Friday, April 12, 2024
Homeকিশোর গল্পরবিনহুড - কাজী আনোয়ার হোসেন

রবিনহুড – কাজী আনোয়ার হোসেন

ভূমিকা

রবিন হুড বলে সত্যিই কি কেউ ছিল?

অনেক তর্ক-বিতর্কের পর পণ্ডিতেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, যদিও জন্ম-বৃত্তান্ত কিছুই পাওয়া যায় না, খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে রবিন হুড বলে যে সত্যিই কেউ একজন ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। সত্যিই সে অত্যাচারী নর্মান শাসক আর অর্থলোলুপ ধর্মযাজকদের অমানুষিক নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে দস্যু হয়েছিল, খ্যাতি অর্জন করেছিল গরীব-দুঃখীর বন্ধু আর অত্যাচারীর যম হিসেবে। সেকালে অসংখ্য গান রচিত হয়েছিল তার বীরত্ব ও মহত্ত্বের আশ্চর্য সব কীর্তি-কাহিনী নিয়ে। লোকের মুখে-মুখে ফিরেছে সে-গান কয়েক শতাব্দী ধরে।

সেই শেরউড জঙ্গল আজও আছে ইংল্যাণ্ডের নটিংহামশায়ারে- যদিও লোকালয়ের সম্প্রসারণে অনেক ছোট হয়ে গেছে তার আকার। আজও আছে সেখানে ‘ব্লু বোর সরাইখানা’-যদিও আমার বিশ্বাস, এটা আধুনিক কোন ব্যবসায়ীর উদ্যমের ফসল, সেই আদি ব্লু বোর নয়। রবিন হুডের কবর খুঁজে পাওয়া যায়নি, কিন্তু তার বিশ্বস্ত অনুচর লিটল জনের কবর পাওয়া গেছে বলে দাবি করছে ইংল্যাণ্ড, স্কটল্যাণ্ড ও আয়ারল্যাণ্ড। এর মধ্যে ডার্বিশায়ারের হেদারসেজ গ্রামে যে কবরটি পাওয়া যায়, তাতে অস্বাভাবিক লম্বা মানুষের অস্থি আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব থেকে অনুমান করা যায়, লিটল জন বলেও সত্যিই ছিল কেউ।

কিন্তু তাই বলে এ-বইয়ের প্রতিটি ঘটনাকে ঐতিহাসিক সত্য মনে করার কোন যুক্তি নেই। লোকের মুখে মুখে ঘুরলে গল্পের যা হয়-নিজ নিজ কল্পনার রঙ চড়াতে কসুর করে না কেউ—রবিন হুড়ের বেলাতেও ঠিক তাই হয়েছে। অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে এতে-কোটা সত্যি, কোন্‌টা অতিরঞ্জিত, আর কোন্‌টা যে সর্বৈব কাল্পনিক, জানার উপায় নেই আমাদের।

জেনে লাভই বা কি, বলুন? তারচেয়ে আসুন, বাস্তব জটিল জীবনের কর্মব্যস্ততার কোন অবসরে অদ্ভুত এক স্বপ্নের জগতে কিছুক্ষণের জন্যে বিভোর হয়ে হারিয়ে যাই।

কাজী আনোয়ার হোসেন
১০-১২-৭৯।

১. কিভাবে রবিন দস্যু হলো

গভীর গহীন এক বিশাল জঙ্গল। নাম শেরউড ফরেস্ট। সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে দ্রুত, দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে এক যুবক। পরনে সবুজ পোশাক, মাথায় নীল রঙের হুড, কাঁধে প্রকাণ্ড এক ধনুক, পিঠের তূণে বিশ-পঁচিশটা তীর। চলার ছন্দে দুলছে কোমরে ঝুলানো খাপে পোরা ছোট্ট ছোরাটা।

পথের দুপাশে দাঁড়ানো প্রকাণ্ড উঁচু ওক গাছের ফাঁক দিয়ে জঙ্গলের বেশ কিছুটা অংশ দেখা যায়। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো যুবক। একদল হরিণ ছুটে চলে যাচ্ছে। চট্ করে একটা হাত চলে গেল ওর ধনুকের কাছে। অপর হাতে তূণ থেকে একটা তীর তুলে নিতে গিয়েও সামলে নিল সে নিজেকে। না। এটা রাজার সংরক্ষিত জঙ্গল, ওগুলো রাজার হরিণ। ওগুলোর একটা মারলে চোখ উপড়ে নেয়া হবে, কান কেটে দেয়া হবে, এবং আরও এমন সব ভয়ঙ্কর শাস্তি দেয়া হবে যার চেয়ে মৃত্যুও অনেক ভাল। বেআইনী কিছু করে বসা ঠিক হবে না।

আবার হাঁটতে শুরু করলো যুবক। কিছুদূর এগিয়ে রাস্তা ছেড়ে ঢুকে পড়লো জঙ্গলে। ওর জানা আছে, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কিছুটা এগোলে অনেকখানি ঘুরপথ এড়ানো যাবে। তাছাড়া জঙ্গল ওর ভাল লাগে। ভাল লাগে জংলী পাখির কল-কাকলি। এদিকটায় এখানে-ওখানে হলি আর হেজেলউডের ঝোপঝাড়। পাশ কাটিয়ে এগোচ্ছে, হঠাৎ কর্কশ একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

‘অ্যাই! দাঁড়াও! রাজার জঙ্গল মাড়াচ্ছো যে? কে তুমি? কোথায় যাওয়া হচ্ছে অমন বীরদর্পে?’

ঘুরে দাঁড়ালো যুবক। দেখলো পাঁচ-ছয়জন লোক বসে আছে একটা মস্ত ওক গাছের নিচে, পান-ভোজনে ব্যস্ত। ওদের মধ্যে একজন উঠে দাঁড়িয়েছে ওকে দেখে! এক নজরেই চিনতে পারলো যুবক এদের। জঙ্গল-রক্ষী। সসম্ভ্রমে সালাম করলো সে।

‘আমার নাম,’ মৃদু হেসে বললো যুবক, রবার্ট ফিযুথ। ‘যদিও বেশির ভাগ লোক আমাকে ডাকে রবিন হুড বলে। যাচ্ছি নটিংহাম শহরে।’

‘কেন? কি কাজ তোমার নটিংহামে?’

‘ওখানকার শেরিফ একটা শূটিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক বড় বড় তীরন্দাজ আসছেন। আমিও চলেছি আমার তীর-ধনুক নিয়ে।’

হো হো করে হেসে উঠলো লোকটা। ‘বলে কি পুঁচকে ছোঁড়া! বড়দের একটা ধনুক কাঁধে নিয়ে বেড়ালেই কি তীরন্দাজ হওয়া যায়?’ আবার হাসলো একপেট। ও ধনুকে ছিলা পরাবার ক্ষমতা আছে নাকি তোমার? লক্ষ্যভেদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।

‘আরে দূর!’ বলে উঠলো ভোজনরত একজন গার্ড। ‘দুধের বাচ্চা, ধনুকটা একটু বাঁকা করেই দেখাক না খোকন!’

টিটকারি শুনে রাগে লাল হয়ে গেল রবিনের মুখটা। জ্বলে উঠলো দুই চোখ। ‘বেশ তো!’ বললো সে, ‘তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে ভাল তীরন্দাজ, এসো না, বাজি হয়ে যাক। দেড়শো গজের মধ্যে যে-কোন লক্ষ্য ভেদ করে দেব আমি।’

‘কি বাজি ধরবে? কত আছে তোমার কাছে, ছোকরা?’ সকৌতুকে জানতে চাইলো দাঁড়ানো লোকটা। হাতে ধরা রূপোর পাত্র থেকে মদ খেল এক ঢোক। রবিন বুঝলো, এই লোকটাই রক্ষীদের দলনেতা।

‘বিশ মার্ক,’ জবাব দিল সে।

‘বেশ!’ ভুরু কুঁচকে উঠলো দলনেতার। বোঝা গেল রেগে গেছে সে এই অল্পবয়েসী যুবকের ঔদ্ধত্য দেখে। হঠাৎ একটা আঙুল তুললো সে বহুদূরের একটা ঝোপের দিকে। ‘ঐ যে তোমার টার্গেট। লাগাও দেখি?’

রবিন চেয়ে দেখলো কোত্থেকে দৌড়ে এসে ঝোপটার পাশে থমকে দাঁড়িয়েছে একদল হরিণ। টের পেয়েছে কাছে-পিঠে মানুষের উপস্থিতি। সবার আগে রয়েছে একটা বিশাল শিং-অলা পুরুষ হরিণ। নাক ওপরে তুলে গন্ধ নেয়ার চেষ্টা করছে, অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে সামনের একটা পা ঠুকছে মাটিতে।

কোন কথা না বলে ধনুকটা নামাল রবিন কাঁধ থেকে, বাঁকা করে ছিলা পরালো তাতে, তারপর তূণ থেকে বেছে বের করলো পছন্দসই একটা তীর। ওর সহজ স্বচ্ছন্দ ভঙ্গি দেখে টের পেয়ে গেল সবাই, যে-সে লোক নয় এই যুবক, অল্পবয়সী হলে কি হবে, প্রচণ্ড শক্তি রয়েছে ওর গায়ে, আর রয়েছে তীর-ধনুকের ব্যাপারে অসাধারণ দক্ষতা। বাঁকা হয়ে গেল বিশাল ধনুকটা। ডান হাতটা চলে এসেছে কানের পাশে।- পরমুহূর্তে মৃদু ঝংকার উঠলো ছিলায়। বাতাসে শিস কেটে ছুটলো তীর। সবাই দেখল, লাফিয়ে শূন্যে উঠলো বড় হরিণটা, তারপর ধড়াশ করে পড়লো মাটিতে। ঠিক হৃৎপিণ্ডে গেঁথে রয়েছে তীরটা।

কয়েক মুহূর্ত বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে রইলো বনরক্ষীর দল, তারপর প্রশংসার মৃদু গুঞ্জন উঠলো ওদের মধ্যে। হাসিমুখে রক্ষী-প্রধানের দিকে ফিরলো রবিন। হাত বাড়ালো।

‘দিন’। বিশ মার্ক পাওনা হয়েছি আমি।’

বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো লোকটার মুখে। বললো, ‘দিচ্ছি। তবে বিশ মার্ক নয়। তোমার আসল পাওনা কড়ায় গণ্ডায় মিটিয়ে দেব আমি।’ কুৎসিত চাতুরীর একটা ভাব খেলা করছে ওর চোখেমুখে। ‘তোমার কি পাওনা হয়েছে জানো? আইন ভঙ্গের উপযুক্ত সাজা। রাজার হরিণ মেরেছো, নিশ্চয়ই জানা আছে তোমার এই অপরাধের শাস্তি কি? সেটাই দেয়া হবে তোমাকে।’ নিজের লোকদের ইঙ্গিত করলো সে, ‘ধরো, ধরো ব্যাটাকে!’

মুহূর্তে বুঝে নিল রবিন ওদের কথায় রেগেমেগে বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে কি ভয়ঙ্কর বিপদে জড়িয়ে ফেলেছে নিজেকে। ছুটে পালাবার জন্যে পা বাড়ালো, কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে। ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর ওপর দু’জন জঙ্গল-রক্ষী, তাদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে এলো আরো দু’জন। মাটিতে পেড়ে ফেলে ঠেসে ধরা হলো ওকে, বেঁধে ফেলা হলো হাত-পা।

‘যাক, হাতে নাতে ধরা গেল এক হারামজাদাকে!’ বললো রক্ষী-প্রধান। ‘হরিণ চুরি যাচ্ছে, অথচ বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও চোর ধরতে পারছি না খেপেই উঠছিল শেরিফ। আজ শান্ত করা যাবে তাকে।’

কথা শুনে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এলো রবিনের। নিজের কর্মতৎপরতার প্রমাণ দেখাবার জন্যেই ওকে হরিণ মারার ফাঁদে ফেলেছে লোকটা। এখন ওকে নটিংহামে নিয়ে গিয়ে চালান দিয়ে দেবে হরিণ-চোর হিসেবে। নর্মান শেরিফের কাছে কাকুতি মিনতি করে যে কোন লাভ হবে না, ভাল করেই জানা আছে ওর। ওর কথা কানেই তুলবে না সে। ও চোর হোক বা না হোক, কিছু এসে যায় না অত্যাচারী নিষ্ঠুর শেরিফের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার সুযোগ সে কোনমতেই হাতছাড়া করবে না, যাতে ওর ভয়াবহ পরিণাম দেখে সাবধান হয়ে যায় অন্য সব স্যাক্সন প্রজা।

রক্ষী-প্রধানের কথা শুনে হৈ হৈ করে উঠলো সব ক’জন রক্ষী। প্রস্তাবটা খুবই পছন্দ হয়েছে তাদের। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করলো হরিণটার চামড়া ছাড়িয়ে সেই চামড়া দিয়ে মুড়ে নিয়ে যাওয়া হবে ছোকরাকে শহরে। ব্যাস, লেগে গেল ওরা কাজে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রবিনকে হরিণের উত্তপ্ত পিচ্ছিল চামড়ার খোলসের মধ্যে ঢুকিয়ে বেঁধে ফেলা হলো বাইরে থেকে। মাথাটা শুধু বেরিয়ে আছে ঠিক যেখানে হরিণের মাথা ছিল সেই জায়গা দিয়ে।

রাগে দুঃখে জ্বলছে রবিনের কলজেটা। এইসব নীচ বিশ্বাসঘাতকদের কাছে সে প্রমাণ করতে গিয়েছিল ধনুর্বিদ্যার দক্ষতা! চোখের সামনে ভেসে উঠছে নটিংহামের বাজারটা। নিজের চোখে দেখেছে সে ওখানে এক হরিণ-চোরের শাস্তি। বেচারা ক্ষুধার জ্বালায় মেরেছিল হরিণটা। লোকটার যন্ত্রণাকাতর চেহারা, গোঙানি আর নিরুপায় ছটফটানি মনে আছে স্পষ্ট। সেই একই ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে ওর নিজের কপালে, ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠছে সে বারবার। বাকি জীবনটা অন্ধ আর পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকার কথা কল্পনাও করা যায় না। বারবার শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে হাত-পায়ের বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু বৃথা চেষ্টা, বাঁধন আলগা তো হলোই না, বরং এঁটে বসলো আরও।

‘এখন এ ব্যাটাকে শহরে নিয়ে যাওয়ার কি ব্যবস্থা?’ জানতে চাইল একজন গার্ড। মাথা চুলকালো রক্ষী-প্রধান, তারপর বললো, ‘আধ মাইল দূরে জনা তিনেক স্যাক্সন কাঠুরেকে কাঠ কাটতে দেখেছিলাম না? তুমি এক কাজ করো, ডিকন। দৌড়ে গিয়ে ডেকে নিয়ে এসো ওদের। টানা গাড়িটাও সাথে করে আনতে বলবে, যাও।’

ছুটে চলে গেল ডিকন। খানিক বাদেই ফিরে এলো টানাগাড়ি সহ কাঠুরেদের নিয়ে।

‘তোলো এই ব্যাটাকে গাড়িতে,’ হুকুম করলো রক্ষী-প্রধান কাঠুরেদের উদ্দেশে। ‘তারপর টেনে নিয়ে চলো শহরে।’

তিনজন কাঠুরের মধ্যে দুজন দ্রুত এগিয়ে এলো হুকুম পালন করতে, তৃতীয়জন এগোলো অনেকটা যেন ইচ্ছের বিরুদ্ধে। পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছে অত্যন্ত নিম্নবিত্ত লোক এরা। প্রথম দুজন বৃদ্ধ, কিন্তু তৃতীয়জন বছর তিরিশেক বয়সের শক্ত সমর্থ এক যুবক। কেউ কোন কথা বললো না, তিনজন মিলে রবিনকে টানা গাড়িতে তুলে নিয়ে চললো শহরের দিকে।

আধ মাইলের মত গিয়ে একটা এবড়োখেবড়ো রাস্তায় পড়লো গাড়ি। জোরে ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগোচ্ছে, কাত হয়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক, রবিনের বস্তাবন্দী শরীরটা অসহায় ভঙ্গিতে গড়িয়ে গিয়ে একবার ধাক্কা খাচ্ছে গাড়ির এদিকে, একবার ওদিকে। আর তাই দেখে হাসিতে ফেটে পড়ছে জঙ্গল-রক্ষীরা।

গাড়ির পিছন পিছন হাসাহাসি করতে করতে হাঁটছে ওরা, হঠাৎ একলাফে সামনে এগিয়ে গেল রক্ষী-প্রধান। ধনুকটা মাথার ওপর তুলে প্রচণ্ড জোরে মারলো কম বয়েসী কাঠুরের কাঁধের ওপর।

‘অ্যাই, হারামজাদা!’ চেঁচিয়ে উঠলো রক্ষী-প্রধান, ‘ঠিক মত টানছিস না কেন? স্যাক্সনী বেয়াড়াপনা দেখানো হচ্ছে, না?’ এই বলে দমাদম আরো কয়েকটা কিল ঘুসি বসিয়ে দিল লোকটার ঘাড়ে মাথায়।

রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যুবক কাঠুরে, চট্ করে ডান হাতটা চলে গিয়েছিল ওর কোমরে গোঁজা ছোরাটার বাঁটের ওপর, কিন্তু বৃদ্ধ একজনের সাবধানবাণী কানে যেতেই সরিয়ে নিল হাতটা।

‘উইল, মাথাটা ঠাণ্ডা রাখো, বাপ!’ কাঁপা গলায় বলে উঠলো বৃদ্ধ, ‘শান্ত হও। জঙ্গল-রক্ষীদের রাগানো ঠিক না।’

‘ঠিকই বলেছে বুড়ো হাবড়া, কর্কশ কণ্ঠে হেসে উঠলো রক্ষী-প্রধান। ‘আমাদের রাগিয়ে দিলে প্রচুর ক্ষতির আশঙ্কা আছে। হয়েছে এবার। জান-প্রাণ দিয়ে টানো তো এখন, স্যাক্সন কুত্তার বাচ্চারা।’ আবার এক পশলা কিল ঘুসি বর্ষণ করলো লোকটা তরুণ কাঠুরের ঘাড়ে মাথায়। বাধা দিল না তরুণ, পিঠ বাঁকা করে ঘ গুজে সহ্য করে নিল নির্যাতন, একান্ত বাধ্য ভৃত্যের ভঙ্গিতে আবা টানতে শুরু করলো গাড়ি। কিন্তু রবিন লক্ষ্য করলো, ধক্ ধক্ করে জ্বলছে যুবকের চোখ।

বেশ অনেকদূর এগোবার পর একটা বাঁক ঘুরতেই দেখা গেল ছোট্ট একটা গ্রাম। একটা বাড়ির দরজার দু’পাশে লতা-ঝোপ দিয়ে সাজানো।

‘সরাইখানা!’ খুশি হয়ে বললো একজন রক্ষী। ‘এখানে থেমে দু’ঢোক মদ খেয়ে নিলে কেমন হয়? উহ্, পিপাসায় একেবারে শুকিয়ে গেছে বুকটা।’

একবাক্যে রাজি হয়ে গেল বাকি সবাই। ছোট্ট সরাইখানার সামনে থামানো হলো টানা গাড়ি। নিজেদের জন্যে মদের অর্ডার দিল রক্ষীরা।

সরাইখানার সামনে মদের পাত্র হাতে দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করছিল রক্ষীরা, এমনি সময় ওদের একজন চেঁচিয়ে উঠলো, ‘ঐ দেখো কারা আসে!’

দেখা গেল, আরো পাঁচজন জঙ্গল-রক্ষী আসছে এই দিকেই, তাদের সামনে হাঁটছে দু’জন হাত বাঁধা লোক।

‘বাহ্ বাহ্!’ খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো রক্ষী-প্রধান। ‘জমেছে ভাল। ওরাও দুটো ডাকাত ধরেছে দেখা যাচ্ছে! মোট হলো তিনটে…খুশিতে নাচবে আজ শেরিফ! ওহে, কিভাবে ধরলে ওগুলোকে?’

ওরা জানে এই জঙ্গলেরই কোথাও কয়েকজন দুর্ধর্ষ দস্যু থাকে, রাজার হরিণ মেরে খায়, পথিকদের সর্বস্ব লুট করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওদের কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। কিভাবে ধরা পড়লো জানার আগ্রহে সবাই এগিয়ে গেল অগ্রসরমান দলটির দিকে। শক্ত বাঁধন কেটে যে রবিন হুড পালাতে পারবে না, সে ব্যাপারে ওরা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত; আর অনুমতি ছাড়া স্যাক্সন কাঠুরেরা যে এক পা নড়তে সাহস পাবে না, এটাও জানা কথা; কাজেই এদিকে লক্ষ্য রাখার কোন প্রয়োজন বোধ করলো না।

কিন্তু ওরা কয়েক পা এগোতেই এদিক-ওদিক চেয়ে নিয়ে ছুট লাগালো বুড়ো কাঠুরে, যে সাবধান করেছিল তরুণকে। দুটো বাড়ির মাঝখানের সরু রাস্তা ধরে পাখির মত উড়ে যাচ্ছে সে। দ্বিতীয় বৃদ্ধ হাঁ করে চেয়ে ছিল রক্ষীদের দিকে, টেরও পেল না কিছু, বোকার মত হাসাহাসি দেখছে ওদের, নিজেও হাসছে।

যুবক উইল ওর বাপের পিছন পিছন ছুটতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে চাইলো রবিনের দিকে। কথা বললো না রবিন, পাছে শুনে ফেলে রক্ষীরা, কিন্তু মিনতি ফুটে উঠলো ওর চোখের দৃষ্টিতে। এক হাঁটু ভাঁজ করে ঠেলাগাড়ির পাশে বসে পড়লো উইল, কোমর থেকে ছোরাটা বের করে ঘ্যাঁচ ঘাঁচ করে কেটে দিল সমস্ত বাঁধন।

মুক্ত হলো রবিন। ওর ধনুক আর তীরভরা তূণ রাখা ছিল গাড়িরই একপাশে, নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল অপরাধের প্রমাণ হিসেবে শেরিফকে দেখানোর জন্যে। চট করে সেগুলো হাতে তুলে নিয়েই ছুটলো সে উইলের পিছন পিছন। উইল ততক্ষণে বেশ অনেকটা এগিয়ে গেছে, প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে সরু রাস্তাটা ধরে।

‘হব্! হ!’ দৌড়াতে দৌড়াতেই চেঁচিয়ে উঠলো উইল। ‘দৌড়াও! পালাও শিগগির!’

ডাকটা কানে যেতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেন এদিকে ফিরলো বৃদ্ধ কাঠুরে, সঙ্গী-সাথী সব হাওয়া হয়ে গেছে দেখে হাঁ হয়ে গেল ওর মুখ, চোখ তুলেই দেখতে পেল দৌড়াচ্ছে উইল। দুর্ভাগ্যবশতঃ উইলের ডাকটা রক্ষীদের কানেও পৌছালো। পাঁই করে ঘুরে দাঁড়ালো রক্ষী-প্রধ মুহূর্তে ব্যাপারটা বুঝে নিয়েই ক্রুদ্ধ হুঙ্কার ছাড়লো একটা।

‘পালাচ্ছে! পালাচ্ছে হারামীরা!’ চেঁচিয়ে উঠলো সে, ‘বাঁধন খুলে দিয়েছে বন্দীর। ছোটো, ছোটো সবাই! ধরে নিয়ে এসো ওদের, জীবিত বা মৃত।’

কথা বলতে বলতেই একটা তীর লাগিয়ে ফেলেছে সে তার ধনুকে, কান পর্যন্ত নে এনেছে ছিলাটা। এতক্ষণে হুঁশ ফিরে পেয়ে দৌড়াতে শুরু করেছে হব, বুঝতে পেরেছে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু বুড়ো মানুষ, ধীর গতি, আড়ালে সরে যাওয়ার আগেই প্রচণ্ড বেগে ছুটে এলো তীর, ঘ্যাঁচ করে বিধলো এসে পিঠে। হুড়মুড় করে মুখ থুবড়ে পড়লো সে মাটিতে, আর নড়লো না। থির থির করে কাঁপছে শুধু পিঠে বেঁধা তাঁরটা।

ছোট্ট একটা আঙিনায় এসে পৌঁছলো রবিন। ওপাশের কাঠের দেয়ালটা টপকাচ্ছে উইল। বৃদ্ধ কাঠুরেকে দেখা যাচ্ছে না। দৌড়ে গিয়ে দেয়াল টপকালো সে-ও। সামনে বেশ কিছুদূর খোলা মাঠ, তারপর জঙ্গল। দেখা গেল, দুর্বল পায়ে জঙ্গলের দিকে ছুটছে বুড়ো, তার কিছুটা পিছনে উইল।

প্রাণপণে ছুটলো রবিন। জঙ্গলের কাছাকাছি এসেই চিৎকার শুনে তাকাল পিছন ফিরে। পাঁচ ছ’টা মাথা দেখা যাচ্ছে কাঠের দেয়ালের ওপাশে। দেয়াল টপকাচ্ছে ওরা। এক দৌড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লো সে। দেখলো কিছুদূর এগিয়ে অপেক্ষা করছে ওর জন্যে উইল।

‘এদিকে! এদিকে!’ হাঁক ছাড়লো উইল, ছুটলো আবার। কিছুদূর এগিয়েই ছুটন্ত বৃদ্ধকে দেখতে পেল রবিন। মিনিট দশেক দৌড়ে একটা জলা মত জায়গায় এসে পৌঁছলো ওরা। জলাটা বিপজ্জনক চোরা কাদায় ভর্তি। সাবধানে পা ফেলে ফেলে বৃদ্ধের পিছন পিছন ওপারে গিয়ে শক্ত জমিতে উঠলো ওরা দুজন। আরো কিছুদূর এগিয়ে একটা বিশাল ওক গাছের নিচে বসে পড়লো বৃদ্ধ, বিশ্রাম না নিয়ে আর এক পা- ও এগোনো সম্ভব নয় তার পক্ষে।

‘হবু কোথায়?’ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলো বৃদ্ধ।

‘মারা গেছে,’ বললো উইল। ‘দেরি করে ফেলেছিল। দেখলাম, একটা তীর এসে বিধলো ওর পিঠে।

‘হ্যাঁ, রক্ষীদের নেতার ছোঁড়া তীর, আমি দেখেছি,’ বললো রবিন।

এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লো বৃদ্ধ। ‘ওদের সামনে পড়লে আমাদেরও ঐ একই অবস্থা হবে। উইলের হাত যখন ছোঁরার বাঁটে চলে গিয়েছিল, আমি তো ভেবেছিলাম তখনই খুন করবে লোকটা ওকে। করতো, যদি সেই সময়ে গাড়ি টানার জন্যে ওর প্রয়োজন না থাকতো। বড় নিষ্ঠুর লোক!’

‘অনেক কষ্টে সামলে নিয়েছিলাম আমি তখন,’ বললো উইল। ‘ওরকম অন্যায় মার হজম করা কঠিন।’

‘হুঁ!’ চিন্তামগ্ন কণ্ঠে বললো বৃদ্ধ, ‘এক সময় আমরাই ছিলাম জমির মালিক। নর্মানরা অন্যায়ভাবে দখল করে নিল সব। এখন এমন অবস্থা হয়েছে, আমরা যেন কুকুরের চেয়েও অধম। যাই হোক, যা ঘটে গেল, এখন আর আমাদের গ্রামে ফেরা সম্ভব নয়। লুকিয়ে থাকতে হবে আমাদের জঙ্গলের মধ্যে। নইলে ধরে নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে দেবে ফাঁসীকাঠে।’

‘আমাকে হয়তো ফাঁসীকাঠে ঝোলাতো না,’ বললো রবিন। ‘কিন্তু তার চেয়েও খারাপ অবস্থা করে ছাড়তো ওরা নটিংহামে নিয়ে গিয়ে। আমার হাত-পায়ের বাঁধন কেটে দিয়ে তুমি মস্ত বড় বন্ধুর কাজ করেছ, উইল। উইলের একটা হাত ধরলো রবিন, ‘তোমাকে ধন্যবাদ। অসংখ্য, অসংখ্য ধন্যবাদ।

‘ও কিছু না!’ বললো উইল। দু’চারটে পোঁচ দিয়েছি ছোরার, এর বেশি তো কিছু নয়। কিন্তু তুমি, ভাই, কি করে ধরা পড়লে ওদের হাতে? কি দোষ করেছিলে?’

সব খুলে বললো রবিন। শুনে ভুরু কুঁচকে গেল কাঠুরেদের। উইল বললো, ‘কী নিষ্ঠুর, আর ভয়ঙ্কর! ওদের নীচ কৌশল একের পর এক ফাঁদে ফেলে চলেছে আমাদের সবাইকে।’

উঠে দাঁড়ালো বুড়ো। যাক, ওদের নাগালের বাইরে আমরা এখন। যতদিন পারা যায়, আমাদের চেষ্টা করতে হবে ওদের আওতার বাইরে থাকার। এসো আমার সাথে, চলো, আরও নিরাপদ জায়গায় সরে যাই।’

কিন্তু নড়লো না রবিন।

‘বাকি দু’জন বন্দীর জন্যে খারাপ লাগছে,’ বললো সে। ‘নটিংহামে একবার নিয়ে গেলে ওদের কপালে যে কি ঘটবে বোঝাই যায়।’

‘পরিষ্কার,’ বললো উইল। ‘একেবারে পানির মত। অথচ এরাও কিন্তু আমাদেরই মতু স্যাক্সন। নর্মানদের নির্যাতনে অস্থির হয়ে শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছে দস্যুবৃত্তি। জমিজমা ….

‘সব হারিয়েছে,’ কথার মাঝখানেই বলে উঠলো বুড়ো। ‘অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে বাধ্য হয়েছে ওরা জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নিতে। কী জীবন! জঙ্গল-রক্ষীদের তাড়া খেয়ে বনে বাদাড়ে পালিয়ে বেড়ানো… ধরা পড়লে কঠোর শাস্তি!’

‘ওরা যে-পথে নটিংহামে যাবে, ওদের আগেই সেই পথের কোথাও পৌঁছানো সম্ভব?’ উইলের দিকে ফিরে জানতে চাইলো রবিন।

‘তা সম্ভব,’ বললো উইল। ‘কিন্তু লাভ কি তাতে? একদল জঙ্গল-রক্ষীর বিরুদ্ধে কি করতে পারবে তুমি একা?’

‘ঠিক কি করতে চাই তা আমি নিজেও জানি না এখনও,’ বললো রবিন। তবে ওদের সাহায্য করার জন্যে ভেতরটা ছটফট করছে। তীর-ধনুকে আমার হাত ভাল। যাই তো আগে, তারপর একটা না একটা উপায় বেরিয়ে যাবেই। তাছাড়া চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি?’

‘ঠিক বলেছো, বন্ধু,’ বললো উইল। ‘চলো, আমি তোমাকে পথ দেখাবো। আব্বা, তুমি চলে যাও আমাদের সেই জায়গায়। সেই বুড়ো ওক গাছের নিচে দেখা হবে।’

জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল বুড়ো, রবিন রওনা হলো উইলের পিছন পিছন অন্য এক পথে।

মিনিট বিশেকের মধ্যেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কোনাকুনি এগিয়ে সেই ছোট্ট গ্রামটার কাছে এসে পৌছলো ওরা অন্যদিক থেকে। রাস্তার ধারের একটা ঘন ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দিতেই দেখা গেল, ঠিক সময় মতোই পৌঁছেছে ওরা, বন্দী দু’জনকে সাথে নিয়ে মাত্র রওনা দিয়েছে রক্ষী-বাহিনী। টানাগাড়িটা পড়ে আছে যেখানে ছিল সেখানেই। ওর থেকে সামান্য কিছুটা দূরে রাস্তার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে হবের মৃতদেহ, যেমন ছিল তেমনি। লাশটার সৎকারের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায়নি ওরা, যেন ওটা কুকুরের লাশ।

মাথায় রক্ত চড়ে গেল রবিনের। চাপা গলায় শুধু বললো, ‘প্রতিশোধ!’

রবিনের মুখের দিকে চেয়ে মাথা ঝাঁকালো উইল, কিন্তু কিভাবে সেটা নেয়া সম্ভব মাথায় ঢুকলো না ওর।

ভুরু কুঁচকে কি যেন চিন্তা করলো রবিন, তারপর বললো, ‘এই রাস্তা কোথায় কিভাবে বাঁক নিয়ে কি ধরনের এলাকা দিয়ে শহরে পৌঁছেছে বর্ণনা করতে পারবে?’

শুরু করলো উইল স্টিউটলি, কিন্তু একটু পরেই হাত তুলে থামিয়ে দিল ওকে রবিন। ‘ব্যাস, ব্যাস। পেয়ে গেছি আমার পছন্দসই জায়গা। সমতল খোলা জায়গা বললে না? ওইখানে নিয়ে চলো আমাকে। মনে রেখো, পৌঁছতে হবে ওদের আগেই।’

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দ্রুতপায়ে এগোলো ওরা। যখন পৌছলো তখন খোলা জায়গাটার ঠিক মাঝখানে পৌঁছে গেছে রক্ষী দল। জঙ্গলের মধ্যে উইলকে অপেক্ষা করতে বলে পরিষ্কার খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলো রবিন।

‘খবরদার!’ হাঁক ছাড়লো সে, ‘বন্দীদের ছেড়ে দাও, নইলে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে!’

প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলো না রক্ষী-প্রধান। দুঃসাহস আর কাকে বলে! খোলা জায়গায় একা দাঁড়িয়ে এতগুলো লোককে ধমক দিচ্ছে এক পুঁচকে ছোঁড়া! কোন জবাব দিলো না সে। ওর একমাত্র চিন্তা, জঙ্গলের আড়ালে আবার পালিয়ে যাওয়ার আগেই করতে হবে যা করার। পিঠ থেকে ধনুকটা নামালো সে, একটা তীর লাগিয়ে গায়ের সব জোর দিয়ে টানলো ছিলা, তারপর ছাড়লো। কিন্তু দূরত্বটা এতই বেশি যে রবিনের কাছে পৌঁছলো না তীর, গজ বিশেক বাকি থাকতেই বিধলো মাটির বুকে।

বিশাল ধনুকটা চলে এসেছে রবিনের হাতে। তূণ থেকে একটা তীর বের করে পরালো ছিলায়। পরমুহূর্তে ভ্রমরের গুঞ্জন তুলে ছুটলো তীর। ভয়ানক এক আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো রক্ষী-প্রধান, দুই হাতে টেনে বের করার চেষ্টা করছে গলা দিয়ে ঢুকে ওপাশ দিয়ে আধ হাত বেরিয়ে যাওয়া তীরটা।

দাঁড়িয়ে পড়েছে রক্ষীরা, তাজ্জব হয়ে দেখছে অবিশ্বাস্য ঘটনাটা, ছানাবড়া হয়ে গেছে চোখ। এমনি সময় আবার ভেসে এলো রবিনের উদাত্ত কণ্ঠ, ‘ছেড়ে দাও বন্দীদের! নইলে একে একে মারা পড়বে সবাই!’

কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে দ্বিতীয় তীর ছুঁড়লো রবিন। দু’জন রক্ষী একজন বন্দীকে ধরে রেখেছিল দু’পাশ থেকে, তীরটা সোজা এসে বিঁধলো ওদের একজনের কাঁধে। পরমুহূর্তে উড়ে এলো তৃতীয় তীর, বিধলো দ্বিতীয় রক্ষীর কাঁধে। বসে পড়লো দু’জন মাটিতে-চিৎকার করছে গলা ফাটিয়ে। সবাই বুঝে নিল, বন্দীদের ধরে রাখার চেষ্টা করলে কারো রক্ষা নেই আজ।

অকুতোভয় যুবকটির অব্যর্থ লক্ষ্য আতঙ্কের সৃষ্টি করলো রক্ষীদের মধ্যে। যে দু’জন দ্বিতীয় বন্দীকে ধরে রেখেছিল এক লাফে সরে গেল তারা দু’জন দু’পাশে। ওদের এই আতঙ্ক সংক্রামিত হলো আরো দু’তিনজনের মধ্যে দৌড় দিল তারা। তাই দেখে গোটা দলের মধ্যে সঞ্চারিত হলো তীব্র প্রাণভীতি, যে যেদিকে পারলো, ছুটলো ওরা তীরবেগে। এছাড়া অবশ্য উপায়ও ছিল না ওদের, আওতার বাইরে দাঁড়িয়ে অনায়াসে লক্ষ্যভেদ করছে দুঃসাহসী যুবক, অথচ ওরা জানে, ওদের তীর পৌঁছবে না অতদূর।

‘পালাচ্ছে! পালাচ্ছে!’ ঝোপের আড়াল থেকে একলাফে বেরিয়ে এলো উইল স্টিউটলি। ‘আশ্চর্য, রবিন হুড! দারুণ তোমার হাত! এবার আমার কাজ সেরে ফেলি আমি।’ কোমর থেকে ছোরাটা টান দিয়ে বের করে নিয়ে ছুটলো সে বন্দীদের দিকে। অল্পক্ষণেই দৌড়ে ফিরে এলো সদ্য-মুক্ত বন্দীদের সাথে নিয়ে।

মুক্তির আনন্দে উচ্ছ্বসিত দুই দস্যু হাজার বার করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো রবিনের কাছে। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে খুশি আর ধরে রাখতে পারছে না কিছুতেই। কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবে, খুঁজে পাচ্ছে না ভাষা, আরো কিছু বলা দরকার মনে করে পাগলের মত বকে চলেছে। চুমো খাচ্ছে ওর হাতে।

‘এবার? এবার কি করবো আমরা?’ জানতে চাইলো উইল। ‘জঙ্গল-রক্ষীরা আরো দলবল জুটিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজবে আমাদের। ওদের হাতে ধরা পড়লে…’

‘ঠিক বলেছো,’ বলে উঠলো একজন দস্যু। ‘আমাদের সরে পড়া উচিত।’

মাথা ঝাঁকালো রবিন। পা বাড়ালো সামনে। পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো উইল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে একটা বিশাল ওক গাছের নিচে দেখা পেল ওরা বুড়ো স্টিউটলির। সব ঘটনা শুনে বৃদ্ধ বললো, ‘এই অঞ্চলে আর থাকা যাবে না। জঙ্গলের শেষে ওই ওদিকে আমার মেয়ের বাড়ি, ওখানেই লুকাবো আমি। তুমি কি ভাবছো, উইল?’

‘আমি জঙ্গলেই থেকে যাব,’ বলল উইল। ‘আজ থেকে দস্যু হয়ে গেল রবিন হুড। আমি তার অনুচর।’

বিশাল ধনুকের ওপর ভর দিয়ে কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল রবিন চুপচাপ। দস্যু! দস্যু রবিন হুড! কথাটা চমকে দিল ওকে। ধক করে উঠলো বুকের ভেতরটা। পরমুহূর্তে কথাটার সত্যতা উপলব্ধি করলো সে। সত্যিই তো, আজ সে যা করছে তার ফলে তাকে দস্যু বলে ঘোষণা করবে শেরিফ। ওর মাথার দাম ধরা হবে কয়েকশো পাউণ্ড। জঙ্গল-রক্ষী খুন করেছে সে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই আর। এখন থেকে জঙ্গলে জঙ্গলে দস্যুর জীবন কাটাতে হবে ওর। চারপাশে চাইলো রবিন। বিশাল সব গাছের শাখা দুলছে মৃদু বাতাসে, রোদ লেগে চিকচিক করছে পাতাগুলো, এখানে ওখানে ঝোপ-ঝাড়-লতা, কোথাও ঘন, কোথাও হালকা- অপূর্ব সুন্দর লাগলো ওর সবকিছু। প্রজাপতির বিচিত্র রঙ, পাখির মিষ্টি শিস আশ্চর্য এক আনন্দের জোয়ার আনলো ওর মনে-মুক্তির আনন্দ। ‘বাহুবল আর বুদ্ধির জোরে রক্ষা করবো নিজেকে,’ মনে মনে বললো রবিন। ‘মুক্ত স্বাধীন প্রাণ-চঞ্চল জীবন। নটিংহামের কারাগার বা ফাঁসীকাঠের চেয়ে অনেক অনেক ভাল।’ মনটা হালকা হয়ে গেল ওর। আবার তাকালো চারপাশে কেমন হবে জীবনটা ওর এখানে?

‘আমার নাম মাচ,’ বললো দস্যুদের একজন। ‘চলো না, রবিন, আজ থেকে তুমি আমাদের একজন হবে?’

ক্ষতি কি? একটা দলের সাথে থাকতে পারলে তো ভালই। রাজি হয়ে গেল রবিন রওনা হলো ওরা। ঘন্টা দুয়েক একটানা হাঁটার পর বিরাট এক ওক গাছের নিচে খানিকটা পরিষ্কার জায়গা দেখা গেল। দাঁড়িয়ে পড়লো মাচ। কোমরে ঝুলানো একটা শিঙা মুখে তুলে ফুঁ দিল তাতে। সাথে সাথেই উত্তর এলো কাছাকাছি কোথাও থেকে, কিন্তু দেখা গেল না কাউকে। আরো তিনশো গজ এগিয়ে গেল মাচ তার সঙ্গীদের নিয়ে। দেখা গেল, একটা পাথুরে দেয়ালের পাশে বেশ অনেকটা জায়গা ঝোপ-ঝাড় কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে। দেয়ালের কাছাকাছি পৌঁছতেই থেমে দাঁড়াবার হুকুম দেয়া হলো, আড়াল থেকে জানতে চাওয়া হলো ওদের পরিচয়। জবাব দিল মাচ। মাচের গলার আওয়াজ পেয়েই আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো একজন দীর্ঘদেহী লোক, তার পিছনে তাগড়া জোয়ান ছয়জন দস্যু। সবার হাতে তীর-ধনুক।

মাচ আর তার সঙ্গীকে দেখতে পেয়েই আনন্দে আত্মহারা হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো সবাই। ওদের বন্দী হওয়ার খবর ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে ওদের কানে।

‘ফিরে এসেছে!’ চিৎকার করে উঠলো একজন। মার্চ আর ওয়াট ফিরে এসেছে!’

‘কিভাবে?’ চেঁচিয়ে উঠলো আরেকজন। ‘কিভাবে ছুটলে ওদের হাত থেকে?’

‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, সব বলছি,’ দুই হাত তুলে সবাইকে থামতে বললো মাচ। ‘এই যুবক উদ্ধার করেছে আমাদের। এতবড় দুঃসাহসী বীর, আর এত নিপুণ তীরন্দাজ জীবনে দেখিনি আমি।’ এই বলে সমস্ত ঘটনা খুলে বললো সে সবাইকে। রবিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো প্রত্যেকে, বার বার করে ধন্যবাদ জানাল ওদের প্রিয় সঙ্গীদের উদ্ধার করার জন্যে।

সেদিনই সন্ধ্যার পর আগুনের ধারে গোল হয়ে বসে সবাই হরিণের মাংস আর এল (এক ধরনের মদ) দিয়ে নৈশ ভোজন করছিল, গল্পগুজব আর হাসি তামাশা চলছিল এন্তার, এমন সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করলো মাচ। ‘তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, গতকালই আমাদের মধ্যে একজন নেতা নির্বাচনের কথা উঠেছিল। আমরা সবাই একমত হয়েছিলাম যে নেতা ছাড়া কোন দলেরই নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা করা যায় না।’

‘ঠিক, ঠিক,’ বললো একজন স্বাস্থ্যবান দস্যু। ‘তোমার ব্যাপারেই আমরা মোটামুটি একমত হয়েছিলাম, মাচ। তোমাকেই আমাদের নেতৃত্ব…’

‘উঁহু,’ এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লো মাচ। ‘এখন আর সেটা হয় না। মাচ আজ তার প্রভুর দেখা পেয়েছে। আমি আমার বদলে আমাদের নতুন সদস্য রবিন হুডের নাম প্রস্তাব করছি।’

‘আমি এ প্রস্তাব সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করছি,’ বলে উঠলো ওয়াট। বলেই তার ছয় ফুট লম্বা লাঠিটা পাঁই পাঁই কয়েক পাক ঘোরালো মাথার ওপর। কারো যদি আপত্তি থাকে, এসো, হয়ে যাক এক হাত।’

সবাই প্রায় রাজি হয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় লম্বা চওড়া গম্ভীর এক দস্যু মাথা নাড়লো। আমার যতদূর মনে আছে, গতকাল আমরা মোটামুটি ঠিক করেছিলাম যে আমাদের মধ্যে যে সেরা তীরন্দাজ সে-ই নেতা হওয়ার যোগ্য।’

‘সেরকম একটা কথা উঠেছিল বটে,’ বললো মাচ। ‘খুব সম্ভব তুমিই তুলেছিলে প্রস্তাবটা। তবে সে-ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। যাই হোক, সেদিক থেকেও আমার মনোনীত প্রার্থীর জুড়ি নেই। সারা ইংল্যাণ্ডের সেরা তীরন্দাজ রবিন হুড।’

‘শুনলাম, সেরা, গম্ভীর মুখে বললো লোকটা। কিন্তু জানছি কিভাবে?’

তর্কটা খারাপ দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে দেখে মুখ খুললো রবিন। একটা হাত তুলে থামতে বললো সবাইকে।

‘শোনো, মাচ, নেতৃত্ব জিনিসটা অর্জন করে নিতে হয়, ওটা কারো ওপর চাপিয়ে দেয়ার কোন অর্থ নেই। এখানে কেন, কোথাও আমি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ না করে কিছুই প্রত্যাশা করি না। শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদকে তোমাদের নেতা বানাবে, এরকম কথা কি সত্যিই হয়েছিল?’

‘এই রকম একটা কথা সত্যিই উঠেছিল,’ বললো মাচ।

‘বেশ। তাহলে এই কথাই থাক,’ বললো রবিন হুড। ‘কাল সকালে আমরা একজন একজন করে প্রত্যেকে তীর ছুঁড়বো। যে জিতবে তাকেই মেনে নেব নেতা হিসেবে, রাজি?’

সবাই একবাক্যে সায় দিল, ‘রাজি! রাজি!’

খাওয়া দাওয়া শেষ করে যে যার মত শুয়ে পড়লো অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে। সকালে উঠেই একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে জড়ো হলো সবাই। যে দূরত্বে ওরা তীর ছুঁড়তে অভ্যস্ত ততটা দুরে একটা টার্গেট তৈরি করে রবিন হুডকে বললো ওরা, দেখাও তোমার দক্ষতা। ঠিক মাঝখানে লাগাও দেখি একটা তীর।’

‘এটা কোন পরীক্ষাই হলো না,’ মাথা নাড়লো রবিন’। ‘যে-কেউ ভেদ করতে পারে এই লক্ষ্য। দেখা যাবে আমাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনই লক্ষ্যভেদ করেছে। তার চেয়ে এমন একটা লক্ষ্য স্থির করো, যাতে একবারেই চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে যায়।

লম্বা-চওড়া গম্ভীর লোকটার নাম জন ফোর্ড। রবিনের প্রস্তাবে খুশিই হলো সে। বললো, ‘ঠিক আছে, টার্গেটটা কি হবে, কতদূরে হবে সেটা তুমিই নাহয় ঠিক করো, রবিন হুড।’

‘করতে পারি, যদি সবাই রাজি থাকে,’ বললো রবিন।

‘রাজি, রাজি। তুমিই ঠিক করো।’

লতা-পাতা আর জংলী ফুল দিয়ে গোল একটা মালা তৈরি করলো রবিন সেটা উইল স্টিউটলির হাতে দিয়ে একেবারে শেষ মাথার একটা ওক গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে আসতে বললো। ছুটে গিয়ে ঝুলিয়ে দিল উইল মালাটা।

‘এবার এসো,’ বললো রবিন। ‘দেখা যাক পাতা বা ফুল স্পর্শ না করে কে ওই মালার মধ্যে তীর গাঁথতে পারে। যে পারবে তাকেই মেনে নেব আমরা আমাদের দলনেতা হিসেবে।’

এ ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে দস্যু সবাই। অবাক হয়ে গেছে ওরা। ‘তীর লাগাবো কি, ভাল মত দেখতেই তো পাচ্ছি না মালাটা!’ বলে উঠলো একজন। ‘অতদূরে লক্ষস্থির করতে হলে ঈগলের চোখ চাই।’

ওরেব্বাপ!’ দীর্ঘশ্বাস টানলো একজন। ‘ওখানে তীর পাঠাতে হলে ঘোড়ার মত গায়ে জোর চাই।’

‘আমি বাদ!’ চেঁচিয়ে উঠলো আরেকজন, আমার ধনুক টেনে ভেঙে ফেললেও অতদূরে যাবে না তীর।’

শেষ পর্যন্ত টিকলো শুধু জন ফোর্ড। অতদূরে তীর পৌঁছবে কিনা সে-ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে তার, কিন্তু রণে ভঙ্গ দিল না সে, ধনুকে নতুন একটা ছিলা পরিয়ে সোজা দেখে তিনটে তীর বাছাইয়ে মন দিল। কে আগে তীর ছুঁড়বে তাই নিয়ে টস্ করা হলো। প্রথমে ছোঁড়ার সুযোগ পেল জন ফোর্ড।

প্রথম তীরটা গজ দশেক আগেই মাটিতে গাঁথলো। বিরক্ত হলো জন ফোর্ড, খানিক গজ গজ করে আরো জোরে আরো উঁচু দিয়ে মারলো দ্বিতীয় তীর, কিন্তু এটাও পৌঁছলো না লক্ষ্যস্থলে। তৃতীয়বারে কোন মতে পৗঁছলো বটে, তবে মালা থেকে বেশ কিছুটা নিচে গিয়ে বিধলো তাঁর।

‘আমার যতটা সাধ্য আমি করেছি,’ বললো সে। ‘আমার বিশ্বাস কোন মানুষের পক্ষে এর চেয়ে ভাল কিছু করা সম্ভব নয়

‘এবার তুমি, এবার তুমি, রবিন হুড!’ চেঁচিয়ে উঠলো মাচ। ‘তিনটে তীর ছুঁড়তে দেখেছি আমি কাল তোমাকে। তিনটে অব্যর্থ তীর। দেখা যাক আজও হাতটা ঠিক আছে কিনা।’ গলার স্বরে বোঝা গেল, এত কঠিন পরীক্ষায় নেমেছে রবিন হুড যে দ্বিধায় পড়ে গেছে সে, খুব একটা ভরসা পাচ্ছে না মাচ আজ।

বুক ফুলিয়ে দাঁড়ালো রবিন হুড। মস্ত ধনুকটা উঁচু করে ধরতেই চুপ হয়ে গেল সবাই। কিছুটা সামনে ঝুঁকে টান দিয়ে কানের পাশে নিয়ে এলো সে ছিলাটা। দম বন্ধ করে চেয়ে আছে সবাই ওর দিকে। মৃদু ঝংকার উঠলো ছিলায়। ছুটলো তীর। সোজা গিয়ে বিধলো ওক গাছের গুঁড়িতে একেবারে মালার ঠিক মাঝখানে। বিস্মিত উল্লাস ধ্বনি বেরিয়ে এলো সবার মুখ থেকে। এমন অবিশ্বাস্য কাণ্ড জীবনে কখনো দেখেনি ওরা।

‘আবার মেরে দেখাও! আবার মেরে দেখাও!’ চেঁচিয়ে উঠলো জন ফোর্ড। ‘এটা হঠাৎ হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। তিনটে তীর ছোঁড়ার কথা ছিল তোমার। দেখা যাক আরগুলো কোথায় লাগে।’

‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই,’ বললো রবিন হুড। হাসতে হাসতে আরেকটা তীর পরালো সে ছিলায়। ছুঁড়লো। তারপর আরেকটা। প্রত্যেকটা তীর গিয়ে ঢুকেছে মালার মধ্যে, অথচ ফুল বা পাতা স্পর্শ করেনি একটাও।

হৈ-হৈ করে উঠলো সবাই। প্রত্যেকেই ওরা দক্ষ তীরন্দাজ, কাজেই কতবড় অবিশ্বাস্য, অসম্ভব কাণ্ড ঘটিয়েছে রবিন হুড মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছে সবাই, পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে এমন নৈপুণ্য অর্জন করা তাদের ক্ষমতার বাইরে। এ লোক ধনুকের জাদুকর।

‘রবিন হুড, জিন্দাবাদ!’ ধ্বনি তুললো সবাই।

‘এবার কি বলো তোমরা?’ জানতে চাইলো মাচ, ‘আমাদের নেতা হওয়ার যোগ্যতা আছে এই লোকের?’

‘একশো বার! একশো বার!’ ঘোষণা করলো সবাই। সবার চেয়ে বেশি জোরে শোনা গেল জন ফোর্ডের কণ্ঠ। ‘রবিন হুডের নেতৃত্ব মেনে নিলাম আমরা। এখন থেকে ওর কথায় বাঁচবো, ওর কথায় মরবো!’

এবার শপথ অনুষ্ঠানের পালা। একে একে শপথ গ্রহণ করলো সবাই। প্রথমে মাচ, তারপর ওয়াট, তারপর জন ফোর্ড, তারপর উইল, তারপর আরো সবাই।

‘শোনো, বন্ধুরা,’ হাঁক ছাড়লো রবিন হুড। এই দলের নেতা হিসেবে আমি আমাদের নীতিমালা ঘোষণা করছি। তিনটে নীতি আজ থেকে মনে-প্রাণে মেনে চলবো আমরা। প্রথম, আজ থেকে আমরা অত্যাচারী নর্মানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। আমাদের খেটে-খাওয়া স্যাক্সন ভাইদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে ভিটে মাটি থেকে উৎখাত করেছে যারা, ছলে বলে কৌশলে তাদের ধন-সম্পদ কেড়ে নিয়ে নিজেদের আরো ধনী করে তুলছে যারা, তারা আমাদের জন্ম-শত্রু। দ্বিতীয়, আজ থেকে আমরা গরীব বা অভাবী কোন মানুষের কোন ক্ষতি করবো না। বরং নর্মান শেরিফ, ব্যারন, ব্যবসায়ী, আর নির্লজ্জ ধনী ধর্মযাজকদের কাছ থেকে সম্পদ কেড়ে নিয়ে এদের মধ্যে বিতরণ করবো, সবদিক থেকে সব রকমের সাহায্য করবো বিপদগ্রস্তকে। তৃতীয়, কোন নারী, ধনী হোক বা দরিদ্র, নর্মান হোক বা স্যাক্সন, যেন আমাদের দ্বারা কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’ সবার দিকে চাইলো রবিন, ‘তোমরা এই আইন মেনে চলতে রাজি আছো?’

দুই হাত তুলে সমর্থন জানালো সবাই। রাজি আছি। অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবো তোমার নির্দেশ।

‘ধন্যবাদ।’

অপূর্ব মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলো রবিন হুডের মুখে।

২. লিটল জন

নটিংহামের শেরিফের কানে পৌঁছলো সব কথা। কালবিলম্ব না করে বিরাট এক রক্ষীদল পাঠালেন তিনি দস্যুদের উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্যে। লব নামের এক মুচির মুখে এই বিরাট সশস্ত্র বাহিনীর খবর পেয়ে গেল ওরা আগে ভাগেই। এত লোকের সাথে পেরে ওঠা যাবে না বুঝতে পেরে শেরউড ছেড়ে সরে গেল ওরা ইয়র্কশায়ারের জঙ্গলে। সেখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে যখন জানা গেল বিফল হতোদ্যম হয়ে ফিরে গেছে শেরিফের লোকজন, তখন আবার শেরউডে এসে ডেরা বাঁধলো রবিন হুড।

এবার দল গঠনে মন দিল রবিন। পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে সে, শক্তি অর্জন করতে হবে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই। টিকে থাকতে হলে বাহুবল চাই। কাজেই সাহসী, শক্তিশালী, বিশ্বাসী লোক খুঁজে বের করার কাজে লেগে গেল সে। অনেকেই ওর দলে যোগ দিতে আগ্রহী, কিন্তু ভালমত পরীক্ষা করার পর সন্তুষ্ট না হয়ে কাউকে দলে নিল না সে। উপযুক্ত লোকের খোঁজ পেলে তাকে দলে নেয়ার চেষ্টায় যেমন কোন ত্রুটি করতো না সে, তেমনি অনুপযুক্ত, নির্বোধ লোককে ফিরিয়ে দিতেও দ্বিধা করতো না বিন্দুমাত্র। ফলে ক্রমে ক্রমে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠলো ওর দলটা, লোকসংখ্যা বাড়তে বাড়তে গিয়ে দাঁড়ালো পাঁচ-কুড়িতে।

একদিন এক সুন্দর সকালে ঘুম থেকে উঠে চঞ্চল ঝর্ণার পানিতে হাত-মুখ ধুচ্ছে রবিন, গাছের ডালে পাতার আড়ালে বসে মিষ্টি মধুর গান শোনাচ্ছে পাখিরা, চারদিকে ভোরের তাজা একটা ভাব এমনি সময়ে হঠাৎ মনটা বিগড়ে গেল ওর।

‘চললাম,’ আস্তানায় ফিরেই ঘোষণা করলো রবিন। ‘দু’-দু’টো সপ্তাহ পেরিয়ে যাচ্ছে, কোন ঘটনা নেই, শিকার নেই, রোমাঞ্চ নেই-একঘেয়ে জীবন আর ভাল্লাগছে না। কেউ যখন কোন মেহমান আনতে পারছে না, আমি বেরোবো। আজ যদি মোটাসোটা কোন অ্যাবট কিংবা ধনী নাইট বা ব্যারনের কোমরে গোঁজা থলি হালকা না করতে পারি, তাহলে আমার নামই নেই।’

কথা শুনে আরো দু’চারজন তৈরি হচ্ছিল সাথে যাওয়ার জন্যে, হাত তুলে ওদের নিরস্ত করলো রবিন।

‘আমি একা যাবো। তৈরি থেকো, যদি কোন বিপদে পড়ি, কিংবা শাঁসালো কোন শিকারের সন্ধান পাই, তিনবার শিঙা বাজাবো। আওয়াজ পেলেই বুঝবে তোমাদের সাহায্য দরকার পড়েছে আমার।’

হাঁটছে তো হাঁটছেই, হাঁটতে হাঁটতে শেরউডের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে হাজির হলো রবিন, কিন্তু এমন কিছুই ঘটলো না যাতে একটু নতুনত্বের স্বাদ পাওয়া যায়। এ- রাস্তা ও-রাস্তা, এ-গলি ও গলি ধরে হাঁটছে সে, মাঝে মাঝে দেখা হচ্ছে মানুষজনের সাথে। কিন্তু সবাই শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ। মোটা এক সন্ন্যাসী চলে গেল পাশ কাটিয়ে, ঘোড়ায় চেপে চলে গেল এক মহিলা- মাথার হুড খুলে সম্মান দেখালো তাকে রবিন, একটা অন্ধকার মত বন-পথে দেখা পেল এক পল্লী বালার দু’একটা টুকরো সম্ভাষণের পর রওনা হলো যে-যার পথে, বর্শা আর, ঢাল হাতে এক বর্ম-পরা নাইটের সাক্ষাৎ পাওয়া গেল, লাল উর্দি পরা এক পরিচারক ছুটে চলে গেল পাশ দিয়ে। নাহ্, দিনটাই বুঝি মাটি হয় ভাবতে ভাবতে অন্য পথ ধরলো আবার রবিন। এইভাবে এলোপাতাড়ি ঘুরতে ঘুরতে বেশ বড়সড় একটা ঝর্ণার ধারে এসে পৌছলো সে। একটা গাছের কাণ্ড ফেলে পারাপারের ব্যবস্থা হয়েছে। একজন একজন করে পার হতে হয়, দু’জনের জায়গা হয় না। সেতুর ওপর পা রাখতে যাবে, এমনি সময় দেখতে পেল ওপার থেকে বিশাল চেহারার এক ঢ্যাঙা লোক উঠছে সেতু পেরোবার জন্যে।

‘অ্যাই, দাঁড়াও,’ বললো রবিন। ‘পথ ছাড়ো। আমাকে আগে পার হতে দাও।’

‘কেন?’ শান্ত গলায় জানতে চাইলো আগন্তুক।

‘দেখতে পাচ্ছো না, দু’জন পার হওয়ার জায়গা নেই? সরে দাঁড়াও, আমি আগে পার হবো।’

‘কেন? আমি আগে পার হলে ক্ষতি কি? তুমিই একটু সরে দাঁড়াও না।’

‘বেশি বকবক করবে না, খবরদার!’ রেগে গেল রবিন। হয় পথ ছাড়ো, নয়তো বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে দেব তীর!’ কথাটা বলেই ধনুক নামালো সে কাঁধ থেকে।

‘খবরদার!’ গর্জে উঠলো ওপারের লোকটা। ছিলাটা ছুঁয়েছো কি এই লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তোমার গায়ের রঙ পাল্টে দেব। দেখেছো লাঠিটা?’

সাত ফুট লম্বা প্রকাণ্ড লাঠিটার দিকে চাইলো রবিন, তারপর হাসলো। ‘গাধার মত কথা বলছো তুমি, উল্লুক। তিন কদম এগোবার আগেই কলজে ফুটো হয়ে যাবে তোমার।’

‘আর তুমি কথা বলছো কাপুরুষের মত, ঘৃণা প্রকাশ পেল লোকটার কণ্ঠে। তীর- ধনুক থাকলে যে-কোন ভীতুর ডিমও ওরকম বড়াই করতে পারে। লজ্জা করে না তোমার সাধারণ এক লাঠির বিরুদ্ধে ধনুকের হুমকি দিতে? কাপুরুষ কোথাকার!’

‘তবে রে, ব্যাটা!’ বলেই রেগেমেগে তীর ধনুক নামিয়ে রাখলো রবিন মাটিতে। ‘আমি কাপুরুষ? ঠিক আছে, সাহস থাকে তো দাঁড়াও ওখানে। এক্ষুণি একটা লাঠি কেটে নিয়ে আসছি আমি।’

‘বেশ, বেশ,’ বললো দৈত্যের মত লোকটা। মস্ত লাঠিটার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালো। নিয়ে এসো। খুশি মনে অপেক্ষা করছি আমি।’

দ্রুত পায়ে ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল রবিন। সোজা দেখে গ্রাউণ্ড ওকের ঝাড়া ছয় ফুট লম্বা একটা ডাল কেটে নিয়ে ফিরে এলো ছোট ছোট শাখাগুলো ছাঁটতে ছাঁটতে। এদিকে সেই একই ভঙ্গিতে লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্ত মনে শিস দিচ্ছে, আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে লোকটা। শাখাগুলো ছাঁটার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে লোকটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত লক্ষ্য করছে রবিন, আর ভাবছে এতবড় জোয়ানটার সাথে লাগতে যাওয়া কি ঠিক হলো? এমনিতে রবিন হুড লম্বা, কিন্তু এ লোক তার চেয়েও কমপক্ষে একহাত বেশি লম্বা, সাত ফুটের কম তো নয়ই। নিজের চওড়া কাঁধের জন্যে গর্ব অনুভব করতো রবিন, কিন্তু এ লোকের কাঁধ তার চেয়েও এক বিঘৎ বেশি চওড়া। আর কোমরের বেড় কম করেও পঁয়তাল্লিশ ইঞ্চি।

‘যাই হোক,’ মনে মনে বললো রবিন। ‘যত বড় পালোয়ানই হও না কেন, বাছা, পিটিয়ে হাতের সুখ মিটিয়ে নেব আজ।’ মুখে বললো, ‘এই যে ঢ্যাঙা বীরপুরুষ, লাঠিটা দেখতে পাচ্ছো? এগোও দেখি যদি সাহস থাকে। ঝর্ণার মাঝখানে এই গাছের ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধ হবে, একজন আরেকজনকে পিটিয়ে পানিতে না ফেলা পর্যন্ত চলবে যুদ্ধ, যে জয়ী হবে সেই পার হবে প্রথম।’

‘ঠিক আছে, কোন আপত্তি নেই আমার,’ বললো লোকটা। বোঁ করে মাথার ওপর লাঠিটা একপাক ঘুরিয়ে নিয়ে এগোলো সামনে।

শুরু হলো যুদ্ধ। প্রথম কিছুক্ষণ চললো পাঁয়তারা দু’জনেই লাঠি ঘুরাচ্ছে, একদিকে আঘাত করার ভান করে চট করে অন্যদিকে আঘাত করার চেষ্টা করছে, অপরজন সে- আঘাত ঠেকিয়ে দেয়া মাত্র অন্য ধরনের আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, বুঝে নেয়ার চেষ্টা করছে একে অন্যের দুর্বলতা। কয়েক মিনিটের মধ্যে দুজনই টের পেয়ে গেল প্রতিপক্ষকে কাবু করা সহজ হবে না, দুজনই ওস্তাদ লাঠিয়াল। প্রথম আঘাতের সুযোগ বের করে নিল রবিনই। মাথায় মারার ভান করলো সে, ঠেকাবার জন্যে প্রতিপক্ষ লাঠিটা উঁচু করে ধরতেই আশ্চর্য দ্রুতবেগ লাঠি ঘুরিয়ে মেরে দিলো ওর পাঁজরে।

রেগে গিয়ে ছোট্ট একটা গর্জন ছাড়লো দৈত্যটা, তারপর এমন জোরে লাঠি চালালো যে সেটা ঠেকাতে গিয়ে সারা শরীরে তীব্র ঝাঁকুনি অনুভব করলো রবিন। কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে দ্বিতীয় আঘাতের আগেই চড়াৎ করে একটা বাড়ি লাগিয়ে দিল লোকটার পিঠে। এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল লোকটা, বাড়িটা সহ্য করে নিয়েছে সে রবিনের মাথাটা অরক্ষিত অবস্থায় পাওয়ার জন্যেই, অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রচণ্ড এক আঘাত হানলো সে ওর মাথা লক্ষ্য করে। এই এক আঘাতেই যে-কোন মানুষের চিৎ হয়ে পড়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু অবিশ্বাস্য দ্রুততার সাথে ঠেকিয়ে দিল রবিন আঘাতটা, পুরোপুরি সফল হলো না যদিও। তেরছা ভাবে চাঁদি ছুঁয়ে গেল প্রতিপক্ষের লাঠি, কুল কুল করে রক্ত নামলো রবিনের গাল বেয়ে। হাসি ফুটে উঠেছে ঢ্যাঙা দৈত্যের মুখে।

মার খেয়ে খেপে গেল রবিন। ক্ষিপ্র বেগে বেশ কিছুক্ষণ আঘাতের পর আঘাত করে গেল সে। এই প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা নিতে বাধ্য হলো প্রতিপক্ষ, একের পর এক মার ঠেকিয়ে গেল শুধু, মারার সুযোগ পেল না।

বিদ্যুৎ চমকের মত এদিক-ওদিক থেকে নানা রকম মার মারলো রবিন, কিন্তু আশ্চর্য দক্ষতার সাথে সব রকমের আঘাতই ঠেকিয়ে দিচ্ছে ঢ্যাঙা লোকটা, ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ মত একটু আধটু আঘাত করতেও ছাড়ছে না। এইভাবে চললো পুরো একটা ঘন্টা। এক ইঞ্চি পিছালো না দুজনের কেউই, শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে, কিন্তু কেউ একটিবার বললো না-হয়েছে, থাক। ছোটখাট অসংখ্য পিট্টি খেয়েছে দুজনেই, এখানে ওখানে ফুলে গেছে বাড়ি খেয়ে, শরীরে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য লাল-নীল-সবুজ দাগ, কিন্তু হার মানলো না কেউই।

হঠাৎ এক সুযোগে প্রচণ্ড এক আঘাত হানলো রবিন ঢ্যাঙা লোকটার পাঁজরে, আগে যেখানে মেরেছিল ঠিক সেইখানটায়। পড়ে যাচ্ছিল লোকটা, কিন্তু পড়তে পড়তেও সামলে নিয়ে খটাশ করে বাড়ি লাগিয়ে দিল রবিনের মাথায়, ঠিক আগে যেখানে মেরেছিল সেইখানেই। পর মুহূর্তে সামলে নেয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে কষে এক বাড়ি লাগিয়ে দিল সে রবিনের পিঠে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না রবিন হুড, ধড়াশ করে ডিগবাজি খেয়ে পড়লো পানিতে। কয়েক ঢোক পানি খেয়ে ভেসে উঠলো ওপরে।

হা-হা করে হেসে উঠলো ঢ্যাঙা দৈত্য। ‘কি খবর, তীরন্দাজ সাহেব! কোথায় হাবুডুবু খাওয়া হচ্ছে?’

‘কোথায় আবার-পানিতে,’ বললো রবিন নির্বিকার কণ্ঠে। ডাঙার দিকে এগোলো সে। ‘জিতলে তুমিই। বাপ্‌স, মাথার মধ্যে ভন ভন করছে, যেন জুন-সকালের মৌচাক একটা।’ কথা বলতে বলতে হাঁটু পানিতে চলে এলো রবিন। পায়ের ফাঁক দিয়ে ইতি- উতি পালাচ্ছে ছোট ছোট মাছগুলো। শিঙাটা মুখে তুলে তিনটে ফুঁ দিলো সে, তারপর তীরের একটা ঝোপ আঁকড়ে ধরে উঠে এলো ওপরে।

‘জিতেছি বটে,’ বললো দৈত্য, ‘কিন্তু তুমিও কম দেখাওনি, বাপু। লড়েছো বীরের মত। এত দুর্দান্ত লেঠেল আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি আমার।’

‘আমারও না,’ বললো রবিন।

এমনি সময়ে কাছাকাছি শুকনো পাতা মাড়ানোর শব্দ পাওয়া গেল, খশ খশ আওয়াজ আসছে ঝোপ-ঝাড় নড়ার, ‘দু’একটা শুকনো ডাল মট মট করে ভাঙছে যেন কাদের পায়ের চাপে, তারপর প্রায় একসাথে জঙ্গলের আড়াল থেকে উঁকি দিলো বিশ- ত্রিশজন সবুজ পোশাক পরা শক্ত সমর্থ লোক। সবার আগে মাচ, ওয়াট আর উইল

‘আরে, ওস্তাদ! ভিজে যে একেবারে চুপসে গেছো দেখছি!’ বললো মাচ।

‘ভিখারীর কাথার মত সারা শরীরে এত লাল নীল সবুজ বেগুনি রঙ কেন?’ জানতে চাইলো উইল। ‘এই হাল হলো কি করে তোমার?’

‘ওই যে,’ আঙুল তুলে ঢ্যাঙা দৈত্যকে দেখালো রবিন, ‘ওই লোক প্রথমে আচ্ছা মত পিটিয়েছে, তারপর পানিতে ফেলেছে আমাকে।’

‘কী! এতবড় সাহস!’ গর্জন করে উঠলো কয়েকজন।

একসাথে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল লোকটার ওপর, হাসলো রবিন, একটা আঙুল তুলে থামতে বললো ওদের। ‘ওর গায়ে হাত তুলো না কেউ। সাহসী আর গুণী লোকের ওপর কোন অন্যায় অত্যাচার করি না আমরা। ওর সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলাম, হেরে গেছি-ব্যাস, খতম। ওর ওপর কোন রাগ নেই আমার। সত্যিকার বীরের মত লড়াই করে জিতেছে ও।’ লোকটার দিকে ফিরলো এবার রবিন। ‘তোমাকে পেলে খুব খুশি হবো আমরা। আসবে? যোগ দেবে আমাদের দলে?’

‘তোমার দলে?’ মাথা নাড়লো ঢ্যাঙা দৈত্য। উঁহুঁ। আমার চেয়ে অযোগ্য কারও নেতৃত্ব আমি মানতে পারি না

‘কি দিয়ে মাপ নেবে তুমি যোগ্যতার?’ ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলো রবিন, হাত তুলে দলের সবাইকে দেখালো, ‘তুমি কি মনে করো এরা সবাই আমার চেয়ে সবদিক থেকে অযোগ্য? মোটেও না। কেউ বুদ্ধিতে আমার চেয়ে বেশি, কেউ বিদ্যায়; কেউ গায়ের জোরে, কেউ ক্ষিপ্রতায়, কেউ লাঠি খেলায়, কেউ তলোয়ারে, কেউ অভিজ্ঞতায়, কেউ…’

‘তাহলে কেন মেনে নিচ্ছে ওরা তোমাকে নেতা হিসেবে?’

‘আমি এদের মধ্যে সেরা তীরন্দাজ।’

‘তাই বুঝি?’ হেসে উঠলো দৈত্য। তা এসো না, সে ব্যাপারেও হয়ে যাক একহাত?’

‘তীর-ধনুকেও ভাল হাত বুঝি তোমার?’

‘পরীক্ষা প্রার্থনীয়,’ কপট বিনয়ে পিঠ বাঁকিয়ে মাথা ঝুঁকালো ঢ্যাঙা।

‘বেশ,’ মুচকি হাসলো রবিন। আচ্ছা ত্যাদোড় লোক মনে হচ্ছে! ঠিক আছে, উইল, চার আঙুল লম্বা আর চার আঙুল চওড়া এক টুকরো গাছের ছাল কেটে আনো। উল্টো দিকটা যেন সাদা হয়।’ এক মিনিটের মধ্যেই কাছের উইলো গাছ থেকে এক টুকরো ছাল নিয়ে এলো উইল। দূরের একটা ওক গাছের দিকে আঙুল তুললো রবিন। ‘আশি গজ দূরের ঐ ওক গাছের গায়ে সেঁটে দিয়ে এসো ওটা।’ ঢ্যাঙা দৈত্যের দিকে ফিরলো সে, ‘খুব বেশি দূর হয়ে যায় এটা?’

‘মোটেও না, মোটেও না,’ উত্তর দিলো সে খুশি মনে। ভাল দেখে একটা ধনুক আর তাঁর দাও, যদি লাগাতে না পারি, ঐধনুকের ছিলা দিয়ে পিটিয়ে আমার পিঠের ছাল তুলে নিয়ো।

সবার বাড়িয়ে ধরা ধনুকগুলো থেকে নিজের পছন্দসই শক্তপোক্ত একটা ধনুক বেছে নিল লোকটা, অনেক দেখে শুনে বাছাই করলো একটা নিখুঁত সোজা তীর, তারপর দাঁড়ালো গিয়ে দাগের ওপর, যেখান থেকে ছুঁড়তে হবে তীর। বাকি সবাই, কেউ বসে, কেউ নরম ঘাসের গালিচায় শুয়ে অপেক্ষা করছে উইলের ফিরে আসার।

ফিরে এলো উইল। ডান পা-টা পিছিয়ে নিয়ে দৃঢ় ভঙ্গিতে দাঁড়ালো দৈত্যটা, ধনুকে তীর জুড়ে একটানে কানের পাশে নিয়ে এলো ছিলাটা; লক্ষ্যস্থির করেই ছুঁড়লো তাঁর। আশ্চর্য! সোজা গিয়ে লাগলো তীর ছোট্ট বাকলটার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে। হা হা করে হেসে উঠলো দৈত্য। ফিরলো রবিনের দিকে, ‘ঠিক কেন্দ্রবিন্দুটা দখল করে নিয়েছি আমি। দেখা যাক তোমার তীর কোথায় লাগে।’

লোকটার আশ্চর্য হাতের টিপ দেখে প্রশংসার গুঞ্জন উঠলো সবার কণ্ঠে, কেউ কেউ হাততালি দিয়ে উঠলো খুশিতে। কিন্তু রবিনকে দাগের ওপর এসে দাঁড়াতে দেখে মুখ শুকিয়ে গেল সবার। এইবার? পরস্পরের মুখের দিকে চাইলো ওরা। কি করবে রবিন? এর চেয়ে ভাল আর কি করতে পারে সে?

ধনুকে তীর যোজনা করলো রবিন, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে লক্ষ্যস্থির করে ছুঁড়লো তীর। অকল্পনীয় ব্যাপার! রবিনের তীরটা সোজা গিয়ে ঢুকলো কেন্দ্রবিন্দুতে সেঁধিয়ে থাকা তীরের পিছন দিকটায়, চড় চড় করে সেটাকে দু’ফাঁক করে চিরে দিয়ে থামলো গিয়ে ফলার কাছে। লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো সবাই, আকাশ কেঁপে উঠলো ওদের প্রাণখোলা হর্ষধ্বনিতে।

হাঁ হয়ে গিয়েছিল ঢ্যাঙা দৈত্যের মুখটা। চট্ করে মাথা থেকে টুপি খুলে কুর্নিশের ভঙ্গিতে অভিবাদন করলো সে রবিনকে। ‘আশ্চর্য! সত্যিই আশ্চর্য! এমন কাণ্ড জীবনে দেখিনি আমি! ধনুকের জাদুকর দস্যু রবিনও হার মানবে তোমার কাছে!’

‘চেনো তুমি রবিন হুডকে?’ ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলো রবিন

‘চিনি না। তবে তার নাম শুনেই এসেছি আমি বহুদূর থেকে। খুঁজছি তাকে।’

‘কেন খুঁজছো তাকে বলো তো?’

‘তার দলে যোগ দেব বলে।’

খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো রবিনের মুখ। একটা হাত বাড়িয়ে দিল সামনে। ‘তুমি পেয়েছো তাকে খুঁজে, লোকটার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া মুখের দিকে চেয়ে হাসলো সে। ‘রবিন হুডকেই পিটিয়ে পানিতে ফেলেছো তুমি আজ।’

সাগ্রহে চেপে ধরলো লোকটা রবিনের বাড়িয়ে ধরা হাত। ছি, ছি! আগেই পরিচয় দেয়া উচিত ছিল তোমার।’

তাহলে কি তোমার গুণের পরিচয় পেতাম? হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেলাম, সেটাই ভালো হলো না? তোমার মত গুণী লোকের দরকার আছে আমাদের। আজ থেকে তুমি আমাদের একজন হলে, আমাদের সুখ-দুঃখের ভাগীদার। ভাল কথা, কি নামে ডাকবো তোমাকে?’

‘আমার নাম জন লিটল।’

‘জন লিটল?’ হা হা করে হেসে উঠলো উইল স্টিউটলি। ‘চেহারাটা লিটল-ই বটে।’ আবার হাসলো এক পেট। উঁহু, ও নামে চলবে না। তুমি নতুন ঢুকছো দলে, নতুন ভাবে নামকরণ হবে তোমার। আমি রাখবো তোমার নাম।

‘কি নাম রাখবে ভাবছো?’ জানতে চাইলো মাচ।

‘উল্টে দেব নামটা। এখন থেকে ওর নাম হবে লিটল জন, মানে, ছোট্ট জন। দেখতে পাচ্ছো না কি রকম ছোটখাট পাহাড়টা?’

হো হো করে হেসে উঠলো সবাই। এই বিশাল দৈত্যের মত লোকটাকে ‘লিটল জন’ বলে ডাকার কথা ভেবে প্রচুর মজা পেল সকলে। তখনও ওরা কেউ জানে না, রবিন হুডের একান্ত বিশ্বস্ত নির্ভীক অনুচর হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত হতে চলেছে এই লিটল জন।

আজকের মত রোমাঞ্চের সাধ মিটে গেছে রবিনের। সবাই মিলে ফিরে চললো ওরা নিজেদের গুহার দিকে। পথে দুটো হরিণ মেরে সাথে নিল। লিটল জনের সম্মানে ভুরি-ভোজের আয়োজন হবে আজ।

৩. আর্থার এ ব্ল্যাণ্ড

বেশ কিছুদিন পরের কথা। দলের সবার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছে লিটল জন। সবাই মিলে বিপুল বিক্রমে ঠেকিয়ে দিয়েছে শেরিফের একের পর এক বেশ কয়েকটা আক্রমণ। অসম সাহস, কূট রণ-কৌশল আর মহান হৃদয়ের পরিচয় দিয়ে নিজেকে লিটল জন প্রতিষ্ঠা করেছে রবিন হুডের ডান হাত হিসেবে। নেতার প্রতি ভক্তিতেও সে সবার সেরা।

একদিন মে মাসের বিকেলে নিজেদের আস্তানায় গ্রীনউড গাছের নিচে সবুজ ঘাসের গালিচায় শুয়ে-বসে গল্প করছিলো কয়েকজন, গরমে কেমন একটা আলস্য-আলস্য ভাব সবার শরীরে, হালকা হাসি তামাশায় গুলজার হয়ে উঠেছিল আড্ডা। কাছেই ছোট্ট ঝর্ণাটা বয়ে চলেছে কুলকুল শব্দে, তার সাথে মিশে অপূর্ব সুন্দর এক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে কোকিল আর ঘুঘুর উদাস মিষ্টি গান। বিশাল ওকের মস্ত ডালগুলো দুলছে মৃদু মন্দ হাওয়ায়, চিক চিক করছে পাতাগুলো। শেষ বিকেলের রোদে সবুজ ঘাসের ওপর ঝিলমিল করছে আলোছায়ার খেলা।

দলের বেশির ভাগ লোকই ছোট ছোট উপদলে ভাগ হয়ে নানান কাজে চলে গেছে জঙ্গলের এদিক-ওদিকে। আস্তানা পাহারায় রয়েছে কেবল পাচ-ছয়জন। রবিনের পাশেই শুয়ে আছে লিটল জন মস্ত লাঠিটা কোল বালিশের মত করে ধরে; তার পাশে আধ-শোয়া হয়ে বসে আছে সুশ্রী উইল স্টিউটলি, বুদ্ধিতে যার জুড়ি মেলা ভার; রবিনের আরেক পাশে রয়েছে উইল স্কেদলক, পাকানো দড়ির মত শরীর, চোখে হাউণ্ডের দৃষ্টি-দৌড়ে কেউ পারে না ওর সাথে; তার ওপাশে রয়েছে ডংকাস্টারের ডেভিড-বিশাল ধড়, প্রায় লিটল জনের সমান, তেমনি গায়ের জোর, খুবই অল্প বয়স, দাড়ি গোঁফ মাত্র গজাতে শুরু করেছে।

হঠাৎ হাঁটুর উপর একটা চাপড় মারলো রবিন। ‘আরে, কাপড়ের কথা তো ভুলেই গেছিলাম! লিংকন গ্রীন শেষ হয়ে গেছে সেই কবে। সামনেই আসছে কাপড় বিলির তারিখ। এক্ষুণি অ্যাংকাস্টারে লোক না পাঠাতে পারলে বেইজ্জতি কারবার হয়ে যাবে।’ ভুরু কুঁচকে চিন্তা করলো এক সেকেণ্ড, তারপর কনুই দিয়ে গুঁতো মারলো লিটল জনের পাঁজরে। শুয়ে-বসে মেদ জমে যাচ্ছে তোমার শরীরে, লিটল জন। একটু হাঁটাহাঁটি করে এসো, যাও। সোজা অ্যাংকাস্টারে গিয়ে হিউ লঙশ্যাংক্সকে বলবে যেন যত শীঘ্রি সম্ভব চারশো গজ লিংকন গ্রীন কাপড় পাঠিয়ে দেয়। বুঝতে পেরেছো?’

অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে বসলো লিটল জন। গল্পগুজব ছেড়ে এক্ষুণি উঠে পড়তে বলায় মনটা বেজার হয়ে গেছে তার। উশখুশ করে বলেই ফেললো, ‘এক্ষুণি যেতে হবে? কাল সকালে রওনা দিলে হয় না? সন্ধে হয়ে আসছে…’

‘সেজন্যেই রওনা হতে বলছি এখুনি। যে রকম ছোটখাট মানুষটা তুমি, দিনের বেলায় পথ চললে ঠিক চোখে পড়ে যাবে কারও। তোমার জন্যে রাতের অন্ধকারে পথ চলাই নিরাপদ।’

কথা না বাড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ালো লিটল জন, কটিবন্ধ এঁটে নিয়ে হাত পাতলো টাকার জন্যে। কাপড়ের দাম বাবদ যা হয় তার সাথে আরো কিছু হাতখরচের টাকা দিয়ে দিল রবিন। লাঠি হাতে রওনা হয়ে গেল সে।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরু আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলেছে লিটল জন। হাঁটছে আর শিস দিচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর এসে হঠাৎ রাস্তার একটা তেমাথায় থমকে দাঁড়ালো সে। বন্ধ হয়ে গেল শিস। একটা রাস্তা চলে গেছে সোজা বহুদূরের শহর অ্যাংকাস্টারের দিকে, আরেকটা দিয়ে কিছুদূর এগোলেই শেরউডের বিখ্যাত সেই ব্লু বোর সরাইখানা। একবার এপথ আরেকবার ওপথের দিকে বার কয়েক চাইলো সে, তারপর টুপিটা একপাশে কাত করে মাথার পিছনটা চুলকালো। দুই টুকরো হয়ে গেছে মনটা। এক টুকরো বলছেঃ একটু এগোলেই তো ব্লু বোর সরাইখানা। খরচের টাকা রয়েছে পকেটে, কয়েক ঢোক ‘অক্টোবর এল,’ সেইসাথে ভাল কয়েকজন লোক পেলে উফ্, দারুণ জমে যাবে আড্ডা! অপর টুকরো বলছেঃ কোন ধানাইপানাই শুনতে চাই না, সোজা পা বাড়াও অ্যাংকাস্টারের পথে, যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেটা পালন করো।

কিন্তু পা আর বাড়ে না। কর্তব্য পালনের চেয়ে ফূর্তির আহ্বান অনেক অনেক বেশি আকর্ষণীয়। আকাশের দিকে চাইলো সে। পরিষ্কার নীল আকাশে আলস্যভরে ভাসছে উজ্জ্বল সাদা মেঘের ভেলা, সোয়ালো পাখিরা উড়ছে ঘুরে ঘুরে। হঠাৎ ভুরু কুঁচকে ফেললো সে। ভাবলো, মনে হচ্ছে, বৃষ্টি হবে আজ সন্ধ্যায়। এই বৃষ্টি থেকে বাঁচতে হলে আমার ব্লু বোরে গিয়ে আশ্রয় নেয়া উচিত। যেই থামবে অমনি রওনা হয়ে যাব আবার। কাজ দিয়েছে বটে, কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাধাই, এটা নিশ্চয়ই চাইবে না রবিন।’ যেমন ভাবা তেমনি কাজ। দীর্ঘ পদক্ষেপে এগোলো সে সরাইখানার দিকে

বেশ কিছুটা দূর থেকেই সরাইখানার হৈ-হল্লা আর গানের আওয়াজ পেয়ে দ্রুততর হলো ওর চলার গতি। ঢুকেই দেখলো চার পাঁচজনে চমৎকার জমিয়ে তুলেছে আড্ডা, সবার হাতে মদের পাত্র। ওকে দেখে খুশি হয়ে উঠলো সবাই। চমৎকার খাবার এলো, গ্লাসের পর গ্লাস মদ এলো, হাসি-ঠাট্টা-গল্পে রাত হয়ে গেল মেলা। অত রাতে রওনা হওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে সরাইখানাতেই একটা ঘর নিয়ে রাতটা কাটিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল লিটল জন।

কাজটা ভাল করলো না সে। কারণ কর্তব্যে অবহেলা করলে কোন না কোন ভাবে তার শাস্তি পেতেই হয়।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই রওনা হয়ে গেল লিটল জন। চারপাশে চেয়ে যখন বৃষ্টির কোন চিহ্নই দেখতে পেল না, শুকনো খটখট করছে মাঠ ঘাট, তখন মনে মনে ভারি লজ্জা পেল সে। সময় কিছুটা পুষিয়ে নেয়ার জন্যে প্রায় দৌড়ের গতিতে ছুটলো সে অ্যাংকাস্টারের পথে।

.

ব্লাইদ শহরে বাস করতো আর্থার এ ব্ল্যাণ্ড নামে এক দুর্দান্ত সাহসী লোক। চামড়া রঙ করা ছিল তার পেশা। যেমন সাহস, তেমনি গায়ের জোর ছিল লোকটার। কুস্তি ও লাঠি খেলায় আশেপাশে জুড়ি ছিল না তার। কুস্তিতে পাঁচ বছর ছিল সে মিডকান্ট্রি চ্যাম্পিয়ান। একবার লিংকনের অ্যাডামের সাথে লড়তে গিয়ে পাঁজরের একটা হাড় ভেঙে যাওয়ায় কুস্তি ছেড়ে দিয়ে লাঠিকেই আঁকড়ে ধরেছে সে আরো জোরে শোরে। আজ পর্যন্ত আধঘন্টার বেশি কেউ টিকতে পারেনি ওর সাথে লাঠি খেলায়। লাঠি ছাড়া আর একটি ব্যাপারে ছিল তার দারুণ পারদর্শিতা গভীর চাঁদনি রাতে তীর-ধনুক নিয়ে বেরিয়ে পড়তো সে জঙ্গলে, পায়ের ছাপ দেখে দেখে চিনে বের করতো হরিণের ডেরা, আশেপাশে জঙ্গল-রক্ষী না থাকলে এক-আধটা মেরে নিয়ে যেত বাড়িতে। যদিও ধরতে কোনদিন পারেনি, সন্দেহ ঠিকই করতো, বছরের এই সময়টায় তীক্ষ্ণ নজর রাখতো জঙ্গল রক্ষীরা ওর গতিবিধির ওপর।

লিটল জন যেদিন কাপড় কিনতে রওনা হলো তার আগের দিন গোটা দশেক গরুর পাকা চামড়া বিক্রি করতে গিয়েছিল আর্থার নটিংহাম শহরে। লিটল জন যেদিন ভোরে উঠে আবার রওনা দিল অ্যাংকাস্টারের পথে, সেদিন সে-ও একই পথ ধরে ফিরছে ব্লাইদ শহরে-হাতে প্রিয় লাঠি, মাথায় ডবল চামড়া দিয়ে তৈরি খুবই শক্ত এক টুপি।

পথের ওপর এক জায়গায় হরিণের পায়ের ছাপ দেখতে পেয়ে থমকে দাড়ালো আর্থার। ‘সাথে ধনুক অবশ্য নেই,’ মনে মনে বললো সে। কিন্তু শুধু কি মারতেই? ওদের দেখতেও তো মজা।’ এই বলে রাস্তা ছেড়ে পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করে জঙ্গলে ঢুকলো সে। এ-ঝোপ ও-ঝোপের আড়ালে উঁকি ঝুঁকি মারতে মারতে পায়ের দাগ ধরে এগোলো আর্থার, মনের মধ্যে আশার পুলক-এই বুঝি দেখা মেলে সুন্দর একপাল হরিণের।

এদিকে হাঁটছে আর ভোরের প্রাকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছে লিটল জন, গুন গুন করে গান গাইছে এক-আধ কলি। মে সকালের বাতাসে আজ মিষ্টি বুনো ফুলের সুবাস, ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা ক্র্যাব ট্রী, শিশির ভেজা ঘাসের উপর থেকে লাফিয়ে উঠে শূন্যে ঝুলছে লার্ক পাখি-হলুদ রোদ লেগে ঝলমল করছে পাখা, আকাশ থেকে সুধা বর্ষণ করছে তার মিষ্টি সুরেলা গান। কপাল খারাপ, হাঁটতে হাঁটতে আর্থার এ ব্ল্যাণ্ডের কাছাকাছি এসে পৌঁছলো সে, ঝোপঝাড় নড়ার খশ খশ আওয়াজ পেয়ে থমকে দাঁড়ালো। ভাল করে লক্ষ্য করতেই খয়েরি চামড়ার টুপি দেখতে পেল সে আর্থারের।

‘করে কি ব্যাটা!’ বিড় বিড় করে বললো লিটল জন। ‘এরকম উঁকিঝুঁকি মারার কি অর্থ? নিশ্চয়ই ব্যাটা হরিণ-চোর। হাতে নাতে ধরতে হয় তো ব্যাটাকে!’ রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে ঢুকলো সে-ও, অনুসরণ করে চললো আর্থারকে।

বহুক্ষণ ধরে চললো এই রকম-লিটল জন পিছু নিয়েছে আর্থারের, আর আর্থার পিছু নিয়েছে হরিণের। হঠাৎ একটা শুকনো ডাল মাড়িয়ে ফেললো লিটল জন, মট্ করে ভাঙলো ডালটা। সাথে সাথেই পাঁই করে ঘুরে দাঁড়ালো আর্থার এ ব্ল্যাণ্ড।

সিধে হয়ে দাঁড়ালো লিটল জন। হেঁড়ে গলায় হাঁক ছাড়লো, ‘অ্যাই! কে তুমি? চোরের মত উকিঝুঁকি মেরে কি করা হচ্ছে? মতলবটা কি? চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে শয়তানের ধাড়ি!’

কথা শুনে রেগে গেল আর্থার। যদিও হঠাৎ ওর কয়েক হাত পেছনেই এরকম দৈত্যের মত লোক দেখে একটু চমকে গিয়েছিল প্রথমে, কিন্তু সামলে নিল দ্রুত। কারো হাঁক-ডাকে দমবার পাত্র সে নয়। তুমিই বা কি করছো শুনি?’ জানতে চাইলো সে। আর চেহারাটা আমার যেমনই হোক না কেন, জেনে রাখো, তোমাকেও তার চেয়ে ভালো কিছু দেখাচ্ছে না

‘বেশি বড় কথা মানাচ্ছে না ছোট মুখে,’ বললো লিটল জন। ‘জঙ্গল রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে আমার ওপর। কি করছো এখানে, জবাব দাও। সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারলে পিটিয়ে লাশ করবো আজ তোমাকে।’

‘তাই নাকি?’ টিটকারির সুরে জানতে চাইলো আর্থার। তা একা তোমার পক্ষে তো সেটা সম্ভব হবে না, আরো যদি কেউ থাকে, ডেকে নিয়ে এসো তাদের।’

‘আমি একাই একশো!’ হাঁক ছাড়লো লিটল জন। ‘তোমাকে পেটাতে কারও সাহায্যের দরকার পড়বে না আমার।’

‘পড়বে হে, পড়বে। পিট্টি খেলে বাপ-চাচা যত আছে সবাইকে ডাকতে শুরু করবে তারস্বরে। আশে পাশে তাদের কেউ না থাকলে শেষ পর্যন্ত জানে বাঁচাবে কে তোমাকে? লাঠিটা একবার ধরলে আবার হুঁশ থাকে না আমার।’

ভুরু কুঁচকে ভয়ঙ্কর চেহারা ধারণ করলো লিটল জন। বললো, ‘পাগল নাকি ব্যাটা! যাই হোক, পাগলই হও আর ছাগলই হও, অনেক বড় কথা উচ্চারণ করে ফেলেছো-আজ তোমার রক্ষা নেই। এমন রাম প্যাদানি দেব আজ, বাপের নাম ভুলে যাবে, ডাকতে গিয়ে দেখবে নাম মনে নেই কারও। ঠিক আছে, ধরো দেখি লাঠি, দেখা যাক কতক্ষণ হুঁশ থাকে।’

‘বেশ!’ লাঠি হাতে তৈরি হলো আর্থার। কাজেই পুরুষের পরিচয়, কথা দিয়ে ছুঁচোও মারা যায় না। তবে আগেই সাবধান করে দিচ্ছি তোমাকে, বাপু, আমার নাম আর্থার এ ব্ল্যাণ্ড, হাড়গোড় কিন্তু আস্ত রাখবো না।’

‘সে দেখা যাবে!’ রাগে পিত্তিটা জ্বলে গেছে লিটল জনের, কিন্তু তাই বলে লড়াইয়ের নিয়ম ভোলেনি। বললো, দাঁড়াও, তোমার চেয়ে আমার লাঠিটা দেড় ফুট বেশি লম্বা, মাপ দিয়ে আগে কেটে ফেলি বেশিটুকু।

‘কোন দরকার নেই তার,’ জবাব দিল আর্থার। আরো দেড় ফুট বড় হলেও আমার কোন অসুবিধে নেই। এসো!’ আর কথা না বাড়িয়ে লাঠির মাঝামাঝি জায়গা দু’হাতে শক্ত করে ধরে ধীর পায়ে এগোল দু’জন দু’জনের দিকে। দুজনের চোখেই ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ, পারলে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে একে অপরকে।

.

এদিকে রবিন হুডের কানে পৌঁছে গেছে লিটল জনের গাফিলতির কথা। নির্দেশ মত অ্যাংকাস্টারে না গিয়ে ব্লু বোর সরাইখানায় আমোদ-ফুর্তি করে রাত কাটিয়েছে লিটল জন, এই খবর পেয়েই রক্ত চড়ে গেল তার মাথায়। ‘দাঁড়াও, মজা দেখাচ্ছি!’ বলে ভোরবেলাই বেরিয়ে পড়লো সে ব্লু বোরের উদ্দেশে। আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন! রাগের মাথায় হন হন করে হাঁটছে, আর মনে মনে কড়া সব বাক্য রচনা করে চলেছে একের পর এক। সামনে পেলে হয়, ধুয়ে ফেলে দেবে আজ সে লিটল জনকে। ব্লু বোরে গিয়ে লিটল জনকে না পেয়ে ছুটলো সে অ্যাংকাস্টারের পথ ধরে। গায়ের ঝাল ঝাড়তে না পারলে কিছুতেই শান্তি আসছে না মনে। বেশ অনেকটা পথ চলার পর জঙ্গলের মধ্যে থেকে চড়া গলার বাকবিতণ্ডা কানে এলো ওর। ঝগড়া করছে দু’জন লোক ধমকের সুরে।

‘আরে!’ থমকে দাঁড়ালো রবিন হুড। আমাদের লিটল জনের গলা না?’ কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলো সে। ‘নাহ, অপর কণ্ঠস্বরটা চেনা যাচ্ছে না। জঙ্গল-রক্ষীদের হাতে পড়লো না তো আবার ব্যাটা? দেখতে হয়!’

লিটল জন বিপদে পড়েছে ভেবে কর্পূরের মত উবে গেল রবিনের সব রাগ। অতি সন্তর্পণে ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে আড়ালে এগিয়ে গেল সে উত্তেজিত কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে। কাছাকাছি এসে আলগোছে একটা ঝোপের কিছু পাতা একপাশে সরাতেই দেখতে পেল সে লাঠি হাতে ধীর পায়ে এগোচ্ছে দু’জন দু’জনের দিকে।

‘আচ্ছা!’ মনে মনে বললো রবিন হুড, ‘চমৎকার একটা খেলা জমেছে দেখা যাচ্ছে! কসম খোদার, তিনটে সোনার গিনি দেব আমি লোকটাকে, যদি আচ্ছামত পিট্টি দিতে পারে ওই বদমাশকে। খুবই খুশি হতাম আমি তাহলে, কিন্তু…সেটা কি সম্ভব? এমন একটা ঘটনা চাক্ষুষ করার সৌভাগ্য কি হবে আমার? দেখা যাক, বাগাড়ম্বর দেখে তো মনে হয় এ-ও কম যাবে না।’ এই বলে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো সে মাটিতে।

গোল হয়ে ঘুরছে দু’জন একে অপরের চোখে চোখ রেখে, দুজনেই সুযোগ খুঁজছে অপরের অন্যমনস্কতার, সামান্যতম দুর্বলতা পেলেই আঘাত করবে সেখানে। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ প্রতিপক্ষের পদক্ষেপে সামান্য একটু দুর্বলতার আভাস পেয়ে প্রথম আঘাত হানলো লিটল জন তড়িৎ বেগে। খটাশ করে আটকে দিল আর্থার সে-আঘাত, এবং সাথে সাথেই পাল্টা আঘাত করলো। ব্যাস, শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। লাফিয়ে সামনে যাচ্ছে, পিছনে আসছে, ডাইনে যাচ্ছে, বাঁয়ে আসছে দু’জন; পটাপট লাঠির বাড়ি পড়ছে এত জোরে আর এত দ্রুত যে দূর থেকে কেউ শব্দ শুনলে মনে করবে একসাথে মারামারি করছে এক ডজন লোক। ঝাড়া তিরিশ মিনিট ধরে তুমুল লড়াই করে চললো দু’জন, দাপাদাপিতে চষা জমির মত অবস্থা হলো মাটির, লাঙল টানা বলদের মত ফোঁস ফোঁস শ্বাস পড়ছে। দু’জনই মার খাচ্ছে, সুযোগ পেলে কেউ কাউকে ছাড়ছে না, কিন্তু বেশির ভাগ মার পড়ছে লিটল জনের ভাগে, কারণ গভীর রাত পর্যন্ত জেগে আকণ্ঠ মদ খেয়ে শরীরের অবস্থা তার খুব ভাল নয়, তার ওপর রবিনের ভয়ে খুব ভোরে উঠে কিছু মুখে না দিয়েই বেরিয়ে পড়েছে সে অ্যাংকাস্টারের পথে।

একটা করে মার খায় লিটল জন, আর হাসি ফুটে ওঠে রবিনের মুখে। এখনো নিশ্চিত সে, শেষ পর্যন্ত জয় হবে লিটল জনেরই। কারণ, নিজেও পাকা লাঠিয়াল রবিন, আর্থারের খেলার মধ্যে ছোটখাট দু’একটা ত্রুটি যখন ওর চোখে ধরা পড়ছে; ও জানে, ওর চেয়ে অনেক গুণে বেশি পাকা লাঠিয়াল লিটল জনের চোখে দোষগুলো ধরা পড়বেই, ঠিক সময় মত সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে সে। কিন্তু আরো কিছুক্ষণ দেখার পর টের পেল রবিন, আসলে ওগুলো ত্রুটি নয় আর্থারের, ইচ্ছেকৃত ভাবে তৈরি ফাঁদ। একবার একটা ভুলের সুযোগ নিতে গিয়ে বেমক্কা মার খেয়ে মাটিতে পড়ার দশা হলো লিটল জনের, বহু কষ্টে সামলে নিল সে নিজেকে। মনে মনে হাজারবার বাহবা দিল রবিন আর্থারকে।

কিন্তু ঝানু লেঠেল লিটল জন, সুযোগ সে ঠিকই বের করে নিল একবার। ফাঁক পেয়ে প্রচণ্ড জোরে শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে আঘাত করলো সে প্রতিপক্ষের মাথায়। ঐ আঘাত খেয়ে তাগড়া জোয়ান ষাঁড়েরও হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাঁচিয়ে দিল ওকে ওর মাথার ডবল চামড়ার টুপি। টাল সামলাতে গিয়ে উল্টোপাল্টা পা ফেলে কয়েক হাত পিছনে সরে যেতে হলো আর্থারকে। যদি সাথে সাথে এগিয়ে গিয়ে আরো আঘাত করতো লিটল জন, তাহলে জয় ছিল ওর সুনিশ্চিত, কিন্তু কল্পনাও করতে পারেনি সে এই আঘাতের পরেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কোন মানুষ। যখন দেখলো দু’পায়ের ওপরই খাড়া আছে লোকটা এখনো, এগিয়ে গেল সে, কিন্তু ততক্ষণে সামলে নিয়েছে আর্থার, লিটল জন কাছে আসতেই কড়াৎ করে মেরে দিলো মোক্ষম মার। মার খেয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেল লিটল জন, হাত ফসকে ছিটকে দূরে চলে গেল লাঠি। এগিয়ে এসে কষে আরেক বাড়ি লাগালো আর্থার ওর পাঁজরে।

‘দাঁড়াও!’ চেঁচিয়ে উঠলো লিটল জন। ‘পড়ে যাওয়া মানুষকেও মারবে তুমি?’

‘নিশ্চয়,’ আরেক বাড়ি লাগালো আর্থার। ‘পড়ে যাওয়া না বলে বলো ফেলে দেয়া প্রতিপক্ষকে মারবো কিনা। নিশ্চয় মারবো, একশোবার মারবো। তুমি হলেও তাই করতে।

‘থামো! থামো, প্লীজ!’ আর্তনাদ করে উঠলো লিটল জন। হার মানছি। হার মেনে নিচ্ছি আমি!’

‘পিট্টিটা যথেষ্ট হয়েছে বলে মনে করো?’ খুশি খুশি গলায় জানতে চাইলো আর্থার। আবার তুললো লাঠি।

‘যথেষ্ট, যথেষ্ট! সত্যি বলছি, যথেষ্ট হয়েছে।’

‘উচিত শিক্ষা হয়েছে তোমার? ঠিক জানো?’ হালকা করে আরেক বাড়ি লাগালো সে লিটল জনের পিঠে।

‘হয়েছে। দোহাই তোমার, হার মেনে নিয়েছি আমি।’

‘হুম। মেনে নিচ্ছো যে আমি তোমার চেয়ে ভাল লাঠিয়াল?’

‘মেনে নিচ্ছি। সর্বান্তঃকরণে। ব্যাটা পাজির পা-ঝাড়া কোথাকার!’ প্রথম অংশটুকু জোরে, শেষের অংশটুকু নিজের দাড়িকে শুনিয়ে বললো লিটল জন।

‘ঠিক আছে। এবার সিধে রাস্তায় নিজের কাজে চলে যাও। খোদার কাছে হাজার শোকর করো যে খুবই দয়ালু এক লোকের পাল্লায় পড়েছিলে আজ। যাও, ছেড়ে দিলাম।’

‘তোর দয়ার নিকুচি করেছি আমি!’ বিড় বিড় করে বললো লিটল জন।

‘কি বললে?’ ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলো আর্থার।

‘না, বলছিলাম কি, মনে হচ্ছে চুর চুর হয়ে গেছে পাঁজরার হাড়গুলো। আমার ধারণা ছিল গোটা নটিংহামশায়ারে আমার সমান লাঠিয়াল আর একজনও নেই।’

‘আমারও তাই ধারণা ছিল,’ বলেই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো রবিন হুড। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার অবস্থা হয়েছে ওর, পানি এসে গেছে চোখে। ‘বাহবা, বাহবা! কী মার!’ হতভম্ব আর্থারের হাতে তিনটে গিনি গুঁজে দিলো সে। ‘কাজের কাজ করেছো, ভাই, একটা!’ ফিরলো লিটল জনের দিকে। ‘পুরোটা মারপিট প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখেছি আমি ওই ওখানে শুয়ে শুয়ে। বেড়ে মার খেয়েছো, যাই বলো। এক্কেবারে হামাগুড়ি দিইয়ে ছেড়েছে। তোমাকে খুঁজছিলাম আমি কিছুটা ঝাল ঝাড়বো বলে, আমার নির্দেশ অমান্য করার জন্যে নতুন নতুন গালাগালি তৈরি করতে করতে ছুটছিলাম তোমার পিছন পিছন। কিন্তু এই পরম দয়ালু ব্যক্তিটি সব সাধ মিটিয়ে দিয়েছে আমার। তোমার যা পাওনা কড়ায় গণ্ডায়, সুদে আসলে মিটিয়ে আরও কিছু বেশি দিয়ে দিয়েছে।’

উঠে বসেছে লিটল জন, মুখের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে চিরতার পানি খাওয়ানো হয়েছে ওকে দুই গ্লাস। আর্থারের দিকে ফিরলো আবার রবিন হুড। ‘তোমার নামটা কি, ভাই?’

‘লোকে আমাকে আর্থার এ ব্যাণ্ড বলে ডাকে,’ বললো আর্থার। ‘তোমার নাম কি? আর এই গিনি দেয়ারই বা কি অর্থ?’

‘পুরস্কার বা মজুরী, যাই বলো-ওটা তোমার। একে কষে পিট্টি লাগাতে পারলে তোমাকে দেব বলে ঠিক করেছিলাম মনে মনে,’ ভুরু কুঁচকে চিন্তা করলো রবিন। ‘কি বললে? আর্থার এ ব্ল্যাণ্ড? আরে, তোমাকে তো আমি চিনি বলে মনে হচ্ছে। গত অক্টোবরে ইলির মেলায় তুমি নটিংহামের জকের চাঁদি ফাটিয়ে দিয়েছিলে না? ওই জক হচ্ছে আমাদেরই এক লোক, উইল স্কেদলক। কিন্তু আজ তুমি যা দেখালে তার তুলনা নেই। এই যে ভদ্রলোক, মাটিতে বসে গা-হাত-পা টিপছেন, চেনো একে? আজ একটু বেকায়দায় পেয়ে মারধোর করেছো বটে, কিন্তু সারা ইংল্যাণ্ডে লাঠি খেলায় এর জুড়ি নেই। সত্যিই নেই। এর নাম লিটল জন। আমি রবিন হুড।’

‘অ্যা!’ ছানাবড়া হয়ে গেল আর্থারের চোখ দুটো। ‘তু-তুমিই সেই মহান রবিন হুড? আর এ সেই বিখ্যাত লিটল জন-যাকে আমি পীরের মত ভক্তি করি? ছি, ছি, ছি,. ছি! পরিচয়টা আগে জানলে তোমার বিরুদ্ধে লাঠি ধরার দুঃসাহস হতো না আমার,’ ছুটে গেল সে লিটল জনের পাশে। সাহায্য করার জন্যে হাত বাড়ালো। ‘এসো, ভাই লিটল জন, ওঠো, জামা কাপড়ের ধুলো ঝেড়ে দিচ্ছি আমি।’

‘থাক, থাক-লাগবে না. আমি নিজেই উঠতে পারবো, ঝাঁঝিয়ে উঠলো লিটল জন। সাবধানে উঠে দাঁড়ালো। এতই সাবধানে, যে দেখে মনে হচ্ছে ওর হাড়গোড় সব কাঁচ দিয়ে তৈরি, ভেঙে যেতে পারে যখন-তখন। ব্যথায় বিকৃত চোখ মুখ। বললো, ‘খেলেছো ভাল, তবে জেনে রাখো, মাথায় ওই চামড়ার টুপিটা না থাকলে কপালে খারাবী ছিল আজ তোমার।’

লিটল জনের আড়ষ্ট নড়াচড়ার নমুনা দেখে আর এক পেট হাসলো রবিন, তারপর ফিরলো আর্থারের দিকে।

আমাদের দলে যোগ দেবে, আর্থার? তোমার মত সাহসী লোকের দরকার আছে আমার। আসবে আমাদের সাথে?’

‘নেবে আমাকে?’ লাফিয়ে শূন্যে উঠলো আর্থার এ ব্ল্যাণ্ড। ‘যোগ দেব না মানে? একশোবার যোগ দেব। তোমাদের ওই মুক্ত জীবন তো আমার স্বপ্নের জীবন। দুর্গন্ধের মধ্যে বসে চামড়ার কাজ করি, সেটা আমার ভালো লাগে মনে করেছো? মোটেও না। তোমার অনুচর হতে পারা আমার জন্যে পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার।

আবার লিটল জনের দিকে ফিরলো রবিন। মুখে মৃদু হাসি। ‘সোজা অ্যাংকাস্টারের পথে রওনা হয়ে যাও, বাছা। যাতে ডাইনে-বাঁয়ে অন্য কোনদিকে যেতে না পারো সেজন্যে আমিও যাচ্ছি তোমার সাথে। ব্লু বোর ছাড়াও আরো অনেক সরাইখানা আছে শেরউডে। বলা যায় না, সেগুলো হয়তো আবার হাতছানি দিয়ে ডাকবে তোমাকে, তাই একেবারে জঙ্গল পার করে দিয়ে তারপর ফিরবো আমরা ডেরায়।

রাস্তায় ফিরে এসে হাঁটতে শুরু করলো তিনজন।

৪. উইল স্কারলেট

বেশ বেলা হয়ে গেছে। রোদ-ঝলমল রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে ওরা তিনজন-

রবিন হুড, লিটল জন আর আর্থার এ ব্ল্যাণ্ড। পথচারী অনেকে থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে ওদের। চওড়া কাঁধ, এমন সুন্দর স্বাস্থ্য, আর কী দৃঢ়, বলিষ্ঠ পদক্ষেপ-একসাথে এরকম তিনজন যুবকের সাক্ষাৎ সচরাচর মেলে না।

‘আচ্ছা লিটল জন,‘ হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করলো রবিন, ‘সোজা অ্যাংকাস্টারে না গিয়ে কি মনে করে ব্লুবোরে রয়ে গেলে তুমি কাল? আমার কথা শুনলে আজকে আর এই বিপদে পড়তে হতো না

‘বৃষ্টির ভয়ে,’ বিমর্ষ কণ্ঠে বললো লিটল জন। রবিনের হাতে ধরা পড়ে যাওয়ায়, এবং প্রচুর বকাঝকা আর টিটকারি হজম করতে হওয়ায় মেজাজটা খিঁচড়ে আছে ওর। এছাড়া বেদম পিট্টি খেয়ে শরীরের নানান জায়গায় কম-বেশি বিভিন্ন ধরনের ব্যথা তো আছেই।

‘বৃষ্টি!’ পথের ওপর থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো রবিন হুড। বিস্মিত দৃষ্টিতে চাইলো লিটল জনের মুখের দিকে। ‘ওরে উল্লুক, বৃষ্টি কোথায় পেলে? একটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়েনি গত তিন দিন। বৃষ্টি কেন, কালো মেঘের আভাসও দেখা যায়নি এ তল্লাটে।’

‘বৃষ্টি হয়নি ঠিক, কিন্তু হতে তো পারতো,’ মুখ আঁধার করে বললো লিটল জন। ‘দেবতার ইচ্ছায় বৃষ্টি। ইচ্ছে করলে তিনি পরিষ্কার আকাশ থেকেও বৃষ্টি ঝরাতে পারেন। যদি হতো, তাহলে ভিজে জ্বর আসতো না? তুমি কি তাই চাও?’

কথা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো রবিন। ‘ওরে শয়তান! ভেবে ভেবে কী অপূর্ব [ক্তি খাড়া করা হয়েছে! এর সাথে বেশিক্ষণ রাগ করে থাকে কার সাধ্য!’

অসহায় ভঙ্গিতে এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে আবার পা বাড়ালো রবিন হাসিমুখে। ওনা হয়ে গেল সবাই। বেশ কিছুদূর এগিয়ে তেষ্টা পেল রবিনের। গরম হয়ে উঠছে নিটা। পথের ধুলো খেয়ে শুকিয়ে গেছে গলা। একটা বেড়া-ঝোপের ওপাশে ছোট্ট একটা ফোয়ারা দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো ওরা, বেড়া ডিঙাবার সিঁড়ি টপকে চলে গেল পারে। শ্যাওলা ধরা একটা পাথরের নিচ থেকে বেরোচ্ছে বরফের মত ঠাণ্ডা পানি। চুপ্তির সাথে আঁজলা ভরে ভরে পানি খেল ওরা, তারপর একটা ছায়া দেখে শুয়ে পড়লো ধানিক বিশ্রাম নিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে।

বেড়ার ওপাশে বহুদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে রাস্তাটা, অন্য পাশে শষ্যের খেতে কচি বুজ পাতার ওপর রোদের মমতা, মাথার ওপর বীচ গাছের পাতায় মৃদু ঝিরঝির াতাসে বুনো থাইম আর বেগুনী ভায়োলেট ফুলের হালকা মিষ্টি গন্ধ। ফোয়ারার অস্পষ্ট লকুল। নিস্তব্ধ, নিঝুম একটা সুন্দর পরিবেশ। মাঝে মাঝে অখণ্ড নীরবতা ভাঙছে হুদূর থেকে ভেসে আসা মোরগের বাঁক, কিংবা এক ফুল থেকে আরেক ফুলে উড়ে াওয়া ভ্রমরের গুঞ্জন, অথবা কাছের কোন গেরস্ত বাড়ি থেকে ব্যস্ত গৃহিণীর উচ্চৈঃস্বর। অনেকক্ষণ একটি কথাও বললো না ওরা, নীরবে আকণ্ঠ পান করে নিচ্ছে যেন স্বর্গের শান্তিধারা। চুপচাপ শুয়ে পাতার ফাঁক দিয়ে দেখছে অসীম নীল আকাশ। অনেকক্ষণ পর পাশ ফিরলো রবিন, তারপর আস্তে করে কনুই দিয়ে গুঁতো দিল লিটল জনের পাঁজরে।

‘দেখো, দেখো। ননীর পুতুল একটা! এইদিকেই আসছে মক্কেল।’

সবাই দেখলো রাস্তা দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসছে এক যুবক। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, সৌখিন লোক। উজ্জ্বল লাল রঙের সিল্কের কাপড় তার পরনে, লাল মোজা, মাথায় পরা ভেলভেটের টুপিটাও লাল। বড়সড় একটা সাদা পালক গোঁজা রয়েছে এক চানের পাশে টুপিতে। যুবকের লম্বা, কোঁকড়া, হলুদ চুল নেমে এসেছে কাঁধ পর্যন্ত কি হাতে একটা গোলাপ-মাঝে মাঝে নাকের কাছে নিয়ে শুঁকছে।

‘আহা! কী মিষ্টি!’ হেসে উঠলো রবিন। যেন সোনার ময়না পাখি! দেখে নাও, টিল জন, ভাল করে দেখে চক্ষু জুড়িয়ে নাও। এমন মেয়েলী ব্যাটাছেলে টাকায় ম্বালটা মেলে না।’

‘রঙের বাহার একটু বেশিই মনে হচ্ছে আমার কাছে,’ বললো আর্থার। তবে ঠিক নীর পুতুল বলা যাবে না একে। কাঁধ দুটো দেখেছো? যেমন চওড়া কাঁধ, তেমনি সরু কামর। তাছাড়া হাত দুটো লক্ষ্য করো-ল্যাগব্যাগ করে ঝুলছে না, রীতিমত শক্ত, নুইয়ের কাছে আবার একটু বাঁকা। উঁহু, দুধের বাচ্চা না; সৌখিন হতে পারে, কিন্তু ময়েলী বলা যায় না কিছুতেই। আমার বিশ্বাস, ওই ঝলমলে পোশাকের নিচে পেটা কটা শরীর রয়েছে লোকটার।

‘আমারও তাই মনে হচ্ছে,’ বললো লিটল জন। ‘ঠিকই বলেছে আর্থার। দেখে তটা মনে হয় ততটা ফুলের পাপড়ি নয় ছোকরা।’

‘আরে, দূর!’ বললো রবিন হুড। এইসব কোমল পেলব পুরুষ দেখলে গা-টা ঘিন ন করে ওঠে আমার। ফুলটা ধরেছে কিভাবে দেখো না, আহা-হা! ওটা দিয়ে এক ড়ি দিলেই যেন লুটিয়ে পড়বে ধুলায়। নাহ্, ভুল হয়েছে তোমাদের দুজনেরই। সামনে ড়িয়ে একটা ধমক দাও, দেখবে ইঁদুরের মত কিচ কিচ আওয়াজ তুলে গর্ত খুঁজবে; ‘ চংবা বলা যায় না, সোজা মূর্ছা যাবে। ভাবছি, কে হতে পারে লোকটা?’

‘কোন বিরাট ব্যারনের আদরের দুলাল, সন্দেহ নেই,’ বললো লিটল জন। ‘ওর লিতে চকচকে কিছু মুদ্রা আশা করা অন্যায় হবে না।’

‘ঠিক বলেছো, বললো রবিন। ‘এইসব বিলাসপ্রিয় ধনীর দুলাল দেখলে পিত্তি জ্বলে যায় আমার। যখন ভাবি এইসব অকর্মণ্য, অযোগ্য নর্মানদের তর্জনীর ইঙ্গিতে ওদের ইচ্ছেমত উঠতে বসতে হচ্ছে হাজার হাজার স্যাক্সন প্রজাকে, যাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা টাকা চুষে নিয়ে সুন্দর সুন্দর কাপড় পরে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে এরা, অথচ যাদের পায়ের কড়ে আঙুলের যোগ্যতা নেই এদের; তাদেরই জমিজমা কেড়ে নিয়ে…

‘হয়েছে, হয়েছে,’ হেসে ফেললো লিটল জন। ওর থলেটা খানিক হালকা করার জন্যে এত গরম বক্তৃতার দরকার নেই। তবে, মনে হচ্ছে, ভুল হচ্ছে তোমার কোথাও। নর্মানদের তুলনায় অনেক হালকা ওর চুল, আমাদের মত সাচ্চা স্যাক্সন হওয়াও বিচিত্র নয়। খুব সম্ভব অপাত্রে বর্ষণ হচ্ছে…

‘বাজি রাখো,’ বললো রবিন। মানুষ চিনতে আমার ভুল হয় না। যাই হোক, একটু পরেই জানা যাবে আসল সত্য। তোমার কথা যদি সত্যি হয়, একটা কানাকড়িও নেব না, কিন্তু যদি আমার কথাই ঠিক হয়, ওর গা থেকে ছাল ছাড়িয়ে নিতে কেবল বাকি রাখবো। তোমরা বলছো ওর কাপড়ের নিচে পেশী বলে কিছু আছে, বেশ, চুপচাপ এখানে শুয়ে শুয়ে দেখো কিরকম পিট্টি লাগাই।’ এই বলে বেড়া ডিঙিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালো রবিন, দুই কোমরে হাত রেখে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে দেখছে আগন্তুককে।

কাছে এসে পড়েছে যুবক। ধীর পায়ে হাঁটছে, মাঝে মাঝে গোলাপটা নাকের কাছে নিয়ে শুঁকছে, এদিক তাকাচ্ছে, ওদিক তাকাচ্ছে কিন্তু রবিন হুড বলে যে একটা লোক দুনিয়ায় আছে, লক্ষ্যই করছে না। রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো রবিন, তবু ভূক্ষেপ করলো না যুবক, চলার গতি বাড়লো না, কিংবা কমলো না; যেমন আসছিল, আসতেই থাকলো।

‘দাঁড়াও!’ হুঙ্কার ছাড়লো রবিন। ‘যেখানে আছো, দাঁড়িয়ে পড়ো। এক পা সামনে বাড়াবে না!’

‘কেন, ভাই?’ মৃদু নরম গলায় জানতে চাইলো সুশ্রী যুবক। ‘কেন এক পা সামনে বাড়াবো না? আচ্ছা, ঠিক আছে। বলছো যখন, কিছুক্ষণের জন্যে থেমে না হয় শুনেই যাই তোমার কথা। ‘

‘বেশ,’ বললো রবিন। তুমি যখন আমার কথামত কাজ করছো, নরম, ভদ্র ভাষায় কথা বলছো; ভদ্রতা দেখাতে আমিও কসুর করবো না। আমি হচ্ছি সাধু উইলফ্রেডের পবিত্র প্রতিনিধি। এই পথে যারাই যায়, আমি তাদের কাছ থেকে টোল আদায় করি এবং সে-টাকা ভাল কাজে ব্যয় করি। কাজেই তোমার থলেটা বের করে একটু দেখাতে হবে আমাকে। যদি মনে করি তোমার কাছে যতটা থাকা উচিত তার চেয়ে বেশি আছে, তাহলে বেশিটুকু রেখে দেয়াই আমাদের নিয়ম। সাথে বেশি টাকা রাখা তোমার নিজের জন্যেও খুব একটা মঙ্গলজনক বা নিরাপদ নয়।’

হাসি হাসি মুখ করে রবিনের কথাগুলো শুনছিল আর দু’আঙুলে গোলাপের বোঁটা ধরে সুগন্ধ নিচ্ছিল যুবক, রবিন থামতেই মিষ্টি করে হাসলো। ‘বেশ লাগছে কিন্তু,‘ বললো সে, ‘তোমার কথা শুনতে ভালই লাগছে আমার। আরো কিছু বলার থাকলে বলো, ভাই। হাতে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়াবার সময় আছে আমার।’

‘যা বলার বলেছি,’ গম্ভীর স্বরে বললো রবিন। এবার বের করে ফেল থলিটা। কথা দিচ্ছি, যদি বেশি কিছু না থাকে, একটা পয়সাও নেব না তোমার থেকে। নির্বিঘ্নে চলে যেতে পারবে নিজের পথে।

‘আমি খুবই দুঃখিত,’ নরম গলায় বললো যুবক। ‘তোমাকে দেয়ার মত তেমন কিছুই নেই আমার। এবার তাহলে আমি আসি? নিশ্চয়ই বাধা দেবে না তুমি আমাকে, কারণ, তোমার তো কোন ক্ষতি করিনি আমি।

পা বাড়াতে যাচ্ছিল যুবক, হাত তুলে বাধা দিল রবিন। ‘খবরদার! থলে না দেখিয়ে যেতে পারবে না তুমি।’

‘দেখো, বন্ধু, অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললো যুবক। ‘বিশেষ একটা কাজ আছে আমার। তোমাকে যথেষ্ট সময় দিয়েছি, ধৈর্য ধরে সব কথা শুনেছি তোমার, এবার দয়া করে আমাকে নিজের কাজে যেতে দাও। ঝগড়া-ঝাঁটি করে লাভ আছে কিছু?’

‘তোমার নেই, কিন্তু আমার আছে!’ দৃঢ় কণ্ঠে বললো রবিন। ‘আমার হুকুম অমান্য করে এক পা-ও এগোতে পারবে না তুমি!’ বলেই মস্ত লাঠিটা তুললো সে মাথার উপর।

‘খুবই দুঃখের বিষয়,’ এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে বললো যুবক। ‘এরকম একটা ঘটনা না ঘটলেও পারতো। কিন্তু এখন তোমাকে হত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় দেখছি না।’ বলেই সোনালী কারুকাজ করা চামড়ার খাপ থেকে সড়াৎ করে এক টানে বের করলো সে তলোয়ারটা।

‘তলোয়ার রাখো,’ বললো রবিন। ‘ওক-ডালের লাঠির সাথে তলোয়ার দিয়ে কিছুই করতে পারবে না তুমি, এক বাড়িতে দু’টুকরো হয়ে যাবে তোমার খেলনা। তারচেয়ে, এই দেখো, ওখানে অনেকগুলো ওকের চারা দেখা যাচ্ছে, পছন্দসই একটা লাঠি কেটে নিয়ে এসোগে যাও। অবশ্য,’ যোগ করলো রবিন, ‘যদি পিট্টি খেতে আপত্তি না থাকে।’

রবিনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত নজর বুলালো যুবক, লাঠিটা দেখলো, তারপর বললো, ‘ঠিকই বলেছো তুমি। ওই লাঠির কাছে কিছুই না এই তরবারী। ঠিক আছে, একটু অপেক্ষা করো, আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি লাঠি। কথাটা বলে শেষবারের মত ঘ্রাণ নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল যুবক ফুলটা, তরবারী খাপে পুরে এগিয়ে গেল ওকের চারাগুলোর দিকে। রবিন লক্ষ্য করলো হাঁটার ছন্দ সম্পূর্ণ বদলে গেছে যুবকের, ধীর- স্থির, ঢিলেঢালা ভাবটা অদৃশ্য হয়ে গেছে বেমালুম। পছন্দ মত চারা খুঁজে পেতে দেরি হলো না যুবকের। কাটলো না সেটা, আস্তিন দুটো একটু গুটিয়ে নিয়ে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো গাছটার গোড়ার দিকে, তারপর পায়ের গোড়ালি দুটো শক্ত করে মাটিতে গেড়ে হ্যাঁচকা এক টানে তুলে আনলো সেটাকে শিকড় সহ। তারপর, যেন এমন কোন বিস্ময়কর কাজ করেনি সে, এমনি ভঙ্গিতে, তলোয়ার দিয়ে শিকড় আর ছোট ছোট শাখা-প্রশাখা ছাঁটতে ছাঁটতে শান্ত পদক্ষেপে ফিরে এলো।

চুপচাপ শুয়ে শুয়ে সব দেখছিল আর্থার আর লিটল জন। গোটা একটা ওকের চারা শিকড় ছিঁড়ে উপড়ে তুলতে দেখে ঠোঁট দুটো শিস দেয়ার ভঙ্গিতে গোল করে লম্বা করে বাতাস টানলো আর্থার। মুখটা হাঁ হয়ে গিয়েছিল লিটল জনেরও, সংবিৎ ফিরে পেয়ে নড়েচড়ে উঠলো। ‘সব্বোনাশ! দেখলে, আর্থার? মনে হচ্ছে বারোটা বাজবে আজ ওস্তাদের। মাই গড! মড়মড়িয়ে তুলে ফেললো আস্ত গাছটা!’

রবিনের মনের ভিতর কি চলছে বোঝা গেল না, তবে দেখা গেল, পিছু হটবার লক্ষণ নেই তার মধ্যে। মুখোমুখি দাঁড়াল এসে মিষ্টভাষী যুবক। শুরু হলো লড়াই।

অল্পক্ষণেই টের পেয়ে গেল লিটল জন আর আর্থার, গায়ে যে কেবল অসুরের শক্তিই রয়েছে তা নয়, লাঠি খেলার সব কৌশলই জানা আছে যুবকের বিলক্ষণ রবিনের কলা-কৌশল যদিও আগন্তুকের চেয়ে অনেক উন্নত মানের, ক্ষিপ্রতায়ও তার তুলনা হয় না, কিন্তু কৌশল আর ক্ষিপ্রতা দিয়ে কতক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে সে প্রচণ্ড আসুরিক শক্তিকে? দু’জনের দাপাদাপিতে ধুলোর মেঘ সৃষ্টি হলো রাস্তার উপর মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে ওদের। মাঝে মাঝে শুধু শোনা যাচ্ছে খটাখট অদৃশ্য লাঠির ঠোকাঠুকির আওয়াজ। সুযোগ মত তিনটে বাড়ি কষিয়ে দিয়েছে রবিন ইতিমধ্যেইঃ দু’বার পাঁজরে, একবার হাতের উপর। অনেক চেষ্টা করেও একটিবারও রবিনের শরীর স্পর্শ করতে পারেনি যুবকের লাঠি। কপাল ভাল, প্রতিটা আঘাত ঠেকিয়ে দিতে পেরেছে রবিন; কারণ, যে কোন একটা আঘাতই ওকে ধরাশায়ী করার জন্যে যথেষ্ট ছিল। যুবক যখন দেখলো কৌশলে কিছুতেই এঁটে ওঠা যাবে না রবিনের সাথে, তখন গায়ের জোর খাটিয়ে ওকে পরাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিলো সে। প্রচণ্ড জোরে মারলো সে রবিনের লাঠির মাঝ বরাবর; এতই জোরে, যে থতমত খেয়ে গেল রবিন, লাঠিটা আঁকড়ে ধরে রাখাও মুশকিল হয়ে পড়লো ওর পক্ষে। সামলে নেয়ার বিন্দুমাত্র সময় না দিয়ে আবারও মারলো যুবক। বাঁকা হয়ে গেল রবিনের শরীরটা সে আঘাত ঠেকাতে গিয়ে। সাথে সাথেই এলো তৃতীয় আঘাত। মড়াৎ করে মাঝখান থেকে দু’টুকরো হয়ে গেল রবিনের লাঠি, কিন্তু তাতেও আঘাতের গতি কমলো না, দড়াম করে বাড়ি পড়লো রবিনের কাঁধে, ধরাশায়ী হলো সে।

‘থামো!’ যুবককে আবারও লাঠি তুলতে দেখে চেঁচিয়ে উঠলো রবিন। ‘থামো, হার মানছি আমি।’

‘থামো।’ হেঁড়ে গলায় চিৎকার করে উঠলো লিটল জনও। একলাফে বেড়া ডিঙিয়ে লাঠি হাতে ছুটলো সে ওদের দিকে, পিছনে আর্থার। আবার চেঁচিয়ে উঠলো, ‘থামো! থামো বলছি!’

‘না।’ মারমুখো দুইজন ষণ্ডা চেহারার লোক দেখেও বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালো না যুবক। শান্ত গলায় বললো, ‘আরো লোক থাকলে ডেকে আনো তাদেরকে। আমার সাধ্যমত যুঝবো আমি সবার সাথে।’

‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, দুই পাশ থেকে আর্থার আর লিটল জনকে লাঠি তুলতে দেখে চেঁচিয়ে উঠলো রবিন। হাত তুলে এগোতে নিষেধ করলো সঙ্গীদের। আর মারামারি নয়। দেখা যাচ্ছে দিনটা তোমার-আমার কারো জন্যেই ভালো যাচ্ছে না। বাপরে বাপ! হাতের আঙুল থেকে কাঁধ পর্যন্ত অবশ হয়ে গেছে। এত জোরও থাকে মানুষের গায়ে!’

রবিনের দিকে ফিরলো লিটল জন। ‘আহা-হা, খুব ব্যথা লেগেছে বুঝি, ওস্তাদ? সত্যিই বড় দুঃখজনক ব্যাপার। ধুলো-টুলো লেগে জামা-কাপড় এক্কেবারে শেষ। উঠে পড়ো, আমার হাতটা ধরে উঠে পড়ো।’

‘কুণ্ঠ হোক তোর হাতে! রেগে মেগে বললো রবিন। ‘লাগবে না, আমি নিজেই উঠতে পারবো।’

‘বেশ, উঠে দাঁড়াও, তোমার কোটটা অন্ততঃ ঝেড়ে দেয়া উচিত আমার। আহা! এখনও কি ঝনঝন করছে হাড়গোড়গুলো?’ সমবেদনার সুরে বললো লিটল জন, কিন্তু ওর চোখ দুটো চিক চিক করছে দেখে খেপে গেল রবিন।

‘থামবে তুমি, লিটল জন? টিটকারি মারার আর সময় পেলে না?’ কথাটা বলেই হাসি হাসি হলো রবিনের মুখটা। যা ঝাড়ার ঝেড়ে দিয়েছে এই ছোকরা।’ লাল পোশাক পরা যুবকের দিকে ফিরলো এবার সে, ‘তোমার নামটা জানতে পারি?’,

‘আমার নাম গ্যামওয়েল,’ বললো যুবক।

‘তাই নাকি? আরে!’ ভুরু কুঁচকে উঠলো রবিনের। ওই নামের নিকটাত্মীয় আছে আমার। বাড়ি কোথায় তোমার, বলো তো?’

‘ম্যাক্সফিল্ড শহর থেকে আসছি আমি,’ বললো যুবক। ওখানেই জন্ম, ওখানেই মানুষ। এখানে এসেছি আমার মামাকে খুঁজতে।

‘মামা?’

‘হ্যাঁ। আমার মায়ের ছোট ভাই। লোকে তাকে ডাকে রবিন হুড বলে। যদি তোমরা কেউ বলতে পার কোনদিকে গেলে তার দেখা…’

‘আরে! উইল গ্যামওয়েল!’ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে গেল রবিনের দুই চোখ। দুই হাতে চেপে ধরলো যুবকের দুই কাঁধ। ‘তাই তো! সে-ই তো দেখছি! তোমার ওই সুন্দর মেয়েদের মত চুল দেখেই চিনতে পারা উচিত ছিল আমার। তাছাড়া হাঁটার ভঙ্গিটাও মনে পড়ছে এখন। হাসিটাও চিনতে পারছি। ওরে শয়তান! চিনতে পারছিস আমাকে? ভাল করে দ্যাখ তো চেয়ে?’

‘সত্যিই তো!’ এবার অবাক হবার পালা যুবকের। তুমিই তো রবিন মামা!’ এই বলে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো সে মামাকে, চুমো খেলো দুই গালে।

খুশিতে চিকচিক করছে রবিনের চোখ। যুবকের গালে কপালে চুমো খেয়ে বললো, ‘আশ্চর্য! আট-দশ বছর আগে কি দেখেছিলাম, এখন কি!’ যুবকের আপাদমস্তক দেখলো সে চোখ বুলিয়ে। ‘এত বড় হয়ে গেছিস! মনে আছে, কিভাবে তীর-ধনুক ছুঁড়তে হয়, কিভাবে লাঠি ধরতে হয় শিখিয়েছিলাম আমি তোকে?’

‘সব মনে আছে,’ বললো উইল। ‘ছোটবেলা থেকে তোমাকেই দুনিয়ার সেরা বীরপুরুষ বলে জেনে আসছি। সত্যিই, তোমার পরিচয় জানলে তোমার বিরুদ্ধে লাঠি ধরার সাহস হতো না আমার আজ। খুব বেশি ব্যথা লাগেনি তো, মামা?’

‘আরে না, না,’ চট করে আড়চোখে লিটল জনকে দেখে নিয়ে বললো রবিন, ‘কিচ্ছু লাগেনি। ওসব কথা থাক। তবে, প্রার্থনা করি, ওরকম প্রচণ্ড মার ঠেকানোর মন্দ ভাগ্য যেন জীবনে আর না হয়। ওরেব্বাপ, আঙুলের মাথা থেকে কনুই পর্যন্ত কনকন করছে এখনও! আমারই আপন ভাগনের গায়ে এত জোর দেখে গর্ব হচ্ছে এখন, কিন্তু তখন হাত-পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল, ওকের চারা টেনে উপড়ে আনতে দেখে শুকিয়ে গিয়েছিল কলজেটা। যাই হোক, স্যার এডওয়ার্ড আর তোর মাকে ছেড়ে চলে এলি যে?’

‘খুনের অপরাধে খোঁজা হচ্ছে আমাকে, তাই পালিয়ে এসেছি। আমাদের স্টুয়ার্ড গ্রিমকে মনে আছে তোমার?’

‘মনে আছে। খুবই পাজি লোক। ওকে যদি মেরে থাকো, আমার ধারণা ঠিক কাজই করেছো।

‘শোনোই না,’ বললো উইল। ‘আমাদের প্রতিবেশী ব্যারন ডি লেসির অনেকদিন থেকেই চোখ ছিল আমাদের জমি-জমার ওপর। এগুলো দখল করতে পারলে বিরাট এক এস্টেটের মালিক হতে পারবে সে। বাবা বুড়ো হয়ে গেছেন, একমাত্র সন্তান আমি, কাজেই আমাকে খুন করতে পারলে উত্তরাধিকারীর অভাবে আমাদের সবকিছু চলে যাবে তার হাতে। এই ভেবে টাকা পয়সা দিয়ে হাত করে গ্রিমকে লাগিয়েছিল সে আমার পেছনে।‘

গম্ভীর ভাবে মাথা ঝাঁকালো রবিন। ‘তারপর?’

‘একদিন শিকারে গেছি, গ্রিমও সাথে এলো। ওর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন রকম সন্দেহ জাগেনি আমার মনে। একটা ফাঁকা জায়গার কাছাকাছি অপেক্ষা করছি, হরিণ দেখা গেলেই তীর ছুঁড়বো, হঠাৎ কেমন যেন একটা শিরশিরে অনুভূতি হলো। নিজের অজান্তেই পিছন ফিরলাম। দেখি, ধনুকে তীর লাগিয়ে টেনে ছিলাটা কানের পাশে নিয়ে গেছে গ্রিম-তীরের লক্ষ্যস্থল আমি। এক লাফে সরে গিয়ে ওকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করার চেষ্টা করলাম, আর সেই একই সঙ্গে চট্ করে একটা তীর জুড়ে ফেললাম ধনুকে। একই সাথে তীর ছুঁড়লাম দুজন। ওরটা আমার ডাবলেট (এক ধরনের প্রাচীন আঁটো পোশাক) ভেদ করে সামান্য আহত করলো আমাকে, কিন্তু আমারটা সোজা গিয়ে বিধলো ওর বুকে-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মারা গেল গ্রিম। মরার আগে ডি লেসির নীচ চক্রান্তের কথা সব স্বীকার করে গেছে ও।’

‘তারপর?’

‘গ্রিমের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া মাত্র শেরিফকে লেলিয়ে দিল ডি লেসি আমার পেছনে। গ্রেফতারী পরোয়ানা নিয়ে শেরিফের লোক রওনা হয়েছে জানতে পেরে পালিয়ে এসেছি আমি তোমার কাছে।’

‘ভাল করেছো,’ বললো রবিন। ‘কিন্তু ওই কি পালাবার নমুনা? আমরা তো ভেবেছিলাম বেড়াতে বেরিয়েছে কোনো বড়লোকের বখে যাওয়া বিলাসী নন্দন। অমন ধীরেসুস্থে…’

আমার শরীরের অস্বাভাবিক শক্তিই হয়তো এর কারণ,’ বললো উইল। ‘তাড়াতাড়ি নড়তে চড়তে পারি না। এই দেখো না, একটু আগে তিন তিনবার মেরেছো তুমি আমাকে, অথচ আমি একবারও একটা বাড়ি লাগাতে পারিনি তোমার গায়ে, শেষ পর্যন্ত কৌশল বা ক্ষিপ্রতায় না পেরে গায়ের জোরে মারতে মারতে….’

‘থাক, থাক,’ ব্যস্ত কণ্ঠে বললো রবিন। ‘ওসব কথা থাক। তোমাকে পেয়ে খুবই খুশি হয়েছি আমি। দলের সবাই খুশি, হবে তোমাকে দেখে। কিন্তু, আইনের লোক যখন খুঁজছে তোমাকে, তোমার নামটা একটু পরিবর্তন করে নেয়া ভালো। এখন থেকে তোমাকে ডাকবো আমরা উইল স্কারলেট বলে। কেমন?’

‘উইল স্কারলেট,’ এগিয়ে এলো লিটল জন করমর্দনের জন্যে হাত বাড়িয়ে, ‘বাহ্, চমৎকার হয়েছে নামটা। স্কারলেট রঙের পোশাক পরে এসেছো তুমি, তাই তোমার নাম উইল স্কারলেট। আমি লিটল জন। আর এ হচ্ছে তোমারই মত রবিন হুডের নতুন অনুচর, আর্থার এ-ব্ল্যাও। আমি বলে দিচ্ছি, দারুণ নাম করবে তুমি উইল, তোমাকে নিয়ে গাথা রচনা করবে এই অঞ্চলের কবিরা, ঘরে ঘরে বয়ান হবে তোমার কাহিনী, চারণ কবিরা গাইবে গান। সবাই হাসবে, বড়াই করে বীরত্ব দেখাতে গিয়ে কিরকম পিট্টি খেয়েছিল দস্যু রবিন হুড তার আপন ভাগ্নের হাতে, সেই উপাখ্যান শুনে।’

‘এই, না, লক্ষ্মী জন,’ মিনতির সুরে বললো রবিন, এসব নিয়ে কাউকে কিছু বলার কি দরকার? তোমাকে নিয়েও তো হাসবে লোকে। তারচেয়ে আজকের এই সামান্য ঘটনাগুলো আমরা নিজেদের মধ্যে চেপে রাখলেই তো পারি। কি বলো?’

‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই,’ বললো লিটল জন। ‘বারণ করলে কাউকে কিচ্ছুটি বলবো না। আমি ভেবেছিলাম হাসির গল্প বুঝি খুব পছন্দ করো তুমি। এই যেমন খানিক আগে বলছিলে আর্থারের হাতে আমার পিট্টি খাওয়ার গল্পটা দারুণ জমবে, মনে মনে সাজাচ্ছিলে কি রকম ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলবে কাহিনীটা সবাইকে।’

‘না, না। ভুলে যাও। ওসব সামান্য কথা। কাউকে বলবো না আমি, কথা দিচ্ছি।’

‘কাল সন্ধ্যার সেই মেঘের ব্যাপারটা নিয়েও কি কি সব রসিকতা যেন আসছিল তোমার মাথায়, আর…’

‘কিসের রসিকতা?’ ঝাঁঝালো গলায় বললো রবিন। আসলে ভুল হয়েছিল আমারই। এখন স্পষ্ট মনে পড়ছে, মেঘ ছিল আকাশে, ঝড়-তুফানের খুবই আশঙ্কা ছিল কাল।’

এক গাল হাসলো লিটল জন। ‘আমারও তাই মনে হয়েছিল। তার মানে, তুমি স্বীকার করছো ওই ঝড়-তুফানের মধ্যে ভিজে অ্যাংকাস্টারের দিকে না গিয়ে ব্লু-বোরে রাত কাটিয়ে ভালই করেছি, তাই না?’

‘মর তুই, ব্যাটা!’ সরোষে বললো রবিন। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভালই করেছিলে।’

‘ঠিক আছে, ওস্তাদ,’ বললো লিটল জন। ‘আজকে কিচ্ছু দেখিনি আমি। তোমাকে মার খেতে দেখিনি, ডিগবাজী খেয়ে ধুলোয় গড়াগড়ি করতে দেখিনি, আরো পিট্টির ভয়ে কাকুতি-মিনতি করে হার মানতে দেখিনি। যদি কোন দুষ্ট লোক এই ধরনের কোন বানোয়াট মিথ্যা কথা বলে, আমার নাম লিটল জন, টেনে ছিঁড়ে ফেলে দেবো তার জিভ!’

খুক খুক করে হেসে উঠলো সবাই, কিন্তু রবিন গম্ভীর। ‘চলো,’ বললো সে, ‘আর এগোবো না আমরা আজ। অ্যাংকাস্টারে আরেক সময় গেলেই হবে। শেরউডে ফিরবো আমরা এখন।’

এই বলে কারও দিকে না চেয়ে ভ্রু কুঁচকে পা বাড়ালো সে ফিরতি পথে।

৫. মিজ দ্য মিলার

লম্বা পা ফেলে ফিরে চলেছে ওরা শেরউডের দিকে। দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়লো রবিন। পথের মাঝখানে কোথাও খাবার পাওয়া যাবে না জানা কথা, তবু বললো সে, ‘এখন একটা পাউরুটি, বড়সড় এক টুকরো সাদা পনির, আর কয়েক ঢোক হামিং এল হলে কেমন হতো বলতো?’

‘উফ, আর বলো না, মামা, ককিয়ে উঠলো উইল স্কারলেট। মনে হচ্ছে পেটের ভেতর কুস্তি করছে নাড়ীভুঁড়িগুলো। কথা শুনেই জিভে পানি এসে গেছে আমার।’

‘কাছাকাছিই একটা বাড়ি চিনি আমি,’ বললো আর্থার এ ব্ল্যাণ্ড। টাকা দিলে কিনে নিয়ে আসা যায় এসব ওখান থেকে-পাউরুটি; পনির, এল সব।’

‘টাকা তো আছে আমার কাছে,’ বললো লিটল জন, ‘দে নাকি?’

‘ঠিকই তো। তোমার কাছে তো টাকা ছিল,’ বললো রবিন। ‘আমাদের সবার জন্যে খাবার কিনতে কত লাগবে, আর্থার?’

‘আমার মনে হয় ছয় পেনি দিলে যথেষ্ট খাবার পাওয়া যাবে, বারোজন খেয়েও শেষ করা যাবে না,’ বললো আর্থার।

‘ঠিক আছে, ছয় পেনি দিয়ে দাও ওকে, লিটল জন। মনে হচ্ছে তিনজনের খাবার একাই খেতে পারবো আমি। তোমাদেরও নিশ্চয়ই একই অবস্থা? ছয় পেনিই দাও। আমরা রাস্তার পাশে ওই ঝোপের ছায়ায় বসছি, তুমি ছুটে গিয়ে খাবার নিয়ে এসো, আর্থার।’

ছয় পেনি নিয়ে চলে গেল আর্থার। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এলো সে ইয়া বড় এক পাউরুটি আর বড়সড় এক চাকা পনির নিয়ে, কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে এসেছে ছাগলের চামড়ার এক মশক বিয়ার। তলোয়ার দিয়ে সমান চার টুকরো করলো উইল স্কারলেট রুটি আর পনির। কালবিলম্ব না করে খেতে বসে গেল সবাই। গোগ্রাসে গিলছে রুটি আর সুস্বাদু পনির, সেই সাথে হাত বদল হচ্ছে বিয়ার ভর্তি মশকটা যার যত খুশি টেনে চলেছে বিয়ার। খাবারও শেষ, বিয়ারও শেষ। শহুরে ব্যবসায়ীর মত পেট-মোটা মশকের অবস্থা দাঁড়ালো অশীতিপর বৃদ্ধের ঝুলে পড়া শিথিল চামড়ার মত।

‘আহ্!’ তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো রবিন। মনে হচ্ছে জীবনে এত ভাল খাবার খাইনি। যেন নতুন প্রাণ ফিরে এলো ধড়ে। এক্ষুণি যাত্রা করলে নষ্ট হয়ে যাবে আমেজটা। এসো, খানিক বসে যাই। উইল, যতদূর মনে পড়ছে, চমৎকার গলা ছিল তোমার এক কালে। ধরবে নাকি একটা গান?’

‘আমার আপত্তি নেই,’ বললো উইল স্কারলেট, ‘কিন্তু একা গাইবো না আমি।’

‘বেশ তো, সবাই গাইবে তোমার সাথে। নাও, ধরো, শুরু করো।‘

খুক করে একটু কেশে নিয়ে সুন্দর একটা গান ধরলো উইল স্কারলেট।

‘কে আসে রে?’ গানের মধ্যে হঠাৎ বলে উঠলো রবিন। ‘ওই যে, রাস্তা দিয়ে আসছে।’

‘জানি না,’ বিরক্ত কণ্ঠে বললো লিটল জন। যার খুশি আসুক, যাক আমাদের কি? কেউ এলেই একটা ভাল গানের মাঝখানে কথা বলে উঠতে হবে?

‘রাগ করছো কেন, ভাই? অনেকক্ষণ ধরে দেখছি, পিঠে মস্ত একটা বোঝা নিয়ে বাঁকা হয়ে হাঁটছে লোকটা। তাকিয়ে দেখো না একটু, চিনতে পারো কিনা? কে ও?’

রবিনের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো লিটল জন। ‘ওহ্, এই লোক একজন মিলার ময়দা পেষার জাঁতাকলে কাজ করে। প্রায়ই দেখি আমাদের শেরউডের একটা রাস্তা দিয়ে যায়, আসে। খেটে খাওয়া গরীব এক যুবক। ওর জন্যে ভাল একটা গান নষ্ট করার কোন মানে দেখি না।’

‘মনে হচ্ছে লোকটাকে আমি দেখেছি বেশ কয়েকবার,’ বললো রবিন। ‘নটিংহাম শহর ছাড়িয়ে ওই সেলসবারি রোডের একটা মিলে কাজ করে না?’

‘ঠিক ধরেছো। এ সেই লোক।’

‘লোকটা ভাল,’ বললো রবিন। ‘লাঠিও খেলে ভাল। হপ্তাদুয়েক আগে ব্র্যাডফোর্ডের নেডকে খুব পিটিয়েছে। চাঁদি ছিলে দিয়েছে একেবারে। আমি ছিলাম।’

ইতিমধ্যে অনেকটা কাছে এসে পড়েছে তরুণ মিলার, পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ওকে। ময়দা লেগে আছে জামা-কাপড়ে, মস্ত এক বস্তা ভর্তি ময়দা রয়েছে লোকটার পিঠে বোঝার ভারে বাঁকা হয়ে হাঁটছে লোকটা, কিন্তু তাই বলে নিত্য সঙ্গী মোটাসোটা লাঠিটা ত্যাগ করেনি-বস্তার সাথেই বাঁধা আছে সেটা আড়াআড়ি ভাবে। দৃঢ় পদক্ষেপে চলার ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, রীতিমত শক্তিশালী লোক, বোঝার ভারে আরো ফুলে উঠেছে পেশীগুলো, মনে হচ্ছে ছোটখাটো দৈত্য একটা। মুখটা লাল, চুল-দাড়ির রঙ ঠিক শনের মত।

‘খুবই সৎ লোক,’ আবারও বললো রবিন। এরকম একজন নাগরিক যে-কোন দেশের গর্ব।’ হঠাৎ চকচক করে উঠলো রবিনের চোখ দুটো। মৃদু হেসে বললো, এর সাথে খানিক মজা করলে কেমন হয়? চারজন একসাথে ঘিরে ধরবো ওকে, হাঁক-ডাক ছেড়ে ঘাবড়ে দেব, যা আছে সব কেড়ে নেয়ার ভান করবো, তারপর ওকে ধরে নিয়ে যাবো আমাদের আস্তানায়। সেখানে তৃপ্তির সাথে পেট পুরে খাইয়ে ছেড়ে দেব ওর থলেতে যতগুলো পেনি আছে তার বদলে ততগুলো ক্রাউন ভরে দিয়ে। কি বলো তোমরা? কেমন হয়?’

‘খুব মজা হয়, সত্যিই!’ বললো উইল স্কারলেট।

‘মজা তো হয় ঠিকই,’ লিটল জন বললো। ‘কিন্তু খোদা না খাস্তা আজ যদি আরো পিট্টি খেতে হয়, তাহলে নির্ঘাৎ মারা পড়বো। কাজ নেই এসব তামাশায়। আমার সারা শরীরের হাড্ডিগুলো ব্যথায়…’

‘তোমার খালি অলক্ষুণে কথা! ধমক মারলো রবিন। ‘নির্দোষ রসিকতার মধ্যেও তিনি গন্ধ পাচ্ছেন বিপদের! এর মধ্যে মারামারির কথা আসছে কোত্থেকে? মারধোর করতে যাচ্ছে কে? সারাদিনে মারপিট যথেষ্ট হয়েছে, এবার হাসি-তামাশার মধ্যে দিয়ে সুন্দর ভাবে শেষ হোক দিনটা কি বলো তোমরা?’

সবাই মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল, কথা বললো না, কারণ একেবারে কাছে এসে পড়েছে মিলার লোকটা। লিটল জন শুধু বিড় বিড় করে বললো, ‘কি বিপদেই যে ফেলতে যাচ্ছে, আল্লাই মালুম!’

‘চুপ!’ ঠোঁটের উপর আঙুল রাখলো রবিন।

ঝোপের কাছাকাছি এসে পৌঁছলো লোকটা। হঠাৎ হারে-রে-রে-রে করে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলো ওকে ডাকাতের মত চারজন। ‘অ্যাই, দাঁড়াও!’ হুঙ্কার ছাড়লো রবিন হুড।

কাঁধের বোঝা সমেত ধীরে ধীরে ঘুরলো লোকটা, একে একে দেখলো সবাইকে বিস্মিত দৃষ্টিতে। কেমন যেন থতমত খাওয়া চেহারা। বোঝা গেল, গায়ে জোর থাকতে পারে, মগজ ততটা জোরালো নয় লোকটার।

‘কে থামতে বললো আমাকে?’ গুরুগম্ভীর গলা, মস্ত এক কুকুরের চাপা গর্জনের মত শোনালো।

‘আমি বলেছি,’ আর এক পর্দা চড়িয়ে দিল রবিন গলার স্বর।

‘কে তুমি জানতে পারি?’ কাঁধ থেকে ময়দার বস্তাটা ধুপ করে ফেললো সে মাটিতে। ‘তোমার সাথের এরাই বা কারা?’

‘আমরা চারজন ধার্মিক খ্রিস্টান,’ বললো রবিন। এত ভারি বোঝা টানছো দেখে ঠিক করেছি হালকা করে দেব তোমার বোঝা। তোমার হয়ে আমরা চারজন কিছু কিছু করে মোট ভাগ করে নেব।’

‘তোমাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ,’ বললো মিলার। কিন্তু আমার বোঝাটা অতখানি ভারি নয় যে আমি নিজে বইতে পারবো না।’

ঠিক বুঝতে পারনি, ভায়া,’ বললো রবিন। ‘তোমার ওই ময়দার বোঝার কথা বলছি না। বলছি ওই কোমরে গোঁজা থলেটার কথা। মনে হয় ওটা তোমার জন্যে বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে গেছে, আমরা ক’জন ভাগাভাগি করে নিলে হালকা হয়ে যাবে তুমি।’

‘হায়!’ বললো মিলার। কি নেবে তোমরা? একটা ফুটো পয়সাও তো নেই আমার কাছে। আমি গরীব মানুষ, কোথায় পাবো টাকা? দয়া করে যেতে দাও আমাকে। আমাকে মারধোর করে কোন লাভ হবে না তোমাদের। তাছাড়া, তোমাদের মনে রাখা দরকার, রবিন হুডের এলাকায় দাঁড়িয়ে আছো তোমরা।’

‘রবিন হুড! সে আবার কে?’ জানতে চাইলো রবিন কৌতুকের সুরে।

‘গরীবের বন্ধু, অত্যাচারীর যম। যদি জানতে পারে আমার মত একজন দরিদ্র শ্রমিককে হয়রানি করেছো, কান কেটে গাছে ঝুলিয়ে দেবে সে তোমাদের।’

‘তাই নাকি? চেনা-জানা আছে নাকি তার সাথে তোমার?’

‘চিনি না, কিন্তু জানি। আমার নালিশও জানাবার দরকার পড়বে না, বাতাসে ভেসে খবর পৌঁছে যাবে তার কানে। দুনিয়ার কোথাও পালিয়ে বাঁচতে পারবে না তোমরা তার হাত থেকে

‘তাহলে তো খুব ভয়ের কথা!’ কপট ভয়ের অভিনয় করলো রবিন, তারপর চোখ-মুখ কুঁচকে নিষ্ঠুর একটা ভাব ফুটিয়ে তুললো চেহারায়। তুমি ভেবেছো রবিন হুডবে ভয় করি আমি? নিজেকে যতটা কেয়ার করি তার চেয়ে এক কানাকড়িও বেশি কেয়া করি না আমি রবিন হুডকে। ভালোয় ভালোয় বের করে ফেলো পয়সা-কড়ি যা আছে সব।’

বস্তার সাথে বাঁধা লাঠিটার দিকে চাইলো একবার লোকটা। সাথে সাথেই ধমব মারলো রবিন, ‘খবরদার! ওদিকে এক ইঞ্চি হাত বাড়ালেই এক বাড়িতে কান ফাটিয়ে দেব!’

‘না, না…মেরো না আমাকে!’ দু’হাত তুলে কান ঢাকলো মিলার। ‘কিন্তু পয়সা পাব কোথায়? ইচ্ছে হয় তালাশ করে দেখো, একটা পয়সাও নেই আমার ‘পকেটে।’

‘বিশ্বাস করি না,’ হুঙ্কার ছাড়লো রবিন। ‘একটা পয়সাও নেই, তা হতেই পারে না। কোনো সন্দেহ নেই, বস্তার মধ্যে হাত দিলেই বেরিয়ে পড়বে আসল সত্য। আর্থার, ঢালো তো। বস্তায় যা আছে সব ঢেলে ফেলো মাটিতে। আমার বিশ্বাস ময়দার মধ্যে কমপক্ষে দুটো শিলিং পাওয়া যাবে।’

‘হায় রে!’ হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো মিলার বস্তার পাশে। ‘খাবার জন্যে নিয়ে যাচ্ছি ময়দাগুলো, সব নষ্ট হবে, সর্বনাশ হয়ে যাবে আমার। ঠিক আছে, মাটিতে ঢালার দরকার নেই, আমি নিজেই বের করে দিচ্ছি ময়দার নিচে লুকানো টাকা।’

‘এই দেখো!’ কনুই দিয়ে গুঁতো মারলো রবিন স্কারলেটকে। ‘বলেছিলাম না, এই ব্যাটার কাছে অনেক টাকা আছে। টাকার গন্ধ পাই আমি, যেখানেই লুকানো থাক না কেন, ঠিক বের করে দেব চিনে, হ্যাঁ! কি হলো, নিজেই বের করবে, নাকি ঢালবো সব মাটিতে?’

ধীরে ধীরে বস্তার মুখের বাঁধন খুলছে মিলার, যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও, ধীরে ধীরে কনুই পর্যন্ত দুই হাত ঢুকিয়ে দিল ময়দার ভেতর, খুঁজছে কি যেন। ঝুঁকে এলো সবাই কি বের হয় দেখার জন্যে। বস্তার ভেতর হাতড়াচ্ছে মিলার, হঠাৎ বললো, ‘এই যে, পেয়েছি থলিটা।’

কথা শুনে আরো ঝুঁকে এলো সবক’টা মাথা। হাত বের করে আনছে মিলার। হঠাৎ, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, দুই মুঠো ময়দা ছুঁড়ে দিল সে ওদের চোখেমুখে। নাক দিয়ে ময়দা ঢুকে দম বন্ধ হওয়ার দশা হলো সবার, কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না চোখে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হলো আর্থার এ ব্ল্যাণ্ডের। হাঁ হয়ে গিয়েছিল ওর মুখটা, শুকনো খসখসে ময়দা ঢুকে গেছে গলায়, অদম্য কাশিতে বাঁকা হয়ে গেল সে।

হাউমাউ করে উঠলো বাকি তিনজন। দুই হাতে চোখ ডলছে, দূরদর করে পানি নামছে গাল বেয়ে-কিন্তু রেহাই নেই, মুঠো মুঠো ময়দা তুলছে আর ছুঁড়ে দিচ্ছে মিলার ওদের চোখ-মুখ-নাক লক্ষ্য করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নটিংহামশায়ারের অন্ধ ভিখারীর মত অবস্থা হলো সবার, চুল দাড়ি জামা-কাপড় সাদা হয়ে গেছে ময়দা লেগে।

এবার মোটা লাঠিটা তুলে নিয়ে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেল মিলার। কোন বাছ-বিচার না করে দমাদম পিটিয়ে চললো সে সমানে। মার খেয়ে তারস্বরে চিৎকার করছে সবাই, কিন্তু না পাচ্ছে কিছু দেখতে, না পারছে আত্মরক্ষা করতে, না পালাতে। এদিক ওদিক এলোপাতাড়ি পা ফেলে গা বাঁচাবার চেষ্টা করছে সবাই, পড়ে যাচ্ছে, উঠে দাঁড়াচ্ছে, কেউ আবার ছুটে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে গাছের সাথে।

ধুপ! ধাপ! চড়াৎ! খট!-মনের সুখে মেরে চলেছে মিলার পাইকারি হারে। প্রতিটা বাড়ির সাথে সাথে ময়দার মেঘ উঠছে ওদের জামা-কাপড় থেকে।

‘থামো! থামো!’ আর সহ্য করতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠলো রবিন, ‘মার থামাও, আমি রবিন হুড’।’

‘তাই নাকি?’ হেসে উঠলো মিলার। ‘মিছে কথার আর জায়গা পেলে না?’ এই বলে পর পর কয়েকটা বাড়ি মেরে ধোঁয়া ছুটিয়ে দিল সে রবিনের জামা-কাপড় থেকে। ‘গরীব মানুষের টাকা কেড়ে নেবে মহান রবিন হুড? কী মনে করেছো তুমি তাকে? তোমাদের মত ছ্যাঁচড়া চোর? পিটিয়ে খুন করে ফেলব আজ!’ বলেই কষে আরেক বাড়ি লাগালো সে তার পিঠে। তারপর ফিরলো লিটল জনের দিকে, আরে! তোমার ভাগে তো কম পড়ে যাচ্ছে, ধেড়ে শয়তান! আমার কাছ থেকে যা পাওয়া যাবে, সমান ভাগে ভাগ করে নেয়া উচিত তোমাদের সবার।’ এই বলে লিটল জনের কাঁধের ওপর এমন এক বাড়ি লাগিয়ে দিল যে টলমল করে কয়েক পা গিয়েই উইল স্কারলেটের পায়ে পা বেধে হুড়মুড় করে পড়লো সে রাস্তার উপর। আর তুমি? এবার তোমার পালা না কালো-দাড়ি?’ বলেই খটাশ করে মারলো আর্থার এ ব্ল্যাণ্ডের চাঁদির ওপর। কাশতে কাশতেই হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠলো আর্থার। ‘এবার লাল মিঞা। কাপড়টা তো সাদা হয়ে গেছে একেবারে। এসো, এসো, ঝেড়ে দিই ময়দাগুলো।’ চড়াৎ চড়াৎ শব্দে ধুলো ঝাড়ছে সে উইল স্কারলেটের জামা থেকে।

এইভাবে মজার মজার মন্তব্য করছে আর একনাগাড়ে মেরে চলছে মিলার, হেসে খুন হয়ে যাচ্ছে ওদের দুরবস্থা দেখে। যখনই মনে হয় চোখের দৃষ্টি ফিরে পাচ্ছে ওদের কেউ, আরও একমুঠ ময়দা ছিটিয়ে দেয় সে। মারতে মারতে একেবারে কাহিল করে ফেললো সে চার-চারজন তাগড়া জোয়ানকে। টলছে সবাই, দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই।

নির্ঘাৎ মারা পড়বার উপক্রম হয়েছে দেখে শেষ পর্যন্ত শেষ চেষ্টা হিসেবে শিঙাটা তুললো রবিন মুখে। জোরে ফুঁ দিল তিনটে। সম্ভাবনা কম, তবু বলা যায় না, কাছে পিঠে থাকতেও পারে দলের লোকজন।

এদিকে যখন এই পাইকারী পিট্টি চলছে, কাছাকাছিই একটা বুনো পথ ধরে যাচ্ছিল উইল স্টিউটলি এবং রবিন হুডের আরো কয়েকজন অনুচর। কয়েকজনের তারস্বরে চিৎকার আর চড়াৎ চড়াৎ লাঠির আওয়াজ কানে যেতেই থেমে দাঁড়ালো ওরা, কান পেতে শোনার চেষ্টা করছে, বোঝার চেষ্টা করছে ঘটনাটা কি।

‘মনে হচ্ছে, লাঠি খেলা চলছে কাছেই কোথাও। চলো, দেখা যাক মজাটা,’ বললো উইল স্টিউটলি। কিন্তু কয়েক কদম এগিয়েই পরিষ্কার শুনতে পেল সে রবিনের শিঙার সংকেত। মুহূর্তে সম্পূর্ণ বদলে গেল ওর চাল চলন। ‘জলদি! কাছেই কোথাও বিপদে পড়েছে রবিন!’

প্রাণপণে ছুটলো ওরা আওয়াজ লক্ষ্য করে। সবার আগে উইল স্টিউটলি আর ডংকাস্টারের ডেভিড। দৌড়ে এসে রাস্তায় পড়েই থমকে দাঁড়ালো ওরা। যা দেখলো, তাতে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল ওদের। রাস্তার একটা অংশ সাদা হয়ে গেছে ময়দা পড়ে। চারজন ময়দা মাখা ভূতকে বেদম পিটাচ্ছে একজন লাঠি দিয়ে। রবিন হুডকে চিনতে পেরে ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো ওরা তার পাশে। ‘কি হয়েছে! এসবের কি অর্থ?’ জানতে চাইলো উইল স্টিউটলি।

চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু উইল স্টিউটলির গলা চিনতে পেরে চিৎকার করে উঠলো রবিন, ‘অর্থ পরে বুঝো! পিটিয়ে মেরে ফেললো! আগে জলদি ঠেকাও মিলার ব্যাটাকে!’

কিন্তু কাকে ঠেকাবে, অবস্থা বেগতিক দেখে আলগোছে সটকে পড়েছে মিলার। চারজনকে পাঠিয়ে দিল উইল স্টিউটলি মিলারকে ধরে আনার জন্যে, বাকি সবাই লেগে গেল ওদের জামা-কাপড় থেকে ঝেড়ে মুছে ময়দা সাফ করার কাজে। চোখ কচলাতে কচলাতে সব খুলে বললো রবিন ওদের কিভাবে মিলারকে নিয়ে হালকা রসিকতা করতে গিয়ে ভয়ঙ্কর মোড় নিয়েছিল ঘটনাটা।

হাসি চেপে রাখা মুশকিল হলো উইলের পক্ষে, বাকি সবারও একই অবস্থা। নিজেকে সামলে নেয়ার জন্যে ধমক মারলো সে বাকি চারজন অনুচরকে, ‘হাঁ করে কি গল্প শুনছো তোমরা? যাও না, ধরে নিয়ে এসো পাজি বদমাশটাকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পিছমোড়া করে হাত বেঁধে নিয়ে আসা হলো কম্পমান মিলারকে রবিনের সামনে।

‘এখন?’ কটমট করে ওর দিকে চেয়ে ভুরু নাচালো রবিন। ‘পিটিয়েই খুন করে ফেলবে আজ, তাই না? তোমাকে আমি… দাঁত কিড়মিড় করে এইটুকু বলেই থেমে গেল রবিন। চোখের দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে ভস্ম করে দেবে মিলারকে।

কিন্তু রবিনের রাগ বেশিক্ষণ থাকে না, প্রথমে চোখ দুটো চকচক করে উঠলো, তারপর খুক খুক করে হেসে ফেললো সে।

রবিনকে হাসতে দেখে আর সামলে রাখতে পারলো না কেউ নিজেকে, হো হো প্রচণ্ড হাসিতে ফেটে পড়লো সবাই। দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না অনেকে, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো মাটিতে। হাসির ঠেলায় পেটে খিল ধরে যাবার অবস্থা।

‘কি নাম তোমার, ভাই?’ হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো রবিন মিলারকে।

‘মিজ দ্য মিলার, স্যার,’ ভয়ে ভয়ে বললো মিলার।

‘শাব্বাশ!’ ওর পিঠে চাপড় দিল রবিন। নিজ হাতে খুলে দিল ওর বাঁধন। ‘খুব দেখিয়েছো, বাপু। আর একটু হলেই প্রাণটা গেছিল আজ তোমার হাতে। তোমার মত সাহসী লোক পেলে নেব আমি দলে। আসবে তুমি আমাদের সাথে?’

‘আপনি যদি আমার অপরাধ ক্ষমা করেন, হুজুর, না জেনে যা ভুল করেছি মাফ করে দেন; খুশি হয়েই আপনার দলে যোগ দেব আমি। আপনার ঠাট্টা আমি একদম বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলে এভাবে…’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে,’ থামিয়ে দিল ওকে রবিন। ‘এমন কিছুই লাগেনি আমার…ওরে বাবারে! যাই হোক, কপালে যা ছিল ঘটেছে, তিন-তিনজন যোগ্য লোক তো পাওয়া গেছে, কি বলো, লিটল জন? চলো রওনা হওয়া যাক। নতুনদের সম্মানে বিরাট ভোজের আয়োজন হবে আজ আমাদের আস্তানায়।’ এই বলে সবার আগে আগে হাঁটতে শুরু করলো রবিন হুড। কিছুদূর এগিয়েই জঙ্গলে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল গোটা দলটা।

একই দিনে তিন-তিনটে রোমাঞ্চকর ঘটনার পরিসমাপ্তি হলো এইভাবে। খাওয়া দাওয়ার পর অনেক রাত পর্যন্ত নাচ-গান, হাসি-তামাশা চললো সেদিন। তারপর যার যার বিছানা পেতে শুয়ে পড়লো সবাই। নিঝুম নীরবতা নামলো শেরউড জঙ্গলে।

বেশ কিছুদিন চেপে রেখেছিল লিটল জন সেদিনের সব কথা। কিন্তু বেশি দিন পারলো না। সবাই জানে, ওর পেটে কথা থাকে না। এক ইঞ্চি দুই ইঞ্চি করে বেরিয়ে পড়লো সব কথা-কিভাবে আর্থারের হাতে মার খেয়েছিল সে, কিভাবে স্কারলেটের হাতে রবিন। আর তাই নিয়ে রচনা হয়ে গেল লম্বা চওড়া গাথা। চারণ কবির মুখে সে-গান শুনে হেসে খুন হয়ে গেল সবাই, এবং আরো অনেক, অনেক বেশি করে ভালবেসে ফেললো রবিন হুডকে।

৬. নটিংহামের শূটিং ম্যাচ

রেগে আগুন হয়ে গেছেন নটিংহামের শেরিফ।

পর পর কয়েকবার সশস্ত্র বাহিনী পাঠিয়েছেন তিনি শেরউডে রবিন হুডকে ধরে আনার জন্যে। ধরে আনা তো দূরের কথা, রবিন হুড ও তার দলবলের কাছে প্রতিবারই চরম নাজেহাল হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তাদের। প্রথম বার পালিয়ে গিয়েছিল ওরা শেরউড ছেড়ে, কিন্ত এখন এতই শক্তিশালী ও সুশৃংখল দল গঠন করে নিয়েছে রবিন যে ওদের আস্তানার ধারে-কাছেও ভিড়তে পারেনি শেরিফের বাহিনী। বিচিত্র সব কৌশলে প্রতিহত করে দেয়া হয়েছে ওদের সমস্ত প্রচেষ্টা। অনেক টাকা পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে গুপ্তঘাতক পাঠিয়েছেন শেরিফ শেরউডে, হয় ধরে আনবে, নয়তো মেরে রেখে আসবে রবিনকে; কিন্তু নিজেরাই গায়েব হয়ে গেছে তারা। রাজার সীলমোহর দেয়া গ্রেফতারী পরোয়ানা হাতে পাঠিয়েছিলেন একজন টিংকার (ঝালাইকার)-কে। সেই লোক ফিরে তো আসেইনি, শোনা যাচ্ছে রবিন হুডের দলে যোগ দিয়েছে সে শেরউডে গিয়ে।

এইসব বিফল প্রচেষ্টার ফলে শুধু যে তিনি জনসাধারণের সম্মান হারিয়েছেন তা নয়, লোকে হাসাহাসি কানাকানি করছে তাঁকে নিয়ে, টিটকারির পাত্র হয়ে উঠেছেন তিনি সবার কাছে। শেরিফের গাত্রদাহের এটাই প্রধান কারণ। হাসি তামাশার খোরাক হতে কে-ই বা পছন্দ করে?

লোক-লস্কর নিয়ে রওনা হলেন তিনি রাজার কাছে নালিশ জানাতে। কিন্তু হিতে বিপরীত হলো তাতে। রাজা হেনরী তাঁর বক্তব্য শুনে উল্টে ধমক মারলেন তাঁকেই।

‘লজ্জা করে না তোমার এই সামান্য ব্যাপারে আমার কাছে নালিশ নিয়ে আসতে? তোমাকে রাখা হয়েছে কি করতে? সাধারণ এক ডাকাত ধরতে পারো না, ছুটে এসেছো আমার কাছে নালিশ জানাতে ছি, ছি, তোমার যোগ্যতা সম্পর্কেই সন্দেহ হচ্ছে এখন আমার। তোমার অধীনে যে বিরাট বাহিনী রয়েছে, তারা কি করছে-বসে বসে সরকারী বেতন নিচ্ছে, আর ঘাস কাটছে? যাও, তোমার কোন কথা আর শুনতে চাই না আমি, যেভাবে পারো গ্রেফতার করো ওকে; তা না পারলে নিজেই বরখাস্ত হয়ে যাবে তুমি অযোগ্যতার দায়ে।‘

বকা খেয়ে বিমর্ষ বদনে ফিরে চললেন শেরিফ নিজের কাউন্টির দিকে। রাজার কাছে নালিশ করতে গিয়ে ভাল বিপদেই পড়া গেছে। নিজের চাকরি নিয়েই টানাটানি এখন। ফেরার পথে কারো সাথে একটি কথা বললেন না তিনি। মাথা নিচু করে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইলেন। বেশ অনেকটা পথ আসার পর হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো তাঁর মুখ। ‘পেয়েছি!’ উরুর উপর জোরে এক চাপড় মারলেন তিনি। ‘জলদি চলো! দারুণ এক বুদ্ধি এসেছে মাথায়। দুই সপ্তাহের মধ্যে যদি শয়তান রবিন হুডকে হাজতে না পুরতে পারি, তাহলে আমার নাম নেই।’

কি পেলেন শেরিফ যে এতো খুশি হয়ে উঠলেন?

চলতে চলতে একের পর এক নানান ধরনের ফন্দিফিকির আসছিল তাঁর মাথায়। কিন্তু পছন্দ হচ্ছিল না, কোনটাই। কোন না কোন ত্রুটি থেকে যাচ্ছে প্রতিটি পরিকল্পনায়। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়লো তাঁর। তিনি খবর পেয়েছেন, প্রায়ই নটিংহাম শহরে আসে দুঃসাহসী রবিন হুড। যদি কোনভাবে ওকে আবার শহরের চার দেয়ালের মধ্যে আনার ব্যবস্থা করা যায়, সতর্ক থাকলে মোটেই কঠিন হবে না ধরা। কিভাবে আনা যায় ওকে? চট্ করে মনে পড়লো শূটিং প্রতিযোগিতার কথা। শেরউডের দস্যুরা নিজেদের মস্ত তীরন্দাজ বলে মনে করে। যদি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে একটা দারুণ লোভনীয় পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা যায়, তাহলে ঠিক ফাঁদে এসে ধরা দেবে দুঃসাহসী রবিন হুড। ঠিক, একটা বড়সড় শূটিং ম্যাচের আয়োজন করতে হবে নটিংহামে ফিরেই।

শহরে ফিরেই উত্তর-দক্ষিণ-পুব-পশ্চিমে লোক পাঠালেন শেরিফ, ঘোষণায় বলা হলো বিরাট এক শূটিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে নটিংহাম শহরে, বিজয়ীকে পুরস্কার দেয়া হবে একটা সোনার তীর আর একটা পেনি ভর্তি রূপোর শিঙা।

লিংকন শহরে কাজে গিয়েছিল রবিন, সেখানেই সংবাদ পেল সে প্রতিযোগিতার। খবর শুনে দ্রুত ফিরে এলো সে শেরউড জঙ্গলে। সবাইকে ডেকে জানালো খবরটা। তারপর বললো, ‘সারা দেশের যত বড় বড় তীরন্দাজ আছে, সবাই আসবে এই প্রতিযোগিতায়। আমাদের হাতের টিপ যাচাই করে নেয়ার এই এক মস্ত সুযোগ। আমি ঠিক করেছি এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেব। তোমরা কি বলো??

লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো দলের কনিষ্ঠতম সদস্য ডংকাস্টারের ডেভিড। ‘আগে আমার বক্তব্য শুনে নাও, তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো,’ বললো সে সবার উদ্দেশে। ‘এইমাত্র ব্লু বোর থেকে সংবাদ শুনে এলাম আমি। কেবল শূটিং ম্যাচের সংবাদই নয়, ঈডমের কাছ থেকে আরো কিছু জানতে পেরেছি আমি। ও জেনেছে শেরিফের খুবই ঘনিষ্ঠ এক লোক র‍্যালফের কাছ থেকে। শেরিফের ধারণা, এই বিরাট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের লোভ সামলাতে পারবে না রবিন হুড। গোটা আয়োজনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে রবিন হুডকে নটিংহামের প্রাচীরের ভেতর আকর্ষণ করে নিয়ে গ্রেফতার করা। আমরা আমাদের প্রিয় নেতাকে হারাতে চাই না। কাজেই আমি মনে করি এতে অংশগ্রহণ করতে যাওয়া মোটেই উচিত হবে না।’

কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকে মাথা ঝাঁকালো রবিন, তারপর হাসি ফুটে উঠলো ওর মুখে। পিঠ চাপড়ে দিল ডেভিডের। মুখে বললো, ‘ধন্যবাদ, ডেভিড। চোখ-কান খোলা রাখা বুদ্ধিমানের কাজ, এটা আমাদের অস্তিত্বের জন্যেও জরুরী। তুমি যে খবর এনেছো তা যদি সত্যি হয় এবং আমার বিশ্বাস কথাটা পুরোপুরি সত্যি, তবুও আমি মনে করি আমার এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা একান্ত দরকার। লোকে বলবে, শেরিফের ভয়ে রবিন হুড আর তার সাত কুড়ি দুঃসাহসী অনুচর প্রতিযোগিতা বর্জন করে গর্তে সেঁধিয়েছিল, সাহসে কুলায়নি তাদের নটিংহামে আসতে-সেটা কেমন লাগবে তোমাদের শুনতে? ডেভিডের কথা শুনে আরও জেদ চেপে যাচ্ছে আমারঃ যেমন করে হোক ছিনিয়ে নিয়ে আসতে হবে ওই পুরস্কার। কিন্তু বোকার মত কিছু করে বসা ঠিক হবে না। কৌশল দিয়ে মোকাবিলা করবো আমরা কৌশলের। ছদ্মবেশ নিয়ে যাব আমি। তোমরাও, কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক, কেউ পুরোহিত, কেউ ভিখারীর ছদ্মবেশে কাছে পিঠেই থাকবে আমার। সবাই সাথে করে লুকিয়ে নিয়ে যাবে তলোয়ার, তীর- ধনুক। যদি প্রয়োজন পড়ে, যুদ্ধ করে আত্মরক্ষা করবো আমরা। আর যদি তার প্রয়োজন না পড়ে; তাহলে জিতে নিয়ে আসবো সোনার তীর আর রূপোর বিউগল। তীরটা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখব আমরা এই গাছের ডালে। তোমরা সবাই কি বলো?’

সবাই একবাক্যে সায় দিল রবিনের কথায়।

প্রতিযোগিতার দিন উৎসবের সাজে সাজানো হলো নটিংহাম শহর। প্রাচীরের কাছাকাছিই একটা মস্ত সবুজ মাঠে আয়োজন করা হয়েছে প্রতিযোগিতার। প্রাচীরের ধারে সারি সারি বেঞ্চ পাতা হয়েছে নাইট, জমিদার এবং শহরের সম্ভ্রান্ত ধনী লোক ও তাদের স্ত্রীদের বসার জন্যে। টার্গেটের কাছাকাছিই একটা মঞ্চ সাজানো হয়েছে রঙিন সিল্কের রিবন আর ফুলের মালা দিয়ে-শেরিফ আর তাঁর স্ত্রী বসবেন এখানে। প্রায় দেড়শো গজ দূরে মস্ত এক ডোরা কাটা তাঁবু ফেলা হয়েছে প্রতিযোগীদের জন্যে। তাঁবুর একটা খুঁটিতে টাঙানো হয়েছে নানান রঙের পতাকা। হরেক রকম নক্সা করা রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হয়েছে তাঁবু। তাঁবুর ভেতর রাখা হয়েছে মস্ত এক মদের পিপে, প্রতিযোগীদের যার যত খুশি পান করবে বিনা মূল্যে।

সম্ভ্রান্ত অতিথিবৃন্দের জন্যে যেখানে বেঞ্চ পাতা হয়েছে তার উল্টো দিকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে সাধারণ গরীব দর্শকদের জন্যে জায়গা। বসার কোন ব্যবস্থা নেই, শুধু রেলিং দেয়া হয়েছে যাতে আগ্রহের আতিশয্যে মাঠের ভেতর ঢুকে পড়তে না পারে কেউ। প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই আসতে শুরু করলো দর্শকবৃন্দ। কেউ ঘোড়ায় চেপে, কেউ গাড়িতে চড়ে আসছেন ভদ্রলোকেরা। দলে দলে পায়ে হেঁটে আসছে সাধারণ দর্শকেরা, রেলিঙের ওপারে বসে পড়ছে, শুয়েও পড়ছে কেউ কেউ।

একজন দু’জন করে মস্ত তাঁবুতে এসে জড়ো হচ্ছে প্রতিযোগীরা। কেউ কেউ উঁচু গলায় নিজেদের বাহাদুরির গল্প শোনাচ্ছে অন্যদের, কেউ ছিলা টেনে টেনে পরীক্ষা করে দেখছে ধনুকে কোনও দোষ পাওয়া যায় কিনা, কেউ আবার এক চোখ বুজে আরেক চোখের সামনে তুলে ধরে পরীক্ষা করে দেখছে তীরগুলো

দেশের নানান জায়গা থেকে এসেছে মস্ত সব নামজাদা তীরন্দাজ। লোভনীয় পুরস্কার ডেকে এনেছে তাদের অনেক দূর দূরান্ত থেকে। শেরিফের রক্ষী-বাহিনীর সেরা তীরন্দাজ রেড ক্যাপের গিল তো আছেই, লিংকন শহর থেকে এসেছে ক্রুইকশ্যাংক, ট্যামওয়ার্থ থেকে এসেছে প্রবীণ অ্যাডাম-উডস্টকের সেই বিখ্যাত প্রতিযোগিতায় সেকালের সেরা ধনুর্বিদ ক্রিমকে হারিয়ে যে বিজয়ীর শিরোপা কেড়ে নিয়েছিল, এছাড়াও রয়েছে লেসলির উইলিয়াম এবং আরো অনেকে।

পদমর্যাদা অনুযায়ী সবাই যে যার জায়গায় বসে যাওয়ার পর দুধ-সাদা ঘোড়ায় চেপে এলেন শেরিফ, পাশে আরেকটা ঘোড়ায় তাঁর স্ত্রী। বেগুনী সিল্কের পোশাক পরেছেন শেরিফ, মাথায় বেগুনী মখমলের টুপি, পায়ে কালো মখমলের জুতো। শেরিফের স্ত্রী পরেছেন রাজহাঁসের পালক দিয়ে কারুকাজ করা নীল মখমলের পোশাক, আর মহামূল্যবান সোনার অলংকার। নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসলেন তাঁরা, শোভা বর্ধনের জন্যে দু’পাশে দাঁড়িয়ে গেল বর্শা হাতে উর্দি পরা প্রহরী।

নিজ আসনে বসে রাজকীয় ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক চাইলেন শেরিফ, তারপর ইঙ্গিত করলেন ঘোষকের প্রতি। ইঙ্গিত পেয়েই রূপোর শিঙা মুখে তুলে নিয়ে পরপর তিনবার ফুঁ দিল ঘোষক। সংকেত পেয়ে তাঁবু ছেড়ে লাইনের উপর এসে দাঁড়ালো সব তীরন্দাজ। সোল্লাসে চিৎকার করে উঠলো জনতা। যার যার প্রিয় তীরন্দাজের নাম ধরে হাঁক ছাড়ছে অনেকে।

হাত তুলে সবাইকে চুপ করার নির্দেশ দিল ঘোষক। সবাই চুপ করতেই শুরু করলো প্রতিযোগিতার নিয়ম বর্ণনা। একটা করে তীর ছুঁড়বে তোমরা সবাই দেড়শো গজ দূরের এই টার্গেট লক্ষ্য করে। তোমাদের মধ্যে থেকে সেরা দশজনকে বাছাই করে বের করে নিয়ে তাদের প্রত্যেককে দুটো করে তীর ছুঁড়তে বলা হবে। এরপর এই দশজনের মধ্যে থেকে বেছে বের করা হবে সেরা তিনজনকে। তিনটে করে তীর ছুঁড়বে এই শেষের তিনজন। এদের মধ্যে যে সর্বশ্রেষ্ঠ, তাকেই দেয়া হবে পুরস্কার।’

খানিকটা সামনে ঝুঁকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রতিযোগীদের মধ্যে রবিন হুডকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন শেরিফ। সবার উপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে একটু যেন দমে গেলেন তিনি। কই, সবুজ কাপড় পরা কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না। মনে মনে ভাবলেন, ‘এত ভিড়ে চেনা যাবেও না। যদি এসে থাকে, দশজনের একজন সে হবেই; তখন ওকে চিনে নেয়া মোটেই কঠিন হবে না।’

শুরু হলো প্রতিযোগিতা। সবাই ছুঁড়লো একটা করে তীর। এতজনের মধ্যে কেবল ছয়টা তীর লাগলো গিয়ে টার্গেটে তার মধ্যে চারটে বিধেছে কালো জায়গায়, বাকি দুটো মাঝখানের গোল চক্কোরের ধার ঘেঁষে। কাজেই শেষ তীরটা যখন একেবারে মাঝখানে গিয়ে বিধলো, তখন বিপুল হর্ষধ্বনি উঠলো দর্শকদের মধ্যে থেকে।

দশজন রইলো, ছাঁটাই হয়ে গেল বাকি সবাই। এই দশজনের মধ্যে ছয়জন সারা ইংল্যাণ্ডে সুপরিচিত, বেশির ভাগ দর্শকই চেনে তাদের। এরা হচ্ছে, রেড ক্যাপের গিলবার্ট, ট্যামওয়ার্থের অ্যাডাম, ডিকন ক্রুইকশ্যাংক, লেসলির উইলিয়াম, ক্লাউডের হিউবার্ট, এবং হার্টফোর্ডের সুইদিন। এরা ছাড়াও দু’জন আছে ইয়র্কশায়ার থেকে আসা তীরন্দাজ, এছাড়া আছে লম্বা এক নীল পোশাক পরা তীরন্দাজ, এসেছে খোদ লণ্ডন শহর থেকে। কিন্তু সব শেষে যে লোকটা একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে লাগিয়েছিল তীর, কেউ চেনে না তাকে, পরনে জীর্ণ মলিন একটা শতচ্ছিন্ন লাল জামা, একটা চোখ কালো কাপড় দিয়ে বাঁধা কানা।

কাছেই বর্শা হাতে দাঁড়ানো এক লোককে ডাকলেন শেরিফ হাতের ইশারায়। লোকটা ঝুঁকে আসতেই কানে কানে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দেখতে পাচ্ছো? এই দশজনের মধ্যে চিনতে পারছো শয়তান রবিন হুডকে?’

‘না, হুজুর,’ বললো লোকটা। এদের মধ্যে ছয়জনকে ভাল করেই চিনি আমি। আর ইয়র্কশায়ার থেকে যে দু’জন এসেছে তাদের একজন রবিন হুডের চেয়ে বেশ অনেকটা লম্বা, অপরজন বেশ অনেকটা খাটো। কাজেই ওদেরকেও বাদ দেয়া যায়। আর ওই যে ছেঁড়া লাল জামা পরা ভিখারিটা ওকেও বাদ দিতে পারেন অনায়াসে, কারণ রবিনের দাড়ির রঙ সোনালী, কিন্তু এর দাড়ি দেখা যাচ্ছে খয়েরি রঙের, তাছাড়া দেখাই যাচ্ছে লোকটার একটা চোখ কানা। বাকি রইলো নীল পোশাক পরা লোকটা আমার ধারণা এর কাঁধের চেয়ে অন্ততঃ তিন ইঞ্চি বেশি চওড়া রবিনের কাঁধ।’

‘তাহলে সত্যিই এলো না শয়তানটা!’ ভুরু কুঁচকে উঠলো শেরিফের। ‘ওকে সাহসী বলেই জানতাম, কিন্তু আজ বোঝা গেল কতটা ভীরু আর কাপুরুষ! গলার স্বর শুনে বোঝা গেল খুবই হতাশ হয়েছেন শেরিফ। মনে মনে খুবই আশা করেছিলেন তিনি যে এত বড় একটা প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের লোভ সংবরণ করতে পারবে না রবিন হুড।

কিছুক্ষণ বিরতির পর বাছাই করা দশজন তীরন্দাজ আবার এসে দাঁড়ালো দাগের ওপর। দুটো করে তীর ছুঁড়লো প্রত্যেকে। অখণ্ড মেথমে নীরবতা বিরাজ করছে সারা ময়দানে। শ্বাস ফেলতেও যেন ভুলে গেছে সবাই। কিন্তু শেষের সেই ভিখারীটা তীর ছুঁড়তেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো সবাই একসাথে, শূন্যে ছুঁড়ে দিল মাথার টুপি।

আশ্চর্য! আশ্চর্য! সত্যিই আশ্চর্য!’ চেঁচিয়ে উঠলেন অশীতিপর বৃদ্ধ স্যার অ্যামিয়াস। শেরিফের কাছাকাছিই একটা আসনে বসে ছিলেন তিনি। ‘এমন শূটিং জীবনে দেখিনি আমি। গত ষাট বছর ধরে কত হাজার হাজার প্রতিযোগিতা যে দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই। এমন ধনুর্বিদ চোখে পড়েনি আর আমার।’

শেষ-মেষ টিকলো তিনজন : রেড ক্যাপের গিল, কানা ভিখারী, আর ট্যাম ওয়ার্থ শহরের অ্যাডাম।

‘এইবার, গিলবার্ট,’ চেঁচিয়ে বললেন শেরিফ। মান রাখা চাই। যদি জিততে পারো, পুরস্কার তো পাবেই, আরো একশোটা সিলভার পেনি দেব আমি তোমাকে নিজের পকেট থেকে।

‘চেষ্টার ত্রুটি করবো না, হুজুর,’ উত্তর দিল গিলবার্ট।

ভাল দেখে একটা তীর বেছে নিয়ে সতর্কতার সাথে ছুঁড়লো গিলবার্ট। সোজা উড়ে গিয়ে কেন্দ্রবিন্দুর এক আঙুল ডাইনে লাগলো তীরটা। গিলবার্ট গিলবার্ট!’ চিৎকার উঠলো দর্শকদের মধ্যে থেকে। হাততালি দিয়ে উঠলেন শেরিফ, ‘বাহ, চমৎকার।’

এবার ধনুকে তীর যোজনা করলো ছেঁড়া পোশাক পরা ভিখারী। তীর ছোড়ার পূর্ব মুহূর্তে কনুই উঁচু করতেই তার বগল তলায় মস্ত এক হলুদ তালি দেখতে পেল দর্শকরা। হাসির রোল উঠলো সবার মধ্যে। কিন্তু চোখের নিমেষে তীর ছুঁড়ে হাতটা নামিয়ে নিল ভিখারী। স্তব্ধ হয়ে গেল সবার মুখের হাসি। গিলবার্টের চেয়ে দুটো শরষের দানা পরিমাণ ভেতরে বিঁধেছে ভিখারীর তীর, কেন্দ্রবিন্দুর কাছে। নিজের অজান্তেই প্রশংসা বেরিয়ে এলো শেরিফের মুখ থেকে, ‘দারুণ, দারুণ!

অতি সাবধানে তীর ছুঁড়লো এবার অ্যাডাম। গিলবার্ট ও ভিখারীর মাঝখানে গিয়ে বিধলো তার তীর। প্রথম দফায় প্রথম হলো ভিখারী, দ্বিতীয় অ্যাডাম, তৃতীয় গিলবার্ট।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও বিরতির পর আবার তিনটে তীর ছুঁড়লো তিনজন। কিন্তু এবার অ্যাডামের তীরটা গিয়ে বিধলো কেন্দ্র থেকে বেশ কিছুটা দূরে। তার চেয়ে ভাল করলো গিলবার্ট, এবং তার চেয়েও ভাল করলো ছিন্নবস্ত্র ভিখারী। এবারেও প্রথম হলো সে। আবার কিছুক্ষণ বিরতির পর শেষ তীর ছোঁড়ার জন্যে দাগের ওপর এসে দাঁড়ালো তিনজন অতুলনীয় তীরন্দাজ। খুবই সতর্কতার সাথে বেশ অনেকক্ষণ লক্ষ্যস্থির করবার পর আশ্চর্য নৈপুণ্যের সাথে তীর ছুঁড়লো গিলবার্ট। দর্শকরা এতই জোরে হর্ষধ্বনি করে উঠলো যে ভয় পেয়ে উড়ে পালালো বুরুজের উপর বসে থাকা দাঁড়কাকগুলো। কেন্দ্রবিন্দু থেকে সামান্য এক সুতা ডাইনে গিয়ে বিধেছে ওর তীর

‘বেড়ে দেখিয়েছো, গিলবার্ট!’ আনন্দের আতিশয্যে আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন শেরিফ। ‘কোন সন্দেহ নেই, তোমারই কপালে ঝুলছে পুরস্কার। কারো সাধ্য নেই এর চেয়ে ভাল কিছু করে। ছেঁড়া জামা পরা ভিখারীর দিকে ফিরলেন তিনি, ‘কি হে, আরও তীর ছোঁড়ার খায়েশ আছে, নাকি এখানেই হার মেনে ছেড়ে দেবে তীর- ধনুক?’

কোন জবাব না দিয়ে দাগের ওপর গিয়ে দাঁড়ালো কানা ভিখারী। চুপ হয়ে গেল সবাই, সবার মনে কি হয় কি হয় একটা ভাব, দম আটকে রেখে চেয়ে রয়েছে ভিখারীর দিকে। ধনুকে তীর যোজনা করে কয়েক সেকেণ্ড পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো লোকটা, তারপর একটানে ছিলাটা কানের কাছে নিয়ে এসেই ছেড়ে দিল তীর। সোজা উড়ে গেল তীরটা, গিলবার্টের তীরের একটা পালক কেটে গাঁথলো গিয়ে তার পাশে…আশ্চর্য!…কেন্দ্রবিন্দুর ঠিক মাঝখানে। হর্ষধ্বনি করতেও ভুলে গেছে দর্শকবৃন্দ এই অবিশ্বাস্য পারদর্শিতা দেখে, বিস্ফারিত চোখে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে সবাই।

‘নাহ্!’ লম্বা করে শ্বাস টেনে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লো ট্যামওয়ার্থের অ্যাডাম। দুই কুড়ি বছর ধরে তীর-ধনুক নিয়ে কারবার করছি আমি, বেশির ভাগ প্রতিযোগিতায় ছিনিয়ে নিয়েছি জয়ের মালা, কিন্তু আজ আর না- এতদিনের অভিজ্ঞতায় অন্ততঃ কখন হার মেনে নিতে হয় সেটুকু শিক্ষা হয়েছে আমার। কে লোকটা জানি না, কিন্তু আজ বিনা দ্বিধায় মেনে নিচ্ছি আমি ওর তুলনা হয় না।’ এই বলে হাতের তীর ঢুকিয়ে রাখলো সে তূণে, ধনুক থেকে ছিলাটা খুলে সরে গেল দাগের ওপর থেকে।

পুরস্কার বিতরণ করলেন শেরিফ নিজ হাতে। বিপুল হর্ষধ্বনি আর করতালির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে এসে সবিনয়ে পুরস্কার গ্রহণ করলো কানা ভিখারী। ‘তুলনাহীন দক্ষতা দেখিয়ে জিতে নিয়েছো, ভিখারী, তুমি আজকের এই পুরস্কার। নামটা কি তোমার? বাড়ি কোথায়?’

‘লোকে আমাকে টেভিয়োডেলের জক বলে ডাকে,’ বললো লোকটা। ‘ওখানেই বাড়ি।’

‘বেশ, বেশ,’ বললেন শেরিফ। এর আগে এত ভাল তীর ছুঁড়তে দেখিনি আমি কাউকে। ভাল বেতন দেব, আমার বাহিনীতে যোগ দেবে তুমি? ভাগ্যিশ কাপুরুষ রবিন হুড আসেনি এই প্রতিযোগিতায়, এলে তাকেও হার মানতে হতো আজ তোমার কাছে। বলো, যোগ দেবে তুমি আমার রক্ষী বাহিনীতে?’

‘না,’ কর্কশ কণ্ঠে বললো ভিখারী। আমার মনিব আমি নিজে। কারো অধীনে চাকরি করি না আমি।’

‘তবে দূর হও!’ মুহূর্তে রেগে উঠলেন শেরিফ। ‘তোমার এই বেআদবির জন্যে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারতাম, কিন্তু মাফ করে দিচ্ছি। যাও, দূর হয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে!’

‘যাচ্ছি,’ বললো ভিখারী, কিন্তু মনে রাখবেন, কারো মাফেরও তোয়াক্কা রাখি না আমি।’ বলেই পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলো সে।

ছিন্নবস্ত্র এক ভিখারীর মুখে এতবড় কথা শুনতে হবে স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি শেরিফ। হতভম্ব হয়ে গেলেন তিনি কয়েক মুহূর্তের জন্যে। যখন সংবিৎ ফিরে পেলেন, তখন গরীব দর্শকদের রেলিঙের কাছে পৌঁছে গেছে ভিখারী। ‘ধরো, ধরে আনো ওকে! হাঁক ছাড়লেন তিনি। ধরে নিয়ে এসো হারামজাদাকে!’

একবার পিছন ফিরে চাইলো ভিখারী, আরো কয়েক পা এগিয়ে রক্ষীদের পায়ের শব্দ পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। সাত আটজন সশস্ত্র প্রহরী ছুটে আসছে তার দিকে। বিদ্যুৎবেগে একটা তীর বের করে আনলো সে তূণ থেকে, সেটা ধনুকে পরিয়ে একটানে নিয়ে এলো ছিলাটা কানের পাশে। হাঁ হয়ে গেছে সবার মুখ। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সবাই ভিখারীর তীরের লক্ষ্য স্বয়ং শেরিফ।

‘খবরদার, শেরিফ! ফিরিয়ে নিন আপনার লেলিয়ে দেয়া কুত্তাগুলোকে!’ বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে প্রচণ্ড এক ধমক দিল ভিখারী। নইলে দুই চোখের ঠিক মাঝখানে ঢুকিয়ে দেব তীরটা।’

দাঁড়িয়ে পড়লো রক্ষীরা, পিছন ফিরে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে শেরিফের পরবর্তী নির্দেশের। রাগে লাল হয়ে গেছে শেরিফের চোখ-মুখ। কিন্তু তাই বলে নিজের বিপদটা বুঝে নিতে কিছুমাত্র ভুল হলো না তাঁর। এখন গোয়ার্তুমি করতে গেলে ভিখারীর অব্যর্থ তাঁর বিধবে এসে ঠিক দুই চোখের মাঝখানে। ফলাফল, নির্ঘাৎ মৃত্যু।

‘ফিরে এসো!’ চিৎকার করে উঠলেন তিনি। যেতে দাও হারামজাদাকে। ফিরে এসো।

আর এগুলো না বটে, কিন্তু ফিরেও গেল না রক্ষীরা। অপেক্ষা করছে, শেরিফ বিপদমুক্ত হলেই তাড়া করে ঘিরে ধরবে দুর্বিনীত ভিখারীকে।

রেলিং টপকে ওপারে চলে গেল ভিখারী। কিছুদূর ভিড় ঠেলে এগিয়ে হঠাৎ শিঙাটা মাথার উপর তুলে শূন্যে ছুঁড়ে দিল সে ভিতরের মুদ্রাগুলো। চেঁচিয়ে বললো, ‘কুড়িয়ে নাও, ভাই। যে যা পারো কুড়িয়ে নাও।

হুলস্থুল পড়ে গেল গরীব দর্শকদের মধ্যে। এই হুটোপুটি ডিঙিয়ে ইচ্ছে করলেও রক্ষীরা সহজে ধরতে পারবে না ওকে। নিশ্চিন্ত মনে পা বাড়ালো সে নগর-তোরণের দিকে। কোথা থেকে কে জানে, একদল মুখ্যুসুখ্যু গরীব দুঃখী ঘিরে ধরলো ভিখারীকে চারপাশ থেকে। সবাই মিলে বেরিয়ে গেল ওরা শহর থেকে।

সেইদিন শেরউডের সেই বিখ্যাত গ্রীনউড গাছের নিচে জমায়েত হলো বিচিত্র পোশাক পরা একদল লোক। কেউ পরেছে ভিক্ষুকের পোশাক, কেউ সেজেছে মঠের সন্ন্যাসী, কেউ ঝালাইকার, কেউ নিরীহ নির্বোধ চাষী। তাদের মাঝখানে বসে আছে শতচ্ছিন্ন লাল পোশাক পরা সেই ভিখারী, তার এক হাতে একটা সোনার তীর, অপর হাতে রূপোর শিঙা। হাসাহাসি হৈ-চৈ-এর মধ্যে চোখের উপর থেকে কালো পট্টি খুলে ফেললো ভিখারী, দেখা গেল আসলে কানা নয় সে, খুশিতে হাসছে দুই চোখ। এবার শতচ্ছিন্ন পোশাকটা খুললো সে, দেখা গেল ছেঁড়া পোশাকের নিচে রয়েছে লিংকন গ্রীনের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক। তারপর দাড়িতে হাত বুলালো ভিখারী। বললো, ‘কিন্তু এটা? আমার এত সাধের সোনালী দাড়ি থেকে ওয়ালনাটের কষের দাগ তুলবো কি করে?’

কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলো সবাই। উঠে দাঁড়ালো রবিন হুড। পুরস্কার পাওয়া সোনার তীরটা ঝুলিয়ে দিল একটা ডালের সাথে। বললো, ‘এবার ভোজের ব্যবস্থা হওয়া দরকার। কি বলো তোমরা?’

ভোজের পর শুরু হলো নাচ-গান গল্প-গুজব। এত ফুর্তির মধ্যেও রবিনকে একটু অন্যমনস্ক দেখে জানতে চাইলো লিটল জন, ‘কি হয়েছে তোমার, ওস্তাদ? কেমন যেন মনমরা মনে হচ্ছে?’

‘ঠিকই ধরেছো,’ বললো রবিন হুড। খারাপ লাগছে এই ভেবে যে শেরিফ জানলো না কিছুই। তার ধারণা কাপুরুষ রবিন হুড সাহসই পায়নি আজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে।’

‘ও, এই কথা?’ একগাল হাসলো লিটল জন। এ আর এমন কি সমস্যা?’ উইল স্টিউটলির দিকে ফিরলো সে, ‘উইল, একটা পদ্য বানিয়ে ফেলো তো চটপট, লিখে ফেলো একটা কাগজে।

‘কি করবে পদ্য দিয়ে?’ জানতে চাইলো রবিন।

‘দেখোই না কি করি!’ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো লিটল জন। ‘হজমের বারোটা বাজিয়ে দেব আজ শেরিফের!’

এদিকে নটিংহাম শহরে নিজ বাড়িতে বিশিষ্ট অতিথিবর্গের সাথে নৈশ ভোজে বসেছেন শেরিফ। খেতে খেতে মনের খেদ প্রকাশ করে ফেললেন শেরিফ। আমি ভেবেছিলাম রবিন হুড আজ আসবেই আসবে। ও যে এতবড় কাপুরুষ তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। বোধহয় কোন ভাবে টের পেয়ে গেছে ফাঁদ পেতে ধরা হবে আজ তাকে। ভয়ে ইঁদুরের গর্তে সেঁধিয়েছে গিয়ে। কিন্তু, ভাবছি ওই বেয়াড়া ভিখারীটার কথা কে ও?’

কথা শেষ হবার আগেই ঘ্যাঁচ করে একটা তীর এসে বিঁধলো খাবার টেবিলে, শেরিফের ঠিক সামনে।

‘ব্যাপার কি! কি হলো? তীর এলো কোত্থেকে? খোলা ওই জানালা দিয়ে না?’

‘একটা কাগজ জড়ানো রয়েছে ওটার গায়ে,’ বললো একজন।

‘দেখি, দেখি কিসের কাগজ?’ হাত বাড়ালেন শেরিফ।

ভাঁজ খুলতেই দেখা গেল ছোট্ট একটা পদ্য লেখা রয়েছে কাগজের মাঝখানে।

“ভেবেছিলে ধরবে তাকে
পড়বে ফাঁদে রবিন হুড।
পুরস্কারটা কে নিল আজ?
হাসছে তামাম শেরউড!”

পরিষ্কার বুঝতে পারলেন শেরিফ, কানা ভিখারীর ছদ্মবেশে আজ পুরস্কার জিতে নিয়ে গেছে স্বয়ং দস্যু রবিন হুড।

রাগে-দুঃখে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করলো শেরিফের চেহারা। খাবার ফেলেই এক লাফে উঠে দাঁড়ালেন তিনি, গটমট করে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে।

৭. উইল স্টিউটলির ফাঁসী

মহাফাঁপরে পড়ে গেলেন শেরিফ। রাজার কাছে যদি নালিশ করতে না যেতেন তাহলে আর এই বিপদে পড়তে হতো না তাঁকে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে যদি রবিন হুডকে গ্রেফতার না করতে পারেন, নিজের চাকরি নিয়েই টানাটানি পড়ে যাবে। অথচ গ্রেফতারী পরোয়ানা পাঠিয়ে কোন লাভ হয়নি, শূটিং প্রতিযোগিতার কৌশলও মাঠে মারা গেছে। কোন ভাবেই এঁটে ওঠা যাচ্ছে না দস্যুটার সাথে। শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি, শেষ চেষ্টা হিসেবে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করে দেখবেন ওকে ধরা যায় কিনা।

যত কনস্টেবল, নগর-রক্ষী আর জঙ্গল-রক্ষী ছিল সবাইকে ডেকে পাঠালেন তিনি। নির্দেশ দিলেন, ‘যুদ্ধের সাজ পরে নাও সবাই। আমাদের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে শেষ চেষ্টা করবো এবার আমরা। বর্ম পরে থাকবে তোমরা, সাথে নেবে ঢাল তলোয়ার আর তীর-ধনুক। গোটা শেরউড জঙ্গলের প্রত্যেকটি রাস্তা, মেটোপথ আর বুনোপথের ধারে ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করবে তোমরা চার-পাঁচজনের ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে। যদি ওদের বড়সড় দলের মুখোমুখি পড়ে যাও, শিঙা বাজিয়ে সংকেত দেবে আশেপাশের দলগুলোকে, সবাই মিলে আক্রমণ করবে একযোগে। শুনে রাখো, রবিন হুডকে যে ধরে আনতে পারবে তাকে পুরস্কার দেয়া হবে পুরো একশো পাউণ্ড- জীবিত হোক বা মৃত, আমার সামনে এনে হাজির করতে পারলেই পাবে পুরস্কার। তাছাড়া ওর দলের যে-কোন লোককে, জীবিত হোক বা মৃত, ধরে আনতে পারলে পাবে চল্লিশ পাউণ্ড করে। যাও, তোমাদের আর সব ডিউটি মওকুফ করে দেয়া হলো কিছুদিনের জন্যে, যেমন করে পারো ধরে নিয়ে এসো দস্যুদের।’

ষাটটি উপদল তৈরি করলো ওরা, প্রতিটি উপদলে পাঁচজন করে লোক, অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রওনা হয়ে গেল শেরউডের উদ্দেশে। প্রত্যেকের মনে আশা, বলা যায় না, হয়তো পুরস্কারটা ঝুলছে তারই কপালে। পর পর সাতদিন সাতরাত পাহারা দিল ওরা, টহল দিল প্রতিটি রাস্তায়, কিন্তু সবুজ পোশাক পরা লোক তো দূরের কথা, একটুকরো সবুজ কাপড়ও চোখে পড়লো না কারো। কারণ ব্লু বোরের ঈডমের কাছ থেকে আগেই জেনে গেছে রবিন শেরিফের এই সর্বাত্মক প্রচেষ্টার কথা।

খবরটা কানে যেতেই দলের সবাইকে ডেকে আত্মগোপন করবার নির্দেশ দিয়েছে রবিন হুড। বলেছে, ‘আমি অযথা রক্তপাত পছন্দ করি না। ওদের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে গেলে হয়তো আমরাই জিতবো, কিন্তু দু’পক্ষেরই প্রচুর লোক হতাহত হবে তার ফলে, অনেক স্ত্রী হারাবে তাদের স্বামী, অনেক সন্তান হারাবে পিতা। এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলে আমি চাই না এই যুদ্ধে জড়াতে। কতদিন টহল দেবে ওরা? ক্লান্ত হয়ে একদিন ফিরে যেতেই হবে ওদের। ততদিন ডেরা ছেড়ে কোথাও বেরোবো না আমরা। সবার মঙ্গলের জন্যেই এটা করবো আমরা। কিন্তু যদি ওরা আমাদের বাধ্য করে যুদ্ধে নামতে, জান-প্রাণ দিয়ে লড়বো, দেখিয়ে দেব ওদের লড়াই কাকে বলে।

রবিনের এই নির্দেশ মনঃপূত হলো না অনেকেরই, মেনে নিতে পারলো না এই আত্মগোপনের পরিকল্পনা, ক্ষুণ্ন মনে বিড় বিড় করে বললো, ‘ভীতুর ডিম মনে করবে তাহলে শেরিফ আমাদেরকে। সারা দেশের লোক মনে করবে কাপুরুষ রবিনের সাহসে কুলায়নি এদের মোকাবিলা করার।’ অসন্তুষ্ট হলো বটে, কিন্তু রবিনের নির্দেশ মেনে নিল সবাই বিনা আপত্তিতে, একটি কথাও বললো না ওর কথার উপর।

সাতদিন সাতরাত লুকিয়ে রইলো রবিনের দস্যুদল আস্তানার আশে পাশে, কেউ বেরোলো না বাইরে। অষ্টম দিনের সকালে আবার সবাইকে ডাকলো রবিন হুড। বললো, ‘বেশ অনেক দিন তো হলো, এবার লোক পাঠিয়ে দেখা দরকার কি করছে ব্যাটারা। চিরকাল তো আর টহল দিতে পারবে না, ইতিমধ্যেই হয়তো হাঁপিয়ে উঠেছে। তোমাদের মধ্যে কে দেখে আসবে ওরা আছে না গেছে?’

হুল্লোড় উঠলো সবার মধ্যে, ধনুক উঁচিয়ে প্রত্যেকে দাবি জানালো যেন তাকেই পাঠানো হয়। গর্বের সাথে সবার উপর একবার চোখ বুলালো রবিন হুড, সবার সাহস দেখে বুক ভরে গেছে তার। হাত তুলে চুপ করার নির্দেশ দিল সবাইকে, তারপর বললো, ‘তোমাদের সবাইকে তো আর পাঠানো সম্ভব নয়, কাজেই তোমাদের মধ্যে থেকে একজনকে মনোনীত করবো আমি। তোমরা সবাই সাহসী এবং বীর, কোন সন্দেহ নেই তাতে, কিন্তু এ কাজের জন্যে বীরত্ব ও সাহসের চেয়েও অনেক বেশি প্রয়োজন ধূর্ততার। বুড়ো শেয়ালের মত চতুর একজন দরকার আমাদের। আমি প্রস্তাব করছি উইল স্টিউটলির নাম।

খুশিতে লাফিয়ে শূন্যে উঠলো উইল স্টিউটলি, এত লোকের মধ্যে থেকে তাকেই এই কাজের জন্যে বেছে বের করা হয়েছে দেখে হাসি আর ধরে না তার। ধন্যবাদ, রবিন,’ বললো সে। যদি ব্যাটাদের কোন খবর না আনতে পারি তাহলে আমার চতুর উইল স্টিউটলি নাম পাল্টে অন্য নাম রেখো। চললাম!’

সবুজ পরিচ্ছদের ওপর মঠবাসী সন্ন্যাসীর ঢোলা কাপড় চাপালো সে, তলোয়ারটা এমন ভাবে ঝুলিয়ে নিল যাতে বাইরে থেকে কিছুই বোঝা না যায়, অথচ প্রয়োজনের সময় খুব সহজেই বের করে আনা যায় এক টানে। মাথার ঢাকনিটা বেশ খানিকটা টেনে সামনের দিকে নামিয়ে দিয়ে ধীরপায়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়লো সে। শেরিফের পাঠানো দুটো দল পড়লো তার চোখে। অবাক হলো সে এখনো তাড়জোরের সাথেই পাহারা চলছে দেখে। সাথে সাথেই ফিরে না এসে স্থির করলো সে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে ব্লু বোরে, সেখানে ঈডমের কাছ থেকে সব সংবাদ শুনে তারপর ফিরে যাবে আস্তানায়। ডাইনে বাঁয়ে না চেয়ে, দুই হাত বুকে বেঁধে, যেন কতই না গভীর তত্ত্বচিন্তায় মগ্ন, মাথা হেঁট করে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো সে ব্লু বোরের নামনে।

ব্লু বোরে পৌঁছে দেখলো সে শেরিফের জনাকয়েক লোক বসে মদ গিলছে। কারো নাথে কোন কথা না বলে দূরের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলো সে। হাতের লাঠির ওপর ভর দয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলো, যেন গভীর ধ্যানে মগ্ন। আসলে অপেক্ষা করছে সে ডিমকে একা পাওয়ার আশায়। ব্লু বোরের মালিক ঈডম দেখলো ওকে ঠিকই, কিন্তু চনতে পারলো না। মনে করলো, ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে কোন বুড়ো সাধু, নিক, কেউ সিলে কিছু আর ক্ষয়ে যাবে না বেঞ্চটা।

ঈডম চিনতে পারলো না বটে, কিন্তু তার পোষা বিড়ালটা ঠিকই চিনতে পেরেছে টইল স্টিউটলিকে। বরাবর যেমন আদর পায় তেমনি আদরের আশায় কাছে এসে গা ঘষতে শুরু করলো ওর পায়ে। ফলে সন্ন্যাসীর ঢোলা পোশাকটা উপরে উঠে গেল চার মাঙুল পরিমাণ। দ্রুত হাতে কাপড়টা আবার নামিয়ে দিল স্টিউটলি, কিন্তু ইতিমধ্যেই চলের সবুজ কাপড় চোখে পড়ে গেছে একজন কনস্টেবলের। তক্ষুণি কাউকে কিছু বললো না সে, মনে মনে বিচার বিবেচনা করে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে বেঞ্চে সো লোকটা কিছুতেই মঠের সন্ন্যাসী হতে পারে না, কোন সন্দেহ নেই, ও রবিন হুডের দলের লোক।

বিনয়ের সাথে ডাকলো সে সন্ন্যাসীকে, ‘আসুন না, ফাদার, মনে হচ্ছে খুবই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন, কয়েক ঢোক বিয়ার খেয়ে তৃষ্ণা দূর করুন।

মাথা নেড়ে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলো উইল স্টিউটলি, কারণ কথা বলে উঠলে কেউ হয়তো ওর গলার স্বর চিনেও ফেলতে পারে। কিন্তু কথা না বলে উপায় থাকলো না তার। আবার প্রশ্ন করলো কনস্টেবল, ‘এই গরমে কোথায় চলেছেন, ফাদার?’

গলার স্বর একটু মোটা করে উত্তর দিল স্টিউটলি, ‘তীর্থে চলেছি। ক্যান্টারবারি শহরে।’

হাসলো কনস্টেবল। বললো, ‘ক্যান্টারবারিতে তীর্থযাত্রায় যেতে হলে হলি ফাদারদের জোব্বার নিচে লিংকন গ্রীন কাপড় পরার নিয়ম আছে বুঝি? হাঃ হাঃ হাঃ! ভেবেছো ফাঁকি দিতে পেরেছো আমার চোখকে? আমি জানি, হয় ছদ্মবেশী চোর তুমি, নয়তো দস্যু রবিন হুডের লোক। খবরদার! এক ইঞ্চি নড়লেই এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে দেব তলোয়ার দিয়ে

এই বলে একটানে চকচকে তরবারী বের করে ঝাঁপিয়ে পড়লো সে উইল স্টউটলির ওপর। কিন্তু ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে স্টিউটলি যে ধরা পড়ে গেছে, হাতটা মাগেই চলে গিয়েছিল তলোয়ারের বাঁটের কাছে, টান দিয়ে ঢোলা কাপড়ের নিচ থেকে বের করলো সে নিজের তলোয়ার, উঠে দাঁড়ালো এক লাফে। সাঁই করে প্রচণ্ড বেগে তলোয়ার চালালো কনস্টেবল, কিন্তু ওই একবারই, আর কোন সুযোগ পেল না সে, মাঘাত ঠেকিয়ে দিয়ে একের পর এক আঘাত হেনে চললো উইল স্টিউটলি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। দরদর করে রক্ত নামলো কনস্টেবলের শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে। পালাবার পথ পরিষ্কার হয়েছে বুঝতে পেরে ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড় দিতে যাবে, এমন সময়ে টলতে টলতে মাটিতে পড়লো আহত কনস্টেবল, এবং পড়েই দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো উইল স্টিউটলির হাঁটু জোড়া। ছুটে এলো অন্যান্যরা। সবার আগে যে ছিল তার মাথা লক্ষ্য করে তলোয়ার চালালো স্টিউটলি, কিন্তু মাথায় শিরস্ত্রাণ থাকায় বেঁচে গেল সে এ-যাত্রা; গভীর একটা দাগ সৃষ্টি হলো শুধু ইস্পাতের শিরস্ত্রাণে, মাথাটা ঘুরে উঠলো বটে, কিন্তু মারা পড়লো না সে। এদিকে জ্ঞান হারাচ্ছে আহত কনস্টেবল, কিন্তু হাতের বাঁধন আলগা করছে না, ঝটকা দিয়ে পা ছাড়াবার চেষ্টা করলে আরো জাপটে ধরে। ওর এই রকম বেকায়দা অবস্থা দেখে যে তিনজন এগোতে সাহস পাচ্ছিল না তারাও ছুটে এসে ঘিরে ধরলো উইল স্টিউটলিকে। এপাশ-ওপাশ ফিরে বীরত্বের সঙ্গে চারজনের আক্রমণ ঠেকাবার চেষ্টা করছে স্টিউটলি, সুযোগ পেলেই তলোয়ারের খোঁচায় আহত করছে শত্রুদের। কিন্তু বেশিক্ষণ পারলো না। পিছন থেকে আচমকা একটা আঘাত এসে পড়লো ওর মাথার উপর, কুলকুল করে রক্ত নেমে অন্ধ করে দিল ওর চোখ। তাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সে মেঝেতে, হাত থেকে খসে গেল তরবারি। একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেসে ধরলো এবার সবাই ওকে, কিন্তু তাও কি রাখা যায়! – কিল ঘুসি লাথি চালাচ্ছে সে সমানে। কিন্তু বেশিক্ষণ এইভাবে যুঝতে পারলো না সে, চেপে ধরে বেঁধে ফেললো ওরা ওর হাত-পা, বন্দী হলো উইল স্টিউটলি।

গ্রীনউড গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রবিন হুড, ভাবছিল উইল স্টিউটলির কথা, ওর দেরি দেখে উদ্বিগ্ন হচ্ছিল মনে মনে। এমন সময় দেখতে পেল দু’জন অনুচর ছুটে আসছে ওর দিকে, ওদের মাঝখানে দৌড়াচ্ছে ব্লু বোরের মুটকি মেকেন। ওদের দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেল রবিনের, পরিষ্কার বুঝতে পারলো সে, অশুভ-সংবাদ বয়ে আনছে ওরা।

‘উইল স্টিউটলিকে ধরে নিয়ে গেছে! হাঁপাতে হাঁপাতে বললো একজন।

‘খবরটা কে আনলো? তুমি?’ মেয়েটার দিকে ফিরলো রবিন।

হাপরের মত হাঁপাচ্ছে মুটকি মেকেন। বললো, ‘হ্যাঁ। পুরোটা ঘটনা নিজ চোখে দেখেছি আমি। বীরের মত লড়েছে স্টিউটলি, জখম হয়েছে মারাত্মক রকম, অনেক রক্ত পড়তে দেখলাম। হাত-পা বেঁধে নিয়ে গেল ওকে নটিংহাম শহরে, কাল নাকি ফাঁসী হবে ওর। তাই শুনে পিছনের দরজা দিয়ে ছুটে এসেছি আমি খবরটা জানাতে।’

‘ফাঁসী হবে না,’ ঘোষণা করলো রবিন। ‘অন্ততঃ আমাদের প্রাণ থাকতে নয়!’ এই বলে শিঙাটা মুখে তুলে তিনটে ফুঁ দিল সে। জরুরী বিপদ সংকেত।

হুড়মুড় করে চারদিক থেকে ছুটে এলো সাতকুড়ি তাগড়া জোয়ান, ঘিরে ধরলো রবিনকে।

‘সবাই শোন!’ হাঁক ছাড়লো রবিন হুড। ‘আমাদের প্রিয় সহচর উইল স্টিউটলি বন্দী হয়েছে শয়তান শেরিফের লোকের হাতে। আগামীকাল নাকি ফাঁসী হতে যাচ্ছে ওর। যেমন করে হোক ঠেকাতে হবে সেটা, ওকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের মধ্যে। ও যেমন আমাদের জন্যে বিপদের ঝুঁকি নিয়েছে, নিজের জীবন বিপন্ন করেছে, প্রয়োজন হলে ওর জন্যে আমাদের প্রত্যেকের তাই করাই উচিত বলে মনে করি। কাজটা ছেলেখেলা নয়, বিপদের সম্ভাবনা আছে, মৃত্যুও ঘটতে পারে। কারও ওপর জোর জবরদস্তি নেই। লিটল জন আর আমি তো যাবই, তোমাদের মধ্যে আর কে কে যেতে চাও, হাত তোল।’

‘আমি যাব,’ শুধু দু’টি মাত্র শব্দ উচ্চারিত হলো। প্রচণ্ড এক হুংকারের মত আকাশ কাঁপিয়ে দিল শব্দ দুটো, কারণ একসাথে সবাই উচ্চারণ করেছে কথাটা। সবাই মাথার উপর তুলে ধরেছে ধনুক।

‘তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ,’ বললো রবিন। বন্ধুর বিপদে যদি তাকে আমরা সাহায্য না করতে পারি, তাহলে কিসের মানুষ! কাল খুব ভোরে রওনা হবো আমরা, তৈরি থেকো সবাই।’

পরদিন খুব ভোরে সূর্য ওঠার আগেই ছদ্মবেশ ধরে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রওনা হয়ে গেল ওরা বিভিন্ন পথে, একসাথে তিনজনের বেশি নয়। কথা রইলো, নটিংহাম শহরের কাছেই একটা জংলা উপত্যকায় মিলিত হবে সবাই।

‘খবর জানা দরকার সবচেয়ে আগে,’ নির্দিষ্ট জায়গায় সবাই সমবেত হতেই বললো রবিন। ‘কোথায় কিভাবে কি করতে যাচ্ছে ওরা সেটা না জানা পর্যন্ত করার কিছুই নেই আমাদের। চুপচাপ গা ঢাকা দিয়ে থাকো সবাই, লক্ষ্য রাখো দুর্গ-তোরণের দিকে। কাউকে একা বেরোতে দেখলেই আমরা কথা বলবো তার সাথে।

বেলা বেড়ে চলেছে, উশখুশ করছে সবাই, কিন্তু শহর থেকে বেরোচ্ছে না কেউ। খুব সম্ভব উইল স্টিউটলির ফাঁসী দেখার জন্যে আর সমস্ত কাজ বাতিল করেছে শহরবাসীরা আজকের জন্যে। অপেক্ষা করতে করতে যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সবাই, তখন দেখা গেল শহর থেকে বেরিয়ে নগর-প্রাচীরের ধার ঘেঁষা রাস্তা ধরে হাঁটছে এক শীর্ণকায় বৃদ্ধ তীর্থযাত্রী। কনুই দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিল রবিন ডংকাস্টারের ডেভিডের পাঁজরে। ‘যাও, ওর কাছ থেকে কোন খবর পাওয়া যায় কিনা দেখে এসো।’

এগিয়ে গেল তরুণ ডেভিড, বৃদ্ধের কাছাকাছি এসে সসম্ভ্রমে অভিবাদন করলো। হাসতে হাসতে বললো,

উইল স্টিউটলির কোন খবর আছে, হোলি ফাদার? বদমশাটার ফাঁসী দেখবো বলে বহুদূর থেকে এসেছি আমি। কখন কোথায় ফাঁসী হবে বলতে পারেন?’

‘ছি, ছি!’ ডেভিডের দিকে চেয়ে ভুরু কুঁচকে ভর্ৎসনা করলেন বৃদ্ধ। ‘বিনা দোষে একজন ভাল মানুষকে ফাঁসীতে ঝোলানো হচ্ছে, আর তুমি এসেছো সেই তামাশা দেখতে?’ রাগের ঠেলায় হাতের লাঠিটা ঠুকলেন তিনি। ‘অন্যায়, ভয়ানক অন্যায়! কি দোষ করেছিল সে যে তাকে ধরে এনে ফাঁসী দিতে হবে? উচ্ছন্নে যাবে, আমি বলে দিচ্ছি, উচ্ছন্নে যাবে সব! জানতে চাইলে, তাই বলছিঃ আজ সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের কিছু আগে নগর-তোরণের বাইরে নিয়ে আসা হবে ওকে, ওই তে-রাস্তার মোড়ে ঝুলিয়ে দেয়া হবে ফাঁসীতে, যাতে এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নমুনা দেখে সতর্ক হয়ে যায় আর সব দস্যুরা। কিন্তু দস্যু?-কাদের তুমি দস্যু বলবে? রবিন হুডকে?’ এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ, ‘ধন সম্পদ কেড়ে নিচ্ছে সে ঠিকই, কিন্তু কাদের কাছ থেকে? অসৎ, নিষ্ঠুর, ধনী, পাজি লোকের কাছ থেকে। কোথায় যাচ্ছে সেই টাকা? খোঁজ নিয়ে দেখো, আশেপাশের গোটা এলাকায় যত অসহায় বিধবা, যত অক্ষম বৃদ্ধ, যত অসচ্ছল কৃষক-শ্রমিক রয়েছে, যত পঙ্গু-দীন-দুঃখী আছে, সবার জন্যে একমুঠো অন্ন, শীত নিবারণের বস্ত্র জুগিয়ে আসছে সে বছরের পর বছর। আহা, তারই এক বিশ্বস্ত অনুচরকে অন্যায় ভাবে ফাঁসীতে ঝোলাতে যাচ্ছে নিষ্ঠুর শেরিফ, ভাবতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। চলে যাচ্ছি আমি শহর ছেড়ে। যদি জানতাম সে কোথায় থাকে, আমি নিজে গিয়ে খবর দিতাম রবিন হুডকে, বলতাম অন্যায় ভাবে খুন করা হচ্ছে তোমার এক অনুচরকে, যেমন করে পারো উদ্ধার করো তাকে।’

এই বলে নিজের পথে পা বাড়ালেন বৃদ্ধ। কিন্তু তিন কদম এগিয়েই থমকে থেমে দাঁড়ালেন তিনি। কারণ কথা বলে উঠেছে যুবক। আপনার কথা পৌঁছে যাবে রবিন হুডের কানে। আমার বিশ্বাস, নিজের প্রিয় অনুচরকে রক্ষা করার চেষ্টায় কোন ত্রুটি করবে না সে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, ফাদার, আজ যদি উইল স্টিউটলি মারা যায়, চরম প্রতিশোধ নেয়া হবে সে মৃত্যুর।

বৃদ্ধ যখন ঘুরে দাঁড়ালেন, দ্রুত পায়ে চলে যাচ্ছে তখন ডংকাস্টারের ডেভিড। ওর ঋজু, বলিষ্ঠ পদক্ষেপ দেখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠলো তাঁর মুখে। হাত তুলে আশীর্বাদ করে রওনা হয়ে গেলেন তিনি নিজের পথে। বুঝতে পেরেছেন তিনি, এই ছেলে রবিন হুডেরই দলের কেউ, কাছে পিঠেই ওৎ পেতে বসে আছে রবিন। ভালো।

ডেভিডের মুখে সব শুনে সবাইকে কাছে ডাকলো রবিন হুড। বুঝিয়ে দিল পরিকল্পনাটা। ‘দুপুর গড়িয়ে গেলেই উইল স্টিউটলির ফাঁসী দেখতে লোকজন আসতে আরম্ভ করবে আশপাশের অঞ্চল থেকে। আমরা একজন-দু’জন করে ভিড়ে যাব তাদের সাথে, ঢুকে পড়বো শহরে। খেয়াল রেখো, দল থেকে যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে কেউ। সবাই খেয়াল রাখবে সবার দিকে। উইল স্টিউটলিকে নিয়ে যখন রওনা হবে রক্ষীরা, তোমরা প্রত্যেকে চেষ্টা করবে যতটা সম্ভব ওদের কাছাকাছি থাকার। লিটল জনকে বুঝিয়ে দিয়েছি আমি কি করতে হবে। ওর কাজ ও করবে, যতক্ষণ না আমার শিঙার সংকেত পাবে ততক্ষণ তোমরা কেউ কিছু করতে যাবে না। সংকেত পাওয়ার পরও অযথা রক্তপাত ঘটাবে না, একান্ত প্রয়োজন না পড়লে কাউকে আঘাত করবে না; কিন্তু যদি প্রয়োজন পড়ে, শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত হানবে, যেন এক লোককে দ্বিতীয়বার আঘাত করার প্রয়োজন না হয়। মনে রাখবে, আমাদের মূল উদ্দেশ্য উইল স্টিউটলিকে শেরউডে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া, শেরিফ বা তার সৈন্যদলকে শায়েস্তা করা নয়। উদ্ধারের কাজ হাসিল হয়ে গেলেই দল বেঁধে আমরা সরতে থাকবো জঙ্গলের দিকে। আমাদের মধ্যে কেউ আহত বা নিহত হলে তাকে তুলে নেব কাঁধে, ফেলে রেখে পালাবো না। সবাই সব কথা বুঝেছো? কারো কোন প্রশ্ন আছে?’

বুঝেছে সবাই। কেউ কোন প্রশ্ন করলো না।

সূর্য ঢলে পড়লো পশ্চিম আকাশে। দুর্গ-প্রাচীরের উপর থেকে বেজে উঠলো বিউগল। শহরের লোক যে যেখানে ছিল নেমে এলো রাস্তায়। রাজপথ লোকে লোকারণ্য, সবাই চলেছে নগর তোরণের দিকে। সবাই জানে, ফাঁসী দেয়া হচ্ছে রবিন হুডের ঘনিষ্ঠ সহচর উইল স্টিউটলিকে। ধীরে ধীরে খুলে গেল দুর্গ-তোরণ। সবার আগে সাদা ঘোড়ায় চড়ে বেরোলেন শেরিফ, তাঁর পিছনে মার্চ করে আসছে সশস্ত্র রক্ষীদল। রক্ষীদলের মাঝখানে দু’চাকার একটা ঘোড়াটানা গাড়িতে গলায় দড়ির ফাঁস লাগানো অবস্থায় বসে রয়েছে উইল স্টিউটলি, হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে দিনের আকাশে চাঁদের মত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে ওর মুখটা। কয়েক গোছা চুল রক্ত জমে শক্ত আর চোখা হয়ে পড়ে আছে কপালের উপর। দুর্গ থেকে বেরিয়েই চারদিকে চাইলো সে। কিছু কিছু বন্ধুত্ব ও সহানুভূতিপূর্ণ মুখ নজুরে পড়ুলো তার, কিন্তু চেনা মুখ দেখতে পেল না সে একটাও। ভারি সীসার মত গভীর পানিতে তলিয়ে গেল ওর সমস্ত আশা-ভরসা। বুঝলো, খবর পায়নি রবিন হুড।

কিন্তু তবু দমে গেল না সে। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনে শক্ত করলো মনটা। শেরিফের উদ্দেশ্যে বললো, ‘আমাকে এভাবে না মেরে বরং আমার হাতে একটা তলোয়ার তুলে দিন, স্যার শেরিফ। আপনারা যতজন খুশি আসুন, মরার আগে পর্যন্ত লড়াই করে মরতে চাই আমি।’

বীরের মরণ তোমার কপালে নেই, হে ছোকরা,’ বললেন শেরিফ। ‘তলোয়ার পাবে না। সাধারণ চোর-ডাকাতের মতই ঘৃণ্য তুমি, সেই রকম নীচ মৃত্যুই ঘটবে তোমার।

‘ঠিক আছে, আমার হাতের বাঁধন কেটে দিন, অস্ত্র না হয় নাই দিলেন, খালি হাতেই আপনাদের সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মরবো আমি।’

হা হা করে হেসে উঠলেন শেরিফ। ‘কেন, ফাঁসীটা পছন্দ হচ্ছে না তোমার? বুক কাঁপছে এখন? রবিন হুডের দলে যোগ দেয়ার সময় এই সম্ভাবনার কথা উঁকি দেয়নি মনে? এখন খুব খারাপ লাগছে বুঝি?’ আবার একপেট হেসে নিয়ে বললেন, ‘না হে, তে-রাস্তার মোড়ে ফাঁসীতেই ঝুলতে হবে তোমাকে আজ। চোখ ঠুকরে তুলবে দাঁড়কাকে।’

রক্ত চড়ে গেল উইল স্টিউটলির মাথায় শেরিফের এই কথা শুনে, দাঁত মুখ খিঁচিয়ে গালিগালাজ করলো সে শেরিফকে। ‘কাপুরুষ, নীচ, নরকের কীট, বদমাশ, শেরিফ! তুই ভেবেছিস আমাকে ফাঁসীতে ঝোলালেই দমন করতে পারবি রবিন হুডকে? তোর অন্ততঃ সে সাধ্য নেই। থাকলে তোকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করতো না, টিটকারি মারতো না তোর নির্বুদ্ধিতা দেখে। জেনে রাখ, আজকের এই কৃতকর্মের ফল হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে ছেড়ে দেবে তোকে রবিন হুড।’

‘তাই নাকি?’ রেগে উঠলেন শেরিফ। ‘কোথায় তোর রবিন হুড? গর্তে লুকিয়ে রয়েছে কেন? আসুক না সামনে যদি সাহস থাকে! যাই হোক, তোর এই ঔদ্ধত্যের জন্যে শাস্তির মাত্রা আর একধাপ চড়িয়ে দেয়া গেলঃ ফাঁসী দেয়ার পর এক এক করে কেটে নামানো হবে তোর হাত-পা-ধড়-মাথা!’ এই বলে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে সামনে এগোলেন তিনি।

নগর-প্রাচীরের বিশাল তোরণের সামনে এসে পৌঁছলো ওরা। গেট দিয়ে বাইরে দৃষ্টি চলে গেল উইল স্টিউটলির। কী সুন্দর! ঘন সবুজে ছেয়ে আছে পাহাড়, টিলা, ঢিবি, মাঠ, জঙ্গল। বহুদূরে শেরউডের বিশাল ওকের সারি দেখা যাচ্ছে আবছা মত। তির্যক লালচে রোদ বিছিয়ে পড়েছে মাঠে-ময়দানে, শস্যক্ষেত্রে। আলো লেগে কী অপূর্ব মায়াময় হয়ে উঠেছে দূরের ওই কুটিরগুলো। কুলায় ফেরা পাখিদের কল-কাকলি কানে গেল ওর, পাহাড়ের ধারে গলা ছেড়ে ডাকছে একটা ভেড়া, পরিষ্কার আকাশে উড়ছে সোয়ালো। বুকের ভিতর কেমন যেন করে উঠলো উইল স্টিউটলির, আবছা হয়ে এলো চোখের দৃষ্টি, উত্তপ্ত লোনা পানি নামলো গাল বেয়ে। কী সুন্দর এই পৃথিবীটা! অথচ সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে তাকে অকালে।

চট্ করে মাথাটা নামিয়ে নিল সে। সে যে ভয়ে কাঁদছে না, ভালবাসায় কাঁদছে, একথা বুঝবে ক’জন? লোকে যদি ভুল বোঝে ওকে, সেটা রবিনের অসম্মান, তাই মাথা নিচু করে চললো সে বাকি পথটুকু। নগর-তোরণ দিয়ে সবাই বেরিয়ে এলো বাইরে। মনটা শক্ত করে বেঁধে নিয়ে আবার যখন মুখ তুললো স্টিউটলি, বুকের ভিতর লাফ দিয়ে উঠলো ওর কলজেটা-আরে! এ এখানে কেন! ভিড়ের মধ্যে পলকের জন্যে দেখতে পেল সে শেরউডের এক সহচরের অতি পরিচিত মুখ। চারপাশে চোখ বুলিয়েই আনন্দে দম আটকে এলো তার। আরে! চারপাশ থেকে প্রহরীদেরকে ঘিরে রয়েছে ওর একান্ত প্রিয় বন্ধু-বান্ধবেরা, চেষ্টা করছে আরো চেপে আসার। হঠাৎ বুকের ভিতর ছলকে উঠলো এক ঝলক রক্ত-ভিড়ের মধ্যে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে সে তার প্রিয় নেতা দস্যু রবিনের মুখ। আশেপাশের লোকদের কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে সরিয়ে আরো কাছে আসার চেষ্টা করছে রবিন।

‘অ্যাই! কি হচ্ছে?’ জোরে ধমক মারলেন শেরিফ একদল লোককে। ‘এখানে গুঁতোগুঁতি হচ্ছে কেন? সরো, সরে দাঁড়াও!’

আরেক দিকে একটু গোলমালের আভাস পেয়ে সেদিকে মুখ ফেরালো উইল স্টিউটলি। লিটল জন! গাড়িটার আরো কাছে আসার চেষ্টা করছে লিটল জন-ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু।

‘অ্যাই! খবরদার! সরে দাঁড়াও!’ লিটল জনের কনুইয়ের ধাক্কা খেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো একজন সশস্ত্র রক্ষী। ধাক্কাধাক্কি করছিস কেন, হারামজাদা! সরে দাঁড়া!’

‘তুই সরে দাঁড়া, কুত্তার বাচ্চা!’ বলেই ধাঁই করে ভীষণ এক চাপড় কষালো লিটল জন লোকটার মাথার পাশে। লোকটা কাটা কলাগাছের মত দড়াম করে মাটিতে পড়তেই এক লাফে উঠে এলো সে উইল স্টিউটলির গাড়িতে

‘বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই এভাবে চলে যাওয়াটা কি তোমার উচিত হচ্ছে, উইল?’ বললো লিটল জন। যদি যেতেই হয়, চলো, আমাকেও নিয়ে চলো সাথে, তোমার মত বন্ধুর সাথে মরতে আমার কোনই আপত্তি নেই।’ এই বলে ঘ্যাচ ঘ্যাচ দুই পোঁচ দিয়ে কেটে দিল সে ওর হাত-পায়ের বাঁধন। সাথে সাথেই এক লাফে নেমে পড়লো স্টিউটলি গাড়ি থেকে।

‘আরে! ওই দেখো! কে ওই লোকটা? দস্যুটার বাঁধন কেটে দিল! ধরো, ধরো ওকে!’ চেঁচিয়ে উঠলেন শেরিফ। নিজেই ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে এলেন দ্রুতবেগে সাঁই করে চালালেন উন্মুক্ত তলোয়ার।

ঝনাৎ করে ঠেকিয়ে দিল লিটল জন শেরিফের আঘাত। ছদ্মবেশের নিচ থেকে ইতিমধ্যেই বের করে ফেলেছে সে নিজের তরবারী। আঘাত ঠেকিয়েই ইচ্ছে করলে নিজের তরবারীটা সেঁধিয়ে দিতে পারতো শেরিফের গলায়, কিন্তু তা না করে বাম হাতে খপ্ করে চেপে ধরলো সে শেরিফের তলোয়ার ধরা হাতের কব্জি। জোরে এক মোচড় দিতেই হাত থেকে ছেড়ে দিলেন শেরিফ তরবারীটা। চট্ করে সেটা তুলে নিয়ে উইল স্টিউটলির দিকে বাড়িয়ে দিল লিটল জন। ‘নাও, ধরো এটা। মাননীয় শেরিফ ধার দিয়েছেন এটা তোমাকে। জলদি, আমার পিঠে পিঠ দিয়ে দাঁড়াও, উইল-মেরে-কেটে বেরোতে হবে এদের মধ্যে থেকে।

খ্যাপা ষাঁড়ের মত চেঁচিয়ে উঠলেন শেরিফ, ‘ঝাঁপিয়ে পড়ো, ঝাঁপিয়ে পড়ো সবাই এদের ওপর, একসাথে!’

ঠিক এমনি সময়ে বেজে উঠলো রবিনের শ