Saturday, July 13, 2024
Homeউপন্যাসমা - ম্যাক্সিম গোর্কি

মা – ম্যাক্সিম গোর্কি

১.০১-০৫ কারখানার বাঁশি

প্রথম খণ্ড

রোজ ভোরে কারখানার বাঁশি বেজে ওঠে তীক্ষ্ণ তীব্র ধ্বনিতে মজুর-পল্লির ধূম্র-পঙ্কিল আর্দ্র বাতাস কম্পিত হয়, আর ছোট ছোট কুঠরি থেকে অবিচ্ছিন্ন ধারায় বেরিয়ে আসে দলে দলে মজুর। অপ্রচুর নিদ্রায় আড়ষ্ট দেহ, কালো মুখ। ঊষার কনে হাওয়া…সংকীর্ণ মেটো পথ…তারই মধ্য দিয়ে চলে তারা গিয়ে ঢুকে পড়ে সেই উঁচু পাথরের খাচাটার মধ্যে, যেটা তাদের গ্রাস করবার জন্য কাদা-ভরা পথের দিকে চেয়ে আছে শত শত হদে তৈলাক্ত চক্ষু বিস্তার করে। পায়ের তলায় কাদা চট চট করতে থাকে কাদাও যেন তাদের ভাগ্য নিয়ে বিদ্রুপ করছে; কানে আসে নিদ্রাজড়িত কণ্ঠের কর্কশ ধ্বনি, ক্রুদ্ধ তিক্ত গালাগালির শব্দ…তারপর সে-সব ডুবে যায় কলের গম্ভীর ধ্বনিতে, বাষ্পের অসন্তোষ-ভরা গর্জনে। কালে কঠিন চিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় পল্লির বহু ঊর্ধ্বে। সন্ধ্যায় কারখানা তাদের ছেড়ে দেয় দগ্ধ-সর্বস্ব ছাইয়ের মতো। আবার তারা পথ বেয়ে চলে…ধোয়া-মলিন মুখ… মেশিন-তেলের বোটকা গন্ধ: ক্ষুধার্ত সাদা দাঁত কিন্তু সজীব, আনন্দপূর্ণ কণ্ঠ। সেদিনকার মতো কঠিন শ্রম-দাসত্ব হ’তে তারা মুক্তি পেয়েছে, এখন শুধু বাড়ি ফেরা, খাওয়া এবং ঘুম।

গোটা দিনটা হজম করে ওই কারখানা। কল মানুষকে ইচ্ছামতো শোষণ করে জীবন থেকে একটা দিন সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়…মানুষ অজ্ঞাতসারে এগোয় তার কবরের দিকে। তবু তারা খুশি… তাড়ি আছে, আমোদ আছে।…আর কি চাই।

ছুটির দিনে মজুরেরা ঘুমোয় দশটা তক…তারপর উঠে সব চেয়ে পছন্দসই পোশাকটি পরে গিজায় যায়…যাবার আগে ধর্ম-বিমুখতার জন্য ছোটদের একচোট ব’কে নেয়। ফিরে এসে পিরগ খায়; তারপর সন্ধ্যাতক ঘুমোয়। সন্ধ্যায় পথের ওপর আনন্দের মেলা বসে। পথ শুকনো হ’ক, তবু ওভার- যাদের আছে পরে বেরোয়…বর্ষা না থাকলেও ছাতা নিয়ে পথে নামে! যার যা আছে তাই নিয়ে সে স্যাঙ্গাতদের ছাড়িয়ে উঠতে চায়। পরস্পর দেখা হলে কল-কাৰখানার কথাই বলে, ফোরম্যানকে গালি দেয়, কল-সংক্রান্ত কথা নিয়েই মাথা ঘামায়। ঘরে ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে কলহ করে, মাঝে মাঝে তাদের নির্মমভাবে মারে। যুবকেরা মদ খায়, এর-ওর বাড়ি আড্ডা দিয়ে ফিরে, অশ্লীল গান গায়, নাচে, কুৎসিৎ কথা উচ্চারণ করে। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে আসে… নোংরা গ, ছেঁড়া পোশাক, ছিন্ন মুখ…কাকে মেরেছে তারই বড়াই, কার কাছে পিটুনী খেয়েছে তারই অপমানের কান্না। কখনো কখনো বাপমা-ই তাদের তুলে আনেন এথ কিংবা তাড়িখানা থেকে, মাতাল অবস্থায়। কটুকণ্ঠে গালমন্দ করেন…স্পঞ্জের মতো মদসিক্ত শরীরে দু’দশ ঘা বসান…তারপর রীতিমতো শুইয়ে দেন…পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙিয়ে কাজে পাঠান।

বহু বছর ব্যাপী অবসাদের ফলে ক্ষুধা-শক্তি তাদের লোপ পেয়েছে… ক্ষুধা উদ্রেক করার জন্য তারা গ্লাসের পর গ্লাস মদ চালায়। ক্রমে মদের মাত্রা চড়ে যায় প্রত্যেকের প্রাণেই মাথা তুলে দাঁড়ায় একটা অবোধ্য পীড়াদারক অসন্তুষ্টি, যা ভাষায় ফুটলতে চায়। এই অশান্তিকর উদ্বেগের

বোঝা হালকা করার জন্যই তারা তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়টি নিয়েও হানাহানি করে হিংস্র পশুর মতো…কখনো আহতাঙ্গ হয়, কখনো মরে। এই প্রচ্ছন্ন হিংস্রতা ধীরে ধীরে বেড়ে চলে জীবনে। তারা জন্মে আত্মার এই পীড়া নিয়ে। এ তাদের পিতৃধন। কালো ছায়ার মতো কবর পর্যন্ত লেগে থাকবে সঙ্গে…জীবনকে করবে উদ্দেশ্যহীন, নিষ্ঠুরতা এবং … পাশবিক উত্তেজনায় কলঙ্কিত!

চিরকাল বছরের পর বছর…জীবন-নদী বয়ে এসেছে এমনি ধারায়। মন্থর, একঘেয়ে তার গতি-পঙ্কিল তার স্রোত। দিনের পর দিন তারা একই কাজ করে চলে রুটিনের মতো জীবনের এ ধারা বদলাবার ইচ্ছে বা অবসর যেন কারো নেই।

নতুন কেউ যখন পল্লিতে আসে, নতুন বলেই দু’চারদিন সে তাদের কৌতুহল উদ্রেক করে। তার কাছে ভিন্মুলুকের গল্প শোনে, সবাই বোঝে, সর্বত্রই মজুরের ঐ এক অবস্থা। নবাগতের ওপর আর কোন আকর্ষণ থাকে না।

মাঝে মাঝে কোন নয়া লোক এসে এমন-সব অদ্ভুত কথা বলে যা’ মজুর-পল্লিতে কেউ কখনো শোনেনি। তারা তার কথা কান পেতে শোনে…বিশ্বাসও করে না, তর্কও করে না। কারো মধ্যে জেগে ওঠে অন্ধ বিক্ষোভ, কেউ হয় ভীত বিব্রত, কেউ হয়ে ওঠে এক অজানা লাভের ক্ষীণ সম্ভাবনায় চঞ্চল। তারা পানের মাত্রা চড়িয়ে দেয়, যাতে এই অনাবশ্যক বিরক্তিকর উত্তেজনা ঝেড়ে ফেলতে পারে। নবাগতকে যেন তারা ভয়ের চোখে দেখে…সে হয়তো তাদের মধ্যে এমন-কিছু এনে ফেলবে যা তাদের সহজ জীবন-স্রোতে তীব্র আলোড়নের সৃষ্টি করবে। তারা আশাই করেনা যে তাদের অবস্থার ও আবার উন্নতি হতে পারে। প্রত্যেক সংস্কারকে তারা সংশয়ের চোখে দেখে…ভাবে, শেষপর্যন্ত এ শুধু তাদের বোঝা বাড়াবে মাত্র। তাই তারা নবাগতদের এড়িয়ে চলে।

এমনি করে মজুরদের পঞ্চাশ বছরের জীবন কেটে যায়।

.

কামার মাইকেল ভ্লাশভের জীবনও কেটে যায় এমনি ধারায়। গম্ভীর কালো মুখ, সন্দেহ-তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ছোট ছোট চোখ, অবিশ্বাস-ভরা হাসি, উদ্ধত ব্যবহার, কারখানার ফোরম্যান এবং সুপারিন্টেণ্ডেন্টকেও কেয়ার করে না, কাজেই কামায় কম। ফি ছুটির দিনে কাউকে মারা চাই; কাজেই পাড়ার সবাই তাকে ভয় করে, অপছন্দ করে। মারতে গিয়েও ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসে। শত্রুর সাড়া পেলেই ভ্লাশভ হাতের কাছে গাছ, পাথর, লোহা যা পায় তাই নিয়ে রুখে দাঁড়ায়। সব চেয়ে ভয়ানক তার চোখদুটো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে যেন লোহার শলাকার মতো শত্রুকে বিদ্ধ করে…সে চোখের সামনাসামনি যে পড়ে সেই বোঝে কী এক হিংস্র ভয়-ডরহীন নিষ্ঠুর জল্লাদের কবলে সে পড়েছে। মুখের ওপরে-এসে-পড়া ঘন চুলের ফাঁকে ফাঁকে তার হলদে দাঁত ভয়ংকরভাবে কম করতে থাকে। দুরহ নারকী কীট-বলে সে তর্জন করে ওঠে…শত্রুদল চকিতে রণে ভঙ্গ দিয়ে গালি দিতে দিতে পালায়। মাথা খাড়া করে সঁতের মধ্যে ছোট গোটা একটা চুরুট চেপে সে তাদের পিছু নেয়, আর চ্যালেঞ্জ করে, কোন্ ব্যাটা মরতে চাস, আয়। কেউ চায়না।

এমনি সে খুব কম কথা বলে, শুধু ‘নারকী কীট’ এই কথাটা তার মুখে লেগেই আছে। কারখানার কর্তাদের থেকে শুরু করে পুলিসদের পর্যন্ত সে ঐ বলে ডাকে। বাড়িতে গিয়ে বউকে পর্যন্ত বলে, ‘নারী কীট’ আমার পোশাক যে ছিঁড়ে গেলো দেখতে পাস না?

তাঁর ছেলে পেভেলের বয়স যখন চৌদ্দ, তখন একদিন তার চুল ধরে টানতে গেলো। পেভেল পলকে একটা হাতুড়ি তুলে নিয়ে বললো, দুয়োনা বলছি।

কী!-পিতা কৈফিয়ৎ তলবের সুরে গর্জে উঠলো।

পেডেল অবিচলিত কণ্ঠে বললো, যথেষ্ট হয়েছে, আর আমি পড়ে পড়ে মার খাচ্ছি না। বলে হাতুড়িটা সে একবার সদর্পে মাথার ওপর ঘোরালো।

পিতা তার দিকে চাইলেন, তারপর লোমবহুল হাত দু’খানা ছেলের পিঠে রেখে হেসে বললেন, বহুৎ আচ্ছা! ধীরে ধীরে তার বুক ভেঙে একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো, বলে উঠলেন, নারকী কীট…

…এর কিছুকাল পরে বউকে একদিন ডেকে বললেন, আমার কাছে আর টাকা চেয়োনা, ছেলেই এবার থেকে তোমায় খাওয়াবে।

স্ত্রী সাহস করে প্রশ্ন করলো, আর তুমি বুঝি মদ খেয়ে সব ওড়াবে?

সে কথায় তোর কাজ কি, ‘নারকী কীট’ কোথাকার!

সেই থেকে মরণ অবধি তিন বছর ছেলেকে সে চোখ চেয়ে দেখেনি, ছেলের সঙ্গে কথা বলেনি।

মরলো সে ভীষণ যন্ত্রণা পেয়ে। পাঁচদিন ধরে বিছানায় গড়াচ্ছে… সমস্ত অঙ্গ কালো হয়ে গেছে দাঁত কটমট করছে…চোখ বোজা! মাঝে মাঝে ব্যথা যখন বড়ই অসহ হয়, বউকে ডেকে বলে, আর্সেনিক দাও, বিষ খাও।

বউ ডাক্তার ডাকলো। ডাক্তার পুলটিশের ব্যবস্থা করলেন, বললেন, অচিরে একে হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্র করা দরকার।

মাইকেল গর্জে উঠলো, গোল্লায় যাও। আমি নিজে নিজেই মরতে পারব ‘নারকী কীট’ কোথাকার।

ডাক্তার চলে গেলে বউ সজল চোখে জেদ করতে লাগলো, অস্ত্র করাও।

সে হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ করে বউকে ভয় দেখিয়ে বললো, কোন্ সাহসে ওকথা বলি; জানিস, আমি ভালো হয়ে উঠলে তোর বিপদ।

ভোরে কারখানার বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই সে মারা গেলো। বউ একটু কঁদলো, ছেলে মোটেই না। পাড়া-পড়শীরা বললো, বউটার হাড় জুড়িয়েছে, মাইকেল মরেছে। একজন বলে উঠলো, মরেনি, পশুর মতো পচতে পচতে জীবনপাত করেছে।

গোর দিয়ে যে যার ঘরে চলে গেলো… দীর্ঘকাল বসে রইলো শুধু মাইকেলের কুকুরটা…কবরের তাজা মাটির ওপর বসে নীরবে সে কার স্নেহ-কোমল পরশের অপেক্ষা করে।

.

১.০২

দু’হপ্তা পরে এক রবিবারে পেভেল বাড়ি ফিরলো মাতাল হয়ে…টলতে টলতে পড়লে গিয়ে ঘরের এক কোনায়-পিতার মতো

টেবিলের ওপর ঘুষি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, মা, খাবার।

মা উঠে গিয়ে তার পাশটিতে বসলেন, হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ছেলের মাথাটা বুকে টেনে নিলেন। ছেলে মাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো, জৰি খাবার!

‘বোকা ছেলে!’ দুঃখ-ভরা মেহ-সজল কণ্ঠে মা তাকে সঙ্গত করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

কোনো মতে জিভটাকে টেনে জড়িতস্বরে পেভেল বললো, আমি তামাক খাবো, বাবার পাইপটা এনে দাও।

এই প্রথম সে মাতাল হয়েছে। মদে তার শরীর নিস্তেজ হয়েছে কিন্তু জ্ঞান লোপ পায়নি। বারে বারে একটা প্রশ্ন তার মগজে এসে ঘা খেতে লাগলো, ‘মাতাল? মাতাল?…মা যত আদর করেন, তত তার অস্থিরতা বাড়ে…মায়ের করুণ দৃষ্টি তাকে ব্যথা দেয়…সে কাঁদতে চায় কিন্তু পারে না।…মাতলামি দিয়ে উদ্যত ক্রন্দনকে রোধ করতে যায়। মা তার চুলে হাত বুলোতে বুলোতে ধীরে ধীরে বলেন, কেন এ কাজ করিস্ বাবা? এ তো তোর কর্তব্য নয়!

সে অসুস্থ হয়ে পড়ে, বমি করে মা তাকে বিছানায় শুইয়ে দেন… ভিজে তোয়ালে দিয়ে উষ্ণ কপাল ঢেকে দেন। সে একটু সুস্থ হয়… কিন্তু তার চারপাশে সব-কিছু যেন দুলছে…তার চোখের পাতা ভারি… মুখে নোংরা টক আস্বাদ। চোখের পাতার মধ্য দিয়ে মায়ের বড় মুখখানির দিকে চায় আর এলোমেলো চিন্তা করে, হয়তো আমার এখনো মদ খাবার বয়স হয়নি। অন্য সবাই খায়, তাদের তো কিছু হয় না… আমি শুধু ভুগি।

দূরে কোনো স্থান থেকে মায়ের কোমল কণ্ঠ ভেসে আসে, তুই মাতাল হলে তোর এ বুড়ো মাকে কি করে খেতে দিবি, বাবা?

চোখ বুজে সে বলে, সবাই তো খায়।

মা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন। ছেলে মিথ্যে বলেনি। তিনি নিজেই জানেন, শুঁড়িখানা ছাড়া আর কোনো স্থান জোটেনা মজুরদের আনন্দ করার…মদ ছাড়া আর কোনো বিলাসিতা তাদের কপালে নেই…তবু বলেন, খানি, খানি, বাবা! তোর বাবা মদ খেয়ে আমাকে জীবন-তোর দুঃখ-দুর্দশায় ডুবিয়ে রেখে গেছেন…তুই তোর মায়ের ওপর দয়া কর। করবিনি, বাবা?

পেভেল মায়ের কোমল-কাতর কথাগুলি কান পেতে শোনে। পিতার জীবদ্দশায় মা ছিলেন নির্যাতিত, উপেক্ষিত, ভীতা…সে কথা মনে পড়ে। পিতার ভয়ে বাইরে বাইরেই ঘুরতো বলে মা যেন তার কাছে প্রায় অপরিচিতই রয়ে গেছেন। আজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মায়ের দিকে চাইলো। লম্বা, ঈষৎ নম্র দেহ দীর্ঘবর্ষব্যাপী শ্রমে এবং স্বামীর নির্যাতনে তা যেন ভেঙে পড়েছে…চলেন নিঃশব্দে, একদিকে ঈষৎ হেলে সর্বদা যেন কোন কিছু থেকে আঘাত পাবার ভয়। প্রশস্ত গোলগাল মুখ…কপালে চিন্তার রেখা…বাধক্যে চর্ম লোল…এক জোড় কালো চোখ উদ্বেগ এবং বিষাদে ভরা…ডান ভুরুতে একটা গভীর কাটা দাগ, ফলে ভুরুটা যেন একটু উঁচুতে ঠেলে উঠেছে… ডান কানটাও একটু লম্বা বাম কানটার চাইতে দেখলে মনে হয়, কান যেন কি শুনবে এই আতঙ্কে উন্মুখ! গভীর কালো চুলের মাঝে মাঝে সাদা সাদা গুচ্ছ, যেন সেগুলি আঘাতের চিহ্ন। কোমল, করুণ বাধ্য…এই মা। দু’চোখ দিয়ে তার জল গড়ায় ধীরে ধীরে।

ছেলে কোমল অনুনয়-ভরা কণ্ঠে বললো, চুপ কর, মা, কেঁদোনা, আমায় জল দাও।

মা উঠলেন, বললেন, বরফজল এনে দিচ্ছি।

কিন্তু মা যখন ফিরলেন তখন সে নিদ্রিত।

পান-পাত্র টেবিলের ওপর রেখে মা নীরবে প্রার্থনা করতে লাগলেন।

বাইরে মজুরদের মাতলামি-ভরা সঙ্গীত, গালাগালি এবং চীৎকার।

আবার দিন বয়ে চললো তেমনি একটানা সুরের মতো…শুধু এ বাড়ি থেকে আগের সে মাতলামি, সে অশান্তি লোপ পেতে লাগলো। পল্লির অন্যান্য বাড়ি থেকে একটু স্বতন্ত্র হয়ে উঠলো।

বাড়িখানি পন্সির এক-প্রান্তে, একটু ঢালু জায়গায়। তিনটি কামরা, …একটি রান্নাঘর, একটি ছোট কুঠরি…মায়ের শোবার ঘর, রান্নাঘর থেকে একটি ছাদ পর্যন্ত উঁচু পার্টিশনে ভিন্ন করা…ঘরের মাত্র এক তৃতীয়াংশ জুড়ে এই দুটো কামরা। বাকিটা একটা চৌকো কামর, তাতে দু’খানা জানালা, কোনায় পেভেলের বিছানা, তার সামনে একটা টেবিল, দু’খানা বেঞ্চি, কয়েকখানা চেয়ার, একটা ছোট আরশিওয়ালা হাত-পোয়র পাত্র, একটা ট্রাঙ্ক, একটা ঘড়ি এবং দু’টো আইকন।

অন্যান্য সবাই যেমন দিন কাটায়, পেভেলও চেষ্টা করেছিলো তেমনি ভাবে দিন কাটাতে। একজন যুবক যা’ করে থাকে, সব-কিছু সে করলো…একটা বেহালা কিনলো, সার্ট, রঙীন নেকটাই, জুতো, ছড়ি-কোন কিছুই আর তার বাদ রইলো না। বাহ্যত সে সমবয়সী অন্যান্য ছেলেদেরই তো…সান্ধ্যভোজে যায় …নাচে…মদ খায়, তারপর মাথার যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে, বুক জ্বলে, মুখ-চোখ মলিন হয়, আবার মা প্রশ্ন করেন, কালকের দিন ভালো কাটলো, বাবা?

ক্ষুব্ধ বিরক্ত হয়ে সে বলে ওঠে, ও গোরস্থানের মতো নীরস সবাই যেন এক-একটা মেশিন…তার চেয়ে মাছ ধরতে কি শিকার করতে যাবো।

কিন্তু তার মাছ ধরাও হয়ে উঠলোনা, শিকার করাও হয়ে উঠলো না।

ধীরে ধীরে সে সকলের চলা-পথ ত্যাগ করে অন্য এক পথে এসে দাঁড়ালো। মজলিসে যাওয়া তার ক্রমশ কমে এলো। ছুটির দিন যদিও সে কোথাও বেরিয়ে যায়, কিন্তু আর কখনো মাতাল হয়ে বাড়ি ফেরে না। মা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে লক্ষ্য করেন, ছেলের চোখ-মুখ যেন কি একটা অনুপ্রেরণায় ক্রমশ গম্ভীর, কঠিন, তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে যেন সবসময়ই তার মন জ্বলছে কোনো কিছুর ওপর ক্রোধে …অথবা যেন একটা গোপন ক্ষত অহর্নিশ তাকে খোঁচাচ্ছে। বন্ধুরা আসতো প্রথম প্রথম…কিন্তু কোনোদিন তাকে বাড়ি না পেয়ে আসা ছেড়ে দিলো। মা ছেলের এই স্বাতন্ত্র দেখে খুশিও হলেন, শঙ্কিতও হলেন। ছেলে এদিকেও টলছে না, ওদিকেও টলছে না, রুটিন-বাঁধা জীবনও তার নয় সে চলেছে দৃঢ় নিষ্ঠায়, অটুট সংকল্পে কোন এক গোপন পথে…তাই মায়ের শঙ্কা।

বাড়িতে সে বই নিয়ে আসতে লাগলো। প্রথম প্রথম সে লুকিয়ে পড়তো, পড়ে লুকিয়ে রাখতো… মাঝে মাঝে বই থেকে অংশবিশেষ কাগজে নকল করে কাগজখানাও লুকিয়ে ফেলতো। মা-ছেলেতে কথাবার্তা বড় একটা হত না। দিনের কাজের শেষে সন্ধ্যায় হাত-মুখধুয়ে খাওয়া শেষ করে ছেলে বই নিয়ে বসতে, অনেক রাত পর্যন্ত পড়া চলতে। ছুটির দিনে ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতো, ফিরতে অনেক রাতে। তার ভাষা মার্জিত হতে লাগলো, মা তার মুখে নতুন অজানা শব্দ শুনে অবাক হয়ে যেতেন। মায়ের শঙ্কা বাড়তো। ছেলে বই আনে, ছবি আনে, ঘর সাজায়, ফিটফাট হয়ে থাকে। মাতলামি নেই, গালাগালি নেই। ছেলে কি সন্ন্যাসী হল?…খুব সম্ভব শহরের কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছে। তাই বা কি করে হবে? তাতে তো মা টাকা দরকার…ছেলে প্রায় সব টাকাই তো এনে মায়ের হাতে দেয়।…

এমনি করে দু বছর কাটলো।

.

একদিন সান্ধ্যভোজের পর পেভেল ঘরের এক কোনে বসে পড়ছে… মাথার ওপর কেরোসিনের ল্যাম্প ঝুলছে…রান্নাঘরের বাসন-পত্র মুক্ত করে মা সন্তর্পণে ছেলের কাছে এসে দাঁড়ালেন। ছেলে মাথা তুলে নিঃশব্দে প্রশ্ন-ভরা দৃষ্টিতে মায়ের দিকে চাইলো।

কিছু না পাশা! এমনি এলুম,-তাড়াতাড়ি চলে গেলেন না এই কথা বলে, কিন্তু চোখে তার উদ্বেগের সুস্পষ্ট ছাপ। এক মুহূর্ত রান্নাঘরে স্থির, চিন্তামগ্ন, অভিনিবিষ্টভাবে দাঁড়িয়ে থেকে হাতমুখ ধুয়ে ফেলে আবার ছেলের কাছে এলেন, বললেন মৃদু-কোমল সুরে, একটা কথা জিগ্যেস করতে চাই, বাবা, দিনরাত সব সময় কেবল পড়িস কেন?

বইথানা একপাশে সরিয়ে রেখে পেভেল বললো, মা, বোসো। মা ছেলের পাশে বসলেন তার দেহ ঋজু হয়ে উঠলো, ভীষণ একটা-কিছু শোনার বেদনাময় উৎকণ্ঠায়। তার দিকে না চেয়েই পেভেল ধীরে কিন্তু দৃঢ়তা-মাখনো সুরে বলতে লাগলো, আমি নিষিদ্ধ বই পড়ছি। এ বই নিষিদ্ধ-কারণ এতে মজুর-জীবনের খাটি ছবি আঁকা। এ বই ছাপা হয় গোপনে…আর আমার কাছে এ বই আছে, এ যদি প্রকাশ পায়, তাহলে আমার জেল হবে—আমার জেল হবে আমি সত্যি জানতে চাই এই অপরাধে।

মার যেন নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে এলো বড় বড় চোখ মেলে ছেলের দিকে তিনি চাইলেন…মনে হল, এ যেন সে ছেলে নয়, এ নতুন… অপরিচিত। ছেলের জন্য দরদে তাঁর বুক ভরে উঠলো, কেন এমন কাজ করিস, বাবা?

মার দিকে চেয়ে শান্ত, গম্ভীর কণ্ঠে পেভেল বললো, আমি সত্য জানতে চাই, মা।

ছেলের শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠস্বরে রহস্য-সংকুল ভীষণ কি একটা সংকল্পের সাড়া পেয়ে মা কি বলবেন ভেবে পেলেন না। তার চোখে নীরব অশ্রু দেখা দিলো।

কেঁদোনা মা।-পেভেলের মৃদু দরদ-ভরা কণ্ঠ মার কানে এসে ঠেকলো বিদায়-বাণীর মতো। পেভেল বলতে লাগলো, মা, ভেবে দেখ দেখি, এ কি জীবন কাটাচ্ছ তুমি! তোমার বয়স চল্লিশ বছর…কিন্তু বাঁচার মতে বাঁচা কি একটা দিনও বেঁচেছ তুমি? বাবা তোমাকে মারতেন। আমি আজ বুঝি, তাঁর জীবন-ভরা দুঃখের ঝাল ঝাড়তেন তোমার গায়ে…দুঃখ তাকে পিষ্ট করে ফেলতো, কিন্তু সে দুঃখের মুল কি, তা তিনি জানতেন না। তিরিশ বছর খেটে গেছেন। কারখানায় যখন সবেমাত্র দু’টি দালান, তখন থেকে তিনি খাটতে শুরু করেন… এখন সেখানে সাত-সাতটা দালান। কল সমৃদ্ধ হয়, কিন্তু মানুষ মরে…কলের জন্য খাটতে খাটতে মরে।…

আতঙ্ক এবং আগ্রহে উন্মুখ হয়ে মা শুতে লাগলেন। ছেলের চোখ জ্বলছে এক অপরূপ সুন্দর দীপ্তিতে। টেবিলের ওপর ঝুকে পড়ে, মার আরো কাছে মুখ নিয়ে তাঁর সজল চোখের দিকে চেয়ে বললো, আনন্দ তুমি কি পেয়েছে জীবনে? তোমার অতীত জীবন মনে রাখার মতো কতটুকু ছিল তাতে?

মা করুণভাবে ঘাড় নাড়তে লাগলেন…দুঃখ এবং আনন্দ মেশানো এক অজ্ঞাত নতুন ভাব তার ব্যথিত উদ্বিগ্ন অন্তরের ওপর ছড়িয়ে পড়লো শান্তি-প্রলেপের মতো। নিজের সম্বন্ধে, নিজ জীবন সম্পর্কে এমন কথা এই প্রথম কানে এলে তাঁর। যৌবনে তার মনেও একদিন আকাঙ্ক্ষা, অতৃপ্তি, বিদ্রোহ ধূমায়িত হয়ে উঠেছিল, কিন্তু তা বহুদিন হল নিঃশেষে চাপা পড়ে গেছে। আজ যেন সেই আগুন নতুন করে উসকে উঠছে। চিরদিন তারা শুধু দুঃখের অভিযোগই করে এসেছে কিন্তু এ দুঃখের কারণ কি, প্রতিকারই বা কি…তা’ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় নি। আজ সে সমস্যার সমাধান করবার মহৎ সংকল্প নিয়ে দাঁড়িয়েছে তার ছেলে… গৌরবে, আনন্দে তাঁর বুক ভরে উঠলো…ছেলের বক্তৃতার মাঝখানে বলে উঠলেন, তা, কি করতে চাও তুমি?

পাঠ করতে হবে এবং পড়ে অন্যকে শিক্ষা দিতে হবে। আমাদের মজুরদের পাঠ করা অত্যন্ত দরকার আমাদের শিক্ষা করতে হবে, বুঝতে হবে, জীবন কেন আমাদের পক্ষে এত দুর্বহ।

মার বলতে ইচ্ছা হ’ল বাছা, তুমি কি করবে? ওরা যে তোমায় পিষে ফেলবে! তোমার প্রাণ যাবে। কিন্তু ছেলের আনন্দের উচ্ছ্বাসে বাধা দিতে সাহস হল না। ছেলে অগ্নিগর্ভ ভাষায় মনের জ্বালা ব্যক্ত করে যায়, মা সচকিত হয়ে নিম্নস্বরে সুধোন, তাই নাকি, পাশা?

হাঁ, মা-ছেলে দৃঢ়স্বরে জবাব দেয়। তারপর মাকে সে বলে সেই সব লোকের কথা, যারা চান শুধু মানুষের মঙ্গল, যারা চান শুধু মানুষের … অন্তরে সত্যের বীজ বপন করতে…এবং এই অপরাধে তারা পশুর মতো হত হন…জেলে যান, নির্বাসন-দণ্ড ভোগ করেন, সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন…মানুষের দুশমন যারা তাদের হাতে। আবেগের সঙ্গে বলে, এমন সব লোক আমি দেখেছি, মা…এঁরা দুনিয়ার সেরা লোক।

মা আবার বলতে যান, তাই নাকি, পাশা? কিন্তু বলা হয় না। তার ছেলেকে এমন সব বিপজ্জনক কথা বলতে শিখিয়েছে যারা, তাদের গল্প শুনে শঙ্কিত হতে থাকেন। ছেলে মার হাত ধরে প্রগাঢ় স্বরে ডাকে, ‘মা!’ মা বিচলিত হন। বলেন, আমি কিছু করবনা বাছা, শুধু তুই সাবধানে থাকিস…সাবধানে থাকি।

কিন্তু কি হতে সাবধানে থাকবে, তা খুঁজে না পেয়ে বলে ফেলেন, তুই বড় রোগা হয়ে যাচ্ছিল। তারপর তার স্নেহ-ভরা দৃষ্টি দিয়ে পুত্রের সুগঠিত দেহখানি যেন আলিঙ্গন করে বলেন, তুই যেমন খুশি চল, আমি বাধা দেবো না, বাবা। শুধু একটা কথা মনে রাখিস আমার, অসতর্ক হয়ে কথা বলিস না…লোকদের নজরে নজরে রাখিস …ওরা সবাই পরস্পরকে ঘৃণা করে অন্যের অনিষ্ট করে খুশি হয়…নিছক আমোদর লোভে মানুষকে পীড়া দেয় যেই তাদের দোষ দিতে যাবি, বিচার করবি, অনি তারা তোকে ঘৃণা করবে,তোর সর্বনাশ করবে।…

দুয়ারের গোড়ায় দাঁড়িয়ে পেভেল মায়ের এই বেদনাময় অভিজ্ঞতার উপদেশ শুনলো। তারপর মার কথা শেষ হলে বললো, জানি, মা, কী শশাচনীয় এই মানুষের দল! কিন্তু যেদিন উপলব্ধি করলুম, পৃথিবীতে একটা সত্য আছে, মানুষ আমার চোখে নতুনতর, সুন্দরতর শ্রীতে দেখা দিলো। শৈশবে আমি মানুষকে শিখেছিলুম ভয় করতে, একটু বড় হয়ে করেছি ঘৃণা…আজ নতুন চোখে দেখছি সবাইকে…সবার জন্যই আজ আমি দুঃখিত। কেন জানিনা, আমার হৃদয় কোমল হয়ে এলো যখন আমি বুঝলুম, মানুষের ভিতর একটা সত্য আছে, পাপ এবং পঙ্কিলতার জন্য সকল মানুষই দায়ী নয়।…

বলতে বলতে পেভেলের কণ্ঠ নীরব হয়… কান পেতে যেন শোনে প্রাণের ভিতরের কি এক অস্ফুট বাণী, তারপর চিন্তা-মন্থর কণ্ঠে বলে ওঠে…এমনি করেই সত্য বেঁচে থাকে।

পেভেল ঘুমোয়, মা তাকে আশীর্বাদ করে নিজের ঘরে চলে যান।

.

১.০৩

মাঝ হপ্তায় এক ছুটির দিনে বেরিয়ে যাওয়ার আগে পেভেল মাকে বলে, মা, শনিবার জনকয়েক লোক আসার কথা আছে এখানে।

কারা?

দু’চারজন এ পল্লিরই লোক…বাকি আসবে শহর থেকে।

শহর থেকে? মাথা নেড়ে মা বললেন, পরক্ষণেই তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

পেভেল ব্যথিত হয়ে বললো, এ কি মা, কাঁদছ কেন? কি হয়েছে?

জামার হাতায় ছোখ মুছে মা বললেন, জানি না, কান্না পাচ্ছে।

ঘরের এদিক-ওদিক পায়চারি করে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে পেভেল প্রশ্ন করলো, ভয় পাচ্ছ, মা?

মা ঘাড় নাড়লেন, শহরের লোক, কে জানে কেমন!…

পেভেল নীচু হয়ে মার দিকে চাইলো, তারপর ঈষৎ আহত এবং ক্রুদ্ধভাবে বললো, এই ভয়ই আমাদের সর্বনাশের মুল যারা কর্তা তারা এই ভয়কে ষোলো-আনা কাজে লাগায়…আমাদের উত্তরোত্তর ভীত করে তোলে। শোন, মা…মানুষ যতদিন ভয়ে কাঁপবে, ততদিন তাকে পচে পচে মরতে হবে…আমাদের সাহসী হতে হবে, আজ সেদিন এসেছে।

তারপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললো, ভয় খাও, আর যা কর, তারা আসবেই।

মা করুণভাবে বললেন, রাগ করিসনি বাবা, কি করে ভয় না পেয়ে থাকি বল…চিরটা জনম আমার ভয়ে ভয়েই কেটেছে।

ছেলে আরও নরম হয়ে বলে, ক্ষমা কন, মা, কিন্তু আমি বন্দোবস্ত বদলাতে পারব না।

.

তিনদিন ধরে মার প্রাণে কাঁপুনি…ভাবেন, যারা আসছে বাড়িতে, না জানি তারা কী ভয়ংকর লোক…তার গা শিউরে ওঠে।

শেষে শনিবার এলো। রাত্রে পেভেল মাকে বললো, মা, আমি একটু কাজে বেরুচ্ছি, ওরা এলে বসিয়ে, বলল, এক্ষুণি আসছি। আর ভয় খেয়ো না; তারাও অন্য সবারই মতো মানুষ।

মা প্রায় মূর্ছিত হয়ে চেয়ারে বসে পড়েন।

.

বাইরে জমাট-বাঁধা অন্ধকার। কে যেন তার মধ্য দিয়ে শিষ দিতে দিতে এগোচ্ছে শব্দ নিকট থেকে নিকটতর হয়ে জানালার কাছে এসে পড়লো… পায়ের শব্দ শোনা গেলো…মা ভীত চকিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন…দোর খুলে গেলে প্রথমে দেখা গেলো, একটি প্রকাণ্ড হ্যাট, তলায় অবিন্যস্ত কেশগুচ্ছ…তারপরে ঢুকলো একটি ক্ষীণ আনতদেহ…দেহকে ঋজু করে ডান হাত তুলে আগন্তুক অভিবাদন করলো, নমস্কার।

মা নীরবে প্রত্যভিবাদন জানিয়ে বললেন, পেভেল ফেরেনি এখনো।

নবাগত নিরুত্তরে নিরুদ্বিগ্নভাবে লোমের কোটটা ছেড়ে রেখে গা থেকে পুঞ্জিত তুষার ঝেড়ে ফেলতে লাগলো। তারপর চারদিক একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে টেবিলের ওপর আরাম করে বসে মার সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলো, এটা কি ভাড়াটে-বাড়ি, না আপনাদের নিজেদের?

ভাড়াটে।

বাড়িটা তো বিশেষ ভালো না।

পাশা এক্ষুণি আসবে, বসো।

বসেছি তো। আচ্ছা, মা, তোমার কপালে ও দাগটা কে করে দিলে?

প্রশ্নকর্তার ঈষৎ হাস্য এবং প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে আহত হয়ে মা একটু কঠিন সুরে বললেন, তা দিয়ে তোমার দরকার কি?

রাগ করো না, মা। আমার মার কপালেও অমন একটা দাগ ছিল;…তাঁর মুচি স্বামী লোহার ফর্মা দিয়ে আঘাত করেছিল কি না…ইনি ছিলেন ধোপানি, উনি ছিলেন মুচি…মাকে যে কী মার মারতেন…ভয়ে আমার গায়ের চামড়া যেন ফেটে যেতে চাইতো।

মা’র রাগ জল হয়ে গেলে এ কথায়। এরপর দুজনের আলাপ জমে উঠলল। মা ভাবলেন, এর মধ্যে যদি আর সবাই হয়!

আগন্তুকের নাম এণ্ড্রি।

এণ্ড্রির পর এলো একটি মেয়ে–ন্যাটাশা। মাঝারি চেহারা, মাথাভরা ঘন কালো চুল, সাধারণ পোশাক, হাসিমুখ, মধুর স্পষ্ট কণ্ঠ, স্বাস্থ্য নিটোল দেহ, নিবিড় নীল দুটি চোখ…মার প্রাণ খুশিতে, স্নেহে ভরে উঠলো…মনে হল, এ যেন তারই হারিয়ে-যাওয়া মেয়ে আবার তার কোলে ফিরে এসেছে।

এর পরে এলো নিকোলাই–মজুর-পল্লির নামজাদা চোর বৃদ্ধ দানিয়েলের ছেলে। মা অবাক হয়ে বললেন, তুমি, এখানে?

পেভেল বাড়ি আছে?

না।

নিকোলাই তখন ঘরের দিকে চেয়ে বললে, সুপ্রভাত কমরেড।

ন্যাটাশা হাসিমুখে নিকোলাইর করমর্দন করলেন।

মা অবাক হয়ে গেলেন, নিকোলাইও তবে এই দলে আছে।

এর পরে এলো ইয়াকোভ–কারখানার পাহারাদার শোমোভের ছেলে। তার সঙ্গে আর একটি ছেলে—সেও অপরিচিত কিন্তু ভীষণ-দর্শন নয়।

সব্বার শেষে এলো পেভেল–কারখানার দু’জন মজুরকে সঙ্গে নিয়ে।

মা ছেলেকে প্রশ্ন করলেন ধীরে ধীরে, এরাই কি তোর সেই বেআইনী সভার লোক?

হাঁ, বলে পেভেল কমরেডদের কাছে চলে গেলো। মা মনে মনে বলতে লাগলেন, বলে কি, এরা তো দুধের ছেলে!

ঘরের মধ্যে ততক্ষণ মজলিস বসে গেছে। আগন্তুকদল টেবিলের চারদিকে উন্মুখ হয়ে বসেছে। এককোনে ল্যাম্পের নীচে ন্যাটাশা একখানা বই খুলে পড়ছে, মানুষ কেন এমন হীনভাবে জীবন-যাপন করে বুঝতে হলে…

—এবং মানুষ কেন এত হীন হয় বুঝতে হলে…এণ্ড্রি জুড়ে দিলো।

আগে দেখতে হবে, কেমন ভাবে তারা জীবন-যাত্রা শুরু করেছিল…

বই থেকে ন্যাটাশা সেই আদিম অসভ্যদের জীবন-যাত্রা-প্রণালী, তাদের গুহাবাস, পাথরের অস্ত্রে শিকার প্রভৃতির সরল বর্ণনা পড়ে যেতে লাগলো। মা ভাবলেন, এতে বুনো লোকদের গল্প, এতে আবার বে-আইনী কি আছে!

হঠাৎ নিকোলাইর অসন্তুষ্টি-ভরা কণ্ঠ বেজে উঠলো, ওসব যাক। মানুষ কেমন করে জীবন কাটিয়েছে তা শুনতে চাইনা…শুনতে চাই, মানুষের কি রকম ভাবে বাঁচা উচিত।

হাঁ, তাইতো।—লাল-চুলওয়ালা একটি লোক সায় দিলো।

ইয়াকোভ প্রতিবাদ করে বললো, যদি আমাদের সামনে এগোতে হয়, তবে আমাদের সবকিছু জানতে হবে।

নিশ্চয়ই–কোকড়া চুলওয়ালা একজন ইয়াকোভকে সমর্থন করলো।

পলকে বিষম তর্কাতর্কি শুরু হ’ল, কিন্তু অশ্লীল অন্যায় ভাষা কারু মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে না। মা ভাবলেন, ওই মেয়েটি আছে বলেই ওরা সামলে চলছে।

সহসা ন্যাটাশা বলে উঠলো, থামো, শোন ভাইসব।

পলকে সবাই নীরব, ন্যাটাশার দিকে নিবদ্ধ-চক্ষু।

ন্যাটাশা বললো, যারা বলে আমাদের সবকিছুই জানা উচিত, তারাই ঠিক বলছে। যুক্তির দীপ-শিখায় চলার পথ আলোকিত করে নিতে হবে আমাদের–অন্ধকারে যারা আছে, তারা যাতে আমাদের দেখতে পায়। প্রত্যেকটি প্রশ্নের সাধু এবং সত্য জবাব দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের থাকা চাই। যা কিছু সত্য এবং যা-কিছু মিথ্যা,…সবার সঙ্গেই আমাদের পরিচয় থাকা দরকার।

ন্যাটাশা চুপ করলে পেভেল উঠে বললো, আমাদের একমাত্র কাম্য কি পেট বোঝাই করা?

তারপর নিজেই জবাব দিল, না। আমরা চাই মানুষ হতে। যারা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে আমাদের চোখ ঢেকে রেখেছে, তাদের আমরা দেখাবো, আমরা সব দেখি, আমরা বোকা নই, পশু নই, শুধু আহার করতে চাই না, আমরা বাঁচতে চাই মানুষের মতো মানুষ হয়ে। আমাদের শত্রুদের আমরা দেখাব যে, বাইরে আমরা কুলিমজুর, শ্রমদাস যা হই না কেন, বুদ্ধিবৃত্তিতে আমরা তাদের সমান, আর প্রাণশক্তিতে, তেজে, বীর্যে আমরা তাদের চাইতেও ঢের বেশি শ্রেষ্ঠ।

মার বুক ছেলের বাগ্মীতায় স্ফীত হয়ে উঠলো।

এণ্ড্রি, বললো, দেশে আজ ভুড়ির ছড়াছড়ি, সাধু লোকেরই আকাল। এই পচা জীবনের জলাভূমি থেকে এক সেতু গড়ে আমাদের যাত্রা করতে হবে মঙ্গলময় ভবিষ্যতের অভিমুখে। বন্ধুগণ, এই আমাদের ব্ৰত,—এই আমাদের করতে হবে।

দুপুর রাতে মজলিস ভাঙলো, যে যার ঘরে চলে গেলো।

মা বললেন, এণ্ড্রি, লোকটি কিন্তু বেশ। আর ওই মেয়েটি, কে ও?

জনৈক শিক্ষয়িত্রী।

আহা হা, গরম কাপড়চোপড় একদম নেই, ঠাণ্ডা লাগবে যে। ওর আপনার জনেরা কোথায়?

মস্কোতে। ওর বাবা বড়লোক, লোহার কারবার, মেলাই টাকা। ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে এই দলে ভিড়েছে বলে। বড়লোকের আদরিণী মেয়ে, সুখ-সম্পদে লালিত। যা চাইতো তা পেত, কিন্তু আজ সে একা, অন্ধকার রাতে পায়ে হেঁটে চার মাইল পথ চ’লে যায়।

মার প্রাণ পলকে ভারি হয়ে উঠলো, বললেন, শহরে যাচ্ছে?

হাঁ।

ভয় করে না ওর?

না।

কেন গেলো? এখানে তো থাকতে পারতো, আমার সঙ্গে শুতে।

তা হয় না। কাল সকালে উঠে সবাই দেখতো। আমরা তা চাই না, ও-ও চায় না। …

মার মনে সেই আগেকার উদ্বেগ জেগে উঠলো, বসলেন, কিন্তু আমিতো বুঝতে পাচ্ছিনা পেভেল, এর ভিতর বিপজ্জনক বা অন্যায় কি আছে? তোরা তো আর খারাপ কিছু কচ্ছিস না।

শান্তভাবে মায়ের দিকে চেয়ে স্থির কণ্ঠে পেভেল জবাব দিলো, আমরা যা করছি, তাতে খারাপ কিছু নেই, খারাপ কিছু থাকবেও না; কিন্তু তবু আমাদের জেলে যেতে হবে।

মার হাত কেঁপে উঠলো। বসা গলায় তিনি বললেন, ভগবান তোমাদের যে ক’রে হ’ক রক্ষা করবেনই।

না, মা, তোমায় আমি মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারি না; রক্ষা আমরা কিছুতেই পাবোনা।…

মাকে শুতে বলে ছেলে চলে গেলে নিজের কামরায়।

মা একা জানালার কাছটিতে এসে বাইরের দিকে চেয়ে রইলেন। তুষারে-ছাওয়া পথ, ঝড়ে-হাওয়ার অবিরাম মাতামাতিতারপরেই একটা খোলা মাঠ…সাদা তুষার রাশি,…তার ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে শিমুল তুলোর মতো ঘন ধারায় বাতাস প্রলয়-বাঁশি বাজিয়ে যায়। মা দেখলেন, তারই মধ্য দিয়ে একা চলেছে ন্যাটাশা…তার পোশাক বাতাসে দাপাদাপি করছে, পা ব’সে যাচ্ছে, মুখে-চোখে কে যেন মুঠো মুঠো তুষার ছুঁড়ে মারছে–ন্যাটাশা এগোতে পারছে না, ঝড়ের মুখে একগাছি কুশের মতো সে নুয়ে শুয়ে পথ বেয়ে চলেছে। ডানে তার কৃষ্ণাভ অরণ্য-প্রাচীর, নগ্নপত্রহীন গাছগুলি যেন বাতাসে ব্যথিত হয়ে আর্তনাদে চারিদিক পূর্ণ করে তুলেছে। দূরে… শহরের ক্ষীণাতিক্ষীণ আলো।

কী এক অভূতপূর্ব আতঙ্কে শিউরে উঠে’ মা ঊর্ধ্বে চেয়ে প্রার্থনা জানান, ভগবান, রক্ষা করো।

.

১.০৪

এমনি ক’রে দিন কাটে। ফি শনিবারে দলের লোকেরা পেভেলের বাড়িতে এসে মজলিস করে আর এক-এক ধাপ ওপরে ওঠে…কিন্তু কোথায়, কতদুরে গিয়ে এ সিঁড়ি শেষ হয়েছে, কেউ তা জানে না। রোজ নয়া-নয়া লোক আসে, পেভেলের কামরায় আর তিলধারণের স্থান থাকেনা! ন্যাটাশাও আসে, তেমনি শ্রান্ত, ক্লান্ত কিন্তু যৌবনমদে তেনি জীবন্ত, পরিপূর্ণ। মা তার জন্য মোজা বোনেন, নিজের হাতে তার পায়ে পরিয়ে দিয়ে মাতৃস্নেহে তাকে অভিষিক্ত করেন। ব্যাটাশ প্রথমটা হাসে, তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে কি ভাবে। স্নিগ্ধ ধীর কণ্ঠে মাকে বলে, আমার এক ধাই…সেও আমায় এমনি ভাসতে।…কী আশ্চর্য মা, কুলি-মজুরের এতো দুঃখ-সংকুল অত্যাচারিত জীবন…তবু তাদের মাঝে যেটুকু প্রাণ আছে, যতটুকু সাধুতা আছে, তা ওদের মধ্যে নেই—বলে হাত তুলে সে দুরদুরান্তরের কাদের নির্দেশ করে।

মা বললেন, কিন্তু, মা, কেন তুমি নিজের আত্মীয়স্বজন সুখ-সাধ সব ত্যাগ করে এসেছে?

ম্লান হাস্যে ন্যাটাশা বলে, আত্মীয়স্বজন, সুখ-সাধ…কিছু নয় মা! শুধু মার কথা ভেবে কষ্ট হয়…তোমারই মতো সে…মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় তাঁকে দেখি।

মা মাথা নেড়ে দুঃখিত কণ্ঠে বলেন, আহা, বাছা আমার!

ন্যাটাশা কিন্তু জবাবে খিলখিল করে হেসে ওঠে, বলে, না, মা, দুঃখ কোথায়! মাঝে মাঝে এতো আনন্দ, এতো সুখ আমি পাই…বলতে বলতে তার মুখ প্রশান্ত হয়, তার নীল চোখে বিদ্যুৎ খেলে যায়। মার কাঁধে হাত রেখে স্বপ্নবিষ্টর মতো শান্ত, আন্তরিকতাপূর্ণ ভাষায় বলে, যদি জানতে, মা, যদি বুঝতে কী মহা কী আনন্দময় কাজ আমরা করে যাচ্ছি—একদিন বুঝবে!

মার যেন ঈর্ষা হয় স্যাটাশার ওপর, বলেন, আমি বুড়ো, বোকা, কিই বুঝি।

পেভেলের বক্তৃতা ক্রমশ বাড়ে। আলোচনার সুর ক্রমশ চড়তে থাকে…আর তার শরীর হয় ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর। সে যখন ন্যাটাশার সঙ্গে কথা কয়, মা দেখেন যেন তার কণ্ঠ মধুর, তার দৃষ্টি কোমল, তার সমস্ত চেহারা সহজ সরল হয়ে আসে। ন্যাটাশাকে পুত্রবধুরূপে কল্পনা করে মা অন্তরে অন্তরে পুলকিত হয়ে ভগবানকে বলেন, তাই কবরী ঠাকুর।

আলোচনার সুর যখন সপ্তমে ওঠে, এণ্ড্রি সটান দাঁড়িয়ে তাদের কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

তর্কাতর্কি বাঁধাবার প্রধান পাতা নকোলাই। তার দলে শ্যামোয়লোভ, আইভান বুকিন এবং ফেদিয়া মেজিন। ইয়াকোভ, পেভেল, এণ্ড্রি অন্য দলে।

মাঝে মাঝে ব্যাটার বদলে আসেন অ্যালেক্সি আইভানোভিচ। তার আলোচ্য বিষয় অতি সাধারণ—পারিবারিক জীবনযাত্রা, ছেলেপিলে, ব্যবসা-বাণিজ্য, পুলিস, রুটি ও মাংসের দাম, এইসব…প্রত্যেকটা জিনিসে তিনি দেখতে পান জাল-জুয়াচুরি, বিশৃঙ্খলা, বোকামি। মাঝে মাঝে তা নিয়ে ঠাট্টাও করেন, কিন্তু সবসময় চোখে আঙুল দিয়ে দেখান, মানুষের জীবন এসবের ফলে কতো অসহজ এবং অসুবিধাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আর একটি মেয়েও প্রায়ই আসে শহর থেকে। নাম তার শশেংকা, লম্বা সুগঠিত দেহ, পাতলা গম্ভীর মুখ, সমস্ত অঙ্গ দিয়ে যেন একটা তেজ ফুটে বেরুচ্ছে, কী এক অজ্ঞাত রোষে যেন তার কালো ভুরু কুঞ্চিত হয়ে ওঠে। যখন কথা বলে, পাতলা নাকের পাতা কাঁপতে থাকে, সে-ই প্রথম উচ্চারণ করলো, আমরা সোশিয়ালিস্ট। রুদ্র, রুক্ষ তার কণ্ঠ।

মা শুনেই নির্বাক আতংকে মেয়েটির দিকে চাইলেন, কিন্তু শশেংকা চক্ষু অর্ধ-মুদ্রিত করে দৃঢ়-কঠিন কণ্ঠে বললো, এই নবজীবন গঠন-ব্রতে আমাদের সমগ্র শক্তি দান করতে হবে-আর আমাদের একথাটা বুঝতে হবে যে, এ দানের কোনো প্রতিদান আমরা পাবো না।

সোসিয়ালিস্ট কথাটার সঙ্গে মা পরিচিত। বাল্যে গল্প শুনতেন, চাষাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেওয়ায় জমিদাররা জারের ওপর রেগে গিয়ে পণ করেন, জারের মুণ্ডচ্ছেদ না করে চুল ছাঁটবে না। এরাই নাকি সোশিয়ালিস্ট, এরাই তখন জারকে খুন কয়ে। তবে তাঁর ছেলে এবং এর সব সেই সোশিয়ালিস্ট হল কি করে?

সব চলে গেলে ছেলেকে ডেকে জিগ্যেস করলেন, রে, তুই কি সোশিয়ালিস্ট?

হাঁ। কেন বলতো, মা?

দীর্ঘনিশ্বাসের সঙ্গে চোখ নামিয়ে মা বললেন, পাভলুশ, তোর জারের বিরুদ্ধে কেন? একজন জারকে তারা খুন করেছিলো।

পেভেল পায়চারি করতে করতে হেসে বললো, কিন্তু আমরা ও করতে চাই না, মা। মাকে বহুক্ষণ ধরে ধীর গম্ভীর কণ্ঠে বোঝালো। মা তার মুখের দিকে চেয়ে মনে মনে বলতে লাগলেন, পেভেল কোনো খারাপ কাজ করবে না—করতে পারে না।

কিন্তু শশেংকার ওপর মা তেমন খুশি নন। কথা প্রসঙ্গে এণ্ড্রিকে একদিন বললেন, শশেংকা কি কড়া মেয়ে, বাবা! খালি হুকুম, এ করে, ও করো।

এণ্ড্রি, হেসে বললে, তুমি ঠিক জায়গায় ঘা দিয়েছ, মা।

পেভেল নীরস কণ্ঠে বললো, কিন্তু সে মেয়ে ভালো।

এণ্ড্রি বললো, একশোবার…শুধু সে এইটে বোঝে না যে…

তারপরেই দু’জনের মধ্যে যে তর্কাতকি শুরু হল, মা তার খেই ধরতে পারলেন না।

মা লক্ষ্য করতেন, শশেংকা পেভেলের সঙ্গে এত রূঢ় ব্যবহার করে, এমনকি মাঝে মাঝে তিরস্কারও করে, তবু পেভেল কিছু বলে না, চুপ করে থাকে, হাসে, গাটাশার দিকে যেমন করে চাইতে তেমনি করে তার দিকে চায়। এটা মা সইতে পারতেন না।

মজলিসের বৈঠক ঘন ঘন, হপ্তায় দু’দিন করে চলতে লাগলো। নতুন নতুন গানের আমদানি হল…সুরের মধ্য দিয়ে ফুটে বেরুতে লাগলো এক দুর্দমনীয় শক্তি। নিকোলাই গম্ভীরভাবে বলতে, এবার রাস্তায় বেরিয়ে এ গান গাইবার সময় এসেছে।

মাঝে মাঝে তারা আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়ে বিদেশী শ্রমিক ভাইদের জয়-যাত্রার সংবাদে। তাদের নামে জয়ধ্বনি করে, তাদের অভিনন্দিত করে চিঠি পাঠায়, দুনিয়ায় যেখানে যত শ্রমিক আছে, তাদের সঙ্গে নিজেদের অচ্ছেদ্য বন্ধনে বদ্ধ মনে করে, তাদের সঙ্গে আত্মীয় স্থাপন করে।

মার চিত্তও ধীরে ধীরে এইভাবে উহুদ্ধ হয়ে ওঠে! এণ্ড্রি কে সম্বোধন করে একদিন তিনি বলেন, কি মজার লোক তোমরা! কোথাকার কোন্ অর্মেণিয়ান, ইহুদী,অস্টিয়ান…সব তোমাদের কমরেড…সবাইকে বল তোমরা বন্ধু সবার জন্য দুঃখ কর, সবার সুখে উৎফুল্ল হও।

এণ্ড্রি বললো, সবার জন্যই আমরা দাঁড়িয়েছি, মা! এই দুনিয়াটা আমাদের শ্রমিকদের…আমাদের কাছে কোন জাতি নেই, কোন বর্ণ নেই—আমাদের কাছে আছে শুধু মিত্র এবং শক্র। দুনিয়ার নিখিল শ্রমিক আমাদের কমরেড। ধনী এবং কর্তারদল আমাদের দুশমন… দুনিয়ার দিকে যখন চেয়ে দেখি, শ্রমিক আমরা কতো অসংখ্য, কী বিপুল আমাদের প্রাণশক্তি, তখন হৃদয় আনন্দে নেচে ওঠে, সুখে উদ্বেল হয়, বুকের মধ্যে উৎসবের বাঁশি বাজতে থাকে। ঐ ফরাসী শ্রমিক, জার্মান শ্রমিক, ইতালিয়ান শ্রমিক জীবনের দিকে যখন চায়, ওরাও এমনিভাবে উদ্বুদ্ধ হয়। একই মায়ের সন্ততি আমরা, বিশ্বের সকল দেশের সকল শ্রমিকের ভ্রাতৃবন্ধনে আমাদের নবজন্ম। এই বন্ধন ক্রমশ প্রবল হচ্ছে, সূর্যের মতো আমাদের দীপ্ত করে তুলছে—এ যেন ন্যায় গগনে সমুদিত নবসূর্য এবং এ গগন শ্রমিক হৃদয়েরই অভ্যন্তরে। সে যেই হক না, যা-ই তার নাম হক, সোসিয়ালিস্ট মাত্রেই আমাদের ভাই—আজ, চিরদিন, যুগ-যুগান্ত ধরে।

মা তাদের শক্তি-দীপ্ত আননের দিকে চেয়ে অনুভব করেন, সত্যি সত্যিই বিশ্বাকাশে তার চোখের আড়ালে এক নব দীপ্তোজ্জল জ্যোতির আবির্ভাব হয়েছে…আকাশের সূর্যের মতোই যা মহান।

এমনি করে তাদের চাঞ্চল্য বেড়ে চলে। পেভেল মাঝে মাঝে বলে, একটা কাগজ বের করা দরকার।

নিকোলাই বলে, আমাদের নিয়ে কানাঘুষো চলছে পাড়ায়। এখনই সরে পড়া ভাল।

এণ্ড্রি, জবাব দেয়, কেন এতো ধরা পড়ার ভয়!

মা এণ্ড্রিকে ভালবেসে ফেলেছেন নিজের ছেলের মতো। কাজেই তিনিই একদিন প্রস্তাব করলেন পেভেলের কাছে, এণ্ড্রি এখানেই থাকুক না। তাহলে আর তোদের ওর বাড়ি ছুটাছুটি করে হয়রান হতে হয় না।

পেভেল বললে, ঝঞ্চাট বাড়িয়ে লাভ কি, মা।

ঝঞ্চাট…তাতে চিরটা জনমই পুইয়ে এসেছি… অমন ভালো ছেলের জন্য পোহানো তো বরঞ্চ সার্থক!

পেভেল বললো, তাই হক মা, এণ্ড্রি, এলে আমি সুখীই হ’ব।

কাজেই এণ্ড্রি এসে মার আর একটি ছেলে হয়ে বসলো।

.

১.০৫

নিকোলাই কিছু মিথ্যা বলেনি,–পেভেলের বাড়িটা সমস্ত পল্লির ভীতি, আতঙ্ক এবং সন্দেহের কেন্দ্র হয়ে পড়লো। চারপাশে সময়েঅসময়ে নানান প্রকৃতির লোক নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায়-বাড়ির গোপন রহস্য ভেদ করবে বলে। তাড়িখানার মালিক বুড়ো একদিন মাকে পথে পেয়ে বললো, কেমন আছো গো? তোমার ছেলের খবর কি? বিয়ে দিচ্ছ না কেন? বিয়ে দিয়ে দিলেই তোমাদের পক্ষে মঙ্গল। আর বিয়ে হলে মানুষ ও সামাল থাকে। আমি হলে কবে বিয়ে দিয়ে দিতুম। কী দিন-কাল পড়েছে বোঝতে…‘মানুষ’ নামধেয় পশুটির ওপর এখন কড়া নজর রাখা দরকার। মানুষ এখন মগজ খাটিয়ে বাঁচতে চায়, চিন্তা করে করে তারা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এমন-সব কাজ করছে, যা দস্তুরমতো অন্যায়। গির্জায় যায় না, মেলায়-মহোৎসবে যোগ দেয় না, খালি আনাচে-কানাচে ব’সে দল পাকায় আর ফিসফাস করে। এতে ফিসফাস কেন বাপু?

ফিসফাস না করে খোলাখুলি তাড়িখানার লোকেদের সামনে দাঁড়িয়ে বলুক না—সে সাহস নেই। আমি জানতে চাই, কি এ? গোপনীয়? গোপনীয় স্থান একমাত্র পবিত্র গির্জা…অন্য-সব কোনায় ব’সে কানাঘুষ, ঘুষি ভ্রান্তি, মায়া, বুঝলে…

লম্বা বক্তৃতা শেষ করে বুড়ো চলে গেলো। মা বিব্রত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এরপরে সাবধান করে গেলে এক পড়শী বুড়ি। মা বাড়ি এসে ছেলেদের সব খুলে বললেন—তোরা বিয়ে করছিস না, মদ খাচ্ছিস না, অথচ সন্দেহজনক মেয়েদের সঙ্গে মিশছিস…তাই পাড়ার সব, বিশেষত, মেয়েরাও তোদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।

পেভেল বিরক্ত হয়ে বললো, বেশ, যাক।

এণ্ড্রি, দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করে বললো, আস্তাকুঁড়ে সবকিছুতেই পচা গন্ধ। বোকা মেয়েগুলোকে তুমি কেন বুঝিয়ে দিলে না, মা, যে, বিয়ে কী চিজ। তাহলে তারা হাড়িকাঠে গলা বাড়িয়ে দেবার জন্য এতে ব্যস্ত হয়ে উঠতো না।

মা বললেন, তারা সবই দেখে, বাবা, সবই জানে, জানে তাদের ভবিষ্যত কতো দুঃখময়। কিন্তু কি করতে পারে তারা? আর কোন পথ নেই তাদের।

পেভেল বললো, বুদ্ধিই তাদের মোটা, নইলে পথ তারা খুঁজে পেতো। –

মা বললেন, তোরাই কেন তাদের বুদ্ধি শোধরাস, বাবা? বুদ্ধিমতী যারা তাদের ডেকে দুটো কথা বা!

কিছু হবে না তাতে–পভেল জবাব দিল।

এণ্ড্রি, বললো, আচ্ছা, চেষ্টা করেই দেখা যাক না।

খানিকক্ষণ চুপ থেকে পেভেল বললো, হাঁ, আজ কাজের নাম করে মেয়েদের সঙ্গে মিশবে, কাল হাত ধরাধরি করে জোড়ায় জোড়ায় বেড়াবে, তারপর হবে বিয়ে। বাসব শেষ জীবনের। মা ছেলের এই বিবাহ-বিমুখতায় চিন্তিত হয়ে উঠলেন।

একদিন মা শুয়েছেন ঘুমুবেন বলেও কামরায় এণ্ড্রি পেভেল কি কথা বলছে শুনতে পেলেন।

এণ্ড্রি বলছে, তুমি জাননা ন্যাটাকে আমি পছন্দ করি?

জানি।

ন্যাটাশা কি এটা লক্ষ্য করেছে?

পেভেল নিরুত্তরে ভাবতে লাগলো। এণ্ড্রিস্বর আরো নীচু করে বললো, কি মনে হয় তোমার?

লক্ষ্য করেছে, আর সেই জন্যই সে মজলিসে আসা ছেড়ে দিয়েছে।

এণ্ড্রি নীরব উদ্বেগে খানিকক্ষণ পায়চারি করে বললো, যদি আমি তাকে একথা বলি?

কি কথা?…বন্দুকের গুলির মতো পেভেলের মুখ থেকে প্রশ্নটা বেরিয়ে পড়লো।

চাপা গলায় এণ্ড্রি বললো—যে আমি…।

পেভেল বাধা দিয়ে বললো, কেন?

এণ্ড্রি, বাধা পেয়ে মুহূর্তেক স্তব্ধ থেকে একটু হেসে বললো, দেখো বন্ধু, কোন মেয়েকে যদি তুমি ভালোবাসে, তাকে সেটা বলা চাই; নইলে ভালোবাসাটাই বৃথা।

সশব্দে পাঠ্য বইখানা বন্ধ করে পেভেল বললো, কিন্তু তাতে ফয়দা হবে কি বলতে পারে?

অর্থাৎ? এণ্ড্রি জিগ্যাসুনয়নে পেভেলের দিকে চাইলো।

পেভেল ধীরে ধীরে বললো, এণ্ড্রি, কি তুমি করতে যাচ্ছ, সে সম্বন্ধে তোমার মনে পরিষ্কার ধারণা থাকা চাই। ধরে নিলুম, সেও তোমাকে ভালোবাসে, যদিও আমি তা বিশ্বাস করিনা, তবু ধরে নেওয়া গেলো। তারপর বিয়ে হ’ল। চমৎকার মিলন—পণ্ডিতের সঙ্গে মজুরানির সংযোগ। তারপর এলো পুত্রকন্যার বা…পরিবারের জন্যই তোমাদের ব্যস্ত থাকতে হবে …সংসারের শতকরা নিরানব্বই জন যেমন ক’রে জীবন কাটায়, তোমারও তেমনি কাটবে। তোমাদের এবং ছেলে-মেয়েদের জন্য আহারের রুটি এবং বাসের কুটিরের সংস্থান করতে করতে জীবন কাটাবে। যে ব্রত নিয়ে আমরা নেবেছি, তার পক্ষে তোমাদের কোনো অস্তিত্বই থাকবেনা–তোমার এবং ন্যাটাশার।

এণ্ড্রি চুপ করে রইলো। পেভেল এবার সুর নরম করে বললো, এসব, ছেড়ে দাও এণ্ড্রি। একটা মেয়েকে নিয়ে মজে যেয়োনা, স্থির হও,–এই হচ্ছে একমাত্র শ্রেষ্ট পথ।

এণ্ড্রি, বললো, কিন্তু আলেক্‌সি আইভানোভিচ কি বলেছিলেন মনে আছে? মানুষকে পরিপূর্ণ জীবন-যাপন করতে হবে…দেহের এবং আত্মার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে,—মনে আছে পেভেল!

পেভেল সোজা জবাব দিলো, সে আমাদের জন্য নয়, এণ্ড্রি? পরিপূর্ণ জীবন কি করে লাভ করবে তুমি যে তোমার নাগালের বাইরে। এণ্ড্রি, যদি ভবিষ্যৎকে ভালোবাসো, ভবিষ্যৎকে চাও, তবে বর্তমানের সব-কিছু তোমায় ত্যাগ করতে হবে—সবকিছু।

মানুষের পক্ষে তা শক্ত—এণ্ড্রি বললো।

কিন্তু আর কি করার আছে? ভেবে দেখো।

এণ্ড্রি, আবার চুপ…ঘড়ির টিক টিক শব্দে যেন জীবন থেকে এক একটা মুহূর্ত কেটে নিচ্ছে।…শেষে এণ্ড্রির কথা ফুটলো, আদ্দেক প্রাণ বাসে ভালল, আদ্দেক করে ঘৃণা!–এই কি প্রাণ?

আমি জিগ্যেস করি, তোমার আর কি করার আছে?…বলে পেভেল বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলো।

তা হলে আমার চুপ করে থাকতে হবে?

হাঁ, তাই উচিত।

বেশ, তাই হবে। এই পথেই চলবে আমরা, কিন্তু পেভেল তোমার বখন এদিন আসবে তখন তোমার পক্ষে শক্ত হবে এ আদর্শ।

শক্ত এখনই হয়েছে, এন্ড্রি।

বলো কি!

হ্যাঁ!

এণ্ড্রি, চুপ করে গেলো, বুঝলো পেভেলও কোন মেয়েকে ভালোবেসেছে…কিন্তু ব্রতের খাতিরে প্রেমকে সে দমন করে রেখেছে। পেভেল যা’ পেরেছে, সে কেন তা পারবে না। নিশ্চয়ই পারবে।

.

পল্লিময় হুলস্থুলু–সোসিয়ালিস্টরা লাল-কালিতে-ছাপা ইস্তাহার ছড়াচ্ছে মজুরদের মধ্যে। তাতে কারখানার মজুরদের শোচনীয় অবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর মতো করে লেখা, কোথায় কোন্ ধর্মঘট হচ্ছে তার ফিরিস্তি,…সর্বশেষে মজুদেব সংঘবদ্ধ হয়ে স্বার্থরক্ষাকল্পে লড়াই করবার জন্যে উত্তেজনাপূর্ণ আবেদন।

মোটা মাইনে যারা পায়, তারা সোশিয়ালিস্টদের গাল দিয়ে ইস্তাহার নিয়ে তাদের কাছে জমা দেয়। তরুণরা সাগ্রহে প্রত্যেকটি কথা গেলে, উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে বলে, সত্যিই তো তাই। কিন্তু বেশির ভাগই শ্রমক্লান্ত–নিরাশ হৃদয়। ঘাড় নেড়ে বলে, হুজুগ, হুজুগ–ওতে কিছু হবে না, হবার জো নেই। সে যা’ বলুক সবার প্রাণেই কিন্তু একটা চাঞ্চল্য…একদিন যদি দেরি হ’ল ইস্তাহার বের হতে অমনি আলোচনা আজো বেরুলোনা, ছাপা বন্ধ হয়ে গেলো বুঝি! তারপর সোমবারে ইস্তাহার বেরুলে আবার আন্দোলন।

মা জানতেন, এসবের মুলে তাঁরই ছেলে। তার আনন্দও হত, শঙ্কাও হত। একদিন সন্ধ্যায় এসে সেই পড়শী বুড়ি খবর দিয়ে গেলো, নাও এইবার, ঠ্যালা সামলাও; আজ রাতেই পুলিস আসছে, তোমাদের বাড়ি আর নিকোলাইদের বাড়ি, আর মেজিনদের বাড়ি…

মা ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন,–তাঁর মাথা ঘুরছে, সমস্ত শক্তি লোপ পেয়ে গেছে। কিন্তু ছেলের আসন্ন বিপদের কথা মনে পড়তেই সাহসে তাকে বুক বেঁধে উঠতে হল। প্রথমেই তিনি মেজিনকে খবরটা দিয়ে এলেন,–মেজিন বলে দিলো, তুমি যাও, মা, ওদের আমি খবর পাঠাচ্ছি। পুলিস বেড়ায় ডালে ডালে, আমরা বেড়াই পাতায় পাতায়।

মা বাড়ি ফিরে এসে সমস্ত কাগজপত্র বই বুকে গুঁজে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলেন…মনে করলেন, পেভেল এক্ষুণি কাজ ফেলে ছুটে বাড়ি আসবে। কিন্তু পেভেল এলো না। মা অবসন্ন হয়ে রান্নাঘরের বেঞ্চের ওপর বসে পড়লেন—পেভেল ও এণ্ড্রি কারখানা হতে ফিরে এলো…মা তখনো সেই অবস্থায় বসে। জিগ্যেস করলেন, জানো সব?

হাঁ। তোমার কি ভয় হচ্ছে, মা?–পভেল জিগ্যেস করলো।

এণ্ড্রি বললো, ভয় করে লাভ কি? ভয় করলে কি বিপদ উদ্ধার, হয়? হয় না, তবে?

পেভেল বললো, উনটিও বুঝি ধরাওনি, মা!

মা বইগুলি চেপে বসেছিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে তা দেখিয়ে বললেন, ঐগুলো নিয়েই তো ব্যস্ত ছিলাম, সারাক্ষণ…

এণ্ড্রি পেভেল হেসে উঠলো…মা যেন এতে আশ্বস্ত হলেন। পেভেল খানকয়েক বই বেছে নিয়ে উঠানে লুকিয়ে রাখলো। এণ্ড্রি, মাকে সাহস দেবার জন্য গল্প জুড়ে দিলো, কিছু ভয় নেই, মা। ওদের জন্য আমার আপসোস হয়, মা, ইয়া হোমরা চোমরা প্রবীণ অফিসার, তলোয়ার ঝুলিয়ে, ঘোড়া ছুটিয়ে এসে কাজটা কি করেন? এ কোন খোঁজেন, ও কোন খোঁজেন, বিছানাটা ওলটান, মুখে কালি-ঝুল মাখেন–তারপর বিজয়ী বীরের মতো চলে যান। একবার ওদের পাল্লায় পড়েছিলুম, মা। জিনিসপত্র তছনছ করে আমায় ধরে নিয়ে গেলো। তারপর জেলে রাখলো চার মাস। সে কী জীবন…কেবল বসে থাকা, আসে হয়ে…তারপর ডেকে রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেলো। দু’দিকে পাহারা…আদালতে গেলুম…যা-তা জিগ্যেস করলো…তারপর আবার জেলে পাঠালো। তারপর এ জেল থেকে সে জেল, এখান থেকে সেখানে। এমনি ধারা। কি করবে? মাইনে খায়, বেচারীদের যা’, হক একটা-কিছু করে দেখাতে হবে তো!

মার মনে যতটুকু ভয় জমে উঠেছিল তা নিঃশেষে মিলিয়ে গেলো।

১.০৬-১০ পুলিস এলো

পুলিস এলো একমাস পরে অপ্রত্যাশিতভাবে। দুপুর রাত, নিকোলাই, এণ্ড্রি, পেভেল গল্প করছে…মা অর্ধ-নিদ্রিতা।

এণ্ড্রি, কি কাজে রান্নাঘরে গিয়েই হঠাৎ ফিরে এলো ব্যতিব্যস্ত হয়ে, পুলিসের সাড়া পাচ্ছি।

মা বিছানা থেকে উঠে পড়লেন কাঁপতে কাঁপতে। পেভেল মাকে শুইয়ে দিয়ে বলল, শুয়ে থাকে, মা, তুমি অসুস্থ।

স্থানীয় চৌকিদার ফেদিয়াকিনকে সঙ্গে করে পুলিসের এক কর্তা এসে ঢুকলেন। মাকে দেখিয়ে পেছেলের দিকে চেয়ে ফেদিয়াকিন বললো, এই হুজুর ওর মা—আর ঐ হ’ল পেভেল।

কর্তা গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করলেন, তুমি পেভেল ভ্লাশভ?

হাঁ।

তোমার বাড়ি খানাতল্লাশ করব। এই বুড়ি, ওঠ…

হঠাৎ কি একটা শব্দে সন্দিগ্ধ হয়ে কর্তা পাশের ঘরে ছুটে গিয়ে চীৎকার করে বললেন, কে তুমি? নাম কি তোমার?…

তারপর খানাতল্লাশী চললো…জিনিসপত্রগুলো তছনছ করে…বইগুলো খুশিমত এদিক-ওদিক ছুঁড়ে ফেলে। এ অন্যায় অত্যাচার আর সইতে না পেরে নিকোলাই তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো, বইগুলো মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলার কি দরকার?

মা নিকোলাহর সাহস দেখে বিস্মিত, তার পরিণাম ভেবে শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। কর্তা রক্তচোখে নিকোলাইর দিকে চাইতে লাগলেন। মা পেভেলকে বললেন, নিকোলাই চুপ থাকুক না কেন?

কর্তা ধমক দিয়ে বললেন, কি কথা হচ্ছে! চুপ…এ বাইবেল পড়ে কে?

পেভেস বললো, আমি।

এসব বই কার?

আমার।

কর্তা তখন নিকোলাইর দিকে ফিরে বললেন, তুমিই বুঝি এণ্ড্রি?

হাঁ।

পরক্ষণেই এণ্ড্রি তাকে ঠেলে দিয়ে এগিয়ে এসে বললো, ও নয়, আমি এণ্ড্রি।

কর্তা নিকোলাইর দিকে কটমট করে চেয়ে বললেন, হুঁশিয়ার! তারপর পকেট থেকে এক তাড়া কাগজ বের করে ঘেঁটে এণ্ড্রি কে বললেন, এণ্ড্রি, রাজনৈতিক অপরাধে এর আগেও তোমার খানাতল্লাশ হয়েছিল?

হাঁ, রস্টোভ এবং সারাটোভে। তবে সেখানকার পুলিসেব ভদ্রতা-জ্ঞান ছিল। আমার নামের আগে মিস্টার যোগ দিতে অবহেলা করেনি!

কর্তা ডান চোখ কুঁচকে, রগড়ে, চকচকে সাদা দাঁতগুলি বের করে বললেন, তা মিস্টার এণ্ড্রি, তুমি কি জানো কোন্ বদমাশরা এই বে-আইনী ইস্তাহার আর বই বিলি করে বেড়ায়?

এণ্ড্রি জবাব দিবার আগেই নিকোলাই বলে উঠলো, বদমাশ আমরা প্রথম দেখছি এখানে।

কর্তা হুকুম করলেন, শুয়োরকে নিয়ে যাও এখান থেকে।

দু’জন সৈনিক নিকোলাইকে বের করে নিয়ে গেলো। খানাতল্লাশ শেষ হলে কর্তা বললেন, মিস্টার এণ্ড্রি নাখোদ্‌কা, আমি তোমাকে গ্রেপ্তার করলুম।

কি অপরাধে?

পরে বলবো। তারপর মার দিকে চেয়ে বললেন, লিখতে পড়তে জানো, বুড়ি?

জবাব দিল পেভেল, না।

কর্তা ধমক দিয়ে বললেন, তোমায় কে জিগ্যেস করেছে! বুড়ি বলবে।

মার মনে, রি-রি করে উঠলো একটা অপরিসীম ঘৃণা। কর্তার মুখের সামনে হাত নাচিয়ে বললেন, চেঁচিওনা, এখনো তুমি বড় হওনি। জানো না, কী দুঃখ, কী বেদনা…

পেভেল বললো, স্থির হও মা!

এণ্ড্রি বললো, বুকের ব্যথা দাঁত দিয়ে চেপে থাকা ছাড়া তো কোনো উপায় নেই, মা।

মা সে কথা কানে তুললেন না, চেঁচিয়ে উঠলেন, কেন তোমরা এমন করে মানুষকে ছিনিয়ে নিয়ে যাও?

কতাও চড়া সুরে জবাব দিলেন, সে জবাব তুমি চাইতে পারোনা। চুপ কর…

মা ক্রুদ্ধা ফণিনীর মতো ফুলতে লাগলেন।

কর্তা তখন হুকুম দিলেন, নিকোলাইকে হাজির কর।

সৈন্যেরা, দু’জনে দু’হাত ধরে নিকোলাহকে নিয়ে এলো। নিকোলাইর মাথায় টুপি…কি একটা দলিল পড়তে পড়তে কর্তার সেটা খেয়াল হল। পড়া বন্ধ করে তিনি গর্জে উঠলেন, টুপি নাবাও…

নিকোলাই একটু রসিকতা করে বললো, আজ্ঞে হুজুর, আমার তো একখানা তৃতীয় হাত নেই যে আপনার হুকুম তামিল করব। দেখছেন, দু’জনে দু’হাত ধরে।

কর্তা একটু অপ্রস্তুত হলেন। তারপর নিকোলাই এবং এণ্ড্রিকে ধরে নিয়ে চলে গেলেন।

পেভেল বন্ধুদের হাসিমুখে বিদায় দিলো, আবেগে বলে উঠলো, আণ্ড্রে, নিকোলে ভাই!

তার কেবলই মনে হতে লাগলো, পুলিস দু’জনকে ধরে তাকে যে ছুঁলোওনা, এ তাকে অপমান করা ছাড়া আর কিছুই না। তাকে কেন এই সঙ্গে ধরে নিয়ে গেলোনা!

মা সান্ত্বনার সুরে বললেন, নেবে বাবা, নেবে—দু’দিন সবুর কর।

পেভেল বললো, সত্যিই নেবে, মা।

মা ব্যথিত হয়ে বললেন, তুই কি নিষ্ঠুর, পেভেল! একবারও যদি প্রবোধ দিস! আমি একটা আশঙ্কার কথা বললে, তুই বলিস তার চাইতেও ভয়ংকর-কিছু।

পেভেল মার দিকে চাইলো, তার কাছটিতে এগিয়ে এলো, তারপর ধীরে ধীরে বললো, আমি যে পারি না, মা, তোমায় মিথ্যে প্রবোধ দিতে পারি না…তোমার যে সব সইতে হবে, সব শিখতে হবে, মা!

.

১.০৭

পরদিন জানা গেলো, বুনি, শ্যামোয়লোভ, শেমোত এবং আরো, পাঁচজন ধরা পড়েছে। ফেদিয়া মেজিন এসে সগর্বে খবর দিয়ে গেলো, তার বাড়িও খানাতল্লাশ হয়েছে, তবে তাকে ধরেনি।

মিনিট কয়েক পরে প্রতিবেশী রাইবিন এলেন। রাইবিন বৃদ্ধ, বহুদশী এবং তথাকথিত ধর্ম-পদ্ধতির ওপর হাড়ে হাড়ে চটা। পেভেলের সঙ্গে অল্পক্ষণের মধ্যেই তার আলাপ জমে উঠলো। বললেন, তোমরা মদ খাওনা, খারাপ কিছু করনা, তাই সবাই তোদর সন্দেহ করে। এই-ই দুনিয়ার হল! কর্তারা বলেন, তোমরা নাস্তিক, গিজায় যাওনা, যদিও আমিও তথৈবচ। তারপর…ঐ বে-আইনী ইস্তাহারগুলি, ওগুলোও তো তোমরা ছড়াও, নয়?

হাঁ।

মা ভয়ে ভয়ে তা ঢাকতে চান। তারা কেবল হাসে।

রাইবিন বলে, বেশ সুচিন্তিত লেখা, লোককে মাতিয়ে তোলে। সবসুদ্ধ বারোটা বেরিয়েছে, নয়?

হাঁ।

সবগুলিই আমি পড়েছি।

তারপর কথা প্রসঙ্গে পেভেল অগ্নিগর্ভ ভাষায় ব্যক্ত করে যেতে লাগলো, ধর্ম, রাজা, রাষ্ট্র-শাসন, কারখানা, দেশ-বিদেশের মজুর জীবন সম্বন্ধে তার অভিমত। রাইবিন হেসে বললেন, তরুণ তুমি, লোকচরিত্র সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা তোমার খুবই কম।

পেভেল বললো, কে তরুণ, কে বৃদ্ধ, সে কথা ছেড়ে দিন; কার চিন্তার ধারা সত্য, তাই দেখুন।

অর্থাৎ তুমি বলতে চাও, আমরা ঈশ্বর সম্বন্ধে প্রতারিত হয়েছি, এইতো? তা আমারও মত তাই। আমিও বলি, আমাদের ধর্ম মিথ্যা, ধর্ম আমাদের ক্ষতি করেছে।

মা এই নাস্তিক্যবাদে শিউরে উঠে বলেন, ঈশ্বরের কথা যখন ওঠে একটু সতর্ক হয়ে কথা কয়ো।…যে কাজ তোমরা করছ, তাই তোমাদের জীবনে সান্ত্বনা জোগায়, কিন্তু আমার ঈশ্বর ছাড়া যে কিছুই নেই। তাকে কেড়ে নিলে আমি দুঃখে কষ্টে কার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াব।

পেভেল বললো, তুমি আমাদের কথা বুঝলে না, মা। যে মঙ্গলময় দয়াল ঈশ্বর তোমার উপাস্য, আমি তার কথা বলিনি; আমি বলেছি, সেই ঈশ্বরের কথা, যাকে দিয়ে পুরুতের দল আমাদের শাসিয়ে রাখে, যার দোহাই দিয়ে মুষ্টিমেয়ের অন্যায় ইচ্ছার সম্মুখে আমাদের মাথা নোয়াতে বাধ্য করে।

রাইবিন টেবিল চাপড়ে বলেন, ঠিক বলেছ। ওরা আমাদের ঈশ্বরকে ভেঙে চুরে ওদের কার্যোপযোগী করে নিয়েছে। ওদের হাতে যা-কিছু সব আমাদের বিরুদ্ধে। গির্জায় ঈশ্বরের আমদানি শুধু আমাদের ভয় দেখিয়ে দাবিয়ে রাখার জন্য এ ঈশ্বরকে বদলে ফেলতে হবে, মা,–

মা ব্যথিত হয়ে চলে গেলেন সেখান থেকে।

রাইবিন পেভেলকে বলেন, দেখছো, এর আর কোথায়? মাথায় নয়, হৃদয়ে। আর হৃদয় এমন স্থান যে, ও ছাড়া আর কিছু জন্মায় না তাতে।

পেভেল দৃঢ়কণ্ঠে বললো, যুক্তি–একমাত্র যুক্তিই মানুষকে মুক্তি এনে দেবে।

রাইবিন বললেন, কিন্তু যুক্তি তো শক্তি দিতে পারে না–শক্তির একমাত্র উৎস–হৃদয়।

পেভেল রাইবিনে এমনি করে অনেক কথা কাটাকাটি চললো।

শেষটা রাইবিন বললেন, আমাদের কইতে হবে শুধু বর্তমানের কথা…ভবিষ্যতে কি হবে তা আমাদের অজ্ঞাত। মানুষকে মুক্ত করে দাও, তারপর সে নিজেই বেছে নেবে, তার পক্ষে কোটা ভালো। তাদের মগজে ঢের বিদ্যা আমরা ঢুঁসে দিয়েছি, এবার এর অবসান হক,—মানুষকে তার নিজের পথ নিজেকে খুঁজে নিতে দাও। হয়তো তারা চাইবে সমস্ত কিছু বর্জন করতে সমস্ত জীবন, সমস্ত জ্ঞান;–হয়তো তারা দেখবে সকল বন্দোবস্তই তাদের বিরুদ্ধে। তুমি শুধু তাদের হাতে বইগুলি দিয়ে দাও, তারপর নিশ্চিন্ত থাকতে পারো; সব প্রশ্নের উত্তর তারা নিজেরাই দেখে নিতে পারবে। তাদের শুধু স্মরণ করিয়ে দাও যে, ঘোড়ার লাগাম যত কষানো হয়, তত সে ছোটে কম।

মা ক্রমে ক্রমে এ সব শুনতে অভ্যস্ত হন।

.

১.০৮

পেভেলের বাড়িটা মজুরদের মস্ত বড় একটা ভরসাস্থল হয়ে পড়লো। কোন অবিচার অত্যাচার হলেই মজুররা পেভেলের কাছে বুকি নিতে আসে। পেভেলকে সবাই শ্রদ্ধা করে, বিশেষত সেই ‘কাদামাখা পেনি’র গল্পটা বের হবার পর।

কারখানার পেছনে একটা জলাভূমি ছিল…বুনো গাছে ভর্তি… পচা জল…গরমের দিনে তা পচে দুর্গন্ধ হয়, মশা জন্মায়; ফলে, চারদিকে জ্বরের ধুম লেগে যায়। জায়গাটা অবশ্য কারখানার সম্পত্তি; নতুন ম্যানেজার এসে দেখলেন, জলাটা খুঁড়লে বেশ মোটা টাকার পিট মিলবে, কিন্তু খুড়তে বড় কম খরচ হবে না। অনেক ভেবে তিনি বিনা খরচায় কাজ হাসিল করার একটা চমৎকার মতলব ঠাওরালেন।

পল্লির স্বাস্থ্যরক্ষাকল্পেই যখন জলাটা সাফ করা আবশ্যক তখন পল্লিবাসী মজুররাই ন্যায়ত তার খরচ বহন করতে বাধ্য; অতএব তাদের মজুরি থেকে রুবেলে এক কোপেক করে এই বাবদ কেটে নেওয়া হবে। মজুররা তো একথা শুনেই ক্ষেপে উঠলো, বিশেষ করে যখন দেখলো কর্তার পেয়ারের কেরানীবাবুরা এ ট্যাক্স থেকে রেহাই পেয়েছে।

যেদিন এ হুকুম হয়, পেভেল সেদিন অসুস্থতার দরুণ কারখানায় অনুপস্থিত; কাজেই সে কিছুই জানতে পারলো না। পরদিন শিজভ, এবং মাখোটিন বলে দু’জন মজুর তার কাছে এসে হাজির হ’ল, বললো, সবাই আমাদের তোমার কাছে পাঠিয়ে দিলো এই কথাটা জানতে যে, সত্যিই কি এমন কোনো আইন আছে যাতে ম্যানেজার কারখানার মশা তাড়াবার খরচা মজুরদের কাছ থেকে জুলুম করে নিতে পারে। আছে এমন কোনো আইন? তিন বছরের কথা। সেবারও স্নানাগার তৈরি করার নাম করে জোচ্চোররা এমনিভাবে ট্যাক্স বসিয়ে তিন হাজার আটশো রুবেল ঠকিয়ে নিয়েছিল। কোথায় এখন সে রুবেল, কোথায়-বা সে স্নানাগার!…

পেভেল তাদের বেশ করে বুঝিয়ে দিলো যে, এ আইন নয়, অত্যাচার। এতে শুধু পকেট ভারি হবে কারখানার মালিকের।

মজুর দু’জন মুখ ভারি করে চলে গেলো।

তারা চলে যেতে মা হাসিমুখে বললেন, বুড়োরাও তোর কাছে বুদ্ধি নিতে আসা শুরু করেছে, পেভেল।

পেভেল নিরুত্তরে কাগজ নিয়ে কি লিখতে বসলো। লেখা শেষ হ’লে মাকে বললো, এক্ষুণি শহরে গিয়ে এটা দিয়ে এসো।

বিপদ আছে কিছু? মা প্রশ্ন করলেন।

পেভেল বললো, হাঁ। শহরে আমাদের দলের যে কাগজ ছাপা হয় তার পরবর্তী সংখ্যায় এ ‘কাদা-মাখা পেনি’ গল্পটা বেরোনো চাই।

যাচ্ছি এক্ষুণি, বলে মা গায়ের কাপড়টা ঠিক করে নিলেন। তার যেন আনন্দ আর ধরে না। ছেলে এই প্রথম তাকে বিশ্বাস করে তাঁর ওপর জরুরী একটা কাজের ভার দিয়েছে। ছেলের কাজে তিনি লাগলেন এতদিনে।

শহরে গিয়ে তিনি কার্যসিদ্ধি করে ফিরে এলেন।

তার পরের সোমবার–মাথা ধরেছে বলে পেভেল কারখানায় যায়নি। খেতে বসেছে, এমন সময় ফেদিয়া মেজিন ছুটে এলো রুদ্ধশ্বাসে-তার মুখে উত্তেজনা এবং আনন্দ। বললো, এসো, কারখানা সুদ্ধ মজুর জেগে উঠেছে। তোমাকে ডাকতে পাঠালে তারা। শিজভ, মাখোটিন বলে, তোমার মতো করে আর কেউ বোঝাতে পারবে না। বাব্বা, কী কাণ্ড!

পেভেল নীরবে পোশাক পরতে লাগলো।

মেজিন বলতে লাগলো, মেয়েরা জড়ো হয়ে কী রকম চেঁচাচ্ছে দেখো।

মা বললেন, তুই অসুস্থ, ওরা কি করছে কে জানে। চল, আমিও যাচ্ছি।

পেভেল সংক্ষেপে বললো, চলো।

নীরবে দ্রুতপদে তারা কারখানায় এসে উপস্থিত হ’ল। দুয়ারের কাছে মেয়েরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ তীব্র কণ্ঠে আলোচনা চালিয়েছে। তাদের ঠেলে তিনজন কারখানার উঠানের ভেতরে এসে ঢুকলো। চারদিকে উত্তেজিত জনতার চীৎকার এবং আস্ফালন। শিভজ মাখোটিন, ভিয়ালত এবং আরো পাঁচ ছ’জন পাণ্ডা একটা পুরানো লৌহস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে হাত দুলিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করছে;– সবার চোখ তাদের দিকে। হঠাৎ কে একজন চেঁচিয়ে উঠলো, পেভেল এসেছে।

পেভেল? নিয়ে এসো।

তৎক্ষণাৎ পেভেলকে ধরে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হল। মা একা পেছনে পড়ে রইলেন।

চারদিকে কেবল শব্দ হতে লাগলো, চুপ, চুপ! অদুরে রাইবিনের গলা শোনা গেলো, আমরা দাঁড়াব কোপকের জন্য নয়–ন্যায়ের জন্য। কোপেকের গায়ে যে অজচ্ছল রক্ত মাখানো, তার জন্য…

জনতার কানে বেশ জোরে গিয়ে এ কথাটা পড়লো—সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠলো উত্তেজনাপূর্ণ চীৎকার, সাবাস রাইবিন, ঠিক বলেছ।

আঃ, চুপ করনা।

পেভেল এসেছে।

সবগুলি কণ্ঠ একত্র মিলে সৃষ্টি হ’ল একটা তুমুল কোলাহল, কলের শব্দ, বাষ্পের ফোসফোসানি, চামড়ার বেল্টের আওয়াজ, সব তাতে ডুবে গেলো। চারদিক থেকে লোক ছুটে আসছে, হাত দোলাচ্ছে, তর্কাতর্কি করছে,তিক্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় পরস্পরকে ক্ষেপিয়ে তুলছে। যে বেদনা এতদিন বের হবার কোন পথ পায়নি, শান্ত বুকে চাপা রয়েছে, আজ তা জেগে উঠেছে, বের হতে চাচ্ছে, মুখ থেকে ফেটে পড়ছে বাক্যবাণে। আকাশে উঠছে বিরাট এক পাখীর মতো বিচিত্র পাখা দুলিয়ে, জনতাকে নখে জড়িয়ে টেনে-হিঁচড়ে, পরস্পর ঠোকাঠুকি করে;–রোষ-রক্তিম অগ্নিশিখার মতো জীবন নিয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছে। জনতার মাথার উপর ধুলি এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী সবার মুখে আগুন জ্বলছে, গাল বেয়ে পড়ছে ঘাম, কালো কালো ফোটায়–কালো মুখের মধ্য দিয়ে চোখ জ্বলছে, দাঁত চকচক করছে।

শিজভ, মাখোটিন যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে উঠে দাঁড়ালো পেভেল, তার কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত হ’ল, কমরেড :

কথাটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে পেভেলের মধ্যে জাগলো একটা অদম্য আত্মপ্রত্যয়, সংগ্রামেচ্ছা, জনতার কাছে হৃদয় খুলে ধরার আগ্রহ।

‘কমরেড’—কথাটা তাকে আনন্দে, শক্তিতে উদ্বুদ্ধ করে তুললো। ‘আমরা মজুররা গির্জা এবং কারখানা গড়ে তুলি, শৃঙ্খল বানাই, মুদ্রা তৈরি করি, পুতুল গড়ি, কলকব্জা নির্মাণ করি…আমরা সেই জীবন্ত শক্তি, যা আদি থেকে অস্ত পর্যন্ত দুনিয়াকে বাঁচিয়ে রাখে—আহার এবং আনন্দ জুগিয়ে। সর্বকালে, সর্বস্থানে, কাজ করার বেলায় আমরাই সবার প্রথমে কিন্তু জীবনের অধিকারে সেই আমরাই সর্বপশ্চাতে। কে কেয়ার করে আমাদের? কে আমাদের ভালো করতে চায়? কে আমাদের মানুষ বলে স্বীকার করে?—কেউ না।

জনতাও প্রতিধ্বনি করে উঠলো, কেউ না।

শান্ত, সংযত, গম্ভীর, সরল ভাষায় পেভেল বক্তৃতা দিতে লাগলো। জনতা ধীরে ধীরে তার কাছে ঘিষে এক কালো ঘন সহস্র-শির বপুর মতো হয়ে দাঁড়ালো, তাদের শত শত উৎসুক চোখ পেভেলের দিকে নিবদ্ধ। পেভেলের কথাগুলো যেন তারা নির্বাক আগ্রহে গিলছে। পেভেল বলতে লাগলো, শ্রেষ্ঠতর জীবন আমরা কিছুতেই লাভ করতে পারব না ততদিন—যতদিন না আমরা উপলব্ধি করি, আমরা কমরেড, আমরা বন্ধু, এক অভিন্ন সংকল্পে পরস্পরে বাঁধা—সে সংকল্প কি জানো?—আমাদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম।

মার কাছ থেকে কে একজন বলে উঠলো, কাজের কথা বলো।

অমনি সঙ্গে সঙ্গে রব হ’ল, গোলমাল করো না, চুপ কর।

একজন মন্তব্য করলো, সোশিয়ালিস্ট, কিন্তু বোকা নয়।

আর একজন বললো, বেশ জোর গলায় বলছে কিন্তু।

তারপর আবার পেভেলের গলা,–বন্ধুগণ, আজ দিন এসেছে, আমাদের শ্রমভোজী ঐ যে লোভী লক্ষপতির দল, ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে, আমাদের আত্মরক্ষা করতে হবে, বুঝতে হবে, আমাদের রক্ষা করতে পারব একমাত্র আমরা, অপর কেউ নয়। শত্রুকে যদি ধ্বংস করতে হয় তবে একমাত্র নীতি গ্রহণ করতে হবে আমাদের প্রত্যেকের জন্য সকলে, সকলের জন্য প্রত্যেকে।

মাখোটিন চীৎকার করে উঠলো, সাচ্চা কথা বলছে। শোন ভাইসব, সত্য কথা শোনো।

পেভেল বললো, এক্ষুণি ম্যানেজারকে ডাকবো আমরা, ডেকে জিগ্যেস করব।

পলকে যেন ঘুর্ণিবাত্যায় আহত হয়ে জনতা দুলে উঠলো, অজস্র কণ্ঠে চীৎকার হ’ল, ম্যনেজার! ম্যানেজার! সে এসে জবাব দিক।

প্রতিনিধি পাঠাও।…তাকে এখানে হাজির কর।

বহু বাদ-বিতর্কের পর প্রতিনিধি নির্বাচিত হ’ল শিজভ, রাইবিন এবং পেভেল। তারা যাত্রা করবে, হঠাৎ জনতার মধ্যে জেগে উঠলো একটা অনুচ্চ ধ্বনি, ম্যানেজার নিজেই আসছে।

জনতা দুফাঁক হয়ে পথ করে দিলো, তার মধ্য দিয়ে ম্যানেজার ঢুকলেন। হাত ঈষৎ দুলিয়ে, লোক সরিয়ে পথ করে নিচ্ছেন তিনি। কিন্তু কাউকে স্পর্শ করছেন না। লম্বা-চওড়া শরীর, কুঞ্চিত চোখ, শাসনকর্তাসুলভ তীক্ষ্ণ-সন্ধানী দৃষ্টি বিস্তার করে তিনি মজুরদের মুখ দেখে নিচ্ছেন। মজুররা সসম্ভ্রমে টুপি খুলে হাতে নিচ্ছে, তিনি তাদের অভিবাদন যেন অগ্রাহ্য করে চলে যাচ্ছেন। তার উপস্থিতিতে জনতা চুপ করে গেলো, ঘাবড়ে গেলো। সবার মুখে উদ্বেগের হাসি, কণ্ঠে অস্ফুট ধ্বনি,–শিশু যেন তার ছেলেমির জন্য অনুতপ্ত। ম্যানেজার সেই লৌহস্তূপের ওপর পেভেল, শিজভের সামনে দাঁড়িয়ে নিস্তব্ধ জনতার দিকে চেয়ে বললেন, এসব হল্লার মানে কি? কাজ ফেলে এসেছ কেন?

সব চুপ-চাপ। কয়েক সেকেণ্ড গেলো, কোন জবাব নেই। শিজভ, মাথা নীচু করে দাঁড়ালো।

ম্যানেজার বললে, যা জিগ্যেস করছি তার জবাব দাও।

পেভেল তার সামনে এগিয়ে গিয়ে শিজভ, রাইবিনকে দেখিয়ে বললো, আমরা এই তিন জন শ্রমিক-বন্ধুদের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছি, আপনাকে সেই কোপেক-ট্যাক্সটা রদ করতে বলার জন্য।

কেন? পেভেলের দিকে না চেয়ে ম্যানেজার প্রশ্ন করলো।

পেভেল বেশ জোরের সঙ্গেই বললো, এরকম ট্যাক্স আমরা ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করিনা।

ওঃ, তাহলে আমার জল সাফ করবার প্রস্তাবটায় তুমি দেখতে পাচ্ছ শুধুই মজুরদের শোষণ করবার ফন্দি, তাদের মঙ্গলেচ্ছা নয়। এই তো?

হাঁ।

আর, তুমি?–ম্যানেজার রাইবিনকে জিগ্যেস করলেন।

আমারো ঐ একই কথা!

শিজভকে প্রশ্ন করতে সেও ঐ জবাব দিলো।

ম্যানেজার ধীরে ধীরে জনতার দিকে চেয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পেভেলকে বিদ্ধ করে বললেন, তোমাকে দেখে বেশ চোখা লোক মালুম হচ্ছে। তুমি কি প্লানটার উপকারিতা বুঝতে পাচ্ছ না?

পেভেল জোর গলায় বললো, আমরা বুঝতুম, কারখানার নিজের খরচে যদি জলা সাফ করা হত।

ম্যানেজার রুক্ষ জবাবে বলে, কারখানাটা দাতব্যাদার নয়। আমার হুকুম, এক্ষুণি-এই মুহূর্তে কাজে যাও। এই বলে কারও দিকে দৃকপাত না করে ম্যানেজার নীচে নাবতে গেলেন।-জনতার মধ্য থেকে একটা অসন্তুষ্টির চাপা গুঞ্জন শুনে হঠাৎ তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, কী!

সব চুপ চাপ। দূর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো, তুমি নিজে কাজ করগে।

ম্যানেজার স্পষ্ট ভাষায় বেশ একটু কড়া সুরে বললো, পনেরো মিনিটের মধ্যে যদি কাজ শুরু না কর তাহলে তোমাদের প্রত্যেককে বরখাস্ত করা হবে। এই বলে তিনি ভিড় ঠেলে বেরিয়ে গেলেন। তার। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সোরগোল উঠলো।

ওঁকে বলোনা।

ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে এই পেলুম…এতো দেখছি ফ্যাসাদ আরও বাড়লো।

পেভেলের দিকে চেয়ে একজন চেঁচিয়ে বললো, কি হে মাতব্বর উকিল, এখন কি হবে? খুব তত বক্তৃতার পর বক্তৃতা দিচ্ছিলে, কিন্তু যেই ম্যানেজার এলো, অমনি সব ফাঁক্কা।

তাইতো, কি করা যায় এখন?

গোলমাল এমনি করে বেড়ে উঠতে পেভেল হাত তুলে বললো, বন্ধুগণ, আমি প্রস্তাব করি যে, কোপেক-ট্যাক্স বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আমরা ধর্মঘট করে থাকি।

জবাবে শোনা গেল উত্তেজিত কণ্ঠ কোলাহল, আমাদের বোক। পেয়েছ আর কি!

আমাদের এই করা উচিত।

ধর্মঘট?

এক কোপেকের জন্য?

না কেন? কেন ধর্মঘট করব না?

আমাদের দল সুদ্ধুর কাজ যাবে!

তাহলে কাজ করবে কে?

নতুন লোকের অভাব কি।

কারা? যুডাসেরা?

ফি বছর মছা তাড়াবার জন্যে আমাদের ত তিন রুবেল ষাট কোপেক খরচ করতেই হয়।

সবাইকেই তা দিতে হবে।

পেভেল নেবে গিয়ে মার পাশটিতে দাঁড়ালো। রাইবিন তার কাছে এসে বললো, ওদের দিয়ে ধর্মঘট করাতে পারবে না। একটা পেনির ওপরও ওদের লোভ দুরন্ত, অত্যন্ত ভীতু ওরা; বড় জোর তিন’শকে তুমি দলে টানতে পারে, আর নয়। একগাদা গোবর কি একটা শলা দিয়ে তোলা যায়?

পেভেল চুপ করে রইলো, মজুররা সব পেভেলের বাগ্মীতার প্রশংসা করলো কিন্তু ধর্মঘটের সাফল্যে সন্দেহ প্রকাশ করে কাজে গিয়ে যোগ দিলো। পেভেল মনমরা হয়ে পড়লো, তার মাথা ঘুরছে…আত্মশক্তিতে আর তার বিশ্বাস নেই। ভাবতে ভাবতে সে বাড়ি ফিরে এলো।

সেইদিন রাত্রেই পেভেল গ্রেপ্তার হ’ল।

.

১.০৯

ছেলেকে হারিয়ে মা বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন, তার প্রাণ কেবলই হাহা করে বলতে লাগলো, আমায়ও কেন পেভেলের সঙ্গে ধরে নিয়ে গেলো না। রাইবিন এসে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, আমার বাড়িতেও তারা হানা দিয়েছিল, কিন্তু ধরলো না-ধরলো পেভেলকে। ওদের এই-ই হাল। ম্যানেজার চোখ ইশারা করলো, পুলিস বল্লো, যো হুকুম… আর দেখতে দেখতে একটা লোক অদৃশ্য হ’ল। চোরে চোরে মাসতুতে ভাই। একজন পকেট মারে, আর একজন পরাণে মারে।

মা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তোমাদের উচিত পেভলের পক্ষ হয়ে লড়া—তোমাদের সকলের জন্যই সে আজ জেলে গেছে।

কার উচিত?

তোমাদের সবার।

রাইবিন কেমন এক শ্লেষের হাসি হেসে বললো, তোমার যে অতিরিক্ত দাবি, মা। কেউ ওর কিছুই করবে না। কর্তারা হাজার হাজার বছর ধরে শক্তি সঞ্চয় করেছেন। আমাদের কজের মধ্যে তারা বহুত পেরেক ঠুকে রেখেছেন…আমাদের মধ্যে ব্যবধানের বিরাট দেয়াল। আমরা ইচ্ছে করলেই এক্ষুণি তা সরিয়ে মিলতে পারিনে…এইগুলো বাধা দিচ্ছে…এগুলোকে আগে দুর করা চাই।

রাইবিন চলে গেলো।

রাত্রে শোময়লোভ এবং য়েগর আইভানোভিচ এসে হাজির হল। আইভানোভিচ বললো, নিকোলাই জেল থেকে বেরিয়েছে, জানো দিদিমা?

তাই নাকি? ক’মাস জেলে ছিল সে?

পাঁচ মাস এগারো দিন। এণ্ড্রি আর পেভেলের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। এণ্ড্রি, তোমায় প্রণাম জানিয়েছে আর পেভেল বলে পাঠিয়েছে, ভয় নেই। জেল তো যাত্রাপথের সরাই—যা প্রতিষ্ঠা এবং তদ্বির করেছেন কর্তারা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে।…এখন কাজের কথা হক, দিদিমা। কাল ক’জন গ্রেপ্তার হয়েছে জানো?

না। আর কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে নাকি?

হাঁ, চল্লিশ জন এবং আরো দশজনের হবার সম্ভাবনা। তার মধ্যে একজন ইনি—শোময়লোভ।

মা যেন একটু নিশ্চিন্ত হলেন, পেভেল–পেভেল তাহলে একা নেই। বললেন, এতগুলি লোক যখন ধরেছে তখন বেশিদিন রাখতে পারবে না।

আইভানোভিচ বললো, সে কথা ঠিক, দিদিমা। আর আমরা যদি ওদের বাড়া ভাতে ছাই দিতে পারি, তাহলে ওরা আরো নাকাল হয়। কথাটা কি জানো, দিদিমা, ওরা গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিষিদ্ধ ইস্তাহারগুলোও যদি কারখানায় আর না ঢোকে তবে কর্তারা নির্ঘাত বুঝবেন এসবের পাণ্ডা কারা। পেভেল আর তার সঙ্গীদের তখন জেলে শক্ত করে চেপে ধরবে। কাজেই যেমন ব্রতের খাতিরে তেমনি পেভেলদের জন্য আমাদের কারখানার ভেতরে ইস্তাহার বিলির কাজ ঠিক আগের মতোই চালানো চাই। খুব ভালো ইস্তাহারও হাতে আছে, কিন্তু সমস্যা, তা কারখানায় ঢোকানো যায় কি করে? কারখানার গেটে আজকাল প্রত্যেকের শরীর তল্লাশী করা হয়।

মা বুঝলেন, তাকে দিয়ে একটা কিছু কাজ করাতে চায় ওরা। ছেলের মঙ্গলের জন্য কোন কিছুই করতে তাঁর আপত্তি নেই; কাজেই বললেন, তা’ কি করতে হবে আমাকে?

ফেরিওয়ালী মেরি নিলোভনাকে দিয়ে ইস্তাহারগুলো ঢোকাতে পারো না?

মা বলে উঠলেন, ওকে দিয়ে? সর্বনাশ, তা হলে দুনিয়ার কারো জানতে আর বাকি থাকবে না।

তারপর একটু ভেবে বললেন, আমার কাছে রেখে যেয়ো, আমি নিজেই ব্যবস্থা করব। মেরির সাহায্যকারিণী সেজে কারখানায় খাবার নিয়ে যাবো, তখন…ধরা পড়ব না…সবাই দেখবে পেভেল জেলে গেছে বটে, কিন্তু জেল থেকেও তার হাত কাজ করে যাচ্ছে।

তিনজনের মুখই আশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। আইভানোভিচ বলে উঠলো, চমৎকার! শোময়লোভ বললো, এ যদি হয় তো জেল হবে আমার কাছে আরামকেদারা! মা ভাবলেন, ইস্তাহার বেরোলে কর্তারা একথা কবুল করতে বাধ্য হবেন, ইস্তাহার বিলির জন্য পেভেল দোষী নয়। সাফল্যের আশায় এবং আনন্দে মা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলেন, বললেন পেভেলকে বোলো, তার জন্য আমি না করতে পারি হেন কাজ নেই।

আইভানোভিচ মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, তুমি পেভেলের জন্য মিছে ভেবোনা, মা। জেল আমাদের কাছে বিশ্রাম এবং পাঠের স্থান—মুক্ত অবস্থায় যার ফুরসুৎ আমাদের মেলেনা। যাক, তাহলে ইস্তাহারগুলো পাঠাবো। কাল থেকে আবার যুগান্ত-সঞ্চিত অন্ধকার-নাশী চাকা আগের মতো ঘুরতে আরম্ভ করবে। দীর্ঘজীবী হ’ক আমাদের স্বাধীনতা, আর দীর্ঘজীবী হ’ক এই মাতৃ-হৃদয়।

.

তারপর তারা বিদায় নিয়ে চলে গেলো! মা একান্ত মনে ভগবানকে ডাকেন আর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা করেন। তাঁর মানসপটে পেভেলের সঙ্গে আর সকলকার ছবি ফুটে ওঠে।

মা মেরির কাছে গিয়ে তার সাহায্যকারিণীর কাজ নিলেন।

.

১.১০

পরদিন মজুররা অবাক হয়ে দেখলো, কারখানায় নতুন এক খাবারওয়ালী–পেভেলের মা।

মেরি নিজে বাজারে গিয়ে মাকে কারখানায় পাঠিয়েছে।

মজুররা দলে দলে মার কাছে এসে দাঁড়ায়। কেউ দেয় আশা, কেউ সান্ত্বনা, কেউ বা সহানুভূতি, কেউ-বা ম্যানেজার এবং পুলিসকে দেয় গাল। কেউ আবার বলে, আমি হলে তোমার ছেলের ফাঁসি দিতুম, লোকগুলোকে যাতে সে আর বিগড়াতে না পারে।

মা শিউরে উঠেন।

কারখানায় সে কী উত্তেজনা! স্থানে স্থানে মজুরদের ছোট ছোট দল, সবাই ঘোঁট পাকায়। চাপা গলায় অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে। মাঝে মাঝে ফোরম্যানরা মাথা গলিয়ে দেখে যায়, তারা চলে যেতেই ওঠে ক্রুদ্ধ গালাগালি, হাসির হররা।

মার পাশ দিয়ে শোময়লোভকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় দুটো পুলিস। পিছু-পিছু শ’খানেক মজুরের হল্লা। পুলিসদের উদ্দেশ্যে বিদ্রূপ এবং কটূক্তি বর্ষণ করতে করতে তারা চলেছে। একজন বললো, বা কমরেড, বেড়াতে বেরিয়েছ বুঝি!

আর একজন বলে উঠলো, নয়তো কি! আমাদের ওরা কম সম্মান করে চলে?

তৃতীয় একজন বললো, হাঁ, বেড়াতে বেরোলেই সঙ্গে সঙ্গে বডিগার্ড চাইতো!

তীব্র তিক্ত স্বরে এক চক্ষু জনৈক মজুর বললো, কি করবে! চোর-ডাকাত ধরে তো আর মজুরি পোষায় না, তাই নিরীহ লোকদের নিয়ে টানাটানি।

পেছন থেকে আর একজন বলে উঠলো, তাও আবার রাত্তিরে নয়, একবারে খোলা-মেলা দিনে-দুপুরে। লজ্জাও নেই হতভাগাদের। পুলিসেরা এই কটূক্তি এড়াতেই যেন দ্রুত পা চালিয়ে দেয় মজুরদের কথা যে কানে যাচ্ছে এমনই মনে হয়না।

শোময়লোভ হাসি-মুখে জেলে গেল। মার মনে হল, যেন তার আর একটি ছেলেকে কে ছিনিয়ে নিয়ে গেলো। এই যে হাসিমুখে জেলে যাওয়া, এর মাঝেও পেভেলেরই প্রভাব।

সমস্ত দিন পরে মা বাড়ি ফিরে এলেন। সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলো। মা উদগ্রীব হয়ে রইলেন, আইভানোভিচ কখন আসে ইস্তাহার নিয়ে।

হঠাৎ একসময়ে দ্বারে মৃদু করাঘাত হ’ল। মা দ্রুতগতিতে দোর খুলে দিয়ে দেখেন শশেংকা,–দেখেই মার মনে হল, শশেংকা যেন অস্বাভাবিক রকমের মোটা হয়ে পড়েছে। বললেন, এতোদিন এদিক মাড়াওনি যে, ব্যাপার কি?

শশেংকা হেসে বললো, জেলে ছিলুম যে, মা…পোশাকটা বদলাতে হবে আইভানোভিচ আসার আগে।

তাইতো, একেবারে নেয়ে উঠেছ যে।

ইস্তাহারগুলো এনেছি।

দাও, আমার কাছে দাও,–মা অধীর আগ্রহে বলে উঠলেন।

দিচ্ছি—বলে শশেংকা গায়ের চাদরটা খুলে ঝাড়া দিলো, আর মায়ের সামনে পাতা-ঝরার মতো পড়তে লাগলো ভূঁয়ে একরাশি পাতলা কাগজের পার্শেল। মা হেসে তা কুড়িয়ে নিলেন, বললেন, তাইতো অবাক হচ্ছিলুম, এতো মোটা হলে কি করে? বড় কম তো আনোনি? এসেছ কি করে—হেঁটে?

হাঁ।

মা চেয়ে দেখলেন, সেই অস্বাভাবিক মোটা মেয়েটি আবার আগের মতো অসামান্য সুন্দরী হয়ে পড়েছে। কিন্তু তার চোখের নীচে কালি। বললেন, এতদিন জেলে ছিলে মা, এবার কোথায় তুমি একটু বিশ্রাম নেবে, না, সাত মাইল এই মোট বয়ে নিয়ে এসেছে।

এ তো করতেই হবে, মা।

সে যাক—পেভেলের কথা বল। সে ঠিক আছে তো? ভয় খায়নি তো?

না, মা! সে বিগড়াবে না, এটা ধ্রুব সত্য বলে ধরে নিতে পারো।

শশেংকা ধীরে ধীরে বললো, কী শক্তিমান পুরুষ এই পেভেল!

মা বললেন, সে ঠিক। অসুস্থ সে কখনো হয়নি।…কিন্তু তুমি যে শীতে কাঁপছ, দাঁড়াও, চা আর জ্যাম এনে দিচ্ছি।

মৃদুহাশ্যে শশেংকা বললো, তোফা কিন্তু মা এত রাতে তোমার কিছু করবার দরকার নেই, আমি নিজ হাতেই করছি।

হাঁ, তা বৈকি। এই রোগ ক্লান্ত শরীর নিয়ে—নয়? তিরস্কারের সুরে এই কথা বলে মা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। শশেংকাও গেলো তার পিছু পিছু। মা চা করছেন, আর সে একটা বেঞ্চিতে বসে পড়ে বললো, হাঁ, মা, সত্যিই আমি বড়ো ক্লান্ত। জেলখানা মানুষকে নির্জীব করে দেয়। এই বাধ্যতামুলক কর্মহীনতাই হচ্ছে সেখানকার সব চেয়ে ভয়ের কথা। এর চেয়ে পীড়াদায়ক আর কিছু নেই। এক হপ্তা থাকি, পাঁচ হপ্তা থাকি–বাইরে কতো কাজ করার আছে তাতো জানি। জানি যে, মানুষ আজও জ্ঞানের জন্য বুভুক্ষিত—আমরা তাদের অভাব পূর্ণ করতে সক্ষম কিন্তু কি করব, পশুর মতো বন্দী আমরা। এইটেই অসহ্য বোধ হয়—প্রাণ যেন শুকিয়ে যায়।

মা বললেন, কিন্তু এর জন্য কে তোমাদের পুরস্কৃত করবে?… তারপর ধীরে ধীরে দীর্ঘনিঃশ্বাসের সঙ্গে তিনিই তার জবাব দিলেন, ভগবান। কিন্তু তাকে তো তোমরা বিশ্বাস করনা।

না–শশেংকা সংক্ষেপে মাথা নেড়ে বললো।

নিজের ধর্মবিশ্বাসের মর্ম বুঝলে না তোমরা! ভগবানকে হারিয়ে জীবনের এপথে কেমন করে চলবে তোমরা?…

বাইরে জোর পায়ের শব্দ এবং কণ্ঠস্বর শোনা গেল। মা চমকে উঠলেন। শশংকা উঠে দাঁড়ালো। ফিফা করে বললো, দোর খুলো না। পুলিস যদি হয় বলবে আমাকে চেনোনা—আমি ভুলে এ বাড়িতে এসে পড়েছি। হঠাৎ মূর্ছা গেছি…তুমি পোশাক ছাড়াতে গিয়ে দেখেছ ইস্তাহার…বুঝলে?

কেন? কিসের জন্য?

চুপ। এতো পুলিস নয়, মনে হচ্ছে, আইভানোভিচ।

সত্যই আইভানোভিচ এসে ঘরে ঢুকলো। শশেংকাকে দেখে বললো, এরি মধ্যে এসে গেছ তুমি!

মার দিকে ফিরে বললো, তোমার এ মেয়েটি দিদিমা পুলিসের গায়ের কাঁটা। জেল-পরিদর্শক কি এতটা অপমান করায় পণ করে বসলো, ক্ষমা না চাইলে অনশন করে মরবে। আটদিন পর্যন্ত কিছু খেলল না,–মরে আর কি!

মা অবাক হয়ে বললেন, বলো কি! পারলে পরপর আটদিন না খেয়ে থাকতে?

শশেংকা তাচ্ছিল্যভরে ঘাড় দুলিয়ে বললো, কি করব। তাকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়াতে হবে তো!

যদি মারা যেতে?

যেতুম—গত্যন্তর ছিল না কিন্তু শেষটা সে বাধ্য হয়েছিল ক্ষমা চাইতে। অপমান কখনো ক্ষমা করতে নেই, মা!

মা ধীরে ধীরে বললেন, হাঁ, অথচ আমরা স্ত্রীলোকেরা জীবনভোর, অপমান সয়ে আসছি।…

চা পান করে শশেংকা শহরে যাবে বলে উঠে পড়লো। এত রাত্তিরে একা কি করে যাবে ভেবে শঙ্কিত হয়ে মা তাকে থাকতে বললেন; কিন্তু সে শুনলো না। শহরে তাকে ফিরতেই হবে। আইভানোভিচের কাজ আছে বলে সেও সঙ্গে যেতে পারলো না। মা শশেংকার জন্য দুঃখ করতে লাগলেন। আইভানোভিচ, বললো, জমিদারের আদুরে মেয়ে…ওর সইবে কেন? জেলে গিয়ে ওর দেহ ভেঙে পড়েছে।…জানো দিদিমা, ওরা দু’টিতে বিয়ে করতে চায়।

কারা?

ও আর পেভেল। কিন্তু এতোদিন ও পেরে উঠেনি। ইনি যখন জেলে উনি তখন বাইরে। উনি যখন জেলে ইনি তখন বাইরে।

মা বললেন, জানিনে তো! কেমন করে জানবো? পেভেল আমার কাছে তো কিছু বলে নি।

শশেংকার জন্য মার বুকটা যেন আরো দরদে ভরে উঠলো।

আইভানোভিচ, বললো, তুমি শশেংকার জন্য দুঃখ করছ দিদিমা, কিন্তু করে কি হবে? আমাদের বিদ্রোহীদের সবার জন্য যদি তোমার চোখের জল ফেলতে হয় তো চোখের জলও তো অতো পাবে না—অশ্রুউৎস শুকিয়ে যাবে তোমার। স্বীকার করি জীবন আমাদের কাছে, মোটেই সহজ নয়। আমার এক বন্ধুর কথাই বলি—এই দিনকয়েক আগে তিনি নির্বাসন থেকে ফিরে এসেছেন। তিনি যখন নোভোগারদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তখন স্ত্রী স্মোলেনস্কে তার প্রতীক্ষা করছেন। তিনি যখন স্মোলেস্কে পৌঁছলেন তখন তাঁর স্ত্রী মস্কোর কারাগারে। এবার স্ত্রীর সাইবেরিয়া যাওয়ার পালা। বিদ্রোহ এবং বিবাহ—এদুটো পরস্পরবিরোধী এবং অসুবিধাজনক জিনিস-স্বামীর পক্ষেও অসুবিধা, স্ত্রীর পক্ষেও অসুবিধা, কাজের পক্ষেও অসুবিধা। আমারও একজন স্ত্রী ছিল, দিদিমা, কিন্তু এমনিধারা জীবন পাঁচ বছরের মধ্যেই তাকে কবরশায়ী করেছে…

এক চুমুকে চায়ের কাপ নিঃশেষ করে সে তার দীর্ঘ কারা-জীবন এবং নির্বাসনকাহিনী সংক্ষেপে বর্ণনা করে গেলো।

মা নিঃশব্দে সব শুনলেন। তারপর ন্যস্ত কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন।

১.১১-১৫ খাবার নিয়ে কারখানার দুয়ারে

পরদিন দুপুরে আবার খাবার নিয়ে মা কারখানার দুয়ারে এসে হাজির হলেন। আজ ভারি কড়া পাহারা। জামার পকেট থেকে শুরু করে মাথার চুল পর্যন্ত খুঁজে তবে এক-একজন লোককে ঢুকতে দেওয়া হয়। মা এগিয়ে বললেন, একবারটি ঢুকতে দাওনা, বাবা। বড্ড ভারি, আর বইতে পারিনে, পিঠ দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে।

যা যা বুড়ি, ভেতরে যা…দেখোনা, উনিও আসেন যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝাতে!

মা ঢুকে পড়লেন। তারপর যথাস্থানে খাবারের পাত্র দুটো নাবিয়ে রেখে ঘাম মুছে ফেলে চারদিকে চাইলেন। গুসেভ ভ্রাতৃদ্বয় কারখানায় কামারের কাজ করে—তারা তৎক্ষণাৎ কাছে এসে দাঁড়ালো। বড়ো ভাই ভ্যাসিলি ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে প্রশ্ন করলো, পিরগ পেভে?

হাঁ, কাল আনবে।

এই ছিল নির্ধারিত গুপ্তসংকেত। দু’ভায়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আইভান হৃদয়াবেগ কিছুতেই সামাল করতে পারলো না, বলে উঠলো, ওঃ, এমন মা আর হয় না।

ভ্যাসিলি মাটিতে আসন করে বসে খাবারের পাত্রটার দিকে ঝুঁকে পড়লো, আর অমনি এক বাণ্ডিল ইস্তাহার এসে তার বুকের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলো। পরক্ষণেই তা তার জুতোর মধ্যে, পায়ের তলায় চলে গেলো।

এমন চটপট কাজটা হয়ে গেলে যে অন্য কেউ তা একদম লক্ষ্য করতে পারলো না। ভ্যাসিলিও তাদের ভুলিয়ে রাখার জন্য বাজে কথা বলছে, বাড়িতে না গিয়ে আজো এসো এইখানে, এই বুড়িমার কাছ থেকে খাবার খাই।

মা ক্রমাগত হাঁকেন, চাই টক্ কপির সুপ, গরম ঝোল, রোস্ট, মাংস, আর এক-এক করে ইস্তাহারের বাণ্ডিলগুলো আইভান ভ্যাসিলির কাছে চালান দেন। মজুরদল কাছে এসে পড়াতে মা ইস্তাহার দেওয়া থামিয়ে দিয়ে খাবারের হাঁক হাঁকতে লাগলেন। মজুররা এলো, খাবার খেলে, চলে গেলো। তারপর মা আবার তার কাজ শুরু করলেন এবং শেষ করলেন।

সাফল্যের আবেগে আনন্দে তার সমস্ত দিনটা এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্যে কাটলো।

রাত্রে এণ্ড্রি এসে হাজির হল। সে কারামুক্ত হয়ে এসেছে অথচ পেভেল কোথায়?–-মা এণ্ড্রির বুকে মুখ লুকিয়ে ছোটো মেয়েটির মতো কাঁদতে লাগলেন। এণ্ড্রি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, কেঁদোনা মা, পেভেলের জন্য কোন ভাবনা নেই, সে তোফা আছে। শীগগিরই জেল থেকে সে ফিরে আসবে।

এণ্ড্রি, মার কাছে সবিস্তারে জেলের দৈনিক জীবনযাত্রাকাহিনী বর্ণনা করে যায়। মা একটু আশ্বস্ত হন, তারপর বলেন; আজ কি করেছি জানো?…

কি?

মা ইস্তাহার-বিলির কাহিনী বলেন। এণ্ড্রি, উল্লসিত হয়ে বললো, চমৎকার, মা! এতে যে আমাদের কাজ কতটা এগিয়ে গেলো, কতো সুবিধা হ’ল, তা বোধ করি তুমি নিজেও বোঝোনি!

মায়ের প্রাণ …একটুকুতেই খুলে যায় স্নেহাকাঙ্ক্ষী সন্তানের কাছে। এণ্ড্রির কাছেও মা তার করুণ জীবনকাহিনী বিবৃত করে বলেন : স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলের মুখ চেয়ে রইলুম! সেই ছেলে যখন বাপের মতো বিপথে পা দিলো, তখন কত যে ব্যথা পেলুম প্রাণে, তা তোমায় কেমন করে বোঝাবো, এণ্ড্রি? জানি, আমার এ ভালোবাসা স্বার্থ-দুষ্ট, সংকীর্ণ—তোমরা আজকালকার ছেলেমেয়েরা যেমন পরের জন্য দুঃখ বরণ করে নাও, আমি তো তা পারিনে! আমি আমার নিকট আত্মীয়দের ভালোবাসি, পেভেলকে ভালোবাসি, তোমাকে, ভালোবাসি–বোধহয় পেভেলের চাইতেও বেশি …পেভেল বড় চাপা…আমাকে কিছু বলে না। শশেংকাকে বিয়ে করতে চায় আমি মা, আমাকে একথাটাও জানালোনা।

এণ্ড্রি বললো, এ সত্যি নয় মা,–আমি জানি এ সত্যি নয়। পেভেল শশেংকাকে ভালোবাসে একথা ঠিক, কিন্তু বিয়ে করতে চায় না, বিয়ে করতে পারেনা, বিয়ে করবেনা।

বিষণ্ণ চোখে মা বললেন, হরে, এমনি করে কি তোরা নিজেদের বলি দিবি?

এণ্ড্রি, নিজের মনেই বলে চলে, পেভেল অসাধারণ মানুষ লোহার মতো শক্ত তার মন।

মা চিন্তাকুল কণ্ঠে বলেন, কিন্তু সে আজ বন্দী। মন প্রবোধ মানে না। যদিও জানি সোনার ছেলে তোমরা, মানুষের হিতের জন্য এই কঠোর জীবন বরণ করে নিয়েছে, সত্যের জন্য এই জীবন-ভর দুঃখকে স্বীকার করেছে। কি সে সত্য তাও আমি জানি—ধনী যতদিন থাকবে দুনিয়ায়, মানুষ কিছু পাবে না—সত্যও না, সুখও না। এ সাচ্চা কথা, এণ্ড্রি।

এণ্ড্রি ধীরে ধীরে বলে, ঠিক কথা, মা। কার্চে একজন ইহুদী কবি ছিলেন। একবার তিনি লিখলেন–

বিনা দোষে যারা ফাঁসি কাঠে দিল প্রাণ,
সত্য তাদের করিবে জীবন দান।

ঘটনাচক্রে কার্চের পুলিসের হাতেই তিনি খুন হলেন। হন, কথা তা নয়। কথা হলো, তিনি সত্য কি তা উপলব্ধি করেছিলেন এবং তা প্রচার করার জন্য অনেক কিছু করেছিলেন, তিনি সত্য ব্যক্ত করেছিলেন।

এমনি করে সে রাতটা কাটলো।

.

১.১২

পরদিন কারখানার গেটে যেতেই রক্ষীরা বেশ রুক্ষভাবে মাল মাষ্টতে নাবিয়ে মাকে ভালো করে পরীক্ষা করলো।

মা বললেন, আমার খাবার জুড়িয়ে যাবে, বাবা!

চোপ রও—একজন রক্ষী বললো।

আর একজন বললো, ইস্তাহারগুলো নিশ্চয়ই বেড়ার ওপর দিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া হয়।

মা রেহাই পেলেন।

বুড়ো শিজভ, এসে বললো চাপা গলায়, শুনেছে তো, মা?

কি?

ইস্তাহারগুলো আবার দেখা দিয়েছে। রুটির ওপর চিনির মতো করে ছড়িয়ে দিয়ে গেছে ওরা। অথচ শাস্তি হ’ল এর জন্য আমার ভাইপোর, তোমার ছেলের। এখন পরিষ্কার দেখা গেলো, ওরা। নিরপরাধ।

তারপর দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোত বললো, বাবা, এ মানুষ নয় যে হুমকি দিয়ে দমিয়ে রাখবে। এ ভাবধারা—একে পোকার মতো টিপে মারা চলেনা।

মা বাবার হাঁকতে লাগলেন। কারখানায় সেদিন সে কী উত্তেজনা। মজুররা আলাপ-আলোচনা আনন্দে উতলা। একজন বলছে, বাছাধনরা সত্য কথা সইতে পারেন না।

কর্তারা ক্রুদ্ধ বিব্রত হয়ে ছুটাছুটি করছেন। একজন বলছেন, ব্যাটারা হাসছে দেখো। হাসবার মতো বিষয় কিনা—ম্যানেজার যা বলেন ঠিক—আমূল ধ্বংস করতে চায় ওরা। ব্যাটাদের শুধু আগাছার মতো ওপড়ালে হবে না, একেবারে চষে একশা করে দিতে হবে।

আর এক কর্তা বীর দর্পে অদৃশ্য দুশমনের উদ্দেশে আস্ফালন করে বলে, যা খুশি ছাপা, ব্যাটা বজ্জাত, কিন্তু খবর্দার আমার বিরুদ্ধে একটা কথা বলেছিস কি মরেছিস।

গুসেভ এসে মাকে বললো, আজ আবার তোমার কাছে খেতে এসেছি, মা। ওঃ যা খাবার তুমি দিয়েছ, মা, চমৎকার, অতি চমৎকার!

মা খুশি হলেন, ভাবলেন, আমাকে না হলে এদের চলবে কি করে?

অদূরে একজন মজুর বলছে, আমি পেলুম না একখানা কোথাও।

আর একজন বলছে, শুনতে বেশ লাগে কিন্তু। পড়তে না পারলেও এটা বুঝি, বাছাধনদের আঁতে বেশ একটু বা লেগেছে।

তৃতীয়জন বলে, বয়লার ঘরে চলো, পড়ে শোনাচ্ছি। গুসেভ ইঙ্গিত করে বললো, দেখছ না, মা, কেমন কাজ করছে?

মা খুশি হয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। এণ্ড্রিকে বলেন, ওরা দুঃখ করছিল পড়তে জানেনা বলে। আমিও তো তাই—সেই ছোটবেলা যতটুকু যা শিখেছিলুম, স্রেফ ভুলে বসে আছি।

আবার শেখো, মা।

মরতে বসেছি, এখন শেখবো? ঠাট্টা করিসনি, বাছা!

এণ্ড্রি কিন্তু শেলফ থেকে একটা বই নিয়ে মাকে বর্ণ-পরিচয় করাতে লেগে গেলো। ছুরির ডগা দিয়ে একটা অক্ষর দেখিয়ে বললো, এটি কি?

আর।

এটা?

এ।

এমনিভাবে মার শিক্ষা শুরু হয়।

পড়তে পড়তে এক সময় মা হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন, এক পা যখন কবরে, তখন বসলুম বই নিয়ে।

এণ্ড্রি, সান্ত্বনা দিয়ে বললো, কেঁদোনা, মা, তোমার দোষ কি? জীবন তো আর তুমি ইচ্ছে করে অমন ভাবে কাটাও নি। তুমি তবু বুঝতে পাচ্ছ, কী শোচনীয় জীবন তোমাদের। অনেকে কিন্তু এই কথাটাই বুঝতে পারেনা। হাজার হাজার লোক গরু-বাছুরের মতো বেঁচে থেকে বড়াই করে, তোফা আছি। কিন্তু কোথায় তোফা তাদের জীবন! আজ কাজ শেষ হলে খাওয়া, কালও কাজ শেষ হলে খাওয়া, পরশুও তাই—দিনের পর দিন, বছরের পর বছর …ঐ একই রুটিন…কাজ আর খাওয়া, কাজ আর খাওয়া। সঙ্গে সঙ্গে কাচ্চা-বাচ্চার দল আমদানি, দু’দিন তাদের নিয়ে আমোদ…তারপরে রুটিতে টান পড়লে তাদেরই ওপর রাগের ঝাল ঝাড়া, খালি গোগ্রাসে গেলা, বড়োও হয় না যে, কাজ করে একটু সাহাষ্য করবে। ছেলেমেয়েদের তারা ভারবাহী পশু করে তোলে। ছেলেমেয়েরা পেটের জন্য খাটে, জীবনটাকে টেনে নিয়ে চলে একটা চুরি-করা পচা ঝাড়নের মতো। প্রাণ তাদের চঞ্চল হয়ে ওঠেনা আনন্দের সাড়ায়, কখনো দ্রুত তালে বেজে ওঠেনা হৃদয়দ্রাবী ভাবের আবেগে। কেউ বাঁচে ফকিরের মতো ভিক্ষার ঝুলি সম্বল করে, কেউ জীবন কাটায় চোরের মতো পরের জিনিস নিয়ে। কর্তারা চোরের আইন তৈরি করেছে, লাঠি ধারী রক্ষীদল মোতায়েন করে তাদের বলছে, আমাদের তৈরি আইন রক্ষা কর! ভারি সুবিধার আইন এগুলো জনসাধারণের রক্ত শুষে নেওয়ার অধিকার আমাদের দিয়েছে। বাইরে থেকে মানুষকে চেপে পিষে নিঙরে নিতে চায় ওরা, কিন্তু মানুষ বাধা দেয়। তাই ভেতরে এই আইন চালানো-যুক্তি-শক্তিও যাতে তাদের পোপ পেয়ে যায়। মানুষ একমাত্র তারাই যারা মানুষের দেহের শৃঙ্খল নষ্ট করে, মানুষের মনের শৃঙ্খল অপসারিত করে। তুমিওতো তাই করতে চলেছে, মা তোমার সাধ্যমত।

আমি! আমি কী করতে পারব, এণ্ড্রি!

কি করতে পারবে না, মা? কেন পারবে না? বর্ষাধারার মতো আমাদের কাজ-এর প্রত্যেকটি ফোটা পরিস্ফুট করে বীজকে। যখন তুমি পড়তে শিখবে, মা, তখন…হাঁ, তোমায় শিখতেই হবে…ভাবো দেখি, পেভেল ফিরে এসে কতটা অবাক হবে!

মা মনোযোগী ছাত্রীর মতো বই নিয়ে উঠেপড়ে লেগে গেলেন।

.

১.১৩

দরজায় শব্দ হতে মা খুলে দিয়ে দেখেন রাইবিন।

রাইবিন বললো, তুমি একা, মা?

হাঁ।

তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। আমার একটা থিওরী আছে।

মা উদ্বেগে, আশঙ্কায়, রাইবিন কি যেন বলে ভেবে তার দিকে চাইলেন।

রাইবিন বললো, সবকিছুর মুলে চাই টাকা। এই ইস্তাহারগুলোত টাকা জোগায় কে?

মা বললেন, জানিনে তো!

রাইবিন বললো, তারপর, দ্বিতীয় জিগ্যাস্ত, এসব লেখে কারা? শিক্ষিত লোকেরা, কর্তারা। কর্তারা এই সব বই লিখে ছড়ায় এবং এই বইয়েতে তাদেরই বিরুদ্ধে কথা থাকে। এখন আমায় বল, মা, কেন, কোন্ স্বার্থে কর্তারা তাদের অর্থ এবং সময় ব্যয় করে, তাদের নিজেদের, বিরুদ্ধেই লোক ক্ষেপিয়ে তোলে?

মা ভীত হয়ে বলেন, তোমার কি মত?

রাইবিন বলে, আমার মত! যখন ঠিক পেলুম জিনিসটা, আমার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠলো।

কি—কি ঠিক পেলে?

প্রবঞ্চনা, প্রতারণা—হাঁ, ঠিক তাই। জানিনে ভালো করে, তবু অনুভব করি—কর্তারা কোন একটা লীলা করছেন। আমি ওসব চাই নে। আমি চাই সত্য এবং সত্য কি তা আমি বেশ জানি। কর্তাদের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলবনা আমি। আমি জানি, ওদের সুবিধার জন্য যখন দরকার হবে, তখন ওরা আমাকে সামনে ঠেলে দেবে, তারপর আমার হাড় মাড়িয়ে ওরা ওদের ঈপ্সিত স্থানে পৌঁছাবে।

মা ব্যথিত সুরে বললেন, হা ভগবন, পেভেলরা কি তবে এ সব কথা বোঝেনা? না না, আমি এ বিশ্বাস করতে পারিনে। তাদের লক্ষ্য—সত্য, সম্মান, বিবেক…কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই তাদের।

কাদের কথা বলছ, মা?

সকলের কথা, প্রত্যেকের কথা। মানুষের রক্ত নিয়ে কারবার যার করে, তারা সে মানুষ নয়।

রাইবিন মাথা নীচু করে বলে, তারা না হতে পারে, মা, কিন্তু তাদের পেছনে তো এমন একদল লোক থাকতে পারে, যাদের উদ্দেশ্য স্বার্থসিদ্ধি—এমনি এমনি কেউ আর নিজেদের বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপায় না। তুমি আমার কথা ঠিক জেনে রেখো, মা, কর্তাদের কাছ থেকে কখনও কিছু ভালো পাওয়া যাবে না।

মা ভয় পেয়ে বলেন, তা তোমার মতটা কি বলত?

আমার মত! কর্তাদের কাছ থেকে তফাৎ থাকো, বাস—এইমাত্র!

তারপর কিছুক্ষণ চুপ-চাপ থেকে ধীরে ধীরে বলে, আমি চলে যাচ্ছি, মা, লোকদের সঙ্গে গিয়ে মিশব, তাদের সঙ্গে কাজ করব। এ কাজের যোগ্য আমি। লিখতে পড়তে জানি, খাটতে পারি, বোকাও নই। আর সব চেয়ে বড় কথা, লোকদের কি বলতে হবে তা আমি জানি। জানি, তাদের বিশ্বাস করা চলে না। জানি, মানুষের আত্মা আজ কলুষিত, বিদ্বেষ-বিষ-দুষ্ট, সবাই পেট বোঝাই করবার জন্য ব্যগ্র–কিন্তু খাবার কই? তাই তারা পরস্পর খাওয়া-খাওয়ি করে।…আমি যাবো গ্রামে…পল্লিতে…আর লোকদের জাগাবো। তাদের আজ নিজেদের হাতে কাজ নেওয়া দরকার, নিজেদের হাতে একাজ করা দরকার। তারা একবার বুঝুক, তারপর নিজেরাই নিজেদের পথ খুঁজে নেবে। আমি যাচ্ছি শুধু তাদের বোঝাতে, তাদের একমাত্র আশা তারা নিজেরা, তাদের একমাত্র বুদ্ধি তাদের নিজেদের বুদ্ধি, এই হচ্ছে সত্য।

মা ধীরে ধীরে বলেন, তোমায় ধরবে ওরা।

ধরবে, আবার ছেড়ে দেবে। আবার আমি এগিয়ে চলবো।

চাষীরাই তোমায় বাঁধবে, তোমায় জেলে দেবে।

দিক, কিছুকাল জেলে থেকে আবার বেরুব, আবার চলবো। চাষীরা একবার বাঁধবে, দু’বার বাঁধবে, তারপর তারা বুঝবে, আমাকে বাঁধা উচিত নয়, আমার বক্তব্য শোনা উচিত। আমি তাদের ডেকে বলবো, বিশ্বাস করতে বলেছিনে তোমাদের শুধু কথাগুলো শোন। আমি জানি, তারা যখন শুনবে, তখন বিশ্বাস করবে।

মা বলেন, তুমি মারা পড়বে, রাইবিন।

রাইবিনের কালো গভীর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মার দিকে চেয়ে বললো, খৃস্ট বীজের সম্বন্ধে কি বলেছিলেন জানো : তুমি মরবেনা, নতুন অঙ্কুরে জেগে উঠবে। আমি বিশ্বাস করিনে, আমি এত সহজে মরবো। আমি বুদ্ধি রাখি, সোজা পথে চলি; কাজেই গতি আমার অপ্রতিহত। শুধু জানিনে, কেন আমার প্রাণে ব্যথা জাগে। হাঁ…আমি যাবো…তাড়িখানায় যাবো…লোকদের কাছে যাবে।…কিন্তু এণ্ড্রি কই? এখনো আসছেনা যে! এরি মধ্যে আবার কাজে লেগেছে বুঝি!

হাঁ। জেল থেকে বেরুতে না বেরুতেই ওদের কাজ।

এইতো চাই। তাকে আমার কথা বোলো।

বলবো।

এবার উঠি।

কারখানার কাজ ছাড়বে কবে?

ছেড়ে দিয়েছি তো!

যাচ্ছ কখন?

কাল ভোরে।

রাইবিন চলে গেলো। মা একা বসে রইলেন। চারদিকে ঘন অন্ধকার। তার দিকে চেয়ে মা শিউরে উঠলেন, এই অন্ধকারের জীব আমি চিরজীবন।…

এণ্ড্রি এলে মারাইবিনের কথা বললেন। শুনে এণ্ড্রি নেচে উঠলো, যাচ্ছে?—চমৎকার! সত্যের ডঙ্কা বাজিয়ে যাক সে গ্রামে গ্রামে, শোকদের জাগিয়ে তুলুক,আমাদের সঙ্গে এখানে থাকা তার পক্ষে কষ্টকর।

মা বললেন, তাদের কথা বলছিল সে। সত্যিই কি তাই? কর্তারা কি তোমাদের প্রবঞ্চিত করছেন না?

এণ্ড্রি, বললো, তাই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ বুঝি, মা?…তা যা বলেছে, টাকা নিয়েই যত গোলমাল। ওঃ, টাকা যদি থাকতো, মা!…আমরা এখন আছি ভিখের ওপর…এইত ধরো নিকোলাই, পঁচাত্তর রুবেল মাইনে পায়, তার পঞ্চাশ রুবেলই আমাদের দেয়। অন্যান্য সবাইও তাই। ছাত্ররা খেতে পায় না, তবুও একটি একটি করে কোপেক জমিয়ে আমাদের পাঠায়। তাদের কথা বলছিলে, হাঁ, তাদের মধ্যেও রকমফের আছে বৈকি! কেউ আমাদের ঠকাবে, ছেড়ে যাবে, আবার কেউ আমাদের সঙ্গে থাকবে, সেই উৎসব-দিবসে আমাদের সহযাত্রী হবে। সে উৎসব-দিবস…জানি তা দুরে, বহু দূরে। কিন্তু পয়লা মে আমরা একবার তার অনুষ্ঠান করে আনন্দ করব।

তার কথায়, তার আনন্দে মার মন থেকে দুশ্চিন্তা দূর হয়। এণ্ড্রি, ঘরময় পায়চারি করে বেড়াতে লাগলো, তারপর আবার বললো, জানো, মা, প্রাণের মধ্যে মাঝে মাঝে এমন এক আশ্চর্য ভাব জাগে! যেখানে যাও, মনে হবে, সকল মানুষ তোমার কমরেড—সবার মাঝে একই আগুন দীপ্ত, সবাই আনন্দময়, সবাই ভালো। কথা নেই, অথচ সবাই সবাইকে বোঝে। কেউ কাউকে বাধা দিতে চায় না, অপমান করতে চায় না, তার আবশ্যকও বোধ করে না। সবাই একতাবদ্ধ, প্রত্যেকটি প্রাণ গায় তার নিজের গান। সমস্ত গানের তরঙ্গ সম্মিলিত হয়ে প্রবাহিত হয় এক বিশাল, বিরাট, মুক্ত-শ্রোতা আনন্দের নদী। যখন তুমি এই কথা ভাববে, মা, যখন ভাববে, এ হবে, এ না হয়ে পারে না, তখন বিস্ময়বিমুগ্ধ প্রাণ আনলে গলে যাবে। এতে আনন্দ যে, তা তুমি সামলাতে পারবে না, চোখ সজল হয়ে উঠবে।…কিন্তু এ স্বপ্ন হতে যখন জেগে উঠবে, যখন সংসারের দিকে চাইবে, দেখবে সবকিছু তোমার চারপাশে ঠাণ্ডা, নোঙরা,—সবাই শ্রান্ত, ক্ষুধার্ত, কর্মব্যস্ত সংসারের চলতি পথে মানবজীবন কাদার মতো মথিত হচ্ছে, পদদলিত হচ্ছে। …হাঁ…ব্যথা পাবে সন্দেহ নেই, কিন্তু তবু তোমায় মানুষকে অবিশ্বাস করতে হবে, ভয় করতে হবে, ঘৃণা করতে হবে। মানুষ বিভক্ত জীবন মানুষকে দু’টুকরো করে রেখেছে। তুমি তাকে ভালোবাসতে চাইবে, কিন্তু কি করে বাসবে? কি করে ক্ষমা করবে সে মানুষকে, যে তোমায় আক্রমণ করছে বন্য পশুর মত। বুঝছেনা যে তোমার মধ্যেও একটা আত্মা আছে, তোমার মুখে—মানুষের মুখে আঘাত দিচ্ছে। তুমি ক্ষমা করতে পারোনা–তোমার নিজের কথা ভেবে নয়, মানবজাতির কথা ভেবে। নিছক ব্যক্তিগত অপমান আমি ক্ষমা করতে পারি, কিন্তু অত্যাচারীকে অপমান করার আস্কারা দিতে পারি না, মানুষকে মারার, হাত পাকাবার জন্য আমার পিঠ পেতে দিতে পারি না।…

মা চুপ করে শুনতে থাকেন। এণ্ড্রির চোখ জ্বলছে। দৃঢ়কণ্ঠে সে বলতে লাগলো, নোঙরা যা তা আমাকে আঘাত না দিলেও তাকে আমি ক্ষমা করবোনা। আমি একা নই দুনিয়ায়। আজ যদি আমি আমাকে অপমানিত হতে দিই–হয়তো আমি তাকে হেসে উড়িয়ে দিতে পারি, গায়ে না মাখতে পারি, কিন্তু অপমানকারী যে, সে আজ আমার ওপর শক্তি পরীক্ষা করে বর্ষিত-স্পর্ধায় কাল আর একজনের পিঠের চামড়া তুলবে। এই জন্যই আমরা বাধ্য হই, মানুষে মানুষে তফাৎ করতে—যারা অত্যাচারী তাদের দূরে রাখতে, যারা সত্যের জন্য লড়াই করছে তাদের আপনার বলে টেনে নিতে।…বিপদই হচ্ছে এইখানে। দু’রকম চোখ নিয়ে তোমায় দেখতে হবে, দু’রকম প্রাণ নিয়ে তোমায় অনুভব করতে হবে,—একটা বলে, সবাইকে ভালোবাসে, আর একটা বলে, হুলিয়ার, ও তোমার দুশমন। কেন? কারণ এটা অদ্ভুত হলেও সত্য যে, মানুষ আজও এক-সমতলে দাঁড়িয়ে নেই। মানুষের মধ্যে সাম্য আনতে হবে আমাদের, সকল মানুষকে এক সারিতে দাড় করাতে হবে আমাদের মাথা দিয়ে বা হাত দিয়ে মানুষ যতকিছু সুখ-সুবিধার সৃষ্টি করেছে সব আজ নিখিল মানুষের মধ্যে সমান ভাবে বেঁটে দিতে হবে। মানুষকে আর পরস্পরের ভয়ের এবং হিংসার গোলাম, লোভের এবং বোকামির দাস করে রাখবোনা।

এমনি কথাবার্তা প্রায়ই চলতো মা এবং এণ্ড্রির মধ্যে। পড়াও চললে মার। চোখ তার ক্ষীণদৃষ্টি। এণ্ড্রি, বললো, আসছে রববার শহরে নিয়ে গিয়ে তোমায় চশমা কিনে দেব।

তিন-তিনবার মা জেলে পেভেলের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন, কিন্তু পারেন নি। জেলের কর্তা অতিরিক্ত বিনয়ের সঙ্গে, এখন হবে না, এই আসছে হপ্তায় বলে ফিরিয়ে দিয়েছে। মা এণ্ড্রি কে বললেন, খুব নম্র কিন্তু লোকটা।

এণ্ড্রি হেসে বললে, হাঁ, বিনয়ের অভাব নেই, হাসিরও অভাব নেই। ওদের যদি বলা হয়, দেখো, এই লোকটা সাধু, জ্ঞানী, কিন্তু ও থাকলে আমাদের বিপদ। ওকে ফাঁসিতে লটকাও। বাস, আর কথা নেই। ওরা হাসতে হাসতে তাকে ফাঁসিতে লটকাবে, এবং ফাঁসিতে লটকিয়ে ওরা হাসতে থাকবে।

মা বললেন, কিন্তু আমাদের ওখানে যে লোকটি খানাতল্লাশী করতে গিয়েছিল সে একটু ভাল।

এণ্ড্রি বললো, মানুষ ওরা কেউই নয়, মা। মানুষকে আঘাত দেবার, অভিভূত করার, তাকে রাষ্ট্রের চাহিদা মতো গড়ে নেবার যন্ত্র ওরা। কর্তারা যেমন খুশি ওদের চালান। ওরা না ভেবে, কেন, কি দরকার এ প্রশ্ন না করে কর্তাদের হুকুম তামিল করে যায়।

অবশেষে মা একদিন ছেলের দেখা পেলেন। অনেক কথা হলো। মা শেষটা বললেন, কবে ছেড়ে দেবে তোকে? কেন জেল হ’ল তোর? ইস্তাহার তো আবার বেরিয়েছে কারখানায়।

পেভেলের চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, বেরিয়েছে? কবে? কতো?

রক্ষী বাধা দিয়ে বললো, ওসব কথ: বলা নিষেধ, পারিবারিক কথা বলো। অগত্যা পেভেল বললো, তুমি এখন কি করছ, মা?

মা ইঙ্গিতপূর্ণ কণ্ঠে বলেন, আমিই কারখানায় এইসব বয়ে নিয়ে যাই—টক, ঝোল, খাবার…

পেভেল বুঝলো। চাপা হাসির বেগে তার মুখের শিরাগুলো কাঁপতে লাগলো। বললো, তাহলে একটা ভালো কাজ পেয়েছ তুমি, মা। সময় তোমার মন্দ কাটছেনা।

মা বলেন, ইস্তাহার বেরুবার পর আমাকেও খুঁজে দেখেছিল।

রক্ষী বললো, আবার ঐ কথা।

এমনি করে সময় উত্তীর্ণ হল। মা-ছেলে চোখের জলের মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্ন হলেন, বিদায় নিলেন।

বাড়ি এসে মা এণ্ড্রিকে বললেন, আচ্ছা এণ্ড্রি, ওরা কেমন করে পারে, বলতো? আমার তো পেভেলের জন্য মুখে অন্ন রোচে না। আর ওরা দেখি ছেলেদের জেলে পাঠিয়ে দিব্যি আছে, খায়-দায়, হাসি-গল্প করে, যেন কিছুই হয়নি।

এণ্ড্রি বলল, এইটেই তো স্বাভাবিক। আইন আমাদের ওপর যতটা কড়া, ওদের ওপর ততটা নয়। আর আমাদের চাইতে আইনের দরকারও ওদের বেশি। এইজন্যেই আইন যখন ওদের নিজেদের মাথায় ঘা দেয়, ওরা কাঁদলেও জোরে কাঁদেনা—নিজের লাঠি নিজের মাথায় পড়লে তত লাগেনা! ওদের কাছে আইন রক্ষাকর্তা, আর আমাদের কাছে আইন শৃঙ্খল—যা আমাদের হাত-পা বেঁধে পঙ্গু, দুর্বল করে রেখেছে, আমাদের আঘাত দেবার শক্তি লোপ করেছে।

দিন তিনেক পরে নিকোলাই কারামুক্ত হয়ে পেভেলদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। ঘরে আলো দেখতে পেয়ে সে এসে ঢুকলো, বলে, আমি সোজা জেল থেকে আসছি, মা।

তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত, দৃষ্টি বিষণ্ণ, সন্দিগ্ধ! মা কোনদিনই তাকে পছন্দ করতেন না, কিন্তু আজ এই ছেলেটির দিকে চেয়েও কেমন এক দরদে তার প্রাণ ভরে গেলো, বলেন, শুকিয়ে আধখানা হয়ে গেছিস যে, বাবা! দাঁড়া, চা করে দিচ্ছি।

এণ্ড্রি রান্নাঘর থেকে বলে উঠলো, আমিই কচ্ছি চা!

মা তখন বলেন, ফেদিয়া মেজিন কেমন আছে রে? কবিতা লিখছে, না?

নিকোলাই মাথা নেড়ে বলে, হাঁ, কিন্তু আমি ছাই কিছু বুঝিনা তা। একটা খাঁচায় রেখেছে তাকে, আর সে গান করছে। একটা জিনিস আমি খাঁটি বুঝেছি—আর বাড়ি ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই আমার।

মা সমবেদনার সুরে বলেন, ইচ্ছে থাকবে বা কেন! কিসের, মায়ায় সে পুরীতে যাবি?

নিকোলাই বললো, সত্যিই শূন্যপুরী, মা। শুধুই পোকা-মাকড়ের বাসা। এখানে আজকের রাতটা থাকতে পারি, মা?

মা বলেন, ছেলে মার কাছে থাকবে তারও কি আবার অনুমতি নিতে হয়, বাবা!

নিকোলাই আপন মনে কত কি বলে চলে। এণ্ড্রি, রান্নাঘর থেকে আসতে তার মুখের দিকে চেয়ে বলে, আমার মনে হয়, এমন কতকগুলো লোক আছে, যাদের মেরে ফেলা উচিত।

এণ্ড্রি গম্ভীরভাবে বললো, তাই নাকি। কিন্তু কেন শুনতে পারি কি?

যাতে তারা চিরদিনের মতো ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

বটে! কিন্তু জ্যান্ত লোকগুলোকে ঠাণ্ডা করার অধিকার তোমায় কে দিলে?

দিয়েছে তারা নিজেরা।…তারা যদি আমায় আঘাত দেয়, আমার অধিকার আছে জবাবে তাদের আঘাত করার, তাদের চোখ উপড়ে ফেলার। আমায় ছুঁয়ো না, আমিও তোমায় ছোঁব না। আমায় যেমন খুশি চলতে দাও, আমি চুপচাপ থাকবে, কাউকে ছোঁবও না। হয়তো বনে চলে যাবো, নদী-তীরে কুঁড়ে বেঁধে একা থাকবে।

এণ্ড্রি বললো, যাও না, খুশি হয় তাই গে থাকো।

এখন?…নিকোলাই ঘাড় নেড়ে বলে, এখন তা অসম্ভব।

কেন? অসম্ভব কেন? আটকাচ্ছে কে তোমায়?

আটকাচ্ছে মানুষ। আমরণ তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে হবে আমায়–অন্যায় এবং ঘৃণার বাঁধনে। শক্ত সে বাঁধন। আমি তাদের ঘৃণা করি, তাই তাদের ছেড়ে যাবো না। তাদের পথ রোধ করে দাঁড়াবে, তাদের আলিয়ে মারবো আজীবন। তারা আমার শতা করেছে, আমিও তাদের শত্রুতা করব! কৈফিয়ৎ যদি দিতে হয় তোত দেব আমার নিজের কাজের কৈফিয়ৎ। আমার বাবা যদি চোর হয়… বলতে বলতে থেমে গেলো নিকোলাই। তারপর হঠাৎ উষ্ণ হয়ে বলে উঠলো, আইছে-গবর্ভব ব্যাটার মুণ্ডু ছিঁড়ে ফেলব, দেখে নিয়ে।

এণ্ড্রি ব্যগ্র-কৌতুহলে বললো, কেন বলো তো?

ব্যাটা স্পাই, লোকের সর্বনাশ করে বেড়াচ্ছে। ব্যাটার জন্য আজ আমার বাবা পর্যন্ত স্পাই হবার মতলব করছেন।

এণ্ড্রি বুঝলল, নিকোলাইর প্রাণে কী মর্মন্তুদ ব্যথা, কী অসহ যাতনা-এর সান্ত্বনা নেই। যুক্তিতে এ প্রশমিত হয় না, শুধু বললো, ভাই, আমরাও ভুক্তভোগী, আমরাও একদিন অমনি করে ভাঙা কাঁচ মাড়িয়ে রক্তাক্ত পদে চলেছি জীবন-পথে, অন্ধকারে আমরাও অমনি আলোর অন্য হা-হা করেছি।

নিকোলাই বললো, তুমি আমায় বোঝাতে চেয়ো না, বন্ধু, বোঝাবার কিছু নেই। আমার বুকে হাত দিয়ে দেখো-মনে হচ্ছে যেন ক্ষুধার্ত ক্রুদ্ধ নেকড়ের দল গর্জন করছে।

এণ্ড্রি বলে, একদিন এ দূর হবে-সম্পূর্ণভাবে না হলেও, হবে। শিশুর হামের মতো এও মানুষের একটা ব্যাধি। সবাই আমরা এতে ভুগি। যারা শক্তিমান্ তারা ভোগে বেশি। যারা দুর্বল, তারা ভোগে কম। এ ব্যাধি কখন আসে, জানো? যখন মানুষ নিজেকে চিনেছে কিন্তু জীবনের পূর্ণ পরিচয় পায়নি, জীবন-যাত্রায় নিজের স্থান খুঁজে পায়নি। তা না পেয়ে নিজের দামও কষতে পারেনি। তখন তার কেবলই মনে হয়, দুনিয়ার বুকে অপুর্ব চিজ সে, কেউ তাকে মাপতে, পারে না কেউ তার দাম তলিয়ে দেখে না, সবাই চায় তাকে হজম করে ফেলতে। পরে সে বুঝতে পারে, অন্যান্য বহু মানুষের মধ্যে যে প্রাণ তাও তারই মতো…তখন থেকে তার মন নরম হতে থাকে, ন্যাধি উপশম হতে থাকে। লজ্জা জাগে, বোঝে যে, মন্দিরশীর্ষে উঠে একা নিজের ঘণ্টাটি বাজিয়ে লোককে আকৃষ্ট করার চেষ্টা বৃথা—মন্দিরের বড় ঘণ্টা তার ক্ষুদ্র ঘণ্টাধ্বনিকে ডুবিয়ে দিয়ে বেজে উঠে। বড় ঘন্টার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাগতে হলে চাই ছোট ছোট ঘন্টাগুলির একত্র সম্মিলন। আমি কি বলতে চাচ্ছি, বুঝতে পাচ্ছ নিকোলাই?

হাঁ, কিন্তু বিশ্বাস করি না।

.

খাবার এলে। খেতে খেতে এণ্ড্রি, নিকোলাইকে বোঝাতে লাগলো, কারখানায় কেমন ভাবে সোশিয়ালিষ্ট মতবাদ প্রচারিত হয়েছে। নিকোলাই সব শুনলো, তার মুখ আবার গম্ভীর হয়ে উঠলো, বললো,বড্ডো ধীরে চলছে কাজ, বড্ডো ধীরে। আরও তাড়াতাড়ি হলে ভালো হয়।

এণ্ড্রি বলে, মানুষের জীবনটা তো ঘোড়া নয়, নিকোলাই, যে, চাবুক কষে তাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে।

নিকোলাই সেই একই সুরে বলতে লাগলো, কিন্তু বড্ডো ধীরে, ধৈর্য থাকে না আমার। কি করি, কি করি! তার অঙ্গভঙ্গিতে গভীর নৈরাশ্য ফুটে ওঠে।

এণ্ড্রি, বলে, আমরা করব জ্ঞান লাভ এবং জ্ঞান বিস্তার।

যুদ্ধ করব কবে? নিকোলাই সহসা প্রশ্ন করলো।

এণ্ড্রি, হেসে বলে, যুদ্ধ কখন করতে হবে তা জানি না, কিন্তু এটা জানি যে তার আগে আমাদের বহু প্রাণ আহুতি দিতে হবে, আর জানি যে, হাতের ছুরি শানাবার আগে শানাতে হবে মগজের বুদ্ধিকে।

এবং প্রাণকে—নিকোলাই যোগ করে।

হাঁ, প্রাণকেও।

কিছু পরে নিকোলাই উঠে শুতে গেলো। মা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ওর মনের মধ্যে কী একটা ভীষণ চক্রান্ত ঘুরছে, এণ্ড্রি।

হাঁ, মা, ওকে বোঝা বড়ো শক্ত, ব’লে এণ্ড্রি ও বিছানায় গেলো। শুনতে পেলো, মা বলছেন, ভগবন, পৃথিবীর যত মানুষ সবাই তো দেখছি কাঁদছে নিজ নিজ ব্যথায়। কোথায় মানুষ সুখী, কোথায় মানুষ আনন্দিত?

এণ্ড্রি, বললো, আসছে, মা, সে শুভদিন আসছে, যে-দিন মানুষ সুখী হবে, আনন্দিত হবে।…

.

১.১৪

জীবন বয়ে চলে এমনি দ্রুত তালে। নিয়মিতভাবে মার ওখানে কর্মীরা মেলে, মতলব আঁটে, কাজ করে। মা কারখানায় ইস্তাহার ছড়ান, ইস্তাহার বেরুবার পরদিন রক্ষীরা মাকে পরীক্ষা করে বিফলকাম হয়। মার আরদ্ধ-ব্রতের প্রতি নিষ্ঠা বাড়ে।

নিকোলাইর কারখানার কাজ গেছে, এখন কাজ করে এক কাঠের গোলায়, আর মোজ মার ওখানে মজলিসে যোগ দেয়। সবাই চলে যাবার পরও সে থাকে। একা এণ্ড্রির মুখোমুখি বসে প্রশ্ন করে, কিন্তু মানুষ যে আজ সর্বহারা, তার জন্য সব চেয়ে বেশি দায়ী কে—জার?

এণ্ড্রি বলে, দায়ী সেই, যে প্রথম উচ্চারণ করেছিল, এই আমার জিনিস। কিন্তু সে লোকটা মারা গেছে বহু হাজার বছর–তার ওপর রাগ ঝাড়বার উপায় নেই।

কিন্তু ধনী আর তাদের মুরুব্বীরা তাদের কথা কি বলছ? তারা কি নির্দোষ?

এণ্ড্রি তার জবাবে বহু যুক্তিপূর্ণ কথা বলে,—নিকোলাইর মন প্রসন্ন হয় না। সাধারণ মানুষও যে সব দোষের সঙ্গে জড়িত, একথাটা তার মন মানতে চায় না। একদিন সে বলে, দুনিয়া থেকে ঐ দুষ্ট আগাছগুলোকে নির্দয়ভাবে চষে ফেলতে হবে আমাদের।

মা বলেন, আইছেও এমনি কথা বলেছিল।

স্পাই আইছের নাম শুনে মুহূর্তে নিকোলাইর মন কঠিন হয়ে উঠলো। বললো, একজন দোষী ঐ। বলে চলে গেলো।

এণ্ড্রি বললো, সত্যিই আইছে বড় বেড়ে উঠেছে, মা। রাতদিন ও লোকদের ধরিয়ে দেবার মতলবে ঘরের আনাচে-কানাচে ঘুরছে। নিকোলাই একদিন ওকে ধরে আচ্ছা মতো দিয়ে দেবে। কর্তা জনসাধারণের মন কী পর্যন্ত বিষিয়ে তুলেছে দেখ। নিকোলাইর মতো লোকেরা যখন অন্যায়ের অত্যাচারে ধৈর্য হারাবে, তখন কী ভীষণ ব্যাপার হবে! পৃথিবী হবে রক্ত-রঞ্জিত, আকাশেও যেয়ে সে রক্তের ছোপ লাগবে।

.

একদিন অকস্মাৎ পেভেল এসে হাজির হল। মার বুক আনলে উদ্বেল হয়ে উঠলো। মা এণ্ড্রিকে ডাকলেন। তিন জনে প্রাণ খুলে কথা বলতে লাগলো। মা খাবার নিয়ে এলেন। খেতে খেতে এণ্ড্রি রাইবিনের কথা তুললো। পেভেল বললো, আমি থাকলে তাকে যেতে দিতুম না। কি সম্বল করে বেরুলো সে?–অসন্তোষ এবং অজ্ঞানান্ধকার।

এণ্ড্রি হেসে বলে, চল্লিশ বছর অবিরত সংগ্রাম করার ফলে অন্তর যার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে তাকে বাগ মানানো সোজা নয়, বন্ধু।

পেভেল কঠিন সুরে বললো, কেন? তুমি কি মনে কর, জ্ঞান মানুষের মনের পুঞ্জীভূত ভ্রান্তি দূর করতে পারে না?

এণ্ড্রি অর্থপূর্ণ ভাষায় বললো, একলাফে একেবারে আকাশে উঠতে যেয়ো না, পেভেল, দুর্গের চূড়ায় ঘা খেয়ে ডানা ভেঙে যাবে।

তারপর চললো দুই বন্ধুতে বিতর্ক। মা তার এক বর্ণও বুঝতে পারলেন না, শুধু বুঝলেন, পেভেল চাষীদের কথা ভেবে তাদের জন্য নির্ধারিত পন্থার একচুল এদিক-ওদিক যেতে রাজি নয়। এণ্ড্রি চাষীদের পক্ষে, বলে, তাদেরও শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে। এর মধ্যে এণ্ড্রির মতটাই মার মনে লাগে। এমনি করে খাওয়া শেষ হয়, দিন কাটে।

.

১.১৫

মে মাসে মজুরদের একটা উৎসবের আয়োজন হ’ল। বন্দী মজুররা সবাই জেল থেকে এসেছে। উৎসবের ধরণ সম্বন্ধে দুদলের দু’মত। একদল বলে, সশস্ত্র হয়ে মজুরদল বেরিয়ে পড়ুক; আর একদল বলে, না। মজুররা দলে দলে নিশান হাতে সাম্য মন্ত্র ধ্বনি কবে শোভাযাত্রা করুক, শেষোক্ত দলই ভারি। আইভানোভিচ বললো, বন্ধুগণ, বর্তমানের এই ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া একটা মহান্ কাজ, কিন্তু তার জন্য সব্বার প্রথমেই চাই আমার জন্য একজোড়া ওভার-সু, এ ছেঁড়া জুতোর বদলে; কারণ এই ওভার-সুই সোসিয়ালিজমেব জয়যাত্রায় আমাদের সব চেয়ে বেশি কাজে লাগবে। এই পুরাণে ব্যবস্থাকে খোলাখুলি উলটে ফেলে না দিয়ে পৃথিবী ছেড়ে একপাও যেতে চাই না আমি… তাই তো বলি, অস্ত্র এখন থাক।

মা তাদের বাদানুবাদ শুনতেন। তাদের মুখেই শুনলেন তিনি, একদল লোক, যাদের বলে বুর্জোয়া, তাই জনসাধারণের শত্রু। জার যখন ছিলেন, তখন তারা জনসাধারণকে ক্ষেপিয়েছে জারের বিরুদ্ধে, তারপর জনসাধারণ যখন জারকে সরিয়েছে সিংহাসন থেকে, তখন তারা ছলা-কলায় শক্তি আত্মসাৎ করে জনসাধারণকে কোণঠাসা করে বেধেছে,–জনসাধারণ এব প্রতিবাদ করলে তাদের হত্যা করেছে শতে শতে, সহস্রে সহস্রে, মানুষকে চিবিয়ে, পিষে, চুষে মারছে তারা। এই বুর্জোয়াদল…এই ধনীদল…সোনার ভারে প্রাণ তাদের চাপা পড়ে গেছে। এরা মানবজাতির নিষ্ঠু্রতম শত্রু, প্রধানতম প্রবঞ্চক, সর্বাপেক্ষা উগ্র বিষ-পতঙ্গ।

.

শশেংকাও আসে প্রায়ই। না একদিন আড়াল থেকে শুনতে পান পেভেল আর সে কথা বলছে।

তুমিই নিশান বয়ে নিয়ে যাচ্ছ?

হাঁ।

ঠিক হয়ে গেছে।

হাঁ, আমিই এর অধিকারী।

অর্থাৎ আবার তুমি জেলে যাবে। এ কি সম্ভব হত না…

কি?

যে, আর কেউ নিশান বয়ে নিয়ে যেতে?

না।

এবার ভেবে দেখ, কত প্রভাব তোমার। সবাই তোমায় কত পছন্দ করে। তোমার আর নাথোদকার মতো নামজাদা বিপ্লবপন্থী আমাদের মধ্যে আর নেই। একবার ভেবে দেখ, মুক্তিকল্পে কত-কি করার শক্তি আছে তোমার। তাই তো তোমাকে পেলে তারা ছাড়বে না, দীর্ঘকালের জন্য দূরে সরিয়ে ফেলবে তোমায়।

না শশা, আমি সংকল্প করেছি, কোন কিছুই সে সংকল্প থেকে আমায় টলাতে পারবে না।

পারবে না? যদি আমি অনুরোধ করে বলি, পেভেল…

এমন অনুরোধ তোমার করা উচিত নয়, শশা।

উচিত নয় পেভেল! আমি মানুষ, রক্ত-মাংসধারী মানুষ।

শুধু মানুষ নও, অতি-মানুষ। তাইতো তোমাকে আমি ভালোবাসি এবং জানি তুমি অমন অনুরোধ করতে পারে না।

তবে যাও পেভেল…বলে শশা তাড়াতাড়ি চলে যায়।

মার মন আবার আশঙ্কায় দুলে উঠে। পেভেলের সঙ্গে দেখা হলেই জিগ্যেস করেন, পয়লা মে আবার কি করতে চাস?

পেভেল বলে, নিশান হাতে শোভাযাত্রা চালিয়ে নিয়ে যাবে। এতে জেল হবে বলে মনে হয়।

মার চোখ সজল হয়ে এলো। পেভেল মার হাত ধরে বললো, আমায় এযে করতেই হবে, মা। এতেই আমার সুখ, তুমি কি এতে বাধা দেবে, মা!

না, বাধা দেবো না–মা ধীরে ধীরে বলেন।

তার বিষণ্ণ দৃষ্টি পেভেলের চোখ এড়ালোনা, বললো, দুঃখ করো, না, এতে তো আনন্দ করা উচিত। কবে আমাদের দেশে তেমন মা হবে, যারা হাসিমুখে ছেলেদের মৃত্যুর মুখে তুলে দেবেন?

এণ্ড্রি, চিমটি-কাটার মতো করে বললো, ওহে, একটু আস্তে আস্তে চালাও…

মা বললেন, না, তোমায় আমি বাধা দেবো না, পেভেল, কিন্তু কান্না…আমি কেমন করে রোধ করব…আমি যে মা…

এক রকমের ভালোবাসা আছে, যা মানুষের সমস্ত জীবনটাকে মাটি করে দেয়। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে এই কথা বলে পেভেল মার কাছ থেকে সরে যায়।

মা কেঁপে উঠলেন। পেভেল পাছে আরো এমনি নিষ্ঠুর আঘাত দেয়, সেই আশঙ্কায় তিনি বলেন, বাধা দেবো না, পেভেল, বাধা দেবো না। আমি বুঝি, সঙ্গীদের জন্য আজ তোকে একাজ করতেই হবে।

পেভেল বললো, সঙ্গীদের জন্য নয়, তাদের জন্য হলে না করেও পারতুম। এ আমার নিজের জন্য দরকার।

মা চলে গেলেন। এণ্ড্রি দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো। এবার এগিয়ে এসে মায়ের ওপর পেভেলের অনাবশ্যক রূঢ়তার প্রতিবাদ করলো, বললো, এমন স্নেহময়ী মায়ের ওপর এমন আস্ফালন করার কোনই দরকার ছিল না, ওর এক কাণাকড়িরও কদর নেই।

পেভেল নিজের ভুল বুঝতে পেরে মার কাছে ক্ষমা চাইলো, অবুঝ ছেলেকে ক্ষমা কর, না।

মা ছেলের মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে আর্তকণ্ঠে বলেন, যা দরকার তা করিস বাবা, শুধু বুড়ো মাকে কাঁদাসনি।

এণ্ড্রিকে ডেকে বললেন, ও তোর অবুঝ ছোট ভাই, ওকে বকিসনি বাবা।

না বাবা, না বাবা, বলে মা এণ্ড্রির হাত ধরলেন।

এণ্ড্রি তখন বললো, তুমি পাগল হয়েছ, মা আমি পেভেলের গায়ে হাত দোব! আমি ওকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি দেখতে পারি না হতভাগাকে। নতুন জামা পরেছেন উনি, তাই গরবে আর মাটিতে পা পড়ে না, যাকেই পায় তাকেই ঠেলা দিয়ে বলে, দেখ, কেমন জামা পরেছি। জামাটা ভালো, কিন্তু হ’ক ভালো, তাই বলেই কি লোককে এমনি করে ঠেলতে হবে? বলে, এমনিতেই মানুষ হয়ে আছে অতিষ্ঠ…

পেভেল হেসে বলল, কতক্ষণ মুখ চালাবে আর? কম তো বাক্যবাণ নিক্ষেপ করনি?

এণ্ড্রি মেঝেয় উনুনের সামনে পা ছড়িয়ে বসে ছিলো। লেভেল সুয়ে পড়ে তার হাত জড়িয়ে ধরলো।…তার কিছুক্ষণ পরেই দু’ভাইয়ে মতোই তারা আলিঙ্গনাবদ্ধ হ’ল। দেখে মার চোখ আনন্দাশ্রুতে ভয়ে উঠলো। তারপর যেন তিনি লজ্জিত হয়ে বললেন, এ মেয়ে মানুষের চোখের জল, দুখেও ঝরে, সুখেও ঝরে।

পেভেল বললো, এ চোখের জলে লজ্জিত হবার কিছু নেই, মা।

এণ্ড্রি বললো, গর্ব করা উচিত নয় কিন্তু সত্যিই আমরা এক নবজীবনের আস্বাদ পাচ্ছি এখন। এ জীবন খাঁটি, মনুষোচিত, প্রেমে, মঙ্গলে পরিপূর্ণ।

পেভেল মার দিকে চেয়ে বললো, হাঁ।

মা বললেন, জীবনের ধারা যেন বদলে গেছে। আজ এসেছে নতুন রকমের দুঃখ, নতুন ধরণের আনন্দ। তা যে কী, তা জানি নে, বুঝি নে, ব্যক্ত করতে পারিনে ভাষায়।

এণ্ড্রি বললো, এই তো হওয়া উচিত। দুনিয়ার দিকে নজর দিয়ে দেখো, মা, একটা নতুন প্রাণের জন্ম হচ্ছে, একটা নতুন প্রাণ জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করছে! এতকাল সকল প্রাণ ছিল স্বার্থের সংঘাতে নিপীড়িত, অন্ধলোভে জর-জর, হিংসা-বিদ্বেষে ভারাক্রান্ত, মিথ্য-ভীরুতা-হীনতায় দুষিত, রোগজীর্ণ, শঙ্কিত-জীবন, কুহেলির যাত্রী,–নিজের ব্যথাভারে ক্রন্দনোম্মুখ,–হঠাৎ তারি মধ্য থেকে জেগে উঠেছে এক নতুন মানুষ, যুক্তির আলোকে জীবনকে সে আলোকিত করেছে। মানুষকে ডেকে বলছে, ওগো পথ-ভ্রান্ত বন্ধুর দল, আজ দিন এসেছে এ সত্য উপলব্ধি করার যে, তোমাদের সবার স্বার্থ এক, তোমাদের প্রত্যেক মানুষের বাঁচবার দরকার আছে, বাড়বার দরকার আছে। আজও সে একা, তাই কণ্ঠস্বর তার এতো তীব্র। তার আহ্বানে খাঁটি কর্মীরা একপ্রাণ হয়ে দাঁড়ায়, বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করে নব বাণী, হে আমার দেশ-বিদেশের বন্ধুগণ, তোমরা মিলিত হয়ে এক নানগোষ্ঠী গঠন কর! তোমাদের জীবনের প্রতি প্রেম-ঘৃণা নয়। আমি শুনতে পাচ্ছি, বিশ্বময় আজ সেই ৰাই প্রতিধ্বনিত…রাতে বিছানায় শুয়ে…একা লেগে…সর্বত্র এই বাণী শুনি, আর প্রাণ নেচে ওঠে। দুঃখ, অন্যায়ের ভারে প্রপীড়িতা এই ধরণীও সে আহ্বানে সাড়া দেয়, কেঁপে কেঁপে ওঠে, আর মানুষের হৃদয়াকাশে উদিত নবারুণকে সৎবর্ধিত করে।…

পেভেল তাকে কি বলতে যাচ্ছিল, মা বাধা দিয়ে বললেন, ওর কথা শেষ করতে দে।

দীপ্রোজ্জ্বল চক্ষু তুলে এণ্ড্রি বললো, কিন্তু জানো, এখনো অনেক দুঃখ সইতে হবে মানুষকে, লোভের হাতে এখনো তার অনেক রক্তপাত হবে, কিন্তু আমাদের সমস্ত দুঃখ, সমস্ত রক্তও কম মুল্যবান মনে হবে তার কাছে, যা আমরা এরি মধ্যে পেয়েছি উদ্বেল বক্ষে, চঞ্চল মনে, শিরায় শিরায়। তারা যেমন সোনার আলোকে ধনী, আমিও তেমনি ধনে ধনী হয়েছি। সমস্ত বোঝা আমি বইব, সমস্ত দুঃখ আমি সইব; কারণ প্রাণে আমার সেই আনন্দের সাড়া পেয়েছি, যা কেউ কোনোকিছুতে চেপে রাখতে পারে না। এই আনন্দের মধ্যে নিখিল শক্তি নিহিত।

নব-জীবনকে এমনিভাবে অভিনন্দিত করতে লাগলো তারা।

১.১৬-২০ পরদিন ভোর

পরদিন ভোর হতে না হতেই কর্সুনোভা ছুটে এলো, শীগগির এসো, আইছেকে কে খুন করেছে।

শুনেই মার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। আততায়ী বলে চকিতে একজনকে তিনি সন্দেহ করলেন। বললেন—কে খুন করলো?

খুনী কি এখনো সেখানে বসে আছে?

কর্সুনোভা বললো, ভাগ্যিস্ তোমরা সবাই বাড়ি ছিলে? আমি দুপুর রাতে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে গিয়েছিলুম!

পথে যেতে যেতে মা ভীত হয়ে বললেন, কি বলছ তুমি? আমরা খুন করেছি, একথা কারু স্বপ্নেও আসতে পারে?

পারে। তোমরা ছাড়া মারবে কে! তোমাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করত সে, এ তো রাজ্যসুব্ধ লোক জানে।

মার মনে আবার নিকোলাইর কথা জেগে উঠে।

কারখানার দেয়ালের অদুরে লোকের ভিড়-সেখানে আইছের মৃত দেহ। রক্তের চিহ্নমাত্র নেই। স্পষ্ট বোঝা যায়, কেউ গলা টিপে মেরেছে।

একজন বলে উঠলো, পাজী ব্যাটার উচিত শাস্তি হয়েছে!

কে–কে বললো একথা, বলে পুলিসরা ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো শবের কাছে। লোকরা ছুটে পালালো। মাও বাড়ি চলে এলেন। এণ্ড্রি পেভেল বাড়ি এলে জিগ্যেস করলেন, কাউকে ধরেছে?

শুনিনি তো, মা।

নিকোলাইর কথা কিছু বলছে না?

না। এ ব্যাপারে তার কথা কেউ ভাবছেই না। সে কাল নদীতে গেছে, এখনো ফেরেনি।

মা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।

খেতে বসে চামচে রেখে পেভেল হঠাৎ বলে উঠলো, এইটেই আমি বুঝি নে।

কি?—এণ্ড্রি বললো।

পেভেল বললো, উদরপূরণ করার জন্য যে হত্যা, তা অত্যন্ত বিশ্রী! হিংস্র জানোয়ারকে হত্যা—হাঁ, তা বুঝতে পারি,–মানুষ যখন হিংস্র পশুতে পরিণত হয়ে মানবজাতির ওপর অত্যাচার করতে যায়, তাকে আমি নিজ হাতে হত্যা করতে পারি। কিন্তু এইরূপ ঘৃণ্য তুচ্ছ কীটকে হত্যা করা—আমি বুঝিনে কেমন করে এ কাজে মানুষের হাত ওঠে।

এণ্ড্রি বললো, কিন্তু হিংস্র জানোয়ারের চাইতে সে বড় কম ছিল না।

তা জানি।

আমরা মশা মারি–যৎসামান্য রক্ত সে খায়, তা জেনেও।

পেভেল বললো, আমি ও সম্বন্ধে কিছুই বলছিনে। শুধু বলছি, এ অত্যন্ত ছোট কাজ।

এণ্ড্রি বললো, কিন্তু ও ছাড়া কি করতে পারো তুমি?

পেভেল বহুক্ষণ নিরুত্তর থেকে বললো, তুমি পারো অমনভাবে একটা মানুষকে খুন করতে?

এণ্ড্রি দৃঢ়কণ্ঠে বললো, নিজের জন্য কোনো জীবিত প্রাণীকে আমি ছোঁবও না; কিন্তু ব্রত সিদ্ধির জন্য, বন্ধুদের হিতার্থে আমি সব-কিছু করতে পারি—এমন কি তার সর্বনাশ সাধনও করতে পারি—নিজের ছেলেকে পর্যন্ত…

মা শিউরে বললেন, কি বলছ বাবা!

এণ্ড্রি হেসে বললো, সত্যি বলছি, মা, এ আমরা করতে বাধ্য…এই আমাদের জীবন।

পেভেল চুপ করে রইলো। এণ্ড্রি, হঠাৎ যেন কি এক ভাবের প্রেরণায় উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো, বললো, মানুষ কি করে একে ঠেকিয়ে রাখবে? মাঝে মাঝে অবস্থার ফেরে পড়ে বাধ্য হয়ে এক একটা মানুষের ওপর এমন কঠোর হয়ে উঠতে হয়, সেই নবযুগকে আহ্বান করে আনার জন্য, যখন মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে, পরস্পরের সঙ্গে প্রেমের সম্বন্ধে জড়িয়ে পড়ার। জীবনের অগ্রগতির পথে বিঘ্ন যারা নিজেদের শান্তি এবং সম্মানের খাতিরে মানুষকে বিক্রয় করে যারা অর্থ সঞ্চয় করে তাদের বিরুদ্ধে তোমার দাঁড়ানো চাই-ই। সাধু লোকদের পথে দাঁড়িয়ে গোপনে তাদের সর্বনাশ করতে চায় যে যুডাস তাকে বাধা না দিলে আমিও যুডাসের মতো অপরাধী হবো। এ পাপ? এ অন্যায়? আমি জিগ্যেস করি, ঐ যে কর্তারা–ওরা কোন অধিকারে সৈন্য রাখে? জল্লাদ রাখে? কারাগার, দণ্ডনীতি, ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে মানুষকে দাবিয়ে রেখে নিজেদের সুখ-সুবিধা, নিরাপত্তার পথ খোলসা করে? যদি কখনো এমন হয় যে, তাদের দণ্ড দেবার ভার আমি তুলে নিতে বাধ্য হই, তখন আমি কি করব? হাঁ, আমি দেবব ওদের দণ্ড, ভয় খাবো না। ওরা মারে আমাদের দশে দশে, শ’তে শ’তে। আমারও অধিকার আছে হাত ভোলার,–সব চেয়ে কাছে যে শত্রু, সব চেয়ে যে বাধা জন্মায় তাকে আঘাত করার। এই হচ্ছে যুক্তি, কিন্তু তবু আমি স্বীকার করি, ওদের মারা নিষ্ফল—বৃথা রক্তপাত। সত্য জন্মায় একমাত্র আমাদের নিজেদের বুকের রক্ত-ভেজা জমিনে। আমি জানি তা, কিন্তু আমি এ পাপ করব—দরকার যখন হবে তখন নির্মম হ’বো। আমি একমাত্র আমার কথাই বলছি। আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এ পাপ মুছে যাবে, ভবিষ্যতের গায়ে তার কোনো চিহ্ন থাকবে না, আর কারুর নাম এতে কলঙ্কিত হবে না।…

এণ্ড্রি অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলো ঘরময়। তারপর বললো, জয়যাত্রার পথে এমন অনেক সময় হবে যখন তোমার নিজে বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে নিজেকে, তোমার প্রাণ, তোমার যথা-সর্বস্ব ত্যাগ করতে হবে। প্রাণ দেওয়া, ব্রতকল্পে জীবন উৎসর্গ করা—সে তো সোজা। আরো চাই, আরো দাও। তাই দাও, মা তোমার জীবনের চাইতেও প্রিয়। তখনই তুমি দেখবে, জীবনের প্রিয়তম বস্তু যে সত্য, তার অদ্ভুত জীবনীশক্তি।

ঘরের মাঝখানে সে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। তারপর চোখ আদ্দেক বুজে বিশ্বাস-দৃঢ়কণ্ঠে বলতে লাগলো আবার, … এমন সময় আসবে জানি, যখন মানুষ মানুষের সাহচর্যে আনন্দ পাবে, যখন নক্ষত্রের মতো একে অন্যকে আলো দেবে, যখন মানুষমাত্রের কানে বাজবে মানুষের কথা সঙ্গীতের মতো। মানুষ হবে সেদিন মুক্তিতে মহান, খোলা প্রাণে ঘুরবে ফিরবে তারা। হিংসা থাকবে না, বিদ্বেষ থাকবে না, লোভ থাকবে না, মানুষের যুক্তি অজ্ঞাত হবে না। জীবন হবে মানুষের সেরা। মানুষ উন্নতির চরম শিখরে উঠবে-কারণ তখন সে মুক্ত। তখন আমরা জীবন কাটাবো সত্যে, স্বাধীনতায়, সৌন্দর্যে। তখন তারাই হবে তত শ্রেষ্ঠ, যারা যত বেশি প্রাণ দিয়ে পৃথিবীকে জড়িয়ে ধরতে পারে, মানুষকে যত বেশি ভালোবাসতে পারে। সব চেয়ে মুক্ত যারা, তারাই হবে সব চেয়ে মহান্ সব চেয়ে সুন্দর। তখন গৌরবমণ্ডিত হবে জীবন, গৌরবমণ্ডিত হবে জীবনের অধিকারী মানুষদল।…এই জীবনের জন্য আমি সবকিছু করতে প্রস্তুত। দরকার হলে আমি নিজ হাতে নিজের হৃৎপিণ্ড উপড়ে আনবো, নিজ পায়ে তা দলিত করব।…

উত্তেজনায় এণ্ড্রি কাঁপতে লাগলো। পেভেল মৃদুকণ্ঠে জিগ্যেস করলো, কি হয়েছে তোমার, এণ্ড্রি?

শোনো, আমিই তাকে খুন করেছি।

পেভেল বুঝলো, তাই এণ্ড্রি আজ এত চঞ্চল। এণ্ড্রির জন্য সহানুভূতিতে তার বুক ভরে গেলো। মাও এই ব্যথিত ছেলেটিকে স্নেই দিয়ে ঢেকে রাখতে চাইলেন।

এণ্ড্রি বললো, তাকে কেন খুন করলুম, জানো? আমায় অপমান করেছিল—মানুষের পক্ষে চরম অপমান। এমন অপমান করতে আমায় কেউ কখন সাহস করেনি। আমি কারখানার দিকে যাচ্ছি, সে আমার পিছু নিয়ে বলতে লাগলো, আমাদের সবার নামই নাকি পুলিসের খাতায় আছে, পয়লা মের আগে সব্বাইকে শ্রীঘরে যেতে হবে। আমি কোনো জবাব দিলুম না, হাসলুম; কিন্তু রক্ত আমার টগবগ করে ফুটে উঠলো। তারপর সে বললো, তুমি চালাক লোক…এ পথে না চলে তোমার উচিত আইনের কাজে প্রবেশ করা, অর্থাৎ গোয়েন্দা হওয়া..ওঃ, কি অপমান, পেভেল! এর চাইতে মুখের ওপর ঘুসি মারলো না কেন সে! তাও হয়তো সইতে পারতুম। কিন্তু এ অসহ্য! মাথায় খুন চেপে গেলো। পেছন দিকে এক ঘুসি চালালুম… তারপর চলে গেলুম। ফিরে তাকালুমও না। শুনলুম সে ধপ করে পড়ে গেলো নীরবে। মারাত্মক যে কিছু হয়েছে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। আমি শান্তভাবে চ’লে গেলুম, যেন আর কিছু করিনি, একটা ব্যাঙকে লাথি মেরে পথ থেকে সরিয়ে রেখেছি।…তারপর কাজ করতে করতে শুনলুম, আইছে খুন হয়েছে। কথাটা আমার এমন-কি বিশ্বাসও হ’ল না–কিন্তু হাত যেন কেমন অসাড় হয়ে এলো…এ পাপ নয় আমি জানি, কিন্তু এ নোঙরা কাজ…সমস্ত জীবনেও যার কালিমা আমি ধুয়ে ফেলতে পারব না।

পেভেল সন্দিগ্ধদৃষ্টিতে চেয়ে বললো, তা এখন কি করতে চাও, এণ্ড্রি?

কি করব?…আমি খুন করেছি, একথা কবুল করতে ভয় খাইনে আমি। কিন্তু লজ্জা হয়…এমন একটা তুচ্ছ কাজ করে জেলে যেতে লজ্জা হয়। কিন্তু অন্য কেউ যদি এর জন্য অভিযুক্ত হয়, তাহলে আমি গিয়ে ধরা দেবো; নইলে যেমন আছি তেমনি থাকবে।

সেদিন কেউ আর কাজে গেলো না। পেভেল আর মা এণ্ড্রির কথাই বলতে লাগলো। পেভেল বললো, এই তো দেখ, মা, আমাদের জীবন। এমনভাবে আমরা আছি পরস্পর সম্পর্কে যে ইচ্ছে না থাকলেও আঘাত করতে হয়। কাদের? ঐ সব ঘৃণ্য নির্বোধ জীবদের, সৈন্য, পুলিস, গোয়েন্দাদের…যারা আমাদের মত মানুষ, কিন্তু যাদের রক্ত আমাদেরই মতো শোষিত হচ্ছে অহর্নিশ, যারা আমাদেরই মত মানুষ হয়েও মানুষ বলে গণ্য হচ্ছে না। কর্তারা একদল লোকের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন আর একদল লোক …ভয় দেখিয়ে তাদের অন্ধ করে রেখেছেন: হাত-পা বেঁধে নিঙরে শুষে নিচ্ছেন তাদের রক্ত… এক দলকে দিয়ে আর একদলকে করছেন আঘাত। মানুষকে আজ তারা পরিণত করেছেন অস্ত্রে, আর তার নাম দিয়েছেন সভ্যতা।

তারপর কণ্ঠ আরও দৃঢ় করে বললো, এ পাপ, মা। লক্ষ লক্ষ মানুষকে, লক্ষ লক্ষ আত্মাকে হত্যা করার জঘন্য পাপ। হাঁ, আত্মাকে হত্যা করে তারা। তাদের আমাদের তফাৎ দেখ, মা। এণ্ড্রি না বুঝে খুন করেও কেমন বিষঃ, লজ্জিত অস্থির হয়ে পড়েছে। আর তারা হাজার হাজার খুন করে যাবে শান্তভাবে-একটু হাত কাঁপবে না, দয়া হবে না, প্রাণ শিউরে উঠবে না। তারা খুন করবে আমাদের সঙ্গে, আনন্দের সঙ্গে। কেন জানো, মা? তারা সবাইকে সমস্ত কিছুকে টুটি টিপে ধরে মারে শুধু ওদের বাগানবাড়ি, আসবাবপত্র, শোনা রূপা কোম্পানীর কাগজ এবং লোককে দাবিয়ে রাখবার যতকিছু সাজ-সরঞ্জাম, নিরাপদ রাখতে। ওরা খুন করে নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখতে নয়– ওদের সম্পত্তি বাঁচিয়ে রাখতে।…এই অন্যায়, এই অপমান, এই নোঙরামি…এই-ই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে, আমরা যে সত্য নিয়ে লড়াই করছি তা কত বড়, কত গৌরবময়।

বাইরে লোকের পায়ের শব্দ হল। দু’জনে চমকে চাইলেন, পুলিস নয় তো!

.

১.১৭

দোর খুলে ঢুকলো রাইবিন।

রাইবিন সেই শহর ছেড়ে বেরুলো সত্যপ্রচারে–আড্ডা গাড়লো গিয়ে এডিলজেভ বলে এক গ্রামে। যাবার সময় সে মেলাই গরম গরম বই ও ইস্তাহার নিয়ে গিয়েছিল,–তাই দিয়ে সে সত্য প্রচার করতে। বইগুলোর বেশ চাহিদা ছিল। আরো বইয়ের দরকার বলে রাইবিন ইয়াফিম বলে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে শহরে এসেছে।

পেভেল রাইবিনকে সাদরে অভ্যর্থনা করলো।

রাইবিন সেই ক্রুদ্ধ বিদ্রোহীই আছে। কর্তাদের ওপর, বুর্জোয়াদের ওপর আজো সে তেমনি চটা। কথাপ্রসঙ্গে বললো, আমার বেশ সুবিধা আছে, নিষিদ্ধ বই ছড়ানো, আর পুলিশ টের পেলে ধরবে ও অঞ্চলের দু’জন শিক্ষককে, আমায় সন্দেহ করতে পারবেনা।

পেভেল বললো, কিন্তু এটাতো উচিত নয়, রাইবিন।

কোনটা।

তুমি কাজ করবে, আর তার দুঃখ ভোগ করবে অন্যে!

রাইবিন জবাব দিলো, তুমি ভুল বুঝেছে, পেভেল! প্রথমত, শিক্ষকরা বুর্জোয়া, তাদের কোনো ভয় নেই। কর্তারা শাস্তি দেবেন যেসব পল্লিবাসীর কাছে বই পাবেন, তাদেরই। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের বইয়েতে কি নিষিদ্ধ কথা কিছু নেই? আছে, তবে তা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লেখা, আমার বইয়ের মতো সোজা খোলাখুলি লেখা নয়। তৃতীয়ত, বুর্জোয়াদের সঙ্গে বনিবনাও করে চলতে চাই না আমি। পায়ে যে হাঁটছে তার কি সাজে ঘোড়-সওয়ারের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা? সত্য কথা বলতে কি, ওদের এই গায়ে-পড়ে দেশের কাজ করাটাকে আমি দস্তুরমত সন্দেহ করি। ওদের উদ্দেশ্যটা নিশ্চয়ই খুব সাধু নয়। তাই ওরা বিপদে পড়লে আমি দুঃখিত হব না। সাধারণ পল্লিবাসীর ওপর অবশ্য এ রকমটা করতুম না।

মা বললেন, কিন্তু কর্তাদের মধ্যেও এমন দু’চারজন আছেন, যারা আমাদেয় জন্য প্রাণ দেন।

রাইবিন বললো, তাদের কথা স্বতন্ত্র, কিন্তু বেশির ভাগের সঙ্গেই আমাদের অহি-নকুল সম্পর্ক। আমরা ‘হাঁ’ বললে, ওরা বলবে ‘না’ আর আমরা ‘না’ বললে, ওদের ‘হাঁ’ বলাই চাই—আমার পেট ভরে খেলে ওদের ঘুম হয় না, এই ওরা। পাঁচ বছর ধরে আমি শহরে শহরে, কারখানায় কারখানায় ঘুরেছি, তারপরে গেলুম গ্রামে—কিন্তু গিয়ে যা দেখলুম, তাতে বুঝলুম, আর এমন করে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তোমরা শহরে থাকো, ক্ষুধা কি জানো না, অত্যাচার কি প্রত্যক্ষ কর না। কিন্তু গ্রামে সমস্ত জীবন ক্ষুধা মানুষের সঙ্গী হয় ছায়ার মতো ক্ষুধা মানুষের আত্মাকে ধ্বংস করে–তার আকৃতি থেকে মানুষের ছাপ লোপ করে দেয়। মানুষতো গ্রামে বেঁচে নেই, তারা অপরিহার্য অভাবে পচে মরছে, আর তারই চারদিকে কর্তারা শ্যেনদৃষ্টি বিস্তার করে বসে আছে একটি টুকরোও যাতে তাদের মুখে এসে না পড়ে–পড়লে, যাতে তাদের মুখে ঘুসি মেরে তারা তা ছিনিয়ে নিতে পারে।

রাইবিন চারদিকে চাইলো, তারপর পেভেলের দিকে নুয়ে পড়ে টেবিলের ওপর হাত রেখে বলতে লাগলো, এমনি জীবন দেখে গা আমার রি রি করে উঠলো—ইচ্ছে হ’ল ছুটে শহরে চলে যাই। কিন্তু গেলুম না, গ্রামেই রইলুম। কর্তাদের চর্ব্যচোষ্য যোগাবার জন্য নয়, তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে। মানুষের ওপর অনুষ্ঠিত এই অন্যায়, এই অত্যাচারের জ্বালার বাহন আমি—শানিত ছুরিকার মতো এই অন্যায় অহর্নিশ আমার প্রাণে কেটে কেটে বসছে…আমায় সাহায্য কর পেভেল–এমন বই দাও, যা পড়ে মানুষ আর স্থির থাকতে পারবে না—তার মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে উঠবে, এমন সত্য আজ তাদের শিক্ষা দাও যা গ্রামকে উত্তপ্ত করে তুলবে, যা শুনে মানুষ মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়বে।…

তারপর হাত তুলে প্রত্যেকটা কথার ওপর জোর দিয়ে বলতে লাগলো, মৃত্যু আজ শোধ করুক মৃত্যুর ঋণ–মৃত্যু আজ উদ্বুদ্ধ করুক নব-জীবন। সহস্র সহস্র প্রাণ আজ উৎসর্গীকৃত হ’ক বিশ্বমানবকে নবভাবে জাগিয়ে তোলার জন্য।…এই চাই। শুধু মরা নয়-সে তে সোজা। চাই নব জীবন, চাই বিপ্লব…

মা চা নিয়ে এলেন। পেভেল বললো, বেশতো, মাল-মশলা দাও, পাড়াগাঁর জন্যও আমরা একটা কাগজ বের করছি।

দেবো। যতদুর সম্ভব সোজা ভাষায় লিখো…একটা ছোট ছেলে যেন বুঝতে পারে।

তারপর হঠাৎ বলে উঠলো, আহা, যদি ইহুদী হতুম আমি! খৃস্টান সাধুরা অপদার্থ…ইহুদী প্রফেট এমন ভাষায় কথা কইতে পারতো, যা শুনলে শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। তারা গির্জায় বিশ্বাসী ছিল না, ছিল আত্মবিশ্বাসী; তাদের ভগবান ছিল তাদেরই অন্তরে। তাই তারা মানতো একমাত্র অন্তরের নীতি। মানুষ আইনের দাস নয়, সে মানবে তার অন্তরকে। তার অন্তরে সমস্ত সত্য নিহিত। সে পুলিসের দারোগাও নয়, গোলামও নয়-সে মানুষ, মার সমস্ত আইন তার মধ্যে।

রান্নাঘরের দোর খুলে এক যুবক এসে ঢুকলো। এই ইয়াফিম। রাইবিন তাকে পরিচিত করে দিলো পেভেলের সঙ্গে। তারপর বই বাছা শুরু হল। বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে ইয়াফিম বললো, মেলাই বই দেখছি আপনাদের, কিন্তু পড়বার ফুরসুং বোধ হয় কম, গ্রামে কিন্তু পড়ার সময় প্রচুর।

কিন্তু ইচ্ছে বোধ হয় কম?—পেভেল বললো।

কম? কম কেন হবে। যথেষ্ট ইচ্ছে তাদের। দিনকাল কেমন পড়েছে জানেন তো! ভাববার শক্তি হারিয়ে যে নিশ্চিন্ত থাকতে চায়, তার মৃত্যু অবধারিত। মানুষ তো আর মরতে চায় না, তাই ভাবতে শুরু করেছে। তাইতো বই’র চাহিদা…ভূতত্ত্ব—এটা কি?

পেভেল ভূতত্ত্ব কি বুঝিয়ে বলতে ইয়াফিম বললো, জমির উদ্ভব হল কি করে চাষীরা তা তত জানতে চায় না, যত জানতে চায় জমি কি করে তাদের বেহাত হয়ে জমিদারের হাতে গেলো। পৃথিবীটা স্থির থাকুক, ঘুরুক, দড়িতে ঝুলুক, যা খুশি হ’ক—কোনো আপত্তি নেই তাদের–তারা শুধু চায় খাবার।

এমনিভাবে বই বাছাই চলতে লাগলো। পেডেল ইয়াফিকে জিগ্যেস করলো, তোমার নিজের জমি আছে?

হাঁ, ছিল, কিন্তু জমি চষে আর রুটি মেলে না, তাই ছেড়ে দিয়েছি। ভাবছি, এবার সৈন্যদলে ঢুকবো। কাকা বারণ করেন, বলেন, সৈন্যদের কাজ তো লোকদের ধরে ঠেঙানো। কিন্তু আমি যাবো, বহুযুগ ধরে মানুষদের সৈন্যের সাজে সাজিয়ে রাখা হয়েছে—আজ তার অবসান করার দিন এসেছে। কি বলেন?

দিন এসেছে সত্য, কিন্তু কাজটা শক্ত। সৈনিকদের কি বলতে হবে, কেমন করে বলতে হবে, তা জানা চাই।

তা জানবো, শিখবো।

কর্তারা টের পেলে গুলি করে মারবে।

তা জানি। জানি যে তারা কোনো দয়া দেখাবে না। কিন্তু লোক তো জাগবে। আর এই জাগরণই তো বিদ্রোহ। নয় কি?

এবার ওঠা যাক।

রাইবিন, ইয়াফিম উঠে পড়লো। বইগুলো হাতে নিয়ে ইয়াফিম…বললো, আজকাল এ-ই আমাদের আঁধারের আলো।

তারা চলে গেলে পেভেল এণ্ড্রিকে বলে, রাইবিনের তেজ আছে দেখছি।

এণ্ড্রি বললো, হাঁ, আমিও তা লক্ষ্য করেছি।…চাষীদের মন আজ বিষিয়ে উঠেছে। ওরা যক্মহন জাগবে, ওরা যখন নিজেদের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াবে, সমস্ত জিনিস ওরা ওলট-পালট করে দেবে। ওরা চায় মুক্তি, জমি–তাই সমস্ত কিছু প্রতিষ্ঠানকে ওরা ভেঙে-চুরে পুড়িয়ে ভূমিসাৎ করে দেবে মুষ্টি-মুষ্টি ভস্মের মধ্যে বিলুপ্ত হবে তাদের ওপর যুগ-যুগান্ত ধরে অনুষ্ঠিত অন্যায়।

পেভেল বললো, তারপর তারা লাগবে আমাদের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে।

না পেভেল। আমরা তাদের দলে টানতে পারব। বোঝাতে পারব যে, মজুর আর চাষী একই ব্যথার ব্যথী, একই পথের পথিক। আমি জানি, তারা আমাদের কথায় বিশ্বাস করবে, আমাদের দলে যোগ দেবে।

.

১.১৮

দিন কয়েক পরে নিকোলাই এসে হাজির হলো। বললো, ব্যাটাকে আমিই সাবাড় করবো মনে করেছিলুম, কিন্তু মাঝখান থেকে কে এসে মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নিলে।

পেভেল স্নেহভরা কণ্ঠে বললো, চুপ চুপ, যা-তা বলো না।

নিকোলাই বললো, কি করবো আমি। দুনিয়ার কোথায় আমার স্থান–কিছুই বুঝি না। চোখে সব দেখি, মানুষের ওপর যে অন্যায় হচ্ছে, তা’ মর্মে মর্মে অনুভব করি; কিন্তু তা খুলে বলার ভাষা পাই না।…বন্ধু, আমায় কাজ দাও…একটা কঠিন কাজ দাও…এই অন্ধ, অকেজো, জীবন আর সহ্য করতে পাচ্ছি না আমি তোমরা এক মহান কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, সে কাজ ক্রমশ এগোচ্ছে, দেখছি…অথচ আমি দূরে দাঁড়িয়ে। কাঠ তুলি, তক্তা ফাড়ি …অসহ্য। আমায় একটা শক্ত কাজ দাও, ভাই।

পেভেল বললো, দেবো।

এণ্ড্রি বলে উঠলো, চাষীদের জন্য আমরা একখানা কাগজ বের কচ্ছি। তুমি টাইপ সাজানো শিখে তার কম্পোজিটারের কাজ কর। আমি তোমায় শিখিয়ে দেবো।

নিকোলাই বললো, তা যদি দাও, তাহলে এই ছুরিখানা তোমায় উপহার দেবো।

এণ্ড্রি হেসে উঠলো, ছুরি! ছুরি নিয়ে কি করব?

কেন, ভালো ছুরি, দেখো না!

আচ্ছা, সে দেখা যাবে। এখন চল, বেড়িয়ে আসি।

তিন জনে বেড়াতে বেরিয়ে গেলো।

দিন বয়ে চললো এম্‌নি করে। পয়লা মে’র উৎসবের আয়োজনও চলতে লাগলো পূর্ণ মাত্রায়। পথে, ঘাটে, কারখানায়, দেয়ালে, থানার গায়ে, লাল ইস্তাহারের ছড়াছড়ি। পেভেল এণ্ড্রি, দিন-রাত সমানে খাটে। মার ওপরও বহুৎ কাজের ভার থাকে। মা সারাদিন তাই নিয়ে ছুটোছুটি করে বেড়ান। স্পাইতে পল্লি ভরে গেছে কিন্তু কাউকে হাতে-কলমে ধরতে পাচ্ছেনা। পুলিসদের শক্তিহীনতা দেখে তরুণদের আশা এবং উৎসাহ বাড়ছে।

তারপর এলো সেই পয়লা মে।

মা সব্বার আগে জেগে উনুন ধরিয়ে চায়ের জল চাপালেন। জল ফুটে গেলো, কিন্তু তিনি ছেলেদের ডাকলেন না। আজ ওরা একটু ঘুমোক, এ ক’দিন অতো খেটেছে।

কারখানার পয়লা বাঁশি বেজে গেলো। তখনো তাদের ঘুম ভাঙলো না। দ্বিতীয় বাঁশি বাজাতে এণ্ড্রি, উঠে পেভেলকেও ডেকে তুলল। তারপর চা খেতে গেলে মায়ের কাছে।

মা এণ্ড্রিকে একান্তে বললেন, এণ্ড্রি, ওর কাছে-কাছে থাকিস বাবা!

নিশ্চয়ই। যতক্ষণ সম্ভব, থাকবো।

পেভেল বললো, চুপি-চুপি কি কথা হচ্ছে তোমাদের?

কিছু না। মা বলছিলেন, হাত-মুখ বেশ করে ধুতে, যাতে মেয়েরা আমাদের দিকে চেয়ে আর না চোখ ফেরাতে পারে। বলে এণ্ড্রি, হাতমুখ ধুতে চলে গেলো।

পেভেল গাইতে লাগলো মৃদুস্বরে, ওঠো, জাগো, মজুরদল…

মা বললেন, শোভাযাত্রার বন্দোবস্ত করলে পারতিস এখন।

বন্দোবস্ত সবই ঠিক হয়ে আছে, মা।

যদি আমরা ধরা পড়ি আইভানোভিচ এসে যা করার করবে। সে-ই তোমার সব রকমে সাহায্য করে।

বেশ…মা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেন।

ফেদিয়া মেজিন যৌবনোচিত উৎসাহ এবং আনন্দ-দীপ্ত হয়ে ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল, শুরু হয়ে গেছে। সবাই রাস্তায় বেরিয়েছে। নিকোলাই, গুসেভ, শ্যামোয়লোভ কারখানার গেটে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে। বেশির ভাগ লোক কারখানা ছেড়ে বাড়ি চলে এসেছে। চলো, আমরাও যাই, এই ঠিক সময়। দশটা বেজে গেছে।

যাচ্ছি।

দেখবে, মধ্যাহ্নভোজের পর সবাই জেগে উঠবে।

মেজিন, এণ্ড্রি, পেডেল, মা-–চারজনেই বেরিয়ে পড়লেন পথে। দোরে, জানালায়, পথে, সর্বত্র লোকের ভিড় এবং কোলাহল। সবাই এণ্ড্রি পেভেলের দিকে চাইছে, সবাই তাদের অভিনন্দিত করছে। এক জায়গায় একজন চিৎকার করে উঠল, পুলিস ধরবে ওদের; তা হলেই সব শেষ।

আর একজন জবাব দিলো, ধরুক, তাতে কি হয়েছে!

আর একটু দুরে জানালা দিয়ে ভেসে আসছে এক রমণীর অরুদ্ধ কণ্ঠস্বর…একবার ভেবে দেখ, তুমি কি একা?—একা নও। ওরা সব অবিবাহিত। ওদের কি …

যোশীমভের পা কবে কাটা পড়েছিল বলে কারখানা থেকে সে মাসোয়ারা পেতো। তার বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে সে জানালা দিয়ে মুখ বের করে চেঁচিয়ে উঠলো, পেভেল, পাজি, তোর মুণ্ডুটা ওরা ছিঁড়ে না নেয় তো কি বলেছি।

মা শিউরে উঠলেন, ক্রুদ্ধ হলেন। তারা কিন্তু কিছুমাত্র গায়ে না মেখে দিব্যি সাত-পাঁচ গল্প করতে করতে চললো। মিরোনোভ বলে এক মজুর এসে তাদের বাধা দিয়ে বললো, শুনচি নাকি তোমরা দাঙ্গা করতে যাচ্ছ, সুপারিন্টেণ্ডেণ্টের জানালা ভাঙতে যাচ্ছো?

পেভেল বললো, সে কি! আমরা কি মাতাল?

এণ্ড্রি বললো, আমরা যাচ্ছি শুধু নিশান নিয়ে শোভাযাত্রা বের করতে, আর মজুরদের গান গাইতে। সে গান তোমরাও শুনতে পাবে। সেতো শুধু গান নয়, সে মজুরদের মন্ত্র, মজুরদের মতবাদ!

মিয়োনোভ বললো, সে সব আমি জানি। আমি তোমাদের লেখা পড়ি কিনা…তারপর মা, তুমিও বুঝি বিদ্রোহ করতে চলেছে।

হাঁ। মৃত্যু যদি আসে, আমি সত্যের সঙ্গে গলাগলি হয়ে পথ চলবো।

ওরা দেখছি নেহাৎ মিথ্যে বলেনি যে, তুমিই কারখানা, ইস্তাহার ছড়াও।

কারা বলেছে? পেভেল জিগ্যেস করলো।

লোকেরা! আচ্ছা, আসি তাহলে।…

মিরোনোভ চলে যেতে পেভেল বললো, তুমিও দেখছি, মা, জেলে যাবে।

যাই যাবো–-মা ধীরে ধীরে বলেন।

সূর্য ওপরে উঠলো। বেলা বাড়ছে। লোকের উত্তেজনাও বাড়ছে। বড় রাস্তার গায়ে এক গলির মাথায় শ’খানেক লোকের ভিড়। তার মধ্য দিয়ে আসছে নিকোলাইর গলা…মুগুরের ঘায়ের মতো…ওরা আমাদের রক্ত নিঙরে নিচ্ছে, ফল থেকে রস যেমন করে নেওয়া হয়।

সত্যি কথা—একযোগে অনেকগুলি কণ্ঠ বেজে উঠলো।

এণ্ড্রি, বললো, সাবাস, নিকোলাই! বৃলেই সে তার কর্ক্সক্রুর মতো দেহটা ভিড়ের মধ্যে গলিয়ে দিলো! পরক্ষণেই বেজে উঠলো তার গলা, বন্ধুগণ, ওরা বলে, পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন জাতি ইহুদী, জার্মান, ইংরেজ, তাতার…কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করিনে। দু’টি মাত্র পরম্পর-বিদ্বেষী জাত আছে দুনিয়ায়—ধনী এবং দরিদ্র। ধনীদের পোশাক বিভিন্ন হতে পারে, ভাষা স্বতন্ত্র হতে পারে, দেশ হিসাবে তারা ফরাসী, জার্মান অথবা ইংরেজ হতে পারে, কিন্তু মজুরদের সঙ্গে কারবারের বেলা তারা সবাই একজাত, সবাই তাতার। নিপাত যাক এই ধনীর দল!

শ্রোতাদের মধ্যে একটা উল্লাসের ঢেউ বয়ে গেলো।

এণ্ড্রি, বলতে লাগলো, এবার চাও মজুরদের দিকে। ফরাসী মজুর, জার্মান মজুর, ইংরেজ মজুর—সবাই কাটাচ্ছে আমাদের রুশ-মজুরের মতোই কুকুরের জীবন।

ভিড় ক্রমশ বাড়তে লাগলো। এণ্ড্রি গলা চড়িয়ে বলতে লাগলো, বিদেশের মজুররা আজ এই সোজা সত্য বুঝতে পেরেছে। আজ পয়লা মে’র এই উজ্জ্বল দিবসে তারা আবদ্ধ হচ্ছে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে; কাজ ছেড়ে, বাস্তায় এসে দলে দলে মিলিত হয়ে তারা আজ পরস্পরকে দেখছে, আর হিসাব নিচ্ছে তাদের বিপুল শক্তির। এইদিনে মজুরদের মধ্যে স্পন্দিত হচ্ছে একটি প্রাণ,-মজুরদের যে কী বিপুল শক্তি, এই জ্ঞানে সকল প্রাণ আলোকিত; সমস্ত হৃদয়ে আজ বন্ধুত্বের স্পন্দন; সঙ্গীদের সুখের জন্য, তাদের মুক্তি এবং সত্য লাভের জন্য যে যুদ্ধ, তাতে আত্মদান করতে সবাই আজ প্রস্তুত।…

কে একজন চেঁচিয়ে উঠলো, পুলিস।

.

১.১৯

চারজন অশ্বারোহী পুলিস ‘ভাগো’ ‘ভাগো’ বলে ছুটে এলো। পলকে মজুররা ছত্রভঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়লো। এণ্ড্রি তখনও রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। ঘোড়া তার গায়ে এসে পড়ার উপক্রম দেখে সে সরে দাঁড়ালো, আর তক্ষুণি মা তাকে টেনে নিলেন, তুমি না কথা দিয়েছে, পেভেলের সঙ্গে সঙ্গে থাকবে!

ঘাট হয়ে গেছে, মা, তাই থাকবো।

আবার চলতে লাগলো তারা।

গির্জার বাগানে এসে থামলো। চার-পাঁচশো লোকের ভিড়। ছেলে মেয়ে, বুড়ো ছুটোছুটি করছে চারদিকে প্রজাপতির মতো আনন্দে। জনসমুদ্র দুলছে একবার এদিকে, একবার ওদিকে। ভড়ের মধ্যে শিজভের গলা,…না, আমাদের ছেলেদের আমরা ত্যাগ করবনা। জ্ঞানে ওরা আমাদের শ্রেষ্ঠ, সাহসে ওরা আমাদের শ্রেষ্ঠ। জলাভূমির জন্য অন্যায় কর হতে কারা আমাদের রক্ষা করেছে?–ওরা! এ কথাটা ভুললে চলবে না। এ করে ওরা জেলে গেছে, কিন্তু সুফল ভোগ করছি আমরা—আমরা সকলে।…

বাঁশি বেজে উঠলো, জনতার কলরবকে ডুবিয়ে দিয়ে। সবাই চম্‌কে উঠলো। যারা বসে ছিল, উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এক মুহূর্ত সব মৃত্যুর মতো নীরব, নিথর। সবারই সতর্ক দৃষ্টি, মলিন-মুখ। তার মধ্যে আচমকা ধ্বনিত হ’ল পেভেলের দৃঢ় কণ্ঠ, বন্ধুগণ!…

মা’র চোখের সামনে জ্বলে উঠলো যেন আগুনের দীপ্তশিখা…সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে তিনি নিজের দেহটা পেভেলের পেছনে এনে দাঁড় করালেন। সকলের দৃষ্টি ফিরলো পেভেলের দিকে…চুম্বক যেন টানছে লৌহ-শলাকাকে।

বন্ধুগণ! ভাইগণ! আজ লগ্ন উপস্থিত…আজ বর্জন করতে হবে আমাদের এই জীবন, এই লোভ, ঈর্ষা, অন্ধকারের জীবন, এই হিংসা মিথ্যা অপবিত্র জীবন, এই জীবন-যেখানে আমাদের কোন স্থান নেই, যেখানে আমরা মানুষ বলে পরিগণিত নই।…

পেভেল থামলো, জনতা নিঃশব্দে তার দিকে আরো চেপে দাঁড়ালো। মা ছেলের দিকে চেয়ে রইলেন…কী গৰ্বপূর্ণ সাহস-দীপ্ত জলন্ত ছেলের চোখ!

… বন্ধুগণ, আমরা সংকল্প করেছি, মুক্তকণ্ঠে প্রচার করব আমরা কে! …আমরা আজ নিশান তুলে ধরব আকাশে…যুক্তির নিশান, সত্যের নিশান, স্বাধীনতার নিশান! এই সেই নিশান।

জনতার মধ্য দিয়ে মজুরদের লাল ঝাণ্ডা লাল পাখির মতোই ঊর্ধ্বে উত্থিত হ’ল পেভেলের হাতে। তারপর হঠাৎ তা নুয়ে পড়তেই দশ বাবোখানা হাত তা ধরে ফেললো…তার মধ্যে মাও ছিলেন। পেভেল জয়ধ্বনি করে উঠলো, মজুরের জয়!

শত শত কণ্ঠে তার প্রতিধ্বনি হ’ল।

সোশ্যাল-ডিমোক্রেটিক মজুরদলের জয়! সকল দেশের সকল মজুরের জয়!

জনতা যেন উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। নিশানের অর্থ যারা বোঝে, তারা ভিড় ঠেলে তার দিকে এগোয়। মা পেভেলের হাত চেপে ধরে আনন্দে, আবেগে কাঁপতে থাকেন। নিকোলাইও পেভেলের পাশে এসে দাঁড়ায়।

সকল কোলাহল ছাপিয়ে এণ্ড্রির কণ্ঠ ধ্বনিত হ’ল, বন্ধুগণ, আমরা আজ এক পবিত্র জয়যাত্রার সূচনা করলুম…নবীন এক দেবতার নামে। আমাদের সে দেবতা হচ্ছে—সত্য, আলোক, যুক্তি, মঙ্গল। এই পবিত্র জয়যাত্রার পথ যেমন দীর্ঘ, তেমনি কণ্টক-সংকুল। আমাদের লক্ষ্য দুরে, অতি দূরে। কাঁটার মুকুট আমাদের সামনে নাচছে, আমাদের অপেক্ষায়। যারা সত্যের শক্তিতে বিশ্বাসী নও, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সত্য রক্ষা করার সাহস যাদের নেই, আত্মশক্তিতে যারা বিশ্বাস করে, দুঃখের নামে যারা শঙ্কিত হও—তারা তফাতে সরে দাঁড়াও। আমরা তাদেরি আহ্বান করছি, যারা বিশ্বাস করে, জয়ী আমরা হবোই। আমাদের লক্ষ্য সম্বন্ধে যারা সন্দিগ্ধ, তারা আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করে চলে যাক…তারা চিরদিন পাবে শুধু দুঃখ। সঙ্গীদল, সজ্জিত হয়ে দাঁড়াও, বলো, জয়যুক্ত হ’ক এই পয়লা মে…জয়যুক্ত হক মুক্ত মজুর সংঘের এই উৎসব-তিথি।

হাজার হাজার কণ্ঠ ধ্বনিত হয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে, জনতা চেপে দাঁড়ালো। পেভেল লাল-নিশান তুলে ধরলো…তাতে সূর্যের রক্তবর্ণ কিরণ এসে ঝকঝক করে জ্বলতে লাগলো। ফেদিয়া মেজিন চেঁচিয়ে উঠলো, পুরাণে জগৎ ছেড়ে বেরিয়ে পড় যাত্রীদল।…

যাত্রা শুরু হল। সবার আগে নিশান হাতে পেভেল। তারপরেই অন্যান্য নায়কদল। সবাই মজুরদের বিজয়-সংগীত গাইতে গাইতে চলেছে!

ওঠো, জাগো, মজুরদল!
ক্ষুধিত মানব যুদ্ধে চল।

পথের দু’ধার থেকে দলে দলে লোক সোল্লাসে নিশানের দিকে ছুটে আসে, ভিড়ে মিশে যায়, তারপর বিপ্লব-সংগীতে গগন আলোড়িত করে অগ্রসর হয়।

মা এ গান এর আগেও শুনেছেন বহুবার। কিন্তু আজ যেন প্রথম এর সুর তার প্রাণে গিয়ে লাগলো,–

দুঃখী সঙ্গী কাঁদিছে হায়!
সেথা যেতে হবে…আয়রে আয়…

জনতা গানের সুরে মেতে উঠতে লাগলো।

এক মা যাত্রী ছেলেকে বেঁধে রাখার চেষ্টায় কেঁদে উঠছেন, মিতিয়া, কোথায় যাচ্ছিল, বাবা!

মা তাকে বললেন, ছি বোন, যেতে দাও, ভয় পেয়োনা, ভয় কি? আমিও প্রথম প্রথম ভয় পেতুম; কিন্তু এখন ঐ দেখ, আমার ছেলে সবার আগে-নিশান হাতে-ঐ…

শঙ্কিতা মাতার কানে তা গেলো না। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন আর্তকণ্ঠে, ডাকাতরা করছে কি? কোথায় যাচ্ছে? সৈন্যেরা যে ওদের মেরে ফেলবে গো!…

মা বললেন, অধীর হয়োনা বোন! মহৎ কাজের ধরণই এই। এই যীশুখৃস্ট…তিনিই কি যীশুখৃস্ট হতে পারতেন, যদি না শত সহস্র লোক তার জন্য মরতো?

গানের সুর তখন আরও চ’ড়ে গেছে

জারের যখন সৈন্য চাই
ছেলে দাও, নইলে রক্ষা নাই…

শিজভ জোর গলায় বলে উঠলো, সাবাস্ জোয়ান, ভয়ডর কিছু নেই তোমাদের।…আমার ছেলে, সে যদি আজ বেঁচে থাকতো! কারখানা তাকে খুন করেছে। হাঁ, খুন করেছে।

মার বুকের রক্ত দ্রুততালে নেচে উঠলো। কিন্তু ভিড়ের অসম্ভব চাপে তিনি কোণঠাসা হয়ে এক দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন, জন-স্রোতের বিচিত্র গতি। হাজারে হাজারে উন্মত্ত লোক মনে হয় যেন একটা বৃহৎ কাঁসার জয় ঢাকের প্রলয়ংকর ধ্বনি তাদের মাতিয়ে তুলেছে কেউ মাতছে যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায়, কেউ মাতছে একটা অস্পষ্ট আনন্দে, একটা নতুন কিছুর সম্ভাবনায়, একটা জ্বলন্ত কৌতুহলে! বহু বছরের পুঞ্জীভূত কণ্টকিত ব্যথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যেন আজ সংগীতের মধ্য দিয়ে বেরুচ্ছে।

সবাই ঊর্ধ্বে নিশানের দিকে চেয়ে পথ চলেছে, সবাই চিৎকার করছে, কিছু-না-কিছু বলছে, কিন্তু সমস্ত কণ্ঠ ডুবিয়ে বেজে উঠছে সেই গান নতুন গান…এ সে পুরাণে দুঃখ-করুণ সুর নয়, এ সে অভাবক্লিষ্ট ভয়াতুর ব্যক্তিত্বহীন নিরানন্দ নিঃসঙ্গ নিশি-যাত্রীর আর্ত-বিলাপ নয়, এ সে রুদ্ধ-শক্তির অভিব্যক্তি বেদনা নয়।…ভালোমন্দ দুই-ই অবিভেদে নাশ করে যে-এ সে ক্রুদ্ধ সাহসের উত্তেজিত সুর নয়! এ সে পশুশক্তি নয়, যা শুধু মুক্তির জন্যই মুক্তি চাই বলে চিৎকার করে, যা অন্যায়ের প্রতিহিংসাবশে শুধু ধ্বংসই করে চলে, সৃষ্টি করতে পারে না। দাসত্ব-দুষিত, পুরাণো জগতের কোন কিছু নেই এতে। সোজা… সরল সুদৃঢ় শান্ত এ সংগীত। মানুষকে এ মাতিয়ে নিয়ে চলে দীর্ঘ অন্তহীন পথে, সুদূর সমুজ্জ্বল ভবিষ্যতের অভিমুখে। পথের দুঃখ এ গোপন করে না। এর স্থির অচঞ্চল আগুনে জ্বলে পুড়ে গলে যায় মানুষের স্তূপীকৃত দুঃখ-বেদনা, তার চিরাভ্যন্ত মলিন সংস্কার-ভার, নব-যুগের সম্বন্ধে তার মিথ্যা আশঙ্কা।

সেই বিশাল জন-সমুদ্র এই সংগীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে চললো। পেছনে সংশয়ী বিজ্ঞদল। এ অভিনয়ের কখন কোথায় অবসান হবে, তা যেন তারা আগে থেকেই জানে। মা শুনলেন তাদের কথা।

একদল সৈন্য স্কুলের কাছে, আর একদল কারখানার কাছে।

গভর্ণর এসে পড়েছে।

তাই নাকি?

হাঁ, আমি স্বচক্ষে দেখলুম তাঁকে।

একজন তা শুনে সোল্লাসে চিৎকার করে উঠলো, আমাদের ওরা কম ডরায় মনে করেছে? এইতো দেখো–গভর্ণর স্বয়ং সৈন্য নিয়ে হাজির হয়েছেন।…

বিজ্ঞদের কথা মার ভালো লাগছিল না। ভিড় ঠেলে তিনি সামনে এগিয়ে চললেন।

হঠাৎ মনে হল, জন-স্রোতের অগ্রভাগ যেন কি একটা কঠিন জিনিসের ওপর ঘা খেয়ে পেছনে টলে পড়ছে…জনতার মধ্য দিয়ে উঠছে একটা মৃদু কিন্তু আতঙ্ক-ভরা গুঞ্জন। গানের সুরটাও একবার কেঁপে উঠলো, তারপর ধ্বনিত হ’ল আরো উচ্চ এবং দ্রুত তালে। কিন্তু আবার গানের তাল ভঙ্গ হ’ল গায়কদল একে একে সরে পড়তে লাগলো দল থেকে …এদিকে ওদিকে দু’চারটি কণ্ঠ গানকে বাঁচিয়ে রাখার দুরূহ চেষ্টায় চেঁচাতে লাগলো।

ওঠো, জাগো, মজুরদল,
ক্ষুধিত মানব যুদ্ধে চল…

শোভাযাত্রার সামনে কি ব্যাপার হচ্ছে তা চোখে দেখতে না পেভেলও মা যেন ভাবতে পারলেন। দ্রুতপদে তিনি ভিড় ঠেলে এগিয়ে চললেন।

.

১.২০

এগিয়ে পেভেলের গলা পেলেন।

…বন্ধুগণ, সৈনিকেরাও আমাদের মতোই মানুষ। তারা আমাদের মারবে না। কেন মারবে? সকলের হিতার্থে আমরা সত্য প্রচার করি বলে? এ সত্য ঐ সৈনিকদেরও হিতকর। এখন ওরা একথা বুঝছে না বটে, কিন্তু দিন আসছে যখন ওরা আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে, যখন ওরা সমবেত হবে—ঐ ডাকাত এবং খুনীদের পতাকা–যে পতাকাকে ঐ মিথ্যাবাদী পণ্ডদল গৌরবের এবং সম্মানের পতাকা বলে অভিবাদন করতে ওদের বাধ্য করে তার তলে নয়, আমাদের এই মুক্তির এবং মঙ্গলের পতাকা তলে। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এ পতাকা নিয়ে, যাতে তারা সত্বর এ সত্য উপলব্ধি করতে পারে। এগোও, বন্ধুগণ, দৃঢ়পদে এগিয়ে চলো।

পেভেলের কণ্ঠ দৃঢ় এবং স্পষ্ট। কিন্তু জন ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। একে একে ডাইনে বাঁয়ে, বাড়ির দিকে, বেড়ার পাশে ভেগে যেতে লাগলো লোক। জনতার আকৃতি হয়ে পড়লে গোঁজের মতো, আর তার আগায় নিশান হাতে পেভেল।

পথের শেষে বাগানের বাইরে যাবার পথ বন্ধ করে বেয়োনেটধারী একদল সৈন্য…দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে।

মা আরো এগিয়ে গেলেন।

পেভেল বললো, সঙ্গীগণ, সমস্ত জীবনভোর অগ্রসর হও। আর কোন গতি নেই আমাদের। গাও…

…ওঠো, জাগো, মজুরদল!
ক্ষুধিত মানব যুদ্ধে চল…

নিশানটা আরও ঊর্ধ্বে উঠে ঢেউ খেলে খেলে সৈন্য-প্রাচীরের দিকে এগিয়ে গেলো। মা শিউরে উঠে চোখ বুজলেন। জনতা সভয়ে থমকে দাঁড়ালো। এগোলো শুধু পেভেল, এণ্ড্রি শ্যামোয়লোভ ও মেজিন।

মেজিনের কণ্ঠে বেজে উঠলো সংগীতের সুর… ভীষণ রণে… ভয়-চকিত মোটা গলা পেছন থেকে গেয়ে উঠলো,

সঁপিলে প্রাণ…

গানের দু’টো চরণ বেরিয়ে এলো দু’টো দীর্ঘনিশ্বাসের মতো। জনতা আবার পা বাড়ালো সামনের দিকে তাদের পদধ্বনি স্পষ্ট শোনা গেলো। গান আবার নতুন, জোরের সঙ্গে নতুনভাবে বেজে উঠলো।

…ভীষণ রণে সঁপিলে প্রাণ
পর তরে দিল আত্মদান…

কে যেন ঠাট্টার সুরে বলে উঠলো, আহা হা, ব্যাটারা গান ধরেছে দেখোনা, যেন শ্রাদ্ধ-সংগীত।

আর একটি ক্রুদ্ধ কণ্ঠ এলো, ম্যার ব্যাটাদের!

মা বুকে হাত চেপে ধরলেন, চেয়ে দেখলেন, সেই বিরাট জনতা চঞ্চল, সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এগিয়ে চলেছে নিশান হাতে জন বারো লোক–তারাও আবার এক এক করে ছিটকে যাচ্ছে দল থেকে …পায়ের তলার মাটি যেন হঠাৎ তেতে আগুন হয়েছে, এমনি ভাবে। ফেদিয়া গেয়ে উঠলো, …শেষ হবে এ অত্যাচার…

সমবেত সুর ধ্বনিত হল। —মানুষ জাগিবে পুনর্বার…

হঠাৎ সুর ভঙ্গ হয়ে তীক্ষ্ণ আওয়াজ এলো, সঙিন চালাও।

মুহূর্ত মধ্যে সঙিনগুলো একসঙ্গে ঊর্ধ্বে উত্থিত হয়ে সূর্যালোকে ঝলমল করে উঠলো।

মার্চ।

ঐ রে, আসছে, বলে একজন খোঁড়া একলাফে রাস্তার একপাশে গিয়ে সরে দাঁড়ালো।

মা নিষ্পলকে চেয়ে রইলেন। সৈন্যদল গোটা রাস্তাটায় ছড়িয়ে পড়ে সঙিন উঁচিয়ে মার্চ করে আসছে–শান্তভাবে। খানিকদুর এসে তারা স্থির হয়ে দাঁড়ালো। মা ছেলের দিকে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন এণ্ড্রি পেভেলের আগে গিয়ে নিজের দীর্ঘ দেহ দিয়ে তাকে আগলে রেখেছে, আর পেভেল তীক্ষ্ণকণ্ঠে চেঁচাচ্ছে—সামনে থেকে সরে দাঁড়াও। এণ্ড্রি মাথা উঁচু করে মহোৎসাহে গান গাইছে, পেভেল তাকে ঠেলা দিয়ে বলছে, পাশে যাও, নিশান সামনে থাক্।

‘ভাগো’ বলে একজন সামরিক কর্মচারী সজোরে ভূমিতে পদাঘাত করে চকচকে একখানা তলোয়ার খেলাতে লাগলো। তার পেছনে আবার আরও একজন কর্মচারী।

মা যেন শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রতি মুহূর্তে তার বুক ফেটে যাবার উপক্রম হল। দু’হাতে বুক চেপে তিনি এগোতে লাগলেন—জ্ঞানশুন্য, চিন্তাশূন্য। পেছনে জনতা পাতলা হয়ে যাচ্ছে-শীতল বাতাহত পত্রের মতো তারা ঝড়ে পড়ছে দল থেকে।

লাল-নিশানের চারদিকে মজুররা আরও ঘেঁসাঘেঁসি হয়ে দাঁড়ালো। সৈনিকেরা সঙিন দিয়ে তাদের তাড়া করতে লাগলো। মা শুনলেন, পেছনে পলাতকদের শঙ্কিত পদশব্দ আর কণ্ঠস্বর–

পালাও, পালাও—

দৌড়ে যাও, মা—

পিছিয়ে এলো, পেভেল।

নিশান ছাড় পেভেল, আমায় দাও, আমি লুকিয়ে রাখছি–বলে নিকোলাই নিশানটা ধরলো। বারেকের জন্য নিশান পেছনে হেলে পড়লো। পেভেল বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলো, ছাড়ো নিশান।

নিকোলাই হাত টেনে নিলো, যেন হাত তার আগুনে পুড়ে গেছে। গান থেমে গেলো। সঙ্গীরা পেভেলকে ঘিরে দাঁড়ালো, পেভেল তাদের ঠেলে বেরিয়ে এলো সামনে। অকস্মাৎ সকল কোলাহল থেমে গিয়ে দেখা দিলে এক গভীর নীরবতা।

তারপরেই শোনা গেলো সামরিক কর্মচারীর হুকুম, নিশানটা ছিনিয়ে নাও, লেফটেনেন্ট!

হুকুমপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট একলাফে পেভেলের কাছে গিয়ে নিশানটা ধরে টানতে লাগলো, ছাড়ো, ছাড়ো।

নিশানটা দুলে উঠলো, একবার ডাইনে হেললো, একবার বাঁয়ে। তারপর আবার সোজা হয়ে উড়তে লাগলো আকাশে।

লেফটেনেন্ট পিছিয়ে বসে পড়লো, নিকোলাই ঘুষি বাগাতে বাগাতে তীরবেগে ছুটে গেলো মার পাশ ঘিঁষে।

ধরে ব্যাটাদের–সামরিক কর্মচারী গর্জন করে উঠলো। তক্ষুণি অনেকগুলো সৈন্য সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লে সঙিন উঁচিয়ে। নিশানটা প্রবলভাবে দু’লে উঠে পড়ে গেলে নিচে, আর পলকে অদৃশ্য হয়ে গেলো সৈন্যদের মধ্যে।

একজন আর্তনাদ করে উঠলো, উহু! মা ক্ষিপ্তা ব্যাঘ্রীর মতো চীৎকার করে উঠলেন, পেভেল! সৈন্যদের মধ্য থেকে স্পষ্ট কণ্ঠে জবাব এলো পেভেলের, মা, বিদায়, বিদায়!

তবে বেঁচে আছে সে!…মনে আছে আমাকে–মার প্রাণে এই দু’টো ভাব স্পন্দিত হয়ে উঠলো।

সঙ্গে সঙ্গে এলো এণ্ড্রির কণ্ঠ, মাগো, চললুম।

মা হাত তুলে নাড়ালেন, বুড়ো পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে পেভেল-এণ্ড্রিকে দেখতে লাগলেন। এণ্ড্রিকে দেখা যাচ্ছিল। মা চেঁচিয়ে উঠলেন, এণ্ড্রি, পেভেল!

সৈন্যদলের মধ্য থেকে তারা ধ্বনি করে উঠলো, বন্ধুগণ, বিদায়, বিদায়!

প্রতিধ্বনি হলো অজস্র কণ্ঠে–বাড়ির ছাদ থেকে, ঘরের জালা থেকে, ছত্রভঙ্গ জন-সমুদ্র থেকে।

লেফটেনেন্ট মাকে ঠ্যালা দিয়ে চেঁচাতে লাগলো, ভাগে, ভাগো!

মা চেয়ে দেখলেন, নিশানটা ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গেছে, একটা টুকরোতে লাল কাপড়টা জড়ানো। নুয়ে সেটা তুলে নিতেই কর্মচারী মার হাত থেকে তা ছিনিয়ে নিলো এবং একদিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সদর্পে গর্জন করে উঠলো, যাও বলছি এখান থেকে।

সৈন্যদের মধ্য থেকে গানের সুর ভেসে এলো,

ওঠো, জাগো, মজুরদল।

চারদিকে সব-কিছু ঘুরছে, দুলছে, কাঁপছে। টেলিগ্রাফের তারের ঝংকারের মতো একটা গাঢ়, ভীতিপ্রদ ধ্বনি উত্থিত হচ্ছে। সামরিক কর্মচারিটি সক্রোধে হুংকার করে উঠলো, ব্যাটাদের গান বন্ধ কর, সার্জেন্ট ক্রেনড। মা টলতে টলতে গিয়ে সেই ছুঁড়ে-ফেলা নিশান টুকরো আবার তুলে নিলেন।

মুখ বন্ধ কর ব্যাটাদের।

গানের সুর প্রথমটা এলোমেলো হ’ল তারপর কাঁপতে কাঁপতে বন্ধ হ’ল।

একজন সৈন্য মাকে পেছন থেকে টেনে মার মুখ ঘুরিয়ে ঠেলে দিলো, বাড়ি যা, বুড়ি।

মার যেন পা আর চলে না। সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে।

পালা না ডাইনী, বলে একজন তাঁকে এক ঠ্যালায় রাস্তার পাশে সরিয়ে দিলো। মা নিশানের লাঠিটায় ভর দিয়ে চলতে লাগলেন দ্রুত পদে। পা তার ভেঙে এলো। দেয়াল এবং বেড়া ধরে ধরে চলছেন। সৈন্যেরা খালি হাঁকছে, যা যা, বুড়ি।

মা চলে যাবেন ভাবলেন, কিন্তু অজ্ঞাতে তাঁর পা যেন তাকে আবার সামনের দিকে চালিয়ে নিলো। পথ শূন্য। মা দাঁড়ালেন। দুর থেকে অস্পষ্ট শব্দ কানে এলো। শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে চললেন তিনি। রাস্তার মোড়ে একদল লোক উত্তেজিত কণ্ঠে কোলাহল করছে।

ওরা শুধু বাহাদুরী দেখাবার জন্য সঙিনের সামনে বুক পেতে দিচ্ছেন।—এটা মনে রেখো।

দেখ দিকি ওদের দিকে চেয়ে, সৈন্যরা এগোচ্ছে আর ওরা নির্ভীক ভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে।

একবার পেভেলের কথা ভাবো। আর এণ্ড্রি, সেও কি কম?

ঐ কর্মচারী ব্যাটার রকম দেখ–-দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন–ব্যাটা শয়তান।

মার মনের কথা যেন কণ্ঠ দিয়ে ঠেলে বেরোতে চাচ্ছিলো। ঠেলে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, প্রিয় বন্ধুগণ, …

সবাই সসম্ভ্রমে তাকে পথ করে দিলো।

একজন বললো, দেখ দেখ, ওঁর হাতে নিশান! আর একজন কঠিন কণ্ঠে বললো, চুপ।

মা হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলতে লাগলেন, বন্ধুগণ, শোনো। মানুষ তোমরা, একবার প্রাণ খুলে দাঁড়াও। নির্ভয়ে, নিরাতঙ্কে চোখ খুলে চাও। দেখো, আমাদের ছেলেরা আজ জয়-যাত্রায় বেরিয়েছে। আমাদের সন্তান…আমাদের রক্ত আজ সত্যের রণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অন্তরে তাদের ন্যায়ের দীপ্তি। তারা উন্মুক্ত করছে আজ এক নতুন পথ— সহজ এবং বৃহৎ-সকল মানুষের জন্য, তোমাদের সকলের জন্য, তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের জন্য এই পবিত্র ব্রতে আত্মোৎসর্গ করছে তারা। আবাহন করছে এক চির-উজ্জ্বল নবযুগের সূর্যকে। তারা চায় নব-জীবন…সত্য-ন্যায়-মঙ্গল-মণ্ডিত জীবন।

মার প্রাণ যেন ফেটে যাচ্ছে, বক্ষ সংকুচিত হচ্ছে, কণ্ঠ তপ্ত শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে! অন্তরের অন্তস্তলে উথলে উঠছে এক মহান বিশ্ব-প্লাবী প্রেমের বাণী। জিভ পুড়ে যাচ্ছে—এমনি প্রচণ্ড তার শক্তি, এমনি মুক্ত তার গতি। জনতা নির্বাক হয়ে কান পেতে তার কথা শুনছে। এরাও যাতে পেভেলের মতো সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাই ভেবেই যেন না তাদের উত্তেজিত করতে লাগলেন, আমাদের ছেলেরা আজ করাঘাত করছে সুখ-নিকেতনের রুদ্ধ দ্বারে। তাদের অভিযান আমাদের সকলের জন্য। তাদের অভিযান আজ সকল-কিছুর বিরুদ্ধে, যা দিয়ে মিথ্যাচারী ঈর্ষাপর হিংসাব্রতী শত্রুদল আমাদের ধরে বেঁধে পিষে ফেলছে। হে আমার বন্ধুগণ, তোমাদের—শুধু তোমাদেরই জন্য আজ তরুণের এ বিদ্রোহ। তারা যুদ্ধ করছে সমস্ত মানুষের, সমস্ত পৃথিবীর, সমস্ত মজুরের পক্ষ হয়ে। তারা মুক্ত করছে এক সত্যোদ্ভাষিত শুভ্রপথ তোমাদেরই চলার জন্য। সেই তোমরা কি আজ তাদের ছেড়ে চলে যাবে? ত্যাগ করবে? বর্জন করবে? নিজন কণ্টক-সংকুল পথে তাদের একা রেখে পালাবে?–না। তোমরা তোমাদের সন্তানদের মুখ চাও, তাদের গভীর ভালবাসার কথা স্মরণ কর…নিজেদের দুর্গতির কথা ভাব, ছেলেদের প্রাণশক্তিতে বিশ্বাস কর। ওরা যে সত্যের বর্তিকা জ্বেলেছে, তা ওদের অন্তরে জ্বলছে, ওরা তাতে পুড়ে মরছে। ওদের বিশ্বাস করে, বন্ধুগণ, ওদের সাহায্য কর…

গভীর উত্তেজনায় রুদ্ধ-কণ্ঠ হয়ে মা ঢলে পড়লেন। পেছন থেকে একজন তাঁকে ধরে ফেলে। সবাই যেন গরম হয়ে উঠেছে, বলছে, ঠিক কথা, সাঁচ্চা কথা আমরা কেন ভয়ে পালাবে ছেলেদের ছেড়ে।

বুড়ো শিজভ বুক টান করে দাঁড়িয়ে বললো, আমার ম্যাটভি কারখানায় মারা পড়েছে। সে যদি আজ বেঁচে থাকতো, আমি নিজে তাকে ওদের দলে ভিড়িয়ে দিতুম। আমি নিজে তাকে বলতুম, ম্যাটভি, তুমি যাও ঐ সত্যের রণে, ন্যায়ের রণে।…মা ঠিক কথা বলেছেনআমাদের ছেলেরা চেয়েছিল জীবনকে প্রতিষ্ঠা করতে যুক্তি এবং সম্মানের ওপর। আর সেই অপরাধে আমরা তাদের ত্যাগ করে ভীরুর মতো পালিয়ে এসেছি।

জনতা চঞ্চল হয়ে উঠলো। সবার দৃষ্টি মায়ের ওপর। মার দুঃখ যেন সবার অন্তরকে স্পর্শ করেছে, মার আগুন যেন সবার প্রাণ দীপ্ত করে তুলেছে।

শিজভ মার হাতে সেই নিশান-টুকরো গুঁজে দিয়ে তাঁকে বাড়ি নিয়ে চললো। জনতাও পেছনে পেছনে গেলো। তারপর দুজনে ঘরে ঢুকতে জনতা যে যার বাড়ি চলে গেলো।

[ প্রথম খণ্ড সমাপ্ত ]

২.০১-০৫ শোভাযাত্রার ছবি

দ্বিতীয় খণ্ড

সমস্ত দিনটা মা’র চোখের সামনে নাচতে লাগলো সেই শোভাযাত্রার ছবি! অস্থির, উন্মনা হয়ে কখনো তিনি ভাবেন, কখনো বাইরের দিকে শূন্য-দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন।

সন্ধ্যার পর পুলিস এলো তৃতীয়বার বাড়িতে। মাকে বললো, ছেলেদের মনে রাজভক্তি, ধর্মভাব জাগাতে পারো না? এতো তোমাদের মায়েদেরই দোষ। তারপর ভালো করে খানাতল্লাশী করে চলে গেলো। ফুঁ দিয়ে আলো নিভিয়ে মা খানিকক্ষণ অন্ধকারে বসে রইলেন। তারপর ঘুমিয়ে পড়লেন বিছানায়।

ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলেন, সেই শো