Friday, August 28, 2026
Homeগোয়েন্দা গল্পকালবেলা (মাসুদ রানা) - কাজী আনোয়ার হোসেন

কালবেলা (মাসুদ রানা) – কাজী আনোয়ার হোসেন

কালবেলা – ১ (মাসুদ রানা)

ক্লিফডেন, আয়ারল্যাণ্ড।

আঠারো শ’ ছিচল্লিশ সালের মে মাসের সাতাশ তারিখ।

সাগরের নোনা হাওয়ার তোড়ে ভাসতে ভাসতে বিদায় নিয়ে চলে গেছে কালো মেঘের ভেলা। দুপুরে নীল আকাশে ঝলমল করছে সূর্য। সোনালি রোদে চিকচিক করছে বৃষ্টিস্নাত সবুজ ফসলের মাঠ। দু’দিকের কাঠের বেড়ার মাঝে সরু পথে এগিয়ে চলেছে দুই অশ্বারোহী। আশপাশে কেউ নেই, নইলে হয়তো বুঝতে পারত এরা গ্রামের মানুষ নয়।

প্রথমজনের কাঁধ খুব চওড়া, বয়স হবে বড়জোর পঁচিশ চেপেছে বিশাল এক বাদামি স্ট্যালিয়নের পিঠে। দখলদার ইংরেজদের আইন অনুযায়ী এমন তাগড়া ঘোড়া কিনে নিতে পারবে না ক্যাথোলিক আইরিশেরা, কারণ তাদেরকে ব্যয় করার জন্যে অধিকার দেয়া হয়েছে মাত্র পাঁচ পাউণ্ড।

যুবকের সঙ্গী খর্বকায় ও বয়স্ক, চোখে গোল আইগ্লাস পথচলায় খুব অনভ্যস্ত। চরম অস্বস্তি বোধ করছে ঘোড়ায় চেপে। কেউ তাকে দেখলে হয়তো ভেবে নেবে, এ-লোক বোধহয় ইংল্যাণ্ডের অভিজাত কোন স্কুলের প্রধান-শিক্ষক।

ফেলে আসা পথে এদেরকে যারা দেখেছে, তাদের জানার কথা নয়, ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এক গোপন পরিকল্পনা নিয়ে এখানে এসেছে এরা। গত কয়েক বছর ধরে জটিল গবেষণা শেষ করে এবার সেটার ফলাফল প্রয়োগ করবে এ-দেশে।

পরস্পরের পরিচিত হলেও নীরবে এগিয়ে চলেছে তারা। স্যাডলে বসে কোমর ধরে গেছে প্রৌঢ়ের। একটু পর পর কোট থেকে বের করে দেখে নিচ্ছে ঘড়ি। মনের ভেতরে কাজ করছে সুগভীর এক ভয়: কেউ না কেউ পিছু নিয়েছে! কথা বলতে গিয়েও সেটা গিলে নিচ্ছে সে। বারবার করে ভাবছে: ‘অ্যাঙ্গাস, আমার খুব খারাপ লাগছে। আমরা বোধহয় মস্তবড় এক পাপে জড়িয়ে গেছি!’

যদিও প্রৌঢ় কিছু বললেই মুখের ওপরে হেসে যুবক বলে দেবে: আপনি তো সব বুঝেই নেমেছেন! এখন পিছিয়ে গেলে হবে?

জীর্ণ বেড়ার গায়ে চওড়া এক গেটের সামনে থেমে চট্‌ করে এদিক-ওদিক দেখে নিল যুবক। নিচু স্বরে বলল, ‘তা হলে কাজটা এখানেই সেরে নিই।’

ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল তারা। বেড়ার সঙ্গে দড়ি বেঁধে দেয়ায় তাজা ঘাসে মুখ ডোবাল ঘোড়াদুটো। স্ট্যালিয়নের স্যাডল ব্যাগ খুলে কাপড় দিয়ে মোড়ানো লম্বাটে এক কাঠের বাক্স নিল যুবক। ওটা ধরিয়ে দিল প্রৌঢ়ের হাতে। চোরের মত চারপাশে তাকাল তারা। গেট টপকে ফসলের মাঠে নেমে পড়ল যুবক। হাত বাড়িয়ে সঙ্গীর কাছ থেকে বুঝে নিল কাঠের বাক্স। প্রৌঢ় ভাবতে শুরু করেছে: ‘বড্ড ভুল করেছি! এখন আর কিছুই করার নেই!’ সাবধানে গেট ডিঙিয়ে খেতের- ভেতরে নেমে এল সে।

কাপড় দিয়ে মোড়ানো কাঠের বাক্স ডানহাতে নিয়ে হেঁটে চলেছে যুবক। চারপাশে গাঢ় সবুজ পাতার অসংখ্য ছোট গাছ। আইরিশ গরীব বর্গাচাষীরা বলে: এসব অলস বিছানা। এ-দেশে যেদিকে চোখ যাবে, বেশিরভাগ খেতে এই একই গাছ। সরু শাখায় কালচে-সবুজ পাতা, খুদে বেগুনি ফুল।

খেতের মাঝে গিয়ে থমকে দাঁড়াল যুবক ও তার সঙ্গী। হাঁটতে গিয়ে হাঁফ লেগে গেছে প্রৌঢ়ের। পথে কাউকে না দেখে স্বস্তি বোধ করছে যুবক। সাগরের ঢেউয়ের মৃদু স্ শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোন আওয়াজ নেই।

‘ঠিক আছে, এবার কাজটা শেষ করি,’ বলল যুবক।

দেরি না করে ফসলের মাঠে বসে পড়ল তারা। এখন আর পথ থেকে তাদেরকে দেখতে পাবে না কেউ। ওপরের কাপড় সরিয়ে সাবধানে মাটিতে বাক্সটা রাখল যুবক। ওটার ঢাকনি খুলে নিতেই পাশ থেকে প্রৌঢ় দেখতে পেল, ভেতরে লাল ভেলভেটের খোপে কয়েক সারিতে আছে কাঁচের ছোট কিছু বোতল। প্রতিটির ভেতরে আছে কয়েক ফোঁটা বাদামি তরল।

যাতে ভেঙে না যায়, তাই সতর্ক হাতে ভেলভেটের খোপ থেকে সরু এক শিশি নিল যুবক। খুলল ওটার মুখের কর্ক। নাক থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে শিশি। আঠাল তরল থেকে ভেসে আসছে ভয়ানক বিশ্রী এক দুর্গন্ধ।

ভুরু কুঁচকে ওদিকে চেয়ে রইল প্রৌঢ়।

যুবকটি শিশির ভেতরের তরল একটা গাছের গোড়ায় ঢেলে দিতেই, কয়েক সেকেণ্ডে সেটা শুষে নিল বৃষ্টিভেজা মাটি।

আপাতত শেষ হয়েছে তাদের কাজ। কর্ক এঁটে বাক্সের ভেতরে শিশি রেখে দিল যুবক। ঢাকনি বন্ধ করে কাপড়ে মুড়িয়ে নিল বাক্স। গাছগুলোর দিকে তাকাল সন্তুষ্টির চোখে। ওদিকে তিক্ত হয়ে গেছে প্রৌঢ়ের মন। যুবক পথের দিকে এগোতেই আড়ষ্ট ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল সে। চোখ সরাতে পারল না ভেজা মাটি থেকে। একটু আগে ওখানে ঢেলে দেয়া হয়েছে আঠাল সেই তরল।’

এবার কী ঘটবে, সেটা ভেবে দরদর করে ঘামতে লাগল প্রৌঢ়। দুপুরের তপ্ত রোদেও শিরশির করছে তার মেরুদণ্ড। থরথর করে কাঁপছে দু’হাত। বিড়বিড় করে বলল প্রৌঢ়, ‘তো শুরু হলো! অ্যাঙ্গাস, প্রার্থনা করো, আমাদেরকে যেন ক্ষমা করে দেন ঈশ্বর!’

‘আপনি বেশি কথা বলেন, আর্চিবল্ড,’ বলল যুবক, ‘ফিরে চলুন। এখনও বহু কাজ বাকি রয়ে গেছে।’

নীরবে নড়বড়ে গেটের দিকে হেঁটে চলল তারা।

দুই
‘বর্তমান সময়। ফ্রান্সের নরম্যাণ্ডি।

উপকূলীয় বনভূমি ঘেঁষে রানা এজেন্সির দোতলা দালান। বছর চারেক আগেও ব্যস্ত ছিল ওটার নিচতলার ঘরগুলো। অবশ্য এখন কিচেন ছাড়া সব দরজাই থাকে তালাবদ্ধ। করোনাকালীন সময় দেশে ফিরে গেছে এজেন্সির ছেলে- মেয়েরা। এদিকে বিসিআই চিফের অনুমতি ছিল না বলে ইউরোপে রয়ে যেতে হয়েছে মাসুদ রানাকে। মহামারির প্রকোপ হ্রাস পেলেও রাশা ও ইউক্রেনের যুদ্ধের জন্যে গোটা দুনিয়া জুড়ে এখন চলছে ভয়ঙ্কর মন্দা। বড়সব কোম্পানি চাকরি থেকে ছাঁটাই করছে হাজারে হাজারে কর্মকর্তা ও কর্মচারী। যথেষ্ট টাকা নেই এখন সাধারণ মানুষের হাতে। ফলে দিনের পর দিন ক্লায়েন্টের দেখা নেই রানা এজেন্সিতে নতুন করে চালু করা যায়নি বেশিরভাগ শাখা। আবারও অফিস খুলতে পারলে নরম্যান্ডির শাখার চিফ হিসেবে যোগ দেবে রানার বন্ধু, তুখোড় গোয়েন্দা জনি ওয়াকার। গত ক’মাস আগে দেশে ফিরতে শেষ অপারেটিভ রামিন রেজা।

মাঝে দু’মাস বাদ দিলে প্রায় বছর চারেক হলো নরম্যাণ্ডির শাখার ওপরতলার ছোট্ট এক ফ্ল্যাটে বাস করছে রানা। এখন মর্গে গাঢ় কালো কফি হাতে নিয়ে বসে আছে লিভিংরুমের সোফায়। বিসিআই-এর দুর্দান্ত এক ভয়ঙ্কর অ্যাসাইনমেন্টের কথা ভেবে ওর বুক চিরে বেরোল কাঁপা দীর্ঘশ্বাস। ভাবল: হেমন্তে যেভাবে গাছ থেকে খসে পড়ে শুকনো সব পাতা, তেমনি করে ও জীবন থেকেও চলে যাচ্ছে এক এক করে দিনগুলো, বদলে তারী হচ্ছে দুঃসহ অবহেলার স্মৃতির আবর্জনা। আনমনে মাথা নাড়ল রানা। নিজেকে মনে মনে জিজ্ঞেস করল: আর কখনও কি ফিরবে চমৎকার শ্বাসরুদ্ধকর সে-দিনগুলো?

ক্রিং ক্রিং শব্দে ল্যাণ্ডফোন বেজে উঠতেই কফির মগ বামহাতে নিয়ে ডানহাতে রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল বিমর্ষ রানা। ‘হ্যালো, মাসুদ রানা বলছি।’

‘রানা, তুই কি জেনেবুঝে এসব করছিস?’

প্রিয় বন্ধু সৈাহেলের কথা শুনে জবাব দিতে গিয়ে একটু থমকে গেল রানা। তারপর হালকা সুরে বলল, ‘কেন রে, ডাক্তারের চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পেয়ে খুব রেগে গেছেন বস?’

চুপ করে আছে বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স-এর চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর সোহেল আহমেদ। বন্ধুর চাপা দীর্ঘশ্বাস শুনে কৈফিয়তের সুরে রানা বলল, ‘আসলে বছরের পর বছর কোন কাজ নেই! এদিকে ফেরারও অনুমতি নেই…’ মিইয়ে গেল ওর কণ্ঠ।

‘ভাল করেই জানি, বাংলাদেশকে কতটা ভালবাসিস তুই,’ বলল সোহেল, ‘কিন্তু, সেজন্যে তোর তো উচিত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে নিজেকে তৈরি রাখা।’

বন্ধুর অনুযোগ শুনে দ্বিধাহীনভাবে বলল রানা, ‘আমি তো লড়াইয়ের জন্যে তৈরিই ছিলাম, রে! কিন্তু বস মানা করে দিলেন দেশে ফিরতে। তাই করোনাকালীন দুর্যোগের সময়ে চাইলেও মিলিটারি, বিজিবি, পুলিশ বা আনসারদের পাশে থাকতে পারিনি।’

‘তুই কিন্তু কথা বলছিস আবেগ থেকে,’ বলল সোহেল। ‘ভাল করেই জানিস, দেশের বিরুদ্ধে কোথাও কোন ষড়যন্ত্র হলে যে-কোন সময়ে তোর ডাক পড়ত। আর হঠাৎ করে বিপদ হবে না সেটা বলতে পারে না কেউ। তাই বস তোকে বলেছিলেন ইউরোপে রয়ে যেতে।’

চুপ করে থাকল রানা।

‘সাত মাস আগে ছিলি বিশ্বের পাঁচ দুর্ধর্ষ গুপ্তচরের একজন,’ বলল সোহেল। ‘অনেকে বলত তুই-ই সেরা। অথচ, এখন হয়ে গেছিস গভীর সাগরের শামুকের মত স্লো। একটা মেয়ে যতই সুন্দরী হোক; যতই তার এক শ’ রকমের গুণ থাকুক, তাকে না পেলে নিজেকে শেষ করে দিবি তুই?

কফির মগে চুমুক দিয়ে রানার মনের পর্দায় ভাসল মস্ত ঘরের পেছনে সেক্রেটারিয়াল টেবিল। চেয়ারে পিঠ টান করে বাঘের মত বসে আছেন মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খান। কুঁচকে গেছে তাঁর কাঁচা-পাকা ভুরু। হাভানা চুরুটের আঁকাবাঁকা নীলচে ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে ছাতের দিকে। কঠোর চোখে ওকে দেখছেন তিনি।

‘জেসিকা আর আমার ব্যাপারে সবই জেনে গেছেন বুড়ো, না রে, সোহেল?’ আনমনে ঢোক গিলল রানা।

‘তোর ডাক্তারি পরীক্ষার ফলাফল জেনে জেনিকা আর ওর নতুন প্রেমিক-কাম-স্বামীর ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন আমরাও বুঝেছি, মেয়েটার করা অপমানটা ছিল তোর জন্যে খুব আকস্মিক। তবে তুই তো আমাদেরকে আগেই সব বলতে পারতি। আমরা দেখতাম কী করা যায়। অন্তত তোর পাশে তো থাকতে পারতাম!’

তিক্ত হাসল রানা। ‘সারপ্রাইয দেব বলে কিছুই বলিনি। বিয়ের একসপ্তাহ আগে তোদের জন্যে পাঠিয়ে দিতাম বিমানের টিকেট। সেসব কিনেও ফেলেছিলাম।’

বিয়ের বিষয়ে পরে রানার কাছ থেকে সবই জেনে নিয়েছে সোহেল। রানাকে বিয়ে করতে নিজেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে জেসিকা থমসন। বিয়ের দেড়সপ্তাহ আগে স্কটল্যাণ্ডে তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল রানার। কিন্তু যেদিন রওনা হবে, সেই সকালে এল একটি ই-মেইল। তাতে জেসিকা লিখেছে: ‘আমি সত্যিই দুঃখিত, রানা। আমাদের অনুচিত হবে হুট করে বিয়ে করা। একটু দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছি, তোমার প্রতি যে অদ্ভুত আকর্ষণ আমার মনে ছিল, ওটা আসলে স্রেফ সাময়িক মোহ। এ-ও জেনেছি, কখনও তোমাকে অন্তর থেকে ভালবাসিনি। আর সেটা আরও বেশি করে বুঝেছি হ্যারি ও’রাইলির সঙ্গে পরিচয় হওয়ায়।

‘দু’মাস আগে আমাদের পুলিশ স্টেশনে যোগ দিয়েছে ও। ওর সঙ্গে সময় কাটিয়ে এটা বুঝেছি, স্বামী হিসেবে কাউকে গ্রহণ করতে হলে, আমার উচিত হবে ওকেই বিয়ে করা। তোমার আর আমার বিয়ে হলে আমরা কেউই সুখী হতাম না। তুমি যেমন পারতে না স্কটল্যাণ্ডের সমাজে মিশে যেতে, তেমনি তোমাদের দেশে গিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়াও আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। আমরা আসলে একেবারেই আলাদা দুই সমাজের মানুষ।

‘তাই এটাই কি ভাল হলো না, আজ থেকে আলাদা হচ্ছে আমাদের দু’জনের দুই পথ?

‘রানা, পারলে ক্ষমা করে দিয়ো আমাকে।

‘চিরকাল তোমাকে সত্যিকারের ভাল একজন বন্ধু বলেই জানব। আশা করি এই মেসেজ পাওয়ার পর কষ্ট করে আর স্কটল্যাণ্ডে আসবে না।

‘আজকেই দুপুরে গ্রামের চার্চে হ্যারি ও তাহার বিয়ে। আবারও অনুরোধ করছি: আমায় ক্ষমা কোরো। চিরকাল তোমার বান্ধবী জেসিকা হয়েই থাকতে চাই।

‘অ্যাটাচমেন্টে হ্যারি ও আমার ছবি দিলাম। তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে, দুনিয়ায় হ্যারি আর আমি এনেছি স্রেফ পরস্পরের জন্যে।

‘অনেক ভাল থেকো, রানা।’

জেসিকার চিঠিটা পড়ে প্রিয় বন্ধু রানার অপমানের মাত্রা বুঝে তিক্ত হয়ে গিয়েছিল সোহেলের অন্তর। রানা আর স্কটল্যাণ্ডে যায়নি। যোগাযোগও করেনি মেয়েটার সঙ্গে। নরম্যাণ্ডির রানা এজেন্সির অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেছে লণ্ডনে। কিন্তু সেখানেও ছিল না কোন কাজ। আর তখন থেকেই পদে পদে নিজেকে অবহেলা করেছে রানা। হাতে কাজ নেই বলে বেঁচে থাকার সামান্য আগ্রহটাও হারিয়ে ফেলেছে।

‘আমি তোকে খুব ভাল করে চিনি, রানা। জেসিকার জন্যে নয়, ভাল কোন অ্যাসাইনমেন্ট না পেয়ে হতাশ হয়ে গেছিস তুই। ডাক্তাররা তাঁদের রিপোর্টে জানিয়ে দিয়েছেন, গত ছয়মাস ব্যায়াম না করে, নানান অনিয়মের মাধ্যমে নিজেকে ক্ষয় করে দিয়েছিস।’

চুপ করে থাকল রানা।

‘আগেও দু’একবার আনফিট হয়েছিস, বলল সোহেল, ভেবে দেখ ইতালির কথা। মাফিয়া বেজন্মা কুকুরগুলো কিশোরী মেয়ে লুবনাকে ধর্ষণের পর খুন করলে, প্রতিশোধ নিতে নতুন করে গড়ে নিয়েছিলি নিজেকে। পরের কাহিনী গোটা দুনিয়া জানে। আগেও কঠোর পরিশ্রম করে প্রমাণ করে দিয়েছিস, তুই যোগ্যদের চেয়েও অনেক যোগ্য। অবশ্য ডাক্তারেরা এবার তোর শারীরিক ও মানসিক যে রিপোর্ট চিফের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাতে হতবাক হয়ে গেছেন তিনি।’

কফির মগে চুমুক দিল রানা। মুখে কোন রা নেই।

‘ডাক্তারেরা বলেছেন তোর দৈহিক ও মানসিক কণ্ডিশন খুব খারাপ। আর সেজন্যেই বাধ্য হয়ে তোকে পুরো একবছরের জন্যে ছুটি দিয়েছেন চিফ। আমাকে বলেছেন, রানাকে বলবে, আগামী বছর সেপ্টেম্বর মাসের ভেতরে কমপ্লিটলি রিকভার না করলে ‘ওকে অবশ্যই যেতে হবে অবসরে।’’

‘তুই আসলে আমাকে কী করতে বলিস, সোহেল? বেসুরো স্বরে বলল রানা। কাজ নেই বলে দিনের পর দিন অলস জীবন পার করেছি। তুই কি আমাকে শুধু বাঁচার জন্যে বাঁচতে বলিস?’

‘তুই বরং এক কাজ কর, প্যারিসে যা,’ বলল সোহেল। কথাটা শুনে তিক্ত হাসল রানা। ‘ওখানে গিয়ে কী হবে?’

‘সৈয়দ আলী জাকিরের কথা তোর মনে আছে? ওই যে, হালকা-পাতলা লোকটা? আমাদের এজেন্টরা ইউরোপে কোন বিপদে পড়লে দরকারি কাগজপত্র বা যন্ত্রপাতি ওর কাছে পৌঁছে দিয়ে উধাও হতো? আর পরে জাকিরের কাছ থেকে সব আমরা সংগ্রহ করে নিতাম?’

‘হ্যাঁ, চিনি। হাসিখুশি মানুষ। অন্তর থেকে আমাদের দেশটাকে ভালবাসে।’

‘ঠিকই বলেছিস। আর সেই সৈয়দ আলী জাকির এখন আছে মস্ত বিপদে।’

‘খুলে বল, কী ধরনের বিপদে পড়েছে সে।’

‘প্যারিসে তোর অ্যাপার্টমেন্টের কাছেই ওর দোকান।’

‘হ্যাঁ, মনে আছে।’

‘ওখানে গেলেই বুঝবি, গোটা এলাকা দখল করে নিয়েছে একদল রোমানিয়ান মস্তান। যেহেতু সে-এলাকায় ভিনদেশিরা সংখ্যায় বেশি, তাই তাদের কাছ থেকে নালিশ গেলেও রোমানিয়ানদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ খেয়ে মোটেও গা করছে না প্যারিসের পুলিশ। সৈয়দ জাকিরকে হুমকি দিয়েছে রোমানিয়ানেরা। দোকান চালু রাখতে হলে প্রতিমাসে তাদেরকে দিতে হবে দু’হাজার ইউরো। শুধু তা-ই নয়, দোকান ছেড়ে পালিয়ে গেলেও ধরে এনে ওর মাথা ফাটাবে তারা। তখন একলাখ ইউরো না পেলে ওর বউ আর মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে গুম করবে লাশ। এদিকে আপাতত ফ্রান্সে তুই ছাড়া বিসিআই এজেণ্ট বলতে কেউ নেই। এবার আমার কথা বুঝলি, রানা? এ-বিপদে জাকিরকে সাহায্য করতে পারবে না বিসিআই। যেটা তুই চাইলে হয়তো পারবি। আমরা জানি, তুই ডাক্তারী রিপোর্ট অনুযায়ী টোটালি আনফিট। কিন্তু একটু আগে বা বললেন, তুই যদি পারিস, তো সৈয়দ আলী, জাকিরের পাশে যেন দাঁড়াস।’

প্রথম পরিচয়ে ইলিশ পোলাও খাওয়াবে বলে রানাকে জোর করে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল নিরীহ বাঙালি দোকানি। জাকিরের পিচ্চি মেয়েটার মিষ্টি মুখটা ভেসে উঠল রানার চোখের তারায়। লাজুক মেয়ে সীমা শাহানা। দেখতে হয়েছে বাবার মত। ঝুপ করে বসে পা ছুঁয়ে সালাম করেছিল রানাকে। নিজেই লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল রানা। হেসে ফেলে বলেছিল, ‘আরে, আমি তো এত বুড়ো নই যে পা ধরে ‘সালাম করতে হবে!’ পিচ্চির হাতে দিয়েছিল বড় একবাক্স কিটক্যাট চকোলেট।

রাতের খাবারের পর চকোলেটের চারভাগের একভাগ আবার আদর করে ওকেই খাইয়ে দিয়েছিল সীমা। ওর সহজ কথা: ‘তুমি চকোলেটের ভাগ পাবে না, তা-ই কি হয়? আমরা তো এখন বাড়িতে চারজন। তাই সবাই সমান ভাগে ভাগ করে নেব।’

সোহেলের কথায় বাস্তবে ফিরে এল রানা।

শোন, জাকিরের কাছ থেকে জেনেছি, আজ শেষবারের মত বিকেলে রোমানিয়ানেরা ওর কাছ থেকে টাকা নিতে আসবে। যেহেতু ওর কাছে দেয়ার মত টাকা নেই, তাই এবার কী হবে সেটা তো বুঝতেই পারছিস। পিটিয়ে ওর হাড়গোড় ভাঙবে তারা। বাকি জীবনের জন্যে পঙ্গু হবে জাকির। আর এরপর ওর বউ-বাচ্চা…

‘সোহেল, তুই ভাবিস না, আজ দুপুরের আগেই পৌঁছে যাব প্যারিসে, শুকনো গলায় বলল রানা। বুকের ভেতরে উথলে উঠেছে অভিমান। ‘আমাকে তো চিরকালের জন্যে বিদায় করেই দিলেন বস। এখন থেকে তো আর আমাকে কোন দায়িত্ব দেয়া হবে না। আর একটা কাজ এবার হাতে পেলাম।’

‘দেখ, রানা, দোস্ত, ছুটিতে নিজেকে গুছিয়ে নে,’ মিনতির সুরে বলল সোহেল। ‘জানি, তুই পারবি। মনে রাখিস, তুই একা নস্। কোন বিপদ হলে বলবি। আমরা বেঁচে থাকলে ঠিকই হাজির হব।’

‘তা জানি, দোস্ত,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা।

‘জাকিরের বিপদ কেটে গেলে কোথায় যাবি ভাবছিস তুই?’

ক’বছর আগে আয়ারল্যাণ্ডে চাচার বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছি,’ বলল রানা।

‘মনে আছে,’ সায় দিল সোহেল, ‘সে-টাকা জমা দিয়েছিস বিসিআই-এর প্রভিডেন্ট ফাণ্ডে। যাতে অবসর নেয়ার পর বয়স্ক কর্মচারীদেরকে দেয়া যায় বড় অঙ্কের টাকা।’

‘কিছুদিন ধরে খুব মনে পড়ছে বাড়িটার কথা। কৈশোরে বাবা-মা-চাচা-ফুফুসহ ক’বার ওখানে থেকেছি। যদি সুযোগ হয়, আরেকবার ঘুরে আসব ওদিক থেকে।’

‘ঠিক আছে, বলল সোহেল, ‘তবে যেখানেই যাস্, নিজের যত্ন নিবি। বন্ধ করবি বেসামাল, অনিয়ম। আমরা তোর জন্যে খুব দুশ্চিন্তায় আছি রে, দোস্ত। চাই না আমাদের প্রিয় সুপার হিরো চিরকালের জন্যে বিস্মৃত হোক বিসিআই থেকে।’ চুপ হয়ে গেল সোহেল। ক’সেকেণ্ড পর বলল, ‘আরেকটা কথা, রানা, এবার কিন্তু খুব মন দিয়ে শুনবি। আমাদের বুড়ো আমাকে গম্ভীর চোখে দেখে নিয়ে আজ বলেছেন: ‘জীবনের সেরা সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেলে, মনে করি না যে আমার আর বিসিআই-এ রয়ে যাওয়ার কোন প্রয়োজন আছে। কাজেই কিছু দিনের ভেতরে আমি বোধহয় অবসর নেব।’’

সোহেলের কথা তীরের মত বিঁধেছে রানার বুকে। ওর বন্ধু জানল না, রিসিভারের দিকে চেয়ে বিসিআই-এর সেরা এজেন্টের দুই চোখ বেয়ে নেমেছে অশ্রু।

‘তুই ভাল করেই জানিস তোকে কতটা ভালবাসেন বস, বলল সোহেল। ‘মানুষটা হয়তো সত্যিই বুড়ো হয়ে গেছেন। তাঁকে এত কষ্ট দিসনে, রানা। ভাল থাকিস, দোস্ত।’

ফোনের লাইন কেটে যেতেই কফির মগ টেবিলে নামিয়ে রাখল রানা। একবার দেখল হাতঘড়ি।

সৈয়দ আলী জাকিরের পাশে থাকতে হলে দুপুরের আগেই ওকে পৌঁছে যেতে হবে প্যারিসে।

তিন
পুরনো সীসার মত কালো হয়ে গেছে প্যারিসের আকাশ। বিষণ্ণ বিকেলে থেমে থেমে ঝরছে টিপটিপ ইলশে-গুঁড়ি। নিজের ফ্ল্যাট থেকে কয়েক শ’ গজ দূরে পথের ধারে টয়োটা ফোররানার টিআরডি অফ-রোড প্রিমিয়াম গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে আছে রানা। আপাতত আর কেউ নেই রাজপথে। ফুটপাথে কী যেন খুঁটে খাচ্ছে শত শত সাদা-কালো কবুতর।

যে-কোন সময়ে জাকিরের সঙ্গে দেখা করতে দোকানে আসবে রোমানিয়ানেরা। এবং তারা হাজির হবে বলেই আগেভাগে দোকানির সঙ্গে ফোনে আলাপ করে নিয়েছে রানা। মনে মনে শপথ করেছে: ‘মস্তাননেতা অ্যালেকয্যাণ্ড্রুকে এক পয়সাও আপনার দিতে হবে না, জাকির।

পাঁচ মিনিট পর দূরের বাঁক ঘুরে এল ধূসর এক পুরনো মার্সিডিয বেনয্। কড়া ব্রেক কষে থামল জাকিরের গ্রোসারি দোকানের সামনে। বিশ গজ দূরে টয়োটা ফোররানার টিআরডি অফ-রোড প্রিমিয়ামের ড্রাইভিং সিট থেকে অপলক চোখে চেয়ে রইল রানা। ধুপ্ শব্দে খুলে গেছে মার্সিডিযের দরজা। গাড়ি থেকে নেমে সশব্দে দরজা বন্ধ করল দু’জন যুবক। ফুটপাথে উঠে কঠোর চোখে দেখে নিল চারপাশ।

রানা বুঝে গেল, এরা রোমানিয়ান দলের মস্তান। বয়স। পঁচিশ থেকে সাতাশ। একজনের মাথার চুল কালো। রোদে পোড়া কালচে চেহারা। পূর্বপুরুষ জিপসি। অন্যজনের শিরায় আছে স্লাভিক রক্ত। ঘোড়ার মত লম্বাটে মুখ। মাথার চুল সোনালি। দু’জাতির মানুষ না হলে যে-কেউ ভাবত, একই বাবার ঔরসে জন্ম নিয়েছে এরা। দৈর্ঘ্যে হবে সাড়ে ছয় ফুট। ভারী শরীর। চেহারা জানিয়ে দিচ্ছে, ছোটবেলা থেকে চুরি করতে করতে এখন তারা হয়ে গেছে ডাকাত। পরনে কালো চামড়ার জ্যাকেট ও নীল জিন্স। পায়ে বিশাল বুট। আরেকটু বড় হলে নূহ নবীর নৌকার সাইযের বলে ধরে নিত রানা।

গটমট শব্দে জাকিরের দোকানে গিয়ে ঢুকল তারা।

অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর চ্যালারা বেধড়কভাবে পেটাবে জাকিরকে ভাঙচুর করবে দোকান। জাকিরের হাত-পা ভেঙে রক্তারক্তি করে বিদায় নেবে। অন্যান্য দোকানের মালিক বা কর্মচারীরা ভুলেও প্রতিবাদ করতে আসবে না। কারণ সবার বুকে আতঙ্কের স্রোত তৈরি করেছে রোমানিয়ান মস্তানেরা।

পাশের সিট থেকে ব্যাগ নিয়ে ড্রাইভিং দরজা খুলে নেমে পড়ল রানা। বিড়বিড় করে বলল, ‘দেখা যাক!’

ফুটপাথে উঠে গম্ভীর মুখে জাকিরের দোকানে ঢুকে পড়ল রানা। প্যারিসের এদিকে ফিরে বিস্মিত হয়েছে ও। ক’মাস আগেও ঝকঝকে পরিষ্কার ছিল দোকানগুলোর কাঁচ। এখন সেখানে নোংরা সব উক্তি। কিছু দোকানের ভাঙা কাঁচের জায়গায় আছে পাতলা বোর্ড। শেষ হয়ে গেছে স্থানীয় দোকানিদের জমজমাট ব্যবসা। একটু দূরে পুরনো বইয়ের যে দোকান, ওটা আর নেই। পেস্ট্রির লাল রঙের দোকানটাও উঠে গেছে। ক’মাস আগে ওখানে গিজগিজ করত খদ্দের।

এটা প্যারিসের পশ এলাকা নয়, তবে আগে এখানে ছিল মানুষের প্রাণের ছোঁয়া। ভয়ঙ্কর কালো কোন ছায়া যেন এখন ঢেকে দিয়েছে চারপাশ। ফোনে জাকিরের কাছে জানতে চেয়েছিল রানা, ‘এদিকের এই অবস্থা কীভাবে হলো?’

কয়েক মাস আগে এল রোমানিয়ান মস্তানেরা,’ বলেছে জাকির। ‘তারা এলাকা দখল করে নেয়ায় পড়ে গেল ব্যবসা । আমরা হয়ে গেলাম খুব অসহায়।। আজকাল এদিকে আসে না কেউ। তাই কেনা কাটা সবই প্রায় বন্ধ। ফাঁকা পড়ে থাকে সামনের রাস্তা।

‘আপনারা পুলিশে জানালেও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি?’

‘না। পুলিশে নালিশ দিয়েছিল দুই ব্যবসায়ী। তাদের পা ভেঙে দিয়েছে মাস্তানেরা। একবার এদিকে আসেনি পুলিশ। রোমানিয়ানদের নেতা মনে করে সে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট।’

‘তা-ই?’

‘জী। চাাঁদা তুলছে সব দোকান থেকে। অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিলে বা বিক্রি করা হলে মালিকের কাছ থেকে আদায় করে বহু টাকা। রানাকে করুণ সুরে বলেছে জাকির, ‘আমার টাকা নেই যে প্রতিমাসে এত টাকা দেব। ওদিকে দোকান ছেড়ে দিলে আগেই দিতে হবে একলাখ ইউরো। নইলে পিটিয়ে আমার হাড়গোড় ভাঙবে। বলেছে: তাতেই সার শেষ নয়-আমার স্ত্রী ও মেয়েটাকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে মেরে ফেলবে।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফোনে বলেছে রানা, ‘আপনি একদম ভাববেন না। ওদের দলনেতাকে ফোনে জানিয়ে দিন, বিকেলে এসে তারা যেন টাকা নিয়ে যায়।’

‘কিন্তু টাকা না পেলে তো আমাকে খুন করবে!’

‘কিছুই করবে না,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলেছে রানা। ‘আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। ঠিক সময়ে দেখা হবে আপনার সঙ্গে।’ এরপর কল কেটে দিয়েছে রানা। অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নিচের গ্যারাজ থেকে গাড়ি নিয়ে চলে গেছে দূরের এক হার্ডওয়্যার স্টোরে। ওখান থেকে কিনে নিয়েছে দরকারি কিছু জিনিস। ব্যাগ হাতে আবারও উঠেছে গাড়িতে। সোজা ফিরে এসেছে জাকিরের দোকানের সামনে। তখন থেকে ধৈর্য ধরে বসে আছে রোমানিয়ানদের জন্যে। এরপর জাকিরের দোকানে দুই মস্তান ঢুকে পড়তেই কাজে নেমে পড়েছে রানা।

কাউন্টারে থেমে জাকিরের মুখোমুখি হয়েছে দুই দানব । দোকানে নেই কোন খদ্দের। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ছোটখাটো আকারের বাঙালি দোকানি। রানাকে ঢুকতে দেখে আরও ফিকে হয়ে গেল তার মুখের বাদামি ত্বক।

দোকানে দরজার সামনে ছাত থেকে ঝুলছে কয়েকটা ঝুনঝুনি। রানার কপালে লেগে টুংটাং শব্দ করল ওগুলো। চরকির মত ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ল দুই রোমানিয়ান। মরা মাছের মত ঘোলাটে চোখে তারা দেখল রানাকে। দৃষ্টি যেন নীরবে বলছে : ‘শালা তুই ভাগ! নইলে পিটিয়ে মেরে ফেলব!’

দুই মস্তান ভেবে নিয়েছে, ভিনদেশি যুবককে যথেষ্ট সতর্ক করে দিয়েছে তারা। এখন নিষ্পলক চোখে দেখছে, ঘুরে দরকার দিকে চলছে বাদামি রঙের যুবক। কিন্তু বেরিয়ে না গিয়ে দু’হাতে সে ঘুরিয়ে দিল দোকানের ঝুলন্ত সবুজ সাইনবোর্ড। এখন বাইরে ওটার লাল অংশ দেখাচ্ছে : স্টোর ক্লোয্‌ড্‌।

ভেতর থেকে দরজা লক করল বাঙালি যুবক। ঘুরে দুই মস্তানের দিকে চেয়ে আন্তরিক হাসল। কঠোর চোখে তাকে দেখছে রোমানিয়ানেরা। দু’হাত ভাঁজ করেছে বুকে। কুঁচকে গেছে দুই ভুরু। তাদেরকে কিছু না বলে ফ্রেঞ্চ ভাষায় বলল রানা; ‘এরা আর কখনও আপনাকে বিরক্ত করবে না, জাকির।

‘অ্যাই, শালা, কে তুই?’ ঘেউ করে উঠল স্লাভিক । নাম আমার মাসুদ রানা,’ সহজ সুরে বলল বিসিআই এজেণ্ট। ‘তোর নামটা কী?’

‘তোকে একটা সুযোগ দিচ্ছি, বাঁচতে চাইলে লেজ তুলে পালিয়ে যা,’ ধমকে উঠল স্লাভিক। ‘নইলে খুন হবি আমার হাতে!’

‘আমার কিন্তু মনে হয়, তুই নিজেই পড়ে গেছিস মস্ত বিপদে,’ সতর্ক করল রানা।

পরস্পরকে দেখে নিল দুই রোমানিয়ান। হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল কালচে যুবক। তার ভাব দেখে রানার মনে হলো, ভীষণ বিস্মিত হয়েছে সে। স্লাভিক যুবক এখন আগের মত আত্মবিশ্বাসী নয়। বন্ধুর চেয়ে চালাক সে। চাপা স্বরে বলল, ‘তা-ই? আমরা কিছু করলে তখন তুই কী করবি?’

‘আমার কাছে কিন্তু ভয়ঙ্কর অস্ত্র আছে,’ বলে কাঁধ থেকে নিয়ে মেঝেতে ব্যাগ রাখল রানা। ওটার ভেতর থেকে বের করল দুপুরে হার্ডওয়্যার স্টোর থেকে কেনা স্টেল্ গান। ওটার স্প্রিং-লোডেড মেকানিযমের সঙ্গে আছে স্টিলের ছোট এক বাক্স। বাড়ির নানান কাজে লাগে ভেতরের স্টেল্।

রানাকে কঠোর চোখে দেখছে দুই রোমানিয়ান। স্লাভিক যুবকের দিকে স্টেল্ গান তাক করে হ্যাণ্ডেলে চাপ দিল রানা। অস্পষ্ট ক্ল্যাক শব্দে ছোট একটা স্টিলের স্টেল্ ছিটকে গিয়ে লাগল মস্তানের জ্যাকেটের বুকে। টুপ করে মেঝেতে পড়ল পাতলা ধাতব পাত।

তাদেরকে চরম বেইজ্জত করা হয়েছে ধরে নিয়ে রানার দিকে এগোল দুই রোমানিয়ান। অবশ্য তারা হামলা করবে সেজন্যে বসে নেই রানা। দু’সেকেণ্ডে চলে গেছে তাদের আড়াই ফুটের মধ্যে। পরক্ষণে ফুটবলের ফ্রিকিকের মত টানা এক লাথি ঝেড়ে দিল ডানদিকের মস্তানের অণ্ডকোষে।

‘ওরেব্বাপ রে!’ হাহাকার করে দু’হাতে গোপনাঙ্গ চেপে ধরে ঝুঁকে গেল স্লাভিক লোকটা। ক্ষণিকের জন্যে থমকে গেছে তার সঙ্গী। এ-সুযোগে ভারসাম্য ফিরে পেয়ে কোমর ঘুরিয়ে তার বুকে জোরাল এক লাথি বসাল রানা। হুড়মুড় করে পিছিয়ে চিত হয়ে মেঝেতে পড়ল জিপসি যুবক। এদিকে কুঁজো হয়ে আপেলের মত লালচে মুখে হাঁসফাঁস করছে স্লাভিক। সে কিছু বোঝার আগেই একপাশে সরে কনুই দিয়ে তার কণ্ঠনালীতে খচ করে খোঁচা দিল বানা।

মেঝেতে সঙ্গীর পাশে হুড়মুড় করে পড়ল স্লাভিক। পরের সেকেণ্ডে নাচের ভঙ্গিতে এগোল রানা। দুই মস্তানের মাথার পাশে খটাস্-খটাস্ শব্দে লাগল বুটের শক্ত ডগার মাঝারি দুটো লাথি। নতুন করে কিছু বোঝার আগেই নীরবে জ্ঞান হারাল দুই রোমানিয়ান।

লড়াই শেষ হয়েছে মাত্র নয় সেকেণ্ডে!

‘হায়, খোদা!’ বিস্মিত চোখে দুই মস্তানকে দেখল জাকির। বিচলিত হয়ে কচলাচ্ছে দু’হাত। বিড়বিড় করে বলল, ‘এবার সত্যিই আমি শেষ!’

চুপচাপ নিজের ব্যাগ থেকে কাঁচি, বড় এক রোল টেপ ও মার্কার পেন নিল রানা। বেহুঁশ মস্তানদের দুই কবজি, গোড়ালি ও হাঁটুদুটো টেপ দিয়ে মুড়িয়ে দিল। টেপ ব্যবহার করে আটকে দিল তাদের মুখ। কাজ শেষ হতেই জাকিরের দিকে হাত বাড়াল রানা। ‘একটা কাগজ দেখি।’

ক্যাশবুক থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ওর হাতে দিল জাকির। কাঁচি দিয়ে কাগজটা দু’ভাগ করল রানা। এক অংশে মার্কার পেন দিয়ে লিখল: ‘সাবধান!’ অন্য অংশে লিখল মস্তানদের নেতা অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর নাম। এরপর রানা যা করল, তাতে নির্বোধ না হলে যে-কেউ বুঝবে ওর বক্তব্য খুবই সহজ।

স্টেপ গানের ক্লিপ অনায়াসে ভেদ করে প্লাস্টার বা কাঠ। ডানদিকের অচেতন যুবকের কপালে কাগজ সেঁটে ধরে অন্যহাতে স্টেপ গানের হাতলে চাপ দিল রানা। ক্ল্যাক শব্দে যুবকের কপালের হাড়ে গেঁথে গেল তীক্ষ্ণধার স্টেপ্‌ল্। পরে স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে উপড়ে নিতে হবে ওটা। বামদিকের মস্তানের কপালে জুটল তাদের দলনেতার নাম।

রানার কাণ্ড দেখে হাঁ হয়ে গেছে জাকির। মাথা নেড়ে বলল, ‘আপনি কিন্তু এই কাজ করতে পারেন না!’

‘কে বলল পারি না?’ হাসল রানা, ‘করে তো দেখালাম!’

এবার ওরা আমার স্ত্রী, মেয়ে আর আমাকে খুন করবে।’

‘কিছুই করবে না,’ বলল রানা, ‘এরা সত্যিকারের কাপুরুষ। আজকের পর আর কখনও আপনাকে বিরক্ত করবে না।

কয়েক মিনিটের জন্যে বাইরে যাচ্ছে, জাকিরকে জানাল রানা। ও চলে গেলে যেন সামনের দরজা বন্ধ করে দেয় সে। বদলে খুলে রাখবে পেছনের দরজা।

দরজা খুলে দৃঢ়পায়ে পথে বেরিয়ে গেল রানা। পাঁচ মিনিট পর দোকানের পেছনের গলিতে এসে থামল ওর গাড়ি। ভ্যান ওখানে রেখে দোকানে মালামাল সরবরাহ করে পাইকারী বিক্রেতারা। গাড়ি থেকে নেমে রানা দেখল, দরজার কাছে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাকির। তাকে কিছুই না বলে দোকানে ঢুকল রানা। একে একে ছেঁচড়ে অচেতন দুই মস্তানকে নিল গলির ভেতরে। গাড়ির পেছনের ডালা খুলে একে একে ময়দার ভারী বস্তার মত দুই যুবককে ভরল ট্রাঙ্কে। ধুপ করে বন্ধ করল ডালা।

‘ঠিক আছে, এবার অ্যালেকয্যার ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দিন।’ জাকিরকে বলল রানা।

দশ মিনিট পর সরু এক গলিতে ঢুকল ফোররানার টিআরডি অফ-রোড প্রিমিয়াম গাড়ি। দু’পাশে আবর্জনায় ভরা কিছু . গার্বেজ ক্যান। বিশ্রী দুর্গন্ধ চারপাশে। দু’দিকের দেয়ালে নোংরা গালি ও কুৎসিত বাক্য লেখা। গলির শেষে চৌকো আঙিনার বামে দোতলা বাড়ির কথা বলেছে জাকির। ওখানে বাস করে অ্যালেকয্যাণ্ড্রু ও তার স্যাঙাতেরা। আঙিনার অন্যান্য বাড়ি বহু বছরের পুরনো। আগে অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর আস্তানা ব্যবহার করা হতো পতিতালয় হিসেবে। এখনও আছে রঙিন সাইনবোর্ড। পুরু বোর্ডে গজাল মেরে বন্ধ করা হয়েছে নিচতলার জানালা। দোতলার ধুলোভরা জানালায় ঝুলছে খয়েরি পর্দা। বাতি জ্বলছে না কোন ঘরে। কোথাও কারও কোন নড়াচড়া নেই। অবশ্য কেউ না কেউ আছে। বাড়ির উঠনে রুপালি নতুন মার্সিডিয। ওটার পেছনে কালো ল্যাণ্ড ক্রুযার। ইঁদুরের মত ইতর হলেও নতুন গাড়ি ব্যবহার করে অ্যালেকয্যাণ্ড্রু, যাতে তাড়া খেলে দেরি না করে ভেগে যেতে পারে।

অফ-রোড প্রিমিয়াম আঙিনায় রেখে ব্যাগ হাতে নামল রানা। আপাতত গলিতে মানুষ বলতে আছে এক আফ্রিকান তরুণ। দরকারি কিছু পায় কি না সেটা দেখছে গার্বেজ ক্যান ঘেঁটে। বোধহয় সে ড্রাগ অ্যাডিক্ট। অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর বাড়ির উল্টোদিকে পুরনো এক ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে এল ব্যাণ্ডের বেসুরো বিকট গান। যে-কারও মাথা ধরিয়ে দেবে বিশ্রী আওয়াজ। দূরে কোথাও ঘেউ-ঘেউ করছে মেজাজী এক কুকুর। গলা ছেড়ে কেঁদে উঠল পিচ্চি এক মেয়ে। সঙ্গে সঙ্গে চিলচিৎকার জুড়ল এক দম্পতি। এবার নাকি মেয়ের ডায়াপার বদলে দেবে অন্যজন। কয়েক ফুট দূর থেকে আরও কিছু আওয়াজ শুনতে পেল রানা। ওর গাড়ির পেছনে জ্ঞান ফিরতেই গোঙাতে শুরু করেছে দুই মস্তান। মুক্তি চাই তাদের। এরা দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, সেটা আশা করছে রানা।

গাড়ির দরজা লক করে একটু দূরে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সিঁড়িঘরে গিয়ে ঢুকল ও। দরজার আড়ালে থেমে মোবাইল ফোনে কল দিল অ্যালেকয্যাণ্ড্রুকে। তিনবার রিং বাজার পর ধরা হলো ফোন। ঘড়ঘড়ে ভারী কণ্ঠ বলল, ‘কী, কী চাই?’

‘তুমি আমায় চেনো না, তবে তোমাকে আমি চিনি,’ বলল রানা। ‘জানালা দিয়ে নিচে তাকাও। বাইরে তোমার জন্যে দুটো উপহার এনে রেখেছি।

অ্যালেকয্যাণ্ড্রু কিছু বলার আগেই ফোন রেখে দিল রানা। উঁকি দিয়ে দেখল সরে গেছে উল্টোদিকের বাড়ির জানালার খয়েরি এক পর্দী। ধুলোভরা কাঁচের ওদিক থেকে নিচে তাকাল কেউ। এবার বোধহয় ক’জন স্যাঙাত নিয়ে নেমে আসবে লোকটা। তাতে চট করে গরম হয়ে উঠবে পরিবেশ।

রানা ওদেরকে বুঝিয়ে দেবে, তকাল যা করেছে, ভবিষ্যতে যেন তা আর না করে তারা। এরপর কাজ শেষ করে চটজলদি বিদায় নেবে, কারণ অ্যালেকয্যাণ্ড্রুকে বাঁচাতে এসব বাড়ির ড্রাগখোর কেউ না কেউ ফোন দেবে পুলিশে।

অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর বাড়ির দিকে চেয়ে রইল রানা। তারই ফাঁকে ফোন দিল সোহেলকে। প্রথমবার রিং হতেই ওদিক থেকে ফোন ধরল ওর বন্ধু। ‘কিছু বলবি, রানা?’

‘কাজে নেমেছি,’ বলল রানা। ‘বসকে বলিস, আর কোন বিপদ হবে না জাকিরের।

‘ঠিক আছে। তুই সাবধানে থাকিস।’

বস কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে গিয়েও কল কেটে দিল রানা। উল্টোদিকের বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে দু’জন লোক। রানার গাড়ির কাছে গিয়ে থামল তারা। তাদের একজন নির্দ্বিধায় অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। যদিও তার নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারেনি জাকির।

লোকটার বামভুরু থেকে থুতনি পর্যন্ত কুৎসিত এক শুকনো গভীর ক্ষতচিহ্ন। বিশ্রীভাবে বাঁকা হয়েছে ঠোঁটের বামদিক। মাথাভরা ঝাঁকড়া চুল নেমেছে চওড়া কাঁধে। দৈর্ঘ্যে সে ছয়ফুট সাত ইঞ্চি। পাশের সাতফুটি দানব বোধহয় তার ডানহাত। শক্তমুঠোয় স্টেইনলেস স্টিলের নাইন এমএম চৌরাস পিস্তলের বাঁট ধরেছে অ্যালেকয্যাণ্ড্রু!

বাড়ির সিঁড়িঘর থেকে তাদের ওপরে চোখ রাখল রানা। অফ-রোড প্রিমিয়ামে কেউ নেই দেখে চারপাশে তাকাল তারা! আবারও তাদের চোখ ফিরে এল রানার গাড়ির ওপর। বোধহয় শুনতে পেয়েছে পেছনের দিকে গোঙানির আওয়াজ।

সঙ্গীকে গাড়ির পেছন ডালা খুলতে বলে এক পা পিছিয়ে গেল অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। পিতল দিয়ে কাভার করেছে স্যাঙাৎকে। ধুপ শব্দে অফ-রোড প্রিমিয়ামের পেছন ডালা খুলল দানব। একই সময়ে ভেতা। চোখ বোলাল তারা। বন্দিদের স্টেল্ করা কপালে হুঁশিয়ারী বার্তা দেখে সরু হলো তাদের চোখ।

এদিকে নিঃশব্দে সিঁড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে রানা। ব্যাগ থেকে নিয়েছে রাবারের হ্যাণ্ডেলওয়ালা ক্ল হ্যামার। মাত্র তিন সেকেণ্ডে পৌঁছে গেল দুই যুবকের পেছনে। নিজের নাম জাহির করতে গেল না রানা। যুদ্ধে জেতার প্রথম শর্ত হচ্ছে: যার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, তাকে আক্রমণ করো।

সাঁই করে অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর মাথার পাশে হাতুড়ি চালাল রানা। ভাল করেই জানে, আঘাতটা হতে হবে মাপা হাতে, নইলে ভচ্ করে হাড় ভেঙে গেলে বেরিয়ে আসবে ধূসর মগজ।

কাউকে খুন করতে এখানে আসেনি রানা। মাথায় মারাত্মক বাড়ি খেয়ে গোড়া-কাটা কলাগাছের মত ধড়াস করে সিমেন্টের চাতালে পড়ল অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। বিস্ময় নিয়ে রানার দিকে আধপাক ঘুরল তার স্যাঙাত। ফলে হাতুড়ির ঘা লাগল দানবের চোয়ালের উঁচু হাড়ে। টু শব্দ না করে ওস্তাদের পাশে ভূমিশয্যা নিল দানব। জ্ঞান নেই কারও।

‘দুঃখজনক, তোমাদের সঙ্গে দরকারি অস্ত্র নেই,’ বিড়বিড় করল রানা।

চারপাশের বাড়ির জানালায় দেখা দিয়েছে কনো কিছু মুখ। তাদেরকে পাত্তা দিল না রানা। অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর পিস্তলটা পেলে হয়তো নিজের ওপরে আইনি গজব ডেকে আনবে কোন ছোকরা। তাই টোরাসটা সংগ্রহ করল ও। কোমরের বেল্টে অস্ত্রটা গুঁজে নেমে পড়ল কাজে। গাড়ির ভেতরের দুই মস্তানের মাথায় হাতুড়ির ছোট দুটো টোকা দিল। তাতে আবার জ্ঞান হারাল তারা। একে একে তাদেরকে গাড়ি থেকে বের করে পেভমেন্টে শুইয়ে দিল রানা। অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর জ্যাকেটের কলার চেপে ধরে তুলে বসাল তাকে। টেনে নিয়ে গিয়ে রাখল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের দেয়ালের ধারে। লোকটার কদর্য গালে কষে ক’টা চড় দিতেই পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল সে। ঘোলা চোখে এদিক-ওদিক চেয়ে কী যেন বলতে গেল। কিন্তু তখনই রানার বুটের ডগা খোঁচা দিল তার অণ্ডকোষে।

‘সত্যিই তোমার কপাল অনেক ভাল,’ বলল রানা। ‘যারা মহিলা বা বাচ্চাদের ক্ষতি করে, এমনিতে আমি তাদের বিচি কেটে নিই। তবে আজ কেন যেন হাতে রক্ত লাগাতে ইচ্ছে করছে না। ব্যথায় গোঁ-গোঁ করছে অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। তার গালে কষে দুটো চড় মেরে বলল রানা, ‘ঠিক আছে, এবার মন দিয়ে শোনো। দ্বিতীয়বার সতর্ক করব না। তুমি তোমার দলবল নিয়ে এই এলাকা থেকে সরে যাবে। সুস্থ হওয়ার পর যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছ, সবই ফেরত দেবে। বাড়তি কিছু টাকাও দেবে তাদের হাতে। এক এক করে সবার কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেবে। আর কখনও এদিকে যেন দেখতে না পাই। নইলে আবারও খুঁজে নেব তোমাকে। আর তখন কচাৎ করে কেটে নেব তোমার দুই আণ্ডা। আমার কথা ভালভাবে বোঝা গেছে? তুমি এখনও বেঁচে আছ, কারণ তোমাকে খুব খারাপ মানুষ বলে মনে হয়নি আমার। এতক্ষণ কী বলেছি, এবার সেগুলো গড়গড় করে বলো।’

ব্যথায় গাল কুঁচকে বিড়বিড় করে রানার বক্তব্য নিজেও আউড়ে গেল অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। একটা কথাও বাদ পড়ল না।

‘বাহ্!’ বলল রানা, ‘তুমি তো দেখি দারুণ মুখস্থ করো! ঠিক আছে, এবার তা হলে ঘুমিয়ে পড়বে। আবার যখন জেগে উঠবে, শুরু হবে তোমার জন্যে একদম নতুন এক জীবন!’ হাতুড়ির চ্যাপটা দিক দিয়ে যুবকের মাথায় ছোট একটা ঘা দিল রানা। অক্ষিকোটরের ভেতরে উল্টে গেল অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর চোখের দুই মণি।

ব্যাগ থেকে কাঁচি নিয়ে লোকটার ঝাঁকড়া চুল কচকচ করে কাটল রানা। খুলির কাছে রইল দাড়ির মত খোঁচা-খোঁচা কিছু চুল। একটু পর তার তিন অচেতন স্যাঙাতের মাথার চুলের একই হাল হলো কাঁচির প্রবল আক্রমণে। জ্ঞান ফিরলে আয়না দেখে এরা বুঝবে, চরম বেইজ্জত করা হয়েছে তাদেরকে!

অ্যাপার্টমেন্ট ভবন থেকে প্রশংসা করছে কেউ কেউ অন্যদের চোখে চরম হতাশা। বাদামি যুবক এসে সর্বনাশ করে দিয়েছে স্থানীয় ড্রাগ ডিলারের। তাদেরই কেউ ফোন করেছে পুলিশে। দূর থেকে এল সাইরেনের বিলাপের আওয়াজ।

দেয়ালে ঠেস দিয়ে চার অচেতন মস্তানকে বসাল রানা। বুটের হিলের আঘাতে এক এক করে ভাঙল তাদের কবজি ও গোড়ালির হাড়। বহুকাল হাসপাতালে থাকতে হবে তাদেরকে’। ব্যাগ থেকে নিয়ে কৌটার তরল হলদে রঙ ঢেলে দিল মস্তানদের মুখ, বুক ও পেটে। এই রঙটাকে কাপুরুষতার প্রতীক বলে মনে করে মানুষ। সুতরাং আপাতত কোথাও মুখ দেখাবে না এরা।

জ্ঞানহারা চার মস্তানকে শেষবার দেখে নিয়ে অফ-রোড গাড়িতে উঠল রানা। গলি থেকে বেরিয়ে কয়েক মিনিটে চলে গেল নিজের ফ্ল্যাটবাড়ির কাছে। যেহেতু আপাতত কোন বিপদ হবে না জাকিরের, সেজন্যে স্থির করেছে এবার চলে যাবে আয়ারল্যাণ্ডে।

চার
বর্তমান সময়। আগস্ট মাস।

আকাশ থেকে সোনালি আগুন যেন ঢেলে চলেছে খেপে ওঠা সূয্যিমামা। জায়গাটা টুলসা শহরের পঁচিশ মাইল দূরে উলোগাহ্ লেকের তীরে। সরু আঁকাবাঁকা পথে থেমে গেল রুপালি এক রোল্স রয়েস। ওটার একমাত্র যাত্রী জ্যাকুলিন সিলভেস্টার বড় করে শ্বাস ফেলল। ‘যাক, পৌঁছে গেছি!’

গাড়ি থেকে নেমে পেছন দরজা খুলে দিল দক্ষ শোফার। ‘ধন্যবাদ, বব,’ বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল জ্যাকি। সিট থেকে নিয়ে কাঁধে তুলল ছোট্ট ব্যাকপ্যাক।

‘উইকেও সুন্দর কাটুক, মিস সিলভেস্টার,’ জবাবে হেসে বলল শোফার বব। ‘আমার ফোন নম্বর মনে আছে তো? ফিরতে চাইলে জানাবেন। চট্ করে এসে নিয়ে যাব।’ গাড়ির পেছনের দরজা আটকে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে উঠল সে। রোদ্ রয়েস গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরতি পথে চলে গেল।

সামনে অপূর্ব সুন্দর কটেজটা দেখে খুশি হয়ে উঠল, জ্যাকি। আনমনে ভাবল: লিণ্ডা কনারের মত ধনীরা আসলেই থাকেন সমাজের অনেক ওপরের স্তরে। আর ওর কী কপাল, দাতব্য-কর্মী হয়েও বিলাসবহুল এই কটেজ সামনের দু’দিনের জন্যে ওকে ছেড়ে দিয়েছেন ভদ্রমহিলা।

ভয়ঙ্কর ঝড় তৈরি করার জন্যে বদনাম আছে ওকলাহোমার উত্তরদিকের। আর সে সময়ে প্রলয়ঙ্করী হয়ে ওঠে উলোগাহ লেক। সেজন্যে চেরোকি ইণ্ডিয়ান ভাষায় ওটাকে বলে আঁধার মেঘ। অবশ্য আজ পরিবেশ সত্যিই চমৎকার। আয়নার মত পড়ে আছে নিখর বিশাল লেক। ছোট্ট জেটিতে বোটহাউসের জানালায় ঠিকরে সোনালি রোদ গিয়ে পড়েছে কালো অতল জলে। মনোরম কটেজের সামনে চওড়া বারান্দায় দামি রকিং-চেয়ার। বারান্দার ছাত থেকে নেমেছে পুরনো আমলের সুন্দর একটি লণ্ঠন। ড্রাইভার বব বিদায় নেয়ায় একমাইলের ভেতরে এখন আর কেউ নেই। নিজেকে কেমন যেন একা লাগল জ্যাকির।

আজ শুক্রবার। গোটা সপ্তাহ ওর কেটেছে খুব ব্যস্ততায়। তাই আগামী দু’দিন বিশ্রাম পাবে ভেবে খুশি হয়ে উঠল জ্যাকি। বারান্দায় পা রেখে দরজার পাশে কিপ্যাড প্যানেলে অ্যালার্ম কোড এন্ট্রি করে ঢুকে পড়ল কটেজের ভেতরে। .

কটেজটা ছোট হলেও তোমার হয়তো খুব অসুবিধে হবে না, মৃদু হেসে বলেছেন লিঙা। অথচ তাঁর বিলাসবহুল কটেজ আসলে টুলসা ক্রসবি হাইট্স-এ ভাড়া করা জ্যাকির বাড়ির ছয়গুণ বড়। কটেজের ভেতরে দামি আসবাবপত্র। ওক আর ওয়ালনাট কাঠের মেঝে ও দেয়াল ভার্নিশ করা। যিনি তৈরি করেছেন কটেজের ডিযাইন, সেই আর্কিটেক্ট বোধহয় এ- কাজের জন্যে পারিশ্রমিক নিয়েছেন অন্তত একলাখ ডলার।

নিচতলার মাঝে বৃত্তাকার বড় এক অংশের ছাত তিনতলা সমান উঁচু। দোতলার কাঠের গ্যালারি থেকে নিচে দেখা যাবে গোটা লিভিং স্পেস। কটেজের প্রতিটি জিনিস ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক। নিচে দুটো বেডরুম, ওপরেও তা-ই। পাঁচ মিনিটে নিচের বেডরুম দেখে নিয়ে ব্যাকপ্যাক হাতে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল জ্যাকি। ভোরে খোলা জানালা দিয়ে সূর্যোদয় দেখবে বলে বেছে নিল পুবের বেডরুম। বিছানায় ব্যাকপ্যাক রেখে হাইহিল খুলে পরল রানিং শু। নেমে এল নিচতলায়। ওর মনে আছে মিসেস কনারের বলা কথা: জঙ্গলে যেসব ট্র্যাক গেছে, চাইলে ওদিক থেকেও ঘুরে আসতে পারো।

প্রতিবছর বড়লোকদের কাছ থেকে এতিম শিশুদের জন্যে টাকা সংগ্রহ করে রোয বাড ট্রাস্ট। ওটার চিরস্থায়ী সভাপতি লিণ্ডা কনার। আর তাঁরই ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করে জ্যাকি। এ-বছরও নভেম্বর মাসে ওদের সংগঠন থেকে আয়োজন করা হবে রুন্ট ৬৬ ম্যারাথন। এবার সেই দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার জন্যে কয়েক মাস ধরে নিজেকে গড়ে তুলছে জ্যাকি।

কটেজের সামনের দরজা লক করে লেকতীরের বনভূমির ট্র্যাকে জগিং করতে লাগল ও। গাছের ঘন পাতার ফোকর গলে মাটিতে নেমে এসেছে নানান আকারের রোদ। আনমনে ভাবছে জ্যাকি, গত দু’বছরে লিঙার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সুন্দর এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ওর। আর সেজন্যেই বুঝতে পেরেছে, পারিবারিক জীবনে মোটেই সুখীন মানুষটি।

অবশ্য বড়লোকদের ব্যাপার, আদতেই আলাদা। টুলসা শহরের উত্তরদিকে বিশাল এক ম্যানশনে বাস করেন লিণ্ডা ও তাঁর স্বামী। প্রায়ই দেখা যায় ব্যবসার কাজে দিনের পর দিন বাড়ি ফেরেন না অ্যারন কনার। তাঁর বদলে হৃদয়বান কোন পুরুষকে জীবনে পেলে বোধহয় হাজারগুণ সুখী হতেন লিণ্ডা।

আচ্ছা, আমি নিজেই কি সুখী? নিজেকে জিজ্ঞেস করল জ্যাকি। ওর মনে পড়ল কলেজের সুন্দর দিনগুলোর কথা। প্রথমবর্ষে একইসঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত জনি স্মিথ। পাশের সিটে বসত। কিছুদিনের ভেতরে ওরা হয়ে গেল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেই সখ্য একসময় হয়ে গেল পরস্পরের প্রতি গভীর ভালবাসা। নিয়মিত সাক্ষাৎ না হলে দম আটকে আসত ওদের।

এভাবে পেরোল দুটো বছর।

ওরা স্থির করেছিল কলেজের লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পেলেই দেরি না করে বিয়ে করবে।

কিন্তু চতুর্থ বছরে হঠাৎ করে বদলে গেল সব সমীকরণ।

সামনে বরফে ছাওয়া ক্রিসমাস। বাবা-মার সঙ্গে খালার বাড়িতে লস এঞ্জেলেসে যাবে জনি। বিমানবন্দরে এগিয়ে দিতে গেলে হেসে জ্যাকিকে বলেছিল, ‘এয়ারপোর্টে নেমেই কল দেব।’

কিন্তু আর কখনও ফোন করল না জনি।

লস এঞ্জেলেস বিমানবন্দরের ষাট কিলোমিটার দূরের বরফে ভরা এক মাঠে ক্র্যাশ করল ওদের বিমান।

রাতে ইন্টারনেট নিউয পোর্টালে খবরটা জেনে চমকে গেল জ্যাকি। ভাবল: ঈশ্বর নিশ্চয়ই এত নিষ্ঠুর নন যে এভাবে ওর কাছ থেকে কেড়ে নেবেন জনিকে।

সারারাত আর ঘুমাতে পারল না জ্যাকি।

পরদিন পত্রিকা মারফত জানল, সেই বিমান দুর্ঘটনায় বাঁচতে পারেনি কেউ। জ্যাকির মনে হয়েছিল, মাথার ওপরে ভেঙে পড়েছে গোটা আকাশ। পায়ের তলা থেকে সরে গেছে জমিন। সাঁই-সাঁই করে নেমে যাচ্ছে ও কোথায় যেন!

সকালে ওর শুকনো মুখ দেখে বাবা বলল, ‘কী হয়েছে রে, মা?’

ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল জ্যাকি।

ওকে বুকে টেনে নিয়ে কিছুক্ষণ পর বাবা বলল, ‘পৃথিবীটা খুব কষ্টের জায়গা, না রে, মা?’

একটা কথাও বলতে পারেনি জ্যাকি। মনে পড়েছিল বাবার প্রতি মায়ের চরম অবহেলা ও অনৈতিক আচরণ। বাবাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরেছিল জ্যাকি।

নিজের ঘরে ফিরে কাঁদতে কাঁদতে বুঝেছিল, দুনিয়ায় বাবা ছাড়া আসলেই ওর আর কেউ নেই!

কলেজে ক’জন যুবক চাইল ঘনিষ্ঠ হতে। তবে তাদের দিকে ফিরেও দেখেনি জ্যাকি। আজও ওর মন জুড়ে আছে জনির কুচকুচে কালো মণিদুটো, যেখানে ফুটত গভীর মায়া, একরাশ কৌতুক ও গভীর প্রণয়ের অনুরাগ। জনি কখনও হয়ে উঠত খুব গম্ভীর, যেন দুনিয়াটাকে দেখছে বহু দূর থেকে। ওর মত রহস্যময় ও বিবেচক আর কাউকে কখনও দেখেনি জ্যাকি।

বহুক্ষণ হলো লেকতীরে জগিং করছে জ্যাকি। সূর্যাস্তের একটু আগে আবার ফিরল কটেজে। শাওয়ার নিয়ে নতুন পোশাক পরে বেডরুমে বসে ভাবল, রাতে ডিনারে নেবে সামান্য খাবার। লিণ্ডা অবশ্য বলেছেন, ফ্রিয়ে যা আছে, নিতে যেন দ্বিধা না করে। সাইড কেবিনেটে আছে নানান ড্রিঙ্কের বোতল। যা খুশি নিতে পারে।

ফ্রি থেকে গ্রিড্ টিউনা, ভেজিটেবল সালাদ ও চাইনিয নুডল্স্ নিয়ে মাইক্রো আভেনে গরম করল জ্যাকি। দশ মিনিটে সেরে নিল রাতের খাবার। পরের দু’ঘণ্টা পার করল রোমাঞ্চকর এক থ্রিলার বই পড়ে। ওটা শেষ হওয়ায় নেমে এল নিচতলায়। লিণ্ডা বলেছেন কীভাবে চালু করতে হবে বাড়ির অ্যালার্ম সিস্টেম। নিয়মমত দরজা লক করে ওপরের বেডরুমে ফিরে শুয়ে পড়ল জ্যাকি। জানালা দিয়ে দেখল বনভূমি ভাসিয়ে নিচ্ছে দুধসাদা ধবধবে জ্যোৎস্না। লেকের তীরে মৃদু ছলাৎ-ছলাৎ শব্দে ভাঙছে ছোট ঢেউ। কিছুক্ষণ জ্যোৎস্না দেখে আর ঢেউয়ের শব্দ শুনে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল জ্যাকি।

মধুর স্বপ্নে বিভোর হয়ে কত সময় পার করে দিয়েছে জানে না, হঠাৎ করে ওর ঘুম ভাঙল গলার আওয়াজে। বাইরে রোদের বদলে ঘুটঘুটে আঁধার। চট করে বেডসাইড টেবিলে রাখা ঘড়ি দেখে নিল জ্যাকি। এখন বাজে রাত একটা চুয়ান্ন মিনিট। বাড়িতে ডাকাত পড়েছে ভেবে হঠাৎ করে সতর্ক হয়ে উঠল ও। বিছানায় উঠে বসে টের পেল, ধকধক করছে ওর বুকের ভেতরটা। ভুল শুনেছে কি না সেটা বোঝার জন্যে কান পাতল।

না, ওই তো নিচতলায় পুরুষমানুষের গলার আওয়াজ!

ভয় পেলেও নিজেকে সামলে নিল জ্যাকি। বিছানা ছেড়ে নেমে ব্যাকপ্যাক হাতড়ে বের করল সিগ সাওয়ার পি৩২০ মডেলের পিস্তলটা। ওর বাবা ছিল ব্যাঙ্কের সিকিউরিটি গার্ড। মারা যাওয়ার আগে মাত্র দুটো জিনিস মেয়েকে দিয়ে যেতে পেরেছে। তার ভেতর একটা হচ্ছে এই নাইন এমএম পিস্তল। মানুষটা চাইত স্বাবলম্বী হবে তার মেয়ে। তাই কিশোরী বয়সে ওকে ট্রেনিং দিয়েছে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে পিস্তল। বাবার কথাগুলো গেঁথে গিয়েছিল ওর মনে, তাই আমেরিকার বুনো সমাজে কখনও লোডেড পিস্তল ছাড়া বাইরে বেরোয় না।

সিগ সাওয়ার হাতে নিঃশব্দে বেডরুম ত্যাগ করে চলে এল গ্যালারিতে। আঁধারে কাঠের রেইলিং ঘেঁষে নিচে তাকাল। ঢিবঢিব করছে ওর বুক। মনে হচ্ছে, হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ ওকে ধরিয়ে দেবে ডাকাতদের কাছে!

নিচতলায় বৃত্তাকার লিভিং স্পেসে জ্বলছে উজ্জ্বল বাতি। ছায়া থেকে নিচের সবকিছু দেখছে জ্যাকি। নিচে আছে চারজন লোক। তাদের একজনের পিঠ জ্যাকির দিকে। লম্বা লোক সে। চওড়া কাঁধ। মাথার চুল রুপালি। পরনে স্পোর্টস্ জ্যাকেট ও জিন্স। পায়ে উডল্যাণ্ড শু। দ্বিতীয় ও তৃতীয়জন আছে জানালার কাছে। তাদের বয়স হবে সাতাশ। চিতার মত সুঠাম শরীর। চেহারা খুব গম্ভীর। একজনের কালো চুল আর্মি ছাঁট দেয়া। অন্যজনের পনিটেইল করা চুল সোনালি। দু’জনের পরনে টি-শার্ট ও জিন্সের প্যান্ট।

চতুর্থজন বেঁটে ও মোটা। কালো চুল কোঁকড়া। গালে চাপ দাড়ি। গদিওয়ালা দামি এক আর্মচেয়ারে বসেছে সে।

নিচে কী হচ্ছে জানা নেই জ্যাকির। তবে এরা কীভাবে ডিঅ্যাকটিভেট করল অ্যালার্ম সিস্টেম, সেটা ভেবে পেল না ও। অবশ্য এরা ডাকাত হলে এত নিশ্চিন্তে থাকতে পারত না।

রুপালি চুলের লোকটার হাতে ক্রিস্টালের স্বচ্ছ গ্লাস। ওটার ভেতরে সাইড কেবিনেট থেকে নেয়া সোনালি তরল। হঠাৎ করে সে ঘুরে যেতেই স্বস্তি বোধ করল জ্যাকি। পিস্তলের বাঁটে আলগা হলো ওর আঙুল। ভদ্রলোক লিপ্তার স্বামী। ভিড়ের ভেতরেও তাঁকে চিনবে ও। বোধহয় অন্যদের সঙ্গে ব্যবসার আলাপ করতে এখানে এসেছেন।

হঠাৎ লজ্জায় লালচে হলো জ্যাকির দু’গাল। ভদ্রলোক যদি এখন জানেন, ও এসে উঠেছে এ-কটেজে, তো না জানি কী ভাববেন তিনি! এটা পরিষ্কার, ওকে যে এখানে থাকতে দিয়েছেন লিণ্ডা, সেটা স্বামীকে বলেননি তিনি। হয়তো রেগে উঠবেন ভদ্রলোক। দুর্ব্যবহারও করতে পারেন!

ব্রিত বোধ করছে জ্যাকি। এটা বুঝে গেল, চাইলেও কটেজে লুকিয়ে থাকতে পারবে না। সুতরাং ওর বোধহয় এখন উচিত নিজের উপস্থিতি জানিয়ে দেয়া। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে মুখ খুলতে গেল জ্যাকি, কিন্তু তখনই হঠাৎ করে পাল্টে গেল নিচের পরিবেশ।

টেবিলে মদের গ্লাস রাখলেন লিণ্ডার স্বামী অ্যারন কনার। হাতের ইশারায় ডাকলেন জানালার কাছের দুই যুবককে। দেরি না করে চেয়ারে বসা দাড়িওয়ালা লোকটার পাশে এসে থামল তারা। মধ্যবয়স্ক মানুষটা কিছু বোঝার আগেই কনুই ধরে তাকে আর্মচেয়ার থেকে টেনে তুলল। পিঠে জোর ধাক্কা দিয়ে কার্পেটের ওপরে লোকটাকে ফেলে দিল তারা। এবার ঘটল আরও ভয়ঙ্কর ঘটনা। দুই যুবকের হাতে উঠে এল পুলিশের ব্যবহৃত স্টিলের ব্যাটন। কবজির মোচড়ে হয়ে গেছে টেলিস্কোপের মত লম্বা। পরক্ষণে মুষলধারে ধাতব লাঠির বাড়ি নামল মধ্যবয়স্ক লোকটার ঘাড় ও পিঠের ওপর।

নির্মমতা দেখে লিণ্ডার স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা হারাল জ্যাকি।

‘এখানে নয়,’ শান্ত স্বরে বলল অ্যারন কনার, ‘বাইরে নাও, বার্ব।’

অবিশ্বাস নিয়ে চেয়ে রইল জ্যাকি।

রক্তাক্ত মানুষটাকে ছেঁচড়ে দরজা পার করিয়ে চাঁদের আলোয় ভরা বারান্দায় নিল দুই যুবক।

ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াতে গেল বয়স্ক লোকটা।

আর তখনই ঘটল আরও আতঙ্কজনক ঘটনা।

আরেকটু হলে জ্যাকির মুখ চিরে বেরোত আর্তনাদ। হোলস্টার থেকে কালো এক পিস্তল বের করল ক্রু-কাট চুলের যুবক। পর পর দুই গুলির আওয়াজে কেঁপে উঠল কটেজ। প্রথম গুলিতে ফুটো হয়েছে প্রৌঢ়ের বাম হাঁটুর বাটি। পরের বুলেট চুরমার করেছে ডানহাঁটু। গুলির প্রতিধ্বনি মিলিয়ে গেলেও নির্জন এলাকার চারদিকে ছড়িয়ে গেল লোকটার করুণ আর্তচিৎকার।

সহজ চোখে তাকে দেখছে অ্যারন কনার।

জ্যাকি ভাবল, সত্যিই কি এই লোক ওর বসের স্বামী? এসব কি সত্যিই ঘটছে?

কাউকে বললেও তো বিশ্বাস করবে না ওর কথা!

অবশ্য…

বেডরুমে ঢুকে স্মার্টফোন নিয়ে আবার গ্যালারিতে ফিরল জ্যাকি। কাঁপছে দু’হাত। দ্বিতীয় চেষ্টায় চালু করল ভিডিয়ো। বুঝে গেছে, খুনিগুলো যদি টের পায় ভিডিয়ো করা হচ্ছে, তো দেরি করবে না ওকে খুন করতে।

হামাগুড়ি দিয়ে সরে যেতে চাইছে আহত লোকটা। প্রচণ্ড ব্যথা ও আতঙ্কে ফুঁপিয়ে উঠছে। শান্ত চোখে তাকে দেখছে অ্যারন কনার। প্রৌঢ় যেন আহত এক তেলাপোকা!

কনারের ইশারায় বেচারার পাশে গিয়ে থামল পনিটেইল করা যুবক। পিস্তল তুলল প্রৌঢ়ের ডানহাতের আঙুলের দিকে। পরক্ষণে লাফ দিল যুবকের হাতের অস্ত্র। গুলি লাগতেই বেড়ে গেল আহত প্রৌঢ়ের আর্তনাদ।

মজা পেয়ে হাসছে অন্য তিনজন। লোকটার উরুতে গুলি করল দ্বিতীয় যুবক। পরক্ষণে দুই গুলিতে উড়িয়ে দিল বামহাতের সব আঙুল।

টানা আর্তচিৎকার ছাড়ছে বয়স্ক লোকটা।

কাঁপা হাতে ছোট্ট স্মার্টফোন ধরে রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে জ্যাকি।

‘ধর, শুয়োরটার চিৎকার শুনে বিরক্ত হয়ে গেছি,’ বলল অ্যারন কনার। জ্যাকেট সরিয়ে হোলস্টার থেকে নিল দীর্ঘ নলের এক রিভলভার। চাঁদের আলোয় আয়নার মত চকচক করছে ওটা। হ্যামার তুলে দাড়িওয়ালার মাথার পেছনে অস্ত্রের নল তাক করে টিপে দিল ট্রিগার।

অন্যদুই অস্ত্রের চেয়েও জোরে গর্জন ছাড়ল রিভলভার। হামাগুড়ি দিতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল দাড়িওয়ালা। রক্তে ভেসে গেল মুখের একপাশ। মুচড়ে উঠে স্থির হয়েছে তার দেহ।

বুনো পশ্চিমের কাউবয়দের মত করে রিভলভারটা চরকির মত ঘুরিয়ে হোলস্টারে রেখে দিল অ্যারন কনার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলল, ‘ভ্যানে তোলো হারামজাদাকে। পরে টুকরো করে মাংসগুলো কুকুর দিয়ে খাইয়ে দেবে।

‘ওকে বস,’ একইসঙ্গে বলল দুই যুবক।

‘যাহ্, হারামজাদার রক্ত লেগে গেছে আমার জুতোয়।’

‘সরি, বস,’ বলল পনিটেইল।

‘সমস্যা নেই,’ কাঁধ ঝাঁকাল কনার। ‘ধুয়ে নিলেই হবে।’

একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ভয়ে কাঁপছে জ্যাকি। দু’হাত-পা ধরে লাশটাকে তুলল দুই যুবক। রাখল গিয়ে জঙ্গলের ধারে ভ্যানের কাছে। খুনিরা কটেজ ছেড়ে বেরোতেই জ্যাকি বুঝে গেছে, এখনই মোক্ষম সময়। দেরি না করে পালিয়ে যেতে হবে ওকে। স্মার্টফোন অফ করে একছুটে গিয়ে ঢুকল বেডরুমে। ঘরে টুকটাক জিনিস রয়ে গেছে। তবে এখন আর সময় নেই সেসব গুছিয়ে নেয়ার। ব্যাকপ্যাকে ফোন রেখে ছোঁ দিয়ে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এল বেডরুম থেকে।

কাঁধে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে ছুটে নেমে এল নিচতলায়, হাতে ঝুলছে পিস্তল। উজ্জ্বল আলো জ্বলছে লিভিং স্পেসে। নিজেকে উলঙ্গ বলে মনে হলো জ্যাকির। এইমাত্র কটেজের দিকে ঘুরে চেয়েছে তিন খুনির একজন। যে-কোন সময়ে হয়তো ধরা পড়বে ও। আর সেটা হলে কী ঘটবে, ভাল করেই বুঝতে পারছে।

বারান্দায় থকথকে রক্ত দেখে বমি এল জ্যাকির নিজেকে সান্ত্বনা দিল: পার হতে হবে মাত্র কয়েক ফুট, তারপর পালিয়ে যেতে পারবে জঙ্গলের ভেতরে। দমকা হাওয়ায় পড়া বাঁশ পাতার মত কাঁপছে ওর দু’পা। ভয়ে যে- কোন সময়ে হারাবে চেতনা।

দু’পা ফাঁক করে জঙ্গলের এক গাছের গায়ে ছ্যার ছ্যার করে প্রস্রাব করছে লিণ্ডার স্বামী। বামহাত রেখেছে কোমরে। ঠোঁট গোল করে শিস দিচ্ছে খুশিমনে। সুযোগ বুঝে বারান্দা পেরিয়ে একছুটে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল জ্যাকি। অ্যারন কনার আছে মাত্র বিশ ফুট দূরে। জ্যাকি পরিষ্কার শুনল মূত্রত্যাগের আওয়াজ। ওদিকে রুপালি ভ্যানের কাছে নিচু গলায় আলাপ জুড়েছে কনারের স্যাঙাতেরা। একটু পর আবার ফিরে এল কটেজের দিকে

ভয় পেয়ে ঘন এক ঝোপে ঢুকল জ্যাকি। নড়াচড়া করলে ধরা পড়বে ভেবে আটকে রেখেছে শ্বাস। ওর মাত্র দেড়ফুট দূর দিয়ে গেল পনিটেইল করা যুবক। তার মুখের চুইংগামের মিন্টের গন্ধ নাকে এল জ্যাকির।

ঝোপ পেরোতে গিয়ে হঠাৎ করেই থেমে গেছে যুবক। বোধহয় বুনো জন্তুর মত কাজ করে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। ঝোপের ভেতরে বসে জ্যাকি দেখল, চাঁদের আলো পড়েছে যুবকের মুখের একপাশে। অন্যদিকে কটেজের হলদে আলো। বুনো জানোয়ারের মত চকচক করছে তার দু’চোখ

‘কী হলো, টনি?’ জানতে চাইল দ্বিতীয়জন।

পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে টনি /স্ক্যালেস। এখন চাইলে হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁয়ে দিতে পারবে জ্যাকি।

‘না, কিছু না, বার্ব,’ আবারও কটেজের দিকে চলল স্ক্যালেস।

প্যান্টের চেইন আটকে কটেজের সামনে গিয়ে থামল অ্যারন কনার। বিরক্ত হয়ে বলল, ‘রক্তে ভেসে গেছে বারান্দার মেঝে!

তার কথা শুনে পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসল দুই যুবক। বসের পিছু নিয়ে আবারও ঢুকে পড়ল কটেজে।

ঝোপ ছেড়ে বেরিয়ে ভীত হরিণীর মত জঙ্গলের দূর থেকে দূরে ছুটল জ্যাকি!

কালবেলা – ৫ (মাসুদ রানা)

ওকলাহোমার সেই খুনের ঘটনার দু’দিন পর।

এসময়ে আয়ারল্যাণ্ডে পড়ে কনকনে শীত। উত্তাল সাগর থেকে হু-হু হিমঠাণ্ডা হাওয়া এসে কাঁপিয়ে দেয় গ্যালওয়ে উপকূল। চামড়ার জ্যাকেটের কলার ওপরে তুলে দিল মাসুদ রানা। ম্লান দুপুরে আটলান্টিকের আকাশে ডিমের কুসুমের মত ঝুলছে লালচে সূর্য। আনমনে নুড়িভরা সৈকতে হাঁটতে গিয়ে রানা দেখছে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে ওর ছায়া।

সৈকতে একা থাকতে ভাল লাগে ওর। পা ফেলছে ধীরে ধীরে। জানা নেই এরপর কোথায় যাবে বা কী করবে। মাঝে মাঝে থেমে দেখছে সাগরের ধূসর ঢেউ। ভাবছে: ওরা যদি জানিয়ে দিত, কেন এত অর্থহীন হয়ে গেল ওর এই জীবন!

আগেও এই সৈকতের রুক্ষ পাথরে ঢেউ আছড়ে পড়তে দেখত রানা। অবশ্য সে-ও তো মেলা আগের কথা। একে একে ওর জীবন থেকে বিদায় নিলেন বাবা-মা-চাচা-ফুফু। নিজে নানা বিপদে জড়িয়ে গেলেও বেঁচেবর্তে রয়ে গেছে ও।

রানার বুক চিরে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস। ঝুঁকে সৈকত থেকে তুলে নিল একমুঠো নুড়িপাথর। এক এক করে ছুঁড়ল ঢেউয়ের ওপরে ফোঁস ফোঁস করা ফেনার ভেতরে।

‘আমি এখানে কী চাই?’ জিজ্ঞেস করল নিজেকে। সাগরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে চলল একটু দূরের বাড়িটার দিকে। কয়েক গজ গিয়ে আবারও থামল। খেয়াল করে দেখল উঁচু পাথুরে জমিতে দুর্গের মত ভিক্টোরিয়ান বাড়িটা। ওটার পেছনে এঁকে এঁকে গেছে ব্যক্তিগত সৈকত। এ- এলাকার প্রেমে পড়ে বাড়ি ও সরু সৈকত কিনে নিয়েছিলেন ওর চাচা। মৃত্যুর আগে সবই দান করে যান রানাকে।

বহু বছর পড়ে ছিল বাড়ি। তারপর দেখে রাখবেন সেই শর্তে ওখানে বাস করতে এলেন নিঃসন্তান এক বয়স্ক দম্পতি। কয়েক বছরের ব্যবধানে নিউমোনিয়া ও ক্যান্সারে মারা গেলেন তাঁরা। তখন কাজে গছে না বলে বাড়ি ও সৈকত বিক্রি করে দিয়েছে রানা।

অবশ্য এখন একদম বদলে গেছে বাড়িটা, এবং সেজন্যে অতীতের কথা ভেবে বুকে এসে ব্যথা লাগছে রানার। মনে মনে নিজেকে বলল: দুনিয়ায় কোনকিছুই চিরকালীন নয়। এমন কী মানুষের ভালবাসাও পাল্টায় নানান রঙ। জেসিকার কথা ভেবে তিক্ত হাসল রানা। নিজেকে বলল: ‘বলো তো, আসলে এখানে কেন এলে তুমি?’

নুড়িভরা সৈকত যেখানে শেষ, তারপর পাথুরে সিঁড়ি, বেয়ে উঠলে বাড়ির পেছন উঠন। নতুন মালিক ভেবেছেন নিরাপত্তার কথা, তাই এখন বাড়ির শেষ সীমানায় লোহার সেফটি রেইলিং। সাগরের দিকে এক কনসার্ভেটরি রুমের কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে সূর্যের লালচে দুর্বল আলো।

বাড়ির পাশে সরু পথ ঘুরে চলে গেছে সামনের উঠনে। ওদিকে পৌঁছে মুখ তুলে তাকাল রানা। চাচার বাড়ি বেশি বদলে গেছে সদর গেটে ঝুলন্ত সাইনবোর্ডের জন্যে।

ওখানে লেখা: গ্যালওয়ে গেস্ট-হাউস।

নামটা দেখে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে রানার। কে যেন অন্তরের গভীরে বলে চলেছে: এ-বাড়ি কিন্তু তোমার আর নয়! তুমি এখন আর এটার মালিক নও!

তা হলে আমি এখানে কী করছি? -নিজেকে জিজ্ঞেস করল রানা। কোন জবাব পেল না সেখান থেকে। বিষাদ-ভরা মন নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে, এমন সময় শুনল পরিচিত কণ্ঠ। ‘মিস্টার রানা?’

ঘাড় ফিরিয়ে মোটা এক মহিলাকে দেখতে পেল ও। তাঁর বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ। মুখে মিষ্টি হাসি। পরনে ঢলঢলে নীল গাউন। ধূসর চুল খোঁপা করা। প্রথম দর্শনে তাঁকে মনে হবে বড় কোন হাসপাতালের হেডনার্স। বাড়িটার মত বদলে যাননি। রানা সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়ার সময় যেমন ছিলেন, তেমনই আছেন। বড়জোর আরও চওড়া হয়েছে কোমর। কে জানে, বিশ বছর বয়সেও হয়তো এমনই ছিলেন।

জোর করে মুখে হাসি ফোটাল রানা। ‘দেখা হয়ে ভাল লাগছে, মিসেস অ্যাপলউড।’

‘আমারও, মিস্টার রানা,’ হাসলেন মহিলা।

‘আপনাদের ব্যবসা এখন কেমন চলছে?’ ভদ্রতা করে জানতে চাইল রানা।

‘খুব ভাল। আপনি কি ছুটিতে এসেছেন গ্যালওয়েতে?’

‘জী,’ বলল রানা, ‘এখন কেমন বোধ করছেন মিস্টার অ্যাপলউড?’

‘কোমরের অপারেশনের পর থেকে বেশ ভাল আছে। আজ গেছে গলফ খেলতে। সন্ধ্যার আগে আর ফিরবে না। আপনি ঘুরে গেছেন জানলে আড্ডা দিতে না পেরে খুব আফসোস করবে।’

‘আমারও ভাবতে গিয়ে খারাপ লাগছে, তাঁর সঙ্গে দেখা হবে না,’ ডাহা মিথ্যা বলল রানা। গল্ফ খেলা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিরস গল্প শুনতে চরম আপত্তি আছে ওর। তার চেয়েও মারাত্মক এক বিষয় আছে মিস্টার অ্যাপলউডের। আর সেটা হলো তাঁর ব্যথাভরা কোমর। কীভাবে ট্যাড়া চোখ নিয়ে গর্তে গলফ্ বল ফেলে দেন, সেটাও কঠিন গবেষণার বিষয়। ডানচোখ চেয়ে থাকে সরাসরি সামনে, অন্য চোখটা দেখে আকাশের চাঁদ-তারা।

‘ভেতরে এসে ড্রিঙ্ক নিন, মিস্টার রানা,’ বললেন মিসেস অ্যাপলউড। ‘ক’দিন আগে আমরা বার চালু করেছি।’

একটু দ্বিধা করে তাঁর পিছু নিল রানা। বাড়িতে ঢুকে মনে পড়ল ছোটবেলার স্মৃতি। আগে এন্ট্রান্স হলে ছিল কাঠের কালো প্যানেল। সেসব এখন নেই। আধুনিক করা হয়েছে রিসেপশন এরিয়া। মহিলার সঙ্গে হেঁটে রানা পৌঁছে গেল লিভিং ও ডাইনিং রুমের কাছে। এখন দুই ঘরের মাঝে কোন দেয়াল নেই। ফুলেল ওয়ালপেপার দেখে মনে মনে ভুরু কুঁচকে ফেলল রানা। এ-ছাড়া দেয়ালে আছে কাঁচা রঙের কিছু সস্তা তৈলচিত্র। আগে ছিল না এমন এক আর্চওয়ে পেরিয়ে। ওরা পা রাখল নতুন কনসার্ভেটরি রুমে। রবিবারের ডিনারের জন্যে সাজানো আছে টেবিল ও চেয়ার। ঘরের অন্যদিকে ওক কাঠের মস্ত বার। লাউঞ্জে বসে চুপচাপ পত্রিকা পড়ছেন আশি পেরিয়ে যাওয়া বেশ ক’জন অতিথি।

জানালার কাছে আর্মচেয়ারে বসে আছে এক মেয়ে। রানা অনুমান করল, তার বয়স হবে পঁচিশ। ছেঁটে রাখা বালিরঙা চুলের জন্যে তাকে কিশোরী বলে মনে হচ্ছে। পরনে সাদা টি-শার্ট ও নীল জিন্সের প্যান্ট। সামনে টেবিলে একটা মিনি ল্যাপটপ। পাশে হোয়াইট ওয়াইনের আধখাওয়া গ্লাস। মেয়েটাকে কালো এক নোটবুক থেকে কমপিউটারে তথ্য টুকতে দেখল রানা। বুঝে গেল, ছুটিতেও কাজ এড়াতে পারেনি বেচারি।

আগ্রহ ভরা চোখে রানাকে দেখছেন মিসেস অ্যাপলউড হাসি-হাসি মুখে বললেন, ‘কী বুঝলেন?’

‘খুব সুন্দর করে সব গুছিয়ে নিয়েছেন,’ আবারও মিথ্যা বলল রানা।

‘সত্যিই?’ খুশি হলেন মহিলা। বারের পেছনে গিয়ে হাতে নিলেন বড় একটা মগ। আপনাকে কী দেব, মিস্টার রানা? আজকে আপনার জন্যে বিনে পয়সায় সার্ভ করা হবে।

মিথ্যা ও ভদ্রতা বহুদূর নেয় মানুষকে, ভাবল রানা। ‘অনেক ধন্যবাদ। আমি নেব গিনেস বিয়ার।

একটু পর বিয়ারে ভরা মগ ওর হাতে দিলেন ভদ্রমহিলা। কিছু বলতেন, কিন্তু তখনই বেল বাজল রিসেপশন এরিয়া থেকে। ব্যবসার কাজে হন্তদন্ত হয়ে ওদিকে ছুটলেন তিনি। একা হয়ে বারের স্টুলে বসে ঠাণ্ডা বিয়ারে চুমুক দিল রানা। নিজেকে বলল: এ-বাড়ি আগের মত নেই, সেটা জেনেও কাঁচা জখমে লবণ ঢালতে এলাম কেন?

ফিরে এসে ওর চটকা ভাঙালেন মিসেস অ্যাপলউড। বললেন, ‘আরেকটা বিয়ার দিই?’

‘আপত্তি নেই,’ দীর্ঘশ্বাস চাপল রানা।

‘ওই যে সুন্দরী? জানালার দিকে চেয়ে নিচু স্বরে বললেন মহিলা। ‘উনি কিন্তু খুব নামকরা এক লেখিকা! ‘

‘তা-ই?’ ভদ্রতা রক্ষা করতে গিয়ে ঘুরে দেখল রানা। ছোট ল্যাপটপে টাইপ করছে মেয়েটা। অবশ্য তখনই নোটবুকের লেখা কম্পোজ শেষ হলো তার। চামড়ার ছোট্ট পাউচে ভরল নোটবুক। পায়ের কাছ থেকে কাপড়ের ব্যাগ তুলে ওটার ভেতরে রাখল পাউচ। কাজ শেষ করে আবারও টাইপ করতে লাগল ল্যাপটপে।

‘কী না জানি গ্যালওয়ে নিয়ে লিখছেন!’ বললেন মিসেস অ্যাপলউড। চকচক করছে দু’চোখ। হয়তো লিখবেন এই রেস্ট-হাউসের কথাও। আর তা হলে তো এটা হবে আকর্ষণীয় এক টুরিস্ট স্পট!’

‘আপনি ভাবছেন উনি লিখছেন গ্যালওয়ে রেস্ট-হাউসের খুন টাইপের কোন বই?’ জানতে চাইল রানা।

‘কে জানে!’ ওর কোমরে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে ফিক করে হাসলেন মিসেস অ্যাপলউড। আবার বাজল বেল। অর্ডার নিতে খদ্দেরের দিকে ছুটলেন তিনি।

ছয়
আধঘণ্টা পর মিসেস অ্যাপলউডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার সৈকতে ফিরল রানা। কৈশোরে গুগলিতে ভরা যে মস্ত চ্যাপটা পাথরে বসে সাগর দেখত, আজও ওটার ওপরে বসল। মিসেস অ্যাপলউড খাতির করে ওকে গিলিয়ে দিয়েছেন একে একে তিন পাইন্ট বিয়ার। নেশার ঘোরে এখন কমে গেছে ওর মানসিক যন্ত্রণা। ভাবতে শুরু করেছে: ওর এবার উচিত নিজের দিকে ফিরে চাওয়া। নিজেকে এভাবে শেষ করে দেয়া যৌক্তিক কারও কাজ নয়!

ঢেউয়ের দিকে চেয়ে শপথ নিল রানা: আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে বৃষ্টি থাকুক বা রোদ, দৌড়ে আসবে পুরো সাত মাইল সৈকত। দেবে এক শ’ বুকডন ও এক শ’ সিটআপ।

অবশ্য আজকের দিনটা ছুটি ধরে নিয়ে সময়টা পার করে দিলে বড় কোন ক্ষতি নেই। চামড়ার জ্যাকেটের পকেট থেকে নিল প্রিয় বন্ধু সলীল সেনের পাঠিয়ে দেয়া বাংলাদেশে তৈরি অ্যালকেমিস্ট সিরিজের বেনসন সিগারেটের প্যাকেট। ওটা থেকে নিয়ে জ্বেলে নিল ষোলোতম শলা। ধোঁয়ায় ফুসফুস ভরে নিয়ে চেয়ে রইল ধূসর সাগরের বুকে। পশ্চিমে অ্যালান দ্বীপকুঞ্জ পেছনে ফেলে চারপাশ ছেয়ে দিচ্ছে নন কালো মেঘের চাদর। একটু পর গ্যালওয়ে উপকূলে নামবে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি।

নুড়িভরা সৈকতে পদশব্দ শুনে ঘুরে তাকাল রানা। ওর দেরি হলো না বালিরঙা চুলের মেয়েটাকে চিনতে। এ হচ্ছে সেই লেখিকা। পরনে টি-শার্টের ওপরে ফ্লিস দেয়া হালকা এক জ্যাকেট। কাঁধে ঝুলছে কাপড়ের ব্যাগ।

কাছে এসে রানার দিকে চেয়ে মিষ্টি হাসল মেয়েটা। নরম সুরে বলল, ‘হ্যালো! ম্লান সূর্যের রোদ এড়াতে কপালে তুলেছে হাত। সাগরের ঝিরঝিরে হাওয়া দুলিয়ে দিচ্ছে তার খাটো চুল।

জবাবে ভদ্রতা করে হাসল রানা। সৈকতে একা থাকতেই ভাল লাগছিল ওর। ভাবেনি অন্য কেউ এখানে হাজির হবে।

‘আমি আবার বিরক্ত করছি না তো আপনাকে?’ বলল মেয়েটা।

‘না-না, তা নয়,’ জানাল রানা।

চ্যাপটা পাথরের ওপর থেকে বালি সরিয়ে ওখানে বসল মেয়েটা। ‘জায়গাটা খুব সুন্দর, তা-ই না?’

মৃদু মাথা দোলাল রানা। ‘ঠিকই বলেছেন।’

‘আমার নাম বেলা ওয়েস,’ বলল মেয়েটা। কথার সুরে রানা বুঝে গেল সে ইংরেজ।

‘আমি মাসুদ রানা, হাত বাড়িয়ে দিল রানা। মেয়েটার হাত নরম, তবে শক্ত করেই ধরেছে ওর হাত।

‘জানি, আপনার নাম মাসুদ রানা,’ বলল বেলা ওয়েস।

‘তা-ই?’ মেয়েটার চোখে তাকাল রানা।

‘মিসেস অ্যাপলউড বলেছেন আপনি আগে এই সম্পত্তির মালিক ছিলেন।’

কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘পরে বিক্রি করে দিয়েছি।’

‘জায়গাটা সুন্দর। বাড়ি আর সৈকত বিক্রি করে নিশ্চয়ই এখন আপনার খুব আফসোস হয়?’

জবাব না দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাল রানা, ‘শুনেছি আপনি নাকি একজন লেখিকা?’

মুচকি হাসল বেলা ওয়েস। ‘মিসেস অ্যাপলউড সুযোগ পেলেই পেটের সব কথা উগরে দেন।

‘মনে পাপ নেই বলেই হয়তো। তিনি বললেন, আপনি হয়তো আপনার উপন্যাসে লিখবেন তাঁদের গেস্ট-হাউসের কথা।’

‘তা হলে হতাশ হতে হবে তাঁকে। আমি আসলে বইয়ের লেখিকা নই।

‘তা-ই?’ আবারও সাগরের দিকে তাকাল রানা।

‘আমি আসলে একজন সাংবাদিকা।’

কোন মন্তব্য না করে চুপ করে থাকল রানা।

‘সরি,’ বলল বেলা ওয়েস, ‘বুঝতে পেরেছি আমি আসলে আপনাকে বিরক্ত করছি। আমি বরং আসি।’

অবহেলা করে বসেছে রানা। মেয়েটার দিকে তাকাল রানা। ‘আপনি মোটেই আমাকে এরক্ত করছেন না।’

‘না, এটা বুঝেছি যে আপনি একা থাকতে চান। আপনাকে বিরক্ত করেছি বলে দুঃখিত।

‘আমারই বরং দুঃখ প্রকাশ করা উচিত,’ বলল রানা। ‘আপনার সঙ্গে ভাল আচরণ করিনি।’ একটু থেমে বলল, ‘একটু পর বৃষ্টি নামবে। সৈকতের বহু দূরে আমার কটেজ। তাই আগেভাগে পৌঁছে যেতে চাই। আপনার কোন আপত্তি না থাকলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ওখান থেকে।’

দ্বিধা নিয়ে হাতঘড়ি দেখল বেলা। ‘একটা কাজ আছে। তবে তার আগে খানিকটা সময় পাব। এদিকটা তো আপনার চেনা। ঠিক আছে, তো চলুন, ঘুরে আসি সৈকতের ওদিকটা থেকে।’

পাথর থেকে নেমে রওনা হলো ওরা। রানা বলল, ‘ওদিকে দেখার মত নতুন তেমন কিছু নেই।’ সৈকতের উত্তরদিকে আঙুল তাক করল ও। ‘ওদিকে যে মস্ত পাথর দেখছেন, ওটা ঘুরে রাস্তা গেছে শহরের দিকে। সে-পর্যন্ত সৈকত আর গেস্ট-হাউসের জমি। তার ওদিকে আছে আমার ভাড়া করা কটেজ। উপকূলীয় সরু এক রাস্তার এদিকে।’

‘আপনাকে গাইড হিসেবে পেয়ে খুশি হলাম।’

‘কথাটা বলেছেন, সেজন্যে ধন্যবাদ।’

গেস্ট হাউস পেছনে ফেলে সৈকত ধরে হেঁটে চলল রানা ও. বেলা। মেয়েটা জানতে চাইল, ‘আমি কি ধরে নেব আপনার পরিবার নিয়ে কটেজে উঠেছেন?’

‘তা নয়। আমি একা মানুষ। সঙ্গে আর কেউ নেই।’

‘ব্যবসার জন্যে এসেছেন, না আনন্দের জন্যে?’

‘কোনটাই নয়।’

ওদের ওপর দিয়ে ভেসে গেল কালো এক ছায়া। মুখ তুলে তাকাল ওরা। চওড়া ডানা মেলে সাগরে ভেসে গেল বড় এক গাল পাখি

‘আমি কখনও এত বড় পাখি দেখিনি,’ বলল বেলা।

‘এদিকে প্রচুর আছে,’ জানাল রানা। ‘পিঠ-কালো বড় গাল ওটা। যদি ওটাকে বড় বলে মনে করেন, তো অ্যালব্যাট্রেস দেখলে সত্যিই চমকে যাবেন। মাঝে মাঝে এদিকে উড়ে আসে।’

সাগরের তাজা হাওয়া বুক ভরে নিল বেলা। ‘চারপাশ কী প্রশান্তিময়! বুঝলাম, কেন আবারও এখানে ফিরে এসেছেন। কিছু মনে করবেন না, জানতে ইচ্ছে হচ্ছে: এখান থেকে চলে গিয়েছিলেন কেন?’

‘গত চার বছরেরও বেশি ছিলাম ফ্রান্সের নরম্যাণ্ডিতে।’

‘আপনি বাস করেন চমৎকার সব জায়গায়,’ হাসল বেলা। ‘আমি নিজে থাকি নিউবারিতে। ওখানে দেখার মত কিছুই নেই। বলুন তো, নিজের বাড়ি বলে এখন কোন্ জায়গাটাকে মনে করেন আপনি?’

‘আমার আসলে কোন বাড়ি নেই। ঘুরে বেড়াচ্ছি এখান থেকে ওখানে।’

‘এরপর কোথায় যাবেন বলে ভাবছেন?’

‘কোন পরিকল্পনা করিনি। আগে বা পরে যাব কোথাও।’

হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল বেলা ওয়েস। ব্যাগের ভেতরে হাত ভরে বের করল ছোট ল্যাপটপ। স্ক্রিনের দিকে চেয়ে বলল, ‘এক্সকিউয মি। আমার একটা মেসেজ আসার কথা।’

‘আপনি সবসময় ল্যাপটপ সঙ্গে রাখেন?’ বলল রানা।

‘যখন-তখন কাজে লাগে যে!’ কমপিউটার ব্যাগে রেখে চামড়ার সরু পাউচ বের করল বেলা ওয়েস। ওটার সামনের পকেট থেকে নিল দুটো মোবাইল ফোন। নীল মোবাইলের স্ক্রিন। অন করে দেখল। আনমনে মাথা নাড়ল। হতাশার সুরে বলল, ‘দূর!’ আবারও ফোন রাখল পাউচে। পাউচ চলে গেল ওর ব্যাগের ভেতরে।

‘খুব জরুরি কোন মেসেজ?’ বলল রানা।

‘রিসার্চের তথ্য পাওয়ার কথা,’ যেন এড়িয়ে যাওয়ার সুরে বলল বেলা। চেহারায় দ্বিধা। একবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ভেবেছিলাম কেউ না কেউ ফোন করবে। যাক গে!’

‘রিসার্চের জন্যেই গ্যালওয়েতে এসেছেন?

মাথা দোলাল বেলা। ‘আমাকে তুমি করে বলতে পারেন, রানা। অনুমতি পেলে আমিও তুমি করেই বলব।’

‘বেশ, বেলা।’

‘গত দশদিন এদিকে ঘুরেছি। কিলার্নি, লিমেরিক, অ্যাথলন… বহু জায়গা।’

‘তাতে কোন লাভ হয়েছে?’

‘তা হয়েছে। ভাবতেও পারিনি এমন সব তথ্য পেয়েছি।’

‘আমি অতিরিক্ত কৌতূহলী হতে চাই না,’ বলল রানা। হাসল বেলা ওয়েস। ‘গোপন রিসার্চ। আমি নিজেও এখন কিছু জানাব না। দয়া করে কিছু মনে কোরো না।’

কিছু বলল না রানা। সাগর থেকে হু-হু করে আসছে শীতল হাওয়া। ক্রমে বাড়ছে তার বেগ। মুখ তুলে আকাশ দেখল রানা। খুব কাছে চলে এসেছে পাহাড়ের মত উঁচু কালো মেঘ। ‘আমাদের বোধহয় দৌড়ে গিয়ে কটেজে ঢুকতে হবে। যা ভেবেছি, তার অনেক আগেই বৃষ্টি চলে এসেছে।’

‘বাধ্য না হলে ল্যাপটপ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে চাই না।’

‘তোমার বইটি কী বিষয়ে, সেটাও বলা যাবে না?’

‘তা নয়, বইটি হবে ঐতিহাসিক বায়োগ্রাফি।’

‘চিনি এমন কারও ওপরে লেখা?’

‘তাঁর নাম লেডি জেনিফার হলওয়ে। উনিশ শতকে ডায়েরি আর বই লিখতেন। কবিও ছিলেন। তখনকার প্রথম সারির নারীবাদী। অবাক হইনি যে তাঁর নাম শোনোনি।

‘সত্যিই শুনিনি,’ বলল রানা। ‘তবে তোমার রিসার্চের কথা শুনে মনে পড়ল, জেনিফার হলওয়ে বোধহয় ছিলেন এবারডেন এস্টেটের মালিক লর্ড স্টার্লিংফোর্ডের স্ত্রী। একসময়ে ব্যালিনাস্লোর ক’মাইল দূরে মস্ত জমিদারি ছিল তাঁর স্বামীর।’

‘দশে দশ পেয়েছ। বুঝলাম স্থানীয় বহু কিছুই জানো!’

‘লর্ড স্টার্লিংফোর্ডের ব্যাপারে এদিকে কিংবদন্তী আছে। গ্রামের সরাইখানা বা পানশালায় গেলে শুনবে নিষ্ঠুর সেই ইংরেজ জমিদারের গল্প। নিরীহ মানুষের ওপরে অত্যাচার করতে করতে একসময় পাগল হয়ে যায় সে। নিজের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করে। অবশ্য আর কিছু জানি না। তো তুমি লিখতে চাও লেডি স্টার্লিংফোর্ডের জীবনী?

‘তা বলতে পারো,’ কাঁধ ঝাঁকাল বেলা ওয়েস।

‘বই নিয়ে তোমাকে অনুৎসাহিত মনে হচ্ছে,’ বলল রানা।

ওকে দেখল বেলা। ‘তাই বুঝি মনে হচ্ছে? অবশ্য এর কারণও আছে। জানি না বইটা আর লিখতে পারব কি না। গত কয়েক দিনে এমন কিছু জেনেছি, যে কারণে দ্বিধান্বিত হয়ে গেছি…’ মিইয়ে গেল বেলার কণ্ঠস্বর। চট করে দেখল আকাশ। ওদের মাথার ওপরে চলে এসেছে কালো মেঘের সারি।

এবার যে-কোন সময়ে নামবে বৃষ্টি,’ বলল রানা। ওর কথা শেষ হতে না হতেই ভারী ফোঁটা নিয়ে ঝরঝর করে নামল আস্ত আকাশ। সাগর থেকে এল শোঁ-শোঁ হাওয়া।

কোমরে ফ্লিসের জ্যাকেট শক্ত করে জড়িয়ে নিল বেলা। বৃষ্টির শব্দের ওপর দিয়ে বলল, ‘হায়, যিশু! আমরা তো ভিজে যাচ্ছি!’

বহু পেছনে চ্যাপটা পাথরটা দেখল রানা। তারপর বলল, ‘বেলা, গেস্ট-হাউসের চেয়ে আমার কটেজ অনেক কাছে। কী করবে ভাবছ? চাইলে বৃষ্টির সময়টা আমার ওখানে বসতে পারো।’

ওর দিকে তাকাল বেলা। ‘তো জলদি চলো!’

সাত
ছুটে চলেছে রানা ও বেলা। ঝোড়ো হাওয়ায় ভর করে টাস- টাস শব্দে নামছে বৃষ্টির ভারী ফোঁটা। নুড়িভরা সৈকত ও বড় এক পাথরখণ্ডের মাঝের পথ ধরে কটেজের কাছে পৌঁছে গেল ওরা। ছোট্ট বাগান পেরিয়ে থামল সদর দরজায়। তালা খুলে বেলাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল রানা।

ভিজে গিয়ে শীতে থরথর করে কাঁপছে মেয়েটা। গা বেয়ে টপটপ করে মেঝেতে পড়ছে পানি। একবার শিউরে উঠে বলল, ‘আমাকে বোধহয় ডুবন্ত ইঁদুরের মত বিশ্রী দেখাচ্ছে?’

‘না, তা নয়, ভেজা বেড়ালের মত,’ হাসল রানা।

ফ্লিসের ভেজা জ্যাকেট খুলল বেলা। ঠাণ্ডায় বেগুনি হয়ে গেছে ওর ফর্সা দুই বাহু।

ওর দিকে চেয়ার বাড়িয়ে দিল রানা। বেলার হাত থেকে ফ্লিসের জ্যাকেট নিয়ে ঝুলিয়ে রাখল চেয়ারের পিঠে। বলল, ‘আগুন জ্বেলে নিলে চট করে শুকিয়ে যাবে জ্যাকেট।’ কটেজ ভাড়া করার পর চ্যালাকাঠ কেটে রেখেছে ও। ওখান থেকে কয়েকটা নিয়ে গুঁজে দিল ফায়ারপ্লেসে।

খবরের কাগজ মুড়িয়ে আগুন ধরাবে, এমন সময় দেখল ব্যাগে উঁকি দিচ্ছে বেলা। কয়েক সেকেণ্ড পর স্বস্তির সঙ্গে বলল মেয়েটা, ‘ভাগ্যিস কিছু ভিজে যায়নি!’ চেয়ারের কাঁধে ঝুলিয়ে দিল হাতের ব্যাগ।

কাঠের সরু সিঁড়ি উঠেছে দোতলায়। ওটা দেখাল রানা। ‘ওপরে ওয়ার্ডোবে তোয়ালে পাবে। বাথরুমে হেয়ার ড্রায়ার।’ সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠল বেলা। এদিকে ফায়ারপ্লেসের দিকে ঝুঁকে লাইটার দিয়ে খবরের কাগজে আগুন দিল রানা।

মিনিট দশেক পর নেমে এল বেলা। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিয়েছে মাথার চুল। রানার জ্বেলে নেয়া আগুনে উষ্ণ হয়ে উঠেছে কটেজ। খুশি হয়ে বলল বেলা, ‘ছোট হলেও কটেজটা সুন্দর। সত্যিই রুচি আছে তোমার।

‘এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় এটা ছিল পরিত্যক্ত, জেলে কুটির। চারদেয়াল ও অর্ধেক ছাত ছাড়া কিছুই ছিল না। বৃষ্টি এলে এখানে ঠাঁই নিতাম। অবশ্য গত কয়েক বছরে সবই বদলে গেছে। জানালার পাশে ওক কাঠের ড্রেসারের সামনে থামল রানা। ওটার ওপর থেকে নিল আধখালি উইস্কির বোতল। ঘুরে তাকাল বেলার দিকে। ‘ড্রিঙ্ক নেবে? এটা ছাড়া আপাতত কটেজে অন্য কোন পানীয় নেই।’

‘জনি ওয়াকারের ব্ল্যাক লেবেল, বারো বছর ম্যাচিউর করা,’ হাসল বেলা। ওর চোখ পড়ল ড্রেসারের পাশে খালি কিছু বোতলের ওপর। চট্ করে বলল, ‘তুমি বোধহয়। সত্যিকারের সমঝদার!’

‘বদ্ধ মাতাল বলে ধরে নাওনি সেজন্যে ধন্যবাদ,’ তিক্ত হাসল রানা। দুটো ক্রিস্টালের গ্লাসে ঢেলে নিল দু’আউন্স করে উইস্কি।

‘আমার বোধহয় নেয়া উচিত হবে না,’ বলল বেলা। ‘উইস্কি এলোমেলো করে দেয় মাথা। অবশ্য এ-ও ঠিক, সামান্য নিলে ক্ষতি কোথায়!’

‘উইস্কি উষ্ণ করে মানুষের ঠাণ্ডা হৃদয়,’ বলল রানা।

‘ওটা যে মানুষের কোথায় থাকে, আজও বুঝতে পারিনি, ‘ রানার হাত থেকে উইস্কির গ্লাস নিল বেলা। পরেরবার কার্ডিওলজিস্টের সঙ্গে দেখা হলে জেনে নেব। … চিয়ার্স!’

‘চিয়ার্স!’ গ্লাসে গ্লাসে টোকা দিল ওরা।

ফায়ারপ্লেসের দু’পাশের দুই চেয়ারে মুখোমুখি বসল। লালচে আগুনের আভায় রক্তিম দেখাচ্ছে ওদের মুখ।

গ্লাসে চুমুক দিয়ে আরেকটু হলে মুখ থেকে উইস্কি ফেলে দিত বেলা। বিড়বিড় করে বলল, ‘হায়, যিশু! গলা তো পুড়ে ‘গেছে!’

‘খুব বেশি কড়া?’ বলল রানা।

‘তুমি তো অভ্যস্ত, তাই বুঝবে না,’ আরেক চুমুক উইস্কি গলায় ঢালল বেলা। ‘মনে হচ্ছে গরম হয়ে গেছে শরীর!’

বহুদিনের একাকী রানার ভাল লাগছে বেলার সঙ্গ। সৈকতে মেয়েটাকে অভদ্রের মত বিদায় করে দেয়নি বলে নিজের ওপরে খুশি হয়ে উঠল ও।

‘তো আসলে কী কাজ করো তুমি, রানা?’

‘বলতে পারো আমি আপাতত বেকার।’

‘রহস্যময় যুবক! একাকী! কাছে টানলেও কারও সঙ্গে কোন সম্পর্কে জড়ায় না! নেই তার ভবিষ্যৎ কোন পরিকল্পনা! আর এখন শুনছি আয়-রোজগার করার মত কোন পেশাও নেই! তো ব্যাপারটা কেমন হলো, রানা?’

প্রশ্ন এড়াতে গিয়ে বলল রানা, ‘কী ধরনের কাজ করব, আসলে সেটা নিয়েই ভাবতে শুরু করেছি।’

‘আগে কী করতে? নাকি বেশি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে বসেছি?’

রহস্যমানব হয়ে কাজ নেই, ভাবল রানা। মেয়েটা হয়তো এরপর ভেবে নেবে পড়ে গেছে ভয়ঙ্কর এক সিরিয়াল কিলারের খপ্পরে! আত্মরক্ষা করার জন্যে নিজের সম্পর্কে বলল রানা: ‘আগে ছিলাম মিলিটারিতে। পরে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করেছি।’

‘তোমাকে দেখে তো ব্যবসায়ী বলে মনে হয় না,’ হাসল বেলা।

‘পেশা ছিল অস্বাভাবিক।’ গ্লাস খালি হতেই উঠে বোতল থেকে নতুন করে সোনালি তরল ঢেলে নিল রানা।

ড্রিঙ্কে চুমুক দিয়ে বেলা বলল, ‘তুমি তো জানো, আমি কৌতূহলী সাংবাদিক।’ ডানহাতের তর্জনী তাক করল রানার বুকে। ‘মনে রেখো, চাইলে নিরেট পাথরের পেট থেকেও সবই বের করতে পারি।’

‘তা-ই?’

‘সেজন্যে আমি রীতিমত বিখ্যাত!’

‘তবে তো আর মুখ না খুলে উপায় নেই! ঠিক আছে, আগেভাগে বলি: আমি আসলে মানুষকে সহায়তা করি।’

‘সহায়তা করো, তার মানে কী?’

‘কেউ বিপদে পড়লে তার হয়ে গোয়েন্দাগিরি করি। কখনও খুঁজে বের করি কিডন্যাপ হওয়া মানুষকে।’

‘তাই?’ ঢক করে উইস্কি গলায় ঢালল বেলা। অন্তর্ভেদী চোখে দেখল রানাকে। ফায়ার প্লেসে টাস্ করে ফাটল একটা কাঠের টুকরো। চারদিকে ছাল কমলা ফুলকি। ‘তা হলে তো তোমাকে অনেক ধরনের ঝুঁকি নিতে হয়!’

‘কখনও কখনও।’

‘অবশ্য কিছু পুরুষ আছে, যারা ঝুঁকি না নিয়ে বাঁচতে পারে না।’

ক্রমে চড়ছে রানার নেশা। নরম সুরে বলল, ‘জেসিকাও একই কথা বলত।

‘জেসিকা কি তোমার প্রেমিকা?’

‘আগে তা-ই ছিল। কয়েক মাস আগে ভেঙে গেছে বিয়ে।’

‘তা-ই? সরি! তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।’

‘হয়তো ভালর জন্যেই এমনটা হয়েছে। পরে আফসোস না করে আগেই সরে যাওয়া আসলে ঢের ভাল।’

‘আমি জানি মন ভেঙে গেলে কেমন লাগে।’

‘তবে কি তোমারও মন ভেঙে গেছে?

মাথা দোলাল বেলা। ‘তিনবছর একসঙ্গে থাকার পর ভেবেছি বিয়ে করব। কিন্তু তখন ম্যালোরি…’ চুপ হয়ে গেল মেয়েটা।

‘সবসময় সব হিসাব মেলে না,’ বলল প্রায় মাতাল রানা। ‘যতই তুমি চাও।’

‘তুমি কি মেয়েটাকে এখনও ভালবাস?’

‘সত্যি বলতে, আসলে বুঝি না,’ বলল রানা। ‘মেয়েটা কী ধরনের ছিল?’

কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল রানা, ‘রাগী হলেও কেউ বিপদে পড়লে বাড়িয়ে দিত সাহায্যের হাত। বলত: কখনও সংসারের জালে জড়াবে না। আমিও তা-ই ভাবতাম। কিন্তু পরে নিজেই বিয়ে করতে চাইল। তারিখও স্থির হলো। যেদিন ওর গ্রামে যাব, সে-ভোরে এল ই-মেইল। জানাল: একজনকে ভালবাসে। সেদিনই চার্চে ছিল ওদের বিয়ে।’

‘বলো কী!’ উইস্কি গিলতে গিয়ে বিষম খেল বেলা। সামলে নিয়ে বলল, ‘এ আবার কেমন মেয়ে! আমার তো মনে হচ্ছে, তুমি পড়ে গিয়েছিলে আস্ত ডাইনীর খপ্পরে!’

‘তুমি নিজে কেমন ধরনের পুরুষকে বিয়ে করতে চাও?’

‘সে এমন কেউ, যে আমার ভেতরে ভাল কিছু দেখবে। আর দ্বিধা না করে বলবে সেটা। অন্য কোন মেয়ের জন্যে পাগল হয়ে উঠবে না। তবে, রানা, আসলে জানো, দুনিয়া থেকে বহু আগে বিদায় নিয়েছে সত্যিকারের ভালবাসা। আমি আশপাশে একজনও দেখি না, যে স্বার্থ ছাড়া এক পা এগোয়।’

হাসল রানা। ‘আমিও আছি তোমার তৈরি কাতারে।

মাথা নাড়ল বেলা। ‘তোমাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তুমি আসলে অন্য ধরনের মানুষ। রানার দিকে গ্লাস বাড়িয়ে দিল, মেয়েটা। ‘দাও দেখি আরেক ঢোক আগুনে পানি।’

ভাবতে গিয়ে বিস্মিত হলো রানা, কত অনায়াসেই না গড় গড় করে বলে দিয়েছে জেসিকার উপেক্ষণ। আর সেটা করেছে চরম নিঃসঙ্গতা থেকে! বেলার হাতে উইস্কি ভরা গ্লাস দিতে গিয়ে ওর মনে পড়ল, সারা দিন কিছু খায়নি ও। সকালেও নাস্তার বদলে গিলেছে উই স্কি। তারপর মিসেস অ্যাপলউড দিলেন পুরো তিন পাইন্ট বিয়ার। এখন ঘোলা লাগছে ওর মগজ। রানা টের পেল, অনুচিত হবে আর ড্রিঙ্ক করা। তবুও উইস্কিতে ভরে নিল গ্লাস। জানতে চাইল, ‘এমন কী ঘটল যে বইটা আর লিখবে না?’

কাঁধ ঝাঁকাল বেলা। ‘ভেবেছিলাম বইটা জমবে। কারণ, আগে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ওপরে বায়োগ্রাফি লেখেনি কেউ। রিসার্চের জন্যে সাতমাস এদিকে ঘুরেছি। এ-কাজে ক’বার ফিরে গেছি ইংল্যাণ্ডে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, কাজ শেষ করতে পারব না। তাই আগামীকাল ফিরছি নিজের দেশে।’

মেয়েটা আকর্ষণীয়া, আন্তরিক ও সহৃদয়। আগামীকাল সে চলে যাবে শুনলে হতাশ হবে পরিচিত যে-কেউ। অবশ্য কারও সঙ্গেই জড়িয়ে যাওয়ার কোন ইচ্ছে রানার নেই। নরম সুরে বলল ও, ‘দীর্ঘ সাতমাস গবেষণা করার পর ভাবছ হাত গুটিয়ে নেবে? বলবে, আসলে কী কারণে হারিয়ে গেল উৎসাহ?’

‘উৎসাহ হারিয়ে যায়নি। লেডি স্টার্লিংফোর্ডের জীবনের কাহিনী সত্যিই চমকে দেয়ার মত।’

‘আমাকে কি শোনাবে তাঁর অতীত?’

‘সত্যিই জানতে চাও?’

‘তোমার বলতে আপত্তি না থাকলে শুনব।’

শ্রাগ করল বেলা। ‘বাথ-এ আঠারো শ’ পঁচিশ সালে জন্ম নেন জেনিফার হলওয়ে। __ ষোলো বছর বয়সে প্রথম দর্শনে তাঁকে পছন্দ করে হবু বর লর্ড অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড। বয়সে তিন বছরের বড় সে। কিন্তু ততদিনে বিখ্যাত হয়ে গেছে উদ্ভিদ-বিজ্ঞানী ও কেমিস্ট হিসেবে। কমবয়সে হাতে এসেছে পরিবারের বিপুল সম্পদ। যেমন ধনী, সাহসী, তৈমনি সুদর্শন এক যুবক। মাত্র ক’দিনে জয় করল সে জেনিফারকে। বলা চলে প্রায় উড়িয়ে আনল এ-দেশে। কিন্তু সুখ হলো না তাদের দাম্পত্য জীবনে। জেনিফার বুঝলেন, চারপাশের মানুষের ওপর অত্যাচার চালাতে অভ্যস্ত লর্ড স্টার্লিংফোর্ড। কাউকে মানুষ বলেই মনে করে না সে।’

‘আমিও সেটাই শুনেছি।’

‘এ-কথাই বলে মানুষ নরপশু ছিল লোকটা। জমিদারীর হর্তাকর্তা হিসেবে তার উচিত ছিল আইনের শাসন বজায় রাখা। ছিল একলাখ একরেরও বেশি জমি। উনিশ শতকে নিজের এলাকায় গরীব কৃষকের কাছে সে ছিল সত্যিকারের ঈশ্বর। কিন্তু তার শাসনামলে চলল চরম নির্যাতন। এরপর আঠারো শ’ সাতচল্লিশে মহাদুর্ভিক্ষে দেশটা হলো খিদেভরা ভয়ঙ্কর এক নরক। মর্মান্তিক সে-দুর্যোগে মানুষের করুণ পরিণতি জানলে শিউরে উঠবে যে-কেউ।’

ইতিহাসবিদ না হয়েও বইয়ে এসব পড়েছে রানা। সাধারণ মানুষের জন্যে আয়ারল্যাণ্ড তখন ছিল হাবিয়া দোজখ। আজও মায়েরা তাদের বাচ্চাদেরকে বলে: কীভাবে খেতে না পেয়ে মরেছে এই দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ।

‘কিছুদিনের ভেতরে মরল দশ লাখ মানুষ,’ বলল রানা। ‘আয়ারল্যাণ্ডের প্রধান খাবার আলু। সে-ফসল নষ্ট হওয়ায় মানুষের বেঁচে থাকার আর কোন অবলম্বন ছিল না।’

‘নামকরা ইতিহাসবিদেরা বলেন: দুর্ভিক্ষে মারা গেছে বিশ লাখ মানুষ,’ শুধরে দিল বেলা। ‘এ-দেশে তখন আশি লাখ মানুষ। দু’হাজার তিন সালে ডারফুরের দুর্ভিক্ষে মারা গেছে একলাখ মানুষ। ওই এলাকার জনসংখ্যা দু’কোটি সত্তর লাখ। এ-থেকে বুঝবে, কী মারাত্মক ছিল আয়ারল্যাণ্ডের আকাল। মাছির মত মরেছে মানুষ। গভীর গর্ত খুঁড়ে লাশের ওপরে ঢেলে দিয়েছে নতুন লাশ। এমনও হয়েছে, অতিদুর্বল অনেকে বেঁচে আছে, কিন্তু শরীরে শক্তি নেই যে কবর থেকে প্রতিবাদ করবে। চারপাশে চরম খিদে নিয়ে অসংখ্য মানুষ। একবার এক বর্গাচাষী বাগান থেকে বাচ্চার জন্যে একটা আপেল সংগ্রহ করেছিল বলে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারে লর্ড অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড।’

‘ভাল লোককেই বিয়ে করেছিলেন লেডি হলওয়ে।’

সেজন্যে সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে প্রচণ্ড মানসিক কষ্ট। তখন অত্যাচারী স্বামীর হাত থেকে রেহাই পেত না স্ত্রীরা। প্রতিটা সিদ্ধান্ত নিত পুরুষেরা। আইনগতভাবে যখন খুশি স্ত্রীকে ধর্ষণ করতে পারত। যা খুশি করার অধিকার ছিল তাদের হাতে। আমার ধারণা: এ-সুযোগ হাতছাড়া করেনি লর্ড স্টার্লিংফোর্ড। অবশ্য লেডির ডায়েরিগুলো হাতে পেলে বহু কিছুই বুঝতাম।’

‘ডায়েরি লিখতেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড?’

‘এ-দেশে এসে নিয়মিত তা-ই করেছেন। ওগুলো পেলে বহু কিছুই পরিষ্কার হতো আমার কাছে।’

‘ডায়েরিগুলো কি হারিয়ে গেছে?’ জানতে চাইল রানা। মাথা নাড়ল বেলা। ‘প্রায় সবই আছে এ-দেশের এক প্রফেসরের কাছে। তিনি ইতিহাস সংরক্ষণ করেন। তাঁরই ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে সেসব। আমি যোগাযোগ করেছি তার সঙ্গে, কিন্তু ডায়েরি দেখতে দেবেন কি না, জানাননি এখনও। এখন তাঁর ফোনের জন্যেই অপেক্ষা করছি।’

‘বুঝলাম।’

‘যাই হোক, পরবর্তী সময়ে লেখা লেডি জেনিফারের কিছু চিঠি পেয়েছি। তাতে আছে দুঃসহ বৈবাহিক জীবনের বর্ণনা।

‘স্বামী মারা গেলে আয়ারল্যাণ্ড থেকে চলে যান তিনি?’

‘না, ওই লোক মরেছে বেশ পরে। আট বছর নরকে বাস করে এক আত্মীয়ের সাহায্য নিয়ে ইংল্যাণ্ডে চলে যান মহিলা। আর তখন থেকেই বদলে যায় তাঁর জীবন। শুরু করেন মেয়েদের অধিকারের পক্ষে লেখালেখি। বই লেখেন কয়েকটা কবিতা ও উপন্যাসের। দরিদ্র নারী-শিক্ষার জন্যে গড়ে তোলেন একটি স্কুল।’

‘অর্থাৎ নাগপাশ থেকে রেহাই পেয়েছিলেন,’ বলল রানা।

‘তা আসলে নয়। জীবনে খুব স্বল্পস্থায়ী হয় ভাল সময়। তাঁর এক চিঠি অনুযায়ী: আঠারো শ’ একান্ন সালের গ্রীষ্মে আইনি জটিলতায় পড়েন তিনি। ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়। যা জেনেছি, তাতে মহিলা যোগাযোগ করেন লণ্ডনের নামকরা এক আইনজ্ঞের সঙ্গে। তাঁর নাম ছিল স্যর মার্টিন হাডসন। তিনি নিজেও ছিলেন খুব রহস্যময় মানব।’

‘বলতে থাকো, আমি শুনছি।’

কাঁধ ঝাঁকাল বেলা। সরকারের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ ছিল তাঁর। অনেকে বলত তিনি গুপ্তচর। কেন তাঁর সঙ্গে লেডি স্টার্লিংফোর্ড যোগাযোগ করেন, তা জানা যায়নি অবশ্য সে-সময়ে ক্যাড্রিক ডাফ ঘটনায় … ‘

‘সরি? আমি তোমার কথা বুঝতে পারিনি।’

দোষটা আমার। ক্যাড্রিক ডাফ ছিল একজন শিক্ষক। তাকে স্কুলে চাকরি দিয়েছিলেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড। তখন জুলাই মাস। শিক্ষকের বয়স সাতাশ। সুদর্শন। আত্মবিশ্বাসী। দুর্দান্ত সাহসী মানুষ। এরপর জানলাম, লেডি স্টার্লিংফোর্ডের প্রেমে পড়েছে সে। যদিও লেডি তাকে প্রত্যাখ্যান করলে, ডাফ ধরে নেয় জেনিফার অন্য কাউকে ভালবাসেন। তখন প্রচণ্ড রেগে গিয়ে পিস্তল সংগ্রহ করে গুলি করে লেডির বুকে। বুঝতেই তো পারছ… খুন হন জেনিফার স্টার্লিংফোর্ড।’

‘অর্থাৎ, আরও রহস্যের জন্ম দিয়ে মারা গেলেন তিনি।’

তোমাকে বলেছি, নিরেট পাথরের বুক থেকেও তথ্য বের করতে পারি। সেজন্যেই আমি একমাত্র মানুষ, যে ভাল করেই জানে: কোনভাবেই লেডি স্টার্লিংফোর্ডের প্রেমিক ছিল না সেই শিক্ষক। ডাফ ছিল সমকামী। আসলে তাকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছিল। খুনি জানত, ক্যাড্রিক ভুলেও চাইবে না সমকামী হিসেবে সমাজে প্রমাণিত হতে। তার ছিল পারিবারিক সম্মান হারাবার ভয়। ফলে উপায় না দেখে মুখ বন্ধ রাখে সে।’

‘বুঝলাম। কিন্তু সেক্ষেত্রে কে খুন করল লেডিকে?’

‘তার নাম বিলি ক্র্যাকার। পেশাদার খুনি। যদিও কে তাকে কাজটা দিল, সেটা জানার আগেই তো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে বই লেখার কাজ।

‘আঠারো শ’ একান্ন,’ বলল রানা। ‘একই বছরে নিজের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করে স্টার্লিংফোর্ড।’

‘শুধু তা-ই নয়, মরে একই মাসে। দুটি মৃত্যুর মাঝে ছিল মাত্র দু’সপ্তাহ। জেনিফার খুন হন সেপ্টেম্বরের সাত তারিখে। আর তাঁর প্রাক্তন স্বামী মারা গেছে একুশ তারিখে।’

‘হয়তো স্ত্রীকে হারিয়ে আত্মগ্লানি থেকে আত্মহত্যা করেছে, বলল রানা।

ওর কথায় নাক কুঁচকাল বেলা। ভাবলে কী করে যে তার মত এক নরপশু মানসিক কষ্টে মরবে!’

‘কী জানি!’ বলল রানা, ‘আমি তো আর লেখক নই। তবে মনে হচ্ছে, দারুণ কাহিনী পেয়েও ছেড়ে দিচ্ছ। নাটকীয়তা, খুন, অবিচার, কেলেঙ্কারি, চক্রান্ত-কী নেই প্লটে!

অনিশ্চয়তায় ভুগছে বেলা। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘তোমাকে আগেই বলেছি, এরপর ঘটেছে আরও কিছু ঘটনা।’

মেয়েটার মুখে দুশ্চিন্তা ও উত্তেজনার ছাপ দেখছে রানা ‘তুমি বলেছ, রিসার্চ করতে গিয়ে অস্বাভাবিক কিছু জেনেছ,’ বলল ও। তুমি কি সে বিষয়ে কিছু বলতে চাও?’

মাথা দোলাল বেলা। ‘ক’দিন আগে অন্যকিছু জানলাম।’

‘সেটা কী?’

‘এমন কিছু, যেজন্যে বদলে গেছে সব। তাই বাধ্য হয়ে বাদ দিচ্ছি বইটি লেখার চিন্তা। আমার ভুল না হলে, এবার বাকি জীবনে বই না লিখলেও আমার ভালভাবেই চলে যাবে।’

‘তা হলে তো পেয়ে গেছ সোনার খনি,’ হাসল রানা।

‘সত্যিই তা-ই। রিসার্চের সময় স্রেফ কপালের জোরে পেয়েছি এমন এক তথ্য, যেটা পাওয়ার কথা নয়। যেন আমার জন্যেই অপেক্ষায় ছিল ওটা। আপাতত আর কিছু বলব না। তুমি আবার কিছু মনে কোরো না, রানা।’

‘যদিও সত্যিই আমি কৌতূহলী হয়ে উঠেছি,’ বলল রানা, ‘একটু আগে বললে গোপন কিছুই বলবে না, সেক্ষেত্রে এত কিছুই বা জানালে কেন?’

‘তোমার কথা শুনে,’ বলল বেলা, ‘তুমিই তো বলেছ, মানুষ বিপদে পড়লে তাদেরকে সাহায্য করো।’

‘বলেছি আগে এসব করতাম। তার সঙ্গে তোমার এই কাহিনীর কীসের সম্পর্ক?

‘তুমি কি এখনও… মানে… সত্যিই সব জানতে চাও?’

‘তুমি বলতে চাইলে নিশ্চয়ই শুনব,’ বলল রানা।

‘আসলে… এ-ব্যাপারে যা জেনেছি… তা ভয়ঙ্কর। তুমি এসব জানলে যে-কোন সময় বিপদে পড়বে।’

‘তা-ই?’

‘হ্যাঁ, এসব তথ্য নিয়ে নাড়াচাড়া করলে খেপে যাবে ক্ষমতাশালী কিছু লোক। তারা আছে গুরুত্বপূর্ণ সব পদে। তাই মনে হচ্ছে এবার বোধহয় যোগ্য কারও সাহায্য লাগবে আমার।’

‘এই যোগ্য মানুষটা কী ধরনের হবে?’

যেমন ধরো তুমি। হয়তো তোমার মত যোগ্য এক বডিগার্ড লাগবে আমার।’

‘তুমি কি ঠাট্টা করছ?’ বেলার চোখে তাকাল রানা।

‘মোটেই তা নয়। তুমি বলেছ, তোমার হাতে আপাতত কোন কাজ নেই। তাই ভাবছি, তুমি যদি আমার সঙ্গে…’

‘সত্যিই তোমার বডিগার্ড লাগবে?’

‘তেমনই তো মনে হচ্ছে!’

‘কিন্তু তুমি তো আমাকে ভাগ করে চেনোই না!’

‘আমি একজন মেয়ে। চোখ দেখে অনেক কিছুই বুঝি। তুমি কখনও কারও সঙ্গে বেইমানি করোনি।’

‘আমি পেশাদার বডিগার্ড নই,’ বলল রানা। ‘তা ছাড়া…’

‘এ-ও বুঝেছি, তুমি আছ খুব দ্বিধার ভেতরে,’ মাথা দোলাল বেলা। ‘আমার অনুচিত হয়েছে তোমাকে চিন্তিত করে তোলা। সত্যি লজ্জা পাচ্ছি যে, এত কথা বলেছি তোমাকে।’ বারকয়েক মাথা নাড়ল বেলা। চোখ পিটপিট করে তাকাল হাতের গ্লাসের দিকে। তারপর নিচু স্বরে বলল, ‘আমি বোধহয় বেশি ড্রিঙ্ক করে ফেলেছি। মাথা বনবন করে ঘুরছে। বোতলটা দেখেছ, রানা? আমরা প্রায় খতম করে দিয়েছি ওটা!’

‘বেশিরভাগই গেছে আমার পেটে,’ বলল রানা। ‘শোনো, বেলা, তোমার সত্যিই সাহায্য লাগলে উপযুক্ত লোক জোগাড় করে দিতে পারব। ফোন পেলেই হাজির হবে সে।

‘সত্যিই কি তা-ই?’

‘যদিও প্রথমে সবই খুলে বলতে হবে তোমার, নইলে যাকে কাজ দেব, সে কিছু না জেনে দায়িত্ব নেবে না।’

‘ব্যাপারটা লেডির ডায়েরির সঙ্গে সম্পর্কিত।’

গ্লাসের উইস্কিটুকু গলায় ঢালল রানা। ‘তিনি মারা গেছেন দেড় শ’ বছরেরও আগে। তা হলে এখন কেন তোমার বিপদ হবে? তা হলে কি তোমাকে হুমকি দিয়েছে কেউ?’

জবাব দেয়ার আগে হাতঘড়ি দেখে চমকে গেল বেলা। বিড়বিড় করে বলল, ‘সর্বনাশ, ভাবিনি এতক্ষণ ধরে গল্প করেছি! এবার যেতে হবে গেস্ট হাউসে। দশটায় কল দেব একজনকে!’

আজ রবিবার। রানা জানে এ-দেশে এই দিনে কোন কাজ করে না কেউ। ‘এখানে বসেই ফোন করতে পারো,’ বলল ও।

‘বলেছ, সেজন্যে ধন্যবাদ।’ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল বেলা। কখন যেন থেমে গেছে বৃষ্টি। সৈকতে সূর্যাস্তের কমলাটে রোদ। ‘আরও দেরি করলে অন্ধকারে হেঁটে ফিরতে হবে। তা-ই মনে হচ্ছে গেস্ট হাউসে চলে যাওয়াই আমার ভাল। ফোনে কথা বলতে হবে অন্তত আধঘণ্টা। অবশ্য তোমার প্রস্তাবটা আমার মনে থাকল। কথা দিচ্ছি, পরে তোমাকে সবই খুলে বলব। আমাকে তোমার ফোন নম্বর দাও। পরে কল দেব।’

‘আগামীকাল সকালে না হয় কথা হবে?’ বলল রানা, ‘আমরা বসতে পারি সেই চ্যাপটা পাথরের ওপরে।

মাথা নাড়ল বেলা। ‘না, সকাল সাড়ে সাতটায় আমাকে এয়ারপোর্টে নেয়ার জন্যে ট্যাক্সি আসবে।

‘মানা করে দাও,’ কটেজের পেছনে আঙুল তাক করল রানা। বাইরে আছে ভাড়া নেয়া টয়োটা প্রিমিয়ো। ‘তোমাকে গাড়িতে করে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেব। তখন শুনে নেব সব।’

ওর কথায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বেলার মুখ। তাতে কোন সমস্যা হবে না তো তোমার? মানে… ঘাড়ে চেপে বসছি না তো?

‘মোটেই নয়। কথাগুলো জরুরি হবে বলেই মনে হচ্ছে।’

তোমার মন মস্ত বড়, রানা,’ চেয়ার ছেড়ে হাতের গ্লাস টেবিলে রাখতে গিয়ে তাল হারাল বেলা। ফ্লিসের জ্যাকেট ও কাপড়ের ব্যাগ যে কাঠের চেয়ারে ঝুলছে, ওটার সঙ্গে হোঁচট খেল ও। কাত হয়ে মেঝেতে ঠাস্ করে পড়ল চেয়ার। বেলা পা পিছলে পড়ছে দেখে হাত বাড়িয়ে ওকে ধরে ফেলল রানা। মেয়েটার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে ভাঙল গ্লাস। নানাদিকে ছিটিয়ে গেল ক্রিস্টালের ধারাল টুকরো।

‘হায়, যিশু!’ বলল বেলা। ‘সত্যি আমি দুঃখিত!’

যে-কারও হাত ফস্কে ভাঙতে পারত,’ বলল রানা। ঝুঁকে সিধে করল চেয়ার। ‘আশা করি ক্ষতি হয়নি তোমার ল্যাপটপের।’

মেঝেতে ছড়িয়ে গেছে মেক-আপ কিট, হেয়ারব্রাশ, পারফিউম। ঝুঁকে ওসব তুলতে লাগল বেলা। তারই ফাঁকে বলল, ‘ডাস্টপ্যান আর ব্রাশ দাও, ভাঙা কাঁচ সরিয়ে ফেলি।’

‘লাগবে না,’ বলল রানা। ‘সব গুছিয়ে নাও, তোমার তো গিয়ে ফোন করতে হবে।’ ওর মনে হলো না বেলা পুরো সুস্থ। হাত ধরে ওকে সোজা হতে সাহায্য করল রানা। ‘ঠিক আছ? আমি কি তোমাকে গেস্ট হাউসে পৌঁছে দিয়ে আসব?

‘লাগবে না। লাজুক হাসল বেলা।

‘তা হলে সকালে দেখা হবে,’ বলল রানা, ‘গেস্ট- হাউসের সামনে থেকো। যাওয়ার পথে কথা সেরে নেব।’

‘সবকিছুর জন্যে তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ,’ রানার বাহু স্পর্শ করল বেলা। ‘ঠিক আছে, দেখা হবে সকাল সাড়ে সাতটায়।’ জ্যাকেট পরার পর কাঁধে ব্যাগ তুলে কটেজ ছেড়ে বেরিয়ে গেল মেয়েটা।

কিছুক্ষণ বেলার গমনপথে চেয়ে রইল রানা। তারপর দরজা বন্ধ করে ফায়ারপ্লেসের পাশের ড্রেসারের ওপর থেকে বোতল নিয়ে গ্লাসে ঢেলে নিল উইস্কি। ভাবল, ‘দেখি আগামীকাল কী বলে ও!’

আট
সৈকত ও বোল্ডারের মাঝের সরু পথে হেঁটে চলেছে বেলা। চট্ করে দেখে নিল হাতঘড়ি। মাত্রাতিরিক্ত উইস্কি গিলে ভোঁতা হয়ে গেছে ওর মগজ। নিজেকে মনে মনে বলল, ‘স্বাভাবিক হও! সামনে জরুরি কাজ! দেরি না করে ফিরতে হবে গেস্ট-হাউসে। বিশ মিনিট পর দিতে হবে ফোন।’

আজ যে-কথা হবে, তার ওপরে নির্ভর করছে বহু কিছু। দ্রুত না হাঁটলে মন ভরে অপূর্ব এক রঙিন সূর্যাস্ত দেখত বেলা। সৈকত প্রশান্তিময়। ঢেউয়ের আওয়াজ আর সিগালের কিচির-মিচির ছাড়া সবই যেন দারুণ কোন চিত্র। অবশ্য সৈকত সংলগ্ন পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে রুপালি এক জিপগাড়ি।

হাঁটতে হাঁটতে ভাবল বেলা, রানা আবার ধরে নেয়নি তো যে ফোনকলটি জরুরি নয়? আসলে মস্তবড় এক সুযোগ এসেছে ওর সামনে। একবার সফল হলে জীবনেও আর ভাবতে হবে না টাকার জন্যে।

বেলার মনে পড়ল রানার মায়াভরা চোখদুটো। আনমনে ভাবল, কাউকে ভালবাসলে সেই মানুষটা হয়তো হবে মাসুদ রানার মতই কেউ। নিজেকে বলল, ক’দিন এখানে রয়ে গেলে বুঝতে পারতাম মানুষটার মনের কথা। কিন্তু সেটা এখন সম্ভব নয়। নিউবারি না ফিরে উপায় নেই ওর। আগে জরুরি ব্যবসা, পরে আর সবকিছু।

রানার চিন্তা মন থেকে বিদায় করতে চাইল বেলা। ভাবতে লাগল হাজার হাজার মাইল দূরের একলোকের কথা। ঠিক সময়ে তাকে ফোন না দিলে ভেস্তে যাবে সব পরিকল্পনা।

ছত্রিশ ঘণ্টা আগে ফোন করে চমকে দিয়েছে তাকে। আর সে যখন অত টাকা দিতে রাজি হয়ে গেল, বেলা বুঝল ক’দিনের ভেতরে ডলারে উপচে পড়বে ওর বেডরুম। তখন চাইলে দুনিয়ার সবই কিনতে পারবে।

কথা বলা এখন জরুরি, কারণ এতক্ষণে হতভম্ব ভাব কাটিয়ে সতর্ক হয়ে উঠেছে লোকটা। টাকা দেয়ার ব্যাপারে সাবধানে কথা বলবে। তা-ই বেলাকেও হতে হবে হুঁশিয়ার। হয়তো এরই মধ্যে ফোনে যোগাযোগ করতে চেয়েও নিজেকে সংবরণ করেছে লোকটা।

গেস্ট-হাউসে ফিরে ফোন দেবে বেলা। ব্যাগের পকেটে পাউচে আছে স্মার্টফোন নোকিয়া এক্স৩০। ঝুঁকি হ্রাস করতে গিয়ে সঙ্গে রেখেছে বেলা কমদামি এক স্যামসাং মোবাইল ফোন। সরকারি আইনি সংস্থা জানবে না ওটার মালিক আসলে কে। হঠাৎ থেমে ব্যাগে যেখানে পাউচ থাকার কথা, জায়গাটা স্পর্শ করল বেলা। ঢোক গিলতে গিয়ে টের পেল শুকিয়ে গেছে ওর গলা। আরেহ্, ব্যাগে তো নেই পাউচটা!

‘হায়, ঈশ্বর!’ বিড়বিড় করল বেলা। ‘ওটা তা হলে কোথায় গেল? পাউচ কি তবে রয়ে গেছে রানার কটেজের মেঝেতে?

ব্যাগে টুকটাক জিনিস তোলার দৃশ্য মনে পড়ল ওর।

মেক-আপ, আয়না, হেয়ার ব্রাশ… পার্স…

তখন কি ব্যাগে তুলতে ভুলে গেছে পাউচটা?

নিজের ওপরে রেগে গেল বেলা। এজন্যেই কখনও মাতাল হতে নেই! পাউচ বোধহয় ঢুকেছে সোফার নিচে। তখন ওদিকে খেয়াল ছিল না ওর।

চট্ করে হাতঘড়ি দেখল বেলা। দশমিনিট পর ফোন করতে হবে! এখন ছুট দিলে সময়মত পৌছুতে পারবে রানার কটেজে। যদিও ওখানে বসে আলাপ করা উচিত হবে না। অবশ্য বাথরুমে ঢুকে মিউজিক ছেড়ে কথা বলা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে রানা কিছুই শুনতে পাবে না।

ঘুরে ফিরতি পথে চলল বেলা। চোখে পড়ল রুপালি সেই মাযদা জিপ। সৈকতের পাশের পথে এগিয়ে চলেছে ওটা। ড্রাইভার বোধহয় দেখছে সূর্যাস্তের চমৎকার দৃশ্য। হয়তো কাউকে খুঁজছে সে।

কিন্তু বেলা ঘুরে রওনা হতেই ইউ-টার্ন নিয়ে সৈকতের ঘাসে নামল জিপ। রুপালি বডি ও কালো কাঁচে প্রতিফলিত হলো সূর্যের লালচে শেষ আলো।

হঠাৎ করেই একরাশ সন্দেহ এল বেলার মনে।

জিপটা কি ওর পিছু নিয়েছে?

নিজেকে জিজ্ঞেস করল বেলা: আমি কি থমকে দাঁড়াব?

আমি স্থানীয় নই। ড্রাইভার কিছু জানতে চাইলেও জানাতে পারব না। তা ছাড়া, তাড়া আছে আমার!

বেলার মনে হলো, কোথায় যেন কী ঠিক নেই!

ওর এখন উচিত রানার কটেজের দিকে ছুটে যাওয়া!

বেলার তিরিশ গজ দূরে পৌঁছে গেছে মাযদা জিপ। একটু পর ওকে ধরে ফেলবে ড্রাইভার। ঘাসজমি পার করে নুড়িপাথরের প্রান্তরে নেমে এল জিপ। দুশ্চিন্তা আরও বাড়ল বেলার। শুকিয়ে গেছে বুক।’ মগজ থেকে উধাও হয়েছে নেশা। মনটা বারবার বলছে: কোথাও মস্ত কোন সমস্যা আছে!

ড্রাইভার চাইছে পথ রুদ্ধ করে দিতে!

ভয়ে ধড়ফড় করছে বেলার বুক। নিজেকে জিজ্ঞেস করল, ড্রাইভার আসলে কী চায় আমার কাছে? নির্জন এই সৈকতে কি কিডন্যাপ বা রেপ করবে সে? নাকি আরও ভয়ঙ্কর কিছু ভেবেছে লোকটা?

ভয় লাগতেই দৌড়াতে শুরু করল বেলা। আশা করছে একটু পর পৌঁছে যাবে রানার কটেজে।

হঠাৎ করেই বেড়ে গেল জিপের গতি। পেছনে ছিটকে দিচ্ছে নুড়িপাথর। ছোট এক বোল্ডারে হোঁচট খেয়ে আরেকটু হলে পড়ে যেত বেলা। বিড়বিড় করে অভিশাপ দিল নিজেকে। আরও জোরে ছুটল কটেজের দিকে। পেছনে ব্রেক কষে থেমে গেছে জিপ। ঝটাং শব্দে খুলে গেল দুই দরজা। গাড়ি থেকে নেমে, এল দু’জন যুবক। কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল বেলা। ওর দিকে চেয়ে আছে লোকদুটো। গাড়ির দরজা বন্ধ না করে দ্রুত ছুটে এল তারা।

বেলা বুঝে গেল, এরা এসেছে খারাপ কোন উদ্দেশ্য নিয়ে। একবার একজন বিরক্ত করতে এলে তার তলপেটে লাথি মেরে পালিয়ে গিয়েছিল বেলা। কিন্তু এখন সেই সুযোগ নেই। দৌড়ে পারবে না দুই যুবকের সঙ্গে।

একজনের মাথায় হুডি, অন্যজনের মাথায় বেসবল ক্যাপ। গম্ভীর চেহারা জানিয়ে দিচ্ছে, কোনভাবেই হাল ছাড়বে না তারা।

মস্ত বিপদে পড়ে ছোটার গতি আরও বাড়াল বেলা। ঝুলন্ত ব্যাগের ভেতরে ল্যাপটপ ঠাস্ ঠাস্ বাড়ি মারছে উরুতে। তাতে কমে যাচ্ছে দৌড়ের গতি। কাঁধ থেকে ব্যাগ নিয়ে মাটিতে ফেলে দিল বেলা। ছুটতে ছুটতে পেছনে তাকাল। ফুঁপিয়ে উঠল আতঙ্কে। এখন তীরবেগে আসছে দুই যুবক।

ঘাড় ফিরিয়ে আবারও পেছনে তাকাল বেলা।

না থেমেই ব্যাগটা তুলে নিয়েছে ডানদিকের যুবক।

এরা আমার কাছে কী চায়? দৌড়ের ফাঁকে ভাবল বেলা।

দু’দিকে চলেছে দুই যুবক। প্রথমজন বেলাকে ধরতে না পারলে বড় বোল্ডারের ওদিকে গিয়ে ওকে ধরবে অন্যজন।

পালাবার উপায় নেই বেলার!

এভাবেই খরগোশ শিকার করে শিকারি কুকুরেরা!

কটেজে যাবার আগেই ধরা পড়বে, বুঝে গেল বেলা। একবার ভাবল ছুটে নেমে পড়বে কি না সাগরে। পরক্ষণে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করল, আর একটু, তারপর পৌঁছে যাব রানার কটেজে!

.

মেঝে থেকে ক্রিস্টালের টুকরো ডাস্টপ্যানে তুলতে গিয়ে ভাবল রানা, বেলা তো চলে গেছে, এখন বড্ড একা লাগছে। আরও একটু ড্রিঙ্ক করলে হয়তো কাটবে নিঃসঙ্গতার বোধ।

এটা ওর জন্যে লোভনীয় চিন্তা।

যদিও মন বলছে: ‘খবরদার! যথেষ্ট! আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে দেরি না করে ব্যায়াম শুরু করবে!’

মনের আরেক অংশ বলছে: ‘আরে, বোকা, আরেকটু গিললে অসুবিধে আসলে কোথায়? খাও না! মানা করেছে কে?’

মেঝের সমস্ত ভাঙা ক্রিস্টাল তুলে কিচেনের রিসাইকেল বিনে ঢালল রানা। এরই ভেতরে গার্বেজ ক্যানে জমেছে উইস্কির খালি কয়েকটা বোতল। ঝাড় ও ডাস্টপ্যান কিচেনের কোনায় রেখে ফিরে এল রানা লিভিংরুমে। সিদ্ধান্ত নিল, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আধগ্লাস উইস্কি সত্যিই ওর কোন ক্ষতি করবে না।

টেবিল থেকে প্রায় খালি উইস্কির বোতল হাতে নিল রানা। গ্লাসে সোনালি তরল ঢেলে ঠোঁটে ঠেকাল। আর তখনই শুনতে পেল বাইরের শব্দগুলো।

আর্তচিৎকার করে উঠেছে এক মেয়ে!

ঝট করে হাত থেকে বোতল ও গ্লাস ড্রেসারের ওপরে রেখে জানালার দিকে চলল রানা। হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ওর কোমর লেগেছে টেবিলের কোণে। গুঁতো খেয়ে ঘুরে গেল প্যাডেস্টাল ল্যাম্প। জানালায় থেমে রানা দেখল, আশি গজ দূরে কটেজ লক্ষ্য করে ছুটে আসছে এক মেয়ে!

আর সে অন্য কেউ নয়, স্বয়ং বেলা ওয়েস!

পেছনে তেড়ে আসছে (শ্বতাঙ্গ দুই যুবক। রানার মনে হলো, তাদের বয়স ওর কাছা কাছি হবে। হালকা শরীর হলেও দৌড়ের ভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে পুরোপুরি ফিট। একজনের মাথার চুল কালচে, আর্মি ছাঁট। পরনে নেভি ব্লু জ্যাকেট। অন্যজনের পরনে বাদামি হুডি। তীরবেগে আসছে তারা। নীল জ্যাকেটের হাতে এখন বেলার কাপড়ের সেই ব্যাগ।

ঝাপসা চোখে ক’বার পলক ফেলল রানা। সিদ্ধান্ত নিতে পারল না যে ওর এখন কী করা উচিত।

ভয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় আর্তচিৎকার ছাড়ল বেলা। রানার নাম ধরে ডাকল: ‘রানা! রানা! বাঁচাও!’

হঠাৎ সতর্ক হয়ে উঠেছে রানা। ঘুরে দরজা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে। বেলা আছে এখন পঞ্চাশ গজ দূরে। ওকে প্রায় ধরে ফেলেছে লোকদু’ জন।

সামনের গেট খুলে বড় বোল্ডারের দিকে ছুট দিল রানা। ছোট এক পাথরে হোঁচট খেয়ে আরেকটু হলে পড়ে যেত। কোনমতে সামলে নিল নিজেকে। ভাবছে: ‘একদম বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি নিজের! এখন যা ঘটছে, যেভাবে হোক সেটা সামাল দিতে হবে!’

বেলাকে ধরে ফেলল দুই যুবক। রানাকে তাদের দিকে ছুটতে দেখেও তোয়াক্কা করছে না তারা। কাঁধ খামচে ধরে বেলাকে হ্যাঁচকা টানে ঘুরিয়ে নিল নীল জ্যাকেট, পরক্ষণে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল মাটিতে। ব্যথা পেয়ে কাতরে উঠেছে মেয়েটা।

প্রাণপণে ছুটছে রানা। বুকের ভেতরে পাগলা ঘোড়ার মত লাফ দিচ্ছে হৃৎপিণ্ড। কানে শোঁ-শোঁ আওয়াজ। ছুটন্ত রানা দেখল, উঠে দাঁড়িয়ে আক্রমণকারীদের কাছ থেকে সরে যেতে চাইছে বেলা। কিন্তু তখনই পেটে লাথি মেরে ওকে মাটিতে ফেলে দিল বাদামি হুডি।

প্রায় একই সময়ে পৌঁছে গিয়ে হুডিওয়ালার বুকে ডানকাঁধ দিয়ে গুঁতো মারল রানা। ফুসফুস ফাঁকা হতেই খাবি খেল যুবক। তার মুখে পুদিনা পাতার গন্ধ পেল রানা। ব্যথা পেয়ে পিছিয়ে গেলেও মাটিতে পড়ে গেল না যুবক। বেল্টের পেছন থেকে সামনে আনল হাত। এখন মুঠোয় খাটো এক কালো সিলিণ্ডার। ওটার একপ্রান্ত ধরে ঝাঁকি দিল সে। সড়াৎ করে, খুলে গেল পুলিশের ব্যাটন। বেশিরভাগ দেশে ওটা বেআইনি। অস্ত্রটা দিয়ে বেশি জোরে মারলে খুলি ফেটে বেরোবে মগজ।

বহুবার সশস্ত্র লোকের বিরুদ্ধে লড়ে রানা জানে, ওর প্রথম কাজ হবে ব্যাটন কেড়ে নেয়া। যুবক লোহার ডাণ্ডা তুলে বাড়ি মারার আগেই সামনে বেড়ে তার হাত ধরতে গেল রানা। ট্রেইণ্ড শরীর আগে বিদ্যুদ্বেগে নড়ত, কিন্তু মাসের পর মাস ব্যায়ামে অবহেলা ও অতিরিক্ত মদ্যপান ওকে করে দিয়েছে খুব ধীর। সাধারণ মানুষের চেয়ে দ্রুত হলেও পেশাদার খুনির বিরুদ্ধে জেতা ওর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

বিদ্যুদ্বেগে প্রতিক্রিয়া দেখাল দুই যুবক।

ব্যাটন দখল করতে হলে যত ক্ষিপ্র হওয়া উচিত, তা নয় মাতাল রানা। এক পা সরে গেছে হুডিওয়ালা, পরক্ষণে বাতাস কেটে হুইল শব্দে ব্যাটন নামাল রানার নাকের একইঞ্চি আগে। ঝট করে পিছিয়ে ছে রানা। ওর বুঝতে দেরি হলো না, বেলা আর ও আছে মস্তবড় বিপদে।

এদিকে নীল জ্যাকেটের ভেতর থেকে ব্যাটন নিল দ্বিতীয় যুবক। কবজির মোচড়ে দীর্ঘ হলো অস্ত্রটা।

হামলা হবে বুঝে বড় এক বোল্ডারের দিকে পিছিয়ে গেল রানা। কিন্তু তখনই খটাস্ করে ব্যাটন নামল ওর কলারবোনে। আরও দ্রুত পেছাতে গিয়ে পিংপং বলের মত গোল এক পাথরে পিছলে হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ল রানা। আগে হলে গড়ান দিয়ে ঝট করে উঠে দাঁড়াত। কিন্তু এখন সেটা ওর জন্যে অসম্ভব। বুট পরা পা মাথার পাশে লাগতেই চোখে দেখতে পেল সাদা এক ঝিলিক। রানার মনে হলো আগুন ধরে গেছে ওর খুলিতে। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উঠে দাঁড়াল। যে-কোন সময়ে ব্যাটন দিয়ে ওর মাথা ফাটিয়ে দেবে দুই যুবক!

অবশ্য এবার দয়াবশত রানারই পক্ষ নিলেন ভাগ্যদেবী নীল জ্যাকেট নড়ার আগেই সামনে বেড়ে তার ডান কবজি ধরে ফেলল রানা। ওটা মুচড়ে নিচে নিয়ে বামহাতের তালু দিয়ে ওপরে ঠেলল শত্রুর কনুই। ব্যথা পেয়ে হাত থেকে ব্যাটন ছেড়ে দিয়েছে যুবক। কবজি আটকে রেখে তার পেটে লাথি দিল রানা। যদিও জোর নেই ওর লাথিতে। ধরাশায়ী না হয়ে উল্টে রানার বাহু খপ করে ধরল নীল জ্যাকেট। ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়াতে গিয়ে রাশ বুঝল, শত্রুর শরীরে ষাঁড়ের মত জোর! যদিও বা হাতে ঘুষি মেরে ফাটিয়ে দিল যুবকের গালের ত্বক।

এদিকে কাছে চলে এসেছে হুডিওয়ালা। তার ব্যাটন ওপর থেকে নামতে দেখেও ঠিক সময়ে সরে যেতে পারল না রানা। স্টিলের ডাঙা ঠাস্ করে পড়ল ওর চোয়ালে। তীব্র ব্যথায় রানার মনে হলো মুখের ভেতরে ফেটে গেছে চল্লিশ এমএম গ্রেনেড।

নুড়িপাথরে ভরা জমিতে পা পিছলে ধুপ করে পড়ল রানা। দু’চোখে দেখতে পাচ্ছে অসংখ্য রঙিন নক্ষত্র। আর তখনই কপালের একপাশে ঠাস্ করে নামল ব্যাটন। পরের সেকেণ্ডে তৃতীয় বাড়ি মাথায় লাগতেই আঁধার এক অতল কূপে টুপ করে তলিয়ে গেল রানা।

নয়
বহু দূরে কোথায় যেন নানাধরনের আওয়াজ। ধীরে ধীরে জেগে উঠছে মাসুদ রানা। মাথার ভেতরে জট পাকিয়ে আছে অর্থহীন কিছু গর্জন ও প্রচণ্ড ব্যথা। বোধহয় যে-কোন সময়ে বিস্ফোরিত হবে ওর খুলি। কিছুক্ষণ পর পিটপিট করে চোখ মেলল রানা। আঙুল দিয়ে ডলে দেখল বাম চোখের ওপরে। জায়গাটা প্রায় অবশ হয়ে গেছে। ঝাপসা দেখছে ডান চোখে। চারদিকে রঙিন রশ্মি। উঠে বসতে চেয়েও ব্যর্থ হলো রানা। ইঞ্জিনের মত ধুপধুপ করছে মাথার ভেতরে।

খুব ধীরে ধীরে ফিরে এল ওর দৃষ্টিশক্তি। সৈকত ও বোল্ডারে এসে পড়েছে ঘুরন্ত নীল আলো। ফি-ফিয আওয়াজ তুলছে রেডিয়ো। কে যেন উঠিয়ে বসাল রানাকে। প্রচণ্ড শীত লাগছে বলে বারবার কেঁপে উঠছে ওর শরীর। মাথার ভেতরে তীব্র ব্যথা লাগতেই কুঁচকে গেল মুখ। চারপাশে কী যেন করছে কারা যেন। সৈকতের ধারে পুলিশের গাড়ি আর দুটো অ্যাম্বুলেন্স।

কিন্তু এগুলো এখানে কী করছে?

‘আমি একাই বসতে পারব,’ মুখ তুলল রানা। ওকে ধরে রেখেছে মধ্যবয়সী এক মহিলা। পরনে প্যারামেডিকদের পোশাক। শান্ত করতে গিয়ে কী যেন বলছে নরম স্বরে। যদিও একটা কথাও বুঝতে পারছে না রানা। একটু দূরে জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে ক’জন। এখানে কী ঘটেছে তাদের কাছ থেকে জেনে নেবে ভেবে উঠে দাঁড়াল রানা, কিন্তু তাতে হঠাৎ করে বেড়ে গেল মাথার ব্যথা। ঝিমঝিম করছে শরীর।

ওকে ধরে রাখল মহিলা প্যারামেডিক। কয়েক পা নিয়ে বসিয়ে দিল একটা বোল্ডারের ওপরে। যন্ত্রণা-ভরা মাথা নিয়ে অস্থির লাগছে রানার। দু’হাতে চেপে ধরল কপালের দু’দিক। ভিজে গেল হাতের দু’তালু। নীল আলোয় রানা দেখল আঠাল তরলটা আসলে রক্ত। সাবধানে হাত বোলাল মুখে। একটু পর বুঝতে পারল, কোথা থেকে এসেছে রক্ত। ভিজে গেছে ওর টি-শার্ট। কাঁধের ওপরে কম্বল রেখেছে কেউ। রক্তে লাল হয়ে গেছে ওটা। বুজে যাওয়া বাম চোখের ওপরে আঙুল রেখে ওটার কী হয়েছে বুঝতে চাইল রানা।

‘চোখে হাত দেবেন না,’ সতর্ক করল প্যারামেডিক I এখন তার কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে রানা। ফোলা চোয়ালে আঙুল ছোঁয়াতে গেলেই লাগছে মারাত্মক ব্যথা। চোখের ওপর থেকে রক্ত মুছল রানা। আবার দেখতে পেল। তবে দৃষ্টি খুব ঝাপসা। ওর মনে পড়ল, দু’জন যুবক মিলে পিটিয়ে অজ্ঞান করেছে ওকে। চোখে ভাসল পুলিশের ব্যাটন হাতে তাদের দু’জনের চেহারা।

‘বেলা?’ দুর্বল গলায় বলল রানা। ঘুরে তাকাল চারপাশে। ‘বেলা কোথায় গেছে?’

কোথা থেকে যেন এসে এক পুলিশ অফিসার কথা বলল প্যারামেডিক মহিলার সঙ্গে। রানা শুনল: ‘একে জেরা করতে হবে।’

জবাবে প্যারামেডিক বলল, ‘আগে ওকে চিকিৎসা দিতে হবে। হাসপাতালের কথা জানাল মহিলা।

‘বেলা কোথায়? আবারও জিজ্ঞেস করল রানা। ‘ওকে সাহায্য করতে হবে।’

‘আপনি সেটা আর পারবেন না,’ বলল প্যারামেডিক।

ওর ওপরে হামলা করেছে লোকদুটো, জানাল রানা।

কেন যেন ওর কথা শুনতে চাইছে না কেউ!

এদের কি মাথা নষ্ট হয়ে গেল? ভাবল রানা। জড়ানো স্বরে কথা বলতে গিয়ে ব্যর্থ হলো। মেলে রাখতে পারল না দু’চোখ। একটু পর ওকে শুইয়ে দেয়া হলো স্ট্রেচারে। রওনা হলো কারা যেন। ধীরে ধীরে পেরোচ্ছে সময়। ধুম শব্দে বন্ধ হলো একটা দরজা। গর্জে উঠল ইঞ্জিন। রানা বুঝল, ও আছে চলন্ত এক গাড়িতে। পাশেই বসে আছে কেউ। হয়তো সেই মৃদুভাষী মহিলা প্যারামেডিক। ওকে নেয়া হচ্ছে বহু দূরে কোথাও। রানার মনে হলো, ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যাচ্ছে ও মেঘের ভেলায়। অবশ হয়ে এল ওর শরীর।

তারপর হঠাৎ অন্য এক পরিবেশে নিজেকে দেখতে পেল রানা। চারপাশে অত্যুজ্জ্বল সাদা আলো। দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে দেয়াল। ওপর থেকে ওর দিকে চেয়ে আছে কারা যেন। রানা বুঝল, গার্নিতে করে ওকে নেয়া হচ্ছে ধবধবে সাদা এক করিডর ধরে। ‘আমি ঠিকই বেলাকে বাঁচাব,’ বলেই জ্ঞান হারাল রানা।

.

পরের ক’ঘণ্টা রানার কাটল অদ্ভুত এক ঘোরের ভেতরে। আচ্ছন্ন এক পরিবেশে জানল না, কখন রক্তাক্ত পোশাক খুলে হাসপাতালের রোব পরিয়ে গার্নি থেকে নিয়ে ওকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে পর্দাঘেরা কিউবিকলের বেডে। চারপাশে ক’জনকে হাঁটাচলা করতে দেখল। তারা এল আবার বিদায় নিল। ওর মুখে ঝুঁকে কী যেন করল কেউ। মানুষগুলো বোধহয় ধরে নিয়েছে ও ভিনগ্রন্থে কোন জন্তু। একবার বাঁকা সুঁই দিয়ে সেলাই করল সাদা পোশাকে গণ্ডারের মত একলোক। তখন কপালে সুড়সুড়ি লাগল রানার। বুঝে গেল, খুলির ফেটে যাওয়া ত্বক সেলাই করা হচ্ছে। মনে পড়ল অতীতে ক্ষত সেলাইয়ের স্মৃতি। এখন যা হচ্ছে, সেটা আসলে কিছুই নয়। দু’বার রানা বলতে চাইল, আমি ঠিক আছি। কিন্তু এত বেশি দুর্বল যে কথা বলতে পারল না। এরপর ভারী হয়ে গেল ওর চোখের পাতা।

কনকাশন হয়েছে কি না সেটা জানতে গিয়ে কোনমতেই- ওকে ঘুমাতে দিল না ডাক্তারেরা। তাদের ভেতরে টাইয়ে ফুলের ছোপ দেয়া ডাক্তার পিটার হাম্বল শুকনো রসিকতার রাজা। একটু পর পর টর্চ মেরে ওর চোখ দেখল সে। জানতে চাইল মাথা-ব্যথা বা দুর্বলতা আছে কি না। রানা জানাল, ওর কিছুই হয়নি।

বমি করছে না রোগী। ফ্যাকাসে হয়নি ত্বক। জড়িয়ে যাচ্ছে না কথা। ফুলে ওঠেনি চোখের পাতা। রোগীর ভেতরে কনকাশনের লক্ষণ না দেখে খুশি হলো ডাক্তার হাম্বল। অবশ্য রোগীর তীব্র মাথা-ব্যথা ও মাথাঘোরা নিয়ে দুশ্চিতা কাটল না তার। হুইল চেয়ারে করে রানাকে নেয়া হলো এক্স- রে রুমে। ওখানে ফাটল ধরা খুলি পরীক্ষা করে আবার ফেরত নিল কিউবিকলে। কোনভাবেই রানাকে ঘুমাতে দিল না হাম্বল। ওর ঘাড়ের নিচে দিল দুটো মোটা বালিশ। যতবারই রানা জিজ্ঞেস করল, কোথায় আছে বেলা, বা কী হয়েছে ওর, একটা কথাও বলল না কেউ। সৈকতে দুটো অ্যাম্বুলেন্স দেখেছে রানা। ওর ধারণা, ওটার একটার ভেতরে ছিল বেলা।

আধঘণ্টা পর পর নার্স পরখ করে দেখল নিউরো রিঅ্যাকশন।

‘মাথায় সামান্য আঘাত,’ তাকে জানাল রানা। ‘মরলে তো আগেই মরে যেতাম।

রাত তিনটেয় সন্তুষ্ট হলো ডাক্তার হাম্বল। তার ধারণা: কনকাশন হলেও এখন আর কোমা হবে না রানার। কিউবিকল থেকে সরিয়ে ওকে নেয়া হলো এক ওয়ার্ডে। ঘুমাবার অনুমতি পেল রানা। আগেই নানান ওষুধ দিয়ে ভোঁতা করে দেয়া হয়েছে ওর মগজ। বালিশে মাথা রেখে অদ্ভুত ভাসমান এক জগতে সাঁতরাতে লাগল রানা।

অস্বস্তিকর ঘুমের ভেতরে দেখল বারবার বেলাকে। আলাপ করতে করতে কোথায় যেন চলে গেল মেয়েটা। আচ্ছন্নতার ভেতরে রানা বুঝল, আগামাথা নেই এসব স্বপ্নের। এরপর যে স্বপ্ন এল, সেটা ভয়ঙ্কর। কটেজের জানালা থেকে রানা দেখল সৈকতে বেলাকে তাড়া করছে দুই লোক। তাদের দিকে ছুটে গেল ও। কিন্তু তখনই বাতাস কেটে নেমে এল ব্যাটন…

চমকে গিয়ে ঘুম ভাঙল রানার। চোখ মেলে দেখল মাথার ওপরে সাদা ছাত। জানালার পর্দা গলে মেঝে ও বেডে পড়েছে সোনালি রোদ। রাত কেটে কখন যেন চলে এসেছে সকাল।

বালিশে মাথা কাত করে রানা দেখল, ওয়ার্ডের শেষমাথায় আছে ওর বেড। বেশিরভাগ বেডে বয়স্ক সব লোক। একজন ভীষণ হুঁকোরে কাশি দিচ্ছে। মস্ত ঘরে পায়চারি করছে হাতির মত মোটা এক মহিলা মেট্রন। দূর দেয়ালের ঘড়িতে বাজে আটটা সতেরো।

মাথাঘোরা কমলেও দপ দপ করছে রানার খুলি। ব্যথার পেছনে ব্যাটনের যে অবদান, তার চেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে হ্যাংওভার। মরা কাঠের মত গলা শুকিয়ে গেছে বলে রানার মনে হলো, ভাল হতো কয়েক আউন্স উইস্কি গিলতে পারলে।

হাত তুলে স্পর্শ করল কপালের ব্যাজে। ক্ষত টিপে দেখতে গিয়ে আঁৎকে উঠল ব্যথায়। খচ খচ করছে ওর মন। আগে কখনও আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে এভাবে ব্যর্থ হতে হয়নি ওকে। অথচ গতকাল অসহায় এক মেয়েকে বিপদের সময়ে সাহায্য করতে পারেনি।

বিছানায় শুয়ে নিজেকে দোষারোপ করতে লাগল রানা। বারবার মনে প্রশ্ন জাগল: বেলা এখন কোথায়? সুস্থ আছে তো মেয়েটা? আবার কখন দেখা হবে ওর সঙ্গে?

ওয়ার্ডের ঘড়িতে সাড়ে আটটা বাজতেই পাকা সিদ্ধান্ত নিল রানা। এবার বেরোতে হবে ওকে এই বন্দিশালা থেকে। এরপর কারও কাছ থেকে জেনে নেবে বেলা এখন কোথায় আছে। বেডকভার সরিয়ে বিছানা ছেড়ে নামবে, এমন সময় নীল পোশাকে খুনখুনে এক বুড়ো আর্দালি থামল ওর বেডের পাশে। ট্রলির ওপরে হাসপাতালের বিস্বাদ নাস্তা। খাবার দেখেই বিদ্রোহী হয়ে উঠল রানার মন। ঘাড় কাত করে মানা করল বুড়োকে। কিন্তু ট্রলি থেকে নিয়ে বেড়ে নাস্তার ট্রে নামিয়ে দিল বুড়ো।

নাস্তা করার চেয়ে বেলার খোঁজ নেয়া এখন অনেক বেশি জরুরি। বুড়োকে জিজ্ঞেস করল ‘রানা, ‘এখন কোথায় আছে বেলা?’

জবাবে ট্রে দেখাল আর্দালি। ‘আগে নাস্তা করে নিন।’

‘পারলে অন্য কাউকে আপনার আনা খাবার গিলিয়ে দিন,’ প্রতিবাদ করল রানা।

ওর কথা শেষ হতে না হতেই আজরাইলের মত হাজির হলো হাতিসম মহিলা মেট্রন। বাজখাই গলায় বলল সে, ‘নাস্তা করতে হবে। নইলে পেইন কিলার দিতে পারব না।’

মহিলা ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বাধ্য হয়ে টোস্ট করা পাউরুটি ও দুধ খেল রানা। তারই ফাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘বেলা এখন কোথায় আছে?’

পলকের জন্যে মেট্রনের চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি দেখল রানা। জানতে চাইল, ‘বেলা সুস্থ আছে তো? আমাকে বলুন, ওকে এখন কোথায় পাব?’

‘আমি সেটা বলতে পারব না,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল মেট্রন।

‘তা হলে যে বলতে পারবে, তেমন কাউকে খুঁজে নেব, গা থেকে চাদর সরিয়ে দিল রানা।

‘ভুলেও বেড থেকে নামবেন না,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল মহিলা। দু’হাত কোমরে। রানা লক্ষ্মী ছেলের মত শুয়ে না পড়লে জোর খাটাতে বোধহয় দ্বিধা করবে না সে। কাছ থেকে মেট্রনের বাইসেপ দেখে রানার মনে হলো, এই মহিলা বোধহয় পৃথিবীর সেরা পেশাদার ওজন উত্তোলনকারিণী

‘আমার পোশাক কোথায়?’ মহিলার চোখে কঠোর দৃষ্টি ফেলে বেডের ওদিক দিয়ে নেমে পড়ল রানা। এত বেশি রেগে গেছে যে, ভয় পেয়ে এক পা পিছিয়ে গেল মেট্রন।

‘আমার রোগী দেখি আজ বেশ সুস্থ,’ বলে উঠল কে যেন। ঘুরে ওয়ার্ডের দরজার দিকে তাকাল রানা।

এইমাত্র ঘরে ঢুকেছে ডাক্তার হাম্বল। আজকের টাই আরও ফুলেল। ডাক্তারের পেছনে ঘরে পা রেখেছে তিক্ত চেহারার একলোক। সঙ্গে তরুণী এক মেয়ে।

তাদেরকে হাসপাতালের কর্মী বলে মনে হলো না রানার।

‘আপনার কাছে অতিথি এসেছেন,’ বলল ডাক্তার হাম্বল। রানা, এখন আগের চেয়ে সুস্থ কি না, সেটা জেনে নেয়ার জন্যে ওকে বেড়ে বসতে অনুরোধ করল সে।

বিরক্ত হলেও ডাক্তারের কথা মেনে নিল রানা। চট করে ওর স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করল হাম্বল, তারপর দুই অতিথিকে দেখিয়ে দিল দুটো চেয়ার।

তিক্ত চেহারার লোকটা তিনদিকের সাদা পর্দা টেনে ওয়ার্ড থেকে আলাদা করে দিল রানার বেড়।

ডাক্তার বিদায় নিতেই চেয়ার টেনে বসল তারা। তাদের আগমনে কৌতূহলী হয়ে উঠেছে ওয়ার্ডের বয়স্ক রোগীরা।

কালবেলা – ১০ (মাসুদ রানা)

টুলসা সিটি।

এখন গভীর রাত। কর্কশ ঐকতান তুলেছে বেশ কিছু ঝিঁঝি। থেমে থেমে হুঙ্কার ছাড়ছে বাঘা দুই কুকুর। ওয়াইল্ড হক মোটেলে নিজের ঘরের বাতি নিভিয়ে জানালা দিয়ে নিষ্পলক চোখে হাইওয়ে দেখছে জ্যাকি। ওয়েস্ট স্কেলি ড্রাইভ ধরে ছুটে যাচ্ছে একটা-দুটো গাড়ি। ওদিকে চেয়ে দু’দিন আগে লিপ্তার কটেজে যা দেখেছে, সেটা নিয়ে ভাবছে জ্যাকি। আচ্ছন্ন হয়ে আছে কেমন এক ঘোরের মাঝে। দুঃস্বপ্নের মত মনে হচ্ছে সবকিছু। সেই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য বোধহ্য অন্তরের অদ্ভুত কোন খেলা! মনে হচ্ছে হ্যালুসিনেশন হয়েছে ওর।

যদিও নিজেই বুঝতে পারছে, সবই আসলে নিষ্ঠুর বাস্তবতা। প্রথম সুযোগে কটেজ থেকে বেরিয়ে লুকিয়ে পড়েছিল জঙ্গলে। খুনিগুলো কটেজে ঢুকলে ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটল। নাকে-মুখে লাগল ডালপালা। জঙ্গল পেরোবার পর আরও বাড়ল দৌড়ের গতি। আগুনের মত জ্বলছিল ওর ফুসফুস। একটু পর পর ঘুরে দেখেছে কেউ তেড়ে আসে কি না।

একসময়ে পেছনে গাড়ির আলো দেখে প্রাণভয়ে লুকাল এক গাছের আড়ালে। কিন্তু ওকে দেখে ফেলল ড্রাইভার। গাড়ি এসে থামল গাছের পাশে। জানালার কাঁচ নিচু করে জানতে চাইল মহিলা, ‘তুমি কি কোন বিপদে পড়েছ?’

পিস্তল কোমরে গুঁজে বেরিয়ে এল জ্যাকি। বুঝে গেল, এবারের মত বেঁচে গেছে।

ফয়িল শহরের পুবে ক’মাইল দূরে চব্বিশ ঘণ্টা খোলা এক বার-এ চাকরি করে মহিলা। শিফট শেষে বাড়ি ফিরছে। জানাল রুট ৬৬ ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমে ঘুমন্ত ক্লেয়ারমোর আর ক্যাটুসা পার করে টুলসা সিটিতে পৌঁছে দেবে জ্যাকিকে। – চলার পথে জিজ্ঞেস করল, বাজে কোন ঝামেলায় পড়েছে কি না। তখন মিথ্যা বলেছে জ্যাকি: ঝগড়া হয়েছে বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে। এ-কথা বিশ্বাস না করার মত যৌক্তিক কোন কারণ খুঁজে পায়নি আগাথা ক্রিস্টি। সে মধ্যবয়স্কা মহিলা, তিন স্বামীকে পাঁচবার ডিভোর্স দিয়ে এখন সুখেই আছে। ক্রসবি হাইটসের বাড়িতে জ্যাকিকে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিয়েছে সে।

গভীর রাতে দু’বেডরুমের দোতলা অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে মেইন গেট লক করে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে জ্যাকি। বাথরুমে ব্যথা-ভরা পায়ের তালু ধুয়ে পরে নিয়েছে নতুন মোজা। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে ঢকঢক করে গিলেছে আধগ্লাস গর্ডস্‌ লণ্ডন জিন। সোফায় বসে ভেবেছে, এবার কী করা উচিত?

প্রথম কাজ হবে পুলিশে খবর দেয়া। যদিও এতে ছারখার হবে লিা কনারের সংসার। স্ক্যাণ্ডালের জন্যে ধ্বংস হবে রোয বাড ট্রাস্ট। এরপর এ-শহরের কেউ ওকে আর চাকরি দেবে না। তবুও ওর কর্তব্য হচ্ছে পুলিশে সব জানিয়ে দেয়া।

ওর কাছে আছে অকাট্য প্রমাণ।

ব্যাকপ্যাক থেকে ফোন নিয়ে ভিডিয়ো দেখল জ্যাকি। ওভার এক্সপোষ দৃশ্যে খুনিদেরকে দেখাচ্ছে আবছা সব যমদূতের মত। একটু পর ফোন হাতে ছোট্ট অফিসে ঢু ও। ফোনের সঙ্গে ইউএসবি কেবল যুক্ত করে সংযোগ দিল কমপিউটারে। ফোন থেকে ডাউনলোড করল ভিডিয়ো। বড় স্ক্রিনেও স্পষ্ট ফুটল না দৃশ্যগুলো। মাত্র একবার দেখা গেল লিণ্ডার স্বামীর মাথার পেছনদিক। জট পাকিয়ে বিশ্রী ভোঁ-ভোঁ করছে খুনিদের গলা।

‘সর্বনাশ!’ ভাবল জ্যাকি, ‘পুলিশকে এই ভিডিয়ো দেখালে তারা তো আমার কোন কথাই বিশ্বাস করবে না!’

সিদ্ধান্তহীনতা চেপে ধরল ওকে। ভাবতে শুরু করেছে কী করবে, এমন সময় ডেস্কে বাজল ল্যাও ফোন। চমকে গিয়ে জ্যাকি ভাবল, এত রাতে কে ফোন করছে? দ্বিধা নিয়ে ফোনের রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল। ‘হ্যালো?’

জবাবে ওদিক থেকে খুট করে কেটে দেয়া, হলো লাইন। নিজেই এবার কল দিল জ্যাকি। ওদিক থেকে ফোন ধরল না কেউ। ওর মনে হলো, এবার ঘটতে শুরু করবে বহুকিছু। হয়তো রং নাম্বারে কল দিয়েছে কেউ। আবার এমনও হতে পারে, খুনিরা জেনে নিল এখন কোথায় আছে ও! –

কটেজে ওর জিনিসপত্র পেলে লিণ্ডার স্বামী বা তার লোক বুঝে গেছে কটেজে কে ছিল! লিণ্ডা নিজেই হয়তো স্বামীকে বলেছে কটেজে ওর ওঠার কথা! একই কথা হয়তো জানিয়ে দিয়েছে ড্রাইভার বব। নানাভাবে ফাঁস হতে পারে তথ্য। সেক্ষেত্রে খুনিরা হয়তো জেনে গেছে টুলসার এই ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে ও। জ্যাকি বুঝে গেল, এ-বাড়ি এখন ওর জন্যে খুব ‘বিপজ্জনক। সুতরাং দেরি না করে ওর উচিত হবে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া।

প্রমাণ হিসেবে ভিডিয়ো থাকলেও নিজে খুন হলে ওটা কোন কাজেই আসবে না। দেরি না করে কমপিউটারের মাধ্যমে ভিডিয়ো ক্লিপ তুলে নিল দুটো ডিভিডিতে। ব্যাকআপ হিসেবে রাখল ও-দুটো। এরপর দোতলায় গিয়ে পরে নিল পুরনো জুতোজোড়া। আরও কিছু জিনিসপত্র ভরল ব্যাকপ্যাকে বিছানার নিচে স্টিল অ্যামো কেবিনেট খুলে তিনটে সিগ সাওয়ার ম্যাগাযিন নিয়ে রাখল ব্যাকপ্যাকের পাশের পকেটে। একই জায়গায় ঠাঁই পেল পিস্তল। বেডসাইড ড্রয়ার থেকে সংগ্রহ করল ক্যাড্ মেইস। হামলা হলে শেষ ভরসা হিসেবে রেখেছে ওটা। রাসায়নিকে ভরা ক্যান গুঁজল ব্যাকপ্যাকে। বাড়িতে এখন এমন কিছু নেই, যেটা ওর খুব দরকার হবে।

অ্যাপার্টমেন্টের দরজা লক করে ব্যাকপ্যাক কাঁধে বেরিয়ে এল জ্যাকি। মরুভূমির মত খাঁ-খাঁ করছে রাস্তা। আশপাশে কোন গাড়ি নেই। খুনিদের কেউ নজর রাখছে না বাড়ির ওপরে। ব্যাগ কাঁধে ব্যথা-ভরা পায়ে ছুটতে লাগল জ্যাকি।

এরপর দু’রাত আগে এসে উঠেছে এই মোটেলে। খিদে লাগলে সিকিমাইল দূরে হাইওয়ের এক ডাইনার থেকে এনেছে খাবার। দ্বিতীয়বার আর যায়নি ওর অ্যাপার্টমেন্টে। এলাকার ছেলেদেরকে পছন্দ করত না ওর বাবা। তাই তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক তৈরি হয়নি জ্যাকির। ফলে এমন কেউ নেই যার কাছে এখন ঠাঁই পাবে। মায়ের কাছে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। দেবতার মত ওর বাবাকে ছেড়ে এক জানোয়ারের সঙ্গে সংসার করছে সে, কারণ লোকটার আছে দামি মদ কিনে দেয়ার টাকা।

জানালা দিয়ে দূরে চেয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করল জ্যাকি, এ-শহর ছেড়ে কি আমি পালিয়ে যাব? প্রিয় গাড়িটা ওকে দিয়ে গেছে বাবা। ওটা পুরনো হলেও কাজে লাগবে ওকলাহোমা থেকে বেরিয়ে যেতে। পরে খুঁজে নেবে নতুন কোন আশ্রয়। অবশ্য সেক্ষেত্রে একদম প্রথম থেকে শুরু করতে হবে ওকে। কাজটা অত সহজ হবে না ওর জন্যে।

জ্যাকির বুক চিরে বেরোল কাঁপা দীর্ঘশ্বাস।

এগারো
নিজেকে পুলিশ ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর ড্যানিয়েল হকিন্স বলে পরিচয় দিল অফিসার। নার্ভাস টাইপের লোক সে। বয়স হবে পঞ্চাশ। চড়ুই পাখির চোখের মত এদিক-ওদিক ঘুরছে দু’চোখ, পলক পড়ছে না একবারও। কেন যেন তাকে অপছন্দ হলো রানার। যদিও খুঁজে পেল না তার কারণ। লোকটার সহকারী ডিটেকটিভ সার্জেন্ট জোয়ান লিলির বয়স আন্দাজ পঁচিশ। তাকে মানুষ বলেই মনে হলো রানার। বুঝো গেল, কেন তাকে সঙ্গে করে এনেছে ইন্সপেক্টর। সে মর্মান্তিক দুঃসংবাদ দিলে জখমে মলম দেবে মহিলা সার্জেন্ট।

‘আমি জানতে চাই বেলা খুন হয়েছে, নাকি কিডন্যাপ, তারা কিছু বলার আগেই বলল রানা।

‘কেন ভাবছেন কিডন্যাপ হবে?’ কৌতূহলী চোখে ওকে দেখল ইন্সপেক্টর।

‘যা বলার সেটা বরং আপনিই বলুন,’ বলল রানা।

‘আমরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই মারা যান মিস ওয়েস,’ বলল সার্জেন্ট লিলি। ‘ভয়ঙ্করভাবে খুন হন। পরে তাঁর আত্মীয়দের কাছে খবর দিয়েছি আমরা। তাঁরা ইংল্যাণ্ড থেকে রওনা হয়েছেন। মিস্টার রানা, আমি সত্যিই দুঃখিত।’

মেয়েটা খুন হয়েছে ওর নিজের ব্যর্থতার জন্যে, বুঝে গেল রানা। ওর উচিত ছিল শারীরিকভাবে ফিট থাকা। সেক্ষেত্রে হয়তো এখনও বেঁচে থাকত বেলা।

‘কী ধরনের হামলা করেছে ওর ওপরে?’ জানতে চাইল রানা।

ভুরু কুঁচকে ফেলল সার্জেন্ট।

ইন্সপেক্টর হকিন্সের দিকে তাকাল রানা।

হঠাৎ করে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে লোকটার মুখ।

রানা জেনে গেল, বেলার লাশ দেখেছে এরা। শুধু তা-ই নয়, আগে কখনও এত ভয়ঙ্কর বিকৃত হওয়া মৃতদেহ দেখেনি।

‘মিস্টার রানা, আমার মনে হয় না যে এসব নিয়ে আর আলাপ করা উচিত, বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘আমি জানতে চাই,’ শুকনো গলায় বলল রানা।

‘মিস ওয়েসের বুক-পেটে ছিল ছোরার গভীর সব ক্ষত,’ বলল মেয়েটা। ‘কেটে নেয়া হয় নাক ও ঠোঁট… চুপ হয়ে গেল সে। যে-কোন সময়ে বমি করে দেবে।

‘উপড়ে নেয় দু’চোখ, তারপর গলা কাটে, ‘ তিক্তস্বরে বলল ‘ইন্সপেক্টর হকিন্স। ‘আরেকটু হলে কাটা পড়ত ঘাড়। মনে হয় না সে-সময়ে বেঁচে ছিল মিস ওয়েস।’

রানার হাতের মুঠোর টানে ফড়ফড় করে ছিড়ে গেল বেডকভার। বেলার মিষ্টি মুখ ভেসে উঠেছে ওর চোখের তারায়। কানে শুনতে পেল মধুর কণ্ঠস্বর। হাসছে মেয়েটা। রানার মনে হলো, নিজেও অসুস্থ হয়ে যাবে সার্জেন্ট লিলির মত।

গলা খাঁকারি দিল ইন্সপেক্টর। ‘এ-ঘটনায় সাক্ষী আছে। তাঁরা এসেছেন লণ্ডন থেকে বেড়াতে। গ্যালওয়ে গেস্ট-হাউস থেকে বেরিয়ে দু’জন লোককে দেখতে পান। তাদের সঙ্গে ছিল জিপগাড়ি। ওটা থেকে নেমে মিস ওয়েসকে ধাওয়া করে খুনিরা। সৈকতে একাই ছিল মেয়েটা। দূর থেকে সব দেখতে পান দুই টুরিস্ট। আপনি কটেজ থেকে বেরিয়ে বাধা দিতে গেলে আপনার মাথায় লাঠির বাড়ি মারে খুনিরা। আপনি পড়ে গেলে ছোরা বের করে তাদের একজন। বিনকিউলারে সব দেখেন পুরুষ টুরিস্ট। তি ন… কী যেন বলে তাঁদেরকে?’

‘অর্নিথোলজিস্ট,’ বলল সার্জেন্ট লিলি, পক্ষিবিজ্ঞানী। ‘বেলাকে ছোরা মারতে দেখেন তিনি?’ বলল রানা।

নড করল সার্জেন্ট লিলি। ‘একটু পর মিস ওয়েসকে খুন করে গাড়িতে উঠে চলে যায় তারা। আমরা পরে জেনেছি গাড়িটা চুরি করা হয়েছিল ক্লিফডেনের এক খামার থেকে।’

‘আজ ভোরে উপকূলীয় এলাকা ন্যাহিঞ্চে পাওয়া গেছে ওটা,’ বলল ইন্সপেক্টর হকিন্স। ‘এক স্থানীয় লোক আগুনে গাড়ি পুড়তে দেখে গার্ডাদের কাছে ফোন দেয়।

‘এরপর খুনিদের কোন তথ্য আপনারা আর পাননি,’ মন্তব্য করল রানা।

‘আমরা খোঁজ নিচ্ছি সোর্সের মাধ্যমে,’ বলল ইন্সপেক্টর। -এ-ধরনের কেসে কর্তৃপক্ষ ভঙ্গি করে, সবকিছুর ওপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে।

‘আপনাদের তো কিছু করার আছে বলে মনে হচ্ছে না,’ বলল রানা। ‘উধাও হয়ে গেছে তারা।’

‘আমরা ভাবছি, আপনি হয়তো জরুরি সূত্র দেবেন, বলল সার্জেণ্ট লিলি।

যেহেতু আমি তাদেরকে কাছ থেকে দেখেছি-তাই?’

‘দেখলে কি আপনি তাদেরকে চিনতে পারবেন?’ মাথা দোলাল রানা।

‘তা হলে চেহারার বর্ণনা দিন।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল রানা, ‘শ্বেতাঙ্গ। বয়স ত্রিশের নিচে হালকা শরীর। কথা বলেনি, তাই জানার উপায় নেই তারা আইরিশ, ইংলিশ না অন্য দেশের। একজন অন্যজনের চেয়ে সামান্য লম্বা। উচ্চতা ছয় ফুট। আর্মি ছাঁট দেয়া খাটো চুল। একজনের পরনে নেভি জ্যাকেট। ওটা সিন্থেটিক বা নাইলনের।’

প্যাড বের করে নোট মিল সার্জেন্ট লিলি।

‘অন্যজনের পরনে বাদামি হুডি, বলল রানা, ‘ভালভাবে তার মুখ দেখতে না পেলেও সে বামহাতি।’

‘আপনি সেটা কীভাবে জানলেন?’ প্রশ্ন করল ইন্সপেক্টর। তিক্ত চোখে তাকে দেখল রানা। ‘এটা জানতে বিজ্ঞানী হতে হয় না। ব্যাটন ছিল তার বামহাতে। দু’জনের পায়ে ছিল স্টিলের টোক্যাপসহ বুট। জানি, কারণ এখনও আমার শরীরে ব্যথা আছে।’

‘এটা ভাল সূত্র,’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘আপনার সেটাই মনে হচ্ছে?’ বিরক্ত হলো রানা। ‘আর কিছু?’ জানতে চাইল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘বাদামি হুডির মুখে মিন্টের গন্ধ ছিল,’ বলল রানা!

নোট নিয়ে বলল সার্জেন্ট লিলি, ‘মিণ্ট?’

‘চুইংগাম। তবে সাধারণ নয়। বিদঘুটে গন্ধ।

‘সেটা কী ধরনের?’ চোখ সরু করল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘নিকোটিন গাম,’ বলল রানা, ‘হয়তো চেনেন? ধূমপান ছাড়তে গিয়ে অনেকে ব্যবহার করে।’

‘আপনি ঠিক জানেন তো?’

‘নিজে ওটা দিয়ে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করেছি। সুতরাং ভুল বলছি না।

‘ঠিক আছে,’ বলল সার্জেন্ট লিলি। নোট নেয়ার ফাঁকে বলল, ‘আর কিছু?’

‘আমার ধারণা: এরা আগেও মানুষ খুন করেছে, বলল রানা। ‘নিজেদের কাজ বোঝে।’

‘সেটা আপনি কীভাবে জানলেন?’

‘কারণ, আগে আমি আর্মিতে ছিলাম। আপনারা ‘ যাদেরকে খুঁজছেন, তারা মিলিটারি ট্রেইণ্ড সাইকোপ্যাথ। এদেরকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারি।’

পরস্পরের দিকে তাকাল ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট।

‘মিস্টার রানা, আমরা এরই ভেতরে জেনে নিয়েছি আপনার ব্যাকগ্রাউণ্ড,’ বলল ইন্সপেক্টর।

মনে মনে বলল রানা, খুব যৎসামান্যই আপনারা জানেন।

‘তা হলে তো আরও বহু তথ্য আপনি দিতে পারবেন, তা-ই না?’ জানতে চাইল সার্জেন্ট লিলি।

মাথা নাড়ল রানা। ‘সরি।’

বিরক্ত হলো ইন্সপেক্টর। ‘ফাইলে দেখলাম আপনি এক ডিটেকটিভ এজেন্সির চিফ। ক’দিন আগে ছিলেন ফ্রান্সে।’

মাথা দোলাল রানা। ‘নরম্যাণ্ডিতে। আপাতত কোন কাজের সঙ্গে জড়িত নই।’

‘কিছুই না?’

মাথা নাড়ল রানা।

ভুরু কোঁচকাল ইন্সপেক্টর। ‘অথচ জেনেছি, আপনি হাইলি ট্ৰেইণ্ড।’

‘আগে তা-ই ছিলাম,’ বলল রানা।

‘আমার ধারণা: যুদ্ধের ট্রেনিং কখনও ভুলে যায় না কেউ।’

‘অতিরিক্ত ড্রিঙ্ক করি,’ স্বীকারোক্তির সুরে বলল রানা। ‘গতকাল যখন হাম হলো, ড্রিঙ্ক করছিলাম কটেজে বসে। সেজন্যে ধীর হয়ে যায় আমার প্রতিক্রিয়া। নইলে সৈকতে বেলার বদলে দেখতে পেতেন লোকদু’জনের লাশ।’

ওকে দেখছে সার্জেন্ট লিলি। ‘আপনি কি তবে বলতে চান যে তাদেরকে খুন করতেন?’

চুপ করে থাকল রানা।

‘আপনি আসলে কী বলতে চান? কঠোর চোখে ওকে দেখল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘কী বলেছি, সেটা আপনারা শুনেছেন,’ শীতল স্বরে বলল রানা, ‘বরং এই কেসের ব্যাপারে কথা বলুন। আপনাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এই হামলার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক আছে।

‘আমরা তা বলছি না,’ চট করে বলল সার্জেন্ট লিলি। দুশ্চিন্তা নিয়ে দেখল ইন্সপেক্টরকে।

‘মনে রাখবেন, মিস্টার রানা, কোথাও হামলা হলে আমরা সিরিয়াস হয়ে যাই,’ বলল ইন্সপেক্টর। ‘সুতরাং নিজে ভুলেও আইন হাতে তুলে নেবেন না। সেটা আপনার জন্যে মঙ্গলজনক হবে না।’

‘আপনি কি তবে চান অন্যায় দেখেও চুপচা’ সব মেনে নেব? তাতে উপকার হবে সমাজের?’ বলল রানা।

‘আমি তা বলছি না। তবে নিজ হাতে আইন তুলে নিলে সেটা কখনও সমাজের জন্যে মঙ্গলজনক হয় না.।’

‘আপনার কি ধারণা যে আমি আইন ভেঙেছি?’ বলল রানা। ‘বেলার মৃত্যু কিন্তু আপনারা ঠেকাতে পারেননি।

‘কেন এমনটা হলো, তা আমরা তদন্ত করে বের করব, বলল ইন্সপেক্টর, ‘আর যেহেতু এসবের সঙ্গে মদ জড়িত, তাই বিষয়টা গভীরভাবে তদন্ত করতে হবে।

‘আমি সৈকতে যাওয়ার আগে প্রায় মাতাল ছিলাম,’ বলল রানা। ‘আর তখন আপনার মত কোন হিরোকে দেখতে পাইনি, যে বিপদ থেকে রক্ষা করবে বেলাকে। আপনারা যখন হাজির হলেন, ততক্ষণে বহু দূরে চলে গেছে খুনিরা।’

‘আপনার আচরণ খুব আপত্তিকর,’ বলল ইন্সপেক্টর; ‘আর সেজন্যে আপনাকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দিতে পারি।’

‘আমার আচরণ যে কতটা খারাপ, আপনি ভাবতেও পারবেন না, ইন্সপেক্টর।’ ক্রমেই আরও রেগে উঠছে রানা।

চোখ পাকিয়ে ওকে দেখছে ইন্সপেক্টর।

বদলে শীতল চোখে তাকে মেপে নিচ্ছে রানা। পরিষ্কার বুঝে গেল, বোকা গাধাটা জানে না, যে-কোন সময়ে তার গলা দিয়ে নেমে যাবে একগাদ। ভাঙা দাঁত।

এবার বলুন কীভাবে আপনার সঙ্গে পরিচয় হলো মিস ওয়েসের,’ বুদ্ধিমতীর মত প্রসঙ্গ পাল্টাল সার্জেন্ট লিলি। নার্ভাস চোখে দেখে নিল বসকে। ‘হামলার আগে সৈকতে আপনারা হাঁটছিলেন, সেটা আমরা জেনেছি।’

খুব ধীরে ধীরে হকিসের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে মেয়েটাকে দেখল রানা। ‘আমাদের মধ্যে কোন সম্পর্ক ছিল না। গতকালই পরিচয়। আমার ধারণা, মিসেস অ্যাপলউড এরই ভেতরে এ-ব্যাপারে আপনাদেরকে জানিয়েছেন।

‘তার মানে আপনাদের আগে কখনও দেখা হয়নি?’

‘প্রতিটি কথা আবারও বলতে হলে সারাদিন লাগবে, বলল বিরক্ত রানা।

দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরল সার্জেন্ট লিলি। একটু পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘সাক্ষীদের কথা অনুযায়ী, মিস ওয়েসের কাছ থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় খুনিরা। আপনি ওটা সম্পর্কে কিছু জানেন?’

‘কাপড়ের ব্যাগ,’. বলল রানা, ‘রঙ নীল, হলুদ ও বেগুনি। ভেতরে ছিল ল্যাপট।। এ-ছাড়া ছিল নোটবুক, কয়েকটা মোবাইল ফোন, ব্যক্তিগত মেক-আপ আইটেম আর চিরুনির মত সাধারণ জিনিস। অবশ্য এ-বিষয়ে আর কিছু জানি না।’

‘আপনি দেখি মেয়েটার ব্যাগে কী আছে সবই জানতেন, সন্দেহের সুরে বলল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘আমি সবসময় চোখ-কান খোলা রাখি,’ বলল রানা, ‘আপনি নিজেও তা-ই করতে পারেন।’

‘আমরা এসেছি জরুরি তথ্য সংগ্রহ করতে, মিস্টার রানা,’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘তা-ই করা উচিত,’ বলল রানা, ‘আমি নিজেও তা-ই। করব। যেহেতু গত বিশ বছরে এদিকে কেউ খুন হয়নি, সেক্ষেত্রে কেন খুন করা হলো বেলাকে, সেটা জানতে চাই। কয়েক বছর আগেও সৈকতের ধারে আমার একটা বাড়ি ছিল। পরে বিক্রি করে দিয়েছি। এদিকের প্রতিটি পাব চিনি। প্রতিভাবান ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর হকিন্স এখানে বসে আমার দোষ না খুঁজলে, হয়তো পাব-এ কান পেতে অপরাধীদের ব্যাপারে জরুরি সব তথ্য পেতেন। সেক্ষেত্রে আমিও বুঝতাম, নিজের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।’

‘শুনুন, আপনি কিন্তু…’ রানার বুকের দিকে তর্জনী তাক করল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

যদিও তার কথা কেড়ে নিল রানা, ‘না, হকিন্স, আপনিই বরং আমার কথা মন দিয়ে শুনুন। ঠাণ্ডা চোখে দেখছে তাকে। ‘পেশাদার দুই অপরাধী গাড়ি চুরি করে এনে বেআইনি ব্যাটন হাতে অচেনা এক মেয়ের ওপরে হামলে পড়বে না। সুতরাং ধরে নিতে পারি, এর পেছনে আছে কোন না কোন জরুরি কারণ। আপনার বদলে আমি হলে ভাবতাম: এসবের পেছনে রয়েছে শক্ত কোন মোটিভ। জেনেবুঝে খুন করা হয়েছে বেলা ওয়েসকে। কাজেই মেয়েটা কীসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল সেটা আগে জানা দরকার। আমার কথাগুলো কি আপনি বুঝতে পেরেছেন, ইন্সপেক্টর?’

রানার দিকে তাক করা তর্জনীটা নামিয়ে চেয়ারে গুঁজে গেল পুলিশ কর্মকর্তা। রেগে গেলেও মুখে কোন কথা নেই।

ভুরু কুঁচকে গেছে সার্জেন্ট লিলির। নোটবুক থেকে মুখ তুলল সে। ‘রেকর্ড অনুযায়ী বেলা ওয়েস ছিলেন সেলফ- এমপ্লয়েড রাইটার। গেস্ট-হাউসের মালিক বলেছেন, বই লিখছিলেন তিনি। এসব থেকে আমরা কোন মোটিভ পাইনি।’

‘সাধারণ বই নয়, আয়ারল্যাণ্ডের ঐতিহাসিক কিছু বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করে বেলা,’ বলল রানা।

‘তো?’

‘ঐতিহাসিক বিষয়ে গবেষণার সময় জরুরি তথ্য গায়। যেটা ছিল গোপন কিছু। আর সেজন্যেই ঝুঁকিতে পড়ে বেলা।’

ভুরু কুঁচকে ফেলল সার্জেন্ট লিলি। ‘কী ধরনের ঝুঁকি?’

‘আমাকে সেটা বলেনি বেলা,’ বলল রানা।

‘এত কিছুই বা আপনাকে বলল কেন?’ বলল ইন্সপেক্টর। ‘আপনারা স্বল্প-পরিচিত, পরস্পরকে ভালমত চিনতেন না।’

‘কারণ, বেলা সাহায্য চেয়েছিল আমার কাছে।’

‘কেন সেটা করল সে?’

‘ও সাহায্য চেয়েছিল আমার কাজের ধরন জেনে।’

‘আপনার সেসব কাজ খুব ক্লাসিফায়েড, নাকি, মিস্টার রানা?’ খোঁচা দিতে চাইছে ইন্সপেক্টর। দু’তর্জনী বাঁকা করে দেখাল ইনভার্টেড কমা।

‘আর্মি থেকে অবসর নেয়ার পর কাজ করেছি সিকিউরিটি ইণ্ডাস্ট্রিতে, সে-কারণে আগ্রহী হয়েছিল বেলা,’ বলল রানা।

‘আপনি কি বডিগার্ড ছিলেন?’ রাগী গলায় বলল হকিন্স।

‘আগে কিডন্যাপড্ মানুষ খুঁজে বের করে উদ্ধার করেছি,’ বলল রানা। ‘তবে কাউকে রক্ষা করতে বডিগার্ডের কাজ খুব কমই করেছি। অবশ্য যখন করেছি সেটা, চেয়েছি দক্ষতার সঙ্গে করতে।’

‘যাই হোক, আপনি মিস ওয়েসের কাছে জানতে চান, তাঁকে কেউ কিডন্যাপ করতে চায় কি না?’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

মাথা দোলাল রানা। ‘হ্যাঁ। বেলা জানত, সে আছে মৃত্যু- ঝুঁকিতে। নিরাপত্তা চাইছে শুনে আমি বলেছি, আমার পরিচিত বডিগার্ডের সাহায্য নিতে পারে। কথা হয়েছিল, আজ ভোরে এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় এ-বিষয়ে আমরা আলাপ করব।’

‘আপনাকে কেন এসব বলল সে? কেন যোগাযোগ করল না পুলিশে?’ চেয়ারে পিঠ সোজা করল ইন্সপেক্টর।

তিক্ত হাসল রানা। ‘সেটা আমি জানি না।’

‘অর্থাৎ, আপনার জানা নেই, কে বা কার কাছ থেকে বিপদ হবে বলে ভেবেছিলেন মিস ওয়েস?’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘আমার সঙ্গে এ-ব্যাপারে ওর কোন কথা হয়নি। সময় পেলে হয়তো খুলে বলত। অবশ্য এটা বুঝেছি, কোন কারণ ছাড়া ওর ওপরে হামলা করা হয়নি। হঠাৎ সৈকতে অচেনা এক মেয়েকে দেখে খুন করেনি খুনিরা। তারা এসেছিল তৈরি হয়ে।’

‘আমরা মিস ওয়েসের খুনিদের আইনের আওতায় আনব,’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

ওরা যেমন ধরনের লোক, তাদের গায়ে টোকাও দিতে পারবেন না আপনারা,’ স্পষ্ট করে বলল রানা।

‘হয়তো তা-ই,’ বলল ইন্সপেক্টর, ‘কিন্তু সেক্ষেত্রে আপনিও কিছুই করতে পারবেন না।’

ওদের জন্যে আমি তৈরি ছিলাম না,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল রানা। ‘পরেরবার এই ভুল হবে না।

‘ভুলবেন না, আইন-রক্ষার কাজ পুলিশের, বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘খুনিরা এখন কোথায় সেটা আপনারা জানেন?’ বলল রানা।

‘আপনি নিজে তাদেরকে কোথায় পাবেন বলে ভাবছেন?’, টিটকারির হাসি হাসল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘এদিকে যে নেই তা নিশ্চিত ‘ বলল রানা। ‘আমরা যখন কথা বলে সময় নষ্ট করছি, প্রতি সেকেণ্ডে আরও দূরে চলে যাচ্ছে তারা।’

‘আমরা যে তাদেরকে গ্রেফতার করতে পারব, তাতে মনে কোন সন্দেহ রাখবেন না,’ বলল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘আপনি আসলে আঁধারে নিজের পোঁদের ফুটোও দুই হাতে খুঁজে পাবেন, সে-ক্ষমতা আপনার নেই,’ সব্জ সুরে বলল রানা।

এ-কথায় একই সময়ে চেয়ার ছাড়ল দুই ডিটেকটিভ। লালচে হয়েছে ইন্সপেক্টরের দুই গাল। মেঝে দেখছে সার্জেন্ট লিলি। মেয়েটার জন্যে খারাপই লাগল রানার।

‘পরে তদন্তের অগ্রগতি আমরা জানিয়ে দেব,’ বলল হকিন্স।

চুপ করে থাকল রানা।

পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে গেল ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট।

কিছুক্ষণ বসে বসে বেলার কথা ভাবল রানা। ওর দুঃখ লাগছে এটা ভেবে যে, আর কখনও দেখা হবে না হাসিখুশি। মেয়েটার সঙ্গে। আরও বাড়ল রানার মনের তিক্ততা। মনের আয়নায় দেখতে পেল, বেলার পেট-বুকের ক্ষত থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে তাজা রক্ত। উপড়ে নিয়েছে নীল দুটো চোখ। জবাই হওয়া বেলার রক্ত শুষে নিচ্ছে পাথুরে জমি।

একটু পর নার্সকে ডাকল রানা। ওর কথায় ওয়ার্ড ছেড়ে চলে গেল মেয়েটা। ফিরল পাঁচ মিনিট পর। তার সঙ্গে এসেছে ডাক্তার হাম্বল। সে বলল, ‘আরও একদিন আপনাকে ওয়ার্ডে রাখতে চাই।’

জবাবে রানা বলল, ‘আমি হাসপাতালের পার্কিং লট পেরোতে গিয়ে মরে গেলে আমার সঙ্গে তর্ক জুড়বেন।

রোগী কোন কথা শুনবে না বুঝে শেষবারের মত রানার চুলের ফাঁকে করোটির সেলাই দেখল ডাক্তার হাম্বল। তারপর বিদায় নিল বিমর্ষ মুখে

বাথরুমে পোশাক পাল্টে হাসপাতাল থেকে বেরোল রানা। আগেই মনস্থির করেছে, এবার খুঁজে বের করবে বেলার খুনিদেরকে।

বারো
হাসপাতাল থেকে সরাসরি কটেজে ফিরল না রানা। পায়ে হেঁটে দুটো গ্রাম পার করে তারপর বাস ধরে পৌঁছুল গ্যালওয়ের বড় রাস্তায়। ওখান থেকে সিকিমাইল দূরেই চেনা এক সৈকত। গ্যালওয়ে গেস্ট-হাউসে না গিয়ে সেখানে চলে গেল রানা। কৈশোরে আবিষ্কার করেছিল সৈকতের কাছে ছোট্ট পাহাড়ি গুহাটা। এমনই এক জায়গা, যেখানে ওকে বিরক্ত করতে আসবে না কেউ।

সাগরতীরের পাহাড়ি গুহায় বসে ধূমপান করতে খুব ইচ্ছে হলো ওর। তখনই স্থির করল, আর কখনও সিগারেটের ধারেকাছে যাবে না। ভাবতে লাগল, এরপর কী করবে।

ওর সামনে এখন মাত্র দুটো পথ।

এক: সবকিছু ভুলে ফিরে যেতে পারে ফ্রান্সে। দুই: অথবা খুঁজতে পারে বেলার খুনিদেরকে।

প্রথম কাজটা করলে অপেক্ষা করতে হবে একদিন খুনিদেরকে গ্রেফতার করবে পুলিশ। সেক্ষেত্রে বেলার আত্মীয়দের সান্ত্বনা দেয়াই যথেষ্ট। দরকারে সহায়তা করবে আইনি কর্তপক্ষকে। অর্থাৎ নিজে থেকে কিছুই করতে হবে না ওর।

ওদিকে দ্বিতীয় কাজটা না করলে প্রতিক্ষণে ক্ষয় হবে ওর হৃদয়। আগে কখনও কোন কাজে গাফিলতি করেনি। ফলে বেলার খুনিকে খুঁজে বের না করলে নিজেকে ওর মনে হবে দোষী। মেয়েটার মৃত্যুর দায় কোনভাবেই এড়াতে পারবে না।

এদিকে খুনিদেরকে খুঁজতে গেলে হয়তো লাগবে বহু দিন। চুপ করে সাগরতীরের গুহায় বসে রইল রানা। বহুক্ষণ পর বেরিয়ে এল সৈকতে। দুপুর হলেও খিদে নেই পেটে। হেঁটে যাওয়ার সময় দেখল ওর ভাড়া করা কটেজ। বেলা যেখানে খুন হয়েছে, পেরিয়ে এল জায়গাটা। ওখানে বাতাসে

তপত করে উড়ছে গার্ডার টাঙানো টেপ। একটু দূরে এক ল্যাণ্ড রোভার। পাথরের ভেতরে সূত্র খুঁজছে মোটা দুই গার্ডা। একটু পর হাল ছেড়ে ফিরে যাবে স্টেশনের উষ্ণ পরিবেশে।

গ্যালওয়ে গেস্ট-হাউসে পা রেখে রিসেপশন ডেস্কে কাউকে দেখতে পেল না রানা। চট করে পাতা উল্টে দেখে নিল রেজিস্ট্রি খাতা। এখন যারা আছে গেস্ট-হাউসে, তাদের ভেতরে আছেন বেলজিয়ান এক দম্পতি-মশিয়ো গফিন ও তাঁর স্ত্রী ম্যাডাম জুলিয়ান। আগামীকাল ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা লণ্ডনে।

‘রুম নাম্বার নাইন,’ মনে মনে বলল রানা। রওনা হয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। তবে ওখানে পৌঁছাবার আগেই খুলে গেল স্টাফ ওনলি লেখা এক দরজা। আগে ওটা ছিল চাচার স্টাডিরুম। প্যাসেজে বেরিয়ে এলেন মিসেস অ্যাপলউড। লালচে হয়ে আছে তাঁর ফোলা দু’চোখ। অনেক কেঁদেছেন মহিলা। রানার মার খাওয়া চেহারা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে আবারও কাঁদতে লাগলেন তিনি। রানা কিছু বলার আগেই ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, ‘আহা, বেচারি বেলা ওয়েস! কী ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল!’

রানার মনে হলো, এদিকের সৈকতে খুনের ঘটনা ঘটে যাওয়ায় গেস্ট-হাউসের ওপরে তার বাজে প্রভাব পড়বে কি না, সেটা নিয়ে বেশি ভাবছেন মহিলা। আজ সারা সকাল তাঁকে বিরক্ত করেছে মিডিয়ার লোক। তাদের মন্দ প্রচারণায় যে-কোন সময়ে বন্ধ হবে গেস্ট-হাউস ব্যবসা। টুরিস্টরা ধরে নেবে, যেহেতু সৈকতে ঘুরঘুর করছে খুনি, কাজেই এ-এলাকা খুবই বিপজ্জনক। সেক্ষেত্রে টাকার অভাবে গলফ্ ক্লাবের সদস্যপদ হারাবেন মিস্টার অ্যাপলউড। তাতে মারাও যেতে পারেন মানসিক যন্ত্রণায়।

মহিলাকে সংক্ষেপে সান্ত্বনা দিল রানা। তারপর আঙুল তুলে সিঁড়ি দেখাল। ‘মিস্টার গফিনের ঘর কি নয় নম্বর? আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’

‘হ্যাঁ, ওই রুমেই উঠেছেন,’ টিশ্যু পেপার দিয়ে চোখের কোণ মুছলেন মহিলা। ‘তবে আপাতত তাঁরা লাঞ্চ করছেন কনসার্ভেটরি রুমে। যে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল, তারপর আজ আর কিছুই মুখে তুলতে পারছেন না কেউ!’ মহিলা জিজ্ঞেস করলেন না কী কারণে বেলজিয়ান ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে রানা। নিজে থেকেও কিছু বলল না ও। মিসেস অ্যাপলউডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা ঢুকল কনসার্ভেটরি রুমে।

খুনের ঘটনা খারাপ প্রভাব ফেলেছে অতিথিদের ওপরে। চুপচাপ লাঞ্চ করছে কয়েকজন। পারতপক্ষে কথা বলছে না কেউ। মাঝে মাঝে প্লেটে লেগে টুংটাং শব্দ করছে চামচ। ঘরে চোখ বুলিয়ে মধ্যবয়স্ক এক লোককে মশিয়ো গফিন বলে মনে হলো রানার। ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রী হালকা গড়নের। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান বাইরে। রোদে পোড়া চেহারা। মিস্টার গফিনের উঁচু কপালের ওদিকে ব্যাকব্রাশ করা চুল রুপালি। তাঁর স্ত্রীর চুল সোনালি। ঘরের ‘কোণে টেবিলে বসে লাঞ্চ সেরে চুপচাপ কফিতে চুমুক দিচ্ছেন তাঁরা। গত সন্ধ্যার ভয়াবহ ঘটনায় মুষড়ে পড়েছেন। তাঁদের টেবিলের সামনে গিয়ে থামার আগে রানাকে লক্ষ করলেন না তাঁরা।

‘মশিয়ো অ্যাণ্ড ম্যাডাম গফিন?’ নরম সুরে বলল রানা।

চমকে উঠে মুখ তুলে ওকে দেখলেন মধ্যবয়স্ক দম্পতি। ‘আমি গ্রাহাম গফিন, ভিনদেশি সুরে ইংরেজি বললেন ভদ্রলোক। ‘আর ইনি আমার স্ত্রী জুলিয়ান। আর আপনি…

‘রানা, মাসুদ রানা,’ নিজের নাম বলল রানা। ‘আপনাদেরকে বিরক্ত করছি বলে দুঃখিত।’ চেয়ার দেখিয়ে ফ্রেঞ্চ ভাষায় জানাল, ‘আমি কি কিছুক্ষণের জন্যে আপনাদের পাশে বসতে পারি? বেশি সময় নেব না।

‘আপনি কী বিষয়ে কথা বলতে চান?’

‘গত সন্ধ্যার খুনের ব্যাপারে,’ বলল রানা। ‘কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। এরপর আর বিরক্ত করব না আপনাদেরকে।

পরস্পরকে দেখলেন বেলজিয়ান দম্পতি। তাঁরা কিছু বলার আগেই চেয়ার টেনে বসল রানা।

‘আপনি বোধহয় পুলিশ নন?’ জানতে চাইলেন জুলিয়ান গফিন। ঝিকঝিক করছে নিখুঁত সাদা দাঁত। পোশাক থেকে এল শ্যানেল ফাইভের সুবাস।

‘না, আমি পুলিশ নই,’ বলল রানা, ‘গতকাল বাধা দিতে চেয়েছিলাম খুনিদেরকে।

‘আমি আপনাকে আহত হতে দেখেছি,’ চট্ করে রানার ফোলা মুখ দেখে নিলেন মোশিয়ো গফিন।

এটা বোধহয় জানেন, পুরো ঘটনা আমি দেখতে পাইনি। তাই জানতে চাই আসলে কী ঘটেছিল।’

শুকনো হাসলেন বেলজিয়ান ভদ্রলোক। ‘আয়ারল্যাণ্ডে কি পুলিশের বদলে যার যার তদন্ত করে নিতে হয়?’

তা নয়। তবে একজন মেয়েকে সৈকতে খুন করা হলো, এ-ও তো স্বাভাবিক কিছু নয়। আপনারা ওই ঘটনার সাক্ষী। তাই সে-ঘটনায় অস্বাভাবিক কিছু দেখে থাকলে, সেটা আমাকে বললে উপকৃত হব।

‘আমরা পুলিশকে সবই খুলে বলেছি,’ জানালেন জুলিয়ান গফিন, ‘গ্রাহাম আর আমি বিকেলে হাঁটতে গিয়েছিলাম। গেস্ট-হাউসের দিকে ফিরছি, এমন সময় শুনলাম গর্জে উঠেছে একটা ইঞ্জিন। তখন ঘুরে দেখলাম রুপালি একটা বড় গাড়ি।’

‘ওটা ছিল মাযদা জিপ,’ বললেন মোশিয়ো গফিন।

‘রাস্তা ছেড়ে দ্রুত সৈকতের দিকে এল ওটা। আমরা বুঝে গেলাম কাউকে ধাওয়া করছে ড্রাইভার। বেচারি মেয়েটা তখন দৌড়াতে শুরু করেছে। গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ল দু’জন লোক। ছুটে গেল মেয়েটার দিকে। ব্যাগ ফেলে দৌড়াচ্ছিল মেয়েটা। লোকদুটোর একজন তুলে নিল ওর ব্যাগ। আমরা ভাবলাম তারা ছিনতাইকারী। ব্যাগ নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু সেটা না করে মেয়েটাকে ধরতে গেল তারা। আর সে-সময়ে দেখলাম কটেজ থেকে বেরোলেন আপনি। আপনার আসলে অনেক সাহস, মোশিয়ো।’

‘আমি একজন পক্ষী-বিশেষজ্ঞ,’ বললেন গ্রাহাম গফিন। ‘বছরের এ-সময়ে এদিকে অনেক পাখি আসে। ওগুলো দেখার জন্যে সঙ্গে বিনকিউলার ছিল। পরিষ্কার দেখলাম দুই খুনির একজন বের করেছে একটা ছোরা।’

‘বাদামি হুডি, নাকি জ্যাকেট পরা লোকটা?’ জানতে চাইল রানা।

‘হুডি পরা লোকটার হাতে ছিল ছোরা। তাকে সৈনিক বলেই মনে হলো আমার। ছোরাটাও ছিল মিলিটারির জন্যে তৈরি।

তাঁর চোখে তাকাল রানা। ‘বলবেন কী, কেন এটা আপনার মনে হলো?’

‘আমার শখ মিলিটারির নানান জিনিস সংগ্রহ করা,’

বললেন গ্রাহাম। ‘ইনসিগনিয়া, মেডেল, বেয়োনেট, ছোরা ইত্যাদি। মেয়েটাকে যে ছোরা দিয়ে খুন করল, ওটা ছিল ইউনাইটেড স্টেটসের মেরিন কর্পসের ফাইটিং অ্যান্ড ইউটিলিটি নাইফ। কালো রঙের সাত ইঞ্চি ফলা। ক্লিপ পয়েন্ট। চামড়া দিয়ে তৈরি হাতল।

‘কা-বার নাইফ,’ বলল রানা।

মৃদু মাথা দোলালেন বেলজিয়ান ভদ্রলোক।

এবার জানতে চাইল রানা, ‘আপনি কি পুলিশকে এই বিষয়ে কিছু বলেছেন?’

‘নিশ্চয়ই,’ বললেন গ্রাহাম। ‘লোকটা ছোরা বের করলে ভয়ে পালিয়ে যেতে চাইল মেয়েটা। তবে এরপর কিছুই আর দেখতে পেলাম না। কারণ, মেয়েটা চলে গেল বড় এক বোল্ডারের ওদিকে। তীরবেগে তার পিছু নিল হুডি পরা লোকটা। তাকে ঠাণ্ডামাথার খুনি বলে মনে হয়েছে আমার। তখনই বুঝলাম খারাপ কিছু ঘটবে। একটু পর হাসতে হাসতে বোল্ডারের ওদিক থেকে ফিরে এল সে।’

‘তার মুখে হাসি ছিল?’ হাতদুটো মুঠো হয়ে গেল রানার।

‘খুশি হয়েছিল মেয়েটাকে জবাই করে। ওটা যেন মজার কোন খেলা। আমি সব দেখলেও তখন আর কিছুই করতে পারিনি। হতভম্ব হয়ে যাই কিছুক্ষণের জন্যে।’

কফির দিকে তাকালেন ভদ্রলোক। রানার মনে হলো বমি করতে চান। ‘আপনার অচেতন দেহের পাশে গিয়ে থামল হুডি পরা লোকটা, চেহারা খুব শান্ত। আমার মনে হলো, এবার আপনাকেও খুন করবে সে। আর তখনই সচেতন হয়ে হাত নাড়তে নাড়তে তাদের দিকে ছুট দিলাম। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিলাম। আমাকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জিপে উঠল তারা। দেরি হলো না গাড়ি নিয়ে চলে যেতে।’

‘আমার প্রাণরক্ষা করেছেন বলে অসংখ্য ধন্যবাদ, স্যর, বলল রানা। ‘তবে বাধা দিতে গেলে খুন হতেন তাদের হাতে।’

‘আরও আগেই আমার উচিত ছিল গার্ডায় ফোন করা, বললেন গফিন। ‘নইলে দেখতে হতো না মেয়েটার বিকৃত ‘লাশ।’

আলতো করে স্বামীর বাহুতে হাত রাখলেন জুলিয়ান। নরম সুরে বললেন, ‘এরপর আমরা পুলিশে যোগাযোগ করি অবশ্য ততক্ষণে সর্বনাশ হয়ে গেছে। কী ভয়াবহভাবেই না খুন করেছে মেয়েটাকে!’

‘আপনাদেরকে তিক্ত অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দিয়েছি বলে আমি দুঃখিত,’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রানা।

‘আপনার জন্যে ড্রিঙ্কের অর্ডার দিই?’ জানতে চাইলেন গ্রাহাম গফিন।

মাথা নাড়ল রানা। ‘ধন্যবাদ, স্যর। লাগবে না। আশা করি নিরাপদে পৌঁছে যাবেন লণ্ডনে।

গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে সৈকতে ফিরে এল রানা। সাগর থেকে হু-হু করে আ হাওয়ায় চেপে আকাশে জড় হয়েছে ঘন কালো মেঘ। কটেজের দিকে পা বাড়াতেই শুরু হলো ঝরঝর করে বৃষ্টি। কনকনে শীতল জলে ভিজে গেল রানা। হাঁটতে হাঁটতে ভাবল: চারদিকে চোখ রাখেন গফিন, নইলে বুঝতেন না কা-বার নাইফ ব্যবহার করেছে খুনি। ইন্সপেক্টর হকিন্স কি বুঝতে পেরেছে তাঁর কথা?

খুনি মিলিটারি থেকে প্রশিক্ষিত। খুনের সময় ব্যবহার করেছে সম্মুখ সমরের ছোরা কা-বার নাইফ। ওটা কিচেন নাইফের মত সস্তা কিছু নয়। এ-থেকে বোঝা যাচ্ছে, মেলা টাকা দিয়ে ভাড়া করা হয়েছে দক্ষ খুনি। কিন্তু সে-টাকা দিল কে বা কারা? কেনই-বা চাইল বেলা খুন হোক?

আয়ারল্যাণ্ডে রিসার্চ করার সময় কারও জন্যে হুমকি হয়ে উঠেছিল বেলা। আজকের দুনিয়ায় গুলির আঘাতে যত মানুষ মারা পড়ে, তারচেয়ে বেশি খুন হয় বিপজ্জনক তথ্যের জন্যে। নিশ্চয়ই জরুরি কোন তথ্য জেনে গিয়েছিল বেলা। রানা নিজে সেটা জানলে উন্মোচিত হবে খুনের মোটিভ তখন এ-ও বেরোবে কোথা থেকে এসেছে টাকা। আর অর্থের উৎস জানিয়ে দেবে বেলাকে খুন করতে নির্দেশ দিয়েছে কে। অবশ্য এখন রানার বড় সমস্যা হচ্ছে জরুরি সূত্র খুঁজে পাওয়া।,

তেরো
কটেজে ফিরে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে নিল রানা। টের পেল কেটে যাচ্ছে হাসপাতালে দেয়া পেইন কিলারের প্রভাব। শুরু হয়েছে মুখ-মাথা জুড়ে টনটনে ব্যথা। হঠাৎ নিজেকে বড় দুর্বল লাগল ওর। বুঝে গেল, ব্যথা দূর করতে হলে ওষুধের মত কিছু লাগবে। ভেজা পোশাক পাল্টে নেয়ার আগেই ভাবল, এখন এক ঢোক উইস্কি না নিলেই নয়।

ওর চোখ পড়ল ড্রেসারের মাথায় রাখা উইস্কির বোতল ও গ্লাসের ওপরে। বোতল খালি হলেও গ্লাসে আছে আড়াই ইঞ্চি মদ। গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতেই বিদ্যুতের শক খেল রানা। গতকাল ছুটে গিয়েছিল বেলাকে বাঁচাতে, কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। হাত বাড়িয়েও থমকে গেছে রানা। কয়েক পলক চেয়ে রইল সোনালি তরলের দিকে। মনের ভেতরে কে যেন বলল, ‘যথেষ্ট, রানা! নতুন করে আর মদ গিলতে যেয়ো না।’

হাত বাড়িয়ে উইস্কি ভরা গ্লাস ও খালি বোতল নিল রানা। দ্রুত পায়ে চলে গেল কিচেনে। বোতলটা যেন রিসাইকেল বিনে। তারপর সিঙ্কে ঢেলে দিল গ্লাসের উইস্কি। ফিরে এল পাশের ঘরে। বাক্সে আছে উইস্কির আরও কয়েকটা বোতল। বাস তুলে নিয়ে ফিরে এল কিচেনে। এক এক করে বোতলের মুখ খুলে সিঙ্কে ডাবল সোনালি তরল। তিন মিনিটে মিনিটে – খালি হলো সাতটা বাতল। ততক্ষণে অ্যালকোহলের গন্ধে কিচেনের পরিবেশ। হয়ে গেছে চালু ডিসটিলারির মত।

কিচেন থেকে বেরিয়ে আর্মচেয়ারে গিয়ে বসল রানা। সারা বিকেল ঝরঝর করে ঝরল বৃষ্টি। জানালা দিয়ে সে-দৃশ্য দেখল ও। প্রচণ্ড হয়ে উঠেছে মাথা ব্যথা। কোনকিছুই পাত্তা দিল না রানা। শেষ বিকেলে জুতো খুলে লাগেজ হাতড়ে বের করল একজোড়া কেস্। ওর মনে পড়ল, গত ছয়মাসে ওগুলো ব্যবহার করেনি। জুতোর ফিতে বেঁধে কটেজ থেকে বেরিয়ে এল রানা। ছুটতে লাগল বৃষ্টির ভেতরে।

কৈশোরে প্রতি ভোরে এই সৈকতে দৌড়াত পাঁচ মাইল। এরপর শুরু হতো প্রেস আপ ও সিট আপ। পরিশ্রান্ত না হয়ে ব্যায়াম করত একঘণ্টার বেশি। আজ রানা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল: যত কষ্ট হোক, নিজেকে আবারও যোগ্য করে তুলবে।

প্রথম মাইল ছুটতে গিয়ে মাংসপেশির ব্যথা ও হাঁফ লাগার জন্যে নিজেকে বারবার দোষ দিল রানা। মনের ভেতরে খুনের দায় নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বৃষ্টির ভেতরে ছুটে চলল সৈকতের শেষপ্রান্তের দিকে। নুড়িপাথরে পড়ছে একেক পা, আর ঝাঁকুনি খেয়ে বাড়ছে ওর মাথা-ব্যথা। মনে হচ্ছে যেন ছিঁড়ে যাবে গেণিগুলো। হাঁসফাঁস করছে যন্ত্রণায় ভরা ফুসফুস। কয়েকবার মনে হলো, এবার একটু থামি, একটু বিশ্রাম নিই।

যদিও একবারের জন্যেও থামল না রানা।

একঘন্টা পর টলতে টলতে ফিরল কটেজে। ততক্ষণে সিধে হয়ে দাঁড়াবার সাধ্যও ফুরিয়ে এসেছে ওর। ভার্নিশ করা লিভিংরুমের মেঝেতে দীর্ঘ জলধারা রেখে বসে পড়ল ড্রেসারের পাশের আর্মচেয়ারে। ফুলে ঢোল হয়েছে পায়ের পাতা ও কাফ মাসল। গুঙিয়ে উঠে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে এক এক করে খুলল ভেজা কেড্‌স্ ও মোজা। আড়ষ্ট দু’পা মেঝেতে রাখতেই মনে হলো, ওগুলো কোন গাছের মরা গুঁড়ি। কী যেন খচ্ করে বিধল ডানপায়ের পাতার নিচে। ব্যথা পেয়ে পা তুলে রানা দেখল, মাংসে গেঁথে গেছে একটুকরো ক্রিস্টাল। বুড়ো আঙুল ও তর্জনী দিয়ে ধরে ওটা তুলে আনল রানা। ক্ষত থেকে টপটপ করে পড়ছে রক্ত। অবশ্য গভীর নয় কাটা জায়গা। বুঝে গেল, মেঝে থেকে ভাঙা গ্লাস সরাবার সময় রয়ে গেছে স্ফটিকের টুকরো।

রানা মেঝেতে বসে খুঁজতে লাগল ধারাল আরও টুকরো রয়ে গেছে কি না। ঘড়ঘড় আওয়াজে ঠেলে দিল আর্মচেয়ার। মেঝেতে এক জায়গায় মদ পড়লেও আশপাশে কোন ভাঙা স্ফটিক নেই।

অবশ্য তার বদলে রয়েছে অন্যকিছু।

আর্মচেয়ারের তলায় হাত ভরে ওটা বের করল রানা।

জিনিসটা চামড়ার একটা পাউচ।

ভুরু কুঁচকে ওটার দিকে চেয়ে রানার মনে পড়ল, গতকাল বিকেলে কাঠের চেয়ারের কাঁধে ভেজা ব্যাগ ঝুলিয়ে রেখেছিল বেলা। চলে যাওয়ার আগে মদের প্রভাবে চেয়ারের ওপরে টলে পড়লে ব্যাগসহ মেঝেতে পতন হয় চেয়ারটার। চারপাশে ছড়িয়ে যায় ব্যাগের ভেতরে জিনিসপত্র। তাড়াহুড়ো করে সব গুছিয়ে নিয়ে বিদায় নেয় বেলা। জানত না আর্মচেয়ারের নিচে রয়ে গেছে মোবাইল ফোনের পাউচ।

গেস্ট-হাউসের দিকে যাওয়ার সময় ব্যাগে পাউচ নেই সেটা টের পায় বেলা। তখন ছুটতে ছুটতে আসে রানার কটেজের কাছে। কিন্তু সে-সময় ওকে ধাওয়া করছে দুই খুনি।

পাউচ দৈর্ঘ্যে সাড়ে সাত ইঞ্চি, চওড়ায় চার ইঞ্চি। ভেড়ার চামড়া দিয়ে তৈরি। মূল পকেট ছাড়াও সামনে আছে চেইন দেয়া ছোট পকেট। রানা আগেই জানে, পাউচে কী আছে। প্রমাণ হিসেবে ওটা পুলিশের হাতে তুলে দেবে কি না, সেটা ভাবতে গিয়ে সময় নিল ও। তারপর বুঝে গেল, কাজটা করা উচিত হবে না।

দ্বিধা না করে পাউচের বড় পকেট থেকে নিল বেলার নোটবুক। চোখ বোলাল লেখাগুলোর ওপরে। বেলা টুকে রখেছে কয়েক পৃষ্ঠা নোট, আয়ারল্যাণ্ডের কিছু জায়গা আর ‘জন মানুষের নাম। নোটবুক সরিয়ে রেখে পাউচের সামনের পকেটের চেইন খুলল রানা। ভেতর থেকে নিল দুটো স্মার্টফোন। দুটোর একটা নোকিয়ার দামি মোবাইল ফোন, অন্যটা কমদামি স্যামসাং। শেষেরটা মাত্র ক’দিন আগে কেনা। স্ক্রিন থেকে খোলেনি প্রোটেকটিভ প্লাস্টিক শিট।

রানার মনে পড়ল, গতকাল এদিকে আসার সময় চামড়ার পাউচ থেকে স্মার্টফোন নিয়ে মেসেজ এসেছে কি না দেখেছে বেলা। খুব হতাশ হয়েছিল তখন। বলেছিল, একলোকের কাছ থেকে মেসেজ পাবে বলে আশা করছে। ওটা ওর রিসার্চের সঙ্গে জড়িত। দুশ্চিন্তার ছাপ ছিল মুখে। অবশ্য এ- ব্যাপারে সে-সময় আর কিছু বলেনি।

তখন কিছু না ভাবলেও এখন বেলার মৃত্যুর পর প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে রানা। ভাবল: গতকাল কোন্ ফোনটা ব্যবহার করেছিল বেলা?

পাশাপাশি দুই ফোন দেখার পর ওর মনে পড়ল, বেলার হাতে ছিল কমদামি স্যামস্যাং।

ওটা চালু করল রানা। কনট্যাক্ট লিস্টে বোধহয় থাকবে গুরুত্বপূর্ণ লোকটার নাম।

যদিও কনট্যাক্ট লিস্ট প্রায় খালি।

হয়তো আগেই বেশিরভাগ ডেটা ডিলিট করেছে বেলা।

ব্যাক কি টিপে এসএমএস মেন্যুতে গেল রানা।

তিনদিন আগে সার্ভিস প্রোভাইডারের ‘ওয়েলকাম, নিউ ইউয়ার’ মেসেজ ছাড়া অন্য কোন ডেটা নেই।

এ-ফোন আয়ারল্যাণ্ডের নানাদিকে যাওয়ার সময় দু’চার দিন আগে কিনেছে বেলা।

দ্বিতীয় ফোন কেন কিনল মেয়েটা? ভাবল রানা।

জরুরি তথ্য পাওয়ার সঙ্গে নতুন ফোন কেনার কি কোন সম্পর্ক আছে?

মেসেজ মেনু থেকে সরে কল হিস্ট্রি দেখল রানা।

প্রায় অব্যবহৃত ফোন থেকে তিনবার কল করেছে বেলা আর সেটা করেছে ফোন কেনার দিনে।

প্রথম কল স্থানীয় সময় বিকেল তিনটে পঁচিশে। ওটা গেছে আমেরিকার এক ল্যান্ডফোনে। কথা বলেছে মাত্র তিন মিনিট।

এরপর ফোন করেছে লণ্ডনের এক ল্যাণ্ডফোনে। তখন কথা বলেছে কয়েক মিনিট।

তৃতীয় ফোন আবারও আমেরিকায়।

সে-সময়ে কথা হয়েছে একচল্লিশ মিনিট।

কিন্তু বেলা কেন আবারও ফোন করল আমেরিকায়?

এর পেছনে নিশ্চয়ই জরুরি কোন কারণ ছিল?

রিসিভড্ কল চেক করে মাত্র একটা ফোনকল পেল, রানা। একই দিনে তিনটে চল্লিশ মিনিটে ফোন করেছে বেলা লণ্ডনে। কথা বলেছে তিন মিনিট। এরপর পাঁচটা একত্রিশ মিনিটে আমেরিকায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেছে। এরপর আর ব্যবহার করেনি স্যামসাং।

আমেরিকায় যে ল্যাণ্ডফোনে কল করেছিল বেলা, অপশন টিপে সে-নাম্বারে ফোন দিল রানা।

আয়ারল্যাণ্ডে এখন বিকেল তিনটে।

অর্থাৎ আমেরিকায় বাজে রাত তিনটে।

দু’বার রিং হওয়ার পরে আমেরিকার দক্ষিণের সুরে বলল এক মেয়ে, টুলসা সিটি হল। মেয়রের অফিস। আপনার জন্যে আমরা কী করতে পারি?’

মেয়রের অফিস? বিস্মিত হয়েছে রানা। চট করে ভেবে নিয়ে বলল, ‘লণ্ডন থেকে টনি ব্র্যাডম্যান বলছি। তিনদিন আগে আমার কলিগ বেলা ওয়েস আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।’

‘তা-ই? কিন্তু কী বিষয়ে?’ দ্রুত জানতে চাইল মেয়েটা।

এ-বিষয়ে নিজে কথা বলতে চাই মেয়রের সঙ্গে,’ বলল রানা।

‘আগে বলুন আপনি কোথায় জব করেন ..

‘শেরিফস ব্যাজ ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক।’ লণ্ডনে রানার এক বন্ধু সেই ব্যাঙ্কের সিকিউরিটি চিফ। ‘শুনুন, মিস, জরুরি কারণে কথা বলতে চাই মেয়রের সঙ্গে। আপনি কি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবেন, আপনার অফিসে তিনদিন আগে কল দিয়েছিল আমার কলিগ?’

বিষয়টি সিকিউরিটির বুঝতে পেরে মেয়েটা বলল, ‘দয়া করে একটু অপেক্ষা করুন। আমি চেক করে দেখছি।’ মিনিটখানেক পর আবার লাইনে এল সে। ‘জী, তিনদিন আগে মেয়রের সঙ্গে কথা বলতে চান’ আপনার কলিগ কিন্তু …’

তাকে বাধা দিল রানা, ‘আমার কলিগ কি মেয়রের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছে?’

‘না, তিনি তখন অফিসে ছিলেন না। আপনি বলুন তো আসলে…’

আবারও বাধা দিল রানা, ‘আমার কলিগ নিশ্চয়ই বলেছিল, কেন মেয়রের সঙ্গে আলাপ করতে চাইছে?’ বুঝে গেছে এভাবে তথ্য আদায় করতে পারবে না। অবশ্য কিছু হারাবারও নেই ওর।

‘বলুন তো, আসলে কে আপনি?’ অধৈর্য সুরে বলল মেয়েটা।

আর কিছুই জানতে পারবে না বুঝে ‘ধন্যবাদ, আপনার রাত সুন্দর কাটুক,’ বলে ফোন রেখে দিল রানা।

কেন টুলসার মেয়রের সঙ্গে কথা বলেছে বেলা? নিজেকে জিজ্ঞেস করল ও। এবার লিস্টের পরের নম্বরে কল দিল। ওটা লণ্ডনের। কিন্তু ওদিক থেকে জবাব দিল না কেউ। অ্যানসারিং সার্ভিসও নেই। এবার বেলার আমেরিকায় করা সেই মোবাইল ফোনে কল দিল রানা।

কিন্তু অফ করে রাখা হয়েছে ডিভাইসটা।

দ্বিতীয় ফোনের দিকে তাকাল রানা। প্রায় নতুন হলেও বহু ব্যবহার করা হয়েছে নোকিয়া। ভেতরে প্রচুর নম্বর। বাবা-মার কাছে নিয়মিত ফোন করত বেলা। এ-ছাড়া আছে অ্যাড্রেস বুকে আত্মীয়স্বজন ও বান্ধবীদের ফোন নম্বর। ফোন ঘেঁটে এমন কোন তথ্য পেল না রানা, যেটা থেকে বোঝা যাবে আসলে কী ধরনের কাজ কত বেলা। আরও কিছুক্ষণ পর অপরাধবোধে ভুগতে লাগল রানা। মৃত এক মেয়ের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাচ্ছে। হতাশ হয়ে পাউচের পকেটে রেখে দিল কোনদুটো।

এবার পড়তে লাগল নোটবুক। ওটা শুধু নোটবুক নয়, ডায়েরির মত করে টুকটাক বহু কথাই লিখেছে বেলা। অনেক রিসার্চারের মত কখন কোথায় কী কাজে গেছে, তা টুকে রেখেছে। গুছিয়ে কাজ করত। যদিও হাতের লেখা বুড়ো ডাক্তারদের মতই জটিল। আগস্ট মাসে এক পাতা জুড়ে বেলা লিখেছে আইরিশ ট্রিপের বিষয়ে। গত কয়েক সপ্তাহে গ্রাম্য বেশ কিছু জায়গায় গেছে। সেগুলোর ভেতরে আছে ভেঙে পড়া পুরনো এবারডেন ম্যানশনের কথা। অতীতে সে এলাকায় বেশ কয়েকটা গ্রাম মিলে ছিল রিশাল এবারডেন এস্টেট। একটা নোটে বেলা লিখেছে:

কথা বলেছি সেইণ্ট ম্যালাচি চার্চের ফাদার ও-সুলিভানের সঙ্গে। জানলাম তাঁদের রেকর্ড অনলাইনে নেই।
বায়ার্ন ১৮০৯ সালে জন্মালে কীভাবে ১৮২২!!! এ তো অসম্ভব!!!!!

কিছুই জানা নেই বলে নাম, তারিখ ও সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না রানার কাছে। আনমনে ভাবল, এবার বোধহয় বেলার মত আমাকেও উঁকি দিতে হবে অতীতে। সেক্ষেত্রে হয়তো জানব কেন খুন করা হয়েছে মেয়েটাকে।

নোটবুক রেখে কিচেনের দেয়ালের পেরেক থেকে টয়োটা প্রিমিয়োর চাবি নিল রানা। পায়ে বুট পরে নিয়ে কটেজ ছেড়ে বেরিয়ে চলে এল গ্যারাজে। ভাল করেই জানে, খুনের ব্যাপারে নতুন তথ্য পেতে হলে নিজে থেকে তদন্ত করতে হবে ওকে।

চোদ্দ
আমেরিকার ওকলাহোমা রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর টুলসায় এখন বাজে সকাল সাড়ে নয়টা। এরই মধ্যে সূর্যের তাপে চারপাশ হয়ে গেছে জ্বলন্ত উনুন। এমন কী অপেক্ষাকৃত শীতল শাটারবদ্ধ গ্যারাজেও দরদর করে ঘামছে জ্যাকি। ধুপ করে আটকে দিল গাড়ির পেছনের ট্রাঙ্কের ডালা। মোমপালিশ করা মসৃণ বড়ি ঢাকল তারপুলিন দিয়ে। অন্তরের গভীরে শুনল বাবার আদুরে কণ্ঠস্বর: ‘ভুলিস না, মা, সবসময় কোন না কোন বিকল্প হাতে রাখবি।’

প্রায়ান্ধকার গ্যারাজে গাড়িটার কাছ থেকে সরে এল জ্যাকি। বারবার মনে হচ্ছে, কেউ না কেউ চোখ রেখেছে ওর ওপরে। কানে শুনছে কাদের পদশব্দ। আসলে পুরো দু’দিন বিশ্রী সেই মোটেলে লুকিয়ে থেকে শুরু হয়ে গেছে মানসিক সমস্যা। ভয় লাগছে ভীষণ। অবশ্য শেষমেশ নিতে পেরেছে জরুরি সিদ্ধান্ত। ওর ধারণা, সঠিক কাজই করছে। আসলে এ-ছাড়া আর কোন উপায়ও তো নেই।

গ্যারাজের শাটারের নিচের সরু ফাঁক দিয়ে আসছে এক চিলতে সোনালি রোদ। ওখানে থেমে বিশ্রী আওয়াজে শাটার তুলল জ্যাকি। গ্যারাজ থেকে বেরিয়ে আবার টেনে বন্ধ করল শাটার। তালা মেরে দিল হ্যাণ্ডেলে। বাইরের ঝলমলে আলোয় কুঁচকে গেল ওর ভুরু। কপালে হাত রেখে দেখল ডানে-বামে। একসারিতে কিছু তালাবদ্ধ গ্যারাজের সামনে আছে ও। আশপাশে কেউ নেই। ফাঁকা পড়ে আছে ঝোপে ভরা বিশাল উঠনের মত জায়গা। দেয়ালে-দেয়ালে নানান নোংরা উক্তি।

আমার কপাল ভাল হলে শুক্রবার রাতে খুনিরা বুঝতে পারেনি তাদের কুকীর্তি দেখে ফেলেছি, ভাবল জ্যাকি। আর সেটা সত্যি হলে হাড়ে হাড়ে শয়তানগুলো বুঝবে, অন্যায় করে কখনও রেহাই পাওয়া যায় না।

গ্যারাজের উঠন পেরিয়ে রাস্তায় এল জ্যাকি। ওর জন্যে মিটার চালু করে বসে আছে এক ট্যাক্সি ড্রাইভার। ‘এবার কোথায় যাবেন, মিস?’ জানতে চাইল সে।

‘ডাউনটাউন,’ বলল জ্যাকি, ‘পুলিশ হেডকোয়ার্টারে।’

‘আচ্ছা।’

জ্যাকি পেছনের সিটে উঠতেই রওনা হলো ড্রাইভার। দু’চোখ বুজে মেয়েটা ভাবল, কী বলবে পুলিশকে। ওর ব্যাকপ্যাকে আছে ডিভিডি ও স্মার্টফোন। ও-দুটোর জন্যে এবার ফেঁসে যাবে লিঙার স্বামী।

ডাউনটাউনে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে সরাসরি মেইন ডেস্কে গেল জ্যাকি। ডেস্কের পেছনের চেয়ারে বসে আছে বয়স্ক এক সার্জেন্ট। তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্যে খুকখুক করে কাশল জ্যাকি। জবাবে মুখ তুলে ওকে দেখল গম্ভীর লোকটা। তার পরনে হাতকাটা কালচে-নীল শার্ট। বুক পকেটের ওপরে প্লাস্টিকের কার্ডে লেখা: টুলসা সিটি পুলিশ।

‘আমি জ্যাকুলিন সিলভেস্টার,’ অফিসারকে বলল জ্যাকি, একজন ডিটেকটিভের সঙ্গে কথা বলতে চাই। ভাল হয় সিনিয়র কেউ হলে। বিষয়টা খুবই জরুরি।’

ওর গলায় তাগিদ টের পেয়ে সতর্ক হলো অফিসার। পাঁচ মিনিটের ভেতরে রিসেপশন লবিতে জ্যাকির সঙ্গে দেখা করল ক্লান্ত চেহারার সাদা পোশাকের এক পুলিশের গোয়েন্দা। বড়জোর ত্রিশ হবে তার বয়স। নিজের নাম বলল জিম লিয়োনার্ড। ব্যস্ত লবি থেকে জ্যাকিকে নিয়ে গেল ছোট এক অফিসে। হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিল চেয়ার। ওখানে বসে কোলের ওপরে ব্যাকপ্যাক রাখল জ্যাকি। নিজে টেবিলের কোনায় পা ঝুলিয়ে বসল ডিটেকটিভ। তার ভাব দেখে জ্যাকির মনে হলো, কাজ ফেলে এসে মহাবিরক্ত সে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল ডিটেকটিভ, ‘ঠিক আছে, বলুন, মিস…..

‘আমার নাম জ্যাকুলিন সিলভেস্টার।’

‘বেশ। ডেস্ক ডিউটিতে থাকা অফিসারকে বলেছেন, খুব দরকারি কাজে এখানে এসেছেন।’

আমার মনে হয় না গত একসপ্তাহে এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছু আপনি শুনেছেন,’ বলল জ্যাকি।

‘তা হলে শুনি আপনার কী বলার আছে।’

‘প্রথম থেকে বলছি,’ বলল জ্যাকি। ওর কথায় ডায়েরিয়া আক্রান্ত রোগীর মত বিকৃত চেহারা করল ডিটেকটিভ। ‘আমি চাকরি করি রোয বাড ট্রাস্টে। আমরা টুলসার গরীব শিশুদের আবাসন ও খাবারের সুব্যবস্থা করি।’

‘আগেও এই ট্রাস্টের নাম শুনেছি, বলতে থাকুন,’ বলল ডিটেকটিভ। চট করে দেখে নিল হাতঘড়ি।

‘তা হলে তো আপনি জানেন রোয বাড ট্রাস্টের ডিরেক্টর আসলে কে,’ বলল জ্যাকি।

‘হ্যাঁ, জানি। টুলসার সবাই সেটা জানে।’

‘আমি লিণ্ডা কনারের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। কাজ করি তাঁর সরাসরি নির্দেশে। অনেকের কাছ থেকে সম্মান পেলেও প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হয় আমাকে। তাই কখনও কখনও বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ি।’

ডিটেকটিভের চোখ বলছে: আসল কথায় আসুন, মিস!

‘আমার বস আর তাঁর স্বামীর উলোগাহ্ লেকের পুব তীরে একটা কটেজ আছে,’ বলল জ্যাকি। ‘তিনদিন আগে…’

চুপচাপ শুনতে লাগল ডিটেকটিভ। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে উধাও হলো তার মুখের বিরক্তি। এখন আর একটু পর পর হাতঘড়ি দেখছে না। থেমে গেছে পা দুলিয়ে অধৈর্য ভাব করা। পিঠ টানটান করে চেয়ে আছে জ্যাকির দিকে। কুঁচকে গেছে ভুরু। ওর কথা শেষ হওয়ার পর ডেস্ক থেকে নেমে পায়চারি শুরু করল সে। চোখে-মুখে দ্বিধা। মিনিট দুয়েক পর বলল, ‘আপনার কোন ভুল হচ্ছে না তো?’

‘আমার কথা অবিশ্বাস হলে নিজেই ভিডিয়ো দেখুন, ব্যাকপ্যাকে হাত রাখল জ্যাকি। ‘আমার বলা প্রতিটি ঘটনা ওটাতে পাবেন।’

তীক্ষ্ণ চোখে কিছুক্ষণ ওকে দেখল অফিসার লিয়োনার্ড, তারপর ‘একমিনিটের মধ্যে ফিরছি,’ বলে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। পেছনে আটকে দিয়েছে কবাট।

ঘরে একা বসে থাকল জ্যাকি

মিনিট পাঁচেক পর দড়াম করে খুলে গেল দরজা। ঘরে ঢুকল বিশাল শরীরের একলোক। তার কাঁধ বাইসনের কাঁধের মত চওড়া। বয়স অন্তত পঞ্চাশ। মাথায় চুল রুপালি। পাথর কুঁদে তৈরি চেহারা। কপালে ও গালে লালচে সব শিরা। জীবনে অন্তত তিনবার ভেঙেছে তার নাক। পরনে জ্যাকেট নেই। শার্টের ওপর চামড়ার হোলস্টারে ঝুলছে কালো এক কোল্ট পাইথন রিভলভার। লোকটাকে দেখে জ্যাকির মনে পড়ল বুনো পশ্চিমের দুর্ধর্ষ মার্শালদের কথা। ওই যে, যারা সঙ্গে রাখত লম্বা নলের সিক্সগান। শার্টের হাতা গুটিয়ে রেখেছে অফিসার। পেশিবহুল বাহু কাঠুরেদের মত। তার পিছু নিয়ে আবারও ঘরে ঢুকেছে জিম লিয়োনার্ড। অবশ্য তাকে পাত্তা না দিয়ে জ্যাকির সামনে থামল বয়স্ক অফিসার।

‘আমি টুলসার পুলিশ চিফ রিপার রিগবি,’ ঘড়ঘড়ে গলায় বলল সে, ‘একটু আগে ডিটেকটিভ লিয়োনার্ডকে যা বলেছেন, সেটা আমার সামনে আবারও বলুন।’

বিশালদেহী অফিসারের সামনে নিজেকে নগণ্য বলে মনে হলো জ্যাকির। শুকনো গলায় বলল, ‘আপনি চান, আমি যেন আবার সবকিছু প্রথম থেকে বলি?’

‘একটু আগে বলেছেন উলোগাহ্ লেকে তাঁর কটেজে আপনাকে থাকতে দেন লিণ্ডা কনার। কিন্তু কেন সেটা তিনি দিলেন?’

‘কারণ তিনি খুবই বড় মনের মানুষ,’ বলল জ্যাকি।

‘হৃদয়বতী মহিলা। ঠিক আছে, বলতে থাকুন।

‘তাঁকে বলেছিলাম, কাজ করে করে ক্লান্ত হয়ে গেছি। তখন তিনি বললেন, তাঁর স্বামী গেছেন বোস্টনে। তাই আমি চাইলে দু’এক দিন কাটিয়ে আসতে পারি তাঁর কটেজ থেকে। জানালাম, আমার গাড়ির ইঞ্জিনে গোলমাল ধরা পড়েছে। তাই ওটা নিয়ে দূরে যেতে পারব না। তখন তিনি বললেন তাঁদের ড্রাইভারকে বলবেন, যাতে সে রোদ্ রয়েসে করে আমাকে কটেজে পৌছে দেয়। এ-কথায় খুব খুশি হয়েছিলাম। ভাবলাম লেকের তীরে দুটো দিন বিশ্রাম নেব। সেই সঙ্গে দৌড় প্র্যাকটিস করে নেব ম্যারাথনের জন্যে। অবশ্য এসব আগেই ডিটেকটিভ লিয়োনার্ডকে জানিয়ে দিয়েছি।’

‘কীসের ম্যারাথন?’ গভীর সন্দেহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল চিফ রিগবি।

‘গতবছর টুলসা সিটি মহিলা ম্যারাথনে দ্বিতীয় হয়েছি। তাই নভেম্বরের দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে চাই। এই ম্যারাথনের কল্যাণে লাখ লাখ ডলারের ফাণ্ড সংগ্রহ করে রোয বাড ট্রাস্ট। আমার যদিও মনে হচ্ছে না আপনি এসব জানতে চান।

‘ঠিকই বলেছেন, আমি জানতে চাই কটেজে কী ঘটেছে।’

‘ডিনারের পর শুয়ে পড়লেও মাঝরাতে ঘুম ভাঙল পুরুষ মানুষের গলার আওয়াজে। ভাবলাম বোধহয় ডাকাত পড়েছে কটেজে। বিছানা থেকে নেমে পিস্তল হাতে নিলাম। আর তারপর…’

‘আগ্নেয়াস্ত্রের পারমিট আছে আপনার?’ জানতে চাইল চিফ রিগবি।

বিরক্ত হয়ে ভুরু কুঁচকাল’ জ্যাকি। ‘আপনার কি ধারণা আমিই খুনি, নাকি কটেজে যারা গিয়েছিল, আসলে তারা? আমি এখানে আমার পিস্তলের গল্প বলতে আসিনি। আপনি কি আমার পিস্তল বা পারমিট দেখতে চান?’

‘পরে দেখব। বলতে থাকুন।’

‘কটেজে যে এল, তার সঙ্গে চাবি ছিল বলেই দরজা খুলে ঢুকতে পেরেছে। তখনই বুঝলাম, বোস্টনে যাননি লিণ্ডা কনারের স্বামী। তাঁর সঙ্গে ছিল ক’জন লোক। তাদের একজনের গালে চাপদাড়ি। মাথার কোঁকড়া চুল কালো। বয়স হবে চল্লিশ বা পঞ্চাশ

‘যে পরে খুন হয়, বলল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড।

‘তার নাম জেনেছেন?’ সহকারীর দিকে না চেয়ে জ্যাকির কাছে জিজ্ঞেস করল চিফ রিগবি।

‘একবারও তার নাম ধরে ডাকেনি কেউ,’ বলল জ্যাকি। তাদের ভেতরে কথাও হচ্ছিল না। একটু পর লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলল তারা। আর তারপর…

‘একমিনিট,’ বাধা দিল চিফ। ‘ওখানে ক’জন ছিল?’

‘মারধর করেছে ডাকাতের মত দুই যুবক। ব্যাটন দিয়ে পেটাল মধ্যবয়স্ক লোকটাকে। এসব ব্যাটন ব্যবহার করে পুলিশ ও সিকিউরিটি গার্ডেরা। তারপর লোকটাকে কটেজের বাইরে তাদেরকে নিয়ে যেতে বলল সে।’

‘এই সে-টা আসলে কে?’ জানতে চাইল চিফ রিগবি।

মাথা দোলাল জ্যাকি। ‘সে লিণ্ডা কনারের স্বামী। বলল, ‘এখানে নয়, বাইরে নাও, বার্ব।’ আমার মনে হলো, সে চাইছে না কার্পেটে রক্ত পড়ুক। সেই দুই যুবক দাড়িওয়ালা লোকটাকে ছেঁচড়ে দরজা পার করিয়ে নিয়ে গেল বারান্দায়। আর তখনই প্রথমবার গুলি করা হলো তাকে।

‘কতবার গুলি করা হয়েছে?’ জানতে চাইল চিফ রিগবি।

‘গুনিনি, তিন বা চারবার। প্রথমে তাকে খুন করেনি। অন্যরা মজা পাচ্ছিল ইঁদুর-বেড়াল খেলতে গিয়ে। আহত লোকটাকে শীতল চোখে দেখছিল তারা। তারপর অ্যারন কনার বের করল বড় এক রিভলভার। আপনার হোলস্টারের অস্ত্রটার মত। বোধহয় ফোর্টি-ফোর ক্যালিবারের রুপালি রঙের রিভলভার। স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি।’

‘অস্ত্র তো দেখি ভালই চেনেন?’ নিষ্পলক চোখে জ্যাকিকে দেখছে চিফ রিগবি।

‘আমার বাবা ছোটবেলায় শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে চালাতে হবে পিস্তল,’ জবাবে বলল জ্যাকি।

‘তো অস্ত্র আপনার খুব পছন্দ, ঠিক কি না?’

পুলিশ চিফের চোখে সরাসরি তাকাল জ্যাকি। ওর মনে হচ্ছে, ওকে ফাঁসিয়ে দিতে চাইছে লোকটা। ‘আমি একজন আধুনিক মহিলা,’ বলল ও। ‘তাই চাই না অসহায় হয়ে খুন হব একদল ডাকাতের হাতে।’

‘ঠিক আছে,’ বাতাসে হাত নাড়ল চিফ। ‘এই বিষয়ে কোন তর্কে যাব না। এবার বলুন, ওখানে আর কী ঘটল?

‘এরপর লোকটাকে গুলি করল অ্যারন কনার।’

কথা শুনে ঠোঁট মোচড়াল চিফ। ‘অর্থাৎ আপনি বলছেন, নিজে গুলি করেছেন তিনি? নিজে ট্রিগার টিপে দিয়েছেন? জেনে-বুঝে?’

‘বলতে পারেন খুশিমনে খুন করেছে সে,’ বলল জ্যাকি। ‘মাত্র ক’ফুট দূর থেকে গুলি করেছে মাথার পেছনে। এরপর সঙ্গের লোকদুটোকে বলল, ‘টুকরো করে মাংসগুলো কুকুর দিয়ে খাইয়ে দেবে।

‘লাশ টুকরো করার কথা বলেছেন তিনি?’

‘তা-ই বলেছে,’ মাথা দোলাল জ্যাকি।

গম্ভীর হয়ে গেছে চিফ রিগবি। শুকনো গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। অন্য দু’জনকে নির্দেশ দেয়ার সময় কেমন ছিল তাঁর মনোভাব?’

‘ঠাণ্ডা গলায় কথা বলেছে।’

‘মাতাল ছিলেন?’

‘না। স্বাভাবিক কণ্ঠেই কথা বলেছে অ্যারন কনার।’

‘আপনি বলছেন, ঠাণ্ডামাথায় মানুষ খুন করেছেন তিনি?’ ওর প্রতিটি কথা এখন যাচাই করছে চিফ রিগবি, বুঝে গেল জ্যাকি। এমন ঘটনার কথা জানলে নিজেও তা-ই করত ও। চিফ রিগবির চেহারা নির্বিকার। ধীরে ধীরে মাথা দোলান জ্যাকি। ‘অবশ্যই! জেনে-বুঝেই খুন করেছে! এতে কোন ভুল নেই।’

‘আর আপনি মিথ্যা বলছেন না, সেটা শপথ করে বলতে পারবেন আদালতে?’

‘একই প্রমাণ আছে আমার তোলা ভিডিয়োতে,’ বলল জ্যাকি। ‘ওটাকে মিথ্যা অভিনয় বলে মনে করবে না কেউ।’

বড় করে শ্বাস নিল চিফ রিগবি। জ্যাকির সামনে থেকে সরে দু’বার মাথা নেড়ে বলল, ‘মিস সিলভেস্টার, আপনি কি এরই ভেতরে কাউকে এই বিষয়ে কিছু বলেছেন??

‘এখনও নয়। এমন কী বলিনি আমার বস লিণ্ডাকেও। গত দু’দিন ছিলাম জঘন্য এক মোটেলে। বারবার ভেবেছি লিণ্ডাকে ফোন দেব। কিন্তু পরে ভাবলাম ওটা করা ঠিক হবে না।’

‘আশা করি বুঝতে পেরেছেন, কত বড় অপরাধের দায় আপনি চাপিয়ে দিচ্ছেন টুলসা সিটির মেয়রের কাঁধে?’ জানতে চাইল পুলিশ চিফ।

‘দেখুন, আমি নিজেকে নির্বোধ মানুষ বলে মনে করি না,’ জবাবে বলল জ্যাকি। ‘জানি কী বলেছি। আর তার ফলে কী ঘটতে পারে, সেটাও আমার অজানা নয়। আসলে নিজের চোখে যা দেখেছি, আদালতে গেলেও সেটাই বলব। আমার বস লিণ্ডার স্বামী টুলসার মেয়র অ্যারন কনারকে নিজের চোখে ঠাণ্ডামাথায় মানুষ খুন করতে দেখেছি। আমার এই কথায় একবিন্দু মিথ্যা পাবেন না।

জ্যাকি চুপ করে যাওয়ায় পরস্পরকে দেখল ডিটেকটিভ জিম লিয়োনার্ড ও পুলিশ চিফ রিপার রিগবি। দু’জনের চেহারায় ফুটে উঠেছে দুশ্চিন্তার ছাপ।

কালবেলা – ১৫ (মাসুদ রানা)

সরু পথ গিয়ে উঠেছে টিলার কাঁধে। বামদিকে মস্ত আঙিনার পেছনে আগুনে পোড়া পরিত্যক্ত বিশাল ম্যানশন। ওটার কবাটহীন জানালা গলে আসছে বৃষ্টিভেজা ঝোপের বুনো গন্ধ। সাগর থেকে হু-হু করে বইছে নোনা হাওয়া। আকাশ থেকে কালো মেঘ সরে যাওয়ায় ঝলমল করছে সোনালি সূর্য। এবারডেন হলের পুব উইঙের কাছে গাড়ি রেখে নেমে পড়ল মাসুদ রানা। ছোটবেলায় এ-বাড়িতে পিকনিক করেছে চাচার সঙ্গে। তখন সফেদ দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ বলেন এবারডেন হলের করুণ কাহিনী। কেউ জানে না আঠারো শত একান্ন সালে কেন পুড়ল বাড়ির পশ্চিম উইং। ধসে গেল ছাতের বড় অংশ। অনেকে বলতেন, বদ্ধউন্মাদ হয়ে ম্যানশনে আগুন দেয় স্টার্লিংফোর্ড। আর নিজেই পুড়ে মরে সে নরকে।

এ-কথা সত্যি হলে নিজের কাজে সম্পূর্ণ সফল হয়নি লোকটা, কারণ পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে যাওয়ার আগেই নিজে থেকে নিভে যায় আগুন। অনেকে বর্ণনা করেছে, কীভাবে মচমচে রোস্ট হয়ে মরেছে ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর নরপশু সেই জমিদার। তার পোড়া আঙুলে পারিবারিক সোনার আঙটি আর ছাই হওয়া ওয়েস্ট কোটের ভেতরে সোনার ঘড়ি ছাড়া তাকে চেনার কোন উপায় ছিল না। শাসক হিসেবে চরম দুর্নাম ছিল তার। আর সেজন্যেই ম্যানশনে আগুন ধরলেও ওটা নেভাতে গ্রাম থেকে আসেনি কেউ সবার মনে দগদগে ঘায়ের মত ছিল আঠারো শ’ সাতচল্লিশের দুর্ভিক্ষের স্মৃতি। সে-সময় খেতে না পেয়ে মাছির মত পালে পালে মারা গেছে তাদের আত্মীয়স্বজন। জমিদার কোন সাহায্য তো করেইনি, নির্বিচারে খুন করেছে তাদেরকে। কোন দেশে এমন ভয়ঙ্কর মন্বন্তর হলে পরের পাঁচ শ’ বছরেও তা ভুলতে পারে না এলাকার মানুষ।

বছরের পর বছর আবহাওয়ার নিয়ত অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ধসে পড়ছে এবারডেন হল। আগের চেয়েও করুণ হাল হয়েছে ওটার। কঙ্কালের মত চারদিকে পাথুরে দেয়াল। মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়েছে ছাতের স্লেট। বৃষ্টিতে পচে গেছে দরজা-জানালার কবাট। তুষারপাতে ফাটল ধরা মেঝেতে জন্মেছে বুনো ঝোপঝাড়। এখানে-ওখানে পড়ে আছে মদ ও বিয়ারের খালি বোতল। অবশ্য ওগুলোও বহুকাল আগের। আজ আর কেউ আসে না এবারডেন হলে পিকনিক করতে।

ভুতুড়ে ম্যানশনে পা রেখে চারপাশে তাকাল রানা। কিছুক্ষণ ভাবল বেলার নোটবুকের কথা। এখন ওর পকেটে থাকলেও জরুরি কোন তথ্য ওটাতে নেই। একটু পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার গাড়িতে উঠল রানা। চলল পশ্চিমে দু’মাইল দূরে গ্লেনফেল শহরের বাজার লক্ষ্য করে।

লর্ড অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ডের আমলে গ্লেনফেল ছিল দরিদ্র মানুষের বস্তি। পরে ওটা শহর হয়ে গেলেও এখনও সেখানে আছে পাথরের ছোট সব পুরনো ওঅর্কহাউস। দুর্ভিক্ষের সময় এতিম ছেলে-মেয়েদেরকে ওখানে রাখা হতো। খাবার ও চিকিৎসার অভাবে একেক বাড়িতে প্রতি সপ্তাহে মরত চল্লিশ থেকে পঞ্চাশজন শিশু। বিছানায় থাকত সারি সারি লাশ ও মৃতপ্রায় মানুষ। গ্লেনফেলবাসীদের মত একই পরিণতি বরণ করেছিল আয়ারল্যাণ্ডের অসংখ্য শহর ও গ্রামের অসহায় লাখ লাখ মানুষ। দখলদার ইংলিশেরা ছিল সমাজের মাথা। তবে সব জেনেও কোন ধরনের সহায়তা তারা করেনি। এতে গভীর যে ক্ষত তৈরি হয় আয়ারল্যাণ্ডের মানুষের মনে, তাতে অত্যাচারী ইংরেজদেরকে চিরকালের জন্যে চরম ঘৃণা করতে শিখেছে তারা।

শত বছর পর ওঅর্কহাউসগুলোর বেশিরভাগ হয়ে গেল ধনী খামারিদের শস্যের গুদাম। তেমনই এক গুদামের উঠনে গাড়ি রেখে সেইন্ট ম্যালাচি চার্চ খুঁজতে বেরোল রানা। শহরে আছে মার্বেলের মেমোরিয়াল স্ল্যাব। দুর্ভিক্ষের বিশ বছর পর ওটাতে লেখা হয়েছে হাজার হাজার মৃত মানুষের নাম। ওখানে কিছুক্ষণ থেমে আবার হাঁটতে লাগল রানা।

বিকেল পাঁচটায় ঢুকল ছায়াঘেরা ম্যালাচি চার্চে। আকারে ওটা বড় বা দেখতে সুন্দর না হলেও যে-কোন ধর্মালয়ের মতই ওখানে আছে নীরবতা ও প্রশান্তির স্বর্গীয় পরিবেশ।

উঁচু ছাত থেকে ফিরছে রানার জুতোর শব্দের প্রতিধ্বনি। একবার থেমে দেয়ালের কাছে একটা প্লেক দেখল। ওটাতে লেখা: উনিশ শ’ বাইশ সালে গ্রেনফেলের বাইরে গণকবরে পাওয়া গেছে আট হাজার তিন শ’ আটচল্লিশজন নারী-পুরুষ ও শিশুর কঙ্কাল।

প্লেকের কাছ থেকে সরে যাওয়ার আগেই পেছনে পায়ের শব্দ শুনতে পেল রানা। ঘুরে দেখল ওর সামনে এসে থেমেছেন দয়ালু চেহারার এক বৃদ্ধ। তাঁর মুখে স্মিত হাসি দেখে বলল রানা, ‘ফাদার ও-সুলিভান?’

হাসলেন বৃদ্ধ। ‘হ্যাঁ, আমিই সে। আপনার জন্যে কী করতে পারি?’

‘একটু সময় দিলে আপনার সঙ্গে কথা বলতাম,’ বলল রানা।

‘কোন সমস্যা নেই। কী বলবেন, বলুন?’

নিজের নাম জানাল রানা। যাজককে বলল, আইরিশ মন্বন্তরের ইতিহাস নিয়ে রিসার্চ করছিল ওর এক কলিগ। কিন্তু হঠাৎ করে সে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আরও তথ্য সংগ্রহ করার জন্যে নিজে এসেছে ও।

‘আমার কলিগ এসেছিল মাত্র কয়েক দিন আগে। আমাকে বলেছে, আপনার সঙ্গে কথা বলেছে ও।’

রানার মুখে বেলার চেহারার বর্ণনা শুনে মাথা দোলালেন ফাদার ও সুলিভান। ‘হ্যাঁ, মনে আছে। আমাদের চার্চের পুরনো রেজিস্টার খাতা দেখতে চেয়েছিল। খুব যত্নের সঙ্গে নিজের কাজ করে। আমার কাছে জানতে চেয়েছিল আমাদের রেকর্ড নিখুঁত কি না। জবাবে বলেছি: যতটা জানি, কাজে কোন ত্রুটি রাখা হয়নি। তা ছাড়া, রেকর্ডে ভুল হবেই বা কেন?’ রানার চোখে তাকালেন তিনি। ‘আপনি তো বললেন আপনার কলিগ অসুস্থ। আশা করি খারাপ কোন রোগ হয়নি?’

‘ওর শারীরিক অবস্থা এখন খুব গুরুতর,’ বলল রানা।

‘শুনে দুঃখ পেলাম। মিষ্টি এক মেয়ে। আশা করি স্রষ্টা ওকে নিরোগ করবেন। … এবার, বলুন, আপনি আসলে আমার কাছে কী জানতে চান, মিস্টার রানা?

‘আপনার আপত্তি না থাকলে একই রেকর্ড আমিও দেখতে চাই। তাতে হয়তো বুঝব ওর নোটগুলোর অর্থ আসলে কী। নিজে ওকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি…’ চুপ হয়ে গেল রানা।

‘বুঝতে পেরেছি, মিস্টার রানা। বেশি অসুস্থ হয়ে গেছে সে। ঠিক আছে, তা হলে আপনি না হয় আরেকবার দেখবেন আমাদের রেকর্ডগুলো। আসুন আমার সঙ্গে।

নুড়িপাথরে ছাওয়া সরু এক পথে রানাকে চার্চের পেছনে নিয়ে গেলেন ফাদার ও সুলিভান। পকেট থেকে নিলেন বড় একটা চাবি। পুরনো আমলের এক দরজার তালা খুলে রানাকে নিয়ে প্রবেশ করলেন ছোট এক অফিসে। রানার মনে হলো, একপলকে ও পৌঁছে গেছে শত বছর আগে। আসবাবপত্রের ওপরে পুরু ধুলো, বাতাসে ভেজা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।

‘এ-ঘরেই আছে পুরনো সব রেকর্ড,’ ঝুঁকে আসা তাকের ওপরে হলদেটে প্রাচীন রেজিস্টার খাতাগুলো দুঃখ-ভরা চোখে দেখলেন ফাদার ও-সুলিভান। ‘গত এক শ’ বছরে এদিকের মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে থেকে শুরু করে দেশত্যাগ পর্যন্ত সবই এসব খাতায় আছে। আজকাল অবশ্য অনেক প্যারিশে রেকর্ড রাখা হয় অনলাইনে। সে-কাজ হয়তো করবে আমার পরবর্তী প্রজন্মের ম্যালাচি চার্চের যাজকেরা। নিজে আমি নতুন টেকনোলজির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারিনি। শুনলে হয়তো অবাক হবেন, আমাদের এখানে কোন টেলিভিশনও নেই।’ মলিন হাসলেন ফাদার। পরক্ষণে চট করে ফিরলেন বর্তমানে। ‘ঠিক আছে, ঘেঁটে দেখুন রেকর্ড। আমার মনে আছে, মেয়েটা আসার আগে বহু বছর কেউ এখানে এসে ওগুলো দেখতে চায়নি। আর তারপর একই সপ্তাহে এলেন আপনারা দু’জন। এটা সত্যি বড় এক রহস্য বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। তাই আপত্তি না থাকলে দয়া করে কি বলবেন, আপনারা আসলে কী খুঁজছেন?’

‘আমার কলিগ যে তথ্য দিয়েছে, সেসব এখনও অসম্পূর্ণ,’ বলল রানা। ‘এই প্যারিশের একজনের অতীত ইতিহাস নিয়ে কাজ করছিল ও।

‘আমার মনে আছে, এ-কথাই বলেছে মেয়েটা, সাদা দাড়ি চুলকে নিলেন ফাদার ও সুলিভান। ‘যেহেতু আমার কাজ মানুষের জীবন নিয়ে, তাই মৃত্যুর হিসেব ইচ্ছে করেই মনে রাখি না। তবুও বলুন, মানুষটার জন্ম কোন্ সালে হয়েছিল?’

‘আঠারো শ’ নয় সাল,’ বলল রানা।

‘হুম, সে তো বহুকাল আগের কথা! তার ব্যাপারে তথ্য পেতে হলে আপনাকে ঘাঁটতে হবে অনেক রেজিস্টার খাতা। বলুন তো দেখি কী ছিল মানুষটার নাম?’

‘বায়ার্ন,’ বলল রানা।

অবাক চোখে ওকে দেখলেন ফাদার। ব্যস? তার বংশ- পরিচয় আপনার জানা নেই? বায়ার্ন নামের একলোক, যে কি না জন্ম নিয়েছে আঠারো শ’ নয় সালে? কিন্তু, বাছা, আপনি কি একবার ভেবে দেখেছেন, এই প্যারিশে গত শতাব্দীতে বায়ার্ন নামে কত শত মানুষের জন্ম হয়েছে? আপনার খুঁজে বের করতে হবে বিশেষ একজনকে। কাঁচা ঝাঁকালেন ও- সুলিভান। ‘যা-ই হোক, আপনি চেষ্টা করে দেখুন। ঈশ্বর আপনাকে সহায়তা করুন। সময় যতই লাগুক, এখানে রয়ে যেতে বিব্রত বোধ করবেন না। আপনার কাজ শেষ হলে দরজায় তালা মেরে আমার কাছে দিয়ে যাবেন চাবিটা।’

‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, ফাদার,’ বলল রানা।

‘সবকিছু আরও জটিল করে দেয়ায় আমি দুঃখিত,’ বললেন ফাদার। ‘তবে মনে রাখবেন, বেশকিছু রেকর্ড আছে ল্যাটিন ভাষায়। কেউ একদিন হয়তো ইংরেজিতে ভাষান্তর করবে। আর তখন তার সময়টা কাটবে দুঃস্বপ্নের মত। ঠিক আছে, ঈশ্বর আপনাকে সহায়তা করুন।’

ঘুপচি ঘরে রানাকে রেখে বিদায় নিলেন ফাদার ও- সুলিভান। চারপাশের পুরনো রেজিস্টার খাতার দিকে ঘুরে তাকাল রানা। দু’চার দিন আগে এখানে এসেছে বেলা। আর ওর মত করেই খুঁজতে হবে জরুরি তথ্য। কিছুক্ষণ এদিক- ওদিক দেখার পর একটু এলোমেলো রেজিস্টার খাতাগুলোর ওপরে চোখ পড়ল রানার। প্রথম রেজিস্টার খাতায় লেখা: Parish birth records 1805 January to 1809 December.

ধুলোভরা রেজিস্টার খাতাটা হাতে নিয়ে ওটার ওপরে বেলার আঙুলের ছাপ দেখতে পেল রানা। ওর চোখে ভেসে উঠল রক্তাক্ত এক ক্ষত-বিক্ষত মেয়ের মৃতদেহ।

ঘরের কোণে ছোট্ট টেবিল। ওটার ওপরে রেজিস্টার রেখে প্রথম পৃষ্ঠা খুলতেই বাতাসে ভেসে উঠল মিহি ধুলোর মেঘ। বহুকাল আগের অপূর্ব সুন্দর হাতের লেখায় রচিত হয়েছে প্রতিটি অক্ষর। কালের পরিক্রমা ঝাপসা করে দিয়েছে কিছু শব্দ। দাঁত দিয়ে পুরু কাগজ কেটে নামিয়েছে একদল ইঁদুর। জায়গায় জায়গায় তেলাপোকার বিষ্ঠা। রেজিস্টার খাতার শেষদিকে শুরু হয়েছে আঠারো শ’ নয় সাল। রেজিস্টার খাতা অনুযায়ী তখন গ্লেনফেল আর আশপাশের গ্রামে জন্মেছে শত শত বায়ার্ন নামে শিশু। একের পর এক পৃষ্ঠা ওল্টাতে গিয়ে রানা বুঝল, একফোঁটা মিথ্যা কথা বলেননি ফাদার। সত্যি, বায়ার্নের বংশ-পরিচয় না পেলে কোনভাবেই খুঁজে বের করা যাবে না আসল লোকটাকে।

আরও কিছুক্ষণ রেজিস্টার খাতা ঘেঁটে হাল ছেড়ে দিল রানা। দরজায় তালা মেরে ফিরে এল চার্চের ভেতরে। খুঁজে নিল ফাদার ও-সুলিভানকে।

‘কিছু পেলেন?’ জানতে চাইলেন তিনি।

‘হয়তো জানতাম, যদি বুঝতাম আসলে কী খুঁজতে হবে, বলল রানা।

‘আপনি যদি দুর্ভিক্ষের ব্যাপারে আগ্রহী হন, তো একবার ঘুরে আসতে পারেন জাদুঘর থেকে।’

‘জাদুঘর?’

‘বড় জাদুঘর না হলেও মন্বন্তরের সময় আয়ারল্যাণ্ডের গ্রামের মানুষ কীভাবে মারা গেছে সেটা বুঝতে পারবেন।’

‘তা হলে ঘুরে দেখব ওটা,’ বলল রানা, ‘আমাকে সহায়তা করেছেন বলে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’ বৃদ্ধ মানুষটার সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করল রানা।

‘স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি, আপনার কলিগ যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন,’ বললেন ফাদার ও-সুলিভান, ‘আপনিও ভাল থাকুন।’

বুকের ভেতরে কেমন যেন এক চাপ নিয়ে চার্চ থেকে বেরিয়ে এল রানা।

ষোলো
টুলসা, ওকলাহোমা।

ছোট্ট অফিস থেকে বের করে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের বড় এক কামরায় আনা হয়েছে জ্যাকিকে। ওর সঙ্গে আছে পুলিশ চিফ রিপার রিগবি ও ডিটেকটিভ জিম লিয়োনার্ড। প্লাস্টিক চেয়ারে ঘেরা দীর্ঘ এক টেবিলের শেষমাথায় আছে ডিভিডি প্লেয়ার আর বড় একটা স্ক্রিন।

জ্যাকি ব্যাকপ্যাক থেকে ডিস্ক নিয়ে তার হাতে দেয়ায় জানতে চাইল চিফ রিগবি, ‘এই ডিস্ক কি একমাত্র কপি?’

‘জী, একমাত্র,’ মিথ্যা বলল জ্যাকি।

‘আর ফোনে যে ভিডিয়ো, সেটা কোথায়?

‘আমার কাছেই আছে,’ ব্যাকপ্যাক দেখাল জ্যাকি।

‘প্রমাণ হিসেবে ওটাও লাগবে,’ হাতের ইশারা করল চিফ। জ্যাকির কাছ থেকে সংগ্রহ করল ফোন। ইশারায় দেখিয়ে দিল প্লাস্টিকের একটা চেয়ার। ওখানে বসল জ্যাকি, আড়ষ্ট লাগছে ওর ঘাড় ও কাঁধের পেশি। ওর পাশের চেয়ারেই বসল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড।

ডিভাইসে ডিস্ক ভরল পুলিশ চিফ রিপার রিগবি। স্ট্যাণ্ড থেকে রিমোট কন্ট্রোল নিয়ে বসে পড়ল একটা চেয়ারে। ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে বলল, ‘এবার নিজের চোখে দেখব।’ ডিভিডি প্লেয়ারের দিকে তাক করে বাটন টিপে দিল রিমোট, কন্ট্রোলের।

চালু হলো ভিডিয়ো।

গত দু’দিনে জ্যাকি ভুলে গিয়েছিল, কটেজে কী পরিমাণ ঝাপসা ছবি তুলেছে। দৃশ্যগুলো এখন দেখে হতাশ হয়ে গেল বেচারি। ছবিতে আকাশ থেকে যেন ঝরছে অজস্র বালিকণা। কটেজের আলোয় সবই ছায়াভরা।

পেরোল দীর্ঘ দুটো মিনিট। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে বসে রইল জ্যাকি। লজ্জা লাগছে পুলিশদের দিকে তাকাতে। অস্বস্তি নিয়ে নড়েচড়ে চেয়ারে বসল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড। হয়তো ভাবছে, জ্যাকি মেয়েটা বোধহয় আসলে পাগল।

আবছায়ায় কটেজের বারান্দায় ঘটল হরর সিনেমার মত ঘটনা। জ্যাকি বুঝে পেল না, কটেজে ওর উপস্থিতি আর বিশ্রী ভিডিয়ো কেমন প্রভাব ফেলেছে দুই পুলিশের মনে। বিশ্রী শব্দ তৈরি করেছে রেকর্ডিং। ফোনের প্রতিক্রিয়াশীল ছোট্ট মাইকে গুলির শব্দ চাপা পড়ল মানুষের বিকৃত গলার নিচে। ভিডিয়ো ক্লিপে খুনের দৃশ্য যেন অবাস্তব ও হাস্যকর। বারান্দায় হাত-পা ছুঁড়ছে ঝাপসা হয়ে যাওয়া লোকটা। পলকের জন্যে দেখা গেল তার খুনি লোকটাকে। দৃশ্য খুব অস্পষ্ট। খুনি গুলি ছুঁড়তেই হঠাৎ করে মেঝেতে স্থির হলো লোকটা। এক সেকেণ্ড আগে রিভলভারের নল থেকে ছিটকে গেছে হলদেটে-কমলা হলকা। একই সময়ে গর্জে উঠেছে অস্ত্র। জ্যাকির হাতে ক্যামেরা নড়ে গেছে বলে আবারও অ্যাডজাস্ট হলো এক্সপোয়ার। কাউবয়দের ভঙ্গিতে চরকির মত ঘুরিয়ে নিয়ে হোলস্টারে রিভলভার রাখল খুনি।

চাপা কণ্ঠস্বর এল মাইকে:

‘যাহ্, আমার জুতোয় হারামজাদার রক্ত লেগেছে।’

‘সরি, বস।’

‘সমস্যা নেই। ধুয়ে নিলেই হবে।’

মৃতদেহের ওপর থেকে সরে গেল তিনজন মানুষের ছায়া। তখনই ভয় পেয়ে পিছিয়ে এল জ্যাকি। শেষ হলো ক্লিপ। কালো হয়ে গেছে স্ক্রিন।

ঘরে নেমেছে থমথমে নীরবতা। টেবিলে রিমোট কন্ট্রোল রেখে জ্যাকির দিকে তাকাল চিফ রিপার রিগবি। ‘ব্যস? আর কিছুই নেই?’

কাঁধ ঝাঁকাল জ্যাকি। এরপর আর কোন ভিডিয়ো করতে পারিনি।’

‘তবে তো বড় বিপদ,’ বলল রিগবি, ভিডিয়োতে কোথাও তো মেয়র কনারকে দেখলাম না।’

লোকটা বাধা দেয়ার আগেই ছোঁ দিয়ে রিমোট কন্ট্রোল নিল জ্যাকি। বাটন টিপে হাই-স্পিডে পিছিয়ে নিল ভিডিয়ো। বারান্দায় পড়ে আছে মানুষটা। দোতলার বারান্দা থেকে তোলা হয়েছে মেয়রের ভিডিয়ো। বাইরের দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে অ্যারন কনার। তার পায়ের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে পেট ঘষ্টে সরে যেতে চাইছে মৃত্যুপথযাত্রী লোকটা। চিৎকার করছে ব্যথায়। স্পিকারে বিকৃতভাবে আসছে সেই শব্দ। প্লে বাটন টিপে ঠিক জায়গায় এনে ইমেজ পয করল জ্যাকি। আঙুল তুলে দেখাল দৃশ্যটা। আপনি কী করে বলছেন যে অ্যারন কনারকে চিনতে পারেননি? ওই যে সে!’

স্ক্রিনের দিকে কিছুক্ষণ দেখার পর জ্যাকির দিকে তাকাল চিফ রিগবি। ‘আমি শুধু দেখছি সুট পরা একলোক। চুল সোনালি, বাদামি বা সাদা। আপনি ভাবছেন এই ডিভিয়ো দেখে টুলসার মেয়রকে গ্রেফতার করব আমরা? সেটা করলে উল্টো আমাকেই গ্রেফতার করবে পুলিশ!’ নিজের কথায় হাসল রিগবি। তবে হাসি নেই তার চোখে।

‘জানি, ভিডিয়োটা অস্কার পাওয়ার মত নয়, প্রথমবারের মত বলল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড। ‘বেশ হতাশ হয়েছি।’

‘কিন্তু নিজের চোখেই তো সব দেখতে পেলেন?’ বলল জ্যাকি। ‘আপনারা মেয়র কনারের চেহারা না দেখলেও ওই কটেজ তো তারই! এটা থেকে তো বহু কিছুই বোঝার কথা!’

মাথা নাড়ল চিফ রিগবি। ‘ওই কটেজ যে-কারও হতে পারে।’

‘তা হলে চাবি কার কাছে ছিল?’ বলল জ্যাকি। ‘কে বন্ধ করল অ্যালার্ম কোড?’

‘মিস সিলভেস্টার, প্রতিবছর শত শত কেস নিয়ে কাজ করি আমরা,’ বলল চিফ রিগবি। ‘যে-কেউ বেআইনিভাবে ঢুকতে পারবে কটেজটাতে। টেকনোলজি যত জটিল হচ্ছে ক্রিমিনালরা শিখে নিচ্ছে আরও নানান কায়দা।’

‘আপনি তা হলে আমাকে এখন কী করতে বলছেন?’ বলল জ্যাকি। ‘সম্ভবত কোন ব্যবসার কথা বলে কটেজে ডেকে নিয়ে লোকটাকে খুন করেছে মেয়র অ্যারন কনার। সে জানত না যে কটেজে আমি আছি।’

ডিটেকটিভ লিয়োনার্ডের দিকে তাকাল জ্যাকি

‘ফরেনসিক টেকনিশিয়ানরা হয়তো ভিডিয়ো পরিষ্কার করতে পারবে,’ নিচু গলায় বলল অফিসার। ‘সেক্ষেত্রে…

‘আপাতত ধরে নেব, আপনার কথা বিশ্বাস করার মত কোন কারণ তৈরি হয়নি, মিস সিলভেস্টার, ́ সহকারীর কথাটা কেড়ে নিয়ে শেষ করল চিফ রিগবি।

‘কিন্তু এটা তো মানবেন, ওখানে একজনকে খুন করা হয়েছে! এখন সেই কটেজে গেলে নানান ধরনের প্রমাণ পাবেন!’

‘কে জানে এই ফুটেজ আসলে কোন্ জায়গার,’ নির্বিকার সুরে বলল চিফ রিগবি। ‘আপনি আমাদেরকে এমন কোন প্রমাণ দেননি, যেটা পেয়ে আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করব।’

‘কিন্তু আমি নিজেই তো খুনের সাক্ষী!’ রেগে গিয়ে টেবিলে ডানহাতের চাপড় দিল জ্যাকি।

‘মাথা ঠাণ্ডা রাখুন, মিস,’ বলল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড।

‘আপনারা তা হলে মিসেস কনারকে ফোন করে জেনে নিন, ওই কটেজের চাবি তিনি আমাকে দিয়েছিলেন কি না!’

জ্যাকির কথা শুনে হাসল পুলিশ চিফ রিগবি। ‘আপনি চাইছেন, আমরা টুলসার ফার্স্ট লেডিকে ফোন করে বলব: আপনার স্বামী মেয়র কনার লেকের ধারে আপনাদের কটেজে একলোককে গুলি করে খুন করেছে-আপনি কি এ-ব্যাপারে কিছু জানেন? বলুন তো, মিস, আমাদের ঘাড়ে কয়টা মাথা?’

‘তা হলে আমাকে এখন কী করতে বলেন?’ অসহায় হয়ে বলল জ্যাকি। ‘কিছুই করব না?’

‘আমরা অবশ্যই তদন্ত করব,’ বলল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড, ‘সাফ করা হবে ভিডিয়ো। হয়তো জাদু দেখাবে টেকনিশিয়ানরা।’

‘নিজে আমি কী করব?’ বলল জ্যাকি। ‘আছি মস্ত বিপদে! যখন-তখন খুন হব প্রমাণিত খুনির হাতে। আপনারা কি আমাকে পুলিশি নিরাপত্তা দেবেন, নাকি দেবেন না?’

‘এখনই তার প্রশ্ন উঠছে না, বলল ডিটেকটিভ, ‘আপনার কেস আপাতত আমরা নিচ্ছি না। পরে সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করা হলে সেক্ষেত্রে আমরা আপনাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেব।’

‘অর্থাৎ আপনারা আমার জন্যে কিছুই করবেন না।’

চেয়ার ছেড়ে জ্যাকির সামনে থামল চিফ রিগবি। কঠোর চোখে দেখল ওকে। বুক পকেট থেকে কার্ড নিয়ে ধরিয়ে দিল ওর হাতে। ‘এখানে আমার ফোন নম্বর আছে। দরকার হলে আমাকে ফোন দেবেন।’

‘তার মানে, আমার ব্যাপারে কোন ধরনের দায়িত্ব আপনারা নিচ্ছেন না?’ কার্ড হাতে পুলিশ চিফকে দেখল জ্যাকি। বুঝে গেছে, আগের মতই রয়ে গেছে বিরাট বিপদে।

‘আপনি বরং এখন বাড়ি ফিরে যান, মিস,’ বলল চিফ রিগবি। ‘কারও সঙ্গে আলাপ করবেন না। শহর ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আমরা পরে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

সতেরো
এখনও গ্লেনফেলে বেলা-হত্যার বিষয়ে কোন ধরনের সূত্র পায়নি রানা। চার্চ থেকে বেরিয়ে ঢুকল ফেমিন মিউযিয়ামে। ফাঁকা পড়ে আছে দর্শকহীন দালান। গ্যালারি বড়জোর গ্রামের পোস্ট অফিস বা বড় কোন দোকানের সমান। চারদেয়ালে কাঁচ দিয়ে ঢাকা কেবিনেটের ভেতরে নানান ধরনের প্রদর্শনী।

এক এক করে ঘরের ডিসপ্লে দেখতে লাগল রানা। একটা কাঁচের কেবিনেটে আছে জার। ওটার ভেতরে স্বচ্ছ তরলে ডুবে আছে পিটোথোরা সংক্রমণে পচে যাওয়া আলু। আঠারো শ’ ছিচল্লিশ সালে এদিকের মানুষের প্রধান খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গোটা দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল চরম দুর্ভিক্ষ। একটা ডিসপ্লের সামনে থেমে রানা দেখল, কাঁচের ওদিকে পেন্সিল দিয়ে আঁকা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের ছবি। এরচেয়েও কষ্টকর ও ভয়াবহ চিত্রকর্ম আগেও দেখেছে রানা। উনিশ শ’ ছিচল্লিশে বাংলার বুকে যে চরম মন্বন্তর হয়েছিল, তখন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সেই দৃশ্য তুলে ধরেন তাঁর আঁকা ছবিতে।

একটু এগোতেই গ্লাস কেসের ভেতরে সাদা-কালো এক ছবি দেখল রানা। উনিশ শ’ বাইশ সালে মাটি খুঁড়ে বের করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষের হাড়গোড়। তিক্ত চেহারায় গর্তের ধারে কোদাল হাতে দাঁড়িয়ে আছে ক’জন। ছোট কিছু ছবিতে আছে ক্লোযআপ দৃশ্য। একটাতে রানা দেখল, মুচড়ে যাওয়া এক শিশু। মৃত্যুর আগে প্রচণ্ড যন্ত্রণা সয়েছে বেচারি।

ছবির নিচে ক্যাপশনে লেখা: দেশের শত শত গণকবরের মাত্র একটি গ্লেনফেলের এই সমাধি। তখন আয়ারল্যাণ্ডে মারা পড়ে কমপক্ষে উনিশ লাখ মানুষ। স্কিবারিনের গণকবরে একই সঙ্গে মেলে বারো হাজার লাশ। দুর্ভিক্ষের ব্যাপারে বাড়িয়ে কিছু বলেনি বেলা, নতুন করে আবারও উপলব্ধি করল রানা। সবুজ এই দেশের মাটির নিচে আছে মানুষের হাজারো গণকবর।

পাশের কেবিনেটে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্ভিক্ষ পরবর্তী কয়েক বছর খাবারের চরম অভাব দেখতে হয়েছে আইরিশদের। ভাড়া দিতে পারেনি বলে ইংরেজ জমিদার তাদের প্রজাদেরকে আর্কটিকের হাড়কাঁপা শীতে ঝাড়ি থেকে উৎখাত করত। যেটা আসলে ছিল মৃত্যুদণ্ড দেয়ার মত একটি সিদ্ধান্ত। কিছুই করার ছিল না আইরিশদের। বউ-বাচ্চা নিয়ে অসহায় মানুষগুলোকে মরতে হতো প্রচণ্ড শীতে।

আরেক স্ট্যাণ্ডে আছে প্রাগৈতিহাসিক যন্ত্রপাতি। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ওগুলো দিয়ে চাষ করত আইরিশ কৃষকেরা। কোদালের কাঠের শাফট দেখে রানা বুঝতে পারল, হাতের ত্বকের ঘষায় ক্ষয়ে গেছে ওটা। অসহায় চাষী তাদের পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করলেও ফসলের বড় অংশ চলে যেত ইংরেজ জমিদারদের হাতে।

পরের ডিসপ্লেতে কাঠের সামুদ্রিক জাহাজের প্রতিকৃতি। আঠারো শ’ চল্লিশের দশকে নতুন দুনিয়ায় পাড়ি দিতে গিয়ে বাড়ি ছেড়েছে হাজার হাজার আইরিশ। অবশ্য তারা ছিল সৌভাগ্যবান। কফিন শিপ বা ইংরেজদের তৈরি জাহাজের ডেকের নিচে গাদাগাদি করে বাস করত। পরিবেশ ছিল নরকের মত। নিয়মিত খুনোখুনি ও বর্ষণ ছিল খুব স্বাভাবিক বিষয়। প্রতিনিয়ত সঙ্গী ছিল ভয়ঙ্কর সব সংক্রামক রোগ। যারা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পৌঁছাবার পথে মরত, তারাও জানত দেশে যে পরিবেশ, তাতে সাগরে মৃত্যু তাদের জন্যে হবে রীতিমত আকর্ষণীয়।

ফাদার ও-সুলিভান বলেছেন জাদুঘর ছোট, তবে এখানে না এলে রানা বুঝত না কী পরিবেশে মৃত্যুবরণ করেছে মানুষগুলো। জাদুঘর থেকে বেরিয়ে রানা ভাবল, ম্যালাচি চার্চে আসলে কী ধরনের তথ্য আবিষ্কার করেছিল বেলা? কেন সেটার জন্যে মরতে হলো ওকে?

ছোট এক বাজার পার হওয়ার সময় থমকে দাঁড়াল রানা। ওর চোখ পড়েছে ‘ফি বি’স সারপ্লাস’ লেখা এক সাইনবোর্ডের ওপরে। পেছনে বড় একটা ঘর। জানালায় ঝুলছে ‘ওপেন’ লেখা নোটিশ। দরজার ওদিকে মেঝেতে স্তূপ হয়ে আছে আমেরিকান ও ব্রিটিশ আর্মির রুকস্যাক ও হ্যাভারস্যাক। এ-ছাড়া আছে পশ্চিম জার্মানির আর্মির ব্যবহৃত পঞ্চাশ বা ষাট দশকের নানান ধরনের কিট।

একটা জানালা দিয়ে পছন্দমত এক ব্যাগ দেখে দোকানে ঢুকল রানা। ঘরে ক্যানভাস, মোম ও তেলের গন্ধ। ফোল্ডিং কোদাল থেকে শুরু করে তাঁবুর খুঁটি—কী নেই দোকানে!

‘দোকান বন্ধ করে দিচ্ছি,’ কাউন্টারের পেছন থেকে বলল বয়স্ক একলোক। রানা ধারণা করল, এই ভালুকটাই ফিলবি। চোখে তার বুল ডগের মত সন্দেহের দৃষ্টি। যদিও রানা তার নাকের কাছে দুটো বিশ ইউরোর নোট ধরতেই সহজ হয়ে গেল তার চাহনি।

‘আমি এটা কিনতে চাই।’ হাতে নিয়ে কাছ থেকে ‘ব্যাগ দেখল রানা। পুরনো হলেও ওটা বেশ মজবুত। ব্যবহার করা যাবে আরও বহু দিন। দুটো বিশ ইউরো ফিলবির হাতে ধরিয়ে দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল রানা। কাঁধে ঝুলছে পছন্দমত ব্যাগ। একবার দেখে নিল হাতঘড়ি: সন্ধ্যা ছয়টা তেরো মিনিট। ড্রিঙ্ক করার জন্যে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ওর গলা। আর্মির মালামালে ভরা দোকান থেকে কয়েক বাড়ি দূরেই পাব। ওটার ভেতরে গিজগিজ করছে মানুষ।

বার-এ ঢুকে নানান ব্র্যাণ্ডের আইরিশ উইস্কির বোতলে গিয়ে পড়ল রানার চোখ। একপাশে বিয়ারের কল।

‘কী দেব?’ হাসিমুখে জানতে চাইল বারম্যান। ‘মিনারেল ওঅটর,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা।

ওকে হতাশ চোখে দেখল বারম্যান। ‘পানির সঙ্গে বরফের কুচি দেব, নাকি লেবু?’

‘শুধু পানি।’

পানির বোতল হাতে বিয়ার গার্ডেনে ঢুকে কাঠের এক বেঞ্চিতে বসে পড়ল রানা। পানিতে চুমুক দিয়ে ভাবল: এবার? এখন কী করব? হাতে তো কোন সূত্র নেই!

হতাশ হয়ে চুপ করে বসে থাকল রানা। একটু দূরের টেবিলে বিয়ার হাতে গল্প করছে দুই যুবক আর তাদের দুই বান্ধবী। বয়স হবে বিশ থেকে পঁচিশ। সবার সামনে যে পরিমাণ বিয়ারের খালি বোতল দেখতে পেল রানা, তাতে ওর মনে হলো এরই ভেতরে মাতাল হয়ে গেছে তারা। দুই যুবকের একজনের কাঁধ বেশ চওড়া। দশাসই গর্দান। পাশে সোনালি চুলের তরুণী মেয়েটাকে নিজের ব্যাপারে গর্ব করে গল্প শোনাচ্ছে। মেয়েটার চোখে-মুখে অস্বস্তি।

এ-ধরনের হামবড়া টাইপের যুবক দেখলে অন্তর থেকে অপছন্দ করে রানা। আনমনে ভাবল, ‘যাক গে, আমার কী! আবার ডুবে গেল ভাবনার গভীরে। একটু পর বের করল বেলার দুই ফোন। প্রিপেইড স্যামসাং দিয়ে রিডায়াল করল লণ্ডনের সেই নম্বরে। আগেরবার কেউ কল না ধরলেও এবার পাঁচবার রিং হওয়ার পর ওদিক থেকে বলল কেউ, ‘গ্রেগ কার্সটি বলছি।’

পাশের টেবিলের দিকে পিঠ দিয়ে চু স্বরে বলল রানা, ‘মিস্টার কার্সটি, যোগাযোগ করেছি বেলার তরফ থেকে।

অচেনা কণ্ঠস্বর শুনে সন্দেহের ছাপ পড়ল লোকটার গলায়, ‘ইয়ে… ঠিক আছে। তো কী বলতে চান?’

‘আপনি কি বেলাকে চিনতেন?’ জানতে চাইল রানা।

‘ইয়ে… হ্যাঁ। ওকে ভাল করেই চিনি। মাফ করবেন, আপনি আসলে কে?’

‘আমার নাম পল জ্যাডেন। বেলার বন্ধু ছিলাম।

‘ছিলাম মানে?’ বিস্ময়ের সুরে জানতে চাইল লোকটা।

‘বেলা মারা গেছে,’ বলল রানা, ‘দয়া করে ফোন রেখে দেবেন না। আমি মজা করছি না। গতকাল গ্যালওয়েতে খুন হয়েছে বেলা। আপনি বোধহয় টিভি-সংবাদ দেখেন না। কার্সটি, অনলাইনে গেলে সবই জানতে পারবেন।’

‘হায়, ঈশ্বর!’ আঁৎকে উঠল কার্সটি। ‘আমি তো ভাবতেও পারিনি! মাত্র দু’দিন আগে ওর সঙ্গে…’

‘জানি। আপনি তখন ওর সঙ্গে কী আলাপ করেছেন?’

‘আপনি নিজের নাম কী যেন বললেন? জ্যাডেন? আপনি কি পুলিশের লোক?’

‘না, পুলিশ নই। বেলাকে পছন্দ করতাম। আর সেজন্যে খুঁজে বের করতে চাই ওর খুনিদেরকে। আপনি নিজেও হয়তো আছেন বিপদে। দয়া করে ফোন রেখে দেবেন না।’

‘কী ধরনের বিপদ?’ কাঁপা গলায় জানতে চাইল কার্সটি।

‘আপনি একই দিনে দুবার কথা বলেন বেলার সঙ্গে। বেলা আপনাকে ফোন করেছিল তিনটে একচল্লিশ মিনিটে। এরপর দু’ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর পাল্টা ফোন করেন আপনি। কথা বলেন তিন মিনিটের কম। আমি জানতে চাই, কেন বেলার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন। এ-তথ্য হয়তো রক্ষা করবে আপনাকে।

‘তথ্যের জন্যে ফোন করে বেলা,’ ভয় পেয়ে হড়বড় করে বলল কার্সটি। পরে ফোন করেছি জরুরি কিছু খবর দেয়ার জন্যে। আসলে… ওকে বলেছি রিসার্চের বিষয়ে এরবেশি আর কিছুই জানি না। … শপথ করে বলতে পারি।’

‘তথ্য দেয়া-নেয়ার ব্যবসা আছে আপনার, তা-ই না?’ বলল রানা, ‘কী ধরনের তথ্য বেলাকে দিয়েছিলেন?’

‘বেলা একটা ফোন নম্বর চেয়েছিল। আর কিছু না।’

‘কী ধরনের ফোন নম্বর?’

‘মোবাইল ফোন নম্বর।’

‘ওটা কি আমেরিকার?’

‘হ্যাঁ। ওকলাহোমার। টুলসার।’

‘বলতে থাকুন, কার্সটি। কিছু গোপন করবেন না। ফোন নম্বরটা কার?’

সে-কথা আমি বলতে পারব না…’

‘এটা তো খুব সহজ একটা প্রশ্ন,’ বলল রানা, ‘ওই ফোন আসলে কার?’

দ্বিধা কাটিয়ে আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল কার্সটি, ‘অ্যারন কনারের।’

‘অ্যারন কনার আসলে কে?’

‘টুলসার মেয়র।’

আবারও টুলসার মেয়র? -ভাবল রানা। ‘তার নম্বর পাওয়ার জন্যে আপনাকে কত দিয়েছিল বেলা?’

একহাজার পাউণ্ড,’ বলল কার্সটি, ‘নম্বর পাওয়ার জন্যে আমাকে বেশকিছু টাকা খরচ করতে হয়। তাই এত বেশি টাকা লাগে।’

‘আপনাকে যোগ্য লোক বলেই মনে হচ্ছে,’ বলল রানা। ‘এবার বলুন, কার্সটি, আপনার মত একজনকে কী কারণে একহাজার পাউণ্ড দিল বেলা? টুলসার মেয়রের ফোন নম্বর পেলে ওর কী লাভ? আমার মনে হচ্ছে বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

‘শুনুন, মিস্টার, বেলা আমাকে কিছুই বলেনি। জানি না কেন এত টাকা খরচ করল। তথ্য দেয়ার বদলে আমি পাল্টা প্রশ্ন করি না। আমার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল বেলার।’ বড় করে শ্বাস নিল কার্সটি। ‘হায়, যিশু! শুনুন, এরই ভেতরে অনেক কিছু বলে ফেলেছি। আর কিছু বলার নেই। বেলা যারা গেছে জেনে খারাপ লাগছে। ভাল ক্লায়েন্ট ছিল সে। এবার ফোন রেখে দিচ্ছি। দয়া করে আর কখনও আমাকে ফোন দেবেন না।’

কার্সটি লাইন কেটে দেয়ার পর কল হিস্ট্রি দেখল রানা। মারা যাওয়ার দু’দিন আগে বিকেলে আমেরিকার এক মোবাইল ফোনে কথা বলেছে বেলা। আয়ারল্যাণ্ড থেকে পুরো ছয়ঘণ্টা পেছনে ওকলাহোমা। কার্সটির কথা সত্যি হলে বেলা বোধহয় তৃতীয় কলের সময় কথা বলে টুলসার মেয়র কনারের সঙ্গে। কিন্তু এত সময় ধরে কী আলাপ করেছিল বেলা?

ব্যস্ত শহর টুলসা। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মেয়র অ্যারন কনার। শেষ সকালে হঠাৎ ব্যক্তিগত ফোনে কল করল ব্রিটিশ এক সাংবাদিক। সেক্ষেত্রে মেয়র যে পর্যায়ের মানুষ, তার তো দেরি না করে ফোন রেখে দেয়ার কথা। তা হলে অচেনা এক মেয়েকে কী কারণে এতটা সময় দিল সে?

নানান সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছে রানা।

স্টার্লিংফোর্ড। আয়ারল্যাণ্ড। বায়ার্ন। টুলসা…

কিন্তু কোন তথ্যের সঙ্গে অন্যটা জোড়া দেয়া যাচ্ছে না।

এবার কী করবে ভাবতে শুরু করেছে রানা, এমন সময় পাশের টেবিল থেকে এল উঁচু গলার বিতণ্ডা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওদিকে তাকাল ও। বান্ধবীর দিকে লালচে চেহারায় চেয়ে আছে গর্দানওয়ালা যুবক। টেবিলে রেখেছে আনারসের মত মস্ত দুই মুঠো। ‘হারামজাদী মাগী!’ হুঙ্কার ছাড়ল সে, ‘আজ তোর আর রেহাই নেই! কুত্তী কোথাকার!’ ধীরগতিতে বান্ধবীর মাথার চুল খামচে ধরতে গেল যুবক।

তখনই ঘটল দুটো ঘটনা।

এক: বয়ফ্রেণ্ড মারধর করবে ভেবে মুখ কুঁচকে ফেলল তার বান্ধবী।

দুই: অনিচ্ছাকৃতভাবে মেয়েটার হাতে লেগে উল্টে গেল গ্লাস। ছলাৎ করে বিয়ার পড়ল বয়ফ্রেণ্ডের আইফোনের ওপরে।

‘হারামজাদী মাগী, দেখ, কী করলি তুই!’ বিস্ফারিত চোখে বিয়ারে ভেজা আইফোন দেখছে যুবক। ‘হাতে নে আমার ফোন! গায়ের কাপড় দিয়ে ভাল করে পরিষ্কার কর্! যন্ত্রটা নষ্ট হয়ে থাকলে এক থাবায় মটকে দেব তোর ঘাড়!’

‘নিজেই তুলে নাও,’ পাল্টা চেঁচাল মেয়েটা। ‘অমানুষ!’

মনে মনে তরুণীকে বাহবা দিল রানা।

ঝট করে ডানহাতের মুঠোয় মেয়েটার মাথার চুল পেঁচিয়ে নিল যুবক। বেচারির মুখটা নামিয়ে আনতে চাইছে টেবিলের ওপরে। ‘এইবার দেখ, মাগী, মজা কেমন লাগে!’

চুলে টান খেয়ে চিৎকার জুড়েছে তরুণী। যাতে ছেড়ে দেয়া হয় তার সঙ্গিনীকে, সেজন্যে প্রতিবাদ করল দ্বিতীয় মেয়েটা।

তার বয়ফ্রেণ্ড কড়া গলায় ধমক দিল তাকে, ‘তোমার মুখটা একদম বন্ধ রাখো!’

দাঁত বের করে হাসতে হাসতে নিজের বান্ধবীর মাথার চুল ধরে আরও জোরে নিচে টান দিল ষাঁড়।

আরেক ঢোক পানি খেয়ে গ্লাস টেবিলে রেখে পাশের টেবিলের সামনে গেল রানা। নরম সুরে বলল, ‘খুব মজা লাগছে অসহায় এক মেয়েকে শায়েস্তা করতে পেরে?’

জবাবের অপেক্ষা না করে ডান পা তুলে টেবিলে রাখা আইফোনের ওপরে ঠাস্ করে নামাল রানা। চুরচুর হয়ে ভাঙল ডিভাইসের পুরু কাঁচ। পায়ের পাতা দিয়ে ঠেলে মাটিতে ফেলে দিল আইফোন। পরক্ষণে ধুপ করে ওর বুট নামল ওটার ওপরে। বিধ্বস্ত ডিভাইসের দিকে না চেয়েই বলল রানা, ‘এবার ওকে ছেড়ে দাও। তোমার আইফোন আর নেই যে মাটি থেকে তুলবে।’

তরুণীর চুল পেঁচিয়ে ধরে বিস্মিত চোখে রানাকে দেখছে যুবক। ‘কেন ভাঙলি আমার আইফোন?’

‘মিটিয়ে দিলাম সব ঝগড়া,’ বলল রানা, ‘এবার ছাড়ো মেয়েটাকে। ওকে ব্যথা দিচ্ছ। তৃতীয়বার কিন্তু মুখে কিছু বলব না।’

বিয়ার গার্ডেনে ক’জন চেয়ে আছে এই টেবিলের দিকে। রানা আরও কিছু বলার আগেই হঠাৎ ওর টেবিলে বাজল বেলার নোকিয়া। অবশ্য এখন কল রিসিভ করতে পারবে না ও।

‘তোকে ভর্তা করে দেব, শালা বাদামি কুত্তা!’ হুঙ্কার ছাড়ল যুবক। বান্ধবীর চুল থেকে টেনে নিল মুঠো। বেঞ্চি থেকে ঝট্ করে উঠে দাঁড়াল। দৈর্ঘ্যে সে রানার চেয়ে তিন ইঞ্চি উঁচু।

মারপিটে যোগ দেবে বলে উঠে দাঁড়িয়েছে তার বন্ধু

রক্তলাল চোখে রানাকে দেখছে ষাঁড়।

বিয়ার গিলে মাতাল হয়ে গেছে এরা, টের পেল রানা। দু’বন্ধুর মধ্যে মারপিটে অভ্যস্ত হচ্ছে ষাঁড়। একমেয়ের ওপরে নির্যাতন করে হয়ে উঠেছে মস্তবড় বীর।

বিসিআই-এর কয়েকজন মেয়ে এজেন্টের কথা মনে পড়ল রানার। ওরা মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে শুইয়ে দেবে বোকা ষাঁড়টাকে। সে জানেও না যে আজ ফুরিয়ে গেছে ভাগ্যদেবীর সহায়তা।

মুঠো পাকিয়ে কনুই পেছনে নিল ষাঁড়। রাগে খিঁচিয়ে রেখেছে বড় বড় হলদে দাঁত। শ্বাস নিচ্ছে ঝড়ের হাওয়ার মত। তার ঘুষিটা আসতে দেখে বিস্মিত রানা ভাবল: ব্যাটা কী করে এত ধীর হলো!

নাক লক্ষ্য করে মন্থরগতি ঘুষি আসতেই সরে গিয়ে খপ করে যুবকের মুঠো ধরে মুচড়ে দিল রানা। কুড়মুড় শব্দে ফেটে গেল কার্টিলেজ। বিকট আর্তনাদ জুড়েছে ষাঁড়। তাকে ঘুরিয়ে দিয়ে ঘাড় চেপে ধরে মুখটা টেবিলে ঠাস্ করে ফেলল রানা। এত জোরে নয় যে ফেটে যাবে নাকের হাড় ও দাঁত। অবশ্য থ্যাপ করে যে শব্দটা হলো, তাতে রানা বুঝল আগামী দু’সপ্তাহ নাক-মুখের ব্যথায় বিছানায় শুয়ে কাঁদবে ষাঁড়টা।

পুরো একমিনিট তার মুখ টেবিলে চেপে ধরে রাখল রানা। এরপর বুঝে গেল, ফুরিয়ে গেছে ষাঁড়ের লড়াই করার শখ। হাত সরিয়ে নিতেই টেবিল থেকে কাত হয়ে মাটিতে পড়ল ষাঁড়। তার বন্ধু বিস্মিত চোখে দেখছে রানাকে। একবার দেখল বান্ধবীর দিকে, পরক্ষণে ঘুরেই একদৌড়ে পালিয়ে গেল।

‘তুমি ঠিক আছ তো?’ তরুণীর কাছে জিজ্ঞেস করল রানা।

বিপদ কেটে যাওয়ায় মাথা দোলাল মেয়েটা। মাটিতে শুয়ে ম্যালেরিয়ার জ্বরে আক্রান্ত ভালুকের মত কোঁ-কোঁ করে কাতরাচ্ছে ষাঁড়।

‘ভবিষ্যতে ভাল কাউকে খুঁজে নিয়ো,’ মেয়েদুটোকে বলল রানা। ‘সেক্ষেত্রে হয়তো ঠকতে হবে না।’

বারকয়েক মাথা দোলাল মেয়েদুটো।

বিয়ার গার্ডেনে অনেকে চেয়ে আছে এদিকে। হৈ-চৈ শুনে পাব থেকে বের হয়েছে কয়েকজন। সময় নষ্ট না করে নিজের টেবিলে ফিরে এল রানা। বেলার ফোন পকেটে পুরে কাঁধে ব্যাগ তুলে ঢকঢক করে গিলল গ্লাসের শেষ পানিটুকু। তারপর সহজ পায়ে চলল নিজের গাড়ির দিকে। ভিড় করা মানুষগুলো সরে গিয়ে পথ করে দিল।

গার্ডারা আসার আগেই এলাকা ত্যাগ করবে, ভেবেছে রানা। কেন যেন আগের চেয়ে সুস্থির বোধ করছে।

আঠারো
টয়োটা প্রিমিয়োর ড্রাইভিং সিটে বসে দরজা বন্ধ করল রানা। বেলার নোকিয়া স্মার্টফোন চেক করতেই ইন-বক্সে পেল ভয়েস মেসেজ। আইরিশ সমাজের উঁচু পর্যায়ের মানুষদের সুরে ধীরে ধীরে কথা বলছেন তিনি: ‘এই মেসেজ বেলা ওয়েসের জন্যে। আমি সাধাভ ইউ. কেলি। আপনার কয়েক দিন আগে পাঠিয়ে দেয়া প্রশ্নের জবাবে বলছি: জী, আমার কাছেই আছে লেডি হলওয়ের ডায়েরি। দুঃখিত, অসুস্থতার কারণে আগে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।’

এই লোক আসলে কে, ভাবছে রানা।

‘আপনি রিসার্চের জন্যে ডায়েরি দেখতে চেয়েছেন,’ বলে চলেছেন ভদ্রলোক। ‘এবং আদতেই সেগুলোতে আছে জরুরি কিছু তথ্য। এমন কিছু বিষয়, যা প্রকাশ হোক সেটা আমি চাই না। আপনি যদি কথা দেন সবকিছু গোপন রাখবেন, সেক্ষেত্রে ডায়েরি দেখাতে আমার আপত্তি নেই। এটা জেনেও পড়তে চাইলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। ভাল থাকুন।’

ইনি গোপন রাখতে চান ডায়েরির কথা, ভাবল রানা। কিন্তু সেটা কেন করছেন? পাশের সিটে ফোন রেখে দেখতে পেল, সামনে দিয়ে গেল গার্ডাদের পেট্রল-কার। প্যাসেঞ্জার সিটে বসে রেডিয়োতে কথা বলছে তাদের একজন।

ঝামেলা এড়াতে প্রিমিয়ো স্টার্ট করে গ্লেনফেল থেকে বেরিয়ে এল রানা। মনে ঘুরছে গতকাল কটেজে বেলার উচ্চারিত কথাগুলো। আয়ারল্যাণ্ডে একজনের কাছে পাওয়া যাবে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরি। কিন্তু তাতে এমন কী রয়ে গেছে, যেটা এত বছর পরেও গুরুত্বপূর্ণ? কী জানা আছে যে অতটা সতর্ক হয়ে কথা বলেছেন মি. কেলি?

সন্ধ্যার পর কটেজে ফিরে নিজের স্মার্টফোনের মাধ্যমে অনলাইনে গেল রানা। সাধাভ ইউ, কেলি সম্পর্কে তেমন কিছু লেখা নেই ওয়েব-এ। দশবছর আগে ছিলেন ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের ইতিহাসের এমিরিটাস প্রফেসর। ছবিতে রানা দেখল শীর্ণ এক লোককে। ধূসর চুল ব্যাকব্রাশ করা। চোখে সোনার তারের ফ্রেমের চশমা। বেলার নোকিয়া থেকে ভদ্রলোকের নম্বর নিয়ে নিজের ফোন ব্যবহার করে কল দিল রানা। ক’বার রিং হওয়ার পর শুনতে পেল ভদ্রলোকের গলা, ‘সাধাভ ইউ, কেলি বলছি।’

‘প্রফেসর কেলি, আপনি আমাকে চিনবেন না। আমার নাম মাসুদ রানা। আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি বেলা ওয়েসের কারণে।’

‘লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরির বিষয়ে?’ জানতে চাইলেন ভদ্রলোক। ‘হ্যাঁ, কিছুদিন আগে বেলা ওয়েস আমার ফোনে মেসেজ দেন। তবে একটা কথা বুঝতে পারছি না, আপনি কেন তাঁর হয়ে কথা বলছেন? উনি কি কোন ঝামেলায় পড়ে গেছেন?

‘জী। নিজে থেকে আপনার সঙ্গে আর কখনও কথা বলবে না বেলা। কারণ গতকাল ওকে খুন করা হয়েছে।’

নীরব থাকল লাইন। তারপর প্রফেসর বললেন, ‘খুন? আর আপনি… বেলা ওয়েসের একজন বন্ধু? অথবা আত্মীয়?’

‘বেলা আমার বান্ধবী ছিল না। মাত্র গতকাল পরিচয়। অবশ্য ওকে পছন্দ করতাম। ভাবতেও পারিনি এত নিষ্ঠুরভাবে ওকে খুন করা হবে।’

‘দুঃখজনক। এটা জেনে খুব খারাপ লাগছে।’

‘প্রফেসর কেলি, আমি বরং সরাসরি মূল বক্তব্যে আসি। আমার ধারণা: লেডি স্টার্লিংফোর্ডের বিষয়ে রিসার্চ করতে গিয়েই খুন হয়েছে বেলা। মেসেজে আপনি বলেছেন ডায়েরির ভেতরে গোপন এবং জরুরি কিছু তথ্য আছে। আর এ-বিষয়ে আপনার কাছ থেকে আরও কিছু জানতে চাই। যাতে খুঁজে বের করতে পারি বেলার খুনিকে।’

‘পুলিশ কি নিজেরা খুনের তদন্ত করছে না?’

‘তারা তাদের সাধ্যমত করছে,’ বলল রানা। ‘আমি নিজে আলাদাভাবে তদন্ত করব। প্রফেসর, যে-লোক খুন করেছে, সে জবাই করে গেছে বেলাকে। আমি একমাত্র মানুষ যে ওকে শেষবার জীবিত দেখেছি। তাই জানতে চাই, কেন বেলাকে এভাবে খুন করা হলো। সেজন্যে আপনার কাছে সহায়তা চাইছি। আপনি এমন কিছু জানেন, যে-কারণে খুন হয়েছে বেলা।’

‘আমি এতটা নিশ্চিত নই,’ বললেন প্রফেসর কেলি, ‘এক শ’ বছরেরও আগে হারিয়ে গিয়েছিল লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরি। বহু বছর পর এবারডেন হলে সেসব খুঁজে পাই। এরপর বারো বছর হলো ওগুলো আমার কাছেই আছে। তখন এ-দেশের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিলাম। ডায়েরিগুলো এখন আছে আমার বাড়ির সিন্দুকে। আমি একাকী মানুষ, কালেকশন আগে কখনও কাউকে দেখাইনি। এত বছরে আর কেউ কখনও ডায়েরি দেখতেও চায়নি। তাই মনে হচ্ছে, ডায়েরির সঙ্গে মেয়েটার নৃশংস খুনের কোন সম্পর্ক নেই।’

‘কেউ একজন জেনে গেছে ইতিহাসের কোন রহস্য ভেদ করেছে বেলা। আর বিষয়টা চাপা দেয়ার জন্যেই খুন করা হয়েছে ওকে। বেলাকে কে খুন করাল, সেটা জানতে হলে ডায়েরি পড়ে দেখা আমার জন্যে জরুরি। আর সেসব আছে আপনার কাছে। প্রফেসর কেলি, আপনি ডায়েরি পড়তে দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে পারেন। তাতে হয়তো ধরা পড়বে খুনি।’

চুপ করে আছেন প্রফেসর। কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘কী যেন নাম বললেন আপনার?’

‘মাসুদ রানা।’

কেটে গেল পুরো একমিনিট।

‘আপনি হয়তো সাহায্য করতে পারবেন ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এক খুনিকে গ্রেফতার করতে,’ বলল রানা, ‘কথা দিচ্ছি, একবার ডায়েরি দেখার পর আর কখনও আপনাকে বিরক্ত করব না। আপনি বললে যে-কোন জায়গায় গিয়ে দেখা করতে আপত্তি নেই। আমার জন্যে আপনার কোন ক্ষতি হবে না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারি।’

কী যেন ভাবছেন প্রফেসর। শক্ত হাতে কানের সঙ্গে ফোন চেপে ধরে রেখেছে রানা।

‘বেশ,’ অবশেষে বললেন প্রফেসর, ‘আপনি আমার সঙ্গে দেখা করলে ডায়েরি পড়তে দেব। অবশ্য সেজন্যে আপনার আসতে হবে আমার বাড়িতে। আমি এখন আর দ্বীপ ছেড়ে কোথাও যাই না।’

‘কোন্ দ্বীপে আমাকে আসতে হবে, বলুন?’ জানতে চাইল রানা।

‘মেডেইরা।’

‘আপনার বাড়ির ঠিকানা দিন,’ বলল রানা।

.

বিমানে যেতে হবে মেডেইরার রাজধানী ফুনশাল-এ। ভোরে দু’ঘণ্টা ড্রাইভ করে আয়ারল্যাণ্ডের পুবে ডাবলিন এয়ারপোর্টে পৌছে যাবে, স্থির করেছে রানা। ইন্টারনেট ব্যবহার করে কেটে নিল পরদিন সকাল সাতটায় ফুনশাল যাওয়ার বিমানের টিকেট। রাত দশটার আগেই গুছিয়ে নিল ব্যাগ। পোশাক ছাড়া আর তেমন কিছুই নেয়নি রানা। হালকা ডিনার সেরে শুয়ে পড়ল এগারোটায়।

কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে ভোরের আগে কটেজ থেকে বেরিয়ে এল। গাড়িতে চেপে যাওয়ার সময় কালো আকাশে ঝলমলে কোটি কোটি রঙিন নক্ষত্র দেখতে পেল রানা।

দেড়ঘণ্টা পর পৌছে গেল ডাবলিনে। বিমানের জন্যে এয়ারপোর্টের ডিপারচার লাউঞ্জে বসে কফির কাপ হাতে অপেক্ষা করল রানা। গ্রামের বাড়ির ঠিকানা বলার পর কীভাবে ওখানে যাওয়া যাবে, সেটা জানিয়ে দিয়েছেন প্রফেসর কেলি। ফোন রেখে দেয়ার আগে বলেছেন অদ্ভুত এক কথা।

‘সন্ধ্যার আঁধার নামার আগে হাজির হবেন না। আমি দিনের আলোয় কোন মানুষের সঙ্গে দেখা করি না।’

লোকটা কি আসলে ভ্যাম্পায়ার নাকি? আনমনে হেসেছে রানা। জীবনে নানান ধরনের মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে ওর। তাদের কেউ কেউ দিনে ঘুমিয়ে জেগে থাকে রাতে। মেডেইরায় সন্ধ্যা হবে দশটায়, সুতরাং তার আগে দেখা মিলবে না প্রফেসরের।

উনিশ
মাঝ সকালে বিমানে চেপে ডাবলিন থেকে পাঁচ শ’ মাইল দূরে পৌছে গেল রানা। নিচে দেখতে পেল আয়ারল্যাণ্ডের ঘন সবুজ বনভূমি। এরপর বিমান উড়ে গেল গাঢ় নীল সাগর ও আদিম ছোট সব সৈকতের ওপর দিয়ে। জায়গায় জায়গায় সাগর থেকে হঠাৎ করেই আকাশে নাক তুলেছে কালো রুক্ষ ক্লিফ। সেগুলো ঘিরে নেচে চলেছে সফেদ ঢেউয়ের ফেনা। মেডেইরা দ্বীপের প্রধান বন্দরে গিজগিজ করছে হাজারো বোট। সেগুলোর মাঝে রাজরানির মত সোনালি রোদে ঝলমল করছে সাদা রঙের ক্রু লাইনার।

বিমানের ডিম্বাকৃতি জানালা দিয়ে কুয়াশাভরা পর্বত ও সেগুলোর মাঝে সবুজ উপত্যকা দেখছে রানা। একদিকে খাড়া কালো ক্লিফ, অন্যদিকে বিস্তৃত নীল সাগর-মাঝে যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে মেডেইরা এয়ারপোর্ট। সাগরে প্রকাণ্ড সব কংক্রিটের পিলারে ভর করে সামনে গেছে রানওয়ে। ‘অত্যন্ত দক্ষ পাইলট না হলে কেউ সাহস পাবে না ওখানে নেমে যেতে।

পৌনে একঘণ্টা পর ছোট্ট এয়ারপোর্ট টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে শুকিয়ে গেল রানার বুক। প্রচণ্ড গরমে দাউ-দাউ করে যেন জ্বলছে চারপাশ। ইউরোকার রেন্টাল থেকে লাল রঙের দু’হাজার একুশ সালের ভিডাব্লিউ অ্যাটলাস ক্রস স্পোর্ট কার ভাড়া নিল রানা। গাড়ির পেছন সিটে ব্যাগ ও লেদার জ্যাকেট রেখে চালু করল এয়ার কণ্ডিশনার। তারপর ঝোড়ো বেগে রওনা হলো উত্তরদিকের পথ ধরে। ফুনশাল শহর এড়িয়ে এগিয়ে চলল দ্বীপের ঘন বনভূমি ও পাহাড়ি এলাকার দিকে। বহু দূরে কোথাও আছে প্রফেসর কেলির ভিলা।

মেডেইরার প্রাকৃতিক দৃশ্য সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। যদিও তা দেখার মত মন এখন নেই রানার। অরণ্য ও পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া নির্জন পথে আরও গ্রাম্য এলাকার দিকে চলল ও। প্রফেসর কেলি দিনের আলোয় দেখা দেবেন না ভাবতেই একরাশ বিরক্তি জমল রানার মনে। সামনে বড় এক টিলার কোলে রেস্টুরেন্ট দেখে ওখানে থামল। উপত্যকার বহু ওপরে বাগানে বসে সেরে নিল স্থানীয় খাবার এস্পেটাডা দিয়ে। ওটা রোস্ট করা গরুর মাংস ও আলুর চিপ্‌। ওয়াইনের বদলে নিল পাহাড়ি বরফঠাণ্ডা পানি। বেশ কিছুক্ষণ দেখল নিচে সবুজ উপত্যকার অপূর্ব দৃশ্য। বারবার ওর মনে হলো একটা সিগারেট পেলে মন্দ হতো না। তবে বকা দিয়ে নিজের মনটাকে নিয়ন্ত্রণে আনল রানা।

অ্যাটলাস ক্রস স্পোর্টস্ কারে উঠে আবার রওনা হলো আঁকাবাঁকা পাহাড়ি নির্জন পথে। মাথার ওপরে থাকল গাছের ঘন পাতার সবুজ ছাউনি। একসময়ে ধীরে ধীরে শীতল হলো উত্তপ্ত দিন। সন্ধ্যার আগে আকাশে দেখা দিল বেগুনি ও নীলের খেলা। রানা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে প্রফেসর কেলির নির্জন ভিলার কাছে।

ভদ্রলোকের বাড়ির সবচেয়ে কাছের গ্রাম চার মাইল দূরে। ভিলার চারপাশে সাদা রঙ করা উঁচু পাথুরে দেয়াল। ওটা বেয়ে উঠে গেছে নানান ধরনের লতাগুল্ম। চারদিকে ঝোপঝাড়। কিছুটা যাবার পর দুই পিলারের মাঝে বড় এক গেটের সামনে গাড়ি রাখল রানা। প্রকাণ্ড গেট ভেতর থেকে বন্ধ। গাড়ি থেকে নেমে কোন হ্যাণ্ডেল বা হুড়কো দেখতে পেল না রানা। অবশ্য গেটের একদিকের পিলারে ঝুলছে ইন্টারকম বক্স। রানা বাটনে চাপ দিলেও ওদিক থেকে সাড়া দিল না কেউ। ইন্টারকম নষ্ট কি না ভাবতে শুরু করেছে, এমন সময় ক্লিক শব্দ হওয়ার পর রেইলের ওপরে সরসর করে সরে গেল গেট।

গাড়ি নিয়ে উঠনে ঢুকে পড়ল রানা। ইউনিভার্সিটির বেশিরভাগ রিটায়ার্ড অধ্যাপকদের বাড়ির চেয়ে অনেক বেশি যত্ন নিয়ে নিজের ভিলা তৈরি করেছেন কেলি। তিনি যে শুধু ধনী তা নন, সিকিউরিটির ব্যাপারেও খুব সচেতন। অন্তত নানান ধরনের অ্যালার্ম সিস্টেম সেটাই প্রমাণ করছে। রানার গাড়ি ভেতরে ঢুকতেই পেছনে আটকে গেছে গেট।

গাড়ি থেকে নেমে রানা বুঝল, আজ সন্ধ্যায় হ্রাস পেয়েছে দিনের তাপমাত্রা। পেছনের সিট থেকে লেদার জ্যাকেট নিয়ে ভিলার দরজার দিকে চলল ও। কাঁধে ঝুলছে ব্যাগ। ভাল করেই জানে, ঝোপ থেকে ওর ওপরে চোখ রাখছে চারটে ক্যামেরা। ভিলা বেশ লম্বাটে ও নিচু। চারপাশ থেকে ওটাকে ঘিরে রেখেছে লতাগুল্ম ও ফুলের গাছ। সদর দরজা পর্যন্ত যাওয়ার আগেই দুটো কেনেল। রানাকে আসতে দেখে ওগুলো থেকে বেরোল বিশাল দুই জার্মান শেফার্ড। ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে চাপা গর্জন ছাড়ল তারা। সরাসরি ও-দুটোর চোখে চোখ রেখে সহজ পায়ে কেনেল পেরোল রানা। টের পেল, পেছন থেকে কঠোর চোখে ওকে দেখছে কুকুরগুলো। যে-কোন সময়ে পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওর ওপরে।

ভিলার দরজার পাশে আরেকটা ইন্টারকম বক্স। স্পিকারে রানা শুনল আইরিশ সুরে মার্জিত একটি কণ্ঠ: ‘দরজা খোলা। ভেতরে আসুন।’

দরজা পেরিয়ে বড় এক হলওয়েতে পা রাখল রানা। পাথরের মেঝে মোজাইক করা। উঁচু জানালায় ঝুলছে ভারী সব পর্দা। সেগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকছে চাঁদের রুপালি জ্যোৎস্না। হলওয়ে ফুরিয়ে গেছে চওড়া এক করিডরে। ওটার দু’দিকে একটু পর পর টবে সাজানো আছে পাতাবাহার গাছ। দেয়ালে নানান চিত্রকর্ম। আবছা আলোয় ভালভাবে দেখা গেল না ওগুলো। প্রায়ান্ধকার করিডর বামে বাঁক নিতেই সামনে আধখোলা এক দরজা দেখতে পেল রানা।

ঘরের ভেতরে জ্বলছে হলদেটে টিমটিমে আলো।

ইন্টারকমের সেই পরিচিত কণ্ঠ জানালেন, ‘আমি এখানে। ঘরে ঢুকে পেছনে দরজা বন্ধ করে দিন।’

ঘরে পা রেখে নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করল রানা। মস্ত এক টেবিলের ওপরে জ্বলছে ল্যাম্প। সেই মৃদু আলোয় রানা দেখতে পেল ঘরের চারদেয়ালে উঁচু বুকশেলফ। ওখানে আছে বোধহয় দুমূল্য সব অ্যান্টিক বই। ঘরের আসবাবপত্র বেশ পুরনো হলেও তা খুব দামি। একদিকে প্রায় অন্ধকার ছায়ার ভেতরে বড় এক চামড়ার উইং চেয়ারে রানার দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছেন কেউ। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘খুশি হলাম যে পথ খুঁজে আসতে পেরেছেন।’

‘আতিথ্য করার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,’ বলল রানা।

চেয়ারের হাতলে ভর করে উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর কেলি। এখনও রয়ে গেছেন ছায়ার ভেতরে। অস্পষ্ট আলোয় মানুষটার কালচে অবয়ব দেখছে রানা।

‘কেউ এলে ভাল লাগে, মিস্টার রানা। আমি নিজে নিঃসঙ্গ এই জীবন বেছে নিইনি। আমার আসলে কোন উপায় ছিল না।’

প্রফেসর কেন এ-কথা বলেছেন, কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারল রানা। ছায়া থেকে বেরিয়ে এসেছেন তিনি। তাঁর মুখ ভয়ঙ্করভাবে বিকৃত। রাতে তাঁকে দেখলে পিশাচ ভেবে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাবে সাধারণ মানুষ

‘আশা করি ঘাবড়ে যাননি,’ নরম সুরে বললেন প্রফেসর। ‘বেশ ক’বছর ধরেই আমাকে মেনে নিতে হয়েছে এই পরিণতি। এখন আর আয়নায় নিজেকে দেখি না।’

তাঁর ফোস্কা ভরা কালচে মুখ জুড়ে নড়ছে রক্তাক্ত মাংসপেশি। এখন নাক বলতে কিছুই নেই। বদলে আছে বড় দুটো গর্ত। খসে পড়ছে চোখের চারপাশের আলগা কালো ত্বক। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কপাল ও করোটির লালচে হাড়। উইং চেয়ারের পিঠে যে হাতটা রেখেছেন, ওটা যেন হিংস্র কোন জন্তুর রক্তে ভরা থাবা।

‘স্কিন ক্যান্সার, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রফেসর, ‘এজন্যে এখন আর বাইরে যাই না। আমাকে ফোন করেও কেউ পায় না। আর সেজন্যেই বেলা ওয়েসের মেসেজের জবাব দিতে দেরি হয়েছে। কোন সপ্তাহ একটু ভাল থাকি। আবার কোন সপ্তাহে পড়ে থাকি বিছানায়। আপনার ভাগ্য ভাল যে আপাতত আমি একটু সুস্থ। এখন আর সূর্যের আলোয় বেরোতে পারি না। তাই রাত হয়ে গেছে আমার নিয়ত সঙ্গী। আপনার সঙ্গে দিনে দেখা করতে পারিনি বলে আমাকে ক্ষমা করবেন।’

‘আমি সত্যিই দুঃখিত, স্যর,’ বলল রানা। ‘আপনার এই রোগটা কি চিকিৎসাযোগ্য?’

একসময় দেহের মাংস খসে পড়বে, আর তখন আমাকে কবরে শুইয়ে দেবে কেউ,’ তিক্ত হাসলেন প্রফেসর। ‘বলতে পারেন যে আমাকে চরম শাস্তি দিচ্ছেন ঈশ্বর। যদিও জ্ঞানত কখনও কারও ক্ষতি করিনি। যাই হোক, আপনি যদি আমাকে খুন করতে এসে থাকেন, তো অখুশি হব না। শুধু অনুরোধ করব, আমাকে যেন যন্ত্রণাহীনভাবে মেরে ফেলা হয়। ভাল মানুষ সেটাই করবে।’

‘আমি কেন আপনাকে খুন করব, স্যর?’ বলল রানা।

‘আমার মনে হয়েছে সেটা আপনি করতে পারেন,’ বললেন প্রফেসর। ‘আমি কিন্তু সেক্ষেত্রে খুশিই হব।’

চুপ করে থাকল রানা।

‘বর্তমান দুনিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বলতে রয়ে গেছে শুধু ইন্টারনেট। আর ওটার মাধ্যমে জেনেছি, আপনি আসলে দুর্ধর্ষ এক অ্যাডভেঞ্চারার। বহু মানুষকে জঙ্গল, পাহাড় আর সাগর থেকে উদ্ধার করে এনেছেন। নামকরা শখের আর্কিওলজিস্ট। এ-ছাড়া খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আপনি ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের সঙ্গে জড়িত। আর তা-ই মনে হয়েছে, আপনি হয়তো আমাকে উদ্ধার করবেন কষ্টকর এই জীবন থেকে।’

‘আমি কাউকে খুন করতে আসিনি, স্যর,’ বলল রানা।

‘তা হলে বলুন, পুলিশ কি খুঁজে বের করেছে বেলা ওয়েসকে কারা খুন করল?’

‘আমার তা মনে হয় না।’

‘কী এক বাজে জগতে বাস করি আমরা,’ দুঃখিত সুরে বললেন প্রফেসর। মাথা নাড়লেন। ‘ড্রিঙ্ক কেবিনেট থেকে ড্রিঙ্ক নিতে পারেন। উইস্কি, ব্র্যাণ্ডি, ভোদকা বা…’

‘ধন্যবাদ, লাগবে না,’ বলল রানা।

‘বেশ, তবে আমাকেই বরং দিন উইস্কি? একদম কানায় কানায় গ্লাস ভরে দেবেন।

মেঝেতে ব্যাগ রেখে কয়েক পা সরে ড্রিঙ্ক কেবিনেট খুলল রানা। স্বচ্ছ ক্রিস্টালের গ্লাস নিয়ে উইস্কির বোতল থেকে ওটার ভেতরে ঢালল সোনালি তরল। গ্লাস, ধরিয়ে দিল প্রফেসরের রক্তাক্ত ত্বকহীন হাতে। পানপাত্র ঠোঁটে তুললেন প্রফেসর। দু’ঢোকে শেষ করলেন উইস্কি। বড় করে ঢেকুর তুলে বললেন, ‘এখন আগের চেয়ে ভাল লাগছে। অথচ, একসময় এ-জিনিস ছুঁয়েও দেখতাম না। আজ এটা হয়ে গেছে স্বস্তি পাওয়ার একমাত্র উপায়।’

‘ডায়েরির বিষয়ে কিছু বলবেন?’ জিজ্ঞেস করল রানা।

‘আপনার পেছনে ডেস্কে পাবেন সব,’ বললেন প্রফেসর।

ঘুরে রানা দেখল, টেবিলের ওপরে ধূসর চামড়া দিয়ে মোড়া কয়েকটা পুরনো খাতা। কুঁচকে গেছে ওগুলো।

‘এবারডেন হলের ধ্বংসস্তূপে পেয়েছি সবমিলিয়ে চারটে, ‘ বললেন প্রফেসর কেলি। ‘আজকালকার ডায়েরির মত নয়। বলতে পারেন চিঠি। বেশ কয়েক বছর ধরে লিখেছেন মিসেস স্টার্লিংফোর্ড। প্রথমটার শুরু আঠারো শ’ বেয়াল্লিশ সালে। তখন মাত্র কয়েক মাস হয়েছে বিয়ে করেছেন তাঁরা। বাস করছেন স্বামীর এস্টেটে। তাঁর শেষ ডায়েরি লেখা হয়েছে আয়ারল্যাণ্ডে আঠারো শ’ ঊনপঞ্চাশ সালে। মাঝের তিন বছরের ডায়েরি হারিয়ে গেছে। তবে এসবের ভেতরে পাবেন জরুরি কিছু তথ্য। দয়া করে সাবধানে পড়বেন। পৃষ্ঠা যেন ছিঁড়ে না যায়।’

‘বোধহয় নিয়ে গিয়ে আমাকে ওগুলো পড়তে দেবেন না?’ ওপরের হার্ডবাউণ্ড খাতা হাতে নিল রানা।

‘ঠিকই ধরেছেন। তবে সময় নিয়ে পড়তে পারবেন। যা জানতে চান, আশা করি সবই ওখানে পাবেন।’

কালবেলা – ২০ (মাসুদ রানা)

ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠা খুলে পড়তে লাগল রানা।

‘কিছু বুঝতে পেরেছেন?’ মুচকি হেসে বললেন প্রফেসর।

‘ভদ্রমহিলার হাতের লেখা দারুণ সুন্দর,’ বলল রানা।

‘নিজেও ছিলেন খুব রূপসী। তাঁর পোর্ট্রেট দেখেছি। আর কিছু আপনার চোখে পড়েছে?’ রানার বুদ্ধি পরীক্ষা করতে গিয়ে খুশি হয়ে উঠেছেন প্রফেসর। চকচক করছে দুই মণি।

কী দেখতে হবে সেটাই জানা নেই। প্রফেসরের খেলা একপেশে মনে হওয়ায় টেবিলে খাতা নামিয়ে রাখল রানা। বদলে নিল আরেকটা খাতা। কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে বলল, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না। ডায়েরিতে আসলে কী দেখতে হবে, আপনি সেটা বলে দিলে কৃতজ্ঞ বোধ করব।’

‘পড়ে গেলে প্রথমে মনে হবে এসব ডায়েরি খুব সাধারণ,’ রহস্যময় হাসি হাসলেন প্রফেসর। ‘আয়ারল্যাণ্ডে সামাজিক বা রাজনৈতিক জীবনে বড় ভূমিকা ছিল না লেডির। ডায়েরিতে পাবেন পারিবারিক চিত্র। তাঁর স্বামী ছিলেন গোঁয়ার আর দায়িত্বজ্ঞানহীন নিষ্ঠুর লোক। একসময়ে নিজ বাড়িতে আগুন ধরিয়ে পুড়ে মরেন। নইলে ইতিহাসে তাঁর নাম থাকার কথা ছিল না। যদিও তখন ছিলেন প্রতিভাবান একজন বিজ্ঞানী।’

‘বোটানিস্ট, তা-ই না?’ বেলার দেয়া তথ্য মনে পড়তেই জানতে চাইল রানা।

‘তাকে বলতে পারেন একজন জাদুকর,’ বললেন কেলি 1 ‘কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে সমবয়সীদের চেয়ে একবছর আগে তুলনাহীন রেযাল্ট করে পাশ করেন। মানুষ হিসেবে ছিলেন জেদী ও উদ্ধত। ছাত্রাবস্থায় হন একজন লর্ড। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আফ্রিকায় বিস্তারের সময় মারা যান তাঁর বাবা ব্রিগেডিয়ার কেড্রিক স্টার্লিংফোর্ড। মা লিসা ছিলেন অর্ধেক স্প্যানিশ, আঠারো শ’ সাঁইত্রিশ সালে মারা যান টাইফয়েডে। তখন মাত্র তারুণ্যে পা রেখেছেন অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড। প্যারিসে গিয়ে সে-সময়ের নামকরা বিজ্ঞানী সলোমান ভানানানের শিক্ষানবিশ হন।’

আরও তথ্য পাওয়ার জন্যে চুপ করে আছে রানা।

‘তিনি ছিলেন ফ্রান্সের সেরা উদ্ভিদবিদ। দু’জনের ভেতরে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। বিয়ের পর আঠারো শ’ তেতাল্লিশ ও পঁয়তাল্লিশ সালে দু’বার প্যারিসে গিয়ে ভার্নানানের সঙ্গে দেখা করেন লর্ড। বিশেষ করে ক্রিপ্টোগাস্‌ গবেষণায় তাঁর ওস্তাদ ছিলেন ফরাসি সেই বিজ্ঞানী।’

‘সিক্রেট সিম্বল?’ বিস্ময় নিয়ে প্রফেসরকে দেখল রানা। ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন কেলি। ‘ক্রিপ্টোগ্রাম্‌স্‌ নয়। উদ্ভিদ বিজ্ঞানে ক্রিপ্টোগাস্‌ মানে শেওলা, শৈবাল, লাইকেন আর ছত্রাক ধরনের উদ্ভিদ।

‘বুঝলাম,’ মুখে বললেও প্রফেসর কী বোঝাতে চাইছেন তা আঁচ করতে পারছে না রানা। মনের ভেতরে কে যেন বলছে: বোকা, এখানে এসে খামোকা সময় নষ্ট করলে।

‘কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে লর্ড স্টার্লিংফোর্ডের ছিলেন বয়স্ক এক বোটানিস্ট বন্ধু। নাম তার নরম্যান আর্চিবল্ড। পরে হন অক্সফোর্ডের ম্যাগডালেন কলেজের প্রফেসর। আধুনিক বিজ্ঞানে তাঁর তেমন কোন ভূমিকা নেই। যদিও আঠারো শ’ চল্লিশের দশকে একের পর এক রিসার্চ পেপার প্রকাশ করেন। যাই হোক…’ আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন প্রফেসর।

‘হঠাৎ করে থেমে গেলেন যে?’ বলল রানা।

জবাবে চতুর হাসলেন প্রফেসর। ‘প্রথমে এসব ডায়েরি দেখে কিছু বোঝা না গেলেও তার ভেতরে আছে গোপন বার্তা। গভীরে গেলে বুঝতে পারবেন অকল্পনীয় কিছু ঘটেছিল।’

‘যেমন?’ অধৈর্য বোধ করলেও শান্ত স্বরে বলল রানা। ‘ডায়েরির অবিশ্বাস্য তথ্যটা তা হলে আসলে কী?’

‘আমি এরই ভেতরে আপনাকে সূত্র দিয়েছি। অবাক হচ্ছি যে আপনি এখনও ওটা বুঝতে পারেননি।

আরও তিক্ত হলো রানার মন। লোকটা এত অসুস্থ না হলে ঘাড় ধরে চেয়ার থেকে টেনে তুলে বারকয়েক ঝাঁকিয়ে নিয়ে বলত, ‘যা বলার জলদি বলুন, নইলে মটকে দেব ঘাড়!’

‘একটা কথা বলুন তো, মিস্টার রানা,’ বললেন প্রফেসর, ‘আঠারো শ’ চল্লিশের দশকের শেষদিকে আয়ারল্যাণ্ডে কী ঘটেছিল? আর এসব ডায়েরির লেখিকা কেন সে-বিষয়ে বারবার উল্লেখ করেছেন?’

‘দুর্ভিক্ষ?’

মাথা দোলালেন প্রফেসর কেলি। ‘ঠিকই ধরেছেন। আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে ওটাকে দুর্ভিক্ষ বলব না। ডায়েরি পড়লে আপনি বুঝবেন, ওটা অন্যকিছু ছিল। মিসেস স্টার্লিংফোর্ডের মত আমিও ওটার কথা ভুলব না। আঠারো শ’ ছিচল্লিশ সালের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া আর এর পরের কয়েক বছর যে কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে গেছে আয়ারল্যাণ্ডের মানুষ, সেটা ইতিহাসে খুব কালো এক বাজে অধ্যায়।’

‘মড়ক ধরেছিল দেশের সমস্ত এলাকার আলুর গাছে, বলল রানা। ‘ফলে শুরু হয়েছিল দুর্ভিক্ষ, তা-ই না?’

‘যারা সত্যিটা জানে, তারা অন্য কথা বলবে। সত্য ছিল ভিন্ন রকম।’ রানা কিছু জানে না বুঝতে পেরে চকচক করছে প্রফেসরের চোখ। ‘আপনার যে পরিচিতি পেয়েছি, তাতে ভেবেছি আমার দেয়া তথ্য পেয়ে চট্ করে সব বুঝে নেবেন। ইতিহাসে যা লেখা হয়, সেটা সবসময় সঠিক হবে তা নয়। কোন দেশের সরকার চাইলেও সবসময় সত্যিটা প্রকাশ করতে পারে না।

‘তা হলে আপনিই বরং বলুন দুর্ভিক্ষের বিষয়ে সত্যটা আসলে কী,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা।

‘আপনি বোধহয় আলু চেনেন?’ বললেন প্রফেসর কেলি ভদ্রলোকের কথা শুনে বিরক্তি বাড়ল রানার। ‘জী।’

চেয়ারে হেলান দিলেন প্রফেসর। ‘আয়ারল্যাণ্ডে আঠারো শ’ চল্লিশের দশকে জনসংখ্যা ছিল সবমিলিয়ে আশি লাখ। আর তারা ছিল মাত্র একটা সবজির ওপর নির্ভরশীল। আসলে আলু ছাড়া আর কোন খাবার তখনকার মানুষের ক্যালোরি মেটাতে পারত না। আয়ারল্যাণ্ডের গ্রাম্য মানুষ বলতে গেলে তিনবেলা শুধু আলুর তৈরি নানান খাবার খেয়ে বাঁচত। গৃহপালিত বিড়াল থেকে শুরু করে গরু-তাদেরও প্রধান খাবার ছিল সেই একই আলু। পাঁচজনের পরিবারের সপ্তাহে লাগত আড়াই শ’ থেকে তিন শ’ আলু। ফসলের মাঠে প্রচণ্ড শ্রম দিত বলে শরীর সুস্থ রাখতে বাড়ির কর্তা প্রতিদিন খেত বারো থেকে চোদ্দ পাউণ্ড আলু। আয়ারল্যাণ্ডের নারী-শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবার প্রধান খাবার ছিল সেই একই সবজি। আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?’

‘বিকল্প খাবার ছিল না বলে আলুর ফলন ভাল না হলে বিপদে পড়ারই কথা,’ বলল রানা।

‘ঠিকই ধরেছেন,’ মাথা দোলালেন প্রফেসর, ‘তারা ছিল খুব ঝুঁকির ভেতরে। আসলে একটা ঝুড়ির ভেতরে সব ডিম কখনও রাখতে হয় না। আঠারো শ’ ছিচল্লিশ সালে বিশ লাখ একর জমিতে বাম্পার ফলন হলো। তার আগের বছর নষ্ট হয়েছিল হাজার হাজার একর জমির ফসল। তাই পরের বছরে সবাই ভাবল, পেটপুরে খেতে পারবে। ফসলের মাঠ ভরে গেল আলুর গাছের গাঢ় সবুজ পাতা ও বেগুনি ফুলে। কিন্তু জুন মাসের শুরুর দিকে কিছু এলাকায় ফসলের মাঠে দেখা দিল সংক্রমণ। মাত্র কয়েক সপ্তাহে গোটা দেশে ওটা ছড়িয়ে গেল গ্যাংগ্রিনের মত। ইতিহাসবিদেরা বলেন, বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে ঘুমাতে গেল চাষীরা। আর পরদিন জানল সর্বনাশ হয়ে গেছে তাদের। পচে বিশ্রী দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে মাঠভরা হাজার হাজার আলুর গাছ। চাষীরা ব্যস্ত হয়ে মাটি খুঁড়ে তুলে আনতে চাইল আলুগুলো। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে দেখল গাছের মতই পচে কালো হয়ে গেছে বেশিরভাগ আলু। কেউ বুঝল না কীভাবে গোটা দেশের কোটি কোটি গাছ একই সময়ে ওভাবে মরল! যে ক’টা আলু বেঁচে গেল, সেগুলো দিয়ে হয়তো দেশের মানুষের খাবারের চাহিদা মিটবে মাত্র কয়েক দিনের।’

ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন প্রফেসর কেলি। আবারও খেই ধরলেন, ‘এরপর শুরু হলো পশ্চিমা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষ। খাবারের অভাবে চোখের সামনে মরতে লাগল লাখে লাখে মানুষ। যারা এতদিন মাছ ধরে বা খরগোশ শিকার করে সবার সঙ্গে ভাগ করে খেত, তারাও যখন দেখতে পেল যে না-খেয়ে আছে তাদের পরিবার, বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীর মুখের ওপরে বন্ধ করে দিল দরজা। কিছু দিনের ভেতরে তাদেরকেও খাবার হিসেবে ভুট্টা বা বার্লি কিনতে গিয়ে বিক্রি করতে হলো গৃহপালিত পশু। অথচ, ওগুলো তাদের শেষ সম্বল। অভাব হলে বিক্রি করবে ভেবেছিল। এরপর একে একে বিক্রি হলো চাষের যন্ত্রপাতি। এমন কী বাদ পড়ল না গায়ের পোশাক।’

রানা যেন চোখের সামনে দেখছে দুঃসহ এক সময়।

‘খাবারের অভাবে সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলো আগে মরতে লাগল। কেউ কেউ বাঁচতে চাইল পচা আলু খেয়ে। অন্যরা সৈকতে গিয়ে খুঁজল সামুদ্রিক পাখির ডিম ও শেলফিশ। বিষাক্ত শৈবাল খেয়ে মরল অনেকে। বাঁচার জন্যে ঘাস খেতেও দ্বিধা করেনি মানুষ। আর তখনই শুরু হলো মৃত্যু ঠেলাগাড়ির প্রচলন। স্তূপ করে ওগুলোতে শীর্ণ সব লাশ তুলে দূরে নিয়ে গিয়ে মাটি খুঁড়ে চলল গণকবর দেয়া। কারও আর সাধ্য থাকল না ইংরেজ জমিদারদের খাজনা মিটিয়ে দেবে। আর তার ফলে প্রচণ্ড মারধর খেয়ে করুণভাবে মরতে লাগল গ্রামের আইরিশ মানুষেরা। যারা প্রতিবাদ করতে গেল, তাদের মৃত্যু হলো আরও শোচনীয়ভাবে।’

কথাগুলো শুনে দৃঢ়বদ্ধ হয়ে গেছে রানার চোয়াল।

‘হরদম চুরি হলো অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ খামারিদের গরু বা শুয়োর। রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল তাদের। বাধ্য হয়ে পাহারা দিতে লাগল রাইফেল হাতে। আশপাশের গরীব প্রতিবেশীর বাড়িতে মাংসের ঝোলের গন্ধ পেলে সোজা গিয়ে খুন করত তাদেরকে। ধনীরা তাদের মাঠে বড় বড় গর্ত খুঁড়ে সেগুলো ঢেকে রাখত ঘাস ও ঝোপ দিয়ে। গর্তের নিচে পুঁতে রাখা হতো বর্ণার মত চোখা লাঠি। ক্ষুধার্ত চোর তাদের বাড়ির কাছে লে গর্তে পড়ে নিদারুণ কষ্ট পেয়ে মরত। বাঁচার জন্যে নিষ্ঠুর হয়ে উঠল সবাই। সমাজ থেকে বিদায় নিল বাজনা, নৃত্য, কবিতা বা সাহিত্যের মত কোমল সংস্কৃতি।’ নিজের রক্তাক্ত হাতের দিকে তাকালেন প্রফেসর কেলি।

‘খাবারের অন্য কোন উৎস থাকলে এতবড় দুর্যোগ হতো না, বড় করে শ্বাস ফেলল রানা।

চট করে ওকে দেখলেন প্রফেসর। ‘আমার মনে হয় না আপনি আমার কথা বুঝতে পেরেছেন। বাধ্য হয়েই আলুর চাষ করত চাষীরা। ওটা ছিল সবচেয়ে কমদামে পাওয়া ফসল। দেশের আশি লাখ মানুষের ভেতরে ষাট লাখ মানুষ নির্ভর করত আলুর ওপরে। এ-ছাড়া গরীবদের অন্য কোন উপায়ও ছিল না।’

জাদুঘরে দেখা পচা আলুর কথা মনে পড়তেই বলল রানা, ‘বুঝতে পেরেছি। আপনি বলুন।’

‘তা হলে বোধহয় এটাও বুঝবেন, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে গেছে বিশ লাখ মানুষ। অথচ ওটা ঈশ্বরের তৈরি দুর্ভিক্ষ নয়। নয় সাধারণ কোন মন্বন্তর। মৃত্যু ঠেলাগাড়িতে তুলে শুধু যে লাশ নিয়ে কবর দেয়া হয়েছে, তা নয়, দাফন করা হয়েছে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকেও। তখনও তারা শ্বাস নিচ্ছে। এর এক শ’ বছর পর জার্মানিতে পাঁচ লাখ ইহুদীকে না খাইয়ে মারল হিটলারের বাহিনী। অথচ ইহুদীরা কিন্তু তখন ছিল সত্যিকারের ধনী। কথাটা বুঝতে পেরেছেন? আসলে যাদের হাতে থাকবে অস্ত্র, তারা যা খুশি করতে পারবে। আইরিশদের গরীব জনগোষ্ঠীরও কিছু করার ছিল না। বার্নার্ড শ’ এ-বিষয়ে নাটক লিখেছিলেন। আপনি হয়তো ম্যান অ্যাণ্ড সুপারম্যান নাটকটি দেখেছেন?’

‘পারতপক্ষে থিয়েটারে যাই না,’ বলল রানা।

‘জার্মানিতে যুদ্ধের সময় মারা যান আমার বাবা;’ বললেন প্রফেসর কেলি। ‘বলুন তো, ওখানে কি দুর্ভিক্ষ হয়েছিল? তা তো নয়! না খাইয়ে মারা হয় লাখ লাখ মানুষকে। খাবারের অভাব ওখানে ছিল না। আসলে খাবার দেয়া হয়নি ক্ষুধার্ত মানুষকে। আয়ারল্যাণ্ডে এই একই কাজ করে ইংরেজরা।’

‘ইতিহাসে এমন কোন তথ্য আমি পাইনি,’ আপত্তি তুলল রানা।

বিকৃত ঠোঁটে হাসলেন প্রফেসর কেলি। ‘ক্ষমতাশালীরা নিজেদের জন্যে লিখিয়ে নেয় ইতিহাস। আসলে বাস্তবতা হচ্ছে, জেনে-বুঝে আয়ারল্যাণ্ডে তৈরি করা হয় দুর্ভিক্ষ। ওটা আসলে ছিল ভয়ঙ্কর এক গণহত্যা। এর আগে পৃথিবীর বুকে কখনও এতবড় জেনোসাইড করা হয়নি।’

চুপ করে শুনছে রানা।

প্রফেসর শ্বাস নিয়ে বললেন, ‘অভাব আয়ারল্যাণ্ডে না থাকলেও খাবার দখল করে রেখেছিল ইংরেজরা। আঠারো শত ছিচল্লিশ ও সাতচল্লিশ সালে ফসলের মৌসুমে এই দেশ থেকে রপ্তানী করা হয়েছে পাঁচ শত টনের বেশি ফসল। সেসব থাকলে লাখ লাখ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা যেত। এ-ছাড়া রপ্তানী করা হয়েছে প্রচুর পরিমাণে মাখন, ডিম আর গবাদিপশু। আয়ারল্যাণ্ডের বন্দরগুলোর মাধ্যমে এসব খাবার পাঠানো হয়েছে ইংল্যাণ্ডে। বলুন তো, কারা করেছে রপ্তানী? তারা সবাই ছিল ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা। এ-দেশের খেতগুলোর মালিক তখন ছিল ইংরেজ জমিদারেরা। তাদের কাছ থেকে এসব পণ্য কমে কিনত ইংল্যাণ্ডের জনতা। এ- দেশের গরু, শুয়োর আর মাখন মেটাত তাদের আশি ভাগ চাহিদা।’

‘জানতাম না,’ বলল রানা।

‘সাধারণ ইতিহাসের বইয়ে এসব আপনি পাবেন না,’ তিক্ত হাসলেন কেলি। ‘ব্রিটিশ সরকার নিশ্চিত করে যেন আয়ারল্যাণ্ডের মানুষ এসব পণ্য কোনভাবেই ভোগ করতে না পারে। সশস্ত্র সৈন্যবাহিনীকে দিয়ে পাহারা দিয়ে শত শত ওয়্যাগন ভরা খাবার বন্দরে নিয়ে তুলে দেয়া হতো জাহাজে।

আয়ারল্যাণ্ডের কেউ যদি একটা ডিমও চুরি করত, তো ফাঁসি দেয়া হতো তাকে। কারও কপাল ভাল হলে তাকে পাঠানো হতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভয়াবহ বাজে কোন এলাকায়।

‘দুর্ভিক্ষের সময় রাস্তায় সারি দিয়ে যেত মৃত্যু ঠেলাগাড়ি। ওটার সঙ্গে রওনা হতো বন্দরের দিকে যাওয়া খাবারে ভরা ওয়্যাগন। ক্ষুধার্ত কাউকে একদানা খাবার দেয়নি ইংরেজ শাসকেরা। তাদের নিষ্ঠুরতা দেখে চমকে গিয়েছিল দুনিয়ার মানুষ। রোম ও আমেরিকা থেকে এসেছিল খাবারে ভরা জাহাজের বহর। এমন কী তুরস্কের সুলতান পাঠিয়ে দেন প্রচুর খাবার। কিন্তু সেসব খাবার দখল করে নেয় ইংল্যাণ্ডের সেনাবাহিনী।’

হাসলেন প্রফেসর কেলি। ‘শুধু তা-ই নয়, ব্রিটিশ সরকার আইন করল: যেন গরীবেরা স্যামন বা ট্রাউট মাছ ধরে খেতে না পারে। বলা হয়েছিল, এসব মাছ ভোগ করবে শুধু ধনী জমিদার ও তাঁদের অতিথিরা। আরও আইন করা হলো, ক্ষুধার্ত কোন পরিবার ফাঁদ পেতে বা গুলি করে খরগোশ মারতে পারবে না। তখন আইরিশদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হলো সব ধরনের অস্ত্র। এমন কী স্কুইরেল মারার ক্ষমতাও আর আইরিশদের থাকল না। ব্রিটিশ সরকার জানাল, বিদ্রোহের আশঙ্কায় কারও হাতে তারা কোন অস্ত্র থাকতে দেবে না। ওদিকে ইংরেজ জমিদারেরা তাদের সঙ্গীদেরকে নিয়ে খরগোশ বা যে-কোন পশু শিকার করতে পারবে। তারা যখন ক্যারিজে ঝুলিয়ে শিকার নিয়ে ফিরত, শুষ্ক চোখে সেটা দেখত ক্ষুধার্ত আইরিশেরা। চাইলে মানুষ আসলে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, সেটা ইংরেজদেরকে না দেখলে কেউ বুঝবে না।’

‘ইংরেজরা কেন এসব করল?’ জানতে চাইল রানা। ‘ফসল ফলাতে হলে আইরিশ চাষীদেরকে লাগবে। তাদেরকে না খাইয়ে মেরে ফেললে ক্ষতি তো ইংরেজদেরই।’

‘বাড়তি মানুষ ইংরেজরা চায়নি,’ বললেন প্রফেসর কেলি। ‘সাম্রাজ্যবাদী বা ব্যবসায়িক সম্প্রদায় সবসময় গরীব মানুষকে মস্তবড় বোঝা বলে মনে করে। বেশি মুনাফা করতে হলে অর্জন করতে হবে আরও সম্পদ। যেমন ধরুন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবোরিজিনদেরকে খোজা করে দিয়ে তাদেরই এলাকার খনিতে কাজ করাত ইংরেজরা। দক্ষিণ আমেরিকার উপজাতিগুলোকে তাদের বনভূমি থেকে উৎখাত করে কোটি, কোটি গরু পালন করে বড়লোক হয়েছে শ্বেতাঙ্গরা। বোর্নিওতে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয়দেরকে, যাতে করে দুনিয়াজুড়ে পাম অয়েলের মার্কেট দখল করতে পারে। গোটা দুনিয়ায় এই একই কাজ করছে তারা।’

কাঁধ ঝাঁকালেন প্রফেসর কেলি। ‘সংক্ষেপে বললে ব্রিটিশ সরকারের দরকার ছিল প্রচুর জমি। তাদের মনে হয়েছিল গরীব আইরিশেরা পৃথিবীর বুকে না থাকলেও কিছুই যায়-আসবে না। গরীবেরা না খেয়ে মরলে এ-দেশ হাসতে হাসতে লুটেপুটে খেতে পারবে ইংরেজেরা। আর সেটাই করেছে তারা। তখন আরও দশ লাখ মানুষ বাধ্য হয়েছিল আমেরিকার দিকে রওনা হতে। দুর্ভিক্ষ তৈরি করে গোটা এই দেশের মানুষকে ভিক্ষুক করে আরও ধনী হয়েছে. ইংরেজ সরকার।’ রানার চোখে চেয়ে শীতল হাসলেন প্রফেসর।

মানুষের লোভ কত ভয়ঙ্কর হয়, সেটা আরেকবার উপলব্ধি করে তিক্ত হয়ে গেছে রানার মন। আয়ারল্যাণ্ডের দুর্ভিক্ষের বিষয়ে এ-ধরনের তথ্য ‘আগে কখনও কোথাও পড়েনি। অবশ্য এসবের সঙ্গে বেলা ওয়েসের খুনের কী সম্পর্ক, সেটা এখনও জানা যাচ্ছে না। ‘ধরে নিলাম আপনি যা বলেছেন, এসবই জেনে গিয়েছিল বেলা,’ বলল রানা। ‘কিন্তু এত বছর আগের এক দুর্যোগের কারণে ওকে খুন করা হবে কেন?’

‘ঠিকই ধরেছেন,’ বললেন কেলি। ‘বলতে পারেন এসব এখন প্রাচীন ইতিহাস। কে মরেছে আর কে মরেনি, তা নিয়ে এত ভাববে কেন কেউ? এসবে তো কারও কোন লাভ-ক্ষতি নেই। অবশ্য…’ চুপ হয়ে গেলেন প্রফেসর।

‘অবশ্য বলে থেমে গেলেন কেন?’ জানতে চাইল রানা।

‘আপনি লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরি ঘাঁটলে নিজেই বুঝে যাবেন আসলে কাদের আছে মস্তবড় লাভ ও ক্ষতি।’.

‘ডায়েরিতে মন্বন্তরের বিষয়ে আরও কিছু আছে?’ জানতে চাইল রানা।

গোপন কিছু বিষয় পাবেন, যে-কারণে খুন করা হয়েছে বেলা ওয়েসকে, বললেন প্রফেসর।

একুশ
‘আপনি নিজেই কি একটু খুলে বলবেন?’ ভদ্রতার সঙ্গে বলল রানা। ‘আমি জানার জন্যে বহু দূর থেকে আপনার কাছে এসেছি।’

ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন প্রফেসর কেলি। ‘ডায়েরিতে সবই পাবেন। পড়তে এসেছেন। সেটাই বরং করুন। আগেই আপনাকে সেটা করতে বলেছি।’

‘আপনি সত্যিই অত্যন্ত জটিল মনের মানুষ, আগে কখনও সেটা আপনাকে কেউ বলেছে?’ বলল বিরক্ত রানা।

মুচকি হাসলেন প্রফেসর। ‘মৃত্যুপথযাত্রী হওয়ার এটা এক বড় সুবিধা, বুঝলেন? ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতে না পারলেও আপনার মত একজন যোগ্য মনোযোগী ছাত্র পেয়ে গেছি!’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানতে চাইল রানা, ‘বলুন তো, কেউ কি এসব ডায়েরি কপি করেছে?’

‘না, সে-উপায় ছিল না। আবিষ্কার করার পর আমি ছাড়া আর কেউ পড়েনি।’

‘তা হলে অন্য কারও এসব জানার কথা নয়,’ বলল রানা। ‘সেক্ষেত্রে বেলা জেনেছে অন্য কোন উপায়ে।’

‘আমারও তা-ই ধারণা,’ বললেন প্রফেসর, কখনও কখনও দু’একটা চিঠি পাওয়া গেছে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের। সেসব আছে একাধিক ইতিহাসবিদ বা সংগ্রাহকদের কাছে। কিন্তু এসব চিঠি ডায়েরির মত এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

‘তা হলে বেলা জানত না আপনার কাছে রয়ে যাওয়া ডায়েরির গোপন তথ্য?’

‘ঠিকই ধরেছেন। সে ডায়েরি পায়নি। তথ্য পেয়েছে অন্য কোন উৎস থেকে। যদিও সে-সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।’

‘আমি একে একে গুছিয়ে নিচ্ছি আমার চিন্তা,’ বলল রানা, ‘প্রথমে কিছুদিন আগে বেলা জানল, আপনার কাছে আছে ডায়েরি। ওগুলো দেখতে চাইল সে। সেজন্যে মেসেজ দিল আপনাকে। আপনি রাজিও হলেন। কিন্তু ততক্ষণে মারা গেছে বেলা।

‘সেজন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত,’ বললেন প্রফেসর। ‘ই- মেইল যখন করল, তার অনেক পরে ওটা দেখেছি। আর শেষ মেসেজ বোধহয় দিয়েছে মৃত্যুর দুই বা তিনদিন আগে।’

চট করে তাঁকে দেখল রানা। ‘ই-মেইল করেছিল বেলা?’

‘আমি বোধহয় আপনাকে বলতে ভুলে গেছি। একটা চিঠির বিষয়ে লিখেছিল বেলা ওয়েস।’

‘সেটা কী ধরনের চিঠি?’

‘যে চিঠি দেয়া হয়েছিল হানি ফ্লেচারকে।

আগামাথা বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকল রানা।

দেখি বেলা ওয়েসের ই-মেইল খুঁজে পাই কি না, চেয়ার ছেড়ে আড়ষ্ট পায়ে ডেস্কের পেছনে গেলেন প্রফেসর। ছোট এক ল্যাপটপ নিয়ে ফিরলেন চেয়ারে। হাঁটুর ওপরে মেশিনটা রেখে ডালা খুলে অন করলেন সুইচ। তাঁর চশমার দুই কাঁচে লেগে ঠিকরে গেল স্ক্রিনের নীলচে আলো।

‘এই যে,’ কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘পড়ে শোনাচ্ছি: ‘প্রিয় প্রফেসর কেলি, আপনার হয়তো মনে আছে কিছু দিন আগে যোগাযোগ করেছি। জানতে চেয়েছি, আপনার কাছে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের যেসব ডায়েরি আছে, সেগুলো আমি দেখতে পাব কি না। আপনার সঙ্গে যখন যোগাযোগ করি, তারপর রিসার্চের কারণে ডায়েরিগুলো দেখা খুব জরুরি হয়ে উঠেছে। আমার হাতে হানি ফ্লেচারের কাছে লেখা জেনিফার হলওয়ের একটি চিঠি আছে। ওটা লেখা হয়েছে আঠারো শ’ ঊনপঞ্চাশ সালের শেষদিকে। তখন মাত্র ইংল্যাণ্ডে ফিরে গেছেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড। যাঁরা আয়ারল্যাণ্ড থেকে তাঁকে দেশে ফিরতে সহায়তা করেন, চিঠিতে তাঁদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ দেন তিনি। তাঁরা হেনরি ফ্লেচার, তাঁর দুই বোন হানি ও এলিজা। এ-ছাড়া লেডি ধন্যবাদ জানান বায়ার্ন কনারকে। এঁরা লেডিকে লর্ড স্টার্লিংফোর্ডের খপ্পর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করেন।’

স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে রানাকে দেখলেন প্রফেসর। ফ্লেচার পরিবার ছিল লেডির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। ডায়েরিতে মাঝে মাঝে তিনি লিখেছেন তাঁদের কথা। তখন নামকরা পরিবেশবিদ ও মানবতাবাদী এক সঙ্ঘের সংগঠক ছিলেন ফ্লেচার। দুই যমজ বোনকে নিয়ে বাস করতেন বাথ-এ। লেডি স্টার্লিংফোর্ড যখন এবারডেন হলে ছিলেন, মাঝে মাঝেই আয়ারল্যাণ্ডে এসে তাঁর আতিথ্য নিতেন তাঁরা। দাম্পত্য-কলহ বিশ্রী আকার ধারণ করলে ইংল্যাণ্ডের উঁচু সমাজে লেডি স্টার্লিংফোর্ডকে ঠাঁই করে দেন তাঁরা। ‘রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রচণ্ড প্রভাব ছিল তাঁদের…’

প্রফেসরের কথা আর শুনছে না রানা। চমকে গেছে বায়ার্ন কনার নামটা শুনে। আইরিশ এ-বংশ বিরল নয় এ- দেশে।

বেলা নিজেও নোটবুকে লিখেছে বায়ার্নের কথা। লোকটা জন্ম নিয়েছিল আঠারো শ’ নয় সালে। আর তার ব্যাপারে খোঁজ নিতে ম্যালাচি চার্চে গিয়েছিল বেলা। ওর মত লোকটার বংশ-পরিচয় জানত না বলে প্যারিশের রেকর্ড থেকে আসল লোকটাকে খুঁজে নিতে পারেনি রানা।

কিন্তু এর অর্থ আসলে কী?

দ্রুত মনে মনে কিছু হিসাব কষল রানা।

বায়ার্ন নামটা কেন নোটবুকে লিখল বেলা, সে এক জটিল রহস্য। তবে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের চিঠি পড়েই তার ব্যাপারে বোধহয় আগ্রহী হয়ে ওঠে বেলা। দেরি না করে আবারও যোগাযোগ করেছিল প্রফেসর কেলির সঙ্গে। ওদিকে চার্চের রেকর্ড ঘেঁটে বের করল বায়ার্ন কনারের বিষয়ে তথ্য। একই সময়ে ফোন দিল লণ্ডনে গ্রেগ কার্সটির কাছে। লোকটা জানাল ওকলাহোমার টুলসা শহরের মেয়র অ্যারন কনারের ফোন নম্বর। এরপর বহুক্ষণ আইরিশ-আমেরিকান লোকটার সঙ্গে আলাপ করেছিল বেলা।

কিন্তু কী ছিল তাদের কথা বলার বিষয়টি?

বংশক্রম জেনে নেয়ার জন্যে ফোন দিয়েছিল বেলা? পকেট থেকে বেলার নোটবুক নিয়ে পাতা উল্টে তথ্যগুলো আবারও পড়ল রানা:

কথা বলেছি সেইণ্ট ম্যালাচি চার্চের ফাদার ও-সুলিভানের সঙ্গে। জানলাম তাঁদের রেকর্ড অনলাইনে নেই।
বায়ার্ন ১৮০৯ সালে জন্মালে কীভাবে ১৮২২!!! এ তো অসম্ভব!!!!!

লোকটার পরিচয় ও জন্ম সাল এখন জানে রানা। কিন্তু শেষদিকের লাইনে এ তো অসম্ভর, এটাই বা কেন লিখেছে?

‘বায়ার্ন কনার সম্পর্কে আপনার কাছে আরও কিছু লিখেছে বেলা?’ প্রফেসরকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চাইল রানা।

‘শুধু এটুকু,’ বললেন কেলি, ‘ই-মেইলের শেষাংশ পড়ে শোনাচ্ছি: ‘আমি খুবই আগ্রহী রায়ার্ন কনারের বিষয়ে। মনে হচ্ছে লেডির ডায়েরিতে তার সম্পর্কে আরও কিছু পাব। আপনার জবাবের জন্যে অধীর অপেক্ষা করছি, স্যর।’ স্ক্রিন থেকে চোখ তুললেন প্রফেসর। ‘ব্যস, আর কিছুই নেই।’

‘এরপর আর বেলার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হয়নি?’

দুঃখিতভাবে মাথা নাড়লেন প্রফেসর। ‘আমার ধারণা, আমার ই-মেইলের জন্যে অপেক্ষা করেছিল। আর পরে…’ চুপ হয়ে গেলেন তিনি।

‘তাঁর ডায়েরিতে বায়ার্ন কনারের ব্যাপারে বিশেষ কিছু লিখেছেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড?’ জানতে চাইল রানা।

‘বেশ ক’বার। তবে লেডি কেন তার ব্যাপারে লিখলেন, সেটা জানি না। স্টার্লিংফোর্ড এস্টেটের সামান্য এক আইরিশ চাকর ছিল সে। লেডির ঘোড়া রাখত।’

কথাটা শুনে একটু হতাশই হলো রানা।

চোখ বুজে মাথা নাড়লেন প্রফেসর। ক্লান্ত স্বরে বললেন, ‘অনেক রাত হলো, মিস্টার রানা। এবার আমাকে ক্ষমা করতে হবে। আশা করি লেডির ডায়েরি পড়ে সবই বুঝবেন। আমি এখন গিয়ে শুয়ে পড়ব। আবার না হয় আলাপ হবে সকালে।’

চেয়ার ছেড়ে টেবিল থেকে চার খণ্ড ডায়েরি হাতে নিল রানা। ‘আপাতত এগুলো আমি নিচ্ছি।’

‘জানতাম তা-ই করবেন, চেয়ার ছেড়ে ডেস্কের ওপরে ল্যাপটপ রাখলেন প্রফেসর। ‘আমার মনে হয় না যে রাত কাটাতে কোন হোটেলরুম বুক করেছেন। তাতে অবশ্য কোন সমস্যা নেই। ভিলার পাশেই অতিথির জন্যে কোয়ার্টার আছে। আমার সঙ্গে আসুন।’

আলো থেকে সরে দরজা খুলে করিডরে বেরোলেন তিনি। ব্যাগ কাঁধে তুলে তাঁকে অনুসরণ করল রানা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বুঝল, কেন রাতের আঁধারকে সঙ্গী করেছেন প্রফেসর। আকাশ থেকে মৃদু আলো বিলিয়ে চলেছে অসংখ্য তারা। তাতে কোন ধরনের অসুবিধা হচ্ছে না তাঁর।

‘একমিনিট, মিস্টার রানা, অ্যাডি ও ন্যানিকে রাতের খাবার দেব, তারপর আপনাকে পৌঁছে দেব গেস্ট-হাউসে।’ উঠনে কেনেলের দিকে গেলেন প্রফেসর। আউট হাউস থেকে ডগ ফুডে ভরা বড় দুটো থালা এনে রাখলেন কেনেলের মুখে। হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল দুই জার্মান শেফার্ড। গপগপ করে খেতে লাগল সুস্বাদু খাবার।

আদর করে কুকুরদুটোর মাথা চাপড়ে দিলেন প্রফেসর। রানার কাছে ফিরে বললেন, ‘ভালুকের মত বড় হলেও ওরা খুব নিরীহ। আপনার কোন ক্ষতি করবে না। অবশ্য এই খবর তো আর ডাকাতেরা জানে না। কী রে, ঠিক বলেছি না?’

খাবার থেকে মুখ তুলে তাঁকে দেখল দুই কুকুর।

রানা বুঝতে পারল, প্রফেসর আসলে ওর মতই বড় বেশি একা।

এবার চলুন, গেস্ট-হাউস দেখিয়ে দিই,’ বললেন কেলি। ‘নিশ্চয়ই এরই ভেতরে খিদে লেগেছে আপনার? কিচেনে সবই আছে। যেটা খুশি নেবেন। বেশিরভাগই টিনজাত খাবার। এ-ছাড়া পাবেন মাঝারি মানের কয়েক বোতল ওয়াইন। আরও ভাল কিছু নেই, কারণ আমার কাছে অতিথি আসেন না।’

‘পরিবারের কেউ আপনার সঙ্গে থাকেন না?’ প্রফেসরের পিছু নিল রানা।

‘না,’ মাথা নাড়লেন তিনি। ‘আমি আমার বংশের শেষ মানুষ। বহু বছর লাগে এক মেয়েকে ভালবেসেছিলাম। তবে তার পছন্দ হয়নি আমাকে। বিয়ে করা আর হয়ে ওঠেনি। তাই ছেলেমেয়েও নেই। নিজেকে বুঝ দিই যে, অ্যাডি আর ন্যানিই আমার সন্তান। তাই ব্যবস্থা করেছি, যাতে আমি মারা গেলেও খাবারের কষ্ট যেন পেতে না হয় ওদেরকে।

কথাগুলো শুনে মন খারাপ হয়ে গেল রানার।

‘আপনি হয়তো ভাবছেন, বুড়ো এক প্রফেসর এমন রাজপ্রাসাদের মত মস্ত বাড়ির মালিক কীভাবে হলো,’ হাসলেন প্রফেসর। ‘রিটায়ার করার পর যে টাকা পেয়েছি, তাতে এমন বাড়ির মালিক হওয়ার কথা নয়। তবে আমার এক অবিবাহিত চাচা মারা গেলে তাঁর করা উইলের কারণে হাতে আসে কয়েক লাখ পাউণ্ড আর এই ভিলা। টাকা খাটিয়েছি ব্যবসায়। তাতে যে মুনাফা আসে, ভালভাবেই চলে যায় আমার।’

ভিলার পাশে ছোট দোতলা বাড়ির সামনে গিয়ে থামল ওরা। দরজা খুলে রানার হাতে চাবি দিলেন প্রফেসর। ভারী গলায় বললেন, ‘নিজের বাড়ি বলে মনে করবেন, মিস্টার রানা। ডায়েরি পড়তে গিয়ে আবার রাত করবেন না। নিশ্চিন্ত ঘুম বোধহয় দুনিয়ায় সেরা প্রাপ্তি। ভাল থাকুন। শুভরাত্রি।’

বিমর্ষ মানুষটাকে ছায়ার ভেতর দিয়ে বাড়ির দিকে ফিরতে দেখল রানা।

বাইশ
বিশাল ভিলার পাশে ছোট দোতলা বাড়িটা চমৎকার এক ছোট কটেজের মত। একতলা থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার প্যাসেজে। মাঝে করিডর রেখে মুখোমুখি দুটো বেডরুম। একটার আছে ফ্রেঞ্চ উইণ্ডো, ওদিকে ব্যালকনি। এ-ঘর পছন্দ করল রানা। অ্যান্টিক খাটের ওপরে ভেলভেটের লাল চাদরে নামিয়ে রাখল লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরি রাত হলেও খিদে নেই, তাই কিচেন থেকে কোন খাবার নিল না।

গরম পড়েছে আজ। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে প্রফেসর কেলির কথা মনে পড়ল রানার। কিছুক্ষণ পর বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকে বসে পড়ল খাটের নরম গদিতে। বিড়বিড় করে বলল,

‘দেখি কী লিখেছেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড!’

মশার অত্যাচার ঠেকাতে জানালায় ঝুলছে ভারী পর্দা। ঘরে ঢুকছে না চাঁদের আলো। খাটের পাশে নিচু টেবিলে ছোট এক ল্যাম্প। ওটা জ্বেলে মৃদু আলোয় প্রথমদিকের ডায়েরি খুলল রানা। ঝাপসা হওয়া কালিতে প্রথম পৃষ্ঠার ওপরে লেখা: আঠারো শ’ বেয়াল্লিশ সাল, মে মাসের তেরো তারিখ।

বিয়ের মাত্র কিছু দিনের ভেতরে এবারডেন হলে এসে ডায়েরি লিখতে শুরু করেন মহিলা। এক এক করে পৃষ্ঠা উল্টে যেতে লাগল রানা।

যেমন সুন্দর লেডির হাতের লেখা, তেমনি দারুণ গুছিয়ে লিখতেন। কোথাও বাড়তি কোন শব্দ নেই। পাঠকের মনে ফুটে ওঠে আঠারো শতকের নির্জন এক মস্ত ম্যানশনে বসে ডায়েরি লিখে চলেছে অদ্ভুত রূপবতী এক নিঃসঙ্গ যুবতী। রানার মনে পড়ল, মাত্র গতকাল দেখে এসেছে সেই ধসে পড়া বাড়ি।

আরও কিছুটা পড়েও চমকে যাওয়ার মত কিছু পেল না ও। অভিজাত এক পরিবারের সাধারণ সব কথা চমৎকার করে লেখা। আঠারো শ’ বেয়াল্লিশ সালে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের দৈনন্দিন জীবনে উত্থান-পতন ছিল না। অবশ্য অনুযোগ করেছেন, বাইরের সামাজিক বা বাড়ির কর্মকাণ্ডে তাঁকে জড়াতে চান না তাঁর স্বামী।

‘অবাক লাগে, কীভাবে ষাঁড়ের মত এক গোঁয়ার পুরুষ চাকরকে বাড়ির সব দায়িত্ব দিয়েছে আমার স্বামী। অবশ্য আমার ব্যক্তিগত চাকর পামেলা সত্যিই হাসিখুশি ভাল মেয়ে। সে আর বায়ার্ন এই বাড়িতে না থাকলে হয়তো বিরক্তির কারণে আত্মহত্যা করে বসতাম।

বায়ার্ন কনারের বয়স যখন তেত্রিশ বছর, নতুন বধূ হয়ে এবারডেন হলে পা রাখেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড। মিষ্টি আচরণ করে তাঁর মন জয় করে নিয়েছিল কনার। কিন্তু এত বছর পর তার ব্যাপারে এত আগ্রহী হয়ে উঠল কেন বেলা?

ডায়েরি নীরবে পড়তে লাগল রানা। পরের কয়েক পৃষ্ঠার পর লেডি লিখেছেন: ম্যানশনের কর্ত্রী হিসেবে তাঁর কোন ভূমিকাই নেই। বেশিরভাগ সময় তাঁর কাটে পিয়ানো বা হাপ বাজিয়ে, বই পড়ে। যখন খুব বিরক্তি লেগে যায়, এবারডেন হল থেকে বেরিয়ে ঘুরে আসেন দূরের গ্রাম থেকে। তখন সবসময় তাঁর সঙ্গে থাকে প্রিয় ঘোড়া এলিসা। ঘোড়ায় চড়তে ভালবাসলেও স্বামীর সঙ্গে শেয়াল শিকারে যেতেন না। কাজটা খুব নিষ্ঠুর বলে মনে হতো তাঁর। এক জায়গায় লিখেছেন: ‘এমনিতেই শেয়ালের জীবন খুব কষ্টকর, সবসময় পেটে খাবার জোটে না। স্রেফ মজা পাওয়ার জন্যে হিংস্র কুকুর দিয়ে তাদেরকে ভয়ঙ্করভাবে হত্যা করা আর যাই হোক, আনন্দের কিছু হতে পারে না। তবে আমার কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছে আমার স্বামী এবং তার রক্তলোলুপ বন্ধুরা।’ আরও কয়েক মিনিট ডায়েরি পড়ার পর আঠারো শত বেয়াল্লিশ সালের নভেম্বরে আবারও এল বায়ার্ন কনারের কথা। ভাল আচরণের জন্যে মানুষটাকে সত্যিই পছন্দ করতেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী বায়ার্ন ছিল নরম মনের প্রকাণ্ড এক দানব। খুব শ্রদ্ধা করত লেডিকে। যত্নের সঙ্গে দেখভাল করত তাঁর ঘোড়াগুলোকে। আরও কয়েক পাতা পড়ার পর রানা জানল, গোপনে বায়ার্নের কাছ থেকে আয়ারল্যাণ্ডের স্থানীয় গ্যালিক ভাষা শিখছিলেন তিনি। কাজটা আড়ালে করতে হতো, কারণ ইংরেজ সরকারের তরফ থেকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল সেই ভাষা। কোন আইরিশ তার বংশ-পরিচয় জানাবার জন্যে গ্যালিক ভাষা ব্যবহার করতে পারত না। ‘আমার স্বামী যদি একবার জানতে পারে এই ভাষায় কথা বলেছি, তা হলে তুলকালাম করবে সে। আইরিশেরা নাকি আমাদের চেয়ে অনেক নিচু জাতের মানুষ। তাই কাজের মানুষদেরকে জানিয়ে দিয়েছে, তার সামনে গ্যালিক ভাষায় কথা বললে ঘোড়ার চাবুক দিয়ে মেরে পিঠ ফাটিয়ে দেবে।’ তিক্ত হয়ে পরের বাক্য লিখেছেন লেডি: ‘পারলে আমাকে ওদের মত করে চাবুক পেটা করে দেখুক! আইরিশদের মাতৃভাষা আমার কাছে ওদের দারুণ সুন্দর তৃণভূমি, পাহাড়, উপত্যকা বা গিরিসঙ্কটের মতই মাধুর্যময় বলে মনে হয়।

এবারডেন হলের কর্মচারী পামেলা ও বায়ার্ন ছাড়া আর কারও সঙ্গেই কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি লেডির। অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করতেন ইংল্যাণ্ড থেকে এবারডেন হলে বেড়াতে আসবেন তাঁর আত্মীয়রা। এঁরা দুই যমজ বোন হানি ও এলিজা ফ্লেচার। বয়সে লেডির এগারো বছরের বড় তাঁরা। এঁদের বড় ভাই নামকরা ডাক্তার ও পরিবেশবিদ হেনরি ফ্লেচার বোনেদের সঙ্গে বেড়াতে আসছেন জেনে খুশি হন জেনিফার। ডায়েরিতে মাঝে মাঝেই লিখেছেন: ‘মানসিকতার দিক থেকে কোথায় আমার খালাত ভাই ভদ্র ও সংযত হেনরি ফ্লেচার, আর কোথায় আমার স্বামীর হৈ-চৈ করা ষাঁড়ের মত খুনি বন্ধুরা! ডিনারে গপ-গপ করে একগাদা খাবার খাওয়ার পর বোতলের পর বোতল পোর্ট গিলে মাতাল হয়ে ওঠে এরা। টেবিল সোফা পুড়িয়ে দেয় চুরুটের আগুনে। লোকগুলোর দস্তু ভরা কথার ভেতরে নগ্নভাবে প্রকাশ পায় টাকা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়ার লোভ! আজ সন্ধ্যার পর দুনিয়ার আরেক প্রান্তে অদ্ভুত সুন্দর এক দেশের কথা জানিয়েছেন হেনরি ফ্লেচার। তাঁর প্রতিটা কথা মুগ্ধ হয়ে শুনেছে অতিথি ভদ্রমহিলারা।’

মেক্সিকোতে দুর্লভ প্রজাপতি ধরেছেন হেনরি। একা গিয়ে উঠেছেন তুরস্কের দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায়। ডায়েরি পড়ে রানার মনে হলো, লেডি স্টার্লিংফোর্ডের হৃদয়ের বড় এক অংশ জুড়ে ছিলেন খালাত ভাই হেনরি ফ্লেচার। অবশ্য আজ কোনভাবেই প্রমাণ করা সম্ভব হবে না, তাঁরা স্রেফ পরস্পরের বন্ধু ছিলেন না।

চারপাশের সবাইকে মানুষ বলেই গণ্য করতেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড। তাঁকে পছন্দ না করার মত কোন কারণ দেখতে পেল না রানা। যদিও এটা বুঝতে পারছে, বহুদূর থেকে এই দ্বীপে এসেও জরুরি কোন সূত্র এখনও পায়নি। পুরো একঘণ্টা ডায়েরি পড়ার পর চোখ তুলে দেখল অন্য তিন ডায়েরি। সব পড়তে হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগবে ওর।

এবার দ্রুত পাতা উল্টে গেল রানা। আরও কিছুক্ষণ পর প্রথম ডায়েরি শেষ করে হাতে নিল দ্বিতীয় খণ্ড। লেডি ওটা লিখতে শুরু করেন আঠারো শ’ ছিচল্লিশ সালের সেপ্টেম্বরের বিশ তারিখে। প্রথম এবং এই ডায়েরির মাঝে বোধহয় ছিল বেশ কয়েক খণ্ড। ওগুলো আর খুঁজে পাননি প্রফেসর কেলি।

এবারের ডায়েরি পুরো চার বছর পরের। ওটাতে বায়ার্ন কনারের ব্যাপারে আরও কিছু আছে কি না, সেটা বোঝার জন্যে পড়তে লাগল রানা। ওর কাছে রহস্যময় এক চরিত্র হয়ে উঠেছে আস্তাবলের কর্মচারী। রানা ভাবল, লেডি স্টার্লিংফোর্ড ইংল্যাণ্ডে ফেরার ফলে লোকটার কপালে কী জুটেছিল? আঠারো শ’ একান্ন সালে এবারডেন হল পুড়ে গেলে তখন কোথায় ছিল সে? জটিল এই কাহিনীতেই বা কী ভূমিকা তার?

পরবর্তী তিন লাইন পড়তে না পড়তেই উঠনে হুঙ্কার ছাড়ল দানবীয় দুই জার্মান শেফার্ড। অস্বাভাবিক কিছু দেখে সতর্ক হয়ে উঠেছে ওরা। ওটা হয়তো পেঁচা বা কোন নিশাচর প্রাণী, ভাবল রানা। পলকের জন্যে ডায়েরি থেকে ছুটে গেছে ওর মনোযোগ। উঠনের কাছে ঘেউ-ঘেউ করছে দুই কুকুর।

পরক্ষণে আবারও মনোযোগ নষ্ট হলো রানার। এবার যে শব্দ শুনতে পেয়েছে, তাতে চমকে গিয়ে তাকাল পর্দা দিয়ে ঢাকা জানালার দিকে। আড়ষ্ট হয়ে গেছে ওর শরীর।

চারপাশে নেমে এসেছে নীরবতা। তবে তার আগে যা শুনেছে রানা, সেটা খুব অস্বাভাবিক। পর-পর দু’বার চাপা ধুপ আওয়াজে গর্জে উঠেছে সাইলেন্সার্ড পিস্তল। কাতরে উঠে চুপ হয়ে গেছে কুকুরদুটো। এখন কবরের মত নীরব চারপাশ।

রানা বুঝে গেল, কয়েক সেকেণ্ড আগে খুন করা হয়েছে প্রফেসর কেলির বিশ্বস্ত কুকুরদুটোকে!

তেইশ
ধকধক করছে রানার বুক। লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে নিভিয়ে দিল রিডিং ল্যাম্প। নীরবে চলে গেল ফ্রেঞ্চ জানালার সামনে। পর্দা সামান্য ফাঁক করে তাকাল ব্যালকনির দিকে। চাঁদের আলোয় অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না ওর। আগের মতই ভিলার বাগানের গাছপালা ও ঝোপঝাড় নিথর।

ব্যালকনিতে বেরিয়ে এসে রেইলিঙের এক পিলারের পেছনে বসে পড়ল রানা। চারপাশে শব্দ বলতে ঝিঁঝির টানা সুরতান। একটু পর রেইলিঙের পিলারের পাশ দিয়ে চেয়ে নিচে দেখতে পেল নড়াচড়া। প্রথমজনের পিছু নিয়েছে দ্বিতীয়জন। ট্রেনিং নেয়া চোখ না থাকলে অন্ধকারে তাদেরকে দেখবে না কেউ। উঠন পেরিয়ে ছুটে আসছে ভিলার দিকে অচেনা জায়গায় দক্ষভাবে রয়ে যাচ্ছে ছায়ার ভেতরে। রানা বুঝে গেল, মিলিটারি থেকে প্রশিক্ষিত সৈনিক বা অফিসার এরা। যুদ্ধের এই একই ট্রেনিং আছে ওর। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে ভিলার ছায়ায় হারিয়ে গেল তারা।

ব্যালকনি থেকে রানা দেখল, ভিলার দেয়াল ছেয়ে আছে আইভি লতায়। ঝরা ফুলে ভরা মাটি ব্যালকনি থেকে কমপক্ষে পনেরো ফুট নিচে। দ্বিধা না করে রেইলিং টপকে গেল রানা। দু’হাতে ধরেছে পুরু দুই আইভি লতা। দেয়ালে পা রেখে নেমে যেতে লাগল দ্রুত। তিরিশ সেকেণ্ড পেরোবার আগেই নামল ফুলের বেডের ভেজা মাটিতে। সামনেই পোর্টিকোর খোলা দিক, দেয়াল ঘুরে চলে গেছে বাড়ির মূল অংশে। লোকদুটো কোথায় গেছে বুঝতে গিয়ে সতর্ক হয়ে উঠেছে রানা। গভীর রাতে ঝিঁঝির ডাক ছাড়া কোথাও কোন আওয়াজ নেই। একটু পর ওর চোখে পড়ল উঠনে গাঢ় ছায়ায় পড়ে আছে কালো দুটো স্তূপ। নিঃশব্দে ওখানে গেল রানা। ভাল করেই বুঝে গেছে ওগুলো আসলে কী।

মৃত এক জার্মান শেফার্ডের দিকে ঝুঁকে গেল রানা। চাঁদের ম্লান আলোয় দেখল মাটিতে চকচক করছে কী যেন। বুলেটের আঘাতে কুকুরটার ঘাড় ফুটো হওয়ায় চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে রক্ত।

ঘাসজমি পেরিয়ে পোর্টিকোতে গেল রানা। ফ্ল্যাগস্টোনের মেঝেতে মৃদু শব্দ তুলছে ওর বুট। ভিলার সামনে পৌঁছে দেখল হাট করে খুলে রাখা হয়েছে দরজা। লোকদু’জন সময় নেয়নি লক খুলতে। এরা যারাই হোক, দক্ষ নিজেদের কাজে। দরজা পেরিয়ে ভিলায় ঢুকল রানা। অন্ধকার মোজাইক করা হলওয়ের সামনেই চওড়া করিডর। আগে সে- পথে প্রফেসরের স্টাডিতে গেছে রানা। ওপরের হলদে বাতির আলোয় দেখতে পেল ডানে উঠে গেছে কারুকাজ করা রেইলিং দেয়া সিঁড়ি। ওটার কাছে থেমে দূর থেকে শুনতে পেল মানুষের গলা।

রাতে পুরনো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা বড় একটা আর্ট। আর বিদ্যাটা কাজে লাগে বলে শিখে নিয়েছে রানা। এ-বাড়ির সিঁড়ির কাঠের ধাপ নরম হলেও মাঝ দিয়ে গেছে মার্বেলের রানার। একেকবারে মার্বেলের দু’ধাপ ডিঙিয়ে দোতলায় উঠে এল রানা। কারুকাজ করা রেইলিং গেঁথে গেছে একদিকের দেয়ালে। পাশেই বড় ল্যাণ্ডিং। নিচে হলওয়ে। আগের চেয়ে স্পষ্টভাবে গলা শুনতে পেল রানা। কর্কশ স্বরে কথা বলছে একাধিক লোক। রানা তিক্ত মনে ভাবল: এরা যারাই হোক, প্রফেসরের ছোটবেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়!

ল্যাণ্ডিং থেকে সরাসরি গেছে চওড়া এক প্যাসেজ। ওটার একটু দূরে রানা, দেখতে পেল আধখোলা দরজা। ঘরের ভেতরের আলো এসে পড়েছে প্যাসেজের মেঝেতে।

সতর্ক পায়ে এগোল রানা। মন দিয়ে শুনছে গলার আওয়াজ। যদিও বুঝতে পারছে না কী বলা হচ্ছে। করিডরের দেয়ালে ঝুলছে একাধিক পেইণ্টিং। দরজার পাশে প্রাচীন অস্ত্রের ডিসপ্লে!

সেসবের ভেতরে আছে অ্যান্টিক আইরিশ কেল্টিক ঢাল। রানার মনে পড়ল, বৃত্তাকার জিনিসটার ইংরেজি নাম টার্জ। তৈরি করা হয়েছে লোহার ফিতায় বেঁধে কাঠ ও চামড়া দিয়ে। বয়স হবে অন্তত চার শ’ বছর। ওপরের দেয়ালে ঝুলছে বেশ কিছু প্রাচীন ছোরা। নিচেই এক্স অক্ষরের মত আড়াআড়িভাবে লোহার খাপে চওড়া ফলার দুই তলোয়ার। যোদ্ধার মুঠো রক্ষা করতে গিয়ে ওদুটোর হাতল ঘিরে রেখেছে ঝুড়ির মত স্টিলের ভারী তার।

হাত বাড়িয়ে কাছের তলোয়ার দেয়াল থেকে নিল রানা। স্বস্তি বোধ করল শব্দ হয়নি বলে। ঝুড়ির ভেতরে হাতলে চেপে বসল ওর হাত। হাতল হাঙরের চামড়ার মত রুক্ষ। খাপ থেকে তলোয়ার এখন বের করলে ঝং করে শব্দ হবে। তাই খাপ থেকে ওটা বের করল না রানা। পা টিপে টিপে চলে গেল আধখোলা দরজার পাশে। উঁকি দিল ঘরের ভেতরে।

চব্বিশ
অনুপ্রবেশকারীদের বুট থেকে শুরু করে পোশাক ও মুখের স্কি মাস্ক কালো রঙের। রানার চোখ আগে গেল তাদের কোমরে কালো করডিউরা হোলস্টারের ওপরে। প্রথমজনের হোলস্টারে কালো গ্লক, অন্যজনের হাতে উদ্যত একই অস্ত্র।

ঘরে রাজকীয় অ্যান্টিক খাটে ঘুমিয়ে ছিলেন প্রফেসর। ফুলেল চাদর একটু আগে তাঁর গা থেকে সরিয়ে নিয়েছে লোকদু’জন। চমকে গিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসেছেন তিনি। আর তখনই ঘাড় ধরে বিছানা থেকে তুলে দুই কবজি বেঁধে তাঁকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে ঘরের মাঝের এক চেয়ারে।

চেয়ারের পেছনে থেমে প্রফেসরের মাথার তালুতে অস্ত্রের নল চেপে ধরেছে একজন। ডাবল স্ট্যাক বক্স-এর বদলে পিস্তলে ডাবল ড্রাম ম্যাগাযিন। একাধারে গুলি করতে পারবে এক শ’ রাউণ্ড। লোকটার সঙ্গীর পিঠ দরজার দিকে। চাপা স্বরে প্রফেসরকে বলল সে, ‘শুয়োরের বাচ্চা, শেষবারের মত বলছি: চুতিয়া বেটির ডায়েরিগুলো এখন কোথায়?’

তার কণ্ঠে আমেরিকার দক্ষিণের সুর স্পষ্ট। রানা ধারণা করল, এরা আলাবামা বা লুইযিয়ানার লোক। দ্বিতীয়জনের স্কি মাস্কের পেছনে পনিটেইল করা তেলতেলে সোনালি চুল। কোমরের বামদিকে হোলস্টারে গ্লক। রানা বুঝে গেল, এরা বেলার সেই দুই খুনি!

‘জলদি বল, নইলে এক গুলিতে ফুটো করে দেব তোর মগজ,’ বলল লোকটা। ‘কী করবি চট্ করে ঠিক কর্!’

দু’হাতের বাঁধন খুলতে চাইছেন প্রফেসর। খুনিদের কাছ থেকে মুক্ত হতে গিয়ে ছিঁড়ে গেছে সিল্কের পায়জামা। রানা দেখল, তাঁর ফাটা ত্বকে দগদগে লাল ঘা। খাটের পাশে টেবিলে উল্টে আছে ফুলদানী। খুনিদের বুটের নিচে থেঁতলে গেছে রঙিন কিছু ফুল। বাতাসে ভাসছে সেগুলোর মিষ্টি সুবাস। এ-ছাড়া ঘরে আছে নিকোটিনে ভরা মিন্ট চুইংগামের দুর্গন্ধ। সৈকতে সেই বিকেলে বেলার খুনিদের একজনের মুখে এই একই গন্ধ পেয়েছিল রানা। আর সেই লোকই এখন দাঁড়িয়ে আছে দরজার দিকে পিঠ দিয়ে।

বেলার খুনিকে দেখে রেগে গেছে রানা। লোকটার বেল্টে ঝুলছে কা-বার কমব্যাট নাইফ। রানার মনে কোন সন্দেহ থাকল না, এই একই ছোরা দিয়ে খুন করা হয়েছে বেলাকে।

ঘরের পরিবেশ যেন হয়ে গেছে পরাবাস্তব।

কাউকে ঘুম থেকে তুলে চেয়ারে বসিয়ে হাত বেঁধে দিলে ভয়ে তার প্রস্রাব করে দেয়ার কথা। অথচ তোয়াক্কা নেই প্রফেসরের। খুনিদের দিকে চেয়ে হাসছেন। এইমাত্র যেন শুনেছেন মজার কোন কৌতুক। তাঁর সাহস দেখে বিস্মিত হয়ে গেছে দুই খুনি। ভাবতে পারেনি তাদের মুখের ওপরে কেউ হাসবে।

রানা বুঝে গেল, এখন হামলা করলে হয়তো ওর দিকে হেলে পড়বে ভাগ্যের দাঁড়িপাল্লা। ঘরে ঢুকে খাপ থেকে তলোয়ার বের করে চুইংগামখোরের কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত চিরে দিতে পারবে। কিছু বোঝার আগেই গুরুতর আহত হবে লোকটা। কিন্তু সেখানেই শেষ হবে ভাগ্যদেবীর সহায়তা। রানা আবার তলোয়ার তোলার আগেই গ্লক দিয়ে ওকে ঝাঁঝরা করবে দ্বিতীয় খুনি। সুতরাং বোকার মত আক্রমণে যাওয়া ওর উচিত হবে না।

ঝটকা দিয়ে হোলস্টার থেকে গ্লক নিয়ে অস্ত্রের নল দিয়ে প্রফেসরের মুখে গুঁতো দিল পনিটেইল। মাযল নব্বুই ডিগ্রি ঘুরিয়ে পর পর দু’বার গুলি করল বেডরুমের দেয়ালে। খক- খক করে দুটো শব্দ তুলেছে সাইলেন্সার। ‘শেষবারের মত সুযোগ দিচ্ছি! বল্, বইগুলো কোথায়?’

‘জানি কীসের কথা বলছ,’ বললেন প্রফেসর কেলি। ‘এ-ও জানি, ওগুলো এখন কোথায় আছে। কিন্তু খুন করলেও বলব না। সুতরাং সময় নষ্ট না করে গুলি করো আমার কপালে। শেষ হয়ে যাক দুনিয়ায় আমার কষ্টকর এই সময়।’

কড়া চোখে তাঁকে দেখছে দুই খুনি।

‘বুঝতেই পারছ, মিথ্যা বলছি না,’ বললেন কেলি। ‘আমি এ-ঘটনার একমাত্র সাক্ষী। সুতরাং আমাকে মেরে না ফেলে তোমাদের কোন উপায় নেই। তো গুলি করো। দেরি কীসের?’

ঘরে নেমেছে থমথমে নীরবতা।

আপাতত প্রফেসরের জন্যে কিছু করতে পারবে না রানা। জেনে-বুঝেই নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে আনছেন ভদ্রলোক।

পরস্পরকে দেখল দুই খুনি।

প্রফেসর কেলির পেছনের লোকটা বলল, ‘শালার মাথার নাটবল্টু খুলে গেছে!’

পনিটেইল নিচু গলায় বলল, ‘কাজ শেষ করো।’

প্রফেসরের মাথার তালু ফুটো হলো এক গুলিতে। এত কম রেঞ্জে বুলেটের আঘাতে চেয়ার নিয়ে কাত হয়ে মেঝেতে পড়লেন তিনি। মৃত্যুক্ষণে দেখেছেন শুধু সাদা এক ঝিলিক। ব্যথা পাননি, কারণ মগজ ছিন্ন করে খুলির আরেক দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে বুলেট। প্রফেসরের খুনির জানা নেই, ক্যান্সার ধরা পড়ার পর থেকে নিশ্চিন্ত মৃত্যু চেয়েছেন তিনি। আত্মহত্যা করার সুইস ক্লিনিক তাঁকে এত সহজে মৃত্যু দিতে পারত না।

‘এবার?’ পিস্তলের ধূসর ধোঁয়া থেকে চোখ সরাল প্রফেসরের খুনি। ‘চাইলেও তো এত বড় বাড়ির ভেতরে ডায়েরি খুঁজে নিতে পারব না।’

‘তো?’ হাসল পনিটেইল। ‘প্ল্যান বি তো সবসময় বেশি মজার। চলো, বাড়িতে আগুন দিই।’ সেফটি অন করে হোলস্টারে পিস্তল রেখে দরজার দিকে চলল সে।

এদিকে তার জন্যে খাপে ভরা তলোয়ার নিয়ে করিডরে অপেক্ষা করছে রানা। চওড়া ফলার তলোয়ারের বিরুদ্ধে দুটো গ্লক পিস্তল। লড়াই একদম ভারসাম্যহীন। অবশ্য আগেও বহুবার এ-ধরনের বিপদের মোকাবিলা করেছে রানা। যেহেতু এখনও চমকে দিতে পারবে, তাই বিনা লড়াইয়ে শত্রুকে ছেড়ে দেয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। দরজা দিয়ে বেরোবার জায়গাটা লড়াইয়ের জন্যে সেরা। খোলা করিডরে এত সুবিধা পাবে না রানা।

মুখে মিন্টের গন্ধ নিয়ে ঘর থেকে আঁধার করিডরে বেরোল বেলার খুনি। আর তখনই তাকে বাগে পেল রানা। দুই খুনির যে-কোন একজনকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। পরে তার কাছ থেকে জেনে নেবে কে তাদেরকে পাঠিয়ে দিয়েছে এবং সেটা কী কারণে। আপাতত বেঁচে থাকুক মিণ্টখোর খুনি। খাপে ভরা তলোয়ার দু’হাতে ধরে ওটার ঝুড়িওয়ালা হাতল পনিটেইলের মাথার পেছনে ঠকাস্ করে নামাল রানা। পাকা বাঁধাকপির ওপরে হাতুড়ি পড়লে এমন ধুপ শব্দ হয়।

কুকুরের মত কেঁউ করে উঠে করিডরের মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ল মিণ্টখোর। এরই ফাঁকে তার হাত ছোবল দিয়েছে হোলস্টারে। পিস্তল বের করলেও রানার লাথি খেয়ে ছিটকে গেল ওটা। ঠং-ঠনাৎ শব্দে গিয়ে পড়ল করিডরের দূরে। পরক্ষণে খুনির থুতনির নিচে লাগল রানার কঠিন এক লাথি। লোকটা চিত হয়ে পড়ে যেতেই ঠাস্ করে মেঝেতে বাড়ি খেল তার মাথার পেছনদিক। একই সময়ে ঘরের দরজায় থেমেছে প্রফেসরের খুনি। তার মুখোশের ভেতরে বিস্ফারিত হলো দু’চোখ। এখন তাকে শেষ করতে হলে রানার চাই স্রেফ বাড়তি একসেকেণ্ড সময়।

সামনে বেড়ে খাপ থেকে সড়াৎ করে তলোয়ার নিল রানা। যদিও ওর চেয়েও অনেক দ্রুত সতর্ক শত্রু-ঝট্ করে ঢুকে পড়ল ঘরে। তাড়া করে লোকটার বুক লক্ষ্য করে তলোয়ার চালাল রানা। এদিকে লাথি মেরে ওর নাকের সামনে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে প্রফেসরের খুনি। গায়ের জোরে তলোয়ার চালিয়ে নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি রানা। দরজার তক্তা ভেদ করে ঢুকে গেছে সতেরো ইঞ্চি ফলা। হ্যাঁচকা টানে ওটা ছোটাতে চাইলেও কাঠের ভেতরে ফেঁসে গেছে চওড়া ফলা। কোনমতেই আর বেরোল না।

একমাত্র অস্ত্রটা হারিয়ে রানার মনে পড়ল, করিডরে তো রয়ে গেছে পিস্তল! তলোয়ারের কথা ভুলে মিণ্টখোরের গ্লকের খোঁজে ছুটল রানা। এদিকে মার খেয়ে দমে যায়নি পনিটেইল। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে চলে গেছে পিস্তলের কাছে। অস্ত্রটা হাতে তুলে নেবে, এমন সময় তার পিঠে ভাঁজ করা হাঁটু গেঁথে দিল রানা। লোকটার চোয়ালে বসাল ডানহাতি জোরাল ঘুষি। হাড়ের সঙ্গে হাড়ের সংঘর্ষে তীব্র ব্যথা পেয়ে আঁৎকে উঠল রানা। পলকের জন্যে ভাবল, চরম অন্যায় হচ্ছে ওর প্রতি! লোকটার ব্যথার বোধ এত কম কেন! এরই ভেতরে আবারও উঠে বসছে! তার মুখে কষে আরেক ঘুষি বসাল রানা। মিণ্টখোরের মুখ থেকে ছিটকে বেরোনো রক্তে ভিজে গেল ওর মুঠো। রানার সন্দেহ হলো, ব্যাটা বোধহয় আবারও উঠে বসবে!

এদিকে মেলা সময় নষ্ট করে বসেছে। ঝট্ করে খুলে গেল প্রফেসরের ঘরের দরজা। কাঠে গেঁথে থাকা তলোয়ারের ফলা ঠং করে লাগল পাশের দেয়ালে। চৌকাঠে এসে থেমেছে দ্বিতীয় খুনি, দু’হাতে শোভা পাচ্ছে টুইন-ড্রাম ম্যাগাযিনসহ গ্লক পিস্তল! অস্ত্রের মাযল রানার দিকে তাক করেছে সে! ওদিকে মেঝেতে পড়ে থাকা গ্লুকের কাছ থেকে এখনও পুরো দু’ফুট দূরে রানার হাত!

সামনে বাড়ল প্রফেসরের খুনি। স্লো মোশনে রানা দেখল, তার বুড়ো আঙুল সরিয়ে দিল অস্ত্রের ফায়ার সিলেক্টর সুইচ। চওড়া হাসি ফুটেছে লোকটার মুখে। নীরবে যেন বলছে: শালা, এইবার তোরে পাইসি!

এক সেকেণ্ডের দশভাগ সময়ে রানা বুঝল, পড়ে গেছে মস্তবড় বিপদে! সাধারণ পিস্তলে ফায়ার সিলেক্টর সুইচ থাকে না! যে অস্ত্রের পেছনে থাকে টুইন-ড্রাম ম্যাগাযিন, ওটা অবশ্যই গ্লক ১৮এস! পিস্তলের মত হলেও ওটাকে অফিশিয়ালি ক্লাস দেয়া হয়েছে সাবমেশিন গানের। লিভার সরিয়ে সেমি-অটো থেকে অটো মোডে নিলে প্রতিমিনিটে বেরোবে বারো শ’ গুলি!

বাঁচতে হলে এখন গ্লক পিস্তলের কথা ভুলে লেজ গুটিয়ে পালাতে হবে! অন্ধকার করিডরে বুলেটের স্রোত এড়াতে মাথা নিচু করে এঁকেবেঁকে ছুট দিল রানা। বোলতার মত ভো-ভো শব্দে চারদিকের দেয়ালে বিধল একরাশ গুলি। নানাদিকে ছিটকে পড়ছে সিমেন্টের টুকরো। হুক থেকে খসে গেল ছবি। ঠুসঠাস শব্দে বিস্ফোরিত হচ্ছে কাঁচ। সামনের মেঝেতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে শরীর গড়িয়ে সরে যেতে চাইল রানা। ঠুকঠাক শব্দে সিমেন্টের টুকরো লাগছে চোখে মুখে। প্রতিমিনিটে অস্ত্র থেকে বেরোবে বারো শ’ রাউণ্ড। অর্থাৎ প্রতি সেকেণ্ডে বিশটা গুলি। তামার জ্যাকেট পরা সীসার অ্যালয়ে ভরে গেল করিডর।

কয়েক গড়ান দিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছে রানা বুঝে গেল, ধাপ বেয়ে নামতে গেলে খুন হয়ে যাবে। তাই দেরি না করে ল্যাণ্ডিঙের রেইলিং টপকে খসে পড়ল শূন্যে। মাথার ওপরে দেখল কমলা ছুটন্ত ফুলকি। রেইলিঙের লোহার দণ্ডে লেগে নানাদিকে ছিটকে যাচ্ছে বুলেট।

দ্রুত নেমে যাওয়ার অনুভূতি হচ্ছে রানার। পরক্ষণে সিঁড়ির অন্তত দশ ধাপ নিচে পড়ে প্রচণ্ড ঝাঁকি খেল। ওর মনে হলো ফেটে গেছে কাঁধ ও পাঁজরের হাড়। ব্যথা এতই বেশি, ভুস করে বুক থেকে বেরিয়ে গেল শ্বাস। কিন্তু এখন ব্যথা নিয়ে ভাবার সময় নয়! কয়েক ধাপ গড়িয়ে নেমে লাফ দিয়ে উঠে দৌড় দিল একতলার দিকে। ওপরে দেখা দিয়েছে প্রফেসরের আততায়ী। খালি ম্যাগাযিন ইজেক্ট করে পিস্তলে ভরল নতুন ড্রাম ম্যাগাযিন। খোঁড়াতে খোঁড়াতে তার পেছনে এল প্রথম লোকটা। গ্লাভ্স্ পরা হাতে পিস্তল, অন্যহাতে টিপে ধরে রেখেছে মাথার পেছনদিক।

নিচের পঞ্চম ধাপ থেকে নিচের মোজাইক করা মেঝেতে লাফিয়ে নেমে তীরবেগে ছুটল রানা। একবার দরজা পেরোতে পারলে পরখ করে দেখবে ওপর থেকে পড়ে হাড় ভেঙেছে কি না।

অবশ্য এখন আর অত সময় নেই রানার হাতে। ওপরের লোকটা চাপা স্বরে বলল, ‘চারপাশে আগুন ধরিয়ে দাও!’

এরা ম্যাচের কাঠির কথা ভাবছে না, ভাল করেই জানে রানা। সিঁড়ি ভরে গেল অত্যুজ্জ্বল সাদা আলোর বিন্দুতে। দুই আততায়ীর ড্রাম ম্যাগাযিন থেকে বেরোচ্ছে থোকা থোকা বুলেট। ওগুলো ইনসেনডিয়ারি এক্সপ্লোয়িভ অ্যামুনিশন। যুদ্ধে শত্রুর গাড়ি ও বাড়িতে আগুন দিতে ব্যবহার করা হয়। আধুনিক ছোট অস্ত্রের জন্যে নতুন টেকনোলজি। নিজেও রানা কয়েক ক্রেট ব্লু টিঙ্‌ এসব বুলেট খরচ করেছে শত্রুর ট্যাকটিকাল টার্গেটে। বুলেটগুলো আকারে ছোট হলেও আগুন ধরিয়ে দেবে রকেট গ্রেনেডের চেয়েও আগে।

এখন আর দরজা পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে না রানা। একটা বুলেট লাগলে শুকনো শলাকার মত জ্বলে উঠবে ওর শরীর। চামড়ার জ্যাকেটের কাঁধ ফুটো করল একটা বুলেট। ভীষণ গনগনে তাপে লাল হলো ওর কান। ডাইভ দিয়ে সামনের মেঝেতে পড়ে ক্রল শুরু করল রানা। তারই ফাঁকে দেখল, ট্রেসারের মত মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে জানালার পর্দায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে ইনসেনডিয়ারি বুলেট। হলওয়ে ভরে গেল ধোঁয়া ও আগুনে। সিঁড়ির ওপর থেকে গুলি করছে দুই খুনি। ঠকঠক করে বুলেট লাগছে দরজায়। ছিটকে যাচ্ছে কাঠের জ্বলন্ত খণ্ড। চারপাশে কটুগন্ধী ধোঁয়া।

দরজার কথা মাথা থেকে দূর করে পালিশ করা মেঝেতে উঠে দাঁড়াল রানা। দিক পরিবর্তন করে উড়ে চলল করিডর ধরে প্রফেসর কেলির স্টাডিরুম লক্ষ্য করে। এদিকে সিঁড়ি বেয়ে নামছে দুই আততায়ী। রানার দিকে অস্ত্র তাক করে উগলে দিল শতখানেক জ্বলন্ত বুলেট। বিস্ফোরিত হলো ‘সাজিয়ে রাখা গাছের বড় একটা টব। নানাদিকে ছিটকে গেল সিরামিকের টুকরো। তখনই পাশের দেয়ালে ঘষা খেয়ে করিডরে বাঁক নিল রানা। ভীষণ জ্বলছে ওর ডান কাঁধ। পেছনের করিডর হয়ে গেছে মৃত্যু টানেল। ছাত চেটে দিচ্ছে আগুনের লকলকে শিখা। বন্ধ করে দিচ্ছে রানার পালিয়ে যাওয়ার সব পথ।

ছুটতে ছুটতে দুটো বিষয় ভাবল রানা। প্রথমত: খুন না হয়ে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত: ওর চাই লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরি। যেহেতু সূত্র পাওয়ার জন্যে এত দূরে এসেছে, তাই এখন অনুচিত হবে সেসব ফেলে যাওয়া। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে যেতেই ঘন ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে ছুটে চলল রানা। চোখে প্রায় কিছুই দেখছে না।

কালবেলা – ২৫ (মাসুদ রানা)

দাউ-দাউ করে জ্বলছে আগুন। ভিলার ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে মাসুদ রানা। নাক-মুখ দিয়ে ঢুকছে কালো ধোঁয়া। চোখের পানি আর ঘামের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সারামুখ। ‘হঠাৎ রানা টের পেল, বিস্ফোরণের আঘাতে থরথর করে কেঁপে উঠেছে চারপাশের দেয়াল ও মাথার ওপরের ছাত। আবারও ফাটল শক্তিশালী বোমা। ওটা সম্ভবত কোন গ্রেনেড। এর অর্থ কী, সেটা বুঝতে দেরি হলো না রানার। আগুনে ভরা বাড়ি ধসিয়ে দিচ্ছে খুনিরা। পুড়ে ছাই হওয়ার আগেই বেরিয়ে যেতে হবে এই বাড়ি থেকে।

ভিলার ভেতরে আছে গোলকধাঁধার মত সব প্যাসেজ। প্রতি ঘরে আছে পাশের কামরায় যাওয়ার দরজা। আগুনের তাড়া খেয়ে একেক দরজা পার হয়ে পরের কামরায় ঢুকছে রানা। এরই ভেতরে আগুন ধরেছে জানালাগুলোর পর্দায়। ছড়িয়ে পড়ছে অসহ্য তাপ। রানা ভাবতে শুরু করেছে, ভুল দিকে বাঁক নিয়ে নিশ্চিত করেছে নিজের মৃত্যু, এমন সময় বাড়ির পেছনে দেখতে পেল ওপরে যাওয়ার সিঁড়ি। মনে মনে ওটাই খুঁজছিল রানা। লেলিহান আগুনে জ্বলছে সিঁড়ির প্রথম পাঁচ ধাপ। সিঁড়ি বেয়ে ঝড়ের বেগে উঠতে লাগল ও। কমলা শিখা পোড়াচ্ছে হাঁটুর গোছার পেশি ও গোড়ালির হাড়। ব্যথা পাত্তা না দিয়ে দৌড়ে জ্বলন্ত ধাপ টপকে গেল রানা। বিকট এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল গোটা বাড়ি। ছাত থেকে ঝরঝর করে ঝরল প্লাস্টার। দু’হাতে মাথা ঢেকে ওপরের দিকে ছুটল রানা।

পরের বিস্ফোরণ হলো আরও প্রচণ্ড। চমকে গিয়ে রানা ভাবল, হয়তো এ-বাড়ির ওপরে আকাশ থেকে ফেলা হচ্ছে ভারী বোমা! অন্ধকার সিঁড়িতে দুই সেকেণ্ডের জন্যে থমকে গেল রানা। ভয়ে শুকিয়ে গেছে গলা। যে-কোন সময়ে মাথার ওপরে নেমে আসবে বিধ্বস্ত ছাত!

ছুটে দোতলায় উঠে এল রানা। সামনের দরজার হ্যাণ্ডেল ধরে বুঝতে পারল, আগুন জ্বলছে না ঘরের ভেতরে। শীতল হ্যাণ্ডেল ঘুরিয়ে ঝড়ের বেগে ছায়াভরা ঘরে ঢুকল রানা। চোখ থেকে ঘাম ঝেড়ে চারপাশে চেয়ে দেখল, এটা বেডরুম হলেও ব্যবহার করা হতো গুদাম হিসেবে। এদিকে-ওদিকে বাক্স ও বইয়ের স্তূপ। ছোট এক জানালা দিয়ে দেখতে পেল উঠন ও আইভি লতায় ভরা প্রাচীর। জানালার সামনে গিয়ে থামতেই হু-হু করে এল শীতল হাওয়া। তাজা বাতাসে ভরে গেল রানার ফুসফুস। মুঠোয় শক্ত করে ধরল কাঁটাযুক্ত আইভি লতা, তারপর বেরিয়ে এল জানালা দিয়ে। নিজেকে দেয়াল বেয়ে চলা কোন মাকড়সা বলে মনে হলো ওর। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ঠিক দিকেই এসেছে। বিশফুট দূরে গেস্ট- হাউসের দোতলার বারান্দা। ওদিকের ঘরেই আছে ডায়েরি। একটু সময় লাগলেও আইভি লতা ধরে ঝুলতে ঝুলতে চলে যেতে পারবে বারান্দায়। বামে নিচে এক জানালা থেকে বেরোচ্ছে কমলা শিখা। এখন গেস্ট-হাউসে আগুন ধরে না গিয়ে থাকলেই বাঁচোয়া!

.

‘গুলি বন্ধ করো! অস্ত্র নামিয়ে বন্ধুর কাঁধ স্পর্শ করল লিয়াম বার্ব। আগুনে ভরা করিডরের ওদিকে হারিয়ে গেছে অচেনা যুবক।

বিরক্তি নিয়ে বন্ধুকে দেখল টনি স্ক্যালেস। ‘মনে হচ্ছে হারামজাদাকে চিনি। আয়ারল্যাণ্ডে মেয়েলোকটাকে খতম করার সময় আমাদের সঙ্গে লাগতে এসেছিল।’

‘হয়তো,’ বলল বার্ব।

থুহ্ করে মুখ থেকে নিকোটিন গাম ফেলল স্ক্যালেস। মুখের রক্তে লাল হয়ে গেছে গাম। ‘আরেকটু হলে আমার মাথা ফাটিয়ে দিত। জানি না শালা এখানে কী করছে। তবে আসল কথা হচ্ছে, হাতের কাছে পেলে আমি ওকে খুন করব।’

‘তুমি তো মেরিন ফোর্সের মেজর,’ বলল বার্ব। ‘তোমরা চিরকাল ধরেই ভয় পাও লড়তে গিয়ে। যাক গে, শুয়োরটাকে ওর মত মরতে দাও। চলো, বেরিয়ে যাই।’

ইনসেনডিয়ারি বুলেট লেগে জ্বলছে সদর দরজা। সামনে বেড়ে কমব্যাট বুট দিয়ে কবাটে লাথি বসাল মেজর বার্ব। ছয়টা লাথি দেয়ার পর খুলে গেল জ্বলন্ত দরজা। ছুটে বেরিয়ে গেল সে, পিছনে স্ক্যালেস। ঘুরে ভিলার দরজা-জানালা লক্ষ্য করে ষাট রাউণ্ড গুলি ছুঁড়ল তারা। নিচতলা ও দোতলার জানালা দিয়ে বেরোচ্ছে কালো ধোঁয়া ও কমলা আগুন। হোলস্টারে অস্ত্র রেখে বেল্ট থেকে ইনসেনডিয়ারি গ্রেনেড নিয়ে ভাঙা এক জানালা দিয়ে ভেতরে ছুঁড়ল বার্ব। ঘুরে যে- যার মুখ ঢাকল তারা। তিন সেকেণ্ড পর থরথর করে কেঁপে উঠল গোটা বাড়ি। জানালা ও দরজা দিয়ে বেরোল তপ্ত দমকা হাওয়া।

‘আগুন দিতে আমার ভাল লাগে,’ বলল স্ক্যালেস। নিজেও বেল্ট থেকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ছুঁড়ল একটা গ্রেনেড। প্রচণ্ড আওয়াজে বিস্ফোরিত হলো ওটা। আবারও বাড়ির দিকে ফিরে তারা দেখল, লকলকে আগুনে পুড়ছে ভিলার সামনের দিক। একই কথা ভাবছে স্ক্যালেস ও বার্ব দ্বিতীয় প্ল্যান সবসময় মজাদার হয়। তার ওপরে তাদের বস বলে দিয়েছে, প্রফেসর কেলি ডায়েরি না দিলে যেন পুড়িয়ে দেয়া হয় তার বাড়ি।

এক পলক আগুনে ভরা বাড়ি দেখে নিয়ে অ্যাটলাস ক্রস স্পোর্টস কারের পাশে থামল বার্ব। গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে আছে কিছু কাগজপত্র। ওগুলো কার রেন্টাল ডকুমেন্ট। বেল্ট থেকে অ্যালিউমিনিয়ামের ভারী টর্চ নিয়ে ওটা দিয়ে গাড়ির জানালার কাঁচ ভাঙল সে। রেন্টাল ডকুমেন্ট নিয়ে চট করে দেখল কার নামে ভাড়া নেয়া হয়েছে গাড়ি। লোকটার নাম মাসুদ রানা। আনমনে ভাবল বার্ব, মাসুদ রানা আবার কে!

কাঁচভাঙা গাড়ির ভেতরে কাগজ ছুঁড়ে ফেলল সে। স্ক্যালাসকে বলল, ‘ব্যাটাকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করবে।’

‘তুমি নিজেই শেষ করতে যাও না!’ রেগে গিয়ে বলল স্ক্যালাস। মাথা আর মুখের ব্যথায় বমি পাচ্ছে তার

আলাদা হয়ে ভিলার দু’দিকে চলল তারা

একটু পর স্ক্যালাস বুঝল, কারও সাধ্য নেই জ্বলন্ত ভিলার নরকে রয়ে যাবে। নিশ্চয়ই জ্যান্ত পুড়ে মরেছে মাসুদ রানা। যদিও কুকুরটার উচিত ছিল আরও অনেক বেশি কষ্ট পেয়ে মরা।

নিচতলার জানালা দিয়ে ভলকে ভলকে বেরোচ্ছে কালো ধোঁয়া ও কমলা আগুনের শিখা। বেল্ট থেকে নিয়ে দোতলার অন্ধকার এক জানালা লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়ল স্ক্যালাস। চিরকাল নিখুঁত ছিল তার নিশানা। জানালার কাঁচ ভেঙে ভেতরে গিয়ে পড়েছে গ্রেনেড। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলো বোমাটা। ভিলার দোতলায় দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে আগুন। একবার ওদিকে চেয়ে ছুটে চলল স্ক্যালাস। একহাতে উদ্যত সাবমেশিন গান কাম পিস্তল। আগুন থেকে কেউ বেরোলে দেরি করবে না তাকে গুলি করে ফেলে দিতে। অবশ্য বাড়িতে কোথাও নেই প্রাণের কোন ছোঁয়া।

কিছুটা যেতেই ভেন্টসহ কাঠের হাউসিঙে এক্সস্ট ফ্যান দেখতে পেল স্ক্যালাস। চট্ করে বুঝে গেল, ঘরটা ভিলার কিচেন। হাউসিঙের ভেতরে আছে বড় দুটো বিউট্যান বল্‌। ওগুলো দেখে খুশি হলো স্ক্যালাস। কয়েক গজ পিছিয়ে ব্লক থেকে দশটা গুলি করতেই বিস্ফোরিত হলো দুই বটল। আরেকটু হলে শক্তিশালী শকওয়েভের ধাক্কায় উড়ে গিয়ে চিত হয়ে মাটিতে পড়ত স্ক্যালাস। চারপাশে ছড়িয়ে গেছে গ্যাসের নীল আগুন। ওটার আওতা থেকে সরে যেতে গিয়ে হুড়মুড় করে পিছাল স্ক্যালাস। বাড়ির ছাত ছাপিয়ে উঠে গেছে গ্যাসের আগুন। লকলক করে চেটে দিচ্ছে ভিলার জানালা। আগেও অনেক বাড়িতে আগুন দিয়েছে স্ক্যালাস। ওর মনে হলো না যে এখন আর ভিলার ভেতরের দাবানলে বেঁচে আছে কেউ।

দু’বছর আগে মেরিন ফোর্স ত্যাগ করার পর থেকেই ফুর্তিতে আছে স্ক্যালাস। আগে যদি জানত অপরাধীর জীবন এত আনন্দের, তো কখনও চাকরি করতেই যেত না। আবার দৌড় শুরু করল সে। ভিলার পাশ দিয়ে ছুটতে ছুটতে ভেতরে ছুঁড়ে দিল দুটো গ্রেনেড। বাড়ি ঘুরে ফিরে আসতেই দেখতে পেল দাঁড়িয়ে আছে ওর বন্ধু।

‘বিস্ফোরণটা কীসের?’ তার কাছে জানতে চাইল বার্ব।

‘বিউট্যান বল্‌,’ বলল স্ক্যালাস, ‘ফোর্ট ক্যাম্পবেলে তোমাদেরকে বোধহয় কিছুই শেখায় না, নাকি?’

‘আরেকটু হলে আমার গায়ে শত শত শাপনেল বিধতা’ রেগে গেল বার্ব। ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?’

‘তা হলে বলো, কে আসলে ভয় পেয়েছে?’ মুচকি হাসল স্ক্যানাস। সে আরও কিছু বলার আগেই হুড়মুড় করে অ্যাটলাস ক্রস স্পোর্টস কারের উইগুশিল্ডের ওপরে ধসে পড়ল বাড়ির জ্বলন্ত একটা অংশ। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে আগুন গিলে নিল গাড়িটাকে।

‘কাজ শেষ,’ বলল স্ক্যালাস, ‘চলো, বিদায় নিই।’

আরও কয়েক সেকেণ্ড ভিলার দিকে চেয়ে থেকে বলল বার্ব, ‘আসলে কে ছিল লোকটা?’

কে ছিল সেটা জেনে আর লাভ কী?’ বলল স্ক্যালাস। ‘বড় কথা হচ্ছে: শালা কাবাব হয়ে গেছে!’

জ্বলন্ত ভিলার দিকে চেয়ে হঠাৎ করে শ্বাস নিল বার্ব। ‘ওই যে! আবারও সেই শালা!’

.

দেয়ালে পা রেখে সরে যাচ্ছে রানা। মনে মনে আশা করছে পাথুরে দেয়াল থেকে উপড়ে আসবে না আইভি লতা। মিনিটখানেক পর পৌছে গেল ব্যালকনির কাছে। কিন্তু তখনই শুনতে পেল একলোকের চিৎকার। ঘাড় ঘুরিয়ে উঠনে চেয়ে গলা ও বুক শুকিয়ে গেল রানার। উঠন থেকে ওর দিকে অস্ত্র তাক করছে মুখোশধারী দুই খুনি!

মাথার পাশের দেয়ালে ঠক-ঠক করে দুটো বুলেট লাগতেই ব্যস্ত হয়ে উঠল রানা। ঝড়ের বেগে বারান্দার দিকে পেরিয়ে গেল শেষ একফুট জায়গা। পাথুরে রেইলিং টপকে চট্ করে আড়াল নিল এক পিলারের ওদিকে। পাথরে লেগে ঠং-ঠং শব্দে ছিটকে পড়ছে বুলেট। লাথি মেরে ফ্রেঞ্চ উইণ্ডো খুলে ঘরে ঢুকে পড়ল রানা। চমকে গেল ভেতরে আগুন দেখে। নরকের মত হয়ে গেছে ঘরের পরিবেশ। ধোঁয়ায় শ্বাস আটকে এল। বিছানার কাছে গিয়ে চোখে পড়ল মেঝেতে আছে জ্যাকেট ও ব্যাগ। ছোঁ দিয়ে তুলে নিল ওগুলো। জ্বলছে বিছানার চার স্ট্যাণ্ড ও দামি পর্দা। কিছু শিখা চাটছে বিছানায় রাখা একটা ডায়েরি। খপ করে ওটা নিয়ে বিছানায় আছড়ে আগুন নিভিয়ে নিল রানা। ধোঁয়ার ভেতরে কাশতে কাশতে ব্যাগে ভরল ডায়েরি। যেজন্যে এসেছে, সেই কাজ করা শেষ। এবার বেরিয়ে যেতে হবে এই ঘর থেকে।

জানালা-পথে ঢুকে ছাতে ঠাস্ ঠাস্ করে লাগছে বুলেট। বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। শেষ ভরসা বাথরুমের জানালা। বাথরুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল প্রায় অন্ধ রানা। হাতড়ে হাতড়ে রেইল থেকে নিল তোয়ালে। কল খুলে পানি দিয়ে ওটা ভিজিয়ে পেঁচিয়ে নিল নাকে-মুখে। বুঝে গেল বেরোবার তুলনায় বাথরুমের জানালা অনেক ছোট। আবার এসে ঢুকল বেডরুমে। দাউ-দাউ করে জ্বলছে পুরো খাট। কার্পেটে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আগুনের শিখা। ঘরের দরজা লক্ষ্য করে সামনে বাড়ছে তরল আগুনের ঢেউ, যেন জীবিত বিপজ্জনক প্রাণী। শিখা মাড়িয়ে দরজার দিকে ছুটল রানা। কবাট খুলে বেরিয়ে এল করিডরে। কিন্তু প্যাসেজের দু’দিকে নর্তকীর মত নেচে চলেছে আগুনের হলদে ঢেউ।

মরণফাঁদে পড়েছে রানা। যেতে পারবে না কোনদিকেই। অবশ্য, হয়তো সরাসরি ওঠা যাবে ছাতে। ওপরের দড়ি টেনে হ্যাচ নিচে নামাল রানা। ট্র্যাপডোরের সঙ্গে নেমে এসেছে টেলিস্কোপ ল্যাডার। লোহার রেইলিং স্পর্শ করে চমকে গেল রানা। ওটা যেন তাতানো খুন্তি। ধাপ ডিঙিয়ে অন্ধকার চিলেকোঠায় উঠে এল ও তক্তা দিয়ে। তরি ঘরের মেঝে। দড়ি টেনে কাঠের মই তুলে ট্র্যাপডোর লক করল। বুঝে গেছে, আপাতত রক্ষা পেয়েছে আগুনের হলকা থেকে।

অবশ্য শেষমেশ কাঠে ঠিকই ধরবে আগুন। মেঝের তক্তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে হলদে আভা। ক্রমে ঘন ধোঁয়ায় ভরে উঠছে চিলেকোঠা। ওপরের এই ঘরে আছে ভাঙা আলনা, প্যাকিং ক্রেট, কাঠের টুকরো, পুরনো রকিং চেয়ার ইত্যাদি। ধোঁয়ায় ফুসফুস ভরে যাওয়ায় মাতালের মত টলতে শুরু করেছে রানা। তাজা বাতাস না পেলে যে-কোন সময়ে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে। লক্ষ করল চিলেকোঠার ছাত বেশ নিচু। স্পর্শ করা যায় সহজেই। ছাত হাতড়ে স্কাই লাইট খুঁজল রানা। কিন্তু একটু পর বুঝল, ছাতে তেমন ধরনের কোন কিছুই নেই। অক্সিজেনের অভাবে হাঁসফাঁস করছে ফুসফুস। কপাল বেয়ে নেমে দু’চোখ জ্বালিয়ে দিচ্ছে নোনা ঘাম। বড়জোর আর একমিনিট, তারপর জ্ঞান হারাবে রানা। এবং সেক্ষেত্রে আজই একটু পর শেষ হবে ওর জীবন!

ঝুঁকে মেঝে হাতড়ে চারফুট দৈর্ঘ্য ও সমান প্রশস্তের এক কাঠের মাচা হাতে ঠেকল রানার। ওটা নিজের দিকে টেনে নিতে গিয়ে বুঝে গেল, ফুরিয়ে যাচ্ছে ওর শক্তি। অক্সিজেনের অভাবে সাড়া দিচ্ছে না পেশি। ভারী মাচা তুলে ছাতে গুঁতো দিতে গিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল রানা। আরেকটু হলে তাল হারিয়ে হুড়মুড় করে পড়ত মেঝেতে। ছাতে গুঁতো দিয়ে কোন লাভ হয়নি। দাঁতে দাঁত চেপে সমস্ত শক্তি দিয়ে আবারও মাস ঠেলে দিল ছাত্র লক্ষ্য করে। তাতে খটাস্ করে ছুটে গেল কী যেন।

ওপরে চেয়ে ছাতে সরু এক ফাটল দেখল রানা। ওখান থেকে মেঝেতে খসে পড়েছে একটা টাইল্স্। আর হঠাৎ সেই পথে ঢুকেছে একরাশ তাজা বাতাস। আবারও বুক ভরে শ্বাস নিতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল রানা। নতুন করে দেহে ফিরছে শক্তি। কয়েক সেকেণ্ড পর সর্বশক্তি দিয়ে ছাতের দিকে মাচা ঠেলল রানা। কড়াৎ শব্দে ছাত ভেঙে বেরিয়ে গেল মাচার একদিক। ঝরঝর করে মেঝেতে পড়ল একগাদা টাইল্স্। মাথার ওপরে এখন এবড়োখেবড়ো বড় একটা গর্ত। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে হাত থেকে মাচা ছেড়ে দিল রানা। ধুপ করে মেঝেতে পড়ল ওটা। গর্তের কিনারা ধরে নিজেকে ছাতে টেনে তুলল রানা। সামান্য এই কাজেই হাঁফিয়ে গেছে। ঘন ঘন ক’বার শ্বাস নেয়ার পর ধীরে ধীরে বিদায় হলো বুকের ব্যথা। নিজের সঙ্গে ব্যাগ এনেছে রানা। ওটা তুলে নিয়ে ঢালু ছাত ধরে এগোল। বামহাতে কচলে নিল জ্বালা ধরা দু’চোখ। ঘুরে দেখল, আগ্নেয়গিরির মত জ্বলছে গোটা ভিলা। রাতের আকাশে বহু দূর থেকে দেখা যাবে এই আগুন।

রানার চোখে পড়ল, প্রাচীরের ছায়ার দিকে ছুটে চলেছে মুখোশ পরা দু’জন লোক। বোধহয় কাছেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছে তাদের গাড়ি। দূর থেকে আবছাভাবে এল সাইরেনের আওয়াজ। গ্রামের কেউ রাতের পটভূমিতে কমলা আভা দেখে যোগাযোগ করেছে ইমার্জেন্সি সার্ভিসে। যে-কোন সময়ে পুলিশ আসবে ভেবে এখন পালিয়ে যাচ্ছে দুই আততায়ী।

রানা নিজেও চাইছে না পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিতে। প্রথম সুযোগে ছাত থেকে নেমে উধাও হবে, নইলে ওকেই হয়তো অগ্নিকাণ্ডের জন্যে অপরাধী সাব্যস্ত করবে পুলিশ। টাইলসে পিছলে গেলে অনেক নিচে গিয়ে পড়তে হবে। সাবধানে ঢালু ছাত ধরে এগোল রানা।

কয়েক কদম যেতেই হঠাৎ করে এল প্রচণ্ড বিস্ফোরণের আওয়াজ। নিচে ফেটে গেছে গ্যাসের মোটা কোন পাইপ। লকলক করে উঠে এল লেলিহান আগুন ও তপ্ত হাওয়া। রানার পায়ের নিচে ঠাস্ ঠাস্ করে ফাটল টাইল্স্। শকওয়েভের জোর ধাক্কায় শূন্যে উঠে ধুপ করে ছাতে পড়ল রানা। পরক্ষণে ঢাল বেয়ে পিছলে নেমে যেতে লাগল। রানার জ্যাকেটের বাম কবজিতে ধরে গেছে আগুন। পতন ঠেকাতে গিয়ে হাত থেকে ছেড়ে দিল ব্যাগ। ঢালু ছাতের শেষপ্রান্তে পৌঁছে দেখতে পেল মোটা একটা পাইপ। দু’হাতে ওটা জাপটে ধরল রানা। কিন্তু ওর ওজন নিতে না পেরে মট করে ভাঙল কাঁচা লোহার পাইপ। চার হাত-পা ছড়িয়ে শুরু হলো ওর পতন।

প্যারাশ্যুট ড্রপের মতই শরীর গুটিয়ে নিয়েছে রানা। নিচে ক্যানভাসের ছাউনিতে পড়েই দেখল ঝড়ের বেগে উঠে আসছে জমিন! ভিলার আগুনের আলোয় ওটা প্যাটিয়ো না কংক্রিটের চাতাল, বুঝতে পারল না। পরক্ষণে প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়ে বুক থেকে বেরিয়ে গেল দম। অবশ্য পড়েছে স্পঞ্জের মত কিছুর ওপরে। হঠাৎ চারপাশে আগুনের বদলে থাকল ভেজা কী যেন!

কয়েক সেকেণ্ড পর রানা টের পেল, কংক্রিটে না পড়ে ঝপ্ করে নেমে এসেছে প্লাস্টিকের কাভার দিয়ে ঢাকা অব্যবহৃত সুইমিংপুলে। শরীরে কাভার জড়িয়ে নিয়ে তলিয়ে যাচ্ছে গভীর পানিতে!

নিভে গেছে জ্যাকেটের কবজির আগুন। ওর মনে চেপে বসল মৃত্যুভয়। প্লাস্টিক মোড়ক থেকে ঝটকা দিয়ে বেরোতে চাইলেও দেহের দু’পাশে আটকা পড়েছে ওর দু’হাত। মোড়কে জড়িয়ে আছে দু’পা, লাথি মেরেও সরাতে পারল না কাভার। এরই ভেতরে গিলে নিয়েছে কয়েক ঢোক পানি। দুই কনুই দিয়ে পানির নিচে আবারও ঝটকা দিল রানা। তাতে হাতের ওপর থেকে খসখস শব্দে সরতে লাগল কাভার। ওর আঙুল খপ করে ধরল কী যেন। ওটা সুইমিংপুলের কাভার বেঁধে রাখার দড়ি। রানা আশা করল, শক্ত ভাবে বাঁধা আছে ওটার অন্যপ্রান্ত। দড়ি ধরে নিজেকে টেনে তুলতেই গা থেকে সরে যাচ্ছে প্লাস্টিকের কাভার। একটু পর হঠাৎ ছুটে গেল ওর বামহাত ও দু’পা। দড়ি টেনে সুইমিংপুলের টাইলস করা কিনারায় নিজেকে তুলে নিল রানা। চোখের সামনে দেখতে পেল করুণ গোঙানি ছেড়ে ধসে পড়ল ভিলার দোতলার জ্বলন্ত ছাত। রাতের আঁধার আকাশে ছিটকে গেল হাজার লাল-কমলা-হলদে ফুলকি। আগুনের টুকরো পড়ে দপ করে জ্বলে উঠল প্যাটিয়োর প্লাস্টিকের ছাউনি-একটু পর গলে নামবে কংক্রিট চাতালে। একটু দূরে নিজের ব্যাগ দেখতে পেয়ে চট করে ওটা সরিয়ে নিল রানা, নইলে ব্যাগসহ পুড়ে ছাই হতো লেডির ডায়েরি।

জ্বলন্ত ভিলা থেকে সরে গেল রানা। শীতে কাঁপতে শুরু করেছে ভেজা পোশাকে। মৃত্যুফাঁদ থেকে বেরিয়ে হতক্লান্ত উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল উঠনের কিনারায় ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতরে। প্রাচীরের সামনে থেমে ওদিকে ছুঁড়ে দিল ব্যাগ। দেয়ালের অমসৃণ পাথর বেয়ে উঠে চট করে নেমে পড়ল প্রাচীরের এপাশে।

কাছে চলে এসেছে পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেডের সাইরেন। প্রাচীরের ওপর থেকে জঙ্গুলে পথে ঘুরন্ত আলো দেখেছে রানা। লোকগুলো চলে আসার আগেই ঢুকে পড়ল জঙ্গলে। গাছের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেল টানা দু’মাইল। তারপর ব্যাগ থেকে নিয়ে পাল্টে ফেলল পোশাক। পানি চিপে গায়ে পরে নিল জ্যাকেট। রাতের শীতল হাওয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছে ওকে। অবশ্য দ্রুত হাঁটলে একটু পর এত ঠাণ্ডা লাগবে না। ভেজা বুটের ব্যাপারে কিছু করার নেই। শব্দ তুলছে ফচ ফচ। অস্বস্তি নিয়ে আঁধারে এগিয়ে চলল রানা। ওর জানা নেই লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরি থেকে জরুরি কোন সূত্র পাবে কি না। অবশ্য এ-ও ঠিক, মেডেইরায় এসে বেশকিছু বিষয় জানতে পেরেছে। নিশ্চয়ই এতক্ষণে বহু দূরে চলে গেছে পেশাদার দুই আমেরিকান খুনি। এবার হয়তো ফিরবে নিজেদের দেশে। দু’জনেই মিলিটারি থেকে প্রশিক্ষিত, স্পেশাল ফোর্সের, নইলে এত দক্ষতা অর্জন করতে পারত না।

আগেও এদের মত মানুষকে পচে যেতে দেখেছে রানা। যদিও দল ত্যাগের আগেই বোঝা গেছে, যে-কোন সময়ে চরম কোন অন্যায় করবে লোকটা। কেউ লাখ লাখ ডলার পেয়ে হয়ে উঠেছে পেশাদার খুনি, আবার কেউ খুন করেছে স্রেফ মজার জন্যে। রানার মনে পড়ল বেলা-হত্যায় ব্যবহৃত কা-বার নাইফের কথা। কয়েক দশক ধরে ওটা ইউএস মেরিন ফোর্সের সৈনিকদের প্রিয় ছোরা। নিজেও ক’বার সেই বাহিনীর হয়ে বিপজ্জনক কিছু মিশনে গেছে রানা। ওর মনে হলো, দুই খুনির মধ্যে পনিটেইল আসলে ছিল মেরিন ফোর্সে।

এরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়ে গেছে অস্ত্র। টাকা ছাড়া দুনিয়ায় কিছুই হয় না। সুতরাং ধরে নেয়া যায় অস্ত্র কিনে সেটা গোপনে পাচার করা এবং পেশাদার আততায়ী নিয়োগে ব্যয় হয়েছে কয়েক যাখ ডলার। অর্থাৎ যে এসব করাচ্ছে, তার আছে অঢেল টান। বেলার ল্যাপটপে ছিল প্রফেসর কেলির কাছে দেয়া ই-মেইল। ওটা থেকেই লোকটা বোধহয় জেনে গেছে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরির অস্তিত্ব। সে ধরে নিয়েছে এসব ডায়েরি তার জন্যে খুব বিপজ্জনক। তাই দেরি না করে পাঠিয়ে দিয়েছে দুই আততায়ীকে।

আসলে কেন কী ঘটছে তা জানা না থাকলেও রানার মন বলছে: এসবের সঙ্গে জড়িত রহস্যময় সেই বায়ার্ন কনার!

মনে ঠাণ্ডা ক্রোধ নিয়ে জঙ্গলে হেঁটে চলল রানা। ভোরে পুবের আকাশে সূর্য উঠতেই স্থির করল, আজই ত্যাগ করবে এই দ্বীপ।

অদৃশ্য এক তর্জনী যেন ওকে দেখিয়ে দিচ্ছে টুলসা শহর।

ছাব্বিশ
টুলসা, ওকলাহোমা।

ঘড়িতে বাজে সকাল নয়টা।

‘আমার চুল পরিপাটি আছে তো?’ সহকারিণী মাটিল্ডার দিকে তাকাল অ্যারন কনার। নিজের ছোট্ট অফিস তার জন্যে ছেড়ে দিয়েছে ফ্যাক্টরির ম্যানেজার। আপাতত ঘরটা ব্যবহার করা হচ্ছে মেয়রের ড্রেসিংরুম হিসেবে। কনারের আরও চার কম। এখন ঘরে ব্যস্ত। একটু পর পর হাতঘড়ি দেখছে ম্যাক জোভান। এদিকে শেষবারের মত মেয়রের জন্যে বক্তৃতার খসড়া রীক্ষা করে দেখছে টেরেসা ব্রুকস।

চড়ুই পাখির মত চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কথা বলে মাটিল্ডা টেস, বয়স চৌষট্টি। মেয়রের সেক্রেটারি ও রাজনৈতিক সংগঠক সে। অ্যারন কনারের কপাল থেকে কয়েকটা ধূসর চুল সরিয়ে দিল। মেয়রের প্রতিটি দিকে খেয়াল আছে তার। ‘পেছনের চুল একটু হেঁটে দিতে হবে।’

‘আমাকে কি খুব খারাপ দেখাচ্ছে, মাটিল্ডা?’ নার্ভাস হয়ে জিজ্ঞেস করল অ্যারন কনার। সাধারণ বক্তৃতা হলে হাসতে হাসতে বক্তব্য দিত, কিন্তু আজকের ব্যাপার অন্যরকম। তাকে যেন ভাল দেখায়, সেজন্যে স্পারসহ নতুন একজোড়া চামড়ার কাউবয় বুট কিনেছে। বরাবরের মত গলায় ঝুলছে পানারঙের সজ টাই। এটাকে ঠিক জায়গায় রেখেছে সোনা ও হীরার পঞ্চাশ হাজার ডলারের দামি এক টিফানির টাইপিন।

‘আপনাকে দারুণ লাগছে,’ মায়ের আদর ঝরল মাটিল্ডার কণ্ঠ থেকে। গত আট বছরে রীতিমত ঝগড়া করে অ্যারনের ওয়ার্ড্রোবের সব পোশাক বদলে দিয়েছে সে। এখন যা আছে, প্রতিটি দুর্দান্ত রুচিকর ও দামের দিক থেকে দুর্মূল্য।

তোমাকে নির্বোধ গাধার মত দেখাচ্ছে, এবার ফালতু চুলের কথা বাদ দিয়ে বেরিয়ে এসে __ ওঠো!’ ঘরের দরজা থেকে ঘড়ঘড়ে স্বরে বলল কেউ। থরথর করে কেঁপে উঠেছে চারদিকের দেয়াল। হাজির হয়ে গেছে বিগ রিয়ান কনার। মাথাভরা সাদা চুল। দৈর্ঘ্যে ছয়ফুট তিন ইঞ্চি। দু’কাঁধ যেন বাইসনের কাঁধের মত চওড়া। দৈর্ঘ্যে সে ছেলের চেয়ে পুরো পাঁচ ইঞ্চি বেশি।

চট করে নার্ভাস চোখে বাবাকে দেখল অ্যারন। তার নিজের কর্মচারীর সামনে বহু দিন ধরে অপমানজনক সব কথা বলছে রিয়ান কনার। আর সেটা অসহ্য লাগে অ্যারনের। যদিও, কখনও মুখে কিছু বলার সাহস হয়নি তার। ছোটবেলায় বুঝে গেছে, তর্ক করতে নেই বিগ কনারের সঙ্গে। নইলে এক ঘুষিতে কাটিয়ে দেবে সামনের লোকটার চোষাল।

‘আমি তৈরি,’ মাটিল্ডার দিকে তাকাল অ্যারন। ‘এবার শেষ করা যাক জরুরি বক্তৃতা।’

আর টুলসা শহরের অক্স বিজনেস সেণ্টারের সবচেয়ে বড় অ্যাওনোস্পেস প্ল্যান্ট পার্কস ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বারো শ’ কর্মচারীর সামনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরবে অ্যারন কনার। এই কোম্পানি গালফস্ট্রিম জি০০ জেট বিমানের ডানা ও ফিউজেলাজ তৈরি করে। ফ্যাক্টরির শেষমাথায় মস্ত এক ওয়্যারহাউসে মঞ্চ। একটু দূরে গানট্রির পরে ঝুলছে প্রায় তৈরি সব ফিউজেলাজ।

ওয়্যারহাউসের ভেতরে দমবন্ধ ভাগসা পরিবেশ। নিজেকে শান্ত রেখে পডিয়ামে উঠে গেল অ্যারন কনার। তাকে দেখে হৈ-হৈ করে প্রশংসা করল ফ্যাক্টরি কর্মচারীরা। এদিকের এলাকায় মেয়র কন্যার খুব জনপ্রিয়। আর সেজন্যেই নিজের বক্তৃতা এখানে দেবে বলে স্থির করেছে সে। কর্মীদের সবার শার্টের কলার নীল। তাদের ভেতরে নেই কোন মহিলা। দু’চারজন কালোমানুষ ছাড়া অন্যরা শ্বেতাঙ্গ। রাজনৈতিক দিক থেকে সবাই রিপাবলিকান। এ-ধরনের শ্রোতাই পছন্দ করে অ্যারন। টাইপিন ঢিলা করেছে সে। পরনে কোট নেই। কনুইয়ে গুটিয়ে নেয়া দামি শার্টের আস্তিন। এসব দেখে আরও খুশি হবে কর্মীরা।

দর্শক-শ্রোতার প্রশংসার ঝড় কমে এলে মুখ খুলল অ্যারন কার: ‘ভাই সকল, কী খবর তোমাদের?’ তাদের জন্যে স্থানীয় অর্থনীতি কত উপকৃত হচ্ছে, সেটা দু’চার কথায় জানাল সে। এ-ও বলল, তাদের মাঝে আজ এখানে হাজির হতে পেরে কত খুশি সে। মাত্র কয়েকটা কথা বলে অ্যারন বুঝে গেল, এরা এখনও তার পক্ষেই আছে।

‘তোমরা জানো, ভাই সকল, আমি যখন কোর্ট হাউসে কাজ করতাম, তখনও কথা বলতে গিয়ে বেশি সময় নিতাম না। তাতে খুশি হত জুরিরা। কারও দেরি হতো না বাড়িতে ফিরে যেতে। কাজেই আজও বেশিক্ষণ তোমাদেরকে আটকে রাখ না। তোমরা তো জানো, আমি চাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বকবক করে যেতে পারতাম। বলতাম মেয়র হিসেবে আমার সময়ে কত ধরনের উন্নতি করেছি এই সমাজ আর শহরের জন্যে। এটাও বুঝিয়ে দিতাম যে আমার সময়ে অনেক কমে গেছে টুলসায় হাজার রকমের অপরাধ। আমরা চাঙ্গা করেছি এ-শহরের অর্থনীতি। তোমাদের জন্যে টুলসার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছি আমি। বিশেষ করে অ্যাওরোস্পেস সেক্টরে আমার সহায়তায় তোমরা করেছ বিশাল এক অগ্রগতি। একই সময়ে আমরা করে গেছি শহরের এবং চারপাশের প্রকৃতির উন্নয়ন। আমার মনে আছে, কীভাবে টর্নেডোর পর ঝড়ের বেগে নতুন করে নব্বুই হাজার টুলসানের জন্যে ব্যবস্থা করেছি বিদ্যুৎ এবং বাসস্থানের। তোমরা জানো, কত কঠিন ছিল সেই বিপর্যয়।

সবার ওপরে চোখ বুলিয়ে অ্যারনের মনে হলো না কেউ তার কথায় অমনোযোগী।

‘কিন্তু তোমাদের কাছে আজ একগাদা ডেটা বা সংখ্যা : উগলে দেয়ার জন্যে আমি আসিনি, জোর দিয়ে বলল সে। ‘তোমরা ভাল করেই জানো, গত এই আট বছরে তোমাদের ছেলেমেয়ে ও নাতিপুতিদের জন্যে আগের চেয়ে অনেক বেশি বাসযোগ্য করে তুলেছি এই শহর। নিজেরাও সেটা অন্তর দিয়ে বুঝতে পারো তোমরা। আর আমার সৌভাগ্য, তোমাদের সঙ্গে এই আনন্দ আমিও ভাগ করে নিতে পেরেছি। তোমরা আমাকে বিশ্বাস করে, সহায়তা দিয়ে আজ প্রায় স্বর্গের মত এক জায়গা করে দিয়েছ টুলসা শহরটাকে। এবং সেজন্যে আমার তরফ থেকে হাজার হাজার সালাম ও ধন্যবাদ তোমাদেরকে।’

বিকট আওয়াজে গর্জে উঠে ওয়্যারহাউস কাঁপিয়ে দিল হাজারখানেক কর্মী। বেশ কিছুক্ষণ লাগল সমর্থনের হুঙ্কার কমে আসতে।

‘এই শহর আর এই শহরের নাগরিকদের জন্যে আমি গর্বিত,’ আবার শুরু করল অ্যারন। ‘তবে গত দুই নির্বাচনেই শেষ হয়ে যায়নি আমার দায়িত্ব। আজ যদি তোমরা আমাকে আবারও নির্বাচিত করো, এটাও ধরে নিয়ো যে টুলসা হবে ওকলাহোমা স্টেটের সেরা এলাকা। আর সেজন্যে এবার মেয়র নয়, আমি নির্বাচন করব গভর্নর হিসেবে। আমি এটা জানি, আমরা চাইলে এই রাজা গড়ে তুলতে পারি স্বর্গের মত করে। আমার এখন শুধু চাই তোমাদের আন্তরিক সহায়তা। তবেই তোমরা দেখবে আগামী নভেম্বর মাসে তোমাদের ভোটে আমি হয়ে উঠেছি গর্ভনর।’

হৈ-হৈ করে উঠল শত শত কর্মী। উল্লাসের প্রচণ্ড এক আওয়াজ হলো ওয়্যারহাউসে।

টুলসার মেয়রের তরফ থেকে এই ধরনের বার্তা আসবে, সেটা অবিশ্বাস্য ছিল না। কয়েক সপ্তাহ ধরে এই বিষয়ে গু ছড়িয়ে গিয়েছিল শহরে। অবশ্য আজ জানিয়ে দেয়া হলো, সামনের নির্বাচনে গভর্নর হওয়ার লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন মেয়র অ্যারন কনার।

মৃদু হাসিমুখে দর্শকদের ওপরে চোখ বোলাল মেয়র। ‘ভাই সকল, তোমরা জানো, আমি রুপার চামচ মুখে নিয়ে বড় হয়ে উঠিনি। মৃদু হাসল অ্যারন। নভেম্বরে ধনা ব্যবস্থানি ল্যামারের সঙ্গে যে প্রতিযোগিতা হবে, সেজন্যে তাকে খোঁচা দিয়েছে সে। বাবার কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার পেয়ে ধনী লোকটি চাইছে দেশজুড়ে কোন আগ্নেয়াস্ত্র যেন আর বিক্রি না করা হয়। সেই সঙ্গে চাইছে তাদের আইনগত অধিকার যেন আদায় করতে পারে সমকামীরা: ‘আমি বহু বছরের পুরনো আইরিশ সংস্কৃতির মানুষ, বলল অ্যারন। ‘তাই আমি চাই না হঠাৎ করে বদলে যাক আমাদের সমাজ।’ থুতনি ওপরে তুলল সে। ‘আমি কাজ করতে চাই সাধারণ কর্মীর জন্যে। তোমরা হৃদয়ে বহন করো আমার মতই শত শত বছরের ঐতিহ্য। আজ থেকে শত বছর আগে আমার বড়আব্বা বায়ার্ন কনার এসেছিলেন আয়ারল্যাণ্ডের গ্লেনফেল গ্রাম থেকে। তখন তিনি ছিলেন উদ্বাস্তু। একটা ডলারও ছিল না তাঁর পকেটে। দু’হাতে শক্তি আর পেটে খিদে নিয়ে লড়াই শুরু করেন তিনি।

বহুবার বক্তৃতা এবং সাক্ষাৎকারে এ-কথাই বলেছে অ্যারন কনার। কথাগুলো গপ করে গেলে শ্রোতা-দর্শকেরা। কখনও ব্যাক ফায়ার করেনি ওটা।

‘আমার বড়আব্বা জানতেন দারিদ্র্য ও চরম খিদে কতটা কষ্টের,’ গম্ভীর মুখে নাটকীয়ভাবে বলল অ্যারন। ‘মনে কোন সন্দেহ রেখো না, হাত থেকে শিকল ছুঁড়ে ফেলে তিনি এসেছিলেন স্বাধীন এক রাজ্যে। তিনি যখন এ-এলাকায় পা রাখেন, তখন ওকলাহোমা নামের কোন রাজ্য ছিল না। এরপর তিনি, আমার দাদা আর আমার বাবার মত মানুষেরা মিলে গড়ে তুলেছে এই ওকলাহোমা। আজ গোটা আমেরিকায় সেরা জায়গা হয়ে উঠেছে এ-এলাকা। আর আমি চাই, এটা যেন স্বর্গের মতই থাকে।’

প্রশংসার ঝড় বইল শ্রোতাদের ভেতরে। মাইকে এবার বলল অ্যারন, ‘এবার কয়েকটা কথা জানাবে বলে মঞ্চে এসো, আমার প্রিয় বাবা!’

বুড়ো কনার মঞ্চে উঠতেই খুশি হয়ে চিৎকার ছাড়ল শ্রোতারা। পডিয়ামে এসে দাঁড়াল দানব। তার ভেতরে দৈহিক কোন আড়ষ্টতা নেই। বড় করে পেট ভরে দম নিয়ে মাইকে ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে বলল, ‘অ্যাই, আমার ছেলেকে নির্বাচিত করতে ভুল করবে না তোমরা! আমার কথা বুঝতে পেরেছ? ওর চেয়ে যোগ্য আর কেউ আপাতত এই দেশে নেই।’

খুশিতে হৈ-হৈ করে উঠল কর্মীরা। যাইক ছেড়ে ধীর পায়ে পডিয়াম থেকে পেছনের স্টেজে গেল রিয়ান কনার।

খুশিমনে মাইকে অ্যারন বলল, ‘ওই লোক কিন্তু আমার বাবা, বুঝতেই পারছ। অষ্টাশি বছর বয়স হলেও মনে হয় না যে বুড়ো হয়ে গেছেন। আর তা থেকে বুঝতে পারি, আমিও আগামী বহু বছর তোমাদের জন্যে কাজ করে যেতে পারব। তোমরা কী বলো?’

আগের চেয়ে জোরে হাততালি দিল সবাই।

অ্যারন গভর্নর হবে সেটা ভেবে খুশি হয়ে উঠেছে কর্মীরা।

হাসিমুখে ওয়্যারহাউস থেকে বের হলো অ্যারন। আগেই বেরিয়ে গেছে তার বাবা।

‘এবার সল্টারকে খবর দিতে হবে, রোদে বেরিয়ে মাটিল্ডাকে বলল অ্যারন। গত কয়েক সপ্তাহ আগে জনি এফ. সল্টারকে ক্যাম্পেইন ম্যানেজার করেছে সে। কনারকে ভোট দেয়ার ব্যাপারে মিডিয়াকে আগ্রহী করে তুলছে লোকটা।

‘শুরু হলো খেলা,’ বলল অ্যারন। ‘আমরা জানিয়ে দিলাম যে নির্বাচনে আমরা থাকছি। সুতরাং এখন আর কোন সুযোগ নেই ল্যামারের। নভেম্বরে গো হেরে বাড়িতে বসে কাঁদবে সে।’ নিজের গাড়ির কাছে পৌঁছে মনের চোখে অ্যারন দেখল ওকলাহোমা সিটির ৮২০ এনই ২৩ স্ট্রিটের গভর্নর ম্যানসন।

এবার আর আমাদেরকে ঠেকাতে পারবে না কেউ, বলল মাটিল্ডা, ‘তবে কথা হচ্ছে, নির্বাচন করার আগে সব ধরনের খরচ আপনি মেটাতে পারবেন কি না।’

পার্কল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সামনে গালফস্ট্রিম জেটের একটা প্রতিকৃতি দেখছে তারা। একই আসন বিমান ব্যবহার করে অ্যারন। মৃদু হেসে বলল সে, ‘মানি ইয নো প্রবলেম। ল্যামারের দশগুণ টাকা আমরা খরচ করব নির্বাচনের জন্যে। গাধাটা বুঝতেও পারবে না যে কিছুই করার নেই তার।

‘তবে তো ভাল,’ বলল মাটিল্ডা, ‘আমি আসলে হারতে ভালবাসি না।’

‘আমার বুড়ো হাবড়া বাপটা আমাকে হারতে দেবে না,’ বলল অ্যারন।

মেয়রের ক্যাডিলাকের পেছনে আছে কালো তিন মার্সিডিস এসএল-ক্লাস কনভার্টিবল। আর সামনে মস্ত নীল ডজ র‍্যাম, ক্রু-ক্যাব পিকআপ। ওটার সাসপেনশন অনেক উঁচু। নাকে বুল বার। যন্ত্রদানবটা যেন প্রমাণ করছে, ওটার মালিক রিয়ান কনারের মতই সে-ও রাখে প্রচণ্ড শক্তি।

গাড়ির খোলা জানালায় কনুই রেখে দাঁড়িয়ে আছে রিয়ান কনার। তপ্ত হাওয়ায় দুলছে মাথার সাদা চুল। নিজের দিকে বাবার কঠোর চোখ দেখে মনে মনে হোঁচট খেল অ্যারন। আর তখনই পকেটে বেজে উঠল স্মার্টফোন। ওটা বের করে নতুন এক টেক্সট মেসেজ দেখতে পেল। কুঁচকে গেল তার ভুরু। আবারও ফোন পকেটে রেখে মাটিল্ডাকে বলল, ‘পরে অফিসে দেখা হবে।’

‘কখন?’ জানতে চাইল ব্যক্তিগত সেক্রেটারি।

‘কিছু কাজ শেষ করার পর, সহজ সুরে বলল অ্যারন। উঠে পড়ল ক্যাডিলাকে। মার্সিডিস গাড়িগুলোতে চেপে বসল মাটিল্ডা এবং অন্যরা।

‘আর কখনও আমাকে বুড়ো হাবড়া বাপ বলে সম্বোধন করবে না,’ ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে ছেলেকে বলল রিয়ান কনার। ‘নইলে এর পরেরবার লাথিয়ে তোমার পোঁদ ফাটিয়ে দেব!’

বাবা কী বলেছে সেটা অন্তর থেকে বুঝল অ্যারন। ‘কথাটা বলেছি বলে সত্যিই সরি, বাবা। দয়া করে মাফ কোরো।’

তিক্ত চোখে তাকে দেখল রিয়ান কনার। ‘গভর্নর তো দূরের কথা, তুমি তো গাধার গুও হতে পারবে না। এমন কী ভাল একটা গাড়িও তুমি চালাতে শেখোনি।’

‘ক্যাডিলাক তো দামি গাড়ি,’ আপত্তির সুরে বলল অ্যারন।

জবাবে মাথা নাড়ল বুড়ো। ‘লাখ ডলারে কিনতে গেছ বিলাসী গাড়ি। কিন্তু ওটা আসলে টিনের ক্যান।’ মাটিতে থুতু ফেলল সে। ‘আমি যাচ্ছি র‍্যাঞ্চে। আগামী কয়েক দিনের জন্যে যাব টোপেকা। ঘোড়া বিক্রির জন্যে।’

‘ঠিক আছে,’ ঢোক গিলে বলল অ্যারন।

কঠোর চোখে তাকে দেখে নিয়ে গাড়িতে উঠল বুড়ো। একরাশ ধোঁয়া উড়িয়ে রওনা হলো ডজ র‍্যাম পিকআপ। ওদিকে চেয়ে রইল মেয়র কনার। নিচু গলায় বলল, ‘বাপ শালা, বলো তো, শেষমেশ কবে মরবে তুমি!’

ততক্ষণে বহু দূরে চলে গেছে অষ্টাশি বছরবয়সী চিরতরুণ রিয়ান কনার।

সাতাশ
চাপা গোঁ-গোঁ শব্দে পঁয়ত্রিশ হাজার ফুট ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে বোয়িং সেভেন হান্ড্রেড সেভেনটি সেভেন। বিজনেস ক্লাসে নিজের সিটে বসে আছে মাসুদ রানা। দু’ঘণ্টা ধরে দেখছে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে আইলের ওদিকের সিটের যাত্রী। বিরক্তি কাটাতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রানা। বিমানের ডানার অনেক তলা দিয়ে পিছিয়ে পড়ছে ছেঁড়াখোঁড়া সাদা মেঘ। হাজার হাজার ফুট নিচে দিগন্ত বিস্তৃত ধূসর আটলান্টিক মহাসাগর।

সঠিক সময়ে লিসবনে পৌছুতে গিয়ে উন্মাদের মত ছুটতে হয়েছে রানাকে, নইলে ধরতে পারত না নিউ ইয়র্কের আইবেরিয়ার ফ্লাইট। পাঁচঘণ্টা পর বিমান নামবে জেএফকে এয়ারপোর্টে। তখন অপেক্ষা করতে হবে কানেকটিং ফ্লাইটের জন্যে। পরের বিমান টুলসায় ল্যাণ্ড করবে স্থানীয় সময় দুপুর দুটোয়। আপাতত কাজ নেই রানার, তাই ফোল্ডিং টেবিল খুলে পড়তে লাগল লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরি।

এপ্রিলের ষোলো তারিখ, আঠারো শ’ সাতচল্লিশ।

‘আজ বড্ড লজ্জা লাগছে, কীভাবে এত স্বার্থপর হয়ে উঠলাম! আমার স্বামীর কথায় দিনের পর দিন আতিথেয়তা করেছি এবারডেন হলে তার বিলাসিতায় তলিয়ে যাওয়া লোভী সব নরপশু বন্ধুদেরকে। তবে এরা বাস্তবে মানুষই নয়!

‘আমি অসুস্থ বোধ করছি, এই মিথ্যা কথা বলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরে এসে ডায়েরি লিখছি। কানে আসছে মদ্যপগুলোর বিকট অট্টহাসি। গলা পর্যন্ত পোর্ট গিলছে তারা। হাতে জ্বলছে দামি হাভানা চুরুট।

‘কখনও কখনও মাথা-ব্যথার কথা বলে এদের কাছ থেকে পালিয়ে আসি। আজ ডিনারে এসেছে চরম স্বার্থপর, অন্ধ বিশজন জানোয়ার! বুঝে পাই না, এদের কেন হৃদয় বলতে কিছুই দেননি পৃথিবীর স্রষ্টা!

‘কখনও কখনও যে কড়া কথা শুনিয়ে দিইনি, তা-ও নয়। মাঝে মাঝে মনে হয় অ্যাঙ্গাসের গানরুম থেকে অস্ত্র নিয়ে গুলি করে দিই এদের বুকে।

‘আজ আমার বামের চেয়ারে বসে লর্ড কার্লিক্স বলেছে, আয়ারল্যাণ্ডে দুর্ভিক্ষ হওয়ায় সত্যিই কপাল খুলে গেছে তার মত অনেকের।

‘ঝোপের মত গোঁফওয়ালা এক লর্ড বলল, আইরিশেরা যত দ্রুত মরে সাফ হবে, ততই ভাল ইংল্যাণ্ডের। খ্যাকখ্যাক করে হাসতে হাসতে জানাল, ‘লগুম, লিভারপুল আর গ্লাসগো বন্দরে মজুদ করা আছে চার লাখ কোয়ার্টার ভুট্টার দানা। যদিও ইংরেজ সরকারের বড়কর্তারা ভুলেও সেগুলো আইরিশ কুকুরগুলোকে বনা পয়সায় দেবে না।’

‘কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, এদের মুখে বমি করে দেয়া উচিত। আয়ারল্যাণ্ডে প্রতিদিন মারা পড়ছে হাজার হাজার মানুষ। অথচ সব জেনে-বুঝেও কাউকে চারআনা পয়সাও সাহায্য দেবে না এরা। প্রত্যেকে চারবেলা নষ্ট করছে দামি সব খাবার। যা দিয়ে দূর করা যেত অন্তত পাঁচজনের ক্ষুধা। অ্যাঙ্গাসের বন্ধুরা সবাই বড় জমিদার। নিজেদের প্রজাদেরকে না খাইয়ে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছে তারা। যারা খাজনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতেও দ্বিধা নেই এদের।

‘অথচ, আইরিশ কর্মচারী কাজে যোগ না দিলে পরিত্যক্ত হবে এদের এসব জমিদারী। আমি নিজে গ্রামে গিয়ে দেখেছি কেল্টিক জাতি কত ন্যায়বান, হাসিখুশি ও কঠোর পরিশ্রমী। নিজেদের পরিবারের জন্যে প্রাণ দিতেও দ্বিধা করে না আয়ারল্যাণ্ডের পুরুষেরা।

‘আজও এবারডেন হলে দাওয়াত পেয়ে আড্ডা দিতে এসেছে ভুঁড়িসর্বস্ব হারামি ইবলিশের একটা দল। একেকজনের থুতনির নিচে তিনটে করে ভাঁজ। দামি খাবার গিলে অথর্ব হয়ে গেছে তারা। যারা এদের জন্যে প্রচণ্ড পরিশ্রম করে, বিপদের সময়ে তাদেরকেই না খাইয়ে মেরে ফেলছে এরা।

গরীবদের সাহায্য করে কোন লাভ হয় না,’ একটু আগে বলেছে নির্লজ্জ লর্ড বেহ্যাম। ‘ওরা পৃথিবীতে এসেছে পাছায় লাথি খাওয়ার জন্যে।’ কথাটা শেষ করে পোর্কের মস্ত এক টুকরো মুখে পুরেছে সে।

‘ঠিকই বলেছেন, লর্ড বেহ্যাম,’ সায় দিল কয়েকজন।

‘চট্ করে দেখলাম আমার স্বামীর মুখ। অন্যদের চেয়ে বেশি জোরে হাততালি দিয়েছে সে।

‘অসুস্থ বোধ করছি, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন,’ বলে ডিনারের টেবিল থেকে উঠে এলাম।

‘আমি যে বিরক্ত হয়ে ডিনার না করে চলে এসেছি, সেটা ভাল করেই বুঝতে পেরেছে আমার স্বামী অ্যাঙ্গাস। বুঝে গেছি আজ রাতে আমার সঙ্গে গায়ে পড়ে দুর্ব্যবহার করবে সে। নতুন করে শোনাবে: আইরিশ কুকুরগুলো মরে গেলেও দুনিয়ার আসলে কিছুই যায়-আসবে না।

‘ওহ্, আজ যদি এবারডেন হলে থাকতেন হেনরি ফ্লেচার! নিশ্চয়ই তাঁর কাছ থেকে পেতাম সমর্থন ও মানসিক সাহায্য। আইরিশদেরকে চোখের সামনে এভাবে মরতে দেখেও কিছুই করতে পারছি না।

‘হায়, ঈশ্বর, তুমি কি সত্যিই আছ?

‘কোন্ আকাশে থাকো তুমি?

‘কে জানে, তুমিও হয়তো নিষ্ঠুর এসব লর্ডের মতই বধির ও অন্ধ!’

ড্রিঙ্ক ট্রলির শব্দে মনোযোগ ছুটে গেল রানার। ওর পাশে থেমে মিষ্টি করে হাসল সুন্দরী এয়ারহোস্টেস। নরম সুরে জানতে চাইল, কোন ড্রিঙ্ক লাগবে কি না। ট্রলির ওপরে খুদে কিছু মল্ট উইস্কির বোতল দেখে খচ্ করে বুকে খোঁচা খেল রানা। মুখে হাসি টেনে এনে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, শুধু মিনারেল ওঅটর।’

পানির বোতল দিয়ে ট্রলি ঠেলে চলে গেল এয়ারহোস্টেস। টেবিলে পানির বোতল রেখে আবারও ডায়েরিতে ডুব দিল রানা।

সত্যিকারের ভদ্রমহিলা ছিলেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড। রানার বন্ধু জনি ওয়াকার বিমানে থাকলে হয়তো হেসে বলে উঠত, ‘পুরুষের তো দুটো, তবে এই মহিলার বোধহয় ছিল চারটে বিচি!’

ডায়েরিতে প্রফেসর কেলির রহস্যময় সেসব সূত্র এখনও খুঁজে পায়নি রানা। এরইমধ্যে পড়ে শেষ করেছে দুটো ডায়েরি। বাকি আছে অন্যদুটো। তৃতীয় ডায়েরি পড়তে লাগল রানা’।

মে মাসের তৃতীয় দিন, আঠারো শ’ সাতচল্লিশ

‘নিজের চোখে দেখছি, আমাদের জমিদারীতে না খেয়ে মরছে শত শত মানুষ। যারা বেঁচে আছে, তাদের শরীর হয়ে গেছে কাঠির মত শীর্ণ। কেউ কেউ আর বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। অক্ষিকোটরে ঢুকে যাওয়া চোখে এখন বোবা, করুণ আর্তি। অথচ, তাদের জন্যে কিছুই করতে পারছি না। আমার স্বামী অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড আজ বলে দিয়েছে: গ্রামে গিয়ে মানুষের সঙ্গে যেন না মিশি।

‘বাচ্চাগুলোর জন্যে বড্ড কষ্ট হয়। দিনের পর দিন না খেয়ে শুকিয়ে গেছে কঙ্কালের মত। কচি মুখ হয়ে গেছে বুড়োর মত ভাঁজ পড়া। খাবারের অভাবে করোটি থেকে খসে পড়ছে গোছা গোছা চুল।

‘গ্রামে আমি গেলে ছুটে আসে ওরা। আমার সাধ্যমত খাবার ওদের জন্যে নিয়ে যাই। কিন্তু আমার যে সাধ্য নেই শত শত বাচ্চার পেট ভরিয়ে দেবার!

‘যাদের প্রচণ্ড পরিশ্রমে আজ এত বড়লোক হয়ে উঠেছে অ্যাঙ্গাস, তারাই আজ খেতে না পেয়ে একে একে লুটিয়ে পড়ছে মৃত্যুর কোলে।

‘অ্যাঙ্গাস জানিয়ে দিয়েছে, আমি যেন আর কখনও দেখা না করি আইরিশদের সঙ্গে!’

টেবিলে ডায়েরি রেখে পাশের সিটের দিকে তাকাল রান্না। ঘোঁৎ-ঘোঁৎ শব্দে নাক ডাকছে লোকটা। ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষের কথা ডায়েরিতে পড়ে আরও তিক্ত হয়েছে রানার মন। কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে মেঘ দেখে নতুন করে ডায়েরিতে চোখ বোলাল।

এক জায়গায় লেডি স্টার্লিংফোর্ড লিখেছেন, বাধ্য হয়ে জাহাজে চেপে আমেরিকায় যাচ্ছে আইরিশেরা। একবার সেই দেশে নেমে যাত্রা করছে পশ্চিমে।

কথাগুলো পড়ে স্মার্টফোন ব্যবহার করে অনলাইনে গেল রানা। পড়তে শুরু করল বুনো পশ্চিমের ইতিহাস।

বিশাল দেশ আমেরিকা তাদের মত মানুষের জন্যে নতুন ঠাঁই, সেটা বুঝে গিয়েছিল আইরিশেরা। বড় ভূমিকা রেখেছে রেলরোড ও খাল তৈরিতে। সিভিল ওঅরে যুদ্ধ করেছে সবার পাশে দাঁড়িয়ে। প্রচণ্ড পরিশ্রম করে গড়ে তুলেছে অসংখ্য কারখানা। কখনও হয়েছে আমেরিকায় পুলিশ, কখনও বা বেসবল খেলোয়াড়। ছেলেমেয়েদেরকে চেষ্টা করেছে ভাল স্কুলে পড়াতে। উনিশ শ’ দশ সালে ডাবলিনের চেয়ে বেশি আইরিশ ছিল শুধু নিউ ইয়র্ক শহরে। আমেরিকার বর্তমান জনসংখ্যার বারো পার্সেন্ট অর্থাৎ তিন কোটি ষাট লাখ মানুষের পূর্বপুরুষ ছিল আইরিশ। এখন খোদ আয়ারল্যাণ্ডেও এত মানুষ নেই।

আমেরিকান আইরিশেরা গর্বিত জাতি। যেমন আছে তাদের নিজস্ব পতাকা, তেমনি আছে দারুণ সব অনুষ্ঠান। প্রতিবছর নিউ ইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, ডেট্রয়েট, শিকাগো, সেইণ্ট লুই ও টুলসার আইরিশেরা মেতে ওঠে সেইণ্ট প্যাট্রিকের বিশেষ অনুষ্ঠানের দিনে।

নোটবুকে টুলসার বিষয়ে তথ্য টুকছে রানা।

শহরের মেয়র এখন অ্যারন কনার। চার পুরুষ ধরে আছে আমেরিকায়। দাম্ভিক এক লোক। আইরিশ হিসেবে টুলসায় ভোগ করে নানান ধরনের সুবিধা। দক্ষ রাজনীতিক সে। বহু ভাল কাজ করেছে বলে তার আছে বিপুল মানুষের সমর্থন। টুলসার নাগরিকদের ভোটে পর পর দু’বার নির্বাচিত হয়েছে মেয়র হিসেবে।

রাজনীতিতে বহু পরে এসেছে অ্যারন কনার। তিরিশ বছর বয়সে প্রথমবার হয়েছিল আইনপ্রণেতা। জন্মেছে উনিশ শত সত্তর সালে। তার বড়আব্বা, দাদা আর বাবা অতি ধনী আইরিশ আমেরিকান। বিশেষ করে দাদা। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অয়েল বুমের সময় হয়ে ওঠে বিলিয়নেয়ার। তখন টুলসা ছিল ধুলোভরা কাউ-টাউন। মাত্র কয়েক দিনে ওটা হয়ে গেল দুনিয়া-সেরা অয়েল ক্যাপিটাল। উনিশ শ’ পঁয়ত্রিশ সালে বিশ্বের বড় কয়েকটি কোম্পানির একটি হলো অ্যারন কনারের দাদা লকান কনারের স্পিয়ারহেড অয়েল কোম্পানি। পরে ওটার হাল ধরল অ্যারন কনারের বাবা রিয়ান কনার। টুলসায় মানুষ এককথায় তাকে চেনে বিগ কনার হিসেবে। এখনও বেঁচে আছে সে। কুখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা। তার সঙ্গে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে প্রচণ্ড মার খেয়ে আহত হয়েছে বহু লোক। সে ওকলাহোমার প্রথম পাঁচজন ধনীর একজন। উনিশ শ’ নব্বুই সালে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে স্পিয়ারহেড় কোম্পানি বিক্রি করে দেয়। জন্মাবধি টুলসার প্রেয়ারি স্প্রিং-এ পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া স্পিয়ারহেড র‍্যাঞ্চে বাস করে। অনলাইনে তার ছবি দেখল রানা। তাকে বলা চলে চওড়া কাঁধের এক মেরুভালুক। মাথার চুল ধবধবে সাদা। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। পরিষ্কার বোঝা যায়, কোনকিছুতে না শুনতে রাজি নয় সে। বয়স অষ্টাশি হলেও এখনও তার প্রচণ্ড প্রভাব আছে একমাত্র ছেলের ওপরে। বাবার নির্দেশে ওকালতি পড়েছে কমবয়সে মা-হারা অ্যারন কনার। তারপর বাবার দেয়া সাহায্য পেয়ে হয়ে উঠেছে টুলসা শহরের মেয়র। সাক্ষাৎকারে নিজেই সে বলেছে, ‘আজ যা হতে পেরেছি, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে আমার বাবা। নইলে হয়তো কিছুই হতে পারতাম না।’

অ্যারন কনার আসলে কী ধরনের লোক, সেটা জানার জন্যে মনের ভেতরে জোর তাগিদ অনুভব করছে রানা।

আটাশ
বায়ার্ন কনারের জীবনে বহু কিছুই আছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে কখনও প্রকাশ করা যানে না, খুব ভাল করেই জানে টুলসার মেয়র অ্যারন কনার।

আঠারো শ’ একান্ন সালের ভেম্বর মাসে ঝোড়ো এক সকালে জাহাজ থেকে নিউ ইয়র্ক বন্দরে পা রেখেছে বায়ার্ন কনার। এরপর মাত্র ক’দিনে বুঝে গেছে, যেসব আইরিশেরা আমেরিকায় এসেছে, তারা নিজের দেশের মানুষকে সাহায্য করতে মুখিয়ে আছে। ইংল্যাণ্ডের অভিজাত সমাজে গোপন হাত আছে বলে মাত্র কিছু দিনের ভেতরে প্রতিষ্ঠিত হলো সে নিউ ইয়র্কে। দুঃসাহসী, একগুঁয়ে মানুষটা দ্বিধা করল না কঠোর পরিশ্রম করতে। তা ছাড়া, তার জানা ছিল ভাল ঘোড়া আসলে কোনগুলো। তখন আমেরিকার মানুষ দূরে বা কাছে যে-কোন জায়গায় যাওয়ার জন্যে ব্যবহার করত ঘোড়া। আঠারো শ’ সাতান্ন সালের ভেতরে চারপাশে খবর ছড়িয়ে গেল বায়ার্ন কনার জানে কীভাবে সংগ্রহ করতে হবে দারুণ সব ঘোড়া। আরও বড় কথা, অতিরিক্ত মুনাফাও করে না সে। চমৎকার ঘোড়া বিক্রি করে সুলভ দামে। কিছুদিনের ভেতরে নিউ ইয়র্কে গড়ে তুলল সে তেরোটা বড় আস্তাবল।

এর মাত্র চার বছর পর গোটা আমেরিকা জুড়ে শুরু হলো ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ। ঘোড়া জোগান দিতে গিয়ে ইউনিয়ন আর্মির সঙ্গে চুক্তি করল বায়ার্ন কনার। তাতে কয়েক মাসে রিশগুণ হলো তার সম্পদ। পঁয়ষট্টি সালে গৃহযুদ্ধের ভেতরে ছাপ্পান্ন বছর বয়সে বিয়ে করল পছন্দের মেয়ে ক্যারি ও-রাইলিকে। আয়ারল্যাণ্ড থেকে যেসব মেয়ে এসেছিল, বিশ বছর বয়সী এই তরুণী ছিল তাদের মধ্যে সেরা সুন্দরী। বয়সে ছত্রিশ বছরের বড় স্বামীকে নিয়ে যৌনজীবনে তিক্ততা ছিল না তার। আঠারো শ’ সাতষট্টি সালে জন্মাল এই দম্পতির একমাত্র ছেলে লকান কনার। মসৃণভাবে চলল ছোট্ট এই পরিবারের সবার জীবন।

পুবে সতেরো বছর ব্যবসা করে আঠারো শ’ আটষট্টি সালে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ক্যানসাসে চলে গেল বায়ার্ন কনার। লাখ লাখ একর জুড়ে সবুজ ঘাসের অবারিত জমি। সবধরনের সুবিধা বুকে নিয়ে দেশটা উন্মুক্ত ছিল ধনী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের জন্যে। ঘোড়া বিক্রির পাশাপাশি সীমান্তে অস্ত্র ব্যবসা শুরু করল বায়ার্ন। দেদারসে কিনল কনফেডারেট আর্মির পরিত্যক্ত মাস্কেট, বন্দুক, কোল্ট রিভলভার থেকে শুরু করে হেনরি রিপিটিং রাইফেল। তার ছিল নানাধরনের ক্রেতা। কে ডাকাত আর কে গরুচোর, তা নিয়ে ভাবল না। শেরিফ, মার্শালেরা যেমন তার কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কিনত, তেমনি তার কাছ থেকে চোরাই অস্ত্র সংগ্রহ করত ডাকাতেরা। ইউরোপ থেকে আসা সেটলাররা যখন ইণ্ডিয়ানদের কাছ থেকে বাঁচতে অস্ত্র কিনছে, সেই একই সময়ে ইণ্ডিয়ানদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করত সে। ফলে মাত্র ক’বছরে বায়ার্ন কনার হয়ে গেল মধ্যপশ্চিম এলাকায় সেরা অস্ত্র ব্যবসায়ী।

বিশ বছর তুমুল ব্যবসা করল সে। পরের বছর আঠারো শ’ ঊননব্বুই সালে হঠাৎ শ্বেতাঙ্গ সরকার পাশ করল ইণ্ডিয়ান অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন বিল। এল ওকলাহোমায় দু’মিলিয়ন একর জমি দখল করে নেয়ার বিশাল সুযোগ। যে আগে যাবে, জমি তার। বিশেষ এই সুযোগ পেতে আগ্রহী হলো বায়ার্ন কনার। সরকার থেকে বলা হয়েছিল, যারা আঠারো শ’ ঊননব্বুই সালের বাইশ এপ্রিলের মধ্যে ওকলা ‘হামায় পৌছুবে, তাদের ভেতরে আগে বণ্টন করা হবে সেরা র জমি। অন্যরা কিছু বোঝার আগেই আর্কানসাস নদীর তীরে র‍্যাঞ্চ করতে উর্বর এক লাখের বেশি একর জমি দখল করল, ‘বস’ বায়ার্ন কনার। যারা পরে জমি নিতে এল, দেখল ছোটখাটো এক আর্মি দিয়ে এলাকা পাহারা দেয়াচ্ছে আইরিশ লোকটা। তার দলে আছে শতখানেক পেশাদার ভাড়াটে সশস্ত্র খুনি। সেটলারদের ক’জন খুন হয়ে যেতেই ওদিকের জমি ছেড়ে পালিয়ে গেল অন্যরা।

সেই বছর নিউমোনিয়ায় মরল বায়ার্ন কনারের প্রিয় স্ত্রী। অবশ্য তাতে দমে গেল না সে। সময় তখন তার জন্যে সত্যিই দারুণ। চোখের সামনে দেখল কয়েক ঘণ্টায় গড়ে উঠল বিশাল শহর ওকলাহোমা সিটি। পরের সাত ঘণ্টায় বেড়ে ওটার জনসংখ্যা হলো দশ হাজার। ততক্ষণে জমি ও অস্ত্র বিক্রি করে নতুন রাজ্য ওকলাহোমার সেরা ধনী হয়ে গেছে ‘বস’ বায়ার্ন কনার।

কয়েকটা ইণ্ডিয়ান ছোট দল মানল না শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য। সুতরাং খুনি লেলিয়ে দিয়ে চেরোকিদেরকে খুঁজে বের করে পাইকারীভাবে খুন করাল বায়ার্ন কনার ও তার ছেলে। দখল করে নিল আরও হাজার হাজার একর জমি।

এরপর পঁচাশি বছর বয়েসী বাটপার এক বড় ক্যাটল ব্যারনকে নিজের হাতে পিটিয়ে মারল বায়ার্ন করার। আইনের পক্ষের কেউ বলল না যে খারাপ হয়েছে কাজটা। শেষমেশ এক শ’ আট বছর বয়সে উনিশ শ’ সতেরো সালে মারা গেল সে। তার আগে যাজক ডেকে এনে হাউমাউ করে কেঁদে নিজের চরম সব পাশে 1 জন্যে মাফ চাইল ঈশ্বরের কাছে।

তার মৃত্যুর পর বিশাল রাজ্যের মালিক হলো তার ছেলে লকান কনার। উনিশ শ’ বিশ সালে তেপ্পান্ন বছর বয়সে পরমাসুন্দরী এক জার্মান তরুণীকে বিয়ে করল সে। তবে উনিশ শ’ ঊনত্রিশ সালে আমেরিকায় মহামন্দা এলে নড়ে গেল তার পারিবারিক অর্থনৈতিক ভিত্তি। কয়েক বছর পর উনিশ শ’ পঁয়ত্রিশ সালে জন্ম নিল তাদের একমাত্র সন্তান রিয়ান কনার। আর কী কপাল লকান কনারের, এর ক’দিন পর তার জমির কূপে পাওয়া গেল বিপুল পরিমাণ পেট্রোলিয়াম। বহু বছর ওকলাহোমা স্টেটে সবচেয়ে বেশি তেল উত্তোলন করা হয়েছে সেই কূপ থেকে।

তখন বিংশ শতাব্দীর সে-সময়ে গোটা দুনিয়া জুড়ে চলছে গাড়ি কেনার হিড়িক। আর গাড়ির জন্যে চাই পেট্রোলিয়াম। হুড়মুড় করে এল লকান কনারের কাছে লাখ লাখ ডলার। কিন্তু উনিশ শ’ চল্লিশ সালে দ্রুতগামী এক ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি গাড়ি সংঘর্ষে স্ত্রীসহ মারা গেল সে।

ওকলাহোমার সবচেয়ে কমবয়সী মিলিয়নেয়ার হয়ে গেল লকান কনারের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে রিয়ান কনার। তার জন্যে আদালত গঠন করল একটি ট্রাস্টি বোর্ড। পরে পঁচিশ বছর বয়সে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতি ও স্নাতক হয়ে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরল সে। এ সময় তার কর্মজীবনে অকল্পনীয় সাফল্যের সব কাহিনী হয়ে গেল ওকলাহোমার স্বর্ণখচিত মস্তবড় এক ইতিহাস।

.

রুট সিক্সটি-সিক্স ধরে দক্ষিণে চলেছে অ্যারন কনারের দামি গাড়ি। একটু পর পুবে পিছিয়ে গেল টুলসা বাইবেল চ্যাপেল ও চার্চ অভ গড় অভ দ্য অ্যাপোস্টলিক। এক পঁয়ত্রিশ অ্যাভিন্যুর পরে আরও গেলে হার্ভি ইয়াং এয়ারপোর্ট। শহরের তিন বিমানবন্দরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। ওখানে রাখা হয় প্রায় ষাটটি এয়ারক্রাফট। তারই একটি অ্যারনের ব্যক্তিগত গালফস্ট্রিম বিমান। বেশ কিছু দিন হলো শহরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে কাঁচকলা দেখিয়ে ওটা নিয়ে দক্ষিণে টেক্সাস ও নিউয়েভো লারেডোতে যাচ্ছে সে। টুলসার মেয়র বলে মুখের ওপরে কথা তুলছে না কেউ। এই এয়ারপোর্টে বিমান থাকলে সুবিধা পাবে, তাই ভাড়া নিয়েছে মাঝারি একটি হ্যাঙার। এ-ছাড়া এই এয়ারপোর্টে আছে আরও কিছু সুবিধা। এর একটি হচ্ছে: হ্যাঙারে বসে নিজের লোকদের সঙ্গে ব্যবসার কথা সেরে নেয় সে। আর দ্রুত শনৈঃ শনৈঃ বড় হচ্ছে তার ব্যবসা। যদিও তার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ওটার কোন সম্পর্ক নেই। সিটি হলের স্টাফ বা মাটিল্ডা টেস ঘুণাক্ষরেও জানে না তলায় তলায় কী করছে সে।

সাধারণ মানুষ মনে করে বাবা রিয়ান কনারের কাছ থেকে টাকা পেয়ে বড়লোক হয়ে গেছে অ্যারন কনার। যদিও কথাটা একদম মিথ্যা। আজকাল ব্যবসা থেকে তার বাবা যা রোজগার করে, তার চেয়েও বেশি আয় করে সে। আর একবার গভর্নর হতে পারলে হুড়মুড় করে আসবে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। মাত্র কিছু দিনের ভেতরে সে হয়ে উঠরে ওকলাহোমার তিনজন ধনীর একজন। আর এরপর একসময়ে বুড়ো খচ্চর রিয়ান কনার যখন পড়ে থাকবে মৃত্যুশয্যায়, সে-সময়ে, গোপন কথাগুলো বলে তাকে ভীষণভাবে চমকে দেবে অ্যারন।

নিজের হ্যাঙারের পাশে ধুলো ভরা ধূসর ফোর্ড ভ্যান দেখে মনে মনে হাসল সে। গাড়িটার পাশে ক্যাডিলাক থামতেই ভ্যানের পেছন-দরজা খুলে নেমে পড়ল লিয়াম বার্ব ও টনি স্ক্যালাস। বার্বের চোখে মিলিটারি ইত্য সানগ্লাস। পরনে কালো পোশাক। স্ক্যালাসের টি-শার্টে লেখা: ইউ ক্যান কিল মি, আদারওয়াইয ইউ উইল বি কিন্তু।

ক্যাডিলাক থেকে নেমে অ্যারন কনার দেখল ধারে-কাছে সন্দেহজনক কেউ নেই। থমথম করছে চারপাশ।

‘খুব সুন্দর বুট, বস,’ মুখে বলল স্ক্যালাস। কনারের দামি পোশাক ও দুর্মূল্য ক্যাডিলাক দেখে তিক্ত হয়ে গেছে তার মন। প্রতিসপ্তাহে অন্তত তিনবার বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে ডিনার করে অ্যারন। প্রতিটি ডিশের দাম অনেক বেশি বলে নিজে সেখানে যেতে পারে না স্ক্যালাস।

‘কার হাতে বেধড়ক মার খেলে? স্ক্যালাসের ফাটা ঠোঁট আর বেগুনি গাল দেখে ভুরু নাচাল অ্যারন।

‘যে লাগতে এসেছিল, তাকে যদি দেখতেন, নিকোটিন গাম চিবুতে লাগল স্ক্যালাস।

‘আমি কিন্তু বেশি সময় দেব না, হ্যাঙারে ঢুকে চট্ করে কথা শেষ করবে,’ জার্নাল মেয়র কনার। হাতের ইশারায় তার পিছু নিল প্রাক্তন দুই মিলিটারি অফিসার। মেডেইরা থেকে ফিরে হ্যাঙারে গালফস্ট্রিম বিমান রেখে বিদায় নিয়ে চলে গেছে পাইলট। বিমানে উঠে আরামদায়ক সিটে মুখোমুখি হয়ে বসল অ্যারন, স্ক্যালাস ও বার্ব। চোখে কৌতূহল নিয়ে দুই স্যাঙাতের দিকে চাল টুলসার মেয়র। ‘এবার বলো, ভাল কোন খবর আনতে পেরেছ?’

‘মেডেইরায় বেশ ঝামেলা হয়েছিল,’ বলল বার্ব।

বিস্ময় নিয়ে তাকে দেখল অ্যারন। ‘কী ধরনের ঝামেলা? তোমাদের কাজ তো খুব সহজ ছিল। নিয়ে আসবে কয়েকটা পুরনো ডায়েরি।’

‘ভয়ের কিছু নেই, বস,’ বলল স্ক্যালাস। ওখানে ঝামেলা হলেও সেটা আমরা মিটিয়ে দিয়ে এসেছি।’

‘সত্যিই সেটা পেরেছ কি না, তোমাদের কথা শুনে বুঝব। বলো, ওখানে কী হয়েছিল?’

‘নিশ্চিন্তে থাকুন, বস,’ বলল বার্ব। ‘আগুনে পুড়িয়ে আপনার সেই ডায়েরিগুলো আমরা ছাই করে দিয়েছি।’

‘প্রফেসর বা সেই লোকও এখন আর বেঁচে নেই,’ বলল স্ক্যালাস।

বিরক্তি নিয়ে ওকে দেখল বার্ব। বেশি কথা বলে স্ক্যালাস।

‘ওই লোক আবার কে?’ জানতে চাইল অ্যারন।

‘আয়ারল্যাণ্ডের সৈকতে মেয়েটাকে যে বাঁচাতে এসেছিল,’ বলল বার্ব। ‘নাম ছিল তার মাসুদ রানা। আমাদেরকে বিপদে ফেলেছিল মেডেইরাতে।’

‘কীসের সৈকত?’ বিস্ময় নিয়ে বলল অ্যারন। ‘গ্যালওয়ের কথা বলছ?’

‘হ্যাঁ। মেডেইরাতে আবারও দেখা হয় লোকটার সঙ্গে।’

‘সে-ই কি পিটিয়েছে টনিকে? আর তার নাম মাসুদ রানা?’

মাথা দোলাল বার্ব। মুখ নিচু করে নিজের পায়ের দিকে তাকাল স্ক্যালাস। ‘দেখে যত ভয়ঙ্কর জখম বলে মনে হচ্ছে, আসলে তেমনটা নয়।’

‘লোকটা ওখানে কী করছিল?’ তেতো সুরে বলল অ্যারন।

‘আমাদের জানা নেই,’ বলল বার্ব, ‘হঠাৎ করেই আসে বাড়িটাতে। এরপর বাড়িসহ তাকে পুড়িয়ে দিই আমরা। কাহিনী খতম।’

দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে অ্যারন। মাথা নাড়ল বিরক্ত হয়ে। ‘সে কি তোমাদের পিছু নিয়ে মেডেইরায় গিয়েছিল? সেক্ষেত্রে এত বড় বোকামি তোমরা করলে কীভাবে? সে কি পুলিশের সদস্য? নাকি প্রাইভেট কোন গোয়েন্দা?’

‘আমাদের পিছু নেয়নি কেউ,’ নিচু গলায় বলল বার্ব।

‘কিছু জেনে গিয়ে পরে হয়তো কথা বলেছে অন্য কারও সঙ্গে,’ বলল অ্যারন। আমি তার সম্পর্কে জানতে চাই।’ মিনি-আইপ্যাড বের করে এক নামকরা নিউয নেটওঅর্কে ডায়াল করল সে। তিন সেকেণ্ড পর গেল পশ্চিম আয়ারল্যাণ্ডে প্রফেসরের ওপরে করা খবর। দ্রুত পড়ল সে। মিনিটখানেক পর মুখ তুলে দেখল স্ক্যালাস ও বাবকে। ‘তোমাদের সে লোক খুনিদেরকে বাধা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। নিউযে তাকে দেখানো হয়েছে হিরো হিসেবে। নাম মাসুদ রানা।’

‘হ্যাঁ, এই একই লোক,’ বলল বার্ব।

‘কীসের হিরো,’ বিড়বিড় করল স্ক্যালাস।

এর ব্যাপারে আর কিছু জানতে পেরেছ?’ কড়া গলায় জানতে চাইল অ্যারন কনার।

‘আমরা এটা জানি যে, সে মারা গেছে আগুনে পুড়ে,’ বলল স্ক্যালাস।

গুগলে মাসুদ রানা নামটা সার্চ করল অ্যারন কনার। মাত্র এক সেকেণ্ডে লাফ দিয়ে স্ক্রিনে এল কয়েকজন মাসুদ রানার নাম ও ঠিকানা। একজন সৌদি আরবের বাঙালি মুদি দোকানদার। দ্বিতীয়জন জর্ডানের রোড কন্ট্রাক্টর। তৃতীয়জন ইণ্ডিয়ার হাশিখুশি এক তরুণ। লিস্টের নিচে চোখ বোলাতে লাগল অ্যারন কনার। মিনিট দুয়েক পর বলল, ‘এই যে আমাদের লোক। গুগলে ছবিও আছে।’

ঝুঁকে স্ক্রিন দেখে বলল বার্ব, ‘হ্যাঁ, এ-ই সেই লোক।’

‘আগে ছিল আর্মির মেজর,’ বলল অ্যারন, ‘এখন এক প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি চালায়। নানান দেশে আছে ওটার শাখা। অনেকে বলে এই লোক নাকি আধুনিক দুনিয়ার প্রথমসারির এক অভিযাত্রী।’

‘তাতে আমাদের কী?’ কাঁধ ঝাঁকাল স্ক্যালাস।

তাকে পাত্তা না দিয়ে ওয়েবসাইট ঘাঁটতে লাগল অ্যারন। ক্রমেই লালচে হলো দুই গাল। বিড়বিড় করে বলল, ‘এই লোক দেখছি সহজ প্ৰাণী নয়!’

‘যদি আমার কাছে জানতে চান, তো বলব: তাতে কী যায় আসে আমাদের?’ বলল স্ক্যালাস।

‘আমি তোমার মতামত চাইনি, টনি,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল অ্যারন কনার। ‘আমি জানতে চাই লোকটা আসলে কে।’

‘এখন আর বেঁচে নেই,’ বসকে শুধরে দিল বার্ব। এর মত বহু লোক দেখেছি। তবে মরলে তাদের কোন মূল্য থাকে না। ওকে নিয়ে আপনার আর ভাবতে হবে না। মুখ ফস্কে কথা বলেছিল, তাই আরেকবার তিক্ত চোখে স্ক্যালাসকে দেখল সে।

‘নুমার মত প্রতিষ্ঠানের অনারারি ডিরেক্টর,’ বলল কনার।

হাসল স্ক্যালাস। ‘মেজর হোক বা অনারারি ডিরেক্টর, মরে গেলে কারও মূল্য থাকে না। বোধহয় চিনত প্রফেসরকে।’

‘তা-ই?’ বলল অ্যারন কনার। ‘সেক্ষেত্রে ধরে নিতে পারি তুমি বোধহয় চাঁদের দেশের অদ্ভুত এক গাধা!’

চুপচাপ অপমান হজম করল স্ক্যালাস।

‘সে কে, সেটা নিয়ে আমাদের আর ভাবতে হবে না,’ জোর দিয়ে বলল বার্ব। ‘বেঁচে থাকলে পরেরবার দেখা হলেই খুন হতো আমাদের হাতে।’

‘এ-ধরনের লোক আমার পিছু নেবে, সেটা চাই না,’ বলল মেয়র কনার। আইপ্যাড দেখাল সে। ‘তোমরা শিয়োর যে মারা গেছে সে?’

‘তাতে কোন ভুল নেই,’ বলল স্ক্যালাস।

‘তার কথা ভুলে যান, শুকনো গলায় জানাল বার্ব। ‘সে এখন পুরনো ইতিহাসের অংশ।’

‘মাথায় রেখো, ভুল যেন না হয় তোমাদের,’ বলল অ্যারন, ‘কারণ, আমরা এখন যে ব্যবসা করছি, তাতে হঠাৎ করে কেউ নাক গলিয়ে দিলে মস্ত বিপদ হবে।’ কোটের পকেট থেকে কালো এক কার্ড নিল সে। উল্টো দিকে লেখা এক মেয়ের নাম ও ঠিকানা। কার্ড ধরিয়ে দিল বার্বের হাতে। ‘ক্রসবি হাইটসের এ-মেয়েটাকে ধরে আনবে আমার কাছে। ভুলেও খুন করবে না। আমি তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতে চাই।’

‘এই কুত্তী আসলে কে?’ কার্ডের দিকে তাকাল বার্ব।

‘বিপজ্জনক। কাজ করে আমার স্ত্রীর অফিসে।’

‘অফিসে কাজ করে, তাতে কী?’ ভুরু কুঁচকাল বার্ব।

‘যে-রাতে উলোগাহ্ লেকের তীরে আমার স্ত্রীর কটেজে খুন করলাম হারামজাদা হিউবার্ট হ্যারল্ডকে, তখন মালকিনের অনুমতি পেয়ে ওখানে থাকতে গিয়েছিল এই মেয়ে।’

‘বলেন কী!’ চমকে গিয়ে সমস্বরে বলল বার্ব ও স্ক্যালাস।

‘হ্যাঁ, আমরা যখন হ্যারল্ডকে খুন করছি, তখন গোপনে আমাদের ভিডিয়ো তুলেছে। তারপর তোমাদের নাকের ডগা টপকে পালিয়ে গেছে। নিজেরাই বলো, সেটা কী করে হতে দিলে তোমরা? অবশ্য কপাল ভাল, প্রমাণগুলো এখন আছে নিরাপদ হাতে। জেনেছি, সেই ভিডিয়োর আর কোন কপি নেই। তবুও মেয়েটাকে জীবিত চাই। বুঝতে পেরেছ?’

বার্বের বুঝতে দেরি হলো না, এখন কার নিরাপদ হাতে আছে সেই ভিডিয়ো। কালো কার্ডের লেখা নাম ও ঠিকানা বন্ধুকে দেখাল সে। চকচক করে উঠল স্ক্যালাসের দু’চোখ। ওদিকের এলাকা ভাল করেই চেনে সে।

স্ক্যালাসের চোখ দেখে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল অ্যারন কনার। ‘আমি চাই না তুমি ওদিকে যাবে। মেয়েটা তোমার চেহারা চেনে। কাজেই পাঠাবে এমন একজনকে, যে গোলমাল না করে তাকে তুলে আনতে পারবে।

‘কোন ধরনের বিপদ হবে না’ কথা দিল বার্ব।

মাথা নাড়ল বিরক্ত অ্যারন। ‘আমি অত নিশ্চিত নই। এরই ভেতরে একবার পালিয়ে গেছে।’

‘আমাকে শুধু একবার সুযোগ দিন,’ অনুরোধের সুরে বলল স্ক্যালাস।

জবাবে মাথা নাড়ল অ্যারন কনার। ‘আগেই বলেছি, তোমরা ওদিকে যাবে না। নিজেদের দলের কাউকে পাঠাও। কাজটা করতে যেন দেরি না করে সে।’

ত্রিশজন খুনে লুঠেরাকে কাজে রেখে অ্যারনের ব্যবসা দেখাশোনা করছে বার্ব। আজকাল মাঝে মাঝেই তার মনে হচ্ছে, যেভাবে বেড়ে উঠছে ব্যবসা, তাতে আরও বেশি লোক লাগবে। মাথার খোঁচা-খোঁচা চুলে হাত বুলিয়ে বলল সে, ‘আমরা কাজটা দেব গ্রিন ক্রমম্যানকে।’

‘ওই লোক আবার সব গুবলেট করে দেবে না তো?’ সন্দেহ নিয়ে জানতে চাইল অ্যারন কনার।

মাথা নাড়ল বার্ব। ‘ভাববেন না।’

‘তা হলে তাকে ডাকো। বলে দেবে, কাজ ঠিকভাবে শেষ হলে বোনাস পাবে তিন হাজার ডলার।’

‘এ-ধরনের কাজে সে নেবে কমপক্ষে পাঁচ হাজার,’ বলল বার্ব। ‘কারও বাড়িতে ডাকাতি করা সহজ। কিন্তু কিডন্যাপিং অন্য কিছু। ধরা পড়লে বিশ বছরেও জেল থেকে বেরোতে পারবে না। তা ছাড়া, সঙ্গে অন্তত আরেকজনকে লাগবে।

অধৈর্য হয়ে বাতাসে হাত নাড়ল কনার। দরকার হলে দশ হাজার ডলার খরচ করবে। ‘আজই মেয়েটাকে তুলে আনবে। তার সঙ্গে আমি নিজে কথা বলব। গ্রুমম্যানকে বলে দিয়ো, লোকসহ সাড়ে সাত হাজার ডলার পাবে।’

‘কথা শেষ হলে, তখন?’ আগ্রহ নিয়ে বলল স্ক্যালাস।

জবাবে কাঁধ ঝাঁকাল অ্যারন। ‘এরপর মেয়েটার কী হবে, সেটা নিয়ে ভাবছি না। কুকুর দিয়ে খাইয়ে দেয়ার আগে তাকে ভোগ করতে পারো, টনি। তবে পরে যেন চিরকালের জন্যে দুনিয়া থেকে হাওয়া হয়ে যায়। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’

ঊনত্রিশ
দু’দিন হলো বাড়িতে বসে আছে জ্যাকি। মনে কাজ করছে গভীর এক ভয়: কে জানে, কখন কী হয়!

ট্রাস্টের সভাপতি লিণ্ডা কনারকে ফোন করে বলেছে, সর্দির ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ও। মহিলা সহৃদয়, তাই এক সপ্তাহের জন্যে ছুটি দিয়েছেন ওকে। ফোন রাখার আগে বলেছেন, ‘এত কাজ জমেছে, তোমাকে ছাড়া কীভাবে সব সামলে নেব বুঝতে পারছি না। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তুমি যেন চট্ করে সুস্থ হয়ে ওঠো।

কত বড় ঝামেলায় জড়িয়ে গেছে, সেটা বুঝতে পেরে মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম হয়েছে জ্যাকির। মন্দার এ সময়ে লিণ্ডা কনারের দেয়া চাকরিটা ওর খুব প্রয়োজন। মহিলাকে পছন্দও করে। কিন্তু গত কয়েক দিনে যা ঘটে গেছে, এরপর কীভাবে যাবে অফিসে? লিণ্ডার চোখে কী করে চোখ রাখবে? আর ট্রাস্টের অফিসে যদি আসে টুলসার মেয়র কনার-তখন? মাঝে মাঝেই আসে সে! একই রুমে তার সঙ্গে মুখোমুখি হলে ওর চেহারা কেমন হবে, স্রেফ খোদা জানেন! যদি ওর মনের কথা ধরা পড়ে যায় লোকটা কাছে? যদি বুঝতে পারে যে খুনের সাক্ষী এখন হাতের মুঠোয়? সেক্ষেত্রে কী হবে?

হাজারো দুশ্চিন্তা ঘুরছে জ্যাকির মনে। একেক ঘণ্টা ওর কাছে এক শ বছরের মত লাগছে। প্রতিদিনের মত একসময় ডুবে গেল সূর্য, নেমে এল কালো রাত। পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে কোন খবর এল না। বারবার ভাবল জ্যাকি: আসলে কী করছে পুলিশের লোকেরা?

সারারাত ঘুমাতে না পেরে চেয়ে রইল ছাতের দিকে। সকালে বিছানা ছেড়ে নাস্তা করে নেয়ার পর ভাবতে লাগল পুলিশ চিফ রিপার রিগবি আর ডিটেকটিভ জিম লিয়োনার্ডের সঙ্গে ওর সাক্ষাৎকারের কথা। বারবার মনে হলো, ভাল হতো সেই বিকেলে কটেজে না গেলে। বা খুন না-ই হতো লোকটা! অন্তর থেকে জ্যাকি বুঝতে পারছে, কিছু না কিছু করতে হবে ওকে। কিন্তু সেই কাজটা আসলে কী?

নিজেকে গৃহবন্দি বলে মনে হচ্ছে ওর। খুনের দৃশ্য মুছে দিতে পারছে না মন থেকে। নিজের কাজে যে যাবে, তা-ও সম্ভব নয়। গত কয়েক ভোরে আর্কানসাস নদীর তীরে নিউব্লক পার্ক ট্রেইল ধরে জগিং করেনি। বাড়ি থেকে মাত্র একবার বের হয়ে ক্যাব নিয়ে চলে গেছে মেকানিকের গ্যারাজে। মেরামত করিয়ে এনেছে নিজের পুরনো সুবারু গাড়িটা। ওর স্মার্টফোন এখনও রয়ে গেছে পুলিশ চিফের কাছে, তাই বাড়ি ফেরার আগে এক সুপারশপ থেকে কিনে নিয়েছে কমদামি এক সেলফোন, কিছু পাউরুটি, সব্জি, মাংস ও ডিম।

নানান ভাবনার সাগরের অতলে ডুবে ধীরে ধীরে পেরোল ওর দুপুর। টিভিতে দেখল ইয়ামোটা এক মহিলা নালিশ করছে উকিলের কাছে। ফাস্ট ফুডের এক কোম্পানির জন্যে সর্বনাশ হয়ে গেছে তার। ফাটা গলায় বলল, ‘নিজেই দেখুন, আমার কী হাল করে ছেড়েছে! লোভনীয় খাবার দেখিয়ে মানুষ খুন করছে এরা!

‘আপনি মা-ই বা খেতেন?’ জানতে চাইল উকিল।

‘তা হলে বাঁচতাম কী করে?’

‘তা হলে কি তাদের খাবার খেয়ে আপনি বেঁচে আছেন, নইলে বাঁচতেন না?’

‘আপনি বেশি কথা বলেন!’ ধমকের সুরে বলল মহিলা।

টিভির অনুষ্ঠান আর ভাল লাগল না জ্যাকির। এক মগ চা হলে মন্দ লাগত না ওর। টিভি অফ করে চলে এল কিচেনে। ওর কিচেন ছোট হলেও গোছানো। চট করে মেলে দরকারি জিনিস। কাউন্টারের এক তাকের নিচে হাঁড়িকুঁড়ি ও বৈদ্যুতিক কেতলি। ওপরের স্টিলের বার থেকে ঝুলছে চকচকে ছোটবড় সসপ্যান। সুইচ অন করে এক মগ পরিমাণ পানি কেতলিতে ভরল জ্যাকি। কাবার্ড থেকে বের করে টি- ব্যাগ নিয়ে রাখল খালি এক মগে। পানি গরম হওয়ায় ফোঁস- ফোঁস শব্দ করছে কেতলি। কট শব্দে অফ হলো প্লাস্টিকের সুইচ। কেতলি থেকে মগে তপ্ত পানি ঢেলে দিতেই কিচেনে ছড়িয়ে গেল দামি চায়ের গন্ধ। এবার চাই এক চামচ চিনি। কৌটার দিকে হাত বাড়াতেই হঠাৎ পেছন থেকে এল কালো গ্লাভস পরা একটা হাত। ভীষণ চমকে গেল জ্যাকি।

আর্তচিৎকার করার আগেই চেপে ধরা হলো ওর মুখ। আরেক হাতে হ্যাঁচকা টানে পিছিয়ে নিল লোকটা। তার শক্ত বুকে ঠেকে গেল জ্যাকির পিঠ। খসখসে চামড়া চেপে বসল ওর নাকের ওপরে। ঝটকা দিয়ে সরে যেতে চাইল জ্যাকি। কিন্তু হামলাকারীর গ্লাভ্স পরা আঙুল যেন স্টিলের তৈরি। পেছন থেকে ধাক্কা আসতেই কিচেন কাউন্টারে সেঁটে গেল জ্যাকি। পেছনে পালোয়ানের মত কোন লোক। সামনে সারি সারি ড্রয়ার, সরে যাওয়ার উপায় নেই। লোকটার পেটে কনুই দিয়ে গুঁতো মারবে বা হাঁটুর বাটির ওপরে লাথি দেবে, সেটাও এখন সম্ভব নয়।

লোকটার গ্লাভ্স পরা হাতে মিলিমিটারের চিহ্নসহ সিরিঞ্জ দেখে ভয়ের মাত্রা বাড়ল জ্যাকির। প্লাস্টিকের স্বচ্ছ খাপটা ঢেকে রেখেছে সুঁই। সিরিঞ্জের ভেতরে হলদে তরল। পিছিয়ে নেয়া হয়েছে প্লাঞ্জার। তর্জনী দিয়ে প্লাস্টিকের খাপ টোকা দিয়ে উড়িয়ে দিল লোকটা। চকচক করছে সরু সুঁই।

জ্যাকি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলেও কোনভাবেই সরে যেতে পারল না। ওকে ঠেসে ধরেছে লোকটা। দারুণ কাটছে তার প্রতিটি সেকেণ্ড। ভাল করেই জানে, গায়ের জোরে তার সঙ্গে পারবে না জ্যাকি। সিরিঞ্জের প্লাঞ্জার সামনে ঠেলে দিতেই সুঁইয়ের মুখে দেখা গেল একবিন্দু হলদেটে তরল।

অসহায় জ্যাকি চেয়ে রইল সুঁইটার দিকে। ধীরে ধীরে কাছে এল সুঁই। যে-কোন সময়ে বিধবে ওর ঘাড়ে। খুব ছোট একবিন্দু তরল টলমল করছে সুঁইয়ের মাথায়। যে-কোন সময়ে সিরিঞ্জের পুরো তরল ঢুকবে ওর দেহে।

তখনই হঠাৎ জ্যাকি বুঝল, ওকে খুন করতে আসেনি লোকটা। তা হলে দু’হাতে মটকে দিত ওর ঘাড়, বা পিঠে গেঁথে দিত ছোরা। এই লোক আসলে এসেছে ওকে ড্রাগ দিয়ে অচেতন করে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। আর তারপর ভয়ঙ্কর কিছু যে করবে, তা তো বোঝাই যাচ্ছে!

এই হামলার পেছনে আছে অ্যারন কনার। সে বা তার লোক ওকে কোথাও নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করবে। পরে মেরে কটেজের সেই লোকের মত মাথা দেহ-হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে পুঁতে দেবে জঙ্গলে।

প্রচণ্ড আতঙ্কে ঘুরতে শুরু করেছে জ্যাকির মাথা। ওর মনে হলো, যে-কোন সময়ে জ্ঞান হারাবে। লোকটা আর কাউন্টারের মাঝে আটকা পড়ে কাঁপছে ওর সারাশরীর

ঘাড়ের খুব কাছে চলে এল সুঁই।

‘নড়বে না, ডার্লিং,’ জ্যাকির কানের কাছে বলল লোকটা। ‘নইলে কখন ভুল করে তোমার চোখ উপড়ে নেব, তার কি কোন ঠিক আছে!’

টিটকারি শুনে ভীষণ রেগে গেল জ্যাকি। অসহায় পেয়ে ওরই বাড়িতে ওকে নিয়ে যা খুশি করছে কিডন্যাপার!

তবে কুকুরটাকে এভাবে ছেড়ে দেবে না ও!

চিৎকার করে ডানহাত ছুটিয়ে নিয়ে তার হাতের সিরিঞ্জ সরিয়ে দিতে চাইল জ্যাকি। ভয় পাচ্ছে, যে-কোন সময়ে সুঁইয়ের খোঁচায় ফুটো হবে কবজি বা বাহু।

‘কুত্তী!’ ওর কানে হিসহিস করল লোকটা, ‘তুই চাইলেও ছুটতে পারবি না!’

জ্যাকি বুঝে গেল, ঠিক কথাই বলেছে লোকটা। ঘাড়ের কাছে চলে এসেছে সিরিঞ্জ। এমন কোন উপায়ও নেই যে লোকটার কবল থেকে রেহাই পাবে। আর তখনই ওর মনে হলো, এখনও হয়তো রয়ে গেছে একটা সুযোগ।

সামনের কাউন্টারের ওপরে আছে আগুনের মত গরম চা। ধোঁয়া উঠছে ওটা থেকে।

লোকটার হাত ছেড়ে খপ করে মগ নিল জ্যাকি, পরক্ষণে ওর কানের পাশ দিয়ে পিছনে গেল উত্তপ্ত চা। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো ব্যথা-ভরা করুণ আর্তনাদ। হামলাকারীর মুখে ছলাৎ করে গিয়ে পড়েছে মগের গরম তরল।

‘খুন করে ফেলেছে কুত্তী আমাকে! মাগী কোথাকার!’ টলতে টলতে পিছিয়ে গেল লোকটা। কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে মুক্ত হয়ে গেছে জ্যাকি। একদিকে সরে গেছে লোকটার হাতের সিরিঞ্জ। এ-সুযোগে ঝটকা দিয়ে সরে গেল জ্যাকি। ভাল করেই জানে, যে-কোন সময়ে নিজেকে সামলে নেবে লোকটা।

ঘুরে প্রথমবারের মত হামলাকারীর মুখ দেখতে পেল জ্যাকি। লোকটা গণ্ডারের মত ভারী ও গাঁট্টাগোট্টা। শ্বেতাঙ্গ। বয়স হবে চল্লিশ। পোড়া ডান গার্ল ও কপাল জ্বলছে বলে আরও কুৎসিত দেখাচ্ছে কামুক চেহারা। এরই ভেতরে ফুলে বুজে গেছে ডান চোখের পাতা। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে যেতে পারবে না জ্যাকি।

কাউন্টারের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে হুক থেকে ভারী একটা সসপ্যান নিল ও। দু’হাতে ওটা শক্ত করে ধরে গায়ের জোরে সাঁই করে চালাল লোকটার মাথা লক্ষ্য করে। খুলির পাশে ভারী ধাতব সসপ্যান লাগতেই জোরাল ঢনাৎ শব্দ শুনতে পেল জ্যাকি। ভীষণ ঝাঁকুনি খেয়ে কেঁপে গেল ওর দুই কাঁধ।

মাথায় বাড়ি খেয়ে আরও রেগে গেল গণ্ডার। লাফ দিয়ে সামনে বেড়ে ঘ্যাঁচ করে সিরিঞ্জের সুঁই গেঁথে দিতে চাইল জ্যাকির গায়ে। কিন্তু সসপ্যান ঢালের মত ব্যবহার করেছে জ্যাকি। চকচকে স্টিলে লেগে পিছলে অন্যদিকে গেল সুঁই। সামনে বেড়ে লোকটার কবজির ওপরে চাঁই করে সসপ্যান নামাতে চাইল জ্যাকি। কিন্তু দ্রুত সরে গেল হামলাকারী। মুখ থেকে বেরোল মুলার মত দুই সারি হলদে দাঁত। মুখে টিটকারির হাসি। ‘তোর আর কোন সুযোগ নেই, কুত্তী! হারামজাদী, এবার তোর পোঁদ দিয়ে ভরে দেব আমার এই সিরিঞ্জ! তাতে বড়জোর জ্ঞান থাকবে পনেরো সেকেণ্ড। তারপর তোর ভেতরে ভরব আমার অন্যকিছু। তাতে দারুণ মজাও পাব।’

আবারও সামনে বেড়ে জ্যাকির গায়ে সিরিঞ্জ গেঁথে দিতে চাইল সে। কিন্তু চট করে সরে গেল জ্যাকি। এক সেকেণ্ড আগে যেখানে ছিল, তার পেছনের কাউন্টারে বিধল সিরিঞ্জ।

‘দ্যাখ, কী অকাজটাই না করলি!’ ভুরু কুঁচকে বাঁকা সুঁই দেখল গণ্ডার। বিরক্ত হয়ে ঘরের আরেকদিকে ছুঁড়ে ফেলল সিরিঞ্জ। জ্যাকেটের তলা থেকে বের করল সাত ইঞ্চি ফলার একটা ছোরা। ‘তোর কপাল আসলেই খারাপ রে! তোকে নিয়ে যাব এক লোকের কাছে! ওখানে রেপ হওয়ার পর ধীরে ধারে ধুঁকে ধুঁকে মরবি!’

ধীরপায়ে জ্যাকির দিকে এল গণ্ডার। তবে ধরা পড়ার আগেই বিদ্যুদ্বেগে একপাশে সরে গেল জ্যাকি। তখনই দেখতে পেল সুযোগটা। তেড়চাভাবে আসছে লোকটা। তাতে হয়তো তার ওদিকে চলে যাওয়ার সুযোগ মিলে যেতে পারে। সর্বশক্তি দিয়ে গণ্ডারের বুক লক্ষ্য করে সসপ্যান ছুঁড়ল জ্যাক। লোকটা কিছু বোঝার আগেই ভারী জিনিসটা ঠাস্ করে তার গলায় লেগে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। চমকে গেছে কিডন্যাপার। আর এ সুযোগে ঝোড়ো বেগে তাকে পাশ কাটিয়ে খোলা দরজার ওদিকে পৌছে গেল জ্যাকি।

ঘুরেই ওর পিছু নিয়েছে গণ্ডার।

এদিকে ছোট্ট দোতলা বাড়ির সংক্ষিপ্ত করিডর পার করে সিঁড়ির ধাপে পৌঁছে গেছে জ্যাকি। একেকবারে তিনধাপ টপকে উঠে এল ওপরে। হাট করে খোলা বেডরুমের দরজা। ছুটে ঢুকল ঘরে। ওদিকে কিচেন থেকে বেরিয়ে মেইল ট্রেনের গতি তুলে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে হবু কিডন্যাপার, হাতে উদ্যত ছোরা।

কয়েক পা ফেলে বিছানার পাশে চলে গেল জ্যাকি। ছোট টেবিলটার ওপরে হোলস্টারের ভেতরে আছে পিস্তল। খাপ থেকে ছোঁ দিয়ে অস্ত্রটা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ও।

ততক্ষণে তারী পায়ের ধূপধাপ শব্দ করে ওপরের ল্যাণ্ডিং পেরিয়ে বেডরুমে ঢুকে পড়েছে গণ্ডার। জ্যাকির হাতে পিস্তল দেখে ভীষণ বিস্মিত হলো সে। ছোরাসহ হাত মাথার ওপরে তুলে কড়া ব্রেক কষে থামল। যাতে তাকে গুলি না করা হয়, সেজন্যে অনুরোধ করতে হাঁ করল মুখ। তবে দেরি করে ফেলেছে সে। সিগ সাওয়ার পি ৩২-এর গ্রিপ দু’হাতে ধরে সরাসরি গণ্ডারের বুক লক্ষ্য করে টিগ টিপে দিল জ্যাকি।

যদিও বুম শব্দে গুলি বেরোবার দল অস্ত্র থেকে এল মৃদু ক্লিক আওয়াজ। তাড়াহুড়োয় চেম্বারে গুলি না ভরেই ট্রিগার টিপে দিয়েছে জ্যাকি।

এখন আর সময় নেই যে স্লাইড টেনে চেম্বারে ভরে নেবে গুলি। ঝড়ের মত ওর দিকে এল দুই শ’ ষাট পাউণ্ডের গণ্ডার।

বিপদ বুঝে ঘুরে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীর গড়িয়ে খাটের অন্যদিক দিয়ে সরু জায়গায় নেমে পড়ল জ্যাকি। প্রায় একই সময়ে স্লাইড টেনে ধাতব শব্দে চেম্বারে ভরল বুলেট। সোজা হয়ে সরাসরি গণ্ডারের বুক লক্ষ্য করে পিস্তল তাক করল জ্যাকি।

বিছানায় উঠতে গিয়ে হঠাৎ করে থমকে গেছে গণ্ডার। জ্যাকির চোখে দেখছে শীতল খুনি-দৃষ্টি।

চাপা স্বরে বলল জ্যাকি, ‘শহরের বেশিরভাগ হারামজাদা ড্রাগ্‌খোর। আমার বাবা বলত গুলি করলে সেটা করবে ঠিক দিকে। তবে বাধ্য না হলে কাউকে খুন করবে না। আমি এখন তা-ই করছি।’ সিগ সাওয়ারের নল নিচু করে গণ্ডারের ..হাঁটুর বাটি লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপে দিল জ্যাকি।

বন্ধ ঘরে প্রচণ্ড গর্জন ছাড়ল নাইন এমএম পিস্তল। মিলে মিশে গেল গুলির শব্দ ও গণ্ডারের আর্তনাদ। জ্যাকির বুলেট বিঁধেছে কিডন্যাপারের ডান হাঁটুর দু’ইঞ্চি ওপরের মাংসে। হঠাৎ করে তার শরীরের ওজন আর নিল না ডান পা। পঙ্গু হয়ে ধপ করে মেঝেতে আছাড় খেল গণ্ডার। হাত থেকে পড়ে গেছে ছোরা। দু’হাতে ক্ষতটা চেপে ধরল সে। তীব্র ব্যথায় মুচড়ে উঠছে কেঁচোর মত। দশ আঙুলে চেপে ধরা ক্ষত থেকে ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছে রক্ত।

দৌড়ে নিচু বিছানায় উঠল জ্যাকি, পরক্ষণে লাফ দিয়ে টপকে গেল আহত গণ্ডারকে। তীরবেগে বেডরুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। ওর মনে পড়ল, পকেটে রাখার আগে ডিকক করতে হবে পিস্তল। দ্রুত ভাবতে শুরু করেছে জ্যাকি। পালিয়ে যাওয়ার আগে করিডর থেকে কিছু জিনিস ওর চাই। পিস্তল কাছেই আছে। ডিকক করে পকেটে রাখল। এবার লাগবে জ্যাকেট, গাড়ির চাবি আর ওর পার্স।

বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বেরোবার সময় ওর মনে পড়ল সিরিঞ্জ রয়ে গেছে কিচেনে। ওটা জোরালো প্রমাণ। সিরিঞ্জ সংগ্রহ করতে ছুটে আবার কিচেনে ঢুকল জ্যাকি। মেঝেতে আছে ভারী সসপ্যান। পাশে কয়েক টুকরো হওয়া ভাঙা মগ। মেঝেতে ছড়িয়ে গেছে চা। কয়েক ফুট দূরে সেই সুঁই বাঁকা সিরিঞ্জ। ভেতরে হলদে তরল। কাউন্টার থেকে টিশ্যু পেপার নিয়ে সিরিঞ্জ জড়িয়ে নিয়ে পার্সে রেখে দিল জ্যাকি। দোতলায় ধুপধাপ শব্দ করছে কিডন্যাপার, গলা থেকে বেরোচ্ছে চাপা গোঙানি।

আর দেরি না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল জ্যাকি। ওর লাল গাড়িটা আছে ধুলোভরা ড্রাইভওয়েতে। দৌড়ে ওটার পাশে চলে গেল জ্যাকি। রাস্তায় চোখ যেতেই দেখল ষাট গজ দূরে সাদা একটা গাড়ি। আগে কখনও ওখানে কাউকে পার্ক করতে দেখেনি। কালো উইওস্ক্রিনের ওদিকে ড্রাইভিং সিটে বসে কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে ড্রাইভার।

দ্বিতীয়বার ওদিকে না চেয়ে সুবারু গাড়িতে উঠল জ্যাকি। ইঞ্জিন চালু করে পিছিয়ে গেল ড্রাইভওয়ে ধরে। পথে নেমে এসে চাপ দিল অ্যাক্সেলারেটরে। বনবন করে চাকা পিছলে রওনা হয়ে গেল গাড়ি। ওদিক থেকে এল কালো এক সেডান। আরেকটু হলে ওটার নাকে গুঁতো দিত জ্যাকি। শেষসময়ে নিজের লেনে ফিরে আবারও গতি তুলল।

এখনও জানে না কোথায় যাবে। প্রথম কথা: পালাতে হবে এ-এলাকা থেকে। উন্মাদিনীর মত প্রচণ্ড বেগে পেরোতে লাগল সামনের গাড়িগুলোকে। হর্ন বাজিয়ে আপত্তি জানাল কয়েকজন ড্রাইভার। পরের একমাইলে দু’বার দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেল জ্যাকি। এরপর ওর ধমনী থেকে ধীরে ধীরে বিদায় নিল অ্যাড্রেনালিন। নিজেকে বড় বেশি ক্লান্ত লাগল জ্যাকির। ব্রেক কষে রাস্তার ধারে গাড়ি রেখে দেখল, স্টিয়ারিং হুইলের ওপরে থরথর করে কাঁপছে ওর দু’হাত। বড় করে ক’বার শ্বাস নেয়ার পর হঠাৎ করেই খুব কান্না পেল জ্যাকির। বুঝে গেছে, আর কখনও ফিরে যেতে পারবে না নিজের ভাড়া করা বাড়িতে।

কালবেলা – ৩০ (মাসুদ রানা)

টুলসা ইন্টারন্যাশনালের দিকে উড়ে চলেছে বিশাল বিমান। নামতে শুরু করে ধর্-ধর্ শব্দ ছাড়ছে ওটার এয়ারফ্রেম। জানালা দিয়ে নিচে ঘন সবুজ টিলা, বিস্তৃত জঙ্গল ও রোদে পোড়া বাদামি ঘাসের প্রেয়ারি দেখতে পেল রানা। পেছনে অপূর্ব প্রকৃতি ফেলে বিমান এল শহরের ওপরে। নানাদিকে আকাশে নাক তুলেছে সুউচ্চ সব স্কাইস্ক্র্যাপার। এদিকে- ওদিকে হাইওয়ে, সবুজ পার্ক ও ছোট বাড়ি। নীল জলের আর্কানসাস, নদীতীরে প্রকাও এলাকা নিয়ে, ইণ্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা। দেখতে না দেখতে সব পেছনে ফেলে টুলসা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের চওড়া রানওয়েতে নেমে এল বিমান। সময় নিল না গতি কমিয়ে নিতে। প্রকাণ্ড শরীর ঘুরিয়ে পৌঁছে গেল টার্মিনাল ভবনের সামনে।

আধঘণ্টা পর কাস্টম্স্ ও ইমিগ্রেশনের ঝামেলা মিটিয়ে অ্যারাইভাল লাউঞ্জে পা রাখল রানা। কারেন্সি এক্সচেঞ্জ-এর এক দোকান থেকে ইউরো ভাঙিয়ে বুঝে নিল এক তোড়া ডলার। স্টারবাক কফি কিনে দু’ডলার খরচ করে সংগ্রহ করল টুলসা শহরের একটি ম্যাপ। ওটা জানিয়ে দিল, উত্তর-পুব ডাউনটাউনের পাঁচ মাইল দূরে আছে রানা। একটু পর ‘কাগজপত্র দেখিয়ে টুলসা রেন্টাল থেকে ভাড়া করল একুশ সালের কালো এক ফোর্ড ব্রঙ্কো জিপ। দ্বিতীয়বার চট করে ওটা দেখতে যাবে না কেউ। জিপের ভেতরে যথেষ্ট জায়গা। দরকার হলে ওখানে ঘুমাতে পারবে রানা। অবশ্য জিপটা ভাল লেগেছে অন্য কারণে। ওটার টিন্টেড জানালা গাঢ় কালো। তাতে হয়তো আড়ালে রয়ে যাওয়ার মত বাড়তি সুবিধে পাবে। এরই ভেতরে রানা স্থির করেছে, এবার একে একে কী ধরনের কাজগুলো করবে। জিপ ভাড়া করেছে পুরো এক সপ্তাহের জন্যে। যদিও নিজের কাজ শেষ করতে এতদিন লাগবে বলে ভাবছে না রানা।

ইউরোপের সময় অনুযায়ী চলছে রে, দেহঘড়ি। কাছেই লিনাক্স নামের এক স্টেকহাউস দেখে ওখানে ঢুকল রানা। কিনে নিল বাড়িতে তৈরি গরম চিকেন পাই। ওটা প্রায় কুমারের চাকার মতই বড়। এখন চলছে আগস্ট মাস। দক্ষিণ থেকে ঝিরঝির করে আসছে তপ্ত হাওয়া। স্টেকহাউস থেকে বেরিয়ে গাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার আগেই শার্টের পিঠ ভিজে গেল ওর।

প্রধান সড়ক ধরে দক্ষিণে এগিয়ে চলল ব্রঙ্কো জিপ। ইউরোপ থেকে এত দিন পর আবারও আমেরিকায় পা রেখে সবই স্বাভাবিকের চেয়ে বড় বলে মনে হচ্ছে রানার। পেছনে পড়ল কাঠ চেরাইয়ের বিশাল এক আড়ত। দু’পাশে পিছিয়ে যাচ্ছে ইণ্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স, ওয়্যারহাউস ও পুরনো সব গাড়ির স্যালভেজ ইয়ার্ড। একটু পর পছন্দমত এক জেনারেল স্টোর দেখে ওটার সামনে গাড়ি রেখে নেমে পড়ল রানা।

মস্ত এই জেনারেল স্টোরে বোধহয় এমন কিছু নেই, যেটা পাওয়া যাবে না। দুটো ডেনিম শার্ট ও কালো জিন্স প্যান্ট কিনল রানা। এ ছাড়া কাউন্টারে রাখল বিনকিউলার, সানগ্লাস, বেসবল ক্যাপ ও প্লাস্টিকের পাঁচ লিটারের পানির ক্যান। কাউন্টারের পেছনের চেয়ারে বসে আছে বয়স্ক এক লোক। তার তুলোর মত সাদা চুলের মাঝে লালচে মস্ত এক টাক। মানুষটার পরনে ডুঙ্গারি। লাখখানেক ভাঁজ কুঞ্চিত চেহারায়।

‘এখান থেকে সবচেয়ে কাছে মাঝারি মানের কোন হোটেলটায় উঠতে পারি?’ মালপত্রের বিল মিটিয়ে জানতে চাই রানা।

‘ইংলিশ নাকি?’ তীক্ষ্ণ চোখে ওকে দেখল বৃদ্ধ। ইংরেজি উচ্চারণ তো অক্সফোর্ডের। অথচ গায়ের রঙ ময়লা।

‘আমি বাংলাদেশের মানুষ,’ বলল রানা, ‘জাতে বাঙালি।’ গুড। তোমাদের কথা আমি জানি। উনিশ শ একাত্তর সালে যুদ্ধ করে তোমরা দেশ স্বাধীন করেছিলে। তারপর থেকে তোমাদের যেন উন্নতি না হয়, সেজন্যে নানানভাবে বেড়ালের মত খামচে দিত পাকিস্তানি শাসকেরা। আর এখন শুনছি তারা নিজেরাই নাকি ফকির হয়ে গেছে। এদিকে আমার কথা যদি জানতে চাও, তো আমার চোদ্দগুষ্টি আয়ারল্যাণ্ড থেকে এসেছে সিভিল ওঅরের সময়। আমার নাম প্যাডি ফ্ল্যানাগান।’

‘পরিচিত হয়ে খুশি হলাম, প্যাডি, বলল রানা। বুঝে গেছে, ইংরেজ হলে লোকটার কাছ থেকে আন্তরিক ব্যবহার পেত না। ‘আমার নাম রানা। মাসুদ রানা।

‘জীবনে প্রথমবার টুলসায় এসেছ, রানা?’

‘ঠিকই ধরেছেন।’

‘ছুটি কাটাতে?’

‘ঠিক তা নয়,’ বলল রানা।

‘আমারও মনে হচ্ছে তুমি টুরিস্ট নও। ক’দিন থাকছ?’

‘কাজ শেষ হলেই বিদায় নেব।’

‘বুঝলাম মিথ্যা বলার মানুষ তুমি নও,’ ঠোঁট কোঁচকানো হাসি দিল প্যাডি ফ্ল্যানাগান। ‘ঠিক আছে, এই রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে সামনে পাবে ওল্ড ইয়েলার ইন। রুমগুলো খুব দামি না হলেও বেশ আরামদায়ক।’

‘তাতেই আমার চলবে,’ বলল রানা।

‘পরে হয়তো আবার দেখা হবে, কী বলো? দুনিয়ার বেশিরভাগ জিনিস পেয়ে যাবে আমার দোকানে। দিন-রাত খোলা থাকে। ওপরতলায় ঘুমাই। তাই মাঝরাতে এলেও উঠনে এসে হাঁক দিলেই আমাকে পাবে।’

দোকানের ঝুঁকে আসা তাকগুলো দেখল রানা। ‘ঠিকই বলেছেন, আপনার দোকানে অনেক কিছুই আছে।’

একটু পর ওল্ড ইয়েলার ইনে পা রেখে রানার মনে হলো, মোটেলটা যেন আসলে পুরুষদের সাধারণ এক মেস। মালিকের মুখে দেড়হাতি ধূসর দাড়ি, পেটের জায়গায় উল্টে যাওয়া গামলার মত ভুঁড়ি। ওর আইডি দেখতে চাইল না সে। টাকা পেয়ে খুশি হয়ে রেখে দিল ড্রয়ারে। কারও চোখে পড়তে হবে না বুঝে রানাও বেশ সন্তুষ্ট। ঘরে ঢুকে পর্দা টেনে দেয়ায় ছায়াময় হয়ে গেল ভেতরটা। দরজা লক করে শাওয়ার সেরে নতুন প্যান্ট-শার্ট, পরে নিল রানা। মাথায় ক্যাপ চড়িয়ে চোখে সানগ্লাস পরে ব্যাগ হাতে রুম থেকে বেরিয়ে সোজা গিয়ে উঠল ফোর্ড ব্রঙ্কো জিপে।

টুলসার বাণিজ্যকেন্দ্র লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল রানা। ওর বুঝতে দেরি হলো না, এ-শহরের ওপর কী প্রচণ্ড প্রভাব ছিল অতীতের অয়েল বুম-এর। চারপাশের বাড়িঘর যেন চোখে আঙুল দিয়ে খোঁচা মেরে দেখাচ্ছে: অ্যাই, তোমরা কি জানো যে আমাদের সম্পদের শেষ নেই?

বিশাল পার্কে আছে দামি ফোয়ারা, চমৎকার লেক ও জলপ্রপাত। প্রাচুর্য প্রকাশ করার দিক থেকে সেরা হচ্ছে ব্যাঙ্ক অভ ওকলাহোমার আশপাশের এলাকা। প্রকাণ্ড বাড়িটা এই রাজ্যের সবচেয়ে উঁচু দালান। প্রেয়ারির মাঝে সে-সময়ের শক্তিশালী ডলারের গর্বিত বিশাল এর প্রতীক।

ম্যাপ দেখে ইস্ট সেকেণ্ড স্ট্রিটে সিটি হল খুঁজে নিল রানা। বিশাল দালানের সামনের দিক কাঁচ দিয়ে মোড়ানো। প্রবেশপথ থেকে দূরে রাস্তার ওদিকে জিপ রাখল রানা। চট্ করে দেখে নিল হাতঘড়ি। এখন বাজে বিকেল পৌনে পাঁচটা। নির্মেঘ নীলাকাশে ঝলমল করছে সোনালি সূর্য। পকেট থেকে ফোন নিয়ে আয়ারল্যাণ্ডে পাওয়া টুলসার সেই ল্যাণ্ডফোনে ডায়াল করল রানা।

আজ আবারও ধরল একই রিসেপশনিস্ট মেয়েটা। তার কণ্ঠে দক্ষিণী টান। ‘মেয়রের অফিস।’

‘হাই, আমি শেরিস্ ব্যাজ ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক থেকে টনি ব্র্যাডম্যান,’ বলল রানা।

‘কয়েক দিন আগে কল করেছিলেন, তা-ই না?’ শীতল কণ্ঠে বলল রিসেপশনিস্ট। ‘লণ্ডন থেকে?’

‘ঠিকই ধরেছেন। বিশাল ভবনের জানালাগুলোর দিকে চেয়ে মেয়েটা কোন্ অফিসে আছে, আনমনে ভাবল রানা। ভাল করেই জানে, এক শ’ গজ দূর থেকে দেখতে পাবে না কাউকেই। ‘মিস্টার কনার কি অফিসে আছেন?’

‘অফিসেই আছেন,’ বলল মেয়েটা। ‘কিন্তু এখন তাঁকে বিরক্ত করা যাবে না।’

‘তা হলে পরে যোগাযোগ করব,’ লাইন কেটে দিল রানা। ওর এটা জানা দরকার, ঠিক কখন অফিস থেকে বেরোবে মেয়র। ক’দিন তার পিছু নিয়ে সে কী ধরনের- অপরাধে জড়িত, সেটা জেনে নেবে। তারপর সময়মত কিডন্যাপ করে নিয়ে যাবে গোপন কোথাও। পেট থেকে বের করবে সব। হাতে আছে যথেষ্ট সময়, তাই ধৈর্যের কোন অভাব হবে না ওর।

জিপের জানালার কাঁচ নিচু করে নিল রানা। গরমের ভেতরে বসে মাঝে মাঝে এক ঢোক করে পানি গিলতে লাগল। চোখ সর্বক্ষণ সিটি হলের অফিসের ওপরে। এরই ভেতরে মুখস্থ করেছে ভবনের লেআউট। আরেকদিকে অন্য কোন প্রবেশপথ থাকতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে দু’দিকে চোখ রাখতে পারবে না। অবশ্য ভাল দিক হচ্ছে, এই প্রকাণ্ড ভবনের মেইন কার পার্ক মাত্র একটা। আর সেজন্যেই রানা ভাবছে,

অফিস থেকে বেরোলে সহজেই দেখতে পাবে মেয়র অ্যারন কনারকে।

একটু পর বিকেল পাঁচটায় ভবন থেকে বেরোতে লাগল মেয়রের অফিসের কর্মচারীরা। কেউ কেউ গিয়ে উঠল তাদের গাড়িতে। এরা অপেক্ষাকৃত সচ্ছল। অন্যরা হেঁটে কমপাউণ্ড থেকে বেরোতেই তাদেরকে পেছনে ফেলে গাড়িতে চেপে চলে গেল কর্মকর্তারা। জিপের টিন্টেড জানালার কাঁচ তুলে দিল রানা। এখন কাছে এলেও কেউ দেখতে পাবে না ওকে। অবশ্য জানালা বন্ধ করতেই দ্রুত গরম হয়ে গেল জিপের ভেতরটা। কিছুক্ষণ পর ঘেমে নেয়ে উঠল রানা। ব্যাগ থেকে নিয়ে চোখে লাগাল কমপ্যাক্ট বিনকিউলার। আঙুল দিয়ে ঘুরিয়ে গোল কব্জা থেকে আদায় করল ম্যাক্সিমাম যুম। সিটি হল থেকে বেরোচ্ছে নানান পদের অফিস স্টাফ।

বেশিরভাগ কর্মচারী মহিলা। ছোট দল তৈরি করে গল্প করতে করতে হাসিমুখে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। খুশি যে আজকের মত অফিস ছুটি। তাদের দিকে মন না দিয়ে পুরুষদের ওপরে চোখ রাখল রানা। কেউ কেউ বয়স্ক হলেও অন্যরা যুবক। কারও পরনে সুট, আবার কারও নেই। অবশ্য এদের ভেতরে নেই মেয়র কনার।

ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে রানা। ভবনের প্রবেশপথ থেকে সরে গেল না ওর চোখ। ধীরে ধীরে পেরোল আরও আধঘণ্টা। এখন প্রতি পাঁচ মিনিটে সিটি হল থেকে বেরোচ্ছে এক বা দু’জন। সোয়া ছয়টায় থেমে গেল মানুষের বেরোনো। চিন্তায় পড়ে গেল রানা। অন্যদের সঙ্গে চলে গেছে মেয়র কনার? নাকি কাজ শেষ করবে বলে রয়ে গেছে অফিসে?

বড়কর্তারা কখনও দেরিতে বেরোয়। তেমন হলে ক্ষতি নেই রানার। আপাতত কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই ওর।

পৌনে সাতটার পর কেউ আর বেরোল সিটি হল থেকে। রানার মনে হলো আর উচিত হবে না সময় অপচয় করা। বিনকিউলার নামিয়ে রেখে ব্যাগ থেকে নিল তৃতীয় ডায়েরি। দ্রুত পড়তে লাগল। একই সময়ে নজর রাখল সিটি ভবনের ওপরে।

একত্রিশ
চোখদুটো ভিজে গেছে জ্যাকির। আজ বাবা বেঁচে থাকলে এই বিপদে ওকে আগলে রাখত। ওর মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। প্রতিসপ্তাহে আবদার করত ও, আর বাবাও ওকে নিয়ে যেত চিড়িয়াখানায়। ওখানে বাবার হাত ধরে মজা করে ঘুরে বেড়াত জ্যাকি। পুরনো মধুর দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই চিড়িয়াখানায় চলে এসেছে ও। তা ছাড়া, এখানে এসেছে এক পরিকল্পনা নিয়ে। বছরের এ সময়ে চিড়িয়াখানায় থাকে শত শত মানুষ। তাদের ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারবে ও। ধরে নেয়া যায় এতজনের ভেতরে ওর ওপরে হামলা করবে না অ্যারন কনারের লোক।

অবশ্য পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর বন্ধ হবে চিড়িয়াখানা। তার আগেই ভেবে বের করতে হবে এরপর কী করবে। এখন শেষ বিকেল। খুব গরম পড়েছে। আকাশে হাসছে সোনালি রোদ। হাতিদের এলাকার বাইরে রেইলিঙে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাকি। মস্ত প্রাণীগুলোকে ভাল লাগে ওর। বুড়ো দাদুর মত কেমন ধীরস্থির, সবকিছুতে ধৈর্যের ছাপ। ওদেরকে আটকে রাখা হয়েছে বলে খারাপ লাগে, তবে নিজেদের দেশে পোচারদের হাতে খুন হয়ে যাওয়ার চেয়ে এখানে নিরাপদে থাকাই ওদের জন্যে ভাল।

হঠাৎ করে হাতিগুলোর প্রতি ভীষণ হিংসা এল জ্যাকির। বুঝে গেছে, ওদের জীবনের চেয়ে ঢের অনিরাপদ হয়ে গেছে ওর নিজের জীবন। যে-কোন সময়ে হয়তো খুন হবে।

বাড়িতে যে-লোক এসে হামলা করেছে, সে ছিল অ্যারন কনারের দলের পাণ্ডা। যদিও কোনভাবেই তা প্রমাণ করতে পারবে না জ্যাকি। একবার ভাবল: আমার কি উচিত ছিল তার মুখ খোলাবার চেষ্টা করা? ক্ষতের ওপরে হাঁটু রেখে পিস্তলের নল তার মুখে ঠেসে ধরলে হয়তো বহু কথা বলত। বা উচিত ছিল নাইন ওয়ান ওয়ানে ফোন দেয়া। কিন্তু তখন ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল পালিয়ে যেতে। সেটা বোধহয় ছিল ওর বড় ধরনের ভুল। যদিও বাড়ির বাইরে গাড়িতে যে-লোক ঘুমের ভান করে বসে ছিল, সে হয়তো যে-কোন সময়ে এসে হামলা করত।

না, পালিয়ে এসে ভুল করেনি ও। আর এবার ভেবে বের করতে হবে, এরপর কী করবে।

নতুন ফোন পার্স থেকে নিয়ে পুলিশ চিফ রিগবির নম্বরে কল দিল জ্যাকি। ওদিক থেকে ফোন ধরতেই বলল, ‘চিফ রিগবি? জ্যাকুলিন সিলভেস্টার বলছি। আপনি বলেছেন কোন প্রয়োজন হলে যেন আপনার সঙ্গে কথা বলি। তো এখন বাধ্য হয়েই কল দিয়েছি। আমার বাড়িতে ঢুকে হামলা করেছে একলোক।’ দ্রুত বলে গেল জ্যাকি। ওদিক থেকে চুপচাপ শুনল পুলিশ চিফ। বাদ পড়ল না সিরিঞ্জ ও গুলির কথা। ‘বাড়ির সামনে পার্ক করা সাদা গাড়ির ড্রাইভার এসবে জড়িত কি না, বলতে পারব না। তবে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে অ্যারন কনারের লোকেরা।’

‘মাথা ঠাণ্ডা রাখুন, মিস সিলভেস্টার,’ বলল চিফ রিগবি। ‘আপনি আপাতত কোথায় আছেন?’

‘শহরের চিড়িয়াখানায়। যদিও বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। একটু পর বন্ধ হবে চিড়িয়াখানা।’

‘জানি। আপনি ভাববেন না। ওখানে নিরাপদে আছেন। চিড়িয়াখানার গেট পেরোলে পার্কিং লটে পাবেন পেট্রল কার। ওখানে যান। আমি কথা বলছি অফিসারদের সঙ্গে। ওরা আপনাকে সরাসরি নিয়ে আসবে আমাদের এখানে।’

‘যে-কোন সময়ে আমার ওপরে হামলা হবে,’ জানাল জ্যাকি, ‘পুলিশ কি আমাকে নিরাপত্তা দেবে?’

‘নিশ্চয়ই! দুশ্চিন্তা করবেন না।’ ফোন কেটে দিল পুলিশ চিফ রিগবি।

ভিড় ঠেলে গেটের দিকে চলল জ্যাকি। কিন্তু কয়েক পা যেতেই শিরশির করে উঠল ওর মেরুদণ্ড। আগেও দেখেছে, কেউ আড়াল থেকে ওকে দেখলে এমন অনুভূতি হয়। ব্যাপারটা অদ্ভুত হলেও সত্যি।

যেদিক থেকে চোখ রাখা হচ্ছে, সেদিকে ঘুরে তাকাল জ্যাকি। ভিড়ের ভেতরে কাউকে আলাদা করার উপায় নেই। খিলখিল করে হাসছে ক’টা ছোট মেয়ে। এক পিচ্চির মুখে লেগেছে আইসক্রিম। পেছন থেকে এল বাঘের হুঙ্কার।

হেঁটে চলল জ্যাকি। মাইকে এল কর্তৃপক্ষের ঘোষণা। পনেরো মিনিটের ভেতরে বন্ধ করা হবে চিড়িয়াখানা। চট্‌ করে একবার হাতঘড়ি দেখে নিয়ে হাঁটার গতি বাড়াল জ্যাকি। মনে মনে বলল, ‘আশা করি মেইন গেটে পুলিশের গাড়ি পাব। অফিসাররা নিশ্চয়ই গাড়িতে করে পৌঁছে দেবে তাদের হেডকোয়ার্টারে।

কিন্তু গেটের ওদিকে পার্কিং লটে কোন পেট্রল কার দেখতে পেল না জ্যাকি। তাতে দুশ্চিন্তা বাড়ল ওর। পুলিশের লোক তা হলে কোথায়?

আবারও শিরশির করছে জ্যাকির মেরুদণ্ড। ঘুরে পেছনে তাকাল। পলকের জন্যে ওর মনে হলো, ভিড়ে চট্ করে সরে গেল একলোক। বোধহয় গোপনে পিছু নিয়েছে সে। কিন্তু সেটা করছে কতক্ষণ ধরে? চিড়িয়াখানায় জ্যাকি আসার পর থেকেই কি ওর ওপরে চোখ রেখেছে? এত দ্রুত সরে গেছে, তার মুখ দেখতে পায়নি জ্যাকি। তবে তার পরনে ছিল হলদে টি-শার্টের ওপরে চেক দেয়া শার্ট।

এত গরমেও শীতল এক কাঁপুনি ধরল জ্যাকির বুকে। আবারও দেখল হাতঘড়ি। গেটের এদিকে কোন পুলিশের গাড়ি নেই। ‘কোথায় গেল? তাদের তো এদিকেই থাকার কথা?’

পার্কিং লটের দিকে হনহন করে হেঁটে চলল জ্যাকি। যে- যার মত বাড়ির দিকে রওনা হচ্ছে দর্শকেরা। আগামী পাঁচ মিনিটের ভেতরে ফাঁকা হবে এ-এলাকা। আর এরই ভেতরে পুলিশের লোক না এলে, ওকে একা পাবে অনুসরণকারী শয়তানটা। পিছু যে নেয়া হচ্ছে, তা ওর মনের কোন কল্পনা নয়। হয়তো সেই সাদা গাড়ির লোকটা দলের কাউকে বলেছে এখানে চলে আসতে। জ্যাকি একা হলেই হামলা হবে ওর ওপরে। বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেও কোন লাভ হলো না। প্রথম সুযোগে এরা ধরে নিয়ে যাবে ওকে অ্যারন কনারের কাছে।

ধীরে ধীরে পেরোল আরেকটা মিনিট। চিন্তাগুলো বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে জ্যাকির। বুঝতে পারছে না এবার কী করা উচিত। ওকে পাশ কাটিয়ে যে-যার গাড়িতে উঠে বিদায় নিচ্ছে দর্শকেরা। গর্জে উঠছে একের পর এক ইঞ্জিন। পার্কিং লট থেকে রাস্তায় গিয়ে পড়ছে তাদের গাড়ি। আশপাশে পুলিশের কোন পেট্রল কার নেই।

ঘুরে পেছনে তাকাল জ্যাকি। চল্লিশ গজ দূরে দেয়ালের ওদিকে চট্ করে সরে গেল চেক শার্ট পরা একলোক। পলকের জন্যে তাকে দেখলেও জ্যাকি বুঝে গেল, ওরই পিছু নিয়েছে সে।

‘কী করবি ভেবে দেখ,’ মনে মনে বলল জ্যাকি। ভয়ে কাঁপছে ওর শরীর। একবার ভাবল, পিস্তল বের করে গুলি শুরু করব? ভয়ে হৈ-চৈ, হুলুস্থুল করবে দর্শকেরা। পরে যদি প্রমাণ হয়ে যায় যে ওর ভুল হয়েছে, তো ব্যাপারটা শেষমেশ গড়াবে আদালতে।

লোকটা কখন হামলা করবে, সেজন্যে অপেক্ষা করব? – ভাবল জ্যাকি। কপাল ভাল হলে প্রথম গুলি লক্ষ্যভেদ করবে। কিন্তু সেটা যদি না হয়? দ্বিতীয় সুযোগ কি আর পাবে ও?

পুলিশের জন্যে অপেক্ষা করে কোন লাভ হবে না। অফিসাররা হয়তো আছে কয়েক মাইল দূরে। এখন একমাত্র যে-কাজ করতে পারে জ্যাকি, সেটা হচ্ছে পুলিশের হেডকোয়ার্টারে নিজেই পৌছে যাওয়া।

মনস্থির করে ভিড় করা লোকগুলোর সঙ্গে পার্কিং লটে নিজের গাড়ির দিকে চলল জ্যাকি। বারবার দেখে নিচ্ছে পেছনদিকে। কোথাও নেই চেক শার্ট পরা লোকটা। যদিও জ্যাকির পিঠে যেন বিঁধে যাচ্ছে তার চোখ। গাড়ির কাছে পৌছে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল ও। ইঞ্জিন চালু করে পিছিয়ে গিয়ে ঘুরে এগিয়ে চলল অন্যান্য গাড়ির পেছনে। একটু পর পেরোল এয়ারপোর্ট। চওড়া হাইওয়ে দক্ষিণে গিয়ে সরাসরি ঢুকে পড়েছে শহরে।

পাঁচ মিনিট পর রিয়ারভিউ মিররে চোখ যেতেই ধক করে উঠল জ্যাকির বুক। পেছনে হাজির হয়ে গেছে সেই সাদা গাড়ি। চিড়িয়াখানায় গিয়েছিল ওটার ড্রাইভার। ওখান থেকে পিছু নিয়েছে আবারও। পথ থেকে চোখ সরাতে পারছে না জ্যাকি। ফলে ভাল করে দেখতে পাচ্ছে না পেছনের গাড়ি। ওটা বোধহয় ড্রাইভ করছে সেই একই লোক। গাড়ির উইণ্ডশিল্ডে রোদ পড়েছে বলে ভেতরে দেখা গেল না কে আছে। পরের জংশানে ডানদিকে বাঁক নিয়ে চেরোকি এক্সপ্রেসওয়ের দিকে চলল জ্যাকি। বুঝতে চাইছে সত্যিই ওর পিছু নিয়েছে কি না লোকটা।

হ্যাঁ, ওর ধারণা বোধহয় সঠিক।

বাঁক ঘুরে পেছনে পেছনে আসছে গাড়িটা। হঠাৎ করেই কোন সিগনাল না দিয়েই বামে বাঁক নিয়ে আবার দক্ষিণে গিয়ে হার্ভার্ড অ্যাভিন্যুতে পড়ল জ্যাকি। সাদা গাড়িটাকে দেখতে পেল রিয়ারভিউ মিররে। এখন আর ওর মনে কোন সন্দেহ নেই যে, ওকেই অনুসরণ করছে লোকটা।

পকেটের পিস্তল স্পর্শ করে মনে মনে বলল জ্যাকি, ‘ভয় কী, আমার সঙ্গে পিস্তল আছে। নিরাপত্তা নিয়ে এত ভাবতে হবে না। এত দূর যখন চলে এসেছি, তো বাকি পথও পার করে গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারব।’

নিজেকে যতই শান্ত রাখার চেষ্টা করুক জ্যাকি, আসলে খুব ভয় লাগছে ওর।

বত্রিশ
সিটি হলের ওপরে চোখ রেখেছে রানা। তারই ফাঁকে দেখছে ব্রঙ্কো জিপের স্টিয়ারিং হুইলের ওপরে রাখা লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরি। সিগারেটের তৃষ্ণা পেতেই নিজেকে জানিয়ে দিল, ‘ওই জিনিস আর নয়। আঠারো শ’ সাতচল্লিশ সালের ডায়েরিতে আবারও মন দিল।

একটু পর বেড়ে গেল ওর হতাশা। ডায়েরিতে এমন কিছু নেই, যেটা রহস্যজনক। প্রফেসর কেলির ওপরে বিরক্তি বোধ করছে রানা। লোকটা নিজে থেকেই বলতে পারত, দুর্ভিক্ষের সময়ে আসলে কী ঘটেছে। ডায়েরিতে নতুন করে আর কিছু লেখা হয়নি বায়ার্ন কনারের ব্যাপারে। এমন কোন সূত্র নেই, যা থেকে বোঝা যাবে আসলে কী জেনেছিল বেলা।

অবশ্য দক্ষ এক লেখিকা ছিলেন মিসেস স্টার্লিংফোর্ড। এখনও নিজের লেখার মাধ্যমে টেনে রেখেছেন রানাকে।

‘আজ জানলাম, আমার স্বামীর নির্দেশে আইরিশদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে সব ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র। আমাদের জমিদারীতে ক্ষুধার্ত কয়েকজন লোক দুটো খরগোশকে গুলি করে মেরে আগুনে পুড়িয়ে খেয়েছিল। ফলে প্রহরীদেরকে পাঠিয়ে তাদেরকে ধরে এনে চরম শাস্তি দিয়েছে অ্যাঙ্গাস। আমি আপত্তি তুলেছিলাম। আমাকে শাসিয়ে দিয়েছে সে: আজ মারছে খরগোশ। এরপর হামলা করবে ইংরেজদের ওপরে। এদের হাতে অস্ত্র থাকা মানেই আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাওয়া।

‘আজই সকালে কাছের কয়েকজন ভাড়াটের সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছি। তাদের হাতে দিয়েছি আমার কাছে থাকা সামান্য কিছু টাকা। ওগুলো দিয়ে বাচ্চাদেরকে হয়তো কয়েক দিন খাবার কিনে দিতে পারবে তারা। আমার স্বামী জানে না, আমাকে উপহার দেয়া তার গয়না গোপনে বিক্রি করতে শুরু করেছি আমি। এক বাড়িতে দেখলাম তিনটে ছেলেমেয়ে। পরনে ছেঁড়া পোশাক। চোখ ঢুকে গেছে গর্তে। এতই দুর্বল যে উঠে বসতে পারে না। উল্টোদিকে খড়ের বিছানায় মৃত্যুপথযাত্রী মধ্যবয়স্ক একলোক। বাড়ির কর্ত্রী অনুরোধ করল যেন তাদেরকে সামান্য খাবার এনে দিই। কিন্তু কিছু টাকা দেয়া ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না।

‘মানুষের এই করুণ পরিণতি দেখতে হচ্ছে বলে মানসিকভাবে আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি দিনের পর দিন। পাশের কয়েকটি বাড়িতেও সবারই একই দুরবস্থা। সবাই অপেক্ষা করছে নিশ্চিত মৃত্যুর জন্যে। টিলার ওদিকে গিয়ে দেখলাম আগুনে জ্বলছে কুঁড়েঘরগুলো। এ-কাজ করেছে আমার নিজের স্বামী। প্রজারা এলাকা থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে, অথবা তারা এখন আর বেঁচে নেই। এই মানুষগুলোর জন্যে কোন কফিনের বরাদ্দ দেয়া হয়। স্রেফ লাশ পুঁতে ফেলা হয় মাটিতে। ইংরেজদের অত্যাচার ও নির্যাতনের নমুনা দেখে ঘোড়া থামিয়ে অনেকক্ষণ কাঁদলাম।

‘গতকাল আস্তাবলে এসেবেলা নামের এক কাজের মেয়ের সঙ্গে আমার কথা হলো। আঁধারে বসে কাঁদছিল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার কী হয়েছে?’

‘জবাবে মেয়েটা যা বলেছে, তাতে শিউরে উঠেছি ভয়ে। সারারাত আর ঘুমাতে পারিনি। এই যে এখন ডায়েরি লিখছি, তিরতির করে কাঁপছে আমার আঙুল।

পরিবারের মানুষগুলোকে বাঁচাবার জন্যে ইংরেজদের খাবারের বিশাল কনভয়ের ওপরে হামলা করেছিল কয়েকজন আইরিশ যুবক। তাদের হাতে ছিল সামান্য কয়েকটা লাঠি। দুর্বল শরীরে জোর ছিল না তাদের। ইংরেজ সৈনিক দলের হাতে ধরা পড়ে এদের এগারোজন। ডাকাতি করার চেষ্টা ধরে নিয়ে তাদেরকে ফাঁসি দিয়ে খুন করেছে। তাদেরই একজন এসেবেলার আপন বড় ভাই।

‘আজ সকালে অ্যাঙ্গাসকে অনুরোধ করেছি, জমিদারীতে যারা এখনও বেঁচে আছে, তাদেরকে যেন খাবার সরবরাহ করে সে। টাকার তো অভাব নেই তার। কিন্তু আমার মুখের ওপরে টিটকারির হাসি হেসেছে সে। বলেছে, এরপর আইরিশেরা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে খরগোশ বা অন্য কোন প্রাণী হত্যা করতে গেলে তাদেরকেও নির্দ্বিধায় হত্যা করা হবে।

ভয়ঙ্কর বাজে লোক অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড, সেটা ভাল করেই বুঝে গেছে রানা। ডায়েরি থেকে চোখ তুলে তাকাল টুলসা সিটি হলের দিকে। গত কয়েক মিনিটে কেউ বেরোয়নি। যে-কারণেই হোক, আজ অফিসে বেশি সময় কাটাচ্ছে অ্যারন কনার। হয়তো গভীর রাতে বেরোবে। অবশ্য তাতে কোন সমস্যা নেই রানার।

আবারও চোখ বোলাতে লাগল ডায়েরির পাতায়। লেডি স্টার্লিংফোর্ড বর্ণনা দিয়েছেন, কত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় কনভয়ের ওপরে হামলা করা আইরিশদেরকে। এলি নামের একজন আহত ছিল। জেলখানা থেকে বের করে ছেঁচড়ে নিয়ে গিয়ে তাকে তোলা হয় ফাঁসির মঞ্চে। তখন লেডির কেমন লেগেছে ভাবতে গিয়ে তিক্ত হয়ে গেল রান্নার মন। মহিলা যদি পারতেন, তো নিজেই যোগ দিতেন আইরিশ, লুঠেরা দলে। এবং সেটা করলে তাঁকেও যে ছেড়ে দেয়া হতো না, সেটা লিখেছেন তিনি।

ইংরেজ সৈনিকরা আহত না হলেও একে একে ফাঁসি দেয়া হয়েছে এগারোজন আইরিশকে। চরম অন্যায় করা হয়েছে দেশটার সাধারণ মানুষের ওপরে। রানার মনে পড়ল, ভারত উপমহাদেশে ইংরেজদের নির্যাতনের নিষ্ঠুর ইতিহাস। নরপশু শ্বেতাঙ্গ শাসকেরা ভাবত ভারতের সাধারণ জনগণ আসলে বড়জোর নেড়ি কুকুর। কাজেই সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের ছিল না কোন অধিকার।

পাতা উল্টে দ্রুত পড়ল রানা। একজায়গায় এসে সরু হয়ে গেল ওর দু’চোখ। বিড়বিড় করে বলল, ‘বলে কী!’ ওর মনে পড়ল প্রফেসর কেলির বক্তব্য: ‘ডায়েরিতে সবই পাবেন। ওগুলো পড়তে এসেছেন। সেটাই বরং করুন। আগেই আপনাকে সেটা করতে বলেছি।’

হঠাৎ করে রানা বুঝেছে, ডায়েরিতে পেয়েছে খুব জরুরি এক তথ্য। লেডি স্টার্লিংফোর্ডের হাতের লেখা অস্পষ্ট হলেও বক্তব্য আগুনের মত জ্বলজ্বলে। দ্বিতীয়বারের মত লেখাগুলো পড়ল রানা।

আগস্টের বাইশ তারিখ, আঠারো শ’ সাতচল্লিশ

‘এমন এক ঘটনা আবিষ্কার করে বসেছি, যেটার কারণে সত্যিই ভীষণভাবে কেঁপে গেছি। এ-ধরনের তথ্যের কারণে হয়তো খুন হব আমি। আজ হেনরি ফ্লেচার এবারডেন হলে থাকলে তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে পারতাম। এখন এমন কেউ নেই যাকে এসব কথা বলতে পারব। কাউকে বোঝাতে পারব না কীভাবে দুমড়ে যাচ্ছে আমার হৃদয়।

‘মাঝে মাঝে ভাবতাম, বাড়ির পুবে আমার স্বামীর ল্যাবোরেটরিতে বসে আসলে কী করে সে। কাজের মানুষকে ওদিকে যেতে দিত না অ্যাঙ্গাস। এমন কী আমারও অনুমতি ছিল না ল্যাবোরেটরিতে পা রাখার। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে-ঘরে কাটাত অ্যাঙ্গাস। কাজ শেষে বেরিয়ে এসে তালা মেরে দিত দরজায়। নিজের কাজের ব্যাপারে কারও সঙ্গে কথা বলত না। আমাকে এ-কথাও বলেছে, সে গাছের ওপরে যে ধরনের জটিল গবেষণা করে চলেছে, তার কিছুই আমি বুঝতে পারব না।

‘বড় কৌতূহল হতো আমার। তাই কখনও কখনও গোপনে চলে যেতাম ল্যাবোরেটরির দরজার কাছে। উকি দিতাম তালার ফুটোর ভেতরে। কিন্তু সবসময় দেখতাম ওদিকের সাদা রঙ করা দেয়াল।

‘নিজের ল্যাবোরেটরিতে মাত্র একজনকে ঢুকতে, দিত অ্যাঙ্গাস। তিনি রয়েল সোসাইটি কলেজের প্রফেসর নরম্যান আর্চিবল্ড। এবারডেন হলে এসে দিনের পর দিন কাটাতেন তিনি। সত্যিকারের একজন সম্মানী মানুষ হিসেবে আমিও তাঁকে শ্রদ্ধা করতাম। যদিও পারতপক্ষে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন না তিনি। আমার মনে হতো, কী যেন গোপন করে রেখেছেন। ল্যাবোরেটরিতে ঢুকে নিচু গলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করতেন অ্যাঙ্গাসের সঙ্গে।

‘এভাবে পেরিয়ে গেছে অনেক সময়। আর তারপর সবই জেনে গেলাম আমি। সংক্ষেপে বলছি, কীভাবে জোগাড় করেছি ল্যাবোরেটরির দরজার চাবি। আমার স্বামীর ডেস্কের ওপরে চুরুটের বাক্সে ছিল ওটা। গতকাল অ্যাঙ্গাস বাসায় নেই দেখে পুব উইঙে গিয়ে ঢুকলাম ওর ল্যাবোরেটরিতে। মনের ভেতরটা খচ খচ করছিল যে অপরাধ করছি।

‘ল্যাবোরেটরি কক্ষ যত বড় ভেবেছি, তার চেয়ে অনেক ছোট। টেবিলে নানান যন্ত্রপাতি, কাগজপত্র আর অনেকগুলো বই। সহজে বুঝে গেলাম, গাছ নিয়ে জটিল কোন গবেষণা করছে অ্যাঙ্গাস। ওর হাতে লেখা কিছু কাগজ পড়েও কিছুই বুঝলাম না। তবে এটা জেনে গেলাম, ‘নানান ধরনের এক্সপেরিমেন্টের রেযাল্ট টুকে রেখেছে সে। এই কাজটা করেছে আঠারো শত পঁয়তাল্লিশ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত মোটা এক বইয়ে দেখলাম একটা গাছের স্কেচ। একই জিনি এঁকেছে অ্যাঙ্গাস। ওদিকের দেয়ালে কাঠের তাকে কাঁচের জারে সারি সারি করে সাজিয়ে রেখেছে গাছের নমুনা। প্রতিটি জারের ওপরে লেখা সে-সময়ে গাছের কী অবস্থা ছিল! চোখ বুলিয়ে বুঝলাম, সুস্থ গাছ থেকে শুরু করে অসুস্থ হওয়া গাছ আর শেষে ওটার পচে যাওয়া অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করেছে অ্যাঙ্গাস।

‘বোটানির কিছুই বুঝি না। কিন্তু আয়ারল্যাণ্ডে গত কয়েক বছর ধরে থেকে এটা বুঝেছি, জারগুলোর ভেতরে রয়েছে সাধারণ আলুর গাছ। এ-দেশে যে-কোন খেতে ওটা দেখা যায়। নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম: অ্যাঙ্গাস আর তার সঙ্গী প্রফেসর আসলে এসব গাছ নিয়ে কী ধরনের গবেষণা করছে? এর জবাব পেলাম একটু পর।

‘টেবিলের ওপরে ছিল কাঠের ছোট বাক্স। ওটার ভেতরে ভেলভেটের খোপে দেখলাম ছোট ছোট ভায়াল। সেগুলোর ভেতরে থকথকে একধরনের তরল। সাহস করে একটা ভায়ালের ছিপি খুললাম। নাকের কাছে নিতেই বমি চলে এল আমার। চট করে আবারও ছিপি আটকে আগের জায়গায় রেখে দিলাম। প্রতিটা ভায়ালের ওপরে অ্যাঙ্গাস লিখে রেখেছে: ‘ফিটোফোরা ইনফেস্ট্যান্স।

‘জিনিসটা আসলে কী সেটা বোঝার পর দেরি না করে ল্যাবোরেটরির দরজা লক করে পালিয়ে এসেছি। অ্যাঙ্গাসের স্টাডিতে গিয়ে চুরুটের বাক্সে চাবি রেখে দিয়েছি। এরপর ওর লাইব্রেরি থেকে সংগ্রহ করলাম গ্রিক ভাষার ওপরে লেখা এক ডিকশনারি। বহুক্ষণ লাগল ফিটোফোরা ইনফেস্ট্যান্স শব্দদুটো খুঁজে নিতে। গ্রিক ভাষায় ফিটো অর্থ ধ্বংস করা বা নষ্ট করে দেয়া। আর ইনফেস্ট্যান্স মানে সংক্রমণ ঘটিয়ে দেয়া।

‘তা হলে কি সংক্রমণ ঘটিয়ে দেয়ার মাধ্যমে আলুর গাছ ধ্বংস করে দিয়েছে অ্যাঙ্গাস? তা হলে সে এবং তার বন্ধু এই ভয়ঙ্কর গবেষণাই করেছে এতদিন ধরে? হলদেটে তরল আর আলুর গাছ নষ্ট হয়ে যাওয়া তা হলে কীসের আলামত? তবে কি এই দেশের আলুর খেতের সব গাছ ধ্বংস করে দিয়েছে এই দু’জন মিলে?

কেমন যেন ঘুরতে লাগল আমার মাথা। এ যেন সত্যিকারের দুঃস্বপ্নের মত। নানান সময়ে আলুর গাছের নমুনা জারের ভেতরে সংগ্রহ করেছে অ্যাঙ্গাস। কিন্তু এ যে সত্যিই ভয়াবহ ঘটনা!

‘আমি বিজ্ঞানী নই, তবে এটা বুঝতে দেরি হয়নি যে জেনে-বুঝে এই দেশের সমস্ত আলুর গাছ নষ্ট করে দিয়েছে অ্যাঙ্গাস আর প্রফেসর আর্চিবল্ড। আর তার ফলে এই দেশে দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভিক্ষ।

‘হায় ঈশ্বর, আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন!

‘আমি যে আর কিছুই বুঝতে পারছি না!

‘তবে কি এ-দেশের দুর্ভিক্ষের পেছনে রয়েছে আমার স্বামী?’

বহু বছর আগে কী ধরনের ভয়ঙ্কর অন্যায় করা হয়েছে আয়ারল্যাণ্ডের মানুষের ওপরে, সেটা জেনে হতবাক হয়ে ডায়েরি বন্ধ করল রানা।

মেডেইরা দ্বীপে ‘প্রফেসর কেলি কী বলেছিলেন, সেটা মনে পড়ল ওর। ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করার পর আঠারো শত চল্লিশের দশকে দু’বার প্যারিসে নামকরা এক ফরাসি বিজ্ঞানীর সঙ্গে দেখা করে অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড। দু’জন তখন গাছের ফিটোফোরা ইনফেস্ট্যান্স বা মহা সংক্রমণের ওপরে গবেষণা করেছে। আর তখন তারা বেছে নিয়েছে আলুর গাছ।

তাদের গবেষণা সফল হওয়ার পর শুরু হয় আয়ারল্যাণ্ডে আলুর গাছে মড়ক গোটা দেশের বড় এক অংশের মানুষ বাধ্য হয় না খেয়ে মরে যেতে। ঊনবিংশ শতকে যদি একদল বিজ্ঞানী এই ধরনের রোগ ছড়িয়ে দিয়ে থাকে, তা হলে তাদের তো এটাও জানার কথা, তাদের ফর্মুলার প্রকোপ কীভাবে ঠেকাতে হবে।

প্রফেসর কেলির কন্ঠস্বর ভেসে এল রানার কানে: ‘আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে ওটাকে দুর্ভিক্ষ বলব না। ডায়েরি পড়লে আপনি বুঝবেন, ওটা অন্যকিছু ছিল।’

প্রাকৃতিক দুর্যোগ এক কথা, আর, গোটা এক দেশের ভাগ্যে প্রলয়ঙ্করী দুর্ভিক্ষ ডেকে আনা অন্যকিছু। জেনেবুঝে আয়ারল্যাণ্ডের সাধারণ মানুষের মুখের খাবার কেড়ে নিয়েছিল শাসক জাতি ইংরেজেরা। ফলে সে-সময়ে বাধ্য হয়ে মৃত্যুবরণ করে কমপক্ষে বিশ লাখ মানুষ।

তৃতীয় ডায়েরিতে রয়ে গেছে কী রহস্য, সেটা এখন বুঝে গেছে রানা। উইণ্ডশিল্ড ভেদ করে চোখ বোলাল আকাশে। পুরো ব্যাপারটা হজম করতে গিয়ে ওর মনে হলো, আঠারো শ’ ছিচল্লিশ সালে আয়ারল্যাণ্ডের চরম অকাল আসলে ছিল এক শ’ মেগাটন পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের সমান!

আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে পথের ওদিকে নড়াচড়া দেখল রানা। সোজা হয়ে বসল জিপের ড্রাইভিং সিটে। এইমাত্র সিটি হল ভবনের সামনে ব্রেক কষে থেমে গেছে একটা গাড়ি। লাফিয়ে ওটা থেকে নামল দু’জন লোক। দ্রুত পায়ে ঢুকে পড়ল ভবনের ভেতরে।

তার আগে বিনকিউলারে চেহারাদুটো দেখে নিয়েছে রানা। তাদেরকে আগেও দেখেছে মেডেইরাতে। এখন পরনে সাধারণ পোশাক। একজনের মাথায় খোঁচা-খোঁচা চুল, দ্বিতীয়জনের মাথায় পনিটেইল। তার গেঞ্জির ওপরে লেখা: ইউ কিল মি, আদারওয়াইয ইউ উইল বি কিল্ড। ভবনে পা রাখার আগে প্যান্টের পকেট থেকে র‍্যাপার নিয়ে ওটা খুলে মুখে কী যেন পুরেছে।

রানা বুঝল, ওটা নিকোটিন গাম। বিড়বিড় করে বলল ও, ‘আশা করি আমাদের আবারও দেখা হবে।’

তেত্রিশ
এয়ার কণ্ডিশণ্ড অফিসে নিজের সিটে বসে আছে মেয়র অ্যারন কনার। ওদিকের দেয়াল থেকে তাকে দেখছেন বর্তমান পোপ, জেএফকে, আর রবার্ট কেনেডি। মেয়রের অফিসে ডেমোক্রেটিক নেতাদের ছবি দেখলে নাক সিটকাবে কনারের প্রতিদ্বন্দ্বীরা। আসলে আইরিশ-আমেরিকানদের খুশি করতেই নিজের অফিসে এসব ছবি রেখেছে অ্যারন।

কালো বিশাল চেয়ারে বসে দামি বুট ডেস্কের ওপরে তুলে দিয়েছে সে। আপাতত অফিসের দরজা লক করা। আজকের মত অফিস থেকে বিদায় নিয়েছে মাটিল্ডা টেস ও তার সহকর্মীরা। ফলে এখন আর বেআইনি কুকীর্তিতে নিয়োজিত লোকজনের সঙ্গে ফোনে আলাপ সেরে নেয়ার জন্যে বাথরুম বা গাড়ি ব্যবহার করতে হবে না তাকে। আলাপ করছে নিউভো লারেডোতে পার্টনার লুই গৌরলের সঙ্গে। ওই লোক আছে এখন মরুভূমির ভেতরে। সেজন্যে কড়কড় আওয়াজ করছে অ্যারনের ফোনের স্পিকার। নিচু গলায় কথা বলছে গৌরলে। বেআইনি কাজের আলাপ করার সময় বেশিরভাগ অপরাধীর গলার আওয়াজ নিচুই হয়।

দু’জনের করা আলাপে নেই কারও কোন নাম। মালপত্র লেনদেনের বিষয়েও ব্যবহার করছে ছদ্মনাম। কেউ ফোনে আড়ি পাতলেও কিছুই বুঝবে না। পুরো সাতাশ মিনিট কথা বলার পর তারা স্থির করল, আগামী সপ্তাহে দক্ষিণে যাবে শিপমেন্ট। এবারের চালান আগের চেয়ে অনেক বড়। তাই দু’পক্ষ চাইছে কোথাও যেন কাজে কোন ত্রুটি না থাকে। অ্যারন কনার পুরো আত্মবিশ্বাসী, তার তরফ থেকে কোন ভুল হবে না। সে-রাতে কটেজে খুন হয়েছে হিউবার্ট। পরে গুম করা হয়েছে তার লাশ।

‘এখনও সামান্য কিছু সমস্যা রয়ে গেছে,’ গৌরলেকে বলল অ্যারন।

‘সেটা এখনও কাটানো হয়নি?’ বলল তার পার্টনার।

‘তা করা হয়েছে। আমার মনে হয় না আর কোন ঝামেলা হবে।’ মৃদু হাসল অ্যারন। ‘আমার যা করার, সবই করেছি।’

ফোনালাপের মাঝে হঠাৎ করেই পর পর তিনবার টোকার আওয়াজ হলো মেয়রের অফিসের দরজায়। কথা বলতে গিয়ে থমকে গেছে কনার। নিচে নামছে দরজার হ্যাণ্ডেল। রেগে গেল সে। কোন্ গাধা তাকে বিরক্ত করছে? নিশ্চয়ই কোন কুত্তার বাচ্চা মেথর!

‘আগের কথা অনুযায়ী ঠিক সময়ে স্টেশনে হাজির হব, ‘ বলছে গৌরলে। ‘আশা করি সঠিক সময়ে রওনা হবে ট্রেন।

‘কখনও তো লেট করে না,’ জবাব দিল অ্যারন।

‘যদিও টিকেটের দাম ক্রমে বেড়ে চলেছে।’

‘কিন্তু সঠিক সময়ে পৌঁছে যাচ্ছে যাত্রীরা। আর সেজন্যে তারা খুশি। তা-ই তো?’

ধুপ-ধুপ করে হাত দিয়ে দরজায় বাড়ি দিচ্ছে কে যেন।

বিরক্ত হয়ে দরজার দিকে তাকাল অ্যারন। মুচড়ে দেয়া হয়েছে হ্যাণ্ডেল। মেথরটা কি ধরে নিয়েছে ফেঁসে গেছে দরজা?

‘পরে আবারও আমাদের কথা হবে,’ বলে লাইন কেটে দিল অ্যারন। আগের চেয়ে জোরে ধাক্কা দেয়া হচ্ছে কবাটে। চেয়ার ছেড়ে গিয়ে দরজা খুলল অ্যারন কনার। পরক্ষণে ঘেউ ঘেউ করে উঠল, ‘বিরক্ত করছ কেন! আমি ব্যস্ত!’

কিন্তু দরজায় আসেনি কোন মেথর।

‘ব্যাপারটা কী, তোমরা এখানে!’ বিস্মিত হলো অ্যারন। সামনে দাঁড়িয়ে আছে বার্ব ও স্ক্যালেস। ভয় পেয়ে চট্ করে করিডরে উঁকি দিল মেয়র। কপাল ভাল অফিসে এখন আর কেউ নেই। দাঁতে দাঁত চেপে নিচু গলায় বলল সে, ‘ভেতরে ঢোকো। আমি না তোমাদেরকে বলেছি কখনও এখানে পা রাখবে না?’ দুই খুনি ঘরে ঢুকতেই পেছনে দরজা লক করল সে।

‘আপনি তো আধঘণ্টা ধরে ফোনে কথা বলছেন, বস, বিরক্ত স্বরে বলল বার্ব। ‘অনেকক্ষণ ধরেই আপনাকে ফোনে চেয়েছি। ব্যাপারটা জরুরি। ঝামেলা হয়ে গেছে।

‘কী এত মস্ত বিপদ হয়ে গেল যে আমার অফিসে চলে আসতে হবে? তোমাদের কি মাথা নষ্ট হয়ে গেছে?’

‘গুলি খেয়েছে ক্রমম্যান।’

‘কী খেয়েছে?’ চমকে গেল অ্যারন।

‘ওকে গুলি করেছে সিলভেস্টার বেটি,’ চুইংগাম চিবুতে চিবুতে বলল স্ক্যালেস। তার মুখের নিকোটিনের গন্ধ ভক করে লাগল কনারের নাকে।

‘গ্রুম্যান কি খুন হয়ে গেছে?’ ঢোক গিলল অ্যারন। ‘বহু দিন আর হাঁটতে পারবে না, তাতে ভুল নেই,’ বলল স্ক্যালেস।

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল মেয়র। ‘বার্ব, আমি তোমাকে পই পই করে বলেছি, দায়িত্বশীল কাউকে কাজটা দিতে।’

‘নাইন মিলিমিটারের বুলেট দক্ষতার সঙ্গে কাজ শেষ করে,’ নিচু গলায় বলল বার্ব। ‘হাঁটুর ওপরের মাংসে লেগে ক্যানসাসের ম্যাপের মত বড় এক ক্ষত তৈরি হয়েছে ওর। আরেকটু হলে ছিঁড়ে পড়ত পা। মেয়েলোকটা বোধহয় ব্যবহার করে হলো পয়েন্ট বুলেট।’

‘শালার কপাল,’ বিড়বিড় করল কনার। পরক্ষণে রেগে গেল। ‘সহজ এক কাজে এত বড় গোলমাল করলে কী করে?’

‘এত ঘাবড়ে যাবেন না, বস,’ বলল স্ক্যালেস। ‘সবই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। পুলিশ কোনকিছুই জানবে না।’

‘আরে, গাধা, পুলিশ নিয়ে ভাবছি না,’ ধমকে উঠল অ্যারন। ‘তোমাদের তো বোঝার কথা, কীভাবে সেই ভিডিয়োর কথা জানলাম।’ বার্বের দিকে তাকাল সে। ‘ওই মেয়েলোকই ভিডিয়ো করেছিল। বেটি তো আর ইউএস মেরিন নয়! ভেবেছিলাম গ্রুমম্যান নিজের সঙ্গে আরও লোক নেবে।

‘নিয়েছিল তো বেন্টলিকে,’ বলল বার্ব।

‘তা হলে তাকেও গুলি করেছে?’ গর্জে উঠল অ্যারন।

‘সে ছিল বাইরে গাড়ির ভেতরে,’ বলল বার্ব। নিজের পায়ের পাতার দিকে তাকাল। ‘প্ল্যান অনুযায়ী লুকিয়ে ছিল। কথা ছিল মেয়েটাকে তুলবে গাড়ির ট্রাঙ্কে। কিন্তু একটু পর দেখা গেল বাড়ি থেকে ছিটকে বেরোল মেয়েটা। গাড়ি নিয়ে কোথায় যেন চলে গেল।’

‘বেন্টলি ছিল তার বন্ধুর কাছ থেকে সামান্য দূরে। অথচ গুলির আওয়াজ পেল না? হারামজাদা কি কালা নাকি?’

‘ইয়ারফোনে গান শুনছিল,’ লজ্জিত চেহারায় বলল বার্ব।

‘কীসের গান?’

লালচে হয়ে গেল বার্বের দু’গাল। ‘হেভি মেটাল গান। ফুল ভলিউমে শুনছিল।’

‘এরপর থেকে বেন্টলি কম শুনলে সঙ্গে সঙ্গে ওর মগজে একটা বুলেট গেঁথে দেবে,’ রাগ সামলাতে না পেরে বলল অ্যারন। ‘এটা নির্দেশ! না, বাদ দাও, বরং এখনই ওর মগজে বুলেট গেঁথে দাও। এখন বোধহয় তোমরা বলবে: মেয়েলোকটাকে হারিয়ে ফেলেছে সে, তাই তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?’

এবার মুখ তুলে তাকাল বার্ব। ‘বেন্টলি এরপর ঢুকে পড়ে বাড়ির ভেতরে। সিঁড়িতে দেখে ক্রমম্যানকে। তার পা প্রায় ছিঁড়ে গেছে। ক্ষত থেকে ঝরঝর করে পড়ছিল রক্ত। গ্রুমম্যান জানাল একটু আগে কী ঘটেছে। তখন তাকে গাড়িতে তুলে মেয়েটার পিছু নিল বেন্টলি। তাকে ধরতে পারল গিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে। ততক্ষণে দলের আরও কয়েকজনকে ডেকে নিয়েছে গ্রুমম্যান।’

‘ক্রমম্যান বেঁচে থাকুক বা মরে যাক, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না,’ বলল অ্যারন। ‘আমার দরকার ওই বেটিকে হাতের মুঠোয় পাওয়া। এরপর কোথায় গেল সে?’

‘গ্রুমম্যান বলেছে মেয়েটা সোজা গেছে চিড়িয়াখানায়। তারপর থেকে আর যোগাযোগ করেনি সে। তখন থেকে আপনাকে ফোন করছি, কিন্তু লাইন বিযি ছিল। এরপর বাধ্য হয়ে এখানে এসেছি আমরা।’

‘চিড়িয়াখানা,’ ঘোঁৎ করে উঠল মেয়র কনার।

‘গ্রুমম্যান তো সেটাই বলল।’

‘ওখানে গিয়ে কী করবে বেটি? বাঁদরদের খাঁচার সামনে গিয়ে ভেঙচি কাটবে?’

খিঁক-খিঁক করে হাসল স্ক্যালেস।

তাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেবে ভাবল কনার, কিন্তু তখনই পকেটে বাজল ফোন। কল করেছে রিপার রিগবি।

‘বলুন তো দেখি এইমাত্র আমাকে ফোন করেছে কে?’ বলল চিফ অভ পুলিশ। ‘খুব ভয় পেয়ে গেছে সে। বলল: কে যেন তাকে কিডন্যাপ করতে চায়। আপনার ছেলেরা নাকি, মিস্টার মেয়র?’

‘আমি এ-ব্যাপারে কিছুই জানি না,’ বলল অ্যারন। ‘তবে জানতে চাই মেয়েটা এখন কোথায় আছে।’

‘শহরের চিড়িয়াখানায়, বলল রিগবি। ‘তাকে তুলে নেয়ার জন্যে রওনা হয়েছে আমার লোক। ওরা জানতে চায় এরপর কী করতে হবে। আপনি আমাকে কী করতে বলেন, মেয়র?’

‘মেয়েটার কোন ক্ষতি চাই না,’ বলল কনার। ‘অন্তত এখনই নয়। আমার কাছে তাকে ধরে আনুন। জানেনই তো কোথায় যেতে হবে।’ কল কেটে পকেটে ফোন রাখল সে। মুখে ফুটে উঠেছে বিজয়ের হাসি। এখনও সবই আছে তার নিয়ন্ত্রণের ভেতরে। পালিয়ে গেলেও আবারও ফাঁস পরিয়ে দেয়া যাবে বোকা মেয়েটার গলায়।

হঠাৎ বাজল বার্বের ফোন। ‘গ্রুমম্যান,’ স্ক্রিন দেখে নিয়ে কল রিসিভ করে কানে ফোন ঠেকাল সে। নিস্পৃহ চেহারায় শুনল ওদিকের কথা। আধমিনিট পর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘ঠিক আছে, আপ-ডেট দিয়ো।’ ফোন রেখে মেয়রের দিকে তাকাল বার্ব। ‘এইমাত্র চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে এসেছে সে।’

‘তার সঙ্গে পুলিশের লোক আছে?’ বলল অ্যারন।

মাথা নাড়ল বার্ব। ‘না, সে একা।’

‘সর্বনাশ!’ বিড়বিড় করল মেয়র। মেয়েটাকে ঠিক সময়ে গিয়ে তুলে নিতে পারেনি পুলিশের লোক। ‘অর্থাৎ, আবারও খপ্পরে পড়ে গেলাম উজবুক বেন্টলির?’

‘সে আর কোন ধরনের ভুল করবে না। মেয়েটা যখন চিড়িয়াখানায়, তখন তার গাড়ির হুইলের ভেতরে জিপিএস ট্র্যাকার রেখে দিয়েছে। সোজা দক্ষিণে আসছে গাড়িটা। বেন্টলি আছে ঠিক পেছনে। ব্যাকআপ হিসেবে সঙ্গে রেখেছে দলের ক’জনকে। আপনি কি এসব জেনেও বেন্টলির মগজে বুলেট গেঁথে দিতে বলছেন?’

‘আমি চাই তোমরা গিয়ে মেয়েটাকে ধরে আনবে, দরজার দিকে আঙুল তাক করে চেঁচিয়ে উঠল মেয়র কনার। ‘আমি তাকে জীবিত চাই। যাতে কথা বলতে পারি। মারধর করে আহত করবে না। আমার কথা কি তোমরা বুঝতে পেরেছ? নোংরা পাছাদুটো নিয়ে এবার এই অফিস থেকে বের হও। আর আরেকটা কথা, ভবিষ্যতে কখনও আমার অফিসে আসবে না তোমরা।’

মেয়রের অফিস থেকে বেরিয়ে বার্ব ও স্ক্যালেসের বেশিক্ষণ লাগল না নিজেদের গাড়িতে উঠতে। বেন্টলিকে ফোন করে বলল বার্ব, ‘আমরা আসছি। মেয়েটার কাছ থেকে দূরে থেকো। নিজে থেকে কিছু করবে না। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’

‘কুত্তীটাকে একবার হাতে পেলে ছিঁড়ে নেব ওর দুই স্তন, তিক্ত স্বরে বলল স্ক্যালেস। ইঞ্জিন চালু করে ভ্যান ঘুরিয়ে নিয়ে দ্রুত গতিতে রওনা হলো সে।

বার্ব ও স্ক্যালেস এত তাড়াহুড়ো না করলে দেখতে পেত, তিনটে গাড়ির পেছনে আসছে কালো এক ব্রঙ্কো জিপ।

চৌত্রিশ
টুলসা সিটির ডাউনটাউন লক্ষ্য করে ছুটে চলেছে জ্যাকির লাল সুবারু। পেছনে আছে সেই সাদা গাড়ি। জ্যাম বেধেছে বলে সামনের গাড়িগুলো ধীর গতিতে চলেছে। আরও কয়েক মিনিট পর পুলিশ হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে যাবে জ্যাকি। বারবার ভেবেছে, একবার ওখানে গেলে পুলিশের ভয়ে হয়তো পেছনের লোকটা পালিয়ে যাবে। আবার তা না-ও হতে পারে। হয়তো অপেক্ষা করবে বাইরে। তারপর পুলিশের হেডকোয়ার্টার থেকে বেরোলেই কিডন্যাপ করবে ওকে। জানার উপায় নেই পুলিশ চিফ কী করবেন। হয়তো পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে পেছনের লোকটাকে ফাঁকি দিয়ে কোন এক মোটেলে গিয়ে উঠবে ও। অবশ্য অ্যারন কনার আর তার লোকদের এড়িয়ে বেশিদিন লুকিয়ে থাকতে পারবে না। ভয়ে কাঁপছে জ্যাকির বুক। হঠাৎ করেই বুঝে গেল, এবার কী করতে হবে ওকে।

বামে বাঁক নিল জ্যাকি। বিশ গজ যেতেই দেখতে পেল, সবুজ থেকে লাল হচ্ছে ডানের ট্রাফিক সিগনাল। ঝোড়ো বেগে ওটা পেরিয়ে মনে মনে হাসল জ্যাকি। এবার পেছনের সিগনালে আটকা পড়বে সাদা গাড়ি। ষাট গজ দূরে পথের ধারে বিশাল এক বহুতল শপিং মল। ওটার পার্কিং লট আণ্ডার গ্রাউণ্ডে। চাকার কর্কশ শব্দ তুলে বাঁক নিয়ে খাড়া র‍্যাম্প বেয়ে নেমে চলল জ্যাকি। পেছনের লোকটা ওকে দেখে থাকলেও চট্ করে হাজির হতে পারবে না লাল বাতির জন্যে। অর্থাৎ অন্তত দু’মিনিট পাচ্ছে ও। সহজেই পার্কিং লটে গাড়ি রেখে উঠে যাবে ওপরের শপিং মলে। ভিড়ের ভেতরে ওকে খুঁজে পাবে না কেউ। শপিং মলের পেছনদিকের রাস্তায় নেমে পড়বে জ্যাকি। টুলসা শহরটা নিউ ইয়র্কের মত নয় যে পাঁচ সেকেণ্ড পর পর ট্যাক্সি আসবে, তবে কপাল ভাল হলে পেয়েও যেতে পারে কোন ক্যাব। আর তা না পেলে দেরি না করে উঠে পড়বে প্রথম বাসে।

অবশ্য ওর জানা নেই, লালবাতি তোয়াক্কা না করে চলে এসেছে খয়েরি রঙের এক লিংকন গাড়ি। পার্কিং লটের পেছনে ছায়ামত জায়গায় ধূসর এক ধুলোভরা মিটসুবিশি মিরাজ গাড়ির পেছনে নিজের গাড়ি রেখে নেমে পড়ল জ্যাকি। মাত্র ছুট দিয়েছে লিফটের দিকে, এমন সময় র‍্যাম্প বেয়ে সাঁই করে নেমে এল খয়েরি গাড়িটা। সরাসরি জ্যাকির দিকে বাঁক নিল ওটা। পাতাল গ্যারাজে গুম-গুম শব্দ তুলছে ইঞ্জিন। জ্যাকি আর লিফটের মাঝে এসে কড়া ব্রেক কষে থামল গাড়িটা। পরক্ষণে দরজা খুলে নামল ওটার ড্রাইভার। পরনে ঢিলা চেক শার্ট। ভেতরে হলদে গেঞ্জি। লোকটার মাথার ওপরের ছাতে জ্বলছে-নিভছে নষ্ট এক টিউব লাইট। ছায়ার ভেতরে লোকটার চেহারা ভালভাবে দেখা গেল না।

ভয় পেয়ে ঘুরেই নিজের গাড়ির দিকে ছুটল জ্যাকি। কিন্তু তখনই পেছন থেকে জোর গলায় বলল লোকটা, ‘থামুন! প্লিয, আগে আমার কথা শুনুন!!

এই কণ্ঠস্বর চেনে বলে থমকে গিয়ে ঘুরে তাকাল জ্যাকি। নিজের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা।

চোখ সরু করে তাকে দেখল জ্যাকি। কিছুই বুঝতে পারছে না। তা হলে কি ও পুলিশে যোগাযোগ করার আগেই ওর পিছু নিয়েছিল এ-লোক?

‘অবাক হয়েছেন?’ দু’হাত ওপরে তুলে ওর দিকে এগোল ডিটেকটিভ। ‘দয়া করে ভয় পাবেন না, আমি আপনার কোন ক্ষতি করতে আসিনি।’

‘আপনি এখানে কী করছেন?’ জানতে চাইল জ্যাকি।

‘সবই খুলে বলছি,’ আরেক পা এগোল লিয়োনার্ড।

সন্দেহের দোলায় দুলছে জ্যাকির মন। দু’পা পিছিয়ে কাঁপা গলায় বলল, ‘যেখানে আছেন, ওখানে দাঁড়িয়েই কথা বলুন। ভুলেও এগিয়ে আসবেন না।

‘আমি আসলে ভাল দলের একজন, বলল ডিটেকটিভ। তার চেহারায় সততার ছাপ দেখতে পেল জ্যাকি। প্রায় অনুরোধের সুরে বলল জিম লিয়োনার্ড, ‘আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।’

‘আমার বাড়িতে ঢুকে হামলা করেছে একলোক,’ বলল জ্যাকি, ‘তার কাছে ছিল ইঞ্জেকশন। অজ্ঞান করে কোথাও নিয়ে যেত। আর এরপর আমার পিছু নিয়েছেন আপনি। এখন বলছেন বদমাশদের দলের নন। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে কে যে ভাল আর কে খারাপ, সেটা আর বুঝতে পারছি না।’

‘মিস সিলভেস্টার, বলল ডিটেকটিভ, ‘আমি আপনাকে জ্যাকি নামে ডাকতে পারি?’ আরেক পা এগোল সে।

‘আগেই সাবধান করেছি,’ পকেট থেকে বের করে জিম লিয়োনার্ডের বুকে সিগ সাওয়ার পিস্তল তাক করল জ্যাকি। বাড়িতে ষাঁড়টাকে গুলি করার সময়ে এভাবেই দু’হাতে শক্ত করে ধরেছিল পিস্তলের বাঁট। ‘আর এক পা এগোলে গুলি করব।’

থমকে গেল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড। সতর্ক চোখে দেখল পিস্তলটা। ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। ‘আমার জন্যে আপনার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে হবে না।’

‘এরপর বলবেন পুলিশের বুকে পিস্তল তাক করতে নেই, নাকি? এটা ফেডারেল ক্রাইম? সরি, ডিটেকটিভ! আপনাকে আমি বিশ্বাস করছি না। দরকারে গুলি করব আপনার বুকে।’

‘আমি শুধু পুলিশ অফিসার নই,’ বলল লিয়োনার্ড, ‘কাজ করছি এফবিআই-এর সঙ্গে। আর সেজন্যেই আপনার সঙ্গে আলাপ করে নেয়া খুব জরুরি হয়ে উঠেছিল। দয়া করে পিস্তল নামিয়ে রাখুন। অন্তত ওটা তাক করবেন না আমার বুকের দিকে। আমি খুলে বলছি আসলে কী ঘটেছে।’

‘এফবিআই?’ দ্বিধা নিয়ে বলল জ্যাকি।

‘আমার কথা বিশ্বাস করতে পারেন।’

দু’বার মাথা নাড়ল জ্যাকি। ‘মরলেও না! আপনি পারলে এফবিআই-এর আইডি দেখান!’

‘পুলিশের ব্যাজ ছাড়া এখন আর কিছুই দেখাতে পারব না। আগেই বলেছি, কাজ করছি এফবিআই-এর হয়ে। তার মানে এমন নয় যে তাদের একজন হয়ে গেছি। সত্যি কথা হচ্ছে, গোপনে এফবিআই-এর হয়ে তদন্ত করছি আমি।’

‘গোপনে? কেন?’

‘আমার কথা বিশ্বাস করুন: আপনি আছেন মস্ত বিপদে।’

‘সেটা জানি,’ পিস্তল নামিয়ে ঊরুর পাশে রাখল জ্যাকি। প্রয়োজনে ঝট্ করে তুলে গুলি করবে। ডানহাতের তর্জনী অস্ত্রের ট্রিগারে। ‘ঠিক আছে। যা বলার ব্যাখ্যা করে বলুন। তবে ভুলেও আর এক পা-ও সামনে বাড়বেন না।’

‘এফবিআই তদন্ত করছে অ্যারন কনারের বিরুদ্ধে। সেটা করা হচ্ছে গোপনে। তাতে আমার সহায়তা চেয়েছে তারা। গত কয়েক মাস ধরেই তাদের হয়ে কাজ করছি। সেজন্যেই আপনি আমার অফিসে এসে খুনের কথা বললে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। তখনও ভাবতে পারিনি যে এভাবে কপাল খুলে যাবে। জ্যাকি, আপনি হতে পারেন আমাদের সেরা সাক্ষী।’

‘তা-ই? কিন্তু আমি সব বলতে গেলে আপনার মুখে ছিল বিরক্তির ছাপ। এরপর নিয়ে এলেন চিফ রিগবিকে। সে বলল, আমার কাছে আসলে প্রমাণ বলতে কিছুই নেই।’

তীক্ষ্ণ চোখে ওকে দেখল ডিটেকটিভ। যেন আশা করছে তার কথা বিশ্বাস করবে জ্যাকি। ‘আমি যদি তখন আপনার সঙ্গে এ-বিষয়ে কথা বলতাম, তো বড় ধরনের বিপদ হতো। তা-ই ভাব করেছি বিরক্তি বোধ করছি আমি। আপনাকে আগেই বলেছি, এটা গোপন মিশন। ফলে খুব সতর্কতার সঙ্গে এক পা এক পা করে এগোতে হচ্ছে আমাকে। একবার ভুল হলে হাত ফস্কে বেরিয়ে যাবে অ্যারন কনার। আর সেটা হলে আমাদের জন্যে ব্যাপারটা হবে মারাত্মক ক্ষতিকর।

‘তাকে ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করতে দেখেছি,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল জ্যাকি। ‘এর চেয়ে খারাপ কী হবে?’

‘ধরুন, তার জন্যে খুন হবে হাজারো নিরপরাধ মানুষ। সেটা আরও খারাপ নয়? খুন, ড্রাগ্‌স্‌, কিডন্যাপিং, ধর্ষণ আর পতিতালয়ের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ ডলার পাচ্ছে সে।’

কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল জ্যাকি।

‘এ-ছাড়া বেআইনি অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত অ্যারন কনার,’ বলল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড, ‘প্রাক্তন দুই মিলিটারি অফিসারের মাধ্যমে সংগ্রহ করছে হাজার হাজার অস্ত্র। আণ্ডার-ওঅর্ল্ডের অপরাধীদের কাছে বিক্রি করছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারে। তার খদ্দেরদের মধ্যে আছে হার্ডি লোকো নামের ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর একটি দল। তাদের হাতেই তুলে দিচ্ছে বেশিরভাগ অস্ত্র। আর এরফলে দ্রুত বড় হচ্ছে দলটা। এরা রক্তপিশাচ। ড্রাগসের জাল বিছিয়ে দিয়েছে মেক্সিকোর পুবে। প্রতিবছর তাদেরকে রুখে দিতে গিয়ে লড়ছে এটিএফ বা ডিইএ। হার্ডি লোকোর ড্রাগসের বেআইনি ব্যবসা বিলিয়ন ডলারের। ভবিষ্যতে আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে তাদের হাতে খুন হবে বহু নীতিবান অফিসার। আর সে-দায় আসলে অ্যারন কনারের। সুতরাং যেভাবেই হোক আমরা তাকে ঠেকাব।’

ডিটেকটিভের দিকে চেয়ে আছে জ্যাকি। তা হলে সে- রাতে কটেজে যে লোককে খুন করল, সে-ও কি…’

‘আমাদেরই একজন,’ তিক্ত সুরে বলল লিয়োনার্ড। ‘ভাল, নাম হিউবার্ট হ্যারল্ড। কয়েক মাস আগে গোপনে যোগ দেয় এফবিআই-এ। ভেবেছিল অপরাধ জগৎ থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। এফবিআই তাকে কথা দেয়, অ্যারন কনারের গোটা অপারেশনের ব্যাপারে জানালে আদালতে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তোলা হবে না। তবে কী করে যেন তাকে ধরে ফেলে কনারের দলের লোক। আমরা তাকে উদ্ধার করার আগেই হাওয়া হয়ে যায়। আমার ধারণা হয়েছিল যে তাকে খুন করেছে বার্ব। দলে সবচেয়ে বুদ্ধিমান অপরাধী সে।’

‘বার্ব?’

মাথা দোলাল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড। ‘পুরো নাম লিয়াম বার্ব। কয়েক বছর আগেও আর্মির ফিথ স্পেশাল ফোর্সের দক্ষ মেজর ছিল। গালফ বলুন বা আফগানিস্তান, প্রতিটি যুদ্ধে পেয়েছে মেডেল। তবে এরপর হঠাৎ করে জানা গেল নানা অপরাধে জড়িত সে। চাকরি চলে যাওয়ায় দু’বছর বিভিন্ন দেশে মার্সেনারি অফিসার হিসেবে কাজ করেছে। যেসব নোংরা কুকীর্তি করেছে, সেসব আপনি জানলে হয়তো জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবেন। বছর খানেক আগে আবার ফিরেছে ওকলাহোমায়। তাকে চিনতে দেরি হয়নি অ্যারন কনারের। নিজের ব্যবসার চিফ অভ স্টাফ করেছে বার্বকে। আপনি এই লোককে আগেও দেখেছেন।’

‘কটেজে যে দু’জন যুবক ছিল, তাদের একজন।’

‘তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু টনি স্ক্যালেস। মেরিন ফোর্সের স্পেশাল অপারেশন্স কমাণ্ডের মেজর। বার্বের মতই হাইলি ট্ৰেইণ্ড। শুধু তা-ই নয়, সে বার্বের চেয়েও হিংস্র। সত্যিকারের এক ভয়ঙ্কর সাইকো। খুন করতে পারলে আর কিছুই চায় না। এদিকে বার্বের মগজ ব্যবসায় তুখোড়। অনায়াসে জটিল সব চ্যানেল ধরে সংগ্রহ করছে আধুনিক সব অস্ত্র। বলতে পারেন টনকে টন। আর সেগুলো এক পার্টনারের মাধ্যমে বিক্রি করছে অ্যারন কনার। সেজন্যে ক’দিন পর পর বিমানে করে মেক্সিকোর সীমান্তে নিউভো লারেডোয় যাচ্ছে সে। তার সেই পার্টনারের নাম আমরা জেনেছি। লুই গৌরলে। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে জানা গেল নামটা আসলে নকল। হার্ডি লোকো আর মেয়র কনারের মাঝে দালাল হিসেবে কাজ করে সে।’

‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে সবই আপনারা জেনে গেছেন,’ বলল জ্যাকি।

‘আমাদের চাই আরও জোরাল প্রমাণ,’ বলল লিয়োনার্ড। ‘হিউবার্ট হ্যারল্ড জবানবন্দি না দিলে কোনকিছুই প্রমাণ করতে পারতাম না। আইনের কারণে আমাদের হাত-পা বাঁধা। অ্যারন এতই চতুর, কোথাও কোন সূত্র রাখেনি।’ মৃদু হাসল ডিটেকটিভ। ‘এতদিন তার বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ ছিল না। কিন্তু এখন আমরা পেয়েছি একজন চাক্ষুষ সাক্ষী। আর সে হচ্ছেন আপনি। আমাদের তুরুপের তাস। আপনার করা সেই ভিডিয়ো প্রথম প্রমাণ, যেটার কারণে আদালত, বুঝবে বেআইনি কাজে নিয়োজিত মেয়র কনার। হিউবার্ট হ্যারল্ডকে ছাড়াও আমরা এবার প্রমাণ করতে পারব, ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডার করেছে লোকটা।’

‘সেক্ষেত্রে ভিডিয়োটা কাজে লাগাচ্ছেন না কেন?’ বলল জ্যাকি। ‘প্রমাণ হিসেবে আমি ভিডিয়ো হাতে তুলে দেয়ার পরেই আপনারা তাকে গ্রেফতার করতে পারতেন।’

‘বিষয়টা অত সহজ নয়, বলল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড। ‘এমন নয় যে শুধু বেআইনি কাজে অ্যারন জড়িত। তার সঙ্গে আছে বড় পদের সরকারি অনেকে। যেমন ধরুন দুর্নীতিপরায়ণ কোয়ার্টারমাস্টারদের কথা, যারা গোপনে অস্ত্র সরিয়ে নিচ্ছে ইউএস আর্মস্ ডিপো থেকে। তারপর আছে এ-শহরের পুলিশ ডিপার্টমেন্টের নীতিহীন একদল অফিসার। ওদিকে আছে মেক্সিকো সরকারের অফিসাররা, যারা ঘুষ খেয়ে চোখ বুজে থাকে অস্ত্রের চালান যাওয়ার সময়ে। মস্তবড় র‍্যাকেট তৈরি করেছে এরা। তা-ই জাল না ফেলে কাজে নামবে না এফবিআই। আর যখন তারা তৈরি হবে, বড় ধরনের মিশনে নেমে একসঙ্গে গ্রেফতার করবে এসব অপরাধীদেরকে।’

চোখ বড় করে ডিটেকটিভকে দেখছে জ্যাকি। ‘এমন কী পুলিশের অফিসাররাও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে গেছে?’

‘ভাবতে গেলে চমকে যেতে হয়, তবে ঘটনা তেমনই। আর সেজন্যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছি এফবিআই-এর সঙ্গে। বদমাশগুলোর একটা হচ্ছে রিপার রিগবি। সে আবার টুলসার চিফ অভ পুলিশ। বুঝতেই পারছেন এদের শেকড় কতটা গভীরে।’

‘হায়, যিশু!’ বিড়বিড় করল জ্যাকি।

‘গত শরতে যোগাযোগ করল এফবিআই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপের পর জানাল, টুলসার পুলিশের চিফকে সন্দেহ করছে তারা। আরও বলল, পুলিশ ডিপার্টমেন্টে নিজেদের লোক চাই তাদের। আমি কি চোখ রাখব রিগবির ওপরে? কথা শুনে চমকে গিয়েছিলাম। পানিতে নেমে কুমিরের সঙ্গে লড়ব কীভাবে? পরে ভাবলাম, দেশের উপকারের জন্যে মরে যেতেও দ্বিধা করব না। তখন থেকে নিয়মিত নজর রাখছি রিগবির ওপরে। এফবিআইকে দিচ্ছি জরুরি তথ্য।’

‘আর সেজন্যেই রিপার রিগবিকে অফিসে আমার সামনে ডেকে এনেছিলেন?’ বলল জ্যাকি।

মাথা দোলাল লিয়োনার্ড। জেনে নেয়া দরকার ছিল, আপনার কথা শুনে কেমন হয় তার প্রতিক্রিয়া। আর তারপর ভিডিয়ো দেখতে গিয়ে যে চেহারা করল, তাতে পেয়ে গেলাম নিরেট প্রমাণ। আমি এখন জানি, গোপনে অ্যারন কনারকে নানান ধরনের পুলিশি সহায়তা দিচ্ছে সে।’

‘আর আপনি ভাব করছেন যে তার দলেই আছেন?’

‘আশা করি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন। আপনার সঙ্গে কথা বলার পর আরেকটু হলে বলে উঠতাম: এবার মুঠোর ভেতরে পেয়েছি কুকুরগুলোকে! আপনি কখনও চিফ অভ পুলিশের বাড়িটা দেখেছেন? পুলিশের বেতন দিয়ে কেনা যায় না এত বিলাসবহুল ভিলা।’

‘আপনি বলছেন মেয়র আর পুলিশের চিফ মেক্সিকোর ড্রাগ লর্ডদের কাছে অস্ত্রের চালান পাঠাচ্ছে?’

‘আমার মনে হয় না অস্ত্র চালানে সরাসরি জড়িত রিগবি। ক’দিন পর পর ব্যবসার জন্যে বিমানে করে সীমান্তের কাছে যাচ্ছে অ্যারন। কেউ যেন কিছু বলতে না পারে, সেজন্যে রিগবিকে ঘুষ দিচ্ছে সে। হিউবার্ট হ্যারল্ড হত্যা চাপা দেয়ার জন্যেও নিশ্চয়ই হাজার হাজার ডলার তার পকেটে গেছে। এ-ছাড়া, কনারের গোপন ওয়্যারহাউসে যেন পুলিশ রেইড না দেয়, সেটাও দেখে সে।’

‘কীসের ওয়্যারহাউস?’

‘অ্যারন কনারের অস্ত্রের বড় গুদাম আছে। এসব অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রাক্তন মেজর বার্ব। আমরা শুধু এটা জানি, টুলসা কাউন্টিতে কোথাও আছে সেই গুদাম। ওটা থেকে বের করে ট্রাকে অস্ত্র তুলে রাজ্যের বাইরে নিয়ে যায় বার্ব, স্ক্যালেস ও তাদের দলের লুঠেরারা। টেক্সাসের দক্ষিণ দিয়ে ঢুকে চলে যায় মেক্সিকোর সীমান্তে। কার্টেলের হাতে তুলে দেয় মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র। প্রতিবার নানান রুট ব্যবহার করে ট্রাকের বহর থামে আলাদা রদেভু পয়েন্টে। আমাদের পক্ষে এত বড় এলাকায় চোখ রাখা সম্ভব নয়। রিগবির জরুরি আরেক কাজ হচ্ছে ওকলাহোমা থেকে বেরোবার সময় ট্রাক- বহর যেন কোনভাবে থামানো না হয়, সেটা নিশ্চিত করা। এজন্যে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেয় সে। তার দলে আছে আরও অনেকে। নইলে সবকিছু গোপন থাকত না। ধরে নিতে পারেন, প্রচুর টাকায় পুলিশ অফিসারদের অনেকে বিক্রি হয়ে গেছে। প্রতি বছর আরও বাড়ছে দুর্নীতিপরায়ণ অফিসারের সংখ্যা। এফবিআই-এর ধারণা: রিপার রিগবির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছে কমপক্ষে ত্রিশজন পুলিশ সদস্য। ক্রমেই আরও খারাপ হচ্ছে পরিস্থিতি। কনার এবার নেমেছে গভর্নর হওয়ার নির্বাচনে। যদি একবার নির্বাচিত হতে পারে, কে জানে, আরও কত বড় হবে তার সংগঠন। …কী হলো? ভুরু কুঁচকে কী ভাবছেন?’

ফ্যাকাসে হয়ে গেছে জ্যাকি। শুকনো গলায় বলল, ‘আমি পুলিশ চিফকে ফোন করে জানিয়েছি চিড়িয়াখানায় আছি। তখন বলল পাঠাবে দু’জন পুলিশ অফিসার। চিড়িয়াখানার গেটের কাছে দাঁড়িয়ে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছি, এমন সময় মনে হলো আপনি খুনি বা কিডন্যাপার দলের কেউ। সেজন্যেই গাড়িতে উঠে পালিয়ে এসেছি।’

‘ঠিক কাজই করেছেন। সে আমাদেরকে এখানে খুঁজে পাবে না।

‘আপনি জানলেন কী করে যে কোথায় আছি আমি?’

‘আমি পিছু নিয়েছি আপনার বাড়ি থেকে।’

‘চোখ রেখেছিলেন আমার বাড়ির ওপরে?

মাথা দোলাল লিয়োনার্ড। ‘যখনই সম্ভব হয়েছে, সেটাই করেছি। তবে নিয়মিত ডিউটির জন্যে সবসময় তা পারিনি। তা ছাড়া, আপনার বাড়ির কাছে ঘুরঘুর করলে সন্দেহ করত রিগবি। যাই হোক, কিডন্যাপার যখন হামলা করল আপনার ওপরে, তখন ওদিকে ছিলাম না। নইলে প্রথমেই তাকে গ্রেফতার করতাম। আমার কথা বিশ্বাস করুন, জ্যাকি। রিগবির কাজ শেষ করে আপনার বাড়ির কাছে ফিরে দেখি গাড়িতে উঠে পালিয়ে যাচ্ছেন আপনি। মনে হলো খারাপ কিছু হয়েছে। কিন্তু আসলে সেটা কী, তা জানতে গিয়ে আর সেখানে অপেক্ষা করিনি। আপনার পিছু নিয়ে বুঝলাম ঠিক কাজই করছি, আপনি আছেন বড় কোন বিপদে।’

‘যা-ই হোক, এখন তো পৌঁছে গেছেন,’ বলল জ্যাকি।

আপনার ওপরে যে-লোক হামলা করেছে, তার চেহারার বর্ণনা দিতে পারবেন?

‘বয়স চল্লিশ হবে। শ্বেতাঙ্গ। আপনার সমানই লম্বা। তবে বেশ মোটা। খুব বিশ্রী চেহারা।’

‘এই বর্ণনা অনেকের সঙ্গে মিলে যাবে। লোকটা হয়তো গ্রিন গ্রুমম্যান। ওদিকের এক মাঝবয়েসী লুটেরা।’

‘সহজেই তাকে চিনে নিতে পারবেন। আত্মরক্ষা করার জন্যে তার পায়ে গুলি করেছি আমি।

‘মাথায় গুলি করলে আরও সহজে তাকে পেতাম। নীচ মনের নোংরা বদমাশ গ্রিন ক্রমম্যান। সে হামলাকারী হয়ে থাকলে খুঁজে নিয়ে তার পেট থেকে সবই বের করব। হয়তো বহু কিছুই জানতে পারব অ্যারন কনারের ব্যাপারে।’

‘আর এদিকে আমার কী হবে?’ জানতে চাইল জ্যাকি। ‘আমার এখন কী করা উচিত?’

‘আপনি নিরাপদ নন। তাই এবার কথা বলব এফবিআই স্পেশাল এজেন্ট ববি হুকের সঙ্গে। রদেভু পয়েন্টে গিয়ে তার হাতে তুলে দেব আপনাকে। তার আগে আপনার নিরাপত্তার সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি আমি।’

‘ববি হুকের হাতে তুলে দেবেন মানে?’

‘এরপর সাক্ষীর নিরাপত্তার সব দায় নেবে এফবিআই।’

‘তার মানে নতুন পরিচয়ে নতুন এলাকায় চাকরি দেবে?’

‘ঠিকই ধরেছেন। আগেই আমার উচিত ছিল কাজটা করা। এরপর কোনভাবেই আপনাকে নাগালে পাবে না মেয়র কনার। আমি বেঁচে থাকলে আপনাকে আর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না।’

মৃদু মাথা দোলাল জ্যাকি। আর তখনই ওরা শুনতে পেল, পাতাল গ্যারাজের র‍্যাম্প বেয়ে নেমে আসছে দুটো গাড়ি। তিন সেকেণ্ড পর ওদের ওপরে এসে পড়ল তিনটে হেডলাইটের আলো।

‘এরই ভেতরে চলে এসেছে এফবিআই-এর লোক?’ বলল জ্যাকি।

‘না,’ শুকনো স্বরে জানাল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড। ‘এরা এফবিআই-এর লোক নয়!’

কালবেলা – ৩৫ (মাসুদ রানা)

ধূসর ভ্যানের পিছু নিয়েছে রানা। ভারী ট্রাফিকের ভেতরে সামনে রাখছে কমপক্ষে পাঁচটা গাড়ি। ওর মনে হচ্ছে না যে ব্রঙ্কো জিপের ব্যাপারে সচেতন সামনের দুই খুনি। যদিও যে- কোন সময়ে হয়তো সন্দেহ করে বসবে তারা।

দূরে রয়ে গিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছে রানা। ট্রাফিকের লাল বাতি জ্বললে যে-কোন সময়ে চোখের সামনে থেকে উধাও হবে টার্গেট। হয়তো কোন লাল সিগনাল না মেনে দ্রুত ইন্টারসেকশন পেরোবে ভ্যানের ড্রাইভার। তখন তাকে নজরে রাখতে গিয়ে রানাকেও বাড়াতে হবে গতি। তাতে চোখে পড়ে যেতে পারে পুলিশের লোকেদের। এজন্যেই অপরাধী ও পুলিশবাহিনী একাধিক গাড়ি, ট্রাক ও মোটর সাইকেল ব্যবহার করে চোখ রাখে টার্গেটের ওপরে। নিজেদের মাঝে থাকে রেডিয়ো যোগাযোগ। আরও ভাল হয় আকাশে হেলিকপ্টার তুলে নজর রাখলে। দলের কেউ যদি মনে করে তাকে সন্দেহ করছে টার্গেট, রেডিয়ো করে পিছিয়ে যায় সে। বদলে পিছু নেয় অন্য কেউ। ঠিকভাবে কাজটা করতে পারলে কেউ বুঝতে পারে না আসলে কী ঘটছে।

অবশ্য রানার উপায় নেই যে কারও কাছ থেকে সাহায্য নেবে। আর সেজন্যেই সতর্ক হয়ে ডাউনটাউনে কয়েকটা গাড়ির পেছনে থেকে এগিয়ে যাচ্ছে রানা। ভ্যানের ধুলোভরা কাঁচের পেছন-দরজার ওপরে ওর চোখ। যে-কোন সময়ে সতর্ক হবে সামনের লোকদুটো। সুযোগ পেলেই ঝড়ের বেগে এগোচ্ছে ধূসর ভ্যান। বারবার লেন বদলে নিয়ম না মেনে বামে বা ডানে সরে ওভারটেক করছে গাড়িগুলোকে। বাধ্য হয়ে রানাকেও তখন বাড়াতে হচ্ছে গতি। ভাল করেই বুঝতে পারছে, কোথাও যাওয়ার তাড়া আছে লোকগুলোর। একটা স্টেশন ওয়্যাগনকে পেরিয়ে গেল তাদের ভ্যান। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা। জিপের গতি তুলে ভাবল, খুনিগুলো স্বাভাবিক বেগে গেলে মন্দ হতো না। বেশি গতির কারণে চারপাশের ড্রাইভারদের চোখে পড়ছে তারা।

ঝোড়ো বেগে একের পর এক মোড় পার করছে ঠাণ্ডা মাথার খুনি। সোজা চলেছে শহরের উত্তরদিকে। কয়েক মিনিট পর রানা বুঝল, সাদা এক ফোর্ড গাড়িকে অনুসরণ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে লোকটা। দুই গাড়ির ড্রাইভারের ভেতরে যেন শুরু হয়েছে গোপন কোন প্রতিযোগিতা। এতদূর থেকে রানা আঁচ করতে পারল না সাদা গাড়ির ভেতরে কতজন আছে। তবে ওর মনে হলো দলে তারা কমপক্ষে তিন থেকে চারজন।

সামনের জ্যামে অসংখ্য গাড়ি আটকা পড়তেই গতি হ্রাস করল সাদা ফোর্ড ও ধূসর ভ্যান। রানা দেখল, দুই গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের লোকদু’জন নামিয়ে নিয়েছে জানালার কাঁচ। ফোর্ডের যাত্রী সাদা গরিলার মত ভারী চেহারার এক লোক। চোখে কালো সানগ্লাস। কানে চেপে ধরেছে ফোন। একই কাজ করছে ভ্যানের দ্বিতীয় যাত্রী। রানা আন্দাজ করল, জরুরি কোন উদ্দেশ্যে চলেছে এরা। চেহারা খুব গম্ভীর। মেডেইরার অভিজ্ঞতা থেকে রানা জানে, এদের সঙ্গে থাকবে আধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্র। এদিকে ওর নিজের কাছে অস্ত্র বলতে কিছুই নেই!

কথাটা মাত্র ভেবেছে রানা, এমন সময় দ্রুত বদলে গেল সামনের দৃশ্যপট। জ্যামের ভেতরে ধীরগতি গাড়ির মাঝে তৈরি হলো সামান্য ফাঁক। সুযোগটা নিল সাদা ফোর্ডের ড্রাইভার। ডানে সারি সারি গাড়ি পাশ কাটিয়ে ঝড়ের বেগে এগোল। দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে ফোর্ডের পিছু নিল ভ্যান। বিড়বিড় করে ভাগ্যকে দোষ দিল রানা। সামনের দুই গাড়ির মতই মাত্র পাঁচ সেকেণ্ডে জিপের গতি তুলল পঞ্চাশ মাইলে। তুমুল বেগে যেতে যেতে দেখল এক ইন্টারসেকশনের কাছে চলে গেছে সাদা ফোর্ড। ওটার ঘাড়ের কাছে শ্বাস ফেলছে ধূসর ভ্যান। একই সময়ে রানা বুঝে গেল এবার কী ঘটবে। বাতি সবুজ থাকতেই ইণ্টারসেকশন পেরোবে ভ্যান ও ফোর্ড। এদিকে নিজে লাল বাতির চক্করে আটকা পড়বে ও। আর তখন কোন নিয়ম না মেনে এগোলে মারাত্মক ঝুঁকি নিতে হবে। তাতে ঘটতে পারে ভয়ঙ্কর কোন দুর্ঘটনা।

অবশ্য ভুল বলে প্রমাণিত হলো রানার ধারণা। সিগনাল পেরোবার আগেই সবুজ থেকে লাল হলো বাতি। যদিও কিছুই পাত্তা না দিয়ে গতিহ্রাস না করে এগিয়ে চলল সাদা ফোর্ডের ড্রাইভার। লেজের কাছে ভ্যান সঙ্গে নিয়ে পার হচ্ছে ব্যস্ত ইন্টারসেকশন। সামনে থেকে এল বড় এক নিসান পেট্রল জিপ। মুখোমুখি সংঘর্ষ হবে বুঝতে পেরে কড়া ব্রেক কষে একদিকে বাঁক নিল জিপের ড্রাইভার। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চরকির মত ঘুরে গেল ভারী গাড়িটা। ওটার পেছনে আসা এক সুবারু লেক্সাসের নাকে দড়াম করে বসিয়ে দিল জোর একটা গুঁতো। ধাক্কা খেয়ে দ্রুতগামী এক বাসের গতিপথে চলে গেল হালকা সুবারু। চারপাশে বেজে উঠেছে হরেক ধরনের হর্ন, চমকে গেছে ড্রাইভারেরা। নানান সংঘর্ষে তুবড়ে গেল কিছু গাড়ির বড়ি। পথে ছড়িয়ে পড়ল প্লাস্টিকের অসংখ্য টুকরো। এত বিশৃঙ্খলার ভেতরেও আঁচড় ছাড়াই দ্রুত গতিতে বেরিয়ে গেল সাদা ফোর্ড। অবশ্য পিছিয়ে এসে ধূসর ভ্যানের পথ আটকে দিয়েছে লেক্সাস গাড়ি। ওটাকে নাক দিয়ে ঠেলে এগিয়ে গেল ভারী ভ্যান। চারপাশে কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দ। পরক্ষণে ইন্টারসেকশন পার হয়ে সাদা ফোর্ডের পিছনে ছুটে চলল ধূসর ভ্যান।

জিপের গতিহ্রাস করল রানা। সামনে দেখছে দুর্ঘটনায় পড়া বেশকিছু গাড়ি। জিপ থামিয়ে নেমে পড়ল রানা। দূরে দেখতে পেল সাদা ফোর্ড আর ধূসর ভ্যান চলে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে উধাও হলো গাড়িদুটো। বিরক্ত হয়ে জিপের বনেটে ধুম করে ঘুষি মারল রানা।

যে-যার গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে অনেকে। আকস্মিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বোকা বনে গেছে কেউ কেউ। জ্যাম হয়ে গেছে কার যেন গাড়ির হর্ন। টানা প্যাঁ-প্যাঁ শব্দে চলছে বিশ্রী আর্তনাদ।

ভ্যানের গুঁতো খেয়ে তুবড়ে গেছে সুবারু লেক্সাসের পেছনদিক। এদিকে সামনের দিক ভচকে গেছে বাসের ধাক্কা লেগে। সুবারুর রেডিয়েটর থেকে ভুশভুশ করে বেরোচ্ছে সাদা বাষ্প। বাসের ড্রাইভার ভারী শরীরের এক কালোমানুষ। পরনে ইউনিফর্ম ও মাথায় ক্যাপ। দুর্ঘটনা কবলিত এলাকার চারপাশে চোখ বুলিয়ে মাথা নাড়ল সে। বাস থেকে নেমে এসেছে প্যাসেঞ্জারেরা, সবার চেহারা ফ্যাকাসে। হেঁচকি তুলে কাঁদতে শুরু করেছে পিচ্চি এক মেয়ে।

‘আপনারা কাণ্ডটা দেখলেন?’ দূরের রাস্তার দিকে আঙুল তাক করলেন বয়স্কা এক মহিলা। ‘সাদা গাড়ির ড্রাইভার লোকটা আসলে বদ্ধ উন্মাদ!’

‘কেউ আহত হয়েছেন?’ জানতে চাইল রানা। জবাবে মাথা নাড়ল ক’জন। কারও মাথায়, গায়ে বা হাতে-পায়ে রক্ত নেই। ভাঙা এসব গাড়ির ইনশিওরেন্স কোম্পানির মালিকপক্ষ চরম বিরক্ত হবে জরিমানা গুনতে গিয়ে। এবার কী করবে সেটা ভাবতে শুরু করেছে রানা। চাইলেও আর অনুসরণ করতে পারবে না। বহু দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে সাদা গাড়ি আর ধূসর ভ্যান।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে নিসান জিপের দিকে তাকাল রানা। অবশ্য তার আগে চোখের কোণে দেখেছে অন্যকিছু। কয়েক পা হেঁটে গেল রানা। ওর পায়ের নিচে কুড়মুড় করে ভাঙল ভাঙা হেডলাইটের কাঁচ। লেক্সাসের ওপরে যেখানে চড়াও হয়েছিল ভ্যান, সেখানের রাস্তায় পড়ে আছে থকথকে কালো তরল। চারপাশে ভাঙা প্লাস্টিকের টুকরো। ধাক্কা লেগে উপড়ে গেছে ধূসর ভ্যানের ডানদিকের হেডলাইট-যেন অক্ষিকোটর থেকে খসে পড়া কোন চোখ। প্রচণ্ড সংঘর্ষে ফাটল ধরে গেছে ভ্যানের রেডিয়েটরে।

ঝুঁকে আঙুলের ডগা দিয়ে রাস্তা থেকে কালো তরল তুলল রানা। ওটা বেশ গরম পানি নয়, ভারী মোবিল। লেক্সাস গাড়ি থেকে পড়েনি। এ থেকে দুটো ব্যাপার বুঝে গেল রানা। প্রথম কথা: হালকা গাড়িটার সামনের দিকে বড় কোন ক্ষতি হয়নি। দ্বিতীয় কথা: দুর্ঘটনার জায়গা থেকে সরাসরি রাস্তার দূরে চলে গেছে কালো তরলের দাগ। ওটা এসেছে ধূসর ভ্যানের ইঞ্জিন থেকে।

দেরি না করে জিপে এসে উঠল রানা।

‘আপনি এখন কোথাও যেতে পারবেন না,’ আপত্তি তুলল বাস ড্রাইভার। ‘আগে পুলিশ আসুক। তাদেরকে খুলে বলবেন আসলে এখানে কী ঘটেছে।’

তাকে পাত্তা না দিয়ে জিপ নিয়ে এগোল রানা। দুটো মার খাওয়া গাড়ির পেছনদিক একসঙ্গে লেগে আছে। জিপের নাক দিয়ে গাড়িদুটোকে ঠেলে সরিয়ে পথ করে নিল রানা। এখন রেন্টাল কার কোম্পানির কাছে ফেরত দিলে তারা বড়জোর পাবে দু’চারটা আঁচড়। তাতে রানাকে গুনতে হবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে স্রেফ পঞ্চাশ ডলার। কিন্তু ভবিষ্যতে হয়তো ওকে দণ্ডি দিতে হবে হাজার হাজার ডলার!

এসব না ভেবে ঝড়ের বেগে মোবিলের কালো দাগের পিছু নিল রানা।

ছত্রিশ
ছায়াভরা পার্কিং লটে মূর্তি হয়ে গেছে জ্যাকি ও ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড। ওরা দেখতে পেল আলোয় বেরিয়ে এসেছে সাদা ফোর্ড গাড়ি। হেডলাইট দেখে ওটা চিনতে পারল জ্যাকি আগে গাড়িটা ছিল ওর বাড়ির কাছে। পার্কিং লটের মেঝেতে সাসপেনশন ঘষা লাগতেই কর্কশ আওয়াজ হলো। সাদা গাড়ির পিছু নিয়ে এল ধূসর এক ভ্যান। জ্যাকি দেখতে পেল, ভেঙে গেছে ওটার হেডলাইট ও রেডিয়েটর গ্রিল। সরাসরি ওদের দিকে আসছে গাড়িদুটো।

‘সাবধান!’ বলে খপ্ করে হাত ধরে জ্যাকিকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিল ডিটেকটিভ। টনক নড়তেই ওর গাড়ি ও সামনের পিকআপের পেছনের সরু ফাঁকে ঢুকে পড়ল জ্যাকি। ওর দেখাদেখি সংকীর্ণ জায়গাটাতে বসে গাড়িদুটোর ওপরে চোখ রাখল ডিটেকটিভ।

তার লিংকন গাড়ির পাশে এসে থামল সাদা গাড়িটা, এদিক-ওদিক দুলছে ভারী স্প্রিঙে ভর করে। আড়াআড়িভাবে লিংকনের পথরুদ্ধ করল ধূসর ভ্যান। ধাতব আওয়াজে খুলে গেল দুই গাড়ির পাঁচটা দরজা। সাদা গাড়ি থেকে নেমে এসেছে তিক্ত চেহারার তিনজন লোক। তাদের একজনকে চিনতে পারল জ্যাকি। বাড়ির বাইরে গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়ে ছিল সে। তার সঙ্গী জ্যাকিকে কিডন্যাপ করে আনলে – গাড়িতে তুলে নেয়ার সময়ে তাকে সাহায্য করত। অন্য

দু’জনকে চিনতে পারল না জ্যাকি।

ধূসর ভ্যান থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে দুই বদমাশ। তাদেরকে ভাল করেই চেনে জ্যাকি। সে-রাতে লেকের তীরে কটেজে মানুষ খুনের সঙ্গে জড়িত এরা। প্রতি রাতে তাদেরকে দুঃস্বপ্নে দেখে জ্যাকি। তখন ভয়ে শুকিয়ে যায় ওর বুক। ভাড়াটে খুনিদুটোর একজনের নাম বার্ব, অন্যজনের স্ক্যালেস।

ভ্যানটাও চিনতে পেরেছে জ্যাকি। কটেজের কাছে পার্ক করা ছিল। ওটাতে করেই সরিয়ে নিয়ে গিয়ে গুম করা হয়েছে লাশ।

ডিটেকটিভের দিকে তাকাল জ্যাকি। সতর্ক হয়ে উঠেছে লোকটা। ঢিলা শার্ট সরিয়ে দিয়ে হোলস্টার থেকে বের করল পিস্তল। ভারী ও বড় অস্ত্রটা কোল্ট ১৯১১ গভার্নমেন্ট মডেল। চাপা স্বরে বলল লিয়োনার্ড, ‘মাথা নিচু করে বসে থাকুন।

ওদের দিকে হেঁটে আসছে লোকগুলো। গ্যারাজের ভেতরে প্রতিধ্বনি তুলছে পদশব্দ। পাঁচজনের বিরুদ্ধে জ্যাকিরা মাত্র দু’জন। চাপা স্বরে নির্দেশ শুনতে পেল জ্যাকি। ওর মন চাইল চোখ বুজে একপলকে গায়েব হয়ে যেতে। কোল্টের চেম্বারে এক রাউণ্ড গুলি ভরল লিয়োনার্ড। জোর গলায় বলল, ‘পুলিশ! থামো! নইলে গুলি করব!’

জবাবে গ্যারাজে গর্জন ছাড়ল কয়েকটা আগ্নেয়াস্ত্র। তাতে থরথর করে কাঁপল চারপাশ। ভুরু কুঁচকে হাত দিয়ে কান ঢাকল জ্যাকি। ওর গাড়িতে লাগল কয়েকটা গুলি। অন্যগুলো পেছনের কংক্রিটের দেয়ালে তৈরি করল মুঠোর সমান গর্ত। জবাবে গুলি’ পাঠিয়ে জ্যাকির গাড়ির পেছনদিকে সরে গেল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড। জ্যাকির কাছ থেকে আট ফুট দূরে আছে সে। গুডুম গুডুম আওয়াজ করল আরও ক’টা গুলি। সুবারুর ভেতরে গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলে যেমন হতো, সেভাবেই শিলাবৃষ্টির মত চারপাশে ছড়িয়ে গেল ভাঙা কাঁচ।

ধুলোভরা মিটসুবিশি মিরাজ গাড়িটার পেছনে লুকিয়ে পড়ল জ্যাকি। হঠাৎ করেই বুঝে গেছে, আসলে গুলি করা হচ্ছে ডিটেকটিভের দিকে। গাড়ির পাশে শুয়ে পাল্টা গুলি করছে সে। পর পর চারবার সাদা ঝিলিক দেখতে পেল জ্যাকি। বদ্ধ জায়গায় বিকট আওয়াজ তুলেছে .৪৫ ক্যালিবারের কোল্ট। জ্যাকির বাহুর নিচে এসে গুঁজল খরচ করা একটা গুলির তপ্ত খোসা।

জিম লিয়োনার্ডের গুলির তোড়ে একদিকে ডাইভ দিল লোকগুলোর দু’জন। ঝনঝন করে ভেঙে পড়েছে সাদা ফোর্ড গাড়ির কাঁচ। ওদিকে আরও দুটো গুলি পাঠাল লিয়োনার্ড। এমনই এক বাজে জায়গায় আছে, কারও গায়ে গুলি করতে পারছে না। তার গুলি লাগছে দূরে সাদা গাড়িটার বড়িতে।

মিটসুবিশির মালিক উঁচু করে নিয়েছে সাসপেনশন। চাকাও স্বাভাবিকের চেয়ে বড়। ভয়ে গাড়িটার তলায় ঢুকে পড়ল জ্যাকি। আড়াল থেকে দেখতে পেল, সামান্য দূরে হালকা ওজনের কমব্যাট বুট পায়ে একজন। ধূসর ভ্যানের পেছনে আড়াল নিয়েছে সে। প্রাথমিক আতঙ্ক কেটে যেতেই আবারও মাথা কাজ করছে জ্যাকির। স্পর্শ করে দেখল, ওর প্যান্টের পকেটে আছে নাইন এমএম সিগ সাওয়ার পিস্তল। বুঝে গেল, ওটা বের করলেও গাড়ির তলা থেকে ঠিক দিকে তাক করতে পারবে না। অবশ্য চুপ করে শুয়ে না থেকে পর পর তিনবার গুলি করল জ্যাকি। নাইন এমএম পিস্তলের রিকয়েলে কুঁচকে গেল ওর ভুরু। কানের ভেতরে ভোঁ-ভোঁ আওয়াজ। জ্যাকি দেখল প্রায় নাচতে নাচতে পালিয়ে গেল কমব্যাট বুটের মালিক। জ্যাকির গুলি বিঁধেছে ডিটেকটিভ লিয়োনার্ডের খয়েরি লিংকন গাড়ির বডিতে।

লোকগুলোর উদ্দেশে ৪৫ পিস্তল থেকে আরও একটা গুলি পাঠাল ডিটেকটিভ, তারপর খালি হয়ে গেল ম্যাগাযিন। সাত গুলির ম্যাগাযিন দ্রুত শেষ হয় বলে বেশিরভাগ মানুষ আজকাল এমন পিস্তল বেছে নেয়, যেটার থাকে নয় বুলেটের ম্যাগাযিন। মিটসুবিশির নিচে শরীর মুচড়ে ঘুরে তাকাল জ্যাকি। পিস্তল থেকে ম্যাগাযিন খুলে মেঝেতে ফেলেছে ডিটেকটিভ। বাম কোমরের বেল্টের পাউচ থেকে নিল স্পেয়ার ম্যাগাযিন। এই কয়েক সেকেণ্ডের সুযোগ নিয়ে সাদা গাড়ির কাভার থেকে বেরিয়ে এসেছে ওটার ড্রাইভার। ছুটে পৌছে গেল জ্যাকির গাড়ি ও পিলারের মাঝে। জিম লিয়োনার্ডের পেছনে পৌঁছুতে চাইছে সে। ডিটেকটিভ রিলোডের কাজে ব্যস্ত বলে কিছুই টের পায়নি। নিজের কাঁচভাঙা গাড়ির পাশে নড়াচড়া দেখতে পেল জ্যাকি।

‘জিম!’ চিৎকার করে সতর্ক করল। পরক্ষণে মিটসুবিশির তলা থেকে গুলি করল লোকটার পা লক্ষ্য করে। গাড়ির নিচ থেকে বের না হলে লক্ষ্যভেদ প্রায় অসম্ভব। তবুও আন্দাজে আবারও গুলি করল জ্যাকি। ওর হাতে পর পর দু’বার লাফ দিয়েছে সিগ সাওয়ার। সুবারু গাড়ির ভেতর দিয়ে গিয়ে লোকটার কাঁধে বিধেছে বুলেট। আর্তনাদ ছেড়ে বিকৃত চেহারায় ক্ষত চেপে ধরল সে। পেছনের কংক্রিটের পিলারে গিয়ে ছিটকে লেগেছে তাজা রক্ত।

খুশিমনে জ্যাকিকে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দেখাল ডিটেকটিভ। মুখে ফুটেছে কৃতজ্ঞতার আন্তরিক হাসি। চরম আতঙ্কজনক পরিবেশে দমে গেছে জ্যাকির মন। তবুও ভাবল, হয়তো এই লড়াইয়ে জিতে যাব আমরা। অবশ্য পরের কয়েক সেকেণ্ডে বুঝে গেল, কত বড় ভুল ছিল ওর ধারণা।

সুবারু গাড়ির একদিক ঝাঁঝরা হলো অটোমেটিক অস্ত্রের গুলিতে। কংক্রিটের মেঝেতে লেগে নানাদিকে গেল বুলেট। প্রাণভয়ে মিটসুবিশির নিচে শুয়ে থাকল জ্যাকি। ভ্যানের লোকদু’জনকে পলকের জন্যে দেখতে পেল। তারা চলেছে ডিটেকটিভ লিয়োনার্ডের দিকে, হাতে অদ্ভুত কোন অ্যাসল্ট পিস্তল। জ্যাকির মনে হলো, এসব বোধহয় ব্যবহার করে শুধু মিলিটারির সদস্যরা। অস্ত্রটা আগেও বহুবার ব্যবহার করেছে বার্ব ও স্ক্যালেস। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে ওর গাড়িটা ঝাঁঝরা করে দিল তারা।

হাঁচড়েপাঁচড়ে গাড়ির পেছনে সরে গেল ডিটেকটিভ জিম লিয়োনার্ড। সে যেন অসহায় কোন খরগোশ, আর তাকে ঘিরে ধরেছে একদল হিংস্র হাউণ্ড। গুলির তোড় এত বেশি যে নিজে আর গুলি করতে পারছে না সে। জ্যাকির গাড়ির চাকা ছিঁড়ে যেতেই মেঝেতে বসে পড়ল সুবারু। বডিতে অন্তত এক শ’টা বুলেটের গর্ত। ধীর পায়ে সামনে বেড়ে গুলি করছে স্ক্যালেস ও বার্ব। ঝড়ের বেগে পিস্তল রিলোড করল স্ক্যালেস। তাকে কাভার দিয়েছে তার সঙ্গী। আবারও এগোল তারা। অস্ত্রের একদিক থেকে ছিটকে পড়ছে খরচ করা গুলির খোসা। অসংখ্য বুলেট বেরোচ্ছে বলে নলের মুখে সার্বক্ষণিক জ্বলছে সাদা আগুন। বিকট আওয়াজে আর আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে জ্যাকির। ভাল করেই বুঝে গেল, মিটসুবিশির তলা থেকে আর সরে যেতে পারবে না। যে- কোন সময়ে চোখের সামনে দেখবে ডিটেকটিভ লিয়োনার্ডের মৃত্যু। ভাঙা সুবারু গাড়ির পেছনে শুয়ে আছে মানুষটা। তার ভাঁজ করা একটা পা দেখতে পেল জ্যাকি। গাড়ির পাতলা বড়ি ছিঁড়ে যাওয়ায় ক্রমে কাভার হারাচ্ছে ডিটেকটিভ। যে- কোন সময়ে অসংখ্য বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হবে সে। পার্কিং লটের কংক্রিটের দেয়ালে হঠাৎ করেই ছলাৎ করে লাগল একরাশ রক্ত। ভীষণ ঝাঁকি খেল লিয়োনার্ডের ভাঁজ করা পা। শরীরে তৈরি হয়েছে মৃত্যু খিঁচুনি।

এবার বোধহয় আমার মৃত্যুর পালা, ভাবল জ্যাকি। দু’বার গড়ান দিয়ে বেরিয়ে এল মিটসুবিশ্রির তলা থেকে। উঠে দাঁড়িয়ে পিছনে না চেয়েই গুলি করল পর পর তিনবার, তারপর দেয়াল আর সারি দেয়া গাড়ির পাশ কেটে তীরবেগে ছুটল শপিং মলের দিকে। বিশ গজ গেলে লিফট বা সিঁড়ি। যদিও সেখানে হয়তো পৌঁছুতে পারবে না জ্যাকি। একবার শপিং মলে উঠলেও রেহাই নেই ওর। পেছন থেকে ধেয়ে আসবে খুনিরা। স্থির করল জ্যাকি: প্রাণ থাকতে হাল ছেড়ে দেবে না। কোনভাবেই ওকে জীবিত পাবে না এরা।

সিঁড়ির দিকে মাত্র দশ গজ যেতেই কঠিন কংক্রিটে মুখ থুবড়ে পড়ল জ্যাকি। হাত থেকে ছুটে গেল পিস্তল। প্রায় অচেতন হয়ে গেছে তীব্র ব্যথায়। কী যেন ফুটো করেছে ওর কাঁধের মাংস। অবশ্য ওটা বুলেট নয়। সেক্ষেত্রে চোখের সামনে দেখতে পেত রক্তের বাষ্প। জ্যাকির শরীর খুঁড়ে যেন তৈরি করা হচ্ছে গভীর কোন লেক। থরথর করে কাঁপছে শরীর। যেন গলে যাবে হাড়-মাংস। দেহ জুড়ে বইছে তীব্র যন্ত্রণার স্রোত। ছিটকে নানানদিকে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীন হাত- পা। পেছনে বেঁকে গেল মেরুদণ্ড। যে-কোন সময়ে মট করে ভাঙবে ওটা। জ্যাকির কাঁধে যে ডার্ট গেঁথে গেছে, ওটার পেছনে আছে লম্বা তার। আর মুঠোর মধ্যে একটা ডিভাইস ধরে রেখেছে পনিটেইল করা লোকটা। কাঁধের হোলস্টারে অটোমেটিক পিস্তল রেখে ধীরপায়ে এগিয়ে এল সে।

এখন কেমন লাগছে, মাই ডার্লিং?’ নরম সুরে বলল পশুটা। ‘বলো দেখি, তোমার কি দারুণ লাগবে না টনি স্ক্যালেসের সঙ্গে বিছানায় ফুর্তি করার সুযোগ পেলে?’ জ্যাকির পাশে থেমে ঝুঁকে মুচকি হাসল সে। দু’পাটি দাঁতের মাঝে সাদা একটা চুইংগাম। ভক করে মিন্টের গন্ধ পেল জ্যাকি। চট্ করে ওর মনে পড়ল সেই কটেজে খুনের রাতের কথা।

হাতের যন্ত্রটার সুইচ অফ করল স্ক্যালেস। বিদ্যুৎ তরঙ্গ থেমে গেলেও জ্যাকি এতই বিহ্বল, উঠে বসতে পারল না। আবছাভাবে দেখল ওকে ঘিরে ধরেছে কয়েকজন লোক। শক্ত হাতে হ্যাঁচকা টানে ওকে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। কাঁধের মাংস থেকে টান দিয়ে বের করে নিল ডার্ট। ‘আমার গা থেকে হাত সরান,’ জড়ানো কণ্ঠে বলল জ্যাকি। মুখ থুবড়ে পড়ে ছেঁচে গেছে গাল। ব্যথায় নিজের কণ্ঠস্বর অচেনা মনে হলো ওর। বুঝে গেছে, এরা ব্যবহার করেছে টেইয়ার। লাথি মেরে, দু’হাতে ঘুষি মেরে নিজেকে ছুটিয়ে নিতে চাইল জ্যাকি। একজনের বুকে লাগল ওর একটা ঘুষি। কিন্তু সেটা এতই দুর্বল, জবাবে মুচকি হাসল লোকটা।

সুবারুর ভাঙা জানালা দিয়ে গিয়ে জ্যাকির গুলি বিধেছে যার কাঁধে, সে নালিশ করল, ‘কুত্তীটা আমাকে গুলি করেছে!’ রক্তে ভিজে গেছে তার শার্টের বুক। ‘সত্যিই গুলি করেছে!’

‘দৌড় দিয়ে দ্যাখ, মাগী, কর্কশ স্বরে বলল স্ক্যালেস। পিস্তলের মাযল ঠেসে ধরল জ্যাকির থুতনির নিচে। ইস্পাতের স্পর্শটা শীতল ও কঠিন। ‘পারলে দৌড় দে! সুযোগ করে দে আমাকে! দেখবি এক গুলিতে ফুটো করব তোর মগজ!’

‘পিস্তল সরাও,’ ধমকের সুরে বলল বার্ব। জ্যাকির মনে পড়ল, এই লোক সেই রাতে কটেজে ছিল। ‘ভুলে যেয়ো না যে এই মেয়েটাকে জীবিত চাইছে বস।’

‘সে তোমার বস! আমার না! আবার বলে মেয়র! এমন একদিন আসবে যে এক গুলিতে তার খুলিও উড়িয়ে দেব আমি!’

‘বাজে কথা বাদ দাও, টনি,’ বলল বার্ব। জ্যাকির দিকে তাকাল। ‘কথা শুনছ? তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে মেয়র। তোমার সম্মানিত বোধ করা উচিত। সে খুব ক্ষমতাশালী লোক।’

‘ভাল করেই জানি তোমরা কারা,’ বলল জ্যাকি। ‘তুমি বার্ব আর এ স্ক্যালেস। নিজেদেরকে ভাবতে মিলিটারির অফিসার। কিন্তু আসলে তোমরা পচে যাওয়া মৃত কুকুর। লজ্জায় তোমাদের মরে যাওয়া উচিত।

‘ডাক্ট টেপ দিয়ে তোর মুখ আটকে দেব,’ বলল স্ক্যালেস, ‘আর একটা কথাও বলবি না।’ বেল্টে পিস্তল গুঁজে শক্ত করে জ্যাকির বাহু ধরল সে।

‘চলো, বিদায় নিই,’ ভ্যানের ড্রাইভিং সিটের দিকে চলল বার্ব। ‘কুত্তীটাকে পেছনের সিটে বসিয়ে দাও। আমি ড্রাইভ করব, টনি। তুমি পাশে থাকবে।’ আহত লোকটার দিকে আঙুল তাক করল সে। রিচি, তুমি বরং স্যামকে ফোর্ড চালাতে দাও। ফিনি, তুমি ভ্যানের ভেতরে বসে কুত্তীটাকে পাহারা দেবে। বেশি তেড়িবেড়ি করলে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখবে। তবে মারধর করবে না।’

‘কনারের সঙ্গে কথা শেষ হলে ফুর্তি করার সুযোগ দেব, ‘ দাঁত বের করে হাসল স্ক্যালেস।

‘মৃত্যুদণ্ড হলে এতগুলো দাঁত বের করে মরতে পারবে না,’ রেগে গিয়ে বলল জ্যাকি।

তিতকুটে হলো স্ক্যালেসের চেহারা। থুহ্ করে মুখ থেকে ফেলে দিল চুইংগাম। ‘তোমার কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছি।’ জ্যাকির বাহু ধরে খামচে ভ্যানের দিকে টেনে নিয়ে চলল সে। তাকে লাথি মারতে গিয়ে পা পিছলে মেঝেতে পড়ে গেল জ্যাকি। ঘাড় চেপে ধরে ব্যথা দিয়ে ওকে টেনে তুলল স্ক্যালেস।

সাদা ফোর্ডে রিচিকে উঠতে সাহায্য করল স্যাম। মেঝেতে তৈরি হয়েছে রক্তের সরু রেখা। ভ্যানের পেছনে চলে গিয়ে দরজা খুলে সরে দাঁড়াল ফিনি। ধাক্কা দিয়ে জ্যাকিকে ভ্যানে তুলে দিতে চাইল স্ক্যালেস। আর তখনই এল ইঞ্জিনের গম্ভীর আওয়াজ। ঘুরে ওদিকে তাকাল সবাই। স্ক্যালেস চমকে গিয়ে বলল, ‘এই শালা আবার কে!’

‘কে জানে কোন্ শালা,’ রিচি গাড়ির ভেতরে বসে পড়তেই বলল স্যাম।

গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজে গমগম করছে পাতাল গ্যারাজ। বাঁক নিয়ে র‍্যাম্প বেয়ে কালো এক জিপ নেমে আসতে দেখল বার্ব ও স্ক্যালেস। ওটার গতি খুব দ্রুত। পার্কিং লটে সাধারণত কেউ এত জোরে চালায় না। বার্বের দলের ওপরে এসে পড়ল জ্বলজ্বলে সাদা হেডলাইট।

চোখ সরু করে বিড়বিড় করে বলল স্ক্যালেস, ‘ব্যাপার কী!’ ছেড়ে দিয়েছে জ্যাকির বাহু। কোমর থেকে টেনে বের করল অ্যাসল্ট ওয়েপন।

গতি কমছে না জিপের। র‍্যাম্প বেয়ে নেমে ‘বুম্!’ শব্দে কংক্রিটে লাগল সাসপেনশন। চারদিকে ছিটকে গেল হলদে- কমলা ফুলকি।

গর্জন ছাড়তে ছাড়তে ছুটে আসছে গাড়িটা।

সবাই বুঝে গেল, থামবে না জিপের উন্মাদ ড্রাইভার। ‘ধুশালা!’ চমকে উঠল ফিনি। সরাসরি ভ্যানের পেছনে এসে লাগবে দ্রুতগামী জিপ!

জ্যাকির অন্য হাতটা ছেড়ে দিল বার্ব। কাঁধের হোলস্টার থেকে পিস্তল নিয়ে নল তাক করল জিপের দিকে। দেরি না করে একই কাজ করেছে স্ক্যালেস। গাড়িটার ইঞ্জিন ছাপিয়ে গর্জে উঠল দু’জনের হাতের পিস্তল। গুলির আঘাতে শত শত ফাটল তৈরি হলো জিপের উইণ্ডশিল্ডে। বনেটে বিধল অজস্র বুলেট। তবে রকেট লঞ্চার ব্যবহার না করা হলে কোনভাবেই এখন আর ভ্যানের পেছনে এসে জিপের গুঁতো ঠেকাতে পারবে না কেউ। হঠাৎ করে খুলে গেল ড্রাইভারের দরজা। কে যেন খসে পড়ল জিপ থেকে। মেঝেতে গড়াতে শুরু করেছে লোকটা। নিয়ন্ত্রণহীন তিন হাজার পাউণ্ডের বিশাল মিসাইল হয়ে গেছে জিপ। সোজা যাচ্ছে স্ক্যালেস ও বার্বের দিকে। আর্তনাদ করে উঠে কোমর থেকে মিনি-উযি নিল ফিনি। বুদ্ধিমান কেউ হলে লাফিয়ে অন্যদিকে সরে যেত, কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষ নয় সে। কী করবে ভাবতে গিয়ে দ্বিধা করেছে।

নাকে তুলে নিয়ে ভ্যানের পেছনে ফিনিকে পিষে দিল কালো জিপ। হাওয়াইটয়ার ফাটার মত বিকট শব্দ হলো পার্কিং লটে। ভ্যান ও জিপের সংঘর্ষে কোমর থেকে দু’টুকরো হয়েছে ফিনি। ডান বাইসেপ থেকে ছিঁড়ে গেল তার বাহু। ওটা ছিটকে জিপের ছাতের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়ল দূরের মেঝেতে।

লাফ দিয়ে শূন্যে ভেসে উঠেছে ভারী দুই গাড়ি। ছিটকে সামনে বেড়ে দশফুট দূরে কংক্রিটের এক পিলারে গিয়ে বাড়ি খেল ভ্যান। সবই যেন ঘটছে স্লো মোশনে। চারদিকে ছিটকাল হাজারো ভাঙা কাঁচ। একফুট পিছিয়ে এসে সাসপেনশনের ওপরে ভর করে মেঝেতে নেমে এল জিপ, তারপর বার দুয়েক দুলে উঠে স্থির হয়ে গেল।

সাঁইত্রিশ
প্যারাশ্যুট ড্রপের প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে জিপ থেকে ডাইভ দিয়ে নেমে এসেছে রানা। পার্কিং লটের কংক্রিটের মেঝেতে দু’বার গড়ান দিয়ে টেনে ছেড়ে দেয়া স্প্রিঙের মত লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। বামহাতে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরির ব্যাগ। এদিকে তীব্র বেগে ধূসর ভ্যানের পেছনে গিয়ে ধুম করে লেগেছে ব্রঙ্কো জিপ।

ভ্যানের ইঞ্জিন থেকে পড়া মোবিলের চিহ্ন অনুসরণ করে কোথায় গিয়ে হাজির হবে.. জানা ছিল না রানার। অবশ্য র‍্যাম্প বেয়ে নেমে আসতে গিয়ে টের পেয়েছে হাজির হয়ে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে নিতে মাত্র তিন সেকেণ্ড নিয়েছে ও। ধূসর ভ্যান, সাদা ফোর্ড গাড়ি আর খয়েরি লিংকনের কাছে আছে চারজন লোক। তাদের দু’জন আবার মেডেইরার অনেক পুরনো বন্ধু ওর। ফোর্ডের প্যাসেঞ্জার সিটে যে সাদা গরিলা ছিল, এখন গাড়ির পেছনে বসে আছে সে। একহাতে চেপে ধরেছে রক্তাক্ত কাধ। গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়ায় এক সুবারু গাড়ির পাশে রক্তের পুকুরে মুখ থুবড়ে আছে এক লোক।

এ-ছাড়া লোকগুলোর মাঝে আছে একমেয়ে। রানা জানে না সে কে এবং কী কারণে এখানে আছে। অবশ্য আপাতত এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই ওর। দুটো পিলারের মাঝে মাত্র বিশ ফুট দূরে আছে ভাঙা গাড়িগুলো। গুলি শুরু হওয়ার আগেই একদৌড়ে কাছের পিলারের আড়াল নিল রানা। ভাল করেই জানে, ওর এই আকস্মিক আগমনের বিস্ময়টুকু সামলে নেবে লোকগুলো। যে পিলারের ওদিকে লুকিয়ে পড়েছে রানা, ভ্যান ও জিপের সংঘর্ষের শব্দের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই ওটার গায়ে এসে লাগল একরাশ গুলি। সমস্যা হচ্ছে, বিপদ এলে কী করবে, সেটা আগে থেকে ভাবার সুযোগ হয়নি রানার। এখন চেনা দুই খুনির তরফ থেকে গুলি আসতেই বুঝে গেল, চরম অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে গেছে ও। নিজে পাল্টা গুলি না করলে খুনিরা চট্ করে বুঝবে প্রতিপক্ষ নিরস্ত্র। সেক্ষেত্রে হাসিমুখে এসে ঝাঁঝরা করে দেবে ওকে।

এবার কী করবে ভাবতে শুরু করেছে রানা, এমন সময় ওর চোখ পড়ল কাটা এক বাহুর ওপরে। ওটা আছে এদিকের পিলার ও পরের পিলারের মাঝে। এখনও দরদর করে রক্ত বেরোচ্ছে বাহুর ছেঁড়া মাংসপেশি থেকে। আঙুলগুলো শক্ত করে ধরে রেখেছে আগ্নেয়াস্ত্রের বাঁট। পলকে অস্ত্রটা চিনে গেল রানা। মিনি-উযি সাবমেশিন পিস্তল!

কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে থেমে গেছে গুলি। পিলারের কোনা থেকে উঁকি দিল রানা। পনিটেইল আর তার বন্ধু পাল্টে নিচ্ছে তাদের ম্যাগাযিন। এটাই শেষ সুযোগ, বুঝতে দেরি হলো না রানার। কাভার ছেড়ে ছুটল মিনি-সাবমেশিন পিস্তলের দিকে। ওকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল শত্রুদলের একলোক। রানার ডান কান পাশ কাটিয়ে চলে গেল বুলেটটা। দ্বিতীয় গুলি ঢুকে পড়ল ওর ব্যাগের ভেতরে। তীরবেগে ছুটছে রানা। নতুন করে ওর দিকে অস্ত্র তাক করছে দুই খুনির আরেক স্যাঙাত্। তবে সে গুলি করার আগেই ঝুঁকে উযি তুলে নিয়ে একটা পিলারের আড়ালে সরে গেল রানা। চট্ করে দেখে নিল অস্ত্রটা। মৃত লোকটার রক্তে মেখে আছে। ওটা। তবে সাবমেশিনটা নতুন বলেই মনে হলো ওর। অস্ত্রে আছে এক্সটেণ্ডেড ম্যাগাযিন। ভেতরে পঞ্চাশটা গুলি। তবে এই ক’টা গুলিতে যুদ্ধজয় সম্ভব নয়। শত্রুপক্ষের কাছে আছে একাধিক অস্ত্র। নিজেকে কোণঠাসা মানুষ বলেই মনে হলো রানার। পিলারের কোনা থেকে বের করল উযির খাটো নল। মাত্র একবার ট্রিগার স্পর্শ করতেই সাবমেশিন পিস্তলের নল থেকে ছিটকে বেরোল বেশ কয়েকটা গুলি। শুনলে যে-কেউ ভাববে ফড়ফড় করে ছেঁড়া হচ্ছে পুরু কার্ডবোর্ড। তফাৎ হচ্ছে আওয়াজটা খুব জোরে। খরচ করা বুলেটের খোসার হলদে এক স্রোত তৈরি করেছে ইজেক্টর পোর্ট। রানা গুলি করছে বুঝেই কাভার নেয়ার জন্যে নিজেদের গাড়িগুলোর ওদিকে ছিটকে সরে গেল শত্রুপক্ষ।

হঠাৎ করে কালো ধোঁয়ায় ভরা জিপের ভেতরে দেখা দিল আগুনের লকলকে কমলা জিভ। শিখাগুলো মাত্র ক’সেকেণ্ডে গিলে নিল গোটা জিপ। চোখের কোণে রানা দেখল, ধুপ করে খুলে গেছে সাদা ফোর্ড গাড়ির পেছনের দরজা। টলতে টলতে বেরিয়ে এল সেই সাদা গরিলা। একহাতে একটা পিস্তল। তবে সে গুলি করার আগেই পিলারের পাশে উযি রেখে একপশলা বুলেট বর্ষণ করল রানা। আধপাক ঘুরে গাড়ির ওপরে হুমড়ি খেয়ে সেখান থেকে মেঝেতে পড়ল মৃত লোকটা।

পিলারের আড়ালে রয়ে গিয়ে উযির ম্যাগাযিন চেক করল. রানা। এরই ভেতরে খরচ করে ফেলেছে অর্ধেক গুলি। সাবমেশিন পিস্তলের বড় সমস্যা হচ্ছে ঝড়ের বেগে শেষ করে অ্যামুনিশন। তারচেয়েও বড় কথা, স্পেয়ার ম্যাগাযিন নেই রানার কাছে। এদিকে ওর শত্রুদের কাছে অভাব নেই গুলির!

আরও ঘন হয়ে উঠেছে জিপের কালো ধোঁয়া। কুয়াশার মত ঘিরে ধরেছে অন্যান্য গাড়ি। শত্রুপক্ষকে এখন আর দেখতে পাচ্ছে না রানা। হঠাৎ করেই তাদের একজন বেরোল লিংকন গাড়ির পেছন থেকে। প্রথমে রানা ভাবল, হামলা করবে সে, কিন্তু পরক্ষণে দেখল শ্বাসরুদ্ধকর ধোঁয়ার ভেতরে টিকতে না পেরে কাশতে কাশতে দু’ভাঁজ হয়ে গেছে লোকটা, হাতে পিস্তল। একাধিক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় কাউকে বাড়তি সুযোগ দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দেরি না করে লোকটার মাথায় একটা গুলি গেঁথে দিল রানা। ছিটকে গিয়ে লিংকন গাড়ির পেছনে গিয়ে পড়ল লাশটা। হালকা ওজনের উঠি দিয়ে লক্ষ্যভেদ করা কঠিন। রানার কয়েকটা গুলি ভেঙে দিয়েছে খয়েরি গাড়ির টেইল লাইট। করডাইটের কটু গন্ধের ওপর দিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে গেছে পেট্রলের ঝাঁঝাল ঘ্রাণ। রানা বুঝে গেল, গুলি করে ফুটো করতে পেরেছে গাড়িটার পেট্রল ট্যাঙ্ক।

কংক্রিটের মেঝেতে গড়াচ্ছে পেট্রলের স্রোত। মৃত লোকটার তলা দিয়ে পৌঁছে গেল একটু দূরের জ্বলন্ত জিপের কাছে। পরক্ষণে পেট্রলে দপ করে ধরল আগুন। লেলিহান শিখা চাটতে লাগল পার্কিং লটের ছাত। গপ করে জিপ ও লিংকন গাড়িটাকে গিলে নিল আগুনের নীল ঢেউ।

‘চলো!’ চিৎকার করে পনিটেইলকে বলল দ্বিতীয় খুনি। আগুনের প্রচণ্ড তাপে পিছিয়ে গিয়ে ভ্যানের কাছে চলে গেছে তারা। সাধারণ এক কাজে এসে এরই ভেতরে খতম হয়ে গেছে তাদের তিনজন। তিক্ত চেহারায় আশপাশে জ্যাকি আছে কি না খুঁজে দেখল দ্বিতীয় খুনি।

কিন্তু কোথাও নেই মেয়েটা!

এখন তাকে খুঁজে নেবে, সেটা সম্ভব নয়। নিচু গলায় কাকে যেন অভিশাপ দিল লোকটা। মেয়েটাকে হাতের মুঠোয় না পেলে রেগে গিয়ে বিশ্রী গালি দেবে ওদের বস। অবশ্য এখন আর এসব ভেবে কোন লাভ নেই। এখানে যেটা ঘটল, আপ্রাণ চেষ্টা করলেও গোপন করতে পারবে না মেয়র অ্যারন কনার। পুলিশ ডিপার্টমেন্টে যতই লোক থাকুক, তদন্ত না করে রেহাই পাবে না পুলিশ চিফ রিগবি। সুতরাং এখন খুব দ্রুত বিদায় নিতে হবে এখান থেকে।

‘চলো!’ পনিটেইলকে আবারও তাড়া দিল সে। জবাবে তিক্ত চোখে তাকে দেখল ঠাণ্ডা মাথার খুনি। একই সঙ্গে ভ্যানে উঠে পড়ল তারা। পেছনের সিটে ছুঁড়ে ফেলল অস্ত্র। জ্বলন্ত জিপের আগুন এসে চেটে দিচ্ছে ভ্যানের তুবড়ে যাওয়া পেছনদিক। ওটার সামনের দিকটাও ক্ষত-বিক্ষত। অবশ্য পুরনো আমলের জিএমসি কোম্পানির গাড়ি খুব মজবুত। ইগনিশনে চাবি মুচড়ে দিতেই গর্জে উঠল ইঞ্জিন। দুই খুনি ‘বুঝে গেছে, ক’মাইল দূরে গিয়ে ভ্যানটা কোথাও রেখে গা ঢাকা দিতে হবে।

ব্যাক গিয়ার ফেলে অ্যাক্সেলারেটর চেপে ধরল দ্বিতীয় খুনি। ঠেলে জ্বলন্ত জিপটাকে পেছনে নিয়ে গেল ভ্যান। ওটার চাকার নিচে চ্যাপটা হলো ফিনির দু’ভাগ হওয়া মরদেহ। থেমে ঢাকার কর্কশ আওয়াজে ঘুরে ঘন কালো ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে র‍্যাম্পের দিকে ছুটল ভ্যান।

পিস্তলের শেষ ক’টা গুলি ভ্যানের পেছনে পাঠাল রানা। তিক্ত মনে দেখল র‍্যাম্প বেয়ে উঠে যাচ্ছে গাড়িটা। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে বাঁকের ওদিকে যেতেই ওটাকে আর দেখা গেল না।

যে-কোন সময়ে এই পার্কিং লটে হাজির হবে পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেডের লোক। পিলারের ওদিক থেকে বেরিয়ে এসে গুলিশূন্য পিস্তল হাত থেকে ফেলে দিল রানা। ধোঁয়ার মাঝে দেখতে পেল ওর গুলিতে মারা গেছে দু’জন। তৃতীয় লোকটার দু’ভাগ হওয়া দেহ চ্যাপটা হয়ে গেছে গাড়ির চাকার ভারী চাপে। বিকৃত লাশটা দেখলে ভয়ে চমকে উঠবে যে-কেউ।

আগুনে ভরা ব্রঙ্কো জিপ আর কোন কাজে লাগবে না। তিক্ত মনে ভাবল রানা, আজকাল যে হারে রেন্টাল কোম্পানির গাড়ি ধ্বংস করছে, তাতে ইনশিওরেন্স কোম্পানি দুনিয়ায় না থাকলে জরিমানা দিতে গিয়ে ক’দিনে ফতুর হয়ে যেত ও।

একটু আগে যে মেয়েটাকে দেখেছে, হঠাৎ অক্ষত দুটো গাড়ির মাঝের জায়গা থেকে বেরিয়ে এল সে। রানার কাছ থেকে মাত্র তিন গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে কালিঝুলি। দু’চোখ বেয়ে দরদর করে ঝরছে অশ্রু। মেঝেতে কাটা পড়া লাশ দেখে ভয় পেয়ে হাত দিয়ে চেপে ধরল মুখটা। ঘুরে দৌড়ে চলে গেল ছোট এক সুবারুর কাছে। বসে পড়েছে মৃত এক লোকের পাশে। ফুঁপিয়ে উঠে নিচু গলায় বলল, ‘দুঃখিত। জানতাম না যে আপনি আসলে একজন ভাল মানুষ ছিলেন।’

মেয়েটার পাশে গিয়ে থামল রানা। নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘ইনি কে ছিলেন?’

উঠে দাঁড়িয়ে ভুরু কুঁচকে ওকে দেখল জ্যাকি। ‘আপনি এটা কী বলছেন! আমি তো ভেবেছি আপনি তাঁর দলের!’

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল রানা।

‘তা… তা হলে… আপনি স্পেশাল এজেন্ট ববি হুক নন?’

‘না,’ মাথা নাড়ল রানা। ‘আমার নাম মাসুদ রানা।’

‘কথা শুনে ব্রিটিশ মনে হচ্ছে। কিন্তু গায়ের রঙ…’

‘আমি বাংলাদেশি, এদিকের মানুষ নই,’ বলল রানা। ‘এবার এখান থেকে চলে যেতে হবে। একটু পর পৌঁছে যাবে পুলিশের লোক। অন্য কোথাও গিয়ে আলাপ সেরে নেক আমরা। আমার সঙ্গে আসুন।’

কয়েক সেকেণ্ড ওর চোখে চেয়ে রইল জ্যাকি। যেন বুঝে নিতে চাইছে মানুষটাকে বিশ্বাস করা যাবে কি না। তারপর মাথা দুলিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। একমিনিট অপেক্ষা করুন। কয়েক গজ ছুটে গিয়ে মেঝে থেকে একটা পিস্তল নিয়ে আবার ফিরে এল সে।

‘চাইলে আরও অস্ত্র নিতে পারেন,’ আশপাশে কয়েকটা আগ্নেয়াস্ত্র দেখাল রানা।

‘আমার কাছে এটার ঐতিহাসিক মূল্য আছে,’ কথাটা বলেই সরাসরি ওর বুকে সিগ সাওয়ার তাক করল জ্যাকি! ‘আশা করি সত্য বলেছেন, নাকি ধরে নিয়ে যাবেন আমাকে অ্যারন কনারের কাছে?’

‘বুকে হাত রেখে বলতে পারি, প্রাণ থাকতে আপনার কোন ক্ষতি করব না,’ গম্ভীর স্বরে বলল রানা।

আরেকবার ওকে দেখল জ্যাকি। তারপর কোমরে পিস্তল গুঁজে নিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তবে মনে রাখবেন আমার কাছে অস্ত্র আছে। আজই দু’জন লোককে গুলি করেছি।’

‘কথা শুনে এবার সত্যিই ভয় পেলাম,’ মৃদু হাসল রানা।

‘আমার গাড়িটা বেশ পুরনো ছিল,’ বলল জ্যাকি। ‘এছাড়া ছিল ডিটেকটিভ লিয়োনার্ডের লিংকন। দুটোতেই কে যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।’

‘আগুন ধরিয়ে দেয়ার দায় আসলে আমার,’ বলল রানা। একটু দূরে তর্জনী তাক করল জ্যাকি। ‘তো চলুন, আমরা এলিভেটরে চেপে শপিং মলে উঠি। ধাওয়া খাওয়ার আগে ওদিকেই যাচ্ছিলাম।

দ্রুত এগিয়ে আসছে পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেডের সাইরেন। জ্যাকিকে বলল রানা, ‘আপনি তো এদিকেরই মানুষ, তা-ই না?’

‘হ্যাঁ।’

‘তা হলে আপনিই বরং পথ দেখান,’ বলল রানা।

আটত্রিশ
লিফটে চেপে শপিং মলে উঠতে দু’মিনিট লাগল জ্যাকি আর রানার। এলিভেটরের ইস্পাতের দরজা খুলে যেতেই ওরা দেখতে পেল, গোলাগুলি ও ফায়ার অ্যালার্মের আওয়াজে ভীত সন্ত্রস্ত একদল বিশৃঙ্খল শপারকে। এরই ভেতরে পৌঁছে গেছে শতখানেক পুলিশ অফিসার। লাইন তৈরি করে শপিং মল থেকে সবাইকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে তারা। নিচের পার্কিং লটের প্রবেশপথ দিয়ে বেরিয়ে ঝিরঝিরে হাওয়ায় সন্ধ্যার আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে ঘন কালো ধোঁয়া। হাজির হচ্ছে একের পর এক ইমার্জেন্সি ভেহিকেল। শপিং মলের ওপরে ভাসছে হেলিকপ্টার। ওটার বিকট আওয়াজের সঙ্গে তাল রাখছে অনেকগুলো সাইরেন। এ ছাড়া মহিলা ও বাচ্চাদের সম্মিলিত হৈ-চৈ আর পুরুষদের হাঁকডাক তো আছেই।

ওপর থেকে রাস্তায় চোখ বোলাল রানা। ওদিকে কোন ধূসর ভ্যান নেই। পুলিশের লোক পৌঁছে যাওয়ার আগেই পালিয়ে গেছে দুই খুনি।

‘আপনার নাম যেন কী?’ জ্যাকির কাছে জানতে চাইল রানা।

‘জ্যাকুলিন সিলভেস্টার, ভুরু কুঁচকে ওকে দেখল জ্যাকি, কাঁধে ডার্ট বিধে যাওয়ার জায়গাটা টিশটিশ করে ব্যথা করছে ওর। ‘এবার বলুন, আপনি আসলে কে।’

‘আগে, চলুন, এক কাপ কফি নেয়া যাক,’ বলল রানা।

শপিং মল থেকে বেরিয়ে সিকি মাইল দূরে বড় এক কফি শপে ঢুকল ওরা। বিশাল টিভিতে নিউয় কাস্টার গম্ভীর চেহারায় ভারী গলায় বলে চলে শপিং মলে হামলা করেছিল একদল সন্ত্রাসী।

টিভি দেখার জন্যে কফি শপে জড় হয়েছে অনেকে। রানাদের টেবিলের পাশের টেবিল থেকে একজন বলে উঠল, ‘আমার পরিচিত একজন নিজের চোখে সব দেখেছে! সে বলল, হঠাৎ কোথা থেকে এসে গুলি শুরু করেছে একদল মুসলিম জঙ্গি!’

‘দৈত্যের মত বিশাল নিগ্রোগুলোকে দিয়ে শালাদের পোঁদ মারিয়ে নেয়া উচিত!’ বলল উত্তেজিত এক কাস্টমার

‘আরে, থামুন তো!’ ধমক দিল আরেকজন। ‘আপনার চিৎকারে নিউয় কাস্টারের কথাই তো শুনতে পাচ্ছি না!’

সবার চোখ আবারও চলে গেল টিভির পর্দার ওপরে। দুই কাপ কফি কিনে জানালার ধারে ওদের টেবিলে ফিরে এল রানা। চারপাশে চেয়ে নিয়ে বুঝল, কারও খেয়াল নেই ওদের দিকে। দূর থেকে এল হেলিকপ্টার ও সাইরেনের আওয়াজ। পাশের রাস্তা দিয়ে গেল পুলিশের গাড়ি। উদ্বিগ্ন পথযাত্রীরা থমকে দাঁড়িয়ে পুলিশ অফিসারদেরকে দেখছে।

বড় করে এক চুমুক কফি নিয়ে বলল জ্যাকি, ‘তা হলে আপনার নাম মাসুদ রানা?’

‘হ্যাঁ। আপনার, সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম, জ্যাকুলিন।’

‘আমাকে জ্যাকি বলে ডাকতে পারেন। আর আপনি আপনি করে কথা না বললেও চলবে। আমি বয়সে আপনার চেয়ে ছোটই হব।’

‘বেশ,’ বলল রান

‘আমার বোধহয় আপনাকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত। আপনি এসে আমার াণ বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

‘তুমিও আমাকে রানা বলে ডেকো। অত বুড়ো হইনি যে আমাকে আপনি করে বলতে হবে,’ বলল রানা। ‘একটু আগেও আমার দিকে পিস্তল তাক করেছিলে। সত্যি সত্যি যে গুলি করে দাওনি, সেজন্যে তোমাকেও ধন্যবাদ।’

‘কিন্তু এখন কথা হচ্ছে, তুমি আসলে কে? হঠাৎ করে কোথা থেকে এসে উদয় হলে?’

সে লম্বা এক কাহিনী। পরে হয়তো বলব। এখন বলো, লোকগুলো তোমার কাছে কী চাইছিল?’

হঠাৎ ছলছলে হয়ে গেল জ্যাকির দু’চোখ। কাপতে শুরু করেছে কফির কাপ ধরা হাত। বিপদ কেটে যাওয়ায় ওর ভেতরে কাজ করছে শক। ‘ওরা আমাকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছে। কয়েক দিন ধরেই খুঁজছে। আসলে… সর্বনাশ হয়ে গেছে আমার জীবনের। এবার আমাকে খুন করবে তারা। কেউ নেই যে আমাকে বাঁচাতে পারবে।’

‘এত হতাশ হতে নেই, জ্যাকি,’ বলল রানা। ‘খুলে বলবে কেন এরা তোমার পেছনে লেগেছে?’,

‘আমি এক লোকের নৃশংস হত্যার সাক্ষী,’ বলল জ্যাকি। নিজেকে সামলে নিল। ‘খুব খারাপ কাজ করেছিল তারা আর তাদের বস।’

‘তুমি বোধহয় বলছ অ্যারন কনারের ব্যাপারে?’

চোখ তুলে রানাকে দেখল জ্যাকি। তা হলে তো ভূমি সবই জানো। হঠাৎ করে এসবে জড়িয়ে যাওনি।’

‘আমি কনারের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছি।’ বলল রানা। ‘এটা জেনেছি যে, লোকটা দরকার হলে যে-কাউকে খুন করাতে গিয়ে দ্বিধা করে না।’

মাথা দোলাল জ্যাকি। ‘আমি নিজেও সেটা জানি।’

‘তোমাকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছে কেন? তুমি কি মেয়রের অফিসে চাকরি করো?’

‘টুলসায় তার স্ত্রী লিণ্ডা কনারের একটা চ্যারিটি ফার্ম আছে। আমি সেখানে চাকরি করি। লিণ্ডা আমাকে জুনিয়র বান্ধবী বলেই মনে করেন। তাই বলেছিলেন, আমি চাইলে তাঁর কটেজে গিয়ে কয়েক দিন কাটিয়ে আসতে পারি গেলাম উলোগাহ্ লেকের তীরে সেই কটেজে। কিন্তু সে-রাতে অ্যারন কনার আর তার লোকেরা…’ চোখ সরু করে রানার দিকে তাকাল জ্যাকি। হঠাৎ করে একটা চিন্তা এসেছে ওর মনে। ‘তুমি কি হিউবার্ট হ্যারন্ডের খুনের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছ? তার হয়ে প্রতিশোধ নেবে?’

‘আগে কখনও এই নামের কারও কথা শুনিনি,’ জবাবে বলল রানা। ওর চোখে চেয়ে জ্যাকি বুঝে গেল, মিথ্যা বলছে না মানুষটা। ‘লোকটা আসলে কে?’

‘খুন করেছে তাকে। সে-রাতে তাকেই খুন হতে দেখেছি আমি। এফবিআই-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তার। চেয়েছিল অ্যারন কনারকে ধরিয়ে দিতে।’

‘হিউবার্ট হ্যারল্ডের জন্যে টুলসায় আমি আসিনি,’ বলল রানা। এসেছি বেলা ওয়েস নামের এক মেয়ের জন্যে। ওকে খুন করিয়েছে অ্যারন কনার।’

‘তুমি কি তা হলে পুলিশ অফিসার? নাকি ডিটেকটিভ?’

‘আমি সাধারণ মানুষ,’ বলল রানা। ‘মেয়েটাকে যখন খুন করা হয়, তখন ওখানে ছিলাম। আহত হয়েছিলাম বলে তাকে বাঁচাতে পারিনি। খুব কষ্ট পেয়ে মারা যায় বেচারি। পরে আমার মনে হয়েছে, খুনিদেরকে শাস্তি দেয়ার কাজটা নিজের কাঁধে তুলে নেয়া উচিত। এরা যা করেছে, সেজন্যে আমার কাছে জবাব দিতে হবে অ্যারন কনারের।’

‘বেলা ওয়েস কি…’

মাথা নাড়ল রানা। ‘কোন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না। সদ্য পরিচিতা নতুন এক বান্ধবী।’

‘ওকে মরে যেতে হলো বলে আমার খারাপ লাগছে।’

‘আমারও খুব খারাপ লেগেছে।’

‘মেয়েটাকে তারা খুন করল কেন?’

‘শুধু এটা জানি, কোন কারণে অ্যারন কনারের জন্যে হুমকি হয়ে উঠেছিল বেলা। আমি এ-ব্যাপারে আরও খোঁজ নিচ্ছি। মনে হচ্ছে, তুমিও হয়তো নতুন কিছু জানাতে পারবে। সেক্ষেত্রে পরস্পরকে সাহায্য করতে পারব আমরা। তোমার সঙ্গে যে-লোক ছিল, যাকে খুন করেছে এরা, সে আসলে কে?’

মুখ খোলার আগে দ্বিধা করল জ্যাকি, তারপর নিচু গলায় বলল, ‘তার নাম জিম লিয়োনার্ড। পুলিশ ডিপার্টমেন্টের এক ডিটেকটিভ। গোপনে কাজ করছিল এফবিআই-এর হয়ে। তারা তদন্ত করছিল, কারণ ধারণা করা হচ্ছে অ্যারন কনার…’ চুপ হয়ে সতর্ক চোখে চারপাশে তাকাল জ্যাকি।

‘আমাদের দিকে কারও মনোযোগ নেই,’ বলল রানা। ‘এফবিআই অ্যারন কনারের ব্যাপারে কী ধরনের তদন্ত করছে?’

সামনে ঝুঁকে নিচু গলায় বলল জ্যাকি, ‘লিয়োনার্ড বলেছেন, মেক্সিকোর ড্রাগস কার্টেলের কাছে হাজার হাজার অস্ত্র বিক্রি করছে অ্যারন কনার। ভয়ঙ্কর সেই দলের নাম হার্ডি লোকো।’

‘খুলে বলো, আমি শুনছি,’ বলল রানা।

‘মিলিটারি থেকে চুরি করা অস্ত্র তাদের কাছে বিক্রি করে কনার। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের। এবারের নির্বাচনে যদি গভর্নর হয়ে ওঠে, তো আরও বড় পরিসরে শুরু করবে অস্ত্র ব্যবসা।’

আমেরিকার সরকারের যত বড় পদে বসবে অ্যারন কনার, তত বেশি বেআইনি অস্ত্র মেক্সিকোতে পাচার করবে, বুঝে গেল রানা। আর সেসব অস্ত্রের কারণে সাধারণ মানুষ মারা পড়লেই বা তার কী?

‘অ্যারন আগে ছিল উকিল,’ বলল রানা। ‘কোনভাবেই মিলিটারির সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকার কথা নয়। তা হলে এত অস্ত্র কোথা থেকে পাচ্ছে সে?’

‘এফবিআই-এর ধারণা: অস্ত্র জোগাড় করে প্রাক্তন মেজর লিয়াম বার্ব আর তার সহকারী প্রাক্তন মেজর টনি স্ক্যালেস। মিলিটারির চাকরি ছেড়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অ্যারন কনারের ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করে তারা।’

নিষ্পলক চোখে ওকে দেখল রানা। ‘তাদের নাম তা হলে লিয়াম বার্ব আর টনি স্ক্যালেস?’

‘স্ক্যালেসের মাথায় আছে পনিটেইল। সর্বক্ষণ চুয়িংগাম চিবোয় লোকটা। অন্যজন বার্ব। অ্যারন কনারের ডানহাত। এরা দু’জনই আগে ছিল স্পেশাল ফোর্সের অফিসার।’

কিছুক্ষণ পর বলল রানা, ‘আমিও তা-ই ভেবেছি।’

‘তাদের অস্ত্র ব্যবহার করা দেখে?’

‘না, যতবার আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে, প্রত্যেকবার

তাদের কাছে ছিল আধুনিক অস্ত্র।’

‘আগেও তোমার সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে?’

‘প্রথমবার তাদের হাতে ছিল স্টিলের ব্যাটন ও ছোরা। পরের বার সাবমেশিন পিস্তল। অভাব ছিল না গুলির। আর আজকে ব্যবহার করেছে মিলিটারির অত্যাধুনিক অস্ত্র ক্রিস ভেক্টর। এ-জিনিস চাইলেও সংগ্রহ করতে পারবে না সাধারণ ‘পাবলিক।’

‘লিয়োনার্ড বলেছিলেন মিলিটারির ভেতরে হাত আছে লিয়াম বার্বের,’ বলল জ্যাকি। ‘শুনেছি টুলসা কাউন্টিতে বড় এক ওয়্যারহাউসে হাজার হাজার অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে অ্যারন কনার। তার দলের একদল লুঠেরা ট্রাকে তুলে নিয়ে ওসব টেক্সাস পার করে পৌঁছে দিচ্ছে সীমান্তে। লাখ লাখ ডলার পেয়ে নরকের নরপিশাচ অ্যারন কনার হাসতে হাসতে মিলিটারি থেকে চুরি করা সব অস্ত্র তুলে দিচ্ছে হার্ডি লোকোর হাতে। ড্রাগ্‌স্‌ কার্টেল অস্ত্র কিনছে নিজেদের এলাকা আরও বড় করার জন্যে। …আমার কথা থেকে কিছু বুঝলে?’

‘ক্রিস ভেক্টর ৪৫ ক্যালিবারের সাবমেশিন গান। টমি গানের নতুন সংস্করণ। পলিমার দিয়ে তৈরি। খুব আধুনিক ডিলেইড রিকয়েল সিস্টেম। সাইক্লিক রেট প্রতি মিনিটে এক হাজার বুলেটের বেশি। আগে নিজের চোখে দেখিনি। ক্রিস ভেক্টরের বেশ কয়েক ক্রেট হাতে পেলে তার বদলে কোটি ডলার দিতেও হয়তো দ্বিধা করবে না ড্রাগ্‌স্‌ কার্টেল।’

‘অস্ত্রের ব্যাপারে তুমি এত কিছু জানলে কীভাবে?’ রানার চোখে তাকাল জ্যাকি।

‘কারণ, আমি নিজেও সৈনিক ছিলাম,’ বলল রানা।

‘তুমি যা-ই হও, ওদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে ‘না’ বলল জ্যাকি। ‘বার্ব আর স্ক্যাসে তো একা নয়, তাদের নির্দেশে কাজ করে একদল হারামজাদা লুঠেরা। ছোটখাটো একটা আর্মি তৈরি করে নিয়েছে তারা।’

‘তবুও একবার চেষ্টা করব এদেরকে ঠেকাতে, তিক্ত হাসন রানা।

‘ওদের সঙ্গে লাগতে গেলে স্রেফ খুন হয়ে যাবে, মাথা নাড়ল জ্যাকি। ‘কর্তৃপক্ষের কাছে মুখ খুলেছিল বলে খুন হয়ে গেছে হিউবার্ট হ্যারল্ড। তোমার বান্ধবী বেলা ওয়েস বোধহয় গোপন কিছু জেনে গিয়েছিল, তাই তাকেও সরিয়ে দিয়েছে দুনিয়া থেকে। বুঝলে, আমাদেরকে আসলে বাঁচতে দেবে না এরা।’

চুপ করে ভাবছে রানা, আজ কী জেনেছে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ডায়েরি থেকে। অ্যারন কনারের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর গ্রেগ কার্সটির কাছ থেকে নিয়েছিল বেলা। রানার মনে পড়ল, বেলা বলেছিল প্ল্যান সফল হলে বাকি জীবনে আর কোন কাজ করতে হবে না ওকে। ‘আমার ধারণা, টাকা আদায় করতে অ্যারন কনারের ওপরে চাপ তৈরি করেছিল বেলা,’ বলল ও। ‘মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার।’

‘তার ফল কী ধরনের হয়েছে, সেটা তো বুঝলেই,’ বলল জ্যাকি।

‘বেলা অস্ত্র চোরাচালানের ব্যাপারে কিছু জানত না,’ বলল রানা। ‘অন্য কোন কারণে ব্ল্যাকমেইল করছিল।’

‘বিপদের তো শেষ নেই,’ বলল জ্যাকি। ‘জেনে রাখো, মেয়র অ্যারন কনারের পকেটে আছে টুলসার পুলিশ চিফ রিপার রিগবি।’

‘স্বাভাবিক,’ বিস্মিত হয়নি রানা।

‘এফবিআই-এর হয়ে তার ওপরে চোখ রেখেছিলেন ডিটেকটিভ লিয়োনার্ড। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, কোনভাবেই আমরা পুলিশের সাহায্য পাব না।’

‘আমি আসলে পুলিশের সাহায্য চাইছি না,’ বলল রানা।

‘কিন্তু কিছু না কিছু তো আমাদেরকে করতে হবে, তা-ই না?’

‘আমরা মানে?’ জ্যাকির চোখে তাকাল রানা।

‘আমার কাছে আছে শক্ত প্রমাণ,’ বলল জ্যাকি। ‘ওটার কারণে মৃত্যুদণ্ড হবে অ্যারন কনারের। সে-রাতে কটেজে যখন মানুষটাকে খুন করল, তখন ওপরতলা থেকে মোবাইল ফোনে ভিডিয়ো করেছি আমি।’

‘ফোনটা এখন কোথায়?’ জানতে চাইল রানা।

‘দিয়ে দিতে হয়েছে পুলিশ চিফ রিগবির কাছে। ডিস্কে যে কপি করেছি, সেটাও। তখন তো জানতাম না যে লোকটা নিজেই পাকা অপরাধী। তাকে সবই খুলে বলেছিলাম। তাই অ্যারন কনার যে একজন খুনি, সেটা বলার পর থেকেই হয়ে গেলাম তাদের টার্গেট। কিন্তু তারা জানে না, আমার কাছে রয়ে গেছে ডিস্কের দ্বিতীয় কপি।’

‘ওটা এখন তোমার সঙ্গে আছে?’

‘আমাকে পাগল ভাবো? ডিস্ক এমন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছি, যে ভাবতেও পারবে না কেউ।’

‘তা হলে এবার সেই ডিস্ক দিয়ে কী করবে বলে ভাবছ?’ বলল রানা।

‘সরাসরি যাব এফবিআই-এর কাছে। যা জানি সবই খুলে বলব তাদেরকে।’

‘আর তারপর?’ জানতে চাইল রানা।

ভুরু কুঁচকে ওকে দেখল জ্যাকি। ‘তুমি কি ভাবছ সব জেনেও কিছুই করবে না ওরা?’

‘হয়তো করবে, আবার না-ও করতে পারে। তুমি হয়তো ভাবছ এফবিআই-এর লোক রাজপুত্রের মত সাদা ঘোড়ায় চেপে এসে গ্রেফতার করবে কনারকে। তাতে শেষ হবে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। বাকি জীবন পচে মরবে জেলে। কিন্তু একবার এটা ভেবেছ, এফবিআই অন্যকিছু করতে পারে হয়তো সঠিক সময়ের জন্যে অপেক্ষা করবে তারা। নইলে জিম লিয়োনার্ড খুনের প্রমাণের ব্যাপারে সব জানিয়ে দেয়ার পরেও তারা গা নাড়াচ্ছে না কেন?’

‘এই শহরে আর বাস করতে পারব না,’ বলল জ্যাকি। ‘চাকরি ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এদিকে বাঁচতে হলে অন্য কোন শহরে গিয়ে নতুন একটা পরিচয় চাই আমার। সেটা হয়তো তৈরি করে দেবে এফবিআই। চিরকালের জনে উধাও হবে জ্যাকুলিন সিলভেস্টার। বদলে উদয় হবে নতুন এক মেয়ে। এমন একজন, যে নিরাপদে পার করবে নিজের জীবন।’

‘শুনেছি সাক্ষীকে সবসময় রক্ষা করতে পারে না এফবিআই। আর সেক্ষেত্রে হঠাৎ করে দুনিয়া থেকে উধাও হয় সেই সাক্ষী। সরকারি এজেন্টরাও তো মানুষ, তাই তাদেরও কাজে ভুল হয়। নিজেই তো বুঝতে পারছ, তোমাকে কোন ধরনের নিরাপত্তা দিচ্ছে না এ-দেশের সরকার। হয়তো তাদের ভালর জন্যে ঘাড় পেতে দিলে, কিন্তু ঘাড়ে কোপ যখন আসবে, ঠেকাবে না কেউ। তোমার কি মনে হয় যে, এফবিআই বিশেষ কোন ব্যবস্থা নিয়েছে তোমার জন্যে?’

‘তুমি নিজেই বলেছ অ্যারন কনার থাকবে জেলে। ওখান থেকে তো আর আমার ক্ষতি করতে পারবে না।’

মাথা নাড়ল রানা। ‘গভীরভাবে ভাবো, জ্যাকি। অ্যারন কনার ধনী লোক। আর টাকা-পয়সা যার আছে, সে সেটা খরচ করে যে-কোন জায়গায় তোমাকে খতম করে দিতে পারবে। জেলের বড়কর্তাদের সঙ্গে ডিনারে বসে শ্যাম্পেন আর লবস্টার খেতে খেতে বিরোধী দলের লোকদেরকে খুন করার নির্দেশ দেয় মাফিয়া ডনেরা। এটা তো তোমার জানা থাকার কথা।’

‘তুমি যা বলছ, সেটা অতি নাটকীয় বলে মনে হচ্ছে না?’

‘অবশ্যই অতি নাটকীয়। তবে ওটাই বাস্তব।’

‘তুমি তা হলে আমাকে কী করতে বলো? যদি অনেক দূরে কোথাও গিয়ে লুকিয়ে পড়ি?’,

‘এফবিআই নতুন পরিচয় তৈরি করে দিলেও বেশি দিন রেহাই পাবে না। যদি সব ঠিকঠাকভাবে চলে, আর অ্যারন কনার এবং তার লোকেরা বুড়ো হয়ে জেল থেকে বেরোয়, তবুও তোমাকে খুঁজে নেবে তারা। আসলে চিরকালের জন্যে উধাও হতে পারে না কেউ। এটা সম্ভব নয়।’

‘তুমি খুব জোর দিয়ে কথাগুলো বললে-কিন্তু সেটা কেন?’

‘কারণ আমি জানি। আগে যে পেশায় ছিলাম, আমাকে অনেক সময়ে লুকিয়ে থাকা মানুষকে খুঁজে নিতে হতো। আগে আর পরে, ধরা তারা পড়তই।’

‘অর্থাৎ তুমি নিজে আগে খুঁজে নিতে মানুষগুলোকে?’

মৃদু মাথা দোলাল রানা। ‘কেউ যদি শ্বাস ফেলে, আজ হোক বা কাল তাকে খুঁজে নেয়া যায়। এখন বড় কথা হচ্ছে, তার পক্ষের লোক তাকে খুঁজে নেবে, না বিপক্ষের লোক। আমার মত কেউ হলে প্রাণে মরবে না তুমি। ওদিকে কনারের দলের কেউ তোমাকে পেয়ে গেলে ধরে নাও তুমি আর দুনিয়ায় নেই।’

‘কী মিষ্টি করেই না কথা বলো তুমি!’ তিক্ত স্বরে বলল জ্যাকি। ‘তা হলে? এখন কী করব? এফবিআই যদি আমাকে নিরাপত্তা না দেয়, ধরে নিলাম সেটা তারা দেবে না, তা হলে কাকে বিশ্বাস করে তার হাতে নিজেকে তুলে দেব? এর মানেই তো হচ্ছে, সত্যি সত্যিই খুন হয়ে গেছি আমি!’

‘মোটামুটি তা-ই,’ বলল রানা।

‘এত ভাল কথা আগে শুনিনি,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল জ্যাকি। ‘আমার দিনটা একেবারে রঙিন করে দিলে, রানা! ধন্যবাদ তোমাকে।’

তোমার খারাপ কিছু হোক, তা চাই না,’ বলল রানা। ‘তবে সত্যি কথা হচ্ছে, আরামদায়ক মিনিমাম সিকিউরিটি জেলে সাধারণ মানুষের চেয়ে ঢের বিলাসে থেকেও সুখী হবে না অ্যারন কনার। আমাদের চেয়ে বেশি নিরাপদে থাকলেও অন্তর জ্বলবে তার। আর যেহেতু তার টাকা আছে, কাজেই বেশিদিন তাকে জেলেও থাকতে হবে না। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’

‘তা হলে আমি আসলে কী করব?’ অসহায় চোখে ওকে দেখল জ্যাকি। ‘আমার তো দেখি বাঁচারই কোন উপায় নেই!

‘কফি শেষ করো।’

‘একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।’

নিজের কফি দু’চুমুকে শেষ করল রানা। ‘ঠিক আছে, এবার চলো।’

‘কোথায় যাব?’

‘সবচেয়ে কাছের সেকেণ্ড হ্যাণ্ড গাড়ি বিক্রির দোকানে। যাতায়াতের ব্যবস্থা না হলে কোন কাজই করতে পারব না। গাড়ি কেনার পর তোমাকে নিরাপদ কোথাও রেখে সেরে নেব কিছু কাজ। পরে দু’জন মিলে বসে ভাবব, কী করা যায়।’

‘কোন হোটেল বা মোটেলে উঠবে বলে ভাবছ?’

‘আমার মোটেলটা মন্দ নয়।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলল জ্যাকি। ‘ও।’

‘তোমার খারাপ লাগবে না। খুবই স্টাইলিশ। সুযোগ- সুবিধা দেখার মত।’

ডান ভুরু কপালে তুলল জ্যাকি।

ওকে চোখ টিপল রানা। ‘একই রুমে থাকতে হবে। তবে বিশ্বাস করতে পারো আমাকে। রাত-বিরেতে হঠাৎ করে চড়াও হব না।’

‘আর দিনের বেলায়? তখন যদি চড়াও হও?’

‘তুমি দেখছি আমার বুকের পাঁজর ভেঙে চুরচুর করে দিচ্ছ,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা। ‘আমি অত খারাপ ছেলেই নই!’

‘আমার তো আসলে কোন উপায়ই নেই তোমার সঙ্গে না গিয়ে, মন খারাপ করে বলল জ্যাকি। ‘তুমি ভাল না খারাপ সেটা যাচাইয়ের সুযোগ কোথায় আমার?’

‘তুমি বাঁচতে না চাইলে না-গিয়ে রয়ে যেতে পারো।’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে জ্যাকি বলল, ‘ঠিক আছে। তবে মনে রেখো, রুমের বিছানা আমার। সোফায় ঘুমাবে তুমি। আর তোমাকে. কোন গাড়ি কিনতে হবে না। আমার আরেকটা গাড়ি আছে। ওটা ব্যবহার করতে পারব আমরা।’

ঊনচল্লিশ
সন্ধ্যার কালচে আকাশে একটা-দুটো করে ফুটছে নক্ষত্র। দূর থেকে এল ঝিঁঝি পোকার ডাক। একসারি গ্যারাজের কাছে পৌঁছে আঙুল তুলে রানাকে একটা শাটার দেখাল জ্যাকি। শাটারের ওপরে ঝাপসা হয়ে গেছে বাজে ছেলেদের আঁকা নোংরা ছবি। বিশাল উঠনে নানাদিকে ঝোপঝাড়। দেখলে যে-কেউ বুঝবে, পরিত্যক্ত হয়ে গেছে জায়গাটা। পার্স থেকে চাবি নিয়ে ঝুঁকে শাটারের ভারী তালা খুলল জ্যাকি। রানাকে বলল, ‘শাটার তুলতে হাত লাগাও। কল-কব্জায় জং ধরে গেছে।’

‘ভেতরের গাড়িটা আবার জংধরা নয়তো?’ বলল রানা।

‘নিজেই দেখবে।’

শাটার ওপরে তুলতেই বিশ্রী কর্কশ ধাতব আওয়াজ শুনল রানা। চট্ করে গ্যারাজে ঢুকল জ্যাকি। ওর পিছু নিয়ে সামনে ঘন কালো অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখল না রানা। গ্যারাজের ভেতরে গাড়ি পালিশের মোম, পুরনো মবিল ও লোহার জোরাল গন্ধ।

‘বাতি জ্বেলে নেব,’ বলল জ্যাকি, ‘আগে শাটার নামাও।’

আরেকবার কর্কশ আওয়াজে নেমে এল শাটার। ঘুটঘুটে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে রানা ও জ্যাকি। অবশ্য তিন সেকেণ্ড পর ক’বার টিপটিপ করে ছাতে জ্বলে উঠল সাদা ফ্লুরোসেন্ট টিউব লাইট। উজ্জ্বল আলোয় চারপাশ দেখল রানা। বাইরে থেকে যেমন মনে হয়, গ্যারাজ তার চেয়ে বড়। একদিকের দেয়ালে জড় করা হয়েছে বাতিল মালে ভরা বাক্স। এ-ছাড়া আছে কাঠের ওঅর্কবেঞ্চের ওপরে নানান যন্ত্রপাতি। পাশেই তারপুলিনের ক্যানভাসের নিচে লম্বাটে এক বড় গাড়ি। তারপুলিন টেনে সরিয়ে দিল জ্যাকি।

ছোটবেলা থেকেই সত্যিকারের ভাল গাড়ির পাকা সমঝদার রানা। জ্যাকি তারপুলিন সরিয়ে নেয়ায় নিচু সুরে শিস না বাজিয়ে পারল না ও। উজ্জ্বল আলোয় চকচক করছে কালো রঙের গাড়িটার প্রতিটি নিখুঁত ভাঁজ। চাকার হুইল ক্রোম প্লেটেড। বহু বছর আগে আমেরিকার ভাল কোম্পানিগুলো তৈরি করত এ-ধরনের শক্তিশালী গাড়ি।

‘উনিশ শ’ একাত্তরের প্লিমাউথ ব্যারাকুডা,’ ভালবাসা নিয়ে মস্ত গাড়িটার দিকে তাকাল জ্যাকি। ‘এটা ছিল আমার বাবার গর্ব আর আনন্দের বড় উৎস। নিজেই কম দামে নানান যন্ত্রপাতি একে একে কিনে তৈরি করেছিল।

‘তোমার বাবা তোমাকে দানবটাকে চালাতে দেন?’

‘বাবা আর নেই,’ বলল জ্যাকি, ‘ব্যাঙ্কের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে সামান্য পেনশন পেত। তবে মারা যাওয়ার আগে গাড়িটা দিয়ে গেছে আমাকে। এই গাড়ি আর আমি ছাড়া আর কোনকিছুই ছিল না মানুষটার।’ পার্স খুলে গাড়ির দুটো চাবি নিল ও। ‘বাবা চলে গেলে এরপর আর প্রায় ব্যবহার করা হয়নি। নিজে চালিয়েছি বড়জোর দু’চারবার। অবশ্য বাবার স্মৃতি হিসেবে যত্ন করেই রেখেছি।’ রানার চোখে বিস্ময় দেখে মৃদু হাসল জ্যাকি। ‘পিচ্চি মেয়েরা জানবে না এমন বহুকিছুই আমাকে শেখাত বাবা। যেমন ধরো: কীভাবে নামানো যায় হেমি ভি-৮ ইঞ্জিন। অথবা কীভাবে চালাতে হয় পিস্তল। রাইফেল পেলে জঙ্গলে গিয়ে হোয়াইট- টেল হরিণ শিকার করে চামড়া ছিলে মাংস কেটে কাবাব তৈরি করতেও জানি। তোমাকে কথা দেব, খুব খারাপ হবে না রান্না।’

পকেট থেকে সিগ সাওয়ার নাইন এমএম পিস্তল বের করে রানাকে দেখাল জ্যাকি। ‘মারা যাওয়ার দু’দিন আগে এটা আমাকে দেয় বাবা।’

‘এবার বুঝলাম, কেন অস্ত্রটা ফেলে আসতে চাওনি,’ বলল রানা।

‘সামনে খুব খারাপ সময় আসছে, মা, ‘ বাবা বলেছিল। ‘আমি চাই আমার মৃত্যুর পর আমার পিচ্চি মেয়েটা যেন দুনিয়ার সঙ্গে লড়াই করার জন্যে তৈরি থাকে।’’

‘ভাল একজন বাবা পেয়েছিলে,’ বলল রানা।

‘অবশ্যই,’ বলল জ্যাকি। ‘তবে এটা জানি না যে শেষমেশ হিউবার্ট হ্যারল্ডের মত গুলি খেয়ে মরব কি না।’ প্লিমাউথের পেছনে গেল মেয়েটা। ট্রাঙ্ক আনলক করে ডালা খুলে ভেতরে কী যেন খুঁজল। পাঁচ সেকেণ্ড পর সোজা হয়ে দাঁড়াল। এখন ওর হাতে নীল বড় এনভেলপ। ওটার ভেতর থেকে জ্যাকি নিল পলিথিনের একটা ব‍্যাগ। সেটা থেকে বের করল একটা কমপ্যাক্ট ডিস্ক। ‘এখানে আসার আরেকটা কারণ হচ্ছে, এখানেই এটা রেখেছিলাম,’ বলল জ্যাকি।

‘ভিডিয়োর কপি ওটা?’

‘তোমার মোটেল রুমে ডিভিডি প্লেয়ার আছে?’

‘দৃশ্যগুলো না দেখলেও আমার চলবে,’ বলল গম্ভীর রানা। ‘আমাকে কিছু বিশ্বাস করাতে হবে না তোমার। আমি এরই ভেতরে জেনে গেছি অ্যারন কনারের লোক কী ধরনের পশু।’

‘এরপর কী করবে বলে ভাবছ?’ জানতে চাইল জ্যাকি।

‘আগেও এই একই প্রশ্ন করেছ,’ বলল রানা।

‘হ্যাঁ। কিন্তু তুমি কোন জবাব দাওনি। তুমি আসলে কী করতে চাও? সোজা হাজির হবে কনারের বাড়ি বা অফিসে? সিনেমার নায়কের মত হুট করে গুলি করে খুন করবে লোকটাকে?

‘এমন কিছু করব, যাতে জিম লিয়োনার্ডের মত করে মরতে না হয় তোমার।’

‘কী করতে চাও বার্ব আর স্ক্যালেসের ব্যাপারে? অ্যারনকে হাতের মুঠোয় পেতে হলে আগে শেষ করতে হবে তাদেরকে।’

জবাবে কিছু বলল না রানা। প্লিমাউথের দিক থেকে ফিরে দেখে নিল কাঠের ওঅর্কবেঞ্চ। রুক্ষ ও দাগে ভরা ওটার পাটাতন। বেঞ্চের একদিকে স্টিলের ভাইসের ওপরে জি- ক্যাম্প। যন্ত্রপাতি ঘাঁটতে লাগল রানা। একমিনিটের ভেতরে বেছে নিল হেভি ডিউটি হ্যাকসও আর ইস্পাতের এক বাঁদা। ‘জিনিসটা ধার চাইলে দেবে? সঙ্গে ভাইসটা?’

‘নাও,’ বলল জ্যাকি। এত অবাক হয়েছে যে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছে, কী কারণে যন্ত্রপাতি নিচ্ছে রানা।

‘তুমি গাড়িটা চালাবে, না আমি?’ জানতে চাইল রানা।

‘আমি। তুমি পথ দেখাবে। তোমার মোটেলে তো যাচ্ছি আমরা, তা-ই না?’

‘এখন নয়,’ বলল রানা। ‘আগে শপিঙে যাব।’

.

অন্ধকারে প্যাডি ফ্ল্যানাগানের বাড়ির উঠনে যখন হাজির হলো রানা ও জ্যাকি, ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে জেনারেল স্টোর। অবশ্য প্লিমাউথ থেকে নেমে কাঠের বাড়ির নিচে থেমে দোতলার এক জানালায় বৈদ্যুতিক আলো দেখতে পেল রানা। বাড়ির পেছনে মচমচ আওয়াজ তোলা একটা বারান্দার ওদিকে কাঠের সরু দরজা। দেয়ালের এক ব্র্যাকেটে ঘণ্টি পেয়ে টিং-টিং শব্দে বাজাল রানা।

‘এই লোক কি তোমার বন্ধু নাকি?’ অন্ধকারে ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখল জ্যাকি।

‘প্রায় তা-ই বলা চলে,’ বলল রানা। আবারও বাজাল ঘণ্টি। বাড়ির ভেতরে তারস্বরে ঘেউ-ঘেউ করে উঠল বড় এক কুকুর। মিনিট তিনেক পর দরজার ওদিকে এসে থামল কেউ। ন্যাড়া মেঝেতে খড়খড় আওয়াজ তুলছে কুকুরের নখ। বারান্দার সিলিঙে জ্বলে উঠল বাতি। ভারী গলায় কেউ ধমক দিল, ‘চুপ কর, জো!’ আর কোন আওয়াজ নেই। নড়াচড়া বন্ধ করে মেঝেতে বোধহয় বসে পড়েছে কুকুরটা। এবার দরজায় ড্রিল করা ছোট এক ফুটো দিয়ে কে যেন তাকাল। চোখ পিটপিট করে রানাকে দেখছে লোকটা। তারপর খড়মড় শব্দে ছিটকিনি নামানো হলো। খুলে গেল সরু দরজা।

‘বিষয়টা কী, রানা? এত জলদি আবার ফিরে এলে?’ গাল কোঁচকানো হাসি দিল দোকানদার প্যাডি ফ্ল্যানাগান। তার পায়ে স্যাণ্ডেল বা জুতো নেই। পরনে ডুঙ্গারি। ধুলোভরা হলওয়ে থেকে এল সস্তা উইস্কির বিটকেলে দুর্গন্ধ। মালিকের পাশেই আছে বিশাল এক ডোবারম্যান কুকুর। আধহাত জিভ বের করে দেখছে রানা আর জ্যাকিকে। চোখে গভীর সন্দেহ। ‘আরও কিছু জিনিস কিনব, তাই দেরি না করে চলে এলাম,’ বলল রানা। ‘আপনি তো বলেছিলেন হাঁক দিলেই আপনাকে যে-কোন সময়ে পাব।’

‘আমি মিথ্যা বলি না, রানা,’ বলল ফ্ল্যানাগান। ‘দোকান কখনও বন্ধ করি না। ভেতরে এসো। দেখা যাক প্যাডি ফ্ল্যানাগানের দোকান তোমার চাহিদা মেটাতে পারে কি না।’

‘মনে হচ্ছে নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছি,’ হাতের ইশারায় জ্যাকিকে পথ দেখাল রানা। দোকানদারকে বলল, ‘ভাল মোটেলের কথা বলেছিলেন। সেজন্যে অনেক ধন্যবাদ।’

‘শুভ সন্ধ্যা, মিস,’ বলল প্যাডি ফ্ল্যানাগান।

‘জ্যাকি, ইনি প্যাডি,’ দু’জনের পরিচয় করিয়ে দিল রানা।

‘আর এটা আমার দোস্ত জো,’ কুচকুচে কালো কুকুরটাকে দেখাল বৃদ্ধ।

‘তুই ছোটখাটো বাঘ, তা-ই না?’ ডোবারম্যানের মাথায় হালকা চাপড় দিল জ্যাকি। ওকে পছন্দ করে ফেলেছে দানবটা। বিরাট জিভ বের করে হাত চেটে দিল।

‘যাদেরকে কাস্টমার হিসেবে রাতে চাই না, তাদেরকে এদিকে ভিড়তে দেয় না জো,’ বলল দোকানদার। জ্যাকি ও রানা বাড়িতে ঢুকে পড়তেই দরজা আটকে ছিটকিনি মেরে দিল সে। তার পিছু নিয়ে ধুলোভরা করিডর ধরে এগোল ওরা। আরেক দরজা পেরোতেই সামনে পড়ল দোকানের পেছনদিক। জ্যাকির পাশে গর্বিত ভঙ্গিতে হাঁটছে জো।

‘তো এবার বলো, রানা, তোমার জন্যে কী করতে পারি?’ মৃদু হাসল বৃদ্ধ। ‘জরুরি কিছু লাগবে? বিয়ার? বাড়তি আরও মালপত্র?’

‘ভাবছি ব্রাউনিং এ ফাইভ, মসতবার্গ ৫০০… এ ধরনের কিছু জিনিসের কথা,’ বলল রানা।

‘তুমি তা হলে জঙ্গলে যেতে চাও?’ বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই বলল বৃদ্ধ।

‘জী। কয়েক বাক্স গুলিও লাগবে। ডাবল যিরো বাক শট আর ব্রেনেক স্লাগ।’

‘একটু বড় ধরনের টার্কি শিকার করবে বলে মনে হচ্ছে, ‘ রানার চোখে তাকাল প্যাডি ফ্ল্যানাগান।

‘ক্রিসমাসের দেরি আছে, আপাতত টার্কিরা নিরাপদে থাকুক,’ বলল রানা।

‘তুমি বোধহয় তা হলে অনেক বেশি বিপজ্জনক কোন জন্তু শিকার করবে?’

‘বেশিরভাগ সময় তা-ই করি।’

‘ঠিক আছে, বুঝলাম। একটু অপেক্ষা করো।’ পাশের রুমে গিয়ে ঢুকল বৃদ্ধ ফ্ল্যানাগান। মিনিট দুয়েক পর বগলে গুঁজে নিয়ে এল লম্বা একটা বাক্স। ওটা কাউন্টারের ওপরে রেখে ডালা খুলল। ‘ইথাকা ৩৭ ফেদারলাইট,’ বাক্সের ভেতর থেকে বন্দুকটা বের করল সে। ‘পাম্প করলে পর পর গুলি করতে পারবে পাঁচবার। হালকা স্পর্শে কাজ করবে ট্রিগার। চোক বোর সিলিণ্ডার। জিনিসটা প্রায় হাওয়াইট্যার। তোমার কতগুলো শেল লাগবে, রানা?’

‘একাত্তর সালের ব্যারাকুডার ট্রাঙ্কে যতগুলো আঁটে,’ বলল রানা।

এককান থেকে আরেক কানে গেল ফ্ল্যানাগানের হাসি। ‘তা-ই, বাছা? তোমাকে না আগেই বলেছি, বুড়ো প্যাডির কাছে এমন কিছু নেই, যেটা তোমার চাহিদা মেটাতে পারবে না।’ পাশের ঘরে গেল বৃদ্ধ। একটু পর ভারী গুলির বাক্স হাতে প্রায় কুঁজো হয়ে ফিরে এল। ‘বেশিরভাগই ফেডারাল আর হর্নাডি। এসবের ভেতরে কিছু উইনচেস্টারও আছে।’ হাঁফাতে শুরু করে কাউন্টারের ওপর গুলির বাক্স রেখে আরও আনার জন্যে পাশের ঘরে গেল ফ্ল্যানাগান।

একটু পর ফিরে এসে কাউন্টারের ওপরে পাহাড়ের মত উঁচু বাক্সের স্তূপ তৈরি করল সে। রানা জানে, প্রতিটি গুলির ভেতরে আছে অন্তত এক আউন্স সলিড লোড। প্রতি সেকেণ্ডে ছিটকে যাবে বারো শ’ ফুট। রেঞ্জের ভেতরে মর্দা হাতি খতম করতেও সমস্যা হবে না। যদিও হাতি শিকার নিয়ে ভাবছে না রানা। ডাবল যিরো বাক কার্তুজ ছিটকে বেরোবে .৩৩ ইঞ্চি ডায়ামিটারের ব্যারেল থেকে। বলগুলোর আঘাতের শক্তি সাবমেশিন গানের তিনটে গুলির সমান। বন্দুকের আটটা বল একই সঙ্গে লাগলে কব্জা ভেঙে খসে পড়বে যে-কোন দরজা। একে একে বাক্স গুনল রানা। বাকশটের আছে সতেরো বাক্স, আর সলিড বুলেটের চোদ্দটা। প্রতিটায় আছে বিশটা করে রাউণ্ড। বন্দুকের ম্যাগাযিনে থাকবে চারটে আর চেম্বারে একটা। এক শ’ বিশবারের বেশি অস্ত্রটা রিলোড করতে পারবে রানা।

‘মনে হয় এতেই চলবে,’ বলল ও। ‘এবার ভরে নেয়ার জন্যে একটা ব্যাগ লাগবে।’

‘ব্যাগ বিনা পয়সায় দেব,’ বলে দোকানের আরেকদিকে গেল ফ্ল্যানাগান। একটু পর ফিরল কালো রঙের শক্তপোক্ত এক ক্যানভাস হোল্ডঅল হাতে। ভেতরে সোনার অসংখ্য বার রাখলেও ওজনটা নিতে পারবে এই ব্যাগ।

‘আরও একটা জিনিস চাই,’ বলল রানা। ‘ওটা হবে ভাল কোন ছোরা।’

‘ছোরা না থাকলে শিকার জমে, বলো?’ মাথা দোলাল ফ্ল্যানাগান। কাউন্টারের নিচে হাত ভরে বের করল খাপসহ দানবীয় এক সার্ভাইভাল নাইফ। তার ভাব দেখে রানার মনে হলো, এই জিনিস প্রতিদিন দশটা করে বিক্রি করে। বৃদ্ধের হাত থেকে নিয়ে খাপ খুলে ছোরা দেখল রানা। ওর বুঝতে দেরি হলো না, জিনিসটা কমদামি ইস্পাত দিয়ে তৈরি। মাত্র কয়েক পোঁচ দিলেই নষ্ট হবে ফলার ধার। তারচেয়েও বড় কথা: বেকায়দা চাপ পড়লেই মট্ করে ভাঙবে ওটা।

‘পছন্দ হলো না?’ রানার গম্ভীর চেহারা দেখল বৃদ্ধ। ‘বেশ, তা হলে একটু অপেক্ষা করো, অন্যকিছু নিয়ে আসি। ভেবেছিলাম নিজের কাছেই রেখে দেব। তবে তোমাকে আমার ভাল লেগেছে, বাছা।’ আবারও আলাউদ্দিনের গুহায় সেঁধিয়ে গেল সে। মিনিট তিনেক পর ফিরে এসে চাপা স্বরে বলল, ‘এই যে!’ তেলে ভেজা কম্বলের ফালি সরিয়ে কাউন্টারের ওপরে রাখল খাপসহ একটা ছোরা। ‘অন্য কেউ চাইলে দিতাম না, তবে তোমার জন্যে দু’ শ’ ডলার,’

‘গর্বের সঙ্গে বলল বৃদ্ধ।

খাপ খুলে ছোরাটা হাতে নিল রানা। ওটা অনেক পুরনো হলেও অদ্ভুত সুন্দর। দু’দিকে ধার দেয়া দীর্ঘ ফলা। কাঁটা বসানো নাকলডাস্টারের মত স্টিলের হাতল। আঙুল বসে যায় চারটে ডেবে যাওয়া ফুটোয়। শত্রুর মাথা ভেঙে দেয়ার জন্যে আছে নিখুঁত পমেল ক্যাপ। ধাতব হাতলের ওপরে লেখা: ইউএস. ১৯১৮। রানা বুঝে গেল, এটা সাধারণ হান্টিং বা সার্ভাইভাল নাইফ নয়। জিনিসটা তৈরি করা হয়েছে স্রেফ মানুষ খুন করার জন্যে। মরণপণ যুদ্ধে শত্রুকে হারাতে হলে এমনই ছোরা চাই, আর সেজন্যে বহু বছর আগে মিলিটারির তুখোড় কোন যোদ্ধার মগজ থেকে এসেছিল এই ডিযাইন। রানা বুঝে গেল, আগেও রক্তের স্বাদ পেয়েছে অস্ত্রটা। ফলার ওপরে কালচে যে দাগ, ওটা শুকিয়ে যাওয়া খড়খড়ে রক্ত।

‘এটা মার্ক ওয়ান ইউএস আর্মি ট্রেঞ্চ নাইফ,’ বলল ফ্ল্যানাগান।

‘খুব ভাল জিনিস, সত্যিই আমার কাজে লাগবে,’ বলল রানা।

‘আর কাজে না লাগলে বুঝতে হবে তুমি পড়ে গেছ মস্ত কোন বিপদে। আমার মনে হচ্ছে না যে এমনি এমনি এসব সংগ্রহ করছ তুমি। আমি কি ঠিক বললাম?’

সতর্ক করার জন্যে রানার চোখে তাকাল জ্যাকি। বৃদ্ধের প্রশ্নের কোন জবাব দিল না রানা।

‘আমি কারও বিষয়ে নাক গলাই না,’ বলল ফ্ল্যানাগান। ‘তবে একটা কথা, বাছা-তুমি এত এত অস্ত্র কিনে বড় কোন গোলমাল তৈরি করবে না তো?’

‘কোন গোলমালে যাব না, নিশ্চিন্ত থাকুন,’ বলল রানা। ‘শুনে খুশি হলাম। টাকা কি নগদ দেবে?’ বলল বৃদ্ধ। ‘ওটাই সেরা মাধ্যম।’

বৃদ্ধের বিল নগদ ডলারে মিটিয়ে দিল রানা।

‘আপনার কাছ থেকে মাল কিনে ঠকতে হয়নি,’ বলল ও। ‘ভাল থাকবেন, প্যাডি।’

‘তুমিও ভাল থেকো, বাছা। একই কথা তোমার ক্ষেত্রেও, মিস। আজ তোমরা এলে, তাই চমৎকার কাটল আমার সময়।’

‘আমরাও ভাল সময় কাটিয়েছি,’ বলল জ্যাকি।

ওর হাত চেটে দিল ডোবারম্যান জো। ওটাকে নীরবে বিদায় জানানো বলা যেতে পারে।

প্লিমাউথের ট্রাঙ্ক জ্যাকি খুললে গ্যারাজ থেকে আনা যন্ত্রপাতি ও ডিভিডির নীল এনভেলপ সরিয়ে ইথাকা বন্দুক ও ভারী হোল্ডঅল ভেতরে গুছিয়ে রাখল রানা।

‘মনে হচ্ছে না এসবে আমি জড়িত, মনমরা হয়ে বলল জ্যাকি। রানার হাতে ধরিয়ে দিল গাড়ির চাবি। ‘আমরা এবার খুন হব অ্যারন কনারের লোকেদের হাতে। অথচ কিছু করার নেই! কিন্তু এত আয়োজন করে খুন হতে যাবার মানেই বা কী?’

‘এত মন খারাপ কোরো না,’ বলল রানা। ‘চলো, কোন খাবারের দোকান থেকে খাবার কিনি। আমার পেটে নাচছে একদল ছুঁচো।

‘কিন্তু এত ভয় পেয়েছি যে আমার খিদে মরে গেছে!’

‘তবুও শরীর সুস্থ রাখতে হলে কিছু না কিছু খেতে হবে।’

জ্যাকি গাড়িতে উঠতেই প্লিমাউথ ঘুরিয়ে ফ্ল্যানাগানের উঠন থেকে বেরিয়ে এল রানা।

কালবেলা – ৪০ (মাসুদ রানা)

রাতে সর্বক্ষণ খোলা থাকে এমন এক গ্রিল হাউসের সামনে থামল রানা। মাত্র কয়েক ব্লক দূরেই ওল্ড ইয়েলার ইন। একটু পর খাবার কিনে গাড়ি নিয়ে চলে গেল মোটেলের উঠনে। ইচ্ছে করেই রুম নিয়েছে সদর দরজার কাছে।

ভাল হোটেলে উঠলে বন্দুক ও হোল্ডঅল দেখে নানান প্রশ্ন তুলত হোটেল কর্তৃপক্ষ। ওল্ড ইয়েলার ইনে সে-ঝামেলা নেই। কারও চোখে না পড়েই জ্যাকিকে নিয়ে নিজের রুমে ঢুকে পড়ল রানা। মেয়েটাকে সোফায় বসতে ইশারা করে বিছানার পাশের মেঝেতে রাখল বন্দুক ও হোল্ডঅল।

রানা খাবারের প্যাকেট খুলতেই পনির ও মেয়োনেসে ভরা বিশাল বার্গার আর প্রচুর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দেখে চেগিয়ে উঠল জ্যাকির খিদে। এ ছাড়া ওর জন্যে পাঁচ ক্যান বিয়ারও কিনে এনেছে রানা। নিজের জন্যে এক বোতল কোক।

‘আসলে মন্দ নয় মোটেলটা,’ বলল জ্যাকি। ‘যদিও স্বস্তি পাবে না কোন মেয়ে। সন্দেহের চোখে দেখল ডাবল বেড। ডেবে গেছে ওটার তোষক। ‘শোয়ার মত লম্বা সোফা তো দেখছি না!’

‘নেই, বলল রানা। ‘আমি মেঝেতে ঘুমাব।’

কী যেন ভাবছে জ্যাকি।

কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘খেয়ে নাও। খাবার সব ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

ছোট্ট টেবিলের দু’পাশের চেয়ারে বসল ওরা। চুপচাপ খেতে লাগল বার্গার ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। মিনিটখানেক পর জ্যাকি বলল, ‘ভাবতেও পারিনি যে এত খিদে লেগেছে।

‘বিপদ কেটে গেলে এমনটা হয়,’ বলল রানা।

বিয়ারের ক্যান বাড়িয়ে দিল জ্যাকি। ‘নেবে না?’

‘গুরুর কড়া নিষেধ,’ বলল রানা। ওর মনের পর্দায় ফুটে উঠেছে মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের গম্ভীর মুখ। ‘আমি কোক নিচ্ছি।’

‘ঠিক আছে, ‘বলল জ্যাকি।

ক্যানের মুখ খুলে কোকে চুমুক দিয়ে তিতকুটে হয়ে গেল রানার চেহারা। বিড়বিড় করে বলল, ‘না, এটা আমার জন্যে নয়!’ জ্যাকির হাতে বিয়ারের ক্যান দেখে ওর বুক চিরে এল মস্ত দীর্ঘশ্বাস।

‘বিয়ার নেবে না কেন?’ বলল জ্যাকি। ‘তুমি কি তা হলে একজন অ্যালকোহলিক?’

সরাসরি প্রশ্নে থমকে গেছে রানা। ঘরের হলদে আলোয় সবুজ দেখাচ্ছে জ্যাকির মণি। ‘অ্যালকোহলিক না হলেও বেশ কিছু দিন ধরে ড্রিঙ্ক করেছি,’ বলল ও।

‘আমার মা অ্যালকোহলিক ছিল,’ নির্দ্বিধায় বলল জ্যাকি। ‘এ-ধরনের মানুষের সঙ্গে বাস করা কত কঠিন, সেটা জানি মা’র জীবনে সবচেয়ে প্রিয় ছিল টাকিলা আর বুরবন।’

‘আমার প্রিয় ছিল মল্ট উইস্কি,’ স্বীকার করল রানা।

‘কত দিন হলো ছেড়ে দিয়েছ?’

‘মাত্র কয়েক দিন।’

‘তোমার সামনে ড্রিঙ্ক করলে পাগল হয়ে উঠবে না তো?’

‘না, তা হব না।’

‘সারাদিন যা গেল, বিয়ার না পেলে মরেই যেতাম।’ আবার নীরবতা নামল ওদের মাঝে।

একটু পর বলল রানা, ‘মা অ্যালকোহলিক। ওদিকে মারা গেছেন বাবা। তো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই তোমার?’

মাথা নাড়ল জ্যাকি।

খাবার শেষ করে টেবিল গুছিয়ে রাখল ওরা।

মোটেলের উঠনে গেল রানা। গাড়ির ট্রাঙ্ক থেকে ভাইস নিয়ে ফিরল রুমে। যন্ত্রটা আটকে নিল টেবিলের ধারে। খুলে ফেলল কোমরের বেল্ট।

‘কী করছ?’ দ্বিতীয় বিয়ারের ক্যানে চুমুক দিল জ্যাকি।

মেঝে থেকে বন্দুক তুলে ব্যারেল খুলে নিল রানা। দৈর্ঘ্যে ওটা দু’ফুটের বেশি। ব্রিচে বেল্ট জড়িয়ে ব্যারেলে পেঁচাল বেল্টের শেষ অংশ। ইস্পাতের নলে এবার কেটে বসবে না ভাইসের দাঁত। ব্যারেল ঠিক জায়গায় রেখে গায়ের জোরে ভাইসে টাইট দিল ও। পরের কাজে মেলা শব্দ হবে, তাই ছেড়ে দিল রেডিয়ো। মিউয়িক চ্যানেলে বাজছে কান্ট্রি মিউযিক। রানা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তোমরা কি সর্বক্ষণ এসব বাজনাই শোনো?’

‘প্রমাণ হলো, তুমি এদিকের মানুষ নও,’ বলল জ্যাকি।

ভাইসে রাখা ব্যারেলের ওপরে হ্যাকসও চালান রানা। সর্বনাশ হতে লাগল দুর্দান্ত এক স্পোর্টিং শটগানের। অস্ত্রটা দূরে লক্ষ্যভেদ না করলেও হয়ে উঠবে সত্যিকারের রায়ট গান। আইনের দৃষ্টিতে ওটার নল কেটে নেয়া বড় একটি অপরাধ। অবশ্য এসব নিয়ে ভাবছে না রানা।

‘আগেও এ-কাজ করেছ,’ কর্কশ শব্দে শিরশির করছে জ্যাকির দু’পাটি দাঁত।

‘দু’চারবার,’ স্বীকার করল রানা।

‘আজ কী জঘন্য একটা দিন পার করলাম,’ বলল জ্যাকি, ‘দু’জনকে গুলি করেছি। ধাওয়া করেছে আমাকে। কাঁধে গেঁথে দিয়েছে টেইযার। আরেকটু হলে কিডন্যাপ হতাম। আর এখন অদ্ভুত একজনের সঙ্গে বসে আছি, যে আসলে কোন্ দেশের মানুষ সেটাও আমি জানি না। সে আবার কান্ট্রি মিউযিক পছন্দ করে না। বিচ্ছিরি শব্দে কাটছে ভাল একটা বন্দুকের ব্যারেল।’

‘জাতে আমি বাঙালি, নাগরিক বাংলাদেশের,’ বলল রানা।

‘যদি বাঁচি, হয়তো ঘুরে আসব তোমাদের দেশ থেকে,’ বলল জ্যাকি।

‘সবুজ-শ্যামল-মায়াভরা একটা দেশ দেখতে পাবে, যার একটু পর পর বিশাল সব নদী। মুখ তুলে জ্যাকিকে দেখল রানা। তারপর আবারও শুরু করল হ্যাকসও চালানো।

দশমিনিট পর কাটা পড়ল ব্যারেল। ডানহাত ব্যথা হয়ে গেছে রানার। হ্যাকসও টেবিলে নামিয়ে রাখল। রাঁদা দিয়ে মসৃণ করতে লাগল ব্যারেলের এবড়োখেবড়ো মুখ। কাজ শেষে টেবিলে থাকল পাউডারের মত ধাতব গুঁড়ো। চকচকে কাভারের এক সিনেমা ম্যাগাযিন টেবিল থেকে নিয়ে ওটার ওপরে জড় করে রাখল গুঁড়ো। একটু পর পত্রিকা গেল ওয়েস্ট বাস্কেটের ভেতরে। খাটো ব্যারেলটা বন্দুকে আটকে নিল রানা।

দ্বিতীয় ক্যান শেষ করে পা থেকে জুতো খুলে বিছানায় আধশোয়া হলো জ্যাকি। হাতে বিয়ারের তৃতীয় ক্যান। ওটার মুখ খুলে চুমুক দিতেই একটা কথা মনে পড়ল ওর। ব্যাগ ঘেঁটে বের করল একটা সিরিঞ্জ। ভুরু কুঁচকে ওটা দেখে নিয়ে রানার কাছে জানতে চাইল, ‘বলো তো, আমার শরীরে কী মিশিয়ে দিতে চেয়েছে শয়তানটা?’

বন্দুক টেবিলে রেখে বিছানার পাশে গেল রানা। জ্যাকির হাত থেকে নিয়ে সিরিঞ্জের বাঁকা নিড়ল খুলে টেবিলের ওপরে ফেলল দু’ফোঁটা তরল। আঙুলে সামান্য মেখে নিয়ে ওঁকে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘মনে হচ্ছে যোটেপিন। আগেও এই জিনিস দেখেছি।’

‘কী কাজ করে ওটা?’ একবার শিউরে উঠল জ্যাকি।

‘ফাস্ট-অ্যাক্টিং অ্যান্টিসাইকোটিক ও অ্যান্টিম্যানিক প্রডাক্ট। মার্কেট থেকে সরাবার আগে হাসপাতালে রেগে যাওয়া পাগলদেরকে দিতেন ডাক্তারেরা। একটা ডোয দিলে শান্ত হয়ে যেত উন্মাদেরা। এই যোটেপিন ব্যবহার করে মেয়েদেরকে অবশ করে ধর্ষণ করত নরপশুরা। এর আছে বাজে সাইড এফেক্ট। মাত্র ক’দিন শরীরে গেলে মগজ এমন হবে যে, মানুষটা হয়ে উঠবে জীবন্ত যোম্বির মত

কুঁচকে গেছে জ্যাকির ভুরু। ‘কিডন্যাপারের কাছ থেকে পেয়ে ভেবেছিলাম প্রমাণ হিসেবে পুলিশকে দেখাব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে টয়লেটে ফেলে ফ্লাশ করে দেয়া উচিত।’

এটা অন্য কাজেও লাগে,’ বলল রানা।

‘ওটা আমার কাছ থেকে দূরে রেখো।’

‘বেশ,’ নিডল আটকে টেবিলের ওপরে সিরিঞ্জ রাখল রানা। গিয়ে বসল বিছানার পাশে। জ্যাকিকে জিজ্ঞেস করল, ‘সত্যি করে বলো তো, তোমার এখন কেমন লাগছে?’

‘আগের চেয়ে ভাল,’ হাতের ক্যান তুলে দেখাল জ্যাকি। ‘যদিও বিয়ার গিলে এখন ঘুম পাচ্ছে।

‘তোমার বসের ব্যাপারে আমাকে জানাও।’

‘লিণ্ডা কনার?’

মৃদু মাথা দোলাল রানা।

‘আমাদের মধ্যে বেশ খাতির আছে। তিনি ভাল একজন বস। যারা তাঁর হয়ে কাজ করে, তাদের খেয়াল রাখেন উনি কাজে আন্তরিক। যদিও স্বামীর দুর্ব্যবহারের জন্যে মন খারাপ থাকে তাঁর। আর কী বলব, বলো তো?’

‘স্বামী তাকে কতটুকু বিশ্বাস করে?’

‘তা জানি না। যদিও শপথ করে বলতে পারি, লিণ্ডার জানা নেই যে গোপনে কী করছে অ্যারন কনার।’

‘তুমি কি পুরো নিশ্চিত?’

মাথা দোলাল জ্যাকি। ‘ওভার শিয়োর।’

‘ঠিক আছে।

‘আমি নিশ্চিত না হলে কী করতে?’ বলল জ্যাকি।

‘ভাবতাম মহিলা বহু কিছুই জানে। সেক্ষেত্রে তার কাছ থেকে জানতাম কোথায় আছে চোরাই অস্ত্রের ওয়্যারহাউস।’

‘অ্যারন কনারকে বিয়ে না করলে ভাল করতেন লিণ্ডা,’ বলল জ্যাকি। ‘স্বামী এফবিআই-এর হাতে গ্রেফতার হলে বুক ভেঙে যাবে তাঁর।’

‘অর্থাৎ, লি। এসবে জড়িত নয়। এবার বলো, কী জানো অ্যারন কনারের বাবা সম্পর্কে।’

‘বিগ রিয়ান?’

‘আগে কখনও তার সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে?’

বিয়ারের প্রভাবে সবুজ চোখ মেলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে জ্যাকির, হাই তুলল। ‘হ্যাঁ, একবার দেখা হয়েছিল। ছেলের সঙ্গে আমাদের অফিসে এসেছিল। বুড়ো লোকটার আচরণে আমরা সবাই ভয় পেয়েছিলাম।’

‘আমি তার ছবি দেখেছি,’ বলল রানা।

‘শ্বশুরকে ভয় পান লিণ্ডা। তাই যান না স্পিয়ারহেড র‍্যাঞ্চে। তা ছাড়া, তাঁর অ্যালার্জি আছে ঘোড়ায়। গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল জ্যাকি। ‘আমি অবশ্য ঘোড়া খুব পছন্দ করি।’

তোমার বাবা নিশ্চয়ই শিখিয়েছেন ঘোড়ায় চড়তে?’

‘হুম,’ ঘুম-ঘুম চোখে হাসল জ্যাকি।

মেয়েটা ঘুমাতে চাইছে বুঝেও জিজ্ঞেস করল রানা, ‘স্পিয়ারহেড নামে অ্যারনের বাবার অয়েল কোম্পানি ছিল।’

‘আগে অয়েল ফিল্ড সবই ছিল ইণ্ডিয়ান টেরিটোরিতে। গোটা রাজ্য ছিল তাদের। ইণ্ডিয়ান সংস্কৃতির বহু নাম চলে এসেছে আমাদের সমাজে। সুযোগ পেলেই সেটলারেরা চরম নিষ্ঠুরতা করেছে ইণ্ডিয়ানদের প্রতি।’

‘কখনও গেছ সেই র‍্যাঞ্চে?’

মাথা নাড়ল জ্যাকি। ‘অবশ্য জানি ওটা কোথায়। কে-ই বা না জানে? শহরের পশ্চিমে বিশাল প্রেয়ারিতে।

ওকলাহোমার সবই বড়, ভাবল রানা। হয়তো সেই র‍্যাঞ্চেই আছে অ্যারনের অস্ত্রের ওয়্যারহাউস। জানতে চাইল ও, ‘বিগ রিয়ান কি সেখানে একাই থাকে?

‘তা-ই তো জানি। বহু বছর আগে মারা গেছে তার স্ত্রী। তখন থেকেই একা।’ আবারও হাই তুলল জ্যাকি। নিচু গলায় বলল, ‘তুমি বিয়ে করোনি?’

মাথা নাড়ল রানা।

‘আমিও না,’ বলল জ্যাকি। ‘যাকে ভালবেসেছি, তাকে আর পাইনি।’

‘কেন? কী হয়েছিল?’

‘বিমান দুর্ঘটনা। পরে কারও সঙ্গে জড়াতে আর মন চায়নি। বলতে পারো ভাল মনের কাউকে পাইনি।’ রানার চোখে তাকাল জ্যাকি। ‘বরং বলো তোমার কথা। পরিবারে কারা আছেন তোমার?’

‘আত্মীয়রা মারা গেছেন বহু বছর আগে,’ বলল রানা। ‘তাই পৃথিবীতে নিজের বলে আমার কেউ নেই।’

‘কখনও কাউকে পাশে পাওনি?’

চুপ করে আছে রানা। মনে পড়েছে জেসিকার কথা।

‘জনির সঙ্গে তোমার অনেক মিল, বলল জ্যাকি। ‘যাকে আমি ভালবাসতাম।’

‘তা-ই?’ বলল রানা।

‘হ্যাঁ, বলল জ্যাকি, ‘ওর মণিদুটোও ছিল তোমার চোখের মত রহস্যময় অতল কালো সাগর। আগে জানতাম না, কারও চোখে চেয়ে পার করে দেয়া যায় পুরো একটা জীবন!’

রানা হঠাৎ করেই বুঝল, জ্যাকি আসলে এখন বলছে ওর চোখের ব্যাপারে!

খুকখুক করে কাশল জ্যাকি। পাশ ফিরে গায়ে টেনে নিল বেডশিট। ঘুমের ঘোরে বলল, ‘তুমি যেন আবার আমায় ফেলে কোথাও চলে যেয়ো না!’

জ্যাকির শিথিল হাত থেকে অর্ধেক ভরা বিয়ারের ক্যান নিয়ে টেবিলের ওপরে রাখল রানা। সোফায় বসে ভাবল, এবার কী করা উচিত ওর?

একচল্লিশ
জ্যাকিকে বিয়ার গিলতে দেখে মরা কাঠের মত শুকিয়ে গেছে রানার গলা। কয়েকবার ভেবেছে, দু’ঢোক নিলে ক্ষতি কী! যদিও পরক্ষণে নিজেকে নিষেধ করেছে, ‘পা দেব না লোভের ফাঁদে!’ মনে ভেসে উঠেছে বিসিআই চিফের গম্ভীর চেহারা।

ঘুমিয়ে পড়েছে জ্যাকি। রুমের বাতি নিভিয়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করল রানা। ভাবতে লাগল সারাদিনের ঘটনাগুলো নিয়ে। ডায়েরি অনুযায়ী আয়ারল্যাণ্ডের দুর্ভিক্ষের জন্যে সম্পূর্ণ দায় অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড আর তার সিনিয়র বন্ধু নরম্যান আর্চিবল্ডের। তারাই ল্যাবোরেটরিতে তৈরি করেছে আলুর গাছের মড়কের ব্যাকটেরিয়া। তাদের কারণে ভয়ঙ্কর করুণভাবে মারা গেছে কমপক্ষে বিশ লাখ মানুষ। এটা ভাবতে গেলে কেমন যেন অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।

একটু পর বাথরুমে ঢুকে বাতি জ্বেলে পকেট থেকে স্মার্টফোন নিল রানা। বসল পুরনো বাথটবের কিনারায়। ইন্টারনেটে সার্চ করল নরম্যান আর্চিবল্ডের জন্যে। এই নামে খুব কম মানুষই আছে দুনিয়ায়।

ইন্টারনেটে কিছু তথ্য ছাড়া তার সম্পর্কে আর কিছুই নেই। তখনকার নামকরা এক বোটানিস্ট। শিক্ষকতা করত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। আঠারো শ’ ত্রিশ থেকে চল্লিশের দশকে কয়েকটি বই ও সায়েন্টিফিক পেপার প্রকাশ করেছিল। সেগুলোর বিষয়ে আগ্রহী হতে পারল না রানা। কিন্তু এরপর পেল ওয়েব সার্চে অন্যকিছু।

তখনও পঞ্চাশ বছর হয়নি নরম্যান আর্চিবক্তের। আঠারো শ’ একান্ন সালের সেপ্টেম্বরের ছয় তারিখে ম্যাগডালেন কলেজে মৃত্যুবরণ করে নিজের রুমে। বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষের মত স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে মারা পড়েনি। পেছন থেকে গুলি করে ফুটো করা হয় তার মাথার খুলি। কোন পিস্তল ছিল না তার ঘরে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ঘোষণা করেন: নরম্যান আর্চিবল্ডের মৃত্যু আত্মহত্যা নয়। এবং কোন প্রমাণ রেখে যায়নি তার খুনি।

বেলার বক্তব্য অনুযায়ী: আঠারো শত একান্ন সালে সেপ্টেম্বরের একুশ তারিখে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করে অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড। অর্থাৎ, নরম্যান আর্চিবল্ড খুন হওয়ার মাত্র পনেরো দিন পর মৃত্যু হয় তার।

অক্সফোর্ড থেকে আয়ারল্যাণ্ডের গ্রামাঞ্চলে খবর যেতে তখন বোধহয় লাগত কমবেশি পনেরো দিন, ভাবল রানা। সেক্ষেত্রে এমনও হতে পারে, মার্চিবল্ড খুন হলে নিজেও খুন হবে সে-ভয়ে আত্মহত্যা করেছিল অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড। যদিও রানার ধারণা, এমন কাজ আসলে করেনি সে। অন্যভাবে হয়েছে তার মৃত্যু। হয়তো মাতাল ছিল। গায়ের ধাক্কা খেয়ে মোমদানী থেকে পড়ে গেছে জ্বলন্ত মোম। তাতে আগুন ধরেছে এবারডেন হলে।

আর্চিবল্ডের জন্যে আবারও ওয়েবসাইট ঘাঁটতে লাগল রানা। কয়েক মিনিট পর পেল ঝাপসা এক ছবি। সে- আমলের আনুষ্ঠানিক পোশাক লোকটার পরনে। আঠারো শত পঁয়তাল্লিশ সালে ছবিটি তোলা হয়েছে একটি সায়েন্স কনভেনশনে। ছোটখাটো লোক সে। চোখে আইগ্লাস মাথাজুড়ে টাক। গালে নেমেছে চওড়া জুলফি। প্রফেসরকে ঘিরে রেখেছে একদল ছাত্র। সবার পরনে ওয়েস্ট কোটের ওপরে কালো সুট। আর্চিবল্ডের পেছনে দৈত্যের মত এক যুবক। ক্যামেরায় ছবি তুলতে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করছিল। নিচের ক্যাপশনে চোখ বোলাল রানা। কয়েক সেকেণ্ড পর বুঝল, বিশাল লোকটাই অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড। আগে তার স্ত্রীর দেয়া বর্ণনা পড়লেও এই প্রথমবার তার ছবি দেখছে রানা। দম্ভ ফুটে বেরোচ্ছে তার চোখ-মুখ থেকে। দৈর্ঘ্যে বোধহয় কমপক্ষে ছয় ফুট সাত ইঞ্চি। শুধু যে দৈত্যের মত, তা নয়, তার ভেতরে আছে ভীষণ অশুভ কী যেন।

কেন যেন শিরশির করে উঠল রানার মেরুদণ্ড।

লর্ড অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড, পিকচার, আয়ারল্যাণ্ড লিখে সার্চ দিল ও। পেরোল কয়েক সেকেণ্ড, তারপর হঠাৎ করেই স্ক্রিনে ফুটে উঠল একটা ছবি। ওদিকে চেয়ে চমকে না গিয়ে পারল না রানা। অন্তত কয়েক মিনিট ধরে দেখল ঝাপসা ছবিটা।

আঠারো শ’ চুয়াল্লিশ সালে এবারডেন হলে একদল অতিথির সঙ্গে ছবি তুলেছে অ্যাঙ্গাস। গম্ভীর সে। যেন গেছে কারও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে। সামনে তার স্ত্রী লেডি স্টার্লিংফোর্ড। রানার মনে হলো, বহুকাল ধরেই চেনে তাঁকে। প্রফেসর কেলি বলেছিলেন, মহিলা অপূর্ব সুন্দরী। যদিও সৌন্দর্যের পূর্ণ বর্ণনা তিনি দিতে পারেননি। ভদ্রমহিলার কাঁধে হাত রেখে অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ডের চেহারায় যেন ফুটে উঠেছে, স্ত্রীকে সম্পদ নয়, সম্পত্তি বলে মনে করে সে। তার কথার ওপরে কথা বলার কোন ধরনের অধিকার ছিল না জেনিফার হলওয়ের।

ছবিতে পেছনে ইউনিফর্ম পরনে এবারডেন হলের কর্মচারীরা। কারও কারও বয়স তেরো-চোদ্দ। সবাই নার্ভাস। একদিকে টুইড স্যুট পরা ঢ্যাঙা একলোক। তাকে অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ডের কুচক্রী ম্যানসার্ভেন্ট বলে মনে হলো রানার। লেডির অনুরোধে ছবি তোলার জন্যে আস্তাবল থেকে আনা হয়েছে তাঁর ঘোড়াদুটোকে। লাগাম হাতে দাঁড়িয়ে আছে দৈত্যের মত একজন। চোখে-মুখে কেমন আড়ষ্টতা।

তাকে দেখে রানা বুঝল, এ-লোকই বায়ার্ন কনার।

ডায়েরিতে লেডি লিখেছেন, বোকা ও বিশ্বস্ত ছিল পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী লোকটা। ষাঁড়ের মত শক্তিশালী। উচ্চতার দিক থেকে সে ছিল লর্ডের সমান।

এই লোকই বায়ার্ন কনার, ভাবছে রানা। এর ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিল বেলা। গ্লেনফেল গর্জায় গেছে প্যারিশ রেকর্ড ঘাঁটতে। রানার মনে আর কোন সন্দেহ থাকল না, এই একই ছবি দেখেছে মেয়েটা এবং এ-ছবিতেই আছে গূঢ় এক রহস্য।

আস্তাবল রক্ষকের দিকে চেয়ে রইল রানা। একটু পর ওর চোখ পড়ল অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ডের মুখের ওপরে। রানার মনে বিদ্যুদ্বেগে খেলে গেল একটা দুরূহ চিন্তা। বুঝে গেছে, কী জেনে গিয়েছিল বেলা। একই কারণে এখন ও জানে, ডায়েরি হাতে পাওয়ার জন্যে কেন মরিয়া হয়ে গেছে অ্যারন কনার। এ-ও এখন পরিষ্কার, কেন খুন করা হয়েছে বেলা ওয়েসকে।

মনে মনে ঝাঁকি খেয়েছে রানা। অন্তর ভরে গেছে ক্রোধ ও ক্ষোভে। সে-আমলে চরম অবিশ্বাস্য বলে মনে হলেও সত্যিটা ছিল আসলেই অকল্পনীয়। অনলাইনে আছে নিউ ইয়র্কের মেয়র অফিসের আর্কাইভে লাখ লাখ জন্ম ও মৃত্যুর সনদ। সাইটে ঢুকে আঠারো শত একান্ন সালে আয়ারল্যাণ্ড থেকে আসা মানুষগুলোর ‘এ’ থেকে ‘যেড’-এর নামের যে ক্রম দেয়া আছে, সেটা অনুযায়ী ‘বি’ অক্ষর দিয়ে সার্চ করল রানা। দশমিনিট পর বড় করে শ্বাস ফেলে ইন্টারনেট থেকে বেরিয়ে এসে পকেটে রেখে দিল ফোন। বাথরুমের বাতি নিভিয়ে চলে এল বেডরুমে।

ঘুমের চটকা ভেঙে বালিশ থেকে মাথা তুলে ওকে দেখছে জ্যাকি। ‘কী হলো, তুমি ঘুমাবে না? আমার পাশে এসে শুয়ে পড়ো।’

‘বলো তো, কটেজে আসলে সেই রাতে কী ঘটেছিল,’ বলল রানা।

বেয়াল্লিশ
এখন বাজে রাত একটা।

একটু আগে আবারও ঘুমিয়ে গেছে জ্যাকি। ওর সঙ্গে কথা বলার পর তারাভরা রাতে, মোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছে রানা। বেশ গরম পড়েছে আজ। ঘামে ভিজে গেছে ওর শার্টের পিঠ। মোটেলের কোন জানালাতেই কোন আলো নেই। থমথম করছে চারপাশ। দূরে টিভি দেখছে কেউ। আবছাভাবে এল প্রবল হাসির আওয়াজ। ছায়ার ভেতরে গার্বেজ ক্যানের কাছে ফোঁস ফোঁস করে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে চাইছে দুই বেড়াল। হাইওয়ে ধরে ঝোড়ো বেগে কোথায় যেন চলে গেল আঠারো চাকার এক ট্রাক।

আনমনে ভাবল রানা: কবে শেষ হবে আমার এই পথচলা? ওর বুক চিরে এল দীর্ঘশ্বাস। পকেট থেকে স্মার্টফোন নিয়ে ডায়াল করল অ্যারন কনারের মোবাইল ফোনে। বেশ ক’বার বাজার পর কেটে গেল লাইন। কোন মেসেজ না দিয়ে আবারও কল করল রানা। ফলাফল আগের মতই। তৃতীয়বার ডায়াল করলে অবশ্য ওদিক থেকে এবার ধরল কে যেন।

গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে ফিসফিস করে বলল বিরক্ত অ্যারন কনার, ‘কে তুমি! এত রাতে কী চাই?’

‘ভদ্রতার সঙ্গে কথা বলো,’ তাকে সতর্ক করল রানা, ‘নইলে ফোন রেখে দেব। আর সেক্ষেত্রে সকালে কল দেব তোমার স্ত্রীর কাছে। সে বোধহয় শুনতে চাইবে আমার কথা। বিশেষ করে যখন জানবে আইনের বাইরে গিয়ে কী করছ তুমি।’

এবার মনোযোগ না দিয়ে পারল না অ্যারন কনার। চুপ করে আছে সে। স্পিকারে চাপা শ্বাস শুনছে রানা। ‘তুমি চাও না এত রাতে তোমার স্ত্রীকে ঘুম থেকে তুলি,’ বলল ও। ‘সেক্ষেত্রে অসংখ্য প্রশ্নের জবাব দিতে হবে তোমাকে। সুতরাং লক্ষ্মী ছেলের মত বিছানা ছেড়ে নিচতলায় নেমে এসো। আরামদায়ক কোন চেয়ারে বসে মন দিয়ে শুনবে আমার কথা। তা হলে আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ কিছু জানবে না। আমার কথা বুঝতে পেরেছ, অ্যারন? আমি কিন্তু তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।’

চাপা ঘোঁৎ শব্দ শুনল রানা। কাপড়ের খস খস আওয়াজ তুলে বিছানা থেকে নামল টুলসার মেয়র। মিনিট দেড়েক পর বলল, ‘জানি তুমি কে। তোমার ব্যাপারে সবই জেনেছি।’

‘তা-ই?’ বলল রানা। ‘আমি হচ্ছি তোমার পথে পড়ে থাকা ক্ষুরধার এক কাঁটা। এরই ভেতরে দোস্ত রিপার রিগবি মিশ্চয়ই তোমাকে বিরক্ত করতে শুরু করেছে? ওই যে, শপিং মলের দুর্ঘটনার জন্যে? তোমার বোধহয় উচিত তার মাসোহারা দ্বিগুণ করে দেয়া।’

‘তুমি আসলে কী চাও, রানা?’ রেগে গিয়ে বলল অ্যারন।

‘আমি কী চাই তা পরে বলছি,’ বলল রানা। ‘বরং তুমি বলো আসলে কত টাকা দিতে চাও।’

‘মাঝরাতে এজন্যে ঘুম ভাঙালে? নির্বোধ কোথাকার!’

‘শুনেছি চুক্তি করার সময় তুমি সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নাও,’ বলল রানা। এবারও বোধহয় তাতে ভুল হবে না।’

‘কী বলবে সেটা বলো,’ ক্লান্ত স্বরে বলল অ্যারন কনার।

‘আমার কাছে আছে তোমার জরুরি কিছু জিনিস। যেমন ধরো ঐতিহাসিক কয়েকটা ডায়েরি। আমি কি আরও বিস্তারিতভাবে খুলে বলব?’

‘বুঝতে পেরেছি। আর বলতে হবে না।’

এই তো চট্ করে বুঝলে। ধুলোভরা ডায়েরি আমার কোন কাজে আসবে না। তাই তোমাকে সব দিয়ে দিতে চাই।’

‘বুঝতে পেরেছি। তুমি তা হলে ওগুলো বিক্রি করতে চাও।’

‘যে বেশি দেবে, তাকেই দেব। নিলামের প্রথম ডাক শুরু হচ্ছে পাঁচ মিলিয়ন ডলার দিয়ে।’

নাক দিয়ে ঘোঁৎ শব্দ করল অ্যারন। ‘তার মানে সবই তোমার জানা হয়ে গেছে?

‘আমি সব ফাঁস করে দিলে কী ঘটতে পারে, সেটা একবার ভেবে দেখেছ? শেষ হয়ে যাবে তোমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। অনেকে চাইবে তোমাকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় নামিয়ে দিতে। যতই চেষ্টা করো, তোমাকে বাঁচাতে পারবে না তোমার দুই সাইকো চ্যালা লিয়াম বার্ব ও টনি স্ক্যালেস।

‘কিন্তু পুরনো ক’টা ডায়েরির জন্যে পাঁচ মিলিয়ন ডলার? নিলামে তুললে বড়জোর তুমি পাবে দশ হাজার।

চুপ করে থাকল রানা। অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হওয়ার পর বলল, ‘বাজার যে বিক্রেতার, সেটা ভুলে যেয়ো না, অ্যারন। এক্ষেত্রে ক্রেতার কিছু করার নেই।’

‘তাতে কী! কেন এত টাকা দেব? আমি তো আড়াই মিলিয়ন ডলার দিয়েও ওগুলো কিনতে রাজি নই।’

‘তুমি দেবে, কারণ ভুল লোকের কাছে এসব ডায়েরি চলে গেলে মস্ত ক্ষতি হবে তোমার,’ বলল রানা। ‘তুমি ভাল করেই জানো কী বিষয়ে আমরা কথা বলছি। পাঁচ মিলিয়নের নিচে নিলামে ডাক দিতে পারবে না। আমার ধারণা: এর চেয়ে বেশি চেয়েছিল বেলা ওয়েস। আমি কি ভুল বললাম?’

চুপ করে থাকল কনার।

‘আমি যে আসলে কত ভাল একজন মানুষ, সেটা এবার বুঝিয়ে দিচ্ছি: পাঁচ মিলিয়ন ডলারে বাড়তি পাবে জ্যাকুলিন সিলভেস্টারকে। তার ওপরে কটেজে তোমার, বার্ব আর স্ক্যালেসের যে ভিডিয়ো, সেটাও পাচ্ছ একদম বিনে পয়সায়। কেউ জানবে না যে তোমরাই খুন করেছ হিউবার্ট হ্যারল্ডকে। চুক্তিটা এখন তোমার কাছে কেমন বলে মনে হচ্ছে?’

হতবাক হয়ে গেছে টুলসার মেয়র।

হাসল রানা, ‘হ্যালো? আবার জ্ঞান হারালে না তো?’

‘আমি শুনছি,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল মেয়র কনার।

‘আমি চাই নগদ পাঁচ মিলিয়ন ডলার। আর সেটা দেবে আজ রাতেই। মালামাল বিনিময়ের পর আর কখনও আমাকে দেখতে পাবে না।

‘তুমি কি পাগল হলে? ভাল করেই জানো, এত টাকা কেউ কখনও নিজের বাড়িতে রাখে না। পাঁচ মিলিয়ন ডলার জোগাড় করতে হলে আমার লাগবে অন্তত দু’দিন।’

‘বানাইপানাই বাদ দাও, অ্যারন। ক্লায়েন্টের কাছ থেকে কি ব্যাঙ্কের চেক নাও তুমি? সুতরাং আজ রাতেই হয় দেবে নগদ টাকা, অথবা টা-টা দিয়ে দেবে ডায়েরিগুলোকে।

কিছুক্ষণ ভেবে বলল অ্যারন, ‘ঠিক আছে, রেগে যাওয়ার কিছু নেই। টাকা আমি দেব। তবে এরপর আবারও আমাকে বিরক্ত করতে চাইলে দুনিয়ার যেখানে যাও, খুন হবে আমার লোকের হাতে।’

‘তুমি জানো ভাল চুক্তি কীভাবে করতে হয়,’ বলল রানা। ‘এবার মন দিয়ে শোনো লেকের তীরে সেই কটেজে রাত সাড়ে তিনটের একা হাজির হবে। সঙ্গে ডলারে ভরা দুটো হোল্ডঅল। মেয়েটা আর ডায়েরি নিয়ে ঠিক সময়ে দেখা দেব। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’

‘একা গেলে মেয়েটাকে কী করে সামলে রাখব? ফিরতি পথে কুত্তী তো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে গোটা শহরের মানুষকে জাগিয়ে দেবে!’

ওটা মোটেই কোন সমস্যা নয়, বলল রানা, ‘ঘুমিয়ে থাকবে সে। নিজে ওকে তুলে দেব তোমার গাড়ির ট্রাঙ্কে। আমার কথা বুঝতে পেরেছ? তারপর ওকে নিয়ে কী করবে, সেটা স্রেফ তোমার ব্যাপার। খুন করার আগে রেপ করাতে পারো দুই স্যাঙ্গাতকে দিয়ে। কাজ শেষে কুকুর দিয়ে খাইয়ে দিলেই বা আমার কী!’

‘তুমি খুব ভাল পযিশনে আছ, তা-ই না, রানা?’

‘ঝোপ বুঝে কোপ দিতে হলে বহু কিছু জানতে হয়। তুমি নিজেও আমার মতই বুদ্ধিমান মানুষ।

‘আমার হয়ে কাজ করবে? ভাল বেতন দেব। ধরো, প্রতি মাসে দশ হাজার ডলার।

পকেটে পাঁচ মিলিয়ন ডলার এলে তোমার চাকরি করবে কোন্ শালা?’ চট্ করে হাতঘড়ি দেখল রানা। ‘এবার রওনা হও, মিস্টার মেয়র! হাতে পাবে মাত্র দু’ঘণ্টা। এরপর দেখা হবে কটেজে।’

তেতাল্লিশ
উত্তরা হাওয়া এসে দুলিয়ে দিচ্ছে উলোগাহ্ লেকের কালো, জল। রাতের আঁধারে জঙ্গলের ওপর দিয়ে কি-ই-ই-ই শব্দে দূরে চলে গেল এক মর্দা পেঁচা। কটেজের বারান্দায় জ্বলছে দামি লণ্ঠন। হলদেটে বাতি ঘিরে উড়ছে শতখানেক মথ। খুলে রাখা হয়েছে সদর দরজার তালা। আশা করা হচ্ছে একটু পর পৌঁছে যাবে এক বা একাধিক অতিথি। সামনের ঘরে বেজে চলেছে মোয়ার্টের বারো নং কনসার্টো। অ্যারন কনারের বিশাল সিডি কালেকশন দেখে বিস্মিত না হয়ে পারেনি রানা।

এখন বাজে রাত তিনটে বিশ। একটু পর পৌঁছে যাওয়ার কথা অ্যারন কনারের। অথচ এরই ভেতরে সরু রাস্তা ধরে আসছে দুটো হেডলাইট। যদিও ওটা মেয়রের ব্যক্তিগত ক্যাডিলাক নয়, সাদা জিএমসি কমার্শিয়াল প্যানেল ভ্যান। এবড়োখেবড়ো পথে হোঁচট খেয়ে কটেজের সামনে থামল ওটা। বন্ধ করা হলো না ইঞ্জিন। সরাসারি বারান্দার ওপরে গিয়ে পড়েছে হেডলাইটের জোরালো আলো।

রানা যা ভেবেছে, ঠিক তা-ই ঘটেছে। ঝুঁকি নিয়ে এ দিকে আসতে যায়নি অ্যারন কনার। ভ্যানের দু’দরজা খুলে নেমে পড়ল লিয়াম বার্ব ও টনি স্ক্যালেস। খোলা হলো পেছনের দরজা। হুড়মুড় করে নামল প্রায় দুই মেজরের ছয় সশস্ত্র স্যাঙাত। নিজেদের ভেতরে কোন কথা হচ্ছে না কারও। চেক করল অটোমেটিক অস্ত্র ক্রিস ভেক্টর। সবার কাছে যে পরিমাণ গুলি, তাতে যুদ্ধে খতম করে দিতে পারবে মাঝারি এক কোম্পানি সৈনিকদেরকে।

পাশাপাশি থেমে কটেজ লক্ষ্য করে অস্ত্র তাক করল বার্বের লোকেরা। বারান্দার লণ্ঠনের আলো পড়ে তৈরি হয়েছে তাদের দীর্ঘ ছায়া। পরিবেশে চাপা উত্তেজনা। আজ কী করতে হবে, সবাইকে খুলে বলেছে বার্ব ও স্ক্যালেস। তারা লড়বে ভয়ঙ্কর একলোকের বিরুদ্ধে। শপিং মলের পাতাল গ্যারাজে একই লোক তাদের সঙ্গী ফিনির অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে ডজনখানেক গাড়ি। এক বা দু’বার নয়, তিনবার ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে। এজন্যে মাসুদ রানাকে সত্যিকারের কিংবদন্তী বলে ভাবছে বার্বের দলের লোকেরা। অবশ্য এটাও ঠিক, আজ আর কোনভাবেই বাঁচতে পারবে না বাঙালি লোকটা

সবার মনে কাজ করছে ভয়। বারান্দার দিকে কয়েক পা গিয়ে মেগাফোন মুখে তুলল বার্ব। রাতের নীরবতা চিরে দিল .. তার কণ্ঠ: ‘ঠিক আছে, মাসুদ রানা! ভাল করেই জানো, আমরা কী কারণে এখানে এসেছি! মেয়েটাকে নিয়ে কটেজ থেকে বেরিয়ে এসো! চালাকি করবে না! মাথার ওপরে রাখবে দুই হাত! ডিভিডি আর মেয়েটাকে পেলে তোমাকে ছেড়ে দেব আমরা! কথা বুঝতে পেরেছ? দেরি না করে বেরিয়ে এসো কটেজ থেকে!’

কটেজের ভেতরে বেজে চলেছে মোযার্টের সঙ্গীত। বাতাসের ধাক্কা খেয়ে আরেকটু খুলে গেল ভেজানো দরজা।

ঘর থেকে বেরিয়ে এল না কেউ।

‘আমার কথা শুনতে পাচ্ছ, রানা?’ মেগাফোনে আবারও বলল বার্ব। ‘কোন ধরনের চালাকি করবে না! বাঁচার জন্যে তোমাকে স্রেফ পাঁচ সেকেণ্ড সময় দিলাম!’

জবাব দিল না কেউ।

‘হারামজাদা কটেজে বসে কী করছে?’ দলের ডানে অস্ত্র হাতে নিচু গলায় বলল ম্যাট কালাহার।

অস্বস্তি নিয়ে হাসল তার সঙ্গী মর্গ্যান। ‘মনে হয় মেয়েটাকে নিয়ে কটেজের বেডরুমে শুয়ে হাম্পু করছে। এত সুন্দরী মাল সহজে পাওয়া যায় না!’

‘যত বড় যোদ্ধা বা প্রেমিকপুরুষ হোক না কেন, আজ মরতেই হবে তাকে,’ বলল আরেকজন।

কঠোর চোখে তাদেরকে দেখল বার্ব। নীরব হয়ে গেল সবাই। স্ক্যালেসের সঙ্গে চোখাচোখি হলো বার্বের। ‘কুকুরের বাচ্চা নিজে থেকে বেরোবে না,’ ফিসফিস করল স্ক্যালেস।

কাঁধ ঝাঁকাল বার্র। ‘ঠিক আছে, আমরা আর অপেক্ষা করব না।’ মেগাফোন মাটিতে ফেলে দিল সে। অ্যারন কনারের নির্দেশ পেয়ে সে বিরক্ত। তার ইচ্ছে ছিল মুখোমুখি হয়ে খতম করবে মাসুদ রানাকে। কিন্তু সেটা আর হলো না। এদিকে স্ক্যালেসের বুক ফেটে যাচ্ছে জ্যাকিকে ভোগ করতে না পেরে। আসলে কিছু নির্দেশ পালন করা সবসময় খুব কঠিন হয়!

আজ রাতে তাদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে সব ধরনের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করে মাসুদ রানাকে গুম করতে। সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে বার্ব, আবারও যেন হাত থেকে ফস্কে না যায় লোকটা!

‘ঠিক আছে, কাঁধে ঝুলন্ত ক্রিস ভেক্টর হাতে নিল বার্ব। ‘এবার কাজ শুরু করো!’

সেফটি ক্যাচ অফ করে অস্ত্র কাঁধে ঠেকাল সবাই। ট্রিগারে চেপে বসল আঙুল। সঙ্গে সঙ্গে খানখান হয়ে গেল রাতের থমথমে নৈঃশব্দ্য। বিকট আওয়াজ শুনে নীড় ছেড়ে আকাশে ছিটকে গেল ঘুমভাঙা একঝাক ভীত পাখি। গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হচ্ছে ওক কাঠের দেয়াল ও দরজা। প্রতি সেকেণ্ডে কটেজের দিকে যাচ্ছে এক শ’ ত্রিশটির বেশি গুলি। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে গুঁড়ো হলো বারান্দার রেইলিং। ধসে গেল জানালা। ভেঙে চুরচুর হলো হিউস্টন থেকে লিণ্ডা কনারের কেনা বারান্দার দামি কাঁচের লণ্ঠন।

অস্ত্র রিলোড করে আবার গুলিবর্ষণ শুরু করল তারা। সামনের দেয়াল উড়িয়ে দিল প্রতি মিনিটে ষাট কেজি তামার বুলেট। ঝাঁঝরা হলো কটেজের ভেতরের অংশ। একটা গুলি স্তব্ধ করে দিল সিডি প্লেয়ার। নানাদিকের বা ফেটে যাওয়ায় একে একে নিভে গেল ভেতরের সব বাতি। ভ্যানের হেডলাইটের আলোয় কটেজটাকে এখন দেখাচ্ছে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাড়ির মত। কারও সাধ্য নেই প্রাণে বাঁচবে ওখানে। কাভার নিতে চাইলেও খুন হয়ে গেছে রানা আর মেয়েটা।

মাথার ওপরে হাত তুলে নির্দেশ দিল বার্ব। হঠাৎ গুলি থেমে যাওয়ায় চারপাশে নেমে এল থমথমে নীরবতা। কটেজের ভেতরে ফিফি শব্দ করছে কী যেন। ওপর থেকে নিচের বারান্দায় ঠং করে পড়ল গুলিতে ভাঙা একটা পাইপ। মেঝের ওখানেই গুলি খেয়ে মারা গিয়েছিল হিউবার্ট হ্যারল্ড।

একটু পর কটেজ বলতে আর কিছুই থাকবে না। ফেরার আগে সেটা নিশ্চিত করবে বার্ব ও স্ক্যালেস। ভ্যানে আছে চারফুট লম্বা ও দুইফুট চওড়া একটা বাক্স। ওটার ঢাকনি খুলে নিল বার্ব। খাতির আছে বলে ভেতরের জিনিসটা পেয়েছে দুর্নীতিপরায়ণ এক অ্যামুনিশন ডিপো চিফের কাছ থেকে। অস্ত্রটা নতুন লাইটওয়েট ভার্শন এম-৩২ ফোরটি- মিলিমিটার রোটারি গ্রেনেড লঞ্চার। জিনিসটা তৈরি করা হয়েছে ইউএস আর্মি স্পেশাল অপারেশন্স কমাণ্ডের জন্যে। সাধারণ রায়ট থেকে শুরু করে কেমিকেল ও অরফেয়ার বা হাই এক্সপ্লোসিভ বোমা নিক্ষেপের জন্যে উপযুক্ত। মাত্র চার সেকেণ্ডে ছুঁড়বে ছয় রাউণ্ড গ্রেনেড। অস্ত্রটা হাতে পাওয়ার জন্যে অধৈর্য হয়ে গেছে মেক্সিকান ড্রাগ্‌স্ কার্টেল হার্ডি লোকো।

লঞ্চারটা ভাল কি না, আজ জেনে নেবে বার্ব। ভ্যানের সামনে ফিরে বারান্দার দিকে গ্রেনেড লঞ্চার তাক করল সে। দ্রুত টিপতে লাগল ট্রিগার। বিধ্বস্ত কটেজে বিদ্যুদ্বেগে ঢুকে পড়ল ছয়টা গ্রেনেড। প্রায় একই সময়ে ফাটল ওগুলো। বোমার বিস্ফোরণে দেয়াল ও ছাত ফেটে আকাশে উঠে গেল। আগুনের বিশাল এক লাল গোলক। নানাদিকে ছিটকাল কাঠের টুকরো। দেয়াল বা আসবাবপত্র বলতে কিছুই থাকল না। বৃষ্টির মত আকাশ থেকে ঝরঝর করে ঝরল ভাঙা জিনিসপত্র। ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেছে বার্বের দলের ক’জন লুঠেরা। লেলিহান আগুনের ভেতরে ধসে পড়েছে দোতলা ও প্রথমতলার ছাত।

নতুন করে আর লঞ্চার রিলোড করল না বার্ব। কটেজের ভেতরের সব কিছুই পুড়ে গেছে গনগনে আগুনে। আজকাল যেখানে দেখা দেয় বার্ব আর স্ক্যালেস, সর্বনাশ হয়ে যায় সেই বাড়ির।

‘মজা কাকে বলে!’ হাসল স্ক্যালেস। জ্যাকিকে ভোগ করা গেল না বলে এখন মনে কোন দুঃখ নেই। কটেজে কোথাও চাপা পড়ে ছাই হচ্ছে মেয়েটার লাশ। খতম হয়ে গেছে মাসুদ রানা। আর কখনও বিরক্ত করতে আসবে না সে।

‘আমাদের কাজ শেষ, বলল বার্ব। ‘ডিইএ এজেন্টদের কনভয় উড়িয়ে দিতে হলে এই জিনিসই চাই। এবার খুশিতে নাচতে শুরু করবে মেক্সিকান ড্রাগ কার্টেলের ওরা।’ ঠোঁট থেকে মিলিয়ে গেল তার হাসি। ‘তা হলে আজকের মত শেষ হলো আমাদের পার্টি! চলো, এবার বাড়ি ফিরি!’

স্বস্তি নিয়ে ধসে যাওয়া কটেজের কমলা আগুন দেখছে সবাই। আর একটা গুলিও ছুঁড়তে হবে না। উত্তপ্ত অস্ত্র হাতে উঠে পড়বে নিজেদের ভ্যানে।

‘রাতটা ছিল সত্যিই দারুণ!’ বলল মর্গ্যান।

‘কালাহার কোথায়?’ হঠাৎ করে বলল দলের একজন। সবার ওপরে চোখ বোলাল বার্ব। গুলি করার সময় ডানে ছিল কালাহার। ভ্যানে চেপে তারা এসেছে আটজন। টনি এবং তাকে বাদ দিলে দলে এখন আছে মাত্র পাঁচজন। তা হলে কোথায় গেছে ম্যাট কালাহার?

‘তোমরা ওকে দেখেছ?

মাথা নাড়ল সবাই।

‘একটু আগেও আমার ডানে ছিল,’ জানাল জুন ম্যাস।

‘তা হলে গেছে কোথায়?’

‘আমি জানি না, বস।’

‘বোধহয় প্রস্রাব করতে গেছে,’ জঙ্গলের দিকে তাকাল স্ক্যালেস। ‘অ্যাই, ম্যাট! ফিরে এসো! আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে!’

কুঁচকে গেছে বার্বের ভুরু। আগুনের কাঁপা কমলা আভায় রহস্যময় দেখাচ্ছে অরণ্যের গাছগুলোকে।

‘কালাহার?’ গলা ছেড়ে ডাকল বার্ব, ‘জলদি এসো! নইলে তোমাকে ফেলেই চলে যাব!’

কিছুক্ষণ পার হয়ে গেলেও কোন জবাব এল না। এরই ভেতরে কটেজ থেকে অন্তত দু’ শ’ গজ দূরে সরে গেছে ম্যাট কালাহার।

আঁধারে তার অচেতন দেহ কাঁধে তুলে হেঁটে চলেছে মাসুদ রানা!

চুয়াল্লিশ
পেছন থেকে মুখ চেপে ধরে ম্যাট কালাহারের ঘাড়ে সুঁই গেঁথে সিরিঞ্জের বেশ অনেকটা তরল ইনজেক্ট করা হয়েছে। ড্রাগসের প্রভাবে সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে গেছে লোকটার। দেখার সময় ছিল না যে হামলা করেছে কে। বিসিআই থেকে যে ট্রেনিং দেয়া হয়, তাতে এজেন্টরা সবাই হয়ে ওঠে তুখোড় যোদ্ধা। একই প্রশিক্ষণের গুণে আঁধারে নিঃশব্দে এসে কালাহারকে অচেতন করে গভীর জঙ্গলে ধরে নিয়ে গেছে মাসুদ রানা।

এখন ড্রাগসের প্রভাব কমে যেতেই অসহায় বোধ করছে ম্যাট কালাহার। এদিক-ওদিক তাকাল ঝাপসা চোখে। তাকে আনা হয়েছে বড় এক ঘরের ভেতরে। তবে সাধারণ ঘর নয়। মাথা কাজ করছে না বলে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। কাঠের চেয়ারে বসলেও নাড়াতে পারছে না হাত-পা। একটু পর বুঝে গেল, অবশ নয় তার শরীর। চেয়ারের পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে দু’হাত। একইভাবে চেয়ারের পায়ায় আটকা পড়েছে দু’পায়ের গোড়ালি। জড়ানো দুর্বল কণ্ঠে কথা বলতে গিয়ে টের পেল, রুমাল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে তার মুখ। ব্যথায় দপদপ করছে মাথা, যখন-তখন বমি হবে। চোখ পিটপিট করে দৃষ্টি পরিষ্কার করতে চাইল সে। আর তখনই বুঝতে পারল, তার মুখের দিকে তাক করা আছে নলকাটা বন্দুকের বৃত্তাকার কালো মাল!

একদম নড়ছে না ওটা!

সামনের চেয়ারের পিঠ থেকে তাক করা হয়েছে বন্দুক।

জ্ঞান ফিরতেই মুখের দিকে বারো গেজের বন্দুক চেয়ে আছে দেখতে পেলে প্যান্ট ভিজিয়ে দেয়া দোষের কিছু নয়। করুণ গোঙানি বেরোল ম্যাটের মুখ থেকে। সরে যেতে চাইল চেয়ার থেকে। অবশ্য বিন্দুমাত্র নড়ল না ভারী আসবার্ব। সামনের চেয়ারে বন্দুক কাঁধে নিয়ে গম্ভীর চেহারায় বসে আছে বাদামি রঙের এক যুবক।

‘তা হলে ফিরে এলে জগতে?’ বলল রানা। জঙ্গলের ধারে ক্যারোটিড আর্টারির অক্সিজেন বন্ধ করে কালাহারকে ধরে আনতে পারত। কিন্তু তাতে একটু পর ফিরে আসত তার চেতনা। ফলে বহুক্ষণ তাকে অজ্ঞান রাখতে গিয়ে সিরিঞ্জের তিনভাগের দু’ভাগ ড্রাগ দিয়েছে রানা। লোকটাকে কাঁধে নিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলে গেছে ব্যারাকুডা গাড়ির কাছে। কালাহারকে ভরে দিয়েছে ট্রাঙ্কের ভেতরে। এরপর সরাসরি ফিরে এসেছে ওল্ড ইয়েলার ইনের উঠনে। ঘুম থেকে তুলে জ্যাকিকে সঙ্গে নিয়ে তিনঘণ্টা আগে ফিরেছে গ্যারাজে। ভেতর থেকে শাটার বন্ধ করে চেয়ারে বসিয়ে বেঁধে দিয়েছে লোকটার হাত-পা। তারপর থেকে অপেক্ষা করছে।

‘আমি আসলে কোথায়?’ জানতে চাইল ম্যাট কালাহার। মুখে রুমাল বেঁধে রাখা হয়েছে বলে কোন কথাই বলতে পারল না সে।

‘তুমি আছ মস্ত বিপদে,’ বলল রানা। ‘আমার নাম মাসুদ রানা। আর এই মেয়ে জ্যাকি। আগেই আমাদের নাম তুমি জেনে নিয়েছ। তোমার বন্ধুরা তোমাকে ডাকে ম্যাট কালাহার বলে। তাই তোমার নাম আমি জানি। আরও বহু কিছুই জানি বার্ব ও স্ক্যালেসের ব্যাপারে। এ-ও জানতে বাকি নেই, তোমাদের বস হচ্ছে মেয়র অ্যারন কনার। এবার তোমার মুখের বাঁধন খুলে দিলে সব খুলে বলবে আমাকে। নইলে হয়তো আজই শেষ হবে তোমার প্রাণ।’ চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে কালাহারের মুখের বাঁধন খুলল রানা। ঘাড় কাত করে মেঝেতে রক্ত মেশানো থুতু ফেলল লোকটা। ফিতার মত করে রুমাল এঁটে বসেছিল বলে কেটে গেছে ঠোঁটের দু’পাশে।

‘এবার কাজের কথায় এসো, চেয়ারে গিয়ে বসল রানা। কাঁধে তুলে নিয়েছে বন্দুকের কুঁদো। ‘তোমার মত বদমাশকে নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না, মিথ্যা বললে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে বারো গেজের শটগানের গুলি কী ধরনের কাজ করে। কাজেই যা জানতে চাইব, সংক্ষেপে তার জবাব দেবে। মিথ্যা এড়িয়ে কথা না বললে তোমার কপালে তৈরি হবে রক্তের বার্না। বুঝতে পেরেছ আমার কথা?’

‘মরু, শালা, কুত্তার বাচ্চা!’ গালি দিলেও বন্দুকের ওপর থেকে চোখ সরাতে পারল না গলাহার। চোখে ভয়।

চেয়ারে ঝুঁকে বসল রা। কী বললে, কালাহার? আবারও বলো তো? তোমার কথা মন দিয়ে শুনতে চাই তবে সেগুলো ভাল না লাগলে কী করব, সেটা তো বুঝতেই পারছ।

‘নরকে যা, শুয়োরের বাচ্চা!? কাঁপছে কালাহারের গলা। ‘যা খুশি কর! গুলি কর! আমার মুখ খোলাতে পারবি না!’

তাকে কঠোর চোখে দেখল রানা। ‘মরার আগে তোমার শেষ কোন খায়েশ আছে, কালাহার?

‘কিছু বললে আমাকে খুন করবে বার্ব বা স্ক্যালেস। আমি কষ্ট পেয়ে মরতে চাই না। আমার আর কিছুই বলার নেই, কুত্তার বাচ্চা!’

ধীরে ধীরে মেঝেতে বন্দুক নামিয়ে রাখল রানা। কালাহারকে খুন করলে কোন তথ্য পাবে না। কর্কশ হাসল রানা। ‘তবে তো আর কিছুই করার নেই! বোকা হাঁদা, তুমি ভুল করে জাগিয়ে দিয়েছ আমার সাইকোপ্যাথ মনটাকে!’

বিস্ফারিত চোখে ওকে দেখে নিয়ে ঢোক গিলল কালাহার।

নিচু গলায় বলল রানা, ‘মিনিট বিশেকের জন্যে গ্যারাজ থেকে বেরিয়ে যাও, জ্যাকি। বাইরে থেকে বন্ধ করে দেবে শাটার।’

‘আমি বরং এখানেই থাকি?’ আপত্তির সুরে বলল জ্যাকি।

‘তা সম্ভব নয়,’ বলল রানা। চোখ সরাচ্ছে না কালাহারের চোখ থেকে। ‘তোমাকে অতটা ভয় দেখাতে চাই না।’

দ্বিধা করলেও কয়েক সেকেণ্ড পর মাথা দোলাল মেয়েটা। চলে গেল ইস্পাতের শাটারের সামনে। ঝুঁকে হ্যাণ্ডেল ধরে ওপরে তুলে দিল শাটার। ভেতরে এসে পড়েছে ভোরের লালচে রোদ। গ্যারাজের বাইরে পার্ক করা আছে প্লিমাউথ গাড়ি। চওড়া ঢাকা ও আর্চে জঙ্গলের ধুলোবালি। বাইরে বেরিয়ে গেল জ্যাকি। নামিয়ে কংক্রিটের সঙ্গে মিশিয়ে দিল শাটার। গ্যারাজে রয়ে গেছে রানা ও কালাহার।

গাড়ির দরজা খুলে যাওয়ার আওয়াজ পেল রানা। ওর জন্যে বাইরে অপেক্ষা করছে মেয়েটা।

গ্যারাজে নেমে এল থমথমে নীরবতা। ভয় নিয়ে রানাকে দেখছে ম্যাট কালাহার। কপালে জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

‘সবার মনেই থাকে কিছু কালো অশুভ চিন্তা, একটু পর বলল রানা। ‘কিন্তু আমারগুলো এতই কালো, যে এমন কী আমিও কখনও কখনও ভয় পেয়ে যাই।’ ধীরপায়ে ওঅর্কবেঞ্চের কাছে গেল রানা। চোখ বোলাতে লাগল যন্ত্রপাতির ওপরে। ‘একটু পর তুমি খুব ভয় পাবে। কারণ আমি যা করব, সেটা দেখলে তোমার মনে হবে মরে যেতে পারলে বেঁচে যেতে। একবার কাজ শুরু করলে আবার থামতে পারি না। সোনালি রোদের এই ভোরে এমন কিছু করে দেখাব, যেটা এমন কী বার্ব বা তার বন্ধু’ স্ক্যালেসও সারাজীবনে ভাববে না। তুমি বোধহয় জানো না, কালাহার, তুমি আছ আমার টর্চার সেলে। এখান থেকে তোমার লাশ যখন বেরোবে, ততক্ষণে তুমি হবে অদ্ভূত চার টুকরো।’

‘আমি কিছুই জানি না, ঈশ্বরের কসম!’ বেসুরো কণ্ঠে বলল কালাহার। ‘যা করতে বলেছে, সেটাই করেছি।’

চকচক করছে রানার দু’চোখ। ঠোঁটে ফুটে উঠল ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর হাসি। ‘আগেও অনেকে এ-কথা বলেছে। তবে কাজ একবার শুরু করলে নিজে থেকেই অনেক কথা বলবে। তোমার মত লোকেরা এই একই ভুল করে। একসময় বাঁচার জন্যে কাঁদে বাচ্চাদের মত। কিন্তু আমি একবার মজা পেয়ে গেলে তখন আর থামতে পারি না।’

বেঞ্চ থেকে বল-পিন হাতুড়ি নিল রানা। হাঁটুর বাটি, বাহু, দাঁত বা খুলি ফাটাতে ওটা খুব কাজের জিনিস। চিন্তিত চেহারায় হাতুড়িটা দেখল রানা। তারপর বিরক্ত হয়ে ওটা বেঞ্চে রেখে হাতে নিল আরেকটা যন্ত্র। নরম সুরে বলল, ‘আগে কখনও ভেবেছ ত্বক, মাংস কেটে হাড়ের ভেতরে ধীরে ধীরে বোল্ট-ক্রপার গেঁথে বসলে কেমন মজা লাগে! তোমাকে ভাল করে দেখাচ্ছি কীভাবে কাজটা করতে হয়।’

দেহ মুচড়ে চেয়ার ছেড়ে নেমে যেতে চাইল কালাহার। যদিও সেটা সম্ভব হলো না তার পক্ষে। বোল্ট-ক্রপার হাতে ধীর পায়ে এল রানা। চেয়ারের পেছনে যাওয়ার আগে একবার দেখে নিল হাতের যন্ত্রটা। এবার কী ঘটতে চলেছে সেটা বুঝতে পেরে গলা শুকিয়ে গেছে কালাহারের। বিড়বিড় করে বলল ‘ঈশ্বর! মাফ চাই! আমি মাফ চাই! হায় হায়, ঈশ্বর, মাফ করো তুমি!’

বোল্ট-ক্রপার চেপে বসল ম্যাট কালাহারের কড়ে আঙুলের মাংসে! লোকটার কানে মধুর কণ্ঠে বলল রানা,

একদম ভেবো না, এক এক করে সবই কেটে নামাব।’

ব্যারাকুডা গাড়ির সিটে বসার একটু পর গ্যারাজের ভেতর থেকে করুণ এক আর্তনাদ শুনল জ্যাকি। ভয় পেয়ে বুজে ফেলল দু’চোখ।

কালবেলা – ৪৫ (মাসুদ রানা)

খিঁচড়ে আছে অ্যারন কনারের মন। মাঝরাতে রানার সঙ্গে কথা শেষ করে দোতালায় গিয়ে আনমনে জ্বেলে দিয়েছে বেডরুমের বাতি। ফলে ভেঙে গেল লিঙার কাঁচা ঘুম। এরপর অ্যারনের ওপর শিলাবৃষ্টির মত বর্ষিত হলো একহাজার একটা প্রশ্ন। কিছুই হয়নি সেটা জানালেও তাকে চেপে ধরল লিঙা। প্রায় সারারাত ধরে চলল আকাশ-পাতাল তর্ক। শেষমেশ পাশের বেডরুমে গিয়ে ঠাঁই নিল অ্যারন। এতে আরও সন্দেহপ্রবণ হয়ে গেছে তার স্ত্রী।

এরপর সকাল সাড়ে ছয়টায় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে অ্যারন। এতই বেড়ে গেছে মাথা-ব্যথা, খেয়াল করতে পারেনি নিচতলায় নেমে এসেছে হলুদ পায়।মা পরে। বরাবরের মত একবারও দেখেনি ল্যাণ্ডিঙে কুমারী মা মেরির প্রমাণ আকারের অপূর্ব সুন্দর মূর্তি, জ্ঞানী আইরিশ পণ্ডিতদের উদ্ধৃতি, আয়ারল্যাণ্ডের তিনরঙা পতাকা, প্রাচীন হার্প এবং অন্যান্য অ্যান্টিক।

সরাসরি এসে ঢুকেছে কিচেনে। কাবার্ড খুলে কৌটা থেকে বের করে নিয়েছে একমুঠো অ্যাসপিরিন। ভেবেছে ওষুধ গেলার সময় ড্রিঙ্ক করবে দুষ্প্রাপ্য মিডলটন উইস্কি কিন্তু শেষে সেটা না করে একগ্লাস পানি দিয়ে গিলে নিয়েছে সাদা বড়ি। ড্রামের ধুবধুর শব্দে মাথার ভেতরে ব্যথা তৈরি করছে মগজ। এবার কী করবে ভাবছে, এমন সময় পকেটে বেজে উঠল মোবাইল ফোন। ওটা বের করে স্ক্রিন দেখে বুঝতে পারল, ভয়েস মেইল দিয়েছে লিয়াম বার্ব।

প্রোগ্রাম চালু করতেই কথা বলল প্রাক্তন মেজর: দেরি না করে ফোন করুন। বিষয়টি খুব জরুরি।’

মাথা-ব্যথা নিয়ে বার্বকে কল দিল অ্যারন। তাতে যে খবর শুনতে পেল, মনে হলো লাথি এসে লেগেছে তার অণ্ডকোষে। ধপ করে বসে পড়ল একটা চেয়ারে। বনবন করে ঘুরতে শুরু করেছে মাথা। গতরাতে যা ঘটে গেছে সেটার বিস্তারিত বর্ণনা দিল বার্ব। কটেজে ছিল না মাসুদ রানা। ব্যর্থ হয়েছে তাদের মিশন। তার ওপরে উধাও হয়ে গেছে দলের সদস্য ম্যাট কালাহার। বহু খুঁজেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।

‘আর কটেজ?’ প্রায় ফিসফিস করে বলল অ্যারন কনার।

‘ওই কটেজ আর নেই, দুঃখিত। আপনার নির্দেশ অনুযায়ী ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে ওটা।’

বড় করে ঢোক গিলল অ্যারন। এবার সত্যিই বোধহয় তাকে গিলতে হবে পুরো এক বোতল মিডলটন রেয়ার উইস্কি। কী জবাব দেবে সে তার স্ত্রীকে? কটেজটা ছিল লিঙার খুব প্রিয়।

‘একঘণ্টা পর আমার সঙ্গে দেখা করো,’ শুকনো গলায় বলল কনার। কল কেটে ফোন করে ঘুম ভাঙাল ব্যক্তিগত সহকারিণী মাটিল্ডা টেসের। কোন ব্যাখ্যা না দিয়েই জানাল, আজ যে সাক্ষাৎকার দেয়ার কথা ছিল, সেটা অনিবার্য কারণে বাতিল করতে হচ্ছে।

‘কিন্তু রেল ইউনিয়নের নেতারা চরম বিরক্ত হয়ে উঠবে,’ বলল মাটিল্ডা। ‘এরই ভেতরে দু’বার তাদের কাছ থেকে আমরা সময় নিয়েছি।’

‘তারা যা খুশি ভাবুক। দরকার হলে বলতে হবে, আমি নিজেই খুন হয়ে গেছি রেলগাড়ির নিচে চাপা পড়ে।

‘বিষয়টা হাসির নয়, মেয়র কনার!’

‘ঠিক আছে, তো তাদেরকে জানাতে হবে আমি অসুস্থ। তাতে হবে? সত্যিই খুব দুর্বল লাগছে অ্যারনের। ফোন রেখে দিল। ওপরতলায় ধুপধাপ করে দরজা খোলা-বন্ধের আওয়াজে বুঝে গেল, আজও বরাবরের মত ভোরে উঠে পড়েছে লিপ্তা। তারচেয়েও বড় কথা, গতরাতের তর্কের কারণে তিরিক্ষি হয়ে আছে তার মন। এখন কিছু বললে শুরু হবে মুখ থেকে গোলাবর্ষণ। মরুক শালী! কটেজ নিয়ে নিজে থেকে আর একটা কথাও বলবে না অ্যারন। পরে খবর জানার পর লিণ্ডাকে নরম সুরে বলবে, ‘ডার্লিং, জেনে খুব কষ্ট পেলাম। তবে তোমার জন্যে ওটার চেয়ে ভাল কোন কটেজ আমি তৈরি করে দেব।’

লিণ্ডা বাথরুমে ঢুকতেই তাকে এড়াতে গিয়ে প্রায় দৌড়ে দোতলায় গিয়ে উঠল কনার। ঝড়ের বেগে পোশাক ছেড়ে নতুন সুট পরে নেমে এল নিচতলায়। তিন মিনিট পেরোবার আগেই দীর্ঘ ড্রাইভওয়ে পার করে রাস্তায় গিয়ে পড়ল তার ক্যাডিলাক গাড়ি। এত সকালে ভিড় নেই। দ্রুত গতি তুলে এয়ারপোর্টের দিকে চলল মেয়র কনার।

মাঝপথে আবারও বেজে উঠল তার ফোন। কল দিয়েছে লুই গৌরলে। ‘কেমন আছেন?’ জানতে চাইল লোকটা। জমজমাট কোন নাইট ক্লাব থেকে ফোন করেছে সে। চলছে দারুণ পার্টি। বিকট আওয়াজে বাজছে হেভি মেটাল মিউযিক। মেক্সিকান ড্রাগ ডিলারদের অস্ত্র সাপ্লায়ারের কাছে সকাল পৌনে সাতটা মানে এখনও গভীর রাত।

‘ভাল! খুবই ভাল!’ নাক বাঁকা করল অ্যারন কনার।

‘তা হলে মন দিয়ে শুনুন। এবারের শিপমেন্ট দেরি না করে পাঠিয়ে দিতে হবে। আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?’

তার কথা শুনে ঝুলে গেল কনারের নিচের চোয়াল। আরেকটু হলে তার ক্যাডিলাক রাস্তার ধারে পার্ক করা এক গাড়ির পেছনে গুঁতো মারত। বড় করে শ্বাস ফেলে বলল সে, ‘ঠিক আছে।’

‘বেশ। পরের সপ্তাহের জন্যে ওরা অপেক্ষা করবে না। বুঝতেই তো পারছেন।’

অধৈর্য হয়ে গেছে ড্রাগস্ কার্টেলের বসেরা। মালপত্র কখন চায় ওরা?’ জানতে চাইল অ্যারন।

‘আপনি হাতে পাচ্ছেন দু’দিন। আশা করি সমস্যা হবে না।’ লুই গৌরলে, এমনভাবে বলেছে, যেন আস্ত দুটো স্টেট পার করে ছয় শ’ মাইল দূরে মিলিয়ন ডলারের অবৈধ অস্ত্র ও গোলাগুলি পৌঁছে দেয়া বড় কোন বিষয় নয়। অথচ, টেক্সাস ও মেক্সিকোর বর্ডার পাহারা দিচ্ছে দু’দেশের শত শত সীমান্ত-রক্ষী।

‘মাত্র দু’দিনের ভেতরে? হায়, যিশু! আপনি তো আমাকে খুন করবেন!’ দুশ্চিন্তা বাড়ল কনারের। দু’দিনের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে যেতে হলে আগামীকাল সকালে অস্ত্র- গোলাবারুদ ট্রাকে তুলে রওনা দিতে হবে। অর্থাৎ, আজই ট্রাক-বহরে লোড করতে হবে মালামাল। দলের সবাই প্রচণ্ড পরিশ্রম করলে কাজটা তারা পারবে কি না তাতেও সহে আছে। হাতে একেবারেই সময় নেই। তার ওপরে অ্যারনের ঘাড়ের ওপরে তপ্ত শ্বাস ফেলে ঘাম ছটিয়ে দিচ্ছে হারামজাদা মাসুদ রানা। ওদিকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি মেয়েলোকটাকে!

‘আপনি খুন হন সেটা চাই না, হাসি-হাসি সুরে বলল লুই গৌরলে। ‘তবে টাকা তো আগেই নিয়েছেন। সুতরাং এখন জিনিস ঠিকভাবে হাতে না পেলে সত্যিই ওরা আপনাকে খতম করে দিতে পারে।’

কথাটা যে চরম সত্যি, সেটা বুঝে গলা শুকিয়ে গেল, অ্যারন কনারের।

‘পরে কথা হবে,’ কল কেটে দিল গৌরলে।

ততক্ষণে ব্যক্তিগত হ্যাঙারের কাছে পৌঁছে গেছে কনার। এরই মধ্যে হাজির হয়েছে নতুন এক সাদা ভ্যান। ওটার- পাশে দাঁড়িয়ে আছে বার্ব ও স্ক্যালেস। বার্বের চেহারায় চরম অস্বস্তি থাকলেও ড্যাম কেয়ার চেহারায় চুইংগাম চিবুচ্ছে স্ক্যালেস। তার টি-শার্টে লেখা: মর, শালা!

গতরাতের মিশন ব্যর্থ হলেও নিজে থেকে কিছু বলল না বার্ব। তাদের দু’জনকে হাতের ইশারা করে হ্যাঙারে ঢুকল অ্যারন। সিঁড়ি বেয়ে গালফস্ট্রিম বিমানে গিয়ে উঠল তারা। মুখোমুখি চেয়ারে বসে বার্ব ও স্ক্যালেসকে দেখল মেয়র। ঝড়ের বেগে প্রশ্ন করল, ‘কটেজে কী হয়েছে? কেন রানাকে খুন করা যায়নি? মেয়েলোকটা কোথায়? আর কোথায় গেছে সেসব ডায়েরি?’

বলার মত কিছু নেই বার্বের।

অ্যারনের মনে কাজ করছে চরম আতঙ্ক। সিট ছেড়ে সরু আইলে পায়চারি করতে লাগল সে। রাগ ও দুশ্চিন্তায় অস্থির বোধ করছে। জানে না এলোমেলো হয়ে গেছে মাথার চুল।

‘ব্যাটা খুব সতর্ক,’ নিজে থেকে বলল স্ক্যালেস। ‘এত ভয় পেয়েছে যে আর মুখোমুখি হওয়ার সাহস পায়নি। শালা আসলে মুরগির ছানা। পরে আমরা যখন সবাই একসঙ্গে থাকব না, তখন বোধহয় আড়াল থেকে হামলা করবে।’ নাক দিয়ে বিরক্তি প্রকাশের আওয়াজ ছাড়ল সে। ‘কালাহার আস্ত গাধা। সুযোগ পেয়েও রানাকে খতম করে দিতে পারেনি। চাইলে আমার দাদীও জবাই করতে পারত বাঙালি ছাগলটাকে।’

ফালতু কথা বাদ দাও, টনি, শান্ত স্বরে বলল বার্ব। ‘মাসুদ রানাকে খুন করা তো দূরের কথা, তাকে দেখতেও পায়নি কালাহার। উল্টে ওকে ধরে নিয়ে গেছে। এবার কালাহারের পেট থেকে আমাদের ব্যাপারে সবই জেনে নেবে। কাজটা শেষ হলে খতম করে দেবে কালাহারকে।’

‘কালাহার জানে যে মুখ খুললে সে বাঁচতে পারবে না।’

‘আমাদের মত রানাও জানে কীভাবে মুখ খোলাতে হয়, বলল বার্ব।

‘অত যদি জানে, তাতেই বা কী?’ মাথা নাড়ল স্ক্যালেস। ‘লাগতে এলে আমাদের দু’জনের যে-কোন একজনের হাতে খুন হবে।’

‘যিশুর কসম, তোমরা ফালতু কথা বন্ধ করো!’ ধমকে উঠল মেয়র কনার। ‘আমাকে একটু ভাবতে দাও!’ পায়চারি করতে করতে দরদর করে ঘামছে সে। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘মনে হচ্ছে ভুলই করে ফেলেছি। আমার উচিত ছিল মাসুদ রানাকে টাকাগুলো দিয়ে দেয়া।’

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল বার্ব। ‘টাকার জন্যে আসলে এসব করছে না সে। টাকার কথা বলেছে ফাঁদে ফেলার জন্যে। ভাল করেই জানত, আপনি কটেজে যাবেন না। বদলে আমরা গেলে তার ফাঁদে পা দেব। আমাদের একজনকে তুলে নিয়ে যাবে সে।’

‘সে কি এতই চালাক?’ দাঁতে দাঁত পিষল অ্যারন। ‘দুনিয়ায় টাকার চেয়ে বেশি কিছু নেই। টাকার অঙ্ক বাড়ালে হয়তো এখনও তাকে কিনে নিতে পারব আমরা।’

‘আপনার টাকার লোভ তার নেই, বস,’ বলল বার্ব। ‘আপনাকে হাতের মুঠোয় চায়। আয়ারল্যাণ্ডে যে মেয়েটাকে আমরা খুন করে এসেছি, তার হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায় সে

কথা শুনে পায়চারি থামাল কনার। তার পিঠ বেয়ে নামল শিরশিরে অনুভূতি। ‘সেক্ষেত্রে কুকুরটাকে পুঁতে দিতে হবে বালির নিচে! কী, তোমরা পারবে না? পরেরবার হয়তো কপাল খুলবে তোমাদের? অথবা আর কাউকে কাজটা দেব। ‘মেক্সিকান কুকুরগুলো হয়তো তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতা দেখাতে পারবে। দেরি করবে না রানাকে খুন করতে।’

‘আপনি না বুঝে কথা বলছেন, বস,’ বলল স্ক্যালেস।

কড়া চোখে তাকে দেখল মেয়র। ‘আমি কী ভুল বলেছি?’

সানগ্লাস, খুলে মেয়রের চোখে তাকাল বার্ব। অপমানে ফ্যাকাসে হয়ে গেলেও জ্বলছে তার দু’চোখ। আরেকটু হলে ভয় পেয়ে এক পা পিছিয়ে যেত অ্যারন।

পরেরবার কোন ভুল হবে না আমাদের,’ বলল বার্ব। ‘খুন হবে মাসুদ রানা। কথা দিলাম, আমি নিজে তার হৃৎপিণ্ড কেটে এনে থালায় করে উপহার দেব আপনাকে।’

‘কীভাবে খুন করবে সেটা তোমাদের ব্যাপার,’ বলল মেয়র কনার। ‘সেজন্যে কত টাকা খরচ হবে, সেটা নিয়েও ভাবছি না। কাজটা যেভাবে হোক শেষ করো। আর কখনও যেন আমার চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে লোকটা।

‘তবে একটা কথা,’ বলল স্ক্যালেস। ‘আমরা এখনও জানি না কোথায় লুকিয়ে আছে সে। যা করার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে করছে। এটা বড় ধরনের একটা সমস্যা।

‘সেই সমস্যা দূর হবে,’ বলল বার্ব, ‘কালাহারের পেট থেকে খবর বের করবে সে। হামলা করবে ব্ল্যাক বেয়ারে। আর তখন আমরা তৈরি থাকব তার জন্যে।’

‘এত সাহস পাবে না, আপত্তির সুরে বলল স্ক্যালেস

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল বার্ব। ‘আমার তা মনে হয় না, টনি। ধরে নাও, ব্ল্যাক বেয়ারে আসবে সে। আর আমাদের উচিত তাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া। তারপর মুঠোয় পেয়ে গেলে খতম করে দেব তাকে।

ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কী যেন ভাবছে মেয়র কনার। কয়েক সেকেণ্ড পর মাথা নাড়ল। ‘তুমি ভুল ভাবছ, বার্ব। জ্যাকি মেয়েলোকটা আমাদের জন্যে তালার চাবি। তাকে চেনে রানা। ডিভিডিটাও নিজের চোখে দেখেছে। সে জানে কীভাবে মারা গেছে হিউবার্ট হ্যারল্ড। মেয়েলোকটার সঙ্গে সম্পর্ক আছে রানার। হয়তো প্রথম থেকেই এসবে সে জড়িত। সেজন্যে মনে হচ্ছে, মেয়েটাকে হাতের মুঠোয় পেলে মাসুদ রানাকেও হাতে পাব আমরা।’

‘আমাদের লোক চোখ রাখবে জ্যাকুলিন সিলভেস্টারের বাড়ির ওপরে, প্রস্তাব দিল স্ক্যালেস। এখনও মনে আশা, খুন করার আগে খায়েস মিটিয়ে ভোগ করবে সুন্দরী মেয়েটাকে।

‘আগেও বাড়িটার ওপরে চোখ রেখে কোন লাভ হয়নি, সেটা ভুলে গেলে তুমি?’ বলল বার্ব।

‘তোমাদের ভুলে হাত ফস্কে বেরিয়ে গেছে মেয়েটা, ‘ অভিযোগ করল স্ক্যালেস। ‘গ্রুমম্যানের বদলে আমি গেলে হাসতে হাসতে ধরে আনতাম।’

‘আবারও নিজের বাড়িতে ফিরে যাবে,’ জোর দিয়ে বলল অ্যারন কনার। ‘ওখানে চোখ রাখো তোমরা। দিনের পর দিন তো আর লুকিয়ে থাকতে পারবে না। এদিকে বলে দেব, যাতে মেয়েটাকে ধরতে টুলসায় নানান জায়গায় ছান দেয় রিপার রিগবির লোক।’

প্ল্যানটা সুবিধার, বলে মনে হচ্ছে না বার্বের। কারও বাড়িতে চোখ রাখার কাজটা দক্ষ একজন প্রাক্তন মেজরের জন্যে খুব ছোট ও অপমানজনক। তা ছাড়া, পড়ে আছে এর চেয়ে ঢের বড় কাজ। সেটাই বলল সে, ‘নিজে থেকে তো আর অস্ত্রে ভরে যাবে না ট্রাক। কাজ শেষ করার জন্যে আমাকে থাকতে হবে ব্ল্যাক বেয়ারে।’

স্ক্যালেসের কথা মনে ধরেছে কনারের। দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল সে। ‘মর্গ্যান আর তার দলের লোকেরা তোমাকে ছাড়াও মাল তুলতে পারবে ট্রাকে। ফোনে তাকে বলে দাও, যাতে আজ সকাল থেকেই কাজে নামে। আমাদের ট্রাক রওনা হবে আগামীকাল সকালে। এদিকে তোমরা যাও ক্রসবি হাইটসে। হাতের মুঠোয় পেলেই ধরে আনবে মেয়েটাকে। আমরা তাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করলে নিজেই মরার জন্যে হাজির হবে মাসুদ রানা।’

ছেচল্লিশ
গাড়িতে বসে নয় মিনিট পার করেছে জ্যাকি। এক এক করে গেল আরও পাঁচ মিনিট। কোলে দু’হাত রেখে আঙুলের দিকে চেয়ে রইল জ্যাকি। মনেপ্রাণে চাইছে, যেন মগজে না আসে ভয়ঙ্কর কোন চিন্তা। অবশ্য অন্তর বড় অদ্ভুত এক অচিন পাখি। একটু পর জ্যাকি ভাবতে লাগল, না জানি কত ভয়ঙ্করভাবে লোকটাকে আহত করছে রানা। সেই আর্তনাদের পর থেকে আর কোন আওয়াজ নেই। ইস্পাতের শাটারের ওদিকের নীরবতা বহু কিছুই বলে দিচ্ছে।

আচ্ছা, লোকটাকে কি মেরেই ফেলল রানা?

আসলে কে এই মাসুদ রানা?

প্রায় অচেনা এক মেয়ে খুন হয়ে গেছে বলে কেন অ্যারন কনারের ওপরে প্রতিশোধ নিতে চাইছে সে?

কেন নিচ্ছে এত বড় ঝুঁকি?

আগে ছিল মিলিটারিতে। চেনে নানান আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু জ্যাকির কি উচিত হচ্ছে মাসুদ রানাকে বিশ্বাস করা?

ওর কি উচিত নয় এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া?

ইগনিশনে চাবি আছে। গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে যাবে?

চাবি স্পর্শ করল না জ্যাকি। মনের চোখে ভাসল জনির মায়াভরা চোখ। ঠিক তার চোখের মতই মাসুদ রানার চোখ। অতল গভীর। কখনও কঠোর। কখনও হাসিভরা। মোটেলে সুযোগ পেয়েও ওর দিকে হাত বাড়ায়নি মানুষটা।

না, মাসুদ রানা নিশ্চয়ই ভাল মনের একজন পুরুষ!

আধঘণ্টা পেরোবার পর আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না জ্যাকি। এবার কিছু করতে হবে ওকে। গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়বে, এমন সময় ঘড়ঘড় শব্দে উঠল গ্যারাজের শাটার। রোদে বেরিয়ে এসে সরাসরি গাড়ির দিকে এল রানা। হাতে কালাহারের ৪০ ক্যালিবারের অটো। জিন্সের ভেতরে গুঁজে রাখল অস্ত্রটা।

রানার দিকে চেয়ে ওর মাথা থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত চোখ বোলাল জ্যাকি। কই, তার গায়ে একফোঁটা রক্ত নেই। হাতে নেই কোন রক্তাক্ত যন্ত্রপাতি। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে না কাউকে নির্যাতন বা খুন করেছে। অবশ্য এ-ও ঠিক, মানুষ হত্যা করার কী-ই-বা জানে জ্যাকি?

‘কী হলো গ্যারাজের ভেতরে?’ জানতে চাইল ও।

‘কী আর হবে,’ কাঁধ ঝাঁকাল রানা।

ভুরু কুঁচকে ফেলল জ্যাকি। ‘কিছু তো বলবে, নাকি?’

‘আমরা আলাপ করেছি,’ বলল রানা।

‘আমি যে ভয়ঙ্কর এক আর্তনাদ শুনতে পেলাম?’

‘তখন কী ভাবলে?’ মৃদু হাসল রানা।

হঠাৎ লজ্জা পেল জ্যাকি। নিচু করে নিল চোখ। রক্তিম হয়ে গেল দু’গাল। মনের ভেতরে বুঝে গেল, ঠাণ্ডা মাথায় কাউকে খুন করার মানুষ হতেই পারে না রানা।

চেয়েছি তুমি যেন আতঙ্কিত হও,’ বলল রানা। ‘তোমার ভয় স্পর্শ করুক ওকে। আর তখনই তোমাকে বললাম বাইরে যেতে। ভয়ানক কিছু করব বলেই কোন সাক্ষী রাখিনি আমি। এরপর আমরা একা হতেই বললাম, এক এক করে কেটে নামিয়ে দেব ওর আঙুল। তারপর বেশিক্ষণ লাগেনি ওর মুখ থেকে সব জেনে নিতে।’

‘তু… তুমি কিছুই কাটোনি?

ওর কড়ে আঙুলে বসিয়ে দিয়েছি বোল্ট-ক্রপার। তবে ত্বকে আঁচড়ও কাটতে হয়নি। ভয়ে আর্তনাদ করার পর থেকে গড়গড় করে সব বলে গেছে।’

গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ল জ্যাকি। দৌড়ে গিয়ে ঢুকল গ্যারাজের ভেতরে। আগের মতই চেয়ারে বসে আছে ম্যাট কালাহার। চার হাত-পায়ের আঙুল আর নাক-কান সব আগের মতই আস্ত আছে। অবশ্য কীভাবে যেন হারিয়ে গেছে লোকটার জ্ঞান।

‘সিরিঞ্জে যে ড্রাগ ছিল, তা দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া যেত মর্দা গণ্ডারকে,’ জ্যাকির পাশে থামল রানা। ‘তিনভাগের একভাগ পুশ করেছি ওর শরীরে। মনে হয় না একঘণ্টার ভেতরে আর ঘুম থেকে উঠতে পারবে।’

‘তারপর কী করবে লোকটার?’ জানতে চাইল জ্যাকি

‘কোথাও ফেলে রাখব। আর কোন কাজে আসবে না। যা জানার সব জেনে গেছি।’

চুপ হয়ে গেছে রানা।

জ্যাকি দেখতে পেল ওঅর্কবেঞ্চে পড়ে আছে একটা কাগজ। ওটাতে কী যেন লেখা। প্রথম দুটো শব্দ: ব্ল্যাক বেয়ার। জ্যাকির চোখ অনুসরণ করে কাগজটার দিকে তাকাল রানা। চট্ করে গিয়ে ওটা তুলে নিয়ে পকেটে রেখে দিল।

‘ব্ল্যাক বেয়ার আসলে কী?’ জানতে চাইল জ্যাকি।

‘জরুরি কিছু নয়, বলল রানা। গ্যারাজ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ড্রাইভিং সিটে উঠে চালু করল ব্যারাকুডার ইঞ্জিন। দরজা বন্ধ করে ব্যাক গিয়ার দিয়ে গাড়িটা নিয়ে এল গ্যারাজের মাঝামাঝি জায়গায়। অর্ধেক গাড়ি বাইরে, ভেতরে অর্ধেক।

‘কাগজে নিশ্চয়ই আছে নতুন কোন তথ্য?’ রানা গাড়ি থেকে নেমে পড়তেই বলল জ্যাকি।

লোকটাকে ট্রাঙ্কে তুলতে সাহায্য করো,’ জবাব না দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাল রানা।

জ্যাকি বুঝে গেল, ওর প্রেমিক জনি স্মিথের মতই একই ধরনের মানুষ মাসুদ রানা। যতই চাপ দেয়া হোক, ইচ্ছের বিরুদ্ধে একটা কথাও বলবে না এই লোক।

দু’জন মিলে চেয়ারসহ কালাহারকে ওপরে তুলল ওরা। ভরে দিল গাড়ির মস্ত ট্রাঙ্কে। ধুপ্ করে ঢাকনি বন্ধ করল রানা। আবার উঠল ড্রাইভিং সিটে। সামনের গিয়ার ফেলে এগিয়ে গেল কয়েক ফুট। গ্যারাজ থেকে বেরিয়ে এসেছে জ্যাকি। ইঞ্জিন চালু রেখে গাড়ি থেকে নামল রানা। শাটার নামিয়ে তালা মারল। গাড়িতে উঠে পরে নিল জ্যাকেট। ওটা দিয়ে আড়াল করে দিয়েছে বেল্টে গোঁজা পিস্তল।

তুমি কিছুই বলবে না, তা-ই না?’ বলল জ্যাকি।

‘আপাতত নয়। এবার বিদায় নেব এই এলাকা থেকে।’ জ্যাকি গাড়িতে উঠতেই রওনা হয়ে গেল রানা। গ্যারাজ এরিয়া পেছনে ফেলে উঠে এল রাস্তায়। গত দু’দিনে শহরটা সম্পর্কে বেশ ধারণা তৈরি হয়েছে ওর মনে।

‘তুমি গ্যারাজ থেকে আমাকে বের করে দিয়েছিলে, যাতে লোকটার কথা শুনতে না পাই,’ বলল জ্যাকি। ‘এখন মনে হচ্ছে, তুমি জেনে গেছ কোথায় নিজের অস্ত্রের গুদাম করেছে অ্যারন কনার।’ পাশ থেকে রানাকে দেখল জ্যাকি। ‘কাগজে লিখে নিয়েছ, কীভাবে ওখানে যাওয়া যায়।

‘এসব ভুলে যাও,’ নরম সুরে বলল রানা।

‘ব্ল্যাক বেয়ার,’ বলল জ্যাকি। ‘ওটা কি কোন ছোট শহর? আগে কখনও ওটার নাম শুনিনি।’

‘আমি এ-প্রসঙ্গে কিছু বলতে চাই না,’ বলল রানা। ‘কিন্তু বলবে না কেন? আমিও তো এসবে জড়িয়ে গেছি।’

‘কারণ, যেটা তুমি জানো না, সেটা তোমার কোন ক্ষতি করবে না,’ বলল গম্ভীর রানা।

‘কিন্তু তুমি ওখানে গেলে আমিও যাব।

মাথা নাড়ল রানা। ‘সে-উপায় নেই। আমাকে যেতে হবে একা।’

‘এমন কোরো না, রানা। প্লিয, আমাকে একা ফেলে কোথাও চলে যেয়ো না!’

‘এখন পর্যন্ত তোমার কপাল ছিল ভাল। কিন্তু ভবিষ্যতে সেটা মন্দ হয়ে যেতে পারে। ভেবে দেখো, এরই ভেতরে খুন হয়ে গেছে কয়েকজন মানুষ। আর আমি এরপর যেখানে যাব, সেখানে চাইলেও তোমাকে সঙ্গে নিতে পারব না। যেতে হবে আমাকে একা। তোমার দায়িত্ব তখন আমি নিতে পারব না।’

‘তা হলে আবারও ফিরে যাব ওল্ড ইয়েলার ইনে?’

‘ওখানে নয়। তোমাকে ডাউনটাউনে আরও ভাল কোথাও রাখব। সেখানে নিরাপদে থাকবে। তবে ওখান থেকে বেরিয়ে ঘোরাঘুরি করতে যেয়ো না।’

জবাব না দিয়ে রানার দিকে চেয়ে রইল জ্যাকি। রানা বুঝে গেল, রেগে গেছে মেয়েটা। ডানহাতের বুড়ো আঙুল পেছনে তাক করল রানা। ‘তোমাকে পৌঁছে দিয়ে গাড়ি থেকে বিদায় করে দেব ঘুমন্ত সুন্দরকে। এক বা দু’ঘণ্টা পর জেগে উঠে গুনতে শুরু করবে হাত-পায়ের আঙুল। খুশি মনে ভাববে দুনিয়া আসলে দারুণ জায়গা। বুদ্ধিমান হলে একবার বাঁধন খুলে দিলে পালিয়ে যাবে হাজারো মাইল দূরে

‘ভাল লাগছে, তাকে তুমি খুন করোনি,’ বলল জ্যাকি। ‘তুমি আসলেই ভাল একজন মানুষ।’

‘তুমি তো আমাকে চেনোই না। আমি কিন্তু খুব খারাপ। ঘন ঘন মাথা নাড়ল জ্যাকি। ‘আমি একজন মেয়ে, পুরুষের চোখে চোখ রাখলে আমরা অনেক কিছুই বুঝে যাই। তুমি তো যাবে অ্যারন কনারের বিরুদ্ধে লড়তে। আর সর্বক্ষণ আমি তোমার জন্যে দুশ্চিন্তা করব। নাও না আমাকে তোমার সঙ্গে? আমি হয়তো কোন সাহায্যে এলাম? তুমি জানো, গুলি চালাতে পারি। চোখ রাখতে পারব আড়াল থেকে। রানা…’

‘এবারের কাজ একা আমাকে করতে হবে, জ্যাকি, বল্ল রানা। ‘এ-ছাড়া কোন উপায় নেই।’

‘তোমার যদি কোন ক্ষতি হয়, নিজেকে আমার অপরাধী বলে মনে হবে। ভুলে যাইনি, তুমি না থাকলে শপিং মলের নিচের গ্যারাজে কিডন্যাপ কর হতো আমাকে। তারপর খুন হতাম জানোয়ারগুলোর হাতে। রানা, আমি কি তোমার জন্যে কিছুই করতে পারব না?’

‘তুমি নিরাপদে থাকলে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারব, বলল রানা। এটা তুমি করতে পারো আমার জন্যে।’ চট্‌ করে জ্যাকির দিকে তাকাল ও।

দু’ফোঁটা জল জমেছে মেয়েটার চোখে। নিচু গলায় বলল জ্যাকি, ‘হয়তো আর কখনও তোমাকে দেখতে পাব না।’

‘আমি ঠিকই ফিরব, কথা দিলাম, দৃঢ়কণ্ঠে বলল রানা। ‘আর তারপর নিজের বাড়িতে নিরাপদে ফিরতে পারবে তুমি।’

.

টুলসার ডাউনটাউনে হায়াট রিজেন্সি হোটেলের দু’শ’ পাঁচ নম্বর রুম ভাড়া নিয়েছে রানা। কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছে, স্ত্রী নিনা হ্যাম্পটনকে নিয়ে তেল ব্যবসার কাজে নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছে। এন্ড ইয়েলার মোটেলের তুলনায় হায়াট রিজেন্সি হোটেল যেন একেবারেই স্বর্গ। বিলাসবহুল বিশাল রুমে পা রেখে খুশি হয়ে গেল জ্যাকি। চওড়া জানালা দিয়ে দেখতে পেল প্রতিবেশীদের সাজানো সব সুন্দর বাগান। রানা বলল, পারতপক্ষে ঘর ছেড়ে যেন বের না হয় জ্যাকি। কাজ শেষ হলে নিজেই যোগাযোগ করবে ও।

জ্যাকির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে এল রানা। শহরের মাঝ দিয়ে ওর প্লিমাউথ চলল দক্ষিণ- পুবে। মাঝ-সকালে আকাশ থেকে আগুন ঢালছে সোনালি সূর্য। গরমের ভেতরে যাতে দমকা বাতাস ভেতরে ঢোকে, তাই গাড়ির জানালা খুলে দিল রানা। মাস্কোগি টার্নপাইক ধরে চলে গেল ব্রোকেন অ্যারো এলাকায়। কয়েক মাইল যাওয়ার পর সরু হয়ে গেল শাখা রাস্তা। এঁকেবেঁকে গেছে বহু দূরে। কখনও পথের ধারে পড়ল ছোট কিছু খামার। আরও অনেকক্ষণ পর নির্জন রাস্তায় একরাশ ধুলোর মেঘ তৈরি করে গাড়ি থামাল রানা। দরজা খুলে নেমে পড়ল। আশপাশে শুকনো ঝোপঝাড় ছাড়া আর কিছুই নেই। বাদামি ঘাসের প্রান্তরে, পুড়ছে নানারঙের পাথরখণ্ড। বন-বন আওয়াজে উড়ছে হাজার হাজার পতঙ্গ।

গাড়ির ট্রাঙ্ক খুলে টেনেহিচড়ে চেয়ারসহ কালাহারকে বের করল রানা। বড় এক ঝোপের পাশে খিল চেয়ার। এখনও জ্ঞান ফেরেনি লোকটার। কাঁধের ওপরে কাত হয়ে পড়ে আছে মাথা। ঠোঁটের কোণ বেয়ে নামছে লালা। তাকে চেয়ারে এলিয়ে থাকতে দিয়ে গাড়ির কাছে ফিরল রানা। ভেতর থেকে নিল ব্যাগ ও শটগান। আবার ফিরে এল কালাহারের সামনে। ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠছে লোকটা।

কয়েক গজ দূরে বড় এক পাথরের ওপরে বসল রানা। পায়ের কাছে রেখেছে ব্যাগ। বোল্ডারের ওপরে নামিয়ে রাখল বন্দুক। জ্যাকেট খুলে গুটিয়ে নিল শার্টের হাতা। জোর আওয়াজে ডেকে চলেছে একদল ঝিঁঝি পোকা। কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকল রানা। ভেবে নিচ্ছে এরপর কী করবে। ওর মনে পড়ল বার্ব ও স্ক্যালেসের কথা। লোকদুটো দুনিয়ার সেরা সেনাবাহিনী থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। অথচ নষ্ট হয়ে গেছে পচা আমের মত। বয়সে রানার সমানই হবে। অবশ্য ওর মত অনিয়ম করেনি তারা। নিয়মিত ব্যায়াম করা শরীর। এরই ভেতরে কয়েকবার মোকাবিলা হলেও লড়াই করতে গিয়ে পিছিয়ে যেতে হয়েছে রানাকে। হয়তো পরেরবার খুনই হবে তাদের হাতে।

চোখ খুলে রানা দেখল, এখনও পূর্ণ সচেতন হয়ে ওঠেনি কালাহার। ব্যাগ থেকে ডায়েরি নিল ও। পাতাল পার্কিং লটে মেশিন পিস্তল সংগ্রহ করার সময়ে একটা গুলি ছিঁড়ে দিয়েছে তৃতীয় ডায়েরিটার মলাট।

এরপর এসব ডায়েরি নিয়ে কী করবে, সেটা নিয়ে ভাবছে রানা। ওর কোন কাজে আসবে না ওগুলো। যা জানতে চেয়েছে, সেটা জেনে গেছে। পুরনো স্মৃতিময় ডায়েরিগুলোর আছে লাখ পাউণ্ডের ঐতিহাসিক মূল্য। গ্রেনফেলের জাদুঘরের কথা মনে পড়তেই রানা বুঝে গেল, সামনের লড়াইয়ে প্রাণে বাঁচলে ওর উচিত হবে ডায়েরিগুলো ওখানে দান করে দেয়া।

আর যদি মরেই যায়, তবে তো আর কিছুই করার নেই। বহু দিন পর কেউ না কেউ হয়তো পাবে ডায়েরিগুলো। তার হয়তো মনে হবে চামড়া দিয়ে মোড়া খাতা কোন কাজে লাগবে না। অথবা, দাম বুঝে কেউ না কেউ কিনে নেবে।

তপ্ত রোদে বসে কালাহারের দিকে চেয়ে রইল রানা। আরও কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে খুলে গেল লোকটার দু’চোখ। চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে বুঝল, এখনও বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। তিক্ত চোখে দেখল রানাকে। কিন্তু রানা ব্যাগ থেকে ইউএস আর্মি ট্রেঞ্চ নাইফ বের করতেই নগ্ন ভীতি ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে।

নাকলডাস্টার হ্যাণ্ডেলে চেপে বসল রানার ডান মুঠো। তাকে মেরে ফেলা হবে ধরে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে ব্যর্থ হলো কালাহার। কয়েক সেকেণ্ড পর অবাক হয়ে দেখতে পেল, এগিয়ে এসেছে রানা। একে একে কেটে দিচ্ছে তার হাত-পায়ের বাঁধন। কাজ শেষ করে কয়েক ফুট পিছিয়ে এসে বোল্ডারের সামনে থামল রানা। ব্যথা-ভরা চেহারায় চেয়ারে বসে আছে কালাহার। একহাতে টিপছে অন্যহাতের আড়ষ্ট কবজি।

‘জ্যাকিকে কথা দিয়েছি, তোমাকে ছেড়ে দেব,’ বলল রানা। ‘ভাল কেউ তা-ই করবে। যদি তার উল্টো করতাম, মেয়েটা মনে কষ্ট পেত। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পেরেছ, কালাহার?’

ধীরে ধীরে সম্মতিসূচক মাথা দোলাল লোকটা।

বেল্টে গুঁজে রাখা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিল রানা। কক ও লক করা ওটা। চেম্বারে আছে একটা বুলেট। সেফটি অন করা। আলতো হাতে কালাহারের দিকে অস্ত্রটা ছুঁড়ে দিল রানা। খপ করে ওটা ধরল লোকটা।

‘গুলি করার প্রথম সুযোগ তুমিই পেলে,’ বলল রানা।

ম্যাট কালাহারের মুখে ফুটে উঠল হাঙুরে হাসি। অস্ত্রের নল ওপরে তুলতে শুরু করে বলল, ‘তুমি শালা আসলেই পাগল! দু’সেকেণ্ডে খুন হবে আমার হাতে!’

‘আমি ঠাণ্ডা মাথার খুনি নই,’ বলল রানা, ‘ছিলাম না।’

চোখে চোখ রেখে চেয়ে আছে রানা ও কালাহার। থমথম করছে চারপাশ। বন্ধ হয়ে গেছে ঝিঁঝির কর্কশ ডাক। হঠাৎ করেই নড়ে উঠল কালাহার। পিস্তল তুলেই অফ করল সেফটি ক্যাচ। সরাসরি রানার মুখ লক্ষ্য করে তাক করছে পিস্তলের নল। একই সময়ে পাথরের ওপর থেকে ইথাকা শটগান নিয়েছে রানা। বন্দুকের মাযল থেকে ছিটকে বেরোল একরাশ লাল ফুলকি।

প্রচণ্ড ‘বুম!’ শব্দটা হওয়ার আগেই কালাহারের কোমর দু’টুকরো করে দিল ব্রেনেক বুলেট।

মাটি থেকে পিস্তল তুলে ওটার গায়ে লাগা রক্ত ঘাসে মুছে নিল রানা। ব্যাগ, ডায়েরি ও বন্দুক নিয়ে রাখল গাড়ির ভেতরে। পেছনে রোদে পোড়া ঘাসে চিত হয়ে পড়ে আছে দুই ভাগ হওয়া কালাহার। আকাশে উড়ছে বেশ কয়েকটা বায়ার্ড। কিছুক্ষণের মধ্যে লাশ ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে নেয়ার জন্যে নেমে আসবে ওরা।

একমিনিট পেরোবার আগেই গর্জে উঠল প্রিমাউথের ভি- এইট ইঞ্জিন। পেছনে ধুলো উড়িয়ে রওনা হয়ে গেল গাড়িটা।

রানা এবার চলেছে একপাল হিংস্র নরপশু শিকারে।

সাতচল্লিশ
নব্বুই মাইল বেগে কয়েক মিনিটে বারো মাইল দক্ষিণ-পুবে মাস্কোগি কাউন্টির অ্যাডোনিস শহরে পৌঁছে গেল প্লিমাউথ। ওখানে মানুষের দেখা পেল না রানা। প্রধান সড়কের দু’পাশে প্রায় ধসে পড়া কাঠের বাড়ি। জানালাগুলো ভাঙা। উঠনে ঘন ঝোপ। আশি বছর আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে শহরটা। দামি কিছু নেই বলে স্থানীয় চোরের দল আর এদিকে আসে না।

সামনে বামে বাঁক নিয়ে ভুতুড়ে শহর পেছনে ফেলে আবারও সমতল প্রেয়ারির বুক চিরে এগিয়ে চলল রানা। নির্জন পথের ধারে তারকাঁটার ওজন বুকে নিয়ে এদিকে- ওদিকে ঝুঁকে আছে একের পর এক শুকনো মোটা খুঁটি। এখানে-ওখানে শুকিয়ে যাওয়া মরা গাছ। দিগন্ত জুড়ে ঘাসের জমিতে নানানদিকে ঝোপঝাড়। কোথাও ধুলো মেখে বড় সব পাথরখণ্ড। এখন আর নিচে পিচঢালা পথ নেই, বদলে রুক্ষ পাথুরে মাটি। তার বুকে এঁকেবেঁকে গেছে ভারী ট্রাকের চাকার গভীর চিহ্ন।

মিথ্যা কথা বলেনি ম্যাট কালাহার। এদিকটা পরিত্যক্ত হলেও ব্যবহার করা হয় কাঁচা এই পথ। একবার গাড়ি থামিয়ে চাকার দাগ দেখে নিল রানা। নতুন চিহ্নগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগের। চাপ খাওয়া মাটি থেকে উবে যায়নি শিশির।

সামনেই তাদেরকে দেখতে পাব, ভাবল রানা। আরও কিছুক্ষণ যাওয়ার পর এক জায়গায় দেখতে পেল পথের পাশে ঘন ঝোপঝাড়। এরপর কাঁচা পথ থেকে বামে গেছে সরু এক ট্র্যাক। দু’চার ঘণ্টা আগেও ওটা ধরে গেছে একাধিক ভারী ট্রাক। চাকার চিহ্ন অনুসরণ করে এগোল রানা। তিন শ’ গজ যেতেই সামনে দেখতে পেল উঁচু তারের বেড়া। ওটার মাঝে তালা দেয়া চওড়া এক ধাতব গেট। দু’পাশে বহু দূরে গেছে তারের বেড়া। গেটের সামনে থেমে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল রানা। বেড়ার ওদিকে উঁচু ঢালু জমির বুক চিরে গেছে ট্রাকের চাকার দাগ। ঢালের ওদিকে চার শ’ গজ দূরে টিলার কোলে পুরনো এক খামার বাড়ি ও কিছু দালান। রানা খেয়াল করল, তারের আট ফুট উঁচু বেড়া একদম নতুন। ওটা দিয়ে বোধহয় ঘিরে নেয়া হয়েছে মাইলের পর মাইল জমি। এবং জরুরি কোন কারণ ছাড়া যে এখানে সিকিউরিটি ফেন্স তৈরি করা হয়নি, সেটা যে-কেউ বুঝবে। বড় এক প্যাডলক দিয়ে ভেতর থেকে আটকে দেয়া হয়েছে গেট। কার নির্দেশে সেটা করা হয়েছে, তা বুঝতে সময় লাগল না রানার। এখানেই যে অ্যারন কনারের সেই গোপন অস্ত্রের গুদাম আছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই!

বেড়ার ওদিকে পুরনো একটা গেট দেখতে পেল রানা। ওটার পাশে কাঠের সাইনবোর্ডে কালো কালিতে আঁকা দাঁত খিঁচানো এক ভালুকের বিশাল মুখ। নিচে বড় করে লেখা: ব্ল্যাক বেয়ার ফার্ম।

অবশ্য বহুকাল আগেই বন্ধ হয়ে গেছে খামার।

আবারও প্লিমাউথে এসে উঠল রানা। ব্যাক গিয়ার দিয়ে চলে গেল পেছনের বাঁকে। জলশূন্য শুকনো এক বড় ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে রাখল গাড়ি। গরমের ভেতরেও জ্যাকেট পরে বেল্টে গুঁজে নিল ম্যাট কানাহারের পিস্তল আর ওর ট্রেঞ্চ নাইফ! বিনকিউলার হাতে নেমে পড়ল প্লিমাউথ থেকে। হাত বাড়িয়ে গাড়ি থেকে নিল ইথাকা বন্দুক। ওটার ম্যাগাযিন থেকে সলিড বুলেট সরিয়ে সেখানে ভরল বাকশট ছররা। মুখোমুখি যুদ্ধে একাধিক শত্রুর বিরুদ্ধে রাইফেলের চেয়ে ঢের বেশি কাজে দেবে বাকশট। চেম্বারে একটা গুলি ভরল রানা। এখন ইথাকার পেটে আছে সবমিলিয়ে পাঁচটা গুলি। জ্যাকেটের পকেটে ভরল আরও কিছু বুলেট, তারপর বন্দুকের স্লিং কাঁধে ঝুলিয়ে হাতঘড়ি দেখে নিল।

বাজে এখন ঠিক দুপুর বারোটা।

সামনে কী ধরনের বাধার মুখে পড়তে হবে, সেটা নিয়ে খুব একটা ভাবছে না রানা। মনে মনে বলল, কাজ তো কাজই। সুতরাং সেটা শেষ করতে হবে।

কাঁচ তুলে গাড়ির দরজা লক করে দিল রানা। আবার ফিরে এল তারের বেড়ার সামনে। তারের বাধা টপকে নেমে পড়ল ওদিকে। একবার হাত থেকে ধুলো ঝেড়ে নিয়ে মন দিয়ে দেখতে লাগল চারপাশ। চাকার চিহ্ন অনুসরণ করলে নির্ঘাৎ গিয়ে পড়বে বিপদে। নিশ্চয়ই এদিকে থাকবে এক বা একাধিক ‘গার্ড। দীর্ঘ ঘাস ও ঘন ঝোপের ভেতর দিয়ে সতর্ক পায়ে ফার্ম হাউসের দিকে চলল রানা। কিছুক্ষণ পর পৌঁছে গেল বাড়িটার এক শ’ গজের ভেতরে। ভাল করেই জানে, যা করার করতে হবে ওকে একা। বিরুদ্ধে হয়তো থাকবে দশ বা বিশজন সশস্ত্র লোক। সুতরাং বেঁচে ফিরতে হলে ট্যাকটিকাল কোন ভুল করার সুযোগ আসলে ওর নেই।

সশস্ত্র গার্ড আছে, আগেই ধারণা করেছে রানা। লোকটা দাঁড়িয়ে আছে হাঁটু সমান ঘাসের ভেতরে। হাতে স্কোপওয়ালা স্কাউট রুগার রাইফেল। সরাসরি চেয়ে আছে নিচের ঢালের ঝোপগুলোর দিকে। চেহারায় চরম বিরক্তি। কী ভাবছে, সেটা সে-ই বলতে পারবে।

ঝোপঝাড় ও গাছের আড়াল নিয়ে এগোতে লাগল রানা। কোমর সমান ঝোপের ভেতর দিয়ে হেঁটে পৌঁছে গেল গার্ডের দশফুট পেছনে। থেমে বুঝে নিল লোকটা ওকে দেখে ফেলেছে কি না। ঝোপের দিকেই চেয়ে আছে সে। এখনও ওর দিকে ঘুরতে শুরু করেনি রাইফেলের স্কোপ।

সাবধানে আবারও সামনে বাড়ল রানা। পরের আধ মিনিটে পৌঁছে গেল গার্ডের দু’ফুট পেছনে। কোমরের বেল্টের খাপ থেকে নিল ট্রেঞ্চ নাইফ। মনে মনে গুনল: এক… দুই… তিন! পরক্ষণে ঝড়ের বেগে ক্ষিপ্র চিতার মত ঝাঁপিয়ে পড়ল অপ্রস্তুত গার্ডের ওপরে। লোকটাকে মাটিতে পেড়ে ফেলে একটানে ফাঁক করে দিল তার গলা। কমাণ্ডো ট্রেনিঙে রানাকে শেখানো হয়েছে, আক্রমণের সময় দ্বিতীয় কোন চিন্তা মনে আসতে দেবে না। ভারতে শুরু করা মানেই মনে দ্বিধা আসতে দেয়া। আর সেটা তোমাকে খুন করবে।

একমিনিট পর রক্তাক্ত লাশটা দুই হাতে ধরে চিত করল রানা। লোকটার পকেটে আইডি না থাকলেও ফোন ‘ও ওয়ালেট আছে। দুটোই নিজের পকেটে রাখল রানা। গার্ডের রাইফেল ও কোমরের পিস্তল নিয়ে আবারও এগোল খামার- বাড়ির দিকে।

দুটো ভারী অস্ত্র নিয়ে চলা কঠিন। পুরনো খামার বাড়ির বেশ কাছে পৌছে গেছে রানা। মরা দুটো গাছের পেছনে থেমে দাঁড়ান। গাছদুটো দাঁড়িয়ে আছে ইংরেজি ভি আকৃতি নিয়ে। জায়গাটা আশপাশের জমির চেয়ে উঁচু। কারও চোখে না পড়েই দেখা যাচ্ছে নিচের দৃশ্য। মরা একটা গাছের গায়ে রাইফেল ঠেক দিয়ে রেখে রানা ভাবল, দরকার হলে পরে ফিরে এসে অস্ত্রটা সংগ্রহ করবে। পেটে ভর করে শুয়ে পড়ল মাটিতে। বিনকিউলার দিয়ে দেখতে লাগল খামার বাড়ি ও

অন্যান্য দালান। ওর ধারণা সত্যিই সঠিক, পুরনো খামার বহু বছর আগেই পরিত্যক্ত। খসে গেছে দেয়ালের তক্তা। এখানে-ওখানে ঝোপঝাড়। উঠনে জংধরা তেলের ড্রাম, গাড়ির পুরনো চাকা ও চাষের ভাঙা নানান যন্ত্রপাতি।

আগেও কয়েকবার এমন ধরনের পুরনো খামার দেখেছে রানা। ওগুলো বেআইনি কাজে ব্যবহার করে দুর্নীতিপরায়ণ স্থানীয় লোকেরা। কখনও জায়গাটা হয় ড্রাগসের আখড়া, কখনও পতিতালয় বা চোরাই মালপত্র রাখার গুদাম।

অবশ্য ব্ল্যাক বেয়ার ফার্মে চলছে একেবারেই অন্যকিছু। খামার বাড়ির ধুলোভরা উঠনে তিনটে বড় ট্রাক ও কয়েকটা ফোর-হুইল জিগ। একটু দূরেই অলিম্পিক সাইযের এক সুইমিংপুল। যদিও ওটা আরও গভীর। সেখানে ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে একদল লোক। ভোরেও বোধহয় সুইমিংপুল ঢেকে রাখা হয়েছিল লোহার শিট দিয়ে। পরে সরিয়ে নেয়া হয়েছে সেসব। একটা ট্রাক্টরের সঙ্গে আটকে নেয়া হয়েছে লোহার দীর্ঘ শেকল। সেটা দিয়ে বেঁধে গর্ত থেকে তুলে পাশের জমিতে রাখা হচ্ছে স্টিলের তৈরি সব ক্রেট। একেকটা ক্রেটের ওজন হবে বোধহয় কয়েক টন।

সুইমিংপুলের ভেতরে আছে অসংখ্য ক্রেট। কোনটা চারকোনা, কোনটা লম্বাটে। কিছু সাদা কাঠের। অন্যগুলো মিলিটারির ব্যবহৃত ম্যাটমেটে সবুজ রঙের। ওপরে ও পাশে স্টেনসিল করে কী যেন লেখা। সুইমিংপুলের ধারে বড় এক ক্রেন লরি। এ-ধরনের যন্ত্রদানব ব্যবহার করা হয় বাড়ি তৈরি করার সময় বালি তুলতে। পাশে দাঁড়িয়ে রিমোট কন্ট্রোল্ড প্যানেলে কাজ করে চলেছে একলোক। ক্রেন লরির হলদে বাহু গর্ত থেকে তুলে আনছে ভারী ক্রেট। ঘুরে যাচ্ছে লরির বাহু, ওটার হাইড্রলিক লিফট ক্রেটগুলো নামিয়ে দিচ্ছে ট্রাকে কার্টের ওপরে। কার্ট থেকে ক্রেট নিয়ে ট্রাকে গুছিয়ে রাখছে দু’জন।

মই বেয়ে সুইমিংপুলে নেমে অপেক্ষাকৃত হালকা ক্রেট তুলে আনছে কয়েকজন। হাত বদল হয়ে সব চলে যাচ্ছে, ট্রাকের পেছনের বেডে। এরা পরিশ্রম করছে ঘন্টার পর ঘণ্টা। ঘর্মাক্ত মুখে মিহি ধুলোর আস্তরণ। এরই ভেতরে অন্ত দিয়ে ভরে নেয়া হয়েছে প্রথম ট্রাক। লাইনের পেছনে চলে গেছে ওটা। দড়ি দিয়ে তারপুলিন বেঁধে নিচ্ছে দু’জন লোক। এদিকে অস্ত্রের ক্রেটে অর্ধেক ভরে গেছে দু’নম্বর ট্রাকটা পরে অস্ত্র লোড করার জন্যে পেছনেই অপেক্ষা করছে তৃতীয় ট্রাক।

এক এক করে শুনল রানা, ট্রাকে অস্ত্র তুলছে সবমিলিয়ে আঠারোজন লোক। সবার বেল্ট বা কোমরের হোলস্টারে পিস্তল। কাছের দালানের দেয়ালে ঠেস দিয়ে রেখেছে রাইফেল। তাদের ভেতরে অ্যারন কনারকে দেখতে না পেয়ে বিস্মিত হলো না রানা। অবশ্য তার জন্যে এখানে আসেনি ও। ওর উদ্দেশ্য এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এদের ভেতরে বার্ব ও স্ক্যালেসও নেই। হয়তো কোন দালানে বসে তত্ত্বাবধান করছে গোটা অপারেশন। প্রায় স্বার নজর দ্বিতীয় ট্রাকের ওপরে। দ্রুত ভরা হচ্ছে অস্ত্রের ক্রেট। একনম্বর ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একলোক, হাতে বারো গেজের বেনেলি অটো শটগান। গরমে তাকে কাজ করতে হচ্ছে না বলে চেহারায় প্রশান্তির ছাপ।

বিনকিউলার চোখ থেকে নামিয়ে গাছের আড়াল থেকে সরে এল রানা। পরের তিনমিনিটে চলে গেল দালান ও ট্রাকগুলোর কাছে। হাতে আবারও উঠে এসেছে ট্রেঞ্চ নাইফ। নিঃশব্দে চলে গেল প্রথম ট্রাকের পাশে। বিশেষ কোনদিকে নজর নেই একমাত্র গার্ডের। ফলে টেরও পেল না হাজির হয়ে গেছে সাক্ষাৎ যমদূত। শীতল ইস্পাতের ধারাল পোঁচে ফাঁক হয়ে যেতেই বিশ্রী ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরোল লোকটার গলা থেকে। শক্ত করে তার মুখ চেপে ধরল রানা। দু’মিনিট পর মাটিতে শুইয়ে দিল লাশ। ট্রাকের একপাশ থেকে উঁকি দিয়ে দেখে নিল, কারও খেয়াল নেই যে হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছে তাদের গার্ড। ট্রাকের ক্যাবে কেউ নেই। ইগনিশনে ঝুলছে চাবি। ট্রাকের পেছনদিকে গিয়ে তারপুলিন বেঁধে রাখা দুটো দড়ি খুলল রানা। তারপুলিনের ফাঁক গলে উঠে এল লোডিং বে-তে। অসংখ্য ক্রেটের জন্যে নড়াচড়া করা ওর জন্যে কঠিন। ছোরা দিয়ে কেটে দিল প্রথম ক্রেটের স্ট্র্যাপ। ঢাকনি খুলে দেখতে পেল ভেতরে সারি দিয়ে সাজানো আছে ক্রিস ভেক্টর। একেক ক্রেটে দশটা করে। রানা আন্দাজ করে নিল, এই ট্রাকে আছে কমপক্ষে চল্লিশটা ক্রেট। অর্থাৎ, তিন ট্রাকে আঁটবে এক শ বিশটা। কার্টেলের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে একহাজারেরও বেশি ভয়ঙ্কর অস্ত্র ক্রিস ভেক্টর।

অবশ্য পরের ক্রেট আকারে বেশ বড়। ওটার ঢাকনি খুলে রানা দেখতে পেল, ভেতরে আছে রোটারি গ্রেনেড লঞ্চার। গত রাতে লেকের তীরে এই একই জিনিস দেখেছে বার্বের হাতে। ক্রেটের ভেতরে আছে বিশটা অস্ত্র। এই জিনিস পেলে এক ডিভিশন সৈনিকের বিরুদ্ধে সমানে সমানে লড়াই করতে পারবে ড্রাগ কাটেলের নরপশুরা।

কিছু ক্রেটের গায়ে লেখা: হাই এক্সপ্লোসিভ

ছোরা দিয়ে খুঁচিয়ে একটা ক্রেটের ঢাকনি খুলল রানা। ঠোঁট গোল করে মনে মনে শিস বাজাল। বহুদিন পর আবারও দেখতে পাচ্ছে একইসঙ্গে চল্লিশটার বেশি ফোর্টি মিলিমিটার গ্রেনেড। চারপাশে চেয়ে রানা বুঝে গেল, ট্রাকে আছে কমপক্ষে এমন বারোটা ক্রেট। বিস্মিত না হয়ে পারল না ও, কীভাবে এত বেশি অর্ডিন্যান্স চুরি গোপন রাখবে ইউএস কোয়ার্টারমাস্টারেরা?

অবশ্য এখন এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। বাইরে রানা শুনল ক্রেনের শব্দ ও লোকজনের গলা। দ্বিতীয় ক্রেট থেকে . দুটো রোটারি লঞ্চার নিল ও। ও-দুটোর ভেতরে ভরল পাঁচটা করে গ্রেনেড। লোডিং পোর্ট বন্ধ করে দু’হাতে দুই লঞ্চার নিয়ে নেমে পড়ল ট্রাক থেকে। নীরবে গিয়ে খুলল ট্রাকের ক্যাবের দরজা। প্যাসেঞ্জার সিটে রেখে দিল গ্রেনেড লঞ্চার দুটো। নিজে উঠে পড়ল ড্রাইভিং সিটে। বিড়বিড় করে বলল, ‘তো শুরু হোক খেলা!’

ক্যাবের দরজা বন্ধ করে ইগনিশনে মুচড়ে দিল বেডফোর্ড ট্রাকের রুপালি চাবি।

আটচল্লিশ
হায়াট রিজেন্সি বিলাসবহুল রুমে বিচলিত বোধ করছে জ্যাকি। অস্বস্তি নিয়ে ভাবছে, কী যেন মনে পড়ার কথা ওর। ওকে রেখে নরকের মত খারাপ কোথাও গেছে রানা। নিশ্চয়তা নেই যে ফিরে আসতে পারবে! হয়তো মানুষটা আর বেঁচেই নেই? এ-কথাটা ভাবতেই তিক্ততায় ভরে গেল জ্যাকির মন। মগজের এক অংশ বলল: আর দেরি করছ কেন? যাও, গিয়ে সাহায্য করো রানাকে!

কিন্তু মানুষটা কোথায় গেছে, সেটা জানবে কী করে? রানার কথা ভাবতে গিয়ে অস্থির লাগছে জ্যাকির।

রুম লক করে লিফটে উঠে নেমে এল লবিতে। ডেস্ক ক্লার্কের কাছ থেকে জেনে নিয়ে সোজা গিয়ে ঢুকল হোটেলের বিষনেস সেন্টারে। অতিথিদের জন্যে আছে সুপারফাস্ট ব্রডব্যাও। ফাঁকা এক টার্মিনাল দেখে ওখানে বসে পড়ল জ্যাকি। গুগলে ‘ব্ল্যাক বেয়ার টুলসা’ ফ্রেটি লিখে সার্চ দিল। ম্যাট কালাহারের কাছ থেকে জেনে শব্দগুলো কাগজে লিখেছিল রানা। নিশ্চয়ই এসবের কোন গূঢ় অর্থ আছে?

কিছুক্ষণ সার্চ করার পর বিশেষ এক ওয়েবসাইট খুঁজে পেল জ্যাকি। সেখানে ক্রয়-বিক্রয় হয় ওকলাহোমার পরিত্যক্ত সম্পত্তি। দীর্ঘ লিস্ট আছে ভুতুড়ে শহরের। জ্যাকি আগে জানত না টুলসা শহরের কাছে পড়ে আছে এত পরিত্যক্ত বাড়িঘর। ওয়েবসাইটে দেখল, টুলসা থেকে কাছেই মাস্কোগি কাউন্টিতে আছে অ্যাডোনিস গোস্ট টাউন। অনেক আগে পরিত্যক্ত হয়ে গেলেও উনিশ শ’ ঊনপঞ্চাশ সালে আবারও সেখানে নতুন করে বসতি করে একদল লোক। চালু করা হয় ব্ল্যাক বেয়ার ফার্মস্টিড। ওখানে চাষ করা হতো গম। কিন্তু ষাট সালের আগেই লাভজনক নয় বলে বন্ধ করা হয় খামার। আবারও জনশূন্য হয়ে যায় অ্যাডোনিস টাউন।

‘ব্ল্যাক বেয়ার!’ বিড়বিড় করে বলল জ্যাকি। দেরি না করে গুগল ম্যাপ থেকে জেনে নিল জায়গাটা কোথায়। ঝাপসা স্যাটেলাইট ইমেজ দেখে বুঝল, ওখানে আছে বড় একটা খামার-বাড়ি আর কিছু দালান। চোখ পিটপিট করে ভাবল জ্যাকি, তা হলে, এফবিআইকে কাঁচকলা দেখিয়ে ওখানেই অস্ত্রের গুদাম করেছে অ্যারন কনার?

‘আমি এবার ওখানে যাব,’ নিচু গলায় বলল জ্যাকি।

একটু দূরের দু’জন হোটেল-অতিথি বিস্মিত চোখে ওকে দেখলেন।

ব্ল্যাক বেয়ার হোমস্টিডে গিয়ে তারপর কী করবে, সেটা ভেবে পেল না জ্যাকি। ওদিকের এলাকায় বাস চলে না। চট্‌ করে বুঝে গেল, অত দূরে যেতে হলে ওর চাই ভাল কোন গাড়ি। মনে মনে বলল: যেভাবে হোক রানার এই বিপদে ওর পাশে আমি থাকব।

নিজের রুমে ফিরে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল জ্যাকি। তারপর দরজা লক করে প্রথমতলায় নেমে এসে বেরিয়ে এল হোটেল থেকে। ভাবল, ভাড়া নিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে অ্যাডোনিসে না গিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে ওখানে যাওয়াই ভাল।

প্রচণ্ড রোদে যেন জ্বলছে চারপাশ। সাদা আলো ছিটকে আসছে ফুটপাথ থেকে। ইস্ট সেকেণ্ড স্ট্রিট পার হয়ে গাছের ছায়াভরা পথে ব্যাঙ্ক অভ ওকলাহোমার বিশাল দালানের দিকে হেঁটে চলল জ্যাকি। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে: দয়াময়, ট্যাক্সি জুটিয়ে দাও। আর সেজন্যে বেশি সময় নিয়ো না, প্রভু!’

মাত্র পাঁচ ফুট যেতে না যেতেই ধক করে উঠল ওর হৃৎপিণ্ড। এদিকেই আসছে হলদে এক ট্যাক্সি। হাত তুলে ওটাকে থামার ইশারা করল জ্যাকি। চলমান গাড়ির লাইন থেকে বেরিয়ে রাস্তার বাঁকে বিশ গজ দূরে থেমে গেল, ট্যাক্সি। ওটা আছে ব্যাঙ্কের সদর দরজার কাছে। প্রায় দৌড়ে ট্যাক্সির দিকে ছুটে চলল জ্যাকি। নিজের সৌভাগ্যে বিস্মিত। কিন্তু গাড়িটার কাছে যাওয়ার আগেই আঁটসাঁট পোশাক পরা হাতির মত মোটা এক লোক বেরিয়ে এল ব্যাঙ্ক থেকে। ফোনে কথা বলতে বলতে তার চোখ পড়ল ট্যাক্সির ওপরে। জ্যাকির আগেই জায়গামত পৌছে গেল সে

‘দুঃখের কথা, রনির মন খারাপ হবে, বুঝলে, রিচি,’ -জোর গলায় বলল, ‘তবে আজই হিন ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে চুক্তি করব। টাকাগুলো সত্যিই আমাদের দরকার।

‘মাফ করবেন, স্যর,’ তার সামনে গিয়ে থামল জ্যাকি। ‘আমিই কিন্তু আগে এই ট্যাক্সি ডেকেছি।’

মোটা ঘাড় ঘুরিয়ে চরম তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে ওকে দেখল হাতি। ‘একমিনিট, রিচি। অ্যাই, মেয়ে, তুমি কী চাও?’

‘বলছি, ট্যাক্সিটা আমি ডেকেছি,’ বলল জ্যাকি, ওটা আমার দরকার।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে কুমিরের মত ভয়ঙ্কর একটুকরো হাসি দিল মোটকু। ‘ভালই বলেছ, সুন্দরী ডার্লিং! তবে কস্মিনকালেও এই ট্যাক্সি তোমার ছিল না! ওটা আসলে আমার!’

‘আমি আগে দেখেছি, ‘ আপত্তি তুলল জ্যাকি।

‘তুমি কি পাঁচ বছরের শিশু নাকি; মেয়ে? এত আমি আমি করে কোন লাভ হবে না। পারলে অন্য ট্যাক্সি জোগাড় করে নাও।’

মোটকু ও ট্যাক্সির মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে গেল জ্যাকি। করুণ চোখে চেয়ে বলল, ‘আমার কাজটা খুব জরুরি, স্যর। তাই ট্যাক্সিটা খুব দরকার। আপনি আসলে ভাবতেও পারবেন না যে…’

‘তুমি যতই সুন্দরী হও, মেয়ে, আমার হাগা পোঁদে চুমু দিলেও ট্যাক্সি বাপু তোমাকে দিতে পারব না, মোটা পেট দিয়ে জ্যাকিকে সরিয়ে দরজা খুলে মস্ত এক চাল কুমড়োর মত ট্যাক্সিতে ঢুকে পড়ল সে। নতুন করে কথা বলতে লাগল ফোনে। ‘আরে, না! কোথাকার এক গাধী এসে বিরক্ত করছে। যা বলছিলাম, রিচি, রনির পোঁদ ফেটে গেলেই বা আমার কী? আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’

রাগ নিয়ে তাকে দেখছে জ্যাকি। বুঝে গেছে, নাকের ডগার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে সাধের ট্যাক্সি। আর তখনই মগজে বুদ্ধি এল ওর। ব্যাগ থেকে পিস্তল বের করে ঝুঁকে গিয়ে সরাসরি তাক করল হাতির ভুঁড়ির দিকে। ‘হারামি শয়তান কোথাকার! শুয়োরের চর্বির ডিপো! জলদি বেরো আমার ট্যাক্সি থেকে! আর একটা কথা বললে গুলি করে পেট ফুটো করে দেব!’

ঝগড়ার আভাস পেয়ে থেমে গেছে ক’জন পথযাত্রী। কিন্তু পিস্তল দেখে যে যার মত পালিয়ে যেতে চাইল তারা। একজন চিৎকার করে বলল, ‘গুলি! মেয়েটা গুলি করছে!’

ফোন মেঝেতে ফেলে মাথার ওপরে হাত তুলে বোকা বোকা চেহারা করেছে মোটকু। বেসুরো কন্ঠে বলে উঠল, ‘হায়, যিশু, না-না, গুলি কোরো না! আমি নেমে যাচ্ছি! এই ট্যাক্সি তো বাবা চিরকালই তোমার!’ গাড়ির মেঝে থেকে ফোন কুড়িয়ে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ট্যাক্সি ছেড়ে নেমে এল সে। তিন ভাঁজ করা থলথলে থুতনি নেমে এসেছে বুকে। অবাক চোখে জ্যাকিকে দেখছে ট্যাক্সি চালক। কী করবে বুঝে উঠছে না।

তখনই চিৎকার শুনল জ্যাকি। ‘পুলিশ! অস্ত্র ফেলো! নইলে বাধ্য হব গুলি করতে।

মূর্তির মত থমকে গেল ডাকি। কখন যেন মাত্র পাঁচ গজ দূরে হাজির হয়েছে দুই পুলিশ অফিসার। জ্যাকির বুকে তাক করেছে তাদের গ্লক পিস্তল।

হাত থেকে পিস্তল ছেড়ে দিতেই ফুটপাশে পড়ে ঠং-ঠনাৎ আওয়াজ তুলল অস্ত্রটা। জ্যাকি মাথার ওপরে হাত তুলতেই ওকে কাভার করল এক অফিসার। দ্বিতীয়জন এসে কুড়িয়ে নিল পিস্তল। ধমকের সুরে বলল, ‘গাড়িতে বুক ঠেকাও!’

নির্দেশ পালন করল জ্যাকি। একটু পর গ্রেফতার হলো। হাজির হয়ে গেছে পুলিশের ক্রুযার। একদল লোকের সামনে গাড়ির পেছনের সিটে তোলা হলো জ্যাকিকে। দরজা লক হয়ে যেতেই রওনা হয়ে গেল জুয়ার।

জ্যাকি এতই বিস্মিত, বুঝতে পারল না কোথায় নেয়া হচ্ছে ওকে। একটু পর থেমে গেল গাড়ি। খোলা হলো পেছনের দরজা। ওর ঘাড় ধরে গাড়ি থেকে বের করল এক অফিসার। পিঠে ঠেলা দিয়ে নেয়া হলো বড় এক বাড়ির ভেতরে। সেখানে ওর ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়ার পর ভরে দেয়া হলো ছোট এক সেলে। ধাতব বেঞ্চিতে বসে দু’হাতে কপাল টিপতে লাগল জ্যাকি। তীব্র রাগে ও মানসিক কষ্টে ওর মনে হলো, যে-কোন সময়ে হড়হড় করে বমি করে দেবে।

তিলতিল করে পেরোতে লাগল সময়। অনেকক্ষণ পর সেলের দরজায় লাঠির আওয়াজে মুখ তুলে তাকাল। ওর দিকে চেয়ে টিটকারির হাসি হাসছে এক পুলিশ অফিসার।

‘বাহ্, নিজেই তুমি হাজির?’ বলল পুলিশ চিফ রিগবি। ‘খুবই ভাল!’

ঊনপঞ্চাশ
ট্রাকের ইঞ্জিন সগর্জনে চালু হলেই লোকগুলোর ভেতরে সাড়া পড়বে, ভাল করেই জানত রানা। আর সেটাই হলো। যে-যার হাতের মালপত্র ফেলে হৈ-হৈ করে উঠল তারা। কেউ বের করল পিস্তল, অন্যরা দেয়ালে কাত করে রাখা রাইফেল তুলে ছুটে এল পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের দিকে গিয়ার সামনে ঠেলে অ্যাক্সিলারেটর দাবিয়ে দিল রানা।

বারকয়েক হোঁচট খেয়ে এবড়োখেবড়ো জমিতে হেলেদুলে মোটা মহিলার মত এগোল ট্রাক। চাইলেও ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে না রানা। অনায়াসে ধাওয়া করে ওকে ধরবে জিপের ড্রাইভারেরা। অবশ্য ভেগে যাওয়ার কোন ইচ্ছে ওর নেই।

রানার একমাত্র উদ্দেশ্য অ্যারন কর্নারের সর্বাত্মক ক্ষতি করা। সেটা এমন হতে হবে, যেন কমাণ্ডো আক্রমণে খুব দ্রুত হ্রাস পায় লোকটার দলের শক্তি।

ট্রাক নিয়ে অস্ত্রে অর্ধেক ভরা ট্রাকে দিকে ছুটছে রানা। ক্রমেই বাড়ছে যন্ত্রদানবের গতি। প্রচণ্ড নাকি খেয়ে নড়ছে রানার পাঁজরের হাড়। দু’হাতে শক্ত করে ধরেছে স্টিয়ারিং হুইল। দানবীয় ট্রাক হুড়মুড় করে এসে পিষে দেবে বুঝতে পেরে লাফিয়ে সরে যাচ্ছে অ্যারন কনারের দলের দস্যুরা। ওজনদার ট্রাক নিয়ে অপেক্ষাকৃত হালকা ট্রাকের ওপরে চড়াও হলো রানা। দ্বিতীয় ট্রাক ছেঁচড়ে সরে গিয়ে ধুম করে গুঁতো মারণ ক্রেন লরির গায়ে। ফলে মস্ত ঘাছের মত টলমল করে কাত হয়ে পড়ে অপারেটরকে চ্যাপটা করে দিল ক্রেন লরি সেখানেই থামল না ওটা, পিছলে হুড়মুড় করে নেমে গেল কংক্রিটের গভীর সুইমিংপুলে। ক্রেনের ওজনে চুরমার হয়ে গেছে কয়েকটা মই, একগাদা ইকুইপমেন্ট ও অস্ত্রের ক্রেট। পরক্ষণে ক্রেন লরির পিছু নিয়ে গর্তে নামল অস্ত্রে অর্ধেক ভরা ট্রাক। পিঠ থেকে ঝরবার করে ঝরছে নানান আকারের ক্রেট।

এদিকে রানার ট্রাকে এসে বিঁধছে শত শত গুলি। গভীর গর্তের পাশে কড়া ব্রেক কষে ট্রাক রাখল রানা। ওর কাঁধে শটগান থাকলেও ওটা ব্যবহার না করে দুই গ্রেনেড লঞ্চার হাতে ট্রাকের দরজা খুলে বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শূন্যে ভেসে থাকতেই স্পর্শ করেছে গ্রেনেড লঞ্চারের ট্রিগার। প্রথম গ্রেনেড গিয়ে লাগল এক জিপ গাড়ির গায়ে। বোমার আঘাতে খেলনার মত উড়ে গেল ভারী জিপ। অন্তত পাঁচ ফুট দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ল আগুনে ভরা জঞ্জাল। রেঙের ভেতরে ছিল বার এ্যাপনেলের আঘাতে মারা পড়েছে তিন লুঠেরা। চতুর্থজন লাফিয়ে সরে গিয়ে আড়াল নিয়েছে আরেক জিপগাড়ির। গ্রেনেড হামলার জবাব দেয়ার জন্যে গুলি পাঠাল সে। তবে রানার পরের গ্রেনেড সরাসরি লাগল তার বুকে। প্রচণ্ড আঘাতে পো নে উড়ে গিয়ে মাটিতে পড়ল লোকটা। আর তখনই সুইমি পুলের ভেতরে ফাটল রানার ছোঁড়া তৃতীয় গ্রেনেড। গভীর গর্তের মধ্যে শুরু হলো গোলাবারুদের একের পর এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। ভয়ঙ্করভাবে থরথর করে কাঁপতে লাগল মাটি। আকাশের দিকে লকলক করে উঠে গেল ফুটবলের মত বিশাল এক কমলা আগুন। যুদ্ধবিধ্বস্ত কুয়েতের জ্বলন্ত তেলের কূপের চেয়েও বড় হলো লেলিহান শিখা।

এক দালানের আড়ালে সরে গেলেও রানার মনে হলো, প্রাচীন কোন ড্রাগন যেন মুখ থেকে আগুনের হলকা ছুঁড়ে দিচ্ছে ওর দিকে। তাপের তীব্রতা আরও বাড়লে স্রেফ সেদ্ধ হবে ও। গোলাবারুদের নারকীয় বিস্ফোরণে মাত্র দু’সেকেণ্ডে ধসে গেল মস্ত এক কাঠের আস্তাবল। আকাশ থেকে ঝরবার করে নামল কালো হয়ে যাওয়া লোহার মোচড়ানো পাত। ওগুলো চাপা দিল কয়েকটা জিপ গাড়িকে। আগুনের তাপ সহ্য করতে না পেরে পিঁপড়ের মত ছত্রভঙ্গ হয়ে নানানদিকে পালিয়ে যাচ্ছে লোকগুলো।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন: একবার মাটিতে পড়ে গেলে শত্রুকে উঠতে দিয়ো না। একই মতাদর্শ ছিল জেনারেল জর্জ প্যাটনের। এখনও রানার কাছে আছে সাতটা গ্রেনেড। এতবড় দুই ট্যাকটিশিয়ানের বিরু। যাওয়ার ইচ্ছে ওর নেই। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে গ্রেনেড ছুঁড়ে খালি করল দুই লঞ্চার। আগুনে পুড়তে লাগল দুই ট্রাক ও খামারের দালান। একের পর এক বিস্ফোরণে অস্ত্র ও গোলাবারুদের গভীর গর্ত থেকে আকাশে উঠছে বিশাল অগ্নি গোলক। একেক শিখার জিভ দৈর্ঘ্যে তিরিশতলা স্কাই-স্ক্র্যাপারের চেয়েও উঁচু। চারদিকে কালো যে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে, ওটা বোধহয় চোখে পড়বে ওকলাহোমা সিটি থেকে।

গ্রেনেড লঞ্চার ফেলে কাঁধ থেকে বন্দুক নিয়েছে রানা। অস্ত্রের চেম্বারে আছে প্রথম রাউণ্ড। পুরনো এক গাড়ির আড়াল থেকে ওর দিকে পিস্তল তাক করছে একলোক। দেরি না করে তার মুখ লক্ষ্য করে বাকশট পাঠাল রানা। খচ্চরের মত ওর কাঁধে লাখি দিল বন্দুকের কুঁদো। রানা দেখল ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে সরে গেছে লোকটা। কিন্তু গাড়ির তলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার দু’পা। ঝড়ের বেগে শটগান পাম্প করে আবারও গুলি পাঠাল রানা। দু’পা ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ায় গটিতে পড়ল অ্যারন কনারের দলের লুঠেরা। রানার তৃতীয় গুলি ফুটো করল তার হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস।

রানার পায়ের কাছের মাটিতে লেগে অন্যদিকে ছিটকে গেল একটা বুলেট। দুই দালানের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে দৌড় দিল রানা। তারই ফাঁকে পকেট থেকে গুলি নিয়ে ভরে নিল বন্দুকের ম্যাগাযিন। না থেমে ছুটে চলেছে ওপরদিকের জমি লক্ষ্য করে। ওখানে ভি-এর মত দাঁড়িয়ে আছে মরা দুই গাছ। তারই একটার গায়ে ঠেক দিয়ে রেখে এসেছে মৃত গার্ডের রাইফেল। ছুটন্ত রানাকে লক্ষ্য করে তাড়াহুড়ো করে গুলি করছে কেউ কেউ। পলকের জন্যে ঘুরে কোমরের কাছ থেকে গুলি ছুঁড়ল রানা। বুলেটের আঘাতে চুরচুর হয়ে ভাঙল এক দালানের কোনা। ওদিকে লুকিয়ে ছিল একলোক, কাত হয়ে উঠনে পড়ল সে। টি-শার্টের বুকে ফুটে উঠল লাল এক বড় গোলাপের মত নকশা।

দ্বিতীয়বার ওদিকে না চেয়ে ছুটছে রানা। মাত্র দশ সেকেণ্ডে পৌঁছে গেল মরা দুই গাছের পেছনে। রাইফেল নিয়ে, শুয়ে পড়ল মরা ঘাসে ভরা মাটিতে। এত দূর থেকে বন্দুক কাজে না এলেও রাইফেল অন্যকিছু। ওটার আছে শক্তিশালী, ম্যাগনিফিকেশন স্কোপ। হঠাৎ এই আকস্মিক আক্রমণে উঠনে ধোঁয়ার ভেতরে বিশৃঙ্খলভাবে ছুটোছুটি করছে অ্যারন কনারের লোকেরা। তাদের ভেতরে নেই বার্ব ও স্ক্যালেস। অর্থ বিপদের সময়ে তাদের এখানে থাকার কথা!

স্কোপের ক্রস হেয়ারে একজনকে পেয়ে চিগারে মৃদু স্পর্শ করল রানা। ৩০৮ বুলেট লক্ষ্যের দিকে রওনা হতেই কাঁধে লাগল জোরালো গুঁতো। বিকট আওয়াজে ঝনঝন করছে দু’কান। টার্গেটের বুকে ছিটকে উঠল লাল বাষ্প। লোকটা পড়ে যেতেই নতুন টার্গেট খুঁজে নিল রানা। আবারও ট্রিগার স্পর্শ করতেই মাটিতে পড়ে গেল লোকটা। এরপর পাল্টে গেল যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশ। অন্যদিকে হাওয়া বইতেই কালো ধোঁয়া ঢেকে দিল প্ৰকাণ্ড উঠন।

স্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে নিল রান্না। এবার সময় হয়েে বিদায় নেয়ার। চরম ক্ষতি করা গেছে অ্যারন কনারের।

আপাতত যথেষ্ট।

উঠে গেটের দিকে ছুটল রানা। পাঁচ মিনিটে তারের বেড়া টপকে পৌঁছে গেল গাড়ির কাছে। এদিকে আসার সময়ে প্রথম গার্ডের ওয়ালেট পরীক্ষা করে দেখেছে। ওটার ভেতরে আছে দু’ শ’ হয় ডলার, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কয়েকটা কার্ড। লোকটা ছিল ভাড়াটে দস্যু। ব্ল্যাক বেয়ার ফার্মে কাজের জন্যে তাকে আইডি কার্ড দিয়েছিল অ্যারন কনার। লোকটার নাম রেনি এফ. ডান। জরুরি নাম বা নম্বর থাকতে পারে ভেবে তার ফোন দ্রুত চেক করল রানা।

অ্যাডোনিস শহরে ফেরার সময় কল দিল জ্যাকিকে। যদিও ওদিক থেকে সাড়া দিল না কেউ।

অফ করা আছে ডিভাইস।

ফোন চালু করলে জ্যাকি যেন বুঝতে পারে ও ফিবে আসছে, সেজন্যে সংক্ষেপে মেসেজ পাঠান রানা। খচ খচ করছে ওর মন। পথের ধারে গাড়ি রেখে গুগল থেকে নম্বর নিয়ে কল দিল হায়াট রিজেন্সি হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে। রিসেপশনিস্ট হ্যালো বলতেই রানা জানাল, দু’ শ পাঁচ নম্বর • রুমে যেন লাইন দেয়া হয় মিসেস হ্যাম্পটনের কাছে।

একটু পর রিসেপশনের মেয়েটা বলল, বেশ অনেকক্ষণ আগে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন মিসেস হ্যাম্পটন

মনে অস্বস্তি নিয়ে আবারও রওনা হলো রানা। ক্রমেই বাড়ছে গাড়ির গতি।

কালবেলা – ৫০ (মাসুদ রানা)

নিজের বাড়িতে আছে টুলসার মেয়র অ্যারন কনার। কিচেন টেবিলে বসে গোগ্রাসে খাচ্ছে ঠাণ্ডা মাংস দিয়ে তৈরি সুস্বাদু স্যাণ্ডউইচ। একটু আগে স্থির করেছে, অফিসে কারও সঙ্গে আপাতত যোগাযোগ করবে না। এমন কী ক্যাম্পেইন ম্যানেজারের সঙ্গেও নয়। স্যাণ্ডউইচ খেতে খেতে এরপর কী করবে সেটা ভাবছে সে, এমন সময় বেজে উঠল তার ফোন। কল রিসিভ করতেই তিক্ত স্বরে বলল বার্ব, ‘আগেই বলেছি, মস্ত ভুল করছেন। কিন্তু আপনি কিছুই শুনলেন না।’

‘তুমি আবার কী বলেছিলে?’ জানতে চাইল কনার।

‘আমি সব খুলে বলার আগে বসে পড়ুন কোন চেয়ারে।’

‘আমি বসেই আছি। দেরি না করে বলো কী হয়েছে!’

‘সর্বনাশ হয়ে গেছে, বস। এইমাত্র ব্ল্যাক বেয়ার থেকে ফোন করেছে মর্গ্যান। ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে ব্ল্যাক বেয়ার। আমাদের ছেলেদের কিছুই করার ছিল না।

কথা শুনে বুকের ভেতরে ধক্ করে উঠল কনারের। স্যান্ডউইচ ফেলে দু’হাতে চেপে ধরল মাথা। মুচড়ে উঠেছে পেটের ভেতরে। টয়লেটে যেতে পারলে ভাল হতো। ‘কাজটা কি মাসুদ রানার?’ বেসুরো কণ্ঠে জানতে চাইল সে।

তো আর কে হবে? আপনি আর টনি বাধ্য করলেন, যেন ক্রসবি হাইটসে গিয়ে অপেক্ষা করি। ওদিকে সুযোগ পেয়ে ব্ল্যাক বেয়ারে হামলা করল মাসুদ রানা। আগেই আপনাকে বলেছি, এমনটা ঘটতে পারে।’

‘হায়, ঈশ্বর! এটা কোন সময়ের ঘটনা?’

‘কিছুক্ষণ আগের।‘

‘অস্ত্রগুলো কি রক্ষা পেয়েছে? প্রথমে কটেজটা গেল। আর এখন অস্ত্রের ওদাম ধ্বংস হয়ে গিয়ে থাকলে সর্বনাশ হয়েছে অ্যারনের।

এরচেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। বোমার আঘাতে উড়ে গেছে আমাদের তিনটে ট্রাক। ট্রাকে আর সুইমিংপুলে যত অস্ত্র ছিল, শেষ হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত মিলেছে আমাদের দলের বারোজনের লাশ। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তিনজনকে। বেঁচে আছে মাত্র তিনজন। মর্গ্যান, লুকম্যান ও স্টিভেন্স। বিস্ফোরণের আঘাতে বাম কান উড়ে গেছে লুকম্যানের।

কার কান কাটা পড়েছে সেটা নিয়ে ভাবছে না অ্যারন। দ্রুত ছুটন্ত রেলগাড়ির মত বুকে ধিকধিক আওয়াজ করছে হৃৎপিণ্ড। ‘হায়, ঈশ্বর! কিন্তু ব্ল্যাক বেয়ারে কীভাবে ঢুকল সে? গেটে পাহারা দিচ্ছিল কে?’

‘রেনি এফ. ডান। মারা গেছে সে। এক কান থেকে আরেক কান পর্যন্ত গলা কেটে দিয়েছে রানা। সঙ্গে করে নিয়ে গেছে তার ফোন ও ওয়ালেট। রেনির রাইফেল দিয়েই খুন করেছে ব্র্যাড়ি আর স্ট্রংকে।’

স্ট্রং বা অন্যদের জন্যে মনে কোন দুঃখ নেই অ্যারনের। কী যেন উঠে এসেছে গলার কাছে। কয়েকবার চেষ্টার পর ঢোক গিলতে পারল। ‘তুমি বলছ ব্ল্যাক বেয়ারে আমাদের গুদাম ধ্বংস হয়ে গেছে। আসলে কী বলতে চাইছ?’

বার্বের পরের কথায় মনে জেগে থাকা শেষ আশার আলোটাও নিভে গেল অ্যারনের। ‘মন দিয়ে শুনুন, বস। মর্গ্যান বলেছে, এখন আণবিক বোমা পড়া হিরোশিমার মতই ন্যাড়া হয়ে গেছে ব্ল্যাক বেয়ার।’

‘সর্বনাশ!’ বিড়বিড় করল কনার। পেটের ভেতরে অনুভব করছে জোরাল চাপ। দ্রুত টয়লেটে যেতে হবে তাকে। বেগ সামলে জানতে চাইল, ‘তোমরা দু’জন এখন কোথায়?’

‘এখনও চোখ রাখছি মেয়েটার বাড়ির ওপরে,’ তিক্ত হাসল বার্ব। ‘তবে আপনি অনুমতি দিলে সোজা যাব ব্ল্যাক বেয়ারে। এখন কী করব সেটা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ কয়েক ‘পলক কেটে গেলেও জবাব দিল না তার বস। বার্ব জানতে চাইল, ‘বস? আপনি কি লাইনে আছেন?’

টেবিলে ফোন রেখে ছুটে গিয়ে কিচেনের সিঙ্কে হড়হড় করে বমি করছে অ্যারন। ভীষণ অসুস্থ। মিনিট তিনেক পর মুখ ধুয়ে একগ্লাস পানি দিয়ে গিলে নিল আটটা অ্যান্টাসিড। সিঙ্কের কাছ থেকে সরে ধুপ করে বসল উইকার চেয়ারে। শীতল ঘামে ভিজে গেছে সর্বাঙ্গ। লাখ লাখ ডলারের অস্ত্র হারিয়ে থরথর করে কাঁপছে চার হাত-পা। শুধু যে ভয়াবহ ক্ষতি, তা নয়, মেক্সিকান ড্রাগ ‘কার্টেলের বস যখন জানবে আর অস্ত্র পাবে না, দেরি না করে আততায়ী পাঠিয়ে দেবে ওকে খুন করতে। এরা যেমন আইনের ভয়ে সতর্ক থাকে, তেমনি ভীষণ নিষ্ঠুর। ধরে নেবে এই হামলা করেছে ডিইএ বা এফবিআই। এবার চারপাশ থেকে কার্টেলের ওপরে আসবে হামলা। ধরা পড়বে আমেরিকান অস্ত্র সরবরাহকারী লোকগুলো। সুতরাং সব ফাঁস হয়ে যাওয়ার আগেই কার্টেলের বসের উচিত হবে অ্যারনকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়া। হয়তো ওকে গাড়িসহ তুলে নিয়ে যাবে কার্টেলের লোক। বাড়ি থেকেও কিডন্যাপ করতে পারে। হয়তো ফাঁসি দেবে কলাম্বিয়ানদের স্টাইলে। অথবা এক এক করে কেটে নামিয়ে দেবে হাত-পা। সেক্ষেত্রে খুব কষ্ট পেয়ে মরতে হবে ওকে।

চেয়ার ছেড়ে আবারও সিঙ্কের সামনে গেল অ্যারন। কল ছেড়ে পানির ঝাপটা দিল চোখে-মুখে। গলা চিরে বেরোল করুণ গোঙানি।

ওদিকে আবারও বেজে উঠেছে ফোন। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে টেবিলের দিকে এগোল সে। ভাবছে: এবার কী? বার্ব কি আরও খারাপ কোন খবর দেবে? এরই ভেতরে ওকে খুন করতে রওনা হয়েছে কার্টেলের আততায়ী?

‘আমার এবার কী করা উচিত?’ ভাঙা গলায় কথাটা বলে ফোন তুলে কানে ঠেকাল অ্যারন কনার।

‘আপনার জন্যে সুসংবাদ আছে,’ বলল চিফ অভ পুলিশ রিগবি।

তার কথা শুনতে শুনতে অ্যারনের মনের মেঘলা আকাশে দেখা দিল একফালি সোনালি রোদ। নিজের প্রশংসা না করে পারল না রিগবি, তার হাতে ধরা পড়েছে জ্যাকুলিন সিলভেস্টার। তাকে নেয়া হয়েছে গোপন এক বাড়িতে।

‘তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে?’ জানতে চাইল অ্যারন।

‘না, কাগজে-কলমে তা করা হয়নি। আপাতত হারিয়ে গেছে সে। যারা ধরে এনেছে, তারা আমার দলের লোক।’

‘গুড!’ চাপা শ্বাস ফেলল অ্যারন। তার মনে জন্মে গেছে বেঁচে থাকার নতুন এক আশা। জ্যাকুলিন সিলভেস্টার এখন বড় কোন হুমকি নয়। হয়তো মেয়েটার জন্যেই ধরা পড়বে মাসুদ রানা। সেক্ষেত্রে কষ্ট হলেও সব সামলে নেবে অ্যারন। ড্রাগ কার্টেলের বস সেক্ষেত্রে হামলা করবে না। তাদের সঙ্গে নতুন চুক্তি করবে সে। এদিকে নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারলে হয়ে উঠবে স্টেট গভর্নর। তখন হাতের মুঠোয় চলে আসবে অনেক কিছু। ভুলে যাবে ব্ল্যাক বেয়ার দুর্ঘটনা। হয়তো একসময় সে হবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। এখন বড় কথা হচ্ছে, ওর ওপর থেকে কেটে যাচ্ছে বিপদের কালো মেঘ।

‘আপনি আমাকে কী করতে বলেন? মানে, মেয়েটার ব্যাপারে?’ জানতে চাইল রিপার রিগবি।

নির্দেশের জন্যে অপেক্ষা করছে পুলিশ চিফ। ধীরে ধীরে ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটল মেয়র অ্যারনের। কটেজ আর ব্ল্যাক বেয়ার খুইয়ে বসে এখন ওর চাই নতুন আস্তানা। সেটা হতে হবে এমন একজায়গা, যেখানে লুকিয়ে রাখা যাবে জিম্মিকে। নিজের বাড়ি বা এয়ারক্রাফট হ্যাঙার নিরাপদ নয়। এখন মাত্র একজায়গায় মেয়েটাকে রাখা যেতে পারে।

‘কুত্তীটাকে র‍্যাঞ্চে নিয়ে যান,’ বলল অ্যারন কনার।

কথা শুনে দ্বিধায় পড়ল রিপার রিগবি। ‘স্পিয়ারহেড? বড় রিয়ানের বাড়িতে? বলেন কী, অ্যারন, আপনার মাথা ঠিক আছে তো?’

বুড়ো শয়তানটা এমন কী পুলিশের চিফকে ঘাবড়ে দেয়, তিক্ত মনে ভাবল অ্যারন। নিচু গলায় বলল, ‘বুড়ো ক’দিনের জন্যে ঘোড়া বিক্রির চুক্তি করতে ক্যানসাসের টোপেকায় গেছে। ভাববেন না। গোটা বাড়িতে কেউ নেই এখন।’

বিগ রিয়ন এখন দু’ শ’ মাইল দূরে আছে শুনে স্বস্তির শ্বাস গোপন করল পুলিশ চিফ রিগবি। ‘ঠিক আছে। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে মেয়েটাকে ওখানে পৌছে দেব।

‘দেরি করবেন না, চিফ। সঙ্গে করে আনবেন আপনার দলের কয়েকজনকে।’

ওখানে কোন হামলার ভয় পাচ্ছেন?’ জানতে চাইল রিগবি।

‘আমরা সামলাতে পারব না, এমন কিছু নয়,’ মৃদু হেসে বলল অ্যারন কনার। ‘তবে দলে ভারী হলে ক্ষতি নেই।’

একান্ন
টুলসা কাউন্টির সীমানায় ঢুকে আবারও জ্যাকিকে ফোন দিল রানা। চারপাশে এখন ব্রোকেন অ্যারো এলাকা। ক’বার বাজলেও ফোন ধরল না জ্যাকি।

‘খারাপ কিছু?’ মনে মনে বলল রানা।

কথা না শুনে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে গেছে জ্যাকি। এখন ফোন ধরছে না। অথচ, ওর ফোনের জন্যে অপেক্ষা করার কথা মেয়েটার। মনের ভেতরে কু ডাকছে রানার। এ-ছাড়া আরও এক ব্যাপারে ও চিন্তিত। ব্ল্যাক বেয়ার ফার্মে ছিল না বার্ব ও স্ক্যালেস। তারা ওখানে থাকলে এবং মারা পড়লে নতুন কোন ঝামেলা পোহাতে হতো না। এদিকে এখন সবচেয়ে বড় ট্যাকটিকাল সুবিধা হারিয়ে বসেছে রানা।

ব্ল্যাক বেয়ারে হঠাৎ হামলা করে তাদেরকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। তবে এবার পরের হামলার জন্যে তৈরি থাকবে অ্যারন কনার ও তার দলের লোকেরা। রানার জন্যে ‘এটা কঠিন বাস্তবতা। তার ওপরে এখন কোথায় আছে বার্ব ও স্ক্যালেস, সেটা জানতে না পারা ওর জন্যে খুব বিপজ্জনক। তারাই বোধহয় কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে জ্যাকিকে। ফলে এবার তৈরি হবে নানান ধরনের জটিলতা।

চোয়াল দৃঢ়বদ্ধ করে অ্যাক্সেলারেটরে চাপ আরও বাড়াল রানা। হেমি ভি৮ ইঞ্জিনের ঘড়-ঘড় আওয়াজ তুলে অপেক্ষাকৃত মন্থরগতি গাড়ি ও ট্রাক পিছনে ফেলে ছুটছে ব্যারাকুডা। টার্নপাইকে পৌছে বাঁক নিয়ে রানা চলল টুলসা শহরের দিকে। মাত্র কয়েক মিনিট পর পৌছে যাবে হোটেলে। তখন খোঁজ নিলেই হয়তো জানা যাবে কোথায় গেছে জ্যাকি।

কথাগুলো মাত্র ভেবেছে রানা, এমন সময় পাশের সিটে অচেনা সুরে বেজে উঠল স্মার্টফোন। ব্ল্যাক বেয়ারের মৃত গার্ড রেনির কাছ থেকে ফোন ও ওয়ালেট সংগ্রহ করেছে রানা। তৃতীয়বার ফোন বাজার পর সামান্য দ্বিধা করে রিপ্লাই বাটন টিপে ডিভাইসটা কানে ঠেকাল রানা।

‘কী? ঝলমলে এই দিনে তোমার কেমন লাগছে?’

মেয়র কনারের কণ্ঠ চিনে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরল রানা। লোকটা আছে ফুর্তির মুডে। ভাবটা এমন, ফোন দিয়েছে ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর কাছে। কনারের কথায় কেন যেন শিরশির করে উঠল রানার মেরুদণ্ড।

‘কংগ্র্যাচুলেশন্স, রানা। একটু আগে জানলাম আমার খরচে দারুণ মজা করেছ। এ-ও বুঝে গেছি, তাতে খুব খুশিও হয়ে উঠেছ। নাকি আমি ভুল বললাম?’

চুপ করে থাকল রানা।

‘অবশ্য এখন ফোন করেছি অন্য কাজে। যেন ভেবে না বসো যে শেষ হয়ে গেছে সব।’ লোকটা হাসি-হাসি সুরে কথা বললেও সেসব তীরের মত এসে বিঁধছে রানার কানে। ‘সত্যি বলতে, মজা মাত্র শুরু। একটু আগে আমার আতিথ্য নিয়েছে এক মেয়ে। তুমি বোধহয় তাকে চেনো। তা-ই না, রানা?’

ওকে ফোনে দাও,’ বলল রানা। ঘণ্টায় নব্বুই মাইল বেগে পিছিয়ে পড়ছে কালো রাস্তা।

হাসতে শুরু করে বলল অ্যারন কনার, ‘সরি, রানা। আপাতত তোমার সঙ্গে কথা বলার সাধ্য তার নেই।’

ওর কোন ক্ষতি হলে তুমিও আর আস্ত থাকবে না,’ সতর্ক করল রানা।

‘না, না, ওর ক্ষতি হবে কেন? ওকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। দরকার হলে ওর জন্যে ফুলশয্যার ব্যবস্থা করে দেব।’

‘তুমি আসলে কী চাও, অ্যারন কনার?’

‘আমি চাই তোমার সঙ্গে পরিচিত হতে। ভাবছি তোমার মত দক্ষ একজন অনুচর পেলে মন্দ হয় না। দু’জন মিলে এ- বিষয়ে একটা জরুরি মিটিং করব। তুমি কী বলো?’

‘আমাকে জানাও কোথায় আসতে হবে, ‘বলল রানা।

‘সরাসরি চলে এসো স্পিয়ারহেড র‍্যাঞ্চে। কারও কাছে খোঁজ নিলেই সে দেখিয়ে দেবে কীভাবে আসতে হবে।

‘আমি যত দ্রুত সম্ভব হাজির হব,’ বলল রানা।

আবারও হাসল অ্যারন কনার। তবে সেই হাসির ভেতরে আছে চাপা রাগ। ‘তোমার কথা শুনে খুশি হলাম। তোমার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। দেখা হলে মনে হবে, বহুদিন পর সাক্ষাৎ হলো ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর সঙ্গে।

‘হ্যাঁ, দেখা হবে,’ বলে কল কেটে দিল রানা।

জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দিল ফোনটা। এখন এক শত বিশ মাইল বেগে শহর লক্ষ্য করে ছুটছে প্লিমাউথ ব্যারাকুডা।

বায়ান্ন
মুচকি হেসে শার্টের পকেটে ফোন রেখে দিল কনার। তার পরনে হাতে সেলাই করা জিন্সের প্যান্ট, সাদা হালকা শার্ট, পায়ে কাউবয় বুট। প্যান্টের কোমরে রুপার বার্কলসহ ঘড়িয়ালের চামড়ার বেল্ট। ঊরুতে জন বিয়াঞ্চি হোলস্টারে .৪৪ ক্যালিবার স্মিথ অ্যাণ্ড ওয়েসন রিভলভার। অর্ডার দিয়ে তৈরি করিয়ে নিয়েছে ওটা। নিকেল প্লেট চকচক করছে আয়নার মত। কোকোবোলো কাঠের লালচে গ্রিপে মাদার- অভ-পার্ল বসিয়ে খোদাই করা হয়েছে এ এবং সি আদ্যক্ষর। রিভলভারটা সঙ্গে আছে বলে নিজেকে খুব ক্ষমতাশালী বলে মনে হচ্ছে তার।

আজকের দুপুরটা চমৎকার। টিকটিক শব্দ তুলছে একটু আগে বন্ধ করা ক্যাডিলাকের উত্তপ্ত ইঞ্জিন। গাড়ির পাশে থেমে চারপাশে তাকাল অ্যারন। মাথার ওপরে বিশাল আকাশ, নিচে তিনদিকে দূরে গেছে স্পিয়ারহেড র‍্যাঞ্চের ঘাসে ভরা প্রকাণ্ড রেঞ্জ। এদিকটা এত প্রশান্তিময় ও নীরব যে মনে হচ্ছে এটাই বুঝি স্বর্গ। বেড়া দেয়া ঘাসের মাঠে চরছে ভাল জাতের নিখুঁত সব ঘোড়া। হোয়াইটউড দিয়ে তৈরি এক শ’ বছরেরও বেশি পুরনো বিশাল র‍্যাঞ্চ হাউসটাকে ছায়া দিচ্ছে কয়েকটা মস্ত আকারের ওক গাছ। ডালে ডালে কাকলি করছে একঝাঁক পাখি। হ্যাঁ, সত্যিই আজ দারুণ একটা দিন। যদিও একটু আগেও সময়টা ছিল খুব দুশ্চিন্তাময়। এরপর হঠাৎ করে পরিস্থিতি চলে এসেছে অ্যারনের মুঠোর ভেতরে।

আগেই বার্বকে বলেছে সে, জ্যাকুলিন সিলভেস্টার হচ্ছে তাদের জন্যে জটিল এক তালা খোলার সহজ চাবি।

আর মাসুদ রানা?

সে চাইছে হাতের মুঠোয় নেবে সেই চাবি।

কিন্তু আর কখনও ওটা পাবে না সে।

আনমনে হাসল মেয়র অ্যারন কনার। এবার এক এক করে সব দিক সামলে নেবে সে। কোথাও কোন খুঁত রাখবে না।

ব্যক্তিগত পথে ভ্যান আসতে দেখে ক্যাডিলাক থেকে সরে কয়েক পা এগোল অ্যারন। তার পাশে এসে থামল ভ্যান। ওটা থেকে নেমে পড়ল বার্ব ও স্ক্যালেস। ভ্যানের স্লাইডিং ডোর খুলে নামল মর্গ্যান, স্টিভেন্স ও লুকম্যান। শেষজনের কানে ভারী ব্যাণ্ডেজ। তাকে দেখাচ্ছে মড়াখেকো ধাড়ি শকুনের মত। আজ স্ক্যালেসের টি-শার্টে লেখা: গড সেভ মি, আই অ্যাম নট আ পুলিস!

‘আরও লোক আনলে না কেন?’ চোখ সরু করে তাদেরকে দেখল অ্যারন। পরক্ষণে ভাবল: মাত্র একজনকে খতম করতে আবার কতজনকে লাগে?

‘আমাদের দলে জীবিত আর কেউ নেই,’ বলল বার্ব। ‘মেয়েটাকে র‍্যাঞ্চে আনা হয়েছে?’

‘একটু পর পৌঁছুবে,’ দিগন্তে চোখ বুলিয়ে বলল অ্যারন। মিনিটখানেক পর দেখতে পেল ধুলোর বড় একটা ঝড় আসছে র‍্যাঞ্চ হাউসের দিকে। তার ভেতরে সামনের গাড়িটা পুলিশ চিফ রিগবির বিএমডাব্লিউ সেভেন সিরিযের সেডান। পেছনে আট সিটের লিংকন ন্যাভিগেটর।

ভ্যান ও ক্যাডিলাকের পাশে এসে থামল গাড়িদুটো।

বিএমডাব্লিউ থেকে নামল রিপার রিগবি, কাঁধের হোলস্টারে রিভলভার। পাশের লিংকন ন্যাভিগেটর থেকে নামল পুলিশ অফিসার র‍্যাণ্ডি পার্সন, মাইক হ্যানোভার, ববি বাইবেল ও ক্যাল অ্যামেট। চারজনই মেয়র অ্যারন কনারের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পাচ্ছে।

গাড়ির পেছন-সিট থেকে জ্যাকিকে টেনে নামাল ক্যাল অ্যামেট। তার হাত থেকে ছুটে যেতে চাইল মেয়েটা। তবে গায়ের জোরে পারল না।

‘সাহস আছে মেয়েটার,’ ঘোঁৎ করে উঠল চিফ রিগবি।

জ্যাকি পরীর মত সুন্দরী। ওকে দেখে জিভে লালা চলে এসেছে স্ক্যালেসের।

‘চমৎকার দিন, কী বলো, ‘মিস,’ হাসল অ্যারন কনার। ‘স্পিয়ারহেড র‍্যাঞ্চে তোমাকে দেখে খুব খুশি হয়েছি।’

‘নরকের আগুনে পুড়ে মরবি, হারামখোর!’ মাটিতে থুতু ফেলল জ্যাকি।

‘বলেছি না, ওর সাহস আছে?’ বলল পুলিশ চিফ।

‘পরে ঠাণ্ডা মেরে যাবে,’ ব র্ব ও স্ক্যালেসকে ইশারা করল অ্যারন। ক্যাল অ্যামেটের কাছ থেকে জ্যাকিকে বুঝে নিল দুই খুনি। শক্তহাতে ধরেছে মেয়েটার দু’কনুই। বাড়ির দিকে না গিয়ে আস্তাবলের দিকে চলল অ্যারন। গত ক’বছরে মুনাফা কমে গেছে র‍্যাঞ্চের। ভাড়াটে লোকগুলোকে বিদায় করে দিয়েছে বিগ রিয়ান। বিক্রি করেছে প্রচুর ঘোড়া। ফলে আস্তাবল এখন প্রায় খালি। অ্যারন খুশি, শেষমেশ বয়সের কাছে হেরে যাচ্ছে হারামি বুড়ো। র‍্যাঞ্চ হাউসের পাশে ইঁটের তৈরি আস্তাবলে ঢুকে ছোট এক ঘরের দরজা দেখাল অ্যারন। ‘বার্ব, স্ক্যালেস, ওকে ওখানে আটকে রাখো।’

‘ডার্লিং, আমি কিন্তু পরে তোমার বুকের গোলাপি বোঁটা দুটো কামড়ে ছিঁড়ে নেব। তুমি আবার কিছু মনে কোরো না!’ জ্যাকির দিকে চেয়ে জিভ দিয়ে দু’ঠোঁট চাটল স্ক্যালেস। বন্দিনীকে ঘরের ভেতরে ঠেলে দিয়ে দড়াম করে ঘরের দরজা বন্ধ করল সে। আটকে দিল ছিটকিনি।

‘এখন থেকে তুমি মেয়েটার জেলরক্ষী,’ বলল অ্যারন।

‘সেজন্যে অনেক ধন্যবাদ,’ চওড়া হাসল স্ক্যালেস।

এদিকে অ্যারনের দস্যুদলের সদস্য আর টুলসা পুলিশ অফিসারদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সন্দেহ ও বিদ্বেষের পরিবেশ। কড়া চোখে একে অপরকে দেখছে তারা। সবাইকে সহজ করতে গিয়ে বলল অ্যারন, ‘মনে হয় না তোমাদের বিরুদ্ধে লড়ে জিতে যেতে পারবে মাসুদ রানা।’

‘তো ঝামেলার পেছনে সেই হারামজাদা?’ জানতে চাইল পুলিশ চিফ রিগবি।

‘সে কিছুই না,’ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল অ্যারন।

তাতে মাথা নাড়ল বার্ব। ‘সে আসলে ভয়ঙ্কর এক টর্নেডোর মত।’

‘একবার তার সামনে প্রিয় বান্ধবীর চামড়া ছিলতে শুরু করলে আর বাড়াবাড়ি করতে পারবে না; বলল মেয়র অ্যারন।

‘আমার মনে হচ্ছে, আপনার এখন কোথাও লুকিয়ে পড়া উচিত,’ বলল বার্ব।

‘তুমি বৃথাই দুশ্চিন্তা করো, শুকনো হাসল অ্যারন।

পুলিশ অফিসারেরা দেখেছে বার্বের কথা শুনে হঠাৎ করে আমসি হয়ে গেছে মেয়রের মুখ। চট্ করে রিভলভারের বাঁটে হাত দিয়েছে লোকটা।

হাতঘড়ি দেখল বার্ব। ‘যে-কোন সময়ে আসবে রানা। মর্গ্যান, সবার হাতে অস্ত্র দাও।’

মাথা দুলিয়ে ভ্যানের পেছনের দরজা খুলল মর্গ্যান পামার। ভ্যানে উঁকি দিয়ে জানতে চাইল অফিসার মাইক হ্যানোভার, ‘তোমরা কী ধরনের অস্ত্র এনেছ?’

মর্গ্যানের কাছ থেকে নিয়ে হ্যানোভারের হাতে এম ফোর ব্যাটল রাইফেল দিল স্ক্যালেস। ‘এটা তোমার কাজে লাগবে। মাসুদ রানা সহজে মরে যাওয়ার বান্দা নয়।’

‘মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছ, উনি?’ বলল রিপার রিগবি। আগেও তার সঙ্গে দেখা হয়েছে স্ক্যালেসের। তখন পুলিশ চিফ বুঝে গেছে, প্রাক্তন মেজর আসলে স্বয়ং শয়তানের দোসর।

‘ভয় না পেলেও সতর্ক হচ্ছি,’ মধ্যমা তুলে পুলিশ চিফের পশ্চাদ্দেশ লক্ষ্য করে বিশেষ ইঙ্গিত করল স্ক্যালেস। ‘এই দুনিয়ায় এমন কেউ নেই, যাকে ভয় পাবে টনি স্ক্যালেস।

এরইমধ্যে ভ্যান ও গাড়ি থেকে নামানো হয়েছে সব অস্ত্র। পুলিশদের আনা অস্ত্র বের করেছে ববি বাইবেল ও র‍্যাণ্ডি পার্সন। পুলিশ দলের সবার হাতে দেয়া হলো রেমিংটন টুয়েলভ গেজ পাম্প শটগান আর ০৮৫৫০ মডেলের এআর ফাইভ ফাইভ সিক্স রুগার রাইফেল। এ-ছাড়া সবার সঙ্গে আছে পিস্তল বা রিভলভার। শেষবার অস্ত্র পরীক্ষা করার সময় সবার ভেতরে নামল নীরবতা।

পুলিশ অফিসারদের পেটমোটা কেভলার ভেস্ট পরতে দেখে টিটকারির হাসি হাসল স্ক্যালেস। ‘এবার বলো দেখি, চিফ রিগবি, ভয় পাচ্ছে আসলে কারা?

‘র‍্যাঞ্চ হাউসে যাওয়া যাক,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল অ্যারন।

বিগ রিয়ান চেয়েছে ওকি ডিযাইনে র‍্যাঞ্চ হাউস সাজিয়ে নিতে। প্রকাণ্ড ঘর তার পছন্দ। আসবাবপত্রও স্বাভাবিকের দ্বিগুণ আকারের। চামড়ামোড়া দামি সোফা ও চেয়ারের ক্লাঠের অংশে ভার্নিশ করা। দেয়ালে দেয়ালে শিংওয়ালা হরিণের মাথা। কিছু ছবিতে দেখা যাচ্ছে গণ্ডার, বাইসন ও সিংহের লাশের পাশে রাইফেল বা বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছে বিগ রিয়ান। যৌবনে নানান দেশে গিয়ে শিকার করেছে সে। ছাতে ঝুলছে সত্যিকারের ওয়েল্স্ ফার্গো স্টেজকোচের চাকা। ওটা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ঝাড়বাতি। বিশাল লিভিংরুমের এক অংশ বুনো পশ্চিমের সেলুনের বার-এর মত। ঘরের দেয়ালে ঝুলছে চেরোকি বর্শা, টওমাহক, কাউবয়দের পুরনো সিক্সগান ও উইনচেস্টার রাইফেল। ছোটবেলা থেকে প্রাচীন এ আবহে বড় হয়েছে বলে এই ঘরের সৌন্দর্য দ্বিতীয় বার দেখতে গেল না অ্যারন কনার। বসে পড়ল চামড়া মোড়া গভীর এক কাউচে। চারপাশের চেয়ারে বসল কেউ কেউ। অন্যরা হেলান দিল দেয়ালে। শুরু হলো মাসুদ রানার জন্যে অপেক্ষার পালা।

পেরিয়ে গেল বহুক্ষণ।

ঘণ্টাদুয়েক পর অধৈর্য হয়ে কাউচ ছেড়ে ঘরে পায়চারি করতে লাগল অ্যারন কনার। বহু দূরে ফাঁকা চোখে চেয়ে আছে বার্ব। গায়ে ঠেস দিয়ে রেখেছে রাইফেল। চুইংগাম চিবুতে চিবুতে মনের আয়নায় জ্যাকির লোভনীয় নগ্নদেহ দেখছে স্ক্যালেস।

‘ড্রিঙ্ক হলে কেমন হয়?’ স্পিরিট কেবিনেটের দিকে তাকাল মাইক হ্যানোভার। এতক্ষণ ধরে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরে এখন গরম লাগছে তার।

‘আমি হলে ভুলেও ড্রিঙ্ক করতাম না,’ মহাশূন্য থেকে চোখ না সরিয়ে বলল বার্ব। ‘সতর্ক থাকতে হবে।

ঘরে আবারও নামল নীরবতা। ধীরে ধীরে পেরোতে লাগল সময়। এক সময়ে পশ্চিমে ঢলে গেল সূর্য। আকাশে ছড়িয়ে দিল সোনালি-লাল আলো। তারপর আকাশ হলো বেগুনি। একটু পর নেমে আসবে সন্ধ্যার কুচকুচে কালো আঁধার।

‘ব্যাটা এল না কেন?’ নিজেকে প্রশ্ন করল ববি বাইবেল। জবাব দিল না কেউ।

আরও কিছুক্ষণ পর নামল সন্ধ্যার আঁধার। আকাশে মিটমিট করতে লাগল লাল-নীল-সাদা কোটি নক্ষত্র। এখনও স্পিয়ারহেড র‍্যাঞ্চে পা রাখেনি মাসুদ রানা। যাতে বাড়ির ভেতরে চোখ বোলাতে না পারে সে, সেজন্যে টেনে দেয়া হলো ঘরের পর্দা। কোথায় যেন হাহাকার করল নিঃসঙ্গ এক কয়োটে।

থমথমে নীরবতায় অস্বস্তি নিয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল অফিসার হ্যানোভার ও অ্যামেট। এতক্ষণ অপেক্ষা করতে . হবে সেটা ভাবতে পারেনি তারা। টেবিলে গরম খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে তাদের স্ত্রীরা। খাবার শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ টিভি দেখে শুয়ে পড়ত তারা।

‘ব্যাটা আসলে ভয় পেয়েছে,’ অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভাণ্ডল অ্যারন কনার। ‘হয়তো আর এখানে আসবেই না?’

‘না, সে আসবে,’ চাপা শ্বাস ফেলল বার্ব।

আরও পঁচিশ মিনিট পর পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, হেডলাইট জ্বেলে র‍্যাঞ্চ হাউসের দিকে এগিয়ে আসছে একটা গাড়ি।

সবাই ভিড় করল জানালার কাছে। কান পেতে শুনল ভিএইট ইঞ্জিনের ভারী ঘড়ঘড়ে গর্জন।

এসেছে,’ সবাইকে সতর্ক করে দিল রিগবি, ‘এবার সবাই তৈরি হও!’

তেপ্পান্ন
‘ব্যাটার বুকে কি ভয় বলে কিছুই নেই? অবিশ্বাস্য!’ বাড়ির দিকে গাড়ির আলো এগিয়ে আসতে দেখছে র‍্যাণ্ডি পার্সন। ‘সরাসরি আসছে খুন হওয়ার জন্যে!’

‘ওর হয়তো মাথা নষ্ট হয়ে গেছে,’ বলল চিফ রিগবি। হোলস্টার থেকে নিল কোল্ট পাইথন রিভলভার। শ্বাস ফেলে বলল ‘এসো, এবায় কাজ শেষ করি!

স্লিক স্পিক শব্দে পাম্প করে রেমিংটন শটগানের চেম্বারে গুলি ভরল ববি বাইবেল। শব্দটা শুনলে যে-কারও গলা শুকিয়ে যাবে। স্ক্যালেস নিজের এম ফোর কারবাইনের সেফটি ক্যাচ অফ করল। চট করে দেখল বন্ধু বার্বের মুখ। দু’জনই একই কথা ভাবছে। আজ শালার পুলিশের বাচ্চারা একই দলে লড়লেও, এমন কথা নেই যে দু’দিন পর ওদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না তারা। ওরা খুন হলে বাহাদুরির ভঙ্গি নেবে, যেন উদ্ধার করেছে গোটা মানব সভ্যতাটাকে।

আরেক জানালার পর্দা ফাঁক করে চেয়ে আছে অ্যারন। বিড়বিড় করল, ‘লোকটা করছেটা কী?’ র‍্যাঞ্চ হাউসের কাছে চলে এল সাদা আলো। আর তখনই প্রথমবারের মত গাড়িটা চিনতে পারল অ্যারন। এক সেকেণ্ডে শুকিয়ে গেল তার গলা।

গাড়িটা ডজ র‍্যাম!

মাসুদ রানা আসেনি!

বাড়ি ফিরেছে বিগ রিয়ান!

‘হায়, ঈশ্বর!’ বিড়বিড় করে বলল অ্যারন। অবশ হয়ে গেছে তার সারাশরীর। বাড়ির বাইরে এসে থামল পিকআপ ট্রাক। দপ করে নিভে গেল হেডলাইট। বন্ধ হলো ইঞ্জিন। ক্যাব থেকে নেমে এল বুড়ো রিয়ান। ক্যানসাস থেকে ড্রাইভ করে এসেও মোটেই আড়ষ্ট নয় তার হাত-পা। বুড়োর পরনে জিন্সের প্যান্ট, ডেনিম জ্যাকেট, পায়ে কাউবয় বুট। কাঁধে ফিতায় ঝুলছে ব্যাগ। উঠনে চার চারটে গাড়ি দেখে সেদিকে চেয়ে রইল সে। তার দু’ভুরু কুঁচকে যেতে দেখল অ্যারন। এর মানে এবার আসছে ভয়ঙ্কর ঝড়!

মস্ত ঢোক গিলে বিড়বিড় করে বলল অ্যারন, ‘সর্বনাশ!’

ধুপ শব্দে খুলে গেল বাড়ির সামনের দরজা। জোরে বন্ধ করা হলো কবাট। করিডরে পায়ের জোরালো আওয়াজ। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পর লিভিংরুমে ঢুকল বিগ রিয়ান। পাকা ভুরুর তলা দিয়ে কঠোর চোখে দেখছে একমাত্র ছেলেকে। বাড়ির ভেতরে সশস্ত্র কয়েকজনকে দেখে রেগে কাঁই হয়ে গেছে সে।

‘ভেবেছি তুমি টোপেকাতে আছ,’ মগজে আর কোন কথা এল না অ্যারনের।

‘এখানে এসব কী হচ্ছে?’

‘চলো, পাশের ঘরে যাই,’ বাবার কনুই ধরে দরজার দিকে নিয়ে যেতে চাইল অ্যারন। বিগ রিয়ানের গলার ভেতর থেকে বেরোচ্ছে ঘড়ঘড় আওয়াজ। তাকে প্রায় জোর করেই লিভিংরুম থেকে বের করে উল্টোদিকের ঘরে ঢুকল অ্যারন। এ-ঘর ব্যবহার করা হয় টিভি লাউঞ্জ হিসেবে।

ভীষণ গম্ভীর হয়ে বিগ রিয়ান বলল, ‘কাজ শেষ, তাই আগেই বাড়ি ফিরেছি। আর এখন দেখছি এখানে জড় করেছ একদল সশস্ত্র শয়তান বাঁদর। আর সেজন্যে এবার যৌক্তিক কোন ব্যাখ্যা দিতে হবে তোমাকে। শুনি তোমার কী বলার আছে, অ্যারন?’

‘এসবের সঙ্গে তোমার কোন সম্পর্ক নেই, বাবা। জরুরি কাজে এদেরকে ডেকেছি। তুমি এবে জড়িয়ে গেলে যখন- তখন ক্ষতি হবে তোমার।’

‘ফালতু কথা বাদ দাও, অ্যারন। তোমার আবার কীসের জরুরি কাজ? পোঁদে কাজ গুঁজে দিলেও তো কিছুই তোমার মাথায় গিয়ে ঢোকে না!’

‘বাবা, একটু বোঝার চেষ্টা করো…

‘যা বোঝার বুঝেছি! দেরি না করে এক্ষুণি তোমার লোক নিয়ে বিদায় হও!’

রাগে লালচে হয়ে গেল অ্যারনের মুখ। ‘তা এখন সম্ভব নয়।’

‘আমার কথার ওপর দিয়ে কী বললে, অ্যারন?’

‘বলেছি, সেটা এখন সম্ভব নয়। আমরা জরুরি মিটিং করছি। এরা আমার সহযোগী।’

‘সহযোগী?’ দাঁতে দাঁত পিষল বিগ রিয়ান। খপ করে ধরল অ্যারনের বাহু। ‘কীসের সহযোগী? আমাকে গাধা বলে মনে করো তুমি? ভেবেছ সস্তা ক’টা বাটপার দেখলে তাদেরকে আমি চিনতে পারি না?’

‘লিভিংরুমে তুমি কিন্তু নিজেই দেখেছ চিফ অভ পুলিশকে।

‘হ্যাঁ! তো কী? আমাকে অন্ধ মানুষ বলে মনে হয় তোমার? ভাবছ, কিছুই বুঝতে পারছি না?’ অ্যারনের বাহুতে আঁকশির মত এঁটে বসেছে বৃদ্ধের আঙুলগুলো।

‘হাত ছাড়ো!’ হ্যাঁচকা টানে বাহু ছুটিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল মেয়র।

‘কেন এখানে লোক জড় করেছ, কাপুরুষ হারামজাদা?’ চাপা স্বরে বলল বিগ রিয়ান। ‘আবার কোন্ ঝামেলায় জড়িয়ে গেছ? এজন্যে তোমাকে এত কষ্ট করে বড় করেছি, যাতে একটা ছেঁচড়া ক্রিমিনাল হয়ে ওঠো?’

সত্য কথা হঠাৎ করে শুনে মগজে আগুন ধরে গেল অ্যারনের। হিসহিস করে বলল সে, ‘তোমার সময়ে তুমি ছিলে কিংবদন্তী! তাই সহজেই এসব বলতে পারছ! কিন্তু একবার ভেবে দেখেছ, এ জীবনে আমি কী পেয়েছি? মাথার ওপরে তোমার মত এক দানব থাকলে আমি নিজে কী করে নাম করব? এটা কখনও তোমার মাথায় ঢুকেছে?’

‘ছোটবেলা থেকেই তুমি কাপুরুষ আর বাটপার,’ রাগত স্বরে বলল বিগ রিয়ান। ‘আর এখন দেখছি আমার বাড়িতে বসে গোপনে খুন করতে চাও সাহসী কাউকে! মানুষটাকে অ্যাম্বুশ করবে, এটাই তোমার যোগ্যতা ঠিক কি না!’

‘আমি…’

‘এটাকেই ব্যবসা বলে চালিয়ে দিতে চাইছ? জবাব দাও, আমার চোখের আড়ালে কী করে বেড়াচ্ছ তুমি! মনে রেখো, এখন থেকে আমার কাছ থেকে একফোঁটা সাহায্য পাবে না! রাগে বিস্ফারিত হয়েছে বৃদ্ধের দু’চোখ। ‘এমন বাড় বেড়েছ যে ধরে নিয়েছ বেয়াদবি করে পার পেয়ে যাবে?’

‘বাবা, তুমি কিন্তু নিজেই বেশি বাড়াবাড়ি করছ!’

‘নষ্ট হয়ে গেছে তোর আত্মা, খেঁকিয়ে উঠল বিগ রিয়ান। ‘আমি মনে করি না যে তোর মাথায় ঘোড়ার গুয়ের সমান বুদ্ধি আছে! কখনও ভেবেছিস, আমাদের বংশ কোথা থেকে এসেছে সেটা ফাঁস হয়ে গেলে মুখেও থুতু দেবে না কেউ?’ মস্ত দু’মুঠো বাগিয়ে অ্যারনের দিকে এক পা এগোল বৃদ্ধ।

এতদিন পর বাবার হাতে আবার মার খেতে হবে ভেবে তিরিক্ষি হয়ে গেল অ্যারনের মেজাজ। হ্যাঁচকা টানে হোলস্টার থেকে বের করল রিভলভার। ‘সেই ছোটবেলা থেকেই দেখছি যে নিজেই তুমি অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করছ! বহু কিছু থেকে বঞ্চিত করেছ আমাকে! খবরদার! আর এক পা-ও সামনে বাড়বে না!’

হলদে দাঁত খিঁচিয়ে ছেলেকে পেটাতে সামনে বাড়ল বিগ রিয়ান। ‘পিটিয়ে তোর হাড় ভাঙব, হারামজাদা ছেলে!’

‘আর এক পা-ও এগোবে না! পিছিয়ে যাও!’ বাবার বুকের দিকে অস্ত্রের নল তাক করে হ্যামার কক করল অ্যারন।

তিক্ত চোখে অস্ত্রটা দেখে নিয়ে আরেক পা এগোল বিগ রিয়ান। এখন তাকে আট ফুটি দানব বলে মনে হচ্ছে অ্যারনের। তার বাবা যেন গ্র্যানিটের বিশাল এক পাহাড়। লাখ লাখ টন ওজন নিয়ে ঝুঁকে আসছে চাপা দেবে বলে। ‘আমি তোকে পেটালে তুই কী করবি, শুয়োর কোথাকার? গুলি করবি? বুড়ো একলোককে? সাহস থাকলে সেটাই কর্! জানোয়ার কোথাকার!’ অ্যারনের বুকে বুড়ো আঙুল দিয়ে খোঁচা দিল বৃদ্ধ। ঠেলা মেরে ছেলেকে পিছিয়ে দিল একফুট।

‘আমি কিন্তু তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি, বাবা!’

ভিক্ত চোখে ছেলেকে দেখল বৃদ্ধ বাবা। রাগে লাল হয়ে গেছে তার মুখ। ‘বুড়ো বাপকে রিভলভার হাতে হুমকি দিস্? তোর লজ্জা লাগে না, অ্যারন? যেদিন তোর মা’র পেট থেকে বেরোলি, সেদিনই আমার উচিত ছিল তোকে মেরে ফেলা! তাতে হয়তো শান্তি পেত তোর মা’র আত্মা!’

পেছাতে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে অ্যারনের। আর- সরে যেতে পারবে না। তার হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নেয়ার জন্যে থাবা দিল বিগ রিয়ান।

আর তখনই ‘বুম!’ শব্দে গর্জে উঠল রিভলভার।

ম্যাগনাম বুলেট যেন শুষে নিল ঘরের বাতাস; হতবাক হয়ে তিনসেকেও ছেলেকে দেখল বিগ রিয়ান। যেন বিশ্বাস করতে পারছে না যে তার বুকে গুলি করেছে নিজের ছেলে! চোখ নিচু করে দেখল বুকের ফুটো দিয়ে ছিটকে বেরোচ্ছে টকটকে লাল রক্ত। এক পা পিছিয়ে গেল বৃদ্ধ। ডান হাঁটু ভাঁজ হলো তার। তারপর অন্য পা। কাত হয়ে পলিশ করা কাঠের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল দানবীয় মানুষটা। পতনের ধুপ্ শব্দটা গুলির আওয়াজের চেয়ে কম বলে মনে হলো না অ্যারনের। বাবার দিকে তাকাল সে, পরক্ষণে দেখল হাতের রিভলভার।

দড়াম করে খুলে গেছে আধভেজানো ঘরের দরজা। প্রায় দৌড়ে ভেতরে ঢুকে মেঝের দিকে তাকাল বার্ব। নিথর হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে বিগ রিয়ান।

‘আমি কিন্তু খুন করিনি,’ নিজের গলা অচেনা লাগল মেয়রের। ‘যা করার করেছে মাসুদ রানা! তোমরা আদালতে সেটা বলবে, বুঝতে পেরেছ? র‍্যাঞ্চ হাউসে ঢুকে নিরস্ত্র এক বুড়ো মানুষকে খুন করেছে সে! মনে রেখো, তুমি এসবের চাক্ষুষ সাক্ষী!’

চুপ করে থাকল বার্ব। কী বলবে মাত্র ভাবতে শুরু করেছে, এমন সময় উল্টোদিকের ঘর থেকে এল গুলির বিকট আওয়াজ।

চুয়ান্ন
ঘুরে করিডরে বেরিয়ে এল বার্ব। পেছনেই অ্যারন কনার, হাতে উদ্যত রিভলভার। উল্টোদিকের ঘরে ঢুকে তারা দেখল, সোফা ও চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে সবাই। সবার চোখ এখন উঠনে। জানালার সামনে আছে ববি বাইবেল, হাতে পাম্প অ্যাকশন শটগান। অস্ত্রটার নলের মুখ থেকে বেরোচ্ছে ধূসর ধোঁয়া। গুলি ফুটো করেছে জানালার কাঁচ।

‘এখানে কী হয়েছে?’ জানতে চাইল বার্ব।

জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজাল বাইবেল। জানালার দিকে তাক করেছে বন্দুক। নিচু গলায় বলল, ‘আমি বাইরে কী যেন দেখেছি। নড়ে উঠেই সরে গেল।’

‘তাই সঙ্গে সঙ্গে ঘাবড়ে গিয়ে গুলি করেছ,’ বলল বার্ব। ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল বাইবেল। ‘তা নয়। সত্যিই কাউকে দেখেছি। মাত্র একসেকেণ্ডে সরে গেছে।’

‘হয়তো কোন ঘোড়া,’ বিড়বিড় করল রিপার রিগবি।

পিস্তল হাতে জানালায় গিয়ে দাঁড়াল বার্ব। পর্দা সরিয়ে ফাটা কাঁচের ওদিকে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। ভাবছে, এরা ভয় পেয়ে ছায়া দেখলেও গুলি করতে শুরু করেছে। অবশ্য বাইবেলের কথা সঠিকও হতে পারে।

বাইরের পরিবেশ থমথমে। মাসুদ রানা সত্যি এসে থাকলে বাড়ির যে-কোন জায়গায় হামলা করবে সে।

‘পাশের ঘরে কার ওপরে গুলি চালালেন?’ অ্যারনের কাছে জানতে চাইল রিগবি।

‘বাদ দিন,’ কড়া চোখে তাকে দেখল বার্র। ‘এখন থেকে নিচু গলায় কথা বলবেন।’ ঘরের সবাই বুঝে গেল, এখন আর নেতৃত্বে নেই পুলিশ চিফ। একপলকে বার্বের হাতে চলে গেছে দায়িত্ব। ‘মর্গ্যান, বাতি নিভিয়ে দাও। আর তোমরা…’ ববি বাইবেল, র‍্যাণ্ডি পার্সন আর ক্যাল অ্যামেটের দিকে তাকাল সে। ‘তোমরা যাবে বাড়ির সামনের উঠনে। ছায়া থেকে বেরোবে না। কোথাও কোন নড়াচড়া দেখলে দেরি না করে গুলি করবে। তার ফলে যদি গোলাগুলি শুরু হয়, ভুলেও সরে যাবে না পযিশন থেকে।’ মর্গ্যান পামার, গ্যারি লুম্যান ও ম্যাল স্টিভেন্সের দিকে ফিরল বার্ব। ‘এদিকে বাড়ির পেছনদিকে চোখ রাখবে তোমরা।’

‘আমি এই ঘরের জানালার সামনে থাকছি,’ মিচু গলায় বলল রিপার রিগবি। ‘কেউ ভেতরে ঢুকতে চাইলে গুলি করে ফেলে দেব।’

বাতি নিভিয়ে দিল মর্গ্যান পামার। জানালার পর্দা ভেদ করে ঢুকেছে আবছা জ্যোৎস্না। মৃদু আলোয় রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে ছায়াভরা ঘর। চিরকাল অন্ধকারকে ভালবেসে এসেছে বার্ব। এতে সে অভ্যস্ত। ঘুরে হাতের ইশারা করল স্ক্যালেসকে। এবার কী করতে হবে, জেনে গেল ঠাণ্ডা মাথার খুনি। তার বন্ধু নীরবে বুঝিয়ে দিয়েছে, দেখে আসতে হবে আস্তাবলে আছে কি না মেয়েটা।

হ্যানোভারের কাঁধে টোকা দিল স্ক্যালেস। ‘মাইক, আমার সঙ্গে এসো।’

যার যার অস্ত্র নিয়ে বাড়ির সামনের দিক পাহারা দিতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল বাইবেল, পার্সন ও অ্যামেট। ওদিকে বাড়ির পেছনে আস্তাবলের দিকে চলল স্ক্যালেস হ্যানোভার।

নিচু গলায় অ্যারনকে বলল বার্ব, ‘আপনার সঙ্গে থাকতে পারছি না, বস। তাই দেরি না করে কোন ঘরের দরজা বন্ধ করে অপেক্ষা করুন।

‘আমি তা হলে থাকছি বুড়োর স্টাডিরুমে,’ নার্ভাস কণ্ঠে বলল অ্যারন। বুঝে গেছে, বাবাকে খুন করে কী ভয়ঙ্কর কুকীর্তি করে বসেছে। নির্দ্বিধায় নিজেকে ক্ষমাও করে দিল ভাবতে এটা ভাল লাগছে, এখন থেকে গোটা র‍্যাঞ্চ আসলে তার।

‘পথ দেখান,’ তাকে বলল বার্ব।

করিডরে বেরিয়ে চওড়া সিঁড়ির কাছে এল অ্যারন। বার্বকে নিয়ে উঠে এল ওপরতলায়। বিশাল বাড়ির উত্তর দিকের শেষ ঘর বিগ রিয়ানের স্টাডিরুম। জানালা গলে চাঁদের রুপালি আলো পড়েছে বুড়োর ডেস্কে। একটু দূরে ফায়ারপ্লেসের ওপরের দেয়ালে ঝুলছে হরিণের মস্ত এক করোটি।

‘ঘর লক করে রাখবেন,’ বলল বার্ব, ‘গোলাগুলির শব্দ পেলেও বেরোবেন না। কেউ দরজা ভেঙে ঢুকতে চাইলে…’

এক গুলিতে তাকে শেষ করে দেব, কোমরে ঝুলন্ত হোলস্টার থেকে নিয়ে রিভলভার দেখাল অ্যারন। এই অস্ত্র দিয়েই খুন করেছে হিউবার্ট হ্যারল্ডকে।

মেয়র যে ট্রিগার টিপে দিতে দ্বিধা করবে না, ভাল করেই জানে বার্ব। ঘর ছাড়ার আগে বলল, ‘সতর্ক থাকুন।’

‘একবার এদিকে এলে আমার হাতে খুন হবে রানা।’ ঘরের দরজা লক করে ডেস্কের পেছনে গিয়ে বাবার চেয়ারে বসে পড়ল অ্যারন কনার।

.

থমথম করছে র‍্যাঞ্চ হাউস। ঘন কুয়াশার চাদরের জন্যে বাড়ির বাইরের পরিবেশ যেন অন্য জগতের। একটু পর কী ঘটবে উপলব্ধি করে একবার শিউরে উঠল বার্ব। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল নিচতলায়। আর তখনই শুনতে পেল গুলির প্রচণ্ড আওয়াজ। বাইরে গর্জে উঠেছে তিনটে অস্ত্র। একটু থেমে আবারও গুলি হলো দু’বার।

গোলাগুলি শুরু হয়েছে বাড়ির সামনে থেকে।

করিডর পেরিয়ে সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এল বার্ব। মস্ত এক ওক গাছের ছায়ায় লুকিয়ে আছে ক্যাল অ্যামেট আর র‍্যাণ্ডি পার্সন। অন্ধকারমত জায়গাগুলোর দিকে তাক করছে হাতের অস্ত্র। কয়েক ফুট গিয়ে মাটিতে একটা রেমিংটন ৮৭০ পাম্প শটগান দেখতে পেল বার্ব।

ওটা ববি বাইবেলের।

‘বরি কোথায় যেন গেছে,’ হাঁফাতে শুরু করে বলল র‍্যাণ্ডি পার্সন। ‘একটু আগে পাশেই ছিল। তারপর কীভাবে যেন এক সেকেণ্ডে হারিয়ে গেল!’

‘তুমি কিছুই দেখোনি? কিছু না কিছু তো দেখার কথা।’

অন্ধকারে চেয়ে সশব্দে ঢোক গিলল র‍্যাণ্ডি পার্সন। শব্দটা পেয়ে বিরক্ত হলো বার।

‘না, আমরা কিছুই দেখিনি। একসেকেণ্ড আগে ছিল, পরের সেকেণ্ডে দেখি নেই।’

‘মনে হলো ভূত এসে ওকে নিয়ে গেছে,’ বিড়বিড় করল ক্যাল অ্যামেট।

চারপাশের আঁধারে চোখ বোলাল বার্ব। ভাল করেই বুঝে গেছে, পুলিশ অফিসারকে তুলে নিয়ে গেছে মাসুদ রানা। খুব কাছে কোন ঝোপঝাড়ে এখন আছে বাইবেলের লাশ।

বহুবার নানান দেশে মানুষ শিকার করেছে বার্ব। এমন কেউ নেই, যে রক্ষা পেয়েছে ওর হাত থেকে। চোখ সরু করে দূরে তাকাল সে। একসেকেণ্ডের জন্যে তার মনে হলো, কী যেন নড়ে উঠেছে বাড়ির পাশে। নিষ্পলক চোখে ওদিকে চেয়ে রইল বার্ব। বুঝে গেল, সত্যিই একসেকেণ্ড আগে সরে গেছে একটা ছায়া। ওটা কালোর ভেতরে আরও কালো। ভুলেও ফ্ল্যাশলাইট জ্বালতে গেল না বার্ব। অন্ধকার যেমন কাজের, তেমনি হতে পারে মৃত্যুদূত। আর সেজন্যেই আঁধারকে এত ভালবাসে সে।

ঘুরে ফিসফিস করে র‍্যাণ্ডির কানে বলল বার্ব, ‘আমার পিছু নাও। তিনগজ পেছনে থাকবে। আওয়াজ যেন না হয়।’

বাড়ির পাশে যেখানে নড়াচড়া দেখতে পেয়েছে বার্ব, সাবধানে চিতার মত নিঃশব্দে ওখানে চলে গেল সে। পিছু নিয়েছে পার্সন ও অ্যামেট। কয়েক ফুট পেছনে পার্সনের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছে বলে মনে হলো বার্বের। পেছনে শুকনো একটা ডাল ভেঙে যেতেই গাল কুঁচকে মনে মনে গালি দিল পুলিশের লোকদেরকে। পেছনে যারা আছে, কেউ ইউএস স্পেশাল ফোর্সের সৈনিক বা অফিসার নয়। পুলিশবাহিনীর ওপরে বিরক্ত হয়ে ভাবল বার্ব, এই শালারা নিজেদের জাহির করতে পারলে খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে যায়। আর আওয়াজ করে গণ্ডারের মত। ঘাড় কাত করে কঠোর চোখে পেছনে তাকাল বার্ব। অন্ধকারে দেখতে পেল পার্সনের ফ্যাকাসে মুখ। ঠোঁটের ওপরে আঙুল রেখে সতর্ক করল বার্ব। জবাবে নীরবে মাথা নেড়ে পার্সন যেন বুঝিয়ে দিল, শব্দটা আসলে তার করা নয়।

সরু হলো বার্বের দু’চোখ। পার্সনের কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল। একটু আগেও ওদিকে ছিল ক্যাল অ্যামেট। কিন্তু এখন উধাও হয়েছে সে!

‘ ঘুরে পার্সনকে পাশ কাটিয়ে ছয়গজ পিছনে গিয়ে থেমে গেল বার্ব। ধুলোর ভেতরে নাক গুঁজে পড়ে আছে অ্যামেট। বসে পড়ে পুলিশ অফিসারকে ধরে চিত করল বার্ব। ভেঙে দেয়া হয়েছে লোকটার কণ্ঠনালী আর ঘাড়।

বুকের ভেতরে শীতল অনুভূতি হচ্ছে বার্বের। বহুদিন এমন ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়নি সে। চোখ বোলাল চারপাশের আঁধারে। উল্টে যেন ওকেই দেখছে ঘন সব ছায়া।

‘আমি জানি, তুমি এদিকেই কোথাও আছ,’ মনে মনে বলল বার্ব।

অ্যামেটের লাশ দেখে বড় করে শ্বাস ফেলল পার্সন। বিড়বিড় করে বলল, ‘হায়, যিশু! কোন শালা….

‘রানা আমাদেরকে উল্টো শিকার করছে,’ বলল বার্ব।

হঠাৎ করে বাড়ির ভেতরে জ্বলে উঠল একটা বাতি।

র‍্যাণ্ডি পিছু নিল কি না, সেদিকে নজর না দিয়ে দৌড়ে র‍্যাঞ্চ হাউসের সদর দরজার কাছে গেল বার্ব। করিডরে জ্বলছে বৈদ্যুতিক হলদে আলো। গুলি করে লিভিংরুমের যে জানালার কাঁচ ভাঙা হয়েছে, সেখানে অন্ধকারে বসে পাহারা দিচ্ছিল পুলিশ চিফ রিগবি। কিন্তু সে জ্বেলে দেয়নি বাতি।

আর্মচেয়ারে বসে আছে লোকটা। পুরনো এক চেরোকি টওমাহক কুঠার প্রায় দু’ভাগ করে দিয়েছে তার করোটি। রিগবির পায়ের কাছে জড় হচ্ছে অগভীর রক্তের পুকুর। গাঢ় লাল রঙের তরল চিকচিক করছে হলদে আলোয়।

বার্ব টের পেল, ঘরে এসে ঢুকেছে র‍্যাণ্ডি। পুলিশ অফিসারের মুখ চিরে বেরোল চাপা আর্তনাদ। এমন ভয়ানক দৃশ্য দেখার জন্যে মানসিকভাবে তৈরি ছিল না সে।

‘এখান থেকে কোথাও সরে যেয়ো না,’ তাকে বলল বার্ব। মুখ হাঁ করে তার চিফের লাশ দেখছে লোকটা। তাকে পাশ কাটিয়ে করিডরে বেরিয়ে এল প্রাক্তন মিলিটারি অফিসার। বাতি নিভিয়ে চলে গেল সিঁড়ির মুখে। নিঃশব্দে উঠল দোতলায়। জোরে নক ক ল স্টাডিরুমের দরজায়।

‘বাইরে কে!’ ভেতর থেকে এল ভীত কণ্ঠস্বর।

চেক করে দেখলাম, বস। ভেতরেই থাকুন।

অ্যারন আর কিছু বলার আগেই নিচতলায় ‘বুম!’ শব্দে গর্জে উঠল আগ্নেয়াস্ত্র। ঘুরে এক দৌড়ে সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেল বার্ব। ঝড়ের বেগে নেমে এল নিচতলায়। সতর্ক পায়ে ঢুকে পড়ল লিভিংরুমে।

আগের জায়গা থেকে সরে গেছে র‍্যাণ্ডি। বারকাউন্টারের কাছে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। তার অর্ধেক মাথা এখন আর নেই। টপটপ করে রক্ত পড়ছে কার্পেটে

করিডরে পায়ের আওয়াজ শুনে চরকির মত ঘুরল বার্ব। রাইফেল তাক করল দরজার দিকে। কিন্তু স্টিভেন্স, লুকম্যান’ আর মর্গ্যানকে ঘরে ঢুকতে দেখে নামিয়ে নিল অস্ত্রটা।

‘শালা আবার মরল কী করে!’ পুলিশ অফিসারের লাশ দেখে নাক কুঁচকাল লুকম্যান।

‘আমি না তোমাদেরকে বলেছি পযিশন থেকে না সরে যেতে,’ বিরক্ত কণ্ঠে বলল বার্ব। ‘টনি কোথায়?’

কালবেলা – ৫৫ (মাসুদ রানা)

অন্ধকার আস্তাবলে সারি সারি ঘোড়া রাখার স্টল। শার্টের পকেট থেকে তালার চাবি নিয়ে হাসল স্ক্যালেস। অ্যারন ভাল করেছে তাকে মেয়েটার জেলার করে। ফ্ল্যাশলাইটের আলো জ্বেলে আস্তাবলের ভেতরের ছোট ঘরটার প্যাডলক তালা খুলল সে। দরজা সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিল ভেতরে। আদর-ভরা কণ্ঠে বলল, ‘আমি এসে গেছি, ডার্লিং! এবার দু’জন মিলে দারুণ মজা করব! শুধু তুমি আর আমি!’’

ছোট ঘরের কোণে সাদা চুনকাম করা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে জ্যাকি। দু’হাতে জড়িয়ে ধরেছে ভাঁজ করা দুই হাঁটু। স্ক্যালেসকে দেখে ভয়ের ছাপ পড়ল ওর মুখে। কড়া আলোয় কুঁচকে গেছে চোখ। জ্যাকির মুখে আলো ফেলে দাঁত বের করে হাসল স্ক্যালেস। বসে বসে কাঁদছে মেয়েটা। বাহ্, ভাল তো!

‘আগেই তো বলেছি, আবার ফিরে আসব!’ থুতনির নিচে ফ্ল্যাশলাইট গুঁজে ভয়ানক শয়তানি হাসি দিল স্ক্যালেস। ঘাড় ফিরিয়ে মাইক হ্যানোভারকে বলল,

হ্যানোভারকে বলল, ‘কিছুক্ষণ এখানে থাকছি। তুমি চোখ-কান খোলা রাখবে। নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ কী করতে বলেছি?’

‘জানতাম না আপনি কাজের ভেতরেও ফুর্তি করেন, ব্রাদার,’ চোখ টিপে হাসল হ্যানোভার।

‘আমি শালা তোমার ব্রাদার নই,’ কড়া চোখে তাকে দেখল স্ক্যালেস। ‘অবশ্য আমার কাজ শেষে তোমাকেও সুযোগ করে দেব। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’ ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিল সে। আলো ফেলল জ্যাকির চোখে-মুখে। ‘যাক্, এবার আমরা একা হলাম!’

চোখ পিটপিট করে উঠে দাঁড়াল জ্যাকি। জানে না এখন কী করা উচিত। সরে যাওয়ার আগেই ছুটে গিয়ে ওর ঘাড়ের পাশে জোরালো এক রদ্দা মারল স্ক্যালেস। পরক্ষণে তার ডানহাতি ঘুষি নামল জ্যাকির বাম গালে। মেয়েটা জ্ঞান হারিয়ে টলে পড়ে যাচ্ছে দেখে একহাতে ধরে ফেলল স্ক্যালেস। আস্তে করে শুইয়ে দিল ঘরের মেঝেতে। বিড়বিড় করে বলল, ‘যাক, এবার শুধু ফুর্তি! তুমি আর আমি! দেখি তো তোমার ভেতরে কেমন মজা পাই!’

ভেতরে সব ঠিক আছে তো? ঘরের বাইরে থেকে বলল মাইক হ্যানোভার।

‘অ্যাই, ‘শালা, চোপ!’ ধমক দিয়ে অচেতন মেয়েটার পাশে বসে পড়ল স্ক্যালেস। কাঁধ থেকে নামিয়ে মেঝেতে রেখেছে এম ফোর কারবাইন। ফ্ল্যাশলাইট এমনভাবে তাক করল, যাতে আলো সরাসরি পড়ে জ্যাকির দেহের ওপরে। কোমরের খাপ থেকে নিল ইউএসএমসি কা-বার নাইফ।

ভীতু মেয়েদেরকে জোর করে ধর্ষণ করার আগে ছোরা দেখিয়ে দারুণ মজা পায় স্ক্যালেস। কা-বারের ডগা দিয়ে পটাপট ছিঁড়ে দিল জ্যাকির ব্লাউস। একহাতে কাপড় সরিয়ে খুশি হয়ে ভাবল, এমন শ্বেত-পর্বত-চূড়াই তো তার চাই!’

ঝুঁকে জ্যাকির স্তনবৃত্তে কামড় দিতে গিয়েও থমকে গেল সে। বাইরে র‍্যাঞ্চ হাউসে গুলির আওয়াজ।

‘ওদিকে গোলাগুলি, জোর গলায় বলল হ্যানোভার।

ঘাড় কাত করে খেঁকিয়ে উঠল স্ক্যালেস, ‘চোপ, শালা! আরেকবার কথা বললে তোর পোঁদ দিয়ে ভরে দেব আমার কা-বার নাইফ!’ আবারও জ্যাকির স্তনের দিকে ঝুঁকল সে। এখন দুনিয়া নিয়ে ভাবার সময় নয়। বাইরে যা হবে সব সামলে নেবে বার্ব।

ব্লাউস ছিঁড়ে ফালি করে জ্যাকির মুখ বেঁধে দিল সে। খুব ভয় পেয়ে কাঁপতে শুরু করেছিল মেয়েটা। আর সেজন্যে এখন জ্ঞান ফিরে পেলেও ছোরা দেখিয়ে আগের মত মজা পাবে না স্ক্যালেস। খাপে কা-বার নাইফ রেখে দূরে শুনতে পেল মাত্র একটা গুলির আওয়াজ। শব্দটা এসেছে র‍্যাঞ্চ হাউস থেকে। দরজার কাছে হ্যানোভারের নার্ভাস পায়চারির শব্দ শুনে একটু থমকে গেল প্রাক্তন মেজর। পরক্ষণে আনমনে হাসল সে। পুলিশের বাচ্চার আক্কেল হয়েছে। এখন আর কথা বলে বিরক্ত করছে না!

‘সুন্দরী, মরে তো গেল তোমার মাসুদ রানা!’ চাপা স্বরে বলল স্ক্যালেস। ‘এবার পা-দুটো ফাঁক করে নিয়ে একটু ঘুরে আসি তোমার গভীর পুকুর থেকে!’

অজ্ঞান জ্যাকির উরুতে হাত বোলাল সে। ধীরে ধীরে হাত উঠে এল স্তন পেরিয়ে কাঁধ ও গলায়। ভাবছে স্ক্যালেস: ধর্ষণ করার পর অচেতন অবস্থায় গলা টিপে মারব? আগে কখনও এই কাজটা করিনি। বা কেমন হবে লাশের সঙ্গে যৌন মিলন করলে? নাকি জ্ঞান ফিরলে জোর খাটিয়ে ভোগ করাই অনেক বেশি মজার? কাজ শেষ করে হাসতে হাসতে গলা টিপে মারব? নাকি ছোরা দিয়ে কেটে দেব ওর গলা?

মজার এই জগতে আসলে কত কিছুই না করা যায়!

প্রতিদিন এমন কত না চিন্তা আসে স্ক্যালেসের মগজে। চাইলে যা খুশি করতে পারে সে। সত্যি কেউ নেই বাধা দেবার।

না, এই সুন্দরীকে খুন করে পরে ভোগ করার দরকার নেই। কাজ শেষে ছোরা দিয়ে ফাঁক করে দেবে ওর গলা। জ্যাকির ঠোঁটে চুমু দিতে গিয়েও পিছিয়ে এল স্ক্যালেস। চেইন ও বোতাম খুলে নামিয়ে দিল মেয়েটার জিন্সের প্যান্ট। ভেতরে গোলাপি রঙের জাঙ্গিয়া দেখে শিরশির করতে লাগল স্ক্যালেসের তলপেট। একহাতে টান দিয়ে নামাল জ্যাকির জাঙ্গিয়া। ফিসফিস করে বলল, ‘উহ্, আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারছি না! তুমি তো এটা জানো না, আমার অস্ত্রটা পুরো নয় ইঞ্চি!’

‘আরেহ্, বাইরে কী যেন…’ বলে দরজার কাছে চুপ হয়ে গেল মাইক হ্যানোভার।

দরজার কবাটে ধুপ্ ধুপ্ করে চাপড় দিচ্ছে সে।

‘মর্, শালা! ধমকে উঠল স্ক্যালেস। ‘কুত্তার বাচ্চা, তোকে না বলেছি ভুলেও বিরক্ত করবি না!’

খুব জোরে কী যেন লাগল দরজায়। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মেঝে থেকে ফ্ল্যাশলাইট নিল স্ক্যালেস। ছুটে গিয়ে খুলল দরজা। এতই রেগে গেছে যে স্থির করেছে, ঘুষি মেরে হ্যানোভারের গোটা দশেক মাড়ির দাঁত খসিয়ে দেবে।

কিন্তু ঘরের দরজার কাছে নেই লোকটা।

আস্তাবলে বেরিয়ে এসে ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় স্টলগুলো এক এক করে দেখতে লাগল স্ক্যালেস। নিচু গলায় ডাকল, ‘কী রে, কই গেলি, শালা পুলিশের বাচ্চা!’

কোন জবাব নেই।

লোকটা বোধহয় গেছে অন্যদেরকে সাহায্য করতে।

‘মর্, শুয়োরের বাচ্চা!’ বিড়বিড় করে বলল স্ক্যালেস। মনে মনে ভেবেছিল মেয়েটাকে খুন করে দু’ভাগ করে দেবে পুলিশ অফিসারের গলা। একটু হতাশ হলো। কয়েক ঘণ্টা ধরেই হামবড়া ভঙ্গি করছিল হারামজাদা। তার ওপরে শালা আবার পুলিশ। বহুদিন আইনরক্ষাকারী কাউকে খুন করে না সে। আগেও মনে হয়েছে, সাধারণ মানুষের চেয়ে পুলিশকে খুন করা অনেক বেশি মজার। তার ওপর সে যদি হয় দুর্নীতিপরায়ণ, তো কথাই নেই। মাইক হ্যানোভার শালা মরলে এবার কে ডাকবে পুলিশ? -মনে মনে হাসল স্ক্যালেস।

আবার এসে ঢুকল ছোট ঘরটার ভেতরে। আর তখনই তার মুখে প্রচণ্ড বেগে ধুম্ করে লাগল কী যেন। চোখের সামনে সাদা আলোর বিশাল এক বিস্ফোরণ দেখল স্ক্যালেস। পরের সেকেণ্ডে চোখের সামনে জ্বলে উঠল কুয়াশাভরা লাখো নক্ষত্র। তার মুখ-নাক থেকে ছিটকে বেরোল রক্তের স্রোত। তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল স্ক্যালেস। তীব্র ব্যথার ভেতরে ভাবতে শুরু করেছে : মাটি ফুঁড়ে কখন এল এই হারামজাদা?

ছাপ্পান্ন
চট্‌ করে পাল্‌স্ দেখে বুঝে গেল রানা, একটু সময় লাগলেও জ্ঞান ফিরে পাবে জ্যাকি। ব্লাউস ছিঁড়ে নিয়ে সরু ফিতা তৈরি করে ওর মুখ বেঁধে দিয়েছে স্ক্যালেস। গিঠ খুলে মেঝেতে ফিতা ফেলল রানা। কেটে গেছে জ্যাকির ঠোঁটের কোণ। জোর ঘুষি লেগে ফুলে গেছে একদিকের গাল। কঠোর চোখে স্ক্যালেসকে দেখে নিয়ে সহজ সুরে বলল রানা, ‘আগে আমাকে দেখলেও মনে হয় না তুমি চেনো আমি কে।’ নলকাটা বন্দুক লোকটার মুখের দিকে তাক করল রানা।

চোখ পিটপিট করে ওকে দেখছে প্রাক্তন মেজর। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সারামুখ। হাসতেই দেখা গেল তার রক্তাক্ত মাড়ি ও দাঁত। নিচু গলায় বলল সে, ‘তুই একটা কুত্তার বাচ্চা!’

‘ভাল করেই জানতাম তোমাকে কোথায় পাব,’ বলল রানা। ‘উঠে দাঁড়াও।’

স্ক্যালেস আহত হলেও অত দুর্বল নয়, চট্ করে উঠে দাঁড়াল। একটু ভাঁজ হয়ে গেছে দুই হাঁটু। লড়াইয়ের জন্যে তৈরি। চাপা স্বরে বলল, ‘চাইলে গুলি করো। ভয় পাই না।’

হাত থেকে ইথাকা বন্দুক ছেড়ে দিয়ে বেল্টের খাপে রাখা ট্রেঞ্চ নাইফ স্পর্শ করল রানা। অবশ্য ছোরা বের না করেই বলল, ‘আগে টের পেয়েছ ছোরার হাতল কতটা শক্ত। আর এবার বুঝবে দেহে ফলা ঢুকে গেলে কেমন লাগে।’

মেঝেতে রক্তমাখা থুতু ফেলল স্ক্যালেস। হাসি-হাসি মুখে বলল, ‘ভেবেছ আগে কখনও আমার গায়ে ক্ষত তৈরি হয়নি?’

এবার শেষবার হবে,’ নিচু গলায় বলল রানা।

‘বিরাট ভুল করলে, মাসুদ রানা,’ রক্তাক্ত হাসি উপহার দিল স্ক্যালেস। ‘তোমাকে তো মাতাল লোক’ বলেই জানি। হাতের মদের বোতলটা এখন কোথায়? যেহেতু লড়তে চাও, কাজেই ছোরা দিয়ে কেটে আলাদা করে দেব হাত-পা। পরে সব গিলিয়ে দেব তোমাকেই। তোমার বান্ধবীর কলিজাটাও গিলতে হবে তোমাকে। অবশ্য তখন সঙ্গে গিলিয়ে দেব কয়েক ঢোক উইস্কি।’

চুপ করে টনি স্ক্যালেসের চোখে চেয়ে আছে রানা।

হাসতে হাসতে হঠাৎ করে খাপ থেকে কা-বার নাইফ নিয়ে দু’পা সামনে বেড়ে একপাশ থেকে সাঁই করে ছোরা চালান স্ক্যালেস। এমন রাউণ্ডহাউস স্ল্যাশ দেখলে ঘাবড়ে যায়’ অনেকে। ছোবল দেয়া র‍্যাটলস্নেকের মতই দ্রুত স্ক্যালেস। তবে একসেকেও আগেই রানা বুঝে গেছে, কী করবে লোকটা। ঝট করে পিছিয়ে যাওয়ায় রানার পেটের তিন ইঞ্চি দূর দিয়ে গেল ছোরার ডগা। আর তখনই হাত বাড়িয়ে খপ্ করে স্ক্যালেসের কবজি ধরেছে রানা। হাতের নার্ভে প্রচণ্ড চাপ পড়তেই আলগা হয়ে গেছে স্ক্যালেসের মুঠো। ঠং শব্দে মেঝেতে পড়ল কা-বার নাইফ। প্রায় একই সময়ে ঘুরে ডান, হাতের কনুই ঠাণ্ডামাথার খুনিটার মুখে গেঁথে দিল রানা। প্রচণ্ড ব্যথা পেয়ে মাতালের মত টলমল করে পিছিয়ে গেল লোকটা। এদিকে সামনে বেড়ে রানা ধরে ফেলল তার কবজি। অন্যহাতে বিদ্যুদ্বেগে খাপ থেকে নিল ট্রেঞ্চ নাইফ। শক্তহাতে ধরেছে নাকলডাস্টারের হাতল। পরক্ষণে ট্রেঞ্চ নাইফের কাঁটাভরা হ্যাণ্ডগার্ড ঠাস্ করে নামল স্ক্যালেসের নাকের ওপরে।

প্রচণ্ড ব্যথায় পাগল হয়ে গেল লোকটা। জানেও না কোথা থেকে এসেছে তীব্র আক্রমণ, ফলে আত্মরক্ষাও করতে পারেনি। তার নাক হয়ে গেছে রক্তে ভরা ছোট একটা স্তূপ। আরেক গুঁতো খেয়ে ভেঙে যাওয়া নাক উঠে গেল বাম চোখের কাছে। পরক্ষণে হ্যাগার্ড মুখের ওপরে নেমে আসতেই খটাং শব্দে ভেঙে গেল স্ক্যালেসের চোয়ালের হাড়। মুখ থেকে ছিটকে বেরোল ভাঙা কয়েকটা দাঁত। একসেকেণ্ডের জন্যে আক্রমণে বিরতি দিচ্ছে না রানা। একেক আঘাতে ভেতরে ডেবে যাচ্ছে স্ক্যালেসের থেঁতলে যাওয়া নাক আর মুখ। কয়েক জায়গায় ভাঙল চোয়াল। ঠাস্ করে ফেটে গেল বাম অক্ষিকোটর। স্ক্যালেসের চেহারাটা হয়ে গেছে রক্ত ও থকথকে মাংসের দলার মত।

তাল সামলাতে না পেরে চিত হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল আমেরিকান স্পেশাল ফোর্সের প্রাক্তন মেজর, প্রায় অচেতন। তার কবজি ধরে রেখেছে রানা। নিজের ভাঁজ করা হাঁটুর ওপরে রেখে উল্টোদিকে জোর মোচড় দিতেই মড়াৎ শব্দে ভাঙল লোকটার বাহুর হাড়। রক্তভরা মুখে আর্তনাদ করতে গিয়ে গড়গড়ার মত আওয়াজ করছে স্ক্যালেস। তার হাত ছেড়ে দিয়ে অন্য হাতটা নিয়ে ভাঙল রানা। আর্তচিৎকার করার সাধ্য নেই ঠাণ্ডামাথার খুনির। তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কিলবিল করছে মেঝেতে। সে যেন গায়ে ডেটল ঢেলে দেয়া কোন মৃতপ্রায় কেঁচো। বুটের হিল দিয়ে তার গলায় জোরে চাপ দিল রানা। শ্বাস আটকে যাওয়ায় বিশ্রী ঘড়ঘড় শব্দ করছে লোকটার কণ্ঠনালী। থেঁতলে যাওয়া ফাটা মুখের দিকে চেয়ে নরম সুরে বলল রানা, ‘এতক্ষণ যে খাতির পেলে, সেটা এসেছে বেলা ওয়েসের তরফ থেকে।

স্ক্যালেসের থুতনির নিচে নরম মাংসে ডগা ঠেকিয়ে গায়ের জোরে ওপরে ছোরা ঠেলল রানা। ভাঙা চোয়াল, জিভ ও তালু ভেদ করে মগজের গভীরে ঢুকল ট্রেঞ্চ নাইফ। গলে যাওয়া চোখদুটো উল্টে গেল নরপশুটার। ক্ষত-বিক্ষত, বিকৃত মুখটা আরেকবার দেখে নিয়ে হ্যাঁচকা টানে ছোরা বের কবল রানা। রক্তাক্ত মগজমাখা ফলা মুছে নিল মৃত মেজরের গেঞ্জিতে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে খাপে গুঁজে রাখল ট্রেঞ্চ নাইফ। রক্তপিশাচটাকে খুন করে বুকে রাগ বা তৃপ্তি কিছুই নেই রানার। ওর শুধু মনে হলো, শেষ করেছে নিজের জরুরি একটা কাজ। স্ক্যালেসের কারবাইনের ট্যাকটিকাল স্লিং বাম কাঁধে ঝুলিয়ে ইথাকা বন্দুক নিয়ে ওটা ঝোলাল ডান কাঁধে।

স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছে অচেতন জ্যাকি। তবে ওকে এখানে রাখা যাবে না। সাবধানে ওকে তুলে নিল রানা। আস্তাবলে বেরিয়ে একবার থামল এক স্টলের সামনে। ওটার ভেতরে রেখেছে স্ক্যালেসের এক সঙ্গীর লাশ। রানা চলে এল চওড়া গেটের কাছে। আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখল ডানে- বামে কেউ নেই। এখন পর্যন্ত ওর হাতে মারা পড়েছে শত্রুপক্ষের ছয়জন। অর্থাৎ র‍্যাঞ্চ হাউসের ভেতরে ও বাইরে এখনও আছে অ্যারনের দলের আরও তিনজন খুনি।

এ-ছাড়া আছে বার্ব। তার ব্যাপারে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে, নিজেকে মনে করিয়ে দিল রানা। আস্তাবল থেকে বেরিয়ে চলে এল র‍্যাঞ্চ হাউসের উঠনে। শিরশির করছে মেরুদণ্ড। যে-কোন সময়ে হয়তো পিঠে এসে বিঁধবে বুলেট। ভাল করেই বুঝে গেছে, কোথায় রাখতে হবে জ্যাকিকে। সেজন্যে আগেই সংগ্রহ করেছে চাবি। জায়গাটা তেমন নিরাপদ না হলেও আপাতত আর কিছু করার নেই। জ্যাকিকে কাঁধে রেখে অন্যহাতে ডজ র‍্যাম পিকআপের দরজা খুলল রানা। মেয়েটাকে শুইয়ে দিল পেছনের সিটে। জানালার টিন্টেড কাঁচ কুচকুচে কালো, দিনের আলোতেও জ্যাকিকে দেখতে পাবে না কেউ।

একটু পর জ্ঞান ফিরলে অচেনা জায়গায় হয়তো ঘাবড়ে যাবে বেচারি। তবে ওকে সব বুঝিয়ে বিদায় নেবার মত সময় এখন রানার হাতে নেই। নিঃশব্দে গাড়ির দরজা আটকে লক করে কি ফব-এর বাটন টিপে ডিসআর্ম করল অ্যালার্ম সিস্টেম। নইলে জ্যাকি জেগে উঠে দরজা খুলতে গেলে কর্কশ আওয়াজে বেজে উঠবে সাইরেন।

‘একটু অপেক্ষা করো,’ জ্যাকি কিছুই শুনছে না জেনেও নিচু গলায় বলল রানা। উঠন পেরিয়ে আবারও গিয়ে ঢুকল র‍্যাঞ্চ হাউসে। করিডরে থেমে উঁকি দিল লিভিংরুমের ভেতরে। মগজের ভেতরে চেরোকি কুঠার নিয়ে আর্মচেয়ারে বসে আছে ধূসর চুলের লোকটা। এ-বাড়িতে অস্ত্রাগার গড়ে তুলেছে বিগ রিয়ান কনার। বারের কাছে রক্তের পুকুরে পড়ে আছে অর্ধেক মাথা উড়ে যাওয়া একলোক। আশপাশে আর কেউ নেই। আবার করিডরে বেরিয়ে এল রানা। ওর ডানের দরজার তলা থেকে এসেছে রক্তের স্রোত। দরজাটা সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিল রানা। রক্তের ভেতরে পড়ে আছে বিশালদেহী বয়স্ক এক লোক। তার চেহারার সঙ্গে অ্যারন কনারের অনেক মিল। বাড়ির ভেতরে ঢুকে প্রথম যে গুলির শব্দটা পেয়েছে রানা, ওটা এসেছিল এ-ঘর থেকেই। বুড়োকে কে খুন করল, জানা নেই ওর। অবশ্য জীবিত থাকলে হয়তো তার কারণে বিপদ বাড়ত রানার।

সিঁড়ির দিকে চলল ও। খুঁজে বের করতে হবে অ্যারন কনারকে। সে এখানেই আছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। বোধহয় বসকে পাহারা দিচ্ছে লিয়াম বার্ব। সে যে কর্তব্য ভেবে সেটা করছে, তা নয়, আসলে নিয়মিত যার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা মেলে, তাকে খাতির না করে উপায় নেই বার্বের মত লোকের। এতবড় বাড়িতে অ্যারনকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে লোকটা? –ভাবল রানা। পরক্ষণে বুঝে গেল, গোলাগুলি হওয়ার সম্ভাবনা নিচতলায় বেশি, কাজেই আর যেখানেই থাকুক, একতলায় নেই তারা।

করিডরের শেষদিকে কোন আলো নেই। আঁধার সিঁড়ির কাছে গিয়ে থামল রানা। প্রথম ধাপে পায়ের ওজন চাপিয়ে দেখে নিল ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে কি না। সিঁড়ির মাঝের অংশ মচমচে হলেও দু’দিকের কাঠ ঠিক আছে। বামের কিনারা ধরে উঠতে লাগল রানা। সামনে এক শ’ আশি ডিগ্রি ঘুরে উঠে গেছে সিঁড়ি। দোতলায় উঠে চওড়া করিডরে পা রাখল রানা। দু’দিকে ঘরের দরজা। করিডরের দেয়ালে ঝুলছে হরিণের বিশাল সব মাথা। চকচক করছে তাদের কাঁচের চোখ।

করিডর ধরে এগিয়ে এক এক করে দু’দিকের দরজা সামান্য ফাঁক করে দেখতে লাগল রানা। পঞ্চম দরজা খুলে বুঝল ওটা বেডরুম। দরজা নিঃশব্দে বন্ধ করতে গিয়ে থমকে গেল। এইমাত্র ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ হয়েছে। ঘাড় কাত করে কান পাতল রানা। বুঝতে দেরি হলো না, পিছু নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে কমপক্ষে তিনজন লোক।

র‍্যাঞ্চ হাউসে আবার পা রেখেছে অ্যারন কনারের দলের দস্যুরা। চট্ করে বেডরুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল রানা। অন্ধকারে মন দিয়ে শুনতে লাগল পায়ের আওয়াজ। পদশব্দ উঠল দোতলায়। একটু আগে রানা যেভাবে দরজা খুলে দেখেছে, সেভাবে এক এক করে দরজা খুলছে তারা। এগিয়ে আসছে এ-ঘরের দিকে। দলে বোধহয় কমপক্ষে চারজন।

মিনিটখানেক পর রানার ঘরের সামনে এসে থামল তারা। বাইরে থেমে গেছে পদশব্দ। দরজার তলা দিয়ে এল ফ্ল্যাশলাইটের সাদা আলো। রানার মনে হলো, শুনতে পেয়েছে কয়েকজনের ফিসফিস করে কথা বলার আওয়াজ।

ঘুরতে শুরু করেছে দরজার হ্যাণ্ডেল।

দু’পা পিছিয়ে কোমরের কাছ থেকে দরজার মাঝামাঝি জায়গায় ইথাকা বন্দুকের নল তাক করল রানা। পরক্ষণে দ্রুত পাম্প করে দরজা লক্ষ্য করে পাঠাল পর পর তিনটে বাকশট শেল। মাযল থেকে ছিটকে বেরোনো কমলা আগুনের আলোয় দেখতে পেল কবাটের বুকে তৈরি হয়েছে এবড়োখেবড়ো বিশাল এক গর্ত। ঝাঁঝরা হয়ে গেছে দরজার মাঝের কাঠ।

গুলির প্রচণ্ড শব্দে ঝনঝন করছে রানার কান। তারই মাঝে শুনতে পেল সিঁড়ির দিকে ছুট দিয়েছে একজন। দেরি না করে ইথাকার ব্রিচে সলিড বুলেট ভরে নিল রানা। পাম্প করেই বন্দুক হাতে ঘুরে গেল ছুটন্ত পায়ের আওয়াজের দিকে। সামনে বাধা থাকলেও কোন সমস্যা নেই ওর। সলিড বুলেট কাঠের দেয়াল ভেদ করে ঠিকই লাগবে টার্গেটের গায়ে। রানার কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে বিকট ‘বুম!’ আওয়াজে গর্জে উঠল ইথাকা। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের বুকে দেখা দিল বড় এক গোল গর্ত। রানার গায়ে এসে লাগল একগাদা ঝুরঝুরে প্লাস্টার।

সিঁড়ির কাছে ধুপ্ করে পড়ল কেউ। ঝড়ের বেগে দরজা খুলে করিডরে বেরিয়ে এল রানা। সামনেই মেঝেতে পড়ে আছে ক্ষত-বিক্ষত তিনটে লাশ। সেগুলো টপকে সিঁড়ির দিকে ছুটল রানা। পকেট থেকে নিল আরও কয়েকটা বুলেট। না থেমে দৌড়ের ওপরে গুলি ভরল শটগানের ম্যাগাযিন টিউবে। ওর পেছনে পড়ল দেয়ালের একটা গর্ত। ওদিক দিয়েই বের হয়েছে ইথাকার বুলেট। বাম দেয়ালে লাল রক্তের ছিটা। সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নেমে গেছে আহত লোকটা। টার্গেটের পিছু নিয়ে মাঝের ল্যাণ্ডিঙে ‘পা রেখে, পরের সেকেণ্ডে ঝটকা দিয়ে পিছিয়ে এল রানা। নিচতলায় খাপ পেতে অপেক্ষা করছে আততায়ী। ওক কাঠের রেইলিঙে লেগে দেয়াল ভেদ করল তার ছোঁড়া বুলেট। একপাশে সরে গিয়ে ইথাকার নল রেইলিঙের ওদিকে নিল রানা। নিচের লোকটাকে লক্ষ্য করে পর পর পাঠাল চারটে বাকশট।

কয়েক সেকেণ্ড পর মিলিয়ে গেল গুলির প্রতিধ্বনি। রানার গুলির জবাবে কোন প্রতিআক্রমণ নেই। নীরব হয়ে গেছে চারপাশ। সিঁড়ির অন্ধকারে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে রানা। ধীরে ধীরে পেরিয়ে গেল দীর্ঘ এক মিনিট। তারপর আরেক মিনিট। নিচে নড়াচড়ার কোন আওয়াজ নেই।

আরও দু’মিনিট পর সন্তুষ্ট হয়ে ওপরের করিডরে ফিরে এল রানা। গিয়ে থামল তিন লাশের পাশে। মেঝে ভেসে যাচ্ছে তাজা রক্তে। বিপরীত দেয়ালে রক্তের ছোপ। ক্ষত- বিক্ষত হয়ে গেছে ওদিকের দরজা। অন্ধকারে রানা দেখল, কাঠের দরজার স্প্রিন্টার লেগে ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে লাশ তিনটের বুক-পেট। মৃতদেহ পাশ কাটিয়ে এক এক করে আবারও ঘরের দরজা খুলে দেখতে লাগল রানা। হ্যাণ্ডেল মুচড়ে টের পেল অষ্টম দরজার তালা লক করা। এ-দরজার কাঠ নিরেট লাথি মারলেও কোনভাবেই খোলা যাবে না।

‘বার্ব, এলে?’ ভেতর থেকে বলল কেউ। গলার আওয়াজ অ্যারন কনারের!

কেউ জবাব দিচ্ছে না বুঝে ঘর থেকে গুলি করল লোকটা। পুরু কাঠের দরজায় তৈরি হলো সরু তিনটে ফাটল।

ঝট করে দরজার কাছ থেকে সরে গেছে রানা। ওর বুঝতে দেরি হয়নি, লোকটার কাছে আছে ভারী ক্যালিবারের অস্ত্র। তাতে অসুবিধে নেই, আরও শক্তিশালী অস্ত্র আছে রানার কাছে। ইথাকার ব্রিচে আরেকটা ব্রেনেক বুলেট ভরে দরজার লকের সঙ্গে মাযল ঠেকিয়ে গুলি করল ও। দুনিয়ায় এমন কোন তালা নেই, যেটা ভারী বুলেটের আঘাতে চুরমার হবে না। প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে ভেতরের দিকে খুলে দেয়ালে গিয়ে লাগল দরজার কবাট।

ঘরে ভীত ইঁদুরের মত লুকিয়ে পড়তে চাইছে অ্যারন কনার। কিন্তু ভেতরে কেউ ঢুকে পড়েছে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। রানার বুকের দিকে তাক করতে গেল .৪৪ ম্যাগনাম রিভলভার। কিন্তু কাপুরুষটার ওপরে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা। তার হাত থেকে মুচড়ে কেড়ে নিল ভারী রিভলভার। ওটার বাঁট দিয়ে প্রচণ্ড এক গুঁতো বসিয়ে দিল অ্যারন কনারের মুখে। ভীষণ ব্যথা পেয়ে ডেস্কের দিকে টলমল করে পিছিয়ে গেল লোকটা।

বাড়ির অন্যান্য ঘরের মতই ঐতিহ্য বজায় রেখে স্টাডিরুম গুছিয়ে নিয়েছে বিগ রিয়ান কনার। প্রকাণ্ড ডেস্কে জ্বলছে তামা ও সবুজ কাঁচের ব্যাঙ্কার ল্যাম্প। পেছনে চামড়ার বিশাল চেয়ার। একটু দূরে উঁচু ফায়ারপ্লেস। ওপরের দেয়ালে এক র‍্যাকে আছে শিংওয়ালা বড় এক হরিণের স্টাফ করা মাথা। ওটার পাশে পুরনো আমলের নামকরা লিভার অ্যাকশন উইনচেস্টার রাইফেল। বুড়ো র‍্যাঞ্চার বোধহয় ওটা দিয়েই শিকার করেছিল হরিণের এই ট্রফি।

ঘরের ভেতরে কী আছে ভালমত খেয়াল করতে পারেনি রানা। ওর চোখে ভাসছে আয়ারল্যাণ্ডের সৈকতে প্রাণভয়ে ছুটে আসা বেলার সেই করুণ দৃশ্য। বেচারির পেছনে তেড়ে আসছে অ্যারন কনারের পাঠিয়ে দেয়া দুই খুনি। রানা আগেও স্বপ্নে দেখেছে, পাথরের ওদিকে পড়ে আছে বেলার গলাকাটা লাশ।

‘না, প্লিয, আমাকে খুন কোরো না, আরও এক পা পেছাল অ্যারন। বিস্ফারিত হয়েছে দু’চোখ। সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে দু’হাত। ও-দুটো দিয়ে যেন ঠেকিয়ে দেবে বারো গেজের বন্দুকের বুলেট।

সরাসরি তার মুখে ইথাকার মাল তাক করল রানা। কালাহারকে বলা কথাটা মনে পড়ল: ‘আমি ঠাণ্ডামাথার খুনি নই।’ কিন্তু অ্যারন কনারের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু করতে গিয়ে মন থেকে কোন আপত্তি এল না ওর।

শটগান পাম্প করল রানা। ক্ল্যাক আওয়াজে পেছনে যাবে এক্সট্র্যাক্টর ক্ল। খপ করে ধরবে খরচ করা গুলির খোসার রিম। টেনে চেম্বার থেকে বের করে দেবে ইজেক্টর পোর্ট দিয়ে। তখনই ক্ল্যাক আওয়াজে সামনে আসবে পাম্প। ম্যাগাযিনের টিউব থেকে বেরিয়ে চেম্বারে ঢুকবে তাজা বুলেট। কিন্তু বড় ধরনের কোন ত্রুটি হয়েছে ইথাকা শটগানের মেকানিযমে। সামনে বাড়ছে না পাম্প। ঠিকভাবে কাজ করছে না অ্যাকশন। কী যেন আটকে দিয়েছে চেম্বার। একসেকেণ্ড পর রানা বুঝল, বিকল হওয়ায় গুলির খালি খোসা টেনে বের করতে ব্যর্থ হয়েছে ইজেক্টর।

পাম্প-অ্যাকশন শটগানের ক্ষেত্রে এটা বড় ধরনের ঝামেলা। পুলিশ বা সৈনিককে ফায়ারআর্ম ট্রেনিঙে শেখানো হয় কীভাবে সারাতে হবে এ-ধরনের সমস্যা। প্রতিটি ক্লাসেই এ-বিষয়ে আলাপ করা হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে এমন ঘটে খুব কম। বলা চলে দশলক্ষ বারে একবার বিকল হয় পাম্প-অ্যাকশন বন্দুক। ব্যাপারটা আসলে গাড়ি নিয়ে মরুভূমিতে চলার সময়ে একাধিক চাকা ফুটো হওয়া বা ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার মত। কিন্তু সেক্ষেত্রে জোর সম্ভাবনা থাকে, শেষমেশ করুণভাবে মরবে মানুষটা।

রানা বন্দুকের কুঁদো জোরে মেঝেতে ঠুকতে পারে, অথবা হাত থেকে ফেলে দিতে পারে বিকল অস্ত্র। তার বদলে কাঁধ থেকে নেবে স্ক্যালেসের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া কারবাইন। কিন্তু সেক্ষেত্রে তা করতে হবে দু’ থেকে তিন সেকেণ্ডে। কারণ অ্যারন কনার বুঝে গেছে, ঝামেলায় পড়ে গেছে রানা।

চোখে বিস্ময় নিয়ে ওকে দেখছে সে। পরের সেকেণ্ডে হুড়মুড় করে ডেস্কের কোনা ঘুরে বিশাল চেয়ারের ওদিকে গেল অ্যারন কনার। আরেকটু হলে হোঁচট খেয়ে মেঝেতে পড়ত। এক লাফে চলে গেল ফায়ারপ্লেসের ওপরের র‍্যাকের কাছে। ওটা থেকে হ্যাঁচকা টানে নিল হান্টিং রাইফেল। র‍্যাক থেকে কাত হয়ে নিচে এসে পড়ল শিংওয়ালা হরিণের মাথা।

রাইফেলের লিভার টানল লোকটা। ম্যালফাঙ্কশন করল না বহু পুরনো বিশ্বস্ত অস্ত্র। ক্লিক শব্দে চেম্বারে ঢুকল তর্জনীর সমান দীর্ঘ প্রচণ্ড শক্তিশালী বুলেট। হতবাক রানা বুঝে গেল, নিজের সব অস্ত্রে গুলি তরে রাখত রিয়ান কনার!

বিসিআই এজেন্টের মাথা লক্ষ্য করে অস্ত্রের মাযল তাক করল অ্যারন কনার, মুখে মুচকি হাসি!

সাতান্ন
হান্টিং রাইফেলের কালো মাযল চেয়ে আছে রানার দিকে। হাত থেকে আস্তে করে বন্দুক ফেলে দিল ও।

‘তেড়িবেড়ি না করে কারবাইনটাও ফেলো,’ নির্দেশ দিল অ্যারন কনার।

কাঁধ থেকে স্লিং খুলে এ ফোর কারবাইন, মেঝেতে ফেলল রানা।

‘ছোরাটাও,’ বলল মেয়র কনার।

খাপ থেকে ট্রেঞ্চ নাইফ নিয়ে একসেকেণ্ড ভাবল রানা, লোকটার বুক লক্ষ্য করে ওটা ছুঁড়বে? তবে বেশিরভাগ ছোরা থ্রোয়িং নাইফ নয়। ইস্পাতের ভারী নাকলডাস্টারের জন্যে লক্ষ্যভেদ প্রায় অসম্ভব। এদিকে একবার অ্যারন ট্রিগার টিপে দিলেই ঘরের মরা হরিণটার মত অক্কা পারে ও।

হাত থেকে ছোরা ছেড়ে দিল রানা।

ঠং শব্দে মেঝেতে পড়ল ওটা।

খুশিতে চকচক করছে অ্যারনের দু’চোখ। ‘ভেবেছিলে এখানে এসে আমাকে খুন করবে, নাকি?’

‘মরতে তোমাকে হবেই, অ্যারন।

‘সেই মেয়েটার কথা বলছ, ঠিক না? বেটির নাম বোধহয় ছিল বেলা ওয়েস।’

‘বিস্মিত হলাম এখনও নামটা মনে রেখেছ,’ শ্লেষ ভরা কণ্ঠে বলল রানা।

‘তুমি ভেবেছ তাকে খুন করাতে গিয়ে আমার খুব ভাল লেগেছে?’

‘জানি, তোমার আর কোন উপায় রাখেনি বেলা,’ বলল রানা।

‘আমিও তো একই কথা ভাবি। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলেও এই একই কাজ করত।’

‘তা ঠিক। তুমি বেশিরভাগ মানুষের মতই।’

‘তা হলে কি ভাবছ, ওর দাবি মিটিয়ে দিলেই ভাল করতাম? তাতে থামত সে? জীবনেও না! সুযোগ পেয়ে রক্ত চুষে আমাকে শেষ করে দিত।’

‘তাই শেষমেশ সব রক্ত ঝরাতে হলো ওকেই,’ বলল রানা।

‘সবার জীবনেই গোপন কিছু বিষয় থাকে, রানা। তুমি এটা বলতে পারো, অন্যদের চেয়ে গোপনীয় বিষয় আমার বেশি। আর এ-ব্যাপারে তোমার বান্ধবী বহু কিছু জেনে গিয়েছিল।

‘ঠিক, প্রায় সবই জেনেছিল,’ বলল রানা। ‘আমি নিজে শুধু পূরণ করেছি শূন্যস্থান। ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বেলা জেনে গেছে বায়ার্ন কনারের নাম। তারপর খুঁজতে গিয়ে জেনেছে এই বংশে আমেরিকায় আছে এক রাজনৈতিক নেতা। সে গর্ব করে, তার পূর্বপুরুষ বায়ার্ন কনার এসেছে দুর্ভিক্ষপীড়িত আয়ারল্যাণ্ড থেকে। রাজনীতির ময়দানে এ- ধরনের তথ্য সাধারণ মানুষকে গেলাতে পারলে তারা অন্তর থেকে সমব্যথী হয়। কিন্তু বড়বেশি বকবক করতে লাগলে তুমি। ফলে ঐতিহাসিক কিছু তারিখ মেলাতে গিয়ে সব বুঝে গেল বেলা।

‘তা-ই নাকি?’ মুচকি হাসল অ্যারন কনার।

‘হ্যাঁ, বেলা গ্রেনফেলে খোঁজ নিয়ে জেনে গেল সত্যিকারের বায়ার্ন কনারের জন্মতারিখ। আর সে ছিল এবারডেন হলের সাধারণ এক আস্তাবল কর্মী। জন্ম নিয়েছিল আঠারো শ’ নয় সালে। আর তা। মৃত্যু হয় উনিশ শত সতেরোতে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অমরিকায় যে তথ্য সে দিয়েছে, সেটা অনুযায়ী তার জন্ম হয়েছে আঠারো শ’ বাইশ সালে। এই কয়েক বছরের ব্যবধান জানতে পেরে কৌতূহলী হয়ে গেল বেলা। তথ্যটা জেনে নিয়ে প্রথমে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করল। তোমাকে জানাল, আয়ারল্যাণ্ড আর আমেরিকায় তোমার পূর্বপুরুষ বায়ার্ন কনারের জন্মতারিখ ও সাল মোটেও মিলছে না। এসব জেনেও বিষয়টা হালকাভাবে নিয়ে বেলার কথা উড়িয়ে দিতে পারতে। অথচ, সেটা না করে ঘাবড়ে গেলে। আর এটা শুধু তোমার মত নির্বোধ কারও পক্ষেই সম্ভব। তোমার কথায় সন্দেহপ্রবণ হলো বেলা। খুঁড়তে লাগল আরও গভীরে। পরেরবার যখন যোগাযোগ করল, ততক্ষণে জেনে গেছে কী পরিণতি হয়েছে সত্যিকারের বায়ার্ন কনারের। টাকা না দিলে সব ফাঁস করে দেবে বলে হুমকি দিল বেলা। ফলে সে হয়ে গেল তোমার চিরশত্রু। সত্য প্রকাশ হলে আসলে তোমাকে এত কিছু হারাতে হবে যে, তার মুখ চিরকালের জন্যে বুজে না দিয়ে তোমার উপায় থাকল না। আমি কি ঠিক বলেছি, অ্যারন?’

দৃঢ়বদ্ধ হয়েছে লোকটার চোয়াল। সরু চোখে দেখছে রানাকে। উইনচেস্টারের ট্রিগারে চেপে বসেছে তর্জনী।

‘এবার বোধহয় বুঝলে, কীভাবে তোমার পূর্বপুরুষ লর্ড অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ডের ব্যাপারে সব জেনেছে বেলা,’ বলল রানা।

‘ও, তা হলে সবই জেনে গেছ, তা-ই না?

‘অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড জন্মায় আঠারো শ’ বাইশ সালে। আর সেটাই আমেরিকান সরকারের জন্ম-মৃত্যুর রেজিস্ট্রি খাতায় আছে।’

তিক্ত হেসে মাথা নাড়ল অ্যারন স্টার্লিংফোর্ড। ‘সত্যি তোমার প্রশংসা না করে পারছি না। ঠিকই বলেছ। কিন্তু তাতে তোমার কোন ধরনের ফায়দা নেই। আর কেউ কখনও জানবে না আমার পূর্বপুরুষ নীল রক্তের মানুষ লর্ড স্টার্লিংফোর্ড।’

‘জেনেছি, সে ছিল ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এক কাপুরুষ,’ বলল রানা। ‘হত্যা করেছে বহু মানুষকে। নিজের স্ত্রীকে নির্যাতন করত। বায়ার্ন কনারের পরিচয় চুরি করার জন্যে তাকে খুন করে। নিজে মারা গেছে সেটা দেখাতে পুড়িয়ে দেয় তার লাশ। তারপর প্রথম সুযোগে পালিয়ে আসে আমেরিকায় তুমি তো অবশ্য আগেই এসব জানো। তোমার জানা আছে, কত বড় নরপশুর উত্তরপুরুষ তুমি। আর এটা মোটেও অবাক হওয়ার কিছু নয় যে, সেই জানোয়ারের মতই হয়ে গেছ রক্তপিশাচ

অ্যারন স্টার্লিংফোর্ডের ঠোঁট থেকে মুছে গেল হাসি। ‘অপমান করে মজা পাচ্ছ, তা-ই না? সবই তো জেনে গেলে। আমার বাবাও আগে এসব জানত না। তবে তারপর আমার দাদার রেখে যাওয়া ডায়েরি থেকে সব জেনে নিয়েছে উনিশ শ’ ছাপ্পান্ন সালে। আবার আমার বাবা এসব বলেছে আমাকে, যখন আমার বয়স একুশ বছর। এবার বুঝলে?’

‘এটা জানতে, অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড তার এক বয়স্ক বন্ধু নরম্যান আর্টিবল্ডের সঙ্গে মিলে ল্যাবে তৈরি করেছিল ভয়ঙ্কর এক বিষ?’ জানতে চাইল রানা। ‘কপালের জোরে ওটার কথা জেনে যান অ্যাঙ্গাসের প্রথম স্ত্রী জেনিফার হলওয়ে। সেটার কথা লিখেও যান তাঁর ডায়েরিতে। নরপশুগুলোর তৈরি করা ফিটোফোরা ইনফেস্ট্যান্স পচিয়ে দিয়েছিল আঠারো শ’ ছিচল্লিশ সালে আয়ারল্যাণ্ডের সমস্ত আলুর গাছ।’

সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল অ্যারন। ‘হ্যাঁ, জানি। অ্যাঙ্গাস কী করেছিলেন, সেটা পরের পুরুষেরা সবাই জানত। যেহেতু একটু পর তোমাকে খুন করব, তো কোনকিছু গোপন রাখতে চাই না। আমার হারামখোর বাপ একবার বন্ধ মাতাল হয়ে সবই আমাকে বলে দিয়েছিল। আমার বয়স তখন পঁচিশ।’

‘তোমার পূর্বপুরুষ শুয়োরের চেয়ে হাজারগুণ নিকৃষ্ট, বিস্মিত হয়েছিলে, সেটা জেনে? তার কারণে আয়ারল্যাণ্ডে কয়েক মাসের ভেতরে মারা পড়ে বিশ লাখ মানুষ।’ কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘আমি ধারণা করছি, সে আসলে ছিল ব্রিটিশ সরকারের গুপ্তচর।

‘এ-ধরনের কোনরকমের প্রমাণ নেই,’ মাথা নাড়ল স্টার্লিংফোর্ড।

‘ভুল বললে,’ বলল রানা। ‘খুন হয়েছিল বলে এ-বিষয়ে এরপর আর তদন্ত করতে পারেনি বেলা। তবে আমি নিজে ঠিকই খোঁজ নিয়েছি। অ্যাঙ্গাসের প্রথম স্ত্রী জেনিফার ইংল্যাণ্ডে পা রাখার পর আঠারো শত একান্ন সালে লণ্ডনে মার্টিন হাডসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সে ছিল বড় মাপের উকিল। ভদ্রমহিলা বোধহয় চেয়েছিলেন সব প্রকাশ করে দিতে কী ধরনের জঘন্য অপরাধ করেছে তাঁর প্রাক্তন স্বামী। কিন্তু উকিলের কাছে যাওয়া ছিল মস্তবড় ভুল। মহিলা জানতেন না সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আঁতাত ছিল মার্টিন হাউসনের। তখনকার সরকারের মাত্র কয়েকজন জানত, তাদের হয়ে আয়ারল্যাণ্ডে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ডেকে এনেছে বিশ্বস্ত গুপ্তচর অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড। এরফলে খুন হয়েছে দখল করে নেয়া দেশটির বিপুল সংখ্যক মানুষ। আর এ-সুযোগে হাসতে হাসতে মিলিয়ন মিলিয়ন একর জমি দখল করে নিয়েছে ইংল্যাণ্ডের বড়লোকেরা।’

চোখ সরু করে ওকে দেখছে অ্যারন স্টার্লিংফোর্ড। কয়েক সেকেণ্ড কী যেন ভেবে বলল, ‘চাইলে সবই বলতে পারো। তোমার খুলি উড়িয়ে দিতে খুব তাড়া নেই আমার।’

‘ব্রিটিশ সরকারের ওপরমহলের কর্মকর্তারা যখন জেনে গেল, সবই জানেন জেনিফার হলওয়ে, তারা দেরি করল না তাঁকে খুন করাতে। দোষ চাপিয়ে দিল নিরীহ এক স্কুল টিচারের ওপরে। জেনিফার খুন হওয়ার মাত্র ক’দিন পর তারই ঘরে গুলি খেয়ে মরল নরম্যান আর্চিবল্ড। অবশ্য আগেই সে সতর্ক করেছিল অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ডকে। এবার যে-কোন দিন খুন হবে বুঝে নিজেও ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এক পরিকল্পনা করল অ্যাঙ্গাস। তখন তার চাই নিজের মত মানানসই আকারের লাশ। পেয়েও গেল তেমন একজনকে। আস্তাবল কর্মী বায়ার্ন কনারকে খুন করে নিজের পোশাক পরাল সে। আঙুলে দিল বংশের আঙটি। যাতে পরে মানুষ বুঝতে পারে আগুনে পুড়ে মরেছে অত্যাচারী জমিদার। এবারডেন হলে আগুন ধরিয়ে নিজের সমস্ত টাকা-পয়সা নিয়ে আমেরিকায় পালিয়ে এল অ্যাঙ্গাস। আমেরিকায় এসে দেখল আইরিশ হিসেবে নানান ধরনের সুবিধা পাচ্ছে। নিজের পরিচয় ফাঁস হলে বিপদে পড়বে, সে-ভয় ছিল তার। বোধহয় খুন হতো ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের এজেন্টদের হাতে। ঘটনা যা-ই হোক, মৃত্যুর সময়ে বিছানায় শুয়ে যাজক ছাড়া আর কারও কাছে নিজের সত্যিকার পরিচয় প্রকাশ করেনি সে।

‘বুঝলাম। এবার কথা শেষ হয়েছে তোমার?’

‘তোমার বড়আব্বা, দাদা, বাবা আর তুমি এমন এক বংশের জানোয়ার, যাদের পরিচয় প্রকাশ পেলে কবরেও থুতু দেবে না আইরিশেরা। নকল বংশ-পরিচয় বহন করে মস্ত বড়লোক হয়ে গেছ তোমরা। বিশেষ করে তুমি। অর্জন করেছ রাজনৈতিক ক্ষমতা, যেটা আসলে একদম মিথ্যার ওপরে ভর করে আছে। আইরিশেরা যদি কখনও জানতে পারে তোমার বড়আব্বা ছিল ব্রিটিশ সরকারের গুপ্তচর, আর তার কারণে খুন হয়েছে তাদের দেশের লাখ লাখ মানুষ-সেক্ষেত্রে তাদের সময় লাগবে না মুখ ফিরিয়ে নিতে অন্য কোন প্রার্থীকে ভোট দেবে তারা। শুধু তা-ই নয়, এই রাজ্যের সব পুলিশের সাহায্য নিলেও যে-কোন সময়ে খুন হবে তুমি। আসলে নিজেও এসব জানো তুমি। আর সেজন্যে দেরি করোনি বেলা ওয়েসকে খুন করতে। সত্যিই ওকে খুন না করে তোমার অন্য কোন উপায় ছিল না।

এতক্ষণ চোখে চোখ রেখে কথা বলতে গিয়ে তিলতিল করে সামনে বেড়েছে রানা। ক’বার ভঙ্গি করেছে বদল করছে পা। কিন্তু এখন ডেস্কের এদিকে দাঁড়িয়ে আছে ও, আর ওদিকে অ্যারন স্টার্লিংফোর্ড।

রানা ভাবছে: নলটা খপ করে ধরে লোকটার হাত থেকে কেড়ে নেবে রাইফেল। তবে সে-সুযোগ সত্যিই পেল না ও।

আটান্ন
কখন যেন সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় এসে উঠেছে মরণাপন্ন এক বৃদ্ধ। তার দেহ ভেসে যাচ্ছে রক্তে। করিডর পার করে হাজির হয়ে গেছে নিজের স্টাডিরুমের দরজায়।

রানা হঠাৎ করে দেখতে পেল, চৌকাঠে এসে থেমেছে রিয়ান স্টার্লিংফোর্ড। তীব্র যন্ত্রণা ও প্রচণ্ড রাগে থরথর করে কাঁপছে সে। মুখে উঠে এসেছে তাজা রক্ত। দু’পাটি দাঁত খিঁচাচ্ছে হিংস্র পশুর মত। শ্বাস নিতে গিয়ে গলার গভীর থেকে বেরোচ্ছে ঘড়ঘড় শব্দ। হোঁচট খেয়ে স্টাডিরুমে ঢুকল বৃদ্ধ। ফুরিয়ে গেছে তার শরীরের শক্তি। টলমল করছে ঝড়ের প্রকোপে পড়া জাহাজের মত। সরাসরি চেয়ে আছে ছেলের দিকে। হয়তো ভাবছে: এই ছেলের জন্যে কী-ই-না করেছি, আর দ্বিধা না করে সে চেয়েছে আমাকে খুন করতে!

‘তুমি আজ আমার হাতে খুন হবে, ছেলে, ফিসফিস করে বলল বিগ রিয়ান। ঠোঁটের কোণে রক্তাক্ত বুদ্বুদ। মারা যাচ্ছে সেটা বুঝেও কোন তোয়াক্কা নেই। নিচতলা থেকে উঠে এসেছে নিজের খুনিকে শেষ করতে।

রক্তমাখা হাত ওপরে তুলন বিগ রিয়ান। নিচতলার দেয়াল থেকে নিয়েছে পুরনো আমলের সিক্সগান। কক করা আছে অস্ত্রটা। কম্পমান রিভলভারের নল নিজের ছেলের বুকে তাক করল সে।

বাবাকে জীবিত দেখে হতভম্ব হয়ে গেছে অ্যারন। দুই চোখে ফুটে উঠেছে চরম আতঙ্ক। রানার দিক থেকে সরিয়ে বাবার দিকে উইনচেস্টারের নল ঘোরাল সে।

আর তখনই মিলেমিশে গেল জোড়া আগ্নেয়াস্ত্রের বিকট আওয়াজ। উইনচেস্টারের এক্সপ্রেস বুলেট বিঁধে গেল বিশ রিয়ানের হৃৎপিণ্ডে। সঙ্গে সঙ্গে মারা পড়ল বৃদ্ধ। ওদিকে ৪৫ ক্যালিবারের নরম সীসার বুলেট ভেদ করেছে অ্যারনের বাম ভুরু। খুলির ভেতরে মৌমাছির মত ভোঁ-ভোঁ করে ঘুরতে লাগল গুলি। ফলে মগজটা হয়ে গেল থকথকে সুপের মত। হাঁটু ভেঙে ধুপ্ করে মেঝেতে পড়ল অ্যারন স্টার্লিংফোর্ডের লাশ। পাশেই পড়েছে রাইফেল।

একই সময়ে বাপ-ছেলের জান কবজ করেছে যমদূত। বিস্মিত চোখে লাশদুটো দেখে রানা বুঝে গেল, আজ সত্যিই নিভে গেছে স্টার্লিংফোর্ড বংশের প্রদীপ!

স্টাডিরুম থেকে বেরিয়ে এল রানা। এবার জ্যাকিকে সঙ্গে নিয়ে চলে যাবে এই র‍্যাঞ্চ ছেড়ে।

বাড়ি থেকে বের হয়ে রানা দেখল, গুমোট হয়ে উঠেছে পরিবেশ। কালো মেঘের ভেলায় ঢাকা পড়েছে আকাশের হাজারো নক্ষত্র। যে-কোন সময়ে নেমে আসবে ঝমঝমে বৃষ্টি। উঠনে ওক গাছের নিচে ঘন, ছায়ার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে ডজ র‍্যাম। পকেট থেকে চাবি নিয়ে সেন্ট্রাল লকিং খুলতে গিয়ে রানা বুঝল, খোলা আছে পেছনের দরজা।

গাড়ির ভেতরে নেই জ্যাকি!

ডজ র‍্যামের দরজা ভেতর থেকে খুলে জ্যাকি বোধহয় চেয়েছে র‍্যাঞ্চের কোথাও লুকিয়ে পড়তে। হয়তো রানাকে খুঁজতে গেছে আস্তাবলে। অথবা, গাড়ির সেন্ট্রাল লকিং খুলে ওকে কিডন্যাপ করেছে কেউ। গাড়ির পেছনের মাটি ভাল করে দেখল রানা। মনে মনে নিজেকে দোষ দিল, মোটেই উচিত হয়নি সেন্ট্রাল অ্যালার্ম সিস্টেম ডিসেবল করে দেয়া। এবার যেভাবে হোক খুঁজে নিতে হবে মেয়েটাকে। গাড়ির কাছ থেকে সরে জোর গলায় ডাকল রানা, ‘জ্যাকি!’

উত্তর দিল না কেউ।

টাস্ শব্দে রানার কপালে পড়ল বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা। আরেক ফোঁটা নামল কাঁধে। তারপর আকাশ ভেঙে নেমে এল তুমুল বারিধারা। কয়েক সেকেণ্ডে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল রানা। গাড়িগুলোর ছাতে দামামা বাজাচ্ছে জোরাল বৃষ্টির হাজারো ফোঁটা। র‍্যাঞ্চ হাউসের ছাতের পাইপ বেয়ে নেমে চারপাশের জমি ভাসিয়ে নিচ্ছে যেন খরস্রোতা নদী।

‘জ্যাকি!’ আবারও গলা ছেড়ে ডাকল রানা।

‘এই যে, এখানে,’ বলল একটা কণ্ঠ।

আধ পাক ঘুরে দাঁড়াল রানা।

ওক গাছের ওদিক থেকে বেরিয়ে এল লিয়াম বার্ব। বর্মের মত বুকে সেঁটে ধরে রেখেছে জ্যাকিকে। একহাতে মুখ চেপে ধরে, অন্যহাতে পিস্তল ধরেছে মেয়েটার ঘাড়ে। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে বার্বের মুখ। দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে বেশ টলছে। তার পিস্তল ধরা হাত কাঁপতে দেখে রানা বুঝে গেল, একটু আগে র‍্যাঞ্চ হাউসের সিঁড়িতে চতুর্থ লোকটা ছিল বার্ব। দেহে অন্তত দু’বার বন্দুকের গুলি বিধে গেছে বলে তাকে হারাতে হয়েছে প্রচুর রক্ত। মারা পড়তে পারে সে-ভয়ে আগের চেয়েও সতর্ক।

ধীর পায়ে হেঁটে বৃষ্টির মাঝে মুখোমুখি হলো রানা ও বার্ব। ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছুটিয়ে নিতে গিয়ে ব্যর্থ হলো জ্যাকি। রানাকে দেখছে চোখে ভয় নিয়ে। বুঝে গেছে, যে- কোন সময়ে হয়তো খুন হবে ওর প্রিয় মানুষটা।

গোলাগুলি এড়াতে স্ক্যালেসের কারবাইন মাটিতে নামিয়ে রাখল রানা। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তুমি বোধহয় কখনও হাল ছাড়ো না, বার্ব?’

‘একই কথা তোমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য,’ যন্ত্রণা-ভরা কাঁপা গলায় বলল প্রাক্তন মেজর লিয়াম বার্ব।

‘মেয়েটাকে ছেড়ে দাও, বার্ব। অন্যরা মারা গেছে। ‘ পিটপিট করে চোখ থেকে বৃষ্টির পানি ঝরাল বার্ব। ‘না, সবাই নয়।’

‘মেয়েটার তো কোন দোষ নেই,’ অনুরোধের সুরে বলল রানা। ‘ওকে ছেড়ে দাও। লড়াই করে এখন আর কিছুই পাবে না। বরং এটাই ভাল, যে যার পথে চলে যাই।’

জ্যাকির ঘাড়ে পিস্তলের নল ঠেসে ধরল বার্ব। রাগ ও ঘৃণায় জ্বলজ্বল করছে তার দু’চোখ।

‘তুমি আসলে ওকে খুন করতে চাও না,’ বলল রানা।

‘তুমি ঠিকই ধরেছ,’ দাঁতে দাঁত পিষল বার্ব। জ্যাকির ঘাড় থেকে সরিয়ে রানার বুকে তাক করল পিস্তল। ‘দু’হাঁটু গেড়ে মাটিতে বোসো। মাথার ওপরে রাখবে দু’হাত।’

ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে হাতদুটো মাথার ওপরে রাখল রানা। ঘাড় তুলে দেখছে বার্বের হাতের পিস্তল। ওর মুখ বেয়ে নেমে যাচ্ছে বৃষ্টির পানির অবারিত স্রোত। ভিজে গেছে প্যান্টের হাঁটু। বেশ ঠাণ্ডা লাগছে।

কঠোর চেহারায় ওকে দেখল বার্ব। একটু কেঁপে গেল তার হাতের পিস্তল। চোখ পিটপিট করল সে। তারপর হঠাৎ করেই জোরে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল জ্যাকিকে। তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল মেয়েটা।

পরের সেকেণ্ডে গুলি করল লিয়াম বার্ব

বুকে বুলেট লাগতেই পিঠ দিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল মাসুদ রানা।

কী ঘটে গেছে সেটা বুঝতে পেরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল জ্যাকি।

হাসতে হাসতে কয়েক পা এগিয়ে এল লিয়াম বার্ব।

বুকে তীব্র ব্যথা নিয়েও কাত হয়ে উঠে বসল রানা। ঝাপসা হয়ে গেছে ওর দৃষ্টি।

রানার বুকে পিস্তল তাক করল বার্ব। বাঙালি লোকটাকে খুন করার পর খতম করে দেবে মেয়েটাকে। তারপর এই এলাকা ছেড়ে চলে যাবে চিরকালের জন্যে। দাঁতে দাঁত পিষল সে। ‘এবার বিদায় হবি, কুত্তার বাচ্চা!’

ঊনষাট
‘এবার তা হলে সত্যিই বিদায়,’ ব্যথা-ভরা কণ্ঠে বলল রানা। কোমরের পেছনে বেল্ট থেকে ঝট করে নিল অ্যারন স্টার্লিংফোর্ডের .৪৪ ম্যাগনাম রিভলভার। ওটার সিলিণ্ডারে এখনও আছে দুটো বুলেট।

একসেকেণ্ড পর ঝড়ের বেগে পর পর দু’বার ট্রিগার টিপে দিল রানা। দুটো গুলিই ভেদ করল বার্বের কপাল।

পিছিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে মাটিতে ধুপ্ করে পড়ল আমেরিকান আততায়ী। হাত থেকে ছুটে গেছে পিস্তল।

‘রানা!’ প্রিয় মানুষটার দিকে ছুটে এল জ্যাকি। ‘হায়, ঈশ্বর! রানা! প্লিয! তুমি মরে যেয়ো না!’

প্রচণ্ড ব্যথায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ল রানা। হাত থেকে খসে গেছে রিভলভার’। হাঁটু গেড়ে ওর পাশে বসল জ্যাকি।

ওর চোখে চোখ রেখে বামহাতে জ্যাকেটের চেইন টেনে খুলল রানা। অবাক হয়ে ওকে দেখল জ্যাকি। রানার জ্যাকেটের ভেতরে আছে পুলিশ চিফ রিপার রিগবির বুলেটপ্রুফ ভেস্ট!

ওটাতে লেগে আটকা পড়েছে চ্যাপটা হওয়া একটা বুলেট!

বড় করে শ্বাস নিয়ে উঠে বসল রানা। ওর কেভলার ভেস্ট থেকে ভেজা ঘাসের মধ্যে টুপ করে খসে পড়ল ছেতরে যাওয়া গুলিটা।

‘তোমার তো গুলি লাগেনি!’ অবাক হয়ে বলল জ্যাকি।

‘বুকে বিঁধে না গেলেও জোর ধাক্কা দিয়েছে,’ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল রানা। ‘তাতে ফাটল ধরে গেছে পাঁজরের একটা হাড়ে।’

‘আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে তুমি গুলি খেলে!’ উঠে রানাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল জ্যাকি। বৃষ্টির চেয়েও জোরে অশ্রুবর্ষণ হচ্ছে ওর চোখ থেকে। ‘রানা… আমি কখনও তোমার এই ঋণ শোধ করতে পারব না!’

‘মনে হয়েছিল বুলেটপ্রুফ ভেস্ট কাজে লাগবে।’ বার্বের লাশটা দেখল রানা। কাদা-পানিতে মিশে যাচ্ছে রক্ত।

আমেরিকান আততায়ীর পকেট থেকে ফোন সংগ্রহ করল রানা। বুক পকেট থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে ধরিয়ে দিল জ্যাকির হাতে।

‘আমার বাবার প্লিমাউথ!’ অবাক হয়েছে জ্যাকি, ‘আমি তো ভাবতেও পারিনি ওটা আর আস্ত পাব!’

‘আঁচড়টাও পড়েনি,’ বলল রানা। ‘একটু দূরেই রেখেছি।’

‘আমরা এবার কোথায় যাব?’ জানতে চাইল জ্যাকি।

‘তুমি ফিরে যাবে তোমার বাড়িতে।’

‘আর তুমি?’ অসহায় চোখে রানাকে দেখল জ্যাকি। ‘আমার বাসায় উঠবে না, রানা?’

মাথা নাড়ল বিসিআই এজেণ্ট। ‘সেটা এখন সম্ভব নয়।’

একটু পর আস্তাবলের পেছনে গেল ওরা। রানা ওখানেই রেখেছে গাড়িটা। বার্বের ফোন ব্যবহার করে নাইন ওয়ান ওয়ান নম্বরে কল দিল ও। পুলিশের লোক ধরতেই বলল, ভয়ঙ্কর গোলাগুলি হওয়ায় স্পিয়ারহেড র‍্যাঞ্চে মারা গেছে মেয়র কনার ও টুলসা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ক’জন পুলিশ। তাদের ভেতরে আছে পুলিশ চিফ রিপার রিগবি। রানা এ- ছাড়া আরও জানাল, যেন যোগাযোগ করা হয় এফবিআই স্পেশাল এজেন্ট ববি হুকের সঙ্গে। যাতে সে কয়েকজন এজেন্টকে নিয়ে চলে যায় ব্ল্যাক বেয়ার ফার্মে। সেখানেও আছে বেশ কিছু লাশ।

কথা শেষ করে ফোনটা ঘন এক ঝোপের ভেতরে ফেলল রানা। এবার ব্যস্ত হবে এফবিআই ও পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। আর তারা সন্দেহ করার আগেই ওর চলে যেতে হবে বহু দূরে।

পুলিশ যখন স্পিয়ারহেড র‍্যাঞ্চে হাজির হবে, তার অনেক আগে প্লিমাউথ নিয়ে টুলসা শহরে পৌঁছে যাবে রানা ও জ্যাকি।

.

টুলসা শহরের দিকে ফেরার সময় ড্রাইভ করছে জ্যাকি। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘সত্যিই আমার বাড়িতে উঠবে না?’

এবারও মাথা নাড়ল রানা। ‘তোমার বাড়িতে হাজির হবে এফবিআই এজেণ্ট। চাই না তাদের সঙ্গে দেখা হোক।’

‘আর কখনও ফিরবে না টুলসায়, রানা?’

‘পরে হয়তো কখনও ফিরব।’

‘আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করব,’ বলল জ্যাকি।

‘উচিত হবে না,’ বলল রানা। ‘আমি তো চির ভবঘুরে। কখন কোথায় থাকি তার ঠিক নেই।’ দূরে চেয়ে আছে ও। জ্যাকি কিছু বলার আগেই জানাল, ‘শহরে ঢুকে প্রথম পার্কের পাশে আমাকে নামিয়ে দেবে।’

‘রাতের আঁধারে হারিয়ে যাবে, যাতে কেউ খোঁজ না পায়?’

‘ঠিকই ধরেছ।’

‘এরপর কোথায় যাবে, রানা?’

‘আসলে এখনও কিছু ঠিক করিনি।’

একটু পর টুলসা শহরে প্রবেশ করল প্লিমাউথ ব্যারাকুডা।

সামনে ঘাসে ভরা পার্ক দেখে গাড়ি রাখল জ্যাকি। রানার দিকে তাকাল। ওর চোখে টলমল করছে দু’ফোঁটা অশ্রু। রানার বাহুতে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, ‘যেখানেই থাকো, ভাল থেকো। আমি কখনও তোমায় ভুলব না। ভুলব না তোমার মায়াভরা চোখদুটোকে।’

জ্যাকির নরম মুঠোদুটো হাতে নিয়ে মৃদু চাপ দিল রানা। ‘সত্যিই হয়তো আবারও দেখা হবে, জ্যাকি।’ গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ল ও। ‘তার আগে পর্যন্ত বিদায়।’

চুপ করে আছে মেয়েটা। পার্কে ঢুকে প্রথম বেঞ্চে বসে পড়ল রানা। কিছুক্ষণ ওকে দেখে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো জ্যাকি।

প্লিমাউথ গাড়িটা চলে যেতে দেখল রানা। এবার সত্যিই অদৃশ্য হতে হবে ওকে। বেঞ্চি ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে, তার আগে পকেট থেকে ফোন নিয়ে চেক করল রানা।

ব্যস্ততার ভেতরে কখন যেন এসেছে একটা মেসেজ।

স্কটল্যাণ্ড থেকে সংক্ষিপ্ত চিঠি লিখেছে জেসিকা থমসন :

‘রানা, তুমি কি পারবে আমাকে একবার ক্ষমা করে দিতে? মস্তবড় ভুল করে ফেলেছি তোমায় কষ্ট দিয়ে। আর তাই হয়তো আমার ওপরে চরম প্রতিশোধ নিলেন দয়াময় ঈশ্বর! রানা, তুমি জানো না, কতবড় পশু আমার স্বামী ও’রাইলি। প্রতিদিন তার কাছে অপমানিত হয়ে, মার খেয়ে হতক্লান্ত হয়ে গেছি। আবারও তোমাকে অনুরোধ করছি: দয়া করে ক্ষমা করো আমাকে। একবার কি আসবে আমার সঙ্গে দেখা করতে? বিশ্বাস করো, আগে জানতাম না, আসলে অন্তর থেকে তোমাকেই ভালবেসেছি আমি।’

মেসেজটা দ্বিতীয়বার না পড়েই ডিলিট করল রানা। বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পার্ক থেকে বেরিয়ে হেঁটে চলল অজানা এক গন্তব্যের উদ্দেশে।

(সমাপ্ত)

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments