Tuesday, February 27, 2024
Homeছোট গল্পআঠারো কলার একটি - জগদীশ গুপ্ত

আঠারো কলার একটি – জগদীশ গুপ্ত

নাচনসাহা গ্রামনিবাসী বেণুকর মণ্ডলের কয়েক বিঘা জমি আছে, তা চষবার লাঙল এবং লাঙল টানবার বলদ আছে কারো কাছে কিছু পাওনা আছে, কারো কাছে কিছু ঋণ আছে গৃহসংলগ্ন খানিক পতিত জায়গা আছে–সেখানে বাসি-উনুনের ছাই ঢালা হয় স্তূপীকৃত ছাই বিছিয়ে দেয় আর মাটি খুঁড়ে শাক জন্মানো হয়—এটুকু শখ বেণুকরের আছে…

এ-সব ছাড়া তার স্ত্রী আছে, জানকী, আর আছে মনে একটা ক্ষোভ আর কেউ নেই, আর কিছু নেই।

বেণুকরের রূপও কিছু আছে, তবে জাঁকাল তেমন নয় এবং বুদ্ধিও কিছু আছে, তবে ধারাল তেমন নয়—তবে কৃষি-সংক্রান্ত ব্যাপারে এবং দেনা-পাওনার হিসাবে তার ভুল হয় না।

আবার এও উল্লেখযোগ্য যে, একটা দোষ তার আছে ভোরে তার ঘুম ভাঙে না, রোদ উঠলে ভাঙে।

বেণুকরের বয়স এই ছাব্বিশ চলছে–স্ত্রী জানকীর বয়স এই উনিশ। চার বছর হলো তারা বিবাহিত হয়েছে।

বিবাহিত জীবনের চার বছর সময়টা কম নয়—

মুহূর্তের পর মুহূর্ত অতীত হয়ে খুব ধীরে ধীরে সময়টা কাটছে। সুতরাং আশা করা যেতে পারে যে বেণুকরের সম্ভোগের ধারণায় একটা পরিচ্ছন্নতা আর আকাঙ্ক্ষায় একটা স্থৈর্য এসেছে। ভূষণহীন আটপৌরে অবস্থায় এসে জীবনের বহিরবয়বটা নিস্তরঙ্গ হয়ে চার বছর বিবাহিত জীবন যাপন করা হলো দেখে এমন একটা ধীরতা আর সন্তোষ মানুষের কাছে মানুষ আশা করে কিন্তু এটা করে পরের বেলায়, নিজের কথা নিজের মন জানো পারিবারিক শ্রান্তি ও জড়তাকে সংযম মনে করে মানুষ নিজের বেলায় ঐ ভুলটি করে করতে বাধ্য হয়…

কিন্তু মনের ভিতরটা আকুল হয়ে নিঃশব্দে ছটফট করলে তার বিরুদ্ধে বাধাটা কী! বলতে কি, বেণুকর মণ্ডল আকুল হয়েই থাকে এবং তার মনে একটি ক্ষোভ আছে।

বেণুকরের এই ক্ষোভের জন্ম কোথায় অনুসন্ধান করতে গেলে এই নিদারুণ সত্য বিস্মৃত হলে চলবে না যে, তারা চার বছর হলো বিবাহিত হয়েছে এবং অম্পায়ু মানুষের পক্ষে চারটি বছর খুবই দীর্ঘ সময়। সুতরাং খুবই দীর্ঘ চারটি বছরের অবিরাম সাহচর্যবশত স্ত্রীর ভঙ্গি আর গঠন যদি চোখের সামনে পুরনো হয়ে উঠতে থাকে তবে উপায় কী! প্রতিরোধ করবার উপায় মানুষ খোঁজে, কিন্তু পায় না। এই নিরুপায় অবস্থাটা বড়োই লোভের সৃষ্টি করে—বেণুকরের তাই করেছে।

জানকীর বয়স এই উনিশা তার বয়স যখন পনেরো ছিল তখন হতে চার বছর ধরে উঠতে বসতে অষ্টপ্রহরের সঙ্গিনী রূপে স্বামী বেণুকরের জীবনে সে পরিব্যাপ্ত হয়ে গেছে—কেবল ভাবের দিক দিয়ে নয়, কাজে-কর্মেও। জানকী চাষের কাজে, বলদ পালনে, শাক উৎপাদনে অনুকম্পা আর সহযোগিতা করে বেণুকরকে মুগ্ধ করেছে।

কিন্তু এই ক্রমাগত সহযোগিতার ফলেই যদি পনেরো বছরের স্ত্রীকে, চার বছর পরে উনিশ বছরে একটু স্তিমিত আর দূরবর্তী বলে বেণুকরের মনে হয় তবে তাকে ক্ষমা করা যেতে পারে— সেটা তার অনন্যসাধারণ বিকৃত মনের অপরাধ না-ও হতে পারে মানুষ মাত্রেই মনে-মনে স্বভাবতই অধার্মিক এবং মানুষ মাত্রেরই স্নায়ুরোগ ভিতরে থাকেই—এটাই তার কারণ পনেরো বছরের প্রথম পদক্ষেপ শুরু হয়ে উনিশ বছরে উপনীত হতে যেসময়টা কেটেছে তা আয়ুকে ক্ষয় করেছে, কিছু দান করেছে, কিছু অপহরণ করেছে বেণুকর তা গ্রাহ্য করে না কিন্তু মদিরায়। অজানা জিনিসের ভেজাল মিশিয়ে তাকে হীনবল করে দিয়েছে এইটাই বড়ো সাংঘাতিক বেণুকরের মনে ওতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের এই ক্ষোভটি সাংঘাতিক এবং তা না। জন্মালে যৌবনের ওপর নূতন নূতন সজ্জা-প্রসাধনের প্রয়োজন হতো না—কটাক্ষ-কৌশল বিলুপ্ত হয়ে যেতো। তার ওপর, এই চার বছর ধরে যে যৌবনোদ্দামতাকে একমাত্র জানকীরই নিজস্ব শক্তি, অর্থাৎ টেনে রাখবার কলাময় রঞ্জু বলে বেণুকরের মনে হতো, তা যেন এখন আর হয় না। বেণুকরের মনে ক্ষোভ আছে বলা হয়েছে, সেই ক্ষোভের উৎপত্তি ঐখানো জানকীর রক্তাধর আর শুভ্র দশন তেমনি চমৎকারই আছে—দেহের নিবিড়তাও তেমনি অশেষ—কিন্তু ঐ পর্যন্তই আর এমন কিছুরই উদ্ভাবন সেখানে নেই যার নাম দেওয়া যায় লীলাময়িত্ব, আর যা তাকে নিত্যই নূতন করে তুলবে এবং বেণুকরের লুব্ধতা আর প্রীতি আর আকর্ষণ এবং তারপরে তৃপ্তির আর অন্ত থাকবে না।

শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল এই কথাটাই যে, স্ত্রীর পক্ষ হতে মানসিক একটা সুজনলীলা—রূপের পর। রূপের আবর্তন আর রসের অন্তে রসের উদ্ভব দেখবার জন্য লাঙল আর বলদের মালিক চাষী গৃহস্থ বেণুকর মোড়ল লালায়িত হয়ে উঠেছে। তার মনে হয়, দূর, একঘেয়ে আর ভালো লাগে না।

জানকী রাঁধে যেমন সুন্দর, গোছালও তেমনি, আর দ্রুত কাজ সারতেও তেমনি পটু। সে জানে সবই—সুচ হাঁটিয়ে ছেড়া কাপড় সূক্ষ্মভাবে রিপু করতে যেমন জানে, তেমনি জানে চেঁকি পাড়িয়ে চাল, চিড়ে প্রস্তুত করতে কিন্তু জানে না যে, বস্তু হিসেবে তার স্বকীয়তা এবং দর একটু কমে এসেছে—

আজ হঠাৎ তা জানা গেলো।

ঘর-দোর ঝাঁট দিয়ে সন্ধ্যা-প্রদীপ জ্বালবার পর কিছুক্ষণ গৃহবধূর হাতে কাজ থাকে না। চারদিকে তখন শাঁখ, ঘণ্টা বাজতে থাকে। মানুষ যখন বর্বর ছিল বাসস্থানকে সুরক্ষিত করতে শেখেনি, সন্ধ্যাকে বন্য জন্তুর ভয়ে ভয়ঙ্কর মনে হয়ে তখন ঐ প্রচুর ধাতব শব্দ উৎপন্ন করবার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু এখন বাজে আরতির সময় মন্দিরে। সে যাই হোক, এই সময়টা বিরামের সময়।

বেণুকরের গৃহেও এই সময়ে কর্মবিরতি দেখা দিয়েছে বসে বসে নিবিষ্টভাবে হুঁকো টানছে। আর জানকী অদূরে পা মেলে বসে আছে—উভয়েই নীরব। হুকো টানতে টানতে প্রদোষ অথচ শুভ এই সময়ে বেণুকরের দৈবাৎ মনে হলো, জীবনের মধুস্বাদে যে-অপরিমেয় নিবিড়তা ছিল তা যেন আর নেই—তৃষ্ণা যেন নিঃশেষ হয়ে মিটছে না—কে যেন দ্রাক্ষারসে জল ঢেলে দিয়েছে। …তার পূর্বোক্ত ক্ষোভটা অকস্মাৎ পূর্ণবেগে জেগে উঠল।

হুঁকো টানা বন্ধ করে বেণুকর আকাশের দিকে তাকাল—সেখানে কিছুই ছিলো না, কিছুই তার চোখে পড়ল না তেল ফুরিয়ে দীপের শিখা যখন নিবে আসে তখন একটা নিঃশব্দ হাহাকার যেন কোথায় ওঠে, মনে কি শিখায় তার ঠিক নেই…তেমনি একটা পরাজিত অশক্তের শোকের ছায়া যেন আকাশে রয়েছে, কিন্তু বেণুকর মণ্ডলের সে-চোখ নেই যে-চোখে আকাশের বর্ণ, ভাষা, গতি সচেতনভাবে প্রতিফলিত হয়। তবু সে খানিকক্ষণ আকাশের দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল…তারপর সে চোখ নামিয়ে তাকাল স্ত্রী জানকীর দিকে তাকিয়ে মলিনভাবে একটু হাসল, যেন একটা উদ্বেগ সে গোপন করতে চায়।

জানকী স্বামীর চোখের ওঠা-নামা লক্ষ করেছিল, জিগগেস করল, ‘কী?’

বেণুকর বলল, ‘কিছু না। তবে শুধোচ্ছিলাম একটা কথা।’

মিষ্ট কণ্ঠে জানকী বলল, ‘বলো শুনি।’

বেণুকর আবার একটু হাসল। তার ধারণা, হাসির দ্বারা তার পশ্চাদবর্তী কথার পথ সুগম হচ্ছে। তারপর বলল, ‘শুনি, মেয়েমানুষের আঠারো কলা—সত্যি নাকি?’

বক্তা কী বলতে চায় তা জানকী তৎক্ষণাৎ বুঝল, বলল, “সত্যি নয়। কলা আঠারো তো নয়ই, তার ঢের বেশি কেউ বলে ছত্রিশ, কেউ বলে চুয়ান্ন।’

দেখা গেলো, জানকী একদা যে কুড়ির ঘর পর্যন্ত নামতা কণ্ঠস্থ করেছিল তা সে বিস্মৃত হয়নি। বেণুকর বিস্মিত হলো, কয়েকবার হুকো টেনে বলল, ‘এতো? কিন্তু তোর তো তার একটাও দেখিনে!’

‘তা আশ্চর্য কী এমন! দেখাইনে তাই দেখো না!’

বেণুকর চুপ করে রইল। একটা মানুষ যা দেখাতে পারে কিন্তু দেখায় না, সেটাকে দেখাও বলে তার কাছে আবদার করা যেতে পারে কিন্তু আবদার করে, আদায় করার মতো জিনিস স্ত্রীলোকের কলা নয়—সংখ্যা তা যতোই হোক।

জানকী জিগগেস করল, ‘কার ঢঙ দেখে ভালো লেগেছে?না কেউ সুর ধরিয়ে দিয়েছে?’

বেণুকর বলিল, ‘তা সব কিছু নয়। অমনি মনে হলো, বললাম।’

‘দেখবে?’

বেণুকর এবার লজ্জা পেলো। মনে মনে যার অভাব অনুভব করে বেণুকর ভূষিত হয়ে উঠেছিল, সেই জিনিসটা দিতে চাইতেই ব্যাপার কেমন বেখাপ্পা হয়ে উঠলা…উদ্দেশ্য প্রচ্ছন্ন থাকে বলে যে-দান অমূল্য করে পাওয়া হয়, তা জানিয়ে-শুনিয়ে দিতে গেলে ভালো লাগে না— কেমন লাগে তা ভাবাই যায় না।

বেণুকর হুকো রেখে মুখ নামিয়ে রইল—

জানকী বলল, ‘চাষার ঘরে কলা! আচ্ছা দেখাব।’

শুনে বেণুকর খুব অপদস্থ হয়ে মুখ ফিরিয়ে প্রস্থান করল।

বৈশাখের শেষ। বৃষ্টিতে মাটি একটু ভিজলেই চাষের কাজ শুরু করা যায়, কিন্তু মেঘের দেখা নেই। বৃষ্টির অভাব দারুণ দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে—এমন সময় দেবতা একদিন দয়া করলেন—তুমুল গর্জন করে একদিন বিকালে মেঘবারি বর্ষণ করল। জল প্রচুর নয়, তবে সূত্রপাত হিসেবে আশাপ্রদ—কৃষিজীবীরা আনন্দিত হয়ে উঠল—মাঠে এবার লাঙল চলবে।

বেণুকর বলল, ‘যাক বৃষ্টি তো হলো।’

জানকী বলল, ‘এবার আমায় ছেড়ে বলদের আদর হবে।’

বেণুকর বলল, ‘ধ্যেৎ।’

স্বর খানিক তিক্ত করে জানকী বলল, ‘ধ্যেৎ কেন?’

তারপর মনের কথাটা চেপে বলল, ‘কালই মাঠে বেরুতে হবে তো!’

‘হবেই তো।’

‘আগে চষবে কোন মাঠটা?’

চার বছর ধরে স্বামীর সঙ্গে কায়মনোবাক্যে সহযোগিতার ফলে জানকী তাদের সব জমিই চেনো

বেণুকর বলল, ‘পূবের মাঠে তিন কিত্যে এক লাগাও—তাতেই হাত দেবো আগে। দুদিন লাগবে দক্ষিণ দিকটা নামো কাজেই উত্তর থেকে লাঙল দিতে হবে। তবে তাড়াতাড়ি তেমন নেই।’ বলে ক্ষেত্ৰকৰ্ষণের ব্যবস্থা করে বেণুকর আকাশের দিকে চাইল—আকাশে মেঘের আনাগোনা রয়েছে।

পরদিন প্রত্যুষে নয়, সকাল বেলা, রোদ ওঠবার পর গুড় মুড়ি আর জল খেয়ে বেণুকর লাঙল আর বলদ নিয়ে, আর হুঁকো আর কলকে প্রভৃতি নিয়ে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে মাঠের উদ্দেশে বেরুচ্ছে, এমন সময় জানকী পিছু ডাকল বলল, ‘টানাকাঠির বাকসো নিয়েছ?’

বেণুকর ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এঃ, প্রথম দিনটাতেই পিছু ডেকে ফেললি! নিয়েছি।’

জানকী বলল, ‘ঘরের যুবতী বউ পিছু ডাকলে ভালো হয়।’

বেণুকর বলল, ‘ধ্যেৎ।’

‘ধ্যেৎ কেন? তারপর জানকী বলল, ‘কাঠির বাকসো মাটিতে নামিয়ে রেখো না, ভিজে উঠবো’।

বেণুকর বলল, “বেশ।’ বলে বেরিয়ে গেলো।

কিন্তু সেদিন দু-কিতার বেশি জমিতে লাঙল দেওয়া সম্ভব হলো না—রোদের তেজ খুব, আর অতিরিক্ত রোদ সহ্য করে তাড়াতাড়ি করবার দরকারও তেমন নেই।

খেতে বসে বেণুকর বলল, ‘দক্ষিণের খানা বাকি রইল কাল ওটা হলেই ও মাঠটা শেষ হয়।’

পরদিন সকালবেলা বেণুকর আবার মাঠে যাবে কিন্তু তার আগে অর্থাৎ খুব ভোরে জানকীকে শয্যা ত্যাগ করতে দেখা গেলো এবং তারপর আরও দেখা গেলো, ন্যাকড়ার একটা পুঁটুলি আর ধারাল একটা খুরপি নিয়ে সে পুবের মাঠের দিকে ছুটছে…

চাষের কাজে সে অবশ্যই যায়নি—গিয়েছে অন্য কাজে।—

সকালবেলা, সূর্যোদয়ের খানিক পরে, গুড়-মুড়ি আর জল খেয়ে বেণুকর আগের মতো মাঠে লাঙল দিতে এসেছে। রাত্রির গরমের পর গ্রীষ্মের প্রাতঃকাল ভারি স্নিগ্ধ লাগায় বেণুকর সানন্দে লাঙলে বলদ জুড়লা পাচনখানা বাগিয়ে ধরে সে আল ছেড়ে খেতে নামল…

বলদ তার আদেশ বোঝে—চলে থামে তার কথায়। তার আদেশে বলদযুগল লাঙল টেনে চলতে শুরু করল…চতুষ্কোণ ক্ষেত্র বেড়ে লাঙল মন্থর গতিতে চলতে লাগল…লাঙলের জোরে নিচেকার শুষ্ক মাটি পিণ্ডের আকারে উৎপাটিত আর স্বতন্ত্র হয়ে লাঙলের ফালে খনিত মৃত্তিকার দু-পাশে যেন গজিয়ে উঠতে লাগল…দেখতে ভারি আরাম, যেন অপরূপ নূতন কিছুর সৃষ্টি হচ্ছে। বেণুকরের কৃষি-স্ফুর্তি বেড়ে গেলো।

কিন্তু তার কৃষি-স্ফুর্তি স্থায়ী হলো না। লাঙল দুবার ক্ষেত্রের চারকোণ বেড় ঘুরে এসে তৃতীয়বারের মাঝামাঝি আসতেই উন্মুলিত মাটির দিকে চেয়ে বেণুকর বিস্ময়ে একেবারে হতবাক হয়ে রইল…মাটি কেটে আর মাটি ওলোটপালোট করেই লাঙল এই পর্যন্ত এসেছে, কিন্তু ঠিক এই স্থানটিতে লাঙল কেবল নীচের মাটিই উপরে তোলেনি, মাটির নীচ থেকে আরো কিছু তুলেছে…লাঙলের ফালে আধ হাত আড়াই পোয়া মাটির ভেতর থেকে উঠেছে ফুল নয়, ফল নয়, শস্য নয়, শামুক নয়, কচ্ছপের ডিমও নয়, টাকার ঘাটিও নয়, জীবন্ত একটি মাগুর মাছ! কৃষিজীবী বেণুকর মণ্ডল কৃষিকর্ম, বলদ, লাঙল, খেত-খামার, ধান, কলাই, বৃষ্টি, বৈশাখ, ছায়া, রৌদ্র প্রভৃতি সমুদয় বিস্মৃত হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মাগুর মাছটির দিকে—অপূর্ব আবির্ভাব তা….দেড় পোয়া সাত ছটাক ওজনের জলবাসী মাছ মাটির ভিতরেও কেমন তরতাজা বলিষ্ঠ ছিল। কাত হয়ে কানে হেঁটে মাছটি খোঁড়া মাটির গুঁড়ো আর ঢেলার ভেতর দিয়েই চলবার চেষ্টা করছে।

মাগুরটির দিকে নিষ্পলক চক্ষে তাকিয়ে থেকে থেকে বিস্ময়ের পর বেণুকরের মনে জন্মাল। অনন্ত আনন্দ। এরই নাম অদৃষ্ট—ঈশ্বর যদি দেন তো ছাপ্পর ছুঁড়েই দেন, কথাটা সত্যি কিন্তু তার চাইতেও কল্যাণের কথা এই যে, ঈশ্বর যদি দেন তো মাটির ভিতর সজীব মাগুর মাছ রেখে দেনা ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র মানুষের প্রতিদিনের আহার ব্যাপারের দিকেও ব্রহ্মাণ্ডপতির কেমন নজর দেখো! তুচ্ছ বেণুকর আহার করবে বলে স্নেহবশত তিনি কী আশ্চর্য কাণ্ডই না ঘটিয়েছেন!

লাঙল, বলদ এবং কো-কলকে মাঠে রেখেই বেণুকর মাগুর মাছের মাথা আঙুলে চেপে ধরে আর স্নেহময় ব্রহ্মাণ্ডপতির প্রতি কৃতজ্ঞতায় উদ্বেলিত হয়ে বাড়ির দিকে দৌড়ল…

জানকী হয়তো বৈশাখের অখাদ্য বেগুন ভাজবার আর বড়ি-পোস্ত করবার আর আলু-কুমড়োর টক রাঁধবার কথা ভাবছে। আজ আর সে-সব কিছু নয়—আজ খালি মাগুর মাছের ঝোল আর ভাত—আর কিছু নয়। মাগুর মাছের মাথার চাইতে লেজই মিষ্ট বেশি…

পথে দেখা রাজীব হাজরার সঙ্গে–রাজীবের ইচ্ছা হলো, দাঁড়িয়ে দুটি কথা কয়, আর মাটি মাখা মাগুর মাছ হাতে করে বেণুকরের বাড়ির দিকে দৌড়োবার কারণটা কী তা জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু বেণুকর থামল না—

‘পেয়ে গেলাম দৈবাৎ–’, বলে রাজীবের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির জবাব দিয়ে সে তেমনি দ্রুতপদে অগ্রসর হয়ে গেলো।

পিছনে দুপদাপ শব্দ শুনে জানকী ঝাঁটা থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল–সে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিল চেয়ে দেখল, স্বামী অসময়ে বাড়ি এসেছেন, হাতে তাঁর তাজা মাগুর মাছ, আর মুখময় হাসি।

‘শোন এক তাজ্জব ব্যাপার!’ বলে শুরু করে বেণুকর মৎস্যপ্রাপ্তির ইতিহাস বলল—পরিশিষ্টে নীতি হিসেবে সে এটাও বলল যে ঈশ্বর যখন দেন তখন শুকনো মাটির ভিতর মাগুর মাছ রেখে দেন—খাওয়াবার উদ্দেশে। …তারপর অধিকতর পুলকের সঙ্গে বলল, নে মাছ রাখা এই মাছের ঝোল আর ভাত, আর কিছু না আজ।’

আদ্যন্ত শুনে জানকী প্রশ্ন করল, ‘মাছ কোথায় পেলে গো? দিব্যি মাছটি তো!’

প্রশ্নের জবাবে কথার সুরে আদর ঢেলে বেণুকর বলল, ‘শুনলি কী তবে এতক্ষণ! মাঠে লাঙল দিচ্ছি—হঠাৎ দেখি, মাটির ভেতর থেকে উঠেছে লাঙলের মাটির সঙ্গে এই মাছ!’ বলে সে চোখ বড়ো করে তাকিয়ে রইল।

কিন্তু জানকী এই কথা শুনে বলল, ‘মিছে কথা।’

‘মিছে কথা! তোর দিব্যি, ভগবানের দিব্যি।’

‘তবে রাখো এই হাঁড়ির ভেতর—খানিক জল দিয়ে রাখো।‘

হাঁড়ির ভেতর জল দিয়ে মাগুর মাছ তখনকার মতো জিইয়ে রাখা হলো স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি পরম সহানুভূতির সঙ্গে জল পেয়ে মাছ ক্রীড়াশীল হয়ে উঠেছে—সেই দিকে তাকিয়ে বেণুকর বলল, ‘আজ এই মাছের ঝোল আর ভাত খাবো। সকাল-সকাল ফিরব মাঠ থেকে।’ বলে বেণুকর মাঠের উদ্দেশ্যে ফিরে দাঁড়াল।

যেতে যেতে দরজায় দাঁড়িয়ে হেসে বলল, ‘কী অদেষ্ট দেখ।’

জানকী বলল, ‘হুঁ।’

জানকীর সকাল-সকাল রান্না শেষ হয়েছে। বেণুকরও সকাল-সকাল মাঠ হতে ফিরেছে। — বলল, ‘চান করতে চললাম। ভাত বাড়ো।’

জানকী বলল, ‘বেশ এসো গে।’

মাগুর মাছের ঝোল খাবার ব্যগ্রতায় বেণুকর ষোলো আনা আরাম আদায় করে স্নান করতে পারল না—পুকুরের জলে তাড়াতাড়ি দুটো ডুব দিয়ে সে উঠে পড়ল…

তার ফিরবার সাড়া পেয়ে জানকী জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাত বাড়ব?”

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কাপড় ছাড়ছি।’

কাপড় ছেড়ে এসে বেণুকর পিঁড়িতে বসল বলল, ‘আন দেখি।’

জানকী থালায় দিলো ভাত আর বাটিতে দিলো ঝোল।

বেণুকর ঝোলের দিকে চেয়ে বলল, ‘আবার হিঞ্চের ঝোল করেছিস কেন? তোর বড়ো রান্নার শখ।’

জানকী প্রশংসা পেয়েও কথা কইল না—

বেণুকর শাকের ঝোল মেখে বাড়া-ভাতের চার ভাগের এক ভাগ খেয়ে তিন ভাগ রেখে দিলো মাগুর মাছের ঝোলের জন্য বলল, ‘মাছ দে।’

মাঠের মাটির ভেতর মাগুর মাছ পেয়ে বেণুকর যতোই বিস্মিত হোক, দিশেহারা হয়নি–সে বিস্ময়ের অন্ত ছিল, তাতে তার মস্তিষ্কের পরিস্থিতি একেবারে নষ্ট হয়নি কিন্তু মাছ চাওয়ার পর জানকীর কথায় তার যে বিস্ময় জন্মাল সে-বিস্ময়ের সীমা-পরিসীমা মাপ-পরিমাপ ওজন-আধার কিছুই যেন নেই…তা এতোই বেশি! জানকী স্পষ্ট বলল, ‘মাছ কোথায় পাবো?

বেণুকর জন্মাবধি ঠাট্টা বোঝে না বুঝলে কথাটাকে ঠাট্টা মনে করতে পারত—বিস্ময় দুঃসহ হয়ে তার মাথা এমন ঘুরে উঠত না।

শরীর খাড়া করে বেণুকর বলল, “মাছ কোথায় পাবি? যে-মাছ এনে দিলাম তখন, তা কী হলো?’

‘মাছ তুমি কখন আনলে?’

‘মাছ আমি কখন আনলাম? মাছ আনিনি? কুকুর-বেড়াল দিয়ে খাইয়েছিস বুঝি?’

‘নেও, এখন থামো। আর একটু শাক-ঝোল দেই, খেয়ে ফেলো ভাত ক’টি আর খ্যাপামি করো না মাছ-মাছ করে।’

‘খ্যাপামি করব না মাছ-মাছ করে? দে বলছি মাছের ঝোল শিগগির, নইলে ভালো হবে না’ বলে বেণুকর চোখ দুটো এমন লাল করে তুলল যে, তার সম্মুখে প্রতিবাদ আর না চলবারই কথা

কিন্তু জানকী বলল, ‘মন্দই বা কী করতে পারো মিছিমিছি?

মন্দই বা কী করতে পারি মিছিমিছি? এখনও বলছি ভালো ভাবে—রাগাস নে বেশি…’

‘মাছ কোথায় পাবো যে তোমায় ঝোল বেঁধে খাওয়াব? কী মুশকিলেই ফেললে তুমি আমাকে!’

কী মুশকিলেই ফেললাম তোকে, তবে দেখ মুশকিল কাকে বলে।’ বলে বেণুকর এঁটো হাত বাড়িয়ে জানকীর চুল ধরতে যেতেই, তাতেই স্বামীর সেই যৎসামান্য প্রচেষ্টাতেই, ভয় পেয়ে জানকী এমন চিৎকার করল যে, বেণুকরই চমকিয়ে হাত টেনে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।

আশেপাশে অনেক লোক বাস করে—

বিপন্না প্রতিবেশিনীর আর্তনাদ শুনে তাদের তিন-চার জন দৌড়ে এলো…

‘মোড়ল রয়েছ? কী হলে ম’ল্যান?’—প্রবীণ নধরগোপাল চৌধুরী উঠোন হতে প্রশ্ন করে এগুতে লাগল।

নধগোপাল চৌধুরী উকিলের মুহুরি ছিল। বৃত্তির পয়সা চুরি করে একবার এবং উকিলের টাকার হিসেব মিলোতে না পেরেও চোখ গরম করায় আর-একবার মার খেয়ে গ্রামে এসে বসেছে। নম্বরের এক ছেলে কলকাতায় এক দোকানে বেচা-কেনার কাজ করে। ভয়ঙ্কর আদালতের ভয়াবহ জটিল সব ব্যাপার তার কাছে জলের মতো পরিষ্কার, এই জন্যে এবং ছেলের মারফৎ কলকাতার আভিজাত্যের সঙ্গে সংযুক্ত বলে নধরের গ্রামে প্রতিপত্তি খুব বিবাদের মীমাংসায় কর্তা সাজতে তার যেমন আনন্দ, তেমন আর কিছুতেই নয়…

এই নধর চৌধুরী বেণুকর এবং জানকীকে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছে ব্যাপার কী—

কিন্তু রান্নাঘরের ভেতর থেকে বেণুকরের কোনো জবাব আসল না—জবাব দিলো জানকী বলল! ‘আমাকে অনর্থক মারতে উঠেছে।’

‘কেন?’ বলে নধর চৌধুরী প্রভৃতি বেণুকরের রান্নাঘরের সম্মুখে এসে দাঁড়াল…

জানকী মাথার কাপড় একটু টেনে দিলে। বলল, ‘শোনো তোমরা ওকে শুধিয়ে। কী বলছে সব আবোল-তাবোল মাছ-মাছ করে।’

বেণুকর বলল, ‘কী বলছি সব আবোল-তাবোল মাছ-মাছ করে?…শোনো নধরদা, সক্কাল বেলা গেলুম মাঠে লাঙল দিতো দু-বেড় চষতেই দেখি, একটা মাগুর মাছ, এতো বড়ো তাজা মাগুরটা—মাটির ভিতর থেকে উঠে পড়ছে।‘

বিবাদের বিষয়ের জটিলতা দেখে নধর পুলকিত হলো বলল, ‘আচ্ছা। মাটির ভেতর মাগুর মাছ! তারপর?’ বলতেই তার দৃষ্টি বিচারকের দৃষ্টির মতো সূক্ষ্ম হয়ে উঠল।

বাদী বেণুকর বলতে লাগল, ‘ছুটে এলুম ঘরে। বললাম, এই মাছের ঝোল আর ভাত খাবো আজ রাঁধ ভালো করে বলে মাছ ঐ হাঁড়িতে জল দিয়ে রেখে গেলুম আবার মাঠে। …চান করে খেতে বসলাম—দিলো হিঞ্চে শাকের ঝোল খালি। রাগ হয় না মানুষের?’

প্রতিবাদিনী জানকী বলল, ‘শুনলে লোকের কথা! মাছ নাকি এনে দিয়েছে!’

বিচারক নধর চৌধুরী উভয় পক্ষের বাদ-প্রতিবাদ শুনে বলল, ‘বেণু, ভাই, ঠাণ্ডা হও। মাঠের জল শুকিয়েছে কার্তিক মাসে এটা হচ্ছে গিয়ে বোশেখ। মাটির ভেতর মাগুর মাছ তো তাজা কি মরা কোনো অবস্থাতেই থাকতে পারে না।’

‘বললেই হলো থাকতে পারে না! আমি দেখলাম, পেলাম, হাতে করে বাড়ি নিয়ে এলাম—আর তুমি পঞ্চায়েতি করে বলে দিলে আন্দাজের ওপর, থাকতে পারে না!’

সকলে হাসতে লাগল। কালীপদ বলল, ‘মাথা বিগড়েছে।’

জানকী বলল, ‘সেই মাছের ঝোল রাঁধিনি বলে আমায় মারতে উঠেছে।’

‘মারবই তো।’ বলে বেণুকর পুনরায় রুখে উঠতেই কালীপদ প্রভৃতি রান্নাঘরে ঢুকে তাকে ধরে ফেলল।

নধর চৌধুরী বলল, ‘অকারণে মারধোর করো না, বাপু! মাছ তুমি পাওনি। অসম্ভব কথা বললে চলবে কেন? আদালতে এ-কথা টিকবে না। …দেখি চোখ।’ বলে নজর করে বেণুকরের চোখ দেখে নধর চৌধুরী বলল, ‘লাল হয়েছে।’

গুণময় পাল বলল, ‘শুনছ, বেণুকর, হাত ধুয়ে ঠাণ্ডা জায়গায় একটু বসো।–এখুনি সেরে যাবে। বোশেখের রোদ হঠাৎ মাথায় লাগলে চোখে অমন সব ভ্রম লোকে দেখে। সেবার আমারই হয়েছিল অমনি। মাঠ থেকে ফিরছি ঠিক দুপুরবেলা লাঙল আর গোরু দুটো নিয়ে, কিন্তু মনে হচ্ছে, গোরু যেন দুটো নয়, চারটে।’ বলতে বলতে গুণময়ই ঘটিতে করে জল এনে বেণুকরের হাত ধুয়েই তাকে ঠাণ্ডা জায়গায় বসিয়ে দিলো জানকীকে বলল, ভয় নেই, ভালো হয়ে যাবে।’

বেণুকর একবারে নিবে শেষ হয়ে গেলো—তার তখন প্রায় অচেতন অবস্থা…

বারান্দায় সে ঘাড় গুঁজে বসে রইল—হাত নেড়ে জানাল, তোমরা এখন যাও।

প্রতিবেশীগণ বেরিয়ে গেলো—

হিতসাধকগণের অগ্রণী নধর চৌধুরী বলে গেলো, “আর যেন চেঁচামেচি শুনিনে।’

খানিক চুপ করে থেকে জানকী একটু হাসল তারপর বলল, “আঠারো কলা দেখতে চেয়েছিলে! এ তারই একটি …রাগ করে না, তোমার পায়ে ধরি।’ বলে জানকী সত্যই স্বামীর পা ধরে বলল, ‘মাগুর মাছের ঝোল বেঁধেছি। এসো খেতে দি’গে।’

বেণুকর উঠে খেতে গেলো, কিন্তু রাগের জ্বালায় কথা কইল না।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments