Wednesday, September 30, 2026
Homeগোয়েন্দা গল্পশার্লক হোমস: দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য মাজারিন স্টোন

শার্লক হোমস: দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য মাজারিন স্টোন

শার্লক হোমস: দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য মাজারিন স্টোন

অনেক অত্যাশ্চর্য অ্যাডভেঞ্চারের স্মৃতি মাখানো বেকার স্ট্রিটের ঘরখানিতে ফের দাঁড়িয়ে মনটা খুশিতে ভরে উঠল ডক্টর ওয়াটসনের। দেওয়ালে ঝোলানো সায়েন্টিফিক চার্ট, অ্যাসিড-পোড়া কেমিক্যাল-বেঞ্চ, কোণে দাঁড় করানো বেহালার বাক্স আর কয়লা রাখবার ধাতবপাত্রে রাখা পাইপ আর তামাকের ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে তাকাল হোমসের নতুন ছোকরা চাকর বিলির হাসিহাসি তাজা মুখখানার দিকে। গ্রেট ডিটেকটিভের বিষণ্ণ মুর্তি ঘিরে বিরাজিত একাকিত্ব আর বিচ্ছিন্নতা কিছুটা ভরিয়ে তুলতে পেরেছে এই ছোকরা।

বিলি, কিছুই দেখছি পালটায়নি। তুই পর্যন্ত একইরকম আছিস। তোমার মনিবও নিশ্চয় তাই?

শোবার ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বিলি বললে, ঘুমোচ্ছেন।

অবাক হল না ওয়াটসন। গ্রীষ্মের এমন ফুরফুরে সন্ধ্যায় সাতটার সময়ে ঘুমোনো শার্লক হোমসের মতো বিদঘুটে স্বভাবের লোককেই মানায়।

হাতে কেস এসেছে নিশ্চয়?

আজ্ঞে হ্যাঁ, ভীষণ খাটছেন। শরীর না ভেঙে পড়ে। কিছু খাচ্ছেন না। শুকিয়ে কাঠি হয়ে যাচ্ছেন। মিসেস হাডসন জিজ্ঞেস করেছিলেন, মিস্টার হোমস, ডিনার খাবেন কখন? পরশু সাড়ে সাতটায়, বললেন উনি। হাতে কেস এলে যা করেন আর কি।

তা যা বলেছিস।

কারো পিছু নিচ্ছেন নিশ্চয়। কালকে বেরিয়েছিলেন বেকার শ্রমিকের ছদ্মবেশে কাজ খুঁজছেন যেন। আজকে নিয়েছিলেন বুড়ির বেশ। অ্যাদ্দিনে তো অনেক দেখলাম, তবুও চমকে গিয়েছিলাম আজ। ওই দেখুন না বুড়ির ছাতা–বলে সোফার গায়ে হেলান দিয়ে রাখা একটা বেটপ মেয়েদের ছাতা দেখিয়ে দাঁত বার করে হেসে ফেলল বিলি।

কিন্তু কেন, বিলি?

গলা নামিয়ে বিলি বললে, আর কেউ যেন না-শোনে। ক্রাউন ডায়মন্ড কেস!

বল কী। লাখ পাউন্ড দামের হিরে চুরির কেস?

আজ্ঞে হ্যাঁ। প্রাইম মিনিস্টার আর হোম সেক্রেটারি পর্যন্ত এসে ওই সোফায় বসে মিস্টার হোমসকে দিয়ে কথা আদায় করেছেন হিরে বার করে দিতেই হবে। তারপরেই এলেন লর্ড ক্যান্টলমিয়ার—।

বটে!

আজ্ঞে হ্যাঁ। ভারি খারাপ লোক, স্যার। প্রাইম মিনিস্টার আর হোম সেক্রেটারির মতো মানুষ হয় না। কিন্তু এই লর্ড ক্যান্টলমিয়ারের ব্যাভার ভারি খারাপ। ওঁর বিশ্বাস মিস্টার হোমস একটা ফালতু লোক হিরে খোজের কাজ ওঁকে দেওয়ার একদম ইচ্ছেও নেই। মিস্টার হোমস হেরে গেলেই যেন তিনি বাঁচেন।

মিস্টার হোমস তা জানেন তো?

যা জানবার, মিস্টার হোমস তা ঠিকই জেনে ফেলেন।

তাহলে লর্ড ক্যান্টলমিয়ারকেই বুদ্ধ বানিয়ে ছাড়বে হোমস। জানলার ওই পর্দাটা কীসের বিলি?

দিন তিনেক আগে মিস্টার হোমস ঝুলিয়েছেন। আড়ালে একটা মজার জিনিস আছে।

ধনুক জানলার সামনে থেকে পর্দাটা সরিয়ে দিল বিলি।

আর একটু হলেই চেঁচিয়ে উঠত ডাক্তার ওয়াটসন। অবিকল শার্লক হোমসের মতোই একটা নকল মূর্তি একইরকম ড্রেসিং গাউন পরে মুখখানা জানলার দিকে কিছুটা ঘুরিয়ে ঘাড় হেঁট করে বসে যেন একটা অদৃশ্য কেতাব পড়ছে। মুণ্ডখানা খুলে নিয়ে তুলে ধরল বিলি।

মাঝে মাঝে মুণ্ডু ঘুরিয়ে বসাই যাতে রাস্তা থেকে দেখলে মনে হয় জ্যান্ত মানুষ মাথা ঘুরিয়ে বসে বই পড়ছে–খড়খড়ি বন্ধ না-থাকলে কিন্তু হাতও দিই না।

বিলি, এর আগেও এই ধরনের জিনিস একবার কাজে লাগিয়েছিলাম।

আমি আসার আগে। বলতে বলতে জানলার পর্দা সরিয়ে বিলি বললে, ওই দেখুন ওদিকের জানলায় একটা লোক বসে নজর রেখেছে এদিকে।

ওয়াটসন যেই পা বাড়িয়েছে, অমনি শোবার ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল শার্লক হোমসের দীপ্ত শীর্ণমূর্তি। মুখ ফ্যাকাশে, কিন্তু চলনভঙ্গিমা রীতিমতো ক্ষিপ্র, প্রাণবন্ত। এক লাফে জানলায় গিয়ে পর্দা টেনে এনে বন্ধ করে দিল খড়খড়ি।

বেঘোরে মরবি ছোঁড়া। যা ভাগ! ওয়াটসন, সঙিন মুহূর্তে এসে গেছ দেখছি।

কী ব্যাপার বলো তো?

খুব বিপদে পড়েছি।

কীরকম বিপদে?

হঠাৎ মৃত্যুর বিপদ! আজ সন্ধ্যা নাগাদ ঘটতে পারে।

কী–কী বললে?

খুন হয়ে যেতে পারি–একটু পরেই।

ঠাট্টা করছ নাকি?

ঠাট্টা জিনিসটা অল্পস্বল্পই আছে আমার মধ্যে। তা সত্ত্বেও ঠাট্টা করার দরকার হলে এর চাইতে ভালো ঠাট্টাই করতাম ওয়াটসন। বোসো, তামাক, মদ যা খুশি খাও। ইদানীং আমার অবশ্য তামাক খেয়েই দিন কাটছে।

খাওয়া ছেড়েছ কেন?

খেলে রক্ত ব্রেন থেকে পেটে চলে যায় বলে। হজম করানোর জন্যে রক্ত চালান দেওয়ার সময় এটা নয়–আমার পুরোটাই ব্রেন না-খেলে পুরো ব্রেনটা বেশ চাঙা থাকে–বাদবাকি অঙ্গগুলো এখন শুকিয়ে থাকুক।

কিন্তু বিপদটা—।

ও হ্যাঁ, সত্যিই যদি খুন হয়ে যাই, খুনির নামধামটা তুমি একটু কষ্ট করে মনে রেখো। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে পাঠিয়ে দিয়ে আমার শেষ শুভেচ্ছাসহ। নামটা সিলভিয়াস কাউন্ট নেগ্রেটো সিলভিয়াস–লিখে নাও হে, লিখে নাও। ১৩৬ মুরসাইড গার্ডেন্স, নর্থ ওয়েস্ট। হয়েছে?

উদবেগে মুখখানা কীরকম যেন হয়ে গেল ওয়াটসনের। হোমস যে বাড়িয়ে বলছে না, বরং কমিয়ে বলছে বুঝতে পেরে সঙ্গেসঙ্গে নাম-ঠিকানাটা লিখে নিল কাগজে।

বলল, হোমস, দিন দুয়েক আমার হাতে কাজ নেই। বলো কী উপকার করতে পারি।

ভায়া, তুমি ব্যস্ত ডাক্তার। রুগিদের ভিড় লেগেই থাকে।

এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। লোকটাকে গ্রেপ্তার করাচ্ছ না কেন?

পারি, কিন্তু করাচ্ছি না বলেই এত দুশ্চিন্তা।

কেন?

হিরেটা কোথায় এখনও জানি না।

ক্রাউন জুয়েল?

হ্যাঁ। হলদে হিরে–প্রকাণ্ড সেই মাজারিন হিরে। জাল পাতাই রয়েছে–হিরে চোরদের ধরেও ফেলব যেকোনো মুহূর্তে কিন্তু লাভ কী ওয়াটসন? হিরে তো পাব না?

জালের মৎস্যদের মধ্যে কাউন্ট সিলভিয়াস বুঝি একজন?

শুধু মৎস্য নয়–হাঙর। কামড়ায়। অন্যজন হল বক্সার স্যাম মার্টন। লোক খারাপ নয়–কিন্তু কাউন্টের হাতের পুতুল। হাঙর হয় বাজন মাছ সহজেই টোপ খেয়ে বসে। গোড়া থেকেই জালে পড়ে তিড়িক-তিড়িক নেচে বেড়াচ্ছে।

কাউন্ট সিলভিয়াস এখন কোন চুলোয়?

সকালটা তার সঙ্গেই তো কাটিয়ে এলাম বুড়ির ছদ্মবেশে। হাতে ছাতা তুলে দিয়ে আধা-ইটালিয়ান উচ্চারণে কী খাতিরটাই না করল। সহবত জানে ঠিকই, পাক্কা শয়তান যখন আসল রূপ ধরে।

বেঁচে গেছ।

তা গেছি। পেছন পেছন তো ছিলাম বেনজির কারখানায়–এয়ার গান যে তৈরি করে, সেই স্ট্রবেনজি। রাস্তার ওপারের জানলায় এয়ার গানখানা এখন এই জানলাই তাক করে রয়েছে–যেকোনো মুহূর্তে নকল মূর্তির খাসা ব্রেন ফুটো হয়ে যাবে শব্দহীন একখানা বুলেটের আবির্ভাবে। কী ব্যাপার, বিলি?

ট্রেতে করে একটা ভিজিটিং কার্ড নিয়ে এসেছিল বিলি। চোখ বুলিয়ে নিয়ে পরম কৌতুকে হেসে উঠল হোমস।

আসলি মাল এসে গেছে ওয়াটসন। খোদ কাউন্ট স্বয়ং হাজির। লোকটার বুকের পাটা দেখেছ? বড়ো শিকারে নাম আছে কাউন্টের। আমাকে শিকার করতে পারলেই ষোলোকলা পূর্ণ হয়।

পুলিশ ডাকো।

ডাকব, পরে। জানলা থেকে উঁকি মেরে দেখ তো রাস্তায় কেউ ঘুরঘুর করছে কি না।

পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখে ওয়াটসন বললে, দরজার কাছেই একজনকে দেখা যাচ্ছে।

ওই হল স্যাম মার্টন—মাথামোটা পরম অনুগত অনুচর। বিলি, ভদ্রলোক কোথায়?

ওয়েটিংরুমে।

আমার ঘণ্টার আওয়াজ পেলেই নিয়ে আসবে।

আজ্ঞে।

আমি ঘরে না-থাকলেও ঘরে বসাবে। আজ্ঞে।

বিলি বেরিয়ে যেতেই ওয়াটসন বললে, হোমস, অসম্ভবকে সম্ভব করতে যাচ্ছ। লোকটা বিপজ্জনক। মরিয়া। সব করতে পারে। খুনও করতে পারে।

করলে অবাক হব না।

আমি তোমার সঙ্গে থাকব।

তাতে পথের কাঁটাই কেবল হবে।

তার?

না, আমার।

তোমাকে ফেলে আমি যাব না।

যাবে, ভায়া, যাবে। এ-খেলাও তুমি খেলে যাবে শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গেই তবে সামনে থেকে নয়, আড়াল থেকে, বলে নোটবই নিয়ে খসখস করে একটা পাতায় কী লিখে ছিঁড়ে নিয়ে ধরিয়ে দিল ওয়াটসনের হাতে, সোজা চলে যাও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে পুলিশ ডেকে এনে অ্যারেস্ট করিয়ে দাও কাউন্টকে। ততক্ষণ আমি ওকে আটকে রাখছি–এসেছে আমার সঙ্গেই কথা বলতে ইচ্ছেটা পুরণ করা যাক।

সানন্দে যাব।

সেই ফাঁকে আমি কথায় কথায় ওর পেট থেকে হিরে কোথায় আছে বার করে নেব। ঘণ্টা বাজিয়ে দিল হোমস, শোবার ঘরে লুকোনো দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও। আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে চাই হাঙর মহাপ্রভুর সুরতখানা।

ফাঁকা ঘরে কাউন্টকে ঢুকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল বিলি। দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই ইতিউতি সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল বিরাটকায় কাউন্ট। সত্যিই দর্শনীয় মূর্তি। নাকখানা ইগলপাখির চঞ্চুর মতো। ইয়া কালো গোঁফের নীচে পাতলা দৃঢ়সংবদ্ধ ঠোঁটে সীমাহীন নিষ্ঠুরতা। বেশভূষা অত্যন্ত পরিপাটি–কিন্তু চাকচিক্য যেন বড়ো বেশি চোখে লাগে। ফাঁদ পাতা আছে কি না এই সন্দেহে ইতিউতি তাকিয়ে ভীষণ চমকে উঠল কাউন্ট। চোখ পড়েছে জানলার সামনে রাখা চেয়ারে বসা অবস্থায় শার্লক হোমসের নকল মূর্তির দিকে। কিছুক্ষণ নিথর দেহে নিঃসীম বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকার পর খুনের সংকল্পে কঠিন হয়ে গেল চোয়ালের হাড়, চোখের মণি। ঘরে কেউ নেই দেখে নিয়ে হাতের লাঠিখানা মাথার ওপর তুলে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল মূর্তির পেছনে। শেষ লাফটা লাফাতে যাচ্ছে এমন সময়ে পেছনের শোবার ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভেসে এল শ্লেষমাখা হিমশীতল কণ্ঠস্বর :

ভাঙবেন না, কাউন্ট! ভাঙবেন না!

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল কাউন্ট। ক্ষণেকের জন্যে ফের লাঠি মাথায় তুলে এমনভাবে পা বাড়াল যেন নকল ছেড়ে আসল লোকের মাথাটাই এবার ছাত্ করে ছাড়বে। কিন্তু দীর্ঘ মুর্তির ধূসর স্থির চাউনি আর বিদ্রুপমাখা হাসির মধ্যে যেন জাদু ছিল–লাঠি নামিয়ে নিল কাউন্ট।

নকল মূর্তির দিকে পা বাড়িয়ে হোমস বললে, জিনিসটা খাসা বানিয়েছে বটে ট্যাভারনিয়ার ফ্রেঞ্চ মডেল শিল্পী ট্যাভারনিয়ার। মোমের মূর্তি তৈরি করতে জুড়ি নেই। যেমন এয়ারগান চালাতে জুড়ি নেই আপনার বন্ধু স্ট্রবেনজির।

এয়ারগান! মানে?

টুপি আর লাঠি পাশের টেবিলে রাখুন। ধন্যবাদ! চেয়ার টেনে নিয়ে বসুন। রিভলভারটাও বার করুন। চমৎকার! ইচ্ছে হলে রিভলভারের ওপরেই বসতে পারেন। আপনি এসে ভালো করেছেন–কথা ছিল।

ভীষণভাবে ভ্রুকুটি করে কাউন্ট বললে, আপনার সঙ্গেও আমার কথা ছিল হোমস। সেইসঙ্গে ইচ্ছে ছিল মেরে পাট করে দেওয়ার।

টেবিলে পা তুলে দিয়ে হোমস বলে, জানি। কিন্তু হঠাৎ আমাকে নিয়ে এত ব্যস্ত হওয়ার কারণটা জানতে পারি?

বড্ড বেড়েছেন বলে। পেছনে ফেউ পর্যন্ত লাগিয়েছেন।

ফেউ! মোটেই না!

বাজে কথা একদম বলবেন না। জোড়া ফেউ পেছনে লাগিয়েছেন।

তুচ্ছ ব্যাপার। তার আগে একটা ব্যাপার আপনি শুধরে নিন। আমার নামের আগে উপসর্গটা বলতে ভুলবেন না। চোরচোট্টাদের সঙ্গে কারবার করলেও তারা আমাকে মিস্টার হোমস বলেই ডাকে আপনি ব্যতিক্রম হতে যাবেন না।

মিস্টার হোমস!

চমৎকার! এবার বলি, ফেউ বলে যাদের ভুল করেছেন, তারা ফেউ নয়।

ঘৃণায় মুখ বেঁকিয়ে হাসল কাউন্ট।

অন্যের চোখে ধূলো দেওয়া যায়, আমার চোখে নয়। গতকাল একটা স্পোর্টিং বুড়ো পেছনে লেগেছিল–আজ একটা বুড়ি। সারাদিন ঘুরেছে পেছন পেছন।

প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ। ফাঁসির দড়িতে ঝোলার আগে ব্যারন ডোসন দুঃখ করে বলেছিলেন–আমি আইনকে যেমন অনেক দিয়েছি, মঞ্চকে তেমনি অনেক বঞ্চিত করেছি। প্রশংসা আপনিও করলেন আমার অভিনয় প্রতিভার। ফেউ দুজন কেউ নয়–আমি!

আপনি!

ওই তো সোফার গায়ে হেলান দেওয়া রয়েছে ছাতাটা। চিনতে পারছেন? নিজে হাতে করে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন?

ইস! যদি জানতাম—

তাহলে গরিবের ঘরে আর পায়ের ধুলো দিতে আসতেন না!

আরও কুটি কুটিল হল কাউন্টের ভয়ানক মুখখানা।

ব্যাপার আরও ঘোরালো হল। নিজেই স্বীকার করলেন আমার পেছনে লেগেছেন। কেন?

আলজেরিয়ায় আপনি সিংহ শিকার করতেন না?

করতাম।

কেন করতেন?

উত্তেজনার জন্যে–বিপদের স্বাদ পাওয়ার জন্যে।

সেইসঙ্গে দেশ থেকে উৎপাতকে দূর করার জন্যে, তাই না?

তা তো বটেই!

সংক্ষেপে–আমার উদ্দেশ্যও তাই।

তড়াক করে লাফিয়ে উঠে হিপপকেটে হাত দিল কাউন্ট।

বসে পড়ুন মশায়, বসে পড়ুন। আমি জানি ওখানে আর একটা পিস্তল আছে। হলদে হিরে কোথায় আছে বলুন।

কুটিল হেসে চেয়ারে হেলান দিল কাউন্ট।

তাই নাকি?

আপনার পেছনে কেন লেগেছি আপনি জানেন। কতটা আমি জেনেছি জানবার জন্যেই আজ আপনি গরিবের ঘরে পায়ের ধুলো দিয়েছেন। শুনে রাখুন, আমি সব জানি। শুধু একটা খবর বাদে। এখুনি আপনি তা বলবেন।

বটে! বটে! কোন খবরটা জানেন না শুনি?

ক্রাউন ডায়মন্ড এখন কোথায়?

আমি তার কী জানি?

আপনি জানেন।

তাই নাকি?

দুই চোখ ইস্পাত বিন্দুর মতো সূচাগ্র করে হোমস শুধু বললে, ধাপ্পা দেবেন না। আমার চোখের সামনে আপনি কাচ ছাড়া কিছুই নয়–ভেতর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি।

তাহলে তো জেনেই ফেলেছেন হিরে কোথায়।

সকৌতুক হাততালি দিয়ে হোমস বললে, তাহলে স্বীকার করলেন আপনি জানেন।

কিছুই স্বীকার করিনি আমি।

পথে আসুন, কাউন্ট। নইলে বিপদে পড়বেন।

কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে কাউন্ট বলল, ব্লাফ মেরে যান–কান খোলা আছে।

কিস্তিমাতের চাল দিতে গিয়ে পাকা দাবা খেলুড়ে যেমন চোখ কুঁচকে তাকায়, সেইভাবে চেয়ে রইল হোমস। তারপর টেবিলের ড্রয়ার টেনে একটা নোটবই বার করে বললে :

এর মধ্যে কী আছে জানেন?

না!

আপনি!

আমি?

আজ্ঞে, আপনি! পাতায় পাতায় হাজির আপনার বিপজ্জনক নোংরা জীবনের কীর্তিকাহিনি।

হোমস! দু-চোখ জ্বলে উঠল কাউন্টের। আমার সহ্যের একটা সীমা আছে, খেয়াল থাকে যেন!

সব পাবেন এর মধ্যে, মিসেস হ্যারল্ডের মৃত্যুর আসল ঘটনা পর্যন্ত–যার ফলে আপনি তার ব্লাইমার এস্টেটের মালিক হয়ে বসে দু-দিনে জুয়ো খেলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

স্বপ্ন দেখছেন নাকি?

মিস মিন্নি ওয়ারেনডারের পুরো জীবনকাহিনিও পাবেন।

ছোঃ! অত সোজা নয়!

আরও আছে। ১৮৯২ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি রিভিয়েরাগামী ডিলুক্স ট্রেনে ডাকাতির ঘটনা। আর এই দেখুন সেই বছরেই ক্রেডিট লায়নেসে জাল চেকের কারবার।

উঁহু, ভুল করলেন ওইখানে।

তাহলে ভুল করিনি অন্যখানে! কাউন্ট তাস খেলাটা আপনি ভালোই জানেন। প্রতিপক্ষের হাতে তুরুপের তাস এসে গেলে নিজের হাতের তাস দেখিয়ে দেওয়াই ভালো সময় বাঁচে।

হলদে হিরের সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক?

অত ছটফট করবেন না! আপনার সব কীর্তিই আমার জানা–এমনকী ক্রাউন ডায়মন্ডের কেসে মাথামোটা ওই লড়াকু স্যাঙাতকে নিয়ে আপনি যা যা করেছেন সমস্ত নখদর্পণে।

বটে!

হোয়াইট হলে যে-গাড়োয়ান আপনাকে নিয়ে গেছিল, তাকে আমি পেয়ে গেছি। যার গাড়িতে ফিরে এসেছিলেন, সেও আমার হাতের মুঠোয়। ডায়মন্ড কেসের কাছে আপনাকে ঘুরঘুর করতে দেখেছে যে দারোয়ান, তার জবানবন্দিও আছে এই খাতায়। ইকি স্যান্ডার্সের কাছে হিরে নিয়ে গেছিলেন কেটে চেহারা পালটানোর জন্যে ইকি রাজি হয়নি কিন্তু এখন সে ইনফর্মার হয়ে আমার কবজায় চলে এসেছে! কাজেই, খেলা আপনার ফুরিয়েছে কাউন্ট।

রগের শিরা ফুলে উঠল কাউন্টের। দু-হাত মুঠো পাকিয়ে কোনোমতে সামলে নিল নিজেকে। কথা বলতে গেল, কিন্তু শব্দ ফুটল না।

হোমস বললে, সব তাস দেখিয়ে দিলাম—একটা বাদে। সেটাই কেবল পাচ্ছি না–ডায়মন্ড সাহেব।

পাবেনও না।

তাই নাকি? কাউন্ট সিলভিয়াস, তাহলে একটা রফায় আসুন। হিরে না-পেলে বিশ বছর জেল হয়ে যাবে আপনার আর স্যাম মার্টনের। তাতে কোনো লাভ নেই আপনার। কিন্তু হিরে যদি বার করে দেন আপনার চুল পর্যন্ত ছোঁব না। এবারকার মতো আমার হিরে দরকার–আপনাকে নয়। কিন্তু পরে যদি বেচাল দেখি—ছাড়ব না।

যদি রাজি না হই?

বললাম তো, হিরে না-পেলে আপনাকে ধরব।

দোরগোড়ায় আবির্ভূত হল বিলি।

আজকের আলোচনায় স্যাম মার্টনের থাকা দরকার কাউন্ট। বিলি, সদর দরজার সামনে একজন হোঁতকা চেহারার বিচ্ছিরি দেখতে লোক দাঁড়িয়ে আছে। ওপরে আসতে বলো।

যদি না-আসে?

জোর করতে যেয়ো না। শুধু বললো, কাউন্ট সিলভিয়াস দেখা করতে চান।

বিলি উধাও হতেই কাউন্ট বললে, কী করতে চান?

ওয়াটসন এতক্ষণ এখানে ছিল। ওকে বলেছি, এখুনি আমার জালে ধরা দিতে দুটো মাছ আসবে। একটা হাঙর, আর একটা বাজন।

হিপপকেটে হাত দিয়ে চেয়ার ছেড়ে কাউন্ট উঠে দাঁড়াতেই ড্রেসিং গাউনের ভেতর একটা বস্তু আধখানা টেনে বার করল হোমস।

খামোখা পিস্তলে হাত রাখছেন। আওয়াজ করে আমাকে মারা বিপজ্জনক, আপনি জানেন। ওর চাইতে এয়ার গান অনেক নিরাপদ। গুড ডে, মিস্টার মার্টন। রাস্তাটা বড়ো একঘেয়ে লাগছিল, তাই না?

হোমসের সৌজন্য হকচকিয়ে দিল মুষ্টিযোদ্ধা স্যাম মার্টনকে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ইতিউতি তাকিয়ে বুঝতে পারল না জবাবটা কীরকম হওয়া উচিত।

জিজ্ঞেস করল কমরেডকে, ব্যাপার কী, কাউন্ট? কী চায় এ?

কাউন্ট শুধু কাঁধ ঝাঁকিয়ে গেল–জবাব দিল হোমস।

ছোট্ট করে বলছি। খেল খতম।

কমরেডকেই জিজ্ঞেস করল মার্টন, তামাশা করছে নাকি?

জবাব দিল হোমস, তামাশা যে হচ্ছে না, আর একটু পরেই হাড়ে হাড়ে বোঝা যাবে। কাউন্ট সিলভিয়াস, পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। শলাপরামর্শ করে ঠিক করুন, ধরা দেবেন, না হিরে দেবেন। আমি পাশের ঘরে গিয়ে বেহালা বাজাচ্ছি–ঠিক পাঁচ মিনিট পরে আসব।

কোণ থেকে বেহালা তুলে নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকল হোমস। পরক্ষণেই শোনা গেল বেহালার তারে ছড়ি টানার করুণ সুর।

উদবিগ্ন স্বরে মার্টন বললে, হিরের খবর জেনে ফেলেছে নাকি?

তার চাইতেও বেশি জেনেছে।

গুড লর্ড! মুখ সাদা হয়ে গেল ঘুসিবাজের।

ইক স্যান্ডার্স ফাঁস করে দিয়েছে।

খুন করব।

তাতে আমাদের সুবিধে হবে না।

জুলজুল করে শোবার ঘরের দিকে তাকিয়ে মার্টন বললে, আড়ি পেতে কথা শুনছে না তো?

বেহালা বাজাতে বাজাতে আড়ি পাতা যায়?

তা ঠিক। পর্দার আড়ালে কেউ নেই তো? বড়ো বেশি পর্দা এ-ঘরে, বলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে জানলার সামনে ডামি মূর্তিটা দেখে আঁতকে উঠল মার্টন।

ভয় নেই, ডামি। অভয় দিল কাউন্ট।

তাই নাকি? সব্বোনাশ! অবিকল ওইরকম! কিন্তু পর্দাগুলো—

ধুত্তোর পর্দা! খামোখা সময় নষ্ট হচ্ছে। হিরে না-দিলে জেলে ঢুকিয়ে ছাড়বে হোমস।

অ্যাঁ!

ছেড়ে দেব যদি হিরে দিই।

লাখ লাখ টাকার হিরে দিয়ে দোব!

নইলে জেল।

ঘরে তো একলা। দুজনে গিয়ে সাবাড় করে দোব?

তাতে বাঁচব না। প্রথমত গুলি করে পালাতে পারব না। দ্বিতীয়ত প্রমাণ-টমান নিশ্চয় পুলিশের হাতে পৌঁছে গেছে। ওকী?

একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল জানলার দিক থেকে। তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল দুই মূর্তিমান। কিন্তু কেউ কোথাও নেই–চেয়ারে বসানো ডামি মূর্তিটা ছাড়া।

রাস্তার আওয়াজ, বললে মার্টন। তাহলে বলুন এখন কী করা যায়।

হিরে আমার কাছেই চোরা পকেটে। আজ রাতেই পাচার করতে হবে ইংলন্ডের বাইরে রোববারের মধ্যেই চার টুকরো করতে হবে আমস্টারডামে। ভ্যান সেডারের খবর এখনও পায়নি হোমস।

ভ্যান সেডার তো সামনের হপ্তায় যাবে?

তাই কথা ছিল। এখন যেতে হবে পরের জাহাজেই। হয় তুমি নয় আমি হিরে নিয়ে লাইম স্ট্রিটে যাব তার কাছে এখুনি।

কিন্তু চোরা কুঠরি যে এখনও তৈরি হয়নি।

না হোক, ঝুঁকি নিতে হবে। আবার খরখরে চোখে এদিক-ওদিক তাকাল কাউন্ট। আওয়াজটা রাস্তা থেকেই এসেছে–সন্দেহ নেই।

বলল, হোমসকে হিরে দোব বলে ভুলিয়ে রাখছি। গর্দভটা হিরে পাবে শুনলে আমাদের জেলে ঢোকাবে না। হিরে হল্যান্ডে পৌঁছে গেলেই আমরা সটকান দেব ইংলন্ডের বাইরে।

খাসা প্ল্যান!

তুমি যাও–খবর দাও ওলন্দাজটাকে।

আঃ, কান ঝালাপালা হয়ে গেল বেহালার আওয়াজে! এদিকে এসো, এই নাও হিরে।

আপনার সাহস তো কম নয়। সঙ্গে রেখেছেন।

আর কোথাও নিরাপদ নয়–আমার কাছে ছাড়া।

আলোয় একটু ধরুন তো দেখি ভালো করে।

এই দেখো।

ধন্যবাদ!

চক্ষের পলকে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে এসে ছোঁ মেরে এক হাতে হিরে খামচে নিয়ে আরেক হাতে রিভলভার তুলে ধরল হোমস। বিষম বিস্ময়ে টলমলিয়ে উঠল দুই মুর্তিমান–সেই ফাঁকে ইলেকট্রিক ঘণ্টা বাজিয়ে দিল হোমস।

মারপিট করতে যাবেন না–ফার্নিচার চুরমার হয়ে যাবে। প্লিজ! পুলিশ নীচে দাঁড়িয়ে আছে।

রাগে বিস্ময়ে খাবি খেতে খেতে কাউন্ট বললে, আ–আপনি কোত্থেকে—

অবাক হচ্ছেন? আওয়াজ শুনে বুঝতে পারেননি আমিই পর্দার আড়ালে ডামি মূর্তি সরিয়ে রেখে নিজে বসেছি সে-জায়গায়। নইলে কি এত মন খুলে কথা বলতেন? শোবার ঘর থেকে পর্দার আড়াল পর্যন্ত দোসরা পথ আছে একটা।

কিন্তু বেহালার বাজনা–

আরে ছ্যাঃ! ওটা তো গ্রামোফোন বাজছে! বাজুক গে! আধুনিক আবিষ্কারের কত সুফল দেখছেন।

হুড়মুড় করে এক পাল পুলিশ ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে। হাতকড়া লাগিয়ে গাড়িতে আসামিদের তুলে সদলবলে সবাই উধাও হতেই ঘরে ঢুকল বিলি। হাতে ট্রে। ট্রে-র ওপর একটা কার্ড।

লর্ড ক্যান্টলমিয়ার এসেছেন।

ঘরে তখন ওয়াটসন। চোখ মটকে হোমস বললে, লোকটাকে একটু শিক্ষা দোব। হিরে পেয়েছি বলতে যেয়ো না।–বিলি, নিয়ে এসো।

ঘরে ঢুকল কালো জুলপিওলা বেঁটেখাটো শুকনো চেহার শ্লথচরণ এক ভদ্রলোক গোল কাঁধের সঙ্গে এহেন চেহারা যেন মানাচ্ছে না।

সোল্লাসে বললে হোমস, আসুন লর্ড ক্যান্টলমিয়ার। বাইরে কনকনে শীত, তাই না? ওভারকোটটা খুলে দেব?

ধন্যবাদ। কোট খুলব না। নাছোড়বান্দার মতো কোটের হাতায় হাত রাখল হোমস।

এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললেন লর্ড মশায়, আমি এখানে বসতে আসিনি। আপনার গাঁয়ে-মানে-না-মোড়লগিরি দেখতে এসেছি।

কাজটা খুবই কঠিন।

জানতাম–ল্যাজেগোবরে হবেন আমি জানতাম।

সত্যিই স্যার, হাবুড়ুবু খেয়ে মরছি।

তা আর বলতে।

একটা ব্যাপারে একদম খেই পাচ্ছি না। একটু বুদ্ধি দেবেন?

বড্ড দেরিতে চাইলেন বুদ্ধিটা। বলুন।

চোর ধরবার পর কেস ঠিক সাজিয়ে ফেলব।

আগে ধরুন।

তা ঠিক। কিন্তু হিরে যে নিয়েছে, তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ কী হবে?

হিরে তার কাছে পাওয়া গেছে এইটাই মোক্ষম প্রমাণ।

তখন তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে?

অবশ্যই।

হোমস বড়ো একটা হাসে না–কিন্তু সেদিন ওইরকমই একটা আওয়াজ শুনতে পেল ওয়াটসন!

মাই ডিয়ার স্যার, তাহলে দুঃখের সঙ্গে আপনাকে গ্রেপ্তার করার কথাই বলতে হয়।

ভীষণ রেগে গেলেন লর্ড ক্যান্টলমিয়ার। পাণ্ডুর গাল লাল হয়ে গেল ভেতরের আঁচে।

মিস্টার হোমস, মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। আপনার ক্ষমতায় কোনোদিনই আস্থা আমার ছিল না—পুলিশই পারবে হিরে উদ্ধার করতে–আপনি নন। চললাম।

দরজা আটকে দাঁড়িয়ে হোমস বললে, সে কী! কিছুক্ষণের জন্যে হিরে কাছে রাখার চাইতেও বড়ো অপরাধ হল চলে যাওয়া।

অসহ্য! যেতে দিন!

ওভারকোটের ডান পকেটে হাত দিন।

কী বলতে চান?

যা বলছি করুন।

পর মুহূর্তে বেবাক বোকার মতো কাঁপা হাতে প্রকাণ্ড হলদে হিরে নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল লর্ড মশায়।

বলল তোতলাতে তোতলাতে, একী! একী! এ আবার কী মিস্টার হোমস!

খুব খারাপ অভ্যেস লর্ড ক্যান্টলমিয়ার, খুব খারাপ অভ্যেস। গাড়োয়ানি ইয়ার্কির অভ্যেসটা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারি না–একটু নাটক করার লোভ কিছুতেই সামলাতে পারি না–ওয়াটসন জানে আমার এই দুর্বলতা। হিরেটা আমিই রেখেছিলাম আপনার পকেটে।

সবিস্ময়ে একবার হিরে আরেকবার হোমসের হাসি উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে লর্ড বলল, ইয়ার্কির সময় যদিও এটা নয়–ইয়ার্কির এই প্রবৃত্তিটাও অসুস্থ বিকৃত তাহলেও মিস্টার হোমস, আপনার ক্ষমতা সম্বন্ধে এক্ষুনি যা বলেছিলাম, তা ফিরিয়ে নিচ্ছি। শুধু বুঝতে পারছি না মাজারিন হিরে—

কী করে পেলাম, পরে শুনবেন। আপনার বন্ধুদের কাছে এই গাড়োয়ানি ইয়ার্কির কাহিনি। ফলাও করে বললেই যথেষ্ট প্রায়শ্চিত্ত হবে আমার, বিলি, লর্ড ক্যান্টলমিয়ারকে এগিয়ে দিয়ে এসো। আর মিসেস হাডসনকে বললো ঝটপট দুজনের ডিনার দিতে।

————–

টীকা

হলদে হিরের হয়রানি : দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য মাজারিন স্টোন অক্টোবর ১৯২১ সংখ্যার স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনে এবং নভেম্বর ১৯২১ সংখ্যার হার্স্ট ইন্টারন্যাশনাল ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর কয়েকমাস আগে এই কাহিনির ভিত্তিতে দ্য ক্রাউন ডায়মন্ড বা অ্যান ইভনিং উইদ শার্লক হোমস নাটকের অভিনয় শুরু হয় ১৯২১-এর দোসরা মে। ব্রিস্টলের হিপোডড্রামে এই নাটকের প্রথম অভিনয়ের পর প্রায় দেড় বছর ধরে বিভিন্ন মঞ্চে এটি অভিনীত হয়।

প্রাইম মিনিস্টার : সেই সময়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আর্থার জেমস বলফোর (১৮৪৮-১৯৩০)।

হোম সেক্রেটারি : চিলস্টনের ফার্স্ট ভাইকাউন্ট, অ্যারিটাস একার্স-ডগলাস ব্রিটেনের হোম সেক্রেটারি ছিলেন ১৯০২ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত।

এই ধরনের জিনিস একবার কাজে লাগিয়েছিলাম : দি এমটি হাউস গল্পে এই ঘটনা ঘটেছিল।

মাজারিন হিরে : জন্মসুত্রে ইতালীয় কার্ডিনাল স্কুল মাজারিন (১৬০২-১৬৬১) চতুর্দশ লুইয়ের যুবাবয়সে ফ্রান্সের মন্ত্রী ছিলেন। মিলান শহরে পোপের প্রতিনিধি মাজারিনকে ফ্রান্সে পাঠানো ফ্রান্স এবং স্পেনের মধ্যে কাজিয়ার মীমাংসার মধ্যস্থতা করতে। পরে মাজারিন ফরাসি রাজদূত, অ্যানি অব অস্ট্রিয়ার মন্ত্রণাদাতা নিযুক্ত হন। মাজারিনের ছিল মহামূল্যবান রত্নের বিশাল সংগ্রহ। নিজের উইলে মাজারিন তার সংগ্রহের বহুলাংশ ফরাসি রাজবংশকে দিয়ে যান। এর মধ্যে ছিল আঠারোটি হিরে। অবশ্য যতদূর জানা যায়, এর মধ্যে একটি হিরেও হলুদ রঙের ছিল না।

ওয়েটিংরুমে : বেকার স্ট্রিটে হোমসের বাড়িতে ওয়েটিংরুমের উল্লেখ এই একবারই মাত্র পাওয়া গিয়েছে।

শোবার ঘরে লুকোনো দরজা : এ-রকম কোনো দরজার উল্লেখও এই প্রথম এবং শেষ।

ফ্রেঞ্চ মডেল শিল্পী ট্যাভারনিয়ার : দি এমটি হাউস গল্পের মূর্তিটির ভাস্কর ছিলেন নোবলের মঁসিয়ে অস্কার মিনিয়ে।

আমস্টারডাম : হল্যান্ডের আমস্টারডাম শহর হিরে কাটাবার বিখ্যাততম স্থান। পৃথিবীর বৃহত্তম হিরে কালিনান এবং ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে যাওয়া কোহিনুর এই শহরেই কর্তিত হয়েছিল।

গ্রামোফোন : ওই সময়ে ইংলন্ডে গ্রামোফোন বলতে বার্লিনার-গ্রামোফোন অ্যান্ড টাইপরাইটার কোম্পানির তৈরি রেকর্ড বোঝা যেত। আমেরিকায় এর প্রচলিত নাম ছিল ফোনোগ্রাফ। এমিল বার্লিনার (১৮৫১-১৯২৯) আমেরিকায় গ্রামোফোন আবিষ্কার করেন।

হোমস বড়ো একটা হাসে না : হোমসিয়ান হিউমার প্রবন্ধে এ. জি. কুপার লিখেছিলেন হোমসকে হাসতে দেখা গিয়েছে দু-শো বিরানব্বই বার। কিন্তু চার্লস ই, লটারবাখ এবং এভোয়ার্ড এস. লটারবাখ দ্য ম্যান হুসেলডম লাফড প্রবন্ধে হোমসের জোরে হাসি, কাষ্ঠ হাসি, মুচকি হাসি, বাঁকা হাসি, ঠাট্টা করে হাসি প্রভৃতি নানাবিধ শ্রেণিবিভাগ করে দেখিয়েছেন। সব গল্প-উপন্যাস মিলিয়ে হোমসের হাসির মোট ঘটনা তিনশো ষোলো।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments