Tuesday, February 27, 2024
Homeউপন্যাসআগুনপাখি - হাসান আজিজুল হক

আগুনপাখি – হাসান আজিজুল হক

Table of contents

ভূমিকা

সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় একটি নাম হাসান আজিজুল হক। ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্ধমান জেলার যুবগ্রামে তার জন্ম। অধ্যাপনার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘকাল জুড়ে চলেছে তাঁর সৃষ্টির কাজ, অবিস্মরণীয় অনেক গল্পের স্রষ্টা তিনি। গল্প অনেক লিখেছেন, কিন্তু, রহস্যময় কোনো কারণে, উপন্যাস-লেখায় বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। প্রতিভাবান এই কথাসাহিত্যিক এ-বইটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকসমাজের উৎসুক প্রতীক্ষার যেন অবসান হলো, আমাদের হাতে এসে পৌঁছল হাসান আজিজুল হকের হৃদয়স্পর্শী এই উপন্যাস আগুনপাখি।

০১. ভাই কাকালে পুঁটুলি হলো

আমার মায়ের য্যাকন মিত্যু হলো আমার বয়েস ত্যাকন আট-ল বছর হবে। ভাইটোর বয়েস দেড়-দু বছর। এই দুই ভাই-বুনকে অকূলে ভাসিয়ে মা আমার চোখ বুজল। ত্যাকনকার দিনে কে যি কিসে মরত ধরবার বাগ ছিল না। এত রোগের নামও ত্যাকন জানত না লোকে। ডাক্তার-বদ্যিও ছিল না তেমন। মরবার আগে মুখে যেদি ওষুধ পড়ত, তাই কতো! পেরায় পিতি বছর কলেরা-বসন্তেই কতো যি লোক মরত, তার সীমাসংখ্যা নাই। আমার মা যি কলেরা-বসন্তে না মরে অজানা কি একটো রোগে মারা গেল তাই কত ভাগ্যি!

মায়ের মত আমার পষ্ট মনে পড়ে। এক বাদলের রাত-দোপরে জান গেল। কদবার পয্যন্ত লোক নাই। বাপজি দখিন-দুয়ারি ঘরের উসারায় গালে হাত দিয়ে বসে থাকলে। তার এক খালা ছিল, আমি দাদি বলতম–সেই দাদি এসে সব দেখাশোনা করলে। আমার মনে আছে–ঘরে জ্বলছে রেড়ির ত্যালের পিদিম, দেড় বছরের ভাই ঘুমিয়ে আছে অঘোরে, গায়ে একটো কাঁথা চাপানো। মাঝে মাঝে ঘরে ঢুকছে বাদুলে হাওয়া। পিদিম নেবে নেবে। তা সকাল না হলে তো করার কিছু নাই। মওতা সারা রাত অমনি করে থাকলে, একটো পুরনো শাড়ি চাপা দেওয়া, মুখ মাথা ঢাকা। মনে হছিল দুনিয়ায় আমাদের কেউ নাই। সবই ছিল আমাদের, তবু মনে হছিল।

মা মরার পরে ভাইটি সেই যি আমার কোলে উঠল আর তাকে নামাইতে পারলম না। যেখানে যাই, সে আমার কাকালে আছে। ইদিকে বাড়ি ফাঁকা, দেখার কেউ নাই। অতো বড় বাড়ি! উঁচু-উসারা-অয়লা দখিন-দুয়োরি ঘরটো ত্যাকন করা হয়েছে। তা বাদে বিরাট লম্বা এনে, তার দখিন মাথায় আর একটা বড় ঘর। ই ঘরটো উত্তর-দুয়োরি। ত্যাকন ঘরটো পড়ে থাকে। দখিন-দুয়োরি ঘরেই আমাদের ওঠা-বসা। বাপজি ঘরটো বানিয়েছিল খুব যত্ন করে। হোক মাটির–আমাদের দ্যাশের পেরায় সব বাড়িই তো মাটির ঘরটোর মাটির দেয়াল ছিল খুব চ্যাওড়া, খরানির কালে ঘর যেন ঠান্ডা হিম, ঢুকলেই জানটো একেবারে তর হয়ে যেত। ছাউনি খ্যাড়ের, গরম হবে কোথা থেকে? খ্যাড়ের চালের তলায় কাঠামো ছিল লোহার মতুন কালো কুচকুচে সারি তালকাঠের।

তা অ্যাকন আমি বাড়িতে দিনরাত থাকি কেমন করে? বাপজি দিনের বেলায় কততক্ষণই বা বাড়িতে থাকত! দখিন-দুয়োরি ঘরের উসারার ছামনেই আঁজির গাছ। ঐ পেয়ারাই, আমরা বলতম আঁজির। ই আঁজির গাছটো ঠিক যেন মাহারুহ, পেল্লায় বড়। পেয়ারা গাছ কুনোদিন অতো বড় হয় না। মণ মণ আঁজির হতে, ভেতরটা ছিল গোলাপি লাল আর মিষ্টি যেন গুড়। ভাইকে নিয়ে এই আঁজির গাছের তলাতেই দিন কেটে যেত। দখিন-দুয়োরি ঘরটোর ঠিক পেছনেই ছিল আর একটা ছোট ঘর। ঐ ঘরে থাকত আমার ঐ দাদি, বাপজির খালা। তিন কুলে কেউ নাই। সোয়ামি-ছেলেমেয়ে সব মরে-ঝরে যেয়ে দাদি একা। ছোট ঐ ঘরে সারাদিন খুটুর খুটুর করে বেড়াত। ঘরের ভেতরটা আঁদার, একটিমাত্র দরজা ঘরে ঢোকার লেগে, কুনোদিকে কুনো জানে নাই। ঘরের বাইরে উসারার এক পাশে একটো মাটির চুলো। রান্নাবাড়া সব ঐখানে। ঘরের ভেতরে শুদু হাঁড়ি সাজানো। কালো কালো হাঁড়ি, বড়-ছোট হিসেব করে একটোর ওপরে আর একটো বসানো। সার সার শুদু হাঁড়ি, অতো হাঁড়িতে কি যি থাকত কে জানে! একটো মোটে মানুষ, কি-ই বা থাকবে?

দাদি আমাকে খুব ভালোবাসত। আমিই বা আর কোথা যাই, ভাই-কোলে দাদির কাছে কাছেই থাকতম। বয়েস তো ত্যাকন অ্যানেকটোই হয়েছে, দাদির এটা-ওটা ফাইফরমাশ খাটতম। কিন্তুক ভাই কি কোল থেকে নামবে? সব সোমায় আমাকে আঁকড়ে ধরে আছে। কাকালে আমার ঘা হয়ে গেল। দাদি বুড়ি মানুষ। খুব ফরশা, মুখে বসন্তের দাগ। অমন মানুষ হয় না। ফল-পাকুড় যা পেত আমার হাতে তুলে দিত। পেরায়ই আমাকে বলত, আমার যা আছে সব তোকে দিয়ে যাব। কি-ই বা এমন ছিল তার? সেই দাদির দেওয়া বড় একটো কাঁসার জামবাটি এখনো আছে আমার কাছে। দাদির ঐ একমাত্র জিনিশ আজও টিকে আছে।

আমার বাপ দাদির ইসব দেওয়া-থোয়া তেমন পছন্দ করত না। খুব রাশভারি মানুষ ছিল, কাউকে তেমন গেরাহ্যি করত না। মাহা বেপদ হলেও কাউরি কাছে যেয়ে কিছুতেই কুনো ব্যাগোতা করত না। তাই বলে বাপজির কিন্তুক মেজাজ গরম ছিল না। বরং উল্টো, খুব আস্তে আস্তে তার কথা। হড়বড় করে কিছু বলত না কুনোদিন। তেমন একটো হাসত না, তবে ভেতরে ভেতরে মজা ছিল খুব কথায়। তা সি যা-ই হোক–কে এসে কি হাতে দেবে ছেলেমেয়ের, বাপজি তা তেমন ভালোবাসত না। তা বলে কি আপন খালার ওপর রাগ করবে? তা লয়।

দাদি পড়ে থাকত এক কোণে। এই গতর, মিশিমাখা দাঁত। দাঁতে দাঁত দিত যি! কুনো পাউডার ত্যাকন ছিল না। গায়ে-মাখা সাবান তা-ও ত্যাকন তেমন পাওয়া যেত না। দাদি কুনো গন্ধ কি কুনো বাস একটুও সইতে পারত না। বোধায় ফুলের গন্ধও নাকে গেলে থু থু করে থুতু ফেলত। কুনো ভালো গন্ধ কি কুনো বাস যেদি দাদির নাকের ছামনে ধরেছি মজা দেখার লেগে, দাদি অমনি কাপড় দিয়ে নাক চেপে ছুটে যেয়ে ঘরে ঢুকত। তা-বাদে শুকুইয়ের হাঁড়ি শুকে তবে তার ধড়ে জান আসত। এমন মানুষের ওপর কেউ কুনোদিন রাগ করতে পারে! আমরা দুই ভাই-বুন ছেলম তার জানের জান। বাপজি তাইলে তার খালাকে আর কি বলবে? সে তো নিজেই বুঝতে পারছে যি, সোংসার অচল হয়ে গেয়েছে। কে রাঁধে, কে খেয়ে দেয়? কে ঘর ঝাঁট দেয়? সব যি আঁদার। আমি নাইলে এট্টু বড় হয়েছি কিন্তুক ঐটুকু ভাইটিকে কে দেখে? কে লাওয়ায়, খাওয়ায়?

শেষতক বাপজিকে আবার বিয়ে করতে হলো। লতুন মা এল ঘরে। পাতলা কালো মেয়ে, আমার চেয়ে সাত বছর বড় হবে। মাথায় লম্বা কালো চুল, হেঁটোর নীচে পড়ছে। বড় বড় চোখদুটিতে ভারি মায়া। নিজের মা গেলে কি আর মা পাওয়া যায়! সি কথা সত্যি বটে। মা ফিরে প্যালম না ঠিকই, তবে মায়েরই মতুন আর সেই সাথে সখির মতুন একজনকে প্যালম। সংসারে আবার ছিরি ফিরল।

কিন্তুক ভাইটি আমাকে ছাড়লে, আঁকড়ে ধরে থাকলে। কোল থেকে তাকে আর নামাইতে পারি না। নতুন মা অ্যানেক চেষ্টা করলে ওকে কাছে টানতে। সে কিন্তুক হরগেজ আমাকে ছাড়বে না। খাবে আমার কাছে, শোবে আমার কাছে। আমার কাকালে সে যেন সব সোমায়ে একটো পুঁটুলি!

০২. বিছেনা ছেড়ে একদিন আর উঠলে না

দাদি আমার বাপজিকে একটুকুনি ভয়ই করত। যেদি কিছু খেতে দেবে, একটো লাড়ু, বাতাসা কি পাটালি কিংবা চিনির কদমা, আড়ালে ডেকে নিয়ে যেয়ে লুকিয়ে দিত। লতুন মা য্যাতোদিন ছিল না, বাপজি ত্যাতোটো খেয়াল করত না। সারাদিন বাড়িতেই থাকত না, তা খেয়াল করবে কি? লতুন মা এলে বাড়ি আবার ঠিকঠাক হলো, ঘর-দুয়ারে ঝট পড়তে লাগল, ঘরের মেজে-দেয়ালে আবার লাতা দেয়া হতে লাগল। লিয়ম ধরে রাঁধা-বাড়া চলল। সসাংসার আবার ঠিক হলে আমাদের হাতে দাদির দেওয়া খাবার-দাবার দেখলে বাপজি যেন অখুশি হতো। তবে ঠান্ডা মানুষ তো! য্যাতেই রাশভারি হোক, চ্যাঁচামেচি কুনোদিন করত না। কিন্তু তার অখুশির কথা বুক যেন ছাদা করে দিত। তা সহ্যি করা খুব কঠিন। আমি জানতম বলেই দাদিকে বলতম, সবকিছু আমাদের দিতে যাস ক্যানে দাদি?

তু যি আমার জান বুন। ই দুনিয়ায় আর থাকা কিসের লেগে? তিন কুলে আমার কেউ নাই। সোয়ামি নাই, পুত নাই, মেয়ে নাই, ভাই নাই। খালি তুই আছিস। আল্লা জানে, তুই আছিস তাই আমার দুনিয়ায় থাকা।

ই কথার কি কুনো জবাব আছে? দাদি যি বলত আমার যা আছে সব তোর–তা আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দ্যাখতম দাদির কি আছে। ঐ কেঁদাকাটা আঁদার ঘর আর কালো কালো মাটির হাঁড়ির সার আর তো কিছু দেখি নাই দাদির। তবে দাদি য্যাকন আমাকে বলত, আমার জানের জান, ত্যাকন বোঝতম দাদির জান আছে। ঐ একটো জিনিসই আছে, আর সেটা আমার। আঃ, হায়রে–সেই জানটো কি আমার।

একদিন ঠিক সকালবেলায়, কাক ত্যাকন ডেকেছে কি ডাকে নাই, আমি যেয়ে দেখি দাদি ত্যাকননা ওঠে নাই। আমকাঠের ভাঙা দুয়োরটো ঠেসানো। ভাবলম এমন তো কুনোদিন হয় না! দাদি ওঠে সুয্যি ওঠার আগে আঁদার থাকতে। ই কেমন কথা হলো? আমি যেয়ে দরজাটো ঠেলা দিয়ে খোললম। ঘর আঁদার। ঘরের ভেতরে কিছুই দেখা যেছে না। তাপর একটু একটু আবছা দেখলম খেজুরপাটির ওপর কাঁথার বিছেনায় দাদি শুয়ে আছে। কাছে গিয়ে ডাকলম, ঠ্যাললম, সাড়া দিলে না। ত্যাকন আমি চেঁচিয়ে কেঁদে ওঠলম। দাদি আর বিছেনা ছেড়ে উঠলে না। মরে কাঠ হয়ে আছে!

বাপজির খালা য্যাকন, ত্যাকন দাদির লিশ্চয় অ্যানেক বয়েস। তা কতে হবে? কে বলবে সি কথা? ত্যাকনকার দিনে লোকে নিজের বয়েস জানত না। মরা নিয়ে কারও কুনো ভাবনা ছিল না। মওত ত্যাকনকার জ্যান্ত মানুষের পেছু পেছু ঘুরে বেড়াত। বয়েসের কথা ভেবে আর কি হবে? তবে মনে হয়, অ্যানেক বয়েস হয়েছিল দাদির। চার-কুড়ি বছরেরও বেশি হবে।

দাদি চলে গেল যেন দুনিয়ার সব গাছের পাতা শুকিয়ে ঝরে গেল। আবার দাদি নিজেও কতোদিন বাদে শুকনো পাতার মতুনই কোথা হারিয়ে গেল! অ্যাকন আর কিছুই মনে পড়ে না। তবে বুকটোকে চিরলে সোনার পিতিমে আমার দাদিকে আজও দেখতে পাওয়া যাবে লিশ্চয়। কোথা দাদির কবর অ্যাকন আর কেউ জানে না। আমিও জানি না। অথচ আমি ঠিক জানতম কবরটো কোথা। কিন্তুক সি জায়গায় গেলেও অ্যাকন আর বলতে পারব না।

বাপজি ছেলেমেয়ে ঘর-সংসার কুনো কিছুকে যি ভালোবাসত তা চোখে দেখতে পাবার উপয় ছিল না। কুনোদিন বাপজির কোলে উঠেছি বলে মনে পড়ে না। গায়ে মাথায় হাত দিলে কি দুটো মিষ্টি কথা বললে, কখনো এমন দেখি নাই! কথাই তো বলত কম। মা য্যাকন গেল ত্যাকন তো আমি বেশ বড় হয়েছি–কই বাপজি তো একবারও কাঁদলে না, চোখ থেকে দু-ফোটা পানি ফেললে না? ত্যাকনকার ভাবই ছিল এইরকম। বউ মরলে কাদলে সেই পুরুষের খুব নিন্দে।

মনে পড়ে, ঘরের ভেতর ছেঁয়া-ছেঁয়া আঁদারে বাপজি খালি গায়ে খেতে বসেছে। পরনে শুদু একটো ধুতি পরা। বেরাট মানুষ, ফরশা ধপধপে গায়ের রঙ। বেরাট কাঁসার থালায় ঝিঙেশাল চালের ভাত, বড় বড় কঁসার বাটিতে নানারকম তরকারি। মাছ-গোশতো ত্যাতে লয় কিন্তুক। সব শ্যাষে জামবাটি ভরা ঘন দুধ, কলা আর আখের গুড়। বাপজির গায়ের বলও ছিল তেমনি। এই নিয়ে গাঁয়ে গাঁয়ে কতো গপ্পো! অত বল, কিন্তুক কুনোদিন একটি লোকের গায়ে হাত তোলে নাই। জেনে-শুনে একটি পিপড়ের ক্ষেতিও করে নাই। কুনোদিন কুনো মানুষকে একটো অকথা-কুকথাও বলে নাই। তবু কত যি কথা ছিল তাকে নিয়ে। একবার একটো আখমাড়াইয়ের কল দশজনা মিলে সরাইতে পারছে না। যিখানে আখমাড়াই হবে, সাল হবে, গুড় উঠবেসি তত বছরের একটো উচ্ছবই বটে–কলটোকে গরুর গাড়িতে তুলে সিখানে নিয়ে যেতে হবে। ঐ কল পুরোটা লোহা দিয়ে তৈরি। চার ধারে শুদু চারটে শালকাঠের পায়া। দশজনায় সি কলটোকে কিছুতেই জুৎ করতে পারছে না। দেখতে দেখতে বাপজির কি যি হলো, আস্তে আস্তে বললে, সন্ দিকিনি তোরা। এই বলে একাই সেই লোহার কল সাপুটে ধরে মাটি থেকে চাগিয়ে তুলে ফেললে। এই আচ্চয্যির কথা এখনো সবাই বলে।

ইদিকে ল্যাখাপড়া জানা মানুষ–বাংলা জানত, ফারসি জানত। গাঁয়ে ত্যাকন পাঠশালা হয়েছে বটে কিন্তুক বাপজি কোথা থেকে ওসব শিখেছিল, তা জানি না। ল্যাখাপড়া শেখার লেগে ত্যাকনকার দিনের মানুষ কোথা কোথা সব চলে যেত। বাপজি-ও লিশ্চয় কোথাও যেয়ে শিখেছিল ল্যাখাপড়া। ফারসি বয়েত বলত মাঝে মাঝে আর একটো বাংলা শুভঙ্করি বই লিখেছিল। ইসব অ্যানেকদিন দখিন-দুয়োরি ঘরের চ্যাঙরিতে টাঙানো ছিল। পরে আর দেখি নাই।

জমিজমা আমাদের বেশ ছিল। খাওয়া-পরার অভাব হতো না। কিন্তুক ঐ জমিই সব–আর কিছু নাই। কঠিন চুম না করলে কিছুই পাবার উপয় ত্যাকন ছিল না। জান-পরান দিয়ে খাটলে ভাতের অভাব নাই। নিজে খাও, গরিব-দুখিকে দাও। নুন আর মশলাপাতি ছাড়া কিছুই তো কিনতে হতো না। পরের কালে দেখলম কেরাসিন কয়লা আর মিলের শাড়ি কিনতে হতো।

আমাদের ছেলেবেলায় ধুতি আর শাড়িও কিন্তুক তাঁতিবাড়িতে কিনতে পাওয়া যেত। ই কথার মানে হচে, কম-বেশি জমি যার আছে তার সব আছে, তার আর কুনো ভাবনা নাই। সবরকম আনাজপাতি, চাল-গম-আটা, তেল-ডাল-গুড়, মিষ্টি-দুধ-দই-ছানা কিছুর অভাব নাই। তবে গরিবের অভাব সব কালে। জমি-জিরেত না থাকলে উপোস না করে কি উপয়? তবে একটা কথা না খাটতে পারলে তোমার শত জমিজমা থেকে কিন্তু কিছু পাবে না। তা তুমি নিজেই খাটো কি মুনিষ-মাহিন্দার খাটাও।

বাপজি সব কাজ জানত। এমন কাজের লোক আমি জেবনে দেখি নাই। ই কি আচ্চয্যি–হ্যানো কুনো কাজ নাই যা বাপজি পারত না। চাষবাসের য্যাতো কাজ, জমি চষা, রোয়া, নিড়ননা, ধান কাটা, গম কাটা, ঝাড়া, মরাই তৈরি করা, ইসব কাজ তো বটেই, জাল বোনা, মাছ ধরা, বাঁশের কাজ, কাঠের কাজ–বিশ্বসসাংসারের সব কাজ তার জানা ছিল। তা বলে সব কাজ কি নিজে নিজে করত, তা লয়। বরঞ্চ আয়েশিই ছিল খানিকটা। ডালপালায় বড় বংশ, আদ্দেকটো গাঁই আমাদের জ্ঞাতিগুষ্টি ভাই-ভায়াদে ভরা। আর তেমনি দাপট। জমিসম্পত্তি বিস্তর। বড় বড় পুকুর, দিঘি ইসব ছিল। সব জমি চাষ হতো না, পড়ে থাকত। গরু-মোষ চরার লেগে জমি, ভাগাড়ের লেগে আলাদা জমি সব ছিল।

বাপজির ভাইদের সব আলো আলেদা সংসার, আলো আলেদা বাড়ি। দলিজ খামার সব আলেদা ইয়াদের মধ্যে বাপজির বড় ভাই, আমাদের দেড়েল চাচার কুনো সংসার-ছেলেমেয়ে ছিল না। তার কি নোম্বা-চওড়া চেহারা! ভয়ে মুখের দিকে চাইতে পারতম না। মুখভত্তি সফেদ পাকা দাড়ি নাভির নীচে এসে পড়ত আৰু তেমনি ঘের সেই দাড়ির। চোখ আর কপাল বাদ দিলে মুখের! কুনো জায়গা বাদ ছিল না আর তেমনি ঘন নোম্বা গোঁফ। হাঁ-মুখটা দেখতেই পাওয়া যেত। বাঘের মতুন গলার আওয়াজ। আমরা ভেজা দুরের কথা, গাঁয়ের কুনো মানুষ তার ছামুতে দাঁড়াইতে পারত না। তা দেড়েল চাচাও কম কথার মানুষ, চিৎকার চ্যাঁচামেচি কুনোদিন করে নাই। বুজুর্গ মানুষ, কটো পুঁথিও লিকিনি লিখেছিল। তাকে আমরা দেড়েল চাচা কলতম ক্যানে? চাচা য্যাকন পেশাব করতে বসন্ত, দাড়ি এসে পড়ত ডুয়ে। সেই লেগে দু-হাতে দাড়ি গোছ করে ধরে ডান বগলে ভরে তবে পেশাব করতে বসতে পারত।

দেড়েল চাচা কুনোদিন বাড়িতে ঢুকত না। বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে মসিদ দিঘির দখিন পাড়ে আমাদের দলিজ ছিল। সেই দলিজেই থাকত চাচা। দলিজটো উত্তফ্র-দক্ষিণে নোম্বা। মাটির দেয়াল আর টিনের চাল। তাতে তিটো ঘর। দখিন দিকের ঘরটো এমনি পড়ে থাকত। বাকি ঘরটোয় মেহমান কিংবা বিদেশী কেউ এলে থাকতা; আর উত্তর দিকের ঘরটোয় থাকত দেড়েল চাচা। একটো তক্তপোেশ”চাচার বিছেনা, বালিশ। এক পাশে কাঠের চৌপাইয়ের ওপর ফরসিকো। ইয়া নোম্বা তার নল। ভুরভুরে গন্ধময়লা অম্বুরি তামুক দিয়ে কঙ্কে সাজিয়ে আগুন ধরিয়ে সেই ফরসি দেওয়া হতো দেড়েল চাচার হাতে। দেড়েল চাচা রাত-দিন ভুরুক ভুরুক তামুক টানত, ম-ম গন্ধোয় ভরে যেত খানকা। খানকার বাঁ দিকে বেরাট মসিদ দিঘি, তার পচ্চিম-পাড়ে ভাঙা কিন্তুক পাকা মসিদ। পুবদিকটো একদম খোলা। বাঁ দিকে খানিকটা দূরে খাঁ-দের খামারের ঘরদুয়োর খানিকটো দেখা যেত।

ঘরের ভেতর পুবমুখো বসে দেড়েল চাচা ফরসিতে তামুক টানছে। দোপরবেলায় দস্তরখানা কাঁধে ফেলে খাঞ্চা করে ভাত-তরকারি নিয়ে যেছে আব্যশ চাকর। রেতে খাবার নিয়ে যেচে ঐ আব্যশই। দিনে-রেতে আর কুনো লোকই চাচার কাছ ঘেঁসতে সাহস পেত না। সি একটু কেমন বেপার না? আবার কথা শোনো। ক ক রোদে কাকপক্ষী নাই, গরম হাওয়ায় ধুলোয় দম আটকিয়ে যায়, এমন সোমায় কোন্ গাঁয়ের কোন্ বেল্লিক ছাতা মাথায় দিয়ে দলিজের ছামনে দিয়ে যেছে। দেড়েল চাচা শুদু হেঁকে উঠলে, কে? কে যায়? আবশ, ধরে নিয়ে আয় তো! দেখি কোন্ লায়েক ছাতা মাথায় আমার খানকার সামনে দিয়ে যায়। বেয়াদপ!

আর বলতে হতো না, ছাতামাতা গুটিয়ে সি লোক তো ভয়ে কাপতে শুরু করত। লোকে বলত, আমাদের দেড়েল চাচা কামেল মানুষ ছিল। কেউ বলত, দু-দুটো জিন তার ফরমাশ খাটত। আমরা সিসব জানি না। তার ছামনে পড়তম না কিছুতেই। দেড়েল চাচার মওত হলে ঐ দলিজের উত্তর দিকেই পুকুরের পাড়ে তার মাটি হয়েছিল। কেন যে গোরস্থানে হয় নাই তা আমরা কেউ জানি না।

যাকগো, ভাই-বেরাদরে বিরাট এই বংশ। কাউরির সাহস ছিল না একটো কথা বলে। কিন্তু বাপজি নিজে কাউরির সাথে মাখামাখি পছন্দ করত না। ভাই, চাচাতো ভাইদের সাথেও না। মা মরার পরে বিয়ে আবার করলে বটে তবে ঐ একলা স্বভাবটা ঠিকই রইল। বিয়ের কিছুদিন পর লতুন মায়ের প্যাটে আবার একটো ভাই হলো আমাদের। তারপরে হয়েছিল আরও তিন বুন। লতুন মায়ের মতুন ভালো মানুষ দুনিয়ায় দেখা যাবে না। সব দিকে নজর তার। তবে সবচাইতে বেশি নজর আমার আর আমার ছোট ভাইটোর দিকে, তার পরে তার নিজের ছেলেমেয়ে। কালোপানা মানুষটির চেহারা-ছবি যেন পটে আঁকা। আর কি যি তার হাতের গুণ! ঐ হাতের রাঁধা যে একবার খেয়েছে, সে কুনোদিন ভুলতে পারবে না। মাটির ঘরের দেয়াল কেমন করে যি লেপত, সি আর কেউ পারবে না। গরুর গাড়ি করে লাল মাটি আনিয়ে রাখত এরোলের মাঠ থেকে। সেই মাটি দিয়ে ছোট ছোট ম্যাঘের গায়ে ম্যাঘের মতুন দেয়াল লেপত। ঠিক যেন লাল কোদালে কুড়ুলে ম্যাঘের আসমান।

লতুন মায়ের খোঁকাটি জন্মানোর পরেই দু-কোশ দূরের আমার নানার বাড়ির গাঁ থেকে মামুরা এসে বললে, এক মেয়ে এক ছেলে রেখে আমাদের বুন মরতে না মরতে দামাদ-ভাই আবার বিয়ে করেছে। সি ভালো কথা, লতুন খোঁকার জন্ম হয়েছে, সি-ও ভালো কথা, তবে আমরা আমাদের ভাগ্নেকে নিয়ে যাব, তাকে মানুষ করব। ভাগ্নিটো এখানে থাক্। তার মানে হচে, আমার মায়ের প্যাটের ভাইটোকে মামুরা নিয়ে যাবে, আমি বাপের সোংসারেই থাকব। আমার দু-তিন মামু ত্যাকন বেঁচে, খালারাও আছে, নিজের নানা আর ত্যাকন বেঁচে নাই। তাদের আবস্তা তেমন ভালোও লয়, মন্দও লয়। বরং এট্টু গরিবই বটে। তবে নামকরা বড় বংশ, চাষাভুষাে লয়। নিজের হাতে চাষবাস কেউ করে না। কেউ পাঠশালে মাস্টার, কেউ মক্তবে ওস্তাদজিবিদ্বেনবংশ আর কি! কেউ কেউ ছিল অকম্মা, ই গাঁ উ গাঁয়ের দিঘিতে মাছ ধরে বেড়াত সারা বছর, কেউ পুঁথি লিখত, কারুর শখ ছিল নানারকম তামুক খাবার। কতরকম তামুক আর কতোরকম তার সরঞ্জাম, সি আর কি বলব! মেয়েদের তো রাঁধাবাড়া আর ছেলে মানুষ করা ছাড়া আর কুনো কাজ ছিল না। বিয়ে আবার সব ঘরে ঘরে মেয়েরা কেউ বংশের বাইরে যায় না। বাইরের মেয়ে কেউ আসেও তেমন। মোসলমান মিয়ে মোকাদিমদের মদ্যে এইরকমই চল ছিল।

তা আমার ভাইটিকে নিয়ে যাবার পেস্তাব য্যাকন করলে, বাপজি একটো কথা বললে না। তার স্বভাবই ছিল ঐরকম। ছেলে নিয়ে যাবি যা। আমার সোংসারে মানুষ হবে না, খেতে পাবে না মনে করছিস, কর গা। এমন চাপা মানুষ, এ কথাগুনোও বললে না। শুদু বললে, আমার ইখানে কুনোদিন ভাতের অভাব হবে না। তবে সৎ-মায়ের কাছে ভাগ্নেকে রাখতে চাও না, আমি কিছু বলব না। যা করার তোমরাই করবে, ছেলের কাছ থেকে আমার কুনো পিত্যেশ নাই।

সত্যিই আমার কাকাল থেকে ভাইটিকে ছিড়ে নিয়ে চলে গেল মামুরা। বাপজি ঘর থেকে কোলে নিয়ে ঝর ঝর করে চোখের পানি ফেললে।

ভাইকে নিয়ে মামুরা চলে গেল।

০৩. আমার বিয়ের ফুল ফুটল

দাদি ত্যাকন আর নাই। ভাইটিও কাছে নাই। লতুন মা-ই তার নিজের খোঁকাটিকে দেখে, আমাকে তেমন আর ওকে নিয়ে বেড়াতে হয় না। এই করতে করতে একদিন আমি হঠাৎ কেমন করে যি বড় হলোম, তা নিজেই জানতে পারি নাই। কবে একদিন ফালি ছেড়ে মোটা তাঁতের শাড়ি ধরেছি। তাঁতিবাড়ি থেকেই পাওয়া যেত ত্যাকনকার দিনে শাড়ি ধুতি। শাড়ি ধরার পর আর তেমন বাড়ির বাইরে যাই না।

পুকুর-ডোবা গাছপালা আর পাঁজর-বেরুনো মাটির বাড়ি দেখে বোঝা যেত আমাদের গাঁ-টো খুব পুরনো। পাকা সয়রান হয়েছিল এই সিদিন যুদ্ধর সোমায়। দিনে দুটো, সকালে একটো আর সাঁঝবেলায় একটো-এই দুটো মটরগাড়ি যেত ঐ পাকা রাস্তা দিয়ে।ইছাড়া সারাদিন শুনশান–গাঁ-টোকে মনে হতো ই দুনিয়ার লয়। আমি তো চিনি গাঁ-টোকে! গেরস্ত বাড়ির ছামনে অত বড় পাকুড়গাছ, ই কি অলক্ষুনে লয়? পাকুড়গাছ থাকবে মাঠের মাঝখানে, নাহয় গাঁয়ের মাঝখানটোয়, যেখানে লোকজন এসে বসবে, তামুক খাবে–তা লয়–পাকুড়গাছ, মাহারুহ গাছ, বাড়ির এগৃনের ওপর। ই অলক্ষুনে লয়? কাকচিল তো বসছেই,শকুনিও এসে বসছে। মরা গরু-বাছুরের হাড়, বেড়াল-কুকুরের ছেড়া চামড়া এইসব পড়ছে বাড়ির এগনেয়। ভিন পাড়ায় যাবার সোমায় বেলগাছের মাথায় দুটো শাকচুন্নিকে আমি অ্যানেকদিন দোপরবেলায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে দেখেছি। কারুর বাড়ির মাছভাজা খাবার যুক্তি। ই গাঁয়ের বাতাসটোই এমনি। মাঠের বড় পুকুরটোর ধারে প্যাক্তা তত যে খুশি দেখতে পেত সাঁঝবেলাটা পার হলেই। লোকে ইসব জানত। তবে এদের ঘরের লোক বলেই মনে করত। লোকে যেন মনে করত মানুষ দুরকম–মরা মানুষ আর জ্যান্ত মানুষ। একসাথে তো থাকবেই। যেসব জ্যান্ত মানুষ ঘরে-বাইরে ঘুরে বেড়াইছে, তাদের মদ্যে দু-একটো মরা মানুষ যি নাই তা কে বলবে? চেনবার তো বাগ নাই। কি রূপ নিয়ে কার ভ্যাকে জ্যান্ত মানুষের সাথেই যি জিন-ভূত আছে তা কেউ বলতে পারবে না। আমার ছোট মামুর ঘরেই একটো জিন থাকত, তার কথা আমি নিজের কানে শুনেছি। সে ছিল ভালো জিন, বাড়িতে হঠাৎ মেহমান এলে সরু গলায় ক্যান ক্যান করে বলত, উসারায় তক্তপোশে মিষ্টি আছে দ্যাখো গা। বাড়িতে অমুক এয়েছে, মিষ্টি লাগবে না?

মিষ্টি লাগবে তো আপনি আনতে গেলেন কেন? মামু জিজ্ঞাসা করলে।

বাড়িতে মেহমান এলে মেহমানদারি করতে হয়, মেহমানের খেদমত করতে হয়।

তা তো হয়, তা আপনি কোথা থেকে কার মিষ্টি নিয়ে এলেন?

আমরা জিন, আমরা সব পারি।

কার না কার মিষ্টি এনেছেন, দাম দিয়েছেন?

আমাদের দাম দিতে হয় না।

মামু মক্তবের ওস্তাদজি, এট্টু রাগ করে বললে, আর কোনোদিন আনবেন না।

টিনের চালে ত্যাকন খুব শব্দ হতে লাগল, জিন-ও রেগেছে বুঝতে পারা গেল। তা সি যাকগো, লোকে জানে না, আমরা জানি যি রাতদোপর আর দিনদোপর একরকম, কুনো তফাত নাই। নিশুতি রাতদোপর যেমন ছমছম ছমছম করে, দিনদোপরও তেমনি। পেত্যয় হলে জষ্টি মাসের দোপরবেলায় ত্যাকনকার দিনের গাঁয়ের ভেতরে ঢুকতে হবে। দোপর ঠিক নিশুত রেতের মতুন। সারা গাঁ খাঁ খাঁ করছে, রাস্তায় একটি লোক নাই, কুনো পেরানির সাড়া-শব্দ নাই–গরুর গোয়ালের আঁদার মাচান থেকে উই যি গাওড়া খটাশটো রাস্তায় গরম ধুলোর ওপর দিয়ে বাপ বাপ বলে ডাকতে ডাকতে যেচে কে বলবে ওটো খটাশ লয় আর কিছু? আর ঐ যি গাঁয়ের ই কোণে উ কোণে একটো-দুটো পুরনো মাটির ঘর ছিল যিগুনোয় কুনো মানুষ বাস করত না, আলকাতরা মাখানো আমকাঠের দুয়োর শেকল-তালা দেওয়া থাকত, ঐ ঘরগুনো কি একদম ফঁকা? দেয়ালঘেরা এগনে, ঘরের পিড়ে কি একদম শুন্যি? তা লয়, তা লয়। ঐসব ভিটে ঐসব ঘর ক্যানে ছেড়ে যেত লোকে? তা কেউ বলতে পারবে না।

আবার এই একই গাঁয়ে সকালে কিংবা বৈকালে যাও–কি সোন্দর! মানুষ যেচে-আসচে, কথা বলছে, ছেলে-পিলেরা খিলখিলিয়ে হাসছে, পাড়ার মেয়েগুনো অমনিই কুনো ভিটেতে ঝাল-ঝাপটি খেলছেকোথা ভূত, কোথা জিন? কেউ কোথাও নাই। বিহানবেলায় কোদাল কাধে, গরু-মোষের লাঙল নিয়ে জোয়ান মরদ ছেলে-ছোকরারা মাঠে যেচে, ওস্তাদজি পোক্কার একটো খাটো ধুতি পরে মোটা পাঞ্জাবি গায়ে পাঠশালে যেচে, কচি কচি ছেলেরাও যেচে পাঠশালে। কি সোন্দর! তাই বলছেলম একই গাঁ, তার কতোরকম রূপ।

আমি কিন্তুক একদিনও পাঠশালে যাই নাই। বাপজি যেতে দেয় নাই। মেয়ে আবার পাঠশালে যেয়ে ল্যাখাপড়া শিখে কি করবে? খানিকটো বেয়াদপ হবে, মুখের ওপর কথা বলবে–এই তো? এর লেগে পাঠশালে পড়ার কি দরকার? এইরকম দিন যি ছিল একদিন, অ্যাকন আর আমারও পেত্যয় হয় না। ত্যাকন লোকের কুনো নড়াচড়া ছিল না। কেউ কোথাও যেত না। সারা জেবন সবাই একসাথে থাকত। গাঁ থেকে এক কোশ দূরেও কেউ যেত না। মাঠের জমি, ধান, ফসল, আবাদ, পুকুর ঘুরে যে যেখানেই যাক, ঠিক সাঁঝের বেলায় ফিরে আসবে-ইয়ার কিছুতেই বে-লিয়ম হবে না। ক্যানে যাবে মানুষ! হাটে যেতে হতে পারে কুনোদিন, গরুর গাড়িতে ধান বেচতে যেতে পারে গঞ্জে কিংবা মোকামে, নাহয় কুটুমবাড়ি যেত দু-চার গা পেরিয়ে। ল্যাখাপড়া শিখে কি করবে গাঁয়ের মানুষ? বাপজি তাই মনে করত কার লেগে ল্যাখাপড়া রে বাপু!

তা পাঠশালে তো গ্যালম না, তাই বলে বয়েস কি বসে থাকবে? হঠাৎ একদিন শুনতে প্যালম আমার বিয়ের সম্বন্ধ এয়েছে। ত্যাকন আমার বয়েস চোদ্দ কি পনেরো। ত্যাকনকার দিনের হিসেবে অনেক বয়েস। এই আমাদের বয়সের মেয়েদের কুনো একটা ভুল হয়ে গেলে মা-চাচিরা বলত, শরম লাগে না ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে? বিয়ে হলে এতদিনে যি দুই ছেলের মা হতিস। তাইলে, আমার বিয়ের সম্বন্ধ যি এল তা আর আচ্চয্যির কথা কি? সম্বন্ধ এল, কথাবাত্তা হতে লাগল কিন্তুক আমাকে কেউ একটো কথাও শুদুলে না। শুদুবেই বা ক্যানে? ই ব্যাপারে আমার তো কুনো কথা নাই। মুরব্বিরা যা করবে তা-ই হবে। তারা যেদি মনে করে একটো কলাগাছের সাথে আমার বিয়ে দেবে, আমাকে তাই মানতে হবে। এইরকমই ছিল ত্যাকনকার দিন। ছেলে হয়তো ত্যাতোটা লয়, মেয়ে হলো বাপের আঘিন্নে দায়। বাপ যেদি মনে করে মেয়েকে কেটে পানিতে ভাসিয়ে দেবে, তাতে কারু কিছুই বলার নাই। সেই লেগে বলছি, মেয়ে ই কথা শুদুতেই পারবে না যি কার সাথে তার বিয়ে হচে। রূপ-গুণের কথা দূরে থাক, পাত্তরের বয়েসটোও শুদুতে পারবে না। বুড়ো হোক, ধুরো হোক, মেয়েকে মেনে নিতেই হবে। ষাট বছরের বুড়োর সাথে পনেরো বছরের মেয়ের বিয়ে ত্যাকনকার দিনে আকছার হতো। দোজবরে তেজবরে হেঁপোরুগি মাতাল চোয়ার কাউরির বিয়ে করার লেগে সোন্দর মেয়ের অভাব হতো না। সিদিক থেকে আমার তো মাহা কপালের জোর যি শোনলম, পাত্তরের বয়েস মাত্তর এক কুড়ি আট বছর। ইয়ার চেয়ে ভালো যোগ ত্যাকনকার দিনে আর কিছু ছিল না। হলোই বা আমার দ্বিগুণ বয়েস বিয়ে যে হচে এই পরম ভাগ্য! অ্যাকনকার দিনে ছেলে পেথম বিয়েই করছে দু-কুড়ি বছর বয়েসে। তাতে কুনো দোষ নাই।

শোনলম চার কোশ দূরের এক গা থেকে সম্বন্ধ এয়েছে। একটু দূর হয়ে যেছে বটে তবে মটরে আর র্যালে খানিকটা রাস্তা যাওয়া যায়। শুকনো দ্যাশ তো, গরুর গাড়িতে মাঠে মাঠে একবেলার মদ্যেই যাওয়া যাবে। তা দূরেই হোক আর কাছেই হোক, ই সম্বন্ধ ছাড়া যাবে না। নামজাদা বেরাট বংশ, আবস্তাটো অ্যাকন একটু পড়ে এয়েছে বটে কিন্তুক ভাত-কাপড়ের অভাব কুনোদিন হবে না।

আমি শুদু এইটুকুই শোনলম। পাত্তর কেমন, কি করে ইসব কথা কেউ তুললেও না, আমিও আর কিছু জানতে প্যালম না! ত্যাকন কি আর জানি এমন সোয়ামি আমার কপালে ছিল। ছিপছিপে ছোটখাটো শামলা রঙের মানুষ, আসমানের বাজের মতুন শক্ত। তবু সে সোনার মানুষ। কিন্তুক আমার লেগে মুটেই লয়–আর সবার লেগে। মা-বাবা, ভাই-বুন, আত্মীয়স্বজনের লেগেই শুদু লয়, সারা দিগরের মানুষের লেগে। আমার কথা আর কি বলব? আমাকে সে সারা জেবন হেনস্তা করেছে, কতো কুবাক্যি বলেছে, হাত ধরে ঘর থেকে বার করে দিতে চেয়েছে, তবু আমি মনের ভেতরে ঠিকই জানি ভেতরে ভেতরে কি সনমান সে আমাকে দিয়ে গেয়েছে। কিন্তু সে শুদু ভেতরে ভেতরে, নাইলে তামাম লোকের ভালো করবে, শুদু আমার দিকে চেয়ে দেখবে না।

বিয়ে হয়েছিল বৈকালি। সাঁজ রেতে একসাথ করা হলো। তা শেষ হতে না হতে লোকজন নিয়ে পালকি করে নিজের গাঁয়ে ফিরবে। একবার কি দুবার বলার পর আর কারুর সাধ্যি হলো না রাতটো থেকে যেতে বলতে। হাজার হলেও মাঠ ভেঙে পালকি নিয়ে এই এতটা পথ যেতে হবে। দিনকাল ভালো লয়, সঙ্গে সোনাদানা আছে, বেপদ হতে কতোক্ষণ?কুনো কথাই সে কানে তুললে না। সঙ্গে কজন লেঠেল আছে আর বাউরি কাহাররা তো সবাই লেঠেল। ভাবনা কিছু নাই। মিশমিশে আঁদার রেতে মিশমিশে কালো চার মুশকো বাউরি কাহার বাতাসের বেগে পালকি নিয়ে ছুটল মাঠের ওপর দিয়ে। কাহারদের হাতে এই বড় বড় লাঠি–এক একজনা যমদূতের মতুন। কে তাদের ছামনে দাঁড়াবে? সঙ্গের বরযাত্রী লোক-লস্কর সেই আঁদারেই তাদের সাথে সাথে ছুটল। খালি একজনার হাতে একটা ডেল্লাইটের আলো।

লতুন মায়ের ত্যাকন আবার ছেলেপুলে হবে। এইটুকুনি মানুষ। তেমন লড়তে-চড়তে পারছে না। ইয়ার মদ্যে তার এক খোঁকা হয়েছে। লিয়ম মতুন লতুন মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলে। আমিও কদলম। এইরকমই লিয়ম ছিল–গলা জড়িয়ে কাঁদতে হবে, নাইলে নিন্দে হবে। তবে কেউ কাঁদত লিয়ম মতুন, একটু হুঁ হুঁ করলে, ফোঁ ফোঁৎ করে মিছে নাক ঝাড়লে, আবার কারু কারু বুকের কবাট ফেটে যেত যেন। আমার ঠিক তা-ই হলো। এই মা, এই ভাই, এই বাড়ি-ঘর, ঘাট-পুকুর, এই আসমান-জমিন–সব ছেড়ে চেরকালের লেগে বিদেয় লিছি। কতো কথা মনে পড়ছে। কোথা থাকল মা, কোথা থাকল বাপ, কোথা থাকল ভাই! লতুন মা আওয়াজ করে কাঁদতেও পারলে না। পেটের ভারে সে ত্যাকন হাঁসফাঁস করছে। গড়গড়িয়ে চোখে পানির ধারা নামল।

বছরে দু-মাস করে আমার কাছে থাকবি। আমি নিয়ে আসব।

তা মনে হয় আমার বিয়ের পর থেকে শেষ ছেলেটো হওয়া পয্যন্ত এই লিয়মের তেমন লড়চড় হয় নাই। ঐ মা যি আমাকে আমার নিজের মায়ের শোক ভুলিয়ে দিয়েছিল!

ক-দণ্ডের মদ্যে সেই রেতে রেতেই কাহাররা বিয়ের পালকি পৌঁছে দিলে আমার শ্বশুরবাড়ি। আমি আমার জন্মস্থান থেকে চেরবিদায় লেলম।

০৪. মাটির রাজবাড়িতে আমার আদর

বিহানবেলাতেই আবার বাউরি কাহাররা এল। পালকি সাজাতে লাগলে তারা। আমাকে রাজবাড়িতে নিয়ে যাবে। সি আবার কি বেপার! কেউ কিছু বলে না আমাকে। লতুন বউ, শুদুবই ঝ কাকে? শ্যাষে কত্তা এসে ঘরে ঢুকে ঘাড়টো একটু অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললে, রাজবাড়ি গাঁয়েই বেশি দূরে নয়। এপাড়া থেকে ওপাড়া। কিন্তু গরুর গাড়িতে সেখানে গেলে মান থাকবে না। পালকিতেই যেতে হবে তোমাকে। গয়না যেখানে যা আছে সব পরো। বিয়ের লাল বেনারসিটা পরে নতুন বউ সেজেগুজে যেতে হবে, বুঝেছ? এরা রাজার আত্মীয়।

কত্তা ঐ বাড়িতে ছেলের মতুন। সেই লেগে নতুন বউ দেখাতে নিয়ে যাওয়া হচে। এই আমি পেথম কত্তাকে কাছ থেকে ভালো করে দেখলম। কেমন পোষ্কার কথা! তেমন করে কথা আমি তো এ জেবনে আর কাউকে বলতে শোনলম না। আমাদের মতুন গেঁয়ো ঘড়ে কথা কুনোদিন তার মুখে শুনি নাই। ইদিকে আবার সহজ মানুষ। হায়, ত্যাকন কি আর জানি, ঐ সহজ মানুষ কি কঠিন মানুষ।

পালকি তুললে কি হিঁদুপাড়ায় এক বাড়ির সিং-দরজায় নামালে। পালকিতে বসেই দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলম দু-তিনটে বড় বড় বাঁধা ঘাটঅয়লা পুকুরের ঘাস-ঢাকা পাড় আর বড় বড় বিরিক্ষের পাশ দিয়ে লহমার মদ্যে পালকি এক বেরাট দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। কত্তা কিন্তুক হেঁটেই একটু আগে সেখানে হাজির। আমি পালকির ভেতর থেকে চোখ তুলে যাকে দেখতে প্যালম, সাথে সাথে বুঝতে পারলম সে-ই হলো ই বাড়ির গিন্নি। খুব ফরশা মোটা মানুষ, বেশি নোম্বা লয়। বয়েস হয়েছে, সেই লেগে কোমর অ্যানেকটো পড়ে গেয়েছে। এই ভেরোলো মুখ, চাইতে ভয় লাগে। মাথায় ছোট ছোট শাদা চুল। মোটা কুঁজো মানুষ আবার বুড়ি! ইনি লিকিনি রাজার ভাগ্নি।

আগে কিছুই জানতম না, অ্যাকন জানলম, এই গাঁ-ই রাজার শ্বশুরবাড়ি। হিঁদুদের মদ্যে রাজা লিকিনি জেতে তেমন উঁচু লয়। নিজের জেতের মদ্যে তেমন মেয়ে পেছিল না যি বিয়ে করে। শ্যাষে ই গাঁয়েই এক গরিব ঘরে নিজের জেতের একটো সুন্দরী কন্যে পেয়েছিল। তাকেই লিকিনি বিয়ে করে। আবার সেই লেগেই নিজের ভাগ্নির ই গাঁয়েই বিয়ে দেয়। তাইলে ই গাঁ হলো রাজার শ্বশুরবাড়ি। সেই লেগে ই গাঁয়ে আছে পাকা শিবতলা, সিখানে তিনটে পাকা মন্দির, আছে পাকা ইশকুল। এমন ইশকুল ইদিকে আর অ্যাকটোও নাই আর সেই ইশকুল চালানোর লেগে আছে বেরাট এক দিঘি আর বিস্তর জমিজোমা। গাঁয়ে আরও এক ঘর রাজার আত্মীয় আছে। বোধায় রাজার ভাই-ভায়াদদের কেউ। তারাই সব জমি-সম্পত্তি ভোগ করে, দেখাশোনা করে, ভাগ্নি তেমন কিছু পায় না। সেই ঘরের সাথে এই ভাগ্নি বাড়ির তেমন পোট নাই।

ইসব কথা পরে শুনেছি। ত্যাকন হাঁ করে তাকিয়ে থাকলম কত্তামার মুখের দিকে। মুখে কি এটুও হাসি আছে? শুদু বললে, এসো। তার সাথের ঝি-বউরা আমাকে পালকি থেকে নামিয়ে নিলে। কত্তামা মুখ ফিরিয়ে থপথপ করে হাঁটতে শুরু করলে আমরাও তার পেছু পেছু বাড়িতে ঢোকলম।

এই বিরাট এনে! এগনে শুদ্ধ গোটা বাড়ি মাটির পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সব নিখুঁত ছিমছাম। এগনের ভেতরে ইদিকে-উদিকে জাম গাছ, পেয়ারা গাছ, আমড়া গাছ–তা-বাদে গ্যাদা, সন্ধ্যামণি, পাতরকুচি, তুলসী–এইসব গাছ। সারা উঠোনে হেঁয়া। পরিপাটি করে এনে লিকোননা, একটি শুকনো পাতা পড়ে নাই। এগ্‌নের উত্তর দিক ঘেঁসে দখিন-দুয়োরি মাটির দোতলা বড় কোঠাঘর। তার চাল খ্যাড়ের, কড়িবরগা শাল আর তাল-কড়ির। দেখেশুনে মনে হয় এমন ঘর চেরকাল থাকবে। আরও সব রান্নাঘর, হেঁশেল, বৈঠকখানা—সবই মাটির বটে কিন্তুক মনে হচে সবলতুন, মনে হচে মাটির ঘরে বাস করবে বলেই সব মাটির করেছে, নাইলে পাকা বাড়ি করা এদের লেগে কিছুই লয়।

এগ্‌নে পেরিয়ে, দোতলা কোঠাঘরের চ্যাওড়া উসারা পেরিয়ে অ্যাকটো ঠান্ডা আঁদার আঁদার ঘরে নিয়ে যেয়ে আমাকে অ্যাকটো কাঠের পিঁড়িতে বসাইলে। কামার পরনে সরু পাড়ের শাদা মিহি ধুতি। বেধবা তো! গায়ে কিন্তুক বেলাউজ নাই। ত্যাকনকার দিনে গাঁয়ের বউ-ঝিরা বেলাউজ পরত না। কত্তামা এত বড় ঘরের বউ। ভেবেছেলম তার গায়ে কি বেলাউজ থাকবে না?

ঘরের কোণে একটো পেল্লায় কঁঠালকাঠের দবজ চেয়ার পাতা ছিল। কত্তামা এসে সেই চেয়ারে বসলে। দেখলম, এনার পা দুটিও খালি। হ্যাঁ, মাহারানীর মতুন লাগছে বটে! ধবধবে শাদা মোটা মানুষ, চেয়ার জুড়ে বসেছে, কোথাও একটু ফাঁক নাই। সেই চেয়ারে বসে একজন মাঝবয়েসি বউকে হাতের ইশারা করলে। বউটোর সিতিতে চ্যাওড়া করে সিঁদুর লেপা। ঘরের এক কোণে রাখা একটো গয়নার বাসো নিয়ে এসে বউটি আমার ছামনে রাখলে। কত্তামা ত্যাকন আমার দিকে চেয়ে আস্তে আস্তে বললে, বউমা, তোমার গায়ের গয়নাগুলি একটি একটি করে খোলো। আমার গয়না দিয়ে তোমাকে সাজিয়ে একবার নয়নভরে দেখি তো মা কেমন লাগে! এই কথার পরে সব ভুলে কত্তামার মুখের দিকে চেয়ে দেখতে দেখতে আমি একটি একটি করে আমার গয়নাগুলিন খুলতে লাগলম। সব খোলা হয়ে গেলে কত্তামা আবার চোখের ইশারা করতে সেই মাঝবয়েসি বউটি কাঠের গয়নার বাসো খুলে একটি একটি গয়না বার করে আমাকে পরিয়ে দিতে লাগল। আঁদার-আঁদার ঘরে ঐসব খাঁটি সোনার ভারী গয়না ঝকমক করতে লাগল। কেরূমে কেরমে কঙ্কণ, বাজু, কানপাশা, ফাঁদি নথ, টায়রা, গোট, ভারী বিছেহার সব আমাকে পরানো হলো। আরও গয়না ছিল, তবে সি আর পরানোর জায়গা নাই। কত্তামা বললে, বউমা, এখন আর এইসব গয়না খুলো না। ঐ বাসোয় আরও গয়না আছে, তোমার গয়নাও এখন ঐ বাসায় থাকুক। যাবার সময় পালকিতে তুলে দেবে।

কত্তামার এই কথার পরে বউটি আবার আমার সব গয়না সেই বাসোয় ভরে বাসোটা বন্ধ করে চাবি আমার ছামনে রেখে দিলে। কি বাহার সেই গয়নার বাক্সোর! তার সারা গায়ে হাতির দাঁতের কাজ, কেমন সব মনোহারী নকশা। আর চন্দনকাঠ দিয়ে তৈরি বলে সেই বাসো হাতে করলেই সুবাস। সেই গন্ধ সেই নকশা আর এই পিথিমিতে নাই। কুথাও কুনোদিন উ আর কেউ পাবে না।

গয়না পরা হয়ে গেলে শাদা পাথরের বড় এক থালায় নানারকম সন্দেশ-মিষ্টি সাজিয়ে আমার ছামনে রেখে দিলে। ইমিষ্টি গাঁ-ঘরে মেলার কুনো কথাই নাই, শহর থেকে আনাতে হয়েছে। তাপর পায়েস, ক্ষীর আরও কতো কি যি এল হিশেব নাই। কামা শুদু বললে, বউমা, খাও।

অত মানুষের ছামনে একা কি কিছু খাওয়া যায়? কুনোমতে এক-আধটু খেয়ে আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকলম।

সব শ্যাষে কত্তামা কষ্ট করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, বউমা, মনে রেখো, তুমি আমার বড় ছেলের বউ। তোমার কিন্তু দেওর-ননদ আছে। তারা সব ছোট। তাদের যখন বিয়ে-থা হবে তখন আমি হয়তো থাকব না, তোমাকেই সব দেখেশুনে নিতে হবে।

কত্তামা-ও দেখলম পেঁয়োভাষায় কথা বলে না। আমি পালকিতে ওঠার পরে কত্তাকে নাম ধরে ডেকে বললে, বউমা আমার সোনার পিতিমে, খবরদার তাকে কোনোদিন কষ্ট দিবি না। তাতে তোর ভালো হবে না।

একটো মজার কথা বলি। এত যি কাণ্ড হলো, কত্তামা কিন্তুক একবারও আমার গায়ে হাত দিলে না, ছুঁলে না। জানা কথা, সব মিটে গেলে কত্তামা আর একবার গা ধুয়ে কাপড় বদলে তবে ঘরের কাজ করবে।

০৫. বড় সোংসারে থই মেলে না

লতুন বউ আমি এসে ওঠলম ডোবা থেকে দিঘিতে। বড় সংসার, কিছুতেই থই মিলছে না। আমাদের বংশও বড় ছিল বটে, গাঁ-জোড়া। বংশ। তবে সিসব আলো আলেদা ভাই-ভায়াদের সোংসার। আমাদের নিজেদের সোংসার ছোট, মা য্যাকন বেঁচে ত্যাকনো ছোট। তার মরার পরে কিছুদিন তো আরও ছোট। লতুন মা আসার পরে একে একে ভাইবুনগুলিন হতে হতে য্যাকন আমার বিয়ের সোমায় হলো, ত্যাকন সোংসার কতকটা বড় হয়েছে বটে, তা বলে ই বাড়ির মতুন লয়। কত্তারা পাঁচ ভাই। আমাকে নিয়ে বউ দুটো। মোটে বড় আর মেজ এই দুই ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে। আর আর ভাইয়ের ত্যাকননা বিয়ে হয় নাই। ছোট ভাইটি তো খুবই ছোট, আট-ল বছরের হবে। চার বুনের মধ্যে দুজনার বিয়ে হয়েছে। বড় বুনটি স্বামী-সংসার নিয়ে গাঁয়েই থাকে। মেজজনার পোড়া কপাল। মাত্তর ল-বছর বয়েসে বেধবা হয়ে এই সোংসারেই ফিরে এসেছে। বাকি দুজনার অ্যাকনো বিয়ে হয় নাই। এত লোক সোংসারে, তবে সবার ওপরে আছে আমার শাশুড়ি। তার বয়েস হয়েছে বটে কিন্তুক ত্যাকনো খুব শক্তদু-চারটা চুল পেকেছে, দাঁত একটিও পড়ে নাই, গোটা সুপুরি চিবিয়ে খেতে পারে। শাশুড়ি ফিট শাদা, কত্তার মতুন শামলা লয়। বেধবা মানুষ, শাদা ধুতি পরনে, কপাল পয্যন্ত লাজ-কাড়া, ঠিক বউমানুষের মতুন। দেখার সাথে সাথে বুঝতে পারলম এই শাশুড়ি-ই ই বাড়ির গিন্নি। তার পরের গিন্নি ঐ বেধবা ননদ। ল-বছরেই বেধবা হয়ে ভাইদের সোংসারে এয়েছে। ই বাড়ির লিয়ম ঠিক হিঁদুদের মতুন, বেধবার বিয়ে নাই ই বংশে। এই ননদ ত্যাকন ভরা যোবতী। আমার চেয়ে বড় বটে, তবে বেশি বড় লয়। বয়েসে চার-পাঁচ বছর বেশি হতে পারে।

আমি লতুন বউ হয়ে থাকলম আর কদিন? কানে তুলো পিঠে কুলো চোখে ঠুলি লাগিয়ে সোংসারের ঘানিতে জুতে গ্যালম দু-দিন যেতে না যেতেই। তবে, এই এক সুবিদা, ই সোংসারে আমার দেখার কিছু নাই। বাড়ির গিন্নি আছে, সেই দেখবে। যা করবার সেই-ই করবে। বড় বউ আর আমি শুদু ঘুন্নিপাক খেলেই হয়ে যাবে। হ্যাঁ, সেই যি ঘানি টানতে লাগলম, সারা জেবন একবারও আর থামতে পারলাম না। ডাইনে বললে ডাইনে, বাঁয়ে বললে বাঁয়ে। শুদুই হুকুম তামিল করা। অ্যাকন মনে হয়, জেবনের কুনো কাজ নিজে নিজে করি নাই, নিজের ইচ্ছা কেমন করে খাটাতে হয় কুনোদিন জানি নাই। আমি কি মানুষ, না মানুষের ছেয়া? তা-ও কি আমার নিজের ছেয়া?

তবে নিশ্চিন্তি বটে! কুনো কিছু তো নিজেকে ঠিক করতে হবে — যা করবার, যা বলবার গিন্নি করবে, গিন্নি বলবে। আর সি কি যে-সে গিন্নি! ঐটুকুন মানুষ, শাদা শাড়িতে কপাল পয্যন্ত ঢাকা, শরীলের কোথাও এতটুকু ধুলোবালি লেগে নাই। এত পোষ্কার থাকে কেমন করে মানুষ তাই ভাবতম। মুখে একটি-দুটি কথা, ভালোবেসেও লয়, মন্দবেসেও লয়। আর না-পছন্দ কুনো কিছু করলে দু-একটি বাকি যা বলত তা যেন কল্‌জে ছাদা করে দিত। এইটোতেই ভয় লাগত বেশি। তবে বিচের ছিল বটে। একটি অন্যায় কাজ লয়, অন্যায্য কথা লয়। কুনো কিছু নিয়ে দুই দুই করা লয়। একেবারে সুক্ষ্ম ষােলো আনা ন্যায্য বিচের। এমন না হলে কি অত বড় সোংসার থাকে? সেই লেগে বলি শাশুড়ি যেন ই জগতের লোক ছিল না।

ইদিকে সোংসারের কত্তা কিন্তুক মেজ জনা, আমার সোয়ামি। তার বড় ভাই, আমার ভাশুর, কত্তার চাইতে ক-বছরের বড় হলে কি হয়, সে ছিল খুব আলাভোলা মানুষ, নেতান্তই ভালো মানুষ। বিষয়-সম্পত্তির কুনো কিছুতেই তার আঠা ছিল না। জেবনের শ্যাষ দিন পয্যন্ত সে যেন কত্তার ছোটই থেকে গেল, কুনো দায়-দায়িত্ব নিলে না। ছোট ভাইকে যেন এট্টু ভয়ই করত মনে মনে। তার ছিল খাওয়ার শখ, জামা-কাপড়ের শখ। তবে সি আর কতোটুকুনি! ছেলেপুলে হলো না কুনোদিন, ভাইবুনদের ছেলেমেয়েরাই ছিল তার সব। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কি ভালোই যি বাসত! বিশেষ আমার ছেলেমেয়েদের। পর পর দুই খোঁকার পরে আমার একটি খুঁকি হয়েছিল। সেই খুঁকি ছিল তার জান। বাড়িতে সে থাকতই না পেরায়। অ্যানেক দিন পরে পরে য্যাকনই বাড়ি আসত, সঙ্গে থাকত হাঁড়িভরা মিষ্টি। মিষ্টি ছাড়া বাড়ি ঢুকত না। হয়তো ব্যাবসার টাকা লষ্ট করে কিংবা টাকা ধার করে ছেলেমেয়েদের লেগে মিষ্টি, খ্যালনা এইসব আনত আর কত্তার কাছে মুখ শুনত এই লেগে। কত্ত বলত শুদু শুদু টাকা লষ্ট করবে কেন? কঠিন কঠিন কথা শুনে ভয় আর লজ্জা নিয়ে এমন করে দাঁড়িয়ে থাকত ছোট ভাইয়ের ছামনে, যেন চোরের দায়ে ধরা পড়েছে। কিন্তুক ঐ পয্যন্তই। কথা এক কান দিয়ে শুনলে আর এক কান দিয়ে বার করে দিলে। বাড়িতে ঢুকলেই ছেলেপুলেরা কেউ ঘাড়ে, কেউ মাথায়। কেউ তো আর তাকে বড় চাচা বলত না, বলত বড় বাপ। সোংসারের সব দায় ঐ মেজ কত্তার হলেও আবার ইদিকে দ্যাখো তেমন দরকার পড়লে সে খবর দিয়ে বড় কত্তাকে বাড়িতে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করত অমুক কাজটা করবে কি না। বড় ভাই-ও তেমনি, তার শুদু একটি কথা, মন হলে করো গা, ভালো মনে হলে করো গা। আমাদের এমন অবাক লাগত! য্যাকন-ত্যাকন বড় ভাইকে এই বকা তো সেই বকা! আবার তেমন তেমন ব্যাপার হলে তার কাছেই হুকুম চাওয়া। কিন্তুক ইকথাও বলতে হবে, ছোটকে যি কতোটা সমীহ করতে হয়, যেদি ছোট তেমন সনমানের যুগ্যি হয়, তা-ও দেখেছি এই সোংসারে।

কত্তাকে ঐ বয়সে যি অতো দায়িত্ব নিতে হয়েছিল তার কারণ হলো, আমার শ্বশুর আট-লটো ছেলেমেয়ে আর বেধবা স্ত্রী রেখে অল্প বয়সেই মারা যায়। কথাবার্তা শুনে আমার মনে হয়, শ্বশুর বোধায় খানিকটা আমার ভাশুরের মতুনই বিষয়-সম্পত্তি দেখে রাখবার মানুষ ছিল না। তবে সে আলাভোলা ছিল না। এলেকার হিঁদু-মোসলমান বড় বড় মানুষের সাথে তার ওঠাবসা ছিল। শখ-সাধও ছিল বোধায় তেমনি। নিজের পালকি ছিল, ছয় বেহারার পালকি। সেই পালকিটি দলিজঘরের বারেন্দায় ভেঙেচুরে পড়ে ছিল অ্যানেকদিন। তা বাদে নিজের আরবি ঘোড়া ছিল তো বটেই। ঘোড়ায় চড়ে ইগাঁয়ে উগাঁয়ে বড় বড় লোকের বাড়িতে যেমন যেত, তেমনি তারাও সবাই ই বাড়িতে আসত। শাশুড়ির ঠেয়ে শুনেছি মানুষজনের আসা যাওয়ার কামাই ছিল না। কোর্মা পোলাও দই মিষ্টি দেদার খরচ হতো। এমনি করে করেই জমি সম্পত্তি কতক বিক্রি হলো, কতক বেহাত হলো। শ্বশুর য্যাকন মারা যায়, ত্যাকন লিকিনি সোংসারের বেহাল অবস্তা। শাশুড়ি বলত, সোংসার য্যাকন ভেসে যায়-যায় হয়েছে ত্যাকন তার এই মেজ ছেলেই এগিয়ে এসে হাল ধরলে। তা নাইলে সব যেত। কত্তার ত্যাকন কতোই বা বয়েস, বিশ বছর হয়েছে কি হয় নাই। সে সব আমোদ-আল্লাদ বাদ দিয়ে ভাইবুনগুলিন আর মাকে নিয়ে জান-পরান দিয়ে এই সোংসারটোকে রক্ষা করলে। ই সোংসারে এসে তাই দেখলম বটে। সোংসারের ভেতরে যা করবে সব মা। মা ছাড়া কথা নাই। নিজের ইস্ত্রী তো বটেই পরে পরে যিসব ভাইয়ের বিয়ে হলো তাদের পেত্যেকের বউকে চোখকান বুজে শাশুড়ির কথা মেনে চলতে হবে। শাশুড়িকে একটি কথা ঝাঝিয়ে বলেছে কিম্বা কাজ করতে করতে ঘটি-বাসন মাটিতে একটু ঠুকে আওয়াজ করেছে, আর রক্ষা নাই। কত্তা সোজা বাড়ির ভেতর ঢুকে বলবে, যে এরকম করলে সে আর একবার যদি এমন করে, তাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে। তা কত্তাকে লাগত না, আমার শাশুড়ির শাসনই য্যাথেষ্ট ছিল।

বউ হয়ে আসার পর থেকে অবশ্যি দেখছি সোংসার অ্যানেকটোই ঠাউরেছে। শ্বশুরের মিত্যুর পরে সাত-আট বছর কত্তাকে কেউ বিয়ের কথা বলতে সাওস পায় নাই। আমার শাশুড়ি-ও লয়। সেই লেগেই এত দেরিতে বিয়ে। সংসারে ঢুকে দেখলম ত্যাকন একমাত্তর সেজ জনার বিয়ের বয়েস হয়েছে, বাকি ভাইবুনরা সব ছোট। বেধবা বুনটোর পরে তার আর দুই ছোট বুনের বিয়ের বয়েস হব-হব। কিন্তুক কি কপাল, এই সোমায় ঠিক ঘোটর বড় যেটি সেই বুনটি মারা গেল। কি অসুখ কে বলবে? মাস দুই-তিন কিছুই পেরায় খেলে না। খাবার দেখলেই বলত অরুচি লাগছে। এই করে শুকিয়ে শুকিয়ে লেয়ালির দড়ি হয়ে গেল। কাটি কাটি হাত পা। তাপর একদিন আমাদের সকলের চোখের ছামনে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলে। আহা, কতোই বা বয়েস, সারাটা জেবন তার ছামনে, সোয়ামি সোংসার সন্তান কিছুই জানলে না, অকালে মা ভাই বুন সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল। ত্যাকনকার দিনে মরে যাওয়াটো যেন কিছুই লয় এমনি ভাব ছিল মানুষের। দু-চার দিন কেঁদেকেটে সব ভুলে যেত। ডাক্তারবদ্যি তো তেমন ছিল না। যা বা ছিল শহরগঞ্জে, পাড়াগাঁয়ে তার কিছুই মিলত না। কঠিন অসুখ হলে যার অসুখ সে যেমন, তেমনি তার সোদররাও সব আশা ছেড়ে দিয়ে মিত্যুর লেগে ঠায় অপেক্ষা করত। কলেরা আর বসন্ত ই দুটো মাহামারীতে বছরে কতো লোক যি মরত তার আর সুমার নাই। অত কাদবে কে? কেঁদে কুনো লাভ নাই। যি কঁদছে সে-ই দুদিন বাদে মরবে কি না কে বলবে? কলেরা-বসন্ত বাদ দিয়ে আর একটো অসুখ ছিল–বুকের ব্যায়রাম, যক্ষ্মা। উ রোগ হলে চিকিচ্ছের চেষ্টাও ছেড়ে দিত মানুষ। এক-একটো বংশ নিব্বংশ হয়ে যেত ই রোগে। যার হয়েছে ই রোগ, সে হয়তো হা হা করে হাসছে, যা মন চায় তাই খেছে, তাপর একদিন টুকুস করে মরে গেল। মানুষ যি জান ভরে কাঁদবে তা কি করতে কাদবে? দুদিন বাদে সে-ও যে টুকুস করে মরবে।

০৬. আমার একটি খোঁকা হলো

বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার একটি খোঁকা হলো। সি দিনই লিকিনি দোপরবেলায় এক কড়াই দুধ উথুলে পড়ে গেয়েছিল। গাই দুয়ে এনে জ্বাল দেবার লেগে দুধ চুলোয় বসিয়েছিল। কেউ আর খেয়াল করে নাই, আঁতুড়ঘরে আমাকে আর লতুন খোঁকাকে নিয়েই সবাই বেস্ত ছিল। এই ফাঁকে সেই উজ্জ্বলন্ত দুধ সব উথুলে উঠে কড়াই থেকে পড়ে গেল। তাই দেখে আমাদের বুবু, সেই বেধবা ননদ হায় হায় করে উঠলে শাশুড়ি শুদু বললে, দুধ নষ্ট হয়েছে হয়েছে। কেউ কোনো কথা বোলো না। বাড়িতে নতুন মানুষ এল–এ সোংসারের পেথম খোঁকা–আর দুধ উথুলে পড়ে গেল! এ বড় সুখের কথা। এবার সোংসারে ধন-দৌলত, সুখ আনন্দও উথুলে পড়বে। তোমরা কেউ এই নিয়ে আর কথা বোলো না।

তা কথা সত্যি বটে–বংশের পেথম ছেলে–লতুন ঝাড়ের গোড়াপও। পেথম ছেলে পেথম লাতিন। আনন্দে সবাই ভাসতে লাগল। ই ছেলে যেন একা আমার ছেলে লয়। কত্তা ত মনেই করলে, না যি তার ছেলে হয়েছে। উ ছেলে তো সবারই, ই বংশের ছেলে। মা বলে আমার খাতির বাড়ল, শাশুড়ি আড়লে আবডালে সবার কাছে বলতে লাগল, ঐ মেজবউ সাংসারের লক্ষ্মী, ঐ বউটি আসা থেকে সোংসারের বাড়-বাড়ন্ত শুরু হয়েছে। খুব পয়া আমাদের বউ। তা আমার খাতির আর আদর বাড়ল বটে, তা বলে খোঁকাকে একা আগুলে রাখতে পারলাম না। সে হলো সবার চোখের মণি। ঘুরেফিরে সবাই এসে খালি তাকে দেখতে চায়। খোঁকাটি আমার শামলা, বাপের রঙ পেয়েছিল, ছেয়ালো ছেয়ালো হাত-পা, ডাগর ডাগর চোখ, ফুলের পাপড়ির মতুন ঠোঁট। সি যি কি সোন্দর! এমন ছেলের মুখ একবার দেখতে পেলে মায়ের এক লাখ বছর দুনিয়ায় বাঁচা হয়ে যায়। সবাই বলতে লাগল আসমান থেকে এক ফালি চাদ নেমে এয়েছে আমার কোলে। বড়ও হতে লাগল চাঁদের মতুন। আজ একটু, কাল একটু। আজ এট্টু আলো দেখি মুখে, কাল দেখি চোখে।

দিন যায়, দিনের পর দিন যায়, দিন গড়িয়ে মাস যায়, মাস গড়িয়ে বছর যায়। সোংসার কেরূমে কেরূমে বড় হতে লাগল। সেজ দ্যাওরের বিয়ে হয়ে গেল। বাড়িতে লতুন বউ এল। তাপর একদিন শ্যাষ ননদটিরও বিয়ে হলো মাহা ধুমধাম করে। বিয়ে হলো দশ কোশ দূরের এক গাঁয়ে। সি ঘরও খুব আবস্তাপন্ন।

দু-একটো কষ্টের কথা সব মানুষেরই থাকে। আমারও কি ছিল? ছিল বৈকি? পিতিকার হোক আর না হোক বলতে পারলে তো মনটা এট্টু খোলসা হয়। তা কাকে বলব? ইসব কথা তো শাশুড়ি-ননদকে বলার লয়। হয়তো তাদের নিয়েই কথা, তাদের বলব কি করে? এক কত্তাকে বলা যায়। তা সে এমন লোক যি ছামনে দাঁড়ালেই মনে হয় ই লোককে ইসব কথা বলা যায় না। মনে হয়, আমার আবার আলাদা কথা কি, নিজের লেগে ইয়াকে আবার কি বলব? সারা দিনে তাকে দেখতেই প্যাতম না। দেখা হতো শুদু অ্যানেক রেতে। শাশুড়ি য্যাতোকাল ছিল আমি ছেলম ঠিক যেন লতুন বউ। এতগুলিন ছেলের মা হয়েও লতুন বউ।

তা আমি আমার কথা বলব কি, একদিন রেতে কত্তা হঠাৎ বললে, একটা কথা বলি শোনো। ছোটবেলায় পাঠশালায় যাও নাই যাও নাই। তা বলে কি চিরকাল মূখ হয়ে থাকবে? একটু লেখাপড়া শেখা কি খারাপ?

কথা শুনে আমি তো সাত হাত পানিতে, ই আবার কি কথা! অ্যাকন আবার আমি কি ল্যাখাপড়া শিখব?

লেখাপড়া শেখার কোনো বয়েস নাই। একটু পড়তে লিখতে শিখলেই বুঝতে পারবে দুনিয়া কেমন করে চলছে।

তা জেনে আমার কি হবে? সোংসারে খাটতে খাটতে জান গেল। জানি, এই করেই জেবন যাবে। এই বয়েসে আমি কি আবার বি.এ. এম.এ. পাশ দোব?

লেখাপড়া শিখতে গেলে বি.এ. এম.এ. পাশ দিতে হয় না। যাই হোক, আমি বই কিনে আনব, দেখবে কদিনের মধ্যেই অক্ষর শিখে যাবে।

উ অ্যাকন আর আমি পারব না।

পারতে তোমাকে হবেই।

কত্তার মুখ দেখে বুঝতে পারলম, উ মানুষ যা করবে ঠিক করে, তা নিয়ে স্ট্যাচামেচি করে না, ভেতরে ভেতরেই ঠিক করে। আমি চুপ করে থাকলম। একটু বাদে কত্তা আস্তে আস্তে শ্যাষ কথাটো বললে, আলো আর আঁধারের যে তফাত–অক্ষর জানা আর না-জানা মানুষের মধ্যে ঠিক সেই তফাত।

কি আতান্তরে যি পড়লম! কত্তা আমাকে কি বেপদের মদ্যে ফেললে! কিন্তুক সি মানুষকে যে চেনে নাই, সে চেনে নাই। একদিন ঠিকই আনলে বিদ্যেসাগরের বন্নপরিচয়ের পেথম ভাগ, একটো সেলেট আর পেনসিল। কত্তা এটুন শৌখিন ছিল, সারা বাড়িতে রেতে জ্বলত পিদিম আর লণ্ঠন, কত্তার ঘরে জ্বলত একটো হেরিকেন। হেরিকেনের ত্যাকন অ্যানেক দাম। কত্তার ঘরে ছিল একটো বিদ্যাশি দামি হেরিকেন। কেউ জানতে পারলে না, অ্যানেক রেতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ঘরের দরজা বন্ধ করে সেই হেরিকেনের আলোয় ল্যাখাপড়া শেখাতে লাগলে আমাকে। সারাদিনের খাটা-খাটনির পরে চোখ জড়িয়ে আসত ঘুমে, কিছুতেই জেগে থাকতে পারতাম না। কিন্তুক কত্তার কুনো মায়া নাই, সি কি তার তর্জন-গর্জন। শোয়া-ছেলে তিকুরে তিকুরে উঠত।

খোঁকা যি জেগে উঠবে?

তা উঠুক। মাথায় কি আছে কি তোমার! অক্ষরটা কি চোখে দেখতেও পাচ্ছ না? পেনসিল হাতে বসে আছ, হাত কি ঘুরছে না স্লেটের ওপর?

কি জানি মাথা কেমন গোলমাল লাগছে।

বুঝতে পারছি, ঘুম আসছে। যাও, ওঠো, চোখে পানি দিয়ে এসো, নাহলে চোখে দু-ফোটা রেড়ির তেল দাও, ঘুম চলে যাবে।

বললে কেউ পেত্যয় যাবে না, ইকটু ইদিক-উদিক হলে মায়া-দয়া তো করতই না, বোকা গাধা মাথায়-গোবর ইসব বলে গাল তত দিতই, চুলের গোছ ধরে টান, কানের লতিতে.একটা মোচড়, ইসবও ছিল। একদিন তো গালে ঠোনা মেরে হাত ধরে টেনে তুললে। সি কি রাগ বাপরে বাপ, যাও বেরিয়ে যাও ঘর থেকে, কখনো আসবে না এদিকে। একটা সামান্য কথা মাথায় ঢুকছে না তখন থেকে? যাও, বেরিয়ে যাও, দরকার নাই লেখাপড়ার।

কি আর করি, ঘর থেকে বেরিয়ে যেয়ে দুয়োরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলম। খানিক বাদে নিজেই আবার এসে ঘরে নিয়ে যেয়ে বললে, যাও, শুয়ে পড়ো, আজ আর পড়তে হবে না।

হুঁ, এমনি করে আমি পড়তে শিখেছেলম। বিদ্যেসাগরের অ আ ক খ বইয়ের পিতিটি অক্ষর আমার চোখের পানিতে ভেজা বলে চোখ বুজলেই সেইসব অক্ষর দেখতে পাই। কালো কালো যত ছবি ছিল বইয়ে সব মনে পড়ে। আকননা সেইসব দিনের কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা হু হু করে। দু-মাসের মাথায় পড়তে লিখতে শেখা হয়ে গেল। পেথম পেথম বানান করে করে, পরে এমনিতে সব পড়তে পারতম। বাড়িতে ‘বঙ্গবাসী’ বলে একটো কাগজ আসত পোেস্টাপিস থেকে। ভালো বুঝতে না পারলেও সেটা কখনো-সখনো পড়তম। কিন্তুক সবই লুকিয়ে লুকিয়ে। বাড়ির কেউ কিছু জানত না। কত্তা কিন্তুক কিছু বারণ করে নাই। তবে ননদ-শাশুড়িকে ইসব বলতে আমারই কেমন শরম লাগত।

আমাদের সোংসারের লেগে সেই সোমায়টো ছিল উঠতির সোমায়। সব সসাংসারে এমন হয়। একটো উঠতির সোমায় আর একটো পড়তির সোমায়। শ্বশুরের মিত্যুর পর সোংসারে খারাপ দিন এয়েছিল। শ্বশুর গত হবার সাথে সাথে ভাই ভায়াদেরা সব সোংসার আলো করে নিলে। সবাই ভিনো হয়ে গেল। ঐ যি শ্বশুর অনেক বিষয়সম্পত্তি লষ্ট করে ফেলেছিল, সেই লেগে সম্পত্তি ভাগ হবার সোমায়ে ভাইয়েরা নিজের নিজের সম্পত্তি পুষিয়ে নিলে। আমার বেধবা শাশুড়ির ভাগে পড়ল খুবই কম জমি। কিন্তুক তার ভাগে পড়েছিল সব ধনের সেরা ধন–এক পুতুর। সিরকম ধন থাকতে আবার ভাবনা! শুদু একটো ভয়, ইরকম ধন কারুর একার নয়, এমনকি শুদু একটো সসাংসারেরও লয়। মায়ের তেমন পুত্রুর গোটা চাকলার। আমার শাশুড়ি সি কথাটো বুঝেই তবে দুনিয়া থেকে গেয়েছে।

কেমন করে সোংসারের উন্নতি-বরকতের অরম্বটো হলো সি কথাটা ইবার বলছি। আমার বিয়ের সোমায় বাপজি গয়নাগাঁটি যা দেবার তা দিয়েছিল। ত্যাকুনি জানা গেয়েছিল আমার সেই দাদিবাপজির খালা–মরবার আগে আমার নামে তার সব জমি–যোলে বিঘে জমি লিখে দিয়ে গেয়েছিল। দাদির তিন কুলে কেউ ছিল। সি কথা আগে বলেছি, সেই লেগে সম্পত্তিটো নিয়ে কুনে। হ্যাঙ্গামা-ফৈজত হয় নাই। বিয়ের পরে-পরেই ঐ সম্পত্তিটো বিক্রি করে দিয়ে কত্তা নিজেদের গাঁয়ের মাঠে পঁচিশ বিঘে জমি কিনলে। আমার নামে কিনেছিল, না সোংসারের সাজার করে দিয়েছিল ঐ জমি, আমি আজও জানি না। সবই তো শাশুড়ির সোংসারের–আমার তোমার কি? এই ছিল শিক্ষে। গোড়াতেই জেনে গেয়েছেলম কত্তার ছামনে কুনো জিনিস নিয়ে আমার আমার করা যাবে না। একবার কি একটো নিয়ে এইরকম আমার আমার করে কথা বলতে যেতে দেখেছেলম, কত্তা একদিষ্টে আমার দিকে চেয়ে আছে। মনে হলো, ই মানুষ আমাকে চেনে না, এখুনি হাত ধরে ঘর থেকে বার করে দেবে। সেই আমার চেরকালের লেগে শিক্ষে হয়ে গেল।

বারে বারে কত্তা কত্তা করছি, তা বলে কেউ যেন না মনে করে যি কত্তা বি.এ. এম.এ. পাশ দিয়েছিল। আমার শ্বশুর লিকিনি খুব ল্যাখাপড়া-জানা আলেম মানুষ ছিল। কিন্তুক কত্তা কোথা থেকে কি শিখেছিল আমি জানি না। আমাকে কুনোদিন বলে নাই। ক-বছর। লিকিনি বাড়ি ছেড়ে বিবাগী হয়ে গেয়েছিল, নদী পেরিয়ে পুবের কুন গাঁয়ে কুন এক পীরবাবার কাছে ফারসি পড়ত। এই গপ্পো অ্যানেকবার শুনেছি। তবে সিসব ডানপিটেমির গপ্পো, ল্যাখাপড়ার কথা নয়। যা-ই হোক, আমার খালি মনে হতো, এই মানুষ জানে না এমন কিছু কি ভূভারতে আছে? এই সোমায় সে গাঁয়ের ইশকুলে ছেলে পড়াইত। সেটো চাকরি ছিল কি না জানি না, পড়াইত এই জানি আর কত্তামার ছোট ছোট ছেলেটিকে লিয়ম ধরে পড়তে বসাইত।

একদিন দেখি বাড়ির ভেতরে এসে মায়ের সঙ্গে কি নিয়ে কথা বলচে। এমনিতে কিছুতেই বাড়ির ভেতরে ঢুকত না, থাকত তো বাইরের একটো ঘরে। বাড়ির ভেতরে এলে বুঝতে হতো গুরুতর কুনো কথা আছে। তা মায়ের সাথে কথা বলছে, আমাদের কারুর কাছে যাবার হুকুম নাই। দূর থেকে দেখছি, ছেলে কিসব বলচে আর মা খালি ঘাড় নেড়ে নেড়ে বলচে, না বাবা, তা হয় না। তা কোরো না। কি যি কথা হলো কিছুই বোঝলম না। বোঝলম রেতে। হেঁশেলের। কাজকম্ম সেরে শেকল তুলে বাইরের ঘরে য্যান অ্যালম, কত্তা দেখলম ত্যাকননা বিছেনায় শোয় নাই। বসে আছে। খোঁকা তার। বিছেনায় অসানে ঘুমুইছে। খুব ঘেমেছে দেখছি গলার কাছটোয় ভিজে গেয়েছে। ঠান্ডা লাগবে না কি হবে–আঁচল দিয়ে ঘামটো মুছিয়ে দিচি ত্যাকন কত্তা বললে, শোনো, কথা আছে। গলার স্বর খুব মোলায়েম। কথা কত্তা এমন করে তো বলে না। এট্টু অবাক হয়ে কাছে যেয়ে বসলম। কত্তা বললে, জীবনে সুযোগ দুর্যোগ দুই-ই আছে। সব সময় সুযোগ আসে না, আর সুযোগ আসে যেমন আচমকা, তেমনি চলেও যায় আচমকা। তা একটা সুযোগ এসেছে। পঁচিশ-তিরিশ বিঘে। জমি একলাটে আছে। কদিন বাদে সেটা নিলাম হবে। রায়েদের জমি।

রায়েরা আবার কারা?

রায়েরা এ গাঁয়ের জমিদার। ওদের রবরবা আমাদের ছেলেবেলায় একআধটু দেখেছি, তবে আমাদের বাপচাচারা আরও ভালো জানত। এখন অবস্থা খুব পড়ে এসেছে। খেতে জোটে না। তাদেরই পঁচিশ-তিরিশ বিঘে জমি নিলাম হবে–ন-কড়ায় ছ-কড়ায় বিকিয়ে যাবে।

তা উ নিয়ে আমাদের কি ভাবনা? আমরা কি উদের কুনো উবগারে লাগব?

কথা শোনো, আমাদের এত বড় সোংসার, টেনে চলা খুব কঠিন। বাপজি তো সব প্রায় শেষ করে দিয়ে চলে গিয়েছে। নিলামটা ধরতে পারলে কাজ হয়। রায়েদের জন্যে খারাপ লাগছে খুব, হাতি খাদে পড়েছে। মানুষের দুর্দিনের সুযোগ নিতে নাই আমি জানি কিন্তু রায়েরা কিছুতেই এ জমি রক্ষা করতে পারবে না। আমি না নিলে আর কেউ নেবে।

কথা কটি বলে কত্তা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে। আমি তো অবাক–জমি নিতে হলে নাও গা— আমাকে শুদুবার কি আছে? আমি সঙ্গে সঙ্গে বললম, ই তো খুব ভালো কথা, নিলেম ডেকে নিতে পারলে সোংসারের লেগে খুব ভালো হয়। আমাকে আবার ই কথা শুদুইছ ক্যানে?

নিলাম তো আর খালি হাতে ডাকা যায় না? টাকা লাগবে না? অত টাকা কোথা থেকে পাব? কাঁচা টাকা আমার হাতে নাই। সংসারে কারও কাছে একটি পয়সা নাই। পয়সাকড়ি যা থাকে আমার কাছেই থাকে। খোরাকির বাইরে ধান যা আছে তা বিক্রি করে আর কতো টাকা পাওয়া যাবে? বলে কত্তা আবার আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলে। আমি ফের অবাক, টাকাপয়সার কথা আমার কাছে ক্যানে? উ বিষয়ে তো আমি কিছুই জানি না। আমিও কত্তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকলম।

টাকার কথা আমি কি বলব?

আমার এই কথার পরে কত্তা এতক্ষণ বাদে আসল কথাটি বললে, দ্যাখো, গয়না তুমি অনেক পেয়েছ, বাপের বাড়ি থেকে পেয়েছ, কত্তামার কাছ থেকেও পেয়েছ। কি হবে গয়না নিয়ে? কবার পরবে ঐ ভারী গয়না? একটু বয়েস হলে হয়তো আর কোনোদিন পরবে না। ঐ ওজনের লোহা বাড়িতে লুকিয়ে রেখে দিয়ে ভাবলেই হলো গয়না সবই আছে? একই কথা হলো না?

কথা শুনে আমি বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে আছি।

দু-একটা পরার মতো গয়না রেখে দিয়ে সংসারের এমন একটা কাজে বাকি গয়নাগুলো দিয়ে দিলে কি হবে তোমার? সবাই জানবে সংসার গড়ে তুলতে কোন্ এক পরের বাড়ির মেয়ে এই মেজ বউ-ই এত বড় কাজ করেছে!

কত্তার কথা শুনে আমার চোখ ফেটে পানি এল। এত নিষ্ঠুর, হায়রে এত কঠিন জান আমার সোয়ামির? কলজেটা ছিড়ে নিলেও তো এত কষ্ট হতো না। মেয়েমানুষের গয়না ছাড়া আর কি আছে! স্বামী চলে গেলেও গয়না থাকবে। আমার সেই গয়না আকন সব কেড়ে নেবে? চোখ-ভরা পানি নিয়ে কত্তার মুখের দিকে চেয়ে দেখতে গ্যালম, ঝাপসায় কিছুই দেখতে প্যালম না। তবে আমি এই ভবসংসারে কার ঠেয়ে যেয়ে দাঁড়াব? শুনতে প্যালম কত্তা বলছে, কেঁদো না। তুমি না দিলে গয়না আমি তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেব না। তোমাকে দেখেই বুঝতে পারছি মেয়েমানুষের কাছে গয়না কি! সন্তান গেলেও তারা গয়না ছাড়বে না।

কত্তার এই শেষ কথাটো যেন আগুনের ছ্যাকা দিয়ে আমার কলজেটো পুড়িয়ে দিলে। ই কি কথা, ই কি কথা, হায় হায়! চোখের পানি ত্যাকন ত্যাকনই শুকিয়ে গেল। একবার ঘুমনো ছেলের দিকে তাকালম, বালাইষাট, আমি হাজারবার লাখবার মরি তোর জানের লেগে! একবার কত্তার দিকে তাকালম। হেরিকেনের আলোয় অ্যাকন তার মুখটো দেখতে পেছি। দেখি কি, সি মুখে এটুও রাগরোষ নাই। আমার দিকে চেয়ে রয়েছে যে চোখদুটি তাতে কি যে ভরসা! তাই বটে, তাই বটে, মেয়েমানুষ এইরকমই বটে, নিরুপায়। আমি বললম, গয়না সব নিয়ে যাও। আমি মন খোলসা করে বলছি একটি গয়নাও আমি রাখতে চাই না।

না না, মোটা কঙ্কণ দুটো রেখে দাও। নিজে না পরো, ছেলের যখন বউ হবে; তাকে দিয়ে দিয়ো।

সেই রেতেই একটি একটি করে সমস্ত গয়নাগাঁটি পুঁটলিতে বেঁধে কত্তার হাতে তুলে দেলম। কদিন বাদেই জানতে পারলম, রায়েদের কাছ থেকে তিরিশ বিঘে জমি নিলেমে কেনা হয়েছে। কত্তা টাকা কি করে জোগাড় করেছিল সি আমি জানি না–গয়না বিক্রি করেছিল,

বন্দুক রেখেছিল তা আর কুনোদিন শুদুই নাই তাকে। এমন মানুষ, যিদিন নিলেমে জমি পাওয়া গেল, সিদিন বাড়িতে ঢুকে পেথম মাকেই ডেকে বললে,, সংসারের আরও তিরিশ বিঘে জমি হলো।

এই পেথম দেখলম আমার শাশুড়ি এগিয়ে যেয়ে ছেলের মাথায় হাত দিয়ে বললে, চিরজীবী হও বাবা, আল্লা তোমার হায়াত দরাজ করুক। এই বলে আঁচল দিয়ে চোখ মুছলে। অথচ রেতে য্যাকন ঘরে গ্যালম কত্তা শুধু বললে, শুনেছ তো, নিলাম ডাকা হয়ে গিয়েছে?

হিসেব করে ত্যাকন দেখলম দাদির ঠেয়ে পাওয়া আমার যোলো বিঘে জমি, শ্বশুরের জমি, আর এই নিলেমের জমি একাই করলে পেরায় আশি-নব্বই বিঘে জমি সংসারের হয়েছে। গাঁয়ে এত জমি আর কারও নাই। সবারই সাধারণ অবস্তা। মোসলমানপাড়ায় দশ-পনেরো বিঘের বেশি জমি কারুর নাই। হিঁদুপাড়াতেও তাই, খুব বেশি হলে দু-চারজনার চল্লিশ-পঞ্চাশ বা ষাট বিঘে। মহারাজার যে দুটি আত্মীয় ই গাঁয়ে আছে, তাদের জমি এট্টু বেশি বটে, তবু ষাট-সত্তর বিঘের বেশি হবে না। ইসব কথা কত্তার কাছেই শোনা। মন হলে কখনো কখনো ইসব কথা বলত।

কত্তাকে সারা জেবনে কুনোদিন নেশা করতে দেখি নাই। শখ করে কুনো সোমায় পান খেতে দেখেছি। তেমন সময়ে ফরসি হুঁকো টানতেও দেখেছি। খেত না, খেত না, য্যাকন খেত, ত্যাকন খুব আয়েশ করেই খেত। দামি অম্বুরি তামুক আনাত, পানের লেগে কিমাম কিনত। দেখে মনে হতো, এই বুঝি কত্তা পান ধরলে কিম্বা তামুক ধরলে। কিন্তুক এসব দু-মাস তিন মাস। তাপর তামুক হঠাৎ ছেড়ে দিলে, ফরসি হুঁকোটোও কোথা পড়ে থাকল। এমনি আজব মানুষ! তবে ইকথা বলব, য্যাকন পান ধরত কিম্বা হুঁকো খেত, মেজাজটো খুব শরিফ থাকত। কথা যা ঐরকম সোমায়েই বলত বেশি।

রায়েদের জমি যি কত্ত নিলেমে কিনে নিয়েছিল, তাতে আমার মনটো খুব খচখচ করত। মাঝে মাঝে মনে হত কত্তাও বোধায় এই নিয়ে আমাকে দুটো কথা বলতে চায়। কাজটো সে করেছে বটে, কিন্তু সি যেন নেহাত বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে বলেই করেছে। কথাটো এই যি জমি কি রায়েদের থাকত আমরা নিলেম না ডাকলে? কত্তা একদিন এমন করে রায়েদের কথা বললে তাতে মনে হলো যেন কেচ্ছা শুনছি। ফরসি টানতে টানতে শুরু করলে, এ গাঁয়ে মিদার যদি কেউ থাকে, তাহলে সে রায়েরা। এরা উঁচু বংশ, বামুন বংশ। গাঁয়ের আদ্দেকটার মালিক ছিল ওরাই। যেমন উঁচু মন, তেমনিই বেহিসাবি খরুচে। খাওয়া-পরায় সবই উড়িয়ে দিত। কিন্তু এদের কেউই মেজাজি ছিল না। সবাই বড় ঠান্ডা মানুষ। যে যা চাইত, ধরে বসত, দিয়ে দিত। এই করতে করতে সব শেষ করে দিলে। ছেলেপুলেরা কেউ গাঁ ছাড়লে না, লেখাপড়া শিখলে না, চোখের সামনে দেখলাম পঁচিশত্রিশ বছরের মধ্যে সব শেষ করে দিয়ে ফতুর হয়ে গেল। জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর অনেকেই এখন গা ছেড়ে চলে গিয়েছে, ছেলেদের কেউ কেউ কলকাতা-টলকাতা গিয়ে বাড়ির চাকর বা রাঁধুনি-বামুনের কাজ করছে। ভিটেমাটি পড়ে আছে, সাপ-খোপ বাসা করেছে। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে পাকা বাড়ি-ঘর, পুজোর মন্দির। ছাদ ফাটিয়ে বট-পাকুড় গাছ উঠেছে। বেনা ঘাস, গোয়াল-লতা, কন্টিকারির জঙ্গলে কাছে যাবার উপায় নাই। এই তো অবস্থা! দেখবে আর দুদিন বাদে ছোট রায় ঝুলি হাতে ভিক্ষে করতে বেরুবে। জমিগুলি আমি কিনলাম, খুবই খারাপ লাগে বটে তবে নিয়তি ঢুকেছে বংশে। মানুষের সংসারে নিয়মই এই, উঠতে উঠতে আকাশে ঠেকবে মাথা, তারপরে পড়তে পড়তে একদিন মাটিতেই আশ্রয়। এ হবেই–সব বংশেই হয়। নিয়তির পথ কেউ বন্ধ করতে পারবে না।

আস্তে আস্তে ফরসি টানতে টানতে ইসব কথা একদিন কত্তা বলেছিল আমাকে। কথা বলতে পারত বটে মানুষটো, অমন আর কোথাও শুনি নাই। ইসব কথা চেরকালের লেগে মাথার ভেতরে ঢুকে গেল : দেখো, কদিনের মধ্যেই জমির টাকা খেয়ে ফুরিয়ে দেবে রায়েদের ছোট তরফ, বড় বড় আইবুড়ো মেয়েদের বিয়ে পর্যন্ত হবে না।

ঠিকই তাই, কদিন বাদেই শোনলম, ছোট রায় তাদের বেরাট বাড়িটো ভেঙে সেগুনকাঠের কড়ি-বরগা, নোকশা-করা কাঠের সাজ আর আর যা কিছু আছে নকড়ায়-ছকড়ায় বিকিয়ে দিচে। সব ঘর ভেঙে দিয়ে একপাশে মাত্তর একটি ঘর রেখে সেখানে বাস করবে, এগনের এক কোণে রান্নার লেগে বানিয়ে নেবে একটো ছোট চালাঘর। যাকগো, ই বাড়ি থেকে রায়েদের বাড়ির আর একটিও জিনিশ কেনা হলো না।

০৭. সোয়ামি সোংসার নিয়ে আমার খুব গরব

যে শাশুড়িকে যমের মতুন ভয় করতম, মুখের দিকে তাকাইতে পয্যন্ত সাহস করতম না, সেই শাশুড়ি একদিন বৈকালবেলায় আমাকে তার ঘরে ডাকলে। খোঁকা ত্যাকন খানিকটো ডাগর হয়েছে, সে-ও সেই সোমায় আমার কাছে ছিল। ঘরে যেয়ে দাঁড়াইতেই শাশুড়ি আমার কাছে এসে বললে, মেতর-বউ, আমি একটা কথা বলি। এই বাড়ির লক্ষ্মী তুমি, তোমার পয়েই সবকিছু আবার হবে। তোমার শ্বশুরের মিত্যুর পর সোংসার ভেসে যেছিল, ছেলেমেয়ে নিয়ে অগাধ পানিতে পড়েছেলম। আমার ঐ মেজ ছেলে সব আবার ফিরিয়ে আনলে। সেই ছেলের বউ তুমি। আমি সব জানি, গায়ের গয়না খুলে দিয়েছ তুমি। আল্লা তোমার ভালো করবে। দোয়া করি তোমাকে। দ্যাওর, ননদ, জা সবাইকে তুমি দেখো। চিরকাল ওরা তোমাকে ভক্তি করবে, মেনে চলবে, আমি জানি। তোমার এই খোঁকা আমার বংশের মানিক। ওর হায়াত দরাজ হোক, এই দোয়া করি আমি–এই বলে শাশুড়ি আমার মাথার ওপর হাত রাখলে।

ঐ একবারই অমনি করে কথা বলেছিল আমার শাশুড়ি, আর কুনোদিন লয়। এমনিতে কথা পেরায় বলতই না। পাতলা পাতলা দুটি ঠোঁট চেপে থাকত, আমাদের সাথে য্যাকন কথা বলত কি কাঠ কাঠ যি লাগত! তা সি যাকগো, সেই থেকে আমি জানি, সব সোমায় নিজের নিজের করলে কিছুই আর নিজের থাকে না।

সোংসারের আয়-বরকত বেড়ে গেল। কত্ত একদিন তার মাকে হিশেব করে বুঝিয়ে দিলে যে চাষের জমি সব মিলে এক-শো বিঘে না হলেও আশি-নব্বই বিঘে হয়েছে। আউশ জমি কুড়ি-পঁচিশ বিঘে, তা থেকে আউশ ধান কিছু তো পাওয়া যাবেই, তা-বাদে সোমবচ্ছরের যব, গম, আলু, পেঁয়াজ, তিল, সরষে যা যা সংসারের দরকার তার সবই পাওয়া যাবে। জমিতে আখ লাগিয়ে চোত মাসে শাল করে যা গুড় পাওয়া যাবে, তাতে সোংসারের পেয়োজন মিটিয়ে অ্যানেকটো বেচাও যাবে। ডাল যা লাগছে, মুগ মুশুরি মাস মটর ছোলা আইরি সব ডালই সারা বছরের লেগে হবে। খোঁরো ডিঙিলি পটল ইসব তরিতরকারিও করা যাবে। আর সত্তর-আশি বিঘে জমির আমন ধানে বছরখোরাকি তো হবেই, সোংসারের দরকারে ধান কিছু বিক্রিও করা যাবে।

চার-পাঁচটো নাঙলের লেগে কেনা হলো আট-দশটো মোষ। এই এলেকার মাটি ভালো লয়, এঁটেল মাটি, ইদিকে গরুর নাঙল চলে না। এই বড় বড় চ্যাঙর ওঠে জমিতে, সি চ্যাঙর ভোলা গরুর কম্ম লয়। হাতি হাতি মোষ দরকার। মোষের নাঙলে-তোলা ঐসব চ্যাঙর আবার টানা দিয়ে ভাঙতে হয়।

চাষের লেগে একটা-দুটো করে আট-দশটো মোষ কেনা হলো। সেই সাথে গরু-বাছুরও বাড়তে লাগল। বাড়িতে এত লোক, ছোট ছেলে বলতে অবিশ্যি আমার খোঁকা, গরুর দুধ তো কম লাগে না। তাই গাই-গরু অ্যানেকগুলিন হলো। তাদের আবার এঁড়ে বকনা বাছুর যি কতো! সব নিয়ে গোয়াল ভত্তি। পেতলের বড় বড় বালতিতে দুধ আনা হয় দু-বেলা। বড় বড় লোহার কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হয় সেই দুধ। তাপর বাড়িতে পেঁয়াজের বড় পাহাড় হয়, রাখার জায়গা নাই। বাড়তি পেঁয়াজ বেচেও কুনো লাভ নাই। দু-পয়সা চার পয়সা সের। নেবেই বা কে? পাঁচ কামরার কোঠাঘরের একটো ঘরের মেজেয় পেঁয়াজ রাখা হয়েছে। সব পচে বাড়ি একদম দুর্গন্ধে ভরে গেল। শুধু পেঁয়াজ কানে, গুড়ের আবস্তাও তাই। খানা রাঁধার বিরাট তামার হাঁড়িতে গুড় রাখা হয়েছে। ঘরে রাখার জায়গা নাই, পিঁড়ের এক কোণে রাখা হয়েছে, ঢাকনা পয্যন্ত নাই। একদিন সবাই দ্যাখে, এই বড় একজোড়া ইদুর মরে তার মদ্যে পড়ে রয়েছে, মাগো কি ঘিন্না! সেই গুড় ফেলে দিলে গুড়ের ঢল বয়ে গেল গোটা এনে জুড়ে। একেই বলে উপছে-পড়া সোংসার। ধান নিয়েও কুনো কুনোবার মুশকিল হতো। অত বড় খামার এক-একটো একশো-দ্যাড়শো মণ ধানের মরাই–একটা-দুটো তো লয়, আট-দশটো সারা খামার জুড়ে, ছেলেপুলেরা লুকোচুরি খেলতে পারত–তা এক-এক বছর সেই খামারেও খ্যাড়ের পালুই আর মরাই করার জায়গা থাকত না। এইসব কথা অ্যাকনকার লোকের পেত্যয় হবে না কিন্তুক ইসবই আমি নিজের চোখে দেখেছি।

বাড়িতে ইদিকে মানুষ বেড়েই যেচে, বেড়েই যেচে। কাজের মানুষ আলেদা পাওয়া যেত না। গরিব পাড়া-পড়শি, ভাই-ভায়াদ, আত্মীয়, বেধবা কিম্বা গরিব বউরা বাড়িতে এসে থাকত, এটো ওটো করত, দুটো খেতে পেত। গামছা দিয়ে ঢেকে বাড়িতে ভাত-তরকারি নিয়েও যেত। কিন্তুক কেউ রেতে থাকত না। গরু মোষ মাঠে নিয়ে যাওয়া, চরানো, আবার বাড়িতে আনার লেগে সোমবচ্ছরের রাখাল রাখা হতো, মাহিন্দার থাকত দুজন। এই সবাই কিন্তুক ঘরের লোক মতুন, তবে রেতে নিজের নিজের বাড়িতে ফিরে যায়। বাড়িতে কেউ থাকে না।

এমনি অ্যাকটো পরিবার একবার এল ভিন গাঁ থেকে। বাপটো কুটে, একগাদা ছেলেমেয়ে নিয়ে মা হিমশিম খেছে। কত্তা খামারের পাশে ছোট খামারে ঘর বাঁধার লেগে তাদের জায়গা দিলে। কুটে বাপটো, কৃঞ্চি-কাবারি দিয়ে চালের ওপরে খ্যাড় চাপিয়ে ঘর একটো বানাইলে বটে, তা কাকেও তার চাইতে ভালো বাসা বানায়। সেই ঘরে সবারই জায়গা হলো। বড় ছেলেটো হলো মাহিন্দার, ছোটটোসে একদম ছোট–সে হলো রাখাল। বাপ ঘরের ভেতর দিনরাত শুয়ে থাকে, তামুক খায় আর কাশে। তিন-চারটো মেয়ে নিয়ে মা মাঠেঘাটে চরে বেড়ায়। তা বলে কেউ উপোস থাকত না, দুটো ভাত সবারই জুটত। তিন মেয়ের নোম্বা নোম্বা চুল, কুনোদিন ত্যাল পড়ে নাই তাতে, কটা শণের মতুন রং। বৈকালবেলা মা-টো এই তিন মেয়ের চুলের উকুন বাছতে বসত আর তারা নড়লেই পিঠে মারত গুম গুম করে কিল। খেতে পেলে তবেই না এমন করে উকুন বাছা!

ছুটো-ছাটা কাজের মানুষ আরও ছিল। তিন-চার আনা দৈনিক মজুরিতে সারা দিনের লেগে মুনিষ দুটো-একটো পেরায় দিন থাকত। তারাও সব গরিব আত্মীয়স্বজন। পানি খাবার বেলা ভরপেট বাসিভাত নাইলে মুড়ি আর দোপরবেলায় ভরপেট গরম ভাত এদের জোগাতেই হতো।

ইসব হলো সারা বছরের ব্যবস্থা। কিন্তুক বর্ষাকালে ধান রোপার সোমায় আর পোষ মাসে ধান কাটার সোেমায় একদম আলাদা বেবস্তা। ত্যাকন দশ থেকে পনেরো জনা মুনিষ পেত্যেকদিন কাজ করত। আবাদের সোমায় টানা বিশ-পঁচিশ দিন থেকে এক মাস পয্যন্ত তাদের থাকতে হত। ধান কাটার সোমায়েও তাই, শ্যাষ না হওয়া পয্যন্ত তারা থাকত। অত লোক কোথা পাওয়া যাবে? ভিন গাঁ থেকে, উত্তরের সব গরিব গাঁ থেকে আসত মুনিষরা। তা বাদে সেই কোথা ছোটনাগপুরের দুমকা জেলার সাঁওতালদের এলেকা থেকে সাঁওতাল মেয়ে-মরদ আসত কাজের লেগে। বর্ষাকালে ধান রোয়া হয়ে গেলে কিম্বা জাড়কালে ধানকাটা শেষ হলে এরা আবার সব নিজের নিজের জায়গায় ফিরে যেত। কত্তার ভাইরা চাষবাসের কাজ দেখাশোনা করত বটে কিন্তুক হাতে মাটি লাগাত না কেউই। একমাত্তর আমার সেজ দাওর নিজের হাতে কিছু কিছু কাজ করত। কিন্তু কত্তাকে তেমন কেউ দেখতেই পেত না। তবু এত বড় যজ্ঞি সে-ই সামলাত। সারা দিন সে বাড়িতে না থাকলেও গাঁয়েই পেরায় থাকত। স্কুল ছিল, কত্তামার বাড়ি ছিল। শহরেও যেত মাঝে মাঝে। শহরে গেলে ধোপ-দোরস্ত জামাকাপড় পরে ভোরবেলায় বেরিয়ে যেত, ফিরত রেতে। জামা-কাপড় আর কি–এই ধুতি আর শাট, কখনো কখনো পিরেন, শীতকালে কাশ্মীরি শাল–ইসবই পরত। কিন্তুক যেখানেই যাক, রেতে ফেরা চাই। চেরকাল এই দেখে অ্যালম, রাত কখনো বাইরে কাটাত না। মেঘঝড়বিষ্টি কোনো কিছুই মানামানি নাই, শতেক বেপদ ঘাড়ে নিয়ে হলেও বাড়ি ফিরবে। এক কোশ দূরে র্যাল ইস্টিশন। সিখানে যাবার পথঘাট নাই বললেই চলে। মাঝে মাঝে ধানের জমির আলপথ ধরে কিম্বা ডাঙামির বনবাদাড় ঝোপ-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে হতো। চারদিক সাপ-খোপে ভরা। গরমকালে ভায়ানক ধুলো আর বর্ষাকালে বেপজ্জয় কাদা। এরই মধ্যে সে যাতায়াত করত। বোধায় অত কষ্ট পেয়েছিল বলেই আর ক-বছর বাদে সোন্দর সড়ক করিয়েছিল গরমেন্টকে দিয়ে। দশ গাঁয়ের যোগাযোগ হয়েছিল র্যাল ইস্টিশনের সাথে।

আমরা আর কি বুঝব? কিন্তুক বড় বড় মানুষ আর বড় বড় শহরের সাথে কত্তার যি যোগাযোগ হচে তা যেন একটু একটু বুঝতে পারতম। তা না হলে অত শহরে যেত ক্যানে? বাড়িতেও দেখি অচেনা-অজানা লোজন আসার কামাই নাই। আমাদের মতুন মেয়েমানুষদের অজানা-অচেনা তো হবেই, কত্তাই মাঝে মাঝে বলত, অ্যামন লোকও য্যাকন-ত্যাকন বাড়িতে আসে কত্তা যাদের চেনে না। আত্মীয়-কুটুম ছাড়া গাঁয়ে-ঘরে কার বাড়িতে আবার কটো অচেনা লোক আসে? তাইলে ই বাড়িতে এত লোক আসবে ক্যানে? ভয়ে আমার বুক দুরদুর করে–কি জানি এত বেগানা লোক ক্যানে আসে বাড়িতে!

ল্যাখাপড়া এট্টু এট্টু য্যাকন শিখছি, ত্যাকন কত্তা একদিন বলেছিল ই দ্যাশ পরাধীন। উ কথার মানে ত্যাকন কিছুই বুঝি নাই। কত্তাকে শুদিয়ে জেনেছেলম যি, ই দ্যাশ মাহারানীর রাজত্ব। দ্যাড়শো বছর ধরে ই দ্যাশ পরাধীন। তার মদ্যে তিন কুড়ি বছর ই দ্যাশ শাসন করেছে এই মাহারানী। সেই রানী মরেচে পেরায় বিশ বছর হলো। অ্যাকন তার ছেলে রাজা। কি আচ্চয্যি, কোথাকার কোন্ দ্যাশের লোক রাজা-রানী হয়ে ই দ্যাশ শাসন করছে!

ইসব কথার কিছুই বুঝতে পারতম না। রানী শাসন করছে, না রাজা শাসন করছে, চোখে দেখতেও পেচি না, কানে শুনতেও পেচি–শাসন করছে তা আমার কি? আমার বিয়ের সোমায় শুনেছেলম একটো যুদ্ধ হচে সারা দুনিয়া জুড়ে। সি তো শোনা কথা, যুদ্ধ কিছু দেখি নাই। তা আজকাল দেখি কত্তা বলছে, সারা দুনিয়ার এই যুদ্ধ জিতে রাজা লিকিনি মুসলিম জাহানের খলিফা যি দ্যাশে থাকে সি দ্যাশ থেকে তাকে তাড়িয়ে দেবে।

কত্তার কথা তেমন বুঝতে না পারলেও কেমন ভয় ভয় করতে লাগল আমার। এইসব লেগেই কি বাড়িতে অত অচেনা-অজানা মানুষ আসছে? এই লেগেই কি কত্তা পেরায় পেত্যেকদিন শহর-গঞ্জে যেচে?

ইদিকে বাড়িতে সুখের অন্ত নাই। দুধ ঘি মাখন মাছ গোশতো তরি-তরকারি চাল-ডালে ভেসে যেচে বাড়ি। দিনদিন লোক বাড়ছে। মুনিষ-জন, বছর-কাবারি মাহিন্দারে বাড়ি ভরা। কত্তা আজকাল পেরায়ই বাড়ির ভেতরে মা-বুনের কাছে আসে এটো-ওটো কথা বলার লেগে। কুনোদিন এসে বলে, মা, তুমি জানো বাপজির তাজি ঘোড়া ছিল, নিজের ছয়-বেহারা পালকি ছিল, বাউরি-পাড়ায় সোমবচ্ছরের জন্যে বেহারাদের ঘর ঠিক করা ছিল। সেসব কোনদিকে কি হয়ে গিয়েছে। পরচালির খুঁটিতে ঘোড়ার পুরনো জিনটা দেখি আর ভাবি, সব আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। পালকি আবার নতুন করে তৈরি হবে। গিগাঁয়ের ছুতোরমিস্ত্রিরা দুদিন বাদে আসবে। পুরনো পালকিটা নতুন করে ফেলব। নতুন ছাউনি হবে, নতুন ভঁপ, নতুন রঙ হবে। আর ঐ সঙ্গে গরুর গাড়ির নতুন একটি বড় টপ্পরও করিয়ে নেব।

ঘরের কাজ করতে করতে আড়চোখে চেয়ে দেখি, শাশুড়ির মুখে বড্ড খুশি। মুক্তোর মতুন জিরি জিরি শাদা দাঁত দেখা যেছে কি যেছে না। ছেলের লেগে শতেক দোয়া যেন ঝরে পড়ছে চাউনি থেকে। শাশুড়ি বলছে, সে তো ভালো কথা বাবা। আমি জানি, তুমি আবার সব করবে।

হ্যাঁ, সব আমার নতুন করে হলো। লতুন পালকি হলো, গরুর গাড়ির লতুন ছই হলো। বাইরে কাজ হতো, কাঠের গন্ধ, বাঁশের গন্ধ, রঙের গন্ধ বাড়ির ভেতরেও প্যাতম। কাঠ চাচা, বাঁশ চ্যাঁচা, বেত চাচার শব্দও কানে আসত। সব তৈরি হয়ে গেলে একদিন সিসব দেখেও অ্যালম।

কদিন বাদে, এক-দু-মাস হবে, কত্তা একদিন ঠিক দোপরবেলায় বাড়ির ভেতরে এসে মাকে বললে, ঘোড়া একটি কেনা হয়েছে, আমাদের খামারে বাঁধা আছে। আড়াল থেকে দেখবে চলো।

শাশুড়ির বাইরে আসার মন ছিল না। কিন্তুক ছেলে বললে আর কি করবে। বউ-ঝি বিধবা ননদ সবাইকে সাথে যেতে বললে। কত্তার ভাইরা কেউ ছিল কি না মনে পড়ছে না। পরচালির দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলম, এই বড় একটো সর্ষে-সর্ষে রঙের ঘোড়া খুঁটিতে বাঁধা আছে, মাহিন্দার ছোঁড়াটো একবার কাছে যেচে, আবার ভয়ে পিছিয়ে আসছে। ঘোড়ার লতুন সাজ, নতুন চামড়ার জিন, ইসব কেনা হয়েছে–সি-সবের গন্ধ পেচি, চামড়ার ক্যাচম্যাচ আওয়াজও পেচি। শাশুড়ি এট্টুখন দাঁড়িয়ে থাকলে, তাপর বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

আর কি, সব তো মোলোকলায় পুন্ন হলো। সবাই এমন ভাব করতে লাগলে যেন সব গরবই আমার। মিছে বলব না, সি আমার খুব ভালো লাগত। তাই বলে দেমাগ আর গরব দেখানোর কুনো বাগ নাই। আমি জানতম, উসব করতে গেলে কত্তা আমার নতিজার বাকি রাখবে না। চিনি তো উ মানুষকে। তা আমারও কুনোদিন উসব করতে মন যায় নাই। আমি ছেলের মা, আমার তো আর কুনো গরব নাই। এক এই গরবই য্যাথেষ্ট!

০৮. সোংসার সুখ-দুখের দুই সুতোয় বোনা

বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার খোঁকা হয়েছিল। তাপর আট বছরের মধ্যে আমাদের সোংসারে আর কুনো ছেলেপুলে হয় নাই। ভাশুরের বিয়ে কত্তার বিয়ের ক-বছর আগেই হয়েছিল। পেথম পেথম মনে হতো, বড় বউয়ের ছেলেমেয়ে হতে একটু সোমায় লাগছে। তা-পর এক বছর যায়, দু-বছর যায়, তিন বছর যায়, য্যান ছেলেপুলে হলো না, ত্যাকন বোঝা গেল উয়াদের আর সন্তান হবে না। ওষুধ-পত্তর করা হয়েছিল বৈকি। কিন্তুক কেরমে কেরমে সবাই আশা ছেড়ে দিলে। বড় বউ তাইলে বাঁজা। আর বড়কত্তা, আমার আলাভুলো ভাশুর, উ নিয়ে কুনোদিনই মাথা ঘামাইলে না। সে তো সংসারের কুনো কিছুতেই থাকত না!

সেজ দ্যাওরের বিয়েটা হলো অ্যানেক পরে। তার বিয়ের বয়েস পেরিয়ে গেয়েছিল। তবে এট্টু দেরি হলেও কত্তাই উদযুগ করে বিয়ে দিলে। কিন্তু বিয়ের তিন-চার বছর পরেও তার ছেলেপুলে কিছু হলো না। সেই লেগেই বলছেলম আট বছর ধরে সোংসারে ছেলে বলতে আমার ঐ খোঁকা। তা এই আবস্তায় সে আর একা আমার খোঁকা হয়ে ক্যানে থাকবে? সে হলো সবার চোখের মণি জানের জান। একা সোংসারে দিন দিন ছিরিবৃদ্ধি। সবাই মনে করতে লাগল ঐ খোঁকাই এত সুখের মূল। তাকে নিয়ে কি যে করবে সি আর কেউ খুঁজে পেত না। সবকিছুতে আগে বড় খোঁকার কথা। বাড়িতে মন্ডা মিঠাই এলে বড় খোঁকা কই? যে য্যাকন বাইরে যেচে, কিছু একটো হাতে করে আনছে বড় খোঁকার লেগে। কত্তাই বরঞ্চ খোঁকার দিকে তেমন নজর দেয় না। সে হয়তো সোমায়ই পায় না। হয়তো ভাবত, ছেলে তো সবারই, আমি না দেখলেই বা কি, দেখার লোকের কি অভাব? ছোট বুনটির ত্যাতোদিনে বিয়ে হয়ে গেয়েছিল বটে; তবে তারপরের ছোট ভাই দুটির ত্যাকননা বিয়ে হয় নাই। এই ল আর ছোট দ্যাওর দুটি আমার দুটি ভাই-ই ছিল, যা বলতম তা-ই শুনত আর খোঁকাকে খানিকক্ষণ না দেখলেই চোখে যেন আঁদার দেখত।

এই করতে করতে আট বছর কেটে গেল। কি আচ্চয্যি মা, চোখের ছামনে আমার শামলা রঙের খোঁকা আট বছরেরটি হয়ে গেল। কি তার চোখে মায়া কি তার, মুখে লাজুক হাসি! সি আর কুনোদিন দেখলম না! ঠিক সোমায়ে তার হাতেখড়ি হলো। কত্তা নিজেই হাতেখড়ি দিলে। এই সোমায়ে, কি করে আমার মনে নাই, গাঁয়ে এক ওস্তাদজি এল। তাকে গাঁয়ে আনা হলো, নাকি সে নিজেই এল, অ্যাকন আর বলতে পারব না। তার কাজ হলো খোঁকাকেই পড়ানো। গাঁয়ে, মোসলমান পাড়ায় তো পড়ার মতুন আর একটি ছেলেও ছিল না। কত্তা মাটির পাঁচির দিয়ে ঘেরা একটো বড় ভিটে কিনেছিল। একটি মাত্তর ছোট মেটে ঘর ছিল সিখানে, তাতে কুনো জানেলা নাই। আলকাতরা মাখানো একটিমাত্র দরজা ছিল। সেই ঘরে হলো ওস্তাদজির আস্তানা আর মোটে একজনা পোড়ো আমার খোঁকা। সবাই বলত কালা ওস্তাদজি, কানে সে কিছুই শুনতে পেত না। ভারি ভালো লোক, তিন-বেলা তার খাবার যেত আমাদের বাড়ি থেকে।

খোঁকার জন্মের চার বছর পর আমার একটা সন্তান লষ্ট হলো। সে-ও খোঁকা ছিল। পেট থেকে মরাই জন্মাইছিল। কে আর কি করবে? দু-দিন বাড়িটো থম ধরে থাকল, শুদু শাশুড়িকে মুখ ফুটে আহাজারি করতে শুনেছেলম। ত্যাকন দুনিয়া কঁকা ছিল, গভভভ লষ্ট হলে সবারই খুব গায়ে বাজত। ই ক্যানে হলো, ই ক্যানে হলো, এমন দুর্দৈব ক্যানে–শাশুড়ির খালি এই আপসোস! ইদিকে ছেলে হতে যেয়ে আমার পেরায় সব রক্ত বেরিয়ে গেল, মরার মতুন হলোম। শরীর শুকিয়ে কাটি হলো। মরা ছেলের মুখটো একবারই দেখেছেলম। সি না দেখাই ভালো ছিল। সোমায়ের অনেক আগেই সে দুনিয়াতে আসতে চেয়েছিল। যিদিন বাড়িতে এই বেপদ ঘটে, সিদিন কত্তা বাড়িতে ছিল কি না মনে করতে পারছি না। বোধায় ছিল না। বাড়ির বউয়ের সন্তান হবে ই ছিল মেয়েলি বেপার, বাড়ির পুরুষদের ইনিয়ে নিয়ে কুনো ভাবনাই ছিল না। তাদের তো কিছু করার নাই। হাড়িবউ দাই ঠিক করা আছে, সি ব্যবস্থা বছরকাবারি। বছরের শেষে দাই একটো সিদে পায়, শাড়ি-কাপড় পায়, চাল-ডাল পায়, পারলে কেউ কেউ নগদ-ও কিছু দেয়। সন্তান হলেও দেয়, না হলেও দেয়। বছর শেষে চোত মাসের মদ্যেই দেয়। আর সন্তান হলে তো কথাই নাই, ত্যাকন অ্যানেক কিছুই পায়। বড়লোকের বাড়ি হলে সোনা-রুপোর গয়নাও পায়। আমার বড় খোঁকা হলে তার দাই সোনার মাকড়ি পেয়েছিল। যাকগো, কত্তা সিদিন ছিল কি ছিল না মনে নাই, এতটুকুনি মরা ছেলে ন্যাকড়ায় জড়িয়ে একপাশে রাখা হয়েছে। রেতে ফিরে কত্তা কি একবার দাঁড়িয়ে দেখলে? কি জানি! ডাক্তারবদ্যির কুনো কথাই ছিল না। তাই ভাবি, ছেলে মলো, মা-ও তো মরতে পারত। তাই যেদি হতো, তাইলে কত্তা কি করত? ব্যাটাছেলে আবার কি করবে? মায়ের কথা শুনে দিনকতক বাদে আবার বিয়ে করত। একটো ফল দিয়ে ফলগাছ মরে গেয়েছে, তা আবার তার পাশে আর একটো ফলগাছ লাগাতে হবে না? ইসব কথা অ্যাকন মনে হয়, ত্যাকন কিন্তুক মনে হয় নাই। কত্তার মুখটা কেমন হয়েছিল ত্যাকন দেখি নাই, পরেও কুনোদিন কত্তা ই নিয়ে কুনো কথা বলে নাই।

বেপদের ছোঁয়া কি চেরকাল থাকে? ই বাড়িতেও থাকল না। একদিন খবর পাওয়া গেল ছোট যে বুনটির বিয়ে হয়েছিল দশ কোশ দূরের এক গাঁয়ে, সেই বুনের একটি খোঁকা হয়েছে। যেদিও সি অন্য বংশের বেপার, তাদের বাড়িতে পেথম বংশধর এয়েছে, তবু মেয়ে তো ই বংশের! সেই লেগে ই বাড়ি আনন্দের সাগরে ভাসতে লাগল। কত্তা তার ছোট বুনদের কি চোখে দেখত সিকথা আগে বলেছি। বিশেষ, তার এই ছোট বুনটিকে ভারি ভালোবাসত! সোম্বাদ পেয়েই কতো কি সামিগ্রি দিয়ে ঝুড়ি বাঁক ভরে লোক রওনা করিয়ে দিলে আর নিজে ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটল ছোট বুনের বাড়ি। গাঁয়েই যে বড় বুনের বিয়ে হয়েছিল, তার ত্যাকন বেশ কটো ছেলেমেয়ে হয়েছে, দুটি ভাগ্নে তো ত্যাকন বেশ ডাগরই হয়েছে, তবু ভিনগাঁয়ে ছোট বুনের খোঁকা হবার খবরে কত্তা কি খুশি যি হলো সি আমার অ্যাকনো মনে পড়ে।

আস্তে আস্তে সব আবার আগে অ্যাকন জোয়ান মরদ হয়ে উঠেছে। দুজনাই বড় স্কুলে পড়ছিল। সেজ-জনা তো ল্যাখাপড়া করলে না, আমার বিয়ের আগেই বোধায় স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল। অ্যাকন দেখছি ল-দ্যাওরের-ও মতিগতি ভালো লয়, স্কুল মনে হয় ছেড়েই দেবে। কত্তার কাছে এসে মাথা নামিয়ে দাঁড়ায়, পায়ের নোখ দিয়ে মাটি খোঁড়ে আর ব্যাবসা-ট্যাবসা করা যায় কিনা ভয়ে ভয়ে ভাইকে সেই কথা শুদোয়। তবে ছোট দ্যাওরটি মন দিয়ে স্কুলে পড়ছে। আমার খোঁকাও কালা ওস্তাদজির কাছ থেকে ছাড়ান পেয়ে স্কুলে ভত্তি হবে হবে করছে। এই সোমায়ে য্যাকন। সবারই মনে হছিল সোংসারে শিগগিরি আর কুনো ছেলেমেয়ে আসবে না, সেইরকম সোমায় আমারই আর একটি খোঁকা হলো। বড় খোঁকার বয়েস ত্যাকন আট বছর।

বড় খোঁকা ছিল শামলা, সি রঙ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যেত, জানে শান্তি হতো। গরমকালে গাছের ছোঁয়ায় বসার মতুন মনে হতো। আর ই লতুন খোঁকার রঙ হলো গোয়রা ধপধপে। বড় খোঁকা হলো ঠিক তার বাপের মতুন–কৰ্ত্তার গায়ের রঙ-ও ছিল শামলা–লতুন খোঁকা হলো তার মামার মতো।

তাইলে সোংসারে ত্যাকননা পয্যন্ত ছেলেপুলে বলতে হলো আমার দুটি খোঁকাই। সেই কালে ছেলেমেয়ে কমবেশি নিয়ে কেউ কিছু ভাবত না। চাকরি করে কঁচা টাকা আয় করে সবকিছু কিনে খাওয়া তো ত্যাকন ছিল না। সবাই গাঁয়ে-ঘরে থাকে, বাইরে আর কে যেচে? বাড়ির খেচে, বাড়ির মাখছে। শুদু কি মানুষ? গরু ছাগল কুকুর বেড়াল সবারই হক আছে। বলতে গেলে এক থালাতেই সবাই খেচে। পগারে, জমিতে, ড্যাঙ্গায় যিখানে ঘাস হয়েছে, সি ঘাস দুটো ছাগলে খেলেও যা, দশটো ছাগলে খেলেও তা-ই। ঘাস কি ফুরিয়ে যেচে? সব্বারই গরুছাগলে সি ঘাস খেতে পারবে। বাড়িতে একটো ছেলে, না দুটো ছেলে, না দশটো ছেলে সি হিসেব ক্যানে করবে লোকে? খাক না সবাই মিলে য্যাতোক্ষণ আছে। তাই দেখতম পেরায় সব বাড়িতেই পাঁচটো-ছটো ছেলেমেয়ে আছেই। দশ-বারোটো, পনেরোটা পয্যন্ত ছেলেমেয়ে হত কারু কারু। তবু গাঁ-ঘর ফাঁকাই লাগত, অ্যাকনকার মতুন গিগি করত না।

লতুন খোঁকার জন্ম হলো বলে বাড়িতে তাই আনন্দ বাড়ল বই কমল না। শাশুড়ি ননদ আমাকে নিয়েই বড়াং করতে লাগল। তারা বলত মেতর বউয়ের পয়েই সব হচে। আয়-সম্পত্তি বাড়ছে, আবার দ্যাখো ক্যানে, বংশও বাড়ছে।

এই করতে করতে দিন পেরুইচে, মাস পেরুইচে, বছর পেরুইচে, শ্যাষে দু-বছর গেলে, আমার পরের খোঁকাটি দু-বছরেরটি হলে, একদিন জানা গেল সেজ বউ বারদার। এই কথা জেনে আমার আনন্দ হলো সবচেয়ে বেশি। এতদিন পেরায়ই মনে হতো সবারই সব সুখ যেন আমি একাই কেড়ে নিয়েছি। সুখ যি ভাগ করে নিতে হয়। নিজের সুখ কম করে নিলে তবে সেই সুখ বাড়ে। আমি সেজ বউয়ের খুব আদর-যত্ন করতে লাগলম। অনেক কাজ আর আমি তাকে করতে দেতম না, নিজেই করতম।

গাঁয়ের খাওয়াদাওয়া ত্যাকন খুব শাদামাটা, একইরকম খাবার-দাবার সব বাড়িতে। সেই ভাত ডাল তরিতরকারি! মাছ গোশতো খুব কম। মাছ যেদি বা মিলত, গোশত খাওয়া খুবই কম। হিঁদুরা বোধায় সারা বছরেও একদিন গোশতো খেত না। মোসলমানরা মুরগি পুষত বলে ডিম আর মুরগির গোশতোটো কখনো কখনো খেতে পেত। সেজ বউয়ের খাওয়াটো যাতে ওরই মদ্যে একটু ভালো হয়, আমি সেই চেষ্টা করতাম। তবে সে খুব সামান্য। কারও লেগে, কুনো কারণে আলাদা খাবার-দাবারের কথা ত্যাকন কেউ ভাবত না। ছেলেমেয়ে হবে, না হবে, ভূ-ভারতে রাতদিন হচে, ইয়ার লেগে আবার হ্যানো লয় ত্যানো করতে হবে ক্যানে। সি যা-ই হোক, দুধ আর ডিমটো আমি আলাদা করে সেজ বউকে জোর করে খাওয়াতম। দশ মাস। দশ দিনের মাথায়, কে জানে দশ মাস, না ন-মাস–সবাই দশ মাস দশ দিনই বলত, তাই বলছি, দশ মাস দশ দিনের মাথায় সেজ বউয়ের একটো মোটাসোটা খোঁকা হলো। আপনাআপনিই হলো। দাইবউ এসে দেখে খোঁকা হয়ে গেয়েছে। মাটিতে পড়ে ওঁয়া ওঁয়া করে কাঁদছে। আমরা সবাই মজাক করে হেসে হেসে বললম, দাইবউ, তোমার ইবার আর কুনো পাওনা নাই, আঁতুড়ঘরে ঢুকতেও হলো না। ই ছেলে তোমাকে কি দাই-মা বলে ডাকবে?

কথা শুনে দাইবউ লথ নেড়ে নেড়ে কি হাসতেই না লাগল। ইয়ার পরের কথাটো এইখানেই বলে দিছি। সেজ বউ আর কুনো সোমায় নিলে না–পরের বছর, এক বছর হয়েছে কি হয় নাই, তার আর একটো খোঁকা হলো।

০৯. এইবার বাপের বাড়ি যাব

দুই ছেলে নিয়ে বাপের বাড়ি যেচি। ছোট ছেলেটো ত্যাকন একটু ভঁটো হয়েছে। মাঝখানে পরপর দু-বছর বাপের বাড়ি যাওয়া হয় নাই সাংসারের হ্যাঙ্গামে। বিয়ের পর থেকে পিতিবারেই গরমকালে বাপের বাড়ি যাওয়া হয়েছে। আবার পিতি বছরেই বাপের বাড়ি থেকে ভাদর মাসের শেষে, নাহয় আশিন মাসে মা কতো যি খাবার-দাবার, পিঠেপুলি, ফলমূল, কাপড়-জামা পাঠাইত তার সীমা নাই। সৎ-মা বলে যি কোথাও গাফিলি হবে, তার জো ছিল না। ভারা কাঁধে নিয়ে লোক আসত, সঙ্গে আসত বাগদিবউ। অ্যানেকরকম জিনিশ আসত। কুনো কুনো বছর আবার বড় মিরিক লয়তো রুই মাছও আসত। শাশুড়ি ইসব যেমন খুব পছন্দ করত, তেমনি নিজের কত্তব্যও করত। ফেরত যাবার সোমায় বাগদিবউকে খুশি করে দিত। ভারাটো-ও ফাঁকা যেত না। আমি বাপের বাড়ি যাই আর না যাই মায়ের কিন্তুক উসব পাঠানোর কুনোবছর কামাই ছিল না।

মাঝখানে দু-বছর যাই নাই। যাই নাই কিন্তুক ইবার যেই যাবার কথা হলো, কত্তাও মত দিলে, ত্যাকন জান যেন ছেড়ে যেতে লাগল। কি করে ভুলে ছেলম মা! কোন্ নিব্বাসনে পড়ে আছি? কাদের নিয়ে কি করতে সোদর ছেড়ে এত দূরে আছি? কোথা রইল মা-বাপ, কোথা রইল ভাই-বুন, কোথা রইল গাঁ-ঘর–এইসব মনে করে বুকের মদ্যে হু হু করতে লাগল।

আমি বাপের বাড়ি য্যাতম আমাদের নিজেদের মোষের গাড়িতে আর ফিরে আসতম বাপের বাড়ির গরুর গাড়িতে। গাড়ি বিহানবেলায় যাবার লেগে তৈরি হলো। গাড়িতে খ্যাড় বিছিয়ে তার ওপর মোটা মোটা চারটো ফুল-তোলা কাঁথা বিছিয়ে বিছেনা তৈরি হলো। নতুন টপ্পরের পেছনের মুখ শাড়ি দিয়ে বাঁধা, ছামনের মুখ-ও শাড়ি দিয়ে বাঁধা। একবার ভেতরে ঢুকলে আর কিছুই দেখবার উপয় নাই। মাহিন্দার ছোঁড়াটো গাড়ি ডাকিয়ে নিয়ে যাবে, পাকা বাঁশের লাঠি নিয়ে পেছু পেছু হেঁটে যাবে হলা বাগদি। পৌছে দিয়ে গাড়ি নিয়ে ফিরে আসবে।

দুই ছেলে সাথে করে গাড়িতে উঠে টপ্পরের ভেতরে ঢোকলম,, কবরের ভেতরে ঢোকলম! বড় খোঁকা ত্যাকন অ্যানেকটো সেয়ানা হয়েছে। সে ভেতরে থাকবে ক্যানে, গাড়োয়ানের কাছে যেয়ে বসবে। আমি খালি ভাবচি পাড়াটো শুধু পেরুইলে হয়, মাঠে যেয়ে পড়তে বাকি, টপ্পরের ছামনের শাড়িটো তুলে দোব। গাড়ির কাঁচ কাঁচ আওয়াজ হচে, টপ্পর লতুন রঙ করা হয়েছে, তার গন্দো আসছে, টপ্পরের সরু একটো ফাঁক দিয়ে রাস্তার লাল ধুলো দেখতে পেচি। বোঝলম, পাড়াটো পেরিয়ে এসে গাঁয়ের ঠিক বাইরে বড় দিঘিটোর দখিন পাড় দিয়ে যেচি। শুকনো ডহরে হড় হড় করে গাড়ি নেমে আবার রাস্তায় উঠতেই আমি খোঁকাকে বললম, ছামনের কাপড়টো সরিয়ে দে তো বাপ।

কাপড় সরিয়ে দিতেই এমন ভালো লাগল সি আর কি বলব! সকালবেলার হাওয়া এসে গায়ে লাগল, জানটো যেন তর হয়ে গেল। ইদিকে নদীনালা তেমন নাই, শুদু ধানের জমি। বিরাম জমি লয়, সেই লেগে মাঠ ধু ধু করে না। ফসলি ধানের জমির মাঠ, তার কি অরম্ব, শ্যাষ নাই? যিদিকে তাকাই, চোখ যেচে যেচে যেচে, কোথাও আটকাবে না। উঁচু-নামো-ও নাই কোথাও। শ্যাষে অ্যানেক দূরে চোখ যেয়ে ঠেকছে কুনো একটো গায়ে। মাথার ওপরের আসমানের মতনই মাঠের আসমান।

সেই সোমায় রাস্তাঘাট তেমন ছিল না। পাকা রাস্তা তো লয়-ই, কাচা সরান-ও লয়। মাঠের ওপর দিয়ে পায়ে-চলার রাস্তা চ্যাওড়া আলের ওপর দিয়ে। লোকে বলে পথ-আল। আর আছে গরু-মোযের গাড়ি চলার অনেক অ্যানেক রাস্তা। কিলবিল করছে। এঁকে-বেঁকে হয়তো দশটো রাস্তার একটো যেয়ে গাঁয়ে ঢুকেছে। ইসব রাস্তা ধান-কাটার সোমায় জাড়কালে খুব ব্যবহার হয়েছে। অ্যাকন খরানির কালে আস্তে আস্তে ঘাসে ঢেকে যেচে। শুদু একটো-দুটো রাস্তা এক গাঁ থেকে আর এক গাঁ হয়ে মাঠের বুক চিরে কোথা গেয়েছে কে জানে! গাড়ি যেয়ে যেয়ে সিসব রাস্তায় খুব ধুলো। বাতাসে উড়ছে, আর বেশি বাতাস হলে ধুলোয় ধুলিষ্কার শাদা মেঘ হয়ে উড়ে বেড়াইচে।

মাঠের মাঝে এসে দেখলম, কুনোদিকে লোকজন দেখা যেচে না। অ্যাকন থাকবেই বা ক্যানে লোক? সেই মাঘ-ফাগুনে ধান কাটা হয়ে গেয়েছে। সব একফসলা বোয়া আমন ধানের জমি, ধান ছাড়া আর কিছু হয় না। ধান কাটার পরে জমি সব অ্যাকন ফাঁকা পড়ে আছে, নাড়াগুলিনও ধুলোয় ঢেকে গেয়েছে। আবার জষ্টি মাসে পানি হয়ে জমিতে বাত না হলে গরু-মোষের নাঙল নিয়ে মানুষ মাঠে নামবে না।

আমি তাই টপ্পরের দু-মুখের শাড়িই খুলে দিতে বললম। কে আর দেখছে? দুই পুত নিয়ে বাপের বাড়ি যেচি, ভয় তো কিছু নাই! সঙ্গে লোকও আছে। গাছপালা ইদিকে তেমন নাই বটে, তাই বলে বনকুল শেয়াকুল, র্যালপাতি ইসবের ঝোপ-ঝাড় কি নাই? আর আছে যিখানে সিখানে থ্যালানে থ্যালানে পুকুর। অ্যাকন শুকিয়ে কাঠ। দু-একটোয় সামান্য পানি আছে, অ্যাকটো-দুটো আছে বেশ পানিতে ভরা। সি পানি খাওয়া-ও যায়। ইসব মেঠো দিঘির পাড়ে বেরাট বেরাট বট-পাকুড় গাছ। তাদের হেঁয়ায় খানিকক্ষণের লেগে গাড়ি থামিয়ে গরু-মোষের বিঘ্রাম হয়। উদের পানি খাওয়ানো-ও হয়।

আমরা তা-ই করলম, অ্যাকটো বড় পাকুড় গাছের তলায় গাড়ি থামিয়ে গাড়োয়ান মোষদুটোকে পানি খাওয়াইতে নিয়ে গেল। আমি-ও কঁকালটো একটু ছাড়ানোর লেগে ছেলেদুটোকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলম। দ্যাখলম, হলা বাগদি ত্যাল-চুকচুকে পাকা বাঁশের লাঠিটি বগলে রেখে দু-হাত জোড় করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ভয় কিছু নাই। জানি যি হলা বাগদি কুনো বেপদ এলে জানকে জান করবে না, তাকে না মেরে আমার কি আমার সন্তানদের গায়ে কেউ একটো আঁচড় পয্যন্ত দিতে পারবে না।

আমি এট্টু ইদিক-ওদিক হাঁটছি, বড় খোঁকা বটগাছটোকে ঘুরে ঘুরে দেখছে কি কি পাখি আছে। দোপরবেলা, তাই পাখি ডাকছে না বটে কিন্তুক অত বড় গাছে অনেক পাখি নড়েচড়ে বেড়াইছে বেশ বোঝা যেচে। গাছটো মনে হচে জ্যান্ত, কথা বলছে। গাছতলায় খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলম। হ্যাঁ, অ্যাকন মনে হচে, মাঠের ঠিক মাঝখানে এয়েছি। কুন্ দিকে কুন্ গাঁ তা আর বোঝা যেচে না। ধুলোয় লেপুটে গেয়েছে। অ্যাকন আসমানও লাগছে গোল, মাঠও লাগছে গোল। একটু ভয় লাগল, ক্যানে তা জানি না। খালি মনে হতে লাগল কুনো রাস্তাই আর শ্যাষ হবে না। কি করে কোথা শ্যাষ হবে কে বলতে পারবে? মনে হচে, ঘরবাড়ি পুকুরঘাট সবুজবন আর কি দেখতে পাওয়া যাবে! ইকথা মনে করে নিজের মনেই হাসলম। কতোবার ই পথ দিয়ে বাপের বাড়ি গেয়েছি। যতোদূরই হোক, পথ কি ফুরোয় নাই, মায়ের কাছে কি যাই নাই?

দোপর গড়িয়ে পেরায় বৈকালবেলায় একটো চটিতে পৌছুলম। আর গাঁ দূরে লয়। কিন্তুক চটিটো তেপান্তর মাঠের মাঝখানেই। ইদিকে-উদিকে দু-চারটো মেটেঘর। মোটে একটো-দুটো ভদ্রাসন। এমন জায়গায় কুনো গেরস্ত কি নিয়ে থাকতে পারে? তবু এই তেপান্তরে বাস করছে দু-একটো পরিবার। আর মেটে ঘরগুলিন হচে দোকান–মুদির দোকান, হাঁড়িকুড়ির দোকান আর মিষ্টির দোকান। যতোবার আসি মিষ্টির দোকানে একবার গাড়ি থামে। ভাইবুনদের লেগে মিষ্টি লি, ছেলেপুলেরা খায়। মিষ্টি কি-ই বা আর পাওয়া যায়। রসগোল্লা, মন্ডা, জিবে-গজা, চিনির ছাঁচ, কদমা-বাতাসা এইসব। ছেনার মিষ্টি-রসগোল্লা আর মন্ডা খুব ভালো হয়। কুনো ভ্যাজাল থাকে না। উপয় থাকলে ময়রা লিশ্চয় ভ্যাজাল দিত, নিরুপায় হয়েই ভ্যাজাল দেয় না। ছেনা আর চিনি দিয়ে মিষ্টি, ভ্যাজালটো কি দেবে? খুব বেশি হলে ছেনায় সুজি দিতে পারে। তা কতোটেই বা দিতে পারে আর সুজি তো খারাপ কিছু লয়। যাই হোক, ছেলেরা, গাড়োয়ান আর হলা বাগদি মিষ্টি খেলে। আমি রাস্তাঘাটে কিছু খাই না। ভাইবুনদের লেগে মিষ্টি নেওয়া হলো শালপাতার বড় বড় ঠোঙায়!

সাঁঝবেলায় মুখ-আঁধারি রেতে বাপের বাড়ি পৌছুলম। সাঁঝ বেলাটোর মুখে কুথাও যেয়ে পৌছুইতে আমার ভালো লাগে না। পিদিম ঘরে ঘরে, নাইলে হেরিকেন জ্বালাইচে, মিটমিট করে আলো জ্বলছে–কিছুই ভালো দেখা যেচে না, মনটো খারাপ লাগে, বৈকালি এসে পেঁৗছুতে পারলে আমি ছেলেদুটিকে তাদের নানি-খালার কাছে রেখে পাড়া বেড়াইতে চলে য্যাতম, নাইলে পাড়ার লোকেরাই আসত বাড়িতে দেখা করতে অ্যাকন আর তা হবার বাগ নাই।

বাড়িতে মা বাপজি ছাড়া এক ভাই, তিন বুন রয়েছে। সৎ-ভাইটো বেশ বড়সড়ো হয়েছে, দুটি বুনও অ্যানেকটো ডাগর হয়েছে। শুদু একটা বুন দুধের শিশু। আমার মা মরে গেলে কি হাল হয়েছিল ই সসাংসারের সব পেরায় ভেসে গেয়েছিল। সৎ-মা এসে আবার ভর-ভরন্ত সোনার সোংসার করেছে। শুদু একটো কথা আচ্চয্যি! বাপজি সি কালের হিসেবে বিদ্বেন লোক, বাংলা জানে, ফারসি জানে, ফারসি বয়েত পয্যন্ত লিখতে পারে, নিজে একটো শুভঙ্করি বই লিখেছে কিন্তুক ছেলেমেয়েদের ল্যাখাপড়ার দিকে ক্যানে তার মন নাই কে জানে! আমাকে নাহয় পাঠশালে পাঠায় নাই, মা মরেছে, ছোট ভাইটো কোলের, সোংসারে বেপৰ্য্যয় বেপদ, মেয়ের ল্যাখাপড়া না হয় না-ই হলো। তা বাদে মেয়েমানুষের আবার ল্যাখাপড়া কি, বারো হাত শাড়িতে মেয়েমানুষ লিকিনি ল্যাংটো, ইসব পাড়াগাঁয়ের মেয়ে কুনোদিন তো জজ-ব্যালেস্টার হবে না, তাইলে তাদের আবার ল্যাখাপড়া শেখার কি দরকার? হ্যাঁ, বোঝলম ইকথা। কিন্তুক ভাইটো কি দোষ করলে? বড়টোর দায়ভার তো নিতে হয় নাই, আমার মামারাই সি ভার নিয়েছে। তাইলে ই ভাইটো ক্যানে ল্যাখাপড়া শিখবে না? দেখলম সে আর স্কুলে যায় না। কুনোমতে পাঠশালের পড়া শ্যাষ করেছে। স্কুলে আর যায় নাই। তাকে শুদিয়ে জানতে পারলম, স্কুলে ভত্তি হতে টাকা লাগবে। বাপজি বলেছে টাকা আসবে কোথা থেকে! স্কুলে পড়ে কাজ নাই।

হঠাৎ একদিন ঠিক দোপরবেলায় ক-ক রোদে আমার ছোট ভাইটি এসে হাজির হলো। অ্যানেকদিন থেকে দেখি নাই। ইয়াকেই দুবছরেরটি রেখে আমার মা দুনিয়া থেকে চলে গেয়েছিল। তাপর বেশিদিন আর বাপজির সোংসারে থাকতে হয় নাই তাকে। মামুরা এসে নিয়ে গেয়েছিল। তারাই তাকে বড় করবে, মানুষ করবে, যা যা করার সবই করবে। আপন লোকদের কাছেই গেল বটে ভাইটো কিন্তুক বাপজি ক্যানে ছেলে ছেড়ে দিলে, সি আমি ত্যাকননা বুঝি নাই, অ্যাকনো বুঝি নাই। অভাবের সোংসার লয়, কিছু লয়। লতুন সোংসার হয়েছে তাতেই বা কি, আমি বড় বুনটা তো আছি ভাইকে দেখার লেগে! তাইলে ছেলে দিয়ে দিলে ক্যানে? সে মামুদের কাছে চলে যাবার পরে আমার সাথে কমই দেখা হয়েছে, মামুদের গাঁয়ের পাঠশালে ভত্তি হয়েছিল। সেখানকার পড়া শ্যাষ হলে আমার শ্বশুরবাড়িতে কত্তার কাছে এয়েছিল। আমার কাছেই আসলে এয়েছিল। বললে, মামুরা তো আর পড়াইতে পারবে না। সে সোমায়ে উ গাঁয়ে বড় স্কুল ছিল না। ত্যাকনকার দিনে বড় স্কুল আর কটো ছিল? খুবই কম আর যে কটোই ছিল, অ্যানেক দূরে দূরে। সেই লেগে দূরের কুনো গাঁয়ে থাকা-খাওয়া থেকে স্কুলের মাইনে পয্যন্ত যি খরচ হবে তার জোগান দেবার শ্যামতা মামুদের নাই। তারা আর কিছু করতে পারবে না। ইসব কথা শুনে আমি কিন্তু কিছুই বলি নাই। হোক মায়ের পেটের ভাই, তবু বাপের বাড়ির আত্মীয়। তার লেগে বলতে যেয়ে আমি ক্যানে শ্বশুরবাড়িতে দোষের ভাগী হব! শাশুড়ি-ননদ য্যাকন বেঁচে আছে। তা আমাকে কিন্তু কিছুই বলতে হলো না। কত্তাই বললে, বেশি কথার লোক লয়, একটো কথাই বললে, আমি দেখছি।

তার পরের দিনই ভাইটিকে নিয়ে কত্ত বেরিয়ে গেল আর সেইদিনই অ্যানেক রাতে একা ফিরে এসে বললে, ট্রেনে কাটোয়া যেয়ে সেখান থেকে দু-কোশ দূরের একটো গাঁয়ের এক নামজাদা ইশকুলে ওকে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে আর এক মোকাদিম মোসলমানের বাড়িতে তার জায়গিরের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়েছে। সে ঐ বাড়িতে থাকবে, খাবে, ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াবে আর ইশকুলে নিজের পড়া পড়বে।

সেই থেকে সে ঐ ইশকুলেই পড়ছিল। কেমন আছে, কি খেচে আমি যি তার খুব খবর লেতম তা নয়। আমার শ্বশুরবাড়িতে সে আসত কমই। য্যাকন আসত সুবিদা-অসুবিদার কথা বলতেই আসত কত্তাকে। তাকে বাপের মতুনই মান্যি করত, ঠিক যেন বটবিরিক্ষের ছোয়ায় বসে আছে। ইশকুলের ছুটি হলে নানার বাড়িতেই চলে যেত বেশিরভাগ সোমায় বলতে গেলে সিটোই তার নিজের বাড়ি। বাপজির কাছে বোধায় তেমন যেত না। সৎ-মা আছে বলে লয় কিন্তুক, বাপজির কারণেই মনে হয় তার উ বাড়ি যেতে মন করত না। সি যি মামুদের কাছে থাকে সিটি বাপজির পছন্দ লয়। সি যি এত কষ্ট করে ল্যাখাপড়া শিখচে সিটিও তার পছন্দ লয় অথচ নিজে কিছু করবে তার লেগে।

তা সেই দোপরবেলা–কাকচিলের আওয়াজ নাই, আসমান থেকে আগুন ঝরছে, এমন সোমায় ভাইটি আমার বাড়ি ঢুকে ছামনে এসে দাঁড়ালে। অ্যানেকদিন দেখি নাই, হঠাৎ চিনতে পারলম না। কে এই ছেলেটি? গোরো ধপধপে, গোঁপদাড়ি অ্যাকনো হয় নাই, হবে-হবে করছে, কে গো এই ছেলেটি? পরেই তাকে চিনতে পারলম। দখিন-দুয়োরি উসারায় একটা মোড়ায় তাকে বসালম। মা এল, ভাইবুনেরা এল। মা আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে পাখার বাতাস করতে লাগল। বড় বুনটো শরবত করে আনলে। এই ভাই তত উদের সবারই বড়। শরবত-টরবত খেয়ে একটু সুস্থ হয়ে সে যা বললে তাতে আমি ভয় পেয়ে গেলম। তার ইশকুলের শ্যাষ ক্লাসের পড়া শ্যাষ, আর কমাস বাদে শ্যাষ পরীক্ষা। সি পরীক্ষা তো গাঁয়ের স্কুলে লয়, সি পরীক্ষা হবে কাটোয়া শহরে। অ্যানেক টাকা লাগবে। কে দেবে এই টাকা? মামুদের তো দুটো টাকা বার করারও খ্যামতা নাই। যি বাড়িতে থাকে, খায়–তারা তো আর টাকা দেবে না।

দামাদ-ভাই এত করেছে, যা করবার সব করেছে, তার কাছেই বা যাব কেমন করে। তাই বাপজির কাছে এয়েছি। বাড়িতে মরাই বাঁধা রয়েছে, একটা নয়, দু-দুটো–ক-মণ ধান বেচলেই তো পরীক্ষার ফি-র টাকা হয়ে যায়।

তা বেশ, বাপজি অ্যাকন বাড়িতে নাই, আসুক, দোপরের ভাত খা, বিছাম কর, তারপর বলিস বাপজিকে।

আমার কথা শুনে সে জোরে মাথা নাড়লে। ভাত দোপরে সে খাবে না। বাপজিকে এগু বলে তাপর অন্য কাজ।

তাকে তো সবাই চেনে, কিছুতেই পয়সা খরচ করতে চায় না। যি লোকের এত বুদ্ধি, দুনিয়ার লোককে বুদ্ধি-ফুদ্ধি দেয়, টাকাপয়সা : খরচের কথা উঠলেই সি লোকের বুদ্ধি কোথা যায় কে জানে! বাড়িসুদু সবাই কাটা হয়ে থাকল, না জানি আজ কি অঘটন ঘটে।

খানিক বাদে বাপজি এল। ত্যাল মেখে গা ধুতে যাবে। অ্যামন সোমায় বড় ছেলে এসে ছামনে দাঁড়িয়ে মাথা হাট করে বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। বাপজি তার দিকে তাকিয়ে ত্যাল মাখা বন্ধ করে ঠান্ডা গলায় শুদুলে, কিছু বলবে? কি বলবে বলো। এই কথা শুনে ভাইয়ের আমার গলা কাঁপতে লাগল, কথা ঠেকে ঠেকে যেতে লাগল। বহুত কষ্ট করে কুনোরকমে কথাগুলিন সে বললে। তাপর যেন তার সাহস এট্টু বাড়ল।

আমার পরীক্ষার ফল খুব ভালো হচ্ছে, এই শেষ পরীক্ষাতেও ফল ভালোই হবে। আমি কলেজে পড়ব, বি এ পাশ করব।

সব কথা শুনে বাপজি অ্যানেকক্ষণ চুপ করে থাকলে। মনে হলো। কুনো কথাই যেন সে শুনতে পায় নাই। ওমা, তাপর সে উঠে দাঁড়িয়ে দড়ি থেকে গামছাটো তুলে কাঁধে ফেলে গা ধুতে যাবার লেগে উসারা থেকে নামতে নামতে বললে, ধান বেচা যাবে না। মরাইয়ে যে কটো ধান আছে তা সবারই মুখের গ্রাস। বেশি যা আছে, তা বেপদ-আপদের লেগে রাখতেই হবে। ধান বেচা যাবে না।

এই কথা বলে বাপজি শা-দিঘিতে গা ধুতে বেরিয়ে গেল। সে-ও গেল আর আমি দেখলম, ভাইয়ের আমার মুখটি লাল টুকটুকে হয়ে উঠল। কদবার পাত্তর সে লয়, ঐ বাপেরই ছেলে তো, আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে একপা-দু-পা করে এনে পেরিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেচে, আমরা সবাই যেয়ে তাকে ধরলম। মা বললে, আর কিছু হোক আর না হোক, ভাতের ওপর রাগ করিস না, ভাত খেয়ে যা বাপ। মুখ ঘুরিয়ে ভাই ত্যাকন বললে, মা, তোমার ভাত হলে খেতম। এ যে আমার বাপের ভাত-যেদিন খাব জোর করে খাব, না হলে খাব না। এই বলে আমাদের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে চলে গেল। কিন্তুক বললে কেউ পেত্যয় যাবে না, গা ধুয়ে এসে সব শুনে বাপজি একটিও কথা না বলে খেতে বসলে আর রোজ যেমন খায়, তেমনিই খেলে। একটি ভাত যি কম খেলে তা লয়।

এই ঘটনার পরে দুটো দিনও পার হয় নাই, একদিন কা এসে হাজির। বাপজি ত্যাকন বাড়িতেই ছিল। সোজা তার কাছে যেয়ে বললে, আপনার বড় ছেলের পরীক্ষার ফি-র টাকা লাগবে। নগদ টাকা আপনার কাছে নাই তা জানি। কিছু ধান বেচেই এই টাকা জোগাড় করতে হবে। বিপদ-আপদের কথা বলেছিলেন, ছেলের এইরকম বিপদের সময়েই তো এই ধান কাজে লাগবে।

কথা শুনে বাপজি চুপ করে রইল, মুনিষ বৈকালি আসবে মোকামে ধান বেচে বেলাবেলিই ফিরবে।

সিদিন দেখেছেলম, বাপের কথায় ছেলের মুখ কেমন রেঙেছিল, আজ দ্যাখলম জামাইয়ের কথায় শ্বশুরের মুখ কেমন রাঙা টুকটুকে হলো। ই যি বাপজির ভায়ানক চাপা রাগ তা বুঝতে আমার বাকি থাকল না। কিন্তুক বাপজি একটি কথা বললে না–হ্যাঁ কি না একটি আওয়াজ বেরুল না তার মুখ থেকে।

বৈকালি লোক এল, মরাই ভাঙলে। গাঁয়ের কয়াল এয়েছিল, সে ধান মাপলে। কত্তা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলে আর বাপজি দোপরে খেয়ে ঘরে ঢুকে ঘর আঁদার করে সেই যি শুয়ে থাকলে, একবার বেরিয়ে এল না। আমরা সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলম, কপাল পয্যন্ত লাজ কেড়ে সৎ-মা হেঁশেলের দরজার আড়ালে চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলে, সৎ-ভাই আর বুনগুনো ভয়ে কেমনধারা করে চাইতে লাগলে, কত্তা কিন্তু কিছুই গেরাজি করলে না।

গাড়ি বোঝাই করে য্যাখন ধান মোকামে বেচতে নিয়ে যেচে, কত্তাও ত্যাকন আর থাকলে না, বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। মা তাকে কিছুই বলতে পারলে না, রাতটো থেকে যেতে বলবে কি কিছু, সিকথা মুখ দিয়ে বার করতেই পারলে না। অ্যামন রাশভারি মানুষ ছিল উ। কত্তা য্যাকন চলেই গেল, মা ত্যাকন হেঁশেল থেকে বেরিয়ে বাপজির ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে। আমিও কি মনে করে মায়ের পেচু পেচু আসছেলম। দরজা পয্যন্ত এয়েচি, কানে এল বাপজি বলছে, আমার মরাই ভেঙে আমারই ছেলেকে যখন সে পর করে দিলে, ওর ছেলেকেও আর বেশিদিন স্কুলে যেতে হবে না

হায় কি বললে, হায় কি বললে, ওগো, হায় কি বললে–দড়াম করে আমি মাটিতে আছড়ে পড়লম, হায়, ই কি বললে? কই, আমার মানিকরা কই, আমার জাদুরা কই! ওমা, আমি এখুনি বাড়ি যাব, আমার বুকের ধন মানিকদের নিয়ে এখুনি বাড়ি যাব। ই বাড়িতে আর এক দণ্ড লয়। এই রেতেই যাব।

সেই রেতে কি আর আসা হয়? সারারাত কিছুই খ্যালম না, পানি পয্যন্ত লয়, কারও সঙ্গে একটি কথা বললম না, দু-চোখের পাতা একবার এক করলম না, দুই ছেলেকে বুকে আঁকড়ে ধরে রাতটো কাটিয়ে সকালবেলাতেই শ্বশুরবাড়িতে ফিরে অ্যালম। মা ভাই বুন সব আসার সোমায় সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে, চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে কিন্তুক একটি কথা কেউ উশ্চারণ করতে পারলে না।

১০. ছেলে চলে গেল শহরে

ফিরে এসে শ্বশুরবাড়িতে কাউকে কিন্তুক সিসব কথা কিছুই বলি নাই। শুদু বললম, ছেলেদের আর মন টিকছিল না, স্কুলও খুলবে তাই চলে অ্যালম। কত্তা কিছু বুঝেছিল কিনা জানি না। কিছুই শুদোয় নাই আমাকে। উ তো কিছু শুদোবার মানুষ লয়! শাশুড়ি-ননদও কোনো কথা বললে না।

বাড়ি এসে শোনলম, বড় খোঁকার গাঁয়ের স্কুলে ল্যাখাপড়া ভালো হচে না। উকে শহরের বড় স্কুলে নিয়ে যেয়ে ভত্তি করা হবে। আমার ছোট দ্যাওরটো পড়েছিল শহরের যি স্কুলে সিখানেই পড়তে যাবে খোঁকা। দ্যাওরের ত্যাকন স্কুলের পড়া শ্যাষ হয়েছে। সে আর আমার ছোট ভাইটি তো একসাথেই শ্যাষ পরীক্ষা দেবে। মেট্রিক না এনট্যান্স কি পরীক্ষা যেন। আর এই পরীক্ষার লেগেই আমার বাপের বাড়িতে এত ধুন্দুমার কাণ্ড হয়েছিল। সেই পরীক্ষা হয়ে গেলেই দ্যাওর চলে আসবে বাড়িতে। তা বাদে পাশ যেদি দিতে পারে, তাইলে কলেজে পড়বে। স্কুলের কাছে যে বোডিংয়ে থাকত, সেই জায়গাটো খালি ইচে। বড় খোঁকা সেইখানে থাকবে আর সেই স্কুলে পড়বে।

খরবটো শোনা অবদি কি যি হতে লাগল বুকের মদ্যে! সি আর কাকে বলব? পাখি এইবার বাসা ছেড়ে উড়ে যেচে। আর কি বাসায় ফিরবে মায়ের বুকের তলায়, আর কি নিশ্চিন্তে ঘুমুবে? কিন্তু আমার বড় খোঁকা উড়বে কি, তার তো অ্যাকনো পাখাই হয় নাই। অত বড় ছেলে, অ্যাকনো খাইয়ে দিতে হয়। আমি না দিলেও দাদি, ফুফু, নাইলে কুনো চাচি খাইয়ে দেয়। আজকাল কারু কাচে খেতে চাইছে না কিন্তুক নিজে খেতে গেলে ফেলে ছড়িয়ে একাকার। উ ছেলে কি সত্যি বড় হয়েছে, কেউ কাছে ডাকলে একেবারে বুকের কাছে চলে যায়, কেউ অ্যাকটো ধমক দিলে মুখটো শুকিয়ে কেমন হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি কুনো কাজ করতে বললে এমন হাঁপুচাপু করে যি দেখলে মায়া হয়। ছেলে যেন দুনিয়ার সবার কাছে অপরাধী হয়ে আছে। মুখে কথা নাই, দু-একটো কথা যা বলে তা আবার শোনাই যায় না। ই ছেলে কি করে বিদ্যাশ-বিভুঁইয়ে থাকবে? মাথায় নোম্বা অ্যানেকটো হয়েছে বটে, দীঘল শরীল, কাচ-পরানি গায়ের রঙ, টানা দুটি চোখ যেন ঘুমিয়ে থাকার মতুন।

কেউ কি উকে বড় হতে দ্যাখে? একটু একটু করে কেমন বাড়ছে? পিতি রেতে চাদের বাড়ার মতুন। জামা-পেন্টুলুন ছোট হয়ে যেচে, খালি গায়ের পাঁজর বোঝা যেচে ইসব কি কেউ দ্যাখে? আমি যি দেখি। দূর থেকে দেখি, কাছ থেকে দেখি। খোঁকা কুনোদিন জানতেই পারে না। উসারার এক কোণে জানেলার ধারে বসে একমনে বই পড়ছে, কাজ করতে করতে একবার একবার থেমে আমি একদিষ্টে খোঁকার মুখের দিকে দেখি। চোরের মতুন দেখি। যেই বই থেকে মুখ তুলে ইদিকপানে তাকিয়েছে, অমনি আমি যেন কতোই না কাজে মন দিয়েছি!

বড় খোঁকা য্যাতোদিন ছোট ছিল, কুনোদিন দেখি নাই যি কত্তা ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখলে। ছোট ছেলেমেয়ে, কি আমার কি অন্য মানুষের, সে কুনোদিন ঘাঁটাঘাঁটি করতে পারত না। আমি মনে করতম, মানুষটো কি পাষাণ! তা সেই কত্তাই আমার কাছে একদিন ধরা পড়ে গেল। দেখলম, আড়াল থেকে ছেলেকে দেখছে। সি যি এমনি দেখা লয়, তা আমি কত্তার দু-চোখের তাকানো দেখেই বোঝলম।

তা যাকগো, ইসব কথা আর বলে কি হবে। ছেলের শহরে যাবার দিন এগিয়ে এল। পরীক্ষা লিকিনি দ্যাওর আর আমার ভাই একসাথেই। দেবে। আজকালেই বড় খোঁকাকে স্কুলে ভত্তি করে দিয়ে আসতে হবে। দেরি হলে হবে না।

যিদিন সকালে যাবে সিদিন আর হেঁটে ইস্টিশনে যাবে না। এমনিতে কত্তা হেঁটে যেয়েই ইস্টিশনে টেরেন ধরে, আজ ছেলে নিয়ে বিশেষ কাজে যেচে, সেই লেগে মোষের গাড়ি করে যাবে। ছেলের লতুন জামা-পন্টুলুন হয়েছে, সকালেই গা-ধোয়া হয়েছে, জামা-কাপড় পরা হলে, ওর বাপ মাথা আঁচুড়ে দিলে। আমার কি যি মন হতে লাগল ছেলের চোখে কাজল দিয়ে দি, তা ধমক খাবার ভয়ে সি কথা বলতেই পারলাম না।

যাবার সময় হলে দাদি, ফুফু, চাচা, চাচিরা এল, সবাই খোঁকার মাথায় হাত দিলে, কপালে চুমু খেলে, দাদি-ফুফুর চোখে পানি এল কিন্তুক আমি কিছুই করতে পারলম না। বুকে কি যেন আটকে গেয়েছে। পাথর লিকিনি, কই কঁদতেও যি পারছি না! চারদিকে কি। হচে কিছুই বুঝতে পারছি না, সব ছেয়া হেঁয়া। কত্তা খুব তাড়া দিতে লাগল। এও তার ছল। কেঁদেকেটে একাকার করে যাবার সোমায়টো না লষ্ট করে ফেলে কেউ, এই লেগে সে অমন তাড়া দেয়। খোঁকাকে নিয়ে সবাই ঘর থেকে বেরুবে, এমন সোমায় খোঁকা টুক করে আমার কাছে এল। একদম বুকের কাছে এসে বললে, যেচি। চোখের পানিতে সব এমন ছয়লাপ হয়ে গেল যি, হ্যাঁ বাপ, যাও, ই কথাটিও বলতে পারলম না।

গাড়ি খামার পেরিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেলে একটো তরাস এসে বুকে ঢুকল। কিসের যি তরাস তা জানি না। কিন্তুক শুনলে কেউ পেত্যয় যাবে না, সেই তরাস আমার সারা জেবনেও আর গেল না।

কত্তা ফিরে এল সেইদিনই অ্যানেক রেতে। এমন আঁদার রেতে ইস্টিশন থেকে এক কোশ পথ হেঁটে কেমন করে যি বাড়ি এল, সি সেই-ই জানে। রাস্তা নাই, মাঠঘাট ভেঙে আসতে হয়। সাপ-খোপে ভরা ই জায়গা। কিন্তু কুনো ভয়-ভিত ছিল না উ মানুষের। হেরিকেন নিয়ে কেউ এগিয়ে আনতেও তো যেতে পারত ইস্টিশনে! তা-ও কাউকে করতে দেবে না।

বড় খোঁকা সিদিনই স্কুলে ভত্তি হয়ে গেয়েছে। বোডিংয়ে থাকার বেবস্থা-ও হয়েছে। বড় খোঁকার চাচা, আমার ছোট দ্যাওর, অ্যাকন-ও তো রয়েছে, তার পরীক্ষা শ্যাষ হয় নাই, শ্যাষ হলে তার জায়গাতেই থাকবে ছেলে–এইসব ঠিক করে এয়েছে কক্স। দেখলম, তার মনে খুব আনন্দ। ছেলের ল্যাখাপড়ার ভালো বেবস্থা হয়েছে। সে একদিন নিশ্চয় জজ-ম্যাজিস্টেট হবে! ইদিকে আমি কি করি, কি করে থাকি, কি করে বাঁচি! সারা দিনে যেদি একবারও তার মুখটো দেখতে না পাই, তাইলে কি বাঁচতে পারি, হায়!

কেমন কপাল, ঠিক পরের দিনই দোপরের আগে লোক এসে খবর দিলে আমার ছোট ননদের সংকট-ব্যায়রাম। আবস্তা খুব খারাপ হয়েছে। এই খবর নিয়ে রাত থাকতে থাকতে গাঁ থেকে রওনা হয়েছিল লোক। পড়ি-মরি পাঁচ কোশ রাস্তা এসে খবরটো কুনো পেরকারে দিতে পারলে। আমার এই ছোট ননদটি যেমন সোন্দরী, তেমনি ভালোমানুষ। ভারি মিষ্টি স্বভাব আর কি সেবা যি করতে পারত মানুষের! সি আবস্তাপন্ন বড় ঘরেই পড়েছিল। আমার পরের খোঁকার জন্মের দু-এক বছর আগেই তার একটি খোঁকা হয়েছে, আর এই বছরটাক আগে আরও একটি খোঁকা এয়েছে তার কোল জুড়ে। ভরা সুখের সংসার–ইয়ার মদ্যে এই মরণ-অসুখের খবর!

খবর শুনে কত্তা কি যি অস্থির হয়ে পড়ল সি আর কি বলব। বড় বড় আপদ-বেপদেও যি লোক স্থির থাকে, মাহা ভয় পেলেও যি লোককে দেখে সবাই সাওস পায় সেই লোক কি যি খ্যাপাখেপি করতে লাগল।

আমি এখুনি যাব, আমার ঘোড়া ঠিক করতে বলো, এক কাপড়ে যাব।

কথা বলতে বলতে কত্তা ছুটে বাড়ির মদ্যে ঢুকে মা-বুনকে শুদু যেচে এই কথাটি জানালে। শাশুড়ি ননদ পাথরের মতুন দাঁড়িয়ে থাকলে, ভাইরা যারা বাড়িতে ছিল, একটি কথাও কেউ বলতে পারলে না–কত্তা শুদু ধুতি-জামাটো বদলে আর মনে হলো বাসো খুলে য্যাতো জমা টাকা ছিল সব বার করে নিয়ে খামারে যেয়ে দাঁড়াইলে। ত্যাতোক্ষণে ঘোড়ায় জিন পরানো হয়ে গেয়েছে, মাহিন্দারটি লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর কুনো কথা না বলে কত্তা যেয়ে ঘোড়ায় উঠল। ঘরের ভেতর থেকে শুদু ঘোড়া ছোটার আওয়াজ প্যালম।

ওমা, ই কি কাণ্ড, সিদিনই রাত দোপরে দেখি কত্তাকে নিয়ে ঘোড়া ফিরে এয়েছে। খামারের দিকে পরচালির ছামনে ঘোড়াটো কখন দাঁড়ালে তা কিছুই বুঝতে পারি নাই। একবার যেন অ্যাকটো হি হি আওয়াজ প্যালম। দরজা খুলে বেরিয়ে আঁদারের মদ্যে দেখি, ঘোড়া কেমন ছটফট করছে আর তার পিঠে বসে মাতালের মতুন দুলছে অ্যাকটো মানুষ। সাথে সাথে আমি বুঝতে পেরেছি আমার সব্বোনাশ হয়েছে। ত্যাকন একবার এমন চেঁচিয়েছেলম যি বাড়ির সবাই হাউমাউ শোর করে জেগে উঠল। ঘরের হেরিকেন হাতে নিয়ে বাইরে এসে দেখি সবাই খামারে এসে গেয়েছে। ঘোড়া আর ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি ত্যাকননা টলমল করে দুলছে। দ্যাওর-রা সব ছিল, ভাশুরও রয়েছেসবাই ছুটে যেয়ে কত্তাকে ধরলে। ঘোড়া ত্যাকন হাঁটু দুমড়ে বসে। পড়েছে। কত্তার জামা-কাপড় ছেড়া, সারা গায়ে ধুলো-কাদা, শরীরের নানা জায়গা ছিড়ে ফেটে গেয়েছে, সেইসব জায়গা থেকে রক্ত ঝুঁঝিয়ে পড়ছে। ঘোড়ার আবস্তা আরও কাহিল। তারও সারা গায়ে কাদা মাখা, ইখানে-ওখানে রোঁয়া উঠে গেয়েছে, রক্ত ঝরছে তারও দ্যাহ থেকে। তা-পরে যা ঘটল সি কথা মনে হলো আকননা আমার সারা গায়ে কাঁটা দেয়, দমটো আটকে আসে। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলম, বেশি সোমায় গেল না ছটফট করতে করতে মুখ দিয়ে গাজলা তুলে ঘোড়াটা যেন কলজে ফেটে মরে গেল। কিন্তুক ত্যাকন তাকে নিয়ে কে ভাবে। কত্তাকে নিয়েই তো কান্নাকাটা পড়ে গেল।

কত্তা শ্যাষ পয্যন্ত সুস্থির হলো বটে কিন্তুক আজও জানি না কেমন করে এই মাহাবেপদ পার হয়েছেলম। যাবার পথে ঘোড়াকে একবার থামতে দেয় নাই কত্ত। সপাৎ সপাৎ করে খালি চাবুক মেরেছে, আর গাঁয়ের ভেতর দিয়ে, মাঠের ভেতর দিয়ে, আমবাগান কলাবাগানের মদ্যে দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়েছে। থামতেও দেয় নাই, মাঠের পুকুরে পানি খেতেও দেয় নাই, একবার কুনো বটপাকুড়ের হেঁয়ায় দাঁড়ায়ও নাই। এই করে ঠিক বৈকালবেলায় বুনের শ্বশুরবাড়ির গাঁয়ে বড় দিঘির উঁচু পাড়ে যেয়ে সে দাঁড়ালেবাড়িটোকে ওখান থেকে দেখা যায়। দোতলা মাঠকোটাটো-ও দেখা যেছিল। গাঁয়ের একমাত্র টিনের চালের বাড়ি। ঘোড়া থামিয়ে একদিষ্টে কত্তা চেয়েছিল জানের জান ছোট বুনের বাড়ির দিকে। ত্যাকন বহু লোক যেছিল সিদিকে। শুদু একজন এয়েছিল কত্তার কাছে। কত্তা তাকে কিছুই শুদোয় নাই, তবু সে বলেছিল, উদিকে তাকিয়ে কি দেখছেন–উ বাড়ির বড় বউটি এই খানিক এগু মারা গেয়েছে।

কত্তা আমাকে পরে বলেছিল, লোকটোর একটা কথাও ত্যাকন সি বুঝতে পারে নাই। চুপ করে তার দিকে এমন করে চেয়েছিল যি, সে ভয় খেয়ে গেল আর যি কথা বলেছিল, সি কথাটো আরও একবার বলেছিল। কত্তা তেমনি করেই দাঁড়িয়ে। তা-বাদে কেমন করে কি কথা মাথায় ঢুকল সে বলতে পারবে না, শুদু একটো কথা মাথায় যেন চিরিক করে উঠল, ইখানে আর লয়, উ বাড়িতে যাব না, যাব না, হরগিজ যাব না, বুনের মরামুখ আমি দেখতে পারব না। ঘোড়ার মুখটি ফিরিয়ে চাবুক কষে তাকে ছুটিয়ে দিয়েছিল কত্তা।

এমন ঘটনা ঘটে গেল সোংসারে, তবু একটো দিন কি থেমে থাকলে? দিন ঠিকই চলে গেল। মানুষের সয় না কি? সোমায়ে সবই সয়। দুনিয়াদারির দায় কি ঠেকানো যেচে? সেই কাজ করতে হবে, খেতে হবে, শুতে হবে, ঘুমুতে হবে। কোটো বাদ যেচে? শোক একটু সয়ে এলে মাস তিনেক বাদে কত্তা দুই ভাগ্নেকে ই সোংসারে চেয়ে নিয়ে এল। বুন গেয়েছে, গেয়েছে, তার তো আর কুনো চারা নাই। ভাগ্নেদুটির একটি পাঁচ বছরের আর একটি দ্যাড় বছরের। দুটিই খোঁকা। ফুটফুটে রাজপুত্তুরের মতোন এই দুই খোঁকাই হলো বুনের চেহ্ন এই দুনিয়ায়। চোখ-মুখ চেহারায় বুনের কথাটি মনে পড়ে। অ্যাকন থেকে ওরা ই বাড়িতেই মানুষ হবে। বড় হলে যা তাদের মন চায়, তারা তাই করবে। যেতে চাইলে নিজেদের সোংসারে ফিরে যাবে।

ছেলেদুটিকে আনতে তেমন কুনো বাধা হয় নাই। বিরাট আবস্তা হলেও বুনটির শ্বশুরবাড়িতে লোকজন তেমন নাই। ছোট ভাই নিঃসন্তান। জানাই গেয়েছে আর ছেলেপুলে হবে না। ইদিকে দুই সন্তান রেখে বড় বউ চলে গেয়েছে দুনিয়া ছেড়ে। লতুন করে আবার বিয়ে-থা সোংসার করার কুনো ইচ্ছা নাই বড় ভাইয়ের। তাইলে নাবালক ছেলেদুটিকে দেখে কে? কত্তা বাপ-চাচাকে এইসব বুঝিয়ে ভাগ্নে-দুটিকে এনে নিজের সোংসারের বিধবা-বুন, আমার মেজ ননদের কাছে ফেলে দিলে। বললে, এরাই এখন তোর দুই ছেলে। এদের তুই মানুষ কর। কথা শুনে বিধবা-বুন–কতো ভুক-পিয়াসি ছিল–ছেলেদুটিকে বুকে টেনে নিলে। ই বাড়ির আর সব ছেলেপুলের মতো তারাও বড় হতে লাগল।

১১. সব গোলমাল লেগে যেচে

সোয়ামি পুত্তুর ননদ শাশুড়ি দ্যাওর ভাশুর ইদের নিয়ে সোংসার করি। সেই ভোর ভোর ঝুঝকিবেলায় উঠি, সুয্যি ত্যাকনো দেখা দেয় নাই। সেই শুরু, সারা দিনে একবার কামাই নাই। কাজ কাজ। রেগেমেগে বলি রাবণের গুষ্টি। ঘর-দুয়োর পোষ্কার রাখো, কুটনো কোটো, বাটনা বাটো, রাজ্যের রাঁধন রাঁধো, চাকর মুনিষ মাহিন্দার সবাইকে খাওয়াও। ই আবার এক সুখও বটে! আমরা বউ-ঝিরা য্যাকন খেতে বসছি, সুয্যি ত্যাকন পাটে বসতে যেচে, রোদ লি লি করচে। এমনি করে দিন কাটে, দ্যাশ-দুনিয়ার আর কি খবর রাখব? নিজের দুটো ছেলের একটো শহরে বোডিংয়ে থাকে, তাকে ন-মাস ছ-মাসেও একবার দেখতে পাই না, আর একটো যে কখন খেচে, কখন ঘুমুইচে তার কিছুই জানি না, সি জানে তার ফুপু। বাড়িতে অ্যাকন ছেলেপুলে বেড়েছে। মনে হচে সেজ বউয়ের আবার ছেলেপুলে হবে। আমার ননদটির হাত এতদিন ফাঁকাই ছিল, তার কাজ ছিল হালকা। অ্যাকন আর তা লয়, তার বুনপেপাদুটো সোংসারে এয়েছে, আমার খোঁকা রয়েছে, সেজর খোঁকা রয়েছে–সব অ্যাকন ঐ ননদকেই দেখতে হবে। কেউ বসে নাই, সবারই কাজ।

সব কাজ সেরে য্যাকন শুতে যাই, কত্তা দ্যাশ-ঘরের কথা দু-চারটে বলে বটে, তার কিছুই বুঝতে পারি না। অক্ষর শিখেছেলম, বই পড়তে শিখেছেলম, বানান করে খবরের কাগজ পড়তে পারতম, বুঝতেও পারতম, অ্যাকন মনে হচে সব ভুলে গেয়েছি। মনে করেছেলম কত্তাকে একদিন শুদোব সেই কুন দ্যাশের খলিফার চাকরি অ্যাকনো আছে না গেয়েছে, সি আর শুদননা হয় নাই। বিছেনায় শুই আর মরার মতুন ঘুমিয়ে পড়ি। কখন শুদোব!

ইদিকে কত্তার গতিক সুবিধে মনে হচে না। পেরায় দিন শহরে যায়। ভোরবেলায় যায় আর এক দণ্ড রেতে ফেরে। গাঁয়ে খুব কমই থাকে। ইশকুলে যাওয়া কি ছাড়লে? আর কত্তামার বাড়ি যি কমই যাওয়া হচে সি তো দেখাই যেচে। বাড়িতে আকা লোকজন আসা অ্যাকন অনেক বেড়েছে। কত্তা আগে কথাবার্তা ত্যাতো বলত না, বরং কিছু শুদুলেই কেমন খেকিয়ে উঠত। অ্যাকন দেখছি নিজে থেকেই এটো-ওটো কথা বলে। যিদিন যিদিন লোক আসে বাড়িতে সিদিন শহরে যায় না। তাইলে লোকজন নিশ্চয় বলে-কয়েই আসে আর যারা আসে তারা যে-সে লোক লয়, তা তাদের চেহেরা, জামা কাপড়, পোশাকআশাক দেখেই বোঝা যায়। আড়াল থেকে অনেকদিন দেখেচি, খাবার বানিয়ে কাউরির হাতে পাঠিয়ে দিতে যেয়ে চোখে পড়েছে উসব মানুষদের। হিঁদু ভদ্দরলোক তো আসেই, আজকাল দেখি যেন মোসলমান মিয়ে-মোকাদিম এট্টু বেশি বেশি আসছে। বড় বড় পাগড়ি দেখতে পাই, হেঁটো পয্যন্ত আলখেল্লা গায়ে দিয়ে আসে কেউ, কারু কারু নোম্বা দাড়ি, বাবরি চুল। কারা ইয়ারা? কি করছে, কাদের নিয়ে আছে কত্তা–এইসব কথা ভেবে ভেবে মরি।

একদিন হঠাৎ কত্তা আমাকে শুদুইলে, আচ্ছা, হিঁদু-মুসলমানে তফাত কি বলো তো শুনি। ই আবার কি কথা? ইসব তো কুনোদিন ভাবি নাই, ভাবতে হবে বলে কুনোদিন মনেও করি নাই। কত্তার কথা শুনে আমি ফ্যাল ফ্যাল করে খানিকক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলম। দেখি সে মিটি মিটি হাসছে। কত্তার ই রূপ তো কুনোদিন দেখি নাই। একটু পরে সে বললে, এত কষ্ট করে যে পড়তে লিখতে শিখলে তা দিয়ে কি তোমার কোনো কাজই হবে না?

কথা শুনে আমার রাগ-ও হলো দুঃখ-ও হলো। কি কথা বলছে এই মানুষ? সকাল থেকে রেতে বিছানায় শোয়া পয্যন্ত তার সোংসারের ঘানি টানছি, চোখে বেঁধেচি ঠুলি, কানে দিয়েচি তুলো, পিঠে বেঁধেচি কুলো, দোপরের খাওয়া খেতে বসি সাঁঝবেলায় আর সে কিনা বলে লেখাপড়া শিখে আমি কি করলম! রাগে আমি গুম মেরে থাকলম, অ্যাকটো কথা বললম না। একটু সোমায় যেতে কত্তা বললে, হিঁদু-মুসলমান সব এক হয়ে এই একবারই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নেমেছিল। মোসলেম জাহানের খলিফাঁকে তাড়ানো যাবে না বলে কত কি করেছিল! শেষ পর্যন্ত কি হয়েছে জানো? ব্রিটিশদের কিছুই করতে হয় নাই। সে দেশের মুসলমানদের এক নেতাই খলিফাগিরি খতম করে দিয়েছে। এখন এ দেশের হিঁদু-মুসলমান এক হয়ে যাই করুক সব বেকার। দাবিই তো আর কিছু নাই। সব ছত্রখান হয়ে গেল। আবার সেই হিঁদু-মুসলমানের নিজের নিজের দাবি নিয়ে মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়েছে। তাতে তো বিদেশীদেরই পোয়াবারো। সেইজন্যে তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, হিঁদু-মুসলমানে তফাত কি? এইবার বুঝতে পেরেছ?

কত্তা তো শুদুইলে কিন্তুক আমি কি বলব কিছু খুঁজে পেচি না। সত্যি সত্যি, ই কথা নিয়ে কুনোদিন ভাবি নাই। তবে বলছে য্যাকন, ত্যাকন নাহয় এট্টু ভেবেই দেখি। ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের গাঁয়ে মোসলমান ছিল বেশি, হিঁদু ছিল কম। আর আমার শ্বশুরবাড়ির এই গাঁয়ে হিঁদু বেশি, মোসলমান কম। ই হলো গাঁয়ে গাঁয়ে তফাত। তবে সেই তফাতের লেগে উ গাঁয়ে আমাদের কুনো অসুবিদা হয় নাই, ই গাঁয়েও কুনো অসুবিদা নাই। মারামারি হরহামেশা হিঁদুতে হিঁদুতে হচে, মোসলমানে মোসলমানে হচে, আবার হিঁদু-মোসলমানেও হচে।

মনে করে দেখলম, বিয়ের পরে কত্তামার কাছে গ্যালম। সি তো বড়লোক হিঁদুর বাড়ি। কামা সারা গায়ে গয়না পরিয়ে দিলে। একবারও মনে হয় নাই হিঁদুতে গয়না পরিয়ে দিচে। মনে হয়েছিল ঠিক যেন আপন মেয়েবউকে জান ভরে মা গয়না পরাইচে। দ্যাখো দিকিনি, তেমন মনে না হলে কি গয়না গায়ে রাখতে পারতম? গা যি আগুনে পুড়ে যেত। আর যেদি বলো উ হচে বড়লোকের গুমর, তা হতেও পারে। সি তো বড়লোক মোসলমান মিয়ে মোকাদিমের গুমরও হতে পারে। তাপরে দেখছি, হিঁদু কামার কেস্তে কাটারি কুড়ুল বানিয়ে দিচে, লাঙলের ইশ, ফাল তৈরি করে দিচে, হিঁদু ছুতোর মিস্ত্রি দরজা জানলা তৈরি করে দিচে, হিঁদু নাপিতবউ এসে দু-পা ভিজিয়ে কতো যত্ন করে হাত-পায়ের নোখ কেটে দিচে, হাড়িবউ এসে সোমায় সোমায় রাত জেগে সন্তান খালাস করে দিয়ে যেচে। সারা জেবন সে সন্তানের মায়ের মতুনই থেকে যেচে। কই হিঁদু বলে তো কিছুই আটকাইচে না, সব কাজই হচে। উদিকে মোসলমানরা চাষের কাজ করছে, মুনিষ খাটছে, মোসলমান রাজমিস্ত্রি স্কুল বোডিং বানাইচে, মোসলমান করাতিরা কাঠ চেরাই করচে, ঘর ছাইয়ে দিচে, সবাই সব কাজ করছে। তফাত কোথা হচে আমি বুঝতে পারছি না। তবে হ্যাঁ, কতকগুলিন কাজ মোসলমানরাই বেশি করে, কতগুলিন কাজ হিঁদুরা বেশি করে। ই গাঁয়েরই স্কুলে একজনাও মোসলমান মাস্টার নাই। ওস্তাদজি তো ইস্কুলের মাস্টার লয়। চাষাভুষাে মুনিষ মোসলমানই বেশি। ক্যানে তা কি আর আমি জানি! যাদের ভদ্দরলোক বলে মোসলমানদের মদ্যে ই এলেকায় তারা এট্টু কম। আবার অন্য এলেকায় হয়তো শ্যা সৈয়দ পাঠান অ্যানেক আছে।

তা সি যা-ই হোক, হিঁদু-মোসলমানে তফাত আছে কি নাই তা নিয়ে এত ভাবনার কি দরকার? সি তো ধম্মে ধম্মে অ্যানেকই তফাত। কেরেস্তানদের সাথে হিঁদুদের তফাত নাই? কেরেস্তানদের সাথে মোসলমানদের নাই? বলে হিঁদুতে হিঁদুতে কতো তফাত তারই ঠিক নাই! মুসলমানে মুসলমানে কি তফাত নাই? এক সোংসারে একজনার সাথে আর একজনার কত তফাত। উসব নিয়ে ভেবে লাভ আছে?

আমি কিন্তুক কত্তাকে ইসব কথা একটো-ও বলি নাই। আমি চুপ করে ভাবছেলম–দেখি সে যেদি কুনো কথা বলে। বললে শেষ পয্যন্ত।

হিঁদু-মুসলমান এখন নিজের নিজের হিসেব নিয়েই আছে। খালি হিসেব কষছে। হিঁদু-মুসলমান একবার এক হয়েছিল তুর্কির খলিফার দাবিতে। সে দেশের মানুষ নিজেরাই খলিফাগিরি বন্ধ করে দিয়েছে। বাস–হিঁদু-মুসলমান আর একসাথে থাকার দরকার কি? একটা বড় দাঙ্গা পর্যন্ত হয়ে গেল সেদিন। ব্রিটিশরা এখন খালি ফাঁদ পাতছে, খালি ফাঁদ পাতছে। হিঁদু-মুসলমানের মধ্যে কেমন করে কিসব ভাগাভাগি হবে তার লিস্টি বার করেছে।

আমি খুব ভয় পেয়ে গ্যালম। ইসব নিয়ে কত্তা তো আগে কুনোদিন। কথা বলে নাই।তবে কি সে অ্যাকন থেকে উসব নিয়েই থাকবে? আমার যেমন ভয় হলো, তেমনি রাগও হলো। এট্টু দাঁড়িয়েছে সোংসার, জমি-জোমা হয়েছে, ঘরবাড়ি সহায় জন মুনিষ রাখাল হয়েছে, নিজের হাতে আর কাউকে কিছু করতে হয় না, খাওয়া-পরার অভাব নাই।মনের মদ্যে চিন্তা নাই–অ্যাকন এটুল্যাশদুনিয়া নিয়ে থাকলে ক্ষেতি কি? এই হলোকত্তার মনের ভাব। কিন্তুক আমি ভাবি কি দরকার ইসবের? জেবন সব্বারই নিজের নিজের, নিজের ছেলে-পুলে, মা, বোন-ভাই-বেরাদর নিয়ে সোংসার। তার বাইরে যাবার কি দরকার? কে কিসের পিতিকার করতে পারে বলে দিকিনি! ই গাঁয়ের জমিদার ছিল রায়েরা, তারা অ্যাকন ভিক্ষে করছে আর আমরা কিনে নিয়েছি তাদের জমি। তারা হিঁদু, আমরা মোসলমান। কত রকম হিঁদু আছে, কত রকম মোসলমান আছে। ক্যানে ইসব ভাবতে হবে? বিটিশরা অ্যাকন আছে, চেরকাল ছিল না, আবার চেরকাল থাকবেও না।

আমি এ কথাগুলিনই বললম। কথা শুনে কত্ত আমার মুখের দিকে একদিষ্টে তাকিয়ে থাকলে বটে, কিন্তুক পষ্ট বুঝতে পারলম, তার মন আমার কথার দিকে নাই। কি যি সে ভাবছে, সেই জানে। আমি আবার বললম, উসব কথা কানে বলছ?

তুমি তো সংসার করছ, না কি? কেউ তোমাকে বারণ করছে না। ছেলেমেয়ে আত্মীয়স্বজন পাড়াপড়শি এইসব নিয়ে তোমার সংসার। সব ঠিক, তবে তোমার সংসারই কি সব? আর কিছু নাই? সংসারের বাইরে গাঁ আছে–একটি-দুটি নয়, হাজার হাজার লাখ লাখ–তেমনি আছে তোমার দেশ, হাজার দেশ, সারা দুনিয়া। দুনিয়ায় কতো মানুষ! সবাই যদি শুধু নিজের নিজের কথা ভাবত, তাহলে দুনিয়ায় আর মানুষ থাকত না, মারামারি কাটাকাটি করে সব মারা পড়ত।

ভালো বুঝতে পারছেলম না কত্তার কথা। কিন্তু তার পরের কথা কটি জানের ভেতরে যেয়ে লাগল।

কাগজে কাগজে বেরিয়েছে, নিজে তো আর দেখি নাই, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ঘরবাড়ি মা-বাপ ছেড়ে চলে এসেছে, ইংরেজ না তাড়িয়ে আর ঘরে ফিরবে না। দ্যাখো, তারা কিছুই চায় না, চায় শুধু জান দিতে, রক্ত দিতে। তাতে হয়তো ব্রিটিশের কিছুই হবে না। সব তারা জানে, জানে তাদের জেল হবে, জরিমানা হবে, ফাসি হবে। তা হোক, ফাঁসির দড়ি কষ্ট করে গলায় পরিয়ে দিতেও হবে না, নিজেরাই গলায় পরিয়ে নেবে। এসব কথার কথা নয়, এসব হচ্ছে। কি করে সম্ভব বলতে পারো পনেরো-ষােলো বছরের একটি মেয়ে নিজের হাতে বন্দুক চালিয়ে ইংরেজ খতম করলে, তারপর ধরা পড়তে যাচ্ছে দেখে কঠিন বিষ খেয়ে সাথে সাথে মরে গেল। কত বয়েস এই মেয়ের? ধরো তোমার বড় খোঁকার বয়েসি।

খোঁকার কথা শুনে এতক্ষণ বাদে জানটো আমার ধড়াস করে উঠল। কত্তাকে কি আজ ভূতে পেলে? তাড়াতাড়ি করে আমি বললম, আর কথা বোলো না। আমার সব গোলমাল হয়ে যেচে। অনেক দিন ছেলের খোঁজখবর পাই না। কালই একবার যেয়ে খবর নিয়ে এসো।

এতক্ষণে কত্তা হাসতে হাসতে বললে, যাব যাব। আমার কথা শুনে তুমি মনে কোরো না আমি ঘর-সংসার ভাসিয়ে দিয়ে না জানি কিসব করব ঠিক করেছি, মোটেই তা নয়। যাই-ই করি, আমি নিজে কোথায় আছি, নিজের ভালো-মন্দ না বুঝে কিছু করব না।

১২. খোঁকা ভালো আছে তবে সোময়টো খারাপ

আমার কথাটো রাখলে। কত্তা পরের দিনই শহরে গেল খোঁকার খবর আনতে। কাল রেতে খোঁকার কথা মনে হবার পর থেকে আমার বুকের ভিতর কি যি করছিল সি আমিই জানি। এই একটো জায়গায় খেয়াল করি, ক আমার মনের কথাটো ঠিকই বুঝতে পারে। রাগ-ঝাল যা-ই করুক, কথা শুনে কখনো কখনো মনে হবে, বুঝি মানুষ লয়, পাষাণ–কিন্তু আসল কাজটো শ্যাষ পয্যন্ত ঠিকই করবে।

কত্তা গেল সকালে আর ফিরে এল সাঁঝের টেরেনে। এবার দেখি, মুখে তার হাসি ধরছে না। পেথমে সে খবর দিলে বড় খোঁকা ভালোই আছে। আর বেশি কিছু বললে না। তাপর রেতে য্যাকন সোমায় হলো কত্তা বললে, খোঁকার কাছে যখুনই যাই, কিছু না কিছু হাতে করে নিয়ে যাই সে তো তুমি জাননা। এবার আর তেমন কিছু না নিয়ে শহরের দোকান থেকে এক হাঁড়ি মেঠাই কিনে নিয়ে গেলাম। খোঁকাকে দেখে ভালো লাগল। বোধ হয় নিজের যত্ন নিজে নিতে একটু শিখেছে। হাফ-প্যান্ট আর হাফ-শার্ট পরে আছে, সে দুটি বেশ পরিষ্কার। মনে হয় সেদিনই কাচা। কিন্তু কেচে দেবে কে? তাহলে কি সে নিজেই কেচে নিয়েছে। নিজের হাতে কোনো কাজ তো তোমরা ওকে করতে দাও নাই–ছেলেকে অকম্ম করে রেখেছ। সেই ছেলে শহরে গিয়ে নিজের কাজ নিজে করছে এ কি কম আনন্দের কথা! খোঁকার টেরি-কাটা ছিমছাম চেহারা দেখে খুব ভালো লাগল। আবার একথাও মনে হলো ছেলে বড় হলেই আলাদা মানুষ–সে কি তখন আর বাপ-মায়ের থাকে? খোঁকাও বড় হচ্ছে, চুপ করে থাকলে কেমন গম্ভীর লাগছে।

মেঠাইয়ের হাঁড়ি তার হাতে দিয়ে বলোম, খেয়ো যেন, না খেলে তোমার মা বাড়িতে বসেই জানতে পারবে। মেঠাই তো, ঠিকমতো রাখলে দু-একদিন তা থাকবে। আমার কথায় সে মাথা হেলিয়ে বললে, খাব। জানি তো ওকে, মুখে কথা খুব কম, আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতেই পারে না। যাই হোক, আর দু-একটি কথা বলে চলে এলাম, বাইরে এসে খানিক দূরে গিয়েই মনে হলো, এই যাঃ, ভুলে গেলাম খোঁকার হাতে তো কিছু টাকা দিয়ে আসা হলো না! জানি টাকা সে নিজের জন্য কিছুই খরচ করবে না। তবু বাড়ি থেকে দূরে একা থাকে, ওর ছোট চাচা এখন থাকে না। কখন কি লাগে না লাগে এইসব ভেবে কটি টাকা দিতে আবার খোঁকার বোর্ডিংয়ে ফিরে গেলাম। গিয়ে দেখি ঘরে সি এক লন্ডভন্ড কাণ্ড। সারা বোর্ডিংয়ের সব কটি ছেলে এসে ঢুকেছে খোঁকার ঘরে। চৌকির ওপর মেঠাইয়ের হাঁড়িটা খোলা–এক-একটি ছেলে আসছে, থাবা দিয়ে মেঠাই নিয়ে মুখে ভরছে, কতক খাচ্ছে, কতক পড়ছে। সে কি হুল্লোড়, সবাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা ঘর জুড়ে আর এক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমার খোঁকা এইসব দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে। সে নিজে কিন্তু তখনো মিষ্টিতে হাত দেয় নাই। বন্ধুরা আনন্দ করে এই মেঠাই খাচ্ছে। তাতেই তার সুখ।

আমি ঘরে ঢুকতেই সবাই একদম চুপ, যেন পাথর হয়ে গিয়েছে আর তোমার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি সে মুখ ভয়ে নীল। আমার দিকে সে তাকিয়ে আছে, তার দুই চোখে যেন পলক পড়ছে না। জানো, খোঁকার ঐ চাউনিটা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। তবে হ্যাঁ, সাথে সাথে আমার মনে হলো, আর ভাবনা নাই, ছেলে মানুষ হতে পেরেছে। ওর কাছ থেকে দুনিয়ার কোনো মানুষের কখনো কোনো ক্ষতি হবে না। বি.এ. এম.এ. পাশ দিক আর না দিক।

তাড়াতাড়ি করে আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম, মাথায় হাত দিয়ে বলোম, ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। ভুল তো আমারই হয়েছে, আগে ওরাই খাবে। আমারই বলে যাওয়া উচিত ছিল সবাইকে ঘরে ডেকে নিয়ে আগে খাওয়াতে। তারপরে তো তুমি খাবে। তুমিই ঠিক করেছ, আমার ভুল হয়েছিল। আমি এই কথা বলতেই কি যে একটি হাসি ফুটে উঠল খোঁকার মুখে সে আর কি বলব! সব ছেলে তখন খোঁকাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে–মিষ্টির হাঁড়ি যেমনকার তেমনি পড়ে আছে। শেষে একটি ছেলে এগিয়ে এসে এক থাবা মিষ্টি নিয়ে খোঁকার মুখে তুলে দিলে। আমিও আর দেরি না করে চলে এলাম। এই হলো যেয়ে তোমার খোঁকার গপ্পো।

কথা শুনে আমার ভাবনা গেল বটে কিন্তুক ই কেমন ছেলে তা নিয়ে আবার ভাবতে বসি। ই তো কিছুই নিজের লেগে রাখবে না, সব দিয়ে দেবে! তাই যেদি সে সারা জেবন করে, তাতে নিন্দে হবে

বরং লোক তার মায়েরই গুণগান করবে এমন ছেলে প্যাটে ধরেছি বলে। কিন্তুক অ্যাকন সে কি যি করে বসে তা কি করে জানব? কত্তা আর কবার যায়? বরং আমার ভাশুর আর ল-দ্যাওরই বেশি যায় খোঁকার কাছে এটো-ওটো নিয়ে। ভাশুরের ছেলেপুলে নাই, দ্যাওরের এখনো বিয়ে-থা হয় নাই, তারা পেরায়ই যেচে ছেলের কাছে। যা-ই নিয়ে যাক, খাবার কি পরার জিনিশ–সিসব তাহলে সে কিছুই নিজের লেগে রাখে না! এইসব কথা ভেবে আমার ভারি দোনোমানো হতে লাগল। একবার মনে হচে এতটো ভালো লয়, শুদু কি জিনিসপত্তরই দেবে, শ্যাষ পয্যন্ত ছেলে সব্বস্ব দিয়ে দেবে! সেই যি সিদিন রেতে কত্তা বললে খোঁকারই বয়েসি কে অ্যাকটো মেয়ে কোথা বন্দুক চালিয়ে বিটিশ মারতে মারতে ধরা পড়ে যেছিল বলে কঠিন বিষ খেয়ে মরেছিল, আমার খালি থেকে থেকে সেই কথা মনে পড়তে লাগল। কি কাল এল মা? দ্যাশ, দ্যাশের লোক চালাইছে, না বিদেশীরা চালাইছে, তা তো ঘরের ভেতর থেকে কিছু বুঝতে পারি না। কে চালালে ভালো হয় আর কে চালালে মন্দ হয়, সি পাল্টাপাল্টি না চালাইলে বুঝবই বা কেমন করে? কত্তা যাকন বলে, তোমার সোংসার তুমি না চালিয়ে আর একজনা ফোপরদালালি করে চালিয়ে দিলে তুমি কি মানবে? ত্যাকন মনে হয়, তাই তো, একবেলা খেচি, আধবেলা খেচি, নিজের খেচি–আর একজনা দরদ দেখিয়ে কোর্মা-পোলাও দিলেই কি ভালো লাগবে? সি কোর্মা-পোলাও কি বিষ-বিষ লাগবে না? আমার হয়ে আর একজন আমার ছেলেকে ভালোবাসলে কি আমার জান ভরবে? লোকে বলে না–সেই যি ভিখ করার নাম করে ডানবুড়ি বাড়িতে ঢুকে লোভ করে ছেলের দিকে চায়, ভিস্থ নিয়ে চাইতে চাইতে চলেও যায় কিন্তু তার পর থেকেই ডাগর-ডোগর ছেলে দিনদিন যি কেমন শুকিয়ে যেচে? ডানের চোখ পড়েছে আর কি রক্ষা আছে? ছেলে শুকুইচে, পেত্যেকদিন শুকুইচে, শুকিয়ে বাঁশপাতা হেন, শ্যাষে বিছেনার সাথে মিশে একদিন দুনিয়া থেকে চলে গেল। ডানের চোখ এমনি, মিছে মায়ের চোখে তাকাইলে কি হবে? ত্যাকন মনে পড়ল দ্যাশের দিকে বিদ্যাশিদের বিলাতিদের তাকানো তাহলে ডানের তাকানো! কত্তার কাছে শুনেছেলম, জানকে জান মনে করে নাই, কতো লোক–সায়েব মারতে গেয়েছে, সায়েব হয়তো মরেছে, হয়তো মরে নাই–নিজের নিজের জান বিলিয়ে দিয়েছে যেন খোলামকুচি। উদিকে যি সায়েব মরেছে কি লোভে সি সাত সমুদ্র পেরিয়ে ই দ্যাশে এয়েছে তা কে বলবে? তা সি-ও তো কুনো না কুনো মায়ের পুত, সেই মা-ও তো একদিন জানবে যি তার বুকখালি হয়েছে!

যিদিন কত্তা আমাদের সবারই লেগে খুব মোটা কাপড় এনে দিলে পরার জন্যে, সিদিন ভারি অবাক হয়েছেলম। খুব দামি কাপড় বাড়িতে আনা হত তা লয়, তবে ওরই মদ্যে এট্টু হালকা-মিহি সুতোর শাড়ি আমরা পরতম। কিন্তুক ই যি ভারী চব্বর, ভিজলে যি গায়ে নিয়ে টানতেই পারব না। কেউ লিকিন আর বিদ্যাশের কুনো জিনিশ ব্যাভার করবে না। কতো জায়গায় বিটিশদের জিনিশ ভঁই করে পুড়িয়ে ফেলছে। এরা বেনে বেসাতির জাত, শ্যাষ পয্যন্ত সব কিছুই উদের ব্যাবসা। সেই ব্যাবসা জব্দ করতে হবে বলে উদের জিনিশ আর কেউ কিনছে না। দিশি জিনিশ খাব, দিশি জিনিশ পরব। মোটা ভাত, মোটা কাপড়। সেই লেগেই এই কাপড়। এই আমাদের পরতে হবে। তা পরছি সেই কাপড়, কত্তারাও পরছে মোটা খদ্দর। তাই বলে বাড়িতে আর চরকায় সুতো কাটতে পারি নাই। যাকগো, কতো হুজুগ দেখলম এই বয়সে।

মাঝে মাঝে মনে করতম, সবকিছু তো আমার লয়, কুনো কুনোটি আমার। সব্বার ছেলে তো আমার লয়, আমারটোই শুদু আমার। আজকাল পেরায়ই মনে হচে কুনো কিছুই শুধু আমার লয়। আমার ছেলেটিও আমার শুদু লয়। ঐ যি মেয়েটি ধরা পড়ার পর মানের ভয়ে কঠিন বিষ খেয়ে মরল, ঐ মেয়েটি কার? উ কি শুদু ওর বাপ-মায়ের? উ কি আমারও মেয়ে লয়? উ আমার হলে দোষ কি। উকেই যেদি জিঙ্গাসা করা হতো, তুমি মেয়েটি কার গো, তাইলে সি মেয়ে কি জবাব দিত? মরবার আগে সি কি বলত, কারু মেয়ে সি লয়, সি ই দ্যাশের সব মানুষের মেয়ে–সি সারা পিথিমির মেয়ে!

ভাবতে ভাবতে কোথা থেকে কোথা চলে অ্যালম, আমার গা শিউরে উঠল। অ্যাতো অস্থির লাগছে ক্যানে? সবকিছু অস্থির। আমাদের গাঁয়ের স্কুলের ছেলেরাও লিকিনি দুদিন পড়া ছেড়ে বেরিয়ে গেয়েছে। দ্যাশে অ্যাকন রাজার আইন না মানা চলছে। স্কুলের কতোটুকুন কতোটুকুন ছেলে–তারাও আইন মানছে না। তাইলে তো শহরেও ইসব হচে। কই কত্তা তো কিছু বললে না। খোঁকা কি তাইলে আবার কত কি ভাবলম। একবার ভাবলাম, খোঁকা এইটুকুন ছেলে, শান্ত–ঠান্ডা। উ আবার কি করতে যাবে? আবার ভাবলম, করলে করুকগো, উ নিয়ে ভাবতে যাই ক্যানে?

তা বললেই কি ভাবনা যায়? দ্যাওর আর ভাইটি অ্যাকন আর শহরে থাকে না। আর ল্যাখাপড়া হলো না তাদের। দ্যাওর বললে, তার আর পড়ায় মন যেচে না, একটো চাকরি-বাকরি পেলে বরং কত্তার পাশে দাঁড়াতে পারবে। সারা জেবন ভাই কি সংসারের বোঝাই শুদু বইবে! সে আর তা হতে দেবে না। এইসব বলে সে। বাড়িতে অ্যাকন বসে আছে। দ্যাওরের এই কথা, কিন্তুক ছোট ভাইটির খুব ইচ্ছা আরও পড়া। তার মাথা ভালো, পড়লে অনেক ওপরে উঠতে পারত। তা হলে হবে কি–খরচ জোগাবে কে? একবার তো এই নিয়ে বাপের সাথে হুলুস্থুল কাণ্ড হয়েছিল। আর দরকার নাই। তাই সে কত্তার কাছে এসে বললে, কলেজে আর সি ভত্তি হবে না–একটো কুনো চাকরি-বাকরি হয় কিনা চেষ্টা করবে। সি-ও অ্যাকন মামার বাড়িতে ফিরে গেয়েছে।

ঠিক এই সোমায়েই একদিন খবর এল–যা ভয় করেছেলম, তাইখোঁকা স্কুলের আর সব ছেলেদের সাথে ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। আইন মানবে না বলে কিসব করতে গিয়েছিল রাস্তায়, সিখান থেকে তাদের দলসুদু ধরে জেলে নিয়ে গেয়েছে!

১৩. ছেলে আনো বাড়িতে, আর পড়তে হবে না

এত কথা ভাবলম কিন্তুক যে-ই শোনলম বড় খোঁকাকে ধরে জেলে নিয়ে গেয়েছে, অমনি সব ওলোট-পালোট হয়ে গেল। ছেলেকে জেলে নিয়ে গেয়েছে, দড়ি দিয়ে বেঁধেছে, না শেকল দিয়ে বেঁধেছেলাঠির বাড়ি মেরে টানতে টানতে নিয়ে গেয়েছে–উ ছেলে কুনোদিন কারু হাতে মার খায় নাই, কেউ ওর গায়ে হাত দেয় নাই কুনোদিন, সেই ছেলে পুলিশের লাঠির বাড়ি খেচে কি জানি, সারাদিন উপোস করে আছে না কি, ভোক্ সহ্য করতে পারে না সি তো আমি জানি, কেউ হয়তো এট্টু খাবার দেয় নাই তাকে–তবু মুখ ফুটে তো একটি কথা সি বলবে না কখনো এইসব হক না-হক কথা খালি বুকের মদ্যে উথথাল-পাতাল করতে লাগল আর খানিক বাদে বাদে দোম যেন আটকে যেতে লাগল। আমি কেবলই বলতে লাগলম, আমার ছেলে এনে দাও, যেমন করে পারো আমার ছেলে এনে দাও। যেন ছেলে বলতে আমার একটিই। ইদিকে পরের খোঁকাটি আট বছরের হয়েছে, চাঁদের মতুন একটি মেয়েও হয়েছে–অ্যাকন ছ-মাসের সিসব কথা মনে হলো না। উরা যি ছামনেই রয়েছে, তাই খেয়াল হচে না। খালি মনে হচে, আমার নাড়িছেড়া ধনটিই আমার কাছে। নাই–আমার কেউ নাই, আমার বিশ্ব-ভোবন আঁদার।

তবে কত্তা গেয়েছে, আমি একটু নিশ্চিন্তি। উ লোক সামান্য লয়, উ মানুষ বটবিরিক্ষি, তামাম মানুষকে হেঁয়া দিতে পারে। ঠিক তা-ই হলো। তিমি-সাঁঝের বেলা খোঁকাকে নিয়ে ফিরলে কত্তা। অন্য অন্য দিন সে ফিরে নিজের বাইরের ঘরেই থাকে, আমরাই পা-ধোয়ার পানি, শরবত নিয়ে যাই। আর খুব কিছু বেপার হলে সে বাড়ির ভেতর মা-বুনের কাছে আসে। আজ সে তা-ই করলে, ছেলেকে নিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে এসে মায়ের কাছে বড় খোঁকাকে ঠেলে দিয়ে বললে, ছেলে যে পথে যাচ্ছে এই বয়েস থেকে, কেন যাচ্ছে, কি করতে যাচ্ছে–এইসব কথা ওর কাছ থেকেই শোনো। তারপর তুমিই ঠিক করো, ওকে বারণ করবে কি করবে না। নেহাত কম বয়েস, তাই দয়া করে এবার ছেড়ে দিলে–দু-বছর জেলও দিতে পারত। ব্রিটিশদের রাজত্ব, বড় কঠিন শাসন মা। এই শাসন এখন দেশের লোকও আর মানতে চাইছে–ঘর-সংসার বাপ-মা ভাই-বোন লেখাপড়া ছেড়ে দলে দলে সব বেরিয়ে আসছে–এরই মতন খোঁকা সব, কিছুই মানছে না,কারুর বারণ শুনছে না, ঝাঁকে ঝাঁকে মরতে যাচ্ছে। কি এখন বলবে বলো দিকিন। আইন তো ছাড় কথা এখানে বোমা ফাটাচ্ছে, ওখানে সায়েব মারছে আর যতো জেল হচ্ছে, ফাঁসি হচ্ছে, ততো তাদের রাগ বাড়ছে। আগুন জ্বলছে দেশে, কি করা যাবে বলো তো? গিন্নি দেখি চুপ করে আছে, তার আড়ালে চুপ করে দাঁড়িয়ে বেধবা ননদটি। কেউ কুনো কথা বলছে না। বড় খোঁকা কত্তার পাশে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে, তার একটো হাত কত্তার হাতে ধরা। আমি আর থাকতে পারলম না, ছুটে যেয়ে ছেলের গায়ে হাত দিয়ে দেখি, গা-গরম, জ্বর এয়েছে। আমি চেঁচিয়ে ওঠলম, ই কি, ই-যি অ্যানেক জ্বর! বাপ না ছাই, কত্তা এই ছেলেকে শহর থেকে নিয়ে এয়েছে, কতোবার গায়ে-পিঠে হাত পড়েছে, ছেলের জ্বর সি কিছুই ট্যার পায় নাই।

আমার চিচকার শুনে গিন্নি এগিয়ে এসে খোঁকার কপালে হাত রাখলে। সে তো অস্থির হবার মানুষ লয়, যাতে বেপদই হোক, মাথা তার ঠান্ডা। কপালে একবার, বুকে একবার হাত দিয়ে গিন্নি আমার দিকে চেয়ে বললে, হা, জ্বর অনেক। তা এত হ্যাঙ্গামা-হুঙ্কুতে জ্বর আসবে না! কেন ভাই, এসবের মধ্যে থাকছ তুমি? তা যাক, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এয়েছে, জ্বর নিয়ে ভাবতে হবে না, আপনা-আপনিই চলে যাবে। যাও, মেজ বউ, উত্তর-দুয়োর ঘরে বিছেনা করে দাও।

সাঁঝবেলার আঁদারে সব ভূতের মতুন দাঁড়িয়ে আছে।পিদিম কিল কিছুই ত্যাকননা জ্বালানো হয় নাই। তখন-তখুনি বিছেনা করব কিআগে একটো রেড়ির ত্যালের পিদিম জ্বালিয়ে উত্তর-দুয়োরি ঘরে ঢোকলম। এমন লাগচে ক্যানে মা! এত আঁদার লাগচে ক্যানে। ঘরের এক কোণেপিদিমটো রাখলম–সারা ঘর যেমনকার তেমনি আঁদার। শুদু পিদিমটো মিটমিট করে জ্বলতে লাগল এক কোণে। খুঁজে খুঁজে বারুণ আনলম, তিমি-সাঁঝে ঝট দিতে নাই। তবু ঘরটো একবার ঝট দেলম, খেজুর পাতার নকশা করা শেতল পাটিটো পাতলম, তাপর হাতের আন্দাজে খুঁজে খুঁজে সিন্দুকের ভেতর থেকে সুজনিটো বার করে পাটির ওপর পাতলম–আহা ত্যাকননা জানি না, জাদু আমার কি কষ্ট করে ঘরের ভেতরে আঁদারের মদ্যে দাঁড়িয়ে আছে। যি ছেলে সহজে নিজের কষ্টের কথা বলে না, সেই ছেলে য্যাকন বললে, মা, আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, ত্যাকন আমার হুশ হলো। এই যি বাপ, এই হয়ে গেল বলে তাড়াতাড়ি করে আমি খোঁকাকে ধরে আস্তে আস্তে শুইয়ে দিতে দিতে বললম, হ্যাঁ বাপ, পুলিশ কি তুকে মেরেছে? আমার কথা শুনে খোঁকা হাসলে, আবছা আঁদারে তার হাসিটি আমি দেখতে প্যালম না। ঐরকম করে হাসতে হাসতেই সে বললে, না না, গায়ে হাত দেবে কেন? গায়ে। হাত দেয় নাই। এক পুলিশের অফিসার আমাকে বললে, তাড়াতাড়ি ছাড়া যদি পাও, ঘরের ছেলে ঘরে যাও–এ পথে থাকলে মরবে–যারা তোমাদের এসব কাজে লাগাচ্ছে তাদের কিছুই হবে না। মাঝখান থেকে তোমরাই মারা যাবে।

খোঁকাকে বিছেনায় শুইয়ে পিদিমটো এনে তার মাথার কাছে রাখতে যেয়ে দেখলম, চোখদুটি তার লাল টকটকে। কপালে হাত দিয়ে দেখলম, জ্বর হু হু করে বাড়ছে। গিন্নি এসে সব দেখেশুনে বললে, খোঁকার মাথাটো একবার ঠান্ডা পানিতে ধুইয়ে দাও মেজ বউ, দিয়ে খানিকক্ষণ কপালে জলপটি দাও। তাইলে জ্বর কমে যাবে।

তা-ই করলম। চাচারা সব এল-গেল, কতো কথা বললে খোঁকাকে, কতো আদর করে কতো কথা বললে, বারে বারে গিন্নি আর বুবু এসে খোঁকার কাছে বসলে। তা-বাদে বাড়ির সব লোকদের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে আমাকে গিন্নি কতোবার বললে রেতের ভাত খেতে! আমি খোঁকার শিয়র থেকে নড়লম না, জলপটি দিতে দিতে আমার কতোবার ঝিমুনি এল, ঝুঁকে ঝুঁকে পড়তে লাগলম, তবু খোঁকার কাছ থেকে যেতে পারলম না। অ্যানেক রেতে মনে হলো, জ্বরটো যেন এট্টু কম হয়ে এয়েছে। খোঁকা আর ত্যাতটো অস্থিরও করছে না। একটু বাদে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

সকালবেলায় মনে হলো জ্বরটো আর নাই, ছেলেকেও অ্যানেকটো চনমনে লাগছে! কাল রেতে কিছুই খায় নাই। তাকে ধরে আস্তে আস্তে পিঁড়েয় নিয়ে বসিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে দেলম। কাল রেতে ছেলের লাল টকটকে চোখ দেখে ভয় পেয়ে গেয়েছেলম। অ্যাকন দেখলম, মুখচোখ শুকিয়ে গেয়েছে বটে, তবে চোখের সেই লাল টকটকে ভাবটো আর নাই।

লিশ্চিন্ত হয়ে আছি–যাকগো, জ্বরটো খারাপ জ্বর লয়। ত্যাকনকার ডাক্তার-বদ্যি খুব কম, লোকে সহজে তাদের ডাকতে যেত না। আর ডাকতে চাইলেই বা পাবে কোথা। পাশ করা কুনো ডাক্তার দশ গাঁয়ে খুঁজলেও পাওয়া যেত না, দু-একজনা যা থাকত সি শহরে। গাঁয়ের মানুষ কি তাদের কাছে যেতে পারে? ই গাঁয়ে উ গাঁয়ে হয়তো বদ্যি দু-একজনা ছিল, ডাক্তার বোধায় একটোও লয়। কেউ হয়তো কুনোদিন কুনো ডাক্তারের কাছে দিনকতক ছিল, এটো-ওটো নাড়াচাড়া করেছে, কষ্টমষ্ট করে ইঞ্জিশন খুঁড়তে পারে, নাইলে দু-দাগ মিকচার বানিয়ে দিতে পারে–সে-ই হলো ডাক্তার। তা ইসব ডাক্তারও কি সব গাঁয়ে আছে? তা নাই। আমার বাপের গাঁয়ে কুনো ডাক্তার-কবরেজ ছিল না। তিন কোশ দূরের গাঁয়ে একজনা ছিল, সকালে তাকে ডাকতে গেলে বৈকালি বা সাঁঝবেলায় একটো বুড়ো ঘোড়ায় চেপে হটর হটর করে সে আসত। তা সে-ই হলো যেয়ে বড় ডাক্তার। আমার শ্বশুরবাড়ির গাঁ ইদিক থেকে খুব ভালো। আছে একজন অ্যালাপ্যাথি, পাশ-টাশ দেয় নাই, তবে খুঁড়তে পারে, বড়ি-মিকচার দিতে পারে। আর একজন হলো হেমাপ্যাথি, শিশিতে পানি ভরে দু-ফোটা করে ওষুধ দিত। এক-আধ আনা পয়সা কেউ তাকে দিত, কেউ দিত না। ইদিকে অসুখ-বিসুখ রাতদিন লেগে আছে, কে আর অত ডাক্তারের কাছে যায় জ্বরজ্বারি নিয়ে? দু-চার দিন বাদে আপনিই চলে যাবে। সর্দি-কাশিতে জ্বর, ফেঁড়ার তাড়সে জ্বর, বদহজমে প্যাটে যন্তন্না, উসব কিছু ধত্যবের লয়, গা-গরম। তবে কঠিন কিছু হলে কি আর করবে মানুষ, রুগির ঘরে যেয়ে চেয়ে চেয়ে দেখত। অসুখ-বিসুখ হামেশা হচে, আপনা-আপনি সেরেও যেচে, আবার মরেও যেচে অ্যানেক মানুষ।

অসুখ কঠিন না সহজ, বোঝবার বাগ ছিল না সি-সময়ে। বড় খোঁকা সকালে কিছু খেলে না। বললে মুখে মজা নাই। অত জ্বর ছিল রেতে, মুখে কি মজা থাকে? তবু সকালে খই-মুড়কি খেলে, দোপরবেলায় ভাতও দুটি খেলে। আমি লিশ্চিন্ত মনে ঘরের কাজকৰ্ম্ম করছি, বাড়ির আর সবাইও লিশ্চিন্ত— সাঁঝবেলার খানিক এণ্ড ঘরে যেয়ে দেখি, খোঁকা বিছেনায় শুয়ে আছে। বললম, এই অবেলায় শুয়ে ক্যানে খোঁকা, একটু উঠে হেঁটে বেড়াও–বলতে বলতে দেখি, বলব কি, তার মুখের দিকে চাওয়া যেচে না, ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে–ছেলে খুব হাঁসফাস করছে। ঠিক, অ্যানেক জ্বর গায়ে। আবার ক্যানে জ্বর এল–মনে একটু ভাবনা হলো, বাড়ির সবাইকে জানালম। খবর পেয়ে কত্তা জ্বরকাঠি নিয়ে ঘরে এল। বগলের তলায় জ্বরকাঠি দিয়ে দেখলে, হ্যাঁ অ্যানেক জ্বর।

এই যি জ্বর এল আর ছাড়লে। সকালবেলাটোয় কম, মনে হতো বুঝিন গেয়েছে, পেথম দিন যেমন মনে হয়েছিল। কিন্তুক ঐ জ্বরকাঠি দিতেই দেখা যেত জ্বর আছে, ছাড়ে নাই। তিন-চার দিন এই রকম গেল, সকালে কম, রেতে অ্যানেক জ্বর। খাওয়ারও রুচি নাই, তা-বাদে, এই কদিন পাইখানা বন্ধ ছিল, একদিন খুব শক্ত পাইখানা হলো, তাপর ঘন ঘন লরম বাজি আর প্যাটে যন্তন্না। কত্তা গাঁয়ের অ্যালাপ্যাথি ডাক্তারকেই আগে ডাকলে।

জ্বরটো যাচ্ছে না কেন, তিন-চার দিন হয়ে গেল–কত্তা শুদুইলে ডাক্তারকে। লাঙলা চাষার মতুন চেহারা ডাক্তারের, দেখলে পছন্দ হয় না। তা মিছে লয়, নিজের হাতে চাষবাস করে ডাক্তার, দরকার হলে লাঙলের মুটোও ধরে। দুই পায়ের আঙুলে হাজা, হাতের আঙুলগুলিনও এই মোটা মোটা! কি করে পছন্দ হবে এমন ডাক্তার? খানিকক্ষণ সে খোঁকার নাড়ি টিপে চোক বুজে থাকলে, তারপর বললে, জিভ বার করে অ্যা অ্যা করো। সব দেখে শুনে শ্যাষে বললে, হাঁ জ্বর আছে–কিসের জ্বর তা তো এখন বলতে পারা যাচ্ছে না। জিবে ময়লা পড়ে রয়েছে। যা-ই হোক, টাইফয়েড সন্দেহ করছিআর দু-চার দিন যাক, রোগ ঠিক বেরিয়ে পড়বে। ওষুধপত্তর কিছু দিচ্ছি। শক্ত খাবার একদম বন্ধ, সা-বালি খাবে, তাতে দুধ দেওয়া চলবে না, জল দিয়ে রান্না করতে হবে। ডাবের জলটা খেতে পারবে আর বেদানার রস। এইরকম চলুক।

এইসব বলে চার আনা ভিজিট নিয়ে ডাক্তার চলে গেল। কথা শুনে কত্তা লিশ্চিন্ত হতে পারলে না, হেমাপ্যাথি ডাক্তারটি বন্ধু লোক, তাকে ডেকে নিয়ে এল। ই ডাক্তারের পরনে একটো হেঁটো ধুতি, কাঁধে একটো মোটা চাদর। সি যি কতো কথা শুদুইলে তার আর অন্ত নাই। অত কথার জবাব খোঁকা আর কি দেবে? ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা শোনছেলম। কত্তাই সব কথার জবাব দিচে, শেষে সে বললে, তোমার কি মনে হচ্ছে? ডাক্তার বললে, সর্বাংশে কিছু নয়–আমি তিনটি পুরিয়া দেব–বাস, আর কিছু লাগবে না।

ঐরকম করে কথা বললে কি কিছু বোঝা যায়। আমি কিছু বুঝতে পারলম না। আরও দুটো দিন গেল কিন্তুক জ্বর একবারও ছাড়লে না। সকালের দিকটোয় একটু কম থাকে, গায়ে-মাথায় হাত দিয়ে মনে হয়, জ্বর নাই আর জ্বরকাঠি বগলে দিলেই দেখা যায় এট্টু জ্বর লেগেই আছে। ক্যানে জানি না, আমার মন খুব কু ডাক ডাকতে লাগল। কিন্তুক কাকে কি বলব বেশি কিছু বলতে গেলেই লোকে বলবে মেতর-বউ বাড়াবাড়ি করছে। অসুখ-বিসুখ যি মানুষের গা-সওয়া। সবাই জানে অসুখ আছে চিকিচ্ছে নাই-সেই লোগে অসুখে কেউ গা করত না। বলত উ কিছু লয়, গা-গরম, এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে। ভালো কি আর হতো? হাজার কিসিমের রোগ-বালাইয়ে হর-হামেশা লোক মরত। কতোরকম অসুখই না ছিল–ঝি-বউদের সূতিকা রোগ, ছোট ছোট ছেলেমেয়ের পুঁয়ে-লাগা রোগ–দিন দিন শুকিয়ে যেচে, শুকিয়ে যেচে, শেষে একদিন মরে গেল, আর একটা রোগ হুপিং কাশি, বাবা রে কি কাশি, কাশতে কাশতে চোখে রক্ত পয্যন্ত জমে যেত, তাপর বড়দের হাঁপানির ব্যায়রাম-ইসব রোগের কুনো চিকিচ্ছে ত্যাকন হতো না। ওগুনো যেন রোগই লয়। দু-একটো মরে গেলেও কুনো শিক্ষে নাই। তেমনি বাতাস লেগে মওত, বাণ মেরে মানুষ মারা ইসবও ছিল। আর ছিল দুটি অসুখ–সি হলে কেউ চিকিচ্ছে করাত না, কুনো চিকিচ্ছে ছিলও না। একটি হলো কুট–হাতে-পায়ে কুটই ভালো হবার লয়, কুনো চিকিচ্ছে নাই। সবচাইতে খারাপ শাপ হচে তোর মুখে কুট হোক। আর একটো হচে ক্ষয়-কাশি, উ হলে মওত আসবেই, চিকিচ্ছে কিছুই নাই। সব শ্যাষে আর ছিল দুটি রোগহুড়মুড়িয়ে এসে পড়ত। একটি হলো নামুনে-কলেরা আর একটি গুটি-বসন্ত। এই দুটি রোগ আপনা-আপনি হতো না। দুই হারামজাদি মাগী এক গাঁ থেকে আর গাঁয়ে নিয়ে যেত। এক মাগীর নাম মা-শেতলা, আর এক মাগী ওলা-বিবি। একজনা বসন্তের, আর একজনা নামুনের, একজন হিঁদু, আর একজনা মোসলমান। দুজনায় মিলে কি মাহা-কাজই না করত! ত্যাখন আর হিঁদু-মোসলমান বাছত না। এক-একটো গাঁয়ে দশ-পনেরোদিন থাকত। কতো বংশ যি নিব্বংশ হতো! বিরান হয়ে যেত গাঁ-কে গাঁ। পরে আর একটি গায়ে যেত। এই দুটি মাহামারী রোগ এলে লোকে চিকিচ্ছে আর কি করাবেদু-হাতে মাথা চাপড়াত।

আমিও খোঁকার অসুখটোকে মনে করেছেলম এমনি জ্বর। দু-দিন বাদেই সেরে যাবে। অ্যাকনো তা-ই মনে হচে। যি রোগের কথা ঐ হেঁটো-ধুতি পরা বামুনটো বলে গেল, সি লোগ আমার ছেলের হতে যাবে ক্যানে? কার কাছে কি দোষ আমি করেছি, কার কি শাপ আমি কুড়িয়েছি যি আমার বড় খোঁকার উ রোগ হতে যাবে? উ কি য্যাকন-ত্যাকন যার-তার হয়? জাতসাপের কামড়ের মতুন উ হলো কালরোগ। পাড়াগাঁয়েরও সব লোক জানে সান্নিপাতিক জ্বর হলে রুগি বাঁচে না। ঐ একজ্বরী সান্নিপাতিক এমনি জ্বর যি একনাগাড়ে একুশ দিন, না-হয় আটাশ দিন, না-হয় ছাপ্পান্ন দিন গায়ে লেগে থাকবে, কিছুতেই ছাড়বে না–শত ওষুধ-পত্তরে কুনো কাজ হবে না। ঐ মেয়াদের মদ্যে রুগি মরে গেল তো গেল, মেয়াদ পয্যন্ত যেদি বেঁচে থাকে তত সুস্থ হবে বটে কিন্তুক একটি অঙ্গ হয় একটি চোখ, না-হয় একটি হাত কিংবা একটি পা লষ্ট হবেই হবে। এমনি কঠিন রোগ! আমার ছেলের কি সেই রোগ হয়েছে? তা ক্যানে হবে? এই দিন-দুনিয়ার সব মানুষ ভালো থাকুক–সব মায়ের পুত!

কিন্তুক সাত দিন পেরিয়ে গেল, ছেলের জ্বর ক্যানে যেচে না? প্যাটটোও খারাপ হলো, তলপেটে দরদও খুব। কত্তা বরং একবার শহর থেকে ডাক্তার নিয়ে আসুক। আমি আর থির থাকতে পারছি না।

১৪. যা ভয় করেছেলম তা-ই হলো

কি করে শহর থেকে বড় ডাক্তার আনা সোম্ভাব হলো, আমি জানি না। বোধায় জমিই খানিকটা বেচতে হলো। দ্যাওর-রা সব ঘেঁকে ধরলে কত্তাকে।গিন্নি আর ননদও দুটো কড়া কথা শুনিয়ে দিলে তাকে। ছেলেই যদি চলে গেল, সম্পত্তি ধুয়ে কি পানি খাবে কত্তা? ছোট দ্যাওর তো কেঁদেই ফেললে। গলা তুলে একটি কথা কুনোদিন সে বলে না কত্তার কাছে, সিদিন কঁদতে কাঁদতে বললে, দু-দিনের মধ্যে শহর থেকে বড় ডাক্তার যদি তুমি না আনো, আমি বিষ খাব বলে দিচ্ছি, এই সংসারের ভাত আমার হারাম হয়ে যাবে।

যা-ই হোক, পরের দিন বৈকালির টেরেনে ডাক্তার এল। ইস্টেশনে মোষের গাড়ি গেয়েছিল, কত্তা ডাক্তারকে নিয়ে বেলা থাকতে থাকতেই বাড়ি এল। হাত-মুখ ধোবে না, কিছু খাবে না, হ্যাট-কোট পরা ডাক্তার সোজা রুগির ঘরে চলে এল। ঘরের বাইরের উসারা থেকে আমরা সব দেখছি। ডাক্তারের বয়েস খুব বেশি লয়, সোন্দর মুখ, ফরশা চেহারা। অনেক রকম করে রুগি দেখলে, তাপর দেখা হয়ে গেলে এমন চুপ করে খানিকক্ষণ বসে থাকলে যি সি দেখে আমার হাত