Tuesday, May 28, 2024
Homeগোয়েন্দা গল্পকালবেলা (মাসুদ রানা) - কাজী আনোয়ার হোসেন

কালবেলা (মাসুদ রানা) – কাজী আনোয়ার হোসেন

কালবেলা – ১

ক্লিফডেন, আয়ারল্যাণ্ড।

আঠারো শ’ ছিচল্লিশ সালের মে মাসের সাতাশ তারিখ।

সাগরের নোনা হাওয়ার তোড়ে ভাসতে ভাসতে বিদায় নিয়ে চলে গেছে কালো মেঘের ভেলা। দুপুরে নীল আকাশে ঝলমল করছে সূর্য। সোনালি রোদে চিকচিক করছে বৃষ্টিস্নাত সবুজ ফসলের মাঠ। দু’দিকের কাঠের বেড়ার মাঝে সরু পথে এগিয়ে চলেছে দুই অশ্বারোহী। আশপাশে কেউ নেই, নইলে হয়তো বুঝতে পারত এরা গ্রামের মানুষ নয়।

প্রথমজনের কাঁধ খুব চওড়া, বয়স হবে বড়জোর পঁচিশ চেপেছে বিশাল এক বাদামি স্ট্যালিয়নের পিঠে। দখলদার ইংরেজদের আইন অনুযায়ী এমন তাগড়া ঘোড়া কিনে নিতে পারবে না ক্যাথোলিক আইরিশেরা, কারণ তাদেরকে ব্যয় করার জন্যে অধিকার দেয়া হয়েছে মাত্র পাঁচ পাউণ্ড।

যুবকের সঙ্গী খর্বকায় ও বয়স্ক, চোখে গোল আইগ্লাস পথচলায় খুব অনভ্যস্ত। চরম অস্বস্তি বোধ করছে ঘোড়ায় চেপে। কেউ তাকে দেখলে হয়তো ভেবে নেবে, এ-লোক বোধহয় ইংল্যাণ্ডের অভিজাত কোন স্কুলের প্রধান-শিক্ষক।

ফেলে আসা পথে এদেরকে যারা দেখেছে, তাদের জানার কথা নয়, ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এক গোপন পরিকল্পনা নিয়ে এখানে এসেছে এরা। গত কয়েক বছর ধরে জটিল গবেষণা শেষ করে এবার সেটার ফলাফল প্রয়োগ করবে এ-দেশে।

পরস্পরের পরিচিত হলেও নীরবে এগিয়ে চলেছে তারা। স্যাডলে বসে কোমর ধরে গেছে প্রৌঢ়ের। একটু পর পর কোট থেকে বের করে দেখে নিচ্ছে ঘড়ি। মনের ভেতরে কাজ করছে সুগভীর এক ভয়: কেউ না কেউ পিছু নিয়েছে! কথা বলতে গিয়েও সেটা গিলে নিচ্ছে সে। বারবার করে ভাবছে: ‘অ্যাঙ্গাস, আমার খুব খারাপ লাগছে। আমরা বোধহয় মস্তবড় এক পাপে জড়িয়ে গেছি!’

যদিও প্রৌঢ় কিছু বললেই মুখের ওপরে হেসে যুবক বলে দেবে: আপনি তো সব বুঝেই নেমেছেন! এখন পিছিয়ে গেলে হবে?

জীর্ণ বেড়ার গায়ে চওড়া এক গেটের সামনে থেমে চট্‌ করে এদিক-ওদিক দেখে নিল যুবক। নিচু স্বরে বলল, ‘তা হলে কাজটা এখানেই সেরে নিই।’

ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল তারা। বেড়ার সঙ্গে দড়ি বেঁধে দেয়ায় তাজা ঘাসে মুখ ডোবাল ঘোড়াদুটো। স্ট্যালিয়নের স্যাডল ব্যাগ খুলে কাপড় দিয়ে মোড়ানো লম্বাটে এক কাঠের বাক্স নিল যুবক। ওটা ধরিয়ে দিল প্রৌঢ়ের হাতে। চোরের মত চারপাশে তাকাল তারা। গেট টপকে ফসলের মাঠে নেমে পড়ল যুবক। হাত বাড়িয়ে সঙ্গীর কাছ থেকে বুঝে নিল কাঠের বাক্স। প্রৌঢ় ভাবতে শুরু করেছে: ‘বড্ড ভুল করেছি! এখন আর কিছুই করার নেই!’ সাবধানে গেট ডিঙিয়ে খেতের- ভেতরে নেমে এল সে।

কাপড় দিয়ে মোড়ানো কাঠের বাক্স ডানহাতে নিয়ে হেঁটে চলেছে যুবক। চারপাশে গাঢ় সবুজ পাতার অসংখ্য ছোট গাছ। আইরিশ গরীব বর্গাচাষীরা বলে: এসব অলস বিছানা। এ-দেশে যেদিকে চোখ যাবে, বেশিরভাগ খেতে এই একই গাছ। সরু শাখায় কালচে-সবুজ পাতা, খুদে বেগুনি ফুল।

খেতের মাঝে গিয়ে থমকে দাঁড়াল যুবক ও তার সঙ্গী। হাঁটতে গিয়ে হাঁফ লেগে গেছে প্রৌঢ়ের। পথে কাউকে না দেখে স্বস্তি বোধ করছে যুবক। সাগরের ঢেউয়ের মৃদু স্ শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোন আওয়াজ নেই।

‘ঠিক আছে, এবার কাজটা শেষ করি,’ বলল যুবক।

দেরি না করে ফসলের মাঠে বসে পড়ল তারা। এখন আর পথ থেকে তাদেরকে দেখতে পাবে না কেউ। ওপরের কাপড় সরিয়ে সাবধানে মাটিতে বাক্সটা রাখল যুবক। ওটার ঢাকনি খুলে নিতেই পাশ থেকে প্রৌঢ় দেখতে পেল, ভেতরে লাল ভেলভেটের খোপে কয়েক সারিতে আছে কাঁচের ছোট কিছু বোতল। প্রতিটির ভেতরে আছে কয়েক ফোঁটা বাদামি তরল।

যাতে ভেঙে না যায়, তাই সতর্ক হাতে ভেলভেটের খোপ থেকে সরু এক শিশি নিল যুবক। খুলল ওটার মুখের কর্ক। নাক থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে শিশি। আঠাল তরল থেকে ভেসে আসছে ভয়ানক বিশ্রী এক দুর্গন্ধ।

ভুরু কুঁচকে ওদিকে চেয়ে রইল প্রৌঢ়।

যুবকটি শিশির ভেতরের তরল একটা গাছের গোড়ায় ঢেলে দিতেই, কয়েক সেকেণ্ডে সেটা শুষে নিল বৃষ্টিভেজা মাটি।

আপাতত শেষ হয়েছে তাদের কাজ। কর্ক এঁটে বাক্সের ভেতরে শিশি রেখে দিল যুবক। ঢাকনি বন্ধ করে কাপড়ে মুড়িয়ে নিল বাক্স। গাছগুলোর দিকে তাকাল সন্তুষ্টির চোখে। ওদিকে তিক্ত হয়ে গেছে প্রৌঢ়ের মন। যুবক পথের দিকে এগোতেই আড়ষ্ট ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল সে। চোখ সরাতে পারল না ভেজা মাটি থেকে। একটু আগে ওখানে ঢেলে দেয়া হয়েছে আঠাল সেই তরল।’

এবার কী ঘটবে, সেটা ভেবে দরদর করে ঘামতে লাগল প্রৌঢ়। দুপুরের তপ্ত রোদেও শিরশির করছে তার মেরুদণ্ড। থরথর করে কাঁপছে দু’হাত। বিড়বিড় করে বলল প্রৌঢ়, ‘তো শুরু হলো! অ্যাঙ্গাস, প্রার্থনা করো, আমাদেরকে যেন ক্ষমা করে দেন ঈশ্বর!’

‘আপনি বেশি কথা বলেন, আর্চিবল্ড,’ বলল যুবক, ‘ফিরে চলুন। এখনও বহু কাজ বাকি রয়ে গেছে।’

নীরবে নড়বড়ে গেটের দিকে হেঁটে চলল তারা।

দুই

‘বর্তমান সময়। ফ্রান্সের নরম্যাণ্ডি।

উপকূলীয় বনভূমি ঘেঁষে রানা এজেন্সির দোতলা দালান। বছর চারেক আগেও ব্যস্ত ছিল ওটার নিচতলার ঘরগুলো। অবশ্য এখন কিচেন ছাড়া সব দরজাই থাকে তালাবদ্ধ। করোনাকালীন সময় দেশে ফিরে গেছে এজেন্সির ছেলে- মেয়েরা। এদিকে বিসিআই চিফের অনুমতি ছিল না বলে ইউরোপে রয়ে যেতে হয়েছে মাসুদ রানাকে। মহামারির প্রকোপ হ্রাস পেলেও রাশা ও ইউক্রেনের যুদ্ধের জন্যে গোটা দুনিয়া জুড়ে এখন চলছে ভয়ঙ্কর মন্দা। বড়সব কোম্পানি চাকরি থেকে ছাঁটাই করছে হাজারে হাজারে কর্মকর্তা ও কর্মচারী। যথেষ্ট টাকা নেই এখন সাধারণ মানুষের হাতে। ফলে দিনের পর দিন ক্লায়েন্টের দেখা নেই রানা এজেন্সিতে নতুন করে চালু করা যায়নি বেশিরভাগ শাখা। আবারও অফিস খুলতে পারলে নরম্যান্ডির শাখার চিফ হিসেবে যোগ দেবে রানার বন্ধু, তুখোড় গোয়েন্দা জনি ওয়াকার। গত ক’মাস আগে দেশে ফিরতে শেষ অপারেটিভ রামিন রেজা।

মাঝে দু’মাস বাদ দিলে প্রায় বছর চারেক হলো নরম্যাণ্ডির শাখার ওপরতলার ছোট্ট এক ফ্ল্যাটে বাস করছে রানা। এখন মর্গে গাঢ় কালো কফি হাতে নিয়ে বসে আছে লিভিংরুমের সোফায়। বিসিআই-এর দুর্দান্ত এক ভয়ঙ্কর অ্যাসাইনমেন্টের কথা ভেবে ওর বুক চিরে বেরোল কাঁপা দীর্ঘশ্বাস। ভাবল: হেমন্তে যেভাবে গাছ থেকে খসে পড়ে শুকনো সব পাতা, তেমনি করে ও জীবন থেকেও চলে যাচ্ছে এক এক করে দিনগুলো, বদলে তারী হচ্ছে দুঃসহ অবহেলার স্মৃতির আবর্জনা। আনমনে মাথা নাড়ল রানা। নিজেকে মনে মনে জিজ্ঞেস করল: আর কখনও কি ফিরবে চমৎকার শ্বাসরুদ্ধকর সে-দিনগুলো?

ক্রিং ক্রিং শব্দে ল্যাণ্ডফোন বেজে উঠতেই কফির মগ বামহাতে নিয়ে ডানহাতে রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল বিমর্ষ রানা। ‘হ্যালো, মাসুদ রানা বলছি।’

‘রানা, তুই কি জেনেবুঝে এসব করছিস?’

প্রিয় বন্ধু সৈাহেলের কথা শুনে জবাব দিতে গিয়ে একটু থমকে গেল রানা। তারপর হালকা সুরে বলল, ‘কেন রে, ডাক্তারের চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পেয়ে খুব রেগে গেছেন বস?’

চুপ করে আছে বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স-এর চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর সোহেল আহমেদ। বন্ধুর চাপা দীর্ঘশ্বাস শুনে কৈফিয়তের সুরে রানা বলল, ‘আসলে বছরের পর বছর কোন কাজ নেই! এদিকে ফেরারও অনুমতি নেই…’ মিইয়ে গেল ওর কণ্ঠ।

‘ভাল করেই জানি, বাংলাদেশকে কতটা ভালবাসিস তুই,’ বলল সোহেল, ‘কিন্তু, সেজন্যে তোর তো উচিত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে নিজেকে তৈরি রাখা।’

বন্ধুর অনুযোগ শুনে দ্বিধাহীনভাবে বলল রানা, ‘আমি তো লড়াইয়ের জন্যে তৈরিই ছিলাম, রে! কিন্তু বস মানা করে দিলেন দেশে ফিরতে। তাই করোনাকালীন দুর্যোগের সময়ে চাইলেও মিলিটারি, বিজিবি, পুলিশ বা আনসারদের পাশে থাকতে পারিনি।’

‘তুই কিন্তু কথা বলছিস আবেগ থেকে,’ বলল সোহেল। ‘ভাল করেই জানিস, দেশের বিরুদ্ধে কোথাও কোন ষড়যন্ত্র হলে যে-কোন সময়ে তোর ডাক পড়ত। আর হঠাৎ করে বিপদ হবে না সেটা বলতে পারে না কেউ। তাই বস তোকে বলেছিলেন ইউরোপে রয়ে যেতে।’

চুপ করে থাকল রানা।

‘সাত মাস আগে ছিলি বিশ্বের পাঁচ দুর্ধর্ষ গুপ্তচরের একজন,’ বলল সোহেল। ‘অনেকে বলত তুই-ই সেরা। অথচ, এখন হয়ে গেছিস গভীর সাগরের শামুকের মত স্লো। একটা মেয়ে যতই সুন্দরী হোক; যতই তার এক শ’ রকমের গুণ থাকুক, তাকে না পেলে নিজেকে শেষ করে দিবি তুই?

কফির মগে চুমুক দিয়ে রানার মনের পর্দায় ভাসল মস্ত ঘরের পেছনে সেক্রেটারিয়াল টেবিল। চেয়ারে পিঠ টান করে বাঘের মত বসে আছেন মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খান। কুঁচকে গেছে তাঁর কাঁচা-পাকা ভুরু। হাভানা চুরুটের আঁকাবাঁকা নীলচে ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে ছাতের দিকে। কঠোর চোখে ওকে দেখছেন তিনি।

‘জেসিকা আর আমার ব্যাপারে সবই জেনে গেছেন বুড়ো, না রে, সোহেল?’ আনমনে ঢোক গিলল রানা।

‘তোর ডাক্তারি পরীক্ষার ফলাফল জেনে জেনিকা আর ওর নতুন প্রেমিক-কাম-স্বামীর ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন আমরাও বুঝেছি, মেয়েটার করা অপমানটা ছিল তোর জন্যে খুব আকস্মিক। তবে তুই তো আমাদেরকে আগেই সব বলতে পারতি। আমরা দেখতাম কী করা যায়। অন্তত তোর পাশে তো থাকতে পারতাম!’

তিক্ত হাসল রানা। ‘সারপ্রাইয দেব বলে কিছুই বলিনি। বিয়ের একসপ্তাহ আগে তোদের জন্যে পাঠিয়ে দিতাম বিমানের টিকেট। সেসব কিনেও ফেলেছিলাম।’

বিয়ের বিষয়ে পরে রানার কাছ থেকে সবই জেনে নিয়েছে সোহেল। রানাকে বিয়ে করতে নিজেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে জেসিকা থমসন। বিয়ের দেড়সপ্তাহ আগে স্কটল্যাণ্ডে তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল রানার। কিন্তু যেদিন রওনা হবে, সেই সকালে এল একটি ই-মেইল। তাতে জেসিকা লিখেছে: ‘আমি সত্যিই দুঃখিত, রানা। আমাদের অনুচিত হবে হুট করে বিয়ে করা। একটু দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছি, তোমার প্রতি যে অদ্ভুত আকর্ষণ আমার মনে ছিল, ওটা আসলে স্রেফ সাময়িক মোহ। এ-ও জেনেছি, কখনও তোমাকে অন্তর থেকে ভালবাসিনি। আর সেটা আরও বেশি করে বুঝেছি হ্যারি ও’রাইলির সঙ্গে পরিচয় হওয়ায়।

‘দু’মাস আগে আমাদের পুলিশ স্টেশনে যোগ দিয়েছে ও। ওর সঙ্গে সময় কাটিয়ে এটা বুঝেছি, স্বামী হিসেবে কাউকে গ্রহণ করতে হলে, আমার উচিত হবে ওকেই বিয়ে করা। তোমার আর আমার বিয়ে হলে আমরা কেউই সুখী হতাম না। তুমি যেমন পারতে না স্কটল্যাণ্ডের সমাজে মিশে যেতে, তেমনি তোমাদের দেশে গিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়াও আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। আমরা আসলে একেবারেই আলাদা দুই সমাজের মানুষ।

‘তাই এটাই কি ভাল হলো না, আজ থেকে আলাদা হচ্ছে আমাদের দু’জনের দুই পথ?

‘রানা, পারলে ক্ষমা করে দিয়ো আমাকে।

‘চিরকাল তোমাকে সত্যিকারের ভাল একজন বন্ধু বলেই জানব। আশা করি এই মেসেজ পাওয়ার পর কষ্ট করে আর স্কটল্যাণ্ডে আসবে না।

‘আজকেই দুপুরে গ্রামের চার্চে হ্যারি ও তাহার বিয়ে। আবারও অনুরোধ করছি: আমায় ক্ষমা কোরো। চিরকাল তোমার বান্ধবী জেসিকা হয়েই থাকতে চাই।

‘অ্যাটাচমেন্টে হ্যারি ও আমার ছবি দিলাম। তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে, দুনিয়ায় হ্যারি আর আমি এনেছি স্রেফ পরস্পরের জন্যে।

‘অনেক ভাল থেকো, রানা।’

জেসিকার চিঠিটা পড়ে প্রিয় বন্ধু রানার অপমানের মাত্রা বুঝে তিক্ত হয়ে গিয়েছিল সোহেলের অন্তর। রানা আর স্কটল্যাণ্ডে যায়নি। যোগাযোগও করেনি মেয়েটার সঙ্গে। নরম্যাণ্ডির রানা এজেন্সির অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেছে লণ্ডনে। কিন্তু সেখানেও ছিল না কোন কাজ। আর তখন থেকেই পদে পদে নিজেকে অবহেলা করেছে রানা। হাতে কাজ নেই বলে বেঁচে থাকার সামান্য আগ্রহটাও হারিয়ে ফেলেছে।

‘আমি তোকে খুব ভাল করে চিনি, রানা। জেসিকার জন্যে নয়, ভাল কোন অ্যাসাইনমেন্ট না পেয়ে হতাশ হয়ে গেছিস তুই। ডাক্তাররা তাঁদের রিপোর্টে জানিয়ে দিয়েছেন, গত ছয়মাস ব্যায়াম না করে, নানান অনিয়মের মাধ্যমে নিজেকে ক্ষয় করে দিয়েছিস।’

চুপ করে থাকল রানা।

‘আগেও দু’একবার আনফিট হয়েছিস, বলল সোহেল, ভেবে দেখ ইতালির কথা। মাফিয়া বেজন্মা কুকুরগুলো কিশোরী মেয়ে লুবনাকে ধর্ষণের পর খুন করলে, প্রতিশোধ নিতে নতুন করে গড়ে নিয়েছিলি নিজেকে। পরের কাহিনী গোটা দুনিয়া জানে। আগেও কঠোর পরিশ্রম করে প্রমাণ করে দিয়েছিস, তুই যোগ্যদের চেয়েও অনেক যোগ্য। অবশ্য ডাক্তারেরা এবার তোর শারীরিক ও মানসিক যে রিপোর্ট চিফের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাতে হতবাক হয়ে গেছেন তিনি।’

কফির মগে চুমুক দিল রানা। মুখে কোন রা নেই।

‘ডাক্তারেরা বলেছেন তোর দৈহিক ও মানসিক কণ্ডিশন খুব খারাপ। আর সেজন্যেই বাধ্য হয়ে তোকে পুরো একবছরের জন্যে ছুটি দিয়েছেন চিফ। আমাকে বলেছেন, রানাকে বলবে, আগামী বছর সেপ্টেম্বর মাসের ভেতরে কমপ্লিটলি রিকভার না করলে ‘ওকে অবশ্যই যেতে হবে অবসরে।’’

‘তুই আসলে আমাকে কী করতে বলিস, সোহেল? বেসুরো স্বরে বলল রানা। কাজ নেই বলে দিনের পর দিন অলস জীবন পার করেছি। তুই কি আমাকে শুধু বাঁচার জন্যে বাঁচতে বলিস?’

‘তুই বরং এক কাজ কর, প্যারিসে যা,’ বলল সোহেল। কথাটা শুনে তিক্ত হাসল রানা। ‘ওখানে গিয়ে কী হবে?’

‘সৈয়দ আলী জাকিরের কথা তোর মনে আছে? ওই যে, হালকা-পাতলা লোকটা? আমাদের এজেন্টরা ইউরোপে কোন বিপদে পড়লে দরকারি কাগজপত্র বা যন্ত্রপাতি ওর কাছে পৌঁছে দিয়ে উধাও হতো? আর পরে জাকিরের কাছ থেকে সব আমরা সংগ্রহ করে নিতাম?’

‘হ্যাঁ, চিনি। হাসিখুশি মানুষ। অন্তর থেকে আমাদের দেশটাকে ভালবাসে।’

‘ঠিকই বলেছিস। আর সেই সৈয়দ আলী জাকির এখন আছে মস্ত বিপদে।’

‘খুলে বল, কী ধরনের বিপদে পড়েছে সে।’

‘প্যারিসে তোর অ্যাপার্টমেন্টের কাছেই ওর দোকান।’

‘হ্যাঁ, মনে আছে।’

‘ওখানে গেলেই বুঝবি, গোটা এলাকা দখল করে নিয়েছে একদল রোমানিয়ান মস্তান। যেহেতু সে-এলাকায় ভিনদেশিরা সংখ্যায় বেশি, তাই তাদের কাছ থেকে নালিশ গেলেও রোমানিয়ানদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ খেয়ে মোটেও গা করছে না প্যারিসের পুলিশ। সৈয়দ জাকিরকে হুমকি দিয়েছে রোমানিয়ানেরা। দোকান চালু রাখতে হলে প্রতিমাসে তাদেরকে দিতে হবে দু’হাজার ইউরো। শুধু তা-ই নয়, দোকান ছেড়ে পালিয়ে গেলেও ধরে এনে ওর মাথা ফাটাবে তারা। তখন একলাখ ইউরো না পেলে ওর বউ আর মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে গুম করবে লাশ। এদিকে আপাতত ফ্রান্সে তুই ছাড়া বিসিআই এজেণ্ট বলতে কেউ নেই। এবার আমার কথা বুঝলি, রানা? এ-বিপদে জাকিরকে সাহায্য করতে পারবে না বিসিআই। যেটা তুই চাইলে হয়তো পারবি। আমরা জানি, তুই ডাক্তারী রিপোর্ট অনুযায়ী টোটালি আনফিট। কিন্তু একটু আগে বা বললেন, তুই যদি পারিস, তো সৈয়দ আলী, জাকিরের পাশে যেন দাঁড়াস।’

প্রথম পরিচয়ে ইলিশ পোলাও খাওয়াবে বলে রানাকে জোর করে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল নিরীহ বাঙালি দোকানি। জাকিরের পিচ্চি মেয়েটার মিষ্টি মুখটা ভেসে উঠল রানার চোখের তারায়। লাজুক মেয়ে সীমা শাহানা। দেখতে হয়েছে বাবার মত। ঝুপ করে বসে পা ছুঁয়ে সালাম করেছিল রানাকে। নিজেই লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল রানা। হেসে ফেলে বলেছিল, ‘আরে, আমি তো এত বুড়ো নই যে পা ধরে ‘সালাম করতে হবে!’ পিচ্চির হাতে দিয়েছিল বড় একবাক্স কিটক্যাট চকোলেট।

রাতের খাবারের পর চকোলেটের চারভাগের একভাগ আবার আদর করে ওকেই খাইয়ে দিয়েছিল সীমা। ওর সহজ কথা: ‘তুমি চকোলেটের ভাগ পাবে না, তা-ই কি হয়? আমরা তো এখন বাড়িতে চারজন। তাই সবাই সমান ভাগে ভাগ করে নেব।’

সোহেলের কথায় বাস্তবে ফিরে এল রানা।

শোন, জাকিরের কাছ থেকে জেনেছি, আজ শেষবারের মত বিকেলে রোমানিয়ানেরা ওর কাছ থেকে টাকা নিতে আসবে। যেহেতু ওর কাছে দেয়ার মত টাকা নেই, তাই এবার কী হবে সেটা তো বুঝতেই পারছিস। পিটিয়ে ওর হাড়গোড় ভাঙবে তারা। বাকি জীবনের জন্যে পঙ্গু হবে জাকির। আর এরপর ওর বউ-বাচ্চা…

‘সোহেল, তুই ভাবিস না, আজ দুপুরের আগেই পৌঁছে যাব প্যারিসে, শুকনো গলায় বলল রানা। বুকের ভেতরে উথলে উঠেছে অভিমান। ‘আমাকে তো চিরকালের জন্যে বিদায় করেই দিলেন বস। এখন থেকে তো আর আমাকে কোন দায়িত্ব দেয়া হবে না। আর একটা কাজ এবার হাতে পেলাম।’

‘দেখ, রানা, দোস্ত, ছুটিতে নিজেকে গুছিয়ে নে,’ মিনতির সুরে বলল সোহেল। ‘জানি, তুই পারবি। মনে রাখিস, তুই একা নস্। কোন বিপদ হলে বলবি। আমরা বেঁচে থাকলে ঠিকই হাজির হব।’

‘তা জানি, দোস্ত,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা।

‘জাকিরের বিপদ কেটে গেলে কোথায় যাবি ভাবছিস তুই?’

ক’বছর আগে আয়ারল্যাণ্ডে চাচার বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছি,’ বলল রানা।

‘মনে আছে,’ সায় দিল সোহেল, ‘সে-টাকা জমা দিয়েছিস বিসিআই-এর প্রভিডেন্ট ফাণ্ডে। যাতে অবসর নেয়ার পর বয়স্ক কর্মচারীদেরকে দেয়া যায় বড় অঙ্কের টাকা।’

‘কিছুদিন ধরে খুব মনে পড়ছে বাড়িটার কথা। কৈশোরে বাবা-মা-চাচা-ফুফুসহ ক’বার ওখানে থেকেছি। যদি সুযোগ হয়, আরেকবার ঘুরে আসব ওদিক থেকে।’

‘ঠিক আছে, বলল সোহেল, ‘তবে যেখানেই যাস্, নিজের যত্ন নিবি। বন্ধ করবি বেসামাল, অনিয়ম। আমরা তোর জন্যে খুব দুশ্চিন্তায় আছি রে, দোস্ত। চাই না আমাদের প্রিয় সুপার হিরো চিরকালের জন্যে বিস্মৃত হোক বিসিআই থেকে।’ চুপ হয়ে গেল সোহেল। ক’সেকেণ্ড পর বলল, ‘আরেকটা কথা, রানা, এবার কিন্তু খুব মন দিয়ে শুনবি। আমাদের বুড়ো আমাকে গম্ভীর চোখে দেখে নিয়ে আজ বলেছেন: ‘জীবনের সেরা সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেলে, মনে করি না যে আমার আর বিসিআই-এ রয়ে যাওয়ার কোন প্রয়োজন আছে। কাজেই কিছু দিনের ভেতরে আমি বোধহয় অবসর নেব।’’

সোহেলের কথা তীরের মত বিঁধেছে রানার বুকে। ওর বন্ধু জানল না, রিসিভারের দিকে চেয়ে বিসিআই-এর সেরা এজেন্টের দুই চোখ বেয়ে নেমেছে অশ্রু।

‘তুই ভাল করেই জানিস তোকে কতটা ভালবাসেন বস, বলল সোহেল। ‘মানুষটা হয়তো সত্যিই বুড়ো হয়ে গেছেন। তাঁকে এত কষ্ট দিসনে, রানা। ভাল থাকিস, দোস্ত।’

ফোনের লাইন কেটে যেতেই কফির মগ টেবিলে নামিয়ে রাখল রানা। একবার দেখল হাতঘড়ি।

সৈয়দ আলী জাকিরের পাশে থাকতে হলে দুপুরের আগেই ওকে পৌঁছে যেতে হবে প্যারিসে।

তিন

পুরনো সীসার মত কালো হয়ে গেছে প্যারিসের আকাশ। বিষণ্ণ বিকেলে থেমে থেমে ঝরছে টিপটিপ ইলশে-গুঁড়ি। নিজের ফ্ল্যাট থেকে কয়েক শ’ গজ দূরে পথের ধারে টয়োটা ফোররানার টিআরডি অফ-রোড প্রিমিয়াম গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে আছে রানা। আপাতত আর কেউ নেই রাজপথে। ফুটপাথে কী যেন খুঁটে খাচ্ছে শত শত সাদা-কালো কবুতর।

যে-কোন সময়ে জাকিরের সঙ্গে দেখা করতে দোকানে আসবে রোমানিয়ানেরা। এবং তারা হাজির হবে বলেই আগেভাগে দোকানির সঙ্গে ফোনে আলাপ করে নিয়েছে রানা। মনে মনে শপথ করেছে: ‘মস্তাননেতা অ্যালেকয্যাণ্ড্রুকে এক পয়সাও আপনার দিতে হবে না, জাকির।

পাঁচ মিনিট পর দূরের বাঁক ঘুরে এল ধূসর এক পুরনো মার্সিডিয বেনয্। কড়া ব্রেক কষে থামল জাকিরের গ্রোসারি দোকানের সামনে। বিশ গজ দূরে টয়োটা ফোররানার টিআরডি অফ-রোড প্রিমিয়ামের ড্রাইভিং সিট থেকে অপলক চোখে চেয়ে রইল রানা। ধুপ্ শব্দে খুলে গেছে মার্সিডিযের দরজা। গাড়ি থেকে নেমে সশব্দে দরজা বন্ধ করল দু’জন যুবক। ফুটপাথে উঠে কঠোর চোখে দেখে নিল চারপাশ।

রানা বুঝে গেল, এরা রোমানিয়ান দলের মস্তান। বয়স। পঁচিশ থেকে সাতাশ। একজনের মাথার চুল কালো। রোদে পোড়া কালচে চেহারা। পূর্বপুরুষ জিপসি। অন্যজনের শিরায় আছে স্লাভিক রক্ত। ঘোড়ার মত লম্বাটে মুখ। মাথার চুল সোনালি। দু’জাতির মানুষ না হলে যে-কেউ ভাবত, একই বাবার ঔরসে জন্ম নিয়েছে এরা। দৈর্ঘ্যে হবে সাড়ে ছয় ফুট। ভারী শরীর। চেহারা জানিয়ে দিচ্ছে, ছোটবেলা থেকে চুরি করতে করতে এখন তারা হয়ে গেছে ডাকাত। পরনে কালো চামড়ার জ্যাকেট ও নীল জিন্স। পায়ে বিশাল বুট। আরেকটু বড় হলে নূহ নবীর নৌকার সাইযের বলে ধরে নিত রানা।

গটমট শব্দে জাকিরের দোকানে গিয়ে ঢুকল তারা।

অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর চ্যালারা বেধড়কভাবে পেটাবে জাকিরকে ভাঙচুর করবে দোকান। জাকিরের হাত-পা ভেঙে রক্তারক্তি করে বিদায় নেবে। অন্যান্য দোকানের মালিক বা কর্মচারীরা ভুলেও প্রতিবাদ করতে আসবে না। কারণ সবার বুকে আতঙ্কের স্রোত তৈরি করেছে রোমানিয়ান মস্তানেরা।

পাশের সিট থেকে ব্যাগ নিয়ে ড্রাইভিং দরজা খুলে নেমে পড়ল রানা। বিড়বিড় করে বলল, ‘দেখা যাক!’

ফুটপাথে উঠে গম্ভীর মুখে জাকিরের দোকানে ঢুকে পড়ল রানা। প্যারিসের এদিকে ফিরে বিস্মিত হয়েছে ও। ক’মাস আগেও ঝকঝকে পরিষ্কার ছিল দোকানগুলোর কাঁচ। এখন সেখানে নোংরা সব উক্তি। কিছু দোকানের ভাঙা কাঁচের জায়গায় আছে পাতলা বোর্ড। শেষ হয়ে গেছে স্থানীয় দোকানিদের জমজমাট ব্যবসা। একটু দূরে পুরনো বইয়ের যে দোকান, ওটা আর নেই। পেস্ট্রির লাল রঙের দোকানটাও উঠে গেছে। ক’মাস আগে ওখানে গিজগিজ করত খদ্দের।

এটা প্যারিসের পশ এলাকা নয়, তবে আগে এখানে ছিল মানুষের প্রাণের ছোঁয়া। ভয়ঙ্কর কালো কোন ছায়া যেন এখন ঢেকে দিয়েছে চারপাশ। ফোনে জাকিরের কাছে জানতে চেয়েছিল রানা, ‘এদিকের এই অবস্থা কীভাবে হলো?’

কয়েক মাস আগে এল রোমানিয়ান মস্তানেরা,’ বলেছে জাকির। ‘তারা এলাকা দখল করে নেয়ায় পড়ে গেল ব্যবসা । আমরা হয়ে গেলাম খুব অসহায়।। আজকাল এদিকে আসে না কেউ। তাই কেনা কাটা সবই প্রায় বন্ধ। ফাঁকা পড়ে থাকে সামনের রাস্তা।

‘আপনারা পুলিশে জানালেও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি?’

‘না। পুলিশে নালিশ দিয়েছিল দুই ব্যবসায়ী। তাদের পা ভেঙে দিয়েছে মাস্তানেরা। একবার এদিকে আসেনি পুলিশ। রোমানিয়ানদের নেতা মনে করে সে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট।’

‘তা-ই?’

‘জী। চাাঁদা তুলছে সব দোকান থেকে। অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিলে বা বিক্রি করা হলে মালিকের কাছ থেকে আদায় করে বহু টাকা। রানাকে করুণ সুরে বলেছে জাকির, ‘আমার টাকা নেই যে প্রতিমাসে এত টাকা দেব। ওদিকে দোকান ছেড়ে দিলে আগেই দিতে হবে একলাখ ইউরো। নইলে পিটিয়ে আমার হাড়গোড় ভাঙবে। বলেছে: তাতেই সার শেষ নয়-আমার স্ত্রী ও মেয়েটাকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে মেরে ফেলবে।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফোনে বলেছে রানা, ‘আপনি একদম ভাববেন না। ওদের দলনেতাকে ফোনে জানিয়ে দিন, বিকেলে এসে তারা যেন টাকা নিয়ে যায়।’

‘কিন্তু টাকা না পেলে তো আমাকে খুন করবে!’

‘কিছুই করবে না,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলেছে রানা। ‘আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। ঠিক সময়ে দেখা হবে আপনার সঙ্গে।’ এরপর কল কেটে দিয়েছে রানা। অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নিচের গ্যারাজ থেকে গাড়ি নিয়ে চলে গেছে দূরের এক হার্ডওয়্যার স্টোরে। ওখান থেকে কিনে নিয়েছে দরকারি কিছু জিনিস। ব্যাগ হাতে আবারও উঠেছে গাড়িতে। সোজা ফিরে এসেছে জাকিরের দোকানের সামনে। তখন থেকে ধৈর্য ধরে বসে আছে রোমানিয়ানদের জন্যে। এরপর জাকিরের দোকানে দুই মস্তান ঢুকে পড়তেই কাজে নেমে পড়েছে রানা।

কাউন্টারে থেমে জাকিরের মুখোমুখি হয়েছে দুই দানব । দোকানে নেই কোন খদ্দের। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ছোটখাটো আকারের বাঙালি দোকানি। রানাকে ঢুকতে দেখে আরও ফিকে হয়ে গেল তার মুখের বাদামি ত্বক।

দোকানে দরজার সামনে ছাত থেকে ঝুলছে কয়েকটা ঝুনঝুনি। রানার কপালে লেগে টুংটাং শব্দ করল ওগুলো। চরকির মত ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ল দুই রোমানিয়ান। মরা মাছের মত ঘোলাটে চোখে তারা দেখল রানাকে। দৃষ্টি যেন নীরবে বলছে : ‘শালা তুই ভাগ! নইলে পিটিয়ে মেরে ফেলব!’

দুই মস্তান ভেবে নিয়েছে, ভিনদেশি যুবককে যথেষ্ট সতর্ক করে দিয়েছে তারা। এখন নিষ্পলক চোখে দেখছে, ঘুরে দরকার দিকে চলছে বাদামি রঙের যুবক। কিন্তু বেরিয়ে না গিয়ে দু’হাতে সে ঘুরিয়ে দিল দোকানের ঝুলন্ত সবুজ সাইনবোর্ড। এখন বাইরে ওটার লাল অংশ দেখাচ্ছে : স্টোর ক্লোয্‌ড্‌।

ভেতর থেকে দরজা লক করল বাঙালি যুবক। ঘুরে দুই মস্তানের দিকে চেয়ে আন্তরিক হাসল। কঠোর চোখে তাকে দেখছে রোমানিয়ানেরা। দু’হাত ভাঁজ করেছে বুকে। কুঁচকে গেছে দুই ভুরু। তাদেরকে কিছু না বলে ফ্রেঞ্চ ভাষায় বলল রানা; ‘এরা আর কখনও আপনাকে বিরক্ত করবে না, জাকির।

‘অ্যাই, শালা, কে তুই?’ ঘেউ করে উঠল স্লাভিক । নাম আমার মাসুদ রানা,’ সহজ সুরে বলল বিসিআই এজেণ্ট। ‘তোর নামটা কী?’

‘তোকে একটা সুযোগ দিচ্ছি, বাঁচতে চাইলে লেজ তুলে পালিয়ে যা,’ ধমকে উঠল স্লাভিক। ‘নইলে খুন হবি আমার হাতে!’

‘আমার কিন্তু মনে হয়, তুই নিজেই পড়ে গেছিস মস্ত বিপদে,’ সতর্ক করল রানা।

পরস্পরকে দেখে নিল দুই রোমানিয়ান। হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল কালচে যুবক। তার ভাব দেখে রানার মনে হলো, ভীষণ বিস্মিত হয়েছে সে। স্লাভিক যুবক এখন আগের মত আত্মবিশ্বাসী নয়। বন্ধুর চেয়ে চালাক সে। চাপা স্বরে বলল, ‘তা-ই? আমরা কিছু করলে তখন তুই কী করবি?’

‘আমার কাছে কিন্তু ভয়ঙ্কর অস্ত্র আছে,’ বলে কাঁধ থেকে নিয়ে মেঝেতে ব্যাগ রাখল রানা। ওটার ভেতর থেকে বের করল দুপুরে হার্ডওয়্যার স্টোর থেকে কেনা স্টেল্ গান। ওটার স্প্রিং-লোডেড মেকানিযমের সঙ্গে আছে স্টিলের ছোট এক বাক্স। বাড়ির নানান কাজে লাগে ভেতরের স্টেল্।

রানাকে কঠোর চোখে দেখছে দুই রোমানিয়ান। স্লাভিক যুবকের দিকে স্টেল্ গান তাক করে হ্যাণ্ডেলে চাপ দিল রানা। অস্পষ্ট ক্ল্যাক শব্দে ছোট একটা স্টিলের স্টেল্ ছিটকে গিয়ে লাগল মস্তানের জ্যাকেটের বুকে। টুপ করে মেঝেতে পড়ল পাতলা ধাতব পাত।

তাদেরকে চরম বেইজ্জত করা হয়েছে ধরে নিয়ে রানার দিকে এগোল দুই রোমানিয়ান। অবশ্য তারা হামলা করবে সেজন্যে বসে নেই রানা। দু’সেকেণ্ডে চলে গেছে তাদের আড়াই ফুটের মধ্যে। পরক্ষণে ফুটবলের ফ্রিকিকের মত টানা এক লাথি ঝেড়ে দিল ডানদিকের মস্তানের অণ্ডকোষে।

‘ওরেব্বাপ রে!’ হাহাকার করে দু’হাতে গোপনাঙ্গ চেপে ধরে ঝুঁকে গেল স্লাভিক লোকটা। ক্ষণিকের জন্যে থমকে গেছে তার সঙ্গী। এ-সুযোগে ভারসাম্য ফিরে পেয়ে কোমর ঘুরিয়ে তার বুকে জোরাল এক লাথি বসাল রানা। হুড়মুড় করে পিছিয়ে চিত হয়ে মেঝেতে পড়ল জিপসি যুবক। এদিকে কুঁজো হয়ে আপেলের মত লালচে মুখে হাঁসফাঁস করছে স্লাভিক। সে কিছু বোঝার আগেই একপাশে সরে কনুই দিয়ে তার কণ্ঠনালীতে খচ করে খোঁচা দিল বানা।

মেঝেতে সঙ্গীর পাশে হুড়মুড় করে পড়ল স্লাভিক। পরের সেকেণ্ডে নাচের ভঙ্গিতে এগোল রানা। দুই মস্তানের মাথার পাশে খটাস্-খটাস্ শব্দে লাগল বুটের শক্ত ডগার মাঝারি দুটো লাথি। নতুন করে কিছু বোঝার আগেই নীরবে জ্ঞান হারাল দুই রোমানিয়ান।

লড়াই শেষ হয়েছে মাত্র নয় সেকেণ্ডে!

‘হায়, খোদা!’ বিস্মিত চোখে দুই মস্তানকে দেখল জাকির। বিচলিত হয়ে কচলাচ্ছে দু’হাত। বিড়বিড় করে বলল, ‘এবার সত্যিই আমি শেষ!’

চুপচাপ নিজের ব্যাগ থেকে কাঁচি, বড় এক রোল টেপ ও মার্কার পেন নিল রানা। বেহুঁশ মস্তানদের দুই কবজি, গোড়ালি ও হাঁটুদুটো টেপ দিয়ে মুড়িয়ে দিল। টেপ ব্যবহার করে আটকে দিল তাদের মুখ। কাজ শেষ হতেই জাকিরের দিকে হাত বাড়াল রানা। ‘একটা কাগজ দেখি।’

ক্যাশবুক থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ওর হাতে দিল জাকির। কাঁচি দিয়ে কাগজটা দু’ভাগ করল রানা। এক অংশে মার্কার পেন দিয়ে লিখল: ‘সাবধান!’ অন্য অংশে লিখল মস্তানদের নেতা অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর নাম। এরপর রানা যা করল, তাতে নির্বোধ না হলে যে-কেউ বুঝবে ওর বক্তব্য খুবই সহজ।

স্টেপ গানের ক্লিপ অনায়াসে ভেদ করে প্লাস্টার বা কাঠ। ডানদিকের অচেতন যুবকের কপালে কাগজ সেঁটে ধরে অন্যহাতে স্টেপ গানের হাতলে চাপ দিল রানা। ক্ল্যাক শব্দে যুবকের কপালের হাড়ে গেঁথে গেল তীক্ষ্ণধার স্টেপ্‌ল্। পরে স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে উপড়ে নিতে হবে ওটা। বামদিকের মস্তানের কপালে জুটল তাদের দলনেতার নাম।

রানার কাণ্ড দেখে হাঁ হয়ে গেছে জাকির। মাথা নেড়ে বলল, ‘আপনি কিন্তু এই কাজ করতে পারেন না!’

‘কে বলল পারি না?’ হাসল রানা, ‘করে তো দেখালাম!’

এবার ওরা আমার স্ত্রী, মেয়ে আর আমাকে খুন করবে।’

‘কিছুই করবে না,’ বলল রানা, ‘এরা সত্যিকারের কাপুরুষ। আজকের পর আর কখনও আপনাকে বিরক্ত করবে না।

কয়েক মিনিটের জন্যে বাইরে যাচ্ছে, জাকিরকে জানাল রানা। ও চলে গেলে যেন সামনের দরজা বন্ধ করে দেয় সে। বদলে খুলে রাখবে পেছনের দরজা।

দরজা খুলে দৃঢ়পায়ে পথে বেরিয়ে গেল রানা। পাঁচ মিনিট পর দোকানের পেছনের গলিতে এসে থামল ওর গাড়ি। ভ্যান ওখানে রেখে দোকানে মালামাল সরবরাহ করে পাইকারী বিক্রেতারা। গাড়ি থেকে নেমে রানা দেখল, দরজার কাছে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাকির। তাকে কিছুই না বলে দোকানে ঢুকল রানা। একে একে ছেঁচড়ে অচেতন দুই মস্তানকে নিল গলির ভেতরে। গাড়ির পেছনের ডালা খুলে একে একে ময়দার ভারী বস্তার মত দুই যুবককে ভরল ট্রাঙ্কে। ধুপ করে বন্ধ করল ডালা।

‘ঠিক আছে, এবার অ্যালেকয্যার ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দিন।’ জাকিরকে বলল রানা।

দশ মিনিট পর সরু এক গলিতে ঢুকল ফোররানার টিআরডি অফ-রোড প্রিমিয়াম গাড়ি। দু’পাশে আবর্জনায় ভরা কিছু . গার্বেজ ক্যান। বিশ্রী দুর্গন্ধ চারপাশে। দু’দিকের দেয়ালে নোংরা গালি ও কুৎসিত বাক্য লেখা। গলির শেষে চৌকো আঙিনার বামে দোতলা বাড়ির কথা বলেছে জাকির। ওখানে বাস করে অ্যালেকয্যাণ্ড্রু ও তার স্যাঙাতেরা। আঙিনার অন্যান্য বাড়ি বহু বছরের পুরনো। আগে অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর আস্তানা ব্যবহার করা হতো পতিতালয় হিসেবে। এখনও আছে রঙিন সাইনবোর্ড। পুরু বোর্ডে গজাল মেরে বন্ধ করা হয়েছে নিচতলার জানালা। দোতলার ধুলোভরা জানালায় ঝুলছে খয়েরি পর্দা। বাতি জ্বলছে না কোন ঘরে। কোথাও কারও কোন নড়াচড়া নেই। অবশ্য কেউ না কেউ আছে। বাড়ির উঠনে রুপালি নতুন মার্সিডিয। ওটার পেছনে কালো ল্যাণ্ড ক্রুযার। ইঁদুরের মত ইতর হলেও নতুন গাড়ি ব্যবহার করে অ্যালেকয্যাণ্ড্রু, যাতে তাড়া খেলে দেরি না করে ভেগে যেতে পারে।

অফ-রোড প্রিমিয়াম আঙিনায় রেখে ব্যাগ হাতে নামল রানা। আপাতত গলিতে মানুষ বলতে আছে এক আফ্রিকান তরুণ। দরকারি কিছু পায় কি না সেটা দেখছে গার্বেজ ক্যান ঘেঁটে। বোধহয় সে ড্রাগ অ্যাডিক্ট। অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর বাড়ির উল্টোদিকে পুরনো এক ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে এল ব্যাণ্ডের বেসুরো বিকট গান। যে-কারও মাথা ধরিয়ে দেবে বিশ্রী আওয়াজ। দূরে কোথাও ঘেউ-ঘেউ করছে মেজাজী এক কুকুর। গলা ছেড়ে কেঁদে উঠল পিচ্চি এক মেয়ে। সঙ্গে সঙ্গে চিলচিৎকার জুড়ল এক দম্পতি। এবার নাকি মেয়ের ডায়াপার বদলে দেবে অন্যজন। কয়েক ফুট দূর থেকে আরও কিছু আওয়াজ শুনতে পেল রানা। ওর গাড়ির পেছনে জ্ঞান ফিরতেই গোঙাতে শুরু করেছে দুই মস্তান। মুক্তি চাই তাদের। এরা দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, সেটা আশা করছে রানা।

গাড়ির দরজা লক করে একটু দূরে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সিঁড়িঘরে গিয়ে ঢুকল ও। দরজার আড়ালে থেমে মোবাইল ফোনে কল দিল অ্যালেকয্যাণ্ড্রুকে। তিনবার রিং বাজার পর ধরা হলো ফোন। ঘড়ঘড়ে ভারী কণ্ঠ বলল, ‘কী, কী চাই?’

‘তুমি আমায় চেনো না, তবে তোমাকে আমি চিনি,’ বলল রানা। ‘জানালা দিয়ে নিচে তাকাও। বাইরে তোমার জন্যে দুটো উপহার এনে রেখেছি।

অ্যালেকয্যাণ্ড্রু কিছু বলার আগেই ফোন রেখে দিল রানা। উঁকি দিয়ে দেখল সরে গেছে উল্টোদিকের বাড়ির জানালার খয়েরি এক পর্দী। ধুলোভরা কাঁচের ওদিক থেকে নিচে তাকাল কেউ। এবার বোধহয় ক’জন স্যাঙাত নিয়ে নেমে আসবে লোকটা। তাতে চট করে গরম হয়ে উঠবে পরিবেশ।

রানা ওদেরকে বুঝিয়ে দেবে, তকাল যা করেছে, ভবিষ্যতে যেন তা আর না করে তারা। এরপর কাজ শেষ করে চটজলদি বিদায় নেবে, কারণ অ্যালেকয্যাণ্ড্রুকে বাঁচাতে এসব বাড়ির ড্রাগখোর কেউ না কেউ ফোন দেবে পুলিশে।

অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর বাড়ির দিকে চেয়ে রইল রানা। তারই ফাঁকে ফোন দিল সোহেলকে। প্রথমবার রিং হতেই ওদিক থেকে ফোন ধরল ওর বন্ধু। ‘কিছু বলবি, রানা?’

‘কাজে নেমেছি,’ বলল রানা। ‘বসকে বলিস, আর কোন বিপদ হবে না জাকিরের।

‘ঠিক আছে। তুই সাবধানে থাকিস।’

বস কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে গিয়েও কল কেটে দিল রানা। উল্টোদিকের বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে দু’জন লোক। রানার গাড়ির কাছে গিয়ে থামল তারা। তাদের একজন নির্দ্বিধায় অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। যদিও তার নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারেনি জাকির।

লোকটার বামভুরু থেকে থুতনি পর্যন্ত কুৎসিত এক শুকনো গভীর ক্ষতচিহ্ন। বিশ্রীভাবে বাঁকা হয়েছে ঠোঁটের বামদিক। মাথাভরা ঝাঁকড়া চুল নেমেছে চওড়া কাঁধে। দৈর্ঘ্যে সে ছয়ফুট সাত ইঞ্চি। পাশের সাতফুটি দানব বোধহয় তার ডানহাত। শক্তমুঠোয় স্টেইনলেস স্টিলের নাইন এমএম চৌরাস পিস্তলের বাঁট ধরেছে অ্যালেকয্যাণ্ড্রু!

বাড়ির সিঁড়িঘর থেকে তাদের ওপরে চোখ রাখল রানা। অফ-রোড প্রিমিয়ামে কেউ নেই দেখে চারপাশে তাকাল তারা! আবারও তাদের চোখ ফিরে এল রানার গাড়ির ওপর। বোধহয় শুনতে পেয়েছে পেছনের দিকে গোঙানির আওয়াজ।

সঙ্গীকে গাড়ির পেছন ডালা খুলতে বলে এক পা পিছিয়ে গেল অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। পিতল দিয়ে কাভার করেছে স্যাঙাৎকে। ধুপ শব্দে অফ-রোড প্রিমিয়ামের পেছন ডালা খুলল দানব। একই সময়ে ভেতা। চোখ বোলাল তারা। বন্দিদের স্টেল্ করা কপালে হুঁশিয়ারী বার্তা দেখে সরু হলো তাদের চোখ।

এদিকে নিঃশব্দে সিঁড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে রানা। ব্যাগ থেকে নিয়েছে রাবারের হ্যাণ্ডেলওয়ালা ক্ল হ্যামার। মাত্র তিন সেকেণ্ডে পৌঁছে গেল দুই যুবকের পেছনে। নিজের নাম জাহির করতে গেল না রানা। যুদ্ধে জেতার প্রথম শর্ত হচ্ছে: যার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, তাকে আক্রমণ করো।

সাঁই করে অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর মাথার পাশে হাতুড়ি চালাল রানা। ভাল করেই জানে, আঘাতটা হতে হবে মাপা হাতে, নইলে ভচ্ করে হাড় ভেঙে গেলে বেরিয়ে আসবে ধূসর মগজ।

কাউকে খুন করতে এখানে আসেনি রানা। মাথায় মারাত্মক বাড়ি খেয়ে গোড়া-কাটা কলাগাছের মত ধড়াস করে সিমেন্টের চাতালে পড়ল অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। বিস্ময় নিয়ে রানার দিকে আধপাক ঘুরল তার স্যাঙাত। ফলে হাতুড়ির ঘা লাগল দানবের চোয়ালের উঁচু হাড়ে। টু শব্দ না করে ওস্তাদের পাশে ভূমিশয্যা নিল দানব। জ্ঞান নেই কারও।

‘দুঃখজনক, তোমাদের সঙ্গে দরকারি অস্ত্র নেই,’ বিড়বিড় করল রানা।

চারপাশের বাড়ির জানালায় দেখা দিয়েছে কনো কিছু মুখ। তাদেরকে পাত্তা দিল না রানা। অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর পিস্তলটা পেলে হয়তো নিজের ওপরে আইনি গজব ডেকে আনবে কোন ছোকরা। তাই টোরাসটা সংগ্রহ করল ও। কোমরের বেল্টে অস্ত্রটা গুঁজে নেমে পড়ল কাজে। গাড়ির ভেতরের দুই মস্তানের মাথায় হাতুড়ির ছোট দুটো টোকা দিল। তাতে আবার জ্ঞান হারাল তারা। একে একে তাদেরকে গাড়ি থেকে বের করে পেভমেন্টে শুইয়ে দিল রানা। অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর জ্যাকেটের কলার চেপে ধরে তুলে বসাল তাকে। টেনে নিয়ে গিয়ে রাখল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের দেয়ালের ধারে। লোকটার কদর্য গালে কষে ক’টা চড় দিতেই পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল সে। ঘোলা চোখে এদিক-ওদিক চেয়ে কী যেন বলতে গেল। কিন্তু তখনই রানার বুটের ডগা খোঁচা দিল তার অণ্ডকোষে।

‘সত্যিই তোমার কপাল অনেক ভাল,’ বলল রানা। ‘যারা মহিলা বা বাচ্চাদের ক্ষতি করে, এমনিতে আমি তাদের বিচি কেটে নিই। তবে আজ কেন যেন হাতে রক্ত লাগাতে ইচ্ছে করছে না। ব্যথায় গোঁ-গোঁ করছে অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। তার গালে কষে দুটো চড় মেরে বলল রানা, ‘ঠিক আছে, এবার মন দিয়ে শোনো। দ্বিতীয়বার সতর্ক করব না। তুমি তোমার দলবল নিয়ে এই এলাকা থেকে সরে যাবে। সুস্থ হওয়ার পর যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছ, সবই ফেরত দেবে। বাড়তি কিছু টাকাও দেবে তাদের হাতে। এক এক করে সবার কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেবে। আর কখনও এদিকে যেন দেখতে না পাই। নইলে আবারও খুঁজে নেব তোমাকে। আর তখন কচাৎ করে কেটে নেব তোমার দুই আণ্ডা। আমার কথা ভালভাবে বোঝা গেছে? তুমি এখনও বেঁচে আছ, কারণ তোমাকে খুব খারাপ মানুষ বলে মনে হয়নি আমার। এতক্ষণ কী বলেছি, এবার সেগুলো গড়গড় করে বলো।’

ব্যথায় গাল কুঁচকে বিড়বিড় করে রানার বক্তব্য নিজেও আউড়ে গেল অ্যালেকয্যাণ্ড্রু। একটা কথাও বাদ পড়ল না।

‘বাহ্!’ বলল রানা, ‘তুমি তো দেখি দারুণ মুখস্থ করো! ঠিক আছে, এবার তা হলে ঘুমিয়ে পড়বে। আবার যখন জেগে উঠবে, শুরু হবে তোমার জন্যে একদম নতুন এক জীবন!’ হাতুড়ির চ্যাপটা দিক দিয়ে যুবকের মাথায় ছোট একটা ঘা দিল রানা। অক্ষিকোটরের ভেতরে উল্টে গেল অ্যালেকয্যাণ্ড্রুর চোখের দুই মণি।

ব্যাগ থেকে কাঁচি নিয়ে লোকটার ঝাঁকড়া চুল কচকচ করে কাটল রানা। খুলির কাছে রইল দাড়ির মত খোঁচা-খোঁচা কিছু চুল। একটু পর তার তিন অচেতন স্যাঙাতের মাথার চুলের একই হাল হলো কাঁচির প্রবল আক্রমণে। জ্ঞান ফিরলে আয়না দেখে এরা বুঝবে, চরম বেইজ্জত করা হয়েছে তাদেরকে!

অ্যাপার্টমেন্ট ভবন থেকে প্রশংসা করছে কেউ কেউ অন্যদের চোখে চরম হতাশা। বাদামি যুবক এসে সর্বনাশ করে দিয়েছে স্থানীয় ড্রাগ ডিলারের। তাদেরই কেউ ফোন করেছে পুলিশে। দূর থেকে এল সাইরেনের বিলাপের আওয়াজ।

দেয়ালে ঠেস দিয়ে চার অচেতন মস্তানকে বসাল রানা। বুটের হিলের আঘাতে এক এক করে ভাঙল তাদের কবজি ও গোড়ালির হাড়। বহুকাল হাসপাতালে থাকতে হবে তাদেরকে’। ব্যাগ থেকে নিয়ে কৌটার তরল হলদে রঙ ঢেলে দিল মস্তানদের মুখ, বুক ও পেটে। এই রঙটাকে কাপুরুষতার প্রতীক বলে মনে করে মানুষ। সুতরাং আপাতত কোথাও মুখ দেখাবে না এরা।

জ্ঞানহারা চার মস্তানকে শেষবার দেখে নিয়ে অফ-রোড গাড়িতে উঠল রানা। গলি থেকে বেরিয়ে কয়েক মিনিটে চলে গেল নিজের ফ্ল্যাটবাড়ির কাছে। যেহেতু আপাতত কোন বিপদ হবে না জাকিরের, সেজন্যে স্থির করেছে এবার চলে যাবে আয়ারল্যাণ্ডে।

চার

বর্তমান সময়। আগস্ট মাস।

আকাশ থেকে সোনালি আগুন যেন ঢেলে চলেছে খেপে ওঠা সূয্যিমামা। জায়গাটা টুলসা শহরের পঁচিশ মাইল দূরে উলোগাহ্ লেকের তীরে। সরু আঁকাবাঁকা পথে থেমে গেল রুপালি এক রোল্স রয়েস। ওটার একমাত্র যাত্রী জ্যাকুলিন সিলভেস্টার বড় করে শ্বাস ফেলল। ‘যাক, পৌঁছে গেছি!’

গাড়ি থেকে নেমে পেছন দরজা খুলে দিল দক্ষ শোফার। ‘ধন্যবাদ, বব,’ বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল জ্যাকি। সিট থেকে নিয়ে কাঁধে তুলল ছোট্ট ব্যাকপ্যাক।

‘উইকেও সুন্দর কাটুক, মিস সিলভেস্টার,’ জবাবে হেসে বলল শোফার বব। ‘আমার ফোন নম্বর মনে আছে তো? ফিরতে চাইলে জানাবেন। চট্ করে এসে নিয়ে যাব।’ গাড়ির পেছনের দরজা আটকে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে উঠল সে। রোদ্ রয়েস গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরতি পথে চলে গেল।

সামনে অপূর্ব সুন্দর কটেজটা দেখে খুশি হয়ে উঠল, জ্যাকি। আনমনে ভাবল: লিণ্ডা কনারের মত ধনীরা আসলেই থাকেন সমাজের অনেক ওপরের স্তরে। আর ওর কী কপাল, দাতব্য-কর্মী হয়েও বিলাসবহুল এই কটেজ সামনের দু’দিনের জন্যে ওকে ছেড়ে দিয়েছেন ভদ্রমহিলা।

ভয়ঙ্কর ঝড় তৈরি করার জন্যে বদনাম আছে ওকলাহোমার উত্তরদিকের। আর সে সময়ে প্রলয়ঙ্করী হয়ে ওঠে উলোগাহ লেক। সেজন্যে চেরোকি ইণ্ডিয়ান ভাষায় ওটাকে বলে আঁধার মেঘ। অবশ্য আজ পরিবেশ সত্যিই চমৎকার। আয়নার মত পড়ে আছে নিখর বিশাল লেক। ছোট্ট জেটিতে বোটহাউসের জানালায় ঠিকরে সোনালি রোদ গিয়ে পড়েছে কালো অতল জলে। মনোরম কটেজের সামনে চওড়া বারান্দায় দামি রকিং-চেয়ার। বারান্দার ছাত থেকে নেমেছে পুরনো আমলের সুন্দর একটি লণ্ঠন। ড্রাইভার বব বিদায় নেয়ায় একমাইলের ভেতরে এখন আর কেউ নেই। নিজেকে কেমন যেন একা লাগল জ্যাকির।

আজ শুক্রবার। গোটা সপ্তাহ ওর কেটেছে খুব ব্যস্ততায়। তাই আগামী দু’দিন বিশ্রাম পাবে ভেবে খুশি হয়ে উঠল জ্যাকি। বারান্দায় পা রেখে দরজার পাশে কিপ্যাড প্যানেলে অ্যালার্ম কোড এন্ট্রি করে ঢুকে পড়ল কটেজের ভেতরে। .

কটেজটা ছোট হলেও তোমার হয়তো খুব অসুবিধে হবে না, মৃদু হেসে বলেছেন লিঙা। অথচ তাঁর বিলাসবহুল কটেজ আসলে টুলসা ক্রসবি হাইট্স-এ ভাড়া করা জ্যাকির বাড়ির ছয়গুণ বড়। কটেজের ভেতরে দামি আসবাবপত্র। ওক আর ওয়ালনাট কাঠের মেঝে ও দেয়াল ভার্নিশ করা। যিনি তৈরি করেছেন কটেজের ডিযাইন, সেই আর্কিটেক্ট বোধহয় এ- কাজের জন্যে পারিশ্রমিক নিয়েছেন অন্তত একলাখ ডলার।

নিচতলার মাঝে বৃত্তাকার বড় এক অংশের ছাত তিনতলা সমান উঁচু। দোতলার কাঠের গ্যালারি থেকে নিচে দেখা যাবে গোটা লিভিং স্পেস। কটেজের প্রতিটি জিনিস ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক। নিচে দুটো বেডরুম, ওপরেও তা-ই। পাঁচ মিনিটে নিচের বেডরুম দেখে নিয়ে ব্যাকপ্যাক হাতে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল জ্যাকি। ভোরে খোলা জানালা দিয়ে সূর্যোদয় দেখবে বলে বেছে নিল পুবের বেডরুম। বিছানায় ব্যাকপ্যাক রেখে হাইহিল খুলে পরল রানিং শু। নেমে এল নিচতলায়। ওর মনে আছে মিসেস কনারের বলা কথা: জঙ্গলে যেসব ট্র্যাক গেছে, চাইলে ওদিক থেকেও ঘুরে আসতে পারো।

প্রতিবছর বড়লোকদের কাছ থেকে এতিম শিশুদের জন্যে টাকা সংগ্রহ করে রোয বাড ট্রাস্ট। ওটার চিরস্থায়ী সভাপতি লিণ্ডা কনার। আর তাঁরই ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করে জ্যাকি। এ-বছরও নভেম্বর মাসে ওদের সংগঠন থেকে আয়োজন করা হবে রুন্ট ৬৬ ম্যারাথন। এবার সেই দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার জন্যে কয়েক মাস ধরে নিজেকে গড়ে তুলছে জ্যাকি।

কটেজের সামনের দরজা লক করে লেকতীরের বনভূমির ট্র্যাকে জগিং করতে লাগল ও। গাছের ঘন পাতার ফোকর গলে মাটিতে নেমে এসেছে নানান আকারের রোদ। আনমনে ভাবছে জ্যাকি, গত দু’বছরে লিঙার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সুন্দর এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ওর। আর সেজন্যেই বুঝতে পেরেছে, পারিবারিক জীবনে মোটেই সুখীন মানুষটি।

অবশ্য বড়লোকদের ব্যাপার, আদতেই আলাদা। টুলসা শহরের উত্তরদিকে বিশাল এক ম্যানশনে বাস করেন লিণ্ডা ও তাঁর স্বামী। প্রায়ই দেখা যায় ব্যবসার কাজে দিনের পর দিন বাড়ি ফেরেন না অ্যারন কনার। তাঁর বদলে হৃদয়বান কোন পুরুষকে জীবনে পেলে বোধহয় হাজারগুণ সুখী হতেন লিণ্ডা।

আচ্ছা, আমি নিজেই কি সুখী? নিজেকে জিজ্ঞেস করল জ্যাকি। ওর মনে পড়ল কলেজের সুন্দর দিনগুলোর কথা। প্রথমবর্ষে একইসঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত জনি স্মিথ। পাশের সিটে বসত। কিছুদিনের ভেতরে ওরা হয়ে গেল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেই সখ্য একসময় হয়ে গেল পরস্পরের প্রতি গভীর ভালবাসা। নিয়মিত সাক্ষাৎ না হলে দম আটকে আসত ওদের।

এভাবে পেরোল দুটো বছর।

ওরা স্থির করেছিল কলেজের লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পেলেই দেরি না করে বিয়ে করবে।

কিন্তু চতুর্থ বছরে হঠাৎ করে বদলে গেল সব সমীকরণ।

সামনে বরফে ছাওয়া ক্রিসমাস। বাবা-মার সঙ্গে খালার বাড়িতে লস এঞ্জেলেসে যাবে জনি। বিমানবন্দরে এগিয়ে দিতে গেলে হেসে জ্যাকিকে বলেছিল, ‘এয়ারপোর্টে নেমেই কল দেব।’

কিন্তু আর কখনও ফোন করল না জনি।

লস এঞ্জেলেস বিমানবন্দরের ষাট কিলোমিটার দূরের বরফে ভরা এক মাঠে ক্র্যাশ করল ওদের বিমান।

রাতে ইন্টারনেট নিউয পোর্টালে খবরটা জেনে চমকে গেল জ্যাকি। ভাবল: ঈশ্বর নিশ্চয়ই এত নিষ্ঠুর নন যে এভাবে ওর কাছ থেকে কেড়ে নেবেন জনিকে।

সারারাত আর ঘুমাতে পারল না জ্যাকি।

পরদিন পত্রিকা মারফত জানল, সেই বিমান দুর্ঘটনায় বাঁচতে পারেনি কেউ। জ্যাকির মনে হয়েছিল, মাথার ওপরে ভেঙে পড়েছে গোটা আকাশ। পায়ের তলা থেকে সরে গেছে জমিন। সাঁই-সাঁই করে নেমে যাচ্ছে ও কোথায় যেন!

সকালে ওর শুকনো মুখ দেখে বাবা বলল, ‘কী হয়েছে রে, মা?’

ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল জ্যাকি।

ওকে বুকে টেনে নিয়ে কিছুক্ষণ পর বাবা বলল, ‘পৃথিবীটা খুব কষ্টের জায়গা, না রে, মা?’

একটা কথাও বলতে পারেনি জ্যাকি। মনে পড়েছিল বাবার প্রতি মায়ের চরম অবহেলা ও অনৈতিক আচরণ। বাবাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরেছিল জ্যাকি।

নিজের ঘরে ফিরে কাঁদতে কাঁদতে বুঝেছিল, দুনিয়ায় বাবা ছাড়া আসলেই ওর আর কেউ নেই!

কলেজে ক’জন যুবক চাইল ঘনিষ্ঠ হতে। তবে তাদের দিকে ফিরেও দেখেনি জ্যাকি। আজও ওর মন জুড়ে আছে জনির কুচকুচে কালো মণিদুটো, যেখানে ফুটত গভীর মায়া, একরাশ কৌতুক ও গভীর প্রণয়ের অনুরাগ। জনি কখনও হয়ে উঠত খুব গম্ভীর, যেন দুনিয়াটাকে দেখছে বহু দূর থেকে। ওর মত রহস্যময় ও বিবেচক আর কাউকে কখনও দেখেনি জ্যাকি।

বহুক্ষণ হলো লেকতীরে জগিং করছে জ্যাকি। সূর্যাস্তের একটু আগে আবার ফিরল কটেজে। শাওয়ার নিয়ে নতুন পোশাক পরে বেডরুমে বসে ভাবল, রাতে ডিনারে নেবে সামান্য খাবার। লিণ্ডা অবশ্য বলেছেন, ফ্রিয়ে যা আছে, নিতে যেন দ্বিধা না করে। সাইড কেবিনেটে আছে নানান ড্রিঙ্কের বোতল। যা খুশি নিতে পারে।

ফ্রি থেকে গ্রিড্ টিউনা, ভেজিটেবল সালাদ ও চাইনিয নুডল্স্ নিয়ে মাইক্রো আভেনে গরম করল জ্যাকি। দশ মিনিটে সেরে নিল রাতের খাবার। পরের দু’ঘণ্টা পার করল রোমাঞ্চকর এক থ্রিলার বই পড়ে। ওটা শেষ হওয়ায় নেমে এল নিচতলায়। লিণ্ডা বলেছেন কীভাবে চালু করতে হবে বাড়ির অ্যালার্ম সিস্টেম। নিয়মমত দরজা লক করে ওপরের বেডরুমে ফিরে শুয়ে পড়ল জ্যাকি। জানালা দিয়ে দেখল বনভূমি ভাসিয়ে নিচ্ছে দুধসাদা ধবধবে জ্যোৎস্না। লেকের তীরে মৃদু ছলাৎ-ছলাৎ শব্দে ভাঙছে ছোট ঢেউ। কিছুক্ষণ জ্যোৎস্না দেখে আর ঢেউয়ের শব্দ শুনে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল জ্যাকি।

মধুর স্বপ্নে বিভোর হয়ে কত সময় পার করে দিয়েছে জানে না, হঠাৎ করে ওর ঘুম ভাঙল গলার আওয়াজে। বাইরে রোদের বদলে ঘুটঘুটে আঁধার। চট করে বেডসাইড টেবিলে রাখা ঘড়ি দেখে নিল জ্যাকি। এখন বাজে রাত একটা চুয়ান্ন মিনিট। বাড়িতে ডাকাত পড়েছে ভেবে হঠাৎ করে সতর্ক হয়ে উঠল ও। বিছানায় উঠে বসে টের পেল, ধকধক করছে ওর বুকের ভেতরটা। ভুল শুনেছে কি না সেটা বোঝার জন্যে কান পাতল।

না, ওই তো নিচতলায় পুরুষমানুষের গলার আওয়াজ!

ভয় পেলেও নিজেকে সামলে নিল জ্যাকি। বিছানা ছেড়ে নেমে ব্যাকপ্যাক হাতড়ে বের করল সিগ সাওয়ার পি৩২০ মডেলের পিস্তলটা। ওর বাবা ছিল ব্যাঙ্কের সিকিউরিটি গার্ড। মারা যাওয়ার আগে মাত্র দুটো জিনিস মেয়েকে দিয়ে যেতে পেরেছে। তার ভেতর একটা হচ্ছে এই নাইন এমএম পিস্তল। মানুষটা চাইত স্বাবলম্বী হবে তার মেয়ে। তাই কিশোরী বয়সে ওকে ট্রেনিং দিয়েছে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে পিস্তল। বাবার কথাগুলো গেঁথে গিয়েছিল ওর মনে, তাই আমেরিকার বুনো সমাজে কখনও লোডেড পিস্তল ছাড়া বাইরে বেরোয় না।

সিগ সাওয়ার হাতে নিঃশব্দে বেডরুম ত্যাগ করে চলে এল গ্যালারিতে। আঁধারে কাঠের রেইলিং ঘেঁষে নিচে তাকাল। ঢিবঢিব করছে ওর বুক। মনে হচ্ছে, হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ ওকে ধরিয়ে দেবে ডাকাতদের কাছে!

নিচতলায় বৃত্তাকার লিভিং স্পেসে জ্বলছে উজ্জ্বল বাতি। ছায়া থেকে নিচের সবকিছু দেখছে জ্যাকি। নিচে আছে চারজন লোক। তাদের একজনের পিঠ জ্যাকির দিকে। লম্বা লোক সে। চওড়া কাঁধ। মাথার চুল রুপালি। পরনে স্পোর্টস্ জ্যাকেট ও জিন্স। পায়ে উডল্যাণ্ড শু। দ্বিতীয় ও তৃতীয়জন আছে জানালার কাছে। তাদের বয়স হবে সাতাশ। চিতার মত সুঠাম শরীর। চেহারা খুব গম্ভীর। একজনের কালো চুল আর্মি ছাঁট দেয়া। অন্যজনের পনিটেইল করা চুল সোনালি। দু’জনের পরনে টি-শার্ট ও জিন্সের প্যান্ট।

চতুর্থজন বেঁটে ও মোটা। কালো চুল কোঁকড়া। গালে চাপ দাড়ি। গদিওয়ালা দামি এক আর্মচেয়ারে বসেছে সে।

নিচে কী হচ্ছে জানা নেই জ্যাকির। তবে এরা কীভাবে ডিঅ্যাকটিভেট করল অ্যালার্ম সিস্টেম, সেটা ভেবে পেল না ও। অবশ্য এরা ডাকাত হলে এত নিশ্চিন্তে থাকতে পারত না।

রুপালি চুলের লোকটার হাতে ক্রিস্টালের স্বচ্ছ গ্লাস। ওটার ভেতরে সাইড কেবিনেট থেকে নেয়া সোনালি তরল। হঠাৎ করে সে ঘুরে যেতেই স্বস্তি বোধ করল জ্যাকি। পিস্তলের বাঁটে আলগা হলো ওর আঙুল। ভদ্রলোক লিপ্তার স্বামী। ভিড়ের ভেতরেও তাঁকে চিনবে ও। বোধহয় অন্যদের সঙ্গে ব্যবসার আলাপ করতে এখানে এসেছেন।

হঠাৎ লজ্জায় লালচে হলো জ্যাকির দু’গাল। ভদ্রলোক যদি এখন জানেন, ও এসে উঠেছে এ-কটেজে, তো না জানি কী ভাববেন তিনি! এটা পরিষ্কার, ওকে যে এখানে থাকতে দিয়েছেন লিণ্ডা, সেটা স্বামীকে বলেননি তিনি। হয়তো রেগে উঠবেন ভদ্রলোক। দুর্ব্যবহারও করতে পারেন!

ব্রিত বোধ করছে জ্যাকি। এটা বুঝে গেল, চাইলেও কটেজে লুকিয়ে থাকতে পারবে না। সুতরাং ওর বোধহয় এখন উচিত নিজের উপস্থিতি জানিয়ে দেয়া। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে মুখ খুলতে গেল জ্যাকি, কিন্তু তখনই হঠাৎ করে পাল্টে গেল নিচের পরিবেশ।

টেবিলে মদের গ্লাস রাখলেন লিণ্ডার স্বামী অ্যারন কনার। হাতের ইশারায় ডাকলেন জানালার কাছের দুই যুবককে। দেরি না করে চেয়ারে বসা দাড়িওয়ালা লোকটার পাশে এসে থামল তারা। মধ্যবয়স্ক মানুষটা কিছু বোঝার আগেই কনুই ধরে তাকে আর্মচেয়ার থেকে টেনে তুলল। পিঠে জোর ধাক্কা দিয়ে কার্পেটের ওপরে লোকটাকে ফেলে দিল তারা। এবার ঘটল আরও ভয়ঙ্কর ঘটনা। দুই যুবকের হাতে উঠে এল পুলিশের ব্যবহৃত স্টিলের ব্যাটন। কবজির মোচড়ে হয়ে গেছে টেলিস্কোপের মত লম্বা। পরক্ষণে মুষলধারে ধাতব লাঠির বাড়ি নামল মধ্যবয়স্ক লোকটার ঘাড় ও পিঠের ওপর।

নির্মমতা দেখে লিণ্ডার স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা হারাল জ্যাকি।

‘এখানে নয়,’ শান্ত স্বরে বলল অ্যারন কনার, ‘বাইরে নাও, বার্ব।’

অবিশ্বাস নিয়ে চেয়ে রইল জ্যাকি।

রক্তাক্ত মানুষটাকে ছেঁচড়ে দরজা পার করিয়ে চাঁদের আলোয় ভরা বারান্দায় নিল দুই যুবক।

ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াতে গেল বয়স্ক লোকটা।

আর তখনই ঘটল আরও আতঙ্কজনক ঘটনা।

আরেকটু হলে জ্যাকির মুখ চিরে বেরোত আর্তনাদ। হোলস্টার থেকে কালো এক পিস্তল বের করল ক্রু-কাট চুলের যুবক। পর পর দুই গুলির আওয়াজে কেঁপে উঠল কটেজ। প্রথম গুলিতে ফুটো হয়েছে প্রৌঢ়ের বাম হাঁটুর বাটি। পরের বুলেট চুরমার করেছে ডানহাঁটু। গুলির প্রতিধ্বনি মিলিয়ে গেলেও নির্জন এলাকার চারদিকে ছড়িয়ে গেল লোকটার করুণ আর্তচিৎকার।

সহজ চোখে তাকে দেখছে অ্যারন কনার।

জ্যাকি ভাবল, সত্যিই কি এই লোক ওর বসের স্বামী? এসব কি সত্যিই ঘটছে?

কাউকে বললেও তো বিশ্বাস করবে না ওর কথা!

অবশ্য…

বেডরুমে ঢুকে স্মার্টফোন নিয়ে আবার গ্যালারিতে ফিরল জ্যাকি। কাঁপছে দু’হাত। দ্বিতীয় চেষ্টায় চালু করল ভিডিয়ো। বুঝে গেছে, খুনিগুলো যদি টের পায় ভিডিয়ো করা হচ্ছে, তো দেরি করবে না ওকে খুন করতে।

হামাগুড়ি দিয়ে সরে যেতে চাইছে আহত লোকটা। প্রচণ্ড ব্যথা ও আতঙ্কে ফুঁপিয়ে উঠছে। শান্ত চোখে তাকে দেখছে অ্যারন কনার। প্রৌঢ় যেন আহত এক তেলাপোকা!

কনারের ইশারায় বেচারার পাশে গিয়ে থামল পনিটেইল করা যুবক। পিস্তল তুলল প্রৌঢ়ের ডানহাতের আঙুলের দিকে। পরক্ষণে লাফ দিল যুবকের হাতের অস্ত্র। গুলি লাগতেই বেড়ে গেল আহত প্রৌঢ়ের আর্তনাদ।

মজা পেয়ে হাসছে অন্য তিনজন। লোকটার উরুতে গুলি করল দ্বিতীয় যুবক। পরক্ষণে দুই গুলিতে উড়িয়ে দিল বামহাতের সব আঙুল।

টানা আর্তচিৎকার ছাড়ছে বয়স্ক লোকটা।

কাঁপা হাতে ছোট্ট স্মার্টফোন ধরে রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে জ্যাকি।

‘ধর, শুয়োরটার চিৎকার শুনে বিরক্ত হয়ে গেছি,’ বলল অ্যারন কনার। জ্যাকেট সরিয়ে হোলস্টার থেকে নিল দীর্ঘ নলের এক রিভলভার। চাঁদের আলোয় আয়নার মত চকচক করছে ওটা। হ্যামার তুলে দাড়িওয়ালার মাথার পেছনে অস্ত্রের নল তাক করে টিপে দিল ট্রিগার।

অন্যদুই অস্ত্রের চেয়েও জোরে গর্জন ছাড়ল রিভলভার। হামাগুড়ি দিতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল দাড়িওয়ালা। রক্তে ভেসে গেল মুখের একপাশ। মুচড়ে উঠে স্থির হয়েছে তার দেহ।

বুনো পশ্চিমের কাউবয়দের মত করে রিভলভারটা চরকির মত ঘুরিয়ে হোলস্টারে রেখে দিল অ্যারন কনার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলল, ‘ভ্যানে তোলো হারামজাদাকে। পরে টুকরো করে মাংসগুলো কুকুর দিয়ে খাইয়ে দেবে।

‘ওকে বস,’ একইসঙ্গে বলল দুই যুবক।

‘যাহ্, হারামজাদার রক্ত লেগে গেছে আমার জুতোয়।’

‘সরি, বস,’ বলল পনিটেইল।

‘সমস্যা নেই,’ কাঁধ ঝাঁকাল কনার। ‘ধুয়ে নিলেই হবে।’

একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ভয়ে কাঁপছে জ্যাকি। দু’হাত-পা ধরে লাশটাকে তুলল দুই যুবক। রাখল গিয়ে জঙ্গলের ধারে ভ্যানের কাছে। খুনিরা কটেজ ছেড়ে বেরোতেই জ্যাকি বুঝে গেছে, এখনই মোক্ষম সময়। দেরি না করে পালিয়ে যেতে হবে ওকে। স্মার্টফোন অফ করে একছুটে গিয়ে ঢুকল বেডরুমে। ঘরে টুকটাক জিনিস রয়ে গেছে। তবে এখন আর সময় নেই সেসব গুছিয়ে নেয়ার। ব্যাকপ্যাকে ফোন রেখে ছোঁ দিয়ে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এল বেডরুম থেকে।

কাঁধে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে ছুটে নেমে এল নিচতলায়, হাতে ঝুলছে পিস্তল। উজ্জ্বল আলো জ্বলছে লিভিং স্পেসে। নিজেকে উলঙ্গ বলে মনে হলো জ্যাকির। এইমাত্র কটেজের দিকে ঘুরে চেয়েছে তিন খুনির একজন। যে-কোন সময়ে হয়তো ধরা পড়বে ও। আর সেটা হলে কী ঘটবে, ভাল করেই বুঝতে পারছে।

বারান্দায় থকথকে রক্ত দেখে বমি এল জ্যাকির নিজেকে সান্ত্বনা দিল: পার হতে হবে মাত্র কয়েক ফুট, তারপর পালিয়ে যেতে পারবে জঙ্গলের ভেতরে। দমকা হাওয়ায় পড়া বাঁশ পাতার মত কাঁপছে ওর দু’পা। ভয়ে যে- কোন সময়ে হারাবে চেতনা।

দু’পা ফাঁক করে জঙ্গলের এক গাছের গায়ে ছ্যার ছ্যার করে প্রস্রাব করছে লিণ্ডার স্বামী। বামহাত রেখেছে কোমরে। ঠোঁট গোল করে শিস দিচ্ছে খুশিমনে। সুযোগ বুঝে বারান্দা পেরিয়ে একছুটে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল জ্যাকি। অ্যারন কনার আছে মাত্র বিশ ফুট দূরে। জ্যাকি পরিষ্কার শুনল মূত্রত্যাগের আওয়াজ। ওদিকে রুপালি ভ্যানের কাছে নিচু গলায় আলাপ জুড়েছে কনারের স্যাঙাতেরা। একটু পর আবার ফিরে এল কটেজের দিকে

ভয় পেয়ে ঘন এক ঝোপে ঢুকল জ্যাকি। নড়াচড়া করলে ধরা পড়বে ভেবে আটকে রেখেছে শ্বাস। ওর মাত্র দেড়ফুট দূর দিয়ে গেল পনিটেইল করা যুবক। তার মুখের চুইংগামের মিন্টের গন্ধ নাকে এল জ্যাকির।

ঝোপ পেরোতে গিয়ে হঠাৎ করেই থেমে গেছে যুবক। বোধহয় বুনো জন্তুর মত কাজ করে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। ঝোপের ভেতরে বসে জ্যাকি দেখল, চাঁদের আলো পড়েছে যুবকের মুখের একপাশে। অন্যদিকে কটেজের হলদে আলো। বুনো জানোয়ারের মত চকচক করছে তার দু’চোখ

‘কী হলো, টনি?’ জানতে চাইল দ্বিতীয়জন।

পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে টনি /স্ক্যালেস। এখন চাইলে হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁয়ে দিতে পারবে জ্যাকি।

‘না, কিছু না, বার্ব,’ আবারও কটেজের দিকে চলল স্ক্যালেস।

প্যান্টের চেইন আটকে কটেজের সামনে গিয়ে থামল অ্যারন কনার। বিরক্ত হয়ে বলল, ‘রক্তে ভেসে গেছে বারান্দার মেঝে!

তার কথা শুনে পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসল দুই যুবক। বসের পিছু নিয়ে আবারও ঢুকে পড়ল কটেজে।

ঝোপ ছেড়ে বেরিয়ে ভীত হরিণীর মত জঙ্গলের দূর থেকে দূরে ছুটল জ্যাকি!

কালবেলা – ৫

ওকলাহোমার সেই খুনের ঘটনার দু’দিন পর।

এসময়ে আয়ারল্যাণ্ডে পড়ে কনকনে শীত। উত্তাল সাগর থেকে হু-হু হিমঠাণ্ডা হাওয়া এসে কাঁপিয়ে দেয় গ্যালওয়ে উপকূল। চামড়ার জ্যাকেটের কলার ওপরে তুলে দিল মাসুদ রানা। ম্লান দুপুরে আটলান্টিকের আকাশে ডিমের কুসুমের মত ঝুলছে লালচে সূর্য। আনমনে নুড়িভরা সৈকতে হাঁটতে গিয়ে রানা দেখছে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে ওর ছায়া।

সৈকতে একা থাকতে ভাল লাগে ওর। পা ফেলছে ধীরে ধীরে। জানা নেই এরপর কোথায় যাবে বা কী করবে। মাঝে মাঝে থেমে দেখছে সাগরের ধূসর ঢেউ। ভাবছে: ওরা যদি জানিয়ে দিত, কেন এত অর্থহীন হয়ে গেল ওর এই জীবন!

আগেও এই সৈকতের রুক্ষ পাথরে ঢেউ আছড়ে পড়তে দেখত রানা। অবশ্য সে-ও তো মেলা আগের কথা। একে একে ওর জীবন থেকে বিদায় নিলেন বাবা-মা-চাচা-ফুফু। নিজে নানা বিপদে জড়িয়ে গেলেও বেঁচেবর্তে রয়ে গেছে ও।

রানার বুক চিরে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস। ঝুঁকে সৈকত থেকে তুলে নিল একমুঠো নুড়িপাথর। এক এক করে ছুঁড়ল ঢেউয়ের ওপরে ফোঁস ফোঁস করা ফেনার ভেতরে।

‘আমি এখানে কী চাই?’ জিজ্ঞেস করল নিজেকে। সাগরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে চলল একটু দূরের বাড়িটার দিকে। কয়েক গজ গিয়ে আবারও থামল। খেয়াল করে দেখল উঁচু পাথুরে জমিতে দুর্গের মত ভিক্টোরিয়ান বাড়িটা। ওটার পেছনে এঁকে এঁকে গেছে ব্যক্তিগত সৈকত। এ- এলাকার প্রেমে পড়ে বাড়ি ও সরু সৈকত কিনে নিয়েছিলেন ওর চাচা। মৃত্যুর আগে সবই দান করে যান রানাকে।

বহু বছর পড়ে ছিল বাড়ি। তারপর দেখে রাখবেন সেই শর্তে ওখানে বাস করতে এলেন নিঃসন্তান এক বয়স্ক দম্পতি। কয়েক বছরের ব্যবধানে নিউমোনিয়া ও ক্যান্সারে মারা গেলেন তাঁরা। তখন কাজে গছে না বলে বাড়ি ও সৈকত বিক্রি করে দিয়েছে রানা।

অবশ্য এখন একদম বদলে গেছে বাড়িটা, এবং সেজন্যে অতীতের কথা ভেবে বুকে এসে ব্যথা লাগছে রানার। মনে মনে নিজেকে বলল: দুনিয়ায় কোনকিছুই চিরকালীন নয়। এমন কী মানুষের ভালবাসাও পাল্টায় নানান রঙ। জেসিকার কথা ভেবে তিক্ত হাসল রানা। নিজেকে বলল: ‘বলো তো, আসলে এখানে কেন এলে তুমি?’

নুড়িভরা সৈকত যেখানে শেষ, তারপর পাথুরে সিঁড়ি, বেয়ে উঠলে বাড়ির পেছন উঠন। নতুন মালিক ভেবেছেন নিরাপত্তার কথা, তাই এখন বাড়ির শেষ সীমানায় লোহার সেফটি রেইলিং। সাগরের দিকে এক কনসার্ভেটরি রুমের কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে সূর্যের লালচে দুর্বল আলো।

বাড়ির পাশে সরু পথ ঘুরে চলে গেছে সামনের উঠনে। ওদিকে পৌঁছে মুখ তুলে তাকাল রানা। চাচার বাড়ি বেশি বদলে গেছে সদর গেটে ঝুলন্ত সাইনবোর্ডের জন্যে।

ওখানে লেখা: গ্যালওয়ে গেস্ট-হাউস।

নামটা দেখে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে রানার। কে যেন অন্তরের গভীরে বলে চলেছে: এ-বাড়ি কিন্তু তোমার আর নয়! তুমি এখন আর এটার মালিক নও!

তা হলে আমি এখানে কী করছি? -নিজেকে জিজ্ঞেস করল রানা। কোন জবাব পেল না সেখান থেকে। বিষাদ-ভরা মন নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে, এমন সময় শুনল পরিচিত কণ্ঠ। ‘মিস্টার রানা?’

ঘাড় ফিরিয়ে মোটা এক মহিলাকে দেখতে পেল ও। তাঁর বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ। মুখে মিষ্টি হাসি। পরনে ঢলঢলে নীল গাউন। ধূসর চুল খোঁপা করা। প্রথম দর্শনে তাঁকে মনে হবে বড় কোন হাসপাতালের হেডনার্স। বাড়িটার মত বদলে যাননি। রানা সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়ার সময় যেমন ছিলেন, তেমনই আছেন। বড়জোর আরও চওড়া হয়েছে কোমর। কে জানে, বিশ বছর বয়সেও হয়তো এমনই ছিলেন।

জোর করে মুখে হাসি ফোটাল রানা। ‘দেখা হয়ে ভাল লাগছে, মিসেস অ্যাপলউড।’

‘আমারও, মিস্টার রানা,’ হাসলেন মহিলা।

‘আপনাদের ব্যবসা এখন কেমন চলছে?’ ভদ্রতা করে জানতে চাইল রানা।

‘খুব ভাল। আপনি কি ছুটিতে এসেছেন গ্যালওয়েতে?’

‘জী,’ বলল রানা, ‘এখন কেমন বোধ করছেন মিস্টার অ্যাপলউড?’

‘কোমরের অপারেশনের পর থেকে বেশ ভাল আছে। আজ গেছে গলফ খেলতে। সন্ধ্যার আগে আর ফিরবে না। আপনি ঘুরে গেছেন জানলে আড্ডা দিতে না পেরে খুব আফসোস করবে।’

‘আমারও ভাবতে গিয়ে খারাপ লাগছে, তাঁর সঙ্গে দেখা হবে না,’ ডাহা মিথ্যা বলল রানা। গল্ফ খেলা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিরস গল্প শুনতে চরম আপত্তি আছে ওর। তার চেয়েও মারাত্মক এক বিষয় আছে মিস্টার অ্যাপলউডের। আর সেটা হলো তাঁর ব্যথাভরা কোমর। কীভাবে ট্যাড়া চোখ নিয়ে গর্তে গলফ্ বল ফেলে দেন, সেটাও কঠিন গবেষণার বিষয়। ডানচোখ চেয়ে থাকে সরাসরি সামনে, অন্য চোখটা দেখে আকাশের চাঁদ-তারা।

‘ভেতরে এসে ড্রিঙ্ক নিন, মিস্টার রানা,’ বললেন মিসেস অ্যাপলউড। ‘ক’দিন আগে আমরা বার চালু করেছি।’

একটু দ্বিধা করে তাঁর পিছু নিল রানা। বাড়িতে ঢুকে মনে পড়ল ছোটবেলার স্মৃতি। আগে এন্ট্রান্স হলে ছিল কাঠের কালো প্যানেল। সেসব এখন নেই। আধুনিক করা হয়েছে রিসেপশন এরিয়া। মহিলার সঙ্গে হেঁটে রানা পৌঁছে গেল লিভিং ও ডাইনিং রুমের কাছে। এখন দুই ঘরের মাঝে কোন দেয়াল নেই। ফুলেল ওয়ালপেপার দেখে মনে মনে ভুরু কুঁচকে ফেলল রানা। এ-ছাড়া দেয়ালে আছে কাঁচা রঙের কিছু সস্তা তৈলচিত্র। আগে ছিল না এমন এক আর্চওয়ে পেরিয়ে। ওরা পা রাখল নতুন কনসার্ভেটরি রুমে। রবিবারের ডিনারের জন্যে সাজানো আছে টেবিল ও চেয়ার। ঘরের অন্যদিকে ওক কাঠের মস্ত বার। লাউঞ্জে বসে চুপচাপ পত্রিকা পড়ছেন আশি পেরিয়ে যাওয়া বেশ ক’জন অতিথি।

জানালার কাছে আর্মচেয়ারে বসে আছে এক মেয়ে। রানা অনুমান করল, তার বয়স হবে পঁচিশ। ছেঁটে রাখা বালিরঙা চুলের জন্যে তাকে কিশোরী বলে মনে হচ্ছে। পরনে সাদা টি-শার্ট ও নীল জিন্সের প্যান্ট। সামনে টেবিলে একটা মিনি ল্যাপটপ। পাশে হোয়াইট ওয়াইনের আধখাওয়া গ্লাস। মেয়েটাকে কালো এক নোটবুক থেকে কমপিউটারে তথ্য টুকতে দেখল রানা। বুঝে গেল, ছুটিতেও কাজ এড়াতে পারেনি বেচারি।

আগ্রহ ভরা চোখে রানাকে দেখছেন মিসেস অ্যাপলউড হাসি-হাসি মুখে বললেন, ‘কী বুঝলেন?’

‘খুব সুন্দর করে সব গুছিয়ে নিয়েছেন,’ আবারও মিথ্যা বলল রানা।

‘সত্যিই?’ খুশি হলেন মহিলা। বারের পেছনে গিয়ে হাতে নিলেন বড় একটা মগ। আপনাকে কী দেব, মিস্টার রানা? আজকে আপনার জন্যে বিনে পয়সায় সার্ভ করা হবে।

মিথ্যা ও ভদ্রতা বহুদূর নেয় মানুষকে, ভাবল রানা। ‘অনেক ধন্যবাদ। আমি নেব গিনেস বিয়ার।

একটু পর বিয়ারে ভরা মগ ওর হাতে দিলেন ভদ্রমহিলা। কিছু বলতেন, কিন্তু তখনই বেল বাজল রিসেপশন এরিয়া থেকে। ব্যবসার কাজে হন্তদন্ত হয়ে ওদিকে ছুটলেন তিনি। একা হয়ে বারের স্টুলে বসে ঠাণ্ডা বিয়ারে চুমুক দিল রানা। নিজেকে বলল: এ-বাড়ি আগের মত নেই, সেটা জেনেও কাঁচা জখমে লবণ ঢালতে এলাম কেন?

ফিরে এসে ওর চটকা ভাঙালেন মিসেস অ্যাপলউড। বললেন, ‘আরেকটা বিয়ার দিই?’

‘আপত্তি নেই,’ দীর্ঘশ্বাস চাপল রানা।

‘ওই যে সুন্দরী? জানালার দিকে চেয়ে নিচু স্বরে বললেন মহিলা। ‘উনি কিন্তু খুব নামকরা এক লেখিকা! ‘

‘তা-ই?’ ভদ্রতা রক্ষা করতে গিয়ে ঘুরে দেখল রানা। ছোট ল্যাপটপে টাইপ করছে মেয়েটা। অবশ্য তখনই নোটবুকের লেখা কম্পোজ শেষ হলো তার। চামড়ার ছোট্ট পাউচে ভরল নোটবুক। পায়ের কাছ থেকে কাপড়ের ব্যাগ তুলে ওটার ভেতরে রাখল পাউচ। কাজ শেষ করে আবারও টাইপ করতে লাগল ল্যাপটপে।

‘কী না জানি গ্যালওয়ে নিয়ে লিখছেন!’ বললেন মিসেস অ্যাপলউড। চকচক করছে দু’চোখ। হয়তো লিখবেন এই রেস্ট-হাউসের কথাও। আর তা হলে তো এটা হবে আকর্ষণীয় এক টুরিস্ট স্পট!’

‘আপনি ভাবছেন উনি লিখছেন গ্যালওয়ে রেস্ট-হাউসের খুন টাইপের কোন বই?’ জানতে চাইল রানা।

‘কে জানে!’ ওর কোমরে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে ফিক করে হাসলেন মিসেস অ্যাপলউড। আবার বাজল বেল। অর্ডার নিতে খদ্দেরের দিকে ছুটলেন তিনি।

ছয়

আধঘণ্টা পর মিসেস অ্যাপলউডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার সৈকতে ফিরল রানা। কৈশোরে গুগলিতে ভরা যে মস্ত চ্যাপটা পাথরে বসে সাগর দেখত, আজও ওটার ওপরে বসল। মিসেস অ্যাপলউড খাতির করে ওকে গিলিয়ে দিয়েছেন একে একে তিন পাইন্ট বিয়ার। নেশার ঘোরে এখন কমে গেছে ওর মানসিক যন্ত্রণা। ভাবতে শুরু করেছে: ওর এবার উচিত নিজের দিকে ফিরে চাওয়া। নিজেকে এভাবে শেষ করে দেয়া যৌক্তিক কারও কাজ নয়!

ঢেউয়ের দিকে চেয়ে শপথ নিল রানা: আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে বৃষ্টি থাকুক বা রোদ, দৌড়ে আসবে পুরো সাত মাইল সৈকত। দেবে এক শ’ বুকডন ও এক শ’ সিটআপ।

অবশ্য আজকের দিনটা ছুটি ধরে নিয়ে সময়টা পার করে দিলে বড় কোন ক্ষতি নেই। চামড়ার জ্যাকেটের পকেট থেকে নিল প্রিয় বন্ধু সলীল সেনের পাঠিয়ে দেয়া বাংলাদেশে তৈরি অ্যালকেমিস্ট সিরিজের বেনসন সিগারেটের প্যাকেট। ওটা থেকে নিয়ে জ্বেলে নিল ষোলোতম শলা। ধোঁয়ায় ফুসফুস ভরে নিয়ে চেয়ে রইল ধূসর সাগরের বুকে। পশ্চিমে অ্যালান দ্বীপকুঞ্জ পেছনে ফেলে চারপাশ ছেয়ে দিচ্ছে নন কালো মেঘের চাদর। একটু পর গ্যালওয়ে উপকূলে নামবে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি।

নুড়িভরা সৈকতে পদশব্দ শুনে ঘুরে তাকাল রানা। ওর দেরি হলো না বালিরঙা চুলের মেয়েটাকে চিনতে। এ হচ্ছে সেই লেখিকা। পরনে টি-শার্টের ওপরে ফ্লিস দেয়া হালকা এক জ্যাকেট। কাঁধে ঝুলছে কাপড়ের ব্যাগ।

কাছে এসে রানার দিকে চেয়ে মিষ্টি হাসল মেয়েটা। নরম সুরে বলল, ‘হ্যালো! ম্লান সূর্যের রোদ এড়াতে কপালে তুলেছে হাত। সাগরের ঝিরঝিরে হাওয়া দুলিয়ে দিচ্ছে তার খাটো চুল।

জবাবে ভদ্রতা করে হাসল রানা। সৈকতে একা থাকতেই ভাল লাগছিল ওর। ভাবেনি অন্য কেউ এখানে হাজির হবে।

‘আমি আবার বিরক্ত করছি না তো আপনাকে?’ বলল মেয়েটা।

‘না-না, তা নয়,’ জানাল রানা।

চ্যাপটা পাথরের ওপর থেকে বালি সরিয়ে ওখানে বসল মেয়েটা। ‘জায়গাটা খুব সুন্দর, তা-ই না?’

মৃদু মাথা দোলাল রানা। ‘ঠিকই বলেছেন।’

‘আমার নাম বেলা ওয়েস,’ বলল মেয়েটা। কথার সুরে রানা বুঝে গেল সে ইংরেজ।

‘আমি মাসুদ রানা, হাত বাড়িয়ে দিল রানা। মেয়েটার হাত নরম, তবে শক্ত করেই ধরেছে ওর হাত।

‘জানি, আপনার নাম মাসুদ রানা,’ বলল বেলা ওয়েস।

‘তা-ই?’ মেয়েটার চোখে তাকাল রানা।

‘মিসেস অ্যাপলউড বলেছেন আপনি আগে এই সম্পত্তির মালিক ছিলেন।’

কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘পরে বিক্রি করে দিয়েছি।’

‘জায়গাটা সুন্দর। বাড়ি আর সৈকত বিক্রি করে নিশ্চয়ই এখন আপনার খুব আফসোস হয়?’

জবাব না দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাল রানা, ‘শুনেছি আপনি নাকি একজন লেখিকা?’

মুচকি হাসল বেলা ওয়েস। ‘মিসেস অ্যাপলউড সুযোগ পেলেই পেটের সব কথা উগরে দেন।

‘মনে পাপ নেই বলেই হয়তো। তিনি বললেন, আপনি হয়তো আপনার উপন্যাসে লিখবেন তাঁদের গেস্ট-হাউসের কথা।’

‘তা হলে হতাশ হতে হবে তাঁকে। আমি আসলে বইয়ের লেখিকা নই।

‘তা-ই?’ আবারও সাগরের দিকে তাকাল রানা।

‘আমি আসলে একজন সাংবাদিকা।’

কোন মন্তব্য না করে চুপ করে থাকল রানা।

‘সরি,’ বলল বেলা ওয়েস, ‘বুঝতে পেরেছি আমি আসলে আপনাকে বিরক্ত করছি। আমি বরং আসি।’

অবহেলা করে বসেছে রানা। মেয়েটার দিকে তাকাল রানা। ‘আপনি মোটেই আমাকে এরক্ত করছেন না।’

‘না, এটা বুঝেছি যে আপনি একা থাকতে চান। আপনাকে বিরক্ত করেছি বলে দুঃখিত।

‘আমারই বরং দুঃখ প্রকাশ করা উচিত,’ বলল রানা। ‘আপনার সঙ্গে ভাল আচরণ করিনি।’ একটু থেমে বলল, ‘একটু পর বৃষ্টি নামবে। সৈকতের বহু দূরে আমার কটেজ। তাই আগেভাগে পৌঁছে যেতে চাই। আপনার কোন আপত্তি না থাকলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ওখান থেকে।’

দ্বিধা নিয়ে হাতঘড়ি দেখল বেলা। ‘একটা কাজ আছে। তবে তার আগে খানিকটা সময় পাব। এদিকটা তো আপনার চেনা। ঠিক আছে, তো চলুন, ঘুরে আসি সৈকতের ওদিকটা থেকে।’

পাথর থেকে নেমে রওনা হলো ওরা। রানা বলল, ‘ওদিকে দেখার মত নতুন তেমন কিছু নেই।’ সৈকতের উত্তরদিকে আঙুল তাক করল ও। ‘ওদিকে যে মস্ত পাথর দেখছেন, ওটা ঘুরে রাস্তা গেছে শহরের দিকে। সে-পর্যন্ত সৈকত আর গেস্ট-হাউসের জমি। তার ওদিকে আছে আমার ভাড়া করা কটেজ। উপকূলীয় সরু এক রাস্তার এদিকে।’

‘আপনাকে গাইড হিসেবে পেয়ে খুশি হলাম।’

‘কথাটা বলেছেন, সেজন্যে ধন্যবাদ।’

গেস্ট হাউস পেছনে ফেলে সৈকত ধরে হেঁটে চলল রানা ও. বেলা। মেয়েটা জানতে চাইল, ‘আমি কি ধরে নেব আপনার পরিবার নিয়ে কটেজে উঠেছেন?’

‘তা নয়। আমি একা মানুষ। সঙ্গে আর কেউ নেই।’

‘ব্যবসার জন্যে এসেছেন, না আনন্দের জন্যে?’

‘কোনটাই নয়।’

ওদের ওপর দিয়ে ভেসে গেল কালো এক ছায়া। মুখ তুলে তাকাল ওরা। চওড়া ডানা মেলে সাগরে ভেসে গেল বড় এক গাল পাখি

‘আমি কখনও এত বড় পাখি দেখিনি,’ বলল বেলা।

‘এদিকে প্রচুর আছে,’ জানাল রানা। ‘পিঠ-কালো বড় গাল ওটা। যদি ওটাকে বড় বলে মনে করেন, তো অ্যালব্যাট্রেস দেখলে সত্যিই চমকে যাবেন। মাঝে মাঝে এদিকে উড়ে আসে।’

সাগরের তাজা হাওয়া বুক ভরে নিল বেলা। ‘চারপাশ কী প্রশান্তিময়! বুঝলাম, কেন আবারও এখানে ফিরে এসেছেন। কিছু মনে করবেন না, জানতে ইচ্ছে হচ্ছে: এখান থেকে চলে গিয়েছিলেন কেন?’

‘গত চার বছরেরও বেশি ছিলাম ফ্রান্সের নরম্যাণ্ডিতে।’

‘আপনি বাস করেন চমৎকার সব জায়গায়,’ হাসল বেলা। ‘আমি নিজে থাকি নিউবারিতে। ওখানে দেখার মত কিছুই নেই। বলুন তো, নিজের বাড়ি বলে এখন কোন্ জায়গাটাকে মনে করেন আপনি?’

‘আমার আসলে কোন বাড়ি নেই। ঘুরে বেড়াচ্ছি এখান থেকে ওখানে।’

‘এরপর কোথায় যাবেন বলে ভাবছেন?’

‘কোন পরিকল্পনা করিনি। আগে বা পরে যাব কোথাও।’

হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল বেলা ওয়েস। ব্যাগের ভেতরে হাত ভরে বের করল ছোট ল্যাপটপ। স্ক্রিনের দিকে চেয়ে বলল, ‘এক্সকিউয মি। আমার একটা মেসেজ আসার কথা।’

‘আপনি সবসময় ল্যাপটপ সঙ্গে রাখেন?’ বলল রানা।

‘যখন-তখন কাজে লাগে যে!’ কমপিউটার ব্যাগে রেখে চামড়ার সরু পাউচ বের করল বেলা ওয়েস। ওটার সামনের পকেট থেকে নিল দুটো মোবাইল ফোন। নীল মোবাইলের স্ক্রিন। অন করে দেখল। আনমনে মাথা নাড়ল। হতাশার সুরে বলল, ‘দূর!’ আবারও ফোন রাখল পাউচে। পাউচ চলে গেল ওর ব্যাগের ভেতরে।

‘খুব জরুরি কোন মেসেজ?’ বলল রানা।

‘রিসার্চের তথ্য পাওয়ার কথা,’ যেন এড়িয়ে যাওয়ার সুরে বলল বেলা। চেহারায় দ্বিধা। একবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ভেবেছিলাম কেউ না কেউ ফোন করবে। যাক গে!’

‘রিসার্চের জন্যেই গ্যালওয়েতে এসেছেন?

মাথা দোলাল বেলা। ‘আমাকে তুমি করে বলতে পারেন, রানা। অনুমতি পেলে আমিও তুমি করেই বলব।’

‘বেশ, বেলা।’

‘গত দশদিন এদিকে ঘুরেছি। কিলার্নি, লিমেরিক, অ্যাথলন… বহু জায়গা।’

‘তাতে কোন লাভ হয়েছে?’

‘তা হয়েছে। ভাবতেও পারিনি এমন সব তথ্য পেয়েছি।’

‘আমি অতিরিক্ত কৌতূহলী হতে চাই না,’ বলল রানা। হাসল বেলা ওয়েস। ‘গোপন রিসার্চ। আমি নিজেও এখন কিছু জানাব না। দয়া করে কিছু মনে কোরো না।’

কিছু বলল না রানা। সাগর থেকে হু-হু করে আসছে শীতল হাওয়া। ক্রমে বাড়ছে তার বেগ। মুখ তুলে আকাশ দেখল রানা। খুব কাছে চলে এসেছে পাহাড়ের মত উঁচু কালো মেঘ। ‘আমাদের বোধহয় দৌড়ে গিয়ে কটেজে ঢুকতে হবে। যা ভেবেছি, তার অনেক আগেই বৃষ্টি চলে এসেছে।’

‘বাধ্য না হলে ল্যাপটপ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে চাই না।’

‘তোমার বইটি কী বিষয়ে, সেটাও বলা যাবে না?’

‘তা নয়, বইটি হবে ঐতিহাসিক বায়োগ্রাফি।’

‘চিনি এমন কারও ওপরে লেখা?’

‘তাঁর নাম লেডি জেনিফার হলওয়ে। উনিশ শতকে ডায়েরি আর বই লিখতেন। কবিও ছিলেন। তখনকার প্রথম সারির নারীবাদী। অবাক হইনি যে তাঁর নাম শোনোনি।

‘সত্যিই শুনিনি,’ বলল রানা। ‘তবে তোমার রিসার্চের কথা শুনে মনে পড়ল, জেনিফার হলওয়ে বোধহয় ছিলেন এবারডেন এস্টেটের মালিক লর্ড স্টার্লিংফোর্ডের স্ত্রী। একসময়ে ব্যালিনাস্লোর ক’মাইল দূরে মস্ত জমিদারি ছিল তাঁর স্বামীর।’

‘দশে দশ পেয়েছ। বুঝলাম স্থানীয় বহু কিছুই জানো!’

‘লর্ড স্টার্লিংফোর্ডের ব্যাপারে এদিকে কিংবদন্তী আছে। গ্রামের সরাইখানা বা পানশালায় গেলে শুনবে নিষ্ঠুর সেই ইংরেজ জমিদারের গল্প। নিরীহ মানুষের ওপরে অত্যাচার করতে করতে একসময় পাগল হয়ে যায় সে। নিজের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করে। অবশ্য আর কিছু জানি না। তো তুমি লিখতে চাও লেডি স্টার্লিংফোর্ডের জীবনী?

‘তা বলতে পারো,’ কাঁধ ঝাঁকাল বেলা ওয়েস।

‘বই নিয়ে তোমাকে অনুৎসাহিত মনে হচ্ছে,’ বলল রানা।

ওকে দেখল বেলা। ‘তাই বুঝি মনে হচ্ছে? অবশ্য এর কারণও আছে। জানি না বইটা আর লিখতে পারব কি না। গত কয়েক দিনে এমন কিছু জেনেছি, যে কারণে দ্বিধান্বিত হয়ে গেছি…’ মিইয়ে গেল বেলার কণ্ঠস্বর। চট করে দেখল আকাশ। ওদের মাথার ওপরে চলে এসেছে কালো মেঘের সারি।

এবার যে-কোন সময়ে নামবে বৃষ্টি,’ বলল রানা। ওর কথা শেষ হতে না হতেই ভারী ফোঁটা নিয়ে ঝরঝর করে নামল আস্ত আকাশ। সাগর থেকে এল শোঁ-শোঁ হাওয়া।

কোমরে ফ্লিসের জ্যাকেট শক্ত করে জড়িয়ে নিল বেলা। বৃষ্টির শব্দের ওপর দিয়ে বলল, ‘হায়, যিশু! আমরা তো ভিজে যাচ্ছি!’

বহু পেছনে চ্যাপটা পাথরটা দেখল রানা। তারপর বলল, ‘বেলা, গেস্ট-হাউসের চেয়ে আমার কটেজ অনেক কাছে। কী করবে ভাবছ? চাইলে বৃষ্টির সময়টা আমার ওখানে বসতে পারো।’

ওর দিকে তাকাল বেলা। ‘তো জলদি চলো!’

সাত

ছুটে চলেছে রানা ও বেলা। ঝোড়ো হাওয়ায় ভর করে টাস- টাস শব্দে নামছে বৃষ্টির ভারী ফোঁটা। নুড়িভরা সৈকত ও বড় এক পাথরখণ্ডের মাঝের পথ ধরে কটেজের কাছে পৌঁছে গেল ওরা। ছোট্ট বাগান পেরিয়ে থামল সদর দরজায়। তালা খুলে বেলাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল রানা।

ভিজে গিয়ে শীতে থরথর করে কাঁপছে মেয়েটা। গা বেয়ে টপটপ করে মেঝেতে পড়ছে পানি। একবার শিউরে উঠে বলল, ‘আমাকে বোধহয় ডুবন্ত ইঁদুরের মত বিশ্রী দেখাচ্ছে?’

‘না, তা নয়, ভেজা বেড়ালের মত,’ হাসল রানা।

ফ্লিসের ভেজা জ্যাকেট খুলল বেলা। ঠাণ্ডায় বেগুনি হয়ে গেছে ওর ফর্সা দুই বাহু।

ওর দিকে চেয়ার বাড়িয়ে দিল রানা। বেলার হাত থেকে ফ্লিসের জ্যাকেট নিয়ে ঝুলিয়ে রাখল চেয়ারের পিঠে। বলল, ‘আগুন জ্বেলে নিলে চট করে শুকিয়ে যাবে জ্যাকেট।’ কটেজ ভাড়া করার পর চ্যালাকাঠ কেটে রেখেছে ও। ওখান থেকে কয়েকটা নিয়ে গুঁজে দিল ফায়ারপ্লেসে।

খবরের কাগজ মুড়িয়ে আগুন ধরাবে, এমন সময় দেখল ব্যাগে উঁকি দিচ্ছে বেলা। কয়েক সেকেণ্ড পর স্বস্তির সঙ্গে বলল মেয়েটা, ‘ভাগ্যিস কিছু ভিজে যায়নি!’ চেয়ারের কাঁধে ঝুলিয়ে দিল হাতের ব্যাগ।

কাঠের সরু সিঁড়ি উঠেছে দোতলায়। ওটা দেখাল রানা। ‘ওপরে ওয়ার্ডোবে তোয়ালে পাবে। বাথরুমে হেয়ার ড্রায়ার।’ সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠল বেলা। এদিকে ফায়ারপ্লেসের দিকে ঝুঁকে লাইটার দিয়ে খবরের কাগজে আগুন দিল রানা।

মিনিট দশেক পর নেমে এল বেলা। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিয়েছে মাথার চুল। রানার জ্বেলে নেয়া আগুনে উষ্ণ হয়ে উঠেছে কটেজ। খুশি হয়ে বলল বেলা, ‘ছোট হলেও কটেজটা সুন্দর। সত্যিই রুচি আছে তোমার।

‘এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় এটা ছিল পরিত্যক্ত, জেলে কুটির। চারদেয়াল ও অর্ধেক ছাত ছাড়া কিছুই ছিল না। বৃষ্টি এলে এখানে ঠাঁই নিতাম। অবশ্য গত কয়েক বছরে সবই বদলে গেছে। জানালার পাশে ওক কাঠের ড্রেসারের সামনে থামল রানা। ওটার ওপর থেকে নিল আধখালি উইস্কির বোতল। ঘুরে তাকাল বেলার দিকে। ‘ড্রিঙ্ক নেবে? এটা ছাড়া আপাতত কটেজে অন্য কোন পানীয় নেই।’

‘জনি ওয়াকারের ব্ল্যাক লেবেল, বারো বছর ম্যাচিউর করা,’ হাসল বেলা। ওর চোখ পড়ল ড্রেসারের পাশে খালি কিছু বোতলের ওপর। চট্ করে বলল, ‘তুমি বোধহয়। সত্যিকারের সমঝদার!’

‘বদ্ধ মাতাল বলে ধরে নাওনি সেজন্যে ধন্যবাদ,’ তিক্ত হাসল রানা। দুটো ক্রিস্টালের গ্লাসে ঢেলে নিল দু’আউন্স করে উইস্কি।

‘আমার বোধহয় নেয়া উচিত হবে না,’ বলল বেলা। ‘উইস্কি এলোমেলো করে দেয় মাথা। অবশ্য এ-ও ঠিক, সামান্য নিলে ক্ষতি কোথায়!’

‘উইস্কি উষ্ণ করে মানুষের ঠাণ্ডা হৃদয়,’ বলল রানা।

‘ওটা যে মানুষের কোথায় থাকে, আজও বুঝতে পারিনি, ‘ রানার হাত থেকে উইস্কির গ্লাস নিল বেলা। পরেরবার কার্ডিওলজিস্টের সঙ্গে দেখা হলে জেনে নেব। … চিয়ার্স!’

‘চিয়ার্স!’ গ্লাসে গ্লাসে টোকা দিল ওরা।

ফায়ারপ্লেসের দু’পাশের দুই চেয়ারে মুখোমুখি বসল। লালচে আগুনের আভায় রক্তিম দেখাচ্ছে ওদের মুখ।

গ্লাসে চুমুক দিয়ে আরেকটু হলে মুখ থেকে উইস্কি ফেলে দিত বেলা। বিড়বিড় করে বলল, ‘হায়, যিশু! গলা তো পুড়ে ‘গেছে!’

‘খুব বেশি কড়া?’ বলল রানা।

‘তুমি তো অভ্যস্ত, তাই বুঝবে না,’ আরেক চুমুক উইস্কি গলায় ঢালল বেলা। ‘মনে হচ্ছে গরম হয়ে গেছে শরীর!’

বহুদিনের একাকী রানার ভাল লাগছে বেলার সঙ্গ। সৈকতে মেয়েটাকে অভদ্রের মত বিদায় করে দেয়নি বলে নিজের ওপরে খুশি হয়ে উঠল ও।

‘তো আসলে কী কাজ করো তুমি, রানা?’

‘বলতে পারো আমি আপাতত বেকার।’

‘রহস্যময় যুবক! একাকী! কাছে টানলেও কারও সঙ্গে কোন সম্পর্কে জড়ায় না! নেই তার ভবিষ্যৎ কোন পরিকল্পনা! আর এখন শুনছি আয়-রোজগার করার মত কোন পেশাও নেই! তো ব্যাপারটা কেমন হলো, রানা?’

প্রশ্ন এড়াতে গিয়ে বলল রানা, ‘কী ধরনের কাজ করব, আসলে সেটা নিয়েই ভাবতে শুরু করেছি।’

‘আগে কী করতে? নাকি বেশি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে বসেছি?’

রহস্যমানব হয়ে কাজ নেই, ভাবল রানা। মেয়েটা হয়তো এরপর ভেবে নেবে পড়ে গেছে ভয়ঙ্কর এক সিরিয়াল কিলারের খপ্পরে! আত্মরক্ষা করার জন্যে নিজের সম্পর্কে বলল রানা: ‘আগে ছিলাম মিলিটারিতে। পরে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করেছি।’

‘তোমাকে দেখে তো ব্যবসায়ী বলে মনে হয় না,’ হাসল বেলা।

‘পেশা ছিল অস্বাভাবিক।’ গ্লাস খালি হতেই উঠে বোতল থেকে নতুন করে সোনালি তরল ঢেলে নিল রানা।

ড্রিঙ্কে চুমুক দিয়ে বেলা বলল, ‘তুমি তো জানো, আমি কৌতূহলী সাংবাদিক।’ ডানহাতের তর্জনী তাক করল রানার বুকে। ‘মনে রেখো, চাইলে নিরেট পাথরের পেট থেকেও সবই বের করতে পারি।’

‘তা-ই?’

‘সেজন্যে আমি রীতিমত বিখ্যাত!’

‘তবে তো আর মুখ না খুলে উপায় নেই! ঠিক আছে, আগেভাগে বলি: আমি আসলে মানুষকে সহায়তা করি।’

‘সহায়তা করো, তার মানে কী?’

‘কেউ বিপদে পড়লে তার হয়ে গোয়েন্দাগিরি করি। কখনও খুঁজে বের করি কিডন্যাপ হওয়া মানুষকে।’

‘তাই?’ ঢক করে উইস্কি গলায় ঢালল বেলা। অন্তর্ভেদী চোখে দেখল রানাকে। ফায়ার প্লেসে টাস্ করে ফাটল একটা কাঠের টুকরো। চারদিকে ছাল কমলা ফুলকি। ‘তা হলে তো তোমাকে অনেক ধরনের ঝুঁকি নিতে হয়!’

‘কখনও কখনও।’

‘অবশ্য কিছু পুরুষ আছে, যারা ঝুঁকি না নিয়ে বাঁচতে পারে না।’

ক্রমে চড়ছে রানার নেশা। নরম সুরে বলল, ‘জেসিকাও একই কথা বলত।

‘জেসিকা কি তোমার প্রেমিকা?’

‘আগে তা-ই ছিল। কয়েক মাস আগে ভেঙে গেছে বিয়ে।’

‘তা-ই? সরি! তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।’

‘হয়তো ভালর জন্যেই এমনটা হয়েছে। পরে আফসোস না করে আগেই সরে যাওয়া আসলে ঢের ভাল।’

‘আমি জানি মন ভেঙে গেলে কেমন লাগে।’

‘তবে কি তোমারও মন ভেঙে গেছে?

মাথা দোলাল বেলা। ‘তিনবছর একসঙ্গে থাকার পর ভেবেছি বিয়ে করব। কিন্তু তখন ম্যালোরি…’ চুপ হয়ে গেল মেয়েটা।

‘সবসময় সব হিসাব মেলে না,’ বলল প্রায় মাতাল রানা। ‘যতই তুমি চাও।’

‘তুমি কি মেয়েটাকে এখনও ভালবাস?’

‘সত্যি বলতে, আসলে বুঝি না,’ বলল রানা। ‘মেয়েটা কী ধরনের ছিল?’

কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল রানা, ‘রাগী হলেও কেউ বিপদে পড়লে বাড়িয়ে দিত সাহায্যের হাত। বলত: কখনও সংসারের জালে জড়াবে না। আমিও তা-ই ভাবতাম। কিন্তু পরে নিজেই বিয়ে করতে চাইল। তারিখও স্থির হলো। যেদিন ওর গ্রামে যাব, সে-ভোরে এল ই-মেইল। জানাল: একজনকে ভালবাসে। সেদিনই চার্চে ছিল ওদের বিয়ে।’

‘বলো কী!’ উইস্কি গিলতে গিয়ে বিষম খেল বেলা। সামলে নিয়ে বলল, ‘এ আবার কেমন মেয়ে! আমার তো মনে হচ্ছে, তুমি পড়ে গিয়েছিলে আস্ত ডাইনীর খপ্পরে!’

‘তুমি নিজে কেমন ধরনের পুরুষকে বিয়ে করতে চাও?’

‘সে এমন কেউ, যে আমার ভেতরে ভাল কিছু দেখবে। আর দ্বিধা না করে বলবে সেটা। অন্য কোন মেয়ের জন্যে পাগল হয়ে উঠবে না। তবে, রানা, আসলে জানো, দুনিয়া থেকে বহু আগে বিদায় নিয়েছে সত্যিকারের ভালবাসা। আমি আশপাশে একজনও দেখি না, যে স্বার্থ ছাড়া এক পা এগোয়।’

হাসল রানা। ‘আমিও আছি তোমার তৈরি কাতারে।

মাথা নাড়ল বেলা। ‘তোমাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তুমি আসলে অন্য ধরনের মানুষ। রানার দিকে গ্লাস বাড়িয়ে দিল, মেয়েটা। ‘দাও দেখি আরেক ঢোক আগুনে পানি।’

ভাবতে গিয়ে বিস্মিত হলো রানা, কত অনায়াসেই না গড় গড় করে বলে দিয়েছে জেসিকার উপেক্ষণ। আর সেটা করেছে চরম নিঃসঙ্গতা থেকে! বেলার হাতে উইস্কি ভরা গ্লাস দিতে গিয়ে ওর মনে পড়ল, সারা দিন কিছু খায়নি ও। সকালেও নাস্তার বদলে গিলেছে উই স্কি। তারপর মিসেস অ্যাপলউড দিলেন পুরো তিন পাইন্ট বিয়ার। এখন ঘোলা লাগছে ওর মগজ। রানা টের পেল, অনুচিত হবে আর ড্রিঙ্ক করা। তবুও উইস্কিতে ভরে নিল গ্লাস। জানতে চাইল, ‘এমন কী ঘটল যে বইটা আর লিখবে না?’

কাঁধ ঝাঁকাল বেলা। ‘ভেবেছিলাম বইটা জমবে। কারণ, আগে লেডি স্টার্লিংফোর্ডের ওপরে বায়োগ্রাফি লেখেনি কেউ। রিসার্চের জন্যে সাতমাস এদিকে ঘুরেছি। এ-কাজে ক’বার ফিরে গেছি ইংল্যাণ্ডে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, কাজ শেষ করতে পারব না। তাই আগামীকাল ফিরছি নিজের দেশে।’

মেয়েটা আকর্ষণীয়া, আন্তরিক ও সহৃদয়। আগামীকাল সে চলে যাবে শুনলে হতাশ হবে পরিচিত যে-কেউ। অবশ্য কারও সঙ্গেই জড়িয়ে যাওয়ার কোন ইচ্ছে রানার নেই। নরম সুরে বলল ও, ‘দীর্ঘ সাতমাস গবেষণা করার পর ভাবছ হাত গুটিয়ে নেবে? বলবে, আসলে কী কারণে হারিয়ে গেল উৎসাহ?’

‘উৎসাহ হারিয়ে যায়নি। লেডি স্টার্লিংফোর্ডের জীবনের কাহিনী সত্যিই চমকে দেয়ার মত।’

‘আমাকে কি শোনাবে তাঁর অতীত?’

‘সত্যিই জানতে চাও?’

‘তোমার বলতে আপত্তি না থাকলে শুনব।’

শ্রাগ করল বেলা। ‘বাথ-এ আঠারো শ’ পঁচিশ সালে জন্ম নেন জেনিফার হলওয়ে। __ ষোলো বছর বয়সে প্রথম দর্শনে তাঁকে পছন্দ করে হবু বর লর্ড অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড। বয়সে তিন বছরের বড় সে। কিন্তু ততদিনে বিখ্যাত হয়ে গেছে উদ্ভিদ-বিজ্ঞানী ও কেমিস্ট হিসেবে। কমবয়সে হাতে এসেছে পরিবারের বিপুল সম্পদ। যেমন ধনী, সাহসী, তৈমনি সুদর্শন এক যুবক। মাত্র ক’দিনে জয় করল সে জেনিফারকে। বলা চলে প্রায় উড়িয়ে আনল এ-দেশে। কিন্তু সুখ হলো না তাদের দাম্পত্য জীবনে। জেনিফার বুঝলেন, চারপাশের মানুষের ওপর অত্যাচার চালাতে অভ্যস্ত লর্ড স্টার্লিংফোর্ড। কাউকে মানুষ বলেই মনে করে না সে।’

‘আমিও সেটাই শুনেছি।’

‘এ-কথাই বলে মানুষ নরপশু ছিল লোকটা। জমিদারীর হর্তাকর্তা হিসেবে তার উচিত ছিল আইনের শাসন বজায় রাখা। ছিল একলাখ একরেরও বেশি জমি। উনিশ শতকে নিজের এলাকায় গরীব কৃষকের কাছে সে ছিল সত্যিকারের ঈশ্বর। কিন্তু তার শাসনামলে চলল চরম নির্যাতন। এরপর আঠারো শ’ সাতচল্লিশে মহাদুর্ভিক্ষে দেশটা হলো খিদেভরা ভয়ঙ্কর এক নরক। মর্মান্তিক সে-দুর্যোগে মানুষের করুণ পরিণতি জানলে শিউরে উঠবে যে-কেউ।’

ইতিহাসবিদ না হয়েও বইয়ে এসব পড়েছে রানা। সাধারণ মানুষের জন্যে আয়ারল্যাণ্ড তখন ছিল হাবিয়া দোজখ। আজও মায়েরা তাদের বাচ্চাদেরকে বলে: কীভাবে খেতে না পেয়ে মরেছে এই দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ।

‘কিছুদিনের ভেতরে মরল দশ লাখ মানুষ,’ বলল রানা। ‘আয়ারল্যাণ্ডের প্রধান খাবার আলু। সে-ফসল নষ্ট হওয়ায় মানুষের বেঁচে থাকার আর কোন অবলম্বন ছিল না।’

‘নামকরা ইতিহাসবিদেরা বলেন: দুর্ভিক্ষে মারা গেছে বিশ লাখ মানুষ,’ শুধরে দিল বেলা। ‘এ-দেশে তখন আশি লাখ মানুষ। দু’হাজার তিন সালে ডারফুরের দুর্ভিক্ষে মারা গেছে একলাখ মানুষ। ওই এলাকার জনসংখ্যা দু’কোটি সত্তর লাখ। এ-থেকে বুঝবে, কী মারাত্মক ছিল আয়ারল্যাণ্ডের আকাল। মাছির মত মরেছে মানুষ। গভীর গর্ত খুঁড়ে লাশের ওপরে ঢেলে দিয়েছে নতুন লাশ। এমনও হয়েছে, অতিদুর্বল অনেকে বেঁচে আছে, কিন্তু শরীরে শক্তি নেই যে কবর থেকে প্রতিবাদ করবে। চারপাশে চরম খিদে নিয়ে অসংখ্য মানুষ। একবার এক বর্গাচাষী বাগান থেকে বাচ্চার জন্যে একটা আপেল সংগ্রহ করেছিল বলে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারে লর্ড অ্যাঙ্গাস স্টার্লিংফোর্ড।’

‘ভাল লোককেই বিয়ে করেছিলেন লেডি হলওয়ে।’

সেজন্যে সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে প্রচণ্ড মানসিক কষ্ট। তখন অত্যাচারী স্বামীর হাত থেকে রেহাই পেত না স্ত্রীরা। প্রতিটা সিদ্ধান্ত নিত পুরুষেরা। আইনগতভাবে যখন খুশি স্ত্রীকে ধর্ষণ করতে পারত। যা খুশি করার অধিকার ছিল তাদের হাতে। আমার ধারণা: এ-সুযোগ হাতছাড়া করেনি লর্ড স্টার্লিংফোর্ড। অবশ্য লেডির ডায়েরিগুলো হাতে পেলে বহু কিছুই বুঝতাম।’

‘ডায়েরি লিখতেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড?’

‘এ-দেশে এসে নিয়মিত তা-ই করেছেন। ওগুলো পেলে বহু কিছুই পরিষ্কার হতো আমার কাছে।’

‘ডায়েরিগুলো কি হারিয়ে গেছে?’ জানতে চাইল রানা। মাথা নাড়ল বেলা। ‘প্রায় সবই আছে এ-দেশের এক প্রফেসরের কাছে। তিনি ইতিহাস সংরক্ষণ করেন। তাঁরই ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে সেসব। আমি যোগাযোগ করেছি তার সঙ্গে, কিন্তু ডায়েরি দেখতে দেবেন কি না, জানাননি এখনও। এখন তাঁর ফোনের জন্যেই অপেক্ষা করছি।’

‘বুঝলাম।’

‘যাই হোক, পরবর্তী সময়ে লেখা লেডি জেনিফারের কিছু চিঠি পেয়েছি। তাতে আছে দুঃসহ বৈবাহিক জীবনের বর্ণনা।

‘স্বামী মারা গেলে আয়ারল্যাণ্ড থেকে চলে যান তিনি?’

‘না, ওই লোক মরেছে বেশ পরে। আট বছর নরকে বাস করে এক আত্মীয়ের সাহায্য নিয়ে ইংল্যাণ্ডে চলে যান মহিলা। আর তখন থেকেই বদলে যায় তাঁর জীবন। শুরু করেন মেয়েদের অধিকারের পক্ষে লেখালেখি। বই লেখেন কয়েকটা কবিতা ও উপন্যাসের। দরিদ্র নারী-শিক্ষার জন্যে গড়ে তোলেন একটি স্কুল।’

‘অর্থাৎ নাগপাশ থেকে রেহাই পেয়েছিলেন,’ বলল রানা।

‘তা আসলে নয়। জীবনে খুব স্বল্পস্থায়ী হয় ভাল সময়। তাঁর এক চিঠি অনুযায়ী: আঠারো শ’ একান্ন সালের গ্রীষ্মে আইনি জটিলতায় পড়েন তিনি। ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়। যা জেনেছি, তাতে মহিলা যোগাযোগ করেন লণ্ডনের নামকরা এক আইনজ্ঞের সঙ্গে। তাঁর নাম ছিল স্যর মার্টিন হাডসন। তিনি নিজেও ছিলেন খুব রহস্যময় মানব।’

‘বলতে থাকো, আমি শুনছি।’

কাঁধ ঝাঁকাল বেলা। সরকারের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ ছিল তাঁর। অনেকে বলত তিনি গুপ্তচর। কেন তাঁর সঙ্গে লেডি স্টার্লিংফোর্ড যোগাযোগ করেন, তা জানা যায়নি অবশ্য সে-সময়ে ক্যাড্রিক ডাফ ঘটনায় … ‘

‘সরি? আমি তোমার কথা বুঝতে পারিনি।’

দোষটা আমার। ক্যাড্রিক ডাফ ছিল একজন শিক্ষক। তাকে স্কুলে চাকরি দিয়েছিলেন লেডি স্টার্লিংফোর্ড। তখন জুলাই মাস। শিক্ষকের বয়স সাতাশ। সুদর্শন। আত্মবিশ্বাসী। দুর্দান্ত সাহসী মানুষ। এরপর জানলাম, লেডি স্টার্লিংফোর্ডের প্রেমে পড়েছে সে। যদিও লেডি তাকে প্রত্যাখ্যান করলে, ডাফ ধরে নেয় জেনিফার অন্য কাউকে ভালবাসেন। তখন প্রচণ্ড রেগে গিয়ে পিস্তল সংগ্রহ করে গুলি করে লেডির বুকে। বুঝতেই তো পারছ… খুন হন জেনিফার স্টার্লিংফোর্ড।’

‘অর্থাৎ, আরও রহস্যের জন্ম দিয়ে মারা গেলেন তিনি।’

তোমাকে বলেছি, নিরেট পাথরের বুক থেকেও তথ্য বের করতে পারি। সেজন্যেই আমি একমাত্র মানুষ, যে ভাল করেই জানে: কোনভাবেই লেডি স্টার্লিংফোর্ডের প্রেমিক ছিল না সেই শিক্ষক। ডাফ ছিল সমকামী। আসলে তাকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছিল। খুনি জানত, ক্যাড্রিক ভুলেও চাইবে না সমকামী হিসেবে সমাজে প্রমাণিত হতে। তার ছিল পারিবারিক সম্মান হারাবার ভয়। ফলে উপায় না দেখে মুখ বন্ধ রাখে সে।’

‘বুঝলাম। কিন্তু সেক্ষেত্রে কে খুন করল লেডিকে?’

‘তার নাম বিলি ক্র্যাকার। পেশাদার খুনি। যদিও কে তাকে কাজটা দিল, সেটা জানার আগেই তো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে বই লেখার কাজ।

‘আঠারো শ’ একান্ন,’ বলল রানা। ‘একই বছরে নিজের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করে স্টার্লিংফোর্ড।’

‘শুধু তা-ই নয়, মরে একই মাসে। দুটি মৃত্যুর মাঝে ছিল মাত্র দু’সপ্তাহ। জেনিফার খুন হন সেপ্টেম্বরের সাত তারিখে। আর তাঁর প্রাক্তন স্বামী মারা গেছে একুশ তারিখে।’

‘হয়তো স্ত্রীকে হারিয়ে আত্মগ্লানি থেকে আত্মহত্যা করেছে, বলল রানা।

ওর কথায় নাক কুঁচকাল বেলা। ভাবলে কী করে যে তার মত এক নরপশু মানসিক কষ্টে মরবে!’

‘কী জানি!’ বলল রানা, ‘আমি তো আর লেখক নই। তবে মনে হচ্ছে, দারুণ কাহিনী পেয়েও ছেড়ে দিচ্ছ। নাটকীয়তা, খুন, অবিচার, কেলেঙ্কারি, চক্রান্ত-কী নেই প্লটে!

অনিশ্চয়তায় ভুগছে বেলা। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘তোমাকে আগেই বলেছি, এরপর ঘটেছে আরও কিছু ঘটনা।’

মেয়েটার মুখে দুশ্চিন্তা ও উত্তেজনার ছাপ দেখছে রানা ‘তুমি বলেছ, রিসার্চ করতে গিয়ে অস্বাভাবিক কিছু জেনেছ,’ বলল ও। তুমি কি সে বিষয়ে কিছু বলতে চাও?’

মাথা দোলাল বেলা। ‘ক’দিন আগে অন্যকিছু জানলাম।’

‘সেটা কী?’

‘এমন কিছু, যেজন্যে বদলে গেছে সব। তাই বাধ্য হয়ে বাদ দিচ্ছি বইটি লেখার চিন্তা। আমার ভুল না হলে, এবার বাকি জীবনে বই না লিখলেও আমার ভালভাবেই চলে যাবে।’

‘তা হলে তো পেয়ে গেছ সোনার খনি,’ হাসল রানা।

‘সত্যিই তা-ই। রিসার্চের সময় স্রেফ কপালের জোরে পেয়েছি এমন এক তথ্য, যেটা পাওয়ার কথা নয়। যেন আমার জন্যেই অপেক্ষায় ছিল ওটা। আপাতত আর কিছু বলব না। তুমি আবার কিছু মনে কোরো না, রানা।’

‘যদিও সত্যিই আমি কৌতূহলী হয়ে উঠেছি,’ বলল রানা, ‘একটু আগে বললে গোপন কিছুই বলবে না, সেক্ষেত্রে এত কিছুই বা জানালে কেন?’

‘তোমার কথা শুনে,’ বলল বেলা, ‘তুমিই তো বলেছ, মানুষ বিপদে পড়লে তাদেরকে সাহায্য করো।’

‘বলেছি আগে এসব করতাম। তার সঙ্গে তোমার এই কাহিনীর কীসের সম্পর্ক?

‘তুমি কি এখনও… মানে… সত্যিই সব জানতে চাও?’

‘তুমি বলতে চাইলে নিশ্চয়ই শুনব,’ বলল রানা।

‘আসলে… এ-ব্যাপারে যা জেনেছি… তা ভয়ঙ্কর। তুমি এসব জানলে যে-কোন সময় বিপদে পড়বে।’

‘তা-ই?’

‘হ্যাঁ, এসব তথ্য নিয়ে নাড়াচাড়া করলে খেপে যাবে ক্ষমতাশালী কিছু লোক। তারা আছে গুরুত্বপূর্ণ সব পদে। তাই মনে হচ্ছে এবার বোধহয় যোগ্য কারও সাহায্য লাগবে আমার।’

‘এই যোগ্য মানুষটা কী ধরনের হবে?’

যেমন ধরো তুমি। হয়তো তোমার মত যোগ্য এক বডিগার্ড লাগবে আমার।’

‘তুমি কি ঠাট্টা করছ?’ বেলার চোখে তাকাল রানা।

‘মোটেই তা নয়। তুমি বলেছ, তোমার হাতে আপাতত কোন কাজ নেই। তাই ভাবছি, তুমি যদি আমার সঙ্গে…’

‘সত্যিই তোমার বডিগার্ড লাগবে?’

‘তেমনই তো মনে হচ্ছে!’

‘কিন্তু তুমি তো আমাকে ভাগ করে চেনোই না!’

‘আমি একজন মেয়ে। চোখ দেখে অনেক কিছুই বুঝি। তুমি কখনও কারও সঙ্গে বেইমানি করোনি।’

‘আমি পেশাদার বডিগার্ড নই,’ বলল রানা। ‘তা ছাড়া…’

‘এ-ও বুঝেছি, তুমি আছ খুব দ্বিধার ভেতরে,’ মাথা দোলাল বেলা। ‘আমার অনুচিত হয়েছে তোমাকে চিন্তিত করে তোলা। সত্যি লজ্জা পাচ্ছি যে, এত কথা বলেছি তোমাকে।’ বারকয়েক মাথা নাড়ল বেলা। চোখ পিটপিট করে তাকাল হাতের গ্লাসের দিকে। তারপর নিচু স্বরে বলল, ‘আমি বোধহয় বেশি ড্রিঙ্ক করে ফেলেছি। মাথা বনবন করে ঘুরছে। বোতলটা দেখেছ, রানা? আমরা প্রায় খতম করে দিয়েছি ওটা!’

‘বেশিরভাগই গেছে আমার পেটে,’ বলল রানা। ‘শোনো, বেলা, তোমার সত্যিই সাহায্য লাগলে উপযুক্ত লোক জোগাড় করে দিতে পারব। ফোন পেলেই হাজির হবে সে।

‘সত্যিই কি তা-ই?’

‘যদিও প্রথমে সবই খুলে বলতে হবে তোমার, নইলে যাকে কাজ দেব, সে কিছু না জেনে দায়িত্ব নেবে না।’

‘ব্যাপারটা লেডির ডায়েরির সঙ্গে সম্পর্কিত।’

গ্লাসের উইস্কিটুকু গলায় ঢালল রানা। ‘তিনি মারা গেছেন দেড় শ’ বছরেরও আগে। তা হলে এখন কেন তোমার বিপদ হবে? তা হলে কি তোমাকে হুমকি দিয়েছে কেউ?’

জবাব দেয়ার আগে হাতঘড়ি দেখে চমকে গেল বেলা। বিড়বিড় করে বলল, ‘সর্বনাশ, ভাবিনি এতক্ষণ ধরে গল্প করেছি! এবার যেতে হবে গেস্ট হাউসে। দশটায় কল দেব একজনকে!’

আজ রবিবার। রানা জানে এ-দেশে এই দিনে কোন কাজ করে না কেউ। ‘এখানে বসেই ফোন করতে পারো,’ বলল ও।

‘বলেছ, সেজন্যে ধন্যবাদ।’ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল বেলা। কখন যেন থেমে গেছে বৃষ্টি। সৈকতে সূর্যাস্তের কমলাটে রোদ। ‘আরও দেরি করলে অন্ধকারে হেঁটে ফিরতে হবে। তা-ই মনে হচ্ছে গেস্ট হাউসে চলে যাওয়াই আমার ভাল। ফোনে কথা বলতে হবে অন্তত আধঘণ্টা। অবশ্য তোমার প্রস্তাবটা আমার মনে থাকল। কথা দিচ্ছি, পরে তোমাকে সবই খুলে বলব। আমাকে তোমার ফোন নম্বর দাও। পরে কল দেব।’

‘আগামীকাল সকালে না হয় কথা হবে?’ বলল রানা, ‘আমরা বসতে পারি সেই চ্যাপটা পাথরের ওপরে।

মাথা নাড়ল বেলা। ‘না, সকাল সাড়ে সাতটায় আমাকে এয়ারপোর্টে নেয়ার জন্যে ট্যাক্সি আসবে।

‘মানা করে দাও,’ কটেজের পেছনে আঙুল তাক করল রানা। বাইরে আছে ভাড়া নেয়া টয়োটা প্রিমিয়ো। ‘তোমাকে গাড়িতে করে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেব। তখন শুনে নেব সব।’

ওর কথায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বেলার মুখ। তাতে কোন সমস্যা হবে না তো তোমার? মানে… ঘাড়ে চেপে বসছি না তো?

‘মোটেই নয়। কথাগুলো জরুরি হবে বলেই মনে হচ্ছে।’

তোমার মন মস্ত বড়, রানা,’ চেয়ার ছেড়ে হাতের গ্লাস টেবিলে রাখতে গিয়ে তাল হারাল বেলা। ফ্লিসের জ্যাকেট ও কাপড়ের ব্যাগ যে কাঠের চেয়ারে ঝুলছে, ওটার সঙ্গে হোঁচট খেল ও। কাত হয়ে মেঝেতে ঠাস্ করে পড়ল চেয়ার। বেলা পা পিছলে পড়ছে দেখে হাত বাড়িয়ে ওকে ধরে ফেলল রানা। মেয়েটার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে ভাঙল গ্লাস। নানাদিকে ছিটিয়ে গেল ক্রিস্টালের ধারাল টুকরো।

‘হায়, যিশু!’ বলল বেলা। ‘সত্যি আমি দুঃখিত!’

যে-কারও হাত ফস্কে ভাঙতে পারত,’ বলল রানা। ঝুঁকে সিধে করল চেয়ার। ‘আশা করি ক্ষতি হয়নি তোমার ল্যাপটপের।’

মেঝেতে ছড়িয়ে গেছে মেক-আপ কিট, হেয়ারব্রাশ, পারফিউম। ঝুঁকে ওসব তুলতে লাগল বেলা। তারই ফাঁকে বলল, ‘ডাস্টপ্যান আর ব্রাশ দাও, ভাঙা কাঁচ সরিয়ে ফেলি।’

‘লাগবে না,’ বলল রানা। ‘সব গুছিয়ে নাও, তোমার তো গিয়ে ফোন করতে হবে।’ ওর মনে হলো না বেলা পুরো সুস্থ। হাত ধরে ওকে সোজা হতে সাহায্য করল রানা। ‘ঠিক আছ? আমি কি তোমাকে গেস্ট হাউসে পৌঁছে দিয়ে আসব?

‘লাগবে না। লাজুক হাসল বেলা।

‘তা হলে সকালে দেখা হবে,’ বলল রানা, ‘গেস্ট- হাউসের সামনে থেকো। যাওয়ার পথে কথা সেরে নেব।’

‘সবকিছুর জন্যে তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ,’ রানার বাহু স্পর্শ করল বেলা। ‘ঠিক আছে, দেখা হবে সকাল সাড়ে সাতটায়।’ জ্যাকেট পরার পর কাঁধে ব্যাগ তুলে কটেজ ছেড়ে বেরিয়ে গেল মেয়েটা।

কিছুক্ষণ বেলার গমনপথে চেয়ে রইল রানা। তারপর দরজা বন্ধ করে ফায়ারপ্লেসের পাশের ড্রেসারের ওপর থেকে বোতল নিয়ে গ্লাসে ঢেলে নিল উইস্কি। ভাবল, ‘দেখি আগামীকাল কী বলে ও!’

আট

সৈকত ও বোল্ডারের মাঝের সরু পথে হেঁটে চলেছে বেলা। চট্ করে দেখে নিল হাতঘড়ি। মাত্রাতিরিক্ত উইস্কি গিলে ভোঁতা হয়ে গেছে ওর মগজ। নিজেকে মনে মনে বলল, ‘স্বাভাবিক হও! সামনে জরুরি কাজ! দেরি না করে ফিরতে হবে গেস্ট-হাউসে। বিশ মিনিট পর দিতে হবে ফোন।’

আজ যে-কথা হবে, তার ওপরে নির্ভর করছে বহু কিছু। দ্রুত না হাঁটলে মন ভরে অপূর্ব এক রঙিন সূর্যাস্ত দেখত বেলা। সৈকত প্রশান্তিময়। ঢেউয়ের আওয়াজ আর সিগালের কিচির-মিচির ছাড়া সবই যেন দারুণ কোন চিত্র। অবশ্য সৈকত সংলগ্ন পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে রুপালি এক জিপগাড়ি।

হাঁটতে হাঁটতে ভাবল বেলা, রানা আবার ধরে নেয়নি তো যে ফোনকলটি জরুরি নয়? আসলে মস্তবড় এক সুযোগ এসেছে ওর সামনে। একবার সফল হলে জীবনেও আর ভাবতে হবে না টাকার জন্যে।

বেলার মনে পড়ল রানার মায়াভরা চোখদুটো। আনমনে ভাবল, কাউকে ভালবাসলে সেই মানুষটা হয়তো হবে মাসুদ রানার মতই কেউ। নিজেকে বলল, ক’দিন এখানে রয়ে গেলে বুঝতে পারতাম মানুষটার মনের কথা। কিন্তু সেটা এখন সম্ভব নয়। নিউবারি না ফিরে উপায় নেই ওর। আগে জরুরি ব্যবসা, পরে আর সবকিছু।

রানার চিন্তা মন থেকে বিদায় করতে চাইল বেলা। ভাবতে লাগল হাজার হাজার মাইল দূরের একলোকের কথা। ঠিক সময়ে তাকে ফোন না দিলে ভেস্তে যাবে সব পরিকল্পনা।

ছত্রিশ ঘণ্টা আগে ফোন করে চমকে দিয়েছে তাকে। আর সে যখন অত টাকা দিতে রাজি হয়ে গেল, বেলা বুঝল ক’দিনের ভেতরে ডলারে উপচে পড়বে ওর বেডরুম। তখন চাইলে দুনিয়ার সবই কিনতে পারবে।

কথা বলা এখন জরুরি, কারণ এতক্ষণে হতভম্ব ভাব কাটিয়ে সতর্ক হয়ে উঠেছে লোকটা। টাকা দেয়ার ব্যাপারে সাবধানে কথা বলবে। তা-ই বেলাকেও হতে হবে হুঁশিয়ার। হয়তো এরই মধ্যে ফোনে যোগাযোগ করতে চেয়েও নিজেকে সংবরণ করেছে লোকটা।

গেস্ট-হাউসে ফিরে ফোন দেবে বেলা। ব্যাগের পকেটে পাউচে আছে স্মার্টফোন নোকিয়া এক্স৩০। ঝুঁকি হ্রাস করতে গিয়ে সঙ্গে রেখেছে বেলা কমদামি এক স্যামসাং মোবাইল ফোন। সরকারি আইনি সংস্থা জানবে না ওটার মালিক আসলে কে। হঠাৎ থেমে ব্যাগে যেখানে পাউচ থাকার কথা, জায়গাটা স্পর্শ করল বেলা। ঢোক গিলতে গিয়ে টের পেল শুকিয়ে গেছে ওর গলা। আরেহ্, ব্যাগে তো নেই পাউচটা!

‘হায়, ঈশ্বর!’ বিড়বিড় করল বেলা। ‘ওটা তা হলে কোথায় গেল? পাউচ কি তবে রয়ে গেছে রানার কটেজের মেঝেতে?

ব্যাগে টুকটাক জিনিস তোলার দৃশ্য মনে পড়ল ওর।

মেক-আপ, আয়না, হেয়ার ব্রাশ… পার্স…

তখন কি ব্যাগে তুলতে ভুলে গেছে পাউচটা?

নিজের ওপরে রেগে গেল বেলা। এজন্যেই কখনও মাতাল হতে নেই! পাউচ বোধহয় ঢুকেছে সোফার নিচে। তখন ওদিকে খেয়াল ছিল না ওর।

চট্ করে হাতঘড়ি দেখল বেলা। দশমিনিট পর ফোন করতে হবে! এখন ছুট দিলে সময়মত পৌছুতে পারবে রানার কটেজে। যদিও ওখানে বসে আলাপ করা উচিত হবে না। অবশ্য বাথরুমে ঢুকে মিউজিক ছেড়ে কথা বলা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে রানা কিছুই শুনতে পাবে না।

ঘুরে ফিরতি পথে চলল বেলা। চোখে পড়ল রুপালি সেই মাযদা জিপ। সৈকতের পাশের পথে এগিয়ে চলেছে ওটা। ড্রাইভার বোধহয় দেখছে সূর্যাস্তের চমৎকার দৃশ্য। হয়তো কাউকে খুঁজছে সে।

কিন্তু বেলা ঘুরে রওনা হতেই ইউ-টার্ন নিয়ে সৈকতের ঘাসে নামল জিপ। রুপালি বডি ও কালো কাঁচে প্রতিফলিত হলো সূর্যের লালচে শেষ আলো।

হঠাৎ করেই একরাশ সন্দেহ এল বেলার মনে।

জিপটা কি ওর পিছু নিয়েছে?

নিজেকে জিজ্ঞেস করল বেলা: আমি কি থমকে দাঁড়াব?

আমি স্থানীয় নই। ড্রাইভার কিছু জানতে চাইলেও জানাতে পারব না। তা ছাড়া, তাড়া আছে আমার!

বেলার মনে হলো, কোথায় যেন কী ঠিক নেই!

ওর এখন উচিত রানার কটেজের দিকে ছুটে যাওয়া!

বেলার তিরিশ গজ দূরে পৌঁছে গেছে মাযদা জিপ। একটু পর ওকে ধরে ফেলবে ড্রাইভার। ঘাসজমি পার করে নুড়িপাথরের প্রান্তরে নেমে এল জিপ। দুশ্চিন্তা আরও বাড়ল বেলার। শুকিয়ে গেছে বুক।’ মগজ থেকে উধাও হয়েছে নেশা। মনটা বারবার বলছে: কোথাও মস্ত কোন সমস্যা আছে!

ড্রাইভার চাইছে পথ রুদ্ধ করে দিতে!

ভয়ে ধড়ফড় করছে বেলার বুক। নিজেকে জিজ্ঞেস করল, ড্রাইভার আসলে কী চায় আমার কাছে? নির্জন এই সৈকতে কি কিডন্যাপ বা রেপ করবে সে? নাকি আরও ভয়ঙ্কর কিছু ভেবেছে লোকটা?

ভয় লাগতেই দৌড়াতে শুরু করল বেলা। আশা করছে একটু পর পৌঁছে যাবে রানার কটেজে।

হঠাৎ করেই বেড়ে গেল জিপের গতি। পেছনে ছিটকে দিচ্ছে নুড়িপাথর। ছোট এক বোল্ডারে হোঁচট খেয়ে আরেকটু হলে পড়ে যেত বেলা। বিড়বিড় করে অভিশাপ দিল নিজেকে। আরও জোরে ছুটল কটেজের দিকে। পেছনে ব্রেক কষে থেমে গেছে জিপ। ঝটাং শব্দে খুলে গেল দুই দরজা। গাড়ি থেকে নেমে, এল দু’জন যুবক। কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল বেলা। ওর দিকে চেয়ে আছে লোকদুটো। গাড়ির দরজা বন্ধ না করে দ্রুত ছুটে এল তারা।

বেলা বুঝে গেল, এরা এসেছে খারাপ কোন উদ্দেশ্য নিয়ে। একবার একজন বিরক্ত করতে এলে তার তলপেটে লাথি মেরে পালিয়ে গিয়েছিল বেলা। কিন্তু এখন সেই সুযোগ নেই। দৌড়ে পারবে না দুই যুবকের সঙ্গে।

একজনের মাথায় হুডি, অন্যজনের মাথায় বেসবল ক্যাপ। গম্ভীর চেহারা জানিয়ে দিচ্ছে, কোনভাবেই হাল ছাড়বে না তারা।

মস্ত বিপদে পড়ে ছোটার গতি আরও বাড়াল বেলা। ঝুলন্ত ব্যাগের ভেতরে ল্যাপটপ ঠাস্ ঠাস্ বাড়ি মারছে উরুতে। তাতে কমে যাচ্ছে দৌড়ের গতি। কাঁধ থেকে ব্যাগ নিয়ে মাটিতে ফেলে দিল বেলা। ছুটতে ছুটতে পেছনে তাকাল। ফুঁপিয়ে উঠল আতঙ্কে। এখন তীরবেগে আসছে দুই যুবক।

ঘাড় ফিরিয়ে আবারও পেছনে তাকাল বেলা।

না থেমেই ব্যাগটা তুলে নিয়েছে ডানদিকের যুবক।

এরা আমার কাছে কী চায়? দৌড়ের ফাঁকে ভাবল বেলা।

দু’দিকে চলেছে দুই যুবক। প্রথমজন বেলাকে ধরতে না পারলে বড় বোল্ডারের ওদিকে গিয়ে ওকে ধরবে অন্যজন।

পালাবার উপায় নেই বেলার!

এভাবেই খরগোশ শিকার করে শিকারি কুকুরেরা!

কটেজে যাবার আগেই ধরা পড়বে, বুঝে গেল বেলা। একবার ভাবল ছুটে নেমে পড়বে কি না সাগরে। পরক্ষণে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করল, আর একটু, তারপর পৌঁছে যাব রানার কটেজে!

.

মেঝে থেকে ক্রিস্টালের টুকরো ডাস্টপ্যানে তুলতে গিয়ে ভাবল রানা, বেলা তো চলে গেছে, এখন বড্ড একা লাগছে। আরও একটু ড্রিঙ্ক করলে হয়তো কাটবে নিঃসঙ্গতার বোধ।

এটা ওর জন্যে লোভনীয় চিন্তা।

যদিও মন বলছে: ‘খবরদার! যথেষ্ট! আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে দেরি না করে ব্যায়াম শুরু করবে!’

মনের আরেক অংশ বলছে: ‘আরে, বোকা, আরেকটু গিললে অসুবিধে আসলে কোথায়? খাও না! মানা করেছে কে?’

মেঝের সমস্ত ভাঙা ক্রিস্টাল তুলে কিচেনের রিসাইকেল বিনে ঢালল রানা। এরই ভেতরে গার্বেজ ক্যানে জমেছে উইস্কির খালি কয়েকটা বোতল। ঝাড় ও ডাস্টপ্যান কিচেনের কোনায় রেখে ফিরে এল রানা লিভিংরুমে। সিদ্ধান্ত নিল, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আধগ্লাস উইস্কি সত্যিই ওর কোন ক্ষতি করবে না।

টেবিল থেকে প্রায় খালি উইস্কির বোতল হাতে নিল রানা। গ্লাসে সোনালি তরল ঢেলে ঠোঁটে ঠেকাল। আর তখনই শুনতে পেল বাইরের শব্দগুলো।

আর্তচিৎকার করে উঠেছে এক মেয়ে!

ঝট করে হাত থেকে বোতল ও গ্লাস ড্রেসারের ওপরে রেখে জানালার দিকে চলল রানা। হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ওর কোমর লেগেছে টেবিলের কোণে। গুঁতো খেয়ে ঘুরে গেল প্যাডেস্টাল ল্যাম্প। জানালায় থেমে রানা দেখল, আশি গজ দূরে কটেজ লক্ষ্য করে ছুটে আসছে এক মেয়ে!

আর সে অন্য কেউ নয়, স্বয়ং বেলা ওয়েস!

পেছনে তেড়ে আসছে (শ্বতাঙ্গ দুই যুবক। রানার মনে হলো, তাদের বয়স ওর কাছা কাছি হবে। হালকা শরীর হলেও দৌড়ের ভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে পুরোপুরি ফিট। একজনের মাথার চুল কালচে, আর্মি ছাঁট। পরনে নেভি ব্লু জ্যাকেট। অন্যজনের পরনে বাদামি হুডি। তীরবেগে আসছে তারা। নীল জ্যাকেটের হাতে এখন বেলার কাপড়ের সেই ব্যাগ।

ঝাপসা চোখে ক’বার পলক ফেলল রানা। সিদ্ধান্ত নিতে পারল না যে ওর এখন কী করা উচিত।

ভয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় আর্তচিৎকার ছাড়ল বেলা। রানার নাম ধরে ডাকল: ‘রানা! রানা! বাঁচাও!’

হঠাৎ সতর্ক হয়ে উঠেছে রানা। ঘুরে দরজা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে। বেলা আছে এখন পঞ্চাশ গজ দূরে। ওকে প্রায় ধরে ফেলেছে লোকদু’ জন।

সামনের গেট খুলে বড় বোল্ডারের দিকে ছুট দিল রানা। ছোট এক পাথরে হোঁচট খেয়ে আরেকটু হলে পড়ে যেত। কোনমতে সামলে নিল নিজেকে। ভাবছে: ‘একদম বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি নিজের! এখন যা ঘটছে, যেভাবে হোক সেটা সামাল দিতে হবে!’

বেলাকে ধরে ফেলল দুই যুবক। রানাকে তাদের দিকে ছুটতে দেখেও তোয়াক্কা করছে না তারা। কাঁধ খামচে ধরে বেলাকে হ্যাঁচকা টানে ঘুরিয়ে নিল নীল জ্যাকেট, পরক্ষণে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল মাটিতে। ব্যথা পেয়ে কাতরে উঠেছে মেয়েটা।

প্রাণপণে ছুটছে রানা। বুকের ভেতরে পাগলা ঘোড়ার মত লাফ দিচ্ছে হৃৎপিণ্ড। কানে শোঁ-শোঁ আওয়াজ। ছুটন্ত রানা দেখল, উঠে দাঁড়িয়ে আক্রমণকারীদের কাছ থেকে সরে যেতে চাইছে বেলা। কিন্তু তখনই পেটে লাথি মেরে ওকে মাটিতে ফেলে দিল বাদামি হুডি।

প্রায় একই সময়ে পৌঁছে গিয়ে হুডিওয়ালার বুকে ডানকাঁধ দিয়ে গুঁতো মারল রানা। ফুসফুস ফাঁকা হতেই খাবি খেল যুবক। তার মুখে পুদিনা পাতার গন্ধ পেল রানা। ব্যথা পেয়ে পিছিয়ে গেলেও মাটিতে পড়ে গেল না যুবক। বেল্টের পেছন থেকে সামনে আনল হাত। এখন মুঠোয় খাটো এক কালো সিলিণ্ডার। ওটার একপ্রান্ত ধরে ঝাঁকি দিল সে। সড়াৎ করে, খুলে গেল পুলিশের ব্যাটন। বেশিরভাগ দেশে ওটা বেআইনি। অস্ত্রটা দিয়ে বেশি জোরে মারলে খুলি ফেটে বেরোবে মগজ।

বহুবার সশস্ত্র লোকের বিরুদ্ধে লড়ে রানা জানে, ওর প্রথম কাজ হবে ব্যাটন কেড়ে নেয়া। যুবক লোহার ডাণ্ডা তুলে বাড়ি মারার আগেই সামনে বেড়ে তার হাত ধরতে গেল রানা। ট্রেইণ্ড শরীর আগে বিদ্যুদ্বেগে নড়ত, কিন্তু মাসের পর মাস ব্যায়ামে অবহেলা ও অতিরিক্ত মদ্যপান ওকে করে দিয়েছে খুব ধীর। সাধারণ মানুষের চেয়ে দ্রুত হলেও পেশাদার খুনির বিরুদ্ধে জেতা ওর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

বিদ্যুদ্বেগে প্রতিক্রিয়া দেখাল দুই যুবক।

ব্যাটন দখল করতে হলে যত ক্ষিপ্র হওয়া উচিত, তা নয় মাতাল রানা। এক পা সরে গেছে হুডিওয়ালা, পরক্ষণে বাতাস কেটে হুইল শব্দে ব্যাটন নামাল রানার নাকের একইঞ্চি আগে। ঝট করে পিছিয়ে ছে রানা। ওর বুঝতে দেরি হলো না, বেলা আর ও আছে মস্তবড় বিপদে।

এদিকে নীল জ্যাকেটের ভেতর থেকে ব্যাটন নিল দ্বিতীয় যুবক। কবজির মোচড়ে দীর্ঘ হলো অস্ত্রটা।

হামলা হবে বুঝে বড় এক বোল্ডারের দিকে পিছিয়ে গেল রানা। কিন্তু তখনই খটাস্ করে ব্যাটন নামল ওর কলারবোনে। আরও দ্রুত পেছাতে গিয়ে পিংপং বলের মত গোল এক পাথরে পিছলে হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ল রানা। আগে হলে গড়ান দিয়ে ঝট করে উঠে দাঁড়াত। কিন্তু এখন সেটা ওর জন্যে অসম্ভব। বুট পরা পা মাথার পাশে লাগতেই চোখে দেখতে পেল সাদা এক ঝিলিক। রানার মনে হলো আগুন ধরে গেছে ওর খুলিতে। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উঠে দাঁড়াল। যে-কোন সময়ে ব্যাটন দিয়ে ওর মাথা ফাটিয়ে দেবে দুই যুবক!

অবশ্য এবার দয়াবশত রানারই পক্ষ নিলেন ভাগ্যদেবী নীল জ্যাকেট নড়ার আগেই সামনে বেড়ে তার ডান কবজি ধরে ফেলল রানা। ওটা মুচড়ে নিচে নিয়ে বামহাতের তালু দিয়ে ওপরে ঠেলল শত্রুর কনুই। ব্যথা পেয়ে হাত থেকে ব্যাটন ছেড়ে দিয়েছে যুবক। কবজি আটকে রেখে তার পেটে লাথি দিল রানা। যদিও জোর নেই ওর লাথিতে। ধরাশায়ী না হয়ে উল্টে রানার বাহু খপ করে ধরল নীল জ্যাকেট। ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়াতে গিয়ে রাশ বুঝল, শত্রুর শরীরে ষাঁড়ের মত জোর! যদিও বা হাতে ঘুষি মেরে ফাটিয়ে দিল যুবকের গালের ত্বক।

এদিকে কাছে চলে এসেছে হুডিওয়ালা। তার ব্যাটন ওপর থেকে নামতে দেখেও ঠিক সময়ে সরে যেতে পারল না রানা। স্টিলের ডাঙা ঠাস্ করে পড়ল ওর চোয়ালে। তীব্র ব্যথায় রানার মনে হলো মুখের ভেতরে ফেটে গেছে চল্লিশ এমএম গ্রেনেড।

নুড়িপাথরে ভরা জমিতে পা পিছলে ধুপ করে পড়ল রানা। দু’চোখে দেখতে পাচ্ছে অসংখ্য রঙিন নক্ষত্র। আর তখনই কপালের একপাশে ঠাস্ করে নামল ব্যাটন। পরের সেকেণ্ডে তৃতীয় বাড়ি মাথায় লাগতেই আঁধার এক অতল কূপে টুপ করে তলিয়ে গেল রানা।

নয়

বহু দূরে কোথায় যেন নানাধরনের আওয়াজ। ধীরে ধীরে জেগে উঠছে মাসুদ রানা। মাথার ভেতরে জট পাকিয়ে আছে অর্থহীন কিছু গর্জন ও প্রচণ্ড ব্যথা। বোধহয় যে-কোন সময়ে বিস্ফোরিত হবে ওর খুলি। কিছুক্ষণ পর পিটপিট করে চোখ মেলল রানা। আঙুল দিয়ে ডলে দেখল বাম চোখের ওপরে। জায়গাটা প্রায় অবশ হয়ে গেছে। ঝাপসা দেখছে ডান চোখে। চারদিকে রঙিন রশ্মি। উঠে বসতে চেয়েও ব্যর্থ হলো রানা। ইঞ্জিনের মত ধুপধুপ করছে মাথার ভেতরে।

খুব ধীরে ধীরে ফিরে এল ওর দৃষ্টিশক্তি। সৈকত ও বোল্ডারে এসে পড়েছে ঘুরন্ত নীল আলো। ফি-ফিয আওয়াজ তুলছে রেডিয়ো। কে যেন উঠিয়ে বসাল রানাকে। প্রচণ্ড শীত লাগছে বলে বারবার কেঁপে উঠছে ওর শরীর। মাথার ভেতরে তীব্র ব্যথা লাগতেই কুঁচকে গেল মুখ। চারপাশে কী যেন করছে কারা যেন। সৈকতের ধারে পুলিশের গাড়ি আর দুটো অ্যাম্বুলেন্স।

কিন্তু এগুলো এখানে কী করছে?

‘আমি একাই বসতে পারব,’ মুখ তুলল রানা। ওকে ধরে রেখেছে মধ্যবয়সী এক মহিলা। পরনে প্যারামেডিকদের পোশাক। শান্ত করতে গিয়ে কী যেন বলছে নরম স্বরে। যদিও একটা কথাও বুঝতে পারছে না রানা। একটু দূরে জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে ক’জন। এখানে কী ঘটেছে তাদের কাছ থেকে জেনে নেবে ভেবে উঠে দাঁড়াল রানা, কিন্তু তাতে হঠাৎ করে বেড়ে গেল মাথার ব্যথা। ঝিমঝিম করছে শরীর।

ওকে ধরে রাখল মহিলা প্যারামেডিক। কয়েক পা নিয়ে বসিয়ে দিল একটা বোল্ডারের ওপরে। যন্ত্রণা-ভরা মাথা নিয়ে অস্থির লাগছে রানার। দু’হাতে চেপে ধরল কপালের দু’দিক। ভিজে গেল হাতের দু’তালু। নীল আলোয় রানা দেখল আঠাল তরলটা আসলে রক্ত। সাবধানে হাত বোলাল মুখে। একটু পর বুঝতে পারল, কোথা থেকে এসেছে রক্ত। ভিজে গেছে ওর টি-শার্ট। কাঁধের ওপরে কম্বল রেখেছে কেউ। রক্তে লাল হয়ে গেছে ওটা। বুজে যাওয়া বাম চোখের ওপরে আঙুল রেখে ওটার কী হয়েছে বুঝতে চাইল রানা।

‘চোখে হাত দেবেন না,’ সতর্ক করল প্যারামেডিক I এখন তার কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে রানা। ফোলা চোয়ালে আঙুল ছোঁয়াতে গেলেই লাগছে মারাত্মক ব্যথা। চোখের ওপর থেকে রক্ত মুছল রানা। আবার দেখতে পেল। তবে দৃষ্টি খুব ঝাপসা। ওর মনে পড়ল, দু’জন যুবক মিলে পিটিয়ে অজ্ঞান করেছে ওকে। চোখে ভাসল পুলিশের ব্যাটন হাতে তাদের দু’জনের চেহারা।

‘বেলা?’ দুর্বল গলায় বলল রানা। ঘুরে তাকাল চারপাশে। ‘বেলা কোথায় গেছে?’

কোথা থেকে যেন এসে এক পুলিশ অফিসার কথা বলল প্যারামেডিক মহিলার সঙ্গে। রানা শুনল: ‘একে জেরা করতে হবে।’

জবাবে প্যারামেডিক বলল, ‘আগে ওকে চিকিৎসা দিতে হবে। হাসপাতালের কথা জানাল মহিলা।

‘বেলা কোথায়? আবারও জিজ্ঞেস করল রানা। ‘ওকে সাহায্য করতে হবে।’

‘আপনি সেটা আর পারবেন না,’ বলল প্যারামেডিক।

ওর ওপরে হামলা করেছে লোকদুটো, জানাল রানা।

কেন যেন ওর কথা শুনতে চাইছে না কেউ!

এদের কি মাথা নষ্ট হয়ে গেল? ভাবল রানা। জড়ানো স্বরে কথা বলতে গিয়ে ব্যর্থ হলো। মেলে রাখতে পারল না দু’চোখ। একটু পর ওকে শুইয়ে দেয়া হলো স্ট্রেচারে। রওনা হলো কারা যেন। ধীরে ধীরে পেরোচ্ছে সময়। ধুম শব্দে বন্ধ হলো একটা দরজা। গর্জে উঠল ইঞ্জিন। রানা বুঝল, ও আছে চলন্ত এক গাড়িতে। পাশেই বসে আছে কেউ। হয়তো সেই মৃদুভাষী মহিলা প্যারামেডিক। ওকে নেয়া হচ্ছে বহু দূরে কোথাও। রানার মনে হলো, ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যাচ্ছে ও মেঘের ভেলায়। অবশ হয়ে এল ওর শরীর।

তারপর হঠাৎ অন্য এক পরিবেশে নিজেকে দেখতে পেল রানা। চারপাশে অত্যুজ্জ্বল সাদা আলো। দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে দেয়াল। ওপর থেকে ওর দিকে চেয়ে আছে কারা যেন। রানা বুঝল, গার্নিতে করে ওকে নেয়া হচ্ছে ধবধবে সাদা এক করিডর ধরে। ‘আমি ঠিকই বেলাকে বাঁচাব,’ বলেই জ্ঞান হারাল রানা।

.

পরের ক’ঘণ্টা রানার কাটল অদ্ভুত এক ঘোরের ভেতরে। আচ্ছন্ন এক পরিবেশে জানল না, কখন রক্তাক্ত পোশাক খুলে হাসপাতালের রোব পরিয়ে গার্নি থেকে নিয়ে ওকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে পর্দাঘেরা কিউবিকলের বেডে। চারপাশে ক’জনকে হাঁটাচলা করতে দেখল। তারা এল আবার বিদায় নিল। ওর মুখে ঝুঁকে কী যেন করল কেউ। মানুষগুলো বোধহয় ধরে নিয়েছে ও ভিনগ্রন্থে কোন জন্তু। একবার বাঁকা সুঁই দিয়ে সেলাই করল সাদা পোশাকে গণ্ডারের মত একলোক। তখন কপালে সুড়সুড়ি লাগল রানার। বুঝে গেল, খুলির ফেটে যাওয়া ত্বক সেলাই করা হচ্ছে। মনে পড়ল অতীতে ক্ষত সেলাইয়ের স্মৃতি। এখন যা হচ্ছে, সেটা আসলে কিছুই নয়। দু’বার রানা বলতে চাইল, আমি ঠিক আছি। কিন্তু এত বেশি দুর্বল যে কথা বলতে পারল না। এরপর ভারী হয়ে গেল ওর চোখের পাতা।

কনকাশন হয়েছে কি না সেটা জানতে গিয়ে কোনমতেই- ওকে ঘুমাতে দিল না ডাক্তারেরা। তাদের ভেতরে টাইয়ে ফুলের ছোপ দেয়া ডাক্তার পিটার হাম্বল শুকনো রসিকতার রাজা। একটু পর পর টর্চ মেরে ওর চোখ দেখল সে। জানতে চাইল মাথা-ব্যথা বা দুর্বলতা আছে কি না। রানা জানাল, ওর কিছুই হয়নি।

বমি করছে না রোগী। ফ্যাকাসে হয়নি ত্বক। জড়িয়ে যাচ্ছে না কথা। ফুলে ওঠেনি চোখের পাতা। রোগীর ভেতরে কনকাশনের লক্ষণ না দেখে খুশি হলো ডাক্তার হাম্বল। অবশ্য রোগীর তীব্র মাথা-ব্যথা ও মাথাঘোরা নিয়ে দুশ্চিতা কাটল না তার। হুইল চেয়ারে করে রানাকে নেয়া হলো এক্স- রে রুমে। ওখানে ফাটল ধরা খুলি পরীক্ষা করে আবার ফেরত নিল কিউবিকলে। কোনভাবেই রানাকে ঘুমাতে দিল না হাম্বল। ওর ঘাড়ের নিচে দিল দুটো মোটা বালিশ। যতবারই রানা জিজ্ঞেস করল, কোথায় আছে বেলা, বা কী হয়েছে ওর, একটা কথাও বলল না কেউ। সৈকতে দুটো অ্যাম্বুলেন্স দেখেছে রানা। ওর ধারণা, ওটার একটার ভেতরে ছিল বেলা।

আধঘণ্টা পর পর নার্স পরখ করে দেখল নিউরো রিঅ্যাকশন।

‘মাথায় সামান্য আঘাত,’ তাকে জানাল রানা। ‘মরলে তো আগেই মরে যেতাম।

রাত তিনটেয় সন্তুষ্ট হলো ডাক্তার হাম্বল। তার ধারণা: কনকাশন হলেও এখন আর কোমা হবে না রানার। কিউবিকল থেকে সরিয়ে ওকে নেয়া হলো এক ওয়ার্ডে। ঘুমাবার অনুমতি পেল রানা। আগেই নানান ওষুধ দিয়ে ভোঁতা করে দেয়া হয়েছে ওর মগজ। বালিশে মাথা রেখে অদ্ভুত ভাসমান এক জগতে সাঁতরাতে লাগল রানা।

অস্বস্তিকর ঘুমের ভেতরে দেখল বারবার বেলাকে। আলাপ করতে করতে কোথায় যেন চলে গেল মেয়েটা। আচ্ছন্নতার ভেতরে রানা বুঝল, আগামাথা নেই এসব স্বপ্নের। এরপর যে স্বপ্ন এল, সেটা ভয়ঙ্কর। কটেজের জানালা থেকে রানা দেখল সৈকতে বেলাকে তাড়া করছে দুই লোক। তাদের দিকে ছুটে গেল ও। কিন্তু তখনই বাতাস কেটে নেমে এল ব্যাটন…

চমকে গিয়ে ঘুম ভাঙল রানার। চোখ মেলে দেখল মাথার ওপরে সাদা ছাত। জানালার পর্দা গলে মেঝে ও বেডে পড়েছে সোনালি রোদ। রাত কেটে কখন যেন চলে এসেছে সকাল।

বালিশে মাথা কাত করে রানা দেখল, ওয়ার্ডের শেষমাথায় আছে ওর বেড। বেশিরভাগ বেডে বয়স্ক সব লোক। একজন ভীষণ হুঁকোরে কাশি দিচ্ছে। মস্ত ঘরে পায়চারি করছে হাতির মত মোটা এক মহিলা মেট্রন। দূর দেয়ালের ঘড়িতে বাজে আটটা সতেরো।

মাথাঘোরা কমলেও দপ দপ করছে রানার খুলি। ব্যথার পেছনে ব্যাটনের যে অবদান, তার চেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে হ্যাংওভার। মরা কাঠের মত গলা শুকিয়ে গেছে বলে রানার মনে হলো, ভাল হতো কয়েক আউন্স উইস্কি গিলতে পারলে।

হাত তুলে স্পর্শ করল কপালের ব্যাজে। ক্ষত টিপে দেখতে গিয়ে আঁৎকে উঠল ব্যথায়। খচ খচ করছে ওর মন। আগে কখনও আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে এভাবে ব্যর্থ হতে হয়নি ওকে। অথচ গতকাল অসহায় এক মেয়েকে বিপদের সময়ে সাহায্য করতে পারেনি।

বিছানায় শুয়ে নিজেকে দোষারোপ করতে লাগল রানা। বারবার মনে প্রশ্ন জাগল: বেলা এখন কোথায়? সুস্থ আছে তো মেয়েটা? আবার কখন দেখা হবে ওর সঙ্গে?

ওয়ার্ডের ঘড়িতে সাড়ে আটটা বাজতেই পাকা সিদ্ধান্ত নিল রানা। এবার বেরোতে হবে ওকে এই বন্দিশালা থেকে। এরপর কারও কাছ থেকে জেনে নেবে বেলা এখন কোথায় আছে। বেডকভার সরিয়ে বিছানা ছেড়ে নামবে, এমন সময় নীল পোশাকে খুনখুনে এক বুড়ো আর্দালি থামল ওর বেডের পাশে। ট্রলির ওপরে হাসপাতালের বিস্বাদ নাস্তা। খাবার দেখেই বিদ্রোহী হয়ে উঠল রানার মন। ঘাড় কাত করে মানা করল বুড়োকে। কিন্তু ট্রলি থেকে নিয়ে বেড়ে নাস্তার ট্রে নামিয়ে দিল বুড়ো।

নাস্তা করার চেয়ে বেলার খোঁজ নেয়া এখন অনেক বেশি জরুরি। বুড়োকে জিজ্ঞেস করল ‘রানা, ‘এখন কোথায় আছে বেলা?’

জবাবে ট্রে দেখাল আর্দালি। ‘আগে নাস্তা করে নিন।’

‘পারলে অন্য কাউকে আপনার আনা খাবার গিলিয়ে দিন,’ প্রতিবাদ করল রানা।

ওর কথা শেষ হতে না হতেই আজরাইলের মত হাজির হলো হাতিসম মহিলা মেট্রন। বাজখাই গলায় বলল সে, ‘নাস্তা করতে হবে। নইলে পেইন কিলার দিতে পারব না।’

মহিলা ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বাধ্য হয়ে টোস্ট করা পাউরুটি ও দুধ খেল রানা। তারই ফাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘বেলা এখন কোথায় আছে?’

পলকের জন্যে মেট্রনের চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি দেখল রানা। জানতে চাইল, ‘বেলা সুস্থ আছে তো? আমাকে বলুন, ওকে এখন কোথায় পাব?’

‘আমি সেটা বলতে পারব না,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল মেট্রন।

‘তা হলে যে বলতে পারবে, তেমন কাউকে খুঁজে নেব, গা থেকে চাদর সরিয়ে দিল রানা।

‘ভুলেও বেড থেকে নামবেন না,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল মহিলা। দু’হাত কোমরে। রানা লক্ষ্মী ছেলের মত শুয়ে না পড়লে জোর খাটাতে বোধহয় দ্বিধা করবে না সে। কাছ থেকে মেট্রনের বাইসেপ দেখে রানার মনে হলো, এই মহিলা বোধহয় পৃথিবীর সেরা পেশাদার ওজন উত্তোলনকারিণী

‘আমার পোশাক কোথায়?’ মহিলার চোখে কঠোর দৃষ্টি ফেলে বেডের ওদিক দিয়ে নেমে পড়ল রানা। এত বেশি রেগে গেছে যে, ভয় পেয়ে এক পা পিছিয়ে গেল মেট্রন।

‘আমার রোগী দেখি আজ বেশ সুস্থ,’ বলে উঠল কে যেন। ঘুরে ওয়ার্ডের দরজার দিকে তাকাল রানা।

এইমাত্র ঘরে ঢুকেছে ডাক্তার হাম্বল। আজকের টাই আরও ফুলেল। ডাক্তারের পেছনে ঘরে পা রেখেছে তিক্ত চেহারার একলোক। সঙ্গে তরুণী এক মেয়ে।

তাদেরকে হাসপাতালের কর্মী বলে মনে হলো না রানার।

‘আপনার কাছে অতিথি এসেছেন,’ বলল ডাক্তার হাম্বল। রানা, এখন আগের চেয়ে সুস্থ কি না, সেটা জেনে নেয়ার জন্যে ওকে বেড়ে বসতে অনুরোধ করল সে।

বিরক্ত হলেও ডাক্তারের কথা মেনে নিল রানা। চট করে ওর স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করল হাম্বল, তারপর দুই অতিথিকে দেখিয়ে দিল দুটো চেয়ার।

তিক্ত চেহারার লোকটা তিনদিকের সাদা পর্দা টেনে ওয়ার্ড থেকে আলাদা করে দিল রানার বেড়।

ডাক্তার বিদায় নিতেই চেয়ার টেনে বসল তারা। তাদের আগমনে কৌতূহলী হয়ে উঠেছে ওয়ার্ডের বয়স্ক রোগীরা।

কালবেলা – ১০

টুলসা সিটি।

এখন গভীর রাত। কর্কশ ঐকতান তুলেছে বেশ কিছু ঝিঁঝি। থেমে থেমে হুঙ্কার ছাড়ছে বাঘা দুই কুকুর। ওয়াইল্ড হক মোটেলে নিজের ঘরের বাতি নিভিয়ে জানালা দিয়ে নিষ্পলক চোখে হাইওয়ে দেখছে জ্যাকি। ওয়েস্ট স্কেলি ড্রাইভ ধরে ছুটে যাচ্ছে একটা-দুটো গাড়ি। ওদিকে চেয়ে দু’দিন আগে লিপ্তার কটেজে যা দেখেছে, সেটা নিয়ে ভাবছে জ্যাকি। আচ্ছন্ন হয়ে আছে কেমন এক ঘোরের মাঝে। দুঃস্বপ্নের মত মনে হচ্ছে সবকিছু। সেই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য বোধহ্য অন্তরের অদ্ভুত কোন খেলা! মনে হচ্ছে হ্যালুসিনেশন হয়েছে ওর।

যদিও নিজেই বুঝতে পারছে, সবই আসলে নিষ্ঠুর বাস্তবতা। প্রথম সুযোগে কটেজ থেকে বেরিয়ে লুকিয়ে পড়েছিল জঙ্গলে। খুনিগুলো কটেজে ঢুকলে ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটল। নাকে-মুখে লাগল ডালপালা। জঙ্গল পেরোবার পর আরও বাড়ল দৌড়ের গতি। আগুনের মত জ্বলছিল ওর ফুসফুস। একটু পর পর ঘুরে দেখেছে কেউ তেড়ে আসে কি না।

একসময়ে পেছনে গাড়ির আলো দেখে প্রাণভয়ে লুকাল এক গাছের আড়ালে। কিন্তু ওকে দেখে ফেলল ড্রাইভার। গাড়ি এসে থামল গাছের পাশে। জানালার কাঁচ নিচু করে জানতে চাইল মহিলা, ‘তুমি কি কোন বিপদে পড়েছ?’

পিস্তল কোমরে গুঁজে বেরিয়ে এল জ্যাকি। বুঝে গেল, এবারের মত বেঁচে গেছে।

ফয়িল শহরের পুবে ক’মাইল দূরে চব্বিশ ঘণ্টা খোলা এক বার-এ চাকরি করে মহিলা। শিফট শেষে বাড়ি ফিরছে। জানাল রুট ৬৬ ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমে ঘুমন্ত ক্লেয়ারমোর আর ক্যাটুসা পার করে টুলসা সিটিতে পৌঁছে দেবে জ্যাকিকে। – চলার পথে জিজ্ঞেস করল, বাজে কোন ঝামেলায় পড়েছে কি না। তখন মিথ্যা বলেছে জ্যাকি: ঝগড়া হয়েছে বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে। এ-কথা বিশ্বাস না করার মত যৌক্তিক কোন কারণ খুঁজে পায়নি আগাথা ক্রিস্টি। সে মধ্যবয়স্কা মহিলা, তিন স্বামীকে পাঁচবার ডিভোর্স দিয়ে এখন সুখেই আছে। ক্রসবি হাইটসের বাড়িতে জ্যাকিকে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিয়েছে সে।

গভীর রাতে দু’বেডরুমের দোতলা অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে মেইন গেট লক করে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে জ্যাকি। বাথরুমে ব্যথা-ভরা পায়ের তালু ধুয়ে পরে নিয়েছে নতুন মোজা। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে ঢকঢক করে গিলেছে আধগ্লাস গর্ডস্‌ লণ্ডন জিন। সোফায় বসে ভেবেছে, এবার কী করা উচিত?

প্রথম কাজ হবে পুলিশে খবর দেয়া। যদিও এতে ছারখার হবে লিা কনারের সংসার। স্ক্যাণ্ডালের জন্যে ধ্বংস হবে রোয বাড ট্রাস্ট। এরপর এ-শহরের কেউ ওকে আর চাকরি দেবে না। তবুও ওর কর্তব্য হচ্ছে পুলিশে সব জানিয়ে দেয়া।

ওর কাছে আছে অকাট্য প্রমাণ।

ব্যাকপ্যাক থেকে ফোন নিয়ে ভিডিয়ো দেখল জ্যাকি। ওভার এক্সপোষ দৃশ্যে খুনিদেরকে দেখাচ্ছে আবছা সব যমদূতের মত। একটু পর ফোন হাতে ছোট্ট অফিসে ঢু ও। ফোনের সঙ্গে ইউএসবি কেবল যুক্ত করে সংযোগ দিল কমপিউটারে। ফোন থেকে ডাউনলোড করল ভিডিয়ো। বড় স্ক্রিনেও স্পষ্ট ফুটল না দৃশ্যগুলো। মাত্র একবার দেখা গেল লিণ্ডার স্বামীর মাথার পেছনদিক। জট পাকিয়ে বিশ্রী ভোঁ-ভোঁ করছে খুনিদের গলা।

‘সর্বনাশ!’ ভাবল জ্যাকি, ‘পুলিশকে এই ভিডিয়ো দেখালে তারা তো আমার কোন কথাই বিশ্বাস করবে না!’

সিদ্ধান্তহীনতা চেপে ধরল ওকে। ভাবতে শুরু করেছে কী করবে, এমন সময় ডেস্কে বাজল ল্যাও ফোন। চমকে গিয়ে জ্যাকি ভাবল, এত রাতে কে ফোন করছে? দ্বিধা নিয়ে ফোনের রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল। ‘হ্যালো?’

জবাবে ওদিক থেকে খুট করে কেটে দেয়া, হলো লাইন। নিজেই এবার কল দিল জ্যাকি। ওদিক থেকে ফোন ধরল না কেউ। ওর মনে হলো, এবার ঘটতে শুরু করবে বহুকিছু। হয়তো রং নাম্বারে কল দিয়েছে কেউ। আবার এমনও হতে পারে, খুনিরা জেনে নিল এখন কোথায় আছে ও! –

কটেজে ওর জিনিসপত্র পেলে লিণ্ডার স্বামী বা তার লোক বুঝে গেছে কটেজে কে ছিল! লিণ্ডা নিজেই হয়তো স্বামীকে বলেছে কটেজে ওর ওঠার কথা! একই কথা হয়তো জানিয়ে দিয়েছে ড্রাইভার বব। নানাভাবে ফাঁস হতে পারে তথ্য। সেক্ষেত্রে খুনিরা হয়তো জেনে গেছে টুলসার এই ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে ও। জ্যাকি বুঝে গেল, এ-বাড়ি এখন ওর জন্যে খুব ‘বিপজ্জনক। সুতরাং দেরি না করে ওর উচিত হবে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া।

প্রমাণ হিসেবে ভিডিয়ো থাকলেও নিজে খুন হলে ওটা কোন কাজেই আসবে না। দেরি না করে কমপিউটারের মাধ্যমে ভিডিয়ো ক্লিপ তুলে নিল দুটো ডিভিডিতে। ব্যাকআপ হিসেবে রাখল ও-দুটো। এরপর দোতলায় গিয়ে পরে নিল পুরনো জুতোজোড়া। আরও কিছু জিনিসপত্র ভরল ব্যাকপ্যাকে বিছানার নিচে স্টিল অ্যামো কেবিনেট খুলে তিনটে সিগ সাওয়ার ম্যাগাযিন নিয়ে রাখল ব্যাকপ্যাকের পাশের পকেটে। একই জায়গায় ঠাঁই পেল পিস্তল। বেডসাইড ড্রয়ার থেকে সংগ্রহ করল ক্যাড্ মেইস। হামলা হলে শেষ ভরসা হিসেবে রেখেছে ওটা। রাসায়নিকে ভরা ক্যান গুঁজল ব্যাকপ্যাকে। বাড়িতে এখন এমন কিছু নেই, যেটা ওর খুব দরকার হবে।

অ্যাপার্টমেন্টের দরজা লক করে ব্যাকপ্যাক কাঁধে বেরিয়ে এল জ্যাকি। মরুভূমির মত খাঁ-খাঁ করছে রাস্তা। আশপাশে কোন গাড়ি নেই। খুনিদের কেউ নজর রাখছে না বাড়ির ওপরে। ব্যাগ কাঁধে ব্যথা-ভরা পায়ে ছুটতে লাগল জ্যাকি।

এরপর দু’রাত আগে এসে উঠেছে এই মোটেলে। খিদে লাগলে সিকিমাইল দূরে হাইওয়ের এক ডাইনার থেকে এনেছে খাবার। দ্বিতীয়বার আর যায়নি ওর অ্যাপার্টমেন্টে। এলাকার ছেলেদেরকে পছন্দ করত না ওর বাবা। তাই তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক তৈরি হয়নি জ্যাকির। ফলে এমন কেউ নেই যার কাছে এখন ঠাঁই পাবে। মায়ের কাছে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। দেবতার মত ওর বাবাকে ছেড়ে এক জানোয়ারের সঙ্গে সংসার করছে সে, কারণ লোকটার আছে দামি মদ কিনে দেয়ার টাকা।

জানালা দিয়ে দূরে চেয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করল জ্যাকি, এ-শহর ছেড়ে কি আমি পালিয়ে যাব? প্রিয় গাড়িটা ওকে দিয়ে গেছে বাবা। ওটা পুরনো হলেও কাজে লাগবে ওকলাহোমা থেকে বেরিয়ে যেতে। পরে খুঁজে নেবে নতুন কোন আশ্রয়। অবশ্য সেক্ষেত্রে একদম প্রথম থেকে শুরু করতে হবে ওকে। কাজটা অত সহজ হবে না ওর জন্যে।

জ্যাকির বুক চিরে বেরোল কাঁপা দীর্ঘশ্বাস।

এগারো

নিজেকে পুলিশ ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর ড্যানিয়েল হকিন্স বলে পরিচয় দিল অফিসার। নার্ভাস টাইপের লোক সে। বয়স হবে পঞ্চাশ। চড়ুই পাখির চোখের মত এদিক-ওদিক ঘুরছে দু’চোখ, পলক পড়ছে না একবারও। কেন যেন তাকে অপছন্দ হলো রানার। যদিও খুঁজে পেল না তার কারণ। লোকটার সহকারী ডিটেকটিভ সার্জেন্ট জোয়ান লিলির বয়স আন্দাজ পঁচিশ। তাকে মানুষ বলেই মনে হলো রানার। বুঝো গেল, কেন তাকে সঙ্গে করে এনেছে ইন্সপেক্টর। সে মর্মান্তিক দুঃসংবাদ দিলে জখমে মলম দেবে মহিলা সার্জেন্ট।

‘আমি জানতে চাই বেলা খুন হয়েছে, নাকি কিডন্যাপ, তারা কিছু বলার আগেই বলল রানা।

‘কেন ভাবছেন কিডন্যাপ হবে?’ কৌতূহলী চোখে ওকে দেখল ইন্সপেক্টর।

‘যা বলার সেটা বরং আপনিই বলুন,’ বলল রানা।

‘আমরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই মারা যান মিস ওয়েস,’ বলল সার্জেন্ট লিলি। ‘ভয়ঙ্করভাবে খুন হন। পরে তাঁর আত্মীয়দের কাছে খবর দিয়েছি আমরা। তাঁরা ইংল্যাণ্ড থেকে রওনা হয়েছেন। মিস্টার রানা, আমি সত্যিই দুঃখিত।’

মেয়েটা খুন হয়েছে ওর নিজের ব্যর্থতার জন্যে, বুঝে গেল রানা। ওর উচিত ছিল শারীরিকভাবে ফিট থাকা। সেক্ষেত্রে হয়তো এখনও বেঁচে থাকত বেলা।

‘কী ধরনের হামলা করেছে ওর ওপরে?’ জানতে চাইল রানা।

ভুরু কুঁচকে ফেলল সার্জেন্ট।

ইন্সপেক্টর হকিন্সের দিকে তাকাল রানা।

হঠাৎ করে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে লোকটার মুখ।

রানা জেনে গেল, বেলার লাশ দেখেছে এরা। শুধু তা-ই নয়, আগে কখনও এত ভয়ঙ্কর বিকৃত হওয়া মৃতদেহ দেখেনি।

‘মিস্টার রানা, আমার মনে হয় না যে এসব নিয়ে আর আলাপ করা উচিত, বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘আমি জানতে চাই,’ শুকনো গলায় বলল রানা।

‘মিস ওয়েসের বুক-পেটে ছিল ছোরার গভীর সব ক্ষত,’ বলল মেয়েটা। ‘কেটে নেয়া হয় নাক ও ঠোঁট… চুপ হয়ে গেল সে। যে-কোন সময়ে বমি করে দেবে।

‘উপড়ে নেয় দু’চোখ, তারপর গলা কাটে, ‘ তিক্তস্বরে বলল ‘ইন্সপেক্টর হকিন্স। ‘আরেকটু হলে কাটা পড়ত ঘাড়। মনে হয় না সে-সময়ে বেঁচে ছিল মিস ওয়েস।’

রানার হাতের মুঠোর টানে ফড়ফড় করে ছিড়ে গেল বেডকভার। বেলার মিষ্টি মুখ ভেসে উঠেছে ওর চোখের তারায়। কানে শুনতে পেল মধুর কণ্ঠস্বর। হাসছে মেয়েটা। রানার মনে হলো, নিজেও অসুস্থ হয়ে যাবে সার্জেন্ট লিলির মত।

গলা খাঁকারি দিল ইন্সপেক্টর। ‘এ-ঘটনায় সাক্ষী আছে। তাঁরা এসেছেন লণ্ডন থেকে বেড়াতে। গ্যালওয়ে গেস্ট-হাউস থেকে বেরিয়ে দু’জন লোককে দেখতে পান। তাদের সঙ্গে ছিল জিপগাড়ি। ওটা থেকে নেমে মিস ওয়েসকে ধাওয়া করে খুনিরা। সৈকতে একাই ছিল মেয়েটা। দূর থেকে সব দেখতে পান দুই টুরিস্ট। আপনি কটেজ থেকে বেরিয়ে বাধা দিতে গেলে আপনার মাথায় লাঠির বাড়ি মারে খুনিরা। আপনি পড়ে গেলে ছোরা বের করে তাদের একজন। বিনকিউলারে সব দেখেন পুরুষ টুরিস্ট। তি ন… কী যেন বলে তাঁদেরকে?’

‘অর্নিথোলজিস্ট,’ বলল সার্জেন্ট লিলি, পক্ষিবিজ্ঞানী। ‘বেলাকে ছোরা মারতে দেখেন তিনি?’ বলল রানা।

নড করল সার্জেন্ট লিলি। ‘একটু পর মিস ওয়েসকে খুন করে গাড়িতে উঠে চলে যায় তারা। আমরা পরে জেনেছি গাড়িটা চুরি করা হয়েছিল ক্লিফডেনের এক খামার থেকে।’

‘আজ ভোরে উপকূলীয় এলাকা ন্যাহিঞ্চে পাওয়া গেছে ওটা,’ বলল ইন্সপেক্টর হকিন্স। ‘এক স্থানীয় লোক আগুনে গাড়ি পুড়তে দেখে গার্ডাদের কাছে ফোন দেয়।

‘এরপর খুনিদের কোন তথ্য আপনারা আর পাননি,’ মন্তব্য করল রানা।

‘আমরা খোঁজ নিচ্ছি সোর্সের মাধ্যমে,’ বলল ইন্সপেক্টর। -এ-ধরনের কেসে কর্তৃপক্ষ ভঙ্গি করে, সবকিছুর ওপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে।

‘আপনাদের তো কিছু করার আছে বলে মনে হচ্ছে না,’ বলল রানা। ‘উধাও হয়ে গেছে তারা।’

‘আমরা ভাবছি, আপনি হয়তো জরুরি সূত্র দেবেন, বলল সার্জেণ্ট লিলি।

যেহেতু আমি তাদেরকে কাছ থেকে দেখেছি-তাই?’

‘দেখলে কি আপনি তাদেরকে চিনতে পারবেন?’ মাথা দোলাল রানা।

‘তা হলে চেহারার বর্ণনা দিন।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল রানা, ‘শ্বেতাঙ্গ। বয়স ত্রিশের নিচে হালকা শরীর। কথা বলেনি, তাই জানার উপায় নেই তারা আইরিশ, ইংলিশ না অন্য দেশের। একজন অন্যজনের চেয়ে সামান্য লম্বা। উচ্চতা ছয় ফুট। আর্মি ছাঁট দেয়া খাটো চুল। একজনের পরনে নেভি জ্যাকেট। ওটা সিন্থেটিক বা নাইলনের।’

প্যাড বের করে নোট মিল সার্জেন্ট লিলি।

‘অন্যজনের পরনে বাদামি হুডি, বলল রানা, ‘ভালভাবে তার মুখ দেখতে না পেলেও সে বামহাতি।’

‘আপনি সেটা কীভাবে জানলেন?’ প্রশ্ন করল ইন্সপেক্টর। তিক্ত চোখে তাকে দেখল রানা। ‘এটা জানতে বিজ্ঞানী হতে হয় না। ব্যাটন ছিল তার বামহাতে। দু’জনের পায়ে ছিল স্টিলের টোক্যাপসহ বুট। জানি, কারণ এখনও আমার শরীরে ব্যথা আছে।’

‘এটা ভাল সূত্র,’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘আপনার সেটাই মনে হচ্ছে?’ বিরক্ত হলো রানা। ‘আর কিছু?’ জানতে চাইল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘বাদামি হুডির মুখে মিন্টের গন্ধ ছিল,’ বলল রানা!

নোট নিয়ে বলল সার্জেন্ট লিলি, ‘মিণ্ট?’

‘চুইংগাম। তবে সাধারণ নয়। বিদঘুটে গন্ধ।

‘সেটা কী ধরনের?’ চোখ সরু করল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘নিকোটিন গাম,’ বলল রানা, ‘হয়তো চেনেন? ধূমপান ছাড়তে গিয়ে অনেকে ব্যবহার করে।’

‘আপনি ঠিক জানেন তো?’

‘নিজে ওটা দিয়ে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করেছি। সুতরাং ভুল বলছি না।

‘ঠিক আছে,’ বলল সার্জেন্ট লিলি। নোট নেয়ার ফাঁকে বলল, ‘আর কিছু?’

‘আমার ধারণা: এরা আগেও মানুষ খুন করেছে, বলল রানা। ‘নিজেদের কাজ বোঝে।’

‘সেটা আপনি কীভাবে জানলেন?’

‘কারণ, আগে আমি আর্মিতে ছিলাম। আপনারা ‘ যাদেরকে খুঁজছেন, তারা মিলিটারি ট্রেইণ্ড সাইকোপ্যাথ। এদেরকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারি।’

পরস্পরের দিকে তাকাল ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট।

‘মিস্টার রানা, আমরা এরই ভেতরে জেনে নিয়েছি আপনার ব্যাকগ্রাউণ্ড,’ বলল ইন্সপেক্টর।

মনে মনে বলল রানা, খুব যৎসামান্যই আপনারা জানেন।

‘তা হলে তো আরও বহু তথ্য আপনি দিতে পারবেন, তা-ই না?’ জানতে চাইল সার্জেন্ট লিলি।

মাথা নাড়ল রানা। ‘সরি।’

বিরক্ত হলো ইন্সপেক্টর। ‘ফাইলে দেখলাম আপনি এক ডিটেকটিভ এজেন্সির চিফ। ক’দিন আগে ছিলেন ফ্রান্সে।’

মাথা দোলাল রানা। ‘নরম্যাণ্ডিতে। আপাতত কোন কাজের সঙ্গে জড়িত নই।’

‘কিছুই না?’

মাথা নাড়ল রানা।

ভুরু কোঁচকাল ইন্সপেক্টর। ‘অথচ জেনেছি, আপনি হাইলি ট্ৰেইণ্ড।’

‘আগে তা-ই ছিলাম,’ বলল রানা।

‘আমার ধারণা: যুদ্ধের ট্রেনিং কখনও ভুলে যায় না কেউ।’

‘অতিরিক্ত ড্রিঙ্ক করি,’ স্বীকারোক্তির সুরে বলল রানা। ‘গতকাল যখন হাম হলো, ড্রিঙ্ক করছিলাম কটেজে বসে। সেজন্যে ধীর হয়ে যায় আমার প্রতিক্রিয়া। নইলে সৈকতে বেলার বদলে দেখতে পেতেন লোকদু’জনের লাশ।’

ওকে দেখছে সার্জেন্ট লিলি। ‘আপনি কি তবে বলতে চান যে তাদেরকে খুন করতেন?’

চুপ করে থাকল রানা।

‘আপনি আসলে কী বলতে চান? কঠোর চোখে ওকে দেখল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘কী বলেছি, সেটা আপনারা শুনেছেন,’ শীতল স্বরে বলল রানা, ‘বরং এই কেসের ব্যাপারে কথা বলুন। আপনাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এই হামলার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক আছে।

‘আমরা তা বলছি না,’ চট করে বলল সার্জেন্ট লিলি। দুশ্চিন্তা নিয়ে দেখল ইন্সপেক্টরকে।

‘মনে রাখবেন, মিস্টার রানা, কোথাও হামলা হলে আমরা সিরিয়াস হয়ে যাই,’ বলল ইন্সপেক্টর। ‘সুতরাং নিজে ভুলেও আইন হাতে তুলে নেবেন না। সেটা আপনার জন্যে মঙ্গলজনক হবে না।’

‘আপনি কি তবে চান অন্যায় দেখেও চুপচা’ সব মেনে নেব? তাতে উপকার হবে সমাজের?’ বলল রানা।

‘আমি তা বলছি না। তবে নিজ হাতে আইন তুলে নিলে সেটা কখনও সমাজের জন্যে মঙ্গলজনক হয় না.।’

‘আপনার কি ধারণা যে আমি আইন ভেঙেছি?’ বলল রানা। ‘বেলার মৃত্যু কিন্তু আপনারা ঠেকাতে পারেননি।

‘কেন এমনটা হলো, তা আমরা তদন্ত করে বের করব, বলল ইন্সপেক্টর, ‘আর যেহেতু এসবের সঙ্গে মদ জড়িত, তাই বিষয়টা গভীরভাবে তদন্ত করতে হবে।

‘আমি সৈকতে যাওয়ার আগে প্রায় মাতাল ছিলাম,’ বলল রানা। ‘আর তখন আপনার মত কোন হিরোকে দেখতে পাইনি, যে বিপদ থেকে রক্ষা করবে বেলাকে। আপনারা যখন হাজির হলেন, ততক্ষণে বহু দূরে চলে গেছে খুনিরা।’

‘আপনার আচরণ খুব আপত্তিকর,’ বলল ইন্সপেক্টর; ‘আর সেজন্যে আপনাকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দিতে পারি।’

‘আমার আচরণ যে কতটা খারাপ, আপনি ভাবতেও পারবেন না, ইন্সপেক্টর।’ ক্রমেই আরও রেগে উঠছে রানা।

চোখ পাকিয়ে ওকে দেখছে ইন্সপেক্টর।

বদলে শীতল চোখে তাকে মেপে নিচ্ছে রানা। পরিষ্কার বুঝে গেল, বোকা গাধাটা জানে না, যে-কোন সময়ে তার গলা দিয়ে নেমে যাবে একগাদ। ভাঙা দাঁত।

এবার বলুন কীভাবে আপনার সঙ্গে পরিচয় হলো মিস ওয়েসের,’ বুদ্ধিমতীর মত প্রসঙ্গ পাল্টাল সার্জেন্ট লিলি। নার্ভাস চোখে দেখে নিল বসকে। ‘হামলার আগে সৈকতে আপনারা হাঁটছিলেন, সেটা আমরা জেনেছি।’

খুব ধীরে ধীরে হকিসের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে মেয়েটাকে দেখল রানা। ‘আমাদের মধ্যে কোন সম্পর্ক ছিল না। গতকালই পরিচয়। আমার ধারণা, মিসেস অ্যাপলউড এরই ভেতরে এ-ব্যাপারে আপনাদেরকে জানিয়েছেন।

‘তার মানে আপনাদের আগে কখনও দেখা হয়নি?’

‘প্রতিটি কথা আবারও বলতে হলে সারাদিন লাগবে, বলল বিরক্ত রানা।

দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরল সার্জেন্ট লিলি। একটু পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘সাক্ষীদের কথা অনুযায়ী, মিস ওয়েসের কাছ থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় খুনিরা। আপনি ওটা সম্পর্কে কিছু জানেন?’

‘কাপড়ের ব্যাগ,’. বলল রানা, ‘রঙ নীল, হলুদ ও বেগুনি। ভেতরে ছিল ল্যাপট।। এ-ছাড়া ছিল নোটবুক, কয়েকটা মোবাইল ফোন, ব্যক্তিগত মেক-আপ আইটেম আর চিরুনির মত সাধারণ জিনিস। অবশ্য এ-বিষয়ে আর কিছু জানি না।’

‘আপনি দেখি মেয়েটার ব্যাগে কী আছে সবই জানতেন, সন্দেহের সুরে বলল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘আমি সবসময় চোখ-কান খোলা রাখি,’ বলল রানা, ‘আপনি নিজেও তা-ই করতে পারেন।’

‘আমরা এসেছি জরুরি তথ্য সংগ্রহ করতে, মিস্টার রানা,’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘তা-ই করা উচিত,’ বলল রানা, ‘আমি নিজেও তা-ই। করব। যেহেতু গত বিশ বছরে এদিকে কেউ খুন হয়নি, সেক্ষেত্রে কেন খুন করা হলো বেলাকে, সেটা জানতে চাই। কয়েক বছর আগেও সৈকতের ধারে আমার একটা বাড়ি ছিল। পরে বিক্রি করে দিয়েছি। এদিকের প্রতিটি পাব চিনি। প্রতিভাবান ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর হকিন্স এখানে বসে আমার দোষ না খুঁজলে, হয়তো পাব-এ কান পেতে অপরাধীদের ব্যাপারে জরুরি সব তথ্য পেতেন। সেক্ষেত্রে আমিও বুঝতাম, নিজের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।’

‘শুনুন, আপনি কিন্তু…’ রানার বুকের দিকে তর্জনী তাক করল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

যদিও তার কথা কেড়ে নিল রানা, ‘না, হকিন্স, আপনিই বরং আমার কথা মন দিয়ে শুনুন। ঠাণ্ডা চোখে দেখছে তাকে। ‘পেশাদার দুই অপরাধী গাড়ি চুরি করে এনে বেআইনি ব্যাটন হাতে অচেনা এক মেয়ের ওপরে হামলে পড়বে না। সুতরাং ধরে নিতে পারি, এর পেছনে আছে কোন না কোন জরুরি কারণ। আপনার বদলে আমি হলে ভাবতাম: এসবের পেছনে রয়েছে শক্ত কোন মোটিভ। জেনেবুঝে খুন করা হয়েছে বেলা ওয়েসকে। কাজেই মেয়েটা কীসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল সেটা আগে জানা দরকার। আমার কথাগুলো কি আপনি বুঝতে পেরেছেন, ইন্সপেক্টর?’

রানার দিকে তাক করা তর্জনীটা নামিয়ে চেয়ারে গুঁজে গেল পুলিশ কর্মকর্তা। রেগে গেলেও মুখে কোন কথা নেই।

ভুরু কুঁচকে গেছে সার্জেন্ট লিলির। নোটবুক থেকে মুখ তুলল সে। ‘রেকর্ড অনুযায়ী বেলা ওয়েস ছিলেন সেলফ- এমপ্লয়েড রাইটার। গেস্ট-হাউসের মালিক বলেছেন, বই লিখছিলেন তিনি। এসব থেকে আমরা কোন মোটিভ পাইনি।’

‘সাধারণ বই নয়, আয়ারল্যাণ্ডের ঐতিহাসিক কিছু বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করে বেলা,’ বলল রানা।

‘তো?’

‘ঐতিহাসিক বিষয়ে গবেষণার সময় জরুরি তথ্য গায়। যেটা ছিল গোপন কিছু। আর সেজন্যেই ঝুঁকিতে পড়ে বেলা।’

ভুরু কুঁচকে ফেলল সার্জেন্ট লিলি। ‘কী ধরনের ঝুঁকি?’

‘আমাকে সেটা বলেনি বেলা,’ বলল রানা।

‘এত কিছুই বা আপনাকে বলল কেন?’ বলল ইন্সপেক্টর। ‘আপনারা স্বল্প-পরিচিত, পরস্পরকে ভালমত চিনতেন না।’

‘কারণ, বেলা সাহায্য চেয়েছিল আমার কাছে।’

‘কেন সেটা করল সে?’

‘ও সাহায্য চেয়েছিল আমার কাজের ধরন জেনে।’

‘আপনার সেসব কাজ খুব ক্লাসিফায়েড, নাকি, মিস্টার রানা?’ খোঁচা দিতে চাইছে ইন্সপেক্টর। দু’তর্জনী বাঁকা করে দেখাল ইনভার্টেড কমা।

‘আর্মি থেকে অবসর নেয়ার পর কাজ করেছি সিকিউরিটি ইণ্ডাস্ট্রিতে, সে-কারণে আগ্রহী হয়েছিল বেলা,’ বলল রানা।

‘আপনি কি বডিগার্ড ছিলেন?’ রাগী গলায় বলল হকিন্স।

‘আগে কিডন্যাপড্ মানুষ খুঁজে বের করে উদ্ধার করেছি,’ বলল রানা। ‘তবে কাউকে রক্ষা করতে বডিগার্ডের কাজ খুব কমই করেছি। অবশ্য যখন করেছি সেটা, চেয়েছি দক্ষতার সঙ্গে করতে।’

‘যাই হোক, আপনি মিস ওয়েসের কাছে জানতে চান, তাঁকে কেউ কিডন্যাপ করতে চায় কি না?’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

মাথা দোলাল রানা। ‘হ্যাঁ। বেলা জানত, সে আছে মৃত্যু- ঝুঁকিতে। নিরাপত্তা চাইছে শুনে আমি বলেছি, আমার পরিচিত বডিগার্ডের সাহায্য নিতে পারে। কথা হয়েছিল, আজ ভোরে এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় এ-বিষয়ে আমরা আলাপ করব।’

‘আপনাকে কেন এসব বলল সে? কেন যোগাযোগ করল না পুলিশে?’ চেয়ারে পিঠ সোজা করল ইন্সপেক্টর।

তিক্ত হাসল রানা। ‘সেটা আমি জানি না।’

‘অর্থাৎ, আপনার জানা নেই, কে বা কার কাছ থেকে বিপদ হবে বলে ভেবেছিলেন মিস ওয়েস?’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘আমার সঙ্গে এ-ব্যাপারে ওর কোন কথা হয়নি। সময় পেলে হয়তো খুলে বলত। অবশ্য এটা বুঝেছি, কোন কারণ ছাড়া ওর ওপরে হামলা করা হয়নি। হঠাৎ সৈকতে অচেনা এক মেয়েকে দেখে খুন করেনি খুনিরা। তারা এসেছিল তৈরি হয়ে।’

‘আমরা মিস ওয়েসের খুনিদের আইনের আওতায় আনব,’ বলল সার্জেন্ট লিলি।

ওরা যেমন ধরনের লোক, তাদের গায়ে টোকাও দিতে পারবেন না আপনারা,’ স্পষ্ট করে বলল রানা।

‘হয়তো তা-ই,’ বলল ইন্সপেক্টর, ‘কিন্তু সেক্ষেত্রে আপনিও কিছুই করতে পারবেন না।’

ওদের জন্যে আমি তৈরি ছিলাম না,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল রানা। ‘পরেরবার এই ভুল হবে না।

‘ভুলবেন না, আইন-রক্ষার কাজ পুলিশের, বলল সার্জেন্ট লিলি।

‘খুনিরা এখন কোথায় সেটা আপনারা জানেন?’ বলল রানা।

‘আপনি নিজে তাদেরকে কোথায় পাবেন বলে ভাবছেন?’, টিটকারির হাসি হাসল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘এদিকে যে নেই তা নিশ্চিত ‘ বলল রানা। ‘আমরা যখন কথা বলে সময় নষ্ট করছি, প্রতি সেকেণ্ডে আরও দূরে চলে যাচ্ছে তারা।’

‘আমরা যে তাদেরকে গ্রেফতার করতে পারব, তাতে মনে কোন সন্দেহ রাখবেন না,’ বলল ইন্সপেক্টর হকিন্স।

‘আপনি আসলে আঁধারে নিজের পোঁদের ফুটোও দুই হাতে খুঁজে পাবেন, সে-ক্ষমতা আপনার নেই,’ সব্জ সুরে বলল রানা।

এ-কথায় একই সময়ে চেয়ার ছাড়ল দুই ডিটেকটিভ। লালচে হয়েছে ইন্সপেক্টরের দুই গাল। মেঝে দেখছে সার্জেন্ট লিলি। মেয়েটার জন্যে খারাপই লাগল রানার।

‘পরে তদন্তের অগ্রগতি আমরা জানিয়ে দেব,’ বলল হকিন্স।

চুপ করে থাকল রানা।

পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে গেল ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট।

কিছুক্ষণ বসে বসে বেলার কথা ভাবল রানা। ওর দুঃখ লাগছে এটা ভেবে যে, আর কখনও দেখা হবে না হাসিখুশি। মেয়েটার সঙ্গে। আরও বাড়ল রানার মনের তিক্ততা। মনের আয়নায় দেখতে পেল, বেলার পেট-বুকের ক্ষত থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে তাজা রক্ত। উপড়ে নিয়েছে নীল দুটো চোখ। জবাই হওয়া বেলার রক্ত শুষে নিচ্ছে পাথুরে জমি।

একটু পর নার্সকে ডাকল রানা। ওর কথায় ওয়ার্ড ছেড়ে চলে গেল মেয়েটা। ফিরল পাঁচ মিনিট পর। তার সঙ্গে এসেছে ডাক্তার হাম্বল। সে বলল, ‘আরও একদিন আপনাকে ওয়ার্ডে রাখতে চাই।’

জবাবে রানা বলল, ‘আমি হাসপাতালের পার্কিং লট পেরোতে গিয়ে মরে গেলে আমার সঙ্গে তর্ক জুড়বেন।

রোগী কোন কথা শুনবে না বুঝে শেষবারের মত রানার চুলের ফাঁকে করোটির সেলাই দেখল ডাক্তার হাম্বল। তারপর বিদায় নিল বিমর্ষ মুখে

বাথরুমে পোশাক পাল্টে হাসপাতাল থেকে বেরোল রানা। আগেই মনস্থির করেছে, এবার খুঁজে বের করবে বেলার খুনিদেরকে।

বারো

হাসপাতাল থেকে সরাসরি কটেজে ফিরল না রানা। পায়ে হেঁটে দুটো গ্রাম পার করে তারপর বাস ধরে পৌঁছুল গ্যালওয়ের বড় রাস্তায়। ওখান থেকে সিকিমাইল দূরেই চেনা এক সৈকত। গ্যালওয়ে গেস্ট-হাউসে না গিয়ে সেখানে চলে গেল রানা। কৈশোরে আবিষ্কার করেছিল সৈকতের কাছে ছোট্ট পাহাড়ি গুহাটা। এমনই এক জায়গা, যেখানে ওকে বিরক্ত করতে আসবে না কেউ।

সাগরতীরের পাহাড়ি গুহায় বসে ধূমপান করতে খুব ইচ্ছে হলো ওর। তখনই স্থির করল, আর কখনও সিগারেটের ধারেকাছে যাবে না। ভাবতে লাগল, এরপর কী করবে।

ওর সামনে এখন মাত্র দুটো পথ।

এক: সবকিছু ভুলে ফিরে যেতে পারে ফ্রান্সে। দুই: অথবা খুঁজতে পারে বেলার খুনিদেরকে।

প্রথম কাজটা করলে অপেক্ষা করতে হবে একদিন খুনিদেরকে গ্রেফতার করবে পুলিশ। সেক্ষেত্রে বেলার আত্মীয়দের সান্ত্বনা দেয়াই যথেষ্ট। দরকারে সহায়তা করবে আইনি কর্তপক্ষকে। অর্থাৎ নিজে থেকে কিছুই করতে হবে না ওর।

ওদিকে দ্বিতীয় কাজটা না করলে প্রতিক্ষণে ক্ষয় হবে ওর হৃদয়। আগে কখনও কোন কাজে গাফিলতি করেনি। ফলে বেলার খুনিকে খুঁজে বের না করলে নিজেকে ওর মনে হবে দোষী। মেয়েটার মৃত্যুর দায় কোনভাবেই এড়াতে পারবে না।

এদিকে খুনিদেরকে খুঁজতে গেলে হয়তো লাগবে বহু দিন। চুপ করে সাগরতীরের গুহায় বসে রইল রানা। বহুক্ষণ পর বেরিয়ে এল সৈকতে। দুপুর হলেও খিদে নেই পেটে। হেঁটে যাওয়ার সময় দেখল ওর ভাড়া করা কটেজ। বেলা যেখানে খুন হয়েছে, পেরিয়ে এল জায়গাটা। ওখানে বাতাসে

তপত করে উড়ছে গার্ডার টাঙানো টেপ। একটু দূরে এক ল্যাণ্ড রোভার। পাথরের ভেতরে সূত্র খুঁজছে মোটা দুই গার্ডা। একটু পর হাল ছেড়ে ফিরে যাবে স্টেশনের উষ্ণ পরিবেশে।

গ্যালওয়ে গেস্ট-হাউসে পা রেখে রিসেপশন ডেস্কে কাউকে দেখতে পেল না রানা। চট করে পাতা উল্টে দেখে নিল রেজিস্ট্রি খাতা। এখন যারা আছে গেস্ট-হাউসে, তাদের ভেতরে আছেন বেলজিয়ান এক দম্পতি-মশিয়ো গফিন ও তাঁর স্ত্রী ম্যাডাম জুলিয়ান। আগামীকাল ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা লণ্ডনে।

‘রুম নাম্বার নাইন,’ মনে মনে বলল রানা। রওনা হয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। তবে ওখানে পৌঁছাবার আগেই খুলে গেল স্টাফ ওনলি লেখা এক দরজা। আগে ওটা ছিল চাচার স্টাডিরুম। প্যাসেজে বেরিয়ে এলেন মিসেস অ্যাপলউড। লালচে হয়ে আছে তাঁর ফোলা দু’চোখ। অনেক কেঁদেছেন মহিলা। রানার মার খাওয়া চেহারা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে আবারও কাঁদতে লাগলেন তিনি। রানা কিছু বলার আগেই ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, ‘আহা, বেচারি বেলা ওয়েস! কী ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল!’

রানার মনে হলো, এদিকের সৈকতে খুনের ঘটনা ঘটে যাওয়ায় গেস্ট-হাউসের ওপরে তার বাজে প্রভাব পড়বে কি না, সেটা নিয়ে বেশি ভাবছেন মহিলা। আজ সারা সকাল তাঁকে বিরক্ত করেছে মিডিয়ার লোক। তাদের মন্দ প্রচারণায় যে-কোন সময়ে বন্ধ হবে গেস্ট-হাউস ব্যবসা। টুরিস্টরা ধরে নেবে, যেহেতু সৈকতে ঘুরঘুর করছে খুনি, কাজেই এ-এলাকা খুবই বিপজ্জনক। সেক্ষেত্রে টাকার অভাবে গলফ্ ক্লাবের সদস্যপদ হারাবেন মিস্টার অ্যাপলউড। তাতে মারাও যেতে পারেন মানসিক যন্ত্রণায়।

মহিলাকে সংক্ষেপে সান্ত্বনা দিল রানা। তারপর আঙুল তুলে সিঁড়ি দেখাল। ‘মিস্টার গফিনের ঘর কি নয় নম্বর? আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’

‘হ্যাঁ, ওই রুমেই উঠেছেন,’ টিশ্যু পেপার দিয়ে চোখের কোণ মুছলেন মহিলা। ‘তবে আপাতত তাঁরা লাঞ্চ করছেন কনসার্ভেটরি রুমে। যে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল, তারপর আজ আর কিছুই মুখে তুলতে পারছেন না কেউ!’ মহিলা জিজ্ঞেস করলেন না কী কারণে বেলজিয়ান ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে রানা। নিজে থেকেও কিছু বলল না ও। মিসেস অ্যাপলউডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা ঢুকল কনসার্ভেটরি রুমে।

খুনের ঘটনা খারাপ প্রভাব ফেলেছে অতিথিদের ওপরে। চুপচাপ লাঞ্চ করছে কয়েকজন। পারতপক্ষে কথা বলছে না কেউ। মাঝে মাঝে প্লেটে লেগে টুংটাং শব্দ করছে চামচ। ঘরে চোখ বুলিয়ে মধ্যবয়স্ক এক লোককে মশিয়ো গফিন বলে মনে হলো রানার। ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রী হালকা গড়নের। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান বাইরে। রোদে পোড়া চেহারা। মিস্টার গফিনের উঁচু কপালের ওদিকে ব্যাকব্রাশ করা চুল রুপালি। তাঁর স্ত্রীর চুল সোনালি। ঘরের ‘কোণে টেবিলে বসে লাঞ্চ সেরে চুপচাপ কফিতে চুমুক দিচ্ছেন তাঁরা। গত সন্ধ্যার ভয়াবহ ঘটনায় মুষড়ে পড়েছেন। তাঁদের টেবিলের সামনে গিয়ে থামার আগে রানাকে লক্ষ করলেন না তাঁরা।

‘মশিয়ো অ্যাণ্ড ম্যাডাম গফিন?’ নরম সুরে বলল রানা।

চমকে উঠে মুখ তুলে ওকে দেখলেন মধ্যবয়স্ক দম্পতি। ‘আমি গ্রাহাম গফিন, ভিনদেশি সুরে ইংরেজি বললেন ভদ্রলোক। ‘আর ইনি আমার স্ত্রী জুলিয়ান। আর আপনি…

‘রানা, মাসুদ রানা,’ নিজের নাম বলল রানা। ‘আপনাদেরকে বিরক্ত করছি বলে দুঃখিত।’ চেয়ার দেখিয়ে ফ্রেঞ্চ ভাষায় জানাল, ‘আমি কি কিছুক্ষণের জন্যে আপনাদের পাশে বসতে পারি? বেশি সময় নেব না।

‘আপনি কী বিষয়ে কথা বলতে চান?’

‘গত সন্ধ্যার খুনের ব্যাপারে,’ বলল রানা। ‘কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। এরপর আর বিরক্ত করব না আপনাদেরকে।

পরস্পরকে দেখলেন বেলজিয়ান দম্পতি। তাঁরা কিছু বলার আগেই চেয়ার টেনে বসল রানা।

‘আপনি বোধহয় পুলিশ নন?’ জানতে চাইলেন জুলিয়ান গফিন। ঝিকঝিক করছে নিখুঁত সাদা দাঁত। পোশাক থেকে এল শ্যানেল ফাইভের সুবাস।

‘না, আমি পুলিশ নই,’ বলল রানা, ‘গতকাল বাধা দিতে চেয়েছিলাম খুনিদেরকে।

‘আমি আপনাকে আহত হতে দেখেছি,’ চট্ করে রানার ফোলা মুখ দেখে নিলেন মোশিয়ো গফিন।

এটা বোধহয় জানেন, পুরো ঘটনা আমি দেখতে পাইনি। তাই জানতে চাই আসলে কী ঘটেছিল।’

শুকনো হাসলেন বেলজিয়ান ভদ্রলোক। ‘আয়ারল্যাণ্ডে কি পুলিশের বদলে যার যার তদন্ত করে নিতে হয়?’

তা নয়। তবে একজন মেয়েকে সৈকতে খুন করা হলো, এ-ও তো স্বাভাবিক কিছু নয়। আপনারা ওই ঘটনার সাক্ষী। তাই সে-ঘটনায় অস্বাভাবিক কিছু দেখে থাকলে, সেটা আমাকে বললে উপকৃত হব।

‘আমরা পুলিশকে সবই খুলে বলেছি,’ জানালেন জুলিয়ান গফিন, ‘গ্রাহাম আর আমি বিকেলে হাঁটতে গিয়েছিলাম। গেস্ট-হাউসের দিকে ফিরছি, এমন সময় শুনলাম গর্জে উঠেছে একটা ইঞ্জিন। তখন ঘুরে দেখলাম রুপালি একটা বড় গাড়ি।’

‘ওটা ছিল মাযদা জিপ,’ বললেন মোশিয়ো গফিন।

‘রাস্তা ছেড়ে দ্রুত সৈকতের দিকে এল ওটা। আমরা বুঝে গেলাম কাউকে ধাওয়া করছে ড্রাইভার। বেচারি মেয়েটা তখন দৌড়াতে শুরু করেছে। গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ল দু’জন লোক। ছুটে গেল মেয়েটার দিকে। ব্যাগ ফেলে দৌড়াচ্ছিল মেয়েটা। লোকদুটোর একজন তুলে নিল ওর ব্যাগ। আমরা ভাবলাম তারা ছিনতাইকারী। ব্যাগ নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু সেটা না করে মেয়েটাকে ধরতে গেল তারা। আর সে-সময়ে দেখলাম কটেজ থেকে বেরোলেন আপনি। আপনার আসলে অনেক সাহস, মোশিয়ো।’

‘আমি একজন পক্ষী-বিশেষজ্ঞ,’ বললেন গ্রাহাম গফিন। ‘বছরের এ-সময়ে এদিকে অনেক পাখি আসে। ওগুলো দেখার জন্যে সঙ্গে বিনকিউলার ছিল। পরিষ্কার দেখলাম দুই খুনির একজন বের করেছে একটা ছোরা।’

‘বাদামি হুডি, নাকি জ্যাকেট পরা লোকটা?’ জানতে চাইল রানা।

‘হুডি পরা লোকটার হাতে ছিল ছোরা। তাকে সৈনিক বলেই মনে হলো আমার। ছোরাটাও ছিল মিলিটারির জন্যে তৈরি।

তাঁর চোখে তাকাল রানা। ‘বলবেন কী, কেন এটা আপনার মনে হলো?’

‘আমার শখ মিলিটারির নানান জিনিস সংগ্রহ করা,’

বললেন গ্রাহাম। ‘ইনসিগনিয়া, মেডেল, বেয়োনেট, ছোরা ইত্যাদি। মেয়েটাকে যে ছোরা দিয়ে খুন করল, ওটা ছিল ইউনাইটেড স্টেটসের মেরিন কর্পসের ফাইটিং অ্যান্ড ইউটিলিটি নাইফ। কালো রঙের সাত ইঞ্চি ফলা। ক্লিপ পয়েন্ট। চামড়া দিয়ে তৈরি হাতল।

‘কা-বার নাইফ,’ বলল রানা।

মৃদু মাথা দোলালেন বেলজিয়ান ভদ্রলোক।

এবার জানতে চাইল রানা, ‘আপনি কি পুলিশকে এই বিষয়ে কিছু বলেছেন?’

‘নিশ্চয়ই,’ বললেন গ্রাহাম। ‘লোকটা ছোরা বের করলে ভয়ে পালিয়ে যেতে চাইল মেয়েটা। তবে এরপর কিছুই আর দেখতে পেলাম না। কারণ, মেয়েটা চলে গেল বড় এক বোল্ডারের ওদিকে। তীরবেগে তার পিছু নিল হুডি পরা লোকটা। তাকে ঠাণ্ডামাথার খুনি বলে মনে হয়েছে আমার। তখনই বুঝলাম খারাপ কিছু ঘটবে। একটু পর হাসতে হাসতে বোল্ডারের ওদিক থেকে ফিরে এল সে।’

‘তার মুখে হাসি ছিল?’ হাতদুটো মুঠো হয়ে গেল রানার।

‘খুশি হয়েছিল মেয়েটাকে জবাই করে। ওটা যেন মজার কোন খেলা। আমি সব দেখলেও তখন আর কিছুই করতে পারিনি। হতভম্ব হয়ে যাই কিছুক্ষণের জন্যে।’

কফির দিকে তাকালেন ভদ্রলোক। রানার মনে হলো বমি করতে চান। ‘আপনার অচেতন দেহের পাশে গিয়ে থামল হুডি পরা লোকটা, চেহারা খুব শান্ত। আমার মনে হলো, এবার আপনাকেও খুন করবে সে। আর তখনই সচেতন হয়ে হাত নাড়তে নাড়তে তাদের দিকে ছুট দিলাম। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিলাম। আমাকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জিপে উঠল তারা। দেরি হলো না গাড়ি নিয়ে চলে যেতে।’

‘আমার প্রাণরক্ষা করেছেন বলে অসংখ্য ধন্যবাদ, স্যর, বলল রানা। ‘তবে বাধা দিতে গেলে খুন হতেন তাদের হাতে।’

‘আরও আগেই আমার উচিত ছিল গার্ডায় ফোন করা, বললেন গফিন। ‘নইলে দেখতে হতো না মেয়েটার বিকৃত ‘লাশ।’

আলতো করে স্বামীর বাহুতে হাত রাখলেন জুলিয়ান। নরম সুরে বললেন, ‘এরপর আমরা পুলিশে যোগাযোগ করি অবশ্য ততক্ষণে সর্বনাশ হয়ে গেছে। কী ভয়াবহভাবেই না খুন করেছে মেয়েটাকে!’

‘আপনাদেরকে তিক্ত অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দিয়েছি বলে আমি দুঃখিত,’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রানা।

‘আপনার জন্যে ড্রিঙ্কের অর্ডার দিই?’ জানতে চাইলেন গ্রাহাম গফিন।

মাথা নাড়ল রানা। ‘ধন্যবাদ, স্যর। লাগবে না। আশা করি নিরাপদে পৌঁছে যাবেন লণ্ডনে।

গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে সৈকতে ফিরে এল রানা। সাগর থেকে হু-হু করে আ হাওয়ায় চেপে আকাশে জড় হয়েছে ঘন কালো মেঘ। কটেজের দিকে পা বাড়াতেই শুরু হলো ঝরঝর করে বৃষ্টি। কনকনে শীতল জলে ভিজে গেল রানা। হাঁটতে হাঁটতে ভাবল: চারদিকে চোখ রাখেন গফিন, নইলে বুঝতেন না কা-বার নাইফ ব্যবহার করেছে খুনি। ইন্সপেক্টর হকিন্স কি বুঝতে পেরেছে তাঁর কথা?

খুনি মিলিটারি থেকে প্রশিক্ষিত। খুনের সময় ব্যবহার করেছে সম্মুখ সমরের ছোরা কা-বার নাইফ। ওটা কিচেন নাইফের মত সস্তা কিছু নয়। এ-থেকে বোঝা যাচ্ছে, মেলা টাকা দিয়ে ভাড়া করা হয়েছে দক্ষ খুনি। কিন্তু সে-টাকা দিল কে বা কারা? কেনই-বা চাইল বেলা খুন হোক?

আয়ারল্যাণ্ডে রিসার্চ করার সময় কারও জন্যে হুমকি হয়ে উঠেছিল বেলা। আজকের দুনিয়ায় গুলির আঘাতে যত মানুষ মারা পড়ে, তারচেয়ে বেশি খুন হয় বিপজ্জনক তথ্যের জন্যে। নিশ্চয়ই জরুরি কোন তথ্য জেনে গিয়েছিল বেলা। রানা নিজে সেটা জানলে উন্মোচিত হবে খুনের মোটিভ তখন এ-ও বেরোবে কোথা থেকে এসেছে টাকা। আর অর্থের উৎস জানিয়ে দেবে বেলাকে খুন করতে নির্দেশ দিয়েছে কে। অবশ্য এখন রানার বড় সমস্যা হচ্ছে জরুরি সূত্র খুঁজে পাওয়া।,

তেরো

কটেজে ফিরে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে নিল রানা। টের পেল কেটে যাচ্ছে হাসপাতালে দেয়া পেইন কিলারের প্রভাব। শুরু হয়েছে মুখ-মাথা জুড়ে টনটনে ব্যথা। হঠাৎ নিজেকে বড় দুর্বল লাগল ওর। বুঝে গেল, ব্যথা দূর করতে হলে ওষুধের মত কিছু লাগবে। ভেজা পোশাক পাল্টে নেয়ার আগেই ভাবল, এখন এক ঢোক উইস্কি না নিলেই নয়।

ওর চোখ পড়ল ড্রেসারের মাথায় রাখা উইস্কির বোতল ও গ্লাসের ওপরে। বোতল খালি হলেও গ্লাসে আছে আড়াই ইঞ্চি মদ। গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতেই বিদ্যুতের শক খেল রানা। গতকাল ছুটে গিয়েছিল বেলাকে বাঁচাতে, কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। হাত বাড়িয়েও থমকে গেছে রানা। কয়েক পলক চেয়ে রইল সোনালি তরলের দিকে। মনের ভেতরে কে যেন বলল, ‘যথেষ্ট, রানা! নতুন করে আর মদ গিলতে যেয়ো না।’

হাত বাড়িয়ে উইস্কি ভরা গ্লাস ও খালি বোতল নিল রানা। দ্রুত পায়ে চলে গেল কিচেনে। বোতলটা যেন রিসাইকেল বিনে। তারপর সিঙ্কে ঢেলে দিল গ্লাসের উইস্কি। ফিরে এল পাশের ঘরে। বাক্সে আছে উইস্কির আরও কয়েকটা বোতল। বাস তুলে নিয়ে ফিরে এল কিচেনে। এক এক করে বোতলের মুখ খুলে সিঙ্কে ডাবল সোনালি তরল। তিন মিনিটে মিনিটে – খালি হলো সাতটা বাতল। ততক্ষণে অ্যালকোহলের গন্ধে কিচেনের পরিবেশ। হয়ে গেছে চালু ডিসটিলারির মত।

কিচেন থেকে বেরিয়ে আর্মচেয়ারে গিয়ে বসল রানা। সারা বিকেল ঝরঝর করে ঝরল বৃষ্টি। জানালা দিয়ে সে-দৃশ্য দেখল ও। প্রচণ্ড হয়ে উঠেছে মাথা ব্যথা। কোনকিছুই পাত্তা দিল না রানা। শেষ বিকেলে জুতো খুলে লাগেজ হাতড়ে বের করল একজোড়া কেস্। ওর মনে পড়ল, গত ছয়মাসে ওগুলো ব্যবহার করেনি। জুতোর ফিতে বেঁধে কটেজ থেকে বেরিয়ে এল রানা। ছুটতে লাগল বৃষ্টির ভেতরে।

কৈশোরে প্রতি ভোরে এই সৈকতে দৌড়াত পাঁচ মাইল। এরপর শুরু হতো প্রেস আপ ও সিট আপ। পরিশ্রান্ত না হয়ে ব্যায়াম করত একঘণ্টার বেশি। আজ রানা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল: যত কষ্ট হোক, নিজেকে আবারও যোগ্য করে তুলবে।

প্রথম মাইল ছুটতে গিয়ে মাংসপেশির ব্যথা ও হাঁফ লাগার জন্যে নিজেকে বারবার দোষ দিল রানা। মনের ভেতরে খুনের দায় নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বৃষ্টির ভেতরে ছুটে চলল সৈকতের শেষপ্রান্তের দিকে। নুড়িপাথরে পড়ছে একেক পা, আর ঝাঁকুনি খেয়ে বাড়ছে ওর মাথা-ব্যথা। মনে হচ্ছে যেন ছিঁড়ে যাবে গেণিগুলো। হাঁসফাঁস করছে যন্ত্রণায় ভরা ফুসফুস। কয়েকবার মনে হলো, এবার একটু থামি, একটু বিশ্রাম নিই।

যদিও একবারের জন্যেও থামল না রানা।

একঘন্টা পর টলতে টলতে ফিরল কটেজে। ততক্ষণে সিধে হয়ে দাঁড়াবার সাধ্যও ফুরিয়ে এসেছে ওর। ভার্নিশ করা লিভিংরুমের মেঝেতে দীর্ঘ জলধারা রেখে বসে পড়ল ড্রেসারের পাশের আর্মচেয়ারে। ফুলে ঢোল হয়েছে পায়ের পাতা ও কাফ মাসল। গুঙিয়ে উঠে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে এক এক করে খুলল ভেজা কেড্‌স্ ও মোজা। আড়ষ্ট দু’পা মেঝেতে রাখতেই মনে হলো, ওগুলো কোন গাছের মরা গুঁড়ি। কী যেন খচ্ করে বিধল ডানপায়ের পাতার নিচে। ব্যথা পেয়ে পা তুলে রানা দেখল, মাংসে গেঁথে গেছে একটুকরো ক্রিস্টাল। বুড়ো আঙুল ও তর্জনী দিয়ে ধরে ওটা তুলে আনল রানা। ক্ষত থেকে টপটপ করে পড়ছে রক্ত। অবশ্য গভীর নয় কাটা জায়গা। বুঝে গেল, মেঝে থেকে ভাঙা গ্লাস সরাবার সময় রয়ে গেছে স্ফটিকের টুকরো।

রানা মেঝেতে বসে খুঁজতে লাগল ধারাল আরও টুকরো রয়ে গেছে কি না। ঘড়ঘড় আওয়াজে ঠেলে দিল আর্মচেয়ার। মেঝেতে এক জায়গায় মদ পড়লেও আশপাশে কোন ভাঙা স্ফটিক নেই।

অবশ্য তার বদলে রয়েছে অন্যকিছু।

আর্মচেয়ারের তলায় হাত ভরে ওটা বের করল রানা।

জিনিসটা চামড়ার একটা পাউচ।

ভুরু কুঁচকে ওটার দিকে চেয়ে রানার মনে পড়ল, গতকাল বিকেলে কাঠের চেয়ারের কাঁধে ভেজা ব্যাগ ঝুলিয়ে রেখেছিল বেলা। চলে যাওয়ার আগে মদের প্রভাবে চেয়ারের ওপরে টলে পড়লে ব্যাগসহ মেঝেতে পতন হয় চেয়ারটার। চারপাশে ছড়িয়ে যায় ব্যাগের ভেতরে জিনিসপত্র। তাড়াহুড়ো করে সব গুছিয়ে নিয়ে বিদায় নেয় বেলা। জানত না আর্মচেয়ারের নিচে রয়ে গেছে মোবাইল ফোনের পাউচ।

গেস্ট-হাউসের দিকে যাওয়ার সময় ব্যাগে পাউচ নেই সেটা টের পায় বেলা। তখন ছুটতে ছুটতে আসে রানার কটেজের কাছে। কিন্তু সে-সময় ওকে ধাওয়া করছে দুই খুনি।

পাউচ দৈর্ঘ্যে সাড়ে সাত ইঞ্চি, চওড়ায় চার ইঞ্চি। ভেড়ার চামড়া দিয়ে তৈরি। মূল পকেট ছাড়াও সামনে আছে চেইন দেয়া ছোট পকেট। রানা আগেই জানে, পাউচে কী আছে। প্রমাণ হিসেবে ওটা পুলিশের হাতে তুলে দেবে কি না, সেটা ভাবতে গিয়ে সময় নিল ও। তারপর বুঝে গেল, কাজটা করা উচিত হবে না।

দ্বিধা না করে পাউচের বড় পকেট থেকে নিল বেলার নোটবুক। চোখ বোলাল লেখাগুলোর ওপরে। বেলা টুকে রখেছে কয়েক পৃষ্ঠা নোট, আয়ারল্যাণ্ডের কিছু জায়গা আর ‘জন মানুষের নাম। নোটবুক সরিয়ে রেখে পাউচের সামনের পকেটের চেইন খুলল রানা। ভেতর থেকে নিল দুটো স্মার্টফোন। দুটোর একটা নোকিয়ার দামি মোবাইল ফোন, অন্যটা কমদামি স্যামসাং। শেষেরটা মাত্র ক’দিন আগে কেনা। স্ক্রিন থেকে খোলেনি প্রোটেকটিভ প্লাস্টিক শিট।

রানার মনে পড়ল, গতকাল এদিকে আসার সময় চামড়ার পাউচ থেকে স্মার্টফোন নিয়ে মেসেজ এসেছে কি না দেখেছে বেলা। খুব হতাশ হয়েছিল তখন। বলেছিল, একলোকের কাছ থেকে মেসেজ পাবে বলে আশা করছে। ওটা ওর রিসার্চের সঙ্গে জড়িত। দুশ্চিন্তার ছাপ ছিল মুখে। অবশ্য এ- ব্যাপারে সে-সময় আর কিছু বলেনি।

তখন কিছু না ভাবলেও এখন বেলার মৃত্যুর পর প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে রানা। ভাবল: গতকাল কোন্ ফোনটা ব্যবহার করেছিল বেলা?

পাশাপাশি দুই ফোন দেখার পর ওর মনে পড়ল, বেলার হাতে ছিল কমদামি স্যামস্যাং।

ওটা চালু করল রানা। কনট্যাক্ট লিস্টে বোধহয় থাকবে গুরুত্বপূর্ণ লোকটার নাম।

যদিও কনট্যাক্ট লিস্ট প্রায় খালি।

হয়তো আগেই বেশিরভাগ ডেটা ডিলিট করেছে বেলা।

ব্যাক কি টিপে এসএমএস মেন্যুতে গেল রানা।

তিনদিন আগে সার্ভিস প্রোভাইডারের ‘ওয়েলকাম, নিউ ইউয়ার’ মেসেজ ছাড়া অন্য কোন ডেটা নেই।

এ-ফোন আয়ারল্যাণ্ডের নানাদিকে যাওয়ার সময় দু’চার দিন আগে কিনেছে বেলা।

দ্বিতীয় ফোন কেন কিনল মেয়েটা? ভাবল রানা।

জরুরি তথ্য পাওয়ার সঙ্গে নতুন ফোন কেনার কি কোন সম্পর্ক আছে?

মেসেজ মেনু থেকে সরে কল হিস্ট্রি দেখল রানা।

প্রায় অব্যবহৃত ফোন থেকে তিনবার কল করেছে বেলা আর সেটা করেছে ফোন কেনার দিনে।

প্রথম কল স্থানীয় সময় বিকেল তিনটে পঁচিশে। ওটা গেছে আমেরিকার এক ল্যান্ডফোনে। কথা বলেছে মাত্র তিন মিনিট।

এরপর ফোন করেছে লণ্ডনের এক ল্যাণ্ডফোনে। তখন কথা বলেছে কয়েক মিনিট।

তৃতীয় ফোন আবারও আমেরিকায়।

সে-সময়ে কথা হয়েছে একচল্লিশ মিনিট।

কিন্তু বেলা কেন আবারও ফোন করল আমেরিকায়?

এর পেছনে নিশ্চয়ই জরুরি কোন কারণ ছিল?

রিসিভড্ কল চেক করে মাত্র একটা ফোনকল পেল, রানা। একই দিনে তিনটে চল্লিশ মিনিটে ফোন করেছে বেলা লণ্ডনে। কথা বলেছে তিন মিনিট। এরপর পাঁচটা একত্রিশ মিনিটে আমেরিকায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেছে। এরপর আর ব্যবহার করেনি স্যামসাং।

আমেরিকায় যে ল্যাণ্ডফোনে কল করেছিল বেলা, অপশন টিপে সে-নাম্বারে ফোন দিল রানা।

আয়ারল্যাণ্ডে এখন বিকেল তিনটে।

অর্থাৎ আমেরিকায় বাজে রাত তিনটে।

দু’বার রিং হওয়ার পরে আমেরিকার দক্ষিণের সুরে বলল এক মেয়ে, টুলসা সিö