Wednesday, July 29, 2026
Homeভৌতিক গল্পসত্যি ভূতের মিথ্যে গল্প - বরেন গঙ্গোপাধ্যায়

সত্যি ভূতের মিথ্যে গল্প – বরেন গঙ্গোপাধ্যায়

সত্যি ভূতের মিথ্যে গল্প – বরেন গঙ্গোপাধ্যায়

সরাইকেলার জঙ্গলে একবার বাঘ শিকার করতে ঢুকেছিলাম। তা বাঘ ফাগ দূরের কথা একটা বেড়াল অবধি চোখে পড়ল না। মাঝখান থেকে কি হল জানিস?

ন’দাদু আমাদের দিকে একবার রহস্যময় চোখে একবার তাকালেন। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে আয়েস করে পা ছড়িয়ে রেখেছিলেন, হাতে একটা গড়গড়ার নল।

আমরা ছেঁকে ধরলাম, কি, কি হয়েছিল দাদু?

আমরা বলতে আমি, পিকলু আর বুবু। দিন কয়েক হল আমাদের পরীক্ষা- ফরীক্ষা শেষ হয়েছে। বই খাতা সব শিকেয় তোলা হয়ে গেছে। সারাদিন টো টো কোম্পানি করে কাটে। সন্ধ্যের পর দাদুর কাছে হামলে পড়ি গল্প শুনতে। ন’দাদু আমাদের গল্পের খনি। কত গল্প যে ওঁর ঝুলিতে লুকনো আছে কে জানে।

—বল না দাদু, কি হয়েছিল?

আবার একবার গড়গড়ার নলে ধোঁয়া টেনে দাদু বললেন, ভূতের পাল্লায় পড়েছিলাম। সে এক ডেঞ্জারাস ব্যাপার।

–ভূতের পাল্লায়। মানে তুমি ভূত দেখেছ দাদু? আমরা আরও ঘন হয়ে বসি।

— দেখেছি কিরে। হা হা করে একগাল হাসলেন দাদু, রেগুলার বুদ্ধি খাটিয়ে ভুতকে কব্জা করে ফেলেছিলাম। বাছারা জীবনে আর আমার পেছনে লাগতে সাহস পাবে না।

ভূতের গল্প শুনতে কার না ভাল লাগে। আমরা নাছোড়বান্দা হয়ে উঠলাম, বল না দাদু, কি হয়েছিল?

বুবু কেমন জবুথবু হয়ে এতক্ষণ বসেছিল। আমরা জানতাম, ভূতের ভয়ে ও সন্ধের পরে বাড়ির বাইরে যেতে চায় না। বললাম, তুই বরং মামনির কাছে যা বুবু, আমরা গল্পটা শুনে নিই।

বুবুর বোধহয় পৌরুষে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমি কেন, তোরা যা না, আমি না শুনে যাব না।

— তুই তো শেষটায় ভয়ে মরবি।

বুবু কি বলতে যাচ্ছিল, দাদু হাসলেন, ভূতকে কখনও ভয় করতে নেই, ভয় করলেই ভূত আরও পেয়ে বসে। ঠিক আছে শোন, গল্পটা বলি।

আমরা দাদুকে প্রায় ছুঁয়ে বসলাম।

আরও একবার গড়গড়ায় তামাক টেনে দাদু শুরু করলেন, তখন আমার কতই বা বয়স। এই তিরিশ বত্রিশ হবে। বুঝলি, ভীষণ ডানপিটে ছিলাম। ঘুষি মেরে নারকেল ফাটাতে পারতাম। দাঁত দিয়ে লোহা চিবোতে পারতাম। তোদের দিদাকে জিজ্ঞেস করিস, জানতে পারবি।

জিজ্ঞেস করার কিছুই ছিল না, দাদুর এখন আশির মত বয়স, এই বয়সেও দাদু ভোর চারটেয় উঠে রোজ ফাঁকা মাঠে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেন। দাদুর সাহস আর শক্তি সম্পর্কে কোনদিনই আমাদের সন্দেহ ছিল না।

পিকলু বলল, ভূতে কি করল বল না দাদু! ভূতের গল্পটা আগে শুনে নিই।

— বলছি, বলছি অত হুড়োহুড়ি করলে চলে? আবার গড়গড়া টেনে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে দাদু শুরু করলেন, তা সে সময় রবার্টসন সাহেবের সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব।

–কে রবার্টসন?

— এই দেখ, রবার্টসন সাহেবের নাম শুনিসনি। একেবারে কোড়া বিলিতি সাহেব রে। ইংরেজী ছাড়া কিছুই জানে না, কাঁটা চামচ ছাড়া খেতে পারে না। তার চলার ভঙ্গি দেখলে তোদের মাথা ঘুরে যেত। তা, সাহেবটা স্টুয়ার্ট কোম্পানীর চাকরী নিয়ে এদেশে আসে। খুব আমুদে লোক। তেমনি মিশুকে। আমার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। তোর দিদা একবার ওকে লাউ চিংড়ি আর মোচার ঘন্ট খাইয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। বিলেতে ফিরে গিয়েও সাহেব সে কথা ভুলতে পারেনি।

তা, সে কথা থাক। সাহেবের খুব শিকারের শখ ছিল। প্রায়ই বলত, কি, যাবে নাকি মুখার্জী?

— কোথায়?

–এবার সরাইকেলার জঙ্গলে যাব ঠিক করেছি। চল না, দুজনে একসঙ্গে গিয়ে একটা বাঘ মেরে আনি।

শিকার টিকারে কোনদিনই আমার তেমন নেশা ছিল না। তাছাড়া জঙ্গলের নিরীহ পশুদের মারা আমি খুব পছন্দ করতাম না। কিন্তু সাহেবের আমন্ত্রণও ফেলতে পারি না। যদি না যাই, সাহেব ভাববে আমি ভীতু। ভয়েই যেতে চাইছি না। বললাম, ঠিক আছে চল।

তৈরী হয়ে নিতে কয়েক ঘন্টা সময়। পায়ে গামবুট পরলাম, মাথায় সাহেবের মত শোলার হ্যাট। পিঠে ছোট্ট একটা হ্যাভারশ্যাক। তাতে সামান্য কিছু ফার্স্ট এড, ছুরি, ব্লেড, দড়ি, রাত কাটাবার মত দু-একটা জামাকাপড়। তার সঙ্গে একটা দোনলা বন্দুক।

— তুমি বন্দুক চালাতে পার? বিস্ময় যেন আমাদের কাটতে চায় না।

দাদু মিটমিট করে একটু হাসলেন, বন্দুক চালান কোন কঠিন কাজ নাকি রে! বন্দুক তো যে কেউ চালাতে পারে। আসলে টারগেটের প্র্যাকটিস কার কত ভাল, তার ওপরেই সব নির্ভর করে। তা, আমার টিপ দেখে সাহেবের চোখও ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল।

সে কথা থাক, দুর্গ দুর্গা করে তো আমরা বেরিয়ে পড়লাম। সরাইকেলার জঙ্গলে এসে সাহেবের সঙ্গে ঢুকেও পড়লাম।

তখনকার সেই সরাইকেলার জঙ্গলের তুলনা নেই। কত হাজার হাজার পাখি। জঙ্গলে ঢুকতেই দুটো বুনো শুয়োরকে দৌড়ে যেতে দেখা গেল। বুনো শুয়োরের জন্য গুলি খরচ করা উচিত নয়। আমি সাহেবের দিকে তাকালাম, সাহেব আঙুল নেড়ে বলল, যেতে দাও।

জঙ্গলের ভেতর কোন রাস্তা নেই। কাঁটা ঝোপঝাড় বাঁচিয়ে কোন রকমে হাঁটতে হচ্ছিল। ওপরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, আকাশ দেখা যায় না। গাছে গাছে আকাশটা একেবারে ঢাকা পড়ে গেছে। ঘড়িতে তখন মাত্র বেলা বারোটা। কিন্তু সূর্যের আলোর হদিশ নেই। এ জঙ্গলে কোনদিন সূর্যের আলো চোকে বলে মনে হয় না।

সাহেব বলল, মুখার্জী, চল আমরা আরও একটু এগোই। আরও ভেতরে না ঢুকলে বাঘের হদিশ পাব না।

জঙ্গল এত ঘন যে একটু গা ছমছম করছিল ঠিকই। কিন্তু সঙ্গে বন্দুক রয়েছে, যে কোন বিপদের জন্য তৈরী হয়েই রইলাম।

হাঁটতে হাঁটতে আরও গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম আমরা। গলা শুকিয়ে এসেছিল। ওয়াটার বটল খুলে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেয়ে নিলাম।

সাহেব বলল, চল মুখার্জী ওই ঢিবিটার ওপর বসে একটু বিশ্রাম করে নেওয়া যাক।

—প্রস্তাবটা খারাপ না। ঠিক আছে, চল।

দুজনে মাটির একটা ঢিবির ওপর হাত পা ছড়িয়ে একটু বসলাম, আর ঠিক সময় হাত পঁচিশেক দূরে সরসর করে কেমন একটা শব্দ

পিকলু হঠাৎ কথা বলে উঠল, কিসের শব্দ দাদু, ভূতের?

—ধুর বোকা। দিনের বেলা ভূত থাকে নাকি। দিনের বেলা ভূতেরা সব ঘুমিয়ে থাকে, রাত হলে ওরা জেগে ওঠে। ভূতেদের ব্যাপারটা মানুষদের ঠিক উল্টো।

তাহলে?

দাদু গড়গড়া টানতে গিয়ে বুঝলেন, আগুন নিভে গেছে। নলটা একপাশে সরিয়ে রেখে হাসলেন, কি হল তারপরে শোন না। শব্দটা একটু পরেই থেমে গেল।

আমরা ততক্ষণে বন্দুক তাক করে তৈরী হয়ে পড়েছি। ঝোপের দিক থেকে জন্তুটা বেরোলেই গুলি করব। কিন্তু জন্তুটার আর কোন সাড়া শব্দ নেই। কি জন্তু তাও বোঝার উপায় নেই। সাহেবের মুখের দিকে তাকালাম।

সাহেবও কিছু বুঝতে পেরেছে বলে মনে হল না।

ফলে, অপেক্ষা করা ছাড়া আর আমাদের উপায় রইল না। খানিকক্ষণ ওইভাবে কেটে গেল, হঠাৎ আবার শব্দ। ঝোপটা আবার একটু নড়ে উঠল। আবার আমরা সতর্ক হয়ে বন্দুক তুললাম। কিন্তু না, আবার শব্দটা থেমে গেল।

বুবু একটু একটু করে আমাকে ঠেলে যেন মাঝখানে এসে বসার চেষ্টা করছিল। বললাম, কি রে ভয় লাগছে?

বুবু ফ্যাকাসে চোখে বলল, তোর ভয় লাগতে পারে, আমার নয়।

বটে। — পিকলু হেসে উঠল, ভীষণ বীরপুরুষ হয়ে গেলি যে!

দাদু বললেন, ভয়ের কি আছে। তারপর কি হল শোন। সাহেব এবার ফিসফিস করে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, মুখার্জী, এখান থেকে জন্তুটাকে ঠিক দেখা যাবে না। আমি ঘুরে ওপাশে যাচ্ছি। তুমি এখানেই পাহারা দাও। এদিক দিয়ে যদি কিছু ছুটে পালায় তুমি গুলি করবে।

সাহেব অভিজ্ঞ শিকারী। ওর কথা মেনে নেওয়াই ভাল। বললাম, ঠিক আছে। আমি বসছি। তবে বেশী দূরে কিন্তু যেও না সাহেব, জঙ্গলে দুজনে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে মুস্কিলে পড়তে হবে।

সাহেব আমাকে ভরসা দিয়ে গুটি গুটি পায় বাঁদিকে খানিকটা এগিয়ে জঙ্গলের মধ্যে মিশে গেল। তারপর আমরা দুজনে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলাম।

অনেকক্ষণ কেটে গেল। সামনের ঝাপের দিকে বন্দুক তাক করে তৈরী হয়ে একা বসে আছি। আর কোন শব্দই নেই। এপাশ ওপাশ তাকালাম, সাহেবের টিকিটিও আর দেখা যাচ্ছে না।

হঠাৎ সেই ঝোপের ভেতর থেকে তিড়িং করে লাফ দিয়ে একটা হরিণ বেরিয়ে এসেই সাঁ সাঁ করে ছুটতে শুরু করল।

আর যায় কোথায়, বন্দুক গর্জে উঠল আমার। কিন্তু আঙুলটা বোধহয় একটু কেঁপে উঠেছিল, হরিণটা প্রাণে বেঁচে পালিয়ে গেল।

হরিণটা পালাতেই সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, রবার্টসন কোথায় তুমি, হরিণ হরিণ।

কিন্তু সাহেবের কোন সাড়া নেই। যাহ্ বাবা! কোথায় গেল লোকটা। কোন বিপদে পড়ল না তো?

আমি আবার চেঁচালাম, সাহেব, ও সাহেব। কোথায় তুমি?

এবারও উত্তর নেই।

ফলে বুঝতে পারছিল, আমার তখন কি অবস্থা। বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে সাহেবের যদি কিছু হয়, লজ্জার আর সীমা থাকবে না। আমি খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম সাহেবকে। ঘড়িতে তখন সন্ধে হয় হয়। জঙ্গলের ভেতর তখন বেশ অন্ধকার জমাট বেঁধে উঠেছে।

আমি আরও কয়েকবার সাহেবের নাম ধরে চেঁচালাম, কিন্তু বৃথাই চেঁচান। বাঘেই ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গেল না তো লোকটাকে? কি যে করি ভেবেই উঠতে পারছিলাম না। অথচ রাত হয়ে গেলে আমারও বিপদ হতে পারে। এখনই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পাহাড়ী বস্তিগুলোতে গিয়ে খবর দেওয়া দরকার। লোকজন সঙ্গে এনে একবার না হয় ভাল করে খুঁজে দেখা যেতে পারে।

ফলে জঙ্গল থেকে বেরোবার জন্য এগোতে শুরু করলাম। কিন্তু তখন রাত্রির মত অন্ধকার চারপাশে, কিছুই দেখার উপায় নেই। ভেবেছিলাম দিনে দিনেই শিকার করে ফিরে যাব, তাই টর্চও আনিনি। কি ভুলই যে করেছিলাম তা বলার নয়।

জঙ্গলের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেললাম। যেদিকে এগোই জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই নেই। মহা দুশ্চিন্তাতেই পড়া গেল। একে এই রাত, তায় গভীর জঙ্গল। বাঘ এসে কখন যে গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কে বলবে।

কিন্তু বিপদে কখনও ভেঙে পড়লে চলে না। মনে সাহস রেখে এগোতে শুরু করলাম। কতক্ষণ যে ওইভাবে কাটল বোঝার উপায় ছিল না। হঠাৎ এক সময় চমকে উঠলাম। জঙ্গলের ভেতরই বেশ দূরে টিমটিম করে আলো জ্বলছে চোখে পড়ল। আলো যখন–নির্ঘাৎ ওখানে লোক আছে। মনে মনে বেশ ভরসা পেলাম। জোরে জোরে পা চালিয়ে দিলাম আলোর দিকে।

বেশ খানিকটা এগিয়ে বোঝা গেল, জঙ্গলের ধারে একটা পোড়োবাড়ি মতন! ভাঙাচোরা। দেয়াল ফুঁড়ে গাছগাছালি গজিয়েছে। সেই বাড়ির সামনের দিকের একটা ঘরেই টিমটিম করে আলো জ্বলছে।

আমি প্রায় ছুটতে ছুটতে বাড়িটার কাছে এগিয়ে এলাম। আর বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে আমি অবাক। দেখি রবার্টসন সাহেব।

—কি ব্যাপার? এখানে? আমি তোমাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান।

সাহেব কেমন অপরাধীর মত তাকাল। আর বলো না মুখার্জী, পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে এই পোড়োবাড়িটা চোখে পড়ে গেল। সঙ্গে একটা মোম ছিল তাই জ্বালিয়ে নিয়েছি। এস, ভেতরে এস। ফাঁকা বাড়ি। রাতটা নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দেওয়া যাবে।

সত্যি ফাঁকা বাড়ি। ঘরের ভেতর প্রচুর ঝুল আর ময়লা জমে আছে। এখানে কেউ যে বাস করে না, তা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু ঘরের মাঝখানে একটা খাট পাতা রয়েছে। রাতটা ওখানেই শুয়ে বসে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। ঘরে ঢুকে বন্দুকটা পাশে রেখে খাটে বসলাম। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা।

সাহেব বলল, বেশ অভিজ্ঞতা হল, তাই না!

—হ্যাঁ, তা তো হল সাহেব। কিন্তু এরকম পোড়োবাড়ি হচ্ছে ভূতেদের আস্তানা। রাতে আবার ঝামেলা না করে।

সাহেব হেসে উঠল, সঙ্গে বন্দুক আছে না। ভূত এগোতে সাহস পাবে না।

আমি মনে মনে হাসি। ভূত যদি খারাপ ধরণের হয়, তাহলে সাহেবের দৌড় দেখা যাবে।

যাই হোক, খাবার দাবার সঙ্গে কিছুই ছিল না। কি আর করি, ঢঢক করে একটু জল খেয়ে খাটে গা এলিয়ে দিলাম। সাহেব মোমবাতির সামনে একটা বই নিয়ে পড়তে বসল। ভালোয় ভালোয় রাতটা এখন কাটলে হয়।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেলে একটু তন্দ্রা মত এসেছিল, হঠাৎ সাহেবের গোঙানীর শব্দ। কি হল? কি ব্যাপার? মোম নেভালে কেন?

খাট থেকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম। ঘরের দরজা জানালাগুলো হা হা করছে খোলা। ওগুলো তো বন্ধ করেই রাখা হয়েছিল। তবে কি সাহেবই খুলে বাহাদুরি দেখাতে গিয়েছিল।

—ও সাহেব, কি হল তোমার?

দরজা জানালাগুলো খোলা বলে অল্প অল্প ভূতুড়ে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল ঘরে। সেই আলোতেই দেখা গেল, সাহেব মেঝেতে উবু হয়ে পড়ে গোঁ গোঁ করছে।

—ও সাহেব। সাহেবকে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভারী লাশ কি টেনে তোলা সম্ভব!

–আহা, কি হয়েছে বলবে তো?

হঠাৎ মনে হল, পাশ থেকে কে যেন খিলখিল করে হেসে উঠেছে। চমকে উঠলাম।

–কে? কে হাসে?

আবার হাসি।

—বটে। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। যদি সাহস থাকে তো বল, কে তুই?

আবার হেসে উঠল সে। হাসতে হাসতেই বলল, কেঁ আমি দেখবি? এই দেঁখ।

নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। দেখি একটা নরকঙ্কাল হাওয়ায় অল্প অল্প দুলছে।

সাহেবও হয়ত এই নরকঙ্কাল দেখেই ভিরমি খেয়েছে। কিন্তু আমি অত ঘাবড়ে যাওয়ার লোক নই। বললাম, চালাকি হচ্ছে না? ভূত সেজে আমাকে ভয় দেখাতে এসেছিস?

—নাঁ গোঁ, আমি সঁত্যিকার ভূত।

–সত্যিকার ভূত। প্রমাণ দেখাতে পারিস?

—কি প্ৰমাণ?

—ঠিক আছে একটা ছোট শিশি নিয়ে আয় দোই। তুই যদি সত্যিকার ভূত হোস, তাহলে আমি যা করতে বলব তাই করে দেখা।

চোঁ করে একটা শিশি এসে আমার পায়ের কাছে পড়ল। শিশিটা তুলে নিয়ে তার ঢাকনা খুলে বললাম, এর মধ্যে যদি সুক্ষ্ম দেহ হয়ে ঢুকতে পারিস তাহলে বুঝব তুই ভূত।

—হুঁ, শিশির মধ্যে ঢুকি, আর অমনি তুই মুখ বন্ধ করে আমায় আটকে রাখবি না! তোর চালাকি আমি জানি!

—ঢুকবি না? দাঁড়া, জোর করে তোকে আমি ঢোকাব।

যেই আমি শিশি হাতে কঙ্কালটার দিকে এগোলাম, অমনি সেই ভূত মাগো বাঁবাগো বলে দে ছুট। ভূত পালাবার সময় চেঁচাতে লাগল, ঢুঁকব না, ঢুঁকব না-

তারপর বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। ভূতের আর সাড়া নেই দেখে আমি মোমটাকে আবার জ্বালিয়ে নিলাম। সাহেবকে মেঝে থেকে টেনে খাটে তুলে শুইয়ে দিলাম। তারপর আবার দরজা জানালা বন্ধ করে সাহেবের পাশে বাকি রাতটা জেগে বসে কাটিয়ে দিলাম।

দাদু থামলেন।

বুবু জিজ্ঞেস করল, সত্যি গল্প?

সত্যি নয় তো মিথ্যে নাকি। দাদু মিষ্টি মিষ্টি করে একটু হাসলেন, ভূতের গল্প কখনও মিথ্যে হয় না রে বোকা। হা হা হা—

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments