Friday, April 12, 2024
Homeউপন্যাসমাতাল হাওয়া - হুমায়ূন আহমেদ

মাতাল হাওয়া – হুমায়ূন আহমেদ

Table of contents

উৎসর্গ

কোনো মৃত মানুষ মহান আন্দোলন চালিয়ে নিতে পারেন না। একজন পেরেছিলেন। আমানুল্লাহ মোহম্মদ আসাদুজ্জামান। তাঁর রক্তমাখা শার্ট ছিল ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের চালিকাশক্তি।

প্রাককথন

আমি মূলত একজন গল্পকার। গল্প বানাতে ভালোবাসি, গল্প করতে ভালোবাসি। দুর্বোধ্য কারণে ইতিহাস আমার পছন্দের বিষয় না। আমি বর্তমানের মানুষ। আমার কাছে অতীত হচ্ছে অতীত। লেখকদের সমস্যা হলো, তারা কাল উপেক্ষা করে লিখতে পারেন না। তারা যদি বিশেষ কোনো সময় ধরতে চান, তখন ইতিহাসের কাছে হাত পাততে হয়।

ঊনসত্তর আমার অতি পছন্দের একটি বছর। আমার লেখালেখি জীবনের শুরু ঊনসত্তরে। একটি মহান গণআন্দোলনকে কাছ থেকে দেখা হয় এই ঊনসত্তরেই। মানুষ চন্দ্র জয় করে ঊনসত্তরে। মাতাল সেই সময়কে ধরতে চেষ্টা করেছি মাতাল হাওয়ায়। তথ্যের ভুলভ্রান্তি থাকার কথা না, তারপরেও যদি কিছু থাকে জানালে পরের সংস্করণে ঠিক করে দেব।

উপন্যাসটি লেখার সময় অনেকেই বইপত্র দিয়ে, ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে সাহায্য করেছেন। দু’একজনের নাম বলতেই হয়। বন্ধু মনিরুজ্জামান, শহীদ আসাদের ছোটভাই। সাংবাদিক এবং কবি সালেহ চৌধুরী।

প্রুফ দেখা, গল্পের অসঙ্গতি বের করার ক্লান্তিকর কাজ করেছে শাওন। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। পুত্র নিষাদ আমার আট পৃষ্ঠা লেখা এমনভাবে নষ্ট করেছে যে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তাকে তিরস্কার।

হুমায়ূন আহমেদ
১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০
নুহাশ পল্লী, গাজীপুর

০১. হাজেরা বিবি

হাজেরা বিবি সকাল থেকেই থেমে থেমে ডাকছেন, হাবু কইরে! ও বু! হাবু!

হাবু তাঁর বড় ছেলে। বয়স ৫৭। ময়মনসিংহ জজ কোর্টের কঠিন ক্রিমিনাল লইয়ার। জনশ্রুতি আছে তিনি একবার এক গ্লাস খাঁটি গরুর দুধকে সেভেন আপ প্রমাণ করে আসামি খালাস করে নিয়ে এসেছিলেন। দুধের সঙ্গে আসামির কী সম্পর্ক- সেই বিষয়টা অস্পষ্ট।

হাজেরা বিবি যে ডাকসাইটে অ্যাডভোকেটকে হাবু ডাকছেন তাঁর ভালো নাম হাবীব। হাবীব থেকে আদরের হাবু। এই আদরটা সঙ্গত কারণেই হাবীবের পছন্দ না। তিনি শান্ত গলায় অনেকবার মাকে বলেছেন, মা, আমার বয়সের একজনকে হাবু হাবু বলে ডাকা ঠিক না। একতলায় আমার চেম্বার। মক্কেলরা বসে থাকে। তারা শুনলে কী ভাববে?

হাজেরা বিবি বললেন, মা ছেলেকে ডাকে। এর মধ্যে ভাবাভাবির কী আছে? তোর মক্কেলদের মা তাদের ডাকে না? না-কি তাদের কারোর মা নাই?

মা, আমার নাম হাবীব। তুমি আমাকে হাবীব ডাকো। হাবু ডাকো কেন? হাবু শুনলেই মনে হয় হাবা।

হাজেরা বিবি বললেন, তুই তো হাবাই। লতিফার বিয়ের দিন কী করেছিলি মনে আছে? হি হি হি। এই তো মনে হয় সেইদিনের ঘটনা। তুই নেংটা হয়ে দৌড়াচ্ছিস, তোর পিছনে একটা লাল রঙের রামছাগল। রামছাগলের মতলবটা ছিল খারাপ। হি হি হি।

হাজেরা বিবির বয়স একাশি। দিনের পুরো সময়টা তিনি কুঁজো হয়ে পালঙ্কে ঠেস দিয়ে বসে থাকেন। রাতে তার একেবারেই ঘুম হয় না। সারা রাত জেগে থাকেন। ক্রমাগত কথা বলেন। বেশির ভাগ কথাই আজরাইলের সঙ্গে। তিনি আজরাইলের শরীরের খোঁজখবর নেন। আদবের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন, আপনার শরীর ভালো? খুব পরিশ্রম যাইতাছে? আইজ কয়জনের জান কবজ করছেন? তার মাথা খানিকটা এলোমেলো অবস্থায় আছে। তিনি অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প প্রায়ই বলেন, যেসব গল্পের বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। তার বেশির ভাগ গল্পেই লতিফ নামের একটা মেয়ের উল্লেখ থাকে। বাস্তবে লতিফা নামের কারোর সঙ্গে তার পরিচয় নেই। আদর করে মাঝে মাঝে লতিফাকে তিনি লতু বলেও ডাকেন।

হাবীবের চেম্বার মফস্বল শহরের তুলনায় যথেষ্ট বড়। সেগুন কাঠের মস্ত টেবিলের তিনদিকে মক্কেলদের বসার ব্যবস্থা। মেঝের একপাশে ফরাস পাতা। মাঝে মাঝে রাত বেশি হলে মক্কেলরা থেকে যান। তখন বালিশের ব্যবস্থা হয়। মক্কেলরা ফরাসে ঘুমান। চেম্বারে দুটা সিলিং ফ্যান আছে। কারেন্টের খুব সমস্যা হয় বলে টানা পাখার ব্যবস্থা আছে। রশীদ নামের একজন পাংখাপুলার পাংখার দড়ি ধরে বসে থাকে। ফ্যান বন্ধ হওয়া মাত্র সে দড়ি টানা শুরু করে।

চেম্বারে তার দূরসম্পর্কের ভাই মোনায়েম খান সাহেবের বড় একটা ছবি আছে। ছবিতে তিনি এবং মোনায়েম খান পাশাপাশি দাঁড়ানো। দু’জনার গলাতেই ফুলের মালা। মোনায়েম খান তখন পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর। হাবীবের আরেকটা বড় ছবি আছে আয়ুব খানের সঙ্গে। ইউনিফর্ম পরা জেনারেল আয়ুব তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন। আয়ুব খান চশমা পরা, তার মুখ হাসি হাসি। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা ছবি কিন্তু মোটামুটি অর্থহীন, কারণ হাবীবের মুখ দেখা যাচ্ছে না। তার মুখের খানিকটা অংশ দেখা গেলেও হতো, লোকে বুঝত যার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করা হচ্ছে তিনি দুদে অ্যাডভোকেট হাবীব খান। এই ছবির দিকে যারই চোখ যায় তিনি মনে মনে বলেন, শুয়োরের বাচ্চা ফটোগ্রাফার! নেংটা করে পাছায় বেত মারা উচিত।

আজ শুক্রবার হাবীব চেম্বারে মকেল নিয়ে বসেছেন। শুক্রবার তিনি চেম্বারে বসেন না। আজ বসতে হয়েছে কারণ মক্কেল শাসালো। খুনের মামলায় ফেঁসেছে। ৩০৫ ধারা। মকেল ভাটি অঞ্চলের বেকুব সিন্ধি গাইয়ের মতো দিনে তিনবার দুয়ানো যাবে। হাবীব মক্কেলের সঙ্গে কথা বলে আরাম পাচ্ছেন না। কারণ কিছুক্ষণ পরপর তার মা’র তীক্ষ্ণ গলায় ডাক শোনা যাচ্ছে হবু হবুরে! ও হাবু! হাবীব খানের মুহুরি প্রণব বাবু বললেন, স্যার, আপনারে আম্মা ডাকেন। আগে শুনে আসেন। আম্মাকে ঠান্ডা করে আসেন। হাবীব বিরক্ত মুখে উঠে গেলেন। মনে মনে ঠিক করলেন চেম্বারটা এখান থেকে সরিয়ে এমন কোনো ঘরে নিতে হবে যেখান থেকে মা’র গলা শোনা যাবে না। এত বইপত্র নিয়ে চেম্বার সরানো এক দিগদারি। সহজ হতো মা’র ঘর সরিয়ে দেওয়া। সেটা সম্ভব না। হাজেরা বিবি ঘর ছাড়বেন না। কারণ দক্ষিণমুখী ঘর। সামনেই নিমগাছ। সারাক্ষণ নিমগাছের হাওয়া গায়ে লাগে। বৃদ্ধ বয়সে নিমের হাওয়ার মতো ওষুধ আর নাই।

হাবীব মার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ হাসি হাসি করে বললেন, ডাকেন কেন?

হাজেরা বিবি বললেন, তুই আছিস কেমন?

ভালো আছি। আর কিছু বলবেন? মক্কেল বসে আছে।

হাজেরা বিবি বললেন, আঁটা মেরে মক্কেল বিদায় কর। তোর সাথে আমার জরুরি কথা।

বলেন, শুনি আপনার জরুরি কথা।

বাড়িতে কী ঘটেছে?

হাবীব বললেন, কিছুই ঘটে নাই।

হাজেরা বললেন, শুনলাম সন্ধ্যাকালে বাড়িতে এক ঘটনা ঘটবে।

কী ঘটনা ঘটবে?

বাড়িতে কাজী সাহেব আসতেছে। বিবাহ পড়াবে?

হাবীব মার খাটের পাশে বসতে বসতে বললেন, সবই তো জানেন। আপনাকে বলেছে কে? যে আপনের কানে কথাটা তুলেছে তার নামটা বলবেন? কে বলেছে?

নাম বললে তুই কী করবি? ফৌজদারি মামলা করবি? তোর বউ লাইলী বলেছে। এখন যা মামলা কর। বৌরে জেলে ঢুকা। এই বাড়ির ভাত তার রুচে না। জেলের ভাত খাইয়া মোটাতাজা হইয়া ফিরুক।

হাবীব বললেন, লাইলী আপনাকে কতটুকু বলেছে সেটা শুনি।

হাজেরা বিবি বললেন, কী বলেছে মনে নাই। সন্ধ্যাকালে কাজী আসবে, বিবাহ পড়াবে—এইটা মনে আছে। ঘটনা কি সত্য?

হ্যাঁ সত্য। আর কিছু জানতে চান?

জানতে চাই। ইয়াদ আসতেছে না। আচ্ছা তুই যা। মক্কেলের সাথে দরবার কর।

হাবীব সরাসরি তার চেম্বারে গেলেন না। তিনি গেলেন রান্নাঘরে। লাইলীকে কঠিন কিছু কথা বলা দরকার। বারবার বলে দিয়েছিলেন, বিয়ের এই ঘটনা কেউ যেন না জানে।

রান্নাঘরে লাইলী মাছ কাটা তদারক করছেন। প্রকাণ্ড এক কাতল মাছ তিনজনে ধরেও সুবিধা করা যাচ্ছে না। হাবীব খানের মক্কেলের ভাটি অঞ্চলে জলমহাল আছে। সেখানকার মাছ। বিশাল টাটকা মাছ দেখাতেও আনন্দ। লাইলী মাথায় শাড়ির আঁচল তুলতে তুলতে বললেন, এক টুকরা মাছ কি ভেজে দিব? খাবেন?

দাও। আরেকটা কথা, ফরিদের বিবাহ বিষয়ে মা’কে তুমি কিছু বলেছ?

বলেছি।

উনাকে বলতে নিষেধ করেছিলাম না? কেন বললা?

আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন বলেই বলেছি। শাশুড়ি জিজ্ঞাসা করবেন, আর আমি মিথ্যা বলব?

হাবীব বললেন, উনার কাছে এখন সত্য-মিথ্যা সবই সমান।

লাইলী বললেন, উনার কাছে সমান কিন্তু আমার কাছে সমান না। আমার কাছে মিথ্যা, মিথ্যাই।

হাবীব রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলেন। স্ত্রীর সঙ্গে বাহাসে যাবার এটা উপযুক্ত সময় না। রান্নাঘরে মাছ কাটাকাটি হচ্ছে। সবাই কান পেতে আছে। কামলাশ্রেণীর মানুষের প্রধান কাজই হলো, ঝাকি জালের মতো কান ফেলা। হাবীব চেম্বারের দিকে রওনা হলেন।

চেম্বারে মুহুরি প্রণব বাবু ছাড়া মক্কেলরা কেউ নাই। তারা জুম্মার নামাজ পড়তে গিয়েছে। খুনের মামলায় যে পড়ে সে এবং তার আত্মীয়স্বজনরা কখনো জুম্মার নামাজ মিস দেয় না।

প্রণব মুখে পান দিতে দিতে বললেন, ভালো পার্টি। এরকম পার্টি বৎসরে একটা পেলেও চলে। জলমহাল আছে তিনটা। বিলাত থেকে ব্যারিস্টার আনতে কত খরচ লাগবে জানতে চাইল।

তুমি কী বললা?

আমি বললাম, বিলাতের খবর রাখি না। দেশের খবর রাখি। তখন সে বলল, পূর্বপাকিস্তানের সবচেয়ে বড় উকিল কে?

আমি বললাম, আপনি তো খোঁজখবর নিয়া তার কাছেই আসছেন। আবার ‘জিগান’ কোন কারণে? মনে সন্দেহ থাকলে কোর্ট কাচারিতে ঘুরেন। ঘুরে খবর নেন। তারপরে আসেন। আমরা তো আপনারে দাওয়াতের কার্ড ছাপায়া আনি নাই। তখন চুপ করে গেল।

হাবীব বললেন, প্রণব, তোমার একটাই দোষ। কথা বেশি বলে। যে কথা বেশি বলে তার গুরুত্ব থাকে না। কথা হলো দুধের মতো। অধিক কথায় দুধ পাতলা হয়ে যায়।

প্রণব বললেন, কথা কম বলার চেষ্টা নিতেছি। পারতেছি না। শুনেছি তালের রস খেলে কথা বলা কমে। এই ভাদ্র মাসে তাল পাকলে একটা চেষ্টা নিব।

হাবীব বললেন, কাজী আসবে কখন?

প্রণব বললেন, রাত দশটার পর আসতে বলেছি। চুপিচুপি কর্ম সমাধা হবে। বিয়ে অধিক রাতে হওয়াই ভালো। আপনাদের তো সুবিধা আছে, লগ্নের কারবার নাই! যখন ইচ্ছা তখন কবুল কবুল কবুল।

হাবীব বললেন, ফরিদকে চোখে চোখে রাখতে বলেছিলাম, রেখেছ? পালিয়ে যায়।

তার ঘরের দরজার সামনে সামছুকে বসায়ে রেখেছি। পালায় যাবার পথ নাই! আর পালাবে বলে মনে হয় না। ঝিম ধরে বসে আছে। হারামজাদা।

গালাগালি করবে না।

প্রণব বললেন, কেন করব না স্যার? সে হারামজাদা না তো কে হারামজাদা। আরে তুই একটা মেয়ের পেট বাধায়েছিস, এখন তুই বিয়ে করবি না? তুই বিয়ে না করলে তার বাপরে দিয়ে বিয়ে করাব।

কথা কম বলো প্রণব।

চেষ্টা করতেছি স্যার। রোজ ভোরে সূর্যপ্রণাম করে ভগবানকে বলি, ভগবান! দয়া করো। জবান কমাও।

হাবীব বললেন, আমাকে এক পিস ভাজা মাছ দিতে বলেছিলাম। কোনো খোঁজ নাই। তোমার বৌদিকে বললা মাছ লাগবে না।

হাবীবের কথা শেষ হবার আগেই বড় কাসার প্লেটে এক টুকরা মাছ চলে এল। বিশাল টুকরা। তাকিয়ে দেখতেও আনন্দ। মাছের সঙ্গে চামচ আছে। হাবীব হাত দিয়ে মাছ ভেঙে মুখে দিলেন। খাদ্যদ্রব্য হাত দিয়ে স্পর্শ করাতেও আনন্দ আছে। সাহেবরা কাটাচামচ দিয়ে খায়। খাদ্য হাত দিয়ে ছোয়ার আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত।

মাছে লবণের পরিমাণ ঠিক আছে। এটা আনন্দের ব্যাপার। চায়ে চিনি এবং মাছে লবণ একই। সামান্য বেশকম হলে মুখে দেওয়া যায় না।

হাবীব বললেন, খুনটা করেছে কে?

নাম জহির। একুশ-বাইশ বছর বয়স। ঘরে লাইসেন্স করা বন্দুক ছিল। সেটা দিয়ে নিজের আপন মামাকে গুলি করেছে। পুলিশ এখনো চার্জশিট দেয় নাই। অনেক টাকা খাওয়ানো হয়েছে। তবে চার্জশিট দু’এক দিনের মধ্যে দিবে।

খুনের কারণ কি মেয়েমানুষ?

সব শুনি নাই।

হাবীব বললেন, জগতের বড় যত crime তার সবের পেছনে একটা মেয়েমানুষ থাকবে। শুরুতে সেটা মাথায় রাখলে সুবিধা হয়। ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়ে গেল হেলেন নামের নাকর্বোচা এক মেয়ের জন্যে।

প্রণব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আফসোস!

হাবীব বললেন, তিন ধরনের নারীর বিষয়ে সাবধান থাকতে শাস্ত্রে বলে। সবু নিতম্বের নারী, বোচানাকের নারী আর পিঙ্গলকেশী নারী। এই তিনের মধ্যে

ভয়ঙ্কর হলো পিঙ্গলকেশী।

প্রণব বললেন, আপনার সঙ্গে থাকা শিক্ষাসফরের মতো। এক জীবনে কত কিছু যে শিখলাম।

হাবীব বললেন, আজ জুম্মা পড়তে যাব না। জোহরের নামাজ ঘরে পড়ে নিব। শরীর ভালো ঠেকতেছে না। ঘরে বিশ্রাম নিব।

মক্কেলদের সঙ্গে বসবেন না।

সন্ধ্যার পর বসব। মাগরেবের ওয়াক্তের পরে। তোমার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেছ? পাক বসাবে না?

প্রণব নিরামিশাষী। স্বপাকে আহার করেন। আজ নানান ঝামেলায় রান্না হয় নাই। প্রণব বললেন, আজ ঠিক করেছি উপাস দিব। মাসে দুই দিন উপাস দিলে শরীরের কলকব্জা ঠিক থাকে। ফকির মিসকিনদের যে রোগবালাই কম হয়, তার কারণ একটাই—তারা প্রায়ই উপাস দেয়।

হাবীব উঠে পড়লেন। প্রণবের সামনে বসে থাকলে সে বকবক করতেই থাকবে। হাবীবের সঙ্গে পাংখাপুলার রশিদও উঠে পড়ল। স্যারের গায়ে সাবান ডলে গোসল দেওয়ার দায়িত্ব তার। রশিদের স্বভাব প্রণবের উল্টা। সে নিজ থেকে কখনো কথা বলে না। সে সবার সব কথা শোনে। আট বছর আগে সে খুনের এক মামলায় ফেঁসেছিল। তার সঙ্গী দু’জনের ফাঁসি হয়েছে, সে বেকসুর খালাস পেয়েছে। হাবীব তাকে পাংখপুলারের কাজ দিয়েছেন।

চেম্বার থেকে বের হয়ে হাবীব ডানদিকে তাকালেন। তার ডানদিকে শেষ প্রান্তে ফরিদের ঘর। টিনের চালের হাফবিল্ডিং। সামনে প্রকাণ্ড অশোকগাছ। লাল ফুলে গাছ ভর্তি। ফরিদ মাথা উঁচু করে ফুলের দিকে তাকিয়ে কাঠের চেয়ারে বসে আছে। হাবীবকে সে দেখেনি। দেখলে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াত। তিনি ডাকলেন, ফরিদ।

ফরিদ থতমত খেয়ে গেল। উঠে দাঁড়াতেও ভুলে গেল। হাবীব এগিয়ে গেলেন তার দিকে।

ফরিদ, আছ কেমন?

জি। ভালো।

আজ তোমার বিবাহ। বিবাহের দিন লুঙ্গি পরে খালিগায়ে বসে আছ, এটা কেমন কথা?

ফরিদ কিছু বলল না। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাবীব বললেন, তোমাকে যে আমি বিশেষ স্নেহ করি এটা জানো?

ফরিদ বিড়বিড় করে বলল, জানি।

হাবীব বলল, বিশেষ স্নেহ করি বলেই এত বড় অন্যায়ের পরেও তোমাকে কোনো শাস্তি দেই নাই। অন্যায়টা যার সঙ্গে করেছ, তার সঙ্গে বিবাহ দিয়ে দিচ্ছি। এখনো বলো তোমার কোনো আপত্তি কি আছে?

না।

এই মেয়েকে তুমি আগে ব্যবহার করেছ বেশ্যার মতো, এখন সে তোমার স্ত্রী হবে। সেটা খেয়াল রাখবে।

জি, রাখব।

প্রণবকে বলে দিব যেন নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি কিনে দেয়। মাথার চুল কাট। বিবাহের দিন চুল কাটা উত্তম সুন্নত।

হাবীব দোতলায় উঠে গেলেন। সিড়ির শেষ মাথায় হঠাৎ তার পা পিছলাল। রশিদ পেছন থেকে দ্রুত ধরে ফেলায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটল না। হাবীব সিঁড়ির শেষ ধাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই দুর্ঘটনা আজ প্রথম ঘটেনি। আগেও দু’বার ঘটেছে এবং একই জায়গায় ঘটেছে। এর মধ্যে কি কোনো ইশারা আছে?

রশিদ বলল, স্যার দুঃখু পাইছেন?

না। আজ তোমার পাংখা টানাটানি করতে হবে না। ফরিদের বিবাহের ব্যাপারটা দেখো।

জে আচ্ছা।

আরেকটা কাজ করো। মাওলানা সাহেবরে খবর দাও। তিনি যেন দেয়া পড়ে সিঁড়িটাতে ফুঁ দেন। এই সিঁড়িতে দোষ আছে।

জে আচ্ছা।

ফরিদের সঙ্গে যার বিবাহ হবে তার নামটা যেন কী? হঠাৎ করে নাম বিস্মরণ হয়েছি।

তার নাম সফুরা।

আচ্ছা ঠিক আছে, এখন তুমি যাও।

রশিদ সঙ্গে সঙ্গে গেল না। হাবীবকে শোবার ঘরে ঢুকিয়ে ফ্যান ছাড়ল। ইলেকট্রিসিটি আছে। সিলিং ফ্যান বিকট শব্দ করে ঘুরছে।

রশিদ বলল, পানি খাবেন স্যার। এক গ্লাস পানি দিব?

না।

সিনান কখন করবেন?

পানি গরম দাও, খবর দিব। ভালো কথা, চুল কাটার পর ফরিদকে ভালোমত সাবান ডলে গাল দিবা।

জি আচ্ছা।

জীবনে তিনবারের গমন অতি গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পর, বিবাহের দিল এবং মৃত্যুর পর। এই তিন গোসলেই বড়ইপাতা লাগে, এইটা জানো?

জে না।

তবে আজকাল জনের পরের গোসল আর বিবাহের গোসল—এই দুই শামলে বইপাতা ব্যবহার হয়না। কেন হয়না কে জানে!

ফরিদ ভাইরে কি বইয়ের পাতা দিয়া গোসল দিব?

দাও।

হাবীব বিছানায় শুয়ে পড়লেন। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। জ্বর আসার আগে আগে শরীর ছেড়ে দেয়। মক্কেলদের সঙ্গে আজ সন্ধ্যায় বসতে পারবেন–এইরকম মনে হচ্ছে না। বমি বমি ভাবও হচ্ছে। এত বড় মাছের টুকরাটা খাওয়া ঠিক হয় নাই।

উপন্যামের এই পর্যায়ে ফরিদের এ বাড়িতে আগমন এবং স্থায়ী হওয়ার ঘটনা বলা যেতে পারে। মাতাল হাওয়ায় ফরিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপুরু। মাঝে। মাঝে গুরুত্বহীন মানুষকে অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। অভাজন হয় যান বিশেষ জন।

শ্রাবণ মাসের সন্ধ্যাবেলা। হাবীব মসজিদে মাগরীবের নামাজ শেষ করে। ফিরছেন। রশিদ ছাতা হাতে তাঁর পেছনে পেছনে আসছে। ছাতার প্রয়োজন ছিল না। বৃষ্টি পড়ছে না। তবে আকাশের অবস্থা ভালো না। মেঘ ডাকাডাকি করছে। যে-কোনো সময় বৃষ্টি নামবে। ছাতা মেলে প্রস্তুত থাকা ভালো।

হাবীব বাড়ির গেটের সামনে থমকে দাঁড়ালেন।গেটে হাত রেখে এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। যুবক তাকে দেখে ভয় পেয়ে গেট ছেড়ে সরে দাঁড়ান। অস্পষ্ট শব্দে বিড়বিড় করল। মনে হয় সালাম দিল। হাবীব বললেন, কে? নাম কী?

ফরিদ।

কিছু চাও?

জে না।

কিছু চাও না, তাহলে আমার বাড়ির গেট ধরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? এই বাড়ির কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছ?

জে না।

এই বাড়ির কাউকে চেনো?

না।

ঠিকমতো বলো, চুরি-ডাকাতির ধান্দা আছে?

ফরিদ বলল, স্যার, আমি আরাম করে একবেলা ভাত খেতে চাই।

দুপুরের খাওয়া হয় নাই?

না।

সকালে কী খেয়েছ?

মুড়ি।

ভাত খাও না কত দিন?

তিন দিন।

করো কী?

ফার্মেসিতে চাকরি করতাম। চাকরি চলে গেছে।

চাকরি কী জন্যে গেছে? চুরি করেছিলা?

জি।

কত টাকা চুরি করেছিলা?

দুইশ টাকা আর কিছু ওষুধ।

টাকা এবং ওষুধ কাকে পাঠায়েছিলা?

স্যার, আমার মাকে। উনার টিবি হয়েছিল।

উনি কি বেঁচে আছেন?

জি-না। উনার ইন্তেকাল হয়েছে।

বাবা কি জীবিত?

জি-না।

আসো আমার সঙ্গে। চেম্বারে গিয়ে বসো। খানা হতে দেরি হবে। অপেক্ষা করে। কী খেতে চাও?

কষানো মুরগির সালুন আর চিকন চালের ভাত।

আর কিছু না?

জি-না।

চেম্বারের সামনের বেঞ্চিতে ফরিদ জবুথবু হয়ে বসে রইল। বৃষ্টি নেমে গেছে। সে বৃষ্টি দেখছে। রাতে সে আরাম করে খেতে পারবে—এই আনন্দেই তার চোখে পানি এসে গেছে। চোখের পানি আটকানোর কোনো চেষ্টা সে করছে মা। আশেপাশে কেউ নেই যে তাকে দেখবে।

ফরিদের বয়স পঁচিশ। অসম্ভব রোগা একজন মানুষ। মাথার চুল কোঁকড়ানো। চোখ বড় বড়। সে মেট্রিকে তিনটা লেটার নিয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছিল। কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। সংসার চালানোর জন্যে ফার্মেসিতে চাকরি নিতে হয়েছিল।

হাবীব ফরিদের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। ঘরে মুরগি ছিল না। তিনি কষানো মুরগি রাধতে বললেন। কালিজিরা চালের ভাত করতে বললেন। রশিদকে বলে দিলেন, ফরিদকে থাকার জন্যে যেন একটা ঘর দেওয়া হয়। যতদিন ইচ্ছা সে থাকবে। খাওয়াদাওয়া করবে।

রশিদ বিস্মিত হয়ে তাকাল। হাবীব বললেন, বড় বড় বাড়ির শোভা হচ্ছে কিছু উটকা মানুষ। আশ্রিত মানুষ। এরা বাড়ির সঙ্গে যুক্ত না। কোনো কাজেকর্মে না। থাকবে, খাবে এবং লজ্জিত হয়ে জীবনযাপন করবে। এদের লজ্জাটাই বাড়ির শোভা। বুঝেছি?

জি।

তুমি বোঝে নাই। বোঝার প্রয়োজনও নাই! যা করতে বলেছি করো। এই ধরনের মানুষ কিছুদিন থাকে, তারপর একদিন কাউকে কিছু না বলে চলে যায়। ত্রিশ দিনের মাথায় চলে যায়। এই ছেলেও তাই করবে।

ফরিদ তা করেনি। সে তিন বছর ধরে আছে। সে নিজ থেকেই বাগানের গাছপালা দেখে। নানান জায়গা থেকে গাছ এনে লাগায়। আশেপাশে যখন কেউ থাকে না, তখন নিচুগলায় গাছের সঙ্গে কথা বলে। তেঁতুলগাছের সঙ্গে তার এক দিনের কথাবার্তার নমুনা

আছ কেমন? ছোট হয়া আছ, বিষয় কী? আদরযত্নের কি কমতি হইতেছে? গোবর সার, পচা খইল সবই তো পাইছরে বাপধন। আরও কিছু লাগবে? লাগলে বলে। সর্বনাশ, পাতায় পোকা ধরছে! দাঁড়াও নিমের ডাল দিয়া ঝাড়া দিব। নিমের ডালের ঝাড় হইল কোরামিন ইনজেকশন। তবে তোমার পোকায় ধরা ডাল ফেলে দিব। একটু কষ্ট হবে। উপায় কী?

বিশাল কাতল মাছ রান্না হয়েছে, হাবীব খেলেন না। তার জ্বর এসেছে। জ্বর গায়ে নিয়েই গোসল করেছেন। এতে সামান্য আরাম পাচ্ছেন। ঘুম এসেছে। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছেন। অসুস্থ অবস্থায় স্বপ্নগুলিও অসুস্থ হয়। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, হাতির পিঠে করে নদী পার হচ্ছেন। নদীতে প্রবল স্রোত। হাতি ঠিকমতো সাঁতরাতে পারছে না। মাহুত মুখে হট হট করছে। হাতি সামলানোর চেষ্টা করছে। পারছে না।

রাত দশটায় তার ঘুম ভাঙানো হলো। ছোট্ট সমস্যা না-কি হয়েছে। কাজী সাহেব এসেছেন। সব প্রস্তুত। শুধু সফুরা এখন বলছে সে কবুল বলবে না। বিবাহ করবে না। খবর নিয়ে এসেছেন প্রণব বাবু। তাকে চিন্তিত এবং ভীত মনে হচ্ছে।

হাবীব বললেন, বিবাহ করবে না। পেটে বাচ্চা নিয়ে ঘুরবে। বড় বাড়ির ইজ্জত নষ্ট করবে।

প্রণব চুপ করে রইলেন।

হাবীব বললেন, নৌকা ঠিক করো। মেয়েটাকে নৌকায় তুলে দাও। নৌকা তাকে ভাটি অঞ্চলে ছেড়ে দিয়ে আসবে। সেখানে সে যা ইচ্ছা করুক। এই জাতীয় মেয়ের স্থান হয় বেশ্যাপল্লীতে। শেষ পর্যন্ত সে সেইখানেই যাবে।

প্রণব বললেন, ফরিদকেও নাওয়ে তুলে দেই, মেয়ের সাথে বিদায় হয়ে যাক।

হাবীব বললেন, না। সে তো বিবাহ করতে রাজি হয়েছে। যে মেয়ে তার সঙ্গে রাত কাটিয়েছে, সে ভালো মেয়ে না। অন্যের সঙ্গেও সে এই কাজ করতে পারে। তারপরেও ফরিদ বিবাহে মত দিয়েছে, এরে ছোট করে দেখা ঠিক না। তার দোষ এতে কিছু কাটা গেছে। মেয়েটাকে বিদায় করে আমাকে খবর দাও যেন শান্তিমতো ঘুমাতে পারি।

প্রণব চলে গেলেন এবং আধঘণ্টার মধ্যে জানালেন, সমস্যার সমাধান হয়েছে। সফুরার সঙ্গে এক শ’ এক টাকা কাবিনে ফরিদের বিবাহ হয়েছে।

হাবীব বললেন, ভালো।

প্রণব বললেন, আপনার জ্বর কি বেশি? একজন ডাক্তার ডেকে আনি?

হাবীব বললেন, না। মাথায় পানি ঢালার ব্যবস্থা করতে বলো। আর জামে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে স্বপ্নের তফসির নিয়ে আসে। স্বপ্নে আমি হাতির উপর উঠেছি। হাতি নদী পার হচ্ছে। নদীতে প্রবল স্রোত।

রাত প্রায় বারোটা। ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে। শহর অন্ধকার। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাতাস দিচ্ছে। এখনো বর্ষণ শুরু হয়নি। ফরিদের নবপরিণীতা স্ত্রী চৌকিতে বসে কাঁদছে। তার মুখ জানালার দিকে ফেরানো বলে ফরিদ মুখ দেখতে পাচ্ছে না। চৌকির ওপর মশারি খাটানো। বাতাসে নৌকার পালের মতো মশারি উড়ছে। ফরিদ মশারি ঠিক করতে ব্যস্ত। ঘরে হারিকেন জ্বলছে। তবে হারিকেন দপদপ করছে। যে-কোনো সময় হারিকেন নিভবে। ফরিদ কলল, রাত অনেক হয়েছে। শুয়ে পড়ো।

সফুরা বলল, আপনে আমার সাথে কথা কবেন না। আমার গায়ে হাত দিবেন না। শইলে যদি হাত দেন দাও দিয়া কোপ দিব। হাত ফালায়া দিব।

ফরিদ বলল, আমি কী দোষ করলাম।

দোষ করেন নাই?

ফরিদ বলল, না। তুমি জানো, আল্লাহপাক জানেন, তোমার সঙ্গে আমার কিছু হয় নাই। কারোর সঙ্গেই কিছু হয় নাই। আমি সেরকম মানুষ না। তুমি মহাবিপদে পড়েছিলা বলে সাহায্য করেছি। একবার আমিও মহাবিপদে পড়েছিলাম। স্যার সাহায্য করেছেন। একজনের বিপদে অন্যজন সাহায্য করবে এইটাই নিয়ম।

সফুরা বলল, যে দোষ করেন নাই সেই দোষ নিজের ঘাড়ে কী জন্যে নিয়েছেন?

একটা কারণ আছে। কোনো একদিন তোমারে বলব। কান্দন বন্ধ করো।

সফুরা বলল, আমি সারা রাত কানব। অপনের অসুবিধা আছে।

আমি ঘুমাইতে পারব না। এইটাই অসুবিধা।

আইজ রাইতে আপনি ঘুমাইতে পারবেন?

কেন পারব না।

আপনে মানুষ না। আপনে গাছ। গাছের সাথে যে কথা বলে, সে গাছই হয়।

আমি গাছের সাথে কথা বলি তুমি জানো?

সবেই জানে।

ফরিদ বলল, এই তো তোমার কান্দা বন্ধ হইছে। তুমি অত্যধিক সুন্দর মেয়ে, এইটা আগে নজর করি নাই।

সফুরা বলল, আগে নজর করলে কী করতেন? ইশারা দিতেন? বিছানার ইশারা?

ছিঃ, এমন চিন্তা করবা না। সব মানুষ একরকম না। কিছু মানুষ আছে। ফেরেশতারও উপরে।

সফুরা বলল, মানুষ তে ফেরেশতার উপরেই। ফেরেশতার যে সর্দার সে মানুষরে সালাম করছিল।

বাহ্, সুন্দর বলেছ। সব মানুষই ফেরেশতার উপরে। তোমার কথা শুনে মনে বল পেয়েছি।

সফুরা বলল, আমি একটা নটি মাগি। আমার কথা শুনে মনে বল পেয়েছেন?

নিজের বিষয়ে এইভাবে বলবা না।

দমকা বাতাসে হারিকেন নিভে গেল। তুমুল বর্ষণ শুরু হলো। স্বামী-স্ত্রী অন্ধকারে পাশাপাশি বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। এক পর্যায়ে সফুরা বলল, আপনে শুইয়া পড়েন। আপনে বইসা আছেন কোন দুঃখে? ঠান্ডা বাতাস ছাড়ছে, আরামে ঘুম দেন! মাথা টিপ্যা দিতে বললে মাথা টিপা দিব।

ফরিদ বলল, গল্প শুনব। একটা গল্প বলব?

বলতে চাইলে বলেন। আমারে গাছ ভাবছেন? ভাবছেন গাছের মতো আমিও আপনের গফ শুইন্যা মজা পাব? আমি গাছ না।

ফরিদ বলল, এক কাঠুরের গল্প। সে কাঠ কাটতে বনে গিয়েছে। হঠাৎ তার কুড়ালটা পড়ে গেল পানিতে। মনের দুঃখে সে কাঁদছে। তখন পানি থেকে জলপরী উঠে এসে বলল, কুড়ালের জন্যে কাঁদছ? এই সোনার কুড়ালটা কি তোমার?

সফুরা বলল, এই গল্প আমি জানি। কাঠুরে বলল, না। তখন জলপরী একটা রুপার কুড়লি তুলে বলল, এইটা তোমার? কাঠুরে বলল, না। আমার কুড়াল লোহার। তখন তার ভালোমানুষি দেখে জলপরী খুশি হয়ে তিনটা কুড়ালই দিয়ে দিল।

ফরিদ বলল, আমি যে গল্পটা বলব সেটা এখানেই শেষ না। আরেকটু আছে। বলি?

বলেন।

সেই কাঠুরে অনেকদিন পর তার স্ত্রীকে নিয়ে বনে বেড়াতে গেছে। হঠাৎ স্ত্রী পানিতে পড়ে ডুবে গেল। কাঠুরে কান্না শুরু করেছে। জলপরী অতি রূপবতী রাজকন্যার মতো এক মেয়েকে পানি থেকে তুলে বলল, এই কি তোমার স্ত্রী?

কাঠুরে বলল, জি এই আমার স্ত্রী।

জলপরী বলল, কালো করে দেখে তারপর বলো।

কাঠুরে বলল, সরি দেখতে হবে না। এই আমার স্ত্রী।

জলপরী বলল, আগের বার তোমার সততা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখন তুমি এটা কী করলে? রূপবতী মেয়ে দেখে স্ত্রীকে ভুলে গেলে?

তখন কাঠুরে বলল, আমি বাধ্য হয়ে বলেছি এইটাই আমার স্ত্রী। যদি না বলতাম, আপনি এরচেয়ে একটু কম সুন্দর আরেকটা মেয়ে তুলতেন। আমি যদি বলতাম এই মেয়ে না। আপনি সবশেষে আমার স্ত্রীকে তুলতেন এবং আগের বারের মতো তিনজনকেই আমাকে দিয়ে দিতেন। আমি নিতান্তই গরিব মানুষ। তিন বউকে পালব কীভাবে? এই কারণে প্রথমবারই বলেছি এটা আমার স্ত্রী।

সফুরা বলল, ও আল্লা। সুন্দর তো।

ফরিদ বলল, গল্পটা তোমার পছন্দ হয়েছে?

সফুরা বলল, হয়েছে।

ফরিদ বলল, এই গল্পটা তোমাকে কেন বললাম জানো? গল্পটা বললাম যেন তুমি বুঝতে পারো আমি কত গরিব। ওই কাঠুরের তিনজন স্ত্রী পালার ক্ষমতা নাই। আমার অবস্থা তারচেয়ে অনেক খারাপ। আমার একজন স্ত্রী পালার ক্ষমতাও নাই।

ফরিদের কথা শেষ হতেই দোতলা থেকে হাজেরা বিবির তীক্ষ্ণ গলা শোনা গেল, হাবু, হাবু! ও হাবু! হাবুরে!

ফরিদের বিয়ের তারিখ ১৭ জানুয়ারি, ১৯৬৮ সন। এই তারিখটা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ থেকে এই দিন শেখ মুজিবুর রহমান বেকসুর খালাস পান। হাসিমুখে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি বের হলেন। ফুলের মালা নিয়ে অনেকেই তার জন্যে অপেক্ষা করছে। তাদের সময় দিতে হবে। মিছিল করে ফেরার পথে বক্তৃতা দিতে হতে পারে। দীর্ঘ কারাবাসে তার শরীর এবং মন—দুইই ক্লান্ত। দ্রুত ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করছে। ঘরে ফিরে গরম পানি দিয়ে গোসল। গোসল শেষে অনেক দিন পর স্ত্রীর হাতের রান্না খাবার। কয়েকদিন থেকেই কেন জানি পুঁটি মাছের কড়কড়া ভাজি আর ছোট টেংরা মাছের টক খেতে ইচ্ছা করছে। আজ কি সম্ভব হবে? মনে হয় না।

জেলগেটের বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আবার গ্রেফতার করা হলো। এবার দেশরক্ষা আইনে না। এবার গ্রেফতার হলেন, আর্মি নেভি এবং এয়ারফোর্স অ্যাক্টে। তাঁকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হলো কুর্মিটোলা সেনানিবাসে।

হাবীব সারা দিনে একবারই খবর শোনেন। রাতের শেষ ইংরেজি খবর। তিনি রাতের খবরে জানলেন দু’জন সিএসপি অফিসারসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ববাংলা বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তারা ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ডেপুটি হাই কমিশনারের সঙ্গে গোপন মিটিং চালাচ্ছিল। দেশ ধ্বংস ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান।

হাবীব বিড়বিড় করে বললেন, এইবার আর রক্ষা নাই। ঝুলে পড়তে হবে। তিনি শোবার আয়োজন করলেন। স্ত্রীর জন্যে অপেক্ষা। স্ত্রী প্রথম বিছানায় যাবে, তারপর স্বামী—এটাই নিয়ম। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না। ব্যতিক্রম হলে স্বামীর আয়ু কমে।

লাইলী পানের বাটা নিয়ে ঢুকলেন। হাবীব পানের বাটা থেকে এক টুকরা লং নিয়ে মুখে দিলেন। লাইলী বললেন, একজন নির্দোষ মানুষরে আপনারা দোষী করলেন?

কে নির্দোষ? কার কথা বলো?

ফরিদের কথা বলি।

সে নির্দোষ কীভাবে জানো?

লাইলী হাই তুলতে তুলতে বললেন, জানি।

হাবীব বললেন, বেশি জানবা না এবং বেশি বুঝবা না। যারা বেশি জানে এবং বেশি বোঝে তারাই বিপদে পড়ে। যেমন শেখ মুজিবুর রহমান। সে বেশি বুঝে ফেলেছিল। এখন তাকিয়ে আছে ফাঁসির দড়ির দিকে। আমাকে অজুর পানি দাও।

লাইলী বললেন, এশার নামাজ তো পড়েছেন। আবার অজুর পানি কেন?

তাহাজ্জুত পড়ব। মন অস্থির হয়েছে।

মন অস্থির কেন?

এত কথা তোমারে বলতে পারব না। অজুর পানি দিতে বলেছি—পানি দাও। আরেকটা কথা, এই বৎসর এখনো খেজুরের রস খাওয়া হয় নাই। কাল সকালে খেজুরের রস খাব।

০২. হাবীব চেম্বারে বসেছেন

হাবীব চেম্বারে বসেছেন। তার সামনে মক্কেলরা বসা। সামনের সারিতে বসেছে। তিনজন, তাদের পেছনে বোরকাপরা এক মহিলা। এমন কঠিন বোরকা যে মুখও দেখা যাচ্ছে না। এই গরমেও বোরকাপরা মহিলার গায়ে কাজ করা হলুদ রঙের চাদর। হাবীবের সঙ্গে প্রণব বসে আছেন। প্রণবের মুখভর্তি পান। রশিদ পাংখা টেনে যাচ্ছে। হাবীব তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মক্কেলদের চোখের দিকে তাকালেন। কথাবার্তা শুরুর আগে তাদের ভাবভঙ্গি দেখা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বয়স্কজনের গায়ের রঙ পাকা ডালিমের মতো। চুল-দাড়ি সবই ধবধবে সাদা। তাঁর দৃষ্টি ভরসাহারা। চোখের নিচে কালি। তিনি লম্বা আচকান পরেছেন। তাঁর হাতে তসবি। তিনি তসবির গুটি টেনে যাচ্ছেন। তার দু’পাশে যে দু’জন বসা তারা টাউটশ্রেণীর তা বোঝা যাচ্ছে। মামলা-মোকদ্দমা জাতীয় বিপদে টাউট জুটে যায়। একজনের থুতনিতে অল্প দাড়ি। মাথায় বেতের টুপি। চোখে সুরমা। পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি। অনাজন যুবা বয়সের। শার্ট-প্যান্ট পরা। তার গা থেকে সেন্টের গন্ধ আসছে। হাবীব বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি আসামির কে হন?

বৃদ্ধ বললেন, পিতা।

নাম?

রহমত রাজা চৌধুরী।

হজ্জ করেছেন?

জি জনাব। দুইবার হজ্জ করেছি।

আপনার সঙ্গে এই দুইজন কে?

একজন আমার গ্রামসম্পর্কের ভাতিজা, নাম সুলায়মান। হজ্জ করেছে। মামলা-মোকদ্দমা ভালো বোঝে। আরেকজন আমার দূরসম্পর্কের ভাই। নাম ইয়াকুব।

আপনার ভাই ইয়াকুব, তিনিও কি মামলা-মোকদ্দমা ভালো বোঝেন?

জি জনাব। জলমহাল নিয়ে একটা হাঙ্গামায় পড়েছিলাম, সে নানান সাহায্য করেছে। তার ‘উনসুনি’ বুদ্ধি ভালো।

হাবীব বললেন, এই দু’জনকে আমার সামনে থেকে চলে যেতে বলেন। যারা মামলা-মোকদ্দমা ভালো বোঝে তাদের সামনে আমার কথাবার্তা বলতে অসুবিধা হয়। কারণ আমি নিজে মামলা-মোকদ্দমা কম বুঝি।

বদ্ধ তার দুই সঙ্গীকে নিচুগলায় কিছু বললেন। দুজনেই কঠিন মুখ করে নাসূচক মাথা নাড়ল। একজন (ইয়াকুব) হাবীবের দিকে তাকিয়ে বলল, জনাব, আমাদের থাকার প্রয়োজন আছে। মামলার অনেক খুঁটিনাটি আমরা জানি। হাজি সাহেব সুফি মানুষ, তিনি বলতে গেলে কিছুই জানেন না।

হাবীব বললেন, আপনি অনেক কিছু জানেন?

জি, অবশ্যই।

খুনটা কে করেছে। আপনি?

আমি কেন খুন করব? এইসব কী বলেন?

হাবীব বললেন, আপনি খুন না করলে সব খুঁটিনাটি জানবেন কীভাবে?

হাজি সাহেব বললেন, এই তোমরা যাও। বাইরে অপেক্ষা করো।

নিতান্ত অনিচ্ছায় দু’জন উঠে গেল। হাবীব বললেন, হাজি সাহেব, আপনার পেছনের মহিলা কে?

আমার ভাগ্নি। জনাব, সে থাকুক। সে শুধু শুনে যাবে, কোনো কিছুই বলবে না।

হাবীব বললেন, উনি থাকলে আমার সমস্যা নাই। আমি টাউট অপছন্দ করি। যাই হোক, আমি প্রশ্ন করলে তা উত্তর দিবেন। উকিল এবং ডাক্তার এদের কাছে মিথ্যা বললে পরে বিরাট সমস্যা হয়।

হাজি সাহেব বললেন, জনাব, আমি এম্নিতেই সত্য কথা বলি। অভাবি মানুষ মিথ্যা বেশি বলে। আমি অভাবি না।

খুব ভালো। খুন আপনার ছেলে করেছে?

জি।

কে খুন হয়েছে?

ছেলের আপন মামা। আমার বড় শ্যালক। তার নাম আশরাফ। আশরাফ আলি খান। খী বংশ।

খুনটা কী কারণে হয়েছে?

এই বিষয়ে আমি জানি না। ছেলে কিছু বলে নাই। সে বলবে না।

ঘটনা কীভাবে ঘটেছে বলুন।

আমার বড় শ্যালক আশরাফ আলি খান ব্যবসা করে। মোহনগঞ্জে এবং ধর্মপাশায় তার বিরাট পাটের ব্যবসা। একটা লঞ্চও আছে। বর্ষাকালে ভাটি অঞ্চলে লঞ্চ চলাচল করে। আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই মোহনগঞ্জে মামার সঙ্গে থাকে।

কেন?

ভাটি অঞ্চলে কোনো স্কুল নাই। মামার সঙ্গে থেকে ছেলে মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুলে পড়েছে। আমার ছেলে লেখাপড়ায় অত্যন্ত ভালো। মাশাল্লাহ। সে চারটা লেটার নিয়ে মেট্রিক পাশ করেছে। সিলেট এম সি কলেজ থেকে স্টার মার্ক পেয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে।

খুনটা কীভাবে হয়েছে সেটা বলুন। ছেলের বিদ্যাবুদ্ধি বিষয়ে পরে জানব।

আমার বড় শ্যালক ফজরের নামাজের অজু করে নামাজে বসেছে, তখন আমার ছেলে দু’নলা বন্দুক দিয়ে দু’টা গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু।

ঘটনা কেউ দেখেছে?

বারান্দায় নামাজ পড়ছিল, ইমাম সাহেব ছিলেন। উনি দেখেছেন। তারপর সবাই ছুটে এসেছে। সবাই ছুটে এসেছে।

পুলিশ চার্জশিট দিয়েছে?

এখনো দেয় নাই। তদন্ত চলছে।

আপনার ছেলে কি পুলিশ কাস্টডিতে?

হাজি সাহেব বললেন, জি-না। পুলিশ তাকে খুঁজছে। কিন্তু সে পলাতক। তাকে শিলচর পাঠিয়ে দিয়েছি সেখানে আমার এক আত্মীয় আছে।

হাবীব বললেন, একটু আগে বললেন, আপনি মিথ্যা বলেন না। এখন তো মিথ্যা বললেন। ছেলে আপনার সঙ্গেই আছে। বোরকাপরাটা আপনার ছেলে।

ছেলের নাম কী?

হাসান রাজা চৌধুরী।

হাবীব কঠিন গলায় বললেন, হাসান রাজা চৌধুরী, বোরকা খেলো।

হাজি সাহেব বললেন, একগ্লাস পানি খাব।

প্রণব পানি আনার জন্যে উঠে গেলেন। হাবীব বিরক্তমুখে সিগারেট ধরালেন। হাসান রাজা চৌধুরী বোরকা খুলল। হাবীব অনেকক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি তার দীর্ঘ জীবনে এমন রূপবান পুরুষ দেখেননি। কোরান শরিফে অতি রূপবান হিসেবে ইউসুফ নবীর কথা বলা আছে। সেই নবী কি সামনে বসে থাকা ছেলেটির চেয়েও সুন্দর ছিলেন?

হাবীব বললেন, মক্কেলের সঙ্গে আমি মামলা ছাড়া অন্য বিষয়ে আলাপ করি না। আজ অন্য একটা প্রসঙ্গে কথা বলব। হাজি সাহেব, আমি আপনার ছেলের মতো রূপবান পুরুষ দেখি নাই। প্রণব, তুমি কি দেখেছ?

প্রণব আগ্রহের সঙ্গে বললেন, একবার দেখেছিলাম। শম্ভুগঞ্জ বাজারে কাপড়ের আড়তে সে বসা ছিল। জিজ্ঞেস করে জানলাম তার নাম মনীন্দ্র। তাকে দেখার জন্যে ভিড় জমে গিয়েছিল। ছয় ফুটের মতো লম্বা। ইংরেজ সাহেবদের মতো গাত্রবর্ণ। আমি যখন বললাম, আপনার নাম এবং পরিচয় কি জানতে পারি? তখন…

হাবীব বললেন, প্রণব, বাকিটা পরে শুনব। এখন একটু বাইরে যাও। রশিদ, তুমিও যাও। আমি এই দু’জনের সঙ্গে প্রাইভেট কিছু কথা বলব।

প্রণব অপ্রসন্ন মুখে উঠে গেলেন। মামলা-মোকদ্দমার প্রাইভেট কথায় তিনি থাকবেন না কেন তা বুঝতে পারছেন না।

হাবীব বললেন, হাজি সাহেব, আপনার মামলা আমি নিব। ছেলের পলাতক থাকাটা ঠিক না। পলাতক থাকার অর্থ অপরাধ স্বীকার করে নেওয়া। খুনের মামলায় পলাতক আসামির বেশির ভাগ সময় মৃত্যুদণ্ড হয়।

হাজি সাহেব বললেন, ছেলেকে কি পুলিশের হাতে তুলে দিব?

এখনো না। যখন বলব তখন। আরও মাসখানিক সে পলাতক থাকতে পারে। আমি মামলা গুছিয়ে আনার পর সে পুলিশের কাছে ধরা দিবে। তবে আপনি যে ছেলেকে বোরকা পরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে রাখছেন তা ঠিক না। আপনার দুই সঙ্গীও বিষয়টা জানে। এটাও ঠিক না। ছেলে এমন জায়গায় থাকবে যে আপনি ‘াড়া আর কেউ জানবে না।

হাজি সাহেব বললেন, আমার এমন কোনো জায়গা নাই। শিলচরে আমার খালাত ভাই থাকে। ছেলে সেখানে যেতে রাজি না।

আপনি কোথায় থাকেন?

আমি হোটেলে উঠেছি। হোটেলের নাম ‘আল হেলাল।

আপনার ছেলেও আপনার সঙ্গে থাকে?

জি।

আপনার দুই সঙ্গীকে না জানিয়ে ছেলেকে আমার এখানে দিয়ে যাবেন। সে মামার এখানে লুকিয়ে থাকবে। আপনি একা পারবেন না। আমার পাংখাপুলার রশিদকে পাঠাব। সে অতি বিচক্ষণ। আমার এখানে ছেলেকে রাখতে আপনার আপত্তি আছে?

হাজি সাহেব বললেন, জি-না জনাব। ছেলের মত আছে কি না একটু জেনে নেই।

হাবীব কঠিন গলায় বললেন, আপনার ছেলের মতামত বলে এখন কিছু নাই। যেদিন মামলার রায় হয়ে যাবে, হাইকোর্ট থেকে আপিলের ফলাফল হাতে আসবে, তখন তার মতামত শুরু হবে।

হাজি সাহেব বললেন, আমি খবর নিয়েছি অনেক খুনের আসামিকে আপনি ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। আমার ছেলেকে কি ছাড়িয়ে আনতে পারবেন?

হাবীব বললেন, ছেলে যদি বলে আমি খুন করেছি তাহলে ছাড়িয়ে আনতে পারব না। তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে।

এই প্রথম হাসান রাজা চৌধুরী মুখ খুলল। সে শান্ত গলায় বলল, আমি মিথ্যা কথা বলব না।

হাবীব বললেন, তাহলে তো বাবা আমার কাছে খামাখা এসেছ। সত্যি কথা বলে ফাঁসিতে ঝুলে পড়ো। তোমাকে আমি একটা কথা বলি, তুমি কঁসিতে ঝুলিলে আমার কিছু যায় আসে না। আবার তুমি খালাস পেয়ে নৌকাবাইচ খেললেও কিছু যায় আসে না। বুঝেছ?

হাসান বলল, জি।

হাবীব বললেন, আমার অনুমানশক্তি ভালো। তুমি খুনটা কেন করেছ সেটা আমি অনুমান করতে পারি। বলব আমার অনুমান?

হাসান বলল, না।

হাবীব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, চিন্তাভাবনা করে ঠিক করুন কী করবেন?

হাজি সাহেব বললেন, আপনি কি চলে যাচ্ছেন।

হাবীব বললেন, জি। গভর্নর মোনায়েম খানকে আজ বার কাউন্সিল থেকে একটা সংবর্ধনা দেওয়া হবে। আমি বার কাউন্সিলের প্রধান।

সময় ১৯৬৮, এশিয়ার লৌহমানব বলে স্বীকৃত আয়ুব খান হাসি হাসি মুখে পাকিস্তানের সব ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করছেন। পূর্ব এবং পশ্চিম, দুই পাকিস্তানেই তার উন্নয়নের দশ বছর পালিত হচ্ছে। বিপুল উৎসাহ এবং উদ্দীপনা।

পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সংহতি আরও প্রবল করার বাসনায় তিনি এক সভায় ঘোষণা করলেন, বাংলা-উর্দু মিলিয়ে এক নতুন ভাষা পাকিস্তানে তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতের পাকিস্তানিরা এই ভাষাতেই কথা বলবে।

সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ঘোষণা করল বাংলা বর্ণমালা লিখন রীতির সংস্কার করা প্রয়োজন।(১)

পূর্বপাকিস্তানে মোনায়েম খান নামের একজনের রাজত্বকাল। তার উত্থানের গল্পটি এরকম—তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ বারের অতি সাধারণ একজন ক্রিমিন্যাল ল’ইয়ার। আয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি নামের অদ্ভুত পদ্ধতিতে এমএলএ হন। নির্বাচিত এমএলএ-রা যাবেন পশ্চিম পাকিস্তানে। সেখানে সংসদ বসবে। এয়ারপোর্টে ছাত্ররা তাদের ঘিরে ধরল। তাদের দাবিদাওয়া যেন সংসদে পেশ করা হয়। সবাই চুপ করে থাকলেন, শুধু মোনায়েম খান বললেন, এইসব দাবিদাওয়া কোনো কাজের কথা না। ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হাতে। লাগল। এক পর্যায়ে কিছু ছাত্র তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ধাক্কা খেয়ে মোনায়েম খানের টুপি উড়ে গেল। এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করা হলো। পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকে ছবিটি ছাপা হলো।

আয়ুব খান বুঝে গেলেন মোনায়েম খানকে তার প্রয়োজন। তিনি শুরুতে তাঁকে করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিছুদিন পরেই গভর্নর।

মোনায়েম খানকে নিয়ে মজার মজার সব গল্প। যেমন, তিনি রাতে ঘুমানোর সময় বুকের ওপর একটা বই নিয়ে ঘুমান। বইটির নাম Friends Not Masters, বইটির লেখক আয়ুব খান।

তিনি না-কি টিভি এবং বেতারের দুই প্রধানকে গভর্নর হাউসে চা খেতে ডেকে নিয়ে বলেছেন, আমার সম্পর্কে কিছু অপপ্রচার আছে। আমি নাকি রবীন্দ্রসঙ্গীত বিরোধী। অবশ্যই না। রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তবে আমি চাই এখন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনারা মুসলমান গীতিকারদের দিয়ে লেখাবেন। বেতার এবং টিভিতে মুসলমানদের লেখা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া অন্য কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ। বলেন, আলহামদুলিল্লাহ।

আনন্দমোহন কলেজের প্রিন্সিপাল নিযুক্তি নিয়েও গল্প আছে। মোনায়েম খান ঠিক করলেন তিনিই প্রিন্সিপাল নির্বাচন করবেন। ঠিক মানুষকে নিতে হবে। নয়তো সমস্যা। দু’জন ক্যান্ডিডেটের একজনকে বললেন, সকালে কী দিয়ে নাশতা করেছেন।

তিনি বললেন, পরোটা ডিমভাজি।

এই ক্যান্ডিডেট সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে গেলেন। কারণ ডিম হিন্দুয়ানি শব্দ। যে ডিম বলবে সে ইসলামি তমুদ্দনের একজন হবে না।

অন্য ক্যান্ডিডেট বললেন, রুটি আর আন্ডাভাজি দিয়ে নাশতা করেছি।

সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হলেন। কারণ ‘আভা’ মুসলমানি শব্দ। তবে তাকেও মোনায়েম খান বললেন, আল্ডা না বলে আপনি যদি বইদা বলতেন তাহলে আমি আরও খুশি হতাম। বইদা হলো ডিমের খাস আরবি। অনেকেই বইদা বলে। আপনার বলতে অসুবিধা কী? এখন থেকে বইদা বলবেন।

মোনায়েম খান তার রাজত্বকালে অতি গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করলেন তা হলো, এনএসএফ নামের ছাত্র সংগঠনকে পুরোপুরি গুণ্ডাবাহিনীতে রূপান্তর করা। তিনি এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন। এনএসএফকে গুণ্ডামির অলিখিত লাইসেন্স দেওয়া হলো। বিষয়টা পুলিশ বাহিনীকেও জানানো হলো।

এই সরকারি দলের একজনের নাম পাচপাত্তুর। সে টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে থাকে। হাতে সাইকেলের চেইন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। মাতাল হাওয়া’ গ্রন্থে পাচপাত্তুরের ভূমিকা আছে বলেই তার বিষয়ে বিস্তারিত বলা হচ্ছে। শুরুতে পাচপাণ্ডুর নামকরণের ইতিহাসটা বলা যাক। তার আসল নাম সাইদুর। তার বাবা বিএম কলেজের শিক্ষক। সে ছিল M.Sc. Part -র ছাত্র। তার ঘরের দরজায় নিজের নাম লেখা। নামের শেষে লেখা Pass Part Two.

‘পাস পার্ট টু’ থেকে হয়েছে পাচপাস্তুর। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে তার পূর্ণ ক্ষমতা যে ঘটনাটি দিয়ে দেখাল তা হলো, এক রাতে রেলওয়ে কলোনি থেকে অল্পবয়েসী দু’জন প্রসটিটিউট নিয়ে এল। শহীদুল্লাহ হলের মাঠে তাদেরকে দিয়ে নগ্ননৃত্যের ব্যবস্থা করল। সে নিজেও চেইন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ নাচল। শহীদুল্লাহ হলের ছাত্র-শিক্ষকরা হতভম্ব হয়ে এই দৃশ্য দেখল।(২)

এনএসএফ নামক সংগঠনটির প্রেসিডেন্টের নাম জমির আলি। সেক্রেটারি মাহবুবুল হক দোলন। এই দু’জন খুব সম্ভব এসএম হলে থাকত। তবে এনএসএফ-এর মূল ঘাঁটি ছিল সদ্যনির্মিত মহসিন হল। এরা সহকারী হাউস টিউটরের জন্যে বানানো চমৎকার একটি উইং দখল করে ছিল। সাধারণ ছাত্রদের টাকায় কেনা খাবারদাবারের একটি অংশ চলে যেত তাদের কাছে। তাদের জন্যে আলাদা রান্না হতো।

মহসিন হলের পাশেই রেললাইন। রেললাইনের দু’পাশে বস্তি। বস্তির কিছু মেয়ে ছিল যৌনকর্মী। তাদেরকে প্রায়ই মহসিন হলে এনএসএফ-এর নেতাদের কাছে আসতে দেখা যেত। হলের প্রভোস্ট এবং হাউস টিউটররা পুরো বিষয় জানতেন। কেউ কিছুই বলতেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্ঞানের অভাব হয়তো ছিল না, সাহসের অভাব ছিল।

মহসিন হলের ৫৬৪ নম্বর রুমে রসায়ন বিভাগের অতি নিরীহ একজন ছাত্র বাস করত। SSC এবং HSC-তে তার রেজাল্ট ভালো ছিল বলে তাকে একটি সিঙ্গেল সিটের রুম দেওয়া হয়েছিল। এই বেচারা এনএসএফের নেতাদের ভয়ে সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকত। একদিন কোনো কারণ ছাড়াই এনএসএফের নেতারা তার ঘরে ঢুকে রুম তছনছ করে দিল। তোষক জ্বালিয়ে দিল এবং বেচারার নিজের টাকায় কেনা Organic Chemistry’র Morrison and Boyed-এর লেখা বিশাল বইটাও ছিড়ে কুটিকুটি করে ফেলল। বই কুটিকুটি করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে বইটা সে অনেক দাম দিয়ে স্কলারশিপের টাকায় কিনেছে। তার একটাই বই। কেমিস্ট্রির অন্য বইগুলি সে লাইব্রেরি থেকে এনে পড়ত। নতুন করে আরেকটা তোষক কেনার টাকা তার ছিল না। খাটে পত্রিকার কাগজ বিছিয়ে ঘুমানো ছাড়া তার কোনো পথ রইল না।

গোবেচারা এই ছাত্রের নাম হুমায়ুন আহমেদ। তার ঘর তছনছ করার ঘটনার তদন্ত করতে এলেন হাউস টিউটর প্রফেসর এমরান (পদার্থবিদ্যার শিক্ষক)। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন। ছাত্রদের প্রতি মমতার তার কোনো কমতি ছিল না।

স্যার আমাকে বললেন, কারা এই কাজ করেছে তাদের নাম বলো। কাগজে লিখে দাও। তদন্তে সত্যি প্রমাণিত হলে কঠিন শাস্তি হবে। হল থেকে বের করে দেওয়া হবে।

আমি নাম কাগজে লিখে স্যারের কাছে দিলাম।

তিনি নামের তালিকা পড়ে ঝিম ধরে গেলেন এবং বললেন, পলিটিকস ছেড়ে দাও। পলিটিকস করো বলেই এই ঘটনা ঘটেছে।

আমি বললাম, স্যার আমি পলিটিকস করি না।

এমরান স্যার হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, আবার মিথ্যা কথা বলে বেয়াদপ ছেলে! সিট ক্যানসেল করে দেব। তুমি পলিটিকস করো না—তারা খামাখা তোমার ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমাকে তুমি কী ভাবে? আমি দুদু খাই?

স্যার নাম লেখা কাগজ আমার হাতে ফেরত দিয়ে চলে গেলেন।

সন্ত্রাসের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আগেও মাথা নিচু করে থাকতেন। এখনো থাকেন।

‘৬৮ এবং ‘৬৯-এর মাতাল হাওয়া আমার গায়ের ওপর দিয়ে গিয়েছে। কিছু অভিজ্ঞতা উপন্যাসের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়ে দেব। উপন্যাসের কাঠামো নির্মাণে এই বিষয়টা চলে না, তবে মাতাল হাওয়া কখনোই নিয়ম মানে না।

————–
(১) কর্তা খুশি রাখার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাকশাল করেন, তখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক বাকশালে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নেন।

(২) আমি নিজে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র। থাকি মহসিন হলে। পাচপাত্তুরকে স্বচক্ষে দেখার জন্যে একদিন শহীদুল্লাহ হলে গিয়েছিলাম। পাচপাত্তুর বন্ধুদের নিয়ে নিজের ঘরে বসে গল্প করছিল। বন্ধুদের একজনের নাম খোকা। সেও দেখতে রাজপুত্রের মতো। খোকা ছিল দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। সে সঙ্গে জ্যান্ত সাপ নিয়ে ঘুরত। সাপ ব্যবহার করত সবাইকে ভয় দোনোর জন্যে। পকেটে থাকত পিস্তল।

০৩. হাজেরা বিবি খাটে বসে আছেন

হাজেরা বিবি খাটে বসে আছেন। তাঁর বিছানায় ভাদ্র মাসের কড়া রোদ জানালা গলে পড়েছে। তিনি তার কাঠির মতো পা কিছুক্ষণ রোদে রাখছেন। পা চিড়বিড় করা শুরু হওয়া মাত্র টেনে নিচ্ছেন, আবার পা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। রোদ নিয়ে এই খেলা তার পছন্দ হচ্ছে। তিনি একেক সময় একেক ধরনের খেলা বের করেন।

হাবীবের স্ত্রী লাইলী শাশুড়ির খাটের পাশে মোড়ায় বসে আছেন। হাজেরা বিবি জরুরি তলব করে পুত্রবধূকে এনেছেন। তুলব কী জন্যে করেছেন এখন ভুলে গেছেন। পুত্রবধূকে বসিয়ে রাখা হয়েছে যদি মনে পড়ে।

রোদ খেলা খেলতে খেলতে হাজেরা বিবি বললেন, কিছুক্ষণের মধ্যে মনে পড়ব। কলবের ভিতরে চইলা আসছে। জবানে আসে নাই। বৌ, বইসা থাকে।

লাইলী বললেন, আম্মা যতক্ষণ বসে থাকতে বলবেন বসে থাকব।

চুপচাপ বইসা না থাইকা সংসারের গফসফ করো। এখন সংসার করতে পারি, তয় সংসারের গফ শুনতে ভালো লাগে।

সংসারের কোন গল্প শুনবেন?

যেটা বলবে সেটাই শুনব। হারামজাদা ফরিদ তার গাভিন বৌ নিয়া আছে কেমন?

ভালো আছে।

ভালো থাকারই কথা। ডিমওয়ালা মাছ বাজারে মিলে, ডিমওয়ালা বউ মিলে। ঠিক বলেছি?

জি।

লতিফার বিবাহের যখন কথা চলতেছে, তখন একটা রব উঠল বউ পোয়াতি। কী কেলেঙ্কারী! লতিফা কানতে কানতে বলল, আমারে ইন্দুর মারা বিষ আইন্যা দেন। আমি বিষ খাব।

লাইলী বলল, লতিফার গল্প থাকুক অম্মা।

হাজেরা বিবি বললেন, থাকবে কী জন্যে? লতিফা কি কোনো মানুষ না? তার সুখ-দুঃখ নাই? হইতে পারে সে গরিবের সন্তান।

লাইলী বলল, লতিফা নামে কেউ নাই আম্মা। প্রায়ই আপনি লতিফার গল্প করেন। একেক সময় একেক গল্প। একবার বলেছেন লতিফা আট বছর বয়সে পানিতে ডুবে মারা গেছে।

হাজেরা বিবি বললেন, বৌমা, মিথ্যা বলি নাই। তোমার সাথে মিথ্যা বইলা আমার কোনো ফয়দা আছে? কাউরে কিছু না বইলা লতিফা দিঘির ঘাটে গেছে সিনান করতে। তখন বাইস্যা মাস। শ্যাওলার কারণে ঘাট হইছে পিছল। পা পিছলায়া পড়ছে পানিতে। দুপুর পর্যন্ত কেউ কোনো খবর জানে না। জোহরের আজানের পর লতিফা পানিতে ভাইস্যা উঠল। গায়ে ছিল হইলদা জামা। মনে হইল পুসকুনির মাঝখানে হইলদা গেন্দাফুল ফুটছে। বুঝলা?

জি।

কাগজ-কলম আনো।

কী আনব?

কাগজ-কলম। আমার জবানে একটা পত্র লিখবা। তোমারে কী জন্যে ডাকছি এখন ইয়াদ হইছে, পত্র লেখার জন্যে ডাকছি। আমার নাতনিরে একটা পত্র লেখব। নাতনির নাম যেন কী?

লাইলী বললেন, আম্মা, নাম তো আপনার রাখা। তোজল্লী।

হাজেরা বিবি গম্ভীর গলায় বললেন, বৌমা, আমার সাথে লুডু খেলবা না। তোজলী নাম আমি রেখেছিলাম এটা সত্য। তোমরা তারে এই নামে ডাকো না। অন্য এক নামে ডাকো। শুধু আমি যখন জিজ্ঞাস করি, কী নাম। তখন আমারে খুশি করার জন্যে বলো তেজিল্লী। এখন বলো তারে কী নামে ডাকব?

নাদিয়া।

হাজেরা বিবি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কী সুন্দর নাম দিয়েছিলাম, আর কী নামেই না ডাকো। পাদের সাথে মিল দিয়া নাম।

লাইলী বললেন, আম্মা, এটা কেমন কথা? পাদের সঙ্গে এই নামের কী মিল?

হাজেরা বিবি বললেন, মিল অবশ্যই আছে। নাদিয়া। দিল সে পাদিয়া।

আম্মা ছিঃ!

ছিঃ ছিঃ করবা না। সবাই পাদে। তুমি পাদো। স্বামীর সামনে পাদো না, আড়ালে গিয়া ভুটভট করো।

লাইলী উঠে দাঁড়ালেন। হাজেরা বিবি বললেন, যাও কই?

কাগজ-কলম আনতে যাই। আপনি চিঠি লিখবেন বলেছেন।

হাজেরা বিবি বললেন, আমি লিখব না। তুমি লিখবা, আমার জবানে লিখবা।

লাইলী কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন। তিনি বিরক্ত, কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করছেন না। ঘরের সকল কাজ পড়ে আছে। বুড়ি তাকে ছাড়ছে না। চিঠিপর্ব কতক্ষণে শেষ হবে কে জানে!

হাজেরা বিবি বললেন, লেখো-নাদিয়া মাগো। লাইলী বললেন, আম্মা! নাদিয়া মাগো কেন লিখব? সে আপনার নাতনি।

হাজেরা বিবি বললেন, তোমারে যা লেখতে বলছি তাই লেখবা। মাগো আমি ইচ্ছা কইরা লেখতে বলছি যাতে সে বুঝে আমার মাথা এখন পুরাপুরি আউলা। নাদিয়া মাগো লিখেছ?

লিখেছি।

লেখো—আমার অন্তিম সময় উপস্থিত হইয়াছে। এই বিষয়ে আজরাইল আলায়হেস সালামের সঙ্গে কথা হইয়াছে। তিনি সঠিক দিনক্ষণ বলেন নাই। কিন্তু ইশারায় জানায়েছেন।

লাইলী বললেন, আস্তে আস্তে বলেন আম্মা। এত তাড়াতাড়ি লিখতে পারি। আজরাইল আপনাকে কী ইশারা দিয়েছে?

হাজেরা বিবি বললেন, উনি বলেছেন—তোর যা খাইতে মন চায় তাড়াতাড়ি খায়া নে?

লাইলী বললেন, কী খেতে আপনার মন চায়?

হাজেরা বিবি বললেন, পাকনা তেতুই খাইতে মন চায়, ডেফল খাইতে মন চায়, বুবি খাইতে মন চায়। এইসব ফল চুকা। বেহেশতে মিলবে না। বেহেশতের সব ফল মিষ্টি।

লাইলী বলেন, এখন কী লিখব বলেন–

লেখো-পত্র পাওয়া মাত্র চলিয়া আসিবে। জান কবজের আগে আগে যেন তোমার মুখ দেখি। তোমার সহিত আমার কিছু গোপন কথাও আছে। এই পত্রকে টেলিগ্রাম মনে করিয়া চলিয়া আসিবা। ইতি তোমার দাদি হাজেরা বিবি।

লাইলী উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আম্মা এখন যাই, চিঠি পাঠাবার ব্যবস্থা করি।

হাজেরা বললেন, চিঠি ডাকে দিবা না। ডাকের চিঠির গুরুত্ব নাই। হারামজাদা ফরিদরে বলো চিঠি হাতে হাতে নিয়া যাবে এবং তোজ্জল্লীরে সাথে। কইরা নিয়া আসবে। সে আজই যাবে।

আচ্ছা।

আইজ কী বার?

বুধবার।

বুধবার হইলে আইজ যাবে না। বুধবার দিন খারাপ। তোমার মা মারা গিয়েছিলেন বুধবারে। লতিফা বিষ খাইছিল মঙ্গলবার রাতে। মারা গেল বুধবারে। হারামজাদা ফরিদরে পাঠাইবা বিষুদবার সকালে। ঠিক আছে।

জি, ঠিক আছে। আম্মা, আমি এখন যাই? না-কি আরও কিছু বলবেন?

হাজেরা বিবি জবাব দিলেন না। তিনি রোদে পা রাখার এবং পা সরিয়ে নেওয়ার খেলা খেলছেন।

ফরিদ তার ঘরে কাঠের চেয়ারে বসে আছে। চেয়ারের একটা পা ভাঙা বলে কোনো কিছুর সঙ্গে ঠেশ না দিয়ে বসা যায় না। সে চেয়ারটাকে খাটের সঙ্গে ঠেশ দিয়েছে। জায়গাটা ভালো পাওয়া গেছে। এখান থেকে জানালা দিয়ে অনেক দূর দেখা যায়। তার দৃষ্টিসীমায় একতলা একটা পাকা বাড়ি। এটা ‘অতিথঘর’। অতিথিদের থাকার ঘর। ঘরের ভেতরটা ফরিদ কোনোদিন দেখে নাই। শুনেছে সুন্দর করে সাজানো। পাশাপাশি দুটা খাট আছে। চেয়ার-টেবিল আছে। মাথার ওপর টানা পাখার ব্যবস্থাও আছে। বিশেষ কোনো অতিথি এলে পাংখাপুলারের ব্যবস্থা করা হয়।

বাড়ির সামনে গেটের মধ্যে আছে। গেটে ঝুমকা লতা এবং নীলমণি লতা। নীলমণি লতায় ফুল ফুটেছে। গেট নীল হয়ে আছে। ফরিদের ধারণা এই ফুলগুলির দিকে চেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দেওয়া যায়।

অতিথঘরে সম্প্রতি একজন অতিথি এসেছে। বয়স অল্প। ফরিদ এই অতিথির রূপ দেখে চমৎকৃত। কোনো পুরুষমানুষ এত রূপবান হতে পারে তা ফরিদের ধারণাতেও ছিল না। ফরিদ তার স্ত্রীর সঙ্গে এই বিষয়ে কথাও বলেছে। সফুরা বলল, উনার কোনো একটা খুঁত আছে। খুঁত ছাড়া মানুষ এত সুন্দর হয় না। মাকাল ফল এত সুন্দর, তার কারণ ফল বিষাক্ত।

ফরিদ বলল, সফুরা, মানুষের সৌন্দর্য দেখবা। খুঁত দেখবা না।

খুঁত দেখব না কেন?

ফরিদ বলল, খুঁত দেখলে মন খারাপ হবে—এইজন্যে দেখবা না। আমাদের চেষ্টা থাকা উচিত যেন সবসময় মন ভালো থাকে।

সফুরা বলল, কেন?

ফরিদ বলল, মানুষের মনের সঙ্গে আল্লাহপাকের যোগাযোগ আছে। মানুষের মন খারাপ হলে উনার খারাপ লাগে।

আপনারে কে বলেছে?

আমি চিন্তা কইরা বাইর করছি।

আপনে দেখি বিরাট চিন্তার লোক।

ফরিদ বলল, কাজকর্ম নাই তো। চিন্তা ছাড়া কী করব বলো?

সফুরা বলল, কাজকর্মের চেষ্টা করেন।

ফরিদ বলল, চিন্তা করাটাও একটা বড় কাজ।

এখন কী নিয়া চিন্তা করেন?

নতুন যে অতিথি আসছে তার বিষয়ে চিন্তা করি।

সফুরা বলল, তার বিষয়ে চিন্তার কিছু নাই। উনি স্যারের দূরসম্পর্কের ভাইগ্না। মাথায় কী যেন দোষ হয়েছে। কবিরাজী চিকিৎসা নিতে এখানে এসেছেন। চিকিৎসায় আরাম না হলে কলিকাতা যাবেন। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলা নিষিদ্ধ। কথা বললে উনার রোগ বাড়ে।

এইসব তথ্য ফরিদ জানে, তবে সে সামান্য বেশি জানে। কারণ মানুষটার সঙ্গে একরাতে তার আলাপ হয়েছে। সেই রাতে শহরে কারেন্ট ছিল না। গরম পড়েছিল অত্যধিক। পাংখাপুলার রশিদ এসে তাকে বলল, স্যারের অর্ডার হয়েছে রাতে আপনি অতিথঘরে যাবেন। সারা রাত পাংখা টানবেন। অতিথের সঙ্গে কোনো কথাবার্তা বলবেন না।

ফরিদ বলল, উনি যদি কিছু জিজ্ঞাস করেন চুপ করে থাকব?

রশিদ বলল, সেটা আমি বলতে পারব না। নিজ বিবেচনায় কাজ করবেন।

উনার নাম কী?

আসগর।

ফরিদ পাংখা টানতে গেল। আসগর বিছানায় শুয়ে ছিল। উঠে বসল এবং বলল, পাংখা টানতে হবে না। কেউ পাংখা টানলে আমার ঘুম হয় না।

ফরিদ বলল, স্যার অর্ডার দিয়েছেন। পাংখা না টানলে উনি রাগ করবেন। রাগ করলে করবেন।

আমি কি চলে যাব?

হ্যাঁ, চলে যাবেন। এই বাড়িতে কি পড়ার মতো কোনো বই আছে? যে-কোনো বই। আমার সময় কাটে না। বই থাকলে পড়তাম।

ফরিদ বলল, আপার অনেক বই আছে। আলমারি ভর্তি বই। কিন্তু আপার ঘর তালা দেওয়া।

উনি কোথায়?

ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়েন। রোকেয়া হলে থাকেন।

কী পড়েন?

ফিজিক্সে অনার্স। আপনি বই পড়তে চাইলে আরেকটা বুদ্ধি আছে।

কী বুদ্ধি?

ময়মনসিংহ পাবলিক লাইব্রেরিতে অনেক বই আছে। তার মেম্বার হলে বই এনে পড়তে পারবেন। লাইব্রেরিতে জামানত হিসাবে কিছু টাকা জমা রাখতে হবে। কুড়ি টাকা। মাসিক চাঁদা এক টাকা।

এত কিছু জানেন কীভাবে?

আমি মেম্বার হওয়ার জন্যে গিয়েছিলাম। জামানতের টাকা ছিল না বলে মেম্বার হতে পারি নাই।

আসগর তোষকের নিচ থেকে একশ টাকার একটা নোট বের করে বললেন, আমার পক্ষে মেম্বার হওয়া সম্ভব না। আপনি মেম্বার হবেন। বই এনে আমাকে দিবেন। আমি পড়ে ফেরত দিব।

জি আচ্ছা।

আরেকটা ছোট্ট কাজ করতে পারবেন? রশিদ নামের একজন আমার জন্যে তিনবেলা টিফিন কেরিয়ারে করে খাবার আনে। আমি যখন খানা খাই, সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে আমি খেতে পারি না। তাকে বলবেন সে যেন সামনে দাঁড়িয়ে না থাকে। আমি নিজেও বলতে পারতাম। কিন্তু আমি লজ্জা পাচ্ছি।

ফরিদ ভয়ে ভয়ে বলল, আপনার মাথার অসুখটা কি একটু কমেছে?

আমার মাথার কোনো অসুখ নাই। কাজেই অসুখ বাড়া-কমার প্রশ্ন আসে না। আচ্ছা আপনি এখন যান।

ফরিদ লাইব্রেরির মেম্বার হয়েছে। সে সপ্তাহে দু’বার লাইব্রেরি থেকে বই আনে। অন্যের জন্যে বই আনা-নেওয়া করতে করতে ফরিদের নিজের বই পড়া অভ্যাস হয়ে গেল। ফরিদ চার নম্বরি হাতিমার্কা একটা খাতা কিনেছে। যে সব বই সে এনেছে তার নাম খাতায় লিখে রাখছে। লাইব্রেরি থেকে বই আনার সময় খাতাটা সে নিয়ে যায়। খাতা দেখে বই নেয়, যাতে একই বই দুইবার নেওয়া না হয়। কোন বই তার নিজের পড়ে কেমন লাগল তাও অল্পকথায় লিখে রাখে।

যেমন–

দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার : মোটামুটি।

ভারতবর্ষের ইতিহাস : খুবই বাজে।

দুটি ফুল এক বৃন্ত : ভালো। প্রেমের বই।

জানবার কথা : জ্ঞানের বই। মোটামুটি।

দস্যু বাহরাম : খুবই ভালো।

প্রেত কাহিনী : অত্যধিক ভালো। ভূতের।

কপালকুণ্ডলা : ভাষা খারাপ। বই খারাপ।

পথের দাবী : খুবই সুন্দর।

পাবলিক লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ানের নাম ক্ষিতিশ বাবু। বয়স ষাট। সারা দিন চা এবং পান খান। মাঝে মাঝে সম্পূর্ণ বিপরীত দুই বস্তু একসঙ্গে খান। তাঁর মুখের সামনে সবসময় বই ধরা আছে। তিনি ঘোষণা করেছেন, এই লাইব্রেরির সব বই যেদিন পড়ে শেষ করবেন সেদিন …লের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ধর্মকর্মে মন দিবেন। অল্পদিনেই ফরিদের সঙ্গে তাঁর ভালো খাতির হয়েছে। বই লেনদেনের সময় কিছুক্ষণ গল্পগুজব করেন।

ফরিদ, বলো দেখি বই পড়লে কী হয়?

জ্ঞান হয়।

পারলা না। জ্ঞান এত সোজা জিনিস না—বই পড়ল জ্ঞান হয়ে গেল। বই পড়লে পাপক্ষয় হয়। আজেবাজে বই পড়লে ছোটখাটো পাপক্ষয় হয়, ভালো বই পড়লে বড় পাপক্ষয়। বুঝেছ?

বুঝার চেষ্টা নিতেছি।

গঙ্গায় ডুবলে হিন্দুর পাপক্ষয় হয়—এইটা জানো তো?

জানি।

পুস্তক হলো হিন্দু-মুসলমান সবেরই গঙ্গাপুস্তকে ডুব দিলে হিন্দু-মুসলমান সবের পাপক্ষয় হয়। মনে থাকবে?

থাকবে।

গঙ্গায় ডুব দিয়া পাপক্ষয়ের মন্ত্রটা জানো?

জে-না।

মন্ত্রটা শোনো

আম্র চুরি, জাম্র চুরি
ভাদ্র মাসে ধান্য চুরি
মন্দস্থানে রাত্রিযাপন
মদ্য পান আর কুকড়া ভক্ষণ
হক্কল পাপ বিমোচন
গঙ্গা গঙ্গা।

এখন যাও বই নিয়া বিদায় হও। তোমার সঙ্গে কথা বলার কারণে বইপড়া বন্ধ, আমার পাপ কাটাও বন্ধ। বিদায়।

ফরিদ বলল, স্যার, আমার খুব শখ আপনারে একবেলা খাওয়াই।

শখ হইলে খাওয়াবা। মুসলমানের বাড়িতে খাইতে আমার সমস্যা নাই।

ফরিদ বলল, নিজের যেদিন রোজগার হবে তখন খাওয়াব। এখন আমি পরের বাড়িতে আশ্রিত।

ক্ষিতিশ বাবু বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন—আশ্রিত অবস্থার পরিবর্তন করো। আশ্রিত মানুষের অন্ন বিষ্টাবৎ। বিষ্টা বোঝা তো?

বুঝি।

বিষ্টা আর কত খাইবা? খাদ্য খাও।

খুব শিগগিরই একটা ব্যবস্থা হবে স্যার।

ফরিদ ক্ষিতিশ বাবুর পায়ের ধুলা নিয়ে বের হয়ে এল। এই কাজটি সে সবসময় করে। বিদায়ের সময় ক্ষিতিশ বাবুর পায়ের ধুলা নেয়।

হাবীব খেতে বসেছেন। পাটি পেতে খেতে বসা। তার সামনে পাখা হাতে লাইলী একটা জলচৌকিতে বসেছেন। লাইলী পাখা হাতে নিয়েছেন অভ্যাসের কারণে। খাওয়ার সময় হাবীব পাখা নাড়ানাড়ি পছন্দ করেন না। কথা চালাচালিও পছন্দ করেন না। এই কথা তিনি তাঁর স্ত্রীকে অনেকবার বলেছেন। কিন্তু লাইলীর মনে থাকে না। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি খাবার সময় বলবেনই।

লাইলী বললেন, অতিথঘরে যে থাকে সে কে?

হাবীব বললেন, তার নাম আসগর। আসগর আলি। আমার দূরসম্পর্কের ভাইগ্না হয়। বাড়ি শম্ভুগঞ্জ। শরীর খারাপ। চিকিৎসার জন্যে এসেছে।

লাইলী বললেন, খাওয়ার সময় মিথ্যা বললে গলায় ভাত আটকাইয়া মৃত্যু হয়। খাওয়া শেষ করেন, তারপর মিথ্যা বলবেন।

হাবীব কিছুক্ষণ কঠিন চোখে তাকিয়ে থেকে আবার নিঃশব্দে খাওয়া শুরু করলেন।

লাইলী বললেন, এই ছেলেরে আমি চিনি। সে ভাটিপাড়ার বারোআনি জমিদার রহমত রাজা চৌধুরী সাবের একমাত্র ছেলে, তার নাম হাসান রাজা চৌধুরী।

তুমি চিনলা কীভাবে?

আপনার ইয়াদ থাকে না যে, আমি ভাটি অঞ্চলের মেয়ে। ভাটিপাড়ায় আমার খালার বাড়ি। আমি ছোটবেলায় জমিদার সাবের বাড়িতে গিয়েছি। এত সুন্দর আর এত বড় বাড়ি ভাটি অঞ্চলে নাই। উনাদের বাড়ির নাম কইতর বাড়ি।

কইতর বাড়ি নাম কী জন্যে?

বাড়িভর্তি কইতর। এইজন্যে বাড়ির নাম কইতর বাড়ি। কইতরগুলির জন্যে প্রতিদিন আধম ধান বরাদ্দ ছিল, এখন কী অবস্থা জানি না।

হাবীব বললেন, কম জানাই ভালো। বেশি জানলে সমস্যা।

লাইলী বললেন, জমিদার সাবের ছেলে একলা অতিথবাড়িতে থাকে, একলা খায়—এইটা কেমন কথা? তারে মূল বাড়িতে থাকতে বলেন। আমি যত্ন করে খাওয়াব।

হাবীব বললেন, পরিস্থিতির কারণে মাঝে মধ্যে হাতি দুর হয়ে যায়। এই ছেলে এখন ইদুর! এর বেশি আমারে কিছু জিজ্ঞাসা করবা না।

আম্মা নাদিয়াকে আনার জন্যে লোক পাঠাতে বলেছেন।

হাবীব বললেন, আম্মার কথা আমার কাছে আদেশ। লোক পাঠাও। ইউনিভার্সিটিতে নানান গোলমাল চলতেছে। ছাত্রগুলা কৈ মাছের মতো উজাইছে। এই সময় হল-হোস্টেলে না থাকা উত্তম।

সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ ঝড় উঠল। আম-কাঁঠালের বাগানের ভেতর ধুলা-আবর্জনার কুলি উঠল। লাইলী ঘোমটা মাথায় দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তার ঝড়.. বৃষ্টি ভালো লাগে। ঝড়ের সময় ঘূর্ণি ওঠার অন্য অর্থ আছে। ছোটবেলায় শুনেছেন ঘূর্ণির ভেতর একটা করে জ্বিন থাকে। নজর করে দেখলেই হঠাৎ হঠাৎ জ্বিনের হাত-পা-মাথা আচমকা দেখা যায়।

লাইলী তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। বাগানে তিনটা ঘূর্ণি উঠেছে। এর পাক খেয়ে খেয়ে একটার সঙ্গে অন্যটা মিশে যাচ্ছে। আবার আলাদা হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হলে জ্বিনরা কেউ থাকবে না। এরা বৃষ্টি পছন্দ করে না।

বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রথমে ফোঁটা ফোঁটা পড়ছিল। এখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। লাইলীর চোখে পড়ল পুকুরঘাটে হাসান রাজা চৌধুরী দাঁড়িয়ে। তার দৃষ্টি আকাশের দিকে। সে মনের আনন্দে ভিজছে।

যে মাওলানার কাছে লাইলী ছোটবেলায় আরবি পড়া শিখতেন তিনি বলতেন, বৃষ্টি আল্লাপাকের খাস রহমতের একটি। বৃষ্টিতে ভিজলে উনার রহমত গায়ে মাখা হয়। এটা শরীর এবং মন দুইয়ের জন্যই ভালো। তবে এই রহমত আল্লাহপাক শুধু মানুষের জন্যে দিয়েছেন। জ্বিনের জন্যে দেন নাই। জ্বিনরা বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না।

লাইলী বলেছিল, জ্বিনদের জন্য কি অন্য কোনো রহমতের ব্যবস্থা আছে?

তিনি বললেন, আছে। আল্লাপাক জ্বিনের জন্যে আগুনের বৃষ্টির ব্যবস্থা রেখেছেন। আগুনের বৃষ্টি তাদের জন্যে।

লাইলী মাওলানা সাহেবের নাম মনে করার চেষ্টা করছেন। নাম মনে আসছে না। কিছু নাম মানুষ অতিদ্রুত ভুলে যায়, হাজার চেষ্টা করলেও মনে করতে পারে না। মনে হয় আল্লাপাক চান না এই নামগুলি মনে থাকুক।

সেই মাওলানার অভ্যাস ছিল কথা বলার সময় ছাত্রীর পিঠে হাত রাখা। একদিন তিনি বললেন, তুমি উড়না ঠিকমতো পরতে পারো না। মাথার উড়না এমনভাবে দিতে হবে যেন মাথার সামনের চুল ঢাকা পড়ে। আমি উড়না পূরায়ে তোমারে দেখায়ে দিতেছি। তিনি উড়না পরাবার সময় লাইলীর বুকে হাত রাখলেন। লাইলী পাথরের মূর্তির মতো বসে রইলেন। তখন তার বয়স বারো। এই ভয়ঙ্কর ঘটনা কাউকে বলার উপায় নাই, কারণ কেউ তার কথা বিশ্বাস করবে না। মাওলানা ছিলেন তাদের অঞ্চলের অতি সম্মানিত মানুষদের একজন।

হঠাৎ লাইলীর মাওলানার নাম মনে পড়ল। মাওলানা আসগর। আজ দুপুরে খাওয়ার সময় নাদিয়ার বাবা এই নাম উচ্চারণ করেছেন।

লাইলী নিচুগলায় কয়েকবার বললেন, মাওলানা আসগর। মাওলানা আসগর।

কাজের মেয়ে মলিনা এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। এই মেয়েটার বয়স অল্প। অল্প বয়সের কারণেই সে তুচ্ছ বিষয়ে উত্তেজিত হয়।

আম্মা, শিল পড়তাছে!

লাইলী অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে বাগানের দিকে তাকালেন—শিল পড়ছে। হাসান রাজা চৌধুরী ছোট বাচ্চাদের মতো ছোটাছুটি করে শিল কুড়াচ্ছে। লাইলী বলেছেন, মলিনা! তুমি খোঁজ নাও তোমার খালু বাড়িতে বা চেম্বারে আছেন কি না। থাকার কথা না। আজ বৃহস্পতিবার। তিনি ৩াশ খেলতে যান। যদি দেখো তোমার খালু নাই, তাহলে ওই ছেলেটারে বলবা আমি চা-নাশতা খাওয়ার জন্যে তাকে ডেকেছি।

দোতলায় নিয়ে আসব আম্মা?

হ্যাঁ, দোতলায় আনবা। চা-নাশতার ব্যবস্থা করবা।

কী নাশতা দিব?

লুচি ভাইজ্যা দিবা। মাংস রান্না আছে। মাংস লুচি।

মলিনা গলা নামিয়ে বলল, কেউ যেন না জানে এমনভাবে আনব আম্মা?

লাইলী বললেন, লুকাছাপার কিছু নাই। তুমি অল্পদিন হয়েছে এই বাড়িতে এসেছ। তুমি আমাকে চিনো না। আমারে চিনলে বুঝতা আমার মধ্যে লুকাছাপা নাই।

মলিনা চলে গেল। লাইলীর মন সামান্য খারাপ হলো, কারণ মলিনাকে তিনি মিথ্যা কথা বলেছেন। তাঁর মধ্যে অবশই লুকাছাপা আছে। মাওলানা আসগরের কথা তিনি কাউকে বলেন নাই। ছেলেটাকে নাশতা খেতে খবর দিয়েছেন, কিন্তু তার আগে খোঁজ নিয়েছেন নাদিয়ার বাবা তাশ খেলতে গেছেন কি না।

হাজেরা বিবি চেঁচাচ্ছেন, ও হাবু! হাবুরে! ও হাবু!

লাইলী শাশুড়ির ঘরে ঢুকলেন।

আম্মা, কিছু লাগবে?

আমার ছেলে কই? হাবলাটা কই?

আজ বৃহস্পতিবার, মনে হয় তাশ খেলতে গেছে।

হাজেরা বিবি বললেন, সত্যি সত্যি তাশ খেলতে যায় কি না, ভালোমতো খোঁজ নিবা। পুরুষমানুষরে বিশ্বাস করবা না। তারা এক জায়গায় যাওয়ার কথা বলে যায় অন্য জায়গায়। তোমার শ্বশুরের কথা শোনো। সে মাসের প্রথম দিন…

লাইলী বললেন, এই গল্প অনেকবার শুনেছি আম্মা।

আরেকবার শোনো। একটা শাড়ি অনেকবার পরেছ বলে আর পরতে পারবা না, তা তো না। ভালো শাড়ি অনেকবার পরা যায়। তারপর ঘটনা শোনো। তখন আমি নতুন বউ। এই বাড়ির হালচাল বুঝি না। বয়সও কম। হায়েজ নেফাস শুরু হয় নাই এমন কম। তারপরেও সন্দেহ হইল। খোঁজ লাগায়া জানলাম তোমার শশুর যায় নটিবাড়িতে। নটির নাম বেদানা। আমি তোমার শ্বশুররে বললাম, আপনে সম্মানী মানুষ। নটিবাড়িতে কেন যাবেন! নটি আসবে আপনার কাছে। বেদানারে আপনার কাছে আইন্যা রাখেন।

তোমার শ্বশুর পাকা ঘর তুলল। নটিবেটিরে এই ঘরে আইন্যা দাখিল করল। আইজ সেই ঘরের নাম ‘অতিথঘর। বুঝেছ?

জি। আপনার ছেলেকে কেন ডুকিছিলেন আম্মা? কিছু লাগবে?

হাজেরা বিবি বললেন, শিল পড়েছে শুনেছি। একটা শিলে মধু মাখায়া আমার মুখে দেও। আমি চুষব। বছরের প্রথম শিলের মধ্যে ওষুধ থাকে। এই ওষুধ শরীরের জন্যে ভালো। ব্যবস্থা করা।

ব্যবস্থা করছি আম্মা।

হাসান রাজা চৌধুরীর সারা শরীর ভেজা। মাথার চুল বেয়ে পানি টপটপ করে পড়ছে। লাইলী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। সে যে এত রূপবান তা তার কল্পনাতেও আসেনি।

লাইলী বললেন, বাবা, কেমন আছ?

ভালো।

আমি ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার তোমাদের বাড়িতে গিয়েছি। বাড়ির নাম কইতর বাড়ি না?

জি।

কইতরগুলি কি এখনো আছে?

জি।

শুনেছিলাম তোমার মায়ের মৃত্যুর দুইদিন আগে সব কইতর চলে গিয়েছিল। এটা কি সত্যি?

জি।

কতদিন পর ফিরে আসে?

মা’র কুলখানির দিন।

শুনেছি তোমার অসুখ। চিকিৎসা চলছে। কী অসুখ?

আমার কোনো অসুখ নাই। এই বাড়িতে আমি পালিয়ে আছি।

মলিনা পালাভর্তি ফুলকো লুচি এবং গরুর মাংস নিয়ে ঢুকেছে।

লাইলী বললেন, বাবা খাও।

হাসান খেতে শুরু করেছে। আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে। লাইলী ইশারায় মলিনাকে চলে যেতে বললেন। মলিনা পুরোপুরি চলে গেল না। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কান পেতে রাখল।

লাইলী বললেন, এখন থেকে তুমি এই ঘরে বসে খাবে। আমি সামনে থাকব।

হাসান বলল, আমার একা খেতে ভালো লাগে। মা মারা যাওয়ার পর একা খাওয়া অভ্যাস হয়ে গেছে।

লাইলী বললেন, অভ্যাসটা বদলানো দরকার। একদিন বিবাহ করবে। তোমার স্ত্রী চাইবে সামনে বসে তোমাকে খাওয়াতে।

আমি বিবাহ করব না।

তাহলে অবশ্যি ভিন্ন কথা। তুমি কেন এই বাড়িতে পালিয়ে আছ?

হাসান বলল, আমি একটা খুন করেছি। এইজন্যে পালিয়ে আছি।

লাইলী তাকিয়ে আছেন। হাসান মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মলিনা ছটফট করছে, কারণ সে লাইলীর প্রতিটি কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু তার প্রশ্নের উত্তরে ওই মানুষটা কী জবাব দিয়েছে তা শুনতে পারে নাই।

প্রণব খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়েছেন। তিনি খবরের কাগজ পড়েন হাতে লাল-নীল পেনসিল নিয়ে। যেসব খবর পড়ে তার শান্তি লাগে সেখানে নীল দাগ দেন। অশান্তির খবরগুলিতে লাল দাগ। লাল এবং নীল দাগ সমান সমান হলে তার বড়ই আনন্দ লাগে। মাঝে মাঝে তিনি বিভ্রান্ত বোধ করেন। লাল দাগ না নীল দাগ দিবেন বুঝতে পারেন না।

আজও একটা বিভ্রান্তি দেখা দিল একচল্লিশজন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হচ্ছে, আমরা সংবাদপত্র মারফত জানিয়া বিস্মিত হইলাম যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল বাংলা বর্ণমালা, লিখন রীতি এবং বানান পদ্ধতির পরিবর্তন সাধনে তৎপর হইয়াছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাংলা ভাষার এইরূপ পরিবর্তন সাধনে একতরফাভাবে কেন যে উদ্যোগী হইয়াছেন তাহা জানি না….

প্রণবের মনে হলো বাংলা ভাষা রক্ষার ব্যবস্থা হচ্ছে এটা ভালো কথা। নীল দাগ দেওয়া উচিত। আবার বিবৃতির কারণে দেশ আন্দোলনের দিকে যাবে। যেকোনো আন্দোলনের একপর্যায়ে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। কাজেই লাল দাগ।

আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবের মুক্তির আন্দোলনে যাচ্ছে।—এটাও লাল দাগ। কারণ ফলাফল হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা।

নীল দাগ দেওয়ার মতো একটা বর পাওয়া গেল। বোয়াল মাছের পেটে চার ভরি স্বর্ণের হার।

বোয়াল ধরা পড়েছে হাকালুকি হাওরে। তার পেট কেটে চার ভরি ওজনের হার পেয়েছে জেলে মন্তাজ মিয়া। সে বাজারে মাছ বিক্রি করতে নিয়ে গিয়েছিল। খদ্দের না জোটায় মন খারাপ করে মাছ বাড়িতে নিয়ে যায়। মাছ কাটার পর হতদরিদ্র মন্তাজ মিয়ার পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

পত্রিকায় মন্তাজ মিয়ার একটা ছবি ছাপা হয়েছে। সে গোমড়ামুখে একটা হার ধরে আছে। ছবি দেখে মনে হচ্ছে পেটে হার পেয়ে সে মহাবিরক্ত।

০৪. নাদিয়াকে ময়মনসিংহ নিয়ে যেতে রশিদ এসেছে

নাদিয়াকে ময়মনসিংহ নিয়ে যেতে রশিদ এসেছে। নাদিয়া বলল, আমি একা যাওয়া আসা করতে পারি। কেন আমাকে নিতে আসেন।

রশিদ জবাব দিল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রশ্ন করলেই উত্তরে কিছু বলা রশিদের স্বভাবে নেই।

নাদিয়া বলল, আপনি ভালো সময়ে এসেছেন। ইউনিভার্সিটি সাত দিনের ছুটি হয়েছে। আয়ুব খান আসছেন এইজন্যে ছুটি। আমরা ছাত্ররা ঝামেলা করে ফেলতে পারি এটাই সরকারের ভয়।

রশিদ বলল, আম্মা, কখন রওনা দিবেন?

ট্রেন কখন?

আমি স্যারের গাড়ি নিয়া আসছি আম্মা। আপনি যখন রওনা দিতে চান তখন রওনা দিব। দুপুরের আগে রওনা দেওয়া ভালো। সইন্ধ্যায় সন্ধ্যায় পৌঁছব।

আমি গাড়িতে যাব না। ট্রেনে যাব। এবং একা যাব। আজ না, আগামীকাল। ‘রোমান হলিডে’ নামে একটা ছবি এসেছে। হলের অনেক মেয়ে ছবি দেখে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। আমি এখনো কাঁদতে পারিনি।

রশিদ বলল, আম্মা আপনারে না নিয়া গেলে স্যরি আমারে খুন করবে।

নাদিয়া বলল, বাবা আয়ুব খানের মতো। নানান প্যাঁচ খেলবে, খুন করবে। আপনি গাড়ি নিয়ে ফেরত যান। আমি এক থেকে তিন গুনব, আপনি এর মধ্যে বিদায় হবেন। এক-দুই-তিন।

ছুটি সাত দিনের, নাদিয়া জানে খুব কম করে তাকে দশ দিন থাকতে হবে। দাদি ছাড়বে না। ঢাকায় আসার জন্যে সে তৈরি হয়ে দাদিকে সালাম করতে যাবে। দাদি বলবেন, খারাপ খোয়াব দেখছি। খুবই খারাপ খোয়াব। আইজ যাওয়া বন। পরের দিন দাদি বলবেন, আইজ না শনিবার। শনিবারের যাত্রা! তোর মাথাটা কি খারাপ হইছে? তারপরের দিন দাদি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তার হাঁপানির টান উঠবে। অসুখ সত্যি না মিথ্যা কেউ ধরতে পারবে না।

দশ দিন মাথায় রেখে নাদিয়া বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে ঠিক করেছে পাঠ্যবই একটাও নিবে না। ছুটিতে গেলে কখনোই পড়া হয় না। শুধু শুধু বাক্সভর্তি বই নিয়ে যাওয়া।

গল্পের বই কিছু নিয়ে যেতে হবে। দিঘির ঘাটে বসে বই পড়ার আনন্দ তুলনাবিহীন। মার জন্যে কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি কিনতে হবে। এই রঙের শাড়ি তার অসম্ভব পছন্দ। অনেকগুলি সবুজ শাড়ি তাঁর আছে। মজার ব্যাপার হলো, নাদিয়া তাকে কখনো সবুজ শাড়ি পরতে দেখে না। কোনো ঘটনা নিশ্চয়ই আছে। মাকে জিজ্ঞেস করতে হবে কী ঘটনা।

নাদিয়া নিউ মার্কেট থেকে তিনটা বই কিনল। ম্যাক্সিম গোর্কির আমার ছেলেবেলা এবং পৃথিবীর পাঠশালা। বেনিয়ত নামের এক লেখকের বই কিনল। নাম Snake inside the Apple, এই বইটা কিনল কভার দেখে। টুকটুকে লাল আপেলের ভেতর কুলি পাকিয়ে আছে সাপ। আপেলটা ঠিক যতটা সুন্দর, সাপটা

আপেলটা ঠিক যতটা সুন্দর, সাপটা ততটাই ভয়ঙ্কর।

নিউ মার্কেট থেকে সে গেল বলাকা সিনেমাহলে। রোমান হলিডে’ ছবির ম্যাটিনি শো’র দুটা টিকিট কাটল। একটা তার জন্যে আরেকটা বিদ্যুত স্যারের জন্যে। স্যারকে সে বলবে না যে পাশাপাশি দুটা টিকিট কেটেছে। স্যারকে সে আপেলের বইটা দেবে। বইয়ের ভেতর টিকিটটা থাকবে। তিনি যদি সত্যি ছবি দেখতে আসেন তাহলে দেখবেন যে পাশের সিটে নাদিয়া বসে আছে। তিনি অবশ্যই চমকে উঠবেন।

নাদিয়া ঘড়ি দেখল। এগারোটা দশ। ছবি শুরু হবে তিনটায়। হাতে এখনো অনেক সময়।

বিদ্যুত কান্তি তাঁর ঘরে বসে স্লাইড রুল দিয়ে জটিল হিসেব করছিলেন। নাদিয়া উঁকি দিয়ে বলল, স্যার আসব।

এসো।

স্যার আমি কাল ময়মনসিংহ চলে যাচ্ছি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।

ভালো করেছ। চা খাবে?

জি স্যার।

ভেতরে এসে বসো আমি চায়ের কথা বলি। তুমি নিজেই বলে আসো ল্যাব অ্যাসিসটেন্ট কিসমতকে। অপটিক্স ল্যাবে আছে। দাড়িওয়ালা। চেনো না?

চিনি স্যার।

কিসমত চা দিয়ে গেছে। বিদ্যুত কান্তি স্লাইড রুল চালাতে চালাতেই কথা বলছেন।

আপনার জন্যে একটা বই এনেছি স্যার। Snake inside the Apple.

গল্পের বই?

জি স্যার।

বিখ্যাত কোনো বই নাকি?

জানি না স্যার। কভার দেখে পছন্দ হয়েছে বলে কিনে ফেলেছি।

বিদ্যুত হাত থেকে স্লাইড রুল নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, মানব জাতির এটা একটা সাধারণ ত্রুটি। তারা শুধু যে কভারের রঙচঙ ছবি দেখে বই কিনে তা, মানুষও তার কভার অর্থাৎ রূপ দেখে পছন্দ করে। চলতি কথা-ই আছে—

পহেলা দর্শনদারি
তারপর গুণ বিচারি।

নাদিয়া বলল, এছাড়া উপায় কী স্যার? রূপ প্রথমেই চোখে পড়বে। গুণ পড়বে না।

বিদ্যুত বললেন, বইটায় তোমাদের ময়মনসিংহের বাড়ির ঠিকানাটা লিখে দাও। আমার এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটিতে কিছু কাজ আছে। হাতে সময় থাকলে তোমাদের বাড়িতে যাব। চা খেয়ে আসব।

নাদিয়া ঠিকানা লিখে দিল। হঠাৎ সে লক্ষ করল, ঠিকানা লেখার সময় হাত কাঁপছে। কেন এরকম হচ্ছে?

স্যার আমি উঠি।

আচ্ছা যাও ভালো থেকো।

আপনিও ভালো থাকবেন। ময়মনসিংহ যদি সত্যি সত্যি যান তাহলে আমাদের বাড়িতে থাকবেন। আমি খুব খুশি হব।

‘রোমান হলিডে’ ছবি শুরু হয়েছে। নাদিয়া ছবির দিকে মন দিতে পারছে না। তার মন পাশের খালি সিটের দিকে। সে নিশ্চিত স্যার এসে পাশের সিটে বসবেন।

বিশ মিনিট পার হবার পর নাদিয়ার পাশের সিটে এসে বসূল ল্যাব অ্যাসিসটেন্ট কিসমত। স্যার তার টিকিট কিসমতকে দিয়ে দিয়েছেন।

হাবীবের সামনে হাজি সাহেব একা বসা। চেম্বারে মানুষ মাত্র তিনজন। হাবীব, হাজি সাহেব, প্রণব। রশিদকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাবীব প্রণবের দিকে তাকিয়ে বললেন, জর্দা ছাড়া আমাকে একটা পান দাও তো।

প্রণব পানের কৌটা খুলতে খুলতে হাজি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনাকেও কি একটা পান দিব?

হাজি সাহেব বললেন, না।

প্রণব বললেন, পানের মধ্যে আছে সাতটা শিরা। সাত শিরার মধ্যে মধ্যমটা বিষ। বাকিগুলি অমৃত। মধ্যমটা বাদ দিয়ে পান খেলে শরীরের জন্যে ভালো। একটা খান?

হাজি সাহেব বললেন, না। আমি পান যে কোনোদিন খাই নাই তা না। পান খাওয়ার অভ্যাস ভালোই ছিল। আমার স্ত্রী নিজের হাতে পান বানায়ে আমার জন্যে সাজায়ে রাখতেন। তাঁর মৃত্যুর পর পান খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।

প্রণব বললেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর কেউ তাজমহল বানায়, আবার কেউ পান খাওয়া ছেড়ে দেয়।

হাবীব বললেন, প্রণব, তুমি মুখভর্তি করে পান নাও। পান চাবাতে থাকো, কথা বন্ধ। এই ফাঁকে আমি হাজি সাহেবকে অতি জরুরি কথাটা বলে শেষ করি। হাজি সাহেব, আরও কাছে আসেন। আমি নিচুগলায় কথা বলব।

হাজি সাহেব এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখে সামান্য শঙ্কা। হাবীব বললেন, আপনার মামলা আমি কীভাবে সাজিয়েছি সেটা শুনেন—

আপনি আপনার ছেলের জন্যে একজন কেয়ারটেকার জাতীয় মানুষ রেখেছিলেন। যার দায়িত্ব সবসময় আপনার ছেলের সঙ্গে থাকা। হাওরে পাখি শিকার আপনার ছেলের শখ। সেই কেয়ারটেকার বন্দুক সঙ্গে নিয়ে আপনার ছেলের সঙ্গে হাওরেও যায়। সে বন্দুক চালাতে পারে। খুন সেই লোক করেছে। কোর্টে সে স্বীকার যাবে। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিবে।

হাজি সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন, আমার ছেলের হয়ে ওই লোক জেলে যাবে?

হ্যাঁ।

যদি তার ফাঁসি হয়?

হাবীব বললেন, ফাঁসি হলে ফাঁসিতে ঝুলবে। তবে ফাঁসি হবে না। মামলা এমনভাবে সাজানো হবে যে প্রত্যক্ষদর্শী নাই। তাছাড়া সে খুনের উদ্দেশ্যে খুন করে নাই। ভোরবেলা পাখি শিকারে যাবে বলে আপনার ছেলে তাকে বলেছে বন্দুক পরিষ্কার করতে। সে বলুক পরিষ্কার করার জন্যে বন্দুক নিয়ে বাইরে এসেছে। বন্দুকে গুলি ভরা ছিল, সে খেয়াল করে নাই। গুলি হয়ে গেছে। এক্সিডেন্টে মৃত্যু। সাজা দশ বছরের বেশি হবে না। জেলখানায় নয় মাসে বছর। আট বছরের মাথায় বের হয়ে আসবে।

হাজি সাহেব বললেন, এমন লোক আমি পাব কই?

হাবীব বললেন, আমি জোগাড় করে দিব।

আপনি কই পাবেন?

হাবীব বললেন, এই ধরনের কাজের জন্যে কিছু লোকজন আমি পুষি।পোষা একজনকে দিব। তার নাম ফরিদ। সে আপনার ছেলের হয়ে সাজা ভোগ করে আসবে। আপনি দুই লাখ টাকার জোগাড় দেখেন। আমি রাখব দেড়। ফরিদকে দিব পঞ্চাশ হাজার। এই টাকায় সে জমি কিনবে। ঘর তুলবে। ব্যবসা করবে। কিছুদিন জেল খাটবে।

হাজি সাহেব বিড়বিড় করে বললেন, যদি কোনো ঝামেলা হয়? যদি ওই লোকের ফাঁসি হয়ে যায়?

ফাঁসি হয়ে গেলে হবে।

হাজি সাহেব বললেন, আমার ছেলে রাজি হবে না।

হাবীব বললেন, ছেলেকে রাজি করার দায়িত্ব আমার না। আপনার। তাকে আমি যা শিখিয়ে দিব, তা-ই সে কোর্টে বলবে। এর বাইরে একটা শব্দ বলবে। কোর্টে কোনো কারণে সে যদি কাশতে চায়, আমাকে জিজ্ঞেস করে কাশবে।

হাজি সাহেব বললেন, ফরিদ সাহেবের সঙ্গে আমি কি কথা বলতে পারি?

না।

টাকার জোগাড় কতদিনের মধ্যে করতে হবে?

যত তাড়াতাড়ি পারেন।

হাবীব উঠে দাঁড়ালেন। হাজি সাহেব ব্যাকুল গলায় বললেন, আপনি কি চলে যাচ্ছেন?

হাবীব বললেন, হ্যাঁ চলে যাচ্ছি। আপনার সঙ্গে কথা যা বলার বলা হয়েছে। বাকি কথা হবে টাকা হাতে পাওয়ার পর। অনেকদিন পর ঢাকা থেকে আমার মেয়ে এসেছে। মেয়েকে কিছু সময় দিব। আপনি যান, আপনার ছেলের সঙ্গে কথা বলুন। কোর্টে কীভাবে মামলা উঠবে তা বুঝিয়ে বলুন। আপনি বুঝিয়ে বলতে না পারলে প্রণবকে সঙ্গে নিন।

নাদিয়া তার দাদির ঘরে। হাজেরা বিবি যেভাবে পা লম্বা করে খাটে হেলান দিয়ে বসেছেন, নাদিয়াও সেভাবে বসেছে। দাদির পান ছেঁচনি তার হাতে। সে নিবিষ্ট মনে পান ছেঁচে যাচ্ছে।

নাদিয়া লম্বা রোগা একটি মেয়ে। তার চেহারার শান্ত স্নিগ্ধতা চোখে পড়ার মতো।

হাজেরা বিবি বললেন, তোর গায়ের রঙ তো আরও ময়লা হইছে।

নাদিয়া বলল, গায়ের রঙ ময়লা হলেও অসুবিধা নাই দাদি। আমার অন্তরের রঙ খুব পরিষ্কার। তুমি দুধের মতো ধবধবে সাদা একজন মানুষ। তোমার অন্তর কালো। কুচকুচে কালো।

হাজেরা বিবি বললেন, কথা সত্য বলেছিস। আমার অন্তরও তোর মতো সাদা ছিল। এই বাড়িতে সংসার করতে আইসা নানান প্যাচের মধ্যে পড়লাম। নিজে প্যাঁচ শিখলাম। অন্তর কালা হওয়া শুরু হইল। শেষমেষ একটা খুনও করলাম।

নাদিয়া অবাক হয়ে বলল, খুন করেছ মানে! কাকে খুন করেছ।

নিজের হাতে করি নাই। অন্যরে দিয়া করাইছি।

কাকে খুন করেছ সেটা বলো।

হাজেরা বিবি নির্বিকার গলায় বললেন, বেদানা নামের একটা নটি বেটি এই বাড়িতে থাকত। তার কইন্যা হয়েছিল। ধাইরে বললাম কইন্যার মুখে লবণ দিয়া দিতে। ধাই তাই করছে। এক চামচ লবণে কারবার শেষ।

নাদিয়া বলল, দাদি, তুমি কি সত্যি কথা বলছ?

হাজেরা বিবি বললেন, তুই পাগল হইছস? আমি কি পিশাচ? বেদানা মাগি মরা সন্তান প্রসব করছে। তিন তিনবার মরা সন্তানের জন্ম দিয়া তার মাথা হইছে খারাপ।

নাদিয়া বলল, দাদি, আমার গা ছুঁয়ে বলো লবণ বিষয়ে যা বলেছ সব মিথ্যা।

হাজেরা বিবি বললেন, অবশ্যই মিথ্যা। লতিফা সাক্ষি। তারে জিজ্ঞাস কর। সে বলবে। দে পান দে।

নাদিয়া দাদির হাতে পান দিল। লাইলী ঘরে ঢুকে বললেন, তোজলী! তোমার বাবা তোমাকে ডাকে।

লাইলী শাশুড়ির সামনে নামের বিষয়ে কখনো ভুল করেন না। আজও করলেন না।

হাবীব বসেছেন পূর্বদিকের বারান্দায়। এই বারান্দা তার শোবার ঘরের লাগোয়া। এখান থেকে দূরের মৃত ব্ৰহ্মপুত্র দেখা যায়। সারাক্ষণই একদল মানুষ ব্রহ্মপুত্রের মাটি কাটছে। হাবীবের শৈশবের স্বপ্ন ছিল একটা নদী কিনবেন। শৈশবের সব স্বপ্নই পরিণত বয়স পর্যন্ত থাকে। এখনো হাবীবের মনের এক গোপন স্থানে নদী কেনার বিষয়টা আছে। বারান্দায় বসলে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মনে হয় ব্রহ্মপুত্র নদীটা তার কেনা। যারা মাটি কাটছে তারা অনুমতি না নিয়েই কাটছে।

বাবা, কেমন আছ?

নাদিয়া আয়োজন করে বসে বাবাকে কদমবুসি করল। হাবীব মেয়ের মাথায় হাত রেখে উঁচুগলায় বললেন, হাসবুনুল্লাহে নিয়ামুল ওয়াকিল ও নিয়ামুল মওলা ও নিয়ামুন নাসির।

নাদিয়া বলল, প্রশ্নের জবাব দিলে না তো বাবা। কেমন আছ?

ভালো আছি মা।

তোমার বুকের ব্যথাটা কি আরও হয়েছে?

হয় মাঝে মাঝে।

ডাক্তার কী বলে?

ডাক্তার কিছু বলে না। প্রেসার ট্রেসার মেপে চলে যায়।

নাদিয়া বলল, ভিজিট নিশ্চয়ই নেয় না।

হাবীব বললেন, নেয় না। নিজেদের ডাক্তার।

নাদিয়া বলল, নিজেদের ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা হয় না বাবা। অন্যদের ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়।

হাবীব বললেন, তোর ইউনিভার্সিটির খবর কী?

নাদিয়া বলল, আন্দোলন চলছে। রোজই মিটিং মিছিল। একদলকে আরেকদল ধাওয়া করছে।

হাবীব বিরক্ত গলায় বললেন, এরা চায় কী?

নাদিয়া বলল, জানি না বাবা।

হাবীব বললেন, না জানাই ভালো। ছাত্ররা চায় নৈরাজ্য। আর কিছু না। তাদের উস্কে দেওয়ার লোক আছে মাওলানা ভাসানী। আজগুবি সব বিষয় নিয়ে আন্দোলনের ডাক। ভুখা মিছিল। অনশন। পারলে সে একাই কোদাল দিয়ে কুপিয়ে দেশটাকে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিয়ে আসে। তার চ্যালাটা বসে আছে জেলে। ফাঁসিতে ঝুলার অপেক্ষায়।

নাদিয়া বলল, উনার চ্যালা কে?

হাবীব তিক্ত গলায় বললেন, বাদাইম্যা সবাই তার চ্যালা। মূল চ্যালা শেখ মুজিব। ইন্ডিয়ার কাছে গোপনে দেশ বিক্রি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এখন ফাঁসিতে ঝুলে দোল খাও।

নাদিয়া বলল, তুমি এত রেগে যাচ্ছ কেন বাবা?

হাবীব বললেন, দেশটাকে ভালোবাসি বলে রেগে যাচ্ছি।

নাদিয়া বলল, বাবা, চা খাবে? আমি খুব ভালো চা বানানো শিখেছি। একটা কেরোসিনের চুলা কিনেছি। রুমে লুকানো আছে। হাউস টিউটররা যখন রাতের রোল কল শেষ করে চলে যান, তখন চা বানাই।

হাবীব বললেন, অনুমতি নাই এ ধরনের কাজ করা ঠিক না। একসময় ঘরে আগুন-টগুন লাগাবি। কেলেঙ্কারি হবে।

নাদিয়া হাসিমুখে বলল, একদিন আগুন লেগেছিল বাবা। বিছানার চাদরে আগুন ধরে গিয়েছিল। হাতের কাছে পানিভর্তি জগ থাকায় রক্ষা।

নাদিয়া চার কাপ চা বানিয়েছে। এক কাপ চা সে তার দাদিকে দিয়ে এসেছে। এক কাপ তার মা’কে। বাকি দুকাপ নিয়ে সে তার বাবার সঙ্গে বসেছে।

হাজেরা বিবি চায়ে চুমুক দিয়েই বললেন, নাতনি কী চা বানাইছে? চায়ের মধ্যে ‘পাদের গন্ধ।

লাইলী দুঃখিত গলায় বললেন, চা ভালো না লাগলে ফেলে দেন। আজেবাজে কথা কেন বলেন! তোজল্লী শুনলে মনে কষ্ট পাবে। নিজে আগ্রহ করে চা বানিয়েছে।

হাজেরা বিবি বললেন, পাদ দিয়া চা ক্যামনে বানাইছে এইটাই আমার জিজ্ঞাসা।

লাইলী হতাশ গলায় বললেন, চা খাওয়ার দরকার নাই মা। ফেলে দিন। ননাংরা কথাগুলি বলবেন না। চায়ে তোজলী সামান্য ওভালটিন দিয়েছে। আপনি ওভালটিনের গন্ধ পাচ্ছেন। আপনি চায়ের কাপটা দিন, আমি ফেলে দেই।

হাজেরা বিবি বললেন, ফেলবা কেন? খাইতে তো চমৎকার হইছে।

নাদিয়া তার বাবাকে বলল, চা খেতে কেমন হয়েছে বাবা?

হাবীব বললেন, ভালো হয়েছে।

আমি রোজ সন্ধ্যায় তোমাকে এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়াব।

আচ্ছা।

ম্যাজিক দেখবে বাবা?

তুই ম্যাজিক জানিস না-কি?

অল্প কয়েকটা জানি। আমার ডান হাতে কী আছে দেখো তো। একটা কয়েন।

হুঁ।

এই কয়েনটা আমি ডান হাত থেকে বাম হাতে নিয়ে গেলাম। ঠিক কি না বলো?

হুঁ। ঠিক।

নাদিয়া বা হাত খুলে দেখাল হাত শূন্য। হাবীব বিস্মিত হয়ে বললেন, কীভাবে করলি?

নাদিয়া বলল, পামিং করে করেছি। কয়েনটা সবসময় আমার ডান হাতেই ছিল। তোমার মনে হয়েছে আমি বাঁ হাতে চালান করেছি। আসলে তা-না। একে বলে পামিং। হাতের তালুতে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখার বিদ্যা। এখন আমি দিনরাত পামিং প্র্যাকটিস করি।

পড়াশোনা বাদ দিয়ে পামিং?

নাদিয়া বলল, আমি পড়াশোনার বিষয়ে খুব সিরিয়াস বাবা। পামিং প্র্যাকটিস করি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে।

হাবীব বললেন, হঠাৎ এইসব ধরলি কেন?

নাদিরা বলল, ম্যাজিকে হঠাৎ উৎসাহ কেন হয়েছে তোমাকে বলি। ক্লাসে গিয়েছি। বিদ্যুত স্যারের ক্লাস। বিদ্যুত কান্তি দে। উনি মধ্যাকর্ষণ সূত্র পড়াবেন। স্যার ক্লাসে ঢুকলেন হোমিওপ্যাথির ওষুধ রাখে এরকম ছোট্ট একটা শিশি নিয়ে। শিশিটা তিনি টেবিলে রাখলেন এবং বললেন, প্রিয় শিষ্যরা। এই বোতলটা কি আপনাআপনি শূন্যে ভাসবে?

আমরা সবাই বললাম, না।

তিনি বললেন, কেন আপনাআপনি শূন্যে ভাসবে না?

আমরা বললাম, মধ্যাকর্ষণ বলের জন্যে শূন্যে ভাসবে না। পৃথিবী তাকে নিজের দিকে টেনে ধরে রাখবে।

স্যার তখন বোতলের দু’হাত ওপরে ব্ল্যাক বোর্ডের ডাস্টার ধরলেন। আমরা অবাক হয়ে দেখি বোতলটা টেবিল ছেড়ে শূন্যে ভেসে উঠল। স্যার বললেন, প্রিয় শিষ্যকুল। যা দেখেছ তাতে বিভ্রান্ত হয়ো না। এটা একটা সাধারণ ম্যাজিক। কারোরই ক্ষমতা নেই মধ্যাকর্ষণ বল অগ্রাহ্য করার। স্যার বললেন, তোমরা কি এই ম্যাজিক দেখে খুশি হয়েছ?

আমরা সবাই একসঙ্গে বললাম, জি স্যার।

তিনি বললেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যাজিক হচ্ছে সায়েন্স। আমরা সেই ম্যাজিকে এখন ঢুকব। সায়েন্সের ম্যাজিক আমরা যতই জানব ততই আমরা অবাক হব। বিস্মিত হব, মুগ্ধ হব। এখন প্রিয় শিষ্যকুল হাততালি দাও, আমি বক্তৃতা শুরু করি।

আমরা হাততালি দিলাম।

স্যার বললেন, মহাকর্ষ বল যিনি প্রথম টের পেয়েছিলেন সেই মহাবিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটনের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যে এক মিনিট standing ovation দিলে কেমন হয়!

আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালাম। তারপর স্যার বক্তৃতা শুরু করলেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলাম।

তোর এই স্যার ছাত্র-ছাত্রীদের শিষ্য ডাকেন?

হুঁ। প্রাচীন গ্রীসের শিক্ষকরা তাদের ছাত্রদের শিষ্য ডাকতেন। তিনিও তাই করেন।

তোর এই স্যার বিজলি না বিদ্যুত?

বিদ্যুত। বিদ্যুত কান্তি দে।

তিনিই তোকে ম্যাজিক শেখান? তিনি কি তোর ম্যাজিকেরও শিক্ষক?

আমি একদিন স্যারের কাছে গিয়েছিলাম বোতল কীভাবে শূন্যে ভাসে তা শেখার জন্যে। তখন স্যার পামিং-এর কৌশল শিখিয়েছিলেন।

হাবীব গম্ভীর গলায় বললেন, তুই কি একাই তার কাছে ম্যাজিক শিখিস? নাকি সব শিষ্যদেরই তিনি ম্যাজিক শেখান?

নাদিয়া বলল, বাবা, তুমি কি কোনো কারণে স্যারকে অপছন্দ করছ?

হাবীব বললেন, পছন্দ-অপছন্দের বিষয় না। একজন ফিজিক্সের শিক্ষক ছাত্রদের ফিজিক্স শেখাবেন। ম্যাজিক না।

নাদিয়া বলল, আইনস্টাইন ছিলেন ফিজিক্সের গ্র্যান্ডমাস্টার। তিনি বেহালা বাজাতেন।

হাবীব বলল, এই প্রসঙ্গটা থাক।

নাদিয়া বলল, বিদ্যুত স্যার একদিন ক্লাসে কী করেছিলেন সেই গল্পটা করি বাবা। তুমি খুব মজা পাবে।

হাবীব বললেন, তোর স্যারের প্রসঙ্গ নিয়ে এক দিনে অনেক আলাপ হয়ে গেছে। আজ আর না।

নাদিয়া বলল, স্যারের একটা কথা তোমাকে বলতেই হবে। তিনি একটা বিষয়ে তোমার সাহায্য চান।

হাবীব বিস্মিত হয়ে বললেন, আমার সাহায্য?

নাদিয়া বলল, ঠিক তোমার সাহায্য না। মোনায়েম চাচার সাহায্য। স্যরি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়েছেন। উনি হিন্দু তো, শেষ মুহূর্তে তাঁকে বাদ দেওয়া হবে। মোনায়েম চাচাকে তুমি বলে দিলেই স্যারের সমস্যার সমাধান হবে।

হাবীব বললেন, কোনো হিন্দুকে স্কলারশিপ দিয়ে বাইরে পাঠানোর বিষয়ে আমার মত নেই। কারণ তারা Ph.D. শেষ করে কখনো পাকিস্তানে ফেরে না। হয় ওই দেশেই থেকে যায়, কিংবা ইন্ডিয়াতে চলে যায়।

নাদিয়া বলল, বিদ্যুত স্যার সেরকম মানুষ না।

তুই তার সঙ্গে কতটুক মিশেছিস যে বলে ফেললি তিনি সেরকম মানুষ না? সারা জীবন পাশাপাশি থেকেও একজন মানুষ অন্য একজনকে বুঝতে পারে না। তোর মা কি আমাকে বুঝতে পারে? পারে না। আমিও তাকে বুঝতে পারি না।

নাদিয়া কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে নিচুগলায় বলল, বাবা, তুমি স্যারের কাজটা করে দেবে?

হাবীব দীর্ঘ সময় মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নাদিয়া মাথা নিচু করে আছে। তার চোখ ছলছল করছে। হাবীব বললেন, তোর স্যারের কাজটা আমি কারে দেব।

নাদিয়া বলল, থ্যাংক য়ু বাবা!

হাবীব বললেন, তোর চোখে পানি কেন?

নাদিয়া বলল, তুমি স্যারের কাজটা করে দেবে না এই ভেবে দুঃখে আমার চোখে পানি এসেছে।

হাবীব বললেন, এত দুঃখ পাওয়ার কি কিছু আছে?

নাদিয়া জবাব দিল না।

হাবীব বললেন, আমি আরেক কাপ চা খাব। যা চা বানিয়ে আন।

হাজেরা বিবি ডাকছেন, হাবু হাবু! হাবুরে! ও হাবু!

হাবীব বিরক্ত মুখে উঠে গেলেন। মা’র ঘরে ঢুকলেন। হাজেরা বিবি পাশে বসার জন্যে ইশারা করলেন। তিনি পাশে বসলেন না।

হাজেরা বিবি বললেন, কাছে বোস। তোরে একটা গোপন কথা বলব।

হাবীব অনিচ্ছায় পাশে বসলেন।

হাজেরা বিবি বললেন, গোপন কথা বলার আগে তোরে একটা শিলুক ভাঙানি দেই। শিলুক ভাঙাইতে পারলে গোপন কথা বলব। না পারলে বলব না। শিলুকটা হইল—

কাটলে ‘লউ’ নাই
না কাটলে ‘লউ’
দিনেরবেলা লেংটা ঘুরে
মুক্তারপাড়ার বউ।

হাবু! ক’ দেখি জিনিসটা কী?

হাবীব কোনো জবাব না দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

ঘুমুতে যাবার আগে রাতের শেষ খবর শুনে হাবীব অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। আয়ুব খানকে নজরুল একাডেমী বিশাল সংবর্ধনা দিয়েছে। সেখানে আয়ুব খান বলেছেন একদিন দেশের সকল ভাষার সংমিশ্রণে একটি পাকিস্তানি ভাষা হবে।

হাবীবের মনে হলো জগাখিচুড়ি ভাষার দরকার কী? আয়ুব খান সবাইকে খুশি করতে চাচ্ছেন। সেটা সম্ভব না। সবাইকে খুশি রাখা যায় না। আয়ুব খান নরম ভাব ধরেছেন। কাউকে নরম দেখলে বাঙালি আক্কা গরম হয়ে যায়। সাপের মতো ফোঁসফাস শুরু করে।

আয়ুব খানকে নরম না হয়ে কঠিন গরম হতে হবে। তখনই সব সাপ গর্তে ঢুকবে। গর্তে আঁকাবাঁকা হয়ে ঢোকার বুদ্ধি নেই। গর্তে সোজা হয়ে ঢুকতে হয়। বাঙালি জাতির সোজা হয়ে গর্তে ঢোকার সময় হয়ে গেছে।

০৫. নাদিয়ার হাতে পুরনো দিনের বাহারি গ্লাস

নাদিয়ার হাতে পুরনো দিনের বাহারি গ্লাস। গ্লাসভর্তি চা। গ্লাস গরম হয়ে আছে। হাত দিয়ে ধরা যাচ্ছে না। নাদিয়া গ্লাসটা ধরেছে তার রুমাল দিয়ে। রুমালে সেন্টের গন্ধ। যতবার সে চায়ে চুমুক দিচ্ছে, ততবারই চায়ের গন্ধের সঙ্গে সেন্টের গন্ধ মিলে অন্যরকম সৌরভ তৈরি হচ্ছে। গন্ধটা ভালো লাগছে না, আবার খারাপও লাগছে না। নাদিয়া যাচ্ছে তার গাছের কাছে। গাছের নাম কদম।

নাদিয়ার ছোটমামা তাকে তার পঞ্চম জন্মদিনে এই গাছটা দিয়ে বলেছিলেন, নিজের হাতে এই গাছ লাগাবি। এখন তোর বয়স পাঁচ। যখন বয়স ষােল হবে, তখন এই গাছ মহীরুহের মতো বড় হয়ে যাবে। প্রতি বর্ষায় ফুল ফুটাবে। তখন তুই গাছের চারদিক বাধিয়ে দিবি। তুই আর তোর স্বামী গাছের বাধানেী পাড়ে বসে গল্প করবি। আমি দূর থেকে দেখব। নাদিয়ার মামা সেই বছরই যক্ষায় মারা যান। দূর থেকে কোনো দৃশ্যই তার দেখা হয়নি।

গাছ প্রসঙ্গে ছোটমামার কথা ফলেছে। কদমগাছ বিশাল হয়েছে। বর্ষার শুরুতে ফুলে ফুলে নিজেকে সে ঢেকে ফেলে। যেন শত শত সোনালি টেনিস বল নিয়ে কদমগাছ দাঁড়িয়ে থেকে বলে, এসো আমার সঙ্গে বর্ষার খেলা খেলবে। নাদিয়া তার স্কলারশিপের টাকায় গাছের চারপাশ বাঁধিয়ে দিয়েছে এবং ছেলেমানুষের মতো বলেছে, এই গাছের বাঁধানো পাড়ে আমি ছাড়া কেউ বসবে না। নাদিয়ার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়। এই গাছের বাঁধানো পাড়ে কেউ বসে না।

বাগানে ঢুকে নাদিয়া চমকে উঠল। তার গাছের বাঁধানো পাড়ে অচেনা একজন মানুষ বসে আছে। মানুষটার হাতে বই। সে বই পড়ছে। সন্ধ্যা হয় হয় সময়। আকাশ মেঘলা থাকায় আলো নেই বললেই হয়। এত অল্প আলোতে বই পড়া কষ্টের। মানুষটা চোখের কাছে বই ধরে এই কাজটা করছে। নাদিয়া প্রায় নিঃশব্দে লোকটার কাছাকাছি চলে এল। শান্ত গলায় বলল, আপনি কে?

মানুষটা হঠাৎ কথা শুনে থতমত খেয়ে গেল। তার হাত থেকে বই পড়ে গেল। সে চট করে উঠে দাঁড়াল। তখন তার কোল থেকে পড়ল একটা চামড়ায় বাঁধানো খাতা এবং কলম।

আমি এই বাড়িতে থাকি।

নাদিয়া বলল, এই বাড়িতে অনেকেই থাকে। আপনি এই বাড়িতে থাকেন এটা কোনো পরিচয় হতে পারে না।

আমার নাম হাসান রাজা চৌধুরী।

আপনি কি বাবার নতুন কোনো কর্মচারী।

না।

কিছু মনে করবেন না। যতবারই আমি ছুটিতে বাড়িতে আসি, ততবারই বাবার নতুন কোনো কর্মচারী দেখি। এইজন্যেই বলেছি। আপনি কতদিন ধরে এখানে আছেন?

সতেরো দিন।

সতেরো দিনে কেউ আপনাকে বলেনি যে কদমগাছের নিচে বসা নিষেধ।

বলে নাই। নিষেধ কেন?

নাদিয়া বল, আমি নিষেধ করেছি এইজন্যে নিষেধ। এই গাছটা আমার। এখানে আমি একা বসি।

হাসান বলল, আর বসব না।

নাদিয়া বলল, বিকেলে বই পড়ার জন্যে এই বাগানে অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। আপনি পুকুরঘাটে বসতে পারেন।

হাসান বলল, আমি বেশির ভাগ সময় সেখানেই বসি।

নাদিয়া বলল, চা খাবেন? আপনাকে চা দিতে বলব? আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি তো, এইজন্যে চায়ের কথা বলে কাটান দেওয়ার চেষ্টা করছি।

হাসান বলল, আমি চা খাব না।

নাদিয়া বলল, আমাকে কি আপনি চিনেছেন?

আপনি এই বাড়ির মেয়ে। আপনার নাম নাদিয়া।

নাদিয়া বলল, আমার তিনটা নাম। একটা নাম তোজল্লী, আমার দাদি রেখেছেন। বাবা-মা নাম দিয়েছেন নাদিয়া। ইউনিভার্সিটির বন্ধুরা আমাকে ডাকে দিয়া। তারা না বাদ দিয়েছে। আপনার সঙ্গে অনেক কথা বলে ফেলেছি, এখন চলে যান। আমি একা একা বসে চা খাব। ভালো কথা, আপনি গত সতেরো দিন ধরে কোথায় অর্থাৎ কোন ঘরে থাকেন?

হাসান আঙুল উঁচিয়ে দেখাল।

নাদিয়া বলল, অতিথঘরে থাকেন? ভূত দেখেছেন? অতিথঘরে ভূত থাকে। বেদানা নামের একটা মেয়ে ওই ঘরে শাড়িতে ফাঁস লাগিয়ে সুইসাইড করেছিল। নিশিরাতে হঠাৎ হঠাৎ তাকে দেখা যায়। অনেকেই দেখেছে। আপনি দেখেননি?

না।

ঘুমিয়ে রাত পার করলে কীভাবে দেখবেন? সারা রাত জেগে থাকবেন, তাহলে দেখতে পাবেন। আচ্ছা এখন যান। কী আশ্চর্য! বইখাতা সব ফেলে চলে যাচ্ছেন। নিয়ে যান।

নাদিয়া চায়ের কাপে চুমুক দিল। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ঠান্ডা চায়ে চুমুক দিতে খারাপ লাগছে না। অন্ধকার নামছে। দিঘির পানি শুধু চকচক করছে। আর সবই অন্ধকার। মাগরেবের আযান হচ্ছে। নাদিয়া শাড়ির আঁচল মাথায় তুলে দিল। শুকনা পাতায় সড়সড় শব্দ হচ্ছে। সাপ যাচ্ছে মনে হয়। নাদিয়া পা উঠিয়ে বসল। সে হঠাৎ বিষণ্ণ বোধ করল। ছোটমামার নামটা সে মনে করতে পারছে না। তার এত প্রিয় একজন মানুষ, অথচ নাম মনে পড়ছে না। চোখের আড়ালে যে থাকে মানুষ তাকে দ্রুত ভুলে যায়। ব্রেইন নতুন স্মৃতি রাখার জন্য পুরনো স্মৃতি ধুয়ে ফেলে। হাসান নামে যে মানুষটার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তার স্মৃতি রাখার জন্যে ব্রেইন কিছু জায়গা করেছে। যে অংশে ছোটমামার স্মৃতি ছিল সেই অংশেই জায়গা করেছে কি না কে জানে।

মাগরেবের নামাজ শেষ করে হাবিব জায়নামাজের একটা কোনা ভাঙলেন। ভাজ করে রাখলেন। এখন এটা আর জায়নামাজ না। সাধারণ বসার আসন। এখন এখানে বসে সংসারি আলাপ-আলোচনা করা যায়। খাওয়াদাওয়া করা যায়।

লাইলী পানের বাটা হাতে পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হাবিব ইশারায় স্ত্রীকে ডাকলেন।

লাইলী বললেন, পান খাবেন? পান বানায়া দিব? হাবিব বললেন, পান খাব না। তুমি একটু বসো।

তিনি জায়নামাজ থেকে সামান্য সরলেন। ভদ্রতা করা। যেন বলা, আমার সঙ্গে জায়নামাজে বসো। যদিও সেরকম জায়গা নেই। লাইলী বসলেন তার সামনে। হাবীব বললেন, তোমার মেয়ে কোথায়?

লাইলী বললেন, বাগানে।

হাবীব বললেন, এই বাড়ির কিছু নিয়মকানুন আছে। সন্ধ্যাবেলা মেয়েছেলে বাগানে যাবে না।

লাইলী বললেন, নাদিয়া বাগানে ঘুরতে পছন্দ করে।

হাবীব বললেন, সব পছন্দের গুরুত্ব দিতে হয় না। আজ যদি তোমার মেয়ে বলে—এক হিন্দু শিক্ষককে আমার পছন্দ হয়েছে। তাকে বিবাহ করতে চাই। তুমি কি সেই মালাউনের সঙ্গে মেয়ের বিবাহ দিবে?

লাইলী বললেন, নাদিয়া কি এমন কোনো কথা বলেছে?

হাবিব বললেন, বলে নাই। যদি বলে তুমি কী করবে? রাজি হবে?

না।

হাবীব বললেন, এখন কি বুঝতে পেরেছ সব পছন্দের গুরুত্ব দিতে হয় না?

বুঝতে পারছি।

কাউকে পাঠাও, মেয়েকে নিয়া আসুক।

লাইলী বললেন, আমি নিজেই যাব। নিয়া আসব। লাইলী উঠে দাঁড়াতে গেলেন। হাবীব বললেন, বসে, কথা শেষ হয় নাই।

লাইলী বসলেন! হাবীব বললেন, আমি তোমার মেয়ের বিবাহ দিতে চাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

লাইলী বললেন, আপনার হাতে কি পাত্র আছে?

আছে। পাত্র এই বাড়িতেই ঘুরঘুর করতেছে।

বেশ কিছু সময় চুপ করে থেকে লাইলী বললেন, একজন খুনির সঙ্গে আপনি মেয়ের বিবাহ দিবেন?

হাবীব বললেন, হ্যাঁ দিব। খুন একটা দুর্ঘটনা। মানুষের জীবনে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা বড় করে দেখতে হয় না। আত্মরক্ষার জন্যে কিংবা সম্মান রক্ষার জন্যে খুন করা জায়েজ আছে।

লাইলী কিছু বললেন না। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন। হাবীব বললেন, ওই ছেলের সঙ্গে তোমার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পেছনে তিনটা কারণ আছে। প্রথম কারণ, জমিদার বংশ। ছেলে বাপের একমাত্র ওয়ারিশ। বিশাল বিষয়সম্পত্তি।

লাইলী বলেন, আপনার ধনসম্পদের কমতি নাই। ধনসম্পদের জন্য আপনার ‘লালচ’ থাকা ঠিক না।

হাবীব বললেন, আমার কথার মাঝখানে কথা বলবা না। স্বামীর কথা শেষ হওয়ার আগেই কথা শুরু করলে আদবের বরখেলাপ হয়। যাই হোক, ওই ছেলের সঙ্গে তোমার মেয়ের বিবাহের দ্বিতীয় কারণ, ছেলেকে আমি মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করব। সে বাকি জীবন এই কারণে তোমার মেয়ের কেনা গোলাম হয়ে থাকবে।

লাইলী বললেন, একজন স্ত্রী স্বামী হিসাবে বন্ধু চায়। কেনা গোলাম চায় না।

হাবীব বললেন, আবারও আদবের বরখেলাপ করলা। যাই হোক, তৃতীয় কারণ শোনো। এই ছেলের চরিত্র ভালো। আমি পরীক্ষা নিয়েছি। পরীক্ষায় সে পাশ করেছে।

কী পরীক্ষা নিয়েছেন?

হাবীব বললেন, মলিনা নামে তোমার যে দাসী আছে, গভীর রাতে তাকে ছেলের কাছে নগ্ন অবস্থায় পাঠায়েছিলাম। ছেলে তাকে ধমক দিয়ে বিদায় করেছে। এবং ঘটনা কারও কাছে প্রকাশ করে নাই।

লাইলী হতভম্ব গলায় বললেন, আপনার মতো মানুষ একজন দাসীর সঙ্গে পরামর্শ করে এমন নোংরা কাজ করে?

হাবীব বললেন, মলিনার সঙ্গে পরামর্শ আমি করি নাই। প্রণব করেছে।

লাইলী বললেন, কথা একই। প্রণব বাবু আপনার হয়েই কথা বলেছে। কত বড় অন্যায় কাজ আপনি করেছেন তা বুঝতে পেরেছেন?

হাবীব বললেন, তুমি বুঝতে পেরেছ এই যথেষ্ট। আমার বুঝার প্রয়োজন। নাই। একসঙ্গে অনেক কথা বলে ফেলেছি। আমার কথা শেষ। এখন যাও বাগান থেকে মেয়েকে নিয়ে আসো। আরেক কথা, আমার কাছে কৈফিয়ত তলব করবা না। তুমি আদালত না।

লাইলী উঠে দাঁড়ালেন। হাবীব এশার নামাজের প্রস্তুতি নিলেন। মাগরেবের নামাজ শেষ করে এশা পর্যন্ত জায়নামাজে বসে থাকা এবং এশার নামাজ আদায় করা একটা উত্তম সুন্নত।

বাগানে ঢোকার মুখে প্রণবের সঙ্গে লাইলীর দেখা হলো। প্রণব রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খিচুড়ি বসাবেন। কাঁচামরিচ খিচুড়ি। এক মুঠ চাল, এক মুঠ ডাল, দশটা কাঁচামরিচ, এক চামচ ঘি দিয়ে অল্প আঁচে রান্না হবে। আঁচের বেকম হলেই খিচুড়ির ঝাল ঠিক থাকবে না।

লাইলী ডাকলেন, প্রণব বাবু, একটু শুনে যান।

প্রণব ছুটে গেলেন। মাথা নিচু করে জোড়হাতে নমস্কার বললেন। লাইলী বললেন, আমার বাপের বাড়ির যে দাসী এ বাড়িতে থাকে, মলিনা নাম, তাকে আগামীকাল ভোরবেলায় টাকাপয়সা দিয়ে বিদায় করে দেবেন।

প্রণব বললেন, অবশ্যই। সকাল আটটার পর তাকে আর এ বাড়িতে দেখবেন না।

রান্না বসিয়েছেন? কী রাঁধছেন?

মরিচ-খিচুড়ি। হরিদ্বারের এক সাধুবাবার কাছ থেকে এই রান্না শিখেছি। ঠিকমতো বাঁধতে পারলে অমৃত। মন্ত্র পাঠ করতে করতে রাঁধতে হয়।

কী মন্ত্র?

প্রণব হাতজোড় করে আকাশের দিকে তাকিয়ে মন্ত্র পাঠ করলেন

গন্ধপুষ্পে ও গনপতয়ে নমঃ
গন্ধপুষ্পে ওঁ নারায়ণায় নমঃ
গন্ধপুষ্পে ও শিবাদি পঞ্চ দেবতাভ্য নমঃ

মন্ত্রপাঠ শেষ করে প্রণব লজ্জিত গলায় বললেন, এই খিচুড়ি অন্য কাউকে খাওয়ানো গুরুর নিষেধ, নয়তো আপনাকে একদিন বেঁধে খাওয়াতাম।

লাইলী বললেন, আপনি একজন সাধুপ্রকৃতির মানুষ। সাধুপ্রকৃতির মানুষ হয়ে বড় বড় অন্যায়গুলি কীভাবে করেন?

প্রণব শান্ত গলায় বললেন, ন্যায়-অন্যায় সবই ভগবান করান। ভগবানের অনুমতি ছাড়া কেউ ন্যায়ও করতে পারে না, অন্যায়ও করতে পারে না।

লাইলী ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বাগানের দিকে রওনা হলেন। কদমগাছের নিচে নাদিয়া বসে আছে। তার পরনের শাড়ি সাদা দূর থেকে সাদা রঙ চোখে পড়ছে। কুমারী মেয়েদের সাদা শাড়ি নিষিদ্ধ, কিন্তু নাদিয়ার প্রিয় রঙ সাদা।

নাদিয়া বলল, আমাকে নিতে তুমি আসবে আমি জানতাম। আমি তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছি।

লাইলী মেয়ের পাশে বসতে বসতে বললেন, মশার কামড় খাচ্ছিস?

নাদিয়া বলল, মশা কানের কাছে গুনগুন করছে কিন্তু কামড়াচ্ছে না। মা দেখো, জোনাকির ঝাঁক। অনেকদিন পর জোনাকি দেখলাম। প্রকৃতিতে কত অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস আছে, তাই না মা? একেকটা ঝাঁকে কতগুলি করে জোনাকি থাকে গোনার চেষ্টা করছি, পারছি না।

লাইলী বললেন, ঘরে চল। এতক্ষণ ধরে বাগানে বসে আছিস, তোর বাবা রাগ করছে।

নাদিয়া বলল, করুক একটু রাগ। মা শোনো, আজ সন্ধ্যাবেলা এক যুবকের সঙ্গে আমার দেখা। গ্রিক দেবতাদের মতো তার রূপ।

গ্রিক দেবতা তুই দেখেছিস?

ছবিতে দেখেছি।

লাইলী বলল, দেবতার সঙ্গে কী কথা হলো?

নাদিয়া বলল, আমি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি। আমার নিজের আলাদা করা জায়গায় বসেছিল। দেখে হঠাৎ রাগ উঠে গেল।

লাইলী বললেন, আমিও তো বসেছি। আমাকে দেখে রাগ লাগছে না?

লাগছে। তবে বেশি লাগছে না। একা একা এখানে আমি ছাড়া কেউ বসতে পারবে না। আমার সঙ্গে পারবে।

লাইলী বললেন, তোর বাবা তোর বিয়ে দিতে চাচ্ছে।

নাদিয়া হালকা গলায় বলল, দিতে চাইলে দিবে। গাভর্তি গয়না পরে বিয়ে করব।

তোর নিজের পছন্দের কেউ আছে?

না। আর যদি কেউ থাকেও তার সঙ্গে বাবা আমার বিয়ে দিবে না। আমার বিয়ে করতে হবে বাবার পছন্দের কাউকে।

লাইলী বললেন, চল ঘরে যাই।

নাদিয়া বলল, আরেকটু বসি। চাঁদ দেখে যাই। এখনই চাঁদ উঠবে।

লাইলী বললেন, ঘন জঙ্গলে বসে আছিস, চাঁদ দেখবি কীভাবে?

নাদিয়া বলল, দিঘির পানিতে চাঁদের ছায়া পড়বে। সেটা দেখব। আচ্ছা মা, দাদি যেসব গল্প করে তার সবই কি মিথ্যা?

লাইলী বললেন, বেশির ভাগই মিথ্যা। উনার মাথা পুরোপুরি গেছে। এখন যা মনে আসে বলেন।

নাদিয়া বলল, আমার নিজের কী ধারণা জানো মা? দাদির মাথা ঠিক আছে। তিনি ভাব করেন ঠিক নেই। এতে তার কিছু সুবিধা হয়। তিনি মিথ্যা কথার মাঝখানে কঠিন কঠিন সত্য কথা বলতে পারেন।

লাইলী ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, হতে পারে।

নাদিয়া বলল, এই বাড়িতে তুমি ছাড়া সবচেয়ে ভালো মানুষ কে বলে তোমার ধারণী?

লাইলী বললেন, জানি না। প্রণব বাবু হতে পারেন।

নাদিয়া বলল, প্রণব কাকা না মা। উনার আচার-আচরণে ভালোমানুষ ভঙ্গি আছে। এই পর্যন্তই। বাবা যদি প্রণব কাকাকে ডেকে বলে, অমুককে খুন করো। প্রণব কাকা নিজে খুনটা করবে না, অন্যকে দিয়ে ঠিকই করাবে।

লাইলী বললেন, হতে পারে।

নাদিয়া বলল, আমার ধারণা এই বাড়ির সবচেয়ে ভালোমানুষ পাংখাপুলার রশিদ।

লাইলী বললেন, ভালোমানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছিস কেন?

কোনো কারণ নেই, এম্নি। আচ্ছা মা, এই বাড়ির সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষটা কে?

লাইলী বললেন, তুই নিজে।

নাদিয়া বলল, হয়েছে। মা, আমি তোমার কাছে আমার বুদ্ধির একটা নমুনা দিচ্ছি। হাসান রাজা চৌধুরী নামের যে ছেলেটার সঙ্গে আমার সন্ধ্যায় দেখা হয়েছে, বাবা তার সঙ্গেই আমার বিয়ে দিতে চাচ্ছে। ঠিক বলেছি?

লাইলী কিছু বললেন না। চাঁদ উঠেছে। তিনি দিঘির জলে চাঁদের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আছেন।

মা, ছোটমামার নাম ভুলে গিয়েছিলাম। খুব খারাপ লাগছিল। এখন মনে পড়েছে। একই সঙ্গে অন্য একটা রহস্য ভেদ করেছি।

কী রহস্য?

সবুজ শাড়ি রহস্য। তুমি তোমার অতি পছন্দের সবুজ শাড়ি পরো না তার কারণ ছোটমামা।

ওই প্রসঙ্গ থাক।

আচ্ছা থাক। আচ্ছা মা ছোটমামার একটা ত্রুটির কথা বলে। ত্রুটিশূন্য একজন মানুষের কথা ভাবতে খারাপ লাগে।

ওর কোনো ত্রুটি ছিল না।

মা ছিল। উনি জানতেন তাঁর কোনো ত্রুটি নেই। এ কারণে তাঁর অহঙ্কার ছিল। অহঙ্কার বড় ধরনের ত্রুটি। ঠিক না মা?

হ্যাঁ ঠিক। মা তোমার কি মনে হয়—আমি অহঙ্কারী।

লাইলী ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুই অহঙ্কারী না। তুই তোর ছোটমামার মতো ত্রুটিশূন্য মানুষ।

মা। থ্যাংক য়ু।

হাজেরা বিবির সামনে মলিনা দাঁড়িয়ে আছে। কেঁদে সে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। চোখের কাজল গালে লেপ্টে গেছে। হাজেরা বিবি তার কান্নাকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি নিজমনে পান ছেঁচে যাচ্ছেন।

তোরে বিদায় দিয়া দিচ্ছে?

জে।

বিদায় দিল কে?

প্রণব স্যার।

হেন্দুটা তো বড় ত্যাক্ত করে। এইজন্যেই হেন্দুজাত খারাপ।

মলিনা কাঁদতে কাঁদতে বলল, কাইল সকাল আটটার আগে বাড়ি ছাইড়া যাইতে বলছেন। কী অপরাধ করলাম কিছুই জানি না। এককথায় বিদায়।

চইলা যাইতে বললে চইলা যাবি। ঘরে দৈ খাকলে দৈ খায়া যাবি। দধি যাত্রা শুভ।

দাদি, কী কন আপনি! আমি চইলা যাব?

হাজেরা বিবি বিরক্ত হয়ে বললেন, তোরে বিদায় দিছে, তুই যাবি না তো কী করবি? ঘরে বইসা ডিম পাড়বি?

মলিনা বলল, বড় সাব ঘটনা এখনো শুনে নাই। বড় সাব শুনলে ব্যবস্থা নিতেন।

কী ব্যবস্থা নিতেন?

আমারে বিদায় করতেন না।

হাজেরা বিবি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, আমার ছেলে তোর বিদায় করত না কোন কারণে? তুই কি তার সাথে হাঙ্গা বসছস? দুপুর রাইতে ঠোটে রঙ মাখছস। তুই কি নটি বেটি? বদমাগি! দূর হ সামনে থাইকা।

হাজেরা বিবি পান ছেঁচায় মন দিলেন।

খিচুড়ি মুখে দিয়ে প্রণবের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। প্রচণ্ড ঝাল। মন্ত্রপাঠে ভুল হয়নি। শুদ্ধ শরীরে বেঁধেছেন। রান্নার সময় হাঁড়িতে কি কোনো মুসলমানের ছায়া পড়েছে? গুরু বলে দিয়েছিলেন, নির্জন স্থানে রান্না করতে হবে। যেন হাঁড়িতে কোনো বিধর্মীর এবং কুকুরের ছায়া না পড়ে। অন্য জীবজন্তুর ছায়া পড়লে অসুবিধা নাই।

কষ্ট করে এই খিচুড়ি খাওয়ার অর্থ হয় না। প্রণব উঠে পড়লেন। রাতে এক গ্লাস দুধ খাবেন।

অতিথঘরের বারান্দায় হাসান রাজা বসে আছে। মূর্তির ভঙ্গিতে বসা। কোনো নড়াচড়া নেই। এই যুবক ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ভঙ্গিতে বসে থাকতে পারে। প্রণবের হরিদ্বারের গুরুত্বও এই ক্ষমতা ছিল। তিনি চোখের পলকও ফেলতেন না। এই যুবক নিশ্চয়ই পলক ফেলে। তারপরেও পরীক্ষা করা দরকার।

হাসান প্রণবের দিকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না। প্রণব সামান্য বিরক্ত হলেন। একজন বয়স্ক মানুষকে সম্মান দেখাতে হয়। তাকে ‘আদাব’ বললে দোষ হতো না।

প্রণব বললেন, ভালো আছেন?

হুঁ।

রাতের খাওয়া হয়েছে?

না।

খাওয়া আসে নাই?

এসেছে, পরে খাব।

প্রণব বললেন, পরে কেন খাবেন? গরম গরম খেয়ে নেন।

হাসান বলল, ঠান্ডা খাবার খেতে আমার অসুবিধা হয় না।

প্রণব বললেন, আমি আবার ঠান্ডা খেতে পারি না।

হাসান বলল, একেক মানুষ একেক রকম।

প্রণব বসলেন হাসানের পাশের চেয়ারে। মুখোমুখি বসতে পারলে ভালো হতো। চোখের পলক ফেলার ব্যাপারটা ধরা যেত। বারান্দা অন্ধকার হয়ে আছে, এটাও একটা সমস্যা।

প্রণব বললেন, নাদিয়া মা’র সঙ্গে আলাপ করছেন দেখলাম। কী নিয়ে আলাপ।

হাসান বলল, তেমন কিছু না।

প্রণব বললেন, নাদিয়া অতি গুণের মেয়ে। মাথায় সামান্য ছিট আছে। গুণের সব মানুষই কিছুটা ছিটগ্রস্ত হয়।

হাসান কিছুই বলল না। চুপ করে রইল। প্রণব আশা করেছিলেন হাসান জানতে চাইবে কী ধরনের ছিট। কেউ কিছু জানতে চাইলে সে বিষয়ে বলা যায়। নিজ থেকে বলা এক সমস্যা। প্রণব বললেন, কী ধরনের ছিটগ্রস্ত সেটা বলি। নাদিয়া মা আমাকে বলল, প্রণব কাকা! জোনাকির আঁকে কয়টা করে জোনাকি থাকে আমাকে শুনে বলবেন। উড়ন্ত জোনাকি গুনা কি সম্ভব?

হাসান এখনো নিশ্চুপ। প্রণব বললেন, মলিনা বলে যে একটা মেয়ে আছে, অল্পবয়স্ক, সুন্দরমতো গোল মুখ। তার চাকরি নট হয়েছে। আগামীকাল ভোর আটটার আগে তাকে চলে যেতে হবে। মনে হয় কোনো বড় ধরনের ভুলত্রুটি করেছে। আপনার সঙ্গে কি কিছু করেছে?

হাসান বলল, না।

নীলমণি লতাটার পাশে জোনাকির একটা ঝাঁক দেখা যাচ্ছে। হাসান ঝাঁকের জোনাকি মনে মনে গুনছে। সতেরোটা জোনাকি হিসাবে পাওয়া গেল।

০৬. হাবীব বৈঠকথানার ইজিচেয়ারে

হাবীব বৈঠকথানার ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছেন। রশিদ বড় তালপাতার পাখায় তাকে হাওয়া করছে। আজ ছুটির দিন। কোর্ট বন্ধ। হাবীব আয়োজন করে খবরের কাগজ পড়তে বসেছেন। ছুটির দিনে তিনি মন দিয়ে কাগজ পড়েন। কোনো খবর বাদ যায় না। কিছু কিছু খবর নিয়ে প্রণবের সঙ্গে আলাপ করেন।

প্রণব বড় একটা জুলচৌকিতে আসন করে বসেছেন। তার সামনে পানের বাটা। নানান পদের মসলা ছোট ছোট কৌটায় ভরা। তিনি কৌটার মুখ খুলে মসলার গন্ধ শুকে শুকে দেখছেন।

হাবীব বললেন, মাওলানা ভাসানী সম্পর্কে তোমার ধারণা কী প্রণব?

প্রণব বললেন, সাধুপুরুষ।

হাবীব বিরক্ত গলায় বললেন, সাধুপুরুষ রাজনীতি করে না।

প্রণব বললেন, তাও ঠিক।

হাবীব বললেন, মানুষটার কাজকর্ম চিন্তাভাবনা কিছুই বুঝি না। আয়ুব খানের পক্ষের লোক ছিল—এখন উল্টাগীত শুরু করেছে। গদি ছাড়তে বলতেছে। তার হিসাব কিছুই বুঝতেছি না।

প্রণব বললেন, সাধুপ্রকৃতির মানুষের হিসাব বুঝতে সাধুমানুষ লাগে। সবাই পারে না। বগুড়ার মোহম্মদ আলির কথা চিন্তা করেন। সবাই তার হিসাব জানে। কারণ সে চোরপ্রকৃতির।

হাবীব তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, চোরকৃতির বললা কী জন্যে?

প্রণব পান মুখে দিতে দিতে বললেন, পূর্বপাকিস্তানের এমএলএ যারা তারা সবাই শপথ করে গেল সংসদে তারা পূর্বপাকিস্তানের দাবিদাওয়া তুলবে। বগুড়ার মোহম্মদ আলি নিজেও শপথ নিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছেই আয়ুব খানের সঙ্গে আঁতাত করে বসলেন। এই দিকে আমি মোনায়েম খান সাহেবকে ধন্যবাদ দিব। উনি আগে কোনো শপথ করেন নাই। স্যার, পান খাবেন?

হাবীব বললেন, দাও খাই। জর্দা ছাড়া। জর্দা সহ্য হয় না। মাথা ঘুরে।

প্রণব বললেন, সামান্য দেই? জর্দা ছাড়া পান আর বোতাম ছাড়া শার্ট একই। বোয়াম ছাড়া শার্টে নিজেকে নেংটা লাগে। জর্দা ছাড়া পানও নেংটা পান।

দেশের গতিক কী বুঝতেছ?

কিছু বুঝতেছি না।

পশ্চিম পাকিস্তানে তো ভালো হাঙ্গামা শুরু হয়েছে। ভুট্টো সাহেবকে ঢুকায়েছে জেলে। এদিকে শেখ মুজিবুর রহমানও জেলে। এটা একটা কাজের কাজ হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান ঝামেলা সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কিছু পারে না। দেশ কিছুদিন ঝামেলা ছাড়া চলবে।

প্ৰণব বললেন, অবশ্যই।

হাবীব বললেন, একজন ঝামেলাওয়ালা, আরেকজন সুনশনওয়ালা। কথায় কথায় অনশন। কার কথা বললাম বুঝেছ?

না।

হাবীব রশিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ফরিদকে ডাক দিয়া আনো। জটিল কিছু কথা তার সঙ্গে আছে। কথার সময় তুমি থাকবা না। বাতাসের প্রয়োজন নাই। আজ আবহাওয়া শীতল।

হাবীব জর্দা দেওয়া পান চিবুচ্ছেন। সামান্য মাথা ঘুরছে, তবে খারাপ লাগছে। ফরিদ এসে বেতের মোড়ায় বসেছে, তাকে চিন্তিত এবং ভীত মনে হচ্ছে। প্রণব তার জায়গাতেই আছেন। হাবীব ফরিদের দিকে না তাকিয়ে বললেন, কেমন আছ ফরিদ?

ফরিদ মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল, ভালো আছি।

সংসার কেমন চলতেছে?

ভালো।

ফরিদ, তোমার বুদ্ধি কেমন?

ফরিদ চমকে তাকাল। কী বলবে বুঝতে পারল না। হঠাৎ বুদ্ধির প্রসঙ্গ কেন চলে এসেছে কে জানে। তার পানির পিপাসা পেয়ে গেল। পানি খাবার জন্যে উঠে যাওয়া সম্ভব না।

হাবীব বললেন, তোমার বুদ্ধির একটা পরীক্ষা নিব বলে তোমাকে ডেকেছি। আজকের ইত্তেফাকে একটা খবর ছাপা হয়েছে—গরুর হাতে গরুচোরের মৃত্যু। খবরটা শব্দ কইরা পড়ো আমি শুনি! খবরটা তৃতীয় পাতায়।

ফরিদ খবরের কাগজ হাতে নিল। তার হাত সামান্য কাঁপছে। সে সব পাতাই খুঁজে পাচ্ছে, তৃতীয় পাতাটা খুঁজে পাচ্ছে না। প্রণব বের করে দিলেন। ফরিদ পড়তে শুরু করল।

গরুর হাতে গরুচোরের মৃত্যু।
(নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত)
ধর্মপাশা অঞ্চলের কুখ্যাত গরুচোর আবুল কাশেমের মৃত্যু হইয়াছে গরুর হাতে। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, আবুল কাশেম জনৈক গৃহস্থের বাড়ি হইতে একটি বলশালী ষাড় চুরি করিয়া হাওরের জনশূন্য প্রান্তর দিয়া দ্রুত পালাইতেছিল। এর মধ্যে তার ধূমপানের নেশা জাগ্রত হয়। সে ষাড়ের দড়িটি নিজের কোমরে বাঁধিয়া একটি বিড়ি ধরায়। দেয়াশলাইয়ের আগুন দেখিয়া গরু চমকাইয়া ছুটিতে শুরু করে। এবং গৃহস্থের বাটিতে উপস্থিত হয়। দেখা যায় দড়ির একপ্রান্তে গরুচোরের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ। কুখ্যাত গরুচোরের মৃত্যুতে অত্র অঞ্চলে

স্বস্তির সুবাতাস বহিতেছে। ফরিদ খবর পড়া শেষ করে চিন্তিত চোখে হাবীবের দিকে তাকাল। হাবীব বললেন, খবরটায় একটা বড় ভুল আছে। ভুলটা কী?

ফরিদ বলল, বলতে পারব না স্যার।

হাবীব প্রণবের দিকে তাকালেন। প্রণব মাথা চুলকে বললেন, আমিও পারব না।

হাবীব বললেন, দেয়াশলাইয়ের আগুন দেখে ভয় পেয়ে গরু দৌড়াতে শুরু করল। এই খবরটা নিজস্ব সংবাদদাতাকে কে দিল? চোর দিতে পারবে না, সে মৃত। তাহলে খবরটা দিতে পারে গরু নিজে। তার পক্ষে কি খবরটা দেওয়া সম্ভব?

এখন ভুল বুঝতে পেরেছ?

ফরিদ হা-সূচক মাথা নাড়ল। হাবীব বললেন, ফরিদ, তোমাকে এই ভুলের কথা বলার পেছনে একটা কারণ আছে। যাতে তুমি আমার বিচার বিবেচনায় আস্থা রাখতে পারো। যাতে বুঝতে পারে যে, আমার সিদ্ধান্তে ভুল থাকে না। আমি তোমার বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি কিছুদিন জেল খাটবা। রাজি আছ?

ফরিদ বলল, আপনি যা বলবেন তা-ই করব।

হাবীব বলেন, অনোর অপরাধে জেল খাট। ভাতে তোমার লাভ ছাড়া ক্ষতি কিছু হবে না। ব্রহ্মপুত্র নদীর দক্ষিণ দিকে কুড়ি বিঘা ধানি জমি পাইবা। তার সঙ্গে নগদ পাঁচ হাজার টাকা। রাজি আছ?

ফরিদ বলল, আপনি যা করতে বলবেন আমি করব। টাকা বা জমি লাগবে। আপনি একটা কাজ করতে বলতেছেন এ-ই যথেষ্ট।

হাবীব বললেন, টাকা-জমি অবশ্যই লাগবে। তুমি বিবাহ করেছ। তোমার সংসার হয়েছে। জেল থেকে বের হয়ে তুমি রাজার হালে জীবন কাটাবে। আশ্রিত জীবন কাটাতে হবে না।

ফরিদ বলল, কতদিন জেলে থাকতে হবে স্যরি?

হাবীব বললেন, খুব বেশি হলে পাঁচ বছর। এখন তুমি বলো, একজন মানুষের জীবনে পাঁচ বছর কি খুব বেশি সময়?

জি-না স্যার।

ঘটনাটা মন দিয়ে শোনো, তুমি একজনের অ্যাসিসটেন্ট। তোমার যে মুনিব তার শিকারের শখ। তিনি ভোরবেলা শিকারে যাবেন। তোমাকে দুনলা বন্দুক পরিষ্কার করতে বললেন। তখন দুর্ঘটনা ঘটল। বন্দুক থেকে গুলি বের হয়ে গেল। একজন মারা গেল।

ফরিদ বলল, যিনি মারা গেলেন তার নাম কী স্যার?

হাবীব বললেন, তার নাম দিয়ে তোমার প্রয়োজন নাই। জীবিত মানুষের নামের প্রয়োজন, মৃত মানুষের নামের প্রয়োজন নাই। আদালতে দুর্ঘটনার মামলা হবে। সাজা পাঁচ বৎসরের বেশি হওয়ার কোনো কারণ নাই।

ফরিদ বলল, সাজা বেশি হলেও কোনো ক্ষতি নাই স্যার।

হাবীব বললেন, প্রণব আজ বিকালে তোমাকে জমি দেখাবে। জমি তোমার স্ত্রীর নামে আগামীকাল রেজিস্ট্রি হবে। জেল থেকে বের হয়ে এসে তুমি ঘর তুলে থাকবে।

হাবীব প্রণবকে ইশারা করলেন। প্রণব উঠে গেলেন। ড্রয়ার থেকে টাকার বান্ডিল বের করলেন। পাঁচ টাকার নোটে পাঁচ হাজার টাকা। হাবীব বললেন, টাকা ভালোমতো গুণে দেখা।

ফরিদ বলল, গুণতে হবে না স্যার।

হাবীব বললেন, অবশই গুণতে হবে।

ফরিদ টাকা গুণছে। হাবীব প্রণবের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, আরেকটা পান দাও। দোতলা থেকে হাজেরা বিবি চেঁচাচ্ছেন, ও হাবু! হাবুরে! হাবু কই গেলি? হাবীব বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকালেন।

হাজেরা বিবির কাছে নাদিয়া উপস্থিত হয়েছে। নাদিয়া বলল, দাদি, কী হয়েছে?

হাজেরা বিবি বললেন, আমার খাটের নিচে আজরাইল বইসা আছে।

নাদিয়া বলল, উনাকে কী করতে বলব? চলে যেতে বলব? না-কি খাটের উপর এসে বসতে বলব?

হাজেরা বিবি কঠিন গলায় কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না। হেসে ফেললেন। নাদিয়া বলল, হাসছ কেন দাদি?

হাজেরা বিবি বললেন, তোর বদামি দেইখা হাসলাম। তুই বিরাট দুষ্ট হইছস।

নাদিয়া বলল, তুমিও অনেক দুষ্ট দাদি। সারাক্ষণ সবাইকে ভয় দেখানোর চেষ্টা। আজরাইল আজরাইল। দিনেদুপুরে আজরাইলের কথা বললে কি কেউ ভয় পাবে? নিশিরাতে বলে দেখতে পারো।

আমারে বুদ্ধি দিবি না। আমার বুদ্ধির প্রয়োজন নাই।

হাজেরা বিবি নাতনিকে হাতের ইশারায় পাশে বসতে বললেন। নাদিয়া বসল। হাজেরা বিবি বললেন, গোপন কথা শুনতে মন চায়? এমন এক গোপন কথা জানি, শুনলে শইলের সব লোম খাড়ায়া যাবে।

নাদিয়া বল, গোপন কথা শুনতে চাই না।

শুনতে চাস না কেন? আসল মজা গোপন কথার মধ্যে।

নাদিয়া বলল, দাদি, একেকজনের আসল মজা একেকরকম। মা’র আসল মজা রান্নাবান্নাতে, বাবার মজা প্যাঁচ খেলানোয়।

হাজেরা বিবি বললেন, এমন কেউ কি আছে যার কোনো মজা নাই?

থাকতে পারে। আমি জানি না।

নাদিয়া উঠে দাঁড়াল। হাজেরা বিবি বললেন, যাস কই? ঠান্ডা হইয়া বস। গফ করি।

নাদিয়া বলল, আমি বারান্দার কাঠের চেয়ারে ঠান্ডা হয়ে বসব। বারান্দায় বসে আমি অনেক মজা পাই।

কী মজা পাস?

বারান্দায় বসে সবাইকে দেখি। কেউ আমাকে দেখে না। এর অন্যরকম মজা।

হাজেরা বিবি বললেন, আমারে সাথে নিয়া চল। আমি তোর সাথে মজা দেখব।

নাদিয়া দাদিকে হাত ধরে খাট থেকে নামাল। নাদিয়ার কাধে ভর দিয়ে তিনি দোতলার বারান্দায় চলে এলেন। টানা বারান্দার একপ্রান্তে তিনটা ভারী হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ার। বারান্দা ঘেঁসে কাঠালগাছ। প্রাচীন এই গাছ বারান্দায় অশ্রু তৈরি করেছে। বারান্দায় কেউ বসেছে কি না, চট করে বোঝা যায় না।

হাজেরা বিবি বসতে বসতে বললেন, কী মজা দেখাবি দেখা।

নাদিয়া বল্ল, ওই দেখো রশিদ ভাই। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।

হাজেরা বিবি বললেন, এটা দেখার মধ্যে মজা কী?

একটা মানুষ গাছের মতো দাঁড়িয়ে আছে, এটা দেখার মধ্যে মজা আছে না? মানুষ তো গাছ না। সে কতক্ষণ এইভাবে থাকে কী করে এইটাই আমরা দেখব।

তুই পাগলি আছস।

আমরা সবাই পাগল। একেকজন একেকরকম পাগল। তুমি হচ্ছ সেয়ানী পাগল।

হাজেরা বিবি এখন রশিদের ব্যাপারে কিছুটা আগ্রহী হয়েছেন। তিনি বিস্মিত গলায় বললেন, ঘটনা তো সত্য। এই হারামজাদা ঝিম ধইরা আছে কী জন্যে?

হে চায় কী? ডাক দিয়া জিগা।

ডেকে জিজ্ঞেস করলে তো দেখার মজাটা থাকবে না। দাদি, এখন পুকুরঘাটের দিকে তাকাও। দেখো একজন বই পড়ছে। তার নাম হাসান রাজা।

হাজেরা বিবি বললেন, এই হারামজাদা এখনো আছে?

নাদিয়া বলল, সবাইকে হারামজাদা বলছ কেন?

হাজেরা বিবি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, যে হারামজাদা তারে হারামজাদা বলব না। মহারাজা বলব? নিজের বাপরে গুলি কইরা মারছে। বাপ নামাজে বসছে, তখন দু’নলা বন্দুক দিয়া গুলি দিচ্ছে। ঠাস ঠাস।

নাদিয়া বলল, এইসব কী বলছ দাদি?

হাজেরা বিবি বললেন, বাতাসে ভাইস্যা যা কানে আসে তা-ই বলি। আগ বাড়ায়া কেউ আমারে কিছু বলে না। রশিদ হারামজাদাটা গেল কই?

নাদিয়া বলল, আমরা যখন দিঘির ঘাটের দিকে তাকিয়ে ছিলাম তখন সে চলে গেছে।

গেছে কোনদিকে?

সেটা তো আমি জানি না দাদি।

হাজেরা বিবি বললেন, জানা দরকার।

কেন জানা দরকার?

এতক্ষণ খাম্বার মতো খাড়ায়া ছিল, ফুড়ুৎ কইরা চইলা গেল। কই গেল জানা দরকার না?

নাদিয়া প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, হাসান রাজা নামের এই যুবক নিজের বাবাকে গুলি করে মেরেছে এটা কি সত্য?

তোর বাপরে জিজ্ঞাস কইরা জান, সত্য না মিথ্যা। তোর বাপু অবশ্য মিছা কথার বাদশা। সমানে মিছা বলবে। তার চউক্ষের দিকে তাকায়া থাকবি মিছা বলার সময় তোর বাপের চউখ পিটপিট করে। আচ্ছা রশিদ হারামজাদা তো আর বাইর হইতেছে না। চিন্তার বিষয় হইল।

নাদিয়া বলল, ঘরে চলো দাদি।

হাজেরা বিবি বললেন, ঘরে যাব না। এইখানে বইসা থাকব।

আমি চলে যাই।

যা ইচ্ছা কর।

নাদিয়া দোতলা থেকে একতলায় নামল। রান্নাঘরের দরজা ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। লাইলী বলল, ধুয়ার মধ্যে থাকিস না মা। গায়ের রঙ ময়লা হয়ে যাবে।

নাদিয়া বলল, তুমি তো জীবনের বেশির ভাগ সময় রান্নাঘরে কাটিয়ে দিয়েছ, তোমার গায়ের রঙ কাচাহলুদের মতো।

লাইলী বললেন, বিয়ের আগে কুমারী মেয়েদের গায়ে ধুয়া লাগলে গায়ের রঙ ময়লা হয়। বিয়ে হয়ে যাবার পর আর রঙ বদলায় না।

নাদিয়া হাসছে। লাইলী বললেন, হাসছিস কেন?

নাদিয়া বলল, তোমার উদ্ভট কথা শুনে হাসছি। তুমি এমন একজনকে কথাগুলি বলছ যে ফিজিক্সের ছাত্রী। এবং ফেলটুসমার্কা ছাত্রী না। খুব ভালো ছাত্রী।

লাইলী বললেন, রান্নাঘর থেকে যা তো মা।

নাদিয়া বের হলো। রওনা হলো দিঘির ঘাটের দিকে। সে ঠিক করেছে প্রথম দিনের মতো নিঃশব্দে যাবে। তাকে দেখে মানুষটা যখন চমকে উঠবে তখন সে ঠান্ডা গলায় বলবে, আচ্ছা আপনি কি আপনার বাবাকে গুলি করে মেরেছেন?

নাদিয়া দিঘির খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। ঘাটের সিঁড়িতে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে মানুষটা বই পড়ছে। তার চোখে পানি। বানানো দুঃখের গল্পে যে অশ্রুবর্ষণ করে সে প্রিয়জনদের দুঃখে কখনো অশ্রুবর্ষণ করবে না।—কথাটা যেন কার? কিছুতেই মনে পড়ছে না। মানুষটা কী বই পড়ছে জানতে ইচ্ছা করছে। ম্যাথমেটেশিয়ান আবেল (Abel) অংকের জটিল কোনো বই পড়লে মুগ্ধ হয়ে অবর্ষণ করতেন।

কেমন আছেন?

মানুষটা ঠিক ওইদিনের মতো চমকে উঠল। তার হাত থেকে বই পড়ে গেল। বইয়ের নাম তিথিডোর। লেখক বুদ্ধদেব বসু। এই বই নাদিয়ার পড়া নেই। বইটা পড়তে হবে।

নাদিয়া বলল, আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি।

হাসান বলল, বসুন।

নাদিয়া বসতে বসতে বলল, দিঘির এই ঘাটটা মনে হয় আপনার খুব পছন্দ?

হাসান বলল, জি।

আপনাদের নিজের বাড়িতে কি এরকম ঘাট আছে?

হাসান বলল, দিঘির ঘাট নেই, তবে হাওরের সঙ্গের ঘাট আছে। আমাদের বাড়ির পেছনে ঘাট। বর্ষার সময় এই ঘাটটা আমার কাছে তাজমহলের চেয়েও সুন্দর মনে হয়।

আপনি কি তাজমহল দেখেছেন?

দেখেছি। আমাদের বাড়িটাও খুব সুন্দর। বাড়ির নামটাও সুন্দর। কইতরবাড়ি।

কী বাড়ি?

কইতরবাড়ি। কইতর হলো কবুতর। বাড়িটার নানান খুপড়িতে শত শত কবুতর বাস করে। আপনি যদি দোতলার বারান্দায় কাকতাড়ুয়ার মতো দুই হাত মেলে দাঁড়ান দুই হাতে কবুতর এসে বসবে। বকম বকম করে ডাকতে থাকবে। কী যে সুন্দর দৃশ্য।

নাদিয়া অবাক হয়ে গল্প শুনছে। অবাক হবার প্রধান কারণ হাসান নামের মানুষটার নিজের বাড়ি সম্পর্কে মুগ্ধতা।

হাসান বলল, আমি আপনাকে অনুরোধ করব এক রাত আমাদের বাড়িতে থেকে আসতে। একবার যদি যান বাকিজীবন এই বাড়ির কথা আপনার মনে থাকবে। স্বপ্নেও আপনি এই বাড়ি দেখবেন।

নাদিয়া বলল, আমি যাব। আচ্ছা আপনার বাবা কি বেঁচে আছেন?

হাসান বলল, হ্যাঁ। উনি এখন ময়মনসিংহেই আছেন। আমি বাবাকে বলব যেন আপনাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। আমি সঙ্গে যেতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু আমি সঙ্গে যেতে পারব না।

পারবেন না কেন?

আমি বিরাট এক ঝামেলায় পড়েছি। ঝামেলা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না।

কথা বলতে না চাইলে কথা বলতে হবে না। আচ্ছা শুনুন, তিথিভোর’ বইটা আপনার পড়া শেষ হওয়ার পর আমাকে দেবেন। আমি পড়ে দেখব চোখের পানি ফেলার মতো কী আছে। এখন পর্যন্ত কেনো গল্পের বই পড়ে আমার চোখে পানি আসেনি।

হাসান বলল, বইটা আপনি নিয়ে যান। আপনি পড়ে শেষ করার পর আমি পড়ব। প্লিজ।

নাদিয়া হাত বাড়িয়ে বই নিল। হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল, এখন আপনি ঘাট ছেড়ে চলে যান। আপনি যেখানে বসে যে ভঙ্গিতে বইটা পড়ছিলেন আমি সেইভাবেই পড়ব। আপনি সর্বশেষ কোন পাতাটা পড়ছিলেন বের করে দিন। আমি পাতাটা ভাজ করে রাখব। দেখব এই পাতাটা পড়ার সময় চোখে পানি আসে কি না।

হাসান পাতা বের করতে করতে বলল, আপনি প্রণব বাবুকে জোনাকির ঝাঁকে জোনাকির সংখ্যা গুনতে বলেছিলেন। আমি তিনটা ঝাক গুনেছি। একটাতে জোনাকির সংখ্যা সতেরো, একটাতে নয়, আরেকটাতে পাঁচ।

নাদিয়া বলল, সব বেজোড় সংখ্যা? আশ্চর্য তো!

হাসান বলল, সাতরা পাখি বলে একধরনের পাখি আছে, এদের দলে সব সময় সাতটা পাখি থাকে। তার কমও না, তার বেশিও না।

নাদিয়া বলল, তাই না-কি?

হ্যাঁ তাই।

এটা আমি জানতাম না। আপনার কাছে কি তাশ আছে? খেলার তাশ।

হাসান আশ্চর্য হয়ে বলল, না তো।

নাদিয়া বলল, দুই প্যাকেট তাশ জোগাড় করে রাখবেন। আমি তাশের ম্যাজিক দেখাব? এখন চলে যান।

সন্ধ্যা সাতটা।

ফরিদ পাবলিক লাইব্রেরিতে। ক্ষিতিশ বাবুর সামনের চেয়ারে বসে আছে। সে ক্ষিতিশ বাবুর জন্যে গরম সিঙ্গাড়া এবং আলুর চপ নিয়ে এসেছে। ক্ষিতিশ বাবু অবাক হয়ে তাকালেন। ফরিদ বলল, আমার নিজের রোজগারের টাকায় কিনা। আপনি খান।

রোজগার শুরু করেছ?

জি।

উত্তম। অতি উত্তম।

ফরিদ নিচুগলায় বলল, আপনার জন্যে একটা ধুতি কিনে এনেছি। যদি নেন খুবই খুশি হব।

ক্ষিতিশ বাবু সিঙ্গাড়া মুখে দিতে দিতে বললেন, তোমাকে একটা প্রশ্ন করব। প্রশ্নের জবাব দিতে পারলে নিব। জবাব দিতে না পারলে ধুতি নিয়া বাড়িত যাবা। প্রশ্নটা হলো—বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাবের নাম কী?

ফরিদ বলল, সিরাজউদ্দৌলা।

ক্ষিতিশ বাবু বললেন, হয় নাই। শেষ স্বাধীন নবাবের নাম মীর কাশেম।

মীর কাশেম?

হ্যাঁ মীর কাশেম। ক্লাইভের গর্ধব মীর জাফরের পর মীর কাশেম সিংহাসনে বসেন। তিনি ইংরেজবিদ্বেষী স্বাধীনচেতা নবাব ছিলেন। পড়াশোনা করার এই এক লাভ। আমজনতা যেটা জানবে তার চেয়ে বেশি জানা।

ফরিদ বলল, জেলখানায় কি লাইব্রেরি আছে?

ক্ষিতিশ বাবু চোখ সরু করে বললেন, জেলখানার লাইব্রেরির খোঁজ নিচ্ছে কেন? জেলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?

জি।

কী অপরাধে জেলে যাবে?

খুনের অপরাধে।

ক্ষিতিশ বাবু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। হতভম্ব ভাব কাটিয়ে বললেন, কাকে খুন করেছ?

ফরিদ বলল, যাকে খুন করেছি তার নাম জানি না।

কীভাবে খুন করেছ? গলা টিপে?

গুলি করেছি।

কী কারণে গুলি করেছ?

বন্দুক পরিষ্কারের সময় হঠাৎ গুলি বের হয়েছে।

কোথায় খুন করেছ?

বেশ কিছু সময় চুপ করে থেকে ফরিদ বলল, কোথায় খুন করেছি আমি জানি না।

ফরিদ যে শুধু ক্ষিতিশ বাবুর জন্যে ধুতি কিনেছে তা নয়, সে তার স্ত্রীর জন্যে লালপাড় টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি কিনেছে। প্রণবের জন্যে ঘিয়া রঙের চাদর কিনেছে।

প্রণব চাঁদর হাতে নিয়ে বললেন, তোমার খরচের হাত খারাপ না। আজ টাকা পেয়েছ, আজই বাজারসদাই শুরু করেছ। কথায় আছে—

হাতে আসছে টাকা
এক দিনে ফাঁকা
দুই দিনে ধার
তিন দিনে গঙ্গা পাড়।

যাই হোক, চাদরটা ভালো কিনেছ। একটা চাদরের প্রয়োজনও ছিল! ভগবান তোমার মঙ্গল করুক। ভগবান আমার কথায় কিছু করবে না। নিজের ইচ্ছায় যদি করে।

ফরিদের স্ত্রী সফুরা শাড়ি কোলে নিয়ে বসে আছে। ফরিদ বলল, রঙ পছন্দ না হলে বদলায়ে দিবে।

সফুরা বলল, রঙ পছন্দ হয়েছে।

রঙ পছন্দ হলে মুখ বেজার কেন?

বুঝতেছি না কেন।

ফরিদ টাকার বান্ডেল এগিয়ে দিতে দিতে বলল, এখানে দুইশ কম পাঁচ হাজার টাকা আছে। তোমার কাছে রাখো। ইচ্ছামতো খরচ কোরো।

টাকা কই পেয়েছেন? চুরি করেছেন?

না। রোজগার করেছি।

কী কাজ করে রোজগার করলেন?

একটা মানুষ খুন করে টাকাটা পেয়েছি। ঘটনা আরেকদিন বলব। আজ না। এখন যাও, নয়া শাড়ি পইরা আসো। তোমারে দেখি।

আপনি মানুষ ভালো।

সব মানুষই ভালো। অতি মন্দ মানুষের মধ্যেও থাকে অতি ভালো। মন্দ এবং ভালো মিলে সমান সমান হয়। আমার কথা না। বই পড়ে শিখেছি।

কথা ঠিক না। বই পইড়া ভুল কথা শিখেছেন। একজন মন্দ মানুষের সবটাই মন্দ। একজন ভালো মানুষের সবটা ভালো। আমার দিকে তাকায়ে দেখেন। আমার সবটাই মন্দ। চেহারা শুধু সুন্দর।

যাও শাড়িটা পরে আসো। নয়ন ভইরা দেখি। বেশিদিন তোমারে দেখব না।

সফুরা উঠে গেল। অসময়ে স্নান করল। সময় নিয়ে সাজতে বসল। ফরিদ নামের অতি ভালো মানুষটার সামনে আজ সে পরী সেজে দাঁড়াবে। গুনগুন করে একটা গীতও করবে–

মন পবনের নাওয়ের মাঝি
কই তোমারে কথা
তোমারে না। আমি
দুঃখ বারতা…

গীত শুনে মানুষটা চমকাবে। কারণ সফুরা যে গীত জানে মানুষটা জানে না।

০৭. লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ

ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে যখন প্রথম পড়তে আসি তখন আমার বাবা এক সন্ধ্যায় আমাকে ডেকে কিছু উপদেশ দিলেন। তাঁর উপদেশের সারমর্ম হচ্ছে—এখন তোমার পূর্ণ স্বাধীনতা। তোমাকে দেখার কেউ নেই। হলে একা একা থাকবে। যা তোমার করতে ইচ্ছা করে করবে। ছাত্ররাজনীতিতে জড়াবে না। আমি দরিদ্র পুলিশ ইন্সপেক্টর, আমি যেন বিপদে না পড়ি।

আমি বললাম, আচ্ছা।

বাবা বললেন, তোমার বুদ্ধি ভালো, মেধা ভালো। আমি চাই তুমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিবে। CSP হবে। কোনো একসময় আমার এলাকা তুমি পরিদর্শনে আসবে। তখন আমি তোমাকে স্যালুট দিব।

মা বিরক্ত হয়ে বললেন, এইগুলি কী ধরনের কথা! বাপ ছেলেকে স্যালুট করবে কোন দুঃখে?

বাবা বললেন, এইসব তুমি বুঝবে না আয়েশা। বাপ-ছেলের কোনো বিষয়, এটা হলো অফিসারের সঙ্গে অফিসারের বিষয়।

বাবা আমাকে চিঠি লিখতেন ইংরেজিতে। সেইসব চিঠির উত্তরও আমাকে ইংরেজিতে লিখতে হতো। যাতে CSP পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে আমার ইংরেজিটা সড়গড় হয়। তাঁকে ইংরেজিতে চিঠি লেখায় সমস্যা ছিল। তিনি প্রতিটি ভুল লালকালিতে দাগিয়ে আমার কাছে ফেরত পাঠাতেন।

তিনি কঠিন পাকিস্তানভক্ত অফিসার ছিলেন। তিনি তার এই ভক্তি কিছুটা হলেও আমার মধ্যে ঢুকাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার মতো আমার কাছেও মনে হতো, লৌহমানব আয়ুব খান একজন যোগ্য শাসক। পূর্বপাকিস্তানের নেতারা ঝামেলা ছাড়া আর কিছু চিন্তা করতে পারেন না। তাদের কারণেই দেশের শান্তি বিনষ্ট হয়। অগ্রগতি থমকে যায়।

বাবার ধারণা নেতাদের মধ্যে মাওলানা ভাসানী কিছুটা ছাড় পেতে পারেন, কারণ হুজুরের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে। এই ক্ষমতার মাধ্যমে তিনি দেশের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় আগেভাগে জেনে ফেলেন। পুলিশের স্পাই হিসেবে একবার বাবাকে দীর্ঘসময় মাওলানা ভাসানীর সহযাত্রী হিসেবে ট্রেনভ্রমণ করতে হয়েছে। এই ট্রেনযাত্রাই তার জন্যে কাল হলো। মাওলানা ভাসানীর জন্যে তাঁর হৃদয়ে কোমল স্থান তৈরি হলো। তিনি বলা শুরু করলেন, মাওলানা ভাসানীকে সাধারণ হিসাবে ফেলা যাবে না। তিনি অনেক বেফাঁস কথা বলবেন, সেই বেফাঁস কথাই আসল কথা।

আমি বাবার আদর্শে নিজেকে তৈরি করার চেষ্টা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়লাম। সব পিতাই অন্যায়ভাবে সন্তানের মধ্যে নিজের ছায়া দেখতে চান। ইঞ্জিনিয়ার পিতা পুত্রকে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করেন। ডাক্তার পিতার ছেলে ইচ্ছা না থাকলেও ডাক্তারি পড়ে। পাশ করার পর বেজার মুখ করে রোগী দেখে। কসাইয়ের ছেলে আশা করে তার ছেলে হবে বিখ্যাত কসাই। আধঘণ্টায় গরুর চামড়া ছিলে কেটেকুটে ফেলবে।

আমি ঠিক করলাম, বাবার কিছু কথা শুনব। কিছু শুনব না। ছাত্ররাজনীতি থেকে দূরে থাকতে হবে, এই কথাটি অবশ্যই শুনব। ছাত্ররাজনীতির নামে গুণ্ডামি আমাকে দারুণ আহত করেছিল। একটি উদাহরণ দেই। তখন শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট ছিলেন ড. মুশফিকুর রহমান। তার টেলিফোনটি চলে গিয়েছিল NSF এর গুণ্ডা খোকার ঘরে। খোকার বক্তব্য—আপনার চেয়ে আমার টেলিফোন বেশি দরকার।

প্রভোস্ট তেলতেলা হাসি দিয়ে বললেন, অবশই অবশ্যই।

খোকা বলল, কোনো জরুরি কল করতে হলে আমার এখানে চলে আসবেন সার।

অবশ্যই আসব। অবশ্যই। ধন্যবাদ।

সেই মাতাল সময়ে ছাত্রদের রাজনৈতিক বিভাজন ছিল এরকম—

ক) ছাত্র ইউনিয়ন। যারা এই দলে ধরেই নেওয়া হতো তাদের মধ্যে মেয়েলিভাব আছে। তারা পড়ুয়া টাইপ। রবীন্দ্রনাথ তাদের গুরুদেব। এরা পাঞ্জাবি পরতে পছন্দ করে। গানবাজনা, মঞ্চনাটক জাতীয় অনুষ্ঠানগুলিতে উপস্থিত থাকে। এদের ভাষা শুদ্ধ। নদীয়া শান্তিপুর স্টাইল। যে-কোনো বিপদআপদে দ্রুত স্থানত্যাগ করতে এরা পারদর্শী। মিছিলের সময় পালানোর সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে এরা পেছনদিকে থাকে।

এই দলটির আবার দুটি ভাগ। মতিয়া গ্রুপ, মেনন গ্রুপ। এক দলের ওপর দিয়ে চীনের বাতাস বয়, আরেক দলের ওপর দিয়ে রাশিয়ার বাতাস বয়।

খ) ছাত্রলীগ। পড়াশোনায় মিডিওকার এবং বডি বিল্ডাররা এই দলে। এই সময়ে তাদের প্রধান কাজ এনএসএফ-এর গুণ্ডাদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেদের সামনে তারা খানিকটা হীনমন্যতায় ভোগে। মারদাঙ্গায় এবং হলের ক্যানটিনে খাবার বাকিতে খাওয়ায় এরা বিশেষ পারদর্শী।

গ) ইসলামী ছাত্রসংঘ। মওদুদীর বই বিলিয়ে ‘দীনের দাওয়াত দেওয়া এদের অনেক কাজের একটি। পূর্বপাকিস্তানকে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করা, মসজিদভিত্তিক সংগঠন করা এদের কাজ। দল হিসেবে এরা বেশ সংঘটিত। কথাবার্তা মার্জিত। অনেকের বেশ ভালো পড়াশোনা আছে।

ঘ) এনএসএফ। প্রধান এবং একমাত্র কাজ সরকারি ছাতার নিচে থেকে গুণ্ডামি করা। সরকার এদের ওপর খুশি। কারণ এদের কারণে অন্য ছাত্র সংগঠনগুলি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না।

এই জাতীয় কোনো সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার প্রশ্নই আসে না। আমি পড়াশোনা নিয়ে থাকি। বিকেলে ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে ছয় আনা খরচ করে দু’টা গরম গরম সিঙ্গারা এবং এককাপ চা খেয়ে শরিফ মিয়ার কেন্টিনের সঙ্গে লাগোয়া পাবলিক লাইব্রেরিতে ঢুকে যাই। গল্প-উপন্যাস পড়ি। ঘড়ির কাটার দিকে খেয়াল রাখি। সন্ধ্যা মিলানো মাত্র হলে ফিরে এসেই গ্লাস হাতে হলের ডাইনিং রুমে ঢুকে যাই। প্রথম ব্যাচে খেয়ে ফেলা।

একরাতে খেতে বসেছি। আমার পাশে কালো কিন্তু সুদর্শন এক যুবক বসেছেন। প্লেটে ভাত নিয়ে অপেক্ষা করছি—বেয়ারা মাংসের বাটি (হলের ভাষায় কাপ) এনে দুজনার সামনে রাখল। কাপে থাকবে অতি ক্ষুদ্র দুই পিস মাংস, এক পিস আলু।

আমি মাংসের বাটিতে হাত দিয়ে মাংস নিচ্ছি। আমার পাশে বসা যুবক আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার তাকিয়ে থাকার অর্থ কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হলো। আমার বাটিভর্তি মাংস! ভুল করে এই যুবকের কাপ আমি টেনে নিয়েছি। এই যুবক NSF এর পাতিগুণ্ডাদের একজন। তার জন্যে আলাদা ব্যবস্থা।

আমি বললাম, ভাই ভুল করে ফেলেছি।

যুবক বললেন, অসুবিধা নাই। খান।

আমি বললাম, আপনি বেয়ারাকে বলুন। আপনার জন্যে আবার আসবে।

প্রয়োজন নাই।

আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনার নামটা কি জানতে পারি?

আমার নাম মনিরুজ্জামান। আমি ইতিহাসে এমএ পড়ি। আপনাকে আমি চিনি। আপনার নাম হুমায়ূন আপনি ম্যাজিক দেখান এবং ভূত নামান, হিপনোটাইজ করেন। এইগুলা কি সত্যি পারেন?

আমি বললাম, পারি।

একদিন করে দেখাবেন?

অবশ্যই।

এই মনিরুজ্জামানের আরেক ভাইয়ের নাম আসাদুজ্জামান। তিনি আমাদের এক সহপাঠিনীর প্রেমে পড়েছিলেন। প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করার জন্যে প্রায়ই কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে আসতেন। রসায়ন বিভাগের শিক্ষকরা তখন সমাজশাসকের ভূমিকা পালন করতেন। একটা ছেলে একজন মেয়ের সঙ্গে রসায়ন বিভাগে কথা বলবে তা হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ছিল— প্রক্টর যদি কোনো ছেলেমেয়েকে গল্প করতে দেখেন, তাহলে ফাইন করা হবে। ফাইনের পরিমাণ পাঁচ টাকা। কোনো ছেলের যদি কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলা বিশেষ জরুরি হয়, তাহলে প্রক্টরকে তা জানাতে হবে। প্রক্টর একটা তারিখ দেবেন। সেই তারিখে প্রক্টরের উপস্থিতিতে দুজনকে কথা বলতে হবে।

আমি যতদূর জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আইন এখনো বদলানো হয়নি। যাই হোক, মনিরুজ্জামানের ভাই আসাদুজ্জামানকে প্রায়ই রসায়ন বিভাগের আশেপাশে শুকনা মুখে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যেত। রসায়ন বিভাগের একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে বেচারা অতি বিব্রত অবস্থায় ছিল। এই আসাদুজ্জামানের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে কবি শামসুর রাহমান তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘আসাদের শার্ট’ লেখেন। আয়ুব গেটের নাম পাল্টে নাম রাখা হয় আসাদ গেট। সেই গল্প যথাসময়ে বলা হবে।

পরিস্থিতি বৈরী হলে শামুক তার নিজের খোলসের মধ্যে ঢুকে যায়। আমার কাছে পরিস্থিতি বৈরী মনে হলো। চলমান উত্তপ্ত ছাত্ররাজনীতির বাইরে নিজেকে নিয়ে গেলাম। বিচিত্র এক খোলস তৈরি করলাম। সেই খোলস ম্যাজিকের খোলস, চক্র করে ভূত নামানোর খোলস। তখন হাত দেখাও শুরু করলাম। হাত দেখে গড়গড় করে নানান কথা বলি। যা বলি তাই না-কি মিলে যায়।

এক শুক্রবারের কথা। নাপিতের দোকানে চুল কাটাতে যাব, আমাকে হলের বেয়ারা বলল, আপনাকে একজন ডাকে।

কে ডাকে?

অ্যাসিসটেন্ট হাউস টিউটর সাহেবের ঘরে যান। দেখলে চিনবেন।

তোমার নাম বলতে অসুবিধা কী?

অসুবিধা আছে।

অ্যাসিসটেন্ট হাউস টিউটরের ঘরে ঢুকে আমার বুকে ছোটখাটো ধাক্কার মতো লাগল। পাচপাত্তুর একজনকে নিয়ে বসে আছে। পাচপাত্তুর অতি ভদ্র গলায় বললেন, শুনেছি আপনি ভালো হত দেখতে পারেন। হাত দেখে দিন।

পাচপাত্তুরের হাতে গোমেদ পাথরের আংটি। আমি বললাম, আপনি গোমেদ ব্যবহার করবেন না।

পাথর চিনেন?

হ্যাঁ। আপনার সামনে মহাবিপদ। মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেলে আপনি বহুদূর যাবেন।

মহাবিপদ কবে?

সেটা বলতে পারছি না।

আমার বিয়ের বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন?

আমি বললাম, আপনার হাত দেখে মনে হচ্ছে আপনি বিবাহিত।

ঠিক আছে আপনি যান। আপনার কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন। কেন্টিনে আমি বলে দিব, ফ্রি খাবেন।

আমি বললাম, তার দরকার হবে না।

ছাত্রলীগের নেতাগোছের একজন রাত দশটায় আমার ঘরে উপস্থিত। কথাবার্তা, হাভভাব খুবই উগ্র।

হুমায়ূন আপনার নাম?

জি।

ছাত্র ইউনিয়ন করেন?

জি-না।

তাহলে কী করেন?

পড়াশোনা করি।

হাত দেখে টাকা নেন?

হাত দেখি, তবে টাকা নেই না।

আমার হাত দেখে দিন।

রাত দশটার পর আমি হাত দেখি না।

কেন?

আমি বললাম, হাত দেখায় আমার যে গুরু তাঁর নাম বেনহাম। উনি রাতে হাত দেখা নিষেধ করে গেছেন।

বেনোম কোন দেশের?

জার্মানির।

উনি আপনার গুরু হলেন কীভাবে?

তাঁর বই পড়ে হাত দেখা শিখেছি। কাজেই তিনি আমার গুরু।

আপনি মানুষকে হিপনোটাইজ করতে পারেন বলে শুনেছি। এটা কি সত্যি?

সত্যি।

আমাকে হিপনোটাইজ করুন। যদি করতে না পারেন আপনার খবর আছে।

আমি মহাবিপদে পড়লাম। হিপনোটাইজের আমি কিছুই জানি না। একজন ম্যাজিশিয়ানকে স্টেজে হিপনোটাইজ করতে দেখেছি। পুরোটাই আমার কাছে ভাওতাবাজি মনে হয়েছে। ম্যাজিশিয়ান দর্শকদের ভেতর থেকে একজনকে চেয়ারে বসালেন। তার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ হাত দিয়ে পাস দিলেন। তারপর বললেন, এখন হাজার চেষ্টা করলেও আপনি আর চেয়ার থেকে উঠতে পারবেন না। ভদ্রলোক অনেক চেষ্টা করলেন, চেয়ার থেকে উঠতে পারলেন না। দর্শকদের মধ্যে হাসির ফোয়ারা। আমি নিশ্চিত, যাকে মঞ্চে ডাকা হয়েছে তিনি ম্যাজিশিয়ানের নিজের লোক। হিপনোটাইজ হবার ভান করেছে। ম্যাজিকের ভাষায় এদের বলে ‘কনফিডারেট’।

ছাত্রলীগের পাণ্ডা আমার সামনে চেয়ারে বসা। তার চোখমুখ চোয়াল সবই শক্ত। সে খড়খড়ে গলায় বলল, কই শুরু করেন।

আমি বাধ্য হয়ে স্টেজে দেখা ম্যাজিশিয়ান যা যা করেছিলেন তা করতে শুরু করলাম। একপর্যায়ে বললাম, এখন আপনি চেয়ারের সঙ্গে আটকে গেছেন। হাজার চেষ্টা করলেও চেয়ার থেকে উঠতে পারবেন না।

জগতে অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, আরেকটি ঘটল। ছাত্রলীগের পাণ্ডা চেয়ার থেকে উঠতে পারে না। সে হতভম্ব। তার সঙ্গের সাঙ্গপাঙ্গরা হতভম্ব। সবচেয়ে হতভম্ব আমি নিজে।

যথেষ্ট হয়েছে, এখন ঠিক করে দিন।

আমি বললাম, এখন আমি দু’বার হাততালি দিব। হাততালির শব্দ শোনার পর উঠতে পারবেন।

দু’বার হাততালি দিলাম, তারপরেও কিছু হলো না। আমি ভয়ে অস্থির হয়ে পড়লাম। কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। বিপদ এইদিক দিয়ে আসবে তা কখনো ভাবিনি।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হবে। তার শরীর চেয়ারে বসা অবস্থায় বেঁকে লোহার মতো শক্ত হয়ে গেছে। সেই অবস্থাতেই চ্যাংদোলা করে তাকে পাঁচতলা থেকে নামানো হলো। আমাকে অপরাধী হিসেবে সঙ্গে যেতে হলো। মহসিন হলের গেটে বিরাট জটলা–এক স্যার বেঁকে গেছে।

ডাক্তাররা বললেন, যে-কোনো কারণেই হোক শরীরের কিছু কিছু মাসল শক্ত হয়ে গেছে। তারা মাসল Relax করার ইনজেকশন দিলেন। আমি একমনে দোয়া ইউনুস পড়তে লাগলাম।

তখন জানতাম না, বইপত্র পড়ে এখন জানি–মানুষকে হিপনোটাইজ করা কঠিন কর্ম না। মানুষের মস্তিষ্কের একটা অংশ সাজেশান নেওয়ার জন্যে তৈরি থাকে। অতি প্রাচীন সময়ে বিপদসংকুল জীবনচর্যায় লিভারের প্রতি আনুগত্য বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত ছিল। আমাদের জিনে এই বিষয়টি ঢুকে গেছে। হিপনোটিস্ট লিডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তার কথা মস্তিষ্ক মেনে নেয়। তিনি যখন সাবজেক্টকে ঘুমিয়ে পড়তে বলেন, সাবজেক্ট ঘুমিয়ে পড়ে। তিনি যখন সাবজেক্টকে বলেন, তুমি চেয়ারের সঙ্গে আটকে গেছ। সে আটকে যায়।

হিপনোটিজমের ঘটনায় মহসিন হলের ছাত্রমহলে আমি বিশেষ এক সমীহের স্থান দখল করলাম। ছাত্রদের প্রতিভা প্রদর্শন অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখিয়ে এবং ডিআইটি ভবনে যখন টিভি কেন্দ্র ছিল সেখানে ম্যাজিক দেখিয়ে আমি ক্ষেত্রটা প্রস্তুত করে রেখেছিলাম।

আমাকে এখন আর কেউ ঘটায় না। আমি মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে মানুষের মাথার খুলি এনে চিকন সুতা দিয়ে আমার ঘরের এককোনায় ঝুলিয়ে দিলাম। দেয়ালের রঙ সাদা, সুতার রঙও সাদা। ব্ল্যাক আর্টের মতো তৈরি হলো। হঠাৎ দেখলে মনে হতো, মানুষের মাথার একটা খুলি শূন্যে ভাসছে। বেশ কয়েকজন এই দৃশ্য দেখে ছুটে ঘর থেকে বের হয়েছে। আর ঢোকেনি। [এক গভীর রাতে এই খুলি চাপা গলায় আমাকে ডাকল, এই ছেলে। এই। ভয়াবহ আতঙ্কে শরীর জমে গেল। পরদিনই আমি খুলি ফেরত দিয়ে এলাম। অন্য কোনো সময়ে এই গল্প বলা যাবে।]

সম্পূর্ণ নিজের ভুবনে আমি তখন সুখে আছি। মাঝে মাঝে কবিতা লেখার ব্যর্থ চেষ্টাও চলে। মিল আসে তো ছন্দ আসে না। ছন্দ এলে মিল আসে না। বাইরের অশান্ত পরিস্থিতির সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমি আছি আমার আপন ভুবনে।

বাইরের অশান্ত পরিস্থিতি বিষয়ে একটু বলি। অশান্তির শুরুটা পশ্চিম পাকিস্তানেলান্ডিকোটাল নামের এক বাজারে। বেশকিছু ছাত্র সেখানে গিয়েছে (নভেম্বর, ১৯৬৮)। কী কর্ম করেছে কে জানে, তবে সেখান থেকে ফেরার পথে চোরাচালানের কিছু মালামাল নিয়ে ফিরেছে। ল্যান্ডিকোটাল চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। তাদের মালামাল বাজেয়াপ্ত করে।

ছাত্ররা শুরু করে গ্রেফতার করা ছাত্রদের মুক্তির আন্দোলন। জুলফিকার আলি ভুট্টো এই সুযোগ হাতছাড়া করেন না। তিনি তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। আয়ুববিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষে আবদুল হামিদ নামের পলিটেকনিকের সতেরো বছরের এক ছাত্র নিহত হয়। আবদুল হামিদ আয়ুববিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহিদ।

আয়ুব খান নিরাপত্তা আইনে প্রচুর ছাত্র গ্রেফতার করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। তার প্রমাণ, আয়ুব খান পেশোয়ারে পৌঁছলে ছাত্ররাই তাকে স্বাগত জানায়। তিনি বক্তৃতা দিতে মঞ্চে উঠলে হঠাৎ হাসিম উমর জাই নামের এক ছাত্র তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে সভা পণ্ড হয়ে যায়।

হাসিম উমর জাইকে গ্রেফতার করা হয়। সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলে—দীর্ঘদিন জনগণকে নির্যাতনকারী অত্যাচারীকে খুন করতে না পেরে আমি দুঃখিত।

লৌহমানব আয়ুব খানের মধ্যে তখন তাম্রমানব ভাব প্রকাশিত হয়। তিনি রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করা শুরু করেন। জুলফিকার আলি ভুট্টো এবং ওয়ালি খানকে দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হয়।

পূর্বপাকিস্তানের অবস্থা তখন মোটামুটি শান্ত। পশ্চিম পাকিস্তানে গ্রেফতার হওয়া ছাত্র এবং রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির দাবিতে সংগ্রামী ছাত্র সমাজ ১৯ নভেম্বর বায়তুল মোকাররমের সামনে একটি সভা করে। সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর সদস্য জনাব মফিজুর রহমান। অনেকের মধ্যে বক্তৃতা করেন ছাত্রলীগের আব্দুর রউফ।

২২ নভেম্বর পূর্বপাকিস্তানের কিছু কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী পশ্চিম পাকিস্তানের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন কবি জসিম উদ্দীন, বেগম সুফিয়া কামাল, কবি শামসুর রাহমান, কবি হাসান হাফিজুর রহমান, কবি ফজল শাহাবুদ্দিন, জনাব আবদুল গাফফার চৌধুরী, লেখক শহীদুল্লাহ কায়সার।

পূর্বপাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে প্রায় সবাই তখন জেলে। যেমন শেখ মুজিবুর রহমান, শ্রী মণি সিং, তোফাজ্জল হোসেন, শ্রী সত্যেন সেন, ছাত্র নেতা জনাব নুরে আলম সিদ্দিকী, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন।

পশ্চিম পাকিস্তানে যে আন্দোলনের সূত্রপাত পূর্বপাকিস্তানে সেই আন্দোলন শুরুতে প্রায় এককভাবেই শুরু করেন মাওলানা ভাসানী। এই অদ্ভুত মানুষটিকে নিয়ে লেখা কবি শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতাটি উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না।

সফেদ পাঞ্জাবি

শিল্পী, কবি, দেশী কি বিদেশী সাংবাদিক,
খদ্দের, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবিকা,
নিপুণ ক্যামেরাম্যান, অধ্যাপক, গোয়েন্দা, কেরানি,
সবাই এলেন ছুটে পল্টনের মাঠে, শুনবেন
দুর্গত এলাকা প্রত্যাগত বৃদ্ধ মৌলানা ভাসানী
কী বলেন। রৌদ্রালোকে দাঁড়ালেন তিনি, দৃঢ়, ঋজু,
যেন মহা-প্লবনের পর নূহের গম্ভীর মুখ
সহযাত্রীদের মাঝে ভেসে ওঠে, কাশফুল-দাড়ি
উত্তুরে হাওয়ায় ওড়ে। বুক তাঁর বিচূর্ণিত দক্ষিণ বাংলার
শবাকীর্ণ হু-হু উপকূল, চক্ষুদ্বয় সংহারের
দৃশ্যাবলিময়, শোনালেন কিছু কথা, যেন নেতা
নন, অলৌকিক স্টাফ রিপোর্টার।…

এখন গল্পাংশে ফিরে যাই। গল্পপিপাসু পাঠকরা রাজনীতির গল্প শুনতে চান না। সত্য তাঁদের আকর্ষণ করে না। তাদের সকল আকর্ষণ মিথ্যায়।

ছুটির দিনের এক দুপুর। বাইরে ঝাঝালো রোদ। দুপুরটা কীভাবে কাটাব বুঝতে পারছি না। ঘরে থাকতে ইচ্ছা করছে না, আবার ঘরের বাইরে যেতে ইচ্ছা করছে না। হলের দারোয়ান এসে খবর দিল আমার কাছে একজন ছাত্রী এসেছে। গেস্টরুমে বসে আছে।

কে আসবে আমার কাছে? শার্ট গায়ে দিয়ে চিন্তিত মুখে নিচে নামলাম। যে মেয়েটি বসে আছে তাকে চেহারায় চিনি, নামে চিনি না। আমরা একসঙ্গে ম্যাথমেটিকস সাবসিডিয়ারি ক্লাস করি। সে পড়ে ফিজিক্সে। শ্যামলা মেয়ে। তার চেহারায় এবং চোখে এমন এক আশ্চর্য সৌন্দর্য আছে যে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। এই তাকিয়ে থাকার জন্যে কোনোরকম লজ্জাবোধও হয় না।

মেয়েটি বলল, আমরা একসঙ্গে ম্যাথ সাবসিডিয়ারি করি।

আমি বললাম, জি।

শুনেছি আপনি খুব ভালো হাত দেখেন। আমি হাত দেখাতে এসেছি।

আমি বললাম, গেস্টরুমে আমি আপনার হাত ধরে যদি হাত দেখি বিরাট সমস্যা হবে।

মেয়েটি বলল, আপনাকে আমার হাত ধরতে হবে না। আমি দুই হাতের ছাপ কাগজে নিয়ে এসেছি।

আমি বললাম, ছাপ কীভাবে নিলেন?

মেয়েটি বলল, স্ট্যাম্পের কালি হাতে মেখে সেই কালি দিয়ে ছাপ দিয়েছি। ছাপগুলি আপনি রেখে দিন। আপনি অবসর সময়ে ধীরেসুস্থে দেখবেন। পরে আপনার কাছে শুনব। আর এই খামটা রাখুন।

খামে কী আছে?

একটা চিঠি আছে। আর কিছু না। আচ্ছা আমি যাই।

আমি খাম খুললাম। সম্বোধনহীন একটা চিঠি। সেখানে লেখা—

আমার নাম নাদিয়া। আমি আপনার সঙ্গে ম্যাথ সাবসিডিয়ারি করি। আপনার যেমন ম্যাজিকে আগ্রহ আমারও তাই। টেলেন্ট শোতে আমি আপনার Antiqravity খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আপনি খুব মন দিয়ে আমার হাতের ছাপ পরীক্ষা করবেন। আমি শুধু একটা জিনিসই জানতে চাই। আমার পছন্দের একজন মানুষ আছেন। তাকে কি আমি বিয়ে করতে পারব?

ক্লাসে শুরুর দিকে আপনি একটা লাল শার্ট পরে আসতেন। এই শার্টে আপনাকে খুব মানাত। এখন আপনাকে এই শার্ট পরতে দেখি না। হয়তো শার্টটা চুরি হয়ে গেছে, কিংবা নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে একশটা টাকা আছে। আপনি অবশ্যই একটা লাল শার্ট কিনবেন। আপনি যেমন নেত্রকোনার ছেলে, আমিও নেত্রকোনার মেয়ে। ধরে নিন আমি আপনার একজন বোন। বোন কি তার ভাইকে একটা শার্ট কিনে দিতে পারে না? আমি হিন্দু মেয়ে হলে রাখি পাঠিয়ে আপনাকে ভাই বানাতাম। দিল্লির সম্রাট হুমায়ূনকে এক রাজপুত রানী রাখি পাঠিয়ে ভাই পাতিয়েছিল।

ইতি

নাদিয়া।

একশ টাকা খরচ করে আমি লাল শার্ট কিনলাম না। দামি রেডিওবন্ড কিছু কাগজ কিনলাম। এই কাগজে কবিতা লেখা হবে। একটা ফাউনটেন পেন কিনলাম। কবিতা ভালো কলমে লেখা হবে। আমার জীবনের প্রথম কবিতা নাদিয়ার দেওয়া টাকায় কেনা কলমে লেখা হয়েছে। আমার রচনার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা এই কবিতাটির সঙ্গেও পরিচিত।

দিতে পারো একশ ফানুস এনে
আজন্ম সলজ্জ সাধ
একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই।।

০৮. হাবীব খানের বাড়িতে মাওলানা এসেছেন

হাবীব খানের বাড়িতে মাওলানা এসেছেন। তিনি ময়মনসিংহ জামে মসজিদের পেশ ইমাম। নাম মাওলানা তাজ কাশেমপুরী। জনশ্রুতি আছে, তিনি একটি জ্বিন পালেন। জিনের নাম খামজী। জ্বিনের মাধ্যমে তিনি জ্বিনের দেশ থেকে গাছগাছড়ার ওষুধ এনে চিকিৎসা করেন। খামজার সঙ্গে না-কি জ্বিনের বাদশার সখ্য আছে। জ্বিনের বাদশা তার প্রিয় একজনকে মানুষের হাতে বন্দি দেখে ক্ষুব্ধ। মাওলানা তাজ কাশেমপুরী কঠিন লোক বলেই এখনো কিছু করে উঠতে পারছে না। তবে যে-কোনো সময় অঘটন ঘটবে। মাওলানা তাজ কাশেমপুরী অত্যন্ত সাবধানে জীবনযাপন করেন। পুকুরে বা নদীতে গোসল করেন না। মানুষকে পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে মারতে জ্বিনরা না-কি পারদর্শী। তিনি তোলা পানিতে গোসল করেন। গলায় একটা তাবিজ পরেন। তাবিজটা আল্লাহর এক অলি স্বপ্নে তাকে দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে তিনি ঘুমুতে গেছেন, তখন স্বপ্নে দেখেন সাদা আলখাল্লা পরা এক সুফী দরবেশ তাঁকে বলছেন, তাজ! জ্বিনের বাদশার হাত থেকে সাবধান। একটা তাবিজ তোকে দিলাম। সবসময় গৃলায় পরে থাকবি। না হলে মহাবিপদ। মাওলানা তাজের ঘুম ভাঙল। তিনি দেখেন, তার হাতের মুঠিতে রুপার এক তাবিজ। সেই থেকে তিনি তাবিজ গলায় পরছেন।

মাওলানাকে আনা হয়েছে দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে ফু দেওয়ার জন্যে। সিঁড়ির শেষ ধাপে অনেকবার হাবীবের পা পিছলিয়েছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে ঘটতে ঘটেনি। তার ধারণা সিড়ির এই ধাপে দোষ আছে। দোষ কাটানোর ব্যবস্থা।

মাওলানা তাজ কাশেমপুরী সিড়িতে ফু দিলেন। একটা তাবিজ সিড়ির রেলিং-এ বেঁধে সিঁড়ি বন্ধন দিয়ে ঘোষণা করলেন, ‘দোষী’ জিনিসটা থাকে পুকুরঘাটে। সেখান থেকে উড়ে আসে। জিনিসটা যথেষ্ট শক্তিধর। তাকে পুকুরঘাট থেকে বিদায় করা যাবে না। তবে সে যেন মূলবাড়িতে আসতে না পারে সেই ব্যবস্থা তিনি করে দিচ্ছেন। তবে বাড়ির মেয়েদের চুলখোলা অবস্থায় এবং হয়েজ-নেফাজ চলাকালে পুকুরঘাটে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। খারাপ জিনিস মেয়েদের খোলা চুলের মুঠি ধরে বাড়িতে ঢোকে।

নাদিয়া বাবার পাশে দাঁড়িয়ে মাওলানার কথা শুনছিল। সে বিরক্ত গলায় বলল, খারাপ জিনিস বলতে কী বোঝাচ্ছেন?

মাওলানা বললেন, এটা একটা হাওয়া। খারাপ হাওয়া।

এর জীবন আছে?

অবশ্যই আছে। তবে তাদের জীবন এবং মানুষের জীবন একরকম না। মানুষ খাদ্যগ্রহণ করে, এরা খাদ্যগ্রহণ করে না।

নাদিয়া বলল, যার জীবন আছে তার মৃত্যুও আছে। এরা কি মারা যায়?

হাবীব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, মা, চুপ কর তো। সব বিষয় নিয়ে কথা বলা ঠিক না।

নাদিয়া বলল, একটা খারাপ জিনিস আমাদের পুকুরঘাটে বসে থাকবে, আর তার বিষয়ে জানতে চাইব না—এটা কেমন কথা! আমি এখনই এলোচুলে একা পুকুরঘাটে যাব। কিছুক্ষণ পুকুরঘাটে বসে থাকব। তারপর ঘরে ফিরব। খারাপ জিনিসটা আমার চুলের মুঠি ধরে ঘরে ঢুকবে। তখন তাকে আমি শায়েস্তা করব।

হাবীব বললেন, কীভাবে শায়েস্তা করবি?

নাদিয়া বলল, আমি কানে ধরে তাকে উঠবোস করাব।

হাবীব গম্ভীর হয়ে রইলেন। প্রণব শব্দ করে হেসে ফেলে চারদিকের পরিস্থিতি দেখে হাসি সামলানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। হাবীব বললেন, মা, ঘরে যা।

নাদিয়া বলল, আমি ঘরে যাব না। আমি পুকুরঘাটে যাব।

সে সত্যি সত্যি সিড়ি বেয়ে নামতে থাকল। হাবীবের মনে হলো মেয়েকে কঠিন ধমক দেওয়া প্রয়োজন। ধমক দিতে পারলেন না। বাইরের একজন মানুষ আছে। তাছাড়া মেয়েটার সাহস দেখে তার ভালো লাগছে।

মাওলানা তাজ বললেন, উচ্চশিক্ষার কিছু কুফল আছে জনাব। প্রধান কুফল মুরুব্বিদের অবাধ্য হওয়া। ধর্মশিক্ষা না হলে এটা হয়।

হাবীব বললেন, আমার মেয়ের ধর্মশিক্ষা আছে। তাকে মুনশি রেখে কোরানপাঠ শিখানো হয়েছে। প্রতি রমজান মাসে সে কোরান খতম দেয়।

মাওলানা বললেন, আপনার মেয়ে সত্যি সত্যি পুকুরঘাটে গিয়েছে, এটা চিন্তার বিষয়। আমি একটা তাবিজ পাঠায়ে দিব। চেষ্টা নিবেন যেন তাবিজটা পরে। আমার কেন জানি মনে উঠছে, আপনের মেয়ের উপর খারাপ বাতাসের নজর আছে। লক্ষণ বিচারে সেরকম পাই।

হাবীব বললেন, তাবিজ পাঠিয়ে দিবেন। আমি ব্যবস্থা করব যেন সে পরে।

সময় সন্ধ্যামাখা বিকাল। নাদিয়া ঘাটে, পানিতে পা ডুবিয়ে বসেছে। পুকুরভর্তি শাপলা ফুল। ফুল রাতে ফোটে। দুপুরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

নাদিয়া মাথার বাঁধা চুল খুলে দিতে দিতে মনে মনে বলল, আয় খারাপ বাতাস আয়। আমার চুল ধরে ঝুলে পড়। তোকে আমি নিজের ঘরে নিয়ে পুষব।

এই সময় একটা ঘটনা ঘটল। হঠাৎ নাদিয়া দেখল, শাপলা ফুলের ঝাঁকের মধ্যে একটি ডুবন্ত মেয়ের মুখ। মেয়েটির চোখ খোলা। সে পানির ভেতর থেকে নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

নাদিয়া বিকট চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে ঘাটে পড়ে গেল। বাড়ির প্রায় সবাই। ছুটে এল। সবার আগে উপস্থিত হলেন প্রণব। তিনি অজ্ঞান নাদিয়াকে কোলে তুলে নিলেন।

হাবীব বললেন, কী সর্বনাশ! মাওলানা সাহেবকে আবার খবর দাও। ডাক্তার ডাকো।

নাদিয়ার জ্ঞান ফিরল এক ঘণ্টা পর। ততক্ষণে বাড়িতে কোরান পাঠ শুরু হয়েছে। মাদ্রাসার একদল তালেবুল এলেম এসে দোয়া ইউনুস খতম দিচ্ছে। এক লক্ষ পঁচিশ হাজার বার এই দোয়া পাঠ করা হবে।

হাবীব শম্ভুগঞ্জ থেকে ভাইপীরকে আনতে লোক পাঠালেন। যত রাতই হোক ভাইপীর যেন উপস্থিত হন। হাবীব একটা গরু সদগার ব্যবস্থা করলেন।

নাদিয়ার মা জায়নামাজে বসলেন। মেয়ের জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত তিনি জায়নামাজ ছেড়ে উঠবেন না।

নাদিয়ার জ্ঞান ফিরল রাত আটটা পঁচিশ মিনিটে। সে বাবার একটা হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। সে থরথর করে কাঁপছে। হাবীব বললেন, মা, আর কোনো ভয় নাই। ভাইপীর সাহেব চলে এসেছেন। তিনি এখনো দোয়াতে আছেন।

নাদিয়া বলল, বাবা, আমি ভয় পেয়েছি। আমি খুব ভয় পেয়েছি।

হাবীব বললেন, আর ভয় নাই মা। আমার সারা দুনিয়া একদিকে আর তুমি একদিকে। কেন ভয় পেয়েছ বলতে চাও? বলতে না চাইলে বলতে হবে না।

নাদিয়া বলল, বাবা, দিঘির পানির নিচ থেকে একটা মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। মেয়েটা মৃত না বাবা, জীবিত। মেয়েটা চোখের পাতা ফেলছিল। মেয়েটা খুব সুন্দর। গায়ের রঙ কাঁচা হলুদের মতো।

থাক, আর বলার দরকার নাই। তোমার মা আজ সারা রাত তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকবে।

হাজেরা বিবি তখন থেকে ‘ও হাবুরে, ও হাবুরে’ বলে চিৎকার করছেন। তার কাছে কেউ নেই। সবাই নাদিয়াকে ঘিরে আছে। তার চিৎকার সবাই শুনেও শুনছে না।

হাবীব মায়ের ঘরে ঢুকলেন। হাজেরা বিবি বললেন, শুনলাম তোর মেয়ে নাকি মারা গেছে?

হাবীব বিরক্ত হয়ে বললেন, কেন ক ডাক ডাকো? নাদিয়া মারা যাবে কেন? সে ভালো আছে, সুস্থ আছে। একা পুকুরঘাটে গিয়েছিল। সেখানে কী দেখে যেন ভয় পেয়েছে।

কী দেখছে?

কী দেখেছে সেটা জানার কোনো প্রয়োজন নাই মা।

অবশ্যই প্রয়োজন আছে। বল কী দেখছে?

হাবীব বললেন, সে দেখেছে দিঘির পানির নিচে একটা মেয়ে। নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

হাজেরা বিবি বললেন, এক্ষণ দিঘিতে জাল ফেলার ব্যবস্থা কর।

জাল ফেলতে হবে কেন?

হাজেরা বিবি বললেন, কোনো এক মাইয়ারে খুন কইরা দিঘির পানিতে ফেলছে। নাদিয়া দেখছে মরা লাশ। জাল ফেলার ব্যবস্থা কর।

হাবীব মা’র ঘর থেকে বের হলেন। থানায় খবর দিলেন। জাল ফেলার সময় পুলিশের উপস্থিতির প্রয়োজন আছে।

রাত দশটায় জেলেরা পুকুরে জাল ফেলল। ঘাটে চারটা হ্যাজাক লাইট জুলছে। থানার ওসি সাহেব এবং সেকেন্ড অফিসার এসেছেন। তাদের জন্যে ঘাটের কাছে চেয়ার-টেবিল পাতা হয়েছে। তারা অন্ধকারে বসেছেন। সন্ধ্যার পর ওসি সাহেবের সামান্য পানের অভাস আছে। তার জন্যে ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের রিফ্রেশমেন্ট রুম থেকে জিনিস এসেছে। জিনিসের সঙ্গে চিকেন কাটলেট এসেছে। (সে সময় রেলের রিফ্রেশমেন্ট রুমে বিয়ার, ভদকা এবং হুইস্কি পাওয়া যেত।) প্রণব তাদের দেখাশোনা করছেন। ওসি সাহেব বললেন, হাবীব ভাইয়ের ব্যবস্থা নিখুঁত। সবদিকে তাঁর নজর এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার। এই ধরনের মানুষ দেশের লিডার হলে দেশ পাল্টে যেত।

প্রণব বললেন, রাতে কিন্তু স্যার খাওয়াদাওয়া করে তারপর যাবেন। খাসি জবেহ করা হয়েছে। হাজি নূর মিয়া বাবুর্চি চলে এসেছে।

ওসি সাহেব বললেন, তার কোনো প্রয়োজন নাই। যা ব্যবস্থা করে রেখেছেন, তারচেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আর কিছু হতে পারে না।

প্রণব বললেন, স্যার প্রয়োজন আছে। খাওয়াদাওয়ার পর স্যার আপনাকে বিশেষ কিছু কথা বলবেন। জরুরি কথা।

হাবীব ভাই কোথায়? তাঁকে দেখছি না তো।

প্রণব বললেন, গভর্নর সাহেব ঢাকা থেকে টেলিফোন করেছেন নাদিয়ার খোঁজ নিতে। এই নিয়ে ব্যস্ত আছেন।

ওসি সাহেব থতমত খেয়ে বললেন, অবশ্যই। অবশ্যই।

পুকুরে জাল ফেলে কিছুই পাওয়া গেল না। দুটা বিশাল সাইজের কাতল মাছ ধরা পড়ল। গায়ে শ্যাওলা পড়া কাতল। প্রণবের নির্দেশে একটা মাছ ওসি সাহেবের বাসায়, একটা মাছ সেকেন্ড অফিসারের বাসায় চলে গেল।

সেকেন্ড অফিসার ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, জমিদারি আইনের সময় এমন মেহমানদারি দেখেছি, তার পরে দেখি নাই।

রাতের খাবার শেষ হয়েছে। হাবীব ওসি এবং সেকেন্ড অফিসারকে নিয়ে চেম্বারে বসেছেন। প্রণব নিজেও উপস্থিত আছেন। হাবীব বললেন, খানা কি মনমতো হয়েছে ওসি সাহেব?

ওসি আখলাকুর রহমান বললেন, গত দশ বছরে এমন খানা খাই নাই। পেট ফেটে মারা যাওয়ার অবস্থা। হজমি বড়ি খাওয়া লাগবে। এখন হাবীব ভাই বলেন, আপনার জন্য কী করব?

আমার জন্য কিছু করা লাগবে না। আপনাদের সামান্য সাহায্য করতে চাই। কইতরবাড়িতে যে খুন হয়েছে, সেই খুনের আসামিকে আমি খবর দিয়ে এনেছি। ফরিদ নাম। তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যান।

আখলাকুর রহমান প্রণবের দেওয়া পান মুখে দিয়ে সরু চোখে তাকালেন। হাবীব বললেন, প্রণব, ওসি সাহেবকে ঘটনা খুলে বলো। বাড়িতে এত ঝামেলা! পরিষ্কার করে কিছু চিন্তাও করতে পারছি না। বলতেও পারছি না। দুনিয়ার কথা বলার দরকার নাই! সারসংক্ষেপ বলে।

প্রণবের মুখভর্তি পান। তিনি চিলুমচিতে মুখের পান ফেলে দিয়ে বললেন, ফরিদ ছিল হাসান রাজা চৌধুরীর খাস কামলা। উনার কাপড় ধােয়া, হাত-পা টিপে দেওয়া, গোসল দেওয়া সব দায়িত্ব তার। হাসান তাকে নিয়ে পাখি শিকারে যাবেন। বন্দুক পরিষ্কার করতে বললেন। বন্দুক পরিষ্কারের সময় দুর্ঘটনা। আচমকা গুলি বের হয়ে গেল। কাছেই হাসানের মামা ফজরের নামাজে বসেছিলেন। এক গুলিতে শেষ। স্যার, ফরিদকে নিয়ে আসি?

নিয়ে আসুন।

ফরিদ ঘরে ঢুকে জড়সড় হয়ে রইল। তার মাথায় টুপি। পরনে পাঞ্জাবি, হাতে তসবি। সে এতক্ষণ তালেবুল এলেমদের সঙ্গে দোয়া ইউনুস খতম দিচ্ছিল।

আখলাকুর রহমান বললেন, তুমি হাসান সাহেবের খাস লোক?

জি স্যার।

শিকারে যাওয়ার আগে কি উনার বন্দুক আগেও পরিষ্কার করেছ?

জি স্যার।

সেফটি ক্যাচ কাকে বলে?

ফরিদ হতাশ চোখে একবার হাবীবের দিকে আরেকবার প্রণবের দিকে তাকাল।

সেফটি ক্যাচ কী জানো না?

জি-না।

পাখি শিকারের জন্যে ছররা গুলি ব্যবহার হয়। ফায়ার করলে একসঙ্গে অনেক ছোট ছোট গুলি বের হয়। এতে পাখি মরে। মানুষের গায়ে লাগলে মানুষ জখম হয়। মরে না। সেদিন বন্দুকে ছররা গুলির বদলে বুলেট ছিল কী জন্যে?

স্যার, আমি জানি না।

বন্দুকে ট্রিগার থাকে। ট্রিগার চাপলে গুলি বের হয়, এটা তো জানো?

জি স্যার।

তোমার হাসান স্যারের বন্দুকে ট্রিগার কয়টা?

জানি না স্যার।

মোহনভোগ বলে একটা মিষ্টি আছে। মিষ্টিটা কী?

হালুয়া স্যার।

এই হালুয়াকে অল্প আঁচে অনেকক্ষণ জ্বাল দিলে হালুয়ার রস কমে যায়। হালয়া টাইট হয়। থানায় নিয়ে আমরা প্রথম যে কাজ করি, রস কমিয়ে হালয়া টাইট করি। তুমি বন্দুক জীবনে কোনোদিনও দেখো নাই। আর বলছ বন্দুক দিয়ে গুলি করে মানুষ মেরেছ? অপরাধ করেছে অন্য একজন। দোষ নিজের কাঁধে নিচ্ছ। ঘটনা তো এইটা?

ফরিদ হতাশ চোখে হাবীবের দিকে তাকাল।

হাবীব বললেন, ওসি সাহেব ঠিকই ধরেছেন। এইটাই ঘটনা।

আখলাকুর রহমান বললেন, আপনার মতো অতি বুদ্ধিমান লোক এত বড় ভুল করে! আসামি শিখিয়ে পড়িয়ে নিবেন না?

হাবীব বললেন, ওসি সাহেব, শিখানোর জন্যে দায়িত্ব আপনার। আপন