পরীর শাল রূপকথার গল্প
এক দ্বীপে ছিল অগণিত হ্রদ আর ঘন বন। সেই জায়গার জল ছিল একদম স্বচ্ছ আর পবিত্র। লোককথা অনুযায়ী, রাতের বেলা সেই জলে পরীরা এসে স্নান করত।
এই দ্বীপেই বাস করত এক যুবক—নাম ছিল আর্য। সে মাঝেমাঝেই রাতে হ্রদের পাশে ঘুরঘুর করত, আশা ছিল যদি কোনওদিন একটিবার পরীদের দেখা পাওয়া যায়।
একদিন পূর্ণিমার রাতে, আর্য একটি হ্রদের পাশ দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ তার কানে এলো হাসির শব্দ। কৌতূহল বশত সে গাছের আড়ালে লুকিয়ে হ্রদের দিকে তাকাল। সেখানে দেখতে পেল কয়েকটি অপরূপ সুন্দরী মেয়ে জলকেলিতে মগ্ন। হ্রদের কিনারায় রাখা ছিল রঙিন সব শাল।
হঠাৎ আর্যের মনে একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। সে চুপিচুপি এগিয়ে একট শাল চুরি করে নিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর সব পরী হ্রদ থেকে উঠে আসে এবং নিজেদের শাল খুঁজে নিতে থাকে। কিন্তু এক পরী খুঁজে পায় না তার শাল। সে দিশেহারা হয়ে যায়। ভাবে—”হে ঈশ্বর! যদি আমার শাল না পাই, তাহলে আমি আর আমার বাড়ি ফিরতে পারব না। আমার পরিবার থেকে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব না তো?”
ততক্ষণে রাত পেরিয়ে ভোর হয়। অন্য সব পরীরা একে একে আকাশে উড়ে যায়, কিন্তু সেই একমাত্র পরী—যার নাম উর্বশী, সে পড়ে থাকে মাটিতে, একা।
সে বসে পড়ে হ্রদের ধারে, চোখের জলে ভেসে যায়। তখন আর্য তার কাছে গিয়ে বলে,
“প্রিয় পরী, তুমি কাঁদছ কেন? আমি তোমার কোনও ক্ষতি করব না। বিশ্বাস করো, আমি খারাপ মানুষ নই।”
পরী কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“আমার শাল হারিয়ে গেছে। এখন আমি আর আমার জগতে ফিরতে পারব না। আমি কি করব বলো?”
আর্য বলে,
“তুমি চলো আমার সঙ্গে। তুমি এই পৃথিবীতে একা। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তোমাকে ভালোবাসা ও সম্মান ছাড়া কিছু দেব না।”
উর্বশী ভাবে, “এই ছেলে হয়তো সত্যিই ভালো। আমি তো এই জগতে কাউকে চিনি না। আপাতত এর সঙ্গেই যাই।”
আর্য জিজ্ঞেস করে,
“তোমার নাম কী?”
পরী উত্তর দেয়,
“উর্বশী।”
আর্যের ছিল অনেক ধানখেত, আর সেই খেত ছিল বেশ উর্বর। কিন্তু উর্বশীর আসার পর থেকেই খেত যেন যাদুর মতো ফলন দিতে শুরু করল। ঘরের ভাণ্ডার কখনোই ফাঁকা থাকত না। তাদের দিনগুলো কাটছিল হেসে-খেলে, ভালোবাসায় ভরা।
একদিন উর্বশী রান্নাঘরে ভাত তুলছিল, হঠাৎ চোখে পড়ে চালের ভেতর থেকে কিছু কাপড়ের টুকরো উঁকি দিচ্ছে। সে কাপড়টা টেনে বের করে দেখে—এ যে তার শাল!
সে হতবাক! এতদিন ধরে যার খোঁজে চোখের জল ফেলেছে, সেটা তো এই ঘরের মধ্যেই ছিল! তবে কি আর্য-ই চুরি করেছিল?
তার চোখ ভিজে যায় পরিবারের কথা মনে করে। শালটা গায়ে দিয়েই হঠাৎ তার পা মাটি ছেড়ে উড়ে যায় আকাশের দিকে।
ঠিক তখনই আর্য বাড়িতে ঢোকে। পরীর হাতে শাল দেখে সে কেঁদে ওঠে—
“উর্বশী! আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি। কিন্তু আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি। দয়া করে চলে যেও না।”
কিন্তু উর্বশী একটাও কথা না বলে ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উড়ে যায়। আর্য পড়ে থাকে মাটিতে, মাথা নিচু করে। তার চোখে শুধু অনুতাপ, আর হৃদয়ে শূন্যতা।
শিক্ষা: অন্যায় করে ভালোবাসা পাওয়া যায় না। প্রতারণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। সত্য ও বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি।
