Wednesday, July 29, 2026
Homeভৌতিক গল্পতান্ত্রিক - ধীরেন্দ্রলাল ধর

তান্ত্রিক – ধীরেন্দ্রলাল ধর

তান্ত্রিক

দুর্গাবিনোদ ইস্কুল মাষ্টারের ছেলে। অনেক দুঃখ কষ্ট সয়ে এম-এ পাশ করলেও মুরুব্বির অভাবে ভাল চাকরি জোগাড় করতে পারল না। শেষ অবধি হলো কেরানী। এখনকার দিনে কেরানীগিরির আবার দুটো ভাগ হয়েছে, নীচু কেরানীর মাইনে হয় সওয়া শো থেকে শুরু, আর উঁচু কেরানীর মাইনে শুরু হয় সওয়া দুশো টাকা থেকে। মুরুব্বিহীন দুর্গাবিনোদ নীচু ধাপের কেরানী হলো। তাও জুটলো অনেক কষ্টে। এম-এ পাশেও কুলোয়নি। এই কেরানীগিরির জন্য আবার পরীক্ষা দিতে হয়েছিল।

যাক চাকরিটা হয়ে দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান তো হলো। দুর্গাবিনোদের পড়াশুনার শখ আছে, সন্ধ্যা সাতটা থেকে সে লাইব্রেরীতে হাজিরা দিয়ে চলল, রাত ন’টা অবধি। দর্শনশাস্ত্রে সে এম-এ পাশ করেছে, এবার হিন্দু দর্শনটা সে ভালভাবে বুঝে নিতে চায়।

ধর্ম কী? ঈশ্বর কী? মানুষ কেমন করে নিজের মধ্যে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করে? এই বুঝতে বুঝতে শেষে এসে পড়ে যে সব সাধু সন্ত মহাত্মা সাধনা করতে করতে ভগবদ-শক্তি লাভ করেছিলেন তাঁদের কথা। ভারতের সাধকদের যত সব অলৌকিক কীর্তির কথা পড়তে পড়তে দুর্গাবিনোদ সাধু দর্শনের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠলো। রবিবারে ছুটির দিনে তার আর বাড়ীতে বসে থাকা চললো না। কলিকাতার আশেপাশে বিশ-পঁচিশ মাইন্টের মধ্যে কোথায় কোন্ আশ্রম আছে, কোথায় কোন্ তান্ত্রিক থাকেন, সেখানে সে যাওয়া আসা শুরু করলো।

দুর্গাবিনোদ আশ্রমে যায়, আরো দশ জনের মাঝে বসে, আশ্রমিক মহাত্মাদের বাণী শোনে, তারপর প্রণাম করে বিদায় নেয়। ফেরার পথে মহাত্মার বাণী মনে মনে আলোচনা করে, মহাত্মা কত বড় সাধক তার একটা পরিমাপ করার চেষ্টা করে। মহাত্মার কোন অলৌকিক শক্তি আছে কিনা জানার চেষ্টা করে।

একদিন খবর পেল হাওড়ার এক গ্রামে এক তান্ত্রিক আছেন তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। জলপড়া দিয়ে অম্লশূল সারান, কানে কাঠি দিয়ে কালা মানুষের বধিরতা দূর করেন, কঠিন বাতের বেদনা সামান্য হাত বুলিয়ে আরাম করে দেন।

যিনি খবরটা দিয়েছিলেন তিনি সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন।

বাস থেকে নেমে মাইল খানেক হেঁটে গেলে একটি ছোট গ্রাম। গাঁয়ের গোড়াতেই এক পুকুর পাড়ে একটি ছোট মন্দির, মন্দিরের পাশেই একখানি চালাঘর। ঘরের দাওয়ায় একজন জটাধারী সাধু বসে আছেন, সামনে ধুনুচীতে আগুন জ্বলছে, পাশে একটা কলসী ও ভাঁড়। কয়েকজন পুরুষ ও মহিলা হাত জোড় করে সামনে মাদুরে বসে আছে।

দুর্গাবিনোদও বসে পড়লো।

সাধুর বয়স বেশী নয়, তার চেহারা বলিষ্ঠ, রং কালো, মাথার জটাও বিশেষ দীর্ঘ নয়। চোখ দুটি জবা ফুলের মতো লাল। তার উপর কপালে লাল চন্দন লেপা। ভক্তির চেয়ে ভয় হয় বেশী।

দুর্গাবিনোদের দিকে নজর ফেলতেই সে হাত জোড় করে প্রণাম জানালো। সাধু নিজে থেকেই বললেন কী চাই? গুরু? গুরু মেলা অত সহজ নয়, আগে নিজেকে তৈরী কর, তারপর গুরু। পাত্র ফুটো হলে জল রাখবি কেমন করে? আধার ঠিক না হলে মন্ত্রশক্তি ধারণ করবি কেমন করে? সে মন্ত্র যে দেবে তার কোন লাভ নেই, যে নেবে সেও ব্যর্থ হবে। তৈরী হ’।

দুর্গাবিনোদ ভরসা পেল। বললো–কিভাবে তৈরী হতে হবে?

বাক্ সংগম কর, বেশী কথা বলবি না। নিরামিষ আহার করবি। অযথা কোন পরিশ্রম করবি না, শক্তি সঞ্চয় করবি। সন্ধ্যার পর কোন মন্দিরে বা গঙ্গার তীরে চুপ করে ঈশ্বরের ধ্যান করবি। ধীরে ধীরে মন আত্মস্থ হবে, চিত্ত দৃঢ় হবে। তখন গুরুমন্ত্র নিয়ে সাধন-ভজনের কথা উঠবে, তার আগে কিছু হবে না।

দুর্গাবিনোদ এতদিনে যেন একটা আলো দেখতে পেল। গুরু ও মন্ত্রের কথাটা সে ভেবেছে, কিন্তু এমন ভাবে তার হদিশ কেউ তাকে বাতলাতে পারেনি। তান্ত্রিকের উপর তার বিশ্বাস হলো। প্রথম দর্শনেই এমনভাবে মনের কথাটা টেনে বলা সহজ নয়।

বিকাল অবধি দুর্গাবিনোদ কালীবাবার সামনে বসে রইল। অবধূত কালীবাবা আর তার সঙ্গে কোন কথা বললেন না। কলসী থেকে ভাঁড়ে মদ ঢালেন আর খান। আর অসুস্থদের রোগের কথা শোনেন। অনেক জনকে ওষুধও দেন। ওষুধ মানে কাউকে ধূনির ছাই, কাউকে যুগের আধগোড়া কাঠি। —এই ছাইটা তিন ভাগ করে তিন দিন সকালে খালি পেটে খাবি।–এই কাঠিটা একটা তামার মাদুলিতে ভরে ধারণ করবি ইত্যাদি।

বিকেলবেলা দুর্গাবিনোদ প্রণাম জানিয়ে উঠে পড়লো। কালীবাবা একবার তাকিয়ে হাসলেন শুধু।

দুর্গাবিনোদ অনেক আশ্রমে ঘুরেছে, অনেক মহারাজকে দর্শন করেছে, দিনের পর দিন অনেকের উপদেশ বাণী শুনেছে। কিন্তু কালীবাবার মতো অলৌকিক ক্ষমতা কারও দেখেনি। ছাই দিয়ে রোগ সারানো, কানে কাঠি দিয়ে বধিরতা আরাম করা, হাত বুলিয়ে বাতের বেদনা মুক্ত করা–এসব বড় কম শক্তির কথা নয়। এই মানুষটি কিছুটা ঐশ্বরিক শক্তি যে আয়ত্তে এনেছেন–একথা মানতেই হবে। দুর্গাবিনোদ কালীবাবার কাছে নিয়মিত যাওয়া-আসা শুরু করলো। যদি ইনি প্রসন্ন হয়ে কৃপা করেন, তাহলে দুর্গাবিনোদও একদিন কৃতার্থ হবে।

কালীবাবা সেই যে প্রথম দিন কথা বলেছিলেন, তারপর থেকে আর কথাই বলেন না। প্রণাম করলে হাসেন আর হাত তুলে বলেন–জয়ন্ত।

দুর্গাবিনোদ এদিকে নিরামিষ খাওয়া শুরু করেছে, কথা কম বলে, অনর্থক কোন ঘোরাফেরা করে পরিশ্রম করে না। রাত বারোটা অবধি বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে। কালীবাবার কথা মতো নিজেকে সে দীক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত করে তুলেছে।

হঠাৎ একদিন মাস ছয়েক পরে কালীবাবা বললেন – তুই তো রবিবারে আসিস, আসছে শনিবারে আয় না। সেদিন অমাবস্যা, রাতে মায়ের পূজো দেখবি।

–এ তো আমার সৌভাগ্য।

–সন্ধ্যায় চলে আসবি। রাতে এখানে থাকবি। সারা রাত জাগতে পারবি তো? আমি সারা রাত পূজো করি।

–একটা রাত তো।

–তাহলে আসার সময় মায়ের পূজো নিয়ে আসিস।

–কী আনতে হবে বলুন?

–তুই আর কী আনবি? তিন বোতল দেশী মদ আনবি। কারণবারি–তাতেই হবে।

কালীবাবা গুণগুণ করে উঠলেন–মদ খাই মা কালী বলে–তারপর কলসী থেকে এক ভাঁড় মদ নিয়ে গলায় ঢাললেন।

দুর্গাবিনোদ সেদিন খুশি হলো। কালীবাবা মদ চেয়েছেন। পূজো দেখার জন্য ডেকেছেন। এবার তিনি প্রসন্ন হবেন। উৎফুল্ল মনে দুর্গাবিনোদ সেদিন বাড়ী ফিরলো।

শনিবার সন্ধ্যায় এক রেশন ব্যাগের মধ্যে তিন বোতল দেশী মদ নিয়ে দুর্গাবিনোদ কালীবাবার আশ্রমে এলো, তখন ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে। কালীবাবা দাওয়ায় বসেছিলেন, বললেন – এনেছিস? দে–

বোতল তিনটি নিয়ে কালীবাবা মন্দিরে চলে গেলেন, বললেন — দু ঘন্টা এখন বোস, পূজোর সময় আমি তোকে ডাকবো।

মাদুর পাতা ছিল, দুর্গাবিনোদ সেই মাদুরের ওপর উঠে বসলো।

ক’ মিনিট বসে থাকার পরেই দুর্গাবিনোদ বুঝলো রাতের অন্ধকারে চুপ করে বসে থাকার মতো স্থান সেটা নয়। কানের পাশে মশার ডাক আর থামতে চায় না। বুদ্ধি করে দুর্গাবিনোদ রেশনের থলির মধ্যে একখানা চাদর এনেছিল। এবার সেই চাদরখানা দিয়ে আপাদমস্তক মুড়ে দিল। শুধু চোখ দুটো বেরিয়ে রইল। তবু মনে হয় যেন মশা কামড়াচ্ছে।

সামনে অন্ধকার, মাঠ ঘাট গাছপালা সবই কালোয় মিশে গেছে। অনেকটা তফাতে দু-তিনটে ঘরের জানলায় আলো দেখা যাচ্ছে। কাছাকাছি মানুষ আছে বলে মনে হয় না। কালীবাবার এই ঘরখানাতেও কেউ থাকে না। তাঁর পরিজনরা থাকে ওই গ্রামে। এখানে কালীবাবা একা থাকেন, সাধন-ভজনের জন্য। ঝিঝি পোকা ডাকছে। চারিপাশে নিঝুম। এই তো সন্ধ্যা হয়েছে, এরই মধ্যে মনে হয় রাত যেন দুপুর হয়ে গেল।

এভাবে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে!

কালীবাবাও তো মন্দিরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন।

পাশে একজন কথা বলার মানুষ থাকলে ভাল হতো। বড় একা একা মনে হয়। দেয়ালে হেলান দিয়ে দুর্গাবিনোদ ঝিমুতে শুরু করে।

দুর্গাবিনোদ কোন এক সময় বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছিল। সহসা ঘুম ভাঙলো কালীবাবার ডাকে – আয় উঠে আয়–আয় উঠে আয় – এবার মায়ের আরতি হবে।

ধড়মড় করে উঠে দুর্গাবিনোদ কালীবাবার অনুসরণ করলো।

মন্দিরের মধ্যে পিদিম জ্বলছে। ধূপধূনায় অন্ধকার। ছোট প্রতিমাটি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। সামনে কিছু জবা ফুল, আর মদের তিনটে বোতল। কালীবাবা আসনে গিয়ে বসলেন, বললেন – তুই দরজার বাইরে বোস।

দুর্গাবিনোদ বাইরে বসে পড়লো।

কালীবাবা ওঁ হ্রীং বলে মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করলেন। মাঝে মাঝে জবা ফুল তুলে প্রতিমার চরণে অর্ঘ্য দিতে লাগলেন। প্রায় ঘন্টাখানেক এইভাবে পূজা করার পর হাঁক দিয়ে উঠলেন–মা কালী করালবদনা-লোল-জিহ্বা মা-

তারপর পঞ্চপ্রদীপের আরতি শুরু করলেন।

এবার প্রদীপের আলোয় ধোঁয়ার মাঝেও কিছু কিছু নজরে পড়তে লাগল। দুর্গাবিনোদ দেখলো ঘরের মধ্যে দরজার পাশে আরেকজন কে বসে আছে। ও কে? কখন এলো?

পঞ্চপ্রদীপ ঘুরতে ঘুরতে আলোটা যখনই সেদিকে পড়ে দুর্গাবিনোদ লোকটির মুখের পানে নজর করে। কি বিশ্রী ফ্যাকাশে মুখ, যেন মড়ার মতো।

আরতি শেষ হয়। শাঁখ বাজিয়ে কালীবাবা বসলেন। মদের তিনটি বোতল মায়ের চরণে স্পর্শ করিয়ে হাঁক দিলেন মা কালী করাল-বদনা … লোল-জিহ্বা মা-

তারপর বললেন- প্রণাম কর — প্ৰসাদ নে–

দুর্গাবিনোদ প্রণাম করলো।

বোতল থেকে এক ভাঁড় মদ ঢেলে কালীবাবা বসে থাকা সেই লোকটির মুখে ধরলেন, বললেন–খাও।

লোকটি মদ খেলো।

কালীবাবা সেই ভাঁড়ে আবার মদ ঢাললেন। তাকে বললেন–ধরো, ওকে দাও-

লোকটি ভাঁড় ধরলো, হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল দুর্গাবিনোদের দিকে।

মানুষের হাত যে এতটা লম্বা হয়, দুর্গাবিনোদ তা জানতো না। ভাঁড় শুদ্ধ হাতখানা সোজা দরজা পার হয়ে চলে এলো তার মুখের কাছে।

দুর্গাবিনোদ থ’।

–ভয় পাসনি, খা, মায়ের প্রসাদ–কালীবাবা বললেন।

দুর্গাবিনোদ তাকিয়ে দেখলো। হাতখানায় কোথাও এতটুকু মাংস নেই, সবটাই কঙ্কাল। হাতের মালিকের পানে তাকালো–মুখ কই, কঙ্কালের করোটি!

দুর্গাবিনোদের সারা দেহ কেঁপে উঠলো।–না না বলেই এক লাফে দাঁড়িয়ে উঠেই সে ছুটলো। সোজা পথ দিয়ে সে ছুটলো। কানে এল পিছনে কে যেন অট্টহাসি হাসছে।

সেই অন্ধকার পথে পুরো দু’মাইল ছুটে এসে দুর্গাবিনোদ থামলো একেবারে বাজারের মধ্যে। তখনও সকাল হতে অনেক দেরী। ভয়ে ভয়ে সে পিছন পানে তাকালো, পিছনে কেউ আসছে কিনা।

বাজারে অনেক ঘরের দাওয়ায় মানুষ শুয়েছিল। তাদের দেখে দুর্গাবিনোদ ভরসা পেল। একটা দোকানের দাওয়ায় সে বসে পড়লো।

পরক্ষণেই মনে হলো সেই হাতখানা তার মুখের সামনে মদের ভাঁড়টা যেন এগিয়ে ধরেছে। দুর্গাবিনোদ চীৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল।

… … …

সকালে বাজারের লোকেরাই দুর্গাবিনোদকে বাসে তুলে দিয়েছিল।

… … …

ভয়ের ভাবটা কাটিয়ে উঠতে ক’দিন তার সময় লেগেছিল।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments