Wednesday, February 28, 2024
Homeউপন্যাসগান্ধর্বী - বাণী বসু

গান্ধর্বী – বাণী বসু

সে যখন রবীন্দ্রসদনের গেট দিয়ে তাড়াহুড়ো করে বেরোচ্ছিল তখন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরীর ওপর একটা প্রকাণ্ড লালচে কালো মেঘ। মাত্র একটাই। বাকি আকাশটা ধূসর। অনেকটা যেন সেই প্রতিচ্ছায়াহীন মানব মনের মতো। কিন্তু ওই একটা লালচে কালো ছোপই ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো। গুহা মানবদের আঁকা বাইসন ছুটতে ছুটতে আসছে। ওইরকম মহাকায়, ওইরকম বেগবান। কিম্বা বলা যেতে পারে ফৈয়জ খাঁ সাহেবের হলক তানের হুঙ্কার। চোখে মুখে ধুলোর ঝাপটা লাগবার আগেই যেমন করে হোক বাসে উঠে পড়তে হবে। নইলে বিপদ। পেছন থেকে দীপালিদি ডেকেছিল— ‘অপু, আমার গানের আগেই চলে যাচ্ছিস যে বড়?’ তার স্বরে অভিমান। অপালা এগোতে এগোতেই বলেছিল—‘না গেলেই নয় রে দীপুদি, তুই তো সবই জানিস।’

তার তানপুরো রয়ে গেল মাস্টারমশাইয়ের জিম্মায়। তানপুরো অবশ্যই তাঁরই। এ কদিন রেওয়াজের জন্য ছিল তার কাছে। যতদিন থাকে সে তটস্থ হয়ে থাকে। মস্ত বড় তুম্বিঅলা তানপুররা। ইন্দোরের কোন বিখ্যাত কারিগরের হাতের তৈরি, ঐতিহ্যবাহী জিনিস। সে অনেকবার বারণ করেছিল মাস্টারমশাইকে। ছোট তানপুরোটাতেও তো তার অনায়াসেই চলে যেত। অন্যান্য প্রতিযোগিতার আগে মাস্টারমশাই সেটাই দিয়েছেন। কিন্তু এবার ওটাই দিলেন। সে কিন্তু কিন্তু করতে এক ধমক খেল। সোহমের গাড়িতে করে পাঠিয়ে দিলেন তার বাড়ি। পণ্ডিত চন্দ্রকান্ত ছিলেন বিচারকদের মধ্যে। একদম অভাবিত। অপালা কেন, আর কোনও প্রতিযোগীই এ আশঙ্কা করেনি। পুনে থেকে এস. এস্‌ জয়কার, লক্ষ্ণৌ থেকে আহম্‌দ হোসেন আসছেন জানা ছিল। কিন্তু এঁরা যদি গ্রাম্য ভাষায় যাকে বলে গোবাঘা হন তো পণ্ডিত চন্দ্রকান্ত আসল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। এতোটাই তফাত। সত্যিকারের নায়ক লোক। যেমন জ্ঞান সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় তেমনি ওস্তাদ গাইয়ে। তেমনি আবার শিক্ষক। সেই সঙ্গে লোকে বলে চন্দ্রকান্তজী সাধক মানুষ। সবই মাস্টারমশাইয়ের কাছে শোনা। তারা শুধু রেকর্ড শুনেছে। একবার মাত্র একবার, সদারঙ্গ সঙ্গীতসম্মেলনে শোনবার সৌভাগ্য হয়েছিল। দাপট কী! বাপ রে। ওঁর আসবার কথা মাস্টারমশাই যদি জেনেও থাকেন, গোপন করে গেছেন ওরা ভয় পাবে বলে।

পনের মিনিট সময়, তার মধ্যে সবগুলি অঙ্গ দেখাতে হবে। মিনিট তিনেকের মতো আলাপ করে নিয়ে সে সবে ‘জিউ মোরা চা আ এ-এ-এ’ বলে টানটা দিয়েছে থামিয়ে দিলেন চন্দ্রকান্তজী।

—‘তোড়ি কখনকার রাগ?’

—‘দিবা দ্বিতীয় প্রহর।’

—‘এখন সময়?’

—‘ঘড়ি দেখে মনে হয় সবে সন্ধ্যা। ইমন, ভূপালিই প্রশস্ত।’

—‘তাহলে?’

—‘সব গানের আসরই যদি সন্ধ্যায় বসে তো ভোরের, সকালের প্রিয় রাগগুলি আমরা গাইব কখন, ওস্তাদজী?’ তানপুরোর খরজে আঙুল রেখে দ্বিধাকম্প্র স্বরে বলেছিল অপালা। আসল কথা, অন্যান্য যেসব উপাধি-পরীক্ষায় তারা এত দিন বসেছে তাতে রাগ-পরিচয় এবং অন্যান্য থিয়োরি জানা আবশ্যক ছিল। কিন্তু চয়েস রাগ বলে যে বস্তুটা থাকত, সেটা তারা যেটা ইচ্ছে সিলেবাসের মধ্য থেকে বাছতে পারত। সময় যাই হোক, সেটি গাইতে কোনও বাধা হয়নি। এ প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী যে আলাদা তাদের সে-কথা কেউ বলেনি। তারা জানবে কি করে? কিন্তু মঞ্চে বসে আয়োজকদের ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা বললে সুর কেটে যাবে। হঠাৎ সে আরেকটু সাহস করে বলল— ‘তা ছাড়া এই বদ্ধ ঘরে দিন রাত সবই তো সৃষ্টি হতে পারে রাগের আশ্রয়ে, বাইরের প্রকৃতি কি এখানে ঢুকতে পারছে?’

পণ্ডিতজীর মুখে সামান্য হাসি। বললেন— ‘তোড়ির মতো ভালো আর কোনটাই কি তৈয়ার নেই! নাকি সেই দীপক-মেঘমল্লারের কহানী তুমি সত্যি-সত্যি বিশ্বাস করো বেটি?’

অপালা মুখ তুলে বলেছিল —‘পণ্ডিতজী যদি আদেশ করেন আমি সন্ধ্যার রাগই গাইব। তবে আমার আগে, তিনজন ভূপালি, ইমন ও পূরবী গেয়ে গেলেন। আমি পুনরাবৃত্তি করলে শ্রোতাদের ধৈৰ্য্যচ্যুতি হতে পারে। এখন পণ্ডিতজী আদেশ করুন।’

চন্দ্রকান্ত স্মিতমুখে বললেন— ‘পুরিয়া তৈয়ার আছে?’ অপালার ভেতরটা চলকে উঠল। হার্মোনিয়মে বসেছেন তার মাস্টারমশাই রামেশ্বর ঠাকুর। তাঁর মুখে হাসি আসা-যাওয়া করছে বিদ্যুতের মতো। পুরিয়া অপালার বড় প্রিয় রাগ। পণ্ডিতজীর লং প্লেয়িং সে বারবার শুনেছে, তুলেছে, আপন আনন্দে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে সে রাগের প্রকাশ মহিমায়। পণ্ডিতজীরই প্রিয় গান, প্রিয় বন্দিশ সে ধরল ময়ূরের মতো আনন্দে। সেই ‘সুপ্‌নোমে আবে পিয়া।’ সামান্য একটু সুর ধরেই আরম্ভ করে দিল গান। অনেক সময় গেছে, আলাপাঙ্গ তো এঁরা শুনেই নিয়েছেন। হলই বা ভিন্ন রাগের। এইটুকু সময়ের মধ্যে যথাসম্ভব বিস্তার, স্বরন্যাস, বোলতান, সরগম, তারপর তার সপাট বড় বড় কূট তান সব করে দেখাতে হবে তো। অন্তত গাইতে গাইতে তার যা করতে ইচ্ছে করবে তাকে তো ইমান তাকে দিতেই হবে। তার সরগমগুলি সারেঙ্গিতে নিখুঁত তুলে বড় তৃপ্তিতে মাথা নাড়লেন ওস্তাদ ছোটেলাল। তর্কে-বিতর্কে সময় গেছে বলে পণ্ডিত চন্দ্রকান্ত তাকে পাঁচ মিনিট সময় বেশি দিলেন। গান শেষে সভাস্থ সবাইকে নমস্কার করে তানপুরাটিকে ‘লহো লহো তুলে লহো’র ভঙ্গিতে মাথায় ঠেকিয়ে অপালা বেরিয়ে গেছে, যবনিকার আড়াল দিয়ে বাইরে। সে জানে তার আর কোনও চান্স নেই, অত তর্কাতর্কি! অত দেরি! পুরিয়া বড় রাগ, কঠিন রাগ। একটু অসতর্ক হলেই মারোয়া কিম্বা সোহিনীর ছোঁয়া এসে যাবে। দ্রুত গানটি, ‘ম্যাঁয় তো পিয়া সঙ্গে রঙ্গরলিয়া’র সময়ে সে মারোয়ায় চলে যাওয়া এবং ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু অত অল্প সময়ে এসব মেটানো যায় না। অন্তত সে পারে না। এখনও। সময় বেশি দিলেও সে তার তৈরি তেহাই দিয়ে গান শেষ করতে পারেনি। অথচ আশ্চর্যের কথা, তার সমস্ত মনটা আশ্চর্য প্রসন্নতায় দ্যুতিময় হয়ে আছে। অত কথা কাটাকাটির পরও কী মন্ত্রে যেন গান গেয়ে সে বড় আনন্দ পেয়েছে। তোড়ির সাজেশনটা মাস্টারমশাইয়েরই। একবার মনে হয়েছিল সন্ধ্যার গান গাওয়াই ভালো। যদিও নিয়মের কথা কেউই জানতেন না, সম্ভবত নিয়ম কেউ করেনওনি। চন্দ্রকান্তজী তাঁর দীর্ঘদিনের সংস্কারে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি কখনও প্রয়াগ, চণ্ডীগড় এ সবের পরীক্ষা তো নেন না! মাস্টারমশাই বলেছিলেন—‘লড়ে যা মেয়ে, তোড়ি কঠিন রাগ, সবাই এর সৌন্দর্য ফোটাতে পারে না। বড় বড় কনফারেন্সে বড় বড় কলাবন্তরা ছাড়া এসব গাইবার সুযোগই কমে যাচ্ছে। এতটা রক্ষণশীলতা আমার ভালো লাগে না। তা ছাড়া প্রতিভা কোনও নিয়ম মেনে চলে না।’ শেষের কথাগুলো মাস্টারমশাই বলেছিলেন আত্মগত। যদিও অপালার কানে সেগুলো পৌঁছেছিল। তার প্রতিভা আছে কিনা সে এখনও জানে না, কিন্তু তার একটা জিনিস আছে সেটা হলো মাস্টারমশাইয়ের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা এবং বাধ্যতা। তিনি না থাকলে তো তার এতদূর পৌঁছনো হতো না! তা সেই লড়ে যেতেই হল।

সোহমের জন্য মনটা খুঁতখুঁত করছে খুব। ওরা দুজনেই মাস্টারমশাইয়ের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী। এরা সময় আগে থেকে জানাচ্ছে না, যেমন অপালাকে ডাকল চতুর্থ। তার রোল নাম্বার হিসেব করলে সে আসে অনেক পরে। তার বাড়ির অসুবিধের কথা ভেবে হয়ত মাস্টারমশাইই ঘটিয়েছেন কাণ্ডটা। রোল নং ধরলে, বোঝাই যাচ্ছে সোহম পড়েছে শেষের দিকে। ও গাইবে খুব সম্ভব শংকরা। ভালো, বড় ভালো গায় সোহম। মাস্টামশাইয়ের পুরুষালি তেজ, বিক্রম, তাঁর বিখ্যাত গমক, গিটকিরি, টপ্পার কাজ—এ সবই সোহমের গলায় অবিকল উঠে আসে। মানায়ও। বেশ পাল্লাদার গলা। মাস্টারমশাইয়ের গলা এই বয়সেই ভেঙে গেছে। স্বরভঙ্গ হয় মাঝে মাঝে। কণ্ঠ নামক শারীরিক যন্ত্রটির ওপর তো মানুষের হাত নেই। কিন্তু সুরের ওপর আছে। মাস্টারমশাই মাত্র পনের বছর বয়সে প্রডিজি হিসেবে ভারতজোড়া খ্যাতি পেয়েছিলেন। রামপুরে আর বরোদায় কাটিয়েছেন বহুদিন। তখন ভারতবর্ষের গুণিসমাজ এক ডাকে চিনত রামেশ্বর ঠাকুরকে। গায়ক-জীবন আরম্ভও করেছিলেন অল্প বয়সে, নিভেও গেলেন অল্পবয়সেই। পঞ্চাশেই আর গলা অতি-তারে যেতে চায় না। সি শার্প থেকে জিতে নেমে এসেছেন। খাদের দিকের রেঞ্জটা একই রকম আছে। মন্দ্রসপ্তকে একটা ভারী সুন্দর জোয়ারি আসে গলায়, জর্জেট কাপড়ের মতো। যেটা অপালার বিশেষ শ্রদ্ধার জিনিস। কিন্তু গায়ক হিসেবে রামেশ্বর আর প্রথম কেন দ্বিতীয় সারিতেও নেই। তবে তিনি শিক্ষক। আদর্শ শিক্ষক। যার ভেতরে গানের গ আছে তার ভেতরে আ কার আর দন্ত্য ন না ঢুকিয়ে তিনি ছাড়বেন না, আর যে কষ্ঠে গান নিয়েই জন্মেছে অপালা অথবা সোহমের মতো তারা যে তাঁর কাছ থেকে কী পায়, হার্মোনিয়মের মারফত, এসরাজের মারফত, সেতারের মারফত, সে অনির্বচনীয়কে তারা শুধু নিজেদের গভীরতম সত্তাতেই জানে, ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না।

সবচেয়ে বড় কথা রামেশ্বরের কোনও অভিমান নেই। এবং সঙ্গীত সম্পর্কে তাঁর একটা সামগ্রিক সুসম্বদ্ধ কল্পনা আছে। বলেন ‘দেখো আগেকার দিনে ঘরানা ব্যাপারটা গড়ে উঠেছিল কিছুটা পারস্পরিক যোগাযোগের অভাবে, কিছুটা আবার কোনও ওস্তাদের শুদ্ধি-বাতিক বা কৃপণতার জন্যে। পাতিয়ালার তানের স্পীড, কি আগ্রা ঘরানার বোল তান, কিরানার রাগের বাঢ়ত। এসব খুব শ্রদ্ধেয় বৈশিষ্ট্য নিশ্চয়ই। কিন্তু আজকে স্পেস-টেকনলজির যুগে বসে আমরা এগুলোকে যথাসাধ্য একত্র করতে পারবো না কেন? তিনি তাঁর সেরা ছাত্র-ছাত্রীদের তারিক আলি, মুমতাজ খান, ঘনশ্যাম গাঙ্গুলি এঁদের কাছে পাঠিয়েছেন তাদের তান-অঙ্গ আরও চোস্ত করতে। ঠুমরির তালিম নিতে। অপালা যা পেয়েছে, হাত ভরে পেয়েছে। আশাতীত পেয়েছে। যদিও গুরু রামেশ্বর তাঁর স্বাভাবিক বিনয়ে বলেন—‘তুমি আমাকে যা দিয়েছো তা তো জানো না মা, তোমরা-দুজনে আমার বসন্তকে ফিরিয়ে এনেছে। নিজের গলায় যৌবনের সে জিনিস তো আর ঈশ্বরের অভিশাপে করতে পারি না। তোমাদের কণ্ঠে তাকে ফিরে ফিরে পাই।’

—‘ঈশ্বরের অভিশাপ কেন বলছেন মাস্টারমশাই?’ অপালা ব্যথিত বিস্ময়ে বলেছে।

—‘ঈশ্বর অহংকার দেখতে পারেন না। চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন অহংকারী মানুষকে।’ “তুমি যদি সুখ হতে দম্ভ করই দূর। প্রতিদিন তব গাথা গাবো আমি সুমধুর···” তানপুরায় ঝংকার তুলে রামেশ্বর গেয়ে ওঠেন। ভাঙা-ভাঙা গলা। তার মধ্যে কী গম্ভীর বিষাদ মাখা আকুতি।

—‘ঈশ্বর যদি ঈশ্বরই হন তবে তিনি এই সামান্য ত্রুটিতে মানুষকে এতো শাস্তি দিতে পারেন না মাস্টারমশাই।’

—‘ঠিক বলেছো। ঠিকই বলেছো মা,’ তানপুরাটি সযত্নে নামিয়ে রাখেন রামেশ্বর, অপালাকে লজ্জা দিয়ে বলে ওঠেন ‘তোমরা আধুনিককালের মেয়ে, ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা তোমাদের অনেক পরিণত, আমরা তো শুধু যা শুনেছি, তা আউড়ে যাই। রাস্তার ভিখারিও এদেশে দেখবে ‘খুদা কি মরজি’ কি ‘সবই মঙ্গলময়ের ইচ্ছা’ বলে মরছে। রিয়ালাইজ করে বলছে কি! মোটেই না। দীর্ঘদিনের মানসিক অভ্যাস। আজকালকার ভাষায় মগজধোলাই। হ্যাঁ যে কথা বলছিলুম। ঈশ্বরের অভিশাপ নয়। বলতে পারো সুরদেবতা কিম্বা গন্ধর্বের অভিশাপ। মানুষের যা কিছু নান্দনিক ক্ষমতা এবং বাসনা তার জন্য একটি আলাদা জগৎ আছে মা। সেই হলো গন্ধর্বলোক। সেখানে দেব গন্ধর্ব বিশ্বাবসু দেখেন সঙ্গীতামৃত সুরক্ষিত আছে কিনা, সেখানে সৃষ্টি হয় মনের আনন্দে। আর আনন্দে সৃষ্টি হয় বলেই সেখানে বেসুর-বেতাল বলে কিছু নেই। সে লোক যেমন তালভঙ্গ সয় না, তেমন তালগর্বও সয় না। ‘কথাটা মনে রেখো মা।’

সামনে ঘ্যাঁচ করে একটা গাড়ি ব্রেক কষলো।

—‘প্রাণটা বেঘোরেই একদিন যাবে দেখছি। ধ্যান করতে করতে পথ-চলা হয় নাকি?’ গাড়ির স্টিয়ারিং-এ সুবেশ ভদ্রলোক চেঁচিয়ে বললেন। তখন ভয় বা লজ্জা পাবার সময় নেই, চারিদিকে শুকনো পাতা উড়ছে। ধুলো উড়ছে, চোখে মুখে এসে লাগছে চোখ জ্বালানো ধুলোর ঝাপট। অপালা দেখল আকাশের বাইসনটা খেপে গেছে। মাটিতে ক্ষুর ঠুকছে প্রবল বিক্রমে এবং সামনে থেকে গজলা হরিণের দল মেঘগুলো তাদের ছোট ছোট করুণ পায়ে তুড়ুক দৌড় মারছে। গাড়িটা পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। তারপরই বিষ্টি বিষ্টি বিষ্টি। ক্যাথিড্রাল রোড়ের কালো পিচ রাস্তা ধরে কেন যে সে আসছিল! ভালো লাগে বলে! বিশাল-বিশাল বনস্পতির সঙ্গ, নিম্নে, মধ্যে, ঊর্ধ্বে সবুজ, তাম্রাভ, কচি, পরিপক্ক প্রায় কৃষ্ণবর্ণ, কত রকমের সবুজ। এবার সেই অবচেতন ভালো-লাগার মূল্য দিতেই হয়। সোঁদা সোঁদা মহুলগন্ধ তুলে, একদিকের দৃশ্যপট আরেকদিকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া, ক্যাথিড্রালের চূড়াটাকে ঐঁকিয়ে-বেঁকিয়ে আবার সোজা তীক্ষ্ণ করে দেওয়া তুমুল বৃষ্টি। কোথাও কোনও আশ্রয় নেই। অপালা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে। একেবারে এক ঝাপটায় তার মাথা, তার হলুদ বেগমবাহার শাড়ি, তার অন্তর্বাস সব ভিজে ভারী হয়ে গেল, এত ভারী যে সে আর নিজেকে নাড়াতে পারে না। হাড়ের মজ্জায় পর্যন্ত যেন জল ঢুকে গেল। এ বৈশাখের এই প্রথম বৃষ্টি। অপালা ভুলে গেছে সে কিছুক্ষণ আগে জবরদস্ত বিচারকমণ্ডলীর সামনে থরো থরো তানপুরো নিয়ে বেপথুমান সওয়াল-জবাব চালাচ্ছিল, যা শ্ৰোতৃমণ্ডলীর কাছে সুন্দর অথচ সপ্রতিভ মনে হয়েছে, সে ভুলে গেছে তার বাড়ি যাওয়ার প্রচণ্ড ভ্রূকুটিময় তাড়া, যা তাকে সোহমের শংকরা শোনার লোভ সম্বরণ করতে বাধ্য করিয়েছে। মল্লার এখন তার শিরায় শিরায় বাজছে। ধমনীতে ধমনীতে বইছে। সে এখন আপাদমস্তক মল্লারে স্নাত;! সুরদাসী মল্লার, রামদাসী মল্লার; নটমল্লার, গৌড়মল্লার, মিঞা কি মল্লার⋯অবশেষে এক তীব্র কেয়াগন্ধী মেঘবর্ণ পুরুষ, তাঁর গলায় নীপ ফুলের মালা··সেই বিশাল ক্রোড়ে সে পুতুলের মতো দুলছে। ‘দোলাও আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে⋯’

কীর্তি মিত্র লেনের মোড়ে নদী বইছে। আধো অন্ধকারে ছপছপ করতে করতে লোকজনের আসা-যাওয়া। শাড়ি-পেটিকোটকে সর্বাঙ্গে ভারী আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে। বারবার কুঁচির কাছে শাড়ির তলাটা জড়ো করে নিংড়ে নিতে নিতে আসছে অপালা। কিন্তু নিংড়ে নিলে কি হবে? কর্নওয়ালিস স্ট্রীটের ওপর তেমন জল না থাকলেও অলিগলিগুলো এখন সব খাল। হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটুর গোছ-ডোবানো উঠোন-জলে যখন সে এসে দাঁড়াল তখন আকাশ-বাতাস এবং গলিভর রং ওঠা মধ্যবিত্ত বাড়িগুলোর চেহারা দেখে মনে হয় এ বুঝি কোনও ছোটখাটো প্রলয়ের মাঝরাত। গলির মোড়ের আলোটা না জ্বলায় জমা জলের চেহারা একেবারে কালির মতো। পেছন দিকে ছপ্‌ছপ্‌। দাদার গলা—‘আজ তোর হবে।’ কলতলায় ঢুকে বেশ করে চৌবাচ্চার জলে চান করে, গামছায় চুল নিংড়ে, শুকনো ডুরে শাড়িটার আঁচল বুকের ওপর টেনে দাওয়ার ওপর এসে অপরাধীর মতো দাঁড়াল অপালা। বৃষ্টির কনকনে ঠাণ্ডা জলের তুলনায় বাড়ির চৌবাচ্চার জলটা রীতিমতো গরম। এখন বেশ একটা আরাম লাগছে। কিন্তু গলা গরম করে গান করার পর ওই কনকনে জলে ভেজার ফল গলার ওপর খুব ভালো হবার কথা নয়। সে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে বলল— ‘মা একটু আদা চা হবে? একটা তেজপাতা আর একটা লবঙ্গ ফেলে দিও, তাতেই দু কাপ হয়ে যাবে।’ পেছন থেকে জেঠুর গলা শুনে সে চমকে উঠল— ‘প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রীটে মানে অত্যন্ত কুখ্যাত অঞ্চলে গান শিখতে যাও। ভগবানদত্ত গলা আছে মানছি। কিন্তু এই রাত্তির নটায় সেসব অঞ্চলে ঘোরাফেরা করার যে কী বিপদ, তুমি ছেলেমানুষ হয়ত পুরোপুরি বোঝাতে পারবো না। কিন্তু আমি বুড়ো মানুষ তো স্ট্রোক হয়ে যাবার মতো হয়েছি। আমি বা বউমা যদি স্ট্রোক-ফোক হয়ে অদড় হয়ে পড়ে থাকি তো এই সংসারের হাল কী হবে সেটুকু বোঝবার মতো বুদ্ধি তোমার হবার কথা। একটি সুতোর ব্যবধান অপু⋯একটি মাত্র সুতো। তার এদিকে স্বর্গ ওদিকে নরক। যাকে বলে জাহান্নম।’ জেঠু পায়ের বেশ আওয়াজ তুলে চলে গেলেন। বিশেষ কাজ না থাকলে তিনি এ সময়ে নীচে নামেন না। অনায়াসেই অপালা এই বিপদটা কাটাতে পারত। কিন্তু জেঠু খুব সতর্ক মানুষ। তিনি সারাক্ষণ খোঁজ রেখেছেন। অপেক্ষা করেছেন এবং কথাগুলিকে শানিয়েছেন। অভিমানে অপুর চোখের কূল ছাপিয়ে উঠছে। সে বলল— ‘মা, তুমি কি জানো না আমি রবীন্দ্রসদনে গিয়েছিলুম? কি কম্পিটিশনে তা-ও বলেছি। আমারটা হবামাত্র চলে এসেছি। আর কারও গান শুনিনি। দীপালিদির না, সোহমের না। আচমকা ঝড়-বৃষ্টি হলে কী করব? বাস পাই না, কিছু না, কতটা রাস্তা এইরকম ভিজে গোবর হয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসেছি তা জানো?’

—‘আমি বটঠাকুরকে বলেছিলুম। উনি বুঝতে চান না। বোধহয় ভুলেও গেছেন কোথায় গেছিস। ওঁর বউবাজার ভীতি আমি কিছুতেই কাটাতে পারছি না। ভয় যে আমারও নেই তা অবশ্য মনে করো না অপু।’

দাদা বলল—‘তোর জন্যে ছাতা নিয়ে আমি একঘণ্টা ট্রাম রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। কি করে মিস করে গেলুম বল তো?’

দুজনেই আদা চা-এ চুমুক দিচ্ছে, মা মস্ত বড় কাঁসার বগি থালার ওপর জেঠুর রুটি-তরকারি বেগুন ভাজা দুধ সাজাচ্ছেন, অপালা বলল— ‘অন্ধকার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে তো ঝাঁকে ঝাঁকে ভেজা কাক, কার থেকে কাকে তুই আলাদা করবি? আজকের বৃষ্টির জন্যে কেউ প্রস্তুত ছিল না কি? এক জনের হাতেও ছাতা দেখলুম না। যখন ঝড় শুরু হল, আমিও তো ভেবেছিলাম, পরশু দিনের মতো আজও ঝড়ের ওপর দিয়েই যাবে।’

দাদা বলল— ‘তোর ওস্তাদজী বোধহয় নিজস্ব ঘরানার একখানা বে-নজির মেঘমল্লার ছেড়েছিলেন। —ব্যাস, ফোঁ ফ্যাঁচ ফোঁত, আকাশ হেঁচে কেশে একেবারে ভ্যাঁক করে কেঁদে ফেলল।’

অপালা চায়ের কাপ ঠকাস করে নামিয়ে রেখে হাতে এক চড় তুলল— ‘দাদা ভালো হবে না বলছি!’ প্রদ্যোৎ সুযোগ পেলেই রামেশ্বর ঠাকুরের ভাঙা মাঝে মাঝে বেসুর হয়ে যাওয়া গলা নিয়ে এমনি তামাশা করে। ক্লাসিক্যাল গান তেমন পছন্দও করে না। আবদুল করিমের বিখ্যাত ভৈরবী ঠুমরি ‘যমুনাকী তীর’ ওর কাছে বেড়ালের কান্না। ফৈয়াজ খাঁর নটবেহাগের রেকর্ডটা শুনে বলেছিল তোর ওই ফৈয়াজ খাঁ সাহেব আর আবদুল করিম খাঁকে লড়িয়ে দে, পার্ফেক্ট হুলো-মেনির ঝগড়া হবে।

গান যে বাড়ির সবার কাছে একেবারে অপাংক্তেয় তা অবশ্য নয়। জেঠু পছন্দ করেন কীর্তন। ছোটতে কচি গলায় কীর্তন আর শ্যামাসঙ্গীত দিয়েই অপালার সঙ্গীত-জীবন শুরু হয়। কচি গলায় সে যখন পাকার মতো গেয়ে উঠত ‘আমি মথুরানগরে প্রতি ঘরে ঘরে যাইব যোগিনী হয়ে⋯দে দে আমায় সাজায়ে দে গো’ কিম্বা ‘আমি স্বখাতসলিলে ডুবে মরি শ্যামা, দোষ কারো নয় গো মা।’ তখন পাকা পাকা বৃদ্ধরাও আহা আহা করে উঠতেন। বুড়িদের মজলিশেও তাকে প্রায়ই ডেকে নিয়ে যাওয়া হতো—চোখের জল বার করবার জন্যে। মা এসব ছাড়াও ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল, এঁদের গান। কাছাকাছির স্কুল ফাংশন, পাড়া-জলসা ইত্যাদি ঘটনায় ছোট্ট অপুর আসন ছিল পাকা। আর এই রকম একটা রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসবে তার ছোট্ট কণ্ঠে ‘বাসন্তী হে ভুবনমোহিনী’ গানটি শুনে অবাক হয়ে রামেশ্বর ঠাকুর তাকে যাকে বলে একেবারে পাকড়াও করে ধরেন।

বৃষ্টি অনেকক্ষণ থেমে গেছে। ভেজা হাওয়ার সঙ্গে জুঁইয়ের গন্ধ ঢুকছে তেতলার ছাতের ঘরে। এ ঘরটা দাদার। কিন্তু অপু ঘরটাতে সমানেই ভাগ বসায়। এখন দাদা সিগারেট খেতে খেতে ছাতে ঘুরছে, অনেকক্ষণ ঘুরবে এইভাবে। এটা ওর রাতের বিলাস। ছাত থেকে হাওয়ায় সিগারেটের গন্ধ ওপরে উড়ে যাবে, মা বা জেঠু টের পাবে না। দাদার এই ধারণা। অথচ আজকাল দাদার জামা কাপড় মুখ সব কিছু থেকে সিগারেটের গন্ধ বেরোচ্ছে। বললে বিশ্বাস করবে না। বারণ করলে বলে—‘তোর যেমন গানের নেশা, আমার তেমনি ধোঁয়ার নেশা।’ —‘দুটোতে কোনও তুলনা চলে?’ অবাক হয়ে অপালা বলে, ‘আমি গানের জন্যে কত সাধনা করি, কত কষ্ট করি, আনন্দ পাই, আনন্দ দিই, তোরটা তোর ক্ষতি করছে, আমারটা কি তাই?’

—‘বাঃ আমি সাধনা করি না? গলায় ধোঁয়া নেওয়া রীতিমতো সাধনাসাপেক্ষ তা জানিস। এই দ্যাখ আমি রিং ছাড়ছি একটার পর একটা, তুই যেমন কতকগুলো সুরের চক্কর ছাড়িস। আর তুই ভাবছিস তোর নেশাটা ইনোসেন্ট, ক্ষতি করবে না? অফ কোর্স তোর ক্ষতি করবে। বদ্‌সংসর্গে পড়বি, সংসারে অশান্তি হবে গাইয়ে মেয়ে নিয়ে, রেজাল্ট খারাপ হবে⋯’

দাদার কথার অবশ্য কোনও মানেই হয় না। সিগারেটের নেশার সঙ্গে গানের নেশার তুলনা সে-ই করতে পারে যে আবদুল করিমের গানে বেড়ালের কান্না শোনে। তবু কথাগুলো বুকের মধ্যে বিঁধে থাকে। তার রেজাল্ট খারাপ হবে⋯সে বদসংসর্গে পড়বে⋯ সংসারে অশান্তি হবে। হাঁটুর ওপর থুতনি দিয়ে তক্তপোশের ওপর সে বসে থাকে। বসে থাকতে থাকতে কখন ভুলে যায় চিলেকোঠার ঘর, কীর্তি মিত্র লেন। চলে যায়, রবীন্দ্রসদন। জমজমাট হল। গমগম করছে। আলো নিভে গেল অডিটোরিয়ামে। মঞ্চের একধারে বিচারকদের আসন। তানপুরার আড়ালে অর্ধেক মুখ লুকিয়ে সে গাইছে, গেয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ যেন তার সঙ্গে অনেকে গেয়ে ওঠে, আরো অনেক স্বর মিশে যাচ্ছে তার স্বরে। মুখটা কে আরম্ভ করলেন? কেসরবাই কেরকার? কিরকম একটা অদ্ভুত কূট কাজ দিয়ে আরম্ভ করলেন। আহা আহা করে উঠল কারা হল থেকে। বিলম্বিত একতালে বিস্তার শুরু করেছেন মঘুবাই। ধীরে ধীরে বাড়ছেন। সঙ্গে কণ্ঠ দিচ্ছেন কোকিলের গলায় রোশেনারা বেগম। ঝরনার মতো তান ঝরে পড়ছে হীরাবাঈয়ের গলা থেকে। ছোট ছোট টুকরা লড়ি পেশ করছেন সরস্বতী। নিজের কণ্ঠও শুনতে পেলো অপালা—সুনি ম্যঁয় হরি আওন কী আবাজ। কখনও এমন হবে কিনা। এই সমস্ত ভারতবর্ষীয় কোকিল-দোয়েল-শ্যামা-বুলবুলদের উত্তরাধিকার কণ্ঠে নিয়ে সে গেয়ে যেতে পারবে কিনা—এ প্রশ্ন তার এই সুরেলা, কালবৈশাখী-অন্তের সিক্ত দিবাস্বপ্নে আদৌ প্রবেশ করে না। এ প্রশ্ন যে উঠতে পারে এ ধারণাই তার এখন নেই। বসে বসেই অপালা ঘুমিয়ে পড়েছে। সারাদিনের উত্তেজনায়, প্রত্যাশায়, ক্লান্তিতে, তৃপ্তিতে। অনেক তৃপ্তিতে। অনেক রাতে মা যখন ডাকতে এলেন, তখন তার দাদাও তার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। দাদা শুয়ে, বোন হাঁটুতে মুখ গুঁজে। জুঁইয়ের গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে সিগারেটের মৃদু গন্ধ। মা ডাকলেন—‘অপু, এই অপু নীচে চ’। রাত সাড়ে এগারটা বাজল।’ ঘুমে অসাড় হাত-পা চলে না, কোনমতে দেয়ালে ভর দিয়ে নেমে আসতে আসতে অপালা ভারী গলায় বলল— ‘ছাতের ঘরটা আমায় দাও না মা!’

—‘তুই একা ছাতের ঘরে শুবি? মাথা খারাপ নাকি?’

—‘আমার রেওয়াজের সুবিধে হয়। দাদাটা বড্ড বেলা করে ওঠে।’

—‘তাহলে খোকা কোথায় থাকবে?’

—‘রান্নাঘরের পাশের ঘরটা তো পরিষ্কার করে দিতে পারো। না হয়, তোমার সঙ্গেই থাকল।’

—‘মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? অতবড় ছেলের একখানা নিজস্ব ঘর না হলে চলে?’

—‘আর এতো বড় মেয়ের বুঝি দরকার হয় না কিছুর?’

সে কথার জবাব না দিয়ে মা বললেন— ‘মাঝরাতে আর জ্বালাসনি অপাই, চল।’


তখন ধূপছায়া রঙের ভোরবেলা। দরজার কড়া-নাড়ার আওয়াজ শুনে অপালার মা সুজাতা প্রথমটা পাশ ফিরে শুয়েছিলেন। আবার ঠকঠক, তবে তো তাঁদেরই বাড়িতে! ঠিকে-ঝি এত সকালে এলো আজ! যাই হোক, এসেছে যখন এখুনি দরজা না খুললে বিপদ। তিনি ধড়মড় করে নীচে নেমে দরজা খুলে দিয়েই লজ্জায় মাথায় কাপড় টেনে দিলেন।

—‘ওমা, মাস্টারমশাই। আপনি এখন এতো সকালে!’

—‘কেন দিদি, এতো সকালে আসার কোনও কারণ অনুমান করতে পারেন না? অপালা কোথায়? ঘুমোচ্ছে?’

—‘হ্যাঁ মাস্টারমশাই।’

—‘নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে বেটি! বাঃ এই তো চাই। প্রকৃত শিল্পীর লক্ষণ! আমি তো সারাটা রাত উত্তেজনায় ঘুমোতে পারিনি দিদি। কখন ট্রামের ঘণ্টি বাজবে। না আছে হাতের কাছে একটা টেলিফোন, না একটা গাড়ি-ঘোড়া। সারাটা রাত ছটফট করেছি।’

—‘আচ্ছা। আপনি ভেতরে এসে বসুন তো আগে!’ মাস্টারমশাই-এর হাতে সেই বিশাল তুম্বিঅলা মেহগনি পালিশের তানপুরা।

দাওয়ায় শতরঞ্জি বিছিয়ে তাঁকে বসিয়ে সুজাতা তাড়াতাড়ি ওপরে গিয়ে অপালাকে ঠেলে তুললেন। —‘অপু শী গগিরই নীচে যা। তোর মাস্টারমশাই এসে বসে রয়েছেন।’

ধড়মড় করে উঠে বসল অপালা, চোখ থেকে ঘুম কাটেনি। তাড়াতাড়ি করে মুখে-চোখে জল দিয়ে শাড়ি বদলে সে যতক্ষণে নীচে এসে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে তার মা কাপড় ছেড়ে চা করতে লেগে গেছেন। ভোরের ধূপছায়া ভাবটা কাটতে শুরু করেছে সবে। এবার সত্যি-সত্যি ঠিকে লোকের কড়া নড়ল।

অপালা মাস্টারমশাইকে প্রণাম করে দাঁড়াল। তার চোখে মুখে দ্রুত ঝাপটার জল চিকচিক করছে। কুচো চুলগুলোর আগা থেকে জলের ফোঁটা দুলছে। হালকা বেগুনি রঙের একটা শাড়ি কোনমতে গায়ে জড়িয়েছে। কিছু বলছে না।

—‘অনুমান করতে পারছো মা, কেন এসেছি?’

যে শুভসংবাদটা সে প্রত্যাশা করেছে সেটা মুখে ফুটে বলতে পারছে না অপালা। কিন্তু তার সমস্ত চোখমুখ ভেতরের আভায় উদ্‌ভাসিত হয়ে যাচ্ছে।

—‘প্রথমেই বলে রাখি মা, হতাশ হয়ো না। তুমি কিন্তু প্রথম হওনি। প্রথম হয়েছে সাদিক হোসেন। শিলং থেকে এসেছে। গেয়েছে ভালোই, একেবারে ব্যাকরণসম্মত। কিন্তু তুমি যা গেয়েছো মা তার তুলনা নেই। ক্রিকেট দেখো?’

অপালা হেসে ফেলে বলল— ‘না।’ যদিও দাদার কল্যাণে ক্রিকেটের নাড়ি-নক্ষত্র তারও অজানা নেই।

—‘দেখা থাকলে বলতাম বুচার-হান্ট এদের খেলার সঙ্গে কানহাই সোবার্সের খেলার যে পার্থক্য এ তাই। গাইছে ভালো। তৈরি গলা। যদিও সে গলার কোয়ালিটি আহা-মরি কিছু নয়। সবই বেশ যথাযথ করল। কম্পিটেন্ট। বাস। তবে আমি আচার্য, আমি আশা করব, আশীর্বাদ করব সবাই বড় হোক। ভালো হোক। সে আমার ছাত্রই হোক আর অন্যের ছাত্রই হোক। গোপনে বলি, তুমি স্বয়ং পণ্ডিতজীর হাতে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছো। জনৈক বিচারক, নাম করব না, তাঁর হাতে অসম্ভব নম্বর পেয়ে সাদিক তোমার থেকে দু নম্বরে এগিয়ে গেছে। তুমি দ্বিতীয় হয়েছো অপু। কিন্তু তোমারই প্রথম হওয়ার কথা, সেই প্রথম পুরস্কার ওরা না দিলেও আমি তোমার হাতে তুলে দিলাম।’ মাস্টারমশাই তানপুরাটির দিকে তাকিয়ে বললেন— ‘এ তম্বুরা আজ থেকে তোমার।’ সুজাতা চা নিয়ে এসেছেন। কয়েকটা বিস্কুট। এতো সকালে তিনি আর কিছু জোগাড় করে উঠতে পারেননি। তাঁর দিকে তাকিয়ে রামেশ্বর বললেন—‘দিদি, অপুর জীবনে একটা মস্ত বড় সুযোগ এসেছে। ও একটা স্কলারশিপেরও স্কলারশিপ পাচ্ছে। লাখে একটা। লখ্‌নৌ-এর নাজনীন বেগম ওকে ঠুম্‌রির তালিম নিতে ওঁর কাছে ডেকেছেন। অপু তুমি তো জানো, বছরে দু-এক জন ছাত্র-ছাত্রীকে উনি এভাবে নিয়ে থাকেন। ওঁর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা মহাল আছে। সেখানে কারও জাতপাতের নিয়ম লঙ্ঘন না করে উনি তাদের খাওয়া-শোয়ার বন্দোবস্ত করেন। রাজার হালে থাকবে। প্রাণভরে শিখবে। নাজনীন বেগম সাহেবার তালিম মানে তুমি ভারতের এক নম্বর ঠুমরি-দাদরা-গজল গায়িকা হয়ে গেলে।’ সুজাতার দিকে তাকিয়ে রামেশ্বর বললেন— ‘দিদি মেয়ে আপনার ষাট-সত্তর বছরের পুরনো হার্মোনিয়মে গান সেধেছে। মাইল মাইল ঠেঙিয়ে পরের বাড়ি গিয়ে তানপুরার রেওয়াজ করেছে। আজ তাই ঠাকুর নিজে যেচে এসেছেন। দু-চার দিন চিন্তা করে নিন। তারপর মেয়েকে এ সুযোগটা নিতে দিন। কোনও দিক থেকেই কোনও অসুবিধে নেই। এই আমার অনুরোধ।’

অপালা যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেইখানেই দাঁড়িয়ে রইল। নড়তে পারছে না। তার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলছে। নাজনীন বেগম! নাজনীন বেগম ছিলেন নাকি তার ওই শ্রোতৃমণ্ডলীর মধ্যে? বিচারের আসনে তো কোনও মহিলাকে দেখেছে বলে মনে পড়ছে না। তবে ভালো করে তাকায়ওনি সে। পণ্ডিত চন্দ্রকান্তকে দেখেই তটস্থ হয়ে গেছে। নাজনীনের পুরো রেকর্ডের সংগ্ৰহ তাকে উপহার দিয়েছেন মাস্টারমশাই। তার যা কিছু মূল্যবান প্রিয়তম উপহার সবই মাস্টারমশাইয়ের দেওয়া। শেষ সংযোজন হল তাঁর নিজের ব্যবহৃত ঐতিহ্যময় এই তানপুরো। এই যন্ত্রটাকে কানের পাশে ধরে সে যখন এর চার তারের ওপর দিয়ে আঙুল চালায় তার শরীরের ভেতর মর্মে মর্মে সুর পৌঁছে যায়, মনে হয় সে যেন শুনতে পাচ্ছে বিশ্বের সেই আদি ধ্রুবপদ যার তানে সুরব্রহ্ম এই বিশ্বকে বেঁধে দিয়েছেন। নাজনীন বেগম এখন প্রকাশ্য কনফারেন্সে বড় একটা গান না। তিনি গান একেবারে সোজা বড় বড় গাইয়ে-বাজিয়েদের নিজস্ব ঘরোয়া আসরে। লখনৌ-এর এক মস্ত শিল্পপতি কোথাকার মহারাজ কুমারকে বিয়ে করবার পর তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। অনেকে আবার বলে তিনি আজকাল তাঁর ইষ্টকেই শুধু গান শোনান। মোট কথা নাজনীন বেঁচে থাকতেই এখন কিংবদন্তী। লেজেন্ড। এর ওর কাছ থেকে শোনা কথা গেঁথে অপালা মনশ্চক্ষে দেখে দুধারে ঝাউ, বেঁটে-বেঁটে ঝাউ। মাঝখান দিয়ে পথ চলে গেছে নাকি অন্তত কোয়ার্টার কিলো মিটার। এ পথের শেষে গম্বুজঅলা একটি দোতলা হর্ম্য। তার মধ্যে সাদা পাথরের ঘর; সেখানে বেগম গান করেন এক শূন্য, মূর্তিহীন ঘরে, যা মসজিদও নয়, মন্দিরও নয়। কিন্তু আত্মিক দিক থেকে দেখতে গেলে সরস্বতীর খাসমহল। দোতলার জাফরির মধ্য দিয়ে নাজনীন তাঁর এই খাসমহলে আগন্তুক গানের পথিকদের দেখেন। মহারাজকুমারের সঙ্গে নাকি তাঁর চুক্তি বছরের মধ্যে ছ মাস অন্তত তাঁকে তাঁর গানের কাছে সমর্পিত থাকতে দিতে হবে। তাতে কোনও অসুবিধে নেই কারণ নাজনীনের স্বামী বেশির ভাগ সময়েই ব্যবসায়িক কারণে ভ্রমণরত থাকেন। তাঁর হেড-অফিসই লন্ডনে। নাজনীনের এই আমন্ত্রণের অর্থ, ছ মাস তাকে লখনৌ থাকতে হবে। সরাসরি বেগমের কাছে তালিম। অপালা কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি। সুদূরতম কল্পনাতেও না। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে যেসব বেদিয়ারা রাস্তায় রাস্তায় গান করে বেড়ায় তাদের যন্ত্রগুলোর থেকেও অনেক খারাপ তার হারমোনিয়ামটার অবস্থা। তাছাড়াও ক্রোম্যাটিক স্কেলে বসানো বলে হারমোনিয়মে মার্গসঙ্গীতের স্বরগুলো ঠিকমতো আসে না। বড় বড় শিক্ষকরা হারমোনিয়াম ব্যবহার করতে একরকম নিষেধই করে দেন। তার যন্ত্রটার একটা রীডে চাপ দিলে অন্য একটি বেসুরে বাজতে থাকে। কোন কোনটা থেকে স্বরই বেরোয় না। দাদাকে অনেক খোসামোদ করে সে হারমোনিয়ামটাকে সারাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বিশেষ কিছুই হয়নি। দোকানে বলে— ‘এটাকে এবার ফেলে দিন, এটা জাঙ্ক হয়ে গেছে।’ তা সেই হারমোনিয়ামেই তার আজন্ম গান সাধা। মাস্টারমশাই যখন তাকে জোর করে ছাত্রী বানালেন, প্রতিদিন সন্ধ্যেয় তাঁর বাড়ি গিয়ে সে রেওয়াজ করত। পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতাগুলোর আগে মাস্টারমশাই তাকে একটা ছোট তানপুরা ধার দিতেন। এই বড় দামী তানপুরা এ বাড়িতে আনতে ভয় হত তার। কোথায় রাখবে? কোনও আলাদা চৌকি নেই। চৌকি রাখবারও জায়গা বিশেষ নেই। দাদা অনেক রাত পর্যন্ত পড়বে। আর বেলা করে উঠবে। দাদার ঘরেই থাকে তার গানের সরঞ্জাম। ভোরবেলা ছাতের ওপর মাদুর পেতে সা পা র্সা টিপে দিনের পর দিন সে পাল্টা সেধেছে।

মাস্টারমশাই যাবার সময়ে মাথায় হাত রাখলে অপালার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়তে লাগল। মাস্টারমশাই বললেন— ‘মনে করো না অপু তোড়ি গাওয়ার জন্য তোমার স্থান নীচে নেমে গেল। ওইটুকু সময়ের মধ্যে তোড়ির আলাপে তুমি রূপটি এতো অপরূপ ফুটিয়েছিলে যে পণ্ডিতজীর কিছু মনে আসেনি। গান ধরতে, তখন সম্বিৎ ফিরে আসে। উনি আমাকে জনান্তিকে বললেন— “এ রত্নটিকে কোথা থেকে আহরণ করলেন রামবাবু!” সভায় সব গুণিজনও তোমার গান শুনে অভিভূত হয়ে গেছেন। আমার ধারণা তোমাকে পাঁচ মিনিট সময় বেশি দেওয়া হয়েছে ইচ্ছে করে মা, ছুতো করে, তোমার গান আরেকটু শোনবার জন্যে। তোমাকে আমি কোমল ধৈবতের পুরিয়া শিখিয়েছি। এ ধৈবত সাধারণ কোমল ধৈবতের থেকে একটু উঁচু শ্রুতিতে। হারমোনিয়মে আসে না। উনি তোমার ওই ধা-এর বিউটি তোমার গান্ধারে আর নিখাদে দাঁড়ানো শুনতে চাইছিলেন বারবার। দ্রুত বন্দেশে তুমি মারোয়ায় যাও কিনা দেখতে অত্যন্ত উৎসুক হয়েছিলেন।’


অবিকল বৃষ্টি-ধোয়া গন্ধরাজ ফুলের মতো সকাল। আকাশ এখন নিকোনো তকতকে, স্বয়ং গোপাল-গোবিন্দর গায়ের রঙটি চুরি করে পরে ফেলেছে। গাছপালাগুলোও যেখানে যা ছিল সব তেমনি সাবান মেখে নেয়ে-ধুয়ে দ্যুতিময় সবুজ পরিচ্ছদে সেজেছে। আশীর্বাদের মতো সকাল। অপ্রত্যাশিতভাবে প্রবাসী প্রিয়জনের ফেরার মতো সকাল। জানলার বাইরে থেকে গোছা গোছা রাধাচুড়োর ডাল ঘরের ভেতর অনুপ্রবেশ করবার চেষ্টা করছে। পর্দাগুলোও খুব সুন্দর একটা হালকা সবুজ। তাই সকালের এই বিশ্বজোড়া আলোর মধ্যেও ঘরের ভেতর কেমন একটা সবুজাভ অন্ধকার। অন্য দিন হলে এমন একটা সকালে জেগে উঠতে সোহমের দারুণ লাগত। পৃথিবী সকালের মুখ দেখারও কত আগে সে তার নিজস্ব, একদম একলার ঘরে তানপুরো নিয়ে ভৈঁরো সেধে যেত। আরম্ভ করত মন্দ্র সপ্তকে, ধীরে ধীরে বাড়িয়ে মধ্য-সপ্তকের পা পর্যন্ত বাস। আবার ফিরে আসা, আবার ভিন্ন পথে ভিন্ন মিড়ে সুরের ক্ষুরধার অলিতে গলিতে ঘোরাফেরা। কিন্তু আজ তার উঠতে ইচ্ছে করছে না। শরীরটা ভারী হয়ে আছে, মন ততোধিক ভারী। সে জানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একবার মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি যাওয়া দরকার। মাস্টারমশাই তো আশা করবেনই। উপরন্তু মিতুল অপেক্ষা করে থাকবে। কিরকম গান শুনল। কারটা কি রকম সব ক্যারিকেচার করে দেখাবে মিতুল। কিন্তু সোহম শুধু এপাশ থেকে ওপাশ ফিরে শুলো। একবার আধবোজা চোখ দিয়ে দেখে নিল মাথার কাছে রাখা টাইমপিসটাতে নটা বেজে গেছে। আরও কিছুক্ষণ সে গড়াবে। তাদের বাড়িতে কারুর প্রাইভেসি, স্বাধীনতা কেউ নষ্ট করে না। মা বেঁচে থাকলে হয়ত এসব অভিজাত নিয়ম মানত না। কিন্তু মা তার তেরো কি চোদ্দ বছর বয়স থেকে সামনে চুল ফেরানো মাথায় আধঘোমটা দেওয়া এক সারদাদেবী গোছের ছবি হয়ে তার পায়ের দিকের দেওয়ালে ঝুলছে। ঘুম ভাঙলেই প্রথম চোখ পড়ে এই ছবিটার ওপর। বউদিদের কারও এতো আগ্রহ বা সাহস নেই যে পরিবারের এই সৃষ্টিছাড়া ছেলেটিকে নিয়ন্ত্রিত করে। সকলেই অবশ্য তাকে ভালোবাসে, সমীহও করে। সমীহ করে তার এই বিশেষ গুণকে, যা পরিবারের আর কারো নেই। সোহম তার পরিবারের বিস্ময়। তাদের বংশানুক্রমিক প্রেসের ব্যবসা। কিন্তু তার বাবা নিজে তো উচ্চশিক্ষিত বটেই, তার তিন দাদাও রেডিওফিজিসিস্ট, অর্ডন্যান্সের বড় অফিসার এবং কেমিস্ট। মাঝখান থেকে সে-ই গানের সঙ্গে কেমিস্ট্রি ল্যাব চলবে না বলে সায়েন্স ছেড়ে দিয়ে এক বছর নষ্ট করে স্ট্রীম বদলালো। এবং হু হু করে গানের জগতে ওপরে উঠতে লাগল। ব্যাপারটা তার অ-শিল্পী কিন্তু উচ্চশিক্ষিত পরিবারে প্রথম প্রথম অস্বস্তি জাগাত, এখন সম্ভ্রম জাগায়। তার বাবা মনে মনে আত্মপ্রসাদের সঙ্গে ভাবেন—‘আমার সব ছেলেগুলিই ট্যালেন্টেড কে জানে ছোটটা সবচেয়ে বেশি কিনা।’

দ্বিতীয়বার পাশ ফিরতে যাচ্ছে, ঘরে কে ঢুকছে মনে হল। মেজ বউ-দি নাকি? তার মাঝে মাঝে এ ধরনের সাহস এবং ইচ্ছে হয়। ভালো করে চোখ মেলে সোহম দেখল দীপালি। এরকম অবস্থায় তার পক্ষে শুয়ে থাকা সম্ভব নয়। ভেতরে ভেতরে ভীষণ লজ্জা পেয়ে—‘আরে দীপালি নাকি, বোসো, বোসো, প্লীজ, আমি বাথরুম থেকে আসছি।’ চোখ কচলাতে কচলাতে একদম এক লাফে সে বাথরুমে পৌঁছে গেল।

দীপালি সোহমের বাড়ি প্রায়ই আসে। অপুর বাড়িও যায়। কিন্তু সোহমের বাড়িতে যে ধরনের অবারিত দ্বার, স্বাধীনতা, আধুনিক রুচি-মেজাজ ও আতিথ্য তা তো অপুর বাড়ি নেই। এখানে তুমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোহমের সঙ্গে গল্প করো, গান করো, কেউ না ডাকলে উঁকি দিয়েও দেখতে আসবে না, সোহমের ফরমাশ মতো খাবার পৌঁছে যাবে হোটেলের ক্ষিপ্রতায় এবং কেতায়। ওদিকে অপু তার খুব প্রিয় হলেও অপুর তো নিজস্ব একটা ঘরই নেই। নেই দীপালিরও। তারা তিন বোন এক ঘরে শোয়। কিন্তু তিনজনেই বোন তো! অপুর যা কিছু নির্জনতা তার চিলেকোঠায় ঘরে। সে ঘর তার দাদার। স্বভাবতই তার দাদা এবং দাদার বন্ধুরাও অনেক সময়েই ঘরখানা অধিকার করে থাকে। তার জ্যাঠামশায়ের শেয়ারে অবশ্য দুখানা ঘর—একখানা শোবার, একখানা বসবার। কিন্তু সেদিকে অপু কেন বাড়ির কেউই পারতপক্ষে যায় না। বাকি রইল একখানা ঘর। যেটাতে অপু তার মায়ের সঙ্গে শোয়। সে ঘরে খাট, আলনা, বাড়তি বিছানার মাচা, খাটের তলায় হাঁড়ি-কুঁড়ি, চৌকিতে সেলাই-কল, কি আছে আর কি নেই হিসেব করতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে। একতলার এক দিকটা ভাড়া। সেদিকের উঠোনের অংশটা তো প্রায়ই খুব অপরিষ্কার হয়ে থাকে। এদিকে রান্নাঘর। সামনে দাওয়া, আর একটা ছোট্ট ঘর, যেটাকে ওরা গুদোম ঘর বলে ব্যবহার করে। বাথরুমে যেতে হলে উঠোন পার হয়ে যেতে হবে। দোতলাতেও অবশ্য একটা ছোটমতো আছে, জ্যাঠামশাইয়ের অংশের লাগোয়া, তাতে তোলা-জল থাকে। জলের হিসেবে কম পড়লেই, কাউকে না কাউকে নিচ থেকে এনে ঢাউস বালতিটা ভর্তি করে রাখতে হবে।

অপুকে ভালো লাগলেও অপুর বাড়ি যেতে ভালো লাগে না দীপালির। তারা পাঁচ বোন। অপুর মতোই পিতৃহীন। কিন্তু মা এবং পাঁচ বোন মিলে তাদের ফাটা সিমেন্টের মেঝে, চৌপাল্লার জানলা, জায়গায় জায়গায় আগড়হীন দরজা এবং সাবেক কালের আলমারি, পা-মেশিন, ট্রাঙ্ক-বাক্স, দেরাজ-আয়না এতো গুছিয়ে রাখে যে অল্প জায়গাকেও অল্প বলে মনে হয় না। তার বড়দি পাশ করা নার্স, মেজদি স্কুলের সেলাই-টিচার, সেজ জন একদিকে নাচ শেখে আর একদিকে রাজ্যের পুঁচকে পুঁচকেকে নাচ শেখায়, চতুর্থ সে। সে-ও গান শিখিয়ে ভালোই উপার্জন করে। ছোট এখনও স্কুলে, কিন্তু হলে হবে কি এতো ভালো সাজাতে পারে, আলপানা দিতে পারে যে বিয়ের মরশুমে তাকে নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। এবং কোনটাই সে একেবারে বিনা দক্ষিণায় করে না। ফলে তাদের সংসার মৌচাকের মতো বিন্দু বিন্দু মধু দিয়ে ভরা। সবার ওপরে রানী মৌ মা। সংসারের কর্তৃত্ব এবং তাদের পাঁচ বোনের পরিচালনার দায়িত্ব মোটামুটি তাঁরই হাতে। সকলেই স্বাবলম্বী। সকলেই হিসেবী, গোছালো। তাই তাদের পয়সা-কড়ির অভাবও তেমন কিছু নেই। যদিও প্রত্যেককেই অসম্ভব খাটতে হয়। মা চান, এইবার একটি একটি করে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে। কিন্তু কিছুতেই, একটা মেয়েরও বিয়ে হচ্ছে না, অথচ প্রত্যেকে গুণী, প্রত্যেকে স্মার্ট, গৃহকর্মনিপুণা। দেখতে-শুনতেও অল্পবিস্তর সুশ্রী। দীপালি হেসে বলে—‘ব্যাপারটা কি জানিস অপু হবু জামাইরা এতগুলো শালী দেখে ভড়কে যায়, ভাবে সব গুলোই বুঝি ঘাড়ে চাপবে।’

সোহম এই বাড়ির এক চতুর্থাংশের অধিকারী। দোতলায় তার শোবার ঘর এবং পড়া ও গানের ঘর পাশাপাশি। এছাড়াও আছে, ঘরের সঙ্গে টয়লেট, চমৎকার একটি ব্যালকনি এবং ছোট্ট একটু কিচেনেট। সোহমদের বাড়ির তিন চারটি কাজের লোকের মধ্যে একটি বনমালী। তাকে আদেশ করলেই সে ছোটবাবুর ফরমাশমতো খাবার-দাবার ঐ ছোট্ট রান্নাঘরে বানিয়ে দেয়। বউদিদের কাউকেও ফরমায়েশ করতে হয় না। আর নানা ধরনের মজলিশ সোহমের ঘরে যখন তখনই হয়। তার কলেজের বন্ধু, গানবাজনার জগতের বন্ধু, পাড়াতেও সে অঢেল পপুলারিটি পায়।

দীপালি দক্ষিণের দিকে তাকালো চমকে। চমৎকার একটা গন্ধ ফুরফুরে হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদিক থেকে ভেসে এলো। ওদিকেই সুন্দর ঝুলবারান্দাটা। সবুজ-পর্দাগুলো লেসের, সরু সরু, ছোট্ট ছোট্ট কাঁচুলির মতো। তাদের ওপর দিয়ে, ভেতর দিয়ে হাওয়া আসছে। মাথার ওপর ঘুরছে বাজারের সবচেয়ে দামী ফ্যান। খাটের উল্টোদিকে দেওয়াল জোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি। কোনও আর্টিস্টের আঁকা তেলরঙ। এই পাহাড় দেখতে দেখতে রোজ ঘুমোয় সোহম। খাটের পায়ের দিকে ওর মায়ের রঙিন ছবি। বেশ ভালো করে রি-টাচ্‌ করা।

এর আগে কখনও ঠিক এই ঘরটিতে এসে বসেনি দীপালি। পাশের ঘরটাই সোহমের আড্ডাখানা। সেটাকে গানঘরও বলা যায়। মেহগনি কাঠের, কাচের পাল্লা বসানো দেরাজে পর পর শোয়ানো আছে তানপুরো তানপুরো আর একটা, বাঁয়া তবলা, একটা সারেঙ্গি। শখ করে এটাও মাস্টারমশায়ের কাছে শিখছে সোহম। আজকে বাড়িতে ঢুকতে প্রথমেই মেজ বউদির সঙ্গে দেখা। ইনি বেশ মাই-ডিয়ার গোছের বউদি। ফিজিক্স-বউদি অর্থাৎ বড়বউদির মতো গম্ভীর-গাম্ভার অল্পভাষী নয়। ওকে ঢুকতে দেখে মেজ-বউদি বললেন ‘ওমা, দীপালি, তুমি এতো সকালে?’ দীপালিকে এঁরা সবাই পছন্দ করেন। সে সপ্রতিভ, সে পরিচ্ছন্ন, ফ্যাশনদুরস্ত। তার সাজপোশাক, কথাবার্তা চালচলন দেখলে কেউ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবে না সে ভবানীপুরের একটা বারো ফুট গলিতে এক তলার দুখানা ঘর, এক চিলতে উঠোন, একটা টিনঘেরা কলঘর নিয়ে থাকে। এতো সকালেই দীপালির প্রসাধন সারা। আসলে দীপালি যখনকার যা তখনকার মতো প্রসাধন ছাড়া বেরোনোর কথা কল্পনাই করতে পারে না। অপুর মতো তেল চকচকে মাথা, নাকের ডগা লাল, মুখে পাউডার নেই, ব্লাউজে সেফটি-পিন—এসব তার চিন্তার বাইরে। সে রঙ মিলিয়ে নীল রঙের হালকা, সিনথেটিক শাড়ি-ব্লাউজ পরেছে। দেশীই কিন্তু দেখলে মনে হবে বাইরের। তার চোখে কাজল, ঠোঁটে ঈষৎ লিপস্টিক, হাতে দামী বিদেশী ঘড়ি—এসব কোথায় কম দামে পাওয়া যায়, তার নাড়ি-নক্ষত্র দীপালির জানা। পায়ের চটিটি পর্যন্ত নেভিব্লু রঙের, রঙ মেলানো, সে মেজবউদির কথার উত্তরে হেসে বলেছিল—‘কেন, বুঝতে পারছেন না বউদি? সোহমকে কংগ্রাচুলেট করতে, আবার কি? আর খুব সকালও নেই। নটা বেজে গেছে, গাইয়েদের সকাল অনেক আগে হয়। আপনি রেজাল্ট জানেন না?’

—‘কি করে জানবো ভাই? কাল মাঝরাত্তিরে কেলে হাঁড়ির মতো মুখ করে এসে শুয়ে পড়ল, কিছু খেল না, দেলো না, বাবা বললেন,—“অতবড় কম্পিটিশন। নিশ্চয়ই খাইয়েছে। ওকে এখন বিরক্ত কর না।”

দীপালি বলল—‘কোনও মানেই হয় না। সোহম থার্ড এসেছে। পুরো ইস্টার্ন রিজিওনের ট্যালেন্ট সার্চ কম্পিটিশন করেছে সুরলোক। একেবারে কনফারেন্স স্টাইল। সেখানে খেয়ালে থার্ড হওয়া ইয়ার্কি নাকি?’

—‘তাই বলো’—মেজ বউদি লম্বা চুলের তলায় গিঁট বাঁধতে বাঁধতে বললেন। তাকিয়ে তাকিয়ে দীপালি ভাবল—অন্তত রঙে সে সোহমের মেজবউদির কাছে হারছে না। চুলও তার একটু একটু কোঁকড়া, মেজবউদির গুলো একেবারে সোজা।

—‘তাই বাবুর রাগ হয়েছে।’ মেজ বউদির মুখে হাসি, ‘ফার্স্ট কে হল? অপালা মিত্র?’

—‘নাহ!’ দীপালি হতাশ ভঙ্গিতে বলল—‘অপালাও না। সাদিক হোসেন বলে কে একটি আসামের ছেলে, কোনদিন নামও শুনিনি। অপালা সেকেন্ড এসেছে।’

মেজ বউদি বললেন—‘তুমি সোজা ওর ঘরে চলে যাও। বেলা নটা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। আমি চা-টা সব পাঠিয়ে দিচ্ছি। কাল রাত-উপোসী আছে, উঠেই খাই খাই করবে।’

বউদির অনুরোধ এবং অনুমতির সূত্র ধরেই দীপালির প্রথম এই ঘরে ঢোকা। পর্দা দুহাতে সরিয়ে ঘরে ঢুকতে তার কেমন গা শিরশির করছিল। ছেলেরা কেমন করে শুয়ে থাকে কে জানে! কে জানে খালি গায়ে নাকি? সোহমের বুকে সামান্য চুল আছে, তার খোলা শার্ট বা পাঞ্জাবির মধ্যে দিয়ে মাঝে মাঝে দেখা যায়। অনেক কষ্টে নিজের ভেতরের শিরশিরোনি থামিয়ে সে ঘরে ঢুকেছে এবং ঢুকে অবাক হয়ে গেছে। এতে পরিচ্ছন্ন, এতো সুবাসিত, এতো সুন্দর ও শালীন যে একটা এই বয়সের ছেলের ঘর হতে পারে সে ভাবতেও পারেনি। উত্তর-দক্ষিণ মুখোমুখি জানলা খোলা, মাথার ওপর তা সত্ত্বেও ফ্যান ঘুরছে। সোহম তার ডোরা-কাটা নাইটড্রেস পরে দুটো বালিশের ওপর একরকম উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে। তার অবিন্যস্ত অজস্র চুল বালিশ ছাড়িয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। দীপালি একটা দোলনা চেয়ার টেনে বসেছিল। সে বসে থাকাকালীনই সোহম তিন-চারবার ওল্টালো পাল্টালো, দীপালির বুক দুরদুর করছিল, কিন্তু কোনও অশালীন অশোভন উন্মোচন ঘটল না। অবশেষে তার উপস্থিতি বুঝতে পেরে সোহম ধড়মড় করে উঠে বসল এবং তারপর একলাফে বাথরুমের দরজায়।

একটু দেরি হল সোহমের। সে একেবারে স্নান সেরে বেরিয়েছে। কোনও একটা ও-ডি-কালোন, না-কি বাথসল্ট ফল্ট ব্যবহার করেছে বোধহয়। ঘরময় মৃদু সুবাস ছড়িয়ে যাচ্ছে। সোহম মেয়েদের মতো শেখিন। পাটভাঙা সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে, চুল উল্টে আঁচড়ে বেরিয়েছে। একটু তাড়াহুড়োর ছাপ। চোখগুলো ওর এমনিতেই একটু রক্তাভ। রাত-জাগা বা বেশি ঘুমোনোর জন্যে আরও বেশি লাল হয়ে উঠেছে। ঘুমন্ত এবং অবিন্যস্ত থাকার ক্ষতিপূরণ স্বরূপই বোধহয় সে আজ একটু বেশি সেজেছে। পাঞ্জাবিতে নীল কাজ। সৌরভটা একটু বেশি রকমই ঢেলেছে।

বিছানাটা দ্রুত হাতে গুছিয়ে ফেলতে ফেলতে সে বলল— ‘ওয়েট এ মিনিট।’

দীপালি বলল— ‘আমি একটু হাত লাগালেই···’

—‘ক্ষেপেছিস!’

—‘কংগ্র্যাট্‌স্‌ সোহম।’

—‘টু হেল উইথ ইয়োর কংগ্র্যাট্‌স্‌।’

—‘অত রাগছিস কেন বাবা? মনে রাখিস এটা কোনও সাধারণ কম্পিটিশন নয়। এরকম আগে হয়নি। পরে হবে কিনা তাই বা কে বলতে পারে।’

সোহম এবার কোমরে হাত দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।

—‘যেতে দে ওসব কথা। গানটা অবশ্য আমি একেবারেই খারাপ গাইনি। ওয়ান অফ মাই বেস্ট দীপু।’

—‘তুই কি করে ভাবিস মাস্টারমশাই থাকতে তুই অপালাকে ছাড়িয়ে যাবি?’

—‘সেটা তো আরও বড় প্রশ্ন আমার। অপালা কাল যা গেয়েছে, আমি ওর গলাতেও অদ্যাবধি অমন গান শুনিনি। আর ওইরকম বাগ-বিতণ্ডার পর। ও যে অত স্মার্টলি জবাবগুলো দেবে ভাবতে পেরেছিলি? তানপুরো হাতে নিলেই অপালা মিত্র আর মনুষ্যলোকে থাকে না। কিভাবে নিজেকে কালেক্ট করল! যে রাগ তৈরি করে এসেছিল, সেটা ছাড়া অন্য সাজেশন এলো অমনি মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে। অথচ অবলীলায় গেয়ে গেলো, আহা! সু প্‌নো মে আওয়ে পিয়া’, সুর করে গেয়ে উঠল সোহম। বলল—‘মধ্যলয় থেকেই তো আমার ওড়িশি নাচতে ইচ্ছে করছিল। প্রতিটি গান্ধারে আর নিখাদে যেই থামছিল আমার দীপু সত্যি মনে হচ্ছিল কোণার্কের টপ-ফেজের সেই যক্ষিণী না সুরসুন্দরী বলে তাদের কথা। যেন নাচতে নাচতে কেউ ঠিক অমনি ভাবে ত্রিভঙ্গ পোজে থেমে গেল।’

দীপালি বলল—‘তুই কি আজকাল নাচও শিখছিস নাকি?’

—‘শিখছি না, তবে দেখছি, দেখেছি, ভালো প্রোগ্রাম থাকলে একটাও মিস করি না। আর কোণার্ক দেখেছি অলরেডি বার চারেক, ভবিষ্যতেও কতবার দেখব বলতে পারছি না।’

দীপালি বলল— ‘দ্যাখ সোহম, তোরা একটু বাড়াবাড়ি করিস। ভয়ানক ইমোশন্যাল, ইম্পালসিভ। প্রথমত, অপালা ভালো গাইলেও অত বড় ওস্তাদকে ওভাবে বলবার সাহস পায় কোথা থেকে রে? “সকালের রাগ কখন গাইব?” পাণ্ডিত্য ফলানো হচ্ছে চন্দ্রকান্তজীর সামনে? মার্গসঙ্গীতের জগতে সহবৎ একটা মস্ত জিনিস তা জানিস?’

—‘কি জানি, আমার তো ওকে কোথাও বে-সহবৎ মনে হয়নি। অপালার বিনয় নিয়ে বোধহয় কোনও দ্বিমত নেই। আমি তো শ্রোতাদের মধ্যেই ছিলুম। অনেককেই তারিফ করতে শুনেছি।’

দীপালি বিরক্ত হয়ে বলল— ‘এটাও জেনে রাখিস সমস্ত জিনিসটা মাস্টারমশাইয়ের শিখিয়ে দেওয়া। গিমিক। নইলে আমরা এতোজন সন্ধের রাতের রাগ তৈরি করে গেলুম, ও হঠাৎ তোড়ি আরম্ভ করল কেন? ওরা কিছু নিয়ম-কানুন করেনি ঠিকই। কিন্তু এটা তো কমনসেন্স! জানবি তোড়ি দিয়ে আরম্ভ, সওয়াল-জবাব যে কোনও রাগ গাইতে চাওয়া এ সমস্তই মাস্টারমশাইয়ের শেখানো। ওর রেঞ্জ দেখানোর চেষ্টা। ভোরের রাগে আলাপটা ও তো সত্যিই বেশি ভালো করে! দেখলি না পুরিয়াতে চট করে গান ধরে দিল!’

সোহম বলল—‘যদি ওর ভালো তৈরি নয় এমন কোনও রাগ গাইতে বলতেন পন্ডিতজী, কী করত ও?’

দীপালি মৃদু হেসে বলল—‘দ্যাখ সোহম, কিছু মনে করিস না আমরা প্রয়াগ, চন্ডীগড় এ সব পরীক্ষাগুলোয় ছাত্র-ছাত্রী বসিয়ে বসিয়ে ঘুণ হয়ে গেছি। আমরা পরীক্ষকদের সাইকলজি পরিষ্কার বুঝি। পণ্ডিতজীর প্রিয় রাগ পুরিয়া, লোকে বলে উনি পুরিয়ায় আর শুধ্‌ কল্যাণে সিদ্ধ। নিজেই সময়ের প্রশ্ন তুলেছেন, এটা এখন অনুমান, কিন্তু নাইনটিনাইন পার্সেন্ট অভ্রান্ত অনুমান যে উনি ওকে পুরিয়া গাইতে বলবেন। আর গাইলও তো দেখলি ওঁরই বন্দিশ, ওঁরই প্যাটার্নে।’

—‘এটা কিন্তু ঠিক বললি না দীপু। পণ্ডিতজীর স্টাইল সাংঘাতিক ভিরাইল, গমকে হলক তানে ভর্তি। অপু ওঁর কিছু কিছু জিনিস করেছে। ওঁর ছোট ছোট তান, মুরকি, ফিরৎ, কিন্তু গেয়েছে সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং ফেমিনিন স্টাইলে। অ্যান্ড হোয়াটেভার ইট ইজ, ও গেয়েছে প্রাণের সমস্ত আবেগ দিয়ে, দুর্দান্ত। ইন ফ্যাক্ট আমি বহু লোককে বলতে শুনেছি সুবিচার হয়নি। সাদিক কি গেয়েছে, বল? একদম স্টিরিওটাইপ্‌ড্‌। ইমপ্রোভাইজেশন, তান, শুনলেই বোঝা যায় সব তৈরি। খুব রেওয়াজি গলা, তৈরিও করেছে ভালো, কিন্তু নো অরিজিন্যালিটি। কোনও তুঙ্গ মুহূর্ত পেলুম না। পেয়েছিস?’

‘তানগুলো তুবড়ির মতো করছিল সোহম। তা সত্ত্বেও আমার মতে তোরই ফার্স্ট হওয়া উচিত ছিল। অপালা সেকেণ্ড। সাদিক থার্ড।’

—‘আমি ফার্স্ট অপালা থাকতে? অপালা ওইরকম গাইতে? আমি আশাও করি না। হলে আমার চেয়ে দুঃখিতও কেউ হত না। তোর জাজমেন্ট বায়াজ্‌ড্‌ বলতে বাধ্য হচ্ছি।’

—‘হতে পারে’, দীপালি দাঁতে নখ কাটল। ‘তবে অপালার মতো ব্যাকিংও তো তুই পাস না!’

—‘এটা বলিস না দীপু! মাস্টারমশাই আমাদের তিনজনের সঙ্গে হারমোনিয়াম সঙ্গত করে গেছেন। অপুর নেবার ক্ষমতা বেশি, অনেক বেশি তো কী করা যাবে? একে তো কিন্নর কণ্ঠ, তারপর গলাটা আপনি ঘোরে, মনে হয় না তার জন্যে ওকে আলাদা করে কোনও এফর্ট দিতে হচ্ছে।’

—‘যাই বলিস সোহম। অপালা কিন্তু ঠিক খেয়াল গাইল না। ওর দ্রুত গানটা তো একেবারে ঠুংখেয়াল হয়ে গেল।’

—‘ও যে খেয়ালের মেজাজে গাইতে পারে সেটা ও ওর তোড়ির আলাপেই দেখিয়ে দিয়েছে। আর দীপু, এক এক জনের একেকটা স্টাইল আছে। তুই নারায়ণ রাও ব্যাসের রেকর্ডগুলোর কথা মনে কর, বড়ে গোলাম আলি সাহেবের স্টাইলের কথা মনে কর। যাক গে, বাজে কথা ছাড়, কত তো বুঝি! আমার প্রধান দুঃখ অপু ফার্স্ট হল না। আমি সেকণ্ড এলাম না। আর দ্বিতীয় দুঃখ তুই নিজেকে বড্ড নেগলেকট করছিস। ছুকরিগুলোকে শেখানো একটু বন্ধ কর এবার। শেখাতে শেখাতে তোর নিজের রেওয়াজ হচ্ছে না। মাস্টারমশাইয়ের জিনিসগুলো গলায় তোল। অত হেলফেলা করিসনি।’

বনমালী কফি এবং খাবার নিয়ে এসেছে। প্রচুর। লুচি, ঘুগনি, মাংস, চাটনি, মিষ্টি।

সোহম বলল—‘কি রে বনমালী? রাতের ডিনার নিয়ে এলি নাকি? সাত সক্কালবেলা? মার-ধোর খাবি মনে হচ্ছে?’

বনমালী দাঁত বার করে হেসে বলল— ‘মেজ বউদিমণি বলে পাঠিয়েছে এক টুকরো পড়ে থাকলে কর্তাবাবুর কাছে খবর যাবে। কাল রাতে দাঁতে কুটো কাটোনি।’

দীপালি বলল—‘জানিস তো সোহম, গান একরকমের কুস্তি। কালোয়াতি গান। আগেকার ওস্তাদরা পুরী, হালুয়া, মালাই, রাবড়ি এসব না খেয়ে গানে বসতেন না। অনেকে আবার তার আগে কতকগুলো ডন বৈঠক সেরে নিতেন। খেয়ে নে।’

সোহম বলল— ‘খিদে অবশ্য পেয়েছে ঠিকই। যাকগে কি বলছিলুম। গান শেখানো বন্ধ কর।’

দীপালি বলল— ‘আমার গান শেখানো বন্ধ করাও হবে না, কোনও কম্পিটিশনে স্ট্যান্ড করাও হবে না। আমি রব চিরদিন নিষ্ফলের, হতাশার দলে।’

—‘ছাড় তো। যত বাজে চিন্তা। দীপালি তোর কিন্তু খুব ন্যাচার‍্যালি সুরেলা গলা। বাজে গান গেয়ে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। খেয়ে নে। খেয়ে নিয়ে চল মাস্টারমশায়ের কাছে যাই। উনি নিশ্চয়ই এক্সপেক্ট করছেন। আমাদের তিনজনের সঙ্গে সমানে হারমোনিয়াম সঙ্গত করেছেন। ভাগ্যিস ওরা হারমোনিয়ামটা অ্যালাউ করেছিল। নাহলে অত জমাটি হত না। কাল বড্ড রাগ হয়েছিল। সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। আজ তুই আসাতে মেজাজটা ভালো হয়ে গেল। আফটার অল এক গুরুর দুই ছাত্র-ছাত্রীকে ওরা প্লেস দিয়েছে। দ্যাট ইজ সামথিং।’

দীপালি বলল— ‘সকালে গিয়ে লাভ নেই। মাস্টারমশাই নিশ্চয়ই অপুকে খবরটা এবং সান্ত্বনা দিতে গেছেন।’

সোহম বলল— ‘তা হোক, মিতুল তো আছে। মিতুলও এক্সপেক্ট করবে।’

দীপালির মুখ একটু চীনেধাঁচের। খুব ফর্সা, ছোট ছোট ফুলো ফুলো বাঁকা চোখ। গোলগাল চ্যাপ্‌টা মুখ এবং শরীরের গড়ন। এ ধরনের মুখে মনের ভাব চট করে ফোটে না। সে শুধু বলল— ‘মিতুল? মিতুল কি করবে? মিতুল তো তোমার খবর জেনেই গেছে। তা ছাড়া মিতুল নিশ্চয় এতক্ষণে স্কুলে চলে গেছে।’

সোহম একটু অপ্রস্তুত গলায় বলল— ‘তা অবশ্য। তা অবশ্য। ঠিক আছে, বিকেলের দিকেই যাবো। তবে তখন তো মাস্টারমশাই ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন কিনা! তোর এখন কী প্রোগ্রাম?’

দীপালি হাত উল্টে বলল— ‘আমার আবার কি প্রোগ্রাম হবে? খাড়া বড়ি থোড়, আর থোড় বড়ি খাড়া। তোকে কংগ্র্যাচুলেট করতে এসেছিলুম। এবার বাড়ি চলে যাবো। অনেক কাজ বাকি। সকালে এক ব্যাচ আসার কথা ছিল। ফাঁকি মেরেছি। কিন্তু দুটো মেয়ে আসে ইনডিভিজ্যুয়ালি। তাদের আমায় অ্যাটেন্ড করতেই হবে। বেসুরো-বেতালার দল সব। কিন্তু তাদের মা-বাবারা তাদের সঙ্গীতপ্রভাকর করে তুলবেই। আমি তাদের জন্যেই বলিপ্রদত্ত ভাই।’

সোহম অন্যমনস্ক গলায় বলল— ‘ঠিক আছে। আমি আজ সকালটা রিল্যাক্স করি। কিম্বা ‘ক্রিটিক অব পিওর রীজন’ বলে একখানা পাঠ্য বই আছে। দেখি উদ্ধার করতে পারি কিনা। কর্তাবাবুর কড়া হুকুম, ভীষ্মদেবই হও আর তারাপদ চক্কোত্তিই হও, এম এ হতেই হবে।’

দীপালিকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে, দক্ষিণের বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট ধরালো সোহম। দীপালি বাঁক ফিরছে। মুখ পেছনে ফিরিয়ে একবার হাতটা নাড়ল। তারপর প্রিয়নাথ মল্লিক রোড়ের বাঁক ফিরে অদৃশ্য হয়ে গেল। বড় ভালো মেয়ে দীপালি। এমন সেতারের মতো সুরেলা মিঠে আওয়াজ নিয়েও আজ কতগুলো বচ্ছর একই জায়গায় আটকে আছে। তবু কোনও নালিশ নেই। সোহম, অপালা, বিশেষত সোহমের জয়েই যেন ওর জয়। এই ধরনের ঈর্ষাহীন পরিবেশের জন্যেই মাস্টারমশাই-এর কাছে শিখতে আরও ভালো লাগে তার। আরও অনেক সফল শিক্ষক আছেন। তাঁরা গলায় সব কিছু করে দেখান। মাস্টারমশাই যখন গলায় পারেন না হার্মোনিয়মে, এসরাজে, সেতারে দেখান। ফলে হয়ত আরও সূক্ষ্ম কাজ, আরও লম্বা লম্বা মিড় আরও তড়িৎগতি তান তাদের গলায় এসে যায়। মিতুল কি হয়ে উঠবে কে জানে? শী ইজ সুইট সিক্সটিন। ওর মা নাকি খুব সুন্দরী ছিলেন। মিতুল নিশ্চয়ই তাঁর মতনই হয়েছে। আহা! তার মার মতো ওর মা-ও ওর মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হঠাৎ হার্ট-অ্যাটাকে মারা যান। বাবার গলার সুর ও পায়নি। কিন্তু মাস্টারমশাই অসীম ধৈর্যে ওকে নিয়ে পড়ে আছেন। বলা কিছু যায় না। চার পাঁচ বছর পর হয়ত ওর ওই ধরা ধরা গলা দিয়ে অন্যরকম সুর বেরোবে। ওর ঝোঁক আপাতত লাইট ক্ল্যাসিক্যালের দিকে। গায়। প্রচুর শোনে। সবচেয়ে ঝোঁক অবশ্য নাচে। ওর কাছে কিছু-কিছু নাচ দেখেছে সোহম। সম্পূর্ণ অশিক্ষিত পটুত্ব থেকে যে এ ধরনের নাচ হওয়া সম্ভব তা সোহম না দেখলে বিশ্বাস করত না। কিন্তু ভারী চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে। ধৈর্য কম। ঠিক তৈরি হয়ে উঠতে পারছে না।

দীপালি চলে যাবার আধঘণ্টা পর সোহম চুলটা আঁচড়ে শার্ট প্যান্ট পরে নিল। বনমালীকে ডেকে বলল—‘বউদিকে বলে দিস আজ কলেজ যাচ্ছি না। দুপুরে এসে ভাত খাবো। বেলা হতে পারে।’

সে প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের মুখে যাচ্ছে। মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি। আজ শনিবার। মিতুলের স্কুল ছুটি থাকে। যাবার সময়ে সে একটা মনোহারি দোকান থেকে বেছে বেছে কিছু ভালো চকলেট কিনল। মিতুল চকলেট খেতে দারুণ ভালোবাসে।


অতন্দ্র আকাশে খালি ধ্রুবতারার মতো জেগে থাকেন নাজনীন বেগম। ধ্রুবতারার মতো স্থির অথচ শুকতারার মতো উজ্জ্বল। ‘মেরে তো মন শ্যামসুন্দর বনমালী’ তিলঙে বাজতে থাকে কানের মধ্যে, প্রাণ নিংড়ে নেওয়া সুরের চলা ফেরা, কখনও মেঘলেশহীন আকাশে চলে যাবে, কখনও একটি মাত্র মেঘের পেছন থেকে চাঁদের কিরণের মতো বহুধা সৌন্দর্যের বিস্ময়ে ছড়িয়ে পড়বে আকাশময়, পৃথিবীময়। জ্যোৎস্নাবিধৌত গঙ্গা-যমুনা-কৃষ্ণা-কাবেরী-গোদাবরীর ওপর কখনও তির্যকভাবে, কখনও সোজাসুজি পড়েছে সুরের ছটা ‘বিনাদরশন মন বিরধ রতনহি। মদন মোহন গোপাল।’

বাবাকে বেশ ছোট বয়সেই হারিয়েছে অপালা। তবু বাবার স্মৃতি অমলিন। মুখটা স্মৃতিতে আবছা হয়ে গেছে। কিন্তু বাবার বাবাত্বটুকু একেবারে স্পষ্ট। তিনি ঠিক কি রকম ছিলেন, কি ভাবে কথা বলতেন, আদর করতেন বিশদ মনে নেই, খালি তিনি ওইরকম ধ্রুবতারার মতোই একটা উপস্থিতি। খুব উজ্জ্বল নয়, কিন্তু আছেন, সর্বদা আছেন, পথ দেখাতে, আলো দিতে, দিক নির্ণয় করতে। সব সময়ে। খুব মৃদুভাবে, নিজেকে একদম জাহির না করেও আছেন। বাবা মারা যাবার পর থেকে অপালার জীবনে সুখ-শান্তি ইত্যাদি বলতে যা বোঝায় তার কিচ্ছু নেই। আরাম, আশ্রয়, অবসর বলতে কিছু নেই। আর শান্তিরও অভাব। যা যা সে করতে চায় তার প্রত্যেকটাতে যদি প্রথমেই না না না শুনতে হয়, আর তার মতো লাজুক নম্র স্বভাবের মেয়েকে সেই ‘না’কে ‘হ্যাঁ’ করতে হয় তাহলে শান্তি বলতে আর কী রইল? তবু অপালা একদিকে জেদী আরেক দিকে স্থিতিস্থাপক। এখন মোটামুটি একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে এসেছে তার জীবনযাত্রা। বাড়ির সকলে মেনে নিয়েছে গানটা সে করবেই। সে প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রীটের মুখে যাবেই। তার কিছু-কিছু মেয়ে-বন্ধুর সঙ্গে ছেলে-বন্ধুও থাকবেই। তার সঙ্গীত ক্লাসের বন্ধু। অনেক সময়ে তাদের সঙ্গে বাসে-ট্রামে অথবা সোজাসুজি তাদের বাড়ির গাড়িতে সে আসবেই। এসব নিয়ে অশান্তি হয়েছে। এখনও হয়। তবে কম।

বিপত্নীক হবার পর জেঠু আবার বিয়ে করেননি। নিজে নিঃসন্তান, ভাইয়ের সংসারেই থাকতেন, এবং ভাই মারা যেতে তার সংসারটি টেনে চলেছেন এটা একটা মস্ত ভরসা। কিন্তু জেঠুর বাবার মতো স্নেহ নেই। শাসন আছে, দাবি আছে, কর্তব্যবোধ আছে, চূড়ান্ত অহং আছে, কিন্তু মমতা নেই। মা ব্যবহার করেন জেঠুর ক্রীতদাসীর মতো। মাথায় আদ্যিকালের দু ব্লেডের পাখাখানা চললেও, ঝালর দেওয়া হাতপাখা নিয়ে মা জেঠুর খাওয়ার কাছে ঠায় বসে থাকেন। রান্নাঘর নীচে, তারা সবাই রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে বসে খেয়ে নেয়। খালি জেঠুর খাবারটাই মাকে চারবেলা ঠাকুরের নৈবেদ্যর মতো থালায় বাটিতে সাজিয়ে গুছিয়ে ঠিক জামাইষষ্ঠীর স্টাইলে ওপরে নিয়ে যেতে হয়। এই সময়ে অপালার দাদা প্রদ্যোৎ নানারকম টিপ্পনী কাটে। দু ভাইবোনের কেউই পারিবারিক প্রথার মধ্যবিত্ততার মধ্যে জেঠুর এই জমিদারি চাল যার বেশির ভাগ দায়টাই তাদের মা বেচারিকে বহন করতে হয়, সেটা পছন্দ করে না। কিন্তু প্রতিবাদ করার কথাও তাদের মনে আসে না। প্রদ্যোৎ খুব হাসি-খুশী ধরনের ছেলে। একেবারেই ‘রাগী যুবক’ নয়, আর অপালা বড়ই শান্ত, খানিকটা ভিতু। জেঠুর মুখোমুখি হওয়ার মতো ব্যক্তিত্বই তার নেই। জেঠুর দুবেলার ভোজনের এই যে পূজা-পর্যায় এই সময়টা যত রকম সাংসারিক কথার আদান-প্রদান চলে। জেঠু বলবেন, মা শুনবেন, মৃদুস্বরে জবাব দেবেন।

—‘বউমা, এ মাসে বাজার খরচটা যেন বড্ড বেশি মনে হচ্ছে, বাজেট ছাড়িয়ে গেছে!’

—‘আনাজের দাম আকাশে চড়েছে দাদা, তাছাড়া দেশ থেকে বনবিহারী এসে দুদিন থেকে গেল না?’

বনবিহারী অর্থাৎ দেশে তাঁদের যা সম্পত্তি আছে, তার তদারকি যে করে এবং বেশির ভাগটাই ভোগ করে সে মাঝে মাঝেই কিছু আম, কিছু ডিম, আলু, সর্ষের তেল এবং চাল, একেক সময়ে হয়ত একেকটা নিয়ে উপস্থিত হয়। তখন সে কদিন থেকে যায়। হগ মার্কেট, কালীঘাটের মন্দির, দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ি, জাদুঘর, চিড়িয়াখানা—এসব তাকে দেখে যেতেই হবে। প্রত্যেকবার।

বট্‌ঠাকুর বলেন—‘বনবিহারী তো রইল, দুদিন কি তিনদিন।’

বউমা বলতে পারেন না বনবিহারীর এক দিনে যা আহার্য লাগে তা প্রায় তাঁদের চারজনের সমান।

সুতরাং বটঠাকুর আবার বলেন, ‘তবে কি দুধটা কমিয়ে দেবো?’

বউমা জানেন দুধ কমাবার অর্থ তাঁর ছেলেমেয়ের সামান্য অংশটুকু বাদ পড়া। কারণ বটঠাকুর তো দুধ ছাড়া থাকতেই পারবেন না। দুধটাকে সামান্য ঘন করতে হয়, তাঁর গোঁফে লেগে থাকে সেটা তিনি পরিতৃপ্তি সহকারে মুছে নেন, এ প্রতিদিনের অনুষ্ঠান। বউমা চুপ করে থাকেন। সহজে তিনি ভেঙে পড়বার পাত্রী নন, কিন্তু এখন তাঁর চোখ টলটল করতে থাকে। স্বামী হঠাৎ মারা গেলেন। কিছুই রেখে যেতে পারেননি। এই বাড়ির ভাগ আর দেশের সম্পত্তির ভাগ এইটুকু তাঁদের নিজস্ব আয়। বাকি সবই বড় ভাসুর।

বড় ভাসুর হঠাৎ উদার কণ্ঠে বলেন—‘না, না, আমারই ভুল। ছেলেটার ডাক্তারি পড়ার খাটুনি কি সোজা খাটুনি? মেয়েটাও তো হামেহাল কলেজ, গান, সংসারের ইতি-কর্তব্য করে যাচ্ছে। তবে কি জানো বউমা, যা থাকবে তোমার ছেলে-মেয়েরই থাকবে। আমি তো আর সঙ্গে নিয়ে যাবো না।’

এ কথা ‘সুজাতা খুব ভালোই জানেন। ভাসুরের আর কেউ নেই। দুটিই ভাই। বোন-টোনও নেই। ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের ভালোও বাসেন খুব। তবে তাঁর নিজের ধরনে। প্রদ্যোৎ বলেছিল এঞ্জিনিয়ারিং পড়বে, তাড়াতাড়ি কোর্সও শেষ হয়ে যাবে, চাকরি পাবারও সুবিধে, কিন্তু জেঠু সেই যে ধরে বসলেন ডাক্তারিতে যখন চান্স পেয়েছে, ডাক্তার হওয়াই চাই, সে থেকে তিনি এক চুলও নড়লেন না। প্রদ্যোৎ এঞ্জিনিয়ারিং পড়লে সংসারটা তাড়াতাড়ি সাবালক হতে পারত। তাঁর নিজেরও যথেষ্ট সুবিধে হত। কিন্তু তিনি কোনও যুক্তিতেই কান দিলেন না। বাড়িতে, বংশে একটা ডাক্তার থাকা দরকার। তাঁদের ঠাকুর্দা খুব সফল ডাক্তার ছিলেন। অপালার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি লড়াই করতে হয় সুজাতাকে। সায়েন্স তাকে পড়তেই হবে। এদিকে মেয়েটা অঙ্ককে ডরায়। জেঠুর যুক্তি, গান করছে, তার ওপর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, তালের অত সূক্ষ্ম হিসেব, রাখে কি করে? মন দিলেই অঙ্ক পারবে। জেঠুর ইচ্ছের বিরুদ্ধে চুপচাপ গিয়ে আর্টস নিয়ে ভর্তি হয়ে এসেছে অপালা। জেঠু খুব অসন্তুষ্ট। তার পর ফলও ভালো হচ্ছে না। মেয়েকে যতটা পারেন আড়াল করে চলতে হয় তার মাকেই।

অপালা ভাবে এই স্যাঁতসেঁতে এঁদো ঘর, জেঠুর ভ্রূকুটি, দাদার উদাসীনতা, যা প্রায় স্বার্থপরতার মতো লাগে একেক সময়ে, মায়ের অসহায়ত্ব, একটা নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র নেই, এরপর কি সত্যি সে লখনৌ যাবে? নাজনীন বেগমের খাসমহলে কিংবদন্তীর গানঘরে তানপুরো নিয়ে বসতে পারবে? সত্যি? একটু পরিবেশের অভাবে বাড়িতে তার গান গেয়ে তৃপ্তি হয় না। সারা বর্ষাকাল ছাতে বেরোতে পারে না, গ্রীষ্মকালেও বড় জোর ছটা। তার পর আর বসা যায় না। দাদা তক্তপোশে ঘুমোয়। বালিশের পাশে উপুড় করে রাখা মোটা মোটা বই। অর্থাৎ অনেক রাত পর্যন্ত পড়েছে। সে আস্তে, খুব আস্তে সুর ধরে, দাদা ঘুমে লাল চোখ মেলে বলে—‘আরম্ভ করলি তো ক্যাঁও-ম্যাঁও? অপালা বলে—‘হ্যাঁ করলুম।’ বেশ স্থির সিদ্ধান্তের তেজ তার গলায়। একটু পরে আরেক ঘুম দিয়ে নিয়ে দাদা বলে—‘নাঃ গলাটা তোর সত্যিই খাসা রে, ঘুমের ব্যাঘাত তো হয়ই না, উপরন্তু এই ভোর সকালে একটা দুর্দান্ত স্বপ্ন দেখে ফেললুম। কি সুর গাইছিলি রে ওটা?’

—‘ললিত।’

—‘বড় ভালো রে সুরটা। নোন তোম তেরে নেরে ওটা কি করিস রে?’

—‘আদি যে মার্গসঙ্গীত, সেটা ঈশ্বরকে লক্ষ্য করে গাওয়া হত। তাই রাগের আলাপের একটা বাণী ছিল ‘অনন্ত হরিনারায়ণ’, পরে মুসলমানী যুগে খানিকটা অশিক্ষিত, খানিকটা সংস্কৃত না জানা গাইয়েদের মুখে ওটা নোম তোম হয়ে গেছে।’

—‘ও রে বাব্বা, এ তো বেশ জ্ঞানের ব্যাপার রে?’

—‘তা তুই কি মনে করেছিলি গান মানে ভ্যারেন্ডা ভাজা?’

—‘ঠিক আছে, ঠিক আছে তুই তোর নোম তোম কর, করে যা, ফ্রাঙ্কলি স্পীকিং অপু আমি ভাবতুম সেই ‘তুমি আমার আর আমি তোমার’ টাইপের কিছু একটা হবে এটা।’

এবার অপুর হাসি পেয়ে যাবে। ললিতের সুরটা কেটে গেছে। গম্ভীর সন্ধি প্রকাশের সুর। সে হাসি চেপে বলবে— ‘তাহলে ওই জাতীয় একটা শোন, আর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রকাশভঙ্গির গভীরতা, ডিফারেন্সটা দ্যাখ, দেখবি?’

অপুর দিকে ফিরে চোখটা বুজিয়ে প্রদ্যোৎ বলবে—‘ঠিক আছে। গেয়ে যা। যদি ভোরের স্বপ্নটা ফিরিয়ে দিতে পারিস তো তোকে একটা প্রাইজ দেবো।’

তখন অপালা যোগিয়ায় ধরবে—‘পিয়া কে মিলন কি আশ সখিরি…’ মীড়ে মীড়ে ভরিয়ে দেবে দাদার চিলেকোঠার ঘর, দু চারবার দাদা মাথা নাড়বে, আহা আহা করবে শুনিয়ে শুনিয়ে, তারপর ঘুমিয়ে পড়বে।

নাজনীন বেগমের গানমহলের খোলা জানলা দিয়ে ঝাউয়ের সারি দেখা যায়। কিরকম ঝাউ কে জানে? কতরকমের আছে? সবগুলোই অপালার ভালো লাগে। যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয় কোনটা বেশি ভালো লাগে? ইমন না পুরিয়া না শ্রী সে কি বলতে পারবে? বেছে নিতে পারবে? বাছা খুব শক্ত! ফোয়ারায় রামধনু রং তুলে ভোরের সূর্য উঠবে। সম্পূর্ণ শূন্য, প্রশস্ত মহলে গুরু-শিষ্যার যুগলবন্দীতে ‘বাজুবন্ধ্‌ খুলু খুলু যায়।’

ক’দিনই মনটা তার খুব ভালো আছে। সুরলোকের নির্বাচিত বিচারকরা তার ওপর সুবিচার করেননি, প্রথম হলে সে একটা ভালো স্কলারশিপ পেতো, তার আর্থিক সুবিধে হত অনেক, এসব তার মাথায় নেই। ইংরেজি ক্লাসে রমলাদি একদিন বললেন—‘অপালা, অপালা মিটার, উই আর প্রাউড অফ য়ু, দা স্টেটসম্যান মিউজিক ক্রিটিক হ্যাজ প্রেইজড্‌ ইয়োর পার্ফম্যান্স সো এলোকোয়েন্টলি!’ কলেজের যাবতীয় ফাংশনে অপালার গান বাঁধা, লেখাপড়ায় সাধারণ হলেও সকলেই তাকে চেনে। তবে ইংরেজির প্রোফেসররা বিশেষত রমলাদি বা আর জি বড্ডই হাই-ব্রাও। সেই তিনি ক্লাসে সবার সামনে এভাবে তাকে প্রশংসা করবেন, ভাবাই যায় না। অপালার মুখ একটুতেই লাল হয়ে যায়, সে মুখ নিচু করে ফেলল। তার দুষ্টু-বন্ধুরা পরে বলতে থাকল—‘দ্যাখ অপালা, তুই যতই ভালো গাস, স্টেটসম্যান যদি তোকে ওভাবে মাথায় না তুলত, আর জিও তোকে নিয়ে এত প্রাউড হতেন না।’ আর জির কথার মাত্রাই এক এক সময়ে হয়ে যায় ‘অ্যাজ দা স্টেটসম্যান সেইজ।’ স্টেটসম্যান নাকি বলেছে ‘দি অ্যাওয়ার্ড মে গো টু অ্যাসাম’স সাদিক হুসেন, বাট দি অ্যাক্লেম গোজ ডিসাইডেডলি টু বেঙ্গলস অপালা মিট্রা, শী ইজ দা রিয়্যাল ট্যালেন্ট দ্যাট দা সুরলোক ওয়াজ লুকিং ফর।’ পল সায়েন্সের চন্দনাদি যাঁকে তাঁর বদমেজাজের জন্য মেয়েরা বলে চণ্ডী তিনি পর্যন্ত বললেন: ‘আমার এক ক্লোজ রিলেটিভ গিয়েছিলেন, শুনলাম অপূর্ব গেয়েছো। গানটাই তোমার আসল ভোকেশন। পরীক্ষার রেজাল্টের জন্য মন খারাপ করো না। ভালো করার চেষ্টা অবশ্যই করবে। কিন্তু দুটো যদি এক সঙ্গে পেরে না ওঠো, কি আর করতে পারো?’

মনীষা কলেজে অপালার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু, নিজেও গায়। সে গিয়েছিল শুনতে। মনীষা বলল—‘তুই একদিন হীরাবাই-টাই দরের গায়িকা হয়ে যাবি অপু। তোর একটা বিশেষত্ব কী জানিস? বেশির ভাগ ক্ল্যাসিক্যাল সঙ্গীত গায়িকারাই কিরকম একটা ট্যারা আওয়াজ বার করেন গলা থেকে। পুরুষের ভঙ্গির মতো। খুব সম্ভব সকলেরই শিক্ষা মেল ওস্তাদদের কাছে তো, তাই। তোর একে ওরকম অপূর্ব গলা, তার ওপর ওই ধরনের কোনও অ্যাফেকটেশন নেই। যারা ক্ল্যাসিক্যালের অতশত বোঝে না, তাদেরও তোর গান ভালো লাগবে।’ মনীষা রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়, একটু ভারী গলা। কলেজ সোশ্যালের নৃত্যনাট্যগুলোতে পুরুষ ভূমিকার গানগুলো তার বাঁধা। নায়িকার গানগুলো গায় অপালা। তার উচ্চাঙ্গসঙ্গীত-দুরস্ত গলায় একটু বেশি কাজ অনেক সময়ে এসে যায়। বাঁধা স্বরলিপিতে গাইতে অসুবিধে হয়। এসব জায়গায় মনীষা তাকে সাহায্য করে। মনীষা বলল—‘দ্যাখ অপু, আমাদের দ্বারা পড়াশুনো বেশিদূর হবে না। তোতে আমাতে মিলে একটা গানের স্কুল খুলব। তুই ক্ল্যাসিক্যাল, আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত, আর তোর ওই বন্ধু দীপালি, নজরুল-টুলগুলো দারুণ গায়, ও ওগুলো শেখাবে। কি বলিস?’ আর তখনই অপালা মনীষাকে তার লখনৌ-এর স্কলারশিপটার কথা বলল। কাউকে না বলবার অঙ্গীকার করিয়ে অবশ্য। মনীষা লাফিয়ে উঠল—‘বলিস কি? তুই তো এবার অনেক উঁচু আকাশের তারা হয়ে যাচ্ছিস তা হলে? আর কি তোর নাগাল পাবো?’

কলেজ বিল্ডিং-এর পেছনের দিকে বাগানে একটা রেন-ট্রি। সেইখানেই বসে ওরা সাধারণত গল্প করে। অপালা গাছটার উঁচু শাখাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল— ‘মনীষা, আমি আমিই, তারা-টারা কোনদিনও হবে না। গান গেয়ে অসম্ভব আনন্দ পাই। সত্যি কথা বলতে, গানকে আমি ঠিক একটা মানুষ, একটা ভীষণ প্রিয় মানুষের মতো ভালোবাসি। গানের চেয়ে বেশি কিছুকে, কাউকে ভালোবাসি না।’

মনীষা বলল—‘তুই একটা পাগল। গান তো একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিস। তাকে আবার কেউ মানুষের মতো ভালবাসতে পারে? ধর তোর মা, তোর দাদা, ধর এর পরে তোর বিয়ে হবে, ছেলে-মেয়ে হবে, এদের তুই ভালোবাসবি না?’

অপালা বলল—‘ভালো তো বাসি। বাসবও। মায়ের ওপর আমার ভীষণ মায়া। খালি মনে হয়, মাকে কবে একটু অবসর একটু স্বাধীনতা দিতে পারব। কিন্তু গান আমাকে যা দেয়, তা আর কেউ, আর কিছুই দিতে পারে না রে! সত্যি বলছি।’

—‘কেন, তোর সোহম?’

অপালা একটু চমকে উঠল, ‘কি বলছিস তুই?’

—‘সোহম আর তোর মধ্যে কিচ্ছু নেই, বিশ্বাস করতে বলিসনি আমায়। এই তো সেদিন দেখলুম মেডিক্যাল কলেজের সামনে দিয়ে একটা নীল অ্যামবাসাডর বেরিয়ে গেল। তার মধ্যে তুই আর সোহম বসে কথা বলছিস। এমন মত্ত হয়ে যে আমাকে দেখতেই পেলি না।’

অপালা হেসে বলল—‘আমাকে দেখতে পেয়েছিলি, সোহমকে দেখতে পেয়েছিলি, তানপুরার ডাণ্ডিটা যে গাড়ির জানলার বাইরে বেরিয়েছিল দেখতে পাসনি? মাস্টারমশায়ের তানপুরাটা এই কমপিটিশনের জন্য প্র্যাকটিস করার উদ্দেশ্যে সোহমের গাড়ি দিয়ে মাস্টারমশাই আমার বাড়ি পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তোর মুখের এই অদ্ভুত কথাটা আমি এই প্রথম শুনছি, মনীষা, আমাদের কারুরই কোনদিন মনে হয়নি। দুজনে এক গুরুর কাছে নাড়া বেঁধেছি, তালিম নিচ্ছি এক সঙ্গে অনেক দিন হয়ে গেল। পরস্পরকে হেল্‌প্‌ও করি খুব। খুব সুন্দর বন্ধুত্ব আছে আমাদের। তার বেশি কিছু না। কেনই বা থাকবে?’

মনীষা বলল—‘দ্যাখ, গান আমিও করি। গানের মতো রোম্যান্টিক জিনিস আর নেই। খুদে খুদে ছাত্রী বয়স্ক মাস্টারমশায়দের প্রেমে পড়ে যায়, আর যারা এক গুরুর কাছে শেখে, ক্ষমতায় পরস্পরের কাছাকাছি তাদের মধ্যে লাভ্‌ আসবে না? হতে পারে?’

অপালা একটু সীরিয়াস ধরনের মেয়ে। চট করে ঠাট্টা-তামাশা করে উঠতে পারে না। তবু খানিকটা ঘাস ছিঁড়ে, সেগুলোকে টুকরো টুকরো করতে করতে চাপা হেসে বলল—‘তোর এরকম কোনও অভিজ্ঞতা আছে মনে হচ্ছে?’

মনীষা ফিক করে হেসে বলল—‘এখনও হয়নি। কিন্তু হলেও তো হতে পারে। সোহম কিন্তু ভালোবাসার মতো ছেলে। সুন্দর চেহারা। লেখাপড়ায় অন্তত তোর চেয়ে ভালো। অমন ব্যাকগ্রাউন্ড, তারপরে ওইরকম ট্যালেন্টেড।’

অপালা বলল—‘তুই কি পাত্র-পাত্রী কলামে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিস নাকি?’

অপালা খুব শান্ত ধীর স্বভাবের মেয়ে। বেশি কথা বলে না। মনের কথাও চট করে বলতে পারে না। দু চোখ শুধু ভারী হয়ে যায় দুঃখ হলে। আনন্দে গাল চকচক করতে থাকে। এই পর্যন্ত। বাইরে থেকে দেখে বোঝা না গেলেও সে আজ উড়তে উড়তে বাড়ি ফিরল। কলেজ থেকে বাড়ি অনেক দূর। অর্ধেক বাসে ওঠা যায় না। আজ চারটে পঁয়তাল্লিশ অব্দি ক্লাস ছিল। বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছ’টা। দরজার কড়া নাড়তে গিয়ে অপালা দেখল দরজাটা খোলা, খুলতেই মা বলল—‘অপু, এত দেরি?’

—‘শেষ পর্যন্ত ক্লাস ছিল তো!’

—‘ঠিক আছে। শিগগিরই বাথরুমে যা। গা ধুয়ে আয়। আমি চুলটা বেঁধে দিচ্ছি। শাড়ি জামা সব বার করে রেখেছি।’ অপালা দেখল মায়ের পরনেও পাট ভাঙা শাড়ি। ধোপর বাড়ির সুন্দর গন্ধটা বেরোচ্ছে। চুল-টুল পরিষ্কার বাঁধা। মা যেন কোথাও যাবে।

সে বলল—‘কেন মা কোথায় যাবো?’

—‘তুই চলই না আগে।’

দোতলায় উঠে অপালা আবার জিজ্ঞেস করল—‘কি ব্যাপার বলো তো মা, জেঠুর কি আবার থিয়েটার যাবার শখ চেপেছে?’ খুব মাঝে মাঝে হলেও পুরো পরিবার নিয়ে সিনেমা থিয়েটার বা দক্ষিণেশ্বর বেলুড় ব্যান্ডেল চার্চ এসব যাওয়া জেঠুর একটা শখ।

মা তখন বলল—‘জনাকয়েক ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা এসেছেন, জেঠুর বসার ঘরে বসে আছেন, তাঁরা তোকে দেখতে চান।’

—‘আমাকে? কেন?’ অপালা অবাক হয়ে বলল।

—‘তোকে দেখতে এসেছেন। বিয়ে, বিয়ের জন্য।’

অপালা একটা পাথরের টুকরোর মতো বসে পড়ল। মায়ের বিছানায়। মা ভয়ে ভয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন—গাল দুটো রক্তহীন হয়ে গেছে। জ্যাঠামশাইয়ের চটির আওয়াজ শোনা গেল। —‘কই তোমাদের হল?’

ঘরের দরজার পর্দা টানা। তিনি দোর থেকেই ফিরে গেলেন। মা ফিসফিস করে বললেন—‘যা অপু, শিগগির যা।’

অপালা ধরা গলায় তেমনি বসে বলল—‘আমি বিয়ে করব না মা।’

মা বললেন—‘বিয়ে করব না বললে মেয়েদের চলে? আজ নয় কাল বিয়ে তো করতেই হবে।’

—‘বেশ তো পরে ওসব কথা ভেবো।’

—‘আমি কোনদিকে যাই অপু। এঁরা নিজে এসেছেন। ছেলেটি তো রাজপুত্তুরের মতো। তোমার গান শুনে, খোঁজ খবর করে ওঁরা এসেছেন। যাও দেখা করে এসো। যা-ও বলছি, যেতেই হবে। আমি বাথরুমে শাড়ি-ব্লাউজ রেখে এসেছি।’

অপালা উঠল। বাথরুমে ঢুকে গেল প্রাণহীন পুতুলের মতো। মা বাইরে অপেক্ষা করছেন তো করছেনই। কুড়ি মিনিট হয়ে গেল। দরজায় আস্তে ধাক্কা দিতে যাচ্ছেন, দরজা খুলে গেল। অপু বেরিয়ে এসেছে। যে ধানীরঙের ধনেখালি শাড়ি পরে সে কলেজ গিয়েছিল সেই একই শাড়ি তার পরনে। চোখ দুটো টকটকে লাল। চোখের নোনতা জল পড়ে মুখের রঙ চকচক করছে। মাথার চুলে পর্যন্ত সে চিরুনি চালায়নি। যেমন সিঁথির দুপাশের চুলগুলো উড়ে একটা ধোঁয়াটে কুন্ডলিমতো হয়েছিল, তেমনি আছে। হা-ক্লান্ত চেহারা।

—‘এ কি? গা ধুসনি? চুল ঠিক করলি না? গাড়োয়াল শাড়িখানা রাখলুম..’

অপালা জবাব দিল না।

—‘মুখে সাবান দিসনি। চোখ এতো লাল। এভাবে কারো সামনে যাওয়া যায়?’

অপালা জবাব দিল না এবারও। মার হাতে এক গ্লাস দুধ, তাতে আজ জেঠুর বরাদ্দ বোর্নভিটা। —‘খেয়ে নে।’

অপালা বলল—‘খিদে নেই।’ অগত্যা টেবিলের ওপর দুধের গ্লাস নামিয়ে রাখলেন মা। বললেন—‘চল।’

জেঠুর বসার ঘরে একটি আরামকেদারা। পুরনো কালের গোল শ্বেতপাথরের টেবিল ঘিরে গদি মোড়া কিছু বেতের সোফা, কাঠের হাতলওলা। অপালাকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই তিনটি পুরুষ উঠে দাঁড়ালেন। একজন মহিলা উৎসুক চোখে চেয়ে আছেন।

জেঠু সোৎসাহে বলে উঠলেন—‘এই আমার ভাইঝি। মানে টেকনিক্যালি ভাইঝি। আসলে আমার মেয়েই তো! এই মাত্তর কলেজ থেকে ফিরল। ভীষণ সিম্পল। সাজ নেই গোজ নেই। মায়ের সঙ্গে হাতে-হাতে সব করছে। তার ওপর কলেজের বি.এ. অনার্সের পড়া, গান। কোনটিতেই ফাঁকি নেই।’

অপালা দরজার দিকে পেছন করে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন পুরুষ শশব্যস্ত হয়ে বললেন—‘আপনি বসুন।’

হঠাৎ এই কণ্ঠস্বরের ভদ্রতায় বা সমাদরে কে জানে কিসে অপালার মাথা ঘুরে উঠল, গা বমি করছে, গলার ভেতর কিসের প্রচণ্ড চাপ, সে আস্তে আস্তে বসে পড়ল। কে বলছে। কোথা থেকে বলছে কিছুই দেখল না।

মহিলা একটু বয়স্ক, ভারীভুরি, তিনি বললেন— ‘তোমার থেকে অনেক বড় আমি। তুমিই বলছি। সেদিন সুরলোকের আসরে তোমার গান শুনে আমরা মানে আমি, আমার স্বামী, আর এই আমার ভাই। আমরা অভিভূত হয়ে গেছি।’

জেঠু বললেন—‘একটা গান শুনিয়ে দাও না মা! সেই যে ‘মহা সিন্ধুর ওপার হতে’, কিম্বা ‘প্রভু আমার প্রিয় আমার’, খালি গলায় গাইবে দেখবেন কিচ্ছু লাগবে না। একটি সুর এদিক-ওদিক হবে না।’

একটি পুরুষ বলে উঠলেন—‘না না, ওঁকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে। গান শোনাতে হবে না। গান তো আমরা শুনেছি, গান শুনেই তো আসা!’

মহিলা বললেন—‘মাসিমা, ওকে নিয়ে যান, পরে একদিন আলাপ হবে’খন।’

অপালা চৌকাঠ পেরোতে পেরোতে শুনল, মহিলা বলছেন—‘খুব লাজুক না?’

জেঠু বললেন—‘লাজুক, নম্র, শান্ত, ধীর। অথচ কী স্টেজ ফ্রি ভাবতে পারবেন না।

‘পাঁচ ছ-বছর বয়স থেকে স্টেজের ওপর শ’এ শ’এ লোকের সামনে গাইছে। তাছাড়া আপনাদের আসার কথাও তো আমরা ওকে জানাইনি!’

—‘সে কি? কেন?’

—‘আরে এসব মেয়ে-দেখানো-টেখানো আজকালকার মেয়েরা পছন্দ না-ও করতে পারে। হয়ত মনে আঘাত লাগবে।’

মহিলা বললেন—‘তো বেশ তো! বললেই হত, কোনও রেস্তোরাঁয় কিম্বা লেক-টেক, ভিক্টোরিয়া-টিয়ায় ব্যবস্থা করা যেত।’

—‘তা যদি বলেন প্রবালবাবু, আমি বয়স্ক মানুষ। আমার ওসব পছন্দ নয়। আর আজ না হয় আপনারা দেখতে এসেছেন। এর পরে আপনাদের শ্বশুর-শাশুড়ি এঁরাও আসবেন। তখন কি বয়স্ক, মানী মানুষকে আমি বলব —“চলুন ভিক্টোরিয়ায় চলুন!”

ছোট্ট একটু হাসি শোনা গেল। মহিলা বললেন—‘তা অবশ্য। আমরা কর্তাগিন্নি বা আমার ভাইয়েরা যে-রকম লিবর‍্যাল, বাবা-মা ন্যাচারালি তেমন না। তাঁরা হয়ত চুল খুলিয়ে, হাঁটিয়ে মেয়ে দেখে নিতে চাইতে পারেন। এ রান্নায় কী ফোড়ন, অম্বলে ঘি লাগে কি না…তখন কিছু মনে করবেন না কাকাবাবু।’

জেঠু বললেন—‘মনে করব কি? আমিও তো ওই দলে! ঘরে নেবেন, বরাবরের মতে, বাজিয়ে নেবেন না?’

জেঠুর ঘর থেকে মায়ের ঘরের দিকে আসতে আসতে গলার আওয়াজগুলো ক্রমশই মৃদুতর হয়ে যাচ্ছিল।

অপালা ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। প্রদ্যোৎ ঢুকল, মা বললেন—‘খোকা, কোন সকালে মেয়েটা এইটুকু খেয়ে বেরিয়েছে। দুধটা ওকে একটু খাওয়া তো! আমার ওদিকে এক গাদা কাজ। ওঁরা তো মেয়ে আসবার আগে একটু চা ছাড়া কিছু মুখে করেননি।’

প্রদ্যোৎ দুধের গেলাস হাতে খাটে বোনের পাশে এসে বসল, বলল—‘তুই কি খুকুমণি? ডুডু খাইয়ে দিতে হবে?’

অপালা মড়ার মতো পড়ে ছিল। কোনও জবাব দিল না।

দাদা বলল—‘অপাই, ভালো করে আমার কথা শোন। তুই তো তোর পাণিপ্রার্থী ভদ্রলোককে দেখিসনি। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, এ. জি. বেঙ্গলে কাজ করেন। টকটকে ফর্সা। চমৎকার স্বাস্থ্য, রীতিমতো সুপুরুষ। খুব গান ভালোবাসেন। মানে তোর ওই নুম, তুম, দিরে, নানা। তোদের লাস্ট সুরলোকের যে কমপিটিশনটা হল, তাইতে তোর গান শুনে, অর্থাৎ তোর গুণ নিজের কানে যাচাই করে, তোকে দা-রুণ পছন্দ করেছেন। এক্কেবারে ফেল্যাট। দ্যাখ, যারা গান ভালোবাসে তারাই সেধে তোকে নিতে চাইছে। এখানে তোর গাইবার ঘর নেই। পরিবেশ নেই। জেঠু দিনরাত টিকটিক করছে। অপাই, এখানে বিয়ে হলে তুই বেঁচে যাবি। লক্ষ্মী মেয়ে। দুধটা খেয়ে নে। দাঁড়া অনেকক্ষণ খালি পেটে আছিস, আগে একটা বিস্কুট খা।’

অপালা বলল—‘ডাক্তারি করিসনি দাদা। সলিড গলা দিয়ে নাববে না। দুধটা দে, খেয়ে নিচ্ছি।’

—‘তবে? রীজনেব্‌ল্‌ হতে হবে তো? আমি নিজে তো কবে জেঠুর গারদখানা থেকে ছাড়া পাবো, তার দিন গুনছি। মেয়ে বলেই তোর কত সুবিধে।’

অপালা দুধটা খেয়ে পাশ ফিরে শুলো।

ঘণ্টাখানেক পরে জেঠু ঘরে ঢুকলেন। তাঁর চটির শব্দ অনেক দূর থেকে শোনা যায়। প্রদ্যোৎ বলে এ বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধাই আছে।’

—‘অপাই! শুয়ে আছো কেন? কান্নাকাটি করছো নাকি? শোনো, ভালো ঘর। ভবানীপুরে নিজেদের বাড়ি, দুটি ভাই, এটি বড়, দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। অত্যন্ত ভালো লোক। বাবাজীটির তো কথাই নেই। চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। ভালো ডিগ্রি, ভালো রোজগার, তোমাদের খেয়াল-ঠুংরিতে রীতিমতো ইন্টারেস্ট। তোমার আপত্তিটা কিসের? আমি তো মনে করি এটা গড-সেন্ড। এতো ভালো সম্বন্ধ আমরা নিজেরা হাজার চেষ্টা করলেও জোগাড় করতে পারতুম না। আর বাইজি হয়ে ঘরে ঘরে মুজরো নেবার বদলে ঘরের বউ হয়ে সংগীত চর্চা করাটাই আমি ভালো মনে করি। আমি কেন, যে কোনও ভদ্রলোক তাই মনে করবে।’

অপালা এখনও তেমনি শুয়ে আছে। কিন্তু উৎকর্ণ। জেঠু এসব কি বলছেন? বাইজি-টাইজি? এতো খারাপ কথা সে কখনও তাঁকে বলতে শোনেনি।

—‘লখনৌ যাবে? নাজনীন বেগমের কাছে গান শিখতে? সেখান থেকে তুমি আর ভদ্রঘরে ভদ্রসমাজে ফিরে আসতে পারবে মনে করেছো? বউমার কাছে সব শুনে আমি গতকাল রামবাবুর কাছে গিয়েছিলাম। বলি, তোমার গার্জিয়ান কে? তিনি না আমি? আজ যদি আমি চোখ বুজি, তিনি তোমায় দেখবেন? সারা জীবনের মতো ভার নিতে পারবেন? না নেবেন? ডু যু নো হু দ্যাট নাজনীন বেগম ইজ? একটা তওয়ায়েফ। চরিত্রহীন, ভ্ৰষ্টা রমণী। তাঁর হাতে আমি তোমাকে তুলে দেবো? আমার ভাইয়ের কাছে, স্বৰ্গত আর সব পিতৃপুরুষের কাছে কী কৈফিয়ত দেবো আমি? ভারতবিখ্যাত তয়ফাওয়ালি হয়ে মঞ্চে মঞ্চে চোখে সুর্মা আর পেশোয়াজ পরে কানে হাত দিয়ে গান করে বেড়াচ্ছো আর হয়ত অনেক টাকা রোজগার করছে—এর চেয়ে অনেক বেশি অভিপ্রেত আমার কাছে যে তুমি তোমার মায়ের মতো গৃহস্থঘরের বউ হয়ে, কস্তাপেড়ে কাপড় পরে স্বামী-পুত্র-কন্যা নিয়ে জাজ্বল্যমান সংসারে গিন্নিপনা করছো। আজ তুমি ছেলেমানুষ। বাইরের চটক, গ্ল্যামার এই সবেই মন যাচ্ছে। স্বাভাবিক, দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু ভবিষ্যতে একদিন এই বুড়ো জেঠুকে মনে করবে, বলবে, বলতে হবে—জেঠু যা বলেছিল, ঠিক বলেছিল। সংসারে অসতীত্বের মূল্যে কেনা নাম টাকার চেয়ে সদুপায়ের সুখ শান্তি সামান্য শাক ভাত অনেক বড়। অনে-ক বড়।’ জেঠু ভারী ভারী পায়ে চলে গেলেন।

অনেক রাতে দাদার চিলে-কোঠার ঘরে অপালা আস্তে আস্তে জিগগেস করল—‘দাদা, তওয়ায়েফ কী রে?’

—‘ওঃ অপু, তুই বড় এমব্যারাসিং কোশ্চেন করিস।’

—‘বল না।’

—ওই বাইজি-টাইজি হবে আর কি?’

—‘কিন্তু নাজনীন বেগম তো বেগম—বেগম মানে রানী—কোন মহারাজকুমার মানে হিন্দু রাজকুমারকে বিয়ে করেছেন। নিয়মিত স্কলারশিপ দেন, আগেকার গুরুকুল পদ্ধতিতে গান শেখান। ওঁর সম্পর্কে জেঠু ওভাবে বললেন কেন?’

—‘আমি তোদের গানের জগতের কিছু জানি? তোর মাস্টারমশায়কে জিজ্ঞেস করিস। কে জানে হয়ত ভদ্রমহিলা বিয়ের আগে ওইরকম কিছু ছিলেন-টিলেন। তা ছাড়া লখনৌ, বেগম ইত্যাদি সব একসঙ্গে শুনে জেঠুর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। জানিসই তো সব।’

—‘তুই, তুই নিজে কী মনে করিস?’

—‘কী বিষয়ে?’

—‘মানে আমার কোনটা চূজ করা উচিত?’

—‘দ্যাখ অপাই, তোর এই লখনৌ-এর স্কলারশিপের ব্যাপারটার পুরো টার্মস অ্যান্ড কনডিশনস না জানা থাকলে তো কোনও মতামত দেওয়া সম্ভব নয়। আমি যেমন এফ. আর. সি এস হতে চাই। ইংলন্ডে যেতে চাই। একটা ওয়াইডার লাইফ, একটা বড় চান্স পেতে। এটাও তোর খানিকটা তেমন। শুধু আমার উচ্চাকাঙক্ষাটার যেমন একটা সোশ্যাল স্যাংশন আছে, তোরটার তেমন নেই। তোর ব্যাপারটা খুব আনসার্টন। আমাদের যদি উদ্বৃত্ত টাকা-পয়সা থাকত, উচ্চবিত্ত শ্রেণীর হতাম, অন্ততপক্ষে বাবাটাও যদি বেঁচে থাকত, হী ওয়াজ এ ডেয়ারিং অ্যান্ড সেনসিব্‌ল ম্যান, তাহলে সেই ভরসায় তোকে এই চান্সটা দেওয়া যেত। কিন্তু আন্ডার দীজ সার্কামস্ট্যান্সেস, আমি জানি না। সত্যিই জানি না, তুইই ডিসাইড কর। এইটুকু বলতে পারি তোর বর, তার দিদি, জামাইবাবু এঁদের আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু এরাই তো সব নয়। শ্বশুর-শাশুড়ি টাইপের লোকগুলোও তো আছে! অ্যাডজাস্টমেন্ট, হ্যানা-ত্যানা। তোর লাইফটা একটু কমপ্লিকেটেড হয়ে যাবে। তবে সিকিওর থাকবে। তাছাড়া যারা গান-বাজনা ভালোবাসে তারা তো তোকে গান কনটিনিউ করতে দেবেই। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট।’

অপালা বলল—‘ধর, আমি কিছুতেই বিয়েতে রাজি হলাম না, লখনৌ গেলাম। গেলে আমি শিখবই। তোদের ভাষায় অনেক ওপরে উঠবই। এ আমি জানি। কিন্তু ধর সমাজ আমাকে নিল না, মানে সামাজিক সিকিউরিটি যাকে বলছিস তা আমার রইল না। সে ক্ষেত্রে তুই আমার পাশে এসে দাঁড়াবি না? তুই আমায় সিকিওরিটি দিবি না?’

—‘আমি?’ প্রদ্যোৎ বলল—‘আমার নিজেরই সিকিওরিটি কোথায় তার ঠিক নেই। ডাক্তার হয়ে বেরোতে, এস্ট্যাবলিশড্‌ হতে কত বছর লাগে জানিস?’

অপালা ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বলল—‘আজ আমার নীচে যেতে ভালো লাগছে না। দাদা তোর কাছে শুতে দিবি? প্লীজ!’

—‘শো না। আরে বোকা! তাতে কি হয়েছে? জেঠু অ্যালাউ করলেই হল।’

অপালা বলল—‘তুই এম. আর. সি. পি এফ আর সি এস করতে লন্ডনে যাবি, আমাকে একটু একটুখানি মনে রাখিস। যদি কখনও কোনও একান্ত দরকার হয়, একটু সাহায্য, একটু সাপোর্ট দিবি তো?’

—‘শিওর! কী পাগল বল তো তুই! আফটার অল আমরা দুটোই তো ভাই বোন। পরম্পরকে দেখবো না? কে বলতে পারে তোকেই হয়ত সাপোর্ট দিতে হবে আমায়।’

আরও রাতে সুজাতা ছাতের ঘরে এসে দেখলেন—দু-ভাই বোন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। অপালা সাধারণত একটু কুঁকড়ে শোয়। তার একটা হাত তার দাদার গায়ে আলতো ভাবে পড়েছে। খোকা বোধহয় কোনও বই পড়ছিল। বইটা যথারীতি বুকের ওপর উল্টো করে রাখা। দু হাত মাথার ওপর তোলা।

দৃশ্যটা জেঠু পছন্দ করবেন না সুজাতা জানেন। কিন্তু ক’ বছরের আড়াআড়ি এই দুই ভাইবোনের অসহায় ঘুমিয়ে থাকার দৃশ্য তাঁর চোখে জল এনে দিল। তিনি বুঝলেন আজ আর অপুকে তুলতে পারবেন না। এটুকু। মাত্র এইটুকুই তার বিদ্রোহ। কিম্বা বিদ্রোহও নয়। অভিমান। চোখ উঁচু করে আকাশে সপ্তর্ষির দিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি। এতখানিক আকাশ, এতখানিক পৃথিবী, অথচ তাঁর ছেলেমেয়ের জন্য একচিলতে ঘরের বেশি কেন নেই! কেন! তিনি আস্তে আস্তে নিচে নেমে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন।


সামনে ব্যাকেলাইটের হাতল-ওলা কফির পট। দুটো কাপে মাপমতো কফি এবং দুধ ঠিকঠাক ঢালতে ঢালতে দীপালি বলল—‘সোহম সত্যি তুমি এটা জানতে না? না ন্যাকা সাজছ?’

—‘হোয়াট ডু ইউ মীন? ন্যাকা সাজছি মানে?’

—‘সরি। কিন্তু আমার ধারণা বিশ্বশুদ্ধু লোক জানে।

—‘অপালা জানে না।’

—‘অপালার কথা ছেড়ে দাও। সে কারও কোনও ব্যক্তিগত ব্যাপারে থাকে না। একটা পুরোপুরি মানুষই না। কিরকম নন-হিউম্যান মেয়ে।’

—‘আই অবজেক্ট দীপালি।’

—‘আমি আসলে ঠিক তা বলতে চাইনি। ও আসলে নিজের গান নিয়ে এমন মশগুল থাকে যে অন্যসব ব্যাপার ওর নজর এড়িয়ে যায়। একেবারে ওয়ান-ট্র্যাক মাইন্ড। যাই হোক, টেক ইট ফ্রম মি। মাস্টারমশাইয়ের স্ত্রী। অথাৎ মিতুলের মা মাস্টারমশাইয়ের এক শিষ্যের সঙ্গে ইলোপ করেছিলেন। মিতুল তখন জাস্ট পাঁচ বছরের মেয়ে। এর চেয়েও ইন্টারেস্টিং গল্প আমার জানা আছে। মিতুলের মার এই ফার্স্ট ইলোপমেন্ট নয়। উনি প্রথমে ছিলেন মাস্টারমশাইয়ের গুরুজীর স্ত্রী। মিতুল তাঁরই মেয়ে। মাস্টারমশায়ের যখন ফর্ম পড়তে শুরু করেছে, তখনই উনি দ্বিতীয়বার ইলোপ করলেন এক উঠতি বাজিয়ের সঙ্গে। বেশ এলেমদার মহিলা।’

—‘বলো কি?’ সোহম আত্মগত বলল, কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে।

—‘মিতুল জানে?’

দীপালি কাঁধ নাচাল। —‘কি করে জানবে বলো। ষোলো বছর বয়স তো হলই!’

কানাঘুষোও তো শোনে! মিতুলের মায়ের ছবি কোথাও দেখেছ?’

—‘না। তা অবশ্য দেখিনি।’

—‘অস্বাভাবিক মনে হয় না?’

—‘হয়নি কখনও। অনেকের থাকে মৃত স্ত্রীর ফটো দেখলে কষ্ট হয়। আমার বাবাই তো মায়ের ছবি নিজের ঘরে রাখেন না। আমার ঘরে টাঙানো আছে। দেখেছ তো?

মাস্টারমশায়ের তো তবে খুব কষ্ট।’

—‘দ্যাখ্‌ সোহম, কিছু মনে করিস না। গল্পের প্রথম অংশটা যদি সত্যি হয়, তাহলে উনি নিজের জালে নিজে জড়িয়েছেন। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। লোকে তো বলে ওঁর সেই রাইভ্যাল নাকি ওঁকে সিঁদুর খাইয়েছিল। তাইতেই ওঁর গলা নষ্ট হয়ে যায়।’

—‘সিঁদুর?’

—‘হ্যাঁ সিঁদুর। সিঁদুর বিষ। খেলে স্পেশ্যালি গলার বারোটা বেজে যায়।’

—‘এসব তুমি জানলে কোত্থেকে?’

—‘আমাদের গানের বাড়ি। আমি গান শেখাচ্ছি পনের বছর বয়স থেকে। দিদিও নাচ নিয়ে আছে। গান-বাজনার লাইনের অনেক কেলেঙ্কারি, অনেক কেচ্ছাই আমার জানা। সামনে দেখছি, আহা কী গুণী, কী সাধুপুরুষ, শিবনেত্র হয়ে আছেন। দিলের সব দরদ মিশিয়ে ছাত্র-ছাত্রী গড়ছেন, ভেতরে ভেতরে দেখবে কে কবে কাকে ফুসলিয়ে এনেছেন। কে শিষ্যাদের কারো কারো ওপর কুনজর দিচ্ছেন, কিছু পাওয়া গেলে ভালো, না পাওয়া গেলে তুমিও আর কিছু পাচ্ছো না গুরুর কাছ থেকে।’

সোহম ভীষণভাবে চমকে উঠল—‘কী বলছো? দীপালি? কী বলতে চাইছো?’

—‘তোমরা আর কী বুঝবে? আমরা বুঝি। আমরা জানি। ইন ফ্যাক্ট, আমাকে উনি প্রায় কিছুই শেখান না। ব্যাক করেন না। রাগে। বোঝ না?’

—‘উনি কি তোমাকে…’

দীপালি বাধা দিয়ে বলে উঠল—‘এসব কেউ সোজাসুজি বলে না সোহম, ঠারে-ঠোরে চায়। প্লীজ আমাকে এ নিয়ে ঘাঁটিও না। কী দরকার? আমি ফেড আপ হয়ে গেছি।’

সোহম ইতস্তত করে বলল—‘তুমি কি বলতে চাও অপালা ওঁকে কোনভাবে খুশি করে?’

—‘আমি কিছুই বলতে চাই না সোহম। শুধু আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে যতটুকু বুঝেছি বলছি। আর আমার অভিজ্ঞতাটা নেহাত ফ্যালনা নয়। অপালা আমার চেয়ে অনেক বেশি ট্যালেন্টেড—একথা আমি একশবার স্বীকার করছি। সেটা একবারও কোয়েশ্চন করছি না। কিন্তু এটা তো মানবে দ্যাট শী ইজ প্লেইন… লুকিং! আমার অভিজ্ঞতা আর ওর অভিজ্ঞতা এক হতে পারে না। মানো তো?’

সোহম অন্যমনস্কভাবে কফির কাপটা নামিয়ে রাখল। অপালাকে দেখতে ভালো, কি ভালো নয় এ প্রশ্ন তার মনে কখনও ওঠেনি। অপালার সঙ্গে সে একসঙ্গে গান শিখছে রামেশ্বর ঠাকুরজীর কাছে তা প্রায় আট দশ বছর তো হবেই। শিখতে শিখতেই বালক-বালিকা থেকে তরুণ-তরুণী হয়ে উঠেছে। অত ছোট থেকে কোনও মেয়ের সঙ্গে মিশলে তার চেহারা সম্পর্কে ধারণা গড়ে ওঠা খুব শক্ত। তাদের সব সময়েই ভালো লাগে। সোহম তাই চোখের সামনে শূন্যের ওপর অপালাকে দেখবার চেষ্টা করল। ছোট কপাল। একপাশে সিঁথি কেটে একটা খুব লম্বা মোটা বেণী করে অপালা। ওর বাড়ি গেলে ওকে খোলা চুলে দেখা যায়। পুরো পিঠ জুড়ে বেশ কালো চুল। তাতে বোধহয় একটু বাদামির মিশ্রণ আছে। খুব লম্বা না হলেও অপালার চেহারাটা লম্বাটে। সেন্টিমিটারে কতটা আসবে, কল্পনার চোখে দেখে বলা যাচ্ছে না। কালো? হ্যাঁ সোহমের নিজের পরিবার, দীপালি, মিতুল, এদের সবার সঙ্গে তুলনায় অপালা বেশ কালো। কালো? তা সে যতই কালো হোক, অপালাকে কোনদিন খারাপ লাগেনি। সোহম হঠাৎ লজ্জিত হয়ে অনুভব করল সে অপালার শরীরের উচ্চাবচতা আবিষ্কার করবার চেষ্টা করছে। মাথাটা একটু নেড়ে নিজেকে নাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে সে একটু ঝাঁঝাল গলায় বলল—‘ওসব বাদ দাও তো!’

—‘বাদ তো দেবই! আমার যে জিনিসটা খারাপ লাগে সেটা হল, মিতুল তো ওই মায়েরই মেয়ে! যে মা দু দুবার ইলোপ করেছে! দ্বিতীয়বার একটা পাঁচ বছরের মেয়ে ফেলে! মিতুল কিরকম চঞ্চল দেখেছো?— মাস্টারমশাইয়ের সব ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কিরকম ভাবে মেশে! এর গলা জড়িয়ে ধরছে। ওর চুল টেনে দিচ্ছে। তাকে ভেঙাচ্ছে!’

সোহম দেখেছে। চাঞ্চল্যটা মিতুলের এক ধরনের আকর্ষণ! ভারী ছটফটে। ভারী ফাজিল।

দীপালি বলল—‘ও আবার না মায়ের মতো পালায়! বাড়িতে তো বাবা ছাড়া কেউ নেই। বাবারা মেয়েদের কতটুকু বুঝতে পারে! দলে দলে ছাত্র আসছে যাচ্ছে। কত ছেলে বাপরে বাপ! দিলীপ সিন্‌হাকে দেখেছ? কনটেসা চড়ে আসে? ওদের এক্সপোর্টের ব্যবসা, অনেক বড়লোককে সেভর‍্যাল টাইমস্ কিনে নিতে পারে। সরোদিয়া। এদিকে মেকানিক্যাল এঞ্জিনিয়ার। ফার্স্টক্লাস পাচ্ছে। চেহারাও দারুণ। ছোট থেকে সিলভার-টনিক খাওয়ার চেহারাই আলাদা। ওর বাজনা শুনেছো? পুরো গোয়ালিয়রের ঘরের বাজনা। দা-রুণ। তবু মাস্টারমশায়ের কাছে আসছে। আরও ভ্যারাইটি, আরও ডিফারেন্ট গতের জন্য। শুনেছো ওর বাজনা?’

—‘শুনেছি। ভালো বাজায়।’

—‘মিতুল তো শুনছি ওর কাছে আজকাল তালিম নিচ্ছে। মাস্টারমশাই নাকি বলেছেন মিতুলের ভোক্যাল হবে না। ও যন্ত্র ধরুক। সরোদ—না সেতার ধরছে। তোমায় বলেনি? হয়ত ওর সঙ্গেই…’

সোহম প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। সে আনমনে কফি ঢেলেই যাচ্ছে।

দীপালি বলল—‘সোহম, আমরা টেবিলটা অনেকক্ষণ আটকে রেখেছি। বেয়ারাটা বড্ড ঘোরাফেরা করছে। চলো আমরা ময়দানের দিকে গিয়ে একটু বসি।’

সোহম হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল—‘ময়দান-ফয়দান ভালো লাগছে না। ওঠা যাক।’

দীপালি বলল—‘আমাদের বাড়ি যাবে? কিম্বা যদি বলো তোমাদের বাড়ি।’

—‘বাড়ি? বাড়ি-টাড়ি নয়।’ সোহম মাথা নাড়ল, এত জোরে যে দীপালি একটু অবাকই হয়ে গেল।

সোহম হঠাৎ প্রায় লাফ দিয়ে উঠে কাউন্টারে গিয়ে বিলটা ঢুকিয়ে দিল। দীপালি পেছন পেছন আসছিল। তার দিকে সামান্য ফিরে সোহম বলল—‘আচ্ছা দীপু চলি। পরে দেখা হবে, একটু কাজ আছে।’ সে এমন হন হন করে এগিয়ে গেল যে দীপালি তাকে ধরবার চেষ্টাই করতে পারল না।

গোধূলি শেষ হয়ে গেছে। প্রথম সন্ধের অন্ধকারে বিজ্ঞাপনের আলোগুলো জ্বলছে নিবছে। এই সময় থেকে আরম্ভ করে চৌরঙ্গি সুন্দরী হতে শুরু করে। পাশে একজন পুরুষ-বন্ধু নিয়ে এই সুন্দরী চৌরঙ্গির পেভমেন্ট দিয়ে পথ চলাও যে কী আরামের, কী তৃপ্তির, কত নবজীবনদায়ী হতে পারে! দীপালি কখনও অসহায় নয়। শৈশবে পিতৃহীন। তারা পাঁচ বোন এবং মা এই ছ’জন নারী মিলে তছনছ হয়ে-যাওয়া সংসার দাঁড় করিয়েছে। অসম সাহসে। বাবা এসরাজ বাজাতেন। মার্চেন্ট অফিসের কর্মী হলেও গান-বাজনার জগতের সঙ্গেই তাঁর দহরম-মহরম ছিল বেশি। সংসারে অনেক রকম উল্টোপাল্টা লোক এসেছে। বাবা মারা যাবার পর বহু লোক সুযোগ নিতে চেয়েছে। তারা বোনেরা মাকে রক্ষা করেছে, মা রক্ষা করেছে তাদের। কিন্তু রক্ষা-করার কাজটা ঠিক নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। একেবারেই বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। দীপালি, ছাইয়ের মতো মুখ নিয়ে মনুমেন্টের দিকে তাকালো। শহীদ মিনার। চৌরঙ্গির যে কোনও কোণে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালেই ওই শহীদ-মিনারের চুড়োটা চোখে পড়ে। এতো ভিড় তবু একলা। এতো মিছিল, এতে বক্তৃতা, তবু শান্ত। এই সগর্জন জীবন-মত্ততার ভেতরে শহীদ-মিনার নিশ্চুপ। সোহম কোনদিকে গেল? যদি দক্ষিণের বাসে উঠত তো অনায়াসেই তাকে সঙ্গে নিতে পারত, আর যদি উত্তরে কিম্বা পূর্বে কিম্বা পশ্চিমে যাওয়ার থাকত সে তো দীপালিকে বলে যেতে পারতো! দীপালির সঙ্গে তার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা। এমন কী গোপন প্রয়োজন যে ওইরকম লাফ দিয়ে চলে যেতে হবে? দীপালির সঙ্গ কি তার সহ্য হচ্ছিল না? এত দিন তো বেশ সহ্য হচ্ছিল! দীপালির সঙ্গ পেলে অনেকেই তো কৃতার্থ হয়ে যায়! মিষ্টি গলা, কথা বলে সুন্দর, দেখতে নয়ন শোভন। পোশাক পরিচ্ছদ রুচিসম্মত, খবরাখবরও রাখে যথেষ্ট। আজকাল সে নাভির ঈষৎ নীচে নামিয়ে শাড়ি পরতে শুরু করেছে। কিন্তু বাইরে থেকে সেটা বোঝা যায় না। শাড়ি হাওয়ায় উড়লে, স্বচ্ছ আকাশে ত্রয়োদশীর চাঁদের মতো তার পরিষ্কার নাভিমণ্ডলী দেখা যায়। আর নাইলন ডেক্রন ইত্যাদি কৃত্রিম সুতোর কাপড় পরলে পাতলা মেঘের আস্তর-ঢাকা চাঁদের মতো দেখায়। নিজেদের আলমারির লম্বা আয়নায় শাড়ি পরবার সময়ে সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই শোভা দেখে। সত্যি কথা বলতে কি নিজে নিজেই মস্ত্‌ হয়ে যায়। দীপালি চন্দন-আতর ব্যবহার করে খুব একটুখানি, দুই কবজির ওপর এবং তুলোয় একটু আতর ঢেলে বুকের খাঁজে রেখে দেয়। একদিন এভাবে রাখলে দুতিনদিন অনায়াসে চলে যায়। মৃদু চন্দনের সুগন্ধ তাকে সবসময়ে ঘিরে থাকে। দীপালির ভেতরে ভেতরে কান্না পাচ্ছিল। অপমানের কান্না। হতাশার কান্না। তার চেয়েও দুর্বোধ্য কিছু একটা তার বুকের ভেতর থেকে কান্নার আকারে ঠেলে ঠেলে উঠছিল। চন্দনের গন্ধটা তার এতো অসহ্য লাগছিল যে বুকের ভেতর থেকে তুলোর টুকরোটা বার করে সে মিউজিয়ামের এক পাশে পেভমেন্টের ওপর ফেলে দিল। কোথায় যাবে সে এখন? আজ, মাত্র আজ, এই শুক্রবার দিনটা তার পূর্ণ ছুটি। আজ সে যা খুশি করতে পারে। সোহমকে টেলিফোন করে আজকের পুরো সন্ধেটা তার সঙ্গে কাটাবার পরিকল্পনা করে সে এসেছিল। সে আজ পরিপূর্ণ গোলাপি। অনেক কিছু না পেয়ে পেয়ে এবং সম্পূর্ণ নিজের ক্ষমতায় অনেক কিছু করতে পেরে তার আত্মবিশ্বাস, দম্ভ, জেদ, উচ্চকাঙ্ক্ষা সবই এখন তুঙ্গে। তার মনে হল সোহমকে ঠিক এই মুহূর্তে আর একবার দেখতে না পেলে সে মরে যাবে, এখনই তার বুক ফেটে যাচ্ছে। এখন সে পরিষ্কার চিন্তাও করতে পারছে না। সোহমের চিবুকের ভাঁজটা, উঃ কেন ভগবান এরকম ভাঁজ তৈরি করেন, সোহম হাফ-হাতা শার্টও একটু গুটিয়ে পরে। বাইসেপ্‌স্ না ট্রাইসেপ্‌স্ সে সব বেশ ভালোভাবে দেখা যায়। সান্ধ্য চৌরঙ্গির সমস্ত বিজ্ঞাপনের আলো, ব্যানার, চলমান জনতা কিছু নেই, কিচ্ছু নেই, আছে খালি সোহমের গুটনো হাতার তলা থেকে দৃশ্যমান স্ফীত মাস্‌ল্‌। তার জামার ওপরের বোতাম খোলা, তার মধ্যে দিয়ে সরোদের জমজমার মতো রোম! একটা অন্ধ তাড়না ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে জোয়ারের স্রোতে তাকে যেন কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে।

তবে কি অপালা? সোহম কি অপালার বাড়ি গেল? দীপালি রাস্তা পার হল। নর্থের বাসে তুমুল ভিড়। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ডিপো থেকে একটা গ্যালিফ স্ট্রীটের ট্রাম ধরল। একটু ঘুরে ফিরে যাবে, তবু যাবে তো? আজকে রাত ঘন হবার পর সোহমকে তার একবার দেখাই চাই। তারপরে অনেক রাতে, নিজের ঘরে, বোনেদের সঙ্গে ভাগের বিছানায় সে ঘুমের ঘোরে সোহম চক্রবর্তীর সঙ্গে পিলু বারোঁয়া হয়ে যাবে। সোহম যখন তার ভরাট পুরুষালি গলায় গায়, দীপালি তার নিজের আসনে বসে মন্ত্রমুগ্ধ মৃগীর মতো নিস্পন্দ হয়ে থাকে। সোহম তার বিলম্বিত বিস্তার পেরিয়ে হঠাৎ বিনাভূমিকায় হলক তান আরম্ভ করে দেয়। অমনি দীপালির শিরা-উপশিরায় ঝলকে ঝলক নীল রক্ত ছুটতে শুরু করে হৃৎপিণ্ডের দিকে, সোহম অভিমুখে। সোহম যদি ঠুমরি বা গজল ধরে, দীপালি সেখান থেকে চলে যায়, কারণ প্রচণ্ড আবেগে তার কণ্ঠ রুদ্ধ, চোখের জলে তার মুখ প্লাবিত, ‘তোরে দেখনে কো জিয়া লাল চায় সজনোয়া!’ সে যে এত লোকের মাঝখানে সোহমের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছে না, সেই কারণে সমস্ত উপস্থিত জনমণ্ডলীকে তার স্লেটের ওপর স্পঞ্জের টুকরো দিয়ে মুছে ফেলতে ইচ্ছে করে। অর্থহীন, বিদ্যুৎ-হীন মুখ সব। অপ্রয়োজনীয়। কেন আছে ওরা? শুধু কতকগুলো নীরস পাথরের দেয়ালের মতো! যাতে সে এইসব বাধা পেরিয়ে সোহমের কাছে পৌঁছতে না পারে!

ট্রামে একেবারে কোণের দিকের লেডিজ সিটটা সে পেয়েছিল। ডান দিকে তাকালেই সেকেন্ড ক্লাসের যাত্রীদের দেখা যায়। দীপালি তার ব্যাগ খুলে গোগো সানগ্লাস পরে নিল, যদিও সূর্য নেই, রোদ নেই। গগল্‌সের তলায় সে রুমাল চেপে ধরল। গরম চোখের জল শুষে নিতে লাগল টার্কিস তোয়ালের টুকরো। তার মেজাজ এখন তার সপ্তকের ধৈবতে। আস্তে আস্তে নিখাদের দিকে উঠছে, তীব্র, তীব্রতর নিখাদ। যেখানে সোহম, তার সোহম। এতে তীব্র, তপ্ত, এতে ক্ষিপ্ত এ ছুট তান যে ট্রামের সিটে মাথা কুটতে চাওয়া শরীর মনটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীপালির সমস্ত দম ফুরিয়ে গেল। সে যখন অপালাদের কীর্তি মিত্র লেনের বাড়িতে পৌঁছলো তখন সে একটা মাঝদুপুরের ঝলসানো পাতা, কিম্বা সম্পূর্ণ নিংড়ে নেওয়া গামছা, শক্তিহীন, দীপ্তিহীন, অবসন্ন। সুজাতা তাকে এ সময়ে দেখে অবাক হয়ে বললেন ‘আরে! দীপালি। এতো রাতে? অপাই ছাতে আছে। খুব ভালো হয়েছে তুমি এসেছে। আজ কিন্তু খেয়ে যাবে।’

অপুর মার আতিথ্য এইরকমের। সন্ধে পেরিয়ে গেছে, অতএব খেয়ে যাবে। আয়োজন হয়ত খুব সামান্যই। কিন্তু অসামান্য তাঁর হাতের গুণ আর আন্তরিকতা।

দীপালি বলল—‘আর কেউ আসেনি?’

—‘কে আসবে আর? কেউ না।’ দীপালির মুখে যেটুকু আলো ছিল, এবার তা এক ফুৎকারে নিভে গেল। অপুদের বাড়ির ছাতে যাবার উৎসাহ আর বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এখন তো আর পিছোনো যায় না। সে আস্তে আস্তে উঁচু উঁচু সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠল।

ছাতের এক কোণে পাঁচিলের ওপর বসানো ফুলের টবের ওপর হাত রেখে অপালা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার ঈষৎ ঢেউ খেলানো চুল আবাঁধা, পিঠের পেছনটা অন্ধকার। সামনেও অন্ধকার। তারার আলোয় শুধু মুখের আদলটুকু দেখা যায়।

কাছে গিয়ে দীপালি বলল—‘এ কি রে অপু, তুই কাঁদছিস?’

—‘না তো!’ অপালা মুখ ফেরালো। তারার আলো পড়ে তার গাল চকচক করছে, নাকের ডগাটাও। কিন্তু এখনও দীপালির মনে হল অপালা কাঁদছে। কান্না তো এক রকমের হয় না। মল্লার কত রকম আছে, সারং কত রকম আছে, কান্না কেন এক রকমের হবে! দীপালি নিজেও তো এখন কাঁদছে, গরম চোখের জলে তার আপাদমস্তক নোনা, অপু কি দেখতে পাচ্ছে? সোহম কি বুঝতে পারছে?

দীপালি বলল—‘কি খবর রে অপু? কবে যাবি ঠিক করলি?’

—‘কোথায়?’ অপালা জিজ্ঞেস করল।

—‘লখনৌ, আবার কোথায়? তুই না বললেও খবরটা আমাদের কানে এসেছে।’

অপালা একটু চুপ করে থেকে বলল—‘যাবো। তবে লখনৌ নয়, হরিশ মুখার্জি রোডের কাছে একটা কি রাস্তা, বেণীনন্দন না কি, তোরা ভালো বলতে পারবি।’

—‘কেন, সেখানে আবার কোন ওস্তাদ থাকেন? একজন নাম-করা সেতারী থাকেন। তুই কি তাঁর কাছে শিখবি? তুই নাজনীন বেগমের স্কলারশিপটা নিবি না?’

—‘কোনও স্কলারশিপই নিচ্ছি না দীপুদি। ওই গলিটাতে আমার বিয়ে হচ্ছে।’

—‘বিয়ে?’ দীপালি আকাশ থেকে পড়ল। ‘তোর বিয়ে? কোনদিন ভাঙিসনি তো?’

—‘আমি নিজে জানলে তো ভাঙব। জেঠু ঠিক করে ফেলেছেন। হঠাৎ। কে ভদ্রলোকের নাকি আমার গান শুনে খুব ভালো লেগেছে। জেঠু অ্যাডাম্যান্ট।’

—‘এ তো খুব ভালো কথা রে অপু!’

—‘তুইও এ কথা বলছিস দীপুদি?’

দীপালি মৃদুস্বরে বলল—‘কি জানি, আমি তো বিয়ে হলে বেঁচে যাই।’ অপালা চুপ করে রইল।

দীপালী বলল—‘বলছিস গান শুনে পছন্দ করেছে, সেখানে তোর গানের অসুবিধে তো হবে না! লখনৌ-এর অফারটা হয়ত অ্যাকসেপ্ট করতে পারবি না এখনই। কিছু মনে করিস না অপু, তোর মতো বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ার চেয়ে বড় সৌভাগ্য মেয়েদের আর হতে পারে না। সে স্কলার মেয়েই হোক আর সঙ্গীতপ্রভাকরই হোক।’

অপালা যেন দীপালির কথাগুলো শুনেও শুনল না। আস্তে আস্তে বলল—‘একটাই আশা। ভদ্রলোকের মা বাবা নাকি বলেছেন বড্ড রোগা আর কালো।’

দীপালি হেসে ফেলল, বলল—‘এটাকে একমাত্র আশা বলছিস?’

অপালা দূরের দিকে তাকিয়ে বলল—‘নাজনীন বেগমের কাছে ঠুমরির তালিম নেওয়ার আশা বোধ হয় নেই। সে এ-বিয়ে না হলেও না।’

দীপালি বলল—‘নাজনীন বেগমের কাছে তালিম না নিলেও তুই ঠুমরি খুব ভালো গাস। সুরলোক যদি ঠুমরির আইটেমটা রাখত, তোর ফার্স্টা প্লেস কেউ হাজার পলিটিক্স করেও আটকাতে পারত না। অত ভেঙে পড়ছিস কেন?’

অপালা বলল—‘শুধু তো বেগমের কাছে তালিম না। দিবারাত্র একটা গানের আবহাওয়ার মধ্যে বাস করার অর্থ বুঝিস দীপুদি! শুধু ওঁর গান রোজ শুনতে পাবো তাই নয়, গানটা কি ভাবে তৈরি হয়ে উঠছে বুঝতে পারবো, ওঁর সাধনার সঙ্গে মিশে যাবো। আরো কত গুণী নিশ্চয়ই আসবেন, আসেন শুনেছি। তাঁদের গান টিকিট কেটে কনফারেন্সে শোনা যায় না। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেও হয়ত কেউ অলৌকিক প্রতিভাধর থাকতে পারে যার সঙ্গে শিখে ধন্য হতে পারতুম। আচ্ছা দীপুদি, তওয়ায়েফ না তয়ফাওয়ালী কী রে?

দীপালি বলল—‘তুই বড্ড ছেলেমানুষ অপু, অন্য কেউ হলে তোকে ন্যাকা বলত। তওয়ায়েফ আর কি, গানবাজনাই যাদের প্রফেশন, বড় বড় রাজবাড়িতে জমিদার বাড়িতে মুজরো নেয়। সর্ট অফ বাইজি আর কি! তবে সাধারণ বাইজিদের সঙ্গে এদের একটু তফাত আছে। এরা উচ্চ মানের গান নাচ করে। বড় বড় ওস্তাদদের সঙ্গে সমানে সমানে। তুই গহরজানের নাম শুনিসনি? গহরজান, মালকাজান। এরাও অন্য বাইজিদের মতো দুর্দান্ত ফ্লার্ট করতে পারে, কিন্তু যার তার কাছে পয়সার বদলে দেহ দেয় না।

অপালা ভীষণ শিউরে উঠল, বলল—‘নাজনীন বেগম কি তাই ছিলেন?’

—‘বোধ হয়। শুনেছি উনি যখন সবে আসরে বার হতে শুরু করলেন রূপে আর গানে তামাম হিন্দুস্তান লিটর‍্যালি পাগল হয়ে গিয়েছিল। তারপর বম্বের কোন ঘরোয়া উৎসবে গান করতে গিয়ে মধ্যপ্রদেশের কে এক রাজকুমারের সঙ্গে আলাপ হয়। বছর পাঁচেক ওঁর পেছনে লেগে থেকে থেকে ভদ্রলোক অবশেষে ওঁকে বিয়ে করেন। এর জন্য বোধ হয় ভদ্রলোককে ওঁর পরিবারের ত্যাজ্য-ট্যাজ্য হতে হয়েছে। খেতাবও ব্যবহার করেন না। এস্টেট না-ই রইল। বিজনেস ম্যাগনেট। টাকার পাহাড়ের উপর বসে আছেন। নাজনীনের কোনও সাধ নাকি অপূর্ণ রাখেননি। ইস্‌স্‌ অপু তোর আমার যদি এইরকম একটা বিয়ে হত! বছরে ছ মাস ইয়োরোপ, আমেরিকা, হংকং, সিঙ্গাপুর, আর ছ মাস নিজের মহালে বড় বড় গুণী ওস্তাদদের নিয়ে গান-বাজনা-নাচনা। তবে তোর আর তো গান শুনেই মুগ্ধ। তুই হয়ত ছোটখাটো নাজনীনই হতে চলেছিস!’

অপালা হাসল, বলল—‘বেণীনন্দনের নাজনীন? ভালো বলেছিস!’

—‘তবু তো কিছু একটা হচ্ছে। জীবনটা এগোচ্ছে। আমায় দ্যাখ। নাজনীন-টিনের মতো সুন্দরী না হলেও লোকে বলে আমার নাকি গ্ল্যামার আছে। কত ছেলে আমার পেছনে ল্যা-ল্যা করে ঘোরে, সে তো আমিও জানি। কিন্তু নোবডি ইজ এ রাজকুমার। নোবডি ইজ সিনসিয়ার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যাচ-কে-ব্যাচ পার করে যাচ্ছি। গাধা পিটে পিটে ঘোড়া করার নিরর্থক চেষ্টায় দ্যাখ জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়টা কেটে গেল। এ যে কী শূন্যতা…নাঃ তুই বুঝবি না।’

—‘কেন রে দীপুদি, মাস্টারমশাইও তো সব সময়ে শেখাচ্ছেন, ওই রকম ব্যাচ-কে-ব্যাচ। ওঁর তো ওরকম কিছু মনে হয় বলে বুঝি না!’

—‘আরে উনি তো ছাত্র-ছাত্রী পাচ্ছেন অপালা মিত্র, দীপালি মিশ্র, সোহম চক্রবর্তী, দিলীপ সিনহা, সৌম্যকান্তি বিশ্বাস…এদের। আমার মতো গা টিপলে ধা বলে এমনি মাল নিয়ে কি ওনার কারবার?’

সোহমের নামটা মুখে আনতে পেরে দীপালির বুকের ভেতরের আটকানো পাথরটা যেন ধস-এর মতো নেমে গেল। ভেতরটা তার থরথর করে কাঁপছে। এতক্ষণে ভালো করে চাঁদ উঠেছে। একটা বাড়ির চিলেকোঠার পেছন থেকে একটু তোবড়ানো ফুটবলের মতো গোলগাল চাঁদ। সেই আলোতে দুজনেই দুজনকে আরও স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছে।

অপালা বলল, ‘সেদিন তো আমি চলে এলুম, তুই কী গাইলি রে? আর সোহম?’

—‘আমার কথা ছেড়ে দে। গাইলুম খম্বাজ। চার্মিং রাগ বলে। থেকে থেকেই তিলং এসে যাচ্ছিল। নিজেই বুঝতে পারছি বিস্তার করতে করতে ধা বাদ যাচ্ছে মধ্যমে দাঁড়িয়ে যাচ্ছি সমানে। ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ইনট্রুড করছে থেকে থেকে। কেউ একটা প্রশ্ন করল না। গানের শেষে প্রথামাফিক হাততালি।’

—‘তোর এতো আধুনিক আর নজরুলগীতি গেয়ে গেয়ে আর শিখিয়ে শিখিয়ে এই অবস্থা হয়েছে দীপুদি। তুই একটু রেওয়াজ করিস না, করিস?’

—‘দ্যাখ, অপু, আর কেউ না জানুক, কিন্তু তুই ভালো করে জানিস এ ছাড়া আর আমার উপায় নেই। এসব ছেঁদো কথা বলে কি লাভ? আমার কথা বাদ দে। গেয়েছে সোহম। সাংঘাতিক! তুই থাকলে মূর্ছা যেতিস। শাংকরাই গাইল। ফৈয়জ খাঁ সাহেবকে আর একটু মোলায়েম করে নিলে সোহমকে পাওয়া যাবে। এতো ম্যাস্‌কুলিন। সাদিক যে ওর ওই কালারলেস ‘দেশ’ নিয়ে কি করে ফার্স্ট হয়ে গেল, হলের কেউ বুঝতে পারেনি। ‘দেশ’ তো গাইলেই ভালো লাগে ভাই। ঠিক মনে হল নোটেশন ফলো করে গাইছে। বিস্তার পর্যন্ত। তান না হয় তুই তৈরি গাইতে পারিস। কিন্তু বিস্তার এরকম সতর্ক, স্বরলিপি-ধরা হবে! কি জানি বাবা, নাকি ও-ই সবচেয়ে কারেক্ট গেয়েছে। এসব ভেতরের পলিটিক্স ছাড়া কি! সব্বাইকার মত ছিল তুই ফার্স্ট। সোহম সেকেন্ড। ফার্স্ট হলে মাসে দেড়শ টাকা করে স্কলারশিপ পেতিস পাঁচ বছর, তোর কত সুবিধে হত বল তো! আমার অবশ্য মত, সোহম প্রথম, তুই দ্বিতীয়। সোহমের গানের বলিষ্ঠতা আমাকে অ্যাপিল করে বেশি। তুই কিছু মনে করলি না তো?’

—‘দূর মনে করব কি? আমার গাইতে ভালে লাগে গেয়ে যাই, কার থেকে ভালো গাইলুম অতশত বিচার করতে পারি না। আলাদা করে টেপ শুনলে হয়ত পারবো। পরে। কিন্তু সে সময়ে পারি না। সোহম একটা জিনিয়াস। ও তো প্রথম হতেই পারে।’

—‘ছেলেটাকে তোর কেমন মনে হয় রে অপু, তুই তো অনেক দিন ধরে মিশছিস!’

—‘আমার খুব ভালো লাগে। মহাপ্রাণ। সরল। কোনও ছোট জিনিস ওর মধ্যে নেই। ওর সঙ্গে যুগলবন্দী গাইতে আমার খুব ভালো লাগে। ওর সঙ্গে আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা খুব ভালো হয় আমার।’

—‘জীবনটাও ওর সঙ্গে যুগলবন্দী হলে ভালো হত, নারে অপু? আসলে ওকেই বোধ হয় তুই বিয়ে করতে চাইছিস, তাই এটাতে এতে আপত্তি, না?’

অপালা অবাক হয়ে বলল—‘কে এসব বলল তোকে? ও আমার ভাইয়ের মতো বা বলতে পারিস দাদার মতো, এবং খুব ভালো বন্ধু। তা ছাড়া ও তো কবে থেকেই ঠিক করেছে মিতুলকে বিয়ে করবে।’

দীপালি আস্তে আস্তে ছাতের ওপর বসে পড়ল। ভেতরে একটা আগ্নেয়গিরি ফেটে গেছে। মিতুলকে সোহমের ভালো লাগে এটা অনুমান করা যায়। কিন্তু মিতুল একটা ষোল বছরের স্কুলে-পড়া, ফ্রক পরা অতি-তরল স্বভাব, গাধার মত গলা-অলা মেয়ে আর সোহম তেইশ-চব্বিশ বছরের, রীতিমতো গুণী গাইয়ে, উচ্চ শিক্ষিত যুবক। সোহমের জীবনে অপালা, অতি সাধারণ দেখতে অপালা কিছু। তার গানের সাথী। মিতুল, অতি-তরল, খেয়ালী, বেয়াদব মিতুলও কিছু—তার ভালোবাসার পাত্রী। খালি দীপালি কেউ না। কিচ্ছু না। কেউ না। যদিও তার সঙ্গেই সবচেয়ে গল্প করে সোহম। কোনও মানে নেই তার। একেবারে অর্থহীন।

অপালা বলল—‘দীপুদি, তুই ওরকম বসে পড়লি কেন? কি হল তোর? শরীর খারাপ লাগছে?’ অবরুদ্ধ কান্নায় দীপালি খালি বলতে পারল—‘অপু, অপু, কী হবে এখন? আমি…আমি সোহমকে ভালোবাসি। ওহ, আই লাভ হিম ম্যাডলি!’

অপালার চোখে জল এসে গেছে। সে দীপালিকে প্রাণপণে তোলবার চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘দীপুদি শোন, আমার কথা শোন। এমন করে ভেঙে পড়িসনি। চল ঘরে যাই আমরা।’

দীপালির গোলাপি শাড়ি ছাতের ধুলোয় লুটোচ্ছে। কোথাও থেকে ঝলকে ঝলকে ভেসে আসা কোনও গন্ধপুষ্পের সৌরভের সঙ্গে মিশে তার চন্দন-আতরের গন্ধ কেমন গা-ছমছমে লাগছে। যেন শির ছিড়ে যায় যন্ত্রণায় এ এমন আকুল করা গন্ধ। দীপালি তেমনি দমচাপা গলায় বলতে লাগল—‘অপু তুই কিছু কর। কিছু কর প্লিজ। আমি পাগল হয়ে যাবো নইলে। মিতুল? হু ইজ মিতুল? একটা গুড়িয়া, মীনিংলেস, অপদার্থ। জাস্ট একটা পুতুল ছাড়া কী? সোহম কি করে ওকে অ্যাট অল…ওহ অপু তুই আমাকে বিষ দে…।’

এই সময়ে প্রদ্যোৎ ছাতে উঠে আসছে দেখা গেল। একটু চেঁচিয়ে বলল—‘অপু, মা খেতে ডাকছে।’

অপালা তাড়াতাড়ি বলল—‘দাদা, দীপুদির হঠাৎ বড্ড বুকে ব্যথা করছে, একটু দ্যাখ তো!’

প্রদ্যোৎ ব্যস্ত হয়ে বলল—‘সে কি? আপনার কিছু গণ্ডগোল ছিল নাকি আগে?’ দীপালি কোনও উত্তর দিতে পারছে না।

প্রদ্যোৎ বলল—‘অপু, পায়ের দিকটা ধরতে পারবি? আগে ঘরে নিয়ে যাওয়া দরকার।’ প্রদ্যোৎ বুকে পিঠে স্টেথো লাগালো। প্রেশার মাপলো। তারপর কান থেকে স্টেথোর নল নামিয়ে বলল—প্রেশারটা একটু হাই। হার্টবিটও একটু বেশি। কিন্তু একসাইটেড হলে ওরকম হতেই পারে।’ সে অপালার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। অপালা খুব ছোট্ট করে ঘাড় নাড়লো। প্রদ্যোৎ বলল—‘আপনি দেখছি খুব কেঁদেছেন। নিশ্চয় কোনও কারণে মনে খুব ব্যথা পেয়েছেন। ঠিক বলেছি না? হাসুন। একটু হাসুন তো আগে! আচ্ছা এইবারে একটা ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি, খেয়ে দেয়ে চুপটি করে শুয়ে থাকবেন। অপু, আর মিনিট দশেক পরে আমরা খেতে যাবো। তারপর আমরা দুজনে ওঁকে বাড়ি পৌঁছে দেব। কোনও ভাবনা নেই। আরে জীবনে কত দুঃখ যন্ত্রণা, ডিস্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, তাতে ভেঙে পড়লে চলবে?’


অফিস পাড়ায় সবে ঘর-ফিরতি ভিড় আরম্ভ হয়েছে। বাস-স্টপগুলোয় জটলা। এই সময়ে পথ-চলতি জনতার চেহারাটা সাইক্লোনের আকার নেয়। উত্তর-যাত্রী আর দক্ষিণ-যাত্রী, পূর্ব-যাত্রী আর পশ্চিম-যাত্ৰী জনতা পরস্পরের সঙ্গে যেন কাটাকুটি খেলে। রাস্তায় হকারদের উৎসাহ-উদ্দীপনাও এ সময়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। গ্র্যান্ড হোটেলের তলায় কাগজের কুমির চলতে থাকে। মাথায় পালকওলা পালোয়ান পুতুলদের লড়াই শুরু হয়ে যায়। প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ, ফোমের থলি, টি-শার্ট, বাহারী পেন, ঘড়ি, ছাতা ইত্যাদি পণ্য নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই ব্যস্ত হয়ে ওঠে। তার ওপরে ইভনিং শো সিনেমার খদ্দেরও জমতে থাকে। এই সমস্ত দিগ্‌বিদিক শূন্য জনতার মধ্য দিয়ে পথ কেটে কেটে এসপ্ল্যানেড পাড়ার একটি কাফেতে ঢুকল সৌম্যদর্শন যুবক। পর্দা-ঢাকা একটি ছোট কেবিনের মধ্যে ঢুকে সে বেয়ারাকে কিছু নির্দেশ দিল। পর্দার ফাঁক দিয়ে রেস্তোরাঁর প্রবেশ পথ দেখা যায়। যুবক অপেক্ষা করছে। আপাত দৃষ্টিতে ধীর। কিন্তু ঘন ঘন মুখ মোছা, ঘাড় মোছা, হাতের ভঙ্গি বদলানো ইত্যাদি থেকে বোঝা যাচ্ছে যুবকটি উত্তেজিত। খানিকটা অধৈর্যও। যুবক নির্ভেজাল গৌরবর্ণ। পরিষ্কার কামানো মুখ। চুল খুব ভদ্রভাবে উল্টে আঁচড়ানো। বাঁ দিকে সিঁথি। বয়স হয়ত ত্রিশ পার হয়নি, কিন্তু মুখের চেহারায় গাম্ভীর্যের সঙ্গে চিন্তাশীল মেজাজ দুটো মিলে তাকে আরেকটু বয়স্ক দেখায়। বঙ্কিমচন্দ্রের নায়ক যেমন ব্রজেশ্বর, নবকুমার কি গোবিন্দলালের ভূমিকায় একে বেশ মানাত। খুব সুপুরুষ দেখতে হলেও যুবকটি বোধ হয় তাড়াতাড়ি প্রৌঢ় হয়ে যাবে। কথা বললে দাঁত দেখা যায় না, এত ছোট ছোট এবং পরিপাটি সাজানো দাঁত। এই মুখগহ্বর চুপসে যায় তাড়াতাড়ি। মাথায় ঘন চুল, কিন্তু দু’পাশে পেছনে সরে গেছে। এই বিন্যাস অবধারিত ভাবে ভবিষ্যৎ টাকের লক্ষণ।

হঠাৎ যুবকটি চঞ্চল হয়ে উঠল। দুটি তরুণ-তরুণী ঢুকছে। দুজনেরই রোগাটে গড়ন। তবে তরুণটির চেহারায় ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যের লক্ষণ আছে। সে একটি টি শার্ট ও ট্রাউজার্স পরেছে। মাথার চুল ফুরফুরে, ঢেউ-খেলানো। মেয়েটি লাজুক, শান্ত। ক্ষীণাঙ্গী। হাতের তুলনায় মুখটি চকচকে। গালে একটা লাল আভা। খুব সম্ভব তার হালকা কমলা রঙের শাড়ির রং প্রতিফলিত হয়েছে মুখে। বড় বড় পল্লব-ঘেরা লম্বা টানা চোখ। নাক চাপা। ঠোঁটের পরিধি বেশ ছোট্ট। মাথায় অনেক চুল। সে দুদিকে দুটি বেণী পেছনে ঝুলিয়েছে। ভীরু কিশোরীর যেটুকু লাবণ্য, বা আকর্ষণ থাকে তার চেয়ে একচুল বেশি বা কম তার নেই। যুবকটি পর্দা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল। একটা হাত তুলল। অতঃপর তিনজনেই পর্দা-ঢাকা কেবিনটার মধ্যে ঢুকল। তরুণ বলল—‘শিবনাথবাবু, আমার বোন আপনাকে কিছু বলতে চায়। ও খুব কম কথা বলে। চট করে নালিশ করে না। শান্ত এবং লাজুক প্রকৃতির মেয়ে। সেই বোন যখন মুখ ফুটে তার ভবিষ্যৎ হ্যাজব্যান্ডের সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে চাইল, আমার মনে হল দিস মাস্ট বি ভেরি ভেরি ইস্পর্ট্যান্ট অ্যান্ড উই মাস্ট টেক হার সিরিয়াসলি। আপনার কী মনে হয়?’

শিবনাথ বলল—‘কী আশ্চর্য! নিশ্চয়! আপনি বসুন! অ্যাকচুয়ালি আমিও মনে মনে এইরকমই কিছু একটা চাইছিলুম…’

প্রদ্যোৎ বলল—‘তাহলে তো কথাই নেই। দুই বাড়ির কেউই যেন ঘুণাক্ষরে এই মিটিঙের কথা জানতে না পারেন। আমি বসছি না। আপনারা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করুন। আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঘুরে আসছি। তখন ওকে নিয়ে যাবো। ও কে সী ইউ।’

শিবনাথ কিছু বলবার আগেই প্রদ্যোৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেল। শিবনাথ দেখল অপালার মুখ নিচু, সে ঘামছে। এই সেই মেয়ে যে রবীন্দ্রসদনে হল-ভর্তি শ্রোতার সামনে পণ্ডিত চন্দ্রকান্তর মতো ভারত বিখ্যাত সঙ্গীতকোবিদ ও ওস্তাদ গায়কের সঙ্গে বিতর্ক জুড়েছিল। যদিও তার মধ্যে আশ্চর্যভাবে কোনও অবিনয়, ঔদ্ধত্য অনুপস্থিত ছিল। বেয়ারাকে বলা ছিল। সে দুটো লস্যি এনে রাখল। শিবনাথ বলল—‘ঠাণ্ডা চলে তো? না অন্য কিছু বলব?’

অপালা মাথা নাড়ল। অর্থাৎ ঠিক আছে। তার সিঁথির দুপাশের আলগা চুল এবং কানের মাকড়ি দুলে উঠল। শিবনাথ জানে না সাহানা রাগিণীর শাস্ত্রীয় রূপ ঠিক কেমন। কিন্তু সেটা যা-ই হোক, এই মেয়েটিকে ‘সাহানা’ বলে মনে হচ্ছে। নরম, শ্যামল, চকচকে গায়ের রঙ, তাতে কমলা আভা। এইরকম কৃশাঙ্গী। বিরহিণী তাই ক্ষীণা। প্রসাধনরহিতা। এমনি নম্র, শান্ত, বিষণ্ণ।

সে বলল, ‘ঠাণ্ডাতে যদি সত্যিই কোনও ক্ষতি না হয় তো শুরু করুন। এই দেখুন, আমি কিন্তু আরম্ভ করছি।’

নিঃশব্দে কিছুক্ষণ লস্যি পান করার পর শিবনাথ বলল—‘কি যেন বলছিলেন?’

অপালা মুখ তেমনি নিচু করেই বলল—‘আমি বিয়ে করতে চাই না, জেঠু, মা আমায় জোর করে…আপনি বলে পাঠান না যে আপনার পছন্দ হয়নি…।’

সামান্য তরল গলায় শিবনাথ বলল—‘আমাকে আপনার পছন্দ হয়নি, সেটাই মুখ ফুটে বলতে পারছেন না, না কি?’

—‘পছন্দের কথা নয়’ অপালা আপাদমস্তক কমলা রং হয়ে বলল—‘বিয়েটাই পছন্দ নয়। আমি এখন গান শিখতে চাই, গান করতে চাই।’

শিবনাথ বলল—‘গান শুনবো বলেই তো আপনাকে ঘরে নিয়ে যেতে চাই। আর শুনতে হলে তো শিখতে দিতেই হবে। কী আশ্চর্য!’

—‘কিন্তু আমি অন্য কর্তব্য করতে হয়তো পেরে উঠব না। গান আমার অনেকটা সময় নিয়ে নেয়।’

—‘বাড়িতে কী কী করেন, একটু শুনি।’

—‘পড়াশোনা করি। কলেজ যাই। ঘরটর একটু-আধটু গুছিয়ে দিই। মায়ের রান্নায় সামান্য, খুব সামান্য সাহায্য করি, রবিবার-রবিবার একটু জামা-কাপড় কাচাকুচি করতে হয়।’

—‘বাস বাস। এর চেয়ে বেশি আপনাকে কখনও কিছু করতে হবে না। বাড়িতে আমার মা রয়েছেন। পিসিমা রান্নাঘরে আপনাকে ঢুকতে দেবেন কিনা সন্দেহ। ভীষণ শুচিবাই। বাবার দেখাশোনাও তাঁদের তদারকিতেই। আমার চাহিদা খুব সামান্য। আর আমার ছোট ভাই এখন এঞ্জিনিয়ারিং-এ সবে ঢুকেছে। বাড়িতে থাকেই না। দিদির তো দেখলেনই বিয়ে হয়ে গেছে। জামাইবাবু অসাধারণ গান-পাগলা। আপনার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হবেন তিনিই। অন দি আদার হ্যান্ড আপনি ভেবে দেখুন, আপনার জ্যাঠামশাই যেরকম কনজারভেটিভ দেখলুম তিনি আপনাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেবেনই। সে জায়গায় আপনি অনুকূল পরিবেশ পেতে না-ও পারেন।’

অপালা এবার চোখ তুলে তাকাল। তার গালে এখনও কমলার ছোঁয়া। মা বলেছিল রাজপুরের মতো দেখতে, মিথ্যে বলেনি। অপালার হঠাৎ খুব সাহস বেড়ে গেল। কলেজের বন্ধু মনীষাকে সে যে কথা বলেছিল সেই কথাটাই সামনে-বসা সুন্দরকান্তি যুবকটিকে বলল—‘আসলে আমি গান ছাড়া আর কিছুই তেমন করে মানে ভালোবাসতে পারি না।’

শিবনাথের মুখে চাপা হাসি খেলে গেল, সে চাপা গলায় বলল—‘ভয় নেই। আমাকে কম ভালোবাসলে আমি কিছু মনে করব না।’

—‘আপনি ছাড়াও আরও অনেকে থাকবেন…’

—‘আপনাকে দেখে তো ঠিক নিষ্ঠুর প্রকৃতির মনে হচ্ছে না?’

এবার অপালার হাসির পালা।

শিবনাথ বলল—‘আমি আপনার ব্যাপারটা বুঝতে পারছি। যথাসম্ভব সামলাবার চেষ্টা করব।’

এই তন্বী শ্যামলা দীর্ঘকেশী মেয়েটি যখন তার লম্বা চোখ সামান্য খুলে তানপুরা হাতে মঞ্চের ওপর বসে থাকে, কণ্ঠ থেকে সুরের স্রোত ঝরতে থাকে তখন শিবনাথের ভেতরে এক ধরনের বিপ্লব ঘটতে থাকে। সে সুরলোকের ফাংশন ছাড়াও অন্য আসরে এর গান শুনেছে। সুরলোকে দিদি জামাইবাবুকে সে-ই ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

বেয়ারা কিছু মিষ্টি এবং নোনতা খাবার এনে রাখল। অপালা বলল—‘আমি আর কিছু খেতে পারব না। জোর করবেন না প্লিজ।’

শিবনাথ বলল—‘এগুলো যে অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে। একটু মুখে দিন। নইলে আমাকে বক রাক্ষস হতে হয়।’

অপালা বলল—‘দাদা এসে গেলে বাঁচা যায়।’

—‘আমার সঙ্গ কি আপনার খুব অসহ্য লাগছে?’

—‘না, না, তা নয়।’ অপালা তাড়াতাড়ি বলল—‘আমি আসলে খাবারগুলোর কথা ভেবে বলছিলুম।’

শিবনাথ বলল—‘আপনাকে বলে রাখা দরকার—আমাদের বাড়িতে প্রকৃত সঙ্গীতানুরাগী বলতে আমি আর আমার জামাইবাবু, যিনি সেদিন আপনাদের বাড়ি গিয়েছিলেন। উনি গান রীতিমতো বোঝেন। দিদিও ওঁর সঙ্গে থেকে থেকে ভালোই বোঝে এখন। মা বাবা পিসিমা এঁরা কিন্তু গান বলতে কীর্তন, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ভক্তিমূলক, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, এইসব বোঝেন। লোকসঙ্গীতও তেমন অ্যাকসেপ্ট করতে পারেন না। আর কোনটা ডি. এল. রায় কোনটা রজনীকান্ত তা বোঝবার ক্ষমতাও তাঁদের নেই। তবে গান শুনতে ভালোবাসেন। আমি শুনেছি আপনি স-বই গান। ওঁদের একটু এই জাতীয় গান দিয়ে খুশি করে দিলেই আপনার সঙ্গীতচর্চার পথ উন্মুক্ত হয়ে যাবে বলে আমার ধারণা। আমার ছোট ভাই বিশ্বনাথ হিন্দি ফিল্মি গান থেকে পাশ্চাত্য সঙ্গীত পর্যন্ত স-বই পছন্দ করে। গানটাকে কেরিয়ার করতে আপনার কোনও বাধা হবার কথা নয়। তবে মধ্যবিত্ত সংসারের নিয়মকানুন মেনে। সে তো আপনাকে এখনও মানতে হয়, হয় না?’

অপালা মাথা নাড়ল।

‘পড়াশোনাটা কন্টিনিউ করবেন তো?’

‘সুযোগ পেলে তো নিশ্চয়ই। গ্র্যাজুয়েট না হলে জেঠু হার্টফেল করবেন।’

‘আর আপনি নিজে?’

অপালা একটু ভেবে বলল—‘আমার নিজের খুব একটা এসে যায় না।’

শিবনাথ বলল—‘আমার সম্বন্ধে আপনার কিছু জানবার নেই?’

অপালা একটু লাজুক হেসে বলল—‘আপনি তো সবই বলে দিয়েছেন।

‘সে কি? কী বললাম?’

অপালা টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল—‘শুধু গান শুনে কাউকে পছন্দ করবার ব্যাপারটা আমার একটু অদ্ভুত অবাস্তব লেগেছে। গান তো কোনও কাজে লাগে না!’

শিবনাথ কি বলবে ভেবে পেল না। তার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে—‘গান আপনাকে ভীষণ সুন্দর করে, আমি সেই সৌন্দর্যে অভিভূত। শয়নে স্বপনে জাগরণে শুধু সেই তানপুরাবাদিনী সুকণ্ঠী মূর্তিই ভাসছে।’ কিন্তু কথাগুলো সে বলতে পারল না। তার বদলে বলল—‘জীবনটা তো শুধু কাজ নয়!’

‘জীবনটা তাহলে কী? আপনার কাছে?’

অপালার মতো লাজুক, মুখচোরা মেয়ের কাছ থেকে হঠাৎ এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না শিবনাথ। সে বলল—‘মুশকিলে ফেললেন। এক কথায় কি এমন শক্ত প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায়? আর এখন এই মুহূর্তে আমি কি ঠিক করে ফেলতে পেরেছি জীবনটা আমার কাছে কী? ঠিক আছে প্রশ্নটা আপনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আপনার কাছে জীবনটা কী?’

অপালা শিবনাথের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—‘আমার কাছে তো জীবনটার অর্থ খুব সহজ। ধরুন ভৈঁরো থেকে ললিত, ললিত থেকে রামকেলী, রামকেলী থেকে পরজ, পরজ থেকে আলাহিয়া বিলাবল…’ বলতে বলতে সে হেসে ফেল।

শিবনাথও হাসছে।

এই সময়ে প্রদ্যোৎ এসে ঢুকল। দুজনের হাসি মুখের দিকে চেয়ে বলল—‘বাঃ। দেখে যেন মনে হচ্ছে মিঞাবিবি রাজি! এক্সপিডিশন তাহলে সাকসেসফুল। কংগ্রাচুলেশনস শিবনাথদা। কংএ্যাট্‌স্ অপাই!’


জ্যাঠামশাই একটা গাড়ি ভাড়া করেছেন সারাদিনের জন্যে। শুভকর্মের আর মাসখানেক মতো বাকি। এর মধ্যে তিনি কনেকে একলা একলা রাস্তায় ছাড়তে চান না। ডিসেম্বর মাসে বিয়ে। শীত। জিনিসপত্রের দুর্মূল্যতা দুপ্রাপ্যতা দুটিই হ্রাস পাবে। একটি মাত্র কন্যার বিবাহ দিতে হলে এমনি সময়ই প্রশস্ত। সবচেয়ে স্বস্তির কথা কন্যাটি কোনক্রমে হলেও বি.এ. অনার্সটা পার হয়ে গেছে। হতে পারে তাঁরা খুব নামজাদা বনেদি পরিবার নন—কি শিক্ষায়, কি অর্থ সামর্থ্যে। কিন্তু একটি ন্যূনতম মানদণ্ড তো আছে। সেই মানদণ্ডটি তিনি বজায় রাখতে চেষ্টা করেন। আর কিই বা আছে জীবনে! নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিবার নেই। কর্ম থেকে অবসর নিয়েছেন। ভাইয়ের স্ত্রীকে যথাসম্ভব দুধে-ভাতে রাখা, আর পরিবারের ঐতিহ্য তা সে যত সামান্যই হোক, সেটুকু বজায় রেখে খাওয়া—বাস, এই বই তো নয়! তিনি নিজে নিজের জন্য আর কতটুকু চান! ভোরবেলা একটু বেল-কলা, ইজিচেয়ারের ওপর পা তুলে রোজ গীতা এক অধ্যায়। একটু দুধ। খাওয়ার সময়ে একান্তে একটু বউমার সাহচর্য, পাঁচরকম কুটি-কুটি পদ দিয়ে একটু শাকান্ন। রাত্রে রুটির সঙ্গে একটু ভাজা, একটু মিষ্টান্ন, একটু ঘন দুধ, একটু নিশ্চিন্ত নিদ্রা, ছেলেটি ডাক্তারি পাশ করে কোনও সরকারি হাসপাতালে জয়েন করুক, মেয়েটি সৎপাত্রস্থ হোক। এই তো তাঁর আশা, এইটুকুই তাঁর আকাঙক্ষা।

অপালা মাস্টারমশায়ের বাড়িতে একাই ঢুকল। জেঠু অবশ্য নামতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এই গলি সম্পর্কে তাঁর ঘৃণা এবং ভীতির কথা মনে করে অপালা তার স্বভাববিরুদ্ধ দৃঢ়কণ্ঠে জানাল দরকার নেই। তা ছাড়াও সে জানে এ মুহূর্তগুলো শুধু তার আর তার মাস্টারমশায়ের। সে তো শুধু বিয়ের নেমন্তন্ন করতে যাচ্ছে না! এ এক রকম শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা। এই পিতা-পুত্রীর অনুক্ত বেদনার মাঝখানে জেঠুর উপস্থিতি সইবে না।

নীচের তলায় অন্য দিনের মতো সারেঙ্গি বা হারমোনিয়ামের আওয়াজ শোনা গেল না। অপালা ঢুকে ডাকল—‘মাস্টারমশাই!’ কোনও সাড়া পেল না। এবার সে মিতুলের নাম ধরে ডাকতে লাগল—‘মিতুল! মিতুল!’ এবার দোতলার বারান্দায় মাস্টারমশাই বেরিয়ে এলেন। অচেনা গলায় বললেন—‘কে?’

—‘আমি অপু মাস্টারমশাই!’

—‘অপু! অপু! নীচে কেন!’ চটিতে চটাস চটাস শব্দ করে রামেশ্বর নীচে নামতে লাগলেন।

‘না, মাস্টারমশাই ওপরে আর যাবো না,’ ভারী হাতে হলুদ চিঠিটা সে মাস্টারমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিল। নিশ্বাস ফেলে মাস্টারমশাই বললেন—‘এ এক হিসেবে ভালোই হল মা। ছেলেটি শুনছি সঙ্গীতপ্রিয়। সহানুভূতিশীল। সৌম্যদর্শন। সৌম্যদর্শন পুরুষ দরদী হয়। হয়ত তুমি আরও অনুকূল পরিবেশই পাবে। তোমাকে নিয়ে আমার একটাই ভয় মা।’

অপালা মাস্টারমশাইকে প্রণাম করে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রামেশ্বর বললেন—‘তুমি বড় দুর্বল মা, বড় অভিমানী, আজকের এই স্বার্থপর পৃথিবীতে কার অভিমান কে বুঝবে? তোমার মধ্যে অপার ঐশ্বর্য, শুধুমাত্র অসার অভিমানের জন্যে যদি নষ্ট করো…’

অপালা একটু চুপ করে রইল, তারপর আস্তে আস্তে বলল—‘মিতুল কোথায় মাস্টারমশাই! ওকে কিন্তু সকাল থেকেই যেতে হবে। রাতে থাকবে। গানবাজনা হবে…।’

—‘যাবে তো নিশ্চয়ই তবে ওর একটা ছোটখাটো অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, ওকে আপাতত ওর এক বন্ধুর বাড়িতে রেখেছি।’

—‘সে কি? কী হল?’

‘ও কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে। এখনও তো দেরি আছে। অপুদির বিয়েতে মিতুল যাবে না, আনন্দ করবে না, তা-ও কি হয়? এর পর কোথায় যাবে?’

‘এখান থেকে সোজা সোহমের বাড়ি। তারপর…’

মাস্টারমশাই অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন—‘অপু সে মর বাড়ি যেও না। সোহম অসুস্থ। অত্যন্ত অসুস্থ।’

—‘সে কি? কী বলছেন, তবে তো আরও যাওয়া দরকার! জেঠুকে বরং বলব, বাকিগুলো উনি একাই সেরে নিন। আমি সোহমের কাছে একটু থাকব।’

—‘না, অপালা না। এ সাধারণ অসুস্থতা নয়। সোহমের মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। সাংঘাতিক ভায়োলেন্ট হয়ে গেছে। গত পরশু আমাদের বাড়িতে এসে একটা ছুরি দিয়ে মিতুলকে আক্রমণ করে। অশ্রাব্য গালাগাল দেয়। পাড়ার লোকে এসে না বলপ্রয়োগ করলে মিতুল হয় অন্ধ, নয় খুন হয়ে যেত। তারাই ওকে কোনক্রমে বাড়ি পৌঁছে দেয়। কিছুদিন থেকেই দেখছিলুম কিরকম বদমেজাজী, উগ্র, অস্থির হয়ে উঠছে। ছুরিটা ভাগ্যিস ভোঁতা ছিল!

অপালার চোখে আতঙ্ক। সে বড় বড় স্থির চোখে চেয়ে বলল—‘কেন? কেন এমন হল মাস্টারমশাই?’

—‘কিছুই বুঝতে পারছি না। মিতুলের ওপর তো ওর একটু বেশিই…’

অপালা বলল, ‘সোহম আমার আপন ভাইয়ের মতো। ওর এরকম বিপদ। আমি কিছুতেই নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি যেতে পারব না মাস্টারমশাই। আমাকে যেতে দিন।’ তার গলায় কাতরতা।

রামেশ্বর বললেন—‘চলো, তবে সে ক্ষেত্রে আমিও যাবো।’ তিনি চটপট সদর দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে এলেন।

রামেশ্বরকে বেরোতে দেখে জেই কৃতাঞ্জলি হয়ে নেমে এলেন। তাঁর ভদ্রতায় কখনও কোনও ঘাটতি থাকে না। বললেন—‘মাপ করবেন রামবাবু, আমি নামতে চেয়েছিলুম। আমার কন্যেটি বুড়ো জেঠুর বেতো হাঁটুর জন্যে বড় ভাবে তো…’

—‘তাতে কী হয়েছে? রসময়বাবু, ওসব চিন্তাও করবেন না। আমাদের অতো ফর্মালিটি নেই। আমরা ভাবগ্রাহী।’

—‘তা আপনিও কি অপুর বন্ধুদের বাড়ি যাবেন?’

—‘হ্যাঁ, আপনার যদি আপত্তি না থাকে, সোহমের সঙ্গে বিশেষ করে একটু দরকার ছিল। যান যখন রয়েইছে একটা।’

—‘আপত্তি কি? আপত্তি কি? ছি ছি ছি। আসুন…’ সাদরে দরজা খুলে দিলেন রসময়বাবু।

সোহমের বাড়িতেও জেঠুকে নামতে দৃঢ়ভাবে বারণ করল অপালা। জেঠুর নামবার কোনও কারণও নেই। তাঁর আসবার কারণও খুব ছিল না। কিন্তু প্রদ্যোৎকে পাওয়া যায়নি। বিয়ের মাসখানেক আগে কনেকে ভাড়া করা গাড়ির ড্রাইভারের ভরসায় ছেড়ে তিনি দেবেন না। তিনি বললেন—‘বেশি দেরি করো না মা অপু।’

অপু মাস্টারমশাইয়ের চোখের দিকে চেয়ে বলল—‘একটু দেরি হবে জেঠু। মাস্টারমশায়ের কি দরকার আছে বলছিলেন, না? ওঁকে আমরা নামিয়ে দিয়ে যাবো তো!’

এদিক থেকে সোহমের দক্ষিণের বারান্দা দেখা যায়। জানলাগুলো বন্ধ। অপালা আর মাস্টারমশাই ভেতরে ঢুকতেই বনমালী চাকর শশব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এল, পেছনে-পেছনে সোহমের রাশভারী বাবা। তাঁর মুখ থমথম করছে। এগিয়ে এসে বললেন—‘আপনারা?’

—মাস্টারমশাই অপালাকে দেখিয়ে বললেন—‘অপু মার বিয়ে। ও সোহমকে নেমন্তন্ন করতে এসেছে।’

‘আপনি তো জানেন রামেশ্বরবাবু সোহম এখন ঠিক নেমন্তন্ন নেবার অবস্থায় নেই।’

—‘আমি নিষেধ করেছিলুম প্রতাপবাবু। কিন্তু সব শুনে অপু বলছে ও সোহমের সঙ্গে দেখা করবেই।’

—‘হী ইজ আন্ডার সিডেশন। তবে কিছুক্ষণ হল ওর ঘোরটা ভেঙেছে। ও যদি অপালাকে আক্রমণ করে, আমি কী করবো? একেই তো আপনার কাছে অপরাধী হয়ে আছি।’

অপালা বলল—‘আমায় ও কিছু বলবে না কাকাবাবু। আমায় একবার যেতে দিন।’

—‘কিন্তু ও খুব সম্ভব মেয়ে দেখলেই ক্ষেপে যাচ্ছে। ডু ইউ নো রামেশ্বরবাবু হী থ্রু এ পেপারওয়েট অ্যাট হিজ মাদার্স পোট্রেট, কলিং হার নেমস!’

অপু আবারও বলল—‘আমায় একবার, অন্তত একবার যেতে দিন কাকাবাবু।’

একটু ইতস্তত করে প্রতাপবাবু বললেন—‘ঠিক আছে এসো। কিন্তু চিঠিটা ওকে দিও না। আমার হাতে দাও। আর রামবাবু আমার অনুরোধ আপনি যাবেন না।’

বনমালী এবং আরেকটি চাকরকে তিনি বললেন অপালার সঙ্গে সঙ্গে যেতে। নিজেও ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

সোহমের ঘরের জানালা সব বন্ধ। সময় বোঝা যায় না। কি একটা কেমিক্যাল সুগন্ধ ঘরে। সাবান হতে পারে, পাউডার হতে পারে, সেন্ট হতে পারে, কিন্তু অচেনা। সোহম বিছানার ওপর খালি গায়ে শুধু একটা পাজামা পরে বসে আছে। তাকে এভাবে খালি গায়ে এবং এমন অবিন্যস্ত কখনও দেখেনি অপালা। তাকে দেখলেই বোঝা যায় সে ঘোরের মধ্যে আছে। চোখগুলো লাল।

বনমালী বলল—‘খোকাবাবু, কে এসেছে দেখো।’

লাল চোখ মেলে সোহম দেখল, জড়িয়ে জড়িয়ে বলল—‘অপু! তুই নয় শিওর। কিন্তু আমি জানি সামবডি আমাকে সিঁদুর খাইয়েছে। রক্ষাকালী পুজোর প্রসাদ বলে এক প্লেট কি ছাইভস্ম এনে দিলে। আসলে সিঁদুর, সিঁদুর ছিল তার মধ্যে।’

—‘সিঁদুর?’ অপালা একটু এগিয়ে গিয়ে বলল—‘সিঁদুর খেলে কি হবে?’

—‘ডোন্ট ইউ রিয়্যালাইজ? সিঁদুরের মধ্যে মার্কারি থাকে, আরও কি কি থাকে কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করে দেখতে হবে। ইট ইজ ব্যাড অ্যাজ ব্যাড ক্যান বি। কক্ষনো সিঁদুর পরিস না অপ। আর গলার পক্ষে ইট ইজ ডেডলি। ওরা আমার গলা নষ্ট করে দিতে চায়। আমি আর গাইতে পারবো না। গাইতে পারবো না।’ সোহমের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ছে।

অপালা বলল—‘কে তোকে এসব বাজে কথা বলেছে? কোথায় কার বাড়িতে কালীপুজোর প্রসাদ খেয়েছিলি?’

—‘দ্যাট দিলীপ সিনহা। সরোদিয়া! রামেশ্বর ঠাকুর। সৌম্য। স-ব। দীপালি। দ্যাট সাদিক হুসেন! ওর ওখানে কী দরকার রে? ও অবধি ছিল। খালি তোকেই দেখলাম না। সবাই মিলে জোর করে আমায় বিষটা খাইয়ে দিল। দেখছিস না গলাটা কি রকম হোর্স লাগছে?’

অপালা বলল—‘তুই বোধহয় খুব চেঁচিয়েছিস সোহম। তাই গলাটা আপাতত ভেঙে গেছে। একটু চুপ করে থাক। কথা বলিস না। ওষুধ খা। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া কর। বিশ্রাম নে। ঠিক হয়ে যাবে।’

সোহম মাথা নাড়ল, যত জোরে সম্ভব—‘খাওয়া-দাওয়া আমি আর করছি না। দেখছিস না, মাই ফাদার, ব্রাদার্স, সিসটার্স-ইন-ল, এমনকি দীজ হেল্পিং হ্যান্ডস্ এরা পর্যন্ত চায় না আমি গান করি। সব খাবারের সঙ্গে একটু একটু সিঁদুর মিশিয়ে রেখেছে।’

বনমালী বলল—‘সেই পরশু থেকে কিছু খাওয়াতে পারিনি অপু দিদিমণি। আমি, আমি নাকি ছোড়দাবাবুকে বিষ দেবো!’ সে কোঁচার খুঁটে চোখ মুছতে লাগল।’

সোহম বলল—‘অপু তুই প্লিজ যাস না। সেভ মি, সেভ মি ফ্রম দীজ পিপল। ফর গড্‌স্ সেক অপু!’

অপালা বলল—‘ঠিক আছে থাকব। কিন্তু তোকে খেতে হবে।’

আমি দিলে খাবি তো?’

সোহম বলল—‘প্লীজ ডু মি দ্যাট ফেভার। আই অ্যাম স্টার্ভিং।’

অপু বাইরে বেরোতে সোহমের বাবা বললেন—‘ডাক্তার লিকুইড দিতে বলেছেন।’

একটু দুধ ওকে যদি খাওয়াতে পারো মা…’

এক গ্লাস ঠাণ্ডা দুধ তাতে ভ্যানিলা দেওয়া, সে সোহমের মুখের কাছে এনে ধরল। আস্তে আস্তে গ্লাসটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল সোহম।

বলল—‘কোথা থেকে আনলি?’

অপালা বলল—‘আমাদের বাড়ি থেকে। পাশে খাটাল আছে দেখিসনি, সদ্য দুয়ে দেয়!’

—‘ঠাণ্ডা হল কী করে? তোরা কি রিসেন্টলি ফ্রিজ কিনেছিস?’ অপালা বিনা দ্বিধায় সঙ্গে সঙ্গে বলল—‘হ্যাঁ।’

সোহম আস্তে আস্তে দুধটা খেয়ে নিল। তার বাবা বললেন—‘ওষুধটাও ওকে খাইয়ে দাও অপালা।’

অপালার হাত থেকে ওষুধটা নিল সোহম, বলল—‘ওষুধটা কিসের? এমনিতেই আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি অফ দীজ ব্লাডি পিল্‌স্‌।’

অপালা বলল—‘এই যে তুই খেতে পারছিস না। শরীরটা কেমন কেমন লাগছে। এগুলো ওষুধটা খেলে ঠিক হয়ে যাবে। তুই খেয়ে নে। আমিও এটা মাঝে মাঝে খাই।’

সোহম বড়িটা মুখে ফেলে দিল। তারপর বলল—‘অপু আমার যদি খিদে পায়। আমি কি খাবো? কে আমায় দেবে?’

অপালা বলল—‘আমিই দেবো, আর কে দেবে! দাঁড়া আমি ব্যবস্থা করছি।’

বাইরে প্রতাপবাবু দাঁড়িয়ে, অপালা বলল—‘ওকে আর কি খেতে দিতে বলেছেন ডাক্তার?’

প্রতাপবাবু বললেন—‘একদম লিকুইড। তবে যতবার সম্ভব। লেবুর রস রয়েছে। ক্লিয়ার চিকেন সুপ রয়েছে।’

অপালা দুহাতে দু গ্লাস নিয়ে ফিরে এলো। সোহমের বেডসাইড টেবিলে দুটি গ্লাস ঢাকা দিয়ে রাখল। বলল—‘এই আমি তোর মুসাম্বির রস করে দিয়ে গেলাম, আর এই গ্লাসটাতে চিকেন সুপ রাখলাম, আমি নিজের হাতে করেছি। তোর যখন খিদে পাবে, যেটা যখন ইচ্ছে, খেয়ে নিস। কেউ তোর ঘরে ঢুকবে না, আমি বারণ করে দিয়ে যাচ্ছি। আর বিকেলে আমি দাদাকে পাঠিয়ে দেবো। দাদার হাতে খাবার পাঠিয়ে দেবো। খাবি তো?’

—‘শিওর!’ খুব জড়ানো গলায় বলল সোহম। সে শুয়ে পড়েছে। তার চোখ বুজে আসছে।

অপালা বাইরে বেরিয়ে এলো। প্রতাপবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। সেই জলদ্‌গম্ভীর চাল, রাশভারী ভাব কিছুই যেন আর নেই। ছোট ছেলের মতো অপালার হাত ধরে কেঁদে ফেললেন, বললেন—‘দুদিন পরে ও কিছু খেল মা। তুমি পারলে আবার এসো। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব। পৌঁছেও দেবো। ওর মায়ের মৃত্যুর পর এ বাড়িতে, বা আমার জীবনে এত বড় বিপদ আর কখনও হয়নি।’

অপালা বলল—‘বিকেলে দাদাকে পাঠিয়ে দেবো। দাদা মেডিক্যাল কলেজে, ফাইন্যাল ইয়ার এখন। আপনারা ওকে খুব ভালো ডাক্তার দেখাচ্ছেন। জানি। কিন্তু দাদাকে ও বিশ্বাস করবে বেশি।’

অপালা তাড়াতাড়ি সিঁড়ি নেমে মাস্টারমশায়ের কাছে এলো। তিনি এতক্ষণ ধরে উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ তাঁকে বসবার একটা চেয়ার দিতেও ভুলে গেছে।

প্রতাপবাবু বললেন—‘কিছু মনে করবেন না রামেশ্বরবাবু। আপনি দেবতুল্য মানুষ। কিন্তু গান বাজনার লাইন বড় খারাপ। যতরকম কুৎসিত প্রবৃত্তির রাজত্ব। ছেলেটার ক্ষমতা ছিল। পারিবারিক ট্র্যাডিশন ভেঙে গান করতে চাইল। আই হ্যাড মাই মিসগিভিঙস্‌। এখন দেখছি আই ওয়জ রাইট। ভুল করেছি।’

রামেশ্বর ঠাকুর কি একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। প্রতাপবাবু বললেন—‘আপনার মেয়ে এখন কেমন আছে? ওর চিকিৎসার খরচ সমস্ত আমার। প্ল্যাস্টিক সার্জারি করাতে হলে তাই হবে। বিন্দুমাত্র ভাববেন না।’

রামেশ্বর নম্র প্রায় আর্দ্র স্বরে বললেন—‘প্রতাপবাবু, খরচ খর্চার কথা আপনাকে ভাবতে হবে না। তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি। সোহম আমার নিজের সন্তানের মতে, এই অপু যেমন। সে সেরে উঠলেই এখন আমি নিশ্চিন্ত হই।’

রাত ন’টা নাগাদ প্রদ্যোৎ যখন ফিরে এলো তখন এক ভয়াবহ গল্প শুনল অপালা। দিন তিনেক আগে সোহম নাকি কোথা থেকে ফিরে গুম হয়ে থাকে, ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করেনি; দাদারা দু একবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ভালো করে জবাব দেয়নি। ভোরবেলায় ওর ঘর থেকে আওয়াজ পেয়ে সবাই ছুটে গিয়ে দেখে ভারী পাথরের পেপার ওয়েট ছুঁড়ে সে তার মায়ের ছবিখানা ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। মুখে তার মৃত মাকে লক্ষ্য করে অশ্রাব্য খিস্তি। বড়দা রেগে-মেগে তাকে থামাতে গেলে সে তাঁকেও একটা ফুলদানি ছুঁড়ে মারে। এছাড়াও টি ভি ট্রানজিস্টার রেডিও সেট, ওয়াল ডেকোরেশন ঘরের মধ্যে যা-যা ছিল সব ভেঙে ছত্রখান করে। তার চেহারা তখন উন্মাদের মতো। মনে হল কাউকে চিনতে পারছে না। লোক্যাল ডাক্তার ঘুমের ওষুধ ইনজেকশন দিয়েছিলেন, কড়া ডোজে। কিন্তু রাতের দিকে কখন সে উঠেছে কেউ জানে না। রামেশ্বরের বাড়ি গেছে এবং সেখানে কোথা থেকে একটা ভোঁতা ছুরি নিয়ে মিতুলকে আক্রমণ করেছে। অনেক কষ্টে রামেশ্বর এবং পাড়ার কিছু লোকে তাকে ধরাশায়ী করে, বেঁধে ছেঁদে। কোনক্রমে বাড়ি দিয়ে যায়, সবসময়ে তাকে ঘুমের ওষুধ ইনজেকশন দিয়ে যাচ্ছেন ডাক্তার। মিতুলের কপালে গালে বুকে বেশ ভালো মতো লেগেছে। কপালের আঘাতটা চোখ ঘেঁসে বেরিয়ে গেছে। প্রদ্যোৎ খুব চিন্তিত, গম্ভীর। বলল—‘অপু ভাবিসনি। আমি বিদ্যুৎদাকে নিয়ে গিয়েছিলুম। উনি বলছেন প্যারানয়েড বলে মনে হলেও আসলে এটা খুব সম্ভব একটা সাময়িক নার্ভাস ব্রেক-ডাউন। এর কারণটা ইমিডিয়েটলি খুঁজে বার করতে হবে। হঠাৎ ও একটা দারুণ শক পেয়েছে। আচ্ছা অপু, ছেলেটা তো তোরই মতো গান-পাগলা, যতবার আমাদের বাড়ি এসেছে দেখেছি সুর ভাঁজতে ভাঁজতে দুটো তিনটে সিঁড়ি একসঙ্গে টপকাতে টপকাতে হয় ওপরে উঠছে নয় নীচে নামছে, আর মা কিছু খেতে দিলেই বলছে—“কি করেছেন এটা মাসিমা, ফাস কেলাস।” তা এমনি মানুষ হিসেবে কিরকম বল তো!’

—‘আমি তো যতদূর জানি, বাড়ির খুব আদরের, বুদ্ধিমান, কিন্তু সরল খুব, হিংসে টিংসের বাষ্পও ওর মধ্যে নেই, সহজেই সব কিছু বিশ্বাস করে নেয়।

মিতুলের প্রতি ওর দুর্বলতার কথাটা দাদাকে এক্ষুনি বলবে কিনা ঠিক করতে পারল না, অপালা। কোনও কোনও গোপন কথা জানা থাকলেও তার গোপনতা রক্ষা করা পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করে সে। যদি দাদা কিছু প্রশ্ন করে নিশ্চয়ই বলবে। সোহমকে পুরোপুরি ভালো করে তোলার জন্যে যদি প্রয়োজন হয় নিশ্চয়ই প্রকাশ করতে হবে।

প্রদ্যোৎ ততক্ষণে বলছে—‘দেয়ার ইউ আর। ছেলেটা বলছিস সরল আর গালিব্‌ল্‌। এটা একটা ইমপর্ট্যান্ট ক্লু। ও যে বলছে রক্ষাকালী পুজোর প্রসাদ খেয়েছে এবং সেখানেই ওকে কেউ কিছু মিশিয়ে খাইয়ে দিয়েছে এটা সম্পূর্ণই ওর কপোল কল্পনা, তোর মাস্টারমশায়ের সঙ্গে কথা বলে এলাম আমি। দিলীপ সিংঘি না কি এক ছাত্র আছে ওঁর, তার বাড়িতে রক্ষাকালীপুজো হয়। সারা রাত নাকি কালী কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত হয়, তাতে রামবাবু, মিতুল এরা যায়, গান-টান করে, কিন্তু সোহম সেখানে প্রসাদ খাবে কি। কখনও যায়নি, তার নেমন্তন্নই হয় না!’

অপালর ঠোঁট কাঁপছে। বলল—‘দাদা, আমার ভীষণ ভয় করছে। একে তো বিয়েটা আমার একেবারেই করতে ইচ্ছে করছে না, তারপরে গোড়াতেই এরকম একটা অশুভ ঘটনা!’

প্রদ্যোৎ বলল—‘এই জন্যে তোদের ওপর রাগ ধরে। তোর বিয়ের সঙ্গে সোহমের অসুখের কী সম্পর্ক? তোদের মধ্যে কি লভ-অ্যাফেয়ার-টার আছে নাকি? সোহম তোর বিয়ের কথা শুনতে পেয়ে উন্মাদ হয়ে গেছে?’

অপালা প্রদ্যোতের বলার ধরনে হেসে ফেলল, বলল—‘চড় খাবি। ঘটনাটা তো অশুভ। এটা তো মানবি! গানের লোকেরা খুব সুপারস্টিশাস হয় জানিস তো? তাছাড়া সোহমের চিন্তা মাথায় নিয়ে বিয়ে করতে আমার খুব খারাপ লাগবে।’ তার মাথার মধ্যে ঘুরছিল সোহমের সেই জড়ানো গলার সাবধানবাণী ‘সিঁদুর খুব খারাপ জিনিস, কক্ষনো সিঁদুর পরিসনি, অপু।’ কিন্তু একথাটা দাদাকে বলা যায় না।

প্রদ্যোৎ বলল—‘বিদ্যুৎদা বলছেন কয়েক মাসের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। তুই ঘাবড়াস না।’

অনেক রাত্তিরে দীপালি এলো। ন’টা বেজে গেছে। জেই খেয়ে উঠেছেন। মা জেঠুর থালা বাটি নিয়ে নীচে নামছেন, প্রদ্যোৎ বোধহয় মোড়ের দোকানে সিগারেট কিনতে গেছে, দরজাটা খোলা রেখে গেছে। তিনি দেখলেন খোলা দরজার এক পাট ভেজিয়ে দীপালি দাঁড়িয়ে আছে। তিনি একেবারে অবাক। দীপালির আসা-যাওয়ার অবশ্য অবাধ স্বাধীনতা। কিন্তু তাঁদের বাড়ির রসময়বাবু-শাসিত পটভূমিতে রাত্তির ন’টায় কোনও মেয়ের বন্ধুর বাড়ি ঢোকার কথা তিনি কল্পনা করতে পারেন না। দীপালি কেমন একরকম গলায় বলল—‘মাসিমা, আমি আজ অপুর কাছে থাকব। অসুবিধে হবে না তো? ও তো আর কদিন পরই শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে।’

এতক্ষণে সুজাতা নিশ্চিন্ত হলেন—‘নিশ্চয়। নিশ্চয়। বাড়িতে বলে এসেছে তো! নিশ্চয় থাকবে। অসুবিধে কি! এসো আমি ওদের খেতে দিচ্ছি, তুমিও বসবে এসো।’

দীপালি বলল—‘আমি খেয়ে এসেছি মাসিমা। ব্যস্ত হবেন না। আমি ছাতের ঘরে যাচ্ছি।’

অপালা তার গলার সাড়া পেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দীপালি বলল—‘অপু খেয়ে ওপরে আয়।’ তার গলা কাঁপছিল। সুজাতা রান্নাঘরের দিকে চলে গেছেন। অপালা টের পেল শেষ কথাটা প্রদ্যোৎও শুনতে পেয়েছে। সে এখন সদর দরজা বন্ধ করছে। দীপালির গলার কাঁপুনিতে অবাক হয়ে সে বোনের সঙ্গে চোখাচোখি করল।

কোনরকমে খেয়ে নিয়ে অপালা ছুটল ওপরে, দেখল দীপালি দু হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে থরথর করে কাঁপছে। ‘কী হয়েছে দীপুদি? কী হয়েছে?’

—‘সোহমের খবর শুনেছিস?’

—শুনেছি। গিয়েছিলাম।’

—‘ও যদি আমাকে খুন করতে আসে? এইরকম রাতেই ও মিতুলকে খুন করতে গিয়েছিল। মিতুল এখন হসপিটালে জানিস তো? চোখের ওপর, গালে, বুকের মাঝখানে লেগেছে। কে জানে ডিসফিগার্ড হয়ে গেল কিনা মেয়েটা!’

—‘তোকে কেন খুন করতে যাবে?’

—‘আরে পাগলদের কিচ্ছু বিশ্বাস নেই। আসলে মানে মিতুলের কথাটা তো আমিই ওকে বলি।’

—‘মিতুলের কথা! কী কথা!’

—‘মিতুলের মা যে মাস্টারমশায়ের এক ছাত্রর সঙ্গে পালিয়ে যান—ইন ফ্যাক্‌ট্‌ উনি যে মাস্টারমশায়েরও গুরুপত্নী, মাস্টারমশাই ভাগিয়ে এনেছিলেন, মিতুল ওই স্ত্রীরই মেয়ে। এসব তো আমিই…’

—‘এসব তুই বলছিস কি দীপুদি? কোথা থেকে শুনলি? যত গুজব?’

—‘গুজব নয়। আমি জানি। আগেকার লোকেরা অনেকেই জানে। আলোচনা করে না।’

—‘কই আমি তো জানি না!’

—‘তোর কথা আলাদা। স্ট্রিক্‌ট্‌ ডিসিপ্লিনে থাকিস। গান শিখিস, বাড়ি চলে আসিস। আমরা গান বাজনার জগতে ছোট থেকে ঘুরি-ফিরি। অনেক কথাই জানি। দিলীপ সিন্‌হা ওই যে রে সরোদ বাজায় ওর সঙ্গে মিতুলের ঘনিষ্ঠতার কথাও আমিই সোহমকে বলেছি।’

—‘ঘনিষ্ঠতা? কতজনের সঙ্গে তো মিতুলের ভাব! একটা ছোট মেয়ে! মা নেই! কেন এসব বলতে গেলি! তুই জানতিস না! আমি যে সেদিন বললাম!’

—‘তার আগে! আরে এমনি গল্প করতে করতে বলেছি, আমি তো ঘুণাক্ষরেও জানি না মিতুলের ওপর অত ঝোঁক! আর যতই বল ওদের কত বড় ফ্যামিলি। ওরা কি কখনও মিতুলের সঙ্গে ওর বিয়ে দিত!’

—‘বিয়ে দিত কি না দিত সেসব পরের কথা। দীপুদি তুই খুব অন্যায় করেছিস। আমি চিন্তাই করতে পারছি না এই কথাগুলো তুই একটা ছেলের সঙ্গে আলোচনা করলি কি করে!’

দীপালি বলল—‘যা হয়ে গেছে, গেছে। আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। তুই আমাকে বাঁচা অপু। সোহম আমাকে খুন করবেই।’

অপালা বলল—‘সোহম, হয়ত তোর এসব কথাতেই ওরকম অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তাতে তোর কোনও দুঃখ নেই দীপুদি! এই যে সেদিন বলছিলি সোহমকে তুই ভালোবাসিস।’

—‘উন্মাদ। বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে ও। নিশ্চয় ভেতরে টেনডেনসি ছিল। নইলে এতো সহজে কেউ এমনি খুনোখুনি করে না। আমাকে ও শেষ করে দেবে। তোর কাছে আমায় রাখ।’

—‘ঠিক আছে। তুই থাক না এখানে। তবে সোহমের এখন তোর উপর হামলা করবার কোনও সম্ভাবনাই নেই। ওকে স্ট্রং ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। অবস্থা আরও জটিল হলে নার্সিং হোমে রাখা হবে।… আয় দীপুদি আমরা দুজনে মিলে শুধ্‌ কল্যাণ গাই।’

দীপালি বলল—‘তোর এখন গান আসছে? তুই গা ভাই! ভয়ে আমার হতা পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

অপালার হঠাৎ মনে পড়ল, সে বলল—‘কি সিঁদুর সিঁদুর করছে রে! সিঁদুর খাওয়ালে নাকি গলা নষ্ট হয়ে যায়। এ সব কথাও তুই-ই ওকে বলেছিলি না কি?’

দীপালির মুখ ছাইয়ের মত শাদা হয়ে গেছে। সে সবেগে মাথা নেড়ে বলল—‘না, না, মোটেই না।’

অপালার এখন মন অনেক শান্ত হয়ে গেছে। সে তার মাস্টারমশাই প্রদত্ত তানপুরো তুলে নিল। রাত যত গভীর হয়, তার গানও ততই গভীরে চলে যায়!’ ‘মন্দরবা বাজো রে’ শুধু ‘বাজো রে’ দিয়েই সে সুরের সমুদ্র তৈরি করে, বেশি তানের মধ্যে লয়কারির মধ্যে যায় না। শুধু ভাব। ভাব থেকে অনুভব, ‘আনন্দ রহো’ বলে সে যখন গলা তোলে তারপর টুকরো টুকরো কাজ দিয়ে নেমে আসে, চম্পকের তীব্র মধুর সুবাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে কল্যাণের স্বরাবরোহণ। সুর যখন তার নাড়িতে নাড়িতে এমনি করে প্রবেশ করে যায় তখন সুখ-দুঃখ থাকে না, ভাবনা-চিন্তা কিছু না, তার মনে হয় সে এক প্রবল পরাক্রান্ত কিন্তু অপরিসীম প্রেমী পুরুষকে অনুসরণ করে চলেছে। কী মাধুর্য, কী ধৈর্য, কী মহিমা এই অনুসরণে। অনুসরণের পথটি সোজা নয়। কখনও আঁকাবাঁকা, কখনও ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দূরত্যয়া, আবার কখনও হে বিরাট নদী—বিশাল রাজপথসদৃশ রাস্তা। তার দুধারে অলৌকিক সৌন্দর্যের সম্ভার। প্রত্যেকটি বাঁকে বিস্ময়ের উপচার নিয়ে অপেক্ষা করছে অদৃশ্য গন্ধর্বর। অবশেষে মোহনার মত এক সুরবিস্তারে তার কল্যাণের বিলম্বিত গানটি সুরসমুদ্রের মৌলিক স্রোতে মিশে যায়। সে আবিষ্ট হয়ে যায়। সমস্ত শরীর ঝিমঝিম করছে, ঘরটা যেন একটা সুরমণ্ডল। বেজেই চলেছে বেজেই চলেছে, ছাতটা সুরের সেই ত্রিসপ্তক বিস্তৃত আদি মহাসাগর, যেদিকে সে তার অভিসার শুরু করেছিল। দীপালি অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে। সটান। শিথিল। তার মাথাটা বালিশের এক দিকে কাত হয়ে পড়েছে। ভয়ের কুঞ্চনগুলো আর নেই। তার মুখে নিস্পাপ শিশুর আত্মসমর্পণের সরলতা।

অপালা তার তানপুরো পেরেকে ঝুলিয়ে রেখে, তুম্বিটার তলায় একটা ছোট টুল গুঁজে দিল। দীপালির পাশে দাদার বালিশে মাথা দিয়ে সে সিগারেট মিশ্রিত একটা পুরুষ-গন্ধ পেতে লাগল, যেটা তার ঘুমের ব্যাঘাত করতে লাগল কিছুক্ষণ। তারপর ঝরকে ঝরকে ঘুম আসতে লাগল। আনন্দময়, কিন্তু অপ্রগাঢ় নিদ্রা। মধ্যরাতে নাকি ভোরের দিকে অপালা জানে না সে ছাড়া ছাড়া দুটো স্বপ্ন দেখল, সে যেন আকুল আগ্রহে কোনও প্রেমিকের দিকে ছুটে চলেছে। তাকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার কেমন একটা ধারণা আছে সে অবর্ণনীয়। সে রূপ বড় বড় শিল্পীদের ছবিতে আভাসিত হয় মাত্র। দারুণ সুগন্ধও সে। নিজেকে অপালা এমনকি শারীরিক ভাবেও ধরে রাখতে পারছে না। ওই পুরুষের সঙ্গে মিলিত হতে না পারলে যেন তার নির্মল শুচি সুরময় নারীত্ব মূল্যহীন অর্থহীন হয়ে যাবে। এমনই তার আকুলতা। এসব জিনিস অপালা জেগে জেগে সজ্ঞানে কখনও অনুভব করে না। সেই সঙ্গে সে বুঝতে পারছে তার পেছনেও ছুটে আসছে আর এক জন পুরুষ। দ্বিতীয়জনকে এড়াবার জন্য সে এঁকেবেঁকে ছুটছে। গান্ধার থেকে সোজা পঞ্চমে না গিয়ে সে রেখাবে ফিরে এলো। তারপর উঠে গেল ধৈবতে, ধৈবত থেকে বক্রভাবে পঞ্চমকে ছুঁয়েই উঠে গেল মধ্য সপ্তকের নিষাদে। এমনি করে সারা রাত সে স্বরের চড়াই উৎরাই ভেঙে আকুল হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল কার কাছ থেকে পালিয়ে, কার সঙ্গে মিলিত হবার জন্য। সে জানে না এরা কারা। ঘুম ভাঙলো দুর্লভ চোখের জলে। বাগেশ্রী, বেহাগ গাইতে গিয়ে এমনিই তার চোখে জল এসে যায়, কেদারার পকড় ধরবার সময়ে ছলছল করে ওঠে চোখ।

চিলেকোঠার ঘরটা এই সময়ে খুব সুন্দর। এতো সুগন্ধ। শীতল। নভেম্বরের গোড়া, অথচ শীত বলতে কিছু নেই। হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে জানলা দিয়ে, তাইতেই শীত-শীত করছে। সে দীপালির গায়ে চাদর টেনে দিল। কিন্তু ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই দীপালি সে চাদর পায়ের ধাক্কায় ধাক্কায় তলার দিকে পাঠিয়ে দিল আবার। সম্ভবত ওর গ্রীষ্মবোধ বেশি। হাওয়ায় তানপুরোর তারগুলো টুং টাং করে উঠল। দীপালি নিভাঁজ, ছেদহীন ঘুম ঘুমোচ্ছে। নিশ্চয় বেশ কয়েকদিন পরে। অপালা আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। এবারেও একটা স্বপ্ন দেখল। এটা অনেক স্পষ্ট। সে যেন এক জমিদারের জলসাঘরে গান গাইছে। সে নয়। নাজনীন বেগম। কখনও সে নাজনীনকে দেখছে, তাঁর কানবালা, হীরের নাকছাবি, এবং জরিদার বেনারসী শাড়ি সমেত, যেমন রেকর্ডের ছবিতে আছে, কিন্তু সে এও বুঝতে পারছে সে নিজেই নাজনীন। চারপাশে কিছু গম্বুজ। শ্রোতা মাত্র একজনই। তাঁকে দেখতে অনেকটা রামেশ্বর ঠাকুরজীর মতো। কিন্তু তার চেতনা বলছে এটা সোহম। সোহম তার গান শুনছে। কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। শুধু দুজনেরই চোখ দিয়ে অবিরল জল পড়ছে। তারপর এক সময়ে সোহম শুয়ে পড়ল। সটান। অপালার পায়ের কাছে সাষ্টাঙ্গ প্রণামের ভঙ্গিতে। আস্তে আস্তে তার শরীর নিস্পন্দ হয়ে এলো। সে কি ঘুমন্ত না মৃত বোঝা গেল না। কিন্তু কে যেন বলল—‘সো যা বেটি, সো যা,’ অপালা দেখল সোহম তো নয় দীপালি ঘুমোচ্ছে। দীপালি না মিতুল ঘুমের ঘোরে সে একেবোরই ঠিক করতে পারছে না।

ভোরের প্রথম আলো তির্যকভাবে অপালার ঠিক ডান চোখের ওপর পড়ল। অর্থাৎ এমনিভাবে এই আলো দাদার চোখেও পড়ে। দাদা নিশ্চয়ই পাশ ফিরে শশায়। সে একটুখানি শুয়ে রইল দীপালি ওঠে কি না দেখতে। না, দীপালি এখনও ঠিক সেইভাবে ঘুমিয়ে যাচ্ছে। কে জানে কতদিন ভালো করে ঘুমোয়নি! ব্যথায়, উৎকণ্ঠায়, শেষ পর্যন্ত ভয়ে! সে ছাতে বেরিয়ে এলো। আস্তে আস্তে চুল খুলতে খুলতে। এই সময়টা সাধারণত সে মুখ ধুয়ে রেওয়াজে বসে। ছাতের ওপর একটা মোটা কম্বল তার ওপর মায়ের বিয়ের গালচে পেতে। এরও আগে বসে যায়। কিন্তু আজকে মনের মধ্যে অনেক ভাবনা ঘোরাফেরা করছে। স্বপ্নগুলো তার স্পষ্ট মনে আছে। হঠাৎ অপালা একটা সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে এলো।

সে তরতর করে নীচে নেমে গেল। মায়ের ঘরে দাদা ঘুমোচ্ছে। মা পাশ থেকে উঠে গেছে। অপালা দাদাকে ঠেলতে লাগল—‘দাদা! দাদা!’ প্রদ্যোৎ একটুখানি চোখ খুলে তাকে দেখল। বিয়ের ঠিক হওয়ার পর থেকে সে বোনের মধ্যে আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব দেখতে পাচ্ছে, মমতাও তার বেড়ে গেছে অনেক বেশি। সে পুরোপুরি চোখ খুলতে অপালা বলল—‘একবার ছাতে আসবি! কথা বলিস না। চুপ!’

প্রদ্যোৎ তার স্বভাবসিদ্ধ একটা মিথ্যা বিরক্তির ভান করে জামাটা গলিয়ে নিয়ে ছাতে উঠে এলো। চিলেকোঠার খোলা দরজা দিয়ে সে দাদাকে বলল —‘দ্যাখ! দ্যাখ্‌ না!’

—‘কী দেখব?’

দীপালি ঘুমোচ্ছ। পোশাক বদলানো হয়নি। পুরোপুরি পোশাক পরে সে ঘুমোচ্ছে। ঠোঁটের লিপস্টিক প্রায় মুছে গিয়ে ঠোঁট দুটিকে বাসি গোলাপের পাপড়ির মতো বিষণ্ণ করে রেখেছে। তার ফর্সা রঙ, সারা রাতের গাঢ় ঘুমের পর এখন সতেজ, সে সবসময়ে কাজল পরে থাকে। বোজা চোখ, কাজলের রেখাতে শুধু চোখের আকার দেখা যায়। বেণীটা তার বাঁ কাঁধের ওপর দিয়ে বুকের ওপর এসে পড়েছে এবং নিশ্বাস প্রশ্বাসের তালে তালে —উঠছে নামছে।

এই পর্যন্ত দেখে প্রদ্যোৎ বলল— ‘এটা কী করছিস অপু? ঘুমোচ্ছে ও। ওকে এভাবে চুপিচুপি দেখাতে ডেকেছিস আমাকে! তুই তো এতো অসভ্য ছিলি না আগে?’

অপালা বলল—‘দাদা, তুই আগে বল দীপুদি সুন্দর কিনা!’

প্রদ্যোৎ বলল, ‘দ্যাট ডিপেন্ডস্‌।’

—‘জবাব এড়াবার জন্যে ইংরিজি বলবি না খবর্দার। বল্‌ অন্তত আমার থেকে তো অনেক সুন্দর। বল্ বল্ না রে!’

—‘আমি জানি না। তোর চেয়ে ফর্সা, এই পর্যন্ত। এর চেয়ে বেশি আমি বুঝি না। এর মানে কি অপু?’

—‘আচ্ছা দাদা, দীপুদি আমারই মতো গান জানে। আমার চেয়ে ভালো গায় এক হিসেবে কারণ আধুনিক, নজরুলগীতি, রাগপ্রধান এসবে ও একেবারে সিদ্ধ। রেডিওতে গায়। জলসায় গায়।’

—‘তো কি?’

—আচ্ছা শিবনাথবাবুকে ওকে দেখিয়ে প্রোপোজ করা যায় না, উনি আমার বদলে দীপালিকে বিয়ে করুন। গান ভালোবাসেন, দারুণ গান-জানা বউ পাবেন, সুন্দরী বউ পাবেন। প্লাস ও অত্যন্ত গৃহকর্মনিপুণা, ওদের বাড়িতে কী লক্ষ্মীশ্রী তুই ধারণা করতে পারবি না। ভীষণ গুণী ওরা পাঁচ বোনেই। তার মধ্যে দীপুদি আবার বোধহয় সবচেয়ে সুন্দর। ও বিয়ে করতেও খুব ইচ্ছুক। মাসিমা খুব পাত্র খুঁজছেন।’

প্রদ্যোৎ চোখ বড় বড় করে বলল— ‘অপু, তুই কি পাগল? বিয়ের আর এক মাসেরও কম বাকি আছে। এখন আমি পাত্রী-বদলের দরবার করব? দীপালি রাজি হবে কেন? শিবনাথদার বাড়ি থেকেই বা রাজি হবে কেন?’

—‘দীপুদিকে রাজি করার ভার আমার। আর ওদের বাড়ি থেকে নিশ্চয় রাজি হবে। দীপুদি কত ফর্সা দেখছিস না?’

প্রদ্যোৎ বলল— ‘অপু তুই যে কী ছেলেমানুষ, কোন ইউটোপিয়ায় যে বাস করিস! গান তো একটা আর্ট, দিবারাত্র তা চর্চা করেও তোর অনুভূতিই বা এতো ভোঁতা হয় কি করে আমি জানি না। ডোন্ট ইউ রিয়্যালাইজ দ্যাট শিবনাথদা ইজ ইন লভ্‌ উইথ ইউ? কালো-ফর্সা ও সব কোনও ব্যপারই নয়। ইট ইজ নট এ সিম্পল কেস অফ ম্যাট্রিমোনিয়াল সিলেকশন।’

অপালা একদম চুপ করে গেল। দাদা তখনও বলে চলেছে— ‘লভ্‌ ইজ নট সো ইজিলি অ্যাভেলেবল্‌ অপু। আমি বুঝতে পারছি তোর দিক থেকে কোনও রেসপন্স নেই। কিন্তু সেটা ক্রমে ক্রমে আসবে। আসতে বাধ্য। দ্যাট শিবনাথ দত্তগুপ্ত হত্যা ডেপ্‌থ্‌ অফ ক্যারেকটার। তা ছাড়াও দীপালিরা তো মিশ্র, ব্রাহ্মণ, হঠাৎ এই ধরনের অসবর্ণ বিয়ের প্রস্তাবে ওরা কান দেবে কেন? ওরাও তো জেঠুর মতোই গোঁড়া। তোর কি কালো-টালো বলেছে বলে ভয় করছে? রাগ-টাগ হয়েছে?’

অপালা কিছুই বলল না। আসলে পরিকল্পনাটা মাথায় আসার পর সে মুক্তির আনন্দে আকাশে সাঁতার দিচ্ছিল। দাদা তাকে বাস্তবের মাটিতে আছড়ে ফেলে দিল। যা তার কাছে এতো সহজ এতো সুন্দর সমাধান মনে হচ্ছে তা কেন অন্যের কাছে এতো অসম্ভব মনে হয়? সে বিয়ে করতে চায় না, অথচ তাকে এরা জোর করে বিয়ের পিঁড়িতে বসাবেই। দীপুদি বিয়ে করতে চায়, এক্ষুনি হলে এক্ষুনি, অত যোগ্যতা, অত রূপগুণ থাকা সত্ত্বেও তার বিয়ে হবে না, হচ্ছে না।

সে বলল— ‘আমার জন্যে একটা কাজ করবি?’

—‘কি? তোর জন্যে তো একটার পর একটা কাজ করে যাচ্ছি?’

—‘আমি কদিন রোজ সোহমের বাড়ি যাবো। আমার ধারণা গান শুনলে ও ঠিক হয়ে যাবে। অন্তত আমার গান। বিয়ের আগের দিন পর্যন্ত।’

—‘সর্বনাশ! তুই কি সোহমকে ভালোবাসিস নাকি?’

—‘নিশ্চয়! আমি সোহমকে দারণ ভালোবাসি। এতো ভালোবাসি আগে জানতুম না।’

—‘তাহলে তো ব্যাপারটা খুব কমপ্লিকেটেড হয়ে গেল রে অপু!’

—‘না দাদা। তুই যা ভাবছিস, ঠিক তা নয়। সোহমকে আমি বন্ধুর মতো, এক পথের পথিকের মতো করে বোধহয় ভালোবাসি। কিন্তু ওকে ভালো করবার জন্যে যেটুকু আমার করা দরকার, সেটুকু আমায় করতে হবেই।’

প্রদ্যোৎ বলল— ‘অপু, তুই আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছিস। তুই অবশ্য বরাবরই ভেতরে ভেতরে জেদী ছিলি। কিন্তু যা করবার চুপচাপ করতিস। খুব বেশি নিয়ম ভাঙতিস না। এখন তো দেখছি তুই মরিয়া হয়ে গেছিস। কোত্থেকে তোর এই চেঞ্জটা এলো?’

অপালা বিষণ্ণ হেসে বলল— ‘তোরা কি ভেবেছিলি তোরা একটার পর একটা নিজেদের গড়া সিদ্ধান্ত আমার উপর চাপিয়ে দিবি। এমন কি একজন সম্পূর্ণ বাইরের ভদ্রলোকের ইচ্ছেটাকেও আমার ওপর জবরদস্তি করে চাপিয়ে দেওয়া হবে। তবু আমি বড় হবো না?’

প্রদ্যোৎ তার দিকে তাকিয়ে বলল— ‘ঠিক আছে দেখি আমি কি করতে পারি।’


সকাল সাড়ে নটা নাগাদ প্রতাপবাবুর টেলিফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। কটা দিন তিনি প্রায় সারাক্ষণই বাড়িতে আছেন।

—‘প্রতাপ চক্রবর্তী বলছি।’

—‘আমি প্রদ্যোৎ। অপালার দাদা।’

—‘ও আচ্ছা, আচ্ছা, বলো!’

—‘সোহম কেমন আছে?’

—‘সিডেশনে আছে তো! ঘোরটা কাটলেই আর বাড়ির কা