Thursday, June 20, 2024
Homeউপন্যাসশকুন্তলা - ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

শকুন্তলা – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

শকুন্তলা – ১

অতি পূর্ব্বকালে, ভারতবর্ষে দুষ্মন্ত নামে সম্রাট্ ছিলেন। তিনি, একদা, বহু সৈন্য সামন্ত সমভিব্যাহারে, মৃগয়ায় গিয়াছিলেন। এক দিন, মৃগের অনুসন্ধানে বনমধ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে, এক হরিণশিশুকে লক্ষ্য করিয়া, রাজা শরাসনে শরসন্ধান করিলেন। হরিণশিশু, তদীয় অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া, প্রাণভয়ে দ্রুত বেগে পলাইতে আরম্ভ করিল। রাজা, রথারোহণে ছিলেন, সারথিকে আজ্ঞা দিলেন, মৃগের পশ্চাৎ রথচালন কর। সারথি কশাঘাত করিবামাত্র, অশ্বগণ বায়ুবেগে ধাবমান হইল।

কিয়ৎ ক্ষণে রথ মৃগের সন্নিহিত হইলে, রাজা শরনিক্ষেপের উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে দূর হইতে দুই তপস্বী উচ্চৈঃ স্বরে কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! এ আশ্রমমৃগ বধ করিবেন না, বধ করিবেন না। সারথি শুনিয়া অবলোকন করিয়া কহিল, মহারাজ! দুই তপস্বী এই মৃগের প্রাণবধ করিতে নিষেধ করিতেছেন। রাজা, তপস্বীর নামশ্রবণমাত্র অতিমাত্র ব্যস্ত হইয়া, সারথিকে কহিলেন, ত্বরায় রশ্মি সংযত করিয়া রথের বেগ সংবরণ কর। সারথি, যে আজ্ঞা মহারাজ বলিয়া, রশ্মি সংযত করিল।

এই অবকাশে, তপস্বীরা রথের সন্নিহিত হইয়া কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! এ আশ্রমমৃগ, বধ করিবেন না। আপনকার বাণ অতি তীক্ষ্ণ ও বজ্রসম, ক্ষীণজীবী অল্পপ্রাণ মৃগশাবকের উপর নিক্ষেপ করিবার যোগ্য নহে। শরাসনে যে শর সন্ধান করিয়াছেন, আশু তাহার প্রতিসংহার করুন। আপনকার শস্ত্র আর্ত্তের পরিত্রাণের নিমিত্ত, নিরপরাধীকে প্রহার করিবার নিমিত্ত নহে।

রাজা লজ্জিত হইয়া, তৎক্ষণাৎ শরপ্রতিসংহারপূর্ব্বক, প্রণাম করিলেন। তপস্বীর দীর্ঘায়ুরস্ত বলিয়া ইন্ত তুলিয়া আশীর্বাদ করিলেন, এবং কহিলেন, মহারাজ! আপনি যে বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, আপনাকার এই বিনয় ও সৌজন্য তদুপযুক্তই বটে। প্রার্থনা করি আপনকার পুত্রলাভ হউক, এবং সেই পুত্র এই সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধিপতি হউন। রাজা প্রণাম করিয়া কহিলেন, ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ শিরোধার্য্য করিলাম।

অনন্তর, তাপসেরা কহিলেন, মহারাজ! ঐ মালিনীনদীর তীরে, আমাদের গুরু মহর্ষি কণ্বের আশ্রম দেখা যাইতেছে; যদি কার্য্যক্ষতি না হয়, তথায় গিয়া অতিথিসৎকার গ্রহণ করুন। আর, তপস্বীরা কেমন নির্বিঘ্নে ধর্ম্মকার্য্যের অনুষ্ঠান করিতেছেন দেখিয়া, বুঝিতে পারিবেন, আপনকার ভুজবলে ভূমণ্ডল কিরূপ শাসিত হইতেছে। রাজা জিজ্ঞাসিলেন, মহর্ষি আশ্রমে আছেন? তপস্বীরা কহিলেন, না মহারাজ! তিনি আশ্রমে নাই; এইমাত্র, স্বীয় দুহিতা শকুন্তলার প্রতি অতিথিসৎকারের ভার প্রদান করিয়া, তদীয় দুর্দৈবশান্তির নিমিত্ত, সোমতীর্থ প্রস্থান করিলেন। রাজা কহিলেন, মহর্ষি আশ্রমে নাই তাহাতে কোনও ক্ষতি নাই; আমি, অবিলম্বে, তদীয় তপোবন দর্শন করিয়া, আত্মাকে পবিত্র করিতেছি। তখন তাপসেরা, এক্ষণে আমরা চলিলাম, এই বলিয়া প্রস্থান করিলেন।

রাজা সারথিকে কহিলেন, সূত! রথচালন কর, তপোবন দর্শন করিয়া আত্মাকে পবিত্র করিব। সারথি, ভূপতির আদেশ পাইয়া, পুনর্বার রথচালন করিল। রাজা কিয়ৎ দূর গমন ও ইতস্ততঃ দৃষ্টিসঞ্চারণ করিয়া কহিলেন, সূত! কেহ কহিয়া দিতেছে না, তথাপি তপোবন বলিয়া বোধ হইতেছে। দেখ! কোটরস্থিত শুকের মুখভ্রষ্ট নীবার সকল তরুতলে পতিত রহিআছে; তপস্বীরা যাহাতে ইঙ্গুলীফল ভাঙ্গিয়াছেন, সেই সকল উপলখণ্ড তৈলাক্ত পতিত আছে; ঐ দেখ, কুশভূমিতে হরিণশিশু সকল নিঃশঙ্ক চিত্তে চরিয়া বেড়াইতেছে; এবং যজ্ঞীয়ধূমসমাগমে নব পল্লব সকল মলিন হইয়া গিয়াছে। সারথি কহিল, মহারাজ! যথার্থ অজ্ঞা করিতেছেন।

রাজা কিঞ্চিৎ গমন করিয়া সারথিকে কহিলেন, সূত! আশ্রমের উৎপীড়ন হওয়া উচিত নহে। এই স্থানেই রথ স্থাপন কর, আমি অবতীর্ণ হইতেছি। সারথি রশ্মি সংযত করিল। রাজা রথ হইতে অবতীর্ণ হইলেন। অনন্তর, তিনি স্বীয় শরীরে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, সূত! তপোবনে বিনীত বেশে প্রবেশ করাই কর্ত্তব্য; অতএব, শরাসন ও সমুদয় আভরণ রাখ। এই বলিয়া, রাজা সেই সমস্ত সূতহস্তে সমর্পণ করিলেন, এবং কহিলেন, তাশ্বগণের আজি অতিশয় পরিশ্রম হইয়াছে। অতএব, আশ্রমবাসীদিগকে দর্শন করিয়া প্রত্যাগমন করিবার উহাদিগকে ভাল করিয়া বিশ্রাম করাও। সারথিকে এই আদেশ দিয়া, রাজা তপোবনে প্রবেশ করিলেন।

তপোবনে প্রবেশ করিবামাত্র, তদীয় দক্ষিণ বাহু স্পন্দিত হইতে লাগিল। রাজা, তপোবনে পরিণয়সূচক লক্ষণ দেখিয়া, বিস্ময়পন্ন হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এই আশ্রম পদ শান্তরসাস্পদ, অথচ আমার দক্ষিণ বাহুর স্পন্দন হইতেছে; ঈদৃশ স্থানে মাদৃশ জনের এতদনুযায়ী ফললাভের সম্ভাবনা কোথায়। অথবা, ভবিতব্যের দ্বার সর্ব্বত্রই হইতে পারে। মনে মনে এই আন্দোলন করিতেছেন, এমন সময়ে, প্রিয়সখি! এ দিকে এ দিকে; এই শব্দ রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। রাজা শ্রবণ করিয়া কহিতে লাগিলেন, বৃক্ষবাটিকার দক্ষিণাংশে যেন স্ত্রীলোকের আলাপ শুনা যাইতেছে; কি বৃত্তান্ত অনুসন্ধান করিতে হইল।

এই বলিয়া, কিঞ্চিৎ গমন করিয়া, রাজা দেখিতে পাইলেন, তিনটি অল্পবয়স্কা তপস্বিকন্যা, অনতিবৃহৎ সেচনকলস কক্ষে লইয়া, আলবালে জলসেচন করিতে আসিতেছে। রাজা, তাহাদের রূপের মাধুরীদর্শনে চমৎকৃত হইয়া, কহিতে লাগিলেন, ইহারা আশ্রমবাসিনী; ইহার যেরূপ, এরূপ রূপবতী রমণী আমার অন্তঃপুরে নাই। বুঝিলাম, আজি উদ্যানলতা সৌন্দর্য্যগুণে বনলতার নিকট পরাজিত হইল। এই বলিয়া, তরুচ্ছায়ায় দণ্ডায়মান হইয়া, রাজা অনিমিষ নয়নে তাঁহাদিগকে অবলোকন করিতে লাগিলেন।

শকুন্তলা, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা নাম্নী দুই সহচরীর সহিত, বৃক্ষবাটিকাতে উপস্থিত হইয়া, আলবালে জলসেচন করিতে আরম্ভ করিলেন। অনসূয়া পরিহাস করিয়া শকুন্তলাকে কহিলেন, সখি শকুন্তলে! বোধ করি, তাত কণ্ব তোমা অপেক্ষাও আশ্রমপাদপদিগকে ভাল বাসেন। দেখ, তুমি নবমালিকাকুসুমকোমলা, তথাপি তোমায় আলবালজলসেচনে নিযুক্ত করিয়াছেন। শকুন্তলা ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, সখি অননুয়ে! কেবল পিতা আদেশ করিয়াছেন, বলিয়াই, জলসেচন করিতে অসিয়াছি এমন নয়, আমারও ইহাদের উপর সহোদরস্নেহ আছে। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি শকুন্তলে! গ্রীষ্মকালে যে সকল বৃক্ষের কুসুম হয়, তাহাদের সেচন সমাপ্ত হইল; এক্ষণে, যাহাদের কুসুমের সময় অতীত হইয়াছে, এস, তাহাদিগকেও সেচন করি। এই বলিয়া, সকলে মিলিয়া সেই সমস্ত বৃক্ষে জলসেচন করিতে লাগিলেন।

রাজা দেখিয়া শুনিয়া, প্রীত ও চমৎকৃত হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এই সেই কণ্বতনয়া শকুন্তলা! মহর্ষি অতি অবিবেচক, এমন শরীরে কেমন করিয়া বল্কল পরাইয়াছেন। অথবা, যেমন প্রফুল্ল কমল শৈবালযোগেও বিলক্ষণ শোভা পায়, যেমন পূর্ণ শশধর কলঙ্কসম্পর্কেও সাতিশয় শোভমান হয়; সেইরূপ এই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী, বল্কল পরিধান করিয়াও, যার পর নাই মনোহারিণী হইয়াছেন। যাহাদের আকার স্বভাবসুন্দর, তাহাদের কি না অলঙ্কারের কার্য্য করে।

শকুন্তলা জলসেচন করিতে করিতে, সম্মুখে দৃষ্টিপাতপূর্ব্বক, সখীদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, সখি! দেখ দেখ, সমীরণ ভরে সহকারতরুর নব পল্লব পরিচালিত হইতেছে; বোধ হইতেছে যেন সহকার অঙ্গুলিসঙ্কেত দ্বারা আমাকে আহ্বান করিতেছে। অতএব, আমি উহার নিকটে চলিলাম। এই বলিয়া, তিনি সহকারিতরুতলে গিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। তখন, প্রিয়ংবদা পরিহাস করিয়া কহিলেন, সখি! ঐ খানে খানিক থাক। শকুন্তল জিজ্ঞাসিলেন, কেন সখি? প্রিয়ংবদা কহিলেন, তুমি সমীপবর্ত্তিনী হওয়াতে, যেন সহকারতরু অতিমুক্তলতার সহিত সমাগত হইল। শকুন্তলা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, সখি! এই নিমিত্তই তোমাকে প্রিয়ংবদা বলে।

রাজা, প্রিয়ংবদার পরিহাসশ্রবণে সাতিশয় পরিতোষ লাভ করিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ংবদা যথার্থ কহিয়াছে; কেন না, শকুন্তলার অধরে নবপল্লবশোভার আবির্ভাব; বাহুযুগল কোমলবিটপশোভা ধারণ করিয়াছে, আর নব যৌবন, বিকসিতকুসুমরাশির ন্যায়, সর্ব্বাঙ্গ ব্যাপিয়া রহিয়াছে।

অনসূয়া কহিলেন, শকুন্তলে! দেখ দেখ, তুমি যে নবমালিকার বনতোষিণী নাম রাখিয়াছ, সে স্বয়ংবরা হইয়া সহকারতরুকে আশ্রয় করিয়াছে। শকুন্তলা, শুনিয়া বনতোষিণীর নিকটে গিয়া, সহর্ষ মনে কহিতে লাগিলেন, সখি অনুসূয়ে! দেখ, ইহাদের উভয়েরই কেমন রমণীয় সময় উপস্থিত; নবমালিকা, বিকসিত নব কুসুমে সুশোভিত হইয়াছে, আর সহকারও ফলভরে অবনত হইয়া রহিয়াছে। উভয়ের এইরূপ কথোপকথন হইতেছে, ইত্যবসরে প্রিয়ংবদা হাস্যমুখে অনসূয়াকে কহিলেন, অনসূয়ে! কি নিমিত্ত শকুন্তলা সর্ব্বদাই বনতোষিণীকে উৎসুক নয়নে নিরীক্ষণ করে, জান? অনসূয়া কহিলেন, না সখি! জানি না, কি বল দেখি। প্রিয়ংবদা কহিলেন, এই মনে করিয়া, যে, যেমন বনতাষিণী সহকারের সহিত সমাগত হইয়াছে, আমিও যেন তেমনই আপন অনুরূপ বর পাই। শকুন্তলা কহিলেন, এটি তোমার আপনার মনের কথা।

শকুন্তলা, এই বলিয়া অনতিদূরবর্ত্তিনী বাধবীলতার সমীপবর্ত্তিনী হইয়া, হৃষ্ট মনে প্রিয়ংবদাকে কহিলেন, সখি! তোমাকে এক প্রিয় সংবাদ দি, মাধবীলতার মূল অবধি অগ্র পর্য্যন্ত মুকুল নির্গত হইয়াছে। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি! আমিও তোমাকে এক প্রিয়সংবাদ দি, তোমার বিবাহ নিকট হইয়াছে। শকুন্তলা, শুনিয়া কিঞ্চিৎ কৃত্রিম কোপ প্রদর্শন করিয়া, কহিলেন, এ তোমার মনগড়া কথা, আমি শুনিতে চাহি না। প্রিয়ংবদা কহিলেন, না সখি! আমি পরিহাস করিতেছি না। পিতার মুখে শুনিয়াছি, তাই কহিতেছি, মাধবীলতার এই যে মুকুলনির্গম এ তোমারই শুভসূচক। উভয়ের এইরূপ কথোপকথন শ্রবণ করিয়া, অনমুয়া হাসিতে হাসিতে কহিলেন, প্রিয়ংবদে! এই নিমিত্তই শকুন্তলা মাধবীলতাকে সাদর মনে সেচন ও সস্নেহে নয়নে নিরীক্ষণ করে। শকুন্তলা কহিলেন, সে জন্যে ত নয়; মাধবীলতা আমার ভগিনী হয়, এই নিমিত্ত ইহাকে সাদর মন সেচন ও সস্নেহ নয়নে নিরীক্ষণ করি।

এই বলিয়া, শকুন্তলা মাধবীলতায় জলসেচন আরম্ভ করিলেন। এক মধুকর মাধবীলতার অভিনব মুকুলে মধুপান করিতেছিল; জলসেক করিবামাত্র, মাধবীলতা পরিত্যাগ করিয়া, বিকসিতকুসুমভ্রমে, শকুন্তলার প্রফুল্ল মুখকমলে উপবিষ্ট হইবার উপক্রম করিল। শকুন্তলা করপল্লবসঞ্চালন দ্বারা নিবারণ করিতে লাগিলেন। দুর্বৃত্ত মধুকর তথাপি নিবৃত্ত হইল না, গুন্ গুন্ করিয়া অধরসমীপে পরিভ্রমণ করিতে লাগিল। তখন, শকুন্তলা একান্ত অধীরা হইয়া কহিতে লাগিলেন, সখি! পরিত্রাণ কর, দুর্বৃত্ত মধুকর আমায় নিতান্ত ব্যাকুল করিয়াছে; তখন, উভয়ে হাসিতে হাসিতে কহিলেন, সখি! আমাদের পরিত্রাণ করিবার ক্ষমতা কি; দুষ্মন্তুকে স্মরণ কর; রাজারাই তপোবনের রক্ষণাবেক্ষণ করিয়া থাকেন। ইতিমধ্যে ভ্রমর অত্যন্ত উৎপীড়ন আরম্ভ করাতে, শকুস্তুলা কহিলেন, দেখ, এই দুর্বৃত্ত কোনও মতে নিবৃত্ত হইতেছে না; আমি এখান হইতে যাই। এই বলিয়া, দুই চারি পা গমন করিয়া কহিলেন, কি আপদ্! এখানেও আবার আমার সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছে। সখি! পরিত্রাণ কর। তখন তাঁহারা পুনর্বার কহিলেন, প্রিয়সখি! আমাদের পরিত্রাণের ক্ষমতা কি, দুষ্মন্তকে স্মরণ কর, তিনি তোমায় পরিত্রাণ করিবেন।

রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, ইহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইবার এই বিলক্ষণ সুযোগ ঘটিয়াছে। কিন্তু, রাজা বলিয়া পরিচয় দিতে ইচ্ছা হইতেছে না। কি করি। অথবা, অতিথিভাবে উপস্থিত হইয়া অভয় প্রদান করি। এই স্থির করিয়া, রাজা, সত্বর গমনে তাঁহাদের সম্মুখবর্ত্তী হইয়া, কহিতে লাগিলেন, পুরুবংশোদ্ভব দুষ্মন্ত দুর্বৃত্তদিগের শাসনকর্ত্তা বিদ্যমান থাকিতে কার সাধ্য, মুগ্ধস্বভাবা তপস্বিকন্যাদিগের সহিত অশিষ্ট ব্যবহার করে।

তপস্বিকন্যারা, এক অপরিচিত ব্যক্তিকে সহসা সম্মুখে উপস্থিত দেখিয়া, প্রথমতঃ অতিশয় সঙ্কুচিত হইলেন। কিঞ্চিৎ পরে, অনসূয়া কহিলেন, না মহাশয়! এমন কিছু অনিষ্টঘটনা হয় নাই। তবে কি জানেন, এক দুষ্ট মধুকর আমাদের প্রিয়সখী শকুন্তলাকে অতিশয় আকুল করিয়াছিল; তাহাতেই ইনি কিছু কাতর হইয়াছিলেন। রাজা, ঈষৎ হাস্য করিয়া শকুন্তলাকে জিজ্ঞাসিলেন, কেমন, তপস্যার বৃদ্ধি হইতেছে? শকুন্তলা লজ্জায় জড়ীভূতা ও নম্রমুখী হইয়া রহিলেন, কিছুই উত্তর করিতে পারিলেন না। অনসূয়া শকুন্তলাকে উত্তরদানে পরাঙ্মুখী দেখিয়া, রাজাকে কহিলেন, হাঁ মহাশয়! তপস্যার বৃদ্ধি হইতেছে; এক্ষণে অতিথিবিশেষের সমাগমলাভ দ্বারা সবিশেষ বৃদ্ধি হইল। প্রিয়ংবদা শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, সখি! যাও যাও, শীঘ্র কুটীর হইতে অর্ঘ্যপত্র লইয়া আইস; জল আনিবার প্রয়োজন নাই; এই ঘটে যে জল আছে, তাহাতেই প্রক্ষালনক্রিয়া সম্পন্ন হইবেক। রাজা কহিলেন, না না, এত ব্যস্ত হইতে হইবেক না; মধুর সম্ভাষণ দ্বারাই আতিথ্য করা হইয়াছে। তখন অনসূয়া কহিলেন, মহাশয়! তবে এই শীতল সপ্তপর্ণ বেদীতে উপবেশন করিয়া শ্রান্তি দুর করুন। রাজা কহিলেন, তোমরাও জলসেচন দ্বারা অতিশয় ক্লান্ত হইয়াছ, কিঞ্চিৎ কাল বিশ্রাম কর। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি শকুন্তলে! অতিথির অনুরোধ রক্ষা করা উচিত; এস আমরাও বসি। অনন্তর সকলে উপবেশন করিলেন।

এই রূপে সকলে উপবিষ্ট হইলে, শকুন্তলা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কেন এই অপরিচিত ব্যক্তিকে নয়নগোচর করিয়া, আমার মনে তপোবনবিরুদ্ধ ভাবের উদয় হইতেছে? এই বলিয়া তিনি, তাঁহার নাম ধাম জাতি ব্যবসায়াদির বিষয় সবিশেষ অবগত হইবার নিমিত্ত, নিতান্ত উৎসুকা হইলেন। রাজা তাপসকন্যাদিগের প্রতিদৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, তোমাদের সমান রূপ, সমান বয়স, সমান ব্যবসায়; সেই নিমিত্ত তোমাদের সৌহৃদ্য অতি রমণীয় হইয়াছে। প্রিয়ংবদা রাজার অগোচরে অনসূয়াকে কহিলেন, সখি! এ ব্যক্তি কে? দেখেছ, কেমন সৌম্যমূর্ত্তি, কেমন গম্ভীরাকৃতি, কেমন প্রভাবশালী। একান্ত অপরিচিত হইয়াও, মধুর আলাপ দ্বারা চিরপরিচিত সুহৃদের ন্যায় প্রতীতি জন্মইতেছেন। অনসূয়া কহিলেন, সখি! আমারও এ বিষয়ে কৌতূহল জন্মিয়াছে; ভাল, জিজ্ঞাসা করিতেছি। এই বলিয়া, তিনি রাজাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহাশয়! আপনকার মধুর আলাপ শ্রবণে সাহসী হইয়া জিজ্ঞাসিতেছি, আপনি কোন রাজর্ষিবংশ অলঙ্কৃত করিয়াছেন? কোন দেশকেই বা সম্প্রতি আপনকার বিরহে কাতর করিতেছেন? কি নিমিত্তই বা, এরূপ সুকুমার হইয়াও, তপোবন দর্শনপরিশ্রম স্বীকার করিয়াছেন? শকুন্তলা শুনিয়া মনকে প্রবোধ দিয়া কহিলেন, হৃদয়! এত উতলা হও কেন? তুমি যে জন্যে ব্যাকুল হইতেছ, অনসূয়া তাহাই জিজ্ঞাসা করিতেছে।

রাজা শুনিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, এখন কি রূপে আত্মপরিচয় দি; যথার্থ পরিচয় দিলে সকল প্রকাশ হইয়া পড়ে। এই বলিয়া, তিনি কিঞ্চিৎ ভাবিয়া কহিলেন, ঋষিতনয়ে! আমি এই রাজ্যের ধর্ম্মাধিকারে নিযুক্ত; পুণ্যাশ্রমদর্শনপ্রসঙ্গে এই তপোবনে উপস্থিত হইয়াছি। অনসূয়া কহিলেন, অদ্য তপস্বীদিগের বড় সৌভাগ্য; মহাশয়ের সমাগমে, তাঁহারা পরম পরিতোষ লাভ করিবেন। এইরূপ কথোপকথন চলিতে লাগিল। কিন্তু, পরস্পর সন্দর্শনে রাজা ও শকুন্তলা উভয়েরই মন চঞ্চল হইল; এবং উভয়েরই আকারে ও ইঙ্গিতে চিত্তচাঞ্চল্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতে লাগিল। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা, উভয়ের ভাব বুঝিতে পারিয়া, রাজার অগোচরে শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, প্রিয়সখি! যদি আজি পিতা আশ্রমে থাকিতেন, জীবনসর্ব্বস্ব দিয়াও এই অতিথিকে তুষ্ট করিতেন। শকুন্তলা শুনিয়া কৃত্রিম কোপ প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, তোমরা কিছু মনে করিয়া এই কথা বলিতেছ; আমি তোমাদের কথা শুনিব না।

রাজা শকুন্তলার বৃত্তান্ত সবিশেষ অবগত হইবার নিমিত্ত একান্ত কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আমি তোমাদের সখীর বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করিতে বাঞ্ছা করি। তাঁহারা কহিলেন, মহাশয়! আপনকার এ অভ্যর্থনা অনুগ্রহবিশেষ; যাহা ইচ্ছা হয়, সচ্ছন্দে জিজ্ঞাসা করুন। রাজা কহিলেন, মহর্ষি কণ্ব কৌমারব্রহ্মচারী, ধর্ম্মচিন্তায় ও ব্রহ্মোপাসনায় একান্ত রত; জন্মাবচ্ছিন্নে দারপরিগ্রহ করেন নাই; অথচ তোমাদের সখী তাঁহার তনয়া, ইহা কি রূপে সম্ভবে, বুঝিতে পারিতেছি না।

রাজার এই জিজ্ঞাসা শুনিয়া অনসূয়া কহিলেন, মহাশয়! আমরা প্রিয়সখীর জন্মবৃত্তান্ত যেরূপ শুনিয়াছি, কহিতেছি শ্রবণ করুন। শুনিয়া থাকিবেন, বিশ্বামিত্র নামে এক অতি প্রভাবশালী রাজর্ষি আছেন। তিনি একদা গোমতীতীরে অতি কঠোর তপস্যা আরম্ভ করেন। দেবতারা, সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া, রাজর্ষির সমাধিভঙ্গ করিবার নিমিত্ত, মেনকানাম্নী অপ্সরাকে পাঠাইয়া দেন। মেনকা তদীয় আশ্রমে উপস্থিত হইয়া মায়াজাল বিস্তার করিলে, মহর্ষির সমাধি ভঙ্গ হইল। বিশ্বামিত্র ও মেনকা আমাদের সখীর জনক জননী। নির্দয়া মেনকা, সদ্যঃপ্রসূতা তনয়াকে অরণ্যে পরিত্যাগ করিয়া, স্বস্থানে। প্রস্থান করিল। আমাদের সখী সেই বিজন বনে অনাথা পড়িয়া রহিলেন। এক পক্ষী, কোন অনির্বচনীয় কারণে স্নেহবশ হইয়া, পক্ষপুট দ্বারা আচ্ছাদন করিয়া রক্ষণাবেক্ষণ করিতে লাগিল। দৈবযোগে, তাত কণ্ব পর্য্যটনক্রমে সেই সময়ে সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। সদ্যঃপ্রসূতা কন্যাকে তদবস্থ পতিতা দেখিয়া, তাঁহার অন্তঃকরণে কারুণ্যরসের আবির্ভাব হইল। তিনি, তৎক্ষণাৎ আশ্রমে অনয়ন করিয়া, স্বীয় তনয়ার ন্যায় লালন পালান করিতে আরম্ভ করিলেন, এবং প্রথমে শকুন্ত অর্থাৎ পক্ষী লালন করিয়াছিল, এই নিমিত্ত নাম শকুন্তলা রাখিলেন।

রাজা শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হাঁ সম্ভব বটে; নতুবা মানবীতে কি এরূপ অলৌকিক রূপ লাবণ্য সম্ভবিতে পারে? ভূতল হইতে কখনও জ্যোতির্ময় বিদ্যুতের উৎপত্তি হয় না। শকুন্তলা লজ্জায় নম্রমুখী হইয়া রহিলেন। প্রিয়ংবদা হাস্যমুখে, শকুন্তলার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া, রাজাকে সম্বোধিয়া কহিলেন, মহাশয়ের আকার ইঙ্গিত দর্শনে বোধ হইতেছে, যেন আর কিছু জিজ্ঞাসা করিবেন। শকুন্তলা, রাজার অগোচরে, প্রিয়ংবদাকে ভ্রূভঙ্গী ও অঙ্গুলিসঙ্কেত দ্বারা তর্জ্জন করিতে লাগিলেন। রাজা কহিলেন, বিলক্ষণ অনুভব করিয়াছ; তোমাদের সখীর বিষয়ে আমার আরও কিছু জিজ্ঞাস্য আছে। প্রিয়ংবদা কহিলেন, আপনি সঙ্কুচিত হইতেছেন কেন? যাহা ইচ্ছা হয়, সচ্ছন্দে জিজ্ঞাসা করুন। রাজা কহিলেন, আমার জিজ্ঞাস্য এই, তোমাদের সখী, যাবৎ বিবাহ না হইতেছে তাবৎ পর্যন্ত মাত্র, তাপসব্রত সেবা করিবেন, অথবা যাবজ্জীবন হরিণীগণ সহবাসে কালহরণ করিবেন। প্রিয়ংবদা কহিলেন, তাত কণ্ব সঙ্কল্প করিয়া রাখিয়াছেন, অনুরূপ পাত্র না পাইলে শকুন্তলার বিবাহ দিবেন না। রাজা শুনিয়া, সাতিশয় হর্ষিত হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, তবে আমার শকুন্তলালাভ নিতান্ত অসম্ভাবনীয় নহে। হৃদয়! আশ্বাসিত হও, এক্ষণে সন্দেহভঞ্জন হইয়াছে; যাহাকে অগ্নিশঙ্কা করিতেছিলে, তাহা স্পর্শসুখ শীতল রত্ন হইল।

শকুন্তলা কৃত্রিম কোপ প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, তানসূয়ে! আমি চলিলাম, আর আমি এখানে থাকিব না। অনসূয়া কহিলেন, সখি! কি নিমিত্তে? শকুন্তলা বলিলেন, দেখ, প্রিয়ংবদা মুখে যা আসিতেছে তাই বলিতেছে; আমি যাইয়া আর্য্যা গোতমীকে কহিয়া দিব। অনসূয়া কহিলেন, সখি! অভ্যাগত মহাশয়ের এ পর্যন্ত পরিচর্য্যা করা হয় নাই। বিশেষতঃ, আজি তোমার উপর অতিথিপরিচর্য্যার ভার আছে। অতএব, ইঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া তোমার চলিয়া যাওয়া উচিত নহে। শকুন্তলা কিছু না বলিয়া চলিয়া যাইতে লাগিলেন। তখন প্রিয়ংবদা শকুন্তলাকে আটকাইয়া কহিলেন, সখি! তুমি যাইতে পাইবে না। আমার এক কলসী জল ধার; আগে শোধ দাও, তবে যাইতে দিব। এই বলিয়া শকুন্তলাকে বলপূর্ব্বক নিবারণ করিলেন। শকুন্তলা, কিঞ্চিৎ কুপিত হইয়া ঋণপরিশোধের নিমিত্ত, কলস লইয়া জল আনিতে উদ্যত হইলেন। তখন রাজা প্রিয়ংবদাকে সম্ভাষণ করিয়া কহিলেন, তপসকন্যে! তোমার সখী বৃক্ষসেচন দ্বারা অতিশয় ক্লান্ত হইয়াছেন, আর উঁহাকে পল্বল হইতে জল আনাইয়া অধিক ক্লান্ত করা উচিত হয় না। আমি তোমার সখীকে ঋণমুক্ত করিতেছি। এই বলিয়া, রাজা অঙ্গুলি হইতে অঙ্গুরীয় উন্মোচন করিয়া, জল কলসের মূল্যস্বরূপ, প্রিয়ংবদার হস্তে অর্পণ করিলেন।

অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা অঙ্গুরীয়মুদ্রিত নামাক্ষর পাঠে বিস্ময়পন্ন হইয়া, পরস্পর মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। অঙ্গুরীয়ে যে দুষ্মন্তনাম মুদ্রিত ছিল, প্রদানকালে রাজার তাহা স্মরণ ছিল না। এক্ষণে, তিনি আত্মপ্রকাশসম্ভাবনাদর্শনে সাবধান হইয়া কহিলেন, মুদ্রিত নাম দেখিয়া তোমরা অন্যথা ভাবিও। আমি রাজপুরুষ, রাজা আমারে প্রসাদচিহ্নস্বরূপ, এই স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় প্রদান করিয়াছেন। প্রিয়ংবদা রাজার ছল বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, মহাশয়! তবে এই অঙ্গুরীয় অঙ্গুলীবিযুক্ত করা কর্তব্য নহে, আপনকার কথাতেই ইনি ঋণে মুক্ত হইলেন; পরে, ঈষৎ হাসিয়া শকুন্তলার দিকে চাহিয়া কহিলেন, সখি শকুন্তলে! এই মহাশয়, অথবা মহারাজ, তোমায় ঋণে মুক্ত করিলেন। এক্ষণে ইচ্ছা হয় যাও। শকুন্তলা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এ ব্যক্তিকে পরিত্যাগ করিয়া যাওয়া আর আমার সাধ্য নহে; অনন্তর, প্রিয়ংবদাকে কহিলেন, আমি যাই না যাই তোমার কি?

রাজা, শকুন্তলার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, আমি ইহার প্রতি যেরূপ, এ আমার প্রতি সেরূপ কি না, বুঝিতে পারিতেছি না। অথবা, আর সন্দেহের বিষয় কি? কারণ, আমার সহিত কথা কহিতেছে না, অথচ আমি কথা কহিতে আরম্ভ করিলে অনন্ত চিত্ত হইয়া স্থির কর্ণে শ্রবণ করে; নয়নে নয়নে সঙ্গত হইলে, তৎক্ষণাৎ মুখ ফিরাইয়া লয়, অথচ অন্যদিকেও অধিক ক্ষণ চাহিয়া থাকে না। অন্তঃকরণে অনুরাগসঞ্চার না হইলে এরূপ ভাব হয় না।

রাজা ও তাপসকন্যাদিগের এইরূপ আলাপ হইতেছে, এমন সময়ে সহসা অনতিদূরে অতি মহান্ কোলাহল উত্থিত হইল, এবং কেহ কহিতে লাগিল, হে তপস্বিগণ! মৃগয়াবিহারী রাজা দুষ্মন্ত, সৈন্য সামন্ত সমভিব্যাহারে, তপোবন সমীপে উপস্থিত হইয়াছেন; তোমারা আশ্রমস্থিত প্রাণিসমূহের রক্ষণার্থে সত্বর ও যত্নবান্ হও; বিশেষতঃ, এক আরণ্য হস্তী, রাজার রথদর্শনে সাতিশয় ভীত হইয়া, তপস্যার মূর্ত্তিমান্ বিঘ্ন স্বরূপ, ধর্ম্মারণ্যে প্রবেশ করিতেছে।

তাপসকন্যারা শুনিয়া সাতিশয় ব্যাকুল হইলেন। রাজা বিরক্ত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কি আপদ! অনুযায়ী লোকেরা, আমার অন্বেষণে আসিয়া, তপোবনের পীড়া জন্মাইতেছে। যাহা হউক, এক্ষণে ত্বরায় গিয়া নিবারণ করিতে হইল। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা কহিলেন, মহারাজ! আরণ্য গজের উল্লেখ শুনিয়া, আমরা অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়াছি; অনুমতি করুন, কুটীরে যাই। রাজা ব্যস্ত হইয়া কহিলেন, তোমরা কুটীরে যাও; আমিও তপোবনপীড়াপরীহারের নিমিত্ত চলিলাম। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা প্রস্থানকালে কহিলেন, মহারাজ! যেন পুনরায় আমরা আপনকার দর্শন পাই। আপনকার সমুচিত অতিথিসৎকার করা হয় নাই, এজন্য আমরা অত্যন্ত লজ্জিত হইতেছি। রাজা কহিলেন, না, না, তোমাদের দর্শনেই আমার যথেষ্ট সৎকার লাভ হইয়াছে।

অনন্তর সকলে প্রস্থান করিলেন। শকুন্তলা, দুই চারি পা গমন করিয়া, ছলক্রমে কহিলেন, অনসূয়ে! কুশাগ্র দ্বারা আমার পদতল ক্ষত হইয়াছে, আমি শীঘ্র চলিতে পারি না; আর, আমার বল্কল কুরবকশাখায় লাগিয়া গিয়াছে, কিঞ্চিৎ অপেক্ষা কর, ছাড়াইয়া লই। এই বলিয়া, বল্কলমোচনচ্ছলে বলম্ব করিয়া, শকুন্তলা সতৃষ্ণ নয়নে রাজাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। রাজাও মনে মনে কহিতে লাগিলেন শকুন্তলাকে দেখিয়া আর আমার নগরগমনে তাদৃশ অনুরাগ নাই। অতএব, তপোবনের অনতিদূরে শিবির সন্নিবেশিত করি। কি আশ্চর্য্য! আমি কোনও মতেই আমার চঞ্চল চিত্তকে শকুন্তলা হইতে নিবৃত্ত করিতে পারিতেছি না।

শকুন্তলা – ২

রাজা, মৃগয়ায় আগমনকালে, স্বীয় প্রিয়বয়স্য মাধব্যনামক ব্রাহ্মণকে সমভিব্যাহারে আনিয়াছিলেন। রাজসহচরেরা, নিয়ত রাজভোগে কালযাপন করিয়া, স্বভাবতঃ সাতিশয় বিলাসী ও সুখাভিলাষী হইয়া উঠে। অশন, বসন, শয়ন, উপবেশন, কোনও বিষয়ে কিঞ্চিন্মাত্র ক্লেশ হইলে তাহাদের একান্ত অসহ্য হয়। মাধব্য রাজধানীতে অশেষ সুখসম্ভোগে কালহরণ করিতেন। অরণ্যে সে সকল সুখভোগের সম্পর্ক ছিল না; প্রত্যুত, সকল বিষয়ে সবিশেষ ক্লেশ ঘটিয়া উঠিয়াছিল।

এক দিবস, প্রভাতে গাত্রোত্থান করিয়া, যৎপরোনাস্তি বিরক্ত হইয়া, মাধব্য মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এই মৃগয়াশীল রাজার সহচর হইয়া প্রাণ গেল। প্রতিদিন প্রাতঃকালে মৃগয়ায় যাইতে হয়, এবং এই মৃগ, ঐ বরাহ, এই শার্দ্দুল, এই করিয়া মধ্যাহ্নকাল পর্যন্ত বনে বনে ভ্রমণ করিতে হয়। গ্রীষ্মকালে পল্বল ও বননদী সকল শুস্কপ্রায় হইয়া আইসে; যে অল্পপ্রমাণ জল থাকে তাহাও, বৃক্ষের গলিত পত্র সকল অনবরত পতিত হওয়াতে, অত্যন্ত কটু ও কষায় হইয়া উঠে। পিপাসা পাইলে, সেই বিরস বারি পান করিতে হয়। আহারের সময় নিয়মিত নাই; প্রায় প্রতিদিন অনিয়ত সময়েই আহার করিতে হয়। আহারসামগ্রীর মধ্যে শূল্য মাংসই অধিকাংশ; তাহাও প্রত্যহ প্রকৃতরূপ পাক করা হয় না। আর, প্রাতঃকাল অবধি মধ্যাহ্ন পর্য্যন্ত অশ্বপৃষ্ঠে পরিভ্রমণ করিয়া, সর্ব্ব শরীর বেদনায় এরূপ অভিভূত হইয়া থাকে যে, রাত্রিতেও সুখে নিদ্রা যাইতে পারি না। রাত্রিশেষে নিদ্রার আবেশ হয়; কিন্তু ব্যাধগণের বনগমনকোলাহলে অতি প্রত্যুষেই নিদ্রা ভঙ্গ হইয়া যায়। ত্বরায় যে এই সকল ক্লেশের অবসান হইবেক, তাহার ও সম্ভাবনা দেখিতেছি না। সে দিবস, আমরা পশ্চাৎ পড়িলে, রাজা, একাকী এক মৃগের অনুসরণক্রমে তপোবনে প্রবিষ্ট হইয়া, আমাদের দুর্ভাগ্যক্রমে শকুন্তলানাম্নী এক তাপসকন্যা নিরীক্ষণ করিয়াছেন। তাহাকে দেখিয়া অবধি, নগরগমনের কথা আর মুখে আনেন না। এই ভাবিতে ভাবিতেই, রাত্রি প্রভাত হইয়া গেল, এক বারও চক্ষু মুদি নাই।

মাধব্য এই সমস্ত চিন্তা করিতেছেন, এমন সময়ে দেখিতে পাইলেন, রাজা মৃগয়ার বেশধারণপূর্ব্বক, তৎকালোচিত সহচরগণে পরিবেষ্টিত হইয়া, সেই দিকে আসিতেছেন। তখন তিনি মনে মনে এই বিবেচনা করিলেন, বিকলঙ্গের ন্যায় হইয়া থাকি, তাহা হইলেও যদি আজি বিশ্রাম করিতে পাই। এই বলিয়া, মাধব্য, ভগ্নকলেবরের ন্যায়, একান্ত বিকল হইয়া রহিলেন; পরে, রাজা সন্নিহিত হইবামাত্র, সাতিশয় কাতরতাপ্রদর্শনপূর্ব্বক কহিলেন, বয়স্য! আমার সর্ব্ব শরীর অবশ হইয়া আছে, হস্ত প্রসারণ করি, এমন ক্ষমতা নাই; অতএব কেবল বাক্য দ্বারাই আশীর্ব্বাদ করি।

রাজা মাধব্যকে, তদবস্থ অবস্থিত দেখিয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, বয়স্য! তোমার শরীর এরূপ বিকল হইল কেন? মাধব্য কহিলেন, কেন হইল কি আবার; স্বয়ং অস্থি ভাঙ্গিয়া দিয়া, অশ্রুপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিতেছ? রাজা কহিলেন, বয়স্য! বুঝিতে পারিলাম না, স্পষ্ট করিয়া বল। নদীতীরবর্ত্তী বেতস যে কুজভাব অবলম্বন করে, সে কি স্বেচ্ছাবশতঃ সেইরূপ করে; অথবা নদীবেগপ্রভাবে? রাজা কহিলেন, নদীবেগ তাহার কারণ। মাধব্য কহিলেন, তুমিও আমার অঙ্গবৈকল্যের। রাজা কহিলেন, সে কেমন? মাধব্য কহিলেন, আমি কি বলবি, ইহা কি উচিত হয় যে, রাজকার্য্য পরিত্যাগ করিয়া, বনচরের ব্যবসায় অবলম্বনপূর্ব্বক, নিয়ত বনে বনে ভ্রমণ করিবে। আমি ব্রাহ্মণের সন্তান; সর্ব্বদা তোমার সঙ্গে সঙ্গে মৃগের অন্বেষণে কাননে কাননে ভ্রমণ করিয়া, সন্ধিবন্ধ সকল শিথিল হইয়া গিয়াছে, এবং সর্ব্ব শরীর অবশ হইয়া রহিয়াছে। অতএব, বিনয়বাক্যে প্রার্থনা করিতেছি, অন্ততঃ এক দিনের মত আমায় বিশ্রাম করিতে দাও।

রাজা, মাধব্যের প্রার্থনা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এ ত এইরূপ কহিতেছে; আমারও শকুন্তলাদর্শন অবধি মৃগয়াবিষয়ে মন নিতান্ত নিরুৎসাহ হইয়াছে। শরাসনে শরসন্ধান করি, কিন্তু মৃগের উপর নিক্ষেপ করিতে পারি না; তাহাদের মুগ্ধ নয়ন অবলোকন করিলে, শকুন্তলার অলৌকিকবিভ্রমবিলাসশালী নয়নযুগল মনে পড়ে। মাধব্য রাজার মুখে দৃষ্টিপাত করিয়া ভাবিতে লাগিলেন, আমি অরণ্যে রোদন করিলাম। রাজা ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, না হে না, আমি অন্য কিছু ভাবিতেছি না। সুহৃদ্বাক্য লঙ্ঘন করা কর্তব্য নহে, এই বিবেচনায় আজি মৃগয়ায় ক্ষান্ত হইলাম। মাধব্য, শ্রবণমাত্র যার পর নাই আনন্দিত হইয়া, চিরজীবী হও বলিয়া, চলিয়া যাইবার উপক্রম করিলেন। রাজা কহিলেন, বয়স্য! যাইও না, আমার কিছু কথা আছে। মাধব্য, কি কথা বল বলিয়া, শ্রবণোন্মুখ ইইরা, দণ্ডায়মান রহিলেন। রাজা কহিলেন, বয়স্য! কোনও অনায়াসসাধ্য কর্ম্মে আমার সহায়তা করিতে হইবেক। মাধব্য কহিলেন, বুঝিয়াছি, আর বলিতে হইবে না, মিষ্টান্নভক্ষণে; সে বিষয়ে আমি বিলক্ষণ নিপুণ বটি, অনায়াসেই সহায়তা করিতে পারিব। রাজা কহিলেন, না হে না, আমি যা বলিব। এই বলিয়া, দৌবারিককে আহ্বান করিয়া, রাজা সেনাপতিকে আনয়ন করিতে আদেশ দিলেন।

দৌবারিকমুখে রাজার আহ্বানবার্তা শ্রবণ করিয়া সেনাপতি অনতিবিলম্বে নৃপতিগোচরে উপস্থিত হইলেন, এবং মহারাজের জয় হউক বলিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, মহারাজ! সমুদয় উদ্যোগ হইয়াছে; আর অনর্থ কালহরণ করিতেছেন কেন, মৃগয়ায় চলুন। রাজা কহিলেন, আজি মাধব্য, মৃগয়ার দোষর্কীর্ত্তন করিয়া, আমায় নিরুৎসাহ করিয়াছে। সেনাপতি, রাজার অগোচরে, ইঙ্গিত দ্বারা মাধব্যকে কহিলেন, সখে! তুমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ হইয়া থাক; আমি কিয়ৎ ক্ষণ প্রভুর চিত্তবৃত্তির অনুবর্ত্তন করি। অনন্তর, রাজাকে কহিলেন, মহারাজ! ও পাগলের কথা শুনেন কেন? ও কখন কি না বলে। মৃগয়া অপকারী কি উপকারী, মহারাজই বিবেচনা করুন না কেন। দেখুন, প্রথমতঃ, স্থূলতা ও জড়তা অপগত হইয়া, শরীর বিলক্ষণ পটু ও কর্ম্মণ্য হয়; ভয় জন্মিলে অথবা ক্রোধের উদয় হইলে, জন্তুগণের মনের গতি কিরূপ হয়, তাহা বারংবার প্রত্যক্ষ হইতে থাকে; আর চল লক্ষ্যে শরক্ষেপ করা অভ্যাস হইয়া আইসে; মহারাজ! যদি চল লক্ষ্যে শরক্ষেপ অব্যর্থ হয়, ধনুর্ধরের পক্ষে অধিক শ্লাঘার বিষয় আর কি হইতে পারে? যাহারা মৃগয়াকে ব্যসনমধ্যে গণ্য করে, তাহারা নিতান্ত অর্বাচীন; বিবেচনা করুন, এরূপ আমোদ, এরূপ উপকার আর কিসে আছে? মাধব্য শুনিয়া, কৃত্রিম কোপ প্রদর্শন করিয়া, কহিলেন, আরে নরাধম! ক্ষান্ত ই, আর তোর প্রবৃত্তি জন্মাইতে হইবেক না; আজি উনি আপন প্রকৃতি প্রাপ্ত হইয়াছেন। আমি দিব্য চক্ষে দেখিতেছি, তুই বনে বনে ভ্রমণ করিয়া, এক দিন, নরনাসিকালোলুপ ভল্লুকের মুখে পড়িবি।

উভয়ের এইরূপ বিবাদারম্ভ দেখিয়া, রাজা সেনাপতিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, দেখ! আমরা আশ্রমসমীপে আছি, এজন্য তোমার মতে সম্মত হইতে পারিলাম না। অদ্য মহিষেরা, নিপানে অবগাহন করিয়া, নিরুদ্বেগে জলক্রীড়া করুক; হরিণগণ, তরুচ্ছায়ায় দলবদ্ধ হইয়া, রোমন্থ অভ্যাস করুক; বরাহেরা অশঙ্কিত চিত্তে পল্বলে মুস্তা ভক্ষণ করুক; আর আমার শরাসনও বিশ্রাম লাভ করুক। সেনাপতি কহিলেন, মহারাজের যেমন অভিরুচি। রাজা কহিলেন, তবে যে সমস্ত মৃগয়াসহচর পূর্ব্বে বনপ্রস্থান করিয়াছে, তাহাদিগকে ফিরাইয়া আন; আর সেনাসংক্রান্ত লোকদিগকে বিলক্ষণ, সতর্ক করিয়া দাও, যেন তাহারা কোনও ক্রমে তপোবনের উৎপীড়ন না জন্মায়।

সেনাপতি যে আজ্ঞা মহারাজ বলিয়া নিষ্ক্রান্ত হইলে, রাজা সন্নিহিত মৃগয়াসহচরদিগকে মৃগয়াবেশ পরিত্যাগ করিতে আদেশ দিলেন। তদনুসারে তাহারা তথা হইতে প্রস্থান করিলে, রাজা ও মাধব্য, সন্নিহিত লতামণ্ডপে প্রবিষ্ট হইয়া, শীতল শিলাতলে উপবেশন করিলেন।

এই রূপে উভয়ে নির্জনে উপবিষ্ট হইলে, রাজা মাধব্যকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বয়স্য! তুমি চক্ষুর ফল পাও নাই, কারণ, দর্শনীয় বস্তুই দেখ নাই। মাধব্য কহিলেন, কেন তুমি ত আমার সম্মুখে রহিয়াছ। রাজা কহিলেন, তা নয় হে, আমি আশ্রমললামভূতা কণ্বদুহিতা শকুন্তলাকে উল্লেখ করিয়া কহিতেছি। মাধব্য, কৌতুক করিবার নিমিত্ত, কহিলেন, একি বয়স্য! তপস্বিকন্যায় অভিলাষ! রাজা কহিলেন, বয়স্য! পুরুবংশীয়েরা এরূপ দুরাচার নহে যে পরিহার্য্য বস্তুর উপভোগে অভিলাষ করে। তুমি জান না, শকুন্তলা মেনকাগর্ভসম্ভূতা, রাজর্ষি বিশ্বামিত্রের কন্যা; তপস্বীর আশ্রমে প্রতিপালিত হইয়াছে এই মাত্র, বস্তুতঃ তপস্বিকন্যা নহে।

মাধব্য, শকুন্তলার প্রতি রাজার প্রগাঢ় অনুরাগ দেখিয়া, হাস্যমুখে কহিলেন, যেমন পিণ্ডখর্জ্জুর ভক্ষণ করিয়া রসনা মিষ্ট রসে অভিভূত হইলে, তিন্তিলীভক্ষণে স্পৃহা হয়, সেইরূপ স্ত্রীরত্বভোগে পরিতৃপ্ত হইয়া, তুমি এই অভিলাষ, করিতেছ। রাজা কহিলেন, না বয়স্য! তুমি তাকে দেখ নাই, এই নিমিত্ত এরূপ কহিতেছ। মাধব্য কহিলেন, তার সন্দেহ কি; যাহা তোমারও বিস্ময় জন্মাইয়াছে, সে বস্তু অবশ্য রমণীয়। কহিলেন, বয়স্য! অধিক আর কি বলিব, তার শরীর মনে করিলে মনে এই উদয় হয়, বুঝি বিধাতা প্রথমতঃ চিত্রপটে চিত্রিত করিয়া পরে জীবনদান করিয়াছেন; অথবা, মনে মনে মনোমত উপকরণসামগ্রী সকল সঙ্কলন করিয়া, মনে মনে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলি যথাস্থানে বিন্যাসপুর্ব্বক, মনে মনেই তাহার শরীর নির্মাণ করিয়াছেন; হস্ত দ্বারা নির্মিত হইলে, শরীরের সেরূপ মার্দ্দব ও রূপলাবণ্যের সেরূপ মাধুরী সম্ভবত না। ফলতঃ, ভাই রে, সে এক অভূতপূর্ব্ব স্ত্রীরত্নসৃষ্টি। মাধব কহিলেন, বয়স্য! বুঝিলাম, শকুন্তলা যাবতীয় রূপবতীদিগের পরাভবস্থান। রাজা কহিলেন, তাহার রূপ অনাঘ্রাত প্রফুল্ল পুষ্প স্বরূপ, নখাঘাতবর্জ্জিত নব পল্লব স্বরূপ, অপরিহিত নূতন রত্ন স্বরূপ, অনাস্বাদিত অভিনব মধু স্বরূপ, জন্মান্তরীণ পুণ্যরাশির অখণ্ড ফল স্বরূপ; জানি না, কোন ভাগ্যবানের ভাগ্যে সেই নির্মল রূপের ভোগ আছে।

রাজার মুখে শকুন্তলার এইরূপ বর্ণনা শুনিয়া, চমৎকৃত হইয়া, মাধব্য কহিলেন, বয়স্য! তবে শীঘ্র তাহার পাণিগ্রহণ কর; দেখিও, যেন তোমার ভাবিতে চিন্তিতে এরূপ অসুলভরূপনিধান কন্যানিধন কোনও অসভ্য তপস্বীর হস্তে পতিত না হয়। রাজা কহিলেন, শকুন্তলা নিতান্ত পরাধীনা; বিশেষতঃ, কুলপতি কণ্ব এক্ষণে আশ্রমে নাই। মাধব্য কহিলেন, ভাল বয়স্য! তোমায় এক কথা জিজ্ঞাসা করি, বল দেখি, তোমার উপর তার অনুরাগ কেমন? রাজা কহিলেন, বয়স্য! তপস্বিকন্যারা স্বভাবতঃ অপ্রগল‍্ভস্বভাবা; তথাপি তাহার আকার ইঙ্গিতে আমার প্রতি অনুরাগের স্পষ্ট চিহ্ন লক্ষিত হইয়াছে— যত ক্ষণ আমার সম্মুখে ছিল, আমার সহিত কথা কয় নাই; কিন্তু আমি কথা কহিতে আরম্ভ করিলে, অনন্যচিত্তা হইয়া স্থির কর্ণে শ্রবণ করিয়াছে; নয়নে নয়নে সঙ্গতি হইলে, মুখ ফিরাইয়া লইয়ছে, কিন্তু অন্য দিকেও অধিক ক্ষণ চাহিয়া থাকে নাই। আবার প্রস্থানকালে কয়েকপদমাত্র গমন করিয়া, কুশের অঙ্কুরে পদতল ক্ষত হইল, চলিতে পারি না, এই বলিয়া দাঁড়াইয়া রহিল, আর কুরবকশখায় বল্কল লাগিয়াছে, এই বলিয়া বল্কলমোচনচ্ছলে বিলম্ব করিয়া, আমার দিকে মুখ ফিরাইয়া সতৃষ্ণ নয়নে বারংবার নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। এ সকল অনুরাগের লক্ষণ বই আর কি হতে পারে? মাধব্য কহিলেন, বয়স্য! তবে তোমার মনোরথসিদ্ধির অধিক বিলম্ব নাই। ভাগ্যক্রমে, তপোবন তোমার উপবন হইয়া উঠিল। রাজা কহিলেন, বয়স্য! কোনও কোনও তপস্বীরা আমায় চিনিতে পারিয়াছেন। বল দেখি, এখন কি ছলে কিছু দিন তপোবনে থাকি। মাধব্য কহিলেন, কেন, অন্য ছলের প্রয়োজন কি? তুমি রাজা, তপোবনে গিয়া তপস্বীদিগকে বল, আমি রাজস্ব আদায় করিতে আসিয়াছি; যাবৎ তোমরা রাজস্ব না দিবে, তারৎ আমি তপোবনে থাকিব। রাজা কহিলেন, তপস্বীরা সামান্য প্রজার ন্যায় রাজস্ব দেন না; তাঁহারা অন্যবিধ রাজস্ব দিয়া থাকেন; তাঁহারা যে রাজস্ব দেন, তাহা রত্নরাশি অপেক্ষাও প্রার্থনীয়। দেখ, সামান্য প্রজারা। রাজাদিগকে যে রাজস্ব দেয়, তাহা বিনশ্বর; কিন্তু তপস্বীরা তপস্যার ষষ্ঠাংশস্বরূপ অবিনশ্বর রাজস্ব প্রদান করিয়া থাকেন।

রাজা ও মাধব্য উভয়ের এইরূপ কথোপকথন চলিতেছে, এমন সময়ে দ্বারবান্ আসিয়া কহিল, মহারাজ! তপোবন হইতে দুই ঋষিকুমার আসিয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান আছেন, কি আজ্ঞা হয়। রাজা কহিলেন, অবিলম্বে লইয়া আইস। তদনুসারে ঋষিকুমারের রাজসমীপে উপনীত হইয়া, মহারাজের জয় হউক, বলিয়া, আশীর্বাদ করিলেন। রাজা আসন হইতে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক প্রণাম করিলেন এবং জিজ্ঞাসিলেন, তপস্বীরা কি আজ্ঞা করিয়া পাঠাইয়াছেন, বলুন। ঋষিকুমারেরা কহিলেন, মহারাজ! আপনি এখানে আছেন জানিতে পারিয়া, তপস্বীরা মহারাজকে এই অনুরোধ করিতেছেন যে মহর্যি আশ্রমে নাই, এই নিমিত্ত নিশাচরেরা যজ্ঞের বিঘ্ন জন্মাইতেছে; অতএব আপনাকে, তাঁহার প্রত্যাগমন পর্য্যন্ত এই স্থানে থাকিয়া, তপোবনের উপদ্রব নিবারণ করিতে হইবেক। রাজা কহিলেন, তপস্বীদিগের এই আদেশে অনুগৃহীত হইলাম। মাধব্য কহিলেন, বয়স্য! মন্দ কি, এ তোমার অনুকূল গলহস্ত। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন; অনন্তর, দৌবারিককে আহ্বান করিয়া, সারথিকে রথ প্রস্তুত করিতে আদেশ দিয়া, ঋষিকুমারদিগকে কহিলেন, আপনারা প্রস্থান করুন; আমি যথাকালে তপোবনে উপস্থিত হইতেছি। ঋষিকুমারেরা অতিশয় আহ্লাদিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ! না হইবেক কেন? আপনি যে বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, আপনার এই ব্যবহার তাহার উপযুক্তই বটে। বিপদ‍্গ্রস্তকে অভয়দান পুরুবংশীয়দিগের কুলব্রত।

এই বলিয়া আশীর্বাদ করিয়া ঋষিকুমারের প্রস্থান করিলে পর, রাজা মধিব্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বয়স্য! যদি তোমার শকুন্তলাদর্শনে কৌতূহল থাকে, আমার সমভিব্যাহারে চল। মাধব্য কহিলেন, তোমার মুখে তাহার বর্ণনা শুনিয়া দেখিতে অত্যন্ত অভিলাষ হইয়াছিল; কিন্তু এক্ষণে নিশাচরের নাম শুনিয়া সে অভিলাষ এক বারে গিয়াছে। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন; ভয় কি, আমার নিকটে থাকিবে। মাধব্য কহিলেন, তবে আর নিশাচরে আমার কি করিবেক? এইরূপ কথোপকথন হইতেছে, এমন সময়ে দ্বারপাল আসিয়া কহিল, মহারাজ! রথ, প্রস্তুত, আরোহণ করিলেই হয়। কিন্তু বৃদ্ধ মহিষীর বার্ত্তা লইয়া করভক এই মাত্র রাজধানী হইতে উপস্থিত হইল। রাজা কহিলেন, অবিলম্বে উহারে আমার নিকটে লইয়া আইস। অনন্তর, করভক রাজসমীপে আসিয়া নিবেদন করিল, মহারাজ! বৃদ্ধ দেবী আজ্ঞা করিয়াছেন, আগামী চতুর্থ দিবসে তাঁহার এক ব্রত আছে; সেই দিবস মহারাজকে তথায় উপস্থিত থাকিতে হইবেক।

এ দিকে তপস্বীদিগের কার্য্য, ও দিকে গুরুজনের আজ্ঞা, উভয়ই অনুল্গঙ্ঘনীয়, এই নিমিত্ত, কর্তব্যনিরূপণে অসমর্থ হইয়া রাজা নিতান্ত আকুলচিত্ত হইলেন, এবং মাধব্যকে কহিলেন, বয়স্য! বিষম সঙ্কটে পড়িলাম, কি করিব কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। মাধব্য পরিহাস করিয়া কহিলেন, কেন, ত্রিশঙ্কুর মত মধ্যস্থলে থাক। রাজা কহিলেন, বয়স্য! এ পরিহাসের সময় নয়, সত্য সত্যই অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়াছি; কি করি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। পরে, তিনি কিয়ৎ ক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিলেন, সখে! মা তোমায় পুত্রবৎ পরিগৃহীত করিয়াছেন। তুমি রাজধানী ফিরিয়া যাও, এবং জননীর পুত্রকার্য্য সম্পাদন কর। তাঁহাকে কহিবে, তপস্বীদিগের কার্য্যে অত্যন্ত ব্যস্ত আছি, এজন্য যাইতে পারিলাম না। মাধব্য, ভাল, আমি চলিলাম, কিন্তু তুমি যেন আমায় নিশাচরভয়ে কাতর মনে করিও না; এই বলিয়া কহিলেন, এখন আমি রাজার অনুজ হইলাম; রাজার অনুজের মত যাইতে ইচ্ছা করি। রাজা কহিলেন, আমার সঙ্গে অধিক লোক জন রাখিলে, তপোবনের উৎপীড়ন হইতে পারে; অতএব সমুদয় অনুচরদিগকে তোমারই সঙ্গে পাঠাইতেছি। মাধব্য শুনিয়া সাতিশয় আহলাদিত হইয়া কহিলেন, আজি আমি যথার্থ যুবরাজ হইলাম।

এই রূপে মাধব্যের রাজধানী প্রতিগমন নির্দ্ধারিত হইলে, রাজা মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন, এ অতি চপলস্বভাব, হয় ত শকুন্তলাবৃত্তান্ত অন্তঃপুরে প্রকাশ করিবেক; এখন কি করি; অথবা এইরূপ কহিয়া বিদায় করি; এই বলিয়া মাধব্যের হতে ধরিয়া কহিলেন, বয়স্য! ঋষিরা কয়েক দিনের জন্য তপোবনে থাকিতে অনুরোধ করিয়াছেন, এই নিমিত্ত রহিলাম, নতুবা যথার্থই আমি শকুন্তলালাভে অভিলাষী হইয়াছি এমন নয়; আমি ইতিপূর্ব্বে তোমার নিকট শকুন্তলাসংক্রান্ত যে সকল গল্প করিয়াছি, সে সমস্ত পরিহাসমাত্র, তুমি যেন যথার্থ ভাবিয়া একে আর করিও না। মাধব্য কহিলেন, তার সন্দেহ কি? আমি এক বারও তোমার ঐ সকল কথা যথার্থ ভাবি নাই।

অনন্তর, রাজা তপস্বীদিগের যজ্ঞবিঘ্ননিবারণার্থে তাপে বনে প্রবিষ্ট হইলেন; এবং মাধব্যও, যাবতীয় সৈন্য সামন্ত ও সমুদয় অনুযাত্রিক সঙ্গে লইয়া, রাজধানী প্রস্থান করিলেন।

শকুন্তলা – ৩

রাজা, মাধব্য সমভিব্যাহারে সমস্ত সৈন্য সামন্তু বিদায় করিয়া দিয়া, তপস্বিকার্য্যের অনুরোধে তপোবনে অবস্থিতি করিলেন; কিন্ত‍ু দিন যামিনী কেবল শকুন্তলাচিন্তায় একান্ত মগ্ন হইয়া দিনে দিনে কৃশ, মলিন, দুর্বল, ও সর্ব্ববিষয়ে নিতান্ত নিরুৎসাহ হইতে লাগিলেন। আহার, বিহার, শয়ন, উপবেশন কোনও বিষয়েই তাঁহার মনের সুখ ছিল না। কোন সময়ে কোন স্থানে গেলে শকুন্তলাকে দেখিতে পাইব, নিয়ত এই অনুধ্যান ও এই অনুসন্ধান। কিন্তু, পাছে তপোবনবাসীরা তাঁহার অভিসন্ধি বুঝিতে পারেন, এই আশঙ্কায় তিনি সতত সাসিশয় সঙ্কুচিত থাকেন।

এক দিন, মধ্যাহ্ন কালে, রাজা নির্জনে উপবিষ্ট হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, শকুন্তলার দর্শন ব্যতিরেকে আর আমার প্রাণরক্ষার উপায় নাই। কিন্তু তপস্বীদিগের প্রয়োজন সম্পন্ন হইলে, যখন তাঁহাৱা আমায় রাজধানীগমনের অনুমতি করিবেন, তখন আমার কি দশা হইবেক; কি রূপে তাপিত প্রাণ শীতল করিব। সে যাহা হউক, এখন কোথায় গেলে শকুন্তলাকে দেখিতে পাই। বোধ করি, প্রিয়া মালিনীতীরবর্ত্তী শীতল লতামণ্ডপে আতপকাল অতিবাহিত করিতেছেন; সেই খানে যাই, তাঁহারে দেখিতে পাইব। এই বলিয়া তিনি, গ্রীষ্মকালের মধ্যাহ্ন সময়ে, সেই লতামণ্ডপের উদ্দেশে প্রস্থান করিলেন।

এ দিকে, শকুন্তলাও, রাজদর্শনদিবসাবধি, দুঃসহ বিরহযাতনায় সাতিশয় কাতর হইয়াছিলেন; ফলতঃ, তাহার ও বাজার অবস্থার কোনও অংশে কোনও প্রভেদ ছিল না। সে দিবস শকুন্তলা অত্যন্ত অসুস্থ হওয়াতে, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা তাঁহাকে মালিনীতীরবর্ত্তী নিকুঞ্জবনে লইয়া গেলেন এবং তন্মধ্যবর্তী শীতল শিলাতলে, নব পল্লব ও জলার্দ্র পদ্মপত্র প্রভৃতি দ্বারা শয্যা, প্রস্তুত করিয়া, তাহাতে শয়ন করাইয়া, অশেষপ্রকার শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন।

রাজা, ক্রমে ক্রমে সেই নিকুঞ্জবনের সন্নিহিত হইয়া, চরণচিহ্নপ্রভৃতি লক্ষণ দ্বারা বুঝিতে পারিলেন, শকুন্তলা তথায় আছেন। তিনি কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া, লতার অন্তরাল হইতে শকুন্তলাকে অবলোকন করিয়া, যৎপরোনান্তি প্রীত হইয়া কহিতে লাগিলেন, আঃ! আমার নয়নযুগল শীতল হইল, প্রিয়ারে দেখিলাম। ইহারা তিন সখীতে কি কথোপকথন করিতেছে, লতাবিতানে ব্যবহিত হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ শ্রবণ ও অবলোকন করি। এই বলিয়া, রাজা উৎসুক মনে শ্রবণ ও সভৃষ্ণ নয়নে অবলোকন করিতে লাগিলেন।

শকুন্তলার শরীরতাপ সাতিশয় প্রবল হওয়াতে, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা শীতল সলিলার্দ্র নলিনীদল লইয়া কিয়ৎ ক্ষণ বায়ু সঞ্চালন করিলেন, এবং জিজ্ঞাসিলেন, সখি শকুন্তলে! কেমন, মলিনীদলবায়ু তোমার সুখজনক বোধ হইতেছে? শকুন্তলা কহিলেন, সখি! তোমরা কি বাতাস করিতেছ? উভয়ে শুনিয়া সাতিশয় বিষন্ন হুইয়া, পরস্পর মুখনিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। বাস্তবিক, তৎকালে শকুন্তলা, দুষ্মম্ভচিন্তায় নিতান্ত মগ্ন হইয়া, এক বারে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়াছিলেন। রাজা, শুনিয়া ও শকুন্তলার অবস্থা দেখিয়া, মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন, ইহাকে অত্যন্তু অসুস্থশরীর দেখিতেছি। কিন্তু কি কারণে এ এরূপ অসুস্থ হইয়াছে? গ্রীষ্মের প্রাদুর্ভাববশতঃ ইহার ঈদৃশ অসুখ, কি যে কারণে আমার এই দশা ঘটিয়াছে, ইহারও তাহাই। অথবা, এ বিষয়ে আর সংশয় করিবার আবশ্যকতা নাই; গ্রীষ্মদোষে কামিনীগণের এরূপ অবস্থা কোনও মতেই সম্ভাবিত নহে।

প্রিয়ংবদা শকুন্তলার অগোচরে অনসূয়াকে কহিলেন, সখি! সেই রাজর্ষির প্রথম দর্শন অবধিই শকুন্তলা কেমন একপ্রকার হইয়াছে; ঐ কারণে ত ইহার এ অবস্থা ঘটে নাই? অনসূয়া কহিলেন, সখি! আমারও ঐ আশঙ্কাই হয়; ভাল, জিজ্ঞাসা করিতেছি। এই বলিয়া, তিনি শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, প্রিয়সখি! তোমার শরীরের গ্লানি উত্তরোত্তর প্রবল হইয়া উঠিতেছে; অতএব আমরা তোমায় কিছু জিজ্ঞাসা করিতে চাই। শকুন্তলা কহিলেন, সখি! কি বলিবে বল। তখন অনসূয়া কহিলেন, তোমার মনের কথা কি, আমরা তাহার বিন্দু বিসর্গও জানি না; কিন্তু ইতিহাসকথায় বিরহী জনের যেরূপ অবস্থা শুনিতে পাই, বোধ হয়, তোমারও যেন সেই অবস্থা ঘটিয়াছে। সে যা হউক, কি কারণে তোমার এত অসুখ হইয়াছে বল; প্রকৃত রূপে রোগনির্ণয় না হইলে, প্রতীকারচেষ্টা হইতে পারে না। শকুন্তলা কহিলেন, সখি! আমার অত্যন্ত ক্লেশ হইতেছে, এখন বলিতে পারিব না। প্রিয়ংবদা কহিলেন, অনসূয়া ভালই বলিতেছে; কেন আপনার মনের বেদনা গোপন করিয়া রাখ? দিন দিন কৃশ ও দুর্বল হইতেছ। দেখ, তোমার শরীরে আর কি আছে; কেবল লাবণ্যময়ী ছায়ামাত্র অবশিষ্ট রহিয়াছে।

রাজা অন্তরাল হইতে শ্রবণ করিয়া কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ংবদা যথার্থ কহিয়াছে; শকুন্তলার শরীর নিতান্ত কৃশ ও একান্ত বিবর্ণ হইয়াছে। কিন্তু কি চমৎকার! এ অবস্থাতে দেখিয়াও, আমার মনের ও নয়নের অনির্বচনীয় প্রীতিলতা হুইতেছে।

অবশেষে শকুন্তলা, মনের ব্যথা আর গোপন করা অসাধ্য বিবেচনা করিয়া, দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, সখি! যদি তোমাদের কাছে না বলিব, আর কার কাছেই বলিব; কিন্তু মনের বেদনা ব্যক্ত করিয়া, তোমাদিগকে কেবল দুঃখভাগিনী করিব। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি! এই নিমিত্তই ত আমরা এত আগ্রহ করিতেছি; তুমি কি জান না, আত্মীয় জনের নিকট দুঃখের কথা কহিলেও, দুঃখের অনেক লাঘব হয়।

এই সময়ে, রাজা শঙ্কিত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, যখন সুখের সুখী ও দুঃখের দুঃখী জিজ্ঞাসা করিয়াছে, তখন অবশ্যই এ আপন মনের বেদনা ব্যক্ত করিবেক। প্রথমদর্শনদিবসে, প্রস্থানকালে সতৃষ্ণ নয়নে বারংবার নিরীক্ষণ করিয়া, অনুরাগের স্পষ্ট লক্ষণ প্রদর্শন করিয়াছিল, তথাপি এখন কি বলিবে, এই ভয়ে অভিভূত ও কাতর হইতেছি।

শকুন্তলা কহিলেন, সখি! যে অবধি আমি সেই রাজর্ষিকে নয়নগোচর করিয়াছি—এই মাত্র কহিয়া, লজ্জায় নম্রমুখী হইয়া রইলেন, আর বলিতে পারিলেন না। তখন তাঁহারা উভয়ে কহিতে লাগিলেন, সখি! বল, বল, আমাদের নিকট লজ্জা কি? শকুন্তলা কহিলেন, সেই অবধি, তাঁহাতে অনুরাগিণী হইয়া, আমার এই অবস্থা ঘটিয়াছে। এই বলিয়া, তিনি বিষণ্ণ বদনে অপূর্ণ নয়নে লজ্জায় অধোমুখী হইয়া রহিলেন। অনসুয়া ও প্রিয়ংবদা সাতিশয় প্রীত হইয়া কহিলেন, সখি! সৌভাগ্যক্রমে তুমি অনুরূপ পাত্রেই অনুরাগিণী হইয়াছ; অথবা, মহানদী, সাগর পরিত্যাগ করিয়া, আর কোন জলাশয়ে প্রবেশ করিবেক।

রাজা শুনিয়া আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইয়া কহিতে লাগিলেন, যা শুনিবার তা শুনিলাম; এত দিনের পর আমার তাপিত প্রাণ শীতল হইল।

শকুন্তলা কহিলেন, সখি! আর আমি যাতনা সহ্য করিতে পারি না, এখন প্রাণবিয়োগ হইলেই পরিত্রাণ হয়। প্রিয়ংবদা, শুনিয়া, সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া, শকুন্তলার অগোচরে অনসুয়াকে কহিলেন, সখি! আর ইহাকে সান্ত্বনা করিয়া ক্ষান্ত রাখিবার সময় নাই; আমার মতে আর কালাতিপাত করা কর্ত্তব্য নয়, ত্বরায় কোনও উপায় করা আবশ্যক। তখন অনসুয়া কহিলেন, সখি! যাহাতে অবিলম্বে অথচ গোপনে শকুন্তলার মনোরথ সম্পন্ন হয়, এমন কি উপায় হয়, বল। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি! গোপনের জন্যেই ভাবনা, অবিলম্বে হওয়া কঠিন নয়। অনসূয়া কহিলেন, কি জন্যে, বল দেখি। প্রিয়ংবদা কহিলেন, কেন তুমি কি দেখ নাই, সেই রাজর্ষিও, শকুন্তলাকে দেখিয়া অবধি দিন দিন দুর্বল ও কৃশ হইতেছেন?

রাজা শুনিয়া স্বীয় শরীরে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, যথার্থই এরূপ হইয়াছি বটে। নিরস্তুর অন্তরতাপে তাপিত হইয়া, আমার শরীর বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে; এবং দুর্বল ও কৃশও যৎপরোনাস্তি হইয়াছি।

প্রিয়ংবদা কহিলেন, অনসূয়ে! শকুন্তলার প্রণয়পত্রিকা করা যাউক; সেই পত্রিকা, আমি পুষ্পের মধ্যগত করিয়া, নির্ম্মাল্যচ্ছলে রাজর্ষির হস্তে দিয়া আসিব। অনসূয়া কহিলেন, সখি! এ অতি উত্তম পরামর্শ; দেখ, শকুন্তলাই বা কি বলে। শকুন্তলা কহিলেন, সখি! আমাকে আর কি জিজ্ঞাসা করিবে? তোমাদের যা ভাল বোধ হয় তাই কর। তখন প্রিয়ংবদা কহিলেন, তবে আর বিলম্বে কাজ নাই; মনোমত একখানি পত্রিকা রচনা কর। শকুন্তলা কহিলেন, সখি! রচনা করিতেছি; কিন্তু পাছে তিনি অবজ্ঞা করেন, এই ভয়ে আমার হৃদয় কম্পিত হইতেছে।

রাজা শকুন্তলার আশঙ্কা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন, এবং তাঁহাকে উদ্দেশ করিয়া কহিতে লাগিলেন, সুন্দরি! তুমি যাহার অবজ্ঞাভয়ে ভীত হইতেছ, সে এই তোমার সমাগমের নিমিত্ত একান্ত উৎসুক হইয়া রহিয়াছে; তুমি কি জান না, রত্ন কাহারও অন্বেষণ করে না, রত্নেরই অন্বেষণ সকলে করিয়া থাকে।

অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাও, শকুন্তলার আশঙ্কা শুনিয়া, কহিলেন, অয়ি আত্মগুণাবমানিনি! কোন ব্যক্তি আতপত্র দ্বারা শরৎকালীন জ্যোৎস্না নিবারণ করিয়া থাকে? শকুন্তলা ঈষৎ হাস্য করিয়া পত্রিকারচনায় প্রবৃত্ত হইলেন, এবং কিঞ্চিৎ পরে কহিলেন, সখি! রচনা করিয়াছি, কিন্তু লিখনসামগ্রী কিছুই নাই, কিসে লিখি বল। প্রিয়ংবদা কহিলেন, এই পদ্মপত্রে লিখ।

লিখন সমাপন করিয়া, শকুন্তলা সখীদিগকে কহিলেন ভাল শুন দেখি সঙ্গত হয়েছে কি না। তাঁহারা শুনিতে লাগিলেন; শকুন্তলা পড়িতে আরম্ভ করিলেন, হে নির্দয়! তোমার মন আমি জানি না, কিন্তু আমি তোমাতে একান্ত অনুরাগিণী হইয়া নিরন্তুর সন্তার্পিত হইতেছি—এই মাত্র শুনিয়া আর অন্তরালে থাকিতে না পারিয়া, রাজা সহসা সম্মুখে উপস্থিত হইলেন এবং শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, সুন্দরি! তুমি সন্তাপিত হইতেছ যথার্থ বটে; কিন্ত‌ু বলিলে বিশ্বাস করিবে না, আমি এক বারে দগ্ধ হইতেছি। অনমুয়া ও প্রিয়ংবদা, সহসা রাজাকে সমাগত দেখিয়া, যৎপরোনাস্তি হর্ষিত হইলেন এবং গাত্রোত্থানপূর্ব্বক, পরম সমাদরে স্বাগত জিজ্ঞাসা করিয়া বসিবার সংবর্দ্ধনা করিলেন। শকুন্তলাও, অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া, গাত্রোথান করিতে উদ্যত হইলেন।

তখন রাজা শকুন্তলাকে নিবারণ করিয়া কহিলেন, সুন্দরি! গাত্রোত্থান করিবার প্রয়োজন নাই; তোমার দর্শনেই আমার সম্পূর্ণ সংবর্দ্ধনা লাভ হইয়াছে। বিশেষতঃ, তোমার শরীরের যেরূপ গ্লানি, তাহাতে কোনও মতেই শয্যা পরিত্যাগ করা কর্ত্তব্য নহে। সখীরা রাজাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহারাজ! এই শিলাতলে উপবেশন করুন। রাজা উপবিষ্ট হইলেন। শকুন্তলা, লজ্জায় অত্যন্ত জড়ীভূতা হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, হৃদয়! যার জন্যে তত উতলা হইয়াছিলে, এখন তাহাকে দেখিয়া এত কাতর হইতেছ কেন? রাজা অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাকে কহিলেন, আজি আমি তোমাদের সখীকে অতিশয় অসুস্থ দেখিতেছি। উভয়ে ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, এখন সুস্থ হইবেন। শকুন্তলা লজ্জায় অবনতমুখী হইয়া রহিলেন।

অনসূয়া কহিলেন, মহারাজ! শুনিতে পাই, রাজাদিগের অনেক মহিষী থাকে, কিন্ত‌ু সকলেই প্রেয়সী হয় না; অতএব আমরা, যেন সখীর নিমিত্ত অবশেষে মনোদুঃখ না পাই। রাজা কহিলেন, যথার্থ বটে রাজাদিগের অনেক মহিলা থাকে; কিন্তু আমি অকপট হৃদয়ে কহিতেছি, তোমাদের সখীই আমার জীবনসর্ব্বস্ব হইবেন। তখন অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা সাতিশয় হর্ষিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ! এক্ষণে আমরা নিশ্চিন্ত ও চরিতার্থ হইলাম। শকুন্তলা কহিলেন, সখি! আমরা মহারাজকে। লক্ষ্য করিয়া কত কথা কহিয়াছি; ক্ষমা প্রার্থনা কর। সখীরা হাস্যমুখে কহিলেন, যে কহিয়াছে সেই ক্ষমা প্রার্থনা করিবে, অন্যের কি দায়। তখন শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ! যদি কিছু কহিয়া থাকি, ক্ষমা করিবেন; পরোক্ষে কে কি না বলে। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন।

এইরূপ কথোপকথন চলিতেছে, এমন সময়ে প্রিয়ংবদা লতামণ্ডপের বহির্ভাগে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া, কহিলেন, অনসূয়ে! মৃগশাবকটি উৎসুক হইয়া ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিতেছে; বোধ করি, আপন জননীর অন্বেষণ করিতেছে; আমি উহাকে উহার মার কাছে দিয়া আসি। তখন অনসুয়া কহিলেন সখি! ও অতি চঞ্চল, তুমি একাকিনী উহারে ধরিতে পারিবে না, চল আমিও যাই। এই বলিয়া উভয়ে প্রস্থানোন্মুখী হইলেন। শকুন্তলা উভয়কেই প্রস্থান করিতে দেখিয়া কহিলেন, সখি। তোমরা দুজনেই আমায় ফেলিয়া চলিলে, আমি এখানে এককিনী রহিলাম। তাঁহারা কহিলেন, সখি! একাকিনী কেন, পৃথিবীনাথকে তোমার নিকটে রাখিয়া গেলাম। এই বলিয়া, হাসিতে হাসিতে, উভয়ে লতামণ্ডপ হইতে প্রস্থান করিলেন।

উভয়ে প্রস্থান করিলে, শকুন্তলা, সত্য সত্যই সখীরা চলি। গেল এই বলিয়া, উৎকণ্ঠিতার ন্যায় হইলেন। রাজা কহিলেন, সুন্দরি! সখীদের নিমিত্ত এত উৎকণ্ঠিত হইতেছ কেন? আমি তোমার সখীস্থানে রহিয়াছি; যখন যে আদেশ করিবে, তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিব। শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ! আপনি অতি মান্য ব্যক্তি, এ দুঃখিনীকে অকারণে অপরাধিনী করেন কেন? এই বলিয়া শয্যা হইতে উঠিয়া, শকুন্তলা গমনোন্মুখী হইলেন। রাজা কহিলেন, সুন্দরি! এ কি কর; একে তোমার অবস্থা এই, তাহাতে আবার মধ্যাহ্ন কাল অতি উত্তাপের সময়; এ অবস্থায় এ সময়ে লতামণ্ডপ হইতে বহির্গত হওয়া কোনও মতেই উচিত নহে। এই বলিয়া হস্তে ধরিয়া, রাজা নিবারণ করিতে লাগিলেন। শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ! ও কি কর, ছাড়িয়া দাও, সখীদের নিকটে যাই; তুমি জান না, আমি আপনার বশ নই। রাজা, লজ্জিত ও সঙ্কুচিত হইয়া, শকুন্তলার হাত ছাড়িয়া দিলেন। শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ! আপনি লজ্জিত হইতেছেন কেন? আমি আপনাকে কিছু বলি নাই, দৈবের তিরস্কার করিতেছি। রাজা কহিলেন, দৈবের তিরস্কার কেন কর? দৈবের অপরাধ কি? শকুন্তলা কহিলেন, দৈবের তিরস্কার শত বার করিব। সে আমায় পরের অধীন করিয়া পরের গুণে মোহিত করে কেন?

এই বলিয়া, শকুন্তলা চলিয়া যাইবার উপক্রম করিলেন। রাজা পুনরায় শকুন্তলার হস্তে ধরিলেন। শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ! কি কর, ইতস্ততঃ ঋষিরা ভ্রমণ করিতেছেন। তখন রাজা কহিলেন, সুন্দরি! তুমি গুরু জনের ভয় করিতেছ কেন? ভগবান্ কণ্ব কখনই কষ্ট বা অসন্তুষ্ট হইবেন না। শত শত রাজর্ষিকন্যারা গান্ধর্ব্ববিধানে আপনাদিগকে অনুরূপ পাত্রের হস্তগত করিয়াছেন, এবং তাঁহাদের গুরুজনেরাও, পরিশেষে সবিশেষ অবগত হইয়া, সম্পূর্ণ অনুমোদন করিয়াছেন। শকুন্তলা, মহারাজ! এই সম্ভাষণমাত্রপরিচিত ব্যক্তিকে ভুলিবেন না এই বলিয়া, রাজার হাত ছাড়াইয়া চলিয়া গেলেন। রাজা কহিলেন, সুন্দরি! তুমি আমার হাত ছাড়াইয়া সম্মুখ হইতে চলিয়া গেলে, কিন্ত‌ু আমার চিত্ত হইতে যাইতে পারিবে না। শকুন্তলা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, ইহা শুনিয়া, আর আমার পা উঠিতেছে না। যাহা হউক, কিয়ৎ ক্ষণ অন্তরালে থাকিয়া ইঁহার অনুরাগ পরীক্ষা করিব। এই বলিয়া, লতাবিতানে আবৃতশরীরা হইয়া, শকুন্তলা কিঞ্চিৎ অন্তরে অবস্থান করিলেন।

রাজা, একাকী লতামণ্ডপে অবস্থিত হইয়া, শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ে! আমি তোমা বই আর জানি না; কিন্তু তুমি নিতান্ত নির্দয় হইয়া আমায় এক বারেই পরিত্যাগ করিয়া গেলে; তুমি বড় কঠিন। পরে, তিনি কিয়ৎ ক্ষণ মৌন ভাবে থাকিয়া কহিলেন, আর প্রিয়াশূন্য লতামণ্ডপে থাকিয়া কি ফল? এই বলিয়া তথা হইতে চলিয়া যান, এমন সময়ে শকুন্তলার মৃণালবলয় ভূতলে পতিত দেখিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা উঠাইয়া লইলেন, এবং পরম সমাদরে বক্ষঃস্থলে স্থাপনপূর্ব্বক, কৃতার্থম্মন্য চিত্তে শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া, কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ে! তোমার মৃণালবলয়, অচেতন হইয়াও, এই দুঃখিত ব্যক্তিকে আশ্বাসিত করিলেক; কিন্ত‌ু তুমি তাহা করিলে না। শকুন্তলা, আর ইহা শুনিয়া বিলম্ব করিতে পারি না, কিন্তু কি বলিয়াই যাই; অথবা, এই মৃণালবলয়ের ছলেই যাই; এই বলিয়া পুনর্বার লতামণ্ডপে প্রবেশ করিলেন। রাজা দর্শনমাত্র হর্ষসাগরে মগ্ন হইয়া কহিলেন, এই যে আমার জীবিতেশ্বরী আসিয়াছেন! বুঝিলাম, দেবতারা আমার পরিতাপ শুনিয়া সদয় হইলেন, তাহাতেই পুনরায় প্রিয়ারে দেখিতে পাইলাম। চাতক পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ হইয়া জলপ্রার্থনা করিল, অমনি নব জলধর হইতে শীতল জলধারা তাহার মুখে পতিত হইল।

শকুন্তলা রাজার সম্মুখবর্ত্তনী হইয়া কহিলেন, মহারাজ! অর্দ্ধ পথে স্মরণ হওয়াতে, আমি এই মৃণালবলয় লইতে আসিয়াছি, আমার মৃণালবলয় দাও। রাজা কহিলেন, যদি তুমি, আমায় যথাস্থানে নিবেশিত করিতে দাও, তোমার মৃণালবলয় তোমায় ফিরিয়া দি, নতুবা দিব না। শকুন্তলা অগত্যা সম্মতা হলেন। রাজা কহিলেন, এস এই শিলাতলে বসিয়া পরাইয়া দি। উভয়ে শিলাতলে উপবিষ্ট হইলেন; রাজা শকুন্তলার হস্ত লইয়া মৃণালবলয় পরাইবার উদেযাগ করিতে লাগিলেন। শকুন্তলা একান্ত আকুলহৃদয় হইয়া কহিলেন, আর্য্যপুত্র! সত্বর হও, সত্বর হও। রাজা, আর্যপুত্রসম্ভাষণ শ্রবণে যৎপরোনান্তি হর্ষ প্রাপ্ত হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, স্ত্রীলোকেরা স্বামীকেই আর্য্যপুত্রশব্দে সম্ভাষণ করিয়া থাকে; বুঝি আমার মনোরথ পূর্ণ হইল। অনন্তর, তিনি শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, সুন্দরি! মৃণালবলয়ের সন্ধি সম্যক্ সংশ্লিষ্ট হইতেছে না; যদি তোমার মত হয়, অন্য প্রকারে সংযোজন করিয়া পরাই। শকুন্তলা ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, তোমার যা অভিরুচি।

রাজা, নানা ছলে বিলম্ব করিয়া, শকুন্তলার হস্তে মৃণাল বলয় পরাইয়া দিলেন এবং কহিলেন, সুন্দরি! দেখ দেখ, কেমন সুন্দর হইয়াছে। শকুন্তলা কহিলেন, দেখিব কি, আমার নয়নে কর্ণোৎপলরেণু পতিত হইয়াছে, দেখিতে পাই না। রাজা ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, যদি তোমার মত হয়, ফুৎকার দিয়া পরিষ্কার করিয়া দি। শকুন্তলা কহিলেন, তাহা হইলে অত্যন্ত উপকৃত হই বটে, কিন্তু তোমায় অত দূর বিশ্বাস হয় না। রাজা কহিলেন, সুন্দরি! অবিশ্বাসের বিষয় কি? নূতন ভৃত্য কি কখনও প্রভুর আদেশের অতিরিক্ত করিতে পারে? শকুন্তলা কহিলেন, ঐ অতিভক্তিই অবিশ্বাসের কারণ। অনন্তর রাজা, শকুন্তলার চিবুকে ও মস্তকে হস্ত প্রদান করিয়া, তাঁহার মুখকমল উত্তোলন করিলেন। শকুন্তলা, শঙ্কিতা ও কম্পিত হইয়া, রাজাকে বারংবার নিষেধ করিতে লাগিলেন। রাজা, সুন্দরি! শঙ্কা কি, এই বলিয়া শকুন্তলার নয়নে ফুৎকার প্রদান করিতে লাগিলেন।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে, শকুন্তলা কহিলেন, আর পরিশ্রম করিতে হইবেক না, আমার নয়ন পূর্ব্ববৎ হইয়াছে; আর কোনও অসুখ নাই। মহারাজ! আমি অত্যন্ত লজ্জিত হইতেছি; তুমি আমার এত উপকার করিলে, আমি তোমার কোনও প্রত্যুপকার করিতে পারিলাম না। রাজা কহিলেন, সুন্দরি! আর কি প্রত্যুপকার চাই? আমি যে তোমার সুরভি মুখকমলের আঘ্রাণ লাভ করিয়াছি, তাহাই আমার পরিশ্রমের যথেষ্ট পুরস্কার হইয়াছে; মধুকর কমলের আঘ্রাণমাত্রেই সন্তুষ্ট হইয়া থাকে। শকুন্তলা ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, সন্তুষ্ট না হইয়াই বা কি করে।

এইরূপ কৌতুক ও কথোপকথন হইতেছে, এমন সময়ে, চক্রবাকবধূ! রজনী উপস্থিত, এই সময়ে চক্রবাককে সম্ভাষণ করিয়া লও; এই শব্দ শকুন্তলার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। শকুন্তলা, সঙ্কেত বুঝিতে পারিয়া, সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ! আমার পিতৃম্বসা আর্যা গৌতমী, আমার অসুস্থতার সংবাদশুনিয়া, আমি কেমন আছি জানিতে আসিতেছেন; এই নিমিত্তই, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা চক্রবাকচক্রবাকীচ্ছলে আমাদিগকে সাবধান করিতেছে; তুমি সত্বর লতামণ্ডপ হইতে নির্গত ও অন্তর্হিত হও। রাজা, ভাল আমি চলিলাম, যেন পুনরায় দেখা হয়, এই বলিয়া, লতবিতানে ব্যবহিত হইয়া, শকুন্তলাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে, শান্তিজলপূর্ণ কমণ্ডলু হস্তে লইয়া, গৌতমী লতামণ্ডপে প্রবেশ করিলেন, এবং শকুন্তলার শরীরে হস্ত প্রদান করিয়া কহিলেন, বাছা! শুনিলাম, আজি তোমার বড় অসুখ হয়েছিল, এখন কেমন আছ, কিছু উপশম হয়েছে? শকুন্তলা কহিলেন, হা ঁপিসি! আজি বড় অসুখ হয়েছিল; এখন অনেক ভাল আছি। তখন গৌতমী, কমণ্ডলু হইতে শান্তিজল লইয়া, শকুন্তলার সর্ব্ব শরীরে সেচন করিয়া কহিলেন, বাছা! সুস্থ শরীরে চিরজীবিনী হয়ে থাক। অনন্তর, লতামণ্ডপে অনসূয়া অথবা প্রিয়ংবদা কাহাকেও সন্নিহিত না দেখিয়া, কহিলেন, এই অসুখ, তুমি একলা আছি বাছা, কেউ কাছে নাই। শকুন্তলা। কহিলেন, না পিসি! আমি একলা ছিলাম না, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা বরাবর আমার নিকটে ছিল; এই মাত্র মালিনীতে জল আনিতে গেল। তখন গৌতমী কহিলেন, বাছা! আর রোদ নাই, অপরাহ্ণ হয়েছে, এস কুটীরে যাই। শকুন্তলা অগত্যা তাঁহার অনুগামিনী হইলেন। রাজাও, আর আমি প্রিয়াশূন্য লতামণ্ডপে থাকিয়া কি করি, এই বলিয়া শিবিরোদ্দেশে প্রস্থান করিলেন।

এই ভাবে কতিপয় দিবস অতিবাহিত হইল। পরিশেষে রাজা, গান্ধর্ব্ব বিধানে শকুন্তলার পাণিগ্রহণসমাধানপূর্ব্বক, ধর্ম্মরণ্যে কিছু দিন অবস্থিতি করিয়া, নিজ রাজধানী প্রস্থান করিলেন।

শকুন্তলা – ৪

রাজা দুষ্মন্ত প্রস্থান করিলে পর, এক দিন অনসূয়া প্রিয়ংবদাকে কহিতে লাগিলেন, সখি! শকুন্তলা গান্ধর্ব্ব বিবাহ দ্বারা আপন অনুরূপ পতি লাভ করিয়াছে বটে; কিন্ত‌ু আমার এই ভাবনা হইতেছে, পাছে রাজা নগরে গিয়া অন্তঃপুরবাসানীদিগের সমাগমে শকুন্তলাকে ভুলিয়া যান। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি! সে সন্দেহ করিও না; তেমন আকৃতি কখনও গুণশূন্য হয় না। কিন্তু আমার আর ভাবনা হইতেছে, না জানি, পিতা আসিয়া, এই বৃত্তান্ত শুনিয়া, কি বলেন। অনসূয়া কহিলেন, সখি! আমার বোধ হইতেছে, তিনি শুনিয়া কষ্ট বা অসন্ত‌ুষ্ট হইবেন না; এ তাঁহার অনভিমত কর্ম্ম হয় নাই। কেন না, তিনি প্রথমাবধি এই সঙ্কল্প করিয়া রাখিয়াছিলেন, গুণবান্ পাত্রে কন্যা প্রদান করিব; যদি দৈবই তাহা সম্পন্ন করিল, তাহা হইলে তিনি বিনা আয়াসে কৃতকার্য্য হইলেন। সুতরাং ইহাতে তাঁহার রোষ বা অসন্তোষের বিষয় কি। উভয়ে, এই রূপ কথোপকথন করিতে করিতে, কুটীরের কিঞ্চিৎ দূরে পুষ্পচয়ন করিতে লাগিলেন।

এ দিকে, শকুন্তলা; অতিথিপরিচর্য্যার ভার গ্রহণ করিয়া, একাকিনী কুটীরদ্বারে উপবিষ্টা আছেন; দৈবযোগে দুর্বাসা ঋষি আসিয়া, তাঁহাকে উদ্দেশ করিয়া, কহিলেন, আমি অতিথি। শকুন্তলা, রাজার চিন্তুায় নিতান্তু মগ্ন হইয়া, এক কালে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়াছিলেন, সুতরাং দুর্ব্বাসার কথা শুনিতে পাইলেন না। দুর্ব্বাসা অবজ্ঞাদর্শনে রোষবশ হইয়া কহিলেন, আঃ পাপীয়সি! তুই অতিথির অবমাননা করিলি। তুই যার চিন্তায় মগ্ন হইয়া আমায় অবজ্ঞা করিলি—আমি অভিশাপ দিতেছি— স্মরণ করাইয়া দিলেও, সে তোরে স্মরণ করিবেক না।

প্রিয়ংবদা, শুনিতে পাইয়া, ব্যাকুল হইয়া কহিতে লাগিলেন, হার! হায়! কি সর্ব্বনাশ ঘটিল। শূন্যহৃদয়া শকুন্তলা কোনও পূজনীয় ব্যক্তির নিকট অপরাধিনী হইল। এই বলিয়া, সেই দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া, প্রিয়ংবদা কহিতে লাগিলেন, সখি! যে সে নয়, ইনি দুর্ব্বাসা, ইঁহার কথায় কথায় কোপ; ঐ দেখ, শাপ দিয়া রোষভরে সত্বরে প্রস্থান করিতেছেন। অনসূয়া কহিলেন, প্রিয়ংবদে! বৃথা আক্ষেপ করিলে আর কি হইবে বল? শীঘ্র গিয়া পায় ধরিয়া ফিরাইয়া আন; আমিও এই অবকাশে, কুটীরে গিয়া, পাদ্য অর্ধ প্রভৃতি প্রস্তুত করিয়া রাখিতেছি। প্রিয়ংবদা দুর্ব্বাসার পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। অনসূয়া কুটীরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন।

অনসূয়া কুটীরে পঁহুছিবার পূর্ব্বেই, প্রিয়ংবদা তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইয়া কহিলেন, সখি! জানই ত দুর্ব্বাসা স্বভাবতঃ অতিকুটিলহৃদয়, তিনি কি কাহারও অনুনয় শুনেন; তথাপি অনেক বিনয়ে কিঞ্চিৎ শান্ত করিয়াছি। যখন দেখিলাম নিতান্ত ফিরিবেন, তখন চরণে ধরিয়া কহিলাম, ভগবন্! সে তোমার কন্যা, তোমার প্রভাব ও মহিমা কি জানে? কৃপা করিয়া তাহার এই অপরাধ ক্ষমা করিতে হইবেক। তখন তিনি কহিলেন, আমি যাহা কহিয়াছি, তাহা অন্যথা হইবার নহে; তবে যদি কোনও অভিজ্ঞান দর্শাইতে পারে, তাহার শাপমোচন হইবেক; এই বলিয়া চলিয়া গেলেন। অনসূয়া কহিলেন, ভাল, এখন আশ্বাসের পথ হইয়াছে। রাজর্ষি প্রস্থানকালে শকুন্তলার অঙ্গুলিতে এক স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় পরাইয়া দিয়া গিয়াছেন। অতএব, শকুন্তলার হস্তেই শকুন্তলার শাপমোচনের উপায় রহিয়াছে। রাজা যদিই বিস্মৃত হন, তাঁহার সেই স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় দেখাইলেই স্মরণ হইবে। উভয়ে এইরূপ কথোপকথন করিতে করিতে,কুটীরাভিমুখে চলিলেন।

কিয়ৎ ক্ষণে, উভয়ে কুটীরদ্বারে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, শকুন্তলা, করতলে কপোল বিন্যাস করিয়া, স্পন্দহীনা, মুদ্রিতনয়না, চিত্রার্পিতার ন্যায়, উপবিষ্টা আছেন। তখন প্রিয়ংবদা কহিলেন, অনসূয়ে! দেখ দেখ, শকুন্তলা পতিচিন্তায় মগ্ন হইয়া এক বারে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া রহিয়াছে; ও কি অতিথি অভ্যাগতের তত্ত্বাবধান করিতে পারে। অনসূয়া কহিলেন, সধি! এ বৃত্তান্ত আমাদেরই মনে মনে থাকুক, কোনও মতে কর্ণান্তর করা হইবেক না; শকুন্তলা শুনিলে প্রাণে বাঁচিবেক না। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি! তুমি কি পাগল হয়েছ? এ কথাও কি শকুন্তলাকে শুনাতে হয়? কোন ব্যক্তি উষ্ণ জলে নবমলিকা সেচন করে?

কিয়ৎ দিন পরে, মহর্ষি কণ্ব সোমতীর্থ হইতে প্রত্যাগমন করিলেন। এক দিন তিনি, অগ্নিগৃহে প্রবিষ্ট হইয়া, হোমকার্য্য সম্পাদন করিতেছেন, এমন সময়ে এই দৈববাণী হইল—মহর্ষে! রাজা দুষ্মন্ত, মৃগয়া উপলক্ষে তোমার ওপোবন আসিয়া, শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়া গিয়াছেন এবং শকুন্তলাও তৎসহযোগে গর্ভবতী হইয়াছেন। মহর্ষি, এই রূপে শকুন্তলার পরিণয়বৃত্তান্ত অবগত হইয়া, তাঁহার অগোচরে ও সম্মতি ব্যতিরেকে সম্পন্ন হইয়াছে বলিয়া, কিঞ্চিন্মাত্র ৱোষ বা অসন্তোষ প্রদর্শন করিলেন না; বরং যৎপরোনাস্তি প্রীত হইয়া কহিতে লাগিলেন, আমার পরম সৌভাগ্য যে শকুন্তলা এতাদৃশ সৎপাত্রের হস্তগত হইয়াছে। অনন্তর তিনি, প্রফুল্ল বদনে শকুন্তলার নিকটে গিয়া, সাতিশয় পরিতোষ প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, বৎসে! তোমার পরিণয়বৃত্তান্ত অবগত হইয়া অনির্বচনীয় প্রীতি প্রাপ্ত হইয়াছি, এবং স্থির করিয়াছি, অবিলম্বে দুই শিষ্য ও গৌতমীকে সমভিব্যাহারে দিয়া, তোমায় ভর্ত্তৃসন্নিধানে পাঠাইয়া দিব। অনন্তর, তদীয় আদেশ ক্রমে শকুন্তলার প্রস্থানের উদেযাগ হইতে লাগিল।

প্রস্থানসময় উপস্থিত হইল। গৌতমী, এবং শার্ঙ্গরব ও শারদ্বত নামে দুই শিষ্য, শকুন্তলাসমভিব্যাহারে গমনের নিমিত্ত প্রস্তুত হইলেন। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা যথাসম্ভব বেশ ভূষা সমাধান করিয়া দিলেন। মহর্ষি শোকাকুল হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, অদ্য শকুন্তলা যাইবে বলিয়া, আমার মন উৎকণ্ঠিত হইতেছে, নয়ন অনবরত বাষ্পবারিতে পরিপূর্ণ হইতেছে, কণ্ঠরোধ হইয়া বাক‍্শক্তিরহিত হইতেছি, জড়তায় নিতান্ত অভিভূত হইতেছি। কি আশ্চার্য্য! আমি বনবাসী, স্নেহবশতঃআমারও ঈদৃশ বৈপ্লব্য উপস্থিত হইতেছে, না জানি সংসারীরা এমন অবস্থায় কি দুঃসহ ক্লেশ ভোগ করিয়া থাকে। বুঝিলাম, স্নেহ অতি বিষম বস্তু। পরে শোকাবেগ সংবরণ করিয়া, শকুন্তলাকে কহিলেন বৎসে! বেলা হইতেছে, প্রস্থান কর; আর অনর্থ কালহরণ করিতেছ কেন? এই বলিয়া তপোবনতরুদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন হে সন্নিহিত তরুগণ! যিনি তোমাদের জলসেচন না করিয়া কদাচ জলপান করিতেন না, যিনি ভূষণপ্রিয়া হইয়াও স্নেহবশতঃ কদাচ তোমাদের পল্লবভঙ্গ করিতেন না, তোমাদের কুসুমপ্রসবের সময় উপস্থিত হইলে, যাঁহার আনন্দের সীমা থাকিত না, অদ্য সেই শকুন্তলা পতিগৃহে যাইতেছেন, তোমরা সকলে অনুমোদন কর। অনন্তর, সকলে গাত্রোথান করিলেন। শকুন্তলা, গুরুজনদিগকে প্রণাম করিয়া, প্রিয়ংবদার নিকটে গিয়া অশ্রুপূর্ণ নয়নে কহিতে লাগিলেন, সখি! আর্য্যপুত্রকে দেখিবার নিমিত্ত, আমার চিত্ত অত্যন্ত ব্যগ্র হইয়াছে বটে, কিন্তু তপোবন পরিত্যাগ করিয়া যাইতে আমার পা উঠিতেছে না। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি! তুমিই যে কেবল তপোবনবিরহে কাতর হইতেছ এরূপ নহে, তোমার বিরহে তপোবনের কি অবস্থা ঘটিতেছে, দেখ!— জীবমাত্রেই নিরানন্দ ও শোকাকুল; হরিণগণ, আহারবিহারে পরাঙ্মুখ হইয়া, স্থির হইয়া রহিয়াছে, মুখের গ্রাস মুখ হইতে পড়িয়া যাইতেছে; ময়ুর ময়ূরী, নৃত্য পরিত্যাগ করিয়া, উর্দ্ধমুখ হইয়া রহিয়াছে; কোকিলগণ, আম্রমুকুলের রসাস্বাদে বিমুখ হইয়া, নীরব হইয়া আছে; মধুকর মধুকরী মধুপানে বিরত হইয়াছে ও গুন্ গুন্ ধ্বনি পরিত্যাগ করিয়াছে।

কণ্ব কহিলেন, বৎসে! আর কেন বিলম্ব কর, বেলা হয়। তখন শকুন্তলা কহিলেন, তাত! বনতোষিণীকে সম্ভাষণ না করিয়া যাইব না। এই বলিয়া, তিনি বনতোষিণীর নিকটে গিয়া কহিলেন, বনতোষিণি! শাখাবাহু দ্বারা আমায় স্নেহভরে আলিঙ্গন কর; আজি অবধি আমি দূরবর্ত্তিনী হইলাম। অনন্তর, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাকে কহিলেন, সখি! আমি বনতোষিণীকে তোমাদের হস্তে সমর্পণ করিলাম। তাঁহারা কহিলেন, সখি! আমাদিগকে কাহার হস্তে সমর্পণ করিলে বল? এই বলিয়া শোকাকুল হইয়া রোদন করিতে লাগিলেন। তখন কণ্ব কহিলেন, অনসূয়ে! প্রিয়ংবদে! তোমরা কি পাগল হইলে? তোমরা কোথায় শকুন্তলাকে সান্তনা করিবে, না তোমরাই রোদন করিতে আরম্ভ করিলে।

এক পূর্ণগর্ভা হরিণী কুটীরের প্রান্তে শয়ন করিয়া ছিল। তাহার দিকে দৃষ্টিপাত হওয়াতে, শকুন্তলা কণ্বকে কহিলেন, তাত! এই হরিণী নির্বিঘ্নে প্রসব হইলে, আমায় সংবাদ দিবে, ভুলিবে না বল? কণ্ব কহিলেন, না বৎসে! আমি কখনই বিস্মৃত হইব না।

কয়েক পদ গমন করিয়া, শকুন্তলার গতিভঙ্গ হইল। শকুন্তলা, আমার অঞ্চল ধরিয়া কে টানে, এই বলিয়া মুখ ফিরাইলেন। কন্ব কহিলেন, বংসে! যাহার মাতৃবিয়োগ হইলে, তুমি জননীর ন্যায় প্রতিপালন করিয়াছিলে; যাহার আহারের নিমিত্ত তুমি সর্ব্বদা শ্যামাক আহরণ করিতে; যাহার মুখ কুশের অগ্রভাগ দ্বারা ক্ষত হইলে, তুমি ইঙ্গুলীতৈল দিয়া ব্রণশোষণ করিয়া দিতে; সেই মাতৃহীন হরিণশিশু তোমার গমন রোধ করিতেছে। শকুন্তলা তাহার গাত্রে হস্ত প্রদান করিয়া কহিলেন, বাছা! আর আমার সঙ্গে এস কেন, ফিরিয়া যাও, আমি তোমায় পরিত্যাগ করিয়া যাইতেছি, তুমি মাতৃহীন হইলে, আমি তোমায় প্রতিপালন করিয়াছিলাম; এখন আমি চলিলাম; অতঃপর পিতা তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন। এই বলিয়া, শকুন্তলা রোদন করিতে করিতে চলিলেন। তখন কণ্ব কহিলেন, বৎসে! শান্ত হও, অশ্রুবেগ সংবরণ কর, পথ দেখিয়া চল; উচ্চ নীচ না দেখিয়া পদক্ষেপ করাতে, বারংবার আঘাত লাগিতেছে।

এইরূপ নানা কারণে মনের বিলম্ব দেখিয়া, শার্ঙ্গরব কণ্বকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভগবন্! আপনকার আর অধিক দূর সঙ্গে আসিবার প্রয়োজন নাই, এই স্থলেই, যাহা বলিতে হয়, বলিয়া দিয়া প্রতিগমন করুন। কণ্ব কহিলেন, তবে আইস, এই ক্ষীরবৃক্ষের ছায়ায় দণ্ডায়মান হই। তদনুসারে, সকলে সন্নিহিত ক্ষীরপাদপের ছায়ায় অবস্থিত হইলে, কণ্ব কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া শার্ঙ্গরবকে কহিলেন, বৎস! তুমি, শকুন্তলাকে রাজার সম্মুখে রাখিয়া তাঁহারে আমার এই আবেদন জানাইবে—আমরা বনবাসী, তপস্যায় কালযাপন করি; তুমি অতি প্রধান বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছ; আর শকুন্তলা বন্ধুবর্গের অগোচরে স্বেচ্ছাক্রমে তোমাতে অনুরাগিণী হইয়াছে; এই সমস্ত বিবেচনা করিয়া, অন্যান্য সহধর্ম্মিণীর ন্যায়, শকুন্তলাতেও স্নেহদৃষ্টি রাখিবে; আমাদের এই পর্য্যন্ত প্রার্থনা; ইহার অধিক ভাগ্যে থাকে ঘটিবেক, তাই আমাদের বলিয়া দিবার নয়।

মহর্ষি, শার্ঙ্গরবের প্রতি এই সন্দেশ মির্দেশ করিয়া, শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎসে! এক্ষণে তোমারেও কিছু উপদেশ দিব। আমরা বনবাসী বটে, কিন্তু লৌকিক ব্যাপারে নিতান্ত অনভিজ্ঞ নহি। তুমি পতিগৃহে গিয়া গুরুজনদিগের শুশ্রুষা করিবে, সপত্নীদিগের সহিত প্রিয়সখীব্যবহার করিবে, পরিচারিণীদিগের প্রতি সম্পূর্ণ দয়া দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করিবে, সৌভাগ্যগর্ব্বে গর্ব্বিত হইবে না, স্বামী কার্কশ্যপ্রদর্শন করিলেও রোষবশা ও প্রতিকূলচারিণী হইবে না; মহিলারা এরূপ ব্যবহারিণী হইলেই গৃহিণীপদে প্রতিষ্ঠিত হয়; বিপরীতকারিণীরা কুলের কণ্টকস্বরূপ। ইহা কহিয়া, বলিলেন, দেখ গৌতমীই বা কি বলেন? গৌতমী কহিলেন, বধুদিগকে এই বই আর কি কহিয়া দিতে হইবেক? পরে শকুন্তলাকে কহিলেন, বাছা! উনি যেগুলি বলিলেন, সকল মনে রাখিও।

এই রূপে উপদেশদান সমাপ্ত হইলে, কণ্ব শকুন্তলাকে কহিলেন, বৎসে! আমরা আর অধিক দূর যাইব না; আমাকে ও সখীদিগকে আলিঙ্গন কর। শকুন্তলা অশ্রুপূর্ণ নয়নে কহিলেন, অনসূয়া প্রিয়ংবদাও কি এই খান হইতে ফিরিয়া যাইবে? ইহারা সে পর্য্যন্ত আমার সঙ্গে যাউক। কণ্ব কহিলেন, না বৎসে! ইহাদের বিবাহ হয় নাই, অতএব সে পর্য্যন্ত যাওয়া ভাল দেখায় না; গৌতমী তোমার সঙ্গে যাবেন। শকুন্তলা পিতাকে আলিঙ্গন করিয়া, গদগদ স্বরে কহিলেন, তাত! তোমাকে না দেখিয়া, সেখানে কেমন করিয়া প্রাণধারণ করিব। এই বলিতে বলিতে, তাঁহার দুই চক্ষে ধারা বহিতে লাগিল। তখন কণ্ব অশ্রুপূর্ণ নয়নে কহিলেন, বৎসে! এত কাতর হইতেছ কেন? তুমি পতিগৃহে গিয়া গৃহিণীপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া, সাংসারিক ব্যাপারে অনুক্ষণ এরূপ ব্যস্ত থাকিবে যে, আমার বিরহজনিত শোক অনুভব করিবার অবকাশ পাইবে না। শকুন্তলা পিতার চরণে নিপতিত হইয়া কহিলেন, তাত! আবার কত দিনে এই তপোবনে আসিব? কণ্ব কহিলেন, বৎসে! সসাগরা ধরিত্রীর একাধিপতির মহিষী হইয়া, এবং অপ্রতিহতপ্রভাব স্বীয় তনয়কে সিংহাসনে সন্নিবেশিত ও তদীয় হস্তে সমস্ত সাম্রাজ্যের ভার সমর্পিত দেখিয়া, পতিসমভিব্যাহারে পুনরায় এই শান্তরসাস্পদ তপোবনে আসিবে।

শকুন্তলাকে এইরূপ শোকাকুলা দেখিয়া গৌতমী কহিলেন, বাছা! আর কেন, ক্ষান্ত হও, যাবার বেলা বহিয়া যায়; সখীদিগকে যাহা বলিতে হয় বলিয়া লও, আর বিলম্ব করা হয় না। তখন শকুন্তলা সখীদিগের নিকটে গিয়া কহিলেন, সখি! তোমরা উভয়ে এক কালে আলিঙ্গন কর। উভয়ে আলিঙ্গন করিলেন। তিন জনেই রোদন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে, সখীরা শকুন্তলাকে কহিলেন, সখি! যদি রাজা শীঘ্র চিনিতে না পারেন, তাঁহাকে তাঁহার স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় দেখাইও। শকুন্তলা শুনিয়া আতিশয় শঙ্কিত হইয়া কহিলেন, সখি! তোমরা এমন কথা বলিলে কেন, বল? তোমাদের কথা শুনিয়া আমার হৃৎকম্প হইতেছে। সখীরা কহিলেন, না সখি! ভীত হইও না; স্নেহের স্বভাবই এই, অকারণে অনিষ্ট আশঙ্কা করে।

এই রূপে ক্রমে ক্রমে সকলের নিকট বিদায় লইয়া, শকুস্তলা গৌতমীপ্রভৃতি সমভিব্যাহারে দুষ্মন্তরাজধানী প্রতি প্রস্থান করিলেন। কণ্ব, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা একদৃষ্টিতে শকুন্তলার দিকে চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে ক্রমে শকুন্তলা দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইলে, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা উচ্চৈঃ স্বরে রোপন করিতে লাগিলেন। মহর্ষি দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন, অনসূয়ে! প্রিয়ংবদে! তোমাদের সহচরী প্রস্থান করিয়াছেন; এক্ষণে শোকাবেগ সংবরণ করিয়া, আমার সাহিত আশ্রমে প্রতিগমন কর। এই বলিয়া মহর্ষি আশ্রমাভিমুখে প্রস্থান করিলেন, এবং তাঁহারাও তাঁহার অনুগামিনী হইলেন। যাইতে যাইতে, মহর্ষি মনে মনে কহিতে লাগিলেন, যেমন স্থাপিত ধন ধনস্বামীকে প্রত্যর্পণ করিলে, লোক নিশ্চিন্ত ও সুস্থ হয়, তদ্রপ, অদ্য আমি শকুন্তলাকে পতিগৃহে প্রেরণ করিয়া নিশ্চিন্ত ও সুস্থ হইলাম।

শকুন্তলা – ৫

এক দিন রাজা দুষ্মন্ত রাজকার্যসমাধানান্তে একান্তে আসীন হইয়া, প্রিয়বয়স্য মাধব্যের সহিত কথোপকথনরসে কালযাপন করিতেছেন; এমন সময়ে, হংসপদিকা নামে এক পরিচারিকা সঙ্গীতশালায় অতি মধুর স্বরে এই ভাবের গান করিতে লাগিল, অহে মধুকর! অভিনব মধু লোভে সহকারমঞ্জরীতে তাদৃশ প্রণয় প্রদর্শন করিয়া, এখন, কমলমধু পানে পরিতৃপ্ত হইয়া, উহারে একবারে বিস্মৃত হইলে কেন?

হংসপদিকার গীতি শ্রবণ করিয়া, রাজা অকস্মাৎ যৎপরোনাস্তি উন্মনাঃ হইলেন; কিন্তু, কি নিমিত্ত উন্মনাঃ হইতেছেন তাহার কিছুই অনুধাবন করিতে না পারিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কেন এই মনোহর গীত শ্রবণ করিয়া আমার চিত্ত এমন আকুল হইতেছে? প্রিয়জনবিরহ ব্যতিরেকে মনের এরূপ আকুলতা হয় না, কিন্তু প্রিয়বিরহও উপস্থিত দেখিতেছি না। অথবা, মনুষ্য, সর্ব্ব প্রকারে সুখী হইয়াও, রমণীয় বস্তু দর্শন কিংবা মনোহর গীত শ্রবণ করিয়া, যে অকস্মাৎ আকুলহৃদয় হয়, বোধ করি, অনতিপরিস্ফুট রূপে জন্মান্তরীণ স্থির সৌহৃদ্য তাহার স্মৃতিপথে আরূঢ় হয়।

রাজা মনে মনে এই বিতর্ক করিতেছেন, এমন সময়ে কঞ্চুকী আসিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিল, মহারাজ! ধর্ম্মারণ্যবাসী তপস্বীরা, মহর্ষি কণ্বের সন্দেশ লইয়া, আসিয়াছেন, কি আজ্ঞা হয়। রাজা, তপস্বিশব্দ শ্রবণমাত্র, অতিমাত্র আদর প্রদর্শনপূর্ব্বক কহিলেন, শীঘ্র উপাধ্যায় সোমরতকে বল, অভ্যাগত তপস্বীদিগকে, বেদবিধি অনুসারে সৎকার করিয়া, অবিলম্বে আমার নিকটে লইয়া আইসেন; আমিও ইত্যবকাশে তপস্বিদর্শনযোগ্য প্রদেশে গিয়া রীতিমত অবস্থিতি করিতেছি।

এই আদেশ প্রদান পূর্ব্বক কঞ্চুকীকে বিদায় করিয়া, রাজা অগ্নিগৃহে গিয়া অবস্থিতি করিলেন এবং কহিতে লাগিলেন, ভগবান্ কণ্ব কি নিমিত্ত আমার নিকট ঋষি প্রেরণ করিলেন? কি তাঁহাদের তপস্যার বিঘ্ন ঘটিয়াছে, কি কোনও দুরাত্মা তাঁহাদের উপর কোনও প্রকার অত্যাচার করিয়াছে? কিছুই নির্ণয় করিতে না পারিয়া, আমার মন অত্যন্ত আকুল হইতেছে। পার্শ্ববর্ত্তিনী পরিচারিকা কহিল, মহারাজ! আমার বোধ হইতেছে, ধর্ম্মারণ্যবাসী ঋষিরা মহারাজের অধিকারে নির্বিঘ্নে ও নিরাকুল চিত্তে, তপস্যার অনুষ্ঠান করিতেছেন; এই হেতু, প্রীত হইয়া, মহারাজকে ধন্যবাদ দিতে ও আশীর্বাদ করিতে আসিয়াছেন। এবম্প্রকার কথোপকথন হইতেছে, এনন সময়ে সোমরাত, তপস্বীদিগকে সমভিব্যাহারে করিয়া, উপস্থিত হইলেন। রাজা, দুর হইতে দেখিতে পাইয়া, আসন হইতে গাত্রোত্থান করিলেন এবং তাঁহাদের আগমনপ্রতীক্ষায় দণ্ডায়মান রহিলেন। তদ্দর্শনে সোমরাত তপস্বীদিগকে কহিলেন, ঐ দেখুন, সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধিপতি, আসন পরিত্যাগপূর্ব্বক দণ্ডায়মান হইয়া, আপনাদের প্রতীক্ষা করিতেছেন। শার্ঙ্গরব কহিলেন, নরপতিদিগের এরূপ বিনয় ও সৌজন্য দেখিলে সাতিশয় প্রীত হইতে হয় এবং অত্যন্ত প্রশংসা করিতে ও সাধুবাদ দিতে হয়। অথবা ইহার বিচিত্র কি—তরুগণ ফলিত হইলে ফলভরে অবনত হইয়া থাকে; বর্ষাকালীন জলধরগণ বারিভরে নম্র ভাব অবলম্বন করে; সৎপুরুষদিগেরও প্রথা এই, সমৃদ্ধিশালী হইলে অনুদ্ধত স্বভাব হয়েন।

শকুন্তলার দক্ষিণ চক্ষু স্পন্দিত হইতে লাগিল। তিনি সাতিশয় শঙ্কিতা হইয়া গৌতমীকে কহিলেন, পিসি! আমার ডানি চোক নাচিতেছে কেন? গৌতমী কহিলেন, বৎসে! শঙ্কিতা হইও না, পতিকুলদেবতারা তোমার মঙ্গল করিবেন। যাহা হউক, শকুন্তলা তদবধি, মনে মনে নানাপ্রকার আশঙ্কা করিতে লাগিলেন ও অত্যন্ত আকুলহৃদয় হইলেন।

রাজা শকুন্তলাকে দেখিয়া কহিতে লাগিলেন, এই অবগুণ্ঠনবতী কামিনী কে? কি নিমিত্তই বা ইনি তপস্বীদিগের সমভিব্যাহারে আসিয়াছেন? পার্শ্ববর্ত্তিনী পরিচারিকা কহিল, মহারাজ! আমিও দেখিয়া অবধি নানা বিতর্ক করিতেছি, কিন্তু কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। যা হউক, মহারাজ! এরূপ রূপ লাবণ্যের মাধুরী কখনও কাহারও নয়নগোচর হয় নাই। রাজা কহিলেন, ও কথা ছাডিয়া দাও, পরস্ত্রীতে দৃষ্টিপাত বা পরস্ত্রীর কথা লইয়া আন্দোলন করা কর্তব্য নহে। এ দিকে, শকুন্তলা আপনার অস্থির হৃদয়কে এই বলিয়া সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন, হৃদয়! এত আকুল হইতেছ কেন? আর্য্যপুত্রের তৎকালীন ভাব মনে করিয়া আশ্বাসিত হও, ও ধৈর্য্য অবলম্বন কর।

তাপসেরা ক্রমে ক্রমে সন্নিহিত হইয়া, মহারাজের জয় হউক বলিয়া, হস্ত তুলিয়া, আশীর্বাদ করিলেন। রাজা প্রণাম করিয়া ঋষিদিগকে আসন পরিগ্রহ করিতে কহিলেন! অনন্তর সকলে উপবেশন করিলে, রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন, নির্বিঘ্নে তপস্যা সম্পন্ন হইতেছে? ঋষিরা কহিলেন, মহারাজ আপনি শাসনকর্তা থাকিতে, ধর্ম্মক্রিয়ার বিঘ্নসম্ভাবনা কোথায়? সূর্য্যদেবের উদয় হইলে কি অন্ধকারের আবির্ভাব হইতে পারে? রাজা শুনিয়া কৃতার্থম্মন্য হইয়া কহিলেন, অদ্য আমার রাজশব্দ সার্থক হইল। পরে, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন ভগবান্ কণ্বের কুশল? ঋষিরা কহিলেন, হাঁ মহারাজ! মহর্ষি সর্ব্বাংশেই কুশলী।

এই রূপে প্রথমসমাগমোচিত শিষ্টাচারপরম্পরা পরিসমাপ্ত হইলে, শার্ঙ্গরব কহিলেন, মহারাজ! আমাদের গুরুদেবের যে সন্দেশ লইয়া আসিয়াছি, নিবেদন করি, শ্রবণ করুন, মহর্ষি কহিয়াছেন, আপনি আমার অনুপস্থিতিকালে শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন; আমি, সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, তদ্বিষয়ে সম্পূর্ণ সম্মতি প্রদান করিয়াছি; আপনি সর্ব্বাংশে আমার শকুন্তলার যোগ্য পাত্র; এক্ষণে আপনকার সহধর্মিণী অন্তঃসত্ত্বা হইয়াছেন, গ্রহণ করুন। গৌতমীও কহিলেন, মহারাজ! আমি কিছু বলিতে চাই, কিন্তু বলিবার পথ নাই; শকুন্তলাও গুরুজনের অপেক্ষা রাখে নাই; তুমিও তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর নাই; তোমরা পরস্পরের সম্মতিতে যাহা করিয়াছ, তাহাতে অন্যের কথা কহিবার কি আছে।

শকুন্তলা, মনে মনে শঙ্কিতা ও কম্পিতা হইয়া, এই ভাবিতে লাগিলেন, না জানি আর্য্যপুত্র এখন কি বলেন। রাজা দুর্ব্বাসার শাপপ্রভাবে শকুন্তলাপরিণয়বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বিস্মৃত হইয়াছিলেন, সুতরাং শুনিয়া বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিলেন, এ আবার কি উপস্থিত! শকুন্তলা এক বারে ম্রিয়মাণ হইলেন। শার্ঙ্গরব কহিলেন, মহারাজ! লৌকিক ব্যবহার বিলক্ষণ অবগত হইয়াও, আপনি এরূপ কহিতেছেন কেন? আপনি কি জানেন না যে, পরিণীতা নারী যদিও অত্যন্ত সাধুশীলা হয়, সে নিয়ত পিতৃকুলবাসিনী হইলে, লোকে নানা কথা কহিয়া থাকে; এই নিমিত্ত, সে পতির অপ্রিয় হইলেও, পিতৃপক্ষ তাহাকে পতিকুলবাসিনী করিতে চাহে।

রাজা কহিলেন, কই আমি ত ইঁহার পাণিগ্রহণ করি নাই। শকুন্তলা শুনিয়া, বিষাদসাগরে মগ্ন হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, হৃদয়! যে আশঙ্কা করিতেছিলে, তাহাই ঘটিয়াছে। শার্ঙ্গরব, রাজার অস্বীকারশ্রবণে, তদীয় ধূর্ত্ততা আশঙ্কা করিয়া যৎপরোনাস্তি কুপিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ! জগদীশ্বর আপনাকে ধর্ম্মসংস্থাপনকার্য্যে নিয়োজিত করিয়াছেন। অন্যে অন্যায় করিলে, আপনি দণ্ডবিধান করিয়া থাকেন। এক্ষণে আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, রাজা হইয়া অনুষ্ঠিত কার্য্যের অপলাপে প্রবৃত্ত হইলে, ধর্ম্মদ্রোহী হইতে হয় কি না? রাজা কহিলেন, আপনি আমায় এত অভদ্র স্থির করিতেছেন কেন? শার্ঙ্গরব কহিলেন, মহারাজ! আপনকার অপরাধ নাই, যাহারা ঐশ্বর্য্য মদে মত্ত হয়, তাহাদের এইরূপই স্বভাব ও এইরূপই আচরণ হইয়া থাকে। রাজা কহিলেন, আপনি অন্যায় ভর্ৎসনা করিতেছেন, আমি কোনও ক্রমে এরূপ ভর্ৎসনার যোগ্য নহি।

এই রূপে রাজাকে অস্বীকারপরায়ণ ও শকুন্তলাকে লজ্জায় অবনতমুখী দেখিয়া, গৌতমী শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎসে! লজ্জিত হইও না; আমি তোমার মুখের ঘোমটা খুলিয়া দিতেছি, তাহা হইলে মহারাজ তোমায় চিনিতে পারিবেন। এই বলিয়া, তিনি শকুন্তলার মুখের অবগুণ্ঠন খুলিয়া দিলেন। রাজা তথাপি চিনিতে পারিলেন না, বরং পূর্ব্বাপেক্ষায় সমধিক সংশয়ারূঢ় হইয়া, মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন শর্ঙ্গরব কহিলেন, মহারাজ! এরূপ মৌনভাবে রহিলেন কেন? রাজা কহিলেন, মহাশয়! কি করি বলুন; অনেক ভাবিয়া দেখিলাম, কিন্তু ইহার পাণিগ্রহণ করিয়াছি বলিয়া কোনও ক্রমেই স্মরণ হইতেছে না; সুতরাং, কি প্রকারে ইহারে ভার্য্যা বলিয়া পরিগ্রহ করি; বিশেষতঃ, ইনি এক্ষণে অন্তঃসত্ত্বা হইয়াছেন।

রাজার এই বচনবিন্যাস শ্রবণ করিয়া, শকুন্তলা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, হায়, কি সর্ব্বনাশ! এক বারে পাণিগ্রহণেই সন্দেহ! রাজমহিষী হইয়া, অশেষ সুখসম্ভোগে কালহরণ করিব বলিয়া, যত আশা করিয়াছিলাম, সমুদায় এক কালে নির্মূল হইল। শার্ঙ্গরব কহিলেন, মহারাজ! বিবেচনা করুন, মহর্ষি কেমন মহানুভবতা প্রদর্শন করিয়াছেন। আপনি তাঁহার অগাচরে তদীয় অনুমতিনিরপেক্ষ হইয়া তাঁহার কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন; তিনি, তাহাতে রোষ বা অসন্তোষ প্রদর্শন না করিয়া, বরং সন্তোষ প্রদর্শন করিয়াছেন এবং কন্যারে আপনার নিকট পাঠাইয়া দিয়াছেন। এক্ষণে প্রত্যাখ্যান করিয়া, তাদৃশ সদাশয় মহানুভাবের অবমাননা করা মহারাজের কোনও মতেই কর্ত্তব্য নহে। আপনি, স্থির চিত্তে বিবেচনা করিয়া, কর্তব্যনির্ধারণ করুন।

শারদ্বত শর্ঙ্গরব অপেক্ষা উদ্ধতস্বভাব ছিলেন। তিনি কহিলেন, অহে শর্ঙ্গরব! স্থির হও, আর তোমার বৃথা বাগ‍্জাল বিস্তার করিবার প্রয়োজন নাই। আমি এক কথায় সকল বিষয়ের শেষ করিতেছি। এই বলিয়া, তিনি শকুন্তলার দিকে মুখ ফিরাইয়া কহিলেন, শকুন্তলে! আমাদের যাহা বলিবার বলিয়াছি; মহারাজ এইরূপ কহিতেছেন; এক্ষণে তোমার যাহা বক্তব্য থাকে বল, এবং যাহাতে উঁহার প্রতীতি জন্মে, এরূপ কর। তখন শকুন্তলা অতি মৃদু স্বরে কহিলেন, যখন তাদৃশ অনুরাগ এতদৃশ ভাব অবলম্বন করিয়াছে, তখন আমি পূর্ব্ববৃত্তান্ত স্মরণ করাইয়া কি করিব; কিন্তু আত্মশোধন আবশ্যক, এই নিমিত্ত কিছু বলিতেছি। এই বলিয়া, রাজাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আর্যপুত্র! এইমাত্র কহিয়া কিঞ্চিৎ স্তব্ধ হইয়া কহিলেন; যখন পরিণয়েই সন্দেহ জন্মিয়াছে, তখন আর আর্য্যপুত্রশব্দে সম্ভাষণ করা অবিধেয়। এই বলিয়া পুনর্বার কহিলেন, পৌরব! আমি সরলহৃদয়া, ভাল মন্দ কিছুই জানি না। তৎকালে তপোবনে তাদৃশী অমায়িকতা দেখাইয়া, ও ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়া, এক্ষণে এরূপ দুর্বাক্য কহিয়া প্রত্যাখ্যান করা তোমার উচিত নহে।

রাজা শুনিয়া কিঞ্চিৎ কোপাবিষ্ট হইয়া কহিলেন, ঋষিতনয়ে! যেমন বর্ষাকালীন নদী তীরতরুকে পাতিত ও আপনার প্রবাহকেও পঙ্কিল করে, সেইরূপ তুমি আমায় পতিত ও আপন কুলকেও কলঙ্কিত করিতে উদ্যত হইয়াছ। শকুন্তলা কহিলেন, ভাল, যদি তুমি, যথার্থই পরিণয়ে সন্দেহ করিয়া, পরস্ত্রীবোধে পরিগ্রহ করিতে শঙ্কিত হও, কোনও অভিজ্ঞান দর্শাইয়া তোমার শঙ্কা দুর করিতেছি। রাজা কহিলেন, এ উত্তম কল্প, কই কি অভিজ্ঞান দেখাইবে, দেখাও। শকুন্তলা রাজদত্ত অঙ্গুরীয় অঞ্চলের কোণে বাঁধিয়া রাখিয়াছিলেন; এক্ষণে ব্যস্ত হইয়া অঙ্গুরীয় খুলিতে গিয়া দেখিলেন, অঞ্চলের কোণে অঙ্গুরীয় নাই। তখন তিনি বিষণ্ণা ও ম্লানবদনা হইয়া, গৌতমীর মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। গৌতমী কহিলেন, বোধ হয়, আল‍্গা বাঁধা ছিল, নদীতে স্নান করিবার সময় পড়িয়া গিয়াছে।

রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, স্ত্রীজাতি অত্যন্ত প্রত্যুৎপন্নমতি, এই যে কথা প্রসিদ্ধ আছে, ইহা তাহার এক উত্তম উদাহরণ।

শকুন্তলা রাজার এইরূপ ভাব দর্শনে ম্রিয়মাণ হইয়া কহিলেন, আমি দৈবের প্রতিকূলতা বশতঃ অঙ্গুরীয়প্রদর্শনবিষয়ে অকৃতকার্য্য হইলাম বটে; কিন্তু এমন কোনও কথা বলিতেছি যে, তাহা শুনিলে অবশ্যই তোমার পূর্ব্ববৃত্তান্ত স্মরণ হইবেক। রাজা কহিলেন, এক্ষণে শুনা আবশ্যক; কি বলিয়া আমার প্রতীতি জন্মাইতে চাও, বল। শকুন্তলা কহিলেন, মনে করিয়া দেখ, এক দিন তুমি ও আমি দুজনে নবমালিকামণ্ডপে বসিয়া ছিলাম। তোমার হস্তে একটি জলপূর্ণ পদ্মপত্রের ঠোঙা ছিল। রাজা কহিলেন, ভাল, বলিয়া যাও, শুনিতেছি। শকুন্তলা কহিলেন, সেই সময়ে আমার কৃতপুত্র দীর্ঘাপাঙ্গ নামে মৃগশাবক তথায় উপস্থিত হইল। তুমি উহারে সেই জল পান করিতে আহ্বান করিলে। তুমি অপরিচিত বলিয়া সে তোমার নিকটে আসিল না; পরে আমি হস্তে করিলে, আসিয়া অনায়াসে পান করিল। তখন তুমি পরিহাস করিয়া কহিলে, সকলেই সজাতীয়ে বিশ্বাস করিয়া থাকে; তোমরা দুজনেই জঙ্গলা, এজন্য ও তোমার নিকটে আসিল। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, কামিনীদিগের এইরূপ মধুমাখা প্রবঞ্চনাবাক্য বিষয়াসক্ত ব্যক্তিদিগের বশীকরণমন্ত্রস্বরূপ। গৌতমী শুনিয়া কিঞ্চিৎ কোপ প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, মহারাজ! এ জন্মাবধি তপোবনে প্রতিপালিত, প্রবঞ্চনা কাকে বলে জানে না। রাজা কহিলেন, অয়ি বুদ্ধতাপসি! প্রবঞ্চনা স্ত্রীজাতির স্বভাবসিদ্ধ বিদ্যা, শিথিতে হয় না; মানুষের কথা কি কহিব, পশু পক্ষীদিগেরও বিনা শিক্ষায় প্রবঞ্চনানৈপুণ্য দেখিতে পাওয়া যায়। দেখ, কেহ শিখাইয়া দেয় না, অথচ কোকিলারা, কেমন প্রবঞ্চনা করিয়া, স্বীয় সন্তানদিগকে অন্য পক্ষী দ্বারা প্রতিপালিত করিয়া লয়। শকুন্তলা কষ্ট হইয়া কহিলেন; অনার্য্য! তুমি আপনি যেমন, অন্যকেও সেইরূপ মনে কর। রাজা কহিলেন, তাপসকন্যাে! দুষ্মন্ত গোপনে কোনও কর্ম্ম করে না; যখন যাহা করিয়াছে, সমুদায়ই সর্ব্বত্র প্রসিদ্ধ আছে। কই কেহ বলুক দেখি, আমি তোমার পাণিগ্রহণ করিয়াছি। শকুন্তলা কহিলেন, তুমি আমাকে স্বৈচ্ছাচারিণী করিলে। পুরুবংশীয়ের অতি উদারস্বভাব এই বিশ্বাস করিয়া, যখন আমি মধুমুখ পাষাণহৃদয়ের হস্তে আত্মসমর্পণ করিয়াছি, তখন আমার ভাগ্যে যে এই ঘটিবেক ইহা বিচিত্র নহে। এই বলিয়া অঞ্চল মুখে দিয়া শকুন্তলা রোদন করিতে লাগিলেন।

তখন শার্ঙ্গরব কহিলেন, অগ্র পশ্চাৎ না ভাবিয়া কর্ম্ম করিলে, পরিশেষে এইরূপ মনস্তাপ পাইতে হয়। এই নিমিত্ত সকল কর্ম্মই, বিশেষতঃ যাহা নির্জনে করা যায়, সবিশেষ পরীক্ষা না করিয়া করা কর্ত্তব্য নহে? পরস্পরের মন না জানিয়া বন্ধুতা করিলে, সেই বন্ধুতা অবশেষে শত্রুতাতে পর্য্যবসিত হয়। শার্ঙ্গরবের তিরস্কারবাক্য শ্রবণ করিয়া রাজা কহিলেন, কেন আপনি, স্ত্রীলোকের কথায় বিশ্বাস করিয়া, আমার উপর অকারণে এরূপ দোষারোপ করিতেছেন? শার্ঙ্গরব কিঞ্চিৎ কোপাবিষ্ট হইয়া কহিলেন, যে ব্যক্তি জন্মাবচ্ছিন্নে চাতুরী শিখে নাই, তাহার কথা অপ্রমাণ, আর যাহারা পরপ্রতারণা বিদ্যা বলিয়া শিক্ষা করে, তাহাদের কথাই প্রমাণ হইবে? তখন রাজা শার্ঙ্গরবকে কহিলেন, মহাশয়! আপনি বড় যথার্থবাদী। আমি স্বীকার করিলাম, প্রতারণাই আমাদের বিদ্যা ও ব্যবসায়; কিন্তু আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, ইহারে প্রতারণা করিয়া আমার কি লাভ হইবেক? শার্ঙ্গরব কোণে কম্পিতকলেবর হইয়া কহিলেন, নিপাত! রাজা কহিলেন, পুরুবংশীয়েরা নিপাত লাভ করে, এ কথা অশ্রদ্ধেয়।

এই রূপে উভয়ের বিবাদারম্ভ দেখিয়া, শারদ্বত কহিলেন, শার্ঙ্গরব! আর উত্তরোত্তর বাকৃছলে প্রয়োজন নাই। আমরা গুরুর নিয়োগ অনুষ্ঠান করিয়াছি; এক্ষণে ফিরিয়া যাই চল। এই বলিয়া রাজাকে কহিলেন, মহারাজ! ইনি তোমার পত্নী, ইচ্ছা হয় গ্রহণ কর, ইচ্ছা হয় ত্যাগ কর; পত্নীর উপর পরিণেতার সর্ব্বতোমুখী প্রভুতা আছে। এই বলিয়া শার্ঙ্গরব, শারদ্বত ও গৌতমী তিন জনে প্রস্থানোন্মুখ হইলেন।

শকুন্তলা, সকলকে প্রস্থান করিতে দেখিয়া, অপূর্ণ লোচনে কাতর বচনে কহিলেন, ইনি ত আমার এই করিলেন, তোমরাও আমায় ফেলিয়া চলিলে, আমার কি গতি হইবেক। এই বলিয়া তাঁহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। গৌতমী কিঞ্চিৎ থামিয়া কহিলেন, বৎস শার্ঙ্গরব! শকুন্তলা কঁদিতে কাঁদিতে। আমাদের সঙ্গে আসিতেছে; দেখ, রাজা প্রত্যাখ্যান করিলেন, এখানে থাকিয়া আর কি করিবে বল? আমি বলি, আমাদের সঙ্গেই আসুক। শার্ঙ্গরব শুনিয়া, সরোষ নয়নে মুখ ফিরাইয়া, শকুন্তলাকে কহিলেন, আঃ পাপীয়সি! স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করিতেছ? শকুন্তলা ভয়ে কাঁপিতে লাগিলেন। তখন শার্ঙ্গরব শকুন্তুলাকে কহিলেন, দেখ, রাজা যেরূপ কহিতেছেন, যদি তুমি যথার্থ সেরূপ হও, তাহা হইলে তুমি স্বেচ্ছাচারিণী হইলে; তাত কণ্ব আর তোমার মুখাবলোকন করিবেন না। আর যদি তুমি মনে মনে আপনাকে পতিব্রতা বলিয়া জান, তাহা হইলে পতিগৃহে থাকিয়া দাসীবৃত্তি করাও তোমার পক্ষে শ্রেয়ঃ। অতএব এই খানেই থাক, আমরা চলিলাম।

এই রূপে তপস্বীদিগকে প্রস্থান করিতে দেখিয়া, রাজা শার্ঙ্গরবকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহাশয়! আপনি উহাকে মিথ্যা প্রবঞ্চনা করিতেছেন কেন? পুরুরংশীয়েরা প্রাণান্তেও পরবনিতাপরিগ্রহে প্রবৃত্ত হয় না; চন্দ্র কুমুদিনীকেই প্রফুল্ল করেন, সুর্য্য কমলিনীকেই উল্লাসিত করিয়া থাকেন। তখন শার্ঙ্গরব কহিলেন, মহারাজ! আপনি, পরকীয় মহিলা আশাঙ্কা করিয়া, অধর্ম্মভয়ে শকুন্তলাপরিগ্রহে পরাঙ্মুখ হইতেছেন; কিন্তু ইহাও অসম্ভাবনীয় নহে, আপনি পূর্ব্ববৃত্তান্ত বিস্মৃত হইয়াছেন। ইহা শুনিয়া, রাজা পার্শ্বোপবিষ্ট পুরোহিতের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া কহিলেন, মহাশয়কে ব্যবস্থা জিজ্ঞাসা করি, পাতকের লাঘব গৌরব বিবেচনা করিয়া, উপস্থিত বিষয়ে কি কর্ত্তব্য বলুন। আমিই পূর্ব্ববৃত্তান্ত বিস্মৃত হইয়াছি, অথবা এই স্ত্রী মিথ্যা বলিতেছেন; এমন সন্দেহস্থলে, আমি দারত্যাগী হই, অথবা পরস্ত্রীস্পর্শপাতকী হই।

পুরোহিত শুনিয়া, কিয়ৎ ক্ষণ বিবেচনা করিয়া, কহিলেন, ভাল, মহারাজ! যদি এরূপ করা যায়। রাজা কহিলেন, কি, আজ্ঞা করুন। পুরোহিত কহিলেন, ঋষিতনয়া প্রসবকাল পর্য্যন্ত এই স্থানে অবস্থিতি করুন। যদি বলেন, এ কথা বলি কেন? সিদ্ধ পুরুষেরা কহিয়াছেন, আপনার প্রথম সন্তান চক্রবর্ত্তিলক্ষণাক্রান্ত হইবেন। যদি মুনিদৌহিত্র সেইরূপ হল, ইঁহাকে গ্রহণ করিবেন; নতুবা ইহার পিতৃসমীপগমন স্থিরই রহিল। রাজা কহিলেন, যাহা আপনাদের অভিরুচি। তখন পুরোহিত কহিলেন, তবে আমি ইঁহাকে প্রসবকাল পর্য্যন্ত আমার আলয়ে লইয়া রাখি। পরে, তিনি শকুন্তলাকে বলিলেন বৎসে! আমার সঙ্গে আইস। শকুন্তলা পৃথিবি! বিদীর্ণ হও আমি প্রবেশ করি, আর আমি এ প্রাণ রাখিব না; এই বলিয়া রোদন করিতে করিতে, পুরোহিতের অনুগামিনী হইলেন।

সকলে প্রস্থান করিলে পর, রাজা, নিতম্ভ উন্মনাঃ হইয়া, শকুন্তলার বিষয়ই অনন্য মনে চিন্তা করিতেছেন, এমন সময়ে, কি আশ্চর্য ব্যাপার! কি আশ্চর্য ব্যাপার! এই আকুল বাক্য রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। তখন তিনি কি হইল। কি হইল! বলিয়া, পার্শ্ববর্ত্তিনী প্রতিহারীকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। পুরোহিত, সহসা রাজসমীপে আসিয়া, বিস্ময়োৎফুল লোচনে আকুল বচনে কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! বড় এক অদ্ভুত কাণ্ড হইয়া গেল। সেই স্ত্রী, আমার সঙ্গে যাইতে যাইতে, অপ্সরাতীর্থের নিকট আপন অদৃষ্টকে ভর্ৎসনা করিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে আরম্ভ করিল; অমনি এক জ্যোতিঃপদার্থ, স্ত্রীবেশে সহসা আবির্ভূত হইয়া, তাহাকে লইয়া অন্তর্হিত হইল। রাজা কহিলেন, মহাশয়! যাহা প্রত্যাখ্যাত হইয়ছে, সে বিষয়ের আলোচনায় আর প্রয়োজন নাই; আপনি অবাসে গমন করুন। পুরোহিত, মহারাজের জয় হউক বলিয়া আশীর্বাদ করিয়া, প্রস্থান করিলেন। রাজাও শকুন্তলাবৃত্তান্ত লইয়া অত্যন্ত আকুল হইয়াছিলেন, অতএব সভাভঙ্গ করিয়া শয়নাগারে গমন করিলেন।

শকুন্তলা – ৬

নদীতে স্নান করিবার সময়, রাজদও অঙ্গুরীয় শকুন্তলার অঞ্চলপ্রান্ত হইতে সলিলে ভ্রষ্ট হইয়াছিল, ভ্রষ্ট হইবামাত্র এক অতিবৃহৎ রোহিত মৎস্যে গ্রাস করে। সেই মৎস্য, কয়েক দিবস পরে, এক ধীবরের জালে পতিত হইল। ধীবর, খণ্ড খণ্ড বিক্রয় করিবার মানসে, ঐ মৎস্যকে বহু অংশে বিভক্ত করিয়া, তদীয় উদরমধ্যে অঙ্গুরীয় পাইল। অঙ্গরীয় পাইয়া, পরম উল্লাসিত মনে, সে এক মণিকারের আপণে বিক্রয় করিতে গেল। মণিকার, সেই মণিময় অঙ্গুরীয় রাজনামাঙ্কিত দেখিয়া, ধীবরকে চোর নিশ্চয় করিয়া, নগরপালের নিকট সংবাদ দিল। নগরপাল আসিয়া ধীবরকে পিছমোড়া করিয়া বাঁধিল এবং জিজ্ঞাসিল অরে বেটা চোর! তুই এ অঙ্গুরীয় কোথায় পাইলি, বল। ধীবর কহিল, মহাশয়! আমি চোর নহি। তখন নগরপাল কহিল, তুই বেটা যদি চোর নহিস্, এ অঙ্গুরীয় কেমন করিয়া পাইলি? যদি চুরি করিস্ নাই, রাজা কি সুব্রাহ্মণ দেখিয়া। তোরে দান করিয়াছেন?

এই বলিয়া, নগরপাল চৌকীদারকে হুকুম দিলে, চৌকীদার তাহাকে প্রহার করিতে আরম্ভ করিল। ধীবর কহিল, অরে চৌকীদার! আমি চোর নহি, আমায় মার কেন; আমি কেমন করিয়া এই আঙ্গটী পাইলাম বলিতেছি। এই বলিয়া, সে কহিল, আমি ধীবরজাতি, মাছ ধরিয়া বিক্রয় করিয়া জীবিকানির্বাহ করি। নগরপাল শুনিয়া কোপাবিষ্ট হইয়া কহিল, মর্ বেটা, আমি তোর জাতি কুল জিজ্ঞাসিতেছি না কি? এই অঙ্গুরীয় কেমন করিয়া তোর হাতে আসিল বল্। ধীবর কহিল, আজি সকালে আমি শচীতীর্থে জাল ফেলিয়াছিলাম। একটা বড় রুই মাছ আমার জালে পড়ে। কাটিয়া উহার পেটের ভিতর এই আঙ্গটী দেখিতে পাইলাম। তার পর এই দোকানে আসিয়া দেখাইতেছি, এমন সময়ে আপনি আমায় ধরিলেন; আর আমি কিছুই জানি না; আমায় মারিতে হয় মারুন, কাটিতে হয় কাটুন, আমি চুরি করি নাই।

নগরপাল শুনিয়া আঘ্রাণ লইয়া দেখিল, অঙ্গুরীয়ে তামিষগন্ধ নির্গত হইতেছে। তখন সে সন্দিহান হইয়া চৌকীদারকে কহিল, তুই এ বেটাকে এই খানে সাবধানে বসাইয়া রাখ্। আমি রাজবাটীতে গিয়া এই সকল বৃত্তান্ত রাজার গোচর করি। রাজা সকল শুনিয়া যেমন অনুমতি করেন। এই বলিয়া, নগরপাল অঙ্গুরীয় লইয়া রাজভবনে গমন করিল; এবং কিয়ৎ ক্ষণ পরে, প্রত্যাগত হইয়া চৌকীদারকে কহিল, আরে! ত্বরায়। ধীবরের বন্ধন খুলিয়া দে, এ চোর নয়। অঙ্গুরীয়প্রাপ্তিবিষয় যাহা কহিয়াছে, বোধ হইতেছে তাহার কিছুই মিথ্যা নহে। আর রাজা উহাকে অঙ্গুরীয়মূল্যের অনুরূপ এই মহামূল্য পুরস্কার দিয়াছেন। এই বলিয়া পুরস্কার দিয়া, নগরপাল ধীবরকে বিদায় দিল এবং চৌকীদারকে সঙ্গে লইয়া স্বস্থানে। প্রস্থান করিল।

এ দিকে অঙ্গুরীয় হস্তে পতিত হইবামাত্র, শকুন্তলাবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত রাজার স্মৃতিপথে আরূঢ় হইল। তখন তিনি, অত্যন্ত কাতর হইয়া, যৎপরোনাস্তি বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন, এবং শকুন্তলার পুনর্দর্শনবিষয়ে একান্ত। হতাশ্বাস হইয়া সর্ব্ব বিষয়ে নিতান্তু নিরুৎসাহ হইলেন। আহার, বিহার, রাজকার্য্যপর্য্যালোচনা এক বারেই পরিত্যক্ত হইল। শকুন্তলার চিন্তায় একান্ত মগ্ন হইয়া, তিনি সর্ব্বদাই ম্লান বদনে কালযাপন করেন, কাহারও সহিত বাক্যালাপ করেন না, কাহাকেও নিকটে আসিতে দেন না; কেবল প্রিয়বয়স্য মাধব্য সর্ব্বদা সমীপে উপবিষ্ট থাকেন। মাধব্য সান্ত্বনাবাক্যে প্রবোধ দিতে আরম্ভ করিলে, তাঁহার শোক সাগর উথলিয়া উঠিত, নয়নযুগল হইতে অবিরত বাষ্পবারি বিগলিত হইতে থাকিত।

এক দিবস, রাজার চিত্তবিনোদনার্থ, মাধব্য তাঁহাকে প্রমদবনে লইয়া গেলেন। উভয়ে শীতল শিলাতলে উপবিষ্ট হইলে, মাধব্য জিজ্ঞাসা করিলেন, ভাল বয়স্য! যদি তুমি তপোবনে শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলে, তবে তিনি উপস্থিত হইলে, প্রত্যাখ্যান করিলে কেন? রাজা শুনিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন, বয়স্য! ও কথা আর কেন জিজ্ঞাসা কর? রাজধানী প্রত্যাগমন করিয়া, আমি শকুন্তলাবৃত্তান্ত এক বারে বিস্মৃত হইয়াছিলাম। কেন বিস্মৃত হইলাম, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। সে। দিবস, প্রিয়া কত প্রকারে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন; কিন্তু আমার কেমন মতিচ্ছন্ন ঘটিয়াছিল, কিছুই স্মরণ হইল না। তাঁহাকে স্বেচ্ছাচারিণী মনে করিয়া, কতই দুর্বাক্য কহিয়াছি, কতই অবমাননা করিয়াছি। এই বলিতে বলিতে, নয়নযুগল অশ্রুজলে পরিপূর্ণ হইয়া আসিল; বাক‍্শক্তিরহিতের ন্যায় হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। অনন্তর, মাধব্যকে কহিলেন, ভাল আমিই যেন বিস্মৃত হইয়াছিলাম; তোমায় ত সমুদায় কহিয়াছিলাম, তুমি কেন কথাপ্রসঙ্গেও কোনও দিন শকুন্তলার কথা উত্থাপন কর নাই? তুমিও কি আমার মত বিস্মৃত হইয়াছিলে?

তখন মাধব কহিলেন, বয়স্য! আমার দোষ নাই, তুমি সমুদয় বলিয়া পরিশেষে কহিয়াছিলে, শকুন্তলাসংক্রান্ত যে সকল কথা কহিলাম, সমস্তই পরিহাসমাত্র, বাস্তবিক নহে। আমিও নিতান্তু নির্বোধ, তোমার শেষ কথাই সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছিলাম, এই নিমিত্ত আর কখনও সে কথা উত্থাপন করি নাই। বিশেষতঃ, প্রত্যাখ্যানদিবসে আমি তোমার নিকটে ছিলাম না; থাকিলেও বরং যাহা শুনিয়াছিলাম, বলিতাম! রাজা, দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া, বাষ্পাকুল লোচনে শোকাকুল বচনে কহিলেন, বয়স্য! কার দোষ দিব, সকলই আমার অদৃষ্টের দোষ! এই বলিয়া অত্যন্ত শোকাভিভূত হইলেন। তখন মাধব্য কহিলেন, বয়স্য! এরূপ শোকে অভিভূত হওয়া তোমার উচিত নহে। দেখ, সৎপুরুষেরা শোক মোহের বশীভূত হয়েন না। প্রাকৃত জনেরাই শোকে ও মোহে বিচেতন হইয়া থাকে। যদি উভয়ই বায়ুভরে বিচলিত হয়, তবে বৃক্ষে ও পর্ব্বতে বিশেষ কি? তুমি গম্ভীর স্বভাব, ধৈর্য্য অবলম্বন ও শোকাবেগ সংবরণ কর।

প্রিয়বয়স্যের প্রবোধবাক্য শ্রবণ করিয়া, রাজা কহিলেন, সখে! আমি নিতান্ত অবোধ নহি, কিন্তু মন আমার কোনও ক্রমে প্রবোধ মানিতেছে না; কি বলিয়াই বা প্রবোধ দিব। প্রত্যাখ্যানের পর, প্রিয়া প্রস্থানকালে, সাতিশয় কাতরতা প্রদর্শনপূর্ব্বক, আমার দিকে যে বারংবার বাষ্পপূর্ণ দৃষ্টিপাত করিয়াছিলেন, সেই কাতর দৃষ্টিপাত আমার বক্ষঃস্থলে বিষদিগ্ধ শল্যের ন্যায় বিদ্ধ হইয়াছে। আমি সেই সময়ে তাঁহার প্রতি যে ক্র‌ুরের ব্যবহার করিয়াছি, তাহা মনে করিয়া, আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে; মরিলেও আমার এ দুঃখ যাবে না।

মাধব্য, রাজাকে নিতান্ত কাতর দেখিয়া, আশ্বাসপ্রদানার্থে কহিলেন, বয়স্য! অত কাতর হইও না; কিছু দিন পরে পুনরায় শকুন্তলার সহিত সমাগম হইবেক। রাজা কহিলেন, বয়স্য! আমি এক মুহুর্ত্তের নিমিত্তেও সে আশা করি না। আর আমি প্রিয়ার দর্শন পাইব না। এ জন্মের মত আমার সকল সুখ ফুরাইয়া গিয়াছে। নতুবা তৎকালে আমার তেমন বুদ্ধি ঘটিল কেন? মাধব্য কহিলেন, বয়স্য! কোনও বিষয়েই নিতান্ত হতাশ হওয়া উচিত নয়। ভবিতব্যের কথা কে বলিতে পারে? দেখ, এই অঙ্গুরীয় যে পুনরায় তোমার হতে আসিবে, কাহার মনে ছিল।

ইহা শুনিয়া, অঙ্গুরীয়ে দৃষ্টিপাতপূর্ব্বক রাজা উহাকে সচেতন বোধে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, অঙ্গুরীয়! তুমিও আমার মত হতভাগ্য, নতুবা প্রিয়ার কমনীয় কোমল অঙ্গুলীতে স্থান পাইয়া, কি নিমিত্ত পুনরায় সেই দুর্লভ স্থান হইতে ভ্রষ্ট হইলে? মাধব্য কহিলেন, বয়স্য! তুমি কি উপলক্ষে তাঁহার অঙ্গুলীতে অঙ্গুরীয় পরাইয়া দিয়াছিলে? রাজা কহিলেন, রাজধানীপ্রত্যাগমনকালে, প্রিয়া অশ্রুপূর্ণ নয়নে আমার হস্তে ধরিয়া কহিলেন, আর্যপুত্র! কত দিনে আমায় নিকটে লইয়া যাইবে? তখন আমি এই অঙ্গুরীয় তাঁহার কোমল অঙ্গুলীতে পরাইয়া দিয়া কহিলাম, প্রিয়ে! তুমি প্রতিদিন আমার নামের এক একটি অক্ষর গণিবে; গণনাও সমাপ্ত হইবে, আমার লোক আসিয়া তোমায় লইয়া যাইবে। প্রিয়ার নিকট সরল হৃদয়ে এই প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছিলাম। কিন্তু মোহান্ধ হইয়া এক বারেই বিস্মৃত হই।

তখন মাধব্য কহিলেন, বয়স্য! এ অঙ্গুরীয় কেমন করিয়া রোহিত মৎস্যের উদরে প্রবিষ্ট হইল? রাজা করিলেন, শুনিয়াছি, শচীতীর্থে স্নান করিবার সময়, প্রিয়ার অঞ্চল প্রান্ত হইতে সলিলে ভ্রষ্ট হইয়াছিল। মাধব্য কহিলেন, হাঁ সম্ভব বটে, সলিলে মগ্ন হইলে রোহিত মৎস্যে গ্রাস করে। রাজা অঙ্গুরীরে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া কহিলেন, আমি এই অঙ্গুরীয়ের যথোচিত তিরস্কার করিব। এই বলিয়া কহিলেন, অরে অঙ্গুরীয়! প্রিয়ার কোমল করপল্লব পরিত্যাগ করিয়া, জলে মগ্ন হইয়া, তোর কি লাভ হইল বল্? অথবা, তোরে তিরস্কার করা অন্যায়; কারণ, অচেতন ব্যক্তি কথনও গুণগ্রহণ করিতে পারে না; নতুবা, আমিই কি নিমিত্ত প্রিয়ারে পরিত্যাগ করিলাম? এই বলিয়া, অশ্রুপূর্ণ নয়নে শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া কহিলেন প্রিয়ে! আমি তোমায় অকারণে পরিত্যাগ করিয়াছি, অনূতাপানলে আমার হৃদয় দগ্ধ হইয়া যাইতেছে, দর্শন দিয়া প্রাণরক্ষা কর।

রাজা শোকাকুল হইয়া এইরূপ বিলাপ করিতেছেন, এমন সময়ে চতুরিকানাম্নী পরিচারিকা এক চিত্রফলক আনয়ন করিল। রাজা চিত্তবিনোদনার্থে ঐ চিত্রফলকে স্বহস্তে শকুন্তলার প্রতিমূর্ত্তি চিত্রিত করিয়াছিলেন। মাধব্য দেখিয়া বিস্ময়োৎফুল্ল লোচনে কহিলেন, বয়স্য! তুমি চিত্রফলকে কি অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়াছ! দেখিয়া কোনও মতে চিত্র বোধ হইতেছে না। আহা মরি, কি রূপ লাবণ্যের মাধুরী! কি অঙ্গসৌষ্ঠব! কি অমায়িক ভাব! মুখারবিন্দে কি সলজ্জ ভাব। প্রকাশ পাইতেছে! রাজা কহিলেন, সখে! তুমি প্রিয়াকে দেখ নাই, এই নিমিত্ত আমার চিত্রনৈপুণ্যের এত প্রশংসা করিতেছ। যদি তাঁহারে দেখিতে, চিত্র দেখিয়া কখনই সন্তুষ্ট হইতে না। তাঁহার অলৌকিক রূপ লাবণ্যের কিঞ্চিৎ অংশমাত্র এই চিত্রফলকে আবির্ভূত হইয়াছে। এই বলিয়া, পরিচারিকাকে কহিলেন, চতুরিকে! বর্ত্তিকা ও বর্ণপাত্র লইয়া আইস; অনেক অংশ চিত্রিত করিতে অবশিষ্ট আছে।

এই বলিয়া, চতুরিকাকে বিদায় করিয়া, রাজা মাধব্যকে কহিলেন, সখে! আমি, স্বাদুশীতলনির্মলজলপূর্ণ নদী পরিত্যাগ কারয়া, এক্ষণে শুষ্ককণ্ঠ হইয়া মৃগতৃষ্ণিকায় পিপাসা শান্তি করিতে উদ্যত হইয়াছি; প্রিয়াকে পাইয়া পরিত্যাগ করিয়া, এক্ষণে চিত্রদর্শন দ্বারা চিত্তবিনোদনের চেষ্টা পাইতেছি। মাধব্য কহিলেন, বয়স্য! চিত্রফলকে আর কি লিখিবে? রাজা কহিলেন, তপোবন ও মালিনীনদী লিখিব; যে রূপে হরিণগণকে তপোবনে সচ্ছন্দে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে এবং হংসগণকে মালিনীনদীতে কেলি করিতে দেখিয়াছিলাম, সে সমুদয়ও চিত্রিত করিব; আর প্রথমদর্শনদিবসে প্রিয়ার কর্ণে শিরীষপুষ্পের যেরূপ আভরণ দেখিয়াছিলাম, তাহাও লিখিব।

এইরূপ কথোপকথন হইতেছে, এমন সময়ে প্রতিহারী আসিয়া রাজহস্তে এক পত্র সমর্পণ করিল। রাজা পাঠ করিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন। মাধব্য জিজ্ঞাসা করিলেন, বয়স্য! কোথাকার পত্র, পত্র পাঠ করিয়া, এত বিষন্ন হইলে কেন। রাজা কহিলেন, বয়স্য! ধনমিত্র নামে এক সাংযাত্রিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য করিত। সমুদ্রে নৌকা মগ্ন হইয়া তাহার প্রাণ বিয়োগ হইয়াছে। সে ব্যক্তি নিঃসন্তান। নিঃসন্তানের ধনে রজার অধিকার। এই নিমিত্ত, অমাত্য আমায় তাহার সমুদয় সম্পত্তি আত্মসাৎ করিতে লিখিয়াছেন। দেখ, বয়স্য! নিঃসন্তান হওয়া কত দুঃখের বিষয়! নামলোপ হইল, লোপ হইল, এবং বহু কষ্টে বহু কালে উপার্জ্জিত ধন অন্যের হস্তে গেল। ইহা অপেক্ষা আক্ষেপের বিষয় আর কি হইতে পারে! এই বলিয়া, দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন, আমার লোকান্তর হইলে, আমারও নাম, বংশ ও রাজ্যের এই গতি হইবেক।

রাজার এইরূপ আক্ষেপ শুনিয়া, মাধব্য কহিলেন, বয়স্য! তুমি অকারণে এত পরিতাপ কর কেন? তোমার সন্তানের বয়স অতীত হয় নাই। কিছু দিন পরে, তুমি অবশ্যই পুত্রমুখ নিরীক্ষণ করিবে। রাজা কহিলেন, বয়স্য! তুমি আমায় মিথ্যা প্রবোধ দাও কেন? উপস্থিত পরিত্যাগ করিয়া অনুপস্থিত প্রত্যাশা করা মূঢ়ের কর্ম্ম। আমি যখন, নিতান্ত বিচেতন হইয়া, প্রিয়াকে পরিত্যাগ করিয়াছি, তখন আর আমার পুত্রমুখনিরীক্ষণের আশা নাই।

এই রূপে কিয়ৎ ক্ষণ বিলাপ করিয়া, রাজা অপুত্রতানিবন্ধন শোক সংবরণপূর্ব্বক প্রতিহারীকে কহিলেন, শুনিয়াছি ধনমিত্রের অনেক ভার্য্যা আছে, তন্মধ্যে কেহ অন্তঃসত্ত্বা থাকিতে পারেন। অমাত্যকে এ বিষয়ের অনুসন্ধান করিতে বল। প্রতিহারী কছিল, মহারাজ! অযোধ্যানিবাসী শ্রেষ্ঠীর কন্যা ধনমিত্রের এক ভার্য্যা। শুনিয়াছি, শ্রেষ্ঠীকন্যা অন্তঃসত্ত্বা হইয়াছেন। তখন রাজা কহিলেন, তবে অমাত্যকে বল, সেই গর্ভস্থ সন্তান ধনমিত্রের সমস্ত ধনের উত্তরাধিকারী হইবেক।

এই আদেশ দিয়া প্রতিহারীকে বিদায় করিয়া, রাজা মাধব্যের সহিত পুনর্বার শকুন্তলাসংক্রান্ত কথোপকথন আরম্ভ করিতেছেন, এমন সময়ে ইন্দ্রসারথি মাতলি, দেবরথ লইয়া, তথায় উপস্থিত হইলেন। রাজা, দেখিয়া আহ্লাদিত হইয়া, মাতলিকে, স্বাগত জিজ্ঞাসা পুরঃসর, আসন পরিগ্রহ করিতে বলিলেন। মাতলি আসন পরিগ্রহ করিয়া কহিলেন, মহারাজ! দেবরাজ যদর্থে আমায় আপনকার নিকটে পাঠাইয়াছেন নিবেদন করি, শ্রবণ করুন। কালনেমির সন্তান দুর্জয় নামে কতকগুলা দুর্দান্ত দানব দেবতাদিগের বিষম শত্রু হইয়া উঠিয়াছে; কতিপয় দিবসের নিমিত্ত দেবলোকে গিয়া, আপনাকে দুর্জয় দানবদলের দমন করিতে হইবেক। রাজা কহিলেন, দেবরাজের এই আদেশে সবিশেষ অনুগৃহীত হইলাম; পরে মাধব্যকে কহিলেন, বয়স্য! অমাত্যকে বল আমি কিয়ৎ দিনের নিমিত্ত। বেদকার্য্যে ব্যাপৃত হইলাম; আমার প্রত্যাগমন পর্য্যন্ত তিনি একাকী সমস্ত রাজকার্য্য পর্য্যালোচনা করুন।

এই বলিয়া সসজ্জ হইয়া, রাজা ইন্দ্ররথে আরোহণপূর্ব্বক দেবলোকে প্রস্থান করিলেন।

শকুন্তলা – ৭

রাজা, দানবজয়কার্য্যে ব্যাপৃত হইয়া, দেবলোকে কিছু দিন অবস্থিতি করিলেন। দেবকার্য্যসমাধানের পর, মর্ত্ত্যলোকে প্রত্যাগমনকালে মাতলিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, দেখ, দেবরাজ আমার যে গুরুতর সৎকার করেন, আমি, আপনাকে সেই সৎকারের নিতান্ত অনুপযুক্ত জ্ঞান করিয়া, মনে মনে অত্যন্ত লজ্জিত হই। মাতলি কহিলেন, মহারাজ! ও সঙ্কোচ উভয় পক্ষেই সমান; আপনি দেবতাদিগের যে উপকার করেন, দেবরাজকৃত সৎকারকে তদপেক্ষা গুরুতর জ্ঞান করিয়া লজ্জিত হন; দেবরাজও স্বকৃত সৎকারকে মহারাজকৃত উপকারের নিতান্ত অনুপযুক্ত বিবেচনা করিয়া সঙ্কুচিত হন।

ইহা শুনিয়া রাজা কহিলেন, দেবরাজসারথে! এমন কথা বলবেন না, বিদায় দিবার সময় দেবরাজ যে সৎকার করিয়া থাকেন, তাহা মাদৃশ জনের মনোরথেরও অগোচর। দেখুন, সমবেত, সর্ব্বদেব সমক্ষে, অর্দ্ধাসনে উপবেশন করাইয়া, স্বহস্তে আমার গলদেশে মন্দারমালা অর্পণ করেন। মাতলি কহিলেন, মহারাজ! আপনি, সময়ে সময়ে দানবজয় করিয়া, দেবরাজের যে মহোপকার করেন, দেবরাজকৃত সৎকারকে আমি তদপেক্ষা অধিক বোধ করি না। বিবেচনা করিতে গেলে, আজি কালি মহারাজের ভুজবলেই দেবলোেক নিরুপদ্রব রহিয়াছে। রাজা কহিলেন, আমি যে অনায়াসে দেবরাজের আদেশ সম্পন্ন করিতে পারি, সে দেবরাজেরই মহিমা; নিযুক্তেরা প্রভুর প্রভাবেই মহৎ মহৎ কর্ম্ম সকল সমাধান করিয়া উঠে; যদি সূর্য্যদেব আপন রথের অগ্রভাগে না রাখিতেন, তাহা হইলে অরুণ কি অন্ধকার দূর করিতে পারিতেন? তখন মাতলি অত্যন্ত প্রীত হইয়া কহিলেন, মহারাজ! বিনয় সদ্‌গুণের শোভা সম্পাদন করে, এ কথা আপনাতেই বিলক্ষণ বর্ত্তিয়াছে।

এইরূপ কথোপকথনে আসক্ত হইয়া, কিয়ৎ দূর আগমন করিয়া, রাজা মাতলিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, দেবরাজসারথে! ঐ যে পূর্ব্বপশ্চিমে বিস্তৃত পর্ব্বত স্বর্ণনির্মিতের ন্যায় প্রতীয়মান হইতেছে, ও পর্ব্বতের নাম কি? মাতলি কহিলেন, মহারাজ! ও হেমকূট পর্ব্বত, কিন্নর ও অপ্সরাদিগের বাসভূমি; তপস্বীদিগের তপস্যাসিদ্ধির সর্ব্বপ্রধান স্থান; ভগবান্ কশ্যপ এ পর্ব্বতে তপস্যা করেন। তখন রাজা কহিলেন, তবে আমি ভগবানকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া যাইব; এতাদৃশ মহাত্মার নাম শ্রবণ করিয়া, বিনা প্রণাম প্রদক্ষিণ, চলিয়া যাওয়া অবিধেয়। তুমি রথ স্থির কর, আমি এই স্থানেই অবতীর্ণ হইতেছি।

মাতলি রথ স্থির করিলেন। রাজা, রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, দেবরাজসারথে! এই পর্ব্বতের কোন অংশে ভগবানের আশ্রম? মাতলি কহিলেন, মহারাজ! মহর্ষির আশ্রম অতিদূরবর্ত্তী নহে; চলুন, আমি সমভিব্যাহারে যাইতেছি। কিয়ৎ দূর গমন করিয়া, এক ঋষিকুমারকে সমাগত দেখিয়া, মাতলি জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবান্ কশ্যপ এক্ষণে কি করিতেছেন? ঋষিকুমার কহিলেন, এক্ষণে তিনি নিজপত্নী অদিতিকে ও অন্যান্য ঋষিপত্নীদিগকে পতিব্রতাধর্ম্ম শ্রবণ করাইতেছেন। তখন রাজা কহিলেন, তবে আমি এখন তাঁহার নিকটে যাইব না। মাতলি কহিলেন, মহারাজ! আপনি, এই অশোকবৃক্ষমূলে অবস্থিত হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ অপেক্ষা করুন, আমি মহর্ষির নিকট আপনকার আগমনসংবাদ নিবেদন করি। এই বলিয়া মাতলি প্রস্থান করিলেন।

রাজার দক্ষিণ বাহু স্পন্দিত হইতে লাগিল। তখন তিনি নিজ হস্তকে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে হস্ত! আমি যখন নিতান্ত বিচেতন হইয়া, প্রিয়াকে পরিত্যাগ করিয়াছি, তখন আর আমার অভীষ্টলাভের প্রত্যাশা নাই; তবে তুমি কি নিমিত্ত বৃথা স্পন্দিত হইতেছ? রাজা মনে মনে এই আক্ষেপ করিতেছেন, এমন সময়ে, বৎস! এত উদ্ধত হও কেন, এই শব্দ রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল; রাজা শ্রবণ করিয়া মনে মনে এই বিতর্ক করিতে লাগিলেন, এ অবিনয়ের স্থান নহে; এখানে যাবতীয় জীব জন্তু স্থানমাহাত্ম্যে হিংসা, দ্বেষ, মদ, মাৎসর্য্য প্রভৃতি পরিত্যাগ করিয়া, পরস্পর সৌহার্দ্দে কালযাপন করে, কেহ কাহারও প্রতি অত্যাচার বা অনুচিত ব্যাবহার করে না; এমন স্থানে কে ঔদ্ধত্যপ্রকাশ করিতেছে? যাহা হউক, এ বিষয়ের অনুসন্ধান করিতে হইল।

এইরূপ কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া, রাজা শব্দানুসারে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া দেখিলেন, এক অতি অল্পবয়স্ক শিশু, সিংহশিশুর কেশর আকর্ষণ করিয়া, অত্যন্ত উৎপীড়ন করিতেছে, দুই তাপসী সমীপে দণ্ডায়মান আছেন। দেখিয়া চমৎকৃত হইয়া রাজা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, তপোবনের কি অনির্বচনীয় মহিমা! মানবশিশু সিংহশিশুর উপর অত্যাচার করিতেছে, সিংহশিশু অবিকৃত চিত্তে সেই অত্যাচার সহ্য করিতেছে। অনন্তর, কিঞ্চিৎ নিকটবর্ত্তী হইয়া, সেই শিশুকে নিরীক্ষণ করিয়া, স্নেহরসপরিপূর্ণ চিত্তে কহিতে লাগিলেন, আপন ঔরস পুত্রকে দেখিলে মন যেরূপ স্নেহরসে আর্দ্র হয়, এই শিশুকে দেখিয়া আমার মন সেইরূপ হইতেছে কেন? অথবা, আমি পুত্রহীন বলিয়া, এই সর্ব্বাঙ্গসুন্দর শিশুকে দেখিয়া আমার মনে এরূপ স্নেহরসের আবির্ভাব হইতেছে।

এ দিকে, সেই শিশু সিংহশাবকের উপর অত্যন্ত উৎপীড়ন আরম্ভ করাতে, তাপসীরা কহিতে লাগিলেন, বৎস! এই সকল জন্তুকে আমরা আপন সন্তানের ন্যায় স্নেহ করি; তুমি কেন অকারণে উহারে ক্লেশ দাও? আমাদের কথা শুন, ক্ষান্ত ছও, সিংহশিশুকে ছাড়িয়া দাও, ও আপন জননীর নিকটে যাউক। আর যদি তুমি উহারে ছাড়িয়া না দাও, সিংহী তোমায় জব্দ করিবেক; বালক শুনিয়া, কিঞ্চিন্মাত্রও ভীত না হইয়া, সিংহশাবকের উপর পূর্ব্বাপেক্ষায় অধিকতর উপদ্রব আরম্ভ করিল। তাপসীরা, ভয়প্রদর্শন দ্বারা তাহাকে ক্ষান্ত করা অসাধ্য বুঝিয়া, প্রলোভনার্থে কহিলেন, বৎস! তুমি সিংহশিশুকে ছাড়িয়া দাও, তোমায় একটি ভাল খেলান দিব।

রাজা, এই কৌতুক দেখিতে দেখিতে, ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হইয়া, তাঁহাদের অতি নিকটে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু সহসা তাঁহাদের সম্মুখে না গিয়া, এক বৃক্ষের অন্তরালে থাকিয়া, সস্নেহ নয়নে সেই শিশুকে অবলোকন করিতে লাগিলেন। এই সময়ে সেই বালক, কই কি খেলনা দিবে দাও বলিয়া, হস্তপ্রসারণ করিল। রাজা, বালকের হস্তে দৃষ্টিপাত করিয়া, চমৎকৃত হইয়া মনে, মনে কহিতে লাগিলেন, কি আশ্চর্য্য! এই বালকের হস্তে চক্রবর্ত্তি লক্ষণ লক্ষিত হইতেছে। তাপসীদিগের, সঙ্গে কোনও খেলানা ছিল না, সুতরাং তাঁহারা তৎক্ষণাৎ দিতে না পরাতে, বালক কুপিত হইয়া কহিল, তোমরা খেলনা দিলে না, তবে আমি উহারে ছাড়িব না। তখন এক তাপসী অপর তাপসীকে কহিলেন, সখি! ও কথায় ভুলবার ছেলে নয়; কুটীরে মাটির ময়ূর আছে, ত্বরায়, লইয়া আইস। তাপসী মৃন্ময় ময়ূরের আনয়নার্থ কুটীরে গমন করিলেন।

প্রথমে সেই শিশুকে দেখিয়া, রাজাৱ অস্তুঃকরণে যে স্নেহের সঞ্চার হইয়াছিল, ক্রমে ক্রমে সেই স্নেহ গাঢ়তর হইতে লাগিল। তখন তিনি মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কেন, এই অপর চিত শিশুকে ক্রোডে করিবার নিমিত্ত, আমার মন এমন উৎসুক হইতেছে! পরের পুত্র দেখিলে মনে এত স্নেহোদয় হয়, আমি পূর্ব্বে জানিতাম না। আহা! যাহার এই পুত্র, সে ইহাকে ক্রোড়ে লইয়া যখন ইহার মুখচুম্বন, করে, হাস্য করিলে যখন ইহার মুখমধ্যে অর্দ্ধবিনির্গত কুন্দসন্নিত দন্তগুলি অবলোকন করে, যখন ইহার মৃদু মধুর আধ আধ কথাগুলি শ্রবণ করে, তখন সেই পুণ্যবান্ ব্যক্তি কি অনির্বচনীয় প্রীতি প্রাপ্ত হয়। আমি অতি হতভাগ্য! সংসারে আসিয়া এই পরম সুখে বঞ্চিত রহিলাম। পুত্রকে ক্রোড়ে লইয়া, তাহার মুখচুম্বন করিয়া, সর্ব্ব শরীর শীতল করিব; পুত্রের অর্দ্ধবিনির্গত দস্তগুলি অবলোকন করিয়া, নয়নযুগলের সার্থকতা সম্পাদন করিব; এবং অর্দ্ধোচ্চারিত মৃদু মধুর বচনপরম্পরা শ্রবণে শ্রবণেন্দ্রিয়ের চরিতার্থতা লাভ করিব; এ জন্মের মত আমার সে আশালতা নির্মূল হইয়া গিয়াছে।

ময়ুরের আনয়নে বিলম্ব দেখিয়া, কুপিত হইয়া বালক কহিল, এখনও ময়ুর দিলে না, তবে আমি ইহাকে ছাড়িব না। এই বলিয়া সিংহশিশুকে অত্যন্ত বলপূর্ব্বক আকর্ষণ করিতে লাগিল। তাপসী বিস্তর চেষ্টা পাইলেন, কিন্তু তাহার হস্তগ্রহ হইতে সিংহশিশুকে ছাড়াইতে পারিলেন না। তখন তিনি বিরক্ত হইয়া কহিলেন, এমন সময়ে এখানে কোনও ঋষিকুমার নাই যে ছাড়াইয়া দেয়। এই বলিয়া পার্শ্বে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিবামাত্র, রাজাকে দেখিতে পাইয়া কহিলেন, মহাশয়! আপনি অনুগ্রহ করিয়া সিংহশিশুকে এই বালকের হস্ত হইতে মুক্ত করিয়া দেন। রাজা, তৎক্ষণাৎ নিকটে আসিয়া, সেই বালককে ঋষিপুত্রবোধে সম্বোধন করিয়া, কহিলেন, অহে ঋষিকুমার! তুমি কেন তপোবনবিরুদ্ধ আচরণ করিতেছ। তখন তাপসী কহিলেন, মহাশয়! আপনি জানেন না, এ ঋষিকুমার নয়। রাজা কহিলেন, বালকের আকার প্রকার দেখিয়া বোধ হইতেছে ঋষি কুমার নয়, কিন্তু এ স্থানে ঋষিকুমার ব্যতীত অন্যবিধ বালকের সমাগমসম্ভাবনা নাই, এজন্য আমি এরূপ বোধ করিয়াছিলাম।

এই বলিয়া, রাজা সেই বালকের হস্তগ্রহ হইতে সিংহশিশুকে মুক্ত করিয়া দিলেন, এবং স্পর্শসুখ অনুভব করিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, পরের পুত্রের গাত্র স্পর্শ করিয়া আমার এরূপ সুখানুভব হইতেছে, যাহার পুত্র, সে ব্যক্তি ইহার গাত্র স্পর্শ করিয়া কি অনুপম সুখ অনুভব করে, তাহা বলা যায় না।

বালক অত্যন্ত দুরন্ত হইয়াও রাজার নিকট অত্যন্ত শান্তস্বভাব হইল, ইহা দেখিয়া এবং উভয়ের আকারগত সৌসাদৃশ্য দর্শন করিয়া, তাপসী বিস্ময়াপন্ন হইলেন। রাজা, সেই বালককে ক্ষত্রিয়সন্তান নিশ্চয় করিয়া, তাপসীকে জিজ্ঞাসিলেন, এই বালক যদি ঋষিকুমার না হয়, কোন ক্ষত্রিয়বংশে জন্মিয়াছে, জানিতে ইচ্ছা করি। তাপসী কহিলেন, মহাশয়! এ পুরুবংশীয়। রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, আমি যে বংশে। জন্মিয়াছি, ইহারও সেই বংশে জন্ম। পুরুবংশীয়দিগের এই রীতি বটে, তাঁহারা, প্রথমতঃ অশেষ সাংসারিক সুখভোগে কালযাপন করিয়া, পরিশেষে সস্ত্রীক হইয়া অরণ্যবাস আশ্রয় করেন।

পরে রাজা তাপসীকে জিজ্ঞাসিলেন, এ দেবভূমি, মানুষের অবস্থিতির স্থান নহে; অতএব এ বালক কি সংযোগে এখানে আসিল? তাপসী কহিলেন, ইহার জননী অপ্সরাসম্বন্ধে এখানে আসিয়া এই সন্তান প্রসব করিয়াছেন। রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, পুরুবংশ ও অপ্সরাসম্বন্ধ এই দুই কথা শুনিয়া, আমার হৃদয়ে পুনর্বার আশার সঞ্চার হইতেছে। যাহা হউক, ইহার পিতার নাম জিজ্ঞাসা করি, তাহা হইলেই সন্দেহভঞ্জন হইবেক।

এই বলিয়া, তিনি তাপসীকে পুনর্বার জিজ্ঞাসিলেন, আপনি জানেন, এই বালক পুরুবংশীয় কোন রাজার পুত্র? তখন তাপসী কহিলেন, মহাশয়! কে সেই ধর্ম্মপত্নীপরিত্যাগী পাপাত্মার নাম কীর্ত্তন করিবেক। রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এ কথা আমারেই লক্ষ্য করিতেছে। ভাল, ইহার জননীর নাম জিজ্ঞাসা করি, তাহা হইলেই এক কালে সকল সন্দেহ দূর হইবেক; অথবা পরস্ত্রীসংক্রান্ত কোনও কথা জিজ্ঞাসা করা উচিত নয়। আমি যখন মোহন্ধ হইয়া স্বহস্তে আশালতার মূলচ্ছেদ করিয়াছি, তখন সে আশালতাকে বৃথা পুনরুজ্জীবিত করিবার চেষ্টা পাইয়া, পরিশেষে কেবল সমধিক ক্ষোভ পাইতে হইবেক। অতএব ও কথায় আর কাজ নাই।

রাজা মনে মনে এই আন্দোলন করিতেছেন, এমন সময়ে অপরা তাপসী কুটীর হইতে মৃন্ময় ময়ুর আনয়ন করিলেন এবং কহিলেন, বৎস! কেমন শকুন্তলাবণ্য দেখ। এই বাক্যে শকুন্তলাশব্দ শ্রবণ করিয়া বালক কহিল, কই আমার মা, কোথায়? তখন তাপসী কহিলেন, না বৎস! তোমার মা এখানে আসেন নাই। আমি তোমায় শকুন্তের লাবণ্য দেখিতে কাইয়াছি। ইহা বলিয়া বাজাকে কহিলেন, মহাশয়! এই বালক জন্মাবধি জননী ভিন্ন আপনার আর কাহাকেও দেখে নাই, নিয়ত জননীর নিকটেই থাকে, এই নিমিত্ত অত্যন্ত মাতৃবৎসল। শকুন্তলাবণ্যশব্দে জননীর নামাক্ষর শ্রবণ করিয়া, উহার জননীকে মনে পড়িয়াছে। উহার জননীর নাম শকুন্তলা।

সমুদায় শ্রবণ করিয়া, রাজা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, ইহার জননীরও নাম শকুন্তলা? কি আশ্চর্য্য! উত্তরোত্তর সকল কথাই আমার বিষয়ে ঘটিতেছে! এই সকল কথা শুনিয়া আমার আশাই বা না জন্মিবে কেন? অথবা আমি মৃগতৃষ্ণিকায় ভ্রান্ত হইয়াছি, নামসাদৃশ্যশ্রবণে মনে মনে বৃথা এত আন্দোলন করিতেছি; এরূপ নামসাদশ শত শত ঘটিতে পারে।

শকুন্তলা অনেক ক্ষণ অবধি পুত্রকে দেখেন নাই, এ নিমিত্ত অতিশয় উৎকণ্ঠিত হইয়া, অন্বেষণ করিতে করিতে সহসা সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। রাজা, বিরহকৃশা মলিনবেশা শকুন্তলাকে সহসা সেই স্থানে উপস্থিত দেখিয়া, বিস্ময়াপন্ন হইয়া। এক দৃষ্টিতে তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিলেন; নয়নযুগলে জলধারা বহিতে লাগিল; বাক্শক্তিরহিত হইয়া দণ্ডায়মান রহিলেন, একটিও কথা কহিতে পারিলেন না। শকুন্তলাও অকস্মাৎ রাজাকে দেখিয়া, স্বপ্নদর্শনবৎ বোধ করিয়া, স্থির নয়নে তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিলেন; নয়নযুগল বাষ্পবারিতে পরিপ্লুত হইয়া আসিল। বালক, শকুন্তলাকে দেখিবামাত্র, মা মা করিয়া তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইল এবং জিজ্ঞাসিল, মা! ও কে, ওকে দেখে তুই কাঁদিস্ কেন? তখন শকুন্তলা গদগদ বচনে কহিলেন, বাছা! ও কথা আমায় জিজ্ঞাসা কর কেন? আপন অদৃষ্টকে জিজ্ঞাসা কর।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে, রাজা মনের আবেগ সংবরণ করিয়া শকুন্তলাকে কহিলেন, প্রিয়ে! আমি তোমার প্রতি যে অসদ্ব্যবহার করিয়াছি, তাহা বলিবার নয়। তৎকালে আমার মতিচ্ছন্ন ঘটিয়াছিল, তাহাতেই অবমাননা করিয়া তোমায় বিদায় করিয়াছিলাম। কয়েক দিবস পরেই, আমার সকল বৃত্তান্ত স্মরণ হইয়াছিল; তদবধি আমি কি অসুখে কালহরণ করিয়াছি, তাহা আমার অন্তরাত্মাই জানেন। পুনর্বার তোমার দর্শন পাইব, আমার সে আশা ছিল না। এক্ষণে তুমি, প্রত্যাখ্যানদুঃখ পরিত্যাগ করিয়া, আমার অপরাধ মার্জ্জনা কর।

রাজা এই বলিয়া, উন্মুলিত তরুর ন্যায়, ভূতলে পতিত কইলেন। তদ্দর্শনে শকুন্তলা আস্তে ব্যস্তে রাজার হস্তে ধরিয়া কহিলেন, আর্য্যপুত্র! উঠ উঠ, তোমার দোষ কি, আমার অদৃষ্টের দোষ। এত দিনের পর দুঃখিনীকে যে স্মরণ করিয়াছ, তাহাতেই আমার সকল দুঃখ দূর হইয়াছে। এই বলিতে বলিতে শকুন্তলার চক্ষে ধারা বহিতে লাগিল। রাজা গাত্রোত্থান করিয়া বাষ্পপূর্ণ নয়নে কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ে! প্রত্যাখ্যান কালে তোমার নয়নযুগল হইতে যে জলধারা বিগলিত হইয়াছিল, তাহা উপেক্ষা করিয়াছিলাম, পরে সেই দুঃখে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া গিয়াছিল। এক্ষণে তোমার চক্ষের জলধারা মুছিয়া দিয়া সকল দুঃখ দূর করি। এই বলিয়া, স্বহস্তে শকুন্তলার চক্ষের জল মুছিয়া দিলেন। শকুন্তলার শোকসাগর আরও উথলিয়া উঠিল; দ্বিগুণ প্রবাহে নয়নে বারিধারা বহিতে লাগিল। অনন্তর দুঃখাবেগ সংবরণ করিয়া, শকুন্তলা রাজাকে কহিলেন, আর্য্যপুত্র! তুমি যে এই দুঃখিনীকে পুনরায় স্মরণ করিবে, সে আশা ছিল না। কি রূপে আমি তোমার স্মৃতিপথে পতিত হইলাম, ভাবিয়া স্থির করিতে পারিতেছি না। তখন রাজা কহিলেন, প্রিয়ে! তৎকালে। তুমি আমায় যে অঙ্গুরীয় দেখাইতে পার নাই, কয়েক দিবস পরে উহা আমার হস্তে পড়িলে, আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত আমার স্মৃতিপথে আরূঢ় হয়। এই সেই অঙ্গুরীয়। এই বলিয়া, স্বীয় অঙ্গুলিস্থিত সেই অঙ্গুরীয় দেখাইয়া, পুনর্বার শকুন্তলার অঙ্গুলিতে পরাইয়া দিবার চেষ্টা করিলেন। তখন শকুন্তলা কহিলেন, আর্যপুত্র! আর আমার ও অঙ্গুরীয়ে কাজ নাই; ওই আমার সর্ব্বনাশ করিয়াছিল; ও তোমার অঙ্গুলিতেই থাকুক।

উভয়ের এইরূপ কথোপকথন হইতেছে, এমন সময়ে মাতালি আসিয়া প্রফুল্ল বদনে কহিলেন, মহারাজ! এত দিনের পর আপনি যে ধর্মপত্নীসহিত সমাগত হইলেন, ইহাতে আমরা কি পর্যন্ত আহ্লাদিত হইয়াছি, বলিতে পারি না। ভগবান্ কশ্যপও শুনিয়া সাতিশয় প্রীত হইয়াছেন। এক্ষণে গিয়া ভগবানের সহিত সাক্ষাৎ করুন। তিনি আপনকার প্রতীক্ষা করিতেছেন। তখন রাজা শকুন্তলাকে কহিলেন, প্রিয়ে! চল অজি উভয়ে এক সমভিব্যাহারে ভগবানের চরণদর্শন করিব। শকুন্তলা কহিলেন, আর্যপুত্র! ক্ষমা কর, আমি তোমার সঙ্গে গুরু জনের নিকটে যাইতে পারিব না। তখন রাজা কহিলেন, প্রিয়ে! শুভ সময়ে এক সমভিব্যাহারে গুরু জনের নিকটে যাওয়া দূষ্য নহে। চল, বিলম্ব করিয়া কাজ নাই।

এই বলিয়া, রাজা শকুন্তলাকে সঙ্গে লইয়া, মাতলিসমভিব্যাহারে, কশ্যপের নিকট উপস্থিত হইলেন; দেখিলেন, ভগবান্ অদতির সহিত একাসনে বসিয়া আছেন। তখন সস্ত্রীক সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে সম্মুখে দণ্ডায়মান রহিলেন। কশ্যপ, বৎস! চিরজীবী হইয়া, অপ্রহিত প্রভাবে অখণ্ড ভূমওলে একাধিপত্য কর, এই বলিয়া আশীর্বাদ করিলেন। অনন্তর শকুন্তলাকে কহিলেন, বৎস! তোমার স্বামী ইন্দ্রসদৃশ, পুত্র জয়ন্তসদৃশ; তোমায় অন্য আর কি আশীর্বাদ করিব; তুমি শচীসদৃশী হও। উভয়কে এই আশীর্বাদ করিয়া উপবেশন করিতে কহিলেন।

সকলে উপবিষ্ট হইলে, রাজা কৃতাঞ্জলি হইয়া বিনপূর্ণ বচনে নিবেদন করিলেন, ভগবন্! শকুন্তলা আপনকার সগোত্র মহর্ষি কণ্বের পালিত তনয়া। মৃগয়াপ্রসঙ্গে তদীয় তপোবনে উপস্থিত হইয়া, আমি গান্ধর্ব্ববিধানে ইহার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলাম। পরে ইনি যৎকালে রাজধানীতে নীত হন, তখন আমার এরূপ স্মৃতিভ্রংশ ঘটিয়াছিল যে ইঁহাকে চিনিতে পারিলাম না। চিনিতে না পারিয়া, প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলাম। ইহাতে আমি মহাশয়ের ও মহর্ষি কণ্বের নিকট অত্যন্ত অপরাধী হইয়াছি। কৃপা করিয়া আমার অপরাধ মার্জ্জনা করুন; আর যাহাতে ভগবান্ কণ্ব আমার উপর অক্রোধ হন, আপনাকে তাহারও উপায় করিতে হইবেক।

কশ্যপ শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, বৎস! সে জন্য তুমি কুণ্ঠিত হইও না। এ বিষয়ে তোমার অণুমাত্র অপরাধ নাই। যে কারণে তোমার স্মৃতিভ্রংশ ঘটিয়াছিল, তুমি ও শকুন্তলা উভয়েই অবগত নই। এই নিমিত্ত আমি তোমাদিগকে সেই স্মৃতিভ্রংশের প্রকৃত হেতু কহিতেছি। শুনিলে শকুন্তলার হৃদয় হইতে প্রত্যাখ্যাননিবন্ধন সকল ক্ষোভ দুর হইবেক। এই বলিয়া, শকুন্তলাকে কহিলেন, বৎসে! রাজা তপোবন হইতে প্রতিগমন করিলে পর, এক দিন তুমি পতিচিন্তায় মগ্ন হইয়া কুটীরে উপবিষ্ট ছিলে। সেই সময়ে দুর্ব্বাসা আসিয়া অতিথি হন। তুমি এক কালে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া ছিলে, সুতরাং তাঁহার সৎকার বা সংবর্দ্ধনা করা হয় নাই। তিনি তাহাতে কুপিত হইয়া, তোমায় এই শাপ দিয়া, চলিয়া যান, তুই যার চিন্তায় মগ্ন হইয়া অতিথির অবমাননা করিলি, সে কখনও তোরে স্মরণ করিবে না। তুমি সেই শাপ শুনিতে পাও নাই। তোমার সখীরা শুনিতে পাইয়া তাঁহার চরণে ধরিয়া অনেক অনুনয় করিলেন। তখন তিনি কহিলেন, এ শাপ অন্যথা হইবার নহে। তবে যদি কোনও অভিজ্ঞান দর্শাইতে পারে, তাহা হইলে স্মরণ করিবেক। অনন্তর, রাজাকে কহিলেন, বৎস! দুর্ব্বাসার শাপপ্রভাবেই তোমার স্মৃতিভ্রংশ ঘটিয়াছিল, তাহাতেই তুমি ইঁহাকে চিনিতে পার নাই। শকুন্তলার সখীর অনুনয়বাক্যে কিঞ্চিৎ শাস্তু হইয়া, দুর্ব্বাসা অভিজ্ঞানদর্শনকে শাপমোচনের উপায় নির্দ্ধারিত করিয়া দিয়াছিলেন; সেই নিমিত্ত, অঙ্গুরীয়দর্শনমাত্র, শকুন্তলবৃত্তান্ত পুনর্বার তোমার স্মৃতিপথে আরূঢ় হয়।

দুর্ব্বাসার শাপবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া, সাতিশয় হর্ষিত হইয়া, রাজা কহিলেন, ভগবান্! এক্ষণে আমি সকলের নিকট সকল অপরাধ হইতে মুক্ত হইলাম। শকুন্তলাও শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এই নিমিত্তই আমার এই দুর্দশা ঘটিয়াছিল; নতুবা আর্য্যপুত্র, এমন সরলহৃদয় হইয়া, কেন আমায় অকারণে পরিত্যাগ করিবেন? দুর্ব্বাসার শাপই আমার সর্ব্বনাশের মূল। এই জন্যেই, তপোবন হইতে প্রস্থানকালে, সখীরাও যত্নপূর্ব্বক আর্য্যপুত্রকে অঙ্গুরীয় দেখাইতে কহিয়াছিলেন। আজি ভাগ্যে এই কথা শুনিলাম; নতুবা যাবজ্জীবন আমার অন্তঃকরণে, আর্য্যপুত্র অকারণে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন বলিয়া, ক্ষোভ থাকিত।

পরে, কশ্যপ রাজাকে সম্বোধন করিয়া, কহিলেন, বৎস! তোমার এই পুত্র সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধিপতি হইবেক, এবং সকল ভুবনের ভর্ত্তা হইয়া, উত্তর কালে ভরত নামে প্রসিদ্ধ হইবেক। তখন রাজা কহিলেন, ভগবন্। আপনি যখন এই বালকের সংস্কার করিয়াছেন, তখন ইহাতে কি না সম্ভবিতে পারে? অদিতি কহিলেন, অবিলম্বে কণ্ব ও মেনকার নিকট এই সংবাদ প্রেরণ করা আবশ্যক। তদনুসারে কশ্যপ, দুই শিষ্যকে আহ্বান করিয়া, কণ্ব ও মেনকার নিকট সংবাদপ্রদানার্থ প্রেরণ করিলেন, এবং রাজাকে কহিলেন, বৎস! বহু দিবস হইল রাজধানী হইতে আসিয়াছ, অতএব আর বিলম্ব না করিয়া, দেবরথে আরোহণপূর্ব্বক, পত্নীপুত্র সমভিব্যাহারে প্রস্থান কর। তখন রাজা, মহাশয়ের যে আজ্ঞা এই বলিয়া, প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া, সস্ত্রীক সপুত্র রথে আরোহণ করিলেন, এবং নিজ রাজধানী প্রত্যাগমনপূর্ব্বক পরম সুখে রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন করিতে লাগিলেন।

মূল রচনাঃ কালিদাস
অনুবাদঃ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments