Saturday, April 20, 2024
Homeউপন্যাসআট কুঠুরি নয় দরজা - সমরেশ মজুমদার

আট কুঠুরি নয় দরজা – সমরেশ মজুমদার

Table of contents

০১. দুরন্ত গতিতে লাল মারুতিটা ছুটে যাচ্ছিল

দুরন্ত গতিতে লাল মারুতিটা ছুটে যাচ্ছিল।

তখন আকাশে শেষ বিকেলের চোরা আলো পঞ্চাশের রূপসীর হাসির মত অপূর্ব মায়াময়। পাহাড়ি রাস্তার একদিকে পাথরের আড়াল অন্যদিকে আদিগন্ত সেই আকাশ আর আকাশ। রাস্তাটায় আপাতত কোনও বাঁক নেই বলে গতি বাড়ছিল গাড়ির। হাওয়ারা পৃথার শ্যাম্পু ধোওয়া চুলে ঢেউ তুলছিল ইচ্ছেমতন। স্টিয়ারিং-এ বসে স্বজনের মনে হচ্ছিল সে বিজ্ঞাপনের ছবি দেখছে।

হঠাৎ গাড়ির গতি কমে গেল। পৃথাকে বিস্মিত করে ব্রেকে শেষ চাপ দিয়ে স্বজন বলল, ‘এই আমাকে একটু আদর করবে?’

সঙ্গে সঙ্গে দু হাত বাড়িয়ে সমুদ্র হয়ে এল পৃথা। নিজেকে খড়কুটো ভাবতে ওইসময় কী আরামই না লাগে! সব মেয়ে কি পৃথার মত এইরকম আদর করতে পারে! স্বজন কোথায় যেন পড়েছিল অযত্ন অবহেলায় ঈশ্বর জন্মলগ্নেই বাঙালি মেয়েদের শরীর এবং মনে সংকোচ শব্দটাকে এঁটে দিয়েছেন। পৃথা ব্যতিক্রম। তাই আনন্দ।

ঝড় থেমে যাওয়ার পরও যেমন হাওয়ারা বয়ে যায় তেমনি পৃথা বলল, ‘আই লাভ ইউ।’

‘উহু, ওভাবে নয়।’

‘তার মানে?’

‘ওই পাহাড়ের দিকে মুখ করে চিৎকার করো শব্দ তিনটে, পাহাড় আমাকে শোনাবে।’

ঝটপট দরজা খুলে নেমে গেল পৃথা। শূন্য চরাচরে শুধু নীড়ে ফেরা পাখিরাই এখন সঙ্গ দিচ্ছে। কোনও গাড়ি নেই, মানুষ তো বহুদূরের। পৃথা মুখ তুলে শেষ শক্তি দিয়ে যখন শব্দ তিনটে উচ্চারণ করল তখন তার নাভিতে ঈষৎ কুঞ্চন। আর সমস্ত আকাশ গেয়ে উঠল গান, ‘আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ।’

প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সে ঘুরে দাঁড়াল, ‘আর তুমি?’

‘তুমি আমার ভাঙা দাওয়ায় স্বর্ণচাঁপা রাজেন্দ্রাণী!’

‘ফ্যান্টাস্টিক। কার লাইন?’

‘এই মুহূর্তে আমার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীকে চাই না।’ স্বজন গাড়িতে বসেই হাসল।

চোখ বন্ধ করে মুখ আকাশে তুলল পৃথা। স্বজনের মনে এল এক ছবি। ছবির নাম ঈশ্বরী।

ও পাশের আকাশে এখন ধুন্দুমার রঙের খেলা। সূর্যদেব পাটে যেতে বসেছেন। তাঁর বাস এখন পৃথিবীর তলায়। রাস্তার ধারে গিয়েও ঝুঁকে দর্শন পাওয়া যাবে না। আকাশটা কেমন নীলচে হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।

স্বজন ডাকল, ‘উঠে এসো।’।

পৃথা কয়েক পা এগোল, ‘অ্যাই, তুমি সরো, আমি চালাই।’

‘পাহাড়ি রাস্তা। থার্ড গিয়ারেই তোলা যাবে না বেশির ভাগ সময়। ঠিক আছে, চলে এসো, সাধ পূর্ণ করো।’

অতএব লাল মারুতির স্টিয়ারিং-এ পৃথা, পাশের জানলায় স্বজন। পা হাত এবং চোখ জুড়ে যে সতর্কতা তা এখন পৃথাকে নিবিষ্ট রেখেছে। গাড়ি উঠছে উপরে। স্বজন ঘড়ি দেখল, এই গতিতে গেলেও পাহাড় ডিঙিয়ে শহরে পৌঁছাতে রাত আটটা বেজে যাবে। টুরিস্ট লজে একটা ঘর তাদের নামে স্থির করা হয়েছে আগাম। ডান দিকে এখন নদী, অনেক নীচে অদ্ভুত গোঙানি তুলে ছুটে যাচ্ছে। মারুতির চোখ জ্বলেছে এর মধ্যে। আকাশে ধূপছায়া আঁধার ঝুপঝুপ করে চেহারা পাল্টাচ্ছে। সতর্ক হাতে গাড়ি চালাবার সময় পৃথার কথা বন্ধ হয়ে যায়। আর এখন বাঁকের পর বাঁক। দু মাসের বিবাহিত জীবনে এমন সিরিয়াস মুখের পৃথাকে কখনও দ্যাখেনি স্বজন।

বিয়ের পর হনিমুন বলতে যা বোঝায় তা হয়নি ওদের। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রায় সতের ঘন্টাই নিঃশ্বাস ফেলার সময় হয় না স্বজনের। নিজেকে গড়ার সময়গুলো থেকে গত দুইমাস একটুও আলাদা করতে পারেনি স্বজন। আর তাই পৃথা মাঝে মাঝেই ঠোঁট ফোলায়। তাই এবার যখন সিনিয়ার ডেকে বললেন অফারটা নিতে তখন সামান্য দ্বিধা সত্ত্বেও রাজি হয়ে গিয়েছিল সে। এতটা পথ পৃথার সঙ্গে এক গাড়িতে যাওয়া আসা করা যাবে। এক টুরিস্ট লজে চমৎকার আবহাওয়ায় থাকা যাবে। এটা তো বাড়তি লাভ। সে যে তারই একটা কাজের সুবাদে এদিকে আসছে তা পৃথাকেও জানায়নি, জানলে পৃথার আনন্দটা ফিকে হয়ে যেতে পারে।

ডাক্তারি পড়ার সময় থেকেই স্বজনের বাসনা ছিল আর পাঁচজনের মত চেম্বার সাজিয়ে পেশেন্ট দেখবে না দু-বেলা। একটি বিশেষ বিভাগ, যার চর্চা ভারবর্ষে এর আগে তেমন ব্যাপকভাবে হয়নি তাকে আকর্ষণ করেছিল। তখন থেকেই সিনিয়ারের সঙ্গে তার গাঁটছড়া। মাঝখানে বছর দুয়েকের জন্যে জাপানে গিয়েছিল ওই বিষয় নিয়ে বিশদ পড়াশুনা করতে। ফিরে এসে কাজ শুরু করে দেখল তার চাহিদা পাড়ার জনপ্রিয় ডাক্তারবাবুর চেয়ে কম নয়। সতের ঘন্টাই কেটে যাচ্ছে এ ব্যাপারে। ফলে পৃথা অসন্তুষ্ট হতেই পারে। অর্থ আসছে কিন্তু পৃথার কাছে অর্থই শেষ কথা নয়। এ বার ওরা তাকে প্লেন ভাড়া দিয়ে নিয়ে আসতে চেয়েছিল। এয়ারপোর্টে গাড়ি রাখতে চেয়েছিল। পৃথাকে নিয়ে লম্বা পাড়ি দেবার লোভে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গাড়ি চালিয়েই আসছে। পৃথা যেমন জানে না সে চিকিৎসার কারণে পাড়ি দিচ্ছে তেমনই ওরাও জানে না পৃথা সঙ্গে আসছে। স্বজনের ধারণা পেশেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ লোক। তাকে পাহাড় থেকে নামানো যাচ্ছে না। চিকিৎসার জন্য যা যা দরকার তার তালিকা সে পাঠিয়ে দিয়েছে। মানুষটি অবশ্যই বিত্তবান। মাঝখানে তার সিনিয়ার থাকায় এ বিষয়ে বেশি কৌতুহল দেখায়নি স্বজন। এখন কেবলই মনে হচ্ছিল সে যে একটা কাজেই এতদূর এসেছে তা জানলে পৃথা কি ভাবে নেবে? কি ভাবে ওকে ঠাণ্ডা করা যায়!

পাহাড়ের বাঁকগুলো ক্রমশ মারাত্মক হয়ে উঠছে। একটা হাল্কা সরের মত আলো ছড়িয়েছে এখন। গাছেদের পাহাড়ের ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে কখনও সেটা রাস্তায় নেতিয়ে পড়ছে। পেছন থেকে একটা গাড়ির আওয়াজ ভেসে এল। দক্ষ ড্রাইভারের হাতে বেশ জোরেই উঠে আসছে সেটা। সেইসঙ্গে অনেক মানুষের গলার আওয়াজ। লোকগুলো যেন পিকনিক করতে যাচ্ছে। মুখ ঘুরিয়ে স্বজন দেখল একটা বড় ভ্যান উঠে আসছে অনেক লোক নিয়ে। সে পৃথাকে বলল, ‘চওড়া জায়গা দেখে ওকে সাইড দাও।’

চওড়া জায়গা খুঁজে পাওয়ার আগেই ভ্যানটা ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। পৃথা নার্ভাস হাতে স্টিয়ারিং ঘোরাল এবং ব্রেক চাপল। ভ্যানটা জায়গা পেয়ে ছুটে গেল ওপরে এবং সেই সঙ্গে মানুষগুলোর উল্লাস আকাশে পৌঁছে গেল। মারুতি গাড়িটা তখন পাহাড়ের এক ধারে জমানো পাথরের ওপর চাকা তুলে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেছে। পৃথা চিৎকার করে উঠল, ‘বদমাশ!’ সে হাঁপাচ্ছিল।

অ্যাকসিডেন্টটা হতে গিয়েও হল না। স্বজন নিঃশ্বাস ফেলল তারপর পৃথাকে শান্ত করতেই বলল, ‘ওটা খুব নিরীহ গালাগাল।’

‘মানে?’ পৃথা চকিতে মুখ ফেরাল।

‘তোমার স্টকে কি রকম গালাগাল আছে?’

‘ও গড! তুমি ইয়ার্কি মারছ? আর একটু হলেই— ।’

স্বজন দরজা খুলে নামল। গাড়িটা একটা দিকে কাত হয়ে আছে। নামতে গিয়ে দুলিয়ে দিল স্বজন। পৃথাও নেমে এল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হল ক্ষতি তেমন কিছু হয়নি। দুজনে ধরাধরি করে পাথরটা থেকে নামিয়ে আনল গাড়িটাকে। স্বজন বলল, ‘লোকে ঠাট্টা করে বলে মুড়ির টিন। ভারী হলে সারারাত এখানেই বসে থাকতে হত। এবার যদি অনুমতি দাও আমি চালাতে পারি।’

কথা না বাড়িয়ে পৃথা গাড়িটাকে ঘুরে এল এ পাশের দরজায়। এসে নাক টেনে বলল, ‘পেট্রলের গন্ধ পাচ্ছি।’

গন্ধ স্বজনও পেয়েছিল। সামান্য ঠেলতেই দেখা গেল পেট্রল পড়ছে টপটপ করে। গাড়ির পেট্রল ট্যাঙ্কটা ফুটো হয়েছে নিশ্চয়ই। স্বজন অসহায়ের মত জিজ্ঞাসা করল ‘সাবান নেই, না? থাকলে টেম্পোরারি বন্ধ করা যেত।’

‘সাবান! সুটকেসে আছে। নতুন সাবান!’

সঙ্গে সঙ্গে পেছনের সিট থেকে সুটকেশ বের করে রাস্তায় রেখে ডালা খোলা হল। প্যাকেট থেকে সাবান বের করে স্বজন চলে গেল ট্যাঙ্কের গর্ত খুঁজতে। এই নিচু গাড়ির পেট্রল ট্যাঙ্কের তলায় হাত পৌঁছাচ্ছে না তার। অনেক চেষ্টার পর ভিজে একটা উৎস খুঁজে অন্ধকারেই সাবানের প্রলেপ দেবার চেষ্টা করল সে। টর্চ ছাড়া সেটা প্রায় অসম্ভব।

মিনিটখানেক চলার পরেই পৃথা বলল, ‘আবার গন্ধটা পাচ্ছি।’

স্বজন নামল। হ্যাঁ, রাস্তায় পেট্রল পড়ার চিহ্ন ছড়ানো। অর্থাৎ সাবানে কোনও কাজ হয়নি। এই রকম অবস্থায় ট্যাঙ্ক শেষ হবার আগে কিছুতেই শহরে পৌঁছানো যাবে না। সে তাড়াতাড়ি নিজের আসনে ফিরে এসেই গাড়ি চালু করল। যত দ্রুত ওপরে ওঠা যায় ততই বাঁচোয়া। অয়েল ইন্ডিকেটারের কাঁটাটা নীচে নামতে শুরু করেছে। ইচ্ছে করলেই। এই রাস্তায় ষাট কিলোমিটার স্পিড তোলা যায় না।

পৃথা জিজ্ঞসা করল, ‘পৌঁছাতে পারবে?’

‘মনে হয় না। সামনে যদি কোনও পাম্প থাকে—! বেশ জোরেই পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। সারারাত এই রাস্তায় বসে থাকতে হবে দেখছি।’

‘কাছাকাছি কোনও রেস্টহাউস নেই?’

স্বজন হেসে ফেলল। কিন্তু তার চোখ বলে দিল সময় বেশি নেই। পেট্রল পড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি ছোটালে বড়জোর দশ কিলোমিটার যাওয়া যাবে। এখন যতটুকু যাওয়া যায় ততটুকুই লাভ। খানিকটা এগোবার পর প্রাইভেট লেখা একটা বোর্ড তার নজরে এল। পাশ দিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা ওপরে চলে গিয়েছে। একটুও না ভেবে সে গাড়িটাকে ওই রাস্তায় তুলে দিল। ইঞ্জিন খানিকটা আপত্তি করে ওপরে উঠেই প্রায় সমান পথ পেয়ে গেল। দুপাশে জঙ্গল এবং পথটা সরু। মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর হঠাৎ স্থির হয়ে গেল গাড়িটা। পৃথার মুখ থেকে ছিটকে এল, ‘শেষ?’

‘মালুম হচ্ছে।’

‘তুমি এ দিকে এলে কেন? বড় রাস্তায় থাকলে অন্য গাড়ির হেল্প পেতাম।’

‘ভাবলাম কাছে পিঠে কোনও বাড়ি আছে, ব্যাড লাক।’

চারপাশে বড় বড় গাছের জঙ্গল। সরু পথটা ডানদিকে বেঁকে গিয়েছে। স্বজন হেডলাইটটা নিভিয়ে দিতেই অপূর্ব এক আলো ফুটে উঠল চরাচরে। চাঁদ উঠেছে পাহাড়ি আকাশে। গোলাকার চাঁদ নয় ফলে তার আলোয় বিক্রম নেই। গাছেদের শরীরে, পাহাড়ের পাথরে মশারির মত নেতিয়ে আছে কিন্তু অদ্ভুত মায়াময়।

স্বজন বলল, ‘ফ্যান্টাস্টিক।’

পৃথা জানলা দিয়ে দেখছিল। দেখে মুগ্ধ হচ্ছিল। মুখ না ফিরিয়ে সে বলল, ‘এমন চাঁদকেই বোধহয় ঘুমঘুম চাঁদ বলে।’

স্বজন বলল, ‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি, বড় রাস্তায় থাকলে তুমি পরিবেশের সাক্ষী হতে পারতে না। এই, একটা কিসি দেবে?’

‘না। আমি এখন চুপচাপ চাঁদ দেখব।’ পৃথা ঘোষণা করল।

স্বজন এবার জঙ্গলের দিকে তাকাল। অদ্ভুত সব আওয়াজ ভেসে আসছে। পাখি এবং পতঙ্গরা স্বরাজ্যে স্বাভাবিক হয়ে আছে। রাস্তার মুখে প্রাইভেট বোর্ড টাঙানো ছিল। অতএব কাছে পিঠে বাড়ি থাকতে বাধ্য। কতদূরে? নেমে দেখতে হয়।

সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি হাঁটবে?’

‘কোথায়?’

‘আশ্চর্য! এ ভাবে বসে থাকবে নাকি? কাছেই বাড়িটা রয়েছে।’

‘তুমি কি করে জানলে?’

‘থাকাটাই স্বাভাবিক।’ স্বজন গাড়ি থেকে নামছিল।

‘আমি একা বসে থাকব নাকি?’ জানলার কাচ তুলে দিয়ে দরজার হাতলে চাপ দিল পৃথা।

জ্যোৎস্নায় পথ দেখা যাচ্ছে। কয়েক পা হাঁটতে না হাঁটতেই পৃথার গলায় গান ফুটল। মৃদু অথচ স্পষ্ট গলায় সে চাঁদের গান গাইতে লাগল স্বজনের একটা হাত জড়িয়ে। বাঁকটা ঘুরতেই ওরা দাঁড়িয়ে গেল। পরিষ্কার একটা ভ্যালির ওপর ঝকঝকে বাংলোটা ছবির মত দাঁড়িয়ে। দূর থেকেই জ্যোৎস্নামাখা বাংলোটাকে ওদের ভাল লেগে গেল। সামনে একটা লম্বা বারান্দা রয়েছে। কিন্তু কোনও ঘরে আলো জ্বলছে না, জানলার কাচগুলো অন্ধকার।

‘কেউ নেই?’ পৃথার গলায় বিস্ময়।

‘না থাক। দরজা খুলতে পারলেই হল। মনে হচ্ছে এককালের কোনও সাহেবি বড়লোকের গ্রীষ্মাবাস। গাড়িটাকে ওখানে রাখা ঠিক হবে?’

‘চল, ঠেলে বাংলোর সামনে নিয়ে আসি।’

ওরা ফিরল। এখন সমস্যাটা অনেক হালকা বলে মনে হচ্ছে। ঘড়িতে বেশি রাত হয়নি। ওরা গাড়িটার কাছে পৌঁছে ঠেলতে লাগল। হাল্কা গাড়ি, সহজেই চলতে শুরু করল সেটা। বাঁকের কাছে পৌঁছানো মাত্র আওয়াজটা কানে এল। রাগী জানোয়ারের হুঙ্কার। পৃথা চাপা গলায় বলল, ‘কিসের আওয়াজ।’

জীবনে প্রথমবার ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারল স্বজন, ‘চটপট গাড়িতে উঠে বসো।’সে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই পৃথাও পাশের আসনে চলে এল। আওয়াজটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। স্বজন হেডলাইট জ্বালল এবং তখনই একটা প্রমাণ সাইজের চিতা বাঘ গম্ভীর চালে এসে দাঁড়াল যেখানে একটু আগে তারা দাঁড়িয়েছিল। গাড়ির দিকে হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে জন্তুটা।

পৃথা দ্রুত সরে আসার চেষ্টা করল স্বজনের কাছে, ‘আমার ভয় করছে।’

‘কথা বোলো না। আমরা গাড়ির ভেতর আছি।’

‘ওই দ্যাখো, ওটা এগিয়ে আসছে।’

স্বজন দেখল। হঠাৎ মনে হল হেডলাইটের আলো চিতাটাকে রাগী করে তুলতে পারে। স্বজন হেডলাইট নিভিয়ে দিতেই জঙ্গলটা যেন আদিম হয়ে উঠল।বাঘটাকে দেখা যাচ্ছে। গাড়ির দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে পড়েছে। হয় তো আলো আঁধারির রহস্য বোঝার চেষ্টা করছে। একটা রাতের পাখি ট্টিহা ট্টিহা আওয়াজ করে উড়ে গেল।

স্বজন ঘামছিল। এই গাড়িটা যদি একটা ভারী জিপ, নিদেন পক্ষে অ্যাম্বাসাডার হত তা হলেও কিছুটা নিরাপদ বলে মনে করা যেত। মারুতির শরীরটাকে চিতা খেলনা বলে মনে করতে পারে। যদিও কাছে আসার পর চিতাটাকে বেশি বড় বলে মনে হচ্ছে না তবু স্বস্তি পাওয়ার কোনও জায়গা নেই। স্বজন শরীরে চাপ অনুভব করল। পৃথা গিয়ার টপকে তার বুকের কাছে চলে এসেছে। ওর শরীরের মিষ্টি গন্ধ এখন সর্বাঙ্গে টের পাচ্ছে সে। পৃথার মুখ দেখার চেষ্টা করল সে। ভয়ে সাদা হয়ে গিয়েছে পৃথা। সে পৃথার মাথায় হাত বোলাল, ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’

‘তুমি কি করবে?’

‘মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলব তুমি আছ আমি আছি।’

‘আঃ। ভালো লাগছে না। দ্যাখো, আসছে!’

চিতাটা এবার দুলকি চালে হেঁটে আসছিল। আলতো লাফে গাড়ির বনেটের ওপর উঠে দাঁড়াল। বিশাল মুখ খুলে হাই তুলল। ও যখন বনেটের ওপর উঠল তখন গাড়িতে যেন ভূমিকম্প হল। এবার চিতাটা উঠে গেল ছাদে। স্বজন ওপরে তাকাল। ছাদটা যেন সামান্য নিচু হয়ে গেল। পেছন দিকে নেমে গেল চিতাটা। তারপর হঠাৎই ছুটে এসে ধাক্কা মারল পৃথার জানলায়। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা ছিটকে সরে গিয়ে একটা গাছের গুঁড়িতে আটকে স্থির হল। পৃথা চিৎকার করে উঠল। আর স্বজন দ্রুত বলে উঠল, ‘দরজা লক্ করো, তাড়াতাড়ি।’

হুড়মুড়িয়ে পৃথা দরজার দিকে সরে গিয়ে লক হাতড়াতে লাগল। জানলার ওপাশে চিতার মুখ। কয়েক সেকেন্ড লক্‌টাক খুঁজে পাচ্ছিল না পৃথা। শেষপর্যন্ত পেয়ে সেটাকে চেপে দিয়ে দু হাতে মুখ ঢাকল। চিতাটা সরে গেল খানিকটা তারপর লাফ দিল। মাথার ওপর দড়াম শব্দটা যেন বোমা ফাটার চেয়েও ভয়ঙ্কর। গাড়ির ছাদটা যে অনেকটা বসে গিয়েছে তা সহজেই বুঝতে পারল স্বজন। এই গাড়ি বেশিক্ষণ চিতাটাকে সামলাতে পারবে না। এখনও কাচে আঘাত করার বুদ্ধি ঢোকেনি চিতার মাথায়। সেটা করলেই তাদের সব আড়াল শেষ।

রাজকীয় ভঙ্গিতে চিতাটা নেমে এল বনেটের ওপর। তারপর চার পা গুটিয়ে উইন্ডস্ক্রিনের দিকে মুখ করে বসল। একেবারে দেড় হাতের মধ্যে চিতার মুখ। একটা থাবা ছুড়লেই কাচটা ভেঙে যাবে। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওদের দুজনের শরীর খুঁজে পাবে না কেউ। একটা কিছু করা দরকার। এ ভাবে চুপচাপ ওর শিকার হওয়ার কোনও মানে হয় না। চিতাটা জ্বলজ্বল চোখে এখন পৃথার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু যদি নড়াচড়া দেখতে পায় তা হলেই আক্রমণ করবে। অতএব যেটুকু সময় পাওয়া যায় ততটুকুই জীবন। খালি হাতে এই জন্তুটার সঙ্গে লড়াই করার কোনও সুযোগই নেই। গাড়িতে কোনও অস্ত্র নেই। শুধু, হ্যাঁ, একটা লম্বা স্ক্রু-ড্রাইভার রয়েছে। ওটা নিয়ে কিছুই করা যাবে না।

বসে থাকতে চিতাটার যেন ঝিমুনি এল। থাবার ওপর মুখ রেখে সে চোখ বন্ধ করল। আরও একটু সময় পাওয়া যাচ্ছে তা হলে! এইভাবে শিকার সামনে রেখে চিতাটা ঘুমাচ্ছে কেন? স্বজনের মনে হল প্রাণীটা খুব একা। এবং বেশ খিদে পেয়েছে। অনেকদিন পরে দুটো ভাল খাবার পেয়ে সামনে রেখে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছে মেজাজ করে খাবে বলে। সে আড়চোখে পৃথার দিকে তাকাল। পৃথা সেই একই ভঙ্গিতে সিটে হেলান দিয়ে পড়ে আছে। ও কি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে?

হঠাৎ কাছাকাছি একটা শব্দ হতেই চিতাটা চকিতে মুখ তুলল। ঘাড় ঘুরিয়ে শব্দের উৎস খুঁজল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল। স্বজনের মাথায় সেই মুহূর্তে চিন্তাটা চলকে উঠতেই হাত চলে গেল সুইচে। সঙ্গে সঙ্গে মারুতিটা ঘড়ঘড় করে আওয়াজ তুলল বনেট কাঁপিয়ে। আর সেই শব্দ পায়ের তলায় পেতেই চিতাটা লাফ দিয়ে পাশের জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। প্রাণীটিকে এই প্রথম ভয় পেতে দেখল স্বজন। সে ক্রমাগত ইঞ্জিন চালু করার চেষ্টা করে যেতে লাগল। পেট্রলের অভাবে গাড়িটা নড়ছিল না এতটুকুও। সে হেড লাইট জ্বেলে দিল। ব্যাটারি ডাউন হোক সে শব্দ করে যাবে।

‘কি করছ?’ ফ্যাসফেসে গলায় পৃথা জিজ্ঞাসা করল।

‘চুপ করো।’

মিনিট তিনেক আওয়াজ করার পর স্বজন থামল। চিতাটা আর সামনে আসেনি। হয়তো ঝোপের আড়ালে বসে লক্ষ করে যাচ্ছে। এতক্ষণে পেছনের আসনে নজর দেবার অবকাশ পেল স্বজন। দুটো সুটকেশ রয়েছে সেখানে। একটা সুটকেশ হাত বাড়িয়ে তুলে নিল সে। ভেতরে অপারেশন করার যন্ত্রপাতি রয়েছে। এ গুলো দিয়ে চিতা মারার কথা পৃথিবীতে কেউ কল্পনা করেনি।

হঠাৎ পেছনে একটা তীব্র ধাক্কা লাগল। এবং সেই সঙ্গে চিতার গর্জন। আর সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগল গাড়িটা। চটপট স্টিয়ারিং ধরে ফেলল স্বজন। চিতাটা ধাক্কা দিচ্ছে পেছন থেকে। সেই ধাক্কার তীব্রতায় গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। বাঁক ঘোরাতেই ভ্যালির মুখে এসে পড়ল গাড়িটা। এবার স্বাভাবিক নিয়মেই নীচের দিকে গড়িয়ে চলল অনায়াসে। ব্রেকে পা নয়, শুধু স্টিয়ারিং কন্ট্রোল করে গাড়িটাকে বাংলোর সামনে নিয়ে এল স্বজন। এতটা পথ পেট্রল ছাড়াই তারা যেভাবে গাড়িটাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিল তার থেকে অনেক দ্রুতবেগে পৌঁছাতে পারল। ব্রেকে চাপ দিয়ে গাড়ি থামিয়ে পেছনে তাকাল স্বজন। চিতাটা দূরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়েই বোধহয় এ দিকে তাকিয়ে আছে। এক মিনিট দু-মিনিট, শেষ পর্যন্ত ফিরে গেল সেটা জঙ্গলে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেও তার কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।

স্বজন তাকাল পৃথার দিকে, ‘দৌড়াতে পারবে?’

‘দৌড়াবো?’

‘এক দৌড়ে বারান্দায় চলে আসবে আমি বলা মাত্র।’

‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’

‘ওই দরজাটা খুলতেই হবে।

‘কি করে খুলবে? তোমার কাছে তো চাবি নেই। আর ওটা যদি ফিরে আসে?’

‘এলে আসবে। এ ভাবে মরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। সুযোগ নিতেই হবে।’ বলতে বলতে স্ক্রু-ড্রাইভারটা হাতে নিয়ে দরজা খুলে নিচু হয়ে গাড়ির সামনেটা ঘুরে বারান্দায় চলে এল সে। একবার পেছন ফিরে দেখল ঢালু মাঠটায় কোনও প্রাণী নেই। দরজায় বড় তালা ঝুলছে। দ্বিতীয় দরজায় চলে এল সে। ভেতর থেকে বন্ধ। ওপরের কাচে সজোরে আঘাত করতেই সেটা ভেঙে পড়ল। হাত ঢুকিয়ে ছিটকিনি নামাল সে। এবার দরজা খুলল। সে চাপা গলায় ডাকল, ‘এসো।’

পৃথা দরজা খুলতে গিয়ে হতভম্ব, ‘দরজা খুলছে না।’

স্বজন দূর থেকেই বুঝল চিতার আঘাতে দরজাটা বেঁকে গিয়েছে। সে পৃথাকে তার দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখল। দৌড়ে দরজার কাছে পৌঁছানো মাত্র মনে হল একটা আগুনের তীর ছুটে আসছে জঙ্গল থেকে। তাড়াতাড়ি পৃথাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করল স্বজন। ছিটকিনি তুলে দিয়ে সে বড় নিঃশ্বাস ফেলতেই ধেক্‌ করে গন্ধটা নাকে এল। পৃথা অন্ধকার ঘরে স্বজনের কাছে সরে এসে বলল, ‘কী বিশ্রী গন্ধ!’

বাইরে চিতাটা তখন গাড়িটার ওপর গর্জন করছে।

পৃথাকে জড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতরে স্বজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। ডাক্তার হিসেবে সে জানে এ গন্ধ মানুষের শরীরের। পচে যাওয়ার পরেই এমন তীব্র হয়।

০২. শহরের একপ্রান্তে বিশাল প্ৰাসাদ

শহরের একপ্রান্তে এই বিশাল প্রাসাদটিকে লোকে এড়িয়ে যায়। ওই বাড়ির ভেতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে যাকে নিয়ে যাওয়া হয় তার অস্থি নিতে আত্মীয়দের যেতে হয় শ্মশানে। সেই দাহ দেখতেও দেওয়া হয় না, কারণ ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢোকানোর পরই আত্মীয়দের কাছে যেতে দেওয়া হয়। বাড়িটার বয়স একশ বছর। ব্রিটিশরা কেন বানিয়েছিল তা নিয়ে অনেক গল্প চালু আছে। আপাতত এটি রক্ষীবাহিনীর মূল কার্যালয়।

পুরো বাড়িটাই পাহাড় কেটে বসানো। দশহাত লম্বা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ঢোকার দরজা একটাই। তারপর বিশাল চাতাল। সেখানে কুকুরের মত ওত পেতে বসে আছে জিপগুলো। যে-কোনও মুহূর্তে সংকেত পেলেই ছুটে যায় ড্রাইভার।

দোতলার একটি ঘরের সামনে অফিসাররা একে একে পৌঁছে গেলেন। ঘরের দরজা বন্ধ। পুলিশ কমিশনার জরুরি তলব দিয়েছেন। তিনি মিটিং করবেন। এমন ব্যাপার সচরাচর হয় না। সি পি কারও সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করেন না। তাই আজ তলব পেয়ে প্রত্যেকেই একটু নার্ভাস।

পুলিশ কমিশনার ভার্গিসের শরীরটা বেশ ভারী। মুখটা বুলডগের মত বলে মনে করে না নিন্দুকেরা। তাঁকে কেউ কখনও হাসতে দ্যাখেনি। যে সি পিকে হাসতে দেখবে তাকে এক বোতল স্কচ উপহার দেওয়া হবে বলে জুনিয়ার অফিসার ক্লাবে একটা ঘোষণা রয়েছে। অবশ্যই গোপন ঘোষণা এবং এখনও পর্যন্ত পুরস্কারের দাবিদার পাওয়া যায়নি।

ঠিক সময়ে দরজা খুলে গেল। অফিসাররা বিরাট ঘরে ঢুকে দেখলেন সি পি জানলায় দাঁড়িয়ে নীচের চাতাল দেখছেন। তাঁর চওড়া পিঠ এবং মাথার পেছনের টাক দেখা যাচ্ছে। গম্ভীর গলায় হুকুম এল, ‘সিট ডাউন জেন্টলমেন।’

অফিসাররা বসলেন। দুজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার, চারজন ডেপুটি। মাঝখানে বড় টেবিল, টেবিলের ওপাশে দামি চেয়ার।

পকেট থেকে একটা চুরুট বের করে তার একটা প্রান্ত দাঁতে কাটতে কাটতে সি পি ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘আমার দুর্ভাগ্য কি তোমরা জানো?’

অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনারদের মধ্যে যিনি সিনিয়ার তিনিই জবাব দেবার অধিকারী। কিন্তু জবাবটা তাঁরও জানা ছিল না। সি পি নিজের চেয়ারে এসে সময় নিয়ে চুরুট ধরালেন। ঘরে দেওয়াল ঘড়ির আওয়াজ ছাড়া কোনও শব্দ ছিল না।

এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে সি পি বললেন, ‘একপাল নিরেট গর্দভকে নিয়ে আমাকে কাজ করতে হচ্ছে। সোম, তুমি কথাটা স্বীকার করো না?’

অপমানটাকে হজম করে নেওয়া এখন অভ্যেসে চলে এসেছে। সোম ঠোঁট চেটে নিলেন, ‘স্যার, আমরা চেষ্টা করছি।’

‘চেষ্টা? ওঃ, আমি অনেকবার বলেছি আমার চাই এন্ড প্রোডাক্ট। তুমি অনেক চেষ্টা করে যদি জিরো পাও তাহলে আমি তোমাকে বাহবা দেব না। তোমাদের তো মজা, খাচ্ছ দাচ্ছ আর ক্লাবে গিয়ে ফুর্তি করছ। অসহ্য।’

সোম বললেন, ‘আমার বিশ্বাস চিতা আর বেশিদিন বাইরে থাকবে না।’

‘কিসে তোমার এই বিশ্বাস এল সোম?’

‘আমরা চারপাশ থেকে ওকে ঘিরে ফেলেছি। পাশের পাহাড়টাতেই ওকে থাকতে হয়েছে। এই শহরে ঢুকতে গেলে ওকে অনেকগুলো পুলিশ-চৌকি পেরিয়ে আসতে হবে। এবার আর সেটা সম্ভব নয়।’ গম্ভীর গলায় বললেন সোম।

‘পাশের পাহাড়ে চিতাটা আছে আর তুমি এখানে বসে কেন?’

‘স্যার, অতবড় পাহাড় জঙ্গলে চিরুনি অপারেশন চালাতে গেলে যে ফোর্স দরকার তা আমাদের নেই। ও সহজেই পালিয়ে যেতে পারে।’

‘ধরো ও এল না, এই শহরেই ঢুকল না, তাহলে?’

‘এখানে না এসে ও পারবে না স্যার!’

‘কেন?’

‘এখানকার মানুষ ওকে ভালবাসে।’

‘কে বলল?’

‘এটাই খবর।’

‘পরশুদিনের উৎসবে কত লোক শহরে জমবে?’

‘এক লক্ষ দশ, এমন অনুমান করা যাচ্ছে।’

‘তার মানে প্রায় প্রতিটি রাস্তায় লোক থিকথিক করবে।’

‘উপায় নেই স্যার। ধর্মীয় উৎসব, বন্ধ করা যায় না।’

‘আর সেই জনসমুদ্রে যদি তোমার চিতা মিশে থাকে তুমি তার ল্যাজও ছুঁতে পারবে না। এই পরশুদিনটার কথা ভেবে আমার ঘুম চলে গিয়েছে। কখন কোন দিক থেকে আক্রমণ হবে কেউ জানি না।’

দ্বিতীয় অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার উশখুশ করছিলেন। নীরবে সোমের অনুমতি নিয়ে তিনি বললেন, ‘স্যার, একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, গত একমাস চিতা চুপচাপ আছে।’

‘বেশ তো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও। যে কোনও স্তব্ধতা মানে বড় আক্রমণের প্রস্তুতি। আমি অনেকবার ভেবেছি লোকটাকে সবাই চিতা বলে কেন!’

সোম বললেন, ‘ও চিতার মত ধূর্ত, তাই।’

সি পি ঠোঁট মুচড়ালেন, ‘তোমরা কেউ চিতা দেখেছ?’

‘হ্যাঁ স্যার। পাশের জঙ্গলেও একটা চিতা আছে। লোকে অবশ্য তাকে পাগলা চিতা বলে থাকে।’ সোম জানালেন।

‘আটবছর পরে যখন আমি অবসর নেব তখনও তোমার এক বছর চাকরি থাকার কথা। তুমি সি পি হলে ফোর্সের অবস্থা কিরকম হবে তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। সোম, চিতা একটি বিরল প্রাণী। যাদের লোকে চিতা বলে তারা ছোট সাইজের বাঘ। লেপার্ড। চিতা নয়। শুধু মুখের দাগে নয় ওর চালচলনই আলাদা। পৃথিবীর সর্বত্র চিতা কমে আসছে। আমি প্রমাণ করতে চাই তোমাদের এই লোকটি লেপার্ড হলেও হতে পারে, চিতা নয়। গত তিনবছরে ও কটা খুব করেছে?’

সোম বললেন, ‘বাইশটা। সবগুলো অবশ্য ও নিজে নয়।’

‘পুলিশের একজন সেপাই কিছু করলে জবাবদিহি আমাকে দিতে হয়। আর আমরা ওদের কজনকে ধরতে পেরেছি? তিনজনকে। ধরামাত্রই আত্মহত্যা করেছে তারা। কি সুন্দর লড়াই। তুমি যদি চিতা হতে আর পরশুদিন উৎসব থাকত তাহলে কি চুপচাপ বসে থাকতে? সুযোগ নিতে না?’

ঢোক গিললেন সোম, ‘হ্যাঁ স্যার।’

‘সেক্ষেত্রে অবশ্য আমি তোমাকে ছারপোকার মত পিষে মারতাম। কিন্তু ওই লোকটাকে পারছি না। তিন বছর ধরে ও আমাকে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে আর সেটা সম্ভব হচ্ছে তোমাদের মত ইট মাথার তোক ফোর্সে আছে বলে। দশ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করার পর কটা খবর এসেছে?’

‘তিনটে। তাও টেলিফোনে। তিনটেই ভুয়ো খবর।’

‘এই শহরের লোকের কাছে তাহলে দশ লক্ষ টাকার চেয়ে ওই বদমাসটা বেশি মূল্যবান। তখন তো বলেছিলে ঘোষণা করার তিনদিনের মধ্যে খবর পাওয়া যাবে। শোনো, তোমাদের স্পষ্ট বলছি পরশুদিন ওকে আমার চাই-ই।’

‘পরশুদিন?’ সোম বিড়বিড় করলেন।

‘হ্যাঁ। পরশুদিন ও এই শহরে আসবেই। শহরের সব রাস্তায় চব্বিশঘন্টা পাহারা বসাও। দশ লক্ষ টাকার কথা প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর মাইকে ঘোষণা করা হোক। শুনতে শুনতে মানুষের নার্ভে যেন আঘাত লাগে। সি পি কথা শেষ করামাত্র টেলিফোন বাজল।

খুব বিরক্ত মুখে তিনি রিসিভার তুলে হ্যালো বললেন। ওপাশ থেকে কিছু শোনামাত্র সকলে দেখল সি পি সোজা হয়ে বসলেন।

‘ভার্গিস?’

‘ইয়েস সার।’

‘এইমাত্র আমাকে জানানো হয়েছে তুমি মাত্র তিনদিন সময় পাচ্ছ। এই তিনদিনের মধ্যে যদি তুমি পাহাড়ি চিতাটাকে খাঁচায় না ভরতে পারো তাহলে প্রমোশনের সময় যে রেজিগনেশন লেটারটা আমাকে দিয়েছিলে তাতে তারিখ বসিয়ে নেওয়া হবে। মনে রেখো, মাত্র তিনদিন অপেক্ষা করবেন তাঁরা।’ খুব ঠাণ্ডা গলায় শব্দগুলো উচ্চারিত হল। ভার্গিস কেঁপে উঠলেন। ভাঁর গলা জড়িয়ে গেল, ‘স্যার! তিনদিন খুব অল্প সময়।’

‘তিনদিন মানে তিনদিন। তুমি জানো আমাকে কাদের কথা শুনতে হয়। কাজ না হলে আমার কাছে তুমিও যা সোমও তা।’ লাইনটা কেটে গেল। এমন গলায় অনেকদিন কথা বলেননি মিনিস্টার। লোকটার অনেক উপকার করেছে ভার্গিস। টাকা পয়সা থেকে মেয়েমানুষ কি পাঠায়নি? অথচ আজ একদম অন্য গলা? যারা মিনিস্টারকে নির্দেশ দিয়েছে তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটা অনুমান আছে ভার্গিসের, হাতে প্রমাণ নেই। এখন বিশ্বাস হল, তাঁর মত মিনিস্টারের লেখা তারিখবিহীন পদত্যাগপত্র ওদের হাতে এসেছে।

রুমালে ঘাম মুছলেন ভার্গিস। তাঁর চোখ এবার সসামের দিকে। হারামজাদা নিরীহ মুখে তাকিয়ে আছে কিন্তু মনে মনে জানে তিনি যত নাজেহাল হবেন তত ওর সামনে সি পির চেয়ার এগিয়ে আসবে। আসাচ্ছি! তিনদিনের মধ্যে এই হুতোমটাকে ফাঁসাতে হবে।

নিঃশ্বাস ফেললেন ভার্গিস! এরা কেউ নিশ্চয়ই বুঝতে পারেনি ওই টেলিফোনটা কে করেছিল এবং কি বলেছে। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাঁটু কাঁপছিল; ‘জেন্টলমেন, আমি তিনদিন সময় দিচ্ছি। সেভেনটিটু আওয়ার্স। এর মধ্যে ওকে খুঁজে বের করতে হবেই। নো এস্কিকিউজ’।

‘ভার্গিসকে উঠে দাঁড়াতে দেখে অফিসাররা চেয়ার ছাড়লেন। ওঁদের মুখগুলো শুকিয়ে গিয়েছিল। সোম বলতে চেষ্টা করলেন, ‘স্যার তিনদিন— ।’

তাঁকে কথা শেষ করতে দিলেন না ভার্গিস, ‘ওটাই হুকুম।’

অফিসাররা বেরিয়ে গেলেন। আধঘন্টার মধ্যে সমস্ত শহর জুড়ে পুলিশ তাণ্ডব শুরু করে দিল। মাইকে ক্রমাগত দশ লক্ষ টাকার কথা ঘোষণা করা হচ্ছিল। ভার্গিস তাঁর অফিসের পাশের দরজা খুলে করিডোর দিয়ে হেঁটে চলে এলেন নিজস্ব বাসভবনে। বিলাসের সমস্ত ব্যবস্থা এখানে। তিনি বিয়ে করেননি। যৌবনে কোনও নারী তাঁকে স্বামী হিসেবে বরণ করার কথা ভাবেনি না তিনি সময় পাননি এ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে।

সোফাতে গা এলিয়ে দিয়েও ভার্গিস স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। মিনিস্টারের কাছে তিনি এবং সোম একই পর্যায়ের, একথা মন থেকে সরাতে পারছিলেন না। তিনদিন বড় কম সময়। তিনদিনে কিছু হবার সম্ভাবনাও তিনি দেখছেন না। আর এমনি এমনি দিনগুলো কেটে গেলে চতুর্থদিনে এই ইউনিফর্ম খুলে ফেলতে হবে। আর সেরকম হলে তিনি অবশ্যই এই শহরে থাকবেন না অবশ্য সেরকম হবার কথা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারছেন না। হঠাৎ তাঁর মাদামের কথা মনে এল। এই শহরের সবচেয়ে দামি মহিলা। পৃথিবীর কেউ জানুক বা না জানুক ভার্গিস জানেন মিনিস্টারের টিকি ওঁর কাছে বাঁধা আছে। ভার্গিস নিজস্ব লাইনে টেলিফোন করলেন ম্যাডামের বিশেষ নম্বরে। দু’বার বাজতেই ম্যাডামের গলা পাওয়া গেল, ‘কে?’

‘নমস্কার ম্যাডাম। আমি ভার্গিস বলছি।’

‘ও ভার্গিস। আমি তোমার জন্যে দুঃখিত।’

‘আপনিও খবরটা জানেন?’ ভার্গিস অবাক।

হাসির শব্দ বাজল, ‘আপনিও মানে?’

‘সরি। ম্যাডাম, আমি অতীতের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই না কিন্তু আজ আপনার কাছে একটু সাহায্য আশা করতে পারি না?’

‘লোকটাকে ধরে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।’

‘এখনও সেটাই সম্ভব হয়নি।‘

‘তিনদিন পরে তোমাকে স্যাক না করলে মিনিস্টারকে পদত্যাগ করতে হবে। শোনো, আমার উপদেশ হল, এই তিনদিন চুটিয়ে জীবনটা উপভোগ করো। বাই।’ ম্যাডাম লাইন কেটে দিলেন।

দেবেনই তো। যখন ওঁর হেলথসেন্টার নিয়ে পাবলিক খেপে গিয়েছিল তখন তিনিই বাঁচিয়েছিলেন। ছয়মাস ধরে রোজ ভোর তিনটে থেকে চারটে পর্যন্ত বর্ডার থেকে সেপাই সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি যাতে ম্যাডামের লোকজন বিনা বাধায় যাওয়া আসা করতে পারে। আর এসব করেছিলেন মিনিস্টারকে প্রফুল্ল রাখতে। ভার্গিসের হাত নিশপিশ করতে লাগল। একেবারে মুর্খের মত তিনি কিছু করেননি। প্রমাণ রেখেছেন। সেগুলো সব এই ঘরের আলমারিতে মজুত আছে। যদি পদত্যাগ করতেই হয় সেগুলোকে আর আগলে রাখবেন না।

ভার্গিস টেলিফোন তুললেন, ‘সোম, নীচে নেমে এস। শহরটাকে দেখব।’

তৈরি হয়ে নিলেন ভার্গিস। হ্যাঁ, সোম এর মধ্যে দুদিন ম্যাডামের ওখানে গিয়েছে এই খবর তিনি পেয়েছেন। হেলথ ক্লিনিকে আরাম করতে পুলিশ অফিসারের যাওয়া নিষেধ আছে। শুনেছেন, কিছু বলেননি।

ঘর থেকে বেরিয়ে স্যালুট উপেক্ষা করতে করতে ভার্গিস মূল বারান্দায় চলে এলেন। তাঁর হিলের শব্দে চারপাশের সেপাইরা তটস্থ হয়ে উঠছিল। বাঁক ঘোরার সময় পোস্টারটা নজরে এল। এখানে এটা সেঁটে দেবার বুদ্ধি কার হয়েছে? বরং এটাকে কোনও দেওয়ালে সেঁটে দিলে কাজ হত। নির্বোধের দল।

পোস্টারটায় চোখ পড়তেই তাঁর পেটের ভেতরটা চিনচিন করে উঠেছিল। ওপরে লেখা, দশ লক্ষ টাকা পুরস্কার। মাঝখানে লোকটার ছবি। ঠোঁটের মিচকে হাসিটা মারাত্মক। নীচে লেখা, আকাশলালকে জীবিত অথবা মৃত চাই।

দশ লক্ষ টাকা। আশ্চর্য! তবু খবর নেই।

ভার্গিস হাঁটতে লাগলেন। সিঁড়ি ভেঙে নীচে এসে দেখলেন সোম ইতিমধ্যে নেমে এসেছে। কাছাকাছি পৌঁছে বললেন, ‘শহরটা দেখব।’

‘ইয়েস স্যার।’

ভার্গিস সি পির জন্যে নির্দিষ্ট গাড়িতে উঠলেন।

উঠে দরজা বন্ধ করে দিলেন। অগত্যা সোমকে আর একটা গাড়ি নিতে হল। ওদের পেছনে সেপাইদের ভ্যান।

চাতাল পেরিয়ে গেট-এর কাছে আসতেই ভার্গিস একটা জটলা দেখতে পেলেন। এখানে গার্ডদের জটলা করা ঠিক নয়। গাড়ি থামিয়ে তিনি চিৎকার করলেন, ‘আড্ডা মারা হচ্ছে, অ্যাাঁ?’

সঙ্গে সঙ্গে সেপাইরা সোজা হয়ে স্যালুট করল। একজন খুব ঝুঁকে ভয়ে ভয়ে নিবেদন করল, ‘স্যার, এই লোকটা।’ বেচারার পক্ষে কথা শেষ করা সম্ভব হল না আতঙ্কে। ভার্গিস দেখলেন একটা শীর্ণ চেহারার লোককে ওরা ধরে রেখেছে। জামাকাপড় ময়লা এবং ছেঁড়া। তিনি দেখলেন সোম তাঁর গাড়ি থেকে নেমে ওইদিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ভার্গিস মনে মনে বললেন, ‘রাবিশ! যেখানে দরকার নেই সেখানেই কাজ দেখাবে!’

সোম সামনে যেতেই সেপাইরা ব্যাপারটা জানাল। লোকটা সি পির সঙ্গে দেখা করতে চায়। কেন দেখা করবে কাউকে বলছে না। ওরা ভয় দেখিয়েছে ভেতরে ঢুকলে হাড় ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না তবু জেদ ছাড়ছে না। সোম সেপাইদের সরে যেতে বললেন। একটু আলাদা হতেই চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি চাস তুই?’

‘দশ লক্ষ টাকা।’ লোকটা হাসল।

‘পেটে ক্যাঁক করে এমন লাথি মারব হাসি বেরিয়ে যাবে।’

‘বাঃ, আপনারাই তো বলেছেন খবর দিলে টাকা পাওয়া যাবে।’

‘কোথায় দেখেছিস ওকে?’

‘টাকাটা পাব তো?’

সোম আড়চোখে দৃরে দাঁড়ানো কমিশনারের গাড়ি দেখলেন। বেশি দেরি করা উচিত মনে হচ্ছে না। তিনি মাথা নাড়তেই লোকটা বলল, ‘চাঁদি হিলসে।’

উত্তেজনায় টগবগিয়ে উঠলেন সোম, ‘কোন বাড়ি?’

‘বাইশ নম্বর। জানলায় এসে দাঁড়িয়েছিল। নীচে লন্ড্রি আছে।’

সোম সেপাইদের কাছে চলে এলেন, ‘আমরা চলে যাওয়ার পাঁচ মিনিট বাদে ওকে এমন ভাবে মারবে যাতে না মরে।’

তারপর তিনি সোজা এগিয়ে গেলেন সি পির গাড়ির সামনে। উত্তেজনা চেপে রাখতে তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছিল।

‘কি ব্যাপার?’ ভার্গিস হুঙ্কার ছাড়লেন।

‘মাথায় গোলমাল আছে।’

‘সেটা জানতে তোমাকে যেতে হয় কেন? চলো।’ সিপির গাড়ি ছাড়ল।

নিজের গাড়িতে বসে সিগারেট ধরালেন সোম। শহর দেখতে হলে তাঁদের চাঁদি হিলস দিয়েই যেতে হবে। দশ লক্ষ টাকা আঃ। একেই বলে যোগাযোগ। হ্যাঁ, লোকটা ধরা পড়লে সিপির চাকরি বাঁধা। তাঁর প্রমোশন বন্ধ। কিন্তু দশলক্ষ টাকার জন্যে আপাতত প্রমোশন উপেক্ষা করতে পারেন তিনি। সিপি হলে তো কাঁটার চেয়ারে বসতে হবে। একবছর বসলেই তাঁর চলে যাবে।

রাস্তায় এর মধ্যেই লোক জমছে। শহরের বাইরে থেকে লোক আসতে শুরু করেছে। দেবতার মূর্তি মাথায় নিয়ে পরশু প্রসেসন বের হবে। তবে আজই পুলিশ বেশ নজরে পড়ছে। সেইসঙ্গে সমানে চলছে দশ লক্ষ টাকার ঘোষণা।

চৌমাথায় এসে সিপির গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়তেই সোম নিজের গাড়ি থেকে নেমে ছুটলেন। ভার্গিস তাঁকে বললেন, ‘বাঁ দিকের রাস্তাটায় নো এনট্রি করে দাও আগামী তিনদিন। কেউ ওখানে ঢুকতে পারবে না।’

‘কিন্তু।’

‘নো কিন্তু। যত চাপ পড়ুক অন্য রাস্তায় এটা আমার খোলা চাই। তাহলে যে কোনও জায়গায় ফোর্স সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছাতে পারবে।’

‘ঠিক আছে স্যার।’

কনভয় এগোল। চাঁদি হিলসে ঢুকছে গাড়িগুলো। সোম বাড়ির নম্বর দেখলেন। এক দুই, পর পরই আছে। কুড়ি একুশ পার হবার সময় তিনি হুইস্‌ল বাজালেন। বাইশ নম্বরের নীচে লন্ড্রি।

সামনের গাড়ি থেমে যেতেই তিনি ছুটে গেলেন, ‘স্যার, স্যার— !’ উত্তেজনায় কথা বন্ধ হয়ে গেল সোমের।

‘কি ব্যাপার?’ বিরক্ত হলেন ভার্গিস।

‘ওকে দেখতে পেলাম। ওই জানলায়।‘

‘কাকে?’

‘চিতা, আই মিন, আকাশলাল।’

সঙ্গে সঙ্গে ভার্গিসের নির্দেশে বাড়িটাকে ঘিরে ফেলা হল। ওয়ারলেসে খবর গেল, ‘আরও সেপাই পাঠাও।’

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বাহিনী তৈরি। ভার্গিস হুকুম দিলেন, ‘ফায়ার করো।’ সঙ্গে সঙ্গে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে কাচ ভেঙে পড়তে লাগল ওপরের জানলা থেকে। সোম উত্তেজিত গলায় বলল, ‘দরজা ভাঙব স্যার?’

মাথা নাড়লেন ভার্গিস। হ্যাঁ। কিন্তু তাঁর চোখ ছোট হয়ে এল। ওপরের ঘরে আলো জ্বলছে। কেউ যদি জানলায় এসে দাঁড়ায় তাহলে কাচের আড়ালে তাকে সিল্যুট দেখাবে। মুখচোখ দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সোম কি করে লোকটাকে দেখতে পেল!

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সব ঘর তছনছ করে সোম রিভলভার হাতে সেই ঘরটিতে ঢুকলেন। বাড়িটার অন্যঘরের মত এখানেও কোনও মানুষ নেই। শুধু টেবিলের ওপর পেপারওয়েটের নীচে একটা কাগজ চাপা রয়েছে। সেইটে পড়ে সোমের মনে হল তাঁর হাঁটু দুটো নেই।

‘কি ওটা?’ পেছন থেকে ভার্গিসের গলা ভেসে এল।

কাঁপা হাতে সোম কাগজটা এগিয়ে দিলেন। ওপরে ভার্গিসের নাম লেখা।

ভার্গিস পড়লেন, ‘আগামী পরশু সকাল ন’টায় টেলিফোনের পাশে থাকবেন। দারুণ সুসংবাদ আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। আকাশলাল।’

ভার্গিস চিরকুটটা হাতে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। সোম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। ভার্গিসের হুঙ্কার শোনা গেল, ‘তোমার রিভলভারটা দাও।’

০৩. এই পরিকল্পনায় ঝুঁকি আছে

হ্যাঁ এই পরিকল্পনায় ঝুঁকি আছে। কিন্তু বন্ধুগণ, ইঁদুরের মত বেঁচে থাকা আর আমার পক্ষে সম্ভব নয়। হয় এখনই নয় আর কখনও নয়। বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় আকাশলাল কথাগুলো বলল। তার মুখের চেহারা ফ্যাকাশে, দেখলেই অসুস্থ বলে মনে হয়। বয়স পঞ্চাশের গায়ে, শরীর মেদহীন।

ঘরের ভেতর শ্রোতা হিসেবে যে তিনজন মানুষ বসে আছে তাদের চিন্তিত দেখাচ্ছিল। তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটির নাম হায়দার আলি। ভাবতে গেলেই তার চোখ বন্ধ হয়ে যায়। সেই ভঙ্গি নিয়েই হায়দর বলল, ‘এখন আমাদের শেষবার চিন্তা করতে হবে। তুমি যখন প্রথম এই পরিকল্পনার কথা আমাকে বলেছ তখনও আমি পছন্দ করিনি, এখনও আমার ভাল লাগছে না। একটু ভুল মানেই তোমাকে চিরজীবনের জন্যে হারাব। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমার বেঁচে থাকাটা দেশের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি।’

‘কি ভাবে বেঁচে থাকা?’ খেকিয়ে উঠল আকাশলাল, ‘এইভাবে জলের তলায় দমবন্ধ করে? কোন্ কাজটা আমি করতে পারছি? আর কাজই যদি না করতে পারলাম, তাহলে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মধ্যে কোনও তফাত নেই। আমি না থাকলে তুমি সেই কাজটা করবে, ডেভিড করবে, অজস্র মানুষ এগিয়ে আসবে। আমাকে কাজ করতে গেলে স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকতে হবে। এই শরীর নিয়ে ওরা আমাকে সেটা করতে দেবে না। পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা এমনি এমনি করেনি সরকার।’

দ্বিতীয় মানুষটি যার নাম ডেভিড, নিচু গলায় বলল, ‘ওটা এখন দশ লক্ষ হয়েছে।’

তৃতীয় মানুষটি বয়সে নবীন, বলল, ‘ওরা আপনাকে পেলে যন্ত্রণা দেবে।’

‘জানি। আমি সব জানি।’ আকাশলাল হাসতে চেষ্টা করল।

হায়দার আলি বলল, ‘কোনও সুযোগ না দিয়েই ওরা ইলেকট্রিক চেয়ারে বসাবে।’

‘সব জানি। তবু আমি ধরা দিতে চাই। এটাই শেষ কথা। আমি আর কতদিন আন্ডার গ্রাউন্ডে থাকব? কোথায় থাকব? দশ লক্ষ টাকা হয়েছে বলছ! এত টাকার লোভ সামনে থাকলে আমি নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারব না। এই গরিব দেশের সহজ মানুষগুলোকে লোভী করে তোলার কোনও অধিকার আমার নেই।’ আকাশলাল. নামতে চেষ্টা করল বিছানা থেকে। হায়দার আলি এগিয়ে যেতেই সে হাত নেড়ে জানাল ঠিক আছে।

ডেভিড বলল, ‘সাধারণ মানুষ কিন্তু দশ লক্ষ টাকায় ভোলেনি। ভার্গিসকে নাজেহাল করতে আমি একটি লোককে পাঠিয়েছিলাম হেডকোয়ার্টাসে মিথ্যে খবর দিয়ে। সে কাজটা করে ফিরে এসেছে। মারধোর খেয়েছে কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আপনার চিঠিটা নিশ্চয়ই ভার্গিস পেয়ে গেছে।’

‘ওকে আমার হয়ে ধন্যবাদ দিয়ো।’ সাবধানে পা ফেলে আকাশলাল পাশের দরজা দিয়ে টয়লেটে ঢুকে গেল।

ওরা তিনজন চুপচাপ বসে রইল। যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তিনবছর আগে আজ তা প্রায় বিধ্বস্ত। একদিকে সামরিক শক্তির পাশব অত্যাচার অন্যদিকে তথাকথিত কিছু বিপ্লবীর বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও এখন যেটুকু আশা টিমটিম করে জ্বলছে তা যে আকাশকে কেন্দ্র করে তা এই তিনজনের চেয়ে বেশি কারও জানা নেই। তিনবছর ধরে শুধু আকাশকে নয় নিজেদের গোপনে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়েছে প্রতিমুহূর্তে। এদেশের মন্ত্রিপরিষদ এবং পুলিশ চিফ ভার্গিস নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যেতে পারবেন যেই তাঁরা জানতে পারবেন আকাশলাল জীবিত নেই। মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে এই লড়াই থমকে যাবে আরও অনেক বছর। তিনজনের অস্বস্তির কারণ এখন এক।

টয়লেটের আয়নায় নিজের মুখ দেখছিল আকাশলাল। গাল বসে গিয়েছে। অনেকদিন পরে নিজের মুখটাকে ভাল করে দেখল সে। বয়েসের আঁচড় নয়, অবহেলার প্রতিক্রিয়া মুখ জুড়ে। তবু রাস্তায় নামলে যে-কোনও মানুষ চিনতে পারবে তাকে। মুখের এই বিধ্বস্ত অবস্থাও তাদের বিভ্রান্ত করবে না। মানুষের মত কোনও প্রাণীর মুখ এক জন্মে এতবার বদল হয় না। অথচ তার তো দীর্ঘদিন ধরে একই রয়ে গেল। বাইরে বেরিয়ে আসার সময় মাথাটা একটু ঝিমঝিম করে উঠল। একটু দাঁড়াতে গিয়েই মত পাল্টাল সে। তিনজোড়া উদ্বিগ্ন চোখ তাকে দেখছে। ওদের আরও উদ্বিগ্ন করার কোনও মানে হয় না।

বিছানায় ফিরে আসামাত্র দরজায় শব্দ হল। হায়দার আলি জানতে চাইল ‘কে ওখানে?’ উত্তর এল, ‘ডাক্তার এসেছেন।’

এ বাড়িতে এবং বাড়ির বাইরে রাস্তায় এখন চব্বিশ ঘন্টা পাহারা। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই খবর পৌঁছে যাবে এই ঘরে। হায়দার ভেতরে নিয়ে আসতে নির্দেশ দিল।

ডাক্তার ঘরে ঢুকলেন। বালিশে হেলান দিয়ে আকাশলাল হাসল, ‘আসুন ডাক্তার।’

ভদ্রলোক খাটের পাশে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি এখন কেমন আছেন?’

‘ভাল। বেশ ভাল। কারও সাহায্য ছাড়াই টয়লেট যাচ্ছি।’

‘হাঁটার সময় মাথা ঘুরছে না তো?’

‘কাল অবৃধি ঘুরছিল, আজ আর হচ্ছে না।’

আমি পরীক্ষা করব। আপনাকে বালিশ সরাতে হবে।’

ডাক্তারের নির্দেশ মান্য করল আকাশলাল। ডাক্তার পরীক্ষা করে যে সন্তুষ্ট হয়েছেন মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। আকাশলাল স্বস্তি পেল।

‘এবার আপনাকে জামাটা খুলতে হবে।’ আকাশলাল জামার বোতাম খুলতেই বিশাল ক্ষতচিহ্ন বেরিয়ে এল। তার অনেকটাই শুকিয়ে গেলেও ওটা যে সাম্প্রতিক তা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়।

আঙুল রাখলেন ডাক্তার, ‘এখানে কোনও ব্যথা বোধ করেন?’

‘বিন্দুমাত্র না।’

আমি একটা স্প্রে দিচ্ছি। দিনে দুবার ব্যবহার করলেই পরশুদিন পুরনো হয়ে যাবে।’

‘ধন্যবাদ। পরশুদিন তো অনেক সময়।’

‘না অনেক সময় নয়। আমার যে-কোনও পেশেন্টকে আমি আপনার অবস্থায় আরও দশদিন বাইরে যেতে দিতাম না। এখনও বলছি আপনি দুঃসাহস দেখাচ্ছেন।’ এই কথাগুলো বলার সময় ডাক্তার যেভাবে ঘরের অন্য তিনজনের দিকে তাকালেন তাতে স্পষ্ট বোঝা গেল তিনি সমর্থন চাইছেন।

ডেভিড উঠে এল পাশে, ‘ডাক্তার, আপনি ওকে সুস্থ বলবেন না?’

দ্রুত মাথা নাড়লেন ডাক্তার, ‘না। একটা বড় পরীক্ষা ওঁর শরীরে করা হয়েছে। সেটার প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্যেও সাতদিন নজরে রাখা দরকার।’

ডেভিড কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে হাত তুলে নিষেধ করল আকাশলাল, ‘অপারেশনের পর আটদিন কেটে গেছে। যা কিছু নজরদারি আপনি নিশ্চয়ই করে ফেলেছেন। না পারলে আমার কিছু করার নেই। আপনাকে আমি অনেক আগে বলেছি পরশু সকালে আমাকে রাস্তায় নামতেই হবে। তাই না ডাক্তার?’

এবার গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে ডাক্তার আবার নার্ভাস হলেন। এই মানুষটির মাথার দাম এখন দশ লক্ষ টাকা। একসঙ্গে এত টাকা তিনি কখনও দ্যাখেননি। আজ থেকে একমাস আগে যখন তাঁকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছিল তখন লোকটির ব্যক্তিত্ব দেখে তিনি অবাক হয়েছিলেন। এমন কি অপারেশন টেবিলে অজ্ঞান হয়ে শুয়ে থাকা মানুষটিও যেন তাঁকে হুকুম করে যাচ্ছিল। এদেশের মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্যে লোকটা মরিয়া, শুধু এই বোধই তাঁকে বন্দি হওয়া সত্ত্বেও সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

তিনি বললেন, ‘কিন্তু আপনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ নন।’

‘আমি জানি। কিন্তু আমি এখন অনেক ভাল।’

‘যদি আরও দিন দশেক সময় দিতেন—’

‘অসম্ভব। ডাক্তার, আপনাকে আমি অনেকবার বলেছি আগামী পরশু আমার পক্ষে সবচেয়ে জরুরি দিন। এই শহরে এক লক্ষের ওপর মানুষ জড়ো হবে উৎসব উপলক্ষে। রাস্তাঘাট থিক থিক করবে। এই জমায়েতটাকে আমার প্রয়োজন।’ কথা বলতে বলতে উঠে বসল আকাশলাল। ‘আপনি ভয় পাবেন না। আমি স্বচ্ছন্দে হেঁটে যেতে পারব। এক কাপ কফি হবে?’

ডাক্তার অবাক হলেন। মাথা নাড়লেন, না। তারপর বললেন, ‘আপনার কি মাথায় কোনও যন্ত্রণা হচ্ছে? অথবা মাথা ধরার মত অস্বস্তি?’

‘সামান্য। ওটা ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না।’

ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘এবার আমি ফিরে যেতে চাই।’

‘যাবেন। আপনার অর্ধেক কাজ হয়েছে এখনও অর্ধেক বাকি। আজ থেকে সাতদিনের বেশি আপনাকে আটকে রাখা হবে না। আর আমার ভাগ্য খারাপ হলে আপনার ভাগ্য ভাল হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি পরশুই চলে যেতে পারবেন।’

‘আমার পক্ষে ব্যাপারটা ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে।’

‘আমি জানি। কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। এই উপমহাদেশে আপনি একমাত্র সার্জেন যিনি কাজটা করতে পারেন। তাই আপনাকে আমাদের প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু আপনার পরিবারের সবাই জানেন যে আপনি সুস্থ আছেন। আপনার লেখা চিঠি তাঁদের কাছে নিয়মিত পৌঁছে দেওয়া হয়। ওঁরাও উদ্বিগ্ন নন।’

‘চিঠিগুলো নিশ্চয়ই সেন্সর করেই দেওয়া হয়।’

‘অবশ্যই। আপনি নিশ্চয়ই আমাদের ঝুঁকি নিতে বলবেন না!’

‘আপনি জানেন আপনার জন্যে দশ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।’

‘অনেক টাকা ডাক্তার, মাঝে মাঝে আমারই লোভ হচ্ছে।’

‘লোভ তো আমারও হতে পারে।’

‘সেটাই স্বাভাবিক।’

‘আশ্চর্য! আমি এবার আসতে পারি?’

‘অবশ্যই।’ ডেভিড ডাক্তারকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেল। বাইরে যে অপেক্ষায় ছিল সে তৎপর হল। ডাক্তার ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘আমি স্প্রে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

‘ধন্যবাদ। আগামীকাল দেখা হবে ডাক্তার!’

‘আর একটা কথা, আজ সকালে আমার ইনজেকশনটা একটা বেড়ালের ওপর প্রয়োগ করেছিলাম। ঠিক ঠাক কাজ করেছে।’

‘লোকে কিন্তু আমাকে চিতা বলে ডাক্তার।’

ডাক্তার বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হল।

এবার তৃতীয়জন কথা বলল, ‘ওরা চাঁদি হিলসের বাড়িটাকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।’

‘সাবাস।’

হায়দার বলল, ‘এর জন্যে ভার্গিসকে বেশ ভুগতে হবে। বাড়িটা মিনিস্টারের প্রেমিকার। বেচারা।’

ডেভিড বলল, ‘এই ভদ্রমহিলাকে কিন্তু আমরা ব্যবহার করতে পারতাম।’

আকাশলাল হাসল, ‘সময় চলে যায়নি। তোমাদের ওপর যে সব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেগুলো এখন কি অবস্থায় আছে?’ হঠাৎ মানুষটা সিরিয়াস হয়ে গেল।

হায়দার বলল, ‘প্রায় শেষ হয়ে গেছে।’

‘প্রায় কেন?’

‘শেষ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষ এবং সেই সূত্রে পুলিশের নজরে এসে যাবেই, তাই শেষটুকু বাকি রাখা হয়েছে।’

‘আমার পরিকল্পনার কথা তোমরা তিনজন জানো। সামান্য ভুল মানে আর ফিরে তাকাবার কোনও সুযোগ নেই। যেসব ব্যাপার তোমাদের এখনও সন্দেহ আছে তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।’

তরুণ উশখুশ করছিল। এবার বলল, ‘আমরা একজনকে আজই আশা করছিলাম। কিন্তু তাঁর শহরে আসার সময়টা নিয়ে গোলমাল হচ্ছে।’

‘গোলমাল হচ্ছে কেন?’

‘ভদ্রলোক এখনও এসে পৌঁছাননি।’

‘তিনি কি রওনা হয়েছেন?’

‘হ্যাঁ তাঁকে আজ বিকেলেও দেখা গেছে নীচে।’

‘লোকটিকে খুঁজে বের করো। আমার পরিকল্পনার শেষটা ওর ওপর নির্ভর করছে হায়দার। ওকে আমার চাই। পরশু সকালে শেষবার আমরা কথা বলব। ততক্ষণ একেবারে আড়ালে থাকো সবাই।’

তিনটে মানুষ চুপচাপ ঘর ছেড়ে গেলে আকাশলাল কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। তিন বছর আগে সবকিছু যেমন উদ্দীপনাময় ছিল এখন তা নেই। সংগ্রামী বন্ধুদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে, কেউ কেউ ভার্গিসের জেলে পচছে। এখন তার সংগঠন যে অবস্থায় পৌঁছেছে তাতে বিরাট কিছু আশা করা বোকামি। হ্যাঁ, এই দেশের মানুষ তার সঙ্গে আছে এখনও। এই কারণেই নতুন লড়াইয়ের কথা এখনও ভাবা যায়। আর তাই মাসের পর মাস লুকিয়ে চুরিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল তারা। এখনও কিছু অর্থ, কিছু বিশ্বস্ত মানুষ অবশিষ্ট আছে। আকাশলাল জানে, শেষ আঘাত হানার সুযোগ এক জীবনে একবারই আসে। এবং সেই সময়টা এখনই। বুকে হাত রাখল সে। শান্ত স্বাভাবিক। শুধু অপারেশনের লম্বা দাগটাই অস্বস্তির। বুকের ভেতরে একটাই আওয়াজ সেটা। অবশ্য দুটো হবার কথাও নয়।

‘আশা করি তুমি বলবে না যে তোমারও কিছু বলার আছে!’ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো উচ্চারণ করলেন ভার্গিস।

তাঁর টেবিলের উল্টোদিকে চার জন কমিশনার র‍্যাঙ্কের অফিসার পাথরের মত মুখ করে দাঁড়িয়ে, ওঁদের থেকে খানিকটা আলাদা হয়ে এ সি সোম মাথা নিচু করে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করছে। পুলিশ কমিশনারের ব্যঙ্গ উপেক্ষা করল একটু মরিয়া হয়েই, ‘আসলে ভুল হয়ে গিয়েছিল!’

‘ভুল? এটাকে ভুল বলা যায়? মিথ্যে কথাকে কোন অভিধানে ভুল বলা হয়েছে সোম? তুমি কিস্যু দ্যাখোনি। ওই বাড়ির জানলায় কোনও মানুষ আসেনি। কিন্তু তুমি গল্প বানিয়ে আমাকে বোকা বানালে। অথচ সেখানে পৌঁছে আমরা জঘন্য চিঠিটা পেলাম। তুমি কি করে জানলে ঠিক ওই বাড়িতেই চিঠিটা থাকবে?’

‘আমি জানতাম না স্যার।’

‘জানতে। আমি যদি বলি তুমি ওই লোকটার হয়ে কাজ করছ?’

‘আমি?’ চমকে উঠল সোম।

‘হ্যাঁ। নইলে ওই চিঠিটার কাছে আমাকে নিয়ে যাবে কেন?’ হাতের উল্টো পিঠ গালে ঘসলেন ভার্গিস, ‘পুলিশ কমিশনারের চেয়ারটার ওপর একটা সেপাইয়ের লোভ থাকবে, তোমাকে আর কি দোষ দেব। তবে সেখানে বসতে গেলে বুদ্ধিটা ধারালো হওয়া দরকার। সত্যি কথাটা বলো।’

‘আমার বোকামি স্যার। আপনার সঙ্গে শহর দেখতে যাওয়ার সময় গেটে একটা লোককে ঝামেলা করতে দেখেছিলেন, মনে আছে নিশ্চয়ই। লোকটা দাবি করছিল যে, সে চিতাকে চাঁদি-হিলসের ওই বাড়িতে দেখেছে।’ সোম ঢোক গিলল।

‘মাই গড! সঙ্গে সঙ্গে দশ লক্ষ টাকার লোভটা ছোবল মারল তোমাকে? আমার কাছে কৃতিত্ব নেবার জন্যে বানিয়ে বললে গল্পটা?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার।’

‘লোকটা কোথায়?’

সোম সহকর্মীদের দিকে তাকাল। একজন অফিসার নিচু গলায় জবাব দিল, ‘চিঠিটা পাওয়া মাত্র ওর সন্ধান নেওয়া হয়েছিল—’

‘পাওয়া যায়নি?’ চিৎকার করলেন ভার্গিস।

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘সেপাইদের অ্যারেস্ট করো।’

স্যার, সেপাইরা বলছে ওদের ওপর অর্ডার ছিল একটু আধটু ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দিতে। এ সি সোম অর্ডারটা দিয়েছিলেন।’

‘আচ্ছা! দশ লাখের ভাগিদার রাখতে চাওনি!’

‘আই অ্যাম সরি স্যার!’

বুলডগের মত মুখটায় আরও ভাঁজ পড়ল, ‘সোম, মিনিস্ট্রি তোমাকে স্যাক করেছে। আমি তোমাকে জেলে পুরব। কিন্তু তবু তোমকে একটা সুযোগ দিতে চাই। ফাইন্ড হিম, দুদিন সময় দিলাম। চাকরিটা পাবে না কিন্তু প্রাণে বেঁচে যেতে পার। তোমাকে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় এ জীবনে দেখতে চাই না। মনে রেখো, দু-দিন। গেট লস্ট। এই দুদিন যেন তোমার মুখ দেখতে না পাই!’

‘ওকে মানে, চিতার কথা বলছেন?’ সোমের গলা থেকে স্বর বের হচ্ছিল না।

ভার্গিস চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঝুঁকে টেবিলে কিছু খুঁজলেন। তারপর সেটা পেয়ে এগিয়ে এলেন সোমের সামনে। সোম আরও কুঁকড়ে দাঁড়াল। টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার পিঠটাকে দেখতে কেমন?’

‘পিঠ? কখনও দেখিনি স্যার।’

‘চেষ্টা করেছ কখনও?’

‘না স্যার।’

‘চেষ্টা করো। এই আয়নাটা নাও। দুই ইঞ্চি আয়না। যেটা কখনও সরাসরি পারবে না সেটা অন্যের সাহায্য নিয়ে করতে চেষ্টা করো। চিতা তোমার পক্ষে আকাশকুসুম সোম, তুমি ওই লোকটাকে খুঁজে বের করো।’ আয়নাটাকে সোমের হাতে গুঁজে দিয়ে ভার্গিস চটপট ফিরে গেলেন নিজের চেয়ারে। তারপর ইশারা করলেন বেরিয়ে যেতে।

প্রথমে সোম পরে অফিসাররা বেরিয়ে গেলে রুমালে মুখ মুছলেন তিনি। হয়ে গেল। সারা জীবনের জন্যে সোমের বারোটা বেজে গেল। আর সি পি হবার স্বপ্ন দেখতে হবে না ওকে। দুদিন পরে জেলের সবচেয়ে খারাপ সেলটা ওর জন্যে বরাদ্দ করতে হবে। মিনিস্টারের দাঁতের ব্যথা এখন নিশ্চয়ই বেড়ে যাবে। চালাকি। তিনি টেলিফোন তুললেন। “অ্যানাউন্স করে দাও এসি সোমকে স্যাক করা হয়েছে। ও আর ফোর্সে নেই।’

আরাম করে চুরুট ধরালেন ভার্গিস। হঠাৎ তাঁর মনে হল সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। লোকটা তাকে ফোন করবে পরশু সকাল নটায়। কেন? নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে এর পেছনে। এত সাহস লোকটার কখনও হয়নি। হঠাৎ মনে হল সোমের সঙ্গে লোকটার যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ ভাবনাটাকে বাতিল করলেন তিনি। সোম বোকা এবং পদের জন্যে আর এবার টাকার প্রতি লোভ দেখালেও ফোর্সের সঙ্গে কখনই বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। পরশু সকাল পর্যন্ত লোকটার ফোনের জন্যে অপেক্ষা করলে তাঁর হাতে আর সময় থাকবে না। চিঠিটা যখন এখানেই পাওয়া গিয়েছে তখন খুবই স্বাভাবিক সে শহরেই আছে। তাঁরই নাকের ডগায় অথবা পিঠের মাঝখানে যেখানে তাঁর হাত পৌঁছাচ্ছে না।

এই সময় টেলিফোন বাজল। অপারেটারের মাধ্যমে নয় সরাসরি লাইনটা এসেছে। ভার্গিস রিসিভার তুললেন, ‘হ্যালো!’

‘ভার্গিস। সোমের কোর্টমার্শাল কবে?’ মিনিস্টারের ছিমছাম গলা।

‘কোর্টমার্শাল?’ ভার্গিস ঢোক গিললেন, ‘এখনও ঠিক করিনি।’

‘বোর্ড চাইছে না ও আর বেঁচে থাকুক।’

‘কিন্তু স্যার, ও একটা ভুল করেছে—’

‘দ্যাটস অর্ডার।’

‘কিন্তু আমার নেক্সট ম্যান—’

‘নেক্সট? নেক্সটের নেক্সট থাকে।’ লাইনটা কেটে গেল।

ঘাম মুছলেন ভার্গিস। টেলিফোনে খবর নিলেন সোম এখন কোথায়! জানলেন সোম এইমাত্র সিভিল পোশাকে হেডকোয়ার্টার্স ছেড়ে চলে গেছে।

আরও মিনিট পনের অপেক্ষা করলেন ভার্গিস। তারপর হুকুম করলেন সোমের বিরুদ্ধে কোৰ্টমার্শালের ব্যবস্থা নিতে।

০৪. উপোসি চাঁদের আলো

উপোসি চাঁদের আলো তখন বাংলোটাকে ঘিরে তিরতিরিয়ে কাঁপছে। মাঝে মাঝে নির্জলা মেঘকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে বাচ্চা মেয়ের মত স্কিপিং করে যেতে হচ্ছে তাকে। ছায়া নামছে সামনের লনে, নেমেই সরে যাচ্ছে। বাঘটা বসে আছে গাড়ির ছাদে, যেভাবে সেবক ব্রিজের মুখে পাথরের সিংহ বসে থাকে।

এ ঘরের দেওয়ালে সুইচ আছে, স্বজন টিপেছিল কিন্তু আলো জ্বলেনি। তীব্র পচা গন্ধটা বেশ মারাত্মক, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বমি আসে। জানলা খুলে দিলে স্বস্তি পাওয়া যেত কিন্তু বাঘের কথা ভেবে সাহস হয়নি। ঘরের ভেতর গাঢ় কফির সঙ্গে কয়েক ফোঁটা দুধ মেশা অন্ধকার। পৃথা শেষপর্যন্ত বলে ফেলল, ‘এখানে থাকতে পারছি না।’

‘বুঝতে পারছি কিন্তু এখান থেকে সকাল হবার আগে বের হবার জো নেই। তিনি অপেক্ষা করছেন।’ স্বজন অসহায় গলায় বলল।

‘একটা কিছু করো!’

সেই একটা কিছু করার জন্য স্বজন দরজা ছেড়ে এগোল। ইতিমধ্যে চোখ কিছুটা মানিয়ে নিয়েছে। আবছা দেখা যাচ্ছে একটা টেবিল, কয়েকটা চেয়ার। পায়ের তলায় কার্পেট। যাঁর বাংলো তিনি অর্থবান মানুষ। স্বজন ঘরের মাঝখানে চলে আসতেই বুঝল পৃথা তার সঙ্গ ছাড়েনি। ওপাশে ফায়ার প্লেস; তার ওপরে স্ট্যান্ডে ঝাপসা ছবি। এপাশের দেওয়ালে ভারী পর্দা। সামান্য আলো যা ঘরে ঢুকছে তা ওরই ফাঁক-ফোকর দিয়ে। স্বজন পর্দা সরাল। না, একটুও ধুলো পড়ল না গায়ে, স্বচ্ছন্দে সরে গেল সেটা আর সঙ্গে সঙ্গে কফিতে আরও দুধ মিশল। এবার ঘরটিকে অনেকটা স্পষ্ট দেখা গেল। সুন্দর সাজানো ঘর। কিন্তু কোনও বিছানা নেই। পৃথা জানলায় চলে গেল। চিতাটা দুই থাবায় মুখ রেখে বাংলোর দিকে তাকিয়ে আছে।

‘এ-ঘরে ফ্রিজ আছে!’ স্বজনের গলা শুনতে পেয়ে পৃথা দেখল সে ঘরে নেই। পাশের দরজায় চটজলদি চলে এল সে। আবছা স্বজন তখন ফ্রিজের সামনে। হাতল ধরে ঈষৎ টানতেই খুলে গেল দরজাটা।

‘আরে! এর ভেতরটা এখনও ঠাণ্ডা আছে!’ চিৎকার করল স্বজন।

পৃথা ছুটে গেল। ফ্রিজের ভেতর থেকে ঠাণ্ডা বেরিয়ে আসছে। ডান দিক বাঁ দিকে, আবছা বেশ কিছু প্যাকেট। স্বজন দরজাটা বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিজের মনে বিড়বিড় করল, ‘ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না!’

‘কারেন্ট নেই অথচ ফ্রিজ ঠাণ্ডা থাকছে কি করে?’ পৃথা জিজ্ঞাসা করল।

‘সেইটাই তো বিস্ময়ের! তার মানে আমরা এখানে আসার আগে কারেন্ট ছিল। লোডশেডিং হয়ে যাওয়ার পর কতক্ষণ ফ্রিজ ঠাণ্ডা থাকে?’ স্বজন পৃথার দিকে তাকাল।

‘দরজা না খুললে ঘণ্টা তিনেক।’

‘তা হলে? কারেন্ট গেল কেন?’ স্বজন ঘরের চারপাশে তাকাল।

‘এই বাংলোয় নিশ্চয়ই কেউ থাকে। নইলে ফ্রিজ চালু থাকত না।’

‘কারেক্ট। চলো, অন্য ঘরগুলো দেখা যাক।’

‘আমরা কিন্তু অনুমতি ছাড়া এখানে ঢুকেছি।’

‘বাধ্য হয়ে। প্রাণ বাঁচাতে এ ছাড়া উপায় ছিল না।’ স্বজন পাশের ঘরে চলে এল। গন্ধটা এখানে আরও তীব্র। কিছু একটা মরে পচেছে। গন্ধটা সেই কারণেই। বিদ্যুৎবিহীন মর্গে গেলে এই গন্ধটা পাওয়া যায়।

অথচ এই বাংলো ছিমছাম সুন্দর। দুটো শোওয়ার ঘর পরিপাটি। কোথাও এক ফোঁটা ধুলো জমে নেই। আর ফ্রিজটাও কিছুক্ষণ আগে চালু ছিল। স্বজন দরজার পাশে কাচের জানলায় চলে এল, ওর পাশে পৃথা। জ্যোৎস্নার ভোল্টেজ একটুও বাড়েনি। চরাচর অদ্ভুত ফ্যাকাশে হয়ে রয়েছে। আর গাড়ির ওপর চিতাটা একই ভঙ্গিতে শুয়ে। স্বজনের মনে হল ওটা ঘুমাচ্ছে।

বাড়িটাকে আরও একটু ঘুরে ফিরে দেখে ওরা দুটো তথ্য আবিষ্কার করল। প্রথমটা আনন্দের, এখানে একটা টেলিফোন আছে। স্বজন রিসিভার তুলে দেখল তাতে কানেকশন আছে। কাকে ফোন করা যায় সেই মুহূর্তে মাথায় না আসায় সে ওটা নামিয়ে রেখেছিল। দ্বিতীয়টা খানিকটা মন্দের, নীচে যাওয়ার সিঁড়ি আছে। অথাৎ মাটির তলায় একটা ঘর আছে। আর গন্ধ আসছে সেখান থেকেই। সিঁড়ির মুখের দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল স্বজন। নীচের অন্ধকারে পা বাড়াতে ইচ্ছে হল না। কিন্তু এতক্ষণে বাংলোটায় যে পচা গন্ধ পাক খাচ্ছে সেটা না বের করতে পারলে স্বস্তি নেই।

কিচেনের পাশে ইলেকট্রিক মিটারের বোর্ডটার কাছে এসে স্বজন একটু ভাবল। আন্দাজে হাত বাড়িয়ে ঢাকনা খুলে টান দিয়ে বের করেই বুঝতে পারল ফিউজটা উড়ে গিয়েছে। সে চিৎকার করল, ‘পৃথা, কোনও ভুতুড়ে ব্যাপার নয়। ফিউজটাকে পালটালেই আলো জ্বলবে।’

‘কি করে পালটাবে?’ পাশ থেকে পৃথা বলল নিচুস্বরে।

‘নিশ্চয়ই তার আছে কোথাও। দ্যাখো না!’

কোথায় দেখবে পৃথা। এমনিতে বাংলোয় হাঁটা চলা করতে এখন হয়তো কোনও অসুবিধে হচ্ছে না কিন্তু খুঁটিয়ে দেখার মত আলো নেই। তার ওপর ওই গন্ধটা ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে তার কাছে। তবু অসাধ্যসাধন করার মতনই একটা তার আবিষ্কার করল স্বজন নিজেই। সেটাকে যথাস্থানে পুরে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতেই ফ্রিজটা আওয়াজ করে উঠল। সুইচ টিপতেই টইটুম্বুর আলো। পৃথা হেসে উঠতেই স্বজন ওকে জড়িয়ে ধরল। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আরাম। স্বজন পৃথার কানে মুখ রেখে বলল, ‘আর ভয় নেই।’

পৃথা মুখ তুলে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল। কাচের ওপাশে পৃথিবীটা এখন আরও ঝাপসা। ঘরের আলো তীব্র বলেই চোখে কিছু পড়ছে না। সে বলল, ‘গন্ধটাকে কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না।’

স্বজন বলল, ‘একটু অপেক্ষা করো ডার্লিং। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ওরা এবার টয়লেটের দরজার সামনে চলে এল। সুইচ টিপতেই সেটা উজ্জ্বল হল। পৃথা মুখ বাড়িয়ে দেখল ভেতরটা চমৎকার পরিষ্কার। কল খুলতেই জল নামল। সে বলল, ‘একটু ফ্রেশ হয়ে নিই!’

‘ক্যারি অন।’ চিৎকার করল স্বজন অনেকটা কারণ ছাড়াই। তারপর একের পর এক সুইচ অন করে যেতে লাগল। সমস্ত বাংলোটা এখন দারুণভাবে আলোকিত। এমনকি বাংলোর বারান্দার আলোগুলোকেও জ্বেলে দিয়েছে সে। এত আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেদের বেশ নিরাপদ বলে মনে হল। সে জানলার কাছে চলে এল। বারান্দার আলো তার গাড়িটাতেও পৌঁছেছে। এবং আশ্চর্য, চিতাটা নেই। গাড়িটা বেশ নিরীহ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনের দরজাটার অনেকটা বেঁকে ভেতরে ঢুকে গিয়েছে। স্বজন হাসল। নিশ্চয়ই আলো জ্বলতে দেখে ভয় পেয়েছে চিতা। ভয় পেলেও কাছে পিঠে থাকবে কিছুক্ষণ, সুযোগের অপেক্ষা করবে। করুক।

ঠিক তখনই বমির আওয়াজ কানে এল। সে ছুটে গেল টয়লেটের সামনে, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজায় ধাক্কা দিল, “কি হয়েছে? তুমি বমি করছ কেন?’ বেসিনের সামনে হাঁপাচ্ছিল পৃথা। সামনের আয়নায় নিজের মুখটাকে কিরকম অচেনা মনে হচ্ছিল। সেই অবস্থায় কোনওমতে উচ্চারণ করল, ‘ঠিক আছে।’

‘শরীর খারাপ লাগছে?’ স্বজনের উদ্বিগ্ন গলা ভেসে এল।

‘না।’ কলের মুখ খুলে দিল পৃথা।

‘দরজাটা বন্ধ করতে গেলে কেন?’ স্বজনের পায়ের আওয়াজ সরে গেল।

অভ্যেস! মনে মনে বলল পৃথা। কারোর সামনে জামাকাপড় চেঞ্জ করার কথা যেমন ভাবা যায় না তেমনি বাথরুম টয়লেটের দরজা খোলা রাখার কথাও চিন্তা করতে হয় না। ওটা আপনি এসে যায়।

মুখে জল দিল সে। আঃ, আরাম। গন্ধটা যে শরীরের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল তা এতক্ষণ টের পায়নি সে। বেসিনের কাছে পৌঁছানো মাত্র শরীর বিদ্রোহ করল। এখন অনেকটা স্বস্তি লাগছে। সে টয়লেটটাকে দেখল। যাঁর বাড়ি তিনি খুব শৌখিন মানুষ। নইলে এত ঝকঝকে থাকত না টয়লেট। বাইরে বেরিয়ে এসে পৃথা দেখল স্বজন ফ্রিজ থেকে কি সব বের করছে। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি করছ?’

‘কিছু খাবার রয়েছে এখানে। গ্যাসটাও চালু। ডিনার রেডি করি।’

‘আমি কিছু খাব না।’

‘কেন?’

‘ভাল লাগছে না।’

স্বজন এগিয়ে এল, ‘অনেকক্ষণ খালি পেটে আছ বলেও বমি হতে পারে।’

‘তা নয়। গন্ধটাকে আমি স্ট্যান্ড করতে পারছি না।’

‘ঠিক আছে। আর একটু সময় যাক। রাত তো বেশি হয়নি।’

‘গন্ধটা ঠিক কিসের?’

‘বুঝতে পারছি না। তবে নীচের ঘর থেকে আসছে বলে মনে হচ্ছে।’

‘চলো না, গিয়ে দেখি।’

স্বজন মাথা নাড়ল, ‘নীচে কি আছে কে জানে, কাল সকালে দেখব।’

‘কাল সকালে এখানে আমরা থাকছি নাকি! তাছাড়া সারারাত এই গন্ধে থাকা অসম্ভব। তোমার খারাপ লাগছে না?’

‘লাগছে। ঠিক আছে, দাঁড়াও, দেখছি। ও হ্যাঁ, চিতাটা পালিয়েছে।’

‘পালিয়েছে?’ পৃথা বিস্মিত।

‘হ্যাঁ, আলো জ্বেলে দেওয়ার পর ব্যাটা ভয় পেয়েছে।’

পৃথা ওই ঘরের জানলায় ছুটে গেল। সত্যি, চিতাটা নেই। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন। যমদূতের মত পাহারা দিচ্ছিল জন্তুটা। সে হাসল, ‘বাঁচা গেল।’

স্বজন পাশে উঠে এল, ‘টেলিফোনটা চালু আছে। আমি টুরিস্ট লজে টেলিফোন করে ওদের জানিয়ে দিই যে এখানে আটকে গেছি।’

‘কাদের জানাবে?’

সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল হল স্বজনের। পৃথার পক্ষে প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক। ওকে এখন পর্যন্ত বলতে পারেনি যে এখানে আসার আর একটা কারণ আছে। শুধু ছুটি কাটানো নয় সেই সঙ্গে কিছু কাজও তাকে করতে হবে। শুনলে আনন্দটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলেই সে চেপে রেখেছিল। উত্তর দেওয়াটা জরুরি বলেই সে উত্তর দিল, ‘ওই যারা টুরিস্ট লজে আমাদের জন্যে ঘর বুক করেছে।’

‘তোমার পরিচিত?’

‘আমার নয়। স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে ওদের।’ স্বজন হাসার চেষ্টা করল, ‘আসলে আজ না পৌঁছালে যদি বুকিং ক্যানসেল হয়ে যায়! টুরিস্টদের খুব ভিড় এখন। শুনেছিলাম কি একটা উৎসব আছে।’

পৃথার চোখ ছোট হল, ‘বাইরে বেড়াতে যাওয়ার জন্যে এত যোগাযোগের কি দরকার!’

স্বজন বুঝতে পারছিল ব্যাপারটা ক্রমশ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পৃথার মুখের দিকে তাকিয়ে সত্যি কথা বলতে ঠিক সাহস হচ্ছিল না ওর। সে দাঁড়ি টানতে চাইল, ‘সবসময় কি দরকার বুঝে কেউ কিছু করে! দাঁড়াও ফোনটা করি আগে!’

সে টেলিফোনের কাছে পৌঁছাতে পেরে যেন আপাতত রক্ষা পেল। এমন ভাবে কথা এগোচ্ছিল যে সে সত্যি কথাটা আর বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারত না। শোনামাত্র যে পৃথার মুড নষ্ট হয়ে যেত তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

টেলিফোন কোম্পানির ছাপানো বইটা খুলে সে টুরিস্ট লজের নম্বরটা খুঁজতে লাগল। দূরত্ব বেশি না হলেও দেখা গেল একই এক্সচেঞ্জের মধ্যে পড়ে না। স্বজন রিসিভার তুলে ডায়াল টোন শুনল। তারপর এস টি ডি কোড্‌ নম্বর ঘোরাল। টুরিস্ট লজের নাম্বার ঘোরানোর পর এনগেজড শব্দ শুনতে পেল। এইসব যান্ত্রিক শব্দগুলো ওকে বেশ আরাম দিচ্ছিল। এখন নিজেদের আর বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা মানুষ বলে মনে হচ্ছিল না। পৃথার গলা ভেসে এল, ‘পাচ্ছ না?’

‘এনগেজড হচ্ছে!’ রিসিভার কানে রেখে স্বজন জবাব দিল। তার আঙুল ক্রমাগত ডায়াল করে যাচ্ছিল। ব্যাপারটা পৃথাকে বিরক্ত করল। স্বজনের এই এক বদ অভ্যাস। কাউকে ফোন করতে গিয়ে এনগেজড বুঝেও অপেক্ষা করে না, জেদের বশে সমানে ডয়াল করে যায়। পৃথা এগিয়ে এল। দরজার পাশের সুইচটা টিপতেই বারান্দার আলো নিভে গেল। সঙ্গে সঙ্গে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া মাঠ এবং জঙ্গল চোখের সামনে চলে এল। চাঁদ এখন যথেষ্ট বলবান। গাড়িটা পড়ে আছে অসহায় ভঙ্গিতে। চিতাটা ধারে কাছে নেই।

‘এই যাঃ।’ স্বজনের চিৎকার কানে আসতেই ঘুরে দাঁড়াল পৃথা।

‘কি হল?’

‘লাইনটা ডেড হয়ে গেল!’ স্বজনের গলায় আফশোস।

‘সে কি? কি করে?’ কিছুই করতে পারবে না তবু পৃথা দৌড়ে গেল কাছে। হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বোতাম টিপল কয়েকবার। কোনও আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না।

স্বজন বলল, ‘অদ্ভুত ব্যাপার। যোগাযোগের একমাত্র রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গেল!’

পৃথা রিসিভার রাখল, ‘এরকম তো হয়ই। কিছুক্ষণ পরে হয়তো লাইন ফিরে আসবে। তা ছাড়া এই বাংলোয় টেলিফোন আছে জেনে তো আমরা ঢুকিনি।’

স্বজনকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল। বাঁ হাতে রিসিভারটাকে শব্দ করে আঘাত করল যদি তাতে ওটা সচল হয়। পৃথা সেটা দেখে বলল, ‘তোমাকে কিন্তু একটু বেশি আপসেট দেখাচ্ছে! আজকে পৌঁছাবে বলে কাউকে কথা দিয়েছিলে?’

‘আশ্চর্য! তোমার এ কথা মনে হল কেন?’

‘তোমার ভঙ্গি দেখে।’

‘বুঝলাম না।’

‘আমরা বেড়াতে এসেছি। গাড়ি খারাপ হয়ে যাওয়াটা দুর্ঘটনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা বাংলোয় পৌঁছাতে পেরেছি। ওই দুর্গন্ধ ছাড়া অস্বস্তিকর কিছু নেই এখানে। আমাদের কাছে টুরিস্ট লজও যা এই বাংলোও তা। কিন্তু তুমি ছটফট করছ ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্যে।’ শান্ত গলায় বলল পৃথা।

আচমকা নিজেকে পাল্টাতে চেষ্টা করল স্বজন। হেসে বলল, ‘ঠিক আছে বাবা, আমি আর টেলিফোন স্পর্শ করছি না। ও-কে!’

ওর হাসি দেখে পৃথার ভাল লাগল। সে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘একটা জানলা খুলব? গন্ধটা তাহলে বেরিয়ে যাবে!’

জানলা খুললে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। চিতাটা যদি কাছে পিঠে থাকে তাহলে দেখতে হবে না। ফাস্টেস্ট অ্যানিম্যাল!’

‘ওটা কাছে পিঠে নেই।’ পৃথা একটু চেষ্টা করেই জানলাটা খুলতে পারল। খুলে বলল, ‘আঃ। বাঁচলাম।’

হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছিল ঘরে। যে পচা বোটকা গন্ধটা ঘরে থমকে ছিল সেটা হালকা হয়ে যাচ্ছিল দ্রুত। পৃথা বলল, ‘আমার খুব ইচ্ছে করছে ওই মাঠে জ্যোৎস্নায় হাঁটতে, যাবে?’

‘পাগল!’

‘চিতাটাকে দেখলেই আমরা দৌড়ে ফিরে আসব!’

‘অসম্ভব। আত্মহত্যা করার কোনও বাসনা আমার নেই।’ স্বজন পৃথার পেছনে এসে দাঁড়াল।

পৃথা একটু ঘনিষ্ঠ হল। তার গলায় গুনগুনানি ফুটল। পূর্ণচাঁদকে নিয়ে এক মায়াবী সুর খেলা করতে লাগল মৃদু স্বরে। স্বজনের ভাল লাগছিল। এবং ওর মনে হল পৃথার কাছে ব্যাপারটা লুকিয়ে কোনও লাভ হচ্ছে না। মেয়েটা এত ভাল যে ওর কাছে সৎ থাকাটাই তার উচিত। তাকে যে চিকিৎসার প্রয়োজনে এখানে আসতে হয়েছে এই তথ্যটুকু জানলে ওর হয়তো খারাপ লাগবে কিন্তু সেটাকে কাটিয়ে তুলতে বেশি সময় লাগবে না। হঠাৎ গান থামিয়ে পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার খিদে পেয়েছে বলছিলে না? চলো!’

‘থাক।’

‘থাকবে কেন? এখন আমার ভাল লাগছে। খেতে পারব।’

‘তাহলে জানলাটা বন্ধ করা যাক।’ স্বজন জানলাটা বন্ধ করতে গিয়ে থমকে গেল, দূরে, মাঠের শেষে যেখানে ঝোপঝাড় সেখানে কিছু যেন নড়ছে। চিতাটা কি ওখানে লুকিয়ে থেকে তাদের নজরে রাখছে। সে সাহস করে আর একটু লক্ষ করার চেষ্টা করল। না চিতা নয়। ঝোপের মধ্যে যে আদলটা চোখে পড়ছে তা চিতার হতে পারে না। হয়তো কোনও বেঁটে গাছ হাওয়ায় নড়ছে। কিন্তু আশেপাশের গাছগুলো তো স্থির! সে জানলা বন্ধ করে দিল!

ফ্রিজের খাবারগুলোর সবই টিনফুড। গরম করে খেয়ে নিলেই চলে। এর আগে দু-একবার খেয়েছিল পৃথা, পছন্দ হয়নি। এই বাংলো যাঁর তিনি টিনফুডের ওপরই ভরসা করেন। এমন কি অরেঞ্জ জুসও ক্যানেই রাখা আছে। গ্যাস জ্বালিয়ে খাবার রেডি করে ওরা খেতে বসল। স্বজন বেশ তৃপ্তি করেই খেল। এই ঘরে এখন আর তেমন গন্ধ না থাকলেও পৃথা সামান্যই দাঁতে কাটল। অরেঞ্জ জুসটাই তাকে একটু তৃপ্ত করল। স্বজন বলল, ‘এবার শোওয়ার ব্যবস্থা করা যাক।

‘এখন শোবে?’

‘কটা বেজেছে ঘড়িতে দ্যাখো।’

‘আমার এখনই ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া— !’

‘আবার কি?’

‘তুমি বলেছিলে গন্ধটা কেন আসছে সেটা দেখবে’!

‘কাল সকালে দেখলেই তো হয়।’

‘না। আমার ঘুম আসবে না। সবসময় মাথায় চিন্তাটা থেকে যাবে।’

অগত্যা স্বজন উঠল। দুটো ঘর পেরিয়ে নীচের সিঁড়ির দরজার কাছে পৌঁছে সুইচ টিপতে লাগল। দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাওয়ায় বোঝা গেল সিঁড়ি আলোকিত। সে পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকের ওপর দিয়ে বেঁধে নিল। পৃথা পেছনে দাঁড়িয়েছিল, স্বজন বলল, ‘তুমি নীচে নামবে না।’

‘কেন?’

‘কি দৃশ্য দেখব জানি না। তা ছাড়া ওপরে একজনের থাকা উচিত!’ স্বজন দরজা খুলতেই গন্ধটা ছিটকে উঠে এল যেন। পৃথা নাকে হাত দিয়ে সরে গেল সামান্য।

সিঁড়িতে আলো জ্বলছে। স্বজন নামছিল। গন্ধটা আরও তীব্র হচ্ছে। রুমালের আড়াল কোনও কাজই দিচ্ছে না। মাটির তলায়! স্টোর রুম।

নীচে নামতেই শব্দ হল। হুড়মুড় করে কিছু পড়ল আর বিশাল মেঠো ইঁদুর ছুটে বেরিয়ে গেল এপাশ ওপাশে। স্বজনের মনে হল অনেকদিন পরে এই ঘরে আলো জ্বলছে। সে চারপাশে তাকাল। একটা লম্বা টেবিলের ওপর কফিনের মত বাক্স। বাক্সর ওপর দুটো ধেড়ে ইঁদুর সাহসী ভঙ্গি নিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। বাক্সের ডালাটা ঈষৎ উঁচু হয়ে থাকলেও ইঁদুরগুলো সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারছে না। ডালাটাকে দেখেই বেশ ভারী মনে হল। উঁচু হয়ে থাকার একটা কারণ চোখে পড়ল। শেষপ্রান্তে একটা ইঁদুরের শীর্ণ শরীর ঝুলছে। বেচারা হয়তো কোনও মতে মাথা গলাতে পেরেছিল কিন্তু সেই অবধিই। ডালার চাপে ঝুলন্ত অবস্থায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরে গেছে। আর ওর মৃত শরীরটাকে খুবলে খেয়ে নিয়েছে সঙ্গীরা। কিন্তু ওই সামান্য ফাঁক গলে গন্ধ বেরিয়ে আসছে বাইরে।

স্বজন এগোল। কফিনের ওপর থেকে ইঁদুর দুটো এবার তাকিয়ে নেমে গেল ওপাশে। ডালাটার একটা দিক ধরে ধীরে ধীরে উঁচু করতেই ওপর থেকে আর্ত চিৎকারটা ভেসে এল। হকচকিয়ে গেল স্বজন। তারপর ডালাটা নামিয়ে কয়েক লাফে সিঁড়িতে পৌঁছে দ্রুত ওপরে উঠে এল সে।

দরজার সামনেই পৃথা, রক্তশূন্য। তাকে দেখতে পেয়েই পাগলের মত জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপতে লাগল। স্বজন ওর মাথায় হাত রেখে নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কি হয়েছে? অমন করছ কেন?’

কথা বলতে পারছিল না পৃথা। সামলে উঠতে সময় নিল খানিক। স্বজন বলল, ‘আমি তো আছি, কি হয়েছে?’

‘দুটো সাদা পা, ঝোপের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল।’

‘সাদা পা? চমকে উঠল স্বজন।

‘হ্যাঁ। কী সাদা। হঠাৎই।’

স্বজন ওকে আঁকড়ে ধরল। কফিনের ঢাকনাটা তোলার মুহূর্তে এক ঝলকের জন্যে সে যা দেখেছিল তা পৃথা ঝোপের বাইরে দেখল কী করে!’

০৫. দূরত্বটা অনেকখানি

দূরত্বটা অনেকখানি। ঢালু মাঠ যেখানে শেষ হচ্ছে সেখানেই ঝোপের শুরু। জানলায় দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া আকাশের নীচেটা শান্ত, স্বাভাবিক। স্বজন গম্ভীর গলায় বলল, ‘তুমি বোধ হয় ভুল দেখেছ।’

‘অসম্ভব। আমি স্পষ্ট দেখেছি।’ পৃথার গলায় এখন স্বাভাবিকতা এসেছে।

‘ঠিক কোন জায়গাটায়?’

পৃথা আঙুল তুলে জায়গাটা দেখাল। এখন সেখানে কিছু নেই। পৃথিবীটা এখন নিরীহ এবং সুন্দর। স্বজন হেসে ফেলল।

পৃথা ভ্রূ তুলল, ‘হাসছ যে?’

‘একটা ইংরেজি ছবি দেখেছিলাম। বাজে হরর ফিল্ম। তাতে ছিল, এইরকম একটা নির্জন বাংলোতে কয়েকটা ছেলেমেয়ে বাধ্য হয়ে রাত কাটাতে আশ্রয় নিয়েছে আর বাংলোর পাশের কবরখানা থেকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন শরীর নিয়ে মৃতেরা উঠে আসছে বাংলোর ভেতরে ঢোকার জন্যে।‘

‘অ্যাই, তুমি কিন্তু আমাকে ভয় দেখাচ্ছ!’

‘অসম্ভব। আজকাল কেউ ভূতের ভয় পায় না।’

‘অন্য জায়গায় পেতাম না, এখানে পাচ্ছি। স্পষ্ট দেখলাম দুটো পা বেরিয়ে এল, আবার এখন উধাও হয়ে গেছে।’

স্বজন ফিরে এল। একটা চেয়ার টেনে আরাম করে বসল। তার মাথায় এখন নীচের ঘরের কফিনটা পাক খাচ্ছে। খুব বেশি দিন মারা যায়নি মানুষটা। এই বাংলোর কেউ হলে তাকে নিশ্চয়ই কফিনে ভরে পচার জন্যে ফেলে রাখবে না। কেউ একা একা মরে কফিনে গিয়ে শুয়ে থাকতে পারে না। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে দ্বিতীয় মানুষ ওই মৃতদেহের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু যদি কেউ কাউকে হত্যা করে তাহলে এমন নির্জন জায়গায় মৃতদেহকে সাক্ষী হিসেবে রেখে যাবে কেন? মাটি খুঁড়ে পুঁতে ফেললেই তো চুকে যেত!

‘নীচে গিয়ে কি দেখলে?’ পৃথা জানলায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল।

চমকে তাকাল স্বজন। সত্যি কথাটা সে বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারবে না। তাই সরাসরি বলে দিল, ‘গন্ধটা একটা মানুষের শরীরের। দেহটা কফিনে রাখা ছিল। কোনও ভাবে ঢাকনাটা একটু খুলে যাওয়ায় গন্ধ উঠে আসছে ওপরে।’

পৃথার গলা থেকে চাপা আর্তনাদ ছিটকে বেরোতেই সে দুই হাতে মুখ চাপা দিল। তারপর দৌড়ে চলে এল স্বজনের কাছে, ‘আমি থাকব না, কিছুতেই থাকব না এখানে। পায়ের তলায় একটা পচা মড়া নিয়ে কেউ থাকতে পারে না।’ ভয়ে সে সাদা হয়ে গেছে।

স্বজন বলল, ‘কোথায় যাবে? আশেপাশে কোনও মানুষের বাড়ি নেই। আর চিতাটার কথা ভুলে যেয়ো না। এখানে এই বন্ধ ঘরে আমরা অনেকটা নিরাপদ। দরজা বন্ধ করে দিলে গন্ধটা তেমন তীব্র থাকছে না। রাতটুকু এইভাবেই কাটাতে হবে।’

‘কিন্তু ওটা যদি ড্রাকুলা হয়?’

‘পাগল!’

‘না পাগলামি নয়। ড্রাকুলারা দিনের বেলায় কফিনেই শুয়ে থাকে। রাত হলে রক্ত খেতে বেরিয়ে পড়ে। এটা সাহেবরাও বিশ্বাস করে!’

‘ড্রাকুলা বলে কিছু নেই। ভূতপ্রেত অলীক কল্পনা। মানুষের সময় কাটানোর জন্যে গল্প তৈরি হয়েছিল কোন এক কালে। চলো, শোওয়ার ব্যবস্থা করা যাক।’ স্বজন উঠে পড়লেও তার মুখে অস্বস্তি ছিল।

‘শোবে মানে? তুমি এখানে ঘুমানোর কথা ভাবতে পারছ?’

‘চেষ্টা করা যাক। খামোকা রাতটা জেগে কাটিয়ে শরীর খারাপ করে কি লাভ?’

‘আমি ঘুমাতে পারব না।’ জেদি দেখাল পৃথাকে।

দুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরল স্বজন, ‘তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? সকাল হলেই দেখবে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

‘ওই পচা মানুষটা?’

‘হয়তো কেউ খুন করে রেখে গেছে!’

‘খুন?’ কেঁপে উঠল পৃথা।

‘আমি জানি না। যাই হোক আমাদের কি! আজ রাতে তো খুন হয়নি।’ পৃথাকে জড়িয়ে ধরেই স্বজন পাশের ঘরের দিকে এগোল। সিঁড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিল ভাল করে। শোওয়ার ঘরে পৌঁছে খাটটাকে দেখল। একটা ভারী বেড কভার পাতা আছে। আঙুল বুলিয়ে দেখা গেল তাতে ধুলোর পরিমাণ নেই বললেই চলে। বেড কভার না তুলেই শুয়ে পড়ল স্বজন। শুয়ে বলল, “আঃ।” পৃথা একপাশে বসল আড়ষ্ট হয়ে।

স্বজন বলল, ‘শুয়ে পড়ো। নীচে থেকে উঠে আসার সময় দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছি, তোমার আর কোনও ভয় নেই।’

কথাটা শুনে পৃথা একটু স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করল, ‘তুমি আচ্ছা মানুষ। হুট করে অন্যের বিছানায় শুয়ে পড়লে। একটু পরেই নাক ডাকবে।’

‘আমার নাক ডাকে না।’

‘একদিন টেপ করে রেখে শোনাব।’

‘আলোটা নিভিয়ে দেবে?’

‘অসম্ভব।’

‘যা ইচ্ছে। তুমি এবার শোবে?’

অগত্যা পৃথা কোনও রকমে শরীরটাকে বিছানায় ছড়িয়ে দিল। তার ভঙ্গিতে বিন্দুমাত্র স্বস্তি ছিল না। স্বজন ওর শরীরে হাত রাখতেই আপত্তি বেরিয়ে এল, ‘প্লিজ, না।’

স্বজন হাসল, ‘আমার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।’

‘আমার এখন কিছুই ভাল লাগছে না।’

স্বজন চুপ করে গেল। ডান হাত সরিয়ে এনে চোখে চাপা দিল। কাল শহরে পৌঁছেই থানায় খবর দিতে হবে। পুলিশের কাজ পুলিশ করবে। সন্ধে থেকে একটার পর একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল আজ।

‘এভাবে শোওয়া যায় না।’ পৃথা উঠে বসল।

‘কেন?’

বেডকভারটা বড্ড খসখসে। তোমার গায়ে লাগছে না?’

‘একটু লাগছে।’

‘ওঠো। এটা সরাই। নীচে নিশ্চয়ই বেডশীট আছে।’ পৃথা নেমে পড়ল খাট থেকে।

অগত্যা স্বজনকে উঠতে হল। একটুখানি শুয়ে শরীর আরামের স্বাদ পেয়ে গেছে। সে বেডকভারের একটা প্রান্ত মুঠোয় নিয়ে টানতেই বালিশসমেত সেটা খোসার মত উঠে আসছিল বিছানা থেকে। সাদা ধবধবে চাদর দেখা যেতে আচমকা দুজনেই পাথর হয়ে গেল। বিছানার ঠিক মাঝখানে সাদা চাদর জুড়ে চাপ বাঁধা কালচে দাগটা। দাগটা যে রক্তের তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

পৃথা বিস্ফারিত চোখে দাগটাকে দেখছিল। স্বজন একটু সম্বিত পেতেই বিছানায় ঝুঁকে দাগটাকে ভাল করে দেখল। রক্ত শুকিয়ে গেলে এরকম দাগ হয়। এখানে কারও রক্তপাত হয়েছিল। শরীর সরিয়ে নেওয়ার পর বেডকভার দিয়ে সেটাকে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বেডকভারের উল্টোপিঠটা দেখল। হ্যাঁ, সেখানেই হালকা দাগ লেগেছে। রক্তপাতের কিছু সময়ের মধ্যেই ওটাকে ঢাকা হয়েছে। স্বজন বেডকভারটাকে ছুঁড়ে দিল দাগটার ওপর। অনেকটা আড়ালে পড়ে গেলেও ভারতবর্ষের ম্যাপের নীচের দিক হয়ে খানিকটা দেখা যেতে লাগল।

স্বজন পৃথাকে বাঁ হাতে জড়িয়ে ধরে পাশের সোফা-কাম- বেডের কাছে চল এল। সোফাটাকে চওড়া করে পৃথাকে সেখানে বসাল। পৃথা কথা বলল, ‘আমি আর পারছি না।’

‘বি স্টেডি পৃথা।’

‘আমার মনে হচ্ছে এখান থেকে কোনও দিন বেরোতে পারব না।’

‘আর ছয় ঘন্টা পরেই ভোর হয়ে যাবে।’

‘ছয় ঘন্টা অনেক সময়। তার আগেই— ?’ পৃথা নিঃশ্বাস ফেলল, ‘নীচের লোকটাকে নিশ্চয়ই ওই বিছানায় খুন করা হয়েছে। আমি শুনেছি অপঘাতে যারা মরে তাদের আত্মা অতৃপ্ত থাকে।’ কেঁপে উঠল সে।

‘আত্মা বলে কিছু নেই।’

‘তুমি হিন্দু হয়েও একথা বলছ?’

‘মানে? খ্রিস্টানরাও যদি আত্মা বিশ্বাস না করে তাহলে ঘোস্ট আসে কোত্থেকে। কিস্যু নেই। আজ পর্যন্ত কাউকে পেলাম না যে ভূত দেখেছে, সবাই বলবে শুনেছি।’

‘তুমি সব জেনে বসে আছ! তাহলে লোকে প্ল্যানচেট করে কেন?’

‘ওটা এক ধরনের সম্মোহন। বোগাস।’

‘আমার ঠাকুমা নিজের চোখে ভূত দেখেছিলেন। পাশের বাড়ির একটা ছেলে নাকি আত্মহত্যা করেছিল, তাকে। ঠাকুমা মিথ্যে বলেছিলেন?’

‘উনি বিশ্বাস করেছিলেন দেখেছেন। আসলে কল্পনা করেছিলেন। তোমার নার্ভ ঠিক নেই এখন। সোফায় শুয়ে পড়ো, আমি পাশে আছি।’

স্বজনের কথায় পৃথা কান দিল না। এই সময় বাতাস উঠল। পাহাড় থেকে দল বেঁধে হাওয়ারা নেমে এসে জঙ্গলে চিরুনি চালাতে শুরু করল। অদ্ভুত এক শব্দমালার সৃষ্টি হল তার ফলে। বাংলোর দেওয়ালে, জানলায় হাওয়ার ধাক্কা লাগতে লাগল। পৃথা জড়িয়ে ধরল স্বজনকে। আর তখনই টুপ করে নিভে গেল আলো। স্বজন বলল, ‘যাচ্চলে! লোডশেডিং?’

পৃথা অন্যরকম গলায় বলল, ‘মোটেই লোডশেডিং নয়।’

‘তাহলে ফিউজটা গিয়েছে। দেখতে হয়।’

পৃথা আঁকড়ে ধরল স্বজনকে, ‘না, কোথাও যাবে না তুমি।’

‘আশ্চর্য! অন্ধকারে বসে থাকবে?’

‘তাই থাকব। আমাকে ছেড়ে যাবে না তুমি!’

অতএব স্বজন উঠল না। বাইরে হাওয়ার শব্দ একটানা চলছে। কাচের জানলার ওপাশে জ্যোৎস্না অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। পৃথা ফিসফিস করে বলল, ‘আমার একটা কথা রাখবে?’

‘বলো।’

‘চলো, গাড়িতে গিয়ে বসে থাকি।’

‘চিতাটা?’

‘ওটা এতক্ষণে চলে গিয়েছে। গাড়িতে অনেক আরাম লাগবে।”

স্বজন ভাবল। টেলিফোনটা ডেড হয়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, নীচের ঘরে কফিনে গলিত মৃতদেহ আর বিছানায় রক্তের দাগ সত্ত্বেও সে নিজেকে এতক্ষণ শক্ত রাখতে পারছে। গাড়ির ভেতরটা আরামদায়ক হবে না। কাচ ভেঙে ফেললে তো হয়েই গেল। তবু এই বাংলোর বাইরে গেলে মনের চাপ কমে যেতে পারে। সে যখন পৃথার অনুরোধ রাখবে বলে সিদ্ধান্ত নিল ঠিক তখনই কাঠের সিঁড়িতে আওয়াজ উঠল। ভারী পায়ের আওয়াজ।

অন্ধকার ঘরে পৃথা স্বজনকে আঁকড়ে বসেছিল। আওয়াজটা প্রথমে বারান্দার একেবারে ওপাশে চলে গেল। গিয়ে থামল। স্বজন ফিসফিসয়ে বলল, ‘ছাড়ো।’

সেই একই গলায় পৃথা জানতে চাইল, ‘কেন?’

‘মানুষ হলে কথা বলব।’

‘না। মানুষ নয়’

‘উঃ, অকারণে ভয় পাচ্ছ।’

স্বজন উঠতে চাইলেও পারল না। শব্দটা আবার ফিরে আসছিল। বারান্দায় কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে খট্‌খট্‌ আওয়াজটা আকেবারে ওই ঘরের জানলার সামনে চলে আসতেই স্বজন গলা তুলল, ‘কে?’

হয়তো ভেতরে ভেতরে নার্ভাস থাকার কারণেই চিৎকারটা অহেতুক জোরালো হল। নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে স্বজন ছুটে গেল কাচের জানলার পাশে। তারপর হো হো করে হেসে উঠল বাংলো কাঁপিয়ে। সিটকে বসে থাকা পৃথা সেই হাসি শুনে অবাক, ভয়ের কিছু নেই বুঝে ছুটে এল পাশে, ‘কি হয়েছে?’

‘স্বচক্ষে ভূত দ্যাখো।’

পৃথা দেখল। প্রাণীটি অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। আকারে একটা ছোটখাটো মোষের মত কিন্তু স্বাস্থ্যবান। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা কি?’

‘বাইসন। বাচ্চা বাইসন।’

‘উঃ, কি ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। কিন্তু চিতাটা কিছু বলছে না ওকে?’ পৃথার গলায় খুশি চমকে উঠল ‘ওমা, দ্যাখো দ্যাখো, কী আদুরে ভঙ্গি করছে।?’

এরা সবসময় দলবেঁধে থাকতে ভালবাসে। চিতার সাধ্য নেই এদের কাছে যাওয়ার। এর দলটা নিশ্চয়ই কাছে পিঠে আছে। দুষ্টুমি করতে নিশ্চয়ই ইনি দলছাড়া হয়েছেন। এসব জায়গায় বাইসন থাকা খুবই স্বাভাবিক।’

‘বাইরে বের হলে ও আমার কাছে আসবে।’ এই প্রথম পৃথাকে সহজ, স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল। স্বজন হাসল, ‘ওর দলের সবাই তোমাকে পিষে ফেলবে।’

এইসময় শব্দ হল। বুনো ঝোপঝাড় থেকে পাহাড়ের মত চেহারার এক একটা বাইসন বেরিয়ে আসতে লাগল মাঠে। তাদের কেউ ঘাস খাচ্ছিল। ওদের দেখতে পাওয়া মাত্র বাচ্চা বাইসনটা দ্রুত বারান্দা থেকে নেমে গেল। জ্যোৎস্নার আলো পরিণত বাইসনদের ওপর পড়ায় তাদের শরীরের শক্তি সম্পর্কে কোনও সন্দেহ রইল না। গোটা দশেক বাইসন খোলা ঢালু মাঠে জ্যোৎস্না মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পৃথার মনে পড়ল কাছাকাছি একটা লাইন, মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়। সে দেখল বাচ্চা বাইসনটা মিশে গিয়েছে দলের সঙ্গে।

ক্রমশ দলটা উঠে আসছিল। বাংলোর সামনে দিয়ে গাড়িটাকে মাঝখানে রেখে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একজনের কী খেয়াল হল, যাওয়ার সময় মাথা নামিয়ে গাড়িটার দরজার নীচেটাকে ওপরে তুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সেটা ডিগবাজি খেয়ে গেল। চারটে চাকা। আকাশের দিকে মুখ করে স্থির হয়ে রইল।

পৃথার গলা থেকে ছিটকে এল, ‘সর্বনাশ!’

স্বজন জ্যোৎস্নায় গাড়িটার তলা দেখতে পাচ্ছিল। কোনদিন ওখানে চোখ যাওয়ার সুযোগই হয়নি। যে পাম্পে সার্ভিসিং-এর জন্যে গাড়ি পাঠাত, তারা যে এতকাল ফাঁকি মেরেছে তা এখন স্পষ্ট। সে বলল, ‘অল্পের ওপর দিয়ে গেল!’

পৃথা বলল, ‘ওরা চলে গেছে।’

হ্যাঁ, এখন মাঠ ফাঁকা। চাঁদ নেমে গেছে অনেকটা। স্বজন বলল, ‘চলো, ওই সোফাতেই রাত কাটানো যাক।’

‘গাড়িটাকে সোজা করা যাবে না?’

‘কেন?’

‘আমি এখানে থাকতে চাই না। তুমি বললে, বাইসনদের চিতা ভয় পায়। তাহলে নিশ্চয়ই সেটা এখন ধারেকাছে নেই।’

‘হয়তো নেই।’

‘তাহলে ভয় কি?’

অগত্যা স্বজন রাজি হল। দরজা খুলে বারান্দায় পা দিতেই বুঝল হাওয়ার দাপট কম নয়। ঝড় বললেই ঠিক বলা হবে। ওপাশের গাছের ডালগুলো বেঁকেচুরে যাচ্ছে। পৃথা বারান্দার রেলিং ধরে চারপাশে নজর রাখছিল। না, চিতাটার কোনও চিহ্ন নেই। নীচে নেমে গাড়িটাকে সোজা করতে চেষ্টা করল স্বজন। যতই হালকা হোক তার একার পক্ষে ওটাকে উপুড় করা সম্ভব হচ্ছিল না।

পৃথা নেমে এসে হাত লাগাল। অনেক চেষ্টার পর গাড়িটা চারচাকার ওপর দাঁড়াল। কিন্তু গিয়ার নড়ে যাওয়ায় গড়াতে লাগল সামনে। পেছন দাঁড়ানো স্বজন ওর গতি আটকাতে পারল না। গড়াতে গড়াতে সোজা মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল গাড়িটা।

দৌড়ে কাছে এসে, ঝোপঝাড় সরিয়ে ওরা দেখল একটা বড় গাছের গায়ে আটকে গেছে গাড়িটা। সে পৃথাকে বলল, ‘ঠেলে ওপরে তুলতে হবে।’

পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন?’

‘এখানে থাকবে নাকি?’

‘কাল সকালে ঠেলব। এখন খুব টায়ার্ড লাগছে।’

‘যা ইচ্ছে।’ সে গাড়ির দরজা খুলল। সামনের দরজাটা বেঁকে গিয়েছে। পেছনটা ঢুকে গিয়ে ব্যাকসিটটাকে চেপে দিয়েছে। গাড়িতে ঢুকতে গেলে ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজাই ভরসা। আগে পৃথা পরে সে ভেতরে ঢুকল। ঢুকে হেডলাইট জ্বালাল। সঙ্গে সঙ্গে গাছপালার মধ্যে দিয়ে তীব্র আলো ছিটকে গেল। নিভিয়ে দিল স্বজন পরমুহূর্তেই।

গাড়ির জানলা বন্ধ। সিটটাকে পেছনে হেলিয়ে দিয়ে পৃথা বলল, ‘আঃ।’

‘ভাল লাগছে?’

‘নিশ্চয়ই। মনে হচ্ছে বাড়িতে ফিরে এলাম।’

‘তোমাকে নর্মাল দেখাচ্ছে।’

পৃথা হাসল। এখান থেকে গাছপালার ফাঁক দিয়ে বাংলোটাকে দেখা যাচ্ছে। ভৌতিক বাংলোর যে ছবি সে জানত তার সঙ্গে একটুও পার্থক্য নেই। আজ বিকেলেও বোঝা যায়নি এমন কাণ্ড ঘটতে পারে।

পৃথা বলল, ‘শোন, আর শহরে যাওয়ার দরকার নেই। কাল সকাল হলে ফিরে চল। এত বাধা পড়ছে যখন—’

‘সকালের কথা সকালেই ভাবা যাবে।’

‘মানে?’

‘আমি ভাবছি বাইসনের দলটা যদি আবার ফিরে আসে তাহলে ওদের পায়ের তলায় গাড়িটার সঙ্গে আমরাও পাউডার হবো।’

‘আবার ফিরতে পারে?’

‘যাওয়ার সময় তো আমাকে কিছু বলে যায়নি।’

‘হাট! খালি ঠাট্টা করো।’ পৃথা বিরক্ত হল, ‘না, ফিরবে না।’

একটু একটু করে হাওয়া কমে গেল। জ্যোৎস্নার রং এখন ফিকে। ভোর হতে এখনও অনেক বাকি। অন্ধকারের একটা পাতলা আবরণ মিশছে জ্যোৎস্নার গায়ে। ওরা চুপচাপ বসে ছিল। মাঝে মাঝে রাতের অচেনা পাখিরা চেঁচিয়ে উঠছে এদিক ওদিক।

পৃথা হঠাৎ বলল, ‘কাল ফিরে যাবে তো?’

‘না।’

‘কেন?’

‘ফিরে যাওয়ার মতো কোনও কারণ ঘটেনি।’

‘আমার ভাল লাগছে না।’

‘না লাগলেও উপায় নেই। আমার শহরে কিছু কাজ আছে।’

‘মানে? তুমি কাজ নিয়ে এসেছ নাকি?’

‘ঠিক তা নয়, যাচ্ছি যখন তখন করে নিতাম।’

‘না কোনও কাজ করা যাবে না, আমরা এবার বেড়াতে এসেছি।’

‘এখন ঝগড়া কোরো না।’ স্বজন কথাটা বলতেই একটা গাড়ির আওয়াজ কানে এল। আওয়াজটা ক্রমশ কাছে আসছে।

পৃথা বলল, ‘এত রাত্রেও নীচের রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। আমরা ওখানে থাকলে লিফট পেতাম। তোমার যে কী বুদ্ধি হল এদিকে উঠে এলে!’

স্বজন বলল, ‘নীচের রাস্তা নয়। গাড়িটা প্রাইভেট রোড দিয়েই উঠছে।’

ওরা গাছপাতার ফাঁক দিয়ে সবকিছু দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু একটা গাড়ি যখন বাঁক নিয়ে বাংলোর দিকে এগিয়ে গেল তখন স্পষ্ট দেখতে পেল। গাড়িটা বাংলোর সামনে এসে থেমে গেল।।

পৃথা বলল, ‘চলো!’

‘চুপ! কথা বোলো না!’ স্বজন সতর্ক করল।

‘কেন?’

‘এই গাড়িতে কারা এল জানি না। সেই লোকটার খুনিও হতে পারে।’

পৃথা বলল, ‘আমাদের দেখতে পাবে না?’

‘না। জঙ্গলের আড়ালে আছে গাড়িটা।’

ওরা দেখল ওপাশে হেডলাইট নিভল। দরজা খুলল। একটি মানুষ গাড়ি থেকে নেমে বাংলোটাকে দেখল। তারপর পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেট ধরাল। সিগারেটটা ঠোঁটেই চাপা ছিল। লাইটারের আলোয় মুখটা স্পষ্ট বোঝা গেল না। লম্বা দোহারা লোকটা এখন গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। একাকী।

০৬. কোথাও কোনও শব্দ নেই

কোথাও কোনও শব্দ নেই। এমন নির্জন রাত্রে জ্যোৎস্নার দিকে তাকালেও ভয় ঢোকে মনে। জ্যোৎস্না বলেই গাছের ছায়া ফেলে। আর সেই ছায়ায় ওত পেতে থাকতে পারে মৃত্যু। কিন্তু সোম তো এখানে এসেছে প্রাণের ভয়েই।

সি-পিকে সে আজ প্রথম দেখছে না। কাউকে বাগে পেলে শেষ করে না দেওয়া পর্যন্ত লোকটা সুখ পায় না। টাকার লোভে সে যখন ফেঁসে গেল তখনই কেন সি-পি তাকে কোট মার্শাল করল না তা মাথায় ঢুকছে না। উল্টে সময় দিয়ে বলেছিল সেই খবর নিয়ে যাওয়া লোকটাকে খুঁজে বের করতে। চিতা নয়, তার ফেউকে খোঁজার দায়িত্ব তার ওপর। অত্যন্ত অপমানকর ব্যাপার। তবু ওই লোকটার সামনে থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েই সে বেরিয়ে পড়েছিল বলে রক্ষে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে হুকুম পাল্টে তাকে গ্রেপ্তার করার আদেশ জারি হল। এত জলদি মত বদলানো সি-পি-র স্বভাব নয়। চাপ এসেছে নির্ঘাত। তার মানে এখন সোমকে লড়তে হবে অনেকের সঙ্গে। আর ধরা পড়লে সারাজীবন কাটবে পাতালঘরে।।

বিপদের গন্ধ পেয়েই সোম বেরিয়ে পড়েছে রিভলভার আর গাড়িটাকে নিয়ে। তার একমাত্র বাঁচার পথ হল চিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়া। সি-পি অথবা মিনিস্টার খুশি না হয়ে পারবে না। সোম জানে এটা হাতের মোয়া নয়, কিন্তু পথ ওই একটাই। কোথায় যাওয়া যায় চিন্তা করতেই এই বাংলোটার কথা মনে এসেছিল। দিন সাতেক আগে গোপনসূত্রে খবর পেয়ে তল্লাসি চালিয়েছিল সোম বিশেষ বাহিনী দিয়ে। কিছুই পাওয়া যায়নি, বাংলোর মালিক বিদেশে। কেয়ারটেকার বলেছে কেউ এখানে আশ্রয় নেয়নি। সোমের বিশ্বাস লোকটা সত্যি কথা বলেনি। কিন্তু চাপ দিতে পারেনি সে। মাঝে মধ্যে ম্যাডাম এই বাংলোয় বিশ্রাম নিতে আসেন। তখন বিশেষ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। কিছু না পাওয়া যাওয়ায় সি-পি খুব খুশি হয়েছিলেন। খোদ ম্যাডাম যেখানে বেড়াতে গিয়ে থাকেন সেখানে উগ্রপন্থীরা আশ্রয় নেবে এটা নাকি উদ্ভট কল্পনা। সোমের সন্দেহ থাকলেও চুপ করে যেতে হয়েছিল।

এখন তাঁর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। হাতে সময় নেই। ধরা পড়লে সি-পি তাকে ছিঁড়ে খাবে। সন্দেহ দূর করতে তাই এই বাংলো দিয়েই খোজ শুরু করা যাক। কী দুর্মতি না তার হয়েছিল, নইলে খবর নিয়ে আসা লোকটাকে তুলে নিয়ে চাঁদি হিলসে গেলে সে আজ বাদে কাল সি-পি হয়ে যেতে পারত।

চাঁদের গায়ে মেঘ জমছে। রিভলভারটা মুঠোয় নিয়ে সোম সিঁড়ি ভাঙল। সামনের দরজায় তালা বন্ধ। তার মানে এখন বাংলোয় কেউ নেই। কেয়ারটেকারটার তো থাকার কথা। বাংলো ছেড়ে চলে যাওয়াটা তো অস্বাভাবিক ব্যাপার। লোকটা বলেছিল দিনের বেলায় বিশেষ প্রয়োজন হলে সে বাইরে যায়। এই তালাটা লোক দেখানো নয় তো! সোমের মাথায় চিন্তা কিলবিল করছিল। কয়েক পা হাঁটতেই তার চোখে পড়ল ওদিকের একটা দরজা হাট করে খোলা। দীর্ঘকাল পুলিশে চাকরি করায় সোমের অনুমানশক্তি এখন প্রবল হয়ে উঠল। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকবে কি ঢুকবে না সে স্থির করতে পারছিল না। দরজার সামনে পৌঁছাতেই তার নাকে গন্ধটা পৌঁছাল। ভেতরে কেউ মরেছে। যে মেরেছে সে ওই দরজা খুলে রেখে পালিয়েছে। এরকম তীব্র গন্ধ নাকে নিয়ে কোনও জীবিত ব্যক্তি বাংলোয় বসে থাকতে পারে না। তার মনে হল যে মরেছে সে যে একটা মানুষ তা দেখা দরকার। এমন তো হতে পারে কুখ্যাত চিতাকেই কেউ খুন করে এখানে রেখে গিয়েছে।

বুনো ঝোপের আড়ালে গাড়ির ভেতর বসে ওরা দেখল লোকটা রিভলভার উঁচিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। স্বজনের প্রথমে মনে হয়েছিল এই লোকটা বাংলোর মালিক হতে পারে, পরে ওর চালচলন এবং রিভলভার দেখে ধারনাটা পাল্টেছে। খুনি নাকি খুনের জায়গায় একবার ফিরে আসে। এই লোকটাও তাই ফিরে এসেছে। রিভলভার উঁচিয়ে যেভাবে ঘরে ঢুকে গেল তাতে মোটেই শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক ভাবার কারণ নেই।

এই সময় পৃথা বলল, ‘খুনি ফিরে এসেছে।’

‘হুঁ। আস্তে কথা বলো।’

‘ও যদি আমাদের দেখতে পায় তাহলে শেষ করে দেবে। প্রথমে চিতা, বাইসন, ডেডবডি আবার খুনি। আমার নার্ভ আর সহ্য করতে পারছে না।’

‘বুঝতে পারছি। কিন্তু লোকটা যদি আজ রাত্রে না বের হয়, আলো ফুটলেই আমাদের দেখতে পাবে। কিছু একটা করা উচিত।’

‘কি করবে? ওর হাতে রিভলভার আছে।’

হঠাৎ স্বজনের মাথায় মতলবটা এল। লোকটা খুনি হোক বা না হোক মাটির নীচের ঘরে নিশ্চয়ই একবার যাবে। খুনি হলে নিজের চোখকে খুশি করতে আর না হলে গন্ধটা কোথেকে আসছে তা দেখার জন্যে তার মতন নীচে নামবে। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলে যদি ওপরের দরজাটা বন্ধ করা যায় তাহলে— । কিন্তু লোকটা কখন নীচে নামছে তা এই এতদূর থেকে বোঝা যাবে কি করে? যদি নীচে না গিয়ে বাইরের ঘরে বসে থাকে! স্বজন নড়তে পারল না। এই মুহূর্তে গাড়িতে বসে থাকাটাই নিরাপদ।

ঘরে আলো জ্বলছে না, সোম সুইচ থেকে হাত সরিয়ে নিল। পকেট থেকে পেন্সিল টর্চ বের করে সে চারপাশে বোলাল। এটা বেডরুম। এখানে একটু আগেও লোক ছিল নইলে বেডকভারটা ওভাবে পড়ে থাকতে পারে না। সে বিছানার ওপর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ দেখতে পেল। চাপা গলায় সোম জিজ্ঞাসা করল, ‘বাংলোয় কেউ আছে? সাড়া না দিলে গুলি খেতে হতে পারে।’

নিজের কানেই শব্দগুলো অন্যরকম শোনাল। সোম মনে মনে নিশ্চিত, এই বাংলোটা খালি, তবে কেউ একটু আগে ছিল। একটু আগে যে কতটা আগে তা সে ঠাওর করতে পারছিল না। পাশের ঘরে ঢুকে সে আরও নিঃসন্দেহ হল। ফ্রিজ খুলে তখনও ঠান্ডা টের পেল। গন্ধটা কি তাহলে পচামানুষের নয়? কাউকে খুন করে পচিয়ে একসঙ্গে কোনও মানুষ থাকতে পারে? গন্ধের উৎস সন্ধান করতে করতে সোম নীচে যাওয়ার সিঁড়ির মুখটায় পৌঁছে গেল।

কাঠের সিড়ি। শব্দটা যতটা কম করলে নয় ততটাই করল সোম। এবং এক সময়ে কফিনের ভেতরে শুয়ে থাকা মৃতদেহটিকে আবিষ্কার করল সে। পুলিশ হিসেবে সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু কম ভীত হল। মৃত ব্যক্তিটির মুখে আলো ফেলামাত্র সে চমকে উঠল। এই লোকটিকে তার না চেনার কোনও কারণ নেই। সি-পি-র সঙ্গে বিশেষ রকমের জানাশোনা। কদিন এই কফিনে শুয়ে আছে কে জানে কিন্তু শরীরে বিকৃতি এসে গেছে। কফিনের ঢাকনা তুলে বিস্ময়ে দাঁড়িয়েছিল সোম হঠাৎ শব্দ কানে আসতেই আলোটাকে সরাল। গোটা কয়েক ধেড়ে ইঁদুর লাফিয়ে ঢুকে পড়েছে কফিনের মধ্যে। তাড়াতাড়ি ঢাকনাটা নামিয়ে দিয়ে সে ভেবে পাচ্ছিল না ইঁদুরগুলোকে ভেতর থেকে কিভাবে বের করে দেবে! বাবু বসস্তাললের শরীরের সঙ্গে ইঁদুরগুলোকে রেখে এসেছে জানলে সি-পি তাকে দ্বিতীয়বার কোর্ট মার্শালে ঝুলিয়ে দেবেন। তাও না হয় হল, কিন্তু লোকটার কতটা ক্ষতি করতে পারে। এখন কামড়লাওে লাগবে না, অসুখবিসুখ করবে না। হ্যাঁ, ইদুরগুলো বাবু বসন্তলালের শরীরের কিছুটা অংশ খেয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু তার আগেই সোম তো পুলিশে খবর দিয়ে দিতে পারে। মৃতদেহের আনাচ কানাচ থেকে ইঁদুর খুঁজে তাড়িয়ে দেওয়ার থেকে সেটা অনেক সহজ।

ওপরে উঠে এল সোম। বাইরের বারান্দায় পা রেখে সে চারপাশে তাকাল। জ্যোৎস্নার দিকে তাকাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হচ্ছে না। এখানে এসেছিল চিতা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনও খবর পাবে বলে, তার বদলে দেখতে পেল বাবু বসন্তলালের শরীর। বোঝাই যাচ্ছে ফোর্স যখন এখানে তল্লাসি করতে এসেছিল তখন মৃতদেহটা ছিল না। অর্থাৎ সাতদিন আগেও বাবু বসন্তলাল বেঁচে ছিলেন। কিন্তু কোথায় ছিলেন? তিনি শহরে এলে হইচই পড়ে যায়। সি-পি ব্যস্ত হয়ে ওঠেন তোষামোদ করতে। মিনিস্টার পার্টি দেন আর ম্যাডাম! ম্যাডাম ওঁর জন্যে সব কিছু করতে পারেন। এই বাংলোয় মাঝে মাঝে বিশ্রামের জন্যে যে ম্যাডাম আসেন তা বাবু বসন্তলালের বাংলো বলেই। বৈদেশিক মুদ্রার একটা বড় অংশ যাঁর হাত ধরে দেশে ঢোকে সেই মানুষটা এখন কয়েকটা ইঁদুর নিয়ে মাটির তলার ঘরে একটা কফিনের মধ্যে শুয়ে শুয়ে পচছে।

হঠাৎ সোমের খেয়াল হল, এই বাংলোয় টেলিফোন বাজছে। টেলিফোন? এখানে? শব্দটা খুবই আস্তে কিন্তু নির্জন বাংলোয় সেটা শোনার পক্ষে যথেষ্ট। ইস, এইটেই এতক্ষণ মাথায় ছিল না। সোম ছুটল। যেখানে ম্যাডাম বিশ্রাম নিতে আসেন সেখানে টেলিফোন না থেকে পারে? যাক, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

অন্ধকার ঘরে শব্দ শুনে টেলিফোনের কাছে পৌঁছে গেল সোম। খপ করে রিসিভার তুলে চিৎকার করল, ‘হ্যালো! হ্যালো!’

ওপাশের মানুষটি যেন কয়েক সেকেন্ড সময় নিল, তারপর কাটা কাটা স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘কে কথা বলছ?’

কে? নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে থমকে গেল সোম। খবরটা সি-পির কাছে পৌঁছে গেলে এখান থেকে আর বের হতে হবে না।

‘হ্যালো। কথা বলছ?’

গলার স্বর যতখানি সম্ভব অশিক্ষিত করে সোম জবাব দিল, ‘আমি এখানে থাকি।’

‘ওখানে তো কারও থাকার কথা নয়। নাম কি তোমার?’

‘আপনি কে বলছেন?’

প্রশ্নটা করা মাত্রই লাইনটা কেটে গেল। সোম পুলিশি অভ্যেসে চটপট অপারেটারকে চাইল, ‘হ্যালো, অপারেটার, বাবু বসন্তলালের বাংলো থেকে বলছি। একটু আগে এখানে কোত্থেকে ফোন করা হয়েছিল?’

অপারেটার সময় নিল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কে বলছেন?’

মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘আমি অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার সোম বলছি।’

‘সরি স্যার, আমি বুঝতে পারিনি। টেলিফোনটা আপনার হেড কোয়াটাস থেকেই করা হয়েছিল। আপনি কথা বলবেন?’ অপারেটারের গলা খুবই বিনীত।

‘না, থ্যাঙ্কু।’ রিসিভার নামিয়ে রাখল সোম। যাচ্চলে। লোকটা নিশ্চয়ই সন্দেহ করেছে। করে টেলিফোনে একটা উড়ো সুযোগ নিয়েছে তাকে ধরার। গলাটা যে পুলিশ কমিশনারের নয় তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অন্য কাউকে দিয়ে করিয়েছে। সোম দিব্য চোখে দেখতে পেল সেই ছোটখাটো অফিসার ছুটতে ছুটতে পুলিশ কমিশনারকে খবর দিতে যাচ্ছে, স্যার, স্যার, এ সি সোমকে পেয়েছি ওই বাংলোয়। আর সেটা শুনে গোমড়ামুখো ভার্গিস বলছে, ‘লোকটা আর এ সি নয় মূর্খ। ওকে এখনই অ্যারেস্ট করো।’

অতএব এখনই এখানে ফোর্স এসে যাবে। ওরা এলে বাবু বসন্তলালের মৃতদেহ খুঁজে পেয়ে যা করার তা করবে কিন্তু তার আগেই ওকে এখান থেকে সরে যেতে হবে। সোম বাইরে বেরিয়ে এল। চাঁদ এখন প্রায় মেঘের আড়ালে। কোথায় যাওয়া যায়? পুলিশের গাড়ি নিয়ে বেশিদূরে গিয়েও কোনও লাভ নেই। ওই গাড়ির জন্যেই তাড়াতাড়ি ধরা পড়তে হবে। আবার গাড়ি ছাড়া এই রকম পাহাড়ি অঞ্চলে বেশিদূর পর্যন্ত যাওয়াও সম্ভব নয়। অন্তত নীচের রাস্তা পর্যন্ত তো যাওয়া যাক, ওরা আসার আগেই এই জায়গা ছাড়া উচিত। সে গাড়ির দিকে পা বাড়াতেই আচমকা কাছাকাছি গাড়ির হর্ন বেজে উঠেই থেমে গেল। প্রচণ্ড চমকে গেল সোম। তাড়াতাড়ি রিভলভার হাতে সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়াল। ওরা এর মধেই এসে গেল! ইম্পসিবে্‌ল। অবশ্য এমনও হতে পারে আগে ফোর্স পাঠিয়ে পরে ফোন করিয়েছে সি-পি। ধরা পড়লে নিস্তার নেই। গাড়ি আসার পথের দিকে সতর্ক চোখে তাকিয়ে পিছু হটতে লাগল সে। কোনমতে ওই ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়লে এখান থেকে সরে পড়া অসম্ভব হবে না।

পাশ ফিরতে গিয়ে কনুই-এর চাপ লাগায় হর্ন বেজে উঠেছিল। আঁতকে ফিরে তাকিয়েছিল পৃথা, স্বজনের মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করা হয়ে গেল। পৃথা চাপা গলায় বলল, ‘কি হবে এখন?’

মনে মনে হাজারবার সরি বললেও কিছুই বলা হবে না। কিন্তু ওরা অবাক হয়ে দেখল যাকে এতক্ষণ খুনি বলে মনে হচ্ছিল সেই লোকটা নির্ঘাত ভয় পেয়েছে। পায়ে পায়ে পিছিয়ে আসছে এদিকেই। আর একটু এলেই তাদের দেখতে পেয়ে যাবে লোকট, পিছন ফিরলেই। স্বজন বুঝতে পারল না হর্ন এদিকে বাজা সত্ত্বেও লোকটা উল্টোদিকে তাকাচ্ছে কেন? কিন্তু এভাবে গাড়ির মধ্যে বসে থেকে লোকটার মুখোমুখি হওয়ার কোনও মানে হয় না। সে পৃথাকে চাপা গলায় বলল, ‘চলো নামি। ধরা পড়তেই হবে।’

‘ধরা পড়ব বলছ কেন? আমরা কি কিছু করেছি?’ পৃথা প্রতিবাদ করল।

সঙ্গে সঙ্গে সোমকে অবাক হয়ে এদিকে তাকাতে দেখা গেল। মানুষের গলার স্বর স্পষ্ট তার কানে পৌঁছেছে। এবং সেটা তার পেছনের বুনো ঝোপ থেকে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। অর্থাৎ তাকে ঘিরে ফেলেছে ওরা।

সোম খুব নার্ভাস গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কে, কে ওখানে?’

স্বজন পৃথার দিকে তাকাল। লোকটার চেহারার মধ্যে রুক্ষত থাকলেও গলার স্বরে, হাবভাবে সেটা একদম নেই। সে গলা তুলল, ‘রিভলভারটা ফেলে দিন।’

সোম বুঝল তার সন্দেহ মিথ্যে নয়। এখন বীরত্ব দেখানো মানে বোকামি করা, সেটা তার চেয়ে বেশি কে জানে। সে রিভলভার মাটিতে ফেলে দিতেই স্বজন ঝোপের আড়াল থেকে হুকুম করল, ‘গুনে গুনে আট পা পিছিয়ে যান।’

অগত্যা সোম আদেশ পালন করল। তাকে খুব অসহায় দেখাচ্ছিল।

পৃথা অবাক হয়ে দেখছিল। এবার বলল, ‘লোকটা খুনি নয়।’

দরজা খুলে বের হচ্ছিল স্বজন, ‘কেন?’

‘খুনিরা এমন সুবোধ হয় না।’

স্বজন কোনও কথা না বলে একদৌড়ে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে মাটিতে পড়ে থাকা রিভলভারটা তুলে নিয়ে সোমের দিকে তাকাল।

জীবনে এত বিস্মিত সোম কখনই হয়নি। স্বজনকে ভাল করে বোঝার আগেই সে দেখল এক সুন্দরী তরুণী ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসছে। এরা কখনই পুলিশ নয়। কোনও বাহিনী তাকে ঘিরে ধরেনি, মাত্র দুটি অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে বোকা বানিয়েছে দেখে সে নিজের ওপর এমন রেগে গেল যে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ধ্যাত!’

রিভলভার হাতে স্বজন হকচকিয়ে গেল, ‘কি হল?’

‘তোমরা কারা?’ সোম প্রশ্ন করার সময়ে ভাবল লাফিয়ে পড়বে কিনা।

‘ভদ্রভাবে কথা বলুন। আমাদের তুমি বলার কোনও অধিকার আপনার নেই।’

‘সরি। আসলে পুলিশে চাকরি করে করে— !’ সোম থিতিয়ে গেল।

‘আপনি পুলিশ?’ স্বজন অবাক।

‘হ্যাঁ, আজ বিকেল পর্যন্ত ছিলাম। আপনারা এখানে কি করছেন।’

স্বজন পৃথার দিকে তাকাল। মেয়েরা মানুষ চেনে হয়তো, এই লোকটা খুনি নাও হতে পারে। সে বলল, ‘আমরা শহরে যাচ্ছিলাম। এখানে আমাদের গাড়ির তেল ফুরিয়ে যায়। একটা চিতা আমাদের আক্রমণ করে। ফলে বাধ্য হয়ে এই জায়গায় আটকে আছি।’

‘ব্যাপারটা যদি গল্প হয় তাহলে আপনাদের কপালে দুঃখ আছে।’ বেশ পুলিশি গলায় ঘোষণা করল সোম।

‘আমি একজন ডাক্তার।’

‘আচ্ছা। গাড়িটা কোথায়?

স্বজন বুনো ঝোপটাকে দেখাল। সোম বুঝতে পারছিল এদের থেকে ভয়ের কিছু নেই। তবু জিজ্ঞাসা করল, ‘বাংলোর ভেতরে গিয়েছেন?’

‘হ্যাঁ। ওখানে একটি মানুষ মরে পড়ে আছে।’

‘লোকটাকে চেনেন?’

‘কি করে চিনব? এই অঞ্চলে এর আগে আসিনি।’

‘কিন্তু ওই লোকটাকে খুনের অভিযোগে আপনাকে যদি ধরা হয়?’

‘টিকবে না। লোকটা মারা গিয়েছে তিনদিনের বেশি আগে। গত পরশুও আমি এখান থেকে কয়েকশো মাইল দূরে অপারেশন করেছি।’

হঠাৎ সোমের খেয়াল হল। আর দেরি করা উচিত নয়। সি-পি যদি তাকে ধরার জন্যে ফোর্স পাঠিয়ে থাকে তাহলে—সে বলল, ‘রিভলভারটা দিন।’

স্বজন বলল, ‘আপনি কে তা না জেনে এটা দেব না।’

‘আমি পুলিশের অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার ছিলাম। ট্র্যাপে পড়ায় আজ থেকে আমার চাকরি নেই। যার জন্যে এই দুরবস্থা তাকে খুঁজতে এখানে এসেছিলাম। লোকটাকে খুঁজে বের করতে না পারলে আমাকে বিনা দোষে শাস্তি পেতে হবে। দিন রিভলভারটা, আমাকে এখান থেকে এখনই চলে যেতে হবে।’ হাত বাড়াল সোম। এই সময় পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকে খুঁজছেন আপনি?’

‘লোকে তাকেও চিতা বলে ডাকে। সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের ক্ষমতা বদল করতে চায়। কিছুতেই তাকে ধরা যাচ্ছে না।’ সোম এগিয়ে এসে রিভলভারটা নিয়ে পৃথার দিকে তাকাল, ‘আপনারা স্বামীস্ত্রী?’

পৃথা বলল, ‘যদি নাও হই তাতে আপনার কি এসে যাচ্ছে।’

‘অ।’ নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে হঠাৎ থমকে গেল সোম। সোজা ফিরে গেল বুনো ঝোপের কাছে।’ এবার গাড়িটাকে দেখতে পেল। পুলিশের গাড়ি নিয়ে বেশি দূর যাওয়া সম্ভব নয় কিন্তু এটাকে তো ব্যবহার করা যেতে পারে। অবশ্য যে অবস্থায় গাছের গায়ে আটকে আছে—!

সে স্বজনকে ডাকল, ‘হাত লাগান, গড়িটাকে তুলি।’

ওরা গাড়িটাকে, হালকা গাড়ি বলেই, তুলতে পারল। নিজের গাড়ি থেকে একটা দড়ি নিয়ে এসে মারুতির সামনের অংশে বেঁধে বলল, ‘আপাতত এখান থেকে চলুন।’

স্বজন নিজের গাড়িতে বসল। পৃথা উঠতে যাচ্ছিল তার আগে কিন্তু সোম ডাকল, ‘ওখানে কষ্ট করে বসতে যাচ্ছেন কেন, এখানে চলে আসুন।’

পৃথা জবাব না দিয়ে মারুতিতেই বসল। সামনের গাড়ির টানে এবার মারুতি বাংলো ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বজন বলল, ‘লোকটা ডাকল, গেলেই পারতে।’

পৃথা বলল, ‘আশ্চর্য! লোকটাকে চিনি না, যা বলছে তা সত্যি কিনা কে জানে!’

গাড়িতে শব্দ হচ্ছে। দরজাগুলোর অবস্থা কাহিল। ওরা জঙ্গলের পথে উঠে এল। পেছনে গাড়ি বাঁধা থাকলে যে-গতিতে গাড়ি চালাতে হয় তার চেয়ে ঢের জোরে চলেছে সোম। লোকটা ভাঁওতাবাজ অথবা খুনি যাই হোক না কেন এই ভয়ঙ্কর বাংলো থেকে ওর কল্যাণে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে, এটাই সত্যি।

প্রাইভেট লেখা বোর্ড পার হয়ে নীচের পিচের রাস্তায় পড়ে সোমকে ডান দিকে বেঁকতে দেখল স্বজন। আশ্চর্য! ডানদিক কেন? ওদিকে তো সমতলে যাওয়ার পথ। তাদের উঠতে হবে বাঁদিক দিয়ে, ওপরে। সে হর্ন বাজাল লোকটাকে থামাবার জন্যে। কিন্তু সোম তা কানেই নিল না। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর সামনের গাড়ি থেমে গেলে স্বজন ব্রেক চাপল। সোম নেমে এল গাড়ি থেকে। তার হাতে একটা সরু পাইপ। বলল, ‘আপনার গাড়ির চাবিটা দিন তো?’

‘কেন?’

‘পেট্রল ক্যাপটা খুলব। ওই গাড়ির পেট্রল এখানে চালান দেব।’ সোম হাসল, ‘পেট্রল পেটে পড়লেই তো ইনি চালু হবেন?’

‘হ্যাঁ তাই মনে হয়। কিন্তু পেট্রল ট্যাঙ্ক লিক্‌ হয়ে গিয়েছে আসার সময়।’

সোম মারুতিটাকে দেখল। নিজের গাড়ি থেকে কিছু যন্ত্রপাতি এবং সাবান বের করে মারুতির সিট সরিয়ে কাজে লেগে গেল। কিছুক্ষণ পরে সোম বলল, ‘মনে হয় ম্যানেজ করেছি, দেখা যাক।’

ওরা দেখল দুটো গাড়িকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে সোম খানিকটা মুখ দিয়ে টেনে এ গাড়ি থেকে ওই গাড়িতে পেট্রল যাওয়ার পথ তৈরি করে দিল।

স্বজন জিজ্ঞাসা করল, ‘কত তেল আছে আপনার গাড়িতে?’

‘সরকারি তেল, হিসেব করে তো কেউ খরচ করে না।’

‘দেখবেন আপনারটা না একদম খালি হয়ে যায়।’

‘খালি করার জন্যেই তো এই ব্যবস্থা’।

স্বজন প্রথমে কথাটার মানে বুঝতে পারেনি। তেল যখন আর এল না তখন সোম বলল, ‘দেখুন তো আপনার গাড়ি ঠিক আছে কিনা।’

স্বজন ইঞ্জিন চালু করে দেখল গাড়ি এত ঝড় সামলেও মোটামুটি ঠিকই আছে। এবার সোম তাকে ডাকল, ‘আমার নাম সোম। আপনার নামটা জানা হয়নি।’

‘আমি স্বজন আর ও পৃথা।’

‘বাঃ ভাল নাম। আপনারা আমার সঙ্গে হাত লাগিয়ে গাড়িটাকে ঠেলুন।’ সোম নিজের গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাল। ওরা গাড়িটাকে ঠেলতেই সেটা বাঁক নিয়ে এগিয়ে চলল খাদের দিকে। সোম দাঁড়িয়ে পড়তেই স্বজন চিৎকার করল, ‘সর্বনাশ, আপনার গাড়ি তো খাদে পড়ে যাবে।’

সোম মাথা নাড়ল, ‘আমি তাই চাই।’

সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটাকে নীচে চলে যেতে দেখল ওরা। অনেক নীচে গাছেদের মাথায় আছড়ে পড়তেই সোম ঘুরে দাঁড়াল, ‘আপনি আমার গাড়িতে ওঠেননি, আমাকে আপনাদের গাড়িতে উঠতে দিতেও কি আপনার আপত্তি আছে পৃথাদেবী?’

০৭. লোকটা মূর্খ

লোকটা মূর্খ। এবং অতিবড় মূর্খ না হলে কেউ ওই বাংলোয় যায় না, গিয়ে টেলিফোন ধরে না। ভার্গিস বিড়বিড় করলেন। এখন মধ্যরাত। বিছানায় শুয়ে খবরটা পাওয়ামাত্র সোমের মুখটাকে মনে করলেন তিনি। লোকটার আর বাঁচার পথ খোলা রইল না। কিন্তু তিনি চাননি ও এত চটজলদি ধরা পড়ুক। অনেকসময় বোকারাও ফস্‌ করে ঠিকঠাক কাজ করে ফেলে। চিতাটাকে যদি সোম ধরতে পারত—! কিন্তু আর দেরি করা উচিত হবে না। খবরটা বোর্ডের কাছে পৌঁছাবেই। ভার্গিস তাঁর দ্বিতীয় সহকারী কমিশনারকে ফোন করলেন, ‘ঠিক এই মুহূর্তে তুমি কি করছ?’

সহকারী কমিশনার সন্ত্রস্ত হয়ে ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে তাকাল, ‘ইয়ে, কিছু না স্যার।’

‘গুড। বাবু বসন্তলালের বাংলোটার কথা মনে আছে? ম্যাডাম যেখানে বিশ্রাম নিতে যান!’

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘সেখানে সোম গিয়েছে। ভোরের আগেই ওকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে এসো।’ লাইন কেটে দিলেন ভার্গিস। একটা ব্যাপার তাঁকে বেশ স্বস্তি দিচ্ছিল। তাঁর গোয়েন্দাবিভাগ যে যথেষ্ট সক্রিয় তা আর একবার প্রমাণিত হল। নানা জায়গায় ঢুঁ মারতে মারতে ওরা ওই বাংলোয় ফোন করেছিল। একটা গলা পায় অথচ গলাটা অশিক্ষিত কেয়ারটেকারের নয়। ওদের সন্দেহ হয়। কিছুক্ষণ পরে তারা অপারেটারকে ফোন করে জানতে পারে সোম ওখানে আছে। এই মূর্খ তাঁকে সরিয়ে সি পি হতে চেয়েছিল। নিজের পরিচয় কেউ অপারেটারকে দেয়!

ভার্গিসের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল সোমকে যে ধরা যাচ্ছে তা মিনিস্টারকে ফোন করে জানিয়ে দিতে। কিন্তু এত রাত্রে সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাঁর ঘুম আসছিল না। কালকের দিনটা হাতে আছে। উপায় না থাকলে তিনি সমস্ত শহরটাতে চিরুনি তল্লাশি করতেন। ভার্গিস বিছানা থেকে নেমে ওভারকোট পরে নিলেন। সার্ভিস রিভলভারটাকে একবার পরীক্ষা করে ইন্টারকমে হুকুম করলেন জিপ তৈরি রাখার জন্যে। তারপর জানলায় গিয়ে দাঁড়ালেন। ঘুমন্ত শহরের অনেকটাই এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুত শান্ত হয়ে আছে শহরটা। আসলে এটা ভান। কয়েকবছরে অজস্র গুলি চলেছে, বদমাসগুলোকে তিনি যেমন মেরেছেন তাঁর বাহিনীর লোকও কিছু মরেছে। এবার বেশ কিছুদিন ওরা চুপচাপ। ওই আকাশলাল আর তার তিন সঙ্গীকে ফাঁসিতে লটকালেই চিরকালের জন্যে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে ওদের লড়াইয়ের চেষ্টা। অথচ এই ছোট্ট কাজটাই করা যাচ্ছে না।

ভার্গিস চুরুট ধরালেন। ওরা শাসনব্যবস্থা পাল্টাতে চায়। বোর্ড এবং তাঁদের নিয়োগ করা মন্ত্রিপরিষদের ওপর ওদের আস্থা নেই। স্বৈরাচারী শাসক বলে মনে করে জনগণবিপ্লবের ডাক দিয়েছে ওরা। ভার্গিসকে এসব করতে হচ্ছে যেহেতু তিনি নিজেকে একজন বিশ্বস্ত সৈনিক বলে মনে করেন। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন আসে, কার প্রতি তিনি বিশ্বস্ত? যারা ক্ষমতায় আছে না এই দেশের প্রতি! উত্তরটা বড় গোলমেলে।

ভার্গিস বেরিয়ে এলেন। ফিনফিনে জ্যোৎস্নায় তাঁর জিপ সেপাইদের স্যালুট অবজ্ঞা। করে পথে নামল। এই মুহূর্তে ড্রাইভার গন্তব্য জানার জন্যে অপেক্ষা করছে বুঝে তিনি আদেশ দিলেন, ধীরে ধীরে শহরের সব রাস্তায় পাক খাও। কোথাও দাঁড়াবে না আমি না বললে।’

জিপের পেছনে তাঁর দুজন দেহরক্ষী অস্ত্র নিয়ে বসে। আর কাউকে সঙ্গে নেননি তিনি। মাঝরাতে এইরকম ঘুরে বেড়ানো পাগলামি হতে পারে কিন্তু তাঁর যে ঘুম আসছিল না। তাছাড়া কে বলতে পারে নির্জন রাজপথে ঘোরার সময় কোনও ক্লু তিনি পেয়েও যেতে পারেন।

ভার্গিস দেখলেন ফুটপাথে বেশ কিছু মানুষ মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। উৎসবের জন্যে আগে ভাগে এসে পড়েছে এরা। পকেটে টাকা নেই যে হোটেলে থাকবে। এদের মধ্যে আকাশলাল যদি শুয়ে থাকে তাহলে তিনি ধরবেন কি করে! উৎসবটা আর হওয়ার সময় পেল না! তিনি বাঁ দিকের ফুটপাথ ঘেঁসে গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। জিপ দাঁড়াল। ভার্গিস দেহরক্ষীদের বললেন, ‘ওই আটজন ঘুমন্ত মানুষকে তুলে নিয়ে এসো এখানে।’

দেহরক্ষীরা কঠোরভাবে আদেশ পালন করল। আচমকা ঘুম ভাঙা আটজন দেহাতি মানুষ কাঁপতে কাঁপতে জিপের পাশে এসে দাঁড়াল। এদের অনেকেই চাদর মুড়ি দিয়ে থাকায় ভার্গিস আদেশ করলেন সেগুলো খুলে ফেলতে। তারপর জোরালো টর্চের আলোয় একে একে মুখগুলো পরীক্ষা করলেন। আটনম্বর লোকটার নজর তাঁর ভাল লাগল না। টর্চের আলো ওর মুখ থেকে না সরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোর নাম?’

‘হুজুর।’

‘নাম বল?’

‘ফাগুলাল।’ চিঁচিঁ করে জবাব দিল লোকটা।

‘কোথায় থাকিস?’

‘ওরেগাঁও।’

‘আকাশলাল তোর কে হয়?’

‘কৌন?’

‘আকাশলালের নাম শুনিসনি?’

‘না। আমাদের গ্রামে কেউ নেই।’

ভার্গিস দেহরক্ষীকে হুকুম করল আকাশলালের ছবি দেখাতে। দেওয়ালে লটকানো পোস্টারটাকে দেহরক্ষী খুলে নিয়ে এসে লোকটার সামনে ধরল। ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন, ‘চিনিস?’

বোকার মত মাথা নাড়ল লোকটা, না।

দেহরক্ষীদের উঠে আসতে ইশারা করে চালককে জিপ ছাড়ার নির্দেশ দিলেন তিনি। এই এক ঘটনা সব জায়গায় ঘটছে। কোনও শালা ওকে চেনে না। কথাটা যে মিথ্যে তা শিশুও বলে দেবে। কিন্তু মিথ্যেটা প্রমাণ করা যাচ্ছে না। জিপ চলছিল সাধারণ গতিতে এ পথ থেকে ও পথে। এত রাত্রে কোনও গাড়ি নজরে পড়ছিল না। পাহাড়ি শহরে সময় গাড়ি চলার কথাও নয়। ঘুরতে ঘুরতে তিনি চাঁদি হিলসের রাস্তায় চলে এলেন। এবং তখনই তাঁর নজরে পড়ল ফুটপাথে এক বৃদ্ধা চিৎকার করে কাঁদছে। বৃদ্ধার পাশে একটি শরীর শুয়ে আছে। হয়তো ওর কেউ মরে গেছে। এই ধরনের সাধারণ শোকের দৃশ্যে না যাওয়াই ভাল কিন্তু তাঁর কানে এল চিৎকারের মধ্যে পুলিশ শব্দটা বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করল বৃদ্ধা। পুলিশকে গালিগালাজ করছে যেন। তিনি জিপ থামিয়ে নেমে পড়লেন। খানিকদূরে জনাচারেক মানুষ উবু হয়ে বসে শোক দেখছিল। পুলিশ দেখে তারা সরে পড়ার চেষ্টা করতেই ভার্গিস ধমকালেন, ‘কেউ যাবে না। দাঁড়াও!’

লোকগুলো দাঁড়িয়ে গেল। একদম চোখের সামনে পুলিশ দেখে বৃদ্ধা হকচকিয়ে চুপ মেরে গেল। ভার্গিস তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে মরেছে?’

‘আমার ছেলে। একটাই ছেলেকে মেরে ফেলল।’ বৃদ্ধা ককিয়ে উঠল।

‘কে মেরেছে?’

বৃদ্ধা জবাব না দিয়ে ফোঁপাতে লাগল।

‘কে মেরেছে বল তার শাস্তি হবে।’

হাউহাউ করে কাঁদল বৃদ্ধা, ‘পুলিশ মেরেছে।’

‘পুলিশ!’ এটা আশা করেননি ভার্গিস। তাঁর কাছে তেমন কোনও রিপোর্টও নেই। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পুলিশ তোমার ছেলেকে কেন মারল?’

‘ও টাকার লোভে পুলিশের কাছে গিয়েছিল। পুলিশ ওকে খুব পিটল। তবু ছেলে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এল। বললাম হাসপাতালে যেতে। গেল না। বলল, হাসপাতালে গেলে পুলিশ আবার মারবে। তারপর সন্ধেবেলায় শুয়ে শুয়ে হঠাৎ মুখ থেকে রক্ত তুলল। তুলতে তুলতে মরে গেল।’

‘কারা ওকে টাকার লোভ দেখিয়েছিল?’ ভার্গিস গন্ধ পেলেন।

‘জানি না হুজুর। বলেছিল পুলিশকে একটা খবর দিতে যেতে হবে।’

‘ওর মুখ থেকে চাদর সরাও।’

বৃদ্ধা কাঁপা হাতে চাদরটা সরালে ভার্গিস টর্চের আলো ফেললেন। হ্যাঁ, এই লোক। এই লোকটাকে খুঁজে বের করতে বলেছিলেন তিনি সোমকে। সোম গিয়ে বসে আছে বাবু বসন্তলালের বাংলোয় আর এই লোকটা ফুটপাথে মরে পড়ে আছে। নিশ্চয়ই ধোলাইয়ের সময় পেটের কিছু জখম হয়েছিল! এই লোকটার কাছ থেকে কোনও খবর পাওয়া যাবে না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ও মরে যাওয়ার পর কেউ দেখতে এসেছিল?’

‘হুজুর, পুলিশের হাতে মার খেয়ে মরেছে শুনলে কেউ কাছে আসে?’

‘আঃ। পুলিশের হাতে মরেছে বলছ কেন? ও তো দিব্যি হেঁটে ফিরে এসেছিল। ঠিক আছে। আমার লোক আসছে। ওর মৃতদেহ ভাল করে সৎকার করে দেবে।’ ভার্গিস জিপের দিকে ফিরে চললেন। দেহরক্ষীরা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি ইশারায় তাদের ছেড়ে দিতে বললেন। তাঁর মনমেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। একটা ভাল ক্লু হাতছাড়া হয়ে গেল। ওয়ারলেসে তিনি মৃতদেহ সরাবার হুকুম জানিয়ে দিলেন।

ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে ছিল আকাশলাল। এই দুটো রাত তার পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তার বলেছেন কোনও রকমে টেনসনের মধ্যে থাকা ওর স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক হবে। কথাটা শুনে হেসেছিল সে। তারপর সহকর্মীদের অনুরোধে ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে ছিল।

সন্ধের পরেই খবরটা এসেছিল। যে মানুষটিকে ডেভিড পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে পাঠিয়েছিল সে মারা গিয়েছে। লোকটা সাধারণ মানুষ, খুব গরিব, ফুটপাথে বাস করত। কিন্তু তাকে যখন বলা হয়েছিল এটা আকাশলালের কাজ তখন সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়েছিল যেতে। যদিও এখন অনেকে বলছে সে টাকার লোভে অতবড় ঝুঁকি নিয়েছিল কিন্তু কথাটা যে সত্যি নয় তা মানুষের জানা উচিত। কিন্তু এই খবরটা আকাশলালকে জানাতে গিয়েও জানাতে পারেনি ডেভিড। মানুষটার টেনসন আরও বাড়বে। সে এবং হায়দার আলোচনা করেছিল এই অবস্থায় লোকটির দেহ কোন্ মর্যাদায় সৎকার করা সম্ভব। ঠিক হয়েছিল ভোর রাত্রে কয়েকজন কর্মী যাবে শববাহক হিসেবে। কারণ মধ্যরাত্রে রাজপথ নিরাপদ নয়। অথচ মাঝরাতের পর খবরটা এল। স্বয়ং পুলিশ কমিশনার লোকটির মৃতদেহ আবিষ্কার করেছেন এবং তাঁর নির্দেশে পুলিশ সৎকারের ব্যবস্থা করেছে। ব্যাপারটা তাদের হতাশ করেছিল। মৃতদেহ দেখে সাধারণ মানুষ যাতে সরকারের ওপর আরও ক্রুদ্ধ না হতে পারে তার ব্যবস্থা করেছেন সি পি।

ডেভিড সিগারেট ধরাল। এখন চব্বিশ ঘন্টায় চার ঘন্টা ঘুমানো অভ্যেস হয়ে গেছে। কয়েকবছর ধরে এই জীবন। সে, হায়দার আকাশলাল অথবা যারা মরে গেছে ইতিমধ্যে তাদের প্রত্যেকের জীবনে এই শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার দগদগে ঘায়ের মত রস ঝরিয়েছে। এর বদলা নেবার জন্যে তিলতিল করে তারা তৈরি হয়েও শেষপর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়ছে বারংবার। এইবার শেষবার। কিন্তু লোকটাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তার নেওয়া উচিত ছিল। এখনও এই ঘর থেকে না বেরিয়েও শহরের যে-কোনও জায়গায় যা কিছু করার ক্ষমতা তাদের আছে। আকাশলাল নিশ্চয়ই তার কাছে কৈফিয়ত চাইবে। নিজের কাছেও তো সে কোনও কৈফিয়ত দিতে পারছে না।

টেলিফোন বাজল। ডেভিড সময় দিল কিছুটা। এই রাত্রে কেউ চট করে রিসিভার তোলে না। টেলিফোনটা সাতবার আওয়াজ করার পর সে রিসিভার তুলল, ‘হ্যালো!’

‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। তিননম্বর চেকপোস্ট থেকে বলছি। এইমাত্র লাল মারুতি চেকপোস্ট পার হয়ে গেল।’ লোকটা দ্রুত বলে ফেলল।

‘এত রাত্রে। ঠিক আছে।’ রিসিভার নামিয়ে রাখল ডেভিড। সে ঘড়ির দিকে তাকাল। আর আধ ঘন্টার মধ্যে গাড়িটা শহরে ঢুকছে। লোকটার সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব হায়দারের। ডেভিড উঠল। পাশের ঘরে হায়দার লম্বা কৌচে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আকাশলালের একটা লাইন মনে পড়ল, ‘ঘুম, তুমি আমার খুব প্রিয়, কিন্তু আমার হাতে সময় নেই তোমায় সঙ্গ দেবার।’ ডেভিড হায়দারকে তুলল। যতই ঘুমে আচ্ছন্ন থাকুক এক ডাকে উঠে পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। ডেভিড তাকে টেলিফোনটার কথা বলল। হায়দার ঘড়ি দেখল। এখন রাত সাড়ে তিনটে। ভোর হতে বেশি দেরি নেই। তিন নম্বর চেকপোস্ট দিয়ে যখন আসছে তখন সহজেই ওদের খুঁজে নেওয়া যায়।

হায়দার বলল, ‘লোকটাকে আমাদের দরকার। এত রাত্রে শহরে ঢুকলে পুলিশের হাতে পড়বে।’

ডেভিড মাথা নাড়ল, ‘তা ঠিক, কিন্তু পুলিশ ওদের কি করবে?’

‘ওদের মানে?’

‘তোমার মনে নেই, ওর সঙ্গে একজন মহিলা আছে। যদি স্বামী স্ত্রী হয় তাহলে এক দিক দিয়ে ভালই। পুলিশ বিশ্বাস করবে ওরা নিরীহ আগন্তুক।’

‘তাছাড়া ওদের কাছে নিশ্চয়ই পরিচয়পত্র আছে। ওরা এই রাজ্যের নাগরিক নয়। অতএব কিছু করার আগে পুলিশ ভাববে কিন্তু আমি চাইছিলাম না ওরা একটুও নাজেহাল হোক। এইসব লোক বিগড়ে গেলে পরে কাজ করতে অসুবিধে হয়।’

‘কি করতে চাও? ওকে তো জানানো হয়েছে কোথায় ওর ঘর বুক করা হয়েছে। নিশ্চয়ই সেখানেই উঠবে এখন। আগামীকাল যোগাযোগ করলেই হয়।’

‘ঠিক তাই। কিন্তু তার আগে দেখা দরকার ও সেই ঘরে পৌঁছাচ্ছে কি না। আমি একটু ঘুরে আসছি।’ হায়দার দ্রুত সাজবদল করতে বসল। মিনিট তিনেকের মধ্যেই তার চেহারা একজন দেহাতি মানুষ যে শহরে উৎসব দেখতে এসেছে তেমন চেহারা নিয়ে নিল। ডেভিড আপত্তি করল না। এ ব্যাপারে তার নিজের ওপর আস্থা না থাকলেও হায়দারের ওপর ভালভাবে আছে।

এই বাড়িটা অদ্ভুত। নীচে গোটা তিনেক ডিপার্টমেন্টাল শপ। তাদের পাশ দিয়ে ওপরে ওঠার যে সিঁড়ি তা দিয়ে দোতলায় পৌঁছানো যায়। সেখানে তিনজন বৃদ্ধ যাজক থাকেন। এঁরা তেমন নড়াচড়া করতে পারেন না। চাকরই সব কাজ করে দেয়। মাঝে মাঝে জানলায় যাজকদের দেখা যায়। দোতলায় পাঁচটি ঘর। প্রতিবেশীরা কৌতূহলী হয়ে প্রথম প্রথম এখানে এসেছিল। কিন্তু বৃদ্ধদের একঘেয়ে বিরক্তিকর কথাবার্তায় আয় এদিকে আসার কথা ভাবেনি। এই তিনজন বৃদ্ধ মানুষকে সামনে রেখে ডেভিডদের আপাত আশ্রয়। বাড়িটার পেছন দিকে একটা ঘোরানো সিঁড়ি দিয়েই যাতায়াত। ওদিকে কারও নজর পড়ার উপায় নেই। কারণ সেখানে একটা সিনেমা হলের বিশাল পাঁচিল রয়েছে। এই তিন বৃদ্ধ আকাশলালকে স্নেহ করেন, তার জন্যে প্রার্থনা জানান কিন্তু একই বাড়িতে থেকেও কখনও দেখা করেন না।

হায়দার রাস্তায় নেমে দেখে নিল দুদিক। পুলিশের গাড়ির কোনও চিহ্ন নেই। মাইনে করা লোকেরা যতই টহল মারুক শেষরাত্রে হাই তুলবেই। সে দ্রুত পা চালাল। দলে তাকে এই হাঁটার ধরনের জন্যে খরগোস বলে ডাকে কেউ কেউ। শেষপর্যন্ত সে সেই রাস্তায় পৌঁছাল যেখানে মানুষজন ফুটপাথেই মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। এখন চারপাশে বেশ কুয়াশা। দূরে জিপের আলো দেখতে পেয়ে সে চট করে ফুটপাথে অন্যান্যদের পাশে শুয়ে পড়ল। জিপটা খুব ধীরে ধীরে আসছে। এত ধীরে যে দরজা খুলে ওঠা যায়। কুয়াশা থাকায় আরোহীদের দেখা যাচ্ছে না। যদিও অনুমান করতে কোনও অসুবিধে হবার কথা নয়। জিপটা বাঁদিকে বাঁক নিতেই উল্টো দিক থেকে আর একটা গাড়ির আলো দেখা গেল। জিপটা সরে এল মাঝ রাস্তায়।

গাড়ির ব্যাপারস্যাপার স্বজনের চেয়ে সোম ভাল জানেন, প্রথম দিকে এমনটা মনে হয়েছিল। স্বজন গাড়ি চাল্লাচ্ছিল সাবধানে। পাশে সোম বসে, পেছনে পৃথা। গাড়িটা শব্দ করছে খুব কিন্তু অন্য কোনও ঝামেলা পাকাচ্ছে না। পেট্রলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল না। যদিও দরজার চেহারা খুব হাস্যকর। সোম জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনারা উৎসব দেখতে যাচ্ছেন?’

‘উৎসব? কিসের উৎসব?’

‘ওঃ। আপনারা এমন সময়ে এখানে এসেছেন যে সময়টার জন্যে পাহাড়ের মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকে। ছোট ছোট গ্রাম থেকেও মানুষ ছুটে আসে শহরে। দিনটা পরশু।’

‘কোনও ধর্মীয় ব্যাপার?’

‘ব্যাপারটা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এখন।’ সোম স্বজনকে ভাল করে দেখল, ‘তাহলে এমনি আসা হচ্ছে? টুরিস্ট?’

‘হ্যাঁ। বেড়াতে এসে কাজ করা আমি একদম পছন্দ করি না।’ ‘পেছন থেকে পৃথা বলল।

‘ভাল। খুব ভাল। কিন্তু উঠবেন কোথায় তা ঠিক করেছেন। এখন খুব ভিড় শহরে।’

‘ওরা ঠিক করে রেখেছে।’ স্বজন উত্তর দিল।

‘কারা?’

‘যাদের আমন্ত্রণে আমি এসেছি।’ স্বজন হাসল।

‘আমরা সেখানে উঠব না। উঠলেই ওরা তোমাকে দিয়ে কাজ করাবে।’ পৃথা প্রচণ্ড আপত্তি জানাল, আচ্ছা, আপনার জানাশোনা ভালো হোটেল আছে?’

সোম হাসল, ‘বিস্তর। আমি বললে ওরা নতজানু হয়ে ঘর দেবে, পয়সা নেবে না।’

‘সে কি? কেন?’ পৃথা অবাক।

‘এখানে পুলিশের বড়কর্তার গুডবুকে সবাই থাকতে চায়। অবশ্য আমি আর পুলিশের কোনও কর্তাই নই। খবরটা পেয়ে গেলে ওরা পাত্তা দেবে না বলেই মনে হয়।’

স্বজন তাকাল, ‘আলাপ হবার সময় এই কথাটা একবার বলেছিলেন। ব্যাপারটা কি?’

‘আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এই সরকারের বিরুদ্ধে একদল মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহ করতে চাইছে। অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের নেতাকে ধরা যাচ্ছে না। প্রচুর টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা সত্ত্বেও জনসাধারণ তাকে ধরিয়ে দিচ্ছে না। এই লোকটার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আমি বোকা বনেছি বলে আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। একদিনের মধ্যে লোকটাকে খুঁজে বের না করতে পারলে আমার রক্ষে নেই।’ করুণ হয়ে গেল সোমের গলার স্বর।

‘ফাঁদটা কি ছিল?’

সোম অল্পকথায় ঘটনাটা বলল। শুধু নিজের টাকার প্রতি লোভপ্রসঙ্গ এড়িয়ে গেল।

পৃথা বলল, ‘এসব জানলে এখানে আসতাম না। যে-কোনও সময় গোলমাল হতে পারে।’

‘উৎসবের সময় কিছু হবে না।’ সোম বলল।

‘আপনি লোকটাকে খুঁজে পাবেন?’ স্বজন জিজ্ঞাসা করল।

‘খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মত অবস্থা। আপনি কিসের ডাক্তার?’

‘কেন?’

‘এই যে বললেন কারা আপনাকে নেমন্তন্ন করে আনছে!’ কথা বলতে বলতে নাক টানল সোম, ‘পেট্রলের গন্ধ পাচ্ছি। দাঁড়ান তো একটু।’

দাঁড়াল স্বজন। ওপাশের দরজা দিয়ে নামা যাবে না। স্বজন নেমে দাঁড়ালে সেদিক দিয়ে নেমে এল সোম। পেট্রল আবার লিক করছে। পৃথাকে নামিয়ে সিট তুলে পেট্রল ট্যাঙ্কের তলায় হাত ঢুকিয়ে আরও কিছুক্ষণ মেরামতির চেষ্টা করল সোম। তারপর বলল, ‘যা তেল আছে আপনারা শহরে পৌঁছে যেতে পারবেন।’

‘আপনি?’ স্বজন জিজ্ঞাসা করল।

‘এরপর আপনার গাড়িতে গেলে ভার্গিস আমাকে ছিঁড়ে খাবে।’

‘ভার্গিস কে?’

‘যাকে কেউ কখনও হাসতে দ্যাখেনি। আমাদের কমিশনার।’

‘আপনি তো শহরেই ফিরবেন?’

‘হ্যাঁ। শহরে ঢুকতে হলেই একটা চেকপোস্ট পড়বে। ওরা দেখুক আমি চাই না।’

‘তাহলে আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না?’

‘শহরে যখন থাকছেন তখন দেখা হয়ে যাবেই।’

স্বজন গাড়ি চালু করে বলল, ‘লোকটা ভালই।’

‘ওপর-চালাক।’‘ পৃথা মন্তব্য করল।

এরপর ওরা তিন নম্বর চেকপোস্টে পৌঁছাল। পরিচয়পত্র দেখিয়ে ছাড়া পেয়ে জোরে গাড়ি ছুটাতে গিয়েও পারা যাচ্ছিল না কুয়াশার জন্যে। যত ওপর উঠছে তত কুয়াশা বাড়ছে। শেষপর্যন্ত শহরের আলো চোখে পড়ল। ঢোকার মুখেই পুলিশের একপ্রস্ত জেরার সামনে পড়তে হল। পৃথার কথা মনে রেখে স্বজন নিজেদের পরিচয় দিল টুরিস্ট হিসেবেই। পথে গাড়ি খারাপ হওয়ায় দেরি হয়ে গেছে।

শহরটা ঘুমাচ্ছে। দুপাশের ঘুমন্ত বাড়িঘরদোর মন্দ নয়। রাস্তায় একটা মানুষ দেখা যাচ্ছে না যাকে জিজ্ঞাসা করা যায়। হঠাৎ দূরে একটা জিপের আলো দেখা গেল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে জিপটা হঠাৎ মাঝরাস্তায় চলে গেল আটকে দেওয়ার ভঙ্গিতে। স্বজন অবাক হল। সে ইঞ্জিন বন্ধ করতে ভরসা পাচ্ছিল না। যে-কোনও মুহূর্তেই গাড়ি অচল হয়ে যাবে। দরজা খুলে সে এগিয়ে গেল জিপের দিকে। কাছে আসতেই তার নজরে এল এক বিশালদেহী পুলিশ অফিসার তার বুক লক্ষ করে রিভলভার ধরে রেখেছে।

০৮. সেপাইরা গাড়িটাকে ঘিরে ফেলল

সেপাইরা গাড়িটাকে ঘিরে ফেলল। প্রত্যেকেই অস্ত্র উঁচিয়ে রেখেছে। নির্দেশ পাওয়ামাত্র গুলি ছুটবে। ভার্গিস চুরুট চিবোতে চিবোতে গাড়িটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, ‘রাস্তায় নেমে আসতে হবে।’

স্বজন পৃথার দিকে তাকাল। এত কাণ্ডের পরে শহরে ঢুকে এ রকম অভ্যর্থনা কপালে জুটবে তা ওরা ভাবতে পারেনি। পৃথার মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। কোনওরকমে দরজা খুলে স্বজন আগে নামল, পৃথাকে নামতে সাহায্য করল। তারপর ভার্গিসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা এই শহরে এইমাত্র ঢুকেছি। কিন্তু আপনারা যেভাবে আমাদের ঘিরে ধরেছেন তাতে মনে হচ্ছে আমরা অপরাধী।’

‘এত রাত্রে এই শহরে কোনও ভূদ্রমানুষ আসে না। পরিচয়টা কি?’

‘আমি একজন ডাক্তার। ইনি আমার স্ত্রী।’

‘যে কেউ যখন ইচ্ছে এমন পরিচয় দিতে পারে। লিখিত প্রমাণ কিছু আছে?’

স্বজন আবার গাড়ির ভেতর মাথা গলিয়ে নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্সটা বের করে ভার্গিসকে দিল। দিয়ে বলল, ‘এই জিনিসটা যে কেউ যখন ইচ্ছে তৈরি করিয়ে রাখতে পারে।’

‘আচ্ছা।’ ভার্গিস ছোট চোখে স্বজনকে দেখলেন, ‘শরীরে দেখছি চমৎকার তেল আছে। আমার এখানে ওই তেল বের করে নেবার যন্ত্র নেই এমন ভেবো না ডাক্তার। আমি এখানকার সি পি, কথা বলবে বুঝেসুঝে। গাড়িটার এই হাল হল কি করে?’

‘অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল।’

ভার্গিস গাড়িটাকে পাক দিয়ে এলেন, ‘মিথ্যে কথা বলার অপরাধে তোমাকে গ্রেপ্তার করা হল। কাল সকালে এক প্রস্ত কথাবার্তা বলার পর সিদ্ধান্ত নেব।’

‘কি বললেন? আমি মিথ্যে কথা বলছি?’ প্রায় চিৎকার করে উঠল স্বজন।

একশো বার, অ্যাকসিডেন্টে গাড়ির একটা দিক আঘাত পায়। এ গাড়ির কোনও দিকই বাকি নেই। তুমি কি আমাকে নির্বোধ মনে করছ? তোমার এই টিনের বাক্সটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে আঘাত করা হয়েছে। কোন অ্যাকসিডেন্টে এমন হয়?’ ভার্গিস সেপাইদের ইশারা করতে তাদের দুজন এগিয়ে এসে স্বজনকে ধরে ফেলল। ভার্গিস এবার পৃথার সামনে দাঁড়ালেন, ‘ম্যাডাম। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। এই মুহূর্তে আমরা এমন এক উদ্বেগে আছি যে কোনও ঝুঁকি নিতে পারি না। তবে যেহেতু আপনি একজন মহিলা এবং সুন্দরী তাই এই শহরে আপনি নিরাপদ যতক্ষণ আপনি রাষ্ট্রবিরোধী কোনও কাজ না করছেন। আপনি ইচ্ছে করলে আমাদের রেস্ট হাউসে যেতে পারেন অথবা কোনও ঠিকানা থাকলে সেখানে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।’

এতক্ষণে যেন নিজেকে ফিরে পেল পৃথা, ‘আমার স্বামীকে আপনি গ্রেফতার করছেন কেন?’

‘শুনতেই পেয়েছেন কেন ওকে আমার প্রয়োজন। এই শহরে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত কিছু মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাকে নিঃসন্দেহ হতে হবে যে আপনার স্বামী তাদের দলে নেই।’

‘আমরা যদি সেইরকম কেউ হতাম তা হলে কি এমন প্রকাশ্যে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম?’

‘আপনার সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাই না ম্যাডাম। আপনারা কোথায় যাচ্ছিলেন?’

‘টুরিস্ট লজে।’

‘ওখানে কি জায়গা পাবেন?’

‘আমাদের জন্যে ঘর বুক করা আছে।’

‘আচ্ছা! শহরে আসার উদ্দেশ্য কি?’

‘আমরা বেড়াতে এসেছি।’

‘সেটা সত্যি হলে আমি খুশি হব। চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি।’ ভার্গিস ইশারায় নিজের গাড়ি দেখালেন। পৃথা মাথা নাড়ল, ‘না আমরা একসঙ্গে যাব। আমি আবার বলছি ওকে মিছিমিছি সন্দেহ করছেন। ও একজন বিখ্যাত ডাক্তার। বিদেশেও কাজ করেছে।’

ভার্গিস এ-কথায় কান দিলেন না। তাঁকে অনুসরণ করে সেপাইরা স্বজনকে জোর করে টেনে নিয়ে জিপে তুলল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে ভার্গিস চিৎকার করলেন, ‘এখান থেকে সোজা পাঁচ মিনিট এগিয়ে গেলেই টুরিস্ট লজ দেখতে পাবেন। গুডনাইট।’

একটি সুন্দরী মহিলাকে এমন সময়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে যাওয়া ভার্গিসের পক্ষেই সম্ভব, হায়দার মনে মনে বলল। পুরো দৃশ্যটা সে দেখেছে আড়াল থেকে। দেখতে দেখতে যে সন্দেহটা মনে আসছিল তা শুধু ওই মহিলার উপস্থিতিতেই গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। ডাক্তারের আসার কথা একা। আর ওই গাড়িটার দিকে তাকালে শুধু অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে শুনলে কিছুই শোনা হয় না। কোনও গাড়িকে এমন উদ্ভট চেহারা নিয়ে চলতে হায়দার কখনও দেখেনি। তাই ভার্গিস সন্দেহ করে ভুল করেনি।

পৃথা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। এমন একটা ঘটনা ঘটবে তা সে কল্পনা করতে পারেনি। যে পুলিশ অফিসারকে ওরা মাঝরাস্তায় নামিয়েছিল তাকে দেখেই কেমন অস্বস্তি হয়েছিল। লোকটা তাদের সাহায্য না করলে বাংলো থেকে বের হওয়া মুস্কিল হত বলেই উপেক্ষা করতে পারেনি। আজকের রাতটা খুব খারাপ, একই সঙ্গে এতগুলো বিপদ তার কল্পনার বাইরে। ভোর হতে আর দেরি নেই। পৃথা ঠিক করল সে কোথাও যাবে না। এই ভাঙাচোরা গাড়ির মধ্যে সে অনেক নিরাপদ বোধ করবে আলো ফোটা পর্যন্ত। তারপর এখানকার পুলিশ-হেডকোয়াটার্সে যাবে স্বজনের খোঁজ নিতে। সে যখন ড্রাইভিং সিটের দিকে এগোচ্ছে তখনই লোকটাকে দেখতে পেল। খুবই সন্তর্পণে রাস্তার পাশের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে।

পৃথার হৃৎপিণ্ড যেন লাফিয়ে উঠল। লোকটা কে? নির্জন রাজপথে একটা উদ্দেশ্যেই এরা এগিয়ে আসে। কিন্তু যেহেতু মানুষটা একা সে সহজে আত্মসমর্পণ করবে না। গাড়ির ভেতরে পা বাড়াবার সময় তার কানে এল, ‘নমস্কার ম্যাডাম। আপনি আমাকে শত্রু ভাববেন না।’

‘আপনি কে?’ প্রায় চিৎকার করে উঠল পৃথা।

‘আমি এই শহরেই থাকি। পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্যে জনসাধারণকে সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আপনার স্বামীকে কমিশনার সাহেব যেভাবে গ্রেপ্তার করল তা আমি দেখেছি। আপনি যে ভেঙে পড়েননি তার জন্যে ধন্যবাদ।’ হায়দার বলল।

‘আপনার নাম?’

‘নাম বললে আপনি চিনতে পারবেন না ম্যাডাম। আচ্ছা, শুনলাম আপনার স্বামী ডাক্তার। উনি কি এখানে কোনও বিশেষ কাজে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন, না যা বললেন, বেড়াতেই আসা!’

‘আমি জানতাম বেড়াতেই আসছি, কিন্তু— ।’

‘শেষ করুন।’

‘আজ রাত্রে জানতে পারলাম ওঁর কিছু কাজ এখানে’।

‘টুরিস্ট লজে আপনাদের জন্যে রুম কে বুক করেছিল?’

‘আমি জানি না।’

‘বেশ। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন, ডাক্তারসাহেবকে আমরাই আমন্ত্রণ জানিয়েছি। কিন্তু ওঁর বয়স এত অল্প তা আমার জানা ছিল না। এখনই ভোর হবে, আপনি কি টুরিস্ট লজে গিয়ে বিশ্রাম করবেন? এখানে কেন অপেক্ষা করবেন?’

‘আমি সকাল হলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে যাব।’

‘নিশ্চয়ই যাবেন। কিন্তু সকাল নটার আগে সেখানে কেউ কথা বলবে না। আপনি টুরিস্ট লজে চলুন। ডাক্তারসাহেবের নাম বললে ওরা ঘর খুলে দেবে।’

পৃধা গাড়িতে বসে স্টার্ট দেবার চেষ্টা করল। শব্দ করে কেঁপে উঠল গাড়িটা, একটুও এগোল না। হয় তেল শেষ হয়ে গেছে নয়তো—! প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে রাস্তায় নেমে পৃথা বলল, ‘এই গাড়িতে সমস্ত জিনিসপত্র পড়ে আছে— ।’

‘দামি জিনিস কিছু থাকলে সঙ্গে নিয়ে যান।’ হায়দার বলল।

পৃথা হায়দারকে দেখল। এতক্ষণ কথা বলে তার মনে হয়েছে লোকটা আর যাই হোক চোর-ছ্যাঁচোড় নয়। লোকটা ঠিক কি তা না বুঝতে পারলেও সে ব্যাগটা তুলে নিল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আমার সঙ্গে আসবেন?’

‘না ম্যাডাম। এতক্ষণ বেশ ঝুঁকি নিয়েছি আমি। এরপর প্রকাশ্য রাজপথে হেঁটে গেলে আর দেখতে হবে না। কিন্তু আপনি নিশ্চিন্তে যান, কোনও বিপদ হবে না।’

‘আপনারা কি বিদ্রোহী?’

‘আমরা অত্যাচারিত। ও হ্যাঁ, অনুগ্রহ করে কমিশনারসাহেবকে আমার কথা বলবেন না। তাতে আপনার স্বামীর বিপদ আরও বেড়ে যাবে।’ হায়দার দ্রুত ফুটপাথে চলে এল। পলক ফেলার আগেই পৃথার মনে হল হারিয়ে গেল লোকটা।

একদিকে স্বজন অন্যদিকে নিজের নিরাপত্তার দুশ্চিন্তা নিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর টুরিস্ট লজটাকে দেখতে পেল পৃথা। এখনও রাস্তার আলো নেভেনি। লজের দরজায় পৌঁছে বেল বাজাতেই সেটা খুলে দিল দারোয়ান গোছের একজন, ‘গুডমর্নিং ম্যাডাম।’ ‘আমাকে বলা হয়েছে এখানে আমাদের জন্যে ঘর বুক্‌ড আছে। আমার স্বামী ডাক্তার—।’

কথা শেষ করতে দিল না লোকটা, ‘আসুন ম্যাডাম। সাত নম্বর ঘর আপনাদের জন্যে তৈরি রাখা আছে। আমি এইমাত্র টেলিফোনে জানতে পারলাম আপনি একাই আসছেন।’

হাঁ হয়ে গেল পৃথা, ‘টেলিফোন করল কে?’

দারোয়ান হাসল, ‘এ নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। আপনাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আমি জিনিসপত্রগুলো গাড়ি থেকে নিয়ে আসব। আসুন।’

ঘরটা সুন্দর। রাস্তার ধারেই। দোতলার জানলায় দাঁড়িয়ে ভোরের আকাশ দেখল পৃথা। দু-একজন মানুষ এখন রাস্তায়। টুপ করে রাস্তার আলো নিভে গেল। স্বজনকে ওরা কেন ধরে নিয়ে গেল? শুধুই যদি তারা এখানে বেড়াতে আসত তাহলে কি এমনটা হত? পৃথার মনে হল তার কাছে অনেক কিছু লুকিয়েছে স্বজন। ওই বিপ্লবী কথা-বলা লোকটা, টুরিস্ট লজে পৌঁ ছানোর আগেই তার সম্পর্কে খবর দিয়ে টেলিফোন আসা—এই সবই রহস্যময়। আর এই রহস্যের সঙ্গে স্বজন জড়িয়ে আছে। কক্ষনো এর বিন্দুবিসর্গ সে জানত না। স্বজন তাকে কেন জানায়নি? আজ যদি ওর কোনও বিপদ হয় তবে তার ফল তো তাকেই বইতে হবে। ওরা যদি স্বজনকে না ছাড়ে? হৃৎপিণ্ড যেন মুচড়ে উঠল পৃথার। না, সে একটুও ঘুমাতে পারবে না। সকাল ন’টা পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে। এই শহর যতই সুন্দর হোক কোনও দিকে তাকাবে না সে।

দরজায় শব্দ হল। চমকে পেছন ফিরে তাকিয়ে পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘কে?’

ঘরে আলো জ্বলছে। দারোয়ান দরজা খুলে সুটকেসগুলো একপাশে নামিয়ে রাখল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘চা এনে দেব ম্যাডাম?’

‘চা!’ কি বলবে বুঝতে পারছিল না পৃথা।

লোকটা মাথা নাড়ল। দরজার দিকে যেতে যেতে হঠাৎ ফিরে দাঁড়াল, ‘আমি ঠিক সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম ম্যাডাম। নইলে এগুলো আর পাওয়া যেত না।

‘কেন?’

‘ওগুলোকে নিয়ে যখন ফিরছি তখন আওয়াজ হতে ঘুরে দেখলাম কেউ অথবা কারা আপনাদের গাড়িতে আগুন-ধরিয়ে দিয়েছে। ওপাশের ব্যালকনিতে গেলে কিছুটা টের পাবেন’। দারোয়ান চলে গেল।

ভোর রাতে বিছানায় শুয়েও ভার্গিসের ঘুম আসছিল না। একসময় তাঁর মনে হল বেঁচে থাকলে এই জীবনে অনেক ঘুমানো যাবে। কিন্তু তাঁর হাতে এখন যে কয়েক ঘন্টা বেঁচে আছে তা ঘুমিয়ে নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। আকাশলালকে তার চাই। একটা সূত্র দরকার। ইতিমধ্যে তিনি এই শহরের টেলিফোন সিস্টেমকে সতর্ক করে দিয়েছেন। কাল সকাল নটায় আকাশলাল যেখান থেকেই তাঁকে টেলিফোন করুক না কেন তাঁর বাহিনী সেখানে তিন মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে। ওটা শেষ সুযোগ। এই টেলিফোনটা কি কারণে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। লোকটা নির্বোধ নয়। যে ব্যবস্থা তিনি নিয়েছেন তা যে নেবেনই লোকটার অজানা নয়। তাহলে? বিছানা ছেড়ে উঠে বসে ভার্গিসের দৃঢ় বিশ্বাস হল লোকটা আগামীকালের উৎসবটাকে কাজে লাগাতে চাইছে। কিন্তু কিভাবে কাজে লাগাবে, সেইটে জানা দরকার। যদি কোনও ভাবে আগামীকালের উৎসবটাকে বাতিল করে দেওয়া যেত। এ ক্ষমতা একমাত্র মিনিস্টারের আছে। না, মিনিস্টারকেও বোর্ডের কাছে অনুমতি নিতে হবে। মিনিস্টারকে রাজি করাতে পারেন ম্যাডাম। ভার্গিস ঘড়ি দেখল। এখন যদি তিনি ম্যাডামকে টেলিফোন করেন তাহলে আর দেখতে হবে না।

টেলিফোন বাজল। ছোঁ মেরে রিসিভার তুললেন তিনি, ‘হ্যালো!’

‘স্যার, যে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে আপনাকে জানাতে হুকুম করেছেন বলে বিরক্ত করছি।’ ডেস্কের অফিসারের বিনীত গলা কানে এল।

ভার্গিসের নাক ঘোঁত শব্দটি তৈরি করল, ‘বলো, বলে ফেল।’

‘আজ শেষ রাত্রে যে গাড়িটাকে আপনি আটকেছিলেন সেটা আগুনে পুড়ছে।’

‘তার মানে?’

‘আমরা আসামিকে নিয়ে চলে আসার পর গাড়িটাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

‘লোকটার বউ ওখানে ছিল?’

‘না স্যার। তিনি টুরিস্ট লজের সাত নম্বর ঘরে আছেন। তাঁর জিনিসপত্রও সেখানে। আমরা এইমাত্র সব চেক করে আপনাকে খবর দিলাম।’

‘খবর দিলে। ইডিয়ট। আগুনটা নেভানোর কথা মাথায় ঢুকল না। নিশ্চয়ই ওই গাড়িতে এমন কোনও ক্লু ছিল যা আমার হাতে পড়ুক ওরা চায় না। দমকল গিয়েছে?’

‘হ্যাঁ স্যার।’

রিসিভার রেখে দিলেন ভার্গিস। নিজেকে নিতান্ত গর্দভ বলে মনে হচ্ছিল তাঁর। নিশ্চয়ই এই ডাক্তার লোকটার সঙ্গে ওদের যোগাযোগ আছে। গাড়ি থেকে প্রমাণ সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয় বলে ওরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ইস, তখন যদি একবার সন্দেহ হত!

পোশাক পরতে পরতে ভার্গিস ইন্টারকমে নির্দেশ দিলেন স্বজনকে তাঁর চেম্বারে নিয়ে আসার জন্যে। এখন তাঁকে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। স্বজনকে জেরা করে খবর বের করতে তাঁর একটুও অসুবিধে হবে না। কত ডেডিকেটেড বিপ্লবীর বারোটা তিনি বাজিয়ে ছেড়েছেন, এ তো এক বিদেশি ছোকরা। নিজের চেম্বারে ঢুকে জানলার বাইরে ভোরের আকাশ দেখলেন ভার্গিস। আহা, মনে হচ্ছে ভাগ্য তাঁর সহায় হচ্ছে।

নিজের চেয়ারে বসে স্বজনকে ঘরে ঢুকতে দেখলেন তিনি। যারা ওকে এখানে এনেছে তারা দরজার বাইরে হুকুমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। ভার্গিস লক্ষ করলেন। ছিমছিমে এক সাধারণ চেহারার যুবক। তাঁর হাতের একটা চড় খেলে অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু প্রথমেই তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন না বলে ঠিক করলেন, ‘বসুন।’

স্বজন টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে বসল, ‘আমি তীব্র প্রতিবাদ করছি।’

‘আমি হলেও করতাম।’ গম্ভীর মুখে ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন, ‘চা না কফি?’

‘আমার কিছুই চাই না। আমাকে কেন ধরে এনেছেন?’

‘নিশ্চয়ই কারণ আছে। আপনি চা না খেলে আমি কি এক কাপ খেতে পারি?’

‘যা ইচ্ছে করুন আপনি। আমার স্ত্রী কোথায়?’

‘তিনি এখন টুরিস্ট লজের সাত নম্বর ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন।’

‘আমি কি করে বিশ্বাস করব?’

ভার্গিস ইন্টারকমে চা দিতে বললেন, এক কাপ। তারপর টুরিস্ট লজের সাত নম্বর ঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে বললেন। তারপর স্বজনের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গাড়িতে কি ছিল?’

‘কি ছিল মানে?’

‘আমি সরল প্রশ্ন করছি, গাড়িতে কি ছিল?’

‘যা থাকে। সুটকেস।’

‘ওগুলো নামিয়ে নেওয়ার পরে তাহলে আগুন ধরিয়ে দিতে হল কেন?’

‘সে কি?’ চমকে উঠল স্বজন, ‘আমার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে?’

‘হ্যাঁ। কেন?’

‘কে ধরাল।’

‘প্রশ্নটা আপনাকে আমি করছি।’

‘বিশ্বাস করুন আমি জানি না। এই শহরে আমার কোনও শত্রু আছে বলে জানা ছিল না।’

‘কাজটা শত্রুরা করেনি, আপনার বন্ধুরাই করেছে।’

‘বন্ধুরা?’

‘হ্যাঁ। কোনও বিশেষ প্রমাণ লোপ করে দিয়ে তারা আপনাকে বাঁচাতে চায়।’

‘বাজে কথা! আমার গাড়িতে তেমন কিছুই ছিল না।’

এইসময় টেলিফোন বাজল। ভার্গিস সাড়া দিলেন প্রথমে, তারপর বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনার স্বামীকে বলুন আমরা আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি কি না!’ রিসিভারটা স্বজনের হাতে তুলে দিলেন তিনি।

রিসিভার কানে চেপে ধরে স্বজন বেশ উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘হ্যালো, পৃথা?’

‘হ্যালো।’ পৃথার গলা।

‘কেমন আছ তুমি? কোথায় আছ?’

‘টুরিস্ট লজে। তুমি কখন ছাড়া পাচ্ছ!’

‘জানি না। আমাকে বিনা দোষে ওরা ধরে নিয়েছে পৃথা!’

‘তাই?’

‘তার মানে?’ চিৎকার করে উঠল স্বজন।

সঙ্গে সঙ্গে হাত থেকে রিসিভার কেড়ে নিলেন ভার্গিস। লাইনটা কেটে দিতেই বেয়ারা চা নিয়ে ঢুকল। স্বজনের দিকে না তাকিয়ে মন দিয়ে কাপে দুধ চিনি মেশালেন তিনি। এই সময় একজন অফিসার তাঁকে একটা কাগজ দিয়ে গেল। চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে কাগজটায় চোখ বোলালেন ভার্গিস, ‘আপনার স্ত্রী দেখছি একদমই ইনোসেন্ট।’

মাথা ঠিক ছিল না স্বজনের। সে ভার্গিসের দিকে তাকাল।

‘আপনাকে আমরা বিনাদোষে ধরে নিয়ে এসেছি শুনে তিনি একটাই শব্দ উচ্চারণ করেছেন, তাই? এছাড়া তিনি আর কি বলতে পারতেন?’

স্বজন বুঝল পৃথার সঙ্গে তার টেলিফোনের সংলাপগুলো ওই কাগজে লেখা আছে। সে সামান্য ঝুঁকে বলল, ‘আপনাকে স্পষ্ট বলছি এমন কোনও অন্যায় আমি করিনি যাতে আমি অপরাধী হতে পারি।’

‘আকাশলালের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে?’

‘কে আকাশলাল?’

চোখ বড় করে ভার্গিস একবার স্বজনকে দেখে নিয়ে চা শেষ করলেন। তারপর বললেন, ‘এই অসময়ে আপনি শহরে এলেন কেন?’

‘বললাম তো রাস্তায় দৃর্ঘটনা হয়েছিল।’

‘কোথায়?’

‘জায়গাটা আমি চিনি না। আমার গাড়ির পেট্রল ট্যাঙ্কে লিক হয়ে যায়। আমরা বাধ্য হই একটা বাংলোয় আশ্রয় নিতে। সেখানে চিতা বাঘের পাল্লায় পড়ি। ওই জন্তুটার আক্রমণে গাড়ির চেহারা অমন হয়েছিল।’

‘কোন বাংলো?’

স্বজন যতটুকু পারে সঠিক বর্ণনা দিল। ভার্গিস বললেন, ‘বাবু বসন্তলালের একটা বাংলো ওদিকে আছে। তার সঙ্গে আপনার বর্ণনা মিলছে। কিন্তু চিতার গল্পটা একটা বাচ্চাছেলেও বিশ্বাস করবে না। ঠিক আছে, ওখানে কে ছিল?’

‘কেউ না। চিতার হাত থেকে বাঁচার জন্যে আমরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকি!’

‘কেয়ারটেকার?’

‘না, কেউ ছিল না। বাড়িটার নীচে একজনের মৃতদেহ পচছে কফিনে।’

‘গুড গড। কার মৃতদেহ?’ সোজা হয়ে বসলেন ভার্গিস।

‘আমি চিনি না।’

‘ওখান থেকে আবার গাড়ি সরিয়ে এলেন কি করে?’

‘আমাদের পরেই একজন এক্স পুলিশ অফিসার ওখানে যান। তিনিই সাহায্য করেছেন।’

ভার্গিসের মুখ শক্ত হয়ে গেল। ইন্টারকমে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সোমকে খুঁজতে যে সার্চ পার্টি গিয়েছিল তারা কি ফিরে এসেছে?’

০৯. বাবু বসন্তলালের শরীর

বাবু বসন্তলালের শরীর তাঁরই বাংলোর কফিনে পচছিল। খবরটা পেয়ে ভার্গিসের ভেতরটা নড়ে উঠল। হয়ে গেল, তাঁর সর্বনাশ হয়ে গেল। খবরটা এখনই মিনিস্টারকে দিতে হবে এবং তারপরই শুরু হয়ে যাবে যা হবার। ম্যাডামের কানে খবরটা পৌঁছোনোমাত্র, চোখ বন্ধ করলেন ভার্গিস। বাবু বসন্তলাল বিরাট ব্যবসায়ী, প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসেন এ দেশের জন্যে। রাজনীতিতে তিনি নেই। কিন্তু ম্যাডামের বন্ধু হিসেবে তাঁর ক্ষমতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। মিনিস্টার কিংবা বোর্ড নয়, ম্যাডামের ভালবাসার মানুষ যে বাবু বসন্তলাল তা ভার্গিসের চেয়ে বেশি আর কে জানে! আর ম্যাডাম মানেই মিনিস্টার, ম্যাডামের ইচ্ছেই বোর্ডের ইচ্ছে।

ভার্গিস টেবিলের উল্টোদিকে উদ্বিগ্ন স্বজনের দিকে তাকালেন, ‘আপনি তো ডাক্তার। ভদ্রলোক কতদিন আগে মরে গেছেন বলে মনে হয়েছিল?’

‘পরীক্ষা না করে বলা মুস্কিল। অনুমান, দিন চারেক তো বটেই।’

‘এটা হত্যাকাণ্ড না স্বাভাবিক মৃত্যু?’

‘স্বাভাবিক মৃত্যু হলে কেউ মাটির নীচের ঘরের কফিনে নিজে হেঁটে গিয়ে শুয়ে থাকতে পারে না। তাছাড়া ওপরের বেডরুমের চাদরে রক্তের দাগ দেখেছি।’

‘হুম! আপনি নিহত মানুষটিকে চেনেন?’

‘আপনাকে বলেছি এখানে এর আগে আমি কখনও আসিনি।’

ভার্গিস উঠে দাঁড়ালেন, ‘আপনি যে ঠিকানা দিয়েছেন সেখানে আমরা খোঁজখবর করছি। যা বলেছেন তা যদি সত্যি হয় তাহলে আপনাকে আটকে রাখার প্রয়োজন হবে না।’

স্বজনের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, ‘আমি জানতে পারি কি আপনারা এত ভয় পাচ্ছেন কাকে?’

কঠোর চোখে তাকালেন ভার্গিস, ‘আমরা কাউকেই ভয় পাই না। বিছানায় শোওয়ার সময় কাঠপিঁপড়ে উঠলে তাকে ঝেড়ে ফেলতে হয়। এটা সেরকম ব্যাপার। বাই দ্য ওয়ে, আপনি বলেছেন, এখানকার টুরিস্ট লজে কেউ ঘর বুক করে রেখেছিল যদিও এখানকার কাউকেই আপনি চেনেন না!’

ঠোঁট টিপে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল স্বজন।

‘সেই লোক কে?’

‘তাও জানি না। আমার সিনিয়রের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে?’

‘আপনাকে কি চিকিৎসা করার জন্যে এখানে আনা হয়েছে?’

‘সম্ভবত তাই। কিন্তু পেশেন্টের নাম আমি জানি না।’

‘আপনার কি মনে হয় আমাদের শহরে ভাল ডাক্তার নেই?’

“নিশ্চয়ই আছেন। তবে আমি যে বিষয় নিয়ে কাজ করি তা অনেকেই করেন না।’

‘আপনার বিষয়?’

স্বজন চিন্তা করল। তার হারানোর কিছুই নেই। পরিচয় গোপন রাখার কথা তাকে কেউ বলে দেয়নি। এরা যদি তার সম্পর্কে খোঁজ নেয় তাহলে সহজেই জানতে পেরে যাবে সত্যি কথা বলে সে কোনও অন্যায় করছে না। স্বজন বলল, ‘মানুষের শরীর সৃষ্টি করার সময় ঈশ্বর কখনও বেশ অমনোযোগী থাকেন। কখনও দুর্ঘটনাজনিত কারণে শরীরে বিকৃতি আসে। বিজ্ঞান এখন সেই ত্রুটিগুলো শুধরে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। আমি ওই বিষয় নিয়েই কাজ করছি।’

ভার্গিস হতভম্ব। তাঁর মাথায় ঢুকছিল না এখানে এমন চিকিৎসা করানোর জন্যে কে এই লোকটাকে আনাতে পারে। টেলিফোন বাজল। চকিতে রিসিভার তুলে আওয়াজ করেই কুঁকড়ে গেল ভার্গিস। অত বড় শরীর থেকে দ্বিতীয় শব্দটা অস্পষ্ট বের হল, ‘ইয়েস।’

‘আমি তো ভেবে পাচ্ছি না তুমি ওখানে কেন আছ? তুমি জানো বাবু বসন্তলাল খুন হয়েছেন?’

‘হ্যাঁ স্যার। এইমাত্র জানলাম।’

‘জেনেছ অথচ আমাকে জানাওনি?’

‘যে ফোর্সকে আমি সোমের জন্যে পাঠিয়েছিলাম তারা এইমাত্র ডেডবডি নিয়ে ফিরেছে।’

‘তুমি ডেডবডি দেখেছ?’

‘না স্যার, এখনও— ।’

‘ভার্গিস। বোর্ড তোমাকে আর বেশি সময় দেবে না। বাবু বসন্তলালের এখন বিদেশে থাকার কথা। অথচ তিনি কয়েকদিন আগে খুন হয়ে তাঁরই বাংলোয় পড়ে আছেন। তুমি কি মনে করেছ এতে তোমার কৃতিত্ব বাড়বে? তুমি ডেডবডি দেখে এখনই ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করে খবরটা দাও!’

‘স্যার, আমি— ?’

‘হ্যাঁ, তুমি।’ মিনিস্টার লাইনটা কেটে দিলেন।

এই সাতসকালে রুমালে মুখ মুছলেন ভার্গিস। হঠাৎ স্বজনের দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হল এই লোকটা কাজে আসতে পারে। তিনি একটু কাছে এগিয়ে গেলেন, ‘লুক ডাক্তার, আমি তোমাকে এখনই ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ তোমাকে রাখতে হবে।’

‘কি অনুরোধ?’

‘তোমার সঙ্গে যারা যখন কন্ট্রাক্ট করবে তাদের সব খবর আমাকে জানাবে। একটা কাগজে কয়েকটা নম্বর লিখে সামনে রাখলেন ভার্গিস, ‘এইটে আমার ব্যক্তিগত টেলিফোন নম্বর। আমি না থাকলেও খবরটা রেকর্ডেড হয়ে থাকবে। কেউ জানতে পারবে না।’

‘আপনি এমন অনুরোধ করছেন কেন?’

‘এই শহরে কোনও মানুষের তোমাকে প্রয়োজন এটা ভাবতে অবাক লাগছে, তাই। আমরা আকাশলালকে অনেকদিন দেখিনি। সে কি অবস্থায় আছে তাও জানি না। কে বলতে পারে ওর জন্যেই হয়তো তোমাকে এখানে আনা হয়েছে।’ বেল টিপলেন ভার্গিস। তারপর স্বজনকে সেখানে বসিয়ে রেখেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজার বাইরে ছুটে আসা এক অফিসারকে দেখে একটু দাঁড়ালেন, ‘লোকটাকে রিলিজ করে দাও কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা কেউ যেন ওর সঙ্গে ছায়ার মত লেগে থাকে। আমি ওর সমস্ত গতিবিধি জানতে চাই।’

হেডকোয়ার্টার্সে এই সকালেই বেশ সন্ত্রস্ত ভাব। বাবু বসন্তলালের মৃত্যু মানে শাসকদলের ওপর আকাশলালের আঘাত, এমন একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনাররা ভার্গিসকে দেখে স্যালুট করলেন। ভার্গিস গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনারা খবরটা পেয়েছেন মনে হচ্ছে।’

একজন উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’

‘হুম্‌। এই ফোর্সে সবার পরে আমাকেই খবর দেওয়া হয় দেখছি।’

‘না স্যার, আপনি তখন রেস্ট নিচ্ছিলেন, তাই— ।’

‘ওই বাংলোতে ফোর্স নিয়ে কে গিয়েছিল?’

তৃতীয়জন মাথা নাড়লেন, ‘আমি স্যার।’

লোকটার আদ্যোপান্ত জানেন ভার্গিস। প্রমোশন দেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না তাঁর, শুধু মিনিস্টারের কথায় বাধ্য হয়ে সই করতে হয়েছে। ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রিপোর্ট কোথায়?’

‘আমি ফিরে এসেই জানিয়ে দিয়েছি স্যার। ওটা আপনার ডেস্কে আছে।’

‘সোম কোথায়?’

‘পাইনি। আমরা বাংলোটা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। আমরা যাওয়ার আগে সেখানে অন্তত দুটো মানুষ ছিল। তারা খাওয়াদাওয়া করেছে সেখানে। মনে হয় বিছানায় শুয়েছিল— ।’

‘আমি বেডরুম স্টোরি শুনতে চাই না। কিভাবে মারা গেছেন বাবু বসন্তলাল?’

‘মৃতদেহ পোস্টমর্টেম না করলে কিছু বোঝা যাবে না স্যার!’

‘এখান থেকে বাংলোয় যাওয়ার রাস্তা একটাই। যদি কোনও মানুষ ওখানে তোমাদের আগে গিয়ে থাকে তাকে ধরতে পারলে না কেন?’

‘স্যার এই রাত্রে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকলে কি করে খুঁজে বের করব। যাওয়ার পথে আমরা একটা ভাঙাচোরা গাড়িকে ওপরে উঠে আসতে দেখেছিলাম।’

‘গাড়িটাকে থামিয়েছিলে?

‘না। কারণ ওর নেমপ্লেট আমাদের দেশের নয়।’

‘ইডিয়ট।’ ভার্গিস আর দাঁড়ালেন না। হাঁটতে হাঁটতে তাঁর মনে হল এই ডাক্তার দম্পতির সঙ্গে সোমের হয়তো যোগাযোগ হয়েছিল। ডাক্তারকে চেপে ধরলে সেটা তিনি বের করতে পারতেন। কিন্তু না, শক্তি প্রয়োগ না করেও ওর কাছ থেকে খবর বের করা যাবে বলে এখনও তিনি বিশ্বাস করেন।

কেন্দ্রীয় শবাগারের সামনে ভার্গিসের কনভয় থামল। দ্রুত পায়ে তিনি ভেতরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে প্রহরীরা ব্যস্ত হয়ে দরজা খুলে দিয়েছিল। সোজা চলে গেলেন সেই কফিনটার সামনে যেখানে বাবু বসন্তলালের মৃতদেহটা শুয়ে আছে। নাকে রুমাল চেপে তিনি ঝুঁকে দেখলেন। হ্যাঁ, চিনতে কোনও ভুল হয়নি। এখন যতই ফুলে-ফেঁপে উঠুক এই মানুষটি জীবিত অবস্থায় তাঁকে কম নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায়নি। লোকটা মরে যাওয়ায় তাঁর খুশি হওয়ার কথা কিন্তু হতে পারছেন না। মরে গিয়ে লোকটা তাঁকে কোথায় নিয়ে যাবে তা একমাত্র শয়তান জানতে পারে। ভাল করে দেখলেন কোনও আঘাতের চিহ্ন আছে কি না। না নেই। ওই বাংলোটায় একজন কেয়ারটেকার ছিল, তার কথা কেউ বলছে না। সম্ভবত গা ঢাকা দিয়েছে ব্যাটা। ওটাকে ধরলেই হয়তো হত্যারহস্য আর রহস্য থাকবে না।

বাইরে বেরিয়ে এসে মিনিস্টারের আদেশ মনে করলেন ভার্গিস। খবরটা এখনই ম্যাডামের কাছে পৌঁছে দিতে হবে তাঁকে। অথচ বাবু বসন্তলালের স্ত্রীকে আগে খবরটা জানানো দরকার ছিল। ভদ্রমহিলা নাকি খুব গোঁড়া, বাইরে বের হন না, ভার্গিস তাঁকে কখনও দ্যাখেননি। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু সংবাদ তো স্ত্রীর আগে পাওয়া উচিত। ওয়্যারলেসে হেডকোয়াটার্সে খবর পাঠালেন ভার্গিস, একজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার এখনই যেন দায়িত্বটা পালন করে।

শহরের সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকাটাকে ভি আই পি পাড়া বলা হয়। ভার্গিসের কনভয় যে বাড়িটার সামনে থামল তার সামনেটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মেয়েলি সাজগোজের দোকান। প্রায় প্রতিটি জিনিসই বিদেশি এবং চড়া দামে বিক্রি হয়। দোকানের পাশ দিয়ে গাছপাতায় ঘেরা প্যাসেজ। বাকি গাড়িগুলোকে রাস্তায় রেখে ভার্গিসের জিপ ঢুকল সেখানে। সুন্দর সাদা দোতলা বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামতেই দারোয়ান ছুটে এল। ভার্গিস বলল, ‘ম্যাডামকে খবর দাও, জরুরি দরকার।’

দারোয়ান মাথা নিচু করল, ‘মাফ করবেন হুজুর আপনি সেক্রেটারি সাহেবের সঙ্গে কথা বলুন।’

‘কেন?’ ভার্গিস বিস্মিত। ‘হুকুম আছে সকাল নটার আগে ওঁকে যেন বিরক্ত করা না হয়।’

ভার্গিস ঘড়ি দেখলেন, এখনও পঁয়ত্রিশ মিনিট বাকি। অগত্যা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলেন। দারোয়ান আগে আগে ছুটে গিয়ে সেক্রেটারিকে খবর দিয়েছিল। মহিলাকে আগেও দেখেছেন ভার্গিস। পাঁচ ফুট লম্বা হাড়সর্বস্ব চিমসে মুখের মহিলা কখনও হাসেন বলে মনে হয় না। এই একটা ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে মিল থাকলেও বিরক্তি আসে।

সেক্রেটারি বললেন, ‘ইয়েস— ।’

‘ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করা দরকার। জরুরি।’

‘মাফ করবেন, আপনি ন’টার পরে আসুন।

‘আমি বলেছি ব্যাপারটা জরুরি।’

‘আমি আদেশ মান্য করতে বাধ্য।’

‘টেলিফোনে কথা বলতে পারি? ব্যাপারটা ওঁরই প্রয়োজন।’

সেক্রেটারি একটু ইতস্তত বললেন, ‘ম্যাডাম এখন আসন করছেন। এইসময় কনসেন্ট্রেশন নষ্ট করতে তিনি পছন্দ করেন না। তবু— ।’

ইন্টারকমের বোতাম টিপে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সেক্রেটারি বললেন, ‘ম্যাডাম, আমি অত্যন্ত দুঃখিত। কিন্তু কমিশনার অফ পুলিশ খুব জরুরি ব্যাপারে নিজে কথা বলতে এসেছেন—! ইয়েস, ঠিক আছে ম্যাডাম।’ রিসিভার নামিয়ে রেখে সেক্রেটারি বললেন, ‘আসুন।’

সাধারণত দোকানের পেছন দিকের অফিসেই কয়েকবার তাঁকে যেতে হয়েছে। ম্যাডামের খাসমহলে ঢোকার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় মনে হল এই ভদ্রমহিলার রুচি আছে। কী চমৎকার সাজানো সব কিছু। নির্দিষ্ট একটি ঘরের বন্ধ দরজায় টোকা দিলেন সেক্রেটারি। ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে এল, ‘কাম ইন, প্লিজ।’

সেক্রেটারি ইঙ্গিত করতেই ভার্গিস দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। ম্যাডাম বসে আছেন একটা কাঠের চেয়ারে। তাঁর ঊর্ধ্বাঙ্গে বা সাদা তোয়ালে জড়ানো। নিম্নাঙ্গে ট্র্যাকস্যুট গোছের কিছু। কাছে যেতেই বললেন, ‘সুপ্রভাত। বসুন মিস্টার ভার্গিস।’

বসার ইচ্ছে না থাকলেও আশে পাশে তাকিয়ে কোনও চেয়ার দেখতে পেলেন না ভার্গিস। একটা বেঁটে মোড়া সামনে রয়েছে। সেটাকেই টেনে নিতে হল। বসেই মনে হল ভদ্রমহিলার অনেক নীচে তিনি, মুখ তুলে কথা বলতে হবে।

‘কি খাবেন? চা না কফি?’

‘ধন্যবাদ। এখন আমি খুবই ব্যস্ত— ।’

‘স্বাভাবিক। সময়সীমা পার হতে বেশি দেরি নেই।’

‘ম্যাডাম। আমি সবরকম উপায়ে চেষ্টা করছি। আগামী কাল সকালে লোকটাকে ঠিক গ্রেপ্তার করতে পারব।’

‘হঠাৎ এই আত্মবিশ্বাস পেলেন কি করে?’

‘আমি নিশ্চিত।’

‘বাঃ। তাহলে সবাই খুশি হবে। আমার এই লোকটাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে। ধরামাত্র যেন ওকে না মেরে ফেলা হয়। ওর বিচার স্বাভাবিক নিয়মেই হওয়া উচিত। অবশ্য আমার যে কথা শুনতে হবে তার কোনও মানে নেই। আপনাদের মিনিস্টার আছেন— ।’

‘আপনার নির্দেশ আমার মনে থাকবে ম্যাডাম।’

‘এই সময় আমি কারও সঙ্গে দেখা করি না।’ ম্যাডাম উঠলেন। ভার্গিসের মনে হল কে বলবে এই মহিলার যৌবন চলে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। এমন মাপা-শরীরের সুন্দরী তিনি কখনও দ্যাখেননি।

‘আমি দুঃখিত ম্যাডাম।’

‘ঠিক আছে। আমি দেখা করলাম কারণ আপনি বিয়ে করেননি।’

ভার্গিস হতভম্ব। এই ব্যাপারটা যে তাঁর যোগ্যতা হয়ে দাঁড়াবে তা কখনও ভাবেননি।

‘বিবাহিত পুরুষদের আমি ঘেন্না করি। ওদের বাসনার শেষ হয় না। কেন এসেছেন?’ শেষ শব্দ দুটো এত দ্রুত উচ্চারণ করলেন ম্যাডাম যে ভার্গিসের মাথায় ঢুকল না কেন তিনি এখানে এসেছেন। ম্যাডাম হাসলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই আমার শরীর দেখতে এখানে আসেননি?’

এবার নড়েচড়ে বসলেন ভার্গিস। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। আজ্ঞে না। ম্যাডাম আমি একটা খারাপ খবর নিয়ে এখানে এসেছি।’

‘বলে ফেলুন।’

‘ইয়ে, আমি খুবই দুঃখিত, বাবু বসন্তলাল আর জীবিত নেই।’

ম্যাডাম তাঁর সুন্দর মুখটা ওপরে তুললেন, ‘তাই?’

প্রচণ্ড হতাশ হলেন ভার্গিস। তিনি ভেবেছিলেন এই খবরটা ম্যাডামকে খুব আহত করবে। নিজেকে সামলে বললেন, ‘হ্যাঁ।’

গতরাত্রে তাঁর মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে।’

‘কোথায়?’

‘তাঁরই বাংলোয়।’

‘কিন্তু তাঁর তো এখন বিদেশে থাকার কথা।’

‘সেটাই রহস্যের। এমনকি বাংলোর বাইরে তাঁর গাড়ি ছিল না।’

‘আর কে ছিল সেখানে?’

‘কেউ না!’ ভার্গিস বললেন, ‘তবে হত্যাকারী ধরা পড়বেই।’

‘কিরকম?’

‘ওঁর চৌকিদার উধাও হয়েছে। লোকটাকে ধরলেই রহস্যের কিনারা হয়ে যাবে।’

‘লোকটাকে ধরা আপনার কর্তব্য।’

‘হ্যাঁ ম্যাডাম।’

‘কিন্তু আপনি কতগুলো কাজ একসঙ্গে করবেন? আকাশলালকে না ধরতে পারলে—’

‘জানি ম্যাডাম।’

‘কে ওর মৃতদেহ আবিষ্কার করেছিল?’

‘এক ডাক্তার দম্পতি ওখানে আশ্রয়ের জন্যে গিয়ে প্রথম সন্ধান পায়। পরে আমি ফোর্স পাঠিয়ে ডেডবডি নিয়ে আসি।’ খুব দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বললেন ভার্গিস।

‘ওর স্ত্রীকে জানানো হয়েছে?’

‘হাঁ ম্যাডাম।’

‘তাহলে ওর শেষকাজ আজই করে ফেলা হোক।

‘একটু সময় লাগবে বোধহয়।’

‘কেন?’

‘পোস্টমর্টেম করতে হবে। মৃত্যুর কারণ জানা দরকার।’

‘বাবু বসন্তলালের মৃত্যুর কারণ বিষ অথবা বুলেট হলে সেটা জানার পর তো তার প্রাণ ফিরে আসবে না। মিছিমিছি ওই শরীরটাকে কাটাছেঁড়া না করে শেষকৃত্যের জন্যে পাঠিয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয় কি?’ ম্যাডাম দু’পা এগিয়ে এলেন।

ভার্গিস উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর শরীর শিরশির করছিল। বললেন, ‘কিন্তু নিয়ম মানতে হলে—’

‘মিস্টার ডার্গিস, আপনি নিয়ম সবক্ষেত্রে মানেন?’

‘না, তবে— ।’

‘আপনি আমার কাছে যে কারণে এসেছেন সেই কারণেই পোস্টমর্টেম করবেন না।

‘বেশ।’

‘এবার আসতে পারেন।’

ভারী পায়ে ভার্গিস বেরিয়ে এলেন। বাইরে সেক্রেটারি অপেক্ষা করছিল। সেই মহিলাই তাঁকে পথ দেখিয়ে নীচে নামিয়ে আনল। সিঁড়িতে পা দেওয়ামাত্র ভার্গিস শুনলেন সেক্রেটারি তাঁকে ডাকছেন। তিনি কপালে ভাঁজ ফেলতেই মহিলা এগিয়ে। এলেন, ‘ম্যাডাম ইন্টারকমে— ।’

অগত্যা আবার উঠে আসতে হল। রিসিভার তুলে হ্যালো বলতেই ভার্গিস ম্যাডামের গলা শুনতে পেলেন, ‘আপনাকে আমার মনে থাকবে।’ লাইন কেটে গেল।

হেডকোয়ার্টার্সের সামনে এসে দাঁড়াল স্বজন। একটা বীভৎস রাতের শেষ যে এত সহজে হবে তা সে ভাবেনি। এখন খুব ক্লান্তি লাগছে। কিভাবে টুরিস্ট লজে পৌঁছানো যাযù