আট কুঠুরি নয় দরজা – সমরেশ মজুমদার
আট কুঠুরি নয় দরজা, কোনখানে তালা নেই আর সেই ঘর তিনতলা৷ আট কুঠুরি হলো শরীরের আটটা গ্রন্থি। মানুষের শরীরটা বেঁচে থাকে এই আটটি গ্রন্থির মধ্যে দিয়ে। আর এই আটটি গ্রন্থির সাথে শরীরের নয়টি দ্বার যুক্ত। মানে নয়টা দরজা। তিনতলা হলো – মস্তিষ্ক , কোমর থেকে দেহের উপরের অংশ, আর শরীরের নিম্নভাগ।
উপন্যাসটির কাহিনী গড়ে উঠেছে ভারতবর্ষের পার্শ্ববর্তী এক পাহাড়ঘেরা রাজ্যকে কেন্দ্র করে, যে রাজ্যে যেকোনও মানুষের পেছনে একটা কাহিনী আছে। হয় সেটা তোষামুদি করে আত্মরক্ষার, নয় অত্যাচারিত হয়ে সর্বস্ব ক্ষয়ের। শুরুতেই দেখা যায় এক ডাক্তার দম্পতি ছুটি কাটানোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় শহরটিতে। পথিমধ্যে তাদের গাড়িটি দুর্ঘটনায় পডার পর থেকে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে।
০১. দুরন্ত গতিতে লাল মারুতিটা ছুটে যাচ্ছিল
দুরন্ত গতিতে লাল মারুতিটা ছুটে যাচ্ছিল।
তখন আকাশে শেষ বিকেলের চোরা আলো পঞ্চাশের রূপসীর হাসির মত অপূর্ব মায়াময়। পাহাড়ি রাস্তার একদিকে পাথরের আড়াল অন্যদিকে আদিগন্ত সেই আকাশ আর আকাশ। রাস্তাটায় আপাতত কোনও বাঁক নেই বলে গতি বাড়ছিল গাড়ির। হাওয়ারা পৃথার শ্যাম্পু ধোওয়া চুলে ঢেউ তুলছিল ইচ্ছেমতন। স্টিয়ারিং-এ বসে স্বজনের মনে হচ্ছিল সে বিজ্ঞাপনের ছবি দেখছে।
হঠাৎ গাড়ির গতি কমে গেল। পৃথাকে বিস্মিত করে ব্রেকে শেষ চাপ দিয়ে স্বজন বলল, ‘এই আমাকে একটু আদর করবে?’
সঙ্গে সঙ্গে দু হাত বাড়িয়ে সমুদ্র হয়ে এল পৃথা। নিজেকে খড়কুটো ভাবতে ওইসময় কী আরামই না লাগে! সব মেয়ে কি পৃথার মত এইরকম আদর করতে পারে! স্বজন কোথায় যেন পড়েছিল অযত্ন অবহেলায় ঈশ্বর জন্মলগ্নেই বাঙালি মেয়েদের শরীর এবং মনে সংকোচ শব্দটাকে এঁটে দিয়েছেন। পৃথা ব্যতিক্রম। তাই আনন্দ।
ঝড় থেমে যাওয়ার পরও যেমন হাওয়ারা বয়ে যায় তেমনি পৃথা বলল, ‘আই লাভ ইউ।’
‘উহু, ওভাবে নয়।’
‘তার মানে?’
‘ওই পাহাড়ের দিকে মুখ করে চিৎকার করো শব্দ তিনটে, পাহাড় আমাকে শোনাবে।’
ঝটপট দরজা খুলে নেমে গেল পৃথা। শূন্য চরাচরে শুধু নীড়ে ফেরা পাখিরাই এখন সঙ্গ দিচ্ছে। কোনও গাড়ি নেই, মানুষ তো বহুদূরের। পৃথা মুখ তুলে শেষ শক্তি দিয়ে যখন শব্দ তিনটে উচ্চারণ করল তখন তার নাভিতে ঈষৎ কুঞ্চন। আর সমস্ত আকাশ গেয়ে উঠল গান, ‘আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ।’
প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সে ঘুরে দাঁড়াল, ‘আর তুমি?’
‘তুমি আমার ভাঙা দাওয়ায় স্বর্ণচাঁপা রাজেন্দ্রাণী!’
‘ফ্যান্টাস্টিক। কার লাইন?’
‘এই মুহূর্তে আমার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীকে চাই না।’ স্বজন গাড়িতে বসেই হাসল।
চোখ বন্ধ করে মুখ আকাশে তুলল পৃথা। স্বজনের মনে এল এক ছবি। ছবির নাম ঈশ্বরী।
ও পাশের আকাশে এখন ধুন্দুমার রঙের খেলা। সূর্যদেব পাটে যেতে বসেছেন। তাঁর বাস এখন পৃথিবীর তলায়। রাস্তার ধারে গিয়েও ঝুঁকে দর্শন পাওয়া যাবে না। আকাশটা কেমন নীলচে হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।
স্বজন ডাকল, ‘উঠে এসো।’।
পৃথা কয়েক পা এগোল, ‘অ্যাই, তুমি সরো, আমি চালাই।’
‘পাহাড়ি রাস্তা। থার্ড গিয়ারেই তোলা যাবে না বেশির ভাগ সময়। ঠিক আছে, চলে এসো, সাধ পূর্ণ করো।’
অতএব লাল মারুতির স্টিয়ারিং-এ পৃথা, পাশের জানলায় স্বজন। পা হাত এবং চোখ জুড়ে যে সতর্কতা তা এখন পৃথাকে নিবিষ্ট রেখেছে। গাড়ি উঠছে উপরে। স্বজন ঘড়ি দেখল, এই গতিতে গেলেও পাহাড় ডিঙিয়ে শহরে পৌঁছাতে রাত আটটা বেজে যাবে। টুরিস্ট লজে একটা ঘর তাদের নামে স্থির করা হয়েছে আগাম। ডান দিকে এখন নদী, অনেক নীচে অদ্ভুত গোঙানি তুলে ছুটে যাচ্ছে। মারুতির চোখ জ্বলেছে এর মধ্যে। আকাশে ধূপছায়া আঁধার ঝুপঝুপ করে চেহারা পাল্টাচ্ছে। সতর্ক হাতে গাড়ি চালাবার সময় পৃথার কথা বন্ধ হয়ে যায়। আর এখন বাঁকের পর বাঁক। দু মাসের বিবাহিত জীবনে এমন সিরিয়াস মুখের পৃথাকে কখনও দ্যাখেনি স্বজন।
বিয়ের পর হনিমুন বলতে যা বোঝায় তা হয়নি ওদের। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রায় সতের ঘন্টাই নিঃশ্বাস ফেলার সময় হয় না স্বজনের। নিজেকে গড়ার সময়গুলো থেকে গত দুইমাস একটুও আলাদা করতে পারেনি স্বজন। আর তাই পৃথা মাঝে মাঝেই ঠোঁট ফোলায়। তাই এবার যখন সিনিয়ার ডেকে বললেন অফারটা নিতে তখন সামান্য দ্বিধা সত্ত্বেও রাজি হয়ে গিয়েছিল সে। এতটা পথ পৃথার সঙ্গে এক গাড়িতে যাওয়া আসা করা যাবে। এক টুরিস্ট লজে চমৎকার আবহাওয়ায় থাকা যাবে। এটা তো বাড়তি লাভ। সে যে তারই একটা কাজের সুবাদে এদিকে আসছে তা পৃথাকেও জানায়নি, জানলে পৃথার আনন্দটা ফিকে হয়ে যেতে পারে।
ডাক্তারি পড়ার সময় থেকেই স্বজনের বাসনা ছিল আর পাঁচজনের মত চেম্বার সাজিয়ে পেশেন্ট দেখবে না দু-বেলা। একটি বিশেষ বিভাগ, যার চর্চা ভারবর্ষে এর আগে তেমন ব্যাপকভাবে হয়নি তাকে আকর্ষণ করেছিল। তখন থেকেই সিনিয়ারের সঙ্গে তার গাঁটছড়া। মাঝখানে বছর দুয়েকের জন্যে জাপানে গিয়েছিল ওই বিষয় নিয়ে বিশদ পড়াশুনা করতে। ফিরে এসে কাজ শুরু করে দেখল তার চাহিদা পাড়ার জনপ্রিয় ডাক্তারবাবুর চেয়ে কম নয়। সতের ঘন্টাই কেটে যাচ্ছে এ ব্যাপারে। ফলে পৃথা অসন্তুষ্ট হতেই পারে। অর্থ আসছে কিন্তু পৃথার কাছে অর্থই শেষ কথা নয়। এ বার ওরা তাকে প্লেন ভাড়া দিয়ে নিয়ে আসতে চেয়েছিল। এয়ারপোর্টে গাড়ি রাখতে চেয়েছিল। পৃথাকে নিয়ে লম্বা পাড়ি দেবার লোভে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গাড়ি চালিয়েই আসছে। পৃথা যেমন জানে না সে চিকিৎসার কারণে পাড়ি দিচ্ছে তেমনই ওরাও জানে না পৃথা সঙ্গে আসছে। স্বজনের ধারণা পেশেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ লোক। তাকে পাহাড় থেকে নামানো যাচ্ছে না। চিকিৎসার জন্য যা যা দরকার তার তালিকা সে পাঠিয়ে দিয়েছে। মানুষটি অবশ্যই বিত্তবান। মাঝখানে তার সিনিয়ার থাকায় এ বিষয়ে বেশি কৌতুহল দেখায়নি স্বজন। এখন কেবলই মনে হচ্ছিল সে যে একটা কাজেই এতদূর এসেছে তা জানলে পৃথা কি ভাবে নেবে? কি ভাবে ওকে ঠাণ্ডা করা যায়!
পাহাড়ের বাঁকগুলো ক্রমশ মারাত্মক হয়ে উঠছে। একটা হাল্কা সরের মত আলো ছড়িয়েছে এখন। গাছেদের পাহাড়ের ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে কখনও সেটা রাস্তায় নেতিয়ে পড়ছে। পেছন থেকে একটা গাড়ির আওয়াজ ভেসে এল। দক্ষ ড্রাইভারের হাতে বেশ জোরেই উঠে আসছে সেটা। সেইসঙ্গে অনেক মানুষের গলার আওয়াজ। লোকগুলো যেন পিকনিক করতে যাচ্ছে। মুখ ঘুরিয়ে স্বজন দেখল একটা বড় ভ্যান উঠে আসছে অনেক লোক নিয়ে। সে পৃথাকে বলল, ‘চওড়া জায়গা দেখে ওকে সাইড দাও।’
চওড়া জায়গা খুঁজে পাওয়ার আগেই ভ্যানটা ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। পৃথা নার্ভাস হাতে স্টিয়ারিং ঘোরাল এবং ব্রেক চাপল। ভ্যানটা জায়গা পেয়ে ছুটে গেল ওপরে এবং সেই সঙ্গে মানুষগুলোর উল্লাস আকাশে পৌঁছে গেল। মারুতি গাড়িটা তখন পাহাড়ের এক ধারে জমানো পাথরের ওপর চাকা তুলে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেছে। পৃথা চিৎকার করে উঠল, ‘বদমাশ!’ সে হাঁপাচ্ছিল।
অ্যাকসিডেন্টটা হতে গিয়েও হল না। স্বজন নিঃশ্বাস ফেলল তারপর পৃথাকে শান্ত করতেই বলল, ‘ওটা খুব নিরীহ গালাগাল।’
‘মানে?’ পৃথা চকিতে মুখ ফেরাল।
‘তোমার স্টকে কি রকম গালাগাল আছে?’
‘ও গড! তুমি ইয়ার্কি মারছ? আর একটু হলেই— ।’
স্বজন দরজা খুলে নামল। গাড়িটা একটা দিকে কাত হয়ে আছে। নামতে গিয়ে দুলিয়ে দিল স্বজন। পৃথাও নেমে এল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হল ক্ষতি তেমন কিছু হয়নি। দুজনে ধরাধরি করে পাথরটা থেকে নামিয়ে আনল গাড়িটাকে। স্বজন বলল, ‘লোকে ঠাট্টা করে বলে মুড়ির টিন। ভারী হলে সারারাত এখানেই বসে থাকতে হত। এবার যদি অনুমতি দাও আমি চালাতে পারি।’
কথা না বাড়িয়ে পৃথা গাড়িটাকে ঘুরে এল এ পাশের দরজায়। এসে নাক টেনে বলল, ‘পেট্রলের গন্ধ পাচ্ছি।’
গন্ধ স্বজনও পেয়েছিল। সামান্য ঠেলতেই দেখা গেল পেট্রল পড়ছে টপটপ করে। গাড়ির পেট্রল ট্যাঙ্কটা ফুটো হয়েছে নিশ্চয়ই। স্বজন অসহায়ের মত জিজ্ঞাসা করল ‘সাবান নেই, না? থাকলে টেম্পোরারি বন্ধ করা যেত।’
‘সাবান! সুটকেসে আছে। নতুন সাবান!’
সঙ্গে সঙ্গে পেছনের সিট থেকে সুটকেশ বের করে রাস্তায় রেখে ডালা খোলা হল। প্যাকেট থেকে সাবান বের করে স্বজন চলে গেল ট্যাঙ্কের গর্ত খুঁজতে। এই নিচু গাড়ির পেট্রল ট্যাঙ্কের তলায় হাত পৌঁছাচ্ছে না তার। অনেক চেষ্টার পর ভিজে একটা উৎস খুঁজে অন্ধকারেই সাবানের প্রলেপ দেবার চেষ্টা করল সে। টর্চ ছাড়া সেটা প্রায় অসম্ভব।
মিনিটখানেক চলার পরেই পৃথা বলল, ‘আবার গন্ধটা পাচ্ছি।’
স্বজন নামল। হ্যাঁ, রাস্তায় পেট্রল পড়ার চিহ্ন ছড়ানো। অর্থাৎ সাবানে কোনও কাজ হয়নি। এই রকম অবস্থায় ট্যাঙ্ক শেষ হবার আগে কিছুতেই শহরে পৌঁছানো যাবে না। সে তাড়াতাড়ি নিজের আসনে ফিরে এসেই গাড়ি চালু করল। যত দ্রুত ওপরে ওঠা যায় ততই বাঁচোয়া। অয়েল ইন্ডিকেটারের কাঁটাটা নীচে নামতে শুরু করেছে। ইচ্ছে করলেই। এই রাস্তায় ষাট কিলোমিটার স্পিড তোলা যায় না।
পৃথা জিজ্ঞসা করল, ‘পৌঁছাতে পারবে?’
‘মনে হয় না। সামনে যদি কোনও পাম্প থাকে—! বেশ জোরেই পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। সারারাত এই রাস্তায় বসে থাকতে হবে দেখছি।’
‘কাছাকাছি কোনও রেস্টহাউস নেই?’
স্বজন হেসে ফেলল। কিন্তু তার চোখ বলে দিল সময় বেশি নেই। পেট্রল পড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি ছোটালে বড়জোর দশ কিলোমিটার যাওয়া যাবে। এখন যতটুকু যাওয়া যায় ততটুকুই লাভ। খানিকটা এগোবার পর প্রাইভেট লেখা একটা বোর্ড তার নজরে এল। পাশ দিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা ওপরে চলে গিয়েছে। একটুও না ভেবে সে গাড়িটাকে ওই রাস্তায় তুলে দিল। ইঞ্জিন খানিকটা আপত্তি করে ওপরে উঠেই প্রায় সমান পথ পেয়ে গেল। দুপাশে জঙ্গল এবং পথটা সরু। মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর হঠাৎ স্থির হয়ে গেল গাড়িটা। পৃথার মুখ থেকে ছিটকে এল, ‘শেষ?’
‘মালুম হচ্ছে।’
‘তুমি এ দিকে এলে কেন? বড় রাস্তায় থাকলে অন্য গাড়ির হেল্প পেতাম।’
‘ভাবলাম কাছে পিঠে কোনও বাড়ি আছে, ব্যাড লাক।’
চারপাশে বড় বড় গাছের জঙ্গল। সরু পথটা ডানদিকে বেঁকে গিয়েছে। স্বজন হেডলাইটটা নিভিয়ে দিতেই অপূর্ব এক আলো ফুটে উঠল চরাচরে। চাঁদ উঠেছে পাহাড়ি আকাশে। গোলাকার চাঁদ নয় ফলে তার আলোয় বিক্রম নেই। গাছেদের শরীরে, পাহাড়ের পাথরে মশারির মত নেতিয়ে আছে কিন্তু অদ্ভুত মায়াময়।
স্বজন বলল, ‘ফ্যান্টাস্টিক।’
পৃথা জানলা দিয়ে দেখছিল। দেখে মুগ্ধ হচ্ছিল। মুখ না ফিরিয়ে সে বলল, ‘এমন চাঁদকেই বোধহয় ঘুমঘুম চাঁদ বলে।’
স্বজন বলল, ‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি, বড় রাস্তায় থাকলে তুমি পরিবেশের সাক্ষী হতে পারতে না। এই, একটা কিসি দেবে?’
‘না। আমি এখন চুপচাপ চাঁদ দেখব।’ পৃথা ঘোষণা করল।
স্বজন এবার জঙ্গলের দিকে তাকাল। অদ্ভুত সব আওয়াজ ভেসে আসছে। পাখি এবং পতঙ্গরা স্বরাজ্যে স্বাভাবিক হয়ে আছে। রাস্তার মুখে প্রাইভেট বোর্ড টাঙানো ছিল। অতএব কাছে পিঠে বাড়ি থাকতে বাধ্য। কতদূরে? নেমে দেখতে হয়।
সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি হাঁটবে?’
‘কোথায়?’
‘আশ্চর্য! এ ভাবে বসে থাকবে নাকি? কাছেই বাড়িটা রয়েছে।’
‘তুমি কি করে জানলে?’
‘থাকাটাই স্বাভাবিক।’ স্বজন গাড়ি থেকে নামছিল।
‘আমি একা বসে থাকব নাকি?’ জানলার কাচ তুলে দিয়ে দরজার হাতলে চাপ দিল পৃথা।
জ্যোৎস্নায় পথ দেখা যাচ্ছে। কয়েক পা হাঁটতে না হাঁটতেই পৃথার গলায় গান ফুটল। মৃদু অথচ স্পষ্ট গলায় সে চাঁদের গান গাইতে লাগল স্বজনের একটা হাত জড়িয়ে। বাঁকটা ঘুরতেই ওরা দাঁড়িয়ে গেল। পরিষ্কার একটা ভ্যালির ওপর ঝকঝকে বাংলোটা ছবির মত দাঁড়িয়ে। দূর থেকেই জ্যোৎস্নামাখা বাংলোটাকে ওদের ভাল লেগে গেল। সামনে একটা লম্বা বারান্দা রয়েছে। কিন্তু কোনও ঘরে আলো জ্বলছে না, জানলার কাচগুলো অন্ধকার।
‘কেউ নেই?’ পৃথার গলায় বিস্ময়।
‘না থাক। দরজা খুলতে পারলেই হল। মনে হচ্ছে এককালের কোনও সাহেবি বড়লোকের গ্রীষ্মাবাস। গাড়িটাকে ওখানে রাখা ঠিক হবে?’
‘চল, ঠেলে বাংলোর সামনে নিয়ে আসি।’
ওরা ফিরল। এখন সমস্যাটা অনেক হালকা বলে মনে হচ্ছে। ঘড়িতে বেশি রাত হয়নি। ওরা গাড়িটার কাছে পৌঁছে ঠেলতে লাগল। হাল্কা গাড়ি, সহজেই চলতে শুরু করল সেটা। বাঁকের কাছে পৌঁছানো মাত্র আওয়াজটা কানে এল। রাগী জানোয়ারের হুঙ্কার। পৃথা চাপা গলায় বলল, ‘কিসের আওয়াজ।’
জীবনে প্রথমবার ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারল স্বজন, ‘চটপট গাড়িতে উঠে বসো।’সে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই পৃথাও পাশের আসনে চলে এল। আওয়াজটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। স্বজন হেডলাইট জ্বালল এবং তখনই একটা প্রমাণ সাইজের চিতা বাঘ গম্ভীর চালে এসে দাঁড়াল যেখানে একটু আগে তারা দাঁড়িয়েছিল। গাড়ির দিকে হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে জন্তুটা।
পৃথা দ্রুত সরে আসার চেষ্টা করল স্বজনের কাছে, ‘আমার ভয় করছে।’
‘কথা বোলো না। আমরা গাড়ির ভেতর আছি।’
‘ওই দ্যাখো, ওটা এগিয়ে আসছে।’
স্বজন দেখল। হঠাৎ মনে হল হেডলাইটের আলো চিতাটাকে রাগী করে তুলতে পারে। স্বজন হেডলাইট নিভিয়ে দিতেই জঙ্গলটা যেন আদিম হয়ে উঠল।বাঘটাকে দেখা যাচ্ছে। গাড়ির দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে পড়েছে। হয় তো আলো আঁধারির রহস্য বোঝার চেষ্টা করছে। একটা রাতের পাখি ট্টিহা ট্টিহা আওয়াজ করে উড়ে গেল।
স্বজন ঘামছিল। এই গাড়িটা যদি একটা ভারী জিপ, নিদেন পক্ষে অ্যাম্বাসাডার হত তা হলেও কিছুটা নিরাপদ বলে মনে করা যেত। মারুতির শরীরটাকে চিতা খেলনা বলে মনে করতে পারে। যদিও কাছে আসার পর চিতাটাকে বেশি বড় বলে মনে হচ্ছে না তবু স্বস্তি পাওয়ার কোনও জায়গা নেই। স্বজন শরীরে চাপ অনুভব করল। পৃথা গিয়ার টপকে তার বুকের কাছে চলে এসেছে। ওর শরীরের মিষ্টি গন্ধ এখন সর্বাঙ্গে টের পাচ্ছে সে। পৃথার মুখ দেখার চেষ্টা করল সে। ভয়ে সাদা হয়ে গিয়েছে পৃথা। সে পৃথার মাথায় হাত বোলাল, ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’
‘তুমি কি করবে?’
‘মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলব তুমি আছ আমি আছি।’
‘আঃ। ভালো লাগছে না। দ্যাখো, আসছে!’
চিতাটা এবার দুলকি চালে হেঁটে আসছিল। আলতো লাফে গাড়ির বনেটের ওপর উঠে দাঁড়াল। বিশাল মুখ খুলে হাই তুলল। ও যখন বনেটের ওপর উঠল তখন গাড়িতে যেন ভূমিকম্প হল। এবার চিতাটা উঠে গেল ছাদে। স্বজন ওপরে তাকাল। ছাদটা যেন সামান্য নিচু হয়ে গেল। পেছন দিকে নেমে গেল চিতাটা। তারপর হঠাৎই ছুটে এসে ধাক্কা মারল পৃথার জানলায়। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা ছিটকে সরে গিয়ে একটা গাছের গুঁড়িতে আটকে স্থির হল। পৃথা চিৎকার করে উঠল। আর স্বজন দ্রুত বলে উঠল, ‘দরজা লক্ করো, তাড়াতাড়ি।’
হুড়মুড়িয়ে পৃথা দরজার দিকে সরে গিয়ে লক হাতড়াতে লাগল। জানলার ওপাশে চিতার মুখ। কয়েক সেকেন্ড লক্টাক খুঁজে পাচ্ছিল না পৃথা। শেষপর্যন্ত পেয়ে সেটাকে চেপে দিয়ে দু হাতে মুখ ঢাকল। চিতাটা সরে গেল খানিকটা তারপর লাফ দিল। মাথার ওপর দড়াম শব্দটা যেন বোমা ফাটার চেয়েও ভয়ঙ্কর। গাড়ির ছাদটা যে অনেকটা বসে গিয়েছে তা সহজেই বুঝতে পারল স্বজন। এই গাড়ি বেশিক্ষণ চিতাটাকে সামলাতে পারবে না। এখনও কাচে আঘাত করার বুদ্ধি ঢোকেনি চিতার মাথায়। সেটা করলেই তাদের সব আড়াল শেষ।
রাজকীয় ভঙ্গিতে চিতাটা নেমে এল বনেটের ওপর। তারপর চার পা গুটিয়ে উইন্ডস্ক্রিনের দিকে মুখ করে বসল। একেবারে দেড় হাতের মধ্যে চিতার মুখ। একটা থাবা ছুড়লেই কাচটা ভেঙে যাবে। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওদের দুজনের শরীর খুঁজে পাবে না কেউ। একটা কিছু করা দরকার। এ ভাবে চুপচাপ ওর শিকার হওয়ার কোনও মানে হয় না। চিতাটা জ্বলজ্বল চোখে এখন পৃথার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু যদি নড়াচড়া দেখতে পায় তা হলেই আক্রমণ করবে। অতএব যেটুকু সময় পাওয়া যায় ততটুকুই জীবন। খালি হাতে এই জন্তুটার সঙ্গে লড়াই করার কোনও সুযোগই নেই। গাড়িতে কোনও অস্ত্র নেই। শুধু, হ্যাঁ, একটা লম্বা স্ক্রু-ড্রাইভার রয়েছে। ওটা নিয়ে কিছুই করা যাবে না।
বসে থাকতে চিতাটার যেন ঝিমুনি এল। থাবার ওপর মুখ রেখে সে চোখ বন্ধ করল। আরও একটু সময় পাওয়া যাচ্ছে তা হলে! এইভাবে শিকার সামনে রেখে চিতাটা ঘুমাচ্ছে কেন? স্বজনের মনে হল প্রাণীটা খুব একা। এবং বেশ খিদে পেয়েছে। অনেকদিন পরে দুটো ভাল খাবার পেয়ে সামনে রেখে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছে মেজাজ করে খাবে বলে। সে আড়চোখে পৃথার দিকে তাকাল। পৃথা সেই একই ভঙ্গিতে সিটে হেলান দিয়ে পড়ে আছে। ও কি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে?
হঠাৎ কাছাকাছি একটা শব্দ হতেই চিতাটা চকিতে মুখ তুলল। ঘাড় ঘুরিয়ে শব্দের উৎস খুঁজল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল। স্বজনের মাথায় সেই মুহূর্তে চিন্তাটা চলকে উঠতেই হাত চলে গেল সুইচে। সঙ্গে সঙ্গে মারুতিটা ঘড়ঘড় করে আওয়াজ তুলল বনেট কাঁপিয়ে। আর সেই শব্দ পায়ের তলায় পেতেই চিতাটা লাফ দিয়ে পাশের জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। প্রাণীটিকে এই প্রথম ভয় পেতে দেখল স্বজন। সে ক্রমাগত ইঞ্জিন চালু করার চেষ্টা করে যেতে লাগল। পেট্রলের অভাবে গাড়িটা নড়ছিল না এতটুকুও। সে হেড লাইট জ্বেলে দিল। ব্যাটারি ডাউন হোক সে শব্দ করে যাবে।
‘কি করছ?’ ফ্যাসফেসে গলায় পৃথা জিজ্ঞাসা করল।
‘চুপ করো।’
মিনিট তিনেক আওয়াজ করার পর স্বজন থামল। চিতাটা আর সামনে আসেনি। হয়তো ঝোপের আড়ালে বসে লক্ষ করে যাচ্ছে। এতক্ষণে পেছনের আসনে নজর দেবার অবকাশ পেল স্বজন। দুটো সুটকেশ রয়েছে সেখানে। একটা সুটকেশ হাত বাড়িয়ে তুলে নিল সে। ভেতরে অপারেশন করার যন্ত্রপাতি রয়েছে। এ গুলো দিয়ে চিতা মারার কথা পৃথিবীতে কেউ কল্পনা করেনি।
হঠাৎ পেছনে একটা তীব্র ধাক্কা লাগল। এবং সেই সঙ্গে চিতার গর্জন। আর সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগল গাড়িটা। চটপট স্টিয়ারিং ধরে ফেলল স্বজন। চিতাটা ধাক্কা দিচ্ছে পেছন থেকে। সেই ধাক্কার তীব্রতায় গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। বাঁক ঘোরাতেই ভ্যালির মুখে এসে পড়ল গাড়িটা। এবার স্বাভাবিক নিয়মেই নীচের দিকে গড়িয়ে চলল অনায়াসে। ব্রেকে পা নয়, শুধু স্টিয়ারিং কন্ট্রোল করে গাড়িটাকে বাংলোর সামনে নিয়ে এল স্বজন। এতটা পথ পেট্রল ছাড়াই তারা যেভাবে গাড়িটাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিল তার থেকে অনেক দ্রুতবেগে পৌঁছাতে পারল। ব্রেকে চাপ দিয়ে গাড়ি থামিয়ে পেছনে তাকাল স্বজন। চিতাটা দূরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়েই বোধহয় এ দিকে তাকিয়ে আছে। এক মিনিট দু-মিনিট, শেষ পর্যন্ত ফিরে গেল সেটা জঙ্গলে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেও তার কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।
স্বজন তাকাল পৃথার দিকে, ‘দৌড়াতে পারবে?’
‘দৌড়াবো?’
‘এক দৌড়ে বারান্দায় চলে আসবে আমি বলা মাত্র।’
‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
‘ওই দরজাটা খুলতেই হবে।
‘কি করে খুলবে? তোমার কাছে তো চাবি নেই। আর ওটা যদি ফিরে আসে?’
‘এলে আসবে। এ ভাবে মরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। সুযোগ নিতেই হবে।’ বলতে বলতে স্ক্রু-ড্রাইভারটা হাতে নিয়ে দরজা খুলে নিচু হয়ে গাড়ির সামনেটা ঘুরে বারান্দায় চলে এল সে। একবার পেছন ফিরে দেখল ঢালু মাঠটায় কোনও প্রাণী নেই। দরজায় বড় তালা ঝুলছে। দ্বিতীয় দরজায় চলে এল সে। ভেতর থেকে বন্ধ। ওপরের কাচে সজোরে আঘাত করতেই সেটা ভেঙে পড়ল। হাত ঢুকিয়ে ছিটকিনি নামাল সে। এবার দরজা খুলল। সে চাপা গলায় ডাকল, ‘এসো।’
পৃথা দরজা খুলতে গিয়ে হতভম্ব, ‘দরজা খুলছে না।’
স্বজন দূর থেকেই বুঝল চিতার আঘাতে দরজাটা বেঁকে গিয়েছে। সে পৃথাকে তার দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখল। দৌড়ে দরজার কাছে পৌঁছানো মাত্র মনে হল একটা আগুনের তীর ছুটে আসছে জঙ্গল থেকে। তাড়াতাড়ি পৃথাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করল স্বজন। ছিটকিনি তুলে দিয়ে সে বড় নিঃশ্বাস ফেলতেই ধেক্ করে গন্ধটা নাকে এল। পৃথা অন্ধকার ঘরে স্বজনের কাছে সরে এসে বলল, ‘কী বিশ্রী গন্ধ!’
বাইরে চিতাটা তখন গাড়িটার ওপর গর্জন করছে।
পৃথাকে জড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতরে স্বজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। ডাক্তার হিসেবে সে জানে এ গন্ধ মানুষের শরীরের। পচে যাওয়ার পরেই এমন তীব্র হয়।
০২. শহরের একপ্রান্তে বিশাল প্ৰাসাদ
শহরের একপ্রান্তে এই বিশাল প্রাসাদটিকে লোকে এড়িয়ে যায়। ওই বাড়ির ভেতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে যাকে নিয়ে যাওয়া হয় তার অস্থি নিতে আত্মীয়দের যেতে হয় শ্মশানে। সেই দাহ দেখতেও দেওয়া হয় না, কারণ ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢোকানোর পরই আত্মীয়দের কাছে যেতে দেওয়া হয়। বাড়িটার বয়স একশ বছর। ব্রিটিশরা কেন বানিয়েছিল তা নিয়ে অনেক গল্প চালু আছে। আপাতত এটি রক্ষীবাহিনীর মূল কার্যালয়।
পুরো বাড়িটাই পাহাড় কেটে বসানো। দশহাত লম্বা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ঢোকার দরজা একটাই। তারপর বিশাল চাতাল। সেখানে কুকুরের মত ওত পেতে বসে আছে জিপগুলো। যে-কোনও মুহূর্তে সংকেত পেলেই ছুটে যায় ড্রাইভার।
দোতলার একটি ঘরের সামনে অফিসাররা একে একে পৌঁছে গেলেন। ঘরের দরজা বন্ধ। পুলিশ কমিশনার জরুরি তলব দিয়েছেন। তিনি মিটিং করবেন। এমন ব্যাপার সচরাচর হয় না। সি পি কারও সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করেন না। তাই আজ তলব পেয়ে প্রত্যেকেই একটু নার্ভাস।
পুলিশ কমিশনার ভার্গিসের শরীরটা বেশ ভারী। মুখটা বুলডগের মত বলে মনে করে না নিন্দুকেরা। তাঁকে কেউ কখনও হাসতে দ্যাখেনি। যে সি পিকে হাসতে দেখবে তাকে এক বোতল স্কচ উপহার দেওয়া হবে বলে জুনিয়ার অফিসার ক্লাবে একটা ঘোষণা রয়েছে। অবশ্যই গোপন ঘোষণা এবং এখনও পর্যন্ত পুরস্কারের দাবিদার পাওয়া যায়নি।
ঠিক সময়ে দরজা খুলে গেল। অফিসাররা বিরাট ঘরে ঢুকে দেখলেন সি পি জানলায় দাঁড়িয়ে নীচের চাতাল দেখছেন। তাঁর চওড়া পিঠ এবং মাথার পেছনের টাক দেখা যাচ্ছে। গম্ভীর গলায় হুকুম এল, ‘সিট ডাউন জেন্টলমেন।’
অফিসাররা বসলেন। দুজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার, চারজন ডেপুটি। মাঝখানে বড় টেবিল, টেবিলের ওপাশে দামি চেয়ার।
পকেট থেকে একটা চুরুট বের করে তার একটা প্রান্ত দাঁতে কাটতে কাটতে সি পি ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘আমার দুর্ভাগ্য কি তোমরা জানো?’
অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনারদের মধ্যে যিনি সিনিয়ার তিনিই জবাব দেবার অধিকারী। কিন্তু জবাবটা তাঁরও জানা ছিল না। সি পি নিজের চেয়ারে এসে সময় নিয়ে চুরুট ধরালেন। ঘরে দেওয়াল ঘড়ির আওয়াজ ছাড়া কোনও শব্দ ছিল না।
এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে সি পি বললেন, ‘একপাল নিরেট গর্দভকে নিয়ে আমাকে কাজ করতে হচ্ছে। সোম, তুমি কথাটা স্বীকার করো না?’
অপমানটাকে হজম করে নেওয়া এখন অভ্যেসে চলে এসেছে। সোম ঠোঁট চেটে নিলেন, ‘স্যার, আমরা চেষ্টা করছি।’
‘চেষ্টা? ওঃ, আমি অনেকবার বলেছি আমার চাই এন্ড প্রোডাক্ট। তুমি অনেক চেষ্টা করে যদি জিরো পাও তাহলে আমি তোমাকে বাহবা দেব না। তোমাদের তো মজা, খাচ্ছ দাচ্ছ আর ক্লাবে গিয়ে ফুর্তি করছ। অসহ্য।’
সোম বললেন, ‘আমার বিশ্বাস চিতা আর বেশিদিন বাইরে থাকবে না।’
‘কিসে তোমার এই বিশ্বাস এল সোম?’
‘আমরা চারপাশ থেকে ওকে ঘিরে ফেলেছি। পাশের পাহাড়টাতেই ওকে থাকতে হয়েছে। এই শহরে ঢুকতে গেলে ওকে অনেকগুলো পুলিশ-চৌকি পেরিয়ে আসতে হবে। এবার আর সেটা সম্ভব নয়।’ গম্ভীর গলায় বললেন সোম।
‘পাশের পাহাড়ে চিতাটা আছে আর তুমি এখানে বসে কেন?’
‘স্যার, অতবড় পাহাড় জঙ্গলে চিরুনি অপারেশন চালাতে গেলে যে ফোর্স দরকার তা আমাদের নেই। ও সহজেই পালিয়ে যেতে পারে।’
‘ধরো ও এল না, এই শহরেই ঢুকল না, তাহলে?’
‘এখানে না এসে ও পারবে না স্যার!’
‘কেন?’
‘এখানকার মানুষ ওকে ভালবাসে।’
‘কে বলল?’
‘এটাই খবর।’
‘পরশুদিনের উৎসবে কত লোক শহরে জমবে?’
‘এক লক্ষ দশ, এমন অনুমান করা যাচ্ছে।’
‘তার মানে প্রায় প্রতিটি রাস্তায় লোক থিকথিক করবে।’
‘উপায় নেই স্যার। ধর্মীয় উৎসব, বন্ধ করা যায় না।’
‘আর সেই জনসমুদ্রে যদি তোমার চিতা মিশে থাকে তুমি তার ল্যাজও ছুঁতে পারবে না। এই পরশুদিনটার কথা ভেবে আমার ঘুম চলে গিয়েছে। কখন কোন দিক থেকে আক্রমণ হবে কেউ জানি না।’
দ্বিতীয় অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার উশখুশ করছিলেন। নীরবে সোমের অনুমতি নিয়ে তিনি বললেন, ‘স্যার, একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, গত একমাস চিতা চুপচাপ আছে।’
‘বেশ তো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও। যে কোনও স্তব্ধতা মানে বড় আক্রমণের প্রস্তুতি। আমি অনেকবার ভেবেছি লোকটাকে সবাই চিতা বলে কেন!’
সোম বললেন, ‘ও চিতার মত ধূর্ত, তাই।’
সি পি ঠোঁট মুচড়ালেন, ‘তোমরা কেউ চিতা দেখেছ?’
‘হ্যাঁ স্যার। পাশের জঙ্গলেও একটা চিতা আছে। লোকে অবশ্য তাকে পাগলা চিতা বলে থাকে।’ সোম জানালেন।
‘আটবছর পরে যখন আমি অবসর নেব তখনও তোমার এক বছর চাকরি থাকার কথা। তুমি সি পি হলে ফোর্সের অবস্থা কিরকম হবে তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। সোম, চিতা একটি বিরল প্রাণী। যাদের লোকে চিতা বলে তারা ছোট সাইজের বাঘ। লেপার্ড। চিতা নয়। শুধু মুখের দাগে নয় ওর চালচলনই আলাদা। পৃথিবীর সর্বত্র চিতা কমে আসছে। আমি প্রমাণ করতে চাই তোমাদের এই লোকটি লেপার্ড হলেও হতে পারে, চিতা নয়। গত তিনবছরে ও কটা খুব করেছে?’
সোম বললেন, ‘বাইশটা। সবগুলো অবশ্য ও নিজে নয়।’
‘পুলিশের একজন সেপাই কিছু করলে জবাবদিহি আমাকে দিতে হয়। আর আমরা ওদের কজনকে ধরতে পেরেছি? তিনজনকে। ধরামাত্রই আত্মহত্যা করেছে তারা। কি সুন্দর লড়াই। তুমি যদি চিতা হতে আর পরশুদিন উৎসব থাকত তাহলে কি চুপচাপ বসে থাকতে? সুযোগ নিতে না?’
ঢোক গিললেন সোম, ‘হ্যাঁ স্যার।’
‘সেক্ষেত্রে অবশ্য আমি তোমাকে ছারপোকার মত পিষে মারতাম। কিন্তু ওই লোকটাকে পারছি না। তিন বছর ধরে ও আমাকে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে আর সেটা সম্ভব হচ্ছে তোমাদের মত ইট মাথার তোক ফোর্সে আছে বলে। দশ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করার পর কটা খবর এসেছে?’
‘তিনটে। তাও টেলিফোনে। তিনটেই ভুয়ো খবর।’
‘এই শহরের লোকের কাছে তাহলে দশ লক্ষ টাকার চেয়ে ওই বদমাসটা বেশি মূল্যবান। তখন তো বলেছিলে ঘোষণা করার তিনদিনের মধ্যে খবর পাওয়া যাবে। শোনো, তোমাদের স্পষ্ট বলছি পরশুদিন ওকে আমার চাই-ই।’
‘পরশুদিন?’ সোম বিড়বিড় করলেন।
‘হ্যাঁ। পরশুদিন ও এই শহরে আসবেই। শহরের সব রাস্তায় চব্বিশঘন্টা পাহারা বসাও। দশ লক্ষ টাকার কথা প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর মাইকে ঘোষণা করা হোক। শুনতে শুনতে মানুষের নার্ভে যেন আঘাত লাগে। সি পি কথা শেষ করামাত্র টেলিফোন বাজল।
খুব বিরক্ত মুখে তিনি রিসিভার তুলে হ্যালো বললেন। ওপাশ থেকে কিছু শোনামাত্র সকলে দেখল সি পি সোজা হয়ে বসলেন।
‘ভার্গিস?’
‘ইয়েস সার।’
‘এইমাত্র আমাকে জানানো হয়েছে তুমি মাত্র তিনদিন সময় পাচ্ছ। এই তিনদিনের মধ্যে যদি তুমি পাহাড়ি চিতাটাকে খাঁচায় না ভরতে পারো তাহলে প্রমোশনের সময় যে রেজিগনেশন লেটারটা আমাকে দিয়েছিলে তাতে তারিখ বসিয়ে নেওয়া হবে। মনে রেখো, মাত্র তিনদিন অপেক্ষা করবেন তাঁরা।’ খুব ঠাণ্ডা গলায় শব্দগুলো উচ্চারিত হল। ভার্গিস কেঁপে উঠলেন। ভাঁর গলা জড়িয়ে গেল, ‘স্যার! তিনদিন খুব অল্প সময়।’
‘তিনদিন মানে তিনদিন। তুমি জানো আমাকে কাদের কথা শুনতে হয়। কাজ না হলে আমার কাছে তুমিও যা সোমও তা।’ লাইনটা কেটে গেল। এমন গলায় অনেকদিন কথা বলেননি মিনিস্টার। লোকটার অনেক উপকার করেছে ভার্গিস। টাকা পয়সা থেকে মেয়েমানুষ কি পাঠায়নি? অথচ আজ একদম অন্য গলা? যারা মিনিস্টারকে নির্দেশ দিয়েছে তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটা অনুমান আছে ভার্গিসের, হাতে প্রমাণ নেই। এখন বিশ্বাস হল, তাঁর মত মিনিস্টারের লেখা তারিখবিহীন পদত্যাগপত্র ওদের হাতে এসেছে।
রুমালে ঘাম মুছলেন ভার্গিস। তাঁর চোখ এবার সসামের দিকে। হারামজাদা নিরীহ মুখে তাকিয়ে আছে কিন্তু মনে মনে জানে তিনি যত নাজেহাল হবেন তত ওর সামনে সি পির চেয়ার এগিয়ে আসবে। আসাচ্ছি! তিনদিনের মধ্যে এই হুতোমটাকে ফাঁসাতে হবে।
নিঃশ্বাস ফেললেন ভার্গিস! এরা কেউ নিশ্চয়ই বুঝতে পারেনি ওই টেলিফোনটা কে করেছিল এবং কি বলেছে। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাঁটু কাঁপছিল; ‘জেন্টলমেন, আমি তিনদিন সময় দিচ্ছি। সেভেনটিটু আওয়ার্স। এর মধ্যে ওকে খুঁজে বের করতে হবেই। নো এস্কিকিউজ’।
‘ভার্গিসকে উঠে দাঁড়াতে দেখে অফিসাররা চেয়ার ছাড়লেন। ওঁদের মুখগুলো শুকিয়ে গিয়েছিল। সোম বলতে চেষ্টা করলেন, ‘স্যার তিনদিন— ।’
তাঁকে কথা শেষ করতে দিলেন না ভার্গিস, ‘ওটাই হুকুম।’
অফিসাররা বেরিয়ে গেলেন। আধঘন্টার মধ্যে সমস্ত শহর জুড়ে পুলিশ তাণ্ডব শুরু করে দিল। মাইকে ক্রমাগত দশ লক্ষ টাকার কথা ঘোষণা করা হচ্ছিল। ভার্গিস তাঁর অফিসের পাশের দরজা খুলে করিডোর দিয়ে হেঁটে চলে এলেন নিজস্ব বাসভবনে। বিলাসের সমস্ত ব্যবস্থা এখানে। তিনি বিয়ে করেননি। যৌবনে কোনও নারী তাঁকে স্বামী হিসেবে বরণ করার কথা ভাবেনি না তিনি সময় পাননি এ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে।
সোফাতে গা এলিয়ে দিয়েও ভার্গিস স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। মিনিস্টারের কাছে তিনি এবং সোম একই পর্যায়ের, একথা মন থেকে সরাতে পারছিলেন না। তিনদিন বড় কম সময়। তিনদিনে কিছু হবার সম্ভাবনাও তিনি দেখছেন না। আর এমনি এমনি দিনগুলো কেটে গেলে চতুর্থদিনে এই ইউনিফর্ম খুলে ফেলতে হবে। আর সেরকম হলে তিনি অবশ্যই এই শহরে থাকবেন না অবশ্য সেরকম হবার কথা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারছেন না। হঠাৎ তাঁর মাদামের কথা মনে এল। এই শহরের সবচেয়ে দামি মহিলা। পৃথিবীর কেউ জানুক বা না জানুক ভার্গিস জানেন মিনিস্টারের টিকি ওঁর কাছে বাঁধা আছে। ভার্গিস নিজস্ব লাইনে টেলিফোন করলেন ম্যাডামের বিশেষ নম্বরে। দু’বার বাজতেই ম্যাডামের গলা পাওয়া গেল, ‘কে?’
‘নমস্কার ম্যাডাম। আমি ভার্গিস বলছি।’
‘ও ভার্গিস। আমি তোমার জন্যে দুঃখিত।’
‘আপনিও খবরটা জানেন?’ ভার্গিস অবাক।
হাসির শব্দ বাজল, ‘আপনিও মানে?’
‘সরি। ম্যাডাম, আমি অতীতের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই না কিন্তু আজ আপনার কাছে একটু সাহায্য আশা করতে পারি না?’
‘লোকটাকে ধরে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।’
‘এখনও সেটাই সম্ভব হয়নি।‘
‘তিনদিন পরে তোমাকে স্যাক না করলে মিনিস্টারকে পদত্যাগ করতে হবে। শোনো, আমার উপদেশ হল, এই তিনদিন চুটিয়ে জীবনটা উপভোগ করো। বাই।’ ম্যাডাম লাইন কেটে দিলেন।
দেবেনই তো। যখন ওঁর হেলথসেন্টার নিয়ে পাবলিক খেপে গিয়েছিল তখন তিনিই বাঁচিয়েছিলেন। ছয়মাস ধরে রোজ ভোর তিনটে থেকে চারটে পর্যন্ত বর্ডার থেকে সেপাই সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি যাতে ম্যাডামের লোকজন বিনা বাধায় যাওয়া আসা করতে পারে। আর এসব করেছিলেন মিনিস্টারকে প্রফুল্ল রাখতে। ভার্গিসের হাত নিশপিশ করতে লাগল। একেবারে মুর্খের মত তিনি কিছু করেননি। প্রমাণ রেখেছেন। সেগুলো সব এই ঘরের আলমারিতে মজুত আছে। যদি পদত্যাগ করতেই হয় সেগুলোকে আর আগলে রাখবেন না।
ভার্গিস টেলিফোন তুললেন, ‘সোম, নীচে নেমে এস। শহরটাকে দেখব।’
তৈরি হয়ে নিলেন ভার্গিস। হ্যাঁ, সোম এর মধ্যে দুদিন ম্যাডামের ওখানে গিয়েছে এই খবর তিনি পেয়েছেন। হেলথ ক্লিনিকে আরাম করতে পুলিশ অফিসারের যাওয়া নিষেধ আছে। শুনেছেন, কিছু বলেননি।
ঘর থেকে বেরিয়ে স্যালুট উপেক্ষা করতে করতে ভার্গিস মূল বারান্দায় চলে এলেন। তাঁর হিলের শব্দে চারপাশের সেপাইরা তটস্থ হয়ে উঠছিল। বাঁক ঘোরার সময় পোস্টারটা নজরে এল। এখানে এটা সেঁটে দেবার বুদ্ধি কার হয়েছে? বরং এটাকে কোনও দেওয়ালে সেঁটে দিলে কাজ হত। নির্বোধের দল।
পোস্টারটায় চোখ পড়তেই তাঁর পেটের ভেতরটা চিনচিন করে উঠেছিল। ওপরে লেখা, দশ লক্ষ টাকা পুরস্কার। মাঝখানে লোকটার ছবি। ঠোঁটের মিচকে হাসিটা মারাত্মক। নীচে লেখা, আকাশলালকে জীবিত অথবা মৃত চাই।
দশ লক্ষ টাকা। আশ্চর্য! তবু খবর নেই।
ভার্গিস হাঁটতে লাগলেন। সিঁড়ি ভেঙে নীচে এসে দেখলেন সোম ইতিমধ্যে নেমে এসেছে। কাছাকাছি পৌঁছে বললেন, ‘শহরটা দেখব।’
‘ইয়েস স্যার।’
ভার্গিস সি পির জন্যে নির্দিষ্ট গাড়িতে উঠলেন।
উঠে দরজা বন্ধ করে দিলেন। অগত্যা সোমকে আর একটা গাড়ি নিতে হল। ওদের পেছনে সেপাইদের ভ্যান।
চাতাল পেরিয়ে গেট-এর কাছে আসতেই ভার্গিস একটা জটলা দেখতে পেলেন। এখানে গার্ডদের জটলা করা ঠিক নয়। গাড়ি থামিয়ে তিনি চিৎকার করলেন, ‘আড্ডা মারা হচ্ছে, অ্যাাঁ?’
সঙ্গে সঙ্গে সেপাইরা সোজা হয়ে স্যালুট করল। একজন খুব ঝুঁকে ভয়ে ভয়ে নিবেদন করল, ‘স্যার, এই লোকটা।’ বেচারার পক্ষে কথা শেষ করা সম্ভব হল না আতঙ্কে। ভার্গিস দেখলেন একটা শীর্ণ চেহারার লোককে ওরা ধরে রেখেছে। জামাকাপড় ময়লা এবং ছেঁড়া। তিনি দেখলেন সোম তাঁর গাড়ি থেকে নেমে ওইদিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ভার্গিস মনে মনে বললেন, ‘রাবিশ! যেখানে দরকার নেই সেখানেই কাজ দেখাবে!’
সোম সামনে যেতেই সেপাইরা ব্যাপারটা জানাল। লোকটা সি পির সঙ্গে দেখা করতে চায়। কেন দেখা করবে কাউকে বলছে না। ওরা ভয় দেখিয়েছে ভেতরে ঢুকলে হাড় ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না তবু জেদ ছাড়ছে না। সোম সেপাইদের সরে যেতে বললেন। একটু আলাদা হতেই চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি চাস তুই?’
‘দশ লক্ষ টাকা।’ লোকটা হাসল।
‘পেটে ক্যাঁক করে এমন লাথি মারব হাসি বেরিয়ে যাবে।’
‘বাঃ, আপনারাই তো বলেছেন খবর দিলে টাকা পাওয়া যাবে।’
‘কোথায় দেখেছিস ওকে?’
‘টাকাটা পাব তো?’
সোম আড়চোখে দৃরে দাঁড়ানো কমিশনারের গাড়ি দেখলেন। বেশি দেরি করা উচিত মনে হচ্ছে না। তিনি মাথা নাড়তেই লোকটা বলল, ‘চাঁদি হিলসে।’
উত্তেজনায় টগবগিয়ে উঠলেন সোম, ‘কোন বাড়ি?’
‘বাইশ নম্বর। জানলায় এসে দাঁড়িয়েছিল। নীচে লন্ড্রি আছে।’
সোম সেপাইদের কাছে চলে এলেন, ‘আমরা চলে যাওয়ার পাঁচ মিনিট বাদে ওকে এমন ভাবে মারবে যাতে না মরে।’
তারপর তিনি সোজা এগিয়ে গেলেন সি পির গাড়ির সামনে। উত্তেজনা চেপে রাখতে তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছিল।
‘কি ব্যাপার?’ ভার্গিস হুঙ্কার ছাড়লেন।
‘মাথায় গোলমাল আছে।’
‘সেটা জানতে তোমাকে যেতে হয় কেন? চলো।’ সিপির গাড়ি ছাড়ল।
নিজের গাড়িতে বসে সিগারেট ধরালেন সোম। শহর দেখতে হলে তাঁদের চাঁদি হিলস দিয়েই যেতে হবে। দশ লক্ষ টাকা আঃ। একেই বলে যোগাযোগ। হ্যাঁ, লোকটা ধরা পড়লে সিপির চাকরি বাঁধা। তাঁর প্রমোশন বন্ধ। কিন্তু দশলক্ষ টাকার জন্যে আপাতত প্রমোশন উপেক্ষা করতে পারেন তিনি। সিপি হলে তো কাঁটার চেয়ারে বসতে হবে। একবছর বসলেই তাঁর চলে যাবে।
রাস্তায় এর মধ্যেই লোক জমছে। শহরের বাইরে থেকে লোক আসতে শুরু করেছে। দেবতার মূর্তি মাথায় নিয়ে পরশু প্রসেসন বের হবে। তবে আজই পুলিশ বেশ নজরে পড়ছে। সেইসঙ্গে সমানে চলছে দশ লক্ষ টাকার ঘোষণা।
চৌমাথায় এসে সিপির গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়তেই সোম নিজের গাড়ি থেকে নেমে ছুটলেন। ভার্গিস তাঁকে বললেন, ‘বাঁ দিকের রাস্তাটায় নো এনট্রি করে দাও আগামী তিনদিন। কেউ ওখানে ঢুকতে পারবে না।’
‘কিন্তু।’
‘নো কিন্তু। যত চাপ পড়ুক অন্য রাস্তায় এটা আমার খোলা চাই। তাহলে যে কোনও জায়গায় ফোর্স সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছাতে পারবে।’
‘ঠিক আছে স্যার।’
কনভয় এগোল। চাঁদি হিলসে ঢুকছে গাড়িগুলো। সোম বাড়ির নম্বর দেখলেন। এক দুই, পর পরই আছে। কুড়ি একুশ পার হবার সময় তিনি হুইস্ল বাজালেন। বাইশ নম্বরের নীচে লন্ড্রি।
সামনের গাড়ি থেমে যেতেই তিনি ছুটে গেলেন, ‘স্যার, স্যার— !’ উত্তেজনায় কথা বন্ধ হয়ে গেল সোমের।
‘কি ব্যাপার?’ বিরক্ত হলেন ভার্গিস।
‘ওকে দেখতে পেলাম। ওই জানলায়।‘
‘কাকে?’
‘চিতা, আই মিন, আকাশলাল।’
সঙ্গে সঙ্গে ভার্গিসের নির্দেশে বাড়িটাকে ঘিরে ফেলা হল। ওয়ারলেসে খবর গেল, ‘আরও সেপাই পাঠাও।’
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বাহিনী তৈরি। ভার্গিস হুকুম দিলেন, ‘ফায়ার করো।’ সঙ্গে সঙ্গে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে কাচ ভেঙে পড়তে লাগল ওপরের জানলা থেকে। সোম উত্তেজিত গলায় বলল, ‘দরজা ভাঙব স্যার?’
মাথা নাড়লেন ভার্গিস। হ্যাঁ। কিন্তু তাঁর চোখ ছোট হয়ে এল। ওপরের ঘরে আলো জ্বলছে। কেউ যদি জানলায় এসে দাঁড়ায় তাহলে কাচের আড়ালে তাকে সিল্যুট দেখাবে। মুখচোখ দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সোম কি করে লোকটাকে দেখতে পেল!
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সব ঘর তছনছ করে সোম রিভলভার হাতে সেই ঘরটিতে ঢুকলেন। বাড়িটার অন্যঘরের মত এখানেও কোনও মানুষ নেই। শুধু টেবিলের ওপর পেপারওয়েটের নীচে একটা কাগজ চাপা রয়েছে। সেইটে পড়ে সোমের মনে হল তাঁর হাঁটু দুটো নেই।
‘কি ওটা?’ পেছন থেকে ভার্গিসের গলা ভেসে এল।
কাঁপা হাতে সোম কাগজটা এগিয়ে দিলেন। ওপরে ভার্গিসের নাম লেখা।
ভার্গিস পড়লেন, ‘আগামী পরশু সকাল ন’টায় টেলিফোনের পাশে থাকবেন। দারুণ সুসংবাদ আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। আকাশলাল।’
ভার্গিস চিরকুটটা হাতে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। সোম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। ভার্গিসের হুঙ্কার শোনা গেল, ‘তোমার রিভলভারটা দাও।’
০৩. এই পরিকল্পনায় ঝুঁকি আছে
হ্যাঁ এই পরিকল্পনায় ঝুঁকি আছে। কিন্তু বন্ধুগণ, ইঁদুরের মত বেঁচে থাকা আর আমার পক্ষে সম্ভব নয়। হয় এখনই নয় আর কখনও নয়। বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় আকাশলাল কথাগুলো বলল। তার মুখের চেহারা ফ্যাকাশে, দেখলেই অসুস্থ বলে মনে হয়। বয়স পঞ্চাশের গায়ে, শরীর মেদহীন।
ঘরের ভেতর শ্রোতা হিসেবে যে তিনজন মানুষ বসে আছে তাদের চিন্তিত দেখাচ্ছিল। তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটির নাম হায়দার আলি। ভাবতে গেলেই তার চোখ বন্ধ হয়ে যায়। সেই ভঙ্গি নিয়েই হায়দর বলল, ‘এখন আমাদের শেষবার চিন্তা করতে হবে। তুমি যখন প্রথম এই পরিকল্পনার কথা আমাকে বলেছ তখনও আমি পছন্দ করিনি, এখনও আমার ভাল লাগছে না। একটু ভুল মানেই তোমাকে চিরজীবনের জন্যে হারাব। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমার বেঁচে থাকাটা দেশের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি।’
‘কি ভাবে বেঁচে থাকা?’ খেকিয়ে উঠল আকাশলাল, ‘এইভাবে জলের তলায় দমবন্ধ করে? কোন্ কাজটা আমি করতে পারছি? আর কাজই যদি না করতে পারলাম, তাহলে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মধ্যে কোনও তফাত নেই। আমি না থাকলে তুমি সেই কাজটা করবে, ডেভিড করবে, অজস্র মানুষ এগিয়ে আসবে। আমাকে কাজ করতে গেলে স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকতে হবে। এই শরীর নিয়ে ওরা আমাকে সেটা করতে দেবে না। পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা এমনি এমনি করেনি সরকার।’
দ্বিতীয় মানুষটি যার নাম ডেভিড, নিচু গলায় বলল, ‘ওটা এখন দশ লক্ষ হয়েছে।’
তৃতীয় মানুষটি বয়সে নবীন, বলল, ‘ওরা আপনাকে পেলে যন্ত্রণা দেবে।’
‘জানি। আমি সব জানি।’ আকাশলাল হাসতে চেষ্টা করল।
হায়দার আলি বলল, ‘কোনও সুযোগ না দিয়েই ওরা ইলেকট্রিক চেয়ারে বসাবে।’
‘সব জানি। তবু আমি ধরা দিতে চাই। এটাই শেষ কথা। আমি আর কতদিন আন্ডার গ্রাউন্ডে থাকব? কোথায় থাকব? দশ লক্ষ টাকা হয়েছে বলছ! এত টাকার লোভ সামনে থাকলে আমি নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারব না। এই গরিব দেশের সহজ মানুষগুলোকে লোভী করে তোলার কোনও অধিকার আমার নেই।’ আকাশলাল. নামতে চেষ্টা করল বিছানা থেকে। হায়দার আলি এগিয়ে যেতেই সে হাত নেড়ে জানাল ঠিক আছে।
ডেভিড বলল, ‘সাধারণ মানুষ কিন্তু দশ লক্ষ টাকায় ভোলেনি। ভার্গিসকে নাজেহাল করতে আমি একটি লোককে পাঠিয়েছিলাম হেডকোয়ার্টাসে মিথ্যে খবর দিয়ে। সে কাজটা করে ফিরে এসেছে। মারধোর খেয়েছে কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আপনার চিঠিটা নিশ্চয়ই ভার্গিস পেয়ে গেছে।’
‘ওকে আমার হয়ে ধন্যবাদ দিয়ো।’ সাবধানে পা ফেলে আকাশলাল পাশের দরজা দিয়ে টয়লেটে ঢুকে গেল।
ওরা তিনজন চুপচাপ বসে রইল। যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তিনবছর আগে আজ তা প্রায় বিধ্বস্ত। একদিকে সামরিক শক্তির পাশব অত্যাচার অন্যদিকে তথাকথিত কিছু বিপ্লবীর বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও এখন যেটুকু আশা টিমটিম করে জ্বলছে তা যে আকাশকে কেন্দ্র করে তা এই তিনজনের চেয়ে বেশি কারও জানা নেই। তিনবছর ধরে শুধু আকাশকে নয় নিজেদের গোপনে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়েছে প্রতিমুহূর্তে। এদেশের মন্ত্রিপরিষদ এবং পুলিশ চিফ ভার্গিস নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যেতে পারবেন যেই তাঁরা জানতে পারবেন আকাশলাল জীবিত নেই। মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে এই লড়াই থমকে যাবে আরও অনেক বছর। তিনজনের অস্বস্তির কারণ এখন এক।
টয়লেটের আয়নায় নিজের মুখ দেখছিল আকাশলাল। গাল বসে গিয়েছে। অনেকদিন পরে নিজের মুখটাকে ভাল করে দেখল সে। বয়েসের আঁচড় নয়, অবহেলার প্রতিক্রিয়া মুখ জুড়ে। তবু রাস্তায় নামলে যে-কোনও মানুষ চিনতে পারবে তাকে। মুখের এই বিধ্বস্ত অবস্থাও তাদের বিভ্রান্ত করবে না। মানুষের মত কোনও প্রাণীর মুখ এক জন্মে এতবার বদল হয় না। অথচ তার তো দীর্ঘদিন ধরে একই রয়ে গেল। বাইরে বেরিয়ে আসার সময় মাথাটা একটু ঝিমঝিম করে উঠল। একটু দাঁড়াতে গিয়েই মত পাল্টাল সে। তিনজোড়া উদ্বিগ্ন চোখ তাকে দেখছে। ওদের আরও উদ্বিগ্ন করার কোনও মানে হয় না।
বিছানায় ফিরে আসামাত্র দরজায় শব্দ হল। হায়দার আলি জানতে চাইল ‘কে ওখানে?’ উত্তর এল, ‘ডাক্তার এসেছেন।’
এ বাড়িতে এবং বাড়ির বাইরে রাস্তায় এখন চব্বিশ ঘন্টা পাহারা। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই খবর পৌঁছে যাবে এই ঘরে। হায়দার ভেতরে নিয়ে আসতে নির্দেশ দিল।
ডাক্তার ঘরে ঢুকলেন। বালিশে হেলান দিয়ে আকাশলাল হাসল, ‘আসুন ডাক্তার।’
ভদ্রলোক খাটের পাশে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি এখন কেমন আছেন?’
‘ভাল। বেশ ভাল। কারও সাহায্য ছাড়াই টয়লেট যাচ্ছি।’
‘হাঁটার সময় মাথা ঘুরছে না তো?’
‘কাল অবৃধি ঘুরছিল, আজ আর হচ্ছে না।’
আমি পরীক্ষা করব। আপনাকে বালিশ সরাতে হবে।’
ডাক্তারের নির্দেশ মান্য করল আকাশলাল। ডাক্তার পরীক্ষা করে যে সন্তুষ্ট হয়েছেন মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। আকাশলাল স্বস্তি পেল।
‘এবার আপনাকে জামাটা খুলতে হবে।’ আকাশলাল জামার বোতাম খুলতেই বিশাল ক্ষতচিহ্ন বেরিয়ে এল। তার অনেকটাই শুকিয়ে গেলেও ওটা যে সাম্প্রতিক তা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়।
আঙুল রাখলেন ডাক্তার, ‘এখানে কোনও ব্যথা বোধ করেন?’
‘বিন্দুমাত্র না।’
আমি একটা স্প্রে দিচ্ছি। দিনে দুবার ব্যবহার করলেই পরশুদিন পুরনো হয়ে যাবে।’
‘ধন্যবাদ। পরশুদিন তো অনেক সময়।’
‘না অনেক সময় নয়। আমার যে-কোনও পেশেন্টকে আমি আপনার অবস্থায় আরও দশদিন বাইরে যেতে দিতাম না। এখনও বলছি আপনি দুঃসাহস দেখাচ্ছেন।’ এই কথাগুলো বলার সময় ডাক্তার যেভাবে ঘরের অন্য তিনজনের দিকে তাকালেন তাতে স্পষ্ট বোঝা গেল তিনি সমর্থন চাইছেন।
ডেভিড উঠে এল পাশে, ‘ডাক্তার, আপনি ওকে সুস্থ বলবেন না?’
দ্রুত মাথা নাড়লেন ডাক্তার, ‘না। একটা বড় পরীক্ষা ওঁর শরীরে করা হয়েছে। সেটার প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্যেও সাতদিন নজরে রাখা দরকার।’
ডেভিড কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে হাত তুলে নিষেধ করল আকাশলাল, ‘অপারেশনের পর আটদিন কেটে গেছে। যা কিছু নজরদারি আপনি নিশ্চয়ই করে ফেলেছেন। না পারলে আমার কিছু করার নেই। আপনাকে আমি অনেক আগে বলেছি পরশু সকালে আমাকে রাস্তায় নামতেই হবে। তাই না ডাক্তার?’
এবার গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে ডাক্তার আবার নার্ভাস হলেন। এই মানুষটির মাথার দাম এখন দশ লক্ষ টাকা। একসঙ্গে এত টাকা তিনি কখনও দ্যাখেননি। আজ থেকে একমাস আগে যখন তাঁকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছিল তখন লোকটির ব্যক্তিত্ব দেখে তিনি অবাক হয়েছিলেন। এমন কি অপারেশন টেবিলে অজ্ঞান হয়ে শুয়ে থাকা মানুষটিও যেন তাঁকে হুকুম করে যাচ্ছিল। এদেশের মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্যে লোকটা মরিয়া, শুধু এই বোধই তাঁকে বন্দি হওয়া সত্ত্বেও সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
তিনি বললেন, ‘কিন্তু আপনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ নন।’
‘আমি জানি। কিন্তু আমি এখন অনেক ভাল।’
‘যদি আরও দিন দশেক সময় দিতেন—’
‘অসম্ভব। ডাক্তার, আপনাকে আমি অনেকবার বলেছি আগামী পরশু আমার পক্ষে সবচেয়ে জরুরি দিন। এই শহরে এক লক্ষের ওপর মানুষ জড়ো হবে উৎসব উপলক্ষে। রাস্তাঘাট থিক থিক করবে। এই জমায়েতটাকে আমার প্রয়োজন।’ কথা বলতে বলতে উঠে বসল আকাশলাল। ‘আপনি ভয় পাবেন না। আমি স্বচ্ছন্দে হেঁটে যেতে পারব। এক কাপ কফি হবে?’
ডাক্তার অবাক হলেন। মাথা নাড়লেন, না। তারপর বললেন, ‘আপনার কি মাথায় কোনও যন্ত্রণা হচ্ছে? অথবা মাথা ধরার মত অস্বস্তি?’
‘সামান্য। ওটা ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না।’
ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘এবার আমি ফিরে যেতে চাই।’
‘যাবেন। আপনার অর্ধেক কাজ হয়েছে এখনও অর্ধেক বাকি। আজ থেকে সাতদিনের বেশি আপনাকে আটকে রাখা হবে না। আর আমার ভাগ্য খারাপ হলে আপনার ভাগ্য ভাল হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি পরশুই চলে যেতে পারবেন।’
‘আমার পক্ষে ব্যাপারটা ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে।’
‘আমি জানি। কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। এই উপমহাদেশে আপনি একমাত্র সার্জেন যিনি কাজটা করতে পারেন। তাই আপনাকে আমাদের প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু আপনার পরিবারের সবাই জানেন যে আপনি সুস্থ আছেন। আপনার লেখা চিঠি তাঁদের কাছে নিয়মিত পৌঁছে দেওয়া হয়। ওঁরাও উদ্বিগ্ন নন।’
‘চিঠিগুলো নিশ্চয়ই সেন্সর করেই দেওয়া হয়।’
‘অবশ্যই। আপনি নিশ্চয়ই আমাদের ঝুঁকি নিতে বলবেন না!’
‘আপনি জানেন আপনার জন্যে দশ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।’
‘অনেক টাকা ডাক্তার, মাঝে মাঝে আমারই লোভ হচ্ছে।’
‘লোভ তো আমারও হতে পারে।’
‘সেটাই স্বাভাবিক।’
‘আশ্চর্য! আমি এবার আসতে পারি?’
‘অবশ্যই।’ ডেভিড ডাক্তারকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেল। বাইরে যে অপেক্ষায় ছিল সে তৎপর হল। ডাক্তার ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘আমি স্প্রে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
‘ধন্যবাদ। আগামীকাল দেখা হবে ডাক্তার!’
‘আর একটা কথা, আজ সকালে আমার ইনজেকশনটা একটা বেড়ালের ওপর প্রয়োগ করেছিলাম। ঠিক ঠাক কাজ করেছে।’
‘লোকে কিন্তু আমাকে চিতা বলে ডাক্তার।’
ডাক্তার বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হল।
এবার তৃতীয়জন কথা বলল, ‘ওরা চাঁদি হিলসের বাড়িটাকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।’
‘সাবাস।’
হায়দার বলল, ‘এর জন্যে ভার্গিসকে বেশ ভুগতে হবে। বাড়িটা মিনিস্টারের প্রেমিকার। বেচারা।’
ডেভিড বলল, ‘এই ভদ্রমহিলাকে কিন্তু আমরা ব্যবহার করতে পারতাম।’
আকাশলাল হাসল, ‘সময় চলে যায়নি। তোমাদের ওপর যে সব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেগুলো এখন কি অবস্থায় আছে?’ হঠাৎ মানুষটা সিরিয়াস হয়ে গেল।
হায়দার বলল, ‘প্রায় শেষ হয়ে গেছে।’
‘প্রায় কেন?’
‘শেষ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষ এবং সেই সূত্রে পুলিশের নজরে এসে যাবেই, তাই শেষটুকু বাকি রাখা হয়েছে।’
‘আমার পরিকল্পনার কথা তোমরা তিনজন জানো। সামান্য ভুল মানে আর ফিরে তাকাবার কোনও সুযোগ নেই। যেসব ব্যাপার তোমাদের এখনও সন্দেহ আছে তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।’
তরুণ উশখুশ করছিল। এবার বলল, ‘আমরা একজনকে আজই আশা করছিলাম। কিন্তু তাঁর শহরে আসার সময়টা নিয়ে গোলমাল হচ্ছে।’
‘গোলমাল হচ্ছে কেন?’
‘ভদ্রলোক এখনও এসে পৌঁছাননি।’
‘তিনি কি রওনা হয়েছেন?’
‘হ্যাঁ তাঁকে আজ বিকেলেও দেখা গেছে নীচে।’
‘লোকটিকে খুঁজে বের করো। আমার পরিকল্পনার শেষটা ওর ওপর নির্ভর করছে হায়দার। ওকে আমার চাই। পরশু সকালে শেষবার আমরা কথা বলব। ততক্ষণ একেবারে আড়ালে থাকো সবাই।’
তিনটে মানুষ চুপচাপ ঘর ছেড়ে গেলে আকাশলাল কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। তিন বছর আগে সবকিছু যেমন উদ্দীপনাময় ছিল এখন তা নেই। সংগ্রামী বন্ধুদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে, কেউ কেউ ভার্গিসের জেলে পচছে। এখন তার সংগঠন যে অবস্থায় পৌঁছেছে তাতে বিরাট কিছু আশা করা বোকামি। হ্যাঁ, এই দেশের মানুষ তার সঙ্গে আছে এখনও। এই কারণেই নতুন লড়াইয়ের কথা এখনও ভাবা যায়। আর তাই মাসের পর মাস লুকিয়ে চুরিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল তারা। এখনও কিছু অর্থ, কিছু বিশ্বস্ত মানুষ অবশিষ্ট আছে। আকাশলাল জানে, শেষ আঘাত হানার সুযোগ এক জীবনে একবারই আসে। এবং সেই সময়টা এখনই। বুকে হাত রাখল সে। শান্ত স্বাভাবিক। শুধু অপারেশনের লম্বা দাগটাই অস্বস্তির। বুকের ভেতরে একটাই আওয়াজ সেটা। অবশ্য দুটো হবার কথাও নয়।
‘আশা করি তুমি বলবে না যে তোমারও কিছু বলার আছে!’ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো উচ্চারণ করলেন ভার্গিস।
তাঁর টেবিলের উল্টোদিকে চার জন কমিশনার র্যাঙ্কের অফিসার পাথরের মত মুখ করে দাঁড়িয়ে, ওঁদের থেকে খানিকটা আলাদা হয়ে এ সি সোম মাথা নিচু করে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করছে। পুলিশ কমিশনারের ব্যঙ্গ উপেক্ষা করল একটু মরিয়া হয়েই, ‘আসলে ভুল হয়ে গিয়েছিল!’
‘ভুল? এটাকে ভুল বলা যায়? মিথ্যে কথাকে কোন অভিধানে ভুল বলা হয়েছে সোম? তুমি কিস্যু দ্যাখোনি। ওই বাড়ির জানলায় কোনও মানুষ আসেনি। কিন্তু তুমি গল্প বানিয়ে আমাকে বোকা বানালে। অথচ সেখানে পৌঁছে আমরা জঘন্য চিঠিটা পেলাম। তুমি কি করে জানলে ঠিক ওই বাড়িতেই চিঠিটা থাকবে?’
‘আমি জানতাম না স্যার।’
‘জানতে। আমি যদি বলি তুমি ওই লোকটার হয়ে কাজ করছ?’
‘আমি?’ চমকে উঠল সোম।
‘হ্যাঁ। নইলে ওই চিঠিটার কাছে আমাকে নিয়ে যাবে কেন?’ হাতের উল্টো পিঠ গালে ঘসলেন ভার্গিস, ‘পুলিশ কমিশনারের চেয়ারটার ওপর একটা সেপাইয়ের লোভ থাকবে, তোমাকে আর কি দোষ দেব। তবে সেখানে বসতে গেলে বুদ্ধিটা ধারালো হওয়া দরকার। সত্যি কথাটা বলো।’
‘আমার বোকামি স্যার। আপনার সঙ্গে শহর দেখতে যাওয়ার সময় গেটে একটা লোককে ঝামেলা করতে দেখেছিলেন, মনে আছে নিশ্চয়ই। লোকটা দাবি করছিল যে, সে চিতাকে চাঁদি-হিলসের ওই বাড়িতে দেখেছে।’ সোম ঢোক গিলল।
‘মাই গড! সঙ্গে সঙ্গে দশ লক্ষ টাকার লোভটা ছোবল মারল তোমাকে? আমার কাছে কৃতিত্ব নেবার জন্যে বানিয়ে বললে গল্পটা?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার।’
‘লোকটা কোথায়?’
সোম সহকর্মীদের দিকে তাকাল। একজন অফিসার নিচু গলায় জবাব দিল, ‘চিঠিটা পাওয়া মাত্র ওর সন্ধান নেওয়া হয়েছিল—’
‘পাওয়া যায়নি?’ চিৎকার করলেন ভার্গিস।
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘সেপাইদের অ্যারেস্ট করো।’
স্যার, সেপাইরা বলছে ওদের ওপর অর্ডার ছিল একটু আধটু ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দিতে। এ সি সোম অর্ডারটা দিয়েছিলেন।’
‘আচ্ছা! দশ লাখের ভাগিদার রাখতে চাওনি!’
‘আই অ্যাম সরি স্যার!’
বুলডগের মত মুখটায় আরও ভাঁজ পড়ল, ‘সোম, মিনিস্ট্রি তোমাকে স্যাক করেছে। আমি তোমাকে জেলে পুরব। কিন্তু তবু তোমকে একটা সুযোগ দিতে চাই। ফাইন্ড হিম, দুদিন সময় দিলাম। চাকরিটা পাবে না কিন্তু প্রাণে বেঁচে যেতে পার। তোমাকে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় এ জীবনে দেখতে চাই না। মনে রেখো, দু-দিন। গেট লস্ট। এই দুদিন যেন তোমার মুখ দেখতে না পাই!’
‘ওকে মানে, চিতার কথা বলছেন?’ সোমের গলা থেকে স্বর বের হচ্ছিল না।
ভার্গিস চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঝুঁকে টেবিলে কিছু খুঁজলেন। তারপর সেটা পেয়ে এগিয়ে এলেন সোমের সামনে। সোম আরও কুঁকড়ে দাঁড়াল। টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার পিঠটাকে দেখতে কেমন?’
‘পিঠ? কখনও দেখিনি স্যার।’
‘চেষ্টা করেছ কখনও?’
‘না স্যার।’
‘চেষ্টা করো। এই আয়নাটা নাও। দুই ইঞ্চি আয়না। যেটা কখনও সরাসরি পারবে না সেটা অন্যের সাহায্য নিয়ে করতে চেষ্টা করো। চিতা তোমার পক্ষে আকাশকুসুম সোম, তুমি ওই লোকটাকে খুঁজে বের করো।’ আয়নাটাকে সোমের হাতে গুঁজে দিয়ে ভার্গিস চটপট ফিরে গেলেন নিজের চেয়ারে। তারপর ইশারা করলেন বেরিয়ে যেতে।
প্রথমে সোম পরে অফিসাররা বেরিয়ে গেলে রুমালে মুখ মুছলেন তিনি। হয়ে গেল। সারা জীবনের জন্যে সোমের বারোটা বেজে গেল। আর সি পি হবার স্বপ্ন দেখতে হবে না ওকে। দুদিন পরে জেলের সবচেয়ে খারাপ সেলটা ওর জন্যে বরাদ্দ করতে হবে। মিনিস্টারের দাঁতের ব্যথা এখন নিশ্চয়ই বেড়ে যাবে। চালাকি। তিনি টেলিফোন তুললেন। “অ্যানাউন্স করে দাও এসি সোমকে স্যাক করা হয়েছে। ও আর ফোর্সে নেই।’
আরাম করে চুরুট ধরালেন ভার্গিস। হঠাৎ তাঁর মনে হল সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। লোকটা তাকে ফোন করবে পরশু সকাল নটায়। কেন? নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে এর পেছনে। এত সাহস লোকটার কখনও হয়নি। হঠাৎ মনে হল সোমের সঙ্গে লোকটার যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ ভাবনাটাকে বাতিল করলেন তিনি। সোম বোকা এবং পদের জন্যে আর এবার টাকার প্রতি লোভ দেখালেও ফোর্সের সঙ্গে কখনই বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। পরশু সকাল পর্যন্ত লোকটার ফোনের জন্যে অপেক্ষা করলে তাঁর হাতে আর সময় থাকবে না। চিঠিটা যখন এখানেই পাওয়া গিয়েছে তখন খুবই স্বাভাবিক সে শহরেই আছে। তাঁরই নাকের ডগায় অথবা পিঠের মাঝখানে যেখানে তাঁর হাত পৌঁছাচ্ছে না।
এই সময় টেলিফোন বাজল। অপারেটারের মাধ্যমে নয় সরাসরি লাইনটা এসেছে। ভার্গিস রিসিভার তুললেন, ‘হ্যালো!’
‘ভার্গিস। সোমের কোর্টমার্শাল কবে?’ মিনিস্টারের ছিমছাম গলা।
‘কোর্টমার্শাল?’ ভার্গিস ঢোক গিললেন, ‘এখনও ঠিক করিনি।’
‘বোর্ড চাইছে না ও আর বেঁচে থাকুক।’
‘কিন্তু স্যার, ও একটা ভুল করেছে—’
‘দ্যাটস অর্ডার।’
‘কিন্তু আমার নেক্সট ম্যান—’
‘নেক্সট? নেক্সটের নেক্সট থাকে।’ লাইনটা কেটে গেল।
ঘাম মুছলেন ভার্গিস। টেলিফোনে খবর নিলেন সোম এখন কোথায়! জানলেন সোম এইমাত্র সিভিল পোশাকে হেডকোয়ার্টার্স ছেড়ে চলে গেছে।
আরও মিনিট পনের অপেক্ষা করলেন ভার্গিস। তারপর হুকুম করলেন সোমের বিরুদ্ধে কোৰ্টমার্শালের ব্যবস্থা নিতে।
০৪. উপোসি চাঁদের আলো
উপোসি চাঁদের আলো তখন বাংলোটাকে ঘিরে তিরতিরিয়ে কাঁপছে। মাঝে মাঝে নির্জলা মেঘকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে বাচ্চা মেয়ের মত স্কিপিং করে যেতে হচ্ছে তাকে। ছায়া নামছে সামনের লনে, নেমেই সরে যাচ্ছে। বাঘটা বসে আছে গাড়ির ছাদে, যেভাবে সেবক ব্রিজের মুখে পাথরের সিংহ বসে থাকে।
এ ঘরের দেওয়ালে সুইচ আছে, স্বজন টিপেছিল কিন্তু আলো জ্বলেনি। তীব্র পচা গন্ধটা বেশ মারাত্মক, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বমি আসে। জানলা খুলে দিলে স্বস্তি পাওয়া যেত কিন্তু বাঘের কথা ভেবে সাহস হয়নি। ঘরের ভেতর গাঢ় কফির সঙ্গে কয়েক ফোঁটা দুধ মেশা অন্ধকার। পৃথা শেষপর্যন্ত বলে ফেলল, ‘এখানে থাকতে পারছি না।’
‘বুঝতে পারছি কিন্তু এখান থেকে সকাল হবার আগে বের হবার জো নেই। তিনি অপেক্ষা করছেন।’ স্বজন অসহায় গলায় বলল।
‘একটা কিছু করো!’
সেই একটা কিছু করার জন্য স্বজন দরজা ছেড়ে এগোল। ইতিমধ্যে চোখ কিছুটা মানিয়ে নিয়েছে। আবছা দেখা যাচ্ছে একটা টেবিল, কয়েকটা চেয়ার। পায়ের তলায় কার্পেট। যাঁর বাংলো তিনি অর্থবান মানুষ। স্বজন ঘরের মাঝখানে চলে আসতেই বুঝল পৃথা তার সঙ্গ ছাড়েনি। ওপাশে ফায়ার প্লেস; তার ওপরে স্ট্যান্ডে ঝাপসা ছবি। এপাশের দেওয়ালে ভারী পর্দা। সামান্য আলো যা ঘরে ঢুকছে তা ওরই ফাঁক-ফোকর দিয়ে। স্বজন পর্দা সরাল। না, একটুও ধুলো পড়ল না গায়ে, স্বচ্ছন্দে সরে গেল সেটা আর সঙ্গে সঙ্গে কফিতে আরও দুধ মিশল। এবার ঘরটিকে অনেকটা স্পষ্ট দেখা গেল। সুন্দর সাজানো ঘর। কিন্তু কোনও বিছানা নেই। পৃথা জানলায় চলে গেল। চিতাটা দুই থাবায় মুখ রেখে বাংলোর দিকে তাকিয়ে আছে।
‘এ-ঘরে ফ্রিজ আছে!’ স্বজনের গলা শুনতে পেয়ে পৃথা দেখল সে ঘরে নেই। পাশের দরজায় চটজলদি চলে এল সে। আবছা স্বজন তখন ফ্রিজের সামনে। হাতল ধরে ঈষৎ টানতেই খুলে গেল দরজাটা।
‘আরে! এর ভেতরটা এখনও ঠাণ্ডা আছে!’ চিৎকার করল স্বজন।
পৃথা ছুটে গেল। ফ্রিজের ভেতর থেকে ঠাণ্ডা বেরিয়ে আসছে। ডান দিক বাঁ দিকে, আবছা বেশ কিছু প্যাকেট। স্বজন দরজাটা বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিজের মনে বিড়বিড় করল, ‘ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না!’
‘কারেন্ট নেই অথচ ফ্রিজ ঠাণ্ডা থাকছে কি করে?’ পৃথা জিজ্ঞাসা করল।
‘সেইটাই তো বিস্ময়ের! তার মানে আমরা এখানে আসার আগে কারেন্ট ছিল। লোডশেডিং হয়ে যাওয়ার পর কতক্ষণ ফ্রিজ ঠাণ্ডা থাকে?’ স্বজন পৃথার দিকে তাকাল।
‘দরজা না খুললে ঘণ্টা তিনেক।’
‘তা হলে? কারেন্ট গেল কেন?’ স্বজন ঘরের চারপাশে তাকাল।
‘এই বাংলোয় নিশ্চয়ই কেউ থাকে। নইলে ফ্রিজ চালু থাকত না।’
‘কারেক্ট। চলো, অন্য ঘরগুলো দেখা যাক।’
‘আমরা কিন্তু অনুমতি ছাড়া এখানে ঢুকেছি।’
‘বাধ্য হয়ে। প্রাণ বাঁচাতে এ ছাড়া উপায় ছিল না।’ স্বজন পাশের ঘরে চলে এল। গন্ধটা এখানে আরও তীব্র। কিছু একটা মরে পচেছে। গন্ধটা সেই কারণেই। বিদ্যুৎবিহীন মর্গে গেলে এই গন্ধটা পাওয়া যায়।
অথচ এই বাংলো ছিমছাম সুন্দর। দুটো শোওয়ার ঘর পরিপাটি। কোথাও এক ফোঁটা ধুলো জমে নেই। আর ফ্রিজটাও কিছুক্ষণ আগে চালু ছিল। স্বজন দরজার পাশে কাচের জানলায় চলে এল, ওর পাশে পৃথা। জ্যোৎস্নার ভোল্টেজ একটুও বাড়েনি। চরাচর অদ্ভুত ফ্যাকাশে হয়ে রয়েছে। আর গাড়ির ওপর চিতাটা একই ভঙ্গিতে শুয়ে। স্বজনের মনে হল ওটা ঘুমাচ্ছে।
বাড়িটাকে আরও একটু ঘুরে ফিরে দেখে ওরা দুটো তথ্য আবিষ্কার করল। প্রথমটা আনন্দের, এখানে একটা টেলিফোন আছে। স্বজন রিসিভার তুলে দেখল তাতে কানেকশন আছে। কাকে ফোন করা যায় সেই মুহূর্তে মাথায় না আসায় সে ওটা নামিয়ে রেখেছিল। দ্বিতীয়টা খানিকটা মন্দের, নীচে যাওয়ার সিঁড়ি আছে। অথাৎ মাটির তলায় একটা ঘর আছে। আর গন্ধ আসছে সেখান থেকেই। সিঁড়ির মুখের দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল স্বজন। নীচের অন্ধকারে পা বাড়াতে ইচ্ছে হল না। কিন্তু এতক্ষণে বাংলোটায় যে পচা গন্ধ পাক খাচ্ছে সেটা না বের করতে পারলে স্বস্তি নেই।
কিচেনের পাশে ইলেকট্রিক মিটারের বোর্ডটার কাছে এসে স্বজন একটু ভাবল। আন্দাজে হাত বাড়িয়ে ঢাকনা খুলে টান দিয়ে বের করেই বুঝতে পারল ফিউজটা উড়ে গিয়েছে। সে চিৎকার করল, ‘পৃথা, কোনও ভুতুড়ে ব্যাপার নয়। ফিউজটাকে পালটালেই আলো জ্বলবে।’
‘কি করে পালটাবে?’ পাশ থেকে পৃথা বলল নিচুস্বরে।
‘নিশ্চয়ই তার আছে কোথাও। দ্যাখো না!’
কোথায় দেখবে পৃথা। এমনিতে বাংলোয় হাঁটা চলা করতে এখন হয়তো কোনও অসুবিধে হচ্ছে না কিন্তু খুঁটিয়ে দেখার মত আলো নেই। তার ওপর ওই গন্ধটা ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে তার কাছে। তবু অসাধ্যসাধন করার মতনই একটা তার আবিষ্কার করল স্বজন নিজেই। সেটাকে যথাস্থানে পুরে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতেই ফ্রিজটা আওয়াজ করে উঠল। সুইচ টিপতেই টইটুম্বুর আলো। পৃথা হেসে উঠতেই স্বজন ওকে জড়িয়ে ধরল। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আরাম। স্বজন পৃথার কানে মুখ রেখে বলল, ‘আর ভয় নেই।’
পৃথা মুখ তুলে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল। কাচের ওপাশে পৃথিবীটা এখন আরও ঝাপসা। ঘরের আলো তীব্র বলেই চোখে কিছু পড়ছে না। সে বলল, ‘গন্ধটাকে কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না।’
স্বজন বলল, ‘একটু অপেক্ষা করো ডার্লিং। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
ওরা এবার টয়লেটের দরজার সামনে চলে এল। সুইচ টিপতেই সেটা উজ্জ্বল হল। পৃথা মুখ বাড়িয়ে দেখল ভেতরটা চমৎকার পরিষ্কার। কল খুলতেই জল নামল। সে বলল, ‘একটু ফ্রেশ হয়ে নিই!’
‘ক্যারি অন।’ চিৎকার করল স্বজন অনেকটা কারণ ছাড়াই। তারপর একের পর এক সুইচ অন করে যেতে লাগল। সমস্ত বাংলোটা এখন দারুণভাবে আলোকিত। এমনকি বাংলোর বারান্দার আলোগুলোকেও জ্বেলে দিয়েছে সে। এত আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেদের বেশ নিরাপদ বলে মনে হল। সে জানলার কাছে চলে এল। বারান্দার আলো তার গাড়িটাতেও পৌঁছেছে। এবং আশ্চর্য, চিতাটা নেই। গাড়িটা বেশ নিরীহ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনের দরজাটার অনেকটা বেঁকে ভেতরে ঢুকে গিয়েছে। স্বজন হাসল। নিশ্চয়ই আলো জ্বলতে দেখে ভয় পেয়েছে চিতা। ভয় পেলেও কাছে পিঠে থাকবে কিছুক্ষণ, সুযোগের অপেক্ষা করবে। করুক।
ঠিক তখনই বমির আওয়াজ কানে এল। সে ছুটে গেল টয়লেটের সামনে, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজায় ধাক্কা দিল, “কি হয়েছে? তুমি বমি করছ কেন?’ বেসিনের সামনে হাঁপাচ্ছিল পৃথা। সামনের আয়নায় নিজের মুখটাকে কিরকম অচেনা মনে হচ্ছিল। সেই অবস্থায় কোনওমতে উচ্চারণ করল, ‘ঠিক আছে।’
‘শরীর খারাপ লাগছে?’ স্বজনের উদ্বিগ্ন গলা ভেসে এল।
‘না।’ কলের মুখ খুলে দিল পৃথা।
‘দরজাটা বন্ধ করতে গেলে কেন?’ স্বজনের পায়ের আওয়াজ সরে গেল।
অভ্যেস! মনে মনে বলল পৃথা। কারোর সামনে জামাকাপড় চেঞ্জ করার কথা যেমন ভাবা যায় না তেমনি বাথরুম টয়লেটের দরজা খোলা রাখার কথাও চিন্তা করতে হয় না। ওটা আপনি এসে যায়।
মুখে জল দিল সে। আঃ, আরাম। গন্ধটা যে শরীরের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল তা এতক্ষণ টের পায়নি সে। বেসিনের কাছে পৌঁছানো মাত্র শরীর বিদ্রোহ করল। এখন অনেকটা স্বস্তি লাগছে। সে টয়লেটটাকে দেখল। যাঁর বাড়ি তিনি খুব শৌখিন মানুষ। নইলে এত ঝকঝকে থাকত না টয়লেট। বাইরে বেরিয়ে এসে পৃথা দেখল স্বজন ফ্রিজ থেকে কি সব বের করছে। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি করছ?’
‘কিছু খাবার রয়েছে এখানে। গ্যাসটাও চালু। ডিনার রেডি করি।’
‘আমি কিছু খাব না।’
‘কেন?’
‘ভাল লাগছে না।’
স্বজন এগিয়ে এল, ‘অনেকক্ষণ খালি পেটে আছ বলেও বমি হতে পারে।’
‘তা নয়। গন্ধটাকে আমি স্ট্যান্ড করতে পারছি না।’
‘ঠিক আছে। আর একটু সময় যাক। রাত তো বেশি হয়নি।’
‘গন্ধটা ঠিক কিসের?’
‘বুঝতে পারছি না। তবে নীচের ঘর থেকে আসছে বলে মনে হচ্ছে।’
‘চলো না, গিয়ে দেখি।’
স্বজন মাথা নাড়ল, ‘নীচে কি আছে কে জানে, কাল সকালে দেখব।’
‘কাল সকালে এখানে আমরা থাকছি নাকি! তাছাড়া সারারাত এই গন্ধে থাকা অসম্ভব। তোমার খারাপ লাগছে না?’
‘লাগছে। ঠিক আছে, দাঁড়াও, দেখছি। ও হ্যাঁ, চিতাটা পালিয়েছে।’
‘পালিয়েছে?’ পৃথা বিস্মিত।
‘হ্যাঁ, আলো জ্বেলে দেওয়ার পর ব্যাটা ভয় পেয়েছে।’
পৃথা ওই ঘরের জানলায় ছুটে গেল। সত্যি, চিতাটা নেই। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন। যমদূতের মত পাহারা দিচ্ছিল জন্তুটা। সে হাসল, ‘বাঁচা গেল।’
স্বজন পাশে উঠে এল, ‘টেলিফোনটা চালু আছে। আমি টুরিস্ট লজে টেলিফোন করে ওদের জানিয়ে দিই যে এখানে আটকে গেছি।’
‘কাদের জানাবে?’
সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল হল স্বজনের। পৃথার পক্ষে প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক। ওকে এখন পর্যন্ত বলতে পারেনি যে এখানে আসার আর একটা কারণ আছে। শুধু ছুটি কাটানো নয় সেই সঙ্গে কিছু কাজও তাকে করতে হবে। শুনলে আনন্দটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলেই সে চেপে রেখেছিল। উত্তর দেওয়াটা জরুরি বলেই সে উত্তর দিল, ‘ওই যারা টুরিস্ট লজে আমাদের জন্যে ঘর বুক করেছে।’
‘তোমার পরিচিত?’
‘আমার নয়। স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে ওদের।’ স্বজন হাসার চেষ্টা করল, ‘আসলে আজ না পৌঁছালে যদি বুকিং ক্যানসেল হয়ে যায়! টুরিস্টদের খুব ভিড় এখন। শুনেছিলাম কি একটা উৎসব আছে।’
পৃথার চোখ ছোট হল, ‘বাইরে বেড়াতে যাওয়ার জন্যে এত যোগাযোগের কি দরকার!’
স্বজন বুঝতে পারছিল ব্যাপারটা ক্রমশ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পৃথার মুখের দিকে তাকিয়ে সত্যি কথা বলতে ঠিক সাহস হচ্ছিল না ওর। সে দাঁড়ি টানতে চাইল, ‘সবসময় কি দরকার বুঝে কেউ কিছু করে! দাঁড়াও ফোনটা করি আগে!’
সে টেলিফোনের কাছে পৌঁছাতে পেরে যেন আপাতত রক্ষা পেল। এমন ভাবে কথা এগোচ্ছিল যে সে সত্যি কথাটা আর বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারত না। শোনামাত্র যে পৃথার মুড নষ্ট হয়ে যেত তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
টেলিফোন কোম্পানির ছাপানো বইটা খুলে সে টুরিস্ট লজের নম্বরটা খুঁজতে লাগল। দূরত্ব বেশি না হলেও দেখা গেল একই এক্সচেঞ্জের মধ্যে পড়ে না। স্বজন রিসিভার তুলে ডায়াল টোন শুনল। তারপর এস টি ডি কোড্ নম্বর ঘোরাল। টুরিস্ট লজের নাম্বার ঘোরানোর পর এনগেজড শব্দ শুনতে পেল। এইসব যান্ত্রিক শব্দগুলো ওকে বেশ আরাম দিচ্ছিল। এখন নিজেদের আর বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা মানুষ বলে মনে হচ্ছিল না। পৃথার গলা ভেসে এল, ‘পাচ্ছ না?’
‘এনগেজড হচ্ছে!’ রিসিভার কানে রেখে স্বজন জবাব দিল। তার আঙুল ক্রমাগত ডায়াল করে যাচ্ছিল। ব্যাপারটা পৃথাকে বিরক্ত করল। স্বজনের এই এক বদ অভ্যাস। কাউকে ফোন করতে গিয়ে এনগেজড বুঝেও অপেক্ষা করে না, জেদের বশে সমানে ডয়াল করে যায়। পৃথা এগিয়ে এল। দরজার পাশের সুইচটা টিপতেই বারান্দার আলো নিভে গেল। সঙ্গে সঙ্গে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া মাঠ এবং জঙ্গল চোখের সামনে চলে এল। চাঁদ এখন যথেষ্ট বলবান। গাড়িটা পড়ে আছে অসহায় ভঙ্গিতে। চিতাটা ধারে কাছে নেই।
‘এই যাঃ।’ স্বজনের চিৎকার কানে আসতেই ঘুরে দাঁড়াল পৃথা।
‘কি হল?’
‘লাইনটা ডেড হয়ে গেল!’ স্বজনের গলায় আফশোস।
‘সে কি? কি করে?’ কিছুই করতে পারবে না তবু পৃথা দৌড়ে গেল কাছে। হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বোতাম টিপল কয়েকবার। কোনও আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না।
স্বজন বলল, ‘অদ্ভুত ব্যাপার। যোগাযোগের একমাত্র রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গেল!’
পৃথা রিসিভার রাখল, ‘এরকম তো হয়ই। কিছুক্ষণ পরে হয়তো লাইন ফিরে আসবে। তা ছাড়া এই বাংলোয় টেলিফোন আছে জেনে তো আমরা ঢুকিনি।’
স্বজনকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল। বাঁ হাতে রিসিভারটাকে শব্দ করে আঘাত করল যদি তাতে ওটা সচল হয়। পৃথা সেটা দেখে বলল, ‘তোমাকে কিন্তু একটু বেশি আপসেট দেখাচ্ছে! আজকে পৌঁছাবে বলে কাউকে কথা দিয়েছিলে?’
‘আশ্চর্য! তোমার এ কথা মনে হল কেন?’
‘তোমার ভঙ্গি দেখে।’
‘বুঝলাম না।’
‘আমরা বেড়াতে এসেছি। গাড়ি খারাপ হয়ে যাওয়াটা দুর্ঘটনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা বাংলোয় পৌঁছাতে পেরেছি। ওই দুর্গন্ধ ছাড়া অস্বস্তিকর কিছু নেই এখানে। আমাদের কাছে টুরিস্ট লজও যা এই বাংলোও তা। কিন্তু তুমি ছটফট করছ ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্যে।’ শান্ত গলায় বলল পৃথা।
আচমকা নিজেকে পাল্টাতে চেষ্টা করল স্বজন। হেসে বলল, ‘ঠিক আছে বাবা, আমি আর টেলিফোন স্পর্শ করছি না। ও-কে!’
ওর হাসি দেখে পৃথার ভাল লাগল। সে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘একটা জানলা খুলব? গন্ধটা তাহলে বেরিয়ে যাবে!’
জানলা খুললে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। চিতাটা যদি কাছে পিঠে থাকে তাহলে দেখতে হবে না। ফাস্টেস্ট অ্যানিম্যাল!’
‘ওটা কাছে পিঠে নেই।’ পৃথা একটু চেষ্টা করেই জানলাটা খুলতে পারল। খুলে বলল, ‘আঃ। বাঁচলাম।’
হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছিল ঘরে। যে পচা বোটকা গন্ধটা ঘরে থমকে ছিল সেটা হালকা হয়ে যাচ্ছিল দ্রুত। পৃথা বলল, ‘আমার খুব ইচ্ছে করছে ওই মাঠে জ্যোৎস্নায় হাঁটতে, যাবে?’
‘পাগল!’
‘চিতাটাকে দেখলেই আমরা দৌড়ে ফিরে আসব!’
‘অসম্ভব। আত্মহত্যা করার কোনও বাসনা আমার নেই।’ স্বজন পৃথার পেছনে এসে দাঁড়াল।
পৃথা একটু ঘনিষ্ঠ হল। তার গলায় গুনগুনানি ফুটল। পূর্ণচাঁদকে নিয়ে এক মায়াবী সুর খেলা করতে লাগল মৃদু স্বরে। স্বজনের ভাল লাগছিল। এবং ওর মনে হল পৃথার কাছে ব্যাপারটা লুকিয়ে কোনও লাভ হচ্ছে না। মেয়েটা এত ভাল যে ওর কাছে সৎ থাকাটাই তার উচিত। তাকে যে চিকিৎসার প্রয়োজনে এখানে আসতে হয়েছে এই তথ্যটুকু জানলে ওর হয়তো খারাপ লাগবে কিন্তু সেটাকে কাটিয়ে তুলতে বেশি সময় লাগবে না। হঠাৎ গান থামিয়ে পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার খিদে পেয়েছে বলছিলে না? চলো!’
‘থাক।’
‘থাকবে কেন? এখন আমার ভাল লাগছে। খেতে পারব।’
‘তাহলে জানলাটা বন্ধ করা যাক।’ স্বজন জানলাটা বন্ধ করতে গিয়ে থমকে গেল, দূরে, মাঠের শেষে যেখানে ঝোপঝাড় সেখানে কিছু যেন নড়ছে। চিতাটা কি ওখানে লুকিয়ে থেকে তাদের নজরে রাখছে। সে সাহস করে আর একটু লক্ষ করার চেষ্টা করল। না চিতা নয়। ঝোপের মধ্যে যে আদলটা চোখে পড়ছে তা চিতার হতে পারে না। হয়তো কোনও বেঁটে গাছ হাওয়ায় নড়ছে। কিন্তু আশেপাশের গাছগুলো তো স্থির! সে জানলা বন্ধ করে দিল!
ফ্রিজের খাবারগুলোর সবই টিনফুড। গরম করে খেয়ে নিলেই চলে। এর আগে দু-একবার খেয়েছিল পৃথা, পছন্দ হয়নি। এই বাংলো যাঁর তিনি টিনফুডের ওপরই ভরসা করেন। এমন কি অরেঞ্জ জুসও ক্যানেই রাখা আছে। গ্যাস জ্বালিয়ে খাবার রেডি করে ওরা খেতে বসল। স্বজন বেশ তৃপ্তি করেই খেল। এই ঘরে এখন আর তেমন গন্ধ না থাকলেও পৃথা সামান্যই দাঁতে কাটল। অরেঞ্জ জুসটাই তাকে একটু তৃপ্ত করল। স্বজন বলল, ‘এবার শোওয়ার ব্যবস্থা করা যাক।
‘এখন শোবে?’
‘কটা বেজেছে ঘড়িতে দ্যাখো।’
‘আমার এখনই ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া— !’
‘আবার কি?’
‘তুমি বলেছিলে গন্ধটা কেন আসছে সেটা দেখবে’!
‘কাল সকালে দেখলেই তো হয়।’
‘না। আমার ঘুম আসবে না। সবসময় মাথায় চিন্তাটা থেকে যাবে।’
অগত্যা স্বজন উঠল। দুটো ঘর পেরিয়ে নীচের সিঁড়ির দরজার কাছে পৌঁছে সুইচ টিপতে লাগল। দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাওয়ায় বোঝা গেল সিঁড়ি আলোকিত। সে পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকের ওপর দিয়ে বেঁধে নিল। পৃথা পেছনে দাঁড়িয়েছিল, স্বজন বলল, ‘তুমি নীচে নামবে না।’
‘কেন?’
‘কি দৃশ্য দেখব জানি না। তা ছাড়া ওপরে একজনের থাকা উচিত!’ স্বজন দরজা খুলতেই গন্ধটা ছিটকে উঠে এল যেন। পৃথা নাকে হাত দিয়ে সরে গেল সামান্য।
সিঁড়িতে আলো জ্বলছে। স্বজন নামছিল। গন্ধটা আরও তীব্র হচ্ছে। রুমালের আড়াল কোনও কাজই দিচ্ছে না। মাটির তলায়! স্টোর রুম।
নীচে নামতেই শব্দ হল। হুড়মুড় করে কিছু পড়ল আর বিশাল মেঠো ইঁদুর ছুটে বেরিয়ে গেল এপাশ ওপাশে। স্বজনের মনে হল অনেকদিন পরে এই ঘরে আলো জ্বলছে। সে চারপাশে তাকাল। একটা লম্বা টেবিলের ওপর কফিনের মত বাক্স। বাক্সর ওপর দুটো ধেড়ে ইঁদুর সাহসী ভঙ্গি নিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। বাক্সের ডালাটা ঈষৎ উঁচু হয়ে থাকলেও ইঁদুরগুলো সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারছে না। ডালাটাকে দেখেই বেশ ভারী মনে হল। উঁচু হয়ে থাকার একটা কারণ চোখে পড়ল। শেষপ্রান্তে একটা ইঁদুরের শীর্ণ শরীর ঝুলছে। বেচারা হয়তো কোনও মতে মাথা গলাতে পেরেছিল কিন্তু সেই অবধিই। ডালার চাপে ঝুলন্ত অবস্থায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরে গেছে। আর ওর মৃত শরীরটাকে খুবলে খেয়ে নিয়েছে সঙ্গীরা। কিন্তু ওই সামান্য ফাঁক গলে গন্ধ বেরিয়ে আসছে বাইরে।
স্বজন এগোল। কফিনের ওপর থেকে ইঁদুর দুটো এবার তাকিয়ে নেমে গেল ওপাশে। ডালাটার একটা দিক ধরে ধীরে ধীরে উঁচু করতেই ওপর থেকে আর্ত চিৎকারটা ভেসে এল। হকচকিয়ে গেল স্বজন। তারপর ডালাটা নামিয়ে কয়েক লাফে সিঁড়িতে পৌঁছে দ্রুত ওপরে উঠে এল সে।
দরজার সামনেই পৃথা, রক্তশূন্য। তাকে দেখতে পেয়েই পাগলের মত জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপতে লাগল। স্বজন ওর মাথায় হাত রেখে নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কি হয়েছে? অমন করছ কেন?’
কথা বলতে পারছিল না পৃথা। সামলে উঠতে সময় নিল খানিক। স্বজন বলল, ‘আমি তো আছি, কি হয়েছে?’
‘দুটো সাদা পা, ঝোপের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল।’
‘সাদা পা? চমকে উঠল স্বজন।
‘হ্যাঁ। কী সাদা। হঠাৎই।’
স্বজন ওকে আঁকড়ে ধরল। কফিনের ঢাকনাটা তোলার মুহূর্তে এক ঝলকের জন্যে সে যা দেখেছিল তা পৃথা ঝোপের বাইরে দেখল কী করে!’
০৫. দূরত্বটা অনেকখানি
দূরত্বটা অনেকখানি। ঢালু মাঠ যেখানে শেষ হচ্ছে সেখানেই ঝোপের শুরু। জানলায় দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া আকাশের নীচেটা শান্ত, স্বাভাবিক। স্বজন গম্ভীর গলায় বলল, ‘তুমি বোধ হয় ভুল দেখেছ।’
‘অসম্ভব। আমি স্পষ্ট দেখেছি।’ পৃথার গলায় এখন স্বাভাবিকতা এসেছে।
‘ঠিক কোন জায়গাটায়?’
পৃথা আঙুল তুলে জায়গাটা দেখাল। এখন সেখানে কিছু নেই। পৃথিবীটা এখন নিরীহ এবং সুন্দর। স্বজন হেসে ফেলল।
পৃথা ভ্রূ তুলল, ‘হাসছ যে?’
‘একটা ইংরেজি ছবি দেখেছিলাম। বাজে হরর ফিল্ম। তাতে ছিল, এইরকম একটা নির্জন বাংলোতে কয়েকটা ছেলেমেয়ে বাধ্য হয়ে রাত কাটাতে আশ্রয় নিয়েছে আর বাংলোর পাশের কবরখানা থেকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন শরীর নিয়ে মৃতেরা উঠে আসছে বাংলোর ভেতরে ঢোকার জন্যে।‘
‘অ্যাই, তুমি কিন্তু আমাকে ভয় দেখাচ্ছ!’
‘অসম্ভব। আজকাল কেউ ভূতের ভয় পায় না।’
‘অন্য জায়গায় পেতাম না, এখানে পাচ্ছি। স্পষ্ট দেখলাম দুটো পা বেরিয়ে এল, আবার এখন উধাও হয়ে গেছে।’
স্বজন ফিরে এল। একটা চেয়ার টেনে আরাম করে বসল। তার মাথায় এখন নীচের ঘরের কফিনটা পাক খাচ্ছে। খুব বেশি দিন মারা যায়নি মানুষটা। এই বাংলোর কেউ হলে তাকে নিশ্চয়ই কফিনে ভরে পচার জন্যে ফেলে রাখবে না। কেউ একা একা মরে কফিনে গিয়ে শুয়ে থাকতে পারে না। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে দ্বিতীয় মানুষ ওই মৃতদেহের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু যদি কেউ কাউকে হত্যা করে তাহলে এমন নির্জন জায়গায় মৃতদেহকে সাক্ষী হিসেবে রেখে যাবে কেন? মাটি খুঁড়ে পুঁতে ফেললেই তো চুকে যেত!
‘নীচে গিয়ে কি দেখলে?’ পৃথা জানলায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল।
চমকে তাকাল স্বজন। সত্যি কথাটা সে বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারবে না। তাই সরাসরি বলে দিল, ‘গন্ধটা একটা মানুষের শরীরের। দেহটা কফিনে রাখা ছিল। কোনও ভাবে ঢাকনাটা একটু খুলে যাওয়ায় গন্ধ উঠে আসছে ওপরে।’
পৃথার গলা থেকে চাপা আর্তনাদ ছিটকে বেরোতেই সে দুই হাতে মুখ চাপা দিল। তারপর দৌড়ে চলে এল স্বজনের কাছে, ‘আমি থাকব না, কিছুতেই থাকব না এখানে। পায়ের তলায় একটা পচা মড়া নিয়ে কেউ থাকতে পারে না।’ ভয়ে সে সাদা হয়ে গেছে।
স্বজন বলল, ‘কোথায় যাবে? আশেপাশে কোনও মানুষের বাড়ি নেই। আর চিতাটার কথা ভুলে যেয়ো না। এখানে এই বন্ধ ঘরে আমরা অনেকটা নিরাপদ। দরজা বন্ধ করে দিলে গন্ধটা তেমন তীব্র থাকছে না। রাতটুকু এইভাবেই কাটাতে হবে।’
‘কিন্তু ওটা যদি ড্রাকুলা হয়?’
‘পাগল!’
‘না পাগলামি নয়। ড্রাকুলারা দিনের বেলায় কফিনেই শুয়ে থাকে। রাত হলে রক্ত খেতে বেরিয়ে পড়ে। এটা সাহেবরাও বিশ্বাস করে!’
‘ড্রাকুলা বলে কিছু নেই। ভূতপ্রেত অলীক কল্পনা। মানুষের সময় কাটানোর জন্যে গল্প তৈরি হয়েছিল কোন এক কালে। চলো, শোওয়ার ব্যবস্থা করা যাক।’ স্বজন উঠে পড়লেও তার মুখে অস্বস্তি ছিল।
‘শোবে মানে? তুমি এখানে ঘুমানোর কথা ভাবতে পারছ?’
‘চেষ্টা করা যাক। খামোকা রাতটা জেগে কাটিয়ে শরীর খারাপ করে কি লাভ?’
‘আমি ঘুমাতে পারব না।’ জেদি দেখাল পৃথাকে।
দুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরল স্বজন, ‘তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? সকাল হলেই দেখবে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
‘ওই পচা মানুষটা?’
‘হয়তো কেউ খুন করে রেখে গেছে!’
‘খুন?’ কেঁপে উঠল পৃথা।
‘আমি জানি না। যাই হোক আমাদের কি! আজ রাতে তো খুন হয়নি।’ পৃথাকে জড়িয়ে ধরেই স্বজন পাশের ঘরের দিকে এগোল। সিঁড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিল ভাল করে। শোওয়ার ঘরে পৌঁছে খাটটাকে দেখল। একটা ভারী বেড কভার পাতা আছে। আঙুল বুলিয়ে দেখা গেল তাতে ধুলোর পরিমাণ নেই বললেই চলে। বেড কভার না তুলেই শুয়ে পড়ল স্বজন। শুয়ে বলল, “আঃ।” পৃথা একপাশে বসল আড়ষ্ট হয়ে।
স্বজন বলল, ‘শুয়ে পড়ো। নীচে থেকে উঠে আসার সময় দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছি, তোমার আর কোনও ভয় নেই।’
কথাটা শুনে পৃথা একটু স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করল, ‘তুমি আচ্ছা মানুষ। হুট করে অন্যের বিছানায় শুয়ে পড়লে। একটু পরেই নাক ডাকবে।’
‘আমার নাক ডাকে না।’
‘একদিন টেপ করে রেখে শোনাব।’
‘আলোটা নিভিয়ে দেবে?’
‘অসম্ভব।’
‘যা ইচ্ছে। তুমি এবার শোবে?’
অগত্যা পৃথা কোনও রকমে শরীরটাকে বিছানায় ছড়িয়ে দিল। তার ভঙ্গিতে বিন্দুমাত্র স্বস্তি ছিল না। স্বজন ওর শরীরে হাত রাখতেই আপত্তি বেরিয়ে এল, ‘প্লিজ, না।’
স্বজন হাসল, ‘আমার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।’
‘আমার এখন কিছুই ভাল লাগছে না।’
স্বজন চুপ করে গেল। ডান হাত সরিয়ে এনে চোখে চাপা দিল। কাল শহরে পৌঁছেই থানায় খবর দিতে হবে। পুলিশের কাজ পুলিশ করবে। সন্ধে থেকে একটার পর একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল আজ।
‘এভাবে শোওয়া যায় না।’ পৃথা উঠে বসল।
‘কেন?’
বেডকভারটা বড্ড খসখসে। তোমার গায়ে লাগছে না?’
‘একটু লাগছে।’
‘ওঠো। এটা সরাই। নীচে নিশ্চয়ই বেডশীট আছে।’ পৃথা নেমে পড়ল খাট থেকে।
অগত্যা স্বজনকে উঠতে হল। একটুখানি শুয়ে শরীর আরামের স্বাদ পেয়ে গেছে। সে বেডকভারের একটা প্রান্ত মুঠোয় নিয়ে টানতেই বালিশসমেত সেটা খোসার মত উঠে আসছিল বিছানা থেকে। সাদা ধবধবে চাদর দেখা যেতে আচমকা দুজনেই পাথর হয়ে গেল। বিছানার ঠিক মাঝখানে সাদা চাদর জুড়ে চাপ বাঁধা কালচে দাগটা। দাগটা যে রক্তের তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
পৃথা বিস্ফারিত চোখে দাগটাকে দেখছিল। স্বজন একটু সম্বিত পেতেই বিছানায় ঝুঁকে দাগটাকে ভাল করে দেখল। রক্ত শুকিয়ে গেলে এরকম দাগ হয়। এখানে কারও রক্তপাত হয়েছিল। শরীর সরিয়ে নেওয়ার পর বেডকভার দিয়ে সেটাকে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বেডকভারের উল্টোপিঠটা দেখল। হ্যাঁ, সেখানেই হালকা দাগ লেগেছে। রক্তপাতের কিছু সময়ের মধ্যেই ওটাকে ঢাকা হয়েছে। স্বজন বেডকভারটাকে ছুঁড়ে দিল দাগটার ওপর। অনেকটা আড়ালে পড়ে গেলেও ভারতবর্ষের ম্যাপের নীচের দিক হয়ে খানিকটা দেখা যেতে লাগল।
স্বজন পৃথাকে বাঁ হাতে জড়িয়ে ধরে পাশের সোফা-কাম- বেডের কাছে চল এল। সোফাটাকে চওড়া করে পৃথাকে সেখানে বসাল। পৃথা কথা বলল, ‘আমি আর পারছি না।’
‘বি স্টেডি পৃথা।’
‘আমার মনে হচ্ছে এখান থেকে কোনও দিন বেরোতে পারব না।’
‘আর ছয় ঘন্টা পরেই ভোর হয়ে যাবে।’
‘ছয় ঘন্টা অনেক সময়। তার আগেই— ?’ পৃথা নিঃশ্বাস ফেলল, ‘নীচের লোকটাকে নিশ্চয়ই ওই বিছানায় খুন করা হয়েছে। আমি শুনেছি অপঘাতে যারা মরে তাদের আত্মা অতৃপ্ত থাকে।’ কেঁপে উঠল সে।
‘আত্মা বলে কিছু নেই।’
‘তুমি হিন্দু হয়েও একথা বলছ?’
‘মানে? খ্রিস্টানরাও যদি আত্মা বিশ্বাস না করে তাহলে ঘোস্ট আসে কোত্থেকে। কিস্যু নেই। আজ পর্যন্ত কাউকে পেলাম না যে ভূত দেখেছে, সবাই বলবে শুনেছি।’
‘তুমি সব জেনে বসে আছ! তাহলে লোকে প্ল্যানচেট করে কেন?’
‘ওটা এক ধরনের সম্মোহন। বোগাস।’
‘আমার ঠাকুমা নিজের চোখে ভূত দেখেছিলেন। পাশের বাড়ির একটা ছেলে নাকি আত্মহত্যা করেছিল, তাকে। ঠাকুমা মিথ্যে বলেছিলেন?’
‘উনি বিশ্বাস করেছিলেন দেখেছেন। আসলে কল্পনা করেছিলেন। তোমার নার্ভ ঠিক নেই এখন। সোফায় শুয়ে পড়ো, আমি পাশে আছি।’
স্বজনের কথায় পৃথা কান দিল না। এই সময় বাতাস উঠল। পাহাড় থেকে দল বেঁধে হাওয়ারা নেমে এসে জঙ্গলে চিরুনি চালাতে শুরু করল। অদ্ভুত এক শব্দমালার সৃষ্টি হল তার ফলে। বাংলোর দেওয়ালে, জানলায় হাওয়ার ধাক্কা লাগতে লাগল। পৃথা জড়িয়ে ধরল স্বজনকে। আর তখনই টুপ করে নিভে গেল আলো। স্বজন বলল, ‘যাচ্চলে! লোডশেডিং?’
পৃথা অন্যরকম গলায় বলল, ‘মোটেই লোডশেডিং নয়।’
‘তাহলে ফিউজটা গিয়েছে। দেখতে হয়।’
পৃথা আঁকড়ে ধরল স্বজনকে, ‘না, কোথাও যাবে না তুমি।’
‘আশ্চর্য! অন্ধকারে বসে থাকবে?’
‘তাই থাকব। আমাকে ছেড়ে যাবে না তুমি!’
অতএব স্বজন উঠল না। বাইরে হাওয়ার শব্দ একটানা চলছে। কাচের জানলার ওপাশে জ্যোৎস্না অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। পৃথা ফিসফিস করে বলল, ‘আমার একটা কথা রাখবে?’
‘বলো।’
‘চলো, গাড়িতে গিয়ে বসে থাকি।’
‘চিতাটা?’
‘ওটা এতক্ষণে চলে গিয়েছে। গাড়িতে অনেক আরাম লাগবে।”
স্বজন ভাবল। টেলিফোনটা ডেড হয়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, নীচের ঘরে কফিনে গলিত মৃতদেহ আর বিছানায় রক্তের দাগ সত্ত্বেও সে নিজেকে এতক্ষণ শক্ত রাখতে পারছে। গাড়ির ভেতরটা আরামদায়ক হবে না। কাচ ভেঙে ফেললে তো হয়েই গেল। তবু এই বাংলোর বাইরে গেলে মনের চাপ কমে যেতে পারে। সে যখন পৃথার অনুরোধ রাখবে বলে সিদ্ধান্ত নিল ঠিক তখনই কাঠের সিঁড়িতে আওয়াজ উঠল। ভারী পায়ের আওয়াজ।
অন্ধকার ঘরে পৃথা স্বজনকে আঁকড়ে বসেছিল। আওয়াজটা প্রথমে বারান্দার একেবারে ওপাশে চলে গেল। গিয়ে থামল। স্বজন ফিসফিসয়ে বলল, ‘ছাড়ো।’
সেই একই গলায় পৃথা জানতে চাইল, ‘কেন?’
‘মানুষ হলে কথা বলব।’
‘না। মানুষ নয়’
‘উঃ, অকারণে ভয় পাচ্ছ।’
স্বজন উঠতে চাইলেও পারল না। শব্দটা আবার ফিরে আসছিল। বারান্দায় কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে খট্খট্ আওয়াজটা আকেবারে ওই ঘরের জানলার সামনে চলে আসতেই স্বজন গলা তুলল, ‘কে?’
হয়তো ভেতরে ভেতরে নার্ভাস থাকার কারণেই চিৎকারটা অহেতুক জোরালো হল। নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে স্বজন ছুটে গেল কাচের জানলার পাশে। তারপর হো হো করে হেসে উঠল বাংলো কাঁপিয়ে। সিটকে বসে থাকা পৃথা সেই হাসি শুনে অবাক, ভয়ের কিছু নেই বুঝে ছুটে এল পাশে, ‘কি হয়েছে?’
‘স্বচক্ষে ভূত দ্যাখো।’
পৃথা দেখল। প্রাণীটি অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। আকারে একটা ছোটখাটো মোষের মত কিন্তু স্বাস্থ্যবান। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা কি?’
‘বাইসন। বাচ্চা বাইসন।’
‘উঃ, কি ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। কিন্তু চিতাটা কিছু বলছে না ওকে?’ পৃথার গলায় খুশি চমকে উঠল ‘ওমা, দ্যাখো দ্যাখো, কী আদুরে ভঙ্গি করছে।?’
এরা সবসময় দলবেঁধে থাকতে ভালবাসে। চিতার সাধ্য নেই এদের কাছে যাওয়ার। এর দলটা নিশ্চয়ই কাছে পিঠে আছে। দুষ্টুমি করতে নিশ্চয়ই ইনি দলছাড়া হয়েছেন। এসব জায়গায় বাইসন থাকা খুবই স্বাভাবিক।’
‘বাইরে বের হলে ও আমার কাছে আসবে।’ এই প্রথম পৃথাকে সহজ, স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল। স্বজন হাসল, ‘ওর দলের সবাই তোমাকে পিষে ফেলবে।’
এইসময় শব্দ হল। বুনো ঝোপঝাড় থেকে পাহাড়ের মত চেহারার এক একটা বাইসন বেরিয়ে আসতে লাগল মাঠে। তাদের কেউ ঘাস খাচ্ছিল। ওদের দেখতে পাওয়া মাত্র বাচ্চা বাইসনটা দ্রুত বারান্দা থেকে নেমে গেল। জ্যোৎস্নার আলো পরিণত বাইসনদের ওপর পড়ায় তাদের শরীরের শক্তি সম্পর্কে কোনও সন্দেহ রইল না। গোটা দশেক বাইসন খোলা ঢালু মাঠে জ্যোৎস্না মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পৃথার মনে পড়ল কাছাকাছি একটা লাইন, মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়। সে দেখল বাচ্চা বাইসনটা মিশে গিয়েছে দলের সঙ্গে।
ক্রমশ দলটা উঠে আসছিল। বাংলোর সামনে দিয়ে গাড়িটাকে মাঝখানে রেখে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একজনের কী খেয়াল হল, যাওয়ার সময় মাথা নামিয়ে গাড়িটার দরজার নীচেটাকে ওপরে তুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সেটা ডিগবাজি খেয়ে গেল। চারটে চাকা। আকাশের দিকে মুখ করে স্থির হয়ে রইল।
পৃথার গলা থেকে ছিটকে এল, ‘সর্বনাশ!’
স্বজন জ্যোৎস্নায় গাড়িটার তলা দেখতে পাচ্ছিল। কোনদিন ওখানে চোখ যাওয়ার সুযোগই হয়নি। যে পাম্পে সার্ভিসিং-এর জন্যে গাড়ি পাঠাত, তারা যে এতকাল ফাঁকি মেরেছে তা এখন স্পষ্ট। সে বলল, ‘অল্পের ওপর দিয়ে গেল!’
পৃথা বলল, ‘ওরা চলে গেছে।’
হ্যাঁ, এখন মাঠ ফাঁকা। চাঁদ নেমে গেছে অনেকটা। স্বজন বলল, ‘চলো, ওই সোফাতেই রাত কাটানো যাক।’
‘গাড়িটাকে সোজা করা যাবে না?’
‘কেন?’
‘আমি এখানে থাকতে চাই না। তুমি বললে, বাইসনদের চিতা ভয় পায়। তাহলে নিশ্চয়ই সেটা এখন ধারেকাছে নেই।’
‘হয়তো নেই।’
‘তাহলে ভয় কি?’
অগত্যা স্বজন রাজি হল। দরজা খুলে বারান্দায় পা দিতেই বুঝল হাওয়ার দাপট কম নয়। ঝড় বললেই ঠিক বলা হবে। ওপাশের গাছের ডালগুলো বেঁকেচুরে যাচ্ছে। পৃথা বারান্দার রেলিং ধরে চারপাশে নজর রাখছিল। না, চিতাটার কোনও চিহ্ন নেই। নীচে নেমে গাড়িটাকে সোজা করতে চেষ্টা করল স্বজন। যতই হালকা হোক তার একার পক্ষে ওটাকে উপুড় করা সম্ভব হচ্ছিল না।
পৃথা নেমে এসে হাত লাগাল। অনেক চেষ্টার পর গাড়িটা চারচাকার ওপর দাঁড়াল। কিন্তু গিয়ার নড়ে যাওয়ায় গড়াতে লাগল সামনে। পেছন দাঁড়ানো স্বজন ওর গতি আটকাতে পারল না। গড়াতে গড়াতে সোজা মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল গাড়িটা।
দৌড়ে কাছে এসে, ঝোপঝাড় সরিয়ে ওরা দেখল একটা বড় গাছের গায়ে আটকে গেছে গাড়িটা। সে পৃথাকে বলল, ‘ঠেলে ওপরে তুলতে হবে।’
পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন?’
‘এখানে থাকবে নাকি?’
‘কাল সকালে ঠেলব। এখন খুব টায়ার্ড লাগছে।’
‘যা ইচ্ছে।’ সে গাড়ির দরজা খুলল। সামনের দরজাটা বেঁকে গিয়েছে। পেছনটা ঢুকে গিয়ে ব্যাকসিটটাকে চেপে দিয়েছে। গাড়িতে ঢুকতে গেলে ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজাই ভরসা। আগে পৃথা পরে সে ভেতরে ঢুকল। ঢুকে হেডলাইট জ্বালাল। সঙ্গে সঙ্গে গাছপালার মধ্যে দিয়ে তীব্র আলো ছিটকে গেল। নিভিয়ে দিল স্বজন পরমুহূর্তেই।
গাড়ির জানলা বন্ধ। সিটটাকে পেছনে হেলিয়ে দিয়ে পৃথা বলল, ‘আঃ।’
‘ভাল লাগছে?’
‘নিশ্চয়ই। মনে হচ্ছে বাড়িতে ফিরে এলাম।’
‘তোমাকে নর্মাল দেখাচ্ছে।’
পৃথা হাসল। এখান থেকে গাছপালার ফাঁক দিয়ে বাংলোটাকে দেখা যাচ্ছে। ভৌতিক বাংলোর যে ছবি সে জানত তার সঙ্গে একটুও পার্থক্য নেই। আজ বিকেলেও বোঝা যায়নি এমন কাণ্ড ঘটতে পারে।
পৃথা বলল, ‘শোন, আর শহরে যাওয়ার দরকার নেই। কাল সকাল হলে ফিরে চল। এত বাধা পড়ছে যখন—’
‘সকালের কথা সকালেই ভাবা যাবে।’
‘মানে?’
‘আমি ভাবছি বাইসনের দলটা যদি আবার ফিরে আসে তাহলে ওদের পায়ের তলায় গাড়িটার সঙ্গে আমরাও পাউডার হবো।’
‘আবার ফিরতে পারে?’
‘যাওয়ার সময় তো আমাকে কিছু বলে যায়নি।’
‘হাট! খালি ঠাট্টা করো।’ পৃথা বিরক্ত হল, ‘না, ফিরবে না।’
একটু একটু করে হাওয়া কমে গেল। জ্যোৎস্নার রং এখন ফিকে। ভোর হতে এখনও অনেক বাকি। অন্ধকারের একটা পাতলা আবরণ মিশছে জ্যোৎস্নার গায়ে। ওরা চুপচাপ বসে ছিল। মাঝে মাঝে রাতের অচেনা পাখিরা চেঁচিয়ে উঠছে এদিক ওদিক।
পৃথা হঠাৎ বলল, ‘কাল ফিরে যাবে তো?’
‘না।’
‘কেন?’
‘ফিরে যাওয়ার মতো কোনও কারণ ঘটেনি।’
‘আমার ভাল লাগছে না।’
‘না লাগলেও উপায় নেই। আমার শহরে কিছু কাজ আছে।’
‘মানে? তুমি কাজ নিয়ে এসেছ নাকি?’
‘ঠিক তা নয়, যাচ্ছি যখন তখন করে নিতাম।’
‘না কোনও কাজ করা যাবে না, আমরা এবার বেড়াতে এসেছি।’
‘এখন ঝগড়া কোরো না।’ স্বজন কথাটা বলতেই একটা গাড়ির আওয়াজ কানে এল। আওয়াজটা ক্রমশ কাছে আসছে।
পৃথা বলল, ‘এত রাত্রেও নীচের রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। আমরা ওখানে থাকলে লিফট পেতাম। তোমার যে কী বুদ্ধি হল এদিকে উঠে এলে!’
স্বজন বলল, ‘নীচের রাস্তা নয়। গাড়িটা প্রাইভেট রোড দিয়েই উঠছে।’
ওরা গাছপাতার ফাঁক দিয়ে সবকিছু দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু একটা গাড়ি যখন বাঁক নিয়ে বাংলোর দিকে এগিয়ে গেল তখন স্পষ্ট দেখতে পেল। গাড়িটা বাংলোর সামনে এসে থেমে গেল।।
পৃথা বলল, ‘চলো!’
‘চুপ! কথা বোলো না!’ স্বজন সতর্ক করল।
‘কেন?’
‘এই গাড়িতে কারা এল জানি না। সেই লোকটার খুনিও হতে পারে।’
পৃথা বলল, ‘আমাদের দেখতে পাবে না?’
‘না। জঙ্গলের আড়ালে আছে গাড়িটা।’
ওরা দেখল ওপাশে হেডলাইট নিভল। দরজা খুলল। একটি মানুষ গাড়ি থেকে নেমে বাংলোটাকে দেখল। তারপর পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেট ধরাল। সিগারেটটা ঠোঁটেই চাপা ছিল। লাইটারের আলোয় মুখটা স্পষ্ট বোঝা গেল না। লম্বা দোহারা লোকটা এখন গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। একাকী।
০৬. কোথাও কোনও শব্দ নেই
কোথাও কোনও শব্দ নেই। এমন নির্জন রাত্রে জ্যোৎস্নার দিকে তাকালেও ভয় ঢোকে মনে। জ্যোৎস্না বলেই গাছের ছায়া ফেলে। আর সেই ছায়ায় ওত পেতে থাকতে পারে মৃত্যু। কিন্তু সোম তো এখানে এসেছে প্রাণের ভয়েই।
সি-পিকে সে আজ প্রথম দেখছে না। কাউকে বাগে পেলে শেষ করে না দেওয়া পর্যন্ত লোকটা সুখ পায় না। টাকার লোভে সে যখন ফেঁসে গেল তখনই কেন সি-পি তাকে কোট মার্শাল করল না তা মাথায় ঢুকছে না। উল্টে সময় দিয়ে বলেছিল সেই খবর নিয়ে যাওয়া লোকটাকে খুঁজে বের করতে। চিতা নয়, তার ফেউকে খোঁজার দায়িত্ব তার ওপর। অত্যন্ত অপমানকর ব্যাপার। তবু ওই লোকটার সামনে থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েই সে বেরিয়ে পড়েছিল বলে রক্ষে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে হুকুম পাল্টে তাকে গ্রেপ্তার করার আদেশ জারি হল। এত জলদি মত বদলানো সি-পি-র স্বভাব নয়। চাপ এসেছে নির্ঘাত। তার মানে এখন সোমকে লড়তে হবে অনেকের সঙ্গে। আর ধরা পড়লে সারাজীবন কাটবে পাতালঘরে।।
বিপদের গন্ধ পেয়েই সোম বেরিয়ে পড়েছে রিভলভার আর গাড়িটাকে নিয়ে। তার একমাত্র বাঁচার পথ হল চিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়া। সি-পি অথবা মিনিস্টার খুশি না হয়ে পারবে না। সোম জানে এটা হাতের মোয়া নয়, কিন্তু পথ ওই একটাই। কোথায় যাওয়া যায় চিন্তা করতেই এই বাংলোটার কথা মনে এসেছিল। দিন সাতেক আগে গোপনসূত্রে খবর পেয়ে তল্লাসি চালিয়েছিল সোম বিশেষ বাহিনী দিয়ে। কিছুই পাওয়া যায়নি, বাংলোর মালিক বিদেশে। কেয়ারটেকার বলেছে কেউ এখানে আশ্রয় নেয়নি। সোমের বিশ্বাস লোকটা সত্যি কথা বলেনি। কিন্তু চাপ দিতে পারেনি সে। মাঝে মধ্যে ম্যাডাম এই বাংলোয় বিশ্রাম নিতে আসেন। তখন বিশেষ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। কিছু না পাওয়া যাওয়ায় সি-পি খুব খুশি হয়েছিলেন। খোদ ম্যাডাম যেখানে বেড়াতে গিয়ে থাকেন সেখানে উগ্রপন্থীরা আশ্রয় নেবে এটা নাকি উদ্ভট কল্পনা। সোমের সন্দেহ থাকলেও চুপ করে যেতে হয়েছিল।
এখন তাঁর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। হাতে সময় নেই। ধরা পড়লে সি-পি তাকে ছিঁড়ে খাবে। সন্দেহ দূর করতে তাই এই বাংলো দিয়েই খোজ শুরু করা যাক। কী দুর্মতি না তার হয়েছিল, নইলে খবর নিয়ে আসা লোকটাকে তুলে নিয়ে চাঁদি হিলসে গেলে সে আজ বাদে কাল সি-পি হয়ে যেতে পারত।
চাঁদের গায়ে মেঘ জমছে। রিভলভারটা মুঠোয় নিয়ে সোম সিঁড়ি ভাঙল। সামনের দরজায় তালা বন্ধ। তার মানে এখন বাংলোয় কেউ নেই। কেয়ারটেকারটার তো থাকার কথা। বাংলো ছেড়ে চলে যাওয়াটা তো অস্বাভাবিক ব্যাপার। লোকটা বলেছিল দিনের বেলায় বিশেষ প্রয়োজন হলে সে বাইরে যায়। এই তালাটা লোক দেখানো নয় তো! সোমের মাথায় চিন্তা কিলবিল করছিল। কয়েক পা হাঁটতেই তার চোখে পড়ল ওদিকের একটা দরজা হাট করে খোলা। দীর্ঘকাল পুলিশে চাকরি করায় সোমের অনুমানশক্তি এখন প্রবল হয়ে উঠল। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকবে কি ঢুকবে না সে স্থির করতে পারছিল না। দরজার সামনে পৌঁছাতেই তার নাকে গন্ধটা পৌঁছাল। ভেতরে কেউ মরেছে। যে মেরেছে সে ওই দরজা খুলে রেখে পালিয়েছে। এরকম তীব্র গন্ধ নাকে নিয়ে কোনও জীবিত ব্যক্তি বাংলোয় বসে থাকতে পারে না। তার মনে হল যে মরেছে সে যে একটা মানুষ তা দেখা দরকার। এমন তো হতে পারে কুখ্যাত চিতাকেই কেউ খুন করে এখানে রেখে গিয়েছে।
বুনো ঝোপের আড়ালে গাড়ির ভেতর বসে ওরা দেখল লোকটা রিভলভার উঁচিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। স্বজনের প্রথমে মনে হয়েছিল এই লোকটা বাংলোর মালিক হতে পারে, পরে ওর চালচলন এবং রিভলভার দেখে ধারনাটা পাল্টেছে। খুনি নাকি খুনের জায়গায় একবার ফিরে আসে। এই লোকটাও তাই ফিরে এসেছে। রিভলভার উঁচিয়ে যেভাবে ঘরে ঢুকে গেল তাতে মোটেই শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক ভাবার কারণ নেই।
এই সময় পৃথা বলল, ‘খুনি ফিরে এসেছে।’
‘হুঁ। আস্তে কথা বলো।’
‘ও যদি আমাদের দেখতে পায় তাহলে শেষ করে দেবে। প্রথমে চিতা, বাইসন, ডেডবডি আবার খুনি। আমার নার্ভ আর সহ্য করতে পারছে না।’
‘বুঝতে পারছি। কিন্তু লোকটা যদি আজ রাত্রে না বের হয়, আলো ফুটলেই আমাদের দেখতে পাবে। কিছু একটা করা উচিত।’
‘কি করবে? ওর হাতে রিভলভার আছে।’
হঠাৎ স্বজনের মাথায় মতলবটা এল। লোকটা খুনি হোক বা না হোক মাটির নীচের ঘরে নিশ্চয়ই একবার যাবে। খুনি হলে নিজের চোখকে খুশি করতে আর না হলে গন্ধটা কোথেকে আসছে তা দেখার জন্যে তার মতন নীচে নামবে। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলে যদি ওপরের দরজাটা বন্ধ করা যায় তাহলে— । কিন্তু লোকটা কখন নীচে নামছে তা এই এতদূর থেকে বোঝা যাবে কি করে? যদি নীচে না গিয়ে বাইরের ঘরে বসে থাকে! স্বজন নড়তে পারল না। এই মুহূর্তে গাড়িতে বসে থাকাটাই নিরাপদ।
ঘরে আলো জ্বলছে না, সোম সুইচ থেকে হাত সরিয়ে নিল। পকেট থেকে পেন্সিল টর্চ বের করে সে চারপাশে বোলাল। এটা বেডরুম। এখানে একটু আগেও লোক ছিল নইলে বেডকভারটা ওভাবে পড়ে থাকতে পারে না। সে বিছানার ওপর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ দেখতে পেল। চাপা গলায় সোম জিজ্ঞাসা করল, ‘বাংলোয় কেউ আছে? সাড়া না দিলে গুলি খেতে হতে পারে।’
নিজের কানেই শব্দগুলো অন্যরকম শোনাল। সোম মনে মনে নিশ্চিত, এই বাংলোটা খালি, তবে কেউ একটু আগে ছিল। একটু আগে যে কতটা আগে তা সে ঠাওর করতে পারছিল না। পাশের ঘরে ঢুকে সে আরও নিঃসন্দেহ হল। ফ্রিজ খুলে তখনও ঠান্ডা টের পেল। গন্ধটা কি তাহলে পচামানুষের নয়? কাউকে খুন করে পচিয়ে একসঙ্গে কোনও মানুষ থাকতে পারে? গন্ধের উৎস সন্ধান করতে করতে সোম নীচে যাওয়ার সিঁড়ির মুখটায় পৌঁছে গেল।
কাঠের সিড়ি। শব্দটা যতটা কম করলে নয় ততটাই করল সোম। এবং এক সময়ে কফিনের ভেতরে শুয়ে থাকা মৃতদেহটিকে আবিষ্কার করল সে। পুলিশ হিসেবে সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু কম ভীত হল। মৃত ব্যক্তিটির মুখে আলো ফেলামাত্র সে চমকে উঠল। এই লোকটিকে তার না চেনার কোনও কারণ নেই। সি-পি-র সঙ্গে বিশেষ রকমের জানাশোনা। কদিন এই কফিনে শুয়ে আছে কে জানে কিন্তু শরীরে বিকৃতি এসে গেছে। কফিনের ঢাকনা তুলে বিস্ময়ে দাঁড়িয়েছিল সোম হঠাৎ শব্দ কানে আসতেই আলোটাকে সরাল। গোটা কয়েক ধেড়ে ইঁদুর লাফিয়ে ঢুকে পড়েছে কফিনের মধ্যে। তাড়াতাড়ি ঢাকনাটা নামিয়ে দিয়ে সে ভেবে পাচ্ছিল না ইঁদুরগুলোকে ভেতর থেকে কিভাবে বের করে দেবে! বাবু বসস্তাললের শরীরের সঙ্গে ইঁদুরগুলোকে রেখে এসেছে জানলে সি-পি তাকে দ্বিতীয়বার কোর্ট মার্শালে ঝুলিয়ে দেবেন। তাও না হয় হল, কিন্তু লোকটার কতটা ক্ষতি করতে পারে। এখন কামড়লাওে লাগবে না, অসুখবিসুখ করবে না। হ্যাঁ, ইদুরগুলো বাবু বসন্তলালের শরীরের কিছুটা অংশ খেয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু তার আগেই সোম তো পুলিশে খবর দিয়ে দিতে পারে। মৃতদেহের আনাচ কানাচ থেকে ইঁদুর খুঁজে তাড়িয়ে দেওয়ার থেকে সেটা অনেক সহজ।
ওপরে উঠে এল সোম। বাইরের বারান্দায় পা রেখে সে চারপাশে তাকাল। জ্যোৎস্নার দিকে তাকাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হচ্ছে না। এখানে এসেছিল চিতা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনও খবর পাবে বলে, তার বদলে দেখতে পেল বাবু বসন্তলালের শরীর। বোঝাই যাচ্ছে ফোর্স যখন এখানে তল্লাসি করতে এসেছিল তখন মৃতদেহটা ছিল না। অর্থাৎ সাতদিন আগেও বাবু বসন্তলাল বেঁচে ছিলেন। কিন্তু কোথায় ছিলেন? তিনি শহরে এলে হইচই পড়ে যায়। সি-পি ব্যস্ত হয়ে ওঠেন তোষামোদ করতে। মিনিস্টার পার্টি দেন আর ম্যাডাম! ম্যাডাম ওঁর জন্যে সব কিছু করতে পারেন। এই বাংলোয় মাঝে মাঝে বিশ্রামের জন্যে যে ম্যাডাম আসেন তা বাবু বসন্তলালের বাংলো বলেই। বৈদেশিক মুদ্রার একটা বড় অংশ যাঁর হাত ধরে দেশে ঢোকে সেই মানুষটা এখন কয়েকটা ইঁদুর নিয়ে মাটির তলার ঘরে একটা কফিনের মধ্যে শুয়ে শুয়ে পচছে।
হঠাৎ সোমের খেয়াল হল, এই বাংলোয় টেলিফোন বাজছে। টেলিফোন? এখানে? শব্দটা খুবই আস্তে কিন্তু নির্জন বাংলোয় সেটা শোনার পক্ষে যথেষ্ট। ইস, এইটেই এতক্ষণ মাথায় ছিল না। সোম ছুটল। যেখানে ম্যাডাম বিশ্রাম নিতে আসেন সেখানে টেলিফোন না থেকে পারে? যাক, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।
অন্ধকার ঘরে শব্দ শুনে টেলিফোনের কাছে পৌঁছে গেল সোম। খপ করে রিসিভার তুলে চিৎকার করল, ‘হ্যালো! হ্যালো!’
ওপাশের মানুষটি যেন কয়েক সেকেন্ড সময় নিল, তারপর কাটা কাটা স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘কে কথা বলছ?’
কে? নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে থমকে গেল সোম। খবরটা সি-পির কাছে পৌঁছে গেলে এখান থেকে আর বের হতে হবে না।
‘হ্যালো। কথা বলছ?’
গলার স্বর যতখানি সম্ভব অশিক্ষিত করে সোম জবাব দিল, ‘আমি এখানে থাকি।’
‘ওখানে তো কারও থাকার কথা নয়। নাম কি তোমার?’
‘আপনি কে বলছেন?’
প্রশ্নটা করা মাত্রই লাইনটা কেটে গেল। সোম পুলিশি অভ্যেসে চটপট অপারেটারকে চাইল, ‘হ্যালো, অপারেটার, বাবু বসন্তলালের বাংলো থেকে বলছি। একটু আগে এখানে কোত্থেকে ফোন করা হয়েছিল?’
অপারেটার সময় নিল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কে বলছেন?’
মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘আমি অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার সোম বলছি।’
‘সরি স্যার, আমি বুঝতে পারিনি। টেলিফোনটা আপনার হেড কোয়াটাস থেকেই করা হয়েছিল। আপনি কথা বলবেন?’ অপারেটারের গলা খুবই বিনীত।
‘না, থ্যাঙ্কু।’ রিসিভার নামিয়ে রাখল সোম। যাচ্চলে। লোকটা নিশ্চয়ই সন্দেহ করেছে। করে টেলিফোনে একটা উড়ো সুযোগ নিয়েছে তাকে ধরার। গলাটা যে পুলিশ কমিশনারের নয় তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অন্য কাউকে দিয়ে করিয়েছে। সোম দিব্য চোখে দেখতে পেল সেই ছোটখাটো অফিসার ছুটতে ছুটতে পুলিশ কমিশনারকে খবর দিতে যাচ্ছে, স্যার, স্যার, এ সি সোমকে পেয়েছি ওই বাংলোয়। আর সেটা শুনে গোমড়ামুখো ভার্গিস বলছে, ‘লোকটা আর এ সি নয় মূর্খ। ওকে এখনই অ্যারেস্ট করো।’
অতএব এখনই এখানে ফোর্স এসে যাবে। ওরা এলে বাবু বসন্তলালের মৃতদেহ খুঁজে পেয়ে যা করার তা করবে কিন্তু তার আগেই ওকে এখান থেকে সরে যেতে হবে। সোম বাইরে বেরিয়ে এল। চাঁদ এখন প্রায় মেঘের আড়ালে। কোথায় যাওয়া যায়? পুলিশের গাড়ি নিয়ে বেশিদূরে গিয়েও কোনও লাভ নেই। ওই গাড়ির জন্যেই তাড়াতাড়ি ধরা পড়তে হবে। আবার গাড়ি ছাড়া এই রকম পাহাড়ি অঞ্চলে বেশিদূর পর্যন্ত যাওয়াও সম্ভব নয়। অন্তত নীচের রাস্তা পর্যন্ত তো যাওয়া যাক, ওরা আসার আগেই এই জায়গা ছাড়া উচিত। সে গাড়ির দিকে পা বাড়াতেই আচমকা কাছাকাছি গাড়ির হর্ন বেজে উঠেই থেমে গেল। প্রচণ্ড চমকে গেল সোম। তাড়াতাড়ি রিভলভার হাতে সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়াল। ওরা এর মধেই এসে গেল! ইম্পসিবে্ল। অবশ্য এমনও হতে পারে আগে ফোর্স পাঠিয়ে পরে ফোন করিয়েছে সি-পি। ধরা পড়লে নিস্তার নেই। গাড়ি আসার পথের দিকে সতর্ক চোখে তাকিয়ে পিছু হটতে লাগল সে। কোনমতে ওই ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়লে এখান থেকে সরে পড়া অসম্ভব হবে না।
পাশ ফিরতে গিয়ে কনুই-এর চাপ লাগায় হর্ন বেজে উঠেছিল। আঁতকে ফিরে তাকিয়েছিল পৃথা, স্বজনের মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করা হয়ে গেল। পৃথা চাপা গলায় বলল, ‘কি হবে এখন?’
মনে মনে হাজারবার সরি বললেও কিছুই বলা হবে না। কিন্তু ওরা অবাক হয়ে দেখল যাকে এতক্ষণ খুনি বলে মনে হচ্ছিল সেই লোকটা নির্ঘাত ভয় পেয়েছে। পায়ে পায়ে পিছিয়ে আসছে এদিকেই। আর একটু এলেই তাদের দেখতে পেয়ে যাবে লোকট, পিছন ফিরলেই। স্বজন বুঝতে পারল না হর্ন এদিকে বাজা সত্ত্বেও লোকটা উল্টোদিকে তাকাচ্ছে কেন? কিন্তু এভাবে গাড়ির মধ্যে বসে থেকে লোকটার মুখোমুখি হওয়ার কোনও মানে হয় না। সে পৃথাকে চাপা গলায় বলল, ‘চলো নামি। ধরা পড়তেই হবে।’
‘ধরা পড়ব বলছ কেন? আমরা কি কিছু করেছি?’ পৃথা প্রতিবাদ করল।
সঙ্গে সঙ্গে সোমকে অবাক হয়ে এদিকে তাকাতে দেখা গেল। মানুষের গলার স্বর স্পষ্ট তার কানে পৌঁছেছে। এবং সেটা তার পেছনের বুনো ঝোপ থেকে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। অর্থাৎ তাকে ঘিরে ফেলেছে ওরা।
সোম খুব নার্ভাস গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কে, কে ওখানে?’
স্বজন পৃথার দিকে তাকাল। লোকটার চেহারার মধ্যে রুক্ষত থাকলেও গলার স্বরে, হাবভাবে সেটা একদম নেই। সে গলা তুলল, ‘রিভলভারটা ফেলে দিন।’
সোম বুঝল তার সন্দেহ মিথ্যে নয়। এখন বীরত্ব দেখানো মানে বোকামি করা, সেটা তার চেয়ে বেশি কে জানে। সে রিভলভার মাটিতে ফেলে দিতেই স্বজন ঝোপের আড়াল থেকে হুকুম করল, ‘গুনে গুনে আট পা পিছিয়ে যান।’
অগত্যা সোম আদেশ পালন করল। তাকে খুব অসহায় দেখাচ্ছিল।
পৃথা অবাক হয়ে দেখছিল। এবার বলল, ‘লোকটা খুনি নয়।’
দরজা খুলে বের হচ্ছিল স্বজন, ‘কেন?’
‘খুনিরা এমন সুবোধ হয় না।’
স্বজন কোনও কথা না বলে একদৌড়ে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে মাটিতে পড়ে থাকা রিভলভারটা তুলে নিয়ে সোমের দিকে তাকাল।
জীবনে এত বিস্মিত সোম কখনই হয়নি। স্বজনকে ভাল করে বোঝার আগেই সে দেখল এক সুন্দরী তরুণী ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসছে। এরা কখনই পুলিশ নয়। কোনও বাহিনী তাকে ঘিরে ধরেনি, মাত্র দুটি অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে বোকা বানিয়েছে দেখে সে নিজের ওপর এমন রেগে গেল যে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ধ্যাত!’
রিভলভার হাতে স্বজন হকচকিয়ে গেল, ‘কি হল?’
‘তোমরা কারা?’ সোম প্রশ্ন করার সময়ে ভাবল লাফিয়ে পড়বে কিনা।
‘ভদ্রভাবে কথা বলুন। আমাদের তুমি বলার কোনও অধিকার আপনার নেই।’
‘সরি। আসলে পুলিশে চাকরি করে করে— !’ সোম থিতিয়ে গেল।
‘আপনি পুলিশ?’ স্বজন অবাক।
‘হ্যাঁ, আজ বিকেল পর্যন্ত ছিলাম। আপনারা এখানে কি করছেন।’
স্বজন পৃথার দিকে তাকাল। মেয়েরা মানুষ চেনে হয়তো, এই লোকটা খুনি নাও হতে পারে। সে বলল, ‘আমরা শহরে যাচ্ছিলাম। এখানে আমাদের গাড়ির তেল ফুরিয়ে যায়। একটা চিতা আমাদের আক্রমণ করে। ফলে বাধ্য হয়ে এই জায়গায় আটকে আছি।’
‘ব্যাপারটা যদি গল্প হয় তাহলে আপনাদের কপালে দুঃখ আছে।’ বেশ পুলিশি গলায় ঘোষণা করল সোম।
‘আমি একজন ডাক্তার।’
‘আচ্ছা। গাড়িটা কোথায়?
স্বজন বুনো ঝোপটাকে দেখাল। সোম বুঝতে পারছিল এদের থেকে ভয়ের কিছু নেই। তবু জিজ্ঞাসা করল, ‘বাংলোর ভেতরে গিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ। ওখানে একটি মানুষ মরে পড়ে আছে।’
‘লোকটাকে চেনেন?’
‘কি করে চিনব? এই অঞ্চলে এর আগে আসিনি।’
‘কিন্তু ওই লোকটাকে খুনের অভিযোগে আপনাকে যদি ধরা হয়?’
‘টিকবে না। লোকটা মারা গিয়েছে তিনদিনের বেশি আগে। গত পরশুও আমি এখান থেকে কয়েকশো মাইল দূরে অপারেশন করেছি।’
হঠাৎ সোমের খেয়াল হল। আর দেরি করা উচিত নয়। সি-পি যদি তাকে ধরার জন্যে ফোর্স পাঠিয়ে থাকে তাহলে—সে বলল, ‘রিভলভারটা দিন।’
স্বজন বলল, ‘আপনি কে তা না জেনে এটা দেব না।’
‘আমি পুলিশের অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার ছিলাম। ট্র্যাপে পড়ায় আজ থেকে আমার চাকরি নেই। যার জন্যে এই দুরবস্থা তাকে খুঁজতে এখানে এসেছিলাম। লোকটাকে খুঁজে বের করতে না পারলে আমাকে বিনা দোষে শাস্তি পেতে হবে। দিন রিভলভারটা, আমাকে এখান থেকে এখনই চলে যেতে হবে।’ হাত বাড়াল সোম। এই সময় পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকে খুঁজছেন আপনি?’
‘লোকে তাকেও চিতা বলে ডাকে। সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের ক্ষমতা বদল করতে চায়। কিছুতেই তাকে ধরা যাচ্ছে না।’ সোম এগিয়ে এসে রিভলভারটা নিয়ে পৃথার দিকে তাকাল, ‘আপনারা স্বামীস্ত্রী?’
পৃথা বলল, ‘যদি নাও হই তাতে আপনার কি এসে যাচ্ছে।’
‘অ।’ নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে হঠাৎ থমকে গেল সোম। সোজা ফিরে গেল বুনো ঝোপের কাছে।’ এবার গাড়িটাকে দেখতে পেল। পুলিশের গাড়ি নিয়ে বেশি দূর যাওয়া সম্ভব নয় কিন্তু এটাকে তো ব্যবহার করা যেতে পারে। অবশ্য যে অবস্থায় গাছের গায়ে আটকে আছে—!
সে স্বজনকে ডাকল, ‘হাত লাগান, গড়িটাকে তুলি।’
ওরা গাড়িটাকে, হালকা গাড়ি বলেই, তুলতে পারল। নিজের গাড়ি থেকে একটা দড়ি নিয়ে এসে মারুতির সামনের অংশে বেঁধে বলল, ‘আপাতত এখান থেকে চলুন।’
স্বজন নিজের গাড়িতে বসল। পৃথা উঠতে যাচ্ছিল তার আগে কিন্তু সোম ডাকল, ‘ওখানে কষ্ট করে বসতে যাচ্ছেন কেন, এখানে চলে আসুন।’
পৃথা জবাব না দিয়ে মারুতিতেই বসল। সামনের গাড়ির টানে এবার মারুতি বাংলো ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বজন বলল, ‘লোকটা ডাকল, গেলেই পারতে।’
পৃথা বলল, ‘আশ্চর্য! লোকটাকে চিনি না, যা বলছে তা সত্যি কিনা কে জানে!’
গাড়িতে শব্দ হচ্ছে। দরজাগুলোর অবস্থা কাহিল। ওরা জঙ্গলের পথে উঠে এল। পেছনে গাড়ি বাঁধা থাকলে যে-গতিতে গাড়ি চালাতে হয় তার চেয়ে ঢের জোরে চলেছে সোম। লোকটা ভাঁওতাবাজ অথবা খুনি যাই হোক না কেন এই ভয়ঙ্কর বাংলো থেকে ওর কল্যাণে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে, এটাই সত্যি।
প্রাইভেট লেখা বোর্ড পার হয়ে নীচের পিচের রাস্তায় পড়ে সোমকে ডান দিকে বেঁকতে দেখল স্বজন। আশ্চর্য! ডানদিক কেন? ওদিকে তো সমতলে যাওয়ার পথ। তাদের উঠতে হবে বাঁদিক দিয়ে, ওপরে। সে হর্ন বাজাল লোকটাকে থামাবার জন্যে। কিন্তু সোম তা কানেই নিল না। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর সামনের গাড়ি থেমে গেলে স্বজন ব্রেক চাপল। সোম নেমে এল গাড়ি থেকে। তার হাতে একটা সরু পাইপ। বলল, ‘আপনার গাড়ির চাবিটা দিন তো?’
‘কেন?’
‘পেট্রল ক্যাপটা খুলব। ওই গাড়ির পেট্রল এখানে চালান দেব।’ সোম হাসল, ‘পেট্রল পেটে পড়লেই তো ইনি চালু হবেন?’
‘হ্যাঁ তাই মনে হয়। কিন্তু পেট্রল ট্যাঙ্ক লিক্ হয়ে গিয়েছে আসার সময়।’
সোম মারুতিটাকে দেখল। নিজের গাড়ি থেকে কিছু যন্ত্রপাতি এবং সাবান বের করে মারুতির সিট সরিয়ে কাজে লেগে গেল। কিছুক্ষণ পরে সোম বলল, ‘মনে হয় ম্যানেজ করেছি, দেখা যাক।’
ওরা দেখল দুটো গাড়িকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে সোম খানিকটা মুখ দিয়ে টেনে এ গাড়ি থেকে ওই গাড়িতে পেট্রল যাওয়ার পথ তৈরি করে দিল।
স্বজন জিজ্ঞাসা করল, ‘কত তেল আছে আপনার গাড়িতে?’
‘সরকারি তেল, হিসেব করে তো কেউ খরচ করে না।’
‘দেখবেন আপনারটা না একদম খালি হয়ে যায়।’
‘খালি করার জন্যেই তো এই ব্যবস্থা’।
স্বজন প্রথমে কথাটার মানে বুঝতে পারেনি। তেল যখন আর এল না তখন সোম বলল, ‘দেখুন তো আপনার গাড়ি ঠিক আছে কিনা।’
স্বজন ইঞ্জিন চালু করে দেখল গাড়ি এত ঝড় সামলেও মোটামুটি ঠিকই আছে। এবার সোম তাকে ডাকল, ‘আমার নাম সোম। আপনার নামটা জানা হয়নি।’
‘আমি স্বজন আর ও পৃথা।’
‘বাঃ ভাল নাম। আপনারা আমার সঙ্গে হাত লাগিয়ে গাড়িটাকে ঠেলুন।’ সোম নিজের গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাল। ওরা গাড়িটাকে ঠেলতেই সেটা বাঁক নিয়ে এগিয়ে চলল খাদের দিকে। সোম দাঁড়িয়ে পড়তেই স্বজন চিৎকার করল, ‘সর্বনাশ, আপনার গাড়ি তো খাদে পড়ে যাবে।’
সোম মাথা নাড়ল, ‘আমি তাই চাই।’
সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটাকে নীচে চলে যেতে দেখল ওরা। অনেক নীচে গাছেদের মাথায় আছড়ে পড়তেই সোম ঘুরে দাঁড়াল, ‘আপনি আমার গাড়িতে ওঠেননি, আমাকে আপনাদের গাড়িতে উঠতে দিতেও কি আপনার আপত্তি আছে পৃথাদেবী?’
০৭. লোকটা মূর্খ
লোকটা মূর্খ। এবং অতিবড় মূর্খ না হলে কেউ ওই বাংলোয় যায় না, গিয়ে টেলিফোন ধরে না। ভার্গিস বিড়বিড় করলেন। এখন মধ্যরাত। বিছানায় শুয়ে খবরটা পাওয়ামাত্র সোমের মুখটাকে মনে করলেন তিনি। লোকটার আর বাঁচার পথ খোলা রইল না। কিন্তু তিনি চাননি ও এত চটজলদি ধরা পড়ুক। অনেকসময় বোকারাও ফস্ করে ঠিকঠাক কাজ করে ফেলে। চিতাটাকে যদি সোম ধরতে পারত—! কিন্তু আর দেরি করা উচিত হবে না। খবরটা বোর্ডের কাছে পৌঁছাবেই। ভার্গিস তাঁর দ্বিতীয় সহকারী কমিশনারকে ফোন করলেন, ‘ঠিক এই মুহূর্তে তুমি কি করছ?’
সহকারী কমিশনার সন্ত্রস্ত হয়ে ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে তাকাল, ‘ইয়ে, কিছু না স্যার।’
‘গুড। বাবু বসন্তলালের বাংলোটার কথা মনে আছে? ম্যাডাম যেখানে বিশ্রাম নিতে যান!’
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘সেখানে সোম গিয়েছে। ভোরের আগেই ওকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে এসো।’ লাইন কেটে দিলেন ভার্গিস। একটা ব্যাপার তাঁকে বেশ স্বস্তি দিচ্ছিল। তাঁর গোয়েন্দাবিভাগ যে যথেষ্ট সক্রিয় তা আর একবার প্রমাণিত হল। নানা জায়গায় ঢুঁ মারতে মারতে ওরা ওই বাংলোয় ফোন করেছিল। একটা গলা পায় অথচ গলাটা অশিক্ষিত কেয়ারটেকারের নয়। ওদের সন্দেহ হয়। কিছুক্ষণ পরে তারা অপারেটারকে ফোন করে জানতে পারে সোম ওখানে আছে। এই মূর্খ তাঁকে সরিয়ে সি পি হতে চেয়েছিল। নিজের পরিচয় কেউ অপারেটারকে দেয়!
ভার্গিসের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল সোমকে যে ধরা যাচ্ছে তা মিনিস্টারকে ফোন করে জানিয়ে দিতে। কিন্তু এত রাত্রে সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাঁর ঘুম আসছিল না। কালকের দিনটা হাতে আছে। উপায় না থাকলে তিনি সমস্ত শহরটাতে চিরুনি তল্লাশি করতেন। ভার্গিস বিছানা থেকে নেমে ওভারকোট পরে নিলেন। সার্ভিস রিভলভারটাকে একবার পরীক্ষা করে ইন্টারকমে হুকুম করলেন জিপ তৈরি রাখার জন্যে। তারপর জানলায় গিয়ে দাঁড়ালেন। ঘুমন্ত শহরের অনেকটাই এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুত শান্ত হয়ে আছে শহরটা। আসলে এটা ভান। কয়েকবছরে অজস্র গুলি চলেছে, বদমাসগুলোকে তিনি যেমন মেরেছেন তাঁর বাহিনীর লোকও কিছু মরেছে। এবার বেশ কিছুদিন ওরা চুপচাপ। ওই আকাশলাল আর তার তিন সঙ্গীকে ফাঁসিতে লটকালেই চিরকালের জন্যে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে ওদের লড়াইয়ের চেষ্টা। অথচ এই ছোট্ট কাজটাই করা যাচ্ছে না।
ভার্গিস চুরুট ধরালেন। ওরা শাসনব্যবস্থা পাল্টাতে চায়। বোর্ড এবং তাঁদের নিয়োগ করা মন্ত্রিপরিষদের ওপর ওদের আস্থা নেই। স্বৈরাচারী শাসক বলে মনে করে জনগণবিপ্লবের ডাক দিয়েছে ওরা। ভার্গিসকে এসব করতে হচ্ছে যেহেতু তিনি নিজেকে একজন বিশ্বস্ত সৈনিক বলে মনে করেন। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন আসে, কার প্রতি তিনি বিশ্বস্ত? যারা ক্ষমতায় আছে না এই দেশের প্রতি! উত্তরটা বড় গোলমেলে।
ভার্গিস বেরিয়ে এলেন। ফিনফিনে জ্যোৎস্নায় তাঁর জিপ সেপাইদের স্যালুট অবজ্ঞা। করে পথে নামল। এই মুহূর্তে ড্রাইভার গন্তব্য জানার জন্যে অপেক্ষা করছে বুঝে তিনি আদেশ দিলেন, ধীরে ধীরে শহরের সব রাস্তায় পাক খাও। কোথাও দাঁড়াবে না আমি না বললে।’
জিপের পেছনে তাঁর দুজন দেহরক্ষী অস্ত্র নিয়ে বসে। আর কাউকে সঙ্গে নেননি তিনি। মাঝরাতে এইরকম ঘুরে বেড়ানো পাগলামি হতে পারে কিন্তু তাঁর যে ঘুম আসছিল না। তাছাড়া কে বলতে পারে নির্জন রাজপথে ঘোরার সময় কোনও ক্লু তিনি পেয়েও যেতে পারেন।
ভার্গিস দেখলেন ফুটপাথে বেশ কিছু মানুষ মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। উৎসবের জন্যে আগে ভাগে এসে পড়েছে এরা। পকেটে টাকা নেই যে হোটেলে থাকবে। এদের মধ্যে আকাশলাল যদি শুয়ে থাকে তাহলে তিনি ধরবেন কি করে! উৎসবটা আর হওয়ার সময় পেল না! তিনি বাঁ দিকের ফুটপাথ ঘেঁসে গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। জিপ দাঁড়াল। ভার্গিস দেহরক্ষীদের বললেন, ‘ওই আটজন ঘুমন্ত মানুষকে তুলে নিয়ে এসো এখানে।’
দেহরক্ষীরা কঠোরভাবে আদেশ পালন করল। আচমকা ঘুম ভাঙা আটজন দেহাতি মানুষ কাঁপতে কাঁপতে জিপের পাশে এসে দাঁড়াল। এদের অনেকেই চাদর মুড়ি দিয়ে থাকায় ভার্গিস আদেশ করলেন সেগুলো খুলে ফেলতে। তারপর জোরালো টর্চের আলোয় একে একে মুখগুলো পরীক্ষা করলেন। আটনম্বর লোকটার নজর তাঁর ভাল লাগল না। টর্চের আলো ওর মুখ থেকে না সরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোর নাম?’
‘হুজুর।’
‘নাম বল?’
‘ফাগুলাল।’ চিঁচিঁ করে জবাব দিল লোকটা।
‘কোথায় থাকিস?’
‘ওরেগাঁও।’
‘আকাশলাল তোর কে হয়?’
‘কৌন?’
‘আকাশলালের নাম শুনিসনি?’
‘না। আমাদের গ্রামে কেউ নেই।’
ভার্গিস দেহরক্ষীকে হুকুম করল আকাশলালের ছবি দেখাতে। দেওয়ালে লটকানো পোস্টারটাকে দেহরক্ষী খুলে নিয়ে এসে লোকটার সামনে ধরল। ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন, ‘চিনিস?’
বোকার মত মাথা নাড়ল লোকটা, না।
দেহরক্ষীদের উঠে আসতে ইশারা করে চালককে জিপ ছাড়ার নির্দেশ দিলেন তিনি। এই এক ঘটনা সব জায়গায় ঘটছে। কোনও শালা ওকে চেনে না। কথাটা যে মিথ্যে তা শিশুও বলে দেবে। কিন্তু মিথ্যেটা প্রমাণ করা যাচ্ছে না। জিপ চলছিল সাধারণ গতিতে এ পথ থেকে ও পথে। এত রাত্রে কোনও গাড়ি নজরে পড়ছিল না। পাহাড়ি শহরে সময় গাড়ি চলার কথাও নয়। ঘুরতে ঘুরতে তিনি চাঁদি হিলসের রাস্তায় চলে এলেন। এবং তখনই তাঁর নজরে পড়ল ফুটপাথে এক বৃদ্ধা চিৎকার করে কাঁদছে। বৃদ্ধার পাশে একটি শরীর শুয়ে আছে। হয়তো ওর কেউ মরে গেছে। এই ধরনের সাধারণ শোকের দৃশ্যে না যাওয়াই ভাল কিন্তু তাঁর কানে এল চিৎকারের মধ্যে পুলিশ শব্দটা বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করল বৃদ্ধা। পুলিশকে গালিগালাজ করছে যেন। তিনি জিপ থামিয়ে নেমে পড়লেন। খানিকদূরে জনাচারেক মানুষ উবু হয়ে বসে শোক দেখছিল। পুলিশ দেখে তারা সরে পড়ার চেষ্টা করতেই ভার্গিস ধমকালেন, ‘কেউ যাবে না। দাঁড়াও!’
লোকগুলো দাঁড়িয়ে গেল। একদম চোখের সামনে পুলিশ দেখে বৃদ্ধা হকচকিয়ে চুপ মেরে গেল। ভার্গিস তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে মরেছে?’
‘আমার ছেলে। একটাই ছেলেকে মেরে ফেলল।’ বৃদ্ধা ককিয়ে উঠল।
‘কে মেরেছে?’
বৃদ্ধা জবাব না দিয়ে ফোঁপাতে লাগল।
‘কে মেরেছে বল তার শাস্তি হবে।’
হাউহাউ করে কাঁদল বৃদ্ধা, ‘পুলিশ মেরেছে।’
‘পুলিশ!’ এটা আশা করেননি ভার্গিস। তাঁর কাছে তেমন কোনও রিপোর্টও নেই। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পুলিশ তোমার ছেলেকে কেন মারল?’
‘ও টাকার লোভে পুলিশের কাছে গিয়েছিল। পুলিশ ওকে খুব পিটল। তবু ছেলে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এল। বললাম হাসপাতালে যেতে। গেল না। বলল, হাসপাতালে গেলে পুলিশ আবার মারবে। তারপর সন্ধেবেলায় শুয়ে শুয়ে হঠাৎ মুখ থেকে রক্ত তুলল। তুলতে তুলতে মরে গেল।’
‘কারা ওকে টাকার লোভ দেখিয়েছিল?’ ভার্গিস গন্ধ পেলেন।
‘জানি না হুজুর। বলেছিল পুলিশকে একটা খবর দিতে যেতে হবে।’
‘ওর মুখ থেকে চাদর সরাও।’
বৃদ্ধা কাঁপা হাতে চাদরটা সরালে ভার্গিস টর্চের আলো ফেললেন। হ্যাঁ, এই লোক। এই লোকটাকে খুঁজে বের করতে বলেছিলেন তিনি সোমকে। সোম গিয়ে বসে আছে বাবু বসন্তলালের বাংলোয় আর এই লোকটা ফুটপাথে মরে পড়ে আছে। নিশ্চয়ই ধোলাইয়ের সময় পেটের কিছু জখম হয়েছিল! এই লোকটার কাছ থেকে কোনও খবর পাওয়া যাবে না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ও মরে যাওয়ার পর কেউ দেখতে এসেছিল?’
‘হুজুর, পুলিশের হাতে মার খেয়ে মরেছে শুনলে কেউ কাছে আসে?’
‘আঃ। পুলিশের হাতে মরেছে বলছ কেন? ও তো দিব্যি হেঁটে ফিরে এসেছিল। ঠিক আছে। আমার লোক আসছে। ওর মৃতদেহ ভাল করে সৎকার করে দেবে।’ ভার্গিস জিপের দিকে ফিরে চললেন। দেহরক্ষীরা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি ইশারায় তাদের ছেড়ে দিতে বললেন। তাঁর মনমেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। একটা ভাল ক্লু হাতছাড়া হয়ে গেল। ওয়ারলেসে তিনি মৃতদেহ সরাবার হুকুম জানিয়ে দিলেন।
ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে ছিল আকাশলাল। এই দুটো রাত তার পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তার বলেছেন কোনও রকমে টেনসনের মধ্যে থাকা ওর স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক হবে। কথাটা শুনে হেসেছিল সে। তারপর সহকর্মীদের অনুরোধে ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে ছিল।
সন্ধের পরেই খবরটা এসেছিল। যে মানুষটিকে ডেভিড পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে পাঠিয়েছিল সে মারা গিয়েছে। লোকটা সাধারণ মানুষ, খুব গরিব, ফুটপাথে বাস করত। কিন্তু তাকে যখন বলা হয়েছিল এটা আকাশলালের কাজ তখন সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়েছিল যেতে। যদিও এখন অনেকে বলছে সে টাকার লোভে অতবড় ঝুঁকি নিয়েছিল কিন্তু কথাটা যে সত্যি নয় তা মানুষের জানা উচিত। কিন্তু এই খবরটা আকাশলালকে জানাতে গিয়েও জানাতে পারেনি ডেভিড। মানুষটার টেনসন আরও বাড়বে। সে এবং হায়দার আলোচনা করেছিল এই অবস্থায় লোকটির দেহ কোন্ মর্যাদায় সৎকার করা সম্ভব। ঠিক হয়েছিল ভোর রাত্রে কয়েকজন কর্মী যাবে শববাহক হিসেবে। কারণ মধ্যরাত্রে রাজপথ নিরাপদ নয়। অথচ মাঝরাতের পর খবরটা এল। স্বয়ং পুলিশ কমিশনার লোকটির মৃতদেহ আবিষ্কার করেছেন এবং তাঁর নির্দেশে পুলিশ সৎকারের ব্যবস্থা করেছে। ব্যাপারটা তাদের হতাশ করেছিল। মৃতদেহ দেখে সাধারণ মানুষ যাতে সরকারের ওপর আরও ক্রুদ্ধ না হতে পারে তার ব্যবস্থা করেছেন সি পি।
ডেভিড সিগারেট ধরাল। এখন চব্বিশ ঘন্টায় চার ঘন্টা ঘুমানো অভ্যেস হয়ে গেছে। কয়েকবছর ধরে এই জীবন। সে, হায়দার আকাশলাল অথবা যারা মরে গেছে ইতিমধ্যে তাদের প্রত্যেকের জীবনে এই শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার দগদগে ঘায়ের মত রস ঝরিয়েছে। এর বদলা নেবার জন্যে তিলতিল করে তারা তৈরি হয়েও শেষপর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়ছে বারংবার। এইবার শেষবার। কিন্তু লোকটাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তার নেওয়া উচিত ছিল। এখনও এই ঘর থেকে না বেরিয়েও শহরের যে-কোনও জায়গায় যা কিছু করার ক্ষমতা তাদের আছে। আকাশলাল নিশ্চয়ই তার কাছে কৈফিয়ত চাইবে। নিজের কাছেও তো সে কোনও কৈফিয়ত দিতে পারছে না।
টেলিফোন বাজল। ডেভিড সময় দিল কিছুটা। এই রাত্রে কেউ চট করে রিসিভার তোলে না। টেলিফোনটা সাতবার আওয়াজ করার পর সে রিসিভার তুলল, ‘হ্যালো!’
‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। তিননম্বর চেকপোস্ট থেকে বলছি। এইমাত্র লাল মারুতি চেকপোস্ট পার হয়ে গেল।’ লোকটা দ্রুত বলে ফেলল।
‘এত রাত্রে। ঠিক আছে।’ রিসিভার নামিয়ে রাখল ডেভিড। সে ঘড়ির দিকে তাকাল। আর আধ ঘন্টার মধ্যে গাড়িটা শহরে ঢুকছে। লোকটার সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব হায়দারের। ডেভিড উঠল। পাশের ঘরে হায়দার লম্বা কৌচে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আকাশলালের একটা লাইন মনে পড়ল, ‘ঘুম, তুমি আমার খুব প্রিয়, কিন্তু আমার হাতে সময় নেই তোমায় সঙ্গ দেবার।’ ডেভিড হায়দারকে তুলল। যতই ঘুমে আচ্ছন্ন থাকুক এক ডাকে উঠে পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। ডেভিড তাকে টেলিফোনটার কথা বলল। হায়দার ঘড়ি দেখল। এখন রাত সাড়ে তিনটে। ভোর হতে বেশি দেরি নেই। তিন নম্বর চেকপোস্ট দিয়ে যখন আসছে তখন সহজেই ওদের খুঁজে নেওয়া যায়।
হায়দার বলল, ‘লোকটাকে আমাদের দরকার। এত রাত্রে শহরে ঢুকলে পুলিশের হাতে পড়বে।’
ডেভিড মাথা নাড়ল, ‘তা ঠিক, কিন্তু পুলিশ ওদের কি করবে?’
‘ওদের মানে?’
‘তোমার মনে নেই, ওর সঙ্গে একজন মহিলা আছে। যদি স্বামী স্ত্রী হয় তাহলে এক দিক দিয়ে ভালই। পুলিশ বিশ্বাস করবে ওরা নিরীহ আগন্তুক।’
‘তাছাড়া ওদের কাছে নিশ্চয়ই পরিচয়পত্র আছে। ওরা এই রাজ্যের নাগরিক নয়। অতএব কিছু করার আগে পুলিশ ভাববে কিন্তু আমি চাইছিলাম না ওরা একটুও নাজেহাল হোক। এইসব লোক বিগড়ে গেলে পরে কাজ করতে অসুবিধে হয়।’
‘কি করতে চাও? ওকে তো জানানো হয়েছে কোথায় ওর ঘর বুক করা হয়েছে। নিশ্চয়ই সেখানেই উঠবে এখন। আগামীকাল যোগাযোগ করলেই হয়।’
‘ঠিক তাই। কিন্তু তার আগে দেখা দরকার ও সেই ঘরে পৌঁছাচ্ছে কি না। আমি একটু ঘুরে আসছি।’ হায়দার দ্রুত সাজবদল করতে বসল। মিনিট তিনেকের মধ্যেই তার চেহারা একজন দেহাতি মানুষ যে শহরে উৎসব দেখতে এসেছে তেমন চেহারা নিয়ে নিল। ডেভিড আপত্তি করল না। এ ব্যাপারে তার নিজের ওপর আস্থা না থাকলেও হায়দারের ওপর ভালভাবে আছে।
এই বাড়িটা অদ্ভুত। নীচে গোটা তিনেক ডিপার্টমেন্টাল শপ। তাদের পাশ দিয়ে ওপরে ওঠার যে সিঁড়ি তা দিয়ে দোতলায় পৌঁছানো যায়। সেখানে তিনজন বৃদ্ধ যাজক থাকেন। এঁরা তেমন নড়াচড়া করতে পারেন না। চাকরই সব কাজ করে দেয়। মাঝে মাঝে জানলায় যাজকদের দেখা যায়। দোতলায় পাঁচটি ঘর। প্রতিবেশীরা কৌতূহলী হয়ে প্রথম প্রথম এখানে এসেছিল। কিন্তু বৃদ্ধদের একঘেয়ে বিরক্তিকর কথাবার্তায় আয় এদিকে আসার কথা ভাবেনি। এই তিনজন বৃদ্ধ মানুষকে সামনে রেখে ডেভিডদের আপাত আশ্রয়। বাড়িটার পেছন দিকে একটা ঘোরানো সিঁড়ি দিয়েই যাতায়াত। ওদিকে কারও নজর পড়ার উপায় নেই। কারণ সেখানে একটা সিনেমা হলের বিশাল পাঁচিল রয়েছে। এই তিন বৃদ্ধ আকাশলালকে স্নেহ করেন, তার জন্যে প্রার্থনা জানান কিন্তু একই বাড়িতে থেকেও কখনও দেখা করেন না।
হায়দার রাস্তায় নেমে দেখে নিল দুদিক। পুলিশের গাড়ির কোনও চিহ্ন নেই। মাইনে করা লোকেরা যতই টহল মারুক শেষরাত্রে হাই তুলবেই। সে দ্রুত পা চালাল। দলে তাকে এই হাঁটার ধরনের জন্যে খরগোস বলে ডাকে কেউ কেউ। শেষপর্যন্ত সে সেই রাস্তায় পৌঁছাল যেখানে মানুষজন ফুটপাথেই মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। এখন চারপাশে বেশ কুয়াশা। দূরে জিপের আলো দেখতে পেয়ে সে চট করে ফুটপাথে অন্যান্যদের পাশে শুয়ে পড়ল। জিপটা খুব ধীরে ধীরে আসছে। এত ধীরে যে দরজা খুলে ওঠা যায়। কুয়াশা থাকায় আরোহীদের দেখা যাচ্ছে না। যদিও অনুমান করতে কোনও অসুবিধে হবার কথা নয়। জিপটা বাঁদিকে বাঁক নিতেই উল্টো দিক থেকে আর একটা গাড়ির আলো দেখা গেল। জিপটা সরে এল মাঝ রাস্তায়।
গাড়ির ব্যাপারস্যাপার স্বজনের চেয়ে সোম ভাল জানেন, প্রথম দিকে এমনটা মনে হয়েছিল। স্বজন গাড়ি চাল্লাচ্ছিল সাবধানে। পাশে সোম বসে, পেছনে পৃথা। গাড়িটা শব্দ করছে খুব কিন্তু অন্য কোনও ঝামেলা পাকাচ্ছে না। পেট্রলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল না। যদিও দরজার চেহারা খুব হাস্যকর। সোম জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনারা উৎসব দেখতে যাচ্ছেন?’
‘উৎসব? কিসের উৎসব?’
‘ওঃ। আপনারা এমন সময়ে এখানে এসেছেন যে সময়টার জন্যে পাহাড়ের মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকে। ছোট ছোট গ্রাম থেকেও মানুষ ছুটে আসে শহরে। দিনটা পরশু।’
‘কোনও ধর্মীয় ব্যাপার?’
‘ব্যাপারটা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এখন।’ সোম স্বজনকে ভাল করে দেখল, ‘তাহলে এমনি আসা হচ্ছে? টুরিস্ট?’
‘হ্যাঁ। বেড়াতে এসে কাজ করা আমি একদম পছন্দ করি না।’ ‘পেছন থেকে পৃথা বলল।
‘ভাল। খুব ভাল। কিন্তু উঠবেন কোথায় তা ঠিক করেছেন। এখন খুব ভিড় শহরে।’
‘ওরা ঠিক করে রেখেছে।’ স্বজন উত্তর দিল।
‘কারা?’
‘যাদের আমন্ত্রণে আমি এসেছি।’ স্বজন হাসল।
‘আমরা সেখানে উঠব না। উঠলেই ওরা তোমাকে দিয়ে কাজ করাবে।’ পৃথা প্রচণ্ড আপত্তি জানাল, আচ্ছা, আপনার জানাশোনা ভালো হোটেল আছে?’
সোম হাসল, ‘বিস্তর। আমি বললে ওরা নতজানু হয়ে ঘর দেবে, পয়সা নেবে না।’
‘সে কি? কেন?’ পৃথা অবাক।
‘এখানে পুলিশের বড়কর্তার গুডবুকে সবাই থাকতে চায়। অবশ্য আমি আর পুলিশের কোনও কর্তাই নই। খবরটা পেয়ে গেলে ওরা পাত্তা দেবে না বলেই মনে হয়।’
স্বজন তাকাল, ‘আলাপ হবার সময় এই কথাটা একবার বলেছিলেন। ব্যাপারটা কি?’
‘আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এই সরকারের বিরুদ্ধে একদল মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহ করতে চাইছে। অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের নেতাকে ধরা যাচ্ছে না। প্রচুর টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা সত্ত্বেও জনসাধারণ তাকে ধরিয়ে দিচ্ছে না। এই লোকটার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আমি বোকা বনেছি বলে আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। একদিনের মধ্যে লোকটাকে খুঁজে বের না করতে পারলে আমার রক্ষে নেই।’ করুণ হয়ে গেল সোমের গলার স্বর।
‘ফাঁদটা কি ছিল?’
সোম অল্পকথায় ঘটনাটা বলল। শুধু নিজের টাকার প্রতি লোভপ্রসঙ্গ এড়িয়ে গেল।
পৃথা বলল, ‘এসব জানলে এখানে আসতাম না। যে-কোনও সময় গোলমাল হতে পারে।’
‘উৎসবের সময় কিছু হবে না।’ সোম বলল।
‘আপনি লোকটাকে খুঁজে পাবেন?’ স্বজন জিজ্ঞাসা করল।
‘খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মত অবস্থা। আপনি কিসের ডাক্তার?’
‘কেন?’
‘এই যে বললেন কারা আপনাকে নেমন্তন্ন করে আনছে!’ কথা বলতে বলতে নাক টানল সোম, ‘পেট্রলের গন্ধ পাচ্ছি। দাঁড়ান তো একটু।’
দাঁড়াল স্বজন। ওপাশের দরজা দিয়ে নামা যাবে না। স্বজন নেমে দাঁড়ালে সেদিক দিয়ে নেমে এল সোম। পেট্রল আবার লিক করছে। পৃথাকে নামিয়ে সিট তুলে পেট্রল ট্যাঙ্কের তলায় হাত ঢুকিয়ে আরও কিছুক্ষণ মেরামতির চেষ্টা করল সোম। তারপর বলল, ‘যা তেল আছে আপনারা শহরে পৌঁছে যেতে পারবেন।’
‘আপনি?’ স্বজন জিজ্ঞাসা করল।
‘এরপর আপনার গাড়িতে গেলে ভার্গিস আমাকে ছিঁড়ে খাবে।’
‘ভার্গিস কে?’
‘যাকে কেউ কখনও হাসতে দ্যাখেনি। আমাদের কমিশনার।’
‘আপনি তো শহরেই ফিরবেন?’
‘হ্যাঁ। শহরে ঢুকতে হলেই একটা চেকপোস্ট পড়বে। ওরা দেখুক আমি চাই না।’
‘তাহলে আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না?’
‘শহরে যখন থাকছেন তখন দেখা হয়ে যাবেই।’
স্বজন গাড়ি চালু করে বলল, ‘লোকটা ভালই।’
‘ওপর-চালাক।’‘ পৃথা মন্তব্য করল।
এরপর ওরা তিন নম্বর চেকপোস্টে পৌঁছাল। পরিচয়পত্র দেখিয়ে ছাড়া পেয়ে জোরে গাড়ি ছুটাতে গিয়েও পারা যাচ্ছিল না কুয়াশার জন্যে। যত ওপর উঠছে তত কুয়াশা বাড়ছে। শেষপর্যন্ত শহরের আলো চোখে পড়ল। ঢোকার মুখেই পুলিশের একপ্রস্ত জেরার সামনে পড়তে হল। পৃথার কথা মনে রেখে স্বজন নিজেদের পরিচয় দিল টুরিস্ট হিসেবেই। পথে গাড়ি খারাপ হওয়ায় দেরি হয়ে গেছে।
শহরটা ঘুমাচ্ছে। দুপাশের ঘুমন্ত বাড়িঘরদোর মন্দ নয়। রাস্তায় একটা মানুষ দেখা যাচ্ছে না যাকে জিজ্ঞাসা করা যায়। হঠাৎ দূরে একটা জিপের আলো দেখা গেল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে জিপটা হঠাৎ মাঝরাস্তায় চলে গেল আটকে দেওয়ার ভঙ্গিতে। স্বজন অবাক হল। সে ইঞ্জিন বন্ধ করতে ভরসা পাচ্ছিল না। যে-কোনও মুহূর্তেই গাড়ি অচল হয়ে যাবে। দরজা খুলে সে এগিয়ে গেল জিপের দিকে। কাছে আসতেই তার নজরে এল এক বিশালদেহী পুলিশ অফিসার তার বুক লক্ষ করে রিভলভার ধরে রেখেছে।
০৮. সেপাইরা গাড়িটাকে ঘিরে ফেলল
সেপাইরা গাড়িটাকে ঘিরে ফেলল। প্রত্যেকেই অস্ত্র উঁচিয়ে রেখেছে। নির্দেশ পাওয়ামাত্র গুলি ছুটবে। ভার্গিস চুরুট চিবোতে চিবোতে গাড়িটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, ‘রাস্তায় নেমে আসতে হবে।’
স্বজন পৃথার দিকে তাকাল। এত কাণ্ডের পরে শহরে ঢুকে এ রকম অভ্যর্থনা কপালে জুটবে তা ওরা ভাবতে পারেনি। পৃথার মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। কোনওরকমে দরজা খুলে স্বজন আগে নামল, পৃথাকে নামতে সাহায্য করল। তারপর ভার্গিসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা এই শহরে এইমাত্র ঢুকেছি। কিন্তু আপনারা যেভাবে আমাদের ঘিরে ধরেছেন তাতে মনে হচ্ছে আমরা অপরাধী।’
‘এত রাত্রে এই শহরে কোনও ভূদ্রমানুষ আসে না। পরিচয়টা কি?’
‘আমি একজন ডাক্তার। ইনি আমার স্ত্রী।’
‘যে কেউ যখন ইচ্ছে এমন পরিচয় দিতে পারে। লিখিত প্রমাণ কিছু আছে?’
স্বজন আবার গাড়ির ভেতর মাথা গলিয়ে নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্সটা বের করে ভার্গিসকে দিল। দিয়ে বলল, ‘এই জিনিসটা যে কেউ যখন ইচ্ছে তৈরি করিয়ে রাখতে পারে।’
‘আচ্ছা।’ ভার্গিস ছোট চোখে স্বজনকে দেখলেন, ‘শরীরে দেখছি চমৎকার তেল আছে। আমার এখানে ওই তেল বের করে নেবার যন্ত্র নেই এমন ভেবো না ডাক্তার। আমি এখানকার সি পি, কথা বলবে বুঝেসুঝে। গাড়িটার এই হাল হল কি করে?’
‘অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল।’
ভার্গিস গাড়িটাকে পাক দিয়ে এলেন, ‘মিথ্যে কথা বলার অপরাধে তোমাকে গ্রেপ্তার করা হল। কাল সকালে এক প্রস্ত কথাবার্তা বলার পর সিদ্ধান্ত নেব।’
‘কি বললেন? আমি মিথ্যে কথা বলছি?’ প্রায় চিৎকার করে উঠল স্বজন।
একশো বার, অ্যাকসিডেন্টে গাড়ির একটা দিক আঘাত পায়। এ গাড়ির কোনও দিকই বাকি নেই। তুমি কি আমাকে নির্বোধ মনে করছ? তোমার এই টিনের বাক্সটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে আঘাত করা হয়েছে। কোন অ্যাকসিডেন্টে এমন হয়?’ ভার্গিস সেপাইদের ইশারা করতে তাদের দুজন এগিয়ে এসে স্বজনকে ধরে ফেলল। ভার্গিস এবার পৃথার সামনে দাঁড়ালেন, ‘ম্যাডাম। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। এই মুহূর্তে আমরা এমন এক উদ্বেগে আছি যে কোনও ঝুঁকি নিতে পারি না। তবে যেহেতু আপনি একজন মহিলা এবং সুন্দরী তাই এই শহরে আপনি নিরাপদ যতক্ষণ আপনি রাষ্ট্রবিরোধী কোনও কাজ না করছেন। আপনি ইচ্ছে করলে আমাদের রেস্ট হাউসে যেতে পারেন অথবা কোনও ঠিকানা থাকলে সেখানে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।’
এতক্ষণে যেন নিজেকে ফিরে পেল পৃথা, ‘আমার স্বামীকে আপনি গ্রেফতার করছেন কেন?’
‘শুনতেই পেয়েছেন কেন ওকে আমার প্রয়োজন। এই শহরে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত কিছু মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাকে নিঃসন্দেহ হতে হবে যে আপনার স্বামী তাদের দলে নেই।’
‘আমরা যদি সেইরকম কেউ হতাম তা হলে কি এমন প্রকাশ্যে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম?’
‘আপনার সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাই না ম্যাডাম। আপনারা কোথায় যাচ্ছিলেন?’
‘টুরিস্ট লজে।’
‘ওখানে কি জায়গা পাবেন?’
‘আমাদের জন্যে ঘর বুক করা আছে।’
‘আচ্ছা! শহরে আসার উদ্দেশ্য কি?’
‘আমরা বেড়াতে এসেছি।’
‘সেটা সত্যি হলে আমি খুশি হব। চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি।’ ভার্গিস ইশারায় নিজের গাড়ি দেখালেন। পৃথা মাথা নাড়ল, ‘না আমরা একসঙ্গে যাব। আমি আবার বলছি ওকে মিছিমিছি সন্দেহ করছেন। ও একজন বিখ্যাত ডাক্তার। বিদেশেও কাজ করেছে।’
ভার্গিস এ-কথায় কান দিলেন না। তাঁকে অনুসরণ করে সেপাইরা স্বজনকে জোর করে টেনে নিয়ে জিপে তুলল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে ভার্গিস চিৎকার করলেন, ‘এখান থেকে সোজা পাঁচ মিনিট এগিয়ে গেলেই টুরিস্ট লজ দেখতে পাবেন। গুডনাইট।’
একটি সুন্দরী মহিলাকে এমন সময়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে যাওয়া ভার্গিসের পক্ষেই সম্ভব, হায়দার মনে মনে বলল। পুরো দৃশ্যটা সে দেখেছে আড়াল থেকে। দেখতে দেখতে যে সন্দেহটা মনে আসছিল তা শুধু ওই মহিলার উপস্থিতিতেই গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। ডাক্তারের আসার কথা একা। আর ওই গাড়িটার দিকে তাকালে শুধু অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে শুনলে কিছুই শোনা হয় না। কোনও গাড়িকে এমন উদ্ভট চেহারা নিয়ে চলতে হায়দার কখনও দেখেনি। তাই ভার্গিস সন্দেহ করে ভুল করেনি।
পৃথা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। এমন একটা ঘটনা ঘটবে তা সে কল্পনা করতে পারেনি। যে পুলিশ অফিসারকে ওরা মাঝরাস্তায় নামিয়েছিল তাকে দেখেই কেমন অস্বস্তি হয়েছিল। লোকটা তাদের সাহায্য না করলে বাংলো থেকে বের হওয়া মুস্কিল হত বলেই উপেক্ষা করতে পারেনি। আজকের রাতটা খুব খারাপ, একই সঙ্গে এতগুলো বিপদ তার কল্পনার বাইরে। ভোর হতে আর দেরি নেই। পৃথা ঠিক করল সে কোথাও যাবে না। এই ভাঙাচোরা গাড়ির মধ্যে সে অনেক নিরাপদ বোধ করবে আলো ফোটা পর্যন্ত। তারপর এখানকার পুলিশ-হেডকোয়াটার্সে যাবে স্বজনের খোঁজ নিতে। সে যখন ড্রাইভিং সিটের দিকে এগোচ্ছে তখনই লোকটাকে দেখতে পেল। খুবই সন্তর্পণে রাস্তার পাশের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে।
পৃথার হৃৎপিণ্ড যেন লাফিয়ে উঠল। লোকটা কে? নির্জন রাজপথে একটা উদ্দেশ্যেই এরা এগিয়ে আসে। কিন্তু যেহেতু মানুষটা একা সে সহজে আত্মসমর্পণ করবে না। গাড়ির ভেতরে পা বাড়াবার সময় তার কানে এল, ‘নমস্কার ম্যাডাম। আপনি আমাকে শত্রু ভাববেন না।’
‘আপনি কে?’ প্রায় চিৎকার করে উঠল পৃথা।
‘আমি এই শহরেই থাকি। পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্যে জনসাধারণকে সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আপনার স্বামীকে কমিশনার সাহেব যেভাবে গ্রেপ্তার করল তা আমি দেখেছি। আপনি যে ভেঙে পড়েননি তার জন্যে ধন্যবাদ।’ হায়দার বলল।
‘আপনার নাম?’
‘নাম বললে আপনি চিনতে পারবেন না ম্যাডাম। আচ্ছা, শুনলাম আপনার স্বামী ডাক্তার। উনি কি এখানে কোনও বিশেষ কাজে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন, না যা বললেন, বেড়াতেই আসা!’
‘আমি জানতাম বেড়াতেই আসছি, কিন্তু— ।’
‘শেষ করুন।’
‘আজ রাত্রে জানতে পারলাম ওঁর কিছু কাজ এখানে’।
‘টুরিস্ট লজে আপনাদের জন্যে রুম কে বুক করেছিল?’
‘আমি জানি না।’
‘বেশ। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন, ডাক্তারসাহেবকে আমরাই আমন্ত্রণ জানিয়েছি। কিন্তু ওঁর বয়স এত অল্প তা আমার জানা ছিল না। এখনই ভোর হবে, আপনি কি টুরিস্ট লজে গিয়ে বিশ্রাম করবেন? এখানে কেন অপেক্ষা করবেন?’
‘আমি সকাল হলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে যাব।’
‘নিশ্চয়ই যাবেন। কিন্তু সকাল নটার আগে সেখানে কেউ কথা বলবে না। আপনি টুরিস্ট লজে চলুন। ডাক্তারসাহেবের নাম বললে ওরা ঘর খুলে দেবে।’
পৃধা গাড়িতে বসে স্টার্ট দেবার চেষ্টা করল। শব্দ করে কেঁপে উঠল গাড়িটা, একটুও এগোল না। হয় তেল শেষ হয়ে গেছে নয়তো—! প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে রাস্তায় নেমে পৃথা বলল, ‘এই গাড়িতে সমস্ত জিনিসপত্র পড়ে আছে— ।’
‘দামি জিনিস কিছু থাকলে সঙ্গে নিয়ে যান।’ হায়দার বলল।
পৃথা হায়দারকে দেখল। এতক্ষণ কথা বলে তার মনে হয়েছে লোকটা আর যাই হোক চোর-ছ্যাঁচোড় নয়। লোকটা ঠিক কি তা না বুঝতে পারলেও সে ব্যাগটা তুলে নিল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আমার সঙ্গে আসবেন?’
‘না ম্যাডাম। এতক্ষণ বেশ ঝুঁকি নিয়েছি আমি। এরপর প্রকাশ্য রাজপথে হেঁটে গেলে আর দেখতে হবে না। কিন্তু আপনি নিশ্চিন্তে যান, কোনও বিপদ হবে না।’
‘আপনারা কি বিদ্রোহী?’
‘আমরা অত্যাচারিত। ও হ্যাঁ, অনুগ্রহ করে কমিশনারসাহেবকে আমার কথা বলবেন না। তাতে আপনার স্বামীর বিপদ আরও বেড়ে যাবে।’ হায়দার দ্রুত ফুটপাথে চলে এল। পলক ফেলার আগেই পৃথার মনে হল হারিয়ে গেল লোকটা।
একদিকে স্বজন অন্যদিকে নিজের নিরাপত্তার দুশ্চিন্তা নিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর টুরিস্ট লজটাকে দেখতে পেল পৃথা। এখনও রাস্তার আলো নেভেনি। লজের দরজায় পৌঁছে বেল বাজাতেই সেটা খুলে দিল দারোয়ান গোছের একজন, ‘গুডমর্নিং ম্যাডাম।’ ‘আমাকে বলা হয়েছে এখানে আমাদের জন্যে ঘর বুক্ড আছে। আমার স্বামী ডাক্তার—।’
কথা শেষ করতে দিল না লোকটা, ‘আসুন ম্যাডাম। সাত নম্বর ঘর আপনাদের জন্যে তৈরি রাখা আছে। আমি এইমাত্র টেলিফোনে জানতে পারলাম আপনি একাই আসছেন।’
হাঁ হয়ে গেল পৃথা, ‘টেলিফোন করল কে?’
দারোয়ান হাসল, ‘এ নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। আপনাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আমি জিনিসপত্রগুলো গাড়ি থেকে নিয়ে আসব। আসুন।’
ঘরটা সুন্দর। রাস্তার ধারেই। দোতলার জানলায় দাঁড়িয়ে ভোরের আকাশ দেখল পৃথা। দু-একজন মানুষ এখন রাস্তায়। টুপ করে রাস্তার আলো নিভে গেল। স্বজনকে ওরা কেন ধরে নিয়ে গেল? শুধুই যদি তারা এখানে বেড়াতে আসত তাহলে কি এমনটা হত? পৃথার মনে হল তার কাছে অনেক কিছু লুকিয়েছে স্বজন। ওই বিপ্লবী কথা-বলা লোকটা, টুরিস্ট লজে পৌঁ ছানোর আগেই তার সম্পর্কে খবর দিয়ে টেলিফোন আসা—এই সবই রহস্যময়। আর এই রহস্যের সঙ্গে স্বজন জড়িয়ে আছে। কক্ষনো এর বিন্দুবিসর্গ সে জানত না। স্বজন তাকে কেন জানায়নি? আজ যদি ওর কোনও বিপদ হয় তবে তার ফল তো তাকেই বইতে হবে। ওরা যদি স্বজনকে না ছাড়ে? হৃৎপিণ্ড যেন মুচড়ে উঠল পৃথার। না, সে একটুও ঘুমাতে পারবে না। সকাল ন’টা পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে। এই শহর যতই সুন্দর হোক কোনও দিকে তাকাবে না সে।
দরজায় শব্দ হল। চমকে পেছন ফিরে তাকিয়ে পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘কে?’
ঘরে আলো জ্বলছে। দারোয়ান দরজা খুলে সুটকেসগুলো একপাশে নামিয়ে রাখল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘চা এনে দেব ম্যাডাম?’
‘চা!’ কি বলবে বুঝতে পারছিল না পৃথা।
লোকটা মাথা নাড়ল। দরজার দিকে যেতে যেতে হঠাৎ ফিরে দাঁড়াল, ‘আমি ঠিক সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম ম্যাডাম। নইলে এগুলো আর পাওয়া যেত না।
‘কেন?’
‘ওগুলোকে নিয়ে যখন ফিরছি তখন আওয়াজ হতে ঘুরে দেখলাম কেউ অথবা কারা আপনাদের গাড়িতে আগুন-ধরিয়ে দিয়েছে। ওপাশের ব্যালকনিতে গেলে কিছুটা টের পাবেন’। দারোয়ান চলে গেল।
ভোর রাতে বিছানায় শুয়েও ভার্গিসের ঘুম আসছিল না। একসময় তাঁর মনে হল বেঁচে থাকলে এই জীবনে অনেক ঘুমানো যাবে। কিন্তু তাঁর হাতে এখন যে কয়েক ঘন্টা বেঁচে আছে তা ঘুমিয়ে নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। আকাশলালকে তার চাই। একটা সূত্র দরকার। ইতিমধ্যে তিনি এই শহরের টেলিফোন সিস্টেমকে সতর্ক করে দিয়েছেন। কাল সকাল নটায় আকাশলাল যেখান থেকেই তাঁকে টেলিফোন করুক না কেন তাঁর বাহিনী সেখানে তিন মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে। ওটা শেষ সুযোগ। এই টেলিফোনটা কি কারণে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। লোকটা নির্বোধ নয়। যে ব্যবস্থা তিনি নিয়েছেন তা যে নেবেনই লোকটার অজানা নয়। তাহলে? বিছানা ছেড়ে উঠে বসে ভার্গিসের দৃঢ় বিশ্বাস হল লোকটা আগামীকালের উৎসবটাকে কাজে লাগাতে চাইছে। কিন্তু কিভাবে কাজে লাগাবে, সেইটে জানা দরকার। যদি কোনও ভাবে আগামীকালের উৎসবটাকে বাতিল করে দেওয়া যেত। এ ক্ষমতা একমাত্র মিনিস্টারের আছে। না, মিনিস্টারকেও বোর্ডের কাছে অনুমতি নিতে হবে। মিনিস্টারকে রাজি করাতে পারেন ম্যাডাম। ভার্গিস ঘড়ি দেখল। এখন যদি তিনি ম্যাডামকে টেলিফোন করেন তাহলে আর দেখতে হবে না।
টেলিফোন বাজল। ছোঁ মেরে রিসিভার তুললেন তিনি, ‘হ্যালো!’
‘স্যার, যে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে আপনাকে জানাতে হুকুম করেছেন বলে বিরক্ত করছি।’ ডেস্কের অফিসারের বিনীত গলা কানে এল।
ভার্গিসের নাক ঘোঁত শব্দটি তৈরি করল, ‘বলো, বলে ফেল।’
‘আজ শেষ রাত্রে যে গাড়িটাকে আপনি আটকেছিলেন সেটা আগুনে পুড়ছে।’
‘তার মানে?’
‘আমরা আসামিকে নিয়ে চলে আসার পর গাড়িটাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
‘লোকটার বউ ওখানে ছিল?’
‘না স্যার। তিনি টুরিস্ট লজের সাত নম্বর ঘরে আছেন। তাঁর জিনিসপত্রও সেখানে। আমরা এইমাত্র সব চেক করে আপনাকে খবর দিলাম।’
‘খবর দিলে। ইডিয়ট। আগুনটা নেভানোর কথা মাথায় ঢুকল না। নিশ্চয়ই ওই গাড়িতে এমন কোনও ক্লু ছিল যা আমার হাতে পড়ুক ওরা চায় না। দমকল গিয়েছে?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
রিসিভার রেখে দিলেন ভার্গিস। নিজেকে নিতান্ত গর্দভ বলে মনে হচ্ছিল তাঁর। নিশ্চয়ই এই ডাক্তার লোকটার সঙ্গে ওদের যোগাযোগ আছে। গাড়ি থেকে প্রমাণ সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয় বলে ওরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ইস, তখন যদি একবার সন্দেহ হত!
পোশাক পরতে পরতে ভার্গিস ইন্টারকমে নির্দেশ দিলেন স্বজনকে তাঁর চেম্বারে নিয়ে আসার জন্যে। এখন তাঁকে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। স্বজনকে জেরা করে খবর বের করতে তাঁর একটুও অসুবিধে হবে না। কত ডেডিকেটেড বিপ্লবীর বারোটা তিনি বাজিয়ে ছেড়েছেন, এ তো এক বিদেশি ছোকরা। নিজের চেম্বারে ঢুকে জানলার বাইরে ভোরের আকাশ দেখলেন ভার্গিস। আহা, মনে হচ্ছে ভাগ্য তাঁর সহায় হচ্ছে।
নিজের চেয়ারে বসে স্বজনকে ঘরে ঢুকতে দেখলেন তিনি। যারা ওকে এখানে এনেছে তারা দরজার বাইরে হুকুমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। ভার্গিস লক্ষ করলেন। ছিমছিমে এক সাধারণ চেহারার যুবক। তাঁর হাতের একটা চড় খেলে অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু প্রথমেই তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন না বলে ঠিক করলেন, ‘বসুন।’
স্বজন টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে বসল, ‘আমি তীব্র প্রতিবাদ করছি।’
‘আমি হলেও করতাম।’ গম্ভীর মুখে ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন, ‘চা না কফি?’
‘আমার কিছুই চাই না। আমাকে কেন ধরে এনেছেন?’
‘নিশ্চয়ই কারণ আছে। আপনি চা না খেলে আমি কি এক কাপ খেতে পারি?’
‘যা ইচ্ছে করুন আপনি। আমার স্ত্রী কোথায়?’
‘তিনি এখন টুরিস্ট লজের সাত নম্বর ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন।’
‘আমি কি করে বিশ্বাস করব?’
ভার্গিস ইন্টারকমে চা দিতে বললেন, এক কাপ। তারপর টুরিস্ট লজের সাত নম্বর ঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে বললেন। তারপর স্বজনের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গাড়িতে কি ছিল?’
‘কি ছিল মানে?’
‘আমি সরল প্রশ্ন করছি, গাড়িতে কি ছিল?’
‘যা থাকে। সুটকেস।’
‘ওগুলো নামিয়ে নেওয়ার পরে তাহলে আগুন ধরিয়ে দিতে হল কেন?’
‘সে কি?’ চমকে উঠল স্বজন, ‘আমার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে?’
‘হ্যাঁ। কেন?’
‘কে ধরাল।’
‘প্রশ্নটা আপনাকে আমি করছি।’
‘বিশ্বাস করুন আমি জানি না। এই শহরে আমার কোনও শত্রু আছে বলে জানা ছিল না।’
‘কাজটা শত্রুরা করেনি, আপনার বন্ধুরাই করেছে।’
‘বন্ধুরা?’
‘হ্যাঁ। কোনও বিশেষ প্রমাণ লোপ করে দিয়ে তারা আপনাকে বাঁচাতে চায়।’
‘বাজে কথা! আমার গাড়িতে তেমন কিছুই ছিল না।’
এইসময় টেলিফোন বাজল। ভার্গিস সাড়া দিলেন প্রথমে, তারপর বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনার স্বামীকে বলুন আমরা আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি কি না!’ রিসিভারটা স্বজনের হাতে তুলে দিলেন তিনি।
রিসিভার কানে চেপে ধরে স্বজন বেশ উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘হ্যালো, পৃথা?’
‘হ্যালো।’ পৃথার গলা।
‘কেমন আছ তুমি? কোথায় আছ?’
‘টুরিস্ট লজে। তুমি কখন ছাড়া পাচ্ছ!’
‘জানি না। আমাকে বিনা দোষে ওরা ধরে নিয়েছে পৃথা!’
‘তাই?’
‘তার মানে?’ চিৎকার করে উঠল স্বজন।
সঙ্গে সঙ্গে হাত থেকে রিসিভার কেড়ে নিলেন ভার্গিস। লাইনটা কেটে দিতেই বেয়ারা চা নিয়ে ঢুকল। স্বজনের দিকে না তাকিয়ে মন দিয়ে কাপে দুধ চিনি মেশালেন তিনি। এই সময় একজন অফিসার তাঁকে একটা কাগজ দিয়ে গেল। চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে কাগজটায় চোখ বোলালেন ভার্গিস, ‘আপনার স্ত্রী দেখছি একদমই ইনোসেন্ট।’
মাথা ঠিক ছিল না স্বজনের। সে ভার্গিসের দিকে তাকাল।
‘আপনাকে আমরা বিনাদোষে ধরে নিয়ে এসেছি শুনে তিনি একটাই শব্দ উচ্চারণ করেছেন, তাই? এছাড়া তিনি আর কি বলতে পারতেন?’
স্বজন বুঝল পৃথার সঙ্গে তার টেলিফোনের সংলাপগুলো ওই কাগজে লেখা আছে। সে সামান্য ঝুঁকে বলল, ‘আপনাকে স্পষ্ট বলছি এমন কোনও অন্যায় আমি করিনি যাতে আমি অপরাধী হতে পারি।’
‘আকাশলালের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে?’
‘কে আকাশলাল?’
চোখ বড় করে ভার্গিস একবার স্বজনকে দেখে নিয়ে চা শেষ করলেন। তারপর বললেন, ‘এই অসময়ে আপনি শহরে এলেন কেন?’
‘বললাম তো রাস্তায় দৃর্ঘটনা হয়েছিল।’
‘কোথায়?’
‘জায়গাটা আমি চিনি না। আমার গাড়ির পেট্রল ট্যাঙ্কে লিক হয়ে যায়। আমরা বাধ্য হই একটা বাংলোয় আশ্রয় নিতে। সেখানে চিতা বাঘের পাল্লায় পড়ি। ওই জন্তুটার আক্রমণে গাড়ির চেহারা অমন হয়েছিল।’
‘কোন বাংলো?’
স্বজন যতটুকু পারে সঠিক বর্ণনা দিল। ভার্গিস বললেন, ‘বাবু বসন্তলালের একটা বাংলো ওদিকে আছে। তার সঙ্গে আপনার বর্ণনা মিলছে। কিন্তু চিতার গল্পটা একটা বাচ্চাছেলেও বিশ্বাস করবে না। ঠিক আছে, ওখানে কে ছিল?’
‘কেউ না। চিতার হাত থেকে বাঁচার জন্যে আমরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকি!’
‘কেয়ারটেকার?’
‘না, কেউ ছিল না। বাড়িটার নীচে একজনের মৃতদেহ পচছে কফিনে।’
‘গুড গড। কার মৃতদেহ?’ সোজা হয়ে বসলেন ভার্গিস।
‘আমি চিনি না।’
‘ওখান থেকে আবার গাড়ি সরিয়ে এলেন কি করে?’
‘আমাদের পরেই একজন এক্স পুলিশ অফিসার ওখানে যান। তিনিই সাহায্য করেছেন।’
ভার্গিসের মুখ শক্ত হয়ে গেল। ইন্টারকমে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সোমকে খুঁজতে যে সার্চ পার্টি গিয়েছিল তারা কি ফিরে এসেছে?’
০৯. বাবু বসন্তলালের শরীর
বাবু বসন্তলালের শরীর তাঁরই বাংলোর কফিনে পচছিল। খবরটা পেয়ে ভার্গিসের ভেতরটা নড়ে উঠল। হয়ে গেল, তাঁর সর্বনাশ হয়ে গেল। খবরটা এখনই মিনিস্টারকে দিতে হবে এবং তারপরই শুরু হয়ে যাবে যা হবার। ম্যাডামের কানে খবরটা পৌঁছোনোমাত্র, চোখ বন্ধ করলেন ভার্গিস। বাবু বসন্তলাল বিরাট ব্যবসায়ী, প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসেন এ দেশের জন্যে। রাজনীতিতে তিনি নেই। কিন্তু ম্যাডামের বন্ধু হিসেবে তাঁর ক্ষমতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। মিনিস্টার কিংবা বোর্ড নয়, ম্যাডামের ভালবাসার মানুষ যে বাবু বসন্তলাল তা ভার্গিসের চেয়ে বেশি আর কে জানে! আর ম্যাডাম মানেই মিনিস্টার, ম্যাডামের ইচ্ছেই বোর্ডের ইচ্ছে।
ভার্গিস টেবিলের উল্টোদিকে উদ্বিগ্ন স্বজনের দিকে তাকালেন, ‘আপনি তো ডাক্তার। ভদ্রলোক কতদিন আগে মরে গেছেন বলে মনে হয়েছিল?’
‘পরীক্ষা না করে বলা মুস্কিল। অনুমান, দিন চারেক তো বটেই।’
‘এটা হত্যাকাণ্ড না স্বাভাবিক মৃত্যু?’
‘স্বাভাবিক মৃত্যু হলে কেউ মাটির নীচের ঘরের কফিনে নিজে হেঁটে গিয়ে শুয়ে থাকতে পারে না। তাছাড়া ওপরের বেডরুমের চাদরে রক্তের দাগ দেখেছি।’
‘হুম! আপনি নিহত মানুষটিকে চেনেন?’
‘আপনাকে বলেছি এখানে এর আগে আমি কখনও আসিনি।’
ভার্গিস উঠে দাঁড়ালেন, ‘আপনি যে ঠিকানা দিয়েছেন সেখানে আমরা খোঁজখবর করছি। যা বলেছেন তা যদি সত্যি হয় তাহলে আপনাকে আটকে রাখার প্রয়োজন হবে না।’
স্বজনের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, ‘আমি জানতে পারি কি আপনারা এত ভয় পাচ্ছেন কাকে?’
কঠোর চোখে তাকালেন ভার্গিস, ‘আমরা কাউকেই ভয় পাই না। বিছানায় শোওয়ার সময় কাঠপিঁপড়ে উঠলে তাকে ঝেড়ে ফেলতে হয়। এটা সেরকম ব্যাপার। বাই দ্য ওয়ে, আপনি বলেছেন, এখানকার টুরিস্ট লজে কেউ ঘর বুক করে রেখেছিল যদিও এখানকার কাউকেই আপনি চেনেন না!’
ঠোঁট টিপে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল স্বজন।
‘সেই লোক কে?’
‘তাও জানি না। আমার সিনিয়রের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে?’
‘আপনাকে কি চিকিৎসা করার জন্যে এখানে আনা হয়েছে?’
‘সম্ভবত তাই। কিন্তু পেশেন্টের নাম আমি জানি না।’
‘আপনার কি মনে হয় আমাদের শহরে ভাল ডাক্তার নেই?’
“নিশ্চয়ই আছেন। তবে আমি যে বিষয় নিয়ে কাজ করি তা অনেকেই করেন না।’
‘আপনার বিষয়?’
স্বজন চিন্তা করল। তার হারানোর কিছুই নেই। পরিচয় গোপন রাখার কথা তাকে কেউ বলে দেয়নি। এরা যদি তার সম্পর্কে খোঁজ নেয় তাহলে সহজেই জানতে পেরে যাবে সত্যি কথা বলে সে কোনও অন্যায় করছে না। স্বজন বলল, ‘মানুষের শরীর সৃষ্টি করার সময় ঈশ্বর কখনও বেশ অমনোযোগী থাকেন। কখনও দুর্ঘটনাজনিত কারণে শরীরে বিকৃতি আসে। বিজ্ঞান এখন সেই ত্রুটিগুলো শুধরে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। আমি ওই বিষয় নিয়েই কাজ করছি।’
ভার্গিস হতভম্ব। তাঁর মাথায় ঢুকছিল না এখানে এমন চিকিৎসা করানোর জন্যে কে এই লোকটাকে আনাতে পারে। টেলিফোন বাজল। চকিতে রিসিভার তুলে আওয়াজ করেই কুঁকড়ে গেল ভার্গিস। অত বড় শরীর থেকে দ্বিতীয় শব্দটা অস্পষ্ট বের হল, ‘ইয়েস।’
‘আমি তো ভেবে পাচ্ছি না তুমি ওখানে কেন আছ? তুমি জানো বাবু বসন্তলাল খুন হয়েছেন?’
‘হ্যাঁ স্যার। এইমাত্র জানলাম।’
‘জেনেছ অথচ আমাকে জানাওনি?’
‘যে ফোর্সকে আমি সোমের জন্যে পাঠিয়েছিলাম তারা এইমাত্র ডেডবডি নিয়ে ফিরেছে।’
‘তুমি ডেডবডি দেখেছ?’
‘না স্যার, এখনও— ।’
‘ভার্গিস। বোর্ড তোমাকে আর বেশি সময় দেবে না। বাবু বসন্তলালের এখন বিদেশে থাকার কথা। অথচ তিনি কয়েকদিন আগে খুন হয়ে তাঁরই বাংলোয় পড়ে আছেন। তুমি কি মনে করেছ এতে তোমার কৃতিত্ব বাড়বে? তুমি ডেডবডি দেখে এখনই ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করে খবরটা দাও!’
‘স্যার, আমি— ?’
‘হ্যাঁ, তুমি।’ মিনিস্টার লাইনটা কেটে দিলেন।
এই সাতসকালে রুমালে মুখ মুছলেন ভার্গিস। হঠাৎ স্বজনের দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হল এই লোকটা কাজে আসতে পারে। তিনি একটু কাছে এগিয়ে গেলেন, ‘লুক ডাক্তার, আমি তোমাকে এখনই ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ তোমাকে রাখতে হবে।’
‘কি অনুরোধ?’
‘তোমার সঙ্গে যারা যখন কন্ট্রাক্ট করবে তাদের সব খবর আমাকে জানাবে। একটা কাগজে কয়েকটা নম্বর লিখে সামনে রাখলেন ভার্গিস, ‘এইটে আমার ব্যক্তিগত টেলিফোন নম্বর। আমি না থাকলেও খবরটা রেকর্ডেড হয়ে থাকবে। কেউ জানতে পারবে না।’
‘আপনি এমন অনুরোধ করছেন কেন?’
‘এই শহরে কোনও মানুষের তোমাকে প্রয়োজন এটা ভাবতে অবাক লাগছে, তাই। আমরা আকাশলালকে অনেকদিন দেখিনি। সে কি অবস্থায় আছে তাও জানি না। কে বলতে পারে ওর জন্যেই হয়তো তোমাকে এখানে আনা হয়েছে।’ বেল টিপলেন ভার্গিস। তারপর স্বজনকে সেখানে বসিয়ে রেখেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজার বাইরে ছুটে আসা এক অফিসারকে দেখে একটু দাঁড়ালেন, ‘লোকটাকে রিলিজ করে দাও কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা কেউ যেন ওর সঙ্গে ছায়ার মত লেগে থাকে। আমি ওর সমস্ত গতিবিধি জানতে চাই।’
হেডকোয়ার্টার্সে এই সকালেই বেশ সন্ত্রস্ত ভাব। বাবু বসন্তলালের মৃত্যু মানে শাসকদলের ওপর আকাশলালের আঘাত, এমন একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনাররা ভার্গিসকে দেখে স্যালুট করলেন। ভার্গিস গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনারা খবরটা পেয়েছেন মনে হচ্ছে।’
একজন উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’
‘হুম্। এই ফোর্সে সবার পরে আমাকেই খবর দেওয়া হয় দেখছি।’
‘না স্যার, আপনি তখন রেস্ট নিচ্ছিলেন, তাই— ।’
‘ওই বাংলোতে ফোর্স নিয়ে কে গিয়েছিল?’
তৃতীয়জন মাথা নাড়লেন, ‘আমি স্যার।’
লোকটার আদ্যোপান্ত জানেন ভার্গিস। প্রমোশন দেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না তাঁর, শুধু মিনিস্টারের কথায় বাধ্য হয়ে সই করতে হয়েছে। ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রিপোর্ট কোথায়?’
‘আমি ফিরে এসেই জানিয়ে দিয়েছি স্যার। ওটা আপনার ডেস্কে আছে।’
‘সোম কোথায়?’
‘পাইনি। আমরা বাংলোটা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। আমরা যাওয়ার আগে সেখানে অন্তত দুটো মানুষ ছিল। তারা খাওয়াদাওয়া করেছে সেখানে। মনে হয় বিছানায় শুয়েছিল— ।’
‘আমি বেডরুম স্টোরি শুনতে চাই না। কিভাবে মারা গেছেন বাবু বসন্তলাল?’
‘মৃতদেহ পোস্টমর্টেম না করলে কিছু বোঝা যাবে না স্যার!’
‘এখান থেকে বাংলোয় যাওয়ার রাস্তা একটাই। যদি কোনও মানুষ ওখানে তোমাদের আগে গিয়ে থাকে তাকে ধরতে পারলে না কেন?’
‘স্যার এই রাত্রে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকলে কি করে খুঁজে বের করব। যাওয়ার পথে আমরা একটা ভাঙাচোরা গাড়িকে ওপরে উঠে আসতে দেখেছিলাম।’
‘গাড়িটাকে থামিয়েছিলে?
‘না। কারণ ওর নেমপ্লেট আমাদের দেশের নয়।’
‘ইডিয়ট।’ ভার্গিস আর দাঁড়ালেন না। হাঁটতে হাঁটতে তাঁর মনে হল এই ডাক্তার দম্পতির সঙ্গে সোমের হয়তো যোগাযোগ হয়েছিল। ডাক্তারকে চেপে ধরলে সেটা তিনি বের করতে পারতেন। কিন্তু না, শক্তি প্রয়োগ না করেও ওর কাছ থেকে খবর বের করা যাবে বলে এখনও তিনি বিশ্বাস করেন।
কেন্দ্রীয় শবাগারের সামনে ভার্গিসের কনভয় থামল। দ্রুত পায়ে তিনি ভেতরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে প্রহরীরা ব্যস্ত হয়ে দরজা খুলে দিয়েছিল। সোজা চলে গেলেন সেই কফিনটার সামনে যেখানে বাবু বসন্তলালের মৃতদেহটা শুয়ে আছে। নাকে রুমাল চেপে তিনি ঝুঁকে দেখলেন। হ্যাঁ, চিনতে কোনও ভুল হয়নি। এখন যতই ফুলে-ফেঁপে উঠুক এই মানুষটি জীবিত অবস্থায় তাঁকে কম নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায়নি। লোকটা মরে যাওয়ায় তাঁর খুশি হওয়ার কথা কিন্তু হতে পারছেন না। মরে গিয়ে লোকটা তাঁকে কোথায় নিয়ে যাবে তা একমাত্র শয়তান জানতে পারে। ভাল করে দেখলেন কোনও আঘাতের চিহ্ন আছে কি না। না নেই। ওই বাংলোটায় একজন কেয়ারটেকার ছিল, তার কথা কেউ বলছে না। সম্ভবত গা ঢাকা দিয়েছে ব্যাটা। ওটাকে ধরলেই হয়তো হত্যারহস্য আর রহস্য থাকবে না।
বাইরে বেরিয়ে এসে মিনিস্টারের আদেশ মনে করলেন ভার্গিস। খবরটা এখনই ম্যাডামের কাছে পৌঁছে দিতে হবে তাঁকে। অথচ বাবু বসন্তলালের স্ত্রীকে আগে খবরটা জানানো দরকার ছিল। ভদ্রমহিলা নাকি খুব গোঁড়া, বাইরে বের হন না, ভার্গিস তাঁকে কখনও দ্যাখেননি। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু সংবাদ তো স্ত্রীর আগে পাওয়া উচিত। ওয়্যারলেসে হেডকোয়াটার্সে খবর পাঠালেন ভার্গিস, একজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার এখনই যেন দায়িত্বটা পালন করে।
শহরের সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকাটাকে ভি আই পি পাড়া বলা হয়। ভার্গিসের কনভয় যে বাড়িটার সামনে থামল তার সামনেটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মেয়েলি সাজগোজের দোকান। প্রায় প্রতিটি জিনিসই বিদেশি এবং চড়া দামে বিক্রি হয়। দোকানের পাশ দিয়ে গাছপাতায় ঘেরা প্যাসেজ। বাকি গাড়িগুলোকে রাস্তায় রেখে ভার্গিসের জিপ ঢুকল সেখানে। সুন্দর সাদা দোতলা বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামতেই দারোয়ান ছুটে এল। ভার্গিস বলল, ‘ম্যাডামকে খবর দাও, জরুরি দরকার।’
দারোয়ান মাথা নিচু করল, ‘মাফ করবেন হুজুর আপনি সেক্রেটারি সাহেবের সঙ্গে কথা বলুন।’
‘কেন?’ ভার্গিস বিস্মিত। ‘হুকুম আছে সকাল নটার আগে ওঁকে যেন বিরক্ত করা না হয়।’
ভার্গিস ঘড়ি দেখলেন, এখনও পঁয়ত্রিশ মিনিট বাকি। অগত্যা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলেন। দারোয়ান আগে আগে ছুটে গিয়ে সেক্রেটারিকে খবর দিয়েছিল। মহিলাকে আগেও দেখেছেন ভার্গিস। পাঁচ ফুট লম্বা হাড়সর্বস্ব চিমসে মুখের মহিলা কখনও হাসেন বলে মনে হয় না। এই একটা ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে মিল থাকলেও বিরক্তি আসে।
সেক্রেটারি বললেন, ‘ইয়েস— ।’
‘ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করা দরকার। জরুরি।’
‘মাফ করবেন, আপনি ন’টার পরে আসুন।
‘আমি বলেছি ব্যাপারটা জরুরি।’
‘আমি আদেশ মান্য করতে বাধ্য।’
‘টেলিফোনে কথা বলতে পারি? ব্যাপারটা ওঁরই প্রয়োজন।’
সেক্রেটারি একটু ইতস্তত বললেন, ‘ম্যাডাম এখন আসন করছেন। এইসময় কনসেন্ট্রেশন নষ্ট করতে তিনি পছন্দ করেন না। তবু— ।’
ইন্টারকমের বোতাম টিপে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সেক্রেটারি বললেন, ‘ম্যাডাম, আমি অত্যন্ত দুঃখিত। কিন্তু কমিশনার অফ পুলিশ খুব জরুরি ব্যাপারে নিজে কথা বলতে এসেছেন—! ইয়েস, ঠিক আছে ম্যাডাম।’ রিসিভার নামিয়ে রেখে সেক্রেটারি বললেন, ‘আসুন।’
সাধারণত দোকানের পেছন দিকের অফিসেই কয়েকবার তাঁকে যেতে হয়েছে। ম্যাডামের খাসমহলে ঢোকার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় মনে হল এই ভদ্রমহিলার রুচি আছে। কী চমৎকার সাজানো সব কিছু। নির্দিষ্ট একটি ঘরের বন্ধ দরজায় টোকা দিলেন সেক্রেটারি। ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে এল, ‘কাম ইন, প্লিজ।’
সেক্রেটারি ইঙ্গিত করতেই ভার্গিস দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। ম্যাডাম বসে আছেন একটা কাঠের চেয়ারে। তাঁর ঊর্ধ্বাঙ্গে বা সাদা তোয়ালে জড়ানো। নিম্নাঙ্গে ট্র্যাকস্যুট গোছের কিছু। কাছে যেতেই বললেন, ‘সুপ্রভাত। বসুন মিস্টার ভার্গিস।’
বসার ইচ্ছে না থাকলেও আশে পাশে তাকিয়ে কোনও চেয়ার দেখতে পেলেন না ভার্গিস। একটা বেঁটে মোড়া সামনে রয়েছে। সেটাকেই টেনে নিতে হল। বসেই মনে হল ভদ্রমহিলার অনেক নীচে তিনি, মুখ তুলে কথা বলতে হবে।
‘কি খাবেন? চা না কফি?’
‘ধন্যবাদ। এখন আমি খুবই ব্যস্ত— ।’
‘স্বাভাবিক। সময়সীমা পার হতে বেশি দেরি নেই।’
‘ম্যাডাম। আমি সবরকম উপায়ে চেষ্টা করছি। আগামী কাল সকালে লোকটাকে ঠিক গ্রেপ্তার করতে পারব।’
‘হঠাৎ এই আত্মবিশ্বাস পেলেন কি করে?’
‘আমি নিশ্চিত।’
‘বাঃ। তাহলে সবাই খুশি হবে। আমার এই লোকটাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে। ধরামাত্র যেন ওকে না মেরে ফেলা হয়। ওর বিচার স্বাভাবিক নিয়মেই হওয়া উচিত। অবশ্য আমার যে কথা শুনতে হবে তার কোনও মানে নেই। আপনাদের মিনিস্টার আছেন— ।’
‘আপনার নির্দেশ আমার মনে থাকবে ম্যাডাম।’
‘এই সময় আমি কারও সঙ্গে দেখা করি না।’ ম্যাডাম উঠলেন। ভার্গিসের মনে হল কে বলবে এই মহিলার যৌবন চলে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। এমন মাপা-শরীরের সুন্দরী তিনি কখনও দ্যাখেননি।
‘আমি দুঃখিত ম্যাডাম।’
‘ঠিক আছে। আমি দেখা করলাম কারণ আপনি বিয়ে করেননি।’
ভার্গিস হতভম্ব। এই ব্যাপারটা যে তাঁর যোগ্যতা হয়ে দাঁড়াবে তা কখনও ভাবেননি।
‘বিবাহিত পুরুষদের আমি ঘেন্না করি। ওদের বাসনার শেষ হয় না। কেন এসেছেন?’ শেষ শব্দ দুটো এত দ্রুত উচ্চারণ করলেন ম্যাডাম যে ভার্গিসের মাথায় ঢুকল না কেন তিনি এখানে এসেছেন। ম্যাডাম হাসলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই আমার শরীর দেখতে এখানে আসেননি?’
এবার নড়েচড়ে বসলেন ভার্গিস। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। আজ্ঞে না। ম্যাডাম আমি একটা খারাপ খবর নিয়ে এখানে এসেছি।’
‘বলে ফেলুন।’
‘ইয়ে, আমি খুবই দুঃখিত, বাবু বসন্তলাল আর জীবিত নেই।’
ম্যাডাম তাঁর সুন্দর মুখটা ওপরে তুললেন, ‘তাই?’
প্রচণ্ড হতাশ হলেন ভার্গিস। তিনি ভেবেছিলেন এই খবরটা ম্যাডামকে খুব আহত করবে। নিজেকে সামলে বললেন, ‘হ্যাঁ।’
গতরাত্রে তাঁর মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে।’
‘কোথায়?’
‘তাঁরই বাংলোয়।’
‘কিন্তু তাঁর তো এখন বিদেশে থাকার কথা।’
‘সেটাই রহস্যের। এমনকি বাংলোর বাইরে তাঁর গাড়ি ছিল না।’
‘আর কে ছিল সেখানে?’
‘কেউ না!’ ভার্গিস বললেন, ‘তবে হত্যাকারী ধরা পড়বেই।’
‘কিরকম?’
‘ওঁর চৌকিদার উধাও হয়েছে। লোকটাকে ধরলেই রহস্যের কিনারা হয়ে যাবে।’
‘লোকটাকে ধরা আপনার কর্তব্য।’
‘হ্যাঁ ম্যাডাম।’
‘কিন্তু আপনি কতগুলো কাজ একসঙ্গে করবেন? আকাশলালকে না ধরতে পারলে—’
‘জানি ম্যাডাম।’
‘কে ওর মৃতদেহ আবিষ্কার করেছিল?’
‘এক ডাক্তার দম্পতি ওখানে আশ্রয়ের জন্যে গিয়ে প্রথম সন্ধান পায়। পরে আমি ফোর্স পাঠিয়ে ডেডবডি নিয়ে আসি।’ খুব দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বললেন ভার্গিস।
‘ওর স্ত্রীকে জানানো হয়েছে?’
‘হাঁ ম্যাডাম।’
‘তাহলে ওর শেষকাজ আজই করে ফেলা হোক।
‘একটু সময় লাগবে বোধহয়।’
‘কেন?’
‘পোস্টমর্টেম করতে হবে। মৃত্যুর কারণ জানা দরকার।’
‘বাবু বসন্তলালের মৃত্যুর কারণ বিষ অথবা বুলেট হলে সেটা জানার পর তো তার প্রাণ ফিরে আসবে না। মিছিমিছি ওই শরীরটাকে কাটাছেঁড়া না করে শেষকৃত্যের জন্যে পাঠিয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয় কি?’ ম্যাডাম দু’পা এগিয়ে এলেন।
ভার্গিস উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর শরীর শিরশির করছিল। বললেন, ‘কিন্তু নিয়ম মানতে হলে—’
‘মিস্টার ডার্গিস, আপনি নিয়ম সবক্ষেত্রে মানেন?’
‘না, তবে— ।’
‘আপনি আমার কাছে যে কারণে এসেছেন সেই কারণেই পোস্টমর্টেম করবেন না।
‘বেশ।’
‘এবার আসতে পারেন।’
ভারী পায়ে ভার্গিস বেরিয়ে এলেন। বাইরে সেক্রেটারি অপেক্ষা করছিল। সেই মহিলাই তাঁকে পথ দেখিয়ে নীচে নামিয়ে আনল। সিঁড়িতে পা দেওয়ামাত্র ভার্গিস শুনলেন সেক্রেটারি তাঁকে ডাকছেন। তিনি কপালে ভাঁজ ফেলতেই মহিলা এগিয়ে। এলেন, ‘ম্যাডাম ইন্টারকমে— ।’
অগত্যা আবার উঠে আসতে হল। রিসিভার তুলে হ্যালো বলতেই ভার্গিস ম্যাডামের গলা শুনতে পেলেন, ‘আপনাকে আমার মনে থাকবে।’ লাইন কেটে গেল।
হেডকোয়ার্টার্সের সামনে এসে দাঁড়াল স্বজন। একটা বীভৎস রাতের শেষ যে এত সহজে হবে তা সে ভাবেনি। এখন খুব ক্লান্তি লাগছে। কিভাবে টুরিস্ট লজে পৌঁছানো যায়? সামনের রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল সে। এই শহরে খুব বড় ধরনের গোলমাল হচ্ছে বা হবে এবং সে নিজের অজান্তে সেই সময়ে এসে পৌঁছেছে। হাঁটতে হাঁটতে সে পোস্টারগুলো দেখতে পেল। আকাশলাল। দশ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে লোকটাকে ধরিয়ে দিতে পারলে। তার মানে ওই লোকটাই পুলিশের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে এসবের তো কোনও সম্পর্ক নেই। অথচ এই শহরে থাকতে হলে পুলিশ কমিশনারের অনুরোেধ তাকে রাখতেই হবে। শব্দটা অনুরোধ কিন্তু মানে হল আদেশ।
হঠাৎ একটা ট্যাক্সি সামনে এসে দাঁড়াল, ‘সাব্?’
খুশি হল স্বজন, ‘টুরিস্ট লজ যাবেন ভাই?’
‘নিশ্চয়ই।’ দরজা খুলে দিল লোকটা। তারপর সামনের ছোট আয়নায় পেছন দিয়ে তাকাল, ‘আপনাকে অনুসরণ করা হচ্ছে স্যার।’
‘তার মানে?’
ট্যাক্সি চলতে শুরু করল। ড্রাইভার বলল, ‘পুলিশের লোক, আমরা বুঝতে পারি।’
স্বজন চকিতে পেছন ফিরে তাকাল। স্বাভাবিক রাস্তা। কাউকেই সন্দেহ করতে সে পারল না। টুরিস্ট লজের সামনে ট্যাক্সি থামলে স্বজন নেমে দাঁড়াতেই ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে গেল। স্বজন অবাক। লোকটা ভাড়া নিল না কেন? তার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। টুরিস্ট লজে ঢুকতেই একটি বেয়ারা গোছের লোক এগিয়ে এল, ‘আপনি ডাক্তার?’
‘হ্যাঁ’
‘সাত নম্বর ঘরে ফ্ল্যাশ কাজ করছে না বলে আপনাদের আট নম্বর ঘর দেওয়া হয়েছে আসুন। লোকটি সামনে এগিয়ে চলল।
১০. বেলা যত বাড়তে লাগল
বেলা যত বাড়তে লাগল তত শহরে পথে মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল। এরা সবাই দেহাতি! পিতামহ পিতাদের অনুসরণ করে প্রতি বছর উৎসবের সময় দু রাতের জন্যে শহরে আসে। এবার শহরে ঢোকার সময় তাদের তন্নতন্ন করে সার্চ করা হয়েছে। সামান্য ছুরি অথবা ভোজালি থাকলে সেটা সরিয়ে ফেলেছে রক্ষীরা। উৎসবের সঙ্গে ধর্ম না জড়ানো থাকলে এই অবস্থায় কেউ শহরে ঢুকত না। ঢুকে তটস্থ হয়ে আছে। সরকারি টিভিতে এইসব মানুষদের দেখানো হচ্ছিল। ভাষ্যকার বলছিলেন, ‘যুগ যুগ থেকে এ রাষ্ট্রের মানুষ উৎসবকে দেখে এসেছে ভালবাসার চোখ দিয়ে। সব টান পেছনে ফেলে গ্রামগ্রামান্তর থেকে সাধারণ অসাধারণ সবাই ছুটে আসেন আগামীকালের আয়োজনে সামিল হতে। অথচ কিছু দেশদ্রোহী তাদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলে সমস্ত আনন্দ দূষিত করে দিতে চাইছে। এরা শুধু সরকারের শত্রু নয় এরা জনসাধারণেরও শত্রু। এই দেখুন, পর্দায় যে বৃদ্ধকে নাতির হাত ধরে হেঁটে আসতে দেখছেন দেশদ্রোহীদের কি অধিকার আছে তাঁর শান্তি কেড়ে নেওয়ার। অতএব শান্তি বজায় রাখতে আপনারা আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করুন। আকাশলাল অথবা তার সঙ্গীদের সন্ধান পাওয়ামাত্র যে কোনও পুলিশ অফিসারকে জানিয়ে দিন।’ এর পরেই পর্দা সাদা এবং শোকের বাজনা বেজে উঠল। তারপরই ঘোষকের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে এদেশের পরম মিত্র বাবু বসন্তলাল আর আমাদের মধ্যে নেই। গতরাত্রে তাঁর মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়েছে। বিশেষভাবে প্রমাণিত, তিনি দেশদ্রোহীদের হাতে নিহত হয়েছেন। দেশদ্রোহীরা বাবু বসন্তলালকে ব্ল্যাকমেইল করতে সক্ষম না হয়ে হত্যা করে। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে এ দেশের অর্থনীতি তাঁর মৃত্যুতে বড় আঘাত পেল। তাঁর মাধ্যমে দেশ বিরাট পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। দেশের এই সুসন্তানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজ সর্বত্র জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে।’ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় ভেসে উঠেছিল বাবু বসন্তলালের যুবক বয়সের ছবি।
আকাশলাল সঙ্গীদের দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে ডেভিড বলে উঠল, ‘মিথ্যে কথা।’
আকাশলাল হাত তুলল, ‘প্রচার খুব বড় অস্ত্র। কিন্তু মনে হয় এটা বুমেরাং হয়ে যাবে।’
হায়দার জিজ্ঞাসা করল, ‘কিভাবে?’
‘বাবু বসন্তলালকে সাধারণ মানুষ অত্যাচারীদের একজন বলেই মনে করত। তার মৃত্যু কোনও ভাবাবেগ তৈরি করবে না। কিন্তু প্রশ্ন হল লোকটা মারা গেল কিভাবে?’
‘সেটা এখনও জানা যায়নি। তবে মারা গিয়েছে কয়েকদিন আগে। ডেডবডি একটা কফিনে ছিল বলে জানতে পেরেছি।’ ডেভিড বলল।
‘কে খুন করল ওকে?’
হায়দার বলল, ‘খুনই যে হয়েছে তার তো প্রমাণ নেই। এমনি মরে যেতে পারে।’
‘এমনি মরে গিয়ে কেউ কফিনে ঢুকে পড়ে না। যে ঢোকাবে সে সবাইকে না জানিয়ে চুপ করে থাকবে কেন? হত্যার দায় আমাদের কাঁধে চাপানো হয়েছে, কিন্তু হত্যাকারী কে? বোর্ড চাইবে না ওকে মেরে ফেলতে। ম্যাডাম—!’ আকাশলাল আচমকা কথা থামিয়ে চোখ বন্ধ করল। হায়দার হাসল। এই একটি ব্যাপারে আকাশলাল তার সঙ্গে কখনই একমত হয়নি। ওই মহিলা, যাঁকে ম্যাডাম বলা হয় তাঁর সঙ্গে মিনিস্টার এবং বোর্ডের ঘনিষ্ঠতা আছে। অথচ মিনিস্টার এবং বোর্ড যে সতর্ক প্রহরায় থাকেন ম্যাডাম ততটা আড়ালে থাকেন না। তাঁকে ইলোপ করে স্বচ্ছন্দে চাপ দেওয়া যেত, কিন্তু আকাশলাল রাজি হয়নি। আজ পর্যন্ত কোনও নারীকে সে আন্দোলনে জড়াতে রাজি হয়নি, তা পক্ষে বা বিপক্ষে, যাই হোক না কেন!
ডেভিড বলল, ‘এর প্রতিবাদ করা দরকার। বাবু বসন্তলালের খুনের দায় আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এটা জনসাধারণকে বোঝাতে হবে।’
আকাশলাল হাত তুলল, ‘জলে যেখানে হাঙরের সঙ্গে লড়াই সেখানে একটা কুমিরের মৃত্যু নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না। আমি ভাবছি, লোকটাকে মারল কে? যাকগে, ডাক্তার এবং তার স্ত্রী কেমন আছে?’
হায়দার বলল, ‘ওরা খুব ঘাবড়ে গেছে। ভার্গিস যে আচরণ করল তাতে ঘাবড়ে যাওয়া স্বাভাবিক।’
‘কাল সকালের আগে আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
‘যেভাবেই হোক করতে হবে। আজ ট্যাক্সিতে আমাদের লোক ওকে টুরিস্ট লজে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। তখনই ওকে তুলে আনা যেত। কিন্তু ওর স্ত্রী বিপদে পড়ত। মেয়েটা ভাল।’
‘হায়দার, আমাদের কোনও ভাল মেয়েকে দরকার নেই। একজন ডাক্তার প্রয়োজন। ওদের পেছনে ফেউ লেগে থাকলে তাকে সরিয়ে আজই এখানে নিয়ে আসার চেষ্টা করো।’
‘এখানে না এনে যদি দু নম্বর ক্যাম্পে নিয়ে যাই? ওখানে আমাদের ডাক্তার আছেন?’
‘না। একে এখানেই দরকার।’
মেকআপ নিয়ে নিজের ভোল বদলাতে হায়দারের জুড়ি নেই। তার অনেকগুলো প্রিয় ছদ্মবেশের মধ্যে একটি হল পুলিশ অফিসারের মেকআপ। টুপি পরলে সেটাই অনেকটা আড়ালের কাজ করে। ড্রাইভারের পাশে বসে জিপে চেপে ওই পোশাকে যাওয়ার সময় বেশ আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। অথচ কখনও যদি সে কাউকে চরম ঘৃণা করে তাহলে তাকে পুলিশ অফিসার হতেই হবে। দশ বছর বয়স থেকে সেই ঘৃণাটা তার বুকে সাপটে বসেছে।
অনেকটা পথ। পেছনে হাঁটলে মনে হবে শেষ নেই পথের। গ্রামটা ছিল শান্ত। পাহাড়ি। মানুষগুলো অভাবী। অভাব থাকলেও অসুখ ছিল না। শীতকালে অঢেল কমলালেবু হত, ভুট্টার চাষ হত, আলু ফলত মাটিতে। তাই বিক্রি করে কোনও মতে সারা বছর বেঁচে থাকা। হায়দারের যখন দশ বছর বয়স তখন একটা পুলিশের দল এল গ্রামে। গ্রামের সবাই কৌতূহলী হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিল পুলিশ দেখতে। প্রত্যেকের হাতে বন্দুক, মুখ পাথরের মত শক্ত। ওদের অফিসার চিৎকার করে বলল, ‘একজন খুনি আসামি এই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে বলে খবর এসেছে। আমি চার ঘন্টার মধ্যে লোকটাকে চাই। তোমরা তাকে বের করে দাও।’
চিৎকারটায় এমন কিছু ছিল যে সবার মুখ শুকিয়ে গেল। হায়দারের বাবা দু’পা এগিয়ে গেলেন, ‘আমাদের গ্রামে কোনও খুনি নেই অফিসার।’
অফিসার বলল, ‘প্রতিবাদ করা আমি পছন্দ করি না। দ্বিতীয়বার এই কথা যেন না শুনি।’
ওরা গ্রামের ছোট্ট প্রাথমিক স্কুল বাড়িটা দখল করে বসল। একজন সেপাই এসে হুকুম করল ভাল মদ এবং মাংস পাঠিয়ে দিতে। সবাই বুঝে গিয়েছিল আদেশ মান্য করতে হবে। কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে তারা নিজেদের মধ্যে কাউকে খুনি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারল না।
খাওয়া দাওয়ার পর হঠাৎ গুলির শব্দ শোনা গেল। বন্দুকটা আকাশের দিকে তুলে অফিসার এগিয়ে এল, ‘খুনি কোথায়? আর কতক্ষণ বসে থাকব?’
গ্রামের যিনি প্রধান এবং বয়স্ক মানুষ তিনি বললেন, ‘হজুর, তেমন কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না’।
হঠাৎ অফিসার প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। তার চোখ হায়দারের বাবার ওপর দুবার ঘুরে গেল, ‘অ্যাই, এদিকে আয়, তোর নাম কি?’
‘ফারুক।’
‘তুই চল আমার সঙ্গে। তুই-ই খুনি।’
‘সে কি! আমি কেন খুনি হতে যাব?’
‘চোপ! কোনও কথা নয়। এই, একে বেঁধে ফ্যালো।’ হুকুম পাওয়ামাত্র সেপাইরা এসে সবার সামনে ফারুকের হাত বেঁধে ফেলল।
দশ বছরের হায়দার চিৎকার করল, ‘তোমরা এ কি করছ? আমার বাবাকে বাঁধছ কেন?’ সে ছুটে গেল বাবার কাছে। সঙ্গে সঙ্গে একটা সেপাই তার শরীরে লাথি ঝাড়ল। ছিটকে পড়ে গেল সে একপাশে। যন্ত্রণায় পা অসাড় হয়ে যাচ্ছিল।
গ্রাম-প্রধান বললেন, ‘আমরা ফারুককে জানি। সে কখনই খুন করেনি।’
‘আমি বলেছি খুন করেছে, এর ওপরে কথা চলবে না। আজ বিকেলের মধ্যে একটা সবল খুনি আমি কোথায় পাব? সব তো রোগা পটকা। খুনি না নিয়ে গেলে চাকরি থাকবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি বাধা দিতে আসো, অথবা আপত্তি করো তাহলে— ।’ দ্বিতীয় বার গুলি চালাল লোকটা, ‘আকাশে নয়, তোমাদের মাথায় গিয়ে বিঁধব।’
হায়দারকে জড়িয়ে ধরে তার মা বসেছিল মাটিতে। বসে চুপচাপ কাঁদছিল। যন্ত্রণা সত্ত্বেও হায়দার তাকে বলেছিল, ‘আমু আবুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। আবু কিছু করেনি। তুমি বাধা দাও।’
মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘কি করব বাবা, কি করে বাধা দেব।’
পরে, বাহিনী চলে যাওয়ার পরে গ্রামের মানুষরা সিদ্ধান্ত নিল, হয়তো মদ্য পান করেছিল বলেই অফিসারের মাথা ঠিক ছিল না। খবর এসেছে, ওরা পাঁচ মাইল দূরের জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে আজ রাত্রে। সেখানে পুলিশের একজন কর্তাও আছেন। তাঁর কাছে গিয়ে সব বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই তিনি ফারুককে ছেড়ে দেবেন।
হায়দার তখন ভাল করে হাঁটতে পারছিল না। পাঁচ মাইল রাস্তা তাকে বয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। অতএব গ্রাম-প্রধানের সঙ্গে তার মা রওনা দিল। হায়দারের দুই কাকাও সঙ্গী হল। যতই যন্ত্রণা হোক বিছানায় যেতে পারেনি হায়দার সেই রাতে। বাড়ির সামনে ইউক্যালিপটাস গাছের নীচে ঢাউস পাথরটার ওপর বসে ছিল চুপচাপ। অন্ধকার নামল। পাহাড়ময় জোনাকিরা ঘুরে বেড়াতে লাগল মিটমিটিয়ে। ওরা ফিরে আসছিল না। এল যখন তখন রাত দুপুর। এল চোরের মতো। গ্রামে ফিরে যে যার ঘরে ঢুকে যাচ্ছিল। হায়দার দেখল বাবা তো নয় মাও দলটায় নেই। সে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমার মা কোথায়?’ বাবা নয়, মায়ের কথাই তার আগে মনে পড়েছিল। সেই চিৎকার শুনে ঘুমন্ত মানুষেরা উঠে এল বিছানা ছেড়ে। ভূতের মত মানুষগুলোকে ঘিরে তারা যখন প্রশ্ন করে যাচ্ছিল তখনও হায়দার হাঁটতে পারছিল না দুই পায়ে। তবু ভিড় ঠেলে সে গ্রাম- প্রধানের সামনে পৌঁছে গিয়েছিল। তাকে দেখে বয়স্ক মানুষটা হঠাৎই সজোরে কেঁদে উঠল। এক কাকা বলল, ‘ও বড় ছোট, ওকে এসব বলার দরকার নেই।’
গ্রাম-প্রধান মাথা নাড়লেন কাঁদতে কাঁদতে, ‘না। ওকে বলা দরকার। এ জানুক।’
তারপর সে ঘটনাটা শুনেছিল। ওরা পাশের সেই জমিদার বাড়িতে পৌঁছেছিল সন্ধের আগেই। ওদের বলা হয়েছিল বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সন্তুষ্ট হওয়ামাত্র ছেড়ে দেওয়া হবে। ওরা অপেক্ষায় বাইরে বসেছিল অনেকক্ষণ। তারপর গ্রাম-প্রধান সেই বড় অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। তাঁকে বলা হল দেখা করা যাবে না। ওরা কি করবে যখন বুঝতে পারছিল না তখন জমিদারবাবু উদভ্রান্তের মত বেরিয়ে এলেন। যেতে যেতে হঠাৎ দলটাকে দেখে থমকে গেলেন। তারপর গ্রাম-প্রধানকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তারা ওখানে এসেছে? লোকটার যতই দুর্নাম থাকুক, গ্রাম-প্রধানের মনে হয়েছিল হাজার হোক চেনা মানুষ। তিনি নিজেদের দুঃখের কথা খুলে বলে সাহায্য চাইলেন। জমিদারবাবু বললেন, ‘অফিসার খুব কড়া লোক। তিনি তোমাদের সঙ্গে দেখা করবেন না। অবশ্য একটা উপায় আছে।’ লোকটা গলা নামাল, ‘ফারুকের বউ যদি গিয়ে অনুরোধ করে তাহলে কাজ হতে পারে।’
গ্রাম-প্রধান বললেন, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে যাব।’
‘তাহলে গ্রামে ফিরে যাও। তাছাড়া ওই পোশাকে গেলে অফিসার ফারুকের বউকেই ঢুকতে দেবে না। ওকে জমিদার বাড়ির মেয়েদের পোশাক পরতে হবে।’
‘কেন?’ গ্রাম-প্রধানের মাথায় কিছু ঢুকছিল না।
‘উনি শুধু আমার বাড়ির মেয়েদের সম্ভ্রম করেন। এখন ও যদি সেই পোশাকে যেতে চায় তাহলে আমি ব্যবস্থা করতে পারি।’
গ্রাম-প্রধানের ইচ্ছে ছিল না কিন্তু হায়দারের মা মরিয়া হয়ে গেলেন। যেভাবেই হোক স্বামীর মুক্তির জন্যে তিনি বড় অফিসারের কাছে পৌঁছাতে চাইলেন। জমিদারবাবু তাকে নিয়ে গেলেন ভেতরে। তার কিছুক্ষণ পরে একজন সেপাই এসে হাসিমুখে বলল, ‘তোরা গ্রামের মানুষরা এক একটা গর্দভ। বড় অফিসার ফুর্তি করার জন্যে জমিদারবাবুর কাছে মেয়েমানুষ চেয়েছিল। চাষাভুশশা নয়, সম্রান্ত ঘরের মেয়ে। তার মানে জমিদারবাবুর বউ অথবা বোন। তিনি সুযোগ পেয়ে তোমাদের ওই মেয়েটাকে নিজের বউ সাজিয়ে বড় অফিসারকে ভেট দিলেন।’
দশ বছর বয়সে ভেট শব্দটার মানে ঠিকঠাক না বুঝলেও হায়দার বুঝেছিল, মায়ের একটা বড় রকমের ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। গ্রাম-প্রধান বলছিলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেও ভেতরে যেতে পারলাম না। সেপাইরা আমাদের ঢুকতে দিল না। শেষ পর্যন্ত একজন দয়া করে জানিয়ে দিল ফারুককে ওখানে নিয়ে যাওয়াই হয়নি। পথেই ওকে গুলি করে নদীর জলে ফেলে দিয়ে গিয়েছে ওরা। বড় অফিসারের কাছে বদলি অপরাধীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ওরা নিতে চায়নি।’ ফেরার সময় আমরা নদীর কাছে অনেক খুঁজেছি। এই রাত্রে কিছুই ভাল দেখা যায় না। কিন্তু মনে হচ্ছে জলে ফেলে দিলে ফারুককে খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ গ্রাম-প্রধান দুহাতে মুখ ঢাকলেন। .
কেউ কেউ কাঁদল। বাকিরা মুখ বন্ধ করে রইল অনেকক্ষণ। একজন গ্রামবৃদ্ধা বলল, ‘তোমরা বউটাকে ওখানে ফেলে রেখে চলে এলে?’
‘সকালের আগে ছাড়বে বলে মনে হয় না। বেরিয়ে এসে যখন শুনবে ফারুক বেঁচে নেই— ।’
‘ছেলেটা তো শুনছে।’
এবার সবার চোখ ঘুরে এল হায়দারের ওপর। সবাই দেখল পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, চোখ জ্বলছে। শরীরের যন্ত্রণা অতিক্রম করে অন্যরকম আগুনে জ্বললে কোনও কোনও মানুষের চেহারা অমন হয়। একজন মহিলা তাকে ঘরে নিয়ে যেতে চাইলে হায়দার তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল, ‘আমি ওদের ছাড়ব না। ওদের না মারা পর্যন্ত আমি থামব না।’
গ্রাম-প্রধান বললেন, ‘চুপ কর বাবা, এসব কথা বলতে নেই।’
লেংচে লেংচে জটলা থেকে সরে এসেছিল হায়দার। তারপর ভোর হবার আগে ওই শরীর নিয়ে হাঁটতে শুরু করেছিল। গ্রামের কিছু লোক তার পেছন পেছন এসেছিল। কিন্তু জমিদার বাড়ি পর্যন্ত যেতে হয়নি তাদের। নদীর ধারে রাস্তার পাশে একটা গাছের ডালে হায়দার তার মাকে ঝুলে থাকতে দেখেছিল। উঃ, কী বীভৎস! বাবার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। মাকে সৎকার করেও তার চোখে জল আসেনি। কান্না তার চোখ থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল চিরদিনের জন্যে।
অনেক অনেকদিন পরে, বিপ্লবী পরিষদ গঠন হবার পর সরকার যখন তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে তখন এক শীতের সকালে হায়দার ফিরে এসেছিল গ্রামে। সংগঠনের কাজে জড়িয়ে পড়ায় তার নামও ততদিনে দেশের মানুষ কিছুটা জেনেছে। গ্রাম-প্রধান তখনও বেঁচে, কিন্তু অশক্ত। হায়দারকে দেখে তিনি খুশি হলেও ভয় পেলেন, ‘কেন এলি? খবর পেলেই ওরা ছুটে আসবে। দরকার থাকলে কাউকে দিয়ে জানিয়ে দিলেই আমরা কাজটা করে দিতাম।
‘আমি যে দরকারে এসেছি তা না এলে হবে না। তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।
‘কোথায়?’
‘জমিদারবাড়িতে।’
‘সর্বনাশ! সেখানে কেন?’ ‘
‘আমার একটা হিসেব মেটাতে হবে। চলো।’
সঙ্গে ছেলেরা ছিল অস্ত্র নিয়ে। পাহাড়ি পথে হেঁটে ওরা পৌঁছে গেল জমিদারবাড়িতে। গ্রাম-প্রধানের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। এখন সেপাইরা গ্রামে নেই। বাড়ির দরজায় একজনমাত্র পাহারাদার। তাকে গ্রাম-প্রধান বললেন, ‘জমিদারবাবুর সঙ্গে দেখা করব ভাই!’
‘দেখা হবে না। এখন তিনি তেল মালিশ করাচ্ছেন।’
‘বল গিয়ে, খুব জরুরি খবর নিয়ে এসেছি। দেরি হলে আফশোস হবে।’
এসব কথা হায়দার তাঁকে শিখিয়েছিল। এবার পাহারাদার ভেতরে চলে গেল। গ্রাম-প্রধান জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোদের মতলবটা কি তা এখন পর্যন্ত বললি না।’
‘আমি অন্যায় কাজ করব না।’
একটু বাদে লোকটা ফিরে এল আর একজনকে সঙ্গে নিয়ে। সে শুধু গ্রাম-প্রধানকে ভেতরে আসতে বলল, বাকিরা বাইরে থাকবে। গ্রাম-প্রধান মাথা নাড়লেন, ‘এই ছেলেকে ছাড়া আমি তো হাঁটতে পারব না ভাই।’ লোকটা বিরক্ত হয়ে হায়দারকেও অনুমতি দিল।
সঙ্গীদের ইশারা করে হায়দার বৃদ্ধকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। বাগানটা একটু অগোছালো, দেখলেই বোঝা যায় মালিকের ক্ষমতা আর আগের মত নেই। বিশাল বাড়িটার যে কক্ষে ওদের নিয়ে আসা হল তাতে অবশ্য বিলাসদ্রব্যের ছড়াছড়ি। শ্বেতপাথরের চেয়ারে বসে সাদা শুয়োরের মত একটা লোক তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। লোকটার মেদ তেলে চকচক করছে। দুজন মেয়েমানুষ তার দুই পায়ে তেল মালিশ করছিল। যে লোকটা হায়দারদের নিয়ে এসেছিল সে এগিয়ে গিয়ে কানে কানে কিছু বলল। জমিদারবাবু হাসলেন। হায়দার লক্ষ করল তাঁর একটাও দাঁত নেই।
‘খবরটা কি?’
গ্রাম-প্রধান হায়দারের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, ‘হুজুর। আমরা অসুবিধেয় পড়েছি। শহর থেকে খুব সুন্দরী এক যুবতী এসে গ্রামে বাস করছে, তা জোর করেই আছে।’
‘সুন্দরী? যুবতী? পাঠিয়ে দে, পাঠিয়ে দে।’ জমিদারবাবু চিৎকার করে উঠলেন। আনন্দে।
হায়দার বলল, ‘বলেছিলাম। আসবে না।’
‘কেন? আমি জমিদার, আসবে না কেন?’
বলল, আপনি নাকি অনেকবছর আগে আপনার বাড়ির বউকে ভেট দিয়েছিলেন এক পুলিশ অফিসারকে। তারা তখন আপনার বাড়ি দখল করে ছিল।’
‘শুয়োরের বাচ্চা। যে একথা বলে তার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব।’ অশক্ত প্রায় পঙ্গু জমিদারবাবু এমন রেগে গেলেন যে তাঁর চর্বি কাঁপতে লাগল, ‘যাকে দিয়েছিলাম সে ছিল এক চাষার বউ। কি নাম যেন তার স্বামীর? ফারুক। হ্যাঁ, তার বউ। আমার বউয়ের জামা পরিয়ে দিয়েছিলাম বলে অফিসার ব্যাটা টেরও পায়নি। তবে বউটা ছিল শয়তান। কিছুতেই বাগ মানল না। ভোরবেলায় গলায় দড়ি দিয়ে মরল।
গ্রাম-প্রধান দেখলেন হায়দারের হাতে একটা কালো চকচকে অস্ত্র। সে সামনে এগিয়ে গেল, ‘শোন রে কুত্তা, দোজখে গিয়ে তুই বসে থাকবি যতদিন না সেই অফিসারটা সেখানে যায়। আমাকে চিনিস? আমার মাকে যা করেছিস তার বদলা নেবার জন্যে এতকাল আমি অপেক্ষা করে এসেছি।’ শব্দ হল। জমিদারবাবুর শরীরটা মুহুর্তেই ঢলে পড়ল। হায়দার ঘুরে দাঁড়িয়ে পথ দেখিয়ে আসা লোকটাকেও গুলি করল। তারপর মেয়ে দুটোকে বলল, ‘তোমাদের কিছু বলব না। আজ থেকে তোমরা মুক্তি পেলে। তবে যদি পুলিশের কাছে আমার কথা ফাঁস করো— ।’
ভয়ে কুঁকড়ে থাকা মেয়েদের একজন বলে উঠল, ‘কক্ষনো না।’
গ্রাম-প্রধান পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। তাকে টানতে টানতে হায়দার বাগানে নেমে এল। তার সঙ্গীরা তখন বাগানে চলে এসেছে। হায়দার জিজ্ঞাসা করল, ‘পাহারাদারটা?’
‘ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে।’
বাড়ির বাইরে পাকদণ্ডির রাস্তায় পৌঁছে হায়দার গ্রাম-প্রধানকে বলেছিল, ‘কেউ তোমাকে দ্যাখেনি। যারা দেখেছিল তারা কথা বলতে পারবে না। শত্রুর সঙ্গে লড়াই করার আগে দালালদের সরিয়ে ফেলা দরকার। তাছাড়া এটা আমার কর্তব্য ছিল। তুমি একা ফিরতে পারবে?’
গ্রাম-প্রধান কেঁদে ফেলেছিল, ‘তোর মতো যদি আমার একটা ছেলে থাকত!’
পুলিশ অফিসারের ছদ্মবেশে রাস্তায় বের হলে হায়দারের একটাই ভয় হয়। তার দলেরই কেউ যদি ভুল বুঝে গুলি চালিয়ে দেয়। অবশ্য ভার্গিসের সেপাইগুলো যখন তাকে স্যালুট করে তখন বেশ মজা লাগে। মোটরবাইকটা পুলিশেরই। নাম্বারপ্লেট পাল্টে নেওয়া হয়েছে। হায়দার সেটা চালাচ্ছিল ধীরে ধীরে। এর মধ্যেই শহরের রাস্তায় লোক জমে গেছে। কাল তো হাঁটাই মুশকিল হবে। আকাশলাল যে ফন্দি এঁটেছে তা শুনতে বেশ, কিন্তু একটু গোলমাল হলেই ওকে হারাতে হবে। আর এই মুহূর্তে আকাশ সঙ্গে না থাকলে তাদের এখান থেকে পালানো ছাড়া কোনও উপায় নেই।
টুরিস্টলজের কাছে পৌঁছে সে দেখল দুজন সেপাই দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখামাত্রই স্যালুট ঠুকল তারা। হায়দার জিজ্ঞাসা করল, ‘ভেতরে আছে?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘ঠিক আছে। তোমরা যাও। আমি এখানে থাকব।’
‘আমরা যাব স্যার?’
‘হ্যাঁ। বড় সাহেব আমাকে থাকতে বলেছেন।’
লোক দুটো ছাড়া পেয়ে খুশি হল। এখানে পুতুলের মত না দাঁড়িয়ে থেকে শহরের পথে ঘুরলেই পকেট ভর্তি হয়ে যাবে। হাজার হাজার গেঁয়ো মানুষ মুরগির মত ঢুকছে। লোক দুটো চলে গেলে হায়দার লজের ভেতর ঢুকল। সাত নম্বর ঘরে ওদের থাকার কথা। সে ওপরে উঠতেই এগিয়ে আসা একটি মানুষ কাষ্ঠহাসি হাসল, ‘হুকুম করুন স্যার?’
‘করিম, আমি হায়দার।’
‘আই বাপ! একদম চিনতে পারিনি। ওদের ঘর বদল করে দিয়েছি। আসুন।’
‘একটা ট্যাক্সি ডাকো। এক্ষুনি।’
ঘর চিনিয়ে দিয়ে হোটেলের সেই লোকটি চলে গেলে দরজায় টোকা দিল হায়দার। তারপর ভেতরে ঢুকল। ওরা দুজন চুপচাপ দুটো চেয়ারে বসে ছিল। হায়দার বলল, ‘আপনাদের এই হয়রানির জন্য দুঃখিত। কিন্তু কিছু করার নেই। সরকার আপনাদের এখান থেকে বহিষ্কৃত করেছেন!’
‘মানে?’ স্বজন উঠে দাঁড়াল।
‘এখনই এই শহর থেকে আপনাদের ফিরে যেতে হবে।’
‘ও ভগবান। বেঁচে গেলাম।’ পৃথা বলে উঠল।
‘কিন্তু যারা আমাকে ডেকেছে— ।’ স্বজনের তখনও দ্বিধা।
‘এখনই না গেলে দুজনকেই জেলে পচতে হবে। আসুন।’
অতএব ওরা দুজন হায়দারের পেছন পেছন বেরিয়ে এল। বের হবার আগে স্বজন একটা সুটকেস তুলে নিল, পৃথা দ্বিতীয়টা। টুরিস্ট লজের সামনে তখন ট্যাক্সি এসে গেছে। পাশে করিম দাঁড়িয়ে। ওদের ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে করিম বলল, ‘মুকবুল খুব ভাল ছেলে স্যার।’
হায়দার ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে ছেলেটা হাসল।
নিজের বাইকে স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে যেতে ট্যাক্সিটা তাকে অনুসরণ করল।
উল্টোদিকের রাস্তায় ওষুধের দোকানে বসে থাকা একটা লোক দৃশ্যটা দেখে এমন হতভম্ব হয়ে পড়েছিল যে কি করবে বুঝতে পারছিল না। তারপর খেয়াল হল একজন পুলিশ অফিসার ওদের নিয়ে গেলেও তার যখন ছায়ার মত লেগে থাকার কথা তখন ঘটনাটা হেডকোয়ার্টার্সে জানানো দরকার। সে ওয়াকি টকির সুইচ অন করল, ‘হ্যালো, হেডকোয়ার্টার্স, হ্যালো— হ্যালো— এস বি ফাইভ বলছি—।’
১১. শহরের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তে
ক্রমশ ওরা শহরের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তে চলে এল। এদিকটায় জনবসতি কম। মোটামুটি বর্ধিষ্ণু মানুষেরা অনেকটা জায়গা জুড়ে বাগানঘেরা বাড়িতে থাকেন। হায়দার ইশারা করতেই ট্যাক্সি থামল। ড্রাইভার নিজে দরজা খুলে সুটকেশ দুটো নীচে নামিয়ে ইঙ্গিত করল নেমে আসতে। স্বজন এবং পৃথা একটা কথাও বলেনি টুরিস্ট লজ থেকে চলে আসার পথটুকুতে। স্বজন এখন জিজ্ঞাসা করল, ‘এখানে কেন?’
সামনে বাইক দাঁড় করিয়ে হায়দার ততক্ষণে কাছে এসে গেছে, ‘এখানে একটু যেতে হবে আপনাদের। কিছু রুটিন চেকআপ আছে তারপর— !’ সে হাসল।।
‘ট্যাক্সি থেকে সুটকেশ নামানো হল কেন?’
‘ট্যাক্সিটার এর ওপারে যাওয়ার পারমিট নেই। আপনি নির্দিধায় নামতে পারেন।’ হায়দার আবার হাসল। অতএব স্বজন এবং পৃথাকে নামতেই হল। পৃথা লক্ষ করছিল, ট্যাক্সির ড্রাইভার বারংবার দুপাশে তাকাচ্ছে। ওরা নেমেআসা মাত্র ওঠে পড়ল ট্যাক্সিতে। সেটাকে ঘুরিয়ে বেশ জোরেই ফিরে গেল শহরের দিকে। স্বজন বলে উঠল, ‘আরে! লোকটা ভাড়া নিল না।’
হায়দার মাথা নাড়ল, ‘এখন তো দায়িত্ব আমাদের, ওটা নিয়ে চিন্তা করবেন না। আপনারা সুটকেশ নিয়ে আমার পেছনে আসুন।’ সে এগিয়ে গিয়ে বাইক চালু করে পাশের প্রাইভেট লেখা রাস্তায় ঢুকে পড়ল। স্বজন এবং পৃথা একটা করে সুটকেশ তুলে নিল। স্বজন বলল, ‘আমার ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে ওরা আমাদের আটকে রাখতে যাচ্ছে।’
‘ওদের কি লাভ আমাদের আটকে?’ চাপা গলায় বলে উঠল পৃথা।
‘জানি না। তবে এই শহরে একটা পলিটিক্যাল গোলমাল চলছে। সেই এক্স পুলিশ-অফিসার বলেছিল কেউ সশস্ত্র বিপ্লব করে ক্ষমতা দখল করতে চায়। আজ এখানকার পুলিশ কমিশনারের যে চেহারা দেখলাম তাতে অমন কিছু হওয়া অসম্ভব ব্যাপার নয়।’ হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিল স্বজন। তাদের হাত দশেক দূরে হায়দার ধীর গতিতে বাইক চালাচ্ছিল। বাইকের আওয়াজে কোনও কথাই তার কানে যাওয়া সম্ভব নয়। দুপাশে গাছ-গাছালি। পাখি ডাকছে। সামনে গাছের আড়ালে একটা দোতলা বাড়ির আভাস।
পৃথা বলল, ‘আমার আর ভাল লাগছে না। তুমি এমন জায়গায় বেড়াতে এলে!’ স্বজন অপরাধীর গলায় বলল, ‘পৃথা, তোমার কাছে লুকিয়ে লাভ নেই। এরা আমার কাছে একটা পেশেন্টকে দেখার প্রস্তাব দিয়েছিল। জায়গাটা পাহাড়ি বলেই ভেবেছিলাম সেইসঙ্গে তোমাকে নিয়ে একটু বেড়িয়ে যেতেও পারব। এখানকার গোলমালের কথা স্যার জানতেন কি না জানি না কিন্তু আমি বিন্দুবিসর্গ জানতাম না।’
‘কারা তোমায় প্রস্তাব দিয়েছিল?’
‘স্যারের মাধ্যমে প্রস্তাব এসেছিল। বলেছিল টুরিস্ট লজে আমার নামে ঘর বুক করা থাকবে। আমি এলেই ওরা যোগাযোগ করবে।’ কথা থামিয়ে দিল স্বজন। হায়দার মোটরবাইক থেকে নেমে পড়েছে। বাড়িটার সামনে বাইক দাঁড় করিয়ে সে অপেক্ষা করল ওদের জন্যে। তারপর পৃথার দিকে হাত বাড়াল, ‘এবার সুটকেশটা আমাকে দিন।’
পৃথা মাথা নাড়ল, ‘না। ঠিক আছে।’
ওরা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আসতেই চাকরণগাছের একজন বেরিয়ে এল দরজা খুলে। হায়দার স্বজনকে বলল, ‘সুটকেশ দুটো এখানেই রেখে দিন। কোনও চিন্তা নেই।’
ওরা যে ঘরে ঢুকল তার দুটো বড় জানালা। স্বজন লক্ষ করল দুজন লোক দুই জানলায় বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর থেকে তাদের সামনেটা দেখা না গেলেও ওদের হাতে যে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র আছে তা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়। হায়দার সেই ঘরে দাঁড়ায়নি। ওদের নিয়ে সে সটান ভেতরে চলে এল। এটা একটা হল ঘর। গোটা চারেক মানুষ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে। তারা হায়দারকে দেখে মাথা নাড়ল। বাঁদিকে দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ি। সিঁড়ির নীচে একটা ঘরের দরজা খুলে হায়দার বলল, ‘এখানে আপনারা বিশ্রাম করুন।’
‘বিশ্রাম করব মানে?’ স্বজন অস্বস্তিতে পড়ল।
‘আপনারা যেখানে ছিলেন সেখানে বিপদে পড়তেন। এখানে আপনারা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
‘আশ্চর্য! আপনি তখন বললেন আমাদের শহর থেকে বাইরে চলে যেতে হবে।’
‘ওকথা না বললে আপনাদের আনতে পারতাম না। আপনি ভেতরে যান, আমি একটু পরেই আসছি।’ হায়দারের ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যে স্বজন অমান্য করতে পারল না। ওরা ভেতরে ঢোকামাত্রই হায়দার বলে গেল দরজাটা ভেজিয়ে। ঘরটা বড়। দুটো সিঙ্গল বিছানা, একটা টেবিল, টিভি এবং বাথরুমটা গায়েই। এক কোণে দুটো সোফা রয়েছে। পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘কি ব্যাপার বলো তো?’
‘মনে হচ্ছে আমাদের অ্যারেস্ট করা হয়েছে।’
‘অ্যারেস্ট করলে এমন সাজানো ঘরে রাখবে কেন?’
‘সেটাও ঠিক। যে লোকটা নিয়ে এল সে পুলিশ অফিসার, বলল, রুটিন চেক আপ করবে, অথচ এখানে যারা অস্ত্র নিয়ে ঘুরছে তাদের শরীরে পুলিশের ইউনিফর্ম নেই। যাকগে, যা হবার হবে।’ দরজায় টোকা পড়ল। তারা জবাব দেবার আগেই দুটো সুটকেশ সেই চাকরগোছের লোকটা রেখে দিয়ে গেল।
জুতো পরেই স্বজন একটা বিছানায় শুয়ে পড়ল, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে!’
‘এই অবস্থাতেও তোমার ঘুম আসছে?’ ফোঁস করে উঠল পৃথা।
‘এই অবস্থা মানে?’ কাত হল স্বজন, ‘অবস্থা তো চমৎকার। ভাল ঘর, আরামদায়ক বিছানা, এক কাপ কফি পেলে মন্দ হত না, যাকগে। বিনি পয়সায় তোফা আছি। শোনো, ঘুম থেকে উঠে তোমার সঙ্গে প্রেম করব। অতএব তুমিও চেষ্টা করো ঘুমিয়ে নিতে!’
‘পারো। তুমি সত্যি পারো।’ পৃথা কিছু করতে না পেরে বাথরুম কাম টয়লেটে চলে এল। ঝকমকে পরিষ্কার। টয়লেট পরিষ্কার দেখলে যাদের মন নরম হয় পৃথা তাদের একজন। সে আয়নায় নিজেকে দেখল, পেত্নির মতো দেখাচ্ছে। আয়না থেকে তার চোখ আর একটু ওপরে উঠতেই আলো দেখতে পেল। কাচ চুঁইয়ে আলো ঢুকছে ঘরে। তার মনে হল ওখানে চোখ রাখলে বাইরেটা দেখা যেত। তাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে।
এদের নজর এড়িয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবেই। স্বজনের সে-ব্যাপারে কোনও হুঁসই নেই। দিব্যি বিছানায় শুয়ে পড়ল! ওপরে ওঠার কোনও সুযোগ নেই। বাইরেটা দেখতে হলে এঘর থেকে বেরুতে হবে। মুখে জল দিয়ে ধবধবে পরিষ্কার তোয়ালেটা চেপে ধরে আরাম পেল পৃথা। এবং সেই মুহূর্তে স্বজনের কথাটা মনে আসতেই নতুন করে ভাবনা এল। স্বজনকে নিশ্চয়ই সশস্ত্র বিপ্লবীরাই এখানে আমন্ত্রণ করে এনেছে। নইলে পুলিশ তাদের পেছনে এভাবে লাগবে কেন? সশস্ত্র বিপ্লব যারা করে তাদের স্বজনের মতো ডাক্তারের প্রয়োজন হবে কেন? স্বজন কি ব্যাপারটা জেনেও তাকে সব খুলে বলছে না?
এই সময় দরজায় শব্দ হল। সেই লোকটি ট্রে নিয়ে ঢুকল। তাতে কফি পট, কাপ ডিস এবং একটা প্লেটে অনেকগুলো বিস্কুট। পৃথা বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে। টেবিলের ওপর ট্রে নামিয়ে লোকটা নীরবে চলে যাওয়ার সময় দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গেল। পৃথা বুঝল দরজা নেহাতই ভেজানো, বাইরে থেকে আটকে দেওয়া হয়নি। সে দেখল স্বজন উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। ইতিমধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে কি না কে জানে। কফিপটের ঢাকনা খুলে সে গন্ধ নিল। চমৎকার। সে দূরে দাঁড়িয়েই ডাকল, ‘কফি দিয়ে গেছে, খাবে?’
সেইভাবে শুয়েই স্বজন জবাব দিল, ‘হুঁ।’
‘ঘুমাওনি তাহলে!’ পৃথা কফি বানাতে লাগল।
‘ঘুম আসছে না। অথচ টায়ার্ড লাগছে। হাঁটু দুটো কেমন শিরশির করছে।’ সে উঠে বসল। পৃথা কফির কাপ আর বিস্কুট এগিয়ে দিতেই স্বজন হাসল, ‘বাঃ, ব্যবস্থা তো চমৎকার। লাঞ্চটাও মন্দ হবে না মনে হচ্ছে।’
‘তোমার এখনও রসিকতা আসছে?’কফিতে চুমুক দিল পৃথা।
‘আচ্ছা, ভেবে ভেবে টেনশন বাড়িয়ে কোনও লাভ হবে? স্বজন কথা শেষ করামাত্র দরজায় টোকা পড়ল কিন্তু কেউ ঢুকে পড়ল না। স্বজন বলল, ‘কাম ইন।’
এবার হায়দারকে দেখা গেল। তার পরনে পুলিশের পোশাক নেই। লোকটাকে খুব স্বাভাবিক বলে মনে হল পৃথার। ঘরে ঢুকে সোফায় বসে হায়দার বলল, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলা যাক।’
‘বলুন।’ স্বজন গম্ভীর হল।
‘আপনাকে এই শহরে আমরাই ইনভাইট করে এনেছি।’
‘আপনারা মানে, পুলিশ?’
‘না। বাইরে বেরিয়েছিলাম বলে বাধ্য হয়ে আমাকে ওই ইউনিফর্ম পড়তে হয়েছিল। বর্তমান শাসনব্যবস্থার যারা পরিবর্তন চায় আমি তাদের একজন।’
‘আশ্চর্য! আপনি তখন মিথ্যে বলেছিলেন?’
‘হ্যাঁ। না বললে আপনি আমার কথা তখন বুঝতে চাইতেন না।’
‘এখনও যে বুঝব এমন ভাবছেন কেন?’
এখন আপনাকে বোঝাবার অবকাশ পাব। টুরিস্ট লজে আপনাদের ওপর পুলিশ কড়া ওয়াচ রেখেছিল। যা হোক, আমরা ভেবেছিলাম যে টুরিস্ট লজে আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন। আগামীকাল যে উৎসব আছে তা ঘুরে দেখবেন এবং তার পরের দিন যে কাজের জন্যে এসেছেন সেটি করে ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু পুলিশ কমিশনার ভার্গিসের নজরে পড়ে সব গোলমাল করে ফেললেন আপনারা। ভার্গিস আপনাকে জেরা করেছিল?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমি কিছুই জানতাম না বলে উনি জানতে পারেননি।’
‘আমি জানতাম আপনি একা আসছেন। যা হোক, যে সমস্যায় আপনাদের পড়তে হল তার জন্যে আমরা দুঃখিত। এখানে আপনারা সম্পূর্ণ নিরাপদ।’
পৃথা কথা না বলে পারল না, ‘আপনারা সরকার পাল্টাতে চাইছেন। বোঝাই যাচ্ছে সরকার আপনাদের ওপর সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু তাঁরা আপনাদের এভাবে থাকতে অ্যালাউ করছেন কি করে?’
হায়দার হাসল, ‘ম্যাডাম। যে গদি কেড়ে নিচ্ছে তাকে জামাই আদর করার মত বোকা শাসক পৃথিবীতে কোনও কালে ছিল কি? ওরা আমাদের সন্ধান পেলে ছিঁড়ে খাবে। আমাদের নেতার মাথার দাম এখন লক্ষ লক্ষ টাকা। এই অবস্থার মধ্যে আমাদের কাজ করে যেতে হচ্ছে।’
স্বজন বলল, ‘কিন্তু মনে হচ্ছে আপনারা প্রকাশ্যেই আছেন।’
‘না। আমাদের একটা আড়াল আছে যা ওদের সন্দেহের বাইরে।’
স্বজন কফির কাপ টেবিলে রাখতে উঠে দাঁড়াল, ‘আপনাদের সমস্যায় আমাকে টানলেন কেন?’
‘কারণ আমাদের নেতার আপনাকে প্রয়োজন।’
‘আমাকে?’
‘হাঁ। আপনার চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞানকে।’
‘আপনারা আমার চিকিৎসার ব্যাপারে সব জানেন?’
‘অবশ্যই।’
‘কিন্তু আমি যদি চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে রাজি না হই?’
‘আমাদের সমস্যা হবে।’
‘তা নিয়ে আমার ভাবনার কোনও কারণ নেই।’
‘যেহেতু আমাদের আছে তাই শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাব আপনাকে রাজি করাতে।’
‘আশ্চর্য! আমি রাজি না হলে— ।’
‘আপনাকে রাজি হতেই হবে।’
‘তার মানে আপনারা জোর করবেন?’
‘অনুরোধ ব্যর্থ হলে আমাদের সামনে অন্য পথ খোলা নেই।’
‘আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?’
হায়দার মাথা নাড়ল, ‘ডক্টর! এসব কথা আপনিই তুললেন। এখন আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। মরিয়া না হয়ে কোনও উপায় নেই। বছরের পর বছর ধরে কয়েকজন স্বার্থসর্বস্ব মানুষ শাসনযন্ত্রকে দখল করে গরিব জনসাধারণকে ক্রীতদাস বানিয়ে শোষণ করে চলেছে। বাইরে থেকে এর চরিত্র কেউ বুঝবে না। আমরা এর প্রতিবাদ করে কোণঠাসা। মানুষের মনে আজ অসন্তোষ ধিকি ধিকি করে জ্বলছে। আমাদের সংগ্রাম স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম। আপনার খারাপ লাগলেও এটা সত্যি।’
‘কিন্তু এর মধ্যে আমি আসছি কোত্থেকে?’
হায়দার পকেট থেকে একটা খাম বের করল। সেটা বিছানায় রেখে বলল, ‘আমাদের নেতার ছবি। ভাল করে স্টাডি করুন। উনি আজ সন্ধেবেলায় আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। আর হ্যাঁ, আপনাদের যা প্রয়োজন সব এখানেই পাবেন। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে আপনাদের বাইরে যেতে দিতে পারছি না। প্লিজ সেই চেষ্টা করবেন না।’
‘বুঝলাম, কিন্তু সেই ট্যাক্সিওয়ালাটা কিন্তু দেখে গেছে কোথায় নেমেছি আমরা।’
‘ও আমাদের লোক।’ হায়দার বেরিয়ে গেল দরজা ভেজিয়ে দিয়ে।
ওর চলে যাওয়া দেখল স্বজন। তারপর সোজা এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। হলঘরটা চুপচাপ। সে বাইরে পা রাখতেই আড়াল থেকে একজন বেরিয়ে এল। তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, ‘স্যার, আপনি ভেতরে যান। যদি কোনও প্রয়োজন থাকে তাহলে বেল বাজাবেন।’
স্বজন জবাব না দিয়ে পৃথাকে ডাকল, ‘পৃথা। চলে এসো। আমরা এখান থেকে বেরুব।’
পৃথা সাড়া দেবার আগেই লোকটা যে ভঙ্গিতে এগিয়ে এল তাতে স্বজন বাধ্য হল পেছনে হাঁটতে। প্রায় জোর করেই ওকে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল লোকটা। স্বজন দেখল এবার বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
কাণ্ডটা চুপচাপ দেখছিল পৃথা। এবার বলল, ‘তুমি পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া বাধালে।’
‘চমৎকার। এরা অন্যায়ভাবে আমাদের আটকে রেখেছে সেটা দেখছ না?’
‘দেখেছি। কিন্তু বুদ্ধিমানরা এমনভাবে ঝগড়া বাধায় না।’
স্বজন রাগী ভঙ্গিতে ফিরে এল বিছানায়, ‘আমি করব না। ওরা যা বলবে তা করতে। হবে এমন দাসখত লিখে দিইনি আসার আগে। আর ওরা জানে না এটা একটা শ্রমিকের কাজ নয় যে কেউ করতে বাধ্য করতে পারে, অপারেশন টেবিলে গিয়ে আমি যা খুশি তাই করতে পারি!’
‘সব ঠিক। এখন মাথাটাকে একটু ঠাণ্ডা করো।’ পৃথা কথাগুলো বলে এগিয়ে গেল টিভির দিকে। বোতাম টিপে সেটাকে চালু করল। কোনও বিখ্যাত মানুষ মারা গিয়েছেন, টিভিতে তাঁর সম্পর্কে বলা হচ্ছে। বাবু বসন্তলাল কত বড় সমাজসেবী ছিলেন তার বর্ণনা দিয়ে ঘোষক বললেন, ‘তাঁর প্রিয় জায়গা ছিল পাহাড়ের বুকে নিজস্ব একটি বাংলো। সেখানে যেতে তিনি খুব ভালবাসতেন। তাই সেই বাংলায় যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তখন আশা করব তাঁর আত্মা শান্তি পাবে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাবু বসন্তলাল মরণের ওপারে চলে গেছেন আমাদের ফেলে রেখে।’ বাবু বসন্তলালের বাংলোর ছবি ফুটে উঠতেই স্বজন চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে! কি বলছে! ওই বাংলোতেই আমরা গিয়েছিলাম। লোকটাকে খুন করা হয়েছিল!’
কোনও খবর নেই। শহর এবং শহরের বাইরে সর্বত্র মাইনে করা লোক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তবু এই অবস্থা। বাবু বসন্তলালের সৎকারের ব্যবস্থা করে আসার পরই প্রথম খবরটা এল। ওই ডাক্তার আর তার বউকে চোখে রাখার দায়িত্ব যার ওপর দেওয়া হয়েছিল সে জানাচ্ছে, এক পুলিশ অফিসার ট্যাক্সিতে তুলে ওদের কোথাও নিয়ে গিয়েছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ভার্গিসের সামনে যাবতীয় অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনাররা গম্ভীর মুখে বসে ছিল। ভার্গিসের হাতের চুরুটটা রিভলভারের মত ধরা। ঘরে ওই মুহূর্তে কোনও শব্দ নেই।
ভার্গিস প্রথমজনের দিকে তাকালেন, ‘অফিসারটা কে?’
‘আমি বাজি রেখে বলতে পারি আমাদের বাহিনীর কেউ নয়।’ লোকটা মিনমিন করল।
‘তাহলে কে?’
‘স্যার, এটা হায়দারের কাজ হতে পারে।’
‘বাঃ। চমৎকার! এরপর হায়দার এই চেয়ারে বসে আপনাদের অর্ডার করবে এবং আপনারা তা মাথা নিচু করে শুনে যাবেন। আকাশলালকে ধরা যাচ্ছে না কারণ সে রাস্তায় বের হচ্ছে না। এই কথাই তো এতদিন বলে আসছিলেন। হোয়াট অ্যাবাউট দিজ পিপ্ল? হায়দার, ডেভিড? এরা তো নাকের ডগা দিয়ে সব কাজ হাসিল করে চলে যাচ্ছে। ওয়ার্থলেশ। আমার মনে ঠিকই সন্দেহ জেগেছিল, এই ডাক্তার ছোকরাটা ওদের সঙ্গে জড়িত। আকাশলালের চিকিৎসার জন্যে ওকে নিয়ে আসা হয়েছে। স্যাডো করতে পারলে ঠিক পৌঁছে যেতাম।’ হতাশ ভঙ্গিতে টেবিলে চুরুট রাখলেন ভার্গিস।
একজন মিনমিন করল, ‘ডাক্তার সম্পর্কে খোঁজ নেব স্যার?’
‘অতীত ঘেঁটে জানতে পারবেন ওর পড়াশুনা কিরকম দারুণ ছিল! গিয়ে দেখুন, ওর ঠিকানাটাও টুরিস্ট লজের রেজিস্টারে নোট করা নেই। এখানে যখন ওকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছিল তখন নামধাম এন্ট্রি করা হয়েছে?’
‘না স্যার। মানে আপনার সঙ্গে অনেক রাত্রে এসেছিল। ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে আপনি ওকে এই ঘরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। মর্নিং ক্লার্ক ডিউটিতে জয়েন করে ওকে পায়নি।’
আফশোসে তাঁর বিশাল মুখটা কয়েকবার দুপাশে নাড়লেন ভার্গিস। তারপর স্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সোম সম্পর্কে কোনও রিপোর্ট আছে?’
‘আছে স্যার।’ প্রথমজন এবার সোজা হয়ে বসল।
‘অ্যারেস্ট করা হয়েছে?’ চোখ ছোট করলেন ভার্গিস।
‘অল্পের জন্যে করা যায়নি। কিন্তু আজ বিকলের মধ্যে— !’
‘এই আপনার রিপোট?’ চিৎকার করে উঠলেন ভার্গিস।
‘না স্যার।’ লোকটি ঢোক গিলল, ‘কাল রাত্রে শহরের বাইরে চেকপোস্ট থেকে এক মাইল দূরের একটা গ্রামে সোম আশ্রয়ের জন্যে গিয়েছিল। অত রাত্রে গ্রামের লোকজন দরজা খোলেনি প্রথমে। শেষে কেউ কেউ বেরিয়ে এলে সোম নিজেকে পুলিশ অফিসার বলে পরিচয় দেয়। ওর কপাল খারাপ, পুলিশ বলেই হয়তো কেউ ওকে আশ্রয় দিতে চায়নি। গ্রামের লোকজন বলেছে সেই অন্ধকারেই সোম দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল। দক্ষিণ দিকে তিন তিনটে গ্রাম আছে। আমাদের লোকজন সেই গ্রামগুলোতে সার্চ করছে এখন। নির্ঘাত বিকেলের মধ্যেই সোম ধরা পড়ে যাবে।’
‘পুলিশ বলে আশ্রয় দিল না! কথাটা শুনতে আপনার খুব ভাল লাগল? ওর গাড়ি?’ গাড়িটাকে খাদে পাওয়া গিয়েছে। একটাই ধাঁধা। গাড়িটা বাবু বসন্তলালের বাংলো ছারিয়ে নীচে যাওয়ার রাস্তা থেকে নীচে পড়েছে। অথচ সোমকে দেখা গেছে উল্টো দিকে চেকপোস্টের কাছের গ্রামে। এতটা রাস্তা নোম কি করে ফিরে এল— ?’
‘সেটা যদি বুঝতে পারতেন তাহলে এই চেয়ারে আমি বসে থাকতাম না। শুনুন, আকাশলাল এবং তার সঙ্গীরা ছিল, এখন তাদের সঙ্গে একটা ডাক্তার জুটেছে। আমার ধারণা ছিল আকাশলাল শহরের বাইরে কোনও গ্রামে বা পাহাড়ে লুকিয়ে আছে। ডাক্তার এখানে আসার পর আমি নিঃসন্দেহ, সে এখানেই আছে। এই এতগুলো লোক আমাদের নাকের ডগায় আছে অথচ আমরা তাদের খুঁজে বের করতে পারছি না। নো। এটা আর বেশিদিন চলতে পারে না। আগামীকালের মধ্যে এদের খুঁজে পেতেই হবে। নইলে আপনাদের সম্পর্কে বোর্ড কি সিদ্ধান্ত নেবে তা আপনারা কল্পনা করতে পারছেন না।’ ভার্গিস মিটিং ভেঙে দিলেন।
সবাই যখন গম্ভীর মুখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল তখন তিনি চুরুট ধরালেন সময় নিয়ে। তারপর চেয়ার ঘুরিয়ে ডানদিকের দেওয়ালের দিকে তাকালেন। সেখানে বিশাল ম্যাপে এই শহরের প্রতিটি রাস্তা আঁকা আছে। চুরুট খেতে খেতে ভার্গিস ম্যাপটার ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে সোজা হয়ে বসলেন। শহরের ঘনবসতি এলাকায় ওরা লুকিয়ে থাকবে এমন তো নাও হতে পারে। এতদিন তাঁর কেবলই মনে হত জনসাধারণের সঙ্গে মিশে থেকে এরা অপারেশন চালাচ্ছে। যদি উল্টোটা হয়। শহরের পশ্চিমাঞ্চলের দিকে নজর রাখলেন তিনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কেউ ওখানে থাকার কথা ভাবতেই পারে না। বিশাল বাড়ি, বাগান, শান্ত নির্জন এলাকা। এদের সুরক্ষার জন্যে পুলিশ দিনরাত বড় রাস্তাগুলোতে টহল দেয়, কিন্তু বাড়িগুলোর ভেতর কি হচ্ছে তা জানার সুযোগ হয়নি। বড়লোকদের আস্তানা বলে ধরেই নেওয়া হয়েছিল, আকাশলালদের সঙ্গে কোনও সংস্রব নেই। এইসব বাড়ি সার্চ করা ঝুঁকির কাজ। কিন্তু মনে যে সন্দেহটা এসেছে তা দূর করতে সেটা করা দরকার। অবশ্য একাই তিনি এত বড় ব্যাপারে জড়াবেন না। মিনিস্টারকে জানাতে হবে। টেলিফোন তুললেন ভার্গিস।
‘স্যার। আমি আপনাকে বলেছিলাম কাল সকালে আমি লোকটাকে মুঠোয় পাব। কিন্তু অতক্ষণ দেরি করার প্রয়োজন নেই, যদি আপনার অনুমতি পাওয়া যায়।’
‘কিরকম?’
‘আমাদের ওয়েস্ট সাইডের বাড়িগুলো সার্চ করার অনুমতি চাইছি স্যার।’
‘আপনি সি পি, এটা পুলিশের আওতায় পড়ে, তাই না?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি যদি আমাকে মর্যাল সাপোর্ট করেন তাহলে— ।’
‘ভার্গিস। বাবু বসন্তলালের পোস্টমর্টেম হয়নি কেন বোর্ড জানতে চেয়েছিল।’
‘স্যার!’ গলা শুকিয়ে গেল ভার্গিসের, ‘ম্যা-ডা-ম।’
বারংবার মর্যাল সাপোর্ট করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কার নির্দেশে কেন কি করা হয়েছে তা আমাদের জানার কথা নয়, শেষ পরিণতির জন্যে দায়ী করব পুলিশ কমিশনারকে!’ লাইনটা কেটে গেল। ভার্গিসের দুই আঙুলে ধরা চুরুট থেকে ক্ষীণ ধোঁয়া পাক খাচ্ছিল শূন্যে।
১২. চেকপোস্টের আগে
চেকপোস্টের আগে নেমে পড়ে নিজেকে বুদ্ধিমান বলে ভেবে খুশি হয়েছিল সোম। যেভাবে শহরের বাইরেও পুলিশভ্যান টহল দিচ্ছে তাতে ওই মারুতি গাড়িতে থাকলে এতক্ষণে মাটির তলার ঘরে চালান হয়ে যেত সে। চেকপোস্টে নিশ্চয়ই ভাল করে গাড়ির আরোহীদের জেরা করা হচ্ছে। সোম নেমে পড়েছিল খানিকটা আগে এবং রাস্তা ছেড়ে উঠে এসেছিল পাহাড়ে। সেখান থেকে রাস্তাটা পরিষ্কার দেখা যায় কিন্তু রাস্তা থেকে কেউ তাকে দেখতে পাবে না।
তখন প্রায় শেষ রাত। বসে থাকতে থাকতে ঘুম এল। পাহাড়ি পাথরে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করতেই ঘুম দখল করল তাকে। যখন চোখ খুলল তখন আলো ফুটে গিয়েছে। এবং তখনই তার মনে হল শহরের বাইরে আসায় তার জীবন বেঁচে গেছে বটে কিন্তু আকাশলাল অথবা সেই খবর দিতে আসা লোকটাকে ধরা এখানে থেকে সম্ভব নয়। সে ইচ্ছে করলে পালিয়ে যেতে পারে অনেক দূরে যেখানে ভার্গিসের পুলিশ পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু ওই পালিয়ে থাকা জীবনে কোনও সুখ নেই। এখন শহরে ঢুকতে গেলেই সে ধরা পড়ে যাবে। আর কোনও বোকামিতে সে নেই অথচ তার পক্ষে শহরে ঢোকা খুবই জরুরি।
খোলা আকাশের নীচে রাত কাটিয়ে অথবা টানটান না ঘুমানোর জন্যেই সোমের শরীর এখনও আলস্য পছন্দ করছিল। সে দেখল নীচের রাস্তা দিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চলতে শুরু করেছে। সাধারণত উৎসবের আগের রাত্রে বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষজন দলবেঁধে তাদের গ্রাম-দেবতাকে নিয়ে আসে শহরে। শহরের দেবীকে পরিক্রমা করে আবার ফিরে যায় গ্রামে। এইসব দেবতাদের চেহারা অদ্ভুত, অনেকের নামও নতুন ধরনের। রাত্রের ওই গ্রাম্য মানুষের দলে ঢুকে পড়তে পারলে শহরে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। সারাদিনের পরিশ্রমের পরে রাত্রের জনতাকে আর খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার ক্ষমতা চেকপোস্টের পাহারাদারদের না থাকারই কথা। কিন্তু সেই সুযোগ নিতে গেলে তাকে মধ্যরাত পর্যন্ত এখানে বসে থাকতে হয়। সারাটা দিন খাদ্য পানীয় ছাড়া এখানে পড়ে থাকা অসম্ভব। সোম মনঃস্থির করতে পারছিল না। সে উঠে পাহাড়ের দিকে তাকাল। এই পাহাড়ের বিভিন্ন ঢালে ছোট ছোট গ্রাম ছড়ানো। আকাশলালের খোঁজে এইসব গ্রামে পুলিশ বারংবার হানা দিয়েছে। এখনও পুলিশের লোক ছড়ানো আছে এখানে ওখানে। গ্রামে তার পক্ষে যাওয়া বিপজ্জনক হবে।
এইসময় একটা লরি এসে দাঁড়াল নীচের রাস্তায়। লরিটা মালপত্র নিয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভারের পাশের দরজাটা খুলে একটা মেয়ে লাফ দিয়ে নীচে নামল। নেমে চিৎকার করল, ‘ভালভাবে যাও।’ লরিটা ওপরে উঠে গেলে মেয়েটা চারপাশে তাকাল। তারপর সরে এল পাহাড়ের দিকে যেখানে সোম দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার চেহারা অত্যন্ত সাধারণ, পোশাক এদেশীয়। সোম কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল কিন্তু মেয়েটাকে দেখতে পেল না। অর্থাৎ মেয়েটা পাহাড়ে ওঠেনি আবার নীচে নেমে যায়নি। সেটা করতে হলে ওকে রাস্তা ডিঙিয়ে যেতে হবে। এই মেয়ের পক্ষে তাকে চেনা সম্ভব নয়। একটু কৌতূহলী হয়েই সোম ধীরে ধীরে নীচে নামতে লাগল। নীচের রাস্তায় নামামাত্র মেয়েটিকে দেখতে পেল সে। রাস্তার ধারে একটা পাথরের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে চুপচাপ। সোমকে দেখামাত্র তার চোখ ছোট হয়ে গেল, মুখে সন্দেহ। সোম হাসতে সে হাসার চেষ্টা করল। একটু এগিয়ে এসে সোম জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি শহরে যাচ্ছ না?’
‘উৎসব তো কাল, আজকে গিয়ে কি হবে।’ মেয়েটার কথা বলায় ধরন বেশ। ক্যাটকেটে।
‘তা অবশ্য।’ বলামাত্রই একটা গাড়ির আওয়াজ কানে এল। ওটা যদি পুলিশের গাড়ি হয় তো এভাবে মুখ দেখানো মানে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা। সে চকিতে পাথরের আড়ালে চলে এল। গাড়িটা যখন সামনের রাস্তায় পৌঁছাল তখন দেখা গেল সোমের সন্দেহ ভুল নয়। মেয়েটার দিকে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে বন্দুকধারী পুলিশ গাড়ি নিয়ে এগিয়ে গেল। মেয়েটা এবার তার পেছনে দাঁড়ানো সোমকে দেখল। এই লোকটা যে পুলিশের ভয়ে ওখানে গিয়ে লুকিয়েছে তাতে তার কোনও সন্দেহ নেই। লোকটা কে হতে পারে? চেহারা দেখে চোর-ডাকাত বলে মনে হচ্ছে না। আবার পালিয়ে বেড়ানো বিপ্লবীদলের কর্মীদের মত চেহারা নয়। সে স্পষ্ট জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে?’
পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সোম হাসল, ‘আমি? একজন সাধারণ মানুষ।’
‘সাধারণ মানুষ কখনও পুলিশকে দেখে ভয় পায় না!’
সোম বুঝল তাকে একটা পরিচয় দিতে হবে। সে গল্প তৈরি করবার চেষ্টা করল কিন্তু তেমন জুতসই কিছু না পেয়ে বলল, ‘আমি আমার ভাইয়ের খোঁজে শহরে যেতে চাই।’
‘ভাই?’
‘হ্যাঁ। ও শহরে থাকে। পুলিশ ওকে খুঁজছে।’
‘পুলিশ ওকে খুঁজছে কেন?’
‘কি বলব! ওর জন্যে আমাদের পরিবারের সবাই জেলে গিয়েছে। মানে পুলিশ সবাইকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। আমি ইন্ডিয়ায় ছিলাম বলে বেঁচে গেছি।’
‘আপনি তাহলে ইন্ডিয়ায় থাকেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি পুলিশকে ভয় পাচ্ছেন কেন?’
‘ওই যে, বললাম তো, পুলিশ আমাকে পেলেও ধরবে। ভাইয়ের খবর নেবে। আমি ধরা না পড়ে ভাইয়ের কাছে পৌঁছাতে চাই।’ সোম গল্পটা বানাতে পেরে খুশি হল।।
‘পলিশ যেখানে আপনার ভাইকে খুঁজে পাচ্ছে না সেখানে আপনি কী করে পাবেন?’
‘আমি দু-একজনকে চিনি যারা খবরটা দিতে পারে।’
‘আপনি আগে এই শহরে থাকতেন?’
‘হ্যাঁ। বছর দশেক আগে আমি ইন্ডিয়ায় চলে গিয়েছিলাম।’
‘আপনার ভাইয়ের নাম কি?’ মেয়েটা সরাসরি তাকাল।
সোম বিপাকে পড়ল। তারপর সেটা কাটাতে পাল্টা জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কে? তোমাকে আমি এতসব কথা বললাম কেন? না, না, আমি আর কোনও কথা বলতে পারব না।’
মেয়েটা এবার হাসল, ‘আপনি যদি সত্যি কথা বলেন তাহলে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।’
‘কীরকম?’ সোম এইরকম কিছু শুনবে বলে অপেক্ষা করছিল।
‘পুলিশের চোখ এড়িয়ে শহরে পৌঁছতে সাহায্য করতে পারি।’
‘বেশ। বলছি। আগে তোমার ব্যাপারটা জানি।’
‘আমি? মেয়েটা পাথর থেকে নেমে দাঁড়াল, ‘আমার নাম হেনা।’ তারপর দৃরের পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘ওইখানে আমাদের গ্রাম। গ্রামে ধোঁয়া উঠছে বলে আমি এখানে বসে আছি। ওটা সংকেত। গ্রামে গোলমাল থাকলে আগুন জ্বেলে আকাশে ধোঁয়া ভোলা হয়।’
‘ও কি ধরনের গোলমাল?’
‘ওখানে না গেলে বলতে পারব না।’
‘তুমি কিভাবে আমাকে সাহায্য করবে?’
‘এখনও ভাবিনি। কিন্তু আপনার ভাইয়ের নামটা বলেননি আপনি।’
মুখে এসেছিল আকাশলালের নামটা কিন্তু শেষমুহূর্তে সামলে নিল। সে গম্ভীর মুখে বলল, ‘আমি জানি না তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে কি না!’
‘আপনার সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক।’
‘আমার ভাইয়ের নাম ত্রিভুবন।’
‘ও।’ মেয়েটা বড় চোখে তাকাল।
‘তুমি আমার ভাইকে চেনো?’
‘আকাশলালের কাছের লোকদের নাম কে না শুনেছে! কিন্তু শহরে গিয়ে আপনার কোনও লাভ হবে না। চিতা এবং নেকড়েদের খবর স্বয়ং ভগবানও জানেন না।’
‘কিন্তু আমাকে যেতে হবেই।’
‘কেন যাবেন?’
‘আমি ভেবে দেখলাম যেখানে আমার সব আত্মীয়স্বজন জেলে বন্দি সেখানে আমি ইন্ডিয়ায় বসে আরাম করছি এটা ঠিক নয়। আমি ভাইয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াব। সোম এমন আবেগে কথাগুলো বলল যে হেনা খুশি হল, ‘বেশ, আসুন আমার সঙ্গে।’
‘কোথায়?’
‘এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে বারংবার পাথরের আড়ালে গিয়ে লুকোতে হবে আপনাকে।’ হেনা তার গ্রামের উল্টোদিকের পাহাড়ে উঠতে লাগল। সোম ভেবে দেখল তার মাথায় যখন কিছুই আসছে না তখন মেয়েটাকে বিশ্বাস করাই একমাত্র পথ। মেয়েটার কথাবার্তা থেকে সরাসরি না হলেও আভাসে বোঝা গেছে যে বিপ্লবীদের সঙ্গে ওর যোগায়োগ আছে। শহরে ঢুকতে হলে ওর ওপর নির্ভর করতেই হবে। পাকদণ্ডির পথ ধরে ওপরে উঠতে উঠতে মেয়েটা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল, ‘আপনি এখানে এলেন কীভাবে?’
‘এক ডাক্তার ভদ্রলোকের গাড়িতে লিফট নিয়েছিলাম।’
হেনার চোয়াল শক্ত হল। সমতল থেকে পাহাড়ে ওঠার পথে তার ডিউটি ছিল। এক বান্ধবীর পানবিড়ির দোকানে বসেছিল সারাদিন। বিকেলের দিকে ডাক্তারের লাল মারুতিটাকে ওপরে উঠতে দেখে সে-ই খবর পাঠিয়েছিল ওপরে। কিন্তু ডাক্তারের গাড়িতে তো একজন মহিলা ছিল। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী গাড়ি?’
‘লাল মারুতি। ইন্ডিয়ার গাড়ি।’ সোম সরল গলায় জবাব দিল।
হেনা মাথা নাড়ল। লোকটা ঠিক বলছে। তাহলে ওঠার সময় পেছনের সিটে লুকিয়েছিল লোকটা তাই দোকানে বসে দেখতে পায়নি সে। ত্রিভুবন আকাশলালের তিন প্রধানসঙ্গীর একজন। সমস্ত দেশে লুকিয়ে থাকা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়িত্ব ওর ওপরে। আর এই লোকটা যদি ত্রিভুবনের ভাই হয় তাহলে ওকে সাহায্য করা উচিত। ওরা হাঁটতে শুরু করল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে সোম জিজ্ঞাসা করল, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি হেনা?’
‘দুই ক্রোশ দূরে আমার এক বন্ধু থাকে, তার কাছে।’
‘তোমার বন্ধু?’
‘হ্যাঁ।’
‘মানে বয়ফ্রেন্ড?’
হেনা শব্দ করে হাসল, ‘আঙুল মানেই হাতের আঙুল? পায়ের হয় না?’
‘তা অবশ্য।’
হঠাৎ হেনা দাঁড়িয়ে গেল। দূরের আকাশে তখন পুঞ্জ পুঞ্জ ধোঁয়া। সে মাথা নাড়ল, ‘না। আর এগোনো যাবে না। ওখানেও গোলমাল শুরু হয়েছে। উৎসবের আগে ওরা সব্বাইকে ঝামেলায় ফেলছে। এতে অবশ্য ভার্গিসের বারোটা বাজতে দেরি হবে না।’
ভার্গিসের নামটা কানে যেতেই একটু শক্ত হল সোম, ‘তুমি ভার্গিসকে দেখেছ?’
‘কে না দেখেছে ওই বুলডগকে?’
অস্বস্তিটা আরও বাড়ল। ভার্গিসকে দেখেছে আর তাকে দ্যাখেনি এমন কি হতে পারে। তার পজিশন ছিল দু-নম্বরে। ওরা জানতে পারলে খুন করতে দ্বিধা করবে না। একদিকে ভার্গিস আর অন্যদিকে বিপ্লবীরা, সসাম দিশেহারা হয়ে পড়ছিল।
হেনা বলল, ‘আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। ওইদিকে চলুন। এখানে একটা ঝরনা আছে। চট করে কারও নজরে পড়বে না।’
ওরা ঝরনার দিকে এগোতেই আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ ভেসে এল। হেনা দৌড়তে লাগল, ‘তাড়াতাড়ি দৌড়ান। দেখে ফেললে গুলি খাবেন।’
পঞ্চাশ বছর বয়সে যতটা দৌড়ানো সম্ভব সোম ঠিক ততটাই দৌড়াল। জঙ্গলের আড়ালে ঢোকামাত্র বসে পড়ল সে। মাথার ওপর চক্কর খাচ্ছে হেলিকপ্টার। ওগুলো তার চেনা। পাইলট হয়তো এখনও সামনাসামনি দেখলে তাকে স্যালুট করবে। কিন্তু রেইডের সময় যখন ওগুলো ব্যবহার করা হয় তখন নির্দেশ থাকে সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই গুলি করার। গুলি না করে ওগুলো চলে গেল যখন তখন বোঝা যাচ্ছে ওদের চোখ এড়ানো গেছে। সোম উঠল। সামনেই হেনা, হাসছে। বলল, ‘আপনার তো বেশ। ট্রেনিং আছে দেখছি!’
‘না, মানে, মনে হল।’ যেন বিড়বিড় করল।
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটু এগোতেই ঝরনাটাকে দেখা গেল। পাহাড়ের বুক থেকে নেমে ছায়াছায়া নির্জনে নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে। সোম বলল, ‘বাঃ, কী সুন্দর!’
‘আপনার খিদে পেয়েছে?’
প্রশ্নটা শোনামাত্র খিদে পেয়ে গেল সোমের। কাল বিকেল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। সারাক্ষণ টেনশনে থেকে খাওয়ার কথা মনেও আসেনি। এখন জল, নির্জনতা এবং ওই প্রশ্নে মনে হল খেতে পেলে আর কিছুই চাইত না সে।
প্রশ্নটা করেই নিজেই উত্তর দিল হেনা, ‘পেলে কিছুই পাবেন না এখানে। তবে!’ সে সোমের দিকে তাকাল, ‘আপনার কাছে রিভলভার আছে?’
অজান্তেই মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেই মনে মনে খেপে গেল সোম নিজের ওপরে। রিভলভারের কথা স্বীকার করল কেন? সাধারণ মানুষের সঙ্গে রিভলভার থাকে নাকি! গর্দভ!
‘তাহলে একটা পথ আছে। ওই দেখুন, বেশ মোটাসোটা ডাহুক। গুলি করে যদি মারতে পারেন, তাহলে আগুন জ্বেলে রোস্ট করে দিতে পারি! হেনা হাসল।
সংকোচ হচ্ছিল সোমের রিভলভারটা বের করতে। সার্ভিস রিভলভারটাকে দেখলে হেনা কি চিনতে পারবে? সে মৃদু আপত্তি করল, ‘গুলি ছুঁড়লে শব্দ হবে না?’
‘হলে হবে। ওপাশে ধোঁয়ায়, মাথার ওপর হেলিকপ্টার, কেউ শুনলে ভাববে পুলিশের গুলি। এদিকে আর আসবে না তাহলে।’ হেনা বলল।
সোম ডাহুকটাকে দেখল। কমসে কম এককেজি ওজন হবে। হেলিকপ্টারের আওয়াজে বোধহয় একটু ভয় পেয়ে গেছে। সে হেনার দিকে তাকাল। খিদেটাকে বড্ড বেশি মনে হচ্ছে এখন। যা হয় হবে আগে তো খেয়ে নিই, মনে মনে ভাবল সে।
সে রিভলভার বের করে তাগ করল। ডাহুকটা মুখ ফিরিয়ে এদিকে তাকাল। সোম ট্রিগার টিপতেই কানফাটানো আওয়াজ হল। কিছু পাখি উড়ে গেল আকাশে শব্দ করে আর ডাহুকটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল যেখানে বসেছিল। হেনা বলল, ‘বাঃ, আপনার টিপ তো দারুণ।’ বলে দৌড়ে গিয়ে কুড়িয়ে আনল পাখিটাকে। সোম খুশি হল। একসময় সে ফোর্সে বেস্ট শুটার ছিল।
আওয়াজটা তখনও কানে লেগে ছিল। সোম আকাশে নজর করল। হেলিকপ্টার আপাতত নেই। কিন্তু কাজটা বেশ বোকার মতই করেছে। পুলিশের পক্ষে ওটা গুলির শব্দ তা বুঝতে অসুবিধে হবে না।
‘নিন, ছাড়ান। আমি আগুন জ্বালার ব্যবস্থা করি।’ হেসে পাখিটাকে সোমের হাতে তুলে দিল।
এ ব্যাপারে সোমের কিঞ্চিৎ অভ্যাস ছিল যৌবনের শুরুতে। সেটা মনে করে সে হাত লাগাল। মেয়েটা ইতিমধ্যে শুকনো ডালপালা জোগাড় করে আগুন জ্বালিয়েছে। ধোঁয়া বের হচ্ছে। সেটা লক্ষ করে সোম বলল, ‘দূর থেকে দেখলে লোকে ভাববে এখানেও গোলমাল হচ্ছে।’
‘কেন?’ হেনা তাকাল।
‘আপনার আগুন থেকে ধোঁয়া উঠছে।’
‘ভালই তো। গুলির শব্দ, আকাশে ধোঁয়া, কেউ এদিকে আসবে না।’
কিন্তু একটু ভুল হয়ে গেল। ওরা যখন ডাহুকের সেঁকা মাংস আরাম করে চিবোচ্ছে তখন জঙ্গলের মধ্যে চারজন মানুষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। দুজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। হেনার ঠিক পেছনে গাছের আড়ালে ওরা। চোখ বন্ধ করে খাবারের স্বাদ না নিলে সোম হয়তো কিছুটা দেখতে পেত। হেনা জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আপনি সবসময় রিভালভার নিয়ে যাবেন?’
‘সবসময় নয়। এবারই আসার সময় মনে হল সঙ্গে রাখা ভাল।’ সোম হাড় চিবোচ্ছিল।
‘এদেশে কোনও রকম আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখা অপরাধ, ধরা পড়লে দশ বছর জেল।’
‘তুমি না ধরিয়ে দিলে পুলিশের সাধ্য নেই আমাকে ধরে।’
‘আমাকে আপনি চেনেন না, একটু আগে আলাপ হল, হঠাৎ এত বিশ্বাস হয়ে গেল কি করে?’
‘কাউকে কাউকে প্রথম দেখেই এরকম মনে হয়।’
‘আপনার রিভলভারটা একবার দেখব?’
‘নিশ্চয়ই।’ পাশে রাখা রিভলভারটা সোম তুলে দিল হেনার হাতে। হেনা ওটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই জঙ্গলে দাঁড়ানো লোকগুলো হেনার মুখ দেখতে পেয়ে স্বস্তি পেল। সোমকে বিস্মিত করে ওরা বেরিয়ে এল সামনে। দেখামাত্র সোম লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল কিন্তু হেনা বলল, ‘আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এরা আমার বন্ধু।’
সোমের মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। তার রিভলভার এখন হেনার হাতে। অসহায় চোখে সে লোকগুলোকে দেখল। একজন হেনাকে নিয়ে কিছুটা দূরে সরে গেল। বাকিরা পাথরের মত সোমের সামনে দাঁড়িয়ে। এখান থেকে পালাবার কোনও পথ নেই।’
যে লোকটা হেনার সঙ্গে কথা বলছে সে উত্তেজিত, ‘তুমি এখানে কেন?’
‘গ্রামে ধোঁয়া উঠছিল বলে তোমার গ্রামে যাচ্ছিলাম। ওখানেও গোলমাল মনে হল।’
‘হ্যাঁ। আজ সবজায়গায় পুলিশ হানা দিয়েছে। কিন্তু এই লোকটাকে কোথায় পেলে?’
‘রাস্তায় আলাপ হল।’
‘লোকটাকে তুমি চিনতে পেরেছ?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু ও নিজেকে ত্রিভুবনের ভাই বলে পরিচয় দিয়েছে। ইন্ডিয়ায় থাকে, ত্রিভুবনের সঙ্গে দেখা করতে চায়। পুলিশ দেখলে ওকে ধরবে বলে শহরে ঢুকতে পারছে না।’
‘বাজে কথা, মিথ্যে কথা।’ লোকটা গর্জে উঠল।
‘আস্তে কথা বল। ব্যাপারটা যে আমরা জানি তা ওকে বোঝাবার দরকার নেই!’
‘কি বলছ তুমি? লোকটা আমাদের ওপর কি অত্যাচার করেছে তা মনে নেই?’
‘আছে। কিন্তু মনে হচ্ছে কোনও গোলমাল হয়েছে ওর।’
‘কিছুই হয়নি। সব ভাঁওতা। দ্যাখো ওর পেছনে হয়তো পুলিশ আসছে।’
‘না। সেটা হলে এতক্ষণে টের পেতাম। আগে ওর সম্পর্কে খবর জোগাড় করো। যদি কোনও গোলমাল না থাকে তাহলে ব্যবস্থা নিতে অসুবিধে হবে না।’
‘আমি এখনই পাঠাচ্ছি। কিন্তু ততক্ষণ ও কোথায় থাকবে?’
‘তোমাদের গ্রামের কি অবস্থা।’
‘অল ক্লিয়ার। পুলিশ চলে গিয়েছে।’
‘সেখানেই চলো।’
হেনা ফিরে এসে সোমের সামনে দাঁড়াল, ‘আপনার রিভলভার দেখে আমার বন্ধুরা খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছে। আমাদের সঙ্গে থাকলে এটার প্রয়োজন আপনার হবে না।’
সোম একটু মাটি পেল যেন, ঘাত নাড়ল, ‘ঠিক আছে।’
‘এরাই আমার বন্ধু। ওদের গ্রাম এখন শান্ত। আপনার গুলির শব্দ শুনে দেখতে এসেছিল। চলুন, ওদের গ্রামে গিয়ে বিশ্রাম করা যাক।’ হেনা এগোল। সোমের সামনে অন্য কোনও পথ খোলা নেই। এরা তাকে কেন চিনতে পারছে না তাই তার মাথায় ঢুকছিল না। অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার হিসেবে সে অনেক অ্যাকশনে নেতৃত্ব দিয়েছে, অনেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছে। মনে হয় গ্রামের মানুষ বলেই তাকে সাধারণ পোশাকে চিনতে পারছে না। শহরের লোক অনেক বেশি চালাক হয়।
ওরা একটা পাহাড়ি গ্রামে ঢুকতেই দুটো কুকুর তেড়ে এল। একটা লোক ধমকে তাদের সরিয়ে দিল। আসবার সময় সোম লক্ষ করেছিল হঠাৎ উদয় হওয়া চারজনের মধ্যে একজন তাদের সঙ্গে ফিরছে না। কোথায় গেল লোকটা? জিজ্ঞাসা করতে সাহস হয়নি তার।
একটু আগে পুলিশ ঘুরে গিয়েছিল বলে গ্রামে উত্তেজনা ছিল। মানুষজন বাইরে দাঁড়িয়ে ওই বিষয়েই আলোচনা করছিল। তারা এদের দেখতে পেল। হেনা মেয়েদের দিকে হাত নাড়ছিল। হঠাৎ একটি প্রৌঢ় চিৎকার করল, ‘ওই যে ওই যে পুলিশ, আমার ছেলেকে মেরেছে, ওকে আমি ছাড়ব না, মার, মার, মার।’ পাগলের মত লাঠি হাতে তেড়ে এল লোকটা।
হেনার সঙ্গীরা লোকটাকে আটকাল, ‘চাচা নিজেকে শান্ত করো। আমরা কষাই নই। বিনা বিচারে ওকে মারা ঠিক হবে না।’
কথাটা কানে যেতেই সোমের মেরুদণ্ড কন্কন্ করে উঠল।
১৩. উৎসবে যোগ দিতে আসা মানুষ
দুপুরেই শহরটার অনেকখানি উৎসবে যোগ দিতে আসা মানুষে ভরে গেল। এবার শহরের সব রাস্তায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না তাদের। বিগ্রহ থাকবে যে মাঠে সেখানেই ভিড়টা বেশি। উৎসব শুরু হতে এখনও চব্বিশ ঘণ্টা বাকি। যতই চিতার পোস্টার পুলিশ ছড়িয়ে দিক, রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ গ্রামের মানুষের মনে প্রবল। কৌতূহলের ব্যাপার হল শুধু বিশেষ এক ধর্মের মানুষ নয়, উৎসবের আকর্ষণ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও কিছু কম নয়। অন্যান্য বছর এই উৎসবে প্রচুর বিদেশিদের দেখা যেত। এবছর সেটি বন্ধ করা হয়েছে। ভারতবর্ষের মানুষদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে আজ ভোর থেকে।
ডেভিডের পক্ষে পুলিশকে এড়িয়ে রাস্তায় হাঁটা মুশকিল। ওয়ারেন্ট তালিকায় তার নাম তিন নম্বরে। এখন দীর্ঘদিন আন্দোলন থিতিয়ে থাকবে। আকাশলাল যে পরিকল্পনা নিয়েছে তা যদি শেষ পর্যন্ত সফল হয় তাহলে অন্তত তিন মাস তাকে ঘরের ভেতর আটকে থাকতে হবে। আর এই তিন মাস দেশের বাইরে সরে যেতে হবে তাদের। পরিকল্পনা সফল হতে অবশ্যই পুলিশ আর ঝামেলা বাড়বে না। পুলিশ অসতর্ক হয়ে পড়লেই চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে। এসব ব্যাপার সম্ভব হবে অনেকগুলো যদি ঠিকঠাক চলে। ডেভিডের মনে এই কারণেই স্বস্তি নেই। অথচ আকাশলালকে বাদ দিয়ে আন্দোলনের কথা এই মুহূর্তে চিন্তা করা যায় না। কেউ অপরিহার্য নয় কথাটা শেষ পর্যন্ত সত্যি হলেও সময়বিশেষে মেনে নেওয়া যায় না। এটা সেই সময়।
গাছতলায় কিছু মানুষ তিনটে পাথরে হাঁড়ি চাপিয়ে কিন্তু ফুটিয়ে নিচ্ছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে গল্প করছে কেউ কেউ। পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও এসেছে। ডেভিড বসে গেল এই দলে। তার পোশাক এখন একজন দেহাতি খেতে খাটা মানুষের মতন।
যে লোকটির পাশে সে বসেছিল তার কোলে একটি শিশু ঘুমোচ্ছে। বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে ডেভিড বলল, ‘বাঃ, খুব ভাগ্যবান ছেলে তো।’
লোকটা অবাক হয়ে তাকাল, ‘কি দেখে ভাগ্যবান মনে হল?’
ডেভিড হাসল, ‘তোমার ছেলে নিশ্চয়ই?’
‘অন্যের ছেলে কোলে নিয়ে আমি বসে থাকব নাকি। গ্রামে হলে এ দৃশ্য দেখতে পেতে না। শহরে এসে বউয়ের ডানা গজিয়েছে, তাই একঘণ্টা একে সামলাতে হচ্ছে।’
‘ডানা গজিয়েছে মানে?’
‘ওই যে চুড়ির দোকান, ফুলের দোকান, ওখানে গিয়েছে।’
‘তাই বলো। তোমার ছেলের ভুরু দেখেছ? জোড়া ভুরু। এ ছেলের কপালে অনেক যশ আছে।’
‘আর যশ!’ লোকটা মুখ তুলে পোস্টার দেখাল যেখানে আকাশলালের ছবির সঙ্গে পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে, ‘ওই তো কত নাম হয়েছে, কিন্তু কি হল?’
ডেভিড হাসল, ‘তোমার ছেলে বড় হলে ওই রকম নাম করুক তা চাও না?’
‘না। আমি চাইব পুলিশ যেন আমার ছেলেকে না মেরে ফেলে !’
ডেভিড মাথা নাড়ল, ‘ঠিক ঠিক। তবে শুনেছি লোকটা নিজের জন্যে কিছুই করছে না।’
লোকটা সন্দেহের চোখে তাকাল, ‘তুমি কে হে? একথা আজ সবাই জানে।’
বোকার অভিনয় করল ডেভিড। মাথা নাড়ল তারপর বিড়ি বের করে লোকটাকে একটা দিয়ে নিজেও ধরাল। টুকটাক গল্প করে একসময় উঠে পড়ল সে। এই হল জনসাধারণ। সবাই আকাশলালকে পছন্দ এবং শ্রদ্ধা করে, কিন্তু কেউ ওর সঙ্গে পথে নেমে জীবন বিপন্ন করতে চায় না। আকাশলাল নিজের জীবন দিয়ে স্বাধীনতা এনে দিলে ওরা সেটা আরাম করে ভোগ করবে, এইরকম বাসনা। গত কয়েকবছরে মানসিকতা একটুও পালটাল না। মাঝে মাঝে হতাশ হয় সে। আকাশলালকে একথা বলেছেও। আকাশ মাথা নেড়েছে, ‘এখন ওরা একথা বলছে বটে কিন্তু যখন সত্যিকারের লড়াই শুরু হবে তখন দেখবে এরা এইসব কথা ভুলে ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের সঙ্গে। অত্যাচার আমাদের যেমন কষ্ট দেয় ওদেরও তেমনি। তাই না?’
কে কাকে বোঝাবে? এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার কোনও পথ নেই।
ডেভিড ভিড় কাটিয়ে ধীরে ধীরে চলে এল শহরের একপাশে। আজ রাস্তায় দু’ পা যেতেই পুলিশের পাহারা। কবরখানার গেটে পুলিশ নেই বটে কিন্তু রাস্তায় প্রায়ই জিপ পাক খাচ্ছে। সে শরীরটাকে একটু একটু করে দুমড়ে নিল। এই মুহূর্তে তাকে দেখলে প্রতিবন্ধী ছাড়া কিছু মনে হবে না। শরীরটাকে বাঁকিয়ে চুরিয়ে সে রাস্তায় শুয়ে পড়ল। তারপর এমন ভাবে গড়াতে লাগল যাতে স্পষ্ট মনে হবে একটি প্রতিবন্ধী মানুষ প্রাণপণে চেষ্টা করছে রাস্তা পার হতে। সেপাই ভর্তি জিপ যাচ্ছিল সামনে দিয়ে। দেখে ওদের দয়া হল। জিপটা থামল। দুটো সেপাই ডেভিডকে চ্যাংদোলা করে রাস্তা পার করে দিল। ডেভিড সেখানে পড়ে রইল, যতক্ষণ না জিপটা চোখের আড়ালে চলে যায়। সে শুয়ে শুয়েই গালে হাত বোলাল। অযত্নে রাখা দাড়ির জঙ্গল তার মুখটাকে অচেনা রেখেছিল সেপাইদের কাছে।
আশেপাশে তাকিয়ে নিয়ে সে গড়িয়ে গড়িয়েই রাস্তার এপাশে চলে এল। তারপর ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কবরখানার গেটে চলে এল। আজও সেখানে রোজকার মত ফুলের দোকানটা রয়েছে। ফুল কিনল ডেভিড। তারপর বিমর্ষ মুখে ঢুকে পড়ল কবরখানায়। লম্বা গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে শুয়ে আছে এই শহরের কত মৃত ব্যক্তি। কোথাও আগাছা বেরিয়ে ঢেকে দিয়েছে স্মৃতিবেদি। ডেভিড চলে এল শেষ প্রান্তে। এই জায়গাটা অপেক্ষাকৃত বেশি জঙ্গলে ভরা। প্রথম স্মৃতিফলকে লেখা আছে সুরজলাল, জন্ম ১৯০৮, মৃত্যু ১৯৬০। পাশেরটা সুরজলালের স্ত্রীর। সুরজলালের ছেলে চন্দ্রলাল শুয়ে আছে খানিকটা দূরে। তার স্ত্রীর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে এখানে কবর দেওয়া যায়নি। এই কবরগুলোর অবস্থান, একটার থেকে আর একটার দূরত্ব ডেভিডের মুখস্থ। সে পাশের খালি জমিটার দিকে তাকাল। চন্দ্রলালের বংশধর আকাশলালের জন্যে ওই জমিটুকু বরাদ্দ। ডেভিড সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। আশেপাশের ঘাস, জঙ্গল নিটোল রয়েছে। কোথাও বিকৃতির চিহ্নমাত্র নেই। জমিটার গায়েই কবরখানার পাঁচিল। শ্যাওলাধরা, অনেক পুরনো। তারপরেই বড় রাস্তা। রাস্তার ওপাশে পুরনো দিনের কিছু অট্টালিকা।
‘ভাইসাব!’
ডাক শুনে ডেভিড তাকাল। কবরখানার বুড়ো চৌকিদার তার দিকে তাকিয়ে। একে সে দেখে আসছে বাল্যকাল থেকে। তার নিজের ঠাকুর্দা, বাবা মা এবং বোনের মৃত্যুর সময় তাকে এখানে আসতে হয়েছে। না, ঠিক হল না কথাটা, বাবা মা এবং বোনের মৃতদেহ নিয়ে সে এখানে আসতে পারেনি। ভার্গিসের কুকুরগুলো ওত পেতে ছিল তার জন্যে। তারা ভেবেছিল সে নিশ্চয়ই আসবে। ভাবাবেগের জন্য একটা প্রতিজ্ঞা নষ্ট করতে চায়নি বলেই সে আসেনি। তারপর যে কয়েক বার এখানে এসেছে, তার কোনও বারই সে ওদের কবরের দিকে পা বাড়ায়নি। গত কয়েকমাসে যখনই এসেছে সে তখন গভীর রাত। এ তল্লাটে মানুষ নেই। বুড়ো চৌকিদারটা বোধহয় চোখে কম দেখে, তাই সন্ধের পর নিজের ঘর ছেড়ে টহলে বের হয় না। এসব খবর আগাম পেয়েছিল সে।
‘জি।’ এগিয়ে এল ডেভিড চৌকিদারের সামনে।
‘আপনার হাতে ফুল কিন্তু এখনও আপনি কাউকে শ্রদ্ধা জানালেন না।’ বুড়ো চৌকিদার দেহাতি ভাষায় ধীরে ধীরে কথাগুলো বলল।
সজাগ হল ডেভিড, ‘হ্যাঁ। কিন্তু কাকে দেব তা ভেবে পাচ্ছি না।’
চৌকিদার অবাক হল। তার ভাঁজপড়া মুখে ঘোলা চোখ স্থির, ‘আপনি ফুল নিয়ে এসেছেন অথচ আপনার কোনও প্রিয়জন এখানে শুয়ে নেই?’
‘ঠিক তা নয়। এখানে যারা শুয়ে আছেন তাঁদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে দুঃখ পেয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন তাঁকেই ফুলটা দেব ভেবেছিলাম।’
চৌকিদার হাসল, ‘যারা চলে যায় তাদের তো দুঃখ থাকে না, যারা আরও কিছুদিনের জন্যে থেকে যায় তারাই দুঃখে জ্বলে পুড়ে মরে। আপনি যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখানে কারও কবর নেই। কিন্তু আমরা জানি খুব শিগগির ওখানে একটা কবর খোঁড়া হবে। রোজ সকালে উঠে আমি প্রার্থনা করি দিনটা যেন আজকের দিন না হয়।’
‘কার কবর খোঁড়া হবে?’
‘ওই যে দেখুন, সুরজলাল, ওখানে চন্দ্রলাল শুয়ে আছেন। চন্দ্রলালের ছেলে আকাশলালকে ধরতে পারলে পুলিশ যে পুরস্কার ঘোষণা করেছে তা আজ একটা শিশুও জানে। এত টাকার লোভ মানুষ বেশিদিন সামলাতে পারবে না। আজ নয় কাল সে ধরা পড়বেই। ধরা পড়লে ওকে মেরে ফেলা ছাড়া পুলিশের কোনও উপায় নেই। তখন ওরা ওকে এখানে নিয়ে আসবে কবর দিতে।
‘ধরা পড়ার আগে আকাশলালরা যা করতে চাইছে তা যদি করে ফেলে!’ প্রশ্নটা করে ডেভিড বুড়োর মুখ খুঁটিয়ে দেখল। সামান্য কি আলো ফুটল সেখানে? নিজের মনেই মাথা নেড়ে বুড়ো হাঁটতে লাগল সরু পথ দিয়ে। হয়তো ও নিজেই বিশ্বাস করতে পারল না কথাটা।
বিশ্বাস তো ডেভিড নিজেও করতে পারছে না। সে আর একবার আকাশলালদের পারিবারিক জমি থেকে পাঁচিলের দূরত্বটা ভাল করে দেখে নিল। আকাশলালকে সে কথা দিয়েছে সব ঠিক আছে। হ্যাঁ, এখন পর্যন্ত সব ঠিকই আছে।
যদি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় তাহলে সব শেষ হয়ে যাবে। আকাশলালকে হাতে পেলে তাদের কব্জা করতে বেশিদিন দেরি হবে না। হায়দারকে বুঝতে পারে না ডেভিড। এত বেশি ঝুঁকি নিয়ে বাইরে যাওয়া তার মোটেই পছন্দ নয়। কিন্তু হায়দার তার পরামর্শ কানে তুলছে না। ডাক্তারটাকে তুলে নিয়ে এসেছে ভাল কথা, কিন্তু ডাক্তারের বউটাকে আনার কি দরকার ছিল। তাকে তো ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দিলেই হত! হঠাৎ এক এক সময় তার মনের মধ্যে অন্য এক ইচ্ছের সাপ ছোবল মারে। যদি শেষ পর্যন্ত সবই ভেস্তে যায় তাহলে এত খেটে মরা কেন? দেশের স্বাধীনতা আনব বলে এই যে ঝাঁপিয়ে পড়া এও তো একটা ভাবাবেগ থেকেই। আকাশলালকে হাজার বোঝালেও সে বুঝবে না এখন। নইলে কোনও পাগলও অমন ঝুঁকি নেয় না। তাহলে?
এখন চেকপোস্টে যতই কড়া পাহারা থাক ইচ্ছে করলে সীমানা পেরিয়ে ডেভিড হয় ইন্ডিয়া নয়তো ভুটানে চলে যেতে পারে। এই দুই দেশের জনস্রোতের মধ্যে মিশে গেলে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া এমন কোনও অসুবিধের ব্যাপার নয়। কিন্তু যদি যেতে হয় তাহলে একেবারে খালি হাতে যাবে কেন? আজ যদি সে টেলিফোন তুলে খবরের কাগজকে জানিয়ে দেয় আকাশলাল কোথায় আছে, তাহলে ভার্গিস তাকে পুরস্কারের টাকা দিতে বাধ্য।
কথাটা ভাবতেই সমস্ত শরীরে কাঁটা ফুটল ডেভিডের। পৃথিবীটা দুলে উঠল। এ কী ভাবছে সে! চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস ফেলল জোরে। মনের ভেতর ফণা তুলতে যাওয়া সাপটা কুঁকড়ে গুটিয়ে গেল আচমকা। ভার্গিস তাকে টাকা দেবেই। কিন্তু সেই টাকা বাকি জীবন ধরে তাকে গুনে যেতে হবে জেলখানার অন্ধকারে বসে। ডেভিড জোরে জোরে পা চালাল। হঠাৎ খেয়াল হতে হাতের ফুলগুলো ছুঁড়ে দিল দুপাশে।
রাস্তায় না নেমে ফুটপাথ ধরে সাবধানে পাঁচিলের পেছনে চলে গেল ডেভিড। তারপর দু-পকেটে হাত ঢুকিয়ে মাথা নিচু করে হনহনিয়ে রাস্তাটা পার হল। সামনেই তিনচারটে ওষুধের দোকান। এই ব্যাপারটা নিয়ে সে অনেক ভেবেছে। কবরখানার পেছনে কেন ওষুধের দোকান খুলেছিল লোকগুলো। আশেপাশে তো হাসপাতালও নেই। সে ওষুধের দোকানগুলোর পাশের গলিতে ঢুকে পড়ল। গলির মুখে যে সিগারেটের দোকানদার বসে আছে সে মাথা ঝাঁকাল। অর্থাৎ সব ঠিক আছে। দু-পা যেতেই দুজন ভবঘুরে মার্কা মানুষ ফুটপাথে বসে তাস খেলতে খেলতে তার দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। এরা সবাই পাহারায় আছে। বাড়িটা তিনতলা। বছর দশেক আগে এই বাড়ির বাড়িওয়ালা কাউকে বাড়িটা বিক্রি করেছিল। সেই ক্রেতা এখানে এসে পাকাপাকি না থেকে ভাড়া দিয়েছে— লোকে এমনটাই জানে। বেল বাজাল ডেভিড। দুবার অনেকক্ষণ ধরে। তারপর দরজা খুলল। মোটাসোটা একজন প্রৌঢ়া বিরক্ত মুখে দরজা খুলে বললেন, ‘ও, তুমি!’
ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ডেভিড জিজ্ঞাসা করল, ‘কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো? অবশ্য হলেও আর মাত্র দুটো দিন।’
‘হচ্ছে না মানে? কোথাও পা রাখতে পারছি না। কোনও ঘরের দরজা বন্ধ করা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে বাড়িটা যে-কোন মুহূর্তে ভেঙে পড়বে।’ প্রৌঢ়া গজগজ করতে করতে একটা চেয়ারে গিয়ে বসলেন।
‘আর দুটো দিন। তারপর যদি বাড়িটা ভেঙে পড়ে পড়ুক।’
‘তা তো বলবেই। তোমরা তো কোথাও বাস করো না। বাস করলে জানতে সেখানে একটা মায়া আপনা থেকে তৈরি হয়ে যায়। প্রথমে তিনতলায় যেতে পারতাম, জানলা খুললেই একটা পুকুর চোখে পড়ত। একসময় সেটা বন্ধ হল। তারপর দোতলায় যেতে পারতাম, রাস্তাটা চোখে পড়ত অন্তত। তা সেটাও বন্ধ হল। এখন এই একটা ঘর আর বাথরুম ভরসা।’
‘আমি জানি আপনি অনেক কষ্ট করছেন। বললাম তো, আজ আর কাল। আপনাকে কাল বিকেলেই এই বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে।’
‘আমার কিন্তু কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। এ পাড়ায় সবাই জানে আমার স্বামী প্রচুর টাকা রেখে গেছে বলে এত বড় বাড়ি ভাড়া নিয়েছি, কিন্তু তিনি যে কিছুই রেখে যাননি তা আমার চেয়ে বেশি কে জানে!’
‘আমরা জানি যে আপনার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। কাল বিকেলে যখন উৎসবে যোগ দিতে আসা মানুষেরা ফিরে যাবে তখন আমাদের কেউ আপনাকে পৌঁছে দেবে একটা গ্রামে। সেখানে আপনি ভালই থাকবেন।’ ডেভিড বলল।
‘ভাল থাকব? আমি কিসে ভাল থাকব তা আমার থেকে তুমি বেশি জানো? আমি ছেলের সঙ্গে কথা বলব। তাকে বুঝিয়ে বললে সে ঠিক বুঝবে।’
‘বেশ তো, আমাকেই বলুন না কিসে আপনার অসুবিধে?’
‘কেন? ছেলের সঙ্গে আমাকে কথা বলতে দিচ্ছ না কেন?’
‘আপনি জানেন আপনার ছেলেকে পুলিশ খুঁজছে। আপনি গেলে যদি আপনার পেছন পেছন পুলিশ হাজির হয় তাহলে তাকে আর বাঁচানো যাবে?’
‘কি? আমি পুলিশ সঙ্গে নিয়ে যাব?’ চিৎকার করে উঠলেন প্রৌঢ়া।
‘আমি ওকথা একবারও বলিনি। কিন্তু পুলিশকে বিশ্বাস নেই। আপনি তো চান। আকাশলাল সুস্থ থাকুক। চান না?’
‘নিশ্চয়ই চাই। সে বলেছে বলেই এখানে পচে মরছি। তাকে পেটে ধরিনি বটে কিন্তু আমাকে তো সে মা বলে ডেকেছে।’
‘বেশ। তাহলে কাল দুপুরেই আপনি রেডি থাকবেন।’ ডেভিড উঠে পড়ল। এই প্রৌঢ়ার সঙ্গে কথা বলে গেলে দিন ফুরিয়ে যেতে সময় লাগবে না।
গলি দিয়ে সে আরও ভিতরে হাঁটতে লাগল। বড় রাস্তা এড়িয়ে এভাবে অনেকটা যেতে পারবে সে। দুই পকেটে হাত, মুখ মাটির দিকে। দেখলে মনে হবে সমস্যাপীড়িত সাধারণ মানুষ। এই বুড়িটার কাছে এলেই তার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। যখন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল এবং আকাশলাল ওকে আবিষ্কার করে ওই বাড়িতে ভাড়াটে হিসেবে বসিয়েছিল তখনই ডেভিডের মনে হয়েছিল একথা। ওর বাবা ছিলেন স্কুলের হেডমাস্টার। বই আর ছাত্রদের পড়াশুনা ছাড়া কিছুই জানতেন না। স্কুলটা ছিল সরকারি এবং মাইনেপত্র ঠিক সময়ে পেতেন না। আর এই নিয়ে দুশ্চিন্তাও ছিল না মানুষটার। সংসার চালাতেন মা। তিনি ছিলেন অমনি মোটাসোটা ভালমানুষ। মাসের বেশ কয়েকটা দিন তাঁকে না খেয়ে থাকতে হত সবাইকে খাবার জুগিয়ে। তবু তিনি রোগা হননি। হয়তো মোটা থাকা একধরনের অসুখ ছিল তাঁর। বাবা ছাত্রদের বোঝাতেন পৃথিবীতে সততার কোনও বিকল্প নেই। অন্যায়ের প্রতিবাদ যে মানুষ করে না তার নিজেকে মানুষ বলে ভাবার কোনও কারণ নেই। কিছু ছাত্রের অভিভাবক এইসব কথাবার্তা পছন্দ করল না। তারা খুব সহজেই সরকারিমহলে জানিয়ে দিল হেডমাস্টার বিপ্লবী তৈরি করতে সাহায্য করে যাচ্ছেন। অল্পবয়সী ছেলেদের তিনি সরকার-বিরোধী করে তুলছেন। ডেভিড তখন স্কুলের শেষ ধাপে। রবিবারে গিজায় যায়, খাবার টেবিলে বসে যে কোনও খাবার পেলেই যিশুকে উৎসর্গ করে তবে খায় বাবামায়ের পাশে বসে। ওর বোন লিজা ছিল ভারী মিষ্টি। পনের বছর বয়সেই সুন্দরী হিসেবে পাড়ায় সে বেশ পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। বাবার কাছে পাওয়া শিক্ষা ওই বয়সে ডেভিডের চোখ খুলে দিয়েছিল। পুলিশি শাসন ব্যবস্থার তাণ্ডব যে কতখানি মারাত্মক তা সে একটু আলাদা করে বুঝতে আরম্ভ করেছিল। আর এই সময় সমভাবনার কিছু মানুষের সঙ্গে তার আলাপ হয়। এইসব মানুষ প্রতিবাদ করতে চায়। তখন ভাবনাটা ছিল এইরকম যে, প্রতিবাদটা ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে পারলেই যেন শাসকশ্রেণী তাদের আচরণ পালটে ফেলবে। এক রাত্রে ডেভিড তার বাবার মুখোমুখি হয়। সে সোজাসুজি বলে, ‘আপনি আমাদের যে শিক্ষা দিচ্ছেন তা কি আমি জীবনের সবক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি?’
বাবা বলেছিলেন, ‘যা সত্য তা সবসময়ই সত্য। ক্ষেত্র বদল হলেও তার কোনও পরিবর্তন হয় না। পরিবর্তন যে করে সে সুযোগসন্ধানী।’
তারপর আর সে থেমে থাকেনি। আন্দোলনে যোগ দিয়েই তাকে বাড়ি থেকে পালাতে হয়েছিল। আর তখনই আকাশলালের সঙ্গে আলাপ। আকাশ তখন ছিল একজন সাধারণ সৈনিক। কিন্তু ওপরতলার নেতৃত্বের সঙ্গে তার সংঘাত শুরু হয়ে গিয়েছিল। কোনও রকম আপস সে মেনে নিতে পারত না। আর সেই মানসিকতাই তাকে ধীরে ধীরে নেতৃত্বের শীর্ষবিন্দুতে নিয়ে গেল। সেই সময় ঘটে গেল ব্যাপারটা।
এই শহরের অন্যতম ধনী বিধবা সুন্দরীকে সবাই ম্যাডাম বলে ডাকে। তিনি শাসনযন্ত্রের শরিক নন অথচ তাঁর অঙ্গুলিহেলনে এ রাজ্যে সবকিছু হয়ে যেতে পারে। ম্যাডামের ভাইয়ের ছেলে গেীতম তাঁর কাছেই মানুষ। কুড়ি বছরের একটা ছেলে যত রকমের উজ্জ্বলতা সম্ভব সবই আয়ত্ত করেছিল। রোজ ওর নামে নালিশ আসত। থানায় অভিযোগ করলে অফিসাররা ডায়েরি লিখতেন না। শহরের কোনও খবরের কাগজ এসব ছাপতে সাহস পেত না। যেহেতু দল তখন সরাসরি সরকার-বিরোধী কাজকর্মে ব্যস্ত ছিল তাই গৌতমকে নিয়ে চিন্তা করার সময় ছিল না। সেইসময়ে ডেভিড খবর পেল গৌতম তার বোনকে জিপে করে তুলে নিয়ে গিয়েছে উত্তরের পাহাড়ে। সেখানে সরকারি বাংলো আছে ঝিলের ধারে। খবর পাওয়া মাত্র ডেভিড ছুটেছিল দুজন সঙ্গী নিয়ে। গৌতমের পক্ষে তখনও সম্ভব হয়নি বোনকে অধিকার করা। কিন্তু ডেভিড ওর পাহারাদারদের অতিক্রম করতে পারেনি। মাঝরাত্রে লোকগুলো বোনের মৃতদেহ নিয়ে এসে ফেলে গেল বাইরে। চিৎকার করে বলে গেল, ‘এই হল বেআদবির শাস্তি। ব্যাপারটা সবাই যেন মনে রাখে।’
প্রতিজ্ঞা করেছিল ডেভিড, গৌতমকে জ্যান্ত সেখান থেকে ফিরতে দেবে না। কথা রেখেছিল সে। পরদিন যখন গৌতম এবং তার তিন সঙ্গীর গাড়ি ফিরছিল তখন পাহাড়ে সোজাসুজি লড়াইয়ে নেমেছিল তারা।
গৌতমের মৃত্যুর খবর পৌঁছানো মাত্র অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। একজন অফিসারের নেতৃত্বে কয়েকজন সেপাই বাড়িতে হামলা চালাল। বাবা এবং মায়ের মৃতদেহ বাড়ির সামনে শুইয়ে দিয়ে তারা চলে গিয়েছিল। মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল ডেভিডের। আকাশলাল না থাকলে সেই সময় সে হয়তো আত্মহত্যাই করত। আকাশলাল তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘তরবারির ফলায় হাত রাখলে কেটে যায় ডেভিড, ওকে কব্জা করতে হলে তার হাতল ধরতে হয়। সেই সময় না আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে হবে আমাদের। তার আগে মাথা গরম করা মানে শুধু আত্মহত্যা করা। নিজেকে সংবরণ করো।’
অনেক কষ্টে নিজেকে সামলেছিল সে। বাবা মা বোনের সমাধির সময় সে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। আর তখন থেকেই সে সরকারের ওয়ান্টেড লিস্টের তিন নম্বরে রয়ে গেছে।
১৪. দুপুরের খাবার খারাপ ছিল না
দুপুরের খাবার খারাপ ছিল না। স্বজন প্রথমে আপত্তি করেছিল, কিন্তু পৃথা তাকে বুঝিয়েছিল না খেলে তার শরীরই কষ্ট পাবে, কাজের কাজ কিছু হবে না। স্ত্রী অথবা নিকটতম বান্ধবীকে পুরুষমানুষ সহজে নিজের কাজের কথা বলতে চায় না। খামোকা বিব্রত না করার ইচ্ছেই হয়তো তার কারণ। কিন্তু সমস্যা যখন প্রবল হয়ে ওঠে, যখন পিঠের পেছনে দেওয়াল নেই, তখন সে তাদের কাছেই নিজেকে মুক্ত করে।
পৃথা সব কথা চুপচাপ শুনেছিল। তারপর বলল, ‘আমি এখন যা-ই বলি না কেন, তা এই অবস্থায় বলা অর্থহীন।’
‘কি বলবে বললা না, হয়তো— ।’ স্বজন থেমে গেল।
‘তুমি ভারতবর্ষ থেকে চলে এলে একজন পেশেন্টের চিকিৎসা করতে অথচ তার নাম জানলে না, পেশা জিজ্ঞাসা করলে না?’ পৃথা মুখ তুলল।
‘সত্যি ভুল হয়ে গেছে। আসলে তখন মাথায় আসেনি। স্যার বললেন এমন করে যে রাজি না হয়ে পারিনি।’
‘তুমি একটা বিদেশি রাজ্যে আসছ, তোমার নিরাপত্তা, আমার নিরাপত্তা নিয়ে না ভেবেই চলে এলে?’ পৃথার গলায় ঝাঁঝ।
‘স্যার বলেছিলেন কোনও অসুবিধে হবে না। ওরা আমাদের জন্যে টুরিস্ট লজে ঘর ঠিক করে রেখেছে। যে কয়দিন কাজ করতে হবে ওরাই সব ব্যবস্থা করবে, আর কাজের শেষে দেশটা ঘুরিয়ে দেখাবে। এটা শুনেই তোমাকে নিয়ে এসেছিলাম।’
‘ওরা তোমাকে টাকা দেবে বলেছিল?’
‘হ্যাঁ। ওরা মানে স্যার আমাকে বলেছিলেন।’
‘তার মানে তোমার স্যার এ সবই জানতেন।’
‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। স্যারকে আমি অনেক বছর ধরে চিনি। ওঁর মধ্যে কোনও প্যাঁচ নেই। এরা আমাদের বন্দি করে রাখবে জানলে উনি আসতে বলতেন না।’
পৃথা মাথা নাড়ল, ‘এখন এসব কথা বলার কোনও মানে হয় না।’
তখন প্রায় বিকেল। ঘরে আলো জ্বালা রয়েছে। স্বজন পৃথার কাছে এগিয়ে এল, ‘পৃথা, যে করেই হোক আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে।’
পৃথা মাথা নাড়ল, ‘কিন্তু দিনের আলোয় সেটা অসম্ভব। রাত নামলেও তা কি করে যে সম্ভব হবে তা বুঝতে পারছি না। এই বাড়ির চারপাশে পাহারা আছে।’
স্বজন গলা নামাল, ‘তুমি বুঝতে পারছ এরা কারা?’
‘এদেশের সরকার-বিরোধী কোনও দল।’
‘ইয়েস। এদেশের পুলিশ কমিশনার আমাকে অভদ্রের মতো ধরে নিয়ে গেলেও কোনও অশালীন ব্যবহার করেনি। লোকটা আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল সকাল হতেই। এদের মতো ঘরের ভেতর জোর করে আটকে রাখেনি। তোমার মনে আছে ওই বাংলোয় আমি একটা ডেডবডি দেখেছিলাম। আমি নিশ্চিত, এরাই লোকটাকে খুন করেছে। অথচ এই মনে হওয়ার কথা আমি পুলিশ কমিশনারকে বলিনি। খুব ভুল করেছি।’
পৃথা স্বামীর দিকে তাকাল, ‘সেই পুলিশ অফিসারের কথা বলেছ?’
‘হ্যাঁ। ওঁর সাহায্যেই আমরা বাংলো থেকে বেরিয়ে এসেছি একথা বলেছিলাম।’
‘তা শুনে উনি কি বললেন?’
‘খুব খেপে গেলেন।’
‘তার মানে ওই লোকটাও এদের দলে?’
‘ঠিক তা নয়, বুঝলে। ব্যাপারটা গোলমেলে।’
‘শোনো, এদেশের ব্যাপারে আমাদের থাকার কোনও দরকার নেই। রাত হোক, তারপর একটা উপায় বের করতেই হবে এখান থেকে পালাবার। তুমি যদি আগে আমাকে বলতে এখানে কাজ নিয়ে আসছ, তা হলে আমি কিছুতেই রাজি হতাম না।’ পৃথা ঠোঁট ফোলাল। স্বজন তাকে জড়িয়ে ধরল, ‘সরি, আমি আর কখনও তোমার অবাধ্য হবো না। কোনও কথা তোমার কাছে লুকোব না।’
‘ছাই।’ মুখ ফেরাল পৃথা।
‘মানে?’ দুহাতে কাছে টানল স্বজন।
‘এখন বলছ, ফিরে গিয়ে যেই নিজের জগৎ পাবে সব ভুলে যাবে।’
ওই অবস্থাতেও স্বজনের মনে হল এই মেয়েটাকে ভাল না বেসে এক সেকেন্ডও নিশ্বাস নেবার কোনও মানে হয় না। সে মুখ নামাচ্ছিল, এমন সময় দরজায় শব্দ হল। সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে সরে গেল পৃথা। আর স্বজনের গলা থেকে অসাড়ে একটিই শব্দ বেরিয়ে এল, ‘শালা!’
স্বজন দরজার দিকে তাকাল। দ্বিতীয়বার শব্দ হল। সে গলা তুলে প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘আবার কি হল? দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ নেই।’
দরজা খুলে গেল। একটি নতুন লোক, হাতে অস্ত্র, ঘরে ঢুকে খুব বিনীত ভঙ্গিতে বলল, ‘আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।’
‘নিয়ে যেতে এসেছেন মানে?’ স্বজন খিচিয়ে উঠল।
‘আমাদের নেতা আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছেন।’
‘তিনি কে হরিদাস পাল যে নিয়ে যেতে বললেই আমি যাব।’
‘তিনি আমাদের মহান নেতা, তাই আপনি ওঁর সম্পর্কে শ্রদ্ধা নিয়ে কথা বলবেন। উনি আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’ লোকটার গলার স্বর যেভাবে পাল্টে গেল তাতে সংশয় রইল না যে সে তার কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন।
পৃথা এবার কথা বলল, ‘ভালই হয়েছে। আমরা ওদের নেতাকেই সরাসরি প্রশ্ন করতে পারি কেন আমাদের এভাবে আটকে রাখা হয়েছে।’
কথাটা মনে ধরল স্বজনের। সে উঠল, ‘চলো।’
পৃথা এগোচ্ছিল কিন্তু লোকটি বাধা দিল, ‘মাফ করবেন, আপনি এখানেই অপেক্ষা করুন।’
‘তার মানে?’ পৃথা অবাক।
‘শুধু ডাক্তার সাহেবকে নিয়ে যাওয়ার হুকুম হয়েছে।’
স্বজন পৃথার দিকে তাকাল, ‘অসম্ভব! এরা ভেবেছে কী! যা ইচ্ছে বলবে আর তাই আমাদের শুনতে হবে? তোমাকে না যেতে দিলে আমি যাচ্ছি না।’
পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘আমি গেলে অসুবিধে কোথায়?’
লোকটা মাথা নাড়ল, ‘আমাকে বলা হয়েছে শুধু ডাক্তার সাহেবকে নিয়ে যেতে।’
হঠাৎ পৃথা বসে পড়ল বিছানায়, ‘তুমি একাই যাও।’
স্বজন স্ত্রীর দিকে এগিয়ে এল, ‘মানে?’
‘দুজনের যাওয়ার জেদ ধরলে হয়তো নেতার সঙ্গে কথা বলার সুযোগই পাওয়া যাবে না। তাছাড়া তুমি ডাক্তার। পেশেন্টের সঙ্গে যখন কথা বলো তখন সাক্ষী হিসেবে কি আমি উপস্থিত থাকি? এটাকেও সেইরকম ভেবে নেব।’ পৃথা বলল।
কাঁধ ঝাঁকাল স্বজন। কথাটায় যুক্তি আছে। তারপর দ্রুত লোকটার দিকে এগিয়ে যেতেই সে দরজার বাইরে পৌঁছে ওপরের দিকে হাত দেখল। লোকটাকে অনুসরণ করে স্বজন হলঘর পেরিয়ে দেখল দোতলায় যাওয়ার দুটো সিঁড়ি আছে। লোকটা তাকে বাঁ দিকের সিড়ি দিয়ে ওপরে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ তার মনে হল এটা এ বাড়ির সামনের দিক হতে পারে না। বাড়িটার পেছনের দিকটাই এরা ব্যবহার করছে।
দোতলায় চারজন মানুষ অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে। হায়দারকে এগিয়ে আসতে দেখল সে। হাসিমুখে কাছে এসে হায়দার বলল, ‘আসুন ডাক্তার, আকাশলাল আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। আপনার সঙ্গে কথা শেষ না হলে আমাদের ডাক্তার ওকে ঘুমের ওষুধ দিতে পারছে না। এদিকে আসুন।’ হায়দার এগিয়ে যাচ্ছিল।
ঘুমের ওষুধ! আকাশলাল! প্রথমটা থেকে বোঝা যাচ্ছে অসুস্থ কেউ এখানে আছেন। আর আকাশলাল শব্দটার সঙ্গে পোস্টারের কল্যাণে ইতিমধ্যে পরিচিত হয়ে গিয়েছে।
ঘরে অল্প আলো। খাটে একটি মানুষ আধা শোওয়া অবস্থায় ছিল, তারা ঢুকতেই উঠে বসল। এই হল আকাশলাল। যার জন্যে লক্ষ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ছবির চেহারার সঙ্গে কোনও পার্থক্য নেই, শুধু সামনে বসা মানুষটাকে বেশ রোগা বলে মনে হচ্ছে। ঘরে আরও তিনজন মানুষ, যাদের একজন বৃদ্ধ এবং গলায় স্টেথো প্রমাণ করে উনি একজন ডাক্তার। দু-হাত জড়ো করে আকাশলাল বলল, ‘আসুন, আসুন। নমস্কার। আপনাকে বিপাকে ফেলার জন্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। বসুন। আমার নাম আকাশলাল।’
স্বজন আকাশলালকে দেখল। এরই মুখ পোস্টারে দেখেছে সে। তবে পোস্টারের থেকে এখন ওকে অনেক রোগা দেখাচ্ছে। চোখের কোল বসা। নাকটা বেশ এগিয়ে আছে। গায়ের রং পাহাড়িদের যেমন হয়। লোকটার চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল, দৃষ্টি ধারালো।
‘আপনি অনুগ্রহ করে বসুন।’ আকাশলালের গলা শুনে সে চেয়ারটার দিকে তাকাল। তারপর নেহাতই বসতে হয় বলে বসে প্রশ্ন করল, ‘আপনাদের উদ্দেশ্য কি?’
‘হ্যাঁ। সেটা নিয়ে আলোচনা করব বলে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি।’ আকাশলাল সামান্য কাশল। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ ডাক্তার উঠে এল, ‘কি ব্যাপার? কাশিটা কখন শুরু হয়েছে? এর আগে শুনিনি তো!’
‘না। এমন কিছু নয়। হঠাৎই হল।’
‘এই সময় কাশি হওয়া ভাল নয়।’ বৃদ্ধকে চিন্তিত দেখাল। সেটা উপেক্ষা করে আকাশলাল বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি আপনি খুব টেনশনে আছেন। আসলে আজ পর্যন্ত আপনার এমন অভিজ্ঞতা হবার কথা ছিল না। আপনি সরাসরি টুরিস্ট লজে উঠবেন, ঘুরে বেড়াবেন এবং প্রয়োজনের সময় আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব, এমনই স্থির ছিল। কিন্তু ঠিক সময়ে আপনি পৌঁছালেন না, সঙ্গে স্ত্রীকে নিয়ে এলেন, তার ওপর ভার্গিসের সঙ্গে আপনার দেখা হয়ে যাওয়া—এ সব ব্যাপার পরিকল্পনাটা পাল্টে দিস’।
স্বজন জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার সিনিয়রের মাধ্যমে আপনারাই যোগাযোগ করেছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমাকে বলা হয়েছিল একজন পেশেন্টের কথা, যিনি অসুস্থতার কারণে এই শহর ছেড়ে যেতে পারছেন না। তিনি কে?’
‘আমি। এই মুহূর্তে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ নই। আপনার সঙ্গে আমার ডাক্তারবাবুর আলাপ করিয়ে দিই। এঁর কথাই আপনাকে বলেছিলাম।’ বৃদ্ধ ডাক্তারকে শেষ সংলাপটি বলল আকাশলাল।
ডাক্তারকে নমস্কার করল স্বজন। তারপর আকাশলালকে বলল, ‘কিন্তু এই শহরের যে কোনও রাস্তা বলে দেবে পুলিশ আপনাকে চাইছে এবং ধরিয়ে দিলে লক্ষ লক্ষ টাকা। পুরস্কার পাওয়া যাবে। পুলিশের চোখে আপনি ক্রিমিন্যাল।’
‘হ্যাঁ। আপনি নিশ্চয়ই জানেন প্রতিবাদ করলে বুর্জোয়া শক্তি কি ভাবে রি-অ্যাক্ট করে।’
এই প্রথম এখানে আসার পর স্বজনের হাসি পেল, ‘সেই রি-অ্যাকশন শুধু বুর্জোয়া শক্তি করে বলছেন কেন? যারা সর্বহারাদের নেতৃত্ব দেয় বলে দাবি করে তারাও তাদের কাজের বিরুদ্ধে কারও প্রতিবাদ হজম করতে পারে না। সঠিক হলেও না।’
‘আপনি হয়তো ঠিকই বলেছেন। কিন্তু ডাক্তার, আমরা আপনার সাহায্য চাই।’
‘কিন্তু আমি যদি সাহায্য করতে রাজি না হই?’
আকাশলালের প্রায় রক্তশূন্য মুখ হঠাৎ খুব শক্ত হয়ে গেল। বোঝা গেল বেশ কষ্ট করেই নিজেকে সামলাচ্ছে সে। এই সময় হায়দার কথা বলল, ‘ডাক্তার! আপনাদের ভারতবর্ষ গণতান্ত্রিক দেশ। ভোটের বাক্সে সেখানে আপনারা নিজেদের মত ব্যক্ত করতে পারেন। সরকার অত্যাচারী হলে তাকে উৎখাত করতে পারেন ভোট না দিয়ে। কিন্তু আমাদের দেশে ভোট হয় না। একজন নাবালক রাজাকে সামনে রেখে বোর্ড রাজত্ব চালাচ্ছে। এই বোর্ডের ইচ্ছের বিরুদ্ধে এখানে কোনও কাজ হয় না। পুলিশ তাই এখানে প্রচণ্ড শক্তিমান। গরিব নিম্নবিত্ত মানুষেরা দিনের পর দিন অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা এই অবস্থা পাল্টাতে চাই। আমরা চাই জনসাধারণের নির্বাচিত সরকারই দেশ শাসন করুক। আর সেটা চাই বলেই ওরা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমাদের শেষ করে দিতে চাইছে।’
স্বজন বলল, ‘দেখুন, আমি একজন বিদেশি। আপনারা সরকার-বিরোধী কাজকর্ম করছেন। এই অবস্থায় আপনাদের সাহায্য করা মানে এদেশের সরকারের বিরোধিতা করা।’
‘এক সেকেন্ড!’ আকাশলাল হাত তুলল, ‘আপনি চিকিৎসক হিসেবে পেশেন্টকেই, দেখবেন বলে আশা করব, তার ব্যাকগ্রাউন্ড, দেখার কি প্রয়োজন আছে?’
স্বজন আকাশলালের দিকে তাকাল। হঠাৎ তার মনে হল যাকে এখানকার পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে সে কি করে শহরের মধ্যেই এমনভাবে থাকতে পারে? লক্ষ লক্ষ টাকার লোভ কেন ওর সঙ্গীদের বিশ্বাসঘাতকতা করতে উদ্বুদ্ধ করেনি? নিশ্চয়ই এই মানুষটার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা ওকে আলাদা করেছে। সে ইচ্ছে না করলে এরা তাকে বাধ্য করতে পারে না কাজ শুরু করতে। হয়তো অত্যাচার সহ্য করতে হবে। কিন্তু তার কৌতূহল হচ্ছিল। একজন অসুস্থ মানুষ, যাকে বিপ্লবের নেতা বলে সবাই জানে তার মনে কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে অত দূর থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডেকে আনার?
স্বজন বলল, ‘বলুন, আমাকে কি করতে হবে?’
আকাশলালের গম্ভীর মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল। দেখা গেল ঘরের অন্য মানুষরাও কথাটা শুনে স্বস্তি পেল। আকাশলাল বলল, ‘থ্যাঙ্কু ডক্টর। আপনি কিছু খাবেন? চা বা কফি?’
‘না।’ মাথা নাড়ল স্বজন।
‘দেখুন ডাক্তার, এদেশের সব মানুষ আমাকে চেনে। আমাকে চেনে আমার মুখ দেখে। পুলিশ ওয়ান্টেড পোস্টারে আমার মুখের ছবি ছেপেছে। ঈশ্বরের দেওয়া এই মুখ নিয়ে আমি কখনই প্রকাশ্যে কাজ করতে পারব না। প্রকাশ্যে কাজ করতে না পারলে আমি বিপ্লবের কোনও সাহায্যেই আসব না। আমি ওভাবে বেঁচে থাকতে রাজি নই। আমি জার্নালে পড়েছি, বিজ্ঞান মানুষের মুখের চেহারা একদম পাল্টে দিতে পারছে। আপনাদের দেশে আপনি ওই ব্যাপারে একজন প্রথম শ্রেণীর বিশেষজ্ঞ। এই কারণেই আপনার শরণাপন্ন হয়েছি আমরা।’ আকাশলাল দ্রুত কথা বলছিল। ফলে শেষের দিকে হাঁপাতে দেখা গেল তাকে।
স্বজন মাথা নাড়ল, ‘কিন্তু ওই অপারেশনের জন্যে যেসব যন্ত্রপাতি দরকার— !’
ত্রিভুবন বলল, ‘বেশির ভাগই আমরা আপনার সিনিয়রের সঙ্গে কথা বলে আনিয়ে রেখেছি। কিছু আপনাকে সঙ্গে নিয়ে আসতে বলেছিলাম।’
‘আচ্ছা, আমার সিনিয়র কি এসব জানেন?’
ত্রিভুবন মাথা নাড়ল, ‘তিনি জানতে চাননি।’
‘আপনাকে দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে। অপারেশন শুরু করার আগে আপনার শরীরের অবস্থা পরীক্ষা করা দরকার। ওঁর কন্ডিশন কি?’ স্বজন বৃদ্ধ ডাক্তারকে প্রশ্ন করল।
তিনি উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন কিন্তু আকাশলাল তাঁকে ইশারায় নিষেধ করল, ‘আমি ভাল আছি। আমার শরীর নিয়ে কোনও দুশ্চিন্তা নেই।’
বৃদ্ধ ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার অপারেশনের জন্যে বডি কন্ডিশন কি রকম থাকা উচিত? কতটুকু ঝুঁকি নিতে পারেন?’
‘পেশেন্টের ব্লাডসুগার একদম নর্মাল থাকবে। প্রেসারও।’
বৃদ্ধ ডাক্তার চিন্তিত হলেন, ‘প্রেসারটা— !’
‘নর্মাল থাকবে।’ আকাশলাল বলে উঠল, ‘আমার ব্লাডসুগার নেই, এবং রক্ত এখন পর্যন্ত সব দিক দিয়েই ঠিক আছে। কিন্তু অপারেশনের পর মুখে কোনও দাগ থাকবে না তো?’
স্বজন হেসে ফেলল, ‘সেটা নির্ভর করছে অপারেশন কি ধরনের হচ্ছে, তার ওপরে। আপনি চাইছেন আপনার মুখের পরিবর্তন এমন ভাবে করতে যাতে কেউ দেখে আপনাকে চিনতে না পারে। তাই তো?’
১৫. আকাশলাল হাসিমুখে মাথা নাড়ল
আকাশলাল হাসিমুখে মাথা নাড়ল।
‘আপনার নাক, চোখের ওপরের সামান্য পরিবর্তনেই সেটা সম্ভব। আর তার জন্যে মুখে কোনও দাগ হবে না। ব্যাপারটা কখন করতে হবে?’ —স্বজন জিজ্ঞাসা করল।
‘আরও দুটো দিন আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে ডাক্তার।’
‘তার মানে আরও দুটো দিন আমাদের ওই ভাবে বন্দি হয়ে থাকতে হবে?’ স্বজনের গলায় আগের অসন্তোষ ফিরে এল।
হায়দার বলল, ‘আপনার ওপর কোনও রকম অত্যাচার করা হচ্ছে না। হ্যাঁ, আপনার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিন্তু বুঝে দেখুন, এ ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনও পথ খোলা নেই। এই মুহূর্তে ভার্গিস সাহেবের চোখে আপনি পলাতক। সমস্ত শহর চষে বেড়াচ্ছে পুলিশ আপনাকে খুঁজে বের করতে। আপনি ধরা পড়লে আমাদের পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যেত। তা ছাড়া, আপনি এখন অনেক কিছু জেনে গিয়েছেন। আশা করি আমাদের সমস্যাটা আপনি বুঝতে পারছেন।’ হায়দার ধীরে ধীরে কথাগুলো বলল।
‘হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। একটি মানুষকে তার বর্তমান পরিচয় পাল্টাতে সাহায্য করতে হবে। কিন্তু মনে রাখবেন, হাতের ছাপ এক থেকে যাবে। প্রতিপক্ষ বুদ্ধিমান হলে ধরা পড়তে বেশি দেরি হবে না। যাক্ গে! কিন্তু ব্যাপারটা কিরকম গোপন থাকছে?’
আকাশলাল বলল, ‘এই ঘরের বাইরে আর একজন ঘটনাটা জানবে।’ সে হায়দারের দিকে তাকাল, ‘ডেভিডের ফিরে আসা উচিত ছিল।’
হায়দার ঘড়ি দেখে মাথা নাড়ল।
স্বজন উঠে দাঁড়াল, ‘আমি এবার যেতে পারি?’
‘অবশ্যই। ডাক্তার, আপনার মন পরিষ্কার হয়েছে তো?’
‘না। এখানে আসার পথে আমরা একটা নির্জন বাংলোয় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেখানে মাটির নীচের ঘরে কফিনের মধ্যে একটি মৃতদেহ দেখতে পাই।’
‘বাবু বসন্তলালের মৃতদেহ।’ হায়দার বলল।
‘তাকে কি আপনারাই খুন করেছেন?’
‘এই প্রশ্নের উত্তর জেনে আপনার কি লাভ?’ আকাশলাল গম্ভীর হল।
‘কাউকে খুন করে ওই ভাবে রেখে দেওয়া আমাকে বিস্মিত করেছে।’
‘ও। না, আমরা খুন করিনি। বিপ্লব শুরু হলে হয়তো বাবু বসন্তলাল আক্রান্ত হতেন। এই লোকটা নিজের স্বার্থের জন্যে মন্ত্রী এবং বোর্ডের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এ দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। আমরা ওর বিচার করতাম। আমরা ভেবে পাচ্ছি না কে ওকে খুন করল! জানি দায়টা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিলে ভার্গিসদের সুবিধে হয়। আর কিছু?’
স্বজন আর দাঁড়াল না।
বৃদ্ধ ডাক্তার চলে গিয়েছিলেন। আকাশলালের সামনে হায়দার, ডেভিড এবং ত্রিভুবন বসে আছে। ত্রিভুবন জিজ্ঞাসা করল, ‘সোমকে নিয়ে কি করব?’
হায়দার বলল, ‘লোকটাকে ভার্গিস খুঁজে পেলে শেষ করে দেবে।’
ডেভিড বলল, ‘তা হলে ওকে ভার্গিসের হাতে তুলে দেওয়াই ভাল।’
‘কিন্তু এই মুহূর্তে সোম ভার্গিসের শত্রু।’ হায়দার বলল।
আকাশলাল এবার কথা বলল, ‘না। ও ভার্গিসের শত্রু হতে পারে কিন্তু আমাদের মিত্র ভাবার কোনও কারণ নেই। একটা লোক এত বছর ধরে যে অত্যাচার করে গেছে তা আমরা রাতারাতি ভুলে যেতে পারি না। ও চাইবে ভার্গিসের ওপর প্রতিশোধ নিয়ে বোর্ডের আস্থা অর্জন করতে। ত্রিভুবন, এই মুহূর্তে ভার্গিসের চেয়ে সোম আমাদের কাছে কম বিপজ্জনক নয়। আর যাকেই হোক, মেরুদণ্ডহীন প্রাণীকে প্রশ্রয় দিলে নিজেদের সর্বনাশই ডেকে আনা হবে।’
এখন নিশুতি রাত। তবে আজকের রাতটার সঙ্গে বছরের অন্যান্য রাতের কোনও মিল নেই। আজ এই নগরের পথে পথে মাঠেঘাটে অজস্র মানুষ জেগে আছে সকাল হওয়ার জন্য।
যাদের পকেটে পয়সা নেই, হোটেল বা ধর্মশালার চার দেওয়ালের মধ্যে যারা আশ্রয় নিতে পারেনি তারা আগুন জ্বেলে গল্পগুজব করে যাচ্ছে খোলা আকাশের নীচে বসে। একটাই তো রাত আর রাত ফুরোলেই উৎসব।
পুলিশ প্রাণপণে শৃঙ্খলা বজায় রাখছে এখনও। কিছু রাস্তায় নো এন্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে, ফুটপাত থেকে নীচে নামতে দেওয়া হচ্ছে না সর্বত্র। তবে এই জনতরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ কাজ নয়। ভালয় ভালয় উৎসবপর্ব চুকে গেলে এরা শহর ছেড়ে গেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে পুলিশ। ভার্গিসের নির্দেশ ছিল এই মানুষের দঙ্গলে আকাশলালদের খুঁজতে হবে। লুকিয়ে পথে নেমে পড়ার এমন সুবর্ণসুযোগ আকাশলাল হারাবে না, ভার্গিস এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত। কিন্তু এই হাজার হাজার মানুষের ভেতর সন্ধান-কাজ চালানো যে অসম্ভব ব্যাপার তা কাজে নেমে বোঝা যাচ্ছে। বরং আইন ভাঙার ভয় দেখিয়ে গরিব মানুষগুলোর কাছে যা পাওয়া যায় তাই হাতিয়ে নেওয়াই অনেক সহজ ব্যাপার বলে মনে করছে পুলিশরা।
ত্রিভুবন চুপচাপ এই ভিড়ে মিশে গিয়েছিল। রাতটা যদি আজকের রাত না হত তাহলে তার পক্ষে এমন নিশ্চিন্তে হাঁটা সম্ভব ছিল না। আকাশলালের খুব কাছের লোকদের মধ্যে যে সে অন্যতম তা পুলিশ যেমন জানে নগরের সাধারণ মানুষেরও অজানা নেই। ত্রিভুবনের বয়স অল্প এবং সে সুদর্শন। সুবেশে থাকলে ফিল্মস্টার বলে ভুল হয়। সাধারণ মানুষ তাই তাকে সহজেই মনে রাখে। আকাশলালকে ধরে দিলে পুরস্কার দেওয়া হবে, সরকারি এই ঘোষণার পর সে দিনের বেলায় রাস্তায় বেরুনো বন্ধ করেছে, কিন্তু সংগঠনও অন্যান্য কাজ চালাতে তাকে রাতের পর রাত জেগে থাকতে হয়। আগামী কাল একটা চূড়ান্ত ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। হায়দার কিংবা ডেভিডের যতই আপত্তি থাকুক, ত্রিভুবনের মনে হয় চুপচাপ ইঁদুরের মত লুকিয়ে থাকার চেয়ে এখন মরিয়া হওয়া ঢের ভাল।
চারচকের কাছে এসে দেখল ফুটপাতের মানুষজন চুপচাপ আর রাস্তা দিয়ে একটার পর একটা পুলিশের লরি যাচ্ছে। লরিভর্তি পুলিশের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরা। ওরা যতক্ষণ যাচ্ছিল ততক্ষণ আগন্তুক মানুষেরা কথা বলেনি, চলে যাওয়া মাত্র যে গুঞ্জন শুরু হল তাতে স্পষ্ট বোঝা গেল পুলিশদের এমন টহল দেওয়া কেউ পছন্দ করছে না।
দূরে পাহাড়ে পাহাড়ে ঢাক বাজছে। মিছিল আসছে এক একটা গ্রাম থেকে। ত্রিভুবন নিশ্চিত আজ চেকপোস্টের পাহারাদাররা হাল ছেড়ে দেবে। শহরে ঢোকার সময় এতক্ষণ পর্যন্ত যে কড়াকড়ি ওরা করে যাচ্ছিল তা শিথিল হবেই। ছোট-ছোট মিছিলগুলোয় ভক্ত মানুষদের আটকাতে ওরা সাহস পাবে না। তাই সে নির্দেশ পাঠিয়েছিল সোমকে নিয়ে ওইরকম একটা মিছিলে মিশে শহরে ঢুকে পড়তে। চারচকের পাশে ফোয়ারার কাছে সে অপেক্ষা করবে, তা হেনার জানা আছে। ওদের দেরি হচ্ছে কেন তা সে বুঝতে পারছিল না। ত্রিভুবন ঘড়ি দেখল। রাত একটা। ফোয়ারাটা আজ আরও ফুর্তি নিয়ে আকাশে জল ছুঁড়ছে। ওর গায়ে আলো পড়ায় দৃশ্যটা চমৎকার। নিজের গায়ে হাত বোলাল সে। দাড়ি গোঁফের জঙ্গলে সুন্দর মুখটাকে আড়াল করে রেখেছে অনেকদিন হল। কিন্তু গায়ের রং আর চোখ মাঝে মাঝেই বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেলে। আগামী কাল ঘটনাটা ঘটে গেলে ভার্গিস সাহেব থিতিয়ে যাবেন চূড়ান্ত জয় হয়ে গেল ভেবে। তার কিছুদিন পরে শুরু হবে আসল খেলা। শরীরের শেষবিন্দু রক্ত সক্রিয় থাকতে সেই খেলায় সে হার মেনে নেবে না। বারো বছর বয়সে নেওয়া প্রতিজ্ঞাটা আজও তাকে মাঝে মাঝে উন্মাদ করে তোলে। পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে শহরে পড়তে আসত ওরা। গ্রাম থেকে বেরিয়ে পাকদণ্ডি দিয়ে ওঠানামা করতে করতে শহরের স্কুলে ঠিক সময়েই পৌঁছে যেত। স্কুলটা ছিল গরিব ছেলেমেয়েদের জন্যে। কথাটা সেই সময়েই ওরা শুনেছিল। ত্রিভুবন ভাবত বাবা মা গরিব হলে তাদের ছেলেমেয়েকে গরিব বলা হয় কেন? গরিব হওয়া যদি দোষের হয় তাহলে ছেলেমেয়েরা কেন দোষী হবে? পড়াশুনায় ভাল ছিল সে, কিন্তু দেখতে ভাল ছিল অনেক বেশি। সবাই তার দিকে প্রশংসার চোখে তাকাত আর সেটা উপভোগ করতে তার মন্দ লাগত না।
ত্রিভুবনের বাবা ছিলেন সাধারণ একজন চাষি। ভুট্টা এবং কফি চাষ করে কোনও মতেই সংসার চলত না বলে একটা দোকান খুলেছিলেন গ্রামে। মা বসতেন সেই দোকানে। ধার দিয়ে দিয়ে দোকানটাকে ফাঁকা করে ফেলেছিলেন বাবা। আর যাই হোক ব্যবসা করার বুদ্ধি তাঁর ছিল না। বরং ও ব্যাপারে মা ছিলেন অনেক আঁটোসাঁটো। দোকান খোলার পরই মা বাবার মধ্যে ঝগড়া হতে দেখেছে সে। একবার শহরে মাল কিনতে গিয়ে বাবা আর ফিরে এলেন না। অনেক চেষ্টা করেও তাঁর খোঁজ পাওয়া গেল না। হাল ছেড়ে দেননি মা। নিজেই দোকান চালাতেন, লোক দিয়ে চাষ করতেন। তার মা সুন্দরী ছিলেন কিন্তু একা হয়ে যাওয়ার পরেও কোনও পুরুষকে কাছে ঘেঁসতে দিতেন না। একবার পুলিশ বাহিনী গ্রামে এল। ওরা গ্রামে এলেই যে যার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিত। শুধু গ্রামপ্রধানকে হাতজোড় করে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। বাহিনীর ক্যাপ্টেন গ্রামপ্রধানের কাছে খাবার দাবার চাইল। তার ব্যবস্থা হল। তখন তার নজর পড়ল মায়ের মুদির দোকানের ওপর। সরাসরি এসে লোকটা মায়ের কাছে মদ কিনতে চাইল।
মা খুবই বিনীত ভঙ্গিতে জানিয়ে দিল যে তিনি মদ বিক্রি করেন না।
লোকটা হা হা করে হাসল, পাহাড়ে মুদির দোকান অথচ লুকিয়ে লুকিয়ে মদ বিক্রি করে না বন্দুক দিয়ে ছবি আঁকার মতো ব্যাপার। ওসব গপ্পো ছেড়ে বোতল বের করো।
গ্রামপ্রধান মায়ের হয়ে বলতে এসে প্রচন্ড ধমক খেল। শেষ পর্যন্ত অসহায় হয়ে মা প্রাণের দায়ে গ্রামে যেসব ঘরে চোলাই হয় তাদের দ্বারস্থ হলেন। কিছুটা মদ জোগাড় করে ক্যাপ্টেনকে দিয়ে বললেন, ‘এর বেশি কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
ক্যাপ্টেন লোকটা আর বেশি এগোয়নি। কিন্তু দলটা চলে যাওয়ামাত্র গ্রামের লোকজন গোলমাল পাকানো শুরু করল। মা একজন মেয়ে হয়ে পুলিশকে মদ খাইয়েছে, এটা যে কত বড় সামাজিক অপরাধ তা সবাই মাথা নেড়ে নেড়ে বলতে লাগল। বাধ্য হয়ে গ্রামপ্রধান বিচারের আসর বসাল। তাতে রায় দেওয়া হল গ্রামের সবাইকে এক বেলা ভরপেট খাইয়ে দিতে হবে। ব্যাপারটা মায়ের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার ছিল। ওটা করতে গেলে দোকানে আর একটা কণাও থাকবে না। ত্রিভুবন তখন ছোট। তার প্রতিবাদ করার শক্তিও হয়নি। ব্যাপারটা নিয়ে যখন কদিন ধরে গ্রামে বেশ হইচই হচ্ছে তখন দ্বিতীয় পুলিশবাহিনী এল। মানুষজন যে যার ঘরের দরজা বন্ধ করলেও মা তাঁর দোকানে চুপচাপ বসে ছিলেন। এই দলের ক্যাপ্টেন লোকটা নিষ্ঠুর চেহারার। গ্রামপ্রধানকে ডেকে বলল, ‘এই সুন্দরী মেয়েটা একা দোকান চালায় নাকি?’
গ্রামপ্রধান মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ। ওর স্বামী হারিয়ে গেছে।’
‘বাঃ। এখন কার সঙ্গে আছে?’
‘ওর ছেলে সঙ্গে থাকে।’
‘খুব ভাল কথা। ওকে বলো আজ রাত্রে আমরা এই গ্রামে থাকছি আর আমি ওর অতিথি হব। যেন ভাল করে যত্ন করে। নইলে তোমাদের গ্রাম থেকে জনা-দশেক ধরে নিয়ে যেতে হবে।’
তখন জোর করে জোয়ান ছেলেদের ধরে নিয়ে গিয়ে বিনিপয়সায় সরকারি কাজ করানো হত। কাজ শেষ করে যারা ফিরে আসত তারা বাকি জীবনটা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারত না। দরজা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ঘরে ঘরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামপ্রধান বিরস মুখে মায়ের কাছে এলে মা চিৎকার করে বললেন ‘আমি কি রাস্তার মেয়ে যে যাকে তাকে ঘরে তুলব।’
গ্রামপ্রধান মিনমিন করে বলল, ‘তুমি শুধু একটু যত্ন করো, তোমাকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে তা মাপ করে দেওয়া হবে। কাউকে খাওয়াতে হবে না।’
ক্যাপ্টেন কথাটা শুনতে পেয়েছিল, ‘বাঃ, এর ওপর শাস্তিটাস্তিও চাপানো হয়েছে দেখছি। এত সুন্দর মেয়েকে কোন শালা শাস্তি দেয়, অ্যাঁ? কাউকে খাওয়াতে হবে না, শুধু আমাকে খাওয়ালেই চলবে।’ লোকটা কথা বলতে বলতে দোকানে উঠে মায়ের কাঁধে হাত রাখতে যেতেই মা ওকে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা মারলেন। লোকটা টাল সামলাতে না পেরে চিত হয়ে পড়ে গিয়ে আচমকা স্থির হয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য পুলিশরা ছুটে গেল দোকানে। ক্যাপ্টেনকে ধরাধরি করে তুলতেই দেখা গেল তার পিঠ থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে আর সেখানে একটা বঁটির ফলা অনেকটা বিঁধে রয়েছে। ক্যাপ্টেনের সহকারী ঝটপট মাকে চুল ধরে টেনে নীচে নামাতেই ত্রিভুবন আড়াল থেকে বেরিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল, ‘মারছ কেন? আমার মাকে মারছ কেন তোমরা? মা তো কিছু করেনি। ওই লোকটাই মাকে মারতে গিয়েছিল। ছেড়ে দাও-।’
ওরা ত্রিভুবনকে তুলে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিল। আছাড় খাওয়ামাত্র ত্রিভুবনের মনে হল পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেছে। যখন জ্ঞান ফিরল তখন পুলিশরা গ্রামে নেই। উঠে বসে সে শুনতে পেল ক্যাপ্টেনের মৃতদেহের সঙ্গে ওরা তার মাকেও ধরে নিয়ে গেছে। সে শূন্য দোকানটার দিকে অবশ চোখে তাকাল। আর তখনই কানে এল গ্রামের মানুষ বলাবলি করছে যে ওরা আজই মাকে মেরে ফেলবে। সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরে সাড় ফিরে এল। টলতে টলতে সে দৌড়াতে লাগল পাকদণ্ডির পথ ধরে। পুলিশগুলো যদি শহরে ফিরে যায় তাহলে এপথেই তাদের পাওয়া যাবে। কিন্তু শহরের মুখটায় পৌঁছেও সে পুলিশ বাহিনীর দেখা পেল না। তখন খেয়াল হল ওদের সঙ্গে যদি গাড়ি থাকে তাহলে ওরা ঘুরপথে এতক্ষণ নিশ্চয়ই শহরে ঢুকে গিয়েছে।
আগুপিছু চিন্তা না করে সে হাঁটতে হাঁটতে যখন দুর্গের মতো হেডকোয়ার্টার্সের সামনে পৌঁছাল, তখন দিন মরে এসেছে। হেডকোয়ার্টার্সের মূল গেটেই সেপাইরা তাকে বাধা দিল। অনেক আকুতি মিনতি করা সত্ত্বেও ওরা তাকে ভেতরে ঢুকতে দিতে নারাজ। ঠিক সেই সময় একটা জিপ ভেতর থেকে বেরোতে গিয়েও দাঁড়িয়ে গেল। জিপের সামনে বসা অফিসার সেপাইদের জিজ্ঞাসা করল গোলমাল কিসের?
সেপাইরা ত্রিভুবনকে ধরে নিয়ে গেল অফিসারের সামনে, ত্রিভুবন উত্তেজিত হয়ে কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।
অফিসার চুপচাপ শুনল। ‘যে ক্যাপ্টেন গ্রামে গিয়েছিল তার নাম জানো?’
‘না। আমার মায়ের কোনও দোষ নেই। ওরা অন্যায় করে ধরে নিয়ে গেছে মেরে ফেলবে বলে।’
‘তোমার মা কেমন দেখতে?’
ত্রিভুবন ঢোক গিলল। মা কেমন দেখতে? মায়ের চেয়ে দেখতে ভাল এমন কাউকে সে এখনও দ্যাখেনি। কিন্তু বারো বছর বয়সেই সে বুঝে গিয়েছিল ওই প্রশ্নটার মানে কি। সে দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিয়েছিল, ‘ভাল।’
‘তুমি জিপে উঠে বোসো। দেখি ওরা কোথায়?’
হঠাৎই আশার আলো দেখতে পেল যেন। জিপে যেতে যেতে অফিসার জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাদের গ্রাম কোনদিকে?’
দিকটা জানিয়ে দিল ত্রিভুবন। অফিসার বাঁ হাতে তার গাল টিপে ধরল। ‘তুমি খুব মিষ্টি দেখতে। অত ভয় পাচ্ছ কেন? আমার সঙ্গে থাকলে তোমার কোনও ভয় নেই।’
কোনও মতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ত্রিভুবন। ওই বয়সেই সে গ্রামের কিছু লোকের আদর কবার ভঙ্গি থেকে বুঝে গিয়েছিল কোনও কোনও পুরুষ কেন এমন আদর করে। তার মন বলল এই অফিসার লোকটা খারাপ, খুব খারাপ। কিন্তু দ্রুত ছুটে যাওয়া জিপ থেকে নেমে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। আর নেমে গেলে মায়ের সন্ধান পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে।
সন্ধে নেমে আসছে দ্রুত। নির্জন পাহাড়ি রাস্তায় হঠাৎ পুলিশের বড় ভ্যানটাকে আসতে দেখা গেল। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিপ থামতেই ভ্যানটাও থামল। ত্রিভুবন দেখল ক্যাপ্টেনের সেই সহকারীটা এগিয়ে এসে অফিসারকে স্যালুট করল। ‘স্যার। একটা খারাপ খবর আছে।’
অফিসার জিজ্ঞাসা করল, ‘মেয়েটা কোথায়?’
ক্যাপ্টেনের সহকারী হকচকিয়ে গেল। খবরটা এত তাড়াতাড়ি কি করে ওপরতলায় পৌঁছে গেল তাই বোধহয় বুঝতে চেষ্টা করছিল। সে কিন্তু কিন্তু করে জবাব দিয়েছিল, আমরা ধরে নিয়ে এসেছিলাম। মার্ডার চার্জ স্যার। গাড়ি অনেক নীচে ছিল। হেঁটে আসার পথে বাথরুম পেয়েছে বলায় ওকে একলা ছেড়ে একটু সরে এসেছিলাম ভদ্রতা করে। সেই সুযোগে নীচে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে।’
‘মরে গেছে?’
‘এখনও মরেনি।’
‘কোথায়?’
‘ভ্যানেই আছে।’
অফিসার গাড়ি থেকে নেমে ভ্যানের পেছনের দিকে যেতেই ত্রিভুবন ছুটল সঙ্গে। মা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কেন? প্রশ্নটা তার ছোট্ট বুকটায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল। ভ্যানের দরজা সেপাইরা খুলে দিতেই অফিসারের মৃতদেহটা দেখা গেল। স্থির হয়ে আছে। তার পাশে রক্তাক্ত মহিলাটি তার মা? অফিসারের নির্দেশে শরীরটা নামানো হল। মায়ের গালের মাংস খুবলে খুবলে তুলে নেওয়া হয়েছে যেন। কোমরের খোলা চামড়ায় দাঁতের চিহ্ন স্পষ্ট। দুটো পা রক্তাক্ত। অফিসার বলল, ‘হুঁ । চমৎকার আছড়ে ছিলে তোমরা। ওকে আমার জিপে তোল।’
মায়ের চেহারা এমন ভীতিকর হয়ে গেছে যে গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছিল না ত্রিভুবনের। অফিসারের জিপ সোজা চলে এল শহরের হাসপাতালে। মাকে ভর্তি করে দেওয়া হল সেখানে। ডাক্তাররা বলল বাঁচানোর চেষ্টা করবে। অফিসার বলল, ‘যাক, কাজ শেষ। আজ রাত্রে চলো, আমার কাছে থাকবে।’ বলে একটা চোখ কোঁচকাল।
সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে ছিল ত্রিভুবন। অফিসার কিছু বোঝার আগেই একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। তারপর শহরের এ গলি ও গলিতে সময় কাটিয়ে আবার ফিরে গিয়েছিল হাসপাতালে মধ্যরাতে। ঠিক তখনই ক্যাপ্টেনের সহকারীকে সে দেখতে পেল হাসপাতালে ঢুকতে। সন্তর্পণে একজন অ্যাটেনডেন্টকে ডেকে কিছু বলে টাকা দিল লোকটা। অ্যাটেনডেন্ট মাথা নেড়ে ভেতরে চলে গেল। মিনিট পনের বাদে ফিরে এসে সে সহকারীকে জানাল, ‘কাজ হয়ে গেছে।’
লোকটা খুশি মুখে বেরিয়ে গেল। ভোর হবার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করল গতরাত্রে মা হার্টফেল করে মারা গেছেন।
যোল বছর আগের এই ঘটনার কথা মনে এলেই এখনও শরীর শক্ত হয়ে যায়। মনে হয় যেন আজই ঘটে গেছে এগুলো। সেই সহকারী ক্যাপ্টেনকে সে নিজের হাতে খুন করেছে বছর তিনেক হল, তবু জ্বালা মেটেনি। সেই অফিসারটি এখন তাদের লক্ষ্য। অনেক নীচে থেকে ভালমানুষের মুখোশ পরে পরে আজ পুলিশ কমিশনার হয়ে গেছে লোকটা। নিশ্চয়ই ওর মনে নেই যোল বছর আগে জিপে বসে যার গাল টিপেছিল সে আজ শত্রুদের অন্যতম।
‘ওকে নিয়ে এসেছি।’
গলাটা কানে যাওয়ামাত্র চমকে ফিরে তাকাল ত্রিভুবন। তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে হেনা। দূরে গাছের তলায় আরও দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে। ত্রিভুবন জিজ্ঞাসা করল, ‘কোনও ঝামেলা হয়নি তো?’ হেমা কাছে এগিয়ে আসতে মাথা নেড়ে না বলল।
‘ও কি তোমার পরিচয় জেনেছে?’
‘না। তবে শহরে ঢোকার পর আর আমাদের সঙ্গে থাকতে চাইছে না। চেকপোস্টে ওকে আড়াল করে আমরা নিয়ে এসেছি। তুমি কথা বলবে?’
‘না। আমরা চাই না ও কালকের সকালটা দেখুক।’
‘ও। এটা আগে জানালে সুবিধে হত।’
‘সিদ্ধান্ত একটু আগে নেওয়া হয়েছে।’ কথাটা বলে ত্রিভুবন হাঁটতে লাগল। রাত আর বেশি নেই। এখন যেটুকু সময় পাওয়া যাবে একটু শুয়ে নেওয়া দরকার।
১৬. সোম দেখছিল মেয়েটাকে
এই এতটা পথ আসার সময়ে তার মনে অনেকবার সন্দেহ এসেছে। সোম দেখছিল মেয়েটাকে। কিন্তু ওদের সাহায্য ছাড়া তার পক্ষে শহরে ঢোকা সম্ভব হত না। প্রায় বাধ্য হয়েই সে এদের কথা মেনে চলেছে। কিন্তু শহরে ঢোকার পর তার মাথায় দ্বিতীয় চিন্তা এসেছিল। এদের সঙ্গে যদি আকাশলালদের সরাসরি যোগাযোগ থাকে, তাহলে এদের সূত্র ধরেই সে লোকটার কাছে পৌঁছে যেতে পারবে। আর একবার সেটা সম্ভব হলে ভার্গিসের ওপর চমৎকার টেক্কা দেওয়া যাবে। যদিও এর মধ্যে দু-দুবার হেনাকে বলেছে সে একাই চলে যেতে চায় কিন্তু সেটা তার মনের ইচ্ছে নয়। না বললে এদের মনে প্রশ্ন জাগবে বলেই বলেছে। দূরে ফোয়ারার কাছে দাঁড়ানো লোকটার সঙ্গে হেনা যখন কথা বলছিল তখন সে চেনার চেষ্টা করেছে। লোকটার মুখে দাড়ি আছে। সে ঠিক চিনতে পারেনি। নিজে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকায় কিছুটা আশ্বস্ত আছে। এবার নিশ্চয়ই হেনা তাকে আকাশলালদের কাছে নিয়ে যাবে। দাড়িওয়ালা লোকটাকে চলে যেতে দেখল সোম।
কাছে এসে হেনা মিষ্টি হাসল, ‘আজকের রাতটা কোথায় কাটানো যায় বলুন তো!’
সোম বলল, ‘থাকার জায়গা ঠিক না থাকলে এখন কোথাও পাবে না। এমনিতেই মানুষ রাস্তায় শুয়ে আছে। আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?’
হেনা বলল, ‘দাঁড়ান, একটু ভেবে দেখি।’ তারপর দ্বিতীয় পুরুষকে ইশারায় খানিকটা সরিয়ে নিয়ে এসে বলল, ‘আমরা কবরখানার দিকে যাচ্ছি, ওকে সরাতে হবে। তুমি এমন ভাবে ফলো করো যাতে ও সন্দেহ না করে।’
লোকটা মাথা নেড়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে হেনা ফিরে এল সোমের কাছে, ‘ওকে কাটিয়ে দিলাম। যত্ত ঝামেলা। ওর বলার মধ্যে এমন একটা সুর ছিল যা সোমকে বিস্মিত এবং পুলকিত করল। মেয়েটা ন্যাতানো সুন্দরী নয়, ধারালো রুক্ষতা ওর স্বভাবে। তার নিজের যথেষ্ট বয়স হওয়া সত্ত্বেও এমন মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে থাকা যায় না। ওর ভাবভঙ্গিতে এতক্ষণ পরে কিছুটা প্রশ্রয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
হেনা বলল, ‘আমরা এখানে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকব নাকি?’
‘নিশ্চয়ই না, নিশ্চয়ই না। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়।’ সোম বিড় বিড় করল।
‘আচ্ছা, এখানকার কবরখানাটা কত দূরে?’
‘কবরখানা। কেন বলো তো?’
‘আমার এক মামা থাকে ওখানে। একলা মানুষ, বিরাট বাড়ি। গেলে খুশি হবে। যাবেন?’
‘যাওয়া যেতে পারে।’ হেনার পেছন পেছন হাঁটা শুরু করল সোম। এই মামাটি আকাশলাল নয় তো? সে কি করবে? আগে থেকে ভার্গিসকে খবর পাঠালে বোকা বনতে কতক্ষণ। আকাশলাল তাকে দেখলেই চিনতে পারবে। আর তখনই একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। এখন অনেক রাত। মেয়েটা কি এত রাত্রে আকাশলালকে জাগাবে? নাকি ভোর অবধি একসঙ্গে কাটিয়ে তারপর মামার কাছে নিয়ে যাবে। মামা! চমৎকার অভিনয় করছে মেয়েটা। কিন্তু ফোয়ারার পাশে দাঁড়ানো লোকটার সঙ্গে দেখা করার পর থেকেই ওর স্বভাবটা বদলে গেল। এইটাই সন্দেহজনক। যেতে যেতে হেনা হাসল শব্দ করে, ‘আপনার কি হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছে?’
‘না, কেন বলো তো?’
‘পিছিয়ে পড়ছেন। দেখে তো মনে হয় এখনও যুবক আছেন।’
‘ও তাই? এই দ্যাখো পাশে এসে গেছি। এবার বাঁ দিকে যেতে হবে।’
‘পুলিশ ভ্যান আসছে, দাঁড়িয়ে পড়ুন থামটার আড়ালে।’
সোম দেখল একটা ভ্যান খুব ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। ওরা দেখলেই চিনতে পারবে এবং তাহলে রক্ষা নেই। সে থামটার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। হেনাও। হেনা বলল, ‘যদি কিছু জিজ্ঞাসা করে আমি কথা বলব। বলব আপনি আমার স্বামী। বলতে পারি?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ।’ সোম নিঃশ্বাস ফেলল।
‘অবশ্য আমার কোনও স্বামী নেই। মানে বিয়েই হয়নি। প্রেমিকও জোটেনি। এমন কপাল। আচ্ছা আপনার কোনও প্রেমিকা আছে?’ চাপা হাসল হেনা।
গলা শুকিয়ে কাঠ। ভ্যানটা হাত কয়েক দূরে এসে পড়েছে। সোম নিঃশব্দে মাথা নেড়ে না বলল।
হেনা ফিসফস করল, ‘আপনার বুকে আওয়াজ হচ্ছে কেন?’
‘কই? না তো।’
‘হ্যাঁ, আমি শুনতে পাচ্ছি।’ হেনা ঘনিষ্ঠ হল।
ভ্যানটা দাঁড়িয়ে পড়েছে খানিকটা গিয়ে। এখনও কেউ লাফিয়ে নামেনি ওটা থেকে। একদিন আগেও ভ্যানগুলো তার ইঙ্গিতে চলাফেরা করত। আর আজ—! সোম মাথা নাড়ল, এই তো জীবন। অন্ধকার ফুটপাতে থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে মেয়েটার শরীরের স্পর্শ পাচ্ছিল। কিন্তু আরামটা উপভোগের সময় এখন নয়।
হেনা বলল, ‘আপনার বুকে ড্রাম বাজছে। দেখব? বলে একটা হাত সোমের জামার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। গেঞ্জির ওপর দিয়ে সাপের মতো হাতটা বুকের কাছে উঠে আসছিল। হায়, এটা যদি রাজপথ না হত এবং ওই ভ্যানটা যদি ওখানে দাঁড়িয়ে না থাকত। সোমের সমস্ত শরীরে কাঁটা ফুটল। সে চোখ বন্ধ করল। এবং তখনই তার বাঁ বুকের ওপরে পিঁপড়ে কামড়ানোর মত একটা যন্ত্রণা টের পেল। মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত সরিয়ে নিয়েছে। নিজের বুকটা চেপে ধরল সোম। যন্ত্রণাটা আর পিঁপড়ের কামড়ের মতো নেই। তার বুক মুচড়ে উঠছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মুখ থেকে একটা গোঙানি ছিটকে উঠতেই সে ঝাপসা চোখে দেখল হেনা সরে যাচ্ছে দ্রুত পায়ে। প্রচণ্ড চিৎকার করে সোম টলতে টলতে রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ল।
ভ্যানটা তখন আবার এগোতে যাচ্ছিল। সামনে বসা একজন সার্জেন্ট চিৎকারটা শুনে পেছনে তাকাল। তার নির্দেশে দুজন সেপাই দ্রুত নেমে গেল সসামের শরীরের দিকে। একজন ফিরে এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, ‘সাব, এ সি সাহেব— !’
‘এ সি সাহেব?’ সার্জেন্ট লাফ দিয়ে নামল। কাছে গিয়ে সে টর্চের আলো ফেলতেই সোমের মুখটাকে চিনতে পারল। দিনরাত স্যালুট দিতে হত এই লোকটাকে। এখন তাদের ওপর হুকুম ছিল খুঁজে বের করার। লোকটাকে মারল কে? আশেপাশে কাউকে সে দেখতে পাচ্ছিল না। শরীরে রক্তপাতের কোনও চিহ্ন নেই। নীচে, রাস্তায়, ফুটপাথে সার্জেন্ট টর্চের আলো ফেলল। এবং তখনই একটা কিছু চকচক করে উঠতেই সে ঝুঁকে পড়ল। ছোট্ট, আধ ইঞ্চি কাচের সিরিঞ্চ। মুখে আরও ছোট সুচ লাগানো। রুমালে বস্তুটাকে তুলে নিয়ে সে ভ্যানের কাছে চলে এসে ওয়ারলেস চালু করল।
‘হেডকোয়ার্টার্স। ইয়েস। কলিং ফ্রম নাম্বার টোয়েন্টি ওয়ান। সি পি-র সঙ্গে কথা বলতে চাই। খুব জরুরি। আর্জেন্ট।’ সার্জেন্ট অধৈর্য হয়ে পড়ছিল। মিনিট খানেক বাদে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল, ‘ইয়েস স্যার। আই অ্যাম সরি স্যার। একটু আগে তিননম্বর রাস্তায় আমাদের এক্স এ সি মিস্টার সোম মারা গিয়েছেন। মনে হচ্ছে ওঁর শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। না স্যার, একটা সিরিঞ্জ— । উনি অবশ্য আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। অ্যাঁ। ও। ঠিক আছে স্যার। ও কে।’
রিসিভার রেখে দিয়ে রুমাল থেকে সিরিঞ্জের অবশিষ্টাংশ রাস্তায় ফেলে জুতো দিয়ে মাড়িয়ে গুঁড়ো করে ফেলল সার্জেন্ট। তারপর রাত্রের নির্জনতাকে খান খান করে গুলি করল মৃত সোমের শরীরে। শরীরটা একটু কাঁপল মাত্র। সে সেপাইকে হুকুম করল, ‘ডেডবডি তুলে নিয়ে এসো। সি পি বলেছেন ওকে আকাশলালরা গুলি করে মেরেছে। মনে রেখো বুদ্ধুরা।
আজ রাতে আরও কয়েকজন মানুষ নিঘুর্ম ছিল।
ধবধবে শ্বেতপাথরের এই ঘরটার একটা দিকে কাচের দেওয়াল যার ভেতর দিয়ে রাতের আকাশটাকে স্পষ্ট দেখা যায়। অনেক তারা সেখানে। ঘরে হালকা নীল আলো জ্বলছিল। পাশাপাশি বসে থাকা তিনজন মানুষের মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। তাদের উল্টো দিকে সুবেশ এক প্রৌঢ়, কিছুটা নার্ভাস ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন। বলতে বলতে তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর সামনে বসা তিনজন স্রোতার কানে তেমনভাবে ঢুকছে না। এটা বোঝামাত্র তাঁর গলার স্বর নিচুতে নামল।
‘দুটো প্রশ্নের জবাব আপনার কাছে চাই মিনিস্টার।’ প্রৌঢ় কথা শেষ করা মাত্র শ্রোতাদের একজন পরিষ্কার গলায় বললেন, ‘বাবু বসন্তলালের হত্যাকারীকে এখনও কেন ধরা হয়নি?’
মিনিস্টার অথবা প্রৌঢ় লোকটি জবাব দিলেন, ‘‘সি পি বলেছেন বাবু বসন্তলালকে আকাশলালরাই খুন করেছে। এটা করে ও আমাদের শাসাতে চেয়েছে।’
‘অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার সোমকে কে হত্যা করেছে?’
‘এক্ষেত্রেও হত্যাকারী আকাশলাল।’
‘আমরা প্রমাণ চাই।’
‘স্যার, প্রমাণ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। একজন বহুদৱে বাংলোয় কফিনে পড়েছিলেন আর একজনকে মাঝরাত্রে রাজপথে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।’
শ্রোতাদের দ্বিতীয়জন গলা পরিষ্কার করে নিলেন, ‘আমরা কোন মূর্খদের নিয়ে বাস করছি। সোমকে খুঁজে বের করতে নির্দেশ দেওয়া হতে আপনি বলেছিলেন প্রথম সুযোগেই সে শহরের বাইরে চলে গিয়েছে। শহরের কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাহলে ওর শরীর শহরের রাস্তায় পাওয়া গেল কি করে?’
‘এটা আমিও বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে কমিশনারের গোয়েন্দাবিভাগ ঠিকঠাক কাজ করছে না। আমাকে একটু সময় দিন।’ মিনিস্টার অনুরোধ করলেন।
এবার তৃতীয়জন প্রশ্ন করলেন, ‘একটা লোক নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে একজন মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে শহরে ঢুকেছিল। এই লোকটাই বাবু বসন্তলালের বাংলোতে গিয়েছিল। কমিশনার ওকে তুলে নেওয়ার পর ওর গাড়ি কে জ্বালাল? কমিশনার যে কারণে ওকে ছেড়ে দিয়েছিল তা কোনও কাজেই লাগেনি। ওরা ট্যুরিস্ট লজ থেকে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছে তা কি জানা গেছে?’
‘একজন পুলিশ অফিসার ওদের নিয়ে গেছে বলে রিপোর্ট হয়েছে।’
‘বাজে কথা। আমাদের পুলিশবাহিনীতে যদি এমন কোনও বিশ্বাসঘাতক থাকে তাহলে তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে। ডাক্তার এবং তার স্ত্রী শহরের বাইরে যেতে পারেনি অথচ আপনারা ওদের খুঁজে বের করতে পারছেন না। ওয়ার্থলেশ!’
‘স্যার। উৎসব উপলক্ষে শহরে এত মানুষ ঢুকে পড়েছে যে এই মুহূর্তে কাউকে খুঁজে বের করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আগামী পরশুর মধ্যে শহর খালি করে দিতে নির্দেশ দিয়েছি আমি। তখন প্রতিটি লোককে খুঁটিয়ে দেখে ছাড়া হবে। ততক্ষণ— ।’
‘না। আগামীকাল বিকেলেই ভার্গিসকে গ্রেপ্তার করবেন। ওকে যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছে তার বেশি আর দেওয়া সম্ভব নয়। ওর বিরুদ্ধে চার্জ আনবেন জনবিরোধী কাজকর্ম করার। শেষ অভিযোগটা হবে অপরাধীকে আড়াল করতে বাবু বসন্তলালের মৃতদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই সৎকার করতে দিয়েছে সে।’
‘কিন্তু স্যার, কমিশনার রিপোর্ট দিয়েছে ম্যাডামের নির্দেশ মেনেই— ।’
‘আপনি এবার যেতে পারেন।’
মিনিস্টার একটা অ্যাটাচি কেস তুলে ধীরে ধীরে দরজার বাইরে চলে এলেন। তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা সোজা হয়ে দাঁড়াল। অনেকদিন হয়ে গেল তিনি মন্ত্রিত্বে আছেন। বোর্ড চাইছে বলেই আছেন। কিন্তু এখন বাতাসে বিপদের গন্ধ পাচ্ছেন তিনি। যেভাবে আগামীকাল ভার্গিসকে গ্রেপ্তার করা হবে সেইভাবেই তাঁকেও সরিয়ে দেওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার।
মনে মনে প্রচণ্ড খেপে গেলেন তিনি ভার্গিসের ওপর। লোকটা সত্যিকারের অপদার্থ। যেসব পুরুষের মহিলাদের ওপর বিন্দুমাত্র আসক্তি থাকে না, তাদের মস্তিষ্ক কখনই প্রাপ্তবয়স্ক হয় না। বোর্ড তাকে যেসব প্রশ্ন করেছে তার একটারও জবাব তিনি দিতে পারেননি ওই অপদার্থটার জন্যে। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার, বোর্ড আজ তাঁকে আকাশলালকে নিয়ে কোনও প্রশ্ন করেনি। করলে তাঁকে বলতে হত কমিশনার আশা করছেন আগামীকালই সফল হবেন। মিনিস্টার তাঁর ‘সচিবকে জিজ্ঞাসা করলেন, কমিশনার এসেছে?’
‘উনি নীচে অপেক্ষা করছেন।’
‘চলে যেতে বল। ওর মুখ আমি দেখতে চাই না।’
সঙ্গে সঙ্গে সচিব ছুটে গেল খবরটা জানাতে। ধীরেসুস্থে নামলেন মিনিস্টার। এই বাড়িতে সবসময় যুদ্ধকালীন তৎপরতা দেখা যায়। একটা মাছির পক্ষেও এখানে বিনা অনুমতিতে ঢোকা অসম্ভব। মিনিস্টার ঘড়ি দেখলেন।
মিনিট তিনেক বাদে তাঁর গাড়ি একটা কনভয় নিয়ে রাজপথ দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল। সাইরেন বাজিয়ে একজন সার্জেন্ট রাস্তা পরিষ্কার করে ছুটছিল আগে আগে। যদিও এত রাত্রে রাস্তায় মানুষ নেই কিন্তু ফুটপাত উপচে পড়া আগন্তুক ফ্যালফ্যাল চোখে দৃশ্যটা দেখল। বিশেষ একটা বাড়ির সামনে গাড়িগুলো পৌঁছে যাওয়া মাত্র নিরাপত্তারক্ষীরা পজিশন নিয়ে নিল। মিনিস্টার নামলেন। সিঁড়ির ওপরে যে মহিলাটি দাঁড়িয়েছিলেন তিনি বিনীত গলায় বললেন, ‘আসুন স্যার। ম্যাডাম আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’
মিনিস্টার হাসার চেষ্টা করলেন। মহিলার পেছন পেছন সিড়ি ভেঙে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন তিনি। বাইরে প্রহরীরা সজাগ হয়ে পাহারা দিতে লাগল।
দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে মহিলা দাঁড়িয়ে গেলে মিনিস্টার পর্দা সরিয়ে ভেতরে পা দিয়ে শুনতে পেলেন, ‘সুপ্রভাত!’
‘প্রভাত! প্রভাতের তো এখনও অনেক দেরি!’
‘ইংরেজি মতে প্রভাত শুরু হয়ে গেছে। জানোই তো, বিদেশে থাকায় আমার অনেক কিছু আলাদা।’
মিনিস্টার এগিয়ে গেলেন। দুধের চেয়ে সাদা এক মিশরীয় পোশাক পরে ম্যাডাম আধাশোয়া হয়ে আছেন বালিসে হেলান দিয়ে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি। ওই মহিলার সঙ্গে তাঁর আলাপ বিদেশে। এদেশের একজন ধনী ব্যবসায়ীর স্ত্রী হিসেবে যতটুকু বিদুষী হওয়া সম্ভব ততটুকুই। মন ভরানো সৌন্দর্য হয়তো এঁর নেই কিন্তু তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বারংবার তাকাতে হয়। এক শিরশিরে সৌন্দর্যের ফণা সবসময় ওঁর চোখ ঠোঁটের ভঙ্গিতে দুলে দুলে ছোবল মারতে চায়। বিদেশ থেকে স্বামীকে নিয়ে ফিরে আসার পর তাঁর সঙ্গে ম্যাডামের ঘনিষ্ঠতা। এখানকার ওপরমহলের সঙ্গে তিনি ওঁদের আলাপ করিয়ে দেবার কিছুদিনের মধ্যে স্বামী মারা যান। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র দমে যাননি ভদ্রমহিলা। উঠতে উঠতে এ রাজ্যের অন্যতম মানুষের ভূমিকায় পৌঁছে গিয়েছেন। মিনিস্টার জানেন ম্যাডাম অকৃতজ্ঞ নন। তাঁর আজকের যা কিছু উন্নতি তা এই ভদ্রমহিলার জন্যে।
এককালের ঘনিষ্ঠতা এখনও তাঁকে এই বাড়িতে আসার অধিকার দিচ্ছে। কিন্তু তিনি জানেন সম্পর্কটা আর সেই জায়গায় আটকে নেই। ম্যাডামকে তাঁর অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হয় না। এ রাজ্যের যাবতীয় ব্যবসাবাণিজ্য ম্যাডামের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া পরিচালিত হতে পারে না অবশ্য সেসব ব্যবসা বিদেশকেন্দ্রিক এবং সরকারি অনুমতিসাপেক্ষ ব্যাপার। লোকে ম্যাডামকে আড়ালে ম্যাডাম টেন পার্সেন্ট বলে ডাকে। ওই ভেট না দিলে এই রাজ্যে থেকে কোন বৈদেশিক বাণিজ্য করা সম্ভব নয়। তাঁর সঙ্গে এখন ওঁর সম্পর্ক কি ধরনের? মিনিস্টার নিজেই ঠিক বোঝেন না।
‘খুব সমস্যায় না পড়লে এতরাত্রে এখানে আসতে না।’
‘হ্যাঁ। সমস্যা খুবই। ভার্গিস আমাকে ডোবাল।’
‘যারা আমলা এবং পুলিশের ওপর নির্ভর করে প্রশাসন চালায় তাদের পরিণতি জানা।’
‘মানলাম। কিন্তু এ ছাড়া আমার সামনে কোন পথ খোলা ছিল? তোমার কথামতো ভার্গিস বাবু বসন্তলালের দেহ ময়নাতদন্ত করায়নি বলে বোর্ড খুশি নয়।’
‘খুব স্বাভাবিক। ময়নাতদন্ত করাটা আইনসঙ্গত ব্যাপার। করলে জানা যেত ওকে গুলিবিদ্ধ করার আগে কড়া ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।’ ম্যাডাম স্বাভাবিক গলায় বললেন।
‘ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল?’ মিনিস্টার হতভম্ব, ‘তুমি কি করে জানলে?’
‘আমি তোমার মতো কান দিয়ে দেখি না?’
‘তাই তুমি চাওনি পোস্টমর্টেম হোক। হলে ব্যাপারটা জানা যেত। খবরটা গোপন রেখে তোমার কি লাভ? আমি তোমাকে কিছুতেই বুঝতে পরি না।’
ম্যাডাম হাসলেন, ‘আমিও পারি না। তোমার সেই সমস্যাটা কি?’
মিনিস্টার এক মুহূর্ত ভাবলেন। তাঁকে এখনও বসতে বলেননি ম্যাডাম। অথচ কয়েক বছর আগে তার অগাধ অধিকার ছিল ওই বিছানায়। তিনি বললেন, ‘আমি তোমার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছি। তুমি আমাকে পথ বলে দাও।’
‘কিসের পথ?’
‘আমি মুক্তি পেতে চাই। সসম্মানে। আমাকে ছুঁড়ে ফেলার আগে আমি চলে যেতে চাই।’
‘সে কী? এত ক্ষমতা তোমার! এ রাজ্যের শিশুরাও তোমার কথা ভয়ে ভয়ে শোনে— ।’
‘প্লিজ! এই পুতুলের ভূমিকা আমার সহ্য হচ্ছে না। বোর্ডের কোনও কাজই আমি ঠিকঠাক করাতে পারছি না। আজ ভার্গিস আছে বলে সব দায় তার ওপর চাপছে। আগামীকাল বিকেলে ভার্গিস চলে গেলে বন্দুকের নল আমার দিকে ঘুরে আসবে।’
‘তোমার বদলে যতক্ষণ আর একটা ঠিকঠাক লোককে না পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ তুমি নিরাপদ। আর সেই সময়টুকু যখন হাতে পাচ্ছ তখন তার সৎ ব্যবহার করো।’
‘অসম্ভব। প্রথম কথা, আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো বলতে এখন কিছুই নেই। বাবু বসন্তলাল আমাকে স্তোকবাক্য দিত। পুরো দেশটা বৈদেশিক ধারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে যদি আরবের দুই শেখ তাদের সব ডলার ফেরত চায় তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়াব? আর আমি যত ধার নেওয়া কমানোর প্রস্তাব দিচ্ছি তত বোর্ড সেটাকে বাতিল করছে। দেশের মানুষকে যদি অবাধ বাণিজ্য করার অধিকার না দেওয়া হয়, যদি ক্ষুদ্র শিল্পে উৎসাহ না দেওয়া হয় তাহলে রপ্তানি করার মতো কোনও জিনিসই থাকবে না আমাদের হাতে। দ্বিতীয়ত, আকাশলাল। ক্রমশ আমার মনে একটা ধারণা তৈরি হচ্ছে যে আমাদের মধ্যে কেউ লোকটাকে শেল্টার দিচ্ছে। যে দিচ্ছে সে আমাদের থেকেও শক্তিমান। এখনও পর্যন্ত আমি ওই লোকটাকে সব কাজকর্ম বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছি কিন্তু যে কোনও মুহূর্তেই তো বিস্ফোরণ হতে পারে।’
‘আকাশলাল ধরা পড়লে তোমার এই চিন্তা দূর হবে?’
‘ধরা পড়বে? হায়। আমিও এই আশার কথা বোর্ডকে বলে এলাম। আগামীকাল লোকটা নাকি ভার্গিসকে ফোন করবে। ভার্গিস বাহিনীকে অ্যালার্ট করেছে ফোন করা মাত্র সেই টেলিফোনের কাছে যেন পৌঁছে যায় লোক। কিন্তু আকাশলাল কেন ফোন করবে তা মাথামোটাটা জানে না আগামীকাল উৎসব। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ের দিনটাকে কেন ও বেছে নিল ফোন করার জন্যে?’
‘হ্যাঁ। এটা একটা পয়েন্ট। কিন্তু তুমি কি করতে চাও?’
‘আগামীকাল বিকেলে আমি পদত্যাগপত্র দেব। তুমি বোর্ডকে দিয়ে সেটা অ্যাপ্রুভ করিয়ে নেবে। অবশ্য তার আগেই আমি— ।’ মিনিস্টার থেমে গেলেন।’
‘কোথাও পালিয়ে গিয়ে তুমি নিস্তার পাবে না।’ ম্যাডাম নেমে দাঁড়ালেন বিছানা থেকে, ‘বোর্ড যা চাইছে তাই মন দিয়ে করা ছাড়া তোমার কোনও উপায় নেই।’
‘ম্যাডাম, আমি তোমার কাছে সাহায্য চাইছি।’
ম্যাডাম হাসলেন, ‘আমি দুঃখিত। এই সুন্দর ছোট্ট পাহাড়ি শহরটাকে আমি বড় ভালবেসে ফেলেছি। দেখছ না, ইউরোপ আমেরিকা ছেড়ে এখানে আমি পড়ে আছি। লোকে বলত আমি আমার স্বামীর টানে এসেছি এখানে। কিন্তু তিনি তো চলেই গেলেন। বাবু বসন্তলালকে আমি পুরুষমানুষ হিসেবে খুব পছন্দ করতাম। টাকা ছিল বটে লোকটার, কিন্তু রুচিও ছিল। কিন্তু যেই তাঁর মনে হল এই দেশটা থেকে তিনি কিছুই পাবেন না অমনি তাঁকেও চলে যেতে হল। তোমার সঙ্গেও আমি ঘনিষ্ঠ ছিলাম। কিন্তু এখন বোর্ড যা চাইছে সেটাই আমার ইচ্ছে।’
‘তার মানে?’ মিনিস্টার চিৎকার করে উঠলেন।
‘এখনও পর্যন্ত সব কিছু তোমার অধিকারে আছে। রাত অনেক হয়েছে। এবার ফিরে গিয়ে বিশ্রাম নাও।’ ম্যাডাম ধীরে ধীরে পাশের দরজা দিয়ে ভেতরে চলে গেলেন।
মিনিস্টার কয়েকমুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। সম্পর্ক পাল্টাতে পাল্টাতে যখন শীতল থেকে শীতলতর হয়ে যায় তখন যে পক্ষ দুঃখ পায় সে কি মুর্খ?
১৭. বিছানায় শুয়ে থাকতে পারেনি ভার্গিস
গতরাত্রে বিছানায় শুয়ে থাকতে পারেনি ভার্গিস। অন্ধকার থাকতেই উঠে এসে বসেছিল নিজের চেয়ারে। এখন ভোর। এখন এই বিশাল পুলিশ-হেডকোয়াটার্স শব্দহীন। এত বড় অফিস-ঘরে তিনি একা। জানলার বাইরে পৃথিবীটা ধীরে ধীরে রং পাল্টাল।
একটা দিন আসছে। হয়তো শেষ দিন তাঁর ক্ষেত্রে। এই দিনটার মোকাবিলা তিনি কিভাবে করবেন সেটাই স্থির করতে হবে। আজ যদি আকাশলালকে ধরা সম্ভব না হয় তাহলে তাঁকে চলে যেতে হবে। মিনিস্টার তাঁর পক্ষে কথা বলবেন না। এই চলে যাওয়া মানে সোমের যে কুঠুরিতে যাওয়ার কথা ছিল সেই মাটির তলায় নির্বাসিত হওয়া। ভার্গিস নড়েচড়ে বসলেন। পায়ের তলায় শিরশির করে উঠলেও তিনি চোয়াল শক্ত করলেন। না, চুপচাপ তিনি দুভার্গ্যকে মেনে নেবেন না। এতকাল যে বিশ্বস্ততার সঙ্গে কর্তব্য করে গেছেন তার মূল্য কেউ যদি এভাবে দেয় তা মানতে পারেন না তিনি।
গতরাত্রে দুটো ঘটনা ঘটেছে। সোমের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে। যে সার্জেন্ট তাঁকে খবর দিয়েছিল সে তাঁরই নির্দেশে গুলি করেছে সোমের মৃতদেহে। তিনি যে নির্দেশ দিয়েছেন তার কোনও রেকর্ড নেই। মৃতদেহ নিয়ে আসা মাত্র পোস্টমর্টেম করতে পাঠিয়েছেন তিনি। তার রিপোর্ট আজ সকাল ছটায় পাওয়ার কথা। এই পোস্টমর্টেম করার আদেশ ওই সার্জেন্ট জানে না। জানে না তার কারণ প্রায় তখনই লোকটাকে ভ্যান সমেত পাঠিয়েছেন বাবু বসন্তলালের বাংলোয়। পোস্টমর্টেমে যদি জানা যায় গুলি ছোঁড়া হয়েছিল অন্যকারণে, সোমের মৃত্যুর পরে, তাহলে সার্জেন্টটির বারোটা চিরকালের জন্যে বেজে যাবে। মাঝে মাঝে তিনি যে কোন দৈবিক ক্ষমতায় ভবিষ্যৎ দেখতে পান তা নিজেই জানেন না। সোম বিপ্লবীদের গুলিতে নিহত হয়েছে, এমন একটা প্রচার করার কথা ভেবেছিলেন। এক্ষেত্রে পোস্টমর্টেম করানোর কোনও বাসনাই ছিল না। ঠিক তখনই দ্বিতীয় খবরটা এল।
বাবু বসন্তলালের বাংলোর চৌকিদারকে পাওয়া গেছে। লোকটা নাকি স্বাভাবিক নেই। ঘটনার পরেই সে ইণ্ডিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিল নির্দেশমতো। কিন্তু বিবেকদংশনের কারণে সে আবার ফিরে এসেছে। শহরে ঢুকতে চেয়েছে ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করবে বলে। লোকটাকে চেক পোস্টের আগেই বাস থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভার্গিস সোমের মৃতদেহের আবিষ্কারক সার্জেন্টকে পাঠিয়েছেন লোকটাকে জেরা করার জন্যে। ওকে যেন বাবু বসন্তলালের বাংলোতে নিয়ে গিয়ে জেরা করা হয়, এমন নির্দেশ দিয়েছেন। লোকটা বাবু বসন্তলালের মৃত্যুর হদিশ দিতে পারবে। এই অবধি ঠিক ছিল। ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করার পাগলামো ভার্গিসকে সতর্ক করেছিল। খুব বড় একটা সাপ ঝোলা থেকে বেরিয়ে আসবে এবং তিনি যদি সেই সাপটাকে ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে এগিয়ে আসা অস্ত্রগুলোর মোকাবিলা করা সহজ হয়ে যাবে। ব্যাপারটাকে যথেষ্ট গোপনে রাখার চেষ্টা করেছেন ভার্গিস। মিনিস্টারকেও তিনি জানাননি। যদি কোনও সাপ সত্যি বের হয় তাহলে সেটা বের করার দায় চাপবে ওই সার্জেন্টের ওপর। লোকটার নাম সহজেই খরচের খাতায় উঠে যাবে।
ঘড়ি দেখলেন তিনি। সকাল নটা বাজতে এখনও অনেক দেরি। সার্জেন্ট গভীর রাত্রে চলে যাওয়ার পর আর রিপোর্ট করেনি। এই রিপোর্ট পাওয়া খুব জরুরি।
ঠিক কাঁটায় কাঁটায় ছটায় একটা প্রাথমিক পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলেন তিনি। সোমের শরীরে ভয়ংকর একটা বিষ পাওয়া গিয়েছে যা তার শ্বাসযন্ত্র রুদ্ধ করেছিল। গুলি করা হয়েছিল তার কিছু পরেই। আরও বিস্তারিত রিপোর্ট পাওয়া যাবে পরের রিপোর্টে। এইটুকুই দরকার ছিল। বিশেষ টেলিফোন তুললেন ভার্গিস। সাড়া পেতেই তাঁর কণ্ঠস্বর আপনা থেকেই নেমে গেল! ‘স্যার! কাল রাত্রে সোমের মৃত্যু গুলিতে হয়নি।’
‘হোয়াট?’ মিনিস্টারের চিৎকার কানে এল।’
‘পোস্টমর্টেম বলছে, ওর শরীরে বিষ পাওয়া গেছে। গুলি পরে করা হয়েছে।’
‘আশ্চর্য! আপনারা আরম্ভ করেছেন কী? সার্জেন্ট বলেছিল গুলিতে মারা গিয়েছে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। ওর রিভলভার আর গুলি পেলেই বোঝা যাবে ও সেটা ব্যবহার করেছে কি না। হয়তো কৃতিত্ব নেবার নেশায় মৃতদেহে গুলি করে খবরটা দিয়েছে।’
‘কিন্তু ও কি বলেছে ওর গুলিতেই মারা গিয়েছে সোম?’
‘না, তা বলেনি।’
‘তাহলে কৃতিত্ব নিচ্ছে কি করে? লোকটাকে এখনই ডাকুন। যদি আপনার অনুমান সত্যি হয় তাহলে মিথ্যেবাদীটাকে চরম শাস্তি দিন।’
‘ঠিক আছে স্যার। ও এনকোয়ারি থেকে ফিরে এলেই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
‘ভার্গিস!’ হঠাৎ মিনিস্টারের গলা বদলে গেল।
‘ইয়েস স্যার!’
‘ইউ মাস্ট ডু সামথিং। আকাশলালকে আজ ধরতেই হবে। আমি তোমাকে বাঁচাতে পারব না ভার্গিস। আজকের দিনটাই তোমার শেষ সুযোগ।’ লাইনটা কেটে গেল।
ঠিক সাড়ে ছটায় ভার্গিস জানতে পারলেন সেই সার্জেন্ট তিন নম্বর চেকপোস্ট থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চায়। এক মুহূর্ত দেরি করলেন না তিনি। একটি ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে জিপ ছুটিয়ে বেরিয়ে গেলেন কাউকে কিছু না জানিয়ে।
ভোর থেকেই রাস্তায় ভিড়। শহর পেরোতে গাড়ির গতি শ্লথ করতে হচ্ছিল বলে ভার্গিসের মেজাজ খিঁচড়ে যাচ্ছিল। মিনিট কুড়ির মধ্যে তিনি তিন নম্বর চেকপোস্টে পৌঁছাতে পারলেন। সেখানে তখন শহরে ঢোকার জন্যে মানুষের বিশাল লাইন পড়ে গেছে। তারা ভার্গিসকে সভয়ে দেখছিল। চেকপোস্টের সেপাই স্যালুট করে তাঁর পথ তৈরি করে দিতেই তিনি ভ্যানটাকে দেখতে পেলেন। ভ্যানের দরজা খুলে কালকের সেই সার্জেন্টটা নেমে এল। সারারাত না ঘুমোনো পুলিশদের অভ্যেস আছে কিন্তু লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছিল ভূত ভর করেছে। কোনওমতে হাত তুলে কপালে ঠেকাল সার্জেন্ট।
ভার্গিস ওর পাশে জিপ দাঁড় করাতে বলে সার্জেন্টকে উঠে আসতে নির্দেশ দিল। সার্জেন্ট চুপচাপ নির্দেশ পালন করতে তিনি ড্রাইভারকে জিপ চালাতে বললেন। মিনিট তিনেকের মধ্যে পাহাড়ের ঢালু একটা নির্জন জায়গায় পৌঁছে গেলেন ওঁরা। সার্জেন্টকে নিয়ে ভার্গিস নেমে এলেন জিপ থেকে। একটা খাদের ধারে দাঁড়িয়ে তিনি লোকটার দিকে তাকালেন, ‘কি হয়েছে?’
‘স্যার।’ সার্জেন্টের গলা খুবই নিচুতে।
‘ইয়েস মাই বয়।’
‘স্যার আমি কি করব বুঝতে পারছি না।’
‘আমি বুঝিয়ে দেব। লোকটাকে পেয়েছ?’
‘হ্যাঁ স্যার। প্রথমে মনে হয়েছিল ওর মাথা ঠিক নেই। কিছুতেই ওকে দিয়ে কথা বলাতে পারছিলাম না। ভোরবেলায় ও বলে ফেলল।’ কেঁপে উঠল সার্জেন্ট।
‘কি বলল?’
‘যা বলল তা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না স্যার। আর এই কথাটা যদি আমি রিপোর্ট করি তাহলে আমার কি হবে তাও ধারণা করতে পারছি না।’
‘তুমি আমার কাছে রিপোর্ট করছ। আমি তোমাকে শেল্টার দেব। ইন ফ্যাক্ট তোমাকে আমি ইতিমধ্যে শেল্টার দিয়েছি।’ ভার্গিস হাসলেন।
‘কথাটা বুঝলাম না স্যার!’
‘সোমের বডি পোস্টমর্টেম করে বোঝা গেছে ওর মৃত্যু কোনও একটা বিষে হয়েছিল। গুলি লেগেছে তার পরে। আর গুলিটা পুলিশের রিভলভারের। এবং তোমাকে গুলি ছুঁড়তে দেখেছে কয়েকজন সেপাই। একটা ডেডবডিকে তুমি কেন গুলি করবে তা মিনিস্টার বুঝতে পারছেন না। রহস্যটা উনি উদ্ধার করতে বলেছেন।’ ভার্গিস আবার হাসলেন।
সার্জেন্ট চিৎকার করে উঠল, ‘স্যার! আপনি এ কি কথা বলছেন?’
‘মিনিস্টার আমাকে বলেছেন। কিন্তু তোমার নার্ভাস হবার দরকার নেই। ওঁকে যা বোঝাবার আমি বুঝিয়েছি? আমার কথা যারা শোনে তাদের আমি বিপদে ফেলি না। এখন বল, লোকটা কি বলেছে?’ ভার্গিস পকেট থেকে চুরুট বের করলেন।
‘বাবু বসন্তলালকে খুন করা হয়েছে। কাঁপা গলায় বলল সার্জেন্ট।
‘খবরটা তুমি কি আগে জানতে না?’ চুরুট ধরালেন ভার্গিস।
‘কিন্তু কে খুন করেছে জানেন?’
‘কে?’
‘ওই চৌকিদারটা।’
‘স্বীকার করেছে?’
‘হ্যাঁ। বিবেকের কামড়ে অস্থির হয়ে যাচ্ছিল লোকটা।’
‘ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিল কেন?’
‘স্যার, ও বলছে, ম্যাডামই ওকে বাধ্য করেছেন বাবু বসন্তলালকে…. ।’ সার্জেন্ট বাক্য শেষ করতে পারল না।
ভার্গিস অনুভব করলেন তাঁর সারা শরীর মনে অজস্র কদমফুল ফুটে উঠল। এই রকম একটা অস্ত্রের কথা কল্পনা করছিলেন তিনি। চট করে সামলে নিয়ে বললেন, ‘তুমি যা বলছ তা নিশ্চয়ই দায়িত্ব নিয়ে বলছ! নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবছ?’
‘স্যার!’ লোকটা ককিয়ে উঠল।
‘ঠিক আছে। আর কে কে জেনেছে ব্যাপারটা?’
‘আর কেউ নয়। কাউকে বলিনি। ওকে আলাদা জেরা করেছিলাম।’
‘লোকটা এখন কোথায়?’
‘ভ্যানে বসে আছে।’
‘ওই বাংলোয় কোনও পাহারা আছে?’
‘না স্যার।’
‘তুমি লোকটাকে নিয়ে একা ওই বাংলোয় ফিরে যাও। আর কাউকে বলে যাওয়ার দরকার নেই। চৌকিদারটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে তোমাকে যে করেই হোক, নইলে তোমাকে আমি বাঁচাতে পারব না। ও যেন না পালায় অথবা মারা না যায়। কেউ যেন তোমাদের না দেখে। ঠিক সময়ে আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব। গুড লাক।’ ভার্গিস জিপের দিকে এগিয়ে গেলেন।
ঠিক নটা বাজতে কয়েক মিনিট আগে ভার্গিস নিজের চেয়ারে আরাম করে বসে চরুট খাচ্ছিলেন। একটু পরেই টেলিফোনটা বাজার কথা। আর এখন তাঁর লোক শহরের সর্বত্র এই ফোনটা কোত্থেকে আসছে তা ধরার জন্যে উদগ্রীব।
সকাল সবসময় চমৎকার। ঝকঝকে একটা আস্ত রোদের দিনের শুরুটা যেমন সুন্দর তেমনি এঁটুলির মতো মেঘেদের দখলে থাকা আকাশ নিয়ে আসা সকালটাও আকাশলালের একই রকম লাগে। হাজার হোক সকাল মানে একটা গোটা রাতের শেষ।
জানলায় দাঁড়িয়ে নাক টেনে বুকে বাতাস ভরল আকাশলাল। এবং সেটা করতে একটু চিনচিনে ব্যথা তৈরি হয়ে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। ঢোঁক গিলল সে। ডাক্তার বলেছে এখন কোনওরকম চাপ বুকে দেওয়া চলবে না। তার বুকের ভেতরটায় অপারেশনের পরে প্রাকৃতিক নিয়মগুলোকে খর্ব করা হয়েছে। যা ছিল না, কারও থাকে তা বসানো হয়েছে।
এই সকালেই আকাশলালের স্নান এবং দাড়ি কামানো শেষ। এখন শরীরটা আবার বেশ চাঙ্গা লাগছে। অপারেশনের পরে এমনটা কখনও বোধ হয়নি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, অন্তত আজকের দিনে তিনি এইটুকু অনুগ্রহ করলেন। ঈশ্বরে অবিশ্বাস নেই আকাশলালের কিন্তু তাঁকে অবলম্বন সে করে না। এই কারণে বাল্যকালে গুরুজনদের সঙ্গে তার বিরোধ হত। গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা না করলে ঈশ্বর শুনতে পাবেন না বলে যাঁরা মনে করেন তাঁরা ঈশ্বরের ক্ষমতাকে ছোট করে দেখেন। আমি একজন মুসলমান অথবা খ্রিস্টান কিংবা হিন্দু হতে পারি জন্মসূত্রে, কিন্তু ঈশ্বরের কোনও জাত নেই। তিনি যদি সর্বশক্তিমান এবং পরমকরুণাময় হন তা হলে তাঁকে কোনও বাঁধনে বেঁধে রাখা যায় না। এসব কথার প্রতিবাদ কেউ করত না কিন্তু শুনতে ভালও বাসত না। নিজেকে একটি মানুষ বলে ভাবাটাই আকাশলালের পছন্দ। আর এই কারণেই মুসলমান অথবা হিন্দুদের সঙ্গে মিশে যেতে কোনও কালেই তার অসুবিধে হত না।
এই রাজ্যে যে কোনও মানুষের পেছনে একটা কাহিনী আছে। হয় সেটা তোষামুদি করে আত্মরক্ষার, নয় অত্যাচারিত হয়ে প্রায় সর্বস্ব ক্ষয়ের। দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষেরাই যখন শতকরা নিরানব্বই তখন তাদের প্রত্যেকের বুকে আগুন চাপা আছে। আকাশলাল বারংবার চেষ্টা করেছে সেই আগুনটাকে খুঁচিয়ে দাউ দাউ করে তুলতে। অনেকটা এগিয়েও সে এখনও সফল হয়নি, তার কারণ সাধারণ মানুষের ভয়জনিত মানসিক জড়তার জন্যে। তারা তাকে দেখলে উদ্বুদ্ধ হয়। তার কথা শুনতে চায়। এই মুহূর্তে যদি দেশে গোপন ব্যালটে ভোট নেওয়া হয় তা হলে আকাশলালের কাছাকাছি কেউ আসতে পারবে না। কথাটা শাসকশ্রেণী জানে বলেই তাকে ধরার জন্যে এত ব্যস্ততা। ওদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে নিজেকে লুকিয়ে রাখা মানে আর এক ধরনের আত্মহনন। শেষ পর্যন্ত একট ঝুঁকি নিতে চলেছে সে। প্রত্যেক মানুষকে একবার মরে যেতে হয়ই, দুর্ভাগ্য যদি আসে তা হলে সেই মৃত্যুটা না হয় এবারই হল। জানলা থেকে সরে আসতেই সে দেখল হায়দার ঘরে ঢুকছে।
‘সুপ্রভাত হায়দার, নতুন কোনও খবর?’
‘সুপ্রভাত। না, নতুন খবর নয়। ভার্গিস ইতিমধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছে আমাদের হাতেই সোম মারা গিয়েছে। তবে কীভাবে মরেছে তা বলেনি। তুমি তো তৈরি হয়ে গেছ।’
হায়দার খুব স্বচ্ছন্দ হয়ে কথাগুলো বলল না।
‘হ্যাঁ। আমি তৈরি। ডাক্তার কোথায়?’
‘আমাদের হাতে এখনও অনেক সময় আছে।’
আকাশলাল ঘড়ি দেখল। সত্যি তাই। সে চেয়ারে বসল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘ডেভিড এবং ত্রিভুবন কোথায়? আমার কিছু আলোচনা আছে।’
বলতে না বলতেই ওই দুজনে ঘরে ঢুকল। আকাশলাল ওদের দেখল। তারপর ত্রিভুবনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘হেনা কি গ্রামে ফিরে গেছে?’
ত্রিভুবন মাথা নাড়ল, ‘না। আজ ও এখানেই থেকে আপনাকে সাহায্য করবে।’
‘ওকে আমার হয়ে ধন্যবাদ দিয়ো। নতুন কোনও খবর?’
ডেভিড জবাব দিল, ‘কাল যে সার্জেন্ট সোমের মৃতদেহে গুলি ছুঁড়েছিল তাকে রাত্রেই শহরের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে ভার্গিস। আজ সকাল পর্যন্ত সে ফিরে আসেনি। আর একটা ইন্টারেস্টিং খবর হল, ভার্গিসকে একটু আগে শুধু ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে শহরের বাইরে যেতে দেখা গেছে। আমাদের বন্ধুরা নজর রাখছে।’
‘শুধু ড্রাইভারকে নিয়ে? এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার কারণ?’ আকাশলালকে চিন্তিত দেখাল।
‘সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।’
‘খবর নাও। আজ ভার্গিস টেলিফোনের সামনে থেকে কিছুতেই নড়বে না। অন্তত ওর মত মানুষের নড়া উচিত নয়। সেটা না করে ও যখন শহরের বাইরে গিয়েছে তখন নিশ্চয়ই আরও জরুরি কোনও ঘটনা ঘটেছে।’
আকাশলাল নিঃশ্বাস নিল, একটু তাড়াতাড়ি কথা বললে বুকে চাপ বোধ হয়। একটু সময় নিয়ে সে বলল, ‘আমার চিন্তা হচ্ছে। নটার সময় ভার্গিস না থাকলে আমাদের সমস্ত পরিকল্পনাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। না, যেখানেই যাক লোকটা, নটার আগে ঠিক ফিরে আসবে। ওকে আসতেই হবে। কিন্তু কোথায় যেতে পারে আজকের দিনে।’
তিনজন কথা বলল না। উত্তরটা তাদেরও অজানা। ডেভিড বলল, ‘ওহো, আজ ভোরে আমি আপনার কাকার কাছে গিয়েছিলাম।’
‘হুঁ।’ আকাশলালকে চিন্তিত দেখাল।’
‘আমি ওঁকে ঘুম থেকে তুলে আপনার কথা জিজ্ঞাসা করলাম।’
‘কী বললেন?’
‘বললেন গত তিন বছরে তিনশোবার পুলিশকে জবাব দিয়ে দিয়ে তিনি ক্লান্ত তাই নতুন কিছু বলতে পারবেন না। আপনার সঙ্গে তাঁর পরিবারের কোনও সম্পর্ক নেই।’
‘ভাল। তারপর?’
‘তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম আজ যদি আকাশলাল মারা যায় তা হলে আপনাদের পারিবারিক জমিতে তাঁকে কবর দিতে আপত্তি হবে কি না। কথাটা শুনে উনি আমার উপর খুব খেপে গেলেন। বললেন, একটা জ্বলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলার কোনও অধিকার আমার নেই। আমি বললাম সাধারণ কৌতূহল থেকেই একথা জানতে চাইছি। তিনি একটু ভেবে মাথা নেড়ে বললেন তার বাবা যেহেতু তাকে খুব ভালবাসত তাই তার কাছে ওকে শুতে দিতেই হবে।’
‘ধন্যবাদ। অনেক ধন্যবাদ।’ আকাশলাল হাসল। ত্রিভুবনের মুখেও হাসি ফুটল, ‘আপনার কাকা আর একটু পরিশ্রম বাঁচিয়ে দিলেন।’
এবার আকাশলাল দুটো হাত এক করে একটু ভাবল, ‘শোন। তোমরা তিনজন এখানে আছ। আমি জানি সহযোদ্ধা হিসেবে তোমাদের তুলনা নেই এবং তোমাদের দেখা পেয়েছি বলে আমি গর্বিত। আজ যে ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে তাতে নিশ্চয়ই ঝুঁকি আছে। কেন এই ঝুঁকি নিচ্ছি তা অনেকবার তোমাদের বলেছি। এমন তো হতেই পারে বিজ্ঞান ব্যর্থ হল, ভার্গিসের তৎপরতা আরও বেড়ে যাওয়ায় তোমাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব হল না এবং আমি আর ফিরে এলাম না। এসব হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আকাশে মেঘ দেখে কেউ কেউ ছাতি না নিয়েও বের হয় এবং না ভিজে গন্তব্যে পৌঁছে যায় কারণ বৃষ্টিটা তখন নামেনি। কিন্তু বৃষ্টি নামতে পারে ভেবে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আমি না থাকলে তোমরা কে কী করবে তা কি নিজেরা ভেবেছ?’ আকাশলাল পরিষ্কার তাকাল।
তিনজনকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল এমন অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে তারা চাইছে না। কিন্তু আজ আকাশলাল যখন খাদের ধারে পৌঁছে এক পা বাড়িয়ে দিয়েছে তখন তারা কথা বলতে বাধ্য। হায়দার বলল প্রথমে, ‘তোমাকে ছাড়া কাজকর্ম চালানো কঠিন হবে।’
ডেভিড বলল, ‘আমি মনে করি কঠিন নয়, অসম্ভব হবে।’
ত্রিভুবন কথা বলল না, মাথা নেড়ে সায় দিল ডেভিডের মন্তব্যে।
সোজা উঠে দাঁড়াল আকাশলাল, ‘আমি তোমাদের কাছে এরকম কথা আশা করিনি। আমার খুব খারাপ লাগছে এই ভেবে যে এতদিন একসঙ্গে কাজ করেও আমি তোমাদের মনে সেই বিশ্বাস তৈরি হতে সাহায্য করিনি যাতে তোমরা বলতে পারতে লড়াইটা ব্যক্তিগত নয়, জনসাধারণের। আমি যেভাবে অত্যাচারিত হয়েছি তোমরাও সেইভাবে অত্যাচার সহ্য করেছ। লড়াইটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব প্রত্যেকের।’
ত্রিভুবন বলল, ‘কিন্তু সাধারণ মানুষ আপনার মুখ চেয়ে— ’
‘মুখ! এই মুখ যদি পাল্টে যায় তা হলে মানুষ আমার পাশে থাকবে না। না, আমি এই কথা বিশ্বাস করি না। পৃথিবীতে কোনও মানুষ অপরিহার্য নয়। একজন চলে গেলে যদি দেশব্যাপী আন্দোলন থেমে যায় তা হলে সেই আন্দোলন শুরু করাই অন্যায় হয়েছিল। আমি না থাকলে আমার জায়গা নেবে তোমরা। তোমাদের মধ্যে একজন নেতৃত্ব দেবে। একজন আকাশলাল মরে গেলে যে ওরা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাবে এ যেন না হয়। তা হলে কফিনে শুয়েও আমি শান্তি পাব না।’ উত্তেজিত হয়ে কথাগুলো বলেই হেসে ফেলল আকাশলাল, ‘অবশ্য মরে যাওয়ার পর শান্তির কী দরকার, যদি সারাজীবনটাই অশান্তিতে কাটে!’
চুপচাপ ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ হাঁটল আকাশলাল। তারপর ঘুরে দাঁড়াল, ‘কে নেতৃত্ব দেবে তা ঠিক করবে সময় পরিস্থিতির ওপর যে বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে তার ওপর। কিন্তু তোমাদের তৈরি থাকা উচিত এখন থেকেই। আজই আমার শেষ দিন যে হবে না তার নিশ্চয়তা নেই।’
এবার হায়দার কথা বলল, ‘তুমি এ ব্যাপারে দুশ্চিন্তা কোরো না।’
আকাশলাল হাসল, ‘গুড। আমি এই কথাটাই শুনতে চেয়েছি। এখন কটা বাজে? ওঃ, সময় কাটতেই চাইছে না। অন্যদিন লাফিয়ে লাফিয়ে ঘড়ির কাঁটা চলে। ডেভিড, সব কিছু ঠিকঠাক আছে তো?’
ডেভিড এতক্ষণে সহজ হল, ‘হ্যাঁ। পরিকল্পনামাফিক এখনও পর্যন্ত চমৎকার কাজ হয়েছে। শেষবার আমি মিলিয়ে নিয়েছি।’
‘ত্রিভুবন, ঠিক দশটায় মিছিল শুরু হচ্ছে?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু এর মধ্যেই মেলার মাঠে পা রাখা যাচ্ছে না।’
‘খবরটা জনসাধারণকে জানাচ্ছ কীভাবে?’
‘প্রথমে ভেবেছিলাম মাইক ব্যবহার করব। কিন্তু পুলিশের পক্ষে অ্যাকশন নেওয়া সহজ হবে তাতে। গোটা পনেরো গ্যাসবেলুন রেডি রাখা হয়েছে। খবরটা তার গায়ে লিখে উড়িয়ে দেওয়া হবে। লক্ষ লক্ষ লোক একসঙ্গে দেখতে পাবে।’
‘পুলিশ যদি গুলি করে বেলুন চুপসে দেয়?’
‘আমার বিশ্বাস পেট্রলের চেয়ে দ্রুত জ্বলবে খবরটা। মুহূর্তের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে।’ ত্রিভুবন সহযোদ্ধাদের দিকে তাকাল, ‘অন্য কোনও উপায় মনে এলে বলতে পারেন।’
হায়দার মাথা নাড়ল, ‘বেলুন ঠিক আছে। কিন্তু বেলুন ওড়াবার আগে মাইকে যদি ঘোষণা করা হয় তা হলে মন্দ কী! পুলিশ এসে মাইক দখল করে নিয়ে যাবে। নিক না। পুলিশ আসছে দেখলে মাইকম্যান ভিড়ের মধ্যে মিশে যাবে।’
আকাশলালকে এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছিল। সে এগিয়ে গেল টেবিলের কাছে। ড্রয়ার টেনে একটা মোটা ডায়েরি বের করল। সেটাকে হাতে তুলে সে বলল, ‘যদি আমি সত্যি মারা যাই তা হলে এই ডায়েরিতে যা লেখা আছে তা তোমরা অনুগ্রহ করে পড়ে দেখো। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই যেন এই ডায়েরি পুলিশের হাতে না পৌঁছায়। পড়ার পর মনে রাখবে আমি যেরকম শান্ত আছি সেই রকম তোমাদের থাকতে হবে।’ আবার ডায়েরিটাকে ড্রয়ারে রেখে দিল সে।
আগে থেকেই ঠিক হয়ে আছে মেলার মাঠে আকাশলালকে যদি যেতে হয় তা হলে ওর সঙ্গে হায়দার যাবে। সঙ্গে কিন্তু পাশে নয়। বাকি দুজন তাদের জন্যে নির্দিষ্ট কাজের জায়গায় থাকবে। কোনও রকম গোলমাল হলে হায়দার তাদের খবর দেবে। সঙ্গে সঙ্গে গা ঢাকা দেবে সবাই। সেই সব গোপন আস্তানা এখন থেকেই ঠিক করা আছে।
১৮. বৃদ্ধ ডাক্তারকে ঘরে নিয়ে আসা হল
সকাল আটটায় বৃদ্ধ ডাক্তারকে এই ঘরে নিয়ে আসা হল। ভদ্রলোককে দেখেই মনে হল তিনি গত রাত্রে এক ফোঁটা ঘুমোতে পারেননি। আকাশলাল বলল, ‘সুপ্রভাত ডাক্তার।’
‘সুপ্রভাত।’ ভদ্রলোক এক দৃষ্টিতে আকাশলালকে দেখছিলেন।
‘আপনি কি সুস্থ নন ডাক্তার?’
‘অসুস্থ? আমি? হা ভগবান। কে কাকে বলছে। আপনি কেমন আছেন?’
‘আজ আমি খুব ভাল আছি। একদম তাজা।’
‘শুয়ে পড়ুন।’
অতএব আকাশলালকে শুতে হল। বৃদ্ধ যখন তাকে পরীক্ষা করছিলেন তখন তার মনে হল মানুষটি কবে যে একটু একটু করে বদলে গেলেন সে নিজেই বুঝতে পারেনি। যখন ওঁকে প্রায় জোর করে নিয়ে আসা হয়েছিল তখন যে চেহারা তার সঙ্গে এখন কোনও মিল নেই। ওঁর মতো এক পণ্ডিত ব্যক্তি এই যে প্রায় বন্দি জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন তা কি কোনও ইতিহাসে লেখা থাকবে? আর এখানে নিয়ে আসা তো চট করে হয়নি। দিনের পর দিন লোক পাঠিয়ে ওঁকে একটা ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে হয়েছিল আকাশলালকে।
‘প্রেসার নর্মাল নেই। থাকার কথাও নয়। বুকের চাপটা কী রকম আছে?’
‘নেই।’
‘মিথ্যে কথা বলবেন না।’
‘জোরে নিঃশ্বাস নিলে সামান্য লাগে।’
বৃদ্ধ ডাক্তার সামান্য সরে একটা চেয়ারে বসে পাকা চুলে আঙুল বোলালেন, ‘যে জন্যে এত সব তা আজকের দিনটার জন্যে, না?’
‘হ্যাঁ, ডাক্তার। আপনি আর্ধেক কাজ করেছেন বাকিটার জন্যে আমি আপনার ওপর নির্ভরশীল। সব কিছু ঠিকঠাক চললেও আপনার হাতেই আমার ফিরে আসা নির্ভর করছে।’ আকাশলাল খুব হালকা গলায় কথাগুলো বলল।
ডাক্তার মাথা নাড়লেন, ‘আমি যা করেছি এবং করব তার ওপর আমার কোনও হাত নেই। আমি আপনাকে অনেকবার বলেছি এটা এমন একটা এক্সপেরিমেন্ট যার মূল্য হল জীবন। আজ থেকে দশ বছর আগে হলেও আমি এই প্রস্তাবে রাজি হতাম না। কিন্তু আমি কি এখনও রাজি? আপনি আমাকে বাধ্য করছেন কাজটা করতে।’
আকাশলাল হাসল, ‘ডাক্তার। আপনি সেইসব ধনীদের গল্প শুনেছেন?’
‘কাদের গল্প?’
‘যাদের প্রচুর টাকা অথচ মৃত্যু নিশ্চিত। যে অসুখে তারা ভুগছে তার কোনও ওষুধ এখনকার বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনে নিজের শরীরকে বাঁচিয়ে রেখেছে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে টাইম ক্যাপসুলে। মৃতপ্রায় শুয়ে আছে মাটির নীচের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে। যদি কখনও বিজ্ঞান সেই রোগের ওষুধ বের করতে পারে তা হলে— ।’
ডাক্তার হাত তুলে আকাশলালকে থামালেন, ‘আপনি গল্প বললেন, এখনও আমি এটাকে গল্প বললে খুশি হতাম। বিজ্ঞান সব করতে পারে। এখন যা পারছে না আগামী কাল পারবে। কিন্তু ধরা যাক, আশি বছর পরে ওই শরীরকে বের করে এনে রিভার্স প্রক্রিয়ায় তার প্রাণস্পন্দন জাগ্রত করে ওই নতুন ওষুধ প্রয়োগ করে যদি রোগমুক্ত করা সম্ভব হয় তা হলে লাভ কী? ওই মানুষটি তখন কার জন্যে কী জন্যে বাঁচবে? আর কতদিন সেই বাঁচা সে উপভোগ করবে। পাগল। তবু আপনার ক্ষেত্রে আমি রাজি হয়ে গেলাম অন্য কারণে।’
‘কী কারণে ডাক্তার?’
‘এতদিন আমি রুগির চিকিৎসা করতাম প্রথাগত উপায়ে। যা শিখেছি, অভিজ্ঞতা আমাকে যা দিয়েছে তাই প্রয়োগ করতাম। মানুষের কষ্ট যাতে দূর হয় তার জন্যে ওষুধ দিতাম অথবা অস্ত্র ধরতাম। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, মেডিসিন ইজ দি মাদার অফ দি সায়েন্সেস। কেন জানেন, চিকিৎসকদের ইন্টারেস্ট হল মানুষের শরীরে এবং পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যাবে এই প্রফেসনের লোকগুলো হল সেই সংঘব্দ্ধ মানুষ, যারা ধর্ম এবং রাজনীতি বাদ দিয়ে বিজ্ঞানসম্মত পথে চিকিৎসা করে। আমিও তাদের একজন ছিলাম এই মাত্র। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিস্ময় হল মানুষের শরীর। কী নেই এখানে? আমরা তার কতটা তৈরি করতে সক্ষম? ধরুন রক্ত। এখনও বিজ্ঞান রক্ত তৈরি করতে পারল না। পঁচিশ থেকে তিরিশ হাজার মিলিয়ন রেড সেলস আর পঞ্চাশ হাজার মিলিয়ন হোয়াইট সেলস। আর এই সব সেলগুলো যে তরল পদার্থে থাকে তার নাম প্লাজমা। সব জানা সত্ত্বেও তো তৈরি করা গেল না। এসব নিয়ে মাঝে মধ্যে ভাবতাম। মানুষের শরীরের যেসব ধমনী দিয়ে রক্ত চলাচল হয় তা যোগ করলে পৃথিবীর যে-কোনও রেলপথ অনেক ছোট হয়ে যাবে। আমি যেটা করলাম সেটা সামান্য একটা এক্সপেরিমেন্ট। ফ্যান ঠিক ঠিক চালাতে একটা রেগুলেটার লাগে। সেটাকে এড়িয়েও তো ফ্যান চালানো যায়। কিন্তু একই স্পিড় থাকে আর ঝুঁকিও। আপনার ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকিটা নিয়েছি।’ ডাক্তারকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল।
‘অনেক ধন্যবাদ ডাক্তার।’
‘কিন্তু আপনি কেন আমোক এই কাজটা আমাকে দিয়ে করালেন তা এখনও বললেন না। আপনার যদি মরার ইচ্ছে থাকে তা হলে পুলিশের কাছে গেলেই সেটা সহজ হত।’
‘যেহেতু আমি মরতে চাই না তাই আপনার সাহায্য নিয়েছি।’
‘কিন্তু এভাবে কেন?’
‘ঠিক সময়ে আপনাকে আমি বলব ডাক্তার।’ আকাশলাল ঘড়ি দেখল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, ‘আপনি ওষুধটা এনেছেন নিশ্চয়ই?’
‘হ্যাঁ। আমাকে আনতে হয়েছে। কিন্তু আমি আবার আপনাকে সতর্ক করছি।’
‘করুন।’
‘এই ক্যাপসুল খাওয়ার তিন ঘণ্টা পরে আপনার হার্ট বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘ঠিক তিন ঘণ্টা বা আগে পরেও হতে পারে।’
‘গুড।’
‘কিন্তু মনে রাখবেন, হার্ট কাজ বন্ধ করা মাত্রই মৃত্যু-দরজায় পৌঁছে যাওয়া।’
‘সাধারণ অবস্থায় সেই দরজাটায় ঢুকে পড়তে কত সময় লাগে?’
‘সেটা শরীরের ওপর নির্ভর করে। হার্ট বন্ধ হবার পর মস্তিষ্ককোষ তিন ঘণ্টার বেশি সাধারণত সক্রিয় থাকতে পারে না।’
‘আমার ক্ষেত্রে সেটা চব্বিশ ঘণ্টা থাকবে!’
‘আমি তাই আশা করছি।’
‘ডাক্তার, আমি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই আপনার কাছে উপস্থিত হব।’
‘আপনি যা করছেন ভেবে চিন্তে করছেন?’
‘হ্যাঁ। এ ছাড়া কোনও উপায় নেই।’
‘তা হলে একটা অনুরোধ করব। আপনার যদি ফিরে আসা সম্ভব না হয় তা হলে এদের বলে যান আমাকে মুক্তি দিতে। আমি সমস্ত পৃথিবীর লোককে জানাব যে আমিই আপনার হাতে আত্মহত্যার অস্ত্র তুলে দিয়েছি।’
আকাশলাল এগিয়ে গিয়ে ডাক্তারকে জড়িয়ে ধরল। দুজনে আলিঙ্গনাবদ্ধ থাকল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর আকাশলাল ফিসফিস করে বলল, ‘ডাক্তার, আমার বাবাকে আমি শেষ বার যখন আলিঙ্গন করেছিলাম কুড়ি বছর আগে, তখন জানতাম না সেই একই অনুভূতি কখনও আমার হবে। আজ হল।’
হায়দাররা চুপচাপ বসেছিল। আকাশলাল সরে এলে ত্রিভুবন জিজ্ঞাসা করল, ‘এই ক্যাপসুলটা আপনি কীভাবে নিয়ে যাবেন?’
ক্যাপসুলটাকে দেখল আকাশলাল। ছোট্ট নিরীহ দেখতে। রক্তে মিশে যাওয়ামাত্র মৃত্যুবাণ ছুঁড়তে শুরু করবে যা তিন ঘণ্টায় কার্যকর হবে। সে ডাক্তারকে বলল, ‘আমি এটা মুখে রাখতে চাই।’
‘স্বচ্ছন্দে। মুখের ভেতরের তাপ অথবা লালায় এটি গলবে না। আপনাকে দাঁত দিয়ে বেশ জোরে চাপতে হবে ভাঙার জন্যে। আপনার ডান দিকের কষের দাঁতের একটা নেই। ওটা ওখানে রেখে দেবার চেষ্টা করুন।’ ডাক্তার বললেন।
ক্যাপসুলটাকে দুই ঠোঁটে নিল আকাশলাল। তার সঙ্গীরা অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশলালের মনে হল যদি এই মুহূর্তে ডাক্তারের কথা মিথ্যে হয়ে যায় তাহলে ভার্গিসের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না সে সকাল ন’টায়। ধীরে ধীরে সে মুখের ভেতরে নিয়ে গেল ক্যাপসুলটাকে। না, গলছে না একটুও। অন্তত জিভে অন্য কোনও স্বাদ আসছে না। সে কষ দাঁতের পাশে জিভ দিয়ে ক্যাপসুলটাকে ঢোকাতে সেটা চমৎকার আটকে গেল। তবে ইচ্ছে করলেই সেটাকে বের করে নিয়ে আসা যায় দুই দাঁতের দেওয়াল থেকে। আকাশলাল বলল, ‘ধন্যবাদ ডাক্তার।’
দরজায় শব্দ হতেই ত্রিভুবন বেরিয়ে গেল। হায়দার বলল, ‘ডাক্তার, আপনি কি এখন বিশ্রাম করতে যাবেন?’
‘অসম্ভব। এই অবস্থায় কেউ বিশ্রাম করতে যেতে পারে না। তবে, আমি এই ঘরে থাকলে যদি আপনাদের কথা বলতে অসুবিধে হয়— ।’
আকাশলাল মাথা নাড়ল, ‘নাঃ। আপনি থাকতে পারেন।’
ত্রিভুবন ফিরে এল, ‘একটু আগে ভার্গিসকে হেডকোয়ার্টার্সে ফিরে আসতে দেখা গিয়েছে। সে আর তার ড্রাইভার ছিল জিপে।’
‘কোথায় গিয়েছিল? কার সঙ্গে দেখা করেছিল?’ আকাশলাল জিজ্ঞাসা করল।
‘এখনও জানা যায়নি।’
‘সেই সার্জেন্টটার খবর পেলে?’
‘না।’
‘উহুঁ। আমার মনে হচ্ছে ওই সার্জেন্টটার সঙ্গে ভার্গিসের কিছু একটা হয়েছে। হয়তো লোকটাকে সে মেরেই ফেলেছে। ত্রিভুবন, তুমি নিজে দ্যাখো কোন চেকপোস্টে ওদের দেখা গেছে।’
ত্রিভুবন মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
আকাশলাল ঘড়ি দেখল। ন’টা বাজতে আর পনের মিনিট বাকি। সে বলল, ‘ক্যাসেটটা নাও।’
হায়দার ক্যাসেট নিল। মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মিনিট পাঁচেক পরে আধ-কিলোমিটার দূরে একটা পাবলিক টেলিফোন বুথের সামনে হায়দার বাইক থেকে নামল। বুথের সামনে তাদের লোক পাহারায় ছিল। মাথা নেড়ে বুথের ভেতর ঢুকে টেপরেকর্ডার বের করল হায়দার। ইতিমধ্যেই ওর মধ্যে ক্যাসেট ঢোকানো হয়ে গেছে। সে ঠিক ন’টায় ভার্গিসের নম্বরগুলো ঘোরাতে লাগল।
কয়েক মুহূর্ত। রিং হতেই ভার্গিসের হুঙ্কার শোনা গেল, ‘হ্যালো।’
রেকর্ডারের বোতাম টিপল হায়দার। সঙ্গে সঙ্গে আকাশলালের গলা শোনা গেল, ‘ভার্গিস। আমি তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। আজ ঠিক বারোটার সময় মেলার মাঠের মাঝখানে আমার জন্যে তুমি অপেক্ষা করবে। আমি অস্ত্রহীন হয়ে যাব। তোমার লোক যদি আলোচনার আগে আমাকে গুলি করে তাহলে আমার লোকও তোমাকে তৎক্ষণাৎ মেরে ফেলবে। আমি আত্মসমর্পণ করছি এবং সেটা বন্ধুভাবেই হোক। আকাশলাল।’
১৯. রিসিভারটা যেন কানের ওপর সেটে ছিল
রিসিভারটা যেন কানের ওপর সেঁটে ছিল। সম্বিত ফিরতেই সেটাকে সরিয়ে নিয়ে কিছুটা নরম গলায় ভার্গিস বললেন, ‘হ্যলো!’ এক দুই তিন সেকেন্ড যেতে না যেতে ভার্গিস বুঝতে পারলেন লাইনটা ডেড হয়ে গেছে। ‘আমি আত্মসমর্পণ করছি এবং সেটা বন্ধুভাবেই হোক’। ধীরে ধীরে রিসিভারটা নামিয়ে রেখে দু’হাতে মুখ ঢাকলেন ভার্গিস। গলাটা সত্যি আকাশলালের তো। কোনও রকম কথা বলার সুযোগ না দিয়ে একটানা বলে লাইন কেটে দিল লোকটা। বোধহয় অনুমান করেছিল, কোত্থেকে টেলিফোন করা হচ্ছে তা তিনি ধরতে চাইবেন। বুদ্ধিমান, কিন্তু ওইটুকু সময়ই তাঁর লোকের কাছে যথেষ্ট।
এই সময় আবার টেলিফোন বাজল। ডেস্কের সার্জেন্ট জানাচ্ছে আট নম্বর রাস্তার একটি নির্জন টেলিফোন বুথ থেকে ফোনটা করা হয়েছিল এবং সেখানে ইতিমধ্যেই পুলিশ পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেখানে একটি সস্তার টেপরেকর্ডার ছাড়া কাউকে পাওয়া যায়নি। ভার্গিস গর্জে উঠলেন, ‘টেপরেকর্ডার?’
সার্জেন্ট মিউমিউ গলায় বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। সেটা নিয়ে আসা হচ্ছে।’
রিসিভারটা দড়াম করে রেখে দিলেন ভার্গিস। তার মানে তিনি আকাশলালের রেকর্ড করা কথা শুনেছেন। ওঃ, কি আহাম্মক। একবারও খেয়াল করেননি রেকর্ড বলেই কোনও বাড়তি সংলাপ বলেনি লোকটা। আর এর একমাত্র কারণ আকাশলাল তাঁর চেয়ে বুদ্ধিমান। নিজে না এসে রেকর্ড করা গলা পাঠিয়েছে। এমন কি টেপরেকর্ডার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ওর লোক দাঁড়িয়ে থাকেনি।
লোকটার আস্পর্ধা এত যে তাঁকে ভার্গিস এবং তুমি বলে গেছে। আর বলার ধরনে প্রভুত্ব পরিষ্কার। সে যা বলবে ভার্গিসকে যেন তা শুনতে হবে। অসম্ভব! দাঁতে দাঁত ঘষলেন ভার্গিস। একটা ক্রিমিন্যাল, দেশদ্রোহীকে তিনি তাঁর সঙ্গে ও ভাষায় কথা বলতে দিতে পারেন না। আলোচনা করতে চায়। কিসের আলোচনা? কয়েক বছর ধরে যে লোকটা তাঁর ঘুম কেড়ে নিয়েছে যাকে না ধরতে পারলে তাঁর চেয়ার আজ বিকেলে থাকবে না, তার সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। বেলা বারোটায় মেলার মাঠে ওর জন্যে অপেক্ষা করতে হুকুম করেছেন উনি। আস্পর্ধা!
এই সময় একজন অফিসার টেপরেকর্ডারটা নিয়ে ভার্গিসের ঘরে ঢুকলেন। সস্তা জিনিস। অবহেলায় আঙুল তুলে তিনি রেখে দিতে বললেন টেবিলে। অফিসার বেরিয়ে যেতে ঈষৎ ঝুঁকে বোতামটা টিপতে কোনও আওয়াজ হল না। ফিতেটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আবার বোতাম টেপার কিছুক্ষণ বাদে গলা শোনা গেল, ‘ভার্গিস। আমি তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। আজ ঠিক বারোটার সময় মেলার মাঠের মাঝখানে আমার জন্যে তুমি অপেক্ষা করবে’। থাপ্পড় মেরে যন্ত্রটাকে বন্ধ করে লাফিয়ে উঠলেন ভার্গিস, ইডিয়ট। নিজেকে একটা আস্ত ইডিয়ট বলে মনে হচ্ছিল তাঁর। লোকটা স্বেচ্ছায় ধরা দিতে চাইছে আর তিনি কি সব উল্টোপাল্টা ভাবছেন। ওর নিশ্চয়ই আর কোনও উপায় নেই, কোনও রাস্তা নেই তাই ধরা দিতে বাধ্য হচ্ছে। যাই হোক না কেন ধরা দিলে তিনি নিজে হাতকড়া পরাবেন। আর এই জন্যে এখন যত ইচ্ছে তাঁর নাম ধরে ডাকুক অথবা তুমি বলুক কি এসে যায়। আরামের নিঃশ্বাস ছাড়লেন ভার্গিস। তাঁর হাত চলে গেল টেলিফোনের দিকে। মিনিস্টারকে খবরটা জানানো দরকার। সমস্ত দুশ্চিন্তার আজ অবসান হচ্ছে, চিতাকে জালে পুরছেন তিনি আজ বারোটায়। কিন্তু তার পরেই অন্য ভাবনা মাথায় এল। যদি লোকটা শেষ মুহূর্তে মত পাল্টায়। যদি মেলার মাঠে না আসে। বেইজ্জত হয়ে যাবেন তিনি আরও একবার। আগে থেকে গান না গেয়ে ধরার পরেই কথা বলা ভাল। কিন্তু এত জায়গা থাকতে মেলার মাঠের মাঝখানে কেন? ননসেন্স! ওই হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে পুলিশের কাছে ধরা দিলে ওর সম্মান থাকবে? ওসব না করে সোজা এই হেডকোয়ার্টাসে চলে আসতে পারত। অথবা কোনও নির্জন জায়গায় তাঁকে যেতে বললেও চলত। নিজে আসবে অস্ত্রহীন হয়ে অথচ সঙ্গীদের সঙ্গে বন্দুক থাকবে। ওকে গুলি করলে তেনারা তাঁকে গুলি করবেন! করাচ্ছি! নিজে যদি না যান মেলার মাঠে? ভেবে নিজেই আপত্তি করলেন। ভার্গিস ইজ নট এ কাওয়ার্ড। তিনি যাবেন। গুলিও করবেন না। ধরার পর কয়েকদিন রেখে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে সুইচ টিপে দেবেন।
প্রসন্ন মুখে চুরুট ধরাতে গিয়েও থমকে গেলেন ভার্গিস। হোয়াই ইন মেলার মাঠ? নিজের মানসম্মানের কথা না ভেবে জায়গাটাকে বেছে নিল কেন লোকটা? পাবলিক খেপাবার ধান্দা নাকি? কেউ কেউ বলে জনতা লোকটাকে ভালবাসে। বাসতেই পারে। আজ ওরা যাকে ভালবাসে কাল তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দেরিও করে না। ও নিয়ে ভাবনা নেই। কিন্তু আজ আকাশলালকে দেখতে পেলে জনতা নিশ্চয়ই উদ্বেল হয়ে উঠবে। এত লোককে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা তাঁর পুলিশের নেই। সেক্ষেত্রে গুলি চালাতে হবে। গুলি চললে জনতা ভয় পেতে পারে আবার বিপরীত ফলও হতে পারে। ভার্গিসের মনে হল কোণঠাসা হয়ে পড়ায় আকাশলাল এই চালটা চেলেছে। সে জনতাকে একসঙ্গে হাতের কাছে পেয়ে তাদের পুলিশের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে চায়।
এখন মেলার মাঠ লোকারণ্য। জোর করে তার সবটা খালি করে দেওয়া অসম্ভব। অথচ সংঘর্ষ বাধলে গুলি চালাতে হবে। ভার্গিস উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সমস্ত অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনারদের জরুরি তলব করলেন।
মিনিট পনেরোর মধ্যে অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনাররা তাঁর টেবিলের উল্টোদিকে চলে এল। এদের সঙ্গে সোমও আসত, আজ তার শরীর মর্গে। লোকগুলোর মুখ গম্ভীর। ভার্গিস গলা পরিষ্কার করলেন অল্প কেশে, ‘প্রথমে আমি আমাদের সহকর্মী সোমের জন্যে দুঃখপ্রকাশ করছি। আপনারা কেউ এ ব্যাপারে কথা বলবেন?’
কেউ সাড়াশব্দ করল না। ভার্গিস বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনারা জানেন ওপর মহল থেকে আমার ওপর প্রচণ্ড চাপ আসছে আকাশলালকে গ্রেপ্তার করার জন্যে। যে কোনও কারণেই হোক সেটা এখনও পর্যন্ত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমার কাছে যে খবর আছে তাতে তাকে আজ আমরা ধরতে পারি।’ ভার্গিস দেখলেন প্রত্যেকের মুখে কৌতূহল ফুটে উঠল।
ভার্গিসের পেছনের দেওয়ালে এই শহরের ম্যাপ টাঙানো ছিল। তিনি উঠে সেই মাপের সামনে দাঁড়ালেন, ‘আজ আমাদের উৎসবের দিন। লক্ষের ওপর মানুষ আজ এই শহরে জড়ো হয়েছে। উৎসব হয় শহরের এই জায়গাটায় যাকে মেলার মাঠ বলা হয়ে থাকে।’ ভার্গিস তাঁর মোটা আঙুল ম্যাপের একটি জায়গায় রাখলেন, ‘এই মাঠে পঞ্চাশ হাজার মানুষ স্বচ্ছন্দে ধরে যায়। মাঠটিতে ঢোকার রাস্তা চারটে। চারটেই চওড়া। একটি রাস্তা, এটা, আমরা নো এনট্রি করে রেখেছি। আমাদের বাহিনী এবং ভি আই পিরা ছাড়া কেউ ওই রাস্তায় যাবে না। বাকি তিনটে রাস্তায় হাঁটা যাবে না মানুষের ভিড়ে। এখন মেলার মাঠ থেকে কেউ যদি ওই তিন রাস্তা দিয়ে পালাতে চায় তাকে প্রতি পায়ে বাধা পেতে হবে। জোরে বা দ্রুত যেতে পারবে না। আপনাদের তিনজন এই তিনটি পথ নজরে রাখবেন। আমি কাউকে পালাতে দিতে রাজি নই।’ ভার্গিস হাত তুললেন, ‘কোনও প্রশ্ন আছে?’
প্রবীণ একজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার, যাঁর কোনও দিন প্রমোশন পাওয়ার সুযোগ নেই, উঠে দাঁড়ালেন, ‘ওই তিনটে রাস্তা পালাবার জন্যে ব্যবহার করতে হলে প্রথমে মাঠে ঢুকতে হবে। ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছি না।’
‘না বোঝার তো কিছু নেই। মাঠে ওরা ঢুকবে। আকাশলাল এবং তার সঙ্গীরা। আর ওদের ঢোকার সময়ে আমরা কোনও বাধা দেব না। কিন্তু পালাবার সময় দেব।’ ভার্গিস যেন খুব সরল ব্যাপার বুঝিয়ে দিলেন।
দ্বিতীয় অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার উঠে দাঁড়ালেন, ‘ওরা মাঠে আসবে কেন?’
‘হ্যাঁ। এটা ভাল প্রশ্ন। সাহস বেড়ে গেলে মানুষের মাথা খারাপ হয়ে যায়। আমার কাছে খবর আছে আকাশলাল মাঠে আসবে।’ টেলিফোনের কথা বেমালুম চেপে গেলেন ভার্গিস। এদের বললে মিনিস্টারকেও জানাতে হয়।
‘কিন্তু অত মানুষের ভিড়ে তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?’
‘সম্ভব। আমি এমন একটা টোপ দিয়েছি যাতে সে কাছে আসবে। সে এলেও তার সঙ্গীরা আসবে না। তারা থাকবে জনতার সঙ্গে মিশে। আমি তাদের পালাতে দিতে চাই না। আন্ডারস্ট্যান্ড? আর যদি আকাশলাল না আসে তো কি করা যাবে। এটা একটা চান্স। হ্যাঁ, মাঠের এ জায়গাটা এখনই ঘিরে ফেলা দরকার যাতে জনতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। ঘেরা জায়গা থেকে একটা পথ যাবে ওই নো-এনট্রি করা রাস্তায়। এক ঘণ্টার মধ্যে কাজটা শেষ করে আমাকে রিপোর্ট দিন। ও-কে।’ কাঁধ ঝাঁকালেন ভার্গিস যার অর্থ মিটিং শেষ হয়ে গেছে, এবার ঘর খালি করে দিন।।
অফিসাররা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে এক কাপ কালো কফির হুকুম দিলেন ভার্গিস। আজ বেশ আরাম লাগছে। যদিও টেপরেকর্ডারের মাধ্যমে আকাশলালের কথা বলা তিনি পছন্দ করেননি। লোকটা অত্যন্ত ধূর্ত। তিনি যা চিন্তা করেন তা যেন আগে থেকে ভেবে ফেলে। ভাবুক। এখন আর কোনও উপায় নেই বলে আত্মসমর্পণ করছে।
কফি খেতে গিয়ে ভার্গিসের মনে হল যদি আত্মসমর্পণ ভান হয়। কাছাকাছি না এলে ওকে সার্চ করা যাবে না। ও যদি হাত দশেক তফাতে এসে সোজা তাঁর বুক লক্ষ করে গুলি চালায় তা হলে কিছুই করতে পারবেন না তিনি। হয়তো গুলি করার পর লোকটাকে জ্যান্ত ফিরে যেতে দেবে না তাঁর বাহিনীর লোকজন কিন্তু তাতে কি লাভ হবে। যে লোকটা জানে এমনিতেই মরতে হবে তার পক্ষে তো প্রধান শত্রুকে মেরে মরাই স্বাভাবিক।
কফিটাকে বিস্বাদ লাগল। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে হবে। সরাসরি সামনে না থেকে দূরে গাড়ির মধ্যে অপেক্ষা করলে নিশ্চয়ই আকাশলাল প্রকাশ্যে আসবে না। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট থাকলেও মুখ মাথা কি করে আড়াল করবেন? ভার্গিস মনে মনে একটা পরিকল্পনা এঁটে নিলেন। যদি দেখেন আকাশলাল গুলি করতে হাত তুলছে তা হলে এই পরিকল্পনাটা কাজে লাগবে।
টেলিফোন বাজল। অবহেলায় রিসিভারটা তুললেন ভার্গিস, ‘হ্যালো।’
‘আজকের জন্যে তুমি তৈরি ভার্গিস?’ মিনিস্টারের গলা।
‘সেন্ট পার্সেন্ট।’
‘উৎসবের জনতা নিয়ন্ত্রণে থাকবে?’
‘কোন বছর সেটা না থেকেছে?’
ভার্গিসের পাল্টা প্রশ্নে ওপাশে কিছুটা সময় চুপচাপ কাটল। ভার্গিস সেটা বুঝলেন, কিছু বললেন না। যা হবার তা তো হবেই।
‘তুমি তা হলে নিশ্চিত আজ বিকেলের মধ্যেই আকাশলালকে ধরতে পারবে?’
‘আমি তো আপনাকে বলেছি।’
‘ফোন করেছিল সে?’
এবার একটু অস্বস্তি হল। যে গলায় কথা বলছিলেন ভার্গিস তা পাল্টে গেল, হ্যাঁ, ‘ফোনে কথা হয়েছে। লোকটা বারোটার সময় আত্মসমর্পণ করবে।’
‘হোয়াট? আত্মসমর্পণ? অসম্ভব।’
‘ওর নাভিশ্বাস উঠে গেছে। আর লুকিয়ে থাকতে পারছে না। আমিই ওকে উপদেশ দিলাম আত্মসমর্পণ করতে। আপনি সাড়ে বারোটায় ওর সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।’
‘ফোন লোকেট করেছিলে?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল।’ টেপরেকর্ডারের কথা বলতে একটুও ভাল লাগল না ভার্গিসের।
মিনিস্টার বললেন, ‘ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে আমার অসুবিধে হচ্ছে ভার্গিস। মনে হচ্ছে এর পেছনে কোনও মতলব আছে। থাকগে, ভাগ্য তোমার পক্ষে থাকুক। আর হ্যাঁ, বাবু বসন্তলালের বাংলোর কেয়ারটেকারের ব্যাপারটা তোমার কাছ থেকে এখনও শুনতে পাইনি।’
ধ্ক্ করে উঠল ভার্গিসের বুক। এরা সব ঠিকঠাক জানতে পেরে যায় কি করে। উত্তর একটা দিতে হবে। ভার্গিস বলল, ‘ওহো! আমি আজই খবরটা পেলাম। লোকটা নাকি পাগল হয়ে গিয়েছে। সামান্য একটা কেয়ারটেকার তাও পাগল, তার কথা বলে আপনাকে বিব্রত করতে চাইনি।’
‘ওই কেয়ারটেকারটাকে খুঁজে বের করো। পাওয়ামাত্র আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’
‘বেশ। কিন্তু আমার মনে হয় ওর সঙ্গে বাবু বসন্তলালের হত্যার কোনও যোগাযোগ নেই। লোকটা ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। দেহাতি মানুষ।’ ভার্গিস অভিনয় করলেন।
‘লোকটাকে দরকার।’ মিনিস্টার লাইন কেটে দিল।
রিসিভার নামিয়ে রেখে ভার্গিস মনে মনে বললেন, আর বোকামি নয়।
আজ শহরের প্রতিটি খোলা জায়গায় মানুষজন থিক থিক করছে। দিনটা শুরু হয়েছিল চমৎকারভাবে, আকাশে মেঘের চিহ্ন নেই কোথাও। হালকা ফুরফুরে রোদে ওই উৎসবের মেজাজ যেন আরও খুলে গিয়েছিল। বেলা বাড়তেই সবার গন্তব্যস্থল হয়ে দাঁড়াল মেলার মাঠ এবং তার দিকে যাওয়ার রাস্তাগুলো। ঢাক ঢোল ভেঁপু বাজছে সর্বত্র, উড়ছে বেলুন। এই উৎসব হয়তো কোনওকালে বিশেষ এক ধর্মের মানুষদের প্রয়োজনে শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেখানে ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান প্রবল না হয়ে ওঠায় উৎসবের আনন্দে অংশ নিতে অন্য ধর্মের মানুষেরা আপত্তি করেনি। মেলায় ঘুরে বেড়ানো কেনাকাটা করতে কোনও বিশেষ ধর্মের ছাড়পত্র লাগে না। সাধারণ মানুষ চিরকাল এই অল্পেতেই খুশি।
আকাশলাল তৈরি হয়ে বসে ছিল। একটু আগে স্বজনকে তার কাছে নিয়ে আসা হয়েছিল। আকশলাল ঠিক কি চায় তা সে স্বজনকে বুঝিয়ে বলেছে। লোকটা সম্পর্কে স্বজনের কৌতূহল একটু একটু করে বাড়ছিল। এখন প্রস্তাব শোনার পর তার মনে হল চ্যালেঞ্জটা সে গ্রহণ করবে। সে বলল, ‘আপনি যখন আমার ওপর নির্ভর করছেন তখন দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। তবে একটা কথা জানবেন, শুধু মুখ নয়, শরীরের সর্বত্র যেসব চিহ্ন এই মুহূর্তে আপনার পরিচয় হিসেবে রয়েছে সেগুলোকে আমি রাখতে চাই না।’
আকাশলাল হাসল, ‘ডাক্তার, এ ব্যাপারে আপনার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রইল।’
‘আমি কোথায় কাজ করব?’
‘ডেভিড আপনাকে সাহায্য করবে।’
ঠিক পৌনে এগারটায় হায়দাররা ফিরে এল। তারাও তৈরি। আকাশলাল জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার সঙ্গে কে কে যাচ্ছে?’
হায়দার বলল, ‘চারজনকে আমরা এর মধ্যেই মেলার মাঠে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু খবর এসেছে ভার্গিস মাঠের ঠিক একটা ধারে কিছুটা জায়গা ঘিরে ফেলেছে বাঁশ দিয়ে। পাবলিককে ওখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ঘেরা জায়গাটার পেছনের রাস্তা ওরা নো এনট্রি করে রেখেছে। ব্যাপারটা ভাল লাগছে না।’
‘হয়তো আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে ওটা করেছে ভার্গিস।’
‘কিন্তু ঢোকার রাস্তাগুলোতে পুলিশের লোক ছড়িয়ে আছে।’
‘খুবই স্বাভাবিক। তুমি হলেও তাই রাখতে।’ আকাশলাল স্বজনের দিকে হাত বাড়াল, ‘গুডবাই ডক্টর। তোমাকে মেলায় যাওয়ার অনুমতি দিতে পারছি না বলে দুঃখিত। ভার্গিস তোমাকে পেলে এই মুহুর্তে ছাড়বে না। তবে কাজ হয়ে যাওয়ার পর তুমি যাতে ইন্ডিয়ায় ফিরে যেতে পার তার ব্যবস্থা আমার বন্ধুরা করবে। তুমি এবং তোমার স্ত্রীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’
আকাশলালকে নিয়ে ওরা বেরিয়ে এল। ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল ওরা। হলঘরে কয়েকজন পাহারাদার সপ্রশংস চোখে আকাশলালকে দেখছিল। প্রত্যেকের হাত কপালে চলে যেতেই আকাশলাল তাদের নমস্কার করল।
এই বাড়ি থেকে বেরুবার যে পথটা স্বজন জেনেছে সেই পথ দিয়ে গেল না আকাশলাল। স্বজন দেখল বাঁদিকের একটা দরজার সামনে পৌঁছে আকাশলাল শব্দ করল। একটু বাদেই একজন সে দরজাটা ভেতর থেকে খুলল। চেহারায় সম্পন্ন বাড়ির কাজের মেয়ে বলেই মনে হয়। স্বজন শুনল আকাশলাল বলছে, ‘আমি খবর পাঠিয়েছিলাম, উনি যদি কয়েক মিনিট সময় আমাকে দেন।’
দুদিনে মানুষটাকে সে যত দেখছে তত বিস্ময় বাড়ছে। যার জন্যে সরকার এত লক্ষ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে তার ব্যবহার, কথাবার্তা এমন মার্জিত ভদ্র হবে কে জানত। কাজের মেয়েটি আকাশলালকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। ওর সহযোগীরা বাইরে অপেক্ষা করছে। স্বজন বুঝতে পারছিল না যে কাজের দায়িত্ব তাকে দিয়ে গেল আকাশলাল তা কি করে করা সম্ভব? এই যে লোকটা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পুলিশের হাতে ধরা দিতে যাচ্ছে তার পরিণাম মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। মৃত মানুষের ওপর সে কখনও অস্ত্র-প্রয়োগ করেনি। প্রয়োজনও হয় না করার।
পকেট থেকে দুটো ছবি বের করল স্বজন। পোস্টকার্ড সাইজ ছবি। আকাশলালের মুখের দুটো দিক। খুব সাম্প্রতিক ছবি না হলেও ওর মুখ তেমন পাল্টায়নি। নাকের পাশে একটা ছোট আঁচিল আছে। এত ছোট যে তিল বলে ভুল হবে। ঠোঁটের দু কোণ থেকে যে ভাঁজটা সেটা সরালেই— স্বজন মাথা নাড়ল। না সে চব্বিশ ঘণ্টা সময় পাচ্ছে। একটা লোক তার দেশের জন্যে এভাবে নিজেকে খরচ করতে করতে শেষ সীমায় পৌঁছেছে, নিজে রাজনীতি না করলেও শ্রদ্ধাশীল না হয়ে পারা যায় না। ব্যাপারটা নিয়ে আরও ভাবতে হবে।
আকাশলাল ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠল কাজের মেয়েটির সঙ্গে। তার বুকে চাপ পড়ছিল বলে গতি কমছিল। মেয়েটি একটু অবাক হয়েই বারংবার পেছনে তাকাচ্ছিল। আকাশলাল তার কাছেও বিস্ময়। মালিক তাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছেন বলে সে এ-বাড়ির অন্য প্রান্তে যায় না, কারও সঙ্গে কথাও বলে না। কিন্তু তার মনে হল লোকটা খুব অসুস্থ। মুখ হাঁ করে বাতাস নিচ্ছে।
ওপরে ওঠার পর আকাশলাল একটু দাঁড়াল। মনে হল সে সহজ হয়েছে। বলল, ‘আজকাল একটুতেই, ঠিক আছে এখন, চলো—!’
বিশাল একটি সোফায় হেলান দিয়ে যে বৃদ্ধা বসেছিলেন তাঁর মাথায় একটিও কালো চুল নেই। দুটো হাত যেন হাড়জড়ানো শিরাদের ভিড়। মুখও কুঁচকে গিয়েছে। কাজের মেয়েটি সামনে গিয়ে কিছু বলতেই জানলার বাইরে তাকানো চোখ দুটো এদিকে ফিরল, ‘বলো, আকাশ!’
আকাশলাল দুহাত যুক্ত করল, ‘আজ উৎসবের দিন। আমি স্থির করেছি আজই ঠিক দিন’।
‘কিসের ঠিক দিন?’
‘আমি আত্মসমর্পণ করছি।’
‘কি?’ বৃদ্ধা সোজা হয়ে বসলেন, ‘তুমি আত্মসমর্পণ করছ?’
‘হ্যাঁ। আপাতত এ ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।’
‘তুমি জানো এর পরিণাম কি হবে?’
‘হ্যাঁ জানি।’
‘আর যারা তোমার সঙ্গে থেকে লড়াই করে এসেছে তাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছ?’
‘না। তারা থাকবে। তাদের লড়াই থামবে না।’
‘আমি বুঝতে পারছি না তোমার কথা।’
‘যদি কখনও সুযোগ পাই আপনাকে বুঝিয়ে বলব। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন যাতে আমাদের পরিকল্পনা সার্থক হয়।’
‘অসম্ভব। তুমি আত্মসমর্পণ নয় আত্মহত্যা করতে চলেছ আর আমি তোমাকে আশীর্বাদ করব? কখনও নয়। তোমার মা আমার বান্ধবী ছিলেন। আমি তাঁর আত্মার শান্তির জন্য আজ প্রার্থনা করব।’ বৃদ্ধা ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লেন সোফায়।
আকাশলাল বলল, ‘জানি না ইতিহাস কখনও এসব কথা লিখবে কি না, কিন্তু প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।’
চোখ বন্ধ করেই বৃদ্ধা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেন?’
‘আপনি আশ্রয় না দিলে আমরা কোথায় ভেসে যেতাম।’
বৃদ্ধা হাত নাড়লেন। যার অর্থ এসব তিনি শুনতে চান না।
আকাশলাল বলল, ‘এবার আমি চলি।’
বৃদ্ধা সাড়া দিলেন। আকাশলাল সরে যেতে শুরু করেছে, বৃদ্ধা ডাকলেন, ‘শোন। তোমার সঙ্গীদের বলো এক ঘণ্টার মধ্যে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে।’
‘সেকি?’ চমকে উঠল আকাশলাল।’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু আপনি আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন পুলিশ না আসা পর্যন্ত… ।’
‘দিয়েছিলাম। আমি লেডি জে সি প্রধান। পুলিশ আমার বাড়ির ওপর কখনই সন্দেহের চোখে তাকাবে না। যদি তোমরা তাদের আগবাড়িয়ে ডেকে না আনো তা হলে কোনও ভয় নেই। কিন্তু আমি দিয়েছিলাম একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে। কাপুরুষকে নয়।’
আকাশলাল হেসে ফেলল, ‘আপনি ঠিক বলেছেন। আপনি হিন্দু। হিন্দুদের আত্মীয় বিয়োগ হলে অশৌচ পালন করতে হয় এগারো দিন। আমার মৃত্যুর খবর পেলে অন্তত এগারোটা দিন যা চলছিল তা চলতে দেবেন। তারপর আর কেউ এখানে থাকবে না, আমি আপনাকে কথা দিলাম।’
বৃদ্ধা হাত নাড়লেন সেইভাবেই। কোনও কথা আর বলতে চান না তিনি। অর্থাৎ আকাশলালের প্রস্তাব তিনি মেনে নিলেন।
গাড়িটা ধীরে ধীরে বাগানের পথ দিয়ে এগিয়ে আসছিল। ড্রাইভার ছাড়া পেছনের আসনে আরও দুজন বসেছিল। একজন আকাশলাল। তার মুখ একটা মাফলারে জড়ানো। পাশে ত্রিভুবন। গাড়িটা বড় রাস্তায় পড়েই গতি বাড়াল। এদিকটা মেলার পথ নয় বলেই লোকজন কম, গাড়ির ভিড় বেশি নেই।
কিছুটা দূর যাওয়ার পর ত্রিভুবন হেনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল রাস্তার পাশে, একা। ত্রিভুবন বলল, ‘আমরা কি গাড়িতেই অপেক্ষা করব?’
আকাশলাল মাথা নাড়ল, ‘না। তুমি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাও। এরকম একটা জায়গায় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলে অনেকের সন্দেহ হবে।’
‘কিন্তু আপনি— ’
‘একটু ঝুঁকি নিতেই হবে।’
গাড়িটা দাঁড়াল। আকাশলাল দরজা খুলে নামতেই হেনা এগিয়ে এল। কিন্তু ত্রিভুবনের ইচ্ছে করছিল না প্রিয় নেতাকে এভাবে ছেড়ে যেতে। আকাশলাল তার দিকে হাত বাড়াল, ‘বিদায় বন্ধু।’
ত্রিভুবন নিজেকে সংযত করে হাত মেলাল।
গাড়িটা চলে যেতে আকাশলাল হেনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাঃ, তুমি তো বেশ সুন্দর হয়েছ। এবং বুদ্ধিমতীও।’
হেনা মাথা নামাল, ‘সেটা কি করে বুঝলেন?’
‘সোম নিশ্চয় বুঝতে পেরেছিল তোমরা ওকে চিনে ফেলেছ!’
‘হ্যাঁ, গ্রামের কয়েকজন ওঁর দিকে তেড়ে এসেছিল চিনতে পেরে।’
‘তারপর?’
‘আমি ওঁকে পরে বুঝিয়েছিলাম লোকগুলো ভুল করেছে। সোমের মতোই দেখতে এক জনের সঙ্গে ওরা গুলিয়ে ফেলেছে।’
‘সোম বিশ্বাস করেনি?’
‘না। আমার তো তাই মনে হয়। তবে সেটা মনে রেখে দিয়েছিলেন।’
‘হুঁ। ত্রিভুবনকে তুমি বিয়ে করছ কবে?’
‘আশ্চর্য। এই প্রশ্ন এখন আপনার মাথায় আসছে? এই সময়ে?’
আকাশলাল রসিকতা করতে যাচ্ছিল, এমন সময় দূরে ঢাকঢোল বাজিয়ে একটা মিছিল আসতে দেখা গেল। মানুষগুলো কোনও গ্রাম থেকে তাদের গ্রামদেবীকে বহন করে নিয়ে চলেছে মেলার মাঠে। হেনা এগিয়ে গেল তাদের দিকে।
মিছিলটা আকাশলালের সামনে এসে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়াল। আটজন মানুষ বাঁশের ওপর মূর্তি বহন করছে। মৃর্তির চারপাশে পর্দা টাঙানো। ওরা নিচু হতেই আকাশলাল ঘেরাটোপে উঠে বসল। সেখানে কোনও দেবী বা মূর্তি নেই। মিছিলটি চলল আগের মতোই ঢাকঢোল বাজিয়ে। মিছিলের জনাকুড়ি মানুষকে দেখে প্রকৃত দেহাতি ভক্ত বলে মনে হচ্ছিল। ভিড় বাড়ছিল রাস্তায়। কিন্তু মিছিলকে পথ করে দিচ্ছিল সবাই শ্রদ্ধায়। মেলার মাঠে না-যাওয়া দেবীর মুখদর্শন করা যাবে না, এটাই নিয়ম।
আকাশলাল দেখল, ঘেরাটোপের ভেতর নির্দেশমত পোর্টেবল মাইক রাখা আছে।
২০. কথা বাতাসের আগে ছোটে
কথা বাতাসের আগে ছোটে। আকাশলাল আজ মেলার মাঠে ভার্গিসের কাছে ধরা দেবে এমন খবর চাউর হওয়া মাত্র সেটা এই শহরের মানুষদের নিঃশ্বাস ভারী করে তুলল। যাকে ধরতে সরকার কতরকমের অত্যাচার চালিয়েছে, লক্ষ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছে কিন্তু কোনও কাজ হয়নি সেই মানুষটি আজ স্বেচ্ছায় ধরা দিতে আসবে এমন বিশ্বাস করা অনেকের পক্ষেই কঠিন।
কিন্তু মানুষ বিশ্বাস না করলেও কৌতুহলী হয়। আর সেই কারণেই মেলার মাঠ থিকথিকে জনতায় ভরে গেল। দেহাতি থেকে শহরের মানুষদের মনে একই চিন্তা। এমন কি ব্যাপার ঘটল যাতে আকাশলাল ধরা দিচ্ছে! যারা নির্বিবাদে থাকতে চায়, পুলিশের সঙ্গে ঝামেলা এড়িয়ে চলে তারাও আকাশলাল সম্পর্কে একধরনের সহানুভূতি রাখে। আবার কেউ কেউ মনে করে বিপ্লবীরা নিজেদের স্বার্থে আকাশলালের অস্তিত্ব প্রচার করে। আসল আকাশলাল অনেকদিন আগেই মারা গিয়েছে। বোর্ডের যা ক্ষমতা তাতে এদেশে থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখা অসম্ভব। অথচ পুলিশ মানুষটাকে ধরতে পারছে না। যে নেই তাকে ধরবে কি করে।
আজ যখন খবরটা চাউর হল তখন কারও কারও বুক টন টন করে উঠল। ওই মানুষটার আত্মসমর্পণ মানে এদেশ থেকে বিপ্লবের শেষ সম্ভাবনা মুছে ফেলা। নিজেরা যে করে হোক জীবনটাকে কাটিয়ে দিয়েছে কিন্তু বাচ্চাগুলো ভবিষ্যতে যে আরামে থাকবে তার কোনও সম্ভাবনাই রইল না। কয়েকটা পরিবার নিজেদের আরও ধনী করতে করতে একসময় দেশটাকেই হয়তো বিক্রি করে দেবে। যারা দেশটাকে নিজের সম্পত্তি ভাবে তারা তো স্বচ্ছন্দেই সেটা করতে পারে! আকাশলালের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারছিল না অনেকেই। অবশ্য তারা নিজেরাও জানে শত্রুতা না করলেও আকাশলালের পাশে দাঁড়িয়ে বোর্ডের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কখনও নামেনি। একটার পর একটা সংঘর্ষে যখন আকাশলালের দল ক্রমশ ছোট হয়ে এসেছে তখনও ভয়ে নীরব দর্শক থেকে গেছে। কিন্তু আজ আকাশলালের আত্মসমর্পনকে তারা মানতে পারছিল না কিছুতেই। সেই দুঃখ নিয়েই জমা হয়েছিল মেলার মাঠে।
কিন্তু অনেকেই মনে করছে আজ একটা চমৎকার নাটক হবে। আকাশলাল কখনওই ধরা দিতে আসতে পারে না। এত বছর ধরে যে ভার্গিসকে বোকা বানিয়েছে সে খবরটা রটিয়ে দিয়ে মজা দেখবে। অথবা এমন একটা কাণ্ড বেলা বারোটায় হবে যে ভার্গিসের মুখ চুপসে যাবে। সেই মজা দেখতেই অনেকে চলে এসেছে।
মেলা উপলক্ষে বাইরের কিছু সাংবাদিকের সঙ্গে এদেশীয় সাংবাদিকরাও ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এতবড় একটা খবর কানে যাওয়া মাত্র তাঁরাও ছুটে এসেছেন বাঁশ দিয়ে ঘেরা জায়গাটায়, যেখানে নাকি আত্মসমর্পণের ঘটনাটা ঘটবে। এমন কি পরিস্থিতি হল যার কারণে এইরকম সিদ্ধান্ত নিতে হল তা নিয়ে জল্পনাকল্পনা চলছিল সাংবাদিকদের মধ্যে। পুলিশ যেমন আকাশলালকে খোঁজার চেষ্টা করে গেছে এবং সফল হয়নি সাংবাদিকদেরও একই অবস্থা হয়েছিল। আকাশলালকে খুঁজে বের করে একটা জম্পেশ ইন্টারভিউ নিতে পারলে কাগজের প্রচার হুহু করে বেড়ে যেত। কিন্তু লোকটার কোনও হদিশই কেউ পায়নি।
সাংবাদিকদের দলে একটি তরুণী সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। মেয়েটি সুন্দরী তো বটেই কিন্তু ওর পরনে জিনস আর সার্ট। চুল ছোট করে ছাঁটা। কাঁধে ব্যাগ। মেয়েটির সৌন্দর্য রুক্ষতার বেড়া দিয়ে ঘেরা। কোন মতেই পেলব অথবা কোমল নয়। বাঁশের বেড়ার ওপাশে ভার্গিশের জিপ এসে দাঁড়ানো মাত্র সাংবাদিকরা তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেপাইরা এগোতে দিচ্ছিল না তাদের। এদেশীয় সাংবাদিকরা অবশ্য সেই চেষ্টা করছিল না। সরকার বিব্রত হতে পারে এমন লেখা তারা লিখতে পারে না। এখানকার বোর্ড সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন যদিও সরকার বিরোধী কোনও কাগজের অস্তিত্ব এখানে নেই। বিদেশি রাষ্ট্র থেকে যেসব সাংবাদিকরা আসে নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের সব জায়গায় যেতে দেওয়া হয় না এবং এদের পাঠানো রিপোর্টের প্রতিবাদ করতে সরকার সবসময়ই ব্যস্ত থাকে। জিপে বসেই ভার্গিস দেখলেন সাংবাদিকদের। তাঁর মনে হল এই লোকগুলোকে এখান থেকে সরানো দরকার। এই দেশের দুটো পত্রিকার সাংবাদিকরা এখন তাঁর তাঁবেদার কিন্তু বাইরে থেকে আসা লোকগুলো বেআদব। চেকপোস্টেই এদের আটকে দেওয়া উচিত ছিল অন্য অজুহাতে। ভার্গিসের চোখ পড়ল মেয়েটির ওপরে। সেপাইদের সঙ্গে তর্ক করছে বাঁশের বেড়ার ওপাশে দাঁড়িয়ে। চোখ টানার মতো ধারালো মেয়ে। এত্ত সাংবাদিক নাকি। ইউরোপ আমেরিকার মত ইন্ডিয়াতেও তাহলে মেয়েরা সাংবাদিকতার মাঠে নেমে পড়েছে। ভার্গিস চুরুট ধরালেন। তারপর একজন অফিসারকে ডেকে নিচু গলায় কিছু বললেন।
অফিসার এগিয়ে গেলেন জটলাটার দিকে। তারপর গলা তুলে বললেন, ‘সি পি আপনাদের সঙ্গে আলাদা দেখা করতে চান। এখানে জনতার সামনে কোনও রকম ইন্টারভিউ নয়। আপনারা হেডকোয়ার্টার্সে গিয়ে অপেক্ষা করুন।’
এই সময় মেয়েটি প্রশ্ন করল, ‘আকাশলাল কি আসছেই?’
অফিসার মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ, তাই তো জানি।’
‘তা হলে সেই আসার মুহূর্তটাকে ধরে রাখার জন্যে আমাদের এখানে থাকা দরকার।’
‘কিন্তু সি পি চাইছেন—!’
‘বারবার সি পি সি পি করবেন না তো? ভদ্রলোককে বলুন গাড়ি থেকে নেমে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে। আমরা ওঁকে প্রশ্ন করতে চাই।’ মেয়েটির গলায় কর্তৃত্ব।
অফিসার সামান্য ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ম্যাডামের নাম?’
‘আমি ইন্ডিয়া থেকে এসেছি। কাগজের নাম দরবার।’
অফিসার ফিরে গিয়ে ভার্গিসকে বললেন সব। ভার্গিস লোকটাকে দেখলেন, ‘ওয়ার্থলেশ! তোমাকে বলেছিলাম ওদের হটিয়ে দিতে। যাকগে, ওদের বলল সামনে থেকে সরে এসে ওই নো-এনট্রি করা রাস্তায় ফাঁকায় ফাঁকায় দাঁড়াতে। কাজ হয়ে গেলে তখন কথা বলব। আর জানিয়ে দেবে যেহেতু আমি সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি তাই জনতার ঠেলাঠেলির মধ্যে না রেখে ফাঁকা জায়গায় যাওয়ার অনুমতি দিলাম।’
ইচ্ছে হোক বা না হোক সেপাইররা সাংবাদিকদের নো এনট্রি করা রাস্তাটার মুখে নিয়ে গেল। সেখানে অবশ্য আরামেই দাঁড়ানো যাচ্ছে এবং ঘেরা জায়গাটা পরিষ্কার, চোখের সামনে। মেয়েটি ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে আরম্ভ করতেই একজন অফিসার এগিয়ে এল, ‘ম্যাডাম, আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী কোনও পুলিশ অফিসারের ছবি তোলা নিষিদ্ধ।’ মেয়েটি মাথা নাড়ল কিন্তু ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল না। ওদিকে ঢাকঢোল কাড়ানাকাড়া সানাই এবং মানুষের গলা থেকে ছিটকে ওঠা শব্দাবলি মিলেমিশে এক জমজমে পরিবেশ গড়ে তুলেছিল মেলার মাঠে। পাহাড়ি গ্রামগুলো থেকে গ্রামীণ দেবীদের মাথায় নিয়ে ছুটে আসা দলগুলো একের পর এক মেলার মাঠে ঢুকে পড়ছিল। তাদের উৎসাহ দিচ্ছিল সমবেত জনতা।
জিপের ভেতর বসে ভার্গিস ঘড়ি দেখছিলেন। যদি আকাশলাল মিথ্যে কথা বলে তা হলে কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য পরিকল্পনা করতে হবে তাঁকে। যে লোকটা কখনও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি সে কেন খামোকা আগ বাড়িয়ে মিথ্যে বলতে যাবে! কিন্তু এও তো ঠিক, লোকটার আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছে বোকামির চেয়েও খারাপ ব্যাপার। সেটা আকাশলালের চেয়ে ভাল কেউ জানে না। যদি সত্যি হাতে আসে লোকটা, ভার্গিস চোখ বন্ধ করলেন, এতদিনের সব অপমানের প্রতিশোধ তিনি এমনভাবে নেবেন যা ইতিহাস হয়ে থাকবে।
জিপের যেদিকে ভার্গিস বসেছিলেন তার সামনে চারজন সেপাইকে তিনি এমনভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন যাতে দৃষ্টি ব্যাহত না হয় অথচ কেউ তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারবে না। আজ কোনও ঝুঁকি নিতে চান না তিনি। মরিয়া লোকদের কিছু নমুনা তিনি জানেন। আজ যদি আকাশলালের সব পথ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে আত্মসমর্পণের নামে সোজা এগিয়ে এসে তাঁকে গুলি করতে পারে। লোকটাকে সার্চ করার আগে কোনও ঝুঁকি নয়।
ভার্গিসের জিপটা দাঁড়িয়েছিল মাঠের একপাশে ঘেরা জায়গাটায়। তাড়াহুড়োয় বাঁশ দিয়ে ঘেরা হয়েছিল ভার্গিসের নির্দেশে এবং ভিড়ের চাপ পড়েছে বাঁশের ওপর। দূরে একটার পর একটা দেবীদের আগমন ঘটছে। লোকগুলো এত কষ্ট করে মাথায় তুলে কেন যে ওদের নিয়ে আসে তা ভর্গিস আজও বুঝতে পারেন না। একজন দেবতা এখানে বাস করেন আর বছরের এই উৎসবের দিনে তাঁকে দর্শন করাতে দেবীদের নিয়ে আসা হচ্ছে। একজন পুরুষ আর অনেক মহিলা। পৌরাণিক দিনগুলো বেশ ভাল ছিল। ভার্গিসের নিঃশ্বাস পড়ল, নিজের জীবনে মেয়েমানুষ নিয়ে কখনই মাথা ঘামাননি।
‘মিস্টার ভার্গিস!’
ভার্গিস চমকে উঠলেন। মাইকে কে তার নাম ধরে ডাকছে!
‘মিস্টার ভার্গিস, আমি আকাশলাল। আপনি আমার মাথার দাম লক্ষ লক্ষ টাকা রেখেও এদেশের জনসাধারণকে বিশ্বাসঘাতক করতে পারেননি।’ গলাটা গমগম করে উঠতেই মেলায় সমস্ত আওয়াজ থেমে গেল।
‘বছরের পর বছর এদেশের গরিব মানুষদের ওপর বোর্ড এবং আপনারা যে অত্যাচার চালিয়েছেন আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে কোনও দিনই ধরতে পারতেন না। কিন্তু যখন আমি জানতে পারলাম আমাকে না পেলে আপনি আমার পৈতৃক গ্রাম জ্বালিয়ে দেবেন তখন বাধ্য হচ্ছি আত্মসমর্পণ করতে।’
হঠাৎ একটা চিৎকার শোনা গেল, ‘না, না, কক্ষনো না।’
‘আকাশলাল জিন্দাবাদ। আকাশলাল যুগ যুগ জিও।’
মুহূর্তেই শ্লোগানগুলো ছড়িয়ে পড়ল মুখে মুখে। সাধারণ দর্শকদের মধ্যে উন্মাদনা ছড়াল। আকাশে হাত ছুঁড়তে লাগল তারা। ভার্গিস মাথা নাড়লেন, আবার টেপ বাজিয়ে পাবলিক তাতানো হচ্ছে। এবার যদি ওই জনতা তাঁর দিকে ছুটে আসে তাহলে পেছনের নো-এনট্রি করা রাস্তা ছাড়া পালাবার কোনও পথ নেই। তিনি দেখলেন কিছু লোক কাউকে জায়গা করে দিচ্ছে সসম্রমে। জিপের আশেপাশে যেসব সেপাই বা অফিসার ছিল তারা বন্দুক উঁচিয়ে ধরল।
‘ভার্গিস। ওদের বলো বন্দুক নামাতে। আমার গায়ে গুলি লাগলে বন্ধুরা তোমাকে জিপসমেত গ্রেনেড ছুঁড়ে উড়িয়ে দেবে পরমুহূর্তেই।’
ভার্গিস চমকে উঠলেন। গ্রেনেড। চার সেপাই-এর দেওয়াল তাঁকে গুলি থেকে বাঁচাতে পারে কিন্তু গ্রেনেড উড়ে আসবে মাথার ওপর দিয়ে! তিনি হুকুম দিলেন, ‘ফায়ার করবেন না।’
এবং তখনই তিনি লোকটাকে দেখতে পেলেন। জনতার ফাঁকা করে দেওয়া জায়গাটায় হাত তিরিশেক দূরে যে এসে দাঁড়িয়েছে সে-ই আকাশলাল? খুব রোগা লাগছে। দাবি করলেই তো হবে না, প্রমাণ দিতে হবে। ‘হে আমার দেশবাসী বন্ধুগণ। আজ আকাশলালের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। আপনারা আমার ওপর যে বিশ্বাস রেখেছিলেন তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই আমি আমার বিনিময়ে কিছু নিরীহ মানুষকে মরতে দিতে পারি না। আমি জানি পুলিশ আমাকে পেলে কি করতে পারে। কিন্তু আমার উপায় নেই। তবে আশা করব ওরা আমার বিচার করবে। আমার বক্তব্য শোনার সময় দেবে। আর যদি ওরা আমাকে কাপুরুষের মত মেরে ফেলে, হে আমার বন্ধুগণ, আপনারা তার বদলা নেবেন। ভার্গিস, তুমি জিপ থেকে নেমে দাঁড়াও, আমি এগোচ্ছি। আমার কাছে কোনও অস্ত্র নেই এবং আপনারা সবাই দেখতে পাচ্ছেন, আমি সুস্থ, সম্পূর্ণ সুস্থ।’ আকাশলাল আরও একটু এগিয়ে এল। ভার্গিস তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন।
আকাশলাল আবার মাইকে ঘোষণা করল, ‘হে আমার দেশবাসী বন্ধুগণ, আমার সঙ্গে পুলিশকমিশনারের চুক্তি হয়েছে যে সে আমাকে বিনা বিচারে হত্যা করবে না। আমি আপনাদের সামনে সেই চুক্তিমত আত্মসমর্পণ করছি।’
হঠাৎ জনতা চিৎকার করতে আরম্ভ করল। ভার্গিসের মনে হচ্ছিল তিনি বধির হয়ে যাবেন। এই জনতা যদি তাঁর দিকে ছুটে আসে তাহলে পালাবার পথ পাবেন না। আকাশলালের মনে হচ্ছে সেই মতলব নেই কারণ সে ধীরে ধীরে বাঁশের বেড়ার দিকে এগিয়ে আসছে। মানুষ তাকে পথ করে দিচ্ছে সসম্মানে। নিচু হয়ে বেড়া পেরিয়ে আকাশলাল একবার হাত তুলে জনতাকে অভিবাদন জানাল। সঙ্গে সঙ্গে গর্জনটা আকাশ স্পর্শ করল।
আকাশলাল ভার্গিসের সামনে এসে দাঁড়াল, ‘আমি আকাশলাল।’
ভার্গিস ভাল করে দেখলেন। বেশ শীর্ণ চেহারা হলেও লোকটা যে আকাশলাল তা কোনও শিশুও বলে দেবে। তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘এরকম একটা নাটক করার কি দরকার ছিল? সোজা হেড-কোয়াটার্সে চলে এলেই তো হত!’
‘সেক্ষেত্রে পুরস্কারের টাকা কে পাবে তা নিয়ে সমস্যা হত।’
‘তার মানে?’
‘আমি চাইছি আমাকে ধরে দেবার পুরস্কারটা বোর্ড তোমাকেই দিক। আজ হাজার হাজার মানুষ সাক্ষী থাকল ঘটনার।’ খুব খুশির সঙ্গে বলল আকাশলাল।
লোকটা তাঁকে স্বচ্ছন্দে তুমি বলছে, ভাবভঙ্গিতে গুরুজন গুরুজন ভাব। মতলবটা কি? এইসময় নো এনট্রি করা রাস্তায় দাঁড়ানো সাংবাদিকরা ভেতরে ঢোকার জন্য ছোটাছুটি শুরু করে দিল। তাদের আটকাচ্ছে সেপাইরা, কেউ কেউ দূর থেকেই চিৎকার করছে, ‘মিস্টার আকাশলাল, আপনি কেন স্বেচ্ছায় ধরা দিলেন?’ ‘মিস্টার আকাশলাল, আপনি কি বিপ্লবের আশা ছেড়ে দিয়েছেন?’ পুলিশ ওদের আটকে রাখছিল কিন্তু মেয়েটিকে পারল না। একটা ফাঁক পেয়ে সে দৌড়ে চলে এল এদের সামনে, ‘মিস্টার আকাশলাল, আত্মহত্যা না আত্মসমর্পণ কি ভাবে এই ঘটনাটা আপনি ধরতে চাইবেন?’
আকাশলাল খুব অবাক হয়ে গেল, ‘আপনি?’
‘আমি একজন বিদেশি সাংবাদিক। আমার কাগজের নাম দরবার। কিন্তু সেটা বিষয় নয়। এই কাজের জন্য আপনার দেশের মানুষকে কি কৈফিয়ৎ দেবেন?’
সেই অফিসারটি দুজনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন, ‘নো’। এখানে নয়। যদি কিছু প্রশ্ন থাকে হেডকোয়াটার্সে আসুন। সি পি-র অনুমতি নিয়ে ওখানে কথা বলবেন। মিষ্টার আকাশলাল, ‘আপনি আসুন।’
একজন সেপাই এসে আকাশলালের হাত ধরে দ্বিতীয় জিপে তুলল। সঙ্গে সঙ্গে ভার্গিসের জিপ বেরিয়ে গেল নো-এনট্রি করা রাস্তায়। তাঁর পেছনে দ্বিতীয় জিপে আকাশলাল এবং গোটা তিনেক ভ্যান, যেগুলো রাস্তায় অপেক্ষা করছিল। সমস্ত মেলাজুড়ে তখন বিশৃঙ্খলতা শুরু হয়ে গিয়েছে। বাঁশের বেড়া ভেঙে গেছে। মানুষজন পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে। গ্রামীণ বিগ্রহগুলো নিয়ে যারা এসেছিল তারা কোনও মতে সেগুলোকে বাঁচাতে ব্যস্ত।
দশ মিনিট পরে হেডকোয়াটার্সে নিজের চেম্বারে বসে ভার্গিস মিনিস্টারকে ফোন করলেন, ‘স্যার! চিতাকে খাঁচায় বন্দি করেছি।’
‘অভিনন্দন ভার্গিস। অনেক অভিনন্দন।’ মিনিস্টারের গলার স্বর আজ অন্যরকম শোনা গেল, ‘লোকটাকে এখন কোথায় রেখেছ?’
‘দোতলার একটা ঘরে।’
‘ওঃ অনেকদিন পরে আজ একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব। কিন্তু তুমি নিঃসন্দেহ তো যে লোকটা সত্যিকারের আকাশলাল?’
‘হ্যাঁ স্যার। কোনও সন্দেহ নেই।’
‘ধন্যবাদ। অনেক ধন্যবাদ।’
‘তাহলে আপনি বোর্ডকে আমার কথা বলবেন।’
‘অবশ্যই! তবে ওই লোকটাকে আমার চাই।’
‘কাকে স্যার?’
‘ওই কেয়ারটেকারকে। জীবিত অথবা মৃত। ম্যাডাম আমাকে একটু আগেও টেলিফোন করেছিলেন। ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
‘আমি দেখছি স্যার।’
‘আকাশলালকে জিজ্ঞাসাবাদ করো। ওর কাছ থেকে এই তথাকথিত আন্দোলনের সব খবর বের করে একটা রিপোর্ট দেবে। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। তিন-চার দিন সময় নাও। প্রথম দুটো দিন ভদ্রতা কোরো। রেসপন্স না করলে ব্যবস্থা নিয়ো।’
‘ধন্যবাদ স্যার। বিদেশি সাংবাদিকরা ওর সঙ্গে কথা বলতে চায়।’
‘জিজ্ঞাসাবাদ শেষ না করে অ্যালাউ কোরো না। আর ওর সঙ্গীসাথীদের যে করেই হোক খুঁজে বের করো। গাছ উপড়ে ফেললেও মাটির তলায় থাকা ছেঁড়া শেকড় থেকে নতুন গাছ মাথা চাড়া দিতে পারে।’ মিনিস্টার ফোন রেখে দিলেন।
চুরুট ধরালেন ভার্গিস। আঃ আরাম। ফোন বাজল। খবর শুনে গম্ভীর হয়ে একটু ভাবলেন, ‘টেক অ্যাকশন।’
শহরের বিভিন্ন রাস্তায় গোলমাল শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ নিজে থেকেই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকটা সরকারি গাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, এসব বরদাস্ত করবেন না তিনি। একজন অ্যাসিসটেন্ট কমিশনার তাঁর ঘরে ঢুকে স্যালুট করল, ‘স্যার। মেলার মাঠের বিগ্রহগুলো থাকলে অ্যাকশন নেওয়া একটু অসুবিধে হতে পারে। কি করব?’
‘ওগুলোকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বলুন।’
‘আপনি যদি একটা অর্ডার দেন, মানে, এমনিতে প্রথা অনুযায়ী ওদের সন্ধে পর্যন্ত ওখানে থাকার কথা!’
‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আজ চারটে থেকে শহরে কারফিউ জারি করা হচ্ছে। অতএব সব বিগ্রহ যেন তার আগে নিজের নিজের গ্রামে ফিরে যায়। বিকেল চারটে থেকে আগামী কাল ভোর ছটা পর্যন্ত কারফিউ। অ্যানাউন্স করে দিন।’ ভার্গিস হুকুম দেওয়ামাত্র অ্যাসিসটেন্ট কমিশনার স্যালুট করে বেরিয়ে গেল।
চুরুটে টান দিলেন ভার্গিস। এতদিনে হাতের মুঠোয় পেয়েছেন লোকটাকে। উঃ, কম জ্বালিয়েছে। মিনিস্টার যাই বলুন জিজ্ঞাসাবাদের ধার ধারবেন না তিনি। লোকটার শরীর থেকে চামড়া তুলে নিয়ে নুন ছড়িয়ে দিতে হবে। আজকের দিনটা এইভাবেই কাটুক। রাত্রে একটা লম্বা ঘুম দিয়ে সকাল থেকে কাজ শুরু করবেন। আজ বিকেল পর্যন্ত তাঁকে সময় দেওয়া হয়েছিল! এখন বোর্ড তাঁকে নিয়ে কি ভাবছে? হঠাৎই মেজাজ খারাপ হতে লাগল ভার্গিসের। আকাশলাল যদি স্বেচ্ছায় ধরা না দিত তাহলে এইভাবে পা নাচাতে তিনি পারতেন না। ওই লোকটাই তাঁর ভাগ্য ফিরিয়ে দিল। অর্থাৎ ওর কাছেই তাঁর কৃতজ্ঞ থাকা উচিত? অসম্ভব। আজ না হোক কাল তিনি লোকটাকে ধরতেনই। দিনটা আজ না হলে তিনি নিশ্চয়ই বিপাকে পড়তেন। কিন্তু কতটা? একটা অস্ত্র তো তাঁর হাতে ইতিমধ্যে এসে গিয়েছে।
টেলিফোনের দিকে তাকালেন। সার্জেন্ট ছোঁড়াটা কেয়ারটেকারটাকে ঠিকঠাক রেখেছে তো! সব কিছু নির্ভর করছে লোকটার ওপরে। যতক্ষণ কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে ততক্ষণ তিনিও ভাল থাকবেন। কিন্তু কতদিন? ভার্গিসের মনে পড়ল মিনিস্টার আজই কেয়ারটেকারটাকে খুঁজে বের করতে হুকুম দিয়েছেন। মামার বাড়ি! বাংলোতে টেলিফোন আছে কিন্তু নাম্বারটা তাঁর জানা নেই। অপারেটারকে জিজ্ঞাসা করা নিরাপদ নয়। বোর্ড এবং মিনিস্টার কোথায় কাকে টাকা খাইয়ে রেখেছে তা টের পাওয়া অসম্ভব। ভার্গিস একটা টেলিফোন গাইড চেয়ে পাঠালেন।
গাইডের পাতায় বাংলোর নাম্বারটা পেয়ে মনে মনে গেঁথে ফেললেন। না, কোথাও লিখে রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তারপর নিজস্ব টেলিফেনের সেই নম্বরটা টিপলেন। রিং হচ্ছে। দশবার রিং হল কিন্তু কেউ রিসিভার তুলল না। সার্জেন্ট কি করছে? আর তখনই খেয়ালে এল। সার্জেন্টের পক্ষে টেলিফোন না ধরাটাই স্বাভাবিক। ওকে বলা হয়েছে লুকিয়ে থাকতে। লাইন কেটে দিলেন ভার্গিস। কিন্তু তাঁর অস্বস্তি শুরু হল। লোকটা ঠিক ওখানে আছে তো? যদি না থাকে? এই মুহূর্তে জানার কোনও উপায় নেই। তাঁর খুব ইচ্ছে করছিল এখনই জিপ নিয়ে বাংলোয় চলে যেতে। নিজের চোখে না দেখলে, কানে না শুনলে আজকাল কিছুই বিশ্বাস হয় না।
এইসময় তাঁর বিশেষ টেলিফোনটা বেজে উঠল। ভার্গিস কথা বললেন, ‘ইয়েস!’
‘মিস্টার ভার্গিস!’
‘ইয়েস ম্যাডাম!’
‘অভিনন্দন।’
‘ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ।’
‘খুব ব্যস্ত?’
‘একটু, তবে কোনও কাজ থাকলে!’
‘আমি অপেক্ষা করছি।’ ম্যাডাম লাইন কেটে দিলেন।
সোজা হয়ে বসলেন ভার্গিস। টুপিটা টেনে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একজন অ্যাসিসটেন্ট কমিশনারকে এগিয়ে আসতে দেখেও থামলেন না। লোকটার হতভম্ব মুখের সামনে দিয়ে বাঁক নিলেন।
নিচে কিসের জটলা? ভার্গিসের সেদিকে তাকাবার সময় নেই। একজন অফিসার ছুটে এল তাঁর কাছে, ‘স্যার, সাংবাদিকরা বলছে আপনি নাকি কথা দিয়েছেন।’
নিজের জিপে ততক্ষণে উঠে বসেছেন ভার্গিস, ‘অপেক্ষা করতে বলুন, ‘দে হ্যাভ অল দ্য টাইম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড?’ নির্দেশ পেতেই ড্রাইভার জিপ চালু করল। প্রথামত পেছনে দুজন সশস্ত্র সেপাই উঠে বসেছে। ভার্গিসের জিপ হেডকোয়াটার্স থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ল। তখন বিকেল।
ম্যাডামকে আজ দারুণ সুন্দর দেখাচ্ছে। ভদ্রমহিলার বয়স তাঁর মুখচোখ চামড়া এবং ফিগারের কাছে হার মেনেছে। আজ ম্যাডাম নিজের হাতে দরজা খুললেন, ‘ওয়েলকাম।’
ভার্গিসের পা ঝিমঝিম করে উঠল। ম্যাডাম এই গলায় এবং ভঙ্গিতে কখনই কথা বলেননি। দুজনে মুখোমুখি সোফায় বসার পর ম্যাডাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কফি না ভদকা?’
‘ধন্যবাদ। কিছু লাগবে না।’ কৃতার্থ গলায় বললেন ভার্গিস।
‘আমি একটা ভদকা নেব।’ ম্যাডাম হাততালি দিতেই একটি কাজের লোক ঢুকল, ‘একটা টল ভদকা, অনেকটা বরফ দিয়ো’ টেবিলের ওপর রাখা গোল বাক্সের ঢাকনা খুললেন তিনি। ভার্গিস দেখলেন সেখানে সিগারেটগুলো বাজনার তালে তালে ঘুরছে। একটা তুলে নিতেই ভার্গিস স্মার্ট হবার চেষ্টা করবেন। লাইটার জ্বেলে এগিয়ে গিয়ে সম্ভ্রমের সঙ্গে ধরিয়ে দিলেন। ম্যাডাম বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’
চোখ বন্ধ করে যখন ম্যাডাম ধোঁয়া উপভোগ করছেন তখন ভার্গিস এক ঝলক দেখে নিলেন ওঁকে। যে কোনও বয়সের পুরুষ ওঁকে পেলে ধন্য হয়ে যাবে। রূপের সঙ্গে অহঙ্কার না মিশলে মেয়েরা সত্যিকারের সুন্দরী হয় না। নিজের জন্য মাঝে মাঝে কষ্ট হয় ভার্গিসের। পৃথিবীর কোনও মেয়ের জন্য তিনি আকর্ষণ বোধ করেন না। করতে পারেন না।
‘ভার্গিস! আপনি আকাশলালকে কি টোপ দিয়েছেন জানতে পারি?’
টোপ! ভার্গিস চমকে উঠলেন।
ম্যাডাম হাসলেন, ‘নইলে লোকটা এই বোকামি করত না। আপনি হয়তো জানেন না মিনিস্টার আজকে পদত্যাগ করে বাইরে চলে যেতে চেয়েছিল। আপনার ঘটনা সব পাল্টে দিল। কিন্তু এরকম লোক সম্পর্কে আমাদের চিন্তা করতে হচ্ছে।’
‘আসলে আমি এমনভাবে আকাশলালকে চেপে ধরেছিলাম যে—’
‘আমাকে মিথ্যে বলবেন না, প্লিজ।’ ম্যাডাম অনুযোগ করলেন, ‘ঠিক আছে, পরে শুনলেও চলবে। আচ্ছা ভার্গিস, আপনাকে যদি বোর্ড মিনিস্টার হিসেবে মনোনীত করে তাহলে কেমন হয়? আপনার বয়স কম, দারুণ এফিসিয়েন্ট। এই কাজটার জন্য যদি কোনও পুরস্কার দেওয়া হয় তাহলে তো এমনই করা যেতে পারে!’
ভার্গিসের গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে গেল, ‘আমি! মিনিস্টার?’
‘হোয়াই নট? আপনার আপত্তি আছে?’
‘আমি কি বলব! ম্যাডাম, আপনি যা বলবেন তাই হবে।’ ভার্গিস বিগলিত।
বেশ। আপনি জানেন মিনিস্টারের সঙ্গে আমার এককালে বন্ধুত্ব ছিল। আমি নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে সেই বন্ধুত্বের মূল্য ওকে দিয়েছি। তাছাড়া লোকটা নিজেই আমাকে বলেছে পদত্যাগ করতে চায়। অতএব আমার কোনও দায়িত্ব নেই। এখন কথা হল, আপনি কি করবেন?’
ম্যাডাম উঠে দাঁড়ালেন, ‘তা হলে আগামী কাল থেকে আপনি মিনিস্টার হচ্ছেন।’
ভার্গিস আবেগে আপ্লুত হলেন। সোফা থেকে উঠে একটা হাঁটু মুড়ে ম্যাডামের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতেই ম্যাডাম তাঁর বাঁ হাত এগিয়ে ধরলেন। এবং এই প্রথম ভার্গিস কোনও স্ত্রীলোকের হাতের চামড়ায় সজ্ঞানে চুম্বন করলেন।
‘ভার্গিস!’
‘ইয়েস ম্যাডাম!’
‘বাবু বসন্তলালের বাংলোর কেয়ারটেকারকে কাল সকালের মধ্যে আমার চাই।’
উঠে দাঁড়াতে গিয়ে নড়ে গেলেন ভার্গিস। কি উত্তর দেবেন তিনি? কোনও রকমে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন ভার্গিস।
ম্যাডাম বললেন, ‘আপনি এবার যেতে পারেন।’
ম্যাডামের বাড়ি থেকে জিপে বসে ভার্গিস ঠিক করলেন মিনিস্টার হতে পারলে তাঁর আর কিছু চাওয়ার নেই। কেয়ারটেকারকে আজই আনিয়ে নেবেন বাংলো থেকে। ফালতু ঝামেলা করে কোনও লাভ নেই। এইসময় তাঁর গাড়ির বেতারযন্ত্রে হেডকোয়াটার্স থেকে পাঠানো একটা খবর বেজে উঠতেই ভার্গিস চিৎকার করে উঠলেন, ‘ওঃ, নো!’
২১. কারফিউ-এর ভয়ে
তখন শহরের পথে পথে কারফিউ-এর ভয়ে ঘরে ফেরা মানুষের ব্যস্ততা। বাইরে থেকে আসা মানুষেরা যত তাড়াতাড়ি হোক চেকপোস্টের দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে। এদের ঢালাও ছেড়ে দেবার আদেশ না আসায় ভিড় জমে জমে রাস্তা জ্যামজমাট। ভার্গিসের জিপের যখন উড়ে যাওয়ার কথা তখন সেটা সাধারণ গতিতেও এগোতে পারছিল না। জিপের সামনের সিটে বসে ছিলেন বাঁ হাতে নিজের চুল খামচে ধরে। এই রকমই তাঁর জীবনে বারংবার হয়। যখনই কোন সুখের সময় আসে তখনই ঈশ্বর নির্দয় হয়ে ওঠেন। এই যে একটু আগে ম্যাডাম তাঁকে মিনিস্টার হবার প্রস্তাব দিলেন, আগামী কাল সকালেই যার ঘোষণা সবাই শুনতে পেত তা যেন একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। যে করেই হোক বেলুনের ফুটো চাপা দিয়ে হাওয়া বের হওয়া বন্ধ করতে হবে। ভার্গিস চাপা গলায় হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘ড্রাইভার, জলদি!’
দোতলার বন্ধ ঘরে বসে আকাশলাল ঘড়ি দেখছিল। এখন বেলা তিনটে। সেই যে ওরা তাকে ধরে এনে হাতকড়া খুলে এই ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে গেছে তারপর থেকে সে একা। মাঝারি সাইজের এই ঘরে কোনও জানলা নেই। মাথার অনেক ওপরে একটা বড় ফুটো আছে বাতাস ঢোকার জন্যে। ঘরে একটা চেয়ার ছাড়া কোনও আসবাব নেই।
এতক্ষণ পর্যন্ত সব কিছু ভালয় ভালয় হল। ভয় ছিল তাকে দেখামাত্র এরা গুলি করতে পারে কিন্তু করেনি। সাংবাদিকরা তার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল এরা ঝুঁকি নেয়নি। ভার্গিসকে সে যতটা চেনে তাতে মনে হয় ওরা সেই সুযোগ কখনই পাবে না। ক্যাপসুলটাকে জিভের ডগায় নিয়ে এল আকাশলাল। খুব কঠিন আবরণ। সাধারণ ক্যাপসুল হলে মুখের ভেতরের তাপে এতক্ষণে গলে যেত। এটাকে দাঁত দিয়ে ভাঙলেই কাজটা শুরু হয়ে যাবে। তিনঘণ্টার মধ্যে তার হৃদযন্ত্র বিকল হবে। চোখ বন্ধ করল আকাশলাল। হৃদযন্ত্র বিকল হলে যদি অপারেশনটা কাজ শুরু না করে? না, এখন আর কিছু করার নেই। ক্যাপসুলটাকে না ভাঙলে ভার্গিস তাকে আজ না হলে আগামী কাল দড়িতে ঝোলাবেই। আকাশলাল চোখ বন্ধ করল।
ওর কষের দাঁতগুলোর মাঝখানে এখন ক্যাপসুলটা। ধীরে ধীরে চাপ পড়ছে তাতে। খোলটা বেশ শক্ত। প্রথমবারে ভাঙল না। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল আকাশলাল। আরও জোরে চাপ দিতে দিতে একসময় অনুভব করল খোলটা ভেঙে গেছে এবং নরম স্বাদহীন একটা কিছু জিভে জড়িয়ে গেল। হঠাৎ তার মনে পড়ল ডাক্তার বলেছিল ক্যাপসুলটার খোলটাকে মিনিট পাঁচেক মুখের ভেতর রেখে যেন সে বাইরে ফেলে দেয়। ওটাকে গিলে ফেললে কখনই হজম করতে পারবে না।
পাঁচ মিনিটেও একটা সুরাহা করতে পারল না আকাশলাল। ফেলতে হলে ভাঙা খোলটাকে ঘরেই ফেলতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে প্রচার হয়ে যাবে আকাশলাল আত্মহত্যা করেছে। হয়তো ভার্গিস খোলটাকে সাংবাদিকদের দেখাবে। আকাশলাল ভাবল, গিলে ফেললে কি ক্ষতি হবে! হজম করার দরকার কি! সেইসময় ফুটোটার দিকে চোখ পড়ল। অনেকটা ওপরে কিন্তু ওখানে ছুঁড়ে ফেলা যায় না? মুখ থেকে বস্তুটি বের করল আকাশলাল। ভেতরে যা ছিল তা এতক্ষণে শরীরে মিশে গেছে। খোলটা ফুটোটার দিকে ছুঁড়ে দিতেই ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। নাঃ, তার লক্ষ্য মোটেই ভাল নয়। শেষপর্যন্ত এটাই একটা খেলা হয়ে দাঁড়াল। যতবার খোলটা ছোঁড়ে ততবার দেওয়ালের গায়ে ধাক্কা খায়। ফুটোটার খুব কাছে একবারই পৌঁছেছিল। যেহেতু অনুশীলনে ফল পাওয়া যায় তাই একসময় ওটা আর ফিরে এল না। ফুটোটার মধ্যে ঢুকে গেছে জানতে পারার পরই ওর মনে হল নিশ্বাস কেমন ভারী হয়ে যাচ্ছে। হয়তো ছোঁড়ার সময় শরীরে আন্দোলন হওয়ায় এমনটা হতে পারে। ঘরের ভেতরে একটু হাঁটল আকাশলাল। মাত্র পনের মিনিট সময় গিয়েছে কিন্তু মাথাটা এরই মধ্যে একটু ঘুরছে বলে বোধ হল। আকাশলাল আবার চেয়ারে ফিরে গেল। নাঃ, এটা মনের ভুল। ডাক্তার বলেছে তিন ঘণ্টার আগে তার হৃদযন্ত্র বন্ধ হবে না। তিনঘণ্টা অনেক সময়। এখন ওরা যদি তাকে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে যায় তা হলে সে স্বচ্ছন্দে অনেক কথা বলতে পারবে। গোটা পৃথিবী জানবে তাকে সুস্থ অবস্থায় এখানে ধরে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং তার কিছুক্ষণ বাদেই সে মরে গেছে। এই মরে যাওয়ার খবরটায় দেশে এবং বিদেশে যে প্রতিক্রিয়া হবে তা বোর্ড পছন্দ করবে না। ভার্গিসকে এর জন্যে বড় দাম দিতে হবে।
একঘণ্টা পরে সমস্ত শরীরে অদ্ভুত ঝিমুনি এবং বুকের বাঁ দিকে চিনচিনে ব্যথা শুরু হল। ব্যথাটা বাড়ছে। বাঁ দিকের বুকের ঠিক তলায় ওজন বাড়ছে। আকাশলাল চোখ বন্ধ করল। ছাত্রাবস্থা তার কেটেছিল ইন্ডিয়াতে। তখন একবার বেড়াতে গিয়েছিল শান্তিনিকেতনে এক বাঙালি বন্ধুর সঙ্গে। সেখানে ঘুরতে ঘুরতে এক বাউলের সঙ্গে খুব আলাপ হয়ে গিয়েছিল। লোকটার গানের সুর চমৎকার কিন্তু কথার মানে বুঝতে অসুবিধে হত। এমনকি বাঙালি বন্ধুও ঠিক বুঝতে পারত না। বাউলই গানের শেষে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিত। একটা গান এখনও মনে আছে। আট কুঠরি নয় দরজা কোনখানে তালা নেই আর সেই ঘর তিনতলা। আট কুঠুরি হল শরীরের আটটা গ্রন্থি। পিটুইটারি, থাইমাস, থাইরয়েড, প্যরা থাইরয়েড, অ্যালড্রিনাল, প্যারোটিড, প্যাংক্ৰিয়াস এবং টেসটিস অথবা ওভারিস্। এই শরীরটা বেঁচে আছে এই আটটি গ্রন্থির মধ্যে দিয়ে হর্মোন সিক্রিয়েশনের জন্যে। আর এই আটটি গ্রন্থির সঙ্গে শরীরের নয়টি দ্বার যুক্ত। তিনতলা হল, মস্তিষ্ক, কোমর থেকে শরীরের উর্ধ্বভাগ এবং নিম্নভাগ। নাক কান চোখ মুখ ইত্যাদি নটা দ্বার এই তিনতলায় ছড়িয়ে আবদ্ধ, যা স্নায়ুশক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাউল বলেছিল এই দেহ রহস্যময়। পৃথিবীর যাবতীয় রহস্য এর কাছে হার মেনে যায়। সেই হেস্যকে ব্যবহার করার সাধ্য কারও নেই। কিন্তু তাকে নিয়ে একটু লুকোচুরি করার চেষ্টা করলে দোষ কি।
এখন থেকে তার আট কুঠুরিতে তালা পড়ার আয়োজন শুরু হয়ে গেছে, আকাশলালের শরীর মস্তিষ্ককে জানিয়ে দিচ্ছিল। ইতিমধ্যে মস্তিষ্ক বুঝতে পারছে তার প্রাপ্য অক্সিজেনে টান ধরেছে। শরীরে যত অক্সিজেন বরাদ্দ তার শতকরা বিশভাগ মস্তিষ্ক নিয়ে নেয়। প্রতি মিনিটে দেড় পাঁইট রক্ত মস্তিষ্কে সঞ্চালিত হওয়া প্রয়োজন। যদি মস্তিষ্কের কোষগুলো তাদের প্রাপ্য থেকে পাঁচ মিনিটের জন্যে বঞ্চিত হয় তা হলে তারা মরে যায়। আকাশলাল জানে সব ঠিকঠাক চললে তার মস্তিষ্ক অন্তত আগামী চব্বিশঘণ্টা প্রাপ্য অক্সিজেন পাবে, মস্তিষ্ক কোষ মরে যাবে না। কিন্তু স্ক্যানিং ছাড়া তাদের সজীবতা বোঝা সম্ভব নয়। এখন এই শরীরটা একটু একটু করে আর নিজের থাকছে না।
প্রচণ্ড ঘাম হচ্ছিল। সেইসঙ্গে বুকে যন্ত্রণা বেড়ে যাচ্ছিল। আর তখনই দরজা খুলে গেল। দুজন সশস্ত্র প্রহরী দরজায় দাঁড়িয়ে। একজন এগিয়ে এসে আকাশলালকে কিছু বলল। কি বলল? আকাশলাল শোনার চেষ্টা করল। ওরা জিজ্ঞাসা করছে তার কোনও কিছুর প্রয়োজন আছে কি না! মাথা নাড়তে গিয়ে আকাশলাল টের পেল ওটা নাড়ানো যাচ্ছে না। আর তখনই অনুমান করল আগন্তুকরা। সঙ্গে সঙ্গে হইচই পড়ে গেল। স্ট্রেচারে শুইয়ে আকাশলালকে নিয়ে যাওয়া হল মেডিক্যাল রুমে। খবর পৌঁছে গেল ভার্গিসের জিপে।
আকাশলালের সঙ্গে একটা ইন্টারভিউ যে কোনও কাগজের পক্ষে বিষয় হিসেবে চমৎকার। মেলার মাঠ থেকে চলে এসে সাংবাদিকরা ভিড় করেছিল হেডকোয়ার্টার্সে। কিন্তু ‘দরবার’ কাগজের রিপোর্টার অনীকা সিং এদের সঙ্গে আসেনি। ভার্গিস সাহেব যদি শেষ পর্যন্ত আকাশলালকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেয় তা হলে সেই কথা সব কাগজের রিপোর্টরা একসঙ্গে শুনবে। আজ পরে ওদের কারও কাছে জেনে নিলেই হবে আকাশলাল কি বলল। লোকটাকে সে মেলার মাঠেই ধরতে পারত যদি ভার্গিস আগে থাকতে তাদের নো-এন্ট্রি করা রাস্তায় না পাঠিয়ে দিত।
মানুষজন জলস্রোতের মত ছুটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। সবাই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এবার উৎসবের কাজ নমো নমো করে সারা হল। ফুটপাতের ওপর কোমরে হাত রেখে অনীকা বিষয় খুঁজছিল। এরমধ্যে সে তিন চারজনকে প্রশ্ন করতে চেয়েছে কিন্তু কারও জবাব দেবার মত সময় হাতে নেই। চারটের সময় কারফিউ; তার আগেই চেকপোস্ট পার হতে হবে।
রিপোর্টার হিসেবে সে এখনও কিছুই করতে পারেনি। দরবার কাগজের সার্কুলেশন ভাল কিন্তু তার চাকরি পাকা করাতে গেলে ভাল কাজ দেখাতে হবে। নিউজ এডিটর তাকে এখানে পাঠানোর সময় বলেছিল, যাচ্ছ উৎসব কভার করতে কিন্তু তোমার কাছে বিপ্লবীদের সম্পর্কে খবর চাই। ওরা আদৌ কোনও দিন কিছু করতে পারবে কি না জেনে এসো। তবে হ্যাঁ, এমন কিছু লিখবে না যাতে ওদের সরকার বলতে পারে বিদেশি রাষ্ট্রের কাগজ বিপ্লবীদের মদত দিচ্ছে। সিনিয়র সাংবাদিকরা বলেছিল কাঁঠালের আমসত্ত্ব। যাওয়া আসাই সার হবে।
আজ সকালে এখানে পৌঁছে প্রথমে টুরিস্ট লজে গিয়েছিল অনীকা। সে বিস্মিত হয়ে জানতে পেরেছিল একটি ঘর খালি আছে। সেখানে আস্তানা গেড়ে শহরে বেরুতেই আকাশলালের পোস্টার দেখেছিল সর্বত্র। লোকটা দেখতে মন্দ নয়। আর মুখের দিকে তাকালেই মনে হল লোকটা এখন পর্যন্ত প্রেম করেনি। চিবুকের ওপর দুটো হালকা আঁচড না থাকলেই ভাল হল। এই লোকটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে এই লোকটাকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠেছে।
তারপর একের পর এক চমকের মধ্যে দিয়ে সকাল থেকে দুপুর গেল। অনীকার কেবলই মনে হচ্ছিল, বিশেষ করে আকাশলালকে দেখার পর, মানুষটা বোকা এবং কাপুরুষ নয়। এই যে স্বেচ্ছায় পুলিশের হাতে ধরা দিতে এল এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য আছে।
ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ছবি তুলছিল অনীকা। মানুষ পালাচ্ছে। খানিকটা এগোতে দুজন নারীপুরুষকে দেখল হেঁটে যেতে। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটার সময় ওরা এবারও রাস্তায় ছুটন্ত জনতার দিকে তাকাচ্ছে না। লোকটির পোশাক শিক্ষিত ভদ্রজনের মত, মাথায় পাহাড়ি টুপি, মেয়েটি কিন্তু আদৌ শহুরে নয়। দূর থেকেই দেখে অনীকার মনে হল ওরা এই শহরে থাকে অথচ এখানকার উত্তেজনা ওদের মধ্যে নেই। সে দূর থেকেই কয়েকবার ছবি তুলল। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে ক্যামেরা তাগ করতেই বাঁ হাত বাড়িয়ে সেটাকে নিয়ে নিল লোকটা। ছিনিয়ে নিল কিন্তু হাঁটা থামাল না। হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে অনীকা দৌড়াল। এই যে, এটা কী করলেন? ক্যামেরা ছিনিয়ে নিলেন কেন?’
হাঁটতে হাঁটতে লোকটা জবাব দিল, ‘আমি চাই না আমার ছবি কেউ তুলুক।’
‘আশ্চর্য! আমি রাস্তার ছবি তুলছি।’
লোকটা কোনও জবাব দিল না। সঙ্গে মেয়েটিও চুপচাপ হাঁটছিল।
অনীকা বলল, ‘দেখুন আমি একজন সাংবাদিক। রাস্তার ছবি তোলার অধিকার আমার আছে।’
‘নিশ্চয়ই আছে মিস। ক্যামেরাটা আপনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি কিন্তু ফিল্মের রোলটা আমি খুলে নেব। এক মিনিট।’ লোকটা এবার দাঁড়াল।
আঁতকে উঠল অনীকা, ‘আরে আরে খুলবেন না। ওখানে দারুণ দারুণ ছবি আছে। আজ আকাশলাল যখন আত্মসমর্পণ করেছিল তার ছবিও আছে ওখানে।’
‘আচ্ছা! আপনি কোথায় উঠেছেন?
‘কেন?’
‘সেখানেই আজ রাত্রে আপনার ক্যামেরা আর আমার ছবি বাদ দেওয়া ফিল্মটা ঠিকঠাক অবস্থায় পৌঁছে যাবে। আমার সময় নেই মিস, ঠিকানাটা বলুন।’
‘আমি অনীকা সিং, দরবার পত্রিকার রিপোর্টার। টুরিস্ট লজে উঠেছি।’ অনীকার কথা শেষ হওয়ামাত্র ওরা পাশের গলিতে ঢুকে গেল ক্যামেরা নিয়ে। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ কাটাল অনীকা। এরা কারা? এমন হুকুমের স্বরে কথা বলল কেন? সাধারণ গুণ্ডা বদমাস অথবা পুলিশ যে নয় তা বোঝাই যাচ্ছে। লোকটা নিশ্চয়ই কাউকে দিয়ে ডার্করুমে নিয়ে গিয়ে নিজের ছবি বাদ দিয়ে তারপর সব ফেরত পাঠাবে। আর ফেরত যে পাঠাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই অনীকার। আসল কথা হল লোকটা কাউকে ছবি তুলতে দিতে রাজি নয়। কেন? ও কি বিপ্লবীদের একজন? যদি তাই হয় তা হলে নীচের দিকের কেউ নয়। অনীকা ঠোঁট কামড়াতে লাগল, কথাটা যদি একবারও আগে মাথায় আসত।
সে গলিটার দিকে তাকাল। দু-পা হাঁটল। ইতিমধ্যেই দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু হয়েছে। কিন্তু ওরা গেল কোথায়। গলির ভেতরে কয়েক পা হাঁটল সে। গলি বেশি দূরে গিয়ে শেষ হয়নি। তা হলে আশপাশের কোনও বাড়িতেই গিয়েছে বলে অনুমান করা যেতে পারে।
অনীকা বড় রাস্তায় চলে এল। খানিকটা এগিয়ে সে একটা ল্যাম্পপোস্টের সামনে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়াল। চারটে বাজতে বেশি দেরি নেই। তার মধ্যে যদি লোকটা আবার বেরিয়ে আসে তা হলে সে ওকে অনুসরণ করবে। দরকার হলে সরাসরি ইন্টারভিউ চাইবে। মিনিট দশেক দাঁড়ানোর পর অনীকা দেখল সেই মেয়েটি একাই গলি থেকে বেরিয়ে এ দিক ও দিকে দেখে নিয়ে ডান দিকে হাঁটতে শুরু করল। মেয়েটিকে অনুসরণ করে কি কোনও লাভ হবে? কিন্তু লোকটা যদি আর বের না হয়, কারফিউ হয়ে গেলে তো আর সেই প্রশ্ন উঠবে না। অনীকা নিজে মেয়ে কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে তার কিছুতেই বন্ধুত্ব জমে না। কিন্তু এর কাছ থেকে একটা সূত্র পাওয়া গেলেও যেতে পারে। সে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে হাঁটতে আরম্ভ করল।
ক্রমশ খানিকটা নির্জন পথে চলে এল সে। মেয়েটি এবার একটা কবরখানার গেটে পৌঁছে ভেতরে ঢুকে গেল। অনীকা কি করবে বুঝতে পারছিল না। তার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। একে অচেনা শহর তার ওপর সে বিদেশিনী। তবু কৌতূহল প্রবল হওয়ায় সে এগিয়ে গেল। মেয়েটি গেটের সামনে নেই। মুখেই একটা অফিসঘর। সেখানে কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না। সে ভেতরে ঢুকল। অনেকটা জায়গা জুড়ে গাছপালার মধ্যে এই কবরখানা। অনেকদূরে সেই মেয়েটিকে হাঁটতে দেখল অনীকা। নিজেকে যতটা সম্ভব আড়ালে রেখে সে এগিয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল বিপ্লবীদের কেউ এখানে লুকিয়ে আছে। লুকিয়ে থাকার পক্ষে জায়গাটা চমৎকার।
গাছের আড়াল থেকে মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছিল। পাঁচিলের কাছাকাছি একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখছে। একজন বৃদ্ধকে এগিয়ে আসতে দেখল অনীকা। মেয়েটি বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলল। বৃদ্ধ আঙ্গুল তুলে মাটিতে কিছু দেখাল। মেয়েটি মাথা নেড়ে ফিরে আসছে এবার। ওকে যেতে হবে অনীকার পাশ দিয়েই। গাছের আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অনীকা। মেয়েটি ক্রমশ গেটের দিকে চলে গেলে সে আড়াল ছেড়ে বের হল। বৃদ্ধ তখন রাস্তার পাশে বেড়ে ওঠা আগাছা পরিষ্কার করছে। অর্থাৎ মানুষটি কবরখানার কর্মচারী।
অনীকাকে এগিয়ে আসতে দেখে বৃদ্ধ সোজা হয়ে দাঁড়াল। অল্প সময়ের মধ্যে দুজন যুবতীকে বৃদ্ধ বোধহয় কবরখানায় কোনদিন দ্যাখেনি। অনীকা হাসল, ‘নমস্কার। আপনাদের এই কবরখানার পরিবেশ খুব সুন্দর।’
বৃদ্ধ মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। এখানে যাঁরা আছেন তাঁরা শান্তিতেই আছেন।’
‘আমি এই শহরে নতুন। একজন এখানে আসতে বলেছিল— !’
‘তিনি কি মহিলা?’
‘হ্যাঁ।’
‘একটু আগে চলে গেলেন। আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’
‘ও। কি বলল আপনাকে?’
বৃদ্ধ হাত ওল্টালেন, ‘এখানে এসে মানুষ উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে। মহিলা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ওখানে নতুন কবর খোঁড়া হলে ঠিক কোন জায়গাটা আমি পছন্দ করব? আসলে আমিই তো জায়গা ঠিক করে দিই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ওই পরিবারে কেউ মারা গিয়েছে নাকি? তিনি বললেন তেমন সম্ভাবনা আছে। ভাবুন। সম্ভাবনা আছে এই ভেবে কেউ কবরের জায়গা খুঁজতে আসে?’
অনীকা হাসল, ‘আমার বান্ধবীর মাথা ঠিক নেই।’
‘তাই মনে হল।’ বৃদ্ধ এগোল।
‘কোন জায়গাটা খুঁজছিল?
‘ওই তো। এখনও তিনজন পাশাপাশি শুয়ে আছে মাটির নীচে। আমাদের সরকার যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাদের পৈতৃক জায়গা ওটা।’
‘আপনি কি আকাশলালের কথা বলছেন? তিনি তো ধরা দিয়েছেন আজ।’
‘সেকি? সত্যি? যাঃ, হয়ে গেল। আমি কোনও খবরই পাই না, কেউ বলেও না। এখানে বাস করায় লোকে আমাকেই মৃতদের দলে ভেবে নিয়েছে।’ বৃদ্ধ চলে গেল।
জায়গাটার দিকে তাকাতেই অনীকার শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে গেল। মেয়েটা কেন আকাশলালের পারিবারিক কবরের জায়গাটা দেখতে এল? ওরা কি ধরে নিয়েছে পুলিশ আকাশলালকে মেরে ফেলবে। পৃথিবীর যে কোন দেশের পুলিশের পক্ষেই অবশ্য সেটা সম্ভব। সে ধীরে ধীরে জমিটার ওপর হাঁটতে লাগল। এখন সন্ধ্যে হয়ে আসছে। পাখিরা দল বেঁধে ফিরে আসছে কবরখানার গাছে গাছে। তাদের চিৎকারে কান ঠিক রাখা দায়। হঠাৎ পায়ের তলায় একটা কাঁপুনি অনুভব করল অনীকা। যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। অথচ আশেপাশের গাছপালা সবকিছুই স্বাভাবিক। দ্রুত একটু সরে যেতেই কাঁপুনিটা বন্ধ হল। অথাৎ কাঁপুনি হচ্ছে বিশেষ একটি জায়গায়। মাটির নীচে যারা শুয়ে আছে তারা কি নড়েচড়ে বসছে? অনীকা দ্রুত কবরখানা থেকে বেরিয়ে এল। পরিবেশ এমন একটা চাপ তৈরি করে যে অবাস্তবকেও বাস্তব বলে ভাবতে মানুষ বাধ্য হয়, কিছুক্ষণের জন্যেও।
২২. মেডিক্যাল রুমে ঢুকেছিলেন ভার্গিস
ঝড়ের মত মেডিক্যাল রুমে ঢুকেছিলেন ভার্গিস। ততক্ষণে দুজন ডাক্তার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ভার্গিস কিছুক্ষণ আকাশলালকে দেখলেন। এখনও প্রাণ আছে তো শরীরে?
ভার্গিসকে দেখে একজন ডাক্তার এগিয়ে গেলেন, “মারাত্মক ধরনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। একটু আগে সেটা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা চেষ্টা করেছি কিন্তু— ।’
‘মাই গড!’ ভার্গিস বিড়বিড় করলেন। তারপর আবেদন করলেন, ‘ডক্টর। সেভ হিম। ওকে বাঁচান। লোকটার বেঁচে থাকার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।’
‘সরি স্যার। আমাদের আর কিছু করার নেই।’
‘আপনি সিওর,?’
‘হ্যাঁ। হার্ট অনেকক্ষণ বন্ধ হয়ে গেছে। পালস পাওয়া যাচ্ছে না।’
ঝড়ের মত এসেছিলেন। এবার যেন পা সরতে চাইছিল না। আকাশলালের দিকে তাকাতে নিজের জন্যে কষ্ট হল। লোকটা মরে গিয়েও তাকে হারিয়ে দিল। এখন চোখের পাতা বন্ধ, নিঃসাড় শুয়ে আছে। ধীরে ধীরে বাইরে বেরুতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন ভার্গিস, ‘ডাক্তার, আমি না বলা পর্যন্ত কেউ যেন এই খবরটা জানতে না পারে।’
‘আমরা আরও কিছুক্ষণ ওয়াচ করব। তারপর— !’
‘ওয়াচ করবেন মানে? মারা যাওয়ার পর ওয়াচ করে কী লাভ?’ ভার্গিস ঘুরে দাঁড়ালেন।
‘একটু সতর্কতা। হার্ট অ্যাটাকড্ কেসে কখনও কখনও মির্যাক্ল হয়।’
‘প্রে, প্রে ডক্টর।’
‘হ্যাঁ, এখন ওর জন্যে প্রার্থনা করা ছাড়া কোনও পথ নেই।’
‘ওর জন্যে নয়, আমার জন্যে।’ ভার্গিস বেরিয়ে গেলেন।
নিজের ঘরে পৌঁছাতে অনেকসময় লেগে গেল যেন। ধপ করে শরীরটাকে চেয়ারে ছেড়ে দিলেন। খবরটা জানানো দরকার। কাকে জানাবেন? ম্যাডাম না মিনিস্টার। আইনমাফিক চললে মিনিস্টারকেই জানানো দরকার। যে লোকটাকে কাল সকালে তিনি উৎখাত করতেন এখন তাঁকেই সব নিবেদন করতে হবে। না। ম্যাডাম তাঁর প্রতি অনেক অনুগ্রহ দেখিয়েছেন।
ভার্গিস নিজস্ব টেলিফোনের নম্বর ঘোরালেন। কয়েক মুহূর্ত। তারপর টেলিফোন বাজল। কয়েক মুহূর্ত। যে ধরল সে জানাল ম্যাডাম এখন যোগা করছেন। রিসিভার নামিয়ে রাখলেন ডার্গিস। আশ্চর্য! ভদ্রমহিলার ব্যাপার স্যাপার দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এবার তাঁর নিজের টেলিফোন বেজে উঠতেই ভার্গিসের হাত এগিয়ে গেল, ‘হ্যালো!’
‘ভার্গিস!’
‘ইয়েস স্যার?’
‘ইউ ইডিয়ট, তুমি আকাশলালকে মেরে ফেললে?’ মিনিস্টার চিৎকার করলেন।
‘আমি? আমি মেরে ফেলেছি?’ ভার্গিস হতভম্ব।
‘হু উইল বিলিভ ইউ? পুলিশ কাস্টডিতে কেউ মারা গেলে লোকে তাই ভাববে। তুমি এত কেয়ারলেস যে লোকটাকে মরে যেতে অ্যালাউ করলে!’
‘স্যার। কারও হার্ট অ্যাটাকড্ হলে— ।’
‘বললাম তো, লোকে বিশ্বাস করবে না। লোকটা সুস্থ শরীরে কয়েকঘন্টা আগে সবার সামনে দিয়ে হেঁটে এসে ধরা দিল। বিদেশি সাংবাদিকরাও দেখেছে। খবরটা প্রচারিত হওয়ামাত্র কী রিঅ্যাকশন হবে চিন্তা করেছ?’
‘না স্যার, এখনও সময় পাইনি।’
‘তা পাবে কেন? ওকে অ্যারেস্ট করে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছ।’ মিনিস্টার ব্যঙ্গ করামাত্র ভার্গিসের শরীর সোজা হল। লোকটা জানে নাকি সব খবর।
‘শোন ভার্গিস, বোর্ড মিটিং বসেছে। আকাশলালকে ধরার জন্যে আমি তোমার প্রশংসা করে বোর্ড-এর কাছে কিছু সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি দাঁড়াল তার জন্যে তোমাকে জবাবদিহি দিতে হবে। আকাশলালকে বিচার করে শাস্তি দিলে জনসাধারণ কিছু বলতে পারত না। এখন তো বিদ্রোহে ফেটে পড়তে পারে। তাছাড়া আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো কাজটা পছন্দ করবে না। কি করতে চাও?’
‘বুঝতে পারছি না। পোস্টমের্টম করে মৃত্যুর কারণ জেনে জনসাধারণকে জানালে কেমন হয়?’ ভার্গিসের প্রশ্নের উত্তর দিলেন না মিনিস্টার। লাইন কেটে দিলেন।
ভার্গিস অপারেটারকে হুকুম করলেন মেডিক্যাল ইউনিটের ডাক্তারকে ধরতে। ডাক্তার লাইনে আসামাত্র তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কোনও চান্স আছে?’
‘আকাশলাল মারা গেছে। তবে— ।’
‘তবে কী?’
‘কিছুদিন আগে ওঁর বুকে অপারেশন হয়েছিল। হয়তো মাইনর কিছু কিন্তু ভদ্রলোক সুস্থ ছিলেন না এটা পরিষ্কার।’
‘সুস্থ ছিলেন না! কি ডাক্তারি করো, অ্যাঁ! অত লোকের সামনে মেজাজে হেঁটে এল যে তাকে অসুস্থ বলছ? ওর ডেথ সার্টিফিকেট পাঠিয়ে দাও।’
ভার্গিস এবার অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনারদের মিটিং-এ ডাকলেন। সবাই বসলে তিনি চুরুট ধরালেন, ‘আপনারা জানেন আমি আকাশলালকে গ্রেপ্তার করেছি। অর্থাৎ এ রাজ্যে আর কোন ঝামেলা হবে না। কিন্তু লোকটা এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে হার্ট ফেল করে মারা গিয়েছে। মিনিস্টার মনে করছেন এর রি-অ্যাকশন খুব খারাপ হবে। আপনারা কী মনে করেন?’
প্রত্যেকে কথা খুঁজতে লাগল যেন। ভার্গিস কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অসহিষ্ণু গলায় বললেন, ‘বলুন, বলুন, আমি আপনাদের মতামত চাই।’
সিনিয়র অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার বললেন, ‘ওকে ধরার জন্যে আজ গোলমাল হয়েছিল। পাবলিক ভাববে আমরা মেরে ফেলেছি। গোলমাল বাড়বেই।’
‘পাবলিক যদি না জানে?’
সবাই চমকে উঠল। ভার্গিস আবার বলল, ‘ডেডবডি লুকিয়ে ফেলা যেতে পারে। অবশ্য সাংবাদিকরা ছিঁড়ে খাবে আমাকে। কিন্তু পাবলিকের হাতে ডেডবডি দিতে চাইছি না আমি। ওতে আবেগ আরও বেড়ে যাবে।’
কনিষ্ঠ একজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার বললেন, ‘ওর এক কাকা বেঁচে আছে। তাঁকে ডেকে এনে কারফিউ থাকাকালীন সময়ে যদি কবর দেওয়া যায়— ।’
ভার্গিস বললেন, ‘গুড আইডিয়া। হিন্দু হলে চিতা জ্বালাতে হত। এটা আজ চুপচাপ সেরে ফেলা যাবে। লোক পাঠাও, ওর কাকাকে ডেকে আনো’
তরুণ অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার বলল, ‘স্যার। দিনের আলো ফোটার আগেই কাজটা করা উচিত এবং কালকের দিনটাতেও কারফিউ রাখুন।’
‘গুড।’
প্রবীণ বললেন, ‘কিন্তু জনসাধারণকে খবরটা একটু একটু করে দিলে ভাল হয়।’
‘যেমন?’
‘আজ টিভিতে অ্যানাউন্স করা যেতে পারে আকাশলালের হার্ট অ্যাটাকড হয়েছে। অবস্থা ভাল নয়। ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে রাখা হয়েছে ওকে!’
‘দ্যাটস স্পেলন্ডিড। তাই হবে। মিটিং শেষ।’
টুরিস্ট লজের ঘরে বসে দ্রুত রিপোর্ট টাইপ করছিল অনীকা তার ছোট্ট টাইপরাইটারে। ফিরে এসে ও কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে জেনেছিল হেডকোয়ার্টার্সে গিয়ে কোনও কাজ হয়নি। ভার্গিস আকাশলালের সঙ্গে সাংবাদিকদের দেখা করতে দেয়নি। আত্মসমর্পণের ঘটনাটার নাটকীয় বর্ণনা শেষ করে সে জানলায় উঠে গেল। রাস্তা সুনসান। কারফিউ জারি হওয়া রাতের রাজপথে এখন একটা কুকুর পর্যন্ত নেই। মাঝে মাঝে পুলিশের গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। খবরটা ‘দরবার’ অফিসে পৌঁছাতে বেশি দূরে যেতে হবে না তাকে। টুরিস্ট লজের একজন কর্মচারী জানিয়েছে পাশেই একজনের ফ্যাক্স মেশিন আছে। লোকটার হাতে দিলে সে ওখান থেকে পাঠিয়ে দেবে। টিভি খুলল অনীকা। সিনেমা দেখানো হচ্ছে। ইংরেজি ছবি। হঠাৎ ছবি বন্ধ হল। ঘোষক জানাল, ‘আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বিদ্রোহী নেতা আকাশলালের শরীর গুরুতর অসুস্থ। তাঁর হৃদযন্ত্রে গোলমাল দেখা দিয়েছে। ডাক্তাররা চিকিৎসা করছেন। তাঁকে ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
অনীকার কপালে ভাঁজ পড়ল। যে মেয়েটি আকাশলালদের পারিবারিক কবরখানায় গিয়েছিল সে কি জানত এরকমটা হবে। সম্ভাবনার কথা সে বৃদ্ধকে শুনিয়ে এসেছিল। কেউ অসুস্থ হবার আগে কবরের জমি যখন দেখতে যাওয়া হয়, তখন, তখন ব্যাপারটা সাজানো নয় তো?
শহর থেকে মাইল দশেক দূরে একটি ছোট্ট খামারবাড়ির সামনে মধ্যরাতে যে জিপটি থামল তা থেকে নেমে এল একজন পুলিশ অফিসার। তখন ঘড়িতে রাত বারোটা বেজে কুড়ি। চারধার সুনসান। ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটিতে কুকুরেরাও ডাকছে না। বিশেষ একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অফিসার চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে দরজায় শব্দ করল। তৃতীয় বারে ভেতর থেকে সাড়া এলে সে ঘোষণা করল, ‘দরজা খুলুন, পুলিশ।’
দরজা খুলল। এক বৃদ্ধা হ্যারিকেন হাতে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে। বোঝাই যায় একটু আগেও ঘুমোচ্ছিলেন। অফিসার জিজ্ঞাসা করল, ‘কর্তা কোথায়?’
‘ঘুমাচ্ছে। শরীরটা ভাল নেই। আবার কী হল?’ বৃদ্ধার কণ্ঠস্বরে ভয়।
‘ডেকে তুলুন। জরুরি দরকার না থাকলে আপনার চুপসে যাওয়া মুখ দেখতে আমি এত রাত্রে আসতাম না। যান, চটপট ডেকে তুলুন। কোনও রকম বাহানা করার চেষ্টা করবেন না।’
অফিসার যে গলায় কথা বলল তারপর বৃদ্ধার সাহস ছিল না দাঁড়িয়ে থাকার। ঠিক তিরিশ সেকেন্ড বাদে বৃদ্ধকে দেখা গেল হ্যারিকেন হাতে। পরনে ঘুমাবার পোশাক। খুব ভয়ার্ত গলায় তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে?’
‘আপনার ভাইপোর নাম আকাশলাল?’
‘এই দুর্ভাগ্যের কথা তো সবাই জানে?’
‘হুম্। আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।’
সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধার গলা ভেসে এল পেছন থেকে, ‘সে কী! আমরা লিখিতভাবে ভার্গিস সাহেবকে জানিয়ে দিয়েছি আকাশলালের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। যদি তার কোনও খবর পাই সঙ্গে সঙ্গে এখানকার থানায় জানিয়ে দেব। মুশকিল হল, মড়াটা ভুলেও এদিকে আসে না। তা হলে ওঁকে আপনার সঙ্গে যেতে হবে কেন?’
‘প্রয়োজন আছে বলেই যেতে হবে।’ অফিসার ঘোষণা করল।
মিনিট তিরিশের মধ্যে বৃদ্ধকে হাজির করল অফিসার ভার্গিসের সামনে। ভার্গিস চুপচাপ চুরুট খাচ্ছিলেন। বৃদ্ধকে দেখে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘যাক, আপনি বাড়িতে ছিলেন দেখছি। শুনুন, আপনার ভাইপো মারা গিয়েছে।’
বৃদ্ধ চমকে উঠলেন, ‘সে কী!’
‘কেন? দুঃখ উথলে উঠছে নাকি?’
‘আজ্ঞে তা নয়। ওর তো অনেক আগেই মারা যাওয়া উচিত ছিল। তাই।’
‘হুম্। আপনি খুব সেয়ানা। আমি লক্ষ করেছি বুড়ো হলেই মানুষ খুব সেয়ানা এবং স্বার্থপর হয়ে যায়। যাকগে। আপনার ভাইপো হার্ট ফেল করেছে। আমরা মারিনি। ওকে স্পর্শ পর্যন্ত করিনি। লোকটা বিয়ে-থা করেনি। আত্মীয় বলতে আপনি। এখন বলুন, আপনি কি পোস্টমর্টেম করাতে চান?’ চুরুট খেতে খেতে ভার্গিস প্রশ্ন করল।
‘কেন? পোস্টমর্টেম তো সন্দেহজনক ক্ষেত্রে করা হয় বলে শুনেছি।’
‘আপনি মনে করতে পারেন আমরা ওকে বিষ খাইয়ে মেরেছি।’
‘ছিঃ। একথা মনে আসার আগে আমার মরণ ভাল। বিচার করলেই ওর যখন মৃত্যুদণ্ড হবে তখন খামোকা বিষ দিতে যাবেন কেন? না, না, পোস্টমর্টেম করার কোনও দরকার নেই। ওঃ এতদিনে দুশ্চিন্তামুক্ত হলাম।’
ভার্গিস বৃদ্ধের দিকে তাকালেন, ‘তুমি একটি খচ্চর বুড়ো।’
‘আজ্ঞে?’
‘শুনুন। পোস্টমর্টেম যদি না চান, একমাত্র আপনিই চাইতে পারেন, তা হলে ওর মৃতদেহের ব্যবস্থা করতে হয়। এই শহরের কবরখানায় আপনাদের পারিবারিক জায়গা আছে। তাই তো?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। তবে বেশি জায়গা অবশিষ্ট নেই।’
‘সেটা আপনাদের সমস্যা। যে জায়গা আছে সেখানেই আকাশলালকে কবর দিতে হবে। বোর্ড চাইছে পাবলিক জানার আগেই কাজটা হয়ে যাক। কিন্তু যদি আপনার এই ব্যাপারে কোনও আপত্তি থাকে তা হলে স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন।’
‘বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। ছেলেটা কিছু লোককে খেপিয়েছিল। তারা জানতে পারলে গোলমাল পাকাবে। এ সব আমার একদম পছন্দ হয় না। আপনারা বেশি দেরি করবেন না। যদি সম্ভব হয় আজ রাত্রেই ওকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।’
ভার্গিস অফিসারকে বললেন বৃদ্ধকে বাইরে নিয়ে যেতে। এবং সেই সময় তাঁর ব্যক্তিগত টেলিফোন বেজে উঠল। একটু শঙ্কিত হাতে রিসিভার তুললেন ভার্গিস, ‘হ্যালো। ভার্গিস বলছি।’
‘মিনিস্টার ফোন করেছিল?’ ম্যাডামের গলা।
ভার্গিস সোজা হয়ে বসলেন, ‘না ম্যাডাম।’
‘ও কাল সকালে ফোন করবে। একটু আগে বোর্ডের মিটিং হয়ে গেছে। বোর্ড মনে করছে চেষ্টা করলে আকাশলালকে বাঁচানো যেত। মিনিস্টার কিন্তু আপনার পক্ষে সওয়াল। করেননি।’
‘এটা হার্ট অ্যাটাক। আমি এক্ষেত্রে অসহায়।’
‘আমি সেটা বলেছি। এখন কারফিউ চলছে বলে পাবলিক ওপিনিয়ন পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু বোর্ড মনে করছে আগামী কাল শহরে গোলমাল হবেই। আপনি কিভাবে ব্যাপারটার মোকাবিলা করেন তার ওপর বোর্ড আপনার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে।’ ম্যাডাম বললেন।
‘ম্যাডাম?’
‘আপনি এখন পর্যন্ত কী স্টেপ নিয়েছেন?’
‘আগামী কাল সারাদিন কারফিউ জারি করেছি যাতে কেউ রাস্তায় না নামতে পারে আকাশলালের একমাত্র আত্মীয়, ওর কাকাকে, তুলে এনেছি হেডকোয়ার্টার্সে। তিনি চান না পোস্টমর্টেম হোক এবং অবিলম্বে শেষ কাজ করার পক্ষপাতী।’ ভার্গিস সত্যি ঘটনাটা জানালেন।
‘বাঃ। টিভিকে বলুন লোকটাকে ইন্টারভিউ করতে। ও যদি ওদের কাছে একই কথা বলে তা হলে সেটা বারংবার টেলিকাস্ট করতে বলুন। তাতে পাবলিক হয়তো কিছুটা শান্ত হবে। আপনি বুঝতে পারছেন?’
‘ইয়েস ম্যাডাম।’
‘আকাশলালকে কোথায় রেখেছেন?’
‘মর্গে নিয়ে যেতে চাইনি। এখানকার ঠাণ্ডা ঘরেই আছে।’
‘বেশ। ওর পারলৌকিক কাজকর্মের ব্যবস্থা করুন।’ লাইন কেটে গেল।
ভার্গিস খুশি হলেন। যাক ম্যাডাম এখনও তাঁর পক্ষে আছেন। শালা মিনিস্টাররা ঠিক সময় বুঝে পেছনে লেগেছে। হ্যাঁ, আকাশলাল মরে গিয়ে কিছু ক্ষতি করে গেল। ব্যাটা বেঁচে থাকলে চাপ দিয়ে যেসব খবর বের করা যেত তা আর পাওয়া যাবে না। ব্যাটার কিছুদিন আগে অপারেশন হয়েছিল। করল কে? নিশ্চয়ই ইন্ডিয়ায় গিয়ে করিয়েছে। আর তারই ধকল সামলাতে পারল না।
দরজায় শব্দ হতে ভার্গিস বললেন, ‘কাম ইন।’
তরুণ অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার ঢুকল, ‘স্যার। ডেডবডির ছবি তোলা হয়ে গেছে।’
‘গুড। টিভিকে খবর দিয়েছেন?’
‘এখন তো কারফিউ চলছে— ’
চলুক। গাড়ি পাঠিয়ে ওদের তুলে আনুন। আমাদের ডাক্তার আর ওর কাকাকে ইন্টারভিউ করতে বলুন। এবং সেই ইন্টারভিউটা টেলিকাস্ট করতে বলুন। বুঝেছেন?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘এসব ব্যাপার একঘণ্টার মধ্যেই হওয়া চাই। ইতিমধ্যে একজন পাদরিকে জোগাড় করুন। একঘণ্টার পর পাদরি আর ওর কাকাকে নিয়ে আপনি যাবেন কবরখানায়। মাটির তলায় ঢুকিয়ে দিয়ে আমাকে রিপোর্ট করবেন।’ ভার্গিস হাত নাড়লেন।
‘স্যার, জনসাধারণকে ডেডবডি দেখার সুযোগ দেবেন না?’
‘হোয়াট? আপনি কী ভেবেছেন? লোকটা কি জাতীয় নায়ক?’
‘না স্যার। আসলে, পাবলিক সেন্টিমেন্ট— ।’
‘তার জন্যে ওর কাকা আছে। আমরা চাইছি কাল সকালে ওর যেন কোনও হদিশ না থাকে। বেঁচে থেকে যা পারেনি মরে গিয়ে লোকটা পাবলিককে দিয়ে সেই বিপ্লব করিয়ে ফেলতে পারে তা জানেন?’
‘সরি স্যার, এটা মাথায় আসেনি।’
পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে টিভির লোকের অনুরোধে ভার্গিস ক্যামেরার সামনে গম্ভীর মুখে বসলেন। তার আগে একজন মেকআপ ম্যান তাঁর বিশাল মুখে পাউডারের পাফ বুলিয়ে দেওয়ায় তিনি একটু নার্ভাস। ইন্টারভিউ দুটো প্রচারিত হবার আগে কমিশনার অফ পুলিশ হিসেবে তাঁর বক্তব্য থাকা দরকার।
আধ ঘণ্টার মধ্যেই রাত দুপুরে বিশেষ বুলেটিন প্রচারিত হতে লাগল। প্রথমে অনেক বার ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাশ বিজ্ঞপ্তির পর ভার্গিসের মুখ দেখা গেল, ‘আমাদের প্রিয় জনগণ। আপনারা জানেন দেশের নিরাপত্তা, শান্তি এবং সংহতি বিনষ্ট করার জন্যে আমরা বহুদিন ধরে আকাশলালকে খুঁজছিলাম। গত কয়েক বছরে সে এবং তার দলের লোকেরা দুশো বারোজন দেশপ্রেমিক পুলিশকে হত্যা করেছে। শেষ শিকার আমাদের জাতির গৌরব বাবু বসন্তলাল। আমরা চেয়েছিলাম আকাশলালকে গ্রেফতার করে আইনসঙ্গত ব্যবস্থা নিতে। বিচার চলার সময় সে তার বক্তব্য বলার সুযোগ পেত। এ দেশে কেউ যেমন আইনের ঊর্ধ্বে নয় তেমনি আইনের সাহায্য নিতে আমরা কাউকে বঞ্চিত করতেও পারি না। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের কথা, আজ যখন তাকে আমরা গ্রেফতার করতে পারলাম তখন সে যে অসুস্থ তা বুঝতে পারিনি। সে নিজেও তা প্রকাশ করেনি। গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করে তাকে বাঁচাতে পারেননি। একজন দেশদ্রোহীর মৃত্যু এভাবে হোক তা আমরা চাইনি। কিন্তু আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম আকাশলালের নিকটতম আত্মীয় ওর কাকা এই মৃত্যুতে একটুও বিস্মিত নন। বরং তিনি আফশোস করছেন তাঁর ভাইপোর কোনও শাস্তি হল না। মৃত্যু ওই বৃদ্ধের কাছে শাস্তি নয়। বন্ধুগণ, আকাশলালের মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা করার লোকের কোনও অভাব নেই। তারা আপনাদের উত্তেজনা বাড়াবার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু আমি আশা করব দেশপ্রেমিক হিসেবে দেশদ্রোহীদের উসকানিতে আপনারা কান দেবেন না। নমস্কার।’
এরপরেই ডাক্তার এবং আকাশলালের কাকার ইন্টারভিউ প্রচারিত হল। সমস্ত দেশ জানল আকাশলাল নেই। ক্ষোভ দানা বাঁধার সুযোগ পেল না কারফিউ থাকায়! ডাক্তার অথবা সি পির বক্তব্য বিশ্বাস করতে না পারলেও আকাশলালের কাকার কথা উড়িয়ে দিতে পারছিল না বেশির ভাগ মানুষ।
ঘন ঘন টেলিকাস্ট হচ্ছিল সেই রাত্রে। জরুরি অবস্থা বলে টিভি প্রোগ্রাম বন্ধ করেনি। ভার্গিস খুব খুশি। নিজের চেহারাটাকে অবশ্য তাঁর ঠিক পছন্দ হয়নি।
রাত দুটোর পরে তিনটে বিশেষ গাড়ি বের হল হেডকোয়ার্টার্স থেকে। একটিতে তরুণ অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার এবং আকাশলালের কাকার সঙ্গে একজন পাদরি। দ্বিতীয় গাড়িতে আকাশলালের দেহ। তৃতীয়টিতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত পুলিশবাহিনী। গাড়ি তিনটে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ভার্গিস টেলিফোন করেছিলেন মিনিস্টারকে। খুব সরল গলায় জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করেছিলেন, ‘ওর কাকা চাইছেন এখনই শেষকৃত্য করতে। আপনি কী বলেন?’
মিনিস্টার জবাব দিলেন, ‘দ্যাখো ভার্গিস, আমি বিশ্বাস করি তুমি যদি সেই সময়ে হেডকোয়াটার্সে থাকতে তা হলে আকাশলালের চিকিৎসা আরও আগে করা যেত। এখন যে সিদ্ধান্ত নিতে চাও নাও। তার ফল যদি খারাপ হয় তা হলে তোমাকেই জবাবদিহি করতে হবে। বুঝেছ?’
‘ইয়েস স্যার।’
‘দেন গো অ্যাহেড।’ মিনিস্টার টেলিফোন ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন মধ্যরাত। কোনওভাবেই রাস্তায় মানুষজন নেই। ভার্গিস শুতে গেলেন না। এই লোকটা যদি আজ মরে না যেত তা হলে এতক্ষণে তিনি মিনিস্টার হয়ে যেতেন। সেটা হবেন কি না তা নির্ভর করছে জনতা কী রকম প্রতিক্রিয়া দেখায় তার ওপরে।
২৩. টিভিতে তিনজনের বক্তব্য
টিভিতে তিনজনের বক্তব্য শুনল অনীকা। তার ঘুম আসছিল না। টিভির সামনে বসে সে বিস্ময়ে হতবাক। একটু একটু করে সরকার থেকে কি সুন্দরভাবে আকাশলালের অসুস্থতা থেকে মৃত্যুসংবাদ প্রচার করে দিল। বিশেষ করে আকাশলালের কাকাকে হাতের কাছে রেখে তাঁকে দিয়ে ভাইপো সম্পর্কে বলানোর মধ্যে ভাল পরিকল্পনা আছে। সন্ধের পরে সে তার কাগজে যে খবর পাঠিয়েছিল তাতে উৎসবের বর্ণনার চেয়ে আকাশলালই অনেকখানি জুড়ে ছিল। মানুষটার অসুস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল সে। এখন মৃত্যুসংবাদ পাঠানোর কোনও উপায় নেই।
হঠাৎ অনীকার মনে হল ওরা আজ রাত্রেই আকাশলালকে কবর দেবে। দিনের আলোয় কারফিউ থাকা সত্ত্বেও মৃতদেহ বের করার ঝুঁকি নিশ্চয়ই নেবে না। কিন্তু এই ব্যাপারটা আকাশলালের সঙ্গীরা আগাম জানল কি করে? নইলে কেউ কবরের জায়গা দেখতে যায়? ওই মেয়েটি এবং তার সঙ্গী যদি আকাশলালের দলের হয় তবে কবরখানা দেখে তাদের কি লাভ। পুলিশের খাতায় নিশ্চয়ই তাদের নাম আছে এবং পুলিশ নেতার মৃতদেহ হাতছাড়া করবে না। তাহলে কবরখানা দেখে ওদের কি লাভ? অস্বস্তি প্রবল হয়ে উঠল অনীকার। তার মনে হচ্ছিল আজ রাত্রে সেই কবরখানায় যেতে পারলে ও এমন কিছুর সাক্ষী হবে যা অন্য কোনও খবরের কাগজের লোক ভাবতেও পারবে না কাল। কিন্তু কি ভাবে যাওয়া যায় সেখানে? একেই এখন গভীর রাত। তার ওপর কারফিউ চলছে। যে কোনও মানুষকে রাস্তায় দেখলে পুলিশের গুলি করার অধিকার আছে। কারফিউ-এর মধ্যে মারা গেলে কারও সহানুভূতিও পাওয়া যাবে না। কিন্তু সেই ভয়ে বসে থাকলে খবরটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।
অনীকা চিরকালই একটু ডানপিটে। তার এই স্বভাবের জন্যে সাংবাদিকতার চাকরিতে যথেষ্ট সুবিধে হয়েছে। মেয়ে হিসেবে যারা তাকে গুরুত্ব দেয় না তারাই পরে বোকা হয়ে যায়। এই রাত্রে অনীকা ঠিক করল কবরখানায় যাবে। সে তৈরি হল জিনস আর জ্যাকেট পরে। পায়ে কেডস, যাতে দৌড়ানো সহজ হয়। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল টুরিস্ট লজের করিডোরে আলো জ্বলছে। যেহেতু এখন কারও জেগে থাকার কথা নয় তাই একটুও শব্দ নেই। সে নিঃশব্দে নীচে নেমে এসে দেখল সদর দরজা বন্ধ। সেখানে তালা পড়েছে। তালা খোলাতে গেলে যে ডাকাডাকি করতে হয় সেটা অভিপ্রেত নয়। এক মুহূর্ত চিন্তা করে সে পেছন ফিরল। তার ঘরের ব্যালকনি থেকে নীচে নামার চেষ্টা করতে হবে।
নিজের ঘরে এসে অনীকা ব্যালকনিতে গেল। এই উচ্চতা লাফিয়ে নামা বিপজ্জনক হবে। তাছাড়া এদিকটা একদমই খাড়া। সেইসময় যদি টহলদারি ভ্যান আসে তাহলে দেখতে হবে না। তার মনে হল লজে ঢোকার জন্যে নিশ্চয়ই পেছনেও একটা দরজা আছে। সেখানেও কি তালা থাকবে? সে আবার ঘর থেকে বের হল।
‘ম্যাডাম! আপনার কি কোনও অসুবিধে হচ্ছে?’
চমকে পেছন ফিরে তাকিয়ে অনীকা দেখল লজের সেই কর্মচারীটি তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, ‘হ্যাঁ। আমার একটু বাইরে যাওয়া প্রয়োজন। দরজায় তালা থাকায় যেতে পারছি না। আপনি এখানে কি করছেন?’
‘আমার কথা ছেড়ে দিন। কিন্তু এত রাত্রে কারফিউ-এর মধ্যে আপনি কোথায় যাবেন?’
‘ব্যাপারটা একদম ব্যক্তিগত।’
‘আমি আপনাকে বলতে পারি এখন বের হলে বেঁচে ফিরে নাও আসতে পারেন। তাছাড়া এই সময়ে গেট খুলে দিলে সেটা পুলিশকে জানানো কর্তব্য। এই লজ সরকারি।’ লোকটি বলল।
অনীকা ঠোঁট কামড়াল।
লোকটি হাসল, ‘অবশ্য তেমন প্রয়োজন পড়লে আপনি পুলিশের কাছে কারফিউ পাশ চাইতে পারেন।’
‘অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু ব্যাপারটা আমি পুলিশকে জানাতে চাই না।’
লোকটির মুখচোখে পরিবর্তন এল যেন, অন্তত তাই মনে হল অনীকার। একটু ভাবল যেন। তারপর বলল, ‘আপনি এ দেশের মানুষ নন। তাহলে পুলিশের সঙ্গে ঝামেলায় যাচ্ছেন কেন?’
‘আমি সাংবাদিক। সংবাদ নেওয়া আমার কাজ। পুলিশ যদি সেটা গোপন রাখতে চায় তাহলে আমি তাদের এড়িয়ে যাব, এটাই স্বাভাবিক।’ অনীকা বলল।
‘আপনি এখানকার পথঘাট চেনেন?’
‘আমি যেখানটায় যাব সেখানে আজ বিকেলে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছে চিনে যেতে পারব।’ খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলল অনীকা।
‘আপনি নিশ্চয়ই বড় রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলেন। সেইভাবে যেতে চাইলে একশ গজও এখন এগোতে পারবেন না। ঠিক আছে, চলুন, আমি আপনাকে সাহায্য করছি।’
‘আপনি সাহায্য করবেন মানে? আপনি আমার সঙ্গে যাবেন নাকি?’
‘আপনার সঙ্গে যাব না। কারণ আপনি কোথায় যেতে চাইছেন তা আমাকে বলেননি। আমি আমার কাজে যাব। আপনাকে গলির পথ চিনিয়ে দিতে পারি যেখানে সহজে পুলিশের দেখা পাবেন না। আসুন।’ লোকটি নীচে নামতে লাগল।
সন্দেহ হচ্ছিল খুব কিন্তু অনীকা কোনও প্রশ্ন করল না। লোকটি রহস্যজনক। এই প্রায় শেষ রাত্রে এমন বাইরে যাবার পোশাক পরে লজের ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল কেন? সে কোনও শব্দ করেনি। শব্দ শুনে জেগে ওঠার সম্ভাবনাও ছিল না।
লোকটি তাকে পেছনের দরজায় নিয়ে এল। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। খোলার আগে লোকটি জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কোন দিকে যেতে চাইছেন?’
কি বলবে অনীকা? কবরখানার কথা তো না বলে উপায় নেই। সে বলল, ‘একটু আগে টিভি শুনে মনে হল পুলিশ আজ রাত্রেই আকাশলালের কবরের ব্যবস্থা করবে। আমার মনে হওয়া ঠিক কিনা তাই জানতে চাইছি।’
‘ও, তাই বলুন। আপনি কবরখানায় যাবেন। সেখানে যদি ওরা আপনাকে দেখতে পায় তাহলে কি ঘটবে অনুমান করছেন?’
‘আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করবেন না।
লোকটি কাঁধ নাচাল। তারপর নিঃশব্দে দরজা খুলে বলল, ‘রাস্তার মুখে গিয়ে দুপাশ দেখে নিয়ে এক দৌড়ে পেরিয়ে যাবেন। ঠিক ওপাশে যে গলি আছে তার ভেতর ঢুকে অপেক্ষা করবেন। এগোন।’
অনীকা প্যাসেজটা দ্রুত হেঁটে এল। রাস্তাটা নির্জন। কোথাও কোনও প্রাণের চিহ্ন নেই। সে দৌড় শুরু করল। রাস্তাটা পার হতে কয়েক সেকেন্ড লাগল। গলির মুখে ঢুকেই সে দাঁড়িয়ে পড়ল। এই গলিতে কোনও আলো নেই।
‘চলুন।’ লোকটি এসে গেল।
অনীকা নিঃশব্দে সেই অন্ধকারে অনুসরণ করল। মনে হচ্ছিল লোকটি বিপজ্জনক নয়।
তিনটে গাড়ি যখন কবরখানার সামনে এসে দাঁড়াল তখন একটা কুকুরও ধারেকাছে জেগে নেই। কবরখানায় ঢোকার মুখে অফিসঘরের কর্মচারীকে একজন পুলিশ অফিসার তুলে নিয়ে এসেছিল কিছুক্ষণ আগে। ডাক্তারের দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট অনুযায়ী খাতায় আকাশলালের নাম ওঠার পর পুলিশরাই কফিনটা নামাল। অন্ধকার কবরখানায় আলো জ্বালিয়ে সেই কফিনটিকে নিয়ে আসা হল নির্দিষ্ট জায়গাটিতে, যেখানে আকাশলালের পূর্বপুরুষরা মাটির নীচে শুয়ে আছেন।
কয়েকজন লোক হ্যাজাক জ্বালিয়ে মাটি খুঁড়ছিল। সেই বৃদ্ধ তদারকি করছিলেন। খোঁড়ার সময় যাতে পূর্বপুরুষের কোনও কফিনে আঘাত না পড়ে তা খেয়াল রাখছিলেন তিনি। অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার ঘড়ি দেখছিলেন। এবার তাগাদা করলেন, ‘তাড়াতাড়ি।’
কেউ কিছু বলল না। কফিনের ঢাকনা সরানো হল। পাদরি পারলৌকিক কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বৃদ্ধ নিচু গলায় খননকারীদের বললেন, ‘আট ফুট গর্ত হয়ে গেছে। আর খোঁড়ার দরকার নেই। তোমরা ওপরে উঠে এসো।’ তারা আদেশ পালন করল।
আকাশলালের কাকা হ্যাজাকের আলোয় ভাইপোর মুখ দেখছিলেন। পরম প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছে আকাশ। বেঁচে থাকতে খুব জ্বলতে হয়েছে ওর জন্যে। এই বৃদ্ধ বয়সে বিছানায় না শুয়ে আসতে বাধ্য হওয়া, তাও ওরই জন্যে। অথচ ছেলেটা একসময় কি শান্ত ছিল!
পাদরির অনুমতি পাওয়ামাত্র ধীরে ধীরে কফিনটাকে ভাল করে বন্ধ করে মাটির নীচে নামিয়ে দেওয়া হল। আকাশলালের কাকা এবং উপস্থিত অনেকেই মাটি ফেলতে লাগল কফিনের ওপর। তারপর খননকারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মিনিট দশেকের মধ্যেই গর্ত বুজে গেল এবং জায়গাটা সমান হয়ে গেল।
তরুণ অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার বললেন, আপনার ভাইপোর জন্যে যে স্মৃতিসৌধ তৈরি করবেন তাতে লিখবেন মরার পর একটুও জ্বালায়নি।’
কাকা বললেন, ‘মরার পর কে আর সেটা করে বলুন।’
তরুণ অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার বললেন, ‘আমরা সেইরকম আশঙ্কা করেছিলাম। ব্যাপারটা গোপনে না সারলে এতক্ষণ এখানে গোলাগুলি চলত।’
‘হুঁ। এবার আমাকে দয়া করে আমার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিন। আমার স্ত্রী সেখানে একা আছেন। বেচারা খুব ভয় পেয়ে গেছে।’ কাকা হাতজোড় করলেন।।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই কবরখানা খালি হয়ে গেল। শুধু তার বাইরের রাস্তায় একটি পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে রইল সশস্ত্র সেপাইদের নিয়ে। হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল কবরখানার গাছগাছালিকে ঈষৎ কাঁপিয়ে দিয়ে। প্রায় একঘণ্টা সময় একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা অনীকা ভেবে পাচ্ছিল না এখন কি করবে। তার চোখের সামনে ওরা আকাশলালের মৃতদেহ নিয়ে এল, কবর দিল এবং চলে গেল। ঘটনাটির বর্ণনা সে টুরিস্ট লজে ফিরে গিয়ে দারুণ ভাষায় লিখে তার কাগজের কাছে পাঠাতে পারবে। কিন্তু তেমন কোনও নাটকীয় ঘটনা তো ঘটল না।
সকাল হলেও কারফিউ চলবে। সকালের আর বেশি দেরিও নেই। সামনের রাস্তা দিয়ে কবরখানা থেকে বের হওয়া মুশকিল। যে লোকটি তাকে টুরিস্ট লজ থেকে বের করে এনেছিল সে কবরখানার কাছাকাছি এসে সরে গিয়েছিল নিঃশব্দে। লোকটার আচরণ খুবই রহস্যময়।
অনীকা কবরখানায় ঢুকেছিল রেলিং টপকে। ভেতরে ঢোকার পর সাপ বা বিষাক্ত প্রাণী ছাড়া অন্য কোনও ভয় ছিল না। তার এখন মনে হচ্ছে মানুষের চেয়ে বিষাক্ত প্রাণী কিছু নেই।
অনীকা ধীরে ধীরে আড়াল ছেড়ে বের হল। এবং তখনই সে একটি ছায়ামূর্তিকে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসতে দেখল। মূর্তিটি আসছে মাঝখানের পথ দিয়ে। অনীকা কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এখন লুকোবার সুযোগ নেই কিন্তু না নড়াচড়া করলে হয়তো চোখ এড়িয়ে থাকা যাবে এই অন্ধকারে। মূর্তিটি প্রায় হাত দশেক দূরে এসে সদ্য খোঁড়া কবরের দিকে এগিয়ে গেলে অনীকা চিনতে পারল। সেই বৃদ্ধ ফিরে এসেছে। লোকটার হাঁটার ধরনের জন্যেই মনে হচ্ছিল দুলতে দুলতে আসছে। বৃদ্ধ চারপাশে তাকাল। তারপর সন্তর্পণে খোঁড়া মাটি এড়িয়ে পাঁচিলের দিকটায় পৌঁছে ঘাসের ওপর উবু হয়ে বসল।
অনীকা দেখল বৃদ্ধ প্রথমে মাটিতে হাত দিল। তারপর ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ে একটা কান ঘাসের উপর চেপে ধরল। এমন অদ্ভুত আচরণের কোনও ব্যাখ্যা পাচ্ছিল না অনীকা। যে মানুষ মরে গিয়েছে যাকে কফিনে শুইয়ে মাটির নীচে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তার কোনও হৃদস্পন্দন শুনতে চাইছে বৃদ্ধ।
হঠাৎ পিঠে স্পর্শ অনুভব করতেই চমকে ফিরে তাকাল অনীকা। দুজন মানুষ তার পেছনে কখন এসে দাঁড়িয়েছে? টুরিস্টলজের কর্মচারীটি বলল, ‘ম্যাডাম, আশা করি আপনি যা দেখতে চেয়েছিলেন তার সবই দেখা হয়ে গেছে। এবার ফিরে চলুন।’
‘আপনি এখানে?’ বিস্ময় চেপে রাখতে পারল না অনীকা।
‘আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুকুম হয়েছে আমার ওপর।’
কে হুকুম করেছে?’
‘আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। ভোর হয়ে আসছে, চলুন।’
‘দাঁড়ান। আমি ওই বৃদ্ধকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করব।
‘না। আমরা চাই না কেউ ওঁকে বিরক্ত করুক। আসুন।’ লোকটা যে-গলায় কথা বলল তা অমান্য করতে পারল না অনীকা। ধীরে ধীরে সে ওকে অনুসরণ করে পেছনের পাঁচিলের দিকে চলে এল। এখন পাতলা অন্ধকার পৃথিবীতে জড়িয়ে। পাঁচিল টপকে দৌড়ে রাস্তা পার হবার সময় দূর থেকে চিৎকার ভেসে এল।।
লোকটি বলল, ‘তাড়াতাড়ি গলির মধ্যে ঢুকে পড়ুন, ওরা দেখতে পেয়ে গেছে।’ কথা শেষ হওয়ামাত্র গুলির আওয়াজ ভেসে এল। পর পর কয়েকবার। ততক্ষণ গলিতে ঢুকে পড়েছে ওরা। লোকটি বলল, ‘জোরে হাঁটুন।’
হাঁপাতে হাঁপাতে হাঁটছিল অনীকা। কিন্তু তার মাথা থেকে বৃদ্ধের কান পেতে শুয়ে থাকার দৃশ্যটি কিছুতেই যাচ্ছিল না। বৃদ্ধ কি শুনতে চাইছিলেন? আর এই লোকগুলোই বা ওখানে গিয়েছে কেন? শুধু তাকে ফিরিয়ে আনতে? আর একজন তো ওখানেই থেকে গেল! অনীকার মনে হচ্ছিল এর মধ্যে রহস্য আছে। এবং রহস্যটি কি তা জানতে হলে আজ তাকে আর একবার কবরখানায় আসতে হবে। একা।
মাথার ওপর যে রাস্তা সেগুলো পড়ে আছে মরা সাপের মতো। যেহেতু ভার্গিস সাহেব কারফিউ জারি করেছেন তাই শহর আজ মৃত। মাঝে মধ্যে দু-একটি পুলিশের ভ্যান অথবা অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যে। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে কাজ করতে ওদের সুবিধে হচ্ছিল।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে মাটির নীচে যারা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে চলেছিল তারা আজ উত্তেজিত। ডেভিড এবং ত্রিভুবন শেষ তদারকির কাজে ব্যস্ত। কোদালের কোপ পড়ছে মাটিতে। ঝুড়িতে উঠছে মাটি। মাথায় মাথায় সেই ঝুড়ি চলে যাচ্ছে অনেক পেছনে। এত মাটি বাইরে ফেলার কোনও সুযোগ নেই। ফলে রাস্তার ওপাশে যে বিশাল বাড়ির মাঝখানের ঘরের মেঝে ফুঁড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি হয়েছিল তার ঘরে ঘরে জমছে সেগুলো। ওই নির্দিষ্ট ঘরটিকে বাদ দিয়ে অন্যগুলোতে এখন সামান্য বাতাস ঢোকার জায়গা নেই। জানলা বন্ধই ছিল, এখন দরজাও। বাড়িটার ওজন বেড়ে গেছে প্রচুর পরিমাণে। ডেভিডের ভয় হচ্ছিল, যে কোনও মুহূর্তেই বাড়িটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়তে পারে।
কিন্তু এছাড়া উপায় নেই। দিনের পর দিন অনেক ভেবেচিন্তে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তার শেষ পর্যায় এখন। প্রথম দিকে ঠিক ছিল সুড়ঙ্গ হবে চার ফুট বাই চার ফুট। সামান্য ঝুঁকে এগিয়ে যাওয়া যাবে। খাটো চেহারার শক্তপোক্ত মানুষেরা এই কাজটি করছিল। এখন বাড়িটিতে যেহেতু জায়গা অবশিষ্ট নেই তাই শেষ মাটি ফেলা হচ্ছে সুড়ঙ্গের ভেতরেই। তার ফলে কোমর আরও বেশি বেঁকাতে হচ্ছে।
রাস্তা পার হয়ে কবরখানার ভেতরে ঢুকে খোঁড়ার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। খোঁড়ার কাজ যারা করে যাচ্ছিল তাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওই বাড়ির নির্দিষ্ট ঘরটিতে আটকে রাখাও একটা সমস্যা ছিল। আকাশলালের প্রতি ভালবাসাই সেই সমস্যার সমাধান করে এসেছে এতদিন। ডেভিড পেছনে তাকাল। কালো অন্ধকারে দূরে দূরে ব্যাটারির সাহায্যে যে আলো জ্বলানো হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয় কিন্তু দেখা যায়। মাথার ওপরে যে পৃথিবী তার সঙ্গে এই সুড়ঙ্গের কোনও মিল নেই। যথেষ্ট সতর্কতা সত্ত্বেও খুঁড়তে খুঁড়তে অন্য পথে চলে যাওয়া বিচিত্র নয়। অনুমানের ওপর ভাবা হচ্ছে আকাশলালের কবর এখন প্রায় সামনে। ম্যাপ এঁকে মেপেঝুকে চললেও যেহেতু প্রকাশ্যে যাচাই করার সুযোগ নেই তাই শেষ মুহূর্তে ডেভিডের বুকে ভয় জমছিল।
ইতিমধ্যে বারো ঘণ্টা চলে গেছে। আকাশলালের শরীর এখন কবরের নীচে কফিনে শুয়ে আছে। আর বারোটা ঘণ্টা অতিক্রান্ত হলে আর কোনও সম্ভাবনা থাকবে না। এখনও হৃৎপিণ্ডের কাছে একটি পাম্পিং স্টেশন ওর শরীরের কয়েকটি মূল্যবান অঙ্গে রক্ত সঞ্চালনের কাজ অব্যাহত রেখেছে। সেই সঞ্চালন অত্যন্ত সীমিত। ডাক্তারের হিসেবমতো চব্বিশ ঘণ্টায় সেটাও থেমে যাবে।
কি করবে ডেভিড? নিজের সঙ্গে লড়াই করে সে ক্লান্ত। সিদ্ধান্তে আসা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। যে মানুষ একটা দেশকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেও পারেনি, শেষের দিকে যাকে প্রায় ইঁদুরের মতো লুকিয়ে থাকতে হয়েছে সে নতুন জীবন ফিরে পেয়ে কতটা সফল হবে? ইদানীং ডেভিডের বারংবার মনে হচ্ছে এদেশে বিপ্লব সম্ভব নয়। আকাশলাল কিছুতেই বিদেশিদের কাছ থেকে সরাসরি সাহায্য নিতে চায়নি। ওর ধারণা বিদেশিদের কাছে নিজের ইজ্জত বন্ধক রেখে স্বাধীনতা অর্জন করা যায় না। টাকার ব্যবস্থা হলে অস্ত্র কেনা হয়েছে, এইমাত্র। কিন্তু সেই অস্ত্র নিয়ে বোর্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জেতার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। এদেশের বেশির ভাগ মানুষ চায় তারা স্বাধীনতা নামক ফলটিকে পেড়ে ওদের হাতে তুলে দেবে এবং ওরা সেটাকে উপভোগ করবে। আকাশলাল যতই মানুষকে উদ্দীপিত করুক বেশির ভাগ মানুষই তাদের নিজেদের কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে কখনই চাইবে না। হ্যাঁ, আকাশলালকে সে নিজেও শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে। কিন্তু আসল আকাশলাল যখন ব্যর্থ তখন পরিবর্তিত আকাশলাল কি করে সফল হবে? আর পরিবর্তিত আকাশলালকে ছেড়ে তার পক্ষে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। সে নিজের অন্ধকার ভবিষ্যৎ যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। এ থেকে মুক্তির উপায় হল ইন্ডিয়ায় পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু আকাশলাল বেঁচে থাকতে সেটা সম্ভব নয়। বারোটা ঘণ্টা কেটে গেলে এই দ্বিধা তার থাকবে না।
‘কি হল?’ ঠিক পেছনে ত্রিভুবনের গলা শুনল ডেভিড। সুড়ঙ্গের প্রায় শেষ প্রান্তে সে উবু হয়ে বসে ছিল। তার সামনে তিনজন কর্মী আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। ত্রিভুবনের গলার স্বরে চৈতন্য ফিরল যেন।
ত্রিভুবন বলল, ‘আর মাত্র সাড়ে এগার ঘণ্টা বাকি। কাজ শুরু করে দাও।’
‘ওপরের অবস্থা কি?’
‘এখন ভোর হয়ে গেছে। কবরখানায় কেউ নেই। শুধু একজন মহিলা রিপোর্টার লুকিয়ে কবরখানায় ঢুকেছিল তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে।’
‘মহিলা রিপোটার? ডেভিড অবাক।
‘হ্যাঁ। কিন্তু এখন সময় নষ্ট করা ঠিক হচ্ছে না।
‘আমার ভয় হচ্ছে। যদি সুড়ঙ্গটা ঠিকঠাক জায়গায় না এসে থাকে!’
‘ওঃ। আমি অনেক পরীক্ষা করেছি। আমি নিশ্চিত, কোনও ভুল হয়নি।’
অতএব ডেভিডকে আদেশ দিতে হল। কোদালের কোপ পড়তে লাগল সামনে। মাটি পাথর উঠে আসতে লাগল সমানে। শব্দ হচ্ছে। অবশ্য এই শব্দ বাইরের কেউ শুনতে পাবে না। কোনও ধাতব বস্তু বা পাথর বা কাঠের গায়ে আঘাত লাগলেই থেমে গিয়ে সেটাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সকাল আটটায় সুড়ঙ্গের বাতাস ভারী হয়ে গেল। অক্সিজেন কমে যাচ্ছে দ্রুত। সেই সময়ের খুব দেরি নেই যখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে। সুড়ঙ্গ খোঁড়ার প্রাথমিক সময়ে যে ভয় ছিল এখন সেটা তেমন নেই। তখন মনে হত যে কোনও মুহূর্তেই ওপরের মাটি নীচে নেমে এসে মৃত্যুফাঁদ তৈরি করে দেবে অথবা পুলিশ উদয় হবে। সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ করে দিলে কর্মরত সবাই আর পৃথিবীর আলো দেখবে না। সতর্ক করে দেবার জন্যে পাহারাদার থাকলেও ভয়টা মনে চেপে ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন সেরকম কিছুই ঘটছিল না, তখন ভয়টাও মনের এক কোণে নেতিয়ে রইল।
সামনের খননকারীদের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা। কোদালের ডগায় কাঠের অস্তিত্ব। না, দিকভ্রান্ত হয়নি তারা। জমি মেপে মেপে রাস্তার তলা দিয়ে পাঁচিল ওপরে রেখে ঠিকঠাক কবরখানায় ঢুকে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যেতে পেরেছে। ত্রিভবন গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেল, ‘এবার সাবধান। আর কোদাল নয়। হাত চালাও ভাই সব। মাটি নরম আছে। সাবধানে কফিনটাকে টেনে নিয়ে এসো।’ বলাটা যত সহজ কাজটা ততটা ছিল না। আকাশলালের বন্ধ কফিন বাক্সটিকে বের করে সুড়ঙ্গে নিয়ে আসতে অনেক ঘাম বের হল খননকারীদের।
কোমর যেখানে সোজা করা যাচ্ছে না সেখানে এত লম্বা কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। ডেভিড বলল, ‘আমাদের স্ট্রেচার আনা উচিত ছিল।’
‘কি উচিত ছিল তা এখন ভেবে লাভ কি। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। কফিনটাকেই নিয়ে যেতে হবে ঘর পর্যন্ত। এসো ভাই, হাত লাগাই।’ ত্রিভুবন বলল।
‘কফিনটাকে এখানেই রেখে শরীরটাকে নিয়ে যাই।’
ডেভিড ইতস্তত করছিল।
কিন্তু ততক্ষণে কফিনটাকে কোনও মতে টেনে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। শরীরগুলো বেঁকেচুরে সেই ছোট্ট সুড়ঙ্গে একটা ভারী কফিনকে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল পরম মমতায়। সামান্য ঝাঁকুনি হলে ভেতরের মানুষটির শরীরে যে প্রতিক্রিয়া হবে সে সম্পর্কে তারা অত্যন্ত সচেতন ছিল।
প্রায় আধঘণ্টা সময় পরে ওরা কফিনটাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসতে পারল।
কফিনের ডালা খুলল ত্রিভূবন। আকাশলাল যেন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। শরীরটাকে অত্যন্ত সাবধানে বাইরে বের করে নিয়ে আসা হল। আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স আসবে।
ত্রিভুবন ডেভিডের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এবার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ।’
ডেভিড মাথা নাড়ল। আগে থেকেই এই ব্যাপারটা পরিকল্পনায় ছিল। কফিনটাকে রাখা হবে কফিনের জায়গায়। সুড়ঙ্গের ভেতরটায় মাটি ফেলে আবার ভরাট করে দেওয়া হবে। আজ অথবা আগামী কাল যেন কেউ না বুঝতে পারে এখানে এমন কর্মকাণ্ড ঘটেছে।
ডেভিড় খালি কফিন এবং খননকারীদের নিয়ে নেমে গেল সুড়ঙ্গে। এখন কাজ সারতে হবে খুব দ্রুত। বাড়িটার সমস্ত ঘর থেকে মাটি বের করে নিয়ে যেতে হবে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে। খালি কফিন বলেই এবং কারও আঘাতের সম্ভাবনা না থাকায় ওরা অনেকটা সহজেই চলে আসতে পারল সমাধিস্থলে। কিন্তু কফিনটাকে টেনে বের করার সময় কেউ লক্ষ করেনি জায়গা ফাঁকা পাওয়ায় ওপরের নরম মাটি নীচে নেমে এসেছে ভরাট করতে। এখন এই কফিনটাকে ঠিকঠাক রাখতে গেলে আবার মাটি সরাতে হবে। কাজটা শুরু করতেই আর একটা বিপদ হল। সামান্য জায়গা ফাঁকা হতেই ওপরের মাটি তাকে ভরাট করছে। এবং এইভাবে কিছুক্ষণ চললে সমাধিস্থল অনেকটাই বসে যাবে। কারখানার ওপরে দাঁড়ালে সেটা পরিষ্কার দেখা যাবে। আচমকা অতখানি জমি কেন বসে গেল সেই সন্দেহ পুরো ব্যাপারটাকে আর গোপনে রাখবে না। ডেভিড মরিয়া হয়ে উঠল।
ঠিক সেইসময় ওপরের রাস্তা দিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যাচ্ছিল। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে আকাশলাল শুয়ে আছে আর কয়েকঘণ্টার সম্ভাবনা নিয়ে। তার পাশে বসে আছে ত্রিভুবন, উদ্বিগ্ন এবং বেপরোয়া।
ঠিক সেইসময় কবরখানার একজন কর্মচারী সরু পথ দিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়াল। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। গতরাত্রে পুলিশ আকাশলালকে যেখানে কবর দিয়ে গিয়েছে সেই জায়গার মাটি নড়ছে। চিৎকার করতে করতে.সে অফিসঘরের দিকে ছুটে গেল।
২৪. শহরের কয়েকটা রাস্তায়
শহরের কয়েকটা রাস্তায় পাক দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটা চলে এসেছিল নির্জন এলাকায় যেখানে সাধারণত ধনী সম্প্রদায়েরা বাস করে থাকেন। বিশাল বাগান পেরিয়ে একটা প্রাচীন বাড়ির সিঁড়ির সামনে অ্যাম্বুলেন্স থামতেই কয়েকজন নেমে এল দৌড়ে, তাদের পেছনে হায়দার। খুব যত্নের সঙ্গে আকাশলালের শরীরকে স্ট্রেচারে শুইয়ে নামানো হল, নিয়ে যাওয়া হল বাড়িটির ভেতরে। ত্রিভুবনরা ভেতরে ঢুকতেই বড় কাঠের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আর অ্যাম্বুলেন্স অত্যন্ত নিরীহ ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেল রাস্তায়, বাগান পেরিয়ে।
এই বাড়ির একটি বিশেষ কক্ষকে অপারেশন থিয়েটারে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বৃদ্ধ ডাক্তার অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন, তাঁকে সাহায্য করতে যে-কজন মানুষ সেখানে ছিল তাদের চেহারা বেশ কৃশ। বোঝাই যায় বেশ চাপের মধ্যে আছে তারা। অপারেশন থিয়েটারের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে হায়দার সেখানে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথাও কোনও অসুবিধে হয়নি তো?’
ত্রিভুবন জবাব দিল, ‘না। তবে ডেভিড মনে হয় একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছিল।’
‘তার মানে?’
‘সে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ চালাতে অনর্থক দেরি করেছে। তাকে বারংবার মনে করিয়ে দিতে হচ্ছিল যে আমাদের হাতে সময় খুব অল্প আছে।’ ত্রিভুবন জানাল।
‘তোমরা ওখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় কোনও গোলমালের আওয়াজ পেয়েছ?’
‘না। আমরা চলে আসার মুখে ডেভিড আবার সুড়ঙ্গে ফিরে গিয়েছিল মাটি দিয়ে ভরাট করার কাজে। আমরা বিনা বাধায় রাস্তা পেরিয়ে এসেছি।’ ত্রিভুবন জানাল।
‘আশা করছি কেউ এই অ্যাম্বুলেন্সটার কথা পুলিশকে জানাবে না।’ হায়দার যেন নিজের মনেই কথাগুলো বলল। ত্রিভুবনের সন্দেহ হল, ‘কেন? কোনও ঘটনা ঘটেছে নাকি?’
‘হ্যাঁ। ডেভিড এবং তার সঙ্গীরা সুড়ঙ্গের মধ্যে আটকে পড়েছে।’
‘কি করে?’ চমকে উঠল ত্রিভুবন।
‘বিস্তারিত খবর আমি এখনও পাইনি। তবে কবরটা খুঁড়ে ফেলা হচ্ছে এবং পুলিশ মাটি ভর্তি বাড়িটাকেও আবিষ্কার করেছে। অনুমান করছি ডেভিড তার সঙ্গীদের নিয়ে ওই সুড়ঙ্গেই আটকে আছে। যদি ও সারেণ্ডার না করে তাহলে ভার্গিস ওকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবে।’ হায়দার বলল।
‘ডেভিড সারেণ্ডার করবে?’ ত্রিভুবন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
‘এছাড়া ওর সামনে কোনও পথ নেই।’ হায়দার চোখ বন্ধ করল, ভার্গিসের হাতে ও যদি একবার পড়ে তাহলে সে ওর মুখ খুলিয়ে ছাড়বেই। অপারেশনের জন্যে যা যা দরকার তুমি দায়িত্ব নিয়ে করো। আমি ওদিকের খবর নিচ্ছি।’
ত্রিভুবনের কপালে ভাঁজ পড়ল, ‘যদি ডেভিড ধরা পড়ে তাহলে আমাদের এখনই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।’
‘ঠিকই।’ হায়দার মাথা নাড়ল, ‘কিন্তু ও যাতে ধরা না পড়ে তার ব্যবস্থা করছি।’
এলাকাটা এখন পুলিশের হাতে। কারফিউ যদিও চলছিল তবু পুলিশ মাইকে শেষ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে জনসাধারণের উদ্দেশে, ‘সামান্য কৌতূহল দেখাবেন না কেউ। রাষ্ট্রের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক কিছু মানুষকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা হচ্ছে। আপনারা নিজেদের বাড়ির জানলা দরজা বন্ধ করে রাখুন।’ অস্ত্রধারীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে রাস্তায়। এলাকার সমস্ত বাড়ি তাই শব্দহীন।
ভার্গিস কবরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। কবরের মাটি অনেকটা নীচে বসে গিয়েছে। কারখানার কর্মচারীরা পেছনে সারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। তারা প্রত্যেকেই হলফ করে বলেছে ওখানকার মাটির নীচে গর্ত ছিল না। এই কবরখানায় কখনও এমন কাণ্ড হয়নি। ভার্গিস এখানে আসার আগেই অবশ্য একজন পুলিশ অফিসার জানতে পারে খানিক আগে একটি অ্যাম্বুলেন্স রাস্তার উল্টোদিকের গলি থেকে বেরিয়ে কোথাও চলে গিয়েছে। গলির ভেতরের কয়েকটা বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে কেউ অসুস্থ হয়নি। অ্যাম্বুলেন্সটিকে খুঁজে বের করার জন্যে ওয়ারলেসে খবর পাঠানো হয়েছে চারধারে।
একজন অফিসার ছুটে এল ভার্গিসের কাছে। স্যালুট করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, ওই বাড়ির একটা ঘর থেকে সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছিল। সুড়ঙ্গের মুখটাকে আমরা আবিষ্কার করেছি।’
‘হুম্। সুড়ঙ্গের মুখটাকে সিল করে দাও।’
‘আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমরা সুড়ঙ্গের মধ্যে নামতে পারি!’ উত্তেজিত অফিসারটি প্রস্তাব দিল সোৎসাহে।
ভার্গিস তাকে দেখলেন, ‘হামাগুড়ি দেবার ইচ্ছে হলে বাড়ি ফিরে বউয়ের সামনে দিয়ো। যা বলছি তাই করো। গেট আউট।’
‘ইয়েস স্যার।’ অফিসার স্যালুট সেরে আবার ছুটে গেল।
ভার্গিস অন্য পুলিশদের হুকুম দিলেন কবর খুঁড়তে। বলে দিলেন কফিন পাওয়ামাত্র সবাই যেন সতর্ক হয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে।
কোদাল বসতে লাগল মাটিতে। দেখা গেল খুব বেশি জায়গা জুড়ে গর্তটা তৈরি হয়নি। মাটি উঠছে সহজেই। কবর খোঁড়ার সময় যেটুকু গর্ত খুঁড়তে হয়েছিল ঠিক ততটুকু জায়গার মাটিতে ধস নেমেছিল।
ভার্গিস উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওদের মতলব ছিল আকাশলালের মৃতদেহ কবর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু কেন? মৃতদেহটিকে পূর্ণ মর্যাদায় সমাধি দেওয়ার জন্যে? এখন এই পরিস্থিতিতে সেটা ওরা করতেই পারত না। তাহলে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্যে সুড়ঙ্গ খুঁড়বে কেন?
তারপরেই তাঁর মনে হল সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কি দরকার ছিল? আজ রাত্রে কবরখানায় এসে ওরা এখান থেকেই কফিনটাকে তুলে নিতে পারত। রাস্তার ওপার থেকে মাটির নীচে দিয়ে সুড়ঙ্গ একদিনে খোঁড়া সম্ভব নয়। ওরা যখন সেটা করার চেষ্টা করছে তখন পরিকল্পনা অনেকদিনের। আকাশলাল মারা গিয়েছে গতকাল। তার কবরের কাছে মাটির নীচে দিয়ে পৌঁছবার জন্যে ওরা দীর্ঘদিন ধরে সুড়ঙ্গ খুঁড়বে কেন? ওরা কি জানত গতকাল লোকটা মারা যাবে এবং এখানেই কবর দেওয়া হবে? তাহলে এই মৃত্যু সাজানো। ভার্গিস আচমকা চিৎকার করে উঠলেন। এবং তখনই খননকারীরা জানাল, নীচে কোনও কফিন নেই, তার বদলে একটা সুড়ঙ্গের মুখ দেখা যাচ্ছে। .
নিয়ে গিয়েছে। বডি নিয়ে গিয়েছে ওই অ্যাম্বুলেন্সে! রাগে অপমানে এবং হতাশায় ভার্গিসের মুখটা বুলডগের মত হয়ে গেল। তিনি হুকুম দিলেন সুড়ঙ্গের মধ্যে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়তে। যদি কেউ এখনও ওখানে থাকে, তাকে বের করে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবেন তিনি।
সঙ্গে সঙ্গে সেলগুলি ছোঁড়া হল। ধোঁয়া বাইরে বেরিয়ে আসছে দেখে সরে এলেন ভার্গিস। একজন অফিসার বলল, ‘স্যার, রাস্তার পাইপ থেকে কানেকশন নিয়ে সুড়ঙ্গটা জলে ভরে দেব?’
ভার্গিস মাথা নাড়লেন, ‘তাতে সোনার চাঁদ তুমি কি পাবে? ভেতরে কেউ থাকলে দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে? সেই ডেডবডি তোমার কোনও প্রশ্নের জবাব দেবে? আমি জ্যান্ত চাই লোকগুলোকে। মাস্ক পরে শেল ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগোও। ওরা বাধ্য হবে উল্টো দিক থেকে বেরিয়ে আসতে। কাজটা ওই দিক দিয়ে শুরু করো, আমরা এখানে ওদের অভ্যর্থনা জানাব।’
মিনিট তিনেকের মধ্যে আর্তনাদ শোনা গেল। এক একটা মাথা কবরের গর্তে বেরিয়ে আসামাত্র রাইফেলের বাঁটের আঘাত পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। তাদের টেনে ওপরে তোলা হচ্ছে। শুইয়ে দেওয়া হচ্ছে পাশাপাশি। যখন নিঃসন্দেহ হওয়া গেল আর কেউ নীচে নেই, যখন শূন্য কফিনটাকেও ওপরে নিয়ে আসা হয়েছে তখন ভার্গিস লোকগুলোর সামনে পিয়ে দাঁড়ালেন। বেশির ভাগ মানুষ তাঁর পরিচিত নয়, শুধু একজনকে তিনি এদের মধ্যে দেখতে পাবেন আশা করেননি। ডেভিড। এই হতচ্ছাড়া আকাশলালের সাকরেদ ছিল। নিশ্চয়ই ডেডবডি সরাবার দায়িত্ব নিয়েছিল লোকটা। কিন্তু কেন? অঘাত পেয়ে ওর মাথার পাশ দিয়ে রক্ত ঝরছে। চোখ বন্ধ কিন্তু মরে যাওয়ার মতো আহত হয়নি।
ভার্গিস বললেন, ‘একে আমার চাই। ডাক্তারকে বলো আধঘণ্টার মধ্যে একে কথা বলার মতো অবস্থায় এনে দিতে। বি কুইক।’
সঙ্গে সঙ্গে ডেভিডের জ্ঞানহীন শরীরটাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল বাইরে অপেক্ষমাণ একটি জিপের কাছে। ঝকিদের পাইকারি হারে তোলা হতে লাগল ভ্যানে।
আধঘণ্টার চার মিনিট পরে ডেভিডকে হাজির করা হল ভার্গিসের চেম্বারে। সে যে এখনও সুস্থ নয় তার মুখচোখ এবং হাঁটার ভঙ্গি বলে দিচ্ছিল।
ভার্গিস বসে ছিলেন বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে। তাঁর হাতের চুরুট আপনাআপনি জ্বলে যাচ্ছিল। গত মিনিট দশেক তাঁকে একটার পর একটা কৈফিয়ত দিতে হয়েছে মিনিস্টারের কাছে। লোকটা আজ তাঁর সঙ্গে শকুনের মতো ব্যবহার করছে। আকাশলালের মৃতদেহ খুঁজে বের করতে বারোটা ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে তাঁকে। ফোন রেখেই ভার্গিস ম্যাডামকে টেলিফোনে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। ফোন বেজে গিয়েছে, ম্যাডাম বাড়িতে নেই। মিনিস্টারের চেয়ারটা তাঁর খুব কাছে চলে এসেছিল। হাত বাড়ালেই যেন ছুঁতে পারতেন। আকাশলাল মরে গিয়ে সেটাকে অনেক দূরে সরিয়ে দিল। এখন ওর ডেডবডি খুঁজে না পাওয়া গেলে— একমাত্র ম্যাডামই তাঁকে বাঁচাতে পারেন বলে ভার্গিসের বিশ্বাস। হঠাৎ ডেভিডের দিকে তাকিয়ে ওঁর মনে হল, এই লোকটাও পারে, এ যদি আকাশলালের হদিশ তাকে দিয়ে দেয় তাহলে তিনি লড়তে পারবেন।
ভার্গিস চোখ বন্ধ করলেন। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। তারপর হাসলেন, ‘আমি যদি ঘটনাস্থলে না থাকতাম তাহলে এতক্ষণে আপনার কবরের ব্যবস্থা করতে হত। আমার লোকগুলোর মাথা এত মোটা যে কি বলব! ওরা সুড়ঙ্গের ভেতরে জল ঢুকিয়ে আপনাদের ডুবিয়ে মারার পরিকল্পনা করেছিল। আপনি ভাগ্যবান।’
ডেভিডের মাথা ঝিমঝিম করছিল, শরীর গোলাচ্ছিল। পুলিশ কমিশনার ভার্গিসকে চিনতে তার কোনও অসুবিধে হয়নি। এই লোকটার মুখে হাসি কেন?
‘আমার পরিচয়টা আপনাকে দেওয়া হয়নি। আমি ভার্গিস।’
ডেভিড চুপ করে থাকল। ওরা এখন কি করছে? ত্রিভুবন কি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ফিরে যেতে পেরেছে। ওই কবরটা যদি ধসে না পড়ত!
‘মিস্টার ডেভিড! আমি চাই আপনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুন। আমাদের খাতায় আপনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে সেগুলোও আমি ভুলে যেতে চাই। কিন্তু আমি চাইলেই তো সেটা সম্ভব হবে না, আপনাকেও সেটা চাইতে হবে। এখন বলুন, সেটা আপনি কি চান?’ ভার্গিস বেল টিপলেন।
ডেভিড চেয়ারে ধীরে ধীরে মাথা রাখল। তার মাথার অনেকখানি এখন ব্যাণ্ডেজের আড়ালে। মাথার ভেতরটা টনটন করে উঠল। ভার্গিস কি চাইছে?
একজন বেয়ারা ঢুকল, ঢুকে স্যালুট করল। ভার্গিস বললেন, ‘দুটো কফি!’ লোকটা মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল। ভার্গিস একটা ফাইল টেনে নিয়ে মন দিয়ে কাগজপত্র দেখতে লাগলেন। তিনি যে ডেভিডকে প্রশ্ন করেছেন, উত্তরের অপেক্ষা করছেন সে-ব্যাপারে কোনও আগ্রহ এই মুহূর্তে তাঁর আছে বলে মনে হল না।
ডেভিড উশখুশ করতে লাগল। শেষপর্যন্ত, জিজ্ঞাসা না করে পারল না, ‘আপনি কি চান?’ ফাইল থেকে মুখ তুললেন না ভার্গিস। ‘আগে কফি খান তারপর কথা।’
ডেভিড ঘরটি দেখল। এই ঘরের কথা সে আগেই শুনেছে। হেডকোয়ার্টার্সের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা এটি। এখন আর কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। সুড়ঙ্গের মধ্যে যখন বুঝতে পেরেছিল তারা ধরা পড়ে গিয়েছে তখন মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করার কথা। ধরা পড়ে ওদের হাতে গেলে কি ঘটতে পারে তা তার অজানা নয়। তবু মনে হয়েছিল বন্ধুরা হয়তো শেষ মুহূর্তে একটা চেষ্টা করতে পারে যা থেকে বাঁচার উপায় হবে। তাছাড়া আজ সুড়ঙ্গের মধ্যে শুয়ে নিজেকে খুন করতে তার ভারী মায়া লেগেছিল। এখন পুলিশ কমিশনার তার সঙ্গে যে ব্যবহার করছে তা সে মোটেই আশা করেনি। লোকটার এত ভদ্রতা যে নিছকই মুখোশ তা না বোঝার মতো মূর্খ সে নয়। কিন্তু কেন করছে লোকটা?
কাফ এল। ডেভিডের সামনে কাপডিস রাখা হলে ভার্গিস বললেন, ‘নিন, খেয়ে দেখুন। এরকম কফি শহরের কোথাও পাবেন না। আচ্ছা, আপনি কখনও কোনও কফির বাগানে গিয়েছেন? এক্সপেরিয়েন্স আছে?’
‘না।’ বলল ডেভিড।
‘আমিও যাইনি। নিন, কাপ তুলুন।’
ডেভিড কফির কাপে চুমুক দিতেই একটা মোলায়েম আরাম টের পেল। শরীরের এই চাহিদাটার কথা যেন ভার্গিস জানত। কফি খেতে খেতে সে যতবারই চোখ তুলেছে ততবারই দেখেছে ভার্গিস তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কোনও কথা বলছে না লোকটা। সে পেয়ালা শেষ করে বলল, ‘ধন্যবাদ।’
‘শব্দটা আমি উচ্চারণ করতে পারলে খুশি হব।’
‘তার মানে?’
‘আপনাকে আমি একটি প্রশ্ন করেছিলাম। আপনি দীর্ঘজীবন চান কি না?’
‘কে না চায়!’
‘আপনি?’
‘হ্যাঁ, আমিও।’
‘ধন্যবাদ মিস্টার ডেভিড।’ ভার্গিস সামান্য ঝুঁকলেন, ‘কিন্তু আপনাকে আমি এই রাজ্যে থাকতে দিতে পারছি না। আমার লোক আপনাকে সীমান্তে ছেড়ে দিয়ে আসবে। সেখান থেকে আপনি ইন্ডিয়ার যে কোনও বড় শহরে চলে যেতে পারেন। আমরা যদি না চাই তাহলে ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট আপনাকে কখনও বিরক্ত করবেন না। আপনি দীর্ঘ জীবন সেখানেই বাস করতে পারবেন। আপনার বয়স বেশি নয়, বিয়ে থা করে সংসারী হবার সময় এখনও আছে।
ডেভিড ঠোঁট কামড়াল।
ভার্গিস বললেন, ‘এ সবই সম্ভব হবে যদি আপনি আমার সঙ্গে হাত মেলান। আমি আপনাকে ছোট ছোট কয়েকটা প্রশ্ন করব, আপনি তার ঠিকঠাক জবাব দেবেন। ব্যস, আমার কথা আমি রাখব।’
‘আপনি কি প্রশ্ন করবেন?’
‘গুড। প্রথম প্রশ্ন, সুড়ঙ্গটা কেন খুঁড়েছিলেন?’
‘সেটা বুঝতে কি এখনও আপনার অসুবিধে হচ্ছে?’
ভার্গিস থমকে গেলেন। নিজেকে সামলালেন, ‘প্রশ্ন আমি করব, আপনি নন।’
ডেভিস হঠাৎ সাহসী হল, ‘আরে! সুড়ঙ্গ খুঁড়ে কবরের কাছে কেন পৌঁছেছিলাম সেটা কি বুঝতে কারও অসুবিধে হয়েছে? যে কেউ বুঝবে।’
আমি নির্বোধ তাই বুঝিনি। ঠিক আছে, আরও আগে থেকে প্রশ্ন করছি। ওই সুড়ঙ্গ খোঁড়া শুরু হয় কবে থেকে?’ চুরুট নামিয়ে রাখলেন ভাসি অ্যাসট্রের কানায়।
ডেভিডের শরীর শিরশির করে উঠল। এইবার ভার্গিস জাল গোটাতে শুরু করেছে। হয় তাকে সব কথা বলে দিতে হবে নয়—! জ্ঞান ফিরে আসার পরই মনে হয়েছিল তার ওপর অত্যাচারের বন্যা বইবে। এখনও সেটা হয়নি কারণ ভার্গিস তাকে বিশ্বাসঘাতক হবার সুযোগ দিচ্ছে। যে মুহূর্তে লোকটা বুঝবে মিষ্টি কথায় কাজ হবে না, তখনই নির্মম হয়ে উঠবে। ও ইচ্ছে করলে তাকে সারাজীবন জেলে পচিয়ে মেরে ফেলতে পারে, ফাঁসিতে ঝোলাতে একটুও সময় নেবে না। সে কি করবে? আধা সত্যি বলে সময় নেবে? সময় নিয়েই বা কি হবে? আধা সত্যি ধরা পড়ামাত্র ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। কি করা উচিত। একজন বিপ্লবীর এই অবস্থায় অত্যাচার সহ্য করে মারা যাওয়াটাই নিয়ম। ডেভিড দেখল ভার্গিস তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। সে জবাব দিল, ‘কয়েকদিন হল।’
‘কয়েকদিন। তার মানে আকাশমাল ধরা পড়ার আগেই। তাই তো?’
‘সেরকমই দাঁড়ায়।’
‘মিস্টার ডেভিড, আমি বাঁকা কথা একদম পছন্দ করি না। আর আমার পছন্দের ওপর আপনার ইন্ডিয়ায় যাওয়া নির্ভর করছে। হ্যাঁ, আকাশলাল মারা যাওয়ার আগেই, অর্থাৎ সে যখন আপনাদের সঙ্গে ছিল তখনই ওই সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছিল। আপনারা কি করে জানতেন যে সে মারা যাবে; তার ডেডবডি কবর থেকে বের করতে হবে?’
‘আকাশলালই ব্যাপারটার পরিকল্পনা করেছিল।’
‘আপনারা কারণ জানতে চাননি?’
‘তার ধারণা ছিল আপনারা ওকে মেরে ফেলবেন।’
ভার্গিস হাসলেন। ‘লোকটাকে নির্বোধ ভাবার মতো নিবোধ আমি নই। আকাশলাল নিশ্চয়ই জানত আমরা ওর বিচার করব। বিচারটা সাতদিনেও শেষ হতে পারে, সাতমাসও লাগতে পারে। বিচারের শেষে হয়তো ওর মৃত্যুদণ্ড হত। কিন্তু ততদিন ধরে একটা চওড়া রাজপথের নীচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে রাখার বোকামি সে করত না। সে মারা গেলে কবরের মাটি তোলার সময়েই তো ওই সুড়ঙ্গটাকে আমার পেয়ে যেতে পারতাম। না মিস্টার ডেভিড, আপনার এই মিথ্যাভাষণ আমার পছন্দ হচ্ছে না। আপনি সত্যি কথা বলুন।’
‘আমাকে হুকুম দেওয়া হয়েছে, আমি আদেশ পালন করেছি মাত্র।’
‘তার মানে আপনিও জানতেন না আকাশলাল ধরা পড়ার কিছু সময় পরেই মারা যাবে। খুব ভাল কথা। আকাশলালের মৃতদেহটা কোথায় পাঠিয়েছেন?’
মাথা নাড়ল ডেভিড, ‘সেটা আমার জানা নেই।’
ভার্গিসের মুখটা যেন আরও বড় হয়ে গেল, ‘আমার ধৈর্য বড় কম। একবার আপনার শরীরে হাত দিলে এতক্ষণ যে প্রস্তাব দিয়েছি তা আর মনে রাখা দরকার বলে ভাবব না।’
‘আপনি আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করতে বলছেন।’
‘বিশ্বাসঘাতকতা? কার বিরুদ্ধে? নিজের দেশকে বিপন্ন করে বাইরের শক্তির সঙ্গে হাত মেলানো বিশ্বাসঘাতকতা নয়?’ ভার্গিস হাত নাড়লেন, নেমে এলেন আপনি থেকে তুমিতে, ‘তোমার সঙ্গে এসব আলোচনা করে সময় নষ্ট করব না। আকাশলাল মরেছে কিন্তু কিছু রহস্য রেখে গেছে। বাকি যারা আছে তাদের খুঁজে বের করতে আমার বেশি সময় লাগবে না। এই যে তুমি, তোমাকে আমি সুড়ঙ্গের মধ্যেই মেরে ফেলতে পারতাম। মারিনি কিন্তু তার জন্যে কৃতজ্ঞতাবোধও তোমার নেই।’
ডেভিডকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। শেষপর্যন্ত সে মাথা নাড়ল, ‘আমি জানি না।’
ভার্গিস আর সময় নষ্ট করলেন না। হেডকোয়ার্টার্সের সবচেয়ে নির্মম পুলিশ অফিসারকে ডেকে পাঠালেন তিনি ফোন তুলে। নামটা কানে যাওয়ামাত্র কেঁপে উঠল ডেভিড। এর কথা সে অনেকবার শুনেছে। কয়েদিদের ওপর অত্যাচার করার ব্যাপারে এর কোনও জুড়ি নেই। আজ পর্যন্ত মুখ খোলানোর কাজে লোকটা কখনওই বিফল হয়নি। কিন্তু ওদের দুর্ভাগ্য যাদের ধরেছিল তারা দলের খুব সামান্য খবরই জানত।
ডেভিড সোজা হয়ে বসল, ‘আপনি আর একটা ভুল করছেন!’
ভার্গিস কথা না বলে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন।
‘আমি যদি মুখ খুলতে না চাই তাহলে আমার মৃতদেহকে দিয়ে আপনাকে কথা বলাতে হবে। সেটা পারবেন কি না জানি না।’ ডেভিড হাসার চেষ্টা করল।
‘তুমি বেঁচে আছ না মরে গেছ তা নিয়ে আর আমার ভাবনা নেই। মরেই যদি যাবে তাহলে তার আগে আমার লোক শেষ চেষ্টা করুক।’ নির্লিপ্ত গলায় বললেন ভার্গিস, আমি এত কথা কারও সঙ্গে বলি না। যথেষ্ট ভদ্র ব্যবহার করেছি।’
দরজায় শব্দ হতেই ভার্গিস হাঁকলেন, ‘কাম.ইন।’
বেঁটেখাটো চেহারার, প্রায় নেংটি ইঁদুরের মতো একটি লোক ঘরে ঢুকে স্যালুট করল। ভার্গিস বললেন, ‘এই লোকটি মুখ খুলবে কি না জানতে তিনঘণ্টা সময় নেবে। যদি প্রথম আড়াই ঘণ্টায় মুখ না খোলে তাহলে শেষ আধঘণ্টা তোমাকে দিলাম। ডেডবডি পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়া হবে।’
বেল টিপলেন ভার্গিস। বেয়ারা ঘরে ঢোকামাত্র ইশারায় ডেভিডকে নিয়ে যেতে বললেন তিনি। বেঁটে লোকটি দ্বিতীয়বার স্যালুট করামাত্রই টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলে হ্যালো বলতেই ম্যাডামের গলা শুনতে পেয়ে সোজা হয়ে বসলেন ভার্গিস, ‘ইয়েস ম্যাডাম।’
‘আপনি একটার পর একটা ভুল করছেন।’
‘আমি ঠিক, আসলে ডেডবডির জন্যে ওরা এমন কাজ করবে— ।’ বিড় বিড় করলেন ভার্গিস।
‘ডেডবড়ি কোথায়?’
‘এখনই বের করে ফেলব। আকাশলালের ডান হাত ডেভিডকে আমি ধরেছি। সোজা কথায় কাজ না হওয়ায় টর্চার সেলে পাঠাচ্ছি। ও মুখ খুলবেই।’
‘আর একটা ভুল করতে যাচ্ছেন। টর্চার করে কোনও লাভ হবে না। কথা বের করতে হলে অন্য উপায় খুঁজতে হবে। অবশ্য আপনার যা ইচ্ছে— ।’
‘না ম্যাডাম। আমার মনে হচ্ছে আপনিই ঠিক।’
‘তাহলে ওকে বসন্তলালের বাংলোয় নিয়ে আসুন। ব্যাপারটা যত কম জানাজানি হয় তত ভাল। মিনিস্টার তো আপনাকে আলটিমেটাম দিয়ে দিয়েছেন।’
‘হ্যাঁ ম্যাডাম।’
লাইন কেটে যেতেই ভার্গিস চিৎকার করলেন, ‘হেই দাঁড়াও।’
ওরা তখন ডেভিডকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল বাইরে। ভার্গিসের চিৎকার শুনে হকচকিয়ে গেল। ভার্গিস গলা নামালেন, ‘যে যার ডিউটিতে চলে যাও। এভরিবডি। ওকে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। গেট আউট।’
বিস্মিত লোকগুলো এবং বেঁটে মানুষটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাওয়ার পর ভার্গিস ডেভিডকে চেয়ারটা দেখিয়ে দিল, ‘দয়া করে হেঁটে এসে ওখানে বোসো। তোমার জীবনের আয়ু আমি আর একটু বাড়িয়ে দিলাম।’
২৫. দুটো গাড়ি ছুটে যাচ্ছিল
এখন দুপুর। দুটো গাড়ি ছুটে যাচ্ছিল শহর থেকে পাহাড়ি পথ ধরে। প্রথমটি জিপ। সামনের আসনে ড্রাইভারের পাশে ভার্গিস চুরুট মুখে। অত্যন্ত বিরক্ত এবং সেইসঙ্গে চিন্তিত। পেছনে আসছিল পুলিশের ভ্যান। সেখানে আটজন পুলিশের মাঝখানে ডেভিড রয়েছে। ভ্যানের বাইরে থেকে আরোহীদের বোঝা যাচ্ছিল না।
ভার্গিসের বিরক্তি এইভাবে শহরের বাইরে আসতে হচ্ছে বলে। কদিন থেকে বিশ্রাম শব্দটাকে তিনি প্রায় ভুলতেই বসেছেন। সেটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না এখন। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিল এইসময় শহরে থাকা দরকার। অ্যাম্বুলেন্সটার খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু তার ড্রাইভার এবং অফিস জানিয়েছে লেডি প্রধান অসুস্থ খবর আসায় অ্যাম্বুলেন্সটি রাস্তায় বেরিয়েছিল। বৃদ্ধা মহিলা অসুস্থ হতেই পারেন এবং হয়েছেন। তার প্রমাণও বেরোবার আগে তিনি পেয়েছেন। অতএব অ্যাম্বুলেন্সটিকে নিয়ে বেশি দূর ভাবা যাচ্ছে না। হঠাৎ ভার্গিসের খেয়াল হল, লেডি প্রধানের মতো বিত্তশালিনী বৃদ্ধা হাসপাতালে যাওয়ার জন্যে কেন অ্যাম্বুলেন্সকে তলব করবেন? তাঁর নিজের গাড়িই তো রয়েছে। বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলা দরকার। ওঁর বাড়ির লোকদের জেরা করলে জানা যাবে সত্যি কেউ অ্যাম্বুলেন্সের জন্যে ফোন করেছিল কিনা! ভার্গিস তৎক্ষণাৎ হেডকোয়ার্টার্সের সঙ্গে ওয়ারলেসে যোগাযোগ করে এই তদন্তটি করে ফেলার নির্দেশ দিলেন। সময় বেরিয়ে যাচ্ছে। অথচ ডেডবডির কোনও পাত্তা নেই।
ডেভিডকে নিজের গাড়িতে নিয়ে আসা হয়তো উচিত ছিল কিন্তু ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। কে বলতে পারে ওর বন্ধুরা শহরের বাইরে তার ওপর চড়াও হতে চেষ্টা করবে না। অবশ্য ভ্যানটাকে তিনি বাংলোর বেশ কিছুটা দূরেই রেখে দেবেন।
চিন্তাটা অন্য কারণে। বাবু বসন্তলালের বাংলোয় ডেভিডকে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন ম্যাডাম। কেন? তালেগোলে ওখানকার কথা মাথায় ছিল না ভার্গিসের। সেই সার্জেন্ট আর চৌকিদারটা এখনও বাংলোতেই আছে। বাবু বসলালের খুনি চৌকিদারটাকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে তাঁকে। ম্যাডাম জানেন লোকটা পলাতক। ওকে কিছুতেই ম্যাডামের সামনে আসতে দেওয়া যাবে না। মিনিস্টারকে যেমন ম্যাডাম আটকাতে পারেন ঠিক তেমনি ম্যাডামের ওঝা হবে ওই চৌকিদারটি। হেডকোয়ার্টার্স থেকে বের হবার আগে তিনি নিজস্ব টেলিফোনে কয়েকবার চেষ্টা করেছেন বাংলোর সার্জেন্টকে ধরতে। ওখানে সমানে রিং হয়ে গিয়েছে। কেউ রিসিভার তোলেনি।
মূল রাস্তা ছেড়ে গাড়ি দুটো প্রাইভেট লেখা পথটায় ঢুকল। খানিকটা যাওয়ার পর বাঁক নেবার মুখে ভার্গিসের নির্দেশে তারা থামল। ভার্গিস চারপাশে দেখে নিলেন। কোথাও কোনও শব্দ নেই। হাওয়ারা গাছের পাতায় ঢেউ তুলে যাচ্ছে সমানে। পাহাড়ের এই সৌন্দর্য দেখার মন বা সময় ভার্গিসের নেই। তিনি চিতাটার কথা মনে করলেন। এই দিনদুপুরে নিশ্চয়ই সেটা এখানে অপেক্ষা করবে না আক্রমণের জন্যে।
ভার্গিস হেঁটে ভ্যানের সামনে পৌঁছালেন। আদেশ দিলেন বন্দিকে নামিয়ে দিতে। ডেভিডকে নামানো হল। ওর হাতকড়ার দিকে একবার তাকালেন তিনি। ওটা থাক। ঝুঁকি নেবার কোনও মানে হয় না। সবাইকে ওখানেই অপেক্ষা করতে বলে ডেভিডকে জিপে তুলে ড্রাইভারকে সরিয়ে নিজেই স্টিয়ারিং-এ বসলেন। ডেভিডের মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছিল। ব্যান্ডেজে ইতিমধ্যে লাল ছোপ এসেছে। সে ভার্গিসকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?’
‘গেলেই দেখতে পাবে। এতক্ষণে তোমার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে নেবার কথা। কপাল করে জন্মেছিলে বলে আমার পাশে বসে যেতে পারছ।’ ভার্গিস চুরুট চিবোলেন।
ডানদিকে বাঁক ঘুরতেই জিপ চালাতে চালাতেই ব্রেকে পা দিলেন ভার্গিস। তার বুক ধক করে উঠল। নীচে ঢালু পথটার শেষের মাঠের গায়ে বাংলোর সামনে একটা সাদা টয়োটা দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে ম্যাডাম ইতিমধ্যেই এখানে পৌঁছে গিয়েছেন। থুক্ করে থুতু ফেলতেই ভার্গিসের মুখ থেকে চুরুটটা ছিটকে বাইরে গিয়ে পড়ল। সর্বনাশ হয়ে গেল। এখন যা হবার তাই হবে। ম্যাডাম নিশ্চয়ই সাতসকালে এখানে এসে এখান থেকেই তাঁকে টেলিফোন করেছিলেন। তিনি যখন সার্জেন্টকে টেলিফোনে খুঁজেছেন তখন ওঁর নির্দেশেই কেউ রিসিভার তোলেনি। অথাৎ ওঁকে লুকিয়ে চৌকিদারকে পাহারা দেবার জন্যে যে তিনি এখানে একজন সার্জেন্টকে পাঠিয়েছেন তা ইতিমধ্যে ম্যাডাম জেনে গেছেন।
‘ভার্গিস ধীরে ধীরে বাংলোর সামনে জিপটা রাখতেই ম্যাডামকে দেখতে পেলেন। ওপাশে একটা বেতের চেয়ারে বসে আছেন টেবিলে দুই পা তুলে। চোখে বড় সানগ্লাস। গাড়ির শব্দে চোখ ফেরালেন না। ভার্গিস জানেন ম্যাডাম এখানে একা আসেননি। ওঁর দেহরক্ষী কাম ড্রাইভার নিশ্চয়ই ধারে-কাছে আছে।
ভার্গিস জিপ থেকে নেমে কাছে এগিয়ে গেলেন, ‘গুড আফটারনুন ম্যাডাম!’
ম্যাডামের মাথা ঈষৎ নড়ল। পা না সরিয়ে তিনি বললেন, ‘বসন্তলালের পছন্দ ছিল। জায়গাটা দারুণ!’
ভার্গিস কি বলবেন ভেবে পেলেন না। এই সময়ে জায়গার তারিফ করা কেন? তিনি মুখ ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন চারপাশ। সার্জেন্ট কিংবা চৌকিদারটাকে দেখা যাচ্ছে না। ম্যাডাম কি বাংলোর ভেতরে ঢুকেছেন? বারান্দার ওপাশে দরজাগুলো এখন বন্ধ।
‘আপনি অবশ্য এসব কোনও দিন বুঝলেন না।’ ম্যাডাম পা নামালেন। চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘মিস্টার ভার্গিস, আপনার জীবনে শুনেছি কখনওই রোমান্স আসেনি!’
ভার্গিসের গলা বুজে এল, ‘আসলে, ম্যাডাম, সার্ভিসে ঢুকেছিলাম অল্প বয়সে। এটাই মন দিয়ে করতে করতে কখন যে বয়স হয়ে গেল তা বুঝতে পারিনি।’
‘কত বয়স আপনার?’
‘ফিফটি ফোর।’
‘বোম্বেতে শুনেছি ওই বয়সের অভিনেতা নায়ক হয়। আপনি শোনেননি?’
‘আমি মানে, ফিল্ম সম্পর্কে কিছুই জানি না।’ ভার্গিস স্বীকার করলেন।
‘আকাশলালকে ওরা কবর থেকে তুলে কিভাবে সরাল?’
হঠাৎই ম্যাডাম কাজের কথায় চলে আসায় ভার্গিস সোজা হলেন, ‘আমরা সন্দেহ করেছিলাম অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কারফিউ-এর সময় অন্য গাড়িকে রাস্তায় অ্যালাউ করা হয় না।’
‘শহরে যে-কটা অ্যাম্বুলেন্স আছে খোঁজ নিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ। যে অ্যাম্বুলেন্সটিকে আটকানো হয়েছিল সেটা নাকি লেডি প্রধানের কল পেয়ে গিয়েছিল। ভদ্রমহিলা খুবই অসুস্থ।’
‘লেডি অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে যাবেন, এটা ভাবতে পারেন?’
‘না ম্যাডাম। কিন্তু লেডির সঙ্গে কথা বলা যাবে না এখন। ওঁর বাড়ির লোকদের জেরা করার অর্ডার দিয়ে এসেছি।’
‘গুড। লোকটাকে এনেছেন?’
‘হ্যাঁ। আমার জিপে আছে।’
‘নিয়ে আসুন এখানে।’
ভার্গিস ফিরে গেলেন জিপের পাশে। ডেভিডকে হুকুম করলেন নেমে আসতে। ডেভিড ভদ্রমহিলাকে লক্ষ করছিল। এখানে তাকে কেন নিয়ে আসা হয়েছে তা সে বুঝতে পারছিল না।
ডেভিড কাছে যেতেই ম্যাডাম উঠে দাঁড়ালেন, ‘হ্যালো! আপনি ডেভিড?’
‘হ্যাঁ।’
‘বসুন। মিস্টার ভার্গিস, আমরা কি কথা বলতে পারি?’
‘অ্যাঁ?’ ভার্গিস প্রথমে বুঝতে পারেননি।’
‘আমরা একটু কথা বলতে চাই। আপনি ততক্ষণে জায়গাটাকে দেখুন। বলা যায় না এই ফিফটি ফোরেও নতুন করে সব কিছু শুরু করতে পারেন।’ ম্যাডাম শব্দ করে হাসলেন।
অর্থাৎ ওঁকে সরে যেতে বলা হচ্ছে। এটা বেআইনি। ম্যাডাম সরকারের কেউ নন। তাঁর সঙ্গে এত বড় অপরাধীকে একা রেখে যাওয়ার জন্যে তাঁকে জবাবদিহি দিতে হতে পারে। কিন্তু একথাও ঠিক, ম্যাডাম ছাড়া তাঁর কোনও অবলম্বন নেই। ভার্গিসের মনে হল তাঁর সামনে একটা সুযোগ এসেছে। হাতকড়া থাকায় ডেভিডের পক্ষে পালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু তিনি এই ফাঁকে বাংলোটাকে সার্ভে করে নিতে পারেন। যদি সার্জেন্ট চৌকিদারকে নিয়ে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে তাহলে তাদের সরাবার ব্যাবস্থা করতে পারবেন।
ভার্গিস হাঁটতে শুরু করলে ম্যাডাম বললেন, আপনাকে বসতে বলেছি।’
ডেভিড বসল। এতক্ষণে সে ভদ্রমহিলাকে চিনতে পেরেছে। এই রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাবতী মহিলা। এঁর আঙুলের ইশারায় সব কিছু হতে পারে।
ম্যাডাম চেয়ারে বসে বললেন, ‘আকাশলালকে নিয়ে গিয়ে কি করবেন?’
‘আমি জানি না।’
‘আমি জানি।’
‘তার মানে?’
‘কোনও মৃত মানুষকে নতুন করে কবর দেবার জন্যে কেউ এমন ঝুঁকি নেয় না।’
‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না।’
‘ঠিক আছে, আপনি চাইলে আমি বুঝিয়ে দেব। তার আগে বলুন আমাদের মধ্যে কি ধরনের সম্পর্ক হবে? আপনি আমার বন্ধুত্ব চান?’ ঠোঁটের কোণে মদির ভাঁজ ফেললেন ম্যাডাম। ধরা পড়ার পর থেকে এতক্ষণ যেভাবে কেটেছে, এই মুহূর্তটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ওই হাসিটি ডেভিডকে বেশ নাড়া দিল। তবু সে বলল, ‘বন্ধুত্ব সমানে সমানে হয়।’
‘ঠিক কথা। আর হয় নারী এবং পুরুষে। তাই না?’ এবার হাসিটা আরও একটু জোরে।
বাংলোর বারান্দায় উঠেও সেই হাসি শুনতে পেলেন ভার্গিস। মেয়েমানুষটার মতলব কি? এত হাসি ওরকম একটা দেশদ্রোহীর সঙ্গে কিভাবে হাসছে? মানুষ যদি হাসি শুনেই পেটের সব কথা উগরে দিত তাহলে টরচার-শেল তুলে দিতে হত বাহিনী থেকে।
ভাঙা কাচের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন ভার্গিস। চাপ দিলেন কিন্তু ওটা খুলল না। অতএব ভাঙা জায়গা দিয়ে হাত ঢোকাতে ছিটকিনি পেয়ে গেলেন। যে কেউ বাইরে এসে এইভাবে দরজা বন্ধ করে চলে যেতে পারে। ভার্গিস ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন। লনের দুটো মানুষ এখন নিজেদের কথা নিয়ে ব্যস্ত। তিনি দরজাটা ভেতরে ঢুকেই বন্ধ করে দিলেন।
বাইরে তবু হাওয়ার শব্দ ছিল, ভেতরে কোনও আওয়াজ নেই। ভার্গিস জানেন ওরা এখানেই লুকিয়ে আছে। হয়তো ম্যাডাম এসেছেন বলেই সামনে আসতে পারছে না। তিনি চাপা গলায় ডাকলেন, ‘অফিসার!’ কেউ সাড়া দিল না।
ভার্গিস ধীরে ধীরে ঘরটি অতিক্রম করলেন। জানলাগুলোর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর চোখ বাইরে লক্ষ করছিল। ম্যাডাম এবং ডেভিড কথা বলছে। ভার্গিস হাসলেন। ম্যাডামের শরীরে এখনও ওই কিসব বলে, সেসব আছে। কিন্তু লনের চেয়ারে বসে কথা বললে ডেভিড কতটা কাত হবে?
দ্বিতীয় ঘরটি ডাইনিং কাম স্টোর রুম। লুকোবোর জায়গা নেই। তৃতীয় ঘরটিতে একটা ন্যাড়া তোশক রয়েছে খাটের ওপরে। ঘরটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। অ্যাসট্রেতে প্রচুর সস্তার সিগারেটের অবশিষ্ট। ঘরের একপাশে টেবিল চেয়ার। ভার্গিস টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন। কয়েকটা পেপারওয়েট আর একটা কলমদানি ছাড়া টেবিলে কিছু নেই। লোক দুটো গেল কোথায়? ম্যাডামকে দেখে জঙ্গলে পালিয়ে যায়নি তো? যেতে পারত যদি সার্জেন্ট একা থাকত। চৌকিদারটা তো সহজে যেতে চাইবে না। ওর মস্তিষ্ক ঠি্কঠাক নেই। ভার্গিস ড্রয়ার টানলেন। কয়েকটা কাগজ, একটা ডটপেন এবং হাতঘড়ি চোখে পড়ল। ঘড়িটাকে তুলে নিলেন ভার্গিস। ঠিক সময় দিচ্ছে। সাধারণ ঘড়ি, নিত্য দম না দিলে যে ঘড়ি বন্ধ হয়ে যায় এটি সেই রকমের। ব্যান্ড চামড়ার। নাকের কাছে ধরতে ঘামের গন্ধ পেলেন। এবং তার পরই খেয়াল হল গতবছর বাহিনীর সব পুলিশ অফিসারকে বোর্ড একটা করে হাতঘড়ি দিয়েছিল। ওপরের অফিসাররা দামি ঘড়ি পেয়েছিলেন। নীচের তলায় এইরকম ঘড়ি দেওয়া হয়। অর্থাৎ ঘড়িটি এখানে সার্জেন্ট রেখেছে। দম দেওয়া হয়েছে গত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে। আর তার একটাই অর্থ সে এখানে ছিল এবং এখনও আছে। ভার্গিস চাপা গলায় ডাকলেন, ‘সার্জেন্ট!’
দরজা জানলা বন্ধ থাকায় নিজের গলা আরও মোটা এবং জড়ানো বলে মনে হল ভার্গিসের। ব্যাটা গেল কোথায়? তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ঘড়িটা পকেটে পুরে। এপাশে একটা ছোট দরজা। ঠেলাঠেলি করতে সেটাও খুলল। ভার্গিস দেখলেন নীচে সিঁড়ি চলে গেছে এবং নীচের তলায় আলো জ্বলছে। আচ্ছা। সার্জেন্টের লুকিয়ে থাকার জায়গা আবিষ্কার করে ভার্গিস খুশি হলেন। মাটির নীচের ঘরেই বাবু বসন্তলালের কফিন ছিল। নিজের রিভলভারটাকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে নিয়ে ভার্গিস তাঁর ভারী শরীর কাঠের সিঁড়িতে রাখলেন। ঠক্ ঠক্ শব্দ হচ্ছে। নীচের ঘরে বোটকা গন্ধ। তিনি নীচে নামামাত্র শব্দ হতে লাগল। একটা ছোট কাঠের টুকরো যেন পড়ে গেল। ভার্গিস রিভলভার বের করে ডাকলেন, ‘সার্জেন্ট। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ম্যাডাম এখনই চলে যাবেন। বেরিয়ে আসুন। কুইক।’
আর একটা আওয়াজ হল। ভার্গিস মুখ ফিরিয়ে দেখতে পেলেন দুটো ধাড়ি ইঁদুর ছুটে গেল পাশ দিয়ে। এত বড় ইঁদুর সচরাচর দেখা যায় না। তিনি কয়েক পা এগিয়ে ঘরটিকে দেখলেন। পুরনো আসবাব ডাঁই করে রাখা আছে এখানে। মাকড়সার জাল ছিল একসময়। এখন তার কিছু কিছু এখানে ওখানে ঝুলছে। টেবিলের ওপর একটা কফিন পড়ে আছে। এই কফিনটির কথা তিনি জানেন। বাবু বসন্তলালের মৃতদেহ মাটির নীচের ঘরে একটি কফিনে রাখা ছিল। মনে হচ্ছে এটিই সেই কফিন। তিনি এগিয়ে যেতেই কফিনের ভেতর থেকে স্রোতের মত ইঁদুরের দল বাইরে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়তে লাগল। ভার্গিসের মতো মানুষও একটু ভয় পেয়ে গেলেন কাণ্ড দেখে। রিভলভারের গুলি দিয়ে ইঁদুর মারার মতো কাজ যদি তাঁকে করতে হয় তাহলে লজ্জার শেষ থাকবে না। কিন্তু এদের কাণ্ড এবং সাহস দেখে সেটাই মনে হচ্ছে। ভার্গিস বুঝতে পারলেন কফিনে কিছু না থাকলে ওর ভেতর ইঁদুরদের আকর্ষণ থাকত না। তিনি আর একটু এগিয়ে মুখ নামাতে গিয়ে চমকে উঠলেন। সমস্ত শরীর থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। তাঁর মতো জাঁদরেল পুলিশ অফিসারের পেট গুলিয়ে উঠল দৃশ্যটা দেখে। দ্রুত, প্রায় ছিটকে সিঁড়ির কাছে চলে এলেন তিনি। নিজের শরীরটাকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে ওপরে তুলে এনে শোওয়ার ঘরের চেয়ারে ফেলে দিলেন। যদিও সাধারণ মানুষের চেয়ে তাঁর অনেক কম সময় লাগল সামলে নিতে, তবু দৃশ্যটা তিনি ভুলতে পারছিলেন না। সরকারি ইউনিফর্ম পরা সার্জেন্ট শুয়ে আছে কফিনের মধ্যে। চিত হয়ে। ইতিমধ্যেই ইঁদুরেরা ওর শরীরের খোলা জায়গা থেকে মাংস খুবলে নিয়েছে। প্রথম আক্রমণ ওরা করেছে চোখ এবং ঠোঁটের ওপর। চোখের গর্ত দুটো আর মুখের ভেতরে রক্তাক্ত গহ্বর দেখতে পেয়েছেন তিনি। হ্যাঁ, এখনও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চটচটে রক্ত রয়েছে। কালো জমাট হবার সময় পুরোটা পায়নি।
ভার্গিস উঠে দাঁড়ালেন। সার্জেন্টকে খুন করা হয়েছে। এবং ওই ঘটনা ঘটেছে আজ সকালের মধ্যেই। খুন করে কফিনে শুইয়ে দিয়েছে আততায়ী। এখনই হেডকোয়ার্টার্সে টেলিফোন করে এক্সপার্টদের এখানে আনা দরকার। তিনি পা ফেলে জানলার কাছে আসতেই তাঁর চোখ লনের ওপর গেল। ম্যাডাম কথা বলছেন। ডেভিডের মুখ নিচু।
সঙ্গে সঙ্গে ভার্গিসের খেয়াল হল। সার্জেন্ট কেন এখানে এসেছিল এই কৈফিয়ত যদি তাঁর কাছে চাওয়া হয় তাহলে তিনি কি জবাব দেবেন? ওকে তিনিই পাঠিয়েছিলেন এই বাংলোয় তা আর কি কেউ জানে? না। চটজলদি কিছু করার দরকার নেই। তিনি জানেন না, কিছুই দেখেননি। নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন ভার্গিস। কোনওভাবেই তিনি ম্যাডামের কাছে ধরা পড়তে রাজি নন।
কিন্তু এত বড় খুন করল কে? একটা আধাপাগল চৌকিদার এমন কাজ করবে তা তিনি বিশ্বাস করেন না। তাঁর মনে পড়ল সার্জেন্ট যখন চৌকিদারের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁকে টেলিফোন করেছিল তখন কিছু সাক্ষী থেকে গিয়েছিল। থাকগে। কিছু কিছু ব্যাপার উপেক্ষা করতেই হয়। কিন্তু খুনি কে? যে-ই হোক তাকে তিনি ছাড়বেন না কিছুতেই।
ভার্গিস সন্তর্পণে দরজা বন্ধ করে বারান্দায় পা রাখলেন। তাঁর কানে এল ম্যাডাম বলছেন, ‘ধরুন আমি যদি প্রচার করি আপনি আমার কাছে, পুলিশের কাছে সব কথা ফাঁস করে দিয়েছেন তাহলে আপনার দলের লোকেরা সেটা কি অবিশ্বাস করবে?’
‘হ্যাঁ, করবে।’
‘না। করবে না। আকাশলাল মারা যাওয়ার আগেই সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছিল। তার শরীর যখন কবর দেওয়া হচ্ছিল তখন আপনারা সুড়ঙ্গের মধ্যে ছিলেন। আমি বলব আপনি বলেছেন এই মৃত্যুটা সাজানো।’
‘না। আমি এই কথা বলিনি।’
‘বলেছেন। আকাশলাল তো নাও মারা যেতে পারে। যে ডাক্তারের সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভর করে ওকে কবর দেওয়া হয়েছিল সে মিথ্যা কথা বলতে পারে। এই কথাও আমি আপনার কাছ থেকে শুনেছি।’
ম্যাডামের কথা শেষ হওয়ামাত্র ডেভিড খুব নার্ভাস গলায় বলল, ‘এসব আপনি কি বলছেন! আমি এ কথাগুলো বলিনি।’
‘কিন্তু কথাগুলো সত্যি হতেও তো পারত।’
‘হয়তো।’
‘হয়তো নয়। আপনি বলুন, এটাই সত্যি।’
‘আপনি আমাকে এতক্ষণ যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা রাখবেন?’
‘অবশ্যই।’
‘বেশ। আমি যা জানি তার সঙ্গে আপনার অনুমানের মিল আছে।’
‘গুড। মিস্টার ভার্গিস। ডেভিডকে আমরা এখান থেকেই ছেড়ে দিতে পারি?’
‘তার মানে?’ ভার্গিসের গলা মিনমিনে।
‘ধরুন উনি এখান থেকে চলে যাওয়ার পর আপনি কি বলতে পারেন না যে পুলিশের ভ্যান থেকে পালিয়ে গেছেন। এমন তো কত আসামি পালায়। আপনি ওঁকে সময় দেবেন ইন্ডিয়ায় চলে যেতে। উনি যে সহযোগিতা করছেন তার বিনিময়ে এটুকু আমাদের করতেই হবে।’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’
‘আমরা অনুমান করছি আকাশলাল মারা যায়নি। ডাক্তার মিথ্যে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। ওঁরা জীবিত আকাশলালের জন্যেই সুড়ঙ্গ খুঁড়েছিলেন।’
‘অসম্ভব। ডাক্তারকে আমি চিনি। তাছাড়া আমি নিজে ডেডবডি দেখেছি। ম্যাডাম, আকাশলাল অত্যন্ত অসুস্থ ছিল। তার হৃদযন্ত্র বন্ধ ছিল না, পাল্স পাওয়া যায়নি। ওই অবস্থায় মাটির নীচে পাঁচ মিনিট থাকলেও, ধরে নিলাম ওকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল, ধরে নিয়ে বলছি, পাঁচ মিনিটও ওর পক্ষে মাটির নীচে থাকা সম্ভব নয়।’ তীব্র প্রতিবাদ করলেন ভার্গিস, এই লোকটা আপনাকে আষাঢ়ে গল্প শোনাচ্ছিল।’
‘গল্পটা আষাঢ়ে কিনা সেটার প্রমাণ আমরা শিগ্গির পাব। মিস্টার ডেভিড, আপনি ইন্ডিয়ায় চলে যাওয়ার পরেই আমরা আকাশলালকে অ্যারেস্ট করব।’
‘আকাশলাল? তাকে আমরা কোথায় পাচ্ছি?’ ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন।
কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন ম্যাডাম। তাঁর চোখে বিস্ময়। সেই চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে হাত দশেক দূরের ঝোপের মধ্যে। ভার্গিস সেটা লক্ষ করলেন। ম্যাডাম বললেন, ‘কেউ আমাদের লক্ষ করছে। এখানে আর কে থাকে?’
‘কেউ না, কেউ না।’ ভার্গিস অনুমান করলেন চৌকিদারটা ফিরে এসেছে। ম্যাডাম যদি তাকে একবার দেখতে পায়! কি করা যায় এখন?
ম্যাডাম বললেন, ‘ডেভিড, আপনার দলের কেউ না তো?’
‘আমি জানি না।’
‘লোকটা, আমি স্পষ্ট একটা লোককে ওখানে দেখেছি। ও আমাদের খুন করতে পারে মিস্টার ভার্গিস। আপনি কিছু একটা করুন।’
ভার্গিস সন্তর্পণে রিভলভার বের করলেন। তাঁর মনে হল চৌকিদারের মুখ বন্ধ করার এটাই সুযোগ। ওকে মেরে ফেললে ম্যাডাম কিছুই জানতে পারবেন না। তিনি চকিতে গুলি চালালেন। সঙ্গে সঙ্গে একটা আর্তনাদ শোনা গেল এবং ঝোপের ওপাশে কেউ পড়ে গেল।
ভার্গিস রিভলভার নিয়ে ছুটে গেলেন। ঝোপ সরিয়ে কাছে যেতেই লোকটাকে দেখতে পেয়ে তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। ওর পরনে ড্রাইভারের পোশাক। এই লোকটাই তো ম্যাডামের গাড়ি চালায়। এইসময় পেছনে আওয়াজ পেলেন ভার্গিস।
‘মাই গড! এ আপনি কাকে গুলি করেছেন?’
‘আমি বুঝতে পারিনি। আমি একদম ভাবিনি!’ ককিয়ে উঠলেন ভার্গিস!
‘ইজ হি ডেড?’
ভার্গিস ঝুঁকে দেখলেন। বুঝতে অসুবিধে হল না। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন।
‘ওর পকেটে কি আছে দেখুন।’
ভার্গিস চিত করে লোকটাকে শুইয়ে পকেটে হাত দিলেন। কাগজ, আইডেন্টিটি কার্ড, কারফিউ পাশ এবং একটি ছোট পিস্তল বেরিয়ে এল।
‘ওগুলো আমার হাতে দিন।’
ভার্গিস আদেশ মান্য করল। ড্রাইভারের পকেটে পিস্তল কেন?
ম্যাডাম ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন, ‘ওহো নো!’
ভার্গিস বেরিয়ে এলেন ঝোপের আড়াল থেকে। ডেভিড ততক্ষণে দৌড়ে লনের শেষ প্রান্তে চলে গিয়েছে। জঙ্গলে ঢুকে পড়ছে। ম্যাডাম ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘ফায়ার করুন।’
ছুটে গেলে লোকটাকে ধরা যায়। হাতে হাতকড়া নিয়ে কেউ দ্রুত পালাতে পারে না।ওকে মেরে ফেললে অনেক ক্ষতি। ম্যাডাম দাঁতে দাঁত চাপলেন, ‘শুট হিম।’
আর পারলেন না ভার্গিস। রিভলভারের লক্ষ্য সম্পর্কে কোনও দ্বিধা করার কারণ ছিল, না। ডেভিডের শরীরটা জঙ্গলে আটকে পড়ল।
ম্যাডাম বললেন, ‘গিয়ে দেখুন মারা গিয়েছে কিনা।’
ভার্গিসকে ছুটতে হল। ডেভিড মৃত জানাতেই ম্যাডাম বললেন, ‘ওর হাতকড়া খুলে নিন। আমার ড্রাইভারকে খুন করে পালাচ্ছিল বলে আপনি ওকে খুন করতে বাধ্য হয়েছেন। বাই।’
মহিলা দ্রুত চলে গেলেন গাড়ির পাশে। ব্যাগ থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে স্টিয়ারিং-এ বসলেন। তারপরই সাদা হাঁসের মতো বেরিয়ে গেল সাদা টয়োটা।
দুপাশে দুটো মৃতদেহ। ভার্গিস লনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছলেন। গাড়ির চাবি ড্রাইভারের কাছেই থাকার কথা। ওর পকেটে চাবিটা ছিল না, ছিল ম্যাডামের ব্যাগে। কেন? যিনি গাড়ি চালিয়ে আসেননি তিনি কেন চাবি রাখবেন? ড্রাইভারকে পাশে বসিয়ে ম্যাডাম নিশ্চয়ই গাড়ি চালাননি। ম্যাডাম কি জানতেন ড্রাইভারকে সরিয়ে দিতে হবে? তার মানে ওই ড্রাইভারই সার্জেন্টকে খুন করেছে। আর সেই কারণে প্রমাণ লোপ করতে পিস্তলটা নিয়ে গেলেন।
ভার্গিসের সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল। কী ভয়ানক মহিলা। নিজের ড্রাইভারকে খুন হতে দেখেও তিনি ভার্গিসকে কোনওরকম দোষারোপ করেননি। কেন? ভার্গিস দেখলেন চার-পাঁচজন পুলিশ ছুটে আসছে। হয়তো ম্যাডামই তাদের জানিয়ে গেছেন। তিনি একটা চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, ‘দুপাশে দুটো মৃতদেহ আছে। ভেতরে নীচের তলার ঘরে আর একজন। তিনটে বডি এক জায়গায় করো।’
পুলিশরা কাজে লেগে গেল। ভার্গিস বসে বসে ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না। এসব করে ম্যাডামের কি লাভ হচ্ছে। ঘটনাগুলো এমনভাবে ঘটে গেল যে ম্যাডামকে কোনও ভাবেই দোষী করা যাবে না। বরং ম্যাডাম ইচ্ছে করলে তাঁকেই—মাথা নাড়লেন ভার্গিস। আর তখনই ওপাশের জঙ্গল থেকে একটা পুলিশ চিৎকার করে সঙ্গীদের ডাকতে লাগল। মিনিট খানেকের মধ্যেই ভার্গিস নিজের চোখে দৃশ্যটা দেখলেন। তিনটে নয়। আজ বাংলোর ভেতরে বাইরে চারটে মৃতদেহ রয়েছে। চৌকিদারকে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওর জন্যে বুলেট খরচ করেনি ম্যাডামের ড্রাইভার।
২৬. ত্ৰিভুবন ঘড়ি দেখল
ত্রিভুবন ঘড়ি দেখল। অপারেশন হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। পাশের বন্ধ দরজার ওপারে আকাশলাল এখন অনেকগুলো নল জড়িয়ে পুতুলের মতো স্থির। ওইরকম ব্যক্তিত্ববান মানুষটি জীবিত না মৃত তা ঠাওর করা যাবে না এই মুহূর্তেও। অপারেশনের পর বৃদ্ধ ডাক্তার নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে পাশের ঘরে বিশ্রামের জন্যে রাখা হয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টা না গেলে আকাশলাল সম্পর্কে কোনও কথা বলা সম্ভব নয় ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন। চব্বিশ ঘণ্টা শেষ হতে এখনও ঢের দেরি।
আকাশলালকে এই বাড়িতে নিয়ে আসার পর থেকে একটিবারের জন্যেও কোথাও যায়নি ত্রিভুবন। সে এখানে বসেই জানতে পেরেছে ডেভিড সুড়ঙ্গে আটকে পড়েছে। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হেডকোয়ার্টার্সে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভার্গিস তার ওপর অত্যাচার শুরু করেছে। ত্রিভুবন মনে করে ডেভিড অত্যাচার বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারবে না অথবা চাইবে না। ভয়টা এখানেই। হায়দার অবশ্য বলেছে তেমন কিছু ঘটবে না। ডেভিড যাতে মুখ না খোলে তার জন্যে হেডকোয়ার্টার্সের সোর্সগুলোকে কাজে লাগানো হচ্ছে তবু আশ্বস্ত হতে পারেনি ত্রিভুবন। তার কেবলই মনে হচ্ছে আদর্শের জন্যে যেসব মানুষ জীবন দিতে পারে ডেভিড তাদের দলে পড়ে না।
হায়দার তার ওপর দায়িত্ব দিয়ে বেরিয়ে গেছে কয়েক ঘণ্টা আগে। ত্রিভুবনের দুচোখ এখন টানছিল। এইভাবে টেনশনের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেগে থাকার ধকল সে আর সহ্য করতে পারছিল না। যদি আকাশলাল এখন এইভাবেই শুয়ে থাকে তাহলে একটু ঘুমিয়ে নিতে অসুবিধে কী! ভার্গিস যদি জানতে পারে আকাশলাল মারা যায়নি তাহলে সে আর এই বাড়ি থেকে কাউকে বেরিয়ে যেতে দেবে না। আকাশলাল অথবা নিজেকে বাঁচাবার কোনও পথ খোলা থাকবে না তখন। আত্মহত্যাই যদি করতে হয় একটু ঘুমিয়ে নিয়ে করাই ভাল। ত্রিভুবন দরজাটা খুলল।
ওষুধের গন্ধ এখনও ঘরের বাতাস ভারী করে রেখেছে। দেওয়ালের একপাশে খাটটাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আকাশলাল তার ওপর শুয়ে আছে। রক্ত এবং স্যালাইন চলছে। মুখ ফ্যাকাশে। চোখের পাতাও নড়ছে না। ওর পায়ের কাছে টুলে যে নার্সটি বসে ছিল সে ত্রিভুবনকে দেখে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কিন্তু বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে কোনও হদিশ না দিয়ে। ইঙ্গিতে তাকে বসতে বলল ত্রিভুবন। তারপর আকাশলালের পাশে নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়াল। এই মানুষটার ডাকে অনেকের মতো ত্রিভুবন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এই মানুষ না থাকলে সব কিছু ধুলোয় মিশে যাবে। চব্বিশটা ঘণ্টা যেন ভালয় ভালয় কাটে। ত্রিভুবন ধীরে ধীরে ঘরের অন্যপ্রান্তে গেল। লম্বা ইজিচেয়ারটিতে শরীর ছড়িয়ে দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে একটা অদ্ভুত আরাম তিরতিরিয়ে উঠল। চোখ বন্ধ করল সে।
আরও কয়েক ঘণ্টা পরে হায়দারের মুখোমুখি বসে ছিল ত্রিভুবন। এখন তার শরীর বেশ ঝরঝরে। হায়দার দুহাতে মাথা ধরে আফসোসের শব্দ বের করল মুখ দিয়ে, ‘হাতে হাতকড়ি নিয়ে কেউ পুলিশের সামনে দিয়ে পালাতে চায়? কি করে এমন বোকামি করল ও আমি ভাবতে পারছি না।’
ত্রিভুবন ঠোঁট কামড়াল, ‘ও কি মুখ খুলেছিল?’
‘সম্ভবত নয়। ওর কাছ থেকে কিছু জানতে পারলে ভার্গিস এতক্ষণ চুপ করে বসে থাকত না।’
‘ওর মৃতদেহ কোথায়?’
‘পুলিশ মর্গে। ভার্গিস ঘোষণা করেছে ডেভিডের আত্মীয়স্বজন সৎকারের জন্যে মৃতদেহ নিয়ে যেতে পারে। মুশকিল হল ওর কোনও নিকট আত্মীয় নেই। ভার্গিসও সেটা জানে। সে হয়তো ভাবছে আমরাই কাজটা করতে এগিয়ে যাব। মূর্খ! হায়দা কাঁধ নাচাল।
‘তাহলে ডেভিডের শেষ কাজ কি করে হবে?’
‘আমরা ঝুঁকি নিতে পারি না।’
‘অন্য কাউকে পাঠাও।’
‘কাকে পাঠাব? যে-ই যাবে পুলিশ আমাদের সঙ্গে তাকে জড়িয়ে ফেলবে।’ বলতে বলতে হঠাৎ হায়দারের মনে পড়ে গেল কিছু। একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘একটি ইন্ডিয়ান সাংবাদিক, মহিলা, খুব জ্বালাচ্ছে। সব ব্যাপারে তার খুব কৌতূহল। কারাফউ-এর মধ্যে কবরখানায় পৌঁছে গিয়েছিল। এখন ওকে কোনওমতে ওর টুরিস্টলজের ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। ওই মেয়েটিকে রাজি করানো যেতে পারে।’
‘মেয়েটি কি ডেভিডকে চেনে?’
‘না। কিন্তু কৌতূহল বেশি বলে, দেখাই যাক না— ।’ হায়দার উঠে দাঁড়াল, ‘ডাক্তার কেমন আছে? চব্বিশ ঘণ্টা তো শেষ হয়ে গেল।’
‘ভদ্রলোকের নার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়েছিল। এখন একটু সুস্থ।’
‘চলো, কথা বলি।’
দরজায় শব্দ করে ভেতরে ঢুকতেই বৃদ্ধ মুখ ফেরালেন। টেবিলের ওপর ঝুঁকে কিছু লিখেছিলেন তিনি। হায়দার এগিয়ে যেতেই লেখাটা সরাবার চেষ্টা করলেন।
‘কি লিখছিলেন?’
‘এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনাদের প্রয়োজনে লাগবে না।’
‘ডায়েরি নাকি? দেখতে পারি?’
বৃদ্ধ হাসলেন, ‘অদ্ভুত ব্যাপার। আপনাদের নেতার জীবন আমার ওপর ছেড়ে দিতে পরেছেন কিন্তু আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। আমি যে কাজটা করেছি তা এই মহাদেশে কেউ করেনি অথবা করতে সাহস পায়নি। অপারেশনের সময় ঠিক কি কি করেছি তার বিস্তারিত বিবরণ লিখে রাখছিলাম। এর অনেক শব্দই চিকিৎসাবিজ্ঞান না জানা থাকলে বোধগম্য হবে না।’
হায়দার তবু খাতাটা দেখল। একটু চোখ বোলাল। ত্রিভুবনের ব্যাপারটা পছন্দ হচ্ছিল না। এই বৃদ্ধ ডাক্তারকে এখন সন্দেহ করা শুধু বোকামিই নয়, অভদ্রতা। খাতাটা ফিরিয়ে দিয়ে হায়দার জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার পেশেন্টের অবস্থা কি রকম?’
‘স্বাভাবিক লক্ষণগুলো ফিরে আসছে। তবে— ।’ বৃদ্ধ চুপ করে গেলেন।
‘তবে কি?’
‘ওর ব্রেন কতখানি স্বাভাবিক থাকবে সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকে গেছে আমার।’
‘বুঝতে পারলাম না।’
‘আমি ওর বুকে যে পাম্পিং স্টেশন বসিয়েছিলাম তার ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। বড়জোর চব্বিশ ঘণ্টা ওটা কাজ করতে পারত। মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় যে অক্সিজেন শরীরে নেয় এবং যতখানি রক্তচলাচল দেহে করে তার অনেক কম পরিমাণ ওই স্টেশন থেকে আকাশলালের শরীর পেয়েছে। ওর কিডনি এবং লিভার এটা মেনে নিয়েছিল কিন্তু ব্রেন যদি না মানতে পারে তাহলে— ।’
‘এরকম হবার সম্ভাবনা আপনার আগে জানা ছিল না?’
‘ছিল। আমি ওঁকে বুঝিয়ে বলেছিলাম। উনি তবু আমাকে ঝুঁকি নিতে বললেন।’
‘ব্রেন অস্বাভাবিক হয়ে গেলে ওর কি হবে? আপনি কি মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে যেতে পারে বলে ভাবছেন? নাকি পাগলের মতো আচরণ করবে ও!’
‘মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। ব্রেনে অক্সিজেন গিয়েছে কিন্তু যত পরিমাণে যাওয়া উচিত তার অনেক কম। এখন ও চোখের পাতা খুলছে, দেখবার চেষ্টা করছে কিন্তু ওষুধের জন্যে ঘুমিয়ে পড়ছে সঙ্গে সঙ্গে। আমাকে আর একটা দিন দেখতে হবে।’
‘আমরা চাই ও সুস্থ হয়ে উঠুক। সম্পূর্ণ সুস্থ।’ হায়দার বলল।
‘সেটা আমিও চাই। ও সুস্থ হলে আমি নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতে পারি।’ বৃদ্ধ হাসলেন।
‘তার মানে?’
‘চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটা একটা বিস্ময়কর ব্যাপার। সমস্ত পৃথিবীতে হইহই পড়ে যাবে।’ বৃদ্ধের মুখ উদ্ভাসিত। হায়দার সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বলল, ‘কিন্তু ডাক্তার, আপনি কি জানেন ভার্গিস এখন আপনাকেও খুঁজছে। হঠাৎ আপনি উধাও হয়ে গিয়েছেন। আপনি বিপ্লবী ছিলেন না, কিন্তু আমাদের সঙ্গে আপনার কোনও যোগাযোগ হয়েছে কি না তা সে খুঁজে বের করতে চাইবেই। আর এখান থেকে ফিরে গিয়ে আপনি যদি সারা পৃথিবীকে জানান কিভাবে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে আকাশলালের ওপর অপারেশন করেছেন তা হলে কি একটি দিনই জেলখানার বাইরে থাকতে পারবেন?’
বৃদ্ধ ডাক্তার ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকলেন। যেন এসব কথা তাঁর কাছে অবোধ্য ঠেকছে। হঠাৎ খুব দুর্বল গলায় বললেন, ‘আপনারা কি আমাকে সারাজীবন বন্দি করে রেখে দেবেন?’
হায়দারের মুখ এখন বেশ কঠোর। সে বলল, ‘আপনাকে আমরা বন্দি করে রাখিনি। আমাদের নিরাপত্তার জন্যেই আপনাকে বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। যে মুহূর্তে এর প্রয়োজন হবে না তখনই আপনি জানতে পারবেন।’
‘সেটা কবে? আপনার নেতা বলেছিল অপারেশনের পরেই আমাকে যেতে দেওয়া হবে।’
‘আপনি নিশ্চয়ই তাঁকে বলেননি এই ঘটনাটা গল্প করে পৃথিবীকে শোনাবেন।’ হায়দার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ত্রিভুবনকে ইশারা করে। বৃদ্ধের জন্যে খারাপ লাগছিল ত্রিভুবনের। মানুষটা ভাল। নিজের কাজে ডুবে থাকেন সবসময়। কিন্তু হায়দার যা বলল সেটাও ঠিক। সে বাইরে বেরিয়ে এল।
হায়দার দাঁড়িয়ে ছিল। নিচু গলায় বলল, ‘বুড়োটাকে নিয়ে কি করা যায়?’
ত্রিভুবন বলল, ‘বুঝতে পারছি না।’
আকাশলাল চেয়েছে সে পৃথিবীর মানুষের কাছে মৃত বলে ঘোষিত হোক। এখন পর্যন্ত তুমি আমি ডাক্তাররা আর ওই নার্স ছাড়া একথা কেউ জানে না। ডেভিড জানত।’
‘হ্যাঁ, একজনের জানা নিয়ে আর কোনও ভয় নেই।’
ত্রিভুবনের কথা শুনে হায়দার ওর মুখের দিকে তাকাল।
ত্রিভুবন বলল, ‘তুমি ভুলে যাচ্ছ অপারেশনে এই বৃদ্ধ ডাক্তারকে আরও কয়েকজন সাহায্য করেছিল। মুখ খোলার হলে তারাও খুলতে পারে।’
‘হুঁ। কিন্তু আমরা তো তাদের সতর্ক করে দিয়েছি।’
‘সেই সতকর্তা ওদের কতদিন মনে থাকবে?’
‘থাকবে। নাহলে যাতে থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে আমাদের। কিন্তু এই বৃদ্ধকে আমি আর একটুও বিশ্বাস করতে পারছি না। এখনই নোবেল প্রাইজ পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। একমাত্র পথ ওকে সরিয়ে দেওয়া।’
মাথা নাড়ল ত্রিভূবন, এই সিদ্ধান্তটা আমরা যদি না নিই?’
‘কে নেবে?’
‘নেতার সুস্থ হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে পারি।’
‘বেশ। আমি শুধু বলছি হাত থেকে তাস যেন না পড়ে যায়।’
অবস্থা এখন খুব খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। হেডকোয়ার্টার্সে ফিরে একটার পর একটা রিপোর্ট তৈরি করতে হয়েছিল ভার্গিসকে। আকাশলালের মৃত্যু, তার মৃতদেহ চুরি যাওয়া, ডেভিডের মত দাগী আসামিকে ধরেও মেরে ফেলা, বাবু বসন্তলালের বাংলোয় সাজেন্ট, চৌকিদার এবং ম্যাডামের ডাইভারের মৃত্যু—এসবই যে তার অপদার্থতার কারণে এ ব্যাপারে যেন বোর্ডের আর সন্দেহ নেই। আকাশলাল মরেছে ঠিকই, কিন্তু ডেভিডকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে বাকি সবগুলোকে ধরে রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা যেত এ ব্যাপারে ভার্গিস নিজেও নিশ্চিত। কিন্তু হঠাৎ কেন যে তিনি গুলি করতে গেলেন ভার্গিস এখনও বুঝতে পারছেন না। লোকটার হাতে হাতকড়া ছিল। ওই অবস্থায় বেশি দূর পালিয়ে যেতে ও কিছুতেই পারত না। তাছাড়া তিনি ওর পায়ে গুলি করতে পারতেন। ম্যাডামের উত্তেজিত আদেশ শোনামাত্র কেন যে তাঁর বোধবুদ্ধি লুপ্ত হল তা এখন আর ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এখন নিজের চেয়ারে বসে ভার্গিসের কেবলই মনে হচ্ছিল ম্যাডাম অনেক বুদ্ধিমতী মেয়ে। আর এই মনে হওয়াটাই তাঁর কাছে আরও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠছে। ওই সার্জেন্ট এবং চৌকিদার ম্যাডামের ড্রাইভার ছাড়া কারও হাতে মারা পড়েনি। এমন হতে পারে ম্যাডাম সেখানে পৌঁছে ওই সার্জেন্টের সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন তখন ড্রাইভার লোকটাকে গুলি করে। নিরীহ পাগলাটে চৌকিদারকে মেরে ফেলতে লোকটার কোনও অসুবিধে হয়নি। এবং এখন ভার্গিস নিঃসন্দেহ, ঝোপের আড়ালে ড্রাইভারকে লুকিয়ে থাকতে ম্যাডামই বলেছিলেন যাতে তিনি নাটক তৈরি করার সুবিধে পান। ড্রাইভারকে দিয়ে দুটো খুন করানোর পর আর ওকে বাঁচিয়ে রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ভার্গিসকে দিয়ে সেই কাজটা করালেন তিনি।
কিন্তু কেন? এতে ম্যাডামের কি লাভ হল? এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না ভার্গিস। কিন্তু ওই মহিলার ওপর যে আর কোনওভাবে নির্ভর করা যেতে পারে না এটা বোঝার পর নিজেকে এই প্রথম অসহায় বলে মনে হচ্ছিল। বোর্ড অথবা মিনিস্টারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই ভদ্রমহিলার মদত তাঁর সবচেয়ে প্রয়োজন, অথচ— । ম্যাডাম সম্পর্কে যে সন্দেহ মনে জাগছে তাও তো কাউকে বলা যাবে না। মিনিস্টারকে জানানোমাত্র ম্যাডাম তাঁর শত্রু হয়ে যাবেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে চেয়ার ছেড়ে দিতে হবে।
এই সময় টেলিফোনটা বাজল। ভার্গিস অলস ভঙ্গিতে রিসিভার তুলে জানান দিলেন।
‘আমি কি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলছি?’ সুন্দর ইংরেজি উচ্চারণ, গলাটি মহিলার।
‘হ্যাঁ। আপনি কে বলছেন?’
‘আমি একজন রিপোর্টার। আমার নাম অনিকা। আকাশলালকে অ্যারেস্ট করার আগে আমাকে আপনি দেখেছিলেন। অবশ্য মনে রাখার কথা নয়।’
ভার্গিস মনে করতে পারলেন। মেয়েমানুষ এবং রিপোর্টার। এই দুটো থেকে তিনি অনেক দূরে থাকা পছন্দ করেন। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ব্যাপারটা কি?’
‘আপনার সঙ্গে কি দেখা করতে পারি?’
‘কেন? দেখা করার কি দরকার?’
‘ডেভিডের মৃতদেহ নিয়ে কথা বলতে চাই।’
‘ডেভিডের মৃতদেহ?’ ভার্গিস চমকে উঠলেন, ‘আপনি এ ব্যাপারে কথা বলার কে?’
‘আমি টেলিফোনে বলতে চাই না।’ অনীকা জবাব দিল, ‘এখনও শহরে কারফিউ চলছে। আপনার সাহায্য ছাড়া আমি টুরিস্টলজ থেকে বের হতে পারছি না।’
‘ওখানেই থাকুন।’ শব্দ করে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন ভার্গিস। মেয়েটা পাগল নাকি? এই শহরে এসেছিল উৎসব সম্পর্কে রিপোর্ট করতে। ডেভিডের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক থাকার কথাই নয়। ভার্গিসের মনে হল তাঁকে ইন্টারভিউ করার একটা রাস্তা হিসেবে মেয়েটা ডেভিডের প্রসঙ্গ তুলেছে। ভেবেছে ওটা বললে তিনি খুব সহজে গলে যাবেন। অথচ বেচারা জানে না শুধু ওই একটা সংলাপের জন্যে তিনি ইচ্ছে করলে ওকে জেলে পচাতে পারেন। ইয়ার্কি! কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মনে হল সাহস করে যখন তাঁকে টেলিফোন করেছে তখন কিছু সত্যি থাকলেও থাকতে পারে। হয়তো ছাই ওডাতে ওড়াতে আগুন পাওয়া যেতে পারে। ভার্গিস টেলিফোন তুলে হুকুম দিলেন টুরিস্টলজ থেকে মহিলা রিপোর্টারকে তুলে আনতে।
মিনিট কুড়ি বাদে ভার্গিস নিজের টেবিলের ওপাশে অনীকাকে দেখছিলেন। খুব সুন্দরী নয় কিন্তু চটক আছে। পুরুষমানুষরা কিরকম মহিলার প্রতি আকর্ষণবোধ করে তা ভার্গিস ঠিক বোঝেন না। জীবনের এই দিকটা তাঁর অজানাই থেকে গেল।
‘ডেভিডের ব্যাপারে আপনি কি যেন বলবেন বলছিলেন?’ ভার্গিস সরাসরি প্রশ্ন করলেন।
‘আমি তো কিছু বলতে চাইনি।’ অনীকা সরল মুখে বলার চেষ্টা করল।
ভার্গিসের মুখ এবার বুলডগের মতো হয়ে গেল, ‘তাহলে ফোন করেছিলেন কেন?’
‘কিছুক্ষণ আগে একটি লোক এসে আমাকে বলল ডেভিডের কোনও আত্মীয়স্বজন নেই। ওর বন্ধুরা কেউ মৃতদেহ সৎকারের জন্যে নিতে আসবে না কারণ আপনি তাঁদের খুঁজছেন। আমি একজন বিদেশি সাংবাদিক, ডেভিডের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই, আমি নিজে একটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের সদস্য, অতএব আপনার কাছে ওর মৃতদেহ সৎকারের জন্যে আবেদন করতে পারি। শুনে আমার মনে হল মানুষ হিসেবে আমার এটা কর্তব্য।’ অনীকা স্পষ্ট গলায় বলল।
‘কে বলেছে আপনাকে? কে পাঠিয়েছে?’ ভার্গিস গর্জে উঠলেন।
‘লোকটাকে তার নাম জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বলতে রাজি হল না।’
‘এখনও সে টুরিস্টলজে আছে?’
‘না অনুরোধ করেই চলে গেল।’
‘মিস্। আপনি খুব বোকামি করছেন। কারফিউ-এর জন্যে যেখানে কেউ রাস্তায় বেরুতে পারছে না সেখানে আপনার কাছে একজন বেড়াতে এল এবং চলেও গেল? এর চেয়ে ভাল গল্প তৈরি করুন।’
অনীকা হাসল, ‘স্যার! কারফিউ-তে সাধারণ মানুষ পথে বের হয় না। কিন্তু যাদের প্রয়োজন তারা ঠিক বের হচ্ছে। আমার নিজের সেই অভিজ্ঞতা আছে।’
‘হুম! কিন্তু ডেভিডের মৃতদেহ তার আত্মীয় বা বন্ধু ছাড়া দেওয়া হবে না।’
‘তাহলে আপনাদের মর্গে ওর শরীর পচবে।’
‘এরকম অনেক শরীর ওখানে পচে। আপনি তাদের জন্যে কথা বলবেন?’ ভার্গিস নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, ‘মিস, আপনি বিদেশি। কারফিউ থাকা সত্ত্বেও আপনাকে আমি সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দিচ্ছি, নিজের দেশে ফিরে যান।’
‘কিন্তু আমি যদি নিজেকে ডেভিডের বন্ধু বলে দাবি করি?’
‘তাহলে আমি প্রশ্ন করব আপনার সঙ্গে কি ওর দলের লোকদের যোগাযোগ আছে?’
‘আমি সত্যি কথাই বলব, কাউকে চিনি না।’
‘বেশ, আপনাকে মিথ্যে কথা বলার অপরাধে আমি অ্যারেস্ট করছি।’
‘আমি কোনটে মিথ্যে বললাম?’
‘ওই যে গপ্পোটা, কেউ কারফিউ-এর মধ্যে এসে আপনাকে যেটা বলে গেল।’
‘আপনি জানেন কারফিউ-এর মধ্যে ইচ্ছে হলে বের হওয়া যায়। আমিই বেরিয়েছিলাম।’
‘আপনি? কোথায় গিয়েছিলেন?’
‘সাংবাদিক হিসেবে সেটা আপনাকে বলতে আমি বাধ্য নই।’
‘দেখুন, মহিলা বলেই আমি এখন পর্যন্ত আপনার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করছি।’ ভার্গিস থমথমে মুখে অনীকার দিকে তাকালেন। অনীকা ভেবে পাচ্ছিল না কি করবে। পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করার কোনও পরিকল্পনা তার ছিল না। কিন্তু হোটেলের সেই কর্মচারীটি তাকে ডেভিডের ব্যাপারে কিছু করার প্রস্তাব দিলে সে ভেবেছিল এটা একটা সুযোগ হতে পারে। লোকটার কাছে এসে এমন সব প্রশ্ন করবে যার উত্তর তার কাগজে হইচই ফেলে দেবে। অনীকা টেবিলে হাত রাখল, ‘অনেক ধন্যবাদ। আপনাকে খুলেই বলি, টুরিস্টলজ থেকে বেরিয়ে গলি দিয়ে হেঁটে আমি শেষ পর্যন্ত আপনাদের করবখানায় পৌঁছেছিলাম। রাস্তা পার হয়ে আমি সেখানে ঢুকতেও পেরেছিলাম।’
‘অত্যন্ত অন্যায় করেছেন।’ ভার্গিস কিছু একটার গন্ধ পেয়ে সোজা হয়ে বসলেন।
‘সাংবাদিক হিসেবে আমার কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক।’
‘আমাদের পুলিশ আপনাকে কিছু বলেনি?’
‘বোধহয় যাওয়ার সময় টের পায়নি কিন্তু ফেরার সময় তাড়া করেছিল, ধরতে পারেনি।’
‘আর এসব কথা আপনি আমাকে বলছেন?’
‘আপনাকে সত্যি কথা বলছি।’
‘কখন গিয়েছিলেন?’
‘করব দেবার আগে এবং কবর দেওয়ার পরে।’
‘কাকে কবর দেওয়ার কথা বলছেন?’
‘স্যার, আপনি জানেন।’
‘হুম। কি দেখলেন কবর দেওয়ার পর সেখানে গিয়ে?’
‘বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। আকাশলালের লোকজন আমাকে জোর করে সরিয়ে দিয়েছিল।’
‘ওর লোকজন ওখানে ছিল?’
‘সেই সময় ছিল।’
‘ভার্গিস একটা চুরুট বের করলেন, ‘হ্যাঁ, কি দেখলেন?’
‘একটা লোক কবরের কাছে মাটিতে কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করছিল।’
‘লোকটা কে?’
‘আমি চিনি না।’
‘দেখলে চিনতে পারবেন?’
‘মনে হয় পারব।’
‘ব্যাস এইটুকু?’
‘হ্যাঁ।’
ভার্গিস ভেবে পাচ্ছিলেন না গল্পটা সত্যি কি না? মেয়েটাকে নিয়ে এখন কি করা উচিত। এই সময় অনীকা বলল, ‘আমার কাছে সমস্ত ব্যাপারটাই সাজানো মনে হচ্ছে।’
‘কোন ব্যাপারটা?’
‘এই আকাশলালের আত্মসমর্পণ এবং মৃত্যু।’
হো হো করে হেসে উঠলেন ভার্গিস। এমন হাসি হাসতে তাঁকে কখনওই দেখা যায়নি। হাসতে হাসতে বললেন, ‘দয়া করে বলবেন না সে কবর থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।’
২৭. মুখের চেহারা এখন স্বাভাবিক
মানুষটির মুখের চেহারা এখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। চেতনা ফিরে এসেছে। মাঝে মাঝেই সে সেটা জানান দিচ্ছে। বৃদ্ধ ডাক্তার এরকম সময়ে সমানে কথা বলে যান। যন্ত্রণা এড়াতে ঘুমের ওষুধ যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করার পক্ষপাতী তিনি, অন্তত এই পর্যায়ে। পেশেন্ট নিজে শক্তি অর্জন করুক। মানসিক জোর অসুস্থতাকে দ্রুত সারিয়ে ফেলে। আজ বৃদ্ধ ডাক্তারের পাশে স্বজন দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দিয়ে এরা যেটা করাতে চাইছে সেটা করতে গেলে পেশেন্টকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে হবে। আকাশলালকে সেই অবস্থায় পেতে গেলে এখনও দিন দশেক অপেক্ষা করতে হবে তাকে এবং সেটা আর সম্ভব নয়।
পৃথার পক্ষে আর এই বন্দি জীবনে থাকা সম্ভব নয়। বেচারার সহ্যশক্তি এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। বই পড়ে এবং টেলিভিশন দেখে কোনও মানুষ দিনের পর দিন একটি ঘরে কাটিয়ে দিতে পারে না। এখন নিজেদের সম্পর্কটাও আগের মতো স্বাভাবিক নয়। একই ঘরে পাশাপাশি থেকেও পৃথা তাকে আদর করার কথা খেয়ালই করতে পারছে না। যে পৃথার শরীরের প্রতি স্বজনের যে টান এতদিন টানটান ছিল তাও যেন কোথায় হারিয়ে গেল। দুটো মানুষ একটা ঘরে প্রায় পুতুলের মতো বেঁচে থাকার জন্যে বেঁচে আছে।
পৃথা পালাতে চেয়েছিল। স্বজন উদ্যোগ নেয়নি। এই বাড়ি থেকে যদি বা কোনও মতে পালানো যায়, এই শহর থেকে বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। টিভিতে বলছে শহরে কারফিউ চলছে। রাস্তাঘাটে একটাও মানুষ নেই, যানবাহন নেই। মাত্র দু’ঘণ্টার জন্যে যখন কারফিউ তুলে নেওয়া হচ্ছে আজ থেকে কিন্তু সেই সময়টায় কতদূরে যাওয়া সম্ভব? পুলিশ তো তাদের ইতিমধ্যেই এদের লোক বলে ধরে নিয়েছে। অতএব এদের সাহায্য ছাড়া শহর ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
বৃদ্ধ ডাক্তার বললেন, ‘আর কোনও বিপদ নেই। ব্লাড প্রেশার প্রায় নর্মাল, পাল্সও ঠিক আছে। কয়েকদিনের বিশ্রামে উন্ড ঠিক হয়ে যাবে। আমার আর থাকার কোনও প্রয়োজন নেই।
‘আপনারা একসঙ্গে যাবেন।’ নিচু স্বরে পাশে দাঁড়ানো ত্রিভুবন কথা বলল।
‘একসঙ্গে মানে?’
‘পুলিশের চোখ এড়িয়ে ওঁকেও বাইরে যেতে হবে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে। আমাদের পক্ষে বার বার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। একটু বোঝার চেষ্টা করুন।’
‘কি বুঝব? আমি সব কিছু বোঝাবুঝির বাইরে।’ বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন, ‘দেশের বাইরে গিয়ে আমি কি করব? কোথায় যাব? না, না, পুলিশ আমাকে কিছু করবে না। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলব কিছুদিন বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ইন্ডিয়ায় যেতে গেলে তো ভিসা লাগে না।’
ত্রিভুবন বলল, ‘এসব আলোচনা আমরা এ ঘরের বাইরে গিয়ে করতে পারি।’
এই সময় আকাশলাল চোখ খুলল। ওর মুখে যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট। বৃদ্ধ ডাক্তার ঝুঁকে পড়লেন, ‘ইয়েস মাই বয়, ইউ আর অলরাইট। এনি প্রবলেম?’
আকাশলালের ঠোঁট ঈষৎ ফাঁক হল, ‘মাথা-মাথার-উঃ।’
‘মাথার ভেতরে যন্ত্রণা হচ্ছে? হুম্। আমি ওষুধ দিচ্ছি। ইট উইল বি অল রাইট!’
স্বজন জিজ্ঞাসা করল, ‘মাথায় যন্ত্রণা কেন?’
বৃদ্ধ ডাক্তার ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘এটা হওয়াই স্বাভাবিক।’
ত্রিভুবন সন্ত্রস্ত হল। স্বজন কোনও কিছুই জানে না। আকাশলালের শরীরে কেন দু-দুবার অপারেশন করা হয়েছে সে কথা ওকে বলার দরকার নেই। সে বৃদ্ধ ডাক্তারকে বলল, ‘ওঁকে ওষুধ দিন, কথা বলবেন না।’
‘কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেব না এমন শিক্ষা আমার নেই।’ বৃদ্ধ ডাক্তার জবাব দিলেন।
‘আপনি মিছিমিছি সময় নষ্ট করছেন।’ ত্রিভুবন গম্ভীর গলায় বলল।
বৃদ্ধ ডাক্তার এবার আকাশলালের দিকে মন দিলেন। আর একটা ইনজেকশন যেন বাধ্য হয়েই দিতে হল তাঁকে। ত্রিভুবন ওদের নিয়ে পাশের ঘরে ফিরে এসে দেখল হায়দার সেখানে অপেক্ষা করছে। হায়দার জিজ্ঞাসা করল, ‘ইমপ্রুভমেন্ট কতখানি?’
বৃদ্ধ ডাক্তার বললেন, ‘অনেকটা। যা আশা করেছিলাম তার থেকে অনেক ভাল।’
ত্রিভুবন বলল, ‘কিন্তু এখনও সেন্স পুরো আসেনি।’
বৃদ্ধ ডাক্তার ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘কি রকম? একটা মানুষ তার শরীরের যন্ত্রণার কথা জানিয়ে দিচ্ছে এটা আপনার কাছে কিছুই মনে হচ্ছে না?’
‘আমি কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, চিনতেই পারল না।’
‘আপনি কি মনে করেন অপারেশনের দুদিন পরে পেশেন্ট ফুটবল খেলবে?’
হায়দার জিজ্ঞাসা করল, ‘ঠিক আছে। উনি হেঁটে চলে বেড়াবার মতো সুস্থ কতদিনে হবেন?’
‘ওর শরীরের কন্ডিশনের ওপর সেটা নির্ভর করছে। এখন যেরকম অবস্থা তাতে দিন চারেক যথেষ্ট। এই সময় মাথার যন্ত্রণা হতে পারে, একটু জ্বর আসতে পারে। আমার ভয় ছিল ওর লাংসে জল জমে যেতে পারত। জমেনি। ওটা ঠিক আছে। ইনফ্যাক্ট এখন রুটিন চেক-আপ, নির্দিষ্ট ওষুধ আর পথ্য হলেই চলবে। আমার থাকার দরকার নেই।’ বৃদ্ধ ডাক্তার বললেন।
ত্রিভুবন বলল, ‘উনি হেঁটে চলে বেড়ানো পর্যন্ত আপনি থাকবেন। আসুন আমার সঙ্গে।’
বৃদ্ধ ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকালেন। বিড়বিড় করতে করতে তিনি ত্রিভুবনকে অনুসরণ করলেন।
‘অপারেশন করতে হয়েছিল কেন?’ স্বজন জিজ্ঞাসা করল।
ওঁর হার্টের প্রবলেম ছিল।’ হায়দার তাকাল স্বজনের দিকে, ‘আমি খুবই দুঃখিত আপনাদের এভাবে থাকতে হচ্ছে বলে। কিন্তু আরও চার-পাঁচদিন অপেক্ষা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই।’
‘আছে। আমি আগামী কাল অপারেশন করতে চাই।’
‘সে কী! এই অবস্থায়?’
‘দেখুন দুটো কারণের কথা আমি বলব। প্রথমটা হল, পেশেন্ট এখন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। তার শরীর যন্ত্রণা পাচ্ছে। এই অবস্থায় আমার কাজ বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো ব্যাপার হবে। বাড়তি কষ্টটুকু পেশেন্ট টের পাবে না। সুস্থ স্টেজে ফিরে যাওয়ার পরেই আবার ওঁকে অসুস্থ করে তোলা অর্থহীন। আর দ্বিতীয়ত, আমার স্ত্রী এখানে আর দুটো দিন থাকলে পাগল হয়ে যাবেন। বুঝতেই পারছেন আমি সেটা চাই না।’
‘দেখুন ডাক্তার, আপনার সিনিয়ার আপনাকে এখানে পাঠিয়েছেন। আপনার ওপর আমরা ভরসা করছি। কিসে পেশেন্টের ক্ষতি হবে না তা আপনিই ভাল জানেন।’
‘নিশ্চয়ই। কিন্তু একটা কথা— !’
‘বলুন।’
‘আমি যখন এসেছিলাম তখন উনি অসুস্থ ছিলেন। দেখে মনে হয়েছিল একটা বড় ধকল সামলে উনি তখন আরোগ্যের পথে। এরই মধ্যে আবার অপারেশন করতে হল কেন?’
‘প্রথম অপারেশন সম্পূর্ণ সফল হয়নি বলে দ্বিতীয়বার করা প্রয়োজন হয়েছিল।’
স্বজন কাঁধ নাচাল, ‘ঠিক আছে। আমি আগামী কাল সকালে কাজ শুরু করব। আমার যা যা প্রয়োজন আমি ওই ভদ্রলোককে তার একটা লিস্ট দিয়েছি বাকিটা আমার সঙ্গেই আছে। কালকের দিনটা আমি দেখতে চাই। কিন্তু পরশু আমি ফিরে যাবই।’
হায়দার বলল, ‘আপনি যদি বলেন অপারেশন সাকসেকফুল তা হলে আপনার যাওয়ার ব্যবস্থা হবে।’
‘আমি তো মিথ্যেও বলতে পারি।’ স্বজন হাসল।
‘তাহলে আপনি নির্বাচিত হতেন না।’
ঘরে ফিরে এসে স্বজন দেখল পৃথা বিছানায় কুঁকড়ে পড়ে আছে। ওর মুখ বালিশে ডোবানো। পৃথা যে ঘুমোচ্ছে না তা স্বজন জানে। ওর নার্ভের যা অবস্থা তাতে ঘুম আসা সম্ভব নয়। সে বলল, ‘পৃথা, আমরা পরশু কলকাতায় ফিরছি।’
কথাটা শেষ হতেই পৃথা চমকে মুখ তুলল। তারপর লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে ছুটে এসে স্বজনকে জড়িয়ে ধরল। এবং তারপরেই ফোঁপানি শুনতে পেল স্বজন, ‘সত্যি বলছ, বলো, সত্যি তো?’
স্বজন ওকে জড়িয়ে ধরল, ‘একদম সত্যি।’ সে পৃথার শরীরের কাঁপুনি টের পাচ্ছিল। গত কয়েকদিনে পৃথা তাকে একবারও আলিঙ্গন করেনি। আজ এই অবস্থায় স্বজনের শরীরে বিদ্যুৎ এল। পৃথা বলল, ‘কাল নয় কেন?’ ওর মুখ স্বজনের বুকে চেপে রয়েছে।
‘কাল সকালে অপারেশন করব। ডাক্তার হিসেবে চব্বিশ ঘণ্টা আমার অপেক্ষা করা উচিত।’
‘ঠিক বলছ তো?’ পৃথা মুখ তুলল। ওর দুই চোখে জল, কিন্তু ওই জলে আনন্দ আছে।
‘হ্যাঁগো।’ স্বজন মুখ নামাল।
শুকনো তপ্ত ঠোঁটে ঠোঁট নেমে আসামাত্র ঝড় উঠল। এতদিনের কষ্ট, অভিমান, ক্রোধ মুছে গেল আচমকা। বিশ্বচরাচর বিস্মৃত হয়ে গেল আচম্বিতে। দুটো শরীর কিছুক্ষণ পৃথিবীর যাবতীয় ঝড় একত্রিত করে চুরমার হতে লাগল। তারপর বিছানায় পাশাপাশি নিথর হয়ে শুয়ে রইল ওরা পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে। একসময় পৃথা বলল, ‘পরশু কখন যাব?’
‘কারফিউ থাকলে যে-সময়টা শিথিল হয় সেই সময়ে।’
‘এখান থেকে সোজা কলকাতায় তো?’
‘একদম সোজা।’
পৃথা নিঃশ্বাস ফেলল। স্বস্তির নিঃশ্বাস। স্বজন পাশ ফিরল। স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল। এই মুহূর্তে ওকে অনেকটা স্বাভাবিক ঠেকছে। সে ধীরে ধীরে ওর মাথায় হাত বোলাতে লাগল।
হঠাৎ পৃথা জিজ্ঞাসা করল, ‘লোকটা খুব গম্ভীর ধরনের?’
‘কোন লোকটা?’
‘আকাশলাল?’
‘হ্যাঁ, ব্যক্তিত্ব আছে।’
‘ও কী হতে চায়?’
‘কী হতে চায় মানে?’
‘মুখের চেহারা কী রকম করতে চাইছে?’
কিছু বলেনি। ও ওর মুখাবয়ব পাল্টাতে চাইছে।’
পৃথা উঠল। ব্যাগ থেকে একটা কাগজ কলম বের করে কীসব আঁকল মন দিয়ে। ওকে দেখছিল স্বজন। এতক্ষণে মেয়েটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পেরেছে।
‘কী করছ?’
‘বিরক্ত কোরো না।’ কপট গাম্ভীর্য পৃথার মুখে।
স্বজন অপেক্ষা করল। কাগজটা নিয়ে পৃথাই চলে এল কাছে, ‘লোকটার মুখ এইরকম করা নিশ্চয়ই অসম্ভব নয়!’
স্বজন হো হো করে হাসল, ‘এ তো হিটলারের মুখ।’
‘ও তো তাই। জোর করে আমাদের আটকে রেখেছে।’
‘তা বলতে পার, হিটলারি কায়দায়, কিন্তু একটু পার্থক্য আছে। আকাশলাল তার দেশকে স্বৈরতন্ত্র থেকে উদ্ধার করতে চায়, জনসাধারণকে তাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে চায়। নিজের নিরাপত্তা ঠিক রাখতেই ও আমাদের আটকে রাখতে বাধ্য হয়েছে।’
‘বাধ্য হয়েছে!’ তেতো গলায় বলল পৃথা, আমরা যদি টুরিস্ট লজে থাকতাম, নিজেরা ঘুরে বেড়াতাম আর ঠিক কাজের সময় তোমায় যদি ডেকে আনত, তাহলে কী অসুবিধে হত?’
‘সেটা বলতে পার। কিন্তু কারফিউ-এর মধ্যে কোথাও যেতে পারতে না তুমি।’ বলেই হেসে ফেলল স্বজন, ‘তুমি তিনদিন টিভি খুলতে দাওনি। পৃথিবীতে কী হচ্ছে আমি জানি না। এখন কি ম্যাডামের অনুমতি পেতে পারি?’
পৃথাও হাসল। তারপর উঠে গিয়ে রিমোট এনে টিভি চালু করল। সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় একটি রাজপথের ছবি ফুটে উঠল। ঘোষকের গলা শোনা গেল, ‘সন্ত্রাসবাদীরা শহরের রাজপথের নীচে গোপনে সুড়ঙ্গ খুঁড়েছিল কবরখানায় পৌঁছানোর জন্যে। এই সুড়ঙ্গ খুঁড়তে ঠিক কতদিন সময় লেগেছে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করছেন। সুড়ঙ্গের মধ্যে যারা আটকেছিল তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ অনেক গোপন তথ্য জানতে পেরেছে। পুলিশ কমিশনার মিস্টার ভার্গিস বলেছেন, ওই সব তথ্য পাওয়ার পর সন্ত্রাসবাদীদের ধ্বংস করতে বেশি সময় লাগবে না।
টিভিতে সুড়ঙ্গের ছবি ভেসে উঠল এবং সেইসঙ্গে কবরখানার। ঘোষকের গলা শোনা গেল, ‘আকাশলালের মৃতদেহ কবর দেওয়ার পর তাকে অপহরণ করার মধ্যে যে রহস্য রয়েছে তা পুলিশ মহল উদ্ধার করার চেষ্টা করছেন। আকাশলালের সহকারী ডেভিডের মৃত্যু না হলে পুলিশ এতদিনে আরও তথ্য জানতে পারতেন। গত রাত্রে ওয়াশিংটনে এক বোমা বিস্ফোরণে তিনজন মানুষ নিহত হয়েছেন। সংবাদ সংস্থা জানাচ্ছেন— ।’ টিভি বন্ধ করে দিল পৃথা।
স্তম্ভিত স্বজন স্ত্রীর দিকে তাকাল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
পৃথা ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আকাশলালের মৃতদেহের কথা বলল কী করে?’
‘শুনলাম। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না পৃথা। টিভিতে সুড়ঙ্গ দেখাল, আকাশলালের মৃতদেহ চুরি করার জন্যে সুড়ঙ্গ হয়েছে বলল অথচ— ।’ ওকে রীতিমত বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল।
‘তুমি নিজের চোখে একটু আগে আকাশলালকে দেখে এসেছ?’
‘নিশ্চয়ই। কাল সকালে লোকটাকে অপারেট করব।’
পৃথা মাথা নাড়ল, ‘তাহলে এটা পুলিশি অপপ্রচার। আকাশলাল মারা গিয়েছে বলে পাবলিককে বুঝিয়ে বোকা বানাতে চাইছে।’
‘আমার তা মনে হয় না।’
‘মনে হয় না?’
‘না। পুলিশ সত্যি মনে করছে আকাশলালের মৃতদেহ চুরি হয়ে গেছে। পুলিশের পক্ষে সবার নজর এড়িয়ে রাস্তার নীচে দিনের পর দিন ধরে সুড়ঙ্গ খোঁড়া সম্ভব নয়।’
‘তাহলে তুমি কাকে দেখে এলে?’
‘আমার কি দেখতে ভুল হয়েছে?’ বিড় বিড় করল স্বজন, ‘শুয়ে থাকলে মানুষের চেহারা অবশ্য একটু অন্যরকম দেখায়। নাঃ, এত বড় ভুল হবে না।’
‘আশ্চর্য! ডেডবডি কবর থেকে উঠে এখানে শুয়ে থাকবে কী করে?’
‘যদি ডেডবডি না হয়? যদি জীবিত অবস্থায় ওকে কবর দেওয়া হয়?’
‘তুমি কি পাগল? পুলিশ ওকে জীবিত অবস্থায় কবর দেবে কেন?’
‘পুলিশ যদি মৃত বলে ভুল করে থাকে?’
‘উল্টোপাল্টা বলছ। পুলিশের ডাক্তার নেই? ডাক্তার মৃত বা জীবিত বুঝবে না!’
‘নিশ্চয়ই বুঝবে। কিন্তু বুঝেসুঝেই যদি করে থাকে! পুলিশের ডাক্তার তো এদের লোক হতে পারে। পারে না? আকাশলাল জানত এভাবেই বেরিয়ে আসবে, তাই আগে থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়িয়ে রেখেছিল। মৃত্যুটা একটা ভাঁওতা। ওপরে যে লোকটা শুয়ে আছে তার ওপর দু-তিন দিন আগে একটা বড় অপারেশন হয়েছে। আমাকে বলা হল হার্টের ব্যাপার। যা অ্যারেঞ্জমেন্ট দেখলাম তা বড় নার্সিংহোমের ভাল অপারেশন থিয়েটারের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। আমি বুঝতে পারছি না পৃথা। মৃত বা অর্ধমৃত কোনও মানুষকে কবরে শুইয়ে আবার তুলে এনে বাঁচানো আমার জ্ঞানে সম্ভব নয়। অথচ লোকটা বেঁচে আছে।’
পৃথা স্বামীর পাশে এসে দাঁড়াল। কাঁধে হাত রাখল, ‘তুমি এ নিয়ে ভাবছ কেন? পরশুর পর তো আমরা এখানে থাকছি না। কাল তোমার কাজটুকু ঠিকঠাক করে দাও।’
টেলিফোন বাজল। ভার্গিস রিসিভার তুলে শুনলেন, ‘স্যার প্রধান বাস টার্মিনাসে একটু আগে বোমা ফেটেছে। আমাদের একটা জিপ আর দুজন কনস্টেবল প্রচণ্ড আহত হয়েছে।’
‘বোমাটা ছুঁড়ল কে?’
‘ধরতে পারা যায়নি। একটু আগে কারফিউ শিথিল হওয়ায় রাস্তায় মানুষের ভিড় ছিল।’
‘সার্চ পার্টি পৌঁছে গিয়েছে?’
‘হ্যাঁ। এর এক মিনিট বাদেই ভিক্টোরিয়া সিনেমা হলের সামনে আর একটি পুলিশের ভ্যান আক্রান্ত হয়। সেখানেও আড়াল থেকে বোমা ছোঁড়া হয়েছে। কর্তব্যরত সার্জেন্ট গুলি চালালে একজন পথচারী নিহত হয়েছেন।’
‘পথচারী বলবেন না, টেররিস্ট বলে ঘোষণা করুন।’
‘এইমাত্র আর একটি ইনসিডেন্টের খবর এসেছে স্যার। বারো নম্বর রাস্তার মোড়ে এবার গ্রেনেড ছোঁড়া হয়েছে। হ্যাঁ স্যার, গ্রেনেড। একটা পুলিশ ভ্যান বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ছজন পুলিশ অফিসার এবং কনস্টেবল স্পট ডেড।’
দাঁতে দাঁত চাপলেন ভার্গিস, ‘ওরা হঠাৎ এটা শুরু করল কেন?’
‘স্যার, দুজন লোক টেলিফোন করে বলেছে ওরা ডেভিডের হত্যার বদলা নিচ্ছে।’
‘কারফিউ ইমপোজ করুন। ইমিডিয়েটলি। নো মোর রিল্যাক্সসেসন। রাস্তায় যাকে দেখা যাবে তাকেই গুলি করে মারা হবে।’ রিসিভার নামিয়ে রাখলেন ভার্গিস। তাঁকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। লোকগুলো এবার মরিয়া হয়ে তাঁকে ভয় দেখাচ্ছে। ভয় দেখিয়ে কেউ তাঁকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। ডেভিডের হত্যার বদলা? দরকার হলে ওর মৃতদেহ মেলার মাঠে ঝুলিয়ে রাখবেন তিনি। পচে পচে খসে না যাওয়া পর্যন্ত পাবলিক দেখুক। হঠাৎ সেই মেয়ে রিপোর্টারের কথা মনে পড়ল ভার্গিসের। ইন্টারকমে আদেশ দিলেন তাকে তাঁর ঘরে নিয়ে আসার জন্যে।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ভার্গিস অনীকাকে তাঁর সামনে দেখতে পেলেন। ততক্ষণে চুরুট ধরিয়ে ফেলেছেন তিনি। সেই অবস্থায় বললেন, ‘আপনার বন্ধুরা বোমা ছুঁড়ছে, গ্রেনেড ছুঁড়ছে। এর বদলে আমাকে কিছু তো করতে হয়!’
‘আমার কোনও বন্ধু এখানে নেই।’
‘আলবত আছে। তারাই আপনাকে পাঠিয়েছিল। ডেভিডের সৎকারের জন্যে। আমি সেটা অ্যালাউ না করতে ওরা পুলিশ মারছে।’
‘এসব কথা অনর্থক আমাকে বলছেন!’
‘শুনুন মিস, বাজে কথা শোনার সময় আমার নেই। কে আপনাকে পাঠিয়েছে?’
‘যে লোকটি আমাকে অনুরোধ করেছিল তাকে আমি চিনি না।’
‘আমি এখনও আপনার সম্মান বজায় রেখেছি। আমি যদি হুকুম দিই তাহলে আমার লোকজন আপনাকে মার্সিলেসলি রেপ করতে পারলে খুশি হবে।’
‘আমি জানি না কোনও রেপ মার্সি-সহকারে করা সম্ভব কিনা।’
‘ওঃ, আপনার কি ভয় বলে কিছু নেই?’
‘নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু একটা কথা ভেবে অবাক হচ্ছি, আপনি আপনার লোকদের দিয়ে ওই কাজটা করাবেন কেন? আমি কি এতই সাবস্ট্যান্ডার্ড?’
এমন সংলাপ জীবনে কখনও শোনেননি ভার্গিস। তাঁর চোয়াল ঝুলে গেল। তিনি কোনও মতে বলতে পারলেন, ‘বসুন।’
অনীকা বসল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আমি কি এক কাপ ভাল কফি পেতে পারি?’
ভার্গিস মাথা নাড়লেন, ‘না। আপনি কিছুই পেতে পারেন না। ডেভিডের সৎকারের অধিকার যদি আপনাকে দিই তাহলে শহরে গোলমাল থেমে যাবে?’
‘বলতে পারছি না। কারণ কারা গোলমাল করছে আমি জানি না।’
‘ওয়েল! আপনি প্রথমবার কবরখানায় কেন গিয়েছিলেন?’
‘আকাশলালের মৃত্যুর খবর আমাকে বিস্মিত করেছিল। কিন্তু মনে হয়েছিল ওর পারিবারিক কবরখানায় আগাম গিয়ে সৎকারের খবর নিয়ে আসি।’
‘হুম’! ‘দ্বিতীয়বার গেলেন কেন?’
‘আমার সন্দেহ হয়েছিল কোথাও কোনও গোলমাল হয়েছে।’
‘কী গোলমাল?’
‘ওর মৃত্যুটা আমার কাছে স্বাভাবিক নয়!’
‘ডাক্তার সেই সার্টিফিকেট দিয়েছে।’
‘হতে পারে। কিন্তু আমি একজন মানুষকে মাটিতে কান পেতে কিছু শুনতে দেখেছিলাম। পরে সুড়ঙ্গের খবরটা পাই। সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছিল আকাশলালের শরীর কবর থেকে তোলা হবে বলেই। অর্থাৎ আকাশলাল জীবিত অবস্থায় সুড়ঙ্গ খোঁড়ার পরিকল্পনা করেছিল। কারণ সে জানত আপনার এখানে পৌঁছে সে মারা যাবে অথবা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হবে। এই ব্যাপারটা আমার কাছে স্বাভাবিক লাগছে না।’
ঠিক তখনই টেলিফোন বাজল। রিসিভার তুলতেই ডেস্ক থেকে তাঁকে জানানো হল মিনিস্টার তাঁকে এখনই দেখা করতে বলেছেন। এই প্রথম মিনিস্টার তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বললেন না।
২৮. চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিল স্বজন
ঘরের বাইরে এসে চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিল স্বজন। একটি সুস্থ মানুষকে সাময়িক সংজ্ঞাহীন করে অপারেশন করা এক জিনিস আর জীবন মৃত্যুর মাঝখানে দুলতে থাকা একজনকে অপারেশন টেবিলে পাওয়া আর এক জিনিস। দূর্ঘটনায় বিকৃত হয়ে যাওয়া শরীরকে ঠিকঠাক করে একটা আদলে ফিরিয়ে আনার অভিজ্ঞতা তার অনেকবার হয়েছে। কিন্তু এরকম কখনও হয়নি।
এরা যে সমস্ত সহযোগী এনেছিল তারা স্বজনের নির্দেশ পুতুলের মতো মেনেছে। অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগেই তারা নিজেদের মুখ আড়াল করে নিয়েছিল বলে কাউকেই সে বাইরে দেখলে চিনতে পারবে না। চিনবার দরকারও নেই। এখন ভালভাবে কলকাতায় ফিরে যেতে পারলেই হয়।
পায়ের শব্দে মুখ ফিরিয়ে স্বজন দেখল ত্রিভুবন এগিয়ে আসছে। নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল ত্রিভুবন, ‘সব ঠিক আছে?’
স্বজন মাথা নাড়ল। কিছু বলল না।
‘আপনি ইচ্ছে করলে ঘরে ফিরে যেতে পারেন।’
‘আমরা কখন রওনা হচ্ছি?’ স্বজন সরাসরি জিজ্ঞাসা করল।
‘আপনার তো এখনও অনেক কিছু করণীয় আছে।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু সেটা বুঝিয়ে দিলে নার্সই করতে পারবে। এখন শুধু অপেক্ষা করা যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুখের সব দাগ মিলিয়ে যায়।’
‘যদি না যায়?’
‘মানে?’
‘যদি আপনার অপারশনের কোনও চিহ্ন বিশ্রীভাবে ধরা পড়ে?’
‘তা হলে আপনারা আমাকে আনতেন না এখানে।’ স্বজন দৃঢ় গলায় বলল।
‘ঠিক আছে ডক্টর। আপনি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করছি।’
স্বজনকে নীচে পাঠিয়ে ত্রিভুবন নীচের তলার একটি ঘরে ঢুকল। সেখানে দুজন টেলিফোন অপারেটর সতর্কভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খবরগুলো শোনার জন্যে বসে আছে। খবর শুনে ওরা যে কাগজে নোট করে রাখে সেটা তুলল ত্রিভুবন। হেডকোয়ার্টার্সে ঢোকার পর মহিলা রিপোর্টার অনীকার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, সম্ভবত তাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। ডেভিডের মৃতদেহ দেখা যায়নি। শহরের বিভিন্ন জায়গায় যেসব বিস্ফোরণ হয়েছে তাতে সরকার পক্ষের মানুষই আহত অথবা নিহত হয়েছে।
এই সময় হায়দার ঘরে ঢুকল, ‘ত্রিভুবন।’
ত্রিভুবন তাকাল। হায়দার বলল, ‘চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই বাড়ি আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। যে-কোনও মুহূর্তেই ভার্গিসের কাছে এই বাড়ির খবর পৌঁছে যেতে পারে।’
‘তাহলে?’
‘মোটামুটি আগের প্ল্যান অনুযায়ী কাজ করব আমরা। কিন্তু কারফিউ রিলাক্সেশন তুলে নিয়েছে ভার্গিস। আমি তাই সোর্স ব্যবহার করে রাত্রে এখান থেকে বেরুবার ব্যবস্থা করেছি। দুটো দলে আমরা যাব। একদলে দুই ডাক্তার আর ওই ভদ্রমহিলা থাকবেন। অন্যদলে লিডারকে নিয়ে যাওয়া হবে। ভ্যানের মধ্যে বিছানা করে ওকে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। ছজন মানুষ ওই ভ্যানে যেতে পারবে। বাকিদের রিলিজ করে দিতে হবে। আমরা বেরিয়ে যাওয়ামাত্র যারা ওয়ান্টেড নয় তারা নিজের নিজের বাড়িতে ফিরে যাক।’ হায়দার বলল।
ত্রিভুবনের ভাল লাগছিল না প্রস্তাব। সে বলল, ‘কারফিউ-এর ভেতরে বাইরে যাওয়া মানে বেশি মাত্রায় ঝুঁকি নেওয়া। তুমি যাদের ম্যানেজ করেছ তাদের বাইরেও ভার্গিসের পুলিশ আছে।’
‘হ্যাঁ ঝুঁকি আছে। কিন্তু এখানে থাকলে আমাদের অবস্থা ডেভিডের মতো হবে।’ হায়দারের চোয়াল শক্ত হল। আকাশলাল এখানে ধরা পড়ুক সে চায় না। মিনিস্ট্রিতে তার যে লোক আছে সে একটু আগে পরিষ্কার জানিয়েছে এই বাড়িতে থাকা তাদের পক্ষে আর নিরাপদ নয়।
‘তুমি কোন দলে যাবে? লিডারের সঙ্গে কি?’ ত্রিভুবন প্রশ্ন করল।
‘কিছুই ভাবিনি।’ হায়দার জবাব দিল।
‘আমি ডাক্তারদের নিয়ে যাব। ওরা আমাদের পক্ষে বিপজ্জনক। তিনজনের যে কেউ মুখ খুললে সমস্ত পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাবে।’ ত্রিভুবন দূরে বসা অপারেটরদের দিকে তাকিয়ে নিল, ‘এদের বাঁচিয়ে রাখাও আমাদের পক্ষে বেশ ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যাচ্ছে।’
‘নো।’ হায়দার মাথা নাড়ল, ‘কাজ করিয়ে আমরা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। ঠিক আছে, তুমি তাহলে ওদের নিয়ে সীমান্তের দিকে যাবে ভাবছ?’
‘তোমার আপত্তি আছে?’
‘একদম না। দুজনের একজনকে যেতে হতই। এদের দায়িত্ব অন্য কারোর ওপর ছাড়তে রাজি নই। তা হলে আমি লিডারকে নিয়ে যাচ্ছি। রাত্রের মধ্যেই আমরা নামভঞ্জন পৌঁছে যাব। গ্রামের লোক জানতেও পারবে না নতুন লোক এসেছে। তুমি যদি সেই রাত্রে ওখানে ফিরতে না পার তাহলে পরের রাতের জন্যে অপেক্ষা করবে। দিনের বেলায় ওখানে যেয়ো না।’ হায়দার বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ত্রিভূবন হাসল। কথা বলার সময় তার কেবলই আশঙ্কা হচ্ছিল হায়দার তার ওপর নামভঞ্জনে যাওয়ার দায়িত্ব দিয়ে নিজে ডাক্তারদের নিয়ে বর্ডার পার হবে। লোকটা সেরকম চিন্তা করেনি বলেই মনে হয়।
ত্রিভূবন জানে এই ভাবনাটা ঠিক নয়। মাসখানেক আগেও সে ভাবতে পারত না। কিন্তু ডেভিডের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে তার কেবলই মনে হচ্ছে তাকেও ধরে ফেলবে ভার্গিস। ডেভিড ধরা পড়ল, মারা গেল অথচ তারা কিছুই করতে পারল না। সে ধরা পড়লেও দল চুপচাপ থাকতে বাধ্য হবে। মনের মধ্যে কেউ যেন ক্রমাগত সতর্ক করে যাচ্ছে, পালাও, পালাও। ধরা পড়ার আগে ডেভিডেরও কি তাই মনে হয়েছিল। নইলে সে কেন বিপ্লবের বিপক্ষে কথা বলবে? এইসময় হঠাৎ তার হেনার মুখ মনে এল। সে পালিয়ে যাচ্ছে জানলে হেনার কি প্রতিক্রিয়া হবে?
ভারী দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই ভার্গিস বুঝতে পেরেছিলেন তাঁকে খোশগল্প করার জন্যে ডেকে আনা হয়নি। লম্বা টেবিলের ওপাশে বোর্ডের মেম্বাররা বসে আছেন তাঁর দিকে তাকিয়ে। ওদের থেকে একটু দূরত্ব রেখে মিনিস্টার।
‘মে আই কাম ইন?’
‘ইয়েস প্লিজ।’
‘বসুন কমিশনার।’
ভার্গিস বসেছিলেন টেবিলের উল্টোদিকের একমাত্র চেয়ারে। বসেই বুঝেছিলেন, এটা চেয়ার নয়, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো। বোর্ডের মেম্বাররা তাঁর দিকে যেভাবে তাকিয়ে আছেন তাতে ওঁদের মনের কথা বোঝা যাচ্ছে না। অথচ এঁদের অনেকেই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তাঁকে দিয়ে কত কাজ করিয়ে নিয়েছেন। ভার্গিস নিজেকে সহজ রাখার চেষ্টা করছিলেন।
মিনিস্টার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মিস্টার কমিশনার, শহরের অবস্থা এখন কেমন?’
ভার্গিস জবাব দিলেন, ‘আবার চব্বিশ ঘণ্টা কারফিউ জারি হয়েছে।’
‘কেন?’
‘সাধারণ মানুষ যাতে জিনিসপত্র কিনতে পারে তাই আমি কারফিউ রিল্যাক্স করেছিলাম, কিন্তু তার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বোমা ছুঁড়তে শুরু করেছিল।’
‘এতদিন ওদের এমন কাজ করতে দেখা যায়নি। হঠাৎ কেন শুরু করল?’
‘দুটো কারণ হতে পারে। এক, ওরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে নেতৃত্বের অভাবে। দুই, ডেভিডের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে এমন কাণ্ড করেছে।’
‘মিস্টার কমিশনার, আপনার ওপর এই শহর এবং স্টেটের নিরাপত্তা রক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আপনার কি মনে হয় আপনি সেই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছেন?’
‘আমার কাজে কোনও গাফিলতি নেই।’
‘বোর্ডের তরফ থেকে আপনাকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করব। আকাশলাল কেন আপনার কাছে ঢাকঢোল পিটিয়ে ধরা দিল?’
‘ওর পক্ষে লুকিয়ে থাকা আর সম্ভব ছিল না। পুলিশি হামলায় মারা পড়ার সম্ভাবনা ছিল ওর। ভেবেছিল হাজার হাজার লোকের সামনে ধরা দিলে সে বেঁচে থাকবে।’
‘ও কি জানত যে ওর হার্ট অ্যাটাকড্ হবে?’
‘এটা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়।’
‘তাহলে ও নিশ্চয়ই জানত আপনি ওকে মেরে ফেলবেন?’
‘হ্যাঁ বিচারক নিশ্চয়ই বিচারের শেষে ওর ফাঁসির হুকুম দিতেন।’
‘সেটা বিচারের শেষে। এ দেশের আইন অনুযায়ী আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়। ফলে বিচারের রায় পেতে কয়েক মাস পেরিয়ে যায়। তাই না?’
‘হ্যাঁ। ঠিক কথা।’
‘কিন্তু আকাশলাল জানত ধরা পড়ার দু-একদিনের মধ্যেই সে মারা যাবে।’
‘ও যে জানত তা আমি কি করে বলব?’
‘না জানলে ও সুড়ঙ্গ তৈরি করে রাখত না। মিস্টার কমিশনার আপনি কল্পনা করুন, মারা যাওয়ার আগেই আকাশলাল তার শরীর কবর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছে। কেন? সে এও জানত তাকে তার পারিবারিক জায়গাতেই কবর দেওয়া হবে। ওর লোকজন দিনের পর দিন ধরে মাটির তলায় সুড়ঙ্গ খুঁড়ল অথচ আপনার বাহিনী টের পেল না। কেন খুঁড়েছিল সেই তথ্য কি আপনি জানতে পেরেছেন?’
‘ওর মৃতদেহ পুলিশ কবর দেবে এটা সম্ভবত মেনে নিতে পারেনি।’
‘মৃতদেহ সরিয়ে নেওয়ার সময় ধরা পড়ার প্রচণ্ড সম্ভাবনা আছে জানা থাকলেও ওরা শুধু এই কারণে ঝুঁকি নিয়েছিল এমন কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় কমিশনার।’
‘আমি ডেভিডের কাছ থেকে খবর বের করার চেষ্টা করছিলাম।’
‘কি করেছিলেন আপনি?’
‘আমি চাপ দেওয়া শুরু করেছিলাম।’
‘আর তার পর শহরের বাইরে একটা বাংলোর লনে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেললেন যাতে ওর কাছ থেকে কোনও দিনই খবর না পাওয়া যায়।’
‘আমি প্রতিবাদ করছি স্যার। ডেভিড পালিয়ে যাচ্ছিল। আমি ওর পায়ে গুলি করতে চেয়েছিলাম। সেইসময়, ও হোঁচট খেয়ে বসে পড়ায় ওপরে গুলি লাগে।’
‘আকাশলাল মৃত, এ-ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত?’
‘হ্যাঁ। আমি নিজে তাকে দেখেছি। ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছেন।’
‘আপনার কি কখনও সন্দেহ হয়েছে আকাশলাল বেঁচে থাকতে পারে?’
‘না। হয়নি।’
‘কেউ কিছু বলেনি?’
সেই মহিলা রিপোর্টারের মুখ মনে পড়ল তাঁর। কিন্তু কিছু না বলে মাথা নাড়লেন ভার্গিস। মিনিস্টার একাই তাঁকে প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। প্রতি শব্দ রেকর্ড করা হচ্ছে।
‘আমরা খবর পেয়েছি সোমকে একজন সার্জেন্ট গুলি করে মেরেছিল।’
‘না। তার আগেই সে মারা গিয়েছিল। পোস্টমর্টেমে ওর শরীরে বিষ পাওয়া গেছে।’
‘আকাশলালকে পোস্টমর্টেম করা হয়নি কেন?’
‘দুটো কারণ। ডাক্তার স্বাভাবিক মৃত্যুর সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। দুই, সেই রাতের মধ্যেই যদি ওকে কবর না দেওয়া হত তাহলে ওর মৃতদেহকে কেন্দ্র করে শহরে ঝামেলা শুরু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আমি ঝুঁকি নিইনি।’
‘বাবু বসন্তলালের বাংলোতে সার্জেন্টকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। এ ব্যাপারে আপনি কি তদন্ত করেছেন? কেন সার্জেন্ট সেখানে গিয়েছিলেন?’
ভার্গিস বুঝলেন তাঁর ঘাম হচ্ছে। এই একটা বিষয় যা নিয়ে তিনি আলোচনা করতে চান না। এই ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই ম্যাডামের প্রসঙ্গ এসে যাবে। একটুও দ্বিধা না করে তিনি জবাব দিলেন, ‘না। ওর মৃতদেহ আমিই আবিষ্কার করি। ওকে ওখানে দেখব আশা করিনি। সোমের মৃত্যুর পর থেকেই ও নিখোঁজ ছিল।’
‘ওই বাংলোর কম্পাউন্ডে ওখানকার চৌকিদার মৃত অবস্থায় গাছে ঝুলছিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন?’
‘লোকটার মাথা প্রকৃতিস্থ ছিল না বলে শুনেছি।’
‘মিস্টার কমিশনার, জীবিত আকাশলালকে আপনি ধরতে পারেননি। কিন্তু কবর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া আকাশলালের শরীরকে আপনি এই কদিনেও আবিষ্কার করতে পারলেন না। এই ব্যাপারে আপনার কোনও কৈফিয়ত আছে?’
‘আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করছি।’
‘যে সাংবাদিক মহিলাটিকে আপনি টুরিস্ট লজ থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন সে কি আপনাকে কোনও বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছে?’
‘হ্যাঁ। সে বলেছে আকাশলালের স্বর খোঁড়ার আগেই কেউ একজন সেখানকার মাটিতে কান পেতে কিছু শুনতে চেষ্টা করছিল। মেয়েটাকে আকাশলালের লোকজন ওখান থেকে সরিয়ে দেয়। তার বিশ্বাস, এই মৃতদেহ চুরি যাওয়াটা পূর্বপরিকল্পিত এবং এমনও হতে পারে আকাশলাল মারা যায়নি।’
‘আপনার বিশ্বাস হয়নি?’
‘না। কারণ আকাশলালকে মৃত অবস্থায় আমরা দেখেছি। আর মেয়েটি চেয়েছিল ডেভিডের মৃতদেহ সৎকার করতে। সে অবশ্যই সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে যুক্ত, নইলে এই সময়ে এত বড় ঝুঁকি সে নিত না। ওর কথা বিশ্বাস করার কারণ নেই।’
‘ওই টুরিস্ট লজে এক দম্পতি কিছুদিন আগে বেড়াতে এসেছিলেন ইন্ডিয়া থেকে। ওদের সম্বন্ধে সন্দেহ হওয়ায় আপনি ভদ্রলোককে হেডকোয়ার্টার্সে নিয়ে গিয়ে জেরাও করেছিলেন। সেই দম্পতি পরের দিনই উধাও হয়ে যান। তাঁদের খুঁজে বের করেছেন?’
‘প্রথমে খোঁজ নেওয়া চলছিল কিন্তু পরে অন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার চাপে ওদের নিয়ে আর মাথা ঘামানো হয়নি।’
‘ভদ্রলোক ডাক্তার ছিলেন?’
‘যতদূর মনে পড়ছে, হ্যাঁ। কিন্তু সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে ওদের কোনও সংযোগ ছিল না। একথা আমি ইন্ডিয়ার পলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনেছি।’
মিস্টার কমিশনার, আপনার রাজ্যে কেউ নিখোঁজ হয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া যায় না, এক্ষেত্রে এক দম্পতিই নিখোঁজ হয়েছেন। জীবিত বা মৃতদেহ কাউকেই আপনি খুঁজে বের করতে পারেন না। আপনাকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল তার অপব্যবহার করেছেন আপনি। এ ব্যাপারে আপনার কোনও বক্তব্য আছে?’
‘আমি ক্ষমতার অপব্যবহার করিনি।’
‘বাবু বসন্তলালের বাংলোতে আপনি একটি ড্রাইভারকে গুলি করে মেরেছিলেন?’
‘আমি জানতাম না সে ড্রাইভার। সে যেভাবে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিল তাতে আমার তাকে সন্ত্রাসবাদী বলে মনে হয়েছিল। আত্মরক্ষার জন্যেই আমাকে গুলি চালাতে হয়।’
‘লোকটি কি সশস্ত্র ছিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘ওর কাছে কি কোনও অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল?’
ভার্গিসের মেরুদণ্ড কনকন করে উঠল। ম্যাডামের নাম অনিবার্যভাবে এসে যাবে এখন। কিন্তু ভার্গিস বুঝতে পারছিলেন তাঁর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। বোর্ড ইচ্ছে করেই এই জেরার ব্যবস্থা করেছে। যখন কেউ আস্থাভাজন থাকে না তখন তার ত্রুটি খুঁজে পেতে দেরি হয় না। এখন তিনি চোখের সামনে নিজের পরিণতি দেখতে পাচ্ছিলেন। ভার্গিস সোজা হয়ে বসলেন। তারপর খুব সহজ গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘স্যার! আপনি তো জানতে চাইলেন না কেন আমি আসামি ডেভিডকে সঙ্গে নিয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের পাহারায় বাবু বসন্তলালের বাংলোয় গিয়েছিলাম যখন শহরে এমন টেনশন ছিল!’
মিনিস্টার বললেন, ‘মিস্টার কমিশনার, আপনাকে কি প্রশ্ন করা হবে তা আপনি ডিকটেট করতে পারেন না। আপনি এখানে এসেছেন শুধুই উত্তর দিতে। বোর্ড আপনার কাছে সঠিক জবাব চায়।’
এইসময় বোর্ডের তিন নম্বর মেম্বারের টেবিলের সামনে আলো জ্বলে উঠল। মিনিস্টার সেটা লক্ষ করে বিনীত ভঙ্গিতে তাঁর কাছে এগিয়ে গেলেন। মাথা নিচু করে সদস্যের বক্তব্য শুনলেন। কিছু বলার চেষ্টা করলেন। শেষ পর্যন্ত ফিরে এলেন নিজের জায়গায়।
‘আপনি যদি ডেভিডকে নিয়ে হেডকোয়ার্টার্স থেকে অত দূরে না যেতেন তা হলে সে পালাবার চেষ্টা করত না এবং আপনাকে গুলি করতে হত না।’
‘হ্যাঁ, স্যার।’
‘মাননীয় সদস্য মনে করেন যে একই সঙ্গে সার্জেন্ট এবং চৌকিদারের মৃতদেহ পাওয়া, ডেভিড এবং ড্রাইভারের মৃত্যু কাকতালীয় ব্যাপার নয়। একই স্পটে এতগুলো মৃত্যু বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে আপনার কি বক্তব্য?’
‘যা ঘটেছে তা স্বাভাবিকভাবে ঘটেছে।’
‘আমরা আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি। আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যদি আপিন আকাশলালের অন্তধার্নরহস্য সম্পর্কে রিপোর্ট না দিতে পারেন তাহলে আপনাকে বরখাস্ত করা হবে।’
ভার্গিস ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তাঁর মনে হল যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। যা সিদ্ধান্ত নেবার তা বোর্ড নিয়ে নিয়েছে। এই চব্বিশ ঘণ্টা সময় ওরাই নিয়েছে তাঁর উত্তরাধিকারীকে বেছে নেওয়ার জন্যে। ম্যাডামের প্রসঙ্গ টেনে আনতে প্রথমে তিনি চাননি। পরে কোণঠাসা হতে হতে মরিয়া হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু মিনিস্টার কায়দা করে সেদিকটা এড়িয়ে গেলেন। ওদের হাতে তিনি অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন। কেন তাঁকে বাংলোয় যেতে হয়েছিল তা বলতে দিলেই ম্যাডামের প্রসঙ্গ এসে যেত। ভার্গিস বুঝে গেলেন প্রসঙ্গটি তুলতে মিনিস্টার চাননি। আর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা। এর মধ্যে আকাশলালের শরীর খুঁজে বের করতে হবে। ব্যাপারটা প্রায় অসম্ভব। দুজন মানুষের মুখ মনে পড়ল তাঁর এই মুহূর্তে। একজন সেই মহিলা রিপোর্টার, যাকে তিনি তাঁর জিপে বসিয়ে রেখেছেন পুলিশ পাহারায়। দ্বিতীয়জন, ম্যাডাম। এই দুজনের সঙ্গে তাঁকে কথা বলতে হবে। প্রথমজনের কাছ থেকে কিছু হদিশ পাওয়া গেলেও যেতে পারে, দ্বিতীয়জনের সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে তাঁকে।
ভার্গিস নেমে এলেন রাস্তায়। তাঁর জিপের পেছনের আসনে বসে আছে অনীকা। দরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাকে কে পাঠিয়েছে ডেভিডের মৃতদেহ নিয়ে কথা বলার জন্যে?’
‘একটি লোক, ওকে আমি চিনি না!’
‘খুকি, মিথ্যা কথা বোলো না। কেউ একজন বলল, আর তুমি রাজি হয়ে গেলে?’
‘আমার মনে হয়েছিল মৃতদেহের কোনও অপরাধ থাকে না।’
‘আকাশলালের ডেডবডি কোথায় আছে?’ দাঁতে দাঁত চাপলেন ভার্গিস।
‘আমি জানব কি করে?’
‘তুমি সব জানো। ওর মৃত্যু নিয়ে এত কথা বললে আর ওটা জানো না?’
‘আমি শুধু বলেছি ওর মৃত্যুটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
‘সুতরাং তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে আকাশলালকে।’
‘আমি কি করে পারব? আপনি যেখানে পারছেন না।’
‘ভার্গিস সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, ‘তুমি বিপদ ডেকে আনছ!’
‘আপনার হাতে ক্ষমতা আছে আপনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। আমি বিদেশি, আমার কিছু হলে আপনাকে কিন্তু কৈফিয়ত দিতে হবে। মনে রাখবেন আমি একজন সাংবাদিক।’
‘কিন্তু সেই মর্যাদা তুমি রাখোনি।’
‘আশ্চর্য! আপনাদের এই শহরের কোন বাড়িতে লোকটার শরীর লুকিয়ে রেখেছে, তা আমি জানব কি করে? আমি এখানকার রাস্তাঘাটই ভাল করে চিনি না। একদিকে ঘিঞ্জি বাড়িঘর আর একদিকে বাগানওয়ালা প্রাসাদের মতো বাড়ি, এদের কারও সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। আমি শুধু টুরিস্ট লজটা চিনি।’ ‘অনীকা বলল।
শব্দগুলো ভার্গিসকে হঠাৎই নাড়িয়ে দিল। মেয়েটা কি বলল? বাগানওয়ালা প্রাসাদের মতো বাড়ি? হ্যাঁ, শহরের ঘনবসতি এলাকাগুলোয় তাঁর লোক চিরুনি-তল্লাশি চালিয়েছে কিন্তু বাগানওয়ালা প্রাসাদের দিকে পা বাড়ায়নি। ওইসব বাড়ি ধনী এবং বিশ্বস্তদের। সেখানে তল্লাশি চালাতে গেলে বোর্ডের বা মিনিস্টারের অনুমতি নিতে হবে। মহান সদস্যদের প্রত্যেকেই এইরকম বাড়ির মালিক। ভার্গিসের মনে পড়ল ম্যাডামের বাড়ির কথা। সেটিও ওই একই পর্যায়ের। অনীকাকে অন্য গাড়িতে হেডকোয়ার্টার্সে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন তিনি!
ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করার জন্যে ভার্গিসের জিপে, এসকর্ট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল শহরের বর্ধিষ্ণু পাড়ার মধ্যে দিয়ে। কয়েক পুরুষ ধরে এইসব বাগানওয়ালা বাড়ির মালিকরা সবরকম বৈভব ভোগ করছে। সাধারণ মানুষের জীবন এদের ইচ্ছাতেই নিয়ন্ত্রিত হয়। ভার্গিস বাড়িগুলো দেখতে দেখতে যাচ্ছিলেন। বিশাল এলাকা জুড়ে এক একটা বাগান। রাস্তা থেকে মূল বাড়ি দেখাই যায় না। লেডি প্রধানের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর খারাপ লাগল। বৃদ্ধা আর বেঁচে নেই। ইনি খুব কমই বাইরে যেতেন। লেডি প্রধানের কোনও উত্তরসূরি নেই বলেই তিনি জানেন। তার মানে বাড়িটি খালি আছে। এরকম বাড়িতে সন্ত্রাসবাদীরা চমৎকার লুকিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু লেডি মারা গেছেন সম্প্রতি। তিনি বেঁচে থাকতে ওদের নিশ্চয়ই উৎসাহ দেবেন না। ভার্গিস মাথা নাড়লেন। সন্দেহ যখন হচ্ছে তখন একবার রুটিন চেকআপ করলেই হয়। লেডির বাড়িতে তল্লাশি করলে এখন আপত্তি করার কেউ থাকবে না। অবশ্য সেটা রাতের বেলায় করাই ভাল। আজ তাঁর কমিশনার হিসেবে শেষ রাত।
ম্যাডামের বাগানের গেট পেরিয়ে তাঁর গাড়ি যখন ভেতরে ঢুকছিল তখন দ্বিতীয় সন্দেহ হল। তিনি যদি নিজের ক্ষমতার বলে এই বাড়িটি সার্চ করতে পারতেন তাহলে! যে মহিলা নিজের পিস্তল ড্রাইভারকে দিয়ে তাকেই খুন করিয়ে আবার অস্ত্রটি ফেরত নিয়ে যেতে পারেন তিনি স্বচ্ছন্দে সন্ত্রাসবাদীদের এই বিশাল প্রাসাদে আশ্রয় দিতে পারেন। বাঁ দিকের খোপ থেকে মিনি টেপরেকর্ডার বের করে পকেটে পুরে এক লাফে জিপ থেকে নেমে দাঁড়িয়ে ভার্গিস হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘ম্যাডামকে বলো আমি দেখা করতে এসেছি। এক্ষুনি! আমার হাতে সময় নেই। বাঁ হাতে পকেটের টেপরেকর্ডার চালু করলেন ভার্গিস। শক্তিশালী রেকডারটি একঘণ্টা চলবে।
২৯. ম্যাডামের অনুগত কর্মচারী
ম্যাডামের অনুগত কর্মচারীটির মুখে কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। ভার্গিসের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘ম্যাডাম এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন, ওঁকে বিরক্ত করা নিষেধ আছে।’
মাছি গিললেন বলে মনে হল ভার্গিসের। তিনি পুলিশ কমিশনার। এখনও তিনি এই রাজ্যের পুলিশের সর্বময় কর্তা। তাঁর মুখের ওপর এভাবে কথা বলার সাহস এই লোকটা পায় কি করে? তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, ‘ম্যাডামকে খবর দিলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন না।’
লোকটি বলল, ‘আপনি টেলিফোন করে আসুন।’
‘বেশ। সেটা আমি এখান থেকেই করছি। লাইনটা দাও।’
লোকটা আর প্রতিরোধ করতে পারল না। নিজেই রিসিভার তুলে বলল, ‘আমি অনেক আপত্তি করছি কিন্তু পুলিশ কমিশনার শুনতে চাইছেন না, উনি ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলবেন।’
লোকটি অপেক্ষা করল। বোঝা গেল ম্যাডামের সেই সহকারিণী টেলিফোন ধরেছিল। ভার্গিস ততক্ষণে চারপাশে নজর বোলাচ্ছিলেন। এই বাড়িতে ঢোকার নিশ্চয়ই অন্য পথ আছে। আকাশলালের মৃতদেহ—! সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে পড়ে গেল আকাশলালের শরীর যেদিন কবর থেকে উধাও হয়েছিল সেইদিন যে অ্যাম্বুলেন্সটিকে সন্দেহবশত ধরা হয় তাকে এইসব বাগানওয়ালা বাড়ির কাছে ঘুরতে দেখা গিয়েছে। ওর ড্রাইভার একটা অজুহাত দেখানোয় ওকে আর চাপ দেওয়া হয়নি। তাছাড়া নিজে এমন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছেন যে ওর ব্যাপারটা খেয়ালেও ছিল না ভার্গিসের। এখন মনে হচ্ছে তিনি চমৎকার ক্লু পেয়ে গেছেন। যা করার আজ রাত্রেই করতে হবে।
টেলিফোনের রিসিভার তাঁর হাতে দেওয়া হলে ভার্গিস বললেন, ‘হ্যালো।’
‘মিস্টার ভার্গিস? পুলিশ কি কোনও সম্ভ্রান্ত মহিলাকে তাঁর বিশ্রামের সময় বিনা কারণে বিরক্ত করতে পারে, বিশেষ করে যখন তাঁর শরীরে কোনও সুতো নেই?’
‘না মানে, ম্যাডাম, আমি— ।’ ভার্গিস হকচকিয়ে গেলেন।
‘আমার কর্মচারী কি বলেনি আমি বিশ্রাম করছি। সে যদি না বলে থাকে তাহলে এখনই তাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেব। বলুন।’
‘ইয়েস, বলেছিল। কিন্তু ব্যাপারটা এমন জরুরি— ।’
‘আমি কি এই অবস্থায় আপনার সামনে গিয়ে দাঁড়াব?’
‘না, না। আমি জানতাম না আপনি ওইভাবে বিশ্রাম নেন। সরি, খুব দুঃখিত।’
‘ঠিক আছে। জরুরি বলেই আপনাকে ওপরে আসার অনুমতি দিচ্ছি। কিন্তু আপনি আমার থেকে খানিকটা দূরেই থাকবেন। বুঝতেই পারছেন।’ রিসিভার নামিয়ে রাখলেন ম্যাডাম। ভার্গিস নিঃশ্বাস নিলেন। তাঁর চোখের সামনে ম্যাডামের মুখ ভেসে উঠল। এই বয়সেও ম্যাডাম সুন্দরী, চেহারাপওরও ভাল। কিন্তু মেয়েদের ওসব নিয়ে ভার্গিস কোনও দিন মাথা ঘামাননি। কিন্তু আজ যদি ম্যাডাম সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান? ভার্গিসের জিভ শুকিয়ে গেল। প্রাণপণে নিজেকে শক্ত করতে লাগলেন তিনি।
ভার্গিসকে ওপরে নিয়ে যাওয়া হলে ম্যাডামের সেক্রেটারি মহিলা বেরিয়ে এল বারান্দায়। এখানে তিনি এর আগে এসেছেন, আজও কোনও পরিবর্তন দেখলেন না।
তাঁর মনে হল বিশাল এই বাড়িটির অন্য অংশটি একটু বেশি রকমের থমথমে।
‘ইয়েস মিস্টার ভার্গিস!’
ভার্গিসের খেয়াল হল। তিনি ইতিমধ্যে সেক্রেটারির সঙ্গে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছেন। খুব হালকা নীল আলো জ্বলছে ঘরে। সেক্রেটারি বেরিয়ে যেতেই তিনি ম্যাডামকে দেখতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। একটা লম্বা ডিভানে ম্যাডাম শুয়ে আছেন। তাঁর সমস্ত শরীর ধবধবে সাদা মখমল জাতীয় কাপড়ে ঢাকা। ডিভানটির একটা দিক উঁচু বলেই ম্যাডামের শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে ওপরে তোলা। তাতে তাঁর আরাম হচ্ছে।
বসুন।
যে চেয়ারটিতে ভার্গিস বসলেন সেটি ম্যাডামের ডিভান থেকে অন্তত দশ হাত দূরে রাখা ছিল। ভার্গিস চেয়ারটিতে বসামাত্র বুঝতে পারলেন তাঁর শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত।
‘আপনার জরুরি বিষয়টি বলতে পারেন।’
‘আমি আবার দুঃখ প্রকাশ করছি— ।’
‘দ্যাটস অল। আপনি যত তাড়াতাড়ি কথা শেষ করবেন, তত আমার উপকার করবেন কারণ আমি শরীরে এই চাদরটা রাখতে পারছি না। শুরু করুন।’
‘ম্যাডাম।’ ভার্গিস সোজা হয়ে বসলেন, ‘বোর্ড আমাকে চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন। না হলে আমাকে সরে যেতে হবে। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ওঁরা করেছেন, তাতে আমাকে গ্রেফতারও করা যেতে পারে। আপনি আমাকে সাহায্য করুন।’
‘কি ভাবে?’
‘সেটা আপনি জানেন। আপনার প্রসঙ্গ আমি বোর্ডের কাছে তুলিনি।’
‘আমি এর মধ্যে কোত্থেকে এলাম?’
‘বাবু বসন্তলালের বাংলোতে আপনার ড্রাইভার কি করে গেল বলতে হলে আপনার কথাও বলতে হয়। আপনার নির্দেশে আমি লোকটাকে গুলি করতে বাধ্য হই। রিপোর্টে লেখা হয়েছে সে সশস্ত্র ছিল না। কিন্তু আপনি যে ওর অস্ত্র নিয়ে গিয়েছিলেন এটাও আমি বলতে পারিনি। ডেভিড পালাচ্ছিল এবং আপনি আমাকে গুলি করতে বলেছিলেন।
‘কক্ষনো নয়। আমি আপনাকে বলিনি ডেভিডকে গুলি করে মেরে ফেলুন।’
‘উত্তেজনার সময় সামান্য— ।’
‘মিস্টার ভার্গিস, আপনি বোর্ডের সামনে এসব প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু মিনিস্টার আপনাকে সেটা করতে দেননি, তাই না?’
ভার্গিস চমকে উঠলেন। কতক্ষণ আগে তিনি বোর্ডের মিটিঙে ছিলেন? এর মধ্যেই এখানে খবর পৌঁছে গেছে। তাঁর মনে হল ম্যাডামের নেটওয়ার্ক পুলিশ বাহিনীর থেকেও শক্তিশালী।
‘আমি আপনাকে সবার সামনে ছোট করতে চাই না ম্যাডাম।’
‘আপনি কি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে এসেছেন?’
‘না। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি আমাকে সাহায্য করার জন্য।’
‘যেমন?’
‘আপনি জানেন সন্ত্রাসবাদীরা কোথায় আকাশলালের শরীর নিয়ে গেছে।’
‘তাই? আমি জানি? আপনি কি বলতে চাইছেন ভার্গিস সাহেব? আমি জানি অথচ উকে জানাচ্ছি না, তার মানে আমি বোর্ডের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছি?’
‘হ্যাঁ। ব্যাপারটাকে ঘুরিয়ে দেখলে সেই রকমই দাঁড়াবে।’
‘মিস্টার ভার্গিস, এই অভিযোগ প্রমাণ করার দায়িত্ব আপনার!’
আপনি জানতে পেরেছিলেন বাবু বসন্তলালকে যাকে দিয়ে আপনি খুন করিয়েছিলেন সেই লোকটি অর্ধ উন্মাদ অবস্থায় আমার হাতে পড়েছে। আমি জানতাম খবর পাওয়ামাত্র আপনি তাকে সরিয়ে ফেলবেন। তাই আপনার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে আমি একজন সার্জেন্টকে পাঠিয়ে ওর পাহারার ব্যবস্থা করে বাবু বসন্তলালের বাংলোতেই রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি একটা বোকামি করেছিলাম। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার বাহিনীর যে কোনও অফিসার আপনাকে দেখে সম্মান জানাবেই। তারা সবাই জানে এ রাজ্যের সর্বময় কর্তাদের আপনি আঙুলের টানে নাচান। তাই ড্রাইভার নিয়ে যখন আপনি বাংলোর ভেতরে যান তখন সার্জেন্ট আত্মপ্রকাশ করেছিল আপনাকে খুশি করতে। আপনার ড্রাইভার সম্ভবত তাকে নীচের ঘরে নিয়ে গিয়ে খুন করে। করে কফিনে তুলে দেয়। আধ-পাগল চৌকিদারকে গাছে ঝুলিয়ে দিতে ব্ল্যাকবেল্টধারী ড্রাইভারের একটুও কষ্ট হয়নি। আর দু দুটো খুনের পর আপনি আমাকে টেলিফোনে ওখানে যেতে বলেন। ঠাণ্ডা মাথায় লনে বসে থাকেন। এবং হয়তো ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে। ওই ড্রাইভারকে সরিয়ে না দিলে একটি সাক্ষী থেকে যেত যে আপনার বিরুদ্ধে পরে মুখ খুলতে পারে। তাই আমাকে দিয়ে তাকে খুন করালেন। এর একটা কথাও আপনি অস্বীকার করতে পারেন?
ম্যাডাম একদৃষ্টিতে ভার্গিসের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এবার বললেন ‘প্রমান কি?’
‘তার মানে?’
‘আপনার ওই কথাগুলোকে সমর্থন করার মতো কোনও সাক্ষী আছে?’
‘ম্যাডাম। সাক্ষীদের আপনি মেরে ফেলেছেন।’
‘মিস্টার ভার্গিস। এসব বাগানওয়ালা বাড়িতে দু-একটা সাপ থাকে যাদের বাস্তুু সাপ বলা হয়। তারা তাদের মতো থাকে, বিরক্ত করে না, বাড়ির কেউ তাদের ঘাঁটায় না। কিন্তু কখনও ভুল করে কেউ যদি তাদের লেজে পা দেয় তাহলে সেই সাপ সঙ্গে সঙ্গে ছোবল মারে। আর সেই ছোবলের বিষ থেকে পরিত্রাণ নেই। আপনি লেজে পা দিয়েছেন, যেচে, ইচ্ছে করে। আপনি আমার সাহায্য চাইতে এসেছেন, এটা একটা ভানমাত্র। আপনাকে আমি দুটো প্রস্তাব দিচ্ছি। আপনি এখান থেকে ফিরে গিয়ে পদত্যাগপত্র দাখিল করে সীমানা পেরিয়ে চলে যান। আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে কেউ বিরক্ত করবে না। আপনার পেছনে কোনও পুলিশ ছুটবে না।’
ভার্গিস জিজ্ঞাসা করলেন, দ্বিতীয় প্রস্তাব?’
‘এখন থেকে আমি যা বলব তার বাইরে আপনি কোনও কাজ করবেন না। যে কোনও সিদ্ধান্ত নেবার আগে মিনিস্টার নয় আমার অনুমতি দেবেন।’
ভার্গিস হতভম্ব। নিজেকে কিছুটা সামলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিন্তু বোর্ড তো আর তেইশ ঘণ্টা পরে আমাকে স্যাক্, করবে? তার কি করবেন?’
তেইশ ঘণ্টা মানে অনেক সময়। ওয়ান থাউজেন্ড থ্রি হান্ড্রেড এইট্টি মিনিটস। তাই না?’
‘ধরে নিন আপনার দ্বিতীয় প্রস্তাবে আমি রাজি হলাম— ।’
‘তাহলে আমি যা বলব তাই করতে হবে আপনাকে।’
‘বেশ। রাজি আছি।’
‘গুড। তাহলে এগিয়ে আসুন।’
‘মানে?’
‘আপনাকে আমি কাছে আসতে বলছি।’
ভার্গিস এগিয়ে গেলেন। হাতদুয়েক দূরে দাঁড়িয়ে ম্যাডামকে দেখলেন। সমস্ত শরীর সাদা মখমলে ঢাকা সত্ত্বেও আদলটি প্রকাশিত।
‘আমার পায়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান। হ্যাঁ। এবার হাঁটু মুড়ে বসুন মিস্টার ভার্গিস।’
‘কেন?’
‘প্রশ্ন করবেন না। আপনার কর্তব্য আদেশ মান্য করা।’
ভার্গিস হাঁটু মুড়ে বসলেন। ভারী শরীর নিয়ে একটু অসুবিধে হল। এখন তাঁর সামনে দুটো ধবধবে পা। শাঁখের মত সাদা।
চোখ ওপরে উঠতেই ভার্গিস পাথর হয়ে গেলেন। মখমলের চাদরের পাশ থেকে ম্যাডামের ডান হাত বেরিয়ে এসেছে। এবং সেই হাতের মুঠোয় চকচকে কালো ছোট্ট পিস্তল ধরা। পিস্তলের মুখ তাঁর মাথার দিকে তাক করা।
‘আমার মনে হচ্ছিল আপনি প্রমাণের সন্ধানে এসেছেন। আপনার পকেটে কি টেপরেকর্ডার আছে মিস্টার ভার্গিস? থাকলে ওটা আমার পায়ের কাছে রেখে দিন।’
ভার্গিস আদেশ অমান্য করতে পারলেন না।
টেপ রেকর্ডারটা হাতে নিয়ে ম্যাডাম শায়িত অবস্থাতেই খিলখিল করে হেসে উঠলেন, ‘আচ্ছা, মিস্টার কমিশনার, আপনার মাথায় কবে একটু বুদ্ধি আসবে? আমাকে এমন নির্বোধ ভাবলেন কি করে? এবার উঠে দাঁড়ান। হ্যাঁ। ওই চেয়ারটার কাছে চলে যান। বসুন। গুড। আবার বলুন, আমার ওই দুটো প্রস্তাবের কোনটা আপনি গ্রহণ করছেন?’
রাগে অপমানে দুঃখে মাথা নিচু করে বসেছিলেন ভার্গিস। তিনি জানেন ম্যাডামের হাতের আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে হঠকারিতা করে কোনও লাভ নেই। এই অপমান তাঁকে হজম করতেই হবে। তিনি মাথা তুললেন, ‘কোনওটাই নয়।’
‘আচ্ছা!’
‘কাল সকালে আমাকে বরখাস্ত করা হবে আমি জানি। কিন্তু তার আগে আমি দেশের মানুষের কাছে বলে যাব কে দেশদ্রোহী কে নয়!’
‘আবার বোকামি। পুলিশের কথা সাধারণ মানুষ কখনও বিশ্বাস করে না। তাহলে আপনি আমার সাহায্য চান না। আপনি এখন স্বচ্ছন্দে আসতে পারেন।’
মিনিট দশেক পরে বড় রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়েছিল ভার্গিসের জিপ। একটু আগে তিনি ওয়ারলেসে হুকুম পাঠিয়েছেন হেড কোয়ার্টার্সে পুরো একটা ব্যাটিলিয়ন ফোর্স পাঠানোর জন্যে। তারা চলে আসতেই ভার্গিসের জিপ ম্যাডামের বাড়ি ঘিরে ফেলল। ওই বিশাল বাগানওয়ালা বাড়ি থেকে যাতে কেউ বেরিয়ে যেতে না পারে তার সবরকম ব্যবস্থা করে ভার্গিস গন্ডি ছোট করে বাড়ির সামনে পৌঁছে গেলেন। যে কাজটা তিনি করছেন তার জন্যে অনেক জবাবদিহি দিতে হবে তাঁকে, হয়তো চব্বিশ ঘণ্টা নয়, ফিরে যাওয়ামাত্র তাঁর চাকরি শেষ হয়ে যাবে, তবু নিজের কাছে বাকি জীবন স্বাভাবিক থাকতে এটা তাঁকে করতেই হবে।
বাড়িটাকে ঘিরে পুলিশবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে অথচ সদর দরজা বন্ধ, একটিও মানুষ এগিয়ে আসছে না। অথচ মিনিট পঁচিশেক আগে যখন তিনি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তখন কর্মচারীরা এখানেই ছিল। ভার্গিস নিজেই বেল বাজালেন। তৃতীয় বারে একজন লোক বেরিয়ে এল। এই লোকটাকে ভার্গিস আগে দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না। দরজা খুলে বিনীত ভঙ্গিতে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি করতে পারি, স্যার?’
‘ম্যাডামকে খবর দাও।’
‘ম্যাডাম বলেছেন, আপনি স্বচ্ছন্দে সমস্ত বাড়ি সার্চ করতে পারেন। একটু আগে আপনি ওঁকে যে ঘরে দেখে গেছেন সেখানেই বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি। আপনার কাজ হয়ে গেলে ওঁর সঙ্গে কি আপনি দেখা করে যাবেন?
ভার্গিসের সমস্ত শরীর শীতল হয়ে গেল। তিনি বুঝে গেলেন এ বাড়িতে সার্চ করে কিছুই পাওয়া যাবে না। যদি কিছু অথবা কেউ থেকেও থাকে তাহলে তিনি চলে যাওয়ামাত্র তাদের সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অথচ তিনি এ বাড়ির সামনের রাস্তায় অপেক্ষা করছিলেন। বাইরে কারফিউ চলছে। ম্যাডাম কোন পথে তাদের সরালেন। কিন্তু এতদূর পর্যন্ত এগিয়ে তিনি আর পিছিয়ে যেতে পারেন না। পরক্ষণেই তাঁর মাথায় অন্য পরিকল্পনা এল। তিনি মুখে একবারও বলেননি যে বাড়ি সার্চ করবেন অথচ এই লোকটি সেটা উচ্চারণ করেছে। ম্যাডাম জানতেন তিনি এটা করতে যাচ্ছেন? হেড কোয়ার্টার্স থেকে ব্যাটিলিয়ন রওনা হবার সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো খবর পেয়ে গেছেন।
ভার্গিস লোকটিকে সরিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। নীচে, সিঁড়িতে কর্মচারীরা সারি দিয়ে অপেক্ষা করছিল। তাদের ভ্রূক্ষেপ না করে ভার্গিস সোজা দোতলায় উঠে এসে দেখলেন সেই সেক্রেটারি মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায়। ভার্গিস যে গতিতে উঠে এসেছিলেন তাতে তাঁকে আটকানো সম্ভব ছিল না মহিলার। তিনি ‘স্যার’ ‘স্যার’ করে বাধা দেবার আগেই ভার্গিস ম্যাডামের দরজার সামনে পৌঁছে বললেন, ‘মে আই কাম ইন ম্যাডাম?’
ভেতর থেকে গলা ভেসে এল, ‘ইয়েস!’
পর্দা সরিয়ে ভার্গিস ভেতরে ঢুকলেন। ম্যাডাম এখনও সেই একই ভঙ্গিতে শুয়ে আছেন। চেয়ারের পাশে পৌঁছে ভার্গিস বললেন, ‘আপনার কর্মচারী ভুল বুঝেছে ম্যাডাম। আমি এ বাড়িতে তল্লাসির জন্যে আসিনি।’
‘তাহলে?’
‘আমি আপনার দ্বিতীয় প্রস্তাব গ্রহণ করছি!’
‘তাহলে পুরো একটা ব্যাটিলিয়ন সঙ্গে কেন?’
‘এরা আমার অনুগত। যদি আপনি এখন আর রাজি না হন তাহলে আমার মতো এরাও পদত্যাগ করবে, একসঙ্গে।’ ভার্গিস হাসলেন।
‘এই প্রথম আপনাকে বুদ্ধিমান বলে মনে হচ্ছে। বসুন।’
ভার্গিস বসলেন। এখন তাঁর আর কিছুই করণীয় নেই।
রাত তখন সাড়ে বারো। একেই পাহাড়ি শহর তার ওপর কারফিউ চলছে, মনে হচ্ছে, বাতাস ছাড়া পৃথিবীতে কোনও শব্দ নেই, কোনও জীবন নেই। দুটো গাড়ি দাঁড়িয়েছিল লেডি প্রধানের বাড়ির সামনে। দুটোতেই লেডি প্রধানের গাড়ির নাম্বার লাগানো। পরলোকগতা লেডির শেষ কাজ সম্পন্ন করার জন্যে যে কারফিউ পাশ ইসু করা হয়েছিল তা আজ রাতের পর কার্যকর থাকবে না। এখন সেই কাগজগুলো দুজন ড্রাইভারের পকেটে আছে। একটু আগে অত্যন্ত সাবধানে আকাশলালের শরীর নামানো হয়েছে স্ট্রেচারে শুইয়ে। ভ্যানের পেছনে বিশেষ ব্যবস্থা করা বিছানায় তাকে তুলে দেওয়া হয়েছে।
এ বাড়ির কোথাও আলো জ্বলছে না। যেসব সদস্য আজ রাত্রের অভিযানে সামিল হচ্ছে না তাদের উদ্দেশে হায়দার একটা ছোট্ট বক্তৃতা এইমাত্র শেষ করল। সমস্ত দেশ একদিন নিশ্চয়ই এই দেশপ্রেমের স্বীকৃতি দেবে। নেতা সুস্থ হয়ে ওঠামাত্র আবার যখন ডাক দেবেন তখন যে যেখানেই ছড়িয়ে থাকুন ছুটে আসবেনই একথা হায়দার বিশ্বাস করে। সেইসঙ্গে সে মনে করিয়ে দিয়েছে কোনওভাবেই যেন আজকের রাত্রের বিবরণ শত্রু-পক্ষ জানতে না পারে। তাঁরা সবাই ইন্ডিয়ায় চলে যাচ্ছেন নেতাকে রক্ষা করতে। যদি বাকিদের এখানে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তারাও ইন্ডিয়ায় চলে যেতে পারে। আর তারা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ামাত্র সবাইকে বেরিয়ে যেতে হবে। বারোটা পয়তাল্লিশ থেকে একটা পর্যন্ত, সামনের রাস্তায় কোনও পুলিশ পেট্রল থাকবে না এমন ব্যবস্থা করা আছে।
ঠিক তখনই ত্রিভুবন বেরিয়ে এল। হায়দারকে আলিঙ্গন করল সে। নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘আমরা সবাই ইন্ডিয়ায় যাচ্ছি তাই বলেছ তো?’
‘হ্যাঁ। এবার রওনা হতে হবে। পথে অন্তত এই রাস্তা যেখানে শেষ হচ্ছে সেই পর্যন্ত কোনও বাধা পাবে না। তারপর বড় রাস্তা এড়াতে চেষ্টা করবে। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে তাহলে কারফিউ পাশ দেখিয়ে বলবে লেডির শেষকাজে যাঁরা এসেছিলেন তাদের পৌঁছাতে যাচ্ছ। উইশ ইউ গুড লাক।’
‘সেম টু ইউ। আমি যোগাযোগ করব।’
প্রথমে ভ্যানটা রওনা হল, পেছনে জিপ। ওরা রওনা হওয়ামাত্র বাকিরা ছুটে গেল বাড়ির ভেতরে। নিজেদের জিনিসপত্র সামান্যই ছিল কিন্তু লেডি প্রধানের মূল্যবান জিনিস ওদের ভাবনায় ফেলল। ওদের মনে হতে লাগল কিছুদিন ব্যবহার করার সুবাদে এগুলোর ওপর অধিকার জন্মে গিয়েছে। ওরা যে যা পারে সংগ্রহ করে নিয়ে বিপাকে পড়ল। এসব জিনিস একসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। এদিকে রাত বাড়ছে। ওরা এক জায়গায় বসে ঠিক করল ইতিমধ্যে যখন হায়দারের দেওয়া সময়সীমা পেরিয়ে গিয়েছে তখন বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে এখানেই থেকে গেলে ভাল হয়। আগামী কাল দিনের আলোয় জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ হবে।
ঠিক দুটোর সময় লেডি প্রধানের বাড়ি এবং বাগান ভার্গিসের পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলল। হায়দার এবং ত্রিভুবনের ফেলে-যাওয়া সঙ্গীরা প্রায় বিনা বাধায় আত্মসমর্পণ করল পুলিশের কাছে। সমস্ত বাড়ি চষে ফেললেন ভার্গিস। না, কোথাও মৃতদেহ অথবা আকাশলালের প্রধান দুই সঙ্গী নেই। ধৃতদের জেরা শুরু করে দিয়েছিল তাঁর অফিসাররা। সমস্ত বাড়ি ঘুরে একটি ঘরে ঢুকে ভার্গিস হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। যে কোনও বড় নার্সিং হোমের অপারেশন থিয়েটার প্রায় এই রকমই হয়। ওষুধের গন্ধে বাতাস ভারী। এখানে কি কারও অপারেশন হয়েছিল? কার? সঙ্গে সঙ্গে ভার্গিসের পেটের ভেতর চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়ে গেল। মৃতদেহে কি অপারেশন করা যায়? করলে যদি মানুষ আবার বেঁচে যেত তাহলে পৃথিবীতে তো সোরগোল পড়ে যেত। কিন্তু অন্য কেউ যদি অসুস্থ হয়ে থাকে তাহলে সে গেল কোথায়? তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন পাখিরা পালিয়ে গিয়েছে। এখানে আসতে তিনি দেরি করেছেন। ম্যাডামের বাড়িতে ব্যাটিলিয়ন নিয়ে না গিয়ে সেই সময় সোজা যদি এখানে চলে আসতেন তাহলে কাজের কাজ হত। তিনি টেলিফোন তুলে ডায়াল করলেন। এত রাত্রে মিনিস্টারের টেলিফোন বেজে যাচ্ছে। এই নাম্বার মিনিসটারের শোওয়ার ঘরে। লোকটা গেল কোথায়। এতক্ষণ টেলিফোন বাজলে কেউ জেগে থাকতে পারে না। রিসিভার নামিয়ে রেখে ভার্গিস একটু ইতস্তত করে ম্যাডামের বাড়িতে ফোন করলেন। এখন রাত সওয়া তিনটে।
একবার রিং হতেই ওপাশে রিসিভার উঠল, ‘হ্যালো।’
ম্যাডামের গলা। এত রাত্রে মহিলা জেগে আছেন?
ভার্গিস ধীরে ধীরে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন।
দ্রুত গতিতে জিপটা এগিয়ে যাচ্ছিল। লেডি প্রধানের বাড়ি থেকে বের হওয়ামাত্র ভ্যানটির সঙ্গ থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। যতটা সম্ভব বেশি স্পিড তুলেছিল ড্রাইভার। জিপের পেছনে তিনজন মানুষ বসে আছে চুপচাপ। তিন সাক্ষী। নির্জন রাতের রাজপথে কোনও বাধা নেই। ব্যবস্থা অনুযায়ী থাকার কথাও নয়। ত্রিভুবনের কোলের ওপর যে আগ্নেয়াস্ত্রটি তৈরি তাতে অনেক বুলেট প্রস্তুত। রাস্তাটি শেষ হয়ে গেলে তার নির্দেশে ড্রাইভার বাঁ দিকের গলিতে ঢুকে পড়ল। পথ এবার সরু বলে গতি কমাতে হচ্ছে।
হঠাৎ পেছন থেকে স্বজন বলে উঠল, ‘এভাবে চালালে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যাবে।’
ত্রিভূবন জবাব দিল না। তিনটে মানুষকে তার বোবা বলে মনে হচ্ছিল।
বৃদ্ধ ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
‘যাওয়ার পর বুঝতে পারবেন।’ ত্রিভুবন জবাব দিল।
‘এভাবে যেতে আমি রাজি নই।’
‘কিভাবে আপনাকে নিয়ে গেলে রাজি হবেন?’
‘আমাকে ছেড়ে দিন। আমি এখান থেকেই বাড়ি ফিরে যাব।’
‘কারফিউ চলছে। আপনাকে ওরা গুলি করে মারবে।’
‘আমাকে বলা হয়েছিল কাজ শেষ হয়ে গেলে আমি যেখানে ইচ্ছে যেতে পারব?’
‘কে কি বলেছিল জানি না, আমার ওপর দায়িত্ব আপনাকে বর্ডার পার করে দেওয়া। দয়া করে আর বকবক করবেন না। মনে রাখবেন পুলিশের চোখে আপনি একজন ক্রিমিন্যাল।’
‘ক্রিমিন্যাল? আমি?’
‘হ্যাঁ। আপনি আকাশলালের শরীরে অপারেশন করে পুলিশকে ধোঁকা দিয়েছেন?’
এইসময় ড্রাইভার একটা অস্ফুট শব্দ উচ্চারণ করল। ত্রিভুবন দেখল দূরে রাস্তার বাঁকে একটি টহলদারি ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ভ্যানের সামনে দুজন অফিসার। ত্রিভুবন চাপা গলায় বলল, ‘আপনারা কেউ কোনও কথা বলবেন না। যদি কেউ কথা বলার চেষ্টা করেন তাহলে আগে আমি তাকে গুলি করব। আমি সুইসাইড করতে রাজি কিন্তু ধরা দিতে নয়।’
৩০. ত্ৰিভুবনের ইঙ্গিত
ত্রিভুবনের ইঙ্গিতে জিপ ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে গেল। সামনে দাঁড়ানো পুলিশের সকলের হাতে আধুনিক অস্ত্র। ত্রিভুবনের বুকের ভেতরে ড্রাম বাজছিল। হায়দার বলেছে তার সঙ্গে পুলিশের একটা অংশের ব্যবস্থা হয়েছে। এই লোকগুলো সেই অংশের মধ্যে পড়ে কি না কে জানে। পায়ের কাছে ধরা রিভলভারটি কাঁপছিল তার। ধরা পড়ার আগে এটাকে ব্যবহার করবে না।
একজন পুলিশ অফিসার চিৎকার করে বলল হেডলাইট নেভাতে। ড্রাইভার চটপট সেটা নিভিয়ে দিলে লোকটা এগিয়ে এল অস্ত্র হাতে। ড্রাইভারের পাশে দাঁড়িয়ে হুকুম করল, ‘কারফিউ পাশ আছে?’ ড্রাইভার তড়িঘড়ি সেটা বের করে দিল।
লোকটা জিপের ভেতরের আলোয় সেটাকে দেখার চেষ্টা করল। তারপর কাগজটা ফিরিয়ে না দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’
ত্রিভুবন জবাব দিল ‘শিবগঞ্জ।’
‘কেন?’
‘আমাদের এক আত্মীয় মারা গিয়েছে।’
‘নেমে এসো। সার্চ করব।’
‘অফিসার, আমাদের খুব দেরি হয়ে যাবে। ম্যাডাম রাগ করবেন।’
‘ম্যাডাম?’
‘ওঁর হুকুমেই যাচ্ছি।’
লোকটা কারফিউ পাশ ড্রাইভারকে ফিরিয়ে দিয়ে অন্যান্যদের ইশারা করল পথ করে দিতে। জিপ আর দাঁড়াল না। ওদের পেরিয়ে আসামাত্র স্বজন জিজ্ঞাসা করল, ‘ম্যাডাম কে?’
‘কেন? আপনাদের কি দরকার?’
‘পুলিশের কাছে মন্ত্রের মতো কাজ হল ওঁর নাম বলায়।’
‘আপনারা কিছু শোনেননি। চুপচাপ বসে থাকুন।’ রুমালে মুখ মুছল ত্রিভুবন। এখন বাড়িঘর চারপাশে নেই। প্রায় মাঠের মধ্যে দিয়ে গাড়ি ছুটছে। ব্যাপারটা ত্রিভুবনকেও কম বিস্মিত করেনি। হায়দার বলেছিল, ‘পুলিশ যদি তোমাকে বেকায়দায় ফেলতে চায় তাহলে ম্যাডামের দোহাই দেবে। তাতে কাজ না হলে বুঝবে অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে।’ সে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘ম্যাডাম কেন? তিনি এর মধ্যে আসছেন কেন?’
‘আমি জানি না। কিছু কিছু ব্যাপার আছে যা জানতে না চাওয়াই ভাল।’
ত্রিভুবন তখন মাথা ঘামায়নি। মাথা ঘামানোর মতো অবকাশও ছিল না। অব্যাহতি পাওয়ার পর মনে হচ্ছে জল অনেক দূর গড়িয়েছে। তাদের এই আন্দোলনের সঙ্গে দেশ এবং বিদেশের অর্থবান কিছু মানুষ জড়িয়ে আছেন। লেডি প্রধান যদি তাদের আশ্রয় না দিতেন তাহলে আকাশলালের ওপর অপারেশন করা সম্ভব হত না। কিন্তু ওই ম্যাডাম যে তাদের সঙ্গে আছেন এ কথা প্রথমসারির নেতা হয়েও সে জানত না। ম্যাডাম হচ্ছেন স্বৈরাচারী সরকারের একজন প্রতিনিধি। বোর্ডে ওঁর ইনফ্লুয়েন্স খুব। ভার্গিস ওঠে বসে ওঁর কথায়। এমন মহিলা কি করে ওদের সঙ্গে থাকবেন? গুলিয়ে যাচ্ছিল সব ত্রিভুবনের কাছে।
এখন রাত সুনসান। আকাশে যেন তারার বাজার বসে গেছে। এই তিনজনকে সীমান্ত পার করে দিলে তার মুক্তি। তারপর সে চলে যাবে গ্রামে। এই জিপ নিয়ে অবশ্য গ্রামে যাওয়া যাবে না। কিন্তু গ্রামে গিয়ে করবেই বা কি? হঠাৎ আর একটা ভাবনা মাথায় এল। ম্যাডামের সঙ্গে কি আকাশলালের কোনও গোপন সম্পর্ক আছে। এতকাল পুলিশের হাত থেকে ম্যাডামই কি ওদের বাঁচিয়ে রেখেছিল? হায়দার সব জানত? এই সন্দেহ সত্যি হলে বিপ্লবের বড় বড় স্তম্ভগুলো তো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। বিপ্লব ব্যাপারটাই বানানো হয়ে যাবে। রিভলভার আঁকড়ে ধরল সে। আকাশলাল কি তাকে ব্যবহার করেছে? বিপ্লবের নামে তাদের নিঃস্ব করে নিজের আখের গুছিয়ে নিতে অপারেশন করিয়েছে? ত্রিভুবন জানে এই প্রশ্নের উত্তর সময় ছাড়া কেউ দিতে পারবে না। হেনার মুখ মনে পড়ল। মেয়েটা তাকে ভালবাসে। তাকে ভালবাসে বলেই বিপ্লবের অংশীদার হয়েছে ও। হেনা এখন তার জন্যে গ্রামে অপেক্ষা করছে? ঠিক জানা নেই। ক’দিন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। হঠাৎ নিজেকে কিরকম প্রতারিত বলে মনে হচ্ছিল তার।
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ বৃদ্ধ ডাক্তারের গলা ভেসে এল।
‘জাহান্নামে।’ ত্রিভুবন বিকৃত মুখে উত্তর দিল। তার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। স্বজনের গলা পাওয়া গেল, ‘আপনি এভাবে কথা বলতে পারেন না।’
‘কিভাবে কথা বলব তা আপনার কাছে শিখতে হবে নাকি?’
‘এই সময় পৃথা বলে উঠল, ‘আশ্চর্য অকৃতজ্ঞ তো!’
‘ইউ শাট আপ। চুপ করে বসুন।’ চিৎকার করে উঠল ত্রিভবন। হঠাৎই সে নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল সবাই তার ভালমানুষির সুযোগ দিচ্ছে।
পৃথা বলল, ‘চমৎকার। আপনাদের জন্যে আমরা দেশ ছেড়ে এখানে এসে বন্দির জীবন যাপন করলাম। আমাদের কাজে লাগিয়ে এমন ব্যবহার তো আপনারা করবেনই।’
‘ম্যাডাম। আপনারা আমার জন্যে কিছু করেননি। যার জন্যে করেছেন সে ভ্যানে চেপে অন্য দিকে রওনা হয়ে গিয়েছে। আমার মাথা ঠিক নেই, এখন কথা বলবেন না।’ ত্রিভুবনের গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে স্বজন ইশারায় পৃথাকে কথা বলতে নিষেধ করল। কিন্তু বৃদ্ধ ডাক্তার সেটা বুঝলেন না। তিনি বললেন, ‘আমাকে নামিয়ে দিন।’
‘নামবেন মানে? এখানে নেমে কোথায় যাবেন?’
‘যেখানেই যাই, নিজে যাব। আমাকে আপনাদের আর কোনও দরকার নেই।’
‘আছে। এখানে আপনাকে দেখতে পেলেই পুলিশ ধরবে। তারা আপনার পেট থেকে সব কথা টেনে বের করবে। আমরা সেটা চাই না।’
‘উঃ, আমি পাগল হয়ে যাব।’ বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমি কত দিন ধরে এদের কাছে বন্দি হয়ে আছি তা জানেন? আমার পরিবারের কাউকেই আমি দেখতে পাইনি। ওরা নিশ্চয়ই ভেবেছে আমি মরে গেছি। শুধু লোভে পড়ে আমি রাজি হয়েছিলাম। আকাশ আমাকে বলেছিল অপারেশনটা করতে পারলে পৃথিবীর সবাই আমার নাম জানবে। নোবেল প্রাইজ পাব আমি। ওঃ, কী ভুল কী ভুল!’
হঠাৎ ত্রিভুবন ঘুরে বসল, ‘এই বুড়ো, চুপ করবি কিনা বল!’
‘না করব না। চিৎকার করে সবাইকে বলব তোমরা আমাকে বন্দি করে রেখেছ।’
ত্রিভুবন স্বজনের দিকে তাকাল, ‘ওকে সামলান। এই চিৎকার কারও কানে গেলে আর বর্ডার পার হতে পারব না আমরা। পুলিশের চোখে আমরা সবাই এখন অপরাধী। এটা ওকে বোঝান। নইলে আমি কিছু করলে আপনারা দোষ দেবেন না।’
স্বজন বৃদ্ধের হাত ধরল, ‘ডক্টর। একটু শান্ত হন। বর্ডার পেরিয়ে গেলেই আপনি যেখানে ইচ্ছে সেখানে যেতে পারবেন।’
‘না পারব না। দে উইল নট অ্যালাউ মি। আমি ওদের গোপন খবর জেনে গেছি।’ বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন, ‘ওরা আমাকে ছেড়ে দিতে পারে না।’
গোপন খবর? স্বজন শক্ত হল। সে আকাশলালের মুখ অপারেশন করে পাল্টে দিয়েছে। এই ব্যাপারটা তার চেয়ে ভাল কেউ জানে না। পৃথিবীতে একমাত্র সে-ই আকাশলালকে দেখে আইডেন্টিফাই করতে পারবে। যদি নতুন জীবনে আকাশলাল নতুন মানুষ হিসেবে কাজ করতে যায় তাহলে তার মতো সাক্ষীকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইবে না। তার মানে বৃদ্ধের মতো তারাও নিরাপদ নয়।
স্বজন চাপা গলায় বলল, ‘বর্ডার আর কত দূর?’
ত্রিভুবন ড্রাইভারের দিকে তাকাল। ড্রাইভার বলল, “আর মাইল পাঁচেক।’
‘বর্ডার পার হবেন কি করে? সেখানে চেকপোস্ট আছে।’
‘সেটা আমার চিন্তা। আপনারা নিচু হয়ে বসে থাকবেন।’
এই সময় একটা মোটর বাইকের আওয়াজ পাওয়া গেল। রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে মোটর বাইকটা সামনের দিক থেকে আসছে। এখন ওরা পাহাড়ি জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে। রাস্তায় ঘন ঘন বাঁক। তাই মোটর বাইকটাকে দেখা যাচ্ছে না।
ত্রিভুবন বলল, ‘ভগবানের দোহাই, আপনারা চুপ করে থাকুন। বাইকে পুলিশ থাকবেই। আমি ওর সঙ্গে কথা বলব।’
একটা বাঁক ঘুরতেই দূরে বাইকটাকে দেখা গেল। আলোয় সিগন্যাল দিচ্ছে থেমে যাওয়ার জন্যে। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, ‘কি করব?’
‘একা মনে হচ্ছে?’
‘হ্যাঁ। পেট্রল বাইক।‘
‘তাহলে কাছে গিয়ে স্পিড বাড়াও। বাইকটাকে স্ম্যাশ করার চেষ্টা করো।’
হেডলাইটের আলোয় পুলিশ অফিসারকে দেখা গেল। বাইক থেকে নেমে স্টেনগান উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইশারা করছে জিপ থামাতে। জিপের গতি শ্লথ হল। কিন্তু কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎ পিকআপ বাড়িয়ে দিল ড্রাইভার। আর সেই সঙ্গে রাস্তার একপাশে চলে এল যেখানে বাইকটা রয়েছে। চিৎকার করে সার্জেন্ট লাফিয়ে পড়তে চাইল একপাশে। জিপ গতি বাড়িয়েও বাড়াতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল তার চাকা আটকে যাচ্ছে মাটিতে। ড্রাইভার ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল, ‘বাইকটা ভেতরে ঢুকে গেছে।’ সে জিপ থামাতে বাধ্য হল।
চকিতে জিপ থেকে নেমে গুলি ছুঁড়তে লাগল ত্রিভুবন। রাস্তার পাশে শুয়ে থাকা অফিসারের শরীর আর নড়ল না। ত্রিভুবন চিৎকার করল, ‘বাইকটাকে বের কর, জলদি।’
ড্রাইভার ততক্ষণে নীচে নেমে দেখছে। ভেঙেচুরে তুবড়ে বাইকের অনেকটাই সামনের বাঁদিকের চাকার ফাঁকে ঢুকে গেছে। দু’হাত দিয়ে টেনে-হিঁচড়েও সেটাকে বের করতে পারল না লোকটা। বলল, ‘স্যার, আপনাদের হাত লাগাতে হবে।’।
ত্রিভুবন হুকুম করল, ‘নেমে আসুন, নেমে আসুন। না না আপনি নন, আপনি আসুন, হাত লাগান।’ বৃদ্ধকে থামিয়ে সে স্বজনকে হুকুম করল।
অতএব স্বজন নামল। চার ধার অন্ধকার, শুধু জিপের আলো জ্বলছে। তিনজনে কিছুক্ষণ চেষ্টার পর বাইকটাকে সরিয়ে আনতে পারল। জিপে উঠে বসল স্বজন। ত্রিভুবন উঠতে গিয়েও থেমে গেল, ‘স্টেনগানটা নিয়ে আসি। কাজ দেবে।’
মৃত অফিসারের কাছে চলে গেল সে। স্বজন দেখল অন্ধকারে অস্ত্রটাকে খুঁজে পাচ্ছে না ত্রিভুবন। দেখতে দেখতে ঢালুর দিকে নেমে যাচ্ছে। পা দিয়ে খুঁজছে সে। হঠাৎ তার নজরে এল নিজের আসনের ওপর রিভলভারটা রেখে গিয়েছে ত্রিভুবন। চট করে হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়ে সে ড্রাইভারের মাথায় অস্ত্রটা ঠেকাল, ‘স্পিড় নাও। জলদি। নইলে গুলি করব।’
‘কিন্তু— ।’
‘আর একটা কথা বললে তোমার অবস্থা ওই অফিসারের মতো হবে।’ রিভলভার দিয়ে ঠেলল সে ড্রাইভারের মাথাটাকে। সঙ্গে সঙ্গে গিয়ার পাল্টে অ্যাকসিলারেটারে চাপ দিল লোকটা। গাড়ি গতি নিতেই ত্রিভুবনের চিৎকার ভেসে এল, ‘এই, আরে, কি হচ্ছে? এই!’ রিভলভারের নল সরাল না স্বজন। চাপা গলায় বলল, ‘আরও জোরে’ এবং তখনই স্টেনগানের আওয়াজ ভেসে এল। অস্ত্রটাকে খুঁজে পেয়েছে ত্রিভুবন। কিন্তু জিপ ততক্ষণে আর একটা বাঁকের আড়ালে চলে এসেছে।
সোজা চালাও, থামবে না।’ হুকুম করল স্বজন।
‘থ্যাঙ্ক ইউ ব্রাদার।’ বৃদ্ধ বিড় বিড় করে উঠলেন।
এতক্ষণ পৃথা স্বজনের সঙ্গে লেপ্টে ছিল। এবার প্রশ্ন করল ‘আমরা বর্ডার পার হব কি করে?’
‘যেভাবে যাচ্ছিলাম।’
‘ওরা তো গুলি চালাবে।’
‘রিস্ক নিতে হবে।’
কয়েক মিনিটের মধ্যে স্বজনের হাত টনটন করতে লাগল। রিভলভারটা ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ছিল। কিন্তু সে জানে সুযোগ পেলেই কাজে লাগাবে ড্রাইভার। হঠাৎ দূৱে আলো জ্বলছে দেখা গেল। ড্রাইভার বলল, ‘চেকপোস্ট এসে গেছে। কি করব?’
‘স্পিড তোল।’ স্বজন বলল।
‘না।’ বৃদ্ধ বলে উঠলেন, ‘গাড়িটা থামাও। আমি নীচে নেমে ওদের সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করব। সেই সুযোগে তোমরা বেরিয়ে যেতে পার।’
‘আপনি?’
‘আমার জন্যে চিন্তা করার দরকার নেই।’
‘ওরা আপনাকে মেরে ফেলবে।’
‘নাও পারে। আমি ঝুঁকি নেব। এ ছাড়া কোনও উপায় নেই।’
দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে চেকপোস্টের সামনে দুটো ড্রাম রাখা আছে। গোটা পাঁচেক পুলিশ অস্ত্র হাতে অপেক্ষা করছে। স্পিড তুলে বেরিয়ে যেতে গেলে ড্রামের গায়ে ধাক্কা খেতে হবে।
জিপের গতি কমতেই রিভলভার সরিয়ে নিল স্বজন। পায়ের নীচে ফেলে দিল। দুই ড্রামের মাঝখানে জিপের মুখ রেখে দাঁড় করাতেই বৃদ্ধ ডাক্তার নেমে পড়লেন। ততক্ষণে তাদের চারপাশে অস্ত্রধারীদের কৌতূহলী মুখ। বৃদ্ধ ডাক্তারকে বলতে শোনা গেল, ‘অফিসার-ইন-চার্জ কে? আমি তার সঙ্গে কথা বলব।’
‘আপনি কে?’
‘আমি একজন ডাক্তার। আমাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।’
‘কোথায়?’
‘না আর কোনও কথা নয়। ঠিক লোকের সঙ্গে কথা বলব আমি।’
এবারে পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে একজনের গলা ভেসে এল, ‘ওকে নিয়ে এসো।’
দু’জন লোক ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে এগোল। একজন জিপের পাশে দাঁড়িয়ে টর্চ জ্বেলে বলে উঠল, ‘আরে! মেয়েমানুষ আছে জিপে।’ যে বলেছিল, তার হাত থেকে টর্চ নিয়ে আর একজন পৃথার মুখে আলো ফেলল। পৃথা প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, স্বজন ওর হাতে চাপ দিয়ে নিষেধ করল।
বারান্দায় উঠে বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি অফিসার?’
‘লোকে তাই বলে। আপনি কে?’
‘আমি একজন ডাক্তার। উগ্রপন্থীরা আমাকে জোর করে আটকে রেখেছিল। এইমাত্র আপনাদের একজন অফিসার পাহাড়ে ওদের ধরতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। সেই সুযোগে আমরা পালিয়ে এসেছি।’
‘প্রাণ হারিয়েছেন?’ চিৎকার করে উঠল লোকটা, ‘মোটরবাইকে ছিল?’
‘হ্যাঁ।’
সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পড়ে গেল। একটা ভ্যান পুলিশ বোঝাই করে ছুটে গেল পাহাড়ের দিকে। অফিসার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার সঙ্গে জিপে কে কে আছে?’
‘ওরাও ডাক্তার। আমি একটু কমিশনার ভার্গিসের সঙ্গে কথা বলতে পারি?’
‘নিশ্চয়ই। ওদের ডেকে নিয়ে ভেতরে আসুন।’
বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন জিপের কাছে। সেখানে দু’জন সেপাই দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্র হাতে। নিচু গলায় বললেন তিনি, ‘আপনারা কি করবেন?’
‘নামলে ওরা সব জেনে যাবে। আপনি উঠে পড়ুন। পিকআপ নিন ড্রাইভার।’ স্বজন চাপা গলায় হুকুম করতেই জিপ ছিটকে এগিয়ে গেল আর বৃদ্ধ উঠতে গিয়ে গড়িয়ে পড়লেন সেপাইদের সামনে। ড্রাম দুটো দু’দিকে ছিটকে গেল। সেপাইরা ড্রামের আঘাত সামলাতে লাফিয়ে সরে পড়তেই জিপ ধাক্কা মারল বাঁশের বেড়ায়। চৌচির হয়ে গেল সেটা। বন্দুকের আওয়াজ শুরু হতেই জিপ এগিয়ে গেল অনেকটা। এখন পেছন থেকে অবিরত গুলি আসছে। মাথা নিচু করে বসে ছিল ওরা। হঠাৎ ড্রাইভার চিৎকার করে ব্রেক কষল। লাফিয়ে উঠে স্থির হয়ে গেল জিপটা। কাতর গলায় ড্রাইভার বলল, ‘আমার হাতে গুলি লেগেছে।’
‘সরে ঘাও, সরে যাও পাশে।’ স্বজন ওকে কোনও মতে সরিয়ে স্টিয়ারিঙে এসে বসল জিপের গায়ে গুলি লাগল আর একটা। অন্ধকার বলে অসুবিধে হচ্ছে ওদের। বেড়া ভাঙার সময় জিপের হেডলাইটগুলো গিয়েছে। স্বজন অন্ধকারেই জিপ ছোটাল। যে ভ্যানটা চেকপোস্টে ছিল সেটা একটু আগে বিপরীত দিকে রওনা হওয়ায় কেউ ওদের পিছ ধাওয়া করতে পারছে না। মাইল কয়েক পাহাড়ি রাস্তায় আসার পরে উত্তেজনা কমে এল স্বজনের। পৃথা পেছনে চুপ করে বসে আছে। স্বজন জিপ থামিয়ে ড্রাইভারের দিকে তাকাল, ‘কেমন আছ তুমি?’
লোকটা সাড়া দিল না। ওর কাঁধে হাত দিয়ে ঝাঁকাল সে। এবং সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল। মুখ ফিরিয়ে সে পৃথাকে বলল, ‘লোকটা মরে গেছে।’
নিস্তেজ গলায় পৃথা বলল, ‘বোধহয় ওর গায়ে আবার গুলি লেগেছে।’
একটুও দ্বিধা না করে নেমে পড়ল স্বজন। টেনে হিঁচড়ে লোকটাকে জিপ থেকে নামিয়ে রাস্তার এক ধারে শুইয়ে দিল। ফিরে এসে স্টিয়ারিঙে বসে সে পৃথাকে বলল, ‘সামনে এসে বোসো। এখন আমরা বিপদমুক্ত।’
পৃথার গলার স্বর তখনও ক্লান্ত, ‘না।’
‘কেন?’
‘ওখানে আমি বসতে পারব না।’
স্বজন মাথা নাড়ল। তারপর স্পিড নিল। হেডলাইট ছাড়া জিপ বেশি জোরে চালানো সম্ভব নয়, অন্তত এই পাহাড়ি রাস্তাতে তো নয়ই। তা ছাড়া ইদানীং মারুতি চালিয়ে অভ্যস্ত সে। প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকতে হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত একেবারে কমিয়ে দিল গতি। তারা সীমান্ত পেরিয়ে এসেছে। যা কিছু কড়াকড়ি ওপারে ঢোকার বা ওপার থেকে বের হবার মুখে। ভারতীয় সীমান্তে কোনও পাহারাদার নেই। ভারত তার এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নাগরিকদের সম্পর্কে কোনও বাধানিষেধ রাখেনি। তাই এখন ওরা রয়েছে সীমান্তের এপারে। আবার কিছুটা এগোলেই মাইল কয়েক ভারতের থাকবে না। মিলেমিশে অদ্ভুত ব্যবস্থা। এসব জায়গায় দুই দেশের মানুষ অবাধে যাতায়াত করে। স্বজন দেখতে পেল দূরের পাহাড়ি বাঁকে আগুন জ্বলছে। এই রকম নির্জন জায়গায় কেউ এত রাত্রে আগুন জ্বালায় কি? আশেপাশে কোনও ঘরবাড়ি নেই। দু’পাশে এখন অনেক উঁচু পাহাড়, রাস্তাটা নেমে যাচ্ছে ওদের মধ্যে দিয়ে। এখানে এসে এত রাত্রে আগুন জ্বালবে কে?
বাঁক ঘুরে সে আগুনের কাছাকাছি চলে এল। রাস্তার পাশে কাঠ জ্বেলে এই আগুন তৈরি করা হয়েছে, কোনও মানুষ তার আশেপাশে নেই। পেছন থেকে পৃথার গলা ভেসে এল, ‘অদ্ভুত ব্যাপার, না? এভাবে আগুন জ্বেলেছে, দাবানল না লেগে যায়।’
‘কাছাকাছি গাছ নেই।’ গাড়ির ব্রেক চাপল স্বজন।
এই সময় ছায়ামূর্তি দেখা গেল। সম্ভবত জিপটিকে ভাল করে দেখেই সে আত্মপ্রকাশ করেছে। স্বজনের খেয়াল হল রিভলভারটা পেছনের সিটের তলায় রেখে এসেছে। সে চাপা গলায় বলল, ‘রিভলভারটা দাও।’
‘কোথায় আছে?’ পৃথার গলায় ভয়।
‘পায়ের নীচেটা দ্যাখো।’
ততক্ষণে ছায়ামূর্তি স্পষ্ট হয়েছে। স্বজন অবাক হয়ে দেখল আগন্তুক একজন নারী। আগুনের আভায় তাকে প্রচণ্ড রহস্যময়ী বলে মনে হছে। নারীর হাতে কোনও অস্ত্র নেই। ধীরে ধীরে এগিয়ে এল সে জিপের কাছে। অদ্ভুতভাবে স্বজনকে দেখল, ‘আপনি একা?
‘না। আমার স্ত্রী আছেন সঙ্গে।’ জবাবটা বেরিয়ে এল আপনাআপনি, কিন্তু তখনই খেয়াল হল এই নারী তাকে চেনে নাকি? স্বজন অবাক।
‘ত্রিভুবন কোথায়?’
চেকপোস্ট থেকে পুলিশভর্তি ভ্যানের ছুটে যাওয়ার দৃশ্যটি মনে এল। স্বজন বলল, ‘উনি নেমে যেতে বাধ্য হয়েছেন।’
‘কোথায়?’
‘সীমান্তের অনেক আগে।’
‘আপনার সঙ্গে আরও দু’জনের থাকার কথা। বৃদ্ধ ডাক্তার এবং ড্রাইভার।’
‘আপনি কে?’ এবার প্রশ্ন না করে পারল না স্বজন।
‘আমাকে আপনি চিনবেন না।’ নারী বলল, ওরা কোথায়?’
‘মারা গিয়েছেন। চেকপোস্ট পার হতে গিয়ে সংঘর্ষ হয়।’
‘ত্রিভুবনও কি তাই?’
‘না। উনি বেঁচে ছিলেন। অন্তত শেষবার দেখার সময় ছিলেন।’
‘তারপর?’
‘আমরা জানি না। জিপ নিয়ে আমরা চলে এসেছিলাম।’
‘কিন্তু আপনাদের জিপেই তো তার থাকার কথা।’
‘হ্যাঁ, তাই ছিলেনও। কিন্তু মোটরবাইকে চেপে এক পুলিশ অফিসার আমাদের চেজ করতে তিনি জিপ থেকে নেমে পড়েন। অফিসার মারা যায়, আমরা চলে আসি।’
‘ওকে না নিয়েই?’
স্বজনের মনে হল এই নারী ত্রিভুবনের সঙ্গিনী। শুধু ওর দলের লোক নয় তার চেয়ে বেশ কিছু। সে বলল, ‘ওকে নিয়ে এলে আমরা কেউই সীমান্ত পার হতে পারতাম না। বরং এই অবস্থায় উনি একা এদিকে চলে আসতে পারেন।’
নারী যেন বুঝতে পারছিল না তার কি করা উচিত। স্বজন জিজ্ঞাসা করল, ‘আমরা কি যেতে পারি?’
‘নিশ্চয়ই। এই আগুন তাহলে জ্বালিয়ে রাখার দরকার নেই। আপনারা চলে যান।’ নারী ধীরে-ধীরে পাহাড়ের আড়ালে চলে গেল।
পৃথা বলল, ‘মেয়েটার জন্যে কষ্ট হচ্ছে।’
স্বজন বলল, ‘হুঁ।’
পৃথা বলল, ‘তুমি বুঝবে না।’
‘তার মানে?’
‘মেয়েরা কখন এভাবে অপেক্ষা করে থাকে তা মেয়েরাই জানে।’
স্বজন জিপ চালু করল। হাতে স্টেনগান থাকলেও ত্রিভুবনের পক্ষে একা এক ভ্যান পুলিশের সঙ্গে লড়াই করা অসম্ভব। হয়তো ও কয়েকজনকে মেরে তবে মরবে। কিন্তু এসব অনুমান করে লাভ নেই। পাহাড় থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নেমে যাওয়া দরকার।
৩১. চোখ খুলল হায়দার
চোখ খুলল হায়দার। এখনও ভোর হয়নি। কিন্তু আকাশে লালের ছোপ লেগেছে। জানলা থেকে মুখ সরিয়ে সে তক্তপোশের দিকে তাকাল। আকাশলাল ঘুমাচ্ছে পাশ ফিরে। একদম সুস্থ মানুষের মতো ঘুমাবার ধরন। দেখতে দেখতে পাঁচ দিন হয়ে গেল এখানে। এই পাহাড়ি উপত্যকার ছোট্ট গ্রামটিতে মানুষজন কম, তাদের কৌতূহলও বেশি নয়। ভ্যানটাকে নিয়ে দলের অন্যেরা চলে গেছে আরও উত্তরে। এই বাড়িটা যার সেই বুড়ো বড় ভাল মানুষ। লোকটা ঘুমাচ্ছে পাশের ঘরে। বিপ্লবের শুরুতেই ওর দুই ছেলে প্রাণ হারিয়েছিল শহরে কিন্তু তা নিয়ে কোনও আক্ষেপ করেনি একবারও। খাবার দাবার ও-ই এনে দিচ্ছে।
জানলার পাশে ইজিচেয়ার পেতে আধশোওয়া হয়ে হায়দারের দিনগুলো কাটছিল। এখানে বসার প্রধান কারণ জানলা দিয়ে অনেকটা দূর দেখা যায়। পুলিশ যদি খবর পেয়ে আসে তাহলে অন্তত মিনিট পাঁচেক সময় পাওয়া যাবে। পালাতে না পারলে লড়ে মরার সুযোগ পাবে। তাই ঘুম এবং জাগরণের মধ্যে পাঁচটা দিন কেটে গেল। এই কটা দিন পৃথিবী থেকে সে প্রায় বিচ্ছিন্ন। এ ঘরে টিভি নেই, থাকার কথাও নয়। কিন্তু ছোট রেডিও আছে একখানা। তা-ই বাজিয়ে খবর শোনার চেষ্টা করেছে কিন্তু নতুন কিছু জানতে পারেনি। ত্রিভুবন ঠিকঠাক সীমান্ত পার হতে পারল কিনা সেই চিন্তাও হচ্ছে। দুই ডাক্তারকে সীমান্তের ওপাশে পৌঁছে না দিতে পারলে সব কিছু ফাঁস হয়ে যেতে পারে। সে চলে আসার আগে নির্দেশ দিয়ে এসেছিল সমস্ত অ্যাকশন বন্ধ রাখতে। কদিন সব চুপচাপ থাকবে এমন কথা হয়েছে।
হায়দার আকাশলালের দিকে তাকাল। গতকাল মানুষটা অনেক স্বাভাবিক আচরণ করেছে। কথা বলেনি কিন্তু উঠে বসে ছিল। হায়দার তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘খারাপ লাগছে?’
মাথা নেড়ে না বলেছিল। ‘খিদে পাচ্ছে?’ একইভাবে হ্যাঁ বলেছিল। হাঁটিয়ে পাশের টয়লেটে নিয়ে যাওয়ার সময় হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল। ওষুধের ঘোর চলছে এখনও। হায়দার আর কথা বাড়ায়নি।
ভোর হচ্ছে। একটু একটু করে আলো ফুটছে। ডুবে যাওয়ার আগে শুকতারার দপদপানি বেড়ে গিয়েছে। সব কিছু যদি ঠিকঠাক চলে তাহলে মাসখানেকের মধ্যে শহরে ফিরে যেতে হবে। ভার্গিসকে এর মধ্যেই সাসপেন্ড করা হবে। বোর্ড মিনিস্টারের ওপরেও আস্থা রাখতে পারবে না। টালমাটাল ব্যাপারটা চূড়ান্ত অবস্থায় যাওয়ামাত্র ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তবে তার আগে সবাইকে সংগঠিত করা প্রয়োজন। ম্যাডামের কাছে কৃতজ্ঞতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। আশ্চর্যের ব্যাপার আকাশলাল তাকে কখনও এসব কথা জানায়নি। মেলার মাঠে যাওয়ার আগে শুধু তাকে বলেছিল প্রয়োজন হলে ম্যাডামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। চমকে উঠেছিল হায়দার। ‘ম্যাডাম?’
‘হ্যাঁ। অবাক হোয়ো না। রাজনীতি করতে হলে অবাক হতে নেই।’
‘কিন্তু ম্যাডাম তো আমাদের প্রতিপক্ষ।’
‘হ্যাঁ। তবে ম্যাডামের প্রতিপক্ষ হল বোর্ড। কিন্তু সেটা তিনি ওদের জানতে দিতে চান না। আমরা বোর্ডের ধ্বংস চাই শুধু এই কারণেই ম্যাডামের সঙ্গে আমরা বন্ধুত্ব করতে পারি।’
‘বন্ধুত্ব!’
‘হ্যাঁ, রাজনৈতিক বন্ধুত্ব।’
ব্যাপারটাকে অবিশ্বাস্য বলে মনে হলেও আকাশলালের তথাকথিত মৃত্যুর পরে ম্যাডামের নির্দেশ এসেছিল। নির্দেশই বলা উচিত। উত্তরের জন্যে ভদ্রমহিলা অপেক্ষা করেননি। এই যে বাড়ি ছেড়ে চলে আসা তাও ভদ্রমহিলার পরামর্শে। এবং এই সব পরামর্শ এখনও তাদের বিপদে ফেলেনি। চোখ বন্ধ করল হায়দার। তার ঘুম পাচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে। রাতে যে অনিশ্চয়তা থাকে দিনে সেটা কমে যায়। ঘুমিয়ে পড়ল হায়দার।
পাশ ফিরতেই মাথার বাঁ দিকে সামান্য অস্বস্তি শুরু হয়েই মিলিয়ে গেল। চোখ খুলল সে। সমস্ত শরীর ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে প্রচণ্ড পরিশ্রম করার পর সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গিয়েছে। সে চোখ খুলে শুয়ে ছিল কিন্তু প্রথমে কিছুই দেখছিল না। এবং তারপরেই সে তলপেটে চাপ অনুভব করল। গতকাল থেকে সে এইরকম হলেই টয়লেটে যাচ্ছে। তার আগেও বিছানাতে করতে হত না। একটা লোক তাকে খুব সাহায্য করছে। যে মানুষ সাহায্য করে তার মুখ এবং ব্যবহার থেকে সেটা বোঝা যায়।
সে এবার মুখ ফেরাল। মাথার ওপরে কাঠের সিলিং। বিছানাটাও ঠিক পরিষ্কার নয়। এই ঘরে তেমন আসবাব নেই। অথচ কিরকম আসবাব থাকলে ‘তেমন’ ঠিক হত তাও সে বুঝতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে তেমন নেই। ধীরে ধীরে মাথা তুলল সে। আধাবসা অবস্থায় সে লোকটিকে দেখতে পেল। জানলার পাশে একটা লম্বা চেয়ার পেতে আরামসে ঘুমাচ্ছে। বিছানায় না শুয়ে ওই রকম ঘুম কেন? হঠাৎ তার মনে হল লোকটা তাকে পাহারা দিচ্ছে না তো। সেটা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো। কিন্তু ওই লোকটা এখন পর্যন্ত তার সঙ্গে কোনওরকম শত্রুতা করেনি বরং তার কষ্ট কমানোর চেষ্টা করেছে। লোকটার মুখের দিকে ভাল করে তাকাতেই মনে হল কার সঙ্গে যেন খুব মিল আছে। কার সঙ্গে? কিছুতেই সে নামটা মনে করতে পারল না। আর এই চেষ্টা করতেই মাথাটা যেন ভোঁ ভোঁ করে উঠল। চোখ বন্ধ করল সে। তারপর ধীরে ধীরে খাট থেকে নামল। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই টলে উঠল সে। সেটা সামলে ধীরে ধীরে টয়লেটের মধ্যে ঢুকে গেল।
শরীর হালকা হবার পর ও মুখ তুলতেই অদ্ভুত একজনকে দেখতে পেল। দুটো চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। খুব কাহিল হওয়া চোখ। সে মুখ ফেরাতেই লোকটা মুখ ফেরাল। ওর মুখের বাকি অংশ ব্যান্ডেজের আড়ালে রয়েছে। নিজের মুখে হাত দিতে সামনের লোকটাও তাই করল। হঠাৎ তার মাথায় খেয়ালটা এল। সামনের দেওয়ালে একটা সস্তা আয়না টাঙানো রয়েছে। সেখানে তারই মুখ ফুটে উঠেছে। মুখে কি হয়েছে? ব্যান্ডেজ কেন? সে ঈষৎ চাপ দিল, কিন্তু তেমন ব্যথা লাগল না। তার কি কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল? মাথার ওপরটাতেও কোনও চুল নেই কেন? এত বীভৎস দেখাচ্ছে যে নিজের দিকে তাকাতে তার বিতৃষ্ণা লাগল।
ধীরে ধীরে টয়লেট থেকে বেরিয়ে এল সে। লোকটা এখনও ঘুমাচ্ছে। লোকটা কে? বিছানায় ফিরে এসে শুয়ে পড়তেই মনে হল কী আরাম। এইটুকু হাঁটতেই যেন সে ফুরিয়ে যাচ্ছিল। সে চোখ বন্ধ করল। লোকটাকে খুব চেনা মনে হচ্ছে। এবং তখনই সে খেয়াল করল আর কোনও চেনা মুখ সে মনে করতে পারছে না। শুধু মুখ নয়, নামও। তার কোনও পরিচিত মানুষের মুখ এবং নাম মনে আসছে না। কেমন শীত শীত করতে লাগল তার। পৃথিবীতে সে কি একা? তার কেউ নেই?
এই সময় দরজায় শব্দ হতেই সে বুঝতে পারল লোকটা যে এতক্ষণ ঘুমাচ্ছিল, লাফিয়ে উঠল। চোখ অল্প খুলতেই সে দেখতে পেল লোকটা হাতে কিছু ধরে রয়েছে। চাপা গলায় ওকে বলতে শুনল সে, ‘কে? কে ওখানে?’
বাইরে থেকে গলা ভেসে এল, ‘আমি। ঘুম ভাঙল?’
পায়ের আওয়াজ হল। অর্থাৎ চেনা লোক বুঝতে পেরে লোকটা দরজা খুলতে গেল। সে আবার চোখ বন্ধ করল। তার মনে হল সে এখন কোথায় আছে তা জানতে হলে চুপ করে থেকে ওদের কথা শুনতে হবে। আচ্ছা, ঘুমের ভান করে থাকলে কেমন হয়? দরজা খোলার শব্দ হল। একটা সরু গলা কানে এল, ‘বস এখন কেমন আছে? ঘুম হয়েছিল?’
‘হ্যাঁ। খুব ভাল ঘুমিয়েছে। দরজাটা বন্ধ করে দাও বুড়ো।’
‘আপনি মিছিমিছি ভয় পাচ্ছেন হায়দার সাহেব। আমার গ্রামের কেউ জিন্দেগিতে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। এই যে আপনারা পাঁচদিন এখানে আছেন কেউ বিরক্ত করেছে? কাছেই আসেনি। বরং সবাই লক্ষ রেখেছে বইরের কোনও ঝামেলা যেন না আসে।’
‘আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।’
‘এইসব কথা বলবেন না। বস্ মরে গিয়েছে খবর পেয়ে কী কষ্ট না পেয়েছিলাম। তখন কি জানি ওসব পুলিশকে ভাঁওতা দেবার জন্যে। লোকে কিন্তু এখনও জানে বস্ মরে গেছে।’
‘তুমি আবার গল্প করতে যেয়ো না।’
‘মাথা খারাপ! নিজের কবর নিজে যে খোঁড়ে আমি তার দলে নেই।’ লোকটা এগিয়ে এল কাছে। তারপর জিভ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ বের করল, ‘ইস, কি চেহারা ছিল, কি হয়ে গেছে!’
‘একটু চা খাওয়া যাবে?’
‘চা? হ্যাঁ। আসছে।’
‘আমি তোমাকে বলেছি অন্য কাউকে এখানে পাঠাবে না।’
‘এই যাঃ। খেয়াল ছিল না। মেয়েটা বলল চা নিয়ে যাচ্ছি আমিও হ্যাঁ বলে দিলাম।’
‘মেয়ে? মেয়ে আবার কোথায় পেলে?’
‘আমি পাব কেন? আমার ভাইয়ের মেয়ে। খুব ভাল কিন্তু একটু বদমায়েসও। আচ্ছা, বস্-এর মুখ থেকে এসব কবে খোলা হবে?’
‘ডাক্তার বলেছে সাতদিন পরে।’
‘মুখে কি হয়েছে? কদিন থেকে জিজ্ঞাসা করব বলে ভাবছিলাম। মাথায় চোট লাগলে মুখে ব্যান্ডেজ করা হবে কেন?’ মানুষটা যেন ঝুঁকে দেখছিল।
‘মুখেও চোট লেগেছে।’
‘আমাদের গ্রামে অবশ্য ভয় নেই তবে ওরা এখানেও বস্-এর পোস্টার ঝুলিয়েছিল। আমরা অবশ্য সেই পোস্টার ছিড়ে ফেলেছিলাম। সেই যে গো, মৃত বা জীবিত আকাশলালকে—।’ বুড়োর গলা থেমে গেল দরজায় শব্দ হতে। বাইরে থেকে কেউ বলল, ‘চা।’ এই গলা পুরুষের নয়। সে শুনল বুড়ো বলছে, ‘দিয়ে যা। দিয়েই চলে যাবি।’
‘বাব্বা। আমি যেন চোর ডাকাত। তাড়াতে পারলে বাঁচে।’ ঘরের মধ্যে মেয়েদের গলা শোনা গেল, ‘একজন তো এখনও শুয়ে আছে। খুব মারপিট করেছিল, না?’
‘তুই এখান থেকে যাবি?’
মেয়েটি হেসে বেরিয়ে গেল। বুড়ো বলল, ‘বসকে তুলতে হবে?’
‘আমি ডাকছি। তুমি মেয়েটিকে এখানে আসতে দিয়ে ঠিক করোনি বুড়ো। এইসব গল্প আর পাঁচজনের কাছে করবে ও।’
‘মেরে মুখ ভেঙে দেব না?’ বুড়ো বলল।
সে কাঁধে স্পর্শ পেল। খুব আস্তে কেউ তাকে ধাক্কা দিচ্ছে। চোখ না খুলে পারল না সে। মুখের সামনে পাহারাদার লোকটা। একে যেন কি নামে ডেকেছিল বুড়ো? হায়দার। হ্যাঁ, হায়দার। নামটা খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে। হায়দার বলল, ‘গুড মর্নিং। কেমন লাগছে?’
মাথা নেড়ে ভাল বলল সে। হ্যাঁ, মনে হচ্ছে লোকটার সঙ্গে তার ভাল পরিচয় ছিল।
আবছা আবছা কিছু কিন্তু ঠিক জুড়ছে না সেগুলো।
‘উঠতে পারবেন? চা এসে গেছে।’
ধীরে ধীরে উঠে বসল সে। তার মনে হল কিছু খাওয়া দরকার। খিদে পাচ্ছে খুব।
‘টয়লেট যেতে পারবেন?’
প্রশ্নটার জবাব না দিয়ে সে বুড়োর দিকে তাকাল। না, একেও সে কখনও দেখেনি। এ কোথায় রয়েছে সে? হায়দার ওর হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতেই চোখ গেল সেদিকে। কোনও কিছুই যে তার মনে পড়ছে না এমন নয়। কিন্তু মনে পড়ে যাওয়ার মুখেই কেউ যেন দ্রুত জল ঘোলা করে দিচ্ছে। কোনও ছবি ঠিকঠাক তৈরি হচ্ছে না তাই।
অর্ধেক খাওয়ার পর ইচ্ছেটা চলে গেল। মনে হল পেট ভরে গেছে। এখন শুয়ে পড়লেই আরাম। সে সেই চেষ্টা করলে হায়দার বাধা দিল, ‘না, না, আপনি টয়লেট থেকে ঘুরে আসুন আমি ততক্ষণে বিছানাটা চেঞ্জ করে দিচ্ছি। উঠে পড়ুন।’
বুড়ো এগিয়ে এল। ওর হাত ধরে খাট থেকে নামাল। টয়লেটের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় সে আপত্তি করল। টয়লেটে যাবে না। বুড়ো ওকে জানলার পাশে নিয়ে আসতেই সে ইজিচেয়ারে বসে পড়ল। শরীর এগিয়ে নিয়ে বাইরে তাকাল। নীল আকাশে আলোর আভা! আঃ, কী সুন্দর? মন ভরে গেল।
‘বস্। আমাকে চিনতে পারছ?
সে মুখ ঘোরাল। বৃদ্ধ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখে অদ্ভুত অভিব্যক্তি।
না সে চেনে না। কোনও দিন দেখেনি। কিন্তু এ-কথাটা যে বলা যাবে না তা সে বুঝতে পারল। অতএব তাকে হাসতে হল। সেই হাসি দেখে লোকটি খুব খুশি হল। মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘আমি জানতাম বস্-এর স্মৃতিশক্তি আমাদের অনেকের চেয়ে ভাল। অতদিন আগে দেখা হয়েছে অথচ ঠিক মনে আছে। আপনার জন্যে খুব চিন্তায় ছিলাম বস্। আপনি চলে গেলে এই দেশে আর কোনও নেতা থাকত না।’
তার মানে আমি নেতা! সে মনে মনে বলল।
হায়দার এগিয়ে এল, ‘আমাদের যেখানে আশ্রয় নিতে হয়েছে সেখানে কোনও ডাক্তার নেই। তবু আমি শহর থেকে একজনকে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারি। আপনার শরীরে এখন কি কি অসুবিধে হচ্ছে?’
‘বুঝতে পারছি না। খুব দুর্বল লাগছে আর মাথা ঘুরছে।’ সে কথা বলল। বলতে গিয়ে বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। চোখ বন্ধ করল সে।
‘দুর্বল তো হবেনই। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে ধকল গিয়েছে! আমরা তো আপনার বাঁচার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। যে অপারেশন আপনার ওপর করা হয়েছে তা পৃথিবীতে আগে কখনও হয়নি। আপনি তো সবই জানেন।’ হায়দার ধীরে ধীরে কথাগুলো বলছিল।
অপারেশন? কি অপারেশন? আবছা আবছা কিছু মনে পড়ছে তার। কি সেগুলো? সে মাথা নাড়ল।
‘আপনাকে খবরগুলো জানানো দরকার। আপনার হার্ট অ্যাটাক হবার পর আপনি তো এখন পর্যন্ত কিছু জানেন না। ডেডিভ সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে পারেনি। আপনাকে ভার্গিস কবর দিয়েছিল সেই রাত্রেই। আমরা খুব দ্রুত আপনাকে সুড়ঙ্গ পথে বের করে নিয়ে আসি। অ্যাম্বুলেন্সে করে লেডি প্রধানের বাড়ি নিয়ে যাই।’ একের পর এক ঘটনাগুলো বলে যেতে লাগল হায়দার। তারপর থেমে গেল, ‘আপনি শুনেছেন, ভেডিভ নেই।’
মাথা নাড়ল সে। ‘হ্যাঁ, শুনলাম।’
ও।’ একটু চুপ করে থেকে আবার বাকিটা বলতে লাগল হায়দার। আকাশলালের এমন নির্লিপ্ত আচরণ তার একটুও পছন্দ হচ্ছিল না। লোকটা কি সুস্থ? ওর কি মস্তিষ্ক ঠিকঠাক কাজ করছে? কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিল তার। কথা শেষ হওয়ামাত্র সে হাত তুলল, ‘আমি একটু বিশ্রাম চাই, আমাকে একা থাকতে দাও।’
হায়দার বলল, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। বুড়ো, চলো বাইরে যাই।’
বৃদ্ধ দ্রুত বেরিয়ে যেতেই হায়দার চাপা গলায় বলল, ‘এখানকার কারও সামনে আপনার মুখের ব্যান্ডেজ খোলা ঠিক হবে না। লোকে আপনার আগের মুখটা মনে রেখেছে। প্লাস্টিক সার্জারির পর কি দাঁড়িয়েছে তা বেশি লোককে না জানানোই ভাল।’ হায়দার বেরিয়ে গেল ছোট রেডিওটা সঙ্গে নিয়ে।
সে নিজের মুখে হাত দিল। অর্থাৎ তার মুখেও অপারেশন করা হয়েছে। সে নেতা। তার নাম আকাশলাল? কিসের নেতা? কী করেছিল সে। শুয়ে শুয়ে ভাবতে গিয়ে মাথার যন্ত্রণাটা ফিরে এল। চোখ বন্ধ করে থাকল সে।
পাহাড়ি গ্রামটা বেশ ছোট। বুড়োকে পাহারায় থাকতে বলে হায়দার এগিয়ে গেল খাদের দিকটায়। এখানে সব ভাল শুধু রেডিও চালালেই মানুষ কাছে এসে শোনার চেষ্টা করে। সমস্ত পৃথিবীতে যেখানে টিভি অ্যান্টেনা ছেয়ে গেছে, এখানে রেডিওর জন্যেও কিছু লোক কৌতূহলী। কাছেপিঠে মানুষ নেই দেখে হায়দার নব ঘোরাল। ভ্যানটার ফিরে আসার কথা দিন কয়েক বাদে। তার মানে আগামী কাল। ওই ভ্যানে ওয়ারলেস সেট রয়েছে। কিছু আধুনিক অস্ত্র আছে। ওটা চলে এলে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হবে না। রেডিওতে নানান শব্দ হচ্ছিল। অনেকগুলো স্টেশন একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর সে শহরটাকে ধরতে পারল। দেশাত্মবোধক গান হচ্ছে। শালা। তারপরেই মনে হল শুনতে খারাপ লাগছে না। মনে হচ্ছে সে খুব কাছাকাছি রয়েছে। শত্রুর সান্নিধ্যেও নিজেকে একা বলে মনে হয় না। গান শেষ হল। এরপর খবর শুরু হল। এই পাঠকের গলা নতুন মনে হল। দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আরও সুদৃঢ় করার জন্যে বৈদেশিক ঋণ আসছে। শহর থেকে উগ্রপন্থীদের নির্মূল করা হয়েছে। মৃত আকাশলালের লাশ উদ্ধার করতে অক্ষম হওয়ায় পুলিশ কমিশনার ভার্গিসকে বরখাস্ত করা হয়েছে। শ্রীযুক্ত বীরেন্দ্র থাপা নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। পূর্বতন কমিশনার ভার্গিসের দেশসেবার কথা মনে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, তবে তিনি সবরকম সরকারি সুযোগ সুবিধে থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারপরের খবরগুলো নেহাতই জোলো। ভার্গিস আর নেই এই খবরটা হায়দার কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। অমন প্রতাপশালী কুখ্যাত পুলিশ অফিসারকে বোর্ড সরিয়ে দিতে পারল? ওরা ভুল করল। থাপা একটি গোবেচারা অফিসার। ভার্গিসের ক্ষমতার এক দশমাংশ ওর নেই। ভার্গিসের চলে যাওয়া মানে বিপ্লবের পথ আরও পরিষ্কার করা। আকাশলাল প্রায়ই বলত ভার্গিসের পরে যে লোকটা আসবে আমাদের উচিত তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা। একসময় মনে হয়েছিল সোম সেই লোক। এখন জানা গেল থাপা পুলিশ কমিশনার হয়েছে। থাপার সঙ্গে কোন যোগাযোগ তৈরি করতে কি পেরেছিল আকাশলাল?
‘গান শুনব?’ আদুরে গলায় চমকে তাকাল হায়দার। বুড়োর ভাইঝি। হ্যাঁ, শরীর বটে! বুকের ভেতর টিপটিপ করে উঠল হায়দারের। সে বলল, ‘এই যা, ভাগ।’
‘এমা! আমি কি কুকুর যে ওই ভাবে কথা বলছ!’ মেয়েটা হাসল, ‘তুমি দিনরাত ওই ব্যান্ডেজে মোড়া লোকটাকে পাহারা দাও কেন বলো তো?’
‘তোর কি?’
‘লোকটার কি হয়েছে গো? অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল এতদিন?’
‘বুড়োকে জিজ্ঞাসা কর। সে-ই বলবে।’
‘ওম্মা! তুমি একটু মিষ্টি করে কথা বলতে পার না? আমি কি দেখতে খারাপ! জানো, আমার জন্যে চার পাঁচ ক্রোশ দূরের গ্রামের ছোকরারা এখানে ঘুরে বেড়ায়। আমি পাত্তা দিলে এতদিনে দশ বারোটা বাচ্চা হয়ে যেত।’
কথাটা শশানামাত্র অট্টহাস্যে ভেঙে পড়ল হায়দার। এরকম কথা জীবনে শোনেনি সে। মেয়েটা বোকা বোকা চোখে চেয়ে দেখে বলল, ‘পাগল।’ বলে উল্টো দিকে হাঁটতে লাগল। হাসি থামিয়ে ওর যাওয়া দেখল হায়দার। না, সত্যি বয়স হয়ে যাচ্ছে। নিজের জন্যে ভাবার সময় পায়নি কতকাল। মেয়েমানুষের কথা চিন্তা করেনি কতকাল! বিপ্লব শেষ হয়ে গেলে দেশে শান্তি ফিরে এলে চিন্তা করা যাবে এমন ভাবতে ভাবতে হয়তো দিন চলে যাবে। তার যদি কোনও বদ ইচ্ছে থাকত তাহলে এই মেয়েটাকে ঠকিয়ে—। না, মাথা নাড়ল সে।
বুড়োকে চলে যেতে বলে ঘরে ঢুকল হায়দার। বুড়ো জানে আকাশলাল এই ঘরে আছে, সে মারা যায়নি। কিন্তু ওর সামনে ব্যান্ডেজ খোলা যাবে না। আকাশলালের পরিবর্তিত মুখ সে ছাড়া কেউ জানবে না। বুড়োও যেন ওকে দেখে চিনতে না পারে। হায়দার দেখল আকাশলাল ঘুমাচ্ছে। নার্স তাকে যে-সমস্ত ওষুধ খাওয়াতে বলেছিল তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে দরজা বন্ধ করতে আকাশলালকে চোখ খুলতে দেখল।
হায়দার বলল, ‘একটা সুসংবাদ আছে। ভার্গিসকে বরখাস্ত করা হয়েছে।’
‘ভার্গিস?’ বুঝতে পারল না সে।
‘আমাদের কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার। এখন রাস্তার লোক, কমনম্যান! ওর জায়গায় যাকে ওরা প্রমোশন দিয়েছে সে-ব্যাটা এক নম্বরের হাঁদা।’
‘কে?’
‘থাপা। বীরেন্দ্র থাপা। তার মানে এখানে পুলিশ আর কখনও আসবে না।’
‘কেন?’
‘থাপার ক্ষমতা হবে না এত দূর ভাবার। ভার্গিস ভাবতে পারত।’
‘আমার খিদে পেয়েছে।’
‘বিস্কুট খাবেন! আপেলও আছে।’
‘বিস্কুট? ঠিক আছে।’
বস্তুটি দেখে চিনতে পারল সে। আপেলটাকেও। এগুলো চিনতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। কিন্তু ভার্গিস নামটাকে অচেনা মনে হচ্ছে। ধীরে ধীরে সবগুলো খেয়ে নিল সে।
হায়দার বলল, “আজ রাত্রে আপনার ব্যান্ডেজ খুলব।’
‘কেন?’
‘খুলতে তো হবেই। ওটা খোলার পর আপনি আর আকাশলাল থাকবেন না। কি নাম নেওয়া যায়? চন্দ্রকান্ত। সুন্দর নাম। কি বলেন?’
‘ঠিক আছে।’
‘কাল ভ্যান এলে আমরা শহরে যাব। কাল থেকে আপনি সবার সামনে দিয়ে হেঁটে বেড়াতে পারবেন কিন্তু কেউ আপনাকে চিনতে পারবে না।’
‘কেন? চিনতে পারবে না কেন?’
ঝট্ করে হায়দারের চোখে সন্দেহ জ্বলে উঠল। সে হাসার চেষ্টা করল, ‘আপনি আমাকেও পরীক্ষা করার চেষ্টা করছেন? আপনার মুখে প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়েছে যাতে কেউ আপনাকে দেখে চিনতে না পারে। পুলিশ বোকা বনে যাবে।’
সে হাসল। ওই হাসিটা দেখে হায়দারের মন শান্ত হল। হ্যাঁ, তাকে পরীক্ষা করছিল লোকটা। শুধু কথাটা যেন বড় কম বলছে এই যা।
সারাটা দিন শুয়ে শুয়ে সে অনেক ভাবল। তার নাম আকাশলাল। সে নেতা। তার একটা দল আছে। পুলিশ বোধহয় তাকে খুঁজছে। নইলে বোকা বনে যাওয়ার কথা বলবে কেন হায়দার?’
সন্ধের পর একটু শুয়ে ছিল হায়দার। এখানে রাতের খাবার বিকেল বিকেল এসে যায়। একটু দেরি করেনি, খেয়ে নিয়ে গা এলিয়ে ছিল ইজিচেয়ারে।
খাওয়া দাওয়ার পর টয়লেটে ঢুকে ব্যান্ডেজে হাত দিয়েছিল সে। ধীরে ধীরে ব্যান্ডেজের বাঁধন খুলতে লাগল। একটু একটু করে পাতলা হয়ে যাচ্ছিল সেটা। শেষ বাঁধন সরে যেতেই প্যাড দেখতে পেল। প্যাডের নীচে মোটা তুলো। সেগুলো চামড়ায় আটকে আছে। আয়নায় নিজের মুখ দেখল সে। মুখভর্তি সাদা সাদা চাপ তুলো।
৩২. ব্যান্ডেজটা মুখে জড়িয়ে
সন্তর্পণে ব্যান্ডেজটা মুখে মাথায় জড়িয়ে ঘরে ফিরে এল সে। একটু চিন্তা করলেই মাথার ভেতর যে কষ্টটা দপদপিয়ে ওঠে সেটা জানান দিচ্ছে। খাটে শুয়ে সে সামনের দিকে তাকাতেই হায়দারকে দেখতে পেল। হায়দার তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
অস্বস্তি হল ওর। হায়দারকে তার চেনা চেনা মনে হচ্ছে কিন্তু ঠিক ঠাওর করতে পারছিল না। হায়দার তার শত্রু না বন্ধু তাও বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে। বরং যে-বুড়োমানুষটা একটু আগে এসেছিল তাকে অনেক স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল। সে দেখল হায়দার চোখ ফিরিয়ে জানলার বাইরে তাকাল। যেন খুব দুশ্চিন্তায় পড়েছে এমন ভাব। হঠাৎ মনে হল ওই লোকটা তাকে আটকে রেখেছে। এই ঘরে এমন অসুস্থ হয়ে তার থাকার কথা নয়। তবে তাকে এখানে আটকে রাখার পেছনে কি উদ্দেশ্য কাজ করছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। ও কি তাকে মেরে ফেলতে চায়? অথবা কারও হাতে তুলে দেবার জন্যে অপেক্ষা করছে? মাথার যন্ত্রণা তীব্র হয়ে উঠতেই সে অস্ফুট শব্দ উচ্চারণ করল। চমকে তার দিকে তাকাল হায়দার। তারপর দ্রুত উঠে এল পাশে, ‘শরীর খারাপ লাগছে নাকি?’
সে মাথা নাড়ল, না।
হায়দার কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘তোমার কি সব কথা মনে আছে?’
সে চোখ বন্ধ করল। কি উত্তর দেওয়া উচিত? কোনও কথা মনে ঠিকঠাক আসছে না, সেটা জানিয়ে দেবে?
উত্তর না পেয়ে হায়দার বলল, ‘এইজন্যে আমি ঝুঁকি নিতে নিষেধ করেছিলাম। যে কোনও মুহূর্তে তোমার মৃত্যু হতে পারত। কবরের নীচে শুয়ে যে বেরিয়ে আসে তার কাছে জীবনমৃত্যু সমান। তুমি ভাগ্যবান যে এখনও বেঁচে আছ। কিন্তু কি ভাবে বেঁচে আছ তা আমার জানা দরকার। শুনতে পাচ্ছ আমার কথা?’
‘হুঁ।’ সে খুব নিচু স্বরে জানাল।
‘দ্যাখো আকাশলাল, তুমি নেতা, আমাদের দেশের নেতা। তোমার মুখের দিকে সমস্ত দেশের নির্যাতিত মানুষ তাকিয়ে আছে। কিন্তু অপারেশনের ফলে যদি তোমার মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা হলে তুমি কারও উপকারে আসবে না। আমার কথা বুঝতে পারছ?’ হায়দার ঝুঁকে কথা বলছিল।
‘হ্যাঁ।’ সে ঠোঁট ফাঁক করল।
‘পুলিশ তোমকে খুব শিগগির আবার খুঁজতে শুরু করবে। এখন পর্যন্ত তোমার ডেডবডির খবর নিচ্ছিল ওরা। কিন্তু আমাদের কিছু মানুষকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। যে কোনও মুহূর্তেই তারা জেনে যেতে পারে তুমি বেঁচে আছ। আমার কথা তুমি বুঝতে পারছ?’
সে উত্তর দিল না। তার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। অদ্ভুত অবসাদ তাকে আচ্ছন্ন করে ঘুমের দেশে নিয়ে গেল। হায়দার সেটা লক্ষ করে বিরক্তি নিয়ে সরে এল। তার মনে হল সেই মানুষটা আর নেই। এখনকার আকাশলালকে পাহারা দেওয়া আর মৃতদেহ আগলে বসে থাকা একই ব্যাপার।
ঘুম ভাঙতেই সে জানলার দিকে তাকাল। কেউ নেই ওখানে। জানলাটাও বন্ধ। ঘরে একটা আবছা অন্ধকার। সে মুখ ফেরাল, কেউ নেই এখানে। হায়দার কোথায় গেল? টয়লেটের দরজাটাও খোলা। সে উঠে বসল। তোমার মস্তিষ্ক যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা হলে তুমি কারও উপকারে আসবে না। হায়দারের কথাগুলো মনে পড়তেই সে শক্ত হল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না সে জানে না কিন্তু কিছুই মনে পড়ছে না এখনও। উপকারে না এলে হায়দার কি তাকে মেরে ফেলবে? সে শঙ্কিত হল।
তাকে আকাশলাল বলে ডেকেছে হায়দার। ওটাই তার নাম। তার অপারেশন হয়েছিল, কবরের নীচে ছিল। সেখান থেকে নিশ্চয়ই তুলে আনা হয়েছে। তার মানে মরে গেলেও আবার তাকে বাঁচানো হয়েছে। সেটা কিভাবে সম্ভব হল তা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু পুলিশ তার খোঁজ করছে কারণ দেশের নির্যাতিত মানুষের জন্যে সে কিছু করতে গিয়েছিল। কি সব ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা কথা।
আকাশলাল খাট থেকে অন্যমনস্ক হয়ে নামতে যেতেই টাল সামলাতে পারল না। উল্টে পড়ে গেল মেঝের ওপর। মাথাটা বেশ জোরেই ঠুকে গেল খাটের পায়ায়। তীব্র ব্যথায় চিৎকার করে উঠল সে। সেই চিৎকার শুনে কেউ ছুটে এল না। বেশ কয়েক মিনিট মড়ার মতো পড়ে রইল আকাশলাল। দপদপ করছে সমস্ত মাথা। সেটা একটু কমতে সে টলতে টলতে টয়লেটে পৌঁছে গেল। শরীরের ভার হালকা করে মনে হল অনেকটা ভাল লাগছে। আয়নার দিকে তাকাল সে। ব্যান্ডেজমোড়া মুণ্ডখানা কি বীভৎস দেখাচ্ছে। সে নিজের বুকে হাত দিল। চামড়া উঁচু ঠেকল। ক্রমশ হাত নামাতে সে একটা সরলরেখায় মোটা আলের মত কিছু টের পেল বুকের ওপর। চটজলদি জামা সরিয়ে সে শুকিয়ে যাওয়া সেলাই দেখতে পেল। অপারেশন। এখানে অপারেশন হয়েছিল। কেউ চায়নি, সে জোর করেছিল। হঠাৎ বুড়ো ডাক্তারের মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠতেই আকাশলাল উত্তেজিত হল। হ্যাঁ, মনে পড়ছে। তার একটু একটু করে মনে পড়ছে। বুড়ো ডাক্তারকে রাজি করাতে তার অনেক সময় লেগেছিল। এ রকম এক্সপেরিমেন্ট এখনও পৃথিবীতে কেউ করেনি। কিন্তু বুড়ো নামের জন্যে লোভী হয়ে ছিল শেষপর্যন্ত। ভার্গিসের হাত থেকে বাঁচার আর কোনও পথ ছিল না। ভার্গিস? একটা বিশাল শরীরের মানুষকে মনে পড়ল। বুলডগ। হাতে চুরুট নিয়ে সারা দেশ খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। তারপরেই খেয়াল হল হায়দারের কথা। হায়দার বলছিল ভার্গিসের আর চাকরি নেই। কেন?
এলোমেলো ভাবে ছুটে আসা স্মৃতিকে সাজাতে অনেক সময় লাগলেও কিছু কিছু জায়গায় জোড় লাগছিল না। খাটে শুয়ে শুয়ে আকাশলাল সেই চেষ্টা করছিল। কিছু কিছু ঘটনার কথা স্পষ্ট মনে পড়ছিল আবার কোনও কোনও মুখ বা ঘটনা উধাও। শেষপর্যন্ত আকাশলাল যা ভাবতে পারল তা হল স্বৈরাচারী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল সংগ্রাম চালিয়েছিল তারা। দেশের অনেক মানুষ শুধু প্রাণের ভয়ে এবং সংস্কারের কারণে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়নি। তার সঙ্গী-সাথীদের অনেকেই পুলিশের হাতে মারা গিয়েছে। তার মাথার মূল্য অনেক টাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। ভার্গিস নামের এক পুলিশ অফিসার তাকে ধরার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। সেই বুড়ো ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে সে ধরা দেয়। বুড়ো তার বুকের মধ্যে অপারেশন করেছিল। প্রথমবার কে জানত। দ্বিতীয়বার, যখন তাকে মৃত ভেবে পুলিশ কবর দিয়েছিল তখন সঙ্গীরা সেখান থেকে তুলে নিয়ে আসার পর বুড়ো অপারেশন করে বাঁচিয়ে তোলে। সে যে বেঁচে আছে তার প্রমাণ এ সব ভাবতে পারছে। কিন্তু অনেক কিছু তার মনে আসছে না। তার নিজস্ব বাড়ি কোথায় ছিল? তার কোনও আত্মীয়স্বজন আছে কি না? এই ছোট্ট ঘরে সে কেন পড়ে আছে? আর ওই লোকটা যে তাকে পাহারা দিচ্ছে সে তার মিত্র কি না! লোকটাকে সে আগে দেখেছে। কিন্তু ডেভিড অথবা আবছা ত্রিভুবনের সঙ্গে এই লোকটার মুখ গুলিয়ে যাচ্ছিল তার কাছে। ত্রিভুবন অথবা ডেভিডের নামও স্পষ্ট মনে আসছিল না।
দরজায় শব্দ হল। কেউ সেটা খুলল। পায়ের আওয়াজ কাছে আসার পর সে মেয়েটিকে দেখতে পেল। ওর হাতে দুটো কৌটো। চোখাচোখি হতে হাসল মেয়েটা, তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘খিদে পেয়েছে?’
আকাশলাল মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।
মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে একটা কৌটো নিয়ে এগিয়ে এল। ঢাকনা খুলে সামনে ধরে জিজ্ঞাসা করল, ‘উঠে বসে খেতে পারবে?’
আকাশলালের ভাল লাগল। সে ধীরে ধীরে উঠে বসে দেখল দুটো মোটা রুটি আর আলুর তরকারি রয়েছে কৌটোর ভেতরে। সে হাত বাড়িয়ে কৌটোটা নিল।
মেয়েটা বলল, ‘ওরা বলে তোমার মাথায় অপারেশন হয়েছে। কিন্তু তা হলে মুখ ঢাকা থাকবে কেন? মুখে কি হয়েছিল?’
‘আমি জানি না।’ রুটি ছিড়ল আকাশলাল। খুব শক্ত।
মেয়েটা হাসল, ‘তোমার মুখ কেমন দেখতে আমি জানি না।’
কি জবাব দেবে আকাশলাল। সে রুটি চিবোতে লাগল। চোয়ালে সামান্য চিনচিনে ব্যথা হলেও সে উপেক্ষা করল। মেয়েটা বলল, ‘তোমার সঙ্গী খুব রাগী, না?’
‘জানি না।’ গ্রাম্য রান্নাও এখন ভাল লাগছে আকাশলালের।
‘ও বলেছে আর কেউ যেন এ ঘরে না ঢোকে। তোমাদের পুলিশ খুঁজছে?’
‘কি জানি!’
‘তোমাকে যেদিন প্রথম এখানে ভ্যানে চাপিয়ে এনেছিল সেদিন তুমি মড়ার মতো শুয়েছিলে। আমি ভেবেছিলাম ঠিক মরে যাবে।’
‘মরে তো যাইনি।’
‘হুম্। এক একজনের জান খুব কড়া হয়।’
‘এই জায়গাটার নাম কি?’
‘কূংলু।’
‘এখান থেকে শহর কতদূরে?’
‘একদিন হাঁটলে একটা শহরে যাওয়া যায়। সেখানে দুটো সিনেমা হল আছে বলে শুনেছি।’
‘ও। বড় শহর? সেখানে মেলা হয়?’
‘ও, সে অনেকদূর। গাড়িতে একদিন লাগে।’
‘তুমি খুব ভাল মেয়ে।’
‘কেউ বলে না এ-কথা।’ মেয়েটা যেন লজ্জা পেল।
‘তোমার বিয়ে হয়নি?’
‘হয়েছিল। কিন্তু তাকে পুলিশ জেলে রেখে দিয়েছে।’
‘কেন?’
‘কেন আবার? সে আকাশলালের দলে কাজ করত। সবাই বলে আর কখনও সে ফিরে আসবে না। আর এক বছর দেখি—।’
আকাশলালের বুকের ভেতর চিনচিন করে উঠল, ‘তারপর?’
‘তারপর আবার বিয়ে করব। আমাকে বিয়ে করার জন্যে সাতজন হাঁ করে বসে আছে। আমিও তো মানুষ। কতদিন আর উপোস করে বসে থাকি বলে?’
‘ওই সাতজন এই গ্রামের ছেলে?’
‘না। চার জন বাইরের। একজনের আবার ঘোড়ার গাড়ি আছে।’
‘তুমি কি তাকেই বিয়ে করবে?’
‘দেখি। ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে আমার খুব ভাল লাগে। আমি চালাতেও পারি। তুমি যদি চড়তে চাও তা হলে আমি ব্যবস্থা করতে পারি।’
‘সেটা মন্দ হয় না।’
‘কিন্তু ওই গাড়ি এই গ্রামে আনা যাবে না। সবার চোখ টাটাবে। ঘোড়ার গাড়িতে যদি তোমাকে উঠতে হয়, তা হলে হেঁটে নীচের ঝরনা পর্যন্ত যেতে হবে। ওইখানে আমি গাড়িটাকে নিয়ে আসতে পারি, ও রাগ করবে না।’
‘তার মানে তুমি ওকেই বিয়ে করবে।’
‘উপায় কি? সাতজনের মধ্যে ওই সবচেয়ে ভাল। তবে একবছর অপেক্ষা করতে হবে আমাকে।’
‘তোমার স্বামীর নাম কি?’
‘বীর বিক্রম।’
খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। আকাশলাল কৌটোটা ফেরত দিয়ে জল চাইলে মেয়েটা ঘরের এক কোণে রাখা পাত্র থেকে কৌটোয় ঢেলে এনে খাওয়াল।
আকাশলাল জিজ্ঞাসা করল, ‘তা হলে কখন তুমি আমাকে ঘোড়ার গাড়িতে চড়াচ্ছ?’
‘কাল ভোরবেলা। খুব ভোরে। সে সময় গ্রামের সবাই ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু তুমি কি রাস্তা চিনে ঝরনার ধারে একা যেতে পারবে?’
‘কিভাবে যাব বলে দাও।’
মেয়েটা চোখ বন্ধ করে ভেবে নিয়ে বলল, এখান থেকে বেরিয়েই বাঁ দিকে হাঁটবে। সরু পায়ে চলা পথ সোজা নীচে নেমে গিয়েছে। তারপর একটা মাঠ পাবে। মাঠের ডানদিক দিয়ে একটু এগোলেই নীচে আর একটা রাস্তা দেখতে পাবে। তার গায়েই ঝরনা।
‘কাল ভোরবেলায় তো?’
‘হাঁ।’ মেয়েটা কয়েক পা পিছিয়ে গেল, ‘কিন্তু এমন মুখ নিয়ে কি যাওয়া ঠিক হবে?’
‘আমি ব্যান্ডেজ খুলে যাব। তোমার চিন্তা নেই।’
মেয়েটা খালি কৌটো নিয়ে বেরিয়ে গেল একগাল হেসে। দ্বিতীয় কৌটোটা রেখে গেল ঘরে হায়দারের জন্যে। আবার শুয়ে পড়ল আকাশলাল। তার মন বলছিল এই ভাল হল। এখানে থাকতে তার একটুও ইচ্ছে হচ্ছে না। হায়দারকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। কিন্তু পায়ে হেঁটে নিকটবর্তী শহরেও তার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। এ ভাবে শুয়ে থাকলেও শরীর সারতে কতদিন লাগবে তা ঈশ্বরই জানেন। এই মেয়েটা সরল। তাই ধরে নেওয়া যায় সত্যি কথা বলছে। ওর ঘোড়ার গাড়িতে চেপে যদি নিকটবর্তী শহরে যাওয়া যায় তাহলে—! কিন্তু অতটা পথ মেয়েটা যেতে রাজি হবে কেন?
দরজায় শব্দ কানে আসতেই চোখ বন্ধ করল আকাশলাল। তার কানে হায়দারের গলা পৌঁছালেও সে ফিরে তাকাল না।
‘এখন তো ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি না, তবু দিনরাত ঘুমাচ্ছে কি করে?’ হায়দার বলল।
বুড়োর গলা কানে এল, ‘অতবড় ধকল গেছে, শরীরের সব শক্তি তত বেরিয়ে গেছে। লিডার আবার আগের মত হয়ে যাবে তো?’
‘সেটাই সন্দেহের। মনে হচ্ছে ওর ব্রেন চোট খেয়েছে।’
‘সে কি?’
‘হ্যাঁ। সবকথা ঠিকঠাক বুঝতে পারছে বলে মনে হয় না।’
‘তা হলে কি হবে?’
‘দেখি, ভেবে দেখি।’ হায়দারের গলা একটু থেমেই আবার সরব হল, ‘আরে! খাবার দিয়ে গেছে! একটা কৌটো কেন?’
‘ভুলে গেছে হয় তো। বড্ড চঞ্চল। আমি দেখছি।’ বুড়ো বেরিয়ে গেল।
আকাশলাল টের পেল হায়দার একা বসে খাবার খেয়ে যাচ্ছে। আগে কখনই সে তার জন্যে অপেক্ষা না করে খাবার খেতে পারত না। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে মানুষের ব্যবহার কি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। আকাশলাল নিঃশ্বাস ফেলল। সেটা কানে যেতেই খাওয়া থামিয়ে হায়দার তাকাল, ‘তুমি কি জেগে আছ?’
‘হ্যাঁ!’
‘কেমন লাগছে?’
‘ঠিক আছি।’
‘রুটি তরকারি খাবে?’
‘খেয়েছি।’
‘তাই নাকি? তা হলে তো ভালই হয়ে গেছ। তোমার কি সব কথা মনে পড়ছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘সব?’ হায়দারের গলায় এখনও সন্দেহ, ‘ইন্ডিয়া থেকে একজন ডাক্তার তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিল তোমার অপারেশনের জন্যে। মনে আছে কি অপারেশন করেছিল?’
ব্যাপারটা মুহূর্তে ধোঁয়াশা। সেরকম কিছু হয়েছিল বলে মনে পড়ছে না। কেন এসেছিল? কে এসেছিল? অপারেশন তো বুড়ো ডাক্তার করেছিল। সেটা হয়েছিল বুকের ভেতরে। তা হলে কি মুখে কোনও অপারেশন হয়েছিল? সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
হায়দার উত্তেজিত, ‘কি অপারেশন? কোথায় করেছিল?’
নিঃশব্দে হাত তুলে নিজের মুখ দেখিয়ে দিল আকাশলাল।
‘গুড। ওঃ, বাঁচালে তুমি। তোমাকে নিয়ে কি করা যায় ভেবে পাচ্ছিলাম না। শোন, ভার্গিস নেই। রাজধানীতে এখন অনেকরকম গোলমাল শুরু হয়ে গেছে। আমাদের সেখানে যাওয়া উচিত। কিন্তু তোমার যা শরীরের অবস্থা গাড়ি ছাড়া যেতে পারবে না। আমাদের ভ্যানটার এখানে ফিরে আসার কথা ছিল। এখনও যে কেন সেটা আসছে না তা বুঝতে পারছি না। তুমি কিছুদিন এখানেই থেকে যাও। এই বুড়ো খুবই বিশ্বস্ত। পাশের গ্রামে একটা ঘোড়ার গাড়ির সন্ধান পেয়েছি। লোকটা রাজি হচ্ছে না অত দূরে গাড়ি নিয়ে যেতে। কিন্তু দরকার হলে জোর করতে হবে। আমি আগামী কাল সকাল নটা নাগাদ রওনা হয়ে যাব। ওখান থেকে খবর না পাঠানো পর্যন্ত তুমি এখানেই থেকে যেয়ো। সুস্থ হলে তোমায় নিয়ে যাওয়া হবে।’ হায়দার বলল।
‘তুমি এখন সেখানে গিয়ে কি করবে?’
‘ম্যাডামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। ম্যাডাম সাহায্য না করলে তোমাকে নিয়ে ভার্গিস আসার আগে বেরিয়ে আসতে পারতাম না।’
‘ম্যাডাম?’ খুব চেনা চেনা লাগছিল সম্বোধনটা।
‘তোমার সঙ্গে ম্যাডামের যে গোড়া থেকে সংযোগ ছিল তা তুমি আমাদের বলোনি। নেতা হলেও এতটা ঝুঁকি নেওয়া তোমার উচিত হয়নি। তুমি মারা যাওয়ার পর উনি আমাদের সঙ্গে, মানে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রথমে আমার বিশ্বাস হয়নি ঠিক, পরে—। যাকগে। আমি কি তোমার মুখের ব্যান্ডেজ খুলে ড্রেস করে দেব?’
‘এখন নয়।’
‘ঠিক আছে। কাল সকালেই করব। যাওয়ার আগে তোমার পরিবর্তিত মুখটাকে আমার দেখে যাওয়া দরকার।’ হায়দার খাওয়া শেষ করে বাইরে বেরিয়ে গেল।
আকাশলাল নিঃশ্বাস ফেলল। সব কথা তার মাথায় ঠিকঠাক ঢুকছে না। ম্যাডাম কে? তিনি কেন তাদের সাহায্য করছেন? চোখ বন্ধ করতেই তার ঘুম এসে গেল।
ঘুম ভাঙামাত্র আকাশলালের অস্বস্তি শুরু হল। কি যেন করতে হবে? তারপরেই মনে পড়ে গেল। ঘরের ভেতরটা এখন অন্ধকারে ঠাসা। শুধু ওপাশ থেকে নাক ডাকার শব্দ ভেসে আসছে। সে হায়দারের আবছা মূর্তি দেখতে পেল। ইজিচেয়ারে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। এখন কত রাত?
নিঃশব্দে খাট থেকে নামল আকাশলাল। গতকালের চেয়ে আজ শরীর বেশ ঝরঝরে। মাথার যন্ত্রণাটা তেমন নেই। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর পা টিপে টিপে জানলার কাছে পৌছে আকাশ দেখল। আকাশে এখন শুকতারা জ্বলছে। বাইরের অন্ধকার তেমন গাঢ় নয়। সে নীচের দিকে তাকাল। হায়দার ঘুমাচ্ছে মড়ার মতো। হঠাৎ অন্ধকারেই কিছু একটা চোখে পড়ল। কালো-মতো বস্তুটা ইজিচেয়ারের হাতলের ওপর হায়দারের নেতিয়ে থাকা হাতের পাশে পড়ে আছে। আকাশলাল সেটা তুলে নিতেই রিভলভারটাকে অনুভব করল। তা হলে হায়দারের কাছে রিভলভার ছিল।
অস্ত্রটাকে পকেটে পুরে সে দরজার দিকে এগোল। এখনও রাত শেষ হয়নি। মেয়েটা কি এরই মধ্যে একা বেরিয়ে গেছে পাশের গ্রামের প্রেমিকের ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে আসতে? এত সাহস কি ওর হবে? কিন্তু ও যখন বলেছে তখন তার যাওয়া উচিত। না হলে বেলা বাড়লে হায়দার তাকে একা এখানে রেখে চলে যাবে। তারপর কি হবে কে বলতে পারে?
দরজাটা খোলার সময় সামান্য আওয়াজ হল। আকাশলাল মুখ ফিরিয়ে দেখল শায়িত শরীরটা নড়ছে না। সে চট করে বাইরে বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে হিম বাতাসে তার সবঙ্গ কেঁপে উঠল। ভোরের আগে পৃথিবীর বোধহয় বেশি শীতের দরকার হয়। অন্ধকার পাতলা হলেও সে যখন ঢালু পথ বেয়ে নেমে যাচ্ছিল তখন অসুবিধেটাকে টের পেল। মন যা চাইছে শরীর তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। নিঃশ্বাসের কষ্ট বাড়ছে, সেই সঙ্গে ক্লান্তি। মাঝেমাঝেই দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল তার। পকেটে হাত যেতেই অস্ত্রটির অস্তিত্ব টের পেয়ে মনে অন্য ধরনের সাহস তৈরি হচ্ছিল।
এখন গ্রামের সমস্ত মানুষ ঘুমে অচেতন। আকাশলাল ধীরে ধীরে মাঠে নেমে এল। এটুকু আসতেই মনে হচ্ছিল তার শরীরের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গিয়েছে। সে ওপরের দিকে তাকাল। গ্রামটা এখন কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে। এবং তখনই নিজের মুখের কথা মনে এল। এই অবস্থায় যে দেখবে সেই অবাক হবে। ভয়ও পেতে পারে। একটা পাথরের ওপর বসে পড়ল আকাশলাল। তারপর সন্তর্পণে ব্যান্ডেজ খুলতে লাগল। পাকগুলো খুলে এল সহজেই। গতকালের জড়ানোটা সম্ভবত ঠিক ছিল না। এবার তুলোর প্যাড। সেগুলো যেন চামড়ার সঙ্গে শক্ত হয়ে এঁটে আছে। অনেকটা তোলার পরও হাতের তালুতে ওদের অস্তিত্ব ধরা পড়ছিল। টেনে ছিঁড়তে ভয় লাগছিল তার। একটা আয়না থাকলে বোঝা যেত মুখের চেহারা এখন কি রকম দেখাচ্ছে। কিন্তু ব্যান্ডেজ খোলার পর বেশ হালকা লাগছে মাথাটা। অনেকদিন পরে দুই গালে মুখে হাওয়া লাগায় অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। আকাশলাল উঠল। একসময় সে যখন ঝরনার কাছে পৌঁছাতে পারল তখন শুকতারা ডুবে গেছে। পুবের আকাশে হালকা ছোপ লাগছে। সুনসান রাস্তার ধারেকাছে কেউ নেই। ধীরে ধীরে ঝরনার কাছে পৌঁছে সে জলে হাত দিল। কনকনে ঠাণ্ডা। হঠাৎ খেয়াল হতে সে এক আঁজলা জল তুলে নিয়ে মুখের ওপর রাখল। মনে হচ্ছিল ঠাণ্ডা জল চামড়া কেটে ফেলছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর কয়েক আঁজলা জলের ঝাপটা পাওয়ার পর মুখটা বেশ পরিষ্কার হয়ে গেল। আকাশলাল টের পেল তার মুখে এখন তুলোর অস্তিত্ব নেই। ঠিক তখনই তার কানে একটা শব্দ এল। ঘোড়ার নালের শব্দ।
৩৩. ঝরনার ধারে পাহাড়ের গায়ে
ঝরনার ধারে পাহাড়ের গায়ে শরীরটা আড়ালে রেখে আকাশলাল দাঁড়িয়ে-ছিল। যে আসছে তাকে না দেখে দেখা দেওয়া উচিত নয়। নিজের বুদ্ধিসুদ্ধি ফিরে আসছে ভেবে সে খুশি হল। একটু বাদেই শব্দটা কাছে এগিয়ে এল। হঠাৎই আড়াল থেকে একটা ঘোড়া এবং তার পেছনে সাধারণ চেহারার গাড়ি বেরিয়ে এল যেন। গাড়িটি চালাচ্ছে সেই মেয়েটি, তার পাশে একজন তরুণ। এই কাকভোরে ওরা দুই গ্রাম থেকে এসে কোথায় মিলিত হল কে জানে!
আকাশলাল দেখতে পেল ঘোড়ার গাড়িটাকে থামিয়ে মেয়েটা ওপরের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলল ছেলেটাকে। ছেলেটা মাথা নেড়ে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। তারপর ঝরনার দিকে এগিয়ে এল। হয়তো মেয়েটা একাই তার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে কিন্তু ছেলেটা আর একটু এলে সে ধরা পড়ে যাবে। আকাশলাল বাধ্য হয়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
তাকে দেখতে পেয়ে ছেলেটা বেশ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে মেয়েটাকে কিছু বলল। মেয়েটা এদিকে তাকাতেই আকাশলাল হাত নাড়ল। ততক্ষণে ছেলেটার পাশ কাটিয়ে সে কাছে এগিয়ে এসেছে। মেয়েটা বলল, ‘আপনাকে একদম চিনতে পারছি না।’
‘ব্যান্ডেজ খোলার পর কি রকম দেখাচ্ছে? খুব খারাপ?’
‘যাঃ! আপনি খুব সুন্দর। ও আমার বন্ধু!’
‘সাতজনের একজন?’
একটুও লজ্জা পেল না মেয়েটি। মাথা নেড়ে বলল, ‘না। সাতজনের মধ্যে সেরা। আপনার সঙ্গী আজ ওর এই গাড়ি নিয়ে শহরে চলে যাচ্ছে। ওকেও সঙ্গে যেতে হবে। আমার সেটা একদম ইচ্ছে নয়।’
‘কেন?’ আকাশলাল জিজ্ঞাসা করল।
‘লোকটাকে আমার একদম পছন্দ নয়।’
‘তোমার বন্ধু যদি আমাকে নিয়ে শহরে যেত তা হলে কি তুমি আপত্তি করতে?’
মেয়েটি হাসল, ‘না। আপনি ভাল লোক।’
আকাশলাল ছেলেটির দিকে তাকাল, তা হলে ভাই, তুমি আমার একটা উপকার করো। আমার এখনই এই জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। তুমি আমাকে এমন কোথাও পৌছে দাও যেখান থেকে আমি সদরে যাওয়ার গাড়ি পেয়ে যেতে পারি।’
‘এখনই?’ ছেলেটা যেন অবাক হয়েই ছিল।
‘হ্যাঁ। নইলে তোমার বিপদ হতে পারে। আমার সঙ্গী আগে শহরে পৌছালে বীরবিক্রমকে মুক্ত করবে। সে ফিরে এলে তোমার বান্ধবী আর কখনই কোনও পুরুষকে বিয়ে করতে পারবে না।’
‘আপনার বন্ধু কি আকাশলালের লোক?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু আমরাও আকাশলালের সমর্থক।’
‘বেশ। আকাশলাল তোমাদের কথা জানতে পারলে বীরবিক্রমকে একবছরের মধ্যে গ্রামে ফিরতে দিত না। এটা আমি বাজি রেখে বলতে পারি।’
ছেলেটা মেয়েটার কাছে এগিয়ে গেল। ওদের মধ্যে নিচু গলায় কিছু কথা হল যা শোনার চেষ্টা করল না আকাশলাল। মেয়েটা এবার তাকে বলল, ‘আপনার শরীর খারাপ। আপনার যেতে খুব অসুবিধে হবে। আপনি কাল পর্যন্ত ঘরের বাইরে যেতে পারেননি।’
আকাশলাল বলল, “তুমি ঠিকই বলেছ বোন। কিন্তু চলে যাওয়া ছাড়া আমার উপায় নেই।’
শেষ পর্যন্ত ওরা রাজি হল। মেয়েটা নেমে এল গাড়ি থেকে। ছেলেটি লাগাম ধরে আকাশলালকে ইশারা করতে সে মেয়েটির কাছে গেল, ‘তোমাকে একটা অনুরোধ করব। আমাদের এই যাওয়ার কথা তুমি কাউকে বোলো না। এতে আমার যেমন ক্ষতি হবে তেমনি তোমার বন্ধুরও হবে।’
মেয়েটি হাসল, ‘আপনি ভয় পাবেন না। আমি কাউকে কিছু বলব না।’
মিনিট পাঁচেক বাদে ওরা পাহাড়ি পথ দিয়ে চলছিল। ছেলেটি গম্ভীর মুখে লাগাম ধরে তার ঘোড়াটিকে চালনা করছিল। গাড়ি চলা শুরু করলে আকাশলাল বেশ বিপাকে পড়েছিল। গাড়ির দুলুনি তার শরীরকে স্বচ্ছন্দ রাখছিল না। একটু বাদেই পেট গুলিয়ে উঠল। বমি বমি পাচ্ছিল। কিন্তু সে নিজেকে ঠিক রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল। ধীরে ধীরে চলনটা অভ্যেসে এসে যাওয়ার পর সে কিছুটা সুস্থ বোধ করল।
এখন সূর্য উঠে গেছে কিন্তু রোদ পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়েনি। হিম হিম বাতাস আর ভেজা গাছপালার ছাউনির মধ্যে দিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে গাড়িটা ছুটে যাচ্ছিল।
আকাশলাল জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার নাম কি ভাই?’
‘জীবনলাল।’
‘কি করো তুমি?’
‘চাষবাস দেখি। জিনিসপত্র বিক্রি করি। মাঝে মাঝে শহরে যাই, প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে এনে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করি। আপনি কি করেন?’
‘আমি? আকাশলালের বিপ্লবী দলে আছি।’
‘মিছি মিছি সময় নষ্ট করছেন। আকাশলাল মরে যাওয়ামাত্র বিপ্লব শেষ হয়ে গিয়েছে।’
‘তুমি তাই মনে করো?’
‘হ্যাঁ। আমার মনে হয় আকাশলালও দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।’
‘কি রকম?’
‘পুলিশ ওঁকে খুঁজে পাচ্ছিল না। উনি যদি কোনও মতে গ্রামে চলে আসতেন তা হলে আগামী একশো বছরেও খুঁজে পেত না। উনি নিশ্চয়ই সেটা জানতেন। অথচ উনি স্বেচ্ছায় মেলার মাঠে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা দিলেন। ওঁর মতো নেতা কেন ধরা দিতে যাবে? উনি জানতেন না ধরা দেওয়া মানে বিপ্লব শেষ হয়ে যাওয়া?’
‘হ্যাঁ। এটা ওর ভাবা উচিত ছিল।’
‘দেখুন না, ওঁর ধরা দেওয়ার পরই ডেভিডকে পুলিশ ধরে গুলি করে মারল। কয়েকদিন আগে ত্রিভুবনকে সীমান্তের কাছে পুলিশ হত্যা করেছে।’
‘তুমি এদের চোখে দেখেছ?’
‘না। নাম শুনেছি।’
‘হায়দারকে দেখেছ?’
‘না। কাল একটা লোক এসেছিল আমার গাড়িটার জন্যে। সন্দেহ হচ্ছিল খুব কিন্তু লোকটা অন্য নাম বলেছে। শুনলাম ও আপনার সঙ্গে থাকে।’
‘কিন্তু আকাশলালের মৃতদেহ তো কবর থেকে ওর বন্ধুরা তুলে নিয়ে গেছে।’
‘সেটা জানি। কিন্তু মৃত মানুষ বিপ্লব করে না।’
আকাশলাল মাথা নাড়ল। কথাটা ঠিক। মৃত মানুষ বিপ্লব করে না। সে নিজে এখন সব অর্থে মৃত। হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায় সে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কখনও আকাশলালকে দেখেছ?’
জীবনলাল এমনভাবে তাকাল যেন কোনও ছেলেমানুষি প্রশ্ন শুনল। সে হাসল, ‘আকাশলাল কোথায় থাকত কেউ জানত না। কিন্তু তাকে দ্যাখেনি এমন মানুষ এদেশে খুঁজে পাবে না। সামনা সামনি না দেখতে পেলেও ছবিতে দেখেছে। এমন কোনও এলাকা নেই যেখানে তাঁর ছবি টাঙিয়ে ধরিয়ে দিতে বলেনি এই সরকার।’
‘তুমি তা হলে তাকে দেখলেই চিনতে পারবে?’
‘পারতাম। এখন তিনি নেই, সেই সুযোগও আমি পাব না।’
আকাশলাল নিঃশ্বাস চাপল। বেশ জোর দিয়ে কথাগুলো বলল ছেলেটা। ও যে মিথ্যে বড়াই করছে, তা মনে হচ্ছে না। তা হলে তার মুখে কি এমন অপারেশন হয়েছে যাতে চেহারা এত পাল্টে গেল? সেই ডাক্তার দম্পতি, যার কথা হায়দার বলেছিল, যদি তার মুখে অপারেশন করে থাকে তা হলে কেন করল? যাতে তার চেহারা বদলে যায়, লোকে দেখে চিনতে না পারে সেই কারণে কি? আকাশলালের মনে দুটো প্রশ্ন তীব্র হল। তার পরিবর্তিত মুখের সঙ্গে কে কে পরিচিত? অপারেশন করার সময় ডাক্তার নিশ্চয়ই দেখেছিল। কিন্তু ব্যান্ডেজ খোলার সময় না থাকায় মুখের পরিবর্তিত আকার তার অজানা থেকে গেছে। হায়দার তার সঙ্গে ছিল, ধরে নেওয়া যেতে পারে কিন্তু ব্যান্ডেজ খোলার সুযোগ সে পায়নি। এই জীবনলাল যদি তাকে আকাশলাল বলে চিনতে না পারে তা হলে বদলে যাওয়া মুখ দেখে হায়দারও তাকে চিনতে পারবে না।
দ্বিতীয় চিন্তাটা জোরালো। সত্যি কি সে নিজে আকাশলাল? তার স্মৃতিতে যা কিছু শেষ পর্যন্ত ধরা দিচ্ছে তাতে আকাশলাল হবার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই ফাঁকগুলো যা সে মনে করতে পারছে না, তা মনে না পড়া পর্যন্ত সে নিজেকে আকাশলাল ভাবতে ভরসা পাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে দেশের মানুষের কাছে আকাশলাল মৃত। লোকটা স্বেচ্ছায় পুলিশের হাতে ধরা দিয়েছিল। কেন? এ প্রশ্নের উত্তর তার নিজের জানা নেই। ধরা পড়ার পর তার মৃত্যু হল কি ভাবে? মৃত্যুর পরে তাকে কবর দেওয়া হয়েছিল। সেই কবর থেকে যদি সঙ্গীরা বের করে আনে তা হলে মৃত মানুষকে কি করে আবার জীবন্ত করে তুলল ডাক্তার। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ফলে আকাশলাল কিছুতেই বেঁচে থাকতে পারে না। তা হলে সে কে?
প্রশ্নটা তাকে পীড়িত করলেও সে ধন্ধে পড়েছে স্মৃতিগুলোর জন্যে, যা তার মনে মেঘের মতো ভেসে আসছে মাঝে মাঝে। এগুলো কেউ তাকে বলেনি। অথচ সে মনে করতে পারছে। তা হলে এর পেছনে সত্য আছে। আর একটা কথা, গতকাল খাট থেকে নামবার সময় পড়ে গিয়ে আঘাত লাগার পর থেকে সে এগুলো মনে করতে পারছে। কেন?
আকাশলাল জীবনলালকে বোঝাল আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের অত্যাচারে সে এমন অসুস্থ ছিল যে দেশের খবরাখবর জানার সুযোগ হয়নি। এমনকি আকাশলাল কি ভাবে মারা গেল তাও তার জানা নেই। ফিরে গিয়ে বোকা বনে যাওয়ার আগে সে যদি এ-ব্যাপারে জানতে পারে তা হলে ভাল হয়। জীবনলাল ছেলেটি সাদাসিধে। সে গল্প করার সুযোগ পেয়ে এক এক করে সব ঘটনা বলে যেতে লাগল। অবশ্য এই বর্ণনার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার খুঁটিনাটির মিল ছিল না। সরকারি রেডিও এবং মুখে মুখে প্রচারিত ঘটনায় যে কল্পনার মিশেল থাকে তাকেই জীবনলাল সত্য ভেবে বলে গেল। তবু তার মধ্যে অনেকটা জেনে নিতে পারল আকাশলাল। সে আরও জানতে পারল, আকাশলালকে যে ডাক্তার চিকিৎসা করত সেই বুড়োমানুষটা সীমান্ত পার হতে গিয়ে মরে গেছে।
অনেক অনেক দিন বাদে বিছানা থেকে সরাসরি উঠে যে পরিশ্রম আজ হয়েছে সেটা টের পাওয়ার আগেই গাড়ির একপাশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল আকাশলাল। গাড়ির চলার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরে দুলুনি লাগছিল তাতে ঘুমটা আরও গভীর হয়ে গেল। তার মাথাটা কাঠের সিটে মাঝে মাঝে ঠুকে গেলেও সে টের পাচ্ছিল না।
জীবনলালের বয়স বেশি নয়। কিন্তু সে উৎসাহী এবং, কর্মঠ বলে ওই অল্প বয়সেই ভাল রোজগার করতে আরম্ভ করেছে। অবশ্য গাঁয়ের মানুষের কাছে যে রোজগার ভাল বলে মনে হয় সেটা ওই রকমই। ছেলেটার সঙ্গে প্রেম করার জন্যে অনেক মেয়ে মুখিয়ে আছে, কিন্তু তার মন সে দিয়ে ফেলেছে বীরবিক্রমের বউকে। অবশ্য আর এক বছর পরে ওকে কারও বউ বলা যাবে না। গ্রামের আইন অনুযায়ী যত বছর আলাদা থাকলে এবং সেই সময় সন্তান না জন্মালে স্ত্রীর ওপর স্বামী অধিকার হারাবে তত বছর পার হতে আর এক বছর বাকি আছে। বীরবিক্রমের জেল খেটে বেরিয়ে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই। যদিও জীবনলাল আকাশলালের সমর্থক এবং সেই কারণে বীরবিক্রমের মিত্র তবু এই একটি ক্ষেত্রে সে লোকটাকে পছন্দ করছে না। তা ছাড়া বিয়ের পর তোকটা বউকে যত্ন করেনি, মাত্র চারদিনের জন্যে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল আর তা থেকেই প্রমাণ হয় ও বউকে ভালবাসে না। সে যে বীরবিক্রমের বউকে ভালবাসে তা অনেকেই পছন্দ করে না। সে জানে অনেকেই মেয়েটার সঙ্গে মিশে ফালতু মজা করতে চায়। কিন্তু মেয়েটা যে তাকে ছাড়া আর কাউকে পাত্তা দেয় না এ-কথাটাও তো ঠিক। তাই কাল রাত্রে যখন মেয়েটা তাকে বলল, অসুস্থ মানুষটাকে একটু ঘোড়ার গাড়িতে চাপিয়ে ঘোরাতে হবে তখন সে আপত্তি করেনি। বস্তুত গাড়িটা তার গর্ব। এবং ঘোড়াটাও। আশেপাশের কয়েকটা গ্রামেও এমন ঘোড়ার গাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না। কাল বিকেলে যখন লোকটা তার গাড়ি ভাড়া করতে এল তখন সে রাজি হতে চায়নি। অনেক কম টাকা দিচ্ছিল লোকটা। ব্যবসা করতে এসে সে খদ্দের পেলে ফিরিয়ে দেয় না। যদিও লোকটাকে পছন্দ হচ্ছিল না তবু টাকাটার জন্যে একবারে হ্যাঁ বলেনি। এখন মনে হচ্ছে সেটা না বলে ঠিকই করেছে। এই লোকটা যে তার পাশে ঘুমিয়ে আছে সে যে অনেক টাকা দেবে এমন ভরসা নেই কিন্তু যদি বীরবিক্রমের জেল থেকে বেরিয়ে আসা বন্ধ করতে পারে তা হলে টাকা না পেলেও তার চলবে।
ঘণ্টা তিনেক টানা চলার পরে গাড়িটা একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে ঢোকার পর জীবনলাল ঠিক করল আধঘণ্টাটাক ঘোড়াটাকে বিশ্রাম দেওয়া দরকার। এই গ্রামটা ছোট কিন্তু পথের ধারে একটা চা এবং রুটিতরকারির দোকান আছে। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। জীবনলাল গাড়ি দাঁড় করিয়ে গাড়ির পেছন থেকে কিছু ঘাস টেনে বের করে ঘোড়টার সামনে রেখে তার সঙ্গীর দিকে তাকাল। লোকটা মরে গেল নাকি। গাড়ি থেমেছে অথচ ওর ঘুম ভাঙছে না? সে কাছে গিয়ে আকাশলালের হাঁটুতে চড় মারল ‘এই যে! উঠবেন?’
দ্বিতীয় বারে আকাশলাল চোখ মেলল। যেন গভীর কুয়োর নীচে থেকে সে ওপরে উঠে আসছে এমন মনে হল। চোখ খুলে চার পাশটা অচেনা মনে হল তার।
জীবনলাল জিজ্ঞাসা করল, ‘চা খাবেন?’
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল সে। জীবনলাল বলল, ‘আপনার শরীর ঠিক আছে তো?’
‘হ্যাঁ।’ নীচে নামার চেষ্টা করে আকাশলাল বুঝতে পারল তার মাথা ঘুরছে। সে কোনও রকমে মাটিতে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই জীবনলাল হাঁকল, ‘চারটে রুটি, সবজি আর দুটো চা।’
রুটি এবং সবজি শব্দ দুটো কানে যাওয়ামাত্র আকাশলাল টের পেল তার খুব খিদে পেয়েছে। কিছু খেলে শরীরের আরাম হবে। সে টলতে টলতে দোকানের সামনে রাখা কাঠের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে পড়ল।
তার চোখের সামনে একটা ঢালু উপত্যকা রোদে ঝলমল করছে। আহা, কি মিষ্টি রোদ। পৃথিবীটাকে মাঝে মাঝে এমন সুন্দর লাগে। মনটা ঈষৎ ভাল হয়ে গেল তার।
পাশাপাশি বসে খাবার খেয়ে নিল জীবনলাল। খাওয়া শেষ করে জল পান করে বলল, ‘একটা কথা, আপনার নামটা এখনও জানা হয়নি।’
আকাশলাল ছেলেটার দিকে তাকাল। তারপর হেসে বলল, ‘আমাকে আঙ্কল বলল।’
‘ও, ঠিক আছে। আপনার কাছে টাকা আছে তো?’
‘টাকা?’
‘হ্যাঁ, পথে কয়েকবার খাবারের দাম দিতে হবে। তা ছাড়া আমার গাড়ির ভাড়া। ভাল খদ্দেররা আমাকে খাওয়ার টাকা দিতে দেয় না অবশ্য।’
‘আমার কাছে তো কোনও টাকা নেই।’
‘তার মানে?’ জীবনলাল আঁতকে উঠল।
‘আমি অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়েছিলাম এতদিন। তোমার বান্ধবী বলতে ওর নির্দেশ-মতন আজ চলে এসেছি। আমি টাকা কোথায় পাব?’
‘সে কি। তা হলে এসব খরচ কে দেবে?’ জীবনলাল রেগে গেল।
‘দ্যাখো ভাই, আমি বুঝতে পারছি সমস্যাটা। তবে তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস করো, তা হলে আমি কথা দিচ্ছি যা খরচ হবে তার দ্বিগুণ আমি শোধ করে দেব।’
‘দূর মশাই। আমি আপনার নাম পর্যন্ত জানি না, বিশ্বাস করব কি?’ জীবনলাল বলতেই দোকানি বলে উঠল, ‘জীবনলাল, তুমি অর্ডার দিয়েছ, দাম তোমার কাছ থেকে নেব।’
‘ঠিক আছে ঠিক আছে। সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না।’ দোকানিকে ঝাঁঝিয়ে কথাগুলো বলে জীবনলাল তাকাল, ‘আপনার কাছে কি নেই?’
সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল আকাশলালের। সে পকেটে হাত রেখে বলল, ‘আছে। আমার কাছে একটা রিভলভার আছে। ওটা বিক্রি করলে কত দাম পাওয়া যাবে?’
‘রিভলভার?’ বিড় বিড় করল জীবনলাল।
‘হ্যাঁ। নেবে?’
ঠিক তখনই গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। ওরা মুখ ঘুরিয়ে দেখল দু-দুটো পুলিশ-জিপ উঠে আসছে নীচের রাস্তা ধরে। জিপ দুটোয় অস্ত্রধারী পুলিশ ভর্তি।
ঠিক চায়ের দোকানের সামনে জিপ দুটো দাঁড়িয়ে গেল। আকাশলালের বুকের ভেতর শব্দ হচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল এখনই পালানো দরকার। কিন্তু কি করে সে এখান থেকে পালাবে? তার দুটো পায়ে বিন্দুমাত্র শক্তি নেই এখন।
প্রথম জিপ থেকে কয়েকজন পুলিশ নামল। একজন অফিসার দোকানিকে জিজ্ঞাসা করল ‘কুংলু গ্রামটা এখান থেকে কত দূর?’
‘বেশি দূরে না। এই জীবনলাল, কত দূর হবে?’ দোকানদার এদিকে তাকাল।
জীবনলালের ভাল লাগছিল না। পুলিশদের সে সহ্য করতে পারে না। তা ছাড়া তার খদ্দেরের টাকাপয়সা নেই জেনে মেজাজ খারাপ হয়ে ছিল। সে বলল, ‘অনেক দূর।’
অফিসার সামনে এগিয়ে এসে সরাসরি একটা বুট পরা পা জীবনলালের ভাঁজ করা হাঁটুতে রেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘দোকানি বলছে বেশি দূরে নয় তুই বলছিস অনেক দুর। কোনটা সত্যি? মিথ্যে কথা বললে চামড়া ছাড়িয়ে নেব।’
হাঁটুর ব্যথা সহ্য করে জীবনলাল বলল, ‘হেঁটে গেলে আট ঘণ্টা, ঘোড়ার গাড়িতে চার ঘণ্টা। আমি কি করে কাছে বলব?’
বুট সরিয়ে নিল অফিসার, ‘তোর নাম কি?’
‘জীবনলাল।’
‘আকাশলাল তোর কে হয়?’
‘কেউ নয়।’
‘কুংলু গ্রামে দুটো বিদেশি অনেকদিন ধরে রয়েছে। জানিস?’
‘না। আমি ওই গ্রামে থাকি না।’ জীবনলাল মাথা নাড়ল, ‘ও থাকত।’
‘অ্যাই, তোর নাম কি?’ অফিসার আকাশলালের দিকে তাকাল।
‘গগনলাল।’
‘বাঃ। নামের কায়দা খুব। গগনলাল? আকাশলাল কেউ হয়?’
‘সে তো মরে গেছে।’
‘শালা মরে গিয়েও ভূত হয়ে আমাদের নাচাচ্ছে। তোদর গ্রামে বিদেশি আছে?’
‘হ্যাঁ। দুজন।’ আকাশলাল বলল।
‘তুই দেখেছিস?’
‘হ্যাঁ। একজনের মাথায় ব্যান্ডেজ।’
খবর পেয়ে অফিসারকে খুশি দেখাল। ‘তোরা আমাদের সঙ্গে চল।’
আকাশলাল মাথা নাড়ল, ‘মরে যাব সাহেব। আমার শরীর খুব খারাপ! মুখ দিয়ে রক্ত উঠছে। শহরের হাসপাতালে যাচ্ছি ডাক্তার দেখাতে।’
সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ছিটকেই সরে গেল অফিসার। একটু বাদে জিপ দুটো উঠে গেল ওপরে। জীবনলাল তারিফ করল, ‘তোমার বেশ বুদ্ধি। তা আঙ্কল, মুখ দিয়ে রক্ত বেরুবার মতো গগনলাল নামটাও কি বানানো?’
আকাশলাল হাসল। উত্তর দিল না। দাম মিটিয়ে দিয়ে জীবনলাল বলল, ‘শোন, তোমাকে টাকা পয়সা দিতে হবে না। কিন্তু কথা দিতে হবে যাতে বীরবিক্রম এক বছরের মধ্যে ফিরে না আসে সেই ব্যবস্থা তুমি করবে।’
কথা দিলাম।’
পরের দিন সন্ধের মুখে ওরা রাজধানীতে পৌঁছে গেল। পথে যে কটা পুলিশি জেরার সামনে পড়েছিল তা পেরিয়ে আসতে তেমন অসুবিধে হয়নি। আকাশলাল খুবই নিশ্চিত হয়েছিল এই ভেবে যে হয় সে আদৌ আকাশলাল নয় অথবা মুখের ওপর অপারেশন হওয়ায় তার চেহারা একদম বদলে গেছে।
শহরে ঢুকে জীবনলাল জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কোথায় যাবে আঙ্কল?’
আকাশলাল বলল, ‘জানি না। দেখি।’
‘তোমার পকেটে তো পয়সাও নেই।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমি তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকলাম ভাই।’
৩৪. জীবনলাল মাথা নেড়ে বলেছিল
জীবনলাল মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘শোন আঙ্কল। তুমি যদি আমাদের কথাটা মনে রাখো তাহলে আমি তোমার একটা উপকার করতে পারি। আজকের রাতটা বিনা পয়সায় থাকার ব্যবস্থা হলে কেমন হয়?’
‘খুব ভাল।’
‘আমি যেখানে নিয়ে যাব সেখানে ভাল অথবা মন্দ যে-কোনও ব্যবহার পেতে পার। যাই পাও রাতটা কোনমতে কাটিয়ে সকালবেলায় তুমি তোমার ধান্দায় চলে যেয়ো, আমি গ্রামে ফিরে যাব।’
‘খুবই ভাল কথা।’
সেইরাত্রে পাশাপাশি শুয়ে চাপা গলায় জীবনলাল বলল, ‘তাজ্জব ব্যাপার!’
‘কেন? আকাশলালের ঘুম পাচ্ছিল।’
‘আমার মাসির মতো মুখরা মেয়েমানুষ আমি জীবনে দেখিনি। ওর মুখের জ্বালায় না থাকতে পেরে মেসোমশাই পুলিশে নাম লিখিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের গুলি খেয়ে মরেছে, সেই বাড়িতে ঢোকামাত্র কিরকম অভ্যর্থনা পেয়েছিলাম মনে আছে? যেন মেশিনগান চলছে। তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘তারপর যেই তুমি কলতলায় স্নান করতে গেলে তারপর একদম চুপ মেরে গেল?’
‘আমার স্নান করার সঙ্গে তার চুপ করার কি সম্পর্ক?’
‘সেটাই তো বুঝতে পারছি না। মাসির পাক ঘরের জানলা দিয়ে কলতলা দেখা যায়। মেসো মরে গেছে, বাচ্চাকাচ্চা হয়নি, দেখতে শুনতে মন্দ নয় তবু কোনও পুরুষ বিয়ে করতে এগিয়ে আসেনি শুধু ওই মুখের জন্যে। আর বিয়ের কথা বললেই মাসি খেপে আগুন হয়ে যায়। সেই মাসি কলতলায় তোমার মধ্যে যে কি দেখল কে জানে তাড়াতাড়ি এসে আমাকে নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘ওর নাম কি রে?’
আমি বললাম, ‘গগনলাল।’
মাসি চোখ ঘোরাল, ‘যাঃ। গগন মানে তো আকাশ। আকাশলাল মরে গেছে।’
আমি হেসে বলেছিলাম, ‘দূর! এ আকাশলাল হতে যাবে কেন? এ গগনলাল। ওই আকাশলালের মুখের সঙ্গে কি কোন মিল আছে?’
মাসি খুব গম্ভীর মুখে বলেছিল, ‘দুটো মিল আছে। পিঠে দুটো জড়ুল আছে। পাশাপাশি। দেখে আমি চমকে গিয়েছিলাম। কি জানি, মরা মানুষ চেহারা পাল্টে এল নাকি!’
‘তারপর থেকে বারেবারে তোমাকে দেখছে। কিন্তু মুখে আর শব্দ নেই। আমি জানি কাল সকালের মধ্যে পাড়ার সবাই জেনে যাবে যে তোমার পিঠে আকাশলালের মত জোড়া জড়ুল আছে।’
সকালে ঘুম ভেঙেছিল বেশ দেরিতেই। অসুস্থ শরীরে দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তি যেন কাটতে চাইছিল না। আর একটু ঘুমালে কেমন হয় এমন যখন সে ভাবছে তখন গলা কানে এল, ‘কটা বাজল জানা আছে। এর পরে চায়ের পাট বন্ধ।’
আকাশলাল উঠল। সে বুঝতে পারল জীবনলাল সাত সকালেই তাকে না বলে বেরিয়ে গেছে। মুখ হাত পা ধুয়ে সে যখন বাইরে বেরুবার জন্যে পা বাড়াচ্ছে তখন মাসি সামনে এল, ‘চা কে খাবে? আমি কত কাপ গিলব?’
অতএব চা খেতে বসতে হল। খানিকটা দূরে বসে মাসি বলল, ‘বোনপো তো দেশে ফিরে গেছে। বলে গেল তার আঙ্কলের নাকি যাওয়ার জায়গা নেই। তা কোথায় যাওয়া হবে।’
‘দেখি। রাতের বেলায় মাথার ওপরে একটা ছাদ তো দরকার?’
‘ঠিক বুঝেছি। তা পেটের আগুন নেভাবে কে? কাজকর্ম কিছু করা হয়?’
‘কাজকর্ম? না। তবে করতে হবে কিছু।’
‘পিঠে দুটো জড়ুল কবে থেকে হয়েছে?’
‘ও দুটো জন্ম থেকে। মা বলত তোর পিঠেও এক জোড়া চোখ।’
‘তিনি কোথায় আছেন?’
‘মা? মা নেই।’
‘আত্মীয়স্বজন?’
‘নাঃ।’
‘বিয়ে থা?’
হেসে ফেলল আকাশলাল, ‘আমাকে বিয়ে কে করবে?’
‘ন্যাকা!’ মাসি উঠে দাঁড়াল, ‘আজ আর বেরুতে হবে না। বুক জুড়ে অনেক কাটা দাগ দেখেছি। মুখ দেখলেই বোঝা যায় রক্ত নেই শরীরে। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর পাশের বাড়ির হাবিলদার ভাই থানায় নিয়ে গিয়ে নাম লিখিয়ে আসবে। ওরা যে কাগজ দেবে তা পকেটে রাখতে হবে।’ মাসি চলে গেল সামনে থেকে।
আকাশলাল ঠোঁট কামড়াল, এ তো নতুন ফ্যাসাদে পড়া গেল। থানায় গেলে যে জেরা করবে তার জবাব ঠিকঠাক দিতে না পারলে—! মুখ দেখে তাকে কেউ আকাশলাল বলে ভাবতে পারছে না ঠিক। এরা জানে আকাশলাল মরে গেছে। কিন্তু তার জড়ুল দুটো? মুখ পাল্টে দেবার সময় ওই জড়ল দুটোর কথা ভুলে গেল কি করে? আবার এমন লোক থাকতে পারে যে আকাশলালের শরীর চেনে। ব্যাস, হয়ে গেল। সে নিজের হাত পা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। কোথাও তেমন কোনও বিশেষ চিহ্ন চোখে পড়ছে না। না। সাবধানের মার নেই। থানায় যাবে না সে। সুযোগ খুঁজে নিয়ে সে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে।
রাস্তায় পা দিয়ে সে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে দেখল নাগরিকদের। হাঁটতে হাঁটতে তার স্মৃতিতে একটু একটু করে অনেক দৃশ্য ভেসে আসছিল। যেন এই সব পথ দিয়ে সে অনেকবার যাওয়া আসা করেছে, বাঁক নিতেই একটা ফটোর দোকান দেখতে পাবে এবং পেলও। আকাশলাল চমকে উঠল। তার তো কিছু কিছু কথা এখন ঠিকঠাক মনে পড়ছে। একসময় এখানে কারফিউ হত। মানুষ ভয়ে পথে বের হত না। একটা দেওয়ালে প্রায় উঠে আসা পোস্টার ঝুলতে দেখল সে। ওয়ান্টেড আকাশলাল। এই তাহলে তার ছবি। বেশ ভাল মানুষ ভাল মানুষ চেহারা। ওরা প্রচুর টাকা দিত কেউ ধরিয়ে দিলে। অথচ দেশের মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।
কিছুটা হাঁটার পর একটা চায়ের দোকান দেখতে পেয়ে সে ঢুকে পড়ল। দোকান প্রায় খালি। বেঞ্চিতে বসতে একটা ছোকরা এগিয়ে এল, ‘গরম চা?’
হ্যাঁ বলতে গিয়েও সামলে নিল আকাশলাল। সে মাথা নাড়ল।
‘তাহলে কি দেব?’
‘কিছু না।’ মাথা নিচু করে বলল সে। একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে যাবে সে। এমন খদ্দের জীবনে দ্যাখেনি ছেলেটা। কাউন্টারে বসা মালিকের দিকে তাকিয়ে সে ভেতরে চলে যেতেই মালিক গলা খুলল, ‘ভাই সাহেবের কি শরীর খারাপ?’
‘হ্যাঁ। একটু—।’
‘গরম চা খান না। ঠিক হয়ে যাবে।’
সে মুখ তুলে লোকটার দিকে তাকাতেই দেওয়ালে পোস্টার ঝুলতে দেখল। তার নিজের মুখের পোস্টার। এই ছবিটা একটু অন্য ধরনের। জীবিত বা মৃত ধরে দিতে পারলে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি।
দোকানদার বলল, ‘আকাশলাল। এখন আর কোনও দাম নেই। এমনি টাঙিয়ে রেখেছি।’
‘দাম নেই কেন?’
‘লোকটা বেঁচে আছে বলে কেউ ফিস ফিস করে। কবরে মুর্দা ঢুকে গিয়ে কেউ কি বেঁচে ফিরতে পারে? তারপর ওর তিনটে হাত ছিল। তিনটে হাতই খতম।’
‘তার মানে?’
‘ডেভিডটা মরেছিল প্রথমে। তারপর গেল ত্রিভুবন। আর আজ রেডিওতে বলেছে যে কোনও এক পাহাড়ি গ্রামে লুকিয়ে থাকা হায়দারকে পুলিশ মেরে ফেলেছে।’
‘হায়দার নেই?’ আচমকা বেরিয়ে এল মুখ থেকে।
‘রেডিওতে তাই বলল। আরে মশাই গেছে বেশ হয়েছে। আমিও এককালে আকাশলালের সমর্থক ছিলাম। দেশে বিপ্লব হোক চাইতাম। কিন্তু দিনের পর দিন শুধু খুন জখম, ব্যবসা বন্ধ, বিপ্লবের নামগন্ধ নেই শুধু ছেলেগুলো খতম হয়ে যাচ্ছে এ আর কাঁহাতক ভাল লাগে? এই দেখুন, এখন শান্তি এসেছে। শুনছি মিনিস্টারও বদল হবে। এই ভাল।’ দোকানদার হাঁক দিলেন, ‘চা দিয়ে যা।’
আকাশলাল কিছু বলার আগেই একজন মোটাসোটা ভারী চেহারার মানুষকে শ্লথ পায়ে দোকানে ঢুকতে দেখা গেল। দোকানদার হাতজোড় করল, ‘আসুন স্যার, আসুন স্যার।’
‘আর স্যার বলার দরকার নেই। আমি এখন কমন ম্যান।’ ভারী শরীরটা নিয়ে আকাশলালের পাশে বেঞ্চিতে বসতেই সেটা কেঁপে উঠল।
দোকানদার বলল, ‘স্যার সবাইকে তো একসময় অবসর নিতেই হয়।’
‘নো। অবসর নয়। ওরা আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওই বোর্ড আর তার ম্যাডাম। এবং সেটা এই শহরের সবাই জানে। আমাকে জেলে পাঠাতে পারত, পাঠায়নি। কিন্তু দেশের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। আমার এখন একটা ভাল থাকার জায়গা পর্যন্ত নেই।’ ভার্গিস চোখ বন্ধ করলেন, ‘অন্য মানুষ হলে আত্মহত্যা করত। কিন্তু আমি করব না। কেন জানো?’
দোকানদার প্রশ্ন করল না মুখে কিন্তু তার ভঙ্গি বুঝিয়ে দিল সেটা।
‘আমার ক্রমশ সন্দেহ হচ্ছে লোকটা বেঁচে আছে।’ সদ্য গজানো দাড়িতে হাত বোলাল ভার্গিস।
‘কোন লোকটা স্যার।’
‘আমার সর্বনাশের কারণ যে। তোমার ওই পোস্টারটা যার।’
‘কিন্তু আকাশলাল তো—।’
‘আমিও তাই বিশ্বাস করতাম। কিন্তু ওই বুড়ো ডাক্তার কার অপারেশন করেছিল। আমি যদি আর ঘন্টা চারেক আগে লেডি প্রধানের বাড়িতে হানা দিতে পারতাম। ওখানে যেসব যন্ত্রপাতি দেখেছি তা মডার্ন অপারেশন থিয়েটারে থাকে। এইসব প্রশ্ন তুলতেই বোর্ড আমাকে সরিয়ে দিল। আকাশলাল মরে গেছে, ডেভিড মরে গেছে, ত্রিভুবন নেই, এতে বোর্ডের মঙ্গল।’
দোকানদার বলল, ‘স্যার আজ রেডিওতে বলেছে হায়দারও মরেছে।’
‘তাই নাকি? বাঃ। খেল খতম। কিন্তু সেই লোকটা গেল কোথায়? অন্তত ওর মৃতদেহ কেউ দেখতে পেয়েছে বলে দাবি করেনি। উত্তরটার জন্যে আমাকে বেঁচে থাকতে হবেই।’
এইসময় চা এল। ভার্গিসের জন্যে ভাল কাপ প্লেট, আকাশলালের জন্যে গ্লাশ। চুপচাপ লোক দুটোর কথা শুনতে শুনতে আকাশলাল একসময় কেঁপে উঠেছিল। এই তাহলে ভার্গিস। এরই কথা বলেছিল হায়দার। তাকে খুঁজে বের করতে না পারার অপরাধে ওর চাকরি গিয়েছে। ও যদি জানতে পারত সে কত কাছে বসে আছে!
চায়ে চুমুক দিয়ে ভার্গিস বলল, ‘কোন জায়গায় মরেছে হায়দার?’
‘পাহাড়ি গাঁয়ে।’ এগিয়ে গিয়ে ছোট ট্রানজিস্টারটা নিয়ে এসে চালু করল দোকানদার। গান হচ্ছে। ভার্গিস বলল, ‘বন্ধ কর ওটা।’
‘গানের পরেই খবর হবে।’
ভার্গিস চা খেতে খেতে আকাশলালের দিকে তাকাল, ‘আপনি কি অসুস্থ?’
‘হ্যাঁ, একটু-।’
‘খুব খারাপ অসুখ নাকি? মুখটা কেমন কেমন দগদগে লাল!’
‘না, না, খারাপ কিছু না।’
‘থাকেন কোথায়?’
‘শহরের বাইরে। গাঁয়ে।’ ভেতরটা কুঁকড়ে উঠল আকাশলালের।
এইসময় খবর আরম্ভ হল। প্রথমেই হায়দারের খবর। ‘একটি পাহাড়ি গ্রামের বৃদ্ধের আশ্রয়ে সে লুকিয়ে ছিল। পুলিশ অতর্কিতে হানা দিলে বাধা দিতে চেষ্টা করে। গুলি চালায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেই পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। দেরিতে পাওয়া এই খবরের সঙ্গে জানা যায় যে ওই গ্রামের লুকোনো ডেরায় হায়দার একা ছিল না। তার সঙ্গী ছিল অসুস্থ। ঘর থেকে বের হত না। কিন্তু পুলিশ হানার আগেই সেই লোকটি গা ঢাকা দিতে সমর্থ হয়। সমস্ত এলাকায় জোর তল্লাসি হচ্ছে।’ তার পর দেশের অন্যান্য খবরের পরে পাঠক পড়লেন, ‘নগর পুলিশ দফতর থেকে জানানো হয়েছে শহরে একজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। মানুষটির পিঠে জোড়া জড়ুল ছিল। তার মুখের চামড়া লালচে। যদি কেউ এমন মানুষের সন্ধান পান তাহলে অবিলম্বে নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন।’
খবর শেষ হওয়া মাত্র ভাগিস বিড়বিড় করলেন, ‘আকাশলালের পিঠে জোড়া জড়ুল ছিল।’
‘তাই নাকি?’ দোকানদার কৌতূহলী।
‘হুম্।’
‘কিন্তু সে মরে গেছে।’
‘অসুস্থ লোকটা কে? গ্রামের নাম বলল না হতভাগারা। আমি যদি হেডকোয়ার্টার্সে জানতে চাই তাহলে ওর জানাবে না। আমি তো এখন ছেঁড়া কাগজ।’ পকেট থেকে টাকা বের করলেন ভার্গিস, ‘চায়ের দাম।’
দোকানদার বলল, ‘ছি ছি ছি। আপনার কাছে দাম নেব কি করে ভাবছেন?’
‘কদিন এমন ব্যবহার করবে হে!’ উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর পাশের মানুষটির দিকে তাকালেন, ‘চিকিৎসা করান ভাল করে। কি নাম আপনার?’
‘গগনলাল।’
‘এখানে কোথায় উঠেছেন?’
‘দেখি।’
ভার্গিস তাঁর ভারী শরীর টেনে টেনে বেরিয়ে গেলে আকাশলাল দোকানদারকে বলল, ‘ভাই, আমার কাছে পয়সা নেই। চায়ের দাম দিতে পারব না।’
‘সেটা তো চেহারা দেখেই বুঝেছি। যে ভদ্রলোক ওখানে বসেছিল তার পরিচয় জানা আছে?’
‘না।’
‘কোথাকার মানুষ আপনি? ভার্গিসকে চেনেন না! পকেটে পয়সা নেই, থাকার জায়গা নেই, এই শহরে টিকবেন কি করে মশাই! যান কেটে পড়ন।’ হাত নেড়ে বিদায় করল দোকানদার।
চা খেয়ে শরীর ভাল লাগছিল। আকাশলাল ধীরে ধীরে দোকানের বাইরে বেরিয়ে এল। কোথায় যাওয়া যায় এখন? ঠিক তখনই সে ভার্গিসকে দেখতে পেল। ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আকাশলাল হাসার চেষ্টা করল। লোকটা কি তাকে চিনতে পারছে? অসম্ভব। ওই পোষ্টারের ছবির সঙ্গে তার কোনও মিল নেই। ব্যান্ডেজ খোলার পর তার এই পরিবর্তিত মুখ এখন পর্যন্ত আগের পরিচিত কারও দেখার কথা নয়। সে এগিয়ে গেল, ‘এখনও দাঁড়িয়ে আছেন?’
‘কোথায় থাকা হবে?’
‘দেখি।’
‘আমার ওখানে চল। দেড়খানা ঘর নিয়ে কোনও মতে টিকে আছি। রান্নাবান্না করতে পার?’
‘তা পারি।’
‘তাহলে তো কথাই নেই। ফলো মি।’ ভার্গিস হাঁটতে লাগল। খানিকটা দূরত্ব রেখে লোকটাকে সে অনুসরণ করতে লাগল। মাঝেমাঝে, খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর, মুখ ফিরিয়ে ভার্গিস দেখে নিচ্ছেন, সে ঠিকঠাক আসছে কিনা। পালাবার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে কিন্তু পালাতে ইচ্ছে করছিল না। সে এর মধ্যে লক্ষ করেছে, পথচারীরা ভার্গিসকে চিনতে পেরে তরল মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছে। এককালের পুলিশ কমিশনার সেই সব মন্তব্য কানে যাওয়া সত্ত্বেও যখন কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না তখন বোঝাই যাচ্ছে ক্ষমতার এক বিন্দু অবশিষ্ট লোকটার হাতে নেই। এমন লোককে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
একটা সরু গলির মধ্যে পুরনো দোতলা বাড়ির স্যাঁতসেঁতে ঘরে ঢুকে ভার্গিস বলল, ‘আপাতত এটাই আমার আস্তানা। ওইটে কিচেন। কফি বানাও।’
আকাশলাল অনেক চেষ্টার পরে দুকাপ কফি বানাল।
কফির কাপ হাতে নিয়ে ভার্গিস বলল, ‘বোসো। তোমাকে একটা কথা বলছি। কি জানি কেন, তোমাকে দেখার পর থেকেই আমার কিরকম অসুবিধে হচ্ছে। মনে হচ্ছে খুব চিনি অথচ সেটা সম্ভব নয়। নাম বললে-গগনলাল, আকাশলাল বলে কারও নাম কখনও শুনেছ?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। পোস্টারে দেখেছি।’
‘অ। তোমার গলার স্বর আমার খুব চেনা চেনা লাগছে। ব্যাপারটা কি বলো তো?’
‘আমি কি করে বলব!’
‘তোমার পিঠে কোনও জড়ুল আছে?’
‘আছে।’
‘একজোড়া?’
‘তাই তো শুনেছি। নিজের পিঠ তো দেখা যায় না।’
‘আমি দেখতে চাই। দেখাও। জামা খোল।’
‘মাফ করতে হবে। কেউ কিছু চাইলেই সেটা করার ধাত আমার নেই।’
‘তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ জানো?’
‘দোকানদার বলল আপনি পুলিশ কমিশনার ছিলেন। সরকার আপনাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।’
‘তুমি আমাকে আগে চিনতে না?’
‘না।’
‘কিন্তু এখানকার অনেকেই এখন আমায় খাতির করে।’
‘আপনাকে একটা কথা বলি। যখন আর সরকারি পদে আপনি নেই তখন আর পুলিশের মত আচরণ করছেন কেন? ব্যাপারটা খুব হাস্যকর!’
শোনামাত্র ভার্গিসের মুখ করুণ হয়ে উঠল, ‘তাহলে আমি এখন কি করব?’
‘সাধারণ মানুষ যা করে তাই করুন।’
‘আমি তো সেসব পারি না। কখনও করিনি।’ করুণ গলায় বলল ভার্গিস। দেখে মায়া হল আকাশলালের। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘থানায় গেলে আপনাকে পাত্তা দেয়?’
‘একদম না। হাসি-মশকরা করে। চেয়ার সরে যেতে ওরা আমাকে কোনও মর্যাদা দেয় না।’ মাথা নেড়ে ভার্গিস বলল, ‘এগুলো হয়েছে ওই আকাশলালের জন্যে। আমাকে যদি ম্যাডাম আর কিছুটা সময় আগে ছেড়ে দিত তাহলে ওর বডি ধরে ফেলতাম আমি।’
‘ম্যাডাম?’
‘ম্যাডামের নাম শোনোনি? কিরকম মাকাল তুমি।’
‘ভার্গিস সাহেব, যদি আকাশলালকে জীবিত অবস্থায় হাতে পান তাহলে কি করবেন?’
‘কি করব?’ হঠাৎ খুব উত্তেজিত দেখাল ভার্গিসকে। কিন্তু সেটা অল্প সময়ের জন্যে। তারপরই ক্রমশ মিইয়ে যেতে লাগল লোকটা, ‘কিছুই করতে পারব না।’
‘তাহলে উত্তেজনা ছাড়ুন। আমার মনে পড়ছে, পাবলিক আপনাকে ঘেন্না করে।’
‘করত। এখন মজা পায়।’
‘আপনি বিপ্লবের গলা টিপে মারতে চেয়েছিলেন।’
‘চেয়েছিলাম কিন্তু তার কোনও প্রয়োজন ছিল না। ওরা নিজেরাই মরত।’
‘তার মানে?’
‘এখানে বিপ্লবও কিনে নেওয়া হয়। পুলিশ কমিশনার হয়েও সেটা বুঝতে পারিনি।’ ভার্গিস হাসল, ‘এই যে এতদিন লোকে আকাশলাল আকাশলাল করে নাচত এখন কেউ ভুলেও তার নাম উচ্চারণ করে না। আবার অশান্তি হোক কেউ সেটা চায় না। আকাশলাল যদি ফিরে আসত তাহলে সে পায়ের তলায় জমি পেত না।’
‘তাহলে লোকটার সঙ্গে শত্রুতা করে আপনার কি লাভ?’
‘কোনও লাভ নেই। শুধু মনের জ্বালা মিটছে না।’
‘এই যে আমি, আপনার সামনে বসে আছি, আমিও তো-আকাশলাল হতে পারি।’
‘তুমি? আকাশলাল? একেবারে সন্দেহ যে হয়নি তা নয়। পরে বুঝেছি অসম্ভব।’
‘কেন?’
‘লোকটা মরে গেছে। ধরা যাক বেঁচে উঠল। তার মুখ পাল্টাবে কি করে? ধরা যাক সেটাও পাল্টাল। তার ব্যবহার বদলে যাবে কি ভাবে? তোমার মতো হাতজোড় করে কথা সে বলত না।’
‘কিন্তু আমার হাতের রেখা দেখুন। ওটা পাল্টায়নি। পিঠের জড়ল একই আছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলে যাবে। গলার স্বরও। আমিই আকাশলাল। না, উঠবেন না। আমার পয়সা কড়ি নেই কিন্তু একটা রিভলভার আছে। রিভলভারে গুলি ভরা, বুঝতেই পারছেন!
৩৫. তারপর আর কিছু জানা নেই
ভার্গিস বসে পড়ল। তার বাঁ দিকের বুকে চিনচিনে ব্যথা শুরু হল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠল। বিশাল মুখের চর্বিগুলো এখন তিরতিরিয়ে কাঁপছে। আকাশলাল সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভার্গিস ওই অবস্থায় বলল, ‘একই গলা। ইয়েস। কিন্তু আমি কি করতে পারি? কিছুই না। তুমি যদি আকাশলাল হও তাহলে কবরে গিয়েও তুমি বেঁচে উঠেছ!’
‘নিশ্চয়ই। তোমার সামনে বসে আছি এখন।’
‘তার মানে তোমার মৃত্যু হয়নি। ডাক্তারদের কিনে নিয়েছিলে। আগে থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে আমায় বোকা বানিয়ে কবরে গিয়ে শুয়েছিলে। এবার হয়তো শুনব কফিনের ভেতরে তোমার জন্যে অক্সিজেন মাস্ক রাখা ছিল।’ ভার্গিস বিড় বিড় করল।
‘আমার কিছুই মনে নেই।’
‘ইয়ার্কি।’
‘না। আমার বুকে দু-তিনবার অপারেশন করা হয়েছে। নিশ্চয়ই আমার অনুমতি নিয়েই সেসব হয়েছিল। বুঝতে পারছি আমি একসময় খুব মূল্যবান লোক ছিলাম। আর মূল্যবান লোকেদের হাতে বেশ ক্ষমতা থাকে। তাই ধরে নিচ্ছি পরিকল্পনাটা আমার মাথা থেকেই বের হয়েছিল। শুধু বুক নয়, আমার মুখেও অপারেশন করা হয়েছে। কিন্তু পোস্ট-অপারেশন ট্রিটমেন্ট কিছুই হয়নি। আমি শুধু বুঝতে পারছি আমার মুখের পরিবর্তন ঘটিয়ে আকাশলালকে সত্যি সত্যি মেরে ফেলার মতলব হয়েছিল।’
‘এসব তুমি জানো না?’
‘না। আমার স্মৃতিশক্তির অনেকটা হারিয়ে গেছে। এই তুমি, তোমার সঙ্গে আমার কিরকম সম্পর্ক ছিল তাও মনে নেই। লোকের মুখে মুখে শুনে আন্দাজ করেছি।’
‘তোমার কিছুই মনে নেই?’ বুকের ব্যথাটাকে এই একবার ভুলতে পারল ভার্গিস।
‘ছায়া ছায়া মনে আছে। স্পষ্ট কিছু নেই। আমার বাড়ি কোথায় ছিল, আমার কোনও আত্মীয়স্বজন ছিল কিনা তাও আমার মনে পড়ছে না। আমি বিবাহিত ছিলাম কিনা এবং আমার ছেলেমেয়ে আছে কিনা তাও তো জানি না।’
‘নো নো। তুমি অবিবাহিত। মেয়েছেলের ব্যাপারে তোমার কোনও দুর্বলতা ছিল না একথা আমি হলফ করে বলতে পারি। তোমার রেকর্ড আমার মুখস্থ।’ ভার্গিস চোখ বন্ধ করল, ‘আমার বুকে যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক হবে।’
‘দাঁড়াও। আমার সম্পর্কে কিছু খবর দিয়ে যাও। আমার কোনও আত্মীয়স্বজন আছে?’
‘আছে। এক বুড়ো কাকা। কাকিও। আর কেউ নেই।’
‘আমি এখানে থাকতাম কোথায়?’
‘ওঃ সেটা যদি জানতে পারতাম তাহলে অনেক আগে তোমাকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসাতে পারতাম।’ ভার্গিস বুক খামচে ধরল।
‘আমি কাদের নিয়ে বিপ্লব করতে গিয়েছিলাম?’
‘পাবলিককে নিয়ে। হ্যাঁ, ওরা তোমাকে একসময় খুব দেখেছে। আমি আর বলতে পারছি না। তোমার সম্পর্কে ভাল বলতে পারবে ম্যাডাম। তার কাছে যাও।’
‘ম্যাডাম। তিনি কে?’
পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে টেবিলের ওপর রেখেই ককিয়ে উঠল ভার্গিস।
অ্যাম্বুলেন্স ডেকে ভার্গিসকে হাসপাতালে ভর্তি করতে কিছুটা সময় খরচ হল। আকাশলাল ফিরে এল ভার্গিসের ঘরে। কিচেনে কিছু খাবার ছিল। সেটা পেটে চালান দিয়ে সে ভার্গিসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। সুরাদিন যে ধকল গিয়েছিল তাতে ঘুম আসতে দেরি হল না। সেইসময় ভার্গিসকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিল।
আকাশলালের যখন ঘুম ভাঙল তখন সন্ধে হয়ে গিয়েছে। এক কাপ কফি বানিয়ে খেয়ে সে ম্যাডামের কার্ডটাকে নিয়ে নীচে নামল। একটা পাবলিক বুথের ভেতর গিয়ে দাঁড়াল সে। আসবার আগে ভার্গিসের সামান্য সঞ্চয় থেকে কিছু টাকা এবং কয়েন সে পকেটে পুরেছিল। পয়সা ফেলে ডায়াল করল সে। ওপাশে একটি নারীকণ্ঠ জানান দিল, ‘হ্যালো।’
‘ম্যাডাম বলছেন?’
‘আপনার পরিচয় জানতে পারি?’
‘আমাকে বলা হয়েছে সেটা ম্যাডামের কাছ থেকে জেনে নিতে।’
‘আপনার নাম?’
‘আপাতত গগনলাল!’
‘প্লিজ হোন্ড অন।’
মিনিটখানেক বাদে দ্বিতীয় গলা পাওয়া গেল, ‘হ্যালো!’
‘ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলছি?’
‘আপনি?’
‘আমাকে গগনলাল অথবা আকাশলাল বলতে পারেন।’
‘হোয়াট?’
‘দ্যাটস মাই প্রবলেম। মিস্টার ভার্গিস, আপনাদের এক্স পুলিশ কমিশনার আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হার্ট অ্যাটাকের কবলে পড়ে হসপিটালাইজড হবার সময় আপনার কার্ড দিয়ে বলেছেন একমাত্র আপনি আমার প্রবলেম সমাধান করতে পারেন।’
‘আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন?’
‘একদম না ম্যাডাম। আপনি হাসপাতালে ফোন করলে ভার্গিসের ব্যাপারটা—’
‘আমি ভার্গিসের ব্যাপার জানতে চাইছি না। আপনি কে?’
‘আমার মনে হচ্ছে আমি আকাশলাল। লোকে জানতে চাইলে গগনলাল বলছি’। আকাশলাল বলল, ‘ম্যাডাম, আমি টোট্যালি কনফিউজড। অপারেশন টপারেশন হবার পর আমার স্মৃতিশক্তির বারোটা বেজে গেছে। যার সঙ্গে আগে আলাপ ছিল তাকে দেখলে চিনতে পারব না। আবার সে-ও যে আমাকে চিনবে তার উপায় নেই। কারণ আমার মুখের আদল একেবারে বদলে গিয়েছে।’
‘আপনি কেন টেলিফোন করেছেন?’
‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
‘কি জন্যে?’
‘আমার সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। প্লিজ হেল্প মি।’
‘লুক মিস্টার গগনলাল, আপনি যদি নেহাত বদমতলবে এই ফোন করে থাকেন তাহলে নিজের চরম বিপদ ডেকে আনছেন। আপনি আমাকে কোন জায়গা থেকে টেলিফোন করছেন?
‘ভার্গিসের বাড়ির কাছে একটা টেলিফোন বুথ থেকে। সামনে একটা বড় হোটেল দেখতে পাচ্ছি। নাম প্লাজা। আকাশলাল চারপাশে তাকিয়ে জানিয়ে দিল।
‘বেশ। ঠিক ওইখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন আরও মিনিট পনের। গাড়ি যাচ্ছে।’
মিনিট পঁচিশেক পরে ম্যাডামের বিদেশি গাড়ি শহরের ঘিঞ্জি এলাকা ছাড়িয়ে বেশ নির্জন এবং বড়লোকি চেহারার এলাকায় ঢুকে পড়ল। আকাশলাল বসে ছিল গাড়ির পেছন সিটে। এই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ির ভেতরে সুগন্ধি ভাসছে। বেশ লাগছিল তার। সামনের সিটে বসে থাকা দুটো লোক তার সঙ্গে একটিও বাড়তি কথা বলেনি। এই যে ফোন করামাত্র এমন গাড়ি পাঠিয়ে দিলেন ম্যাডাম তার একটাই মানে, আকাশলাল লোকটা সত্যিকারের মুল্যবান ছিল।
তারও মিনিট পাঁচেক বাদে সে একটি দারুণ সাজানো ড্রয়িং রুমে বসে ছিল। অবশ্য ড্রয়িং রুম না বলে হলঘর বললে ভাল মানাত। তাকে এখানে বসিয়ে দিয়ে যে মহিলা চলে গিয়েছেন তারও পাত্তা নেই। ঘরে হালকা নীল আলো জ্বলছে। এইসময় ভেতরের দরজা দিয়ে সম্পূর্ণ সাদা আলখাল্লা জাতীয় পোশাক পরে দীঘাঙ্গিনী এক রমণী ঘরে ঢুকলেন। মহিলা ইচ্ছা করেই ঘরের বিপরীত প্রান্তে বসলেন যাতে তাঁর মুখ অস্পষ্ট দেখায়।
‘কি জানতে চান, বলুন।’
‘ম্যাডাম?’
‘হ্যাঁ, ওই নামেই আমি পরিচিত।’
‘হুঁ। আপনি আকাশলালকে তো চিনতেন।’
মহিলা কোনও জবাব দিলেন না।
‘আপনি আমাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। আমার সঙ্গে কি আকাশলালের মিল আছে?’
‘অন্তত এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে না।’
দেখুন ম্যাডাম। আমি আপনাকে স্পষ্ট বলছি কয়েকদিন আগে এক পাহাড়ি ঠাণ্ডা গ্রামে যখন আমার সেন্স আসে তখন দেখলাম আমি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছি। হায়দার নামের একজন আমাকে পাহারা দিত। জ্ঞান হবার পর আমার নিজের অতীত সম্পর্কে কোনও কথা মনে এল না। অনেকবার আলোচনা করলে আবছা আবছা কিছু মনে পড়ে। ওখানে থাকার সময় আমি হায়দারকে যেমন বিশ্বাস করতে পারিনি তেমনি নিজের ওপর আস্থা কমে আসছিল। ওখানেই জানতে পারলাম ভার্গিসের চাকরি গিয়েছে এবং আমার ব্যাপারে পুলিশ বেশ হতভম্ব হয়ে আছে। আমি শহরে এলাম। আসার পর শুনলাম পুলিশ ওই গ্রামে গিয়ে হায়দারকে মেরে ফেলেছে। এটা থেকে আমার মনে যে ধারণা তৈরি হল তা ঝেড়ে ফেলতে পারছি না। তারপর ভার্গিসের সঙ্গে আলাপ হল। ভার্গিস আমাকে সন্দেহ করেছিল কিন্তু আমার মুখ দেখে সেটা বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওর কাছ থেকে যখন সব খবর নিতে চাইলাম তখনই লোকটা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেল। ওর উপদেশমত আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আকাশলাল থামল।
ম্যাডাম অদ্ভুত চোখে তাকালেন। তারপর আকাশলালকে আপাদমস্তক দেখলেন। শেষপর্যন্ত জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার মুখে ব্যান্ডেজ ছিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনাকে ব্যান্ডেজ খুলতে কেউ দেখেছে?’
‘না।’
‘খোলার পরে কেউ জানে আপনি সেই ব্যান্ডেজ পরা লোক?’
আকাশলাল চিন্তা করল। হ্যাঁ, সেই মেয়েটি জানে যার সাহায্য নিয়ে সে বুড়োর ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। ওর প্রেমিক জানে যে তাকে ঘোড়ার গাড়িতে শহরে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ওরা তাকে আকাশলাল বলে জানে না। সেটা এখন জানে ভার্গিস এবং এই ভদ্রমহিলা। আকাশলাল ম্যাডামকে ব্যাপারটা জানাল।
‘ঠিক আছে। এবার আপনি আপনার জামা খুলুন।’
‘জামা?’
‘ওটা থেকে কুৎসিত গন্ধ বের হচ্ছে।’
‘আমার আর কোন পোশাক নেই।’
‘তাই আপনাকে খুলতে বলছি ওটা।’
আকাশলাল সসঙ্কোচে জামা খুলল। তার বুকের ওপর চিরস্থায়ী হয়ে থাকা দাগগুলো এই অল্প আলোতে বীভৎস দেখাচ্ছিল। ম্যাডাম এগিয়ে এলেন সামনে। কাটা দাগগুলো খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর ধীরে ধীরে পেছনে এসে দাঁড়ালেন, ‘তাহলে আপনি সেই লোক যাকে খুঁজে পাওয়ার জন্যে আজ সকালে থানায় ডায়েরি করা হয়েছে। মেয়েছেলেটা কে?’
‘কার কথা বলছেন বুঝতে পারছি না।’
‘এখানে এসে কোথায় উঠেছিলেন?’
‘যে আমাকে নিয়ে এসেছিল তার মাসির বাড়িতে। সেই ভদ্রমহিলা আমাকে স্নানের সময় দেখে ফেলেন। তারপর খুব ভাল ব্যবহার করতে শুরু করেন।’
‘তাই নাকি? স্নানের সময় আপনার শরীর তাহলে মহিলাদের ওপর প্রভাব ফেলে।’ ম্যাডামের গলায় ঈষৎ ব্যঙ্গ। এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে একটা সাদা কাগজ টেনে এনে বললেন, ‘আপনার দুই হাতের ছাপ এই কাগজের দুপাশে রাখুন।’
‘কেন?’
‘আকাশলালের ফিঙ্গারপ্রিন্টের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।’
‘যদি না মেলে?’
‘তাহলে আপনি একজন প্রতারক।’
‘যদি মেলে?’
‘তাহলে অনেকদূরে যাওয়ার পথ তৈরি হবে। ম্যাডাম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন কাগজে হাতের ছাপ নিয়ে। তার খানিক বাদে একটি স্ত্রীলোক এল নতুন জামা নিয়ে। সেটা শরীরে গলিয়ে আকাশলাল স্ত্রীলোকটিকে অনুসরণ করে বেরিয়ে এল। স্ত্রীলোকটি বলল, ‘ম্যাডাম বললেন আপনি যেখানে ছিলেন সেখানে চলে যেতে। গাড়ি তৈরি।’
‘কিন্তু ওঁর সঙ্গে তো আমার কোনও কথাই হয়নি।’ আকাশলাল বলে উঠল।
‘আপনি নীচে চলুন।’
অগত্যা আকাশলালকে সেই মূল্যবান গাড়িতে চেপে ফিরে আসতে হল শহরে।
গাড়িটা চলে যাওয়ার পর আকাশলাল লক্ষ করল আশেপাশের মানুষজন তাকে দেখছে। সম্ভবত গাড়িটিকে ওরা চেনে এবং গাড়ির মালিকানকেও। সে গম্ভীর মুখে একটা দোকানে ঢুকে কিছু খাবার চাইল। রুটি এবং জেলি খেয়ে রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। ভার্গিসের পয়সা তার পকেটে আছে। এবং তখনই খেয়াল হল ভার্গিসের সঞ্চয় থেকে নেওয়া টাকা সে রেখেছিল শার্টের পকেটে। আর শার্টটা ম্যাডামের বাড়িতে ছেড়ে এসেছে। প্যান্টের পকেটে এখন সামান্য খুচরো পড়ে আছে।
দোকানদার অন্য খদ্দেরকে নিয়ে তখনও ব্যস্ত। আকাশলাল চুপচাপ বেরিয়ে এল বাইরে। ঘরে গিয়ে ভার্গিসের সঞ্চয় থেকে আবার টাকা নিতে হবে। এর হিসেব রাখতে হবে, ঠিকঠাক যাতে সুস্থ হয়ে ফিরে এলে সে লোকটাকে বলতে পারে।
ফুটপাথ দিয়ে হাঁটার সময় খবরটা কানে গেল। ছোট ছোট জটলায় যে বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে তা কানে যেতে সে থমকে গেল। ভার্গিস মারা গিয়েছে। একটু আগে টিভিতে খবরটা ঘোষণা করা হয়েছে। কেউ বা কারা ওর অক্সিজেনের পাইপ খুলে দিয়েছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য একে মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক বলছেন।
হঠাৎ লোকটার মুখ মনে পড়তেই খুব কষ্ট হল আকাশলালের। আজ সকালে লোকটা সুস্থ ছিল। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে অসুস্থ হয় শেষ পর্যন্ত। এখন তাকে কারও কাছে হিসেব দিতে হবে না। ভার্গিসের ওই ঘরে থাকলে আর কার কাছে তাকে জবাবদিহি দিতে হবে তাও জানা নেই। আকাশলালের মনে হল ম্যাডামকে টেলিফোন করা দরকার। ওই শার্টের পকটে যে-কটা টাকা থাকুক তা তো ভার্গিসেরই।
খুচরো পয়সা দিয়ে পাবলিক বুথ থেকে টেলিফোন করল সে। এবার ম্যাডাম লাইনে এলেন অনেক তাড়াতাড়ি। আকাশলাল বলল, ‘ভার্গিস মারা গিয়েছে।’
‘এই খবর শহরের সবাই জানে। আপনি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ামাত্র লোকটা মরে যায়। আপনি যে আকাশলাল তা সন্দেহ করার নোক একজন কমে গেল। এখন থেকে আপনি নিজের পরিচয় গগনলাল হিসেবে দেবেন।’
‘তার মানে?’
‘আপনার অতীত জেনে এখন কোনও লাভ হবে না। পুলিশ আপনাকে একসময় খুঁজেছিল। এখন ওদের কাছে আপনি মৃত। যদি জীবিত থাকতেন তাতে ওদের কি এসে যেত। আপনি আর দেশের পক্ষে বিপজ্জনক নন। কিন্তু আমি চাই ব্যাপারটা আর কেউ না জানুক। আগামী কাল সকালের মধ্যে বাকি দুজন সাক্ষী পৃথিবী থেকে সরে যাবে তখন আর কেউ কখনও আঙুল তুলতে পারবে না।’ ম্যাডামের গলায় আত্মবিশ্বাস।
‘আপনি কি বলছেন? বাকি দুজন সরে যাবে মানে?’
‘যে আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছিল এবং তার প্রেমিকা। একটু ভুল হল। তৃতীয় আর একজন থেকে যাচ্ছে। যে ভদ্রমহিলার বাড়িতে আপনি উঠেছিলেন তিনি।’
‘কি আশ্চর্য! এরা সরে যাবে কেন?’
‘এরা আপনার সম্পর্কে একটু বেশি জেনে ফেলেছে।’
‘জেনে ফেললে ক্ষতি কি?’
‘ক্ষতি অনেক। আপনার, আমার, এই দেশের। আমি ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ এই তথ্য জানবে না। আর হ্যাঁ, আপনি ভার্গিসের ঘর থেকে আর বের হবেন না। আপনার যা জিনিস বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজন হবে তা ঠিক সময়ে পেয়ে যাবেন।’
‘বেঁচে থাকার জন্যে আমার ঠিক কি প্রয়োজন তা আপনি জানেন?’
‘আমি যাকে তৈরি করেছি তার প্রয়োজন আমার চেয়ে বেশি আর কে জানবে।’ লাইন কেটে দিলেন ম্যাডাম। আকাশলালের মনে হচ্ছিল তার ভেতরটা এখন একদম ফাঁকা হয়ে গেছে। তার নিজস্ব বলে কিছু নেই। কোথায় বসে কেউ রিমোট টিপবে এবং তার ইচ্ছেমতন তাকে চলতে হবে। এর থেকে পরিত্রাণ নেই। কিন্তু সেটা এখন থেকে না অনেক অনেক আগে থেকে চলে আসছে তা জানার কোনও উপায় নেই।
ভার্গিসের ঘরে শুয়ে বসে হাঁপিয়ে উঠছিল আকাশলাল। প্রতিদিন তার ঘরে সব রকম প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে যায়। সে লক্ষ করেছে তাকে এখানে নিজের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। এই বাড়ির বাইরে দিনরাত তাকে পাহারা দেবার জন্যে লোক থাকছে।
গতরাতে মিনিস্টারকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভার্গিসকে হত্যা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে অক্সিজেনের পাইপ খুলে নেবার পেছনে মিনিস্টারের মদত ছিল। দ্বিতীয় খবর, বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এর ফলে আজ রাত্রেই বোর্ডের সদস্যদের নতুন করে ভোটাভুটির মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে। আজ বিকেলে ম্যাডামের কাছ থেকে খবর পৌঁছেছে তৈরি থাকার জন্যে। বোর্ডের মেজরিটি যদি ম্যাডামের সমর্থকরা পায় তাহলে তিনি গগনলালের নাম মিনিস্টার হিসেবে সুপারিশ করবেন। আকাশলাল যে বিপ্লবের স্বপ্ন একদিন দেখেছিল তার ফল হল দেশশাসন করার ক্ষমতা পাওয়া। ম্যাডাম সেটা অন্য উপায়ে পাইয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু গগনলালের অস্তিত্ব একমাত্র তিনি জানেন বলে তাঁর পরামর্শকে আদেশ বলে মনে করতে হবে গগনলালকে।
আজ সন্ধ্যার পর আবহাওয়া খারাপ হল। রাত নটা নাগাদ দামি গাড়িটা এল তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। ড্রাইভার ছাড়া দ্বিতীয় মানুষ নেই সেই গাড়িতে। পেছনের আসনে বসামাত্র গাড়ি চলল। খানিকটা যাওয়ামাত্র ড্রাইভার তার মাথায় একটা ধাতব স্পর্শ পেল, ‘গাড়ি ঘুরিয়ে সীমান্তের দিকে নিয়ে যাও নইলে তোমার মাথা উড়ে যাবে।’
লোকটা হকচকিয়ে গেল কিন্তু আদেশ পালন করতে বাধ্য হল। গাড়ির রেডিও তখনও ঘোষণা করে চলেছে বোর্ডের নির্বাচনে আকাঙিক্ষত সদস্যরাই বিজয়ী হয়েছেন। ম্যাডাম যথারীতি এবারও নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। সাধারণ মানুষের প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে বোর্ড দেশের মিনিস্টার হিসেবে যার নাম গ্রহণ করেছেন তিনি সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ। তাঁর নাম গগনলাল। এই অরাজনৈতিক মানুষটি নেতা হলে তাঁর কাছ থেকে দেশের মানুষ অনেক ভাল কাজ পাবে বলেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সীমান্তের রক্ষীরা গাড়ি দেখে বাধা দিল না। পাহাড়ি রাস্তার পাকে পাকে এখন ঘন অন্ধকার। গাড়িটা নেমে যাচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তার পাশে আগুন জ্বলতে দেখা গেল। আগুনের পাশে একটি মেয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে কারও অপেক্ষায়। আকাশলাল জিজ্ঞাসা করল, ‘মেয়েটা কে?’ ড্রাইভার জবাব দিল, ‘পাগলি। ওর প্রেমিককে যে পুলিশ মেরে ফেলেছে তা ও বিশ্বাস করে না।’ আকাশলাল মেয়েটাকে চিনতে পারল না। আগুন পেরিয়ে গাড়িটা নেমে যাচ্ছে নীচে, অনেক নীচে। সে অপেক্ষা করছিল গাড়িটাকে ছেড়ে দিতে পারে এমন একটা জায়গার জন্যে তারপর—? না, তারপর আর কিছু জানা নেই। যেমন নিজের অতীতটাকেও সে সঠিক জানে না।
(সমাপ্ত)
