Wednesday, July 29, 2026
Homeভৌতিক গল্পফ্রান্সিসের অভিশাপ - শিশিরকুমার মজুমদার

ফ্রান্সিসের অভিশাপ – শিশিরকুমার মজুমদার

ফ্রান্সিসের অভিশাপ – শিশিরকুমার মজুমদার

বসুস্ কিউরিও শপের মালিক পরমেশবাবু প্রমাণ সাইজ আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে একটু অবাক হলেন। মান্ধাতার আমলের জিনিস এটা। একটা স্ট্যান্ডের ওপর এমনভাবে দাঁড় করানো আছে যে ইচ্ছা করলেই আয়নাটাকে সামনে পেছনে হেলান যায়। এপাশে ওপাশে বাঁকানো যায়। এটা যে কোনও সাহেব সুবোর বাড়ির জিনিস তাতে সন্দেহ নেই। পুরো পোশাক পরে বের হবার আগে সাহেবরা নিজেদের সাজ পোশাক এতে ভাল করে দেখে নিত।

অকশন মার্টের কেরানী রামরতনবাবুকে আড়ালে ডেকে পরমেশবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ওহে, ওই আয়নাটার মিনিমাম দাম কত রেখেছ? কতয় ছাড়বে বল তো?

রামরতনবাবু একটু থমকে গেলেন। বললেন, বোসবাবু, ও আয়নাটা আপনি কিনবেন না। আপনি আমাদের পুরনো খদ্দের, আপনাকে সাবধান করে দেওয়া কর্তব্য। ওটা জন সিবাস্টিনের বাড়ির জিনিস।

অবাক পরমেশবাবু বললেন, তাতে কি? সাহেবাড়ির কত পুরনো জিনিসই তো আমি কিনেছি। কিনবও আরো কত। জন সিবাস্টিনের জিনিস হলে তো আরও ভাল। ও তাহলে আসল বেলজিয়াম গ্লাসের আয়না। একশ-দেড়শ বছরের পুরনো হবে।

তা হয়তো হবে–বললেন রামরতনবাবু, সঠিক হিসাব বলতে পারব না। তবে যা শুনেছি, ওই জন সিবাস্টিন লোকটা তেমন ভাল লোক ছিল না। সামান্য টাকার জন্য ও বহু লোকের সর্বনাশ করেছিল। পয়সাও কামিয়েছিল অনেক। কিন্তু সেই পাপের পয়সা সে নাকি বেশি দিন ভোগ করতে পারেনি।

একথা শুনে পরমেশবাবু হাসলেন। বললেন, তাতে কি, লোকটা খারাপ ছিল! পাপ কাজ করত। কিন্তু তা বলে তো তার আয়নায় তার পাপের ছায়া পড়েনি, যে থেকে থেকে তা ফুটে উঠবে। ও আয়না আমি কিনষ। অমন একটা গল্পের নায়কের আয়না, দাও বুঝে বেচতে পারলে অনেক লাভ রাখতে পারব।

নিলামে ওটা নিয়ে তেমন হাঁকাহাঁকি হল মা। নিয়ে নিলেন পরমেশবাবু। চেক লিখে দিয়ে রামরতনবাবুকে বললেন, ওহে, ওটা এখন আমারই। রামু ঠেলাওয়ালাকে দিয়ে কালই ওটা আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিও। ভাল কথা, তুমি যেন তখন কি সব আরও বলতে গিয়ে বললে না মনে হল। এখন বল তো কি রহস্য ঘিরে আছে ওই আয়নাটাকে।

রামরতনবাবু বেশ ভয়ের সঙ্গেই বললেন, কাজটা আপনি ভাল করলেন না। শুনেছি, ওই আয়নাটা ভয়ের। কেন, তা অবশ্য আমি জানিনা। যে বাড়ি থেকে ওটা আনা হয়েছিল, সে বাড়ির এক বুড়ি বলেছিল, ওটা নাকি গত একশ পঞ্চাশ বছর ঘরের এক কোণে ছেঁড়া ময়লা কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। কেউ ওতে মুখ দেখেনি। কারণ বাড়ির সবাই জানে ওটার মধ্যে কি এক ভয়ঙ্কর জাদু আছে, যা কোনও মানুষের ভাল করে না।

পরমেশবাবু বেজায় খুশি হয়ে বললেন, ওহে এই গুজবের কথাটা তুমি ভাল করে ইংরেজীতে লিখে টাইপ করে দাও তো আমাকে। যা খরচ লাগে তা আমি দেব। জান তো, যা কিছু আমি কিনি তা আবার বিক্রি করব বলেই কিনি। আমার কিউরিও শপে দেশ-বিদেশের বহু খদ্দের আসে। অমন একটা আয়নার সঙ্গে জন সিবাস্টিনের নাম, আর এমন একটা গল্প জুড়ে দিতে পারলে ও আয়না আমি পাঁচগুণ লাভে বিক্রি করতে পারব হে। ভাল কথা, ওই জন সিবাস্টিন লোকটাই বা কে ছিল? থাকত কোথায় সে?

মাথা চুলকে রামরতনবাবু বললেন, সে তো কুখ্যাত জলদস্যু ছিল। গঙ্গায় তার দৌরাত্ম্যে এক সময় নৌকো চলাচল নাকি বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল। এ অবশ্য আমার শোনা কথা।

আয়নাটা পরমেশবাবু প্রথমে তাঁর বাছাই ঘরে রাখলেন। রামরতনবাবু কথা রেখেছেন। আয়নার সঙ্গে আয়নার ইতিহাসও কোম্পানীর কাগজে টাইপ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন কল কব্জাগুলো তেল দিয়ে নরম করতে হবে। কাঠের ফ্রেমে পালিশ ধরাতে হবে। তারপর কাচ সাফ করে ওটাকে বিক্রির ধরের মাঝখানে বসিয়ে দেবেন উনি। পাঁচ গুণ নয়, হয়তো বিশ গুণ দামও পেতে পারেন, যদি তেমন কোনও খদ্দের এসে পড়ে।

বুধনকে ডেকে বললেন, ওরে সাবান জল গুলে আগে কাচটা ভাল করে সাফ করে ফেল। তারপর আলি মিস্ত্রিকে খবর দে। আজ রাতের মধ্যেই ওটাকে কেন বার্নিস করে দিয়ে যাক। কাল ছুটির দিন আছে, শো রুমের ভাল জায়গায় রাখলে কালই বিক্রি হয়ে যাবে।

সারা দিন নিলামের ধকল গেছে। তাই ক্লান্ত ছিলেন পরমেশবাবু। ওই একটা আয়নাই তো নয়, আর যে সব মূর্তি, পুরনো ঘড়ি কিনেছিলেন, সেগুলো জায়গা মত সাজাতে লাগলেন। জিনিসগুলো ঠিক জায়গামত রাখার ওপরেও বিক্রি অনেকটা নির্ভর করে; মনে মনে তাই আয়নাটাকে যে কোথায় রাখবেন সে কথাই ভাবছিলেন উনি।

হঠাৎ ও ঘর থেকে বুধনের চিৎকার ভেসে এল, চোর চোর। যেমন আচমকা সে চিৎকার তেমনি হঠাৎই তা আবার থেমে গেল। সে মাত্র ক’সেকেন্ডের জন্য। তারপর বিকট একটা আঁ আঁ চিৎকারের সঙ্গে কিছু একটা পড়ার শব্দ।

চোর চোর শব্দে অবাকই হয়েছিলেন পরমেশবাবু। চারদিক বন্ধ বাড়ির মধ্যে চোর ঢুকবে কি রে? কিন্তু যেভাবে শেষ হল ব্যাপারটা তাতে প্রায় ছুটেই উনি বাছাই ঘরে পৌঁছালেন। কাজের লোক হলধরও ছুটেই এসে হাজির হল। তার চোখে মুখে বেশ আতঙ্ক মাখানো। বাবুকে দেখে সে বলল, কি হল বাবু? বুধন যেন চেঁচাল!

পরমেশবাবু দেখলেন, জলের বালতিটা উল্টেছে। সাবান গোলা জলের মাঝখানে মেঝেতে পড়ে বুধন বেহুস হয়ে গোঁ গোঁ করছে। চারদিক যেমন বন্ধ ছিল, তেমনি আছে। চোরের ব্যাপারটা নেহাতই কল্পনা। কিন্তু বুধনের হল কি? কি দেখে ও অমন অজ্ঞান হয়ে গেল!

ধরাধরি করে ওকে নিয়ে গিয়ে পাখার নিচে বেঞ্চে শুইয়ে দিলেন পরমেশবাবু। ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিলেন চোখে মুখে। ফোন করে দিলেন ডাক্তার বিশীকে তাড়াতাড়ি আসার জন্য।..

জ্ঞান ফিরে পেয়ে বুধন ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই রইল।

পরমেশবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছিল রে বুধন?

কোনও কথা বলল না বুধন। তেমনিভাবেই এদিক ওদিক চাইতে লাগল। তা দেখে অবাক পরমেশবাবু বললেন, চোর এখানে আসবে কোথা থেকে রে? এই আয়নাটা এদিক ওদিক ঘোরে, সামনে পেছনেও হেলে। কাচ সাফ করতে করতে ভুঁই অন্যমনস্কের মত হঠাৎ তোর নিজের ছায়া দেখেই চোর ভেবে অমন চেঁচিয়ে উঠেছিলি। আয়নাটা আবার তোর হাতের ধাক্কায় ঘুরে যেতে চোরটাকে, মানে তোর ছায়াকে আর তুই দেখতে পাসনি। তাই ভয়ে …

কথা শেষ করতে পারলেন না পরমেশবাবু। বুধন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কান্নাভরা গলায় বলল, বাবু ও সীসা ভাল না। ওটা বাইরে ফেলে দিন।

থমকে গেলেন পরমেশবাবু। এ কথার মানে? তবে কি রামরতনের কথাই ঠিক। মনের ভাব চেপে রেখে উনি ধমকে উঠলেন, আয়নার কথা আর তোকে ভাবতে হবে না। ওটা আর্মি নিজেই সাফ করব। যা, তুই তোর ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। হলধর, একে নিয়ে যাও। ডাক্তারবাবু আসছেন দেখতে। যা দাওয়াই লাগে তা আমি দেব। যা, যা, এখন শুয়ে পড় গিয়ে।

হলধর বুধনকে তুলে নিয়ে গেল। ওরা চলে যেতেই হাঁক দিয়ে পরমেশবাবু নতুন কাজের লোক মতিকে ডাকলেন। আয়নাটা তাকেই সাফ করতে বলবেন ভাবলেন। সবার আগে ঘরটাও সাফ করতে হবে।

মতি বুধন আর হলধরের আত্মীয়। ওরাই ওকে কাজে এনেছে। কিউরিও শপের কাজ, খুব বিশ্বাসী চেনাজানা লোক না হলে এটা ওটা সেটা প্রায়ই চুরি যায়। আর চুরি মানেই তো লোকসান।

এই শপের শেষ চুরির ব্যাপারটা অবশ্য পরমেশবাবুকে বেশ ভাবিয়েছিল। একটা শ’চারেক বছরের পুরনো সোনার মোহর। দাম নেহাত কম নয়। তালা লাগানো শো কেস থেকে সেটা একদিন বেমালুম উধাও হয়ে গেল। যা এমনিভাবে যায়, তার আর হদিশ পাওয়া যায়না। সেই থেকেই বুধনের মনে বোধহয় চোরের আতঙ্ক ঢুকেছিল। তার ফলে আয়নায় নিজের ছায়া দেখেই এমন কান্ড বাধিয়েছে।

মতি আসতেই পরমেশবাবু ওকে কি কি কাজ করতে হবে তা বলে দিলেন। নিজেও হল ঘরে গেলেন জিনিসগুলো ফের সাজাতে। তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ডাক্তার বিশীর জন্য অপেক্ষা করতে হবে ওঁকে। ডাক্তার বিশী আবার বেজায় গপ্পোবাজ। আজ তো আবার রুগীর সঙ্গে এমন ঘটনার যোগ দেখে বিরাট গল্পের খোরাক পেয়ে যাবেন। আয়নাটাও না আবার দেখতে চেয়ে বসেন।

হেঁকে মতিকে তাড়াতাড়ি কাজ সারতে বললেন পরমেশবাবু। ওঁর হাঁক শেষ হতেই হুড়মুড় করে মতি এসে হাজির ওঁর সামনে। ও হাঁপাচ্ছে! হাঁপাতে হাঁপাতেই বলল, বাবু, ও সীসা জাদু সীসা। ও সীসা আমি সাফ করতে পারব না। মেঝের জল মুছে দিয়েছি। আমি যাচ্ছি।

অবাক পরমেশবাবু ধমকে উঠলেন, কি বলছিস তুই?

হ্যাঁ বাবু, বলল মতি, ও সীসার ভেতর ছায়া নড়ে।

এ কথা শুনে হেসে ফেললেন পরমেশবাবু। যা ভেবেছেন ঠিক তাই। আয়নাটার অদ্ভুত নড়াচড়ায় ছায়া নড়ছে দেখেই দুই বীরপুরুষ কাত। ভাল জিনিসই কিনেছেন উনি। বললেন, ঘরের মেঝে ঠিকমত সাফ করেছিস তো? সাবান জলের বালতিটা রেখে দিয়ে যা। বাকি কাজ আমি করব।

বালতিটা ফেলেই যেন পালিয়ে বাঁচল মতি। ঘর থেকে বের হতে গিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে কি যেন বলতে চাইল। কিন্তু না বলেই বোকার মত মুখ করে চলে গেল।

হলঘরের জিনিসগুলো সাজানো শেষ হতেই ডাক্তার বিশীর আসার খবর পেলেন উনি। হলধরকে বাকি কাজগুলো দেখতে বলে, হাত মুখ ধুয়ে বসার ঘরে হাজির হলেন।

ডাক্তার বিশী ওঁকে দেখেই হৈ হৈ করে উঠলেন। বললেন, দাদা, দারুণ একখানা গল্প শুনলাম আপনার বুধনের কাছে। ও তো হলফ করে বলেছে আয়নার মধ্যে অন্য আর একজনকে নড়তে দেখেই ও চোর ভেবেছিল। পরে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। ভালই আছে এখন। যা ওষুধ দেবার তা দিয়েছি। রাতে ঘুমোলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দাদা আয়নাটা তো আমাকে একবার দেখতে হচ্ছে। আয়নার মধ্যে ছায়া নড়ে এই তো অদ্ভুত কথা, তার ওপরে সে ছায়া আবার অন্যের। চলুন চলুন ব্যাপারটা না দেখলে শান্তি নেই।

চা দিতে বললেন পরমেশবাবু। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আয়নার নড়াচড়ার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও দিতে চেষ্টা করলেন। বোঝালেন কিভাবে আয়নার ভেতরের ছায়া নড়ে।

সব শুনে খালি চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে ডাক্তার বিশী বললেন, আপনি বলছেন আপনার আয়নাটা এমনভাবে কলকব্জা আর বল বেয়ারিং-এর ওপরে মাউন্ট করা যে তার ফলে ওটাতে একটা জাইরোস্কোপিক মুভমেন্ট ঘটানো সম্ভব। আর তা ঘটছে বলেই মনে হচ্ছে ছায়া নড়ছে। এ না হয় বুঝলাম। কিন্তু ওই অপরের ছায়ার ব্যাপারটাকে কি ব্যাখ্যা দেবেন?

হাসতে চেষ্টা করে পরমেশবাবু বললেন, ওর ব্যাখ্যা একটাই। ভয়ে ভুল দেখা। আয়নায় অন্যের ছায়া নড়বে, একি সম্ভব কথা?

মাথা নাড়তে থাকলেন ডাক্তার বিশী। বললেন, যে ব্যাখ্যাই দিন দাদা, ও আয়না দেখার মত জিনিস। চলুন ওটা নিজের চোখে দেখব। দেখি আমার বেলায় কার ছায়া নড়ে ওর ভেতরে।

হলঘরের দরজার কাছে পৌঁছেছেন ওঁরা, ঠিক তখনি হলঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল হলধর। ওর চোখে মুখে আতঙ্ক। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, বাবু, সত্যি আয়নায় জাদু আছে। মতি কোথায়, মতি? সে আমাদের মুখে চুনকালি মাখিয়েছে। সে বোধহয় বাবু এতক্ষণে পালিয়েছে।

অবাক পরমেশবাবু ধমকে উঠলেন, কি আবোল তাবোল বকছিস? আয়নায় জাদু তো মতি পালাবে কেন?

বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে হলধর বলল, তাইতো বাবু বুঝছি না। আয়নায় স্পষ্ট দেখলাম, মতি চুপি চুপি বাবরের সোনার মোহরটা চুরি করল। একা। হ্যাঁ বাৰু, স্পষ্ট দেখলাম আয়নায়!

কি বলছিস তুই। সে মোহর তো চুরি গেছে আজ থেকে প্রায় তিন মাস আগে। তার ছায়া আজ তুই দেখবি কি করে? ধমকেই বললেন পরমেশবাবু।

ডাক্তার বিশী হেসে জিজ্ঞেস করলেন, এই হলধর, গাঁজা ভাঙ খাও নাকি?

বোকার মত তাকিয়ে রইল হলধর। তারপর কেমন করে যেন বলল, বাবু, নিজের চোখকে তো আর অবিশ্বাস করতে পারি না। স্পষ্ট দেখেছি। মতি কোথায়, তাকে ডাকুন।

ওর কথায় আর তেমন কান দিলেন না পরমেশবাবু। বললেন, মতি গেছে বুধনের ওষুধ আনতে। ফিরলে ধরিস তো তাকে

অ্যাঁ, মতি ওষুধ আনতে গেছে! সর্বনাশ বাবু, সে আর ফিরবে না–বলল হলধর।

না ফিরলে থানায় যাস। বিরক্তিতে কথাগুলো বলে পরমেশবাবু ডাক্তার বিশীকে ডাকলেন, আসুন আসুন, চলুন জিনিসটা দেখাই। খেয়াল করেছেন, এরাই এসব দেখছে। আমি নিজে কিন্তু এখনও কিছুই দেখিনি। দেখব কি করে? ওর নড়াচড়ার ব্যাপারটা যে আমি জানি। জানি, কিভাবে ওর মধ্যে ছায়া নাচে।

হলধরকে ওখানে বোকার মত দাঁড় করিয়ে রেখেই ওঁরা বড় ঘরটায় ঢুকলেন। পরমেশবাবু বললেন, ওটা কিন্তু এ ঘরে নেই ডাক্তারবাবু। ওটা আছে আমার বাছাই ঘরে, ওপাশে। যান, একলা দেখুন গিয়ে। দেখুন, আপনার বেলায় আবার কার ছায়া নাচতে শুরু করে।

হো হো করে হেসে উঠলেন ডাক্তার বিশী। বললেন, মন্দ বলেননি। অমন অ’স্নায় একাই মুখ দেখা উচিত। আপনি দাঁড়ান। আমি দেখে আসি, আমার বেলায় কার ছায়া দেখা যায়।

হাসতে হাসতেই পাশের ঘরে চলে গেলেন ডাক্তার বিশী।

এক মিনিট, দু’মিনিট, তিন মিনিট ওদিকে আর কোনও সাড়া শব্দ নেই। পাঁচ মিনিট পরে পরমেশবাবু মহা অস্বস্তিতে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি হল ডাক্তার বিশী? শেষে কি আপনিও আপনার নিজের ছায়ার নড়াচড়া দেখে ঘাবড়ে গেলেন নাকি? ব্যাপার কি? সাড়া শব্দ নেই কেন?

তবুও কোন উত্তর পেলেন না পরমেশবাবু। মানে? ডাক্তার বিশী তো আর কাজের লোকদের মত কুসংস্কারাচ্ছন্ন নন। তবে কেন উনি অমন থমকে রয়েছেন।

তাড়াতাড়ি ওঘরে ঢুকে জীবনে সব থেকে বেশি অবাক হলেন পরমেশবাবু। আয়নাটার দিকেই মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন বিশী। ওঁর মুখ চোখ যেন রক্তশূন্য। আতঙ্ক, ভয় আর দুশ্চিন্তা নিয়ে দু’চোখ বিস্ফারিত করেই তাকিয়ে আছেন আয়নার দিকে।

কি দেখছেন উনি ওই আয়নাটাতে। তাড়াতাড়ি পরমেশবাবু ওঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। স্পষ্ট দেখলেন, দুটো ছায়াই ফুটে উঠেছে আয়নাটাতে নিজের আর ডাক্তারের। আর কোন কিছুই নেই, তবে?

ডাক্তার বিশীর কাঁধে হাত রেখে ব্যস্ত হয়ে পরমেশবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কি হল ডাক্তার বিশী? আপনিও আয়নায় অপরের ছায়া নড়তে দেখেছেন নাকি? এমন ভূত দেখার মত দাঁড়িয়ে আছেন কেন? দেখুন, দেখুন, আমার আর আপনার ছায়া ছাড়া আয়নাটাতে আর কোন ছায়া নেই।

দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন ডাক্তার বিশী। বললেন, আমাকে আমার গাড়িতে তুলে দিন পরমেশবাবু। বাড়ি যাব। অসুস্থ বোধ করছি।

কি হল আপনার? ব্যস্ত হয়ে পড়লেন পরমেশবাবু। কিন্তু মনের কৌতূহল চাপতে না পেরে বললেন, শেষে আপনিও কি ওদের দলে ভিড়লেন।

উত্তরে তেমনি কাঁপা গলায় ডাক্তার বিশী বললেন, বাড়ি, বাড়ি যাব আমি। ড্রাইভারকে বলে দিন, যেন সোজা আমাকে বাড়ি নিয়ে যায়।

ব্যাপারটা ওখানেই শেষ হল না। মতি ওষুধ নিয়ে ফিরল না। হলধরও আর কিছুতেই ওই আয়নাটা সাফ করতে রাজি হল না। রাত অনেক হয়েছে দেখে কিউরিও শপে তালা দিয়ে কোলাপসিবল গেটটা বন্ধ করে দিলেন পরমেশবাবু। এসব করার আগে অন্তত বার চারেক তিনি নিজে গিয়ে ওই আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। নিজের ছায়াই শুধু নাচতে দেখেছিলেন, তাও যখন উনি আয়নাটা নিজের হাতে নাড়াচ্ছিলেন তখন। তাছাড়া আর কোনও ছায়া দেখেননি আয়নায়।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবলেন পরমেশবাবু। সেই আমেরিকানটাকে কালই খবর পাঠাতে হবে। অন্য কেউ দেখার আগে রে জনসনই দেখুক ওটা। এত সব ঘটনা ওটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তা শুনিয়ে দাঁও মারা যাবে। বেশ খুশি মনেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন।

পরদিন বাইরের ঘরে বসে রে জনসনের চিঠিটা টাইপ করছেন, এমন সময় কোনরকম জানান না দিয়েই এক বৃদ্ধা মেম ঘরে ঢুকে পড়লেন। অবাক পরমেশবাবু কিছু বলার আগে বৃদ্ধা ওঁর সামনের চেয়ার টেনে বসে বললেন, আমার নাম ডরোথী সিবাস্টিন। জন সিবাস্টিনের যে আয়নাটা তুমি কিনেছ, সে সম্বন্ধে কিছু কথা আমি তোমাকে বলতে চাই। তার আগে বলি, ওই কুখ্যাত জন সিবাস্টিন আমারই পূর্বপুরুষ। ঈশ্বর তাঁর আত্মার শাস্তি দিন।

মনে মনে খুশিই হলেন পরমেশবাবু। বললেন, ম্যাডাম, আপনি এসেছেন দেখে খুশি হলাম। একটা কথা বলি, যাই বলুন না কেন ধীরে সুস্থে বলবেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে তা টাইপ করে নেব। বিশেষ করে ওই আয়নাটা আর জন সম্বন্ধে। কথার শেষে তাড়াতাড়ি মেশিনের কাগজ বদল করলেন পরমেশবাবু।

বৃদ্ধা বললেন, আমিই এই বংশের শেষ মানুষ। আমার পর আর কেউই থাকবে না। আমার আর্থিক অবস্থা খারাপ। তাই যে কটা দিন বাঁচব ওই পুরনো জিনিস বিক্রী করেই বাঁচব। সব শেষে বাড়িটা। সে কথা থাক। অকশন হাউসেই জানলাম, আয়নাটা তুমি কিনেছ। তাই তোমার কাছে এলাম।

পরমেশবাবু বললেন, তা তো বুঝলাম। কিন্তু বুঝলাম না আপনি কেন এসেছেন আমার কাছে? দাম চুকিয়ে ক্যাশমেমো নিয়েছি। ওই আয়নার আমিই এখন মালিক। ফেরত চাইলে পাবেন না, তা জেনে রাখুন।

না, না–বললেন বৃদ্ধা, ও আর ফেরত চাই না। ওটা দিয়ে আমি আর কি করব। তবে কি জান, ওই আয়নাটা ঘিরে বিশ্রী লোককথা চালু আছে। আর তা চালু আছে বলেই, আমাদের বংশের মাত্র দু’জন ছাড়া আর কেউ ও আয়নায় মুখ দেখেনি।

— দুজন মুখ দেখেছিল বললেন? তারা কারা?

— প্রথম জন সিবাস্টিন নিজে, আর দ্বিতীয় জন আমার ঠাকুর্দা।

–জন সিবাস্টিন আসলে কি করতেন? অনেক আজেবাজে কথা এরই মধ্যে আমার কানে এসেছে।

–জানি না কি শুনেছেন। তবে তিনি আসলে ছিলেন জলদস্যু। ঠিক কথা বললে বলতে হবে জলদস্যুদের জাহাজের একজন সাধারণ নাবিক। বহু যুগ আগে জাহাজ ছেড়ে এদেশের মাটিতে বাসা বাঁধেন। শুরু করেন দাস ব্যবসা। বাংলার দক্ষিণ থেকে ছেলে মেয়েদের ধরে এনে হাত ফুটো করে বেঁধে চালান দিতেন বিদেশে। বাঙালি দাসদাসীর চাহিদা ছিল ইউরোপে। জন এই ব্যবসাতেই কোটিপত্তি হয়ে যান। তখন নিজেই জাহাজ কেনেন। দাস ব্যবসার সঙ্গে ফের শুরু করে দেন জলদস্যুগিরি? লোকে বলত, তাঁর দয়া মায়া বলতে নাকি কিছুই ছিল না। টাকার জন্য যা খুশী তাই করতেন। শেষে এমন হল, লোকে তাঁর নাম মুখে আনতেও ভয় পেত।

এমন যখন তাঁর অবস্থা, চরের মুখে খবর পেলেন বড় নদীর ধারে এক বিদেশী কুঠি বানিয়ে খুব জাঁকজমক করে বাস করছেন। তাঁর অনেক টাকা। জন সে কুঠি লুঠ করার ব্যবস্থা পাকা করলেন। রাতের অন্ধকারে নদীপথে গিয়ে কুঠি ঘিরে ফেললেন। চারদিক কাঁপিয়ে শেষে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কুঠিবাড়ির ওপর। যারা বাধা দিল, একে একে মরল। বাড়ির মালিক নিজে বন্দুক হাতে সব কিছু রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। পারলেন না। দরজা ভেঙে বীরদর্পে ঘরে ঢুকলেন জন।

তাঁকে দেখে বাড়ির মালিকের স্ত্রী ছুটে গিয়ে এই আয়নাটার পেছনে লুকিয়েছিলেন। মালিক হাতের তলোয়ার ফেলে দিয়ে বলেছিলেন, জন আমাকে তুমি মেরো না। দোহাই তোমার।

এ কথা কিন্তু জনের কানে যায়নি। হাতের তলোয়ারটা আমূল বসিয়ে দিলেন বিদেশীর বুকে। আর্তনাদ করে উঠলেন বিদেশী ভদ্রলোক, জন, জন, এ তুমি কি করলে!

বুকের ওপর পা রেখে তলোয়ারটা টেনে বার করতে গেছিলেন জন, তখন এক ঝলক নজর পড়েছিল হতভাগ্যের ওপর। থমকে গেছিলেন জন। মাটিতে পড়ে ছটফট করছে ওঁরই ছোট বোনের স্বামী, যে ইচ্ছা করেই কোনও সম্পর্ক রাখত না জনের সঙ্গে। তা বলে জন তো তাকে হত্যা করতে চাননি। কি করতে কি হয়ে গেল।

ছোট বোনের স্বামী ফ্রান্সিস, শেষবারের মত চোখ মেলে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, জন, আমার সর্বনাশ করে তুমি যদি বড়লোক হতে পার তো তাই হও। কিন্তু নিজের কথা কি কখনও ভেবেছ? ভেবেছ, কোন নরকে তুমি নেমে যাচ্ছ? তাকিয়ে দেখ ওই আয়নাটার দিকে। নিজকে দেখতে পাধে ঠিকভাবে। কথার শেষে ফ্রান্সিসের মাথা ঢলে পড়ল।

জন সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তাঁর ছায়া পড়েছিল ওই আয়নায়। আতঙ্কে শিউরে উঠেছিল জন। ও কে? ওই আয়নার মধ্যে থেকে ওঁরই দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে। কে ও?

জন তাঁর বোনকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন। পারেন নি, কারণ তিনি কাউকে কিছু না বলেই কোথায় চলে গেছিলেন, আর ফেরেন নি

আয়নাটা জন তাঁর নিজের ঘরেই রেখেছিলেন। কয়েক দিন পরেই সবাই শুনল, রাতের অন্ধকারে জন নিজের ঘরে চেঁচাচ্ছেন। মাঝে মাঝে ভয়ে আৰ্তনাদ করছেন। ঘরময় ছুটোছুটি করছেন। শেষে একদিন রাতে ঘরের দরজা খুলে ছুটে বারান্দায় বার হয়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে ছেলেকে বললেন, শোন, আমার অতীত, ওই আয়নাটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে তাড়া করছে। উঃ কি বীভৎস অতীত!

জন বদ্ধ পাগল হয়ে গেছিলেন। বাড়ি ঘর টাকা পয়সা, জলদস্যুর নৌকো রইল পড়ে, একদিন জন মারা গেলেন।

তারপর থেকে ওই আয়নাটা এ বংশের আর কেউই বহুদিন ব্যবহার করেনি। ওটাকে মোটা কাপড়ে মুড়ে এক পাশে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। ওই আয়নাটার সঙ্গে এ বংশের আদি পুরুষ জনের এই গল্প আমাদের বংশে বরাবর চালু আছে। শোনা যায় আমার ঠাকুর্দা এই বংশের আর্থিক অবস্থা আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন।

তিনি পুলিশে চাকরী করতেন। তখন দেশে বিপ্লবীদের কাজ আরম্ভ হয়েছে। তাঁরা জীবন পণ করে বিদেশী সরকারকে হটাবার চেষ্টা শুরু করেছেন। ঠাকুর্দা তাড়াতাড়ি উন্নতির আশায় ওই সব বিপ্লবীদের পিছু নিলেন। দু-চার জনকে ফাঁসিতেও ঝোলালেন। সরকারে তাঁর খুব নাম ডাক হল। তিনিই আবার নতুন করে ঘরবাড়ি সাজালেন।

একদিন আয়নাটার ঢাকনা খুলে আবার ওটাকে নিজের শোবার ঘরেই নিয়ে গিয়ে রাখলেন ঠাকুর্দা। সবাইকে বললেন, কুসংস্কার উনি মানেন না।

কিন্তু তিনিও সে রাতে ওই আয়নার মধ্যে কি দেখলেন কে জানে! তাঁর আর্তনাদ শুনে সবাই ঘরে গিয়ে দেখল তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন।

জ্ঞান ফিরলে দু-চার কথাই তিনি বলতে পেরেছিলেন। যার মানে, ওই আয়নাটাকে আবার ঢেকে দিতে হবে। এমনভাবে তা করতে হবে যাতে ভবিষ্যতেও আর কেউই ওটাতে নিজের ছায়া না দেখতে পারে। তাঁর মুখে শেষ কথা ছিল, সুজাগড়ের জঙ্গল, সুজাগড়ের জঙ্গল।

সুজাগড়ের জঙ্গনেই তিনি এক বিপ্লবী দলকে কোণঠাসা করেছিলেন বুদ্ধি করে। ভেবেছিলেন তাদের বন্দী করে বিচারে পাঠাবেন। কিন্তু স্থানীয় ইংরেজ সেনাপতি তাঁর কোনও কথা না শুনে গোটা দলটাকে গুলি করে মেরে ফেলেছিল। এ খবর কেউ জানত না। আমরা শুনেছিলাম ঠাকুর্দার এক দুর্বল মুহূর্তে।

সেই থেকেই ওই আয়নাটা বাঁধা অবস্থায় পড়েছিল। নিলামওয়ালাদের ডাকতে তারা বলল, ওসব বুজরুকি তারা মানে না। সব জিনিসের সঙ্গে আয়নাটাও তারা তুলে নিয়ে গেল। একটানা এতক্ষণ কথা বলে বৃদ্ধা থামলেন।

পরমেশবাবু টাইপ মেশিন থেকে আঙ্গুল তুলে বললেন, ধন্যবাদ, গল্প আপনি চমৎকার বলেছেন। আচ্ছা আয়নায় কে ঠিক কি দেখেছিলেন সে সম্বন্ধে কিচ্ছু বলে যাননি?

না। বললেন বৃদ্ধা। জন সিবাস্টিন যে সঠিক কি দেখেছিলেন তা আমাদের বংশের কারও ডায়েরীতে পাওয়া যায়নি। তবে ঠাকুর্দা মারা যাবার আগে যা বলে গেছিলেন, সে কথা ঠাকুরমার ডায়েরীতে পাওয়া যায়। তা তো হুবহু আমি আপনাকে বললাম। আমার মনে হয় আয়নায় তিনি বোধহয় ওই সুজাগড়ের জঙ্গলের ঘটনার দৃশ্যই আবার দেখতে পেয়েছিলেন। আর এর তো একটাই মানে হয়,তাঁর অতীত তাঁকে তাড়া করেছিল।

আবার চুপ করলেন বৃদ্ধা। কিছুক্ষণ কারও মুখে কোনও কথা ছিল না। শেষে পরমেশবাবুই জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন বললেন না তো।

বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কারণ একটাই, ওই আয়নায় ফ্রান্সিসের অভিশাপ লেগে আছে। তার জন্যই ওতে সবার অতীত পাপ ধরা পড়ে। এই পৃথিবীতে পাপী কে নয় বলুন? আমি চাই না অন্য আর কেউ ওই আয়নার জন্য বিপদে পড়ে। ওটা ভেঙে ফেলুন।

হাসেন পরমেশবাবু। বললেন, ম্যাডাম, আমার ব্যবসাই পুরনো জিনিস বেচাকেনা করা, যে সব জিনিসসের অমন চমৎকার অতীত, তা কিন্তু আমাদের ঘরে অনেক টাকা আনে। ওটা আমি ভাঙতে পারব না। তাছাড়া আমি নিজে ওটার সামনে বহুবার দাঁড়িয়েছি। আমার অতীত কিন্তু আমাকে একবারও তাড়া করেনি। বসুন, চা খান। তারপর ট্যাক্সি ডেকে দিতে বলছি, বাড়ি যান। মিছিমিছি আয়না নিয়ে আর চিন্তা করবেন না।

বৃদ্ধা দুঃখই পেলেন। তাতে কিন্তু বিচলিত হলেন না পরমেশবাবু। বৃদ্ধা চলে যেতেই গাড়ি হাঁকিয়ে স্বয়ং রে জনসন হাজির হলেন। এক গাল হেসে বললেন, ওহে বোস, তোমার দেওয়া ভিষ আমার ড্রইং রুমকে একেবারে থারটিন সেঞ্চুরিতে নিয়ে গিয়েছে। থ্যাঙ্কস্। আছে কিছু আর, চমকে দেবার মত?

আয়নাটার কথা বললেন পরমেশবাবু। সমস্ত গল্পই শোনালেন। শেষে বললেন, ওটা অবশ্য ঠিক আর্টের জিনিস হল না। তবে আমাদের ডাক্তার বিশীর ঘটনার পর ওটা নিয়ে আমিও ভাবছি। মনে হল তোমাকে বলি। তাই …

রে জনসন পকেট থেকে চেক বই বের করে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেকে সই করে দিলেন। ড্রাইভারকে ডেকে মালটা তখুনি তুলে নিয়ে যেতে বলে নিজেই গাড়ি হাঁকিয়ে চলে গেলেন। তবে সাহেব চলে যাবার আগেই চেকে টাকার অঙ্কটা পরমেশবাবু লিখিয়ে নিয়েছিলেন। অঙ্কটা ওঁরও আশাতীত।

আয়নাটা লরি চেপে চলে গেল। পরমেশবাবু ভাবলেন, বুধনকে জিজ্ঞেস করলে হয় না সে ঠিক কি দেখেছিল আয়নায়? বুধন, হলধর মতি এরা তো সব নিকট আত্মীয়। হলধর, মতিই বা কি দেখেছিল আয়নায় : জিজ্ঞেস করি করি করেও আর জিজ্ঞেস করা হল না। ক’দিন পরে ইংরেজী কাগজে একটা ছোট্ট খবর নজরে পড়ল ওঁর। ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধের সম্মানিত বীর রে জনসনকে তাঁর ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তিনি আপন রিভলবারের গুলিতে আত্মহত্যা করেছেন। ঘরে একটা বিশাল আয়নার ভাঙা কাচের মাঝে তাঁর মৃতদেহ পড়েছিল। আশপাশের সবাই বলেছে কদিন থেকে রাতে ওঁর ঘরে মাঝে-মধ্যে চিৎকার শোনা যেত। গতকাল গুলির শব্দ হওয়াতে পাড়া প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে। সবার ধারণা ওঁর সাময়িক মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল।’

খবর পড়ে পরমেশবাবু চেয়ারে সোজা হয়ে বসেছিলেন। মতি ধরা পড়েছিল অনেক পরে। বাবরের মোহরটা ও বিক্রি করতে পারেনি। এর আত্মীয় হলধর। ছুটিতে বাড়ি গিয়ে ওটা উদ্ধার করে আনে।

পরমেশবাবু এখনও ভাবেন, তবে কি ডাক্তার বিশী তার চিকিৎসা বিভ্রাটে মৃত কোনও পেসেন্টকে সেদিন আয়নায় দেখতে পেয়েছিলেন? সত্যি যে কি তা আর ওঁর জানা হয়নি। কারণ ডাকলেও ডাক্তার আর ওঁর বাড়ীতে আসেন না আজকাল।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments