Wednesday, June 19, 2024
Homeউপন্যাসপুতুল নাচের ইতিকথা - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

পুতুল নাচের ইতিকথা – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

০১. খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছ

খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন।

হারুর মাথায় কাঁচা-পাকা চুল আর বসন্তের দাগভরা রুক্ষ চামড়া ঝলসিয়া পুড়িয়া গেল। সে কিন্তু কিছুই টের পাইল না। শতাব্দীর পুরাতন তরুটির মূক অবচেতনার সঙ্গে একান্ন বছরের আত্মমমতায় গড়িয়া তোলা জগৎটি তাহার চোখের পলকে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে।

কটাক্ষ করিয়া আকাশের দেবতা দিগন্ত কাঁপাইয়া এক হুঙ্কার ছাড়িলেন। তারপর জোরে বৃষ্টি চাপিয়া আসিল।

বটগাছের ঘন পাতাতেও বেশিক্ষণ বৃষ্টি আটকাইল না। হারু দেখিতে দেখিতে ভিজিয়া উঠিল। স্থানটিতে ওজনের ঝাঁঝালো সামুদ্রিক গন্ধ ক্রমে মিলাইয়া আসিল। অদূরের ঝোপটির ভিতর হইতে কেয়ার সুমিষ্ট গন্ধ ছড়াইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। সবুজ রঙের সরু লিকলিকে একটা সাপ একটি কেয়াকে পাকে পাকে জড়াইয়া ধরিয়া আচ্ছন্ন হইয়াছিল। গায়ে বৃষ্টির জল লাগায় ধীরে ধীরে পাক খুলিয়া ঝোপের বাহিরে আসিল। ক্ষণকাল স্থিরভাবে কুটিল অপলক চোখে হারুর দিকে চাহিয়া থাকিয়া তাহার দুই পায়ের মধ্য দিয়াই বটগাছের কোটরে অদৃশ্য হইয়া গেল।

হারুকে সহজে এখানে কেহ আবিষ্কার করিবে, এরূপ সম্ভাবনা কম। এদিকে মানুষের বসতি নাই। এদিকে আসিবার প্রয়োজন কাহারো বড় একটা হয় না, সহজে কেহ আসিতেও চায় না। গ্রামের লোক ভয় করিতে ভালবাসে। গ্রামের বাহিরে খালের এপাড়ের ঘন জঙ্গল ও গভীর নির্জনতাকে তাহারা এই কাজে লাগাইয়াছে। ভূত-প্রেতের অস্তিত্ব হয়তো গ্রামবাসীরই ভীরু কল্পনায়, কিন্তু স্থানটি যে সাপের রাজ্য তাহাতে আর সন্দেহ নাই।

দিনের আলো বজায় থাকিতে থাকিতে বাজিতপুরের দু-একটি সাহসী পথিক মাঠ ভাঙিয়া আসিয়া ঘাসের নিচে অদৃশ্যপ্রায় পথ-রেখাটির সাহায্যে পথ সংক্ষেপ করে। বলিয়া-কহিয়া কারো নৌকায় খাল পার হইলেই গাওদিয়ার সড়ক। গ্রামের পৌঁছিতে আর আধ মাইলও হাঁটিতে হয় না। চণ্ডীর মা মাঝে মাঝে দুপুরবেলা এদিকে কাঠ কুড়াইতে আসে। যামিনী কবিরাগের চেলা সপ্তাহে একটি গুল্মলতা কুড়াইয়া লইয়া যায়। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে ভিনগাঁয়ের সাপুড়ে কখনো সাপ ধরিতে আসে। আর কেহ ভুলিয়াও এদিকে পা দেয় না।

বৃষ্টি থামিতে বেলা কাবার হইয়া আসিল। আকাশের একপ্রান্তে ভীরু লজ্জার মতো একটু রঙের আভাস দেখা দিল। বটগাছের শাখায় পাখিরা উড়িয়া আসিয়া বসিল এবং কিছু দূরে মাটির গায়ে গর্ত হইতে উইয়ের দলকে নবোদ্গত পাখা মেলিয়া আকাশে উড়িতে দেখিয়া হঠাৎ আবার সেই দিকে উড়িয়া গেল। হারুর স্থায়ী নিস্পন্দতায় সাহস পাইয়া গাছের কাঠবিড়ালীটি এক সময় নিচে নামিয়া আসিল। ওদিকে বুঁদিগাছের জালে একটা গিরগিটি কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেকগুলি পোকা আয়ত্ব করিয়া ফেলিল। মরা শালিকের বাচ্চাটিকে মুখে করিয়া সামনে আসিয়া ছপ-ছপ করিয়া পার হইয়া যাওয়ার সময় একটা শিয়াল বার বার মুখ ফিরিয়া হারুকে দেখিয়া গেল। ওরা টের পায়। কেমন করিয়া টের পায় কে জানে!

শশী বলিল, নৌকা ওদিকে সরিয়ে নিয়ে যা গোবর্ধন। ওই শ্যাওড়াগাছটার কাছে। এখান দিয়ে নামানো যাবে না।

বটগাছটার সামনাসামনি খালের পাড় অত্যন্ত ঢালু। বৃষ্টিতে পিছলও হইয়া আছে। গোবর্ধন লগি ঠেলিয়া নৌকা পাশের দিকে সরাইয়া লাইয়া গেল! সাত মাইল তফাতে নদীর জল চব্বিশ ঘণ্টায় তিন হাত বাড়িয়াছে। খালে স্রোতও বড় কম নয়। শ্যাওড়াগাছের একটা ডাল ধরিয়া ফেলিয়া নৌকা স্থির করিয়া গোবর্ধন বলিল, আপনি লায়ে বসবে এসো বাবু, আমি লাবাচ্ছি।

শশী বলিল, দূর হতভাগা, তোকে ছুঁতে নেই।

গোবর্ধন বলিল, ছুঁলাম বা কে জানছে? আপনি ও ধুমসো মড়াটাকে লাবাতে পারবে কেন?

শশী ভাবিয়া দেখিল, কথাটা মিথ্যা নয়। পড়িয়া গেলে হারুর সর্বাঙ্গ কাদামাখা হইয়া যাইবে। তার চেয়ে গোবর্ধন ছুঁইলে শবের আর এমন কী বেশি অপমান? অপঘাতে মৃত্যু হইয়াছে,–মুক্তি হারুর গোবর্ধন ছুঁইলেও নাই, না ছুঁইলেও নাই।

আয় তবে, দুজনে ধরেই নামাই। গাছের সঙ্গে টেনে নৌকা বাঁধ, সরে গেলে মুশকিল হবে। আচ্ছা, আলোটা আগে জেলে নে গোবর্ধন। অন্ধকার হয়ে এল।

আলো জ্বালিয়া শ্যাওড়াগাছের সঙ্গে নৌকা বাঁধিয়া গোবর্ধন উপরে উঠিয়া গেল। দুজনে ধরাধরি করিয়া হারুকে তাহারা সাবধানে নৌকায় নামাইয়া আনিল। শশী একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, দে, নৌকা খুলে দে গোবর্ধন। আর দ্যাখ ওকে তুই আর ছুঁসনে।

আবার ছোঁবার দরকার!

শশী শহর হইতে ফিরিতেছিল। নৌকায় বসিয়াই সে দেখিতে পায়, খালের মনুষ্যবর্জিত তীরে সন্ধ্যার আবছা আলোয় গাছে ঠেস দিয়া ভূতের মত একটা লোক দাঁড়াইয়া আছে। পাগল ছাড়া এসময় সাপের রাজ্যে মানুষ ওভাবে দাঁড়াইয়া থাকে না। শশীর বিস্ময় ও কৌতুহলের সীমা ছিল না। হাঁকডাক দিয়া সাড়া না পাইয়া গোবর্ধনকে সে নৌকা ভিড়াইতে বলিয়াছিল। গোবর্ধন প্রথমটা রাজি হয় নাই। ওখানে এমন সময় মানুষ আসিবে কোথা হইতে। শশীর ও চোখের ভুল। সত্য সত্যই সে যদি কিছু দেখিয়া থাকেও, ওই কিছুটির ঘনিষ্ঠ পরিচয় লইয়া আর কাজ নাই, মানে মানে এবার বাড়ি ফেরাই ভালো। কিন্তু শশী কলিকাতার কলেজে পাস করিয়া ডাক্তার হইয়াছে। গোবর্ধনের কোনো আপত্তিই সে কানে তোলে নাই। বলিয়াছিল, ভূত যদি হয় তো বেঁধে এনে পোষ মানাব গোবর্ধন, নৌকা ফেরা।

তখনো আকাশে আলো ছিল। হারুর চারিপাশে কচুপাতায় আটকানো জলের রুপালি রূপ একেবারে নিভিয়া যায় নাই। কাছে গিয়া হারুকে দেখিবামাত্র শশী চিনিতে পারিয়াছিল।

ওরে গোবর্ধন, এ যে আমাদের হারু এখানে ও এল কী করে?

গোবর্ধনের মুখে অনেকক্ষণ কথা সরে নাই। সে সভয়ে চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, মরে গেছে নাকি ছোটবাবু?

মরে গেছে। বাজ পড়েছিল।

আহা চুলগুলো বেবাক জ্বলে গেছে গো!

হারুর বদলে আর কেহ হইলে, যে মানুষটা মরিয়া গিয়াছে তাহার চুলের জন্য গোবর্ধনকে শোক করিতে শুনিয়া শশীর হয়তো হাসি আসিত। কিন্তু গ্রামের বাহিরে হারুকে এ অবস্থায় আবিষ্কার করিয়া তাহার মনে অত্যন্ত আঘাত লাগিয়াছিল। হারুর ছেলেমেয়ে আছে, আত্মীয়বন্ধু আছে, সকলের চোখের আড়ালে একটা গাছের নিচে ওর একা-একা মরিয়া যাওয়া কী শোচনীয় দুর্ঘটনা! গোবর্ধনের কথায় তাহার মন আরও বিষন্ন হইয়া গেল।

গোবর্ধনের বুকের মধ্যে টিপচিপ করিতেছিল!

এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আর কী হবে ছোটবাবু? গায়ে খপর দি গে চলো।

এমনিভাবে ফেলে রেখে চলে যাব গোবর্ধন?

তার আর করছ কী?

গাঁ থেকে লোকজন নিয়ে ফিরতে ফিরতে শেয়াল যদি টানাটানি আরম্ভ করে দেয়?

গোবর্ধন শিহরিয়া বলিয়াছিল, তবে কী করবে ছোটবাবু?

হাঁক তো, কেউ যদি আসে।

কিন্তু এই বাদল-সন্ধ্যায় আশেপাশে কে আছে যে হাঁকিয়ে ছুটিয়া আসিবে? নিজের হাঁক শুনিয়া গোবর্ধন নিজেই চমকাইয়া উঠিয়াছিল। আর কোনো ফল হয় নাই। রসুলপুরের হাটের দিন খালে অনেক নৌকা চলাচল করে; আজ কতক্ষণে আর-একটি নৌকার দেখা মিলিবে, একেবারে মিলিবে কী না, তাহারও কিছু স্থিরতা নাই।

হারুকে নৌকায় নামাইয়া লওয়ার কথাটা তখন শশীর মনে হয়।

নৌকা খুলিবামাত্র স্রোতের টানে গতিলাভ করিল। গলুই-এর উপর দাঁড়াইয়া লগিটা ঝপ করিয়া জলের মধ্যে ফেলিয়া গোবর্ধন হঠাৎ ঔৎসুক্যের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিল, একটা কথা কও ছোটবাবু। উহার মুক্তি নাই তো?

শশী হাল ধরিয়া বসিয়াছিল। হাই তুলিয়া বলিল, কি জানি গোবর্ধন, জানি না।

তাহার হাই তোলাকে বিরক্তির লক্ষণ মনে করিয়া গোবর্ধন আর কিছু বলিতে সাহস পাইল না।

শশী বিরক্ত হয় নাই, অন্যমনস্ক হইয়া গিয়াছিল। হারুর মরণের সংস্রবে অকস্মাৎ আসিয়া পড়িয়া শশীর কম দুঃখ হয় নাই। কিন্তু তার চেয়েও গভীরভাবে নাড়া খাইয়াছিল জীবনের প্রতি তাহার মমতা। মৃত্যু এক-এক জনকে এক-এক ভাবে বিচলিত করে। আত্মীয় পরের মৃত্যুতে যাহারা মর-মানবের জন্য শোক করে, শশী তাহদের মতো নয়। একজনকে মরিতে দেখিলে তাহার মনে পড়িয়া যায় না সকলেই একদিন মরিবে,–চেনা-অচেনা আপন-পর যে যেখানে আছে প্রত্যেকে–এবং সে নিজেও। শ্মশানে শশীর শ্মশান-বৈরাগ্য আসে না। জীবনটা সহসা তাহার কাছে অতি কাম্য উপভোগ্য বলিয়া মনে হয়। মনে হয়, এমন একটা জীবনকে সে যেন এতকাল ঠিকভাবে ব্যবহার করে নাই। মৃত্যু পর্যন্ত অন্যমনস্ক বঁচিয়া থাকার মধ্যে জীবনের অনেক কিছুই যেন তাহার অপচয়িত হইয়া যাইবে। শুধু তাহার নয়, সকলের। জীবনের এই ক্ষতি প্রতিকারহীন।

মৃত্যুর সান্নিধ্য এইভাবে এইদিক দিয়া শশীকে ব্যথিত করে।

কিছুদূর সোজা গিয়া গাওদিয়ার প্রান্তভাগ ছুঁইয়া খাল পুবে দিক পরিবর্তন করিয়াছে। বাঁকের মুখে গ্রামের ঘাট। গাওদিয়া ছোট গ্রাম। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধার বিশেষ ধারে না। ঘাটও আর কিছুই নয়, কোদাল দিয়া কয়েকটি ধাপ কাটিয়া দেওয়া হইয়াছে মাত্র ঘাটের উপরে একটা টিনের চালা আছে। পাটের সময় সেখানে পাট জমাইয়া বাজিতপুরে শশীর ভগ্নিপতি নন্দলালের গুদামে চালান দেওয়া হয়। তিন চার ক্ষেপ চালান গেলেই গাওদিয়ার পাট চালানের পাঠ ওঠে। তারপর সারা বছর চালাটা পড়িয়া থাকে খালি। গোরু, ছাগল, মানুষ—যাহার খুশি ব্যবহার করে, কেহ বারণ করিতে আসে না। চালার সামনেই চণ্ডীর মার ছেলে চণ্ডী সারাদিন একটা কাঠের বাক্সের উপর কয়েক প্যাকেট লাল-নীল কাগজ মোড়া বিড়ি ও রেকাবিতে ভিজা ন্যাকড়ায় ঢাকা কয়েক খিলি পান সাজাইয়া বসিয়া থাকে।

ঘাটে কয়েকটি ছোট বড় নৌকা বাঁধা ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে একটিতেও এখন না আছে আলো, না আছে মানুষ।

গোবর্ধনের মনে ভয় ছিল, তাহাকে নৌকায় পাহারা রাখিয়া শশী হয়তো নিজেই গ্রামে যাইতে চাইবে। ঘাটে নৌকা বাঁধিয়াই সে তাই বলিল, আমি তা হলে গায়ে খপর দিগে ছোটবাবু?

শশী বলিল, যা। পা চালিয়ে যাস গোবর্ধন। আগে যাবি গোয়ালা পাড়ায়। নিতাই, সুদেব, বংশী-ওরা সবাই যেন ছুটে চলে আসে। বলিস, আমি অন্ধকারে মড়া আগলে বসে রইলাম। আলোটা তুই নিয়ে যা, যেতে যেতে ঘুরঘুটি অন্ধকার হবে। পিছল রাস্তা।

আলো লইয়া গোবর্ধন চলিয়া গেল। এতক্ষণে সন্ধ্যা হইয়াছে। আকাশ খুঁজিলে হয়তো এখনো একটু ধূসর আভা চোখে পড়ে কিন্তু অন্ধকার দ্রুত গাঢ় হইয়া আসিতেছে। শশী ভাবিল, আর পনেরো-বিশ মিনিট দেরি করিয়া বটগাছটার কাছে পৌঁছিলে হারুকে সে ঠাহর করিতে পারিত না। খাল দিয়া যাতায়াত করিবার সময় ভূত ও সাপের রাজ্যটির দিকে সে বরাবর চোখ তুলিয়া তাকায়। আজও তাকাইত। কিন্তু হারুকে তাহার মনে হইত গাছের গুড়িরই একটা অংশ। হয়তো মানুষের আকৃতির সঙ্গে গাছের অংশটির সাদৃশ্য লক্ষ্য করিয়া আর হারুর পরনের কাপড়ের শ্বেতাভ রহস্যটুকুর মানে না বুঝিয়া তাহার একটু শিহরন জাগিত মাত্র। হারু ওইভাবে পড়িয়া থাকিত। কতদিন পরে শিয়ালের দাঁত ও শকুনির চঞ্চুতে সাফ-করা তাহার হাড় কয়খনি মানুষ আবিষ্কার করিত কে জানে! পঞ্চুকে চণ্ডীর-মা যেমন আবিষ্কার করিয়াছিল। সর্বাঙ্গে খাবলা খাবলা পচা মাংস, কোথাও হাড় বাহির হইয়া পড়িয়াছে। দুই হাতের মুঠার মধ্যে প্রকাণ্ড খরিস সাপটা শুকাইয়া হইয়া আছে একেবারে দড়ি।

স্রোতের বেগে নৌকা মৃদু মৃদু দুলিতেছিল। নৌকার গলুইএ সে দোলন একটা জীবন্ত প্রাণের অস্থিরতার মতো পৌঁছিতেছে। নড়িয়া চড়িয়া শশী একসময় সোজা হইয়া বসে। মনে একটা বিড়ি ধরাইবার ইচ্ছা জাগিতেছিল। কিন্তু সেটুকু উৎসাহও সে যেন পায় না। তাহার চোখের সামনে চারিদিক ক্রমে গাঢ় অন্ধকারে ঢাকিয়া যায়। তীরের গাছগুলি জমাটবাধা অন্ধকারের রূপ নেয়, জলের উপর জনহীন নৌকা কখানা হালকা ছায়ার মতো আলগোছে ভাসিতে থাকে। মাথার উপর দিয়া অদৃশ্যপ্রায় কতগুলি পাখি সাঁ-সাঁ শব্দ করিয়া উড়িয়া যায়। চারিদিকে জোনাকি ঝিকমিক করিতে আরম্ভ করে।

এত কাছেও হারুর মুখ ঝাপসা হইয়া যায়। তাহার মুখখানা ভালো করিয়া দেখিবার চেষ্টায় ব্যর্থ হইয়া সে যে মরিয়া গিয়াছে এই সত্যটা শশী যেন আবার নূতন করিয়া অনুভব করে। ভাবে, মরিবার সময় হারু কী ভাবিতেছিল কে জানে! কোন্‌ কল্পনা কোন অনুভূতির মাঝখানে তাহার হঠাৎ ছেদ পড়িয়ছিল?

মেয়ের জন্য পাত্ৰ দেখিতে হারু বাজিতপুরে গিয়াছিল এটা শশী জানিত। পথ সংক্ষেপ করিবার জন্য ওই বিপথে সে পাড়ি জমাইয়াছিল। পথ তাহার সংক্ষিপ্তই হইয়া গেল। পাড়িও জমিল ভালোই।

ঘণ্টাদুই পরে গোটা তিনেক লণ্ঠন সঙ্গে করিয়া হারুর সাত-আট জন স্বজাতি আসিয়া পড়িল। নিস্তব্ধ ঘাটটি মুহুর্তে হইয়া উঠিল মুখরিত।

শশী সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল, নিতাই এসেছে, নিতাই?

নিতাই সাড়া দিল—আজ্ঞে, এই যে আমি ছোটবাবু।

নিতাইয়ের দায়িত্বজ্ঞান প্রসিদ্ধ। শশী আনেকটা ভরসা পাইল।

হারুর বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে নিতাই?

হয়েছে ছোটবাবু।

আলো উঁচু করিয়া ধরিয়া সকলে তাহারা ভিড় করিয়া হারুকে দেখিতে লাগিল। গোবর্ধনের কাছে ব্যাপারটা আগাগোড়া শুনিয়াছিল। শশীর কাছে আর একবার শুনিল।

তারপর ঘাটের খাঁজের উপর উবু হইয়া বসিয়া আরম্ভ করিয়া দিল জটলা।

কিছুক্ষণের মধ্যে শশীর মনে হইল, হারুর পরলোক-গমন ওদের কথার মধ্যেই এতক্ষণে শোচনীয় হইয়া উঠিতেছে। বর্ষণক্ষান্ত বিষন্ন রাত্রে কালিপড়া লণ্ঠনের মৃদু রঙিন আলোয় হারুর জীবনের টুকরো-টুকরো ঘটনাগুলি যেন দৃশ্যমান ছায়াছবির রূপ গ্রহণ করিয়া চোখের সামনে ভাসিয়া আসিতে লাগিল। হারুর পরিবারের ক্ষতি ও বেদনার প্রকৃতি উপলব্ধি যেন এতক্ষণে শশী আয়ত্ত করিতে পারিল। সে বুঝিতে পারিল, সংসারে হারু যে কতখানি স্থান শূন্য রাখিয়া গিয়াছে-এই অশিক্ষিত মানুষগুলির মনের মাপকাঠি দিয়াই তাহার পরিমাণ সম্ভব। এতক্ষণ হারুর অপমৃত্যুকে সে বুঝিতে পারে নাই। হারুকে সে আপনার জগতে তুলিয়া লাইয়াছিল। সেখানে শূন্য করিয়া রাখিয়া যাওয়ার মতো স্থান হারু কোনোদিন অধিকার করিয়া ছিল কি না সন্দেহ।

নীরবে শশী অনেক্ষণ তাহাদের আলোচনা কান পাতিয়া শুনিল। শেষে রাত বাড়িয়া যাইতেছে খেয়াল করিয়া বলিল, তোমরা তাহলে আর বসে থেক না নিতাই। রসিকবাবুর বাগান থেকে বাঁশ কেটে এলে একটা মাচা বেঁধে ফেল।

নিতাই প্রশ্ন করিল, সোজা মশানবিলে নিয়ে যাব কি ছোটবাবু?

শশী বলিল, না। ওর বাড়িতে একবার নামাতে হবে।

হারুকে সোজাসুজি শ্মশানে লইয়া গেলে অনেক হাঙ্গামা কমিত। কিন্তু হারুর মেয়ে মতির জ্বর। সকালে শ্মশানে আসিলেও সে আসিতে পারবে না। তাহাকে একবার না দেখাইয়া হারুকে পোড়াইয়া ফেলিবার কথাটা শশী ভাবিতেও পারিতেছিল না। মতির কাছে খবরটা এখন কয়েক দিনের জন্য চাপিয়া যাওয়ার বুদ্ধিও বাড়ির কাহারও হইবে কি না সন্দেহ। মতি জানিতে পরিবে তাহারই জন্য বর খুঁজিতে গিয়া ফিরিবার পথে হারু অপঘাতে প্রাণ দিয়াছে। জ্বর গায়ে এই বর্ষার রাত্রে হয়তো সে শ্মশানে ছুটিয়া আসিবে। জোর করিয়া বাড়িতে আটকাইয়া রাখিলে আর সকলকেই হয়তো সে ক্ষমা করিবে, নিয়তিকে পর্যন্ত, কিন্তু শশীকে সে সহজে মার্জনা করিবে না। বলিবে, আপনি থাকতে আমাকে একটিবার না দেখিয়ে বাবাকে ওরা পুড়িয়ে ফেলেছিল গো!

রসিকবাবুর বাগান হইতে বাঁশ কাটিয়া আনিয়া মাচা বাঁধা হইল। তারপর হারুকে মাচায় শোয়াইয়া হরিবোল দিয়া মাচাটা তাহারা কাঁধে তুলিয়া লইল।

শশী কহিল, এখন তোমরা হরিবোল দিও না। হারু শ্মশান-যাত্রা করেনি, বাড়ি যাচ্ছে।

কথাটা এমন করিয়া শশী ইচ্ছা করিয়া বলে নাই। নিজের কথায় নিজেরই চোখদুটি তাহার সজল হইয়া উঠিল।

রাস্তাটি চওড়া মন্দ নয়, কিন্তু কাঁচা। বর্ষাকালে কোথাও একহাঁটু কাদা হয়, কোথাও এঁটেল মাটিতে বিপজ্জনক রকমের পিছল হইয়া থাকে। গোরুর গাড়ির চাকাতেই রাস্তাটির সর্বনাশ করে সবচেয়ে বেশি। বর্ষার পর কাদা শুকাইয়া মনে হয় আগাগোড়া যেন লাঙল দিয়া চষিয়া ফেলা হইয়াছে। শীত পড়িতে পড়িতে পথটি আবার সমতল হইয়া যায় সত্য, কিন্তু লক্ষ লক্ষ ক্ষতের উঁচু সীমানগুলি গুড়া হইয়া এত ধুলা হয় যে পায়ের পাতা ডুবিয়া যায়। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বাতাসে ধুলা উড়িয়া দুপাশের গাছগুলিকে বিবর্ণ করিয়া দেয়।

গ্রামে ঢুকিবার আগে খালের সঙ্গে সংযুক্ত নালার উপর একটি পুল পড়ে। পুলের নিচে স্রোতের মুখে জালি পাতিয়া নবীন মাঝি সেই অপরাহ্ল হইতে বুকজলে দাঁড়াইয়া আছে।

নিতাই ডাকিয়া বলে, কী মাছ পড়ল মাঝি?

নবীন বলে, মাছ কোথা ঘোষ মশাই? জল বড় বেশি গো!

মাগুরটাগুর পেলি নবীন? পেলে আমাকে একটা দিস। ছেলেটা কাল পথ্যি করবে।

নবীন মিথ্যা জবাব দেয়। বলে, জলে দেঁড়িয়ে কি মিছা কথা কইছি। এত জলে মাছ পড়ে না। ইদিকে তিন হাত ফাঁক রইছে দেখছ নি?

হারুর মরণের খবরটা সে শান্তভাবে গ্রহণ করে।

বলে, লোক বড় ভালো ছিল গো। জগতে শত্তুর নেই।

তারপর বলে, ই বছর, জান ঘোষ মশায়, অদৃষ্ট সবার মন্দ। তিন বর্ষা নাবল না, এর মধ্যে জল কামড়াতে নেগেছে।

দিন নাই রাত্রি নাই, জলে স্থলে নবীনের কঠোর জীবনসংগ্রাম। দেহের সঙ্গে মনও তাহার হাজিয়া গিয়াছে। হারুর অপমৃত্যুতে বিচলিত হওয়ার সময় তাহার নাই।

অথচ এদিকে মমতাও জানে। দশবছরের ছেলেটা বিকাল হইতে পুলের উপর ঠায় দাঁড়াইয়া আছে। জলে নামিয়া বাপের মতো সেও মাছ ধরিতে চায়। কিন্তু নবীন কোনোমতে অনুমতি দিবে না।

রেতে লয় বাপ, জ্বর হবে। কাল বিহানে আসিস।

বিহানে জল রইবে নি বাবা।

হু, রইবে নি আবার! তোর ডুবজল হবে, জনিস্‌।

পুল পার হইয়া কিছুদূর অবধি রাস্তার দুপাশে শুধু চষা ক্ষেত। তারপর গ্রাম আরম্ভ হইয়াছে। এদিকে বসতি কম। রাস্তার দক্ষিণে ঝোপঝাপের বেষ্টনীর মধ্য পৃথক কয়েকটা ভাঙাচোরা ঘর বৃষ্টিতে ঘর-বাইরে ভিজিয়াছে। ওখানে সাত ঘর বাগদী বাস করে গ্রামের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ওরাই সবচেয়ে গরিব, সবচেয়ে ছোটলোক, সবচেয়ে চোর। দিনে ওরা যে-গৃহস্থের চাল মেরামত করে, রাত্রে সুযোগ পাইলে তাহারই ভিটায় সিঁধ দেয়। কেহ-না-কেহ ওদের মধ্যে ছ মাস এক বছর জেলেই পড়িয়া আছে।

ছাড়া পাইবার পর গ্রামে ফিরিয়া বলে, শ্বশুর-ঘর থে ফিরলুম দাদা। বেশ ছিলাম গো!

একটুকু পার হয়ে গেলে বসতি ঘন হইয়া আসে। বাড়িঘরের উন্নত অবস্থা চোখে পড়ে। পথের দুইদিকেই দুটি-একটি শাখা-পথ পাড়ার দিকে বাহির হইয়া যাইতে আরম্ভ করিয়াছে দেখা যায়। মাঝে মাঝে কলাবাগান সুপারিবাগান ও ছোট ছোট বাঁশঝাড় ডাইনে বায়ে আবির্ভূত হয়। আমবাগানকে অন্ধকারে মনে হয় অরণ্য। কোনো কোনো বাড়ির সামনে কামিনী গন্ধরাজ ও জবাফুলের বাগান করিবার ক্ষীণ চেষ্টা চোখে পড়ে। ক্রমে দু একটি পাকা দালানের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। বাড়িগুলি আগাগোড়া দালান নয়, এক ভিটায় দুখানা ঘর হয়তো ইটের, বাকিগুলি শণে ছাওয়া চাচের বেড়ায় গ্রামেরই চিরন্তন নিজস্ব নীড়।

নির্জন স্তব্ধ পথে শববাহী তাহারাই জীবনের সাড়া দিয়া চলিয়াছে। শশীর বিষন্নতা ঘুচিবার নয়। আলো হাতে সকলের আগে আগে সে যাইতেছিল। নিতাই, সুদেব ওরা কথা কহিতেছে সকলেই, কথা নাই কেবল শশীর মুখে। পথের ধারে কোনো বাড়িতে আলো জ্বলিতেছে দেখিলে তাহার ইচ্ছা হয় হাঁক দিয়া বাড়ির লোকের সাড়া নেয়। এক মিনিট দাঁড়াইয়া অকারণে বাড়ির সকলের কুশল জিজ্ঞাসা করে। তাহার সাড়া পাইয়া কান্নার রোল তুলিবে না এমন একটি পরিবারের খবর না লইয়া হারুর বাড়ির দিকে চলিতে সে যেন জোর পাইতেছিল না।

খানিক আগাইয়া বাজার।

এখানে গ্রাম জমাট বাঁধিয়াছে। দোকানটাটের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু বাদলের রাত্রি গভীর হওয়ার আগে সবগুলি দোকানই এখন বন্ধ হইয়া গিয়াছে। রাস্তার বাঁ দিকে একটা ফাঁকা জায়গায় কতকগুলি টিনের চালা। একদিন অস্তুর

ওখানে বাজার বসে।

কোথা হইতে এক সন্ন্যাসী আসিয়া একটা চালার নিচে আশ্রয় লইয়াছে। সম্মুখে তাহার ধুনির আগুন। আগুনে সন্ন্যাসী মোটা রুটি সেকিতেছিল। ওদিকের চালাটায় লোম-ওঠা শীর্ণ কুকুরটা থাবায় মুখ রাখিয়া তাহাই দেখিতেছে। শশী তাড়াতাড়ি আগাইয়া গেল। তার পা বারবার জলকাদা-ভরা গর্তে গিয়া পড়িতেছিল! মনের গতির আজ সে ঠিক-ঠিকানা পাইতেছিল না।

শ্ৰীনাথ দাসের মুদিখানার পাশ দিয়া কায়েত পাড়ার পথটা বাহির হইয়া গিয়াছে। হারুর বাড়ি এই পথের শেষ সীমায়। তারপর আর বাড়িঘর নাই। ক্রোশব্যাপী মাঠ নিঃসাড়ে পড়িয়া আছে!

পথের মোড়ে বকুলগাছটির গোড়া পাকা বাঁধানো। বিকালের দিকে এখানে প্রত্যহ সরকারি আড্ডা বসে। আলোটা ওখানে নামাইয়া রাখিয়া শশী একটা বিড়ি ধরাইল। চাহিয়া দেখিল গাছের নিচে শুকনো ভাল ও কাঁচা-পাকা পাতার সঙ্গে পাতার উপর ন্যাকড়া-জড়ানো একটা পুতুল পড়িয়া আছে। পুতুলটা শশী চিনিতে পারিল। বৈশাখ মাসে বাজিতপুরের মেলায় শ্রীনাথের দোকানে বসিয়া একঘণ্টা বিশ্রাম করার মূল্যস্বরূপ তাহার মেয়েকে পুতুলটা কিনিয়া দিয়াছিল। বিকালে বৃষ্টি থামিলে এখানে খেলিতে আসিয়া শ্ৰীনাথের মেয়ে পুতুলটা ফেলিয়া গিয়াছে।

রাত্রে পুতুলের শোকে মেয়েটা কাঁদিবে। সকালে বকুলতলা খুঁজিতে আসিয়া দেখিবে পুতুল নাই। পুতুল কে লইয়াছে মেয়েটা তাহা জানিতে পারবে না।

শশী কেবল অনুমান করিতে পারিবে যামিনী কবিরাজের বৌ ভোর ভোর বকুলতলা ঝাঁট দিয়া আসিয়া দেখিতে পাইয়া তুলিয়া লইয়া গিয়াছে।

যামিনী কবিরাজের বৌ চোরও নয় পাগলও নয়; মাটির পুতুলে সে লোভ করে না। কিন্তু প্ৰণাম করিয়া (যে গাছের তলা বাঁধানো, সেটি দেবধর্মী) মুখ তুলিতেই সামনে অত বড় একটা পুতুল পড়িয়া থাকিতে দেখিলে একথা মনে হওয়ার মধ্যে বিস্ময়ের কী আছে যে এ কাজ দেবতার, এই তাঁহার ইঙ্গিত।

পুতুলটিকে আরও খানিকটা গাছের গোড়ার দিকে ঠেলিয়া দিয়া আলোটা তুলিয়া লইয়া শশী আগাইয়া গেল। বলিল, সাবধানে পা ফেলে চলো নিতাই, আস্তে পা ফেলে চলো। ফেলে দিয়ে হারুকে কাদা মাখিও না যেন। কী রাস্তা!

কায়েতপাড়ার সংকীর্ণ পথটির দুদিকে বাঁশঝাড়ে মশা ভন-ভন করিতেছিল। যামিনী কবিরাজের গোয়ালের পিছনটাতে তিন মাসের জমানো গোবর পচিয়া উঠিয়াছে। ডোবার মধ্যে সারাবছর ধরিয়া গজানো আগাছার জঙ্গল এখন বর্ষার টুবু টুবু জলের তলে হাঁপাইয়া হাপাইয়া বিষাক্ত হইয়া উঠিয়াছে।

খানিক দূর আগাইয়া হারুর বৌ এর মড়াকান্না তাহদের কানে ভাসিয়া আসিল।

০২. শশীর চরিত্র

শশীর চরিত্রে দুই সুস্পষ্ট ভাগ আছে। একদিকে তাহার মধ্যে যেমন কল্পনা, ভাবাবেগ ও রসবোধের অভাব নাই, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ সাংসারিক বুদ্ধি ও ধনসম্পত্তির প্রতি মমতাও তাহার যথেষ্ট। তাহার কল্পনাময় অংশটুকু গোপন ও মূক। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে তাহার সঙ্গে না মিশিলে একথা কেহ টের পাইবে না যে তার ভিতরেও জীবনের সৌন্দর্য ও শ্রীহীনতার একটা গভীর সহানুভূতিমূলক বিচার-পদ্ধতি আছে। তাহার বুদ্ধি, সংযম ও হিসাবি প্রকৃতির পরিচয় মানুষ সাধারণত পায়। সংসারে টিকিবার জন্য দরকারি এই গুণগুলির জন্য শশীকে সকলে ভয় ও খাতির করিয়া চলে।

শশীর চরিত্রের এই দিকটা গড়িয়া তুলিয়াছে তাহার বাবা গোপাল দাস।

গোপাল দাসের কারবার লোকে বলে গলায় ছুরি দেওয়া। আসলে সে করে সম্পত্তি কেনাবেচা ও টাকা ধার দেওয়া। অর্থাৎ দালালি ও মহাজনি। শোনা যায়, এককালে সে নাকি বার-তিনেক জীবন্ত মামুষের কেনাবেচার ব্যাপারেও দালালি করিয়াছে—তিনটি বৃদ্ধের বউ জুটাইয়া দেওয়া। সে আজকের কথা নয়। বৃদ্ধ তিনজনের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হইয়াছে। এখন যামিনী করিরাজের মরণ হইলেই ব্যাপারটা পুরোপুরি ইতিহাসের গর্ভে তলাইয়া যাইতে পারে। কিন্তু যামিনী কবিরাজের বউ, শশী যাহাকে সেনদিদি বলিয়া ডাকে এবং শশীকে যে অপুত্রবতী রমণী গভীরভাবে স্নেহ করে, স্বামীকে সে এত যত্নে এত সাবধানে বাঁচাইয়া রাখিয়াছে যে শীঘ্ৰ যামিনী কবিরাজের মরিবার সম্ভাবনা নাই। যামিনী কিন্তু মরিতে চায়। গ্রামের কলঙ্ক রটানোর কাজে উৎসাহী নিষ্কৰ্মা ব্যক্তির সংখ্যা এত বেশি যে, এতটুকু এদিক ওদিক হইলে গ্রামের বউ-ঝিদের কলঙ্ক দিগদিগন্তে রটিয়া যায়। কেহ বিশ্বাস করে, কেহ করে না। যে বিশ্বাস করে সেও সত্যামিথ্যা যাচাই করে না, যে অবিশ্বাস করে, সেও নয়। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নটা নির্ভর করে মানুষের খুশির উপর। গ্রামের কলঙ্কিনীদের মধ্যে শশীর সেনদিদির প্রসিদ্ধিই বেশি। গোপালের সঙ্গেই তার নামটা জড়ানো হয় বেশি সময়। লোকে নানা কথা বলাবলি করে। শশী বিশ্বাস করে না। যামিনী করে। সে খুড়খুড়ে বুড়া। সন্দেহের তীব্র বিষে সে দগ্ধ হইয়া যায়। স্ত্রী পাড়ার কারো বাড়ি গেলে রাগে-দুঃখে এক-একদিন সে কাদিয়াও ফেলে। স্ত্রীর কায়েতবাড়ি কাসুন্দি বানাইয়া আসার কৈফিয়তটা সে বিশ্বাস করে না। অথচ শশীর সেনদিদি সত্য কৈফিয়তই দেয়। অতীতে কখনও সে যদি কোনো অন্যায় করিয়া থাকে, তাহা অতীতের সত্যমিথ্যা পাপপুণ্যে মিশিয়া আছে। উন্মাদ ছাড়া আজ শশীর সেনদিদিকে কেহ অবিশ্বাস করিবে না। বুড়া হইয়া যামিনীর মাথাটা খারাপ হইয়া গিয়াছে।

দেখা হইলে গোপালকে শাপ দেয়। বলে, এক কাঁড়ি টাকা নিয়ে তুই আমার খুব উপকার করেছিলি গোপাল। উচ্ছন্ন যাবি তুই, তোর সর্বনাশ হবে, ঘরবাড়ি তোর শ্মশান হয়ে যাবে!

যামিনী কবিরাজের বউ-এর সম্বন্ধে গোপালের বদনাম হয়তো মিথ্যা তবু লোক গোপাল ভালো নয়। তুচ্ছ কতগুলি টাকার জন্য সে-ই তো প্রতিমার মতো কিশোরীকে বুড়ো, পাগলা যামিনী কবিরাজের বউ করিয়াছিল।

শশীই গোপালের একমাত্র ছেলে, মেয়ে আছে তিনটি। বড়মেয়ের নাম বিন্ধ্যবাসিনী। বড়গার নায়েব শ্যামাচরণ দাসের বড়ছেলে মোহনের সঙ্গে তাহার বিবাহ হইয়াছে। মোহনের একটা পা খোড়া। মেজমেয়ে বিন্দুবাসিনীর বিবাহ হইয়াছে খাস কলিকাতায় বড়বাজারের নন্দলাল অ্যান্ড কোং-এর নন্দলালের সঙ্গে।

গোপালের সে এক স্মরণীয় কীর্তি।

নন্দলালের কারবার পাটের। চারিদিক হইতে পাট সংগ্ৰহ করিয়া জমা করিবার সুবিধা হয় এবং চালান দিবার ভালো ব্যবস্থা থাকে এমন একটি মধ্যবর্তী গ্রাম খুঁজিয়া বাহির করিবার উদ্দেশ্যে বছর-সাতেক আগে সে একবার এদিকে আসিয়াছিল। গোপাল তাহাকে ডাকিয়া লইয়া গিয়াছিল নিজের বাড়ি, আদর-যত্ন করিয়াছিল ঘরের লোকের মতো। তারপর কোথা দিয়া কী হইয়া গেল কে জানে,–হয়তো নন্দলালের দোষ ছিল, হয়তো ছিল না,–তিন দিন পরে গোপালের অনুগত গ্রামবাসীরা লাঠি হাতে দাঁড়াইয়া বিন্দুর সঙ্গে নন্দলালের বিবাহ দিয়া দিল। নন্দলালের চাকরটা রাতারাতি বাজিতপুরে পলাইয়াছিল। পরদিন মনিবের উদ্ধারে সে একেবারে পুলিশ লইয়া হাজির! নন্দলাল ইচ্ছা করিলে কিছু কিছু শাস্তি অনেককেই দিতে পারিত,–গম্ভীর বিষন্ন মুখে পুলিশকে সে-ই বিদায় করিয়া দিল। তারপর বউ লইয়া সেই-যে সে কলিকাতায় গেল,–গাওদিয়ার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখিল না।

যাই হোক, নন্দলালের কাছে বিন্দুবাসিনী হয়তো সুখেই আছে। গ্রামের লোক সঠিক খবর রাখে না। সাত বছরের মধ্যে বিন্দু একবার মাত্র তিনদিনের জন্য বাপের বাড়ি আসিয়াছিল। গ্রামের ছেলে-বুড়ো তখন ঈর্ষার চোখে চাহিয়া দেখিয়াছিল,—অলঙ্কারে অলঙ্কারে বিন্দুর দেহে তিল ধারণের স্থান নাই, একেবারে যেন বাইজি। তবু, হয়তো বিন্দু সুখে নাই! নন্দর তো বয়স হইয়াছে, আর একটা স্ত্রী তো তাহার আছে, চরিত্রও সম্ভবত তাহার ভালো নয়। গাওদিয়াবাসী যাহাদের বিবাহিত কন্যাগুলি সারি সারি দাঁড়াইয়া চোখের জলে ভাসে, তারা ভাবে, হয়তো বিন্দু সুখে নাই! ভাবিয়া তাহারা তৃপ্তি পায়। কেহ মুখ ফুটিয়া মনের কথা বলিয়াও ফেলে। গোপাল শুনিতে পাইলে অস্ফুট স্বরে বলে লক্ষ্মীছাড়ার দল!

এমনি বাপের শাসনে শশী মানুষ হইয়াছিল। কলিকাতায় মেডিকেল কলেজে পড়িতে যাওয়ার সময় তাহার হৃদয় ছিল সংকীর্ণ, চিন্তাশক্তি ছিল ভোঁতা, রসবোধ ছিল স্থূল। গ্রাম্য গৃহস্থের স্বকেন্দ্রীয় সংকীর্ণ জীবনযাপনের মোটামুটি একটা ছবিই ছিল ভবিষ্যৎ জীবন সম্বন্ধে তাহার কল্পনার সীমা। কলিকাতায় থাকিবার সময় তাহার অনুভূতির জগতে মার্জনা আনিয়া দেয় বই এবং বন্ধু। বন্ধুটির নাম কুমুদ, বাড়ি বরিশালে, লম্বা কালো চেহারা, বেপরোয়া খ্যাপাটে স্বভাব। মাঝে মাঝে কবিতাও কুমুদ লিখিত। কলেজে সে প্রায়ই যাইত না, হোস্টেলে নিজের ঘরে বিছানায় চিত হইয়া শুইয়া যত রাজ্যের ইংরেজি বাঙলা নভেল পড়িত, কথকতার মতো হৃদয়গ্রাহী করিয়া ধর্ম, সমাজ, ঈশ্বর ও নারীর (ষোলো-সতেরো বছরের বালিকাদের) বিরুদ্ধে যা মনে আসিত বলিয়া যাইত আর টাকা ধার করিত শশীর কাছে। শশী প্রথমে মেয়েদের মতোই কুমুদের প্রেমে পড়িয়া গিয়াছিল; ওকে টাকা ধার দিতে পারলে সে যেন বর্তিয়া যাইত। কুমুদ প্রথমে তাহাকে বিশেষ আমল দিত না, কিন্তু অনেক দুঃখ, অপমান ও অভিমান চুপচাপ সহ্য করিয়া শশী তাহার অন্তরঙ্গতা অর্জন করিয়াছিল।

সেটা তাহার অনুকরণ করার বয়স। এই একটি মাত্র বন্ধুর প্রভাবে শশী একবারে বদলাইয়া গেল। যে দুর্গের মধ্যে গোপাল তাহার মনকে পুরিয়া সিল করিয়া দিয়াছিল, কুমুদ তাহা একেবারে ভাঙিয়া ফেলিতে পারিল না বটে কিন্তু অনেকগুলি জানালা দরজা কাটিয়া দিয়া বাহিরের আলো বাতাস আনিয়া দিল, অন্ধকারের অন্তরাল হইতে মনকে তাহার বাহিরের উদারতায় বাড়াইতে যাইতে শিখাইয়া দিল।

প্রথমটা শশী একটু উদভ্ৰান্ত হইয়া গেল। মাথা ঘামাইয়া ঘামাইয়া জীবনকে ফেনাইয়া, ফাঁপাইয়া মানুষ এমন বিরাট ব্যাপার করিয়া তুলিয়াছে? জানিবার এত বিষয়, উপভোগ করিবার এত উপায়; বিজ্ঞান ও কাব্য মিশিয়া এমন জটিল, এমন রসালো মানুষের জীবন? তারপর গ্রামে ডাক্তারি করিতে বসিয়া প্রথমে সে যেন হাঁপাইয়া উঠিল। জীবনটা কলিকাতায় যেন বন্ধুর বিবাহের বাজনার মতো বাজিতেছিল, সহসা স্বন্ধ হইয়া গিয়াছে। এইসব অশিক্ষিত নরনারী, ডোবা পুকুর, বন জঙ্গল মাঠ, বাকি জীবনটা তাহাকে এখানেই কাটাইতে হইবে নাকি? ও ভগবান, একটা লাইব্রেরি পর্যন্ত যে এখানে নাই! ক্রমে ক্রমে শশীর মন শান্ত হইয়াছে। সে তো গ্রামেরই সন্তান, গ্রাম্য নরনারীর মধ্যে গ্রামের মাটি মাখিয়া গ্রামের জলবায়ু শুষিয়া সে বড় হইয়াছে। হৃদয় ও মনের গড়ন আসলে তাহার গ্রাম্য। শহর তাহার মনে যে ছাপ দিয়াছিল তাহা মুছিবার নয়, কিন্তু সে শুধু ছাপ, দাগা নয়। শহরের অভ্যাস যতটা পারে বজায় রাখিয়া বাকিটা সে বিসর্জন করিতে পারিল, কুমুদও বইয়ের কল্যাণে পাওয়া বহু বৃহত্তর আশা-আকাঙ্ক্ষাও ক্রমে ক্রমে সে চিন্তা ও কল্পনাতে পর্যবসিত করিয়া ফেলিতে পারিল।

এ সুদূর পল্লিতে হয়তো সে-বসন্তু কখনও আসিবে না যাহার কোকিল পিয়ানো, সুবাস এসেল, দখিনা ফ্যানের বাতাস। তবু, শশীর মনকে কে বাঁধিয়া রাখিবে? দীর্ঘ জীবন পড়িয়া আছে, পড়িয়া আছে বিপুল পৃথিবী। আজ শশী কামিনীঝোপের পাশে ক্যাম্পচেয়ারে বসিয়া বাঁশঝাড়ের পাতা-কাঁপানো ডোবার গন্ধ ভরা ঝিরঝির বাতাসে উন্মনা হোক, কোলের উপর ফেলিয়া-রাখা বইখানার দুটি মলাটের মধ্যে কাম্য জীবনটি তাহার আবদ্ধ থাক, একদিন কেয়ারি-করা ফুলবাগানের মাঝখানে বসানো লাল টাইলে ছাওয়া বাংলোয় শশী খাঁচার মধ্যে কেনারি পাখির নাচ দেখিবে, দামি ব্লাউজে ঢাকা বুকখানা শশীর বুকের কাছে স্পন্দিত হইবে,–আলো পান হাসি আনন্দ আভিজাত্য– কিসের অভাব তখন থাকিবে শশীর?

কায়েতপাড়ার পথটি তিন ভাগ অতিক্রম করিয়া গেলে শশীর বাড়ি। হারুর বাড়ি পথের একেবারে শেষে। এই হারু ঘোষ-খালের ধারে বটগাছের তলে যে সেদিন অপরাহ্লে বজ্রাঘাতে মরিয়া গিয়াছে।

মতির জ্বর কমে নাই। সন্ধ্যার সময় শশী তাহাকে দেখিতে গেল। সারাদিন শশীর সময় ছিল না।

সন্ধ্যার সময় হারুর বাড়িতে প্রদীপ জ্বলে নাই। হারুর বউ মোক্ষদা হারুর ছেলে পরাণের বউ কুসুমের উপর ভারি খাপ্পা হইয়া উঠিয়াছিল। ব্যাপারটা বুঝিয়া দাখো গৃহস্থবাড়ি। সন্ধা আসিয়াছে। বাড়িতে একটা বউ আছে। অথচ সন্ধ্যাদীপ জ্বলে নাই। গলায় গড়ি দিয়া বউটা মরিয়া যায় না কেন?

সে কাপড় ছাড়িল। তারপর জ্বলিতে গেল প্ৰদীপ। তাহার নির্লজ্জ ধীরতা মোক্ষদাকে একেবারে খেপাইয়া তুলিল। কুসুমের হাত হইতে প্রদীপটা ছিনাইয়া লইয়া রান্নাঘরে গিয়া উনানে পাটখড়ি ধরাইয়া সে প্রদীপ জ্বলিল। তারপর তাড়াতাড়ি পার হইতে গিয়া শুকনো উঠানে সে কেমন করিয়া পড়িয়া গেল কে জানে!

কুসুম হাসিয়া উঠিল সশব্দে। তারপর আঁচলটা কোমরে জড়াইয়া মোক্ষদাকে আড়কোলে শূন্যে তুলিয়া শোবার ঘরের সামনে দাওয়ায় নামাইয়া দিল। তেইশ বছরের বাজা মেয়ে, গায়ে তাহার জোর কম নয়।

কিছুক্ষণ বাড়িতে আর কান পাতা যায় না। মোক্ষদা গলা ফাটাইয়া শাপিতে থাকে। ছেলে-কোলে বুঁচি ব্যাপার জানিতে আসিলে ছেলেটা তাহার জুড়িয়া দেয় কান্না। ওদিকের ঘরে বুঁচির মুমূর্ষ পিসি বিছানায় উঠিয়া বসিয়া আর্তস্বরে বলিতে থাকে কী হল রে? ও বুঁচি, ওলো কুসুম, কী হল রে? হেই ভগবান, কেউ কি সাড়া দেবে!

বড় ঘরের অন্ধকারে মতি শুইয়া ছিল, সেও তাহার ক্ষীণকণ্ঠ যতটা পারে উঁচুতে তুলিয়া ব্যাপার জানিতে চায়।

অবিচলিত থাকে শুধু কুসুম। দাওয়ার নিচে খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়াইয়া সে মোক্ষদার গাল শোনে।

তারপর রান্নাঘর হইতে একটা জ্বলন্ত কাঠ আনিয়া ঢুকিতে যায় শোবার ঘরে।

আঘাতের বেদনা তুলিয়া মোক্ষদা হাউমাউ করিয়া উঠে।

ও কী লো বউ, ও কী? ঘরে-দোরে আগুন দিবি না কি?

আগুন দেব কেন মা? পিলসুজের দীপটা জ্বালব।

উনুনের কাঠ এনে দীপ জ্বালাবি? দ্যাখ বুঁচি, দ্যাখ মেলেচ্ছ হারামজাদি ঘরের মধ্যে চিতা জেলে দিতে চলল, চেয়ে দ্যাখ!

কুসুম চোখ পাকাইয়া বলে, গাল দিও না বলছি অত করে, দিও না। আমপাতা দেখছ না হাতে? কাঠ থেকে যদি দীপ জ্বালাব, পাতা নিয়ে যাচ্ছি কি চিবিয়ে খাব বলে নাকি?

মোক্ষদা গলা নামাইয়া বলে, গাল তোমায় আমি দেইনি বাছা–বুঁচিকে।

কুসুমকে এ বাড়ির সকলে ভয় করে। এই বাস্তুভিটাটুকু ছাড়া হারু ঘোষের সর্বস্ব কুসুমের বাবার কাছে আজ বাধা আছে সাত বছর। একবার গিয়া কাদিয়া পড়িলেই সে দিবে নালিশ কিয়া, এরা সব তখন যাইবে কোথায়? তাই বলিয়া কুসুম যে সবসময় বাড়ির লোকগুলিকে শাসন করিয়া বেড়ায়, তা নয়। বরং সে অনেকটা নিরীহ সাজিয়াই থাকে। বকবিকি করিলে সবসময় কানেও তোলে না, নিজের মনে ঘরের কাজ করিয়া যায়। কাজ করিতে ভালো না লাগিলে খিড়কির দরজা দিয়া বাহির হইয়া গিয়া তালবনে তালপুকুরের ধারে ভূপতিত তালগাছটার গুঁড়িতে চুপচাপ বসিয়া থাকে।

উনানে ডাল-ভাত একটা কিছু চাপাইয়া হয়তো যায়। বাড়ির লোকে তাহার অনুপস্থিতি টের পায় পোড়া গন্ধে।

মেজাজের কেহ তার হদিস পায় না। কতখানি সে সহ্য করবে, কখন রাগিয়া উঠিবে, আজ পর্যন্ত তাহা ঠিকমতো বুঝিতে না পারিয়া সকলে একটু বিপদগ্রস্ত হইয়া থাকে।

পাড়ার লোক বলে, বউ তোমাদের যেন একটু পাগলাটে, না গো পরাণের মা?

মোক্ষদা বলে, একটু কেন মা, বেশ পাগল-পাগলের বংশ যে। ওর বাপ ছিল না পাগলা হয়ে, দু বছর-শেকল দিয়ে বেঁধে রাখত?

ঘরে ঢুকিয়া কুসুম প্রদীপ জ্বলিল। গাল ফুলাইয়া সবে সে শাখে তিনবার স্কু দেওয়া শেষ করিয়াছে, উঠানে শোনা গেল শশীর গলা।

বিছানার কাছে গিয়া কুসুম বলিল, সন্ধে হতে না-হতে খোঁজ নিতে এসেছে মতি।

মতি কোনো জবাব দিল না। কুসুম আবার বলিল, ওলো মতি, শুনছিস? সন্ধেদীপ জ্বালাতে-না-জ্বালাতে দেখতে এসেছে—দরদ কত?

ভারী জলচৌকিটা অবলীলাক্রমে তুলিয়া লইয়া গিয়া সে দাওয়ায় পাতিয়া দিল। বলিল, জ্বর কমেছে, ঘুমোচ্ছে এখন।

মোক্ষদা বলিল, মতি আবার ঘুমোল বো? এই মাত্তর সাড়া পেলাম যে?

শশী বলিল তোমার শাঁখের শব্দেও মতির ঘুম ভাঙল না পরাণের বউ?–সে জলচৌকিতে বসিল, ঘরের ভিতরে এক নজর চাহিয়া বলিল, পরাণ বিকেলে গিয়ে বলে এল জ্বর নাকি এবেলা খুব বেড়েছে?

কুসুম বলিল, মিথ্যে বলেছে ছোটোবাবু,–একটুতে অস্থির তো? জ্বর কই?

মোক্ষদা বলিল, কী সব বলছ তুমি আবোলতাবোল, যাও না বাছা রান্নাঘরে।

কুসুম বিনা প্রতিবাদে রান্নাঘরে চলিয়া গেল। মুখে কৌতুকের হাসি নাই, গাম্ভীর্যও নাই।

শশী বলিল, সকালে যে ওষুধ পাঠিয়েছিলাম খাওয়ানো হয়নি?

মোক্ষদা বলিল, তা তো জানি না বাবা, দেখি শুধোই মেয়েকে।

রান্নাঘর হইতে কুসুম বলিল, ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে গো হয়েছে। চেঁচামেচি করে মেয়েটার ঘুম ভাঙাচ্ছ কেন?

ঘরের ভিতর হইতে ক্ষীণকষ্ঠে মতি বলিল, আমি ওষুধ খাইনি মা।

মোক্ষদা চোখ পাকাইয়া রান্নাঘরের দিকে চাহিয়া বলিল, শুনলে বাবা, দিবি কেমন মিথ্যে কথাগুলি বলে গেল বউ, শুনলে?

শশী একটু হাসিল, কিছু বলিল না। কুসুমের এরকম সরল মিথ্যাভাষণ সে মাঝে মাঝে লক্ষ করিয়াছে। ধরা পড়িবে জানিয়া শুনিয়াই সে যেন এই মিথ্যাকথাগুলি বলে। এ যেন তাহার একধরনের পরিহাস। কালোকে সাদা বলিয়া আড়ালে সে হাসে।

ঘরে গিয়া শশী মতিকে জিজ্ঞাসা করিল, কি, কষ্ট হচ্ছে রে মতি? মতি তাহা জানে মা। সে আন্দাজে বলিল, গা ব্যথা কচ্ছে ছোটোবাবু, তেষ্টা পেয়েছে।

পিসিকে শান্তি করিয়া বুঁচি আসিয়াছিল, বলিল, আজ বড়ো কেশেছে ছোটোবাবু সারাদিন।

কানে নল লাগাইয়া শশী মতির বুকটা পরীক্ষা করিয়া দেখিল। এ পরীক্ষায় মতির বড় লজ্জা করে, বুকের মধ্যে টিপটিপ করিতে থাকে। স্টেথোস্কোপের নল বাহিয়া তাহা । শশীর কানে পৌঁছায়, সে অবাক হইয়া বলে, নিশ্বাস বন্ধ করে থাকতে তোকে কে বলেছে মতি, জোরে জোরে নিশ্বাস নে! —বুঁচি আলোটা উঁচু করিয়া ধরিয়াছে, শশী মতির মুখের দিকে তাকায়।

ভাঙা লণ্ঠনের রাঙা আলোতে মতির রঙ যেন মিশিয়া গিয়াছে।

নিঃশব্দ পদে কুসুম যে কখন পিছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল!

বুকে ওর হয়েছে কী? এত পরীক্ষে কিসের?

একটু সর্দি বসেছে বলে মনে হচ্ছে পরাণের বউ। গরম তেল মালিশ করে দিও।

কুসুম ভীরুকষ্ঠে বলে, সর্দি ঠিক তো ছোটোবাবু? পরীক্ষের রকম দেখে ভয়ে বুকে কাপন লেগেছে মা, ক্ষয়রোগেই বা ধরল-গুলো মতি, বলিনি তোকে? বলিনি জ্বরগায়ে হাওয়ায় গিয়ে বসিস নে, ঠাণ্ড লেগে মরবি?

শশী বাহিরে গিয়া একটু বসে। মোক্ষদা তখন সবিস্তারে তাহাকে শোনায় তাহার আছাড় খাওয়ার বৃত্তাত্ত। বলে, বউ আমাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে বাবা, বউ নিয়ে হয়েছে আমার মরণ।–নিচুগলায় আবোলতাবোল অনেকক্ষণ মোক্ষদা বকে। হারু আজ মরিয়াছে দিনসাতেক, তার কথা উল্লেখ করিয়া সে এখন আর সুর করিয়া কাঁদে না, বারবার শুধু চোখ করে সে কুসুমের,—শুনিয়া মনে হয় সবই বুঝে সত্য বলিতেছে। বুঁচি চুপ করিয়া শোনে, কথাটি বলে না; না দেয় সায়, না করে প্রতিবাদ। আর রান্নাঘরে শশীকে শোনাইয়া কুসুম করে যাত্রার দলের গান, টানা গুনগুনানো সুরে, অস্পষ্ট ভীরু গলায়। সত্য সত্যই পাগল নাকি কুসুম?

তারপর রান্নাঘর হইতে বাহির হইয়া কুসুম কোথায় যায় কে বলিবে।

শশী খানিক পরে বিদায় নেয়। হারুর বাড়ি কায়েতপাড়ার পথটার ঠিক উপরে নয়, দুপাশে বেগুনক্ষেতের মাঝখান দিয়ে হাত তিনেক চওড়া খানিকটা পথ পার হইয়া রাস্তায় পড়িতে হয়।

শশী তাড়াতাড়ি এইটুকু পার হইয়া যাইতেছিল, ডাইনে বেগুনক্ষেতের বেড়ার ওপাশ হইতে কুসুম বলিল, ছোটোবাবু, শুনুন!

শশী অবাক হইয়া বলিল, তুমি ওখানে কী করছ বউ? সাপে কামড়াবে যে?

কুসুম বলিল, সাপে আমাকে কামড়াবে না ছোটোবাবু, আমার অদৃষ্ট মরণ নেই।

শশী হাসিয়া বলিল, কী আবার হল তোমার?

পরাণের বউ বলে যে ডাকলেন আজ? পরাণের বউ বললে, আমার গোসা হয় ছোটোবাবু। পিসি বলত,–বুঁচির ছোট পিসি, ও বছর যে সগ্যে গেল, অমনি গাল তাকে একদিন দিলাম দিলাম–

আমাকেও নাহয় দাও দুটো গাল।

তাই বললাম? হাঁ ছোটোবাবু, তাই বললাম? পূজ্য মানুষ আপনি, আপনাকে পুজো করে আমাদের পুণ্যি হয়–

গড়গড় করিয়া মুখস্থ বুলির মতো একরাশ তোষামোদের কথা কুসুম বলিয়া যায়, শুনিতে মন্দ লাগে না শশীর। কত বছর আজ সে কুসুমের এমনি পাগলামি দেখিতেছে। ওর এইসব খাপছাড়া কথায় ব্যবহারে একটি যেন মিষ্টি ছন্দ আছে।

বাড়ি যাও বউ, ভাত পোড়া লাগবে।

কাল আসবেন ছোটোবাবু মতিকে দেখতে?

আসব। কেমন থাকে সকালে একবার খবর পাঠিও, অ্যাঁ।

রোজ একবার এলেই হয়! জ্বর ভুগছে মেয়েটা, দেখে তো যাওয়া উচিত? কদিন আসেননি বলে বাড়ির সবাই কত কথা বললে ছোটোবাবু। বললেন, শশী আমাদের মস্ত ডাক্তার হয়েছে, না ডাকলে আর আসা হয় না। মতি কী বললে জানেন?–ছোটোবাবুর অহংকার হয়েছে!

শশী আগাইয়া যায়, বলে, আমার কাজ আছে বউ, কাল এসে তোমার মিছে কথা শুনব।

মিছে কথা নয়, সত্যি মিছে নয় ছোটোবাবু!

শশী চলিয়া গেলে অন্ধকারে বেগুনক্ষেতে দাঁড়াইয়া কুসুম একটু হাসিল। সামনে গাছের মাথার কাছে একটু আলো হইয়াছে কুসুম জানে এখানে চাঁদ উঠবে। চাঁদ উঠিবে, চাঁদ উঠিবার আভাস দেখিলে কুসুম যেন শুনিতে পায়।

ভিনদেশী পুরুষ দেখি চাঁদের মতন
লাজরক্ত হইলা কন্যা পরথম যৌবন।

কে সে কিশোরী, ভিনদেশী পুরুষ দেখিয়া যার লজ্জাতুর প্রেম জাগিত? সে কুসুম নয়, হে ভগবান, সে কুসুম নয়।

অন্ধকারে ঠাহর করিয়া দেখিয়া বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, শশী না? ও বাবা শশী তোমায় খুঁজে বেড়াচ্ছি যে ভুতো যেন কেমন করছে শশী। ওর মা কাদা-কাটা লাগিয়েছেন। তুমি এসে একটিবার দেখে যাও।

তো বাড়ুজ্যে-বাড়ি গেলি শশী, পয়সা-কড়ি দিয়েছে কিছু? দুটো একটা কলের টাকা না দিলে তো বিপদে পড়ি ককা? কত মিথ্যে বলব বাবার কাছে? পয়সাকড়ির ব্যাপার জানেন তো বাঘার, একটি পয়সা এদিকে ওদিকে হবার যো নাই।

বাসুদেব লজ্জা পাইয়া বলেন, শশীর টাকা কালই পৌঁছিয়া দিয়া আসিৰেন শশীর বাড়িতে, নিজে যাইবেন। শশী ভাবে, আজ নয় কেন? মুখে সে কিছু বলে না বাসুদেবের বাড়ি কম দূর নয়। শ্রীনাথের দোকান ছাড়াইয়া, রজনী সরকারের পাকা দালানের পাশ দিয়া বামুনপাড়া পর্যন্ত গড়ানো সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথের মাঝখান হইতে দক্ষিণদিকে ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়া পায়ে-চলা যে সংকীর্ণ রাস্তাটুকু পোয়াটক গিয়া মাঠের মধ্যে হারাইয়া গিয়াছে, তার শেষাশেষি। কদিন বৃষ্টি হয় নাই, এ বছরের মতো বর্ষা বোধহয় শেষ হইয়াছে পথের কাদা কিন্তু শুকায় নাই। জুতা হাতে করিয়া বাসুদেবের বাড়ি পৌঁছিয়া শশী পা ধুইল। বাসুদেবের ছোটছেলে ভুতোর বয়স বছর-দশেক, সাত-আট দিন আগে গাছের মগড়াল হইতে পড়িয়া গিয়া হাত-পা দুইই ভাঙিয়াছিল। তার পর জ্বরে-বিকারে অজ্ঞান হইয়া জীবন-মৃত্যুর সন্ধিস্থলে আসিয়া পড়িয়াছে। শশী তাহাকে সদর হাসপাতালে পাঠাইতে বলিয়াছিল, এরা রাজি হয় নাই। হাসপাতালের নামে ভুতোর মা ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিয়াছিল, ছেলেকে চৌকাঠের বাহিরে নিলে সে বিষ খাইয়া মরিবে। তারপর শশীই প্রাণপণে ভুতোর চিকিৎসা করিতেছে, দিনে দুইবার তিনবার আসে।

ভূতোর শিয়রে তার মা লক্ষ্মমণি মৃদুস্বরে কাঁদিতেছিলেন। বড় দুটি ছেলে, দুটি বিবাহিতা মেয়ে, তিনটি বউ ঘরের মধ্যে ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। বড় বেঁটি বিধবা, ঘোমটা দিয়া ভূতোকে সে বাতাস করিতেছিল। মায়ের পরে এ বাড়িতে দুরন্ত ছেলেটাকে সেই হয়তো ভালোবাসে সকলের চেয়ে বেশি,–চোখ দিয়া তাহার দরদর করিয়া জল পড়িতেছে।

ভুতোর অবস্থা দেখিয়া শশীর মুখ ম্লান হইয়া গেল। ছেলেটা বাঁচিবে না এ সন্দেহ তাহার ছিল; তবু দুপুরবেলা ওকে দেখিয়া গিয়া একটু আশা তাহার হইয়াছিল বইকী। একবেলায় অবস্থাটা যে এরকম দাঁড়াইবে সে তাহা ভাবিতেও পারে নাই। ছেলেটার সর্বাঙ্গে সে জড়াইয়া জড়াইয়া ব্যান্ডেজ বাঁধিয়াছিল। নড়িবার উপায় তাহার নাই, এখন থাকিয়া থাকিয়া মুখ শুধু বিকৃত করিতেছে। শশীর গলা এমনি মৃদু, এখন আরও মৃদু শোনাইল–একটু আগুন চাই সেঁক দেবার–গরম কাপড় যদি একটুকরো থাকে?

বিধবা বউটি মালসায় আগুন আনিল। একটা আলোয়ান ভাঁজ করিয়া শশীর নির্দেশমতো ভুতোর বুকে সেক দিতে লাগিল। শশী তাহকে একটা ইনজেকশন দিয়া একটু অপেক্ষা করিল। বারবার চোখের ভিতরটা লক্ষ করিয়া দেখিল, নাড়ি টিপিল, তারপর নীরবে উঠিয়া আসিল। সকলে এতক্ষণ শ্বাসরোধ করিয়া ছিল, শশীর উঠিয়া আসার ইঙ্গিতে ঘরে তাহাদের সমবেত কান্না একেবারে ভাঙিয়া পড়িল।

বিধবা বউটি পাগলের মতো ছুটিয়া আসিয়া শশীর পথ রোধ করিয়া বলিল, না, তুমি যেতে পাবে না শশী, আমার ভূতোকে বাঁচিয়ে যাও! যাও আমার ভূতোকে বাঁচিয়ে? ও যে আমার জন্যে জাম আনতে পাছে উঠেছিল শশী!

শশী কী বলিবে? সে গম্ভীর হইয়া থাকে। তারপর পথ পাইলে বাহির হইয়া যায়। জুতা হাতে করিয়া সে নামিয়া যায় পথে। পায়ে-চলা পথটির শেষেও সে কান্নার শব্দ শুনিতে পায়।

শ্ৰীনাথ দাশের মুদি দোকানের সামনে বাঁশের তৈরি বেঞ্চিতে বসিয়া কয়েকজন জটলা করিতেছিল। বোধ হয় গল্পে মশগুল থাকায় বাসুদেবের সঙ্গে যাওয়ার সময় শশীকে তাহারা দেখিতে পায় নাই। এবার শ্রীনাথ দেখিতে পাইয়া ডাকিয়া বলিল, একটু বসে যান ছোটোবাবু,–টুলটা ছাড় দেখি নিয়োগীমশায়, ছোটোবাবুকে বসতে চাও।

পঞ্চানন চক্রবর্তী জিজ্ঞাসা করিল, কোথায় গিয়েছিলে শশী?

শশী বলিল, বাসুদেব বাড়ুজ্যের বাড়ি, ভূতো এইমাত্র মারা গেল।

বটে? বাঁচল না বুঝি ছেলেটা? তবে তোমাকে বলি শোনো শশী, ভুতো যেদিন পড়ল আছাড় খেয়ে, দিনটা ছিল বিযু্যদবার। খবর পেয়ে মনে কেমন খটকা বাধল। বাড়ি গিয়ে দেখলাম পাঁজি–যা ভবেছিলাম। ছেলেটাও পড়েছে, বারবেলাও হয়েছে খতম্! লোকে বলে বারবেলা, বারবেলা কী সবটাই সর্বনেশে বাপু? বিপদ যত ওই খতম হবার বেলা। বারবেলা যখন ছাড়ছে, পায়ে কাঁটাটি ফুটলে দুনিয়ে উঠে অক্কা পাইয়ে দেবে।–-নবীন জেলের বড়ো ছেলেটাকে সেবারে কুমিরে নিলে, সেদিনও বিষ্ণুদবার, সেবারও ছেলেটা খালে নামল, বারবেলাও অমনি ছেড়ে গেল–গাওদিয়ার খালে নইলে কুমির আসে?

খালের কুমির শুধু নয়, ভূতোর কথার ভূতের কথাও আসিয়া পড়িল। তার পর বাজারের সন্ন্যাসী, বাজারদর, একাল-সেকালের পার্থক্য, নারীহরণ, পূর্ণ তালুকদারের মেয়ের কলঙ্ক, বিদেশবাসী গাঁয়ের বড়ো চাকুরে সুজন দাস, এই সব আলোচনা। শশী কি এত উঁচুতে উঠিয়া গিয়াছে যে এইসব গ্রাম্য প্রসঙ্গে তাহার মন বসিল না, শান্ত অবহেলার সঙ্গে নীরবে শুনিয়া গেল? তা তো নয়। শুধু আধখানা মন দিয়া সে ভাবিড়েছিল, এতগুলি মানুষের মনে মনে কী আশ্চর্য মিল। কারো স্বাতন্ত্রা নাই, মৌলিকতা নাই, মনের তারগুলি এক সুরে বাঁধা। সুখ-দুঃখ এক, রসানুভূতি এক, ভয় ও কুসংস্কার এক হীনতা ও উদারতার হিসেবে কেউ কারও চেয়ে এতোটুকু ছোট বা বড় নয়। পঞ্চানন জমিদার সরকারের মুহুরি, কীর্তি নিয়োগী, পেনশনপ্রাপ্ত হেডপিয়ন, শিবনারায়ণ গায়ের বাঙলা স্কুলের মাস্টার, গুরুগতির চাষ-আবাদ–ব্যবসা ইহাদের পৃথক,–মনগুলি এক ধাঁচে গড়িয়া উঠিল কী করিয়া? স্বতন্ত্র মনে হয় শুধু ভুজঙ্গধরকে, বাজিতপুরে সি ছিল এক উকিলের মুহুরি, টাকার গোলমালে দুবছর জেল খাঁটিয়া আসিয়াছে। বেশি কথা ভূজঙ্গধর বলে না, ছোট ছোট কুটিল চোখের চাহনি চঞ্চলভাবে । এদিক-ওদিক ঘুরিয়া বেড়ায়, মনে হয় কী যেন সে মতলব আঁটিতেছে, গোপন ও গভীর। কীর্তি নিয়োগীর মাথা জুড়িয়া চকচকে টাক, এতদিন পিয়নের হলদে পাগড়িতে ঢাকা থাকিত, এখন টাকের উপর আলুর মতো বড় আবটি দেখিয়া হাসি পায়। ইহার প্রতি শ্রীনাথের শ্রদ্ধা গভীর, কেন সেকথা কেহ জানে না। কীর্তির কথাগুলি শ্রীনাথ যেন গিলিতে থাকে। কীর্তি একটি পয়সা বাহির করিয়া । বলে ও ছিদাম, সাবু দিও দিকি এক পয়সার। শ্রীনাথ এক পয়সার যতটা সাগু কাগজে মুড়িয়া তাহকে দেয় তাহ দেখিয়া সকলে যেন ঈর্ষ বোধ করে, ভূজলধরের সাপের মতো চোখদুটিতে কয়েকবার পলক পড়ে না। উপরে ঝোলানো কেরোসিনের আলোটাতে শ্রীনাথের দোকানে আলো মস্ত হয় না, দোকানের সাজানো জিনিসগুলিতে যেন একটি লক্ষ্মীশ্ৰী ছড়ানো থাকে। ছোট ছোট চৌকা কাঠের খোপে চাল, ডাল, একটা ময়দার বস্তা, বারকোশ বসানো তেলের গাদমাখা পাত্র, মুড়ি-মুড়কির দুটি জালা, হরিণের ছবি আটা দেশলাই এর প্যাক, একদিকে কাঁচ বসানো হলদে টিনে সাগু-বালি গোল গোল লজেন্স,-ভুজঙ্গধর চারিদিকে চোখ বুলায়, শ্রীনাথের বসিবার ও পয়সা রাখিবার চৌকো ছোট চোকিটি ভালো করিয়া দেখিবার ভূমিকার মতো। সামনে পথ দিয়া আলো হাতে কেহ ছুটিয়া যায়, কেহ যায় বিনা আলোতে, শ্রীনাথের একটি দুটি খদের আসে। উপস্থিত একজন খদেরকে সে ভূতোর মৃত্যুসংবাদ শোনায়। —না, যে । বিষয়েই আলোচনা চলুক ভূতোর কথাটা তাহারা ভোলে নাই।

শশী উঠি-উঠি করিতেছিল, এমন সময় সকলকে অল্পবিস্তর অবাক করিয়া এক হাতে ক্যাম্বিশের ব্যাগ, এক হাতে লাঠি, বগলে ছাতি, পায়ে চটি, গায়ে উড়ানি যাদব পণ্ডিত পথ হইতে শ্রীনাথের দোকানের সামনে উঠিয়া আসিলেন। মানুষ বুড়া, শরীরটা শীর্ণ, কিন্তু হাড় কখানা মজবুত।

বিদ্যা যাদবের বেশি নয়, পণ্ডিত বলিয়া খ্যাতিও তাহার নাই, ধাৰ্মিক ও অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন বলিয়াই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। গৃহস্থ যোগী তিনি, সংসারী সাধক। স্পর্শ করিবার অধিকার যাহাদের আছে, দেখা হইলে পায়ের ধুলা নেয়, অপরে সাষ্টাঙ্গ প্ৰণিপাত করে। সাধনপথের কতকগুলি স্তর যাদব অতিক্রম করিয়াছেন কেহ জানে না; ভক্তি যাদের উচ্ছসিত, তারা সোজাসুজি সিদ্ধি লাভের কথাটাই বলে। যাবদ নিজে কিছু স্বীকার করেন না, প্রতিবাদও করেন না। কায়েতপাড়ার পথের ধারে, যামিনী কবিরাজের বাড়ি ও শশীদের বাড়ির মাঝামাঝি একটি ছোট একতলা বাড়িতে যাদব বাস করেন। এত পুরাতন, এমন জীর্ণ বাড়ি এ-অঞ্চলে আর নাই। বাড়ির খানিকটা অংশ ভাঙিয়া পড়িয়ছে। এককালে চারিদিকে বোধহয় প্রাচীর ছিল। এখন ছড়ানো পড়িয়া আছে শ্যাওলাধরা কালো ইট। যাদব বাস না করিলে বাড়িটা অনেক দিন আগেই ভূতের বাড়ি বলিয়া খ্যাতিলাভ করিত। স্ত্রী ছাড়া সংসারে যাদবের কেহ নাই। পাগলাটে স্বভাবের জন্য গ্রামের ছেলে-বুড়ো যাদবের স্ত্রীকে পাগলদিদি বলিয়া ডাকে।

কয়েক দিন আগে যাদব কলিকাতায় গিয়াছিলেন। আজ তাহার ফিরিবার কথা নয়। সকলে শশব্যস্তে প্রণাম করিয়া বসিতে দিল। পঞ্চানন জিজ্ঞাস করিল, হঠাৎ ফিরে এলেন পণ্ডিত মশায়?

যাদব বলিলেন, গেঁয়ো মানুষ, শহরে মন টিকল না বাবা।

শ্রীনাথ উচ্ছসিতভাবে বলিল, আপনারও মন টেকাটেকি দেবতা!

একথায় যাদব হাসিলেন। উচ্ছসিত ভক্তিকে গ্রহণ করিবার পদ্ধতি তাহার এই ! একে একে সকলের তিনি কুশল প্রশন করিলেন। ভূতোর মৃত্যুসংবাদে দুঃখিত হইয়া বলিলেন, আহা! কিন্তু বিশেষ বিচলিত হইলেন না। জীবন-মরণ যাহার নিকট সমান, দুরন্ত একটা বালকের মৃত্যুতে বিচলিত হওয়ার কথাও তার নয়। তবু শশীর মনে হইল সাধারণভাৰে আরও একটু ব্যথিত হওয়া যাদবের যেন উচিত ছিল! কানে না শুনিতে পান, একটা পরিবারে এখন যে বুকভাঙা হাহাকার উঠিয়াছে, যাদবের কি সে কল্পনা নাই! মিনিট দশেক বসিয়া যাদব উঠিলেন। বলিলেন, যাবে নাকি শশী বাড়ির দিকে?

শশী বলিল, চলুন।

লাঠি ঠুকিয়া যাদব পথ চলেন। শশী জানে এত জোরে লাঠির শব্দ করা সাপের জন্য মরিতে যাদব কি ভয় পান,-জীবন-মৃত্যু যার কাছে সমান হইয়া গিয়াছে? অথবা শুধু সাপের কামড়ে মরিতে তাঁর ভয়!

চলিতে চলিতে যাদব বলিলেন, তুমি তো ডাক্তার মানুষ শশী, চরক সুশ্রুত ছেড়ে বিলাতি বিদ্যে ধরেছে, কেটে ছিঁড়ে গা ফুঁড়ে মরা মানুষ বাঁচাও,–ব্যাপারটা কী বলো দেখি তোমাদের? সত্যি সত্যি কিছু আছে না কি তোমাদের চিকিৎসাশাস্ত্রে?

শশী বলল, আজ্ঞে আছে বইকী পণ্ডিত মশায়,–কারো একার খেয়ালে তো ডাক্তারিশাস্ত্র হয়নি। হাজার হাজার বৈজ্ঞানিক সারাজীবন পরীক্ষা করে করে সব আবিষ্কার করেছেন, নইলে জগৎসুদ্ধ লোক—

যাদব বললেন, সূর্যবিজ্ঞান না জানা সব বৈজ্ঞানিক তো? আদিজ্ঞান যার নেই পরবর্তী জ্ঞান সে পাবে কোথায় শশী? যেমন তোমরা সব একালের ডাক্তার, তেমনি সব কবিরাজ-দৃষ্টিহীন অন্ধ সব। গাছের পাতার রস নিংড়ে ওষুধ করলে, গাছের পাতায় ওষুধের গুণ এল কোথা থেকে? সূর্যবিজ্ঞান যে জানে সে শেকড়পাতা খোঁজে না শশী, একখানা আতশি কাঁচের জোরে সূর্যরশ্মিকে তেজস্কর ওষুদে পরিণত করে রগীর দেহে নিক্ষেপ করে,–মুহূর্তে নিরাময়। মোটা মোটা বই পড়ে ছুরি কাঁচি চালাতে শিখে কী হয়?

মনে মনে শশী রাগে। গ্রাম্য মনের অপরিত্যাজ্য সংস্কারে সেও যাদবকে ভক্তি কম করে না, তাই সায় না দিলেও তর্ক সে করিতে পারে না। বাড়ির সামনে আসিয়া যাদব বলেন, কলিকাতা থেকে আঙুর এনেছি, দুটি খেয়ে যাও শশী–মুখে বিরুদ্ধ সমালোচনা করিলেও শশীকে যাদব কি স্নেহ করেন, স্নেহ ও বিদ্বেষ যার আছে সমান শশী বলিতে পারে না আঙুর খাওয়ার শখ তাহার নাই। যাদবের সঙ্গে ভিতরে যায়।

ডাইনে বাড়ির ভাঙা অংশের স্তুপ, তার পিছনে সাহাদের দশবছরের পরিত্যক্ত ভিটা। ভারী কাষ্ঠের জীর্ণ কপাটে যাদব লাঠি ঠোকেন। ভিতর হইতে সাড়া লইয়া পাগলদিদি দরজা খুলিয়া বলেন, আজ ফিরলে কেন গো? শশী এয়েছ নাকি সাথে? এসো, ভেতরে এসো।

মুখে একটাও দাঁত নাই, তোবড়ানো গাল, পাকা চুল,-পাগলদিদিকে যাদবের চেয়েও বুড়ো দেখায়। পিঠটাও পাগলদিদির একটু বাকিয়া গিয়াছে। তবু, শীর্ণ জরাগ্রস্ত দেহে ক্ষীণ প্রাণটুকু লইয়া পাগলদিদি ফোকলামুখে অনবরত হাসেন,—এই ভাঙা বাড়ি, । ডোবাজঙ্গল ভরা এই গাওদিয়া গ্রাম, এখানে তাহার বাৰ্ধক্যপীড়িত জীবন, সব যেন কৌতুকময়-ঘনানো মৃত্যুর স্বাদে পাগলাদিদি কৌতুকময়ী।

শশী বসিলে চিবুক ধরিয়া বলেন, বড়কর্তা বাড়ি ছিল না জানতে না বুঝি ছোটকর্তা? এলে না কেন গো? ডুবে শাড়িটি পরে, চুলটি বেঁধে কনেবউটি সেজে যে বসেছিলাম তোমার জন্যে?

আঙুরগুলি যাদব ব্যাগে ভরিয়া আনিয়াছেন। বাহির করিয়া দেখা গেল চাপ লাগিয়া অর্ধেক ফল গলিয়া গিয়াছে। ব্যাগে একটি জামা, দুখানা কাপড়, গামছা এইসব ছিল, আঙুরের রসে সব ভিজিয়া গিয়াছে। যাদব অপ্রতিম্ভ হইয়া হাসেন। পাগলদিদি বলেন : দ্যাখে দাদা বুড়োর বুদ্ধি, ব্যাগে ভরে ফল এনেছেন কেন, গামছাখানা খুলে বেঁধে আনতে পারলে না?–পাগলাদিদিও হাসেন, মুখের চামড়া কুঞ্চিত হইয়া হাজার রেখার সৃষ্টি হইয়া যায়! আঙুর খাইতে খাইতে শশী পাগলদিদির মুখখানা নীরবে দেখিতে থাকে। রেখাগুলিকে তাহার মনে হয় কালের অঙ্কিত চিহ্ন-সাংকেতিক ইতিহাস। কী জীবন ছিল পাগলদিদির যৌবনে? শশী তখন জন্মে নাই। নৃজ বিশীর্ণ দেহটি তখন সুঠাম ছিল, মুখের টান-করা ত্বকে যখন লাবণ্য ছিল, কেমন ছিল তখন পাগলদিদি-মুখের রেখায় আজ কি তাহলে পড়িতে পারবে?

গুছানো সংসার পাগলদিদির। উপুড়-করা বাসনগুলি সাজানো, হাড়ি-কলসীর মুখগুলি ঢাকা, আমকাঠের সিন্দুকটায় গায়ে ধৌত পরিচ্ছন্নতা, পিলসুজে দীপটির শিখা উজ্জ্বল। এখনো ধূপের মৃদু গন্ধ আছে আর শান্ত-সব এখানে শাস্তু। মৃদু মোলেয়েম প্রশান্তি ঘরে ব্যাপ্ত হইয়া আছে। এ ঘরের আবহাওয়ার অমায়িকতা যেন নিশ্বাসে গ্রহণ করা যায়। ভাঙা হাটে যে বিষণ্ণ স্তব্ধতা ঘনাইয়া থাকে এ তা নয়। এ ঘরে বহুযুগ ধরিয়া যেন মানুষের জ্বালা-করা বেদনার হল্লা প্রবেশ করে নাই। এ ঘরে জীবন লইয়া কেহ যেন কোনোদিন হৈচৈ করিয়া বাঁচে নাই,-আজীবন শুধু ঘুমাইয়া এ ঘরকে কে যেন ঘুম পাড়াইয়া রাখিয়াছে। বড় ভালো লাগে শশীর। সে তো ডাক্তার, আহত ও রুগৃণের সঙ্গে তার সারাদিনের কারবার,–দিন ভরিয়া তাহার শুধু মাটি-ছোঁয়া বাস্তবতা,–শ্রান্ত মনে সন্ধার জনহীন মন্দিরে বসার মতো বুড়োবুড়ির এই নীড়ে সে শান্তি ৰোধ করে। শুধু আজ নয়, এখানে আসিলেই তাহার মন যেন জুড়াইয়া যায়। অথচ আশ্চর্য এই এই ঘরখানার এতটুকু আকর্ষণ বাহিরে সে বোধ করে না। এখানে আসিলে সে তো বুঝিতে পারে না মনে তাহার জ্বালা বা অসন্তোষ আছে। এখানে আসিয়া যে সন্তাপ তাহার ধীরে ধীরে জুড়াইয়া আসে, এই ঘরের বাহিরে তাহার দিন সপ্তাহমাসব্যাপী জীবনে তাহা এমনভাবে খাপ খাইয়া মিশিয়া থাকে যে, সন্তাপ সে টেরও পায় না।

০৩. মতির জন্য পাত্ৰ দেখিতে গিয়া

মতির জন্য পাত্ৰ দেখিতে গিয়া কালের ধারে বটগাছের তলে হারু ঘোষ অপঘাতে প্রাণ দিয়াছিল। গ্রামে কি মতির পাত্র মিলিত না? হারুর ছিল উচ্চ আশা। ছেলেবেলা হারু স্কুলে পড়িয়াছিল, বড় হইয়া হার বড়লোক হইয়াছিল। তারপর গরিব হইয়া পড়িলেও মনটা হারুর বিশেষ বদলায় নাই। গাওদিয়ার গোপ-সমাজ পরিহাস করিয়া তাহাকে বলিত ভম্বরলোক। বিশেষ করিয়া বলিত নিতাই। নিতাইয়ের অবস্থা ভালো, চালচলনও তাহার অনেকটা ভদ্রলোকের মতো, তবু হারু তো তাহাকে খাতির করিত না। নিতইয়ের এক ভাগ্নে আছে, তার নাম সুদেব। সুদেবের ঘরবাড়ি জমিজমা আছে, পেটে ইংরেজি বাংলা বিদ্যাও কিছু আছে, বয়সটা কেবল একটু বেশি, প্রায় ছত্রিশ। সুদেবের সঙ্গে মতির বিবাহ দিবার কত চেষ্টাই যে নিতাই করিয়াছিল বলিবার নয়। হারু রাজি হয় নাই। বাজিতপুরে ম্যাট্রিকুলেশন-পাস পত্রিটি দেখিতে গিয়া তাই না অকালে হারু স্বর্গে গেল।

হারু নাই, হারুর ছেলে পরাণ বাপের মতো চালাকও নয়, গোয়ারও নয়। গাওদিয়ার গোপ-সমাজ মতির বিবাহের জন্য আবার একটু ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে। পরাণকে তাহারা অনেক কথা বুঝায়। বলে গায়ের মেয়ে গায়ে থাকাই তো ঠিক। জানাশোনা ঘরে দিলে মেয়ে সুখে থাকিবে। দুধ-বেচা গোপের ঘরেও তো বোনকে দিবার কথা তাহারা বলিতেছে না, সুদেবের ঘর তো বনেদি ঘরের মতো। কেন দোমনা হচ্ছিস বল তো পরাণ? বাজিতপুরের ছেলেটা তো ফসকে গেছে।

সুদেবের সঙ্গে মতির বিবাহ? রসালো ফলের মতো অমন কোমল রঙ যে মতির, প্রতিমার মতো অমল নিখুঁত মুখ? প্রস্তাবটা পরাণের পছন্দ হয় না। কিন্তু অত লোকের কাছে স্পষ্ট না বলিবার মতো মনের জোরও তাহার নাই। নিমরাজি হইয়া সে বলিয়াছে, বাড়িতে আর শশীর মত থাকিলে সে আপত্তি করিবে না।

শশীর মতামতের প্রশ্নটা তাহারা পছন্দ করে নাই। নিতাই হাসিয়া বলিয়াছে, ছোটোবাবু লোক ভালো। কিন্তু নিজের সমাজে হিতৈষী গণ্যমান্য লোক থাকতে ছোটোবাবুকে মুরুব্বি ঠাওরালে পরাণ? ঘরের কথায় পরকে ডাকলে?

আজ একজন বলিয়াছে, ছোটোবাবু হরদম আসেন যান, না বটে?

একথাটা পছন্দ করে নাই পরাণ দুপক্ষের পছন্দ শেষপর্যন্ত কিসে গিয়া ঠেকিত বলা যায় না। কিন্তু হারুর আকস্মিক মৃত্যুর পর পরাণ বড় দমিয়া গিয়াছিল। কলহ না করিয়া বাড়িতে অসুখের ছুতা দিয়া সে উঠিয়া আসিয়াছে।

মতির জ্বর কিন্তু কমিয়া গিয়াছে। বর্ষার গোড়ার দিকে তাহাকে ম্যালেরিয়ায় শশীর দামি কুইনাইন জ্বরটা একেবারে ঠেকাইতে পারে নাই। এবার গা ষ্টুড়িয়া কয়েকবার তাহাকে ওষুধ দিয়া শশী আশ্বাস দিয়াছে, আর জ্বর হইবে না। জ্বরে ভুগিয়া মতির বিশেষ ক্ষতি হইয়াছে মনে হয় না। ম্যালেরিয়া ধরিবার আগে হঠাৎ সে মোটা হইতে আরম্ভ করিয়াছিল। মাঝে মাকে জ্বরে পড়িয়া এটা বন্ধ হইয়া গিয়াছে। মতির সুন্দর গড়নটি চর্বিতে ঢাকিয়া গেলে বড় আপসোসের কথা হইত।

এখনো প্রতি সপ্তাহে মতিকে শশী একটা করিয়া ইনজেকশন দেয়। সকালে বাড়িতে যে কজন রোগী আসে তাদের ব্যবস্থা করিয়া, কালো ব্যাগটি হাতে করিয়া সে যখন হারু ঘোষের বাড়ি যায়, হয়তো তখন বেলা হইয়াছে, সমস্ত উঠান ভরিয়া গিয়াছে রোদে। মতির ভীত শুকনা মুখ দেখিয়া শশী হাসিয়া বলে, এতবার দিলাম এখনো তোর ভয় গেল না মতি? কোন হাতে নিবি আজ? স্পিরিট দিয়া ঘসিলে মতির বাহুতে ময়লা ওঠে। শশী বলে, বড় নোংরা তুই মতি, -গায়ে সাবান দিতে পারিস না?

ইনজেকশন দিয়া শশী দাওয়ায় বসে। পরাণ বলে, একটা পরামর্শ আছে ছোটোবাবু। বিষয়টা মতির বিবাহ-সংক্রান্ত শুনিয়া শশী জাকিয়া বসিয়া একটা বিড়ি ধরায়। ছেলের ইশারায় মোক্ষদা সরিয়া আসে কাছে। বুঁচিও আসিয়া ছেলে-কোলে কাছে দাঁড়ায়।

কুসুমকে দেখিতে না পাইয়া শশী মনে-মনে আশ্চর্য হয়। পুধের ভিটার ঘরখানার ছায়া ঘরের মধ্যেই সঙ্কুচিত হইয়া গিয়াছে। পরাণের কথা শুনিতে শুনিতে প্রতিমুহুর্তে সঞ্চয় করিয়া কুসুম হঠাৎ বাহির হইয়া আসিবে,পরমাত্রীয়দের এই সভার একপ্রান্তে দাঁড়াইয়া থাকিবে পরের মতো।

তার সাড়া পাইয়া কুসুম যে কলসিটা তুলিয়া ঘাটে চলিয়া গিয়াছিল, শশী তাহা কেমন করিয়া জানিবে? পরাণের বক্তব্য শেষ হইয়া আসিলে কুসুম ভিজা কাপড়ে উঠানের রোদে পায়ে দাগ আকিয়া পুবের ঘরের ছায়ার মধ্যে ডুবিয়া যায়। রান্নাঘরের পোড়া ডালের গন্ধে চারিদিক ভরিয়া যাওয়ার পর ঘর হইতে সে আর বাহির হয় না।

মোক্ষদার রূঢ় বাক্যস্রোতে তারপর কিছুক্ষণের জন্য মতির বিবাহের সমস্যা ভাসিয়া যায়। রান্নাঘরের খোলা দরজা দিয়া অপরাধী ভালের হাড়িটা উঠানে আসিয়া আছড়াইয়া পড়িতে আজ যে আবার ও-প্রসঙ্গে উঠিবে সে সম্ভাবনা থাকে না। শশী ভাবে, সকলের কাছে কত বকবকিই বউটা না জানি শুনিবে!

মোক্ষদা, বুঁচি, মতি সকলেই হৈ হৈ করে। ও-ঘর হইতে মুমূর্ষ পিসি চেঁচায়, কী হল রে বুঁচি? কী হল রে মতি? চুপ করিয়া থাকে শশী। সকলকে চুপ করাইতে গিয়া পরাণহরা আরও বাড়ায়। কিন্তু কী নির্বিকার কুসুম – রাগের মাথায় ডালের হাড়িটা যে উঠানে ছুড়িয়া দিয়াছে, সে হাসিমুখে বাহিরে আসে। দাঁড়ায় শশীর সামনে। বলে, জ্বর এল নাকি, দেখুন দিকি ছোটোবাবু।

শশী নাড়ি ধরিয়া বলে, জ্বর আসেনি বউ।

মাথা ধরেছে যে ?

কতক্ষণ ধরে জলে ডুবিয়েছ তুমিই জানো, মাথার দোষ কী?

কুসুম মাথা নাড়িয়া বলে, উঁহু, আমার ঠিক জ্বর আসছে, আমি গিয়ে শুলাম। যা লো মতি, আজ তুই রাঁধবি যা।

কুসুম ঘরে গিয়া শুইয়া পড়ে।

কিন্তু শুইয়া কেন থাকিতে পারবে এই চঞ্চলা নারী? খানিক পরে উঠিয়া আসিয়া না বলিতেই পরাণকে এক ছিলিম তামাকে দিয়া সে অদূরে বসিয়া পড়ে। সুদেবের সঙ্গে মতির বিবাহে শশীর মত নাই শুনিয়া বলে, কেন গো ছোটোবাবু, সুদেব পাত্তর কী এমন মন্দ? পুরুষমানুষের আবার বয়েস—সতিন কাঁটা তো নেই? ঘরে পয়সা আছে লোকটার,–মেয়ে সুখে থাকবে।

শশী বলে, হারুকাকার অমত ছিল সেটা তো ভাবতে হবে বউ?

কুসুম বলে, তিনি সগ্যে গেছেন।

আর কিছু কুসুম বলে না। শশী তাহাকে বুঝাইবার চেষ্টা করে, সুদেব লোক ভালো নয়, মতির সঙ্গে সুদেবকে মানায় না। কুসুম বোঝে কি না কে জানে-মোক্ষদার খর দৃষ্টিপাতে মাথায় ঘোমটা একটু টানিয়া দিয়া নিশ্চল প্রতিমার মতো বসিয়া থাকে। শশী বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠিলে সে আবার মুখ খোলে। বলে, পিসিকে একবার দেখে যান ছোটোবাবু, বুড়ি কাঁদতে নেগেছে।

শশী একটু লজ্জা পায়। মরণাপন্ন পিসিকে দেখিয়া যাওয়ার কথা প্রায়ই তাহার মনে থাকে না। পিসির মরণ এতদূর সুনিশ্চিত যে তার সম্বন্ধে করিবার এখন আর কিছুই নাই। তাই কি শশী ভুলিয়া যায় আজো পিসি বাঁচিয়া আছে?

বড় বাঁচিবার সাধ পিসির।

পিসি মরিলে যে কাঠ দিয়া তাহাকে পোড়ানো হইবে, তাহার ঘরেরই অর্ধেকটা । জুড়িয়া সেগুলি সাজাইয়া রাখবা হইয়াছে। মাথার দিকে ঘরের কোণে দাড়-করানো পাটকাঠির বোঝা হইতে পিসি এখনো পাটের গন্ধ পায়; এক আঁটি পাট ধরাইয়া পিসির মুখাগ্নি করিকে পরাণ। মাথার চুল পিসির অর্ধেক ঝরিয়া গিয়াছে, দেহের লাল চামড়ার তলে মাংস আছে কিনা বোঝা যায় না। পিসি তবু বাঁচিবেই।

চুপিচুপি সে শশীকে বলে, ও বাবা শশী, বই দেখে ওষুধ দিও বাবা, দামি ওষুধ দিও। দামের জন্য ভেবো না, বাবা সেরে উঠি, ওষুধের দাম তোমায় আমি মিটিয়ে দেব।

বলে, আমার যা-কিছু আছে সব তোমাকে দিয়ে যাব, তুমি ভালো করে আমায় চিকিচ্ছে কর।

তবু শশী প্রায়ই ভুলিযা যায় পিসি বাঁচিয়া আছে।

ইনজেকশন দিবার সময় প্রত্যেকবার শশী মতিকে বলিয়াছে, আর তোর জ্বর হবে না মতি।

শশীর আশ্বাস সত্য হইলে এ বছরের মতো মতিকে ম্যালেরিয়া ছাড়িয়াছে। ওদিকে যামিনী কবিরাজের বউ, শশী যাহাকে সেন দিদি বলিয়া ডাকে, পড়িয়াছে জ্বরে।

যামিনী বিখ্যাত কবিরাজ। বহু দূরবর্তী গ্রামে তাহাকে চিকিৎসার জন্য ডাকা হয়। সিদ্ধির পাতা মিশাল দিয়া যামিনী যে চব্যনপ্রাণ প্রস্তুত করে তাহা নিয়মিত সেবন করিলে বৃদ্ধের দেহে যুবার ন্যায় শক্তির সঞ্চার হয়। মরিয়া গেলেও যামিনীর মকরধ্বজ রোগীর দেহে জীবন আনিয়া দিতে পারে। তারপর এই জীবনকে ধরিয়া রাখিবার জন্য যামিনীর আদি ও অকৃত্রিম আবিষ্কার মহাকপিলাদি বটিকা সেবন করা বিধেয়। এই বটিকা প্রস্তুত করিতে তিন রাত্রি সময় রাগে। ইহা কখনও প্রস্তুত হইয়া থাকে না। কারণ, তৈরি করিয়া রাখিলে এই মহাতেজস্কর ঔষধের গুণ সূর্যরশ্মি আকর্ষণ করিয়া লয়। সুতরাং যামিনীর মকরধ্বজের তেজে মৃতদেহে জীবন সঞ্চার হইলেও মহাকপিলাদি বটিকার অভাবে প্রাণটুকু যে সবসময় টিকিয়া থাকে, এমন নয়। কিন্তু সে অপরাধ কি যামিনীর? রোগীর কপাল! মহাকপিলাদি বটিকাতো প্রস্তুত নেই। রোগীকে না হয় বাঁচালাম, তারপর তিনদিন টেকাব কী দিয়ে?

মৃতকে যামিনীর এক লহমার জীবন দান কেহ কখনও দ্যাখে নাই। তবু লোকে বিশ্বাস করে। একজন দুজন নয়, অনেকে!

যামিনী কবিরাজের বউ কিন্তু কখনও স্বামীর ওষুধ খায় না। অসুখ হইলে এতকাল সে বিনা চিকিৎসাতেই ভালো হয়েছে, এবার জ্বরে পড়িয়া শশীকে ডাকিয়া পাঠাইলো।

গোপাল তখন বাড়িতে ছিল। শশীর হইয়া সে বলিয়া দিল, বলগে, যাচ্ছেতারপর শশীকে যাইতে নিষেধ করিয়া দিল।

শশী বলিল, কেন, যাব না কেন?

গোপাল বলিল, কবে তোমায় বুদ্ধি পাকবে, ভেবে পাই না শশী।

শশীও তাহা ভাবিয়া পায় না। সে চুপ করিয়া রহিল।

তখন গোপাল বলিল, যামিনী খুড়ে অত বড় কবরেজ, সে থাকতে ডেকে পাঠানোর মানেটা বোঝ?

শশী বলিল, আজ্ঞে না।

যুবতী স্ত্রীলোক, নানারকম কুৎসাও শুনতে পাই—

গোপালের মুখে এই কথা? লজ্জায় শশী সচকিত হইয়া গেলর। মৃদুস্বরে সে বলিল, এসব আপনার বানানো কথা বাবা।

গোপাল রাগ করিল না, বলিল, তোমার যে কী হয়েছে আজকাল বুঝতে পারি না শশী। তোমার ভালোর জন্যে একটা কথা কইলে তুমি আজকাল তর্ক জুড়ে দাও। সংসারে মানুষকে ভেবেচিন্তে কত সাবধানে চলতে হয় সে জ্ঞান তোমার এখনো জনেনি। এই তোমার উঠতি পসারের সময়, এখনই একটা বদনাম রটে গেলে-এও কি তোমায় বলে দিতে হবে? তুমি চিকিৎসার ভার নিলে বলাবলি করবে না-লোকে যামিনী কবরেজ থাকতে তুমি ছেলেমানুষ তোমার কেন আত মাথাব্যথা? সবার বাড়িতে মেয়েছেলে থাকে, এর পর কে আর ডাকবে তোমায়?

শশীর রাগ হইতেছিল। কিন্তু শৈশব ও কৈশোরের এই মনটিকে ভয় করা তাহার সংস্কারে দাঁড়াইয়া গিয়াছে, গোপালের তীক্ষ্ণ অপলক দৃষ্টিপাতে সে চোখ নামাইয়া লইল। গোপাল আবার বলিল, যামিনী খুড়োর ইচ্ছেও নয় তুমি ওদের বাড়ি যাও।

শশীর নীরবতায় গোপাল খুশি হইয়াছে। বয়স্ক উপযুক্ত সন্তানকে বশ করা, জগতে এতবড় জয় আর নাই। আজকাল নানা ছোট-বড় ব্যাপারে শশীর সঙ্গে গোপালের সংঘর্ষ বাধিতেছিল, কলহ বিবাদ নয়,-তক ও মতান্তর, আদেশ ও অবাধ্যতার বিরোধ। আজ তবে শশী বুঝিতে পারিয়াছে সাংসারিক বুদ্ধিতে বাপের চেয়ে সে ঢের বেশি কাঁচা, গোপাল এখনো তাহাকে পরিচালনা করিতে পারে।

গোপাল আরও অনেক কথা বলিল, শশী নীরবে শুনিয়া গেল। শেষে তাহার কঠিন মুখের ভাব দেখিয়া আর কিছু বলা ভালো না মনে করিয়া গোপাল থামিল।

খাওয়াদাওয়ার পর শশী গেল যামিনী কবিরাজের বাড়ি।

শশীকে দেখিয়া যামিনী কবিরাজ খুশি হইল না। সদর বাড়তে সে তখন মুখে মুখে দুটি ছাত্রকে ওষুধের প্রস্তুত-প্রণালী শিখাইতেছিল, পাশের চালাটায় বুঝি সিদ্ধ হইতেছিল পাঁচন, গন্ধে চারিদিক ভরিয়া দিয়াছে। শশীকে দেখিয়া যামিনী চশমা খুলিয়া বলিল, কী মনে করে শশী? বোসো।

শশী বলিল, সেনদিদির অসুখ শুনলাম ঠাকুর্দা, একবার দেখা করে যাই।

অসুখ?-যামিনী হাসে, কার কাছে শুনলে? জ্বর বুঝি হয়েছিল একটু কাল, না রে কুঞ্জ? আজ অসুখ কোথা!

তবে বুঝি কোনো কাজে ডেকেছেন, বলিয়া শশী ভিতরে গেল।

সেনদিদি শুইয়া ছিল, আচ্ছন্ন অসুস্থ, মৃতকল্প সেনদিদি।

গায়ের উজ্জ্বল রঙ লাল হইয়া অনম্ভের রঙের সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে, সারা গায়ে আরও সব অস্পষ্ট চিহ্ন, শশী যা চেনে। শশীর মুখ শুকাইয়া গেল। শরতের গোড়ায় এ রোগ সে-দিদি পাইল কোথায়। গাউদিয়া গ্রামে, কলিকাতা শহরে, দেশে বিদেশে কোথাও শশী যার মতো রূপসী দেখে নাই, শুধু রূপের জন্যই হয়তো যে মিথ্যা কলঙ্ক কিনিয়াছে, এ কী রোগ ধরিয়াছে তাহাকে?

শশীর ডাক শুনিয়া যামিনী কবিরাজের বউ চোখ মেলিয়া তাকাইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, তুমি এতদিনে এসেছ শশী? আমি যে মরতে বসেছি শশী? কী অসুখ করেছে কিছু জানি না, জ্বরে অচৈতন্য হয়ে থাকি, গায়ের ব্যথা সইতে পারি না–

আমি খবর পাইনি সেনদিদি।

কাকে দিয়ে খবর পাঠাব, কেউ কি আসে আমার কাছে!

সেনদিদি চোখ মেলিতে পারে না, চোখের কোণ দিয়া জল গড়াইয়া পড়ে। শশী বিছানায় বসে, সেনদিদির গায়ের তাপ পরীক্ষা করে, কী করিবে ভাবিয়া পায় না। যামিনী অসুখের কথা গোপন করিবার চেষ্টা করিয়াছিল, এ পর্যন্ত চিকিৎসারও হয়তো কোনো ব্যবস্থা হয় নাই। আজকাল তাহার কী হইয়াছিল, সেনদিদির খবর লইত না কেন? এই মলিন দুর্গন্ধ চাদরে আজ কতদিন না-জানি তাহর সেনদিনি বিনা-চিকিৎসায় পড়িয়া আছে, এতটুকু সেবা করিবারও কেহ থাকে নাই। শশী কিছু বুঝিতে পারে না। যে রূপের জন্য পৃথিবীর লোক উন্মাদ, স্ত্রীর যে সৌন্দর্য মানুষ তপস্যা করিয়া পায় না, যামিনী তাই পাইয়াছে। বুড়া বয়সে সে তো স্ত্রীর দাস হইয়া থাকিবে। কীজন্য তাহার এই বিকৃত । নিষ্ঠুর অবহেলা? কে জানে, হয়তো সীতা আর হেলেন আর ক্লিওপেট্রার মতো যার অসাধারণ রূপ থাকে তাকেরিয়া খাপছাড়া কান্ডই ঘটতে থাকে জগতে!

খানিক পরে যামিনী ঘরে আসিল, মুখ ভার করিয়ী বলিল, এখনো তুমি বসে আছ শশী? আমি ভাবলাম তুমি বুকি চলে গেছ।

শশী বলিল, ঠাকুর্দা, বাইরে আসুন দিকি একবার। বাহিরে গিয়া বলিল, সেনদিদির অসুখ কি আপনি ধরতে পারেননি ঠাকুর্দা।

যামিনী কবিরাজ বলিল, হাসির কথা বললে বটে শশী, চল্লিশ বছর কবরেজি করছি, তিনটে জেলায় যামিনী কবরেজের নাম জানে না এমন লোক নেই, আমায় তুমি শুধোচ্ছ রোগ ধরতে পারিনি? একনজর তাকালে রোগ নির্ণয় হয়। ওঁয়ার হয়েছে ম্যালেরিয়া।

ম্যালেরিয়া নয়, ঠাকুর্দা, বসন্ত। —শশী বলিল।

হ্যাঁ, বসন্ত। শরৎকালে বসন্ত!—বলিল যামিনী কবিরাজ।

বলিল বটে, যামিনীর মুখে কালি পড়িয়াছে কিসের? শশীর কাছে যামিনী যেন অভিমান করিতেছে, একটা পাণ্ডুর ভয় আর কালো চিন্তার রাশিকে গোপন করিবার অভিনয়। শশী কড়াসুরে বলিল, আমি সেনদিদির চিকিৎসার ভার নিলাম ঠাকুর্দা। ছি, ছি, আজ পর্যন্ত কিছুই করেননি?

খায় নাকি আমার ওষুধ?

শশী ঘরে গিয়া বসিল। কী ভাবিয়া যামিনীও ঘরের মধ্যে গিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। শশী দারুণ বিপন্ন বোধ করিতেছিল। আর বিষন্নতা। কয়েকদিন আগে সাতগাঁয়ে সে একটি বসম্ভের রোগী দেখিতে গিয়াছিল। তাহাকে শশী বচাইতে পারে নাই। বাঁচাইবার চেষ্টাও সে করিতে পারে নাই, তাকে ডাকা হইয়াছিল একেবারে শেষমূহুর্তে। শেষপর্যন্ত রোগীর চিকিৎসা করিয়াছিল সাতগাঁর কবিরাজ যামিনীর পূর্বতন ছাত্র ভূপতিচরণ। শশীর হঠাৎ মনে পড়িয়াছে, সেই রোগীটি মারা যাইবার পর যামিনী হাসিয়া বলিয়াছিল, আমার ছাত্র যাকে ছাড়পত্র লিখে দিল তাকে বাঁচাবে শশী- আমাদের শশে?

শশী প্রাণ দিয়া সেনদিদির চিকিৎসা ও সেবা আরম্ভ করিল। অন্য রোগীরা তাহাকে ডাকিয়া পায় না। বাড়িতে কারও জ্বরজ্বালা হইলে চোখের পলকে পরীক্ষা শেষ করিয়া ওষুধ দেয়,-না বলিলে আর খবর নেয় না। বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন সকলকে সে অবহেলা করে। যায় না হারু ঘোষের বাড়ি, বিনা কাজে অথবা মতিকে ইনজেকশন দিতে। কুসুম ভাবিল, শশী বুঝি রাগ করিয়াছে। তালবনের তালপুকুরে পদ্ম তুলিতে গিয়া মতি আশা করিতে লাগিল, ছোটোবাবু আজ নিশ্চয় আসবে। ছোটোবাবুকে একডালা পদ্ম দেব। কিন্তু কুসুমের মনে শশীর উপর রাগ কমিল না। মতির পদ্মফুলের বীচি দিয়া রাঁধা হইল তরকারি।

শুধু সেনদিদির ব্যবস্থা করিতে হইলে শশীর হয়তো চারদিকে তাকানোর সময় পাইত। চিকিৎসা আরম্ভ করিয়া এ-বাড়িতে গোপালের এবং ও-বাড়িতে যামিনীর উপদেশ, সমালোনা ও বাধাদানের বহরে সে বিপন্ন ও বিব্রত হইয়া রহিল। চিকিৎসায় ওদের শ্রদ্ধা নাই, এই কথাটা এমনিভাবে প্রকারান্তরে তাহাকে জানাইয়া দেওয়া হইতেছে। কিন্তু চিকিৎসার আর কোনো ব্যবস্থাও তো নাই। ভালো হোক মন্দ হোক, তার সাকে ছটিয়া ফেলার মধ্যে যুক্তি আছে কোনখানে? আমার ওষুধ খায় না, বলিয়া যামিনী নিজে চিকিৎসা করিতে রাজি নয়,-ওরা মারিয়া ফেলিতে চায় নাকি সেনদিদিকে? তাই বা কেন চাহিবে? তা ছাড়া যামিনীর এই লজ্জাকর পাগলামিতে গোপাল এভাবে সাহায্য করিতেছে কেন, তার স্বার্থ কী?

ব্যাপার যত রহস্যময়ই হোক, শশী একা সেন দিদির তিনটি যমের সাথে লড়াই করিতে লাগিল।

যামিনীকে সে জিজ্ঞাসা করে, বড় গোল শিশির ওষুধ কী হল ঠাকুর্দা?

যামিনী বলে, তিন দাগ ছিল না? খাইয়ে দিয়েছি। কী যে সব ওষুধ তোমার শশী,– সব ওষুধ হয় মদ, নয় সিরাপের গন্ধ!

শশী সভয়ে বলে, খাইয়ে দিয়েছেন? গোল শিশির ওষুধটা খাইরে দিয়েছেন?

তা দিলাম বইকী? ছটফট করছিল দেখে ভাবলাম, তোমার রুগী তোমার ওষুধ, দিই খাইয়ে!

শশী রাগ করিয়া বলে, রোগী আমার নয় ঠাকুর্দা, আমি চললাম। আপনার যা-খুশি করুন।

সে একরকম চলিয়াই আসে। বাড়ির বাহিরে গিয়া গতি শ্লথ করিয়া দাঁড়ায়। মনে পড়ে সেনদিদির ভীরু কাতর চাহনি, একান্ত নির্ভরতা। শশী আবার ফিরিয়া যায়। বলে, ওটা যে গুটি-বসাবার ওষুধ, সাতদিন আগে ও ওষুধটা দিয়েছিলাম, আপনি জানতেন না?

যামিনীর মুখ কয়েকদিনে সম্ভবত দুশ্চিন্তাতেই শুকাইয়া পাংশু হইয়া গিয়াছে। সে চোখ মিটমিট করিয়া বলে, আমি কবরেজ মানুষ, তোমাদের ওষুধের আমি কী জানব ভাই? আমি তো কিছুই জানি না।

জানেন না তো আমায় না বলে ওষুধ খাওয়ালেন কেন? আপনিই মারবেন ঠাকুর্দা সেনদিদিকে। গুটি পাকছে, এখন আপনি খাইয়ে দিলেন গুটি-বসানোর ওষুধ?

যামিনী কথা কয় না।

শশী একটু নরম হইয়া বলে, বড়ো অন্যায় করেছেন ঠাকুর্দা, আর যেন এমন করবেন না কখনও।

যামিনী বলে, আমার একটা ওষুধ খাইয়ে দেবে শশী? তাড়াতাড়ি যাতে গুটি পাকে?

শশী তৎক্ষণাৎ সন্দিগ্ধ হইয়া বলে, খাইয়েছেন না কি কিছু? আপনার ওষুধ?

নাঃ, আমার ওষুধ খায় না।

তার মানে চেষ্টা করেছিলেন খাওয়াবার?

উদভ্ৰান্ত যামিনী এবার খেপিয়া যায়।

যদি করে থাকি? হ্যাঁ হে শশী, যদি করেই থাকি? তোমার ওসব মদ আর সিরাপে আমি বিশ্বাস করি না বাপু চিকিৎসা হচ্ছে! এই যদি তোমার বসন্তের চিকিৎসা হয়, পুঁথিপত্র খালে ভাসিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে গিয়ে বসো গে যাও!

বলিতে বলিতেই যামিনী সাহস হারায়ম তবু মরিয়ার মতো বলে, তুমি আর এসো না!

মাথা শশীও ঠিক রাখতে পারে না ; গোড়া থেকে আপনি যা সব কাণ্ড করছেন ঠাকুর্দা, পুলিশ ডাকলে আপনার দশ বছর জেল হয়।

যামিনী বিবর্ণ মুখে বলে, কী করলাম আমি চিকিৎসা হচ্ছে তোমার, আমি তো একটা বড়িও খাওয়াইনি আমার!

শশী আর কথা-কাটাকাটি করে না। এ পাগলের সঙ্গে ঝগড়া করিয়া লাভ কী?

এই কি কলহের সময় ঠাকুর্দা?

কলহ কে করছে বাপু!

জ্ঞান হইলে যামিনী কবিরাজের বউ বলে, ঘরে কে, শশী? কার সঙ্গে কথা কইছ? — চোখে সে দেখিতে পায় না, চোখদুটি বন্ধ হইয়া গিয়াছে। যামিনী ঘরে আসিয়াছে শুনিলে উতলা হইয়া ওঠে, ওকে যেতে বলো শশী, যেতে বলো ওকে, আমাকে ও বিষ খাইয়ে মারবে- যাও না তুমি এ ঘর থেকে, চলে যাও না।

যামিনী চলিয়া গেলে বলে, বাঁচব তো শশী?

বাঁচবে বইকী।

সেনদিদি খুশি হয়। খানিকক্ষণ চুপ করিয়া পড়িয়া থাকে। শশী কি জানে না, কী অসহ্য তাহার যাতনা? সেনদিনির সহ্যশক্তি দেখিয়া বিস্ময় মানে শশী। নালিশ নাই, কাতরানি নাই, মাঝে মাঝে শুধু জিজ্ঞাসা করে বাঁচিবে কি না।

সেনদিদি বলে, এত ঘাঁটাঘাঁটি করছ, তোমার তো ভয় নেই বাবা?

কিসের ভয়? ছমাস আগে টিকে নিয়েছি।

তখন সেনদিদি বলে, ধরতে গেলে তুমি তো আমার ছেলেই। পেটের ছেলের চেয়ে তোমাকে বেশি ভালোবাসি শশী।

কথাটা শশীকে বিচলিত করিয়া দেয়। সেনদিদি যে তাকে ভালোবাসে সে তা জানে বারো বছর বয়স হইতে। কথাটা বলিবার ভঙ্গি তাহাকে অভিভূত করিয়া রাখে। কেমন একটা বালকত্বের অনুভূতি হয় এক অসুস্থা গ্রাম্য নারীর আবেগপূর্ণ কথায়। পেটের ছেলের চেয়ে ভালোবাসে? একথার অর্থ কী? সেনদিদির তো ছেলেমেয়ে হয় নাই কখনও।

একদিন সেনদিদির শিয়রে সারারাত জাগিয়া ভোরবেলা বাড়ি ফেরার সময় বাড়ির সামনে শিউলিগাছটার তলায় মতিকে শশী ফুল কুড়াইতে দেখিল। শশী যায় না বলিয়া মতি বুঝি ব্যাপার বুঝিতে আসিয়াছে!

শিউলি গাছটা ঝাঁকিয়া ফুল ঝরাইয়া দিয়া শশী জিজ্ঞাসা করিল, তুই কবে টিকে নিয়েছিলি রে মতি?

টিকে নিইনি তো!

নিসনি! কেন, টিকে নিতে কী হয়েছিল? দাঁড়া আজ তোদের বাড়িসুদ্ধ সকলকে টিকে দিয়ে আসব। পাড়ায় বসন্ত হয়েছে খবর রাখিস?

মতি অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া বলিল, টিকে নিলে কী হবে? মা শেতলার কৃপা হবার হলে হবেই গো ছোটোবাবু, হবেই।

তোর মাতা হবে।

শিশিরে একপশলা বৃষ্টির মতো চারিদিক ভিজিয়া আছে। মতির বিবর্ণপাড় শাড়ি আধভেজা কাপড়ের মতো কোমল দেখাইতেছিল। শশীর মনে হয় শাড়ির নমনীয় স্পর্শে মতি ভারি আরাম পাইতেছে। সকালবেলা রাতজাগা চোখে মতিকে যেন তার বয়সের চেয়ে অনেক বড় মনে হইতে লাগিল। ওকে দেখিতে দেখিতে সকালবেলা বিড়ি টানার আলস্য আরও মিষ্টি লাগিল শশীর।

মতি বলিতেছিল, বউ বলে আপনি সায়েব মানুষ, ঠাকুর-দেবতা মানেন না। সত্যি ছোটোবাবু?

না, সত্যি নয়। ঠাকুর-দেবতা খুব মানি।

শুনিয়া মতি যেন স্বস্তি পাইল।

বউ আপনার নামে যা-তা বলে।

অ্যাঁ? কী বলে?

মতি মুচকাইয়া হাসিল, কত কী বলে।

শশী হাসিয়া বলিল, তুইও তো বলিস মতি। পরাণের বউ হয়তো তোর কাছ থেকেই বলতে শিখেছে।

মতির মুখ শুকাইয়া গেল।

আমি আপনার নামে বলি। আমি যদি আপনার নামে কিছু বলে থাকি আমার যেন ওলাউঠা হয়। হয়–হয়–হয়, তিন সত্যি করলাম, ভগবান শুনো।

শশী অবাক হইয়া বলিল, তুই তো আচ্ছা রে মতি! সকালবেলা ফুল তুলতে তুলতে ওলাউঠার নাম করছিস!

মতি এবার রাগ করিয়া বলিল, আমার যেন হয়!

রোদ উঠিলে মতি বাড়ি গেল। শশী ভাবিল এমন গেঁয়ো স্বভাব, দেখতে তো গেঁয়ো নয়!

আর মতি ভাবিল, শেষের দিকে ছোটোবাবু আমাকে কী করে দেখছিল? আমাকে দেখতে দেখতে কী ভাবছিল ছোটোবাবু?

হারু ঘোষের বাড়ির সামনে বেগুনগাছগুলি এমন সতেজ। কয়েকটা গাছে কচি কচি বেগুনও ধরিয়াছে। বড় ঘরের পাশ দিয়া পিছনের মাঠে তাকাইলে অনেক দূরে কুয়াশা দেখা যায়। দূরত্বই যেন ধোয়াটে হইয়া আছে, কুয়াশা মিছে। মতি তৃপ্তিবোধ করে। সকালবেলার সোনালি রোদে তাহার চোখের সীমানার গ্রামখানি দেখিতে অপূর্ব হইয়া উঠিয়াছে বলিয়া নয়। প্রকৃতিকে, তাদের এই গ্রামের প্রকৃতিকে, মতি এতবেশি করিয়া চেনে যে আকাশের রামধনু ছাড়া তাহার চোখ তাহার মন কোথাও রঙ খুঁজিয়া পায় না। নাকের সামনে কচি কিশলয়ের মৃদু হিদোল কোন কাঁচা মনকে দোল দেয় কে জানে, মতির মনকে দেয় না। সর্বাঙ্গের শুভ্রতায় তালগাছের রহস্যময় ছায়া মাখিয়া মাখিয়া তালপুকুরের গভীর কালো জলে হাসঁ সাঁতার দেয়, তাদের গায়ে ঠেকিয়া লাল ও সাদা শাপলাগুলি জলে ডুবিয়া ভাসিয়া ওঠে, চারিদিকের তীর ভরিয়া কলমিশাকের ফুলগুলি বাতাসে যেন কেমন করিতে থাকে। আকাশে ভাসে উজ্জ্বল সাদা মেঘ আর বন্য কপোতের ঝাঁক। শালিখ পাখি উড়িবার সময় হঠাৎ শিস দেয়। অল্প দূরে কাতৌরা পাখির পাঠশালা বসে। বাতাসে থাকে কত ফুল, কত মাটি, কত ডোবার মেশানো গন্ধ।

মতি কিছু দেখে না, কিছু শোনে না, কিছু শোকে না। তালপুকুরের নির্জনতাকে সে শুধু ভোগ করে গায়ে জড়ানো আচলটি কোমরে বধিয়া। গা উদলা করিয়া দেওয়াতেও কেহ যে তাহাকে দেখিতে পাইতেছে না ইহাতে মতির ভারি মজা লাগে।

সংসারের কাজ না করিলে কুসুম তাহাকে বকে। তালপুকুরের ধারে কাজ-ফাকি দেওয়া আলসাটুকু মতি ভোগ করে ভবিষ্যতের চিন্তা করিতে করিতে। সুদেবকে মনে । মনে মরিবার আশীৰ্বাদ করিয়া আরম্ভ না করিলে ভবিষ্যতের ভাবনাটা তাহার যেন ভালো খোলে না।

মতির ভারী ইচ্ছা, বড়োলোকের বাড়িতে শশীর মতো বরের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। কাজ নাই, বকুনি নাই, কলহ নাই, নোংরামি নাই, বাড়ির সকলে সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, হাসে, তাস-পাশা খেলে, কলের গান বাজায়, আর,—আর বাড়ির বউকে খালি আদর করে। চিবুক ধরিয়া তাহার লজ্জিত মুখখানি তুলিয়া বলে, লক্ষ্মী বউ, সোনা বউ, এমন না হলে বউ?

বলে, বাড়ি আলো হল!

স্বপ্ন মতির অফুরন্ত। মস্ত একটি ঘরের এককোণে সে বসিয়া আছে। সর্বাঙ্গে তাহার ঝলমলে গহনা, পরনে ঝকঝকে শাড়ি। ঘোমটার মধ্যে চন্দনচর্চিত মতির মুখখানি কী রাঙা লজ্জায় আনন্দে সে ছোট ছোট নি:শ্বাস ফেলিতেছে আর শুনিতেছে ঘরের বাহিরে । বড়লোকের বাড়ির প্রকান্ড সংসারের কলরব। শশীর বোনের মতো পাড়ার কে যেন একটি মেয়ে মতির সঙ্গে ভাব করিয়া গেল। যামিনী কবিরাজের বউ-এর মতো সুন্দরী একটি মহিলা, মতির বোধ হয় সে ননদই হইবে, পানের বাটা সামনে দিয়া বলিল, পান সাজো, বউ। ও সোনা-বউ, পান সাজো।

তারপর কে বলিল, বউমাকে খেতে দে তোরা কেউ একজন।

যেই বলুক, তালপুকুরের ধারে প্রকৃতির মহোৎসব হইতে বাড়ি ফেরার সময় মতি আবার তীব্রভাবে ইচ্ছা করে সুদেব ব্যাটা মরিয়া যাক।

কুসুমের সঙ্গে আজকাল প্রায়ই ঝগড়া বাধে মতির। সকলের অগোচরে মতিকে কুসুম শশীর কথা তুলিয়া অন্যায় পরিহাস করিতে আরম্ভ করিয়াছে।

বলে, শশীর খারাপ লাগছে মতি? তাই চুপ করে বসে রয়েছিল? আহা ঘাট। ছোটোবাবুকে ডাকব পরক্ষে করে ওষুধ দেবে?

মতি বলে, কেন লাগতে এলি বউ? তোর আমি কী করেছি।

কুসুম বলে, চোখ ছলছল করছে। দেখলে ছোটোবাবুর বুক ফেটে যাবে।

মতি বলে, যমের অরুচি। মর্‌ তুই, মর্‌।

কুসুম তবু বলে, জানিস লো মতি,–রাতে তোর কথা ভেবে ছোটোবাবুর ঘুম হয় না। বসে বসে মালা জপ করে, মতি, মতি, মতি। সুদেবের সঙ্গে তোর নিকে হয়ে গেলে ছোটোবাবু তালপুকুরে ডুবে আত্মহত্যা করবে।

তুই তালপুকুরে ডুবে মর। মরে শাঁকচুন্নি হয়ে থাক।

মতি স্থানত্যাগ করিতে চায়, কুসুমের সঙ্গে সে কথায় পারবে কেন? কুসুম তাহাকে রেহাই দেয় না। খপ করিয়া মতির হাতটা সে ধরিয়া ফেলে। মুখের কাছে মুখ লইয়া গিয়া অপলক চোখের তারা স্থির রাখিয়া কথাগুলিকে দাঁতে কাটিয়া কাটিয়া বলে, লজ্জা নেই তোর? এতবড় ধেড়ে মেয়ে তুই, লজ্জা নেই তোর? পেটে ভাত জোটে না, গয়লার মুখ্য মেয়ে তুই -–ছোটোবাবুর তুলনায় তুই ছোটলোক ছাড়া কী! অত তোর পাকামি কিসের? অমনি করিস বলেই তো বিরক্ত হয়ে ছোটোবাবু আর আসে না।

তারপর মতি কুসুমের হাত দেয় কামড়াইয়া। তাহাকে ছাড়িয়া দিয়া দংশিত হাতখানা ঘুরাইরা ফিরাইয়াকুসুম দাতের দাগগুলি ভালো করিয়া দ্যাখে।

কামড়ালি! আমাকে তুই কামড়ালি! দাঁড়া তোর আমি কী করি দ্যাখ।

কী করিবে? কুসুম তাঁহার কী করিবে? বুক দুরু দুরু করে মতির। ছোট বাবুকে যদি বলিয়া দেয়!

মতির মনে হয়, সে কুসুমের হাত কামড়াইয়া দিয়াছে শুনিলে ছোটোবাবু ভয়ানক রাগ করিবে।

খানিক পরেই সে কুসুমের আশেপাশে ঘোরাফিরা আরম্ভ করিয়া দেয়। একসময় সাহস করিয়া বলে, লেগেছে বউ? দেখি?

কুসুমের ক্ষমা নাই। সে ভাঙাইয়া বলে, লেগেছে বউ? কামড়ে দিয়ে নাকামি করতে এলেন।

মতি দাওয়ায় আসিয়া খুঁটি ধরিয়া দাঁড়ায়। ভাবে, বউ কী ভীষণ মেয়ে। ও ঠিক বলে দেবে।

পিসির ঘরে খোলা দরজা দিয়া পিসিকে দেখা যায়। পিসির আজকাল কথা বন্ধ হইয়া গিয়াছে। কথা বলিতে গেলে গলায় ফ্যাসফ্যাস আওয়াজ হয় মাত্র, কিছুই সে বলিতে পারে না। মতিকে দেখিয়া সে হাতের ইশারায় তাহাকে কাছে ডাকে। মাথা উঁচু করিয়া বারবার ব্যাকুলভাবে মুখের ফাঁকে আঙুল ঢুকাইয়া পিপাসা জানায়। দেখিতে পাইয়াও মতি কিন্তু অনেকক্ষণ নড়ে না।

বলে, যাইগো যাই-অত ব্যস্ত কেন?

মোক্ষদা জিজ্ঞাসা করে, কে ডাকে লো মতি?

পিসি। জল খাবে।

০৪. এবার কার্তিক মাসে পূজা

এবার কার্তিক মাসে পূজা। সেনদিদির সর্বাঙ্গে ব্রনগুলি পাকিয়া উঠিতে উঠিতে গ্রামের পূজার উৎসব শুরু হইয়া গেল। উৎসব সহজ নয়, গ্রামের জমিদার শীতলবাবুর বাড়ি তিনদিন যাত্রা, পুতুলনাচ, বাজি পোড়ানো, সাতগাঁ মেলা-পূজা তো আছেই। গ্রামবাসীর ঝিমানো জীবন প্রবাহে হঠাত প্রবল উত্তেজনার সঞ্চার হইয়াছে, কেবল শশী এবার সেনদিদিকে লইয়া বড় ব্যস্ত।

যাত্রা আরম্ভ হয় সপ্তমীর রাত্রে। যাত্রার দল তার আগেই গ্রামে হাজির হইয়া যায়। বায়না দিবার সময় শীতলবাবু অধিকারীকে বলিয়া দেন, দল নিয়ে দু-একদিন আগেই। আসবে বাপু, এক রাত্রি বেশ করে ঘুমিয়ে রাস্তার কষ্ট দূর করে অভিনয় করবে।

এবার যে-দলকে বায়না দেওয়া হইয়াছিল সে-দল এ-অঞ্চলের নয়। বিনোদিনী অপেরা পার্টির আদি আস্তানা খাস কলিকাতায়। বাজিতপুরের মথুরা সাহার ব্যবসা উপলক্ষে কলিকাতা যাওয়া-আসা আছে। কিছুদিন আগে ছেলের বিবাহে এই দলটি সে কলিকাতা হইতে ভাড়া করিয়া আনিয়াছিল। লোকমুখে দলের প্রশংসা শুনিয়া শীতলবাবু সেই সময় বায়না দিয়া রাখিয়াছিলেন।

কাল বিকেলে বিনোদিনী অপেরা পার্টি আসিয়া পৌঁছিয়াছে। মস্ত দল, সঙ্গে অনেকগুলি বড় বড় কাঠের বাক্স। দেখিয়া গ্রামের লোক খুশি হইয়াছে। দলের অধিকারী বি-এ ফেল, তবে দলে তাহার দুজন বি-এ পাস অভিনেতা আছে শোনা অবধি সকলে উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছে।

থেটার, অ্যাঁ?

উঁহু যাত্রা। অপেরা-পার্টি নাম যে।

তাই ভালো। যাত্রাই ভালো।

সাতগাঁর কাছারিবাড়িটা সাফ করিয়া যাত্রাওয়ালাদের থাকিতে দেওয়া হইয়াছিল। দলের সকলের মশারি নাই, কুমুদের আছে। রাত্রে তার ঘুম মন্দ হয় নাই। সকালে উঠিয়া সে শশীর সঙ্গে দেখা করিতে আসিল।

শশী অবাক হইয়া বলিল, তুই কুমুদ?

কুমুদ হাসিয়া বলিল, না রে, আমি, প্রবীর।

শশী বুঝিতে পারে না-প্রবীর কী, প্রবীর?

গ্রামে বিনোদিনী অপেরা পার্টি এল, চারিদিকে হৈচৈ পড়ে গেছে, খবর পাসনি?

তুই যাত্ৰাদলের সঙ্গে এসেছিস কুমুদ? তুই যাত্রা করিস?

কথাটা বিশ্বাস করিতে এত বিস্ময় বোধ হয়। কুমুদ বদলাইয়া গিয়াছে। মুখে আর সে জ্যোতি নাই। চুলে সেই অন্যমস্ক বিদ্রোহ নাই। অত সকালেও কুমুদ কিছু প্রসাধন সারিয়া তবে দেখা করিতে আসিয়াছে। তবু, যতই বদলাক, এ তো সেই কুমুদা মাসের বই না-দেখিয়া যে একদিন তাহাকে ক্লাসের কাব্যসঞ্চয়নে শেলির দুর্বোধ্য কবিতা বুঝাইয়া দিয়াছিল, মোনালিসার হাসির ব্যাখ্যা করিয়াছিল।

কুমুদ বলিল, করি বইকী যাত্রা। প্রবীর সাজি, লক্ষণ সাজি, চন্দ্রকেতু সাজি, আরও কত কী সাজি। গলা ফাটিয়া পার্ট বলি। সাতটা মেডেল পেয়েছি।

শশী অবাক হইয়া বলিল, আয় ঘরে আয়। বসে সব বলবি চল।

কুমুদকে শশী তাহার ঘরে লইয়া গেল। ঘরে গিয়া আর একবার বলিল, অ্যান্দিন পরে তুই এলি কুমুদ? এতকাল পরে তোর সঙ্গে দেখা হল কী আশ্চর্য!

তাহার বিছানায় বসিয়া ঘরের চারিদিকে চাহিতে চাহিতে কুমুদ বলিল, এতে আশ্চর্যের কী আছে? তিন বছর ধরে বাঙলাদেশের কত গ্রামে ঘুরেছি তার ঠিক নেই। এবার তোদের গ্রামে এলাম।

যাত্রার দলে ঢুকলি কেন?

সে এক ইতিহাস শশী। বাড়ি থেকে দিলে খেদিয়ে। নিলাম চাকরি। চাকরি থেকেও দিলে দেখিয়ে- একদিন অন্তর আপিস গেলে কে রাখবে? ঘুরতে ঘুরতে বহরমপুরে বিনোদিনী অপেরা-পার্টির যাত্রা শুনে অধিকারীর সঙ্গে ভাব জমালাম। অধিকারী লোক ভালো রে শশী, পরীক্ষা করে সতেরো টাকা মাইনে দিয়ে দলে নিলে। দু-চারটে সেনাপতির পার্ট করে গলা খুলল, খুব আবেগ-ভরে চেঁচাতে শিখলাম। একবছরের মধ্যে মেন অ্যাকটর। আশি টাকা মাইনে দেয়। মাসে আটটার বেশি পালা হলে পালা-পিছু পাঁচ টাকা করে বোনাস। দলে আমার খাতির কত!–কুমুদ হাসিল, গ্র্যান্ড সাকসেস, অ্যাঁ?

শশীও হাসিল, তুই শেষে যাত্রা করবি, একথা ভাবতেও পারতাম না কুমুদ।

আমিও কি ভাবতে পারতাম?

তখন আকস্মিক কথার অনটনে শশী বলিল, আজ তুই এখানে খাবি ভাই, সারাদিন থাকবি।

কুমুদ বলিল, বেশ।

মনে মনে শশী ভারি খুশি হইয়াছিল। এতকাল পরে কুমুদের সঙ্গে দেখা হইয়াছে, শুধু এইজন্য নয়। কুমুদ নামিয়া আসিয়াছে বলিয়া। কুমুদের সেই অন্যমনস্ক সরল ঔদ্ধতা নাই, নিজেকে সংসারের আর সকলের চেয়ে স্বতন্ত্র, সকলের চেয়ে বড় মনে করিতে সে ভুলিয়া গিয়াছে। এটুকু শশী প্রথম হইতেই টের পাইতেছিল। কুমুদের কাছে নিজেকে তাহার চিরদিন ছোট মনে হইয়াছে, তুচ্ছ মনে হইয়াছে। কুমুদের অন্যায়ের ইতিহাসগুলি শুনিয়া পর্যন্ত ঈর্ষার সঙ্গে তাহার মনে হইয়াছে এত সাহস এত মনের জোর এতখানি তেজ তাহার নাই, এরকম অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অভাবে জীবনটাই বৃথা গেল তাহার। আজ কুমুদের মৃদু অস্বস্তি, চেষ্টা করা সহস ব্যবহার এবং একেবারে যাত্রার দলের অধঃপতন তাহকে যেন শশীর চেয়েও নিচে নামাইয়া দিয়াছে। বন্ধুকে আর শশীর গুরুজন মনে হইতেছে না।

কুমুদ বলিল, তোর ঘরখানা বেশ সাজানো। গ্রামে থেকে গেঁয়ো বনে যাসনি দেখছি।-সে আবার একটু হাসিল, তাহার পূর্বের হাসির সঙ্গে তুলনা করিয়া এ হাসিকে শশীর মনে হইল ভীরু অপরাধী হাসি-কতকাল ধরে কারো বাড়িতে ঢুকিনি জানিস শশী? চার বছর। পারিবারিক আবহাওয়াটা মুগ্ধ করে দিচ্ছে। বিয়ে করেছিস?

না।

করিসনি? তোর ঘর দেখে মনে হচ্ছিল বউ আছে। ঘর কে গুছিয়েছে রে, বোন? উঠানে যাকে দেখলাম?

ও বোন নয়। ভগিনী,–পিসির মেয়ের মেয়ে। বোন একটা আছে, ছোট, আট বছর বয়স, গোছানোর বদলে বরং নোংরাই করে দিয়ে যায়। আমার খাটের তলাটা হল ওর খেলাঘর তাকিয়ে দাখ, পুতুলেরা সারিসারি ঘুমোচ্ছে এইবার ঘুম ভাঙবে—খুকীর আসবার সময় হল। একটু চেষ্টা করে ভাব জমাস, ভারি চালাক মেয়ে, চারি বুদ্ধি। পড়াচ্ছি কিনা, আমি জানি। চটপট শিখছে। সামনের বছর স্কুলে ভর্তি করে দেব।

শশী চিন্তিত হইয়া মাথা নাড়ে, দেব বলছি—হবে কি না ভগবান জানেন। বাবার এসব পছন্দ নয়। নয়তো বলবেন, ছেলে লেখাপড়া শিখে হয়েছে অবাধ্য, মেয়ে কী হবেন ঠিক কী? স্কুলে-টুলে দিয়ে কাজ নেই বাপ- -শেখা না, বাড়িতেই শেখা!

কুমুদ শশীর মুখের ভাব লক্ষ করিতেছিল, বলিল, বুঝিয়ে দিস আজকাল মেয়েদের স্কুলে না দিলে চলে না।

বুঝিয়ে? বাবাকে? বাবা সেকেলে মানুষ।

কথা বদলাইয়া বলিল, ঘর কে গোছায় বলছিলি? লোকের অভাব কী এ হল বাংলাদেশ একজন রোজগার করে, দশজনে খায়। ঘর গোহাবার লোকের অভাব নেই। তবে-বন্ধুকে শশী চোখ ঠারিল, নিজের ঘর আমি নিজেই গোছাই।

শশীকে যামিনী কবিরাজের বউ-এর কাছে যাইতে হইবে। এ কর্তব্য অবহেলা করিবার উপায় ছিল না। বন্ধুকে খই-এর মোয়া আর চন্দ্রপুলি খাওয়াইয়া শশী বিদায় লইল।

গ্রামে পর্দপ্রথা শিথিল কিন্তু সে গ্রামেরই চেনা মানুষের জন্য। শশীর বাড়ির মেয়েরা সকালবেলা অন্তঃপুরে পাক খায়। কুমুদ উৎসুকদৃষ্টিতে খোলা দরজা দিয়া প্রকান্ড সংসারটির গতিবিধি যতটা পারে দেখিতেছিল। খানিক পরে ছোট একটি ছেলে আসিয়া দরজাটা ভেজাইয়া দিয়া গেল। কুমুদ আহত হইয়া ভাবিল, আমি তো ওদের দেখিনি! ওদের কাজ দেখছিলাম যে আমি। সকলে মিলে কী রচনা করছে তাই দেখছিলাম।

জামাটি গায়ে দিয়া কুমুদ বেড়াইতে বাহির হইয়া গেল। একটা পরিবারের গোপন মর্মস্পন্দন দেখিয়া ফেলার অপরাধ একা-একা অন্তঃপুরের একটা ঘরে বসিয়া সহ্য করা কঠিন।

বাড়ির পিছনে তালবনের ওপাশে উঁচু মাটির টিলাটির দিকে। সে সেইদিকে চলিতে আরম্ভ করিল। জীবনে সে যত পুণ্য অর্জন করিয়াছে, তার পাপের হিসাবটা আজ এখানকার মতো ধরিয়া তালবনের গভীর নির্জনতায় হঠাৎ তাহার পুরস্কার কে দিল, মানুষের বুদ্ধিতে তাহার বিশ্লেষণ নাই। হয়তো শশীর বাড়ির মেয়েরা অকারণে তাহাকে যে লাঞ্ছনা দিয়াছিল, জীবনের নিরপেক্ষ দেবতা ভোরের বাতাস পাখির কলরব আর ঋজু তালগাছগুলির প্রহরায় রক্ষিত যুগান্তের পুরাতন নিভৃত শাস্তির উপলক্ষে ক্ষতিপূরণ করিলেন। এত সহজে সেন্টিমেন্টাল করিয়া দিতে পারে, একটি সুখী পরিবারের অন্তঃপুর ছাড়া পৃথিবীতে এমন স্থান যে আছে কুমুদ তাহা জানিত না। এত কি কুমুদ জানিত যে এই অহেতুকি আনন্দ তাহার মৃত্যুরই শেষ ভূমিকা?

তালপুকুরের ধারে পৌঁছিয়া হঠাৎ তাহার মনে হইল, কী একটা রবারের মতো নরম জিনিসে পা পড়িয়াছে। চোখের পলকে হলুদ রঙের নরম জিনিসটার মুখ মাটি হইতে উঠিয়ে আসিয়া তাহার হাঁটুর কাছে কামড়াইয়া ধরিল। লেজের দিকটা জড়াইয়া গেল তাহার পায়ে।

কুমুদ জীবনে কত পাপ করিয়াছে, পরিমাণ তার কম নয়, অল্প একটু পুণ্যের কয়েক মিনিটব্যাপী অসাধারণ পুরস্কারের পর, এই তাহার শাস্তি। ঘাড় ধরিয়া সাপের মাথাটা কুমুদ হাঁটু হইতে ছিনাইয়া লইল।

সাপ। সাপ।

শুনিয়া আগে আসিল মতি, ভিজা শরীরে শুকনো কাপড়টা কোনোমতে জড়াইয়া।

কুসুম ওভাবে ছুটিতে পারে না। তাহার আসিতে দেরি হইল।

সাপ দেখিয়া মতি বলিল, ও তো ঢোঁড়া সাপ। জলে থাকে। ওর বিষ নেই।

কুমুদের মৃত্যুভয় প্রবল। কুসুম আসিয়া সায় না দেওয়া পর্যন্ত মতির কথা সে বিশ্বাস করিল না। বিশ্বাস করিয়াও হাঁটুর উপরে রুমাল দিয়া সজোরে বাঁধিয়া সন্দিগ্ধভাবে বলিল, শশীকে একবার ডেকে আনো খুকী, দেখুক। যদি বিষ থাকে? চেনো তো শশীকে? তোমাদের পাড়াতেই থাকে,- ডাক্তার।

কুসুম মুচকিয়া হাসিয়া বলিল, যা লো খুকী, ছোটোবাবুকে ডেকে আল। তাহার হাসিটা কুমুদের ভালো লাগিল না।

ছোটোবাবুর কে হন? খানিক পরে কুসুমের একথার জবাবে সে তাই সংক্ষেপে শুধু বলিল, কেউ না। বন্ধু।

ছোটোবাবু আমাদের বলতে গেলে একরকম আপনার লোক। দুবেলা আসেন।

একথা শুনিয়াও কুসুমকে হঠাৎ আত্মীয়া-জ্ঞান করিয়া বসিবার মতো মনের অবস্থা কুমুদের ছিল না। সে বলিল, ঢোড়া সাপের বিষ থাকে না কেন?

সব সাপের কি বিষ থাকে? টোড়া হল জলের সাপ। আমায় একবার কামড়েছিল। হয়তো ওই সাপটাই হবে। একদিন খুব ভোরে এই পুকুরে নাইছি, বেড়াতে বেড়াতে ছোটোবাবু এসে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করতে লাগলে। এমনি সময়ে সাপটা এইখানে কামড়ে দিল,-কুসুম তাহার লিভারটা দেখাইয়া দিল। তাহার বোধ হয় ধারণা ছিল মানুষের হৃদয়ের অবস্থানটা ওইখানে-ছোটোবাবুকে বললাম,সাপে কামড়েছে ছোটোবাবু। শুনে ছোটোবাবুর মুখ যা হয়ে গেল!

কী হয়ে গেল?–কুমুদ কৌতুহল বোধ করিতেছিল।

শুকিয়ে গেল। ছাইবৰ্ণ হয়ে গেল।

সাপের কামড়ে তোমার কিছু হল না?

কুমুদ তুমি বলায় কুসুম রাগ করিয়া বলিল, কথা বলতে শেখোনি দেখছি তুমি। ভদ্দরলোক তো?

তারপর দুজনেই দমিয়া যাওয়ায় আর কথা হইল না। তালগাছগুলি নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া রহিল। একটা মাছরাঙা ঝুপ করিয়া তালপুকুরে আছড়াইয়া পড়িল।

দুপুরবেলাটা বন্ধুর সঙ্গে গল্প করিয়া কাটাইয়া বেলা পড়িয়া আসিলে কুমুদ বিদায় গ্রহণ করিল।

সকাল সকাল পালা শুরু হবে। যাবি তো শশী?

যাব বইকী! নিশ্চয় যাব।

হারুর বাড়ির পিছনে সাতগাঁ পর্যন্ত বিস্তারিত ধানের খেত। তালপুকুরের ধার হইয়া ক্ষেতের আল দিয়া কুমুদ সাতগাঁর কাছারিবাড়ি পৌঁছিল। তালপুকুরে সে মতিকে দেখিবার আশা করিতেছিল। কিন্তু যাত্রা শুনিতে যাওয়ার আয়োজনে ব্যস্ত মতির পুকুরে আসিবার সময় ছিল না। কুসুম রাধিতেছিল। সন্ধ্যার আগেই খাওয়ার পাট চুকিয়া যাওয়া চাই মতি বিনা-বাক্যব্যয়ে তাহার সমস্ত হুকুম পালন করিয়া যাইতেছিল।

পরাণ সব বিষয়ে উদাসীন। সন্ধ্যার আবির্ভাবে তাহার বোন আর বউ যত ব্যস্ত হইয়া ওঠে, সে যেন ততই ঝিমাইয়া যায়। রান্নাঘরে বসিয়া কুসুমের সঙ্গে সে প্রথম একটু গল্প জমাইবার চেষ্টা করিয়াছিল। গল্প করিবার সময় না-থাকায় কুসুম তাহাতে আমল দেয় নাই; দাওয়ায় বসে ইকা টান গে না বাপু মেয়েমানুষের আচল-ধরা পুরবষকে আমি দু চোখে দেখতে পারি না।–কুসুমের ভর্ৎসনায় চিরকাল পরাণের খারাপ লাগে। তবে স্পষ্ট খারাপ লাগার ভাবটা এত অল্প সময়ের মধ্যে মনের একটা উদাস বৈরাগ্য ও দেহের এতটা ঝিমানো আলস্যে পরিণত হইয়া যায় যে, রাগিবার অবসর প্রায়ই সে পায় না। মাঝে মাঝে কুসুমকে তাহার ভারি ছেলেমানুষ মনে হয়। চোদ্দ বছর বয়সে তার বউ হইয়া এতকাল কুসুমের শরীরটাই যেন বড়ো হইয়াছে, মনের বয়স বাড়ে নাই।

মোক্ষদাকে একখানা ফরসা কাপড় পরিতে দেখিয়া পরাণ জিজ্ঞাসা করে, তুমিও যাবে নাকি মা, যাত্রা শুনতে?

না, আমার আবার যাত্রা কী?

জোর করিয়া ধরিলে মোক্ষদা যাইতে রাজি আছে। কিন্তু এরা কেউ যাইতে বলিবেও না। আগে হইতেই মোক্ষদা তাহা জানে। তাই সাতরাদের বুড়ি পিসির সঙ্গে সে আগেই ঠিক করিয়া রাখিয়াছে। তারা দুজনে যাত্রা শুনিতে যাইবে। বাড়ি আসিয়া মেক্ষদা তাহা হইলে বলিতে পারবে, যাত্রা শুনিবার শখ তাহার একটুও ছিল না। কী করিবে, আর একজন টানিয়া লইয়া গেল। জোর করিয়া টানিয়া লইয়া গেল।

পরাণ বলে, ফরসা কাপড় পরে তুমি তবে যাচ্ছ কোথা?

সাতরাদের বাড়ি যাবি বাবা। যদুর পিসি একবার ডেকেছে।

কুসুম ঝা করিয়া সামনে আসিয়া পড়ে।

কাল যেও মা, কাল যেও। আমরা এখন বেরোব, তুমি চললে সাতরাদের বাড়ি। বাড়িতে তা হলে থাকবে কে?

মোক্ষদা তার কী জানে। যার খুশি থাক।

তোমরা যাবে যাত্রা শুনতে, বাড়ির ব্যবস্থা তোমরাই করো বাছা। আমি তার কী জানি? আমি বুড়োমানুষ, সব ব্যাপারে আমাকে টানো কেন? আমি আছি নিজের শতেক জ্বালায়।

কুসুম রাগিয়া বলে, জ্বালা বাপু সংসারে সবারই আছে। ঘরে বসে জ্বললেই হয়। এমন শয়তা করা কেন? আগেই জানি শেষকালেতে ফ্যাকড়া বাধবে।

মোক্ষদা বোধহয় একটু লজ্জাবোধ করে। হয়তো তাহার মনে হয় বুড়োমানুষের যাত্রা শুনিতে যাওয়ার জন্য এত কাণ্ড করা উচিত নয়। বাড়িতে থাকিতে রাজি হইয়া সে গুম হইয়া বসিয়া থাকে।

রান্না শেষ করিয়া কুসুম স্বামীকে খাওয়ায়, তারপর ননদের সঙ্গে এক থালায় নিজে খাইতে বসে। পরাণ পেট ভরিয়া খায়, কুসুম আর মতির গলা দিয়া আজ ভাত নামিতে চায় না। ফেলা-ছড়া করিয়া কোনোরকমে তাহারা খাওয়া শেষ করে। দিনের আলো যত স্নান হইয়া আসে মনের মধ্যে তাহাদের এই আশঙ্কা ততই প্রবল হইয়া উঠে যে, ওদিকে বুঝি যাত্রা শুরু হইয়া গেল। মতিকে কাপড় পরিতে হুকুম দিয়া কুসুম হেশেল তুলিয়া । ফেলে। পুকুর যাওয়ার সময় এখন নাই। উঠোনের এককোণে ছাইফেলা আমগাছটির তলে বসিয়া বাসন ক’খানা কুসুম তাড়াতাড়ি মজিয়া নেয়। এই সুবিধাটুকুর ব্যবস্থা সে সেই বিকালেই করিয়া রাখিয়াছে। দু কাখে দুটি কলসি বহিয়া কত জল তুলিয়া কুসুম যে আজ হাড়িগামলা ভর্তি করিয়াছে।

মতি বলে, আমিও হাত লাগাই বউ, শিগগির হয়ে যাবে, অ্যাঁ।

না। মতি তাড়াতাড়ি কাজ করিতে পারে এ-বিশ্বাস কুসুমের নাই। এক মিনিটের কাজে মতি দশ মিনিট লাগাইয়া দেবে।

যা বললাম তাই কর তো তুই। কাপড় পরতেই তো তোমার দশ ঘণ্টা।

একসময় গোধূলি শেষ হওয়ার আগেই, কী করিয়া কাজ শেষ হয়। বাকি থাকে শুধু এটা আর ওটা, যা করিলেও চলে, না করিলেও চলে। কুসুমের তাড়ায় পরাণ ও মতি দুজনেই কাজ সমাপ্ত করিয়াছে। নিজে সাজিতে গিয়া ওদের দুজনকে দেখিয়া কুসুম এতক্ষণে একটু হাসিল। শার্টের উপর উড়ানি চাপানোয় পরাণকে একেবারে বাবু-বাবু দেখাইতেছে। আর ডুরে শাড়ি পরিয়া মতি হইয়াছে সুন্দরী। মতির হালকা অপরিণত দেহটাকে কুসুম হিংসা করে। মনে হয় তাহার নিজের স্বাস্থ্য এতখানি ভালো না হইলেই যেন সে খুশি হইত। ডুরে শাড়ি তারও আছে বইকী। তবে আজকাল রঙিন লাইন দিয়া শশীর ঢাকিতে কুসুমের লজ্জা

করে।

আসরে যখন তাহারা পৌঁছিল, যাত্রা আরম্ভ হইতে বিলম্ব আছে। চিকের আড়ালে জায়গার জন্য কলহ শুরু হইয়া গিয়াছে ইতিমধ্যেই। সকলেই চিক ঘেষিয়া বসিতে চায়, এগারো বছরের সদ্য-পদা-পাওয়া মেয়ে হইতে তাহার পঞ্চাশ বছরের দিদিরা পর্যন্ত।। এসব বিষয়ে কুসুম ভারি ওস্তাদ। সকলকে ঠেলিয়া-ধুলিয়া সেই-যে সে চিকের কাছে প্রথম সারিতে একটা দশ ইঞ্চি ফাঁকের মধ্যে নিজেকে গুজিয়া দিল, কেহ আর তাহাকে সেখান হইতে নড়াইতে পারিল না। মতি তাহার পিঠের সঙ্গে মিশিয়া সংস্কৃত সাহিত্যের ছুচের পিছনে সূতা চলার উপমার মতো আগাইয়া আসিয়াছিল। কুসুমের পিঠ ঘেষিয়া সে একরকম চরণ দত্তের গৃহিণীর কোলের উপরেই বসিয়া পড়িল। চরণ দত্তের গৃহিণী । তাহাকে ঠেলিতে আরম্ভ করায় কুসুমের কোমর সে জড়াইয়া ধরিল প্রাণপথে।

কুসুম মুখ ফিরাইয়া চোখ রাঙাইয়া চরণ দত্তের গৃহিণীকে বলিল, মেয়েটাকে ঠেলছ কেন গা? কেন ঠেলছ? গাল দিলে ভালো হবে। সরে বোসো, জায়গা দাও। সবাই বসবে, সবই দেখবে-তোমার একার জন্য তো যাত্রা নয়?

কুসুমকে মতির এত ভালো লাগিল! কুসুমের কাছে মতি এত কৃতজ্ঞতা বোধ করিল!

যাত্রা শুরু হওয়ার একটু আগে কুসুম বলিল, ওই দ্যাথ মতি, ছোটোবাবু।

দেখেছি।

এত লোক, এত আলো, এত শব্দ-মতির নেশা লাগিয়া গিয়াছিল। পাটকরা মুগার চাদরটি কাধে দেওয়ায় শশীকে ভারি বাবু দেখাইতেছে। সে আসরে আসিয়া দাঁড়ানো মাত্র মতি তাহাকে দেখিতে পাইয়াছিল। স্বয়ং শীতলবাবু তাহাকে ডাকিয়া কাছে বসাইলেন দেখিয়া শশীর সম্মানে মতিরও সম্মানের সীমা নাই।

শামিয়ানার তলা ভরিয়া গিয়া খোলা আকাশের নীচে পর্যন্ত লোক জমিয়াছে। দুজন স্থূলকায়া গৃহিণীর মাঝে পড়িয়া মতির গরম বোধ হইতেছিল। এদিকে একসময় বাজনা বাজিয়া ওঠে। কনসার্ট-ঐকতান। শুনিলে এমন উত্তেজনা বোধ হয়! কিছু একটা উপভোগ্য ঘটিবার প্রত্যাশা, তারপর বাজনা থামিয়া যাত্রা শুরু হয়। ষোলোজন সখী আসিয়া নৃত্য আরম্ভ করে। তাদের পরনে পশ্চিমা ঘাগরা।

মতি ফিসফিস করিয়া বলে, ব্যাটাছেলে সখি সেজেছে, না বউ?

সখীরা লাচিয়া গেলে প্রবেশ করেন জনা ও অগ্নিদেব। জনাকে দেখিয়া মতির সন্দেহ হয়। ও নিশ্চয়ই মেয়েমানুষ, বউ! না?

তোর মাথা। চুপ কর, শুনতে দে।

প্রবীরের প্রবেশ দ্বিতীয় দৃশ্যে। গঙ্গাদেবীর পুত্ৰঘাতী অৰ্জুনকে যথাবিধি শাস্তি দিবার প্রতিজ্ঞামূলক একপৃষ্ঠাব্যাপী স্বগত উক্তির পরেই। প্রবীরকে দেখিয়াই আসর মুগ্ধ হইয়া যায়। স্মার্ট সাজপোশাক, কী লালিত্যময় যৌবনমূর্তি, তলোয়ারটা কী চকচকে। কথা যখন সে বলে, আসরে একটা শিহরন বহিয়া গিয়া শ্রোতারা যেন পরম আরামবোধ করে। জমিবে, প্রবীরের পার্ট জমিবে। খাসা জমিবে। যেমন রাজপুত্রের মতো চেহারা, তেমনি চমৎকার গলা। প্রবীরের প্রিয়া মদনমঙ্গরীও আসরে আছেন। এত লোকের মাঝে এ যেন একান্ত নির্জন রাজোদ্যান, এমনি নিঃসঙ্কোচ নির্ভুল আবেগমথিত স্বরে প্রবীর তাহাকে ভালোবাসিতে থাকে। যাত্রার আসরে হাত ধরার অতিরিক্ত প্রেমস্পর্শ নিষিদ্ধ। সেজন্য প্রবীরের কোনো অসুবিধা আছে মনে হয় না। শুধু কথায়, শুধু অভিনয়ে এতগুলি লোকের মনে সে বিশ্বাস জন্মাইয়া দেয় যে তাহারা দুজন একদেহ একপ্রাণ!

অবাক হয় কুসুম, আর মতি।

কুসুম বলে, ওলো, এ যে সেই লোকটা!

মতি বলে, কী সুন্দর করছে বউ, মনে হচ্ছে যেন সত্যি!

কুসুম একটু হাসে, যেন তোর সঙ্গেই করছে, না?

মতি জবাব দেয় না। শোনে।

প্রবীর বলে :

রাগ করিয়াছ?
কেন রাগ করিয়াছ অবোধ বালিকা?
কেন এত অভিমান? দুটি চোখে
কেন এত ভর্ৎসনা? মুখে মেঘ
উঠিতেছে বুক দেখে মনে হয়
মন্দ বলিয়াছি।
এ গাম্ভীর্য, হাসিহীন এত কঠোরতা
ফুলে কি মানায়, সখি,
মানায় কুসুমে? আমি তোরে ভালোবাসি,
সত্য কহিয়াছি, প্রাণদিয়ে ভালোবাসি তোরে।
সাক্ষী নারায়ণ। সাক্ষী মোর হৃদয়ের

মতির বুকের ভিতর শিরশির করে। কুসুম মনে-মনে অধীর হইয়া ভাবে বল না লক্ষ্মীছড়ি, রাগ করিনি; মুখ ফুটে ও-কথাটা তুই আর বলতে পারিস না? ধন্য প্রাণ তোর।

রাত তিনটা অবধি যাত্রা শুনিয়া আসিয়া ঘুম ভাঙিতে পরদিন সকলেরই বেলা হয়। হয় না শুধু শশী আর পরাণের। যামিনী করিবাজের বউ রোগের বিপজ্জনক অবস্থায় উপনীত হইয়াছে। সকাল সকাল উঠিয়া স্নান করিয়া শশী তাহার কাছে যায়। পরাণের ক-বিঘা জমির ফসল অবিলম্বে ঘরে না-তুলিলেই নয়। নিজে উপস্থিত না-থাকিলে সাতাশটা খেজুরগাছের রসই তাহার অর্ধেক চুরি হইয়া যাইবে।

তালগাছ ছাড়া আর কোনো গাছ পরাণ এবার জমা দেয় নাই। এবার সে নিজেই খেজুররম জ্বল দিয়া গুড় করবে। ডাঙা জমিতে এবার সে কিছু মূলারও চাষ করিবে স্থির করিয়াছে। শশী বলিয়াছে, জমিতে হাড়ের সার দিলে মূলা ভালো হয়। দশ সের গুড়া হাড় পরাণ পরীক্ষার জন্য আনাইয়া লইয়াছে। এখনো জমিতে দেওয়া হয় নাই। পরাণের অনেক কাজ।

দুপুরে কুমুদ শশীর বাড়িতে আসিল। শশী বাড়ি ছিল না। গোপাল জানিয়াছে কুমুদ যাত্রা করে। কুমুদকে সে বাড়ির বেড়া পার হইতে দিল না। বাহিরের ঘরে বসাইয়া রাখিল।

দাবা খেলতে পারো হে?

আজ্ঞে না।

গোপাল তখন বাড়ির মধ্যে গেল ঘুমাইতে। কুমুদ, গত রাত্রের হাজার নরনারীর হৃদয়জয়ী কুমুদ, নিজেকে পরিত্যক্ত বন্ধুহীন মনে করিয়া গেল তালপুকুরের ধারে। সেখানে তাহার বন্ধু জুটিল মতি।

মতি কি মাঝে মাঝে তালপুকুরে কবিত্ব করিতে আসে? নিঝুম দুপুরের অলস প্রহরগুলি ঘরে কি তাহার কাটে না? কে বলিবে! আজ কিন্তু সে বিশেষ দরকারেই তালপুকুরে আসিয়াছিল। পুকুরপাড়ে কাল সে কানের একটা মাকড়ি হারাইয়াছে। যাত্রা দেখার উৎসাহে কাল খেয়াল থাকে নাই। আজ স্নানের সময় কানে হাত পড়িতে,-ওমা, মাকড়ি কোথায়? ভয়ে কথাটা সে কাহাকেও বলে নাই। দুপুরে সকলে ঘুমাইলে চুপিচুপি খুঁজিতে আসিয়াছে।

রুপা নয়, তামা নয়, সোনার মাকড়ি। কী হইবে?

মাকড়ি মতি পাইল না। পাইল কুমুদকে। উভয় পক্ষই কৃতাৰ্থ হইয়া গেল! কুমুদ এ জগতের রক্তমাংসের মানুষ নয়, রূপকথার রাজপুত্র, মহাতেজা, মহাবীর্যবান, মহামহা প্রেমিক। হা, কুমুদ মাটির পৃথিবীর কেহ নয়। পৃথিবীর সেরা লোক শশী, কুমুদ শশীর মতোও নয়। ছোটোবাবুর কথা মতি কী না জানে? ছোটোবাবু কী খাইতে ভালোবাসে তা পর্যন্ত। কুমুদ কী খায় কে তার খবর রাখে? শার্ট-পরা কুমুদ হইল রাজপুত্র প্রবীর। শশী কে?

কী খুঁজছ খুকী?

মতি বলে। বলিতে মতির ভালো লাগে। সোনার মাকড়ি হারানো যেন বাহাদুরির কাজ। বলে, বাড়িতে জানালে মেরে ফেলবে।

মেরে ফেলবে? বাড়িতে তোমাকে খুব মারে নাকি?

এমনি মারে না। দামি জিনিস হারালে মারে। আজ আপনি কী সাজবেন?

রাবণ। কুমুদ হাসে।

হ্যাঁ, রাবণ বইকী রাবণ তো দেখতে বিশ্ৰী?

কুমুদ খুশি হইয়া বলে, লক্ষ্মণ সাজব।

মতি উৎসুক হইয়া জিজ্ঞাস করে, উৰ্মিলা কে সাজবে? কাল যে আপনার বউ সেজেছিল সে? আচ্ছা, ও তো ব্যাটাছেলে, অ্যাঁ?

কুমুম বলে, ব্যাটাছেলে বইকী।

মতির সঙ্গে কুমুদও মাকড়ি খোঁজে। তালপুকুরের ভাঙাচের ঘাট হইতে তালবনের মাঝামাঝি পর্যন্ত পায়ে-চলা পথের দুধারে।

বাড়ির কাছে পৌঁছিয়া যাওয়ার ভয়ে মতি বলে, ওদিকে নেই, আমি ভালো করে খুঁজেছি। ভাবে, প্রবীর চলিয়া গেলে এখান হইতে বাড়ি পর্যন্ত সে নিজেই খুঁজিয়া দেখিবে। খুঁজিতে খুঁজিতে দুজনে আবার ঘাটে ফিরিয়া যায়।

মতি বলে, কোথায় পড়ে গেছে কে জানে ও আর পাওয়া যাবে না।

না পেলে তোমায় মারবে, না? কে মারবে?

কে মারিবে মতি তাহার কী জানে? একজন কেউ নিশ্চয়।

তবে তো মুশকিল। কুমুদ চিন্তিত হইয়া বলে।

বলে, তোমার আর একটা মাকড়ি কই? দেখি, কী রকম?

অন্য মাকড়িটি মতি আঁচলে বাঁধিয়া রাখিয়াছিল। খুলিয়া দেয়। খুবই সাদাসিধে মাকড়ি, একটুকরা চাঁদের কোলে একরত্তি একটা তারা। তারার তলে চাঁদটা দোলে।

মাকড়ি হারিয়েছে কাউকে বোলো না খুকী।

কেউ টের না পাইলে মতি আপনা হইতে অবশ্যই বলিবে না। কিন্তু কেন?

কাল তোমাকে একটা মাকড়ি এনে দেব।

মতি অবাক হইয়া যায়।

পাবেন কোথায়?

কেন, গায়ে তোমাদের গয়নার দোকান নেই?

কিনে আনবেন!–মতির মনে হয় মাকড়ি কেনার আগে প্রবীর তাকেই কিনিয়া ফেলিয়াছে।

তাহার মাকড়িটা পকেটে ভরিয়া কুমুদ চলিয়ে গেলে, পুকুরঘাটে বসিয়া বসিয়া সে এই কথাটাই ভাবে। তাহাকে একটা মাকড়ি দেওয়া প্রবীরের কাছে কিছুই নয়। আর কত মেয়েকে হয়তো সে অমল কত দিয়াছে। বেশি না থাক, যাত্রার দলে দুটো একটা মেয়েও কি নাই? তবু তাহাকেই মাকড়ি দিতে চাওয়ার জন্য প্রবীর কী ভয়ানক ভালো।

আজ তাহাদের যাত্রা শুনিতে যাওয়া বারণ। পরাণ নিষেধ করিয়া দিয়াছে। রোজ রোজ যাত্রা শোনা কী? একদিন শুনিয়া আসিয়াছে, আজ বাদ যাক, কাল আবার শুনিবে। পরাণ ওদের যাত্রা শুনিতে যাওয়া পছন্দ করে না। কেন করে না তার কোনো কারণ নাই। ওরা যাত্রা শুনিয়া বেলা দশটা পর্যন্ত পড়িয়া পড়িয়া ঘুমাক আর না ঘুমক, পরাণের কিছুই আসিয়া যায় না। প্রতিদিন প্রদোষের আধো-অন্ধকারে সে যখন বাহির হইয়া যায়, এ বাড়িতে কারো ঘুম ভাঙে না। তাহার সুখ-সুবিধার দিকে তাকানোর অভ্যাস এ বাড়িতে কাহারো নাই। এক বেলা ভাতের বদলে মুড়ি খাইয়া থাকিতে হইলে নালিশ করা পরাণকে দিয়া হইয়া উঠে না। তবু সে চায় না বাড়ির মেয়েরা যাত্রা শুনিতে যায়। পর পর দুদিন যাত্রা শুনিতে যায়।

তুমি যাবে না? না, নিজের বেলা ভিন্ন নিয়ম? কুসুম বলিল। সে রাগিয়াছে।

আমার সঙ্গে তোমার কথা কী? ব্যাটাছেলে নাকি?

তুমি গেলে আমিও যাব।

আমি যাব না তবে পরাণও মাঝে মাঝে গোঁ ধরতে জানে।

কুসুম বলে, তুমি যাও না যাও আমি কিন্তু যাব।

চুলোয় যাও।

মুখে যাই বলুক, কুসুম যাত্রা শুনিতে যাওয়ার কোনো আয়োজনই করিল না। পাড়ার অনেক বাড়ির মেয়েরা যাইবে। কুসুমও তাদের সঙ্গে যাইতে পারে। কিন্তু যাওয়ার চেয়ে না-যাওয়ার মধ্যেই এখন রাগ ও অভিমান বেশি প্রকাশ পায়, জিদও তাহাতেই বজায় থাকে বেশি। কুসুম তাই সারাটা দুপুর ঘুমাইয়া কাটাইয়া দিল।

সন্ধ্যার সময় বাজনার শব্দ শুনিয়া অস্থির হইয়া উঠিল মতি। প্রবীর আজ লক্ষ্মণ সাজিবে। কীরকম না জানি আজ দেখাইবে তাহাকো পারিলে মতি একাই চলিয়া যাইত। দু বছর আগেও এমন সে গিয়াছে। এখন আর সেটা সম্ভব নয়। দুবছরের মধ্যে সে যে কী ভয়ানক বড় হইয়া গিয়াছে ভাবিলেও মতির চমক লাগে। কিন্তু কী করা যায়। অমন করিয়া বাজনা বাজিতে থাকিলে ঘরেও টেকা অসম্ভব।

একসময় কুসুমকে সে বলিল, যাত্রা নাই শুনি, ঠাকুর দেখে আসি চল না বউ?

পরাণ দাওয়ায় বসিয়া অর্থসমস্যার কথা ভাবিতেছিল। সে ডাকিয়া বলিল, এদিকে শোন মতি, শুনে যা।

মতি কাছে আসিল কী বলছিলি?

ঠাকুর দেখতে যাব।

ঠাকুর দেখতে যাবি? আচ্ছা, চল। একটু যাত্ৰাও শুনে আসবি অমনি। ।

পরাণ অমনিভাবে একরকম স্পষ্টই হার স্বীকার করিল। কিন্তু কুসুম আর যাইতে রাজি নয়। এখন খাওয়াদাওয়া সারিয়া পান সাজিয়া যাইতে যাইতে পালা শেষ হইয়া যাইবে না।

ঠাকুরপূজার বাদ্য বাজছে। পালা শুরু হতে ঢের দেরি।–পরাণ উদাসভাবে বলিল।

মতি বলিল, চল না বউ? অমন করিস কেন?

কুসুম বলিল, গিয়ে বসবি কোথায়? তোর জন্যে জায়গা ঘুমোচ্ছে সৰ্ব্বাইয়ের পেছনে বসে যাত্রা শোনার চেয়ে ঘরে শুয়ে ঘুমানো ঢের ভালো।

পরাণ বলিল, ছোটোবাবুকে বললে—

ছোটোবাবুর নামোল্লেখে কুসুম আরও রাগিয়া কহিল, ছোটোবাবু কী করবে? জায়গা গড়িয়ে দেবে?

পরাণ বলিল, ছোটোবাবুর বাড়ির সবাই বাবুদের বাড়ির মেয়েদের জায়গায় বসে। নেটের পর্দা টাঙানো, দেখিসনি মতি? বাবুদের বাড়ি ছোটোবাবুর খাতির কত। ছোটোবাবুকে বললে তোদের ওইখানে বসিয়ে দেবে।

কুসুম হঠাৎ শান্ত হইয়া বলে, আমি যাব না।

তাহাকে আর কোনোমতেই টলানো যায় না। বাবুরা জমিদার, শশীরা বড়লোক। ওদের বাড়ির মেয়েদের কত ভালো-ভালো কাপড়, কত দামি দামি গয়না। একটা জবরজঙ্গ লেস-লাগানো জ্যাকেট গায়ে দিয়া তাতিবাড়ির কোরা কাপড় পরিয়া ওদের মাঝখানে (মাঝখানে তাহাকে বসিতে দিবে না ছাই, এককোণে ঝির মতো বসিতে হইবে) গিয়া বসিলে দম আটকাইয়া যাইবে কুসুমের।

শেষপর্যন্ত পরাণের সঙ্গে মতি একাই গেল। শশীকে খুঁজিতে হইল না। সে বাড়িতেই ছিল। সে বলিল, তোর তো কম শখ নয় মতি! কিন্তু সঙ্গে গিয়া মতির বসিবার একটা ভালো ব্যবস্থা করিয়া দিতে সে আপত্তি করিল না। বরং নেটের পর্দার আড়ালে, যেখানে বাবুদের বাড়ির মেয়েরা বসে, মতিকে সেখানে বসাইতে পারিয়া সে বিশেষ গর্বই বোধ করিতে লাগিল।

শীতলবাবুদের বাড়ির মেয়েরা গায়ে সিল্কের ব্লাউজ দেয়, বোম্বাই শাড়ি পরে। শীতলবাবুর ভাই কলিকাতা-প্রবাসী বিমলবাবুর স্ত্রী-কন্যারা পায়ে জুতাও দিয়া থাকে। দু’ভায়ের পরিবারের নারীর সংখ্যাও কি কম! সংসারে যেখানে যত টাকা সেখানে তত নারী, সেখানে তত পাপ। মতি সংসারের এ নিয়ম জানিত না সংসারে কোন নিয়মটাই বা সে জানে? কাঁচা মেয়ে সে, বোকা মেয়ে। প্রায় কুড়ি বগফিট পরিমাণ পরিষ্কার চাদরের উপর গাদা করা ঘষামাজা সাজানো গোছানো স্বজাতির মধ্যে আসিয়া পড়িয়া সে যেন দিশেহারা হইয়া গিয়াছিল।

বিমলবাবুর স্ত্রী শুধোন, আমার মুখে কী দেখছ বাছা?

বিলিবাবুর মেয়ে বলে, তোমার চশমা দেখছে মা।

মতির বুকের ভিতর চিপটিপ করে। তাহাকে বসিতে দেওয়া হইয়াছে সম্মানের আসনেই সামনের দিকে, পিছনে আশ্রিত পরিজনদের মধ্যে নয়। শীতলবাবু নিজে মেয়েটিকে সঙ্গে করিয়া পৌঁছাইয়া দিয়া বলিয়াছেন, সামনে বসিয়ো। শশী ডাক্তারের বাড়ির মেয়ে।

কাল শশী ডাক্তারের বাড়ির মেয়েরা যত বিশ্রী করিয়াই হোক খুব সাজিয়া আসিয়াছিল, এর আজ এ কী বেশ। শীতলবাবু আর বিমলবাবুর বাড়ির মেয়েরা এই কথা ভাবিয়াছিল। তাহারা কাপড় চেনে, গয়না চেনে, নিজেদের ঘষে এবং মাজে। ও মেয়েটা, ধরতে গেলে, রীতিমতো নোংরাই।

শীতলবাবুর পুত্রবধূ গতবার ছেলে হওয়ার সময় বাজিতপুরের সিভিল সার্জন আসিয়া পড়ার আগে শশীর হাতেই জীবন সমর্পণ করিতে বাধ্য হইয়াছিল। বিছানায় শুইয়া শুইয়া লভেল পড়ার সে কী ভীষণ শাস্তি! যাই হোক ছেলেটি ঝির কাছে দোতলায় এখন চোখ বুঝিয়া ঘুমাইতেছে। সিভিল সার্জন করিয়াছিল কচু, ছেলেটা একরকম শশী ডাক্তারের দান বইকী শীতলবাবুর পুত্রবধূ তাই একসময় মতিকে কৌতুহলের সঙ্গ জিজ্ঞাসা করিল, শশী ডাক্তার তোমার কে হয় গো?

কেউ না।

ওমা! কেউ না? এই রাত্রে তুমি পরের সঙ্গে যাত্রা দেখতে এলে?

পর কেন? দাদার সঙ্গে এসেছি।

তোমার দাদা কে? কাদের বাড়ির মেয়ে তুমি?

আমি ঘোষবাড়ির মেয়ে,–আমার বাবা স্বর্গীয় হারানচন্দ্র ঘোষ।

কথাটা শীঘ্রই রটিয়া গেল। হারু ঘোষের মেয়েকে তাহাদের মধ্যে গুজিয়া দেওয়ার স্পর্ধায় শশীর উপর শীতলবাবু আর বিমলবাবুর পরিবারের মেয়েরা বিশেষ অসন্তুষ্ট হইলেন। মতির কাছে যাহারা ছিলেন, তাহারা বাড়ির মধ্যে যাওয়ার ছলে উঠিয়া গেলেন এবং ফিরিয়া আসিয়া অন্যত্র বসিলেন। হাত-পা ছড়াইয়া আরাম করিবার সুযোগ পাইয়াও মতির কিন্তু আরাম হইল না। অবহেলা অপমান বুঝিতে না-পারার মতো বোকা সে তো নয়।

এদিকে শশী মাঝে মাঝে সাজঘরে যায়। কুমুদকে প্রশংসা করিয়া বলে, বেশ হচ্ছে কুমুদ। তুই কলকাতার থিয়েটারে গেলি না কেন?

কুমুদ খুশি হইয়া বলে, ভালো হচ্ছে? চোদ্দো বছর উপোস করতে হয়েছে ভাই। তবু এখনো বউদিকে রাবণের হাত থেকে উদ্ধার করতে পারিনি। অযোধ্যায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে দাদাকে রাজা করতে পারলে বাঁচি।

কুমুদ হাসে। খানিক পরে অশোকবন থেকে বউদিকে আনতে যাব–রাবণবধ হতে বেশি দেরি নেই। সে সিনটা দেখিস। হ্যারে, তোদের গাঁয়ে গয়নার দোকান আছে?

শশী বলিল, গয়নার দোকান! গয়নার দোকান কোথায় পাব? দুটো স্যাকরার দোকার আছে, ফরমাশ দিয়ে গয়না তৈরি করে দেয়। ছোটো ছোটো দুটো একটা গয়না সময় সময় তৈরি করেও রাখে হয়তো, দোকান করার মতো কিছু নয়। গয়না কিনবি নাকি?

কিনব? আমি? কেন, গয়না কিনব কেন?

শশী একটু বিচলিত হয়। কুমুদ গয়নার দোকানের কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছে কেন? তাও এক কথা বলিতে বলিতে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিয়াছে। কী ভাবিতেছে ও?

শশী ভাবে সৃষ্টিছাড়া গোয়ার ছেলে, জগতে এমন কাজ নাই যা করে না,–এইসব করিয়াই যেন সুখ পায়। কিন্তু গয়নার দোকানের খবর নেয় কেন? শশী আরও ভাবে যে খবর লইতে হইবে বিনোদিনী অপেরাপার্টি বাজিতপুরে অভিনয় করার সময় সেখানকার কোনো গয়নার দোকানে কিছু ঘটিয়াছে কি-না।

শশীর মনের মধ্যে সন্দেহটা খচখচ করিয়া বেঁধে বইকী। সে মনে করে বইকী যে আচ্ছা পাগল সে, এ কী কথা এও কী কখনও হয়? তবু সে ভাবিয়া রাখে, বাজিতপুরের গয়নার দোকানের গত দুমাসের কুশল কালই জানিবার চেষ্টা করিবে। এই অন্যান্য কাজটা করিবার আগাম প্রায়শ্চিত হিসাবে রাত বারোটার সময় বাড়ি ফেরার আগে কুমুদকে তাহার ওখানে আহারের নিমন্ত্ৰণ করিয়া যায়।

পরাণকে বলে, মতিকে এবার বাড়ি নিয়ে যাও না পরাণ? কত রাত জাগবে?

পরাণেরও ঘুম পাইয়াছে। সে বললে, যাবে কী!

কিন্তু মতি ডাকিবামাত্র চলিয়া আসে। আজ যাত্রা শুনিতে তাহার ভালো লাগিতেছিল না। সে কাঁচা মনে বিনা-কারণেই সর্বদা আনন্দ ভরিয়া থাকে, যেকোনো একট তুচ্ছ উপলক্ষে মনে যাহার উত্তেজিত সুখ হয়, শীতলবাবু আর বিমলবাবুর পরিবারের মেয়েরা যাত্রা শোনার উৎসাহ তাহার নষ্ট করিয়া দিয়াছে। মতি যেন চুরি করিয়া বাড়ি ফিরিল। তবু, কী সুন্দর ওই মেয়েমানুষগুলি একএকজন যেন এক-একটি ছবি।

হারু ঘোষ যেখানে বজ্রাঘাতে মরিয়াছিল, সেখানটা বিষাক্ত সাপের আস্তানা। হারু ঘোষের বাড়ির কাছে তালবনের সাপগুলির বিষ নাই। বিষ নাই? কুমুদকে যে সাপট কামড়াইয়াছিল সেটার বিষ ছিল না। সেটা জলের সাপ, টোঁড়া সাপ। কিন্তু তালবনের সাপ কি জলের সাপ, সব সাপ কি টোড়া সাপ? কে বলিবে! মতি তাহা জানে না। শেষপর্যন্ত তাহাকে স্বীকার করিতে হয় যে অন্য সাপে কামড়ালে হয়তো যেতেন মরে।

মতির দুকানে দুটি মাকড়ি দোলে। মাকড়িদুটির চাদদুটির কোলে একরতি তারাদুটিও দোলে। কুমুদ নিজের হাতে তাহাকে মাকড়ি পরাইয়া দিয়াছে। ওর মধ্যে একটা নূতন ঝকঝকে অন্যটা অনেক দিনের পুরোনো, মলিন। এ একটা সমস্যার কথা বইকী! মতি যত বোকাই হোক-আসলে সে আর এমন কী বেশি বোকা? এটুকু মতি খেয়াল করিয়াছিল। নূতন মাকড়ি দেখিলেই সকলে ধরিয়া ফেলিবে যে দে বলবে কী? কৈফিয়ত দিবে কী? রাজপুত্র প্রবীর, দুপুরবেলা তালপুকুরের ধারে মাকড়িটি নিজের হাতে তাহার কানে পরাইয়া দিয়েছে শুনিলে বাড়িতে তাহাকে আর আস্ত আস্ত রাখিবে না। কুমুদ এ সমস্যার মীমাংসা করিয়া দিয়াছে। বাড়ি যাওয়ার আগে (বাড়ি যেন মতির কত দূর!) কান হইতে দুটা মাকড়িই মতি খুলিয়া ফেলিবে। রাত্রে তেতুল মাখাইয়া রাখিয়া দিয়া সকালে সোডা দিয়া মাজিলে দুটি মাকড়িকেই মনে হইতে মাজিয়া ঘষিয়া পরিষ্কার করা পুরানো মাকড়ি। জিজ্ঞাসা করিলে মতি বলিবে, সাফ করেছি। তেতুল দিয়ে আর সোডা দিয়ে। মতি এই কথা বলিবে! এই সত্য কথাটা।

কুমুদের বুদ্ধি দেখিয়া মতি অবাক হইয়া গিয়াছে।

–অন্য সাপে কামড়ালে মরে যেতাম? আমি মরে গেলে তুমি কী করতে?

আমি? আমি কী করতাম? কী জানি কী করতাম।

কাঁচা মেয়ে। একেবারেই কাঁচা মেয়ে। কিন্তু মনে মনে মতি সবই জানে। কী জানে না সে? সেদিন কুমুদ সাপের কামড়ে মরিয়া গেলে সে কিছুই করিত না এক নম্বর, মতি এটা জানে। দু নম্বর সে জানে, কুমুদ শুনিতে চায় সে মরিয়া গেলে মতি একটু কাদিত। মতি এত কথা জানে! সে কিছু করিত না এই সত্যকথা, আর সে যে একটু কাদিত এই মিথ্যাকথা, এর কোনোটাই যে বলিতে নাই, এও যদি মতি না জানিবে-মধ্যবর্তী ও জবাবটা দিয়া সে অজ্ঞতার ভান করিল কেন? তবু, যত হিসাবই ধরা যাক মতি কাঁচা মেয়েই।

এখন যদি মরে যাই? কুমুদ বলে।

তা হলে আমি–এখন যদি মরে যান? দূর, মরার কথা বলতে নেই।

কে জানে মতি এসব শিখল কোথায়! আপনা হইতে শিখিয়াছে নিশ্চয়কথা বলিতে, কাপড় পরিতে, ভাত খাইতে শেখার মতো। এসব কেহ শেখায় না। কে শিখাইবে? এবং তারপর কুমুদ মতিকে নানা কথা জিজ্ঞাসা করে। আর ছেলেমানুষি প্রশ্ন নয়। তাহার নিজের কথা, অষ্ট্রীয়-স্বজনের কথা, তাহার গ্রামের কথা। মতি আগ্রহের সঙ্গে সকল প্রশ্নের জবাব দেয়। কখনও পালটা প্রশ্ন করে। কখনওবা আপনা হইতেই কুমুদকে অনেক অতিরিক্ত অবান্তর কথা বলে। তাহার সরল চাহনি একবারও কুটিল হইয়া ওঠে না। তাহার নির্ভরশীলতা কখনও টুটিয়া যায় না। না, মতির কোনো ভাবনা নাই। সে কিছু জানে না, কিছু বোঝে না, পৃথিবীর সবই তাহার কাছে অভিনব, অভিজ্ঞতার অতীত। কুমুদকে হাত ধরিতে দেওয়া উচিত কি অনুচিত সে তার কী জানে। ওসব কুমুদ বুঝিবে। রাজপুত্র প্রবীর বুঝিবে। মতির বিশেষ লজ্জাও করে না। তবে, হঠাৎ চোখ নিচু করিয়া একটু যে সে হাসে সেটা কিছু নয়।

দিন ও রাত্রির মধ্যে দুপুরের সময়ের গতি সবচেয়ে শিথিল। দুপুরের অন্ত নাই। আকাশের সূর্য কতক্ষণে কতটুকু সরিয়া তাহদের গায়ে রোদ ফেলেন জানা যায় না। তাহারা উঠিয়া টিলাটার দিকে চলিতে থাকে। ওদিকে নিবিড় ছায়ার ছড়াছড়ি।

০৫. যামিনী কবিরাজের বউ সেনদিদি

যামিনী কবিরাজের বউ বাঁচিয়া উঠিয়াছে। ভগবানের দয়া, যামিনী কবিরাজের বউ-এর কপাল, শশীর গৌরব।

গোপাল ছেলের সঙ্গে আজকাল প্রায় কথা বন্ধ করিয়া দিয়াছে। যামিনী কবিরাজের বউ বাঁচিয়া উঠিয়াছে বলিয়া নয়, অন্য কারণে। অন্য সাধারণ মানুষের তাই ধরিয়ালওয়া উচিত। ব্যাপারটা হইয়াছিল এই। শশীর বেশ পসার হইয়াছে। বাজিতপুরের সরকারি ডাক্তারকে ডাকিতে খরচ অনেক। অনেকে শশীকেই ডাকে। যামিনী কবিরাজের বেএর চিকিৎসার জন্য কয়েকদিন শশী দূরে কোথাও যাওয়া তো বন্ধ রাখিয়াছেই, তিন মাইল দূরের নন্দনপুরের কল পর্যন্ত ফিরাইয়া দিয়াছে। এই সময়টা যামিনী কবিরাজের বউ মরিতে বসিয়াছিল। গোপালের উস্কানিতে যামিনী ঝগড়া করিয়া অপমান করিয়া শশীর আসা-যাওয়া বন্ধ করিবার চেষ্টা করিয়া সফল হয় নাই। দূর গ্রামে রোগী দেখিতে পাঠাইতে না পারিয়া ছেলের উপর গোপাল খেপিয়া গিয়াছে। অথচ বাড়াবাড়ি করিবার সাহস তাহদের ছিল না। শশীকে তাহারা দুজনেই ভয় করিতে শুরু করিয়া দিয়াছিল। মনে পাপ থাকার এই একটা লক্ষণ। মনে হয়, সকলে বুঝি সব জানে। সাপ উঠিয়া পড়ার আশঙ্কায় কেচো খুঁড়িবার চেষ্টাতেও মানুষ ইতস্তত। আকশে চাঁদ উঠে, সূর্য ওঠে। পৃথিবীটা চিরকাল ঈশ্বরের রাজ্য। মানুষের এই বদ্ধমূল সংস্কার সহজে যাইবার নয়। হাজার পাপ করিলেও নয়।

এমনি করে তুমি, গোপাল বলিয়াছিল, পসার রাখবে? লোকে ডাকতে এলে যাবে না? মক্কেল ফিরিয়ে দেব?

বলিয়াছিল, যামিনী খুড়ো কোনোদিন এতটুকু উপকার করবে যে ওর জন্য এত কছ? নিজের সর্বনাশ করে পরের উপকার করে বেড়ানো কোন দেশী বুদ্ধির পরিচয় বাপু?

আমার মার যদি ওমনি অসুখ হত?-শশী বলিয়াছিল। কেন বলিয়াছিল কে জানে!

তোমার মা তো বাপু বেঁচে নেই। কপাল ভালো, তাই আগে আগে ভেগেছেন। তোমার যা সব কীর্তি—যে কীতি সব তোমার; তুই উচ্ছন্ন যাবি শশী।

যামিনী কবিরাজের বউ বাঁচিয়া উঠিবার পর বিপজ্জনক গাম্ভীর্যের সঙ্গে গোপাল বলে, এইবার কাজকর্মে মন দাও শশী। যামিনী খুড়োর ইচ্ছে নয় তুমি ওদের বাড়ি যাও।

ঠাকুর্দাকে পুলিশে দেওয়া উচিত।

সর্বনাশ! শশী এসব বলে কী!

তোমার ইচ্ছেটা কী শুনি? হ্যা রে বাপু, মনের বাসনাটা তোমার কী? সব ছেড়েছুড়ে আমি কাশী চলে গেলে তমি বোধহয় খুশি হও? গুরুদেব তাই বলছিলেন। বলছিলেন, আর কেন গোপাল, এইবার চলে এসো। আমি ভাবছিলাম, শশীর একটু স্থিতি করে দিয়ে যাই, হঠাৎসব ছেড়ে চলে গেল ও কোনদিক সামলাৰে। কিন্তু তুমি এরকম আরম্ভ করলে আর একটা দিনও আমি থাকি কী করে?

গোপাল করিবে সংসার ত্যাগ, গোপাল যাইবে কাশী সম্মুখযুদ্ধ ত্যগ করিয়া পিছন হইতে গোপালের এই ধরনের আকস্মিক আক্রমণ শশীর অভ্যাস হইয়া গিয়াছে। সে এতটুকু টলে না।

কী অন্যায় কাজটা করেছি আমি, তাই বলুন না।

কী করেছ? মুখে চুনকালি মেখেছ। সবাই কী বলছে তোমার কানে যায় না-আমার কানে আসে। যামিনী খুড়োর বউ-এর অসুখে তোমার এত দরদ কেন? ডাক্তার মানুষ তুমি, একবার গেলে, ওষুধ দিলে, চলে এলে। দিনরাত রোগীর কাছে পড়ে থাকলে বলবে না লোকে যে আগে থাকতে কিছু না থাকলে।

এসব আপনার বানানো কথা।

এ অভিযোগ সত্য বলিয়া গোপালের রাগ বাড়িয়া যায়। গোপাল ছেলের সঙ্গে কথা বলে না।

একটি কথা নয়। বাহিরের ঘরে ফরাশের উপর খাতাপত্র ছড়াইয়া বসিয়া গোপাল হিসাব দেখে,-খাতক, ঋণপ্রার্থী, পরামর্শপ্রার্থী ও অনুগ্রহপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে। শশী ঘরের ভিতর দিয়া পার হইয়া যাইবার সময় গোপাল হঠাৎ কথা বন্ধ করিয়া আড়চোখে ছেলের দিকে তাকায়। কথা বলিবে না, না বলুক, ছেলেকে গলার আওয়াজও সে শুনাইবে না কি? তা-নয়। শশীকে দেখলে গোপালের ডাকিতে ইচ্ছ হয়, শশী শোন। এই ইচ্ছাটা দমন করিবার সময় গলা দিয়া গোপালের আওয়াজ বাহির হয় না। গোপাল বাক্যহারা হইয়া থাকে।

শশী বাহির হইয়া গেলে অনুগ্রহপ্রার্থীকে বলে, শুধিয়ে এসো তো যাচ্ছে কোথায়?

সে যদি আসিয়া বলে,-যামিনী কবিরাজের বাড়ি-গোপাল একদম খেপিয়া যায়।

ইয়ারকি? ইয়ারকি হচ্ছে আমার সঙ্গে?

অনুগ্রহপ্রার্থীর চোখে আর পলক পড়ে না।

যামিনী কবিরাজের বউ-এর গুটিগুলি শুকাইয়া ঝরিয়া পড়িতে কাতিক মাস কাবার হইয়া অগ্রহায়ণেরও কয়েক দিন গিয়াছে। তাহকে দেখিলে এখন ভয় করে, করুণা হয়। সর্বাঙ্গের ছোট ছোট ক্ষতগুলি এখনো লালচে রঙের কদর্য কতকগুলি গর্ত। সময়ে বারকয়েক চুমটি পড়িয়া পড়িয়া ক্ষতের কতক দাগ অনেকটা মিলিয়া আসিবে, কতক থাকিবে। কিন্তু যামিনী কবিরাজের বউ-এর রূপের খ্যাতি আর রহিল না। রূপই গেল নষ্ট হইয়া, রূপের খ্যাতি!

একটা চোখও তার নষ্ট হইয়া গিয়াছে।

এই ক্ষতিটাই যামিনী কবিরাজের বউকে কাবু করিয়াছে সবচেয়ে বেশি। শুধু ক্ষতচিহ্নে ভরিয়া রূপনষ্ট হওয়াটাও তাহার কাছে সহজ ব্যাপার নয়। রূপ তাহার তেত্রিশ বছরের আত্নীয়, তেত্রিশ বছরের আভ্যাস। একগোছা চুল কাটিতে মেয়েরা কাতর হয়, এ তো তাহার সর্বাঙ্গণ সৌন্দর্য, আসল সম্পত্তি। তবু এটা তার সহ্য হইত। মনকে সে এই বলিয়া বুঝাইতে পারিত যে আর কী তাহার ছেলেখেলার বয়স আছে? ছেলে-ভুলানো রূপ দিয়ে এখন সে করিবে কী? কিন্তু চোখ কানা হইয়া যাওয়া! এ তো রূপ নষ্ট হওয়া নয়, এ যে কুৎসিত হওয়া, কদর্য হওয়া! তাহাকে দেখিলে এবার যে লোকের হাসি পাইবে? তাহার অমন ডাগর চোখ!

চোখ নষ্ট হয়ে গেল শশী! আমি কানা হয়ে গেলাম।

কী আর করবেন সেনদিদি? বেঁচে যে উঠেছেন—শশী সান্ত্বনা দেয়।

এর চেয়ে আমার মরাই ভালো ছিল শশী, যামিনী কবিরাজের বউ বলে।

বলে, দেখলে ঘেন্না হয় না?

না না, ঘেন্না হবে কেন? ঘেন্না হয় না।

যামিনী কবিরাজের বউকে দেখিলে শশীর দুঃখ হয়, ঘেন্না হয়তো হয় না। না, ঘেন্না হয় না।

শশী সেরকম নয়।

কিন্তু সেনদিদির দাম যে কমিয়াছে তাতে সন্দেহ নই। শশী অবশ্য বুঝিতে পারে না, সেনদিদির আকর্ষণ যতখানি কমিয়াছে সহানুভূতি দিয়া তাহার ক্ষতিপূরণ হইয়াছে। সেনদিদির হাসি আর দেখিবার মতো নয়, তাহার একটি চোখে এখন আর গভীর স্নেহ রূপ নেয় না, তাহার মুখের দিকে অবাক হইয়া চাহিয়া থাকিবার সাধ্য এখন আর কাহারও নাই। সেনদিদির মুখের কথা, তাহার মেহর ও পক্ষপাতিত্ব আজ আর অমূল্য নয়। তাহার জন্য শশীর দুঃখ হয় কিন্তু শশীকে সে আর তেমনিভাবে টানিতে পারে না।

প্রতিদিন সেনদিদিকে দেখিতে আসার সময় শশী আজকাল পায় না। আসিলেও, বেশিক্ষণ বসিবার তাহার উপায় নাই। যামিনী কবিরাজের বউকে ভালো করিয়া শশীর পসার কয়েক দিনেই বাড়িয়া গিয়াছে। রোগীকে সে আর ফিরাইয়া দেয় না, দেখিতে যায়, পকেটে টাকা লইয়া বাড়ি ফেরে। একটা রাত্রি সে তো নন্দপুরেই কাটাইয়া আসিল। যাতায়াতের খরচ আর দশ টাকা ভিজিট। গ্রামে দশটা রোগী দেখিলে দশ টাকা, এক রাত্রে দশ-দশটা টাকা পাওয়া সহজ কথা নয়।

যামিনী কবিরাজের বউ বলে, সেনদিদিকে ত্যাগ করলে না কি শশী?

না সেনদিদি। রোগীর বড় ভিড়। আসবার সময় পাই না।

আঃ বেঁচে থকো বাবা, তাই হোক। আরও রোগী হোক, লক্ষপতি হও। ভগবানের কাছে দিনরাত এই প্রার্থনা করছি।-যামিনী কবিরাজের বউ যেন কাদিয়া ফেলিবে। রোগা শরীর, আবেগে কান্নাই চলিয়া আসে।-বিয়ে করে সংসারী হও, দেশজুড়ে তোমার নাম হোক, তাই দেখে যেন মরতে পারি।

এক চোখের কোটরে ঢুকানো তাহার একটিমমাত্র ডাগর চোখের নিরতিশয় মোহাচ্ছন্ন সজল দৃষ্টিতে শশীকে সে দেখিতে থাকে। যামিনীর চেলারা ওদিকে হামাদিস্তায় ঠকাঠক শব্দে গুল্ম গুড়া করে। যামিনী খায় তামাক। কাশে আর ভাবে। স্ত্রীর ঘরের চৌকাটও সে ডিঙায় না। শশীর সঙ্গে কথা বলে না। ভাবনার তাহার অম্ভ নাই। থাকার কথাও নয়। এই বয়সে,-বয়স তাহার ষাটের উপর গিয়াছে, মানুষের আর কত সহ্য হয়? কাণ্ড দ্যাখো, এতদিনের রূপসী বউটা এমন কুৎসিত হইয়াই বাঁচিয়া উঠিল যে, চোখে দেখিলে মাথা ঘোরে। ভালো এক আপদ আসিয়া জুটিয়াছিল,–শশী। মানুষকে ও মরিতেও দিবে না?

গ্রামবাসী কিন্তু যামিনীর মুখে অন্য কথা শোনে।

শশীর চিকিৎসা চিকিৎসাই বটে। অমনি চিকিৎসা হলে রুগীকে আর শিগগির শিগগির স্বর্গে যাবার ভাবনা ভাবতে হয় না। মেরেই ফেলেছিল। বসম্ভের চিকিৎসা ও কী জানে? কত ওষুধপত্র দিয়ে আমিই শেষে…

বলে, চোখটা গেল কি সাধে? ওই লক্ষ্মীছাড়ার দু দাগ ওষুধ খেয়ে!

এসব কথা গোপালের কানে যায়। গ্রামের অনেকে গোপালের কাছে গিয়া বলে যে যামিনী কবিরাজ আচ্ছা নিমকহারাম, গোপালের ছেলের নিন্দা করিয়া বেড়াইতেছে। সংবাদটা বলিবার সময় অনেকে মনে মনে হাসে। গ্রামের লোকের অনুমানশক্তি প্রখর। সকালে আকাশের দিকে চাহিয়া তাহারা বলিতে পারে বিকালে বৃষ্টি হইবে। বিকালে যদি নেহাত বৃষ্টি না-ই হয় সে অপরাধ অবশ্য আকাশের। গোপাল যামিনী কবিরাজের বউ আনিয়া দিবার পর গ্রামের লোক চার-পাঁচ বছর ধরিয়া যাহা অনুমান করিয়াছিল তাহা যদি মিথ্যা হয় তবে পৃথিবীই মিথ্যা। অর্থাৎ সে অপরাধ গ্রামের লোকের অনুমানশক্তি ছাড়া জগতের আর সমস্ত কিছুর। তাই, যামিনী কবিরাজ সংক্রান্ত কোনো সংবাদ দিবার সময় গম্ভীর মুখে গোপালের দিকে চাহিয়া মনে মনে তাহারা হাসে।

গোপালের রাগ হয়। সে যামিনীকে বলে, কী শুনছি খুড়ো? ছেলের নিন্দে কেন?

কার নিন্দে? শশীর? যামিনী আশ্চর্য হইয়া যায়, আমি শশীর নিন্দে করব। একথা তোর বিশ্বাস হয় গোপাল?

ঘরে নিন্দে কর, আমার কাছে নিন্দে করো, কথা নেই। কিন্তু খবৰ্দার বাইরে যেন নিন্দে কোরো না খুড়ো।

কিন্তু যামিনী নিজেকে মিলাইতে পারে না। তাহার অসহ্য জ্বালা। সে ফের শশীর নিন্দা করিয়া বসে।

বলে, গীটাকে ও ছোড়া উচ্ছন্ন দেবে। ছোড়ার চুল ছাঁটার কায়দা দেখেছিস!

মাঝে মাঝে শশীকেও সে অপমান করে, শশী গায়ে মাখে না। আগে শশী কারো অপমান সহ্য করিত না, আজকাল তাহার একপ্রকার অদ্ভুত ধৈর্য আসিয়াছে। যামিনীর কথায় তাহার একেবারেই রাগ হয় না। সেনদিদির অসুখ উপলক্ষে ওর যে পরিচয় সে পাইয়াছে তাহাতে বুঝিতে তাহার বাকি থাকে নাই যে, সংসারের বন্ধ পাগল ছাড়াও কমবেশি অনেক পাগল আছে। এক-এক বিষয়ে মাথায় যাহাদের অত্যাশ্চর্য বিকার থাকে। যামিনীও তাহাদেরই একজন। ওর অর্থহীন অপমানে রাগ করিলে নিজে সে এমনি পাগলের দলে গিয়া পড়িবে।

তা ছাড়া, আর-এক দিক দিয়া শশীর মন শাস্ত হইয়া স্থিতিলাভ করিয়াছিল। তাহার ইনটেলেকচুয়াল রোমান্সের পিপাসা। যাহা চায়ের ধোয়ার মতো, জলীয় বাষ্প ছাড়া আর কিছু নয়, চা-ও নয়। জীবনকে দেখিতে শিখিয়া, অত্যন্ত অসম্পূর্ণ ভাসা-ভাসা ভাবে জীবনকে দেখিতে শিখিয়া, সে অবাক হইয়া দেখিয়াছে যে এইখানে, এই ডোবা আর জঙ্গল আর মশাভরা গ্রামে জীবন কম গভীর নয়, কম জটিল নয়। একান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে গ্রামে ডাক্তারি শুরু করিয়া ক্রমে ক্রমে এ জীবন শশীর যে ভালো লাগিতেছে, ইহাই তাহার প্রথম ও প্রধান কারণ। তারপর যাত্ৰাদলের অভিনেতা সাজিয়া কুমুদের আবির্ভাব। মোনালিসার কুমুদ, ভেনাস ও কিউপিডের কুমুদ, শেলি-বায়রন-হুইটম্যানের কুমুদ, পেগ খাওয়া waltz-foxrot-নাচা কুমুদ, নীলাক্ষীর প্রেমিক কুমুদ, তার চেয়ে বয়সে জ্ঞানে বিদ্যায় বুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠ কুমুদ; যাত্ৰাদলের অভিনেতা সাজিয়া তাহার আবির্ভাব! এ কি ব্যর্থ যায়! শশীর মন শাস্ত হইয়াছে, স্থিতিলাভ করিয়াছে। কেমন করিয়া হঠাৎ সে বুঝিতে পারিয়াছে কিডস্কিনের জুতাটা, আশ্চর্য শাড়িটা, বিস্ময়কর ব্লাউজটাই আসল। আর আসল তখনকার কুমুদের টাকাটা। তারপর তোমার চেহারা তো আছেই! সেটাও একটু দরকার আর দরকার বিশ্বজগৎকে একটু ডোন্ট কেয়ার করার ভাব। জমিল রোমান্স।

শশী এটা বুঝিয়াছে। কিন্তু হিসাব তো কম নয়? অতগুলি সমস্বয় তো তুচ্ছ নয়? এটাও শশী স্বীকার করে। স্বীকার করে যে ব্যাপারটা মন্দ নয়। মানুষের সভ্যতার খুবই অগ্রগতির পরিচয়, চমৎকার উপভোগ। লোভ করিবার মতো। পাইলে সে লাভবানই হইত। কিন্ত বঞ্চিত হইয়াছে বলিয়া মনের মধ্যে অসন্তোষ পুষিয়া রাখিবার মতোও কিছু নয়।

শশী ইহাও বুঝিয়াছে যে, জীবনকে শ্রদ্ধা না করিলে জীবন আনন্দ দেয় না। শ্রদ্ধার সঙ্গে আনন্দের বিনিময়, জীবনদেবতার এই রীতি।

শশী তাই প্রাণপণে জীবনকে শ্রদ্ধা করে। সংকীর্ণ জীবন, মলিন জীবন, দুর্বল পঙ্গু জীবন- সমস্ত জীবনকে। নিজের জীবনকে সে শ্রদ্ধা করে সকলের চেয়ে বেশি।

কুসুমের সঙ্গে কিন্তু শশীর আর একদিন ঝগড়া ইহয়া গিয়াছে।

রাত্রে একদিন হঠাৎ কুসুমের পেটের ব্যথা ধরিয়াছিল। অসহ্য প্রাণঘাতী ব্যথা। শশীকে না ডাকিয়া উপায় ছিল না। রাত্রে, বিশেষত শীতের রাত্রে, ঘুম ভাঙিয়া বিছানা ছাড়িয়া উঠিয়া গিয়া ডাক্তারি করাটা শশীর এখনো ভালোরকম অভ্যাস হয় নাই। প্রথমে সে একটু বিরক্তই হইয়াছিল। পেটে ব্যথা পেটে ব্যথার জন্য হারু ঘোষের বংশে কবে ডাক্তার ডাকিয়াছে? একটু গরম তেল মালিশ করিয়া দিলেই হইত। কিন্তু কুসুমের ব্যথার প্রতাপ দেখিয়া শশীর বিরক্তি টেকে নাই।

কলিক? কে জানে?

কী খেয়েছিলে পরাণের বউ?

জবাব দিয়াছিল মতি।

বে আজ কিছু খায়নি ছোটোবাবু। দাদার সঙ্গে ঝগড়া করে সারাদিন উপোস করেছে। একাদশীর দিনে এয়োস্ত্রী মানুষ করল উপোস,–হবে না?

কথাটা সাংঘাতিক। একাদশীর দিন এই উপবাস করার কথাটা। এমন কাজ করিবার মতো বুকের পাট কুসুম ছাড়া আর কারো হইত কি না সন্দেহ।

কিছু খাওনি পরাণের বউ?

খেয়েছি। খাব না কেন? একটা মাছের আঁশ খেয়েছি। কুসুম ধুঁকিতে ধুঁকিতে বলিয়াছিল।

তাহা হইলে একাদশীর দিন উপবাস করে নাই। ঝগড়ার কথাটাই সত্য, একাদশীর উল্লেখট মতি অনর্থক করিয়াছে। শশীর হঠাৎ রাগ হইয়া গিয়াছিল। কেন, কী বৃত্তান্ত না জানিয়ে মতি অমন যা-তা মন্তব্য করে কেন? কিন্তু কুসুমের কী হইয়াছে? কলিক? পেটের ব্যথাটা বড় রহস্যময় অসুখ। পরীক্ষা করিয়া দেখিবার উপায় নাই, সত্য কি মিথ্যা বুঝিবার উপায় নাই, থার্মেমিটার স্টেথোস্কোপ কোনোটাই কাজে লাগে নাই। রোগী যা বলে তা-ই সই। ব্যথাটা ডানদিকে বলিলে ডানদিকে, ঝিলিক দেওয়া ব্যথা বলিলে ঝিলিক-দেওয়া ব্যথা, চনচনে একটানা ব্যথা বলিলে চনচনে একটানা ব্যথা। সন্দেহ করিবার যো নাই। কুসমের বর্ণনা শুনিয়া শশী কিছুই বুঝিতে পারে নাই। পরাণকে সে আড়ালে ডাকিয়া লইয়া গিয়াছিল।

খানিক পরে বাড়ি গিয়া পাঠাইয়া দিয়াছিল ওষুধ। নিজে আর ফিরিয়া যায় নাই।

এই হইল তাহার অপরাধ। পরদিন খবর লইতে গিয়া দেখে কুসুম আগুন হইয়া আছে।

মরিনি। এই আপনার টাকা।

কুসুম সত্য সত্যই আঁচলে বাধা দুটি টাকা শশীর সামনে রাখিল। শশীর বুঝিতে বাকি রহিল না এই উদ্দেশ্যেই সে আচলে টাকা বাঁধিয়া ঘরের কাজ করিতেছিল।

মতি বলিল, তোর কী আস্পর্ধা বউ!

বুঁচি নাই। বুঁচি অনেকদিন আগে শ্বশুরবাড়ি চলিয়া গিয়াছে। সে থাকিলে অন্য কিছু বলিত। আরও কড়া, আরও ঝাঁজালো কিছু।

কুসুম শান্তভাবে বলিল, মা একলা গোয়াল সাফ করছে, যা তো মতি লক্ষ্মটি, হাত লাগবি যা। সুদেবের সঙ্গে তোর বিয়ের পরামর্শটা ছোটোবাবুর সঙ্গে করে নি। মা যেন গোয়াল ফেলে ছুটে আসে না বাপু। কাজ সেরে একেবারে চান করে আসবি। ছোটোবাবু বসবে।

কুসুম হুকুম দিতেও জানে। কেন জানিবে না? সকলে মিলিয়া তোষামোদ করিয়া গোরু কেনার জন্য তাহার অনম্ভজোড়া বাগাইয়া লয় নাই? সেও ছাড়িবে কেন? মাঝে মাঝে ভয়ানক দরকারের সময়, শশীর সঙ্গে এখন সে যে কলহ করিবে এমনি দরকারের সময়, হুকুম তাহার সকলকে মানিতে হইবে।

মতি চলিয়া গেলে শশী বলিল, ওষুধ খেয়ে কাল তোমার পেটব্যথা কমেনি নাকি বউ?

ও ভারি ওষুধ! কটা এইটুকু-টুকু সাদা বড়ি-ওষুধ না ছাই। নিজে একবার আসতে পারেননি? বড়ি খেয়ে ব্যথা যদি না কমত!

এর নাম অকৃতজ্ঞতা। ব্যথা তাহা হইলে কমিয়াছিল? রাত্রে একবার উঠিয়া আসিয়া দেখিয়া গিয়া ওষুধ দিল,ওষুধ খাইয়া ব্যথাও কমিল, তবু কুসুমের মন ওঠে নাই। শশী বিরক্তি বোধ করিল। তোমার সব বিষয়েই একটু বাড়াবাড়ি আছে বউ।

কী আছে? বাড়াবাড়ি? হ্যাগো ছোটোবাবু, আছেই তো। তা যাই বলেন, এক ঘণ্টা ধরে বুক পরীক্ষা ম্যালেরিয়া জ্বর হলে, আমি করি না।

সে বুক পরীক্ষা করিবে, সে কি ডাক্তার? কুসুমের মনটা শশীর বোধগম্য হয় না। পেটব্যথার জন্য কাল এক ঘণ্টা স্টেথোস্কোপটা ওর বুকে লাগাইয়া হৃদস্পন্দন শুনিলে ও কি সুখী হইত? কুসুমের মাথাধরার চিকিৎসা বোধ হয় পাটেপা। সে ডাক্তার মানুষ, এসব পাগলামিকে প্রশ্রয় দিলে তাহার চলিবে কেন?

টাকা পেলে কোথায় পরাণের বউ?

যেখান থেকেই পাই, আপনার ভিজিট দিয়েছি, নিয়ে যান।

কোথা থেকে পেয়েছ না বললে নিতে পারি না, বউ।

কেন, চুরি করেছি ভাবেন নাকি?

শশী ভাবিল, এই বেশ সুযোগ পাওয়া গিয়াছে। কুসুমের এই কথাটাকে পরিহাসে দাঁড় করাইয়া দিলেই সে হাসিয়া ঠাণ্ডা হইয়া যাইবে।

তা আশ্চর্য কী? চুরি না করলে টাকা তুমি পাবে কোথায়? রোজগার করো?

কুসুম বলিল, আমার বাপ ঢের রোজগার করে। তাই বলে আমরা কি আপনার তুল্যি? লোকের গলায় ছুরি দেওয়া পয়সায় আমরা বড়লোক হইনি, তাই আপনারা গরিব বলেন গরিব, চোর বলেন চোর!

শশী মুখ কালো করিয়া বাড়ি ফিরিল।

সারাদিন তাহার মন খারাপ হইয়া রহিল। নিজের চারিদিকে সে যে শিক্ষা ও সভ্যতার খোলটি সযত্নে বজায় রাখিয়াছিল, কুসুম তাহাতে ফাটল ধরাইয়া দিয়াছে। কুসুমের কথা মিথ্যে নয়। হারু ঘোষের চেয়ে তাহার বাবা কি একদিন গরিব ছিল না? লোকের গলায় ছুরি দিয়াই গোপাল যে পয়সা করিয়াছে একথারও প্রতিবাদ চলিবে না। গোপালের চেয়ে কুসুমের বাবা ঢের বেশি ভদ্রলোক। কুসুমকে তাহার বাবা মধ্যে মধ্যে পত্র লেখে গোপালের সাধ্য নাই অমন সুন্দর হস্তাক্ষরে ওরকম চিঠি লিখিতে পারে। ঠিকানায় কুসুমের নামটা বাঙলায় লিখিয়া কুসুমের বাবা বাকিটা লেখে ইংরেজিতে। গোপাল এবিসিডি-ও চেনে না। অপমানটা করিবার সময় কুসুম হয়তো এইসব কথাও মনে রাখিয়াছিল।

গ্রামের লোকেরা তাহাকে যে ছোটোবাবু বলিয়া ডাকে ইহাতে শশীর গৌরব কিছু নাই। এটা উপাধি মাত্র, শুধু নাম। সম্মান নয়। গোপালের মক্কেলরা শিশুকালে আদর করিয়া তাহাকে ছোটোবাবু বলিয়া ডাকিত, ডাকটা কী করিয়া গ্রামে ছড়াইয়া পড়িয়াছে এবং টিকিয়া আছে। এসব ভুলিয়া গিয়া সে কি অহঙ্কারী হইয়া উঠিতেছিল? সকলের সঙ্গে ছোটোবাবুটির মতো ব্যবহার শুরু করিয়া দিয়াছিল?

শশীর আত্বসম্মান অত্যস্ত আহত হইয়া রহিল। সে ভাবিল, আমার রকমসকম দেখে কুসুম হয়তো মনে মনে হাসে। কুসুম হয়তো ভাবে, আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে এমনই করে মানুষ বাপের চুরি-চামারির পয়সায় লেখাপড়া শিখে এত কেন?

কুসুম ক্ষমা চাহিতে আসিল দিন-চারেক পরে। দুপুরবেলা চুপিচুপি, চোরের মতো!

শশীর ঘরের পিছনে বাগান। বাগানে লিচু হয়, আম হয়, কাঠাল হয়, কপি হয়, নটেশাক হয়, তীব্রগন্ধী কাঁঠালি চাঁপা, লালবোঁটা শিউলিফুল ফোটে। বাগান দিয়া আসিয়া ঘরের জানালার ফাঁকে ফিসফিস করিয়া কুসুম ডাকিল, ছোটোবাবু শুনুন।

শশী ঘুরিয়া বাগানে গিয়া দ্যাখে জানালার নিচে তাহার অত সাধের গোলাপচারাটি কুসুম দুই পায়ে মাড়াইয়া মাটিতে পুতিয়া দিয়াছে।

গাছটা মাড়ালে কেন বউ? কিসে দাঁড়াচ্ছ দেখে দাঁড়াতে হয়!

শশীর সাধের ফুলের চারাকে হত্যা করিয়া শুরু করিলেও কুসুমের কাজ হইল। শশী তাহাকে ক্ষমা করিয়া ফেলিল; সমস্ত অপরাধ। আজ পর্যন্ত কুসুম তাহার কাছে যত অপরাধ করিয়াছে সব। কুসুম বলিল, চার রাত সে ভালো করিয়া ঘুমায় নাই। কথাটা শশী বিশ্বাস করিল। কুসুম মানবদনে মিথ্যা বলে জানিয়াও বিশ্বাস করিল। কারণ, কুসুমের মুখে কথাটার প্রমাণ ছিল এবং চোখে ছিল জল। কুসুম আরও বলিল, কয়েক দিনের মধ্যেই সে বাপের বাড়ি চলিয়া যাইবে। তার বাবা ভুবনেশ্বর পত্ৰ দিয়াছে। ছোটোবাবুকে রাগাইয়া চলিয়া যাইবার কথাটা ভাবিতে তাহার এমন খারাপ লাগিতেছিল! তাই ক্ষমা চাহিতে আসিয়াছে।

আমার এই স্বভাবের জন্য কেউ আমাকে দুচেখে দেখতে পারে না। মুখের আমার আটক নেই!

শশী জিজ্ঞাসা করিল, সেদিন রাত্রে তোমার কী হয়েছিল বলো তো? সত্যি বলো!

পেট ব্যথা করেছিল।

জিভ দেখি?

কুসুম সলজ্জভাবে জিভ দেখাইল।

জিভ তো পরিষ্কার।

জিভ পরিষ্কার হবে না কেন ছোটোবাবু?

না, জিভ অপরিস্কার থাকিবার কোনো কারণ নাই। কুসুমের স্বাস্থ্য বাহিরের ফাঁকি নয়, ভিতরেও সে খুব মজবুত। কুসুমকে শশীর এইজন্যই ভালো লাগে। দশ বছরে একবার এক রাত্রে শুধু পেটে ব্যাথায় কষ্ট পায়, আর কোনো রোগ বালাই নাই। এই তো চাই। সব বাঙালি ঘরের মেয়ের এরকম স্বাস্থ্য হইলে জাতটা আজ ডুবিতে বসিত না, শশী একথাও ভাবে।

জানালা দিয়া উৎসুক দৃষ্টিতে ঘরের ভিতর চহিয়া কুসুম বলিল, আপনার ঘরটা একটু দেখে যাব ছোটোবাবু?

চলো না, সিন্ধু ওদের কাউকে ডাকি, অ্যাঁ?

না। আমি একাই দেখে যাই।

কুসুম একাই শশীর ঘর দেখিল। শশী জানিত এটা উচিত নয়। কিন্তু বারণও সে করিল না। ভাবিল ওর যদি বদনামের ভয় না থাকে আমার বয়ে গেল। আমি তো ডাকিনি।

শশীর ঘর দেখিয়া কুসুম বলিয়াছিল, বেশ সাজানো ঘর। কিন্তু জাদুঘর মিউজিয়ামের মতো মানুষের শোবার ঘরে কী আর দেখিবার থাকে? বড়ো আলমারি দুটির পাঁচটি তাক। একটা আলমারিতে ঠাসিয়া বই ভরিয়াও কুলায় নাই, মাথার উপর উঁচু করিয়া সাজাইয়া রাখা হইয়াছে। অপরটির উপরে তাক তিনটিতেও ডাক্তারি বই সাজানো, নিচের তাকে চকচকে ডাক্তারি যন্ত্রপাতি। কোনটা কী কাজে লাগে? কুসুম জিজ্ঞাসা করিল। কুসুমের যেন তাড়াতাড়ি নেই, যতক্ষণ খুশি শশীর ঘরে থকিতে পারে। দেয়ালে কয়েকটা ছবি আর ফটো টাঙানো আছে, কুসুম অন্যমনস্কের মতো সেগুলি দেখিল। ফটোগুলি অধিকাংশই শশীর বাড়ির স্ত্রী-পুরুষের, কোনো মন্তব্য নিম্প্রয়োজন। কুমুদের ফটোটা দেখিয়া কুসুম বলিল, সেই লোকটা না? গতবৎসর শশী দেয়ালে একগোছা ধানের শিষ টাঙ্গাইয়া দিয়াছিল। দেখিয়া কুসুম ভারি খুশি। কাঠের বাক্সে কী আছে? ওষুধ? দেখি। ওই ছোট আলমারিতে ওষুধ রাখিয়াছে, আবার বাক্সে কেন?

এ ঘরে আপনি একা শোন ছোটোবাবু?

একাই শুই।

তা, বউ আসতে আর দেরি কত! শিগগির বাপের বাড়ি চলে যাব ছোটোবাবু। আর আসব না।

আসবে না? সে কী! শশী অবাক হইয়া গেল।

কুসুম একটু ভাবিল আসব, অনেক দেরি করে আসব। হয়তো ও-বছর নয়তো পরের বছর, ঠিক কিছু নেই। আচ্ছা, যাই ছোটোবাবু।

শশী বলিল, কী করে যাবে? বাবা ওদিকে দাওয়ায় এসে বসেছেন। ঘুমিয়ে উঠলেন।

তবে? কুসুম জিজ্ঞাসা করিল। সে যে বিশেষ ভয় পাইয়াছে মনে হয় না। বিপদে কুসুম শান্তই থাকে। বিচলিত হয় না, দিশেহারা হয় না।

শশী বলিল, একটু বোসো। বাবা এখুনি বাইরের ঘরে চলে যাবেন।

তবে দরজা বন্ধ করে দিন। দেখিতে পান যদি?

কে জনিত নিয়তি আজ গোপাল ঘুম ভাঙিয়া ওদিকের দাওয়ায় বসিবে, আজ সাত বছর পরে।

পূজার পর গাওদিয়ার স্বাস্থ্য ক্রমে ক্রমে ভালো হয়। ম্যালেরিয়া কমিয়া আসে, কলেরা বন্ধ হয়, লোকের ক্ষুধা বাড়ে, মাছ দুধ সস্তা হয়। নিমুনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জায় কেবল দুই-দশজন যা মারা যায়—সে কিছু নয়। অগ্রহায়ণ-পোষ মাসে খালের জল অনেক কমিয়া আসে। মাঘের শেষাশেষি ডোবা শুকাইয়া যায়। চৈত্র মাসে অনেক পুকুরে দু-এক হাত জল থাকে মাত্র। বৈশাখে বৃষ্টি না হইলে অধিকাংশ পুকুর শুকাইয়া ওঠে। তখন গ্রামে বড় জলের কষ্ট। শীতলবাবুর বাড়ির সামনের বড় দিঘিটার জল খাইয়া গাওদিয়া, সাতগাঁ আর উখারার লোক প্রাণধারণ করে। বাবুর দিঘিতে বাবুদের বাড়ির লোক ছাড়া কাহারো দেহ ভুবানো নিষেধ। দারোয়ান লাঠি ঘাড়ে পুকুর পাহারা দেয়, শীতলবাবুর ছেলেরা ভাগনেরা আর কম বয়সি মেয়েরা দিঘি তোলপাড় করিয়া স্নান আরম্ভ করিলে লাঠিতে ভর দিয়া সে একগাল হাসে। ঘাট ছাড়া গ্রামের লোকের অন্য কোথাও কলসি ডুবানো বারণ। শীতলবাবুর বাড়ির ছেলেমেয়েরা স্নান করিয়া গেলে দু-তিন ঘণ্টা ঘাটের কাছে জল কাদা হইয়া থাকে।

জল হইতে আসিয়া কেহ বলে ; খোকাবাবুদের একটু সাবধানে স্নান করতে বলতে পারো না দারোয়ানজি?

দারোয়ান বলে ; দিঘি কিসকো? তুমারা?

তা বটে, দিঘিটা বাবুদের বটে।

কিন্তু বৈশাখ মাস আসিতে এখনো দেরি আছে, বৈশাখ মাসে এ বছর খুব ঝড়বৃষ্টি হইতে কিনা এখন হইতে তাই বা কে বলিতে পারে। শীতকালটা গ্রামের লোক সুখে কাটায়। কই, মাগুর, শোলমাছ প্রচুর পাওয়া যায়। যাদের ডোবা আছে, ডোবা শুকাইয়া আসিলে জল ছেঁচিয়া ঝুড়িখানেক মাছ পায়। তার মধ্যে খলসে আর ল্যাঠা মাছই বেশি।

এই খাল আর খালের চিকরি-কাটা দেশে ভালো রাস্তা নাই কিন্তু শীতকালটা দেশে কাটাইবেন সংকল্প করিয়া বিমলবাবু সপরিবারে একটা মোটরগাড়ি সঙ্গে করিয়া গ্রামে আসিলেন।

বাজিতপুরে মোটরগাড়ি আছে। কিন্তু গাওদিয়ায় মোটরগাড়ি!

কুসুম শশীকে বলে, সেবার কলকাতায় মোটরগাড়ি চড়েছি। বিয়ের আগে যেবার কলকাতায় গিয়েছিলাম বাবার সঙ্গে।

শশী বলে, তোমার সে কথা মনে আছে?

কুসুম অবাক হইয়া বলে, বাহু, মনে থাকবে না? কতদিন আর হল? আট বছর কি ন বছর। আমার বয়স কত ভাবেন? পচিশ?

দূর! বাইশ বছর।

সুদেবের সঙ্গে মতির বিবাহের প্রস্তাব ভাঙিয়া গিয়াছে। কুসুম ইদানীং আর ও-কথা উত্থাপনও করিত না। মতির বিবাহ হোক বা না হোক তাহার যেন কিছুই আসিয়া যায় না। পরাণ যদি বা রাত্রে কোনোদিন কথাটা তুলিত, কুসুম হাই তুলিয়া বলিত, তাহার কোনো মতামত নাই। কোনোদিন কিছু না বলিয়াই সে ঘুমাইয়া পড়িত। এদিকে নিতাই তাগাদা দিতেছিল। এত বেশি তাগাদা দিতেছিল যেন বিবাহটা সুদেবের নয়, তাহার নিজের। শশীর সঙ্গে আর একবার পরামর্শ করিয়া শেষে পরাণকে বলিতে হইয়াছে— না, সুদেবের সঙ্গে মতির সে বিবাহ দিবে না। নিতাই শান্তভাবে কথাটা গ্রহণ করিতে পারে নাই। লোভ দেখাইয়াছে, সদুপদেশ দিয়াছে, মেজাজ গরম করিয়াছে, কিন্তু না, পরাণ রাজি নয়।

ছোটোবাবু বারণ করে দিয়েছে, অ্যাঁ? হারুদা মরলে তাকে কে পুড়িয়েছিল পরাণ? কাঁধ দিয়েছিল কে? ছোটোবাবু? ছোটোবাবু যখন বারণ করছে, ব্যাস, তার আর কি, ছোটোবাবুর কথা বেদবাক্যি, বটে?

আমার নিজের বুদ্ধি নেই? মতির বিয়ে আমি শহরে দেব–ভদ্রঘরে।

এ কথাটা পরাণ না বলিলেও পারিত।

যাই হোক, তারপর সুদেব নিতাইয়ের নামে বাজিতপুরের মামলা রুজু করিয়াছে। অভিযোগ গুরুতর, গচ্ছিত ধন অপহরণ, বেআইন আটক, আর মারপিট। গারের জ্বালায় সুদেব নালিশ করিয়াছে বটে কিন্তু কিছু প্রমাণ করিতে পারবে কিনা সন্দেহ নিতাই বিচক্ষণ সংযমী মানুষ। হঠাৎ কিছু করিয়া বসিবার লোক সে নয়, প্রমাণ রাখিয়া অপকর্ম সে কখনও করিবে না।

একদিন বাজিতপুর-ফেরত নিতাইয়ের সঙ্গে শশীর রাস্তায় দেখা হইল। এই মামলার ব্যাপারে নিতাইকে অপরাধী সন্দেহ করিয়াও শশীর রাগ হইয়াছে সুদেবের উপর। নিতাই সুদেবের মামা, নিজের মামা। একেবারে মামলা না করিয়া আর কিছু তো করিতে পারিত? কোর্টে এখন মতির নামটি উঠিয়া পড়িবে। পরাণকে সাক্ষ্য দিতে যাইতে হইবে। সে এক কেলেঙ্কারি ব্যাপার।

কিন্তু নিতায়ের সঙ্গে মামলার কথা শশী আলোচনা করিল না।

বলিল, তোমার কাছে কিছু টাকা পাওনা আছে নিতাই।

দেব ছোটোবাবু, মাঘ মাসটা গেলেই শোধ করে দেব।

শশী চিন্তিত হইয়া বলিল, মাঘ মাস? আচ্ছা, তাই দিও। কিন্তু লালীর বাছুরটা তুমি পরাণকে দিলে না যে? লালী দুধ বন্ধ করেছে শুনলাম?

লালীর বাছুর পরাণকে দেব কেন ছোটোবাবু?

কেন লালীকে বেচবার সময় কথা হয়নি প্রথম বাছুরটা পরাণ পাবে?

না ছোটোবাবু, এমন কথা হয়নি, পরাণ মিছে বলেছে। লালীকে আমি কিনেছি হারুদার ঠেয়ে, পরাণ কি জানে?

শশী উদাসভাবে বলিল, যাক, কথা না হয়ে থাকলে আর কী কথা? পরশু সের ছয়েক দুধ পাঠিও নিতাই। বাড়িতে কী সব করবে বলেছিল।

শশী চলিয়া যায়,–নিতাই ডাকিয়া বলিল, ছোটোবাবু, শোনেন। বাজিতপুরে জামাইবাবুকে দেখলাম। কাল বিয়ানে এ গাঁয়ে আসবেন।

কোন জামাইবাবু?

মেজো।

এ খবর শশী জানিত না। তাদের কোনো সংবাদ না দিয়া নন্দলাল গায়ে আসিতেছে ইহাতে আশ্চর্যও সে হইল না। বিবাহের পরেই নন্দলাল শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক তুলিয়া দিয়াছে। কখনও চিঠি লেখে না, চিঠির জাবাব দেয় না। বিন্দু প্রথম প্রথম চিঠি লিখিত, স্বামীর আদেশের বিরুদ্ধে তাকাইয়া। নন্দলাল টের পাইবার পর বাপের বাড়ির সঙ্গে চিঠি লেখার সম্পৰ্কটুকু তাহাকে তুলিয়া দিতে হইয়াছে। একবার সে যে দু-চার দিনের জন্য বাপের বাড়ি আসিয়াছিল তাও স্বামীকে লুকাইয়া। ব্যবসা উপলক্ষে নন্দলাল দিন পনেরো বোম্বে গিয়েছিল, সেই সময়। এমন ব্যাপার বেশিদিন গোপন থাকিবার নয়। বোম্বে হইতে ফিরিয়া একদিন নন্দলাল স্ত্রীকে বলিয়াছিল, গাওদিয়া গিয়েছিলে?

বিন্দু ভয়ে কাঁপিয়া একটু হাসিয়া ব্যাপারটা উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিয়া বলিয়াছিল, একদিনের তরে গিয়াছিলাম, মোটে একদিন। বাবার যা অসুখের কথা শুনলাম! –রাগ করেছ?

রাগ করেছ?–ভ্যাঙাইয়া–ছোটলোকের বাচ্চা!

গছাইয়া-দেওয়া বউ, প্রাণভয়ে-গ্রহণ করা বউ, লেখাপড়া-নাচ-গান-কিছু না-জানা বউ, জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি।

বিন্দুকে নন্দলাল ত্যাগ করে নাই কেন, কে বলিবে! হয়তো কর্তব্যজ্ঞান, হয়তো খেয়াল, হয়তো নির্বিবাদে ওকে লইয়া যা-খুশি তাই করা যায় বলিয়া নন্দলালের কাছে বিন্দুর একধরনের দাম আছে,-কে বলিবে! বিন্দুকে নন্দলাল অত গয়না-কাপড় দেয় কেন, সে আর এক রহস্য। বিন্দু কি ধার-করা গহনা গায়ে দিয়া বাপের বাড়ি আসিয়াছিল? যাহা পায় নাই তাহাই পাইয়াছে এই অভিনয়টুকু করিয়া যাওয়ার জন্য? কে বলিবে! জীবনের অজ্ঞাত রহস্য গাওদিয়ার বিন্দুকে গ্রাস করিয়াছে, কলিকাতার অনামি রহস্য। কলিকাতায় থাকিয়া পড়িবার সময়ও শশী যাহা ভেদ করিতে পারে নাই। নন্দলাল একপ্রকার অপমানই করিত, কিন্তু শশী যাইতে ছাড়িত না। ভাইফোঁটার দিন ক-বার বিন্দু তাহাকে ফোঁটা দিয়াছে। বিন্দুর গা-ভরা গহনা সে দেখিতে পাইত না? না। অন্তঃপুরের দৈনন্দিন সাদাসিধে জীবনে গহনার বোঝা বহিয়া বেড়াইতে বিন্দু ভালোবাসে না-চোখের আবিষ্কার কানে শোনা এই কৈফিয়ত শশীর কাছে মিথ্যা হইয়া যাইত। শশী ভাবিত, বিন্দু তবে সুখেই আছে! একটা ব্যাপার সে বুঝিত না। বাহিরের লোকের বুঝিবার মতো ব্যাপারও সেটা নয়। নন্দলাল ভিন্ন বড়িতে বিন্দুকে রাখিয়াছে, বিন্দুকে একা। নন্দলালের পরিবার যে-বাড়িতে পচিশ বৎসর বাস করিতেছে, বিন্দু সেখানে কতদিন বধূজীবন যাপন করিয়াছিল জিজ্ঞাসা করিলে বিন্দু সে প্রশ্ন এড়াইয়া যায়, নূতন বাড়িতে কতদিন সে গৃহিণী হইয়া বাস করিতেছে তাও বলে না। ঝগড়াকাটি হতে লাগল, তাই চলে এসেছি। —বিন্দু শুধু ওই কৈফিয়ত দেয়। বলে, বেশ আছি স্বাধীনভাবে। ওখানে এমন ঝগড়া করে এবং বলিয়া এমনভাবে হাসে যে মনে হয় যেন সত্য সত্যই বেশ আছে, স্বাধীনভাবে। ঝি-চাকরের অভাব নাই, সদরে একটা দারোয়ানও আছে। ঘরগুলি দামি আসবাবে ভরতি, বাড়াবাড়ি রকমে ভরতি। বিন্দুর জন্য নন্দলাল বিলাসিতার চূড়ান্ত ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে। সারা বাড়িতে এসেন্সের গন্ধ!

নন্দলাল তাহা হইলে বিন্দুকে ভালোবাসে? বিন্দুর বাড়িতে গিয়া কতদিন শশী দেখিয়াছে, বিন্দুর ভাব অমায়িক, বিন্দু সাদাসিধে। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়াছে, নন্দলাল সে বেলা আসিবে না। আবার কতদিন গিয়া দেখিয়াছে বিন্দু অমায়িক নয়, রহস্যময়ী। বিন্দু মহাসমারোহের সঙ্গে প্রসাধনে ব্যাপৃত হইয়া আছে, কথা বলার সময় নাই! একঘণ্টার মধ্যে নন্দলাল আসিবে।

জীবনের অজ্ঞাত রহস্য বিন্দুকে গ্রাস করিয়াছে বইকী।

পরদিন শশী খালের ঘাটে গেল—যে ঘাটে হারুর মৃতদেহের সঙ্গে এক নৌকায় সে একটি সন্ধ্যা অতিবাহিত করিয়াছিল। সকালবেলা।

নন্দলাল আসিতেছে—বাড়িতে শশী একথা প্রকাশ করে নাই। নন্দলাল কখনও তাহাদের বাড়ি যাইবে না। কিন্তু শশী অনেকদিন বিন্দুর কোনো খবর পায় নাই। নন্দলালের কাছে বিন্দুর খবরটা জানিবার জন্যই সে খালের ঘাটে আসিয়াছে। গ্রামের মধ্যে একান্ত পর উদ্ধত ভগিনীপতিটির সঙ্গে আলাপ করা অসম্ভব।

শশীর মনে আর একটা ইচ্ছা ছিল। সে এক অসম্ভব কল্পনা। বিন্দুর বিবাহের ব্যাপারটা শশী জানে। কিন্তু সে তো আজকের কথা নয়, প্রায় ইতিহাসে দাঁড়াইয়া গিয়াছে। এতকাল নন্দলাল রাগ করিয়া ছিল, ভালো কথা, তাহার দোষ নাই। কিন্তু চিরজীবন অতীত ঘটনার জবাব কাটিয়া চলিয়া লাভ কী? নন্দলাল তো আজ অনায়াসে গোপালকে ক্ষমা করিয়া ফেলিতে পারে। মনে করিতে পারে যে জোর-জবরদস্তি নয়, সে নিজেই দেখিয়া পছন্দ করিয়া বিন্দুকে বিবাহ করিয়াছিল! গোপালের অপরাধে রাগ করিয়া আছে নন্দলাল আর মাঝে পড়িয়া শাস্তি পাইতেছে বিন্দু, এটা উচিত নয়।

বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক তুলিয়া দেওয়াটা বিন্দুর শাস্তি, শশী এইরকম মনে করে। নন্দলালকে সে আজ তাহদের বাড়ি গিয়া উঠিতে অনুরোধ করিবে। আভাসে ইঙ্গিতে বুঝাইয়া দিবে গোপাল আজ সাত বছর অনুতপ্ত হইয়া আছে, আর কেন ভাই, এবার মিটাইয়া ফেল।

তারপর নন্দলাল আসিল! সে আরও বুড়া হইয়াছে, আরও বাবু হইয়াছে। অবস্থার অনুপাতে হিসাব করিলে সঙ্গের চাকরটি কিন্তু তাহার চেয়েও বাবু। এইটুকু খাল বাহিয়া আসিতে দুজনের জন্য নন্দলাল নৌকা ভাড়া করিয়াছে দশজনের। হয়তো তাহার ডুবিয়া মরার ভয়,–কলকাতার বাবু!

খবর না-দেওয়ার জন্য শশী কোনো অনুযোগ করিল না। বলিল, কলকাতা থেকে বেরিয়েছ কবে?

বিন্দু শশীর এক বছরের ছোট। সেই হিসাবে নন্দলালের সে গুরুজন।

পরশু।

বিন্দু ভালো আছে?

ভালো থাকবে না কেন?

কী জবাব! নন্দলালকে সামনে দেখিয়া, তাহার কথা শুনিয়া, শশীর কল্পনা নিভিয়া আসিতেছে। রাগ, প্রতিহিংসা এইসব যে মানুষের অবলম্বন, সহজে ওসব সে ছাড়িতে চায় না। ছাড়িয়া বাঁচিবে কী লইয়া?

খবর পেলাম, আজ সকালে তুমি পৌছবে। বাবা বললেন, ঘাটে যা শশী, বাবুদের গাড়িটা নিয়ে যা, সঙ্গে করে নিয়ে আসবি। নিজেও আসতেন, আমি বারণ করলাম। বাতে কষ্ট পাচ্ছেন, কতক্ষণ ঘাটে অপেক্ষা করতে হবে তারও কিছু ঠিক নেই। তুমি আসছ শুনে বাড়িতে হৈচৈ পড়ে গেছে নন্দ।

নন্দলাল বলিল হুঁ, মোটরটা কার?

নন্দলাল বলিল শীতলবাবুর ভাই বিমলবাবুর। ওরাই জমিদার।

শীতলবাবু লোক কেমন?

প্রশ্ন শুনিয়া শশী একটু বিস্মিত হইল।

বেশ লোক। খুব ধর্মচর্চা করেন। এখানে দাঁড়িয়ে কী হবে? তোমার চাকরকে বলো, জিনিস গাড়িতে তুলুক। নৌকা ছেড়ে দাও, আমাদের নৌকায় ফিরে যাবে।

নন্দলাল মাথা নাড়িল,–আমি এ বেলাই ফিরব শশী। আর কাজ শেষ করে তোমাদের বাড়ি যাওয়ার সুবিধে হবে কি না-মানে, হয়তো সময় পাব না। না, হয়তো কেন, সময় পাব না।

শশী এ অপমানও হজম করিল।

আজ তোমাকে ফিরতে দিচ্ছে কে? সবাই আশা করে আছে নন্দ।

আমাকে ফিরতেই হবে। বাজিতপুরে কাজ ফেলে এসেছি। শীতলবাবুর সঙ্গে দেখা করেই আবার নৌকা খুলব।

শীতলবাবুর কাছে তাহার কী প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করিতে নন্দলাল একটা ভাসাভাসা জবাব দিল যে বাজিতপুরে শীতলবাবুর কিছু জমি কিনিবে। কথা কহিতেও নন্দলালের যেন কষ্ট হইতেছিল। কেন, কী বৃত্তান্ত শশী তাহ কিছুই জিজ্ঞাসা করিল না। নিজেকে তাহার গোমস্তা মনে হইতেছিল নন্দলালের।

বেশ, কাজ থাকলে তোমায় আটকাব না। এ বেলাটা থেকে খাওয়াদাওয়া করে বিকেলে রওনা দিও। বলিয়া শশী যোগ দিল, বাবা নিজে আসতেন নন্দ। আমি বারণ করলাম।

কিন্তু নন্দর সুবিধা হইবে না। সময় নাই।

তখন শশী বলিল, ও আচ্ছা।

তাহার রাগ হইতেছিল, মনে জ্বালা ধরিয়া গিয়াছিল। টিনের চালাটার একধারে চন্ডী ছোকরা কেরোসিন কাঠের উপর রেকাবি-ভরা পান সাজাইয়া রাখিয়াছে, আর কয়েক প্যাকেট লাল-নীল-কাগজে-মোড়া বিড়ি। চণ্ডী নিজে কাছে গিয়া হা করিয়া বাবুদের গাড়িটি দেখিতেছে। গাওদিয়ায় মোটরগাড়ি নন্দ থাকিয়া থাকিয়া গাড়িটার দিকে চাহিতেছিল। কিন্তু শশীর সঙ্গে এইমাত্র সে সম্পর্ক চুকাইয়া দিয়াছে, গাড়িটা আনিয়াছে শশী। নন্দলাল তাই বলিল, শীতলবাবুর বাড়িটা কতদূর?

গাঁয়ের শেষে।

তবে তো কম দূর নয়! ঘোড়ার গাড়ি-ট্যাক্সি পাওয়া যায়? চাকরটাকে পাঠিয়ে দিই, ডেকে আনুক।

ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যায়। এই গাড়ি বাবুদের বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, তুমি ইচ্ছে করলে যেতে পারো। রসিকবাবুর বাগানের একটা গাছের দিকে শশী দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়াছিল, এবার সে আবার চণ্ডীর দোকানের দিকে চাহিল।

নন্দ কী ভাবিল বলা যায় না, বলিল, সময় থাকলে তোমাদের বাড়ি যেতাম শশী।

সময় না থাকলে আর কথা কি?

সেইখানেই ইতি। নৌকায় গিয়া সুটকেস হইতে আয়না-চিরুনি বাহির করিয়া নন্দ চুলটা ঠিক করিয়া লইল। পানের কৌটা হইতে খানিকটা জর্দা মুখে দিল। গায়ের দামি আলোয়ানটা খুলিয়া রাখিয়া একটা তার চেয়ে দামি শাল গায়ে দিয়া মোটরে উঠিল।

এসো শশী। আমার একটু তাড়াতাড়ি আছে।

সেই যেন এতক্ষণে মোটরের মালিকানা-স্বত্ব পাইয়াছে। তা, সেটা আশ্চর্য নয়। মোটরে চড়ার অভ্যাস নন্দলালের আছে, শশী তো চাপে গোরুর গাড়ি।

শশী বলিল, তুমি যাও। আমার এদিকে কাজ আছে!

কলিকাতা শহর! মোটরে চাপিয়া কলিকাতা শহর গাওদিয়ার দিকে চলিয়া গেল। করিয়া দিয়াছে। বিন্দুর বাড়ি যে-পাড়ায়, সে পাড়াটাও ভালো নয়। নন্দ কি পাগল? পাগল হোক আর যাই হোক, ওকে তো সে অনায়াসে মারিতে পারিত। বৃষ্টিধারার মতো কিল চড় ঘুসি। কতক্ষণ আর সহিতে পারিত? পাঁচ মিনিট। পাঁচ মিনিটের মধ্যে নন্দ পায়ের কাছে গড়াগড়ি দিত। অজ্ঞান অচৈতন্য নন্দ।

তবু, নন্দ হয়তো বিন্দুকে ভালোবাসে।

শীত জমিয়া আসে। পৌষ-পার্বণ আসিয়া পড়িতে আর দেরি নাই। গ্রামে অবিরত টেকি পাড় দিবার শব্দ শোনা যায়। আকাশে রবির তেজ কমিয়াছে। মাঠে রবিশস্য সতেজ। মানুষের গা ফাটিতে আরম্ভ করিয়াছে। গায়ে যাহার মাটি বেশি, ঘষা লাগিলেই খড়ি উঠিয়া যায়। লেপ-কাথা খোলা হইয়াছে, বেড়ার ফাঁক গুলিতে ন্যাকড়া ও কাগজ গোজা হইতেছে। মতি একবার জুরে পড়ি পড়ি করিয়া পড়ে নাই। কুসুমের আর একবার পেটব্যথা হইয়া গিয়াছে। পরাণ একদফা গুড় চালান দিয়াছে। এবার তাহার কিছু পাটালি গুড় করিবার ইচ্ছা। শশীর কাছে টাকা ধার করিয়া সে আরও প্রায় চল্লিশটা খেজুরগাছ লইয়াছে। লালীর বাছুরটা নিতাই একদিন যাচিয়া পরাণকে ফেরত দিয়া গিয়াছে।

ছোটোবাবুর জন্যে। নইলে বাছুর তুমি কখনও ফেরত পেতে না। এই কথা বলিয়াছে কুসুম। খেজুরগাছ কিনার জন্য শশীর কাছে পরাণকে টাকা ধার করিতে দিতে কুসুমের নিতান্ত অনিচ্ছা দেখা গিয়াছিল। সবসময় তাহার ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকে মর্যাদা দিলে সংসার চলে না, এই যুক্তিতে পরাণ তাহার কথা গ্রাহ্য করে নাই। মোক্ষদার শরীরের অবস্থাটা কিছুদিন হইতে ভালো যাইতেছে না। শশীর বাড়িতে একটি আশ্রিতা মেয়ে, শশীর সে কী সম্পর্ক ভাই-কি হয়, ছেলে হওয়ার সময় ঠাণ্ডা লাগিয়া নিমুনিয়া হইয়া মরিয়া গিয়াছে।

এই ব্যাপারটিতে শশী বড় ধাক্কা খাইয়াছিল! বাড়ির উঠানে সাময়িকভাবে অতি কম খরচে কাঁচা বাঁশের সস্তা বেড়ার একটি ঘর তুলিয়া আতুড়ঘর করা হয় চাল টিনের। ব্যাপার চুকিলে টিনের চালটি ছাড়া ঘরটিকে বিসর্জন দেওয়া হয়। মৃতা মেয়েটির বেলাতেও এই ব্যবস্থাই হইয়াছিল।

এখন, শশীর বাড়িতে এ প্রথা চিরন্তন। শশী নিজেও এমনি একটি কুটিরে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, মনে নাই। শশী পৃথিবীতে আসিয়াছিল উলঙ্গ সন্ন্যাসী হইয়া, এখন সে ডাক্তার। পসারওয়ালা ডাক্তার, এমন ব্যাপারও সে ঘটিতে দিল কেন?

সে কি শুধু টাকার জন্য ডাক্তারি শিখিয়াছে? যেখানে যতটুকু কাজে লাগাইলে টাকা মেলে আপনার শিক্ষাকে সেখানে ঠিক ততটুকুই কাজে লাগাইবে? সমস্ত গ্রামকে স্বাস্থ্যতত্ত্ব শিখাইতে যাওয়া বৃহৎ ব্যাপার, ওটা নাহয় সে বাদ দিল, কিন্তু নিজের গৃহে?

না, সে ডাক্তার নয়। ব্যবসাদার। বাহিরে সে টাকা কুড়াইয়া বেড়ায়, বাহিরে সে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করিবার ভাড়া-করা সৈনিক গৃহে তাহার অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়া, মৃত্যুর আধিপত্য।

তারপর কয়েক দিন শশী বাড়িতে স্বাস্থ্যনীতি প্রবর্তনের চেষ্টায় সকলকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল।

কী দিয়ে দাঁত মাজছিস?

কয়লা দিয়ে।

নিমের দাঁতন দিয়ে মাজ।

তেতো যে! কয়লায় দাঁত কত সাদা হয়!

যে কয়লা দিয়ে দাঁত মাজিত সে কিছুঁতেই নিমের দাতন ব্যবহার করিতে রাজি হইল না।

শশী কি খেপিয়া গিয়াছে? দাঁত মাজিবে, তার মধ্যে এত কাণ্ড কেন!

মাটিতে ওকে মুড়ি দিলে যে কুন্দ? বাটি নেই!

বাটতে দিলে এক খাবলায় সব খেয়ে ফেলবে যে! তখন ফের চেঁচাতে আরম্ভ করবে। ছড়িয়ে দিলাম, খুঁটে খুটে অনেকক্ষণ খাবে।

কুন্দ সগর্বে ছেলেকে নিরীক্ষণ করে। নধর শিশু শশীর চোখে লাগিয়াছে। একটু কোলে নিক না? শশী তাহাকে বোঝায়, বলে, মুড়ির সঙ্গে ছেলে তোর জার্ম খাচ্ছে জানিস? পেটে কৃমি হবে, আমাশা হবে, কলেরা হবে–

কী সব অমঙ্গুলে কথা! কুন্দ বলে, বালাই ষাট ভাবে, ওসব কিছু যদি হয় তো তোমার মুখের দোষে হয়েছে জানব। ডাক্তার হয়েছ বলেই তুমি যা-তা বলবে নাকি? বাছার তুমি গুরুজন, ওর কপালে কথা তোমার ফলেও যেতে পারে, এ খেয়াল তোমার নেই!

কুন্দর ছেলে হামা দিয়া মাটি হইতে খুঁটিয়া খুঁটিয়া মুড়ি খাইতে থাকে দুবেলা। শশীর কথা কুন্দ বিশ্বাস করে না। দু আঙুলে একটি একটি মুড়ি মুখে দিবার সময় ছেলেকে তাহার কী সুন্দর দেখায়।

শশী রাগ করিয়া ধমক দিলে কুন্দ বলে, চুপ করুন শশীদা। ছেলে আপনার নয়। মামা চোখ বুজলে আপনি বাড়ি থেকে খেদিয়ে দেবেন তা জানি।

বাড়ি হইতে তাড়াইয়া দিবার কথাটা কোথা হইতে আসে শশী বুঝিতে পারে না। তবে অবান্তর শোনায় না। কারণ, শশীর মতে বড়ি হইতে খেদাইয়া দেওয়ার উপযুক্ত কুন্দ ছাড়া আর কে আছে?

শশী বলে, পিসি কথা শোনো, ছেলেকে তোমার অত দুধ খাইও না। ওর সিকি দুধ হজম করবার ক্ষমতাও যে ওর নেই।

পিসি ভাবে, হায়রে কপাল! বাড়িতে এত দুধের ছড়াছড়ি, আমার ছেলে একটু দুধ খায়, এ কারো সয় না। কতটুকু দুধই বা ও খায়!

কী জানি কবে ছেলের দুধের বরাদ্দ কমিয়া যায় এই ভয়ে পিসি ছেলেকে আরও একটু বেশি দুধ খাওয়াইতে আরম্ভ করে। দুপুরবেলা শশী ঘরে ঘরে বলিয়া যায় ; ওঠো, উঠে পড়ো সবাই, ঘুমোতে হবে না। শীতকালের দুপুরে ঘুম কিসের?

সকলে একদিন দুইদিন সহ্য করে, হাসিমুখে উঠিয়া বসিয়া হাই তুলিয়া বলাবলি করে ; শশীর হয়েছে কী? এবার বাপু ওর বিয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই তাহারা বিদ্রোহ করে। যাদের বয়স কম ও স্বামী আছে তারা ভাবে ; আমাদের মতো রাত জাগতে হলে দুপুরে ঘুমোই কেন বুঝতে! যাদের স্বামী নাই, তারা ভাবে : দুপুরবেলা না ঘুমিয়ে করব কù