Thursday, October 1, 2026
Homeকিশোর গল্পসোনার চাঁপা ফুল - পুণ্ডরীক চক্রবর্তী

সোনার চাঁপা ফুল – পুণ্ডরীক চক্রবর্তী

সোনার চাঁপা ফুল

তখনো দিনের আলো ফোটেনি। পথে-ঘাটে অন্ধকার।

রোজকার মতো খুশি বেরিয়ে পড়েছিল কাজে। এগারো পেরিয়ে খুশি বারোয় পা দিয়েছে।

কাজ বলতে পরের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার বাসনপত্র ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা। ঘর-দোর সাফ সুতরো করা।

অতটুকুন মেয়ের এত পরিশ্রম, কষ্ট চোখে দেখা যায় না।

কিন্তু না করেই বা উপায় কী।

মেঠো পথ ভাঙতে ভাঙতে খুশি শিউলি ফুলের গন্ধ পায়। ওর পা দুটো আপনা থেকে থেমে যায়। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। ইচ্ছে হয় কোঁচড় ভরে ফুল কুড়োয়।

কয়েক পা এগোতেই দূর থেকে ভেসে এল মিষ্টি পাখির ডাক। ইচ্ছে হল গাছের নিচে দুদণ্ড দাঁড়িয়ে সে পাখির ডাক শোনে।

কিন্তু কঠিন বাস্তবের আঘাতে সে ইচ্ছে খান খান হয়ে যায়।

হঠাৎ খুশির মনে হল কেউ যেন তাকে ডাকছে। ঘাড় ঘোরাতে খুশি দেখল তার অনুমান ঠিকই।

এক অপরূপ সুন্দরী কিশোরী। খুশির দিকে তাকিয়ে হাসছে।

খুশি বলল, আমায় ডাকছো ভাই?

সুন্দরী কিশোরীটি বলল, এই কাকভোরে তুমি কোথায় চলেছো?

খুশি বলল, কাজে। কিন্তু তুমি কে? তোমায় চিনলাম না তো?

মেয়েটি বলল, তুমি আমায় চিনবে না। আমি পাশের গ্রামে থাকি। তুমি বুঝি পড়াশোনা কর না?

খুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, না ভাই। পড়াশোনা আমার বন্ধ। আমার তো বাবা নেই। মাও অন্ধ চোখে দেখতে পায়

না। মাকে কে দেখবে বলো?

খুশির কথা শুনে ছলছলিয়ে ওঠে কিশোরীর দুই চোখ দরদী কণ্ঠে বলল, বুঝেছি।, তোমরা বড় গরিব। বড় কষ্ট তোমাদের। তা হোক। যা বললে তাই যদি সত্যি হয় শীঘ্র ভাল ফল পাবে।

এই বলে পুতুলের মতো সুন্দর মেয়েটা চাঁপা গাছের নিচে হঠাৎ করে মিলিয়ে গেল।

পরের দিনই একটা আশ্চর্য বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল।

সেই চাঁপা গাছটার নিচে এসে দাঁড়াতেই কটি পাতা সমেত একটা চাঁপা ফুল পড়ে আছে খুশির নজরে পড়ল।

খুশি ফুলটা কুড়িয়ে হাতে নেওয়া মাত্র চমকে গেল। চাঁপাফুল কিন্তু একি কাণ্ড! এ অসম্ভব! এরকম হয় নাকি!

অবাক কাণ্ড! রূপোর পাতা আর সোনার চাঁপা ফুল! এতো ভাবাই যায় না!

খুশির ইচ্ছে করছিল আশ্চর্য ঘটনাটাকে গ্রামের সবাইকে জানায়। ফুলটাও দেখায়।

খুশির মা মানা করল।

কার কি মনে মতলব আছে বলা যায় না। তার চেয়ে যার জিনিস সে খোঁজ করলে উপযুক্ত প্রমাণ পেলে ফিরিয়ে দিতে কসুর করবে না।

সেদিন দুপুরের দিকে খুশিদের বাড়িতে এক ভিখারিণী এসে হাজির হল। বলল, বড্ড খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে দেবে মা?

নিজেদের আহার জোটে না তার ওপর আবার ভিখারিণী।

খুশি বেচারা মুশকিলে পড়ল। কিযে খেতে দেয় কিছু ঠিক করতে পারে না।

খুশির মা বলল, গেরস্থের ঘর থেকে ফেরানো ঠিক হবে না। তাতে করে গৃহের অমঙ্গল হবে।

মাকে খাইয়ে খুশির খাওয়ার মতো হাঁড়িতে যা ছিল সে-কটা খুশি ভিখারিণীকে বেড়ে দিল। সেদিনটা খুশির প্রায় অনাহারে গেল।

কদিন পর একদিন রাত্রে ঝমঝমিয়ে ঝড়-বৃষ্টি নামল। কাঁচা বাড়ি। তালপাতার ছাউনি। ঝড়-বৃষ্টি নামলে কী হয় তা কারো অজানা নয়।

এরি মধ্যে দরজা ঠেলে একজন ঘরে ঢুকল।

খুশি দেখল সেই ভিখারিণী। অবাক হল। এই ঝড়বৃষ্টির রাতে তুমি?

অসহায় কণ্ঠে সে বলল, ভিক্ষে করতে গেছিলাম বহু দূরে। ফিরতে রাত হয়ে গেল। এদিকে ঝড়-বৃষ্টি নেমেছে। ঘরে ফেরাও যাবে না। আজ রাতটার মতো একটু আশ্রয় দেবে মা?

মহাবিপদ! তাকে রাখে কোথায়। নিজেদেরই মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। যা হোক করে মা-মেয়ে রাত কাটায়।

কী আর করা যাবে। ঝড়-জলের রাতে কেউ আশ্ৰয় চাইলে তাকে তো আর তাড়িয়ে দেওয়া যায় না।

খুশির থাকার জায়গাটা সে রাতে তাকে ছেড়ে দিল।

খুশি একরকম সারারাত্রি জেগে বসে কাটাল।

সকাল হতে ভিখারিণী ওদের মঙ্গল কামনা করে বিদায় চেয়ে নিল।

কিছুদিন কেটে গেছে।

একদিন সন্ধ্যায় সেই ভিখারিণী এসে আবার হাজির হল। কাঁদো কাঁদো স্বরে এবার বলল, ছেলেটার বড় অসুখ। হাতে টাকা পয়সা নেই যে ডাক্তার বদ্যি করব। ভেবে দেখলাম তোমরা একদিন অনাহারে থেকে খেতে দিয়েছ, ঝড়বৃষ্টির ভয়ঙ্কর রাতে তোমরা জেগে বসে কাটিয়ে আমাকে বিছানা ছেড়ে দিয়েছ। আপনজনেরাও এমন সদয় ব্যবহার করে না। তাই তোমাদের কাছে ছুটে এলাম। আমার এই বিপদে তোমরা নিশ্চয় শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেবে না।

ভিখারিণী দম নিয়ে আরও বলল, এও জানি, তোমাদের কেউ সাহায্য করলে ভাল হয়, আর আমি কিনা তোমাদের কাছে সাহায্য চাইছি।

খুশির মা সব শুনে বলল, তার্তে কী হয়েছে? মানুষ তো মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েই থাকে।

হঠাৎ খুশির মনে পড়ল কদিন আগে কুড়িয়ে পাওয়া সেই স্বর্ণচাঁপার কথা। মায়ের গলা জড়িয়ে কানে কানে সে কথাটাও পাড়ল।

অনুমতিও পেয়ে গেল মার।

একছুটে সে ঘরের মধ্যে ঢুকে সেই স্বর্ণচাঁপাটা হাতে করে এনে ভিখারিণীর হাতে তুলে দিয়ে বলল, এটার অনেক দাম। এটা তুমি রাখো। এটা বেচে দিলে তোমার ছেলের চিকিৎসার টাকার অভাব হবে না।

ভিখারিণী এতোক্ষণে স্বমূর্তি ধারণ করল।

ম্যাজিকের মতো পরমা সুন্দরী কিশোরী হয়ে গেল।

এই বিস্ময়কর দৃশ্যে অবাক হল খুশি। এ মেয়ে তো সেই মেয়ে!

কদিন আগে যার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। যে সুন্দরী কিশোরী চাঁপা গাছের নিচে অদৃশ্য হয়ে গেছিল।

পরমা সুন্দরী কিশোরী নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, আমি হলাম ফুল পরী। ফুলের বনে থাকি। ওই স্বর্ণচাঁপা আমারই দেওয়া। ওটা তোমাদের কাছে রাখো। আমি ভিখারিণী সেজে তোমাদের মন পরীক্ষা করছিলাম মাত্র। তোমাদের অতিথী সেবা ও আদর আপ্যায়নে আমি ভীষণ সন্তুষ্ট। এখন

থেকে তোমাদের কোনরূপ দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা থাকবে না।

এই বলে ফুল পরী দরজার বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেল। পরীর কথা মিথ্যে হবার নয়।

সত্যিসত্যি সুখ, শান্তি আর স্বচ্ছলতা নেমে এল খুশিদের সংসারে।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments