Friday, April 12, 2024
Homeউপন্যাসআনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি : অ্যানা ফ্রাঙ্ক

আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি : অ্যানা ফ্রাঙ্ক

ভূমিকা

ঠিক তেরো বছর বয়সের এক সদ্য কিশোরী। ডায়েরি লেখার শুরু সেই বয়সেই। দিনে দিনে। কেটে গেছে দুই বছর দুই মাস। পনেরো বছর দুই মাস বয়স পর্যন্ত লিখতে পেরেছিল সেই কিশোরী। ডায়েরির পাতায় শেষ আঁচড় টানার ঠিক সাত মাস পরে এই পৃথিবীর জল-মাটি হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল তার। ফ্যাসিস্ট নাৎসীদের নির্মমতার সাক্ষর হিসেবে এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যেতে হয়েছিল তাকে। চলে গেছে সে কিন্তু রেখে গেছে তার কালজয়ী অমর দিনলিপি। এ হলো সেই কিশোরীর সেই ডায়েরি, দুই বছর দুই মাসের দিনলিপি–আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি।

তার বাবার নাম ছিল অটো ফ্রাঙ্ক, মায়ের নাম এডিথ। মূলত জার্মানির বাসিন্দা তারা, ধর্মে ইহুদি। অটো-এডিথের প্রথম সন্তান মারগট, জন্ম তার ১৯২৬ সালে। দ্বিতীয় সন্তান। আনা–আনা ফ্রাঙ্ক, জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ জুন।

এইসময় জার্মানির মাটিতে মাথা তুলে হুংকার ছাড়ছে হিটলার। চারদিকে বিভৎস। অত্যাচার আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে শুরু করেছে তার নাৎসি বাহিনী। এ যেন সরাসরি ইহুদিদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তারা। অনেক ইহুদিই জার্মানির পাট চুকিয়ে চলে যাচ্ছে অন্য কোনও দেশে, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। ১৯৩৩ সালে দেশ ছাড়লেন অটো ফ্রাঙ্কও। চলে গেলেন হল্যাণ্ডে। আনা ফ্রাঙ্ক তখন চার বছরের শিশু।

এর ঠিক ছয়বছর পর শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। পৃথিবী দখলের দুর্বার স্বপ্ন দেখছে নাৎসী হিটলার। জার্মানি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে, কারণ তিনি ইহুদি। এদিকে হল্যাণ্ডের আলো-হাওয়ায় বড় হচ্ছে আনা ফ্রাঙ্ক।

কিন্তু ফ্রাঙ্ক পরিবারের হল্যাণ্ডের আশ্রয়ও নিরাপদ রইল না। হিটলারের নাৎসিবাহিনী হল্যাণ্ড দখল করল। শুরু হল ইহুদিদের ওপর অত্যাচার। অসংখ্য ইহুদিকে পাঠানো হল বন্দীশিবিরে। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে সরাসরি শমন এল অটো ফ্রাঙ্কের নামে। আসলে। সেই শমন ছিল তার বড় মেয়ে মারগটের নামে। মারগট তখন ষোড়শী সুন্দরী। নাৎসী বাহিনীর কয়েকজন অফিসারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তার রূপ-সৌন্দর্য। তাকে হাতছানি। দিল বন্দীশিবির। কিন্তু সে-ডাকে সাড়া দিলেন না অটো ফ্রাঙ্ক। সমস্ত পরিবার সহ নিলেন এক চরম ঝুঁকি। নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পেছনদিকে এক গোপন আস্তানায় আশ্রয় নিলেন সপরিবারে। সঙ্গে রইল আরও একটি পরিবার। এই সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন তাঁর অতি কাছের কয়েকজন ইংরেজ বন্ধু। আনা ফ্রাঙ্কের বয়স তখন সবেমাত্র তেরো বছর এক মাস। এক সদ্য কিশোরী। যে বয়সটা তার থাকার কথা ছিল স্কুলে। পৃথিবীর খোলা আলো-বাতাসে প্রাণের অপরিমিত উচ্ছাসে যার দিন কাটাবার কথা ছিল সেই কিশোরী আনা ফ্রাঙ্ককে বরণ করে নিতে হলো ঘুপচি ঘরের নিরাপদ আশ্রয়। রাতের বেলা যেখানে ৰাতি জ্বালানো নিষেধ ছিল। দিনের বেলায় কোন জানালা খোলার উপায় ছিল না। সে এক অপরিসীম সহ্যাতীত সময়।

এইসময় কলম উঠে এলো সদ্য কিশোরী আনা ফ্রাঙ্কের হাতে। নিজের মনের কথা, সেই সময়ের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ হতে শুরু করলো কাগজের পাতায় পাতায়। অনেক কষ্ট, অনেক ত্যাগ আর সেই সময়ের কষ্টার্জিত জীবন-যাপন প্রণালীর দিনলিপি একের পর এক লিখে চললো কিশোরী আনা ফ্রাঙ্ক।

এরপর পেরিয়ে গেল একে একে পঁচিশটা মাস। চারদিকে চলছে হিটলারের নাৎসীবাহিনীর অত্যাচার। সেই অত্যাচারের খবরে কেঁপে কেঁপে উঠছে গোপন আস্তানায় লুকিয়ে থাকা ফ্রাঙ্ক পরিবার। কখনও ভয়ে আতংকে কাতর হয়ে নিশ্রুপ–আসলে এছাড়া তো তাদের আর করার কিছুই নেই। কারণ বাইরে বের হলেই নাৎসী বাহিনীর হাতে পড়ার সম্ভাবনা। আর তারপর আতংকময় সেই বন্দীশিবির। যেখান থেকে ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। এভাবেই হয়তো পেরিয়ে যেত দিন। আতংক আর বিভীষিকাময় দিন রাতগুলো হয়তো যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত পার করতে পারতো ফ্রাঙ্ক পরিবার–সেই ঘুপচি ঘরগুলোর মধ্যে বাস করে। কিন্তু সেটাও হলো না। গোপন আস্তানায় আশ্রয় নেবার পঁচিশ মাস পর, ১৯৪৪ সালের ৪ আগস্ট, সেখানে হানা দিয়েছিল নাৎসিবাহিনী, আটজন ইহুদি মানুষকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বন্দীশিবিরে। জার্মানির আউশভিৎস বন্দীশিবিরে ১৯৪৫ সালের ৬ জানুয়ারি মারা যান আনার মা। মারগট আর আনাকে পাঠানো হয় আরও দূরবর্তী বেরজেন-বেসেন বন্দীশিবিরে। ১৯৪৫-এর ফেব্রুয়ারির শেষদিকে অথবা মার্চের শুরুতে সেখানেই মারা যায় মারগট। আর মার্চ মাসেই, ওই বন্দীশিবিরেই, শেষবারের মতো চোখ বুজেছিল পনেরো বছর নয় মাসের সেই কিশোরী আনা ফ্রাঙ্ক। # Biss

বন্দীশিবির থেকে ফিরতে পারেননি অন্য পরিবারের তিনজন সদস্য এবং দাঁতের ডাক্তার ডুসেল-ও। মৃত্যুর অন্ধকার থেকে ফিরে এসেছিলেন শুধু একজন। তিনি ছিলেন মারগট আর আনা-র বাবা অটো ফ্রাঙ্ক। আর তখনই তাদের দুই শুভার্থী–এলি আর মিপ, তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন লাল ডোরাকাটা মলাটের একটা ডায়েরি এবং আরও কিছু কাগজ–এগুলো ছিল আনার লেখা। আনার দিনলিপি। আনার গল্প-উপন্যাস-স্মৃতিকথা।

তারপর প্রকাশিত হয়েছিল সেই দিনলিপি–আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’ নামে। প্রকাশিত হবার পরই শুরু হলো আসল ইতিহাস। সারা পৃথিবী যেন চমকে গেল একজন সদ্য কিশোরীর কলমের আঁচড়ে। পরবর্তীতে এই সদ্যকিশোরীর দিনলিপি অনূদিত হয়েছে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত ভাষায়, তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র, মঞ্চস্থ হয়েছে নাটক।

এক আশ্চর্য অনুভূতি তৈরি হয় পাঠকের মধ্যে এই ডায়েরি পড়তে গিয়ে। কখন যেন এতে খুঁজে পাওয়া যায় একজন কিশোরী আনাকে; পরক্ষণেই পাঠককে বিস্মিত করে সামনে। এসে দাঁড়াবে আশ্চর্য গভীর আনা ফ্রাঙ্ক। সেই সময়ের বিভীষিকাময় দৈনন্দিন ঘটনার বর্ননার পাশাপাশি তেরো থেকে পনেরোর দিকে হেঁটে-চলা কিশোরী অনায়াসে কথা বলে গেছে দর্শন, ঈশ্বর, মানবচরিত্র এমনকি প্রেম-প্রকৃতি-জীবনবোধ নিয়েও। পাশাপাশি ফুটে উঠেছে সমকালীন ইতিহাস, ইহুদিদের লাঞ্ছনা-যন্ত্রণা-সংগ্রাম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি খন্ডকালীন ছবি।

সেই শুরু থেকেই লেখিকা হওয়ার স্বপ্ন ছিল আনা ফ্রাঙ্কের। তার স্বপ্ন ছিল এমন কিছু করার যাতে সে মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকতে পারবে–সাধারণ মানুষের অন্তর জুড়ে। কিন্তু তা হলো না। যে ফুল ফুটলে চারদিক ভরে যেতে পারতো অন্তহীন সুবাসে–সেই ফুলের ফোঁটা হলো না। ঝরে যেতে হয়েছে তাকে কুঁড়িতেই।

কিন্তু বেঁচে আছে তার সেই অমর দিনলিপি। বাঁচিয়ে রেখেছে তাকে বিশ্বজুড়ে পাঠকের অন্তরে। বেঁচে থাকবে আনা ফ্রাঙ্ক, বেঁচে থাকবে তার ডায়েরি।

–নজরুল ইসলাম চৌধুরী

০১. আমার ঘুম ভেঙে গেল

০১. রবিবার, ১৪ জুন, ১৯৪২

শুক্রবার, ১২ই জুন, ছ-টায় আমার ঘুম ভেঙে গেল এবং এখন আমি জানি কেন–সেদিন ছিল আমার জন্মদিন। তবে অত ভোরে ওঠা অবশ্যই আমার বারণ, সুতরাং ভেতরে ভেতরে ছটফট করলেও পৌনে সাতটা অব্দি নিজেকে সামলে রাখতে হল। ব্যস, তারপর আর নিজেকে ধরে রাখা গেল না। উঠে আমি খাওয়ার ঘরে চলে গেলাম। সেখানে মুরটিয়ে (বেড়াল) আমাকে দেখে সাদর অভ্যর্থনা জানাল।

সাতটা বাজার খানিক পরেই আমি চলে গেলাম মা-বাবার কাছে। তারপর বৈঠকখানায় গিয়ে উপহারের প্যাকেটগুলো খুলতে লাগলাম। প্রথমেই যে স্বাগত জানাল সে হলে তুমি, সম্ভবত সেটাই হয়েছে আমার সবচেয়ে সেরা জিনিস। এছাড়া টেবিলে একগুচ্ছ গোলাপ, একটা চারা গাছ, আর কিছু পেওনিফুল, সারাদিনের মধ্যে আরও কিছু এসে গেল।

মা-বাবার কাছ থেকে পেলাম একরাশ জিনিস, আর নানা বন্ধুতে আমার মাথাটা সম্পূর্ণ খেল। আর যা যা পেলাম, তার মধ্যে ছিল ক্যামেরা অবন্ধুরা, একটি পার্টি গেম, প্রচুর লজেন্স, চকোলেট, একটি গোলকধাঁধা, একটা ব্রোচ, জোসেফ কোহেনের লেখা ‘নেদারল্যাণ্ডস্-এর লোককথা আর পৌরাণিক উপাখ্যান’, ‘ডেইজি-র ছুটিতে পাহাড়ে’ (দারুণ একখানা বই), আর কিছু টাকাকড়ি। এইবার আমি কিন্তু কিনতে পারব ‘গ্রীস আর রোমের উপকথা’–তোফা।

তারপর লিস বাড়িতে এল ডাকতে, আমরা ইস্কুলে গেলাম। টিফিনের সময় সবাইকে আমি মিষ্টি বিস্কুট দিলাম, তারপর আবার আমাদের মন দিতে হল ইস্কুলের পড়ায়।

এবার ইতি টানতে হবে। আসি ভাই, আমরা হব হলায়-গলায় বন্ধু!

.

সোমবার, ১৫ জুন, ১৯৪২

আমার জন্মদিনে পার্টি হল রবিবার বিকেলে। আমরা একটা ফিল্ম দেখালাম–’বাতিঘর রক্ষক, তাতে রিন-টিন-টিন ছিল। আমার ইস্কুলের বন্ধুরা ছবিটা চুটিয়ে উপভোগ করেছে। আমাদের সময়টা খুব ভালো কেটেছিল। ছেলেমেয়ে ছিল প্রচুর। আমার মা-মণির সবসময় খুব জানার ইচ্ছে কাকে আমি বিয়ে করব। তার কতকটা আন্দাজ, পিটার ভেসেল্ হল সেই ছেলে; একদিন লজ্জায় লাল না হয়ে কিংবা চোখের একটি পাতাও না কাঁপিয়ে মা-মণির মন থেকে সরাসরি ঐ ধারণাটা সো-সো করে ঘোচাতে পেরেছিলাম। বছর কয়েক ধরে, আমার প্রাণের বন্ধু বলতে লিস্ গুসেন আর সানা হুটমান। এরপর ইহুদীদের মাধ্যমিক ইস্কুলে যোপি দ্য বালের সঙ্গে আমার আলাপ; প্রায়ই আমরা একসঙ্গে কাটাই; আমার মেয়ে বন্ধুদের মধ্যে ওর সঙ্গেই এখন আমার সবচেয়ে বেশি ভাব। অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে লিসের বেশি বন্ধুত্ব; আর সানা যায় অন্য একটা ইস্কুলে–সেখানে তার নতুন নতুন বন্ধু হয়েছে।

.

শনিবার, ২০ জুন, ১৯৪২

দিন কয়েক আমি লিখিনি, তার কারণ আমি সবার আগে চেয়েছিলাম ডায়রিটা নিয়ে ভাবতে। আমার মতো একজনের পক্ষে ডায়রি রাখার চিন্তাটা বেখাপ্পী; আগে কখনও ডায়রি রাখিনি বলে শুধু নয়, আসলে আমার মনে হয়, তেরো বছরের এক স্কুলের মেয়ের মনখোলা কথাবার্তা কোনো আগ্রহ জাগাবে না–না আমার, না সেদিক থেকে আর কারো; তা হোক, কী আসে যায় তাতে? আমি চাই লিখতে কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল, আমার বুকের গভীরে যা কিছু চাপা পড়ে রয়েছে আমি চাই সেসব বের করে আনতে।

লোকে কথায় বলে, ‘মানুষের চেয়ে কাগজে সয় বেশি’; যে দিনগুলোতে আমার মন একটু ভার হয়ে থাকে, সেই রকম একটা দিনে–গালে হাত দিয়ে আমি বসে আছি। মনটা ভীষণ বেজার, এমন একটা নেতিয়ে-পড়া ভাব যে ঘরে থাকব, না বেরিয়ে পড়ব সেটা পর্যন্ত ঠিক করে উঠতে পারছি না–কথাটা ঠিক তখনই আমার মন এল। হ্যাঁ, এটা ঠিকই, কাগজের আছে সহ্যগুণ এবং এই শক্ত মলাট দেওয়া নোটবই, জাক করে যার নাম রাখা হয়েছে। ‘ডায়রি’, সত্যিকার কোনো ছেলে বা মেয়ে বন্ধু না পেলে কাউকেই আমি দেখাতে যাচ্ছি না। কাজেই মনে হয় তাতে কারো কিছু আসে যায় না। এবার আদত ব্যাপারটাতে আসা যাক, কেন আমি ডায়রি শুরু করছি তার কারণটা। এর কারণ হল, আমার তেমন সত্যিকার কোনো বন্ধু নেই।

কথাটা আরেকটু খোলসা করে বলা যাক, কেননা তেরো বছরের একটি মেয়ে দুনিয়ায় নিজেকে একেবারে একা বলে মনে করে, এটা কারো বিশ্বাস হবে না, তাছাড়া তা নয়। আমার আছে খুব আদরের মা-বাবা আর ষোল বছরের এক দিদি। আমার চেনা প্রায় তিরিশজন আছে যাদের বন্ধু বলা যেতে পারে–আমার-একগোছা ছেলে-বন্ধু আছে, যারা আমাকে এক ঝলক দেখবে বলে উদ্গ্রীব এবং না পারলে, ক্লাসের আয়নাগুলোতে আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। আমার আত্মীয়স্বজনেরা আছে, মাসি-পিসি কাকা-মামার দল, তারা আমার ইষ্টিকুটুম; আর রয়েছে একটা সুখের সংসার, না–আমার কোনো অভাব আছে বলে মনে হয় না। তবে আমার সব বন্ধুরই সেই এক ব্যাপার, কেবল হাসি-তামাসা আর ঠাট্টা ইয়ার্কি, তার বেশি কিছু নয়। মামুলি বিষয়ের বাইরে কোনো কথা বলা যায় না। আমরা কেমন যেন কিছুতেই সেরকম ঘনিষ্ঠ হতে পারি না–আসল মুশকিল সেইখানে। হতে পারে। আমার আত্মবিশ্বাসের অভাব, কিন্তু সে যাই হোক, ঘটনাটা অস্বীকার করা যায় না এবং এ নিয়ে আমার কিছু করার আছে বলে মনে হয় না।

সেই কারণেই, এই ডায়রি। যে বন্ধুটির আশায় এতদিন আমি পথ চেয়ে বসেছিলাম তার ছবিটা আমার মানসপটে বড় করে ফোঁটাতেও চাই; আমি তাই অধিকাংশ লোকের মতন। আমার ডায়রিতে একের পর এক নিছক ন্যাড়া ঘটনাগুলোকে সাজিয়ে দিতে চাই না; তার বদলে আমি চাই এই ডায়রিটা হোক আমার বন্ধু, আমার সেই বন্ধুকে আমি কিটি বলে ডাকব। কিটিকে লেখা আমার চিঠিগুলো যদি হঠাৎ দুম করে শুরু করে দিই তাহলে আমি কী বলছি কেউ বুঝবে না; সেইজন্যে আরম্ভে খানিকটা অনিচ্ছার সঙ্গে মাত্র কয়েকটা আঁচড়ে আমার জীবনের ছবি ফুটিয়ে তুলব।

মাকে যখন বিয়ে করেন তখন আমার বাবার বয়স ছত্রিশ আর মার বয়স পঁচিশ। আমার দিদি মারগট হয় ১৯২৬ সালে ফ্রাঙ্কফোর্ট-অন-মাইন শহরে, তারপর হই আমি–১৯২৯-এর ১২ই জুন। আমরা ইহুদী বলে ১৯৩৩ সালে আমরা হল্যাণ্ডে চলে যাই, সেখানে আমার বাবা। ট্রাভিস্ এন.ভি.-র ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। যে কোলেন অ্যান্ড কোম্পানীর সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, তার অফিস একই বাড়িতে আমার বাবা তার পার্টনার।

আমাদের পরিবারের বাকি সবাইয়ের ওপর অবশ্য হিটলারের ইহুদী বিরোধী বিধি বাঁধনের পুরো চোট এসে পড়েছে, কাজেই জীবন ছিল দুর্ভাবনায় ভরা। যে সময়টা ইহুদীদের দ্যাখ-মার করা হয়, তার ঠিক পরে ১৯৩৮ সালে আমার দুই মামা পালিয়ে আমেরিকায় চলে যান। আমার বুড়ি-দিদিমা আমাদের কাছে চলে আসেন, তাঁর বয়স তখন তিয়াত্তর। ১৯৪০ সালের মে মাসের পর দেখতে দেখতে সুদিন উধাও হতে থাকে। প্রথমে তো যুদ্ধ, তারপর আত্মসমর্পণ, আর তারপরই জার্মানদের পদার্পণ। ওরা পৌঁছুনোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ইহুদীদের লাঞ্ছনা দস্তুরমত শুরু হয়ে গেল। দ্রুত পর্যায়ে একের পর এক ইহুদীবিরোধী ফরমান জারি হতে লাগল। ইহুদীদের অবশ্যই হলদে তারা (যাতে আলাদাভাবে তাদের চেনা যায় সেইজন্যে জার্মানরা সমস্ত ইহুদীকে একটি করে ছয় মুখো হলুদ রঙের তারা সকলের চোখে পড়ার মতো করে পরতে বাধ্য করেছিল) পরতে হবে, ইহুদীদের সাইকেলগুলো অবশ্যই জমা দিতে হবে, রেলগাড়িতে ইহুদীদের চড়া নিষিদ্ধ এবং গাড়ি চালানোও তাদের বারণ। কেবল তিনটে থেকে পাঁচটার মধ্যে ইহুদীরা সওদা করতে পারবে এবং তাও একমাত্র ইহুদীদের দোকান’ বলে প্ল্যাকার্ড-মারা দোকানে। আটটার মধ্যে ফিরে ইহুদীদের ঘরে আটক থাকতে হবে। ঐ সময়ের পর এমন কি নিজের বাড়ির বাগানেও বসা চলবে না। থিয়েটার, সিনেমা এবং অন্যান্য আমোদ-প্রমোদের জায়গায় ইহুদীরা যেতে পারবে না। সাধারণের খেলা-ধুলোয় ইহুদীরা যেন যোগ না দেয়। সাঁতারের জায়গা, টেনিস, কোর্ট, হকির মাঠ এবং খেলাধুলোর অন্যান্য জায়গা–সবই তাদের জন্যে নিষিদ্ধ। ইহুদীরা যেন খৃষ্টানদের বাড়িতে না যায়। ইহুদীরা অবশ্যই যাবে ইহুদী স্কুলে। এই রকমের অনেক বিধিনিষেধ জারি হল।

আমরা এটা করতে পারি না, ওটা করা নিষিদ্ধ–এইরকম অবস্থা। কিন্তু তা সত্বেও দিন কেটে যেতে লাগল। গোপি আমাকে বলত, ‘যা কিছু করতে যাও তাতেই ভয়; বলা যায় না, হয়ত বারণ আছে। আমাদের স্বাধীনতায় বেজায় ধরাট। তবু সওয়া যাচ্ছিল।

১৯৪২-এর জানুয়ারিতে দিদু মারা গেলেন; আজও কিভাবে তিনি আমার হৃদয়মন জুড়ে আছেন, আমি তাকে কতটা ভালবাসি–সে কথা কেউ কখনও বুঝবে না।

১৯৩৪ সালে মন্টেসরি কিণ্ডারগার্টেনে আমার হাতেখড়ি, তারপর সেখানেই পাড়শুনো করি। ৬-খ শ্রেণীতে পড়ার সময় ইস্কুলের বৎসরান্তে মিসেস কে.ভে-এর কাছ থেকে আমাকে বিদায় নিতে হল। দুজনেই কেঁদে ফেললাম, মনও খুব খারাপ হয়ে গেল। ১৯৪১ সালে দিদি মারগটের সঙ্গে আমি গেলাম ইহুদী মাধ্যমিক ইস্কুলে–দিদি ভর্তি হল চতুর্থ শ্রেণীতে আর আমি প্রাথমিক শ্রেণীতে।

এ পর্যন্ত আমরা চারজনে নির্ঝঞ্ঝাটে আছি। এরপর আসব আজকের কথায়।

.

শনিবার, ২০ জুন, ১৯৪২

আদরের কিটি,

বিনা বাক্যব্যয়ে শুরু করে দেব। বাড়িটা এখন নীরব নিস্তব্ধ, মা-মণি আর বাপি বেরিয়েছেন আর মারগট গেছে ওর কিছু বন্ধুর সঙ্গে পিং-পং খেলতে।

ইদানীং আমি নিজেও পিং-পং খেলছি। আমরা যারা পিং-পং খেলি, আইসক্রিমের ওপর আমাদের একটু বেশি টান–বিশেষ করে গরমকালে, খেলতে খেলতে যখন শরীর তেতে যায়। কাজেই সচরাচর খেলার পর আমরা চলে যাই সবচেয়ে কাছাকাছি আইসক্রিমের দোকানে–ডেলফি কিংবা ওয়াসিসে–যেখানে ইহুদীরা যেতে পারে। বাড়তি হাত-খরচার জন্যে হাত পাতা আমরা এখন ছেড়ে দিয়েছি। ওয়াসিসে আজকাল প্রায়ই লোকজনে ভর্তি থাকে; আমাদের চেনাশহর বেশ বড় হওয়ায়, তার মধ্যে আমরা সব সময়ই কোনো না কোনো মহাশয় লোক বা ছেলেবন্ধু জুটিয়ে ফেলি। তারা আমাদের এত আইসক্রিম দেয় যা পুরো সপ্তাহ গোগ্রাসে গিলেও আমরা শেষ করতে পারি না।

আমাকে এই বয়সে ছেলে-বন্ধুর কথা মুখ ফুটে বলতে দেখে তুমি বোধহয় খানিকটা অবাক হবে। হায়, আমাদের যা ইস্কুল তাতে এটা কারো পক্ষে এড়ানো সম্ভব বলে মনে হয় না। যেই কোনো ছেলে আমার সঙ্গে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইল এবং আমরা কথা কইতে শুরু করে দিলাম–ব্যস, অমনি সে আকণ্ঠ প্রেমে পড়ে যাবে এবং স্রেফ সে আমাকে তার চোখের আড়াল হতে দেবে না; আমি ধরে নিতে পারি দশবারের মধ্যে নয় বারই এরকম ঘটবে। অবশ্য দিনকতক গেলেই সব পানি হয়ে যায়; বিশেষত যখন দেখে যে, অত সব জুল জুল করে তাকানো-টাকানো আদৌ গায়ে না মেখে আমি দিব্যি মনের আনন্দে সাইকেলে প্যাডেল করে চলেছি। এ ব্যাপারটা যদি আরেকটু বেশি গড়ায়, বাবার কাছে কথা পাড়ার কথা ওরা বলতে আরম্ভ করে সঙ্গে সঙ্গে সাইকেলটাকে একটু হেলিয়ে দিই, আমার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা পড়ে যায়। ছেলেটিকে তখন তার সাইকেল থেকে নামতেই হয়, আমাকে সে ব্যাগটা কুড়িয়ে দেয়। সেই ফাঁকে অন্য দিকে আমি কথার মোড় ঘোরাই।

এরা সব একেবারেই নিরীহ ধরনের ছেলে; কিছু আছে দেখবে যারা চুমো ফুকে দেয় কিংবা খপ করে হাত ব্রার চেষ্টা করে। সেক্ষেত্রে তারা অবশ্যই ভুল দরজায় কড়া নাড়ে! সঙ্গে সঙ্গে সাইকেল থেকে আমি নেমে পড়ে বলি ওদের সঙ্গে আর একপাও যাব না; কিংবা ইজ্জত নষ্ট হওয়ার ভাব দেখিয়ে সাফ সাফ ওদের কেটে পড়তে বলি।

আমাদের বন্ধুত্বের ভিত গড়া হল। আজকের মত এখানেই ইতি।
তোমার আনা

.

রবিবার, ২১ জুন, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আমাদের খ-১ ক্লাসের সকলেরই হাঁটু কাঁপছে, তার কারণ টিচারদের মিটিং আসন্ন। কে কে ওপরের ক্লাসে উঠবে আর কে কে পড়ে থাকবে, এই নিয়ে জোর জল্পনা-কল্পনা চলেছে। আমাদের পেছনে বসে ভিম্ আর য়া; ছেলে দুটির ব্যাপার-স্যাপার দেখে মিপ্‌ দ্য যোং আর আমি বেজায় মজা পাচ্ছি। যে ভাবে ওরা বাজি ধরে চলেছে তাতে ছুটিতে ওদের হাতে আর একটা পয়সাও থাকবে না। ‘তুমি উঠবে’, ‘উঠব না’, ‘উঠবে’,-উদয়াস্ত এই চলেছে। এমন কি মিও ওদের চুপ করতে বলে, আমি রেগে গলা বের করি–তাও ওদের থামানো যায় না।

আমার মতে, সিকি ভাগের উচিত যারা যে ক্লাসে আছে সেই ক্লাসেই থেকে যাওয়া। কিছু আছে একেবারেই নিরেট। কিন্তু টিচাররা দুনিয়ার সবচেয়ে আজব চিড়িয়া; কাজেই তারা হয়ত নেহাৎ খেয়ালবশেই জীবনে এই একবার ঠিক কাজ করে বসবেন।

আমার মেয়ে-বন্ধুদের ক্ষেত্রে আর আমার নিজের ব্যাপারে আমি ভয় পাচ্ছি না। আমরা কোনরকমে ঠেলেঠুলে বেরিয়ে যাব। অবশ্য আমার অঙ্কের ব্যাপারে আমি খুব নিশ্চিন্ত নই। তবু আমরা আর যা হোক ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারি, ইতিমধ্যেই আমরা পরস্পরকে খোশ মেজাজে রাখছি।

আমাদের টিচার মোট নয় জন–সাতজন শিক্ষক আর দুই জন শিক্ষত্রিয়ী। ওঁদের সকলের সঙ্গেই আমার বেশ বনিবনা। আমাদের বুড়ো অঙ্কের মাস্টার মিস্টার কেপ্টর অনেকদিন অব্দি আমার ওপর খুব বেজার ছিলেন, কারণ আমি একটু বেশি বকবক করি। ফলে, ‘একজন বাচাল’-এই বিষয়ে আমাকে একটা রচনা লিখতে হয়েছিল। একজন বাচাল। এ বিষয়ে কী-ই বা লেখা যায়? যাই হোক, এ নিয়ে পরে মাথা ঘামানো যাবে–মনে মনে এটা ঠিক করে আমার নোট বইতে টুকে রাখলাম। তারপর চেষ্টা করলাম নির্বিকার থাকতে।

সেদিন সন্ধ্যেবেলায় অন্যান্য বাড়ির কাজ যখন শেষ করে ফেলেছি, হঠাৎ আমার নোটবইতে লেখা শিরোনামাটার দিকে আমার নজর গেল। ফাউন্টেন পেনের শেষ প্রান্তটা। দাঁত দিয়ে খুঁটতে খুঁটতে, আমি ভাবতে লাগলাম–গোটা গোটা অক্ষরে বেশ ফাঁক-ফাঁক করে। শব্দ সাজিয়ে যে-কেউ কিছুটা আবোল-তাবোল লিখে যেতে পারে; কিন্তু মুশকিল হল বকবক করার আবশ্যকতা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করা। ভাবতে-ভাবতে, হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল–তখনই বসে আমার ভাগের তিনটি পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেললাম। আর লিখে তৃপ্তিও পেলাম। ষোল আনা। আমার যুক্তিগুলো ছিল এই বকবক করাটা হল মেয়েলী স্বভাব; আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব এই স্বভাবের রাশ টেনে রাখতে, কিন্তু আমার এ রোগ একেবারে সারবে না, কেন আমার মা আমার মতই বকবক করেন–সম্ভবত তার চেয়েও বেশি। রক্তের সূত্রে পাওয়া গুণগুলো নিয়ে কে-ই বা কী করতে পারে?

আমার যুক্তিগুলো দেখে মিস্টার কেপ্টর না হেসে পারেননি, কিন্তু পরের বারের পড়াতেও সমানে বকর বকর করতে থাকায় আরেকটি রচনার বোঝা ঘাড়ে এসে গেল। এবারের বিষয় হল ‘সংশোধনের অযোগ্য বাচাল’; লিখে যথারীতি তাঁর হাতে দেওয়ার পর পুরো দুই বারের পড়ায় তিনি আর কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। কিন্তু তৃতীয় বারের পড়ার দিনে তার পক্ষে আর চুপ করে থাকা সম্ভব হয়নি। কথা বলার শাস্তি হিসেবে আমাকে একটা রচনা লিখতে হবে, তার নাম হল বকবকচঞ্চুর ধূর গিন্নী বলল, ‘প্যাঁক্-প্যাঁক্-প্যাঁক’। সারা ক্লাস অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আমাকেও হাসতে হল বটে, কিন্তু এটা বেশ মালুম হল যে, এ-বিষয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবনের শক্তি আমি ফুরিয়ে ফেলেছি। আমাকে তখন এমন জিনিস ভেবে বের করতে হল যা পুরোপুরি মৌলিক। আমার বরাত ভালো ছিল, কেননা আমার বন্ধু সানা ভালো কবিতা লেখে–সানা বলল পুরো রচনাটাই সে পদ্য করে লিখে দেবে। আমি তো আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। কেপ্টর চেয়েছিলেন এই রকম কিম্ভুত বিষয়ের প্যাচে ফেলে আমাকে বোকা বানাতে। আমি তার শোধ তুলব; সারা ক্লাসের কাছে তাকেই বরং হাস্যাস্পদ করে ছাড়ব। পদ্যটা লেখা হয়ে গেল হল একেবারে নিখুত। এক মা-হাঁস আর এক রাজহংস বাবার তিনটি ছিল ছানাপোনা। তারা বড় বেশি বকবক করত বলে বাপ ওদের কামড় দিয়ে মেরে ফেলে। ভাগ্য ভালো যে, কেপ্টর এর রসটা ধরতে পারেন; ক্লাসে তিনি টীকাটিপ্পনি সমেত জোরে জোরে পদ্যটা যেমন আমাদের ক্লাসে, তেমনি আরও অন্যান্য ক্লাসেও পড়ে শোনান।

তারপর থেকে ক্লাসে আমি অবাধে কথা বলতে পারি, আমার ঘাড়ে বাড়তি কাজ চাপানো হয় না; বস্তুত কেপ্টর সমস্ত সময়ই ব্যাপারটা নিয়ে তামাসা করেন।

তোমার আনা

.

বুধবার, ২৪ জুন, ১৯৪২

আদরের কিটি,

এখন সব আগুনে সেদ্ধ হচ্ছে, প্রচণ্ড গরমে আমরা সব রীতিমত গলে যাচ্ছি। আর ঠিক সেই সময় আমাকে সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে পায়ে হেঁটে। ট্রাম যে কত ভালো জিনিস এখন আমি তা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছি; কিন্তু ট্রামে চড়ার বিলাস ইহুদীদের পক্ষে নিষিদ্ধ আমাদের পক্ষে পা-গাড়িই প্রশস্ত। কাল দুপুরে টিফিনের সময়টাতে আমাকে যেতে হয়েছিল

য়ান লুইকেন স্ট্রাটে দাঁতের ডাক্তারের কাছে। দুপুরের পর ফিরে ইস্কুলে আরেকটু হলেই আমি ঘুমিয়ে পড়তাম। ভাগ্য ভালো, দাঁতের ডাক্তারের সহকারিণী ছিলেন খুব দয়ালু, তিনি আমাকে খানিকটা পানীয় দিয়েছিলেন–মানুষটি বড় ভালো।

ফেরী নৌকোয় আমরা পার হতে পারি–ব্যস, ঐ পর্যন্ত। যোসেফ ইস্রাইলস্কাডে থেকে একটা ছোট বোট ছাড়ে, সেখানে বোটের লোকটিকে বলতেই সে আমাদের তৎক্ষণাৎ তুলে নিল। আজ আমাদের যে কষ্টের একশেষ তার জন্যে কিন্তু ওলন্দাজরা দায়ী নয়।

ইস্কুলে যেতে না হলে বাঁচতাম–কেননা ঈস্টারের ছুটিতে আমার সাইকেলটা চুরি হয়ে গেছে আর মা-মণিরটা বাপি দিয়েছেন এক খৃস্টান পরিবারকে নিরাপদে রাখার জন্যে। তবু রক্ষে, সামনে ছুটি–আর এক হপ্তা কাটাতে পারলেই আমাদের শান্তি। কাল একটা মজার ব্যাপার হল; সাইকেল রাখার আড়তটা পেরোচ্ছি, এমন সময় একজন আমার নাম ধরে ডাকল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি সেই সুন্দর দেখতে ছেলেটা, পরশু সন্ধ্যেবেলায় আমার মেয়ে-বন্ধু ইভাদের বাড়িতে যার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। লাজুক-লাজুক ভাব করে এগিয়ে এসে হ্যারি গোল্ডবার্গ বলে সে তার পরিচয় দিল। আমি একটু থতমত খেয়ে ঠিক ধরতে পারছি না ছেলেটা কী চাইছে। কিন্তু আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ইস্কুল অব্দি আমার সঙ্গে সে গেলে আমার আপত্তি হবে কিনা এটা সে জানতে চাইল। আমি বললাম, তুমি তো ঐ রাস্তাতেই যাচ্ছ, চলো আমিও যাচ্ছি’–এই বলে দুজনে হাঁটতে লাগলাম। হ্যারির বয়েস ষোল; ওর ঝুলিতে আছে মজাদার সব গল্প। আজ সকালেও রাস্তায় ও আমার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার মনে হয় এবার থেকে রোজই থাকবে।

তোমার আনা

.

মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ১৯৪২

আদরের কিটি,

এর আগে একদণ্ড সময় পাইনি তোমাকে লেখার। বৃহস্পতি বার সারাটা দিন বন্ধুদের সঙ্গে কেটেছে। শুক্রবার বাড়িতে অতিথিরা এসেছিল, আজ অবধি এইভাবে একটার পর একটা। এই একটা সপ্তাহে হ্যারি আর আমি পরস্পর সম্পর্কে বেশ খানিকটা জেনেছি; হ্যারি ওর জীবনের অনেক বৃত্তান্ত আমাকে বলেছে। হল্যাণ্ডে ও একা এসেছে। ও এখন ওর দাদু দিদিমার কাছে থাকে। হ্যারির বাবা-মা থাকেন বেলজিয়ামে। ফ্যানি বলে হ্রারির এক মেয়ে বন্ধু ছিল। ফ্যানিকেও আমি চিনি। খুব নরম প্রকৃতির খাটো ধরনের মেয়ে। আমাকে দেখার পর হ্যারির মনে হচ্ছে সে এতদিন ফ্যানির সান্নিধ্যে দিবাস্বপ্ন দেখত। আমার উপস্থিতিতে এমন কিছু সে পায় যা তাকে জাগিয়ে রাখে। দেখছ তো, আমরা সকলেই কোনো না কোনো কাজে লাগি এবং কখনও কখনও সেসব অদ্ভুত ধরনের কাজ! গোপি শনিবার রাত্তিরে এখানে ছিল, তবে রবিবার লিসূদের ওখানে চলে যায়; সময় যেন কাটতেই চাইছিল না। কথা ছিল হ্যারি সন্ধ্যেবেলায় আসবে। ছ-টা নাগাদ সে ফোন করলে আমি গিয়ে ধরলাম। হ্যরির গলা, ‘আমি হ্যারি গোল্ডবার্গ, দয়া করে আমাকে একটু ডেকে দেবেন?

‘হ্যাঁ, হ্যারি, আমি আনা বলছি’

‘হ্যালো, আনা, কেমন আছ?’

‘খুব ভালো, ধন্যবাদ।‘

‘আজ সন্ধ্যেবেলা আসতে পারছি না বলে আমার খুব খারাপ লাগছে, কিন্তু তবু শুধু একটু কথা বলে আসতে চাই। দশ মিনিটের মধ্যে আসছি–অসুবিধে হবে না তো?

‘মোটেই না। এসো কিন্তু।‘

‘আচ্ছা, ছাড়ছি। এখুনি এসে যাব।’

রিসিভারটা রাখলাম।

চটপট ফ্রক বদলে ফেলে মাথার চুল একটু আঁচড়ে নিলাম। তারপর হ্যারির পথ চেয়ে দুরুদুরু বক্ষে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। অবশেষে দেখতে পেলাম ও আসছে। দেখামাত্র দৌড়ে নিচে ছুটে গেলাম না যে, সেটাই আশ্চর্য। তার বদলে ও বেলু না বাজানো পর্যন্ত আমি ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলাম। তারপর নিচে গেলাম। আমি দরজা খুলবামাত্র হ্যারি ছিটুকে ভেতরে এল। ‘আনা, আমার দিদিমা মনে করেন তোমার মতো ছোট্ট মেয়ের আমার সঙ্গে প্রতিদিন বাড়ির বাইরে যাওয়া ঠিক নয়, উনি মনে করেন আমার উচিত লোর্স এ যাওয়া। তবে এটা তুমি আশাকরি জানো যে, আমি আর এখন ফ্যানিকে নিয়ে বেড়াতে বের হই না?’

‘জানি না তো; কেন, তোমরা কি আড়ি করেছ?’

‘না, না, তা নয়। আমি ফ্যানিকে বলেছি যে, আমাদের দুজনের ঠিক পটে না; সুতরাং দুজনে মিলে বাইরে বের না হওয়াই আমাদের পক্ষে ভালো। অবশ্য আমাদের বাড়িতে সবাই সব সময়ই তাকে স্বাগত জানাবে; তেমনি আশাকরি ওর বাড়িতেও আমার জন্যে দ্বার অবারিত থাকবে। দেখ, আমি ভেবেছিলাম ফ্যানি অন্য একটি ছেলের সঙ্গে বেরোয়; ওর সঙ্গে আমার ব্যবহারটাও হয়েছিল সেইরকম। কিন্তু ব্যাপারটা আদৌ সত্যি ছিল না। এখন আমার মামা বলেন আমার উচিত ফ্যানির কাছে ক্ষমা চাওয়া। আমার বয়ে গেছে। সুতরাং গোটা ব্যাপারটাই আমি কাটাকাটি করে দিয়েছি। এটা তো ছিল আরও অনেক কারণের মধ্যে মাত্র একটি।

আমার দিদিমার ইচ্ছে, তোমার সঙ্গে না গিয়ে আমি ফ্যানির সঙ্গে যাই; কিন্তু আমি তা করব না। বুড়োমানুষদের মাথায় মাঝে মাঝে এমন বিকট সেকেলে সব ধারণা চেপে বসে! কিন্তু ওদের গোড়ে গোড় দিয়ে চলতে পারব না। দাদু-দিদিমাকে ছাড়া যেমন আমার চলবে না, তেমনি এক হিসেবে আমাকে ছাড়াও ওঁদের চলবে না। এবার থেকে বুধবারের সন্ধেগুলো আমি ফাঁকা পাব।

দাদু-দিদিমার মন রাখার জন্যে আমি নামে কাঠখোদাইয়ের ক্লাস করতে যাই। কিন্তু আদতে যাই জিওনিস্ট-পন্থীদের সভাসমিতিতে। আমার যাওয়ার কথা নয়, কেননা আমার দাদু-দিদিমারা জিওনিস্টদের খুবই বিরুদ্ধে।

আমি আদৌ ধর্মান্ধ নই, কিন্তু ওদিকে আমার একটা ঝোঁক আছে আর মনটাও টানে। কিন্তু ইদানীং এই নিয়ে এমন একটা হ-য-ব-র-ল সৃষ্টি হয়েছে যে আর আমি এর মধ্যে থাকছি না; পরের বুধবারই হবে আমার শেষ যাওয়া। তারপর থেকে বুধবারের সন্ধ্যেগুলো, শনিবারের বিকেল, রবিবারের বিকেল এবং হয়ত আরও কোনো কোনো দিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে।’

কিন্তু তোমার দাদু-দিদিমারা তো এটা চান না; তাদের ফাঁকি দিয়ে তুমি এটা করতে পারো না।’

‘ভারবাসা ঠিকই তার পথ করে নেয়।‘

এরপর আমরা মোড়ের মাথায় বইয়ের দোকানটা পেরোতেই দেখি আরও দুটি ছেলের

সঙ্গে পেটার ভেসেল দাঁড়িয়ে; পেটার বলল, ‘আরে, কী খবর?’–দীর্ঘদিন পর সে আমার সঙ্গে এই প্রথম কথা বলল; আমি সত্যিই খুশী হলাম।

হ্যারি আর আমি হাঁটছি তো হাঁটছিই। শেষকালে ঠিক হল, কাল সন্ধ্যে সাতটার পাঁচ মিনিট আগে হ্যারিদের বাড়ির সামনে আমাদের দেখা হবে।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ৩ জুলাই, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল হ্যারি আমাদের বাড়িতে এসেছিল বাবা-মার সঙ্গে আলাপ করতে। আমি কিনে এনেছিলাম ক্রীম কেক, মিষ্টি, চা আর বাছাই করা বিস্কুট, বেশ পছন্দসই সব খাবার। কিন্তু আমি বা হ্যারি, আমরা কেউই চাইনি হাত-পা গুটিয়ে অনির্দিষ্টকাল বাড়ি বসে থাকতে। কাজেই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম হাঁটতে। ও যখন আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল তখন দেখি আটটা বেজে দশ। বাবা তো রেগে কাই; বললেন, আমি খুব অন্যায় করেছি; কারণ আটটার পর ইহুদীদের বাইরে থাকা খুবই বিপজ্জনক। আমাকে কথা দিতে হল যে, এরপর থেকে আটটা বাজার দশ মিনিট আগেই আমি বাড়ি ফিরব।

কাল হ্যারিদের বাড়িতে আমাকে যেতে বলেছে। আমার মেয়ে-বন্ধু গোপি সারাক্ষণ হ্যারি হ্যারি করে আমার পেছনে লাগে। না গো, আমি সত্যিই কিন্তু প্রেমে পড়িনি। কিছু ছেলে-বন্ধু তো আমার থাকতেই পারে–কেউ ও নিয়ে মাথা ঘামায় না। তবে একজন ছেলে বন্ধু অথবা মা যাকে বলেন বল্লভ, অন্যদের চেয়ে সে যেন আলাদা।

একদিন সন্ধ্যেবেলায় হ্যারি গিয়েছিল ইভাদের বাড়িতে। ইভা বলল হ্যারিকে ও জিগ্যেস করেছিল, ‘ফ্যানি না আনা-কাকে তোমার সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে?’ হ্যারি বলেছিল, সে তোমার জেনে কাজ নেই। কিন্তু চলে যাবার আগে (বাকি সন্ধ্যেটা ওরা বাক্যালাপ বন্ধ করে দিয়েছিল), শোনো তবে, সেই মেয়ে হল আনা, এখন পর্যন্ত। কিন্তু কাউকে বলবে না। বলেই হ্যারি সাঁ করে বেরিয়ে গিয়েছিল।

দেখেই বোঝা যায় হ্যারি আমার প্রেমে পড়েছে, এর মধ্যে তবু একটু মজা আছে, মন্দ কি। মারগট বলবে, ‘হ্যারি খাসা ছোকরা!’ হ্যাঁ, তবে সেটাই সব নয়। মা তো তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ; যেমন দেখতে ভালো, তেমনি সুন্দর আচার-ব্যবহার, চমৎকার ছেলেটি। আমার ভালো লাগে, বাড়ির সবাই ওকে পছন্দ করে। হ্যারিরও সবাইকে পছন্দ। ও অবশ্য মনে করে আমার মেয়ে-বন্ধুরা বড় বেশি খুকি-খুকি। হ্যারি মিথ্যে বলে না।

তোমার আনা

.

রবিবার, ৫ জুলাই, ১৯৪২

আদরের কিটি, ইহুদী নাট্যনিকেতনে আমাদের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হল। আমি এর চেয়ে ভালো আশা করিনি। আমার রিপোর্ট মোটেই খারাপ নয়। একটাতে ‘খুব ভালো’, বীজগণিতে একটা পাঁচ মার্কা, দুটোতে ছয়, আর বাকিগুলোতে কোনোটাতে সাত, কোনোটাতে আট। বাড়ির লোকেরা খুশী হয়েছে তো বটেই, তবে আমার মা-বাবা নম্বরের ব্যাপারে আদৌ অন্যদের মত নন। রিপোর্টের ভাল-মন্দ নিয়ে ওঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি সুখে-স্বচ্ছন্দে বহাল তবিয়তে আছি, একেবারে বাদর হয়ে যাইনি–এটা দেখলেই ওঁরা খুশী। ওঁরা মনে করেন, বাকিটা আপসে হয়ে যাবে। আমার ঠিক তার উল্টো। আমি পড়াশুনো খারাপ হতে চাই না। মণ্টেরী ইস্কুলে প্রকৃতপক্ষে সপ্তম শ্রেণীতেই আমার থেকে যাওয়ার কথা, কিন্তু ইহুদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমাকে নিয়ে নেওয়া হল। ইহুদী ইস্কুলে ভর্তি হওয়া যখন সমস্ত ইহুদী ছেলেমেয়েদের পক্ষে বাধ্যতামূলক হল, তখন খানিকটা অনুনয় বিনয় করার ফলে তবে হেডমাস্টার মশাই আমাকে আর লিসকে শর্তাধীনে ইস্কুলে নিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আমি তাঁর আশাভঙ্গ করতে চাই না। আমার দিদি মারগটও তার রিপোর্ট পেয়েছে; এবারও সে দারুণ ভালো করেছে। ইস্কুলে ‘সপ্রশংস গোছের কোনো ব্যবস্থা থাকলে সেটা পেয়েই সে ওপরে উঠতে পারত, ও যা মাথাওয়ালা মেয়ে! বাবা ইদানীং খুব বেশি সময় বাড়িতেই থাকেন, কেন না ব্যবসার ক্ষেত্রে বাবার কিছু করার নেই; নিজেকে ফালতু বলে ভাবতে নিশ্চয়ই খুব জঘন্য লাগে। ট্রাভিস নিয়ে নিয়েছেন মিস্টার কুপহুইস; কোলেন অ্যাণ্ড কোম্পানী চলে গিয়েছে মিস্টার ক্রালারের হাতে। কদিন আগে আমাদের ছোট্ট চত্বরটা হেঁটে পার হওয়ার সময় আমাদের গা-ঢাকা দিয়ে থাকার কথাটা বাবা পাড়লেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী এমন ঘটল যে হঠাৎ দুম করে এখনই একথা তিনি বলতে শুরু করলেন। বাবা বললেন, ‘দেখ আনা, তুই তো জানিস যে, আজ এক বছরেরও বেশি দিন ধরে অন্য লোকদের সমানে আমরা খাবারদাবার, জামাকাপড়, আসবাবপত্র যুগিয়ে আসছি। আমরা চাই না জার্মানরা আমাদের যথাসর্বস্ব কুজা করুক, তেমনি আমরা নিশ্চয়ই চাই না নিজেরা স্বয়ং ওদের কবলে গিয়ে পড়তে। কাজেই ওরা কবে আসবে, এসে তুলে নিয়ে যাবে তার অপেক্ষায় না থেকে আমরা বরং নিজেদের গরজেই গা-ঢাকা দেব।’

বাবা এমন গুরুতরভাবে কথাগুলো বললেন যে, আমার গলাতেও খুব ব্যগ্রতা ফুটে উঠল, ‘তাহলে, বাবা, এটা হবে কবে নাগাদ?’

‘ও নিয়ে তুই উতলা হোস নে, আমরা সময়মত সব ঠিক করে ফেলব। যতদিন পারিস, কচি বয়েস তোর, গায়ে ফু দিয়ে বেড়া।’ ব্যস, কথা শেষ। হায়, এই অলুক্ষণে কথাগুলো ফলতে যেন যুগ যুগ দেরি হয়!

তোমার আনা।

.

বুধবার, ৮ জুলাই, ১৯৪২

আদরের কিটি,

রবিবার থেকে আজ–এই কয়েকটা দিন মনে হল যেন কয়েকটা বছর। কত কিছু যে ঘটে গেছে এর মধ্যে। গোটা পৃথিবীটা যেন মাটিতে উল্টে পড়েছে। কিন্তু এখনও আমি প্রাণে বেঁচে রয়েছি, কিটি–বাবার মতে, সেটাই বড় কথা।

এখনও বেঁচে আছি ঠিকই, তবে জিজ্ঞেস করো না যেন কোথায় আর কিভাবে। তুমি মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝবে না, যতক্ষণ না রবিবার বিকেলে কী ঘটেছিল তোমাকে বলছি।

বেলা তখন তিনটে (হ্যারি সবে চলে গেছে, যাবার সময় বলেছে পরে আবার আসবে) সামনের দরজায় কে যেন বেল বাজাল। আমি তখন বারান্দায়, রোদুরে গা এলিয়ে দিয়ে একটা বই পড়ছি; ফলে, আমি শুনতে পাইনি। খানিকক্ষণ পরে মারগটকে দেখলাম, রান্নাঘরের দরজায়; তার চোখমুখ লাল। ফিসফিস করে বলল, ‘ঝটিকা-বাহিনী থেকে বাপির নামে শমন পাঠিয়েছে। মা-মণি সঙ্গে সঙ্গে মিস্টার ফান ডানের সঙ্গে-দেখা করতে চলে গেছেন।’ (ফান ডান হলেন ব্যবসাতে বাবার সহকর্মী এক বন্ধু)। শমন এসেছে শুনে তো আমার বুক হিম হয়ে গেল; শমন আসার যে কী মানে তা সকলেই জানে। বন্দীশিবির আর নির্জন কুঠুরির ছবিটা মনের মধ্যে ভেসে উঠল–বাপিকে কি আমরা নিশ্চিত মৃত্যুর হাতে ছেড়ে দেব? দুজনে তখন অপেক্ষা করছি; মারগট স্পষ্ট ভাষায় বলল, ‘বাবা অবশ্যই যাবেন না। আমরা কাল আমাদের গোপন ডেরায় চলে যাব কিনা, মা-মণি গেছেন সেই নিয়ে ফান ডানের সঙ্গে আলোচনা করতে। ফান ডান পরিবারও আমাদের সঙ্গে যাবে। সুতরাং সর্বসাকুল্যে আমরা হব সাতজন। তারপর চুপ। দুজনের কেউই কিছু বলছি না, আমাদের মাথায় তখন বাপির সম্বন্ধে চিন্তা। বাপি গেছেন ঝুড়সে ইভালিডেতে কয়েকজন বুড়োবুড়িকে দেখতে, এদিকে, কী ঘটছে তার বিন্দুবিসর্গ তিনি জানেন না। একে গরম, তার ওপর কী-হয়। কী-হয় ভাব নিয়ে আমরা মা-মণির ফিরে আসার অপেক্ষায়; সব মিলিয়ে আমরা বেজায় সন্ত্রস্ত হয়ে রয়েছি, আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই।

হঠাৎ দরজায় আবার বেল বাজল। আমি বললাম, ‘হ্যারি এসেছে।‘ মারগট আমাকে টেনে ধরল, ‘দরজা খুলিস নে।‘ কিন্তু তার দরকার ছিল না, কেননা ঠিক সেই সময় নিচের তলায় আমরা মা-মণি আর মিস্টার ফান ডানের গলা পেলাম, ওরা হ্যারির সঙ্গে কথা বলছিলেন। তারপর ওঁরা ভেতরে এসে বাইরের দরজাটা এঁটে দিলেন। এরপর যখনই বেল বাজার শব্দ হয় আমরা নিঃশব্দে গুড়ি মেরে নিচে গিয়ে দেখে আসি বাপি এলেন কিনা, আর কেউ এলে দরজা খুলি না।

মারগটকে আর আমাকে ঘর থেকে বার করে দেওয়া হল। ফান ডান, মা-মণির সঙ্গে একা কথা বলতে চান। আমাদের শোবার ঘরে আমরা যখন একা হলাম, মারগট আমাকে বলল শমনটা বাপির নামে নয়, আসলে তার নামে। শুনে আমি আরও ঘাবড়ে গিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলাম। মারগটের বয়েস ষোল; ওরা কি সত্যি ঐ বয়সের মেয়েদের একা তুলে নিয়ে যাবে? তবু ভালো যে, মারগট কিছুতেই যাবে না, সে কথা মা-মণি নিজেই বলেছেন, বাপি যখন আমাদের লুকিয়ে থাকার ব্যাপারে বলছিলেন, তখন সেটাই ছিল তারও মনোগত অভিপ্রায়।

অজ্ঞাতবাসে যাওয়া কোথায় যাব আমরা, শহরে না গ্রামে, বড় বাড়িতে না কুঁড়েঘরে, কবে কখন কিভাবে কোথায়…?

এমন সব প্রশ্ন যা মুখ ফুটে কাউকে জিগ্যেস করা যাবে না, আবার মন থেকে যে ঝেড়ে ফেলে দেব তাও সম্ভব নয়। আমি আর মারগট একটা স্কুলব্যাগে আমাদের সবচেয়ে জরুরি। জিনিসগুলো পুরে ফেলতে শুরু করে দিলাম। প্রথমেই যেটা পুরে ফেললাম সেটা হল এই ডায়রিটা, তারপর চুল কোঁকড়া করার জিনিসপত্র, রুমাল, ইস্কুলের বই, একটা চিরুনি, পুরনো চিঠিচাপাটি; যাচ্ছি অজ্ঞাতবাসে এই ভেবে আমি ব্যাগে ভরেছি যতসব উদভুট্টে জিনিস। কিন্তু তাতে আমার কোনো খেদ নেই আমার কাছে পোশাক-আশাকের চেয়েও ঢের বেশি অর্থবহ হল স্মৃতি।

শেষ পর্যন্ত বাপি এসে গেলেন বেলা পাঁচটায়। সন্ধ্যে নাগাদ আসতে পারেন কিনা জানতে চেয়ে মিস্টার কুপহুইসকে আমরা ফোন করলাম। ফান ডান বেরিয়ে গিয়ে মিপুকে ডেকে আনলেন। ১৯৩৩ থেকে বাপির সঙ্গে মিপের ব্যবসার সম্পর্ক এবং সেই থেকে তাঁরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু; মিপের সদ্য সদ্য বিয়ে-করা স্বামী হেংকও তাই। মিপ এসে তার ব্যাগে কিছু জুতো, কামাকাপড়, কোট, আণ্ডারওয়্যার আর মোজা নিয়ে চলে গেলেন। বলে গেলেন সন্ধ্যেবেলায় আবার আসবেন। তারপর বাড়ি জুড়ে বিরাজ করতে লাগল নৈঃশব্দ্য; আমাদের কারো খাওয়ার কোনো স্পৃহা নেই; তখনও বেশ গুমসানো গরম ভাব এবং সব কিছুই যেন। কেমন-কেমন। আমাদের ওপরের বড় ঘরটা মিস্টার গুডস্মিট বলে একজনকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। স্ত্রীর সঙ্গে ওঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, ভদ্রলোকের বয়স ত্রিশের কোঠায়। এদিন সন্ধ্যেবেলায় হবি তো হ, ওঁর আবার করবার কিছু ছিল না; রাত প্রায় দশটা অব্দি উনি নেই আঁকড়া হয়ে লেগে রইলেন; ওঁকে ভাগাতে গিয়ে একটু অভদ্র হতেই হল। এগারোটায় এলেন। মিআর হেংক ফান সানৃটেন। জুতো, মোজা, বই, অন্তর্বাস আরও একবার মিপের ব্যাগ আর হেংককের লম্বা পকেটের মধ্যে গা-ঢাকা দিল এবং সাড়ে এগারোটা নাগাদ তারা নিজেরাও চোখের আড়াল হলেন। ক্লান্তিতে আমার শরীর ভেঙে পড়ছিল; নিজের বিছানায় এই আমার শেষ রাত জেনেও আমি তৎক্ষণাৎ ঘুমিয়ে পড়লাম; পরদিন সকাল সাড়ে পাঁচটায় আমাকে ডেকে দেবার আগে পর্যন্ত আমি একেবারে ন্যাতা হয়ে ঘুমিয়েছি।

দিনটা ভাগ্যিস রবিবারের মতো অত গরম ছিল না; সারাদিন সমানে টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়ল। আমরা এমনভাবে একগাদা জামাকাপড় গায়ে চড়িয়ে নিলাম যেন কুমেরুতে যাচ্ছি। এর একটাই কারণ ছিল–সঙ্গে যথাসম্ভব জামাকাপড় নেওয়া। সুটকেশ ভর্তি জামাকাপড় নিয়ে বাইরে বেরুনোর কথা আমাদের অবস্থায় কোনো ইহুদী স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। আমি পরে নিয়েছি দুটো ভেস্ট, তিনজোড়া প্যান্ট, একটা ড্রেস স্যুট, তার ওপর একটা স্কার্ট, জ্যাকেট, সুতীর কোট, দুই জোড়া মোজা, লেস লাগানো জুতো। পশমের টুপি, স্কার্ফ এবং আরও কিছু কিছু; বাড়ি থেকে বেরোবার আগে আমার প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল, কিন্তু তা। নিয়ে কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করেনি।

মারগট তার ইস্কুলের ব্যাগে পড়ার বই ভর্তি করে তার সাইকেলটা আনিয়ে নিয়ে মিপের পিছু পিছু উধাও হয়ে গেল এমন কোথাও যা আমার কাছে অজানা। তখনও আমি জানতাম না আমাদের আত্মগোপনের আস্তানাটা কোথায়। সাড়ে সাতটার সময় দরজা টেনে দিয়ে আমরা বাইরে এসে দাঁড়ালাম। আমার মিনিবেড়াল মুরটিয়ে ছিল একমাত্র প্রাণী যার কাছ থেকে আমি বিদায় নিলাম। প্রতিবেশীদের কাছে সে ভালোভাবেই থাকবে। এসব কথা মিস্টার গুডস্মিটের নামে একটা চিঠিতে লেখা হল।

বেড়ালের জন্যে রান্নাঘরে থাকল এক পাউণ্ড মাংস, প্রাতরাশের জিনিসপত্র টেবিলের ওপর ছড়ানো, বিছানাগুলো টান দিয়ে তোলা দেখে মনে হবে আমরা যেন হুটপাট করে চলে গিয়েছি। লোকের কী ধারণা হবে, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা ছিল না; আমরা শুধু চেয়েছিলাম সরে পড়তে কোনরকমে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদে পৌঁছুতে; ব্যস, শুধু এইটুকু। এর পরের কথা কালকে।

তোমার আনা।

.

বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ১৯৪২

আদরের কিটি,

এইভাবে অবিরল বর্ষণের মধ্যে বাবা মা আর আমি হেঁটে চললাম; আমাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে স্কুলব্যাগ আর বাজারের থলি, তার মধ্যে ঠেসে-ফুসে ভর্তি করা রাজ্যের জিনিস।

যেসব লোক কাজে যাচ্ছিল, তারা সহানুভূতির চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল। তাদের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে, তাদের গাড়িতে তারা আমাদের নিয়ে যেতে পারছে না বলে তারা বেশ দুঃখিত; ক্যাটকেটে হলদে তারাই এর জন্যে দায়ী।

যখন আমরা বড় বড় রাস্তায় এসে পড়লাম, কেবল তখনই মা-মণি আর বাপি একটু একটু করে গোটা ব্যাপারটা আমার কাছে ভাঙলেন। বেশ কয়েক মাস ধরে আমাদের মালপত্র এবং নিত্যব্যবহার্য যাবতীয় জিনিস যথাসম্ভব সরিয়ে ফেলা হয়েছে; অজ্ঞাতবাসের সব ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করে নিজে থেকে আমাদের চলে যাওয়ার কথা ছিল জুলাই ১৬ তারিখে। হঠাৎ শমন আসায় দশদিন আগেই আমাদের চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে; ফলে যেখানে যাচ্ছি। সেখানে তেমন পরিপাটি ব্যবস্থা করা যায়নি, কিন্তু তারই মধ্যে যতটা সম্ভব মানিয়ে গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে, যে বাড়িতে বাবার অফিস, সেখানেই আমাদের গোপন ডেরা। বাইরের লোকের পক্ষে বোঝা শক্ত হবে; যাই হোক, পরে আমি সেটা বুঝিয়ে বলব। বাপির যে কারবার তাতে কর্মচারী খুব বেশি ছিল না। মিস্টার ক্রালার, কুপহুইস, মিস্ আর তেইশ বছর বয়সের টাইপিস্ট এলি ফসেন–শুধু এরাই আমাদের আসবার কথা জানতেন। এলির বাবা মিষ্টান পসেন আর দুটি ছোকরা কাজ করত মালগুদামে তাদের সেকথা জানানো হয়নি।

বাড়িটার চেহারা কি রকম বলছি–একতলায় একটা খুব বড় গুদামঘর, সেখানে মালপত্র রাখা হয়। বাড়ির সদরদরজাটা গুদামঘরের দরজার ঠিক পাশেই, এবং সদরদরজার প্রবেশপথে আরও একটি দরজা–সেখান থেকে উঠে গেছে সিঁড়ি (ক)। সিঁড়ির মাথায় ঘষা কাচ লাগানো আরেকটি দরজা, তাতে কালো কালিতে আড়াআড়ি ভাবে লেখা ‘অফিসঘর’। সেটাই হল সদরদপ্তর, খুব বড়, খুব খোলামেলা এবং খুব গমগমে। এলি, মি আর মিস্টার কুপহুইস দিনমানে সেখানে কাজ করেন। একটা ছোট এঁদো ঘরে সিন্দুক, গা-আলমারি, একটা বড় কাবার্ড; সেই ঘর পেরিয়ে ছোট অন্ধকারমত আরেকটি অফিসঘর। আগে এখানে বসতেন মিস্টার ক্রালার আর মিস্টার ফান ডান–এখন মিস্টার ক্রালার বসেন একা। দালানটা দিয়ে সোজা মিস্টার ক্রালারের অফিসঘরে যাওয়া যায়; কিন্তু একমাত্র যে কাঁচের দরজাটা দিয়ে যেতে হয়, সেটা বাইরে থেকে সহজে খোলা যায় না–খুলতে হয় ভেতর থেকে।

ক্রালারের অফিস থেকে কয়লাগাদার পাশ দিয়ে একটা লম্বা দালানপথ চলে গেছে; তার শেষে চার ধাপ উঠলে গোটা বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে জমকালো ঘর ও দপ্তরের খাসকামরা। গাঢ় রঙের ভবিযুক্ত আসবাব, লিনোলিয়াম আর কার্পেট বিছানো মেঝে, রেডিও, ঝকঝকে বাতি। সবই প্রথম শ্রেণীর। এর ঠিক গায়েই বেশ বড়সড় একটা রান্নাঘর, তাতে পানির কল আর গ্যাসের চুলা, পাশেই বাথরুম। এই নিয়ে হল দোতলা। নিচেকার দালানপথ থেকে একটা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলে ওপরতলা (খ)। ওপরে উঠে গেলে একটা ছোট যাতায়াতের পথ। তার দুদিকে দুটো দরজা। বাদিকের দরজা দিয়ে বাড়ির সামনের অংশে। মালগুদামে যাওয়া যায়, অন্যটা দিয়ে যাওয়া যায় চিলেকোঠায়। ওলন্দাজদের সিঁড়িগুলো হয়। বেজায় খাড়া–তারই একটা দিয়ে নেমে গিয়ে নিচের দরজা খুললেই রাস্তা (গ)।

ডানহাতি দরজাটা দিয়ে আমাদের ‘গুপ্ত মহল’টাতে যেতে হয়। বাইরে থেকে দেখে কেউ ভাবতেই পারবে না যে সাদামাটা ছাই-রঙা দরজাটার ঠিক আড়ালেই এতগুলো ঘর রয়েছে। দরজার সামনে একটা পৈঠে, সেটা পেরোলেই অন্দরমহল।

প্রবেশপথের ঠিক সামনা-সামনি একটা খাড়া সিঁড়ি (ঘ)। বাঁদিকের ছোট গলিটা দিয়ে এগোলে একটা ঘর, সেটা হল ফ্রাঙ্ক-পরিবারের শোয়া-বসার ঘর। তার গায়েই তুলনায় একটা ছোট ঘর–সেটা হল পরিবারের দুই তরুণীর পড়ার আর শোয়ার ঘর। ডানদিকের জানলাহীন ছোট ঘরটাতে এক পাশে বেসিন লাগানো পানির কল আর অন্য পাশে পায়খানার খোপ। অন্য দরজা দিয়ে গেলে মারগট আর আমার ঘর। এর পরের সিঁড়িটা দিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলে তোমার তাক লেগে যাবে। ক্যানেলের পাশে এরকম একটা সেকেলে বাড়িতে আলোয় ঝলমল কী প্রকাণ্ড ঘর। ঘরটার একপাশে একটা গ্যাসের চুলো আর একটা হাত ধোয়ার জায়গা (আগে এটা ল্যাবোরেটারি হিসেবে ব্যবহার হত কিনা)। এখন এটা ফান ডান দম্পতির রান্নাঘর; তাছাড়া সাধারণভাবে সকলেরই বসার ঘর, খাওয়ার ঘর এবং বাসন মাজার জায়গা। একটা ছোট এইটুকু দালানঘর হবে পিটার ফান ডানের বাসস্থান। আর নিচের তলার ল্যাণ্ডিংটার মতই রয়েছে বিরাট একটা চিলেকোঠা। এখন তাহলে গোটা ব্যাপারটা বুঝলে। আমাদের ভারি সুন্দর গোটা ‘গুপ্ত মহল’টার সঙ্গে তোমাকে আমি পরিচয় করিয়ে দিয়েছি।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ১০ জুলাই, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আমাদের বাসস্থানের প্যাচানো লম্বা ফিরিস্তি পড়ে তুমি নিশ্চয় ত্যক্ত-বিরক্ত। কিন্তু তবু আমি মনে করি যে, আমরা কোথায় এসে ঠেকেছি সেটা তোমার জানা উচিত।

হ্যাঁ, যা বলছিলাম–দেখছ তো, এখনও আমার কথা শেষ হয়নি–প্রিনসেনগ্রাখটে যখন। আমরা এসে পৌঁছুলাম, মি তাড়াতাড়ি আমাদের ওপরতলায় নিয়ে গিয়ে ‘গুপ্ত মহলে’ তুললেন। মি দরজা বন্ধ করে দিতেই আমরা একা হয়ে গেলাম।

মারগট সাইকেল চালিয়ে ঢের তাড়াতাড়ি এসে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। আমাদের বসবার আর অন্যান্য সমস্ত ঘরই ছিল অকথ্য ভাবে রাবিশে ভর্তি। আগের মাসগুলোতে অফিসে যত কার্ডবোর্ডের বাক্স এসেছে, সবই হয় মেঝেতে, নয় বিছানার ওপর স্তুপাকার হয়ে আছে।

ছোট ঘরটার মট্‌কা অব্দি বিছানার চাদরে কাপড় ঠাসা। আমরা দেখলাম, সে রাত্রে ভদ্রগোছের বিছানায় যদি শুতে হয় তাহলে তক্ষুনি সব সাফসুফ করা দরকার। আমরা সে কাজ শুরু করে দিলাম। মা আর মারগটের কিছু করবার অবস্থা ছিল না; ওরা এত ক্লান্ত যে বিছানায় নেতিয়ে পড়েছিল, মন খারাপ হওয়া ছাড়াও আরও অনেক কিছু ছিল। পরিবারের দুই-‘ধাঙড়’–আমি আর বাপি–আমরা তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করে দিতে চাইলাম।

দম ফুরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত সারাদিন ধরে আমরা বাক্স থেকে জিনিস বের করলাম, তাকগুলোতে ভরলাম, হাতুড়ি ঠুকলাম আর গোছগাছ করলাম। তারপর সে রাতে পরিষ্কার বিছানার ওপর লম্বা হলাম।

সারাটা দিন আমরা দাঁতে কুটো কাটিনি, কিন্তু তাতে কিছু আসে যায়নি। মা আর মারগট এমন নেতিয়ে পড়েছিল যে তাদের খাওয়ার মতো মনমেজাজই ছিল না। অন্যদিকে বাবা আর আমি খাওয়ার কোনো ফুরসতই পাইনি।

মঙ্গলবার সকালে আমরা তার আগের দিনের কাজের জের টানতে লাগলাম। এলি আর মি আমাদের হয়ে রেশন তুলে এনে দিলেন। বাবা মন দিলেন বাইরে আলো না যাওয়ার ব্যবস্থাটাকে আরও পাকাঁপোক্ত করতে। আমরা রান্নাঘরের মেঝে থেকে ঘষে ঘষে ময়লা তুললাম। সেদিনও সারাদিন ধরে আমাদের এইসব চলল। আমার জীবনে এত বড় একটা ওলট-পালট হয়ে গেল, বুধবারের আগে তা নিয়ে ভাববার কোনো সময়ই পাইনি।

এখানে আসবার পর সেই প্রথম আমি জো পেলাম তোমাকে সব কিছু জানাবার আর সেই সঙ্গে এই বিষয়ে নিজেও ঠিকঠাক বোঝবার যে, আমার জীবনযাত্রায় আদতে কী ঘটে গেছে এবং এরপরেও কী ঘটতে যাচ্ছে।

তোমার আনা

.

শনিবার, ১১ জুলাই ১৯৪২

আদরের কিটি,

প্রত্যেক পনেরো মিনিট অন্তর সময় জানান দেয় যে ভেস্টারটোরেন ঘড়ি, তার আওয়াজে বাবা, মা আর মারগট–এরা কেউই এখনও ঠিক ধাতস্থ হতে পারেনি আমি পেরেছি। গোড়া থেকেই আওয়াজটা আমার মনে ধরেছে, বিশেষ করে রাতের বেলায় তাকে একজন বিশ্বস্ত বন্ধু বলে মনে হয়। অদৃশ্য হয়ে যেতে কেমন লাগে সেটা জানতে তুমি বোধহয় উৎসুক হবে; দেখ, আমি শুধু এইটুকুই বলতে পারি যে আমি নিজেই এখনও তা জানি না। আমার মনে হয় না, এ বাড়িতে আমি কখনও সত্যিকার স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব; তার মানে এ নয় যে, এখনে থাকাটা আমি ঘোরতরভাবে অপছন্দ করছি; এটা অনেকটা যেন ছুটির সময় খুব বেখাপ্পা একটা বোর্ডিং হাউসে এসে উঠেছি। একেবারেই পাগলামি, কিন্তু তবু আমার তাই মনে হয়। এই ‘গুপ্ত মহল’টা লুকিয়ে থাকার পক্ষে আদর্শ জায়গা। যদিও এটা একটেরে এবং স্যাতসেতে, তবু এমন আরামদায়ক লুকোবার জায়গা শুধু আমস্টার্ডামে কেন, গোটা হল্যাণ্ড টুড়েও তুমি আর কোথাও খুঁজে পাবে না।

দেয়ালে কিছু না থাকায় আমাদের ছোট ঘরটা গোড়ায় গোড়ায় বেজায় ন্যাড়া লাগত; কিন্তু বাবা যেহেতু আগে থেকে আমার জমানো ফিল্মস্টারদের ছবি আর পিচ্চার পোস্টকার্ডগুলো এনে রেখেছিলেন, তার ফলে আঠার শিশি আর বুরুশের সাহায্যে দেয়ালগুলোকে আমি দিয়েছি অতিকায় ছবির আকার। তাতে ঘরটার মুখে এখন একটু হাসি ফুটেছে। ফান ডানেরা এসে গেলে চিলেকোঠার ঘর থেকে আমরা কিছু কাঠ পাব, তাই দিয়ে দেয়ালে কয়েকটা ছোট ছোট তাক এবং আরও এটা-ওটা বানিয়ে নেব। তাহলেই ঘরটাতে আরেকটু প্রাণ আসবে।

মারগট আর মা-মণি এখন আগের চেয়ে একটু ভালো। সুস্থ বোধ করে মা-মণি কাল প্রথম চুলোতে কিছুটা সুপ চড়িয়েছিলেন, কিন্তু নিচের তলায় কথা বলতে বলতে সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে, মটরশুঁটির দানাগুলো পুড়ে গিয়ে এমনভাবে তলায় ধরে যায় যে, হাজার চেষ্টা করেও প্যান থেকে তা আর ছাড়ানো যায়নি। মিস্টার কুহুইস আমার জন্যে একটা বই এনেছিলেন–ছোটদের বার্ষিকী। আমরা চারজন কাল সন্ধ্যেবেলায় অফিসের খাসকামরায় চলে গিয়ে রেডিও খুলেছিলাম। পাছে কারো কানে যায়, এই জন্যে আমি এত প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম যে, বাপিকে আমি ধরে টানাটানি করতে লাগলাম আমার সঙ্গে ওপরে যাওয়ার জন্যে। আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে মা-মণিও চলে এলেন। পাড়া পড়শিরা পাছে আমাদের আওয়াজ পায় এবং কিছু একটা চলছে এটা চোখে পড়ে, সেইজন্যে অন্যান্য দিক থেকেও আমরা রীতিমত ঘাবড়ে রয়েছি। এখানে প্রথমদিন পা দিয়েই আমরা পর্দার ব্যবস্থা করেছি। প্রকৃতপক্ষে ওগুলোকে ঠিক পর্দা বলা যায় না–আকারে, প্রকারে আর কারুকার্যে পৃথক শুধু কয়েকটা পাতলা, ঢিলে কাপড়ের ফালি–যা আমি আর বাপি নেহাত আনাড়ি হাতে সেলাই করে জোড়াতালি দিয়েছিলাম। এই বিচিত্র কাপড়গুলো ড্রইংপিন দিয়ে আমরা গেঁথে দিয়েছিলাম, যাতে আমরা এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া অব্দি টিক থাকে।

আমাদের ডানদিকে বড় বড় সওদাগরী অফিস আর বাদিকে আসবাবপত্র তৈরির একটা কারখানা, দিনান্তে কাজের পর কেউ আর সেখানে থাকে না; কিন্তু তাহলেও দেয়াল ফুড়ে আওয়াজ যেতে পারে। মারগটের বেজায় ঠাণ্ডা লেগেছে; তাকে বলেছি রাতের বেলায় যেন সে না কাশে। তাকে গুচ্ছের কোডিন গেলানো হয়েছে। আমি মঙ্গলবারের জন্যে অপেক্ষা করে রয়েছি, ঐদিন ফান ড্রানেরা এসে যাবে; তখন অনেক বেশি মজা হবে, এতটা চুপচাপ ভাব আর থাকবে না। সন্ধ্যেবেলায় আর রাতে আমার যে এত গা ছমছম করে, সেটা এই নিঃশব্দতারই জন্যে। আমি মনপ্রাণে চাই যে, আমাদের ত্রাণকর্তাদের কেউ না কেউ রাত্তিরে এসে এখানে ঘুমাক।

কখনও আর ঘরের বাইরে যেতে পারব না, এটা যে কী পীড়াদায়ক, তা আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না–সেইসঙ্গে আমার বড় ভয়, আমরা যখন ধরা পড়ে যাব–তখন আমাদের গুলি করে মারা হবে। দিনের বেলায় আমাদের কথা বলতে হয় ফিস ফিস করে আর পা টিপে টিপে চলতে হয় না হলে মালগুদামের লোকগুলো টের পেয়ে যাবে।

চলি। কেউ আমাকে ডাকছে।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ১৯৪২

আদরের কিটি,

পুরো এক মাস আমি তোমাকে ছেড়ে থেকেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, খবর এখানে এত কম যে, প্রত্যেকদিন লেখবার মত মজাদার কিছু আমি খুঁজে পাই না। ফান ডানেরা এসে গেলেন। ১৩ই জুলাই। আমরা জানতাম ওঁরা আসছেন চোদ্দ তারিখে। কিন্তু জুলাইয়ের তেরো থেকে যোল তারিখ পর্যন্ত জার্মানরা একধার থেকে শমন জারি করতে থাকায় লোকে দিন দিন বিচলিত হয়ে উঠতে থাকে। তারা তাই দেখল, যদি বাঁচতে হয় তাহলে একদিন দেরি করে ফাঁদে পড়ার চেয়ে একদিন আগেই ব্যবস্থা করা ভাল। সকাল সাড়ে নটায় (যখন আমরা বসে প্রাতরাশ সারছি) পেটার এসে হাজির। পেটার হল ফান ডানদের ছেলে, তার ষোলো এখনও পূর্ণ হয়নি-নরম প্রকৃতির, লাজুক, খাটো ধরনের ছেলে; ওর সান্নিধ্য থেকে খুব বেশি কিছু পাওয়া যাবে না। পেটারের সঙ্গে এল তার বেড়াল (মুশচি)। মিস্টার আর মিসেস ফান ডান এলেন তার আধঘণ্টা পরে; মিসেস ফান ডানের টুপির বাক্সে একটা বড় পট দেখে। আমাদের খুব মজা লাগল। উনি সবাইকে শুনিয়ে বললেন, সঙ্গে আমার পট না থাকলে কোথাও গিয়ে আমি স্বাচ্ছন্দ্য পাই না। সুতরাং সবার আগে ওটা তিনি স্থায়ীভাবে তার ডিভানের নিচে রাখলেন। মিস্টার ফান ডান অবশ্য তার নিজেরটা সঙ্গে করে আনেননি, তবে বগলদাবা করে এনেছেন একটা ভাঁজ-করা চায়ের টেবিল।

ওঁরা আসার পর থেকে আমরা সবাই একত্রে আরাম করে বসে খাওয়াদাওয়া করছি; তিনদিন কেটে যেতে মনে হল আমরা সবাই যেন একটা বড় পরিবারভুক্ত লোক। বাইরের লোকালয়ে ফান ডানেরা যে অতিরিক্ত সপ্তাহটা কাটিয়ে এসেছেন, সে সম্পর্কে ফান ডানেরা স্বভাবতই বিস্তর বলতে পারেন। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে আমাদের খুব কৌতূহল হচ্ছিল আমাদের বাড়িটা আর মিস্টার গুডস্মিট সম্পর্কে জানতে।

মিস্টার ফান ডান আমাদের বললেন–

‘সোমবার সকাল নয়টার সময় মিস্টার গুডস্মিট ফোন করে জানতে চাইলেন আমি একবার আসতে পারি কিনা। আমি তক্ষুনি চলে গেলাম। গিয়ে দেখি গ–বেজায় বিচলিত। ফ্রাংরা একটা চিঠি লিখে রেখে গেছেন, উনি আমাকে সেটা পড়তে দিলেন এবং চিঠিতে যা বলা হয়েছে সেইমত বেড়ালটাকে তিনি আশপাশের বাড়িতে নিয়ে যেতে চান বললেন। তাতে আমি খুশীই হলাম। মিস্টার গ–ভয় পাচ্ছিলেন বাড়িতে তল্লাসি হবে। সেইজন্যে আমরা সমস্ত ঘর তন্ন তন্ন করে দেখলাম; খানিকটা গোছগাছ করে প্রাতরাশের জিনিসগুলো সরিয়ে ফেললাম। হঠাৎ আমার চোখে পড়ল মিসেস ফ্রাংকের টেবিলে একটা রাইটিং-প্যাড তার ওপর মাসট্রিটের একটা ঠিকানা লেখা। আমি অবশ্য জানতাম যে, ইচ্ছে করেই এসব করা হয়েছে; তবু আমি খুব অবাক হওয়ার এবং, ইস, একটা কাঁচা কাজ করে ফেলেছে, এই রকমের ভাব দেখিয়ে গ–কে বললাম হতচ্ছাড়া চিরকুটটা অবিলম্বে ছিঁড়ে ফেলতে।

‘আমি এতক্ষণ এমন একটা ভাব করছিলাম যেন তোমাদের উধাও হওয়ার ব্যাপারটার বিন্দুবিসর্গ আমি জানি না। কিন্তু চিরকুটটা দেখতে পেয়ে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। আমি বললাম, মিস্টার গুডস্মিট, ঠিকানাটার উদ্দিষ্ট পুরুষটি যে কে সেটা এতক্ষণে আমার খেয়াল হচ্ছে। হু এইবার মনে পড়েছে, ইনি একজন উচ্চপদস্থ অফিসার; মাসছয়েক আগে অফিসে এসেছিলেন, দেখে মনে হয়েছিল, মিস্টার ফ্রাংকের সঙ্গে তাঁর বেশ দহরম মহরম। তেমন দরকার পড়লে মিস্টার ফ্রাংককে উনি সাহায্য করবেন বলেছিলেন। ভদ্রলোকের কর্মস্থল ছিল মাসট্রিশটু। আমার মনে হয় দ্রলোক তাঁর কথা রেখেছেন; তিনি কোনো না কোনো ভাবে ওঁদের গোড়ায় বেলজিয়ামে এবং তারপর সেখান থেকে সুইটজারল্যাণ্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বন্ধুরা কেউ খোঁজ করলে এই খবরটা আমি তাদের দেব। অবশ্য কারো কাছে মাসট্রিশটের নাম যেন করবেন না।

কথাগুলো বলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে এলাম। ইতিমধ্যে তোমাদের অধিকাংশ বন্ধুই জেনে গেছে, কেননা আলাদা আলাদাভাবে অনেকেই বেশ কয়েকবার খোদ আমাকেই সে কথা বলেছে। এ গল্পটা শুনে আমরা দারুণ মজা পেয়েছিলাম এবং এরপর মিস্টার ফান ডান যখন আমাদের আরও সবিস্তারে সব বললেন, মানুষ কিভাবে কল্পনার লাগাম ছেড়ে দেয় সেটা দেখে তখন আরও বেশি হেসেছিলাম। একটি পরিবার নাকি দেখেছে খুব ভোরবেলায় আমরা দুটিতে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি; আবার এক ভদ্রমহিলা নাকি একেবারে নিশ্চিতভাবে জেনেছেন যে, মাঝরাত্তিরে একটা মিলিটারি গাড়ি এসে আমাদের ডেকে নিয়ে গেছে।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ১৯৪২

আদরের কিটি,

এ আমাদের লুকোবার জায়গায় প্রবেশপথটি এবার যথাযথভাবে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। মিস্টার ক্রালার মনে করছিলেন আমাদের দরজার সামনে একটা কাবার্ড রেখে দিলে ভালো হয় (কেননা লুকোনো সাইকেলের খোঁজে বিস্তর বাড়িতে খানাতল্লাসি হচ্ছে), তবে কাবার্ডটা হবে অস্থাবর–যাতে দরজার মতো খোলা যায়।

গোটা জিনিসটা করলেন মিস্টার ফোসেন। আমরা তাঁকে আগেই সব খুলে বলেছি; কিন্তু তিনি কী করবেন, তার হাত-পা বাঁধা। নিচের তলায় যেতে চাইলে প্রথমে আমাদের হাঁটু মুড়ে নিচু হতে হবে, তারপর ঝাঁপ দিতে হবে, কেননা ধাপগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। গোড়ার তিনদিন আমাদের কপালে ঢিবি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হল, কারণ নিচু দরজায় সবাইকেই ঠোক্কর খেতে হয়েছিল। এখন আমরা একটা কাপড়ে, পশম জড়িয়ে ওপরের ঝনকাঠে এঁটে দিয়েছি। দেখা যাক ওতে কোনো উপকার হয় কিনা!

এখন আমি খুব বেশি গা ঘামাচ্ছি না; সেপ্টেম্বর অবধি নিজেকে ছুটি দিয়ে রেখেছি। এরপর বাবা আমাকে পড়ালেখা করাবেন। ইস্, এরই মধ্যে এত কিছু ভুলেছি যে বলার নয়। আমাদের এখানকার জীবন বলতে সেই থোড়বড়িখাড়া আর খাড়াবড়িথোড়। মিস্টার ফান ডান আর আমি যেভাবেই হোক সচরাচর পরস্পরকে নস্যাৎ করি। মারগটের বেলায় তা হয় না, ওকে উনি বিলক্ষণ ভালবাসেন। মা-মণি থেকে থেকে আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করেন যেন আমি কচি খুকী–এটা আমার অসহ্য লাগে। না হলে, অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। পেটারকে এখনও আমার আদৌ ভালো লাগে না, ছেলেটা কী যে বিরক্তিকর কী বলব। অর্ধেক সময় বিছানায় পিপুফিশু হয়ে কাটায়, খানিকটা কাঠের কাজ করে, এবং তারপরই। ফিরে গিয়ে আরেক দফা ঘোত ঘোত করে ঘুমোয়। একেবারে গাড়োল।

আবহাওয়াটা এখন ভারি সুন্দর। সবকিছু সত্ত্বেও আমরা যতটা পারি উপভোগ করার চেষ্টা করি; চিলেকোঠায় চলে গিয়ে ক্যাম্প-খাটে লম্বা হই–খোলা জানলা দিয়ে ভেতরে এসে ঝলমল করে রোদ্দুর।

তোমার আনা

০২. মিস্টার আর মিসেস ফান ডান

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

মিস্টার আর মিসেস ফান ডানের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়ে গেল। এই জিনিস বাপের জন্মে আমি কখনও দেখিনি। মা-মণি আর বাপি তো এভাবে চেঁচিয়ে পরস্পরকে মুখনাড়া দেওয়ার কথা কল্পনাই করতে পারবেন না। কারণটা ছিল এত তুচ্ছ যে, মোটা ব্যাপারটাই হয়ে দাঁড়াল শুধু কথার ফুলঝুরি। অবশ্য এও ঠিক, যার যেমন অভিরুচি।

পেটারকে যে ঘুর ঘুর করে বেড়াতে হয়, এটা স্বভাবতই তার ভালো লাগার কথা নয়। ও এমন ভয়ঙ্কর রকমের ছিচকাঁদুনে আর আসে যে, কেউ তাকে গুরুত্ব দেয় না। কালকেও দেখি ওর জিভ লাল হওয়ার বদলে নীল হয়ে রয়েছে–ভয়ে ওর মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। এই অসাধারণ প্রকৃতিক ঘটনাটি হুট করে দেখা দিয়ে হুট করে উবে গিয়েছিল। আজ ও গলায় স্কার্ফ জড়িয়ে ঘুরছে, ওর ঘাড়ে নাকি ফিক-ব্যথা; এর ওপর কর্তাবাবা’রও নাকি কোমরে বাতের ব্যথা। তাছাড়া হৃৎপিণ্ড মূত্রাশয় এবং ফুসফুস–এসবের আশপাশেও ওর যখন-তখন ব্যথা হয়। ও হচ্ছে সত্যিকার রোগাতঙ্ক ব্যাধিগ্রস্ত (এইসব লোকদেরই তো হাইপোকনড্রিয়াক বলে, তাই না?)। মার সঙ্গে মিসেস ফান ডানের পুরোটাই যে একটা মধুর সম্পর্ক তা নয়; তিক্ততার কারণ আছে।

একটা ছোট দৃষ্টান্ত দিই, সকলের জন্যে কাপড়ের যে আলমারি–সেখান থেকে মিসেস ফান ডান তিনটি চাদরের সব কয়টিই হস্তগত করেছেন। উনি এটা ধরেই নিয়েছেন যে মা মণির চাদরে আমাদের সবারই কাজ চলে যাবে। ওর পিত্তি জ্বলে যাবে যখন উনি দেখবেন মা-মণি ওঁরই মহৎ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছেন।

সেই সঙ্গে, ওঁর গা জ্বলে যায় যখন উনি দেখেন, আমাদের থালাবাসনের বদলে ওঁর জিনিসে খাবার দেওয়া হচ্ছে। উনি সবসময় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন আমাদের প্লেটগুলো আমরা কোথায় রাখি। ওঁর যা ধারণা তার চেয়ে কাছে, চিলেকোঠার একগাদা হাবিজাবি জিনিসের পেছনে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্সে। আমরা যতদিন এখানে আছি, ততদিন আমাদের প্লেটগুলোর নাগাল পাওয়া যাবে না, সেটা একপক্ষে ভালোই। আমি সব সময় অপয়া; মিসেস ফান ডানের একটা সুপ-প্লেট কাল আমার হাত থেকে পড়ে চুরমার। হয়ে গেছে। উনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলেছিলেন, ‘তোমার কি একটি বারের জন্যেও আক্কেল হল না-ওটা ছিল আমার শেষ সুপ-প্লেট।’

মিস্টার ফান ডান আজকাল গলায় মধু ঢেলে আমার সঙ্গে কথা বলেন। এই ভাব দীর্ঘজীবী হোক। আজ সকালে মা-মণি আমাকে শুনিয়ে ভয়ানকভাবে আরেক প্রস্থ উপদেশ ঝাড়লেন; এসব শুনলে আমার গা জ্বালা করে। আমাদের ধ্যান-ধারণা একেবারেই বিপরীত। বাপি হলেন সোনামণি, যদিও মাঝে মাঝে আমার ওপর রেগে যেতে পারেন। তবে পাঁচ মিনিটেই তার রাগ পড়ে যায়। গত সপ্তাহে আমাদের একঘেয়ে জীবনে একটা সামান্য ছেদ। পড়েছিল; এর মূলে মেয়েদের সংক্রান্ত একটি বই এবং পেটার। গোড়ায় বলা দরকার, মিস্টার কুপহুইস্ যেসব বই আমাদের ধার দেন, তার মধ্যে প্রায় সবই মারগট আর পেটার পড়তে পারে। কিন্তু মেয়েদের বিষয়ে লেখা এই বইটা বড়রা আটকে দিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পেটারের কৌতূহল চেয়ে উঠল।

বইতে এমন কী আছে যা ওদের দুজনকে পড়তে দেওয়া গেল না? ওর মা যখন নিচের তলায় কথা বলতে ব্যস্ত, তখন পেটার চুপিচুপি বামাল বগলদাবা করে পালিয়ে চিলেকোঠায় চলে গেল। ক’দিন গেল নির্ঝঞ্ঝাট। পেটারের মা তার কাণ্ডকারখানা জানতেন। কিন্তু সে কথা কাউকে বলেননি।

এমন সময় পেটারের বাবা ব্যাপারটা জানতে পারলেন। তিনি খুব চটে গিয়ে বইটা সরিয়ে ফেললেন। তিনি ভেবেছিলেন এখানেই গোটা ব্যাপারটা চুকেবুকে গেল। কিন্তু বাবার এই মনোভাবে ছেলের ঔৎসুক্য ক্ষয় পাওয়ার বদলে যে আরও বৃদ্ধি পাবে এটা তার হিসেবের মধ্যে ছিল না। পেটার তখন সেই চিত্তাকর্ষক বইটা পড়ে শেষ করবার জন্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে সেটা হাতাবার এক উপায় বার করল। ইতিধ্যে মিসেস ফান ডান এই গোটা ব্যাপারটাতে মার কী মত সেটা জানতে চাইলেন। মা-র ধারণা, এই বিশেষ বইটা মারগটের উপযুক্ত নয়, তবে বেশির ভাগ বই নির্বিঘ্নে মারগটকে পড়তে দেওয়া যায়।

মা-মণি বললেন, দেখুন মিসেস ফান ডান–মারগট আর পেটারের মধ্যে বিস্তর ফারাক। প্রথমত, মারগট হল মেয়ে এবং মেয়েরা সব সময়ই ছেলেদের চেয়ে বেশি সাবালক; দ্বিতীয়ত, মারগট যথেষ্ট গুরুগম্ভীর বিষয়ে লেখা বই পড়েছে, কোনো বই ওকে পড়তে না দিলে তার জন্যে ও ছোঁক ছোঁক করে বেড়াবে না এবং তৃতীয়ত, মারগটের বাড় বৃদ্ধি বেশি, বুদ্ধিও বেশি–ইস্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে তার পড়া থেকেই তা বোঝা যায়। মিসেস ফান ডান সে বিষয়ে একমত; কিন্তু তবু তিনি মনে করেন, বড়দের জন্যে লেখা বই ছোটদের পড়তে দেওয়াটা নীতিগতভাবে ভুল।

ইতিমধ্যে পেটার দিনের এমন একটা ফাঁক বেছে নিয়েছে যখন পেটার এবং ঐ বইটার কথা কারো আর তেমন মনে নেই; সময়টা হল সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা–সবাই তখন অফিসের খাস কামরায় বসে রেডিও শুনছে। পেটার ঠিক সেই সময় তার মহামূল্য বস্তুটি নিয়ে ফের চিলেকোঠায় উঠে গেছে। কিন্তু বইটাতে সে এমনই জমে গিয়েছিল যে সময়ের কথা আর তার খেয়াল থাকেনি। যখন সে সবে নিচে নেমে আসছে ঠিক তখন ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন ওর বাবা। তারপর কী হল বুঝতেই পারছ। একটা চড় মেরে টান দিতেই বইটা ধপাস করে পড়ল টেবিলে আর পেটার দৌড় দিয়ে পালাল চিলেকোঠায়। এই অবস্থায় তারপর আমরা খেতে বসে গেলাম। পেটার রইল ওপরতলায়–কেউ তাকে ডাকাডাকি করল না। রাত্রে না খেয়েই তাকে শুয়ে পড়তে হল।

আমরা খেয়ে চলেছি, খোশমেজাজে কথাবার্তা বলছি–এমন সময় হঠাৎ হুইসেলের তীক্ষ্ণ একটা আওয়াজ; খাওয়া থামিয়ে আমরা ভয়ে পাংশুবর্ণ হয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। এমন সময় চিমনির ভেতর দিয়ে পেটারের গলা ভেসে এল। ‘আমি কিছুতেই নিচে যাব না, এই বলে দিচ্ছি।’ মিস্টার ডান ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন, মেঝেতে তাঁর ন্যাপকিনটা গড়িয়ে পড়ল। চোখ মুখ লাল করে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আর আমি বরদাস্ত করব না।‘

বিশ্রী কিছু ঘটার আশঙ্কায় বাপি উঠে গিয়ে তার হাত ধরলেন, তারপর দুজনে গেলেন চিলেকোঠায়। খানিকক্ষণ ঠেলাঠেলি গুঁতোগুতির পর টেনেহিঁচড়ে ওকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল। তারপর আবার আমরা খেতে শুরু করে দিলাম। মিসেস ফান ডান চাইছিলেন তাঁর আদুরে ছেলেটির জন্যে এক টুকরো রুটি রেখে দিতে। কিন্তু ছেলের বাবা খুব কড়া। ও যদি এখুনি মাপ না চায়, চিলেকোঠাতেই ওকে রাত কাটাতে হবে। আমরা বাকি সবাই চেঁচিয়ে এর প্রতিবাদ করলাম; আমাদের মতে রাত্রে খেতে না পাওয়াটাই হবে ওর পক্ষে যথেষ্ট শাস্তি। তাছাড়া পেটারের ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে এবং এ অবস্থায় ডাক্তরবদ্যিও ডাকা যাবে না।

পেটার মাপ চায়নি; অনেক আগেই চিলেকোঠার ঘরে চলে গেছে। মিস্টার ফান ডান আর এ নিয়ে বেশি কিছু করেননি; কিন্তু পরের দিন সকালে আমি লক্ষ্য করলাম পেটারের বিছানায় রাত্রে ঘুমোবার চিহ্ন। সাতটার সময় পেটার চিলেকোঠায় ফিরে গিয়েছিল; কিন্তু আমার বাপি ওকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে আবার নিচে নামিয়ে এনেছিলেন। তিনদিন ধরে চলল বিরস বদন আর মুখ বুজে গোঁয়ার-গোবিন্দপনা–ব্যাস্, তারপর আবার সব যে কে সেই।

তোমার আনা।

.

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আজ তোমাকে আমাদের সাধারণ খবরাখবর দেব।

মিসেস ফান ডানকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না। আমি সারাক্ষণ বকবক করি বলে উনি কেবল ‘ঝাড়’ দেন। কোনো না কোনোভাবে সব সময়ই উনি আমাদের জ্বালাতন করেন। একেবারে হালের ব্যাপার হল–হাঁড়ি-পাতিলে যদি একটুও কিছু পড়ে থাকে, তাহলে আর তিনি ধোবেন না; কাঁচের ডিশে তুলে রাখলেই হয়, আমরা যা এতদিন করে এসেছি–তা নয়, প্যানেই সেটা রেখে দিয়ে জিনিসটা উনি নষ্ট হয়ে যেতে দেন।

পরের বারের খাওয়াদাওয়া শেষ হলে মারগটকে কখনও কখনও গোটা সাতেক প্যান মাজতে হয় আর তখন শ্ৰীমতী বলেন, ‘ইস, মারগট, তোর ঘাড়ে বড় বেশি খাটুনি পড়ে যাচ্ছে।‘

বাবা তার বংশপঞ্জী তৈরি করছেন; আমি বাবার সঙ্গে সেই কাজে ব্যস্ত। যেমন যেমন আমরা এগোচ্ছি বাবা সেই মত প্রত্যেকের সম্বন্ধে কিছুটা কিছুটা বলছেন–কাজটা করতে দারুণ মজা লাগছে। এক সপ্তাহ অন্তর মিস্টার কুপহুইস আমার জন্যে কয়েকটা করে বিশেষ বিশেষ বই আনেন। ‘য়ুপ টের হয়েল’ সিরিজ দারুণ রোমহর্ষক। সিসি ফান্ মার্ক্সফেটের পুরাটাই আমার খুব ভালো লেগেছে। আর ‘ঈন্‌ৎ সোমেন্‌সোথেইড’ পড়েছি চারবার এবং কোনো কোনো হাস্যকর অবস্থার উদ্রেক হলে সেই নিয়ে এখনও হাসি।

পড়াশুনা আবার শুরু হয়ে গেছে; আমি ফরাসী নিয়ে আদাজল খেয়ে লেগেছি এবং দিনে পাঁচটা করে অনিয়মিত ক্রিয়াপদ কোনো রকমে মগজে ঠাসছি। ইংরেজি সামলাতে পেটারের দম বেরিয়ে যাচ্ছে আর কেবল মাথা চাপড়াচ্ছে। কিছু স্কুলপাঠ্য বই সদ্য এসেছে; লেখার। খাতা, পেন্সিল, রবার আর লেবেল যা আছে তাতে অনেকদিন চলে যাবে–এসবই আসার সময় আমি নিয়ে এসেছিলাম। লণ্ডন থেকে ওলন্দাজদের বিষয়ে যে খবর বলে আমি কখনও কখনও শুনি। সম্প্রতি প্রিন্স বের্নহার্ডকে বলতে শুনলাম। উনি বললেন যে, রাজকুমারী উরিয়ানার বাচ্চা হবে জানুয়ারী নাগাদ। এটা একটা চমৎকার খবর; রাজপরিবার সম্পর্কে আমার এই আগ্রহ দেখে অন্যেরা তো অবাক।

আমাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে এখন সবাই স্থিরনিশ্চিত যে, আমি তাহলে একবারে হাবা নই–এর ফল হল এই যে, পরের দিন আমার ঘাড়ে আরও বেশি বোঝা চাপানো হল। আমার এই চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সে আমি এখনও সেই প্রাথমিক শ্রেণীতেই থাকব এটা নিশ্চয়ই আমি চাই না।

সেই সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে আরও একটা ব্যাপার উঠেছিল–আমাকে কোনো সাচ্চা ধরনের বই না পড়তে দেওয়া সম্পর্কে। মা-মণি এখন পড়চ্ছেন ‘হীরেন্‌, ফ্লুডেন্ এন্ ক্রেশ্‌টেন’; ওটা আমার পড়বার অধিকার নেই (মারগটের আছে)। গোড়ায় আমাকে বুদ্ধিতে আরও পাকা হতে হবে, আমার গুণবতী দিদির মত। তারপর দর্শনে আর মনোবিজ্ঞানে আমার অজ্ঞতা সম্বন্ধে আমাদের কথা হয়; ও দুটো বিষয় সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। হয়ত পরের বছরে আমার বুদ্ধি পাকবে। (এই খটমটে শব্দগুলোর মানে জানার জন্যে তাড়াতাড়ি আমি ‘কোয়েনেনে’র পাতা উল্টে নিলাম)।

আমি ঘাবড়ে আছি, কারণ এইমাত্র আমার হুশ হল যে শীতের জন্যে আমার থাকার মধ্যে আছে একটা লম্বা-হাতের পোশাক আর তিনটে কার্ডিগান। বাবার কাছ থেকে সাদা ভেড়ার উলের একটা জাম্পার বোনবার অনুমতি পেয়েছি; উলটা খুব সরেস নয়, কিন্তু গরম হওয়া নিয়ে কথা। আমাদের কিছু জামাকাপড় বন্ধুদের বাড়িতে এদিক সেদিকে পড়ে রয়েছে; যুদ্ধ না মিটলে সেসব আর উদ্ধার হবে না, তাও যদি যে যেখানে ছিল সেখানেই তখনও থাকে। মিসেস ফান ডান সম্পর্কে সবে আমি দু-একটা কথা লিখেছি, এমন সময় তার। আবির্ভাব। অমনি ফটাস্ করে খাতাটা আমি বন্ধ করে দিলাম। ‘আনা রে, একটুখানি আমাকে দেখাবি নে?’

‘উঁহু, সম্ভব নয়।’

‘তাহলে শুধু শেষের পাতাটা?’

‘কিছু মনে করবেন না, দেখাতে পারছি না।’

স্বভাবতই আমি ভয়ানক ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়েছিলাম; কারণ ঠিক ঐ পৃষ্ঠাতেই ওঁর সম্পর্কে একটা অপ্রশংসাসূচক বর্ণনা ছিল।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল সন্ধ্যেবেলায় আমি ওপরতলায় ফান ডানেদের ঘরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে গল্প করতে আমি এরকম যাই। কখনও কখনও বেশ জমে। খানিকটা পোকা-মারা বিস্কুট (পোকা-মারা ওষুধে ভর্তি কাপড়ের আলমারিতে বিস্কুটের টিনটা রাখা হয়) আর লেমোনেড খাই। পেটারের সম্পর্কে আমাদের কথা হল। আমি ওদের বললাম পেটার কিভাবে আমার গালে টোকা মারে, ওরকম ও না করে এটা আমি চাই, কেননা ছেলেরা আমার গায়ে হাত দিলে আমার বিচ্ছিরি লাগে।

বাপ-মায়েদের একটা বিশেষ ধরন আছে, সেইভাবে ওঁরা জিজ্ঞেস করলেন–পেটারকে আমি ভালো লাগাতে পারি কিনা, কারণ পেটার নিশ্চয় আমাকে খুব পছন্দ করে। আমি মনে মনে ভাবলাম মরেছে এবং মুখে বললাম, ‘আজ্ঞে, না। ভাবো একবার।

আমি জোর দিয়েই বললাম পেটারকে আমার একটু হাতে-পায়ে জড়ানো বলে মনে হয়–হয়ত সেটা ওর লাজুক স্বভাবের জন্যে–মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার অভাবের দরুন অনেক ছেলে যেরকমটা হয়ে থাকে।

স্বীকার করতেই হবে যে, ‘গুপ্ত মহলের (পুং বিভাগ) শরণঙ্কর সমিতির খুব মাথা আছে। মিস্টার ভ্যান ডীক হলেন ট্রাভিস কোম্পানীর প্রধান প্রতিনিধি; বন্ধুত্ব থাকায় আমাদের কিছু জিনিস উনি আমাদের হয়ে চুপিসাড়ে লুকিয়ে রেখেছেন; মিস্টার ডীক যাতে আমাদের খবরটা পেয়ে যান তার জন্যে ওঁরা কী করেছেন বলছি।

আমাদের ফার্মের সঙ্গে কারবার করে দক্ষিণ জীল্যাণ্ডের এমন একজন কেমিস্টকে ওঁরা টাইপ করে এমনভাবে একটা চিঠি দিয়েছেন যা সে ব্যক্তিকে উত্তর পাঠাতে হবে বন্ধ করা একটি ঠিকানাযুক্ত খামে। বাপি খামের ওপর অফিসের ঠিকানা দিয়েছেন। জীল্যাণ্ড থেকে ঐ খাম যখন আসবে, ভেতরের চিঠিটা সরিয়ে ফেলে তার ভেতর বেঁচে থাকার প্রমাণ হিসেবে বাপির স্বহস্তে লেখা একটি চিরকুট ভরে দেওয়া হবে। এভাবে হলে, ভ্যান ডী চিরকুট পড়ে কোনো কিছু সন্দেহ করবেন না। ওঁরা বিশেষভাবে জীল্যাণ্ড বেছে নিয়েছিলেন এই জন্যেই যে, জায়গাটা বেলজিয়ামের খুব কাছে; সীমান্ত পেরিয়ে সহজেই চিঠিটা গোপনে চালান করা যেতে পারে; তার ওপর, বিশেষ ধরনের পারমিট ছাড়া কাউকেই জীল্যাণ্ডে ঢুকতে দেওয়া হয় না; সুতরাং ওরা যদি ভেবেও নেয় যে, আমরা সেখানে আছি–উনি চেষ্টাচরিত্র করে কখনই সেখানে আমাদের খুঁজতে চলে যাবেন না।

তোমার আনা।

.

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

এইমাত্র মা-মণির সঙ্গে বেশ একচোট ফাটাফাটি হয়ে গেল; ইদানীং আমরা কেউই তেমন মানিয়ে চলতে পারছি না। অন্যদিকে মারগটের সঙ্গে আমার সম্পর্কও ঠিক আগের মত নেই। সচরাচর আমাদের পরিবারে এ ধরনের মেজাজ খারাপ করার রেওয়াজ নেই। তাহলেও সব সময় এটা আমার কাছে কোনোমতেই ভাল লাগে না।

মা আর মারগটের ধরন-ধারণ আমার কাছে একেবারেই অদ্ভুত লাগে। আমি আমার নিজের মার চেয়ে বন্ধুদের বরং বেশি বুঝতে পারি–এটা খুবই খারাপ!

আমরা প্রায়ই যুদ্ধের পরের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করি; যেমন বাড়ির চাকরবাকরদের কিভাবে ডাকা উচিত।

মিসেস ফান ডান ফের চটাচটি করেছেন। ওঁর মেজাজের কোনো ঠিক নেই। ওঁর নিজের জিনিসপত্র উনি ক্রমাগত লুকিয়ে রাখেন। মা-মণির উচিত ফান ডানদের ‘হাওয়া হওয়া’র উত্তরে আমাদেরও ‘হাওয়া করে দেওয়া’। কিছু কিছু লোক আছে যারা নিজেদের ছেলেপুলেদের ওপর আবার পরের ছেলেপুলেদেরও মানুষ করতে ভালবাসে। ফান ডানেরা হলেন সেই গোত্রের। মারগটের বেলায় দরকার হয় না; ও হল যাকে বলে সুবোধ বালিকা, একেবারে নিখুঁত মেয়ে–কিন্তু আমার একার মধ্যে যোগ হয়েছে একসঙ্গে দুজনের দুষ্টুমি। খাওয়ার সময় কি রকম দুই তরফা নিন্দে-মন্দ আর তার চ্যাটাং চ্যাটাং জবাব হয় একবার শুনে দেখো। মা-বাবা সব সময়ই জোরালো ভাবে আমার পক্ষ নেন। ওঁরা না থাকলে আমাকে হাল ছেড়ে দিতে হত। ওঁরা অবশ্য আমাকে বলেন আমি যেন বেশি কথা না বলি, আমার উচিত আরেকটু নম্র হওয়া এবং সব কিছুতে নাক না গলানো। বাবা যদি অমন ফেরেশতার মতো মানুষ না হতেন তাহলে আমাকে নিয়ে আমার মা-বাবার পরিতাপের অন্ত থাকত না; ওরা আমার অনেক দোষই ক্ষমার চোখে দেখেন।

আমি যদি আমার অপছন্দসই কোনো তরকারি কম নিয়ে সে জায়গায় একটু বেশি করে আলু নিই, তাহলে ফান ডানেরা, বিশেষ করে সেফরোফ, কিছুতেই এটা বরদাস্ত করতে পারেন না যে, কোনো ছেলেমেয়ের কেন এত আদরে-মাথা খাওয়া হবে।

সঙ্গে সঙ্গে উনি বলে উঠবেন, অমন করে না, আনা–আরেকটু বেশি করে সব্জি নাও।

তার উত্তরে আমি বলি, রক্ষে করুন, মিসেস্ ফান ডান–আমি যথেষ্ট আলু নিয়েছি।

সব্জিতে তোমার উপকার হবে, তোমার মাও সেকথা বলেন। নাও আরেকটু নাও।’ এই বলে যখন উনি চাপাচাপি করতে থাকেন, বাপি এসে আমাকে বাঁচান।

এরপর মিসেস্ ফান ডান আমাদের ওপর এক হাত নেন–’তোর উচিত ছিল আমাদের। বাড়ির মেয়ে হওয়া, তবে ঠিকমত মানুষ হতিস। আনাকে এতটা আদর দিয়ে মাথায় চড়ানোর কোনো মানে হয় না। আনা যদি আমার মেয়ে হত, আমি তো সহ্যই করতাম না।’

‘আনা যদি আমার মেয়ে হত,’ এটা সব সময়ই ওর ধরতাই বুলি। ভাগ্যিস, আমি ওঁর মেয়ে হইনি।

‘মানুষ হওয়ার ব্যাপারটায় আবার ফিরে আসি। কারণ মিসেস ফান ডানের বকুনি শেষ হওয়ার পর খানিকক্ষণ কারো টু শব্দ নেই। তখন বাবা মুখ খুললেন, ‘আমি মনে করি, আনা অত্যন্ত ভালোভাবে মানুষ হয়েছে; আর যাই হোক না হোক, একটি জিনিস সে শিখেছে আপনার সাতকাণ্ড উপদেশ বচনের উত্তরে ও মুখে কুলুপ দিয়ে থেকেছে। আর সব্জির কথা বলছেন, আপনার নিজের থালার দিকে একবার তাকান। মিসেস ফান ডানের থোতা মুখ একেবারে ভোতা। তিনি নিজেই সব্জি নিয়েছেন যৎসামান্য। তাই বলে তিনি তো আদরে মাথা-খাওয়া নন। বারে! সন্ধ্যেবেলায় সব্জি বেশি খেলে ওঁর যে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়! বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এত কিছু থাকতে আমার ব্যাপার নিয়ে উনি তো চুপ থাকলেই পারেন তাহলে তো আর ওঁকে নিজের কোলে ওভাবে ঝোল টানতে হয় না। মিসেস ফান ডানের লজ্জায় কান লাল হওয়া একটা দেখবার জিনিস। আমার হয় না এবং সেটাই ওর দু-চক্ষের বিষ।

তোমার আনা

.

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল শেষ করবার অনেক আগেই আমাকে লেখা বন্ধ করতে হয়েছিল। আরও একটা ঝগড়ার বিষয়ে তোমাকে না বললেই নয়, কিন্তু সেটা শুরু করার আগে অন্য একটা কথা বলে নিই।

বুড়োবাড়ির দল এত চট করে, এত বেশি মাত্রায় এবং এত সব তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে কেন ঝগড়া করে? এতদিন ভাবতাম শুধু ছোট থাকলেই মানুষ খুনসুটি করে আর বড় হলে সেটা চলে যায়। কখনও কখনও ঝগড়ার সত্যিই কারণ ঘটে, কিন্তু এটা হল নেহাত খিটিমিটি। হয়ত এটা আমার গা-সওয়া হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু তা হতে পারে না বা হবে না, যতদিন প্রায় প্রত্যেকটা আলোচনার (বচসার নাম দিয়েছেন ওঁরা আলোচনা’) বিষয়বস্তু থাকছি আমি। আমার কিছুই, আবার বলছি, আমার কিছুই নাকি ঠিক নয়; আমার চেহারা, আমার চরিত্র, আমার চলনবলন–আদ্যোপান্ত সবকিছু নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। আমাকে (বলা হয়েছে) কড়া কড়া কথা আর চিৎকার চেঁচামেচি একেবারে নীরবে গিলে যেতে হবে; আমি এতে অভ্যস্ত নই।

সত্যি বলতে আমাকে দিয়ে তা হবে না। এইসব অপমান আমি মুখ বুজে সহ্য করব। আমি দেখিয়ে দেব আনা ফ্র্যাঙ্ক মাত্র কাল পেট থেকে পড়েনি। যখন ওঁদের নজরে পড়বে যে আমি ওঁদের শিক্ষা দিতে শুরু করেছি তখন ওঁদের চোখ কপালে উঠবে এবং হয়ত তখন ওঁরা চুপ করে যাবেন। নেব নাকি তেমন ভঙ্গি? স্রেফ বেআদবি! বার বার আমি শুধু অবাক হয়ে যাই ওঁদের জঘন্য আচরণে এবং বিশেষ করে… মিসেস ফান ডানের বোকামিতে, তবে একবার আমার গায়ে একটু সয়ে যাক–সেটা হতে খুব বেশিদিন লাগবে না। তখন ওঁরা কিছু ঢিলের বদলে পাটকেল ফিরে পাবেন, এবং ব্যাপারটা আদৌ আধাখাচড়া হবে না। তখন ওদের গলা দিয়ে বেরোবে ভিন্ন সুর।

ওঁরা যে রকম বলেন আমি কি সত্যিই সেইরকম বেয়াদব, অহঙ্কারী, একগুয়ে, ওপরপড়, বোকা, কুঁড়ের বাদৃশা ইত্যাদি, ইত্যাদি? না, কখনই তা নয়। আর পাঁচজনের মতই আমারও দোষত্রুটি আছে, আমি তা জানি, কিন্তু ওঁরা প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই তিলকে তাল করে দেখান।

এইসব ঠাট্টাবিদ্রুপের খোঁচায় আমার গা মাঝে মাঝে কি রকম রী রী করে ওঠে তুমি যদি জানতে, কিটি! জানি না আর কতদিন আমি আমার রাগ সম্বরণ করে রাখতে পারব। একদিন না একদিন ঠিক ফেটে পড়ব।

যাক গে, এ নিয়ে আর কচলাব না, এমনিতেই এইসব ঝগড়াঝাটির ব্যাপারে ঘ্যান ঘ্যান করে তোমার কানের পোকা বের করে ফেলেছি। তবু টেবিলে যেসব গজালি হয়, তার একটি বেজায় মজাদার, যার সম্পর্কে তোমাকে না বলে পারছি না। কথায় কথায় কিভাবে যেন পিমের (আমার বাপির ডাকনাম পিম্) বিনয়ের পরাকাষ্ঠার প্রসঙ্গটি এসে পড়ে। যে বোকাস্য বোকা তাকেও বাবার এই গুণের কথা স্বীকার করতেই হবে। হঠাৎ মিসেস ফান ডান বললেন, ‘আমারও অমনি নিরভিমান স্বভাব, আমার স্বামীর চেয়েও বেশি।

বটে বটে! এই বাক্যটিই পরিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভদ্রমহিলা যাচ্ছেতাই রকমের বেহায়া এবং এপরপড়া। মিস্টার ফান ডান মনে করলেন তাঁর নিজের সম্পর্কে যে উক্তি করা হয়েছে সে সম্পর্কে কিছুটা ভেঙে বলা দরকার। আমি ওরকম বিনয়ী হওয়াটা পছন্দ করি। আমার অভিজ্ঞতা, ওতে কোনো ফায়দা হয় না। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, আমার কথা শোন আনা, খুব বেশি বিনয়ের অবতার হয়ো না। ওতে না-ঘাটকা না-ঘরকা হবে।

মা-মণিও তাতে সায় দিলেন। তবে মিসেস ফান ডান এ বিষয়ে তার ধারণাটা জুড়ে দিলেন, যা তিনি সব সময়ই করে থাকেন। এরপরই তার মন্তব্যটা হল মা-মণি আর বাপিকে লক্ষ্য করে। জীবন সম্পর্কে তোমাদের দেখছি অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি। ভাবো একবার, কী জিনিস ঢোকানো হচ্ছে আনার মাথায়; আমি যখন ছোট ছিলাম তখন এমন ছিল না। আমি এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ যে, এখনও তাই; তোমাদের আজকালকার বাড়ি বাদ দিলে। মা যেভাবে তার মেয়েদের মানুষ করেছেন এটা তার ওপর সরাসরি আঘাত।

ততক্ষণে মিসেস ফান ডানের চোখমুখ রাঙা হয়ে উঠেছে। মা-মণির মুখে শান্ত নির্বিকার ভাব। যারা রেগে লাল হয় তারা এমন তেতে ওঠে যে, এ ধরনের অবস্থায় তারা অসুবিধের পড়ে। মা-মণির তাতেও কোনো ভাবান্তর হল না; কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কথাবার্তায় ছেদ টানার আগ্রহে এক মুহূর্ত একটু ভেবে নিয়ে তারপর বললেন, ‘আমিও দেখতে পাই, মিসেস ফান ডান, অতিরিক্ত বিনয়ী না হলে জীবনের সঙ্গে তবু কিছুটা মানিয়ে গুছিয়ে চলা যায়। এখন আমার স্বামী আর মারগট, আর পেটার–এরা হল অসম্ভব ভালোমানুষ; অন্যদিকে তোমার স্বামী, আনা, তুমি আর আমি, আমরা একেবারে উল্টো ধরনের না হলেও, কেউ আমাদের ঠেলে এগিয়ে যাবে একটা আমরা কিছুতেই হতে দেব না।’

মিসেস ফান ডান বললেন, ‘কিন্তু, মিসেস ফ্রাঙ্ক, এ আপনি কী বলছেন? আমি হলাম। অত্যন্ত নম্র, মুখচোরা; আপনি আমাকে কী হিসেবে অন্যরকম বলেন?’

মা-মণি বললেন, আমি বলিনি তুমি ঠিক জাহাবাজ, তবে কেউ বলবে না যে তুমি লজ্জাবতী লতাটি।’

মিসেস ফান ডান—‘আগে এটার একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক। বলুন, কী দিক থেকে আমি ওপরপড়া? আমি একটা জিনিস জানি, যদি আমি নিজের আঁচলে গেরো না দিতাম। তাহলে আর দেখতে হত না–পেটে কিল মেরে বসে থাকতে হত।‘

আত্মরক্ষার এই আগডুম বাগডুম শুনে মা-মণি তো হেসেই খুন। তাতে মিসেস ফান ডান চটে গিয়ে গুচ্ছের জার্মান–ওলন্দাজ বুলি ঝাড়লেন, তারপর একেবারে চুপ মেরে গেলেন; শেষে চেয়ার থেকে উঠে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার উপক্রম করলেন।

এমন সময় হঠাৎ আমার দিকে তার চোখ পড়ল। তখন যদি তাঁকে দেখতে। দুর্ভাগ্যবশত যখন তিনি আমার দিকে ফিরেছেন ঠিক সেই মুহূর্তে আমি সখেদে মাথা নাড়ছিলাম–ঠিক ইচ্ছে করে নয়, নিজেরই অজান্তে–কেননা আমি খুব মন দিয়ে এঁদের বাক্যালাপ শুনছিলাম।

মিসেস ফান ডান আমার দিকে ফিরে জার্মানে গড়গড় করে একগাদা কড়া কড়া কথা। শোনালেন; বাজার-চলতি অভদ্র ভাষায়। ঠিক যেন একজন গেঁয়ো লালমুখ মাছওয়ালী–সে এক দেখবার মত দৃশ্য। আমি যদি আঁকতে পারতাম, তাহলে ওঁর চেহারাটা ধরে রেখে দিলে বেশ হত। সে এক গলা-ফাটানো চিৎকার–এমন বোকা, নির্বোধ ছোট মানুষ।

যাই হোক, এ থেকে এখন আমার একটা শিক্ষা হয়েছে। কারো সঙ্গে বেশ ভালোমত বচসা হলে তবেই আসলে লোক চেনা যায়। একমাত্র তখনই তাদের আসল চরিত্র তুমি যাচাই করতে পারো।

তোমার আনা

.

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

অজ্ঞাতবাসে গেলে মানুষের জীবনে অভাবিত সব ঘটনা ঘটে। ভাবো একবার, বাথটাব না থাকায় আমাদের ব্যবহার করতে হচ্ছে হাত ধোয়ার পানির জায়গা। গরম পানি মেলে অফিসঘরে (অফিস বলতে সবসময়ই বুঝবে গোটা নিচের তলা); ফলে, আমরা সাতজন সবাই পালা করে এত বড় বিলাসিতাটা কাজে লাগাই। আমরা একেকজন একেক রকম; কারো কারো শ্লীলতাবোধ অন্যদের চেয়ে একটু বেশি। সেই কারণে সংসারের প্রত্যেকে তার নিত্যকর্মের জন্যে নিজস্ব জায়গা বেছে নিয়েছে। কাঁচের দরজা থাকা সত্ত্বেও পেটার ব্যবহার করে রান্নাঘর। গোসলের ঠিক আগে একে একে আমাদের সকলের কাছে সে যাবে এবং গিয়ে বলবে যে আধঘণ্টা সময় আমরা কেউ যেন রান্নাঘরের পাশ দিয়ে না যাই। ওর ধারণা এটাই যথেষ্ট। মিস্টার ফান ডান সোজা উপরতলায় চলে যান; অতটা পথ গরম পানি টেনে নিয়ে যাওয়ার ঝামেলা কম নয়। কিন্তু ওঁর চাই নিজস্ব ঘরটুকুর আড়াল। মিসেস ফান ডান আজকাল স্রেফ গোসলের পাটই তুলে দিয়েছেন; উনি সেরা জায়গা বের করার অপেক্ষায় আছেন। বাবা গোসল সারেন অফিসের খাসকামরায়; রান্নাঘরে অগ্নিবারক দেয়ালের পেছনের জায়গায় মা-মণি। মারগট আর আমি গা মাজাঘষার জন্যে বেছে নিয়েছি সামনের। অফিসঘর। শনিবার বিকেলগুলোতে ঘরের পর্দাগুলো ফেলে দেওয়া হয়, সুতরাং আধো অন্ধকারে আমরা গা ধুই। অবশ্য, এই জায়গাটা আর আমার ভালো লাগছে না; গত সপ্তাহের পর থেকে যেখানে আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্য থাকবে এমন একটা জায়গার খোঁজে আছি। পেটার একটা ভালো মতলব দিয়েছে–বড় অফিসঘরের শৌচাগারটা আমার পছন্দ হতে পারে। সেখানে বসা যায়, আলো জ্বালানো যায়, দরজা বন্ধ করা যায়, নিজস্ব গোসলের পানি ঢাললে বাইরে বেরিয়ে যাবে। তাছাড়া চোরাচাহনির হাত থেকে বাঁচব।

রবিবার দিন এই প্রথম আমার মনোরম গোসল-ঘরটা আমি পরখ করে দেখলাম বাপরে, কী শব্দ! তবুও আমার মতে এটাই হল সবার সেরা জায়গা। অফিসের শৌচাগার থেকে ড্রেন আর পানির পাইপ সরিয়ে দালানে লাগানোর জন্যে গত সপ্তাহে কলের মিস্ত্রি নিচের তলায় কাজ করেছে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়লে পাইপ যাতে জমে না যায় তারই জন্যে আগে থেকে সারানোর এই ব্যবস্থা। কলের মিস্ত্রির আসাতে সারা দিন আমরা পানি তো নিতে পারিইনি, উপরন্তু শৌচাগারেও যেতে পারিনি। এই মুশকিল আসানের জন্যে আমরা কী করেছিলাম সেটা বললে অবশ্য তোমার কাছে মোটেই প্রীতিকর ঠেকবে না।

এখানে যেদিন আমরা চলে আসি, আমি আর বাবা আমাদের জন্যে যাহোক করে একটা টুকরি বানিয়ে নিয়েছিলাম। আর কিছু না পেয়ে কাজে লাগানোর জন্যে আমরা একটা কাঁচের বয়াম নষ্ট করেছি। যেদিন কলের মিস্ত্রি আসে সেইদিন এইসব পাত্রে দিনের বেলায় বসার ঘরে প্রকৃতিদত্ত জিনিসগুলো জমা করা হয়েছিল। তার চেয়েও খারাপ ছিল মুখে কুলুপ দিয়ে সারাটা দিন বসে থাকা। কুমারী ‘প্যাক-প্যাক’-এর পক্ষে সেটা যে কী যন্ত্রণাকর ব্যাপার তুমি তা ধারণাই করতে পারবে না। এমনিতেই সাধারণত দিনের বেলায় আমাদের কথা বলতে হয় ফিস্ ফিস্ করে কিন্তু তার চেয়ে দশ গুণ খারাপ মুখ বুজে ঠায় বসে থাকা। তিন দিন সমানে বসে থেকে থেকে আমার নিচটা অসাড় হয়ে টনটন করছিল। রাত্তিরে শোয়ার সময়। খানিকটা শরীর চালনা করাতে ব্যথা খানিকটা কমল।

তোমার আনা

.

বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল আমার অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার যোগাড় হয়েছিল। আটটার সময় হঠাৎ খুব জোরে বেল বেজে উঠল। আমি ভাবলাম ঐ এল; কার কথা বলছি বুঝতেই পারছ। কিন্তু সবাই যখন বলতে লাগল যে, কোনো চ্যাংড়া ছেলে কিংবা হয়ত ডাক-পিওন, তখন আমি খানিকটা আশ্বস্ত হলাম।

দিনগুলো এখানে ক্রমেই ভারি চুপচাপ হয়ে পড়ছে। মিস্টার ক্রালারের কাছে রসুইখানায়। কাজ করেন ছোট্টখাট্টো ইহুদী কম্পাউণ্ডার লিউইন। সারা বাড়িটাই তাঁর নখদর্পণে; তাই আমাদের সর্বদাই ভয় এই বুঝি তিনি খেয়ালবশে পুরনো ল্যাবরেটরিতে একবার উকি দিয়ে বসেন। আমরা নেংটি ইঁদুরের মতন ঘাপটি মেরে আছি। তিন মাস আগে ঘুণাক্ষরেও কি কেউ ভাবতে পেরেছিল যে ছটফটে আনাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপ করে বসে থাকতে হবে এবং তার চেয়েও বড় কথা, সেটা সে পারবে।

ঊনত্রিশে ছিল মিসেস ফান ডানের জন্মদিন। অবশ্য দিনটি বড় করে পালন করা যায়নি; তাহলেও তাঁর সম্মানে আমরা একটু প্রীতি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলাম, সঙ্গে কিছুটা উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা হয়েছিল; কিছু ছোটখাটো উপহার আর ফুলও তিনি পেলেন। পতিদেবতার কাছ থেকে পেলেন লাল কারনেশান ফুল, ওটা ওঁদের কুলপ্ৰথী।

মিসেস ফান ডানের বিষয়ে একটু কচলে নেওয়া যাক; তোমাকে আমার বলা দরকার যে বাপির সঙ্গে উনি প্রায় চেষ্টা করেন ফষ্টিনষ্টি করতে; সেটা হয়ে পড়েছে আমার সারাক্ষণ বিরক্তির কারণ। উনি বাপির মুখে আর চুলে ঠোনা মারেন, স্কার্ট টেনে তোলেন এবং বন্ রসিকতা করেন। এইভাবে তিনি চান বাপির নজর কাড়তে। বরাত ভালো, বাপি পান না ওঁর ভেতর কোনো আকর্ষণ বা কোনো রসকস–কাজেই বাপির কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলে না। মিস্টার ফান ডানের সঙ্গে মা-মণি অমন ব্যবহার করেন না–একথা আমি মিসেস ফান। ডানের মুখের ওপর বলেছি।

মাঝে মাঝে পেটার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে আর তখন ও বেশ মজাদার হয়। আমাদের একটা জিনিসে মিল আছে, তাতে সাধারণত সবাই খুব রঙ্গরস পায়–আমরা দুজনেই সাজতে ভালবাসি। দেখা গেল, মিসেস ফান ডানের বেজায় সিঁড়িঙ্গে একটা পোশাক পরেছে পেটার আর আমি পরেছি পেটারের প্যান্ট কোট। ওর মাথায় হ্যাট আর আমার মাথায় ক্যাপ।

বড়রা তাই দেখে হেসে কুটোপাটি আর আমরাও তেমনি মজা পাই। মারগটের আর আমার জন্যে বিয়েন কফের দোকান থেকে এলি নতুন স্কাট কিনে এনেছেন। কাপড় একেবারেই রদ্দি, ছালার কাপড়ের মতন–দাম নিয়েছে যথাক্রমে ২৪,০০ ক্লোরিন আর ৭.৫০ ক্লোরিন। যুদ্ধের আগে কী ছিল, আর এখন কী হয়েছে।

আরেকটা চমৎকার জিনিস আমি ঢাকঢাক গুড়গুড় করে রেখেছি। এলি কোনো এক সেক্রেটারিশিপ পড়ানোর ইস্কুলে না কোথায় যেন লিখে মারগট, পেটার আর আমার জন্যে শর্টহ্যাণ্ডের করেসপণ্ডেস কোর্সের অর্ডার দিয়েছেন। রও, আসছে বছরের মধ্যেই দেখবে আমরা সব কিরকম ষোল আনা পোক্ত হয়ে উঠেছি। যাই হোক আর তাই হোক, সঁটে লিখতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তোমার আনা

.

শনিবার, ৩ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল আবার একচোট খুব হয়ে গেল। মা-মণি ভীষণ চোটপাট করলেন এবং বাপির কাছে আমার ধুড়ধুড়ি নেড়ে দিলেন। তারপর যখন হাউমউ করে কাঁদতে বসলেন তখন আমিও ফেটে পড়লাম। এদিকে আমার যা মাথা ধরেছিল কী বলব। শেষ অবধি বাবাকে আমি বললাম মা-মণির চেয়ে ওঁর ওপর আমার টান বেশি। তার উত্তরে বাপি বললেন, আমি ওটা কাটিয়ে উঠব। আমি তা বিশ্বাস করি না; মা-মণির কাছে যখন থাকি নিজেকে স্রেফ জোর করে আমি শান্ত রাখি। বাপি চান শরীর খারাপ হলে কিংবা মাথা ধরলে মাঝে মাঝে নিজে যেচে আমি যেন মা-মণির সেবা করি। আমি ওর মধ্যে নেই। আমি এখন ফরাসী নিয়ে আদাজল খেয়ে লেগেছি এবং এখন পড়ছি ‘লা বেলে নিফেরনাইসে’।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি

আজ তোমাকে শুধু বিশ্রী মন-খারাপ-করা খবর দেব। আমাদের ইহুদী বন্ধুদের ডজনে ডজনে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এদের সঙ্গে ব্যবহারে গেস্টাপো কোনোরকম ভদ্রতার বালাই রাখছে না, গরু-ভেড়ার ট্রাকে বস্তাবন্দী করে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে ভেস্টারব্রুকের ডেন্টির বিশাল ইহুদী বন্দীশিবিরে। ভেস্টারব্রুক মনে হচ্ছে সাংঘাতিক জায়গী; একশো লোকের জন্যে একটি করে ছোট্ট কলঘর এবং পায়খানাও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। আলাদা আলাদা থাকার ব্যবস্থা নেই। মেয়ে-পুরুষ-বাচ্চা সবাই একসঙ্গে গাদা হয়ে শোয়। এর ফলে সাংঘাতিক নৈতিক অধঃপতন ঘটেছে বলে শোনা যায় এবং কিছুদিন থেকেছে এমন প্রচুর স্ত্রীলোক, এমন কি কমবয়সী মেয়েদেরও পেটে বাচ্চা এসেছে।

পালাবে যে তারও কোনো উপায়ই নেই; শিবিরের বেশির ভাগ লোকেরই মার্কা মারা চেহারা–মাথা কামানো এবং সেই সঙ্গে অনেককেই ইহুদী-ইহুদী দেখতে।

হল্যাণ্ডে থেকেই যখন এই হাল, তখন যে-সব দূর-দূর এবং অজ জায়গায় তাদের পাঠানো হচ্ছে সেখানে কী দশা হবে? আমরা মনে করি, ওদের অধিকাংশকেই খুন করা হচ্ছে। ইংলণ্ডের রেডিও বলছে ওদের নাকি গ্যাস দিয়ে দম বন্ধ করে মারা হচ্ছে।

হয়ত মারবার পক্ষে ওটাই সবচেয়ে সিধে রাস্তা। আমি ভীষণ উতলা হয়ে পড়েছি। মি যখন এই সব ভীষন ভীষন কাহিনী শোনাচ্ছিলেন, তখন আমি কিছুতেই উঠে যেতে পারছিলাম না। সেদিক থেকে উনি নিজেও খুব টান টান হয়ে ছিলেন। যেমন খুব সম্প্রতিকার একটা ঘটনা–এক অসহায় পঙ্গু ইহুদী বুড়ি মিপের দোরগোড়ায় বসে ছিল; গেস্টাপোর লোক বুড়িতে ঐখানে বসে থাকতে বলে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে গাড়ি ডাকতে চলে গিয়েছিল। মাথার ওপর তখন ইংরেজদের প্লেন লক্ষ্য করে গোলা ছোড়া হচ্ছে। আর কেবলি এসে এসে পড়ছে সার্চলাইটের ঝাঝালো আলো–বুড়ি বেচারা সেই সব দেখে ঠক ঠক করে কাঁপছিল। কিন্তু মিপের সাহস হয়নি বুড়িকে ঘরের ভেতরে ডেকে নেওয়ার; অত বড় ঝুঁকি কেউ নেবে না। জার্মানদের শরীরে দয়ামায়া বলে কিছু নেই–মারতে ওদের কিছুমাত্র তর সয় না। এলিও খুব চুপচাপ হয়ে পড়েছে; ওর ছেলে বন্ধুটিকে জার্মানিতে চলে যেতে হবে। ওর ভয়, যে বৈমানিকেরা আমাদের ঘরবাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে যায়, তারা ডীর্কের মাথায় বোমা ফেলবে, প্রায়ই সে সব বোমা হয় দশ লক্ষ কিলো ওজনের। ‘ওর ভাগে দশ লাখ পড়বে বলে মনে হয় না এবং একটি বোমাতেই কাবার’–এসব পরিহাস বরং কুরুচিরই পরিচয় দেয়। অবশ্য ডিককে একা যেতে হচ্ছে তা ঠিক নয়; রোজই ট্রেন ভর্তি করে করে ছেলেরা চলে যাচ্ছে। রাস্তায় ছোটখাটো ট্রেন থামলে কখনও কখনও দু-চারজন চোখে ধুলো দিয়ে কেটে পড়ে, বোধ হয় সংখ্যায় তারা খুবই কম। তাই বলে আমার দুঃসংবাদের এখানেই শেষ নয়। তুমি কখনও হোস্টেজের কথা শুনেছ? অন্তর্ঘাতের শাস্তি হিসেবে একেবারে হালে এই জিনিস চালু হয়েছে। এই রকম ভয়াবহ ব্যাপার আর কিছু ভাবতে পারো?

গণ্যমান্য সব নাগরিক–তারা একেবারে নিরপরাধ তাদের মাথার ওপর খাড়া ঝুলিয়ে হাজতে পুরে রাখা হয়েছে। অন্তর্ঘাতকের পাত্তা করতে না পারলে গেস্টাপো সোজা পাঁচজন করে হোস্টেজকে দেয়ালে লটুকে দেবে। এইসব নাগরিকদের মৃত্যুর খবর প্রায়ই কাগজে বেরোয়। এই অপকর্মকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু’ বলে বর্ণনা করা হয়। খাসা লোক, এই জার্মানরা! ভাবি, আমিও একদিন ওদেরই একজন ছিলাম। না, হিটলার আমাদের জাতিসত্তা অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছে। আদতে জার্মানরা আর ইহুদীরা এখন দুনিয়ার পরস্পরের সবচেয়ে বড় শত্রু।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আমি সাংঘাতিক ব্যস্ত। এইমাত্র আমি ‘লা বেলে নিফেরনাইসে’ থেকে একটি অধ্যায় তর্জমা করেছি এবং নতুন শব্দগুলো খাতায় টুকেছি। এরপর একটা যারপরনেই ভজোঘটে বুদ্ধির অঙ্ক আর তিন পৃষ্ঠা ব্যাকরণ। আমি সোজা বলে দিই রোজ রোজ এই সব বুদ্ধির অঙ্ক আমাকে দিয়ে হবে না। অঙ্কগুলো যে অতি যাচ্ছেতাই, এ বিষয়ে বাপি আমার সঙ্গে একমত। আমি বোধ হয় অঙ্কে বাপির চেয়ে এককাঠি সরেস, যদিও দুজনের কেউই আমরা খুব একটা ভালো নই। প্রায়ই আমাদের মারগটকে ডাকতে হয়। শর্টহ্যাণ্ডে তিনজনের মধ্যে আমিই আছি সব চেয়ে এগিয়ে।

কাল আমি ‘দি অ্যাসণ্ট’ বইটা শেষ করলাম। বইটা বেশ মজার। কিন্তু ‘যুপ টের। হয়েল্‌’-এর কাছে লাগে না। আদতে আমার মতে সিসি ফান মার্ক্সফেট হলেন প্রথম শ্রেণীর লেখিকা। আমি আমার ছেলেমেয়েদের অবশ্যই ওঁর বই পড়তে দেব। মা-মণি, মারগট আর আমি আবার এখন আমাদের খুব আঠা-আঠা ভাব। এটা সত্যিই অনেক ভালো। কাল সন্ধ্যেবেলায় মারগট আর আমি দুজনে এক বিছানায় শুয়েছিলাম। ঠাসাঠাসি করে শুতে হলেও সেটা ভালোই লেগেছে। মারগট জিজ্ঞেস করল আমার ডায়রিটা ও পড়তে পারে কিনা। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, পারো অন্তত খানিকটা খানিকটা।‘ তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম ওরটা আমি পড়তে পারি কিনা। মারগট বলল, ‘হ্যাঁ।’ এরপর কথায় কথায় ভবিষ্যতের প্রসঙ্গ উঠল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম বড় হয়ে ও কী হতে চায়। কিন্তু ও কিছুতেই ভাঙল না। এবং ব্যাপারটা চেপে গেল। আমি আঁচ করে বুঝলাম ওর ইচ্ছে বোধ হয় মাস্টারি করার। আমার অনুমান সঠিক কিনা জানি না। আমার মনে হয় অবশ্য, আমারই বা জানার জন্যে অত ছোঁকছোঁকানি কেন!

আজ সকালে পেটারকে ভাগিয়ে আমি ওর বিছানা দখল করেছিলাম। ও ভীষণ চটে গিয়েছিল, আমি কেয়ার করিনি। আমার ওপর অতটা রাগ না করলেই ও পারত, কাল যখন ওকে আমি একটা আপেল দিয়েছি।

আমি দেখতে খুব কুৎসিত কিনা মারগটকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বলেছিল বিলক্ষণ মনে ধরার মতন আমার চেহারা, এবং আমার চোখজোড়া চমৎকার। কথাগুলো, একটু রেখেঢেকে বলা তাই না?

বারান্তরে কথা হবে।

তোমার আনা

.

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

এখনও আমার হাত কাঁপছে, যদিও আমাদের আচকা ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা ঘটেছিল সেই দু ঘন্টা আগে। খোলাসা করে বলছি। বাড়িটাতে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম আছে পাঁচটা। আমরা জানতাম যে ওগুলো ভর্তি করবার জন্যে কেউ একজন আসছে; কিন্তু আসছে যে ছুতোরমিস্ত্রি, বা তাকে তুমি যাই বলো, এটা আগে থেকে আমাদের জানানো হয়নি।

ফলে, আলমারি-ঢাকা দরজার উল্টোদিকের দালানে হাতুড়ি পেটানোর আওয়াজ আমার কানে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা মুখে চাবি আঁটার কোনো প্রচেষ্টা করেনি। তক্ষুনি ছুতোরমিস্ত্রির কথা আমার মাথায় আসে; এলি আমাদের সঙ্গে খেতে বসেছিল, ওকে আমি সাবধান করে দিয়ে বলি ও যেন নিচের তলায় না যায়। বাবা আর আমি গিয়ে দরজার পাশে দাঁড়াই যাতে লোকটা চলে গেলে আমরা টের পাই। মিনিট পনেরো ধরে হাতুড়ি পেটানোর পর লোকটা তার হাতুড়ি আর যন্ত্রপাতিগুলো আলমারির মাথায় রেখে দিল (আমরা ধারণা–করেছিলাম) এবং তারপর আমাদের দরজায় টোকা দিতে শুরু করল। শুনে আমরা একেবারে ভয়ে সাদা হয়ে গেলাম! ও বোধ হয় কোনোরকম আওয়াজ পেয়ে থাকবে এবং আমাদের গোপন আভড়ার ব্যাপারে খোঁজ খবর করতে চাইছিল। দেখে শুনে সেই রকমই মনে হয়েছিল। দরজা ঠোকা, টানাটানি, ঠেলাঠেলি, খোলাখুলি–এইসব সমানে চলছিল। কোথাকার কে না কে আমাদের এমন সুন্দর আত্মগোপনের জায়গাটা জেনে যাবে, এটা ভেবে আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলাম। যখন আমি ভাবছি যে মৃত্যু আমার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই আমার কানে গেল মিস্টার কুপহুইস বলছেন, ‘দরজা খোলো, আমি হে আমি।’ সঙ্গে সঙ্গে আমরা দরজা খুলে দিলাম। যে-আংটার সঙ্গে আলমারিটা লাগানো, সেটা খুলতে পারে যারা ভেতরের খবর জানে। কিন্তু আংটাটা সেঁটে গিয়েছিল। তার ফলে ছুতোরমিস্ত্রি আসার ব্যাপারটা আগে থেকে আমাদের কেউ জানিয়ে দিতে পারেনি। ছুতোরমিস্ত্রি নিচে চলে গেছে এবং কুপহুইস চাইছিলেন এলিকে ডেকে নিয়ে যেতে, কিন্তু আলমারিটা আর খোলা যাচ্ছিল না। বাপ রে, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যে লোকটা ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল সে আমার কল্পনায় ফেঁপে ফুলে উঠতে উঠতে দানবের আকারে দুনিয়ার সবচেয়ে ডাকসাইটে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছিল।

যাক গে, কপাল ভালো, তাই এবারে সব ভালোয় ভালোয় উৎরে গেল। ইতিমধ্যে সোমবারটা তফা কেটেছে। মিথু আর হেংক রাত্তিরে থেকে গিয়েছিলেন। ফান সাপ্টেদের আমাদের ঘর ছেড়ে দিয়ে মারগট আর আমি সে রাতে মা-বাবার ঘরে শুয়েছিলাম। খাবারটা হয়েছিল গরম উপাদেয়। শুধু একটাই যা বিঘ্ন ঘটেছিল। বাবার বাতিটা গোলমাল করায় গোটা বাড়ি ফিউজ হয়ে যায়। হঠাৎ দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমরা বসে আছি। কী করা যায়? বাড়িতে কিছুটা ফিউজের তার আছে বটে, কিন্তু ফিউজবক্স রয়েছে অন্ধকার গুদাম ঘরের একদম পেছনদিকে–সন্ধ্যের পর খুব খিটকেল কাজ। তবু পুরুষমানুষেরা পিছু হটল না। দশ মিনিট পর মোমবাতিগুলো আবার ফু দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া গেল।

আমি আজ ভোরে উঠেছি। সাড়ে আটটায় হেংককে চলে যেতে হল। জমিয়ে বসে সকালের খাওয়া সেরে মি নিচে চলে গেলেন। বৃষ্টি হচ্ছিল মুষলধারে। তার মধ্যে সাইকেল চালিয়ে যে অফিসে আসতে হয়নি, মিপ্‌ তাতে খুশি। পরের সপ্তাহে এলি আসছে; এখানে এক রাত কাটাতে।

তোমার আনা

.

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আমি খুবই চিন্তায় আছি, বাপি অসুস্থ। খুব জুর আর গায়ে লাল লাল কি সব বেরিয়েছে, হাম বলে মনে হয়। আমরা ডাক্তারও ডাকতে পারছি না, ভাবো! মা-মণি চেষ্টা করছেন বাপির যাতে ঘাম বের হয়। হয়ত তাতে গায়ের তাপ কমবে।

আজ সকালে মি আমাদের বললেন যে, ফান ডানদের বাড়ি থেকে সমস্ত আসবাবপত্র নিয়ে গেছে। মিসেস ফান ডানকে আমরা এখনও বলিনি। এমনিতেই উনি যে রকম তেতে পুড়ে রয়েছেন, তাতে বাড়িতে ওঁর ফেলে-আসা মনোরম সব চিনেমাটির বাসন, আর সুন্দর সুন্দর সব চেয়ার নিয়ে আরেকবার উনি ফোপাতে শুরু করলে সেটা শুনতে আমাদের ভালো। লাগবে না। আমরা বাধ্য হয়ে, আমাদের প্রায় সমস্ত ভালো জিনিস ফেলে রেখে চলে এসেছি; সুতরাং ও নিয়ে এখন গাইগুই করে লাভ কী?।

ইদানীং তুলনায় বড়দের বইপত্র আমি পড়তে পারছি। এখন আমি পড়ছি নিকো ফান জুখটেলেনের ‘ইভার যৌবন’। এর সঙ্গে স্কুলের মেয়েদের প্রেমের গল্পের খুব বেশি তফাত দেখতে পাচ্ছি না। এটা ঠিক যে এদো গলিতে অচেনা পরপুরুষের কাছে মেয়েরা নিজেদের বিক্রি করছে, এ সব কিছু কিছু জিনিস এতে আছে। এর জন্যে তারা একমুঠো টাকা চাইছে। আমার জীবনে এ রকম ঘটলে আমি মরে যেতাম। এতে আরও বলা আছে যে ইভার মাসিক। হয়। ইস, আমার কবে যে হবে; মনে হয় জীবনে এটা একটা দামী জিনিস।

বড় আলমারিটা থেকে বাবা এনেছেন গোটে আর শিলারের নাটক। প্রত্যেক দিন। সন্ধ্যেবেলায় বাবা আমাকে পড়ে শোনাবেন। ‘ডন্ কার্‌রস্‌’ দিয়ে আমাদের এই পড়ার ব্যাপারটা শুরু হয়ে গেছে।

বাপির দেখাদেখি জোর করে মা-মণি তার প্রার্থনাপুস্তক আমার হাতে ঠেসে দিয়েছেন। মুখরক্ষার জন্যে জার্মান ভাষার কিছু কিছু স্ত্রোত্র আমি পড়েছি; পড়তে বেশ সুন্দর, কিন্তু আমার কাছে খুব একটা অর্থবহ বলে মনে হয় না। আমাকে অমন উনি জোর করে ধার্মিক করতে চান কেন, কেবল ওঁকে খুশি করার জন্যে?

কাল আমরা এই প্রথম ঘরে আগুন জ্বালাব। শেষটায় ধোয়ার চোটে আমরা দমবন্ধ হয়ে। মারা না যাই। কত যুগ ধরে যে চিমনি সাফ করা হয়নি তার ঠিক নেই। আশা করা যাক, চিমনিটা ধোয়া টানবে।

তোমার আনা

.

শনিবার, ৭ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

মার মেজাজ সাংঘাতিক তিরিক্ষে, এবং মনে হয় আমার জীবনে সেটা সব সময় অশান্তি ডেকে আনে। না বাবা, না মা–ওঁরা কেউই কখনও মারগটকে বকেন না এবং ওঁরা সব সময় সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপান–এটা কি নেহাতই একটা আকস্মিক ব্যাপার? কাল সন্ধ্যের কথাই ধরা যাক; মারগট একটা বই পড়ছিল, তাতে সুন্দর সুন্দর সব আঁকা ছবি; বইটা উপুড় করে রেখে ও উঠে ওপরে চলে গেল যাতে ফিরে এসে আবার পড়া শুরু করতে পারে। আমার হাতে কোনো কাজ ছিল না বলে বইটা তুলে নিয়ে ছবিগুলো দেখতে শুরু করে দিলাম। মারগট ফিরে এসে ‘ওর’ বই আমার হাতে দেখে ভুরু কুঁচকে বইটা ফেরত চাইল। আমি শুধু চেয়েছিলাম আরও কয়েকটা পাতা উল্টে বইটা দেখতে, তার জন্যেই মারগট ক্রমশ রাগে ফুলে উঠতে লাগল। মা-মণি তার সঙ্গে যোগ দিয়ে বললেন, ‘মারগটকে বইটা দিয়ে দে; ও পড়ছিল।’ বাবা এই সময় ঘরে এলেন। কী ব্যাপার কিছুই না জেনে, শুধু মারগটের মুখে ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভাব দেখেই উনি আমাকে নিয়ে পড়লেন—‘তোমার কোনো বইতে যদি মারগট হাত দিত, তাহলে তুমি কী বলতে আমি দেখতাম।‘ আমি কোনো আপত্তি করে তক্ষুনি বইটা নামিয়ে রেখে ঘর ছেড়ে চলে গেলাম–ওঁরা ভাবলেন, আমি অভিমান করেছি। যেটা হল, সেটা রাগও নয়, অভিমানও নয়–শুধু আমার খুব খারাপ লাগতে লাগল। কী নিয়ে গোলমাল সেটা না জেনে রায় দিয়ে দেওয়া বাবার এটা উচিত হয়নি। আমি বইটা নিজেই মারগটকে দিয়ে দিতাম, এবং ঢের তাড়াতাড়ি, মা-বাবা যদি এ ব্যাপারে নাক না গলাতেন। ওঁরা এসেই এমনভাবে মারগটের পক্ষ নিলেন যেন তার প্রতি এক মহা অপরাধ করা হয়েছে।

মা-মণি মারগটের পক্ষ নেবেন এটা বোঝাই যায়; উনি আর মারগট, ওঁরা দুজনে সব সময়ই পরস্পরকে সমর্থন করে চলেন। এটা আমার কাছে এমন ডালভাত হয়ে গেছে যে মার বকবকানি আর মারগটের মেজাজ এসব আমি একেবারেই গায়ে মাখি না।

আমি ওদের ভালবাসি, তার একমাত্র কারণ ওরা মা আর মারগট বলে। বাবার ব্যাপারটা একটু আলাদা। বাবা মারগটকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখালে, ওর কার্যকলাপ মঞ্জুর করলে, বাবা ওকে প্রশংসা আর আদর করলে আমার বুক ফেটে যায়, কেননা বাবাকে আমি মনে মনে পূজো করি। আমার ভরসা আমার বাবা। দুনিয়ায় বাবাকে ছাড়া আর কাউকে আমি ভালবাসি না। এটা বাবার নজরে পড়ে না যে, মারগটের সঙ্গে বাবা যে ব্যবহার করেন আমার সঙ্গে তা করেন না। মারগটের মত সুন্দর, মিষ্টি, রূপসী মেয়ে দুনিয়ায় দুটি নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি নিশ্চয় এটা দাবি করতে পারি যে, আমার দিকেও তাকানো হোক। বাড়িতে আমি হলাম সব সময়ই উজবুক, হাতে পায়ে জড়ানো; কিছু করলে সব সময়ই আমার হয়। দুনো খোয়ার, প্রথমে জোটে গালমন্দ এবং তারপর আবার আমার মনঃক্ষুণ্ণ হওয়ার ধরনের জান্যে। এই স্পষ্ট পক্ষপাত আর আমি বরদাস্ত করতে রাজী নই। আমি বাপির কাছ থেকে এমন কিছু চাই যা উনি আমাকে দিতে পারছেন না।

মারগটকে আমি হিংসে করি না, কখনই করিনি। ওর চোখমুখ ভালো, ও সুন্দর দেখতে–তার জন্যে আমার গা জ্বলে না। আমি শুধু উন্মুখ হয়ে থাকি বাপির সত্যিকার ভালবাসার জন্যে; শুধু তার সন্তান বলে নয়, আমি আনা হিসেবে।

আমি বাপিকে আঁকড়ে ধরি, কারণ শুধু তার ভেতর দিয়েই বাড়ির প্রতি আমার অবশিষ্ট টানটুকু আমি বাঁচিয়ে রাখতে পারি। বাপি বোঝেন না যে, মাঝে মাঝে মা-মণির ব্যাপারে আমার চাপা অভিমান প্রকাশ করার দরকার হয়। বাপি এ নিয়ে কথা বলতে নারাজ; শেষে মা-মণির ভুলত্রুটি নিয়ে কোনো মন্তব্য হয় এমন যে কোনো জিনিস বাপি স্রেফ এড়িয়ে চলেন। ঠিক তেমনি, আমি আর সব পারি কিন্তু মা-মণি এবং তার ভুলত্রুটিগুলো সহ্য করা আমার পক্ষে শক্ত হয়। এর সবটাই কিভাবে নিজের মনে চেপে রাখতে হয় আমি জানি না। মার জবরজং কাজ, বাঁকা বাঁকা কথা এবং তাঁর মিষ্টত্বের অভাব–সব সময় চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়; অন্য দিকে এটাও মানতে পারি না যে আমি যা করি তাতেই দোষ।

সব কিছুতেই আমরা একে অন্যের ঠিক বিপরীত; কাজেই আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যাব, এটা স্বাভাবিক। মা-মণির স্বভাবের ব্যাপারে আমি কোনো রায় দিচ্ছি না, সে বিচারে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি তাকে দেখছি শুধু মা হিসেবে এবং আমার কাছে সেদিক থেকে তিনি মোটেই সার্থক নন; আমাকে আমার নিজেরই মা হতে হবে। আমি ওদের সকলের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। আমি আমার নিজের কর্ণধার এবং পরে দেখা যাবে কোথায় তরী ভেড়াব। এ সব কথা ওঠে বিশেষ করে এই জন্যেই যে, নিখুত মা। আর সহধর্মিণী কি রকম হওয়া উচিত তার একটা ছবি আমার মানসপটে আঁকা আছে; যাকে আমি ‘মা’ বলতে বাধ্য, তার ভেতর ঘুণাক্ষরেও সে ছবির কোনো আদল দেখতে পাই না।

আমি সবসময় এই বলে মনকে বেঁধে নিই যে, মা-মণির কু-দৃষ্টান্তগুলোর দিকে আমি নজর দেব না। আমি মার শুধু ভালো দিকটাই দেখতে চাই এবং তার ভেতর যেটা না পাব সেটা আমি নিজের ভেতর খুঁজব। কিন্তু তাতে কাজ হয় না এবং এর ভেতর সবচেয়ে খারাপ জিনিস হল–বাপি না, মা-মণি না-ওঁরা কেউই আমার জীবনের এই ফঁাকটা দেখতে পান না এর জন্যে আমি ওঁদেরই দায়ী করি। কেউ কখনও তাদের সন্তানদের একেবারে পুরোপুরিভাবে খুশি করতে পারে বলে মনে হয় না।

মাঝে মাঝে আমি বিশ্বাস করি, ভগবান আমাকে বাজিয়ে দেখতে চান, যেমন এখন তেমনি এর পরেও আমাকে ভালো হতে হবে নিজের চেষ্টায়, কাউকে দেখে নয়, কারো সদুপদেশ শুনে নয়। তাহলে এরপর আমি আরও বেশি জোর পাব। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কে আর এই চিঠি পড়বে? নিজের কাছ থেকে ছাড়া দ্বিতীয় আর কার কাছ থেকেই বা আমার সান্ত্বনা মিলবে? প্রায়ই আমার সান্ত্বনার দরকার হয় বলে, অনেক সময়ই নিজেকে মনে হয় দুর্বল এবং নিজের ওপর অসন্তুষ্ট; আমার দোষত্রুটি বিস্তর। এটা আমি জানি এবং প্রত্যহ আমি আত্মন্নতির চেষ্টা করি, বার বার করি।

আমার রোগ তাড়ানোর প্রথাটা খুবই বিচিত্র। একদিন আনা হয় ভারি বুঝদার মেয়ে এবং তাকে সবজান্তা বলে মেনে নেওয়া হয় এবং পরের দিনই শুনি আনা একটা বোকা পাঠা, একেবারে গণ্ডমূর্খ এবং সে মনে করে বই পড়ে পড়ে ভারি দিগগজ হয়ে উঠেছে। আমি কচি খুকী নই, অথবা এখন আর আদরে-মাথা খাওয়াও নই যে, যাই কিছু করুক সে হবে হাসির পাত্র। কথায় প্রকাশ করে উঠতে না পারলেও আমার নিজস্ব মতামত, ছক এবং ভাবনাচিন্তা আছে। যখন আমি বিছানায় শুই আমার ভেতর কত কিছু যে টগবগ করে ফোটে যাদের সম্পর্কে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি, যারা সব সময় আমার মনোগত অভিপ্রায় ধরতে না পেরে তার কদৰ্থ করে, তাদেরই সঙ্গে আমাকে ওঠাবসা করতে হচ্ছে। সেইজন্যেই আমার শেষ আশ্রয়স্থল হয় আমার ডায়রি। আমার সূচনা আর পরিণতি সেখানেই, কেননা কিটি, সব সময় সহনশীল। আমি তাকে কথা দেব, আমি সব সত্বেও সমানে লেগে থাকব এবং এই সব কিছুর ভেতর দিয়ে আমার নিজস্ব পথ খুঁজে নেব এবং আমার চোখের পানি নীরবে গিলব। এরই মধ্যে যেন দেখতে পাই তাতে ফল হয়েছে অথবা যে আমাকে ভালোবাসে তেমন কারো কাছ থেকে যেন উৎসাহ পাই, এটাই আমার মনোগত বাসনা।

আমাকে দোষী সাব্যস্ত করো না; বরং মনে রেখো, কখনও কখনও আমিও ফেটে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছুতে পারি।

তোমার আনা

.

সোমবার, ৯ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল ছিল পেটারের জন্মদিন, ওর বয়স হল ষোল বছর। ও বেশ সুন্দর সুন্দর কিছু উপহার পেয়েছে। নানা জিনিসের মধ্যে রয়েছে একটা মনোপলি খেলা, একটা দাড়ি কামানোর ক্ষুর আর একটা লাইটার। ও যে খুব একটা সিগারেট খায় তা নয়; আসলে নিছক দেখানোর জন্যে।

সবচেয়ে তাক লাগানোর ব্যাপার এল মিস্টার ফান ডানের কাছ থেকে। বেলা একটার সময় তিনি ঘোষণা করলেন যে ব্রিটিশরা তুনিস, আলজিয়ার্স, কাসাব্লাঙ্কা আর ওরানে অবতরণ করেছে। প্রত্যেকে বলছিল, ‘এইবার শেষের শুরু’, কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল বোধ হয় ইংল্যাণ্ডে একই জিনিস শুনেছিলেন, তিনি বললেন, ‘এটা শেষ নয়। এমন কি এটা শেষেরও শুরু নয়। আসলে এটা বোধ হয় আরম্ভে শেষ।’ তফাতটা কি ধরতে পারছ? আশাবাদী হওয়ার রীতিমত কারণ আছে। রুশরা তিন মাস ধরে যে স্তালিনগ্রাদ শহরে সমানে। প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে, এখনও তা জার্মানদের হাতে চলে যায়নি।

আমাদের গোপন ডেরার প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। আমাদের খাবার জিনিসের যোগান সম্বন্ধে তোমাকে কিছুটা বলা দরকার। তুমি জানো, আমাদের ওপরতলায় কিছু আছে একেবারে সত্যিকার লুভিস্টি শুয়োর।

আমরা রুটি পাই কুপহুইসের বন্ধু এক চমৎকার রুটিওয়ালার কাছ থেকে। বাড়িতে থাকতে যতটা পেতাম, স্বভাবতই সেই পরিমাণ মেলে না। তবে ওতে আমাদের কুলিয়ে যায়। সেই সঙ্গে বেআইনীভাবে চারটে রেশন কার্ড কেনা হয়েছে। এই সব রেশন কার্ডের দাম দিন দিনই বাড়ছে। সাতাশ ফ্লোরিন থেকে বেড়ে এখন তার দাম হয়েছে তেত্রিশ ফ্লোরিন। তাও কী, না ছাপানো এক টুকরো কাগজের জন্যে।

কিছু খাবার বাড়িতে রেখে দেওয়ার জন্যে, ১৫০ টিন তরিতরকারি ছাড়াও, আমরা ২৭০ পাউন্ড শুকনো কড়াইশুটি আর বি কিনেছি। সবটাই আমাদের জন্যে নয়, তার কিছুটা অফিসের লোকদের জন্যে। আমাদের যাতায়াতের ছোট রাস্তায় (লুকানো দরজার ভেতরদিকে) বস্তায় করে জিনিসগুলো হুকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ভেতরের জিনিস খুব ভারী হওয়ায় তার চাপে বস্তার কিছু কিছু সেলাই ছিঁড়ে গিয়েছে।

কাজেই আমরা ঠিক করেছিলাম যে, শীতের জন্য রাখা মালগুলো চিলেকোঠায় রেখে দিলেই ভালো হয়। পেটারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ও যেন মালগুলো টেনে টেনে ওপরে তোলে।

ছটার মধ্যে পাঁচটা বস্তা অক্ষত অবস্থায় সে ওপরে তুলেছিল। ছয় নম্বর বস্তাটা যখন সে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল, তখন বস্তাটার তলা ফেলে যায়। ফলে, বেগুনে বিনগুলো ঝুর ঝুর করে না, একবারে যথার্থ মুষলধারে বেরিয়ে এসে সিঁড়িতে ঝম ঝম করে পড়তে লাগল। বস্তায় পঞ্চাশ পাউণ্ডের মত জিনিস ছিল এবং তার এত আওয়াজ যে, তাতে মরা মানুষও জেগে ওঠে।

নিচেরতলার লোকেরা ভাবল ঝরঝরে পুরনো বাড়িটা বুঝি তাদের মাথায় ভেঙে পড়ছে। (ভগবানের দয়ায় বাড়িতে তখন কোনো বাইরের লোক ছিল না) পেটার এক মুহূর্তের জন্য। ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই হাসতে হাসতে ওর পেট ফাটার যোগাড়, বিশেষ করে ও যখন দেখল সিঁড়ির নিচে আমি দাঁড়িয়ে আছি বিনের সমুদুরের মাঝখানে যেন ছোট্ট একটা দ্বীপ হয়ে। আমার গোড়ালি অব্দি বিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ডোবা।

তাড়াতাড়ি আমরা কুড়োতে শুরু করে দিলাম। কিন্তু বিনের দানা এত পিছল আর ছোট যে গড়িয়ে গড়িয়ে যেন সম্ভব অসম্ভব যত আনাচকানাচ আর গর্তে গিয়ে পড়ছিল। এখন হয়েছে কী, যখনই কেউ নিচে যায় এক দুবার হাঁটু মুড়ে নিচু হয়ে যাতে সে মিসেস ফান ডানকে একমুঠো করে বিন ভেট দিতে পারে।

আরেকটু হলে বলতে ভুলে যেতাম যে বাপি আবার বেশ ভালো হয়েছেন।

তোমার আনা

পুনশ্চ : এইমাত্র রেডিওতে খবর বলল যে, আলজিয়ার্সের পতন হয়েছে। মরোক্কো, কাসাব্লাঙ্কা আর ওরান বেশ কয়েকদিন ধরে ব্রিটিশের কব্জায়। এইবার তুনিসের পালা, আমরা তার অপেক্ষায় আছি।

.

মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

দারুণ খবর–আমরা আরেকজনকে আশ্রয় দিতে চলেছি, উনি এলে আমরা হব আটজন। হ্যাঁ, সত্যি। আমরা বরাবর ভেবেছি যে, আরও একজনের থাকার মতন আমাদের যথেষ্ট জায়গা আর খাবারদাবার আছে। আমাদের ভয় ছিল তাতে কুপহুইস আর ক্রালারের আরও কষ্ট বাড়বে। কিন্তু ইহুদীদের মর্মান্তিক দুর্দশার খবর এখন যে হারে বেড়ে চলেছে, তাতে যে দুজনের কথামত কাজ হবে বাপি তাদের ধরে বসেন এবং তারাও মনে করেন প্রস্তাবটা খুব ভালো। ওঁরা বলেছেন, সাতজনকে নিয়ে যে ভয়, আটজন হলেও সেই এই ভয়, খুব ঠিক কথা। কথা পাকা হওয়ার পর আমরা আমাদের বন্ধুবর্গের মধ্যে বাছাই করে কোন্ একজনকে নিলে আমাদের পরিবারের সঙ্গে ভালভাবে খাপ খাবে, এই নিয়ে আমরা ভাবনাচিন্তা করতে লেগে গেলাম। একজনের সম্বন্ধে মনস্থির করতে কোনো মুশকিল ছিল না। ফলে ডান পরিবারের আত্মীয়স্বজনদের বাপি যখন নাকচ করে দিলেন, তখন আমরা অ্যালবার্ট ডুসেল বলে এজন দাতের ডাক্তারকে মনোনীত করলাম। যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ভাগ্যক্রমে তার স্ত্রী ছিলেন দেশের বাইরে। খুব চুপচাপ ধরনের মানুষ বলে লোকে তাকে জানে। আমরা এবং মিস্টার ফান ডান তাকে যতটা জানি, তাতে দুই পরিবারেরই ধারণা–ভদ্রলোক নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। মিপ ওকে চেনেন। কাজেই ওঁকে এখানে আনার ব্যাপারে মি্প সব ব্যবস্থা করতে পারবেন। উনি এলে মারগটের জায়গায় আমার ঘরে এঁকে শুতে হবে, মারগট ঘুমোবে ক্যাম্পখাটে।

তোমার আনা

.

বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

মিপ্‌ যখন ডুসেলকে জানান যে তার জন্যে একটা গা ঢাকা দেওয়ার জায়গার ব্যবস্থা হয়েছে, ডুসেল বেজায় খুশি হন। মিপ্‌ ওঁকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসার জন্যে তাগাদা দেন। ভাগো হয় শনিবারে এলে। ডুসেল বলেন শনিবারেই চলে আসা বোধহয় সম্ভব হবে না, প্রথমত ওঁর কার্ডের সূচিপত্র হাল অবধি টেনে আনতে হবে, জনা দুয়েক রোগীকে দেখতে হবে এবং দেনাপাওনাগুলো মিটিয়ে ফেলতে হবে। মিপ্‌ আজ সকালে এসেছিলেন এই খবরটা দিতে। আমরা বলি যে, ওঁর দেরি করা উচিত হবে না। ওঁকে এভাবে গোছগাছ করে আসতে গেলে একগাদা লোকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তারা জেনে যাক এটা আমরা চাই না। মিপ্‌ ওঁকে জিজ্ঞেস করবেন শনিবারে কোনোমতে উনি চলে আসতে পারেন কিনা।

ডুসেল না বলেছেন, উনি জানিয়েছেন, সোমবারে আসবেন। এরকম একটা প্রস্তাবে তা সে যেরকমই হোক–কোথায় তিনি লাফিয়ে চলে আসবেন, তা নয়। আমার কাছে একটা এক রকমের পাগলামি বলে মনে হয়। বাইরে থাকা অবস্থায় ওঁকে যদি তুলে নিয়ে চলে যায়, তখন কি উনি আর ওঁর কার্ড সাজানো, দেনাপাওনা মেটানো, রোগী দেখা–এসব করতে পারবেন? তাহলে আর দেরি করা কেন আমার মনে হয় বাবা তাতে রাজী হয়ে বোকামি করেছেন। আর কোনো খবর নেই।

তোমার আনা

.

মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

ডুসেল এসে পৌঁচেছেন। সব ভালোভাবে চুকেছে। মিপ ওঁকে বলেছিলেন ডাকঘরের সামনে একটা বিশেষ জায়গায় ঠিক এগারোটার সময় এসে দাঁড়াতে, সেখানে একটি লোক ওঁর সঙ্গে দেখা করবে। ডুসেল একেবারে কাটায় কাটায় যথাসময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন। মিস্টার কুপহুইস–ডুসেল তারও পরিচিত–ওঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলেন, যে ভদ্রলোকের আসার কথা ছিল তিনি আসতে পারেননি। ডুসেল যেন সটান অফিসে চলে গিয়ে মিপের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর কুপহুইস ট্রামে উঠে অফিসে ফিরে আসেন, আর সেই একই দিকে ডুসেল হাঁটতে থাকেন। এগারোটা কুড়িতে অফিসে এসে ডুসেল দরজায় টোকা দিলেন। মিপ তাঁকে কোট খুলতে সাহায্য করলেন যাতে হলদে তারার চিহ্নটা না দেখা যায়। তারপর তাকে খাসকামরায় নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে ঘর পরিষ্কার করার মেয়েলোকটি থাকা অব্দি কুপহুইস এটা সেটা বলে তাকে ব্যস্ত রাখলেন। তারপর মিপ এসে, একটা কাজের জন্যে ঘরটা ছাড়তে হবে, এই রকমের ভাব দেখিয়ে ডুসেলকে ওপরে নিয়ে গেলেন। ওপরে গিয়ে মিপ ঝোলানো আলমারিটা ঠেলে চোখের সামনে ভেতরে ঢুকে পড়তে দেখে। ডুসেল একেবারে হতভম্ব।

আমরা সবাই ওপরতলায় টেবিলে গোল হয়ে বসে কফি আর কনিয়াক নিয়ে অপেক্ষা করছি, নবাগতকে অথ্যর্থনা জানাব। মিপ ওঁকে প্রথমে আমাদের বৈঠকখানাটা দেখালেন। উনি আমাদের আসবাবপত্র দেখেই চিনতে পারলেন এবং উনি ঘুণাক্ষরেও জানতেন না যে আমরা এখানে রয়েছি, ওঁর ঠিক মাথার ওপর। মিপ যখন ওঁকে খবরটা দিলেন তখন উনি প্রায় মূৰ্ছা যাওয়ার উপক্রম হলেন। ভাগ্যিস্ মিপ ওঁকে বেশি সময় না দিয়ে সটান ওপরতলায় নিয়ে তুললেন।

ডুসেল ধপাস করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে নির্বাক হয়ে বেশ খানিকক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন গোড়ায় উনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। খানিকক্ষন পরে তোলাতে ভোলাতে বললেন, কিন্তু…আবার, সিন্দ…তোমরা তাহলে বেলজিয়ামে নয়? ইশট ডের মিলিটার নিশট কাম, ডাস আউটো….তোমরা তাহলে পালাতে গিয়ে পালাতে পারোনি?

আমরা ওঁকে সব পরিষ্কার করে বললাম সৈন্যদের আর গাড়ির গল্পটা ইচ্ছে করেই রটানো হয়েছিল যাতে লোকে, বিশেষ করে জার্মানরা আমাদের খোঁজে এলে ভুল ধারণা করে।

এতটা বুদ্ধি খাটানো হয়েছে দেখে ডুসেল আবার হাঁ হয়ে গেলেন। এরপর যখন আমাদের দারুণ বাস্তববুদ্ধির পরিচায়ক অতি সুন্দর এই ছোট্ট ‘গুপ্ত মহল’টা ঘুরে ঘুরে দেখলেন, তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া তার আর কিছু করার রইল না।

দুপুরের খাওয়া আমরা সবাই একসঙ্গে বসে খেলাম। তারপর উনি খানিকটা ঘুমিয়ে নিয়ে আমাদের সঙ্গে চা খেয়ে নিলেন। তারপর ওঁর জিনিসপত্রগুলো (মিপ আগেই এনে রেখেছিলেন) খানিকটা গোছগাছ করলেন। ততক্ষণে উনি এটাকে অনেকটা নিজের বাড়ি বলে মনে করতে আরম্ভ করেছেন। বিশেষ করে নিচের টাইপ করা একখানা গুপ্তমহলের নিয়মকানুন’ (ফান ডানের করা) উনি হাতে পেলেন।

‘গুপ্ত মহলের ছক ও সহায়িকা’

ইহুদী ও ঐ জাতীয় লোকদের সাময়িক বসবাসের জন্যে বিশেষ সংস্থা।

বছরের বারোমাসই খোলা থাকে। সুন্দর, শান্ত, জঙ্গলমুক্ত পরিবেশ, আমস্টার্ডামের একেবারে কেন্দ্রস্থলে। ১৩ আর ১৭ নম্বর ট্রামের রাস্তায়, গাড়িতে অথবা সাইকেলেও আসা। যায়। বিশেষ ক্ষেত্রে পায়ে হেঁটেও আসা যায়, যদি জার্মানরা যানবাহনে চড়া নিষিদ্ধ করে।

থাকা খাওয়া ও বিনামূল্যে।

বিশেষ রকমের চর্বিমুক্ত খাবার।

সব সময় পানি পাওয়া যাবে বাথরুমে (হায়, গোসলের ব্যবস্থা নেই) এবং বিভিন্ন ভেতর বাইরের দেয়ালের গায়ে।

প্রচুর গুদামঘর আছে সব রকমের মাল রাখার জন্যে।

নিজস্ব বেতার কেন্দ্র, লন্ডন, নিউইয়র্ক, তেল আবিব এবং আরও বিস্তর বেতারঘাটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। সন্ধ্যে ছ’টার পর কেবল এখানকার বাসিন্দারা ব্যবহার করতে পারবেন। কোনো রেডিও স্টেশনই নিষিদ্ধ নয়, এটা ধরে নিয়ে যে কেবল বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রেই জার্মান স্টেশন শোনা যাবে, যেমন চিরায়ত সঙ্গীত ইত্যাদির জন্যে।

বিশ্রামের সময় : রাত ১০টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। রবিবারে সওয়া ১০টা। পরিচালকদের নির্দেশ অনুসারে, অবস্থা অনুকূল হলে, বাসিন্দারা দিনের বেলায় বিশ্রাম নিতে পারবেন। সাধারণের নিরাপত্তার জন্যে বিশ্রামের সময়কাল অক্ষরে অক্ষরে অবশ্যই মেনে চলতে হবে।

ছুটিছাটা (ঘরের বাইরে) : অনির্দিষ্টকালের জন্যে স্থগিত রইল। বাক-ব্যবহার ও সমস্ত সময় নিচু গলায় কথা বলবেন, এটা আদেশ। সমস্ত সভ্য ভাষা ব্যবহার করা যাবে, সুতরাং জার্মন ভাষা চলবে না।

অনুশীলন ও প্রতি সপ্তাহে একটি করে শর্টহ্যাণ্ড লেখার ক্লাস। অন্য সমস্ত সময়ে ইংরেজি, ফরাসী, গণিত এবং ইতিহাস।

ছোটোখাটো পোষা জীব-বিশেষ বিভাগ (অনুমতিপত্র লাগবে) ও ভালো ব্যবহার মিলবে (উকুন মশা মাছি ইত্যাদি বাদে)।

আহারের সময় : রবিবার এবং ব্যাংকের ছুটির দিন বাদে রোজ সকাল ৯টায় প্রাতরাশ। রবিবার এবং ব্যাংকের ছুটির দিনগুলোতে আনুমানিক সাড়ে ১১টায়।

দুপুরের খাওয়া (খুব এলাহি নয়) ও সওয়া ১টা থেকে পৌনে দুটোর মধ্যে।

নৈশভোজ ঠাণ্ডা এবং/অথবা গরম ও কোনো বাঁধাধরা সময় নেই (বেতারে খবর বলার ওপর নির্ভর করবে)।

কর্তব্য কর্ম : বাসিন্দারা সমস্ত সময় অফিসের কাজে সাহায্য করার জন্যে তৈরি থাকবেন।

গোসল ও রবিবার সকাল ৯টা থেকে সমস্ত বাসিন্দা পানির টব পেতে পারবেন। পায়খানা, রান্নাঘর, অফিসের খাসকামরা অথবা সদর দপ্তর, যার যেটা ইচ্ছে, পেতে পারেন।

মদ্য জাতীয় পানীয় ও একমাত্র ডাক্তারের পরামর্শে।

সমাপ্ত

তোমার আনা।

.

বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

ডুসেল অতি চমৎকার মানুষ, ঠিক যেমনটি আমরা মনে মনে ভেবেছিলাম। আমার ছোট্ট ঘরটাতে ভাগযোগ করে থাকতে ওঁর কোনোই আপত্তি হয়নি।

সত্যিকথা বলতে গেলে, বাইরের একজন লোক আমার জিনিসপত্র ব্যবহার করবেন এ ব্যাপারে আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু একটা ভালো কাজে কিছুটা আত্মত্যাগ তো করতেই হয়; সুতরাং আমি ভালো মনেই আমার এইটুকু স্বার্থ জলাঞ্জলি দেব। বাপি বলেন, আমরা যদি কাউকে বাঁচাতে পারি, তার কাছে আর সব গৌণ এবং তাঁর একথা যথার্থ।

ডুসেল যেদিন এখানে প্রথম এলেন, এসেই আমার্কে, রাজ্যের প্রশ্ন করেছিলেন ঘর পরিষ্কার করার মেয়েলোকটি কখন আসে? বাথরুমটা কখন ব্যবহার করা যায়? পায়খানায় যাওয়া যেতে পারে কোন্ সময়? শুনে তোমার হাসি পাবে, কিন্তু অজ্ঞাতবাসের জায়গায় এই বিষয়গুলো অত সহজ সরল নয়। দিনের বেলায় আমাদের এমন আওয়াজ করা যাবে না যা নিচে থেকে শোনা যেতে পারে। আর যদি বাইরের কোনো লোক থাকে–যেমন ঘর পরিষ্কার করার মেয়েলোকটি–তাহলে আমাদের অতিরিক্ত সাবধান হতে হবে। আমি এ সমস্তই ডুসেলকে ভেঙে খোলসা করে বললাম। কিন্তু একটা জিনিস আমাকে অবাক করল কথাগুলো ভদ্রলোকের মাথায় ঢুকতে বড়ড সময় লাগে। একই জিনিস তিনি দুবার করে জিজ্ঞেস করেন এবং তাও মনে রাখতে পারেন বলে মনে হয় না। হয়ত সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে এবং এটা হয়েছে শুধু হঠাৎ ঠাঁইবদলের জন্যে উনি সম্পূর্ণ ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছেন। বলে। নইলে আর সবাই ঠিকঠাক চলছে।

বাইরের জগৎকে আমরা হারিয়েছি আজ কম দিন হল না; ডুসেল এসে সেখানকার সম্বন্ধে অনেক কথা বললেন। তিনি যা বললেন তাতে বোঝা গেল খবর খুবই খারাপ। অসংখ্য বন্ধুবান্ধব এবং চেনা মানুষ নিদারুণ অদৃষ্টের ফেরে পড়েছে। দিনের পর দিন সন্ধ্যে হলেই সবুজ আর পশুটে মিলিটারি লরি পাশ দিয়ে টিকিয়ে টিকিয়ে যায়। প্রত্যেক সদর দরজায় এসে জার্মনরা খোঁজ করে সে-বাড়িতে কোনো ইহুদী বাস করে কিনা। থাকলে তক্ষুনি পরিবারকে পরিবার উঠিয়ে নিয়ে যাবে। কাউকে না পেলে তখন পরের বাড়িতে যাবে। গা-ঢাকা দিতে না পারলে তাদের হাত থেকে কারো পরিত্রাণ নেই। অনেক সময় তারা নামের তালিকা নিয়ে ঘোরে এবং তখনই দরজায় বেল্ টেপে যখন জানে যে বেশ বড় ঝাক পাওয়া যাবে। কখনও কখনও তারা নগদ টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়–মাথা পিছু এক কাড়ি করে টাকা। আগেকার কালের ক্রীতদাস-খেদায় যাওয়ার মতন। মোটেই হাসির কথা নয়; অত্যন্ত হৃদয়বিদারক সব ব্যাপার। আমি প্রায়ই দেখতে পাই সার সার হেঁটে চলেছে ভালো, নিরীহ মানুষ; সঙ্গের ছেলেপুলেগুলো কাঁদছে; ভারপ্রাপ্ত জন দুই সেপাই তাদের মুখ-নাড়া দিচ্ছে আর মাথায় মারছে যতক্ষণ না তারা মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার মত হয়। বুড়ো, বাচ্চা, পোয়াতী, রুগ্ন, অথর্ব ছাড়াছাড়ি নেই। জনে জনে সবাইকে যেতে হবে মৃত্যুর মিছিলে।

এখানে আমরা কত ভাগ্যবান। কি রকম তোফা আরামে আছি, কোনো ঝামেলা ঝাট নেই। এই সব দুঃখ কষ্ট নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা থাকত না যদি সেইমত প্রিয়জনদের সম্বন্ধে আমরা উতলা বোধ না করতাম যাদের আমরা আজ আর সাহায্য করার অবস্থায়

যখন কিনা আমার প্রিয়তম বন্ধুদের মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা এই শীতের রাত্রে তারা হয়ত কোনো খানাখন্দে পড়ে রয়েছে তখন উষ্ণ বিছানায় শুয়ে আমার নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়। আমার সেই সব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যাদের এখন দুনিয়ার নিষ্ঠুরতম জানোয়ারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাদের কথা মনে হলে আমি বিভীষিকা দেখি। আর এ সবই ঘটছে তারা ইহুদী হওয়ার জন্যে।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি, এসব কি ভাবে যে গ্রহন করব সত্যিই আমরা ভেবে পাচ্ছি না। ইহুদীদের সংক্রান্ত খবর প্রকৃতপক্ষে এতদিন আমাদের কানে এসে পৌঁছায়নি, এখন আসছে। আমরা ভেবেছিলাম যত দূর সম্ভব হেসেখেলে কাটানোই ভালো। মিপ এসে যখন বলে ফেলেন আমাদের কোন বন্ধুর কী হয়েছে, আমার মা-মণি আর মিসেস ফান ডান থেকে থেকে কান্না জুড়ে দেন। সেই জন্যে মিপ আর আমাদের কানে এসব তুলবেন না ঠিক করেছেন। কিন্তু আসা মাত্র চারদিক থেকে প্রশ্নবাণ ডুসেলকে জর্জরিত করা হল। এবং তিনি যে সব কাহিনী বললেন তা এতই নৃশংস আর নিদারুণ যে শোনার পর সারাক্ষণ মনের মধ্যে খচখচ করতে থাকে।

বস্তুত এই বিভীষিকা যখন আমাদের মনের মধ্যে ফিকে হয়ে আসবে, আবার আমরা ঠাট্টামস্করা করব, আবার আমরা এ ওর পেচনে লাগব। এখন আমরা যে রকম মন-খারাপ করে রয়েছি সেইভাবে থাকলে আমাদেরও তাতে ফল ভালো হবে না, বাইরে যারা আছে তাদেরও কোনো উপকারে আমরা আসব না। আমাদের গুপ্ত মহলকে ‘হতাশার গুপ্ত মহল’ করে তুলে কোন্ উদ্দেশ্য চরিতার্থ হবে? আমি যাই করি না কেন, আমাকে কি অষ্টপ্রহর শুধু ঐ ওদের কথাই ভেবে যেতে হবে? কোনো ব্যাপারে আমার হাসতে ইচ্ছে করলে কি তাড়াতাড়ি আমাকে হাসি চাপতে হবে এবং উফুল্ল হওয়ার জন্যে আমাকে লজ্জা পেতে হবে? তবে কি আমায় দিনভর কেঁদে যেতে হবে? না, আমি তা পারব না। তাছাড়া সময়ে এই বিবাদ ঘুচে যাবে।

এই দুঃখকষ্টের সঙ্গে এসে জুটেছে আরও একটা যা পুরোপুরি আমার ব্যক্তিগত; যেমন মরা অবস্থার কথা এখুনি তোমাকে বললাম তার পাশে আমার দুঃখটা কিছুই নয়। তবু তোমাকে না বলে পারছি না যে, ইদানীং আমার কেন যেন মনে হচ্ছে সবাই আমাকে ত্যাগ করেছে। আমার চারপাশে যেন এক দুস্তর শূন্যতা। আগে কখনও আমার এরকম অনুভূতি হত না। আমার হাসি-খেলা, আমার মজা আনন্দ আর আমার মেয়ে বন্ধুরা–এই সবই আমার ভাবনা সম্পূর্ণ ভাবে জুড়ে রাখত। এখন আমি হয় দুঃখের জিনিসগুলো নিয়ে কিংবা নিজের কথা ভাবি। বাবা আমার খুব প্রিয় হলেও, শেষ অব্দি এখন আমি আবিষ্কার করেছি যে, আমার বাপি এখনও আমার ফেলে আসা দিনগুলোর যে ছোট্ট জগৎ তার পুরোটা জুড়ে বসতে পারেন না। কিন্তু এইসব আজেবাজে ব্যাপার নিয়ে তোমাকে জ্বালানোর কোনো মানে হয়? কিটি, আমি খুবই অকৃতজ্ঞ; আমি তা জানি। কিন্তু আমার ওপর যদি বেশি লাফাই-ঝাপাই হয় তাহলে অনেক সময় আমার মাথার মধ্যে ভো ভো করতে থাকে এবং তার ওপর আবার যদি অতসব দুঃখকষ্টের কথা ভাবতে হয় তাহলেই তো গিয়েছি।

তোমার আনা

.

শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আমরা আমাদের বরাদ্দের চেয়ে অনেক বেশি বিজলি খরচ করে ফেলেছি। ফলত, যতদূর সম্ভব খরচ বাঁচানো এবং ইলেকট্রিক কেটে দেওয়ার আশঙ্কা। পনেরো দিন বিন আলোয়; অবস্থাটা ভাবতে পারো? তবে কে জানে, শেষ পর্যন্ত হয়ত সেটা ঘটবে না! আমরা যত রকমের খামখেয়ালি করে সময় কাটাচ্ছি। বাধা জিজ্ঞেস করা, অন্ধকারে ব্যায়াম-চর্চা, ইংরেজিতে ফরাসীতে কথা বলা, বইয়ের সমালোচনা করা। কিন্তু শেষমেশ এ সবই কেমন যেন ভোতা হয়ে যায়। কাল সন্ধ্যেবেলায় আমি একটা নতুন জিনিস আবিষ্কার করেছি; একজোড়া জোরালো দূরবীনের কাঁচের ভেতর দিয়ে পেছনের বাড়িগুলোর আলো-জ্বালা ঘরগুলোতে উকি দিয়ে দেখা! দিনের বেলায় আমাদের পর্দায় একচুল ফাঁক হতে আমরা দিই না, কিন্তু রাতের বেলায় সেটা হলে কোনো ভয় নেই। পাড়াপড়শিরা যে এত মজার মানুষ। হয় এর আগে আমি জানতাম না। সে যাই হোক, আমাদের প্রতিবেশীরা তাই। আমি দেখতে পেলাম এক ঘরে স্বামী-স্ত্রী খেতে বসেছে; একটি বাড়ির লোকজনেরা ঘরে সিনেমা দেখার সরঞ্জাম সাজাচ্ছে। উল্টো দিকের বাড়িতে একজন দাতের ডাক্তার এক বুড়ি মহিলাকে দেখছেন, তিনি তো ভয়ে কাঠ।

সব সময়ে বলা হত যে, মিস্টার ডুসেল নাকি ছেলেপুলেদের সঙ্গে খুব মিশতে পারেন এবং তাদের সবাইকে তিনি ভালবাসেন। এখন তার আসল রূপ ধরা পড়ে গেছে, উনি এক রসকষহীন, সেকেলে নিয়মনিষ্ঠ লোক এবং আদবকায়দার ব্যাপারে লম্বা-চওড়া বুকনি ঝাড়তে ওস্তাদ।

আমি যেহেতু আমার শোবার ঘর–হায় রে, ছোট্ট একটু–শ্রীমৎ মহাপ্রভুর সঙ্গে ভাগযোগ করে থাকার অমূল্য সৌভাগ্যের (!) অধিকারী এবং তিনজন কমবয়সীর মধ্যে সবাই যেহেতু আমাকেই সবচেয়ে বে-আদব বলে গণ্য করে, সেইহেতু আমাকে প্রচুর ভুগতে হয় এবং একঘেয়ে বস্তাপচা বাক্যযন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্যে আমাকে কালা সাজতে হয়। এ সবও সয়ে যেত, ভদ্রলোক যদি ভীষণ কুচুটে প্রকৃতির না হতেন এবং অন্য সবাই থাকতে সব সময় মা-মণির কানে গুজুর-গুজুর ফুসুর-ফুসুর না করতেন। একচোট ওঁর কাছ থেকে হুড়ো খাওয়ার পর নতুন পালা শুরু হয় মা-মণির কাছ থেকে, সুতরাং আগুপিছু দুদিক থেকেই আমাকে ঝাড় খেতে হয়। তারপর আমার কপাল যদি ভালো হয়, তাহলে মিসেস ফান ডানের কাছে আমার ডাক পড়ে জবাবদিহি করার জন্যে এবং তখন একেবারে তুফান। বয়ে যায়।

সত্যি বলছি, পালিয়ে-থাকা অতিরিক্ত খুঁত-কাড়া একটি পরিবারের মানুষ-না-হয়ে ওঠা চোখের-কাটা হওয়াটা ভেবো না সহজ ব্যাপার। রাত্তিরে যখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমার ওপর আরোপ-করা রাজ্যের অপরাধ আর দোষত্রুটির কথা মনে মনে ভাবি, আমার কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে যায়, হয় আমি হাসি নয় কাদি; কখন কি রকম মেজাজ তার ওপর সেটা নির্ভর করে।

আমি যেমন তা থেকে অথবা আমি যা হতে চাই তা থেকে ভিন্ন কিছু হওয়ার একটা ভোতা চাপা বাসনা নিয়ে তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি; আমি যেভাবে চলতে চাই কিংবা আমি যে ভাবে আচরণ করি হয়ত তার থেকে ভিন্ন কোনো আচরণ। হা ভগবান, এবার তোমাকেও আমি গুলিয়ে দিচ্ছি। মাপ করো, লিখে ফেলে সেটাকে আমি কাটতে চাই না এবং কাগজের এই অভাবের দিনে আমি কাগজ ফেলে দিতে পারব না। সুতরাং তোমাকে আমি শুধু এই পরামর্শই দিতে পারি যে, শেষের বাক্যটা তুমি যেন ফিরে পড়ো না, এবং কোনোক্রমেই ওর অর্থোদ্ধারের চেষ্টা করো না, কেন না চেষ্টা করেও তুমি তা পারবে না।

তোমার আনা

.

সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি চানুকা আর সেন্ট নিকোলাস এ বছর প্রায় একই সময়ে পড়েছে মাত্র একদিন আগে পরে। চানুকা নিয়ে আমরা কোনো হৈচৈ করিনি। আমরা শুধু পরস্পরকে দিয়েছি টুকিটাকি উপহার এবং সেই সঙ্গে মোমবাতি জ্বালানো। মোমবাতির অভাবের জন্যে আমরা শুধু দশ মিনিটের জন্যে বাতিগুলো জ্বেলে রেখেছিলাম। গান থাকলে ওতে কিছু যায় আসে না। মিস্টার ফান ডান একটা কাঠের বাতিদান বানিয়েছেন, সুতরাং সবদিক থেকে তাতেও সুব্যবস্থা হয়েছে।

শনিবার, সেন্ট নিকোলাস দিবসের সন্ধ্যেটা অনেক বেশি মজাদার হয়েছিল। মিপ্‌ আর এলিকে সব সময়ে বাপির কানে কানে ফিসফিস করে বলতে দেখে আমাদের খুব কৌতূহলের উদ্রেক হয়েছিল, স্বভাবতই আমরা আন্দাজ করেছিলাম কিছু একটা জিনিস আছে।

হ্যাঁ, যা ভেবেছিলাম তাই। রাত আটটার সময় কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সার বেঁধে নেমে ঘুটঘুটে অন্ধকারে গলির ভেতর দিয়ে এসে (আমার গা-ছমছম করছিল এবং মনে মনে চাইছিলাম যেন নিরাপদে ওপরতলায় ফিরে যেতে পারি) ছোট্ট ঘুপচি ঘরটাতে জমা হলাম। কোনো জানালা না থাকায় সেখানে আমরা আলো জ্বালাতে পারি। আলো জ্বলে উঠতে বাপি বড় আলমারির ঢাকনাটা খুলে দিলেন। ‘ওঃ, কী সুন্দর’ বলে সবাই চেঁচিয়ে উঠল। এক কোণে সেন্ট নিকালাসের কাগজে সাজানো একটা বড় বেতের ঝুড়ি আর তার ওপর ছিল কৃষ্ণ-পেটারের একটা মুখোশ।

তাড়াতাড়ি ঝুড়িটা নিয়ে আমরা ওপরে চলে গেলাম। তাতে ছিল প্রত্যেকের জন্যে একটা করে সুন্দর ছোট্ট উপহার, তাতে গাঁথা একটা করে লাগসই কবিতা। আমি পেলাম একটা ডল পুতুল, তার স্কার্টটা হল টুকরো-টাকরা জিনিস রাখার থলি। বাবা পেলেন বই রাখার ধরুনি এবং ইত্যাকার সব জিনিস। যাই হোক, মাথা থেকে ভালো জিনিস বেরিয়েছিল। যেহেতু আমরা কেউই সেন্ট নিকোলাসের দিন আগে কখনও পালন করিনি, আমাদের হাতেখড়িটা ভালোই হল।

তোমার আনা

.

বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

মিস্টার ফান ডান আগে ছিলেন মাংস, সসেজ আর মশলার কারবারে। এই পেশা ওঁর জানা ছিল বলে ওঁকে বাবার ব্যবসায় নিয়ে নেওয়া হয়। এখন উনি ওঁর সসেজগত দিকের পরিচয় দিচ্ছেন, যেটা আমাদের পক্ষে মোটেই অপ্রীতিকর নয়।

এ দুর্দিনে পড়তে হতে পারে এই ভেবে আমরা প্রচুর মাংস কিনে রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম (অবশ্যই ঘুষ দিয়ে)। দেখতে বেশ মজা লাগে, প্রথমে কিভাবে মাংসের টুকরোগুলো কিমা করার যন্ত্রের ভেতর দিয়ে দুবারে বা তিনবারে যায়, তারপর কিভাবে সঙ্গের মালমশলাগুলো কিমায় মেশানো হয়, এবং তারপর সসেজ তৈরির জন্যে নাড়িভূঁড়ির ভেতর কিভাবে নল দিয়ে তা ভর্তি করা হয়। সসেজের মাংস ভেজে নিয়ে সেদিন রাতে আমরা বাঁধাকপির চাটনির সঙ্গে টাকনা দিয়ে খেলাম, কেননা গোল্ডারল্যাণ্ড সসেজ খেতে হলে আগে খটখটে শুকনো করে নিতে হয়। সেই কারণে মটুকার সঙ্গে সুতো দিয়ে লাঠি বেঁধে তাতে সসেজগুলো আমরা টাঙিয়ে দিলাম। ঘরে ঢুকতে গিয়ে এক ঝলক সার-বাধা সসেজ ঝুলে থাকতে দেখে প্রত্যেকেই হেসে কুটোপাটি হচ্ছিল। সেগুলো সাংঘাতিক মজাদার দেখাচ্ছিল।

ঘরের মধ্যে সে এক দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। মিস্টার ফান ডান তাঁর বপুতে (তাকে দেখাচ্ছিল আরও বেশি মোটা) তার স্ত্রীর একটা অ্যাপ্রন চড়িয়ে মাংস কুটতে ব্যস্ত। রক্তমাখা দুটো হাত, লাল মুখ আর নোংরা আনে তাকে ঠিক কশাইয়ের মত দেখাচ্ছিল। মিসেস ফান ডান একসঙ্গে সব কাজ সারতে চাইছিলেন, একটা বই পড়ে পড়ে ডাচ ভাষা শেখা, সুপের মধ্যে খুন্তি নাড়া, মাংস কিভাবে বানানো হচ্ছে তা দেখা, দীর্ঘশ্বাস ফেলা এবং তার পাজরে চোট লাগা নিয়ে নাকে কাঁদা। যেসব বুড়ি ভদ্রমহিলারা (!) চ্যাটালো পাছা কমাবার জন্যে ঐসব বোকামিপূর্ণ শরীরচর্চা করেন তাঁদের ঐ রকমই দশা হয়।

ডুসেলের একটা চোখ ফুলেছে। আগুনের পাশে বসে ক্যানোনিল ফোঁটানো পানি দিয়ে উনি চোখে সেঁক দিচ্ছেন। জানালা গলে আসা একফালি রোদূরে চেয়ার টেনে নিয়ে বসা পিকে অনবরত এদিক-ওদিক করতে হচ্ছিল। তাছাড়া আমার ধারণা ওর বাতের ব্যাথাটা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। কেননা মুখে একটা কাতর ভাব নিয়ে উনি পুঁটুলি পাকিয়ে বসে মিস্টার ফান ডানের কাজ করা দেখছিলেন। তাকে দেখাচ্ছিল ঠিক বৃদ্ধাশ্রমে থাকা একজন কুঁকড়ে যাওয়া বুড়োর মত। পেটার তার বেড়ালটা নিয়ে ঘরময় খেলার কসরত করে বেড়াচ্ছিল। মা-মণি, মারগট আর আমি আলুর খোসা ছাড়াচ্ছিলাম। মিস্টার ফান ডানের দিকে নজর পড়ে থাকায় আমরা সকলে অবশ্য অনেক ভুলভাল করে ফেলছিলাম।

ডুসেল তার দাঁতের ডাক্তারি শুরু করেছেন। মজার ব্যাপার বলে আমি তাঁর প্রথম রুগীটির বিষয়ে বলব। মা-মণি ইস্ত্রি করছিলেন এবং মিসেস ফান ডানকেই প্রথম অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। ঘরের মাঝখানে রাখা একটা চেয়ারে গিয়ে উনি তো বসলেন। ডুসেল বেজায় গম্ভীর মুখ করে তার ব্যাগ খুলে জিনিসপত্র বের করতে লাগলেন। বীজাণুনাশক হিসেবে খানিকটা ওডিকোলন আর মোমের বদলে ভেজলিন চেয়ে নিলেন।

মিসেস ফন ডানের মুখের ভেতর তাকিয়ে উনি দুটো দাঁত পেলেন যা ছোঁয়া মাত্র মিসেস ফান ভান এমন কুঁকড়ে-মুকড়ে গেলেন যেন এখুনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন আর সেই সঙ্গে ব্যথায় আবোলতাবোল আওয়াজ করতে থাকলেন। লম্বা পরীক্ষার পর (মিসেস ফান ডানের ক্ষেত্রে, বাস্তবে কিন্তু দুই মিনিটের বেশি সময় লাগেনি) ডুসেল একটি গর্ত খুঁড়তে শুরু করে দিলেন। কিন্তু করবে কার বাপের বাধ্যি রোগিণী এমন ভাবে ডানে-বামে হাত পা ছুঁড়তে শুরু করে দিলেন যে–একটা পর্যায়ে গিয়ে ডুসেলকে তার হাতের কুরুনি ছেড়ে দিতে হল–সেটা বিধে রইল মিসেস ফান ডানের দাঁতে।

তারপর আগুনে সত্যিকার ঘৃতাহুতি পড়ল। ভদ্রমহিলা চেঁচাতে লাগলেন (অমন একটা যন্ত্র মুখে নিয়ে যতটা চেঁচানো যায়), হাত দিয়ে যন্ত্রটা মুখ থেকে টেনে বের করতে চেষ্টা করলেন। তাতে হিতে বিপরীত হল। আরও সেটা ঢুকে বসে গেল। মিস্টার ডুসেল তার হাত দুটো দুই পাশে সেঁটে চুপচাপ থেকে প্রহসনটুকু দেখতে লাগলেন। বাকি দর্শকের দল আর থাকতে না পেরে হাসিতে ফেটে পড়ল। কাজটা খারাপ করেছি, কেননা নিজের কথা বলতে পারি, আমার উচিত ছিল আরও জোরসে হেসে ওঠা। অনেকবার এপাশ ওপাশ করে, পা ছুঁড়ে, চেঁচামেচি করে এবং বাচাও বাঁচাও বলে শেষ অবধি যন্ত্রটা উনি টেনেটুনে বের করলেন এবং যেন কিছুই হয়নি এমনিভাব করে তার কাজ চালিয়ে গেলেন।

জিনিসটা উনি এমন চটপট করে ফেললেন যে মিসেস ফান ডান কোনো নতুন ফিকির করার আর সুযোগ পেলেন না। তবে ডুসেল তাঁর জীবনে কখনও এতটা পরের সাহায্য পাননি। দুজন সাকরেদ তার খুব কাজে লেগেছিল। ফান ডান আর আমি আমাদের কর্তব্যকর্ম ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলাম। কর্মরত একজন হাতুড়ে’–এই নামের মধ্যযুগের কোনো ছবির মত দৃশ্যটা দেখাচ্ছিল। ইতিমধ্যে অবশ্য রোগিণীটি ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলেন; তার সুপ আর তার খাবারে তাকে নজর রাখতে হবে। একটা বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ভবিষ্যতে আর কখনও ডাক্তারের হাতে নিজেকে সঁপে দেবার মতন এমন তাড়া। তাঁর কদাচ থাকবে না।

তোমার আনা।

.

রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি, সদর দপ্তরে আরামে বসে পর্দার ফাঁকটুকু দিয়ে বাইরেটা দেখছি। পড়ন্ত বেলা, তবু তোমাকে লেখার মত আলো এখনও রয়েছে।

লোকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে, এ এক ভারি অদ্ভুত দৃশ্য; সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে যেন পেছনে ষাঁড়ে তাড়া করেছে এবং এখুনি সবাই হোঁচট খেয়ে পড়বে। সাইকেল চালিয়ে এখন যারা যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে তাল রেখে চলা অসম্ভব। আমি এমন কি দেখতেও পাচ্ছি না সাইকেল চড়ে যে যাচ্ছে সে কে।

এ পাড়ার লোকজনদের দিকে খুব একটা তাকাতে ইচ্ছে করে না। বিশেষ করে বাচ্চার দল এত নোংরা হয়ে থাকে যে তাদের ছুতে ঘেন্না হয়। নাক দিয়ে পেটা গড়ানো একেবারে বস্তির বাচ্চা। ওদের একটা কথাও আমি শুনলে বুঝব না।

কাল আমি আর মারগট এখানে গোসল করার সময় আমি বলেছিলাম, ‘হেঁটে যাচ্ছে যে বাচ্চারা, ধর, আমরা যদি ওদের এক-একটাকে একটা মাছ ধরার ছিপ দিয়ে টেনে তুলে প্রত্যেককে গোসল করিয়ে দিই, ওদের কাপড়চোপড় কেচে দিই, ফুটোফাটা সেলাই করে দিই, এবং তারপর আবার ওদের ছেড়ে দিই, তাহলে…।’ মারগট আমাকে শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠল, কালই আবার দেখবি ওরা আগের মতই যে-কে সেই নোংরা এবং গায়ে শতছিন্ন কাপড়-জামা।

আমি কী আজে-বাজে বকছি। এসব বাদেও দেখার অনেক কিছু আছে–মোটরগাড়ি, নৌকো আর বৃষ্টি। আমার বিশেষ করে পছন্দ চলন্ত ট্রামের ক্যাচর-ক্যাচর আওয়াজ।

আমাদের যেমন কোনো বৈচিত্র্য নেই, আমাদের ভাবনাচিন্তারও সেই একই দশা। ঘুরে ঘুরে ক্রমাগত সেই একই জায়গায় আমরা এসে হাজির হই–সেই ইহুদী থেকে খাবার জিনিসে আর খাবার জিনিস থেকে রাজনীতিতে। হ্যাঁ, ভালো কথা, ইহুদী বলতে মনে পড়ল, কাল আমি পর্দার ফাঁক দিয়ে দুজন ইহুদীকে দেখেছি। দেখে আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস। হচ্ছিল না; কী বিশ্রী যে লাগছিল, আমি যেন তাদের বিপদে ফেলে পালিয়ে এখন তাদের দুর্দশা দেখছি। ঠিক উল্টোদিকে আছে একটা বজরা; সেখানে সপরিবারে থাকে একজন। মাঝি। তার একটা ঘেউ-ঘেউ করা ছোট কুকুর আছে। যখন সে পাটাতনের ওপর ছুটোছুটি করে তখন ছোট কুকুরটাকে আমরা চিনতে পারি শুধু ওর ডাক শুনে আর ল্যাজ দেখে। এহ, শুরু হল বৃষ্টি, এখন বেশির ভাগ লোক গা-ঢাকা দিয়েছে ছাতার তলায়। চোখে পড়ছে শুধু বর্ষাতি আর মাঝে মাঝে কারো কারো টুপির পেছনটা। সত্যি এখন আর বেশি দেখার আমার দরকার নেই। ক্রমশ এক নজরেই সব মেয়ে আমার জানা হয়ে যাচ্ছে, আলু খেয়ে খেয়ে মোটা ধুমসী, গায়ে লাল কিংবা সবুজ কোট, জুতার হিল ক্ষয়ে-যাওয়া এবং একটা করে ব্যাগ বগলদাবা করা। তাদের মুখগুলো দেখে হয় করুণ নয় দয়ালু বলে মনে হয় সেটা নির্ভর করে স্বামীদের ভাবসাবের ওপর।

তোমার আনা।

.

মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি, ‘গুপ্তমহল’ এই আনন্দ-সংবাদ শুনেছে যে, বড়দিন উপলক্ষে প্রত্যেকে বাড়তি সিকি পাউণ্ড করে মাখন পাবে। খবরের কাগজে বলেছে আধ পাউণ্ড, তবে সে তো সেইসব ভাগ্যবান মর্ত্যের জীবদের জন্যে যারা সরকারী রেশন-খাতার অধিকারী। পালিয়ে-থাকা ইহুদীদের জন্যে নয়–আটের বদলে মাত্র চারটি বেআইনী শেনখাতা কেনা তাদের সাধ্যায়ত্ত।

আমরা সবাই আমাদের মাখন দিয়ে কেকবিস্কুট কিছু বানাব। আজ সকালে আমি কয়েকটা বিস্কুট আর দুটো কেক তৈরি করেছিলাম। ওপরতলায় সবাই খুব ব্যস্ত। মা-মণি বলেছেন গেরস্থালির কাজকর্ম শেষ না করে আমি যেন সেখানে কাজ করতে বা পড়াশুনো করতে না যাই। মিসেস ফান ডান তাঁর চোট-লাগা পাঁজরের দরুন শয্যাশায়ী, দিনভর তাঁর নাকী কান্না, সারাক্ষণ নতুন ড্রেসিং করাতে দিতে তার আপত্তি নেই, এবং কোনো কিছুতেই তাঁর মন ওঠে না। উনি আবার নিজের পায়ে দাঁড়ালে এবং নিজেরটা নিজে গুছিয়ে নিতে পারলে আমি খুশি হব। কেননা তার পক্ষ নিয়ে এটা আমাকে বলতেই হবে–তিনি অসাধারণ পরিশ্রমী এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, বরাবর দেহে মনে সুস্থ। সেই সঙ্গে সদা প্রফুল্ল।

দিনের বেলায় যেন বেশি আওয়াজ করার জন্যে আমাকে যথেষ্ট ‘চুপ চুপ’ শুনতে হয় না= আমার শয়নকক্ষের সঙ্গী ভদ্রলোক রাত্তিরেও এখন আমাকে বার বার ডেকে বলেন, চুপ চুপ।’ তার কথা শুনে চললে, আমার তো পাশ ফেরাও বারণ। আমি ওঁকে আদৌ পাত্তা দিতে প্রার্থী নই। এর পরের বার কিছু বলতে এলে উল্টে আমিই ওঁকে ‘চুপ, চুপ’ বলব।

ওঁর ওপর আমি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠি, বিশেষ করে রবিবারগুলোতে, সাতসকালে উঠে ব্যায়াম করার জন্যে উনি আলো জ্বালিয়ে দেন। মনে হয় স্রেফ ঘণ্টার পর ঘণ্টা উনি চালিয়ে যান, আর ওঁর জ্বালায় আমি বেচারা, আমার শিয়রে জোড়া-দেওয়া চেয়ারগুলো, ঘুম ঘুম চোখে আমার মনে হয়, যেন অনবরত সামনে আর পেছনে সরতে নড়তে থাকে। পেশীগুলো আলগা করার জন্যে বার দুয়েক প্রচণ্ড জোরে হাত ঘুরিয়ে ব্যায়ামের পর্ব শেষ করে শ্রীমৎ মহাপ্রভু শুরু করেন ওঁর প্রাতঃকৃত্য। তার প্যান্টগুলো ঝোলানো থাকে, সুতরাং সেগুলো যোগাড় করে আনতে ওঁকে এখান থেকে সেখানে যেতে আসতে হয়। কিন্তু টেবিলে পড়ে থাকা টাইয়ের কথা ওঁর মনে থাকে না। সুতরাং ফের সেটা আনতে চেয়ারগুলোতে তিনি ধাক্কা মারেন এবং হোঁচট খান।

থাক, আমি আর বুড়ো লোকদের বিষয়ে এর বেশি বলে তোমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাব না। এতে অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না এবং আমার শোধ তোলবার সমস্ত মতলব (যেমন ল্যাম্প ডিস্কানেক্ট করা, দরজায় খিল দেওয়া, ভদ্রলোকের জামা-কাপড় গায়েব করা) ত্যাগ করতে হবে শান্তি বজায় রাখার জন্যে। ইস, আমি কিরকম বিচক্ষণ হয়ে উঠছি! এখানে সর্ব বিষয়ে একজনকে তার বিচারশক্তি প্রয়োগ করতে হবে, মান্য করতে শিখতে হবে, মুখ বুজে থাকতে হবে, ভালো হতে হবে গোঁয়ার্তুমি ছাড়তে হবে এবং আমার জানা নেই আরও কত কী। আমার ভয় হচ্ছে, খুব কম সময়ের মধ্যে আমাকে আমার পুরো বুদ্ধি খরচ করে ফেলতে হবে এবং আমার বুদ্ধির পরিমাণ খুব বেশি নয়। যুদ্ধ যখন শেষ হবে, তখন আর ঘটে কিছু থাকবে না।

তোমার আনা

০৩. আবার এলোমেলো

বুধবার, ১৩ জানুয়ারী, ১৯৪৩

আদরের কিটি,

আজ সকালে আবার সবকিছু আমাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। ফলে, একটা জিনিসও আমি ঠিকমত করে উঠতে পারিনি।

বাইরেটা সাংঘাতিক। দিনরাত ওরা আরও বেশি করে ঐ সব অসহায় দুঃখী মানুষগুলোকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। পিঠে একটা বোচকা আর পকেটে সামান্য টাকা ছাড়া ওদের নিজের বলতে আর কিছু থাকছে না। পথে সেটুকুও ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংসারগুলো ছিটিয়ে গিয়ে স্ত্রী-পুরুষ ছেলেমেয়েরা সব পরস্পরের কাছ থেকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইস্কুল থেকে ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফিরে দেখছে মা-বাবা নিখোঁজ। মেয়েরা বাজার করে বাড়ি ফিরে দেখছে দরজায় তালা ঝোলানো, পরিবারের লোকজনের হাওয়া হয়ে গেছে। যারা জাতে ওলন্দাজ, তারাও খুব চিন্তাগ্রস্ত। তাদের ছেলেদের ধরে ধরে জার্মানিতে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সকলেরই মনে ভয়।

প্রত্যেকদিন রাত্রে শ’য়ে শ’য়ে প্লেন। হল্যাণ্ডের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে জার্মান শহরগুলোতে। সেখানে বোমায় বোমায় মাটি চষে ফেলা হচ্ছে। রুশদেশে আর আফ্রিকায় প্রতি ঘন্টায় শ’য়ে শ’য়ে হাজারের হাজারে মানুষ খুন হচ্ছে। কেউই এর বাইরে থাকতে পারছে না, লড়াই সারা বিশ্ব জুড়ে। যদিও তুলনায় মিত্রপক্ষ এখন ভালো অবস্থায়, তাহলেও কবে যুদ্ধ শেষ হবে বলা যাচ্ছে না।

আমাদের কথা ধরলে, আমরা ভাগ্যবান। নিশ্চয় লক্ষ লক্ষ লোকের চেয়ে আমাদের ভাগ্য ভালো। এখানে নির্ঝঞ্ঝাটে, নিরাপদে আছি। বলতে গেলে, আমরা রাজধানীতে বাস করছি। এমন কি আমরা এতটা স্বার্থপর যে কথায় কথায় বলি, যুদ্ধের পর, নতুন জামা নতুন কাপড়ের কথা ভেবে আমরা উৎফুল্ল হই–অথচ আমাদের সত্যিকার প্রত্যেকটা পাইপয়সা বাঁচানো উচিত, অন্য মানুষজনদের সাহায্য করা উচিত এবং যুদ্ধের পর ধ্বংস হয়েও যেটুকু অবশিষ্ট থাকবে সেটুকু রক্ষা করা উচিত।

বাচ্চারা এখানে ছুটোছুটি করে, গায়ে শুধুমাত্র এটা পাতলা পিরান আর শিলি পরে; না আছে কোট, না আছে টুপি, না আছে মোজা। কেউ তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ায় না। সব সময় তাদের পেটগুলো পড়ে থাকে, কবেকার শুকনো একটা গাজর দাঁতে কাটতে। কাটতে তারা ক্ষিধের ভেঁচকানি ঠেকিয়ে রাখে। কনকনে ঠাণ্ডা ঘরগুলো থেকে বেরিয়ে তারা যায় কনকনে ঠাণ্ডা রাস্তায়; যখন ইস্কুলে ইস্কুলঘর তার চেয়েও ঠাণ্ডা। দেখ, হল্যাণ্ডের হাল এখন এত খারাপ যে, অসংখ্য ছেলেপুলে রাস্তার লোকদের ধরে এক টুকরো রুটির জন্যে হাত পাতে। যুদ্ধের দরুন মানুষের যাবতীয় দুঃখযন্ত্রণার ওপর আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলে যেতে পারি। কিন্তু তাতে নিজেকে আমি আরও ম্রিয়মাণ করে তুলব। যতদিন দুঃখের শেষ হয়, ততদিন যথাসম্ভব শান্তচিত্তে অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই। ইহুদীরা আর খ্রিষ্টানরা অপেক্ষা করছে, অপেক্ষা করছে সারা জগৎ; সেইসঙ্গে বেশ কিছু লোক মৃত্যুর জন্যে দিন গুনছে।

তোমার আনা

.

শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৩

আদরের কিটি,

রাগে টগবগ করে ফুটছি, কিন্তু বাইরে প্রকাশ করব না। ইচ্ছে হচ্ছে পা দাবিয়ে চিৎকার করি, মা-মণিকে আচ্ছা করে ঝাকিয়ে দিই, কান্নায় ফেটে পড়ি, এবং আর কী করব জানি না কারণ, প্রতিদিন আমার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় যত সব অকথা-কুকথা, বাঁকা বাঁকা চোখের দৃষ্টি এবং যত রাজ্যের নালিশ, এবং টান করে বাঁধা জ্যা-মুক্ত শরের মত সেগুলো যথাস্থানে লাগে এবং শরীরে বেঁধার মতই সেগুলো তুলে ফেলা আমার পক্ষে কঠিন হয়।

আমি মারগটকে, ফান ডানকে, ডুসেলকে এবং বাবাকেও চিৎকার করে বলতে চাই ‘আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও, আমি যাতে চোখের পানিতে আমার বালিশ না ভিজিয়ে, চোখের জ্বলুনি ছাড়া, মাথা দবদবানি বাদ দিয়ে অন্তত একটি রাত ঘুমোতে পারি। আমাকে নিষ্কৃতি দাও এই সবকিছু থেকে, এই পৃথিবী থেকে হলে সেও বরং ভালো। কিন্তু আমার তা করা চলবে না; ওরা যেন জানতে না পারে যে, আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি; ওদের তৈরি মতিগুলো ওরা যেন দেখতে না পায়, ওদের সমবেদনা আর দয়ালু চিত্তের পরিহাসগুলো আমার সহ্য হবে না, বরং তাতে আমার আরও ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করবে। আমি কথা বললে সবাই মনে করে আমি চালিয়াতি করছি; চুপ করে থাকলে ওরা মনে করে আমি উদ্ভট। জবাব করলে বলে অভদ, ভালো কিছু মাথায় এলে বলে ধূর্ত, ক্লান্ত হয়ে পড়লে বলে আলসে, একগ্রাস বেশি খেলে বলে স্বার্থপর; বলে বোকা, ভীতু, সেয়ানা ইত্যাদি, ইত্যাদি। দিনভর কেবল আমাকে শুনতে হয় আমি নাকি অসহ্য খুকী; অবশ্য আমি এসব নিয়ে হাসি এবং এমন ভাব দেখাই যেন ওসব বললে আমার কিছু হয় না, কিন্তু আলবৎ হয়। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার চেয়ে নিতে ইচ্ছে করে, আলাদা ধরনের প্রকৃতি, যাতে লোকে আমার প্রতি বিমুখ না হয়। কিন্তু তা সম্ভব নয়। আমার যে স্বভাব সেটা আমাকে দেওয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই তা খারাপ হতে পারে না। আমি প্রাণপণে সকলের মন রেখে চলতে চেষ্টা করি, সেটা যে কত বেশি। ওরা তা ধারণাও করতে পারবে না। আমি এসব হেসে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করি, কেননা আমি দুঃখ পাচ্ছি এটা ওদের দেখাতে চাই না। একাধিকবার হয়েছে, অন্যায় ভাবে একগাদা বকুনি খাওয়ার পর আমি চটে গিয়ে মা-মণিকে বলেছি, তুমি কি বলো না বলো আমি থোড়াই কেয়ার করি। আমাকে ছাড়ান দাও; যে যাই করো, আমার কিছু হওয়ার নয়। স্বভাবতই তখন আমাকে বলা হল আমি অসভ্য এবং কার্যত দুদিন ধরে আমাকে দেখেও হল না; এবং তারপর হঠাৎ এক সময়ে বিলকুল ভুলে গিয়ে আমার সঙ্গে অন্য পাঁচজনের মতই ব্যবহার করা হতে লাগল। আজ মুখ মিষ্টি করে, ঠিক পরের দিনই আবার দাতের বিষ ঝেড়ে দেওয়া এ জিনিস আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি বরং বেছে নেব হিরণয় মধ্যপন্থা (অবশ্য সেটা খুব হিরণীয় নয়), চুপচাপ নিজের মনে থাকব, এবং ওরা আমার প্রতি যা করে, সেই রকম ওদের দেখাদেখি জীবনে অন্তত একবার আমিও ওদের প্রতি নাক সিটকে থাকব। ইস্, যদি তা পারতাম!

তোমার আনা।

.

শুক্রবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩

আদরের কিটি, যদিও আমাদের চিৎকার-চেঁচামেচির ব্যাপারে অনেকদিন কিছু লিখিনি, তাহলেও অবস্থা এখনও যে-কে সেই। অনেক আগেই এই মন-কষাকষি, আমরা মেনে নিয়েছি, কিন্তু মিস্টার ডুসেলের কাছে প্রথম প্রথম এটা একটা সর্বনেশে কাণ্ড বলে মনে হয়েছিল। তবে এখন সেটা তার গা-সহ্য হয়ে আসছে এবং উনি চেষ্টা করেন ও নিয়ে মাথা না ঘামাতে। মারগট আর পেটার, দুজনের কেউই, যাকে তোমরা ‘ছেলেমানুষ’ বলবে, তা নয়। দুজনেই বড় গোমড়ামুখো আর আমি প্রচণ্ড ভাবে ওদের নিলেমন্দ করি এবং আমাকে সব সময় শোনানো হয়, মারগট আর পেটারকে দেখবে কখনো অমন করে না–ওদের দেখে কেন শেখো না? শুনলেই গা জ্বালা করে। তোমাকে বলতে দোষ নেই, মারগটের মতন হওয়ার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। ওরকম কাদার তাল আর ঘাত-কাত মেয়ে আমার পছন্দ নয়; যে যাই বলুক ও শুনবে আর সব কিছুই ঘাড় পেতে মেনে নেবে। আমি শক্ত চরিত্রের মেয়ে হতে চাই। কিন্তু এ সব ধারণার কথা কাউকে বলি না; আমার মনোভাবের ব্যাখ্যা হিসেবে এই প্রসঙ্গ যদি তুলি ওরা আমাকে শুধু উপহাস করবে। খাবার টেবিলে সবাই সাধারণত গুম হয়ে না থাকে, যদিও ভাগ্যক্রমে ‘সুপখোররা রাশ টেনে রাখে বলে কোনো অনাসৃষ্টি ঘটতে পারে না। ‘সুপখোর’ বলতে অফিসের যে লোকগুলো বাড়িতে এলে এক কাপ করে সুপ খেতে পায়। আজ বিকেলে মিস্টার ফান ডান ইদানীং মারগটের কম খাওয়া নিয়ে আবার বলছিলেন। সেই সঙ্গে ওকে খেপাবার জন্যে বললেন, ‘তুমি বুঝি তন্বী হতে চাইছ।’ মারগটের পক্ষ নেবার ব্যাপারে মা-মণি সব সময়ে এক পায়ে খাড়া। উনি ফোস করে উঠলে, আপনার বোকা-বোকা কথা আমার আর সহ্য হয় না।’ মিস্টার ফান ডানের কান লাল হয়ে উঠল, সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, তার বারোধ হয়ে গেল। আমরা অনেক সময় এটা-সেটা নিয়ে হাসাহাসি করি; এই কয়দিন আগেই মিসেস ফান ডান এমন কথা বললেন যার একেবারেই মানে হয় না। তিনি অতীতের কথা বলছিলেন, ওর বাবার সঙ্গে ওঁর কত সুন্দর বনিবনা ছিল এবং উনি কি রকম বখা মেয়ে ছিলেন। উনি বলে গেলেন, আর বুঝলে, আমার বাবা আমাকে শেখাতেন, যদি দেখ কোনো পুরুষ মানুষ একটু বেশি রকম গায়ে পড়তে চাইছে, তুমি তাকে অবশ্যই বলবে, ‘দেখুন, মিস্টার অমুক, মনে রাখবেন আমি এজন ভদ্রমহিলা’। তাহলেই লোকটি বুঝবে তুমি তাকে কী বলতে চাইছ। আমরা মনে করলাম চমৎকার একটা হাসির কথা আর হো-হো করা হাসিতে ফেটে পড়লাম। পেটার সচরাচর চুপচাপ থাকলেও মাঝে মাঝে বেশ হাসির খোরাক যোগায়। বিদেশী শব্দ ব্যবহারের। দিকে ওর এমনিতেই খুব ঝোক। কোন শব্দের কী অর্থ অনেক সময়েই ও অবশ্য তা জানে না। একদিন বিকেলে অফিস ঘরে বাইরের লোক থাকায় আমরা পায়খানামুখো হতে পারিনি। এদিকে পেটারের এমন অবস্থা যে আর তর সয় না, সুতরাং ও আর হুড়কো দেওয়ার। মধ্যে গেল না। আমাদের জানান দেওয়ার জন্যে ও করল কী–পায়খানার দরজায় একটা নোটিশ লিখে লটকে দিল–এস.ভি.পি. গ্যাস। ও লিখেছিল এই মনে করে সাবধান, গ্যাস’। ও ভেবেছিল এটা লিখলে আরও সভ্য দেখাবে। বেচারার ধারণাই ছিল না এস.ভি.পি-র মানে হল–গ্রহণ করে কৃতার্থ করুন।’

তোমার আনা

.

শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩

আদরের কিটি, পিম আশা করেছেন যে কোনদিন আক্রমণাভিযান শুরু হবে। চার্চিলের নিউমোনিয়া হয়েছে, আস্তে আস্তে সেরে উঠছেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতাপ্রেমিক গান্ধী এইবার নিয়ে কতবার যে অনশন করলেন। মিসেস ফান ডান দাবি করেন তিনি অদৃষ্টে বিশ্বাসী। কামান থেকে যখন গোলা ছোড়া হয়, তখন কে সবচেয়ে বেশি ভয়ে কেঁচো হয়ে যায়? পেট্রোনেলা।

গির্জায়-যাওয়া লোকদের কাছে লেখা বিশপের চিঠির একটা কপি হেংক এনেছিলেন। আমাদের পড়াবার জন্যে। চিঠিটা বড় সুন্দর এবং পড়ে প্রেরণা জাগে। নেদারল্যাণ্ডসের মানুষ, গা এলিয়ে বসে থেকো না। প্রত্যেকে তার দেশ, দেশের মানুষ আর তাদের ধর্মের স্বাধীনতার জন্যে নিজস্ব অস্ত্রে লড়ছে।’ গীর্জার বেদী থেকে তারা সোজাসুজি বলছে, সাহায্য দাও, দরাজ হও এবং আশা হারিও না।’ কিন্তু ওতে কি ফল হবে? আমাদের ধর্মের লোকদের বেলায় ওতে কাজ হবে না।

আমাদের এখন কী দশা হয়েছে তুমি ধারণায় আনতে পারবে না। এ বাড়ির মালিক ক্রালার আর কুপহুইসকে না জানিয়ে বাড়িটা বেচে দিয়ে বসে আছে। নতুন মালিক একদিন সকালে সঙ্গে একজন স্থপতিকে নিয়ে বাড়িটা দেখাবার জন্যে দুম করে এসে হাজির। ভাগ্যিস, মিস্টার কুপহুইস তখন উপস্থিত ছিলেন এবং ‘গুপ্তমহল’টা বাদ দিয় বাকি সবটাই তিনি ভদ্রলোককে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। কুপহুইস এমন ভাব দেখান যেন ওপাশে যাওয়ার যে দরজা তার চাবিটা আনতে তিনি ভুলে গেছেন। নতুন মালিক ও নিয়ে আর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। ভদ্রলোক যতদিন না আবার ফিরে এসে ‘গুপ্তমহল’টা দেখতে চাইছেন ততদিন সব ঠিক আছে–কেননা দেখতে চাইলেই তো চিত্তির।

বাপি আমার আর মারগটের জন্যে একটা কার্ড-ইনডেক্স বক্স খালি করে তাতে কার্ড ভরে দিয়েছেন। এটা হবে বই বিষয়ক কার্ড প্রণালী; এরপর আমরা দুজনেই লিখে রাখব কোন কোন বই পড়লাম বইগুলো কার কার লেখা ইত্যাদি। বিদেশী ভাষার শব্দ টুকে রাখার জন্যে আমি আরেকটা খাতা যোগাড় করেছি।

ইদানীং মা-মণি আর আমি আগের চেয়ে নিয়ে চলতে পারছি, কিন্তু এখনও আমরা পরস্পরের কাছে মনের কথা বলি না। মারগট এখন আগের চেয়েও বেশি হিংসুটে এবং বাপি কিছু একটা চেপে যাচ্ছেন, তবে বাপি আগের মতই মিষ্টি মানুষ।

খাবার টেবিলে মাখন আর মারগারিনের নতুন বরাদ্দ হয়েছে। প্রত্যেকের পাতে ছোট্ট এক টুকরো চর্বি রাখা থাকে। আমার মতে, ফান ডানেরা মোটেই ঠিক ন্যায্যভাবে ভাগগুলো করেন না। আমার মা-বাবা এ নিয়ে কিছু বলতে ভয় পান, কেননা বললেই একটা কুরুক্ষেত্র বেধে যাবে। খুব দুঃখের কথা। আমি মনে করি ওসব লোকদের বেলায় যেমন কর্ম তেমনি ফল হওয়াই উচিত।

তোমার আনা।

.

বুধবার, ১০ মার্চ, ১৯৪৩

আদরের কিটি,

কাল সন্ধ্যেবেলায় ইলেকট্রিকের তার জ্বলে গিয়েছিল। তার ওপর সারাক্ষণ দমাদ্দম কামান ফাটার আওয়াজ। গোলাগুলি আর প্লেন-ওড়া সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যাপারে আমার ভয় এখনও আমি কাটিয়ে উঠিতে পারিনি; ফলে প্রায় রোজ রাতেই আমি ভরসার জন্যে বাপির বিছানায় গুঁড়ি মেরে ঢুকে পড়ি। এটা যে ছেলেমানুষি আমি তা জানি, কিন্তু সে যে কী জিনিস তুমি জানো না। বিমানে গোলা-ছেড়া কামানের প্রচণ্ড গর্জনে নিজের কথাই নিজে শোনা যায় না। মিসেস ফান ডান এদিকে অদৃষ্টবাদী, কিন্তু তিনি প্রায় কেঁদে ফেলেন আর কি। বেজায় কাঁপা কাচা ক্ষীণ গলায় বললে, ‘ওঃ, এত বিতকিচ্ছিরি! আঃ, এত দমাদ্দমভাবে গোলাগুলি ছুঁড়ছে, এই বলে আসলে উনি বোঝাতে চান ‘আমার কী যে ভয় করছে, কী বলব।’

মোমবাতির আলোয় যত, অন্ধকারে তার চেয়ে ঢের বেশি খারাপ লাগে। আমি থর থর করে কাপছিলাম, ঠিক যেন আমার জ্বর হয়েছে। করুণ গলায় বাপিকে বললাম মোমবাতিটা আবার জ্বেলে দিতে। বাবাকে নড়ানো গেল না; আলো নেভানোই রইল। হঠাৎ একদফা মেশিনগান কড় কড় করে উঠল, তার আওয়াজ গোলাগুলির চেয়েও দশগুণ বেশি কান-ফাটানো। সেই শুনে মা-মণি বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে মোমবাতি জ্বেলে দিলেন। বাপি খুব বিরক্ত হলেন। তার আপত্তি উত্তরে মা-মণি বললেন, ‘যত যাই হোক, আনা তো আর ঠিক পাকাঁপোক্ত সৈনিক নয়।’ ব্যস, ঐ পর্যন্ত।

মিসেস ফান ডানের অন্য ভয়গুলোর কথা তোমাকে আমি বলেছি কি? বুলিনি বোধ হয়। ‘গুপ্তমহলে’র সব ঘটনা সম্পর্কে তোমাকে যদি আমার ওয়াকিবহাল রাখতে হয়, তাহলে এ ব্যাপারটাও তোমার জেনে রাখা দরকার। এক রাতে মিসেস ফান ডানের মনে হল তিনি চিলেকোঠায় সিঁদেল-চোরের আওয়াজ পেয়েছেন; তাদের পায়ের ধুপধাপ আওয়াজ শুনে ভয় পেয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে উনি ওর স্বামীকে জাগিয়ে দিলেন। ঠিক তক্ষুনি সিঁদেল-চোরেরা হাওয়া এবং মিস্টার ফান ডান সেই ভয়তরাসে অদৃষ্টবাদী মহিলার বুক ধড়ফড় করার আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেলেন না। ‘ও পুট্টি (মিস্টার ফান ডানের ডাক নাম), ওরা নিশ্চয় আমাদের সসেজ আর সমস্ত কড়াইশুঁটি আর বিন নিয়ে চলে গেল। আর পেটার নিরাপদে বিছানায় শুয়ে আছে কিনা তাই বা কে জানে?’ ‘পেটারকে ওরা নিশ্চয় ঝোলার মধ্যে পুরে নিয়ে যাবে না। বলছি, কথা শোনো–ওসব নিয়ে ভেবো না। আমাকে বুঝতে দাও।’ কিন্তু তাতে কোনো ফল হল না। ভয়েময়ে মিসেস ফান ডান সে রাত্তিরে আর দুই চোখের পাতা এক করতে পারলেন না। তার কয় রাত পরে ভূতুড়ে শব্দ শুনে ফান ডানদের পরিবারের সকলেরই ঘুম ভেঙে যায়। হাতে টর্চ নিয়ে পেটার চিলেকোঠায় যেতেই–খুসুরমুসুর আর খসুরমুসুর! ছুটে ছুটে কী পালাচ্ছিল বলো তো? ইয়া ইয়া একপাল ধেড়ে ইঁদুর। যখন আমরা জেনে ফেললাম চোরের দল কারা, তখন মুশ্চিকে আমরা চিকেকোঠায় শুতে দিলাম ব্যস, তারপর আর অনাহুত অতিথিরা ফিরে ওমুখো হয়নি। অন্তত রাতের বেলা।

দিন দুই আগে সন্ধ্যেবেলায় পেটার সিঁড়ির ঘরে উঠেছিল কিছু পুরনো কাগজ আনতে। কলআঁটা দরজাটা শক্ত করে ধরে ধাপে ধাপে ওর নামবার কথা। না তাকিয়ে যেই ও হাত দিয়ে চেপেছে হঠাৎ আচমকা ব্যথা পেয়ে সিঁড়ি থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। নিজের অজান্তে একটা বড় ধেড়ে ইঁদুরের গায়ে হাত পড়ে যাওয়ায় ইঁদুরটা মোক্ষমভাবে তাকে কামড়ে দেয়। ও যখন আমাদের কাছে এসে পৌঁছল, তখন ও কাগজের মত সাদা, হাটু দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে, ওর পাজামা রক্তে ভিজে গেছে। আসলে তা হওয়ারই কথা; বড় ধেড়ে-ইঁদুরের গায়ে থাবা দেওয়া, কাজটা খুব মনোরম নয়; আর তার দরুন কামড় খাওয়া সত্যিই ভয়ঙ্কর ব্যাপার।

তোমার আনা।

.

শুক্রবার, ১২ মার্চ, ১৯৪৩

আদরের কিটি,

তোমার সঙ্গে একজনের আলাপ করিয়ে দিই; ইনি হলেন মা-ঠাকুরন ফ্রাঙ্ক, তারুণ্যের রক্ষাকর্তা। তরুণদের জন্যে বাড়তি মাখন; আধুনিক তরুণ-তরুণীদের সমস্যা; সব কিছুতেই মা-মণি তরুণ-তরুণীদের হয়ে লড়েন এবং খানিকটা টানা-হেঁচড়া করে শেষপর্যন্ত সব সময়ই নিজের গো বজায় রাখেন। একটা বোতলে শোলমাছ রাখা ছিল, সেটা নষ্ট হয়ে গেছে; মুশ্চি আর বোখার তাতে ভালো ভোজ হবে। বোখাকে এখনও তুমি দেখনি অবশ্য আমরা অজ্ঞাতবাসে আসার আগে থেকেই ও এখানে ছিল। ও হল গুদামের আর অফিসের বেড়াল; গুদামঘরগুলোতে ইঁদুরদের ও ঢিট রাখে। ওর বেয়াড়া ধরনের রাজনৈতিক নামের একটা ব্যাখ্যা দরকার। কিছুকাল কোম্পানির ছিল দুটো বেড়াল; গুদামের জন্যে একটা আর চিলেকোঠার জন্যে একটা। মাঝে মাঝে হত কী, দুই বেড়ালের দেখা হত; আর তার ফলে দুজনের হত ভয়াবহ লড়িই। গুদামের বেড়ালটাই সবসময় আগে ঝাপিয়ে পড়ত; এ সত্ত্বেও চিলেকোঠার বেড়ালটাই কী করে যেন জিতে যেত–দেশজাতের লড়াইতে ঠিক যেমন হয়।

কাজেই গুদামের বেড়ালটার নাম দেওয়া হয়েছিল জার্মান বা ‘বোখা’; আর চিলেকোঠার বেড়ালের নাম দেওয়া হয়েছিল ইংরেজ বা টমি। পরে টমিকে ভাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল; আমরা নিচের তলায় গেলে বোখা আমাদের আপ্যায়ন করে।

কিড়নি বিন আর হ্যারিকিট বিন