ভূমিকা
অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, আমি গল্পের প্লট কীভাবে নির্ধারণ করি? পুরোটাই ইমাজিনেশন, নাকি বাস্তবতাও আছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি একটু দ্বিধায় পড়ে যাই, আসলেই তো, গল্পে কী থাকে শুধুই কল্পনা? নাকি বাস্তবতাও?
ভেবে দেখলাম, দুটোই থাকে। চারপাশে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনার নির্যাস যেমন থাকে, তেমনি থাকে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখকের অসীম কল্পনার যৌক্তিক জগতও। অর্থাৎ বাস্তব কোনো ঘটনা যদি গল্পের শেকড় হয়, তবে তার বৃক্ষ কিংবা ডালপালা হয়ে ওঠে লেখকের ইমাজিনেশন।
কল্পনা ও বাস্তবতার এই দারুণ খেলা সম্ভবত লেখকমাত্রই উপভোগ করেন। আমিও। বিশেষ করে এই উপন্যাসে সেটি দারুণভাবেই করেছি।
প্রিয়তম অসুখ সে-উপন্যাসটির গল্পভাবনা আমার মাথায় প্রথম আসে মূলত দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুটি সংবাদ দেখে। প্রতিদিনই আমাদের দেশে বিচিত্র সব ঘটনা ঘটে। তাতে আনন্দ যেমন থাকে, থাকে বেদনাও। তবে পত্রিকা-টেলিভিশনগুলো সাধারণত চমকপ্রদ খবর ছাপাতেই বেশি আগ্রহী থাকে। এই উপন্যাসের প্লটও তেমনই চমকপ্রদ কিছু খবর থেকে উৎসারিত। বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে পরে যুক্ত হয়েছে। লেখকের কল্পনাপ্রবণতাও। আমার ধারণা, পাঠক সেই বাস্তব ও কল্পনার জগতে ঢুকে যেতে যেতে চমকে যাবেন, আপুত ও আহত হবেন। আবার প্রবল ভালোবাসা ও মমতায় আচ্ছন্ন হবেন।
প্রিয় পাঠক, ভালোবাসা, ঘৃণা, রহস্য ও রোমাঞ্চের এই বহুমুখী জগতে আপনাকে আমন্ত্রণ।
সাদাত হোসাইন
আগারগাঁও
০৯. ০২. ২০২২
০১. অপরিচিত নম্বর
ফোনটা এল ঠিক বেলা দুটোয়। অপরিচিত নম্বর। অনিক প্রথমে ভেবেছিল ধরবে না। কিন্তু কী ভেবে শেষ পর্যন্ত ধরল সে। ওপার থেকে খসখসে পুরুষ কণ্ঠটা বলল, তুমি অনিক?
জি।
আমি তোমার আব্বার রুমমেট, ছাত্তার চাচা। মেসে একই সাথে থাকি। তোমার সাথে দেখাও হইছে।
জি চাচা। কেমন আছেন?
এই তো…আছি কোনোরকম। ওপারের কণ্ঠটা থমথমে।
অনিক উদ্বিগ্ন গলায় বলল, কোনো সমস্যা, চাচা?
একটু…। বলে সামান্য থমকাল লোকটা। তারপর বলল, তোমার আব্বা অসুস্থ।
আব্বা অসুস্থ! কপাল কুঁচকে বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি করল অনিক। তার বাবা শাখাওয়াত হোসেন পেশায় গাড়িচালক। থাকেন মিরপুরের এক মেসে। গত রাতেও তার সঙ্গে কথা হয়েছে। অথচ এইটুকু সময়ের ব্যবধানেই তিনি কী এমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে তাকে অন্য কাউকে দিয়ে ফোন করাতে হলো?
কী হয়েছে আব্বার?
অ্যাকসিডেন। গাড়ি অ্যাকসিডেন করছে।
অনিক একঝটকায় উঠে দাঁড়াল। হলের ডাইনিংয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানায় কেবল গা এলিয়ে দিয়েছিল সে। তৃতীয় বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। সারা বছরের প্রস্তুতিহীনতায় পরীক্ষার আগের এই রাতটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিতে চেয়েছিল সে। কিন্তু তা আর হলো না। তাকে এখুনি বেরিয়ে যেতে হবে।
অনিক আবিষ্কার করল তার গা কাঁপছে। দুই কানের পাশ দিয়ে সরু ঘামের উষ্ণ প্রস্রবণ নামতে শুরু করেছে। নিশ্চয়ই বাবার গুরুতর কিছু হয়েছে। না হলে এ সময়ে এভাবে তাকে ফোন করে জানানোর কথা নয়। সে যতটা সম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করল। বলল, আব্বা এখন কোথায়?
হাসপাতালে।
কোন হাসপাতালে?
ঠিকানা বলল লোকটা। অনিক বলল, আপনি কি আমাকে বলবেন যে আব্বার অবস্থা কতটা খারাপ?
লোকটা কথা বলল না। অনিক বলল, চাচা, আমাদের সবকিছুই আপনি জানেন। আব্বার খারাপ কিছু হয়ে গেলে আমাকেই সব সামলাতে হবে। ফলে আমার কাছে কিছু লুকিয়ে লাভ নেই। আমার মা, ছোট বোন গ্রামে থাকে। ওদের কথাও আমাকেই ভাবতে হবে।
বাবা, তুমি তাড়াতাড়ি আসো। তার অবস্থা ভালো না। মাথায় আঘাত লাগছে। রক্ত গেছে অনেক। সময় বেশি নাই।
অনিক যতক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছাল, ততক্ষণে শাখাওয়াত হোসেন মারা গেছেন। তার নিথর শরীর পড়ে আছে হাসপাতালের ধবধবে সাদা বিছানায়। আপাদমস্তক আবৃত সেই শরীর দেখে অনিকের কান্নাকাটি করার কথা ছিল। কিন্তু কেন যেন কাঁদল না সে। বরং একধরনের আশ্চর্য নির্লিপ্ততা তাকে অসাড় করে রাখল। যেন এই জগতের কোনো কিছুতেই আর কিছু যায়-আসে না তার। সে দীর্ঘ সময় বাবার বিছানার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। একা। নিঃশব্দ। বাবার ওই ফ্যাকাশে, প্রাণহীন মুখটাও আর দেখতে ইচ্ছে করছিল না তার।
রাতে যখন সে বাবার লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরছিল, তখন পদ্মায় তুমুল ঢেউ। আকাশজুড়ে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে অসংখ্য তারা জোনাক পোকার মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। ফেরিতে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটার গা ঘেঁষে চুপচাপ দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর তার হঠাই মনে হলো, সে আসলে কিছু ভাবছে না। না বাবার কথা,
মায়ের কথা, কিংবা অন্য কিছু। কেবল এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে ক্রমশই গ্রাস করে ফেলছে। ওই শূন্যতা থেকে উঠে আসার ক্ষমতা তার নেই।
হৃদির ফোনটা এল তখুনি। এর আগেও বেশ কবার ফোন করেছে সে। কিন্তু এত ঝামেলার মধ্যে আর কথা বলতে ইচ্ছে হয় নি অনিকের। বাবার মৃত্যুর খবর জানাতে হয়েছে বাড়িতে। তার পর থেকেই একের পর এক ফোন। সেই সব ফোনও ধরতে ইচ্ছে করছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল, ফোনটা বন্ধ করে রাখে। কিন্তু এই সময়ে সেটি সম্ভব নয়। ফলে অনবরত কথা বলতে হয়েছে। এখন এই মাঝরাতে যখন সবকিছু সুন সান, খানিক অবসর, তখন ফোনটা ধরল অনিক। হৃদি থমথমে গলায় বলল, আমি তোমাকে কতবার ফোন করেছি, জানো?
না।
না মানে কী? তুমি ফোন দেখো নি?
দেখেছি।
তাহলে?
অনিক জবাব দিল না। চুপ করে রইল। হৃদি বলল, কী হলো? কথা বলছ না কেন?
সব সময় কথা বলতে ইচ্ছে হয়, হৃদি?
অনিক খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কথাটা বলল। কিন্তু হৃদি কেন যেন থমকে গেল। বলল, কিছু হয়েছে, অনিক?
কী হবে?
সত্যি করে বলো?
অনিক কথা বলল না। হৃদি বলল, তুমি কোথায়? তোমার চারপাশে কিসের শব্দ?
অনিক এবারও কথা বলল না। বাবার মৃত্যুর খবরটা কেন যেন কাউকে দিতে ইচ্ছে করছে না তার। হৃদিকেও না। মানুষ কেন প্রিয়জন বিয়োগের খবর সবাইকে বলে বেড়ায়? এতে কি তার দুঃখ কিছু কমে, নাকি সে শোক সইবার জন্য খানিক সান্ত্বনা চায়? অনিক জানে না। তার কেবল মনে হচ্ছে, বাবা বুঝি এখনো মিরপুরের ছোট্ট ওই ঘুপচি মেসঘরটাতে শুয়ে আছেন। ছুটির দিনে সে গেলেই আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বলবেন, কিরে, কিছু খেয়েছিস? না খেলে বস। আজ আলু দিয়ে গুঁড়া মাছের চচ্চড়ি করেছি। খেয়ে দেখ। জিবে সাবান ঘষেও স্বাদ ওঠাতে পারবি না।
অনিক অবশ্য বাবার রান্না খুব একটা খায় নি। এর কারণও আছে। বুয়ার পয়সা বাঁচাতে বাবা নিজেই রান্না করতেন। আর সেই ব্যঞ্জনে তেল-নুন-মসলার অপ্রতুলতা এত তীব্র ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ থাকত যে তা মুখে তোলা যেত না। ফলে ইউনিভার্সিটির হলের খাবারই বরং তার কাছে অধিক সুস্বাদু মনে হতো। বাবা অবশ্য কোরবানির ঈদে তাকে গরুর মাংসের স্টেক বানিয়ে খাওয়ানোর কথা বলেছিলেন। বাবার এই এক অভ্যেস। ভালো, পছন্দের কিছু কোথাও দেখলেই তা তাদের জন্য রপ্ত করতে চাইতেন। হয়তো এটাও তেমন কিছুই। কিন্তু কোরবানির ঈদের এখনো তিন মাস বাকি! তাদের একসঙ্গে বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। বাবার লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের গা ঘেঁষে অনিক দাঁড়িয়ে আছে। তারা একসঙ্গেই বাড়ি যাচ্ছে। সে আর বাবা। কিন্তু তাদের মাঝখানে এক জীবনের দূরত্ব।
হৃদি বলল, কী হলো, কথা বলছ না কেন?
অনিক আরও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আচমকা ফোন কেটে দিল। হৃদি আবার ফোন করল। আবার। কিন্তু অনিক আর ধরল না। সে ফোন বন্ধ করে রাখল।
এই মুহূর্তে লোকটাকে দেখতে পেল সে। ফেরির মৃদু আলোয় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে ঘন দাড়ি। মাথায় ক্যাপ। বয়সটা ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পারল না অনিক। তবে লোকটা সিগারেট খাচ্ছিল। শেষ ধোঁয়াটুকু তখনো তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বের হচ্ছে। খুব অভ্যস্ত ভঙ্গিতে অনিকের পাশে এসে দাঁড়াল সে। তারপর অ্যাম্বুলেন্সের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, আপনার বাবা?
অনিক মৃদু মাথা নাড়ল। তবে মুখে জবাব দিল না।
কী করে হলো?
অ্যাকসিডেন্ট।
উফফ! অস্ফুট স্বরে বলল লোকটা। স্পট ডেড?
অনিক এবার আর কথা বলল না। লোকটা আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখল। তারপর বলল, সরি। আমার হয়তো এ সময়ে এসব কথা জিজ্ঞেস করা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু আপনাকে একা একা এই রাতে একটা লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে যেতে দেখে।
কেমন যেন লাগল! তার গলায় সহানুভূতির সুর।
ঢাকায় আমাদের কেউ নেই।
ওহ্। বলে চুপ করে রইল লোকটা। তারপর দীর্ঘ সময় শেষে আবার জিজ্ঞেস করল, কী করেন আপনি?
পড়ছি।
কিসে?
থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে।
ওহ্। বলে আবার চুপ করে রইল। তারপর বলল, পরে নিশ্চয়ই পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে? না, মানে…যদি ডিপার্টমেন্টে ইনফর্ম করে রাখেন?
আমি কাউকে কিছু জানাই নি।
কেন?
অনিক এই প্রশ্নেরও উত্তর দিল না। লোকটার এসব উদ্ভট প্রশ্ন তার ভালো লাগছে। বাকি সময়টুকু সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটাও। তবে ফেরি থেকে ঠিক নামার আগে আগে লোকটা হঠাৎ বলল, আপনি চাইলে আমি আপনার সঙ্গে কিছু দূর যেতে পারি।
মানে? ভারি অবাক হলো অনিক।
না, মানে…। ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল লোকটা। বিষয়টা আপনার কাছে উদ্ভট মনে হতে পারে। হওয়ারই কথা। আমি আসলে এখানে কোনো কাজে আসি নি। প্রায়ই মাওয়া ঘাটে ঘুরতে আসি একা একা। ভাসমান ফেরিতে বসে পানিতে জোছনা দেখি। এটা একটা নেশার মতো ব্যাপার। ভালো লাগে একা একা ঘুরতে। তবে এতে অনেক ইন্টারেস্টিং ব্যাপারও ঘটে।
সামান্য থেমে দম নিল লোকটা। তারপর বলল, অনেক ধরনের লোকের সঙ্গে দেখা হয়। অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা জানা হয়। আপনি হয়তো আমাকে পাগল ভাবছেন। কিন্তু জগতে কত ধরনের মানুষই তো থাকে। তাই না?
অনিক এবারও জবাব দিল না। তার লোকটাকে আর একটুও ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে, বিশেষ কোনো মতলব আছে মানুষটার। না হলে প্রথম থেকেই এভাবে আগবাড়িয়ে কথা বলত না। তা ছাড়া প্রথম দেখাতেই সে চট করে জিজ্ঞেস করেছে, অ্যাম্বুলেন্সে তার বাবার লাশ কি না। এ কথা তো তার জানার কথা নয়! অনিকের হঠাৎ অস্বস্তি হতে লাগল। একটা ভয়ও। এই প্রায় মাঝরাতে সে একা একটা মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে! বিষয়টা যে কারও জন্যই ভয়ের। কিন্তু এতক্ষণ এসব কিছুই মাথায় আসে। নি তার। অথচ এখন লোকটার কথা শুনে প্রবল অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কোথাও কোনো ঝামেলা আছে।
লোকটা বলল, অনেকক্ষণ ধরেই আপনাকে দেখছিলাম আমি। মানুষ দেখা আমার স্বভাব বলতে পারেন। পথে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে মানুষ দেখি। আপনি ফোনে আপনার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। সেখান থেকেই শুনেছি যে আপনার বাবা মারা গেছেন। আর এখন হঠাই মনে হলো, আপনার সঙ্গে কেউ একজন থাকলে হয়তো আপনার ভালো লাগবে। নাথিং এলস।
না। ধন্যবাদ। বলেই গাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে গেল অনিক। সে জানে না কেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে তার হঠাৎ গা ছমছম করতে লাগল।
.
অনিক বাড়ি পৌঁছাল ফজরের আজানের সময়। চারদিকে তখন সুনসান নীরবতা। শেষরাতের শীতল আবহাওয়ায় কেমন একটা হাহাকারের সুর। সেই হাহাকারে মায়ের মিহি গলার গুনগুনে কান্নাটা যেন ধারালো সুতোর মতো তীক্ষ্ণ। তাতে কেটে ফালি ফালি হয়ে যেতে লাগল ভোরের অন্ধকার। অনিকের অকস্মাৎ মনে হলো, এটা একটা স্বপ্নের মতো। কিছুক্ষণের মধ্যে এই নিস্তব্ধ বাড়ি ভরে যাবে মানুষে। উঠানের এখানে সেখানে। চেয়ার পেতে গল্প জমে উঠবে। পুকুরধারের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটা হবে। কবর খোঁড়া হবে উত্তর দিকের রাস্তার ধারে। মা বার কয়েক মূৰ্ছা যাবেন। তার ছোট বোন আয়েশা এসে তাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদবে। আত্মীয়স্বজন-পাড়া-প্রতিবেশী এসে সান্ত্বনা দিতে থাকবে। আর বাবার লাশটা নিঃসাড় পড়ে থাকবে খাঁটিয়ায়। তারপর এই সব শোকের উদযাপন ফুরিয়ে যাবে। এই যে ঘর, এই যে উঠান, ওই যে বাঁশবাগান–সকলই পড়ে থাকবে আগে যেমন ছিল, তেমন। কেবল ওই মানুষটাই থাকবে না। কিংবা যতটুকু ছিল, তাও ক্রমশ বিলীন হয়ে যেতে থাকবে। জলে জমে ওঠা বুদবুদের মতো। মানুষ কিংবা জীবন তো জলের বুদবুদই। সময়ের শরীরে জেগে ওঠে। তারপর মিলিয়ে যায়। সেই মিলিয়ে যাওয়া চিরন্তন। আর কখনো জেগে ওঠে না। লীন হয়ে যেতে থাকে বিস্মৃতিতে। মৃত্যুর ওই সময়টুকুতেই বরং সবচেয়ে বেশি জেগে ওঠে জীবন। একজীবনে মৃত্যু ছাড়া এতটা আড়ম্বরে কি আর কখনো উদ্যাপিত হয় জীবন?
অনিকের মনে হয় না। আর হয় না বলেই হয়তো সকলে হঠাৎ উচ্চকিত হয়ে ওঠে। যে মানুষটির সঙ্গে কারও কখনো কথা বলার ফুরসত মেলে না, তারাও তার মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে আসে। আফসোস করে। স্মৃতিতাড়িত হয়। যেন এই জীবনে ওই মৃত মানুষটির সঙ্গে এই শেষ স্মৃতিটুকুই তার শ্রেষ্ঠ সঞ্চয়। এই যে স্মৃতিকাতরতা, এই যে দুঃখবোধ, শূন্যতা–এ সবই তো মানুষের বেঁচে থাকা। কিন্তু এই পরিপূর্ণ বেঁচে থাকাটুকু সমবেত স্বরে জেগে ওঠে কেবল ওই মৃত্যুতেই। তারপর মিলিয়ে যেতে থাকে জলের বুদ্বুদ জীবনের মতোই।
.
অনিক ঢাকায় ফিরল প্রায় কুড়ি দিন পর। এই সময়টাতে সে কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করে নি। হৃদি দিনের পর দিন ফোন করেছে। কাছের বন্ধুরা খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু লাভ হয় নি। কারণ, তার ফোন বন্ধ। আজ যখন সে হলে এসে উঠেছে, তখন চারদিকে মোটামুটি হইচই পড়ে গেল। পরীক্ষার মাঝখানে হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়েছিল সে। ফলে রাজ্যের উল্কণ্ঠা, দুশ্চিন্তা নিয়েই অপেক্ষা করছিল সবাই। অনিক অবশ্য শান্তই রইল। খুব একটা কথা বলল না কারও সঙ্গে। হৃদির সঙ্গে তার দেখা হলো বেশ কিছুদিন পর। তত দিনে পরীক্ষা শেষ। অনেকেই ছুটি কাটাতে বাড়ি চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ ট্যুর দিচ্ছে এখানে-সেখানে। কেবল অনিকই পড়ে রইল একা।
সেদিন সন্ধ্যায় কলাভবনের পাশের নির্জন মাঠের মতো জায়গাটায় খানিক আড়াল দেখে বসল তারা। তবে সেই বসে থাকাটা ভীষণ আড়ষ্টতারও। যেন দুজনের মাঝখানে অদৃশ্য এক দেয়াল চুপি চুপি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ওই দেয়ালখানা তারা কেউ ডিঙাতে পারছে না। অনিক মাথা নিচু করে সসংকোচ বসে আছে। হৃদি বলল, আমি এ কদিন কেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসি নি, তুমি জানো?
হুম। অনিক হৃদির দিকে তাকাল না। তবে মৃদু জবাব দিল।
কেন?
তোমাকে কিছু জানাই নি বলে।
কেন জানাও নি?
আমার খুব খারাপ লাগছে। কতটা খারাপ লাগছে আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না। মনে হচ্ছে এই সবকিছুর জন্য আমিই দায়ী। একটা প্রচণ্ড অপরাধবোধ কাজ করছে।
অপরাধবোধ! বাবার মৃত্যুতে? ভ্রু কুঁচকে তাকাল হৃদি।
কিসের অপরাধবোধ?
এই প্রশ্নে অনিক চুপ করে রইল। হৃদি বলল, আমরা কাউকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছি বলে?
অনিক এবারও জবাব দিল না। চুপ করে রইল। তার পায়ের কাছে জেগে ওঠা ঘাসের ডগাগুলো আঙুলের ডগায় মিইয়ে দিতে থাকল সে। হৃদি বলল, বলো? এ ছাড়া তো আর কোনো কারণ নেই। আছে?
অনিক বেশ খানিকটা সময় চুপ করে থেকে বলল, ঠিক তা নয়।
তাহলে?
আসলে…তুমি তো জানো, আব্বা খুব চাইতেন গ্রামে ফিরে যেতে। খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বয়স বেড়ে যাচ্ছিল। নানান অসুখবিসুখ। তার ওপর দিনরাত এত পরিশ্রমের কাজও আর ভালো লাগছিল না। কিন্তু উপায়ও তো ছিল না। আমার কিছু একটা না হওয়া অবধি তো ওনার পক্ষে বাড়ি ফিরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। এ জন্যই সারাক্ষণ ফোন করে বলতেন, তোর পাস করতে আর কত দিন লাগবে? পড়াশোনা কবে শেষ হবে? চাকরি কবে পাবি?
অনিকের গলা ভার। সে তার ভাঁজ করা দুই হাঁটুর মাঝে মুখ লুকিয়ে ফেলল। একটা ফুরফুরে হাওয়া কোথা থেকে উড়ে এসে ভ্যাপসা গরমটা কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ হলো না। এই তপ্ত সন্ধ্যায় দরদর করে ঘামতে লাগল সে। হৃদি ডাকল, অনিক?
অনিক সাড়া দিল না। হৃদি আলতো করে হাত রাখল তার মাথায়। আর তখুনি সে আবিষ্কার করল, অনিক কাঁদছে। নিঃশব্দ কান্না। তবে তার কান্নায় থরথর করে কাঁপছে শরীর।
হৃদি অস্থির গলায় ডাকল, অনিক, অনিক?
অনিক এবারও কথা বলল না। সে প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগল তার কান্না সংবরণ করতে। কিন্তু কতটা পারল, তা ওই আবছা অন্ধকারে বোঝা গেল না। হৃদি অনিকের পাশে সরে এল। তারপর এক হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি কি জানো আমি তোমায় কতটা ভালোবাসি?
অনিক কথা বলল না। হৃদি বলল, জানো না?
অনিক মাথা নাড়ল। হৃদি বলল, তোমার এই যে এত খারাপ সময় যাচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে, তা তুমি আমায় বলবে না?
অনিক চোখ তুলে তাকাল। হৃদি বলল, আমরা যদি আমাদের দুঃসময়টা ভাগাভাগি করে নিতে না পারি, একজনের কষ্ট অন্যজন বহন করতে না পারি, তাহলে আমাদের ভালো সময়টা পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে পৌঁছাব কী করে? আর যদি পৌঁছাইও, তখন দেখব সেখানে আমরা আর একসঙ্গে নেই। আলাদা। তাহলে? এই যে তোমার জন্য আমার এত কষ্ট হয়, হাহাকার লাগে, এসবই কি অর্থহীন?
অনিক তার হাতের মুঠোয় হৃদির হাতখানা শক্ত করে ধরল। তারপর ফ্যাকাশে গলায় বলল, আমার খুব গিল্টি ফিলিং হচ্ছে, হৃদি। প্রচণ্ড খারাপ লাগছে।
খারাপ লাগাটা তো স্বাভাবিক। এর চেয়ে খারাপ কিছু তো আর হতে পারত না। কিন্তু গিল্টি ফিলিং কেন হচ্ছে তোমার?
এই প্রশ্নে আবারও চুপ করে রইল অনিক। তারপর বলল, এত দিনে আমার পড়াশোনাটা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তুমি জানো, হয়তো একটা চাকরিবাকরিও কিছু জুটিয়ে নিতে পারতাম। আর তা হলে, আব্বার জন্য যে সেটা কত বড় রিলিফ হতো, আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না। কিন্তু আমি সেসব কিছুই করি নি…। আমি কিনা ঝোঁকের মাথায় তোমাকে বিয়ে করে ফেললাম…।
ঝোঁকের মাথায় না। অনিককে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল হৃদি। আমি তোমাকে জোর করে বিয়ে করতে বাধ্য করেছি। তাই তো?
তুমি কেন বাধ্য করবে? কারও ইচ্ছে না থাকলে কেউ কি তাকে বাধ্য করতে পারে?
হৃদি কথা বলল না। কেমন গম্ভীর আর জড়সড় হয়ে গেল সে। অনিক বলল, তুমি আমাকে ভুল বুঝছ, হৃদি।
ভুল কেন বুঝব, অনিক? এটা তো সত্যিই। তুমি তো ওভাবে হুট করে বিয়েটা চাও নি। আমার কারণেই ঘটনাটা ঘটেছে। হঠাৎ কী খেয়াল চাপল মাথায়! আর তারপর তুমিও খুব প্রেশার নিয়ে নিলে। একের পর এক সেমিস্টার ড্রপ। টিউশন করাতে লাগলে রাতদিন। বাড়িতে টাকা পাঠাতে চাইতে।
কী করব, বলো? ফোন করলেই আব্বা জিজ্ঞেস করতেন, কবে চাকরি পাব, কবে পাস করব। আর তখন খুব ভয় হতো আমার। মনে হতো, এই বুঝি তিনি কোনোভাবে বিয়ের ঘটনাটা জেনে গেছেন। আর জেনে গেলে এত কষ্ট পেতেন! তুমি জানো না, আব্বা শেষ দিকে খুব বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিলেন!
বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিলেন মানে?
এই প্রশ্নে অনিক চুপ করে রইল। হৃদি বলল, বলো?
অনিক বেশ খানিকটা সময় চুপ করে থেকে বলল, আব্বা শেষ কিছুদিন প্রচণ্ড অস্থির হয়েছিলেন। কেন যেন খুব ভয়ও পেতেন। তবে ঠিকঠাক কাউকেই কিছুই খুলে বলতেন না। মা বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করলেই প্রচণ্ড রেগে যেতেন। তার অস্থিরতাটা টের পাওয়া যেত।
কী হয়েছিল?
তা তো জানি না। তবে শেষের দিকে মাকে নাকি বেশ কিছু টাকাও পাঠিয়েছিলেন আব্বা। বলেছিলেন, এবার যে করেই হোক বাড়ি ফিরে যাবেন তিনি। ঢাকায় আর থাকবেন না।
তারপর?
তারপর আর কী? বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অনিক। ছাত্তার চাচা আমাকে ফোন করে জানালেন যে আব্বা অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার কি জানো?
কী?
উনি আমার সঙ্গে গ্রামের বাড়ি যেতে চাইলেন না। ওনার যাওয়া উচিত ছিল না?
হ্যাঁ।
অথচ উনি সবকিছু ঠিকঠাক করে দিয়ে একদম শেষ মুহূর্তে বললেন ওনার নাকি কী একটা ঝামেলা আছে, উনি যেতে পারবেন না।
তুমি একা চলে গেলে? একদম একা? আর কেউ ছিল না?
নাহ্, আর কেউ ছিল না। কথাটা বলতে বলতেই যেন অকস্মাৎ থমকে গেল অনিক। সেদিন গভীর রাতে ফেরিতে দেখা সেই মানুষটার কথা নানা ঝামেলায় এ কদিনে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে লোকটার কথা আবার মনে হলো তার। সঙ্গে সঙ্গেই কেমন একটা গা-ছমছমে অনুভূতি হলো। অত রাতে ওখানে কী করছিল লোকটা? তা ছাড়া তার কথাগুলোও খুব একটা স্বাভাবিক মনে হয় নি অনিকের। তবে তখন যতটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে, এখন যেন তার চেয়েও ঢের বেশি রহস্যময় মনে হচ্ছে। আচ্ছা, বাবার মৃত্যুটা কি স্বাভাবিক? শেষ কিছুদিনে বাবা তাহলে অমন অস্থির আর সন্ত্রস্ত হয়েছিলেন কেন? অতগুলো টাকাই-বা কোথায় পেয়েছিলেন তিনি?
২
ছাত্তার মিয়ার পান খাওয়া লাল দাঁত। দাঁতের ফাঁকে এটা-সেটা আটকে থাকে। সে সেই পান খাওয়া লাল দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, আমি তো বাবা অত কিছু জানি না। আমারে একজন অফিস থিকা ফোন দিয়া বলল, তোমার আব্বার গাড়ি অ্যাকসিডেন হইছে। তার অবস্থা ভালো না। আমি তখন কুমিল্লা থিকা ট্রিপ নিয়া আসতেছিলাম। ঘটনা ঘটছে চিটাগাং রোডে। আমার পৌঁছাইতে বেশি সময় লাগে নাই। গিয়া দেখি অবস্থা ভালো না।
আব্বা কিছু বলেছিলেন আপনাকে?
না। কথা বলনের মতো অবস্থায় তোত সে ছিল না।
গাড়িতে কী ছিল?
কী আর থাকব? আমরা গার্মেন্টসের গাড়ি চালাই। আমাদের গাড়িতে পোশাক আশাক অথবা টেক্সটাইল মিলের সুতা, ডাইং-স্পিনিংয়ের কাঁচামাল–এই সবই থাকে।
হুম। বলে সামান্য চুপ করে রইল অনিক। তারপর বলল, আব্বা বেতন পেতেন কত?
আমার আর তার বেতন সমানই। হাজার পনেরোর মতো।
আচ্ছা। বলে আবারও চুপ করে রইল অনিক। ছাত্তার মিয়া বলল, কেন? কোনো সমস্যা?
অনিক বেশ কিছু সময় কী ভাবল। সে বুঝতে পারছে না কথাটা বলা তার ঠিক হবে কি না। বেশ কিছুদিন ধরে এই বিষয়টা নিয়ে ভেবেছে সে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে নি। আজ ঘুম থেকে উঠেই তার হঠাৎ মনে হলো, বিষয়টা নিয়ে কথা বলবে সে। তাতে যদি ভুল কিছু হয় তো হবে। তারপরও নিজের ভেতরে যে তীব্র অস্বস্তির যন্ত্রণাটা সে বয়ে বেড়াচ্ছে, তা একটু হলেও প্রশমিত হবে।
আব্বা মারা যাওয়ার আগে বাড়িতে বেশ কিছু টাকা পাঠিয়েছিলেন। শান্ত গলায় বলল অনিক।
টাকা! যেন চমকে উঠল ছাত্তার।
হুম।
কত টাকা?
অনেক।
অনেক কত?
অনিক ইচ্ছে করেই ছাত্তারের কৌতূহল বাড়াচ্ছে। তার স্থির দৃষ্টি ছাত্তারের চোখে। ছাত্তার অধৈর্য গলায় বলল, কত?
এই ধরেন লাখ দুয়েক।
ছাত্তার অবশ্য তার চমকে ওঠাটা লুকাল না। সে বিস্মিত ভঙ্গিতে বলল, এত টাকা!
জি।
কত দিন আগে?
এই তো মাস দেড়েক।
এত টাকা শাখাওয়াত ভাই কই পাইলেন?
সেটা তো আমারও প্রশ্ন। মাকে ফোন করে বললেন যে মা যেন ভালো দেখে একটা জমি কেনে গ্রামে। এইটা বায়নার টাকা। সব ঠিক হলে আব্বা পরে বাকি টাকা পাঠিয়ে দেবেন।
পরে আর পাঠায় নাই?
না।
তোমার মা জিজ্ঞাস করে নাই যে হঠাৎ এত টাকা সে কই পাইছে?
করছে। কিন্তু আব্বা কিছু বলেন নাই। আর শেষের দিকে মা কিছু জিজ্ঞেস করলেই রেগে যেতেন।
হুম। বলে গম্ভীর হয়ে গেল ছাত্তার। তারপর বলল, জমি কিনছে তোমার মা?
বায়না করছে। কিন্তু এখন তো আর কিনতে পারবে না। ছাত্তার আর কথা বলল না। অনিক বলল, চাচা, আপনারে একটা কথা বলি?
বলো।
আব্বার মৃত্যুটা কি স্বাভাবিক?
মানে?
মানে আপনি আমাকে সত্যি করে বলবেন। আপনি ভালো করেই জানেন, অস্বাভাবিক হলেও আমি কিছুই করতে পারব না। সেই ক্ষমতাও আমার নাই। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে, আব্বার কী হয়েছিল?
ছাত্তার এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। তবে সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, তোমার একটা ছোট বইন আছে?
জি।
ওর বয়স কত?
বারো।
তোমার উপর এখন অনেক দায়িত্ব। এত দিন যা-ই করছ না করছ, এখন একটু দায়িত্ব নিয়ে বাবা। তোমার উপরে এমনিতেই তোমার আব্বার অনেক মন খারাপ আছিল। কিন্তু সে কখনো বলতে পারত না।
আমি জানি, চাচা। বলে চুপ করে রইল অনিক। তারপর বলল, আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিলেন না?
কী প্রশ্ন?
আব্বার মৃত্যুটা কি স্বাভাবিক ছিল?
অ্যাকসিডেন তো আর স্বাভাবিক ঘটনা না। দুর্ঘটনা। এ ছাড়া আর কী?
আর কিছুই না?
নাহ্। আর কী হইব?
আর কিচ্ছু না? অনিক জোর দিয়ে জানতে চাইল।
না বাবা। আর কিছু না। তোমার আব্বায় ভালো লোক ছিল। আর বাড়িতে যাওয়ার জন্য খুব অস্থির হয়ে গেছিল। তুমি তো জানোই, নানা অসুখবিসুখ তার ছিল। তার উপর রাতের পর রাত গাড়ি চালাইতে হইত। মাইলের পর মাইল। গার্মেন্টসের মাল নিয়া চিটাগাং, ময়মনসিংহ, খুলনা। এক ট্রিপ রাইখা সাথে সাথেই আবার আরেক ট্রিপ। একটু রেস্টও মিলত না। কিন্তু সে যে বাড়ি যাইব, গিয়া খাইব কী? তোমাদের তো কোনো জমিজমাও নাই যে চাষবাস করব। তার ওপর তোমার পড়াশোনাও শেষ হয় না। এইটা নিয়াও ভিতরে ভিতরে খুব অস্থির হইয়া গেছিল সে।
বলে একটু থামল ছাত্তার। তারপর বলল, শোনো, আমার ডিউটিতে যাইতে হইব। পরে আবার তোমার সাথে কথা হইব। এখন আমি তাইলে যাই। বলেই হাঁটতে শুরু করল সে। ছাত্তার থাকে খুপরিঘরের মতো ছোট এক বাসায়। এই বাসায়ই অনিকের বাবা থাকত। কিন্তু আজ কেন যেন আর ঘরের ভেতর ঢুকতে ইচ্ছে করল না অনিকের। সে বেশ খানিকটা সময় একা একা দাঁড়িয়ে রইল বাইরে। তার বার কয়েক মনে হলো, এই বুঝি বাবা সামনের ওই ঘর থেকে বেরিয়ে আসবেন। সে যখন মাঝেমধ্যে হাতখরচের টাকার জন্য আসত, বাবা তখন বাসার সামনের এই ফাঁকা জায়গাটাতে এসে দাঁড়াতেন। তারপর তার সঙ্গে এটা-সেটা নিয়ে গল্প করতেন। সেই সব গল্পের বেশির ভাগই ছিল তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়া নিয়ে। একটা মানুষ তার জীবনের প্রায় পুরোটাই কাটিয়েছেন বাড়ি ফিরে যাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে। অথচ তার সেই ফিরে যাওয়া সংঘটিত হলো চিরপ্রস্থানে।
ছাত্তার বেরিয়ে এল বেশ কিছুক্ষণ পর। কিন্তু তখনো অনিককে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু অবাকই হলো সে। বলল, তুমি এখনো যাও নাই?
এই তো যাচ্ছি, চাচা।
আচ্ছা যাও। বলেই হাঁটতে শুরু করল সে। অনিক জানে না কেন তার আচমকা মনে হতে লাগল, ছাত্তার কিছু একটা লুকাচ্ছে। কিন্তু কী লুকাচ্ছে, তা সে জানে না। সে ঘুরে উল্টো দিকে হাঁটতে লাগল। এই মুহূর্তে তাকে ডাকল ছাত্তার। তারপর তার কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়। অনিক তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। ছাত্তার কেমন ফ্যাকাশে চাপা গলায় বলল, যা হওনের হইছে। এর চাইতে খারাপ কিছু তো আর হইতে পারত না। পারত?
না।
তোমারে একটা অনুরোধ করি?
জি।
এই বিষয় নিয়া তুমি আর ঘাঁটাঘাঁটি কইরো না। যা গেছে, তা কি আর কোনো দিন ফিরা আসব?
অনিক কথা বলল না। ছাত্তার তার কাঁধে হাত রাখল। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলল, যাও। আমার কাছেও আর কখনো আইসো না। কথাটা মনে রাইখো।
৩
রোখসানা বেগমের মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ। সকাল থেকে বেশ কয়েকবার মাথায় পানি ঢেলেছেন তিনি। কিন্তু তাতে লাভ হয় নি। বরং যতবারই তিনি হৃদিকে দেখেছেন, ততবারই তার ব্রহ্মতালু গরম হয়ে গেছে। মনে হয়েছে, এখুনি তাকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। আর সম্ভব হলেও হৃদির যে তাতে কিছু যাবে-আসবে না, তা স্পষ্ট। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, সে বরং এতে খুশিই হবে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি থেকে চলে যাবে। গত রাতে সে ভয়ানক এক ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে না এমন কিছু। কখনো ঘটেছে। বরং বারান্দায় বসে নির্বিকার ভঙ্গিতে গান শুনছে সে। যেন কোথাও কিছু হয় নি।
রোখসানা বেগমের দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলে রাতুল দেশের বাইরে থাকে। হৃদি আর তিথি পড়াশোনা করছে দেশেই। ছোট মেয়ে তিথি মাধ্যমিক পাস করে সদ্য কলেজে উঠেছে। বয়সে ছোট হলেও তিথি বেশ পরিপক্ক, গোছানো, সপ্রতিভ। ফলে তাকে নিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত। তার যত দুশ্চিন্তা বড় মেয়ে হৃদিকে নিয়ে।
রোখসানা বেগমের ধারণা, এই মেয়ে তার জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলবে। তা করছেও। সে থার্ড ইয়ারে উঠতে না উঠতেই একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে চলেছে। কেমন বেপরোয়া আর খামখেয়ালি হয়ে উঠেছে। এ কারণেই একটা ভালো পাত্র দেখে তাকে বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাইছিলেন তিনি। কিন্তু হৃদির ওই এক কথা, সে এখুনি বিয়ে করবে না। বিয়ে করবে মাস্টার্স শেষ করার পর। এই নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল অশান্তি। অনেক চেষ্টা করেও তাকে কিছুতেই বোঝানো যায় নি যে এটিই তার বিয়ের আদর্শ সময়।
সমস্যা হচ্ছে, পড়াশোনাটাও ঠিকমতো করছে না সে। ইউনিভার্সিটিতে হাজারটা কাজের সাথে যুক্ত হয়েছে। সেই সব কাজ আর হইচই করেই তার জীবন কাটছে। ঘরসংসারের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তার সকল আগ্রহ সাজগোজ আর নানান। অনুষ্ঠান-আয়োজনে।
বিষয়টা নিয়ে রোখসানা বেগম যারপরনাই অস্থির হয়ে আছেন। আর এই অস্থিরতা কাটাতেই তিনি একের পর এক ছেলে দেখতে শুরু করেছেন। কিন্তু সেই ছেলেদের কাউকেই হৃদির পছন্দ হচ্ছে না। বিচিত্র সব বাহানায় সে তাদের নাকচ করে দিচ্ছে।
কিন্তু এবারের ঘটনা সবচেয়ে খারাপ। বিষয়টা শোনার পর থেকেই মাথা এলোমেলো হয়ে আছে তার। হৃদি এখনো বুঝতে পারছে না যে নিজের কত বড় সর্বনাশ সে করেছে। এই ঘটনা এখন মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়বে। আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশী অবধি নানান রটনা রটাবে। সেই রটনা কত দূর গিয়ে পৌঁছায় কে জানে!
তিনি সন্ধ্যার আগে আগে আবারও হৃদির সঙ্গে কথা বললেন, তুই সত্যি করে বল তো, ওই ছেলেকে তুই কী বলেছিস?
কোন ছেলেকে?
কোন ছেলেকে আবার? নেহালকে।
বলেছি আপনি বিয়ের আগে ঘন ঘন আমাকে ফোন করবেন না। বিষয়টা ভালো দেখায় না।
আর কিছু বলিস নি?
না।
সে ফোন করলে ভালো দেখাবে না কেন?
ভালো দেখাবে না কেন মানে কী, মা? তুমিই তো এত দিন সারাক্ষণ মিলিটারির মতো আমার ওপর নজর রাখতে, যেন কোনো ছেলের সঙ্গে আমি কথা বলতে না পারি। আর এখন সেই তুমিই বলছ একটা অজানা-অচেনা ছেলের সঙ্গে আমি রাতবিরেতে, সকাল-সন্ধ্যায় যখন-তখন কথা বলব? আর সেটাতে তুমি খারাপ কিছু দেখছ না?
সে তো আর অজানা-অচেনা কেউ না।
তাহলে? সে আমার কোন জনমের চেনা?
চেনা না হলেও চেনা হবে। তুই একটু কথা বল। বার কয়েক আলাদা দেখাসাক্ষাৎ কর। দেখবি চেনা হয়ে যাবে।
চেনাজানা তো হয়েছেই। সে বাসায়ও এসেছে কয়েকবার।
সে তো তোর বাবাকে দেখতে এসেছিল। তার অসুস্থতার খোঁজখবর নিতে।
কেন, আমাকে দেখতে আসে নাই? একদম আয়োজন করেই তো এল।
তাতে কী? কাউকে পছন্দ হলে তাকে দেখতে আসা যায় না?
দেখা তো তাহলে মিটেই গেল। আবার নতুন করে দেখাসাক্ষাতের কী আছে?
আছে। তোরা একজন আরেকজনকে চিনে নিতে পারবি।
তার সঙ্গে চেনাজানা হওয়াতে তোমার এত উৎসাহ! অথচ অন্য কারও সঙ্গে এক মিনিট কথা বলতে দিতেও তো তোমার মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত! কেন? অন্যরা বাঘ-ভল্লুক? আর এই ছেলে সুফি সাধক?
রোখসানা বেগমের প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। তবে তিনি রাগলেন না। যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলেন। বললেন, বিষয়টা তা নয়। নেহাল ছেলে হিসেবে চমৎকার। এত বড় ডিগ্রি। তার সঙ্গে তোর চারপাশে সারাক্ষণ ঘুরঘুর করা ওই সব ফালতু ছেলেকে মেলালে চলবে না। নেহাল তাদের মতো সুযোগসন্ধানী নয়।
তুমি জানো সে সুযোগসন্ধানী নয়?
অবশ্যই জানি।
কীভাবে জানো?
সে ইউরোপের মতো উন্নত জায়গায় থাকে। উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। তার কিসের অভাব যে তাকে সুযোগ খুঁজতে হবে? সে যে তোর মতো একটা মেয়েকে পছন্দ করেছে, এটাই তোর সাতজনমের ভাগ্য।
তাই?
কেন? তোর সন্দেহ আছে?
আছে।
কী সন্দেহ?
তারও অভাব আছে।
তার আবার কিসের অভাব? ভ্রু কুঁচকে বললেন রোখসানা বেগম।
তার অভাব চরিত্রের।
মানে?
মানে হলো তোমার উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, আমার সাতজনমের ভাগ্যের চরিত্রে সমস্যা আছে। সে কী করেছে, জানো?
কী করেছে?
সে বিয়ের আগেই আমাকে তার সঙ্গে শেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
কী! যেন কথাটা বুঝতে পারলেন না রোখসানা বেগম। কী বললি তুই?
কেন, তুমি বোঝো নি?
রোখসানা বেগম কথা বললেন না। তিনি হতভম্ব চোখে হৃদির দিকে তাকিয়ে রইলেন। হৃদি হঠাৎ গলা নরম করে বলল, এটা অবশ্য তার দোষ নয়, মা। সে ইউরোপ-আমেরিকায় থাকে। ওখানকার কৃষ্টি-কালচার দেখে বড় হয়েছে। সেসব থেকেই হয়তো শিখেছে। ওসব দেশে তো এগুলাই চলে, মা। বিয়ের আগেই বেশির ভাগ কাপলের বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যায়। দু-তিনটা বাচ্চা নিয়ে তারপর বিয়ে করতে যায় তারা। দৃশ্যটা একবার ভাবো? আমি তোমার ইউরোপিয়ান ডায়মন্ড জামাইকে নিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছি। আমাদের সঙ্গে একটা চার-পাঁচ বছরের ফুটফুটে বাচ্চা। সে তোমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছে, এখানে কী হচ্ছে, নানি? কী হচ্ছে এখানে? বাবা মা এমন সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে? ইন্টারেস্টিং না বিষয়টা?
রোখসানা বেগম হৃদির কথা শুনলেন কি না বোঝা গেল না। তিনি থমথমে গলায় বললেন, নেহাল সত্যি সত্যি তোকে এই কথা বলেছে?
কোন কথা?
তুই এইমাত্র যা বললি?
কী বললাম আমি?
এই যে বললি। বিভ্রান্ত গলায় বললেন রোখসানা বেগম। সে নাকি বিয়ের আগেই তোর সঙ্গে…। কথাটা পুরোপুরি শেষ করতে পারলেন না তিনি। হৃদি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে ফেলল। তারপর বলল, তুমি কি বোকা, মা?
বোকা কেন হব?
বোকা না হলে তুমি আমাকে যে কথা মুখ ফুটে বলতে পারছ না, সেই কথা ইউরোপ-আমেরিকায় থাকা ও রকম নম্র-ভদ্র-সভ্য একটা ছেলে বিয়ের আগেই আমাকে বলতে পারে? এটা তুমি বিশ্বাস করে ফেললে?
মানে কী?
মানে হলো যা শুনবে, তা-ই চট করে বিশ্বাস করে ফেলবে না। একটু ভাববে, মাথা খাটাবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেবে।
তার মানে তোকে এমন কিছু নেহাল বলে নি?
না।
তুই নেহালকে কী বলেছিস?
আমি কী বলব?
তুই নাকি বলেছিস যে তোর বিয়ে হয়ে গেছে? গোপন বিয়ে। এই বিয়ের কথা তুই বাসায় বলতে পারছিস না বলে বাসার লোকজনও তোর জন্য পাত্র দেখা বন্ধ করছে না?
মা! আহ্লাদী স্বরে ডাকল হৃদি। এই কথা তুমি বিশ্বাস করো? কোনো বুদ্ধিমতী মেয়ে নিজের সম্পর্কে এমন কথা কাউকে বলবে?
তুই তো বুদ্ধিমতী না।
বুদ্ধিমতী না হলেও বলবে না। নিজের ভালো কে না বোঝে! এই কথা যদি আমি কাউকে বলি, তাহলে তা দশজনের কানে যাবে না? আমাদের আত্মীয়স্বজন পরিচিতজনরা জানবে না? তখন কী হবে? একবার যদি এই কথা চাউর হয়ে যায় যে একটা মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তখন দেখবে মানুষের মুখে মুখেই তার বাচ্চাকাচ্চাও হয়ে যাবে। তারপর সেই মেয়েকে আর কেউ বিয়ে করবে?
রোখসানা বেগম চুপ করে রইলেন। হৃদিকে আজকাল তিনি বুঝতে পারছেন না। আগে মেয়েটাকে তার বোকাসোকা, সহজবোধ্য মনে হতো। কিন্তু ইদানীং প্রায়ই মনে হয়, এই মেয়েকে বোঝা তার সাধ্য নয়। তিনি তারপরও বললেন, তোর কোনো ছেলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নাই তো?
কার সঙ্গে আমার সম্পর্ক থাকবে? তুমিই তো বলো, আমার সঙ্গে কেউ এক দিনও টিকতে পারবে না। তো কার দায় পড়েছে আমার সঙ্গে সম্পর্ক করতে?
ওই যে, কী যেন নাম ছেলেটার? অনিক না? ওর খবর কী?
আমি জানি না, মা। এই সব অথর্ব, স্টুপিড ছেলেপুলের কথা আমাকে জিজ্ঞেস করে লাভ নাই। এদের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নাই। এই ছেলে আমাদের তিন-চার বছরের সিনিয়র ছিল। ফেল করতে করতে আর ড্রপ দিতে দিতে এখন প্রায় আমার ক্লাসমেট হয়ে গেছে। হা হা হা। এই ধরনের ইউজলেস ছেলেপুলে দেখলেই মনে হয় কষিয়ে চড় মারি।
বলেই শরীর কাঁপিয়ে হাসতে লাগল হৃদি। যেন এমন আনন্দের কথা সে বহুদিন বলে নি। রোখসানা বেগম একদৃষ্টে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু তার সেই দৃষ্টিতে আশ্বস্ত হওয়ার মতো কিছু ধরা পড়ল না। বরং তিনি ভেতরে ভেতরে সংকুচিত হয়ে গেলেন। তার কেন যেন মনে হতে লাগল, এই মেয়ে ভয়ংকর কোনো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। সেই ঘটনা থেকে যে করেই হোক তাকে বের করে নিয়ে আনতে হবে। নাহলে বিপদ।
.
অবন্তীর এই বাড়িটা খুব পছন্দের। সে ঢাকায় এলেই মেজ খালার বাসায় ওঠে। তার মেজ খালা রোখসানা বেগমদের বাড়িটা আগারগাঁওয়ে। পুরোনো আমলের দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে খানিক খোলা জায়গাও রয়েছে। সেখানে নানা রকম গাছ, লতাপাতার সমাহার। একটা বড় আমগাছ ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ দিকে। ছাদে উঠলেই সেই গাছের পাতা হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেওয়া যায়। বিষয়টা অসম্ভব ভালো লাগে অবন্তীর। মনে হয়, ইট-কাঠ-পাথরের এই শহরে এখনো খানিক মায়াময় আদুরে স্পর্শ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। গ্রাম থেকে হঠাৎ এতটা দূরে এই শহুরে কোলাহলের ভেতর এসে ওই মায়াময় স্পর্শটুকু যেন খুব দরকার ছিল তার।
অবন্তী এবার দীর্ঘদিনের জন্য ঢাকায় এসেছে। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। সে। ফলে হলে সিট পাওয়ার আগ অবধি বেশ কিছুদিন তাকে এ বাড়িতেই থাকতে হবে। এতে অবশ্য হৃদি আর তিথি খুশিই হয়েছে। অবন্তীকে তারা প্রচণ্ড পছন্দ করে। শান্ত, চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে সে। তার আচার-আচরণও সহজ। অল্পতেই মিশে যাওয়া। যায়। নিজের লুকিয়ে রাখা গোপন কথা অকপটে শেয়ার করা যায়। কাউকে বলে দেওয়ার ভয়ও থাকে না। মা সপ্তাহখানেক হলো অবন্তী এখানে এসেছে। এর আগে তারা তিনজন একসঙ্গে মিলেমিশে থাকলেও এবার যেন হৃদি আর অবন্তীর কাছ থেকে খানিক আলাদাই হয়ে পড়ল তিথি। এর অবশ্য কারণও আছে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে নানা প্রয়োজনে, জিজ্ঞাসায় হৃদিই হয়ে উঠল অবন্তীর ভরসার মূল জায়গা। তাদের যাতায়াত, গল্প, আড্ডাও হয় একই সঙ্গে। বিষয়টা রোখসানা বেগমেরও চোখ এড়ায় নি।
তিনি সেদিন ইচ্ছে করেই অবন্তীকে খানিক আলাদা করে ডেকে নিলেন। তারপর এটা-সেটা কথার শেষে বললেন, অনিক ছেলেটা কেমন রে?
অবন্তী চট করে প্রশ্নটা ধরতে পারল না। সে বলল, কোন অনিক?
আরেহ, ওই যে হৃদি যে ছেলেটাকে পছন্দ করে?
কই? আমি তো কিছু জানি না, খালা। হৃদি আপু আমাকে কিছু বলে নি।
তুই কিছু জানিস না?
না।
শোন, ছেলেটাকে আমারও পছন্দ। হৃদির সঙ্গে যেহেতু ছেলেটার একটা ভালো বোঝাপড়া আছে, সেহেতু আমি চাই একটু খোঁজখবর নিয়ে ওদের বিয়েটা দিয়ে দিতে। কিন্তু বুঝিসই তো, মা হয়ে তো আর মেয়ের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলা যায় না! তা ছাড়া হৃদিকে তো তুই চিনিসই। ও কখনোই আমাকে কিছু বলবে না। কিন্তু তোর সঙ্গে তো ওর বান্ধবীর মতোই সম্পর্ক। ওর নাড়িনক্ষত্র জানিস তুই। তাই ভাবছিলাম তোর মাধ্যমেই যদি একটু খোঁজখবর করা যেত, তাহলে আমি নিশ্চিন্তে সিদ্ধান্তটা নিতে পারতাম।
আপু আমাকে এই সব বিষয়ে কিছু বলে নি, খালা।
ধ্যাৎ! বলে অবন্তীর কথাটা যেন উড়িয়ে দিতে চাইলেন রোখসানা বেগম। বললেন, তুই শুধু শুধু আমাকে ভয় পাচ্ছিস। হৃদি নিশ্চয়ই আমাকে কিছু বলতে নিষেধ করেছে?
একদমই না, খালা। হৃদি আপু আমাকে এসব কিছু বলে নি।
তাহলে সারাক্ষণ তোরা কী নিয়ে কথা বলিস?
তেমন কিছু না। বেশির ভাগ সময়ই সিনেমার ড্রেস, মেকআপ–এই সব নিয়ে কথা হয়। আপনি তো জানেনই হৃদি আপুর সাজগোজ কত পছন্দের। আপু সারাক্ষণই ওই হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের সাজগোজ দেখেন, আর সেসব নিয়েই কথা বলেন।
অবন্তীর উত্তর শুনে রোখসানা বেগম চুপ করে গেলেন। তার এখন মনে হচ্ছে, অবন্তীও তার সঙ্গে সত্যি কথা বলছে না। হৃদি নিশ্চয়ই তাকে আগেভাগেই সবকিছু শিখিয়ে দিয়েছে। না হলে এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে এত মিথ্যে কথা সে বলতে পারত না। বিষয়টা নিয়ে প্রচণ্ড মানসিক অশান্তি অনুভব করতে লাগলেন তিনি।
.
নেহাল ছেলেটা ভালো। এ যুগে এমন দ্র, শিক্ষিত ছেলে পাওয়া কঠিন। তা ছাড়া ছেলের পরিবারও বিদেশে থাকে। সে বছর দুয়েকের জন্য কী একটা প্রজেক্ট নিয়ে দেশে এসেছে। প্রজেক্ট শেষ হলেই আবার চলে যাবে। এই সময়ের মধ্যে যদি বিয়েটা দিয়ে দেওয়া যেত, তাহলেই নিশ্চিন্ত। সমস্যা হচ্ছে, হৃদি নিজে ছেলেকে বলেছে যে তার বিয়ে হয়ে গেছে। এমন কথা শুনলে কোনো ছেলেরই আর সেই মেয়ের প্রতি আগ্রহ থাকার কথা নয়। নেহালও বেশ দমে গিয়েছিল। কিন্তু রোখসানা বেগম জানেন, হৃদিকে অসম্ভব পছন্দ করে ফেলেছে সে। প্রথম দেখাতেই রীতিমতো সম্মোহিত হয়ে গেছে। ফলে সুযোগটা নিলেন তিনি। সাধ্যমতো বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, হৃদি মিথ্যে কথা বলেছে, বাবা।
নেহাল খুবই বিনয়ী ছেলে। সে বিনীত ভঙ্গিতেই বলল, কিন্তু আন্টি, সে যদি মিথ্যে কথাও বলে থাকে, তাহলে তার সেই মিথ্যে কথার পেছনেও নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে? শুধু শুধু তো আর কেউ এত বড় মিথ্যে কথা বলবে না?
কারণ ছাড়া সে মিথ্যে কথা কেন বলবে? কারণ অবশ্যই আছে।
তাহলে? সে যদি সত্যি সত্যিই কারও সঙ্গে এনগেজড থেকে থাকে…।
কারণ মানেই তো শুধু অন্যের সঙ্গে এনগেজড বা প্রেম থাকা নয়, বাবা। নেহালকে থামিয়ে দিয়ে বললেন রোখসানা বেগম। আরও অনেক কারণই থাকতে পারে।
আর কী কারণ? নেহাল অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলল।
তার বাবা যে ভয়াবহ অসুস্থ, তুমি নিজ চোখেই তো তাকে দেখেছ?
জি।
সে তার বাবাকে অসম্ভব ভালোবাসে। একদম ছোটবেলা থেকেই, এক দিন তাকে দেখে থাকতে পারে না। তার ধারণা, সে দূরে কোথাও গেলেই আর ফিরে এসে বাবাকে দেখতে পাবে না। এই কারণে বাবাকে ছেড়ে কোথাও যেতেও চায় না। বন্ধুদের সঙ্গে কোনো ট্যুরেও না। এখন সেই মেয়ে যদি হঠাৎ বুঝতে পারে যে তাকে বিয়ের পরে সারা জীবনের জন্য বিদেশে চলে যেতে হবে, তাহলে সেটা কি সে সহজে মেনে নিতে পারবে? পারবে মেনে নিতে?
না। তা পারবে না। ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল নেহাল।
আসল ঘটনা হলো এই। এখন তুমিই বলো, সে যদি এ রকম উল্টাপাল্টা কিছু বলে, এ জন্য তাকে দোষ দেওয়া যায়?
নেহাল কথা বলল না। তবে মনে মনে হৃদির প্রতি একধরনের সহানুভূতি অনুভব করতে লাগল সে। খানিক আগে যে মন খারাপের অনুভূতিটা তার ছিল, তা যেন ক্রমশই দ্রবীভূত হয়ে যেতে লাগল। রোখসানা বেগম বললেন, এই সব ব্যাপারে সে খুবই একগুঁয়ে। বিদেশে থাকতে হবে শুনেই অস্থির হয়ে গেছে। এমনিতে তোমাকে তার অসম্ভব পছন্দ। তুমি একটু ধৈর্য ধরো, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
নেহাল তার কথায় আশ্বস্ত হলেও হৃদি আর অবন্তীর কথায় কিছুতেই আশ্বস্ত হতে পারলেন না রোখসানা বেগম। বরং সবকিছু কেমন গোলমেলে ঠেকছে। এত বড় একটা ব্যাপার, অথচ অবন্তীকে কিছুই বলে নি সে? কথাটা কোনোভাবেই বিশ্বাস হচ্ছে না রোখসানা বেগমের। তিনি দুঃখী দুঃখী গলায় অবন্তীকে বললেন, তুই তো আমাদের সবই জানিস। জানিস না?
কী বিষয়ে, খালা?
এই যে বাড়ি, তোর খালুর অসুস্থতা…। তোর রাতুল ভাইয়ার বিদেশে চলে যাওয়া। তারপর সেখানে গিয়ে বিয়ে করা। সবই তো জানিস?
অবন্তী মাথা নাড়ল, জি।
রোখসানা বেগম বললেন, আমাদের কি আর কোনো ইনকাম আছে বল? এই বাড়ি ভাড়া দিয়েই তো সংসার চলে। তার ওপর রাতুলকে বিদেশে পড়তে পাঠানোর সময় ব্যাংক থেকে প্রচুর টাকাপয়সা লোন করতে হয়েছিল। সঙ্গে তোর খালুর চিকিৎসার খরচ। সব তো এই বাড়ির ওপর দিয়েই, না? তার ওপর এই বাজারে ও রকম দুটো মেয়ের পড়াশোনার খরচও কি কম?
রোখসানা বেগমের গলায় বেদনার সুর। তিনি ভাঙা গলায় বললেন, এখন আমার মাথায় কী দুশ্চিন্তা, একবার চিন্তা কর? কয়েক দিন পর তিথিরও তো বিয়ে দিতে হবে, তাই না? রাতুল তো কবেই আমাদের খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তোর খালুর ওই অবস্থা। এর মধ্যে আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায়, তখন এই মেয়ে দুটোর
কী অবস্থা হবে? কোথায় যাবে তারা? কী করবে?
রোখসানা বেগম শেষের দিকে এসে প্রায় ভেঙে পড়লেন। তার গলা ভার। অবন্তী হাত বাড়িয়ে তাকে ধরল। তিনি ভেজা গলায় বললেন, তুই একটু সত্যি করে আমাকে বল তো মা, হৃদির ঘটনাটা আসলে কী? তুই ছাড়া আমার আর কেউ নাই যে এই বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করতে পারে। অনিক নামের ওই ছেলেটার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?
খালা, আমি সত্যিই জানি না। হৃদি আপু আমাকে কিচ্ছু বলে নি।
কিচ্ছু না?
না। এমনকি অনিক নামে কারও কথা আমি জানিও না। দেখিও নি কোনো দিন।
রোখসানা বেগম আর কথা বললেন না। তিনি উঠে সামনের ফাঁকা জায়গাটাতে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিথি কলেজ থেকে ফিরছে। তার হাতে একগাদা বই। সম্ভবত আবারও নীলক্ষেতে গিয়েছিল সে। এই এক অভ্যাস সে তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছে। দিনরাত গল্পের বই পড়বে। কিন্তু এই গল্পের বই পড়তে গিয়ে যে তার আসল পড়ার বারোটা বেজে যাচ্ছে, সে খেয়াল নেই। বিষয়টা নিয়ে ভীষণ বিরক্ত রোখসানা বেগম। আজ যেন বিরক্তির মাত্রাটা আরও বাড়ল। তিথি ঘরে ঢুকতেই তিনি বললেন, কই গেছিলি তুই?
কেন? কোচিংয়ে।
কোচিং থেকে ফিরতে এত দেরি? কটা বাজে এখন?
সন্ধ্যা ছটা।
তো, এতক্ষণ কী করছিলি?
নীলক্ষেত গিয়েছিলাম।
নীলক্ষেত কী?
কিছু পুরোনো বই কিনে আনলাম।
কী বই?
গল্পের।
এখন তোর গল্পের বই পড়ার সময়?
গল্পের বই পড়ার জন্য আলাদা কোনো সময়ের দরকার হয় না, মা। গল্পের বই পড়ার জন্য দরকার হয় ইচ্ছার। আর ইচ্ছা যেকোনো সময়ই হতে পারে।
তোর না সামনে ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা?
হুম। তাতে কী?
তাতে কী মানে, এই সময়ে কেউ গল্পের বই পড়ে? পরীক্ষার পরে পড়া যাবে না?
ফার্স্ট ইয়ার ফাইনালের পরই আমার জীবনের সব পরীক্ষা শেষ না, মা। এরপর সেকেন্ড ইয়ারের হাবিজাবি নানান পরীক্ষা। তারপর বোর্ড ফাইনাল। তারপর ইউনিভার্সিটি অ্যাডমিশন টেস্ট। তারপর আবার পরীক্ষা। তারপর আবার। এই পরীক্ষার শেষ নেই, মা। জীবনভর চলতেই থাকবে। কিন্তু বই পড়ার এই ইচ্ছেটা আর। জীবনভর থাকবে না। বনফুলের পাঠকের মৃত্যু গল্পের কথা শোনো নি? সময়, বয়স, রিয়েলিটি কী করে মানুষের পাঠকসত্তাটাকে মেরে ফেলে? এই জন্য আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যখনই বই পড়তে ইচ্ছে করবে, পড়ে ফেলব। পরীক্ষা এবার না হলে পরেরবার দেওয়া যাবে। কিন্তু বই পড়ার এই ইচ্ছে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। বয়স। যত বাড়ে, জীবনের নানান যন্ত্রণায় বই পড়ার ইচ্ছে তত কমে। এইটা একটা বাজে রকম সত্য, মা।
এই কথা তোকে কে বলেছে?
কে বলবে, আমি নিজেই আবিষ্কার করেছি। চারপাশের মানুষদের দেখে বুঝতে পারছি। খুব কম মানুষেরই বয়স হওয়ার পরও বই পড়ার ওই আগ্রহটা টিকে থাকে। বেশির ভাগ মানুষেরই থাকে না। কেন, তুমি নিজেও তো বলো, আগে কী বই পড়তাম! দিনরাত বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতাম। কিন্তু এখন পাঁচ মিনিটের বেশি দশ মিনিট কোনো বইতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারি না। কী, বলো না?
রোখসানা বেগম কথা বললেন না। তিনি তীক্ষ্ণ চোখে তিথির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই মেয়েও কি বয়স বাড়ার সাথে সাথে হৃদির মতো হয়ে যাচ্ছে? একগুঁয়ে, বেপরোয়া? আগে তো সে মুখের ওপর এমন তর্ক করত না? যা বলতেন, চুপচাপ সব মেনে নিত। আজ তাহলে কী হয়েছে তার?
সেই সারাটা সন্ধ্যা প্রচণ্ড অস্থিরতা নিয়ে কাটল তার। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অস্থিরতা আরও বাড়ল। এর অবশ্য কারণও আছে। তিনি রাতে চুপি চুপি তিথির ঘরে গেলেন। সে তখন টেবিল ল্যাম্পের আলোয় বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। মাকে দেখেই দেয়ালে হেলান দিয়ে উঠে বসল। তারপর আনমনা ভঙ্গিতে বলল, কিছু বলবে, মা?
হুম।
বলো।
আগে বইটা বন্ধ কর তুই।
তিথি অনিচ্ছাসত্ত্বেও বই বন্ধ করল। রোখসানা বেগম বললেন, তুই অনিক নামের কাউকে চিনিস?
কোন অনিক?
হৃদির সঙ্গে পরিচয় আছে। ওর কোনো বন্ধু বা সিনিয়র এমন কিছু?
ওহ। অনিক ভাইয়া? খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে বলল তিথি। হ্যাঁ, চিনব না কেন? খুব ভালো করেই চিনি।
রোখসানা বেগম ভারি অবাক হলেন। নিজেকে এবার তার সত্যি সত্যিই বোকা মনে হচ্ছে। ওই ছেলের কথা তাহলে তিথিও জানে!
হুম। তুই তাকে চিনিস কী করে?
ভাইয়া তো আমাদের কোচিংয়েই পড়ায়। অবশ্য বেশ কিছুদিন হলো তিনি পড়াতে আসছেন না। সম্ভবত তার বাড়িতে কোনো ঝামেলা হয়েছে। আর হৃদি আপুই তো আমাকে ওই কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিল! তুমি জানো না?
না।
আপুর তো খুব ভালো বন্ধু উনি। অনেক আগে আমাদের বাসায়ও একবার এসেছিলেন। তুমি ভুলে গেছ।
রোখসানা বেগম এবার আর কথা বললেন না। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, মনে মনে তিনি যা আশঙ্কা করছিলেন, ঘটনা তা-ই। এই ছেলের সঙ্গে হৃদির গুরুতর কোনো ব্যাপার আছে। বিষয়টা আর হেলাফেলার পর্যায়ে নেই।
৪
বাবার মৃত্যুর বিষয়টা নিয়ে ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে লাগল অনিক। সে এখন নিশ্চিত, তার কারণেই মারা গেছেন বাবা। তার ওপর প্রচণ্ড অভিমান, হতাশায় শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই টাকা উপার্জনের ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। আর সেই পথই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সেদিন ছাত্তার মিয়ার কথা শোনার পর থেকে আর একমুহূর্তও স্থির হতে পারে নি। সে। সারাক্ষণ কেবল মনে হয়েছে সে নিজ হাতে বাবাকে খুন করেছে। হ্যাঁ, খুনই। অনিক এখন এ ব্যাপারে নিশ্চিত। তবে সে জানে না কারা তার বাবাকে খুন করেছে, কেন খুন করেছে? সে শুধু এটুকুই জানে, এই খুনের জন্য দায়ী মূলত সে নিজে। আজ যদি সে সত্যি সত্যিই সবকিছু ঠিকঠাক করতে পারত, তাহলে বাবাকে আর এভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠতে হতো না। তিনি তখন নিশ্চিন্তে গ্রামে ফিরে যেতে পারতেন।
এই ভাবনাগুলো তাকে প্রতিমুহূর্তে ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খেতে লাগল। একটা তীব্র অক্ষম আক্রোশ আর অপরাধবোধ ক্রমশই ভেতরে-বাইরে সংকুচিত করে ফেলতে লাগল। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারল না সে। এমনকি হৃদিকেও না। হৃদি অবশ্য বুঝতে পারছিল অতলান্ত এক বিষাদ-সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে অনিক। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সেই গভীর জলের অন্ধকার থেকে তাকে টেনে তুলতে পারে না সে।
সেদিন সন্ধ্যায় ভারী বৃষ্টিপাত হলো। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের ভেজা আলো। সেই আলোতে তারা বসে ছিল নির্জন চওড়া ফুটপাতে। তাদের সামনে দিয়ে টুংটাং শব্দে চলে যাচ্ছিল নীল পলিথিনে মোড়া রিকশা। অনিক হঠাৎ বলল, মৃত্যুর সবচেয়ে খারাপ দিক। কি জানো?
হৃদি জবাব দিল না। তবে চোখ তুলে তাকাল। অনিক বলল, মৃত্যুর সবচেয়ে খারাপ দিক হলো তুমি ছাড়া তোমার আশপাশের আর সবাই রয়ে যাবে। কেবল তুমিই থাকবে না।
এ কথা কেন বলছ?
কেন বলছি তা জানি না। তবে এই যে কেউ মরে যাওয়ার পরও পৃথিবীর আর সবকিছু ঠিক আগের মতোই থাকে, কিছুই বদলায় না, এটা খুব কষ্টকর না?
হৃদি কথা বলল না। সে একদৃষ্টে অনিকের দিকে তাকিয়ে রইল। অনিক কেমন উদ্দেশ্যহীন গলায় বলল, এই যে বৃষ্টি…ওই যে দেখো রাস্তার ওপর জমে থাকা পানিতে ল্যাম্পপোস্টের আলো, গাড়ির লালরঙা ব্যাক লাইটের আলোর সঙ্গে ওই আলো মিলেমিশে কী অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য তৈরি করেছে। রিকশার নীল পলিথিনগুলো চকচক করছে। টুংটাং শব্দগুলোও শুনতে কী ভালো লাগছে, তাই না? অথচ ভাবো, আমরা মরে গেলে কেবল আমরাই থাকব না, আর সবকিছু ঠিক এমনই থাকবে! এমনই আলো ঝলমলে, রঙিন!
তুমি এমন কেন করছ, অনিক?
কেমন?
এই যে, আজকাল প্রায় সারাক্ষণই তুমি মৃত্যুর কথা বলো।
সারাক্ষণ?
হুম। মানুষ কখন এত মৃত্যুর কথা বলে, জানো?
কখন?
যখন তার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। যখন সে ভয়ানক কোনো যন্ত্রণায় ভোগে। যখন তার মনে হয় মৃত্যু ছাড়া এই যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণের আর কোনো উপায় তার নেই।
অনিক এই কথায় চুপ করে যায়। হৃদি কী ভেবে কথাটা বলেছে সে জানে না। তবে তার মনে হয়, হৃদির কথাটা মিথ্যে নয়। সত্যি সত্যিই তার আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয় না। কিন্তু সে কতগুলো সম্পর্কের জালে আটকে আছে। দায়িত্বেরও। চাইলেই এই দায়িত্ব আর সম্পর্কের জাল ছিঁড়ে বের হয়ে যাওয়া যায় না। মা আর আয়েশার সঙ্গে কত দিন কথা হয় না তার! অথচ এই সময়ে তাদের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি কথা বলা দরকার ছিল। কিন্তু যতবার সে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গেছে, ততবারই মনে হয়েছে এই বুঝি মা তাকে বলবে, অনিক, তুই কি জানিস তোর বাবা কেন খুন হয়েছে? সে খুন হয়েছে তোর কারণে!
কথাটা মাথায় এলেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। মনে হয় এই কথাটা সারাক্ষণ তার বুকের ভেতর বাজতে থাকে। তীব্র যন্ত্রণার কাটা হয়ে বিধতে থাকে মুহূর্মুহূ। ওই যন্ত্রণা থেকে আর পরিত্রাণ মেলে না। কিন্তু অনিক জানে, যে করেই হোক মাকে আর আয়েশাকে ভালো রাখতে হবে তার। ভালো রাখতে হবে হৃদিকেও। যেভাবেই হোক, হৃদির সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে পারস্পরিক, সবচেয়ে সংবেদনশীল সম্পর্কটাতে জড়িয়েছে সে। এই সম্পর্কে তার দায়িত্বও একটু বেশি। কিন্তু এখন অবধি সেই দায়িত্বের ছিটেফোঁটাও পালন করতে পারে নি সে। বরং হৃদি একাই যেন সবকিছু ধরে রেখেছে। রোজই বাসায় নানান ঝামেলা পোহাতে হয় তাকে। তবে সেসবের বেশির ভাগই নিজের মধ্যে চেপে রাখে সে। সচরাচর বলে না। কিন্তু অনিক বোঝে। আর বোঝে বলেই আরও অসহায় লাগে তার।
হৃদি বলল, আমাদের জীবনে যা ঘটে গেছে, সেসব কি আমরা বদলাতে পারি, অনিক?
অনিক মাথা নাড়ল, না।
তাহলে যা বদলাতে পারবে না, সেসব নিয়ে না ভেবে যা এখনো বদলানো সম্ভব, সেসব নিয়েই কি ভাবা উচিত নয়?
অনিক কথা বলল না। হৃদি বলল, সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে এভাবে বসে থাকলে হবে?
উঁহু।
তাহলে?
তাহলে কী? অসহায় ভঙ্গিতে বলল অনিক, কী করব আমি?
তুমি আবার পড়াশোনাটা শুরু করবে। অন্তত গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করো। তখন যেকোনো একটা চাকরিতে ঢুকে যেতে পারবে। তোমার ওপর দায়িত্ব তো আর কম নয়? তা ছাড়া…।
তা ছাড়া কী?
বাড়িতে খুব সমস্যা হচ্ছে আমার। কথাটা আমি তোমাকে বলতে চাই নি। এমনিতেই তুমি খুব খারাপ সময় পার করছ। কিন্তু আমি সত্যিই জানি না এভাবে আর কত দিন সামলাতে পারব!
এই কথায় আবারও চুপ করে গেল অনিক। এসব যে সে বোঝে না, তা নয়। কিন্তু ভেতর-বাইরে রোজ যেভাবে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে সে, তাতে তার পক্ষে আবারও শক্ত পায়ে উঠে দাঁড়ানো কঠিন। হৃদি হঠাৎ তার কাছে সরে এল। তারপর বলল, তোমাকে একটা সত্যি কথা বলব?
হুঁ।
এই যে তোমার জন্য আমার এত কষ্ট হয়, এই যে তোমাকে আমি এমন পাগলের মতো ভালোবাসি, এর কারণ আমি জানি না। আমার কাছে এগুলো সব জটিল ধাঁধার মতো মনে হয়।
কেন?
কারণ, আমি তো এমন মেয়ে নই।
কেমন মেয়ে তুমি?
আমি খানিক তরল, অগভীর। বলে সামান্য হাসল হৃদি। তারপর বলল, মানে সবাই তা-ই বলে। জীবনে কখনোই তো কিছু নিয়ে তেমন সিরিয়াস হই নি। যখন যা ইচ্ছে হয়েছে করেছি। পরে কী হবে ভাবি নি। আর এসব কারণে আমাকে নিয়ে বাসার সবাই খুব ভয়েও ছিল। এমনকি তোমাকে যখন হুট করে ভালো লেগে গেল, তখনো মনে হয়েছিল এটাও তেমন কিছুই। দুদিন বাদেই ওই ঝোঁকটা কেটে যাবে। কিন্তু তারপর কী হলো, জানো?
কী?
তোমার জন্য আমার কেমন কষ্ট হতে শুরু করল। সারাক্ষণ কেবল মনে হতো, তোমাকে ছাড়া আমি দম নিতে পারছি না। বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ব্যথা। কী আশ্চর্য, বলো তো? আমি তো আর বারো-তেরো বছরের কিশোরী মেয়ে নই যে আমার অমন হবে। তাহলে?
অনিক হৃদির এই প্রশ্নের জবাব দিল না। হৃদিই বলল, আমি তোমাকে একটা ঝোঁকের মাথায় ভালোবেসেছিলাম। ভেবেছিলাম, কদিন পরেই ওই ঝোঁকটা কেটে যাবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কি জানো, দিন যত যেতে লাগল, আমার আসক্তি তত বাড়তে লাগল। মনে হতে লাগল, তোমাকে ছাড়া থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব।
এখন কী মনে হয়?
এখন মনে হয় আমার নিশ্চয়ই বড়সড় কোনো সমস্যা আছে।
কেন?
না হলে তোমার মতো এমন একটা গুড ফর নাথিংকে কেউ এভাবে ভালোবাসতে পারে? বলে হাসল হৃদি। তোমার কী মনে হয়, আছে কোনো কারণ?
অনিক কথা বলল না। হৃদি বলল, কী, মন খারাপ হলো?
কেন?
কারণ, পৃথিবীতে কারণ ছাড়া কিছু ঘটে না। তা যা-ই হোক না কেন। সব সময় যে আমরা বিজয়ী মানুষটাকেই ভালোবাসি, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় পরাজিত মানুষটার প্রতিও আমাদের মায়া হয়। হয় না?
তোমার প্রতি আমার তাহলে কী–মায়া, না ভালোবাসা?
তা তো জানি না। তবে আমি তো পরাজিত মানুষ। তোমার চারপাশে এত এত আলো-ঝলমলে বিজয়ী মানুষ যে সেখানে আমি খুব মলিন, বিবর্ণ। তবে কী হয়, জানো?
কী?
অনেক কোলাহল আর আলোর ভিড়েও আমরা কিন্তু খানিক নির্জনতা খুঁজি। মনে হয়, একটু অন্ধকার বা আড়াল পেলে খানিক জিরিয়ে নেওয়া যেত। বলে থামল অনিক। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, তোমার এই আলো-ঝলমলে জীবনে আমি হয়তো ওই মলিন নির্জনতাটুকু।
কথাটা কী যে ভালো লাগল হৃদির! তোমার এই আলো-ঝলমলে জীবনে আমি হয়তো ওই মলিন নির্জনতাটুকু। কে জানে, অনিকের কথাই হয়তো ঠিক। না হলে তাকে কেন এভাবে ভালোবাসবে সে?
মাঝেমধ্যে এত সুন্দর করে কথা বলে অনিক যে কেবল তন্ময় হয়ে শুনতে ইচ্ছে করে। আচ্ছা, এই কারণে কি তাকে ভালোবাসা যায়? হৃদি জানে না। তবে অনিককে। স্বাভাবিক করে তুলতে প্রাণান্ত চেষ্টা করে সে। কখনো পারে, কখনো পারে না। এই যে এখন তার মনে হচ্ছে অনিক যেন কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই মানুষটা অদ্ভুত মায়াময়। বিষণ্ণও। তবে এই বিষণ্ণতার একটা আকর্ষণ আছে। তার চারপাশের মানুষকে পাখির পালকের মতো আদুরে স্পর্শে ছুঁয়ে দেয়। হয়তো সেই স্পর্শেই ঝুঁদ হয়ে আছে হৃদি। আচ্ছা, অনিকের প্রতি এই যে তন্ময়তা, এই তন্ময়তা কি কখনো কেটে যাবে? আর যদি যায়, তখন কী করবে সে?
অনিক বলল, আমাকে এমন ভালোবাসো বলে কখনো আফসোস হয় না?
হয়। বলে হাসল হৃদি।
তাহলে?
তাহলে কী?
তারপরও ভালোবাসো কেন?
ভালোবাসা কি হিসাব কষে হয়?
হয়। জগতে কত মানুষই তো হিসাব কষে ভালোবাসে।
আমি বাসি না। আমার ভালোবাসা অফুরন্ত, বেহিসেবি। যুক্তিহীনও।
যা অফুরন্ত, বেহিসেবি, তার মূল্যটাও কিন্তু একটু গোলমেলে। মানে সহজে মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
তা কেমন?
এই যে ধরো এক সমুদ্র জল, তা অফুরন্ত। কিন্তু মানুষের কাছে তার চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে এক বোতল সুপেয় পানি। তাই না?
উল্টো যুক্তিও আছে।
কিন্তু তুমি তো বললেই যে তুমি ভালোবাসায় যুক্তিহীন।
কে জানে, হয়তো ওই যুক্তিহীনতার কোথাও অগোচরে যুক্তিও আছে, যা আমি বুঝতে পারি না।
একদম। জগতে যুক্তিহীন বলে আসলে কিছু নেই। বেহিসেবিও না। এখানে সবকিছুই ফুরন্ত। আর যা ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে, তা অসীম কোনো কিছুর চেয়ে অধিক মূল্যবান। অধিক আরাধ্য।
তাহলে…। বলে খানিক ভাবল হৃদি। তোমাকে যে ভালোবাসি, তা সসীম, যৌক্তিক হলে বেশি মূল্যবান হতো?
অনিক এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। সে বলল, যাকে হারিয়ে ফেলার ভয় থাকে, তাকে আমরা যতটা ভালোবাসি, ততটা ভালো কি তাকে বাসতে পারি যাকে হারিয়ে ফেলার ভয় থাকে না? মানে যে আমাদের জীবনে গ্রান্টেড হয়ে থেকে যায়?
প্রশ্নটা যেন ঠক করে বুকে এসে বিঁধল হৃদির। এভাবে তো কখনো ভাবে নি সে। আসলেই তো, অনিককে হারিয়ে ফেলার ভয় সে কখনো করে নি। সব সময়ই মনে হয়েছে, এই সম্পর্কের নিয়ন্ত্রক সে। তাকে ছেড়ে যাওয়ার ক্ষমতা অনিকের নেই। বরং এই সিদ্ধান্তটা পুরোপুরিই তার। কিন্তু কই, তারপরও তো কখনো তাকে কম ভালোবাসে নি সে? কথাটা বলল হৃদি, তোমার কী মনে হয়, আমাদের সম্পর্কে কে গ্রান্টেড? আর কার হারানোর ভয় নেই?
অনিক মৃদু হাসল, এ তো সহজ প্রশ্ন। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না। ওটা এমনি এমনিই জানা থাকে সবার।
তুমি কি আমাকে অবিশ্বাস করো? প্রশ্নটা করল হৃদি।
আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাব? আর তুমি আমার কাছে গ্রান্টেড? তোমার কখনো আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই নেই?
অনিক সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না। তার পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা ভেজা পাতা তুলে নিল দুই আঙুলের চিমটিতে। তারপর বলল, এই যে দেখো, এই পাতাটাতে বৃষ্টির পানি জমে আছে। কিন্তু পানিটুকু ক্রমশই বাষ্প হয়ে উড়ে চলে যাবে। পাতাটা পড়ে থাকবে এখানে। এটা সবাই জানে। হয়তো পাতাটাও। কিন্তু তারপরও সে কি কখনোই বৃষ্টি হলে ওই পানিতে বুক না ভিজিয়ে পারে?
কথাটা শুনে হৃদির ভীষণ মন খারাপ হলো। এই যে সে এত যুদ্ধ করছে, এত যন্ত্রণা সইছে, কার জন্য? অনিকের জন্যই তো! অথচ সেই মানুষটাই কিনা এমন অকপটে, এমন সহজে তার সকল অনুভূতি প্রশ্নবিদ্ধ করছে!
অনিক বলল, তুমি মন খারাপ কোরো না, প্লিজ। আমার খুব ভয় হয়, হৃদি। খুব ভয়।
কেন?
কারণ, তোমাকে হারিয়ে ফেললে আমি পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাব। এই জগতে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই আমার। এই যে আমি এত খারাপ সময় পার করছি, বুকের ভেতর সারাক্ষণ অসহনীয় এক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি, তারপরও কী মনে হয়, জানেনা?
কী?
মনে হয়, তুমি আছ। আমার মন খারাপ হলে, রাতদুপুরে হঠাৎ কান্না পেলে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারব। তুমি আমাকে শক্ত করে বুকের ভেতর জড়িয়ে রাখবে। তোমার ওইটুকু স্পর্শ, ওইটুকু কথা আমাকে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর এক অতল অন্ধকার থেকে টেনে তোলে। এমন একটা মানুষকে যদি আমি হারিয়ে ফেলি? যদি সে আমাকে ছেড়ে কখনো চলে যায়, তখন কোথায় যাব আমি? কী করব?
অনিকের গলা কাঁপছে। ল্যাম্পপোস্টের ভেজা ম্লান আলোয় তার চোখ জোড়া ছলছল করছে। হৃদি হঠাৎ তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। তারপর তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না, অনিক। কোথাও না। কখনো না।
অনিক হঠাৎ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল যেন। তার কম্পমান শরীরের প্রতিটি স্পন্দন কী গভীর আশ্লেষে ছুঁয়ে যেতে লাগল হৃদিকে। হৃদি তার কাঁধে অনিকের ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুর উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করতে লাগল। ওই স্পর্শে কী ছিল সে জানে না। সে কেবল জানে, এই মানুষটা তার। এই মানুষটার সকল দুঃখ, শোক, সন্তাপ তার। সে। তার জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি এই মানুষটাকে তার সর্বস্ব দিয়ে এভাবেই আগলে রাখবে। তাতে তার যত কষ্ট হোক। যত ঝড়-ঝঞ্ঝা, যুদ্ধ-যন্ত্রণাই আসুক না কেন, এই মানুষটাকে ছেড়ে কখনো কোথাও যাবে না সে।
৫
তিথি বলল, তোমার ইউনিভার্সিটি কেমন লাগছে?
অবন্তী হাসল, শহুরে জীবন খুব জটিল। না?
কী জানি? আমার তো সেটা আলাদা করে বোঝার কথা না। ছোট থেকে তো এখানেই বড় হয়েছি।
হুম। এখানে সবকিছুতেই কেমন তাড়া মানুষের। যেন কারোরই একটু থমকে দাঁড়ানোর সময় নেই। কারও কথা শুনবার কিংবা বুঝবার ফুরসত নেই।
এটা কেন বলছ?
হঠাৎ মনে হলো।
উঁহু। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। তুমি কি এর মধ্যেই কারও প্রেমেট্রেমে পড়ে গেলে নাকি?
অবন্তী মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল। সে হলে ওঠার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পূরণ করে জমা দিয়েছে। হৃদি কী এক কাজে ব্যস্ত বলে আজ তিথিকে সঙ্গে নিয়েই এসেছে সে। তিথি বলল, কী হলো, জবাব দিচ্ছ না যে?
কী জবাব দেব?
কারও প্রেমেট্রেমে পড়েছ?
হুম।
কার?
নির্জনতার।
মানে কী?
মানে হলো আমার এত মানুষ, এত কোলাহল ভালো লাগে না, তিথি। এই শহরে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে তোদের বাড়িটা। এত শান্ত, চুপচাপ। মনে হয় সারাক্ষণ ওখানেই বসে থাকি। গ্রামে বসে আলাদা করে নির্জনতার এই অনুভূতিটা এভাবে টের পাওয়া যায় না। এখানে যায়। কারণ, চারদিকের কোলাহলের মধ্যে ওইটুকু খুব শান্তি দেয়। আর মা-বাবার জন্য খুব মন খারাপ হয়। মনে হয়, যদি চড়ুই পাখির মতো ফুড়ৎ করে উড়ে চলে যেতে পারতাম!
তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে যাচ্ছ?
একদমই না। শোন, ক্লাস কেবল শুরু হলো। আমি এখনো এই বিল্ডিং থেকে সেই বিল্ডিং, এই ফরম থেকে সেই ফরম পূরণ করতে করতেই শেষ। প্রেম করব কখন?
তুমি এত মিষ্টি! দেখো প্রেম তোমাকে করতে হবে না, উল্টো তোমার ওপর এসেই রাজ্যের প্রেম হুমড়ি খেয়ে পড়বে।
অবন্তী হাসল, তাহলে তো ভালোই। এসব নিয়ে তোর যা আগ্রহ, আমি না হয় আমার ওই রাজ্যের প্রেম থেকে তোকে কিছু ট্রান্সফার করে দেব।
তুমি অনিক ভাইয়াকে চেনো?
অনিক ভাইয়া? কপাল কুঁচকে তাকাল অবন্তী। নাহ।
হৃদি আপু তোমাকে কিছু বলে নি?
কী বলবে?
সত্যি বলে নি?
নাহ্। তবে ওই দিন খালাও আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু আমি সত্যিই জানি। অবশ্য খালা মনে হয় না আমার কথা বিশ্বাস করেছে!
হুম। বলে সামান্য চুপ করে রইল তিথি। তারপর বলল, মায়ের ধারণা, অনিক ভাইয়ার সঙ্গে হৃদি আপুর কোনো ব্যাপার আছে। মজার ব্যাপার কী, জানো?
কী?
আমি এই এত দিন ধরে অনিক ভাইয়াকে চিনি। তার সঙ্গে প্রায় রোজই দেখা হতো আমার। আমাদের কোচিংয়ে পড়ায়। ইদানীং কী একটা ঝামেলা হওয়ায় বেশ কিছুদিন ধরে আসছে না। তো সেই অনিক ভাইয়ার সঙ্গে যে হৃদি আপুর কিছু থাকতে পারে, এটা আমার মাথায়ই আসে নি। ইনফ্যাক্ট, তেমন কিছু কখনো ধরতেও পারি নি আমি।
কিন্তু খালা না হৃদি আপুর জন্য ছেলে দেখছে?
সমস্যাটা তো সেখানেই। হৃদি আপু নাকি সেই ছেলেকে বলেছে যে তার বিয়ে হয়ে গেছে।
ধ্যাৎ! কী বলছিস তুই?
হুম। তুমি সত্যিই কিছু জানো না? হৃদি আপুর সঙ্গে তোমার এত ভাব, অথচ সে তোমাকে কিছু বলে নি?
উঁহু। তোকেও তো বলে নি!
আমাকে? আমাকে এই সব বলবে ও? ঠোঁট উল্টে বলল তিথি। তুমি জানো কিছু?
কী জানব?
হৃদি আপু তো আমাকে সহ্যই করতে পারে না। ওর একটা জামা পর্যন্ত ধরতে দেয় না আমাকে। ওর ঘরভর্তি কত কত মেকআপ, পারফিউম। কিন্তু কিছু ছুঁতে দেবে না। এই জন্য ওর ঘরে ও তালা পর্যন্ত মেরে রাখে।
কী বলিস?
হুম। আর ও আমাকে বলবে ওর প্রেমের কথা?
খালা এখন কী করবে?
মা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে তোমাকে বোঝাতে। মার ধারণা তুমি কিছু না কিছু জানোই।
ওহ্। বলে হতাশ ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অবন্তী। বলল, কী করি আমি, বল তো?
হৃদি আপুর ফোনটোন চেক করতে পারো। কিছু না কিছু পাবেই। তুমি তো ওর সঙ্গেই থাকো রাতে।
ছি! এটা কী কথা হলো, তিথি? আমি হৃদিপুর ফোন সার্চ করব? এটা আমি মরে গেলেও পারব না।
তাহলে আর কী! আমাকেই করতে হবে। বলে হাসল তিথি।
তারা একটা বাঁধানো বেঞ্চি দেখে বসল। খাঁ খাঁ দুপুর হলেও মৃদু হাওয়া বইছে। শুকনো পাতা উড়ে এসে ভেসে বেড়াচ্ছে হাওয়ায়। দৃশ্যটা ভারি সুন্দর। তবে সেই সুন্দর দৃশ্যের ভেতর বাঁ হাতে চোখ ঢেকে যে ছেলেটি এগিয়ে যাচ্ছিল, তাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল তিথি। সে চিৎকার করে ডাকল, অনিক ভাইয়া।
অনিক থমকে দাঁড়াল। তারপর বলল, তুই এখানে? তিথি বসা থেকে উঠে সামান্য এগিয়ে গেল। বলল, অবন্তী আপুর সঙ্গে এলাম। আমার খালাতো বোন। এবারই এখানে ভর্তি হয়েছে।
ওহ্। বলে অবন্তীর দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল অনিক। সৌজন্যের হাসি। তবে কথা বলার কোনো আগ্রহ দেখাল না। তারপর তিথিকে বলল, তোর পড়াশোনা কেমন। চলছে?
আমার পড়াশোনার কথা বাদ। তার আগে বলো তুমি হঠাৎ কোথায় উধাও হলে?
কোথাও উধাও হই নি। তবে কোচিংটাতে আর পড়াব না ভাবছি।
কেন, কেন? উদ্বিগ্ন গলায় বলল তিথি।
অনেক পরিশ্রম হয়ে যায়। রাত জেগে জেগে লেকচার শিট তৈরি করতে হয়। তার ওপর গুচ্ছের ক্লাস, পরীক্ষা। এত এত খাতা দেখা। এসব করতে গিয়ে আমার পড়াশোনার বারোটা বেজে গেছে।
কী করবে তাহলে?
আদু ভাই হওয়ার আগেই পাসটাশ করে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।
আদু ভাই হওয়ার আর কী বাকি রেখেছ? বলে টিপ্পনী কাটল তিথি। তোমার ক্লাসমেটরা সবাই পাস করে চাকরিবাকরি করছে। কেউ কেউ বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চার বাবাও হয়ে গেছে। তুমিও কিছু একটা করো। বিয়ে করতে হবে না?
অনিক হাসল, সবাইকেই কেন চাকরি করে বিয়ে করতে হবে? আমার মতো কেউ কেউ বিয়েটাকেই চাকরি মনে করে করে ফেলবে!
মানে কী? তুমি কি বিয়েটিয়ে করে ফেলেছ নাকি?
বিয়ে করে ফেলার বিষয় না। বিয়ে হয়ে যাওয়ার বিষয়। কেউ কেউ অনেক চেষ্টা করেও করতে পারে না। আবার কারও কারও ঘাড়ের ওপর এসে সিন্দবাদের ভূতের মতো চেপে বসে। তখন অনেক চেষ্টা করেও আর তাকে নামানো যায় না।
তুমি কিন্তু কেমন রহস্য করে কথা বলছ। ঘটনা কী, খুলে বলো তো?
কোনো ঘটনা নেই। অনেক দিন পর তোর সঙ্গে দেখা। নানা কারণে মনটন খারাপ। এই জন্য একটু তরল রসিকতা করে মন ভালো করার চেষ্টা করছি।
তিথি অবশ্য অনিকের কথায় সন্তুষ্ট হলো না। সে বলল, হৃদি আপুর সঙ্গে কথা হয় তোমার?
কম।
আপু কিছু জানিয়েছে?
কী জানাবে?
আপুর যে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে?
কী! যেন শুনতে পায় নি এমন ভঙ্গিতে বলল অনিক। কার বিয়ে ঠিক হয়েছে?
হৃদি আপুর। কেন, আপু তোমাকে কিছু জানায় নি? তিথি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল।
উমমম…। বলে সামান্য কী ভাবল অনিক। তারপর বলল, কবের ঘটনা এটা?
এই মাসখানেক তো হবেই। ছেলের নাম নেহাল। জার্মানি থাকে। আপুকে নিয়েই চলে যাবে। ওনার ফ্যামিলিও ওখানে থাকে। বিয়ের কথাবার্তাও সব ফাইনাল।
অনিক কী বলবে ভেবে পেল না। হৃদির সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়েছে দুদিনও হয় নি। সেদিন সন্ধ্যার ওই মুহূর্তটা যেন দীর্ঘদিন পর তাকে খানিক জীবনীশক্তি দিয়েছে। আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্পৃহা দিয়েছে। হৃদি তার বিয়ে করা বউ। সে চাইলেই হুট করে কাউকে বিয়ে করে ফেলতে পারে না। তেমন সম্ভাবনাও নেই। তা ছাড়া হৃদির প্রতি ওই বিশ্বাস তার আছে। সেদিন সন্ধ্যার পর সবকিছু আরও দৃঢ় হয়েছে। কিন্তু তারপরও বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা স্পষ্ট দ্বিধার কাটা জেগে উঠতে লাগল। অনেক চেষ্টা করেও ওই অস্বস্তিটুকু উপেক্ষা করতে পারল না সে। নাকি ভেতরে ভেতরে সব সময়ই এই অনিশ্চয়তাটুকু ছিল তার? একধরনের নিরাপত্তাহীনতার বোধও? এই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর অনিকের কাছে নেই। তবে সে টের পাচ্ছে, তিথির কথাটা চিরাচরিত অবিশ্বাস হয়ে কুণ্ডলী পাকানো ধোয়ার মতো ক্রমশই তার বুকের ভেতর ছড়িয়ে যাচ্ছে। সে প্রায় মিইয়ে যাওয়া গলায় বলল, কই? না তো? আমি তো কিছু জানি না।
ওহ। কে জানে, আপু হয়তো তোমাকে সারপ্রাইজ দেবে বলেই এত আগে কিছু বলে নি। তা ছাড়া বুঝতেই পারছ, বিয়েতে তো কত ধরনের উটকো ঝামেলা হয়। হয়তো সেসব এড়াতেই আগেভাগে কাউকে কিছু জানায় নি।
হুম। বলে গম্ভীর হয়ে গেল অনিক। অনেক চেষ্টা করেও নিজের চেহারায় জেগে ওঠা বিমর্ষ ভাবটা লুকাতে পারছে না সে। এমন কেন হচ্ছে তার? হৃদিকে তো সে এত দিন ধরে চেনে! আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তাদের সম্পর্কটাও এখন অনেক বেশি সুসংহত। ক্রমশ স্থির আর শান্ত হয়ে উঠেছে হৃদি। আগের সেই ছটফটে, অগভীর মানুষটা যেন বুঝতে পারছে, এই কঠিন দুর্গম পথে সে-ই নাবিক। তাকেই শক্ত করে হাল ধরে রাখতে হবে। ফলে ধীরে ধীরে আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে সে। অনিকের এই চরম দুঃসময়ে যেভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে তাকে নিয়ে এমন সন্দেহ থাকা লজ্জারই। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে ওই সংশয়টুকু যেন দূর করতে পারল না অনিক।
তিথি বলল, কী হলো? মন খারাপ হয়ে গেল তোমার?
না না, মন খারাপ হবে কেন?
এই যে আপু তোমার এত ভালো বন্ধু, অথচ তোমাকেই এখনো কিছু জানাল না?
আরে ধুর! স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল অনিক। একদমই তা না। আমি আসলে অন্য একটা বিষয় ভাবছিলাম। তার সঙ্গে পরে কথা বলি আমি?
আচ্ছা। বলে অনিকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল তিথি। অনিক অবশ্য অনেক চেষ্টা করেও কিছুই লুকাতে পারল না। বরং তার চোখেমুখে ক্রমশ আরও প্রকট হয়ে উঠতে শুরু করল তীব্র একধরনের অনিশ্চয়তা, আশঙ্কা। সে আর কারও দিকে তাকাল না। মাথা নিচু করে হনহন করে হেঁটে যেতে লাগল।
কে জানে, বাবার কারণে যে ভয়ানক মানসিক দশার মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হচ্ছে, তা-ই হয়তো তাকে এমন নড়বড়ে করে দিল। না হলে তিথির ওইটুকু কথাতেই কী করে এমন এলোমেলো হয়ে গেল সে! এই এত দিনে হৃদিকে কি এতটুকুও চেনা হয় নি তার? বিশ্বাস করতে পারে নি? বিষয়টা বেশ ভাবাল অনিককে। মাথার ভেতর অসংখ্য ভাবনা ক্রমশ ডালপালা ছড়াতে লাগল। সেই ভাবনার কোনোটাকেই আর কোনোটা থেকে আলাদা করতে পারল না সে। ফলে বিশ্বাস আর অবিশ্বাস, দ্বিধা আর দৃঢ়তা–সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে লাগল।
.
তবে সবচেয়ে বেশি অবাক হলো তিথি। অনিকের অবস্থা দেখে থমকে গেছে সে। মা যখন তাকে কথাটা বলেছিলেন, তখন কিছুতেই বিশ্বাস হয় নি তার। বরং মায়ের সঙ্গে তর্কই জুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন অনিকের এই ব্যথাভার বিচলিত পাণ্ডুর মুখ দেখে হতভম্ব হয়ে গেল সে। মানুষটাকে অসম্ভব পছন্দ করে তিথি। সে কোনোভাবেই চায় না। তার কোনো ক্ষতি হোক। কিন্তু মাকে গিয়ে সে কী বলবে? যদি সত্যিই হৃদির সঙ্গে অনিকের কোনো সম্পর্ক থেকে থাকে, তবে তাদের তা এখুনি প্রকাশ করা উচিত। না হলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হবে। হয়ে যাবে সমাধান-অযোগ্য।
তাদের হাতে অফুরন্ত সময়ও নেই যে তারা এই সম্পর্কটাকে এভাবে গোপন রেখে, প্রলম্বিত করে সুবর্ণ কোনো সময়ে গিয়ে সব ঠিক করে নেবে! বরং যা করার করতে হবে এখুনি। ভেতরে ভেতরে নেহালের সঙ্গে হৃদির বিয়ের প্রায় সবই ঠিক করে ফেলেছেন মা। অথচ তারা কেউ জানে না অন্য কোথাও অন্য কোনো গল্প আড়াল হয়ে আছে। সেই গল্পের পরিণতিতে কী আছে কে জানে!
খানিক আগে যে তিথি ফড়িংয়ের মতো ছটফট করছিল, সে-ই যেন মুহূর্তের মধ্যে গম্ভীর হয়ে গেল। আনমনা ভঙ্গিতে অবন্তীর দিকে এগিয়ে গেল সে। তারপর বলল, চলো বাসায় যাই।
কেন, কোনো সমস্যা?
হুম।
কী হয়েছে?
কী হয়েছে এখনো জানি না। তবে আমার মনে হচ্ছে অনিক ভাইয়া আর হৃদিপুর মধ্যে সিরিয়াস কোনো ব্যাপার আছে। বিষয়টা এখুনি স্পষ্ট হওয়া উচিত। তারা হয়তো ভাবছে যে বিষয়টা লুকিয়ে রাখাই সমাধান। কিন্তু আমার ধারণা, এতে বরং সমস্যাটা। বাড়বে।
রিকশায় ফিরতে ফিরতে বাকি ঘটনাও শুনল অবন্তী। শুনে তার মনে হলো তিথির কথা সত্য। যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তাতে অনিক আর হৃদিকে অবশ্যই প্রকাশ্যে আসতে হবে। না হলে এই সমস্যা থেকে তাদের মুক্তি মিলবে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হৃদির বিয়ের বিষয়ে অনিক কেন এখনো কিছুই জানে না? হৃদি কি তবে তাকে কিছুই জানায় নি? জানাল না কেন? প্রশ্নটা করল সে।
তিথি বলল, এটা আমিও বুঝতে পারছি না। একটা ব্যাপার কি খেয়াল করেছ?
কী?
এই যে তোমার সঙ্গে এত কিছু শেয়ার করে হৃদিপু, অথচ অনিক ভাইয়ার কথা কিছু বলল না?
এমন তো হতেই পারে। আপু হয়তো ভেবেছে আমি খালার কাছে বলে দিতে পারি। আবার কেউ কেউ আছে না, যারা নিজেদের প্রাইভেসি খুব মেইনটেইন করে। কাউকে কিছু বলে না।
তোমার মতো? বলে উদ্দেশ্যপূর্ণ হাসল তিথি।
আমার মতো কেন হবে?
এই যে তুমিও আমাকে কিছু বলছ না। যেন ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানো না। অথচ কদিন পরে দেখা যাবে হঠাৎ বাচ্চাকাচ্চার মা হয়ে বসে আছ।
এই…। কপট রাগের ভঙ্গিতে বলল অবন্তী। বেশি পাকামো করবি না। ভুলে যাস না যে তুই আমার থেকে তিন বছরের ছোট।
আচ্ছা, আচ্ছা। ভুল হয়ে গেছে, বড়পা। বলে হাসি চাপল তিথি। তারপর হঠাৎ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, শোনো, আরেকটা কথা। ধরলাম হৃদিপু আমাদের কিছু বলে নি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে বা ওই যে তার প্রাইভেসি। কিন্তু অনিক ভাইয়াকে তো অন্তত কিছু জানানো উচিত ছিল। তাই না? এই নেহাল ভাইয়ের ইস্যু তো আর আজকে থেকে না। মাসখানেক ধরেই বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াস কথাবার্তা হচ্ছে।
কী জানি! আমিও তো কিছু বুঝতে পারছি না। তুই এখন কী করবি, খালাকে বলবি?
ভাবছি। তোমার কী মনে হয়, বলা উচিত, নাকি না?
একবার মনে হয় হ্যাঁ। আবার মনে হয় না।
তুমি তো আমাকে আরও কনফিউজ করে দিচ্ছ। আচ্ছা, মাকে বললে মার কী প্রতিক্রিয়া হবে বলে তোমার মনে হয়? তুমি তো মাকে চেনো?
প্রথমত খুব কষ্ট পাবেন। ওই দিন আমাকে অনেক কথা বলছিলেন। তারপর কী করবেন সেটা বুঝতে পারছি না। হয়তো…।
অবন্তী তার কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই মৃদু চিৎকারে রিকশাওয়ালাকে থামতে বলল তিথি। অবন্তী ভীত গলায় বলল, কী হয়েছে?
জানি না কী হয়েছে। তবে কিছু একটা তো হয়েছেই। বলে লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামল তিথি। তারা প্রায় বাসার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সম্ভবত এ কারণেই তিথিকে বেশ নির্ভার লাগছে। সে পেছনের রিকশাটা কাছাকাছি আসা অবধি অপেক্ষা করল। তারপর সটান সেই রিকশার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রিকশায় যে ছেলেটা বসে আছে, তার চেহারায় একটা ডাকাবুকো ব্যাপার আছে। পরনে ফ্যাকাশে নীল জিনস। কালো শার্ট। কিন্তু সে বসে আছে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে। তিথিকে হঠাৎ এমন রুদ্রমূর্তিতে পথ আগলে দাঁড়াতে দেখে থতমত খেয়ে গেল সে। তিথি কঠিন গলায় বলল, আপনার সমস্যা কী?
জি? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল ছেলেটা।
আপনার সমস্যা কী?
আমার? আমার তো কোনো সমস্যা নেই।
সমস্যা নেই মানে? আপনি সেই কখন থেকে আমাদের পিছু নিয়েছেন? আপনার কি ধারণা, আমরা চোখে দেখতে পাই না? ঢাকা শহরে অন্ধ মেয়েদেরও পথ চলতে হলে চোখকান খোলা রাখতে হয়। আর আমরা তো চোখে দেখতে পাই। এখন বলেন, আপনার কী ঘটনা?
কোনো ঘটনা নেই।
কোনো ঘটনা নেই মানে? আপনি সেই ইউনিভার্সিটি থেকে আমাদের পিছু নিয়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছেন। আর এখন আবার রিকশা নিয়ে আমাদের অনুসরণ করে একদম বাড়ি পর্যন্ত চলে আসছেন? অথচ বলছেন আপনার কোনো ঘটনা নেই?
সত্যি বলছি…।
ছেলেটা কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই চারপাশ থেকে লোকজন হইহই করে উঠল। উত্তেজনায় বিষয়টা এতক্ষণ খেয়াল করে নি তিথি। তার কণ্ঠ শুনে চারপাশে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। তারা ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছে। তিথি বলল, এই লোক আমাদের সেই ইউনিভার্সিটি থেকে ফলো করছে। আর তারপর আমাদের পিছু পিছু রিকশা নিয়ে এত দূর চলে এসেছে…।
তিথির কথা শেষ হওয়ার আগেই ভিড়ের মধ্য থেকে অতি উৎসাহী একজন বিচ্ছিরি শব্দে বকল ছেলেটাকে। আরেকজন তার গায়ে হাত তুলতে উদ্যত হলো। ছেলেটা লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। তাকে সেই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করল অবন্তী। সে তিথিকে বলল, উনি আমার পরিচিত, তিথি।
কী? অবাক গলায় বলল তিথি। তোমার পরিচিত?
হুম।
কে উনি?
বলছি। আগে লোকগুলোকে বিদায় কর।
তিথি মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত বোধ করলেও শেষ অবধি লোকগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তাদের বিদায় করল। তারপর বলল, ঘটনা কী, আপু? লোকটা সেই কখন থেকে আমাদের ফলো করছিল। তুমি ভয় পাবে দেখে আমি এতক্ষণ কিছু বলি নি।
আমি দেখেছি।
তুমিও দেখেছ? অবাক ভঙ্গিতে বলল তিথি।
হুম। বলেই ছেলেটার দিকে তাকাল অবন্তী। তারপর শান্ত গলায় বলল, আপনার কি মনে হয় কাজটা আপনি ঠিক করছেন?
ছেলেটা কথা বলল না। অবন্তী বলল, সবকিছুতেই পরিমিতি বোধ থাকতে হয়। ওটুকু না থাকলে ভালো কিছুও টক্সিক হয়ে যায়।
আমি সরি। কথা বলল ছেলেটা। সে ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। অবন্তী বলল, এটা সরি বলার মতো কোনো বিষয় না। উপলব্ধির বিষয়। কিন্তু আমার ধারণা সেই বোধ আপনার নেই। থাকলে এই ঘটনা আপনি আবারও ঘটাতেন না।
ছেলেটা কথা বলল না। তিথি খানিক দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের করণীয় ঠিক করতে পারছে না সে। তবে এটুকু স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে এই ছেলের সঙ্গে অবন্তীর বিশেষ কোনো সম্পর্ক আছে।
অবন্তী বলল, আপনি প্লিজ, এই কাজটি আর কখনো করবেন না। আমার প্রচণ্ড খারাপ লাগে। মনে হয় সারাক্ষণ কেউ একজন আমার ওপর চোখ রাখছে। আপনিই বলুন, এমন কিছু যদি কেউ আপনার সঙ্গে করত, তাহলে কেমন লাগত আপনার?
ছেলেটা এবারও কথা বলল না। অবন্তী ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। সঙ্গে তিথিও। সে এখনো দ্বিধান্বিত। ছেলেটা যেমন ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে রইল।
.
রাতে কী ভেবে তিথির ঘরে এল অবন্তী। তারপর আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বলল, শোন?
হুঁ।
তুই আমাকে খুব খারাপ ভাবছিস, তাই না?
উঁহু। তা কেন?
না। মানে সবার সামনে তোকে আমি ওভাবে…।
আরে ধুর। এটা কোনো ব্যাপারই না। বলে হাসল তিথি। আমি কি আর জানতাম নাকি যে উনি তোমার পরিচিত!
আসলে…। বলে সামান্য থমকাল অবন্তী। যেন বুঝতে পারছে না কথাটা কীভাবে বলবে সে। উনি আমাদের কলেজের ইংরেজি শিক্ষক মজিবর চাচার ছেলে। মঈন ওনার নাম। মজিবর চাচা হলো বাবার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
আচ্ছা। নিজ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করল না তিথি।
সেই ছোটবেলা থেকেই আমাকে খুব পছন্দ করতেন উনি। তো ওই সময়টাতে যা হয় আর কি, একটা অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করত। ব্যাপারটা ঠিক প্রেম না। কিন্তু কেমন একটা লাগত সারাক্ষণ। মনে হতো, মানুষটার ওই আগ্রহটুকু থাকুক। আমি যে খুব পাত্তাটাত্তা দিতাম, তা না। বরং ইগনোরই করতাম। কিন্তু উনি অদ্ভুত সব কাণ্ড করতেন।
বলে সামান্য থামল অবন্তী। তার চোখের কোণে যেন একটা স্পষ্ট ভয়ের ছায়া। এসএসসিতে আমার রেজাল্টটা ঠিক আশানুরূপ হলো না। বিশেষ করে ইংরেজিটা। এই নিয়ে বাবা-মা খুব আপসেট হয়ে গেলেন। ফলে কলেজে উঠতেই আমার সব দায়িত্ব গিয়ে পড়ল মজিবর চাচার ওপর। আমি ওনার কাছে পড়তে যেতাম। মঈন ভাই ঠিক শান্তশিষ্ট স্বভাবের মানুষ না। পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগ ছিল না। ঢাকায় থাকতেন। তবে প্রায়ই বাড়িতে যেতেন। তখন দেখা হতো। একটু ডাকাবুকো স্বভাবের। ছাত্ররাজনীতি করতেন। সিগারেট-টিগারেট খেতেন। এই নিয়ে ওনাদের পরিবারেও খুব ঝামেলা হচ্ছিল। আর আমিও খুব গুটিয়ে থাকতাম। কিন্তু…।
কিন্তু কী?
উনি কখনো আমাকে কিছুতে জোর করেন নি। বরং যখন দেখতেন যে আমি ভয় পাচ্ছি বা গুটিয়ে যাচ্ছি, তখন উনিও আর এগোতেন না। দূরে দূরে থাকতেন। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় কি জানিস?
কী?
এই যে আমি ওনাকে পছন্দ করতাম না, ওনার ওপর একধরনের বিরক্তি বা ভয়ই কাজ করত। অথচ সেই উনিই যখন দূরে সরে যেতেন, তখন খুব খারাপ লাগত আমার। মনে হতো, উনি কেন আগের মতো আমাকে গুরুত্ব দেন না।
তিথি ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, খুব ইম্পর্ট্যান্স পেতে ইচ্ছে হতো, না?
হুম। তবে সেটা আমি সচেতনভাবে বুঝতে পারতাম না। ওনাকে দেখলে বরং বিরক্তিই লাগত। আর প্রচণ্ড রাগী ছিলেন। বাসার সবার সঙ্গে যখন-তখন রেগে যেতেন। রাস্তাঘাটেও। ফলে একটা ভয়ও কাজ করত। অথচ অবচেতনে আমি চাইতাম উনি আমার আশপাশেই থাকুন। আমাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিন।
তারপর?
তারপর একটা সময় গিয়ে…মানে ঠিক ও রকম প্রেম প্রেম ব্যাপার না…কিন্তু একটা সম্পর্ক হয়ে গেল আমাদের। আমি না আসলে তখনো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কনফিউজড ছিলাম খুব। এই মনে হতো সব ঠিকই আছে। আবার পরমুহূর্তেই মনে হতো, না, আমি আসলে এটা চাই না। ওনাকে আমি পছন্দ করি না। এই সব। একটা প্রচণ্ড দ্বিধা কাজ করত সারাক্ষণ। নিজেকে বুঝতে না পারার ফলে যে অস্পষ্ট অনুভূতিটা হয় আরকি!
সম্পর্কটা ভাঙল কী করে?
এই প্রশ্নে চুপ করে গেল অবন্তী। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ধবধবে সাদা দেয়ালের দিকে। সেখানে একটা পোকা। পোকাটার পেছনে সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে একটা টিকটিকি। টিকটিকিটা কি পোকাটাকে ধরে ফেলতে পারবে, নাকি তার আগেই উড়ে চলে যাবে সে?
কী এক ঝামেলায় হঠাৎ পুলিশ গ্রেপ্তার করল ওনাকে।
পুলিশ? প্রায় আঁতকে ওঠা গলায় বলল তিথি। মানে কী? কী করেছিলেন উনি?
আমি ঠিক জানি না। নানাজন নানা কথা বলে। আমি সেদিনই মজিবর চাচার সঙ্গে লঞ্চে ঢাকায় আসছিলাম। আমার পরীক্ষা তত দিনে শেষ হয়ে গেছে। ঢাকায় ইউনিভার্সিটি অ্যাডমিশন কোচিংয়ে ভর্তি হতে হবে। চাচা আমাকে ওনার এক স্টুডেন্টের কোচিংয়ে ভর্তি করানোর জন্য নিয়ে এলেন। খবরটা আমরা শুনতে পাই পরদিন। মাস কয়েক পর উনি ছাড়া পেলেন।
তারপর?
তারপর আর কী! বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল অবন্তী। ঘটনা গ্রামে জানাজানি হয়ে গেল। ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হলো। মানুষের মুখে মুখে নানা কথা ছড়াতে লাগল। মা বাবাও সম্ভবত ওনার আর আমার ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। ফলে ওনারাও…।
সব শেষ হয়ে গেল?
হুম।
ওনার সঙ্গে আর কথা বলো নি তুমি?
নাহ্।
কেন? তোমার কথা বলা উচিত ছিল না?
এই প্রশ্নের উত্তরে চুপ করে রইল অবন্তী। দীর্ঘ সময়। তারপর বলল, ওই যে পোকাটাকে দেখছিস, দেয়ালে?
হুম।
পেছনের টিকটিকিটাকে?
হুম।
পোকাটা কী নিশ্চিন্ত, না! কিন্তু সে কি জানে যে ওই টিকিটিকিটা এখুনি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে?
তিথি এবার আর জবাব দিল না। সে বিভ্রান্ত চোখে অবন্তীর দিকে তাকিয়ে রইল। অবন্তীর চোখের কোণে টলমল করছে জল। সে আলতো হাতে অবন্তীর হাতখানা ধরল। অবন্তী প্রায় ফিসফিস করে বলল, তুই প্লিজ, খালাকে কিছু বলিস না। আজকের ঘটনাটাও না।
তিথি মাথা নাড়ল, বলব না।
তার হঠাৎ মনে হলো, জীবনজুড়েই আশ্চর্য সব দুঃখ বুকে পুষে হাসিমুখে ঘুরে বেড়ায় মানুষ।
৬
হৃদির বিয়ের ব্যাপারটা রোখসানা বেগম জানতে পারলেন পরদিন সন্ধ্যায়। তিথি অবশ্য তার আগে বাড়ি ফিরেই অস্পষ্ট একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল মাকে। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হচ্ছিলেন না তিনি। বললেন, অন্য কোনো ব্যাপার আছে।
অন্য কী ব্যাপার?
আরও খারাপ কিছু।
আরও খারাপ কিছু কী, মা?
তা তো জানি না। তবে আমার মন কু ডাক দিচ্ছে। তুই হৃদির ভাবভঙ্গি দেখে কিছু বুঝছিস না?
কই? আমার চোখে তো কিছু পড়ছে না।
আমার চোখে পড়ছে।
কী?
হৃদি প্রায়ই বাসা থেকে কাপড় নিয়ে বের হয়।
মানে?
মানে ওর ব্যাগে এক-দুই সেট এক্সট্রা কাপড় থাকে।
তাতে কী? হয়তো টেইলারের দোকানে যায়। তা ছাড়া আপুর তো ইউনিভার্সিটিতে নানান প্রোগ্রাম থাকে। সেখানেও লাগতে পারে। পারে না?
পারে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে তো সে কোনো লুকোছাপা করে না। লুকোছাপা করে অন্য ক্ষেত্রে। একবার তিন্নিদের বাসায় গেল। তারপর ফোন করে বলল রাতে ফিরবে না। ফিরল পরদিন সন্ধ্যায়। তখন কী হলো, জানিস?
কী?
পরদিন সন্ধ্যায় সে যখন বাসায় ফিরল, দেখি তার পরনে অন্য জামা।
তাতে কী? আমি যদি আমার বান্ধবীর বাসায় এক রাতের জন্য যাই, তাহলে তার জামা পরতে পারি না? নাকি সঙ্গে করে আমার অন্য জামা নিয়ে যাব?
হুম। বলে গম্ভীর হয়ে গেলেন রোখসানা বেগম। বললেন, তার পরনে তার নিজেরই অন্য জামা ছিল। তার মানে কী? সে কি তিন্নিদের বাসায় যাওয়ার সময় নিজের আরেক সেট জামা নিয়ে গিয়েছিল?
এই কথায় চুপ হয়ে গেল তিথি। সে তার নিজের যুক্তির ফদেই আটকে গেছে। রোখসানা বেগম বললেন, ধরলাম রাতে থাকবে বলে সে নিয়ে গেছে। কিন্তু সে তো আর আগে থেকেই তিন্নির বাসায় থাকার প্ল্যান করে যায় নি। হঠাৎ করে থেকে গেছে। তাহলে সে জামা নিয়ে গিয়েছিল কেন?
তিথি দেওয়ার মতো কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না। রোখসানা বেগম বললেন, আরও ঘটনা আছে।
কী ঘটনা?
আজ আমি কিছুক্ষণ আগে তিন্নির মায়ের সঙ্গে কথা বললাম। এটা-সেটা বলার পর হঠাৎ সেদিন রাতের কথা জিজ্ঞেস করলাম। মানে সরাসরি না। সে যাতে ঘটনা বুঝতে না পারে, এমনভাবে জিজ্ঞেস করলাম। সে কী বলল, জানিস?
কী?
সেদিন রাতে হৃদি তিন্নির বাসায় যায় নি।
কী বলো?
হুম।
তাহলে কোথায় গিয়েছিল আপু?
আমার ধারণা নেহালকে সে যা বলেছে, সেটাই সত্যি।
কী! আপু লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে?
হুম। সে ওই অনিক ছেলেটাকেই বিয়ে করেছে। সম্ভবত তাদের আলাদা কোনো বাসাও আছে। কিংবা অন্য কারও বাসায় মাঝেমধ্যে গিয়ে থাকে তারা।
এই কথায় তিথি থ হয়ে গেল। তার এখন মনে হচ্ছে মায়ের কথাই সত্যি। রোখসানা বেগম বললেন, এখন আমার আরও অনেক কথাই মনে পড়ছে। তখন সেসব মাথায় নিই নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এ রকম আরও অনেক ঘটনাই আছে। তাকে কখনো রান্নাঘরে ঢুকতে দেখতি আগে?
নাহ্।
কিন্তু আমি যখন বাসায় থাকতাম না, তখন সে প্রায়ই লুকিয়ে লুকিয়ে রান্না করত। সেই রান্না সে কার জন্য করত? তার নিজের জন্য? নিজের জন্য তো সে জগ থেকে এক গ্লাস পানি পর্যন্ত ঢেলে খায় না। তাহলে?
তিথির কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না। কিন্তু তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে হৃদি সত্যি সত্যিই অনিককে বিয়ে করে ফেলেছে এবং সেটা সে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে। কী আশ্চর্য, এত কাছে থেকেও তারা কেউ সেটা এত দিন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারে নি। রোখসানা বেগম হঠাৎ গুনগুন করে কাঁদতে শুরু করলেন। তিথি বলল, মা, এখন কী করবে?
কী করব?
হুম।
আমি গলায় দড়ি দেব।
তুমি গলায় দড়ি দেবে কেন?
কেন দেব জানিস না? আমি আরও আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে ধরে ধরে বলেছি যে নেহালের সঙ্গে হৃদির বিয়ের সবকিছু ফাইনাল। এখন কেবল ডেটটাই বাকি। অত ভালো ছেলে। বড় মুখ করে দশজনকে বলা যায়। সবাই কেমন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। তুই-ই বল, এ রকম একটা ছেলে তুই আশপাশে আর দেখেছিস?
তিথি কথা বলল না। সে মায়ের করুণ, পাংশুটে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রোখসানা বেগম বললেন, আমার গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া তো আর কোনো উপায় নাই। এই মুখ আমি কাকে দেখাব? দেখাতে পারব কাউকে? কে জানে, এর মধ্যে আরও কোনো ঘটনা আছে কি না।
আর কী ঘটনা থাকবে?
দেখা গেল পেট বাধিয়ে বসে আছে।
ছি মা, এসব কী বলছ?
এসব কী বলছি মানে কী, হ্যাঁ, এসব কী বলছি মানে কী? রোখসানা বেগম হঠাৎ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। তার চোখে উন্মাদের দৃষ্টি। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। তিনি চিৎকার করে বললেন, নতুন বিয়ে করা বউয়ের সঙ্গে কোনো ছেলে এক বাসায় এক বিছানায় বসে বসে বিবিসি-সিএনএনের সংবাদ দেখে দেখে বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, খেলাধুলার আলোচনা করে? করে না। তারা নিজেরা খেলাধুলা করে। বিয়েই যখন করতে পারছে, তখন পেট বাঁধাতে আর সমস্যা কী?
বলেই আবার হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন তিনি। সঙ্গে দুহাতে বুক চাপড়াতে লাগলেন। তিথি অবাক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মা যে তার সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলতে পারে, এটা সে কস্মিনকালেও ভাবে নি। কিন্তু এখন কী হবে?
এরপরের ঘটনা অবশ্য সহজ। তিনি তেড়েফুঁড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আমি কেন গলায় দড়ি দেব? আমার মা বলত, দুষ্ট গরুর চাইতে শূন্য গোয়াল ভালো। আমি গোয়াল শূন্য করব। আমার কোল খালি করব। এই রকম পোলাপান থাকার চাইতে না থাকা ভালো।
মা! বলে তিথিও উঠে দাঁড়াল। কী হয়েছে তোমার? আপু যদি ও রকম কিছু করেই থাকে, তাহলে সেটা তো এইভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্নাকাটি করে তুমি ঠিক করতে পারবে না। পারবে?
পারব। আমি আমার মতো করে করব।
কী করবে তুমি?
আমি এক কোপ দিয়া তারে দুই টুকরা করে ফেলব। তারপর জেলে যাব। পত্রিকায় খবর আসবে–মায়ের হাতে মেয়ে খুন। আমি হলাম খুনি মা।
বলেই ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন তিনি। তারপর ছুটলেন হৃদির ঘরের দিকে। কিন্তু হৃদির ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অনেক ডাকাডাকির পরও সে দরজা খুলল না। কোনো শব্দও করল না। মাকে সামলানোর চেষ্টায় তটস্থ তিথি হঠাৎ ভয় পেয়ে গেল। সে বলল, মা, তুমি একটু শান্ত হও। আগে আমার কথা শোনো।
রোখসানা বেগম ধাক্কা দিয়ে তিথিকে সরিয়ে দিলেন। তারপর দুহাতে সজোরে আঘাত করতে লাগলেন দরজায়। এই মুহূর্তে ভেতর থেকে দরজা খুলে দিল হৃদি। তারপর শান্ত ভঙ্গিতে বেরিয়ে এল বাইরে। তাকে দেখে থমকে গেলেন রোখসানা বেগম। হৃদির চোখ লাল। এলোমেলো চুল। মুখ ফোলা।
তাকে দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘ সময় কান্নাকাটি করেছে সে। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা এড়াতে তিথি হঠাৎ দুজনের মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়াল। হৃদি অবশ্য রোখসানা বেগমকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। সে থমথমে গলায় বলল, এত চিৎকার-চেঁচামেচি করার মতো কিছু হয় নি, মা। আমি অনিককে বিয়ে করেছি। আমার বয়স আঠারো পার হওয়ার পরই করেছি। এটা নিয়ে এত সিনক্রিয়েট করার তো কিছু নাই।
রোখসানা বেগম মেয়ের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি তিথির কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া আশা করেন নি। বরং ভেবেছিলেন, সে ভয়ে, অপরাধবোধে সংকুচিত হয়ে থাকবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। সে একই রকম শান্ত গলায় বলল, অনিককে তোমার মেনে নিতে সমস্যা হলে আমাকে বলো। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। এই নিয়ে অযথা হইচই করবে না।
রোখসানা বেগম অনেক চেষ্টা করেও বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেলেন না। তিনি বরং মুখ চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়লেন। তারপর কাঁদতে লাগলেন অঝোরে। হৃদি বলল, মাকে ঘরে নিয়ে যা, তিথি। মাথায় পানিটানি দে। দেখ, প্রেশারটা আবার বেড়েছে কি না! বাড়লে ওষুধ খাওয়া। আর আমাকে অযথা বিরক্ত করবি না। আমার মনমেজাজ ভালো না। বলেই আবার ঘরে ঢুকে গেল সে। তারপর দরজা বন্ধ করে দিল।
বিষয়টাতে যারপরনাই অবাক হলো তিথি। অবন্তীও ভীতসন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে দূরে। তারা দুজন রোখসানা বেগমকে ধরে নিয়ে গেল ঘরে। সেই রাতে আর কোনো কথা বললেন না রোখসানা বেগম। তার দুপাশে দুজন সারা রাত বসে রইল। ভোররাতের দিকে খানিক ঘুমালেন তিনি। কিন্তু সেই ঘুমের মধ্যেও বারবার যেন দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠতে লাগলেন।
অবন্তীকে পরদিন ডাকল হৃদি। বলল, তোদের সঙ্গে পরশু অনিকের দেখা হয়েছিল?
হ্যাঁ।
তিথি ওকে কী বলেছে?
আমি তো ওদের কাছে ছিলাম না, আপু। অবন্তী ভয়ে ভয়ে জবাব দিল। ওরা আমার থেকে একটু দূরে গিয়ে কথা বলেছে।
পরে তিথি তোকে কিছু বলে নি?
অবন্তী কী বলবে বুঝতে পারল না। অনেক ভেবে শেষে বলল, হ্যাঁ।
কী বলেছে?
ওই যে নেহাল ভাইয়ার সঙ্গে তোমার বিয়ে নিয়ে।
আমি কি ওই বিয়েতে মত দিয়েছি?
অবন্তী মাথা নাড়ল, না।
হৃদি বলল, তাহলে? তিথি নাকি অনিককে বলেছে যে বিয়ের সিদ্ধান্ত ফাইনাল। আমি মত দিয়ে দিয়েছি। জোগাড়যন্তর চলছে। কেউ একটা বিয়ের সম্পর্কে থাকা অবস্থায় আরেকটা বিয়ে করতে পারে?
না।
তাহলে?
অবন্তী এবার আর কথা বলল না। হৃদি বলল, অনিক একটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার লাইফে ভয়াবহ সব ক্রাইসিস চলছে। এই সময়ে আমি আর ওর ওপর এই এক্সট্রা প্রেশারটা দিতে চাই নি। নিজে নিজেই যতটা সম্ভব সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিথি তাকে এসব কী বলল! এখন ছেলেটার অবস্থা একবার চিন্তা কর। সেদিনের পর থেকে সে না পারছে আমাকে বিশ্বাস করতে, না পারছে বিষয়টা মেনে নিতে। এমনিতেই নিজের নানা ঝামেলায় বিপর্যস্ত সে। এর মধ্যে এমন ঘটনা শুনলে কারও মাথা ঠিক থাকে?
অবন্তী না-সূচক মাথা নাড়ল। হৃদি বলল, কাজটা একদমই ঠিক হয় নি। তুই তিথিকে একটু বল আমার ঘরে আসতে। ওর সঙ্গে আমার কথা আছে।
.
তিথির নিজেরও এখন খুব অপরাধী লাগছে। কিন্তু সে কোনোভাবেই নেতিবাচক উদ্দেশ্য থেকে কিছু করে নি। বরং অস্পষ্ট হয়ে থাকা সমস্যার শিকড়গুলোকে সামনে এনে একটা সমাধানের পথ তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে যে পুরো বৃক্ষটাই উপড়ে পড়ে সব লন্ডভন্ড করে দেবে তা কে জানত!
হৃদি বলল, তুই অনিককে একটা ফোন কর।
আমি! সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে বলল তিথি।
হু। ফোন করে বল যে তুই যা বলেছিস, তা সত্য না।
অনিক ভাইয়া কি খুব রেগে আছেন, আপু? তোমার সঙ্গে অনেক বাজে ব্যবহার করেছে?
অনিক তো রেগে যাওয়ার মানুষ না। বাজে ব্যবহারও করে না কখনো। সে চুপ হয়ে যাওয়ার মানুষ। কেউ তাকে চড় মারলেও সে চুপচাপ মাথা নিচু করে চলে আসবে। তাকে যদি তার একশটা চড় ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে, তারপরও।
তোমাকে কী বলেছেন উনি?
কিছুই বলে নি।
তাহলে?
তাহলে কী?
তুমি যে কাল দরজা বন্ধ করে কাঁদছিলে?
আমি কেঁদেছি তোকে কে বলল?
কেউ বলে নি। কিন্তু…। বলে সামান্য থমকাল তিথি। তারপর বলল, না মানে…তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
ও তেমন কিছুই বলে নি। শুধু জানতে চাইছিল আমি ওকে জানাই নি কেন?
তুমি কী বললে?
কী বলব? এমন কিছু তো হয়ই নি। তা ছাড়া আমি নতুন করে আর কোনো স্ট্রেস দিতে চাই নি ওকে।
ভাইয়া কি শেষ পর্যন্ত বুঝেছে?
ও তো মুখ ফুটে কখনোই কিছু বলবে না। আসলে সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছে ওর। আর এই সময়গুলোতে মানুষ প্রচণ্ড ইনসিকিউরিটিতে ভোগে। ভাবে, কাউকেই ধরে রাখার ক্ষমতা তার নেই। কে জানে, এ কারণেই হয়তো একটা কনফিউশন কাজ করছে।
আমি ফোন করে কী বলব?
যা সত্যি তা-ই বলবি।
তিথি ফোন করল। অনিক অবশ্য খুবই শান্ত, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলল। তিথি বলল, তুমি কি এখনো রেগে আছ?
রেগে থাকব কেন?
এই যে আমার কারণে এত কিছু হয়ে গেল?
কিছু হয়ে গেলে রাগলে আবার তা ঠিক হয়ে যায়?
তুমি এত কঠিন করে কথা বলছ কেন?
অনিক হাসল, আচ্ছা, সহজ করে বলছি। আমি রাগি নি।
খুব মন খারাপ করেছ?
আজকাল আর আলাদা করে কিছু বুঝতে পারছি না।
ধ্যাৎ, সেটা কখনো হয়?
কী হয় না?
কী কারণে মন খারাপ, সেটা মানুষ বুঝতে পারে না?
গাছ উপড়ে গেলে ডাল ভাঙার কথা আর মনে থাকে?
কঠিন হলেও কথাটা কানে গেঁথে রইল তিথির। মনেও। আসলেই তো, গাছ উপড়ে গেলে ভাঙা ডালের কষ্ট আর কেউ আলাদা করে মনে রাখে না। তখন সবাই গাছটাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
মানুষটা যেন কেমন। শান্ত, চুপচাপ। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় থাকে না ভেতরে কী চলছে! এই যে তার সঙ্গে দেখা হলো, এত কথা হলো, অথচ একবারের জন্যও বাবার মৃত্যুর খবরটা পর্যন্ত দিল না। আবার সেই মানুষটাই হৃদির বিয়ের কথা শুনে মুহূর্তেই কেমন ভঙ্গুর, এলোমলো হয়ে গেল। কিন্তু সেই ভঙ্গুরতাও প্রকাশ করতে চাইল না। আড়াল করে রাখল নিজের ভেতর। বিষয়টা অবাকই করেছিল তিথিকে। কাউকে কতটা ভালোবাসলে এমন কঠিন আবরণে ঢাকা একজন নির্বিকার মানুষও অমন চূর্ণ হয়ে যেতে পারে?
ফোন রাখতেই হৃদি বলল, কী? কথা হলো?
কী বলল?
তেমন কিছু না। বলে সামান্য থামল তিথি। তারপর বলল, একটা কথা বলি, আপু?
বল?
অনিক ভাইয়া তোমাকে খুব ভালোবাসে, না?
কেন?
কারণ, উনি একটা কথা বললেন। কথাটা অন্যদের ক্ষেত্রে সত্যি হলেও ওনার ক্ষেত্রে সত্যি না।
কী কথা?
আমি জিজ্ঞেস করলাম, সেদিনের ঘটনায় ওনার মন খারাপ কি না। উনি বললেন গাছ উপড়ে পড়লে ডাল ভাঙার খবর আর কে রাখে! মানে নানা ঘটনায় উনি উপড়ে পড়া গাছ। ফলে আলাদা করে ওনার মন খারাপ কি না, উনি জানেন না। কিন্তু কথাটা সত্যি না।
সত্যি না কেন?
তিথি সেদিনের ঘটনাটা বলল। শুনে চুপ করে রইল হৃদি। বেশ খানিকটা সময়। তারপর বলল, সম্ভবত এই একটা কারণেই ওকে আমি ভালোবাসি। সম্ভবত এই একটা কারণেই ওভাবে বোকার মতো ওকে বিয়ে করে ফেলেছিলাম। সবার ভালোবাসায় অনেক বেশি দেখালেপনা, আড়ম্বর, উদ্যাপন থাকে। কিন্তু ও আড়ম্বরহীন এক মানুষ। উদ্যাপনও নেই। সবকিছুতেই কেমন নির্বিকার, নির্লিপ্ত। বাইরে থেকে দেখে সহসা কিছু বোঝার উপায় নেই। কিন্তু ওর মতো নীরবে ভালোবাসতে পারে, এমন আর একটা মানুষও কখনো দেখি নি আমি।
হৃদির গলায় যেন বাষ্প জমেছে। তিথি এসে বোনের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর বলল, কিন্তু এখন কী করবে?
জানি না। বলে উদ্দেশ্যহীন ভঙ্গিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল হৃদি। তারপর বলল, কিছু করতে হলে আমাদের সময় দরকার। কিন্তু সেই সময়টাই তো কেউ দেবে না আমাদের। বরং সবাই চাইবে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আমার মাঝে। মাঝে কী মনে হয়, জানিস?
কী?
যদি সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে কোথাও চলে যেতে পারতাম! কিন্তু কোথায় যাব? যাওয়ার তো কোনো জায়গা নেই আমার।
অনিক ভাইয়ার বাড়ি…? ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল তিথি।
ওদের বাড়ি?
হুম।
গ্রামে। আজ খবর এসেছে ওর মা হঠাৎ প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে ঢাকায় নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু ঢাকায় এনেই-বা তাকে রাখবে কোথায় ও? সেই আশ্রয়টুকুই তো নেই।
তিথি কথা বলল না। হৃদি হঠাৎ বলল, একটা কাজ করলে কেমন হয়?
কী কাজ?
আমি যদি নেহালের সঙ্গে দেখা করি?
নেহাল ভাইয়ার সঙ্গে? ভীষণ অবাক হলো তিথি।
হুম।
তার সঙ্গে দেখা করলে কী হবে?
এই প্রশ্নে চুপ করে রইল হৃদি। বেশ খানিকটা সময় কী ভাবল। তারপর বলল, সেটা দেখা করার পর তাকেই না হয় বলব। এই অবস্থায় একমাত্র সে-ই আমার ভরসা।
তিথি হৃদির কথা কিছুই বুঝতে পারল না। তবে হৃদির চোখে খানিক আগে যে বিষণ্ণতার গাঢ় মেঘ ছায়া ফেলেছিল, সেই ছায়ায় হঠাৎ আলোর ঝলকানি তার দৃষ্টি এড়াল না।
৭
জায়গার নাম বৈদ্যবেলঘরিয়া। ঢাকার কাছেই প্রত্যন্ত এক গ্রাম। যত দূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। সেই মাঠে মাইলের পর মাইল মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আখখেত। আখখেতের আল ধরে হেঁটে চলছে তিনজন মানুষ। প্রচণ্ড রোদ থেকে বাঁচতে তিনজনের মাথায়ই মাথাল। এ অঞ্চলের কৃষকেরা গনগনে রোদে খোলা মাঠে কাজ করতে বাঁশ ও তালপাতায় তৈরি হ্যাটসদৃশ এই মাথাল মাথায় পরে থাকে। ছোট্ট দলটার সামনে থাকা লোকটার নাম জামশেদ। তিনি হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন। তারপর ফ্যাসফেসে গলায় বললেন, কারও চোখে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই তো?
পেছনের কৃশকায় লোকটা বলল, না স্যার। আমাদের পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে সবই এখানকার কৃষকদের মতোই।
জামশেদ হাসলেন, তা ঠিক আছে, মতিন মিয়া। কিন্তু সাবধানের মার নেই। সামান্য ভুলও অনেক বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
মতিন মিয়া তাকে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করল। এবড়োখেবড়ো পথের কষ্টকর যাত্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে এসে তারা যেখানে দাঁড়াল, সেখানে মানুষের সাড়াশব্দ নেই। চারপাশে কেবল আখের পাতায় হাওয়ার একটানা খসখস শব্দ। যেন অসংখ্য সাপ একসঙ্গে ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করছে। জায়গাটা ঝোঁপঝাড়ে ঢাকা। দূর থেকে দেখলে অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠা দুর্গম জঙ্গল বলে ভ্রম হয়। জামশেদ হাত তুলে পেছনের দুজনকে থামতে ইশারা করলেন। তারপর বললেন, এখন তো এখানে কেউ নেই, না?
জি না, স্যার।
এইটাও মাথায় রাখবা, মতিন মিয়া। খুব প্রয়োজন না পড়লে তুমিও বেশি একটা এখানে আসবা না। জাস্ট সময়ে সময়ে এসে বাচ্চাগুলোরে খাবার দিয়া যাবা। আর তুমি তো জানোই এদের সপ্তাহে এক দিন খাবার দিলেই হয়।
জি স্যার।
যতটা পারো লোকের দৃষ্টি থেকে দূরে থাকবা। খবরদার, কারও চোখেই পড়া যাবে না। একবার যদি এই খবর জানাজানি হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু তুলকালাম হয়ে যাবে। থানা-পুলিশের আগে এলাকার মানুষই পিটায়ে মেরে ফেলবে তোমাকে। বুঝলে?
বুঝি নি আবার! এই কারণেই তো আমি কোনো কাজের লোকও রাখি নাই এইখানে। যা করার নিজে একা একা এসে করি।
গুড। আরেকটা কথা।
জি স্যার।
খুব সাবধান। এরা কিন্তু একেকটা ভয়ংকর জিনিস। যদি কোনোভাবে এরা এখান থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু সর্বনাশ। একবার ভাবো তো, এরা এখান থেকে। বের হয়ে গ্রামে, লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ল?
কথাটা ভাবতেই গা শিউরে উঠল মতিন মিয়ার। সে ভীত গলায় বলল, ওই দুশ্চিন্তায়ই তো রাতে ঘুমাতে পারি না, স্যার। মাঝেমধ্যে ভয়াবহ সব দুঃস্বপ্ন দেখি। তখন মনে হয় এই সব ছেড়েছুঁড়ে আমি আমার আখ চাষেই ফিরে যাই।
আখ চাষ থেকে বছরে কত টাকা পেতে?
এবার মতিন মিয়ার চোখে হতাশা ফুটে উঠল। সে বলল, খুবই কম, স্যার। এত এত জমি আমার। প্রতিবছর হাড়ভাঙা খাটুনি, গুচ্ছের পয়সা খরচ করে ফসল চাষ করি। তারপরও দিন শেষে খরচের টাকাটাও ওঠে না। কত রকমের ফসলের চেষ্টাই তো করলাম। কিন্তু লাভ হলো কই? দিন শেষে যেই লাউ সেই কদু।
আর আমার সঙ্গে কাজ করার পর থেকে?
মতিন মিয়া এবার আর কথা বলল না। তবে তার চোখেমুখে খানিক আগের হতাশার বদলে আশার আলো ফুটে উঠল।
জামশেদ বললেন, কিছু পেতে হলে কিছু তো দিতেই হবে। ভয়কে জয় করতে হবে। কিন্তু ভয়কে জয় করা মানে কিন্তু দুঃসাহসী বা অসাবধান হওয়া না। থাকতে হবে সতর্ক। তা কেমন আছে আমার বাচ্চাগুলা?
মতিন মিয়া সামনে এগিয়ে খোলা জায়গাটাতে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে বড়সড় একটা পুকুর। পুকুরে নানা জাতের মাছ। তবে জামশেদ সেই মাছের বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখালেন না। তিনি সামনে এগিয়ে যেতে লাগলেন।
মতিন এগিয়ে গিয়ে ঘন জঙ্গলে ঢোকার পথটা খানিক পরিষ্কার করে দিল। যদিও বাইরে থেকে জঙ্গল যত ঘন আর দুর্গম দেখায়, বাস্তবে তা নয়। বরং বিঘা পাঁচেক জায়গাজুড়ে পুরোনো কোনো বাড়ির চিহ্ন ফুটে ওঠে। সেখানে প্রাচীন আমলের আদলে তৈরি বাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখা যায়। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভাঙা দেয়াল, ক্ষয়ে যাওয়া ইট, বিদীর্ণ মেঝে। লতাগুল্ম, ঝোঁপঝাড়ে ঢাকা পড়ে আছে সেসব। লোকালয় থেকে এত দূরের বিচ্ছিন্ন এই বাড়ি দেখে অন্তত এটুকু অনুমান করা যায় যে কোনো জমিদার বা ধনাঢ্য ব্যক্তি শখের বশে এখানে বাগানবাড়ি গড়ে তুলেছিলেন। বাড়ির সামনে ছোটখাটো একটা দিঘির মতোও খনন করা হয়েছিল। সেই দিঘির বাঁধানো ঘাটও ভেঙেচুরে একাকার। তার ফাঁকে ফাঁকে বেড়ে উঠেছে ঘাস, লতা-পাতা। প্রায় ভরাট হয়ে যাওয়া পুকুরে যেটুকু জল জমে আছে, তা পচা, দুর্গন্ধযুক্ত। তবে সেই দুর্গন্ধযুক্ত পচা জলে মৃদু আলোড়ন তুলছে ভয়ংকর কালচে কিছু প্রাণী। দিনের পর দিন বড় গাছের ঝরা পাতা পচে পুকুরের জল ঘোলা হয়ে আছে। ফলে জলে আলোড়ন তোলা। ভয়ালদর্শন ওই প্রাণীগুলোকে চট করে খেয়াল করা যায় না।
জামশেদ মজা পুকুরটার পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, তোমার বাচ্চাগুলা কেমন আছে?
মতিন মিয়া সন্ত্রস্ত গলায় বলল, মাঝে মাঝে মনে হয় আপনারগুলার চাইতে বুঝি এইগুলাই বেশি ভয়ংকর।
জামশেদ হাসলেন। বললেন, এইগুলাও কম ভয়ংকর না। আস্ত মানুষ ছেড়ে দিলে উঠে আসার চান্স কম। খেয়ে সাফ করে ফেলবে।
এই জন্যই রেগুলার খাবার দিয়া রাখি। কিন্তু ভয় লাগে। দিন দিন একেকটার যা সাইজ হচ্ছে!
ভয়ের কী আছে? এরা তো আর পানি থেকে উঠে আসতে পারবে না। পানির শ্বাসে এদের বাস। বুঝলা? এরা ডাঙায় কিছু না। আর যেগুলা বেশি বড়, মাঝে মাঝে সেগুলা দুয়েকটা তো বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রান্নাবান্না করে খেতেও পারো। পরে না হয় আবার ছোট দেখে এনে ছাড়বে?
দুয়েকবার নিয়া গেছিলাম, স্যার। কিন্তু অত বড় দেখে কেউ খেতে চায় না। আমার বউ তো ভয়ই পেয়ে গেছিল। তার কিছুতেই বিশ্বাস হয় না যে মাছ এত বড় হতে পারে। তাও আবার দেখতে রাক্ষসের মতন।
তুমি রাক্ষস দেখছ?
মতিন মিয়া বিব্রত হাসল, জি না।
তাহলে বুঝলা কীভাবে যে এরা রাক্ষসের মতো?
এরা যখন বিরাট বড় মুখ হাঁ করে গোল গোল চোখে তাকায়, তখন কলিজা উড়ে যায়। একবার একটার সাইজ কত হলো, জানেন?
কত?
আড়াই ফুট। ভয়ার্ত গলায় বলল মতিন।
জামশেদ হাসলেন, এই মাগুর আফ্রিকান মাগুর। এরা জাতে সর্বভুক। প্রাপ্তবয়স্ক একেকটা সাইজে তিন-চার ফুট পর্যন্তও হয়।
কী বলেন!
হুম।
মতিন আর কথা বলল না। জামশেদ আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখলেন। তারপর পেছনে ফিরে তাকাল। তার সঙ্গে আঠারো-উনিশ বছরের এক ছেলে। ছেলেটার নাম রাশু। রাশুর নাকের নিচে কেবল মিহি গোঁফের আভাস। ভাঙা, চিমসানো গাল। মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল। তবে এত কিছুর মধ্যেও তার ঈষৎ বাদামি রঙের চোখ জোড়া দৃষ্টি কাড়ে। বয়সের তুলনায় দেখতে খানিক ছোটই মনে হয় রাশুকে। জামশেদ তাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। তারপর বললেন, ব্যাগ থেকে মুরগি দুইটা দে তো।
রাশু তার হাতের ব্যাগ থেকে পলিথিনে মোড়ানো মুরগি দুটো বের করে দিল। দুটো মুরগিরই গলা কাটা। সেই কাটা গলা থেকে রক্তের স্রোত নেমে এসেছে বুক অবধি। তারপর জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে আটকে গেছে বুকের পালকের সঙ্গে। জামশেদ ধীরপায়ে হেঁটে পুকুরটার আরও কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর তার হাতের মুরগি দুটোকে ছুঁড়ে মারলেন জলে। সঙ্গে সঙ্গেই জলের বুকে তীব্র জলোচ্ছ্বাস তৈরি হলো। খানিক আগের মৃদু আলোড়ন পরিণত হলো তীব্র কম্পনে। সেই কম্পনে জল ছলকে উঠতে লাগল চারপাশে। আর ভয়ালদর্শন মাছগুলো যেন সত্যি সত্যিই রাক্ষসে পরিণত হতে লাগল। তারা একযোগে হামলে পড়ল খাবারের ওপর। তার পরের দৃশ্যটা গা গুলিয়ে ওঠার মতো। জামশেদ অবশ্য নড়লেন না। তিনি দীর্ঘ সময় সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চোখেমুখে তৃপ্তির হাসি।
মতিন মিয়া বলল, ভিতরের দিকে চলেন, স্যার।
হুম। বলে কী ভাবলেন জামশেদ। তারপর বললেন, এদিকে কেউ আসে না তো?
না, স্যার। এত দূরে কে আসবে? আর সামনের এই আখখেত আমার। ফলে আমি খেয়াল রাখি যাতে কেউ না আসে। আর কেউ আসলে তো ব্যবস্থা আছেই। সামনের বড় পুকুরে তো মাছের চাষই করি। ওইখানে একটা টংঘরও আছে। আমি আইসা মাঝেমইধ্যে ওইখানে থাকি। পুকুর পার হইয়া এই দিকে সহজে আসি না। তারপরও ধরেন কেউ যদি এইখানেও আসে, তারাও কিন্তু এসে দেখবে যে এই ছোট্ট ডোবাতেও মাছের চাষ হয়। তখন তো আর সন্দেহ করার উপায় নাই যে ভেতরে আসল ঘটনা কী?
হুম। কিন্তু সামনের বড় পুকুরের মাছ চাষে সমস্যা না থাকলেও আমাদের দেশে কিন্তু এই ছোট্ট ডোবার আফ্রিকান মাগুরের চাষ বৈধ না। সুতরাং সাবধান।
জামশেদ ডোবা পেরিয়ে বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালেন। তারপর একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশে চোখ বোলালেন। এই খাঁ খাঁ রোদের দুপুরেও চারপাশটা শান্ত, শীতল। গাছের পাতায় হাওয়ার শব্দ। সূর্যের আলো নকশা কেটেছ মাটিতে। আশপাশে কোথাও একটা ঘুঘু ডাকছে। একটা ডাহুক। বহুদিন ডাহুক দেখা হয় নি। এই নির্জন জল ও জঙ্গলের ধারে হঠাৎ ডাহুকের ডাক শুনে যেন খানিক স্মৃতিকাতরও হয়ে গেলেন জামশেদ।
মতিন মিয়া বলল, একটু বসে জিরাই নিবেন, স্যার?
নাহ্। আমাকে সন্ধ্যার আগেই ঢাকায় পৌঁছাতে হবে। তার আগে বাচ্চাগুলার অবস্থা দেখে যাই। অনেক কাজ বাকি।
উঠানের দুই পাশে দুটি টিনশেড ঘর। একটি ঘরের দেয়াল পাকা। অন্যটি সাধারণ টিনের। মতিন মিয়া টিনের বেড়ার ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে কতগুলো জাল স্তূপ করে রাখা। সে জালগুলো সরিয়ে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর বলল, বাচ্চাগুলা এখন এই ঘরে থাকে, স্যার।
জামশেদ জবাব দিলেন না। মতিন মিয়া ঘরের আলগা টিনের বেড়াটা টেনে একদিকে সরিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকটা পুরো উন্মুক্ত হয়ে গেল। সেই উন্মুক্ত অংশে চোখ রেখে মুহূর্তের জন্য আঁতকে উঠল রাশু। ঘরটার চারপাশে ঘন জাল দিয়ে ঘেরাও করা। সেই জালের গায়ে ঝুলে আছে ভয়ংকরদর্শন এক পদ্মগোখরা। হঠাৎ মানুষের পায়ের কম্পনে ফোঁস করে ফণা তুলল সাপটা। দেখে ভেতরে ভেতরে গুটিয়ে গেল সে। তবে বাইরে তা প্রকাশ করল না। জামশেদ আরও সামনে এগোলেন। ঘরটার মেঝেতে কিছু কাঠের বাক্স। বাক্সগুলোর ডালা খোলা। সেখানে কিলবিল করছে অসংখ্য সাপ। দৃশ্যটা রক্ত হিম করা। এত দিন ধরে এদের দেখাশোনা, পরিচর্যা করা সত্ত্বেও চোখেমুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল মতিন মিয়ার। তবে জামশেদ স্বাভাবিক। তিনি বেশ খানিকটা সময় স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর হাত দিয়ে জালটা এক পাশে সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন। মতিন মিয়া প্রায় আঁতকে ওঠা গলায় বলল, স্যার! এই দিক দিয়ে না। এই দিকটায় সব কিলবিল করতেছে। ডান দিকে আলাদা ঢোকার জায়গা আছে…।
জামশেদ অবশ্য তার কথা শুনলেন না। তিনি বরং হাত তুলে তাকে চুপ থাকতে ইশারা করলেন। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই এগিয়ে গেলেন সাপগুলোর দিকে। মেঝেতে জড়াজড়ি করে থাকা সাপগুলে কারও পায়ের স্পন্দনে ফণা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কয়েকটি ধেয়ে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু অন্যটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকায় পারছে না। জামশেদ অবশ্য সেসব গ্রাহ্য করলেন না। তিনি হাত বাড়িয়ে জালে ঝুলে থাকা সাপটা খপ করে ধরে ফেললেন। তারপর মুখের কাছটা দুই আঙুলে চেপে ধরে নিয়ে এলেন বাইরে। ভেতরের চেয়ে বাইরের এই জায়গাটিতে আলো বেশি। সেই আলোয় নিখুঁত দক্ষতায় সাপটার মুখ ফাঁক করে চোখের সামনে তুলে ধরলেন তিনি। তারপর দীর্ঘ সময় গভীর চোখে নিরিখ করে কী দেখলেন। মতিন মিয়া ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, কী অবস্থা, স্যার?
জামশেদ জবাব দিলেন না। আরও বেশ কিছুক্ষণ একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর খানিক নিচু হয়ে পকেট থেকে একটুকরো কাঁচ বের করে আনলেন। সাপটা ততক্ষণে অনেকটা চুপ হয়ে গেছে। জামশেদ সেই কাঁচের টুকরোটা সাপের দুই দাঁতের সঙ্গে সামান্য সময়ের জন্য চেপে ধরলেন। তারপর তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করে কী দেখলেন। রাশু আর মতিন মিয়া ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে। জামশেদ অবশ্য কাউকে কিছু বললেন না। তিনি হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে সাপটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ঘরের ভেতর। মেঝেতে পড়েই ফোঁস ফোঁস শব্দে আবার ফণা তুলে দাঁড়াতে লাগল সাপটা।
৮
নেহাল বসে আছে ধানমন্ডির এক রেস্তোরাঁয়। এই রেস্তোরাঁটা লেকের গা ঘেঁষে। চারদিকে কাঁচঘেরা। বাইরে তাকালেই শান্ত জলের হ্রদ। তার ওপারে সবুজ গাছের সারি। গাছের পাতার সবুজ ছায়া পড়েছে হ্রদের জলে। মৃদু হাওয়া বইছে। চারপাশে একটা শান্তি শান্তি ব্যাপার। তবে সেই শান্তি শান্তি ব্যাপারের মাঝেও নেহাল খানিক অস্থির হয়ে আছে। হৃদি হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা করতে চাইল কেন?
নেহাল যে খুব প্রেমিক ধাচের পুরুষ, তা নয়। কিন্তু হৃদিকে দেখে কিছু একটা হয়েছিল তার। প্রথম দর্শনেই প্রেম টাইপ ব্যাপার। ফলে বিয়ের ভাবনাটা এগিয়ে যাচ্ছিল দ্রুত। তার পরিবার থেকেও কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। কিন্তু সেই ভাবনায় অকস্মাৎ দেয়াল হয়ে দাঁড়াল হৃদি নিজেই। সেদিন ফোনে তার কথাটা শুনে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল নেহাল। তবে তাকে সেই অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও উদ্ধার করেছেন রোখসানা বেগম। তিনি তার নিভে যাওয়া আশার সলতেতে আবার আলো জ্বেলেছেন। আর তারপরই হৃদি তার সঙ্গে দেখা করতে চাইল। বিষয়টা নিয়ে খানিক দ্বিধান্বিত হলেও কিছু বলে নি সে। বরং কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করেছে। নেহাল সপ্রতিভ, আত্মবিশ্বাসী মানুষ। সে জানে অনেক মেয়ের ক্ষেত্রেই এমন হয়। প্রথম জীবনে উড়নচণ্ডি, চালচুলোহীন ভবঘুরে ছেলেদের প্রেমে পড়ে যায় তারা। কিন্তু সেই প্রেম বেশি দিন থাকে না। কিছুদিনের মধ্যেই ঘোর কেটে যায়। বাস্তবতা বুঝতে শেখে। কে জানে, হৃদির ক্ষেত্রেও হয়তো তেমন কিছুই হবে। না হলেও ক্ষতি নেই। নেহালের ধারণা, খুব বেশি বিরূপ পরিস্থিতি না হলে বিষয়টা সে সামলে নিতে পারবে। এই আত্মবিশ্বাস তার আছে।
.
হৃদির মুখ ভার। চোখ ফ্যাকাশে। সে ধীরপায়ে এসে বসল। নেহাল বলল, মন খারাপ?
হৃদি জবাব দিল না। তবে ম্লান হাসল। নেহালও। বলল, কাদের মন খারাপ থাকা উচিত, জানেন?
কাদের?
যাদের ভালোবাসার কেউ নেই। কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম উল্টো। এখানে তারাই মন খারাপ করে, কাঁদে, যাদের ভালোবাসার কেউ আছে।
মানে?
মানে…। বলে সামান্য থামল নেহাল। তারপর বলল, আমি তখন আমস্টারডামে পড়তে গিয়েছিলাম। একদিন রাস্তার পাশে এক বৃদ্ধ পিয়ানোবাদক পিয়ানো বাজাচ্ছিলেন। সেই পিয়ানোর সুর এমন যে অকারণে আপনার চোখে পানি চলে আসবে। আমি দীর্ঘ সময় তার থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা গাছের ছায়ায় চুপচাপ বসে ছিলাম। দিন শেষে যখন তিনি সবকিছু গুছিয়ে উঠে যাবেন, ঠিক তখন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
কী ঘটনা?
বৃদ্ধ হঠাৎ আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। আমি ভাবলাম, হয়তো অন্য কোথাও যাচ্ছেন। কিন্তু বৃদ্ধ ঠিক আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, তুমি কাঁদছ কেন? আমি তো অবাক! আমি কাঁদলেও অত দূর থেকে ওনার তা বোঝার কথা না।
আপনি কাঁদছিলেন?
ঠিক জানি না। নেহালের গলা ভার। তবে উনি বলার পর হঠাৎ মনে হলো হয়তো কাঁদছিলাম।
কেন?
কারণ, আমি তখন আমস্টারডামের একটা হাসপাতালের বাইরে দিনরাত বসে থাকতাম।
হাসপাতালের বাইরে?
হুম।
কেন?
এভিলিন তখন ভয়ানক এক অসুখে আক্রান্ত।
এভিলিন কে?
নেহাল এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। সে বলল, তাকে রাখা হয়েছে ইনকিউবেটরের মতো একটা জায়গায়। কাঁচের ঘরের বাইরে থেকে তাকে দেখা যায়। সে সারাক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কথা বলতে চায়। কিন্তু পারে না। তার চোখ থেকে টুপ করে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। ঠোঁট কাঁপে। কিন্তু সে কোনো শব্দ করতে পারে না। আমিও না। আমরা জানি, আমরা কেউ আর কখনো কাউকে শুনতে পারব না। কখনোই না। নেহালের গলা বুজে এল। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলাল সে। তারপর বলল, পারিও নি কখনো আর।
এভিলিন কে?
নেহালের চোখের কোনায় চিকচিক করছে জলের ফোঁটা। হৃদির হঠাৎ মনে হলো, এই যে তার আশপাশে এত মানুষ, তাদের সবারই এমন অসংখ্য বুকভার যন্ত্রণা। কিন্তু সেই যন্ত্রণার কথা তার সবচেয়ে কাছের মানুষটারও কখনো জানা হয় না। ফলে তারা পরস্পরের কাছ থেকে রয়ে যায় এক আলোকবর্ষ দূরে। সে নরম গলায় বলল, ওকে খুব ভালোবাসতেন?
নেহাল যেন চকিতে তার চোখ জোড়া আড়াল করল। তারপর হাতের উল্টো পিঠে মুছে ফেলল জল। বলল, আমাদের খুব অল্প দিনের পরিচয়। ও রাশান। আমি বাংলাদেশি। কিন্তু তাতে আমাদের পরস্পর ভালোবাসতে কোনো অসুবিধে হয় নি। বলে আবার থামল সে। দীর্ঘ সময়। তারপর বলল, যদি আমাদের কেউ ভালো না বাসত, কিংবা আমরা কাউকে, তাহলে পৃথিবীর কারও মৃত্যুতে, অসুখেই কিছু যেত আসত না আমাদের। না?
হু। মৃদু কণ্ঠে বলল হৃদি।
বৃদ্ধ পিয়ানোবাদক তখন আমাকে ওই কথাটিই বলেছিলেন। তিনি বললেন, যাদের জীবনে ভালোবাসা নেই, তাদের জীবনে দুঃখ-যন্ত্রণা কম। কিন্তু যারা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ, তাদের জীবন যন্ত্রণাময়। কান্নায় টলমল। ফুল অব টিয়ার্স।
হৃদি কথা বলল না। চুপ করে বসে রইল। নেহালকে অনেক কিছু বলবে ভেবেই এখানে এসেছিল সে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেসব কথা এই ছেলেকে বলা যায় না। এই ছেলে তার ভাবনার মতো নয়। বরং বাইরের ঝলমলে আনন্দময় চেহারার আড়ালে গভীর সংবেদনশীল এক হৃদয় তার রয়েছে।
সে নেহালের সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেও না। তার সঙ্গে পরিচয় নন্দিতার বাসায়। নন্দিতা তার কলেজের বন্ধু। ওর বড় বোনের বিয়েতে এসেছিল নেহাল। সেখানেই টুকটাক কথা। হৃদি তখুনি শুনেছিল, নেহাল উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেই বাইরে গিয়েছিল পড়তে। তারপর পরিবারসহ সেখানেই স্থায়ী হয়ে যায়। বেশ কিছুদিন পর দেশে এসেছে সে। ফলে দেশের সবকিছু নিয়েই তুমুল উচ্ছ্বাস তার। তবে সেই উচ্ছ্বাস প্রকাশের ধরনটা এত তরল যে হৃদির তা পছন্দ হয় নি। ফলে খানিক বিরক্তই হয়েছিল সে।
তাদের যোগাযোগটা অবশ্য হয়েছিল অন্যভাবে। বিয়ের অনুষ্ঠানে রোখসানা বেগমও ছিলেন। তিনি তখন সদা সতর্ক প্রহরীর মতো চারদিকে নজর রাখেন। এই বুঝি তার কন্যার জন্য একজন আদর্শ পাত্রের সন্ধান পাওয়া গেল! সেদিন নেহালকে দেখে, তার সম্পর্কে শুনে আগ্রহের পারদটা ক্রমশই উধ্বগামী হয়ে উঠেছিল তার। কথা প্রসঙ্গে হৃদির বাবা তোফায়েল হোসেনের প্রসঙ্গও উঠল। তিনি জটিল রোগে ভুগছেন। জন্মগতভাবেই রক্তের কণিকায় কিছু জটিলতা তার ছিল। অস্বাভাবিকভাবে জমাট বেঁধে যাচ্ছে রক্ত। ফলে নানাবিধ সমস্যার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় স্ট্রোকেও আক্রান্ত হতে হয়েছে তাকে। এতে শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্রমশ অসাড় হতে শুরু করেছে। অনেক চেষ্টা করেও ডাক্তাররা এর স্থায়ী বা পরিপূর্ণ কোনো সমাধান দিতে পারেন নি। বলা হয়ে থাকে যে বিভিন্ন দেশে এই সমস্যার ট্রায়াল বেসিসে চিকিৎসা কিংবা ওষুধ তৈরির চেষ্টাও চলছে। নেহাল ফার্মাসির শিক্ষার্থী হওয়ার কারণেই এ বিষয়ে কিছু জানাশোনা কিংবা আগ্রহ তার ছিল। ফলে নিজে থেকেই তোফায়েল হোসেনকে একবার দেখার কথা জানাল সে।
হুদিদের বাড়ির সঙ্গে তার অল্পবিস্তর যে যোগাযোগ, তার শুরুটাও সেখান থেকেই। তবে হৃদিই যে এই যোগাযোগর মুখ্য কারণ, তা স্পষ্ট হয়ে উঠল আরও কিছুদিন পর।
একদিন হুট করেই নন্দিতার মা তাদের বাসায় এলেন। কথা বললেন। সেই কথায় সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব! শুনে ভয়াবহ রাগ হয়েছিল হৃদির। এমনকি তাকে যখন নেহাল বাসায় দেখতে এল, তখনো। কিন্তু আজকের এই নেহালকে যেন আগে কখনো দেখা হয় নি। ফলে যে কথাগুলো তাকে বলবে বলে এখানে এসেছিল সে, সেই কথাগুলো আর বলতে ইচ্ছে হলো না।
নেহাল বলল, সরি। মন খারাপ কারোর সঙ্গে এত গম্ভীর ভারী ভারী কথা বলা বোধ হয় মানায় না।
উঁহু। ইটস অলরাইট।
এভিলিন মারা যাওয়ার পর…। বলে থামল নেহাল। সামান্য সময় নিয়ে নিজেকে যেন গুছিয়ে নিলে। তারপর বলল, আমি দীর্ঘদিন কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারতাম না। মনে হতো কাঁচের ওই ঘরটার ভেতর থেকে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ ছলছল।
হৃদি চুপচাপ তাকিয়ে আছে। যেন পড়তে চেষ্টা করছে মানুষটার ভেতরের যন্ত্রণা। নেহাল প্রায় বুজে আসা গলায় বলল, ইটস অ্যান আনবিয়ারেবল, ইনটলারেবল লাইফ।
হৃদি কী বলবে বুঝতে পারছে না। তবে তার সামনে বসা ভগ্নপ্রায় মানুষটার কষ্ট সামান্য হলেও অনুভব করতে পারছে সে। নেহাল বলল, সরি। প্রোবাবলি আই শুড নট টেল দিস হিয়ার। আই অ্যাম সরি…।
উঁহু। ইটস ওকে।
তারপর দীর্ঘ সময়। মৃদু হাওয়ায় জলের বুকে জেগে উঠল অজস্র কম্পন। কিছু হলুদ পাতা উড়ে এসে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সেই কম্পনে। একটা চড়ই পাখি টুপ করে এসে বসে পড়ল বাইরের লাল ইটবাঁধানো চত্বরে। তারপর খুঁটে খেতে থাকল পড়ে থাকা খাবারের উচ্ছিষ্ট। কাছের কোনো টেবিল থেকে চামচ, গ্লাস আর প্লেটের টুংটাং শব্দ ভেসে আসতে লাগল। দুজন থমকে যাওয়া, যন্ত্রণাকাতর মানুষ যেন অকারণ আকর্ষণে কিংবা তুমুল মনোযোগে সেই সব অর্থহীন শব্দ ও দৃশ্য শুষে নিতে থাকল। কিংবা নিজেদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর খানিক উপলক্ষ খুঁজে নিতে চাইল।
অবশেষে নীরবতা ভাঙল হৃদি। বলল, এখন?
নেহাল কথা বলল না। তবে চোখ তুলে তাকাল। হৃদি বলল, এখন পারছেন?
কী?
অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে? ভালোবাসতে?
না।
তাহলে?
তাহলে কী?
এই প্রশ্নে হৃদি চুপ করে গেল। কী বলবে সে? খানিক চুপ থেকে বলল, এই যে…না, মানে…।
মানে…এই যে আপনাকে চাইছি? সরাসরিই কথাটা বলল নেহাল। তবে হৃদি জবাব দিল না। সে চুপচাপ আঙুলের ডগায় জলের আলপনা আঁকতে লাগল টেবিলের কাঁচে।
নেহাল প্রায় ফ্যাকাশে গলায় বলল, আমি জানি না, হাও আই এক্সপ্লেইন দ্য থিংস টু ইউ। ইটস বিট মিস্টেরিয়াস, বাট ইনটেনডেড অ্যাজ ওয়েল। আর…। বলে যেন। সঠিক শব্দটা খুঁজে পাওয়ার জন্য খানিক সময় নিল সে। তারপর বলল, ইট কুড বি সিলি, বাট ট্র। আপনার সঙ্গে আমার দেখাটা…মানে একদম প্রথম মুহূর্তটাই আমাকে এলোমেলো করে দিল। পুরোপুরি। মনে হচ্ছিল, আই ওয়াজ ওয়েটিং ফর ইউ…ওয়েটিং ফর আ লং…লং টাইম। অ্যান্ড ফাইনালি দ্য টাইম হ্যাঁজ কাম। অ্যান্ড ইউ ক্যান বি দ্য লিটমাস পেপার অব দিস লাইফ অব অ্যাগেনি…। অ্যাবজর্ব এভরি বিট অব ইট।
হৃদি কথা বলল না। সে জানে না কেউ এমন কিছু বললে তাকে উত্তরে কী বলতে হয়! ফলে চুপ করে রইল সে। নেহাল বলল, এর মানে কিন্তু মোটেই এই নয় যে আমি। আপনাকে চাইছি বলে আপনারও আমাকে চাইতে হবে! আমি জাস্ট আমার অনুভূতিটা আপনাকে জানিয়েছি। কিন্তু আপনার অনুভূতির প্রতি আমার শতভাগ শ্রদ্ধা আছে। এমনকি আপনি যদি এই মুহূর্তে আমাকে বলেন যে আপনার সামনে থেকে আমাকে। চলে যেতে হবে, আই উইল…। আর কখনো আপনার সামনেও আসব না আমি। কিন্তু অনুভূতিটা তো…ইউ নো, ইরেসিসটেবল! না?
আমি আপনাকে কঠিন কঠিন কিছু কথা বলতে এসেছিলাম। অবশেষে বলল হৃদি। সঙ্গে একটা মিথ্যেও। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, অন্তত আর যা-ই হোক, আপনার সঙ্গে মিথ্যে বলা যায় না।
কেন?
কারণ, আপনি মানুষ ভালো। বলে হাসল হৃদি। নেহালও। বলল, মিথ্যে কথাটা কী?
আমি প্রেগন্যান্ট। শান্ত গলায় বলল হৃদি।
আর সত্যিটা, মানে যে কঠিন কথাগুলো আপনি আমাকে বলতে চেয়েছিলেন?
আমি বিয়ে করেছি, কথাটা সত্য এবং এই ভয়ানক পরিস্থিতি থেকে আপনি আমাকে উদ্ধার করবেন।
আমি?
হুম।
আমি কীভাবে?
তা আমি জানি না। বাট মা যেন বিষয়টা নিয়ে আমাকে আর প্রেশার না দেন, এটা আপনি আমাকে নিশ্চিত করবেন। এই ফেভারটা আমি চাইছি।
নেহাল কথা বলল না। হৃদি বলল, আই অ্যাম সরি ফর এভরিথিং। এভরিথিং। বাট…। আমি আসলে আপনাকে বোঝাতে পারব না যে কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমি যাচ্ছি। ইটস সিম্পলি আনএক্সপ্লেইনেবল।
কী করতে হবে আমাকে?
আমি জানি না। বাট, প্লিজ…। হৃদির কণ্ঠে কাতর অনুরোধ।
নেহাল হাসল। মৃদু, মলিন হাসি। হৃদি বলল, আমি সত্যি সরি। কিন্তু…।
কিন্তু দেয়ার ইজ নো আদার ওয়ে। তাই তো?
হৃদি বিমর্ষ ভঙ্গিতে মৃদু মাথা নাড়ল। নেহাল বেশ খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, আই উইল।
৯
অনিকের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। তার চোখ বসে গেছে। সেই চোখে ক্লান্ত, প্রাণহীন দৃষ্টি। হৃদি বলল, খারাপ কিছু?
এখনো ঠিক জানি না। তবে খুব ভালো কিছু না-ও হতে পারে।
কী করবে এখন?
আপাতত কিছুদিন ঢাকায়ই রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ট্রিটমেন্ট দরকার। তারপর বোঝা যাবে ঘটনা।
কিন্তু রাখবে কোথায়?
সেটাই ভাবছি। এখন আমার এক বন্ধুর বাসায় আছেন।
কিন্তু সেটা কত দিন?
অনিক উদ্দেশ্যহীন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। উষ্কখুষ্ক লম্বা চুলে এলোমেলো হাত বোলাতে লাগল। হৃদি বলল, কিছু ভেবেছ?
হুম।
কী?
একটা বাসা নিয়ে নেব।
বাসা! অবাক গলায় বলল হৃদি। এত টাকা কোথায় পাবে?
একটা টিউশন পেয়েছি নতুন। তুলনামূলক ভালো বেতন। তবে তাতেও যে সব সামলানো যাবে, এমন নয়। ভাবছি বাসাটা অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করব।
কীভাবে?
দুই রুমের বাসা। ড্রয়িংরুম। এক রুমে মা থাকবে। অন্য রুমটা কাউকে দেব। আমার কোনোভাবে চলে যাবে।
হুম। বলে খানিক চুপ করে রইল হৃদি। তারপর বলল, হলের রুম ছেড়ে দেবে?
হ্যাঁ। এত জুনিয়র ছেলেপুলেদের সাথে থাকতে আর ভালো লাগে না। আমাদের ব্যাচের সবাই তো সেই কবেই চলে গেছে।
বাসা দেখেছ?
একটা মোটামুটি ঠিকও করে ফেলেছি।
আচ্ছা। বলে আবার চুপ করে রইল হৃদি। তারপর বলল, খুব মন খারাপ?
অনিক হাসল। তারপর বলল, মন খারাপ করে কী হবে?
মন খারাপ হলে? অনিকের প্রশ্নেরই পুনরাবৃত্তি করল হৃদি।
হুম।
আদর হবে। বলে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে হাসল হৃদি। তারপর অনিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। অনিক বলল, আদরে মন খারাপ ভালো হয়ে যায়?
চেষ্টা তো করা যায়। দেখি, এই নারীজনম কতটুকু ব্যর্থ?
ব্যর্থ কেন হবে?
ব্যর্থই তো! নিজের মানুষটাকেও যদি আদরে বাঁদর বানাতে না পারি, তবে সেই নারীজনম ব্যর্থ না?
তারা বসে আছে ক্রিসেন্ট লেকের পাশের লাল ইটের দেয়ালে। মাথার ওপর কুর্নিশ করার ভঙ্গিতে ঘন হয়ে নেমে এসেছে গাছের ডাল, পাতা। সন্ধ্যার আধো আলো, আধো অন্ধকারে জায়গাটা বেশ নির্জন। আশপাশে কোথাও কেউ নেই। হৃদি হঠাৎ সেই নির্জনতায় অনিককে জড়িয়ে ধরল। তারপর তার গালে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, এটা আমার খুব ভালো লাগে?
কী?
এই যে না কামানো এলোমেলো দাড়ি।
আমার লাগে না।
তাহলে কী? আমার জন্য এমন করে রাখো?
উঁহু।
তাহলে? যেন মন খারাপ হলো হৃদির।
অনিক অবশ্য তা খেয়াল করল না। সে বিষণ্ণ গলায় বলল, আমার কিছু ভালো লাগে না, হৃদি। কিছু না। মনে হয়, এই সবকিছু রেখে দূরে কোথাও চলে যাই। যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না। আমিও কাউকে না। আমার কোনো কষ্ট থাকবে না। মনে হবে এই পৃথিবীতে আমি একা। আমার কোনো পিছুটান নেই।
আমিও না?
অনিক এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। হৃদি তার গলার কাছে নাক ঘষছে। তার নিশ্বাসে উত্তাপ। ঠোঁটে কম্পন। অনিক নিজের অজান্তেই যেন খানিক কাছে সরে এল। তারপর বলল, উঁহু। কেবল তোমাকেই আমার লাগবে।
লাগবে তো?
হুম।
কখন লাগবে? হৃদির গলায় উষ্ণতা।
সব সময়।
আর এখন? এখন লাগবে না?
অনিক কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল হৃদি। দীর্ঘ সময়। কিন্তু অনিকের মনে হলো সময়টা হঠাৎ থমকে গেছে। তার চারপাশের কোলাহল, চলমান যানবাহন, মানুষ–সকলই স্থির হয়ে গেছে ঘড়ির স্তব্ধ কাঁটার মতো। একটা উষ্ণ জলপ্রপাত ক্রমশই উঠে আসছে শরীর বেয়ে। তারপর ছড়িয়ে পড়ছে শিরা উপশিরায়। সেখানে মেঘের মতো জমে থাকা থমথমে সব মন খারাপ ভেসে যাচ্ছে তুমুল স্রোতে। ঝোড়ো হাওয়ায়। সে ক্রমশই পাখির পালকের মতো হালকা হয়ে যাচ্ছে। তারপর ভেসে যাচ্ছে নাম না জানা কোনো এক অচিনপুরের ঠিকানায়।
হৃদি হঠাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। কিন্তু অনিক হাত বাড়িয়ে আবারও কাছে টেনে নিতে লাগল তাকে। হৃদি বলল, উঁহু।
উঁহু কী?
আর না।
কেন?
কারণ, পরীক্ষা শেষ।
কী পরীক্ষা? অবাক গলায় বলল অনিক।
আমার নারীজনম ব্যর্থ না সফল?
অনিক হাসল, কী মনে হলো?
মনে হলো–
আমি হতে পারি ভোর, অথই আদর, নামহীন নদী, কাছে রাখো যদি।
তোমাকে দূরে রাখা যায়?
যায় না?
না।
তাহলে এই যে এমন মন খারাপ করে থাকো?
সে তো আর সব কারণে।
কিন্তু সেই আর সব কারণের মধ্যে আমার কথা মনে থাকে না? এই যে আমি তোমার সঙ্গে আছি, এই কথাটা?
থাকে।
তাহলে?
তাহলে কী?
তাহলে…। বলে কী ভাবল হৃদি। তারপর বলল, তাহলে মন খারাপ থাকে কী করে? এই যে একজন মানুষ তোমাকে এত ভালোবাসে–তোমার কারণে জীবনের আর সব প্রাপ্তি, দুঃখ, আনন্দ তুচ্ছ করে তোমার কাছে ছুটে আসে–অপেক্ষা করে–এসব ভাবলে একটুও মন ভালো হয় না।
হয়।
উঁহু, হয় না। কেন হয় না, জানো?
কেন?
যা আমরা না চাইতেই পেয়ে যাই, যে সারাক্ষণ না বলতেও আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকে, তার অস্তিত্ব আমরা টের পাই না।
তাহলে তোমাকে হারিয়ে ফেলার এত ভয় কেন হয়?
সেটা অন্য কারণ।
অন্য কী কারণ?
এই যে তুমি একটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছ। এই সময়টা তোমাকে নড়বড়ে করে ফেলেছে। ভেতরে ভেতরে একধরনের ইনফিরিওরিটির ফিলিংস দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, সবাই তোমাকে উপেক্ষা করছে বা ছেড়ে যাচ্ছে।
অনিক কথা বলল না। হৃদিই বলল, এটা কেবল আমার একার ক্ষেত্রে না। তুমি একটু ভেবে দেখো, আর সবার ক্ষেত্রেও এমন হচ্ছে কি না। তোমার বন্ধু, কাছের মানুষ, পরিচিতজন। তাদের ক্ষেত্রেও হচ্ছে না?
হৃদির কথার উত্তর দিল না অনিক। তবে মনে মনে ভাবল সে। হৃদি ভুল বলে নি। এই বোধটা আজকাল খুব হয় তার। মনে হয় সকলের কাছেই ক্রমশ অযাচিত, অনাকাক্ষিত হয়ে পড়ছে সে।
হৃদি হঠাৎ গাঢ় গলায় তাকে ডাকল, অনিক?
হুঁ।
তুমি কি জানো এই পৃথিবীতে তোমার চেয়ে বেশি ভালো আমি আর কাউকেই বাসি না?
অনিক জবাব দিল না। চুপ করে রইল। হৃদি বলল, কিন্তু কেন যেন আমার এই অনুভূতিটা আমি তোমাকে কখনো বোঝাতে পারি না। আমি এত চেষ্টা করি, তাও না। সারাক্ষণ মনে হয় আমাকে নিয়ে তোমার যেন একটা দ্বিধা রয়ে গেছে। একটা সংশয়। কেন?
আমি কি তা বলেছি?
ওই যে বললো, আমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় হয় তোমার?
সে তো দ্বিধা বা সংশয় থেকে নয়।
তাহলে?
অনিক সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল না। চুপ করে রইল অনেকটা সময়। তারপর বলল, প্রথম প্রথম যখন ঢাকায় এলাম, তখন বাবা কখনোই আমাকে একা রাস্তা পার হতে দিতেন না। কেন জানেন?
কেন?
বাবার সব সময়ই মনে হতো, একা পার হতে গিয়ে আমি কোনো একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলব। আমি কিন্তু তখন একা একাই সব করি। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। বন্ধুদের সঙ্গে কত জায়গায় যাই। কিন্তু বাবার সঙ্গে কোথাও গেলেই বাবা সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে তটস্থ থাকতেন।
এর সঙ্গে আমাকে নিয়ে দ্বিধার সম্পর্ক কোথায়?
অনিক মৃদু হাসল, আছে। আমরা যাকে খুব ভালোবাসি, তার অনুপস্থিতি কখনো সইতে পারব না বলে সব সময় তাকে হারানোর ভয় হয়। মনে হয় এই বুঝি তাকে হারিয়ে ফেললাম। তার কিছু হয়ে গেল!
অনিক থামলেও দীর্ঘ সময় কথা বলল না হৃদি। তাদের এই এত বছরের সম্পর্ক, বিয়ে, লুকিয়ে-চুরিয়ে একসঙ্গে থাকা, পরস্পরকে জানা, বোঝা–অথচ তারপরও আজকের সন্ধ্যার এই মুহূর্তটুকু তার কাছে বিশেষ হয়ে রইল। অনিক মুখচোরা স্বভাবের মানুষ। সহজে মনের কথা কাউকে বলতে চায় না সে। কিন্তু আজ এখন যে কথাটি সে বলল, তা হৃদির বুকের ভেতর শিরশিরে আনন্দের এক অনুভূতি বইয়ে দিল। সে আলগোছে সরে এল অনিকের কাছে। তারপর তার বুকের ভেতর ছোট্ট পাখির মতো গুটিসুটি মেরে মিশে যেতে যেতে প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমায় তুমি এমন করেই ভালোবেসো?
অনিক জবাব দিল না। হৃদি বলল, তাহলে আমি আর কিছু চাই না। কিছু না। যত ঝড়-ঝঞ্ঝা, বিপদই আসুক না কেন, আমি সব সামলে নেব। তুমি দেখো।
অনিক হাত তুলে হৃদির মাথাটা ছুঁয়ে দিল। তার বুকটা খানিক কাঁপছিল বোধ হয়। গলার কাছটাও। হৃদি সেই কম্পন টের পাচ্ছিল কি না কে জানে! সে অকস্মাৎ মাথা তুলে তাকাতে চাইল। কিন্তু অনিক তাকে তাকাতে দিল না। বরং দুহাতে বেষ্টন করে রাখল বুকের সঙ্গে।
সে তার চোখের জল কাউকে দেখাতে চায় না।
১০. নতুন বাসায় পড়াতে
অনিক যে নতুন বাসায় পড়াতে এসেছে, সে বাসার গৃহকর্তার নাম মাহমুদ হাসান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সুদর্শন, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মানুষ। তার স্ত্রী সুমি একটি কলেজে বাংলা পড়ান। তাদের একমাত্র সন্তান জিতু ক্লাস ফাইভে পড়ে। মূলত তাকেই পড়াতে হবে অনিককে। ফলে কাজটা বেশ সহজ হয়ে গেল তার জন্য।
প্রথম দিন গিয়েই মন ভালো হয়ে গেল অনিকের। মাহমুদ হাসান অল্প কথা বললেও ভীষণ আন্তরিক। তার স্ত্রী সুমি খানিক চটপটে। তবে বিনয়ী। ছেলের পাঠ্যপুস্তকবিষয়ক পড়াশোনার চেয়েও তারা তাকে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে ধারণা দিতে বেশি আগ্রহী। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের উপকথা, রূপকথার বইয়ে তার ঘর ভর্তি। বিষয়টা এমন নয় যে তাকে জোর করে এসব বই পড়ানো হচ্ছে। বরং সে নিজ আগ্রহ থেকেই পড়ছে। বিষয়টা দারুণ ভালো লাগল অনিকের।
মাহমুদ বললেন, আমরা দুজনের কেউই কিন্তু সেই অর্থে দায়িত্ববান অভিভাবক নই।
অনিক জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
মানে…। বলে খানিক ভাবলেন মাহমুদ। তারপর বললেন, মানে এই বয়সের বাচ্চাদের প্রতি অভিভাবকেরা যেমন খড়গহস্ত হয়ে থাকেন আরকি, আমরা তেমন নই। আমরা কিছুতেই ওর শৈশবটা নষ্ট করতে চাই না।
জি।
এ কারণেই আপনাকে ঠিক ওর শিক্ষক নয়, বন্ধু হতে হবে। একটু বয়সে বড়, কিন্তু বন্ধু, যে ওর থেকে বেশি জানে, ওর নানান ভাবনার উত্তর দিতে পারে, সুন্দর যৌক্তিক সমাধান দিতে পারে। আর যেকোনো ধরনের হেট্রেড, সুপ্রিমেসি থেকে দূরে রাখতে পারে। আমি চাই না আমার সন্তান কোনোভাবেই নিজেকে অন্যদের চেয়ে সুপিরিয়র ভাবুক।
কথাগুলো শুনে অনিকের এত ভালো লেগেছিল! তার মনে হয়েছিল, ঠিক এই ভাবনাটাই যদি সকল অভিভাবক তার সন্তানকে দিতে পারতেন, তাহলে এই যে অন্যের বিশ্বাসের প্রতি অসহিষ্ণুতা, চিন্তা ও আচরণের প্রবল গোড়ামি আর একটা ক্রমশই অস্থির হয়ে ওঠা সমাজ, তা খানিকটা হলেও অন্য রকম হতে পারত।
সুমি বললেন, আমরা দুজনই ব্যস্ত। ফলে আপনি কখন আসবেন বা আসবেন না, সেটা আমাদের পক্ষে খেয়াল রাখা সম্ভব নয়। বরং বিষয়টা পুরোপুরি আপনার ওপর। আপনি ওর সঙ্গে কথা বলে, ওর স্কুল বা হোমওয়ার্কের রুটিনের সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করে নেবেন।
আচ্ছা। বলে সেদিনের মতো উঠে গিয়েছিল অনিক। তবে তার দিন চারেক পরে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। অনিকের দীর্ঘ এই টিউশন জীবনে এর আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটে নি। সে আর হৃদি গিয়েছিল তাদের নতুন বাসাটা দেখতে। মোহাম্মদপুরের একটু ভেতরের দিকে হলেও ভাড়া বিবেচনায় বাসাটা ভালো। সমস্যা হচ্ছে, তিন মাসের অ্যাডভান্স ছাড়া মালিক কিছুতেই বাসা ভাড়া দেবেন না। এই নিয়ে খানিক তর্কযুদ্ধও হলো। তবে তাতে লাভ বিশেষ হলো না। অনিকের সঙ্গে আর যে ছেলেটা উঠবে, তার নাম জাবেদ। সে বয়সে অনিকের চেয়ে বেশ বড়। একটা সুপারশপে ম্যানেজারের চাকরি করে। ফলে অনিকের দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু এত কিছুর পরও অতগুলো টাকা একসঙ্গে দেওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
দুপুর থেকেই বিষয়টা নিয়ে মনমরা হয়ে ছিল সে। জিতুকে পড়াতে গিয়েও ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিল না। বারবার ফোনে কথা বলতে হচ্ছিল। হৃদি কিছু টাকার ব্যবস্থা করেছে। সমস্যা হচ্ছে, তার কাছ থেকে টাকাটা নিতে চায় না সে। এমনিতেই নানান। সমস্যায় জর্জরিত হৃদি। ফলে ওই টাকাটা এই মুহূর্তে তার কাছেই থাকা উচিত। এতে আলাদা একটা শক্তি সে পাবে। কিন্তু এ ছাড়া আর উপায়ই-বা কী? অনেক ভেবেও কোনো সমাধান মিলল না অনিকের। তবে খানিক অভাবিত উপায়েই টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। জিতুকে পড়ানো শেষ করে যখন সে বের হতে যাবে, তখনই সুমি এসে দাঁড়ালেন তার সামনে। বললেন, আপনার মায়ের অবস্থা কী?
এই তো।
এই তো কী?
এখনো ঠিক জানি না। ডাক্তার বলেছেন পুরোপুরি বুঝতে একটু সময় লাগবে।
আপনি হলের সিট ছেড়ে দিয়েছেন?
এখনো না। তবে সপ্তাহখানেকের মধ্যে হয়তো ছেড়ে দেব।
নতুন বাসা ঠিক হয়েছে?
অলমোস্ট। অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলল অনিক।
সুমি হাসলেন। তারপর বললেন, এই টাকাটা রাখুন। আপাতত আপনার ঝামেলাটা মেটান। তারপর পরে কখনো সময় হলে আমাকে শোধ করে দেবেন।
অনিক প্রায় আঁতকে ওঠা ভঙ্গিতে পিছিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সুমি গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন, এটা এমন কিছু নয় যে এর জন্য এমন হাত-পা ছুঁড়ে পালাতে হবে। নিন।
সুমির কণ্ঠে কিছু একটা ছিল যে অনিক এড়াতে পারল না। সে দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে খামটা নিল। কিন্তু এই ঘটনা তাকে অভিভূত যেমন করল, তেমনি ভেতরে ভেতরে বেশ খানিকটা তটস্থও করে ফেলল। তার মনে হলো, ঠিক এই কারণে হলেও আর এক দিনও টিউশন মিস দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট ঘণ্টার চেয়েও বেশিক্ষণ পড়াতে হবে। অধিক মনোযোগী হতে হবে। এমন নানা কিছু। তবে বিষয়টা খেয়াল করলেন মাহমুদ। তিনি একদিন ডেকে বললেন, আপনি কি কোনো কারণে আপসেট?
অনিক ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, না না।
সুমি আমাকে ওই দিনের ঘটনা বলেছে। তার ধারণা, এর পর থেকে আপনি খুব আপসেট হয়ে আছেন। শুনুন, আপনি আমাদের ছোট ভাইও হতে পারতেন। কিংবা বয়সে ছোট বন্ধু। কি, পারতেন না?
জি।
তাহলে?
অনিক জবাব দিল না। মাহমুদ বললেন, টেক ইট ইজি। এর জন্য আপনাকে আলাদা করে এত কনসার্ন হতে হবে না। ঠিক আছে?
অনিক মৃদু মাথা নাড়ল। তবে সেদিন থেকে এই পরিবার-পরিজনহীন ঢাকা শহরে তার যেন খানিক মায়ার আশ্রয় তৈরি হলো। একটা অব্যাখ্যেয় আনন্দের অনুভব। কিন্তু অনিক স্বভাবে অন্তর্মুখী। ফলে সে তার এই আনন্দটা কখনো প্রকাশ করতে পারল না। বরং নিজেকে আরও গুটিয়েই রাখল। তবে এত কিছুর মধ্যেও একটা বিষয় তার চোখ এড়াল না, তা হচ্ছে মাহমুদ ও সুমির সম্পর্ক। বয়সের বিস্তর ব্যবধান সত্ত্বেও তাদের পারস্পরিক রসায়নটা মুগ্ধ হওয়ার মতো। বিয়ের এত বছর পর এসেও এমন প্রেমিক যুগলের দেখা মেলা ভার।
সেদিন পড়াতে আসতে খানিক দেরি হলো অনিকের। সন্ধ্যারও ঘণ্টাখানেক পর। আকাশে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। জিতুকে পড়িয়ে সে যখন বের হবে, তখন হঠাৎ করেই চোখ আটকে গেল বারান্দায়। বিস্তৃত খোলা বারান্দার দেয়ালজুড়ে বাগানবিলাস। মেঝেতে ছড়ানো-ছিটানো টব। টবে বাহারি রঙের ফুল। মাঝখানে দুটি বেতের চেয়ার। সেই চেয়ারে পাশাপাশি বসে আছেন মাহমুদ আর সুমি। মস্ত চাঁদের আলোয় তারা। পরস্পরের গা ঘেঁষে বসে আছেন। এই তপ্ত সন্ধ্যার লু হাওয়াতেও সুমি গুনগুন করে রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন–
আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে, বসন্তের এই মাতাল সমীরণে…।
অনিকের অকস্মাৎ মনে হলো, জীবন তো এমনই। এখানে প্রিয়তম মানুষের সান্নিধ্যে চৈত্রের খটখটে দুপুরও হঠাৎ হয়ে ওঠে মাতাল সমীরণের বসন্ত। ঝলসানো আগুনের সূর্যকেও মনে হয় জোছনায় প্লাবিত সন্ধ্যার চাঁদ।
.
বাসায় ওঠার দুই দিনের মাথায় মাকে নিয়ে এল অনিক। তার মা রাহিমা বানু এখনো নিজের সমস্যাটা বুঝতে পারছেন না। ফলে বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন তিনি। চারদেয়ালে বন্দী এই শহরে তার মন বসে না। তার ওপর ছোট মেয়েটাকে গ্রামে ভাইয়ের বাড়িতে রেখে এসেছেন। এই নিয়েও একটা অস্থিরতা কাজ করছে। ভাইয়ের বউকে বিশেষ পছন্দ করেন না তিনি। সে কথা অনিককে বললেনও। অনিক বলল, মা, একটা কথা বলি?
বল।
তোমার যে অসুখটা হয়েছে, সেটা এখনো তেমন বড় কিছু না। কিন্তু ধরো, প্রোপার ট্রিটমেন্ট না করিয়েই যদি তুমি বাড়ি চলে যাও, আর তারপর এটা বাড়ে, তখন কী করবে? গ্রামে আশপাশে কোনো ডাক্তার পাবে? আর তোমাকে নিয়ে ছোটাছুটিই বা কে করবে?
কী হয়েছে আমার? খুব খারাপ কিছু?
সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না করালে সব রোগই খারাপ। জ্বর, পেটব্যথাও। তোমার এখনো কিছু হয় নি। কিন্তু ডাক্তার বারবার করে বলেছেন, তোমাকে আপাতত কিছুদিন ঢাকায় রেখেই চিকিৎসা করাতে হবে।
কিন্তু তুই এত টাকা পাবি কই?
টাকার চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। তোমার যেটা চিন্তা করার, সেটা করো। নিজের শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক রাখো। ডাক্তার যা যা বলেছে, তা করো।
আমার তো এখন চিন্তা ওই একটাই।
কী চিন্তা?
তোর আব্বা অতগুলা টাকা কই পেয়েছিল? আর মারা যাওয়ার আগে আগে অমন অস্থিরই-বা হয়েছিল কেন? এই একটা বিষয় ভেবে ভেবেই আমি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে, শেষের দিকে এসে সে আমাকে কিছু বলতে চাইত, কিন্তু বলত না।
এই কথায় অনিক চুপ হয়ে যায়। তার ছাত্তার মিয়ার কথা মনে পড়ে। আর সঙ্গে সঙ্গে ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মনে হয়, জোর করে ছাত্তারের কাছ থেকে সব কথা আদায় করে সে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। আর সম্ভব হলেও-বা কী? কী করতে পারবে সে? তবে বিষয়টা মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি দেয় না তাকে। রাহিমা বানু বলেন, তোর আব্বার কথামতো অই টাকাগুলা যে মহিদুল মেম্বারের জমি কিনতে বায়না হিসেবে দিলাম, সেই টাকাও তো সে এখন ফেরত দিতে চাইতেছে না।
কী বলে?
বলে টাকা ফেরত দেওয়ার তো কথা ছিল না! কথা ছিল পুরো টাকা দিয়ে জমি কিনে নেবেন।
কিন্তু এখন তো পুরো টাকা দেওয়া সম্ভব না।
এটা সে মানতে চাইছে না। তার এক কথা, পুরো টাকা না দেওয়া পর্যন্ত সে জমিও দেবে না। টাকাও না। বলে সামান্য চুপ করে রইলেন রাহিমা বানু। তারপর বললেন, এই সময়ে ওই টাকাগুলা থাকলে তোর কত উপকার হতো। একটা কাজ করবি নাকি?
কী কাজ?
থানা-পুলিশে জানাবি নাকি? তারে যে আমরা টাকা দিছি, সেই ডকুমেন্টস তো আমাদের কাছে আছে।
অনিক সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল না। সে বেশ খানিকক্ষণ কী ভাবল। তারপর বলল, দরকার নেই, মা। বাদ দাও। এমনিতেই এই টাকা নিয়ে আমার অনেক প্রশ্ন। তারপর এই নিয়ে থানা-পুলিশ করতে গেলে আবার কী ঝামেলা হয় কে জানে!
কথাটা রাহিমা বানুরও যে মাথায় ছিল না তা নয়। কিন্তু অতগুলো টাকার মায়া তিনি ছাড়তে পারছিলেন না। এই সময়ে ওই টাকা কটা ভারি কাজে লাগত। প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় তার। তুমুল কাশির দমকে জেগে উঠে বসে থাকেন। তখন গাছের ছায়ায় ঢাকা শান্ত শীতল ওই বাড়িটা বুকের মধ্যে তিরতিরে হাওয়ার এক অনুভব দিতে থাকে। সেই অনুভবে বাঁশের বেড়ায় ঘেরা স্বামীর কবরটা খুব তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা হয়ে বেঁধে। মনে হয়, মানুষটা কেন এমন করে চলে গেলেন! কতবার বলেছিলেন, সামনে কোরবানিতে বাড়ি আসবেন। তারপর ধুমধাম করে কোরবানি দেবেন। এ তার বহুদিনের শখ। তারপর নিজের জমিতে চাষবাস শুরু করবেন। গরু কিনবেন। গোয়ালঘর করবেন। পুকুরে মাছের চাষ শুরু করবেন।
ঢাকার ফুটপাত থেকে নানা জাতের ফসল, মাছ চাষের নিয়মকানুন-সংবলিত বইপত্র কিনে পাঠাতেন। মানুষটার কত কিছু যে স্বপ্ন ছিল! কিন্তু সাত ভাইবোনের পরিবারে পিতৃহীন বড় সন্তান হওয়ার মাশুলটা তাকে জীবনভর গুনতে হয়েছে। বিয়েও করেছেন সময়ের অনেক পরে। ফলে সন্তানের পিতা হয়েছেন দেরিতে। দায়িত্বের পর দায়িত্ব তাকে শৃঙ্খলের মতোই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছিল। আর ওই শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতেই শেষ কয়েক বছরে ভয়ানক বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন! যেন যেকোনো উপায়েই হোক, এই ক্লান্তিকর, দুঃসহ জীবন থেকে মুক্তি চান তিনি। গাঁয়ের আলো হাওয়ায় খানিক বুক ভরে নিশ্বাস নিতে চান। সেই মুক্তি অবশেষে মিলল তার। চিরদিনের জন্য মুক্তি!
একটা দীর্ঘশ্বাস বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর ভাসতে থাকে হাওয়ায়। রাহিমা বানু অন্ধকারে ওই ভারী হয়ে থাকা হাওয়ায় যেন নিশ্বাস নিতে পারেন না। তার দমবন্ধ লাগে। তবে এই দমবন্ধ শহরেও তার জন্য খানিক ঝলমলে তাজা বাতাস নিয়ে আসে হৃদি। একটা মেয়ে এত সুন্দর কী করে হয়! শুধু যে সুন্দর, তা-ই না, এত আদর করে কথা বলে যে তার মন ভালো হয়ে যায়। মনে হয়, জীবন তাকে একের পর এক যে দুঃসহ যন্ত্রণা উপহার দিয়েছে, তাতে এই মেয়েটা যেন খানিক উপশম।
সেদিন দুপুরবেলা এল সে। সঙ্গে নানা রকম খাবার। এসেই কোমরে ওড়না বেঁধে ঘর গোছাতে লেগে গেল। তিনি এত বারণ করলেন, কিন্তু শুনল না। বরং চোখের পলকে যেন পুরো বাসার খোলনলচে পাল্টে দিল।
অনিক বলল, ও হৃদি, মা। আমার ইউনিভার্সিটিতেই পড়ে।
রাহিমা বানু কথা বললেন না। তিনি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন। অনিককে এই মেয়ে ঠিক কী কারণে পছন্দ করেছে, তা তিনি জানেন না। অনিক বলল, তুমি কিন্তু আবার অন্য কিছু ভেবো না, মা। ও এমনই। কারও কোনো বিপদ-আপদ দেখলে এভাবেই ছুটে আসে। তোমার অসুখের কথা শুনে আর অপেক্ষা করে নি। আমি বারণ করা সত্ত্বেও ছুটে এসেছে। দেখো না কত কিছু রান্না করে এনেছে?
হুম। গম্ভীর গলায় বললেন রাহিমা বানু। নিজের উচ্ছ্বাস তিনি অনিকের সামনে। প্রকাশ করতে চান না। হৃদি তখন বারান্দায় কিছু করছিল। অনিক বলল, তুমি এমন গম্ভীর হয়ে আছ কেন? কোনো সমস্যা?
কী সমস্যা?
মানে তুমি কি অন্য কিছু ভাবছ? ওর সঙ্গে কিন্তু আমার অন্য কোনো ব্যাপার নেই, মা। ও এমনই। তুমি দয়া করে অন্য কিছু ভেবো না।
আমি তো অন্য কিছুই ভাবতে চাই।
মানে?
মানে এই মেয়ে যে ঘরে বউ হয়ে যাবে, সে ঘর আলো করে রাখবে। এ ঘরের লক্ষ্মী। আমার বয়স তো কম হয় নাই। স্বভাব-চরিত্র তো কিছুটা হলেও বুঝি। এই মেয়ে তোর সাতজনমের ভাগ্য! এরে কখনো ছাড়িস না।
অনিক কথা বলল না। তবে বহুদিন পর তার হঠাৎ মন ভালো হয়ে গেল। সে ভাবে নি মা হৃদিকে এতটা পছন্দ করবে!
হৃদি বলল, মা, আপনাকে এখন খাবার দেব?
রাহিমা বানুর মনে হলো, হৃদি তাকে বহু বছর ধরেই মা বলে ডাকছে। এটা নতুন কিছু নয়। এমনকি এই ঘরে তারা বহুকাল থেকেই একসঙ্গে আছেন। তিনি নরম গলায় বললেন, তুমি নিজে বেঁধেছ?
না, মা। কিনে এনেছি।
রাঁধতে পারো তুমি?
একটু-আধটু।
শিখবে রান্না?
কীভাবে মা? বাসায় তো আমাকে কেউ রান্না করতে দেয় না।
আমি শেখাব। তুমি সময় পেলেই রোজ এখানে চলে আসবে। আমি তোমাকে শেখাব।
হৃদি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। এই মানুষটাকে এত আপন লাগছে তার। প্রথম দেখায়ই মনে হয়েছে, মায়েদের মুখ মনে হয় এমনই হয়। এমন সহজ, সাধারণ অথচ মায়াময়। দেখলেই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হয়। সে অবশ্য জড়িয়েই ধরল। দীর্ঘ সময় রাহিমা বানুকে আলিঙ্গন করে বসে রইল সে। ওই মুহূর্তটুকু তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয়। মানুষটার গায়ের ঘ্রাণ, শরীরের স্পর্শ, কথা আর কাজে কী আশ্চর্য মায়াবী কোমল প্রকাশ! হৃদি তা বোঝাতে পারবে না।
এর পর থেকে প্রায় রোজই আসতে লাগল সে। সেদিন সত্যি সত্যি হৃদিকে রান্নাঘরে নিয়ে গেলেন রাহিমা বানু। অনিক তখন কেবল বাজার করে ফিরেছে। কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে দিল হৃদি। তার পরনে মেরুন রঙের শাড়ি। শাড়ির আঁচল শক্ত করে কোমরে প্যাঁচানো। চোখমুখ ঘর্মাক্ত। বুকের কাছটা ঘেমে ভিজে আছে। গলার সরু চেইনের ফাঁক গলে নেমে যাচ্ছে ঘামের প্রস্রবণ। আর একটা অদ্ভুত মাতাল ঘ্রাণ তার শরীর থেকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।
অনিকের হঠাৎ কী যে হলো! সে বাজারের ব্যাগটা পাশে রেখে হৃদিকে খপ করে। ধরে ফেলল। তারপর তাকে টেনে নিয়ে গেল পাশের ঘরে। সেখানে তখন জাবেদ নেই। ফলে তার ঘরটা ফাঁকা। সে তাকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে বেপরোয়া চুমু খেতে লাগল। হৃদি তার সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করতে চাইল। কিন্তু পারল না। অনিকের শরীরে তখন যেন বুনো উন্মাদনা ভর করেছে। সে ভারী নিশ্বাস ফেলছে। হৃদি কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কটমট চোখে তাকাল। তারপর প্রায় হিসহিসে গলায় বলল, তুমি কি পাগল?
হুঁ। ঘোর লাগা গলায় বলল অনিক।
মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার?
হুঁ। আবারও একই স্বরে বলল অনিক।
তুমি আবার কেন এগিয়ে আসছ?
ইচ্ছা।
আর একটুও এগোবে না।
হুঁ।
কী বলছি শুনতে পাচ্ছ না?
হুঁ।
মাকে বলে দেব কিন্তু।
হুঁ। অনিক জানে, আর যা-ই হোক, অন্তত এই মুহূর্তে মাকে কখনো ডাকতে পারবে না হৃদি।
সে এবার কঠিন গলায় বলল, অ্যাই, কী হয়েছে, এমন করছ কেন?
অনিক এবার আর জবাব দিল না। সে আবারও তাকে কাছে টেনে নিতে লাগল। হৃদি হঠাৎ তাকে চমকে দিয়ে চিৎকার করে ডাকল, মা। মা।
রাহিমা বানু রান্নাঘর থেকে জবাব দিলেন, হ্যাঁ। বলো।
একটু এদিকে আসেন।
কেন, কী হয়েছে?
আপনার ছেলে কী করছে দেখে যান।
অনিক আচমকা ছিটকে দূরে সরে গেল। সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি যে হৃদি এমন কিছু করতে পারে। ফলে হতভম্ব হয়ে গেল সে। হৃদি অবশ্য ওইটুকু সুযোগেই ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমের খোলা জায়গাটায় চলে এল। রাহিমা বানু ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তিনি তটস্থ গলায় বললেন, কী হয়েছে, মা? কী করেছে ও?
দেখেন না, এই হলো তার বাজার করার ছিরি! বলে বাজারের ব্যাগটা মেঝেতে উপুড় করে ধরল হৃদি। সেখানে যে খুব খারাপ কিছু রয়েছে, তা নয়। কিন্তু তারপরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানান সমস্যা বের করতে লাগল সে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, রাহিমা বানুও তার সঙ্গে তাল মেলাতে লাগলেন। তিনি বললেন, একদম বাবার স্বভাব পেয়েছে, বুঝলে? তার বাবাও এমন, বাজারে গেলে ওই এক আলু-পটোল ছাড়া আর কোনো তরকারি কোনো দিন চোখে দেখত না। তাও যা আনত, তা রান্নার যোগ্য থাকত না। যেন দোকানদাররা সব বুঝতেই পারত, সব পচা-গলা জিনিস তাকেই গছিয়ে দেওয়া যায়। একবার কী হলো, শোনো…।
বলে রাজ্যের গল্প শুরু করলেন রাহিমা বানু। হৃদির অবশ্য তাতে মন নেই। সে একফাঁকে অনিককে চোরা চোখে টিপ্পনী কাটল। তারপর জিব ভেংচাল। অনিকের খানিক মন খারাপ হলেও হৃদির প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে বিস্মিত হয়ে গেল সে। মুহূর্তেই ঘটনা কেমন অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল মেয়েটা। আবার মাকেও নিজের পক্ষে টেনে নিল!
তবে এই এত কিছুর মধ্যেও একটা বিষয় খুব প্রশান্তি দিয়েছে অনিককে। এ কদিনে কীভাবে কীভাবে যেন হৃদিকে নিয়ে তার আগের সকল সংশয়, দ্বিধা একটু একটু করে দূর হয়ে গেছে। মনে হয়েছে, এই হৃদি আগের সেই হঠাৎ রোদ, হঠাৎ বৃষ্টির শ্রাবণের আকাশ নয়। অননুমেয় নয়। বরং এ অনেক বেশি ধীরস্থির। একে নির্দ্বিধায় ভালোবাসা যায়, ভরসা করা যায়। এ শান্ত নদীর মতো গভীর। স্থৈর্যময়।
তারা বিয়ে করেছে গোপনে। হৃদির জেদ আর হঠাৎ ঝেকের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল অনিককে। ওই হৃদি ঝঞ্ঝার মতো উত্তাল। তাকে সামলানো কিংবা বাধা দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। ফলে অনিককে নির্বিকার ভেসে যেতে হয়েছে তার উন্মাতাল স্রোতে। এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় কাজি অফিসে গিয়ে হঠাৎ বিয়ে করে ফেলল তারা। দেনমোহর এক টাকা। বিষয়টা ভারি রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল হৃদির কাছে। কিন্তু দিন কয়েক যেতে না যেতেই সেই ঘোর যেন কেটে যেতে লাগল তার। মনে হতে লাগল, কাজটা ঠিক হয় নি। বড় ধরনের ভুল করে ফেলেছে সে। কিন্তু এই ভুল শোধরানোর উপায় কী?
সেই উপায় বের করতে গিয়েই ভয়ানক অস্থিরতার এক সময় শুরু হলো। যাচ্ছেতাই আচরণ শুরু করল সে। অনিক শান্ত, চুপচাপ মানুষ। ফলে নির্বিকার ভঙ্গিতে সব সয়ে যেতে লাগল। নিজের দুঃসহ যন্ত্রণাটা কখনোই বুঝতে দিত না। কিন্তু তাতে হৃদির পাগলামি যেন আরও বাড়ত। আরও খেয়ালি, বেপরোয়া হয়ে উঠত সে। আবার হঠাৎ করেই ঠিক হয়ে যেতে। খানিক আগের আচরণের জন্য দুঃখিত হতো। সারিয়ে তোলার চেষ্টা করত তার আঘাতে জরজর অনিকের ক্ষতগুলো।
কিন্তু এই রোদ-বৃষ্টির খেলায় ভেতরে ভেতরে ভীষণ ক্লান্ত বোধ করত অনিক। মাঝে মাঝেই মনে হতো, ঝোঁকের মাথায় করা বিয়ের ওই আগল ভেঙে সত্যি সত্যিই বের হয়ে যেতে চায় সে। কিন্তু তারপরই বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যেত। মনে হতো, ওই খেয়ালি, অনুমান-অযোগ্য, তুমুল পাগলামিতে চারপাশ ভাসিয়ে নেওয়া মেয়েটাকেই ভালোবাসে সে। সেই ভালোবাসা অন্তহীন ও অপরিবর্তনীয়। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর থেকেই কি একটু একটু করে বদলে যেতে লাগল হৃদি?
এই প্রশ্নের উত্তর আজকাল খুঁজতে চেষ্টা করেছে অনিক। আর তারপর তার মনে হয়েছে, হ্যাঁ, এই মানুষটা অন্য রকম। এ এক দ্বিধাহীন নির্ভরতার নাম। একে জীবনের দুর্গমতম যাত্রায় চোখ বন্ধ করে সঙ্গী করা যায়। তারপর হেঁটে যাওয়া যায় অন্তহীন অমানিশার পথ। কে জানে, সেই পথও এমন একজন সঙ্গীর কারণে জোছনায় আলোকিত হয়ে ওঠে কি না! বসন্তের ওই মাতাল সমীরণের মতো সুবাসিত হয়ে ওঠে কি না!
মাকে নিয়ে এই বাসাটায় ওঠার পর থেকে অনিকের সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে। সে এখন পুরোপুরি নির্ভার, নিঃসংশয়। বরং এই যে কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে দরজার কাছে দাঁড়ানো ঘর্মাক্ত মেয়েটাকে দেখে তার জগত্তা হঠাৎ উথালপাতাল হয়ে উঠল, ওই অনুভূতিটাই যেন এতটা বছর খুঁজে ফিরে হয়রান হয়েছিল সে। আজ ওই মুহূর্তটুকু তাকে যেন ফিরিয়ে দিল দীর্ঘদিন ধরে খুঁজে ফেরা তার সেই অস্পর্শ অনুভূতির জাদুর জীয়নকাঠি।
.
সে রান্নাঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে তাকাল। মা হাসিমুখে কী সব বলছেন! হৃদি জগতের সব মনোযোগ দিয়ে তা শুনছে। তার কপালে, নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। চিবুকের কাছে খানিক কালি লেগে আছে। মা হঠাৎ তার শাড়ির আঁচলে সেই কালিটুকু মুছে দিতে লাগলেন। মুছে দিতে লাগলেন তার কপালে জমা ঘামের ফোঁটা। কী আশ্চর্য মায়াময় এক দৃশ্য!
অনিকের হঠাৎ মনে হলো, মা যেন হৃদির আদুরে অধরে লেপ্টে দিতে লাগলেন। অপার্থিব স্পর্শের মায়াঞ্জন।
১১
আলাদা বিভাগের হওয়া সত্ত্বেও অল্প কদিনেই ইউনিভার্সিটিতে অবন্তীর সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে উঠল রিয়া। সে বয়সে তার চেয়ে খানিক বড়। ক্লাসেও বড়ই ছিল। কিন্তু প্রথম বছরই ড্রপ দেওয়ার কারণে অবন্তীর ব্যাচমেট হয়ে গেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, ভাবনা আচরণে তারা পুরোপুরি আলাদা। রিয়া ডাকাবুকো স্বভাবের ঠোঁটকাটা মেয়ে। তার মুখে কিছু আটকায় না। আচরণেও বেপরোয়া। সে দিব্যি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফস করে সিগারেট ধরায়। তারপর গলগল করে ধোয়া ছাড়ে। অবন্তী তখন আড়ষ্ট ভঙ্গিতে খানিক দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ায়। যেন কেউ বুঝতে না পারে যে তারা একসঙ্গে। রিয়া অবশ্য তাতে কিছু মনে করে না। সে বরং জিনসের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে অবন্তীর দিকে ছুঁড়ে দিতে দিতে বলে, একটা খেয়ে দেখ। তাহলেই বুঝবি অসৎ সঙ্গে স্বর্গবাস। হা হা হা।
অবন্তী বিব্রত ভঙ্গিতে এদিক-সেদিক তাকায়। তারপর বলে, এহ্, ছিহ্! এটা কী করছিস তুই?
তোকে জীবন শেখাচ্ছি, মিয়াও।
মিয়াও কী?
মিয়াও হচ্ছে বিড়ালের বাচ্চা। তুই দেখতে বিড়ালের বাচ্চার মতো। আদুরে, কিউট। তোর আচার-আচরণও তেমন। দেখলেই মনে হয় এখুনি মিয়াও মিয়াও বলে ডাকতে শুরু করে দিবি। বলেই অবন্তীর গাল টিপে দেয় রিয়া। অবন্তী ছিটকে আরও খানিকটা দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। রিয়া অবশ্য তাকে যেতে দেয় না। শক্ত হাতে ধরে রাখে। অবন্তী মাঝে মাঝে একটু অবাকও হয়। রিয়া এত প্রাণশক্তি পায় কোথায়? তাকে দেখে মনে হয় না জগতে দুঃখ, যন্ত্রণা, মন খারাপ বলতে কোনো ব্যাপার আছে। সে সদা হাস্যময়।
অবন্তী বলে, সিগারেটের সঙ্গে জীবন শেখার সম্পর্ক কী?
দুটোই মিনিংলেস। মনে হয় উপভোগ্য, কিন্তু আসলে পেইনফুল। কেবল লস আর লস। আগুনে পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে অ্যাশট্রেতে চলে যায়।
শুনে অবন্তী হাসে। মাঝে মাঝে প্রায় নির্বিকার ভঙ্গিতে এমন অদ্ভুত কথা বলে রিয়া যে শুনে থমকে দাঁড়াতে হয়। রিয়ার জীবন কি যন্ত্রণাময়? তাকে দেখে ভুলেও তা মনে হয় না। বরং মনে হয় সে প্রাণশক্তিতে ভরপুর।
রিয়া অকস্মাৎ মৃদু শিস বাজাল। অবন্তী তাকাতেই চোখ টিপে বলল, কিছু দেখতে পাচ্ছিস?
কী দেখব?
দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি।
মানে কী?
মানে হচ্ছে একজন বৃদ্ধ নাবিক ও একটি সমুদ্র।
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস?
নাহ্।
তাহলে?
আমার। বলে ঠোঁট উল্টে অদ্ভুত ভঙ্গি করল রিয়া।
মানে কী?
মানে হলো…। বলে কী ভাবল রিয়া। তরপর গুনগুন সুর তুলে গাইল, কোথায় পাব হাঁড়-কলসি, কোথায় পাব দড়ি, তুমি হও যমুনা রাধে আমি ডুইবা মরি…।
কী হয়েছে তোর? যেন ধৈর্যচ্যুতি ঘটল অবন্তীর।
কী হবে?
এমন করছিস কেন?
এমন করছি, কারণ…ধর, রাধা যদি যমুনা হতে পারে, তাহলে আমিও তো সমুদ্র হতে পারি। না? মানে সি আরকি!…তাহলে কৃষ্ণের মতো ওই ওল্ড ম্যানের সেই সমুদ্রে। ডুবে মরতে সমস্যা কী? লুক অ্যাট দ্যাট হট অ্যান্ড হ্যান্ডসাম ওল্ড ম্যান। বলেই খিলখিল করে হাসল রিয়া।
এতক্ষণে ঘটনা বুঝল অবন্তী। রিয়ার বিভাগের শিক্ষক মাহমুদ হাসান হেঁটে যাচ্ছেন। তার বগলে একগাদা বই। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তিনি পরেছেন ফুলহাতা সাদা শার্ট আর হালকা নীল রঙের জিনস। মেদহীন, ঋজু শরীর। মুখে কাঁচা পাকা দাড়ি। তবে সেই দাড়িতেই তাকে সুদর্শন লাগছে। রিয়া অবন্তীকে আরও কিছু বলতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। তারপর বেশ খানিকটা সময় একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
মাহমুদ হাসানের ক্লাসের এখনো ঘণ্টাখানেক বাকি। কিন্তু তিনি শিক্ষক হিসেবে সময়নিষ্ঠ। তাই আগেভাগেই বিভাগে চলে আসেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। তাদের নানান সমস্যা মন দিয়ে শোনেন। সমাধানের চেষ্টা করেন। রিয়া হঠাৎ বলল, তুই থাক। আমি একটু আসছি।
কই যাচ্ছিস? অবাক গলায় বলল অবন্তী।
ওল্ড ম্যানের সঙ্গে একটু প্রেম করে আসি।
ইশ! বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল অবন্তী। তোর মুখে না কিছু আটকায় না।
আটকাবে কী করে? মুখের কি লক সিস্টেম আছে নাকি?
তাই বলে স্যারকে নিয়ে এসব আজেবাজে কথা?
কেন, স্যাররা প্রেম-বিয়ে করেন না? তাদের বাচ্চাকাচ্চা হয় না? চোখ টিপে বলল রিয়া।
তাই বলে ওনাকে নিয়ে? ওনার বয়স কত, জানিস?
জানি।
কত?
একুশ।
মানে কী?
মানে হলো, ওনাকে দেখলেই আমার মনে হয় উনি একুশ বছরের রাশভারী এক তরুণ। তবে তার ওই গম্ভীর ভাবটা ছাড়াতে পারলেই বয়স আঠারোতে নেমে আসবে।
তা তুই এখন তার বয়স আঠারোতে নামাতে যাচ্ছিস?
অ্যাটলিস্ট চেষ্টা তো করে দেখতে পারি। নাকি বলিস?
তখন তো তোর চেয়েও ছোট হয়ে যাবে!
আই ডোন্ট মাইন্ড। এইজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার বেবি। বলে অবন্তীর পিঠে আলতো চাটি মেরে হাসল রিয়া। যাচ্ছি।
যাচ্ছিস?
হুম। বলে আর অপেক্ষা করল না সে। প্রজাপতির মতো হাওয়ায় ডানা মেলে উড়ে চলে গেল। অবন্তী দাঁড়িয়ে রইল একা। এই সকাল সকাল একা হয়ে গেলে দিনটা কেমন থমকে যায়। এখনো গেল। বাকিটা সময় কী করবে ভেবে পেল না সে। আজ তার ক্লাস নেই। সে এসেছিল প্রশাসনিক ভবনে কিছু কাজ করতে। দুপুরের দিকে দুটো পেপার সংগ্রহ করতে হবে। ফলে অনেকটা সময় একা একাই কাটাতে হবে। কিন্তু এতক্ষণ কী করবে?
বিশাল রেইনট্রিগাছটা ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েদের হলের ঠিক উল্টো দিকে। তার নিচে কখানা কাঠের বেঞ্চি। চা-শিঙাড়ার টংদোকান। অবন্তী সেই বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। এই সময়ে মঈন এসে দাঁড়াল তার সামনে। অবন্তী হতভম্ব ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। বলল, আপনি এখানে?
মঈন হাসল, আমার তো এখানেই থাকার কথা ছিল।
মানে?
বসো, বলছি।
না। আপনি বসবেন না। অবন্তী কঠিন গলায় বলল।
আচ্ছা, তুমি বসো। আমি দাঁড়িয়েই থাকছি।
প্লিইইজ! প্রায় আর্তনাদের স্বরে বলল অবন্তী। আপনি কেন এখানে এসেছেন? কেন এমন করছেন?
প্রশ্নটা আমার করার কথা ছিল।
কী প্রশ্ন?
তুমি কেন এমন করছ?
কী করছি আমি?
বুঝতে পারছ না কী করছ?
নাহ্। বলেই হাঁটতে শুরু করল অবন্তী।
মঈন আচমকা তার হাত চেপে ধরল। তারপর বলল, এখন নিশ্চয়ই বলবে যে তুমি চিৎকার করে লোক জড়ো করবে? তারপর আমাকে অপদস্থ করবে? সব সময় যেমন করো?
অবন্তী কথা বলল না। তার শরীর কাঁপছে। সে দুর্বল ভঙ্গিতে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। আশপাশের কয়েকজন মানুষ ফিরে তাকাচ্ছে। তারা সম্ভবত অবন্তীর কাছ থেকে কিছু শোনার অপেক্ষায় আছে। সে চিৎকার করে সাহায্য চাইলেই ছুটে আসবে। অবন্তী অবশ্য তেমন কিছু করল না। সে নিজে নিজেই মঈনকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে লাগল। তবে তার সেই চেষ্টা ভীষণ নিস্পৃহ। বিষয়টা লক্ষ করে খানিক আশাবাদী হয়ে উঠল মঈন। তাহলে কি বাইরে তার প্রতি যতটা রূঢ়তা সে দেখায়, আসলে ততটা রূঢ় সে নয়?
সুযোগটা নিল মঈন। বলল, তোমার কি মনে হয় না যে তুমি আমার ওপর ইনজাস্টিস করছ?
আমি? অবাক গলায় বলল অবন্তী।
মঈন তার হাত ছেড়ে দিল। বলল, হুঁ।
আমি কীভাবে আপনার ওপর ইনজাস্টিস করব? আমি কি জাজ?
আমরা সবাই-ই কখনো না কখনো জাজ, অবন্তী।
অবন্তী জবাব দিল না। সে এক হাতে অন্য হাত ডলছে। মঈন খানিক শক্ত করেই ধরেছিল। ফলে লাল হয়ে আছে জায়গাটা। মঈন দুঃখিত গলায় বলল, সরি।
অবন্তী কথা বলল না। মঈন বলল, একটু বসবে, প্লিজ?
অবন্তী বসল। তবে তার মুখ গম্ভীর। চোখ থমথমে। মঈন বলল, কারও যদি ফাঁসিও হয়, সে কিন্তু কারণটা জানে। মৃত্যুর আগে সে জেনে যায় কেন তার ফাঁসি হয়েছে। জানে না?
আপনাকে কেউ ফাঁসি দিচ্ছে না। আপনি মারাও যাচ্ছেন না।
সব মৃত্যু কি চোখে দেখা যায়? হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে গেল মঈনের কণ্ঠ। তোমার কি মনে হয় না কারণটা আমাকে স্পষ্ট করে বলা উচিত তোমার?
আমি বলেছি।
কী?
বাবা মা চান না আমি আপনার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখি।
কেন?
কারণটা আপনি জানেন। তা ছাড়া আপনার ওই বিষয়টা নিয়ে সবাই খুব আপত্তিকর কথা বলছিল। আমার রিলেটিভসরাও। আপনার তো তা না জানার কথা নয়!
তুমি কেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাও না, তোমার মা-বাবা চান না বলে? নাকি তুমিও বিশ্বাস করো যে ওই ঘটনায় আমি সত্যি সত্যিই দোষী?
অবন্তী জবাব দিল না। মঈন বলল, আমাদের সম্পর্কটা কিন্তু কাউকে জিজ্ঞেস করে হয় নি, অবন্তী। এমনকি মা-বাবার অনুমতি নিয়েও না। বলে সামান্য থামল সে। তারপর বলল, মেয়েটাকে ছেলেদের হলে জোর করে নিয়ে এসেছিল এক ছেলে। সে পলিটিক্যালি আমার চেয়ে পাওয়ারফুল। ফলে অন্য সবার মতো আমারও উচিত ছিল চুপ করে থাকা। কিন্তু আমি তা করি নি। জানতাম যে এর কনসিকুয়েন্স ভালো না। আমাকে এর জের টানতে হবে। তারপরও।
বলে ফস করে সিগারেট ধরাল মঈন। অবন্তী সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারে। সে ঝট করে মুখ সরিয়ে নিল। নাকের কাছে হাত নিয়ে ধোয়া তাড়াতে লাগল। খানিক বিলম্ব হলেও বিষয়টা খেয়াল করল মঈন। সে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বাঁ পায়ে মাড়িয়ে দিল। তারপর শান্ত গলায় বলল, তুমি জানো আমি একটু শর্ট টেম্পারড। চট করে রেগে যাই। অ্যান্ড দ্যাট ওয়াজ মাই ফল্ট। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আই অ্যাটাকড হিম। সবাই সেটাই দেখেছে বা দেখতে চেয়েছে। কিন্তু পেছনের ওই ঘটনার কথা কেউ বলল না। কেউ জানলও না। সবাই জানল, আমি মেয়েসংক্রান্ত ইস্যুতে দলে আমার সিনিয়র একজনের সঙ্গে ফিজিক্যালি কনফ্লিক্টে জড়িয়েছি। বিষয়টা সেনসিটিভ। পুলিশ যেহেতু আমাকেই গ্রেপ্তার করেছে, সুতরাং দোষটা আমারই। আর এই ধরনের ঘটনায় যা হয় আরকি! কুৎসিত সব ঘটনা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কাগজে খবর পর্যন্ত বের হলো।
অবন্তী কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই একটা মেয়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। মঈন বলল, ওর নাম রিমি। এই সেই মেয়ে। নিজের নিরাপত্তার ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে না পারলেও অন্তত তোমাকে ও ঘটনাটা বলবে। আর কারও কাছে নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণের দায় আমার নেই। কিন্তু তোমার কাছে আছে। বিশ্বাস করা না-করা তোমার ব্যাপার।
রিমির চোখ ফ্যাকাশে। প্রসাধনহীন ক্লান্ত মুখ। তবে সেই মুখেও স্নিগ্ধ, শান্ত সৌন্দর্য। সে ঘটনাটা বলল। অবন্তী অবশ্য তা শুনল কি না বোঝা গেল না। মঈন বলল, আমার কথা তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে না, অবন্তী। কিন্তু জানো তো, মানুষ পুরো পৃথিবীকে নির্বিকারভাবে উপেক্ষা করতে পারলেও কোনো একজনের সামান্য উপেক্ষাও সে সহ্য করতে পারে না।
অবন্তী চোখ তুলে তাকাল। মঈন তাকিয়ে আছে মাথার ওপর গাছের ফাঁকে উঁকি দেওয়া আকাশের দিকে। সে সেই আকাশের দিকে তাকিয়েই প্রায় স্বগতোক্তির স্বরে বলল, আমার কী মনে হয়, জানো?
কী? মৃদু কণ্ঠে বলল অবন্তী।
আমার মনে হয়, তুমি আমাকে অবিশ্বাস করো না। এমনকি আমি কোনো ব্যাখ্যা
দিলেও না। কারণ, তুমি আমাকে জানো। কিন্তু…।
কিন্তু কী?
মঈন আচমকা উঠে দাঁড়াল। তারপর কেমন চিন্তিত ভঙ্গিতে প্রলম্বিত স্বরে বলল, কিন্তু…। যেন খানিক সময় নিয়ে কথাটা আবার গুছিয়ে নিল সে, তোমার এই হঠাৎ বদলে যাওয়ার পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে। অন্য কোনো কারণ। কিন্তু সেই কারণটা তুমি আমাকে বলতে চাইছ না।
কী কারণ? কাঁপা, ফ্যাকাশে গলায় বলল অবন্তী।
সেটা তুমিই ভালো জানো। তোমার মনের সব কথা তো আমি পড়তে পারব না। বলে আবারও থামল সে। তারপর রিমিকে চোখের ইশারায় সরে যেতে বলল। হাতের সিগারেটের প্যাকেটটা যত্ন করে পকেটে পুরল। তারপর কপালের সামনে এসে পড়া চুলগুলোকে দুহাতে ব্যাব্রাশের ভঙ্গিতে মাথার পেছনে ঠেলে দিতে দিতে বলল, মানুষ ভাবে, মানুষের মন পড়তে পারলে বুঝি সবকিছু খুব সহজ হয়ে যেত। কিন্তু এটা সত্যি নয়। মানুষ যদি মানুষের মন পড়তে পারত, তাহলে পৃথিবীটা বরং আরও কঠিন হয়ে যেত। আরও বীভৎস হয়ে যেত।
অবন্তী কী বলবে ভেবে পেল না। মঈন অবশ্য তাকে কিছু বলার সুযোগও দিল না। সে হঠাৎ ঘুরে লম্বা লম্বা পা ফেলে চোখের আড়াল হয়ে যেতে লাগল।
১২
আজকাল হৃদির মন কিছুটা হলেও শান্ত। তার চারপাশের বিরুদ্ধ পরিস্থিতি হঠাৎ করেই যেন বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মা। তিনি তার একরোখা অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন। মাঝেমধ্যে তাদের কথাবার্তাও হয়। তবে সেই কথা যে আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত, তা নয়। বরং তারা দুজনই যেন মাঝখানে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা, ব্যথা আড়াল করে পরস্পরের সঙ্গে সহজ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। তাতে কখনো কখনো সফল হয়, কখনো হয় না। তবে এর জন্য নেহালের কাছে কৃতজ্ঞতা অনুভব করে হৃদি। মানুষটা সম্পর্কে কী বিরূপ ধারণাই না তার ছিল! অথচ সেই মানুষটাই তার জন্য নিজের তীব্র ভালো লাগার অনুভূতিটা অবধি হাসিমুখে বিসর্জন দিয়ে দিল। এমন মানুষ হয় আজকাল?
এভিলিন নামের অজানা-অচেনা মেয়েটার জন্যও দুঃখ অনুভব হয় তার। আচ্ছা, সে কি জানে তার মৃত্যুর পরও এই পৃথিবীতে একজন মানুষ কী অসীম মমতায়ই না তাকে বুকের ভেতর পুষে রেখেছে! ওই বুক থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার সাধ্য কারও নেই। এমনকি নেহাল যদি অন্য কাউকে ভালোও বাসে, তারপরও না। জগতে কেউ কারও জায়গা নিতে পারে না। প্রিয়তম মানুষ যত দূরেই যাক, যতই আড়াল হোক চোখের, তার ওই জায়গাটুকু অবচেতনেই সযত্নে সংরক্ষিত থাকে আজীবন। ওখানে অন্য কারও জায়গা হয় না। কেউ যদি কাউকে এমন করে ভালোবাসে, তাহলে আর কী চাই মানুষের?
হৃদিরও আর বেশি কিছু চাই না। যা পাওয়ার, তা পেয়ে গেছে সে। অনিককে নিয়ে যে আক্ষেপ, অভিযোগ, অভিমান তার ছিল, তা যেন কর্পূরের মতো হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন রাহিমা বানু। এমন করেও ভালোবাসতে পারে কেউ? মায়েরা নাকি পুত্রবধূদের প্রতি সহজাত একধরনের বিরাগ অনুভব করেন। এই কথার সত্য-মিথ্যা হৃদি জানে না। তবে আশপাশে এমন অসংখ্য ঘটনা সে দেখেছে। ফলে যখন থেকে শ্বশুরবাড়ির কথা বুঝতে কিংবা ভাবতে শিখেছে সে, তখন থেকেই অজানা এক আশঙ্কায় আড়ষ্ট হয়ে থাকত। কিন্তু অনিকের মা এমনই এক জাদুর কাঠি যে তার স্পর্শে সেই সব আশঙ্কা, দ্বিধা নিমেষেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
তিনি এখনো তাদের গোপন বিয়ের কথা জানেন না, এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি এ-ও তো সত্যি যে তিনি বুঝতে পারছেন, অনিক আর হৃদি পরস্পরকে ভালোবাসে। অথচ তার আচরণে, কথায় কখনো মুহূর্তের জন্যও মনে হয় নি যে তিনি হৃদিকে দূরে সরিয়ে দিতে চান। বরং তাকে একদিন না দেখলেই অস্থির হয়ে ওঠেন।
সেদিন অদ্ভুত এক কাজও করলেন। হৃদি যখন সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরতে চাইল, তখন হঠাৎ তাকে কাছে ডেকে নিলেন। তারপর দীর্ঘ সময় ধরে বিড়বিড় করে দোয়া পড়ে তার মাথায় ফুঁ দিয়ে দিতে লাগলেন। হাত বুলিয়ে দিলেন মাথায়। দরজার চৌকাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে আলতো করে চুমুও খেলেন। বিষয়টা এত ভালো লেগেছিল। হৃদির! মনে হয়েছিল, এই মানুষটার জন্য হলেও অনিকের সঙ্গে সারা জীবন থেকে যেতে চায় সে। এমন স্নেহের আঁচল আর কোথায় পাবে?
অনিক অবশ্য মায়ের অসুখের বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত। রাতদিন এখানে-সেখানে ছোটাছুটি করছে সে। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, মায়ের খারাপ কিছু হয়েছে। বাবার মৃত্যুর বিষয়টা নিয়ে এমনিতেই প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগছে সে। এর মধ্যে মায়েরও যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আর নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। ফলে আর সবকিছু বাদ দিয়ে ডাক্তার, হাসপাতাল আর টাকার পেছনে দিনরাত ছুটতে লাগল সে। হৃদির সঙ্গে যোগাযোগও যেন খানিক কমে এল। তবে তা নিয়ে হৃদি বিশেষ ভাবিত নয়। সে বরং অনিকের চেয়ে রাহিমা বানুর সঙ্গে সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে লাগল।
কিন্তু এত সব ভালো ব্যাপারের মধ্যেও সেদিন দুপুরে হঠাৎ শরীর খারাপ লাগতে লাগল হৃদির। সঙ্গে চিনচিনে একটা মাথাব্যথাও। বিকেলের দিকে একা একাই ছাদে হাঁটতে গেল সে। সঙ্গে এক মগ গরম কফি। এতে যদি খানিক আরাম লাগে। তবে তাতে লাভ কিছু হলো না। বরং সন্ধ্যা নামার আগে আগেই হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেল। তার। এই মন খারাপের কারণ হৃদি জানে না। তবে ভেতরে ভেতরে আশ্চর্য এক শূন্যতার অনুভূতি হতে লাগল।
এমন কেন লাগছে? আমগাছটার ঝাকড়া ডালপালা বেয়ে হঠাৎ নেমে এল। অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারে কেমন একা লাগতে লাগল হৃদির। মনে হলো, সে খুব দুঃখী, নিঃসঙ্গ। কিন্তু তার দুঃখ অনুভব করার মতো কেউ নেই। এমনকি অনিকও না। হৃদির আচমকা কান্না পেয়ে গেল। সে কি মাকে অনেক দুঃখ দিয়ে ফেলেছে? এই যে মা তার সঙ্গে কথা বলেন, তার ভালো-মন্দ জানার চেষ্টা করেন, কিন্তু মায়ের বুকেও কি তার দেওয়া কষ্ট জমে নেই? নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু মা সেসব আড়াল করেই তার সঙ্গে হেসে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আগলে রাখতে চান। অথচ বিনিময়ে সে মুহূর্তের জন্যও মার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতে পারে না। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে না। সারাক্ষণ কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে। এমন কেন করছে সে? দোষটা তো তারই। তবে সে কেন শুধু শুধু মাকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে?
কথাটা ভাবতেই সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে এল সে। রোখসানা বেগম তখন। কেবল নামাজ পড়ে জায়নামাজে বসেছিলেন। এই মুহূর্তে তার পেছনে এসে দাঁড়াল হৃদি। তারপর ঝট করে বসে পড়ল। রোখসানা বেগম ভারি অবাক হলেন। তবে কিছু বললেন না। হৃদি ডাকল, মা?
হুম?
আমি কি তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারি?
রোখসানা বেগম কথা বললেন না। তবে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। হৃদি ঝড়ের মতো মায়ের বুকে আছড়ে পড়ল। তারপর ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। দীর্ঘ সময়। রোখসানা বেগম অবশ্য তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। কোনো কথা বললেন না তিনি। কেবল দুহাতে মেয়েকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বসে রইলেন। হৃদি বলল, মা?
হুম?
আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিই, না?
দিস তো।
অনেক?
হুম।
এই জন্য তুমি কি আমার ওপর রাগ?
না।
কেন?
মায়েদের রাগতে নেই।
মায়েদের রাগতে নেই কেন?
মায়েরা হলো পৃথিবীর মতো। ধরিত্রী। ধরণি। তাদের অনেক কিছু ধরে রাখতে হয়। ধারণ করতে হয়। তারা রাগলে চলে? পৃথিবী রেগে গেলে কী হবে? সবকিছু
ধ্বংস হয়ে যাবে না?
হুম।
মায়েরা রাগলেও সব ধ্বংস হয়ে যায়। এ কারণে মায়েরা সত্যি সত্যি রাগতে পারে না।
তাহলে কি মিথ্যেমিথ্যি রাগে?
মায়েদের রাগ জোছনার মতো। তাতে আলো আছে, কিন্তু উত্তাপ নেই।
হৃদি কথা বলল না। মায়ের কথাটা তার বুকে বিঁধে রইল। মায়েদের রাগ জোছনার মতো। তাতে আলো আছে, কিন্তু উত্তাপ নেই। কী সুন্দর কথা! সে চুপ করে ছোট্ট শিশুর মতো মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে রইল। মা যে একসময় স্কুলে পড়াতেন, তা বহুদিন ভুলেই ছিল সে। ছোটবেলায় কত কত গল্প শোনাতেন মা। আজ অনেক দিন। বাদে মায়ের এই কথাগুলো শুনে আবার সেসব মনে পড়ে গেল। রোখসানা বেগম হঠাৎ বললেন, তোর গা তো গরম।
ও কিছু না।
দেখি?
বলে হৃদিকে বসা করালেন। তারপর কপালে হাত দিয়ে আঁতকে উঠলেন, তোর গায়ে তো অনেক জ্বর!
কই? বলে নিজেই নিজের কপালে হাত দিল হৃদি। এটা কিছু না,। প্যারাসিটামল খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।
রোখসানা বেগম কথা বললেন না। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর নিজের বিছানায়ই হৃদির শোয়ার ব্যবস্থা করলেন। হৃদি বলল, আমি এখানে ঘুমাব?
হুম।
জীবনেও না। তোমার সঙ্গে একটু আহ্লাদ করলাম বলেই তোমার সঙ্গে ঘুমাতে হবে?
এখন শো। পরে উঠে চলে যাস।
আমি কারও সঙ্গে ঘুমাতে পারি না, মা।
রোখসানা বেগম বাধা দিলেন না। বললেন, যা তাহলে, ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। আমি ডেকে দেব।
.
তখন কেবল সন্ধ্যা হয়েছে। এত তাড়াতাড়ি কেউ ঘুমায়? হৃদিও ঘুমাল না। তার হঠাৎ মনে হলো, সে গ্রাহ্য করতে না চাইলেও তার শরীর সত্যি সত্যিই খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে, একটা ঠান্ডা কনকনে অনুভূতি তার পায়ের তালু থেকে মাথা অবধি ছড়িয়ে পড়ছে। সে গায়ে চাদর টেনে শুয়ে পড়ল। মায়ের সঙ্গের ওই মুহূর্তটুকু তার সন্ধ্যার মন খারাপের অনুভূতিটা শুষে নিয়েছে। কিন্তু অনিকের সঙ্গে খুব কথা বলতে ইচ্ছে হলো তার। সে অনিককে ফোন করল। অনিক অবশ্য প্রথম দুবার ধরল না। কেটে দিল। তৃতীয়বার ফোন ধরে খানিক বিরক্ত গলায় বলল, কী হলো? এত ফোন করছ কেন?
কী করছ তুমি?
আমি পড়াতে আসছি।
কোথায়?
ওই যে নতুন টিউশনটা। জিতু।
আচ্ছা। বলে চুপ করে রইল হৃদি। অনিক বলল, কী বলো?
তুমি কি কিছু বুঝতে পারছ?
কী বুঝতে পারব?
আমার গলা শুনে কিছুই বুঝতে পারছ না?
গলা শুনে কী বুঝব?
আমার যে শরীর খারাপ?
গলা শুনে শরীর খারাপ বোঝা যায়?
যায়।
কীভাবে?
ভালোবাসলে। ভালোবাসা তীব্র হলে ফোনে প্রিয় মানুষটার হ্যালো বলা শুনলেই বলে দেওয়া যায় তার মন খারাপ কি না।
কই? আমি তো বুঝতে পারছি না।
তার মানে তুমি আমায় ভালোবাসো না।
তাহলে কী করি?
খারাপ বাসো।
আচ্ছা।
আচ্ছা মানে কী?
আচ্ছা মানে কিছু না। আমি স্টুডেন্ট পড়াতে এসেছি। বের হয়ে তোমাকে ফোন করছি। বলেই খট করে ফোন কেটে দিল অনিক। হৃদি চুপ করে বসে রইল। তার আবার কান্না পেয়ে গেল। সে জানে এই কান্নার কোনো মানে হয় না। অনিক পড়াতে গিয়েছে। এই সময়ে ছাত্রের সামনে বসে কারও সঙ্গে এই ধরনের কথা বলা সম্ভব নয়। তারপরও তার মন খারাপ হয়ে গেল। সে ফোনটা গালের সঙ্গে চেপে ধরে শুয়ে রইল।
অনিক তাকে ফোন করল গভীর রাতে। হৃদি তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। বার তিনেক রিং হওয়ার পর ফোন ধরল সে। তারপর ঘুম ঘুম গলায় বলল, বলো?
সরি। একটা ঝামেলা হয়ে গিয়েছিল।
সমস্যা নেই।
কী হয়েছে তোমার, মন খারাপ?
উঁহু।
তাহলে?
শরীর খারাপ।
জ্বর?
হুঁ।
ওষুধ খেয়েছ?
খেয়েছি।
এখন কেমন লাগছে?
ভালো।
আমি কি ফোন রেখে দেব?
হুম।
অনিক বুঝতে পারছিল যে হৃদি ঘুমের ঘোরে কথা বলছে। ফলে সে ফোন রেখে দিল। পরদিন বেলা করে ঘুম ভাঙল হৃদির। কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠতে গিয়ে আবিষ্কার করল, তার সারা শরীর ব্যথা। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। সে গোঙানির মতো বার কয়েক মাকে ডাকল। রোখসানা বেগম মেয়ের অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন। বললেন, এ কী অবস্থা তোর?
আমার খুব খারাপ লাগছে, মা। কাতর কণ্ঠে বলল হৃদি।
দিনের বাকিটা সময় আর উঠে দাঁড়াতে পারল না সে। বিকেলের দিকে বাসার পাশের ফার্মেসি থেকে এক ডাক্তার নিয়ে এল তিথি। তিনি দেখে কিছু ওষুধ দিয়ে গেলেন। কিন্তু জ্বর তাতে কমল না। বরং বাড়ল। পরদিন গভীর রাতে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল। রোখসানা বেগম দিশেহারা গলায় বললেন, ওকে হাসপাতালে নিতে হবে। এখুনি হাসপাতালে নিতে হবে।
কিন্তু অত রাতে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা কী! তাদের নিজেদের গাড়ি নেই। তিথি উবারে বার কয়েক খুঁজেও কাছাকাছি কোনো গাড়ি পেল না। সুনসান ফাঁকা রাস্তা। তিথি একবার অনিককে ফোন করার কথা ভাবল। কিন্তু মা বিষয়টা ভালোভাবে নেবেন না বলে আর করা হলো না। তবে সে যতক্ষণে উবার থেকে ফোন পেল, ততক্ষণে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটেছে। তাদের বাড়ির দরজা দিয়ে সাদা একটা গাড়ি ঢুকতে দেখা গেল। গাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এল নেহাল। সম্ভবত রোখসানা বেগম তাকে ফোন করেছিলেন। হৃদিকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো প্রায় শেষরাতে। তাকে হাসপাতালে থাকতে হলো চার দিন। এই চার দিনই নেহাল যতটা সম্ভব তাকে সময় দিল।
অনিক অবশ্য এত কিছু জানে না। সেদিন গভীর রাতে ফোন রেখে দেওয়ার দুদিন বাদে এক সন্ধ্যায় হৃদিকে ফোন করল অনিক, হ্যালো, হৃদি।
হৃদি শান্ত-স্বাভাবিক গলায় বলল, হ্যালো।
আমি মাকে নিয়ে একটু ঝামেলায় আটকে গেছি বলে তোমাকে ফোন করা হয় নি। কেমন আছ তুমি?
ভালো।
শরীর কেমন?
ভালো।
সেদিন যে বলছিলে একটু জ্বর জ্বর?
কবে? ইচ্ছে করেই প্রশ্নটা করল হৃদি।
পরশু।
হৃদির খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, দুদিন পর তুমি খোঁজ নেওয়ার সময় পেলে? কিন্তু সে তা বলল না।
অনিকই বলল, ওই যে আমার ফোন করতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। তুমি তখন ঘুমাচ্ছিলে।
আচ্ছা।
এখন ভালো?
হুম।
কোনো সমস্যা নেই তো?
না।
মা তোমার কথা খুব জিজ্ঞেস করছিল।
আচ্ছা।
অনিক আর বিশেষ কিছু বলল না। ফোন রেখে দিল। হৃদিও কিছু বলতে চাইল না। তবে অনিক ফোন রেখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ কান্না পেয়ে গেল তার। বুকের কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠতে লাগল। তবে সেটাকে সামলাল হৃদি।
সমস্যা হচ্ছে, অনিক আর ফোন করল না। হৃদিও যেন একটা অবচেতন অভিমানে আড়ষ্ট হয়ে রইল। সেদিন রাতে তার সঙ্গে হাসপাতালে থাকল অবন্তী। তখন রাত প্রায় বারোটা। হৃদি মাথায় পানি ঢালতে ওয়াশরুমে ঢুকল। সে বের হলো দীর্ঘ সময় পর। ঘড়ির কাঁটায় তখন বারোটা বেজে দশ। ঘরে পা দিয়েই হতভম্ব হয়ে গেল হৃদি। তার ঘরভর্তি রংবেরঙের ফুল। অজস্র বেলুন উড়ছে হাওয়ায়। একটা বড় কেক টেবিলে। সেই কেকে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটির আজ জন্মদিন।
হৃদি কী করবে ভেবে পেল না। সে এলোমেলো ভঙ্গিতে বিছানায় বসে পড়ল। দরজার সামনে নেহাল দাঁড়িয়ে আছে। সে এক পা এগিয়ে এসে বলল, শুভ জন্মদিন।
হৃদির হঠাৎ চোখে পানি চলে এল। সে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল। এই কান্নার জল সে নেহালকে অন্তত দেখাতে চায় না। কিন্তু কেন দেখাতে চায় না, তা জানে না।
বিষয়টাতে অবন্তীও অবাক হয়েছে। একই সঙ্গে বিব্রতও। হৃদির অসুস্থতা নিয়ে বাড়ির সবাই এত দুশ্চিন্তা করছিল যে তার জন্মদিনের কথা ভুলেই গিয়েছিল সে। কিন্তু নেহাল কী করে জানল? হৃদি অবশ্য অত কিছু ভাবতে পারছিল না। কিংবা সে কী ভাবছে, তা কাউকে বুঝতেই দিল না। চুপচাপ বসে রইল বিছানায়। নেহাল বলল, মন। খারাপ?
উঁহু। মাথা নাড়াল হৃদি।
তাহলে?
মা-বাবা নেই তো! আমি কখনো তাদের ছাড়া জন্মদিনের কেক কাটি নি।
ক্যান আই শো ইউ আ ম্যাজিক?
কিসের ম্যাজিক?
নেহাল দরজার পাশ থেকে সরে গিয়ে কুর্নিশ করার ভঙ্গিতে মাথা নোয়াল। তারপর বলল, দ্য টু ম্যাজিক ইজ হিয়ার!
সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঢুকলেন মা। তার পেছনে হুইলচেয়ারে বাবা। হৃদির এসব কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। সে ছুটে গিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরল। তারপর কাঁদতে লাগল নিঃশব্দে। যেন ওই কান্নাটুকুই তার আনন্দের প্রকাশ। তারাও হৃদিকে জড়িয়ে ধরে রইলেন।
হৃদি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল পরদিনই। অনিককে আর ফোন করল না সে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অনিকও না। বিষয়টাতে এত অবাক হলো সে! এমন কেন করছে অনিক? কী হয়েছে তার? ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রাগ, কষ্ট, অভিমান যেন একসঙ্গে দলা পাকাতে লাগল। এতটা কষ্ট এর আগে কখনো হয় নি তার। তবে সেই কষ্ট কান্নায়। পরিণত হলো দুদিন বাদে।
রাহিমা বানুর জন্য মন কেমন করতে লাগল। মনে হলো তার সঙ্গে খানিক দেখা হলে, কথা বললে হয়তো ভালো লাগবে। কিন্তু অনিককে আর ফোন করবে না সে। কথাও বলবে না তার সঙ্গে। ফলে দিন দুই বাদে এক ভোরবেলা সে অনিকের বাসার দরজায় গিয়ে হাজির হলো। বেশ খানিকক্ষণ কলিং বেল চাপার পর দরজা খুলে দিল
অনিকের বাসায় থাকা লোকটা। হৃদি অবাক গলায় তাকাল, বাসায় কেউ নেই?
জাবেদ বলল, উঁহু।
মা-ও না?
না।
কোথায় গেছে তারা?
আপনি কিছুই জানেন না?
না। কী জানব?
আন্টি তো আজ সপ্তাহখানেক হলো হাসপাতালে।
হাসপাতালে? ভারী অবাক হলো হৃদি। কী হয়েছে মায়ের?
নানান সমস্যা তার। জ্বর, পাতলা পায়খানা। এর মধ্যে কাশি, শ্বাসকষ্ট। নাক দিয়ে নাকি রক্তও পড়ছে।
কী বলছেন আপনি?
হুম। অবস্থা ভালো না।
হৃদি আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না। সে হাসপাতালের ঠিকানা জেনে নিয়ে তখুনি ছুটল।
রাহিমা বানুকে ভর্তি করানো হয়েছে সরকারি হাসপাতালে। সেখানে গিজগিজ করছে অসংখ্য রোগী। তাদের বসার জায়গা নেই। ঘুমানোর বিছানা নেই। বাথরুম নেই। মাথার ওপর ফ্যান নেই। চারদিকে চিৎকার, চেঁচামেচি, কান্না। হৃদি সেই গিজগিজে ভিড় আর কোলাহলের মধ্যেই অনিককে দেখতে পেল।
একটা দেয়ালের গা ঘেঁষে মেঝেতে কোনোরকমে বিছানা পেতে বসে আছে সে। তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছেন মা। প্রচণ্ড গরমে ঘামছেন তিনি। তবে তাকে। একনাগাড়ে বাতাস করে চলেছে অনিক। রাহিমা বানু ঘুমাচ্ছেন। তার পাশের দেয়ালের সঙ্গে একটা স্যালাইন ঝুলছে। মাঝে মাঝে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে অনিক। তার বাঁ দিকটা অন্ধকার। ডান দিকে একটা হলুদ আলো জ্বলছে। সেই আলো এসে পড়েছে তার চুলে। ফলে চুলের প্রান্তগুলো কেমন লালচে হয়ে আছে। তাকে দেখতে লাগছে অপার্থিব এক দেবশিশুর মতো, যেন এখানে তার আগমন বিশেষ কোনো : উদ্দেশ্যে। ফলে চারপাশের এই এত এত রোগ, শোক, জরা, যন্ত্রণার মধ্যেও সে বসে আছে নির্বিকার। যেন তার সত্যিকারের অস্তিত্ব অন্য কোথাও।
আচ্ছা, এমন কেন লাগছে তাকে?
১৩
নীলক্ষেতের বিছানা-বালিশের দোকানটার নাম লাল চান বেডিং স্টোর। দোকানের সামনে বসে আছে রাশু। তার আঙুলের ফাঁকে একটা দেশলাইয়ের কাঠি। সে সেই কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁটছে। দোকানের মালিক লাল চান তার সামনে এসে বসল। বলল, কী
হইল, কথা কস না কেন?
রাশু বলল, কী বলব?
স্যাররে কেমন লাগল?
ভালো।
কেমন ভালো।
ভালোই ভালো।
কী করলি ওইখানে গিয়া?
আপনে যা করেন।
মাগুর মাছরে মুরগি খাওয়াইছে?
খাওইয়েছ।
আর সাপগুলা দেখছস?
হুম।
ডরাস নাই?
ডরাইছি।
কী মনে হয়, ব্যবসা কেমন হইব?
কিসের ব্যবসা?
সাপের ব্যবসা।
সাপের ব্যবসা কেমনে করে? মানুষ সাপ কিন্যা কীরব? রাইন্ধা খাইব, না পালব?
ব্যবসাটা আসলে সাপের বিষের।
সাপের বিষের ব্যবসা! অবাক চোখে তাকায় রাশু।
হুম।
এই বিষয়ে আমার ধারণা নাই। সাপের বিষের যে ব্যবসা করন যায়, এইটাই তো আমি জানি না। সাপের বিষে মানুষ মরে। সেই বিষের আবার ব্যবসা কী?
এই দিকে আয়।
বলে রাশুকে দোকানের ভেতরের দিকে নিয়ে গেল লাল চান। তারপর বলল, ওই যে তোশকগুলা আছে, ওইগুলার নিচে একটা প্লাস্টিকের ফাইল আছে। ফাইলটা বের কর।
রাশু থরে থরে সাজানো তোশকের তলা থেকে ফাইল বের করল। ফাইলের ভেতর অসংখ্য পত্রিকার কাটিং। লাল চান একটা একটা করে সেই পত্রিকা বের করল। তারপর বলল, বানাম কইরা তো পড়তে পারস? নাকি?
বানাম ছাড়াই পারি। বলল রাশু।
সে প্রথম পত্রিকাটা দেখল। বড় বড় করে লেখা, পঁচাত্তর কোটি টাকার সাপের বিষ উদ্ধার!
পরেরটাতে লেখা, এত বিষ আসে কোথা থেকে? যায় কোথায়?
পরের কাটিংয়ে লেখা, সাপের বিষ পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ।
রা কয়েকটার শিরোনাম দেখে বলল, এ তো আচানক কাণ্ড!
হুম। এই জন্যই তো এত সাবধানতা। দেশে তো সাপের খামারের অনুমতি নাই। আবার করলে যে বিশাল কোনো অপরাধ, তা-ও না। কিছু টাকাপয়সা জরিমানা করে ছেড়ে দেয়।
তাইলে ওনার এত ভয় কিসের?
কার?
আপনের জামশেদ স্যারের?
সমস্যা অন্য জায়গায়।
কী সমস্যা?
সাপের বিষ সোনার চাইতেও দামি। অনেক দামি দামি ওষুধ তৈরিতে লাগে। অনেক দেশে নেশা করতেও ব্যবহৃত হয়! অকল্পনীয় চড়া দাম সেই নেশার।
নেশা করতে সাপের বিষ?
হুম।
বাপের জন্মেও শুনি নাই।
বাপ থাকলে না বাপের জন্মে শুনবি? বলে খিকখিক করে হাসে লাল চান। রাশু জবাব দেয় না। সে পত্রিকাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলল, দেশে অনুমতি না থাকলে এত বিষ আসে কোথা থিকা? আর যায়ই-বা কোথায়?
এইখানেই তো খেলা।
কিসের খেলা?
আমাগো দেশে যা ধরা পড়ে, তা আমরা চাষও করি না, উৎপাদনও করি না। আবার বেচিও না।
তাইলে?
আমরা হইলাম পাচার ট্রানজিট। আমাদের দেশে তো আর এগুলার কোনো কাজ নাই। কোনো ওষুধপত্র বা কিছু তৈরিতে ব্যবহৃতও হয় না।
তাইলে উনি কী করতে চান যদি কাজেই না লাগে? এত রিস্ক নিয়া এগুলা কইরা তাইলে লাভ কী?
তুই-ই বল কী লাভ।
রাশু মাথা নাড়ে, জানি না।
আগে উনি অন্য দেশ থেকে আসা জিনিস পাচারে হেল্প করত। ওনার একটা নেটওয়ার্ক আছে। সেইটা ইউজ করত। কিন্তু এখন উনি…।
কিন্তু এখন উনি নিজেই জিনিস বানাইতে চান? লাল চানকে থামিয়ে দিয়ে বলল রাশু। তারপর বিদেশে পাচার করতে চান, যাতে লাভ সব তারই থাকে? রাশুর কণ্ঠে বিস্ময়।
কারেক্ট! টক করে জিবে শব্দ করে লাল চান। এর বাজারদর কল্পনাতীত! একবার চিন্তা কর, দুই-দশটা চালান দিতে পারলেই কোটি কোটি টাকা।
রাশু কথা বলল না। চুপ করে রইল। তারপর বলল, যা বুঝলাম…। বলে আবার থমকে গেল সে।
কী বুঝলি?
এইটা তো নিজেই সরাসরি অবৈধভাবে বিষ পাচারের ব্যবসা। এইটা তো বিরাট বড় ক্রাইম।
কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে?
অনেক বিপদ কিন্তু?
তারে দেইখা কী মনে হইছে? সে ভিতু?
রাশু ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল, নাহ্! সে অন্য কিসিমের মানুষ। চোখ দেখলেই রক্ত ঠান্ডা হইয়া যায়।
হুম।
আপনে এই সবের সঙ্গে মিশলেন কেমনে?
সেইটা অন্য কাহিনি। এইবার আসল কাহিনি শোন।
কী?
তোরে তার খুব পছন্দ হইছে।
আমারে? অবাক গলায় বলে রাশু।
হুম।
বিয়া করব?
মানে?
মানে আমারে কি সে বিয়া করব?
এইটা কী কথা?
নাইলে আমারে তার পছন্দ করার তো কোনো কারণ দেখি না। আমি তার ওই সব ব্যবসারও কিছু বুঝি না। আর সাপখোপ দেখলে কলিজা শুকাই যায়। আমারে ঠিক কী কারণে পছন্দ করব সে?
তা তো জানি না। কিন্তু খুব পছন্দ করছে। এখন থিকা তোর তার সঙ্গেও মাঝে মাঝে থাকতে হবে।
থাকলাম। বলে দাঁতের ফাঁক থেকে দেশলাইয়ের কাঠিটা ছুঁড়ে ফেলল সে।
আপনে যা বলবেন, তা-ই সই। আপনে যদি বলেন গু সাফ করার কাজ করতে হবে, আমি তা-ই করব। তয় সাপখোপ খুব ডরাই আমি। টিভিতে দেখলেও গায়ের পশম দাঁড়াই যায়।
বলে উঠে দাঁড়াল রাশু। তারপর গিয়ে বসল দোকানের সামনের খোলা চত্বরের মতো জায়গাটাতে। ওখানে বসে তুলা, ঝুট কিংবা নারকেলের ছোবড়া কাটতে হয়। এগুলো দিয়েই মূল্যভেদে বালিশ-বিছানা বানায় তারা। তারপর বিক্রি করে। লাল চান বেডিং স্টোরের বিছানা-বালিশের খুব সুনাম। সারাক্ষণ ক্রেতা-বিক্রেতা লেগেই থাকে। কিন্তু ইদানীং যেন বিছানা-বালিশ বিক্রির চেয়েও লাল চানের আগ্রহ অন্য কিছুতে।
রাশু বসে বসে নারকেলের শুকনো ছোবড়া আলাদা করতে থাকে। ঢোলা জামার ফাঁকে তার লিকলিকে কিন্তু পোক্ত শরীর উঁকি দিচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল লাল চান। এই সেদিন তাকে আরিচা ফেরিঘাট থেকে নিয়ে এসেছিল সে। ফেরিতে চা বিস্কুট বিক্রি করত রাশু। সেই ছেলের বয়স এখন উনিশ। ছয় বছর হয়ে গেছে! অথচ এত দিনেও তার মুখচোরা স্বভাব পাল্টায় নি। কোনো কাজে না বলে নি সে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা পয়সা কখনো চায় নি। নিজের আলাদা আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করে নি। যেন আপাদমস্তক এক যন্ত্র সে।
মানুষ কি আসলেই কখনো যন্ত্র হতে পারে? বুকভার যন্ত্রণা কি তাকে যন্ত্র করে ফেলে? লাল চান জানে না। সে কেবল জানে, তার সামনে অবিশ্বাস্য এক ভবিষ্যতের হাতছানি। সেই ভবিষ্যতের জন্য রাশুই হতে পারে তার সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড!
১৪
রিয়া বলল, চল না আমার সঙ্গে একদিন?
কোথায়? অবন্তী জিজ্ঞেস করল।
ওল্ড ম্যানের সঙ্গে দেখা করতে।
তার সঙ্গে আমি কেন দেখা করতে যাব?
আরেহ, তুই যদি কাউকে বিয়ে করিস, আমি তাকে দেখব না? দেখে ভালো-মন্দ জানাব না?
তোর মাথা পুরোপুরি গেছে। শ্রাগ করল অবন্তী। আবোলতাবোল বকতে বকতে এখন আর কখন কী বলিস কিছুই বুঝিস না।
বারে! আবোলতাবোল কী বললাম?
আবোলতাবোল না?
নাহ্! আমার কাউকে ভালো লাগলে বলতে পারব না?
তা পারবি না কেন, তাই বলে ওনাকে?
কেন, ওনার সমস্যা কী, বয়স?
এই প্রশ্নে অবন্তী থমকে গেল। আসলেই তো, বয়স তো আর কাউকে ভালো লাগার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে না। বিয়ে করতে চাওয়ার ক্ষেত্রেও না। রিয়া বলল, বল? কাউকে ভালো লাগার ক্ষেত্রে বয়স কি বাধা হতে পারে?
কিন্তু উনি তো ম্যারেড। তাই না?
হুম। এটা অবশ্য একটা সমস্যা। চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল রিয়া। কী করা যায়, বল তো?
কী করা যায় মানে কী? আচ্ছা, তুই আমাকে একটা সত্যি কথা বল তো, তুই কি সত্যি সত্যিই এসব ভাবিস?
কী সব?
এই যে যা বলছিস? এগুলো কি তুই মন থেকেই বলিস? নাকি জাস্ট মজা করছিস?
মজা কেন করব?
তুই তো সব সময় তা-ই করিস। কখনো তো কোনো কিছু নিয়ে সিরিয়াস হতে দেখি না তোকে! আমি এটাকেও ফান ছাড়া আর কিছু ভাবছি না।
তোর কাছে এটাকে ফান মনে হয়?
নয়তো কী! তোর নিজের কাছে কী মনে হয়? পাল্টা প্রশ্ন করল অবন্তী। এটাকে ফান ছাড়া আর কিছু ভাবার সুযোগ আছে? তোকে তো কখনোই কোনো কিছু নিয়ে সিরিয়াস মনে হয় না আমার! আর সেই তুই সিরিয়াস হবি এমন একটা উদ্ভট ব্যাপার নিয়ে? আর তাও আবার আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?
অবন্তী থামলেও রিয়া কোনো জবাব দিল না। নিস্পলক তাকিয়ে রইল। যেন আচমকাই তার চোখে মেঘের ছায়া পড়েছে। অবন্তী হাসল, কদিন এমন মজাটজা করে তারপর সব ভুলে গিয়ে হঠাৎ আবার অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বি। ঠিক কি না, বল?
রিয়া এবার পুরোপুরি থমকে গেল। অবন্তী বলল, কী হলো? হঠাৎ এমন গম্ভীর হয়ে গেলি যে?
আমাকে তোদের সবার কাছে খুব ফানি মনে হয়, তাই না? তোরা আমাকে কখনো সিরিয়াসলি নিস না?
বিষয়টা তা না। কিন্তু তুই তো এমন একটা বিষয় নিয়ে সিরিয়াস হওয়ার মতো মানুষ না। তুই-ই ভেবে বল, তুই কি কখনো সিরিয়াসলি বিষয়টা নিয়ে ভেবেছিস? নাকি জাস্ট মজা করছিস?
রিয়া এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। তবে খুব শান্ত, ভারী গলায় বলল, আমি আসলে তোদের সবার কাছে একটা এন্টারটেইনমেন্ট হয়ে গেছি, তাই না? আমার কোনো ভালো লাগা, মন্দ লাগা থাকতে নেই বা সেটা থাকলেও অন্যদের কাছে তা ফানি মনে হওয়ার মতো ব্যাপার!
এই, তুই মন খারাপ করছিস কেন?
মন খারাপ করছি না। ওল্ড ম্যান কি বলেন, জানিস?
কী?
বলেন, আমি নাকি নিজেকে খুব খেলো করে ফেলছি।
তার সঙ্গে তোর এসব নিয়েও কথা হয়?
আমি ওনাকে মাঝে মাঝে ফোন করি। ফেসবুকে মেসেজ দিই। হুটহাট রুমে চলে যাই। এসব নিয়ে উনি খুব বিরক্ত। ওনার ধারণা, আমি অসুস্থ।
যাহ্! অসুস্থ কেন হবি?
তুই এতক্ষণ যা বললি, তার মিনিংও কিন্তু অনেকটা তা-ই দাঁড়ায়।
আমি মোটেও তা বলি নি।
রিয়া স্লান হাসল, সরাসরি বলিস নি, কিন্তু অর্থ ওই একই।
একদমই না, রিয়া। প্রায় কাতর কণ্ঠে বলল অবন্তী। তার এখন খারাপই লাগছে।
তুই আমাকে ভুল বুঝছিস। আমি জাস্ট বলতে চেয়েছি, এমন একটা বিষয় নিয়ে কি কেউ কখনো সিরিয়াসলি ভাবে? তুইও হয়তো ভাবছিস না। কিন্তু অনেক সময় এমন হয় না যে আমরা নিজেরাই অনেক কিছু চট করে বুঝতে পারি না? বুঝতে পারি না যে কোনটা সিরিয়াস আর কোনটা না। কিন্তু খানিক ধীরস্থির হয়ে সময় নিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে তারপর বুঝি।
রিয়া এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। তবে সেদিনের পর থেকে ভীষণ চুপচাপ হয়ে গেল। সে। দিন কয়েক বাদে ডিপার্টমেন্টে আসাও বন্ধ করে দিল। এমনকি ফোনেও আর। পাওয়া গেল না তাকে। যেন ভোজবাজির মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। বিষয়টা নিয়ে ভয়ানক অপরাধবোধে ভুগতে লাগল অবন্তী। মনে হলো, এসব তার জন্যই হয়েছে।
বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করার পর একদিন রিয়ার ডিপার্টমেন্টে গেল সে। সেখানে যাদের সঙ্গে তার চেনাজানা ছিল, তাদের কাছ থেকে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ হলো না। রিয়ার খবর কেউ জানে না। এমনকি তার বাসার ঠিকানাও না। ফলে তার সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হলো না। এই নিয়ে মনে মনে প্রচণ্ড অস্থির হয়ে উঠল অবন্তী। নিজেকে শাপশাপান্ত করতে লাগল। তারপর একদিন হুট করেই অদ্ভুত এক কাজ করে বসল সে। সরাসরি চলে গেল মাহমুদ হাসানের রুমে। অবন্তীকে দেখে ভারী অবাক হলেন তিনি। বললেন, আপনি কি আমাদের বিভাগের?
অবন্তী মাথা নাড়ল, না স্যার।
তাহলে?
ফিজিকস।
আচ্ছা আচ্ছা। বলে অবন্তীকে বসতে বললেন।
জি বলুন?
না মানে…। বলে ইতস্তত করতে লাগল অবন্তী। মাহমুদ তার দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, চা খাবেন?
জি না, স্যার।
খান। ভালো লাগবে।
অবন্তী অবশ্য চা খেল না। তার এখন কেন যেন মনে হচ্ছে রিয়ার বিষয়ে এখানে আসাটা তার ঠিক হয় নি। বিষয়টা দৃষ্টিকটু। তা ছাড়া মাহমুদ হাসান এখন নিশ্চয়ই বুঝে যাবেন যে তাকে নিয়ে রিয়ার পাগলামির বিষয়টা অন্য কেউও জানে। বিষয়টা শিক্ষক হিসেবে তার জন্য বিব্রতকর। ক্ষতিকরও।
মাহমুদ বললেন, কোনো সমস্যা?
জি না, স্যার।
কিন্তু আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে সমস্যা।
না, মনে, স্যার…।
মাহমুদ হাসলেন এবার। বললেন, আপনি কি আমাকে রিয়ার বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে এসেছেন?
অবন্তী রীতিমতো চমকে উঠল। বলল, জি স্যার।
রিয়ার কাছে আপনার কথা শুনেছি আমি।
আবারও যেন চমকাল অবন্তী। বলল, আমার কথা?
হ্যাঁ।
কী বলত ও?
মাহমুদ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন, শুনতে চান?
খুব।
শুনলে যদি আপনার মন খারাপ হয়ে যায়?
অবন্তী এবার থমকে গেল। রিয়া তার সম্পর্কে কী এমন বলেছে যে সেসব শুনলে তার মন খারাপ হয়ে যেতে পারে।
মাহমুদ বললেন, রিয়ার ধারণা…। বলে আবার থেমে গেলেন তিনি। তারপর চায়ের কাপ থেকে সময় নিয়ে চামচ দিয়ে কিছু একটা তুললেন। তারপর আবার চুমুক দিলেন। তবে তার এই বিলম্বিত, অলস প্রক্রিয়াটুকু অবন্তীর কাছে সুদীর্ঘ অসহ্য সময় বলে মনে হতে লাগল। অবশেষে কথা বললেন মাহমুদ। বললেন, রিয়ার ধারণা আপনি তার জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। বলে মৃদু হাসলেন তিনি। আপনার মতো এত ভালো বন্ধু নাকি উনি কখনো পান নি। আর পাবেনও না।
উফফ! যেন আটকে রাখা দমটা এতক্ষণে ছাড়ল অবন্তী। বলল, আপনি যে বললেন শুনলে আমার মন খারাপ হবে?
হয় নি?
কেন হবে?
যদি না হয়ে থাকে, তাহলে আপনি সত্যি সত্যিই রিয়ার ভালো বন্ধু।
কীভাবে? মানে…আমি ঠিক আপনার কথা বুঝতে পারছি না।
আচ্ছা। অনেক সময় এমন হয় না যে আমরা আমাদের খুব কাছের বন্ধুকে নিয়েও অনেক দ্বিধা কিংবা সংশয়ে ভুগি?
হুম। খানিক ভেবে বলল অবন্তী।
এটা আমাদের সবারই হয়। একদম অকৃত্রিম বন্ধু তো আর সহসা জোটে না। ফলে যখন কেউ শোনে যে তার কোনো বন্ধু তাকে নিয়ে তার অগোচরে কারও কাছে খুব ভালো কিছু বলেছে, তখন ভালো লাগার পাশাপাশি অবচেতনেই আমাদের খানিক মন খারাপও হয়। একধরনের অপরাধবোধও কাজ করে।
কেন?
কারণ…। তখন আমাদের মনে হতে থাকে, ইশ, ও আমাকে এত ভালোবাসে। অথচ সেই আমিই কিনা ওকে নিয়ে কত কী ভাবতাম, কত কিছু বলতাম! এই ভেবে মন খারাপ হয়।
কথাটা শুনে অবন্তী হঠাৎ থম মেরে গেল। মাহমুদের কথাটা মিথ্যে নয়। রিয়াকে নিয়েও এমন একটা দোদুল্যমানতা তার মধ্যে কাজ করত। কিন্তু আজ এই কথাটা শোনার পর তার মধ্যে যেন প্রবল অপরাধবোধই কাজ করতে লাগল। মনে হতে লাগল, মেয়েটা তাকে এত ভালোবাসে, অথচ সে-ই কিনা তাকে কী সব বলে দুঃখ দিল!
মাহমুদ বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না। উনি ভালো আছেন।
আপনি কি স্যার সবাইকেই আপনি করে বলেন? স্টুডেন্টদেরও? অবন্তী জিজ্ঞেস করল।
মাহমুদ হাসলেন। স্নিগ্ধ, নিঃশব্দ হাসি। তারপর মৃদু মাথা ঝাঁকালেন।
আচ্ছা। বলে খানিক চুপ করে রইল অবন্তী। তারপর বলল, ও সত্যিই ভালো আছে তো?
তেমনই বললেন।
কোথায় আছে?
সম্ভবত বাড়িতেই।
আপনাকে নিজ থেকেই ফোন করেছিল?
হ্যাঁ।
কী বলেছে?
একদিন প্রায় মাঝরাতে অপরিচিত এক নম্বর থেকে হঠাৎ ফোন করে বললেন যে উনি বেশ কিছুদিন ডিপার্টমেন্টে আসবেন না। নিজের সঙ্গে একটু বোঝাপড়া করা দরকার। তাই সবকিছু থেকে খানিক বিরাম নিচ্ছেন।
কবে ফোন করেছিল? যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে অবন্তী।
এই…দিন দশেক আগে।
কবে ফিরবে কিছু বলেছে?
মাহমুদ মাথা নাড়লেন, না।
ও হঠাৎ এমন কেন হয়ে গেল?
মাহমুদ সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিলেন না। খানিক সময় নিলেন। চায়ের তলানিটুকু এক চুমুকে শেষ করে কাপটা সরিয়ে রাখলেন। তারপর খুব মনোযোগী ভঙ্গিতে হাতের কাছে রাখা বইপত্রগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, আসলে নিজের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া আমাদের সবারই দরকার। কারণ, জীবনটা তো কেবল উড়ে চলা না, তাই না? এখানে আমাদের মাটিতে পা রাখতেও জানতে হয়। বুঝতে হয়, ডানা ক্লান্ত হয়ে গেলে আমরা ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারব কি না!
অবন্তী তাকিয়ে রইল। কথা বলল না। মাহমুদ উঠে গিয়ে দখিন দিকের জানালাটা খুলে দিতে দিতে বললেন, যে কেবল আলোতে বাঁচে, তার কিন্তু অন্ধকারের মুখোমুখি হতেও জানতে হয়। কারণ, দেয়ার ইজ লাইট অ্যান্ড ডার্ক এভরিহোয়ার। মাছ কেবল জলে বাস করতে জানে বলেই তার ডাঙার আয়ু ক্ষণিকের।
অবন্তীর অকস্মাৎ মনে হলো, এই মানুষটার কথা কিংবা ভাবনায় একটা অদ্ভুত অন্তরঙ্গতা আছে। চট করে নিজেকে খুব একাত্ম মনে হয়। মনে হয়, দীর্ঘ সময় চুপচাপ তার সামনে বসে থাকা যায়। কথা শোনা যায়। আর নিজের ভাবনাগুলোকে ঝালিয়ে নেওয়া যায়।
মাহমুদ চেয়ারে ফিরে বসতে বসতে বললেন, যে জীবনটা রিয়া কাটাচ্ছেন, যদি কখনো সেই জীবনটা তার কাছ থেকে হারিয়ে যায় কিংবা অন্যরা আর তাকে মনোযোগের কেন্দ্রে না রাখে, তখন সেই জীবনের মুখোমুখি উনি হতে পারবেন কি না, এই বোঝাবুঝিটা ওনার দরকার। শুধু ওনার না, হয়তো আমাদের সবারই।
বলে হাসলেন তিনি। অদ্ভুত সুন্দর সেই হাসি। অবন্তী কথা বলল না। তবে তার কেন যেন মনে হলো, এই মানুষটার মধ্যে কিছু একটা রয়েছে। হয়তো সেই কিছু একটাই রিয়ার মতো গতিময় এক ঝঞ্ঝাকেও হঠাৎ অমন থমকে দিয়েছে। মাহমুদ বললেন, জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী, জানেন?
অবন্তী তাকাল। তার চোখে জিজ্ঞাসা।
উপলব্ধি। আপনি কখন কী করছেন, সেটি যদি উপলব্ধি করতে না পারেন তো জীবন আপনাকে রিগ্রেট করার সুযোগ দেবে না। এই জন্য যত তাড়াই থাকুক, ছুটতে ছুটতেও আমাদের খানিক থামতে জানতে হবে। খানিক জিরিয়ে নিতে হবে। মানুষ ভাবে, কেবল ছুটলেই বুঝি বহুদূর যাওয়া যায়। কিন্তু কথাটা তো সত্য নয়। বহুদূর যেতে হলে বরং ওই বিরামটুকু দরকার।
জি।
যে ভাবনা, জীবনদর্শন কিংবা আচরণের জীবন রিয়া কাটান, সেটি সম্পর্কে তার ওই উপলব্ধিটুকু খুব দরকার। তাকে বুঝতে হবে তিনি কী করছেন, কেন করছেন। কারণ, এই সময়টা চলে গেলে জীবন তো আর তাকে ফিরে আসার সুযোগটা দেবে না। তাই না?
জি।
সরি। যেন হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠলেন মাহমুদ। আমি বোধ হয় খুব বেশি বাজে বকে ফেলছি।
না না। আমার শুনতে ভালো লাগছে।
শিক্ষক হওয়ার এই এক যন্ত্রণা, বুঝলেন? যখন-তখন যে কাউকে স্টুডেন্ট ভেবে লেকচার দিতে ইচ্ছে হয়। বলে হাসলেন মাহমুদ।
আমি তো তা-ই। হাসল অবন্তীও। তারপর আরও খানিক কথা হলো তাদের। অবন্তী যখন মাহমুদ হাসানের রুম থেকে বের হয়ে এল, তখন খুব নির্ভার লাগছিল তার। মনে হচ্ছিল, ওই সময়টুকু তাকে কেমন অন্য রকম এক অনুভব দিয়েছে। মনে হয়েছে, এমন একজন মানুষের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায়। নিজের জীবনের গল্প অকপটে শেয়ার করা যায়।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাকে একবারও শিক্ষক বলে মনে হয় নি। বরং মনে হচ্ছিল, খুব কাছের কোনো বন্ধু। যেই বন্ধু তার চেয়ে বয়সে খানিক বড়। কিন্তু সবকিছু সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান। তবে সেই জ্ঞান সে নিজকে জাহির করতে প্রকাশ করে না। প্রকাশ করে প্রয়োজনে। যখন যতটুকু দরকার, ঠিক ততটুকু। আর তাতে তার সঙ্গের মানুষটি খুব নির্ভার অনুভব করে। হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাসী। জীবনে এমন একজন মানুষ খুব দরকার। তা হোক বন্ধু কিংবা শিক্ষক কিংবা অন্য কিছু।
.
মাহমুদ হাসানের প্রতি রিয়ার অমন উন্মাদনা নিয়ে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়াটা অবন্তীর ছিল, তা যেন সেদিনের পর থেকে অনেকটাই বদলে গেল। তার বরং মনে হলো, রিয়ার মতো কারও পক্ষে হুট করে কোনো পুরুষের প্রতি অমন মুগ্ধ হয়ে পড়া সহজ কোনো ব্যাপার নয়। সেটি হলে তা বরং হতে পারত আরও অনেক আগেই। কিন্তু সে সম্ভবত মাহমুদ হাসানের মতো কারও জন্যই অপেক্ষা করছিল। আর তিনিও তার সহজাত কথায়, আচরণে রিয়াকে অবচেতনেই মুগ্ধ করে ফেলেছিলেন। হয়তো করেছেন আরও অনেককেই। কিন্তু তারা রিয়ার মতো এমন ডাকাবুকো, বেপরোয়া নয় বলেই সেসব তার কাছ অবধি পৌঁছাতে পারে নি। কিন্তু রিয়া পেরেছে।
রিয়া ইউনিভার্সিটিতে এল মাসখানেক পরে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তার ফিরে আসায় অবন্তী যে পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিল, তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না। বরং সে যেন আগের চেয়েও বেশি বেপরোয়া হয়ে ফিরে এসেছে। অবন্তীকে দেখেই বলল, কী রে, আমি মরে গেছি ভেবে তোর হাড় জুড়িয়েছিল?
কী বলছিস এসব?
ন্যাকামি করিস না। আমি সব বুঝি।
কী বুঝিস?
আমি না থাকলে তোরা কী করিস!
কী করি?
মিত আসা সেই
আমার নামে রাজ্যের বদনাম করিস। গিবত করিস। বলিস যে মালটা আর না এলে ভালো হতো!
ছি রিয়া! এসব কী ধরনের কথা? অবন্তী এবার সত্যি সত্যি বিরক্ত হলো। এই ধরনের আজেবাজে কথা বলার জন্য এত দিন বাসায় ছিলি?
বাসায় ছিলাম অন্য কারণে।
কী কারণে?
ওই ওল্ড ম্যানকে নিয়ে আমার আসল ঘটনা বোঝার জন্য।
তোর আবার আসল ঘটনা কী?
মানে, আমি কি সত্যি সত্যিই ওই বুড়োটাকে ভালোবাসি? নাকি তোর কথাই সত্যি?
আমার কী কথা?
ওই যে, জাস্ট মজা করতে করতেই একসময় হঠাৎ ভুলে গিয়েছিলাম যে ওটা আসলে মজা ছিল! পরে ফান আর সিরিয়াসনেসের মধ্যে ফারাক করতে পারছিলাম না। এমন হয় না অনেক সময়?
হুম হয়। তা শেষে কী মনে হলো?
মনে হলো…। বলে একটু থামল রিয়া। তারপর বলল, শুরুটা ফানই ছিল। ওল্ড ম্যান মূলত আমাদের সর্বজনীন ক্রাশ, বুঝলি? সব মেয়েই ডিপার্টমেন্টে এসে প্রথমে তার প্রেমে পড়ে যায়। মানে…ধর, সিরিয়াস কিছু না হলেও অ্যাটলিস্ট তাকে নিয়ে মজাটজা তো হয়ই। সম্ভবত আমিও প্রথমে তেমনই করছিলাম।
তারপর?
তারপর? বলে আবার চুপ করে রইল রিয়া। তার চোখ যেন কেমন বিষণ্ণ হয়ে উঠেছে। একটা ঠান্ডা, শীতল ছায়া। সে প্রায় বিড়বিড় করে বলল, শালা আমাকে শেষ করে দিয়েছে, বুঝলি?
মানে কী?
মানে আই অ্যাম লিটারেলি গন। এই একটা মাস আমার জীবন জাহান্নাম হয়ে গেছে। একটা মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে পারি নি। সারাক্ষণ মনে হতো বুকের ভেতরটা কেমন দমবন্ধ হয়ে আছে। ব্যাটাকে দেখতে না পেলে মরেই যাব। ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে ফেসবুকে স্টক পর্যন্ত করতাম, মেসেজ পাঠাতাম। কিন্তু কঠিন জিনিস, বুঝলি? সিনই করত না!
সিরিয়াসলি? ভ্রু কুঁচকে বলল অবন্তী।
রিয়া আচমকা সপাটে চাটি বসাল অবন্তীর মাথায়। তারপর বলল, আরেকবার এই কথা বললে তোকে আমি খুন করে ফেলব, হারামজাদি।
অবন্তী ভ্যাবাচেকা খাওয়া ভঙ্গিতে বলল, কী কথা?
সিরিয়াস না ফান! তোর ওই এক সিরিয়াস না ফান শুনে শুনে কনফিউজড হয়ে আমি আমার জীবন থেকে একটা মাস শেষ করে দিয়েছি। বলেই কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে বাংলা সিনেমার সংলাপের মতো প্রলম্বিত স্বরে বলতে লাগল, দে, আমার জীবন থেকে একটা মাস ফিরিয়ে দে। এখুনি দে। না হলে তোকে আমি খুন করে ফেলব, শয়তান। তুই আমার মনও পাবি না, দেহও পাবি না। যা পাবার সবই পাবে ওই ওল্ড ম্যান।
বলেই শরীর কাঁপিয়ে হাসতে লাগল রিয়া। অবন্তী হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল। রিয়া বলল, চল ওল্ড ম্যানের সঙ্গে দেখা করে আসি।
কেন!
কারণ, ঘটনা তাকে জানাতে হবে না? সে-ই তো বলেছিল এই ব্রেক নেওয়ার পর আমার মানসিক অবস্থা কী হয়, সেটা তাকে জানাতে।
দেখে তো মনে হচ্ছে আরও খারাপ হয়েছে।
সেটাই তাকে জানাতে হবে। গিয়ে বলতে হবে, ঘটনা হ্যাঁজ সিরিয়াসলি ঘটেন।
এর মানে কী?
মানে ঘটনা সিরিয়াসলি ঘটে গেছে। আমার পুরোপুরি প্রেমে পতন ঘটেছে। এই পতনের গভীরতা এগারো হাজার তেত্রিশ মিটার। এর থেকে ওঠার আর কোনো উপায় নেই।
এগারো হাজার তেত্রিশ মিটার মানে?
মানে…। বলে খানিক চিন্তিত ভঙ্গিতে চুপ করে রইল রিয়া। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, মানে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতা এগারো হাজার তেত্রিশ মিটার। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ কী, জানিস তো?
অবন্তী একদৃষ্টে রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। এর ভাবভঙ্গি সে কিছুই বুঝতে পারছে না। কথাবার্তাও না। তার চেয়ে তো আগেই ভালো ছিল সে।
রিয়া উঠে যেতে যেতে বলল, পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর স্থানের সমানই যদি প্রেমে পড়তে না পারলাম, তাহলে সেই প্রেমের আর প্রেস্টিজ কী থাকল, বল?
১৫
হৃদি বসে আছে রাহিমা বানুর মাথার কাছে। তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে সে। রাহিমা বানু বললেন, তুমি এখন যাও। রাত হয়ে গেছে।
এটা এমন কোনো রাত না, মা।
মেয়েদের জন্য সন্ধ্যাই অনেক রাত।
এটা কেমন কথা হলো, মা? রাত হলে সেটা ছেলে-মেয়ে সবার জন্য একই হওয়ার কথা। আলাদা কেন হবে?
দিনকাল তো ভালো না। চারদিকে এত এত খারাপ খবর শুনি যে ভয় লাগে। মেয়েটাকে রেখে এসেছি ভাইয়ের বাসায়। এই বয়সের মেয়ে। কি-না-কি করে, সারাক্ষণ ভয় হয়। তোমাকে নিয়েও হয়।
আমাকে নিয়েও আপনার সারাক্ষণ ভয় হয়?
হবে না? তুমি কি আমার কাছে আর আলাদা কেউ? আয়েশা আমার যেমন, তুমিও। তোমাদের জন্য বুকটা সারাক্ষণ ছটফট করে। এই যে কটা দিন তোমাকে দেখি নি, হাসপাতালে ছিলাম, সারাক্ষণ কেবল মনে হতো, তুমি যদি একটু পাশে এসে বসতে, একটু কথা বলতে, তাহলেই আমি সুস্থ হয়ে যেতাম। ওই হাসপাতাল, ডাক্তার ওসব কিছুই লাগত না।
কথাটা শুনে চুপ হয়ে রইল হৃদি। এই মানুষটা এমন কেন? এত মায়া! সে বলল, এখন তো হাসপাতাল থেকে এসেছেন। আর আমিও রোজ এসে দেখে যাব।
হ্যাঁ, এসো। কিন্তু যতটুকু থাকো, ততটুকু যত দ্রুত কেটে যায়, যখন থাকো না, সেটা তত দ্রুত কাটে না। খালি মনে হয়, কখন আসবে, কখন! রাহিমা বানুর চোখ ছলছল করে। হৃদি তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলে, মা, আপনি এমন কেন?
তুমি এমন যে! তোমার মতো ভালো মেয়ে আর দেখি নি! কিন্তু অনিকটা এমন হতচ্ছাড়া যে আমার খুব ভয় করে।
কিসের ভয়?
ও যদি তোমাকে ধরে রাখতে না পারে!
কথাটা শুনে থমকে গেল হৃদি। এই প্রথম এমন স্পষ্ট করে কথাটা বললেন রাহিমা বানু। একটা অনাস্বাদিত সলজ্জ অনুভব যেন হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে আসতে লাগল। তারপর ছড়িয়ে পড়তে লাগল শরীরজুড়ে। রাহিমা বানু বললেন, তুমি এখন যাও। কাল আবার এসো।
বাসায় ফিরেও রাহিমা বানুর ওই কথাগুলো বারবার মনে পড়তে লাগল হৃদির। অনিককে ফোন করল সে। বলল, তুমি কি জানো তোমার ওপর আমার কি অসম্ভব মন খারাপ ছিল?
জানি।
এটা কি জানো এখন আর সেই মন খারাপটা নেই।
কেন?
মায়ের জন্য।
তবে তো মাকে সারাক্ষণ তোমার সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতে হয়। তাহলে আমি অন্তত খানিক নিশ্চিন্ত থাকতে পারব।
কিন্তু সে জন্য তো তোমাকে কিছু করতে হবে। এখন তো মা একটু ভালো।
অনিক কথা বলল না। হৃদি বলল, তুমি একটু প্লিজ, গ্র্যাজুয়েশনটা ঠিকঠাক শেষ করো। তারপর কিছু একটা চাকরিবাকরি জুটিয়ে নিতে পারলেই আমি বাসায় বলতে পারব। আমার মা ইদানীং আমার প্রতি খুব পজিটিভ।
হুম। বলে আবারও চুপ করে গেল অনিক।
কথা বলছ না কেন? এই ভালো সময়টা পাল্টে যেতে কিন্তু একমুহূর্তও লাগবে। আর তখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
অনিক তারপরও কথা বলল না। হৃদি বলল, আমি কি ফোন রাখব?
না।
তাহলে?
কিছুক্ষণ ধরে রাখো।
কী হয়েছে তোমার? মন খারাপ কেন?
আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়, মানুষ হিসেবে আমি কেমন?
এই প্রশ্ন কেন?
বলো না!
সত্যি বলব?
মিথ্যে কেন বলবে?
না মানে…খারাপ বললে তো লোকে বলবে আমার পছন্দ খারাপ। জেনেশুনে খারাপ লোককে বিয়ে করেছি। বলে মৃদু হাসল হৃদি।
অনিক বলল, বলো।
আমি না তোমাকে বুঝতে পারি না। কখনো কখনো মনে হয় এই মানুষটার আদ্যোপান্ত আমি চিনি। আবার কখনো কখনো মনে হয়, এই মানুষটাকে আমি চিনিই না। কখনো দেখিই নি। এতটাই অচেনা সে।
আমারও ঠিক তা-ই মনে হয়।
কী?
অচেনা।
কাকে, আমাকে? জিজ্ঞেস করল হৃদি।
না। আমার নিজেকে। অনেক চেষ্টা করেও কখনো নিজেকে বুঝতে পারি না আমি। মনে হয়, একটা ঘাসের মাঠে ইটচাপা যে ঘাসগুলো থাকে, আমি ওই ঘাসগুলোর মতো। সবাই ভাবে আর সব ঘাসের মতোই ওই ঘাসগুলোও সবুজ। কিন্তু ইটটা সরালেই দেখা যায় তারা মৃত, ফ্যাকাশে।
এমন করে কেন বলছ?
হঠাৎ মনে হলো তাই। নাথিং সিরিয়াস।
তুমি আসলে বলতে চাইছ ওই ইটটা সরিয়ে সত্যিকারের তোমাকে দেখার মতো কোনো মানুষ নেই?
আমি নিজেই হয়তো চাই না কেউ ওই আমাকে দেখুক। ইটটা সরাক।
আমিও না?
এই প্রশ্নে চুপ করে রইল অনিক। বলল, তুমি কি একদিন আমার সঙ্গে দূরে কোথাও যাবে?
কোথায়?
তা তো জানি না। তবে দূরে কোথাও।
.
ধলেশ্বরী নদীর পাড় দিয়ে চলে গেছে ঘেসো মেঠো পথ। জলে টইটম্বুর নদী সেই পথ ছুঁই ছুঁই। হৃদি তার পরনের হালকা আকাশি রঙের শাড়িটা প্রায় হাঁটু অবধি তুলে ফেলল। তারপর পা ডুবিয়ে দিল জলে। অনিক বলল, আমার কী ইচ্ছে হচ্ছে, জানো?
কী?
তোমাকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিতে।
হৃদি কটমট করে তাকাল, এটা কী ধরনের কথা?
অশ্লীল কথা।
অশ্লীল কথা? কপাল কুঁচকে বলল নদী।
হুম।
এটা অশ্লীল কথা কী করে হয়? এটা ভয়ংকর কথা।
উঁহু। বলে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে হাসল অনিক। তুমি যখন পানি থেকে উঠবে, তখন হতোমার শরীরে এই আকাশি রঙের শাড়িটা লেপ্টে থাকবে। ওই দৃশ্যটা খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। এমনকি একটা প্ল্যানও ছিল।
হৃদি খানিক ঝুঁকে অনিকের গায়ে পানি ছিটিয়ে দিতে দিতে বলল, ওরে শয়তান, এই ছিল তোর মনে?
অনিক দৌড়ে সরে গেল। হৃদি তাকে খানিক তাড়া করল। তারপর বলল, আচ্ছা, বিয়ের পর নাকি ধীরে ধীরে মানুষের রোমান্টিসিজম কমে যায়। আমাদেরটা কি কমল না বাড়ল?
আমাদের তো এখনো বিয়েই হয় নি। বলল অনিক।
মানে কী?
মানে বিয়ে বলতে যা বোঝায়, ঘর-সংসার, পরিবার, রিলেটিভ, বাচ্চা, রেসপনসিবিলিটজ। মানে যেসব হয় আরকি, ওসব তো আমাদের হয় নি।
তুমি বলছ ওসবের কারণে এসব আর থাকে না?
অনেকটাই। তখন অসংখ্য রঙের সুতো এসে একটা সুতোর বল তৈরি হয়। এলোমেলো। রাস্তায় ঝুলে থাকা অসংখ্য তারের দঙ্গলের মতো। সেসব থেকে নিজেদের সম্পর্কের এই বিশেষ সুতোটা আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়।
কথাটা ভাবল হৃদি। অনিক খুব চুপচাপ, অন্তর্মুখী মানুষ। এ কারণেই হয়তো তার ভাবনাগুলো খুব গোছানো। বাস্তবিকও।
সেই সারাটা দিন তারা ঘুরল। বহুদিন এমন সময় আর কাটায় নি তারা। বিকেলের দিকে হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। হৃদি তখন খোলা মাঠে একটা শুকনো খড়ের গাদার ওপর বসে ছিল। যত দূর চোখ যায়, কোথাও কেউ নেই। কেবল ধু ধু ফসলের মাঠ। মাঠের পাশে নদী। নদীর বুকে শব্দ। সেই শব্দে নূপুরের ছন্দ তুলে নেমে এল বৃষ্টি। হৃদি তটস্থ গলায় বলল, এখন? এখন কী হবে?
কী হবে?
এই যে বৃষ্টি চলে এল।
তাতে কী?
তাতে কী মানে কী, অনিক? আমি বাসায় ফিরব কী করে? আর এখান থেকে এত দূর পথ এই শাড়ি পরেই-বা কী করে যাব?
শাড়ি পরে যাওয়ার কী দরকার?
মানে কী?
এসো খুলে দিচ্ছি। ভেজা শাড়ি রেখে কী লাভ?
হৃদি এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল। বলল, তুমি বুঝতে পারছ না আমি কী বলছি? তখন থেকে বললাম যে আকাশ মেঘলা, চলো ফিরে যাই। তুমি গেলে না। এখন?
আমি তো চাইছিলামই বৃষ্টি নামুক। নদীতে না হোক, অন্তত বৃষ্টিতে ভেজো তুমি।
অনিক! এবার শক্ত গলায় বলল হৃদি।
হুম? বলে হৃদির বুকের কাছে এগিয়ে গেল অনিক। তারপর দুহাতে আঁকড়ে ধরল তাকে। বলল, তোমার কাজল ধুয়ে যাচ্ছে।
হৃদি কথা বলল না। অনিকের এই কথা, এই কণ্ঠস্বর, নদী, মাঠ, বৃষ্টি–সবই তার ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে এ এক অপার্থিব ভালো লাগার মুহূর্ত। কিন্তু এখান থেকে সে যাবে কী করে? এই চিন্তা তাকে আড়ষ্ট করে রাখল। অনিক হৃদির ঘাড়ের কাছের ভেজা চুলে নাক ডুবিয়ে দিল।
হৃদি বলল, পাগল তুমি?
হুম। কেমন ঘোর লাগা কণ্ঠ অনিকের।
হৃদি বলল, চলো, সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
অনিক আচমকা তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। হৃদির যে কী হলো! সে-ও যেন ভুলে গেল এই বৃষ্টি, ধূসর খোলা মাঠ, সন্ধ্যার আকাশ, তার ঘরে ফেরার শঙ্কা। তারা। তুমুল চুম্বনে পরস্পরকে শুষে নিতে থাকল। সঙ্গে শুষে নিত থাকল সংকোচ, শোক, সংশয়।
অনিক ফিসফিস করে বলল–
বৃষ্টি এলেই তোমার চুলে খানিক ভুলে গন্ধ নেব
তোমার ঠোঁটেই খুঁজব নেশা, নিকোটিনটা বন্ধ দেব
বেহিসেবি হাটবাজারে ছেড়েই দেব দামাদামি
বৃষ্টি এলেই বদলে যাব, আবার হব তোমার আমি।
হৃদিকে অবশ্য ভেজা শাড়িতে বাড়ি ফিরতে হলো না। বৃষ্টি থেমে যেতেই অনিক তার ব্যাগের ভেতর থেকে নীলরঙা আশ্চর্য সুন্দর এক শাড়ি বের করল। সঙ্গে শাড়ি পরার প্রয়োজনীয় আর সব পরিচ্ছদও। তারপর বলল, এসব তোমার জন্মদিনের। মনে আছে, তুমি একদিন ঘুরে ঘুরে নীলরঙা এই শাড়ি আর তার সঙ্গে মিলিয়ে এই সব খুঁজেছিলে?
হৃদি কথা বলল না। অনিক বলল, কিন্তু মার হঠাৎ অমন হয়ে গেল যে তোমার জন্মদিনের আর কিছুই আমার মাথায় ছিল না।
হৃদি কথা বলল না। সে টলমল চোখে তাকিয়ে রইল। সূর্য লুকিয়েছে অনেক আগেই। মেঘলা আকাশও যেন আগেভাগেই দিনের যবনিকা টেনে দিচ্ছে। কিন্তু হৃদির চোখে, মুখে, বুকে জ্বলে রইল আশ্চর্য দ্যুতিময় এক আলো! সন্ধ্যার অন্ধকারের সাধ্য কী সেই আলো নেভাবে?
১৬
হৃদির বাবা তোফায়েল হোসেন মারা গেলেন পরদিন ভোরে। রাত থেকেই তুমুল ঝড়বৃষ্টি। বাড়ির সামনের রেইন্ট্রিগাছটার মস্ত দুটি ডাল ভেঙে বেরোনোর পথ রুদ্ধ। সন্ধ্যা থেকেই শরীর খারাপ লাগছিল তার। বাড়ি ফিরে বাবার অবস্থা দেখে অনিককে অসংখ্যবার ফোন করল হৃদি। কিন্তু তার ফোন বন্ধ। ওই ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করেই মাঝরাতে বাড়ি এসে হাজির হলো নেহাল। ততক্ষণে তোফায়েল হোসেন অচেতন। তার শ্বাসপ্রশ্বাসও টের পাওয়া যাচ্ছে না। রোখসানা বেগম চিৎকার করে কাঁদছেন। কাঁদছে হৃদি, তিথি, অবন্তীও। তাদের ধারণা, তোফায়েল হোসেন মারা গেছেন।
রোখসানা বেগম কান্নাজড়ানো গলায় বললেন, উনি নাই। উনি নাই। উনি আমাদের কাউকে কিছু না বলেই চলে গেছেন, বাবা।
নেহাল তাকে দেখল। তারপর বলল, আপনি কিছু মনে না করলে আমি একবার ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাই।
রোখসানা বেগম বললেন, হাসপাতালে নিয়ে কী হবে? মানুষটা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ বললেন বুকে ব্যথা। মাথাটা দপদপ করছে। তারপর বার দুই বমি করলেন। তারপরই…। বলে আবারও হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন তিনি।
নেহাল বলল, আমাকে একবার একটু দেখতে দিন, প্লিজ। একটা শেষ চেষ্টা। তার কণ্ঠে অনুনয়।
সেই ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই তাকে নিয়ে ছুটল নেহাল। সঙ্গে হৃদি আর রোখসানা বেগম। তারা যখন হাসপাতালে পৌঁছাল, তখন সেখানে বিশেষজ্ঞ কোনো ডাক্তার নেই। নেহাল। তার এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করে হাসপাতালে আনাল। তোফায়েল হোসেনের জ্ঞান। ফিরল রাত চারটার দিকে। হৃদি সংজ্ঞাহীনের মতো পড়ে ছিল বারান্দায়। বাবার জ্ঞান
ফিরেছে শুনে সে যেন পাগল হয়ে গেল। তোফায়েল হোসেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ হাসলেন। বললেন, আমি ঠিক আছি। ঠিক আছি। পাগল মেয়ে। তুই এমন করলে অন্যদের কে দেখবে?
হৃদি ডাকল, বাবা, বাবা, ও বাবা?
তোফায়েল হোসেন অনেক কষ্টে মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। কিন্তু তার শরীর দুর্বল। কণ্ঠ ক্ষীণ। হৃদি তারপরও তাকে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল।
রোখসানা বেগম বললেন, তুমি এই ছেলেকে দেখো, এ আল্লাহর কাছ থেকে আসছে। আল্লাহ একে পাঠিয়েছে। বলেই নেহালকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। তারপর অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।
ডাক্তার বললেন, ওনার অবস্থা এখনো বিশেষ ভালো না। হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। যেকোনো সময় আবার অ্যাটাক হতে পারে। আপনারা একটু বাইরে যান। আমাদের আরও অনেক কাজ আছে।
রোখসানা বেগম অবশ্য গেলেন না। তিনি বসে রইলেন স্বামীর পাশেই। করিডরে এক সারি প্লাস্টিকের নীল চেয়ার। সেখানে চুপচাপ বসে রইল হৃদি। তার পাশে নেহাল। নিঃশব্দ করিডরজুড়ে ফিনাইলের গন্ধ। কোথাও কেউ নেই। কেবল একটা দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ। সাদা দেয়ালজুড়ে কাফনের কাপড়ের মতো মৃত্যুর হিমশীতল ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ হৃদিকে কেমন জড়সড় করে রাখল। সে হঠাৎ নেহালের হাতটা শক্ত করে ধরল। নেহাল কিছু বলল না। তবে তার হাতের ভেতর হৃদির হাতের কম্পন অনুভব করতে লাগল সে। দীর্ঘ সময়। তারপর হৃদি প্রায় ফিসফিস করে বলল, আপনি এমন কেন?
কেমন?
জানি না।
আমরা যা জানি না, তার মধ্যে কিছু কিছু হয়তো এমন যে তা আমরা জানতেই চাই না।
কথাটা ভাবাল হৃদিকে। নেহাল মিথ্যে বলে নি। সে আসলেও তাকে জানতে চায় না। ইদানীং একটা অস্পষ্ট ভয় তার মধ্যে কাজ করে। তার কেবল মনে হয়, এই মানুষটা মাঝে মাঝেই কোথা থেকে এসে যেন টুপ করে তার ভাবনায় ঢুকে পড়ে। কিন্তু সে খুব সতর্কতায় সেই ভাবনা এক পাশে সরিয়ে রাখে। তাকে নিয়ে ভাবতে চায় না। এমন কেন হয় তার?
নেহাল বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে।
হৃদির হঠাৎ মনে হলো নেহালের একটা হাত আলতো করে তার কাঁধ ছুঁয়ে আছে। তবে সেই ছোঁয়ায় তার কোনো অস্বস্তি হলো না। বরং একটা অদ্ভুত প্রশান্তি, নির্ভরতা অনুভব করতে লাগল সে। মনে হলো, ওই হাতটা ওখানেই থাকুক। কিংবা তাকে আরও খানিক শক্ত করে ধরে রাখুক। এই মুহূর্তে ওই স্পর্শটুকু তার দরকার।
আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, নেহাল যেন তার মন পড়তে পারল। সে আলগোছে হৃদির মাথাটা কাঁধে টেনে নিল। হৃদি ঠিক জানে না তার ভেতর কী কাজ করছে! কিন্তু একটা দ্বান্দ্বিক ভাবনা বিপুল দ্ব্যর্থকতা পেরিয়ে তাকে নেহালের ওই নির্ভয় আশ্রয়ের কাছে সমর্পণ করল। এই সমর্পণে তার কোনো সচেতন ভূমিকা ছিল না। কিন্তু সে সমর্পিত হলো। এর পুরোটাই যেন কোনো এক অনাবিষ্কৃত, রহস্যময় অনুভূতির জগৎ থেকে প্রবল আচ্ছন্নতায় উৎসারিত।
.
তোফায়েল হোসেন মারা গেলেন ভোর সাতটায়। হৃদির অবশ্য তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এটা সত্যি। তার বরং মনে হচ্ছিল, এবারও নিশ্চয়ই কোনো একটা ভুল হচ্ছে। নিশ্চয়ই বাবা আবার জেগে উঠবেন। তারপর খানিক আগের মতোই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন। আর হাসতে হাসতে বলবেন, আমি ঠিক আছি। আমি ঠিক আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে রে মা। তুই এমন ভেঙে পড়লে আমার কী হবে?
তোফায়েল হোসেন অবশ্য এমন কিছুই আর বললেন না। ডাক্তাররা এসে আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুসংবাদ জানালেন। হৃদি তা কিছুতেই বিশ্বাস করল না। সে পাগলের মতো ছুটে এসে নেহালকে জড়িয়ে ধরল। তারপর চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আপনি আমার বাবাকে ঠিক করে দিন। এখুনি ঠিক করে দিন। আমি জানি আপনি পারবেন। আপনি জানেন বাবার কিছু হয় নি। বাবা বেঁচে আছেন। আপনি প্লিজ আমার বাবাকে ঠিক করে দিন। এখুনি দিন।
নেহাল কথা বলল না। সে চুপচাপ হৃদিকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। এমনকি হাসপাতাল থেকে তোফায়েল হোসেনের লাশ যখন বাড়ি নিয়ে আসা হলো, তখনো। এই পুরোটা সময় একমুহূর্তের জন্যও হৃদি চোখ তুলে তাকাল না। কোনো শব্দ করল না। কাঁদলও না সে। মৃত মানুষের মতো নেহালের বুকের ভেতর নির্জীব হয়ে মিশে যেতে লাগল।
পরের কয়েকটা দিন চলে গেল খুব দ্রুত। একটা আলো-ঝলমলে বাড়ি নিমেষেই হয়ে গেল শোকের সমাধি, যেন এখানে কোনো প্রাণ নেই, কথা নেই, শব্দ নেই। যা আছে, তার নাম কান্না। তবে সেই কান্নার শব্দ কেউ শুনতে পায় না। কেবল অনুভব করতে পারে। নেহাল সেই দিনগুলোতে শক্ত বৃক্ষের মতো আগলে রাখল হৃদিকে। আর হৃদি হয়ে রইল নেতিয়ে পড়া বিবর্ণ লতাগুল্ম।
.
অনিকের কোনো খবর নেই। অবশ্য এ বাড়ির কারও তার কথা মনেও রইল না। হৃদির ফোন বন্ধ। সে দিনমান তার ঘরে আলো নিভিয়ে শুয়ে থাকে। রোখসানা বেগম, তিথি যার যার ঘরে প্রাণহীন লাশের মতো অসাড় হয়ে পড়ে রইলেন। অবন্তীই যা একটু দেখাশোনা করে তাদের। আত্মীয়স্বজন যারা এসেছিলেন, তারাও ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগলেন। তবে এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল নেহাল। এমনিতেই তার সঙ্গে হৃদির বিয়ের কথাবার্তা সকলে কমবেশি জানেন। ফলে গৃহকর্তাহারা এই পরিবারের অসহায় তিন নারীর জন্য যেন সে-ই হয়ে উঠল শেষ ভরসা।
এই কথা কেউ কেউ ঠারেঠুরে বলেও গেলেন। হৃদির চাচি তো সরাসরিই বললেন, মারে, হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। তার ওপর তো আর কারও হাত নাই। এখন এই সংসারে তুই-ই সবার ভরসা। তোর ওপরই সব দায়িত্ব। তা ছাড়া তোর ভাইয়ের অবস্থা তো দেখলিই। বাপটা মারা গেল, তাও সে দেশে আসতে পারল না।
হৃদি কথা বলল না। রোখসানা বেগম ফ্যাকাশে চোখে তাকিয়ে আছেন। ঘরে আরও অনেক আত্মীয়স্বজন আছেন। তারাও যেন চাচির কথাতেই সমর্থন দিয়ে গেলেন।
চাচি বললেন, এখন যা করার তোকেই করতে হবে। তোর মায়ের এই অবস্থা। তিথিরও কয় দিন পর বিয়েশাদি দিতে হবে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো তোর বিয়েটা করে ফেলা। যে যত যা-ই বলুক, মাথার ওপরে একটা পুরুষমানুষের ছায়া লাগেই। না হলে বোঝা যায় জীবন কত কঠিন।
তিনি থামলেও হৃদি কথা বলল না। কথা বললেন না রোখসানা বেগম বা তিথিও। তবে হৃদির মামি এর সঙ্গে যোগ করলেন। তিনি বললেন, কথা ঠিক বলছেন, আপা। তবে শুধু পুরুষমানুষ হলেই হবে না, দায়িত্বশীল পুরুষ হতে হবে। সব পুরুষ তো আর পুরুষ না। আজকালকার ছেলেদের তো দেখি, এদের কথার ঠিক নাই, কাজের ঠিক নাই। আর চরিত্রের কথা কী আর বলব!
এই জন্যই কথাটা তুললাম। মরা বাড়িতে এই সময়ে এই সব নিয়া কথা বলা ভালো দেখায় না। কিন্তু বিষয়টা না বলেও পারছিলাম না। বললেন চাচি। হৃদির কপালটা ভালো। ছেলেটারে দেখছেন? কী করে নাই এই কটা দিন! নিজের ছেলেও বাপের জন্য এই রকম করে না। করে?
সেটা তো দেখলেনই। বললেন দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়া। এই জন্যই বলে, ঘরের চাইতে পরই কখনো কখনো আপন হয়ে যায়।
অবন্তীর মা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর অবশেষে কথা বললেন। তিনি বললেন, সোনার টুকরা ছেলে। এই রকম ছেলে এই যুগে দেখাই যায় না। আপনি ঠিকই বলছেন, হৃদির ভাগ্যটা ভালো। এখন আপা…। বলে রোখসানা বেগমের দিকে তাকালেন তিনি। বললেন, আর দেরি করার দরকার নাই। কোনো আয়োজনও দরকার নাই। যত তাড়াতাড়ি পারেন, বিয়াটা শেষ করেন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। বিয়াশাদির ব্যাপার, কোন দিক দিয়া কখন কী হয়, বলা যায় না। এই জন্যই শুভ কাজে দেরি করতে নাই। তা ছাড়া এই বয়সের এমন একটা ছেলে! কোন দিক দিয়ে কে ছোঁ মেরে নিয়ে যায়, বলাও যায় না। এখন এমন মন আছে, পরে ঘুরে গেলে তখন কী করবেন? বললেন মেজ চাচি।
হৃদি চুপ করে রইল। মামি হৃদির কাছে এগিয়ে এসে তার মাথাটা কোলের সঙ্গে আলতো করে চেপে ধরে বললেন, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। সেটা তো আর বদলানো যাবে না। আর বাবা-মাও কারও চিরদিন থাকে না। এখন যা করার সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করে ফেলতে হবে। দেরি করা যাবে না। তোর ওপরই এখন এই সংসারের সব দায়িত্ব। সুতরাং আর দেরি করিস না।
.
অনিকের সঙ্গে হৃদির কথা হলো বেশ কিছুদিন পর। বাবার মৃত্যুসংবাদটা তাকে দিলেও হৃদি যেন অনুভব করছিল কোথাও কিছু একটা নেই। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা। ওই শূন্যতা ডিঙানোর ক্ষমতা তার নেই। হয়তো অনিকেরও না। সে-ও যেন কেমন নির্জীব হয়ে রইল। তার কণ্ঠ নিস্তেজ। ক্লান্ত। সে বার কয়েক হৃদির সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও হৃদি আগ্রহ দেখাল না। বলল, আমাকে একটু সময় দাও, প্লিজ। এখন কিছুই ভালো লাগছে না।
অনিক খানিক চুপ করে থেকে বলল, আচ্ছা।
হৃদি বলল, মা কেমন আছেন?
ভালো।
এটুকুই। এরপর হৃদিও আর কিছু বলল না। অনিকও না। নেহাল এল পরদিন। হৃদি তার সঙ্গেও যেন ঠিকঠাক কথা বলল না। কিংবা কারও সঙ্গেই না। সে গুম হয়ে রইল নিজের ভেতর। নিজের অন্ধকার ঘরে একা। নিস্পন্দ। তবে নেহাল আসতেই লাগল। রোজ সকাল-বিকেল। দুবেলা নিয়ম করে ঘুরে যেতে লাগল সে।
সেদিন বিকেলে হৃদি বসে ছিল ছাদে। একটা চড়ই এসে বসেছে আমগাছের ডালে। তারপর টুক করে লাফিয়ে চলে গেল দূরে। তারপর আবার ফিরে এল। এসে বসল হৃদির চেয়ারের হাতলে। বসেই রইল। হৃদি চড়ইটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। তার হঠাৎ মনে হলো, পাখিটার কি তাকে এতই নির্জীব মনে হচ্ছে যে সে জড়বস্তু ভেবে তার এত কাছে এসে বসেছে? না হলে চড়ুই পাখিকে কখনো কারও এত কাছে এসে এভাবে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে দেখে নি সে।
নেহালকে তার চোখে পড়ল এর বেশ খানিকক্ষণ পর। ঠিক তার পেছনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সে। হৃদি ফিরে তাকাতেই মৃদু হাসল। হৃদি বলল, আপনি?
সরি।
সরি কেন?
এই যে আপনার একান্ত সময়ে বিরক্ত করলাম। হৃদি স্মিত হাসল, বিরক্ত কেন হব?
আমার তো সব সময় ভয় হয়।
কেন?
যদি কোনোভাবে আপনাকে বিরক্ত করে ফেলি?
একদম না। বরং আপনাকে দেখে আমার মন ভালো হয়ে গেছে। বলেই যেন লজ্জা পেয়ে গেল হৃদি। এভাবে কথাটা বলা সম্ভবত ঠিক হয় নি তার। কী ভাবল লোকটা? তবে চকিতে একবার ভেবে দেখল সে–কথাটা মিথ্যেও নয়। নেহাল যতক্ষণ তার আশপাশে থাকে, এমনকি আশপাশে না থাকলেও সে যখন জানে যে এই বাড়িতেই কোথাও রয়েছে সে, তখন যেন খানিক নির্ভার লাগে। বাকিটা সময় একটা তীক্ষ্ণ অস্থিরতা বয়ে বেড়াতে থাকে। এমন কেন হচ্ছে?
সত্যি?
কী?
আমি আপনার মন ভালো করে দিতে পারি?
হৃদি এবার আর জবাব দিল না। নেহাল বলল, কিন্তু এখন তো আমার খুব খারাপ লাগছে।
কেন? নিজের উৎকণ্ঠাটা এড়াতে পারল না হৃদি।
নেহাল সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না। বেশ কিছুটা সময় চুপ করে রইল। তারপর বলল, আমাকে সপ্তাহ দুয়েকের জন্য একটু বার্লিন যেতে হবে।
কথাটা শুনে হৃদির বুকের ভেতরটা হঠাৎ থম মেরে গেল। মুখে কিছু না বললেও তার চোখ যেন মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। ওই স্পন্দনটুকু দৃষ্টি এড়াল না নেহালের। সে বলল, আপনাদের এভাবে রেখে কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছে না আমার। হয়তো ঠিকও হচ্ছে না। কিন্তু বিষয়টা জরুরি।
কী?
মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমি না গেলে কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছে না। সম্ভবত একটা মেজর অপারেশন লাগবে তার। মা খুব চাইছেন এই সময়টা আমি ওখানে থাকি। নেহালের গলা ভারী। চোখ ছলছল। হৃদি আচমকা নেহালের হাত স্পর্শ করল। আবার গুটিয়ে নিল সঙ্গে সঙ্গে। তবে নেহাল তার সেই গুটিয়ে নেওয়া হাতখানা আবার নিজের হাতের মুঠোয় টেনে নিয়ে শক্ত করে ধরে রাখল। সে স্পষ্ট টের পাচ্ছে। হৃদির উষ্ণ হাতখানা মৃদু কাঁপছে।
নেহাল গাঢ় গলায় বলল, আমি যত দ্রুত সম্ভব ফিরে আসব হৃদি, যত দ্রুত সম্ভব।
হৃদি কথা বলল না। তবে নেহালের হাতের মুঠো থেকে নিজের কম্পিত হাতখানা ছাড়িয়ে নিল সে। তারপর আবার এগিয়ে দিল তার দিকে। তারপর ধরে রাখল। যেন অনাগত বিচ্ছেদের সময়ে এই স্পর্শটুকুই তার কাছে সঞ্চয় হয়ে থাকবে।
নেহাল বলল, তুমি একদম মন খারাপ করবে না। একটুও না। তুমি মন খারাপ করে থাকলে আমার সবকিছু এলোমেলো লাগে।
আপনি তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন, খুব তাড়াতাড়ি।
তুমি অপেক্ষা করবে?
খুব।
আমিও। হয়তো তোমার চেয়ে বেশিই।
হৃদি আর কথা বলল না। তবে এই যে নেহাল তাকে হুট করে তুমি করে বলে ফেলল, তা শুনতে একটুও খারাপ লাগল না তার। বরং মনে হলো নেহাল বুঝি সব সময় তাকে তুমি করেই বলত। কিংবা এই তুমিটুকু শোনার জন্য নিজের অজান্তেই দীর্ঘ দিবস-রজনী অধীর হয়ে অপেক্ষা করে ছিল সে।
ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়েছে। ঝুঁকে পড়া আমগাছের ডালের ফাঁকে সেই অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। নেহাল সেই জমাট অন্ধকারে হৃদিকে কাছে টানল। ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া বৃষ্টির জলের মতো ঢলে পড়ল হৃদিও। নেহাল তাকে শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখল। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে প্রায় নিঃশব্দে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি, হৃদি। ভীষণ ভালোবাসি। এমন ভালো তোমাকে কেউ কখনো বাসে নি।
হৃদি কথা বলল না। তবে সে নেহালের বুকের আরও গভীরে ঢুকে যেতে লাগল। তার চোখের কোণে চকচক করতে লাগল এক ফোঁটা জল। এই জলের ফোঁটাটুকু তার এই জীবনের গভীরতম আনন্দময় অনুভবের নির্যাস। সে সেটুকুকে গড়িয়ে পড়তে দিল না। আলতো হাতে আঙুলের ডগায় সযত্নে সঞ্চয় করল।
১৭
মঈনের ধারণা ছিল অবন্তীর বিষয়টা সে পুরোপুরি মাথা থেকে তাড়িয়ে দিতে পারবে। এত কিছুর পরও যে মানুষটা তাকে সামান্য সুযোগ দিতে চায় না, বিন্দুমাত্র অনুরাগ অনুভব করে না, তার জন্য নিশিদিন এমন উদ্গ্রীব হয়ে থাকারও মানে হয় না। সময়টা প্রতিকূলে হলেও এই শহরে সে এখনো নাম-পরিচয়হীন তুচ্ছ কেউ নয়। বরং চাইলেই নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার নানাবিধ বাস্তবায়ন করতে সে সক্ষম। তার চারপাশে রূপবতী মেয়েদের অভাব নেই। ফলে অবন্তীর অমন উপেক্ষা কিংবা প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো অনর্থক। প্রথম প্রথম বেশ কিছুদিন সেই চেষ্টাটাও করল সে। এর-ওর সঙ্গে ঘুরে বেড়াল। সত্যিকারের প্রেম না হোক, অন্তত একটা প্রেম প্রেম ভাব জমিয়ে তোলার। চেষ্টা করল। কিন্তু দিন শেষে তার সবই নিষ্ফল বলে প্রতীয়মান হলো। বরং রাতে যখন একা অন্ধকার ঘরে ঘুমানোর চেষ্টা করে, তখন কত কত মুহূর্ত আলগোছে এসে তার চোখের পাতা ছুঁয়ে যায়! সেই ছোঁয়া বড় যন্ত্রণাময়। এমন কেন হয় তার?
অবন্তী ভীরু, লাজুক। প্রথম দিনের কথা এখনো মনে আছে মঈনের। মেয়েটা রাজ্যের দ্বিধা, সংকোচ নিয়ে তাদের বাড়ির ঝকঝকে নিকানো উঠোন পেরিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। মঈন গম্ভীর ভঙ্গিতে মুখ তুলে বলেছিল, কী চাই?
সঙ্গে সঙ্গে থমকে গিয়েছিল অবন্তী। পরে তাকে আরও সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল মঈন। রূঢ়, রুক্ষ কথার তিরে ভড়কে দিয়েছিল মুহূর্মুহূ। তখনো কি সে ভেবেছিল যে। এই মেয়েটির জন্য বুকের ভেতর এমন তোলপাড় হয়ে যাবে তার? এই যে কত কত মানুষের কাছে সে কঠোর-কঠিন, নির্মম, হৃদয়হীন; তারা কি জানে একলা রাতের অন্ধকারেও কোনো একজনের জন্য সে নীরবে চোখের জল ফেলে?
একবার অবন্তী তাকে বলেছিল, আপনি এমন কেন?
কেমন?
রুক্ষ, কঠিন, ভীতিকর।
আমাকে ভয় পাও?
হুম।
ভালোবাসো না?
অবন্তী জবাব দেয় নি। মঈন বলেছিল, সবাই তো কোমল, ভালো মানুষদেরই ভালোবাসতে চায়। তুমি না হয় এমন কঠিন, হৃদয়হীন কাউকেই ভালোবাসলে?
আপনি তো হৃদয়হীন নন?
তাহলে?
ভেতরে ভেতরে আপনি খুবই নরম। ভালো মানুষ। কিন্তু আপনার বাইরেটা ভীষণ কর্কশ। কঠিন।
তুমি কোনটা চাও? বাইরের কোমলতা, নাকি ভেতরের কঠোরতা?
দুটোই।
তাহলে তো তোমার দায়িত্ব বেড়ে গেল।
আমার কী দায়িত্ব?
আমার ভেতরটা খুঁড়ে বের করে বাইরের কঠিন দেয়ালটাকেও কোমল করে তোলা।
আমি কী করে পারব?
তুমিই পারবে। তুমি ছাড়া আর কেউ পারবে না।
কী করে?
ভালোবেসে।
আমার যে অত সাহস নেই। আমি আপনাকে ভয় পাই। কিছু বলতেও গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।
আমারও।
আপনারও! মঈনের কথা শুনে ভারি অবাক হয়েছিল অবন্তী। আপনার কেন হয়?
আমিও যে তোমাকে ভয় পাই?
আপনি আমাকে ভয় পান? যেন এমন অবিশ্বাস্য কথা এই জীবনে কখনো আর শোনে নি, এমন ভঙ্গিতে তাকিয়েছিল অবন্তী।
হুম।
কেন?
কারণ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
কাউকে ভালোবাসলে কেউ ভয় পায়?
হুম। ভালোবাসলেই মানুষ ভয় পায়।
কীভাবে?
হারিয়ে ফেলার ভয়। মন খারাপ করিয়ে দেওয়ার ভয়। কষ্ট দিয়ে ফেলার ভয়। আমার সারাক্ষণ কেবল মনে হয়, এই বুঝি আমি তোমাকে দুঃখ দিয়ে দিলাম। তোমার মন খারাপ করিয়ে দিলাম। আর তারপর হারিয়ে ফেললাম।
কথাটা শুনে কী যে ভালো লেগেছিল অবন্তীর! ওই রুক্ষ, রূঢ় মানুষটার ভেতরও যে তার জন্য এমন জল-টলমল গভীর অনুভূতির সরোবর লুকিয়ে আছে, তা তার বিশ্বাস হতে চায় না। তবে তার ভয়টা যেন খানিক কাটতে থাকে।
একদিন সে নিজে থেকেই বলল, আমার একটু একটু ভয় কেটে যাচ্ছে।
সব ভয় কিন্তু কাটিয়ে ফেলো না।
কেন?
তাহলে আমার ভয় বাড়তে থাকবে।
মানে?
মানে তুমি তখন আমাকে পুরোপুরি চিনে ফেলতে থাকবে। আর দুজনের সম্পর্কে যখন কেউ একজন অন্যজনকে পুরোপুরি পড়ে ফেলতে পারে, তখন অন্যজনের জন্য সম্পর্কটা বড্ড কঠিন হয়ে যায়।
কেন?
কারণ, তখন সে আকর্ষণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। জগতে সেই সম্পর্কই সবচেয়ে বেশি গভীর, যেই সম্পর্কে অনাবিষ্কৃত রহস্য থাকে, যা রোজ একটু একটু করে আবিষ্কার করা যায়। সব রহস্য উন্মুক্ত হয়ে গেলে, সবটুকু পড়ে ফেলা গেলে, সেই সম্পর্ক প্রাণহীন হয়ে যায়।
অবন্তী ম্লান হাসল। বলল, মাঝে মাঝে আপনি এমন সব কথা বলেন যে আমি তার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝি না। শুধু যে বুঝিই না, তা-ই নয়, বরং মনে হয়, কথাগুলো আপনি বলছেন না। বলছে অন্য কেউ।
কেন?
শেষ কবে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন?
মনে নেই।
আজ গিয়ে দাঁড়াবেন। তারপর এতক্ষণ যে কথাগুলো বললেন, তা বলবেন। দেখবেন আপনার সঙ্গে এগুলো যায় কি না!
অবন্তী মিথ্যে বলে নি। মঈনও জানে, সে অবন্তীর সামনে প্রায়ই অন্য এক মানুষ হয়ে যেত। ওই মানুষটাকে এই এত এত বছরের জীবনে কখনো দেখে নি সে। কিংবা অন্য কেউও না। কে জানে, জগতের রীতিই হয়তো এই যে সব মানুষই তার বুকের ভেতর গোপনে, সযত্নে এমন একজন নিজকেই লুকিয়ে রাখে, যে তাকে সে নিজেও কখনো দেখে নি। দেখে নি তার চারপাশের আর কেউই। কেবল ওই বিশেষ একজনের জন্যই অপেক্ষায় থাকে সে। তারপর বেরিয়ে আসে আলগোছে, অগোচরে।
মঈন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কষ্ট হয় তার। নিজের সব বাঁধ ভেঙেচুরে একাকার হয়ে যায়। সবকিছু ওলট-পালট করে দিতে ইচ্ছে হয়। এমনকি অবন্তীকেও। কেন সে এমন করছে? অন্তত কারণটা তো তাকে বলতে পারে সে। নিজের সঙ্গে দুর্বোধ্য, অসম এক যুদ্ধে নিরন্তর যুঝতে হয় তাকে। তবে এই যুদ্ধে পরাজয় ছাড়া আর কোনো ফলাফল নেই। সব জেনেও বারবার ওই ব্যর্থ যুদ্ধে শামিল হয় সে। তারপর ফিরে আসে আহত এক সৈনিক হয়ে।
সেদিন অদ্ভুত এক কাজ করল সে। রিয়ার ডিপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ে একমাত্র এই মেয়টির সঙ্গেই অবন্তীর ভাব। এর সঙ্গেই সময় কাটায় সে। নিজের সবকিছু শেয়ার করে। একবার কি তার সঙ্গে কথা বলে দেখবে?
চেষ্টাও করেছিল মঈন। কিন্তু তাতে লাভ বিশেষ হয় নি। রিয়া তখন বসে ছিল বন্ধুদের সাথে। মঈন খানিক দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতেই তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর যতটা সম্ভব বিনয়ের সঙ্গেই বলল, আমি কি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?
উষ্কখুষ্ক চুল, মুখে না কামানো দাড়ি, অবিন্যস্ত পোশাকের অতি সাধারণ ছেলেটাকে দেখে তাদের কারোরই আলাদা কিছু মনে হলো না। তারা পরস্পরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। মঈন বলল, আপনি যদি একটু এদিকে আসতেন?
উপস্থিত মেয়েগুলো হঠাৎ হাসির কলরোল বইয়ে দিল। তারা প্রায় সমস্বরে বলতে লাগল, কে? আমি?
মঈন বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, না না। উনি।
সবাই একযোগে রিয়ার দিকে তাকাল। তারপর টিপ্পনী কেটে বলল, হেই রিয়া, হি ইজ লুকিং ফর ইউ। তাদের কণ্ঠে দুষ্টুমি।
রিয়া তখন কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল। সে একপলক তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। তারপর হঠাৎ ঠোঁট উল্টে বলল, সরি। নো ভ্যাকিন্সি ব্রো। আই অ্যাম এনগেজড!
সঙ্গে সঙ্গেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। মুহূর্তের মধ্যে মাথায় রক্ত চেপে গেল মঈনের। কিন্তু অবন্তীর কথা ভেবে নিজেকে সামলাল সে। যদিও ঘটনাটা মাথা থেকে আর তাড়াতে পারল না। বেশ কিছুদিন লাগল নিজেকে ধাতস্থ করতে।
রিয়াকে তার দরকার। একমাত্র এই মেয়েটিই পারে অবন্তীকে বোঝাতে। কিংবা তার না-বলা কথাগুলো শুনতে। এ কারণেই যতটা সম্ভব নিজেকে বোঝাল মঈন। তারপর আবার এখানে-সেখানে রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু তাকে একা প্রায় পাওয়াই যায় না। তা ছাড়া বেশির ভাগ সময়ই তার আসা-যাওয়ার কোনো ঠিকঠিকানাও থাকে না।
.
এর মধ্যে একদিন হঠাত্র রিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মঈনের। মঈন ছুটে গিয়ে বলল, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
রিয়া মঈনকে চিনতে পারল না। সেদিনের কথা ভুলেই গেছে সে। মঈন বলল, একটু জরুরি। আপনি যদি আমাকে একটু সময় দিতেন?
আমার সঙ্গে? আমার সঙ্গে আপনার কী কথা?
মঈন চট করে অবন্তীর প্রসঙ্গটা বলতে চায় না। সে চায় আগে পুরো পরিস্থিতিটা রিয়াকে বোঝাতে। তার সঙ্গে একটা আন্তরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এতে যদি তার অবস্থাটা বোঝে সে। না হলে হয়তো দেখা যাবে আজই গিয়ে অবন্তীকে সব বলে দিয়েছে। পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। সে তাই বিনীত স্বরে বলল, প্লিজ। একটু শুনুন। আমি অনেক দিন থেকেই আপনার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি। আপনার খোঁজে কত দিন যে ডিপার্টমেন্টে এসেছি, তার ইয়ত্তা নেই। আপনি চাইলে এখানকার অনেককেই জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। হলের সামনেও গিয়েছি!
কী! এবার রীতিমতো ফুঁসে উঠল রিয়া। ফাজলামোর আর জায়গা পান না, না? আপনি চেনেন আমাকে? জানেন আমি কে?
মঈন কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল, আপনি রেগে যাবেন না, প্লিজ। আমি শুধু আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই। তবে তার আগে আপনার কাছে কিছু বিষয় ব্যাখ্যা করা দরকার আমার। না হলে আপনি হয়তো আমাকে ভুল বুঝবেন।
আপনার সঙ্গে আমার কিসের কথা?
আছে। আমাকে কয়েকটা দিন একটু সময় দেবেন, প্লিজ। আমি সব আপনাকে বুঝিয়ে বলব। আমার বিশ্বাস আপনি বুঝবেনও।
কয়েকটা দিন! বিস্মিত ভঙ্গিতে বলল রিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে এতটা বিরক্ত আর কিছু নিয়ে হয় নি সে। রাগও হচ্ছিল তার। সে তখন অপেক্ষা করছিল মাহমুদ হাসানের জন্য। ফলে মঈনের এমন অপ্রত্যাশিত আবদার, অসংলগ্ন কথাবার্তায় ভারি উত্ত্যক্ত বোধ করছিল। সম্পূর্ণ অপরিচিত, অচেনা এই ছেলেটির সঙ্গে তার কী কথা?
জি।
আপনি দয়া করে আর আমার সামনে আসবেন না, প্লিজ। বলে হনহন করে হেঁটে চলে গেল রিয়া। মঈন একই সঙ্গে আহত ও ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। একটা প্রচণ্ড আক্রোশ জেগে উঠছে তার বুকের ভেতর। কিন্তু কেবল অবন্তীর কথা ভেবেই চুপ করে রইল সে। আবার নিজেকে বোঝাল। বেশ কিছুদিন চুপ করে রইল। অবন্তীকে ফোন করার চেষ্টা করল। কিন্তু অবন্তী তার ফোন ধরে না। নিজের সঙ্গে সেই ব্যর্থ যুদ্ধটা চলতেই থাকল মঈনের। ক্রমাগত পরাজয়ও। সেই পরাজয় সে মেনে নিতে পারে না। ফলে যতবার শপথ করে আর কখনো অবন্তীর কথা সে ভাববে না, ঠিক ততবারই উঠে দাঁড়ায়। নতুন করে ভাবনা সাজায়।
সেই ভাবনা থেকেই রিয়ার বাসার ঠিকানাও খুঁজে বের করে ফেলে সে। বেশ কিছুদিন হয় ডিপার্টমেন্টেও আর আসে না রিয়া। কিংবা এলেও অনিয়মিত। সে কি তবে একদিন সরাসরি তাদের বাসায় গিয়ে হাজির হবে? ভাবনাটা মাথায় এলেও তাতে স্থির হতে পারে না মঈন। সে বরং মাঝেমধ্যেই রিয়াদের বাসার কাছে গিয়েও অপেক্ষা করে। তবে চট করে কথা বলার সাহস হয় না। সেই দুর্বিনীত, বেপরোয়া মঈন কখন এমন ভীত, এমন শঙ্কিত, দ্বিধাগ্রস্ত এক মানুষে পরিণত হয়ে গেল?
মঈন তা জানে না! তবে সে এটুকু জানে, যে করেই হোক অবন্তীর না-বলা সেই কথাটা তাকে জানতেই হবে। জানতেই হবে ঠিক কী কারণে সে আর তার সঙ্গে এই সম্পর্কটা রাখতে চায় না। আর তার এই জানার পথে একমাত্র উপায় রিয়া। ফলে সে রিয়ার পেছনে লেগে রইল। কিন্তু তখনো সে জানে না অবন্তীর জন্য তার এই চোয়ালবদ্ধ নির্দোষ সংকল্প তাকে কোথায় নিয়ে যাবে!
১৮
এইটার নাম কী? জিজ্ঞেস করল রাশু।
রাসেল ভাইপার।
ইংলিশ সাপ?
বাংলা নামও আছে।
কী নাম?
চন্দ্ৰবোড়া।
বিষ আছে?
জামশেদ হাসলেন, বিষ না থাকলে এই সাপে আমাদের কাজ কী?
অল্প বিষ, না বেশি বিষ?
পৃথিবীর অন্যতম বিষধর সাপ এটা। অনেকেই মনে করেন, বিশ্বে যত সাপ আছে, তার মধ্যে ছোবল মারার দিক থেকে এটিই সবচেয়ে দ্রুতগতির। এক সেকেন্ডের মোলো ভাগের এক ভাগ সময়ে ছোবল মারতে পারে এটা। এর বিষদাঁত পৃথিবীতে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ।
রাশু ভয়ার্ত চোখে তাকায়। জামশেদের হাতে একটা প্লাস্টিকের বড় বোতল। মুখ খোলা। সেই বোতলের ভেতর বাদামি ফুটকিওয়ালা সাপটাকে দেখলেই আতঙ্কে হিম হয়ে আসে শরীর। এত দূর থেকেও তার তীব্র হিসহিস শব্দ শোনা যাচ্ছে। জামশেদ বললেন, এর মূল খাবার ইঁদুর, টিকটিকি। এটা এতটাই বিষধর যে তাৎক্ষণিক মৃত্যু ছাড়াও এর বিষে শরীরের মাংস পচে গিয়ে বা রক্ত জমাট বেঁধে মানুষের মৃত্যু হয়। এমনকি অঙ্গহানিও হয়। বেশ কিছুদিন এটা বাংলাদেশে দেখা যায় নি। এখন আবার দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পদ্মা নদীর আশপাশের এলাকায়।
ওইটা তো গোক্ষুর?
তফাত আছে। দেখতে প্রায় কাছাকাছি হলেও গোখরার ফণার পেছনে যে চশমার মতো চিহ্ন আছে, এটার কিন্তু তা নাই। এটাই হলো কিং কোবরা বা রাজগোখরা। এর আরেকটা সুন্দর নামও আছে।
কী?
শঙ্খচূড়। বলা হয় এটাই আকারে সবচেয়ে বড় বিষধর সাপ।
ওটা?
কেউটে।
আর ওইটা?
রাশু একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে। জামশেদ সময় নিয়ে উত্তর দেন। ছেলেটাকে তার পছন্দ হয়েছে। কী যেন একটা আছে ছেলেটার মধ্যে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, সে সাপ ভয় পায়। মোটামুটি ধরনের ভয় না, তীব্র ভয়। সাপ দেখলেই তার হাত-পা শক্ত হয়ে যায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা দুর্নিবার কৌতূহলও অনুভব করে। ফলে তার প্রশ্ন বাড়তেই থাকে। লাল চান যখন প্রথমে তাকে এখানে পাঠিয়েছিল, তখন ফিরে গিয়ে এই কাজে আর আসবে না বলেছিল সে। কিন্তু পরেরবারও তাকে আসতে হয়েছে। লাল চান একপ্রকার জোর করেই তাকে পাঠিয়েছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এর পর থেকে আর না বলে নি সে। বরং নিজ আগ্রহেই এসেছে। এবং সেই আগ্রহ দিন দিন বেড়েছে।
জামশেদ এ কারণেই তাকে নিয়ে বসেছেন। খামারে থাকা সব সাপের বিষয়ে খুঁটিনাটি জানাচ্ছেন।
রাশু বলল, সাপের বিষের দাম কেমন?
ভালো দাম।
কত ভালো?
উমমম…। বলে কী ভাবলেন জামশেদ। তারপর বললেন, সোনার চেয়েও বেশি।
কী বলেন! রাশু চোখ গোল গোল করে তাকাল।
হুম। সাপের বিষকে বলা হয় লিকুইড গোল্ড। মানে তরল সোনা। আমাদের এই অঞ্চলেই, মানে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেই এক লিটার সাপের বিষের দাম চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা।
রাশুর চোখ আরও বড় হয়ে যায়। এসব কথা বিশ্বাস হতে চায় না তার। সে বলে, লাল চান ভাই একটু-আধটু বলছে। কিন্তু আপনে একটু খুইলা বলেন তো, এই বিষের কামডা কী? এমন তো না যে মানুষ এইটা খাইতে পারে। তাইলে এর এত দাম ক্যান?
এটা বলতে গেলে একভাবে খাওয়ার জন্যই। তবে সরাসরি না।
মানে?
মানে সবকিছুরই তো দুইটা দিক আছে। আছে না?
জি।
কী কী দিক?
ভালো আর মন্দ।
গুড। সাপের বিষের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই রকম দুইটা দিক আছে। একটা ভালো, আরেকটা মন্দ।
কী কী?
সাপের বিষ বিভিন্ন ধরনের মেডিসিন, মানে ওষুধ বানাতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে সাপে কাটা রোগীর ওষুধ হিসেবে এটা কাজ করে। ইংরেজিতে বলে অ্যান্টিভেনম। এ ছাড়া আরও অনেক ওষুধ আছে।
আর খারাপ?
পৃথিবীতে মানুষ অনেক ধরনের নেশা করে না? খুব দামি নেশাও আছে। যেমন হেরোইন, মারিজুয়ানা, কোকেন এই সব। এগুলার ব্যবসাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্যবসা। তো মানুষ এখন আর এসবেও নেশা করে আনন্দ পায় না। তাই সেই সব নেশাতে সাপের বিষ মেশানো হচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়েই সাপের বিষের অবৈধ ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠছে।
জামশেদ থামলেও রাশু এবার আর কথা বলল না। তার কাছে এসবই কেমন গল্পের মতো মনে হচ্ছে। গাঁজাখুরি গল্প। না হলে সাপের মতো প্রাণীরও কেউ চাষ করতে পারে! প্রথম প্রথম তার ধারণা ছিল, এই লোক বদ্ধ উন্মাদ। তার মাথায় সমস্যা আছে। না হলে এই কাজ কেউ করে! কিন্তু যতই সে তার সঙ্গে মিশছে, ততই তার কৌতূহল বাড়ছে। একধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করছে সে। সাপের বিষেরও যে এত দাম কিংবা চাহিদা থাকতে পারে, এটা সে কস্মিনকালেও ভাবে নি। তবে চারপাশের গোপনীয়তা, হাবভাব দেখে রাশু এটাও বোঝে যে ভয়ানক বিপজ্জনক একটা কাজে জড়িয়ে পড়েছে সে।
এটা তার এত দিনকার লেপ-তোশকের দোকানের নির্দোষ সেলাইয়ের বা তুলো কিংবা নারকেল ছোবড়া ছড়ানোর কাজ নয়, এটা ভয়ানক বিপজ্জনক এক কাজ। এই কাজ দেশের প্রচলিত আইনেও অপরাধ। এ কারণেই সদা সতর্ক থাকতে হয় তাদের। সামান্য এদিক-সেদিক হলেই নেমে আসতে পারে ভয়ানক বিপদ। খুব বেশি মানুষ যুক্ত করারও সুযোগ নেই। এখানে বিশ্বস্ততার বিষয় যেমন আছে, তেমনি আছে সাহসেরও ব্যাপার।
রাশুর ধারণা, এই কারণেই তাকে এত করে চাইছেন জামশেদ। কিন্তু একটা প্রশ্ন তার মনে সারাক্ষণ খচখচ করছে। তার যে ভয়ডর একটু কম, সেটা সকলেই জানে। সে বিশ্বস্তও। কিন্তু একদম প্রথম দিন থেকেই নিজের সর্পভীতির কথা সে জামশেদ স্যারকে জানিয়েছিল। জানিয়েছিল লাল চানকেও। তারপরও তাকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে কেন এত উদ্গ্রীব হয়েছিলেন তিনি? সেই কারণটি আসলে কী?
দেরিতে হলেও এই প্রশ্নের উত্তর রাশু বের করতে পেরেছে। তার ধারণা, সাপে ভয় পেলেও ভেতরে ভেতরে যে সে বিষয়টার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিল, এটা ধরে ফেলেছিলেন জামশেদ। লোকটাকে বাইরে থেকে দেখে সহজ, হাসিখুশি, সাধারণ মানুষ মনে হলেও ভেতরে ভেতরে যে তিনি প্রচণ্ড বুদ্ধিমান, তা বুঝতে অসুবিধা হয় নি রাশুর। তার ধারণা, হাসিখুশি এই মানুষটা ভয়ংকরও। তিনি ভাত খেতে খেতেও হাসিমুখে মানুষ খুন করে ফেলতে পারেন।
জামশেদ বললেন, শোন, এখন গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলব। খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
জি।
আমরা আমাদের একটা পরীক্ষামূলক ছোট চালান বর্ডার ক্রস করেছি।
এর মধ্যে শুরুও হয়ে গেছে? রাশু অবাক গলায় বলল।
হুম। তবে খুবই ছোট চালান। তবে সাকসেসফুল। সামনে আরও একটা পরীক্ষামূলক চালান পাঠাব।
পরীক্ষামূলক মানে কী?
মানে ফাইনাল ম্যাচের আগে প্র্যাকটিস ম্যাচ।
বুঝি নাই।
জামশেদ বললেন, আরেহ! যখন একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হয়, তখন দেখিস না মূল ম্যাচের আগে একটা-দুইটা প্র্যাকটিস ম্যাচ হয়, মানে মেইন খেলার আগে ওইটাই হলো পরীক্ষামূলক খেলা। নিজেদের যাচাই করে নেওয়া আরকি!
বুঝছি। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে যেমন টেস্ট পরীক্ষা?
একদম। তুই তো দেখি আমার চেয়ে ভালো বোঝাতে পারবি। বলে হাসলেন জামশেদ।
রাশু ঘুরে ঘুরে একের পর এক সাপ দেখতে লাগল। আর এই দেখতে দেখতেই তার একটা উপলব্ধি হলো। সাপ সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী, যাকে দেখলে সবাই ভয় পায়। অথচ তারপরও মানুষ কারণে-অকারণে সাপ নিয়ে ভীষণ কৌতূহলী। যে মানুষ সাপের ছবি দেখলেও ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে, সেই মানুষই আবার আড়চোখে তাকায়। কিংবা চোখ ঢেকে রাখা হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে পিটপিট করে দেখে। অর্থাৎ ওই ভয়ের মধ্যেও কোথায় যেন একটা অব্যাখ্যেয় আকর্ষণ কাজ করে।
বিষয়টা নিজেকে দিয়েই উপলব্ধি করেছে সে। এত ভয় থাকার পরও যতবারই সে সাপ দেখেছে, ততবারই মনে হয়েছে, আরও একটু দেখতে চায়, বুঝতে চায়। এখন তো মাঝে মাঝে মনে হয়, ফণা তুলে ধরা ওই গোখরার চোখ দেখে সে যতটা ভয় পায়, ঠিক ততটাই অবদমিত আগ্রহও অনুভব করে। যেন একটা প্রবল সম্মোহন ওই চোখে। ফলে দিন যত যেতে থাকে, ততই জামশেদেরও প্রিয়ভাজন হয়ে উঠতে থাকে সে।
.
সেদিন ঢাকায় ফেরার পর জামশেদ তাকে কাছে ডাকলেন। তারপর বললেন, তোর। কে কে আছে?
কে কে থাকব? পাল্টা প্রশ্ন করল রাশু। বিষয়টা লক্ষ করেছেন জামশেদ। ছেলেটা মাঝেমধ্যেই তার মুখের ওপর এটা-সেটা জিজ্ঞেস করে বসে। এই নিয়ে কোনো জড়তা বা ভয় কাজ করে না। বরং আচার-আচরণে কোথায় যেন একটা চাপা ঔদ্ধত্য কাজ করে। বিষয়টা এখন অবধি তিনি উপভোগই করেন। তবে সেটা খুব বেশি বাড়তে দেওয়া যাবে না। কারণ, যে ভয়ানক ঝুঁকি তিনি নিয়েছেন, তাতে রাশুর মতো কাউকে খুব দরকার। তবে সে জন্য ছেলেটাকে আগে ঘষেমেজে তৈরি করে নিতে হবে।
বাবা-মা? জিজ্ঞেস করলেন জামশেদ।
নাই।
নাই মানে, কোথায় তারা?
জানি না।
জানি না মানে কী, খুলে বল।
আমার মা থাকত মাদারীপুর। বাপের খবর নাই।
মাদারীপুর কী করত?
এই প্রশ্নে আচমকা উঠে দাঁড়াল রাশু। তার হাতের কবজিতে একটা স্টিলের ব্রেসলেট। সে উঠে যাওয়ার সময় সেই ব্রেসলেটে সশব্দে আঘাত করল টেবিলে। তারপর ঘুরে বের হয়ে গেল ঘর থেকে। বিষয়টাতে প্রচণ্ড অবাক হলেন জামশেদ। আর যা-ই হোক, রাশুর কাছ থেকে এমন আচরণ তিনি আশা করেন নি। তাকে অন্তত এটুকু বুঝতে হবে যে সে কখন কোথায় কী আচরণ করবে!
জামশেদ অবশ্য শান্তই রইলেন। মনে মনে রেগে গেলেও বাইরে তা প্রকাশ করলেন না। বরং তিনি উঠে এসে রাশুর পাশে বসলেন। বললেন, তোর সঙ্গে লাল চানের পরিচয় নাকি ফেরিতে?
জে।
তুই চা-সিগারেট বিক্রি করতি?
হুম।
কত পেতি দিনে?
যা লাভ হইত, তার তিন ভাগের এক ভাগ।
চা-সিগারেট তোর নিজের ছিল না?
না।
এখন কত পাস, লাল চানের দোকানে?
ঠিক নাই। যখন যা লাগে দেয়। আর থাকা-খাওয়া। আমার তো কোনো খরচ নাই।
কেন, তোর মায়ের কাছে টাকা পাঠাস না?
সে কই থাকে, জানি না।
তুই না বললি মাদারীপুর?
আগে থাকত। এখন আর থাকে না।
এই জন্য তার খবরও জানিস না?
রাশু ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল, না।
এখন মাদারীপুর থাকে না কেন?
এই প্রশ্নে আবারও উঠে যাচ্ছিল রাশু। জামশেদ আচমকা কষে চড় বসালেন তার গালে। অপ্রস্তুত রাশু ছিটকে পড়ল মেঝেতে। তারপর দীর্ঘ সময় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার হঠাৎ মনে হলো, সে কানে শুনতে পাচ্ছে না। একটা শো শো শব্দ তার কান, ঘাড়, মাথা থেকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে পুরো শরীরজুড়ে। চোখের সামনে যেন অসংখ্য তারার মেলা বসেছে! জামশেদের মতো কারও হাতে এত শক্তি থাকতে পারে, এটা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবে নি।
জামশেদ শান্ত গলায় বললেন, ওঠ। উঠে বস এইখানে।
রাশু উঠে বসার চেষ্টা করল। তার মাথা ঘোরাচ্ছে। জামশেদ তাকে হাত ধরে বসতে সাহায্য করলেন। তারপর বললেন, আমি যখন বসতে বলব, তখন বসবি। যখন উঠতে বলব, তখন উঠবি। ঠিক আছে?
রাশু কথা বলল না। দ্বিতীয় চড়টা পড়ল তার বাঁ কানের ওপর। এবারও প্রস্তুত ছিল না রাশু। তবে এবার আর ছিটকে পড়ল না সে। পড়ে যেতে যেতেও শেষ অবধি নিজেকে সামলে নিল।
জামশেদ বললেন, আমি কথা জিজ্ঞেস করলে কথার উত্তর দিবি। মনে থাকবে?
জি।
জামশেদ নিজে উঠে গিয়ে রাশুর জন্য পানি নিয়ে এলেন। তারপর তার চোখেমুখে পানির ঝাঁপটা দিলেন। কানের কাছে লাল হয়ে থাকা জায়গাটাতে বরফ ঘষে মুখটা মুছিয়ে দিলেন। রাশু অবশ্য কিছু বলল না। সে চুপচাপ বসে রইল। জামশেদ বললেন, আমার ঘরে আয়।
রাশু গেল। তার দুই কান এখনো ঝাঁ ঝাঁ করছে। মাথার পেছন দিকটা অবশ হয়ে আছে। জামশেদ তাকে তার টেবিলের সামনের চেয়ারটাতে বসতে বললেন। তারপর বললেন, তোকে যে আমি অসম্ভব পছন্দ করি, এটা তুই বুঝিস?
জে।
তুই কি আমাকে পছন্দ করিস?
জে।
আমার দিকে তাকা।
রাশু তাকাল। জামশেদ বললেন, আমার কথা না শুনলে আমি যতটা রেগে যাই, আমার সঙ্গে কেউ মিথ্যা কথা বললে আমি তার চেয়ে এক হাজার গুণ বেশি রেগে যাই। বলে থামলেন তিনি। রাশু কথা বলল না। জামশেদ বললেন, আমার সঙ্গে মিথ্যা। কথা বলা যাবে না। মনে থাকবে?
জে।
তুই আমাকে পছন্দ করিস?
জে না।
তাহলে একটু আগে যে তুই মিথ্যা কথা বললি, কেন?
ভয়ে।
আমার সামান্য কথা না শোনার শাস্তি যদি ও রকম হতে পারে, তাহলে তার থেকে এক হাজার গুণ বড় অপরাধ মিথ্যা বলার শাস্তি কী হতে পারে বলে তোর মনে হয়?
মাগুর মাছভর্তি ওই পুকুরে হাত-পা বেঁধে ছেড়ে দেওয়া। রাশু জানে না কেন, কিন্তু চট করে তার মাথায় এই উত্তরটাই চলে এল। আর কিছু না ভেবেই বলে দিল সে। বিষয়টা এমন নয় যে সে আগে কখনো এমন কিছু দেখেছে বা ভেবেছে। কিন্তু জামশেদের প্রশ্নটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, ওই মাগুর মাছের পুকুর সাধারণ কোনো পুকুর নয়। ওটা ভয়ানক কোনো জায়গা। ওই জায়গায় বিশেষ কোনো কাজ করেন জামশেদ। কিন্তু এই কথা চট করে তার মাথায় কেন এল, তা সে জানে না।
জামশেদ বিস্মিত চোখে রাশুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাশু হঠাৎ বলল, বিশ্বাস করেন, আমি আগের কোনো কিছু জানি না। কিছু না। আচুক্কা আমার মাথায় আসল। আর বইলা ফেলছি। আল্লাহর কসম। আমি আগের কিছু জানি না।
কী জানিস না?
কিছুই না।
তাহলে এই কথা বললি কেন? আগে ওইখানে কী হইছে?
আমি জানি না, আমি সত্যিই জানি না। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমারে মাফ করে দেন। বলে হঠাৎ জামশেদের পায়ের কাছে বসে পড়ল রাশু। তারপর করুণ গলায় কাঁদতে লাগল।
জামশেদ বললেন, উঠে বস।
রাশু উঠে বসল।
জামশেদ বললেন, আমাকে ভয় পাস?
জে।
এখন থেকে আর কখনো কোনো দিন এমন কিছু করবি না, যাতে আমাকে ভয় পেতে হয়। মনে থাকবে?
জে।
এরপর কিন্তু আর আমাকে ভয় পাওয়ারও সুযোগ থাকবে না। ঠান্ডা, শান্ত গলায় কথাটা বললেন জামশেদ। কিন্তু তার সেই কথা শুনে রাশুর সারা শরীর শিরশির করে উঠল। সে এত দিন পর এসে যেন বুঝতে পারল, এ সহজ কোনো জায়গা নয়। এখানে তাকে চলতে হবে ধারালো সূক্ষ্ম কোনো সুতোর ওপর পা রেখে। সামান্য এদিক-সেদিক হলেই সেই প্রায় অদৃশ্য সুতোখানায় কেটে ফালি ফালি হয়ে যাবে সে। তার সামনে বসা এই অতি সাধারণ চেহারার মানুষটাকে সে যতটা ভয়ংকর বলে ভেবেছিল, এ তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর, নৃশংস। এর সঙ্গে থাকা মানে প্রতিমুহূর্তে জীবনকে মৃত্যুর হাতে বন্ধক রেখে বাঁচা। কিন্তু সে এ-ও জানে, যে ভয়ানক কানাগলিতে সে ঢুকে পড়েছে, সেই কানাগলি থেকে তার মুক্তি নেই।
১৯
অনিক স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। ঘরে এয়ারকন্ডিশনও চলছে। অথচ ঘামছে সে। ডাক্তার বললেন, অনেকের ক্ষেত্রেই তো মিরাকল ঘটে। ও রকম রেকর্ডও আছে কিন্তু…।
কিন্তু আমার মায়ের ক্ষেত্রে সেটা ঘটারও কোনো চান্স নেই, তাই তো?
আসলে বিষয়টা এত সূক্ষ্ম যে সহসা ধরা যায় না। আমরাও তো এত দিন পর ধরতে পারলাম।
অনিক উঠে দাঁড়াল। বলল, আর কত দিন বাঁচবেন মা?
ওভাবে নির্দিষ্ট করে তো আর বলা যায় না। তারপরও ধরুন ছয় মাসও হতে পারে, আবার ছয় দিনও হতে পারে।
ছয় দিন!
মানে আমি কথার কথা বললাম। আবার ভাগ্য ভালো হলে এক বছরও। এই অবস্থায়ও একবার এক রোগী অবিশ্বাস্যভাবে…।
অনিক রুম থেকে বেরিয়ে এল। ডাক্তারের কথা শুনতে আর ভালো লাগছে না তার। সে সারাটা দিন বাইরে বাইরে ঘুরল। বাসায় ফিরল রাতে। রাহিমা বানু তার জন্য ভাত রান্না করে বসে ছিলেন। লালশাক দিয়ে শোল মাছ। অনিকের পছন্দের খাবার। তিনি খাবার বেড়ে দিতে দিতে বললেন, মেয়েটা আর এল না?
অনিক যেন চট করে বুঝতে পারল না। বলল, কোন মেয়েটা?
হৃদি।
ওহ্।
ওহ্ কী?
আসবে।
কবে? কত দিন হলো দেখি না।
ওর বাবা মারা গেছেন, জানোই তো!
এই কথায় রাহিমা বানু চুপ করে গেলেন। হৃদির বাবা মারা যাওয়ার খবর তিনি শুনেছেন। কিন্তু তখন তার কিছুই করার ছিল না। এখনো যে আছে, তা-ও নয়। তারপরও মেয়েটার জন্য সারাক্ষণই ছটফট লাগে। বুক তড়পায়। এই দুঃসময়ে যদি সামান্য হলেও তাকে সাহস দিতে পারতেন, ভরসা জোগাতে পারতেন! তিনি বিষণ্ণ গলায় বললেন, এই কষ্ট মেয়েটা কী করে সহ্য করছে কে জানে! এত নরম মেয়েটা…তোর একবার যাওয়া উচিত ছিল না?
হুম।
তাহলে গেলি না কেন?
যাব।
আর কবে যাবি?
দেখি।
দেখি কী, এত দিন কী করেছিস?
অনিক জবাব দিল না। তার এখন মায়ের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগছে না। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার সামনে দাঁড়ানো এই মানুষটা, তার মা, এই আশ্চর্য মায়ার আধার মানুষটা দুদিন বাদে আর থাকবে না! এই পৃথিবীতে আর কখনো তাকে দেখতে পাবে না সে। কথা বলতে পারবে না। জড়িয়ে ধরতে পারবে না। গায়ের ঘ্রাণ নিতে পারবে না। তার আঁচলে যে শিশুর গালের মতন নরম মায়া লেগে থাকে, সেই মায়া আর কখনো, কোনো দিন ছুঁয়ে দেখতে পারবে না সে।
কী, কথা বলছিস না কেন?
এ কদিন এত ঝামেলা গেল! তুমি তো দেখলেই…তোমাকে নিয়ে দিনরাত ডাক্তার, হাসপাতাল। এখানে-ওখানে ছোটাছুটি…।
তাও ঠিক। আহত স্বরে বললেন রাহিমা বানু। আমার কী মনে হয়, জানিস?
কী?
আমারও একটু ওদের বাড়িতে যাওয়া উচিত ছিল। আমার জন্য কত কী করল মেয়েটা! ও-ও হয়তো মনে মনে আশা করছিল যে আমি যাব।
হুম।
নিয়ে যাবি আমাকে একদিন?
আচ্ছা।
কবে?
মা! অনিক যেন এবার একটু বিরক্তই হলো। ওদের বাড়িতে এখন তুমি কী হিসেবে যাবে?
তাও তো কথা। বিড়বিড় করে বললেন রাহিমা বানু। তোদের মধ্যে তো এখনো কিছু হয় নি।
অনিক চুপচাপ ভাত খেয়ে উঠে গেল। রাহিমা বানু থালাবাসন ধুতে গেলেন। অনিক অবশ্য তাকে ধুতে দিল না। সে নিজেই সব করল। রাহিমা বানু বললেন, কী হয়েছে তোর?
কী হবে?
কেমন জানি গম্ভীর হয়ে আছিস। কথা বলছিস না। আবার আমাকে রান্নাঘরের কাজও করতে দিলি না।
এমনি। তুমি এখন কী করবে?
শোব।
আচ্ছা। বলে ড্রয়িংরুমের দিকে যেতে গিয়েও আবার থমকে দাঁড়াল অনিক। তারপর হঠাৎ বলল, আমি আজ তোমার সঙ্গে ঘুমাই, মা?
অনিকের কথা শুনে রাহিমা বানু যারপরনাই অবাক হলেন। কত দিন অনিক তার সঙ্গে ঘুমায় না? কত বছর? সেই ছোট্ট অনিক। বুকের কাছ থেকে সামান্য সরে গেলেই গুঙিয়ে উঠত, মা, মা…।
অথচ সেই ছেলেটা, কখন কোন অগোচরে যে এত বড় হয়ে গেল, তা তিনি টেরই পান নি। তারপর ক্রমশই চলে গেল দূরে। আরও দূরে। তিনি বললেন, তুই আমার সঙ্গে ঘুমাবি?
আচ্ছা, না থাক। বলে চুপচাপ ড্রয়িংরুমের মেঝেতে গিয়ে বিছানা বিছিয়ে শুয়ে পড়ল অনিক। মা এলেন আরও খানিক পর। বললেন, কী হয়েছে তোর?
কিছু হয় নি, মা।
কিছু একটা তো হয়েছেই। বল আমাকে?
অনিক পাশ ফিরে শুল। রাহিমা বানু তার মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। বললেন, তুই ছোটবেলা থেকেই এমন।
কেমন?
নিজের মনের কথা সহজে কাউকে বলতে চাস না।
হুম।
একবার কী হয়েছে, তুই তখন ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়িস। তোর স্কুলের অঙ্ক স্যার এসে বললেন, ভাবি, আপনার ছেলেকে কি স্কুলে খালি টিফিন বক্স দেন? কোনো খাবার দেন না? সবাই যখন লেইজারে বাড়ি থেকে আনা টিফিন বক্স খুলে খাবার খায়, তখন দেখি ও একা একা বসে থাকে। তার টিফিন বক্সও ফাঁকা। আবার জিজ্ঞেস করলেও কোনো জবাব দেয় না।
বলে থামলেন রাহিমা বানু। তিনি ছেলের চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন। রাহিমা বানু বললেন, স্যারের কথা শুনে তো আমি অবাক। তুই রোজ বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে যাস। তাহলে? সেই খাবার যায় কোথায়?
অনিক মায়ের কাছে এই ঘটনা কমপক্ষে হাজারবার শুনেছে। অন্য সময় হলে বিরক্ত হতো। কিন্তু আজ আর কিছু বলল না। চুপচাপ শুনতে লাগল। কে জানে আর কদিন সে মায়ের কথা শুনতে পাবে!
রাহিমা বানু বললেন, পরে খোঁজ নিয়ে দেখি তোর স্কুলের বারান্দায় এক পাগলি থাকত। সেই পাগলির এক বাচ্চা ছিল। তুই রোজ স্কুলে গিয়ে প্রথমেই সেই বাচ্চাকে তোর খাবার খাইয়ে দিতি। কিন্তু বাড়িতে কখনো কিছু বলতি না। এমনকি স্কুলেও না। বললে যদি স্যাররা পাগলিটাকে স্কুলের বারান্দা থেকে তাড়িয়ে দেয়! আর থাকতে না দেয় সেখানে! তখন ওইটুকু এক বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবে সে! এই কারণে দিনের পর দিন নিজে না খেয়ে থাকলি। কিন্তু কাউকে কিছু বললি না।
ঘুমাতে যাও, মা। রাত জাগলে শরীর খারাপ করবে।
আর শরীর খারাপ! হতাশ গলায় বললেন রাহিমা বানু। রাতভর কাশতে কাশতে শেষ। ঘুমাব কী করে! আমার সঙ্গে ঘুমালে তোর একফোঁটাও ঘুম হবে না। আমি নিজেও পারি না।
অনিক কথা বলল না। তার হঠাৎ মনে হলো, আর কিছুদিন পরই ঘুমাতে পারবেন। নিরবচ্ছিন্ন গভীর ঘুম। সেই ঘুম শান্তির কি না সে জানে না, তবে ওই ঘুম থেকে পৃথিবীর আর কোনো অসুখই তাকে জাগাতে পারবে না।
.
মা তার ঘরে যেতেই হৃদিকে ফোন করল অনিক। এখনো কিছুই জানানো হয় নি তাকে। হৃদি অবশ্য ফোন ধরল না। গতকালও ধরে নি। অনিক ভেবেছিল পরে হয়তো ব্যাক করবে সে। তা-ও করে নি। বাবার মৃত্যু নিয়ে ভয়ানক ভেঙে পড়েছে সে। মায়ের চেয়ে বাবার প্রতিই যেন একটু বেশি টান ছিল তার। অসুস্থ মানুষটার জন্য সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকত। বাইরে সন্ধ্যা হলেই বলত, বাবা না খুব মন খারাপ করে আমি রাত করে বাড়ি ফিরলে। কেন জানো?
কেন?
বাবা রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলে। সন্ধ্যার পরপরই। আমি তাকে রোজ ওই খাবারটা খাইয়ে দিই। বাবা তো নিজ হাতে খেতে পারে না। জানো তো, তার ডান হাতটা পুরোপুরি মুখ পর্যন্ত তুলতেও পারে না?
এই কথা অনিক কতবার যে শুনেছে, তার ইয়ত্তা নেই। সেই বাবার মৃত্যুতে হৃদি মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত হয়ে আছে, অনিক তা বুঝতে পারে। সঙ্গে এ-ও বুঝতে পারে, হৃদি তার ওপর ভীষণ মন খারাপ করে আছে। রাগ কিংবা অভিমানও। এমন একটা সময়ে পাশে থাকা তো দূরের কথা, সেভাবে খবর পর্যন্ত নিতে পারে নি সে! এরপর যে কবার ফোনে কথা হয়েছে, তাতে ভীষণ নিরুত্তাপ আর নির্বিকার মনে হয়েছে তাকে।
অনিক অবশ্য খুব একটা ঘটায়ও নি। কারণ, সে জানে, এখন কোনো কিছুতেই হৃদির এই অভিমানের বরফ গলবে না। এর জন্য সময় দিতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে সঠিক সময়ের।
সেদিন সন্ধ্যায় ধলেশ্বরীর পাড় থেকে ঝড়বৃষ্টিতে ভিজেই বাসায় ফিরেছিল অনিক। তার ফোনটা ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও সেটিকে আর ঠিক করা যায় নি। এমনকি পরদিনও না। বরং পরদিন বিকেল থেকেই রাহিমা বানু আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার নাক-মুখ দিয়ে ক্রমাগত রক্ত বের হতে লাগল। সঙ্গে ভয়ানক খিচুনি। ভোরের দিকে অচেতন হয়ে গেলেন তিনি।
দিশেহারা অনিক তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। এবার ভর্তি করানো হলো ধানমন্ডির এক ক্লিনিকে। সেখানে এটা-সেটা নানান টেস্ট। দিনের পর দিন দিগভ্রান্ত মানুষের মতো ছোটাছুটি করতে লাগল সে। অনিক তত দিনে বুঝে গিয়েছিল মায়ের খারাপ কিছু হয়েছে। কিন্তু সেই খারাপটা আসলে কতটুকু খারাপ, তা সে বুঝতে পারছিল না। এর অবশ্য কারণও আছে। পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে ডাক্তাররাও কিছু বলতে চাইছিলেন না। ফলে একটা ভয়ানক দমবন্ধ অবস্থায় দিন কাটতে লাগল তার।
এর মধ্যে হৃদির সঙ্গে যে দুয়েকবার কথা হয়েছে, তাতে ভীষণ বিচলিত বোধ করেছে অনিক। সে জানে, এই সময়ে খুব যত্নবান, দায়িত্বশীল কাউকে দরকার হৃদির। যে তাকে শক্ত করে আগলে রাখতে পারবে। সাহস ও শক্তি জোগাতে পারবে। কিন্তু হৃদি যেন অনিককে সেই সুযোগটুকুই আর দিল না। সে ফোন ধরে না। কথা বলে না। আর যেটুকুও বা বলে, তাতে সারাক্ষণ কেমন অন্যমনস্ক হয়ে থাকে। বিষাদগ্রস্তও।
অনিক খানিক চেষ্টা অবশ্য করেছিল। কিন্তু তাতে লাভ হয় নি। যে অতলান্ত বিষাদসমুদ্রে হৃদি ডুবে আছে, তা থেকে তাকে উত্তোলনের সাধ্য অন্তত এই মুহূর্তে তার নেই। কারণ, সে নিজেও ডুবে যাচ্ছে সীমাহীন যন্ত্রণার অন্ধকার অতল গহ্বরে।
কিন্তু এখন কী করবে সে?
রাত যত গম্ভীর হতে থাকে, তত যেন অনিকের বুকে চেপে বসতে থাকতে জগদ্দল এক পাথর। ওই পাথরের ওজন বইবার ক্ষমতা তার নেই। কিন্তু তাকে ফেলেও দিতে পারে না সে। ফলে ওই একা অন্ধকারে লীন হয়ে যেতে থাকে সে। কাঁদতে থাকে নিঃশব্দে।
জগতে কিছু কিছু মানুষ থাকে, যাদের দুঃখগুলো একার, অপ্রাপ্তিগুলো অন্ধকারের আর কান্নাগুলো নৈঃশব্দ্যের। এই কান্না কেউ শুনতে পায় না। ওই দুঃখ কিংবা অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা কেউ দেখতে পায় না। কেবল এই একাকী অন্ধকার রাত্রিগুলো সেই সব বেদনার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে। আজ যেমন থাকল।
অনিক বিছানা থেকে উঠল প্রায় শেষরাতে। তারপর অন্ধকারে মায়ের পায়ের কাছে গিয়ে বসে রইল। এই সময়ে খানিক তন্দ্রাচ্ছন্ন হন রাহিমা বানু। আজও হয়েছেন। ফলে অনিকের উপস্থিতি টের পেলেন না তিনি। অনিক মায়ের পায়ের কাছে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলতে লাগল, মা, মা গো। ও মা। মা গো।
ওটুকুই। এর বেশি কিছু আর বলতে পারল না সে। অসংখ্য মানুষের ভিড়েও যে একাকিত্বের জীবন সে কাটায়, তাতে তার দুঃখ বোঝার মানুষ কই? ওই তো এক হৃদি। কিন্তু সে-ও যে ঝড়ে বিধ্বস্ত ডানাভাঙা পাখি। তার কাছে কী করে আশ্রয় চাইবে সে? বরং তার নিজেরই তো এ সময়ে বিশাল বৃক্ষ হয়ে তাকে ছায়া দেওয়ার কথা!
অনিক তারপরও অপেক্ষায় থাকে। হৃদি হয়তো কখনো তার ফোন ধরবে। কিংবা ফোন করবে নিজ থেকেই। তারপর তারা পরস্পর তাদের দুঃখের পেয়ালাগুলো উপুড় করে দিয়ে শূন্য হয়ে যাবে। আর সেই শূন্যতা পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে প্রগাঢ় ভালোবাসায়, মমতায়। সেই মমতা কি এই সব ক্ষত সারিয়ে দিতে পারবে?
অনিক জানে না। তবে হৃদি তার ফোন ধরে না। কিংবা বেশির ভাগ সময় তার ফোন বন্ধই থাকে। অনিক তারপরও অপেক্ষায় থাকে। এই বুঝি খানিক সহজ হয়ে ওঠে সে। খানিক অভিমান ভুলে কাছে চলে আসে। তার পরেরটুকু অনিক জানে। হৃদিকে তো সে চেনে। যতটা সহজে দূরে চলে যায়, তারও বেশি সহজে কাছে চলে আসতে জানে সে।
হয়তো একটু সময় তার লাগছে। হয়তো আর কটা দিন। তারপর হুট করেই একদিন ফোন করে বলবে, তুমি এমন কেন, অনিক, এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন?
কী করেছি আমি?
তুমি যে কী করেছ, সেটা বোঝার ক্ষমতাও তোমার নেই। ভাবছি, আর কখনোই। তোমার সঙ্গে কথা বলব না।
তাহলে এখন যে ফোন করলে?
এখন তো করলাম সেটা জানানোর জন্য। তোমার সঙ্গে যে আর কখনোই কথা বলব না, সেটা তোমাকে না জানালে তুমি বুঝবে কী করে! এই জন্য ফোন করলাম। এখুনি রেখে দেব।
হৃদি অবশ্য সেই ফোন আর রাখবে না। কথা বলতেই থাকবে। সেই কথায় রাগ, কান্না, অভিযোগ, অভিমান। কিন্তু দিন শেষে তারা আবার আর জনমের হংস মিথুন হয়ে উঠবে। তখন কী করবে অনিক? সে কি তখন মায়ের কথা বলবে? শুনে নিশ্চয়ই দিশেহারা হয়ে যাবে হৃদি! অনিকের প্রতি তার সকল রাগ, অভিমান মিলিয়ে যাবে হাওয়ায়। সে তখন বুঝতে পারবে কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে অনিকও। তারপর উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে আসবে মাকে দেখতে। মা তখন কী করবে?
অনিক রাত জেগে জেগে এই সব কত কী ভাবে! আর হৃদিকে ফোন করে। কিন্তু তার ফোন বন্ধ। মাঝখানে তিথি একদিন তাকে ফোন করেছিল। কিন্তু অনিকের তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হয় নি। তা ছাড়া স্বদিবিষয়ক কিছু তিথিকে বলতেও চায় না। সে। বিষয়টা হৃদি পছন্দও করবে না।
আচ্ছা, বন্ধ ফোনের ওপারের মানুষটা কেমন আছে? সে-ও কি তার কথা ভাবে? তারও কি জানতে ইচ্ছে হয়, এই মানুষটা কেমন আছে? অনিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। লুকানো গোপন দীর্ঘশ্বাস। অনিক পৃথিবীর সেই সব দুঃখী মানুষের একজন, যার গোপন দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। কিন্তু সেই দীর্ঘশ্বাস কখনোই কেউ দেখে না। জানে না। তারা কেবল জানে বাতাসে যেন কিসের হাহাকার ভেসে বাড়ায়!
হৃদিদের বাড়ি যাওয়ার কথাও দুয়েকবার ভেবেছে অনিক। কিন্তু অনেক কিছু ভেবেই আর যাওয়া হয় নি। তা ছাড়া রাহিমা বানুর শরীরটাও দ্রুত খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে অসহ্য মানসিক যন্ত্রণায় কাতর হয়ে থাকে সে। মানুষটা রোজ চোখের সামনে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুই করতে পারছে না সে।
.
অনিক অবশ্য বাড়ি চলে যাওয়ার কথাও ভাবে। অন্তত শেষ কটা দিন মা গ্রামেই থাকুক। আয়েশার সঙ্গেও কত দিন দেখা নেই তার। মাকে দেখার জন্য পাগল হয়ে গেছে সে। মা-ও আর থাকতে পারছেন না। আয়েশার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গেলেই শুধু কাঁদেন। তবে বাড়ি যাওয়ার আগে হৃদির সঙ্গে একবারের জন্য হলেও দেখা করে যেতে চান তিনি। সেদিন কথাটা বললেনও।
তুই আমাকে সত্যি করে বল তো, মেয়েটার কী হয়েছে?
কার, হৃদির?
হুম।
কী হবে?
এত দিন হয়ে গেল, অথচ আর একবারও এল না?
আসবে। সবকিছু একটু নরমাল হলেই আসবে, মা।
তুই সত্যি করে বল তো, তোর সঙ্গে কোনো ঝামেলা হয় নি তো?
কী ঝামেলা হবে?
কত কিছুই তো থাকে। শোন।
বলো।
আমি বাড়ি যাব। আর এক দিনও এইখানে থাকব না। আমার বুক শুকিয়ে আসছে। পরান ছটফট করছে। তার আগে তুই এক কাজ কর।
কী কাজ?
তোর সঙ্গে যতই ঝামেলা হোক, তুই হৃদিকে ফোন কর। ফোন করে বলবি মা দেখা করতে চেয়েছে। তোমাকে দেখার জন্য খুব অস্থির হয়ে আছে। তার সঙ্গে দেখা করেই আমি বাড়ি যাব। বলে সামান্য থামলেন রাহিমা বানু। বললেন, তারপরও না। আসতে চাইলে একটু মিথ্যাও বলবি।
কী মিথ্যা?
বলবি যে মার শরীর খুব খারাপ। খুবই খারাপ। মা তোমাকে দেখতে চেয়েছে। প্রয়োজনে এইটুকু মিথ্যা বলা যায়। এইটুক মিথ্যাতে কোনো ক্ষতি নাই।
অনিক মায়ের কথা শুনে চুপ করে রইল। মা জানে না যে এটা মিথ্যা নয়, বরং এর চেয়ে নৃশংস কোনো সত্য আর এই মুহূর্তে নেই।
.
হৃদি অবশ্য এল না। তবে সেদিন হঠাৎ ফোন করল সে। অনিক মুহূর্তের উত্তেজনায় কী করবে বুঝতে পারছিল না। তার এই বিভীষিকাময় জীবনে এমন আনন্দের ঘটনা যেন। বহুদিন ঘটে নি। সে ফোন ধরল। হৃদি চুপ করে রইল। অনিক বলল, কেমন আছ?
ভালো।
মন খারাপ?
হৃদি জবাব দিল না। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, অনিক এরপর আর বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। অথচ এ কদিনে কত কথা বলবে বলে সে ভেবে রেখেছিল!
তোমার শরীর ভালো? শেষ পর্যন্ত বলল অনিক।
হুঁ।
বাসার সবাই কেমন আছে?
আছে। ভালোই।
তোমাকে এ কদিনে যে কতবার ফোন করেছি!
আমি হয়তো ফোনের কাছে ছিলাম না।
বন্ধও ছিল।
কী জানি! খেয়াল নেই।
হৃদির উত্তরগুলো কেমন প্রাণহীন, দায়সারা গোছের। বিষয়টা বুঝতে পারছে অনিক। কিন্তু ঠিক কী কারণে সে এমন করে কথা বলছে, তা বুঝতে পারছে না। আসলেই কি তার ওপর অভিমানের কারণে এভাবে কথা বলছে সে, নাকি এখনো বাবার জন্য মন খারাপ? বিষয়টা নিশ্চিত হতে পারল না অনিক। কথাটা বলল সে, তোমার কি এখনো আমার ওপর মন খারাপ?
হৃদি উত্তর দিল না। তবে তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল অনিক। কী ভেবে মায়ের কথাটা তুলল সে। বলল, মা তোমার কথা খুব বলছিলেন।
আচ্ছা। বলে খানিক চুপ করে রইল হৃদি। তারপর বলল, কেমন আছেন উনি?
এই তো। আসলে…। অনিক আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু হৃদি তার আগেই বলল, তুমি কি একদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে?
কেন পারব না? উচ্ছ্বসিত গলায় বলল অনিক। অবশ্যই পারব। কবে আসবে বলো?
বাসায় না। বাইরে কোথাও।
কেন, বাসায় আসো।
আসব। পরে। আসলে তোমার সঙ্গে দেখা করাটা খুব দরকার। বলে সামান্য থামল হৃদি। তারপর বলল, আমার কোনো কিছুই ভালো লাগছে না, অনিক। মনে হচ্ছে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। আমার মাথা কাজ করছে না। আমি গুছিয়ে কিছুই চিন্তা করতে পারছি না। আমার নিজের ওপরও কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। যতই চেষ্টা করছি, কাজ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে আমি একটা স্রোতের মতো ভেসে চলছি। অনেক চেষ্টা করেও সেই স্রোতটাকে থামাতে পারছি না। বরং আমার ভেতরে-বাইরে, আশপাশের সবকিছু ভেঙেচুরে সেই স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে।
আজ এই প্রথম একসঙ্গে এতগুলো কথা বলল হৃদি। কিন্তু তার সেই কথাজুড়ে বিষাদ, অসহায়ত্ব, দ্বিধা। অনিক গাঢ় গলায় বলল, তোমার কী হয়েছে, হৃদি?
আমি জানি না, আমি…। কথা শেষ করতে পারল না হৃদি। তার আগেই অকস্মাৎ ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল সে। অনিক উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, কী হয়েছে তোমার? কী হয়েছে? আমাকে বলল, প্লিজ?
আমি জানি না।
হৃদি! অনিক ডাকল। বলো আমাকে?
হৃদি কথা বলল না। কাঁদতেই থাকল। দীর্ঘ সময়। তারপর যেন নিজেকে সামলে নিল। বলল, তুমি আমার সঙ্গে একদিন দেখা করো। সেদিন সব বলব।
কিন্তু কী হয়েছে আগে বলো। তুমি এভাবে কাঁদছ কেন? বাবার জন্য মন খারাপ হচ্ছে? অনিকের গলায় উৎকণ্ঠা।
যেদিন দেখা হবে, সেদিনই বলি? আমার অনেক কথা বলার আছে, অনিক। অনেক কথা।
অনেক কথা?
হুম।
বলে চুপ করে রইল হৃদি। অনিকও। বেশ খানিকটা সময়। তারপর অনিক হঠাৎ বলল, আমি মাকে নিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি, হৃদি।
কবে?
তুমি যেদিন মার সঙ্গে দেখা করবে, সেদিন বা তার পরদিনই। বলে থামল অনিক। তারপর বলল, তোমার অপেক্ষায়ই এত দিন যাওয়া হয় নি। মা তোমাকে একবার না দেখে যেতে চাইছিলেন না।
ওহ্। বলে চুপ করে রইল হৃদি। তারপর বলল, কেন? চিকিৎসা শেষ? সুস্থ হয়ে গেছেন উনি?
অনিক এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। চুপ করে রইল। তারপর বলল, তোমাকেও আমার অনেক কিছু বলার আছে, হৃদি। অনেক কিছু।
২০. নেহাল যেদিন চলে গেল
নেহাল যেদিন চলে গেল, সেদিন ঠিক সন্ধেবেলা হৃদি দাঁড়িয়ে ছিল ছাদে। তার মাথার ওপর দিয়ে মেঘের আড়ালে হারিয়ে যেতে যেতেও উড়োজাহাজটা ডানা দেখিয়ে গেল। খানিক কান স্তব্ধ করে দিয়ে একটা বিদঘুঁটে শব্দ ছড়িয়ে গেল। সেই শব্দ ক্রমশই হৃদির বুকের ভেতর ছড়িয়ে দিতে লাগল তীব্র হাহাকার। অন্তহীন শূন্যতার অনুভব। ওই মেঘের ফাঁকে উঁকি দেওয়া ডানা জোড়া যেন পাখির ডানা হয়ে ঝাঁপটাতে লাগল বুকের ভেতর। হৃদির আচমকা মনে হলো সে নিশ্বাস নিতে পারছে না। একটা তীক্ষ্ণ ব্যথা চিনচিন করে ছড়িয়ে যাচ্ছে তার শরীরজুড়ে। এমন কখনো হয়?
হৃদি বুকভরে নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল দীর্ঘ সময়। যেন নিজেকে স্থির করতে চাইছে সে। নেহাল চলে গেছে সেই কখন, ভোরবেলা। অথচ একটা আস্ত দিন পেরিয়ে এই সন্ধ্যাবেলাও আকাশে কোনো এক নাম না-জানা গন্তব্যের উড়োজাহাজ দেখে তার বুক কেন এমন ভার হয়ে রইবে? এ কেমন কথা? এমন কি আর কখনো হয়েছিল তার?
অনেক ভেবেও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল না হৃদি। সে মোটেও এমন এলোমেলো হতে চায় না। এমন অস্থির, বুকভার হতে চায় না। কিন্তু তার চাওয়া না চাওয়ায় কিছু হলো না। বরং তার পরের কটা দিন একটা মুহূর্তও আর স্বস্তি পেল না সে। সারাক্ষণ নিজের ঘরে থম মেরে বসে রইল। তিথি এল, তোর কী হয়েছে, আপু?
কী হবে?
এই যে সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকিস। ঘর থেকে বের হোস না। কারও সঙ্গে কথা বলিস না। ইউনিভার্সিটিতে যাস না।
হৃদির একবার মনে হলো সে বাবার কথাটা বলে। এই তো মাত্র কিছুদিন হলো বাবা মারা গেলেন। তার মৃত্যুশোক কি এত দ্রুতই সবাই কাটিয়ে উঠেছে? কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, এই প্রশ্নের উত্তর সে নিজের কাছে নিজে খুঁজতে গিয়েই অবাক হয়েছে! খানিক লজ্জিতও বোধ করেছে। বাবার জন্য তার দুঃখানুভূতি যে কম কিছু, তা নয়। কিন্তু সেই বিষাদিত অনুভবে তীব্রতা নিয়ে এসেছে নেহালের অনুপস্থিতি। যে কটা দিন সে পাশে ছিল, মনে হয়েছে কেউ একজন আছে, যে তাকে প্রবল শীতেও খানিক উত্তাপ দিতে পারে। ভয়ংকর অসহায়ত্বেও নির্ভরতা দিতে পারে। কিন্তু সেটি নেহাল থাকতে সে যতটা না উপলব্ধি করেছে, চলে যাওয়ার পর তা উপলব্ধি করছে তার সহস্রগুণ বেশি।
তিথি বলল, তোর কি অনিক ভাইয়ার সঙ্গে কিছু হয়েছে?
নাহ্। কী হবে?
আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ভাইয়ার সঙ্গে কিছু একটা হয়েছে তোর?
কেন এমন মনে হলো?
এই যে এত দিন হয়ে গেল, এত কিছু হলো, অথচ তুই একবারও ভাইয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেলি না। তোর ফোনও দেখি বেশির ভাগ সময় বন্ধই থাকে।
তাতে কী?
না, তেমন কিছু না। আমি ভাইয়াকে একদিন ফোন করেছিলাম। কিন্তু উনিও ঠিকভাবে কথা বললেন না। মনে হলো কিছু একটা নিয়ে খুব আপসেট।
তুই ফোন করেছিলি কেন?
এমনি।
এমনি এমনি তোর অনিককে ফোন করার দরকার নেই।
কথাটার মধ্যে কিছু একটা ছিল। শুনে হৃদি থমকে গেল। বলল, তুই সত্যি করে বল তো আপু, অনিক ভাইয়ার সঙ্গে তোর কী হয়েছে?
কিছু হয় নি।
তাহলে?
তাহলে সবকিছুই হঠাৎ এমন কেন মনে হচ্ছে?
সব বুঝে তোর কাজ নেই। আর এটা নিয়ে তুই আমার সঙ্গে যেমন আর কখনো কথা বলবি না, তেমনি অনিকের সঙ্গেও না। ক্লিয়ার?
তিথি মাথা নাড়ল। তবে বিষয়টা মাথা থেকে তাড়াতে পারল না সে। তার কেবলই মনে হতে লাগল, কোথাও কিছু একটা ঝামেলা আছে এবং সেটা হৃদির দিক থেকেই। অনিককে সে যতটুকু চেনে, সে মুখচোরা প্রকৃতির মানুষ। কোনো কিছু নিয়েই অভিযোগ নেই তার। প্রবল ভালোবাসলেও যেমন সেটি তাকে দেখে বোঝা যায় না, তেমনি প্রবল অভিযোগ কিংবা ঘৃণা থাকলেও না।
নেহালের সঙ্গে হৃদির সম্পর্কটাও তিথির চোখ এড়ায় নি। বিষয়টি নিয়ে রোখসানা বেগম ভারি খুশি। বার কয়েক তিথির সঙ্গে এই নিয়ে কথাও বলেছেন তিনি। তিথি অবশ্য খুব একটা পাত্তা দেয় নি। বলেছে, আপু এখন মানসিকভাবে প্রচণ্ড খারাপ অবস্থায় আছে। এই জন্য এমন হচ্ছে।
এই সময়েই মানুষ কারও প্রতি সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়।
কিন্তু সে তো একজনের প্রতি দুর্বল আছেই।
আমি মা যেমন, তেমনি মেয়েও তো, নাকি?
তিথি হাসল, এটা কী ধরনের কথা? মেয়ে না হলে কি কেউ মা হতে পারে?
সেটা না। একজন মেয়ে হিসেবে তোদের এই বয়সটা তো আমিও পার করে এসেছি, তাই না?
হুম।
তো আমি চোখ দেখলেই বুঝতে পারি হৃদির ভেতরে কী চলছে?
তাহলে এক কাজ করো না কেন?
কী কাজ?
রাস্তায় একটা টিয়াপাখি নিয়ে বসে যাও। মানুষ টিয়াপাখি দেখে ভাগ্য গণনা করাতে আসবে। আর তুমি তাদের চোখ দেখেই সব বলে দেবে। কয়েক দিনের মধ্যেই তোমার নাম ছড়িয়ে পড়বে। আয়রোজগারও ভালোই হবে। রোখসানা বেগম অনেক কষ্টেও নিজের রাগ সংবরণ করতে পারলেন না। বললেন, এই ধরনের কথা আর কোনো দিন আমার সামনে বলবি না। আমার কখনো চিন্তায়ই ছিল না যে আমার পেটে এ রকম বেয়াদব জন্মাবে।
সরি মা। বলল তিথি। তবে তার আচরণ দেখে মনে হলো না যে সে সত্যি সত্যিই দুঃখিত অনুভব করছে। রোখসানা বেগম বেশ খানিকটা সময় চুপ থেকে বললেন, আমার ধারণা, নেহালের প্রতি হৃদির মনোভাব পাল্টেছে।
কিন্তু মা…। বলে আবার চুপ করে গেল তিথি। রোখসানা বেগম বললেন, বল।
না মানে…। দুদিনের মধ্যেই অনিক ভাইয়ার সঙ্গে আপুর এত দিনের সম্পর্কটা নাই হয়ে যাবে?
যাবে। যায়ও। মানুষের এর চেয়েও ঘনিষ্ঠ, এর চেয়েও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক হঠাৎ নাই হয়ে যায়। বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যাওয়ার পরও। আর ওদের তো একটু চেনাজানা, প্রেম। এ এমন কিছু না। আর আমার মেয়েকে আমি চিনব না?
কিন্তু আপু যে বলল অনিক ভাইয়াকে ও বিয়ে করেছে?
তুই এটা বিশ্বাস করিস?
ও তো বলল! তারপরও করব না?
না, করবি না।
কেন?
কারণ, এটা ও সত্যি বলে নি। মিথ্যে বলেছে। নেহালের সঙ্গে ওর বিয়েটা ভেঙে দেওয়ার জন্য বলেছে।
কিন্তু যদি সত্যি সত্যিই এমন কিছু হয়ে থাকে?
এই কথায় রোখসানা বেগম চুপ হয়ে গেলেন। তার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে হৃদি সত্যি সত্যিই কাউকে কিছু না জানিয়ে গোপনে একা একা বিয়ে করে ফেলতে পারে। সেই দিনের ছোট্ট সেই হৃদি, সে অল্পতেই রেগে যায়। কাঁদে। হাসে। খানিক বেপরোয়া এবং খেয়ালিও। কিন্তু তাই বলে কাউকে কিছু না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করে ফেলার মতো সাহস তার হতে পারে, এটা তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করেন না।
নেহালের সঙ্গে হৃদির এখনকার যে বোঝাপড়া, যে পারস্পরিক সংযোগ, তা তিনি দূর থেকেই টের পান এবং বুঝতে পারেন, এই সম্পর্ক একটা পরিণতির দিকে যাওয়ার জন্য অবচেতনেই উন্মুখ হয়ে আছে। কিন্তু হৃদি যদি সত্যি সত্যিই অনিককে বিয়ে করে। থাকে, তাহলে?
.
হৃদি অবশ্য এত কিছু ভাবে না। তার ভাবনার জগজুড়ে কেবলই নেহাল। একটা মানুষ এমন কী করে হয়! এত অসাধারণ হয়েও এত সাধারণ! আচরণে, ভাবনায়, অনুভবে কী আশ্চর্য গভীর আর স্বচ্ছ! কী আলগোছে বুকের ভেতর মানুষের জন্য মায়া পুষে রাখে সযত্নে, অথচ প্রয়োজন না হলে প্রকাশ করে না। বরং দূর থেকে চুপচাপ দেখে যায়। আবার প্রয়োজন হলেই কোন অদৃশ্য থেকে চোখের পলকে ছুটে এসে চট করে দুয়ারে দাঁড়ায়। তারপর অপেক্ষায় থাকে ঝড়-ঝঞ্ঝায় বুক পেতে দিতে।
এভিলিনের কথাও মনে পড়ে তার। কী সৌভাগ্যই না ছিল মেয়েটার! এমন একটা মানুষের ভালোবাসা সে পেয়েছে। কে জানে, হয়তো মৃত্যুর ওপার থেকেও এখনো সে ঠিক ঠিক নেহালের এই তীব্র ভালোবাসাটা টের পায়। অনুভব করে। আচ্ছা, এই যে নেহাল সেদিন তাকে ভালোবাসি বলে ওভাবে জড়িয়ে ধরল, সেই ভালোবাসা কি এভিলিনকে ভালোবাসার মতোই?
এই প্রশ্নটাও নিজেকে করেছে হৃদি। করেছে নেহালকেও। নেহাল চলে যাওয়ার মুহূর্ত থেকেই তার পুরো পৃথিবী যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। প্রতিটি মুহূর্ত যেন অনন্তকাল। কবে আসবে সে? আজকাল নেহালের সঙ্গে তার ইন্টারনেটে কথা হয়। সেই সব কথার বেশির ভাগেই থাকে নেহালের বাবা, মা। তার ফিরে আসার কথা। মাঝখানে নেহালের মায়ের সঙ্গেও কথা হয়েছে। অপারেশনের পর অনেকটাই সুস্থ তিনি। কী সুন্দর করে কথা বলেন। যেন ব্যক্তিত্ব ঠিকরে পড়ে প্রতিটি শব্দে।
হৃদির মাঝে মাঝে মনে হয়, যে পরিচিত, অভ্যস্ত জগতে এত দিন তার বিচরণ ছিল, সেই জগৎ, জগতের মানুষেরা ভীষণ ম্লান, বিষাদিত। কিন্তু নেহালের ওই জগৎটা
যেন ভোরের ঝলমলে আলোর মতো প্রাণবন্ত। ঝরনার জলের মতো উচ্ছল।
এভিলিনকে নিয়ে প্রশ্নটা করতেই নেহাল হেসেছে। বলেছে, আমি যদি তোমাকে এভিলিনের মতো ভালোবাসি, তা কি তোমার ভালো লাগবে?
প্রশ্নটা বুঝতে পারে নি হৃদি। সে চুপ করে ছিল। নেহাল বলল, শোনো, পৃথিবীতে কেউ কারও জায়গা কখনো নিতে পারে না। অনুভূতিও না। ধরো, তুমি যদি কখনো না থাকো, তাহলে তিথিকে কি মা তোমার মতো করে ভালোবাসবেন বা তোমার ভালোবাসাটাও কি তাকে দেবেন? নাকি তিথিকে ভালোবাসবেন তিথির মতো করেই?
ওখানে কোন ভালোবাসাটা শক্তিশালী, তিথিকে তিথির মতো করে ভালোবাসা না। তোমার মতো করে?
এই প্রসঙ্গে কথাটা খুব ভালোভাবে সম্পৃক্ত করতে না পারলেও হৃদির হঠাৎ মনে হলো, সে আসলে চায় না যে নেহাল তাকে এভিলিনের মতো ভালোবাসুক। সে বরং চায় নেহাল তাকে তার মতোই ভালোবাসবে। এমনকি এভিলিনের সঙ্গে তার কোনো তুলনায়ও সে যেতে চায় না।
কথাটা নেহালও বলল, আমি তোমাকে যতটা ভালোবাসি, অতটা ভালো এই জগতে আর কেউ কখনো তোমাকে বাসে নি। বলে খানিক চুপ করে রইল সে। তারপর বলল, তোমাকে একটা কথা বলি, হৃদি?
হুঁ।
ভালোবাসার অসম্ভব ক্ষমতা নিয়ে আমি জন্মেছি। কিন্তু জীবনভর সত্যিকারের মানুষটাকেই কেবল খুঁজেছি। একজনকে পেয়েও হারিয়েছি। তবে ভুল মানুষকে কখনোই ভালোবাসতে চাই নি। তুমি আমার ভুল মানুষ নও। ফলে এই জীবনে আর যা-ই হোক, অন্তত ভালোবাসা নিয়ে কখনো আক্ষেপ করতে হবে না তোমায়।
হৃদির বুকের ভেতর জলের ঢেউয়ের মতো শব্দ হয়। নেহাল একটা মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করলে অস্থির লাগে। দুশ্চিন্তা হয়। অনিকের কথা ভেবেও যে খারাপ লাগে না, তা নয়। তবে সেই খারাপ লাগার অনুভূতিটা অন্য রকম। তার বরং মনে হয়, অত বড় ভুল করাটা তার ঠিক হয় নি। বছর কয়েক আগে ঝোঁকের বশে বিয়েটা সে না করলেই পারত। তার কারণেই অনিকের জীবনটাও হঠাৎ থমকে গেল। এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু। আর এখন? এখন সে কী করবে?
এই প্রশ্নে নিঃসাড় হয়ে থাকে হৃদি। যেন অথই সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া পায়ের নিচে একটু মাটির স্পর্শ চায় সে। দিনরাত নিজের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকে। এই যুদ্ধের কথা কাউকে বলতেও পারে না। ঠিক করতে পারে না নিজের করণীয়ও।
মাঝখানে নেহালের সঙ্গে দুদিন কথাও বলে নি, তাতে যদি নিজেকে খানিক নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু তাতে লাভ হয় নি। বরং উল্টোটাই হয়েছে। প্রবল স্রোতস্বিনী নদীতে বাঁধ দিয়ে রাখলে সেই নদী যেমন দুকূল প্লাবিত করে ছুটে আসে, উপচে পড়তে চায়, হৃদির অবস্থাও হলো তেমন। তৃতীয় দিন রাতে সে ফোন করে খুব শান্ত, স্বাভাবিক গলায় বলল, তুমি কবে আসবে?
এখানে একটু সমস্যা হয়ে গেছে, হৃদি। আমার তো নেক্সট উইকেই রিটার্ন টিকিট ছিল। আরও তো অন্তত পাঁচ দিন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে একটু দেরি হবে।
মানে, দেরি কেন হবে?
আমার এক বন্ধু আসবে ফ্লোরিডা থেকে। ওকে কয়েকটা দিন সময় দিতে হবে। এই জন্য একটু দেরি হচ্ছে। ওই পাঁচ দিনের সঙ্গে হয়তো আরও এক সপ্তাহ যোগ হবে।
হৃদি খানিক চুপ করে থেকে বলল, তুমি কাল চলে আসবে।
কাল চলে আসব মানে! অবাক গলায় বলল নেহাল।
কাল চলে আসব মানে কাল চলে আসবে। বলেই হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল হৃদি। বলল, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, নেহাল। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো। খুব তাড়াতাড়ি।
নেহাল পরদিন না পারলেও টিকিট বদলে চলে এল দুদিন বাদেই। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি চলে এল হৃদিদের বাড়ি। তখন গভীর রাত। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে আছে। জেগে ছিল হৃদি একা। নেহাল ফোন করতেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল সে।
নেহাল উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, কী হয়েছে তোমার?
আমি জানি না।
বলো আমাকে?
আমার খুব ভয় করছে।
কিসের ভয়?
তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
আমাকে কেন হারিয়ে ফেলবে তুমি?
আমি জানি না। কিন্তু আমার ভয় করছে। তীব্র ভয়। আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না। আমার মনে হচ্ছে আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলব। আর কখনো ফিরে পাব না।
হৃদি কাঁদছে। তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে নেহাল। রোখসানা বেগম এই সময়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে গেল তারা। রোখসানা বেগম অবশ্য হৃদিকে তেমন কিছুই বললেন না। তবে নেহালকে বললেন, তুমি এখন বাসায় যাও, বাবা। কাল দিনে এসো। তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।
.
সেই রাতে আর এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারল না হৃদি। সে জেগে রইল অদ্ভুত এক সংকট, সংশয় নিয়ে। তার একবার মনে হলো, সে আসলে অনিককে জড়িয়ে ধরেই কাঁদতে চেয়েছিল। কারণ, সে জানে, যে ভয়ানক অপরাধটা সে করতে যাচ্ছে, এই অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। এমন জঘন্য কাজ সে করতে পারে না। অনিকের মতো মাঝসমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া একজন মানুষকে ছেড়ে সে এভাবে চলে যেতে পারে না।
ফলে তার আসলে নিজেকে সমর্পণ করা উচিত অনিকের কাছেই। তার বুকে যে ক্লেদ, যে লোভ জন্মেছে, তার জন্য তার ক্ষমা চাওয়া উচিত। কিন্তু তা তো সে পারছে না। ফলে একটা অপ্রতিরোধ্য অপরাধবোধ তাকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে। সে মূলত তার ওই ভাঙা টুকরোগুলো নেহালের কাছে জমা দিয়ে আবার যুক্ত করে নিতে চাইছে। হতে চাইছে পরিপূর্ণ অন্য কোনো মানুষ।
এ এক অদ্ভুত দ্বিধার জগৎ। এই জগৎ থেকে সে বেরোতে পারছে না। আবার পরিপূর্ণ শান্তিতে থাকতেও পারছে না। তবে এ কদিনে অন্তত একটি কথা সে বুঝতে পেরেছে। আর তা হলো, নেহালকে ছাড়া সে থাকতে পারবে না। তাতে যত বড় অন্যায়ই তাকে করতে হোক না কেন।
যে অনাঘ্রাত ভালোবাসার সুবাস সে নেহালের কাছ থেকে পেয়েছে, এই সুবাস থেকে তার মুক্তি নেই। এ যদি মৃত্যু হয়, তবে সেই মৃত্যু গ্রহণেও কুণ্ঠা নেই তার। অনিকের প্রতি যে অন্যায়টা সে করছে, সেই অন্যায় নিয়ে তার অনুশোচনাও হয়। কিন্তু হৃদি জানে, জগৎ এমনই, এখানে কিছু পেতে হলে কিছু বিসর্জন দিতেই হয়। সে না হয় অনিককেই বিসর্জন দিচ্ছে।
২১
লাল চানের সামনে টেবিল। টেবিলের ওপর দুটো চকচকে এক শ টাকার বান্ডিল। সে ভ্রু কুঁচকে বলল, এগুলা কী?
বিষ।
বিষ মানে? কিসের বিষ?
সাপের বিষ।
লাল চান সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটে আঙুল চাপা দিল। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলল, আস্তে হারামজাদা। কেউ শুনব।
রাশু কথা বলল না। লাল চান বলল, এই টাকা পাইছস কই?
জামশেদ স্যারে দিছে।
কত টাকা?
গুনি নাই।
গোন।
রাশু টাকা গুনল, পঞ্চাশ হাজার।
টাকা দিছে কেন? কী করতে বলছে?
আপনেরে দেয় নাই। আমারে দিছে।
তোরে? অবাক গলায় বলল লাল চান। তোরে এত টাকা দিছে কেন?
আপনেও দিতে পারেন। থাপ্পড়প্রতি পঁচিশ হাজার। জিনিসটা আমার ভাল্লাগছে। পত্রিকায় খবর হওনের মতো ব্যাপার।
তোর কী হইছে? আবোলতাবোল বকতেছস কেন?
আবোলতাবোল না, কথা সত্য। আমারে থাপ্পড় মারবেন, প্রত্যেক থাপ্পড়ের দাম। পঁচিশ হাজার টাকা। এক শ টাকার চকচকা নোটের বান্ডিল দিতে হবে। মারবেন থাপ্পড়?
রাশু থামলেও লাল চান কথা বলল না। সে সরু চোখে রাশুর দিকে তাকিয়ে আছে। তার ফরসা মুখ লাল হয়ে আছে। বাদামি চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। রাশু বলল, আপনেরে যদি এই সুযোগ দেওয়া হইত, আপনে কী করতেন?
কোন সুযোগ?
আপনের গালে কেউ থাপ্পড় মারব। প্রতি থাপ্পড় পঁচিশ হাজার। দিতে দিতেন থাপ্পড়? তাইলে গাল আগাই দেন, দুইটা চড় মারব। পেমেন্ট নগদ। এক শ টাকার চকচকা নোটে পঞ্চাশ হাজার টাকা।
রাশুর কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল লাল চান। এই ছেলে বলে কী! এই সেদিনও সে তার ধমকে প্যান্ট নষ্ট করে দিত। আর আজ সে এ কী কথা বলছে! লাল চান তীক্ষ্ণ চোখে রাশুর দিকে তাকাল। তার মুখ ভাবলেশহীন। তবে চোখে কিছু একটা আছে। বিষয়টা সে ধরতে পারছে না। রাশু বলল, আমি এখন রেগুলার বাইরে থাকব।
কেন?
স্যারে বলছে।
কী বলছে?
বলছে ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে যেমনে ছাত্রগো টেস্ট পরীক্ষা দিতে হয়, তেমনি সাপের বিষেরও টেস্ট পরীক্ষা দিতে হইব। তারে বর্ডার পাসের পরীক্ষা দিতে হইব।
তোর কী হইছে? তুই এমন আউলাঝাউলা কথা বলতেছস কেন? ঘটনা খুইলা বল আমারে।
রাশু কথা বলল না। হাসল। মলিন হাসি। লাল চান ক্যাশ ছেড়ে উঠে এসে তার পাশে বসল। তারপর বলল, তোরে কি জামশেদ স্যার মারছে?
রাশু এবারও জবাব দিল না। লাল চান বলল, চড়-থাপ্পড় মারছে? চড়-থাপ্পড় মারলে মনে দুঃখ নিস না। সে এখন তোর ওস্তাদ। ওস্তাদের হাতে চড়-থাপ্পড় খাওয়া মন্দ কিছু না, বরং ভালো। এতে শিক্ষাদীক্ষা ভালো হয়। দ্রুত হয়।
রাশু এবারও চুপ করে রইল। লাল চান একটা গামছা ভিজিয়ে এনে রাশুর মাথা, মুখ, ঘাড় মুছে দিতে থাকল। রাশু বলল, আইড় মাছ দিয়া ভাত খাব। নদীর আইড়।
এখন আইড় মাছ পাব কই?
পদ্মার ঘাটে গেলেই পাওয়া যাইব।
এখন পদ্মার ঘাটে যাইব কে?
আপনে যাইবেন।
আমি এহন যাব পদ্মার ঘাটে? ওই হারামজাদা, লাটসাহেব, আমি এহন যাব পদ্মার ঘাটে? তারপর তোর জন্য আইড় মাছ আইনা রাইন্ধা খাওয়াব?
রাশু কথা বলল না। সে দোকানের পেছনের খুপরিঘরটাতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তার ঘুম ভাঙল সন্ধ্যাবেলা। সে ঘুম থেকে উঠে দেখে তার বিছানার পাশে গামলাভর্তি ভাত। ভাতের গামলার পাশে জামবাটি। বাটিতে আলু বেগুন ধনেপাতা দিয়ে ঝোল ঝোল করে রান্না করা আইড় মাছের তরকারি। সে হাতমুখ না ধুয়েই ভাত খেতে বসল। ভাত খাওয়া শেষে দোকানের বাইরে এল। এসে শোনে পুলিশ লাল চানকে ধরে নিয়ে গেছে। ঘটনা শুনে ভারি অবাক হলো সে। লাল চানকে কেন পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে? কী করেছে সে?
লাল চান অবশ্য এল ঘণ্টাখানেক পরই। তাকে দেখে গুরুতর কিছু মনে হলো না। রাশু বলল, কী হইছিল?
আরেহ, পুলিশের একটা নতুন মেস হবে। সেইখানে বিছানা-বালিশ লাগবে। কাজ দিচ্ছে আমারে। আমার কি এখন এইসব খুচরাখাচরা কাজ করার সময়?
রাশু কথা বলল না। লাল চানের দিকে তাকিয়ে রইল। কদিন আগেও এমন একটা কাজ পেলে আনন্দে তার চোখমুখ ঝলমল করত। অথচ এখন সেখানে আরও লাভের লোভ। এই লোভের ছায়া তাকে কোথায় নিয়ে যায় কে জানে! তবে আপাতত সে তাকেও সেই ছায়ায় ঠেলে দিয়েছে। এই ছায়া কত দূর বিস্তৃত হবে, রাশু জানে না।
.
জামশেদ গাড়ি পাঠিয়েছেন। কম দামি পুরোনো আমলের সেডান কার। রাশু গাড়িতে উঠে দেখে বাইরে থেকে যতটা সাধারণ দেখায়, ভেতরে ঠিক অতটা সাধারণ নয়। গাড়িটা। বসার আসনগুলোও ভালো। তবে এর আগে যতবার সে ঢাকা থেকে গিয়েছে, ততবারই ভালো গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। হঠাৎ এমন গাড়ি পাঠাল কেন কে জানে! সে বৈদ্যবেলঘরিয়া পৌঁছাল দুপুরে। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন জামশেদ। সঙ্গে মতিন মিয়া। সে রাশুকে দেখে বলল, এই ছেলে এইখানে থাকতে পারব স্যার?
আমার তো মনে হয় পারব। তোমার কী মনে হয়?
ঠিক বুঝতে পারছি না। এইটুক বাচ্চা একটা ছেলে।
জামশেদ হাসলেন, একটা কথা শোনো নাই?
কী কথা?
ছোট সাপের বড় বিষ?
এই কথায় মতিন মিয়া চুপ হয়ে গেল। জামশেদ রাশুর দিকে তাকিয়ে বললেন, মুরগি আনছিস?
রাশু কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। মতিন মিয়া বলল, স্যার, মাগুর মাছরে মুরগি খাওয়াবে। সেই মুরগি আনছ কি না, সেইটা জিজ্ঞাস করছে।
জি না। রাশু মিনমিনে স্বরে বলল, যেন বড় ধরনের অপরাধ করে ফেলেছে সে।
জামশেদ বললেন, কাজটা কি ঠিক হলো, রাশু মিয়া?
রাশু ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়তে গিয়ে আচমকা থমকে গেল। বলল, আমাকে তো মুরগি আনতে বলা হয় নাই। আর আমি জানতামও না যে এইখানে আসলে সব সময়ই মুরগি নিয়া আসতে হয়। এমন কিছু কেউ বলে নাই আমারে।
জানো নাই যখন, এখন জানলা। এখন থেকে নিয়ে আসবা। বলল মতিন মিয়া।
জামশেদ বললেন, ওইখানে ওই বেতের ঝাপিটার নিচে দুইটা মুরগি আছে। ওই দুইটা আন।
রাশু তাকাল। উঠানে একটা ওলটানো বেতের ঝাপি রাখা। সেই ঝাঁপির নিচে মুরগি আছে বলেছেন জামশেদ। কিন্তু তার কেন যেন মনে হচ্ছে ওই ঝাঁপির নিচে মুরগি নেই। আছে অন্য কিছু। সে ধীরপায়ে ঝাপিটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আর ঠিক তখুনি তীব্র আতঙ্কে তার সারা শরীর হিম হয়ে এল। জামশেদ বিষয়টা লক্ষ করলেন। বললেন, কী? ঝাঁপি ফাঁক করে ঝাপির নিচে হাত দে। আঁপি তুলবি না। ফাঁক দিয়ে হাতে টেনে মুরগি বের করবি।
রাশু মুহূর্তেই ঘটনা বুঝে গেল। ঝাপির নিচে মুরগি আছে, এ কথা সত্য। সে রক্তের দাগও দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু সেই মুরগির সঙ্গে সম্ভবত ভয়ংকর বিষধর কোনো সাপও আছে ওখানে। জামশেদ চাইছেন ওই সাপের সামনে থেকে অনুমানে হাতড়ে মুরগিটা বের করে আনবে সে। কিন্তু এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সে ঝাঁপির নিচে হাত দেওয়ামাত্র সাপ তাকে ছোবল মারবে। কথাটা ভাবতেই রক্তশূন্য হয়ে গেল রাশুর মুখ। মৃত্যুকে সবাই ভয় পায়। সে-ও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু অন্য যেকোনো মৃত্যুর চেয়ে সাপের ছোবল তার কাছে সহস্রগুণ বেশি ভয়ের। সে হাত দিয়ে তা ছুঁতেও পারবে না।
জামশেদ বললেন, কী হলো? বের কর। রাশু দাঁড়িয়ে আছে। তার পা কাঁপছে। গলা শুকিয়ে আসছে। আক্ষরিক অর্থেই নড়তে ভুলে গেছে সে। কিংবা পারছে না। জামশেদ ঠান্ডা হিসহিসে গলায় বললেন, আমার কথা না শুনলে আমার কেমন লাগে তুই জানিস না?
রাশু জানে। কিন্তু সেই জানাও তাকে সামান্যতম উদ্দীপ্ত করতে পারল না। ভীতও করতে পারল না। বরং মনে হলো, এই অবিশ্বাস্য ভয়ংকর কাজের তুলনায় ওই শাস্তি নেহাতই তুচ্ছ। কিংবা ওর চেয়েও বড় যেকোনো শাস্তি সে মাথা পেতে নিতে পারবে।
জামশেদ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তার হাতে একটা কালো চকচকে পিস্তল। রাশুর হঠাৎ মনে হলো, সে আসল ঘটনা বুঝতে পেরেছে। জামশেদ কোনোভাবেই তাকে খুন করতে চান না। তিনি মূলত তাকে ভয় দেখাতে চান এবং দেখতে চান, এমন ভয়ংকর মুহূর্তে রাশুর কি বেশি কাজ করে, মন না মগজ?
রাশু অকস্মাৎ টুপ করে বসে পড়ল। তারপর চোখের পলকে হাত ঢুকিয়ে দিল ঝাপির তলায়। সেখানে একটা মুরগি। সেই মুরগিটার পাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে একটা সাপ। রাশু চোখের পলকে ঝাপির তলা থেকে মুরগিটা টেনে বের করে আনল। তবে সাপটা ততক্ষণে সচকিত হয়ে উঠেছে। সে কুণ্ডলী ভেঙে ফোঁস ফোঁস শব্দ করতে শুরু করেছে। রাশু এবার সবাইকে চমকে দিয়ে আবারও হাত ঢুকিয়ে দিল ঝাঁপির ভেতর। তারপর বের করে আনল সাপটা। ভীত মতিন মিয়া হতভম্ব হয়ে গেছে। আতঙ্কে তার চোখ জোড়া যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে।
রাশু অবশ্য সাপটাকে ছাড়ল না। তাকে ছোবল দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল। তবে তার ধারণা, সে যখন প্রথমবার ঝাপির তলায় হাত ঢুকিয়েছে, সাপটা তখুনি তাকে ছোবল মেরেছে। মতিন মিয়া চিৎকার করে বলল, ছাইড়া দাও। ছাইড়া দাও।
রাশু ছাড়ল না। তাকে আরও বার দুই ছোবল মারল সাপটা। জামশেদ বিস্ফারিত চোখে রাশুর দিকে তাকিয়ে আছেন। তবে তার সেই চোখে সমীহও। রাশুর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। সেই হাসি বিদ্রুপাত্মকও। জামশেদ বললেন, এদিকে আয়।
রাশু এল। জামশেদ বললেন, তুই কখন বুঝলি যে ঝাপির তলায় যে সাপটা আছে, ওইটার বিষ নাই?
আপনে যখন পিস্তল তাক কইরা দাঁড়াইলেন, তখন।
কেন, পিস্তলের সাথে সাপের বিষ না থাকার সম্পর্ক কী?
আমার হঠাৎ মনে হইল আপনে আসলে আমারে মারতে চান না, ভয় দেখাইতে চান। দেখতে চান ভয়ের মুহূর্তে আমি কী করি? কারণ, আমারে মাইরা তো আপনের লাভ নাই। বরং আমি যদি ভয়টারে জয় করতে পারি, ওইটাতে আপনের লাভ। আপনে তাই চাইছেন আমি যেন ভয়টারে জয় করি। এই জন্য বিষদাঁত নাই এমন কোনো সাপ রাখছেন ওইটার মধ্যে।
জামশেদ কথা বললেন না। তিনি স্থির চোখে রাশুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাশু তাকিয়ে আছে তার হাতের সাপটার দিকে। সাপটা এখন আর তাকে ছোবল মারতে চাইছে না। সে ধীরে রাশুর বাহু বেয়ে কাঁধের দিকে উঠে যাচ্ছে। খানিক বাদে হয়তো গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলতে থাকবে। দৃশ্যটা দেখতে ভয়ংকর হবে। তবে জামশেদ জানেন নারাশু তখন কী করবে!
২২
পরদিন বাড়িতে এল নেহাল। রোখসানা বেগম সরাসরিই প্রসঙ্গটা তুললেন। বললেন, আমার মনে হয় হৃদির সঙ্গে বিয়ে নিয়ে যে কনফিউশনটা তোমার ছিল, তা কেটে গেছে।
জি আন্টি।
তাহলে এটা নিয়ে আর দেরি করার কোনো মানে হয় না। তা ছাড়া হৃদি একটু খামখেয়ালি টাইপের। কখন কী করে ফেলে কে জানে! তুমি বিয়ের ব্যাপারে কথা বলো।
জি। আচ্ছা।
রোখসানা বেগম হৃদির সঙ্গেও বিষয়টা নিয়ে কথা বললেন। হৃদি সরাসরি কিছু না বললেও তার নীরবতার ধরন স্পষ্টতই সম্মতির লক্ষণ। বিষয়টাতে রোখসানা বেগম যারপরনাই আনন্দিত হলেন। নেহালকে বললেন হৃদির সঙ্গে বাদবাকি বিষয়গুলো ঠিক করে নিতে, তাদের নিজেদের যদি বিশেষ কোনো প্ল্যান-পরিকল্পনা থাকে। হৃদি অবশ্য তেমন কিছু বলল না। তবে সে যেন খানিক থম মেরে রইল। নেহাল বলল, হৃদি?
হুম।
তুমি কি কোনো কারণে আপসেট?
না তো।
বাট, তোমাকে দেখে তেমনই মনে হচ্ছে।
হৃদি কথা বলল না। নেহাল বলল, কোনো সমস্যা?
একটু। অবশেষে বলল হৃদি।
কী?
হৃদি আবারও চুপ করে রইল। নেহাল তার হাত ধরে বলল, বলো আমাকে।
বলব। বলে থামল হৃদি। তারপর বলল, কিন্তু সেটা শোনার পর তুমি যদি আমাকে আর ভালো না বাসো?
নেহালের মনে হলো সে দূরন্ত গতিতে ছুটতে ছুটতে অন্ধকারে হঠাৎ তার সামনে পথ রোধ করে দাঁড়ানো দেয়ালটাতে ধাক্কা খেয়েছে। তবে নিজেকে সামলে নিল সে। বলল, কী এমন সমস্যা যে সেটা শুনলে আমি আর তোমাকে ভালোবাসব না?
আছে।
থাকুক। তুমি যেকোনো সমস্যা নির্দ্বিধায় আমাকে বলতে পারো।
কিন্তু তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সমস্যাটা শোনার আগেই তুমি ধাক্কা খেয়েছ। একটা অজানা আশঙ্কার ছাপ পড়েছে তোমার মুখে।
নেহাল হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু হৃদির কথা মিথ্যে নয়। কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই যে শঙ্কার কালো মেঘ নেহালের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে, তা তার চোখ এড়ায় নি।
হৃদি ভেবেছিল অনিকের সঙ্গে তার বিয়ের ব্যাপারটা জানলেও নেহাল হয়তো তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে না, যেহেতু এ বিষয়ে একটা প্রাথমিক আভাস সে পেয়েছিল। কিন্তু তার ওই হঠাৎ বদলে যাওয়া মুখচ্ছবি শেষ মুহূর্তে থমকে দিল হৃদিকে। সে বলল, আমার একটা সম্পর্ক ছিল, সেটি নিশ্চয়ই তুমি জানো?
নেহাল হাসল, অমন সবারই কিছু না কিছু থাকে। বাট, সেসব তেমন সিরিয়াস কিছু না।
যদি সিরিয়াস কিছু হয়?
সিরিয়াস কিছু হলে তুমি কি তাকে ছেড়ে দিতে পারতে?
এই প্রশ্নে চুপ হয়ে গেল হৃদি। কী কঠিন, কী রূঢ় একটি কথা কত অবলীলায় বলে ফেলল নেহাল! আসলেই কি অনিকের সঙ্গে সম্পর্কে কখনো সিরিয়াস ছিল না সে? কিন্তু সেটা তো হওয়ার কথা নয়। বরং শেষের দিকে এসে তার ক্রমশই মনে হচ্ছিল, নিজের আগেকার সেই ভঙ্গুর, অস্থির মানসিক দশা থেকে সে বের হয়ে এসেছে। নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করতে শিখেছে এবং সেখানে অনিক হয়ে উঠছে তার সবচেয়ে বড় অবলম্বন। সবচেয়ে বড় অনুভব। তাহলে হঠাৎ কী হলো তার? সবকিছু কেন এমন ওলট-পালট হয়ে গেল!
এই প্রশ্নের উত্তর হৃদির কাছে নেই।
নেহাল বলল, আমি এটাই বলেছিলাম। আমরা এই বয়সে যাকে ভালোবাসা ভাবি, সেটা আসলে ইনফ্যাচুয়েশন। লাভ অ্যান্ড ইনফ্যাচুয়েশন–এ দুটোয় বিস্তর তফাত। কিন্তু এই বয়সটা সেটা আমাদের বুঝতে দেয় না। একটা ঘোরে অন্ধ করে রাখে।
হৃদি বলল, কিন্তু আমি যে তোমাকে বলেছিলাম আমরা গোপনে বিয়ে করে ফেলেছি!
কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য যেন স্তব্ধ হয়ে গেল নেহাল। যেন সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বোঝার চেষ্টা করল হৃদিকে। তারপর হঠাৎ শব্দ করে হাসল। বলল, এখনো কেন এসব নিয়ে মজা করছ? এখন তো আর আমার সঙ্গে তোমার বিয়ে ভেঙে দেওয়ার ব্যাপার নেই। সেবার তো প্রেগন্যান্সির কথা অবধি বলতে চাইছিলে। মাই গড! তুমি না ডেঞ্জারাস। নিজের সম্পর্কে এমন মজা কেউ করে? নিজের বিয়ে, প্রেগন্যান্সি নিয়ে!
হৃদি কী করবে বুঝতে পারছে না। সে বার কয়েক ভাবল বিষয়টা পুরোপুরি স্পষ্ট করেই বলবে। কিন্তু শেষ অবধি পারল না। তার বারবার মনে হতে লাগল, সব শুনে নেহাল যদি ভয়ানক কিছু করে বসে! যদি তাদের বিয়েটা ভেঙে যায়! এমনই হওয়ার কথা। কারণ, যে মেয়ে মাত্র এ কদিনের পরিচয়ে তার এত দিনকার বিয়ের সম্পর্কটা ভেঙে দিতে পারে, সেই মেয়ে সম্পর্কে কারোরই কোনো ভালো ধারণা তৈরি হওয়ার কথা নয়। তাহলে? কী করবে সে?
হৃদি শেষ অবধি বলল, একটা কথা।
হা?
অনিকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। প্রথমে বিষয়টা ফানই ছিল। তারপর কী যে হলো আমার! হঠাই মনে হলো, আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।
তারপর? কৌতূহলী চোখে তাকাল নেহাল।
তারপর…। বলে খানিক চুপ করে রইল হৃদি। যেন কী বলবে তা এখনো গুছিয়ে উঠতে পারছে না সে। বেশ খানিকটা সময় চুপ করে থেকে বলল, আমি বিশ্বাস করি, আমার ভালোগুলো যেমন তুমি ভালোবাসবে, তেমনি আমার সীমাবদ্ধতাগুলোও। ওগুলোর জন্য অন্তত কখনোই আমাকে দূরে সরিয়ে দেবে না।
কখনোই না।
আমি আর অনিক…। বলে সামান্য থামল হৃদি। তারপর যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রেখেই বলল, আমরা বিয়ে করে ফেলেছিলাম।
হোয়াট! নেহালের মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। মানে তোমরা সত্যি সত্যিই বিয়ে করেছিলে? কোর্ট ম্যারেজ? নেহালের ঠোঁট কাঁপছে।
হৃদি নিজেকে হঠাৎ কী বোঝাল কে জানে! সে ঠোঁট উল্টে শ্রাগ করার ভঙ্গিতে বলল, নিজেরা নিজেরা। আমি আর অনিক। বাংলা সিনেমায় যেমন দেখতাম, ও রকম।
মানে?
মানে চাঁদ-তারা-সূর্য, আকাশ-বাতাস সাক্ষী রেখে আরকি!
নেহাল এবার আর হাসল না। তবে এতক্ষণ আটকে রাখা দমটা ছাড়ল সে। বলল, উফফ, গড ড্যাম ইউ। তুমি কীভাবে এমন করে হার্টবিট মিস করিয়ে দিতে পারো, বলো তো? আই ওয়াজ সাপোসড টু ডাই…।
হৃদি জানে কাজটা তার ঠিক হয় নি। কিন্তু তারপরও শেষ অবধি বিষয়টা আর স্পষ্ট করে বলতে পারল না সে। বরং একটা আবছায়া রেখে দিল। এ যেন না বলেও বলা। নিজেকে খানিক দায়মুক্ত করে রাখা।
কিন্তু অনিককে সে কী বলবে? কিংবা মাকে?
২৩
রাহিমা বানুর শরীর ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। গত কিছুদিন হলো বিছানা থেকে উঠতেই কষ্ট হচ্ছে তার। অনিক বলল, মা, তুমি কি তাহলে এখুনি গিয়ে বাড়ি থেকে ঘুরে আসবে? ডাক্তারও বলল, বাড়ির ফ্রেশ আলো-হাওয়ায় কয়েক দিন থেকে এলে তোমার ভালো লাগবে।
এইটা কি আমি আজ থেকে বলছি! রাহিমা বানু যেন একটু রেগেই গেলেন। কত দিন হয় এই এক কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেললাম। তুই-ই তো দেরি করছিস।
মা। নরম গলায় ডাকল অনিক।
হুম।
তুমিই না বললে হৃদির সঙ্গে দেখা না করে যাবে না?
একটা কথা বলি, বাবা? হঠাই যেন রাহিমা বানুর গলার স্বর বদলে গেল।
বলো।
রাহিমা বানু অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই কথা বললেন না। বেশ খানিকটা সময় নিলেন। তারপর বললেন, বড় কোনো ঝামেলা হয়েছে?
না, মা। বড় কোনো ঝামেলা না। হৃদি খুব ইমোশনাল। অল্পতেই হাসে, অল্পতেই কাঁদে। দেখলে না মাত্র কয়েক দিনেই তোমার জন্য কেমন করল!
হুম।
ও ওর বাবাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত। সেই মানুষটা হঠাৎ চোখের সামনে নাই হয়ে গেলেন। বিষয়টা ওকে মানসিকভাবে একদম ভেঙে দিছে। ও কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
এই জন্য তোর ফোন ধরবে না? একটা কথা পর্যন্ত বলবে না?
কথা হয়েছে, মা।
কথা হয়েছে? রাহিমা বানুর বিষণ্ণ মুখে যেন খানিক আলো ফুটল। তিনি হড়বড় করে বললেন, কবে, কখন, কী কথা হয়েছে? আসবে আমাকে দেখতে? আমার কথা কিছু জিজ্ঞেস করে নাই?
করেছে। আমি যখন বললাম বাড়ি নিয়ে যাব তোমাকে, বলল, তোমাকে পুরোপু রি সুস্থ না করেই কেন বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।
বলেছিস যে আমি খুব অসুস্থ? দেখতে চাইছি ওকে? ওই যে…তোকে যা শিখিয়ে দিলাম!
বলেছি, মা।
তাহলে, এল না যে?
আসবে।
সত্যি? যেন কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না রাহিমা বানুর। তিনি যেন মনে মনে ধরেই নিয়েছিলেন যে হৃদি আর তাকে দেখতে আসবে না। অনিকের সঙ্গে নিশ্চয়ই বড়সড় কোনো ঝামেলা হয়েছে। হয়তো সম্পর্কটাই আর নেই। আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে এমন হয়। হুটহাট সম্পর্ক হয়ে আবার হুটহাটই ভেঙে যায়। সত্যি সত্যিই আসবে? সে বলেছে? কবে আসবে? রাহিমা বানুর যেন আর তর সইছে না।
ও একটু খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, মা। নিজ থেকেই ফোন করল। তারপর হঠাৎ কাঁদল।
কী বলিস! রাহিমা বানুর গলায় আর্দ্রতা। বুকটাও কেমন ভার। কেন কেঁদেছে? কী হয়েছে ওর?
এখনো জানি না, মা। বলেছে, আগে আমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়। তারপর তোমাকে দেখতে আসবে।
ঠিকই তো। এখানে এলে আমি তো ওকে সারাক্ষণ সাথে সাথে রাখি। তোর সঙ্গে আলাদা একটু কথা বলার সুযোগও দিই না। আসলে হয়েছে কি, আমরা পুরোনো আমলের মানুষ। সোমত্ত বয়সের দুটো ছেলেমেয়েকে আলাদা ঘরে ছাড়তে আমাদের বাধে। এই জন্য সব সময় চোখে চোখে রাখতাম। আফসোসের ভঙ্গিতেই কথাটা বললেন রাহিমা বানু। কিন্তু তোদেরও তো কিছু কথা থাকতে পারে, যেটা মায়ের সামনে বলা যায় না। এই সামান্য ব্যাপারটাই আমি বুঝতি পারি নাই। কে জানে, হয়তো এ কারণেও আমার ওপর ওর মন খারাপ হয়ে থাকতে পারে। তুই একটু ওকে বুঝিয়ে বলিস। আমি মোটেও অমন না। আমার বোঝার ভুল।
মা, ও মোটেও তোমাকে ভুল বোঝে নি। তুমি এসব নিয়ে মন খারাপ কোরো না। ও একবার এলেই দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। হৃদির মতো এমন সহজ, ভালো মেয়ে তুমি আর পাবে না। ওর রাগ, অভিমান একটু বেশি। হঠাৎ হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। অল্পতেই কষ্ট পায়। আবার আনন্দও। ওকে জাস্ট একবার আসতে দাও, দেখবে গ্রামে গিয়ে সারাক্ষণ তোমার পাশে বসে থাকবে।
আমি সে কথাই বলতে চাইছিলাম। যদি সম্ভব হয় বিয়েটা করে ফেল। তুই চাইলে আমিই কথা বলতে পারি। প্রয়োজনে ওর মায়ের সঙ্গেও কথা বলব।
অনিক মায়ের দিকে তাকিয়ে খানিক অবাকই হলো। ক্রমশ দুর্বল, ক্ষীণ হয়ে পড়া তার রোগা, নিষ্প্রাণ মা যেন মুহূর্তেই ঝলমল করে উঠলেন। তার চোখেমুখে আলোর আভা। বললেন, আমি ওকে গায়ে নিয়ে যাব। তুই দেখিস, একবার ও আমার সঙ্গে গিয়ে কটা দিন থাকলে আর ওর মন খারাপ থাকবে না।
অনিক হাসল, আমি জানি, মা। ও কী বলে, জানো?
কী?
বলে আমাকে না হলেও নাকি ওর চলবে। তোমাকে পেলেই হবে। তোমার সঙ্গে সারা জীবন থাকতে পারবে।
কথাটা শুনে কী যে ভালো লাগল রাহিমা বানুর! একটা অদ্ভুত ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে রইলেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার অনুভবটা যেন ক্রমশই আড়াল হয়ে যেতে লাগল। কবে দেখা করবে ও? তুই কিন্তু ওকে কিছু নিয়ে প্রেশার দিস না। এত ভালো মেয়েটা…। বলতে বলতে গলাটা যেন ধরে এল তার।
অনিক মায়ের শীর্ণ হাতখানা ধরল। এই কদিনেই কী রোগা হয়ে গেছেন মা। হাত কাঁপছে। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে গেছে। অনিক প্রায় স্বগতোক্তির মতো করে বলল, দেব না, মা।
এ কদিনে একটা বিষয় অনিক বুঝতে পেরেছে, হৃদিকে ছাড়া তার চলবে না। যত দুঃখ, যন্ত্রণা, ঝড়-ঝঞ্ঝাই জীবনে আসুক না কেন, ওই মেয়েটাকে তার চাই-ই চাই। বরং সে থাকলে এই সব বিপৎসংকুল পথ সে পেরিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু কবে দেখা করবে হৃদি? মায়ের হাতে যে আর বেশি সময় নেই!
প্রতিটি দিন সে ঘুমাতে যায় তীব্র শঙ্কা নিয়ে। তার ঘুম ভাঙে অবর্ণনীয় আতঙ্কে। ওই বুঝি মায়ের ঘরে গিয়ে দেখবে, বিছানায় নিথর, নিষ্প্রাণ এক মৃতদেহ। আচ্ছা, সত্যি সত্যিই যখন এমন কিছু ঘটবে, তখন কী করবে সে?
এরপর আর ভাবতে পারে না অনিক। বরং মা যখন দুপুরবেলা একটু ঘুমায়, তখন সে দরজার বাইরে থেকে তাকিয়ে থাকে। কই, মাকে তো একবারও মৃত মানুষের মতো মনে হয় না তার। বরং এত শান্ত, স্নিগ্ধ আর মায়াময় মনে হয়! মনে হয়, টুক করে গিয়ে মায়ের কপালে একটা চুমু খেয়ে আসে! মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পায়ের কাছে বসে থাকে। মা মরে যাওয়ার পরে তাহলে কেমন লাগবে তাকে? মৃত্যুও তো একধরনের ঘুমই। তখন কি মায়ের মুখ অন্য রকম হয়ে যাবে? সেই অন্য রকমটা কেমন?
আচ্ছা, মায়ের মুখের মতো এমন মায়াময় মুখ কেন আর নেই পৃথিবীতে? এই যে এত এত দুঃখ-দহন-যন্ত্রণা, এসবের মধ্যেও সারা দিন পর যখন সে ঘরে ফেরে, তখন। মাকে দেখে মনে হয় একটা কনকনে ঠান্ডা জলের ঝরনাধারা যেন বুকের ভেতর অবিরাম বয়ে যেতে থাকে। কী শান্তি, কী আশ্চর্য স্থৈর্য আর আদর ওই মুখ, ওই হাসিতে!
ওই মুখ না দেখে সে থাকবে কী করে?
মায়ের এই না থাকার ভাবনাটুকুতে এসেই হৃদি হয়ে ওঠে অনিকের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। সে জানে, এক অকল্পনীয় বিভীষিকাময় জীবন তার সামনে। সেই জীবনে হৃদিকে তার ভীষণ দরকার। জগতে মাতৃহীন জীবনের চেয়ে ভয়ংকর অভিশাপ আর নেই। সেই অভিশপ্ত জীবনে কেবল হৃদিই তাকে খানিক মায়া দিয়ে, ছায়া দিয়ে আগলে রাখতে পারে। কিন্তু হৃদি কোথায়? কবে দেখা করবে সে?
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ফোনটা এল সেই রাতেই। হৃদি বলল, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই, অনিক।
অনিক হড়বড় করে বলল, কবে, কোথায়?
কালই।
কালই! অনিকের যেন বিশ্বাস হতে চায় না। কত দিন পর স্বদিকে দেখবে সে? নাকি কত বছর? এ যেন সহস্র জনমের তেষ্টায় খাক হয়ে যাওয়া বুকের গহিনে আজন্ম বৃষ্টির অপেক্ষা। অনিক বিড়বিড় করে বলে, তোমাকে আমি কত দিন দেখি না, তুমি জানো?
কত দিন?
মহাদেব সাহার ওই কবিতাটা পড়েছ?
কোন কবিতা?
তোমাকে দেখেছি কবে, সেই কবে, কোন বৃহস্পতিবার, আর এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না।
হৃদি কথা বলে না। অনিকের বুকের ভেতর যেন জ্বলতে থাকে দহনের নদী। অপেক্ষায় থাকে এক সমুদ্র জলের। সেই জল ছলছল সমুদ্রের নাম হৃদি। হৃদি কি তা জানে?
আচ্ছা, মায়ের এই ভয়ানক দুঃসংবাদটা শুনে কী করবে সে? নিশ্চয়ই কেঁদে বুক ভাসাবে। তারপর পাগলের মতো ছুটে আসবে। কিন্তু মাকে তো কিছুই বুঝতে দেওয়া। যাবে না। তার সামনে এমন কিছুই করা যাবে না যাতে সে ঘুণাক্ষরেও কিছু আঁচ করতে পারে। কিন্তু হৃদিকে সামলাবে কী করে সে?
এই নিয়ে কত কী ভাবে অনিক! সেই ভাবনায় তার বিদ্রি রাত কাটে। ভোরের আকাশ জেগে উঠতে থাকে। কাছের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসে আসোলাতু খাইরুম মিনান নাউম। অনিক ঘুম থেকে উঠে বসে। বহুদিন পর অজু করে জায়নামাজে বসে সে। তারপর হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। এই কান্নার উৎস সে জানে না। তবে সেই কান্নায় ভোরের ওই আবছা আলো যেন আরও ম্লান হয়ে যেতে থাকে। মা, মা গো, মা। অনিক নিজেকে আর সামলাতে পারে না। সে হঠাৎ মায়ের বুকের কাছে গিয়ে বসে। রাহিমা বানু চোখ মেলে তাকান। অনিক ফিসফিস করে ডাকে, মা। মা।
রাহিমা বানু জবাব দেন না। তবে উঠে বসেন। তারপর অনিকের মাথাটা কোলের সাথে চেপে ধরে বলেন, কী হয়েছে? হৃদির জন্য খারাপ লাগছে?
না, মা।
তাহলে?
আমি জানি না, মা। আমার খুব খারাপ লাগছে। কষ্ট হচ্ছে খুব।
কেন বাবা?
আমি জানি না, মা। খুব ভয় হচ্ছে আমার।
দুঃস্বপ্ন দেখেছিস?
অনিক হঠাৎ মাথা নাড়ায়, হ্যাঁ।
কী দুঃস্বপ্ন দেখেছিস?
দেখেছি তুমি হঠাৎ দূরে কোথাও চলে যাচ্ছ।
দূরে কোথায় যাব? এই তো বাড়ি গিয়ে কদিন থাকব। তারপর আবার চলে আসব।
অনিক কথা বলে না। সে মাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। ভোরের আলো ফুটতে থাকে। বাইরে কাকের কর্কশ ডাক শোনা যায়। কিন্তু মায়ের শরীরের ওই স্পর্শটুকু, ওই ঘ্রাণটুকু তাকে অপার্থিব আনন্দময় এক অনুভব দিতে থাকে।
.
হৃদিকে দেখে চমকে গেল অনিক। কেমন অচেনা লাগছে তাকে। আচ্ছা, তার চোখে কি কিছু হয়েছে? অনিক ঠিক বুঝতে পারছে না। তবে তার কেন যেন মনে হচ্ছে যে হৃদিকে সে চেনে, এত বছর ধরে দেখে এসেছে, সেই হৃদি এ নয়। এই হৃদির চোখের ভাষা অন্য রকম এবং তা সে পড়তে পারছে না। এমন নয় যে হৃদি খুব অন্য রকম হয়ে গেছে। বরং সে দেখতে আগের মতোই আছে। কিন্তু তারপরও তার ওই চোখের দৃষ্টিতে কিছু একটা আছে, যা তাকে বদলে ফেলেছে। মনে হচ্ছে, এই মানুষটা অন্য কেউ। এর সঙ্গে কথা বলতে হলে ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিতে হবে।
হৃদি বলল, কেমন আছ?
হা ভালো। তুমি?
আমি? উদ্দেশ্যহীন ভঙ্গিতে বলল হৃদি।
হ্যাঁ।
আমি…। বলে থমকাল সে। আমি…আসলে ঠিক বুঝতে পারছি না।
কেন?
হৃদি এই প্রশ্নের জবাব দিল না। অনিক বলল, কী হয়েছে তোমার?
কিছু হয় নি তো!
উঁহু। কিছু একটা তো হয়েছেই। সেটা কেবল বাবার মৃত্যুই না, অন্য কিছু।
নাহ্। অন্য কী হবে? বলে আবার আনমনা হয়ে গেল সে। ইতিউতি তাকাতে লাগল আশপাশে। অনিকের কেন যেন মনে হলো হৃদি তার চোখ লুকাতে চাইছে। সে বলল, আমার দিকে তাকাও।
হৃদি তাকাল। অনিক বলল, তুমি কি কোনো কারণে ভয় পাচ্ছ?
ভয় কেন পাব?
আমি জানি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তুমি কিছু লুকাতে চাইছ। কিংবা বলতে ভয় পাচ্ছ।
হৃদি হাসল, কী লুকাব? লুকানোর মতো কী আছে আমার? তার ঠোঁটে স্লান বিবর্ণ হাসি। চোখে শঙ্কার কালো মেঘ। কিন্তু কিসের শঙ্কা? কী হয়েছে তার? গুরুতর কিছু? অনিক অবশ্য সমস্যাটা ধরতে পারল না। হৃদি বলল, তুমি কেমন আছ? তোমার মা? উনি কেমন আছেন? শরীর ভালো?
মা…আছেন। আসলে…।
বলতে গিয়েও নিজেকে সংবরণ করল অনিক। সে আগে হৃদির সমস্যাটা শুনতে চায়। কে জানে, হয়তো মায়ের কথা শোনার পর নিজের সমস্যাটাই আর বলবে না সে। কেঁদেকেটে একাকার করে ফেলবে। তারা বসেছে একটা রেস্তোরাঁয়। চারপাশে মানুষ। এর মধ্যে কান্নাকাটি শুরু করলে বিপদ। সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। অনিককে চুপ। করে থাকতে দেখে হৃদি বলল, তুমি ভালো আছ?
অনিক জবাব দিল না। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হৃদির দিকে। হৃদি বলল, কথা বলছ না কেন?
তুমি কি জানো যে এই একই প্রশ্ন তুমি আমাকে এই নিয়ে তিনবার করেছ? বলল অনিক।
ওহ্! ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল হৃদি। তাই?
হুম।
সরি।
সরি কেন?
হৃদি কথা বলল না। চুপ করে রইল। অনিকের দিকে তাকাচ্ছে না সে। এদিক সেদিক দৃষ্টি ঘোরাচ্ছে। অনিক বলল, মায়ের কথা শুনবে না?
হুঁ। বলো।
তার আগে বলো সব শুনে তুমি শান্ত থাকবে।
আমি তো শান্তই আছি।
না মানে…মায়ের কথা শুনে। মানে, যদি…।
সমস্যা নেই, বলো। অস্থির ভঙ্গিতে বলল হৃদি।
গত প্রায় দুই মাস..জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সময়টা পার করছি আমি। আমি জানি তুমিও…।
হুম। বলে আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলল হৃদি।
সেদিন সন্ধ্যায় ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় ফিরলাম। তখনো সব ঠিকঠাক। কিন্তু পরদিন বিকেলে হঠাৎ করেই মা…।
হৃদি আচমকা হাত তুলে বলল, একটা কথা বলি?
বলো।
আমার না একটু তাড়া আছে। এই জন্য আগে আমার কথাটা বলি?
হৃদির আচরণে অবাক হলেও কিছু বলল না অনিক। প্রথম থেকেই কেমন অস্থির আর অমনোযোগী লাগছে তাকে। মনে হচ্ছে সে তার কথা শুনছে না। অন্য কিছু ভাবছে। সারাক্ষণ মনে মনে সেই ভাবনাটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বলার সুযোগ খুঁজছে। অনিক বলল, বলো।
হৃদি সরাসরিই কথাটা বলল, আই নিড ডিভোর্স।
মানে! অনিকের মনে হলো সে ভুল কিছু শুনছে।
হৃদি স্পষ্ট কণ্ঠে বলল, আমি তোমাকে দুয়েক দিনের মধ্যেই ডিভোর্স লেটার পাঠাব। আশা করছি এটা নিয়ে তুমি কোনো ঝামেলা করবে না। বলে সামান্য থামল। সে। তারপর বলল, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি, বাট কান্ট হেল্প। বাবা নেই, মা, রিলেটিভসরাও হঠাৎ এমন…। কথা শেষ না করেই থামল সে। তারপর বলল, আই অ্যাম গেটিং ম্যারেড সুন।
অনিক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। এসব কী বলছে সে!
হৃদি উঠে দাঁড়াল। তার ভঙ্গি ধীর, স্থির। কিন্তু তাতে তার ভেতরের অস্থিরতাটা লুকানো গেল না। সে বলল, আরেকটা কথা, আমি জানি আমি খুব জঘন্য একটা কাজ করছি। আই কুড বি দ্য ওয়াস্ট গার্ল অব দিস ওয়ার্ল্ড। হৃদির গলা কাঁপছে। কিন্তু যতটা সম্ভব শক্ত থাকার চেষ্টা করছে সে। অ্যান্ড আই একসেপ্ট ইট। এটা তোমাকে আর বলতে হবে না। বাট প্লিজ, ডু মি আ ফেভার। ডোন্ট মেক অ্যানি নুইস্যান্স প্লিজ। সে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। অনিক দীর্ঘ সময় তার দিকে তাকিয়ে রইল। হৃদি ভেবেছিল অনিক তাকে কিছু বলবে। হয়তো কান্নাকাটি করবে। জোরজবরদস্তি করবে। অনুরোধ করবে। কিংবা অন্য কিছু। কিন্তু অনিক তার কিছুই করল না। সে কেবল তাকিয়েই রইল। তার চোখ স্থির, নিষ্কম্প।
হৃদি বলল, প্লিজ!
অনিকের আচমকা মনে হলো, খানিক আগে হৃদির চোখের যে ভাষাটা সে পড়তে পারে নি, ভীষণ অচেনা লাগছিল, সেই ভাষা সে পড়তে পারছে। তার চোখে ঘোর। তীব্র নেশা। ওই নেশা থেকে পৃথিবীর কোনো শক্তিই আর তাকে ফেরাতে পারবে না। কিন্তু মায়ের জন্য খুব খারাপ লাগছিল তার। মনে হচ্ছিল, আর কিছুক্ষণ পরই তাকে ঘরে ফিরে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে মায়ের মুখোমুখি হতে হবে। মা তাকে হৃদির কথা জিজ্ঞেস করবেন। তখন কী করবে সে?
মাকে নিয়ে হয়তো কালই গ্রামে চলে যাবে। তারপর অপেক্ষায় থাকবে। মায়ের মৃত্যুর অপেক্ষায়। তারপর তাকে কবর দিতে হবে। উত্তর দিকে রাস্তার ধারে বাবার কবর, ওই কবরটার পাশেই হয়তো মায়ের কবর হবে। তারপর তাকে ঢাকায় ফিরে আসতে হবে। এই যে তার সামনে হৃদি দাঁড়িয়ে আছে, এই শহরেই। কিন্তু এই শহরে সে কেন ফিরবে? কার কাছে ফিরবে?
এই যে লোকে লোকারণ্য শহর, সকাল-সন্ধ্যা ভিড়ভাট্টা জাগে,
তবুও এমন একলা লাগার মানে, নিজের একটা মানুষ সবার লাগে!
এই শহরে কিংবা এই পৃথিবীতে তার নিজের বলে তো আর কিছু রইল না। কিচ্ছু না। তারপরও এই শহরে সে কেন ফিরে আসবে?
আচ্ছা, হৃদি এখনো দাঁড়িয়ে আছে কেন? সে কি তার কাছ থেকে নিশ্চয়তা চাইছে? কিসের নিশ্চয়তা? ভালো না বাসার নিশ্চয়তা? নাকি বিচ্ছেদের? বিচ্ছেদের নিশ্চয়তা না হয় মানুষ দিতে পারে, কিন্তু কেউ কি কাউকে কখনো ভালো না বাসার নিশ্চয়তা দিতে পারে? সেই ক্ষমতা কি মানুষের আছে?
হৃদি আচমকা ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। অসংখ্য মানুষের মাঝ দিয়ে ক্রমশ চোখের আড়াল হয়ে যেতে থাকল সে। অনিক তাকিয়েই রইল। তার চোখের কোলে কি এক ফোঁটা জল জমতে শুরু করেছে? অনিক জানে না। তবে সেই জলের ফোঁটাটাকে গড়িয়ে পড়তে দিল না সে। কেবল তার বুকের বাঁ দিক থেকে উঠে আসা আশ্চর্য সূক্ষ্ম এক ব্যথা চিনচিন করে ছড়িয়ে পড়তে লাগল শরীরজুড়ে। অনিক সেই ব্যথাটাকে গ্রাহ্য না করে পারল না। তার খুব দমবন্ধ লাগতে লাগল। মনে হতে লাগল, দুরারোগ্য এক ব্যাধি ক্রমশ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। কিন্তু ওই অসুখের নাম সে জানে না।
২৪
মাহমুদ হাসানের রুমের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রিয়া অভ্যস্ত গলায় বলল, মে আই কাম ইন স্যার?
দীর্ঘ ক্লাস নিয়েছেন মাহমুদ। ফলে খানিক ক্লান্ত তিনি। সেই ক্লান্তি মুছতেই চোখেমুখে জলের ঝাঁপটা দিয়ে কেবল চেয়ারে এসে বসেছিলেন। রিয়ার গলা শুনে চোখ তুলে তাকালেন। তারপর দরজায় দাঁড়ানো রিয়াকে দেখে যেন একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, খুব জরুরি কিছু, রিয়া?
জি স্যার।
আমি একটু ব্যস্ত। আপনি কি ঘণ্টাখানেক পরে আসতে পারবেন? মানে, যদি সমস্যা না থাকে?
একটু জরুরি ছিল।
ওহ। হতাশ গলায় বললেন মাহমুদ। আচ্ছা, আসুন।
রিয়া রুমে ঢুকল। তার হাতে একগাদা বই। সে সেগুলো টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রাখল। মাহমুদ দেখে বললেন, কোনো সমস্যা?
রিয়া গম্ভীর ভঙ্গিতে খানিক কী ভাবল। তারপর বলল, আপনার কি এমন কিছু কখনো হয়েছে যে আপনি সব বুঝতে পারছেন, কঠিন কঠিন বিষয়ও। কিন্তু আপাতদৃষ্টে খুব সহজ কোনো একটা বিষয় আপনি বুঝতে পারছেন না?
হুম। এমন তো হতেই পারে।
আমারও তেমন হচ্ছে।
পার্টিকুলার কোনো সাবজেক্ট?
রিয়া সাথে সাথেই জবাব দিল না। চুপ করে রইল। তারপর বলল, অ্যাস্ট্রোনমি থেকে অ্যানাটমি… ফিজিকস থেকে কেমেস্ট্রি, ম্যাথস…পড়লে কমবেশি সবই তো বুঝতে পারি। কিন্তু আই ক্যান্ট রিড মাইসেলফ।
মানে? ভ্রু কুঁচকে তাকালেন মাহমুদ।
মানে আমি আমাকে বুঝতে পারছি না।
আপনি আপনাকে বুঝতে পারছেন না মানে কী?
মানে…। বলে সামান্য থামল রিয়া। যেন সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কথাটা বলবে কি না। তবে শেষ পর্যন্ত বলল, আপনি এইমাত্র প্রায় দেড় ঘণ্টার একটা ক্লাস নিয়ে এলেন আমাদের, না?
হুম।
অথচ তারপরও আমার মনে হয়েছে আপনার সঙ্গে আমার আরও কথা বলা উচিত। অনেক কথা।
অনেক কী কথা?
তা তো জানি না। মানে, পার্টিকুলার কিছু না। কিন্তু বলা দরকার। কিংবা এমনও হতে পারে, মিনিংলেস কিছু। আপনি বলবেন, আমি শুধু শুনব। পৃথিবীর সব কথাই যে
অর্থপূর্ণ হতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই, তাই না?
মাহমুদ কিছু বললেন না। তিনি হতাশ চোখে রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাসখানেকের স্বেচ্ছানির্বাসনের পর বাড়ি থেকে ফিরে এসে রিয়া যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গত দু-তিন মাসে ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটিয়েছে সে।
মাহমুদের ধারণা, প্রথম প্রথম বিষয়টা হালকাভাবে নিলেও এখন তিনি মেয়েটাকে ভয় পান। অল্প ভয় না, বেশি ভয়। এমন অঘটনঘটনপটীয়সী মেয়ে তিনি জীবনে আর দেখেন নি।
রিয়া বলল, সরি স্যার, আসলে আপনার সঙ্গে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। আমি চেষ্টা করছিলাম নিজেকে বোঝাতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারি নি। অ্যান্ড দিস ইজ মাই প্রবলেম। আমি আমার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। বুঝতে পারলেও বোঝাতে পারছি না। আমি কি চেষ্টা কম করেছি? আপনি কিন্তু সাক্ষী। তাই না? আমার অবস্থায় থাকলে আপনি কী করতেন?
মাহমুদ কথা বললেন না। তিনি উদ্বিগ্ন বোধ করছেন।
স্যার?
মাহমুদ গম্ভীর গলায় বললেন, আপনার কি আর কোনো কথা আছে?
হুঁ। আছে।
কী কথা?
আপনি আমাকে আপনি আপনি করে বলেন, এটা আমার ভালো লাগে না।
আমি সবাইকেই আপনি করে বলি, রিয়া। শুধু আপনাকে না।
এই যে আপনি আমাকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করেন, এটাও আমার পছন্দ না।
রিয়া। শান্ত গলায় বললেন মাহমুদ। আপনাকে আমি কিছু কথা বলতে চাই।
জি বলুন?
আপনার এই বয়সটা আমি পার করে এসেছি না?
জি।
এই বয়সে আমাদের সবারই নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ভাবতে ভালো লাগে। একটু রেকলেস, আনকনভেনশনাল হতে ইচ্ছে করে। আর এ কারণে আমরা এমন কিছু উদ্ভট কাজ করি যে তাতে সবার মনোযোগ পাওয়া যায়। বাট…অ্যাট দ্য। এন্ড অব দ্য ডে, দিস উইল মেক ইউ আনইম্পর্ট্যান্ট টু আদারস।
রিয়া কথা বলল না। সে বুঝতে পারছে মাহমুদ তাকে আঘাত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাতে সে আহত হলো না। বরং ত্যাগ করার ভঙ্গিতে মৃদু ঠোঁট উল্টে হাসল।
মাহমুদ বললেন, আপনি যা করছেন, সেটার জন্য আপনার গিল্টি ফিলিং হয় না?
গিল্টি ফিলিং! যেন অবাক হলো রিয়া। কেন, গিল্টি ফিলিং হবে কেন?
এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবেন মাহমুদ? তিনি নিরুপায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, আমার সত্যি সত্যিই হেল্পলেস লাগছে, রিয়া। আপনি রাতবিরাত যখন-তখন আমাকে ফোন করবেন। ফেসবুকে মেসেজ পাঠাবেন। ডিপার্টমেন্টে রুমে চলে আসবেন। আপনার বোঝা উচিত যে আমি আপনার শিক্ষক। আর এটা অন্য সবার চোখে লাগতে পারে।
শিক্ষককে ছাত্রী ফোন করতে পারবে না?
নিশ্চয়ই পারবে। কেন পারবে না? কিন্তু আপনি কি বিষয়টাকে আর সেই জায়গাতে রাখছেন?
তাহলে? কোন জায়গায় রাখছি?
মাহমুদ জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে খেলেন। বললেন, রিয়া, আপনাকে নিয়ে আমার বাসায়ও সমস্যা হচ্ছে। কদিন আগে আপনি কিছু না জানিয়ে হুট করে আমার বাসায় চলে গিয়েছিলেন। বিষয়টা সুমি ভালোভাবে নেয় নি।
কেন? আপনার বাসায় আপনার স্টুডেন্টরা যেতে পারবে না? যায় না?
যায়। বাট আপনার বিষয়টা তেমন না।
তাহলে স্বীকার করছেন যে আমি অন্যদের চেয়ে আলাদা? চোখ সরু করে। কথাটা বলল রিয়া।
মাহমুদ হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, সুমিকে আপনি কী বলেছিলেন?
কী বলব?
আপনিই বলুন?
বলেছি সুমি আন্টি, মাহমুদ ভাইয়া আছেন?
সুমি আন্টিটা কে?
আপনার স্ত্রী।
আর মাহমুদ ভাইয়া?
আপনি! আমি ভাই হলে সুমি আপনার আন্টি হয়?
হা, হয়।
ওয়েল, কিন্তু আমি আপনার ভাই কী করে হই?
ভাই না, ভাইয়া হন।
দুটোয় পার্থক্য কী?
আছে।
কী পার্থক্য?
মেয়েরা যখন নিজের আপন ভাই ছাড়া অন্য কাউকে খুব নরম গলায় সুর তুলে আহ্লাদী স্বরে ভাইয়া বলে ডাকে, তখন বুঝতে হবে সামথিং ইজ রং। আসলে আপনার সঙ্গে তো আমার বিশাল জেনারেশন গ্যাপ, সো আপনি এসব বুঝবেন না।
রিয়া…। নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছেন মাহমুদ। আমি আপনার শিক্ষক। আপনি বয়সেও আমার থেকে অনেক ছোট। এগুলো আপনার মনে রাখা উচিত। আই অ্যাম অলমোস্ট অ্যান ওল্ড ম্যান।
ইউনিভার্সিটিতে তো আমি আপনাকে স্যারই ডাকি, তাই না? আর ওল্ড ম্যান। আমার ভালো লাগে। কী করব? ভাবছি আপনাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখব। উপন্যাসের নামও ঠিক করে ফেলেছি। নাম কী হবে জানেন?
মাহমুদ কথা বললেন না। ফ্যাকাশে চোখে তাকিয়ে রইলেন। এই মেয়ের থেকে তার মুক্তি কিসে কে জানে! রিয়া বলল, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের একটা বই আছে না, দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি? আমার বইয়ের নাম হবে দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য মি। নামটা। সুন্দর না?
মাহমুদ এবারও কথা বললেন না।
রিয়াই বলল, এটা কিন্তু মেটাফোরিক্যাল নাম। বুঝেছেন তো? এখানে আপনি হচ্ছেন ওল্ড ম্যান আর আমি হচ্ছি সি, মানে সমুদ্র। সি ইজ মি। অ্যান্ড ইউ আর দ্যাট ওল্ড-অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার। বলেই খিলখিল করে হাসল সে।
মাহমুদ কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। এই মেয়ের সাহস দিন দিন বাড়ছে। তাকে এখনই থামানো দরকার। কিন্তু কেন যেন তিনি তা পারছেন না। বরং কোথায় যেন একটা অন্য রকম অনুভব কাজ করছে। এই অনুভবটা তিনি স্বীকার করতে চান না। আবার পুরোপুরি অস্বীকারও করতে পারেন না।
মেয়েটার হাসি সুন্দর। সহজাত সরলতা আছে। চোখেমুখে সারাক্ষণ একটা অকপট উচ্ছ্বাস লেগে থাকে। কিন্তু এসব নিয়ে ভাবতে চান না তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রী সম্পর্ক নিয়ে এমনিতেই নানান গালগল্প প্রচলিত আছে। এত বছর শিক্ষকতার পর সেই গল্পে আর নিজেকে যুক্ত করতে চান না মাহমুদ। বরং যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্বেই থাকতে চান। কিন্তু এমন সর্বগ্রাসী, সর্বপ্লাবী কারও কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। তারপরও তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কে জানে কত দিন পারবেন!
সেদিন হঠাৎ করেই রিয়া তার বাসায় গিয়ে হাজির হয়েছিল। তারপর তার স্ত্রী সুমিকে বলেছে, হ্যালো আন্টি, মাহমুদ ভাইয়া আছেন?
সুমি তাকে চেনে। কিন্তু চট করে আন্টি ডাক শুনে হতভম্ব হয়ে গেল সে। বলল, সরি?
না, মানে আন্টি, মাহমুদ ভাইয়া আছেন? উনি আমাকে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু এখন ফোন ধরছেন না। আপনি কি একটু বলবেন যে উনি কখন আসবেন?
আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। সুমি দরজায় দাঁড়ানো রিয়ার দিকে বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। রিয়া অবশ্য তা গ্রাহ্য করল না। সে মৃদু হেসে বলল, আমার কথা বুঝতে পারছেন না, আন্টি? ওয়েল, ভাইয়া এলে বলবেন যে আমি এসেছিলাম। আজ যাই। পরে আবার আসব। বলে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে লাগল সে।
দরজায় দাঁড়ানো সুমি হতভম্ব চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। রিয়া তাকে আরও হতভম্ব করে দিয়ে সিঁড়ির নিচ থেকে হাত নেড়ে বলল, ভালো থাকবেন, আন্টি। আবার দেখা হবে। বাই।
এই নিয়ে শুরু হলো ভয়ানক অশান্তি। মাহমুদ এমনিতে চুপচাপ, নির্বিরোধ মানুষ। কিন্তু তারপরও শেষ অবধি বিষয়টা আর এড়াতে পারলেন না তিনি। অল্প সময়েই পুরো
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। সেই ঘটনার রেশ কেবল কাটতে শুরু করেছে। এর মধ্যে রিয়া যদি এখন আবার এমন কিছু করতে থাকে, তাহলে ভয়াবহ বিপদ। মাহমুদ নরম গলায় বললেন, রিয়া, আপনার কি মনে হয় না আপনি অতিরিক্ত করছেন?
হ্যাঁ, হয়।
তাহলে?
তাহলে কী?
আপনার উচিত না বিষয়টা এখানেই শেষ করা?
কী জানি! আমার কথা তো ভাবি নি। তবে আপনার কথা ভেবেছি।
আমার কথা কী ভেবেছেন?
ভেবেছি, আপনার তো কোনো উপায় নেই, স্যার।
রিয়ার কথা সত্য। গত এক বছর ধরেই এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজেছেন তিনি। কিন্তু পান নি। মেয়েটা পড়াশোনায় ভালো। কিন্তু ইচ্ছে করেই ড্রপ দিয়ে ফার্স্ট ইয়ারেই রয়ে গেছে। এর যৌক্তিক কোনো কারণও নেই। সে এমনই খেয়ালি, অবিমৃশ্যকারী। সমস্যা হচ্ছে, তার এই অপরিণামদর্শিতার শিকার হচ্ছেন এখন তিনি। এ নিয়ে কারও সঙ্গে কথাও বলা যায় না। বুদ্ধি-পরামর্শও নেওয়া যায় না। বিষয়টা ভীষণ সংবেদনশীল। পান থেকে চুন খসলেই বড় ধরনের বিপদে পড়ে যেতে পারেন তিনি। খুব কাছের বন্ধুদের সঙ্গে বার দুয়েক শেয়ার করারও চেষ্টা করেছিলেন। লাভ হয় নি। তারা বরং সমাধান দেওয়ার পরিবর্তে হাস্যরস করার চেষ্টা করেছেন। যেন জগতে এর চেয়ে আকর্ষণীয়, আনন্দদায়ক বিষয় আর নেই। দুয়েকজন তো রীতিমতো তাকে হিংসে করতে শুরু করেছেন। এই বয়সে এসেও নিজেকে এমন আকর্ষণীয় রাখার সিক্রেট জানতে চেয়েছেন।
মাহমুদ ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, আপনি আমার কাছে আসলে কী চান?
রিয়া সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল না। চুপ করে রইল। দীর্ঘ সময় পর খুব শান্ত, নরম গলায় বলল, সময়।
সময়?
হুম, সময়। বলে টেবিলের কাঁচে জমে থাকা জলের ফোঁটা আঙুলের ডগায় মিলিয়ে দিতে লাগল সে। তারপর বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, মানুষ তো মানুষের কাছে সময়ই চায়। সময় ছাড়া এই জীবনে আর কী চায় মানুষ?
কথাটা যেন বুকে গিয়ে বিঁধল মাহমুদের। আসলেই তো, মানুষ মানুষের কাছে সময় ছাড়া আর কী চায়? কিছুই না। এই জীবন যদি অন্তহীন সময়ের ভগ্নাংশ হয়, তবে সেই জীবন থেকে মানুষ আবার ওই সময়ই চেয়ে বেড়ায়। একাকিত্বে সাহচর্যের সময়। বিষাদে আনন্দের সময়। আনন্দে উদ্যাপনের সময়। কিন্তু সময় ক্রমশই ধূসর আর বিবর্ণ হয়ে যেতে থাকে। মানুষকে করে দিতে থাকে নিঃসঙ্গ, একা।
মাহমুদের হঠাৎ মনে হলো, এই সত্য তার চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। উপলব্ধি করে না।
২৫
রোখসানা বেগম সব শুনে হতভম্ব ভঙ্গিতে বসে রইলেন। হৃদি বলল, আমি এখন কী করব?
রোখসানা বেগম কথা বললেন না। তিনি তাকিয়ে আছেন হৃদির চোখের দিকে। তার চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। সেখানে অচেনা মানুষের প্রতিচ্ছবি। এমন হদিকে এর আগে কখনো দেখেন নি তিনি। হৃদি বলল, মা, আমার যা বলার আমি তোমাকে বলেছি। আমার সিদ্ধান্তও জানিয়েছি। এখন বাকি কাজ তোমার।
আমার কী কাজ?
বিয়ের ব্যবস্থা করা।
আমি বললাম আর ফট করে বিয়ে হয়ে গেল?
তুমি তো তা-ই চাইতে। চাইতে না? তোমার চাওয়াই তো এখন পূরণ হচ্ছে।
তুই যে আমাকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করে ফেলবি, এটা আমি জানতাম? এটা আমি চেয়েছি?
মানুষের চাওয়ামতো তো আর সবকিছু হয় না। হয়? তোমার চাওয়ার বাইরে ওই ঘটনা ঘটেছে। এখন বাকি ঘটনা তোমার চাওয়ামতো হবে। বলে সামান্য থামল হৃদি। তারপর বলল, এখন বলো, আমি কী করব?
তুই কী করবি সেটা আমি বলব?
হুম।
আমার টেবিলের ওপর একটা পার্স আছে। পার্সে টাকা আছে। টাকা নিয়ে গিয়ে দোকান থেকে ভালো দেখে এক বোতল বিষ কিনে আনবি। তারপর দুপুরে গরম ভাতের সঙ্গে সেই বিষ মেখে খেয়ে ফেলবি।
আমি বিষ খাওয়ার মতো কিছু করি নাই, মা।
তুই যা করছিস, তা বিষ খাওয়ার চেয়েও খারাপ। তুই আমার মেয়ে না হয়ে অন্য কারও মেয়ে হলে আমি যে ভাষা ব্যবহার করতাম, সেই ভাষা শুনে তোর বমি চলে আসত।
চেষ্টা করে দেখতে পারো। হৃদির কণ্ঠ ঠান্ডা। দৃষ্টি স্থির।
রোখসানা বেগম বেশ খানিকটা সময় চুপ করে রইলেন। তারপর অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বললেন, তুই সত্যি করে বল তো, তুই কি আসলেই ওই ছেলেকে বিয়ে করেছিস? নাকি আমার সঙ্গে আবারও কোনো ট্রিকস করছিস?
এক কথা বারবার বলতে ভাল্লাগে না, মা। তুমি এখন ডিভোর্স দেওয়ার ব্যবস্থা করো।
বিয়ে করেছিস তুই, আর ডিভোর্স দেব আমি?
আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে বলি নি। দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলেছি।
ডিভোর্স কি মুখের কথা যে বললাম আর হয়ে গেল? আর ওই ছেলে যদি কোনো ঝামেলা করে?
করবে না।
তোকে বলেছে?
বলে নি। কিন্তু আমি ওকে চিনি।
কী চিনিস?
সেটা তোমার জানতে হবে না।
জন্ম দিয়ে এত দিন লালন-পালন করেও তো তোকে আমি চিনতে পারলাম না!
আমাকে তোমার চিনতে হবে না। যা বলেছি, তুমি সেটা করো।
নেহাল যদি এখন তোর বিয়ের বিষয়টা জানে? ওই ছেলে যদি জানায়?
জানাবে না।
তুই কী করবি? জানাবি?
এই প্রশ্নে হৃদি কথা বলল না। সে বিষয়টা নিয়ে ভেবেছে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না। আসলেই কি সে ঘটনাটা নেহালকে খুলে বলবে? নাকি চেপে রাখবে? কিন্তু এই নিয়ে যদি পরে কোনো ঝামেলা হয়? তা ছাড়া বিষয়টা নৈতিকভাবেও ঠিক হবে না।
রোখসানা বেগম বললেন, কী হলো, কথা বলছিস না কেন? এত বড় ঘটনা তুই চেপে যাবি?
বুঝতে পারছি না, মা। একবার ভেবেছিলাম বলব। এত বড় ব্যাপার লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না। কিন্তু ওর প্রতিক্রিয়া দেখে আর সাহস পাই নি। আকারে ইঙ্গিতে কিছুটা বলার চেষ্টা করেছি। ও অবশ্য ভেবেছে আমি ফান করছি।
রোখসানা বেগম চুপ করে রইলেন। হৃদি বলল, তুমি অনিককে নিয়ে ভেবো না। ও কিছু করবে না। ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিলে চুপচাপ সাইন করে দেবে। তুমি ডিভোর্স লেটার পাঠানোর ব্যবস্থা করো।
.
অনিককে ডিভোর্স লেটার পাঠানো হলো স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে। তবে তার আগে এক খাঁ খাঁ দুপুরে রোখসানা বেগম তাকে ফোন করলেন। অনিক ফোন ধরে বলল, কে বলছেন?
আমি হৃদির মা।
মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গেল অনিক। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, আচ্ছা।
কেমন আছ তুমি?
জি ভালো।
তোমার মা?
ভালো।
আর সবাই?
ভালো।
রোখসানা বেগম এরপর আর কথা খুঁজে পেলেন না। তিনি বুঝতে পারছেন না পরের কথাগুলো কীভাবে বলবেন। তা ছাড়া অনিকের কাছ থেকে এমন নির্লিপ্ত আচরণও তিনি আশা করেন নি। অনিক বলল, আপনি কি কিছু বলবেন?
রোখসানা বেগম জবাব দিতে পারলেন না। কী বলবেন তিনি? কীভাবে বলবেন? অনিক বলল, সমস্যা নেই, আপনি বলুন। তা ছাড়া আমাকে মার কাছে যেতে হবে। বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারব না আমি।
কেন?
মায়ের শরীরটা একটু খারাপ। তার সঙ্গে বেশির ভাগ সময়ই কাউকে না কাউকে থাকতে হয়। একা রাখা যায় না।
কী হয়েছে ওনার? যেন কথা বলার প্রসঙ্গ খুঁজে পেলেন রোখসানা বেগম।
তেমন কিছু না। আপনি বলুন।
রোখসানা বেগম অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই কথা বললেন না। বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন, না, মানে হৃদি আর তোমার বিষয়টা আমি শুনেছি। কিন্তু… মানে হৃদি মনে হয় তোমাকে…। বলতে গিয়েও কথা শেষ না করেই থেমে গেলেন তিনি।
অনিক শান্ত গলায় বলল, আমি শুনছি, আপনি বলুন।
আসলে হৃদি…। বলেই হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টালেন রোখসানা বেগম। বললেন, আমার মনে হয় কথাগুলো ফোনে না বলে সামনাসামনি বললেই ভালো হতো, অনিক। আমি কি তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারি?
কেন?
কথাগুলো বুঝিয়ে বলার জন্য। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ফোনে কথা বললে অনেক সময়ই ভুল-বোঝাবুঝির অবকাশ থাকে। সামনাসামনি বললে হয়তো অনেক কঠিন কথাও সহজে বুঝিয়ে বলা যায়।
আমার বরং উল্টোটাই মনে হয়।
কী?
যেসব কথা খুব কঠিন, সেসব বলার জন্য আড়াল দরকার হয়। সব কথা মুখোমুখি বলা যায় না।
কথাটা মনে ধরল রোখসানা বেগমের। অনিককে তিনি যে কথাগুলো বলতে চান, সেগুলো আসলেই সহজ কোনো কথা নয়। এসব চট করে কারও মুখের ওপর বলেও দেওয়া যায় না। কিন্তু তার সামনে আর কোনো পথও খোলা নেই।
অনিক বলল, আপনি সম্ভবত ভাবছেন আমি কোনো ঝামেলা করব। কিন্তু আপনার ভাবনা ঠিক না।
তুমি আমাকে ভুল বুঝছ।
অনিক মৃদু হাসল, আচ্ছা, ভুল বুঝব না। আপনি বলুন?
আসলে…। হৃদির বয়স অল্প। ও একটু ইমোশনাল, একরোখা। তুমি তো জানোই, হুটহাট ঝোঁকের মাথায় অনেক কিছু করে বসে ও। পরে যখন নিজের ভুলটা বুঝতে পারে, তখন…।
আপনি কিছু মনে না করলে আমি একটা কথা বলি? রোখসানা বেগমকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল অনিক।
হ্যাঁ, বলো?
আসলে আমাকে ফোনটা রাখতে হবে। মা ডাকছেন। আমি বরং একটা কাজ করি?
কী কাজ?
আমি আপনাকে আমার গ্রামের বাড়ির ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিই?
মানে? আমি তোমার গ্রামের বাড়ি গিয়ে কী করব?
অনিক আবারও হাসল। মৃদু, ম্লান হাসি, আপনি না। আপনি বরং আমার গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় ডিভোর্স লেটারটা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। আমি সাইন করে দেব।
তুমি এখন গ্রামে?
হুঁ।
বলে চুপ করে রইল অনিক। রোখসানা বেগমও। তিনি ভেবেছিলেন অনিক তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবে। চিৎকার-চেঁচামেচি করবে। তেমন হলে অনিকের ভেতরের অবস্থা অন্তত কিছুটা হলেও আঁচ করা যেত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটি সম্ভব নয়। বরং এই ছেলের অন্তর্জগতের খবর সে নিজে ছাড়া আর কেউ জানে না। এমন নির্বিকার, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সে কথা বলবে, সবকিছু মেনে নেবে, এটা তিনি আশা করেন নি। কিন্তু তেমন কিছু না হওয়া সত্ত্বেও মনে মনে শঙ্কিত বোধ করতে লাগলেন রোখসানা বেগম। তার হঠাৎই মনে হলো, এই ধরনের মানুষ বিপজ্জনক। এদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সহসা ধারণা করা যায় না।
তোমার মায়ের শরীর কি বেশি খারাপ? যেন অযথাই প্রশ্নটা করলেন তিনি।
অনিক সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, আমি যদি এখন ফোনটা রাখি, আপনি কি কিছু মনে করবেন? তার গলা শান্ত, স্বাভাবিক। রোখসানা বেগম জবাব দিলেন না। তার কেন যেন মনে হচ্ছে ফোনের ওপাশের মানুষটাকে হৃদি যত সহজ ভাবছে, সে তত সহজ নয়। বরং সে আর সকলের চেয়ে কঠিন, দৃঢ়। এমন মানুষের অনুভূতি প্রখর হয়। কিন্তু সেই অনুভূতি তারা কখনো প্রকাশ করতে পারে না। ফলে অন্যরা তাদের সম্পর্কে দ্বিধান্বিত হয়। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, তুমি হৃদির ওপর রাগ রেখো না, বাবা। আসলে…।
রোখসানা বেগম তার কথা শেষ করতে পারলেন না। তার আগেই ফোন কেটে দিল অনিক। তিনি দীর্ঘ সময় বন্ধ ফোনখানা কানে চেপে ধরে বসে রইলেন। যেন খানিক আগে ফোনের ওপাশে থাকা মানুষটার না-বলা কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন। পড়তে চেষ্টা করতে লাগলেন তার নিস্তব্ধতার ভাষা। কিন্তু পারলেন না। বিষয়টা তার মধ্যে অজানা এক আশঙ্কা তৈরি করতে লাগল। মনে হতে লাগল, অনিকের এই নীরবতা কোনো প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস।
.
তারপরও সবকিছুই হতে লাগল অতি দ্রুত। হৃদির ডিভোর্স-সম্পর্কিত প্রক্রিয়াও এগোতে লাগল ঠিকঠাক। সে অবশ্য বার কয়েক অনিককে ফোন করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ অবধি আর হয়ে উঠল না। রোখসানা বেগমের শঙ্কাও ভুল প্রমাণিত হলো। কোনো ঝামেলা ছাড়াই ডিভোর্স লেটারে সাইন করে দিল অনিক। সবকিছু যে এত সহজে, এত দ্রুত ঘটে যাবে, এটা কারও কল্পনাতেই ছিল না। অনিকের সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা থাকা সত্ত্বেও হৃদির কিঞ্চিৎ আশঙ্কা ছিল যে শেষ অবধি না কোনো একটা ঝামেলা পাকিয়ে বসে সে। কিন্তু তার এমন ভাবলেশহীন, নিরুপদ্রব প্রতিক্রিয়ায় হৃদিও খানিক অবাক হয়ে গেল।
অনিক কি তবে মনে মনে এটাই চেয়েছিল? সে-ও কি তবে কোনো একটা বাহানায় এই সম্পর্কের জোয়ালটা তার কাধ থেকে নামিয়ে দিতে চেয়েছিল?
এই ভাবনাও ক্ষণে ক্ষণে হৃদিকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগল। তার মনে হতে লাগল, অনিক তার এই বিরূপ-বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে হয়তো সর্বান্তঃকরণেই মুক্ত, ভারহীন হতে চাইছিল। হৃদিকে বহন করার ক্ষমতা তার ছিল না। আর এ কারণেই সে-ও মনে মনে একটা অজুহাত খুঁজছিল এবং হৃদি নিজ থেকেই সেই সুযোগটা তাকে করে দিল!
ভাবনাটা চকিতে কয়েকবার মনের অলিগলি ঘুরে গেলেও তাতে খুব একটা স্থির হতে পারল না হৃদি। সে বরং ব্যস্ত হয়ে পড়ল নেহালকে নিয়ে। তাকে এখনো এ বিষয়ে কিছুই বলা হয় নি। এমনকি এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না সে। সেদিন বিষয়টা নিয়ে মায়ের সঙ্গে তার কথাও হলো। হৃদি বলল, তুমি একটা বুদ্ধি দাও তো, মা।
আমি কী বুদ্ধি দেব?
নেহালকে কি আমি ঘটনাটা বলব?
বুঝতে পারছি না।
ও খুব ভালো ছেলে, মা। মনটা খুব নরম। বললে হয়তো একটু মন খারাপ বেকরবে। রাগ করে থাকবে। কিন্তু তারপর ঠিকই সব মেনে নেবে। কারণ, আমাকে ছেড়ে
ও থাকতে পারবে না।
তুই পারবি?
মানে?
মানে সব শুনে ও যদি বেঁকে যায়? বিয়েতে রাজি না থাকে, তখন? তখন কি তুই ওকে ছাড়া থাকতে পারবি?
এই প্রশ্নে চুপ হয়ে গেল হৃদি। আসলেই, নেহালকে ছাড়া সে থাকতে পারবে না।
জীবন কী আশ্চর্য রহস্যে মানুষের অনুভবের দেয়ালে অসংখ্য চোরাগলির গোপন দরজা লুকিয়ে রাখে। সেই সব দরজা কখন কোন ফাঁকে হুটহাট খুলে যায়, মানুষ তা টেরই পায় না। কিংবা যখন পায়, তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করে সেই সব চোরাগলির মাঝপথে। সেখান থেকে তার ফিরে যাওয়ার আর উপায় থাকে না। সে নিজের অজান্তেই ততক্ষণে হেঁটে গেছে অনেকটা পথ।
নেহালও তেমনই এক চোরাগলির গোপন দরজা। হৃদি আলগোছে অজান্তেই সেই দরজা পেরিয়ে ঢুকে গেছে সম্মোহনী এক অনুভবের জগতে। ওই জগৎ থেকে ফিরে আসবার পথ তার জানা নেই। ফলে নেহালকে হারানোর ভয়ে সে জড়সড় হয়ে যেতে থাকে। আর ঝাপসা হয়ে যেতে থাকে অনিক।
তবে এত কিছুর মধ্যেও ওই একটা বিষয়ই সারাক্ষণ তটস্থ করে রাখে তাকে। অনিকের সঙ্গে তার বিয়ের ঘটনাটা সে নেহালকে বলবে কী করে? বললে যদি নেহাল ফিরে যায়? আবার না বলেও স্বস্তি পায় না সে। নিজেকে অতটা অনৈতিক ভাবতে মন সায় দেয় না তার। ফলে এক প্রবল দ্বিধা ও দ্বন্দ্বে কেটে যেতে থাকে সময়। ওই দ্বিধা কাটাতেই আকারে-ইঙ্গিতে নানা কিছু বলতে চেষ্টা করে সে। তবে নেহাল তার কতটুকু বুঝতে পারে, তা স্পষ্ট নয়।
হৃদি সেদিন বলল, মানুষ কি তার অতীতে বাঁচে, না বর্তমানে?
নেহাল বলল, অতীত হলো শিকড় আর বর্তমান তার বৃক্ষ।
তার মানে মানুষ কেবল তার বর্তমান নিয়ে বাঁচতে পারে না?
পারে। তবে অতীতকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে নয়। ধরো বৃক্ষবিহীন শাখা যেমন হয় না, তেমনি শিকড়বিহীন বৃক্ষও না। ভবিষ্যৎ হলো বর্তমানের শাখা। অতীত হলো শিকড়। এরা কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচতে পারে না।
তুমি এত কঠিন করে কথা বলা কবে শিখলে?
নেহাল হাসল, কঠিন তো নয়। আজ যা বর্তমান, কাল তা অতীত। তাই না? আবার আজ যা ভবিষ্যৎ, আগামীকাল তা বর্তমান। এটা অনেকটা সিঁড়ির মতো। প্রথম ধাপ না পেরিয়ে দ্বিতীয় ধাপে যেমন পৌঁছানো যায় না, তেমনি দ্বিতীয় ধাপ পেরিয়েই অন্য ধাপে পৌঁছাতে হয়। তার মানে প্রতিটি মুহূর্তই ইম্পর্ট্যান্ট। একটি ছাড়া অন্যটাতে পৌঁছানো যায় না।
হৃদি কথা বলল না। নেহাল বলল, যে সিঁড়ির প্রথম ধাপ নেই, তার শেষ ধাপও থাকে না।
কিন্তু কেউ যদি ভুলে অসতর্কতায় পা হড়কে আবার উঠে দাঁড়াতে চায়? ভাঙা, জীর্ণ কোনো ধাপে হোঁচট খেয়ে পা কেটে ফেলে, তারপর আলগোছে সেটিকে ডিঙিয়ে পরের ধাপে চলে যায়, তখন কি আর সে ওই ফেলে আসা ধাপটার দিকে তাকাতে চাইবে? কিংবা এতে তার বর্তমান, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে?
তা যাবে না। কিন্তু জীবন কেমন, জানো তো?
কেমন?
জীবন হচ্ছে দর্শন। তুমি কীভাবে দেখছ, তা-ই তোমার জীবন। কিংবা তুমি। এখানে দৃষ্টিভঙ্গিটাই আসল।
দৃষ্টিভঙ্গিই জীবন?
হুম। জীবন হচ্ছে তা-ই, যেভাবে তাকে তুমি উপলব্ধি করছ। দেখছ। তুমি যদি ভাবো ওই ভাঙা ধাপটা তোমার জীবনের ভুল, ক্ষতির কারণ, সেটাকে তুমি ভুলে যেতে চাও, তাহলে সেটা যেমন সত্যি, তেমনি আবার এটাও হতে পারে যে ওটা তুমি ভুলতে চাও না। বরং মূল্যবান এক অভিজ্ঞতা হিসেবে মনে রাখতে চাও। তখন সেই অভিজ্ঞতা তোমার জীবনের বাকি সিঁড়ির ধাপগুলোতে তোমাকে আরও সাবধানে পা ফেলতে সাহায্য করবে।
হৃদি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না। বেশ খানিকটা সময় চুপ করে থেকে বলল, যদি আমার জীবনেও তেমন কোনো গল্প থাকে! ভুলের গল্প। যেই ভুল থেকে ওই উপলব্ধিটুকু আমার হয়েছে যে আমি আর ভুল করতে চাই না। তাহলে?
তাহলে কী?
তাহলে জীবনের পরের ধাপের মানুষগুলো কি আমার ওই ভুলটাকে মেনে নেবে?
কেন নেবে না? কেউ যখন তোমাকে ভালোবাসবে, সত্যি সত্যি তোমার পথ চলার সঙ্গী হতে চাইবে, তখন সে তোমার সবকিছু নিয়েই ভালোবাসবে। তোমার ভুল, শুদ্ধ, শক্তি, সীমাবদ্ধতা। সব।
তুমিও?
কেন, সন্দেহ আছে?
না না, তা না। তবে অনিকের সঙ্গে সম্পর্কটা নিয়ে আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তুমি যদি কখনো ওটা নিয়ে আমাকে কষ্ট দাও? আঘাত করো?
তাহলে এভিলিনকে নিয়ে তুমিও তো আমাকে আয়নার সামনে দাঁড় করাতে পারো। পারো না?
কিন্তু আমাদের সবার দেখার ভঙ্গি তো এক নয়। আমি যেভাবে দেখি, ভাবি, তুমি তো সেভাবে না-ও ভাবতে পারো।
তুমি কীভাবে ভাবো?
আমি? বলে সামান্য থমকাল হৃদি। যেন কী ভাবল। তারপর বলল, এভিলিনকে ভালোবাসার যে অসম্ভব ক্ষমতা আমি তোমার মধ্যে দেখেছি, এত দিন পরও একজন মৃত মানুষকে যে এতটা ভালোবাসতে পারে, তার সেই ভালোবাসার সামান্যও যদি আমি পাই, তাহলে এ জীবনে আর কিছু চাই না আমার। হয়তো পেয়েছিও। ফলে তোমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ–সবই আমার কাছে কেবল তোমার ওই ভালোবাসতে পারার অদ্ভুত ক্ষমতায় পরিমাপযোগ্য।
তাহলে তোমার অতীত সম্পর্কে আমার অনুভূতি নিয়ে তোমার সংশয় কেন?
এই প্রশ্নে চুপ করে গেল হৃদি। কী জবাব দেবে সে? বলবে অনিকের সঙ্গে তার সম্পর্কের সবটুকু? নেহাল কি তা মেনে নিতে পারবে? হয়তো পারবে। কিন্তু যদি না নেয়? তখন কী হবে?
এই দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারে না হৃদি। বরং সারাক্ষণ আলপিনের মতো বিধে যেতে থাকে তার মন ও মগজে। নেহাল বলে, তুমি কি কোনো কারণে ভয় পাচ্ছ?
হুম। স্বীকার করে হৃদি।
অনিক তোমার কোনো ক্ষতি করবে, এই ভয়?
না। মাথা নাড়ে হৃদি।
তাহলে?
আসলে আমাদের সম্পর্কটা কেমন অদ্ভুত। একটা ঘোরের মতো। এখন মনে হচ্ছে যা কিছু ঘটেছিল, তার সবই একধরনের ঝোঁক। কিন্তু ঝোঁকের মাথায় তুমি যদি বড় ধরনের কোনো ভুল করে ফেলো, তা তো আর শুদ্ধ হয়ে যায় না। তাই না? তা ভুলই থেকে যায়।
কিন্তু ভুল বুঝতে পেরে কেউ যখন সেই ভুল পথ থেকে সরে আসে, অনুশোচনায় ভোগে, তখন তো আর তাকে দোষ দেওয়া যায় না। যায়?
তা যায় না। কিন্তু ওই যে অনিকের সঙ্গে আমার বিয়ের বিষয়টা…? কথা শেষ করতে পারে না হৃদি। তার আগেই নেহাল হাসিতে ফেটে পড়ে। বলে, তুমি এত ছেলেমানুষ, বুঝলে?
কেন?
ও রকম একটা সিনেমা সিনেমা ব্যাপার নিয়ে কেউ এত সিরিয়াস হয়?
ওটা ঠিক সিনেমা সিনেমা ব্যাপার না, নেহাল। আমি তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারছি না। কিংবা বলতে পারছি না।
নেহাল অকস্মাৎ কাছে সরে আসে হৃদির। তারপর দুহাতে তাকে বুকের ভেতর টেনে নেয়। তারপর গভীর আশ্লেষে ঠোঁট টেনে নেয় ঠোঁটের ভেতর। ফিসফিস করে বলে, তোমার অত কিছু বলতে হবে না। বোঝাতেও হবে না। এখন থেকে আমরা আমাদের না-বলা কথাগুলো বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব। এই চেষ্টাটাই আসল। একটা সময় দেখবে, না বলতেও আমরা আমাদের বুঝে ফেলতে পারব। আমাদের অভিমান, কষ্ট, ভালোবাসা–সব। এই জন্য খানিক সময় তো আমাদের নিজেদের দিতে হবে, তাই না?
হৃদি আর কথা খুঁজে পায় না। তার চোখের কোলে জল জমে। এমন ভালোও হয় মানুষ? এমন করে ভালোবাসতে পারে? অনিককে নিয়ে অপরাধবোধের যে সূক্ষ্ম কাঁটা তার বুকের ভেতর খচখচ করছিল, তা ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকে। মিইয়ে যেতে থাকে নেহালকে নিয়ে সংশয়ও। সময় কেটে যেতে থাকে চড়ই পাখির ডানায়। আর মাত্র কটা মাস। তারপর এই মানুষটা পুরোপুরি তার হয়ে যাবে। হয়ে যাবে জীবনের বাকি পথের নির্ভার, নিশ্চিন্ত সঙ্গী। যে তাকে শক্ত করে ধরে রাখতে পারবে। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে প্রবল আত্মবিশ্বাসে দাঁড় করাতে পারবে। তারপর হেঁটে যেতে পারবে বহুদূর পথ। সেই পথে অনিক ক্রমশই বিস্মৃত হতে থাকবে। মুছে যেতে থাকবে তার ছায়া ও ছবি। বিভা ও বিভ্রম।
২৬
অবন্তী এসে উঠেছে হলে রিয়ার রুমে। তারা একই বিছানা ভাগাভাগি করে ঘুমায়। বিষয়টা অবন্তীর পছন্দ না। কারও সঙ্গে বিছানা শেয়ার করতে অভ্যস্ত নয় সে। কিন্তু। চাইলেই তো আর চট করে হলে সিট পাওয়া যায় না। আগে কোনোভাবে একটা রুমে উঠে যেতে হয়। তারপর অপেক্ষায় থাকতে হয় কোনো সিট ফাঁকা হওয়ার। এতে দ্রুত সিট পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বুদ্ধিটা রিয়ার। সে এই কারণেই অবন্তীকে তার রুমে নিয়ে এসেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বুদ্ধিটা কাজেও লেগেছে। রুমের সিনিয়র এক আপুর সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেছে অবন্তীর। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই হল ছেড়ে দেবেন। তখন অনায়াসে তার সিটের দখল নিতে পারবে অবন্তী। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি হল ছাড়ছেন না। আবার তার মুখের ওপর কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছে না অবন্তী। সে বরং মাঝে মাঝেই রিয়াকে বলে, তুই একটু
আপুকে বল না?
কী বলব?
উনি কবে যাবেন?
কেন?
কেন মানে? আর কত দিন আমরা ডাবলিং করব?
সারা জীবন।
মানে কী?
মানে তোকে আর আমি ছাড়ছি না। এমন নরম তুলতুলে পাশবালিশ আমি আর কই পাব? নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে রিয়া।
অবন্তী হাতের উল্টো পিঠে তার মাথায় চাটি মারে, ফাজলামো রাখ। তুই একটু জিজ্ঞেস কর না?
ফাজলামো না। সত্যি বলছি। চিন্তা করেছি ওল্ড ম্যানকে আর বিয়ে করব না। ওই বুড়ো হাড়ে ঠনঠন বাড়ি খাওয়ার চেয়ে তোর তুলতুলে শরীর লেপ্টে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেব। আইডিয়া কেমন?
খুবই বাজে। জঘন্য।
কোনটা?
দুটোই।
তার মানে ওল্ড ম্যানও নেই, তুইও নেই? তাহলে আমার জীবনে আর রইলটা কী?
অবন্তী অনেক চেষ্টা করেও আর সেদিন অন্য কিছু মাথায় ঢোকাতে পারল না। রিয়ার। তবে পরদিন হঠাৎ তাকে চমকে দিল রিয়া। বলল, যাবি আমার সঙ্গে?
কোথায়?
ডেটিংয়ে।
ধ্যাৎ। সব সময় ফান।
ফান না। সিরিয়াস। তোকে আজ একটা ভূত দেখার অভিজ্ঞতা দেব।
ভূত দেখার অভিজ্ঞতা কী?
ভূত দেখার অভিজ্ঞতা হলো হঠাৎ অকল্পনীয় কিছু দেখে চমকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলার অভিজ্ঞতা।
কী সেটা?
চল। নিজের চোখেই দেখতে পাবি।
নিজের চোখে দেখার আগে একটু হিন্টস দিয়ে রাখ। পরে যদি ভূত দেখে চমকে গিয়ে নিজেই মরে ভূতটুত হয়ে যাই?
আমার প্রেম হয়েছে। আজ প্রথম বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।
ঘ্যাট! বলে গাল বকল অবন্তী। তুই সারাক্ষণ কেন এমন হেঁয়ালি করিস? একটু সিরিয়াস হতে পারিস না?
রিয়া প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, হেঁয়ালি করলাম কই? আমি সত্যিই বললাম। কিন্তু আমি যা-ই বলি, তা-ই তোদের কাছে হেঁয়ালি মনে হয়। এখন আমি কী করব বল?
আচ্ছা, কিছু করতে হবে না। কিন্তু তুই তোর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ডেট করতে আমাকে নিয়ে যাবি? এখন আবার বলিস না যে এটাও সিরিয়াস?
রিয়া হঠাৎ খিলখিল করে হাসল। বলল, সমস্যা কী? গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে জাস্ট ফ্রেন্ড ফ্রি! স্পেশাল অফার। ভালো না? একের ভেতর দুই, আমি আর তুই।
ধুর! এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল অবন্তী। সবকিছু নিয়ে এত ফাজলামো ভালো লাগে না রিয়া। বলে উঠে দাঁড়াল সে। তার মুখ থমথমে। রিয়া হঠাৎ তার হাত টেনে ধরল। তারপর বলল, সরি। আর ফান করব না। এবারই শেষ। এই দেখ, কান ধরছি। বলেই সে অবন্তীর কান মুচড়ে দিল। তীব্র যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ছিটকে দূরে সরে গেল অবন্তী। রিয়া শরীর কাঁপিয়ে হাসতে লাগল। যেন তার জীবনে এর চেয়ে আনন্দময় কিছু আর নেই। অবন্তী বেশ খানিকটা সময় তার দিকে তাকিয়ে থেকে হনহন করে হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
.
পরদিন সন্ধ্যায় অবশ্য সত্যি সত্যিই চমকে গেল অবন্তী এবং তা চোখের সামনে হঠাৎ ভূত দর্শনের চেয়ে কম কিছু নয়। ধানমন্ডির যে রেস্তোরাঁটায় তারা গেল, তা বেশ চুপচাপ, নির্জন। লোকজনের ভিড় একদমই নেই। পরিচিত স্প্যানিশ গানের টুংটাং সুর বাজছে গিটারে। একটা আবছায়া ধোঁয়াশা যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে চারপাশ। যে দুয়েকজন মানুষ এখানে আছে, আধো আলো-অন্ধকারে তাদের মুখও দেখা যাচ্ছে না। তবে রিয়াকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে অবন্তী। সে তাকে এখানে একা বসিয়ে রেখে পশ্চিম দিকের দেয়ালঘেঁষা টেবিলটাতে গিয়ে বসেছে। জায়গাটা মূল রেস্তোরাঁ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। ফলে অন্যরা খুব একটা খেয়াল করছে না। অবন্তী অবশ্য একমুহূর্তের জন্যও চোখ সরাল না। রিয়া তাকে কী এমন দেখাবে যে তা দেখে চমকে যাবে সে? সুদর্শন, লম্বা চুলের ঋজু মানুষটা এলেন ঠিক তখুনি। মানুষটাকে দেখে অবন্তীর বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল। মাহমুদ হাসান এখানে? রিয়ার সঙ্গে? যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
.
তারা হলে ফিরল ঘণ্টা দুয়েক বাদে। তবে রিকশায় উঠতেই অবন্তী খপ করে হাত চেপে ধরল রিয়ার। বলল, এটা কী হলো?
কী?
স্যার তোর সঙ্গে এখানে?
কী করবে তাহলে? এখানে ছাড়া আর কোথায় যাবে? বেডরুমের ব্যবস্থা তো। এখনো হয় নি। বলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চোখ টিপল রিয়া।
রিয়া! কটমট করে তাকাল অবন্তী। ঘটনা কী, আমাকে খুলে বল।
ঘটনা কিছুই না। উই আর ডেটিং ফর দ্য ফার্স্ট টাইম।
মানে তুই বলতে চাইছিস যে স্যারের সঙ্গে তোর কোনো একটা…মানে ইউ আর ইন আ রিলেশনশিপ উইথ হিম?
রিয়া এবার আর সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল না। দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল। তারপর গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল, এখনো না। তবে…হুম, সম্ভবত।
মানে কী!
মানে…আমরা ইদানীং কথা বলছি।
রেগুলার?
অলমোস্ট।
কী কথা?
অনেক কিছু। উনি সিনেমা, লিটারেচার নিয়ে অনেক জানেন। সেসব নিয়েও।
ফোনে কথা হয়?
।হুম। বাইরেও।
বাইরে মানে কোথায়?
ক্যাম্পাসে। ডিপার্টমেন্টের করিডরে। ওনার রুমে। কিন্তু জানিসই তো, একটুতেই চারপাশে কেমন ফিসফাস। আর উনি বিষয়টা নিয়ে খুব সতর্ক। ফলে একভাবে বাধ্য হয়েই আজ এখানে আসতে হলো।
তোরা সত্যি সত্যিই…? মানে সত্যি সত্যিই তোরা একটা সম্পর্কে…! যেন। কিছুতেই রিয়ার কথা বিশ্বাস হতে চাইছে না অবন্তীর।
ওভাবে কিছু তো বলা হয় নি। আমিও না। উনিও না। রিয়ার কণ্ঠ শান্ত, গভীর।
তবে তুই তো বুঝতেই পারছিস, সামহাউ ইটস হ্যাঁপেনিং। মানে ওনার চারপাশে যে শক্ত দেয়ালটা উনি তুলে রেখেছিলেন, সেটা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
তা কেমন?
ধর, আগে এক শ বার ফোন করলেও একবার ধরতেন না। আর এখন আমরা প্রায় নিয়মিতই কথা বলি। দেখা হয়। কখনো কখনো উনি নিজে থেকেই মেসেজ করেন। এমনকি আজ যে আমরা এখানে দেখা করতে এসেছি, এটাও কিন্তু উনিই বলেছেন। অথচ এর আগে আমি কতবার অনুরোধ করেছি, লাভ হয় নি। উনি আজ কী বললেন, জানিস?
কী? অবন্তী যেন গলায় জোর পাচ্ছে না। তার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে মাহমুদ হাসানের মতো কেউ সত্যি সত্যিই তার ছাত্রীর সঙ্গে এমন একটি বিশেষ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেন। সে বলল, কী বলেছেন উনি?
বলেছেন, ওনার খুব গিল্টি ফিলিং হচ্ছে।
কেন?
সেটাই। আমরা তো এখনো কেউ কাউকে কিছু বলিই নি। বিশেষ কোনো সম্পর্কের কথাও না। হ্যাঁ, আমরা ইদানীং কথা বলছি। কিন্তু সেটা তো হতেই পারে, তাই না? তাহলে ঠিক কী কারণে উনি গিল্টি ফিল করছেন, বল?
অবন্তী কথা বলল না। রিয়া বলল, তার মানে উনিও জানেন কিংবা বুঝতে পারছেন যে উই আর গোইং টু হ্যাভ আ স্পেশাল রিলেশনশিপ। তাই না?
অবন্তী চুপ করেই রইল। সে এখনো বিষয়টা ঠিকভাবে মেনে নিতে পারছে না। মাহমুদ হাসান সম্পর্কে তার যে ধারণা, তা অন্যদের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। মধ্যবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সুদর্শন, আকর্ষণীয় শিক্ষক তিনি। এতে তার চিন্তা, আচরণ ও ব্যক্তিত্বের ভূমিকাও প্রবল। সেই মানুষটি তার বিবাহিত জীবনের বাইরে এসে এই বয়সে রিয়ার মতো কারও সঙ্গে এমন একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেন, এটি ভাবা কষ্টকরই বটে। ফলে বিষয়টা মেনে নিতে একভাবে নিজের সঙ্গে যুদ্ধই করতে হচ্ছে অবন্তীর।
সে মৃদু গলায় বলল, তোর কোনো গিল্টি ফিলিং হচ্ছে না?
কেন? ওনার ঘরে বউ-বাচ্চা আছে বলে?
আরও নানান কারণ আছে। তবে হ্যাঁ, এটাও একটা কারণ। কিংবা প্রধান কারণ।
বুঝতে পারছি না। আর ওই কথাটা শুনিস নি?
কোন কথা?
নাথিং ইজ আনফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার?
শুনেছি। বাট কথাটাকে আমার খুব গা-ঘিনঘিনে মনে হয়। বলল অবন্তী।
কেন? এত সুন্দর একটা কথাকে কেন গা-ঘিনঘিনে মনে হবে?
এটা মোটেও সুন্দর কোনো কথা না, রিয়া। ইটস আ ফিলদি কোট। এই এক কথা দিয়ে মানুষ ভালোবাসার নামে অন্যায়কেও জাস্টিফাই করতে চায়। কিন্তু আসলেই। কি তা হওয়া উচিত? তুই ভালোবাসার জন্য কাউকে খুন করতে পারিস? কারও ঘর ভেঙে দিতে পারিস? পারিস না। কেউই পারে না। ভালোবাসা হবে কনস্ট্রাকটিভ। ডেস্ট্রাকটিভ না।
কিন্তু কিছু গড়তে হলে তো কিছু ভাঙতেই হয়।
যদি কিছু ভঙ্গুর না হয়, জরাজীর্ণ না হয়, তবে তা ভেঙে সেখানে অন্য কিছু গড়ার দরকার নেই। হি হ্যাঁজ আ গুড ফ্যামিলি লাইফ। ওনার ওয়াইফের সঙ্গে ওনার সম্পর্কও ভালো। তুই একবার ভাব, তুই যদি এমন দিনের পর দিন তার পেছনে লেগে না থাকতি, তাহলে এটা হতো?
রিয়া মাথা নাড়ল, না।
তাহলে? উনিও তো মানুষ, তাই না?
হুম এবং ভালো মানুষ। আমি জানি, ওনার এইটুকু অবধি পৌঁছাতে আমাকে কী করতে হয়েছে!
কিন্তু কাজটা কি ভালো হলো, রিয়া?
রিয়া এবার আর জবাব দিল না। চুপচাপ কী ভাবল। তারপর বলল, আমি সম্ভবত খুব খারাপ মানুষ, অবন্তী। কী করব বল? নিজেকে তো সামলাতে পারলাম না। চেষ্টা কি কম করেছি? তুই দেখিস নি?
অবন্তী কথা বলল না। রিয়া বলল, আমি জানি, সামথিং ইজ রং। টেরিবলি রং। বাট আই কান্ট কন্ট্রোল মাইসেলফ। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তুই বল, করি নি? কিন্তু পারি নি, সেটা কি আমার দোষ? বলেই হঠাৎ ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল রিয়া। অবন্তী রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেল। এমন রিয়াকে দেখতে অভ্যস্ত নয় সে। রিয়া বলল, আমি খুব খারাপ মানুষ, তাই না? খুব খারাপ?
অবন্তী তার এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। তবে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল। তারা যখন হলের গেটে নামল, তখনো স্বাভাবিক হয় নি রিয়া। অবন্তী বলল, শরীর খারাপ লাগছে?
হুঁ।
ডাক্তারের কাছে যাবি?
না।
তাহলে?
কিছুক্ষণ বাইরে বসে থাকি?
আচ্ছা।
তারা হলের উল্টো দিকের খোলা জায়গাটাতে বসে রইল। কোথা থেকে একটা ফুরফুরে হাওয়া এসে খানিক আরামদায়ক অনুভব দিল। ঠিক এই সময়ে ছেলেটাকে চোখে পড়ল অবন্তীর। মঈন দাঁড়িয়ে আছে তার হলের সামনে। সে কি তার খোঁজে এসেছে? কিন্তু তাহলে তো তাকে ফোন করার কথা। সে ফোন বের করে দেখল। না, কেউ তাকে ফোন করে নি। তাহলে মঈন ওখানে কী করছে?
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সে যখন রিয়াকে নিয়ে হলের গেটের দিকে এগোল, তখন চট করে আড়ালে চলে গেল মঈন। বিষয়টাতে ভারি অবাক হলো অবন্তী। তার মানে, মঈন তার সঙ্গে দেখা করতে এখানে আসে নি! সে এসেছে অন্য কোনো কারণে। কিন্তু কী সেই কারণ? সে যদি তার সঙ্গে দেখা করতে আসত, তবে আগের মতোই এগিয়ে এসে কথা বলার চেষ্টা করত। কিন্তু আজ ঠিক অন্য কী কারণে সে এখানে এসেছে? কেন সে তাকে দেখে ওভাবে আড়ালে চলে গেল?
অবচেতনেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াতে লাগল অবন্তী।
একটা তীব্র অস্বস্তি সারা রাত জাগিয়ে রাখল তাকে।
২৭
উঠানের দখিন দিকে ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল তেঁতুলগাছ। সেই গাছের ছায়ায় শুয়ে আছেন রাহিমা বানু। তার পাশে আয়েশা। রাহিমা বানু ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকলেন, ও আয়েশা? আয়েশা?
মা। আয়েশা মৃদু স্বরে জবাব দেয়। মায়ের অবস্থা সে জানে। অনিক তাকে সব বলেছে। এই যে ছোট্ট সংসার, এই সংসারে এখন তারা দুই অসমবয়সী ভাই-বোনই যেন কূলহারা নৌকার মাঝি। ফলে তারা পরস্পরের কাছে কিছু লুকায় না। কিংবা যতটুকু বললে সামনের অকূল পাথারে খানিকটা হলেও স্থির থাকা যাবে ততটুকু বলে। রাহিমা বানু বললেন, তোর ভাই কই?
বাজারে গেছে, মা।
এই দুপুরবেলা বাজারে কী?
তা তো জানি না। বলল, এখনই চলে আসব।
কখন আসবে? কতক্ষণ হলো ও বাড়িতে নাই। তোরে এইভাবে একলা একলা রেখে সে যখন ইচ্ছা তখন বাড়ির বাইরে চলে যাবে, এইটা কেমন কথা?
আমি তো একলা না, মা। তুমি তো আছ।
আমি আছি? যেন স্বগতোক্তির মতো কথাটা বললেন রাহিমা বানু। আমি কি সত্যই আছি? আমি তো নাই।
কে বলছে তুমি নাই? এই যে তুমি আছ! বলেই খানিক ঝুঁকে মায়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেল আয়েশা। রাহিমা বানুর গালের হাড় উঁচু হয়ে আছে। চোখ ঢুকে গেছে গর্তে। সেই গর্তের এখানে-সেখানে জমে আছে জলের ফোঁটা। আয়েশা বলল, তুমি কাঁদতেছ কেন, মা?
কাঁদতেছি নাকি?
এই যে তোমার চোখে পানি?
রাহিমা বানু এবার আর কথা বললেন না। তিনি আজকাল সত্যি সত্যিই বুঝতে পারেন কখন কাঁদেন, কখন ঘুমান, কখন জেগে ওঠেন। তার কাছে দিন-রাত, ঘুম-জাগরণ– সব একই রকম মনে হয়। আয়েশা বলল, তোমার খুব খারাপ লাগতেছে, মা?
বুঝতে পারতেছি না।
তুমি কি একটু উঠে বসবা?
গায়ে জোর নাই। উঠতেই পারি না। বসব কেমনে?
আমি তোমারে ধরে বসাই?
বসা।
আয়েশা অবাক হয়ে লক্ষ করে সে খুব সহজেই মাকে ধরে তুলে বসাতে পারে। কী আশ্চর্য, মা কখন এত শীর্ণ, ক্ষীণকায়, তুলোর মতো পলকা হয়ে গেল? এই তো বছর কয়েক আগেও মা তাকে কোলে নিয়ে এবাড়ি-ওবাড়ি ঘুরে বেড়াত। আর রাগে গজগজ করতে করতে বলত, এত বড় ধাড়ি মাইয়া হইছে, তাও মায়ের কোল থেকে নামনের নাম নাই। এই মাইয়া নিয়া আমি কী করব? একলা বিছানায় ঘুমাইতে পারে না। বাতি নিভাইলে ভয় পায়। আমি না থাকলে তোর কী হইব, হ্যাঁ? কী হইব?
তুমি থাকবা না কেন? ছোট্ট আয়েশা অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকাত।
থাকব না কেন মানে কী? সবাই কি সারা জীবন থাকে?
না থাকলে কই যায়?
আল্লাহর কাছে যায়। আল্লাহ তার কাছে নিয়া যায়।
তাইলে আমিও যাব। তুমি যখন যাবা, তখন একলা কেন যাবা? আমারেও নিয়া যাবা।
বালাই ষাট। বলেই তটস্থ ভঙ্গিতে মেয়ের মাথা, মুখ, বুকে দোয়া পড়ে ফুঁ দিতে থাকেন রাহিমা বানু। এমন কথা কইতে হয় না, মা। এমন অলক্ষুনে কথা আর কখনো বলবা না।
তোমার সঙ্গে যাইতে চাইব না? তাইলে একলা থাকতে চাইব? আমার একলা থাকতে ভয় করে, মা।
রাহিমা বানু প্রসঙ্গ পাল্টাতেন, একলা থাকতে ভয় লাগলে কেমনে হইব? বড় হইতেছ। কয় দিন পর বিয়া দিতে হইব। তখন তো শ্বশুরবাড়ি যাইতে হইব।
এই কথায় চুপ করে যেত আয়েশা। এই শ্বশুরবাড়ি ব্যাপারটা তার ভীষণ অপছন্দের। মানুষ কী করে মাকে রেখে দূরে কোথাও যায়? সে তো এক ঘণ্টাও মাকে
দেখে থাকতে পারে না। মাকে ছাড়া শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার এই ব্যাপারটা কী বিচ্ছিরি। সে গুনগুন করে বলে, আমি বিয়া করব না, মা।
তাইলে কী করবা?
আমি তোমার সঙ্গে থাকব। সব সময় তোমার সঙ্গে থাকব। তুমি না থাকলে আমার ভয় লাগে, মা। অনেক ভয় লাগে।
রাহিমা বানু মেয়েকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে রাখতেন। তারপর চুমু খেতে খেতে বলতেন, আচ্ছা। তোমার কোথাও যাইতে হবে না। তুমি মার সঙ্গে থাকবা। সারা জীবন থাকবা।
রাহিমা বানু মাঝেমধ্যেই আদরে-আহ্লাদে-রাগে মেয়েকে তুমি করে বলতেন। সেই তুমিতে কি খানিক আলাদা কিছু মিশে থাকত? আয়েশা জানে না। তবে তার সেই মা তাকে ছেড়ে চলে যাবেন? সত্যি সত্যিই চলে যাবেন? এ কেমন কথা? এমন কেন হবে? অনিক প্রথম যেদিন তাকে সামনে বসিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে সব কথা খুলে বলেছিল, সেদিন নিজেকে মনে হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্ব মানুষ। মা সত্যি সত্যিই আর বাঁচবেন না? মরে যাবেন? তার একটুও বিশ্বাস হয় নি। মনে হয়েছে এটা একটা দুঃস্বপ্ন। খানিক বাদেই ভাইয়া তার ঘুম ভাঙিয়ে দেবে। মা তারস্বরে চেঁচাতে চেঁচাতে বলবেন, এত বড় মাইয়া এত বেলা পর্যন্ত ঘুমাইলে বিয়া দেওন যাইব? শ্বশুরবাড়িতে এত আহ্লাদ চলত না। ওঠ, ওঠ। হাঁস-মুরগির খোপ থেকে ওইগুলান বাইর কর। খাইতে দে। ওঠ। তারপর স্কুলে যা। পড়াশোনা নাই, নামাজ-রোজা নাই। আদব-কায়দা, কাজ-কর্ম কিছু নাই। এই মাইয়া নিয়া আমি কী করব, আল্লাহ। কী করব? এরা দুই ভাই-বইনই হইছে বাপের মতন। কোনো কিছুর ঠিকঠাকানা নাই।
কিন্তু তেমন কিছু আর হয় নি। তার দুঃস্বপ্ন কেউ ভাঙিয়ে দেয় নি। বরং আরও গাঢ় হয়েছে। সময় যত গিয়েছে, মা ততই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছেন। তার শক্তি কমেছে। গায়ের মাংস শুকিয়ে হাড্ডিসার হয়েছেন। এখন প্রায়ই বিছানায় পেশাব পায়খানা করেন। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, অনিক নিজে সেসব পরিষ্কার করে। কাউকে কিছু বলে না। আত্মীয়স্বজনকেও না। আয়েশা বড় ভাইকে বাঘের মতো ভয় পায়। এর। কারণ এই নয় যে অনিক তাকে কখনো গালমন্দ করেছে। রেগে কথা বলেছে। এর কারণ, সে কথা বলে কম। ফলে আপনা-আপনিই ভাইয়ের প্রতি একটা সমীহ কিংবা শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় তার তৈরি হয়েছে। সেই ভয়টা কখনো কাটে নি। কিন্তু অনিকের মতো স্বল্পভাষী, চুপচাপ, খানিক নির্বিকার ভঙ্গির ভাবলেশহীন মানুষটাই যে তার মায়ের জন্য এমন কিছু করতে পারে, এটা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবে নি।
রাহিমা বানু বললেন, তোর ভাইরে ডাক। বল যে আমার সময় বেশি নাই। কোথায় কবর দিতে হবে, কার কাছে কী দেনা-পাওনা আছে, সেই সব তারে বলে যেতে হবে।
এগুলা তুমি কী বলছ, মা? তোমার কিছু হয় নাই। ভাইয়া তোমারে ঢাকায় নিয়া যাবে। তুমি আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে যাবা।
রাহিমা বানু কথা বলেন না। শূন্য চোখে মাথার ওপরের তেঁতুলগাছের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আয়েশার সামনে এসব কথা তিনি বলতে চান না। কিন্তু মাঝেমধ্যেই কী জানি হয় তার। নিজের প্রতি আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তখন কত কিছু যে বলেন! এইটুকু এক মেয়ে আয়েশা। তার সামনে এসব কথা বলা তার একদম ঠিক নয়। তারপরও কেন বলেন কে জানে!
তিনি প্রসঙ্গ পাল্টান। বলেন, মা রে। একটা কথা বলি?
বলো।
তোমার বয়স অল্প। কিন্তু মা ছাড়া মাইয়ামানুষের বয়স আর অল্প থাকে না। তাদের এক দিনের মধ্যেই বড় হইতে হয়। দুনিয়ার সব হালচাল বুঝতে হয়। কে তার আপন, কে পর–এই সব বুঝতে হয়। যদিও মা না থাকলে মাইয়ামানুষের দুনিয়াতে আর আপন কেউ থাকে না।
মা। আয়েশা মাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে। তুমি এই সব কেন বলতেছ?
কেন বলতেছি জানি না। আমার মনে হয় মাথা খারাপ হয়ে যাইতেছে। কখন কী বলি তার ঠিক নাই। এক কাজ কর। আমারে একটু শোয়াই দে। আমি বসে থাকতে পারতেছি না। যন্ত্রণা শুরু হইছে। মরার যন্ত্রণা।
রাহিমা বানুকে আবার শুইয়ে দেয় আয়েশা। তারপর উঠানে রোদে শুকাতে দেওয়া কাপড় ভাঁজ করে। রান্নার খড়িকাঠগুলো ঘরে নিয়ে রাখে। আশপাশটা ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে। রাহিমা বানু একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন। সেই দিনের সেই মেয়েটা, মাকে ছাড়া একমুহূর্তও থাকতে পারত না। নিজের হাতে ভাত অবধি খেতে চাইত না। সেই মেয়ে মাত্র কদিনেই কেমন করে এমন বড় হয়ে গেল? তার নিজের এখন মনে হচ্ছে ওই মেয়েটা যেন তিনি। আর এই তিনি আসলে আয়েশা। ছোট্ট এক মেয়ে। কী আশ্চর্য, সবকিছু কোন অগোচরে হঠাৎ এমন হয়ে গেল!
আয়েশার জ্বর হলে সারাক্ষণ খ্যানখ্যানে গলায় কাঁদত আর বলত, মা, তুমি আমার কাছে আসো। এইখানে বসে থাকো। আমার পাশে। আমার পাশ থেকে তুমি কোথাও যাবা না। তুমি পাশ থেকে গেলেই আমার ডর লাগে, মা।
কিন্তু রাহিমা বানুর রাজ্যের কাজ। সেই সব কাজ রেখে তিনি সারাক্ষণ মেয়ের পাশে বসে থাকবেন কী করে! তারপরও যতটুকু পারতেন বসে থাকতেন। এক বিকেলে অমন জ্বর নিয়েই মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে গিয়েছিল সে। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার ঘর। সেই ঘরে মা তার পাশে নেই। সে হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। ও মা, মা। মা গো।
রাহিমা বানু ঝড়ের বেগে ছুটে এলেন। বললেন, কী হইছে? কী হইছে? আমি ঘরে বাতি দিতে গেছিলাম। সন্ধ্যাবেলা ঘরে বাতি দিতে হয় না?
আয়েশা তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। তিনি মেয়ের মাথা বুকে চেপে ধরে বললেন, কিছু হয় নাই তো, মা। কিছু হয় নাই। এই যে আমি তোমার পাশে আছি। এই যে মা। মা, তোমার পাশে আছি।
আয়েশা কথা বলতে পারে না। কান্নায় তার গলা বুজে আসে। তারপরও সে বলে, আমি ভাবছি আমি মরে গেছি, মা। আমি ভাবছি আমি কবরের মধ্যে। এই জন্য চারদিকে এত অন্ধকার। আর তুমি নাই। ও মা। আমি ভাবছি…। বলে অঝোরে কাঁদতে থাকে সে।
সেই মেয়ে কত বড় হয়ে গেছে! তার বয়স যে খুব বেড়েছে, তা নয়। কিন্তু সময় তাকে বয়সের আগেই বড় করে ফেলেছে। এখন ওই উঠানের মাঝখানে ঝাড় হাতে ঝাঁট দিতে থাকা সেই মেয়েটাকে দেখেই তার কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। মনে হচ্ছে ও যদি সব কাজ ফেলে রেখে এসে তার পাশে খানিক বসে থাকত। গলায়, কপালে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিত, তাহলে হয়তো একটু ভালো লাগত তার। যন্ত্রণাটা একটু কমত। কী করে তিনি এমন করে আয়েশার মতো হয়ে গেলেন? আর আয়েশা হয়ে গেল তার মতন। সময়ের এই এক আশ্চর্য খেলা। এই খেলার কাছে সকলই তুচ্ছ, অসহায়। সব হিসাবনিকাশ ব্যর্থ।
.
অনিক যখন বাড়ি ফিরল, তখন বিকেল পড়ে এসেছে। কিন্তু বাড়ি ঢোকার সরু পথটার কাছে এসে থমকে দাঁড়াল সে। তেঁতুলগাছটার তলায় অদ্ভুত এক দৃশ্য। মা আধশোয়া হয়ে গাছে হেলান দিয়ে বসে আছেন। আর তাকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে আয়েশা। কিন্তু সে যতটুকু ভাত এক নলায় মায়ের মুখে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে, মা তার সবটুকু গিলতে পারছেন না। ফলে তার ঠোঁটের কোষ গড়িয়ে দানা দানা ভাত গড়িয়ে পড়ছে। এখানে-সেখানে লেগে থাকছে। আয়েশা তখন তার ওড়না দিয়ে মায়ের মুখ মুছে দিচ্ছে। পানির মগ তুলে ধরছে ঠোঁটের কাছে। মা খুব ধীরে একটু একটু করে পানি খাচ্ছেন। বার কয়েক বিষমও খেলেন। আয়েশা তখন যত্ন করে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। দৃশ্যটা কি অস্বাভাবিক কিছু? হয়তো না, কিন্তু তারপরও অনিকের চোখের ভেতরটা হঠাৎ জ্বালা করে উঠল। সে আর বাড়ির ভেতর ঢুকল না। বরং হেঁটে আবার রাস্তার দিকটাতে চলে গেল। রাস্তার দুধারে শূন্য খা খা ফসলের মাঠ। দূরে লাল সূর্য। সন্ধ্যার পাখিরা দল বেঁধে ঘরে ফিরছে। সে সেই শূন্য ফসলের মাঠের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তারপর দাঁড়িয়েই থাকল। ঠিক কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, অনিকের মনে নেই। ততক্ষণে চারপাশে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। গাঢ় হয়ে। জোনাক পোকার দল আলোর মিছিল নামিয়েছে।
এই সময়ে ফোনটা বাজল তার। ফোন করেছে তিথি। তিথির ফোন দেখে একটু অবাকই হলো অনিক। ধরবে না ধরবে না করেও শেষ পর্যন্ত ধরল সে। কিন্তু ফোনের ওপার থেকে তিথি কোনো কথা বলল না। অনিক বলল, তিথি?
হুম।
কিছু বলবি?
হুম।
বল। তিথি অবশ্য বলল না। চুপ করে রইল। অনিক বলল, কিছু হয়েছে?
তুমি কিছু জানো না?
চিনা মা সেলিনা
কী জানব?
তুমি সত্যিই কিছু জানোনা?
তুই কিসের কথা বলছিস, সেটি না বললে কী করে বুঝব জানি কি না?
হৃদি আপুর যে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে?
অনিক সঙ্গে সঙ্গেই কথা বলল না। চুপ করে রইল। বাইরের ঝিঁঝি পোকার ডাক কি বেড়েছে? হঠাৎ করেই কেমন যেন চারপাশটা উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। যেন অসংখ্য পোকামাকড় এলোমেলো ছুটতে শুরু করেছে। তাদের একঘেয়ে বিকট চিৎকারে কান। ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। অনিকের মনে হলো সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না ওই তীক্ষ্ণ। বিকট শব্দ ছাড়া।
তিথি বলল, তুমি জানো না?
অনিক হাসল। বলল, আমি এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, জানিস?
কোথায়?
খাঁ খাঁ শূন্য বিরান ভূমিতে একটা শুকনো মাটির ঢিবির ওপর। আমার চারপাশে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। অসংখ্য জোনাক জ্বলছে। দেখে মনে হচ্ছে আমি বুঝি মহাশূন্যে ভাসছি। চারপাশের জোনাকিগুলোকে মনে হচ্ছে তারার আলো।
তুমি আমার কথা শুনতে পাও নি?
তুই আমার কথা শুনতে পেয়েছিস?
পেয়েছি।
তাহলে আরেকটা কথা শোনাই?
তিথি কথা বলল না। অনিক বলল, এই যে অসংখ্য জোনাক জ্বলছে, তাদের যদি তারা ভেবে ভুল করি, তাহলেই কি তারা তারা হয়ে যাবে?
না।
কিন্তু তাদের তারা ভাবাটাও তো ভুল নয়। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে অন্য জগতের মানুষ মনে হয়। মনে হয় আমি একটা স্বপ্নের জগতে আছি। কিন্তু স্বপ্ন তো ভেঙে যায়, না? দিনের আলোয় সবকিছু যেমন দেখায়, এই ফসলের মাঠ, মাটির ঢিবি, জোনাক পোকার আলো, রাতের অন্ধকারে কি সেসব তেমন দেখায়?
না।
কিন্তু আমাদের তো দুটোই দেখতে হয়। আর দুটোই দেখতে পারি বলেই অন্ধকারে জোনাকির এই মিটিমিটি আলোকে তারার আলোর মতো মনে হলেও আমরা জানি এ তা নয়। আলোয় সবকিছু আবার অন্য রকম হয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এই মুহূর্তটাও তো মিথ্যে কিছু নয়।
তুমি এসব কেন বলছ? আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না?
আমিও পারছি না। আমার সবকিছুই এমন আলো আর অন্ধকারে দেখা বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আমি তাই দুটোকেই অনুভব করার চেষ্টা করছি।
তার মানে হৃদি আপু এই যে এমন করল, এটাও তুমি উপভোগ করার চেষ্টা করছ?
উপভোগ শব্দটা কেমন জানি। একটা ভোগ ভোগ ব্যাপার আছে। ফলে ওই শব্দটা ঠিক ব্যবহার করতে মন সায় দেয় না। তবে জীবন তো এই আলো আর অন্ধকারেরই। এখানে কেবল আলোতে দেখা পৃথিবীই ধরা দেবে, তা তো না। তাই না?
কী জানি! তোমার এই অতি ফিলসফিক্যাল কথাবার্তা আমি বুঝতে পারি না।
সব বুঝে কাজ কী! যত কম বোঝা যায়, তত ভালো। জীবন সহজ হয়ে যায়।
তোমার জীবন কি সহজ? তুমি তো কম বোঝো না?
চেষ্টা তো করাই যায়। আর যার কিছুই থাকে না, না স্বপ্ন, না সম্ভাবনা, তার হারানোর ভয়ও থাকে না। মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় তো ওই হারিয়ে ফেলার ভয়ই। আমার কি আর হারিয়ে ফেলার মতো কিছু আছে?
ছিল তো?
ছিল আর থাকা তো এক নয়। যা ছিল বলা হয়, তার মানে তা আর নেই। আর যা নেই, তা হারিয়ে ফেলার ভয় কী করে হবে?
কথাটা খট করে কানে বিধল তিথির। সে বিড়বিড় করে বলল, তুমি কি কাঁদছ?
একদম না। বলে হাসল অনিক। কাঁদব কেন?
তুমি হৃদি আপুকে কতটুকু ভালোবাসতে আমি জানি।
অনিক কথা বলল না। তিথি বলল, কিন্তু আপু যে কেন এমন…। কথাটা শেষ করল না সে। অনিক বলল, ভালোবাসার জন্য কি কাউকে পেতে হয়? মানে কাউকে
পেলে কি ভালোবাসা যায় না?
যায় হয়তো। কিন্তু মানুষ তো তার ভালোবাসার মানুষটাকে পেতেই চায়।
পাওয়াটা আসলে খুব রহস্যময় এক ব্যাপার। যা দেখে আমরা পেয়ে গেছি ভাবি, এমনও তো হতে পারে যে ওই পাওয়ার আড়ালেই সবচেয়ে বেশি না পাওয়া।
তাহলে কি না পাওয়ার আড়ালেও পাওয়া থাকে?
অনিক এই প্রশ্নের জবাব দিল না। বলল, আমি অনেকক্ষণ থেকে বাড়ির বাইরে। আয়েশা একা মার কাছে। আমি এখন যাই?
যাবে?
হুম।
তিথির হঠাৎ কেন যেন কান্না পেয়ে গেল। তার খুব ইচ্ছে করছিল অনিককে এমন কিছু একটা বলে যে তাতে তার বুকের ভেতর উত্তরে হিম হাওয়ার যে তীব্র হাহাকার মাতম তুলছে, সেই মাতমটা ক্ষণিকের জন্য হলেও থেমে যায়। কিন্তু সে জানে সেই ক্ষমতা তার নেই। হয়তো এই পৃথিবীর কারোরই নেই।
.
রাহিমা বানু মারা গেলেন শুক্রবার জুমার নামাজের আগে আগে। অনিক চুপচাপ মায়ের পাশে বসে রইল। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলল না সে। কাঁদল না। চিৎকার করল না। কেবল তার ডান পাশে বসে থাকা আয়েশাকে এক হাতে ধরে রাখল সে। আসরের নামাজের পর মায়ের দাফন হবে। তার জোগাড়যন্ত্র করছে আত্মীয়স্বজন। সন্ধ্যায় ফোনটা এল তিথির। অনিক ধরল।
কী করছ? বলল তিথি।
অনিক জবাব দিল না। তিথি বলল, তোমার কি মন খারাপ?
না।
তুমি ঠিক আছ তো?
হু।
আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল তোমার মন খারাপ।
অনিক কথা বলল না। তিথি বলল, আমি তোমাকে কেন ফোন করেছি, জানো?
না।
এবার চুপ করে রইল তিথি, বেশ খানিকটা সময়। তারপর বলল, আমি চাই নি খবরটা তুমি অন্য কারও কাছ থেকে পাও। কিংবা অন্ধকারে থাকো।
কী খবর?
হৃদি আপুর আজ বিয়ে হয়ে গেল।
আচ্ছা।
নেহাল ভাইয়া আপুকে নিয়ে জার্মানি চলে যাচ্ছে নেক্সট মান্থেই।
হুম।
তুমি কি কিছু বলবে?
না।
কিছুই না?
অনিক কথা বলল না। তিথিও না। তারা দুজনই দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল। একটা অদ্ভুত অসহ্য নীরবতা কেবল তাদের মাঝখানে অব্যক্ত অসংখ্য কথা, কান্না, অনুভবের নদী হয়ে বয়ে যেতে লাগল।
আমি কি ফোন রাখব?
হুম।
সত্যি রাখব?
হুম। তিথি ফোন রেখে দিল।
সন্ধ্যার আকাশে বিশাল চাঁদ উঠেছে। বাবার পুরোনো কবরের পাশে মায়ের নতুন কবর। চারপাশে বাঁশের কঞ্চি কেটে বেড়া দেওয়া হয়েছে। অনিক সেই কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দীর্ঘ সময়। তার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কেন যেন কাঁদতে পারছে না সে। তার গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াল আয়েশা। অনিক এক হাতে বোনকে জড়িয়ে। ধরে রাখল। আয়েশা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল। নিঃশব্দ কান্না। তবে সেই কান্নায় তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। অনিক বোনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর দুহাতে তার মাথা চেপে রাখল কাঁধের সঙ্গে। তার হঠাৎ মনে হলো, বুকের ভেতর যে নোনাজলের অথই সমুদ্র সে পুষে রেখেছে, তা যেন আয়েশার চোখ বেয়ে অবিরল। জলের ঝরনাধারার মতো নেমে আসছে। আর সে সিক্ত হচ্ছে সেই উষ্ণ জলের তীব্র গভীর স্রোতে।
২৮
রাত গভীর। রাশু একা বসে আছে মজা ডোবাটার কাছে। মাঝেমধ্যেই ডোবার ভেতর থেকে ছটাৎ ছটাৎ শব্দ আসছে। সে একটা ঢিল ছুঁড়ে মারল সেখানে। সঙ্গে সঙ্গে যেন উন্মত্ত হয়ে উঠল দানবীয় জন্তুগুলো। রাশু মৃদু হাসল। তবে অন্ধকারে তার সেই হাসি দেখা গেল না। মতিন মিয়ার উপস্থিতি টের পাওয়া গেল তখুনি। তার হাতে ছোট টর্চ। সে সাবধানে আলো ফেলল মাটিতে। রাশু চট করে উঠে দাঁড়াল। মতিন মিয়া প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমি মতিন।
ওহ্, মতি ভাই?
হুম।
সাথে আর কে?
তুমি চিনবা না। বলেই হাসল মতিন মিয়া। লাল চানকে ঠাহর করতে খানিক সময় লাগল রাশুর। সে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। বলল, আপনে এইখানে?
জামশেদ স্যার আসতে বলল।
কেন?
চালান রেডি করতে হবে।
কিসের চালান?
বিষের। সগ্রহ করতে হবে।
কে করবে, আপনে? অন্ধকারেই চোখ বড় বড় করে তাকাল রাশু। সে জানে, কাজটা সহজ নয়। এই কাজে অভিজ্ঞ লোক দরকার।
না না। আমি না। লোক আছে। সে সব পদ্ধতি জানে।
রাশু অবাক হয়ে লক্ষ করল, দীর্ঘাকৃতির একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে তাদের পেছনে। লাল চান বলল, যা করার উনিই করবেন।
উনি একা পারবেন?
হুম।
কিন্তু এইখানে তো রাতের বেলা আলো জ্বালানো নিষেধ।
সেইটা উনিই বুঝবেন।
আমাকে শিখাবে না? রাশুর চোখে কৌতূহল।
এখুনি না।
তাহলে?
দীর্ঘকায় লোকটা একটা কথাও বললেন না। তিনি ধীরে হেঁটে উঠানের ভেতর দিকে যেতে লাগলেন। রাশু বলল, উনি একলা একলাই যাইবেন? সঙ্গে আর কেউ থাকবে না? আমি যাই?
বলেই সামনে যেতে উদ্যত হলো সে। কিন্তু লাল চান তার হাত ধরে নিবৃত্ত করল। বলল, আগবাড়াইয়া কিছু করতে না নিষেধ করছে তোরে?
হুম। বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল রাশু। দীর্ঘকায় লোকটা অভ্যস্ত, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে হেঁটে গেলেন টিনের ঘরটার দিকে। তবে সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঢুকলেন না তিনি। দাঁড়িয়ে পিঠের ব্যাগ থেকে কী কী সব বের করতে লাগলেন। সম্ভবত আত্মরক্ষামূলক কিছু। তারপর সেসবে নিজেকে আবৃত করতে লাগলেন। রাশু ফিসফিস করে বলল, উনি কী করতেছেন?
সেইটা উনিই ভালো জানেন। অত কিছু তো আমাদের বোঝার দরকার নাই। আমাদের যেই দায়িত্বটা দিছে, সেটা পালন করলেই তো হলো। না?
তাও ঠিক। বিড়বিড় করে বলল রাশু। তবে তাতে খুব একটা সন্তুষ্ট মনে হলো না তাকে। বরং বেশ খানিকটা অসন্তোষ নিয়েই মাটিতে থুতু ফেলল সে।
লাল চান বিষয়টা লক্ষ করল। বলল, কী হইছে তোর, এমন করতেছস কেন?
রাশু কথা বলল না। তার হঠাৎ মনে হলো, এই পুরো বিষয়টার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে খুব অল্প কিছু মানুষ। রাশু কিংবা লাল চান তাদের পুরোপুরি চেনে না। এই না চেনার কারণও আছে। কাজটা যেহেতু বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ, দেশের প্রচলিত আইনে অপরাধও, তাই নিজেদের নিরাপদ রাখতেই যতটা সম্ভব আড়ালে থাকছেন তারা। রাশু আর লাল চান মূলত কাজ করছে বেতনভুক্ত ভাড়াটে শ্রমিকের মতো। তারা যদি কখনো ধরা পড়ে, তখন যেন সহসাই আড়ালের ওই মানুষগুলোর কথা কাউকে না। বলতে পারে–এই বিষয়টাই নিশ্চিত করতে চাইছেন তারা।
বিষয়টা আগেও লক্ষ করেছে রাশু। জামশেদের অফিসে একবার গেলেও সেটি যে তার স্থায়ী কোনো ঠিকানা নয়, তা বুঝতে অসুবিধা হয় নি তার। শুধু তা-ই নয়, জায়গাটাতে এরপর আর কখনো একা একা যেতেও পারবে না সে। এর অবশ্য কারণও আছে। যাওয়ার সময়টা ছিল গভীর রাত। প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে গাড়িতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল সে। এমনকি ফেরার সময়ও।
আজ এই মুহূর্তে রাশুর হঠাই মনে হলো, বিষয়টা ক্লান্তি বা কাকতালীয় নয়, হয়তো অন্য কোনোভাবে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল তাকে! কথাটা ভাবতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তার। ঘুরে উঠানের দিকে এগিয়ে যেতে চাইল সে। লাল চান তার হাত ধরে থামাতে চাইল। কিন্তু রাশু থামল না। সে এক ঝটকায় তার হাত ছাড়িয়ে নিল। তারপর বিড়বিড় করে বলল, সবকিছু তাদের মনমতো হইলে তো হবে না। আমরা এত কিছু করি, আর…।
সে কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই তাকে চমকে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন জামশেদ এবং সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ডান কানের নিচের নরম জায়গাটায় ঠান্ডা কিন্তু তীব্র কিছুর চকিত স্পর্শ টের পেল সে। মুহূর্তখানেক সময়। তারপর কাটা গাছের মতো নেতিয়ে পড়ল রাশু। তার আচমকা মনে হলো চোখের সামনের অন্ধকারে অজস্র তারাবাতি জ্বলছে, নিভছে। পা, মাথা, শরীর অবশ হয়ে আসছে।
জামশেদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন, লাল চান, ওরে ঘরের ভেতর নিয়ে যাও। চোখেমুখে পানির ঝাঁপটা দাও। ঠিক হয়ে যাবে।
লাল চান ততক্ষণে রাশুকে দুহাতে ধরে ফেলেছে। সে অন্ধকারেই জামশেদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জামশেদ বললেন, এর মধ্যে আমরা কাজ সেরে আসছি।
বলেই টিনের ঘরটার সামনে দাঁড়ানো দীর্ঘকায় ছায়ামূর্তির দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। জামশেদের হাতে টর্চ। খুব সাবধানে আলো জ্বাললেন তিনি। তারপর নিজের পিঠে থাকা ব্যাগটা খুলে হাতে নিলেন। লাল চান জানে না সেই ব্যাগের ভেতর কী আছে। তবে জামশেদ সেই ব্যাগ থেকে নানা রকম যন্ত্রপাতি বের করতে লাগলেন। তারপর নিচু গলায় কথা বলতে লাগলেন তার সামনে দাঁড়ানো ছায়ামূর্তিটির সঙ্গে।
লাল চান অবশ্য আর দাঁড়াল না। সে রাশুকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। রাশুর জ্ঞান ফিরল ঘণ্টা দুই বাদে। ততক্ষণে জামশেদদের কাজ আজকের মতো শেষ হয়ে গেছে। রাশু চোখ মেলে তাকাতেই তাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। জামশেদ অবশ্য খানিক আগের প্রসঙ্গটা তুললেনই না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, তোর বদলে আগামী কয়েক দিন লাল চান এইখানে থাকবে। তুই কাল ঢাকায় চলে আয়। কাজ আছে।
রাশুর জবাবের অপেক্ষা না করেই ঘুরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন জামশেদ। রাশু হতভম্ব চোখে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। এতক্ষণ কী হয়েছে, কেন হয়েছে, কিছুই যেন বুঝতে পারছে না সে। লাল চান বলল, ওঠ। হাতমুখটা একটু ধুয়ে নে।
রাশু অবশ্য উঠল না। সে শুয়েই রইল। তার চোখের সামনে এখনো অন্ধকারে দাঁড়ানো জামশেদের আবছায়া মুখখানা ভাসছে। ভাসছে সাপের মতো ছোবল তোলা হাতখানা। চোখের পলকে কী করে ওভাবে তাকে আঘাত করলেন জামশেদ? এই লোকটাকে সে যতই দেখছে, ততই তার ভাবনার জগৎ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এ এক অতলস্পর্শী সমুদ্র। সে যতই ভাবুক এই বুঝি জামশেদের সকল রহস্যময়তা সে ভেদ করে ফেলেছে, আসলে ততই বাকি রয়ে যাচ্ছে অচেনা, অজানা আরেক মহাসমুদ্র।
ওই মহাসমুদ্রের রহস্য সে ভেদ করবে কী করে?
.
রাশু ঢাকায় এসেছে সপ্তাহখানেক হলো। কিন্তু এই এক সপ্তাহেও তাকে কেউ ডাকল না, না জামশেদ বা অন্য কেউ। হঠাৎ করেই তার রোমাঞ্চকর, সদা সতর্ক রোমহর্ষ জীবনটা যেন নিস্তরঙ্গ হয়ে গেল। রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে সে দোকান খোলে। তারপর সারা দিন লেপ-তোশক, বিছানা-বালিশ বিক্রি করে। কর্মচারীদের কাজ বুঝিয়ে দেয়। ক্রেতাদের সাথে দর-কষাকষি করে। কিন্তু এসব করতে আর ভালো লাগে না তার। বরং নিজেকে কেমন নিস্তেজ, নির্জীব মনে হয়। যেন এই আটপৌরে, একঘেয়ে জীবন তার নয়। এই জীবনের জন্য সে জন্মায় নি। কথাটা সেদিন লাল চানকে ফোনে বলল সে।
লাল চান বলল, তোর হইল গল্পের সেই বাঘের বাচ্চার দশা।
বাঘের বাচ্চার আবার কী দশা?
একবার এক বাঘের বাচ্চার জায়গা হলো গরুর খামারে। জন্মের পরপরই তারে সেখানে নিয়ে আসা হইল। তো সে গরুর সাথেই ঘাস, লতা-পাতা, খইল-ভুসি খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেল। দিনের পর দিন বেড়ে উঠতে লাগল তাদের সঙ্গে। আচার-আচরণেও তাদের মতো হয়ে গেল। কোনো দিন মাংসের ঘ্রাণও তার ভাগ্যে জোটে নাই। জুটবে কেমনে? সে তো থাকে গরু-বাছুরের সঙ্গে। তারা তো আর রক্তমাংস খায় না। খায়। ঘাস-লতাপাতা।
হুম।
তো ঘটনাচক্রে একদিন এক গরুর বাছুরের গায়ে কামড় বসাই দিল সে। আর সাথে সাথেই তার জিবে রক্তমাংসের স্বাদ লেগে গেল। কিন্তু তখনই বিষয়টা ধরতে পারল না সে। ধরতে পারল আরও পরে। সে হঠাই বুঝতে পারল যে ঘাস, লতাপাতা খাইতে আর ভালো লাগতেছে না তার। সারাক্ষণ কিসের জানি খিদা, কিসের জানি তেষ্টা! না খেয়ে না খেয়ে শুকাইয়া প্রায় মরণদশা। এর মধ্যে হঠাত্র একদিন সেই বাছুরটারে দেখল সে। তারপর কৌতূহলবশত তার সেই ক্ষতস্থানে জিব লাগিয়ে বোঝার চেষ্টা করল ঘটনা কী। ততক্ষণে তার ভেতরের মাংসাশী ভয়ংকর প্রাণীটা জেগে উঠছে। সে তো জন্মগতভাবেই মাংসাশী। এত দিন বিষয়টা বুঝতে পারে নাই। যেই না বুঝতে পারল, অমনি শুরু হলো তার রক্তমাংসের নেশা।
আপনের ধারণা আমি ওই রকম?
তোর ভাবভঙ্গিতে তো তা-ই মনে হয়। যেই তোরে আমি চিনতাম, আজকাল তো তোরে দেখে আর সেই তুই মনে হয় না। মনে হয় অন্য মানুষ।
কী অন্য মানুষ মনে হয়?
কী অন্য মানুষ মনে হয়, সেইটা তো তুই নিজেই বুঝতেছিস। বুঝতেছিস না?
কথা সত্য। রাশু নিজেও ব্যাপারটা ভেবে দেখেছে। ওই বিষধর সাপের সঙ্গে একা একা বসবাস করার সময়গুলোতে সে ভয় পেত না এমন নয়, বরং তীব্র ভয়ে সারাক্ষণ সচকিত হয়ে থাকত সে। রাতের পর রাত ঘুমাতে পারত না। মনে হতো যদি কখনো ওই টিনের ঘর, ওই জালের দেয়াল ডিঙিয়ে তারা কোনোভাবে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে? কিংবা তার ঘর অবধি এসে যায়? তখন কী করবে সে?
এই ভাবনা তাকে সারাক্ষণ তটস্থ করে রাখত। কিন্তু তারপর কীভাবে কীভাবে যেন বিষয়টাতে অভ্যস্ত হয়ে গেল সে। ওই ভয়ের মধ্যেও কোথায় যেন একটা তীব্র রোমাঞ্চ, একটা দুর্নিবার আকর্ষণ আছে। নেশার মতো। ওই নেশা থেকে সে অনেক চেষ্টা করেও বের হতে পারছে না। এই যে কয়েকটা দিন সে আবার তার আগের জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে, আগের সেই সহজ, সাদামাটা, নিস্তরঙ্গ জীবন, কিন্তু এই জীবনে তার কেবলই হাঁসফাঁস লাগতে থাকে। দম বন্ধ হয়ে আসে। সে সারাক্ষণ উকৰ্ণ হয়ে থাকে কখন জামশেদ তাকে ডাকবেন। কখন সে নতুন কোনো কাজ পাবে। ভয়ংকর, রোমহর্ষ কোনো কাজ।
রাশুকে অবশ্য জামশেদ ডাকলেন পরদিনই। তারা একই সঙ্গে গেলেন বৈদ্যবেলঘরিয়া। লাল চান এ কদিন এখানে একা থাকে নি। তার সঙ্গে থাকতে হয়েছে মতিন মিয়াকেও। জামশেদ মতিন মিয়াকে ডেকে বললেন, সামনে আরও একটা কাজ ধরব। এইটাই শেষ টেস্ট। এরপরই আসল চালান শুরু। কাজটাতে তুমি লাল চানকে হেল্প করবা।
আর রাশু?
রাশু আপাতত কোনো কাজ করবে না।
কেন?
কারণ আছে।
কী কারণ? ফট করে প্রশ্নটা করে বসল রাশু
যে কারণে ওই দিন রাতে তুই পিস্তলের বাঁটের বাড়ি খেয়েছিলি কানের নিচে, সেই কারণ।
আমি তো আর অবাধ্য হই নাই। আর আপনি বলছিলেন নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা কাজে লাগাইতে।
এই জন্যই তো। ওই দিন তোর বুদ্ধি-বিবেচনা কাজ করে নাই। তুই লাল চানের কথা না শুনে উঠানের দিকে যাচ্ছিলি।
রাশু কথা বলল না। সেদিন রাতের ওই সামান্য ঘটনাটা যে এত বড় ব্যাপার হয়ে যাবে, এটা সে ভাবে নি। জামশেদ লাল চানের দিকে ফিরে তাকালেন। বললেন, আর এইখানে থাকলে ফোনে অপ্রয়োজনে কারও সঙ্গে কোনো কথা বলা যাবে না। রাশুর সঙ্গেও না।
জামশেদের কথা শুনে লাল চান চমকে গেল। সে আমতা আমতার করে বলল, আমি তো কারও সঙ্গে কথা বলি নাই।
জামশেদ হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। বললেন, মিথ্যা কথা আমার একদম পছন্দ না, লাল চান। তুমি গতকাল সন্ধ্যায় রাশুর সঙ্গে কথা বলেছ। কী কী কথা হয়েছে, বলব?
রাশু হতভম্ব চোখে জামশেদের দিকে তাকিয়ে রইল। এই কথা জামশেদ জানলেন কী করে! এ কী ভয়ংকর চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আছে সে? অথচ সে ভাবছে তার পায়ের তলায় শক্ত মাটি! জামশেদ অবশ্য তাকে আরও একবার চমকে দিলেন। বললেন, মন বেখারাপের কিছু নাই, রাশু। সামনে বড় কাজ শুরু হচ্ছে। সেই কাজ দিয়েই তোর শুরু। গেট রেডি।
২৯
সুমি বললেন, তুমি কি বিকেলে ফ্রি আছ?
মাহমুদ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, কেন?
বিকেলে একটু বাইরে যাব ভাবছিলাম। তুমি গেলে ভালো হতো।
বাইরে কোথায়?
মায়ের বাসায়।
হঠাৎ?
মায়ের শরীরটা একটু খারাপ। তুমি গেলে খুব খুশি হবে।
মাহমুদ খানিক কী ভাবলেন। তারপর বললেন, যাওয়া যায়। কিন্তু কাল একটা সেমিনার আছে আমার। রাতে প্রেজেন্টেশন রেডি করতে হবে।
ওহ। বলে হতাশ ভঙ্গিতে তাকালেন সুমি। তাহলে তো হবে না। মা বলছিল। আজ রাতটা ওখানে থাকতে।
না না, তাহলে একদমই পারব না। তুমি বরং জিতুকে নিয়ে যাও।
সুমি আর কথা বললেন না। তিনি মাহমুদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব গোছগাছ করে দিয়ে দুপুরের দিকেই বের হয়ে গেলেন। পুরো বাড়িতে মাহমুদ একা। তিনি বিকেল অবধি বসে রইলেন বারান্দায়। সুমি না থাকলে বাড়িটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। একটা অদ্ভুত শূন্যতা বিরাজ করে। এই সময়ে খুব অস্থির লাগে তার। তবে সেই অস্থিরতার কারণটা ঠিকঠাক বুঝতে পারেন না। কারণ, সুমি থাকলেও নিজের কাজে মনোযোগ বসানো কঠিন হয়ে যায়। সারাক্ষণ এটা-সেটা নিয়ে কথা হতে থাকে। গল্প, আচ্ছা, খুনসুটি। তখন মনে হয় নিজের জন্য আলাদা সময় পেলে হয়তো কাজে মন বসাতে পারতেন। কিন্তু এই যে এখন, এখনো তো কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারছেন না। লেখায়ও না। এমন কেন হচ্ছে? তিনি কি তবে কোনো কিছুর অভাব বোধ করছেন?
মাহমুদ ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। এটা-সেটা দেখলেন। কাউকে টেক্সট পাঠানোর কথা ভাবলেন। তারপর মনে হলো সুমিকেই একবার ফোন করবেন কিংবা তিনিই চলে যাবেন সুমিদের বাসায়। গিয়ে চমকে দেবেন তাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হলো না তার। কারণ, ফোনটা বেজে উঠল তখুনি।
সাধারণত বাসায় থাকলে দিনের বেলা তাকে ফোন করে না রিয়া। সে ফোন করে রাতে, যখন তিনি তার স্টাডিরুমে একা লিখতে বসেন। কিন্তু আজ এই অসময়ে কেন ফোন করল সে?
মাহমুদ ফোনটা ধরলেন। রিয়া বলল, আপনি কি কোনো কারণে আপসেট?
মাহমুদ ভ্রু কুঁচকে বললেন, না।
শিওর?
হুম।
আমার ওপর বিরক্ত?
না তো। কেন?
এই যে আমি অসময়ে ফোন করলাম? মাহমুদ হাসলেন, না।
কিন্তু দিনের এই সময়ে বাসায় থাকাকালে আমি ফোন করলে তো বিরক্ত হন আপনি?
আজ হচ্ছি না।
কী কারণ?
কারণ…। বলে সামান্য থামলেন মাহমুদ। বললেন, আমারও সম্ভবত কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।
কেন, কথা বলার মতো কেউ নেই?
না।
কেউ না?
উঁহু।
সুমি কই? চট করে প্রশ্নটা করল রিয়া।
মাহমুদ গম্ভীর গলায় বললেন, তুমি সব সময় কেন ওর নাম ধরে এভাবে বলো?
আমার ইচ্ছে। উদাস ভঙ্গিতে বলল রিয়া। প্রয়োজনে আপনার নাম ধরেও বলব।
মাহমুদ কঠিন হতে গিয়েও শেষ অবধি পারলেন না। তার হঠাৎ মনে হলো, রিয়া যদি তাকে নাম ধরে ডাকে, তুমি করে বলে, তবে সেটা শুনতে কেমন লাগবে তার?
ভাবনাটা মাথায় এলেও প্রশ্রয় দিলেন না তিনি। একা বাসায় থাকলে হুটহাট কী সব আজেবাজে চিন্তা যে মাথায় চলে আসে! এমন কি সব মানুষেরই হয়? নাকি কেবল পুরুষমানুষের? না কেবল তার? মাহমুদ নিজেকে সংযত করলেন। বললেন, ও বাসায়। নেই।
কোথায় গেছে?
ওর মায়ের বাসায়।
কখন ফিরবে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েও থমকালেন মাহমুদ। তার হঠাত্র মনে হলো, অবচেতনেই তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে বিশেষ কিছু ভাবছেন এবং সেই ভাবনাটা শোভন কিছু নয়। কিন্তু তিনি চেষ্টা করেও সেটি মাথা থেকে তাড়াতে পারছেন না।
রিয়া বলল, কী হলো, কথা বলছেন না কেন?
এই একটু পরেই চলে আসবে।
একটু পরে কখন?
মাহমুদ উত্তর দিতে গিয়ে এবারও থমকে গেলেন। কিন্তু কেন থমকে গেলেন, সেটি যেন নিজের কাছেই নিজে স্বীকার করতে চাইলেন না।
রিয়া বলল, কী হলো?
কী হবে?
কখন আসবে?
বললাম তো একটু পরেই।
একটু পরে কখন?
সন্ধ্যার পর।
সন্ধ্যার পর? রিয়া দ্বিরুক্তি করল।
হুম।
তার মানে এখনো অনেকটা সময়। তাই না?
মাহমুদ কথা বললেন না। তিনি স্পষ্টই টের পেতে শুরু করেছেন তার ভেতর একটা অদম্য অবদমিত ইচ্ছে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। তিনি তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন সেই ইচ্ছেটাকে দমন করতে। কিন্তু পারছেন না।
রিয়া বলল, আপনি চুপ করে আছেন কেন?
কী বলব?
সুমির আসতে তো এখনো বেশ খানিকটা সময় বাকি আছে, তাই না?
হুম।
এই সময়ে আপনি তো বাসায় একা?
মাহমুদ আবারও চুপ করে গেলেন। রিয়া বলল, আমার কিন্তু খুব রাগ লাগছে। আপনি এভাবে কথা বললে আমি কিন্তু বাসায় চলে আসব।
বাসায় চলে আসবে? কপট বিস্ময়ের ভান করলেও মাহমুদের ভেতরের একটা অবচেতন সত্তা যেন ততক্ষণে সরব হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
আপনি কথা না বললে তো আসবই।
কী করবে এসে?
আপনি চান আমি আসি? এবার সরাসরিই প্রশ্নটা করল রিয়া।
মাহমুদ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন না। চুপ করে কী ভাবলেন। আসলে নিজের সঙ্গে অদ্ভুত এক যুদ্ধে নেমেছেন তিনি। এই যুদ্ধে তার জয় কিসে, তা তিনি জানেন না। তবে যে অবদমিত ইচ্ছেটা তার ভেতরে প্রবল আলোড়ন তুলতে শুরু করেছে, সেই ইচ্ছেটা ক্রমশ যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রিয়ার গলা হঠাৎ নরম হলো। খানিক গাঢ়ও। সে কেমন মোহনীয় কণ্ঠে বলল, আসব আমি?
না। বললেন মাহমুদ। তবে তার সেই বলায় তেমন দৃঢ়তা নেই। স্পষ্টতা নেই। বরং ওই না-এর ভেতরই যেন একটা অনুচ্চারিত হ্যাঁ উঁকি দিয়ে গেল।
রিয়া বলল, না কেন?
এমনি।
এমনি কেন? আপনি তো বাসায় একা। আমরা তো বাইরে কোথাও দেখাই করতে পারি না। কথাও বলতে পারি না। হাতে তো কিছুক্ষণ সময় আছে। খানিক না হয় নিরিবিলি কথা বলা যাবে।
কিন্তু বিষয়টা ভালো দেখায় না।
কেন? ভালো দেখাবে না কেন? আর আমরা তো এমন কিছু করব না যে ভালো দেখাবে না।
তা না।
তা নয় তো কী? বলে হঠাৎ কেমন খিলখিল করে হাসল রিয়া। বলল, আর করলেই-বা কী? দেখার তো কেউ নেই ওখানে, আছে?
মাহমুদ কথা বললেন না। রিয়া বলল, আমি আসছি।
মাহমুদ আঁতকে ওঠা ভঙ্গিতে বললেন, একদম না, রিয়া। প্লিজ। একা বাসায় এভাবে তোমার আসা ঠিক হবে না।
ঠিক না হলে কেন বললেন যে আপনি বাসায় একা? তার মানে আপনিও মনে মনে চাইছিলেন যে আমি আসি। ঠিক না?
মোটেও তা না। সুমি হঠাৎ চলে গেল। আমার কেন যেন ভালো লাগছিল না।
আমি আসি। ভালো লাগবে।
মাহমুদ তারপরও নানাভাবে রিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু ততক্ষণে তিনি বুঝে গেছেন, এই বোঝানো পুরোপুরি তার মন থেকে নয়, বরং নিজের। সত্তার সচেতন অথচ দুর্বল অংশটা তাকে জোর করে কথাগুলো বলাচ্ছে। অন্যদিকে তার অবচেতন অথচ শক্তিশালী অংশটা সর্বান্তঃকরণে চাইছে রিয়া আসুক। এটা রিয়াও বুঝতে পারছে।
ফলে তার ওই বোঝানোটা যে কেবল তার নিজের কাছেই নিজের দায়মুক্তির আনুষ্ঠানিক চেষ্টামাত্র, তা তাদের দুজনের কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। মাহমুদ ফোন কানে চেপে ধরে বসে রইলেন।
রিয়া বলল, আমি আসছি। বলেই ফোন কেটে দিল সে। মাহমুদ চুপচাপ বসে রইলেন। তার মাথা কাজ করছে।। একটা সূক্ষ্ম ভয়ও জেগে উঠছে। কোনো কারণে যদি সুমি অসময়ে ফিরে আসে, তাহলে?
তিনি সুমিকে ফোন করলেন। সুমি বলল, কী হলো, কোনো সমস্যা?
না। তুমি ঠিকঠাক পৌঁছেছ?
হুম।
মায়ের কী অবস্থা?
ভালো।
আমার কথা জিজ্ঞেস করেছেন?
করেছে। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি বুঝিয়ে বলেছি। পরে একদিন এসে দেখা করে যেয়ো।
আচ্ছা। বলে আর কথা খুঁজে পেলেন না মাহমুদ। সুমি বলল, আর কিছু বলবে?
আমার না ভালো লাগছে না।
কেন?
এই যে ফাঁকা বাসায় আমি একা। কেমন অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে আমিও চলে আসি।
সুমি হাসল। সে জানে মাহমুদ যতই একা থাকতে চান, কিন্তু সে বাসায় না থাকলে একমুহূর্তের জন্যও স্বস্তি মেলে না তার। সারাক্ষণ কেমন অস্থির হয়ে থাকেন। এই অনুভূতিটা অদ্ভুত। এত বছর পরও যখন কেউ এমন করে কারও অনুপস্থিতি অনুভব করে, তখন সেই সম্পর্কটা বিশেষ কিছু। তারও এখন ইচ্ছে করছে মাঝরাতে বাসায় গিয়ে মাহমুদকে চমকে দিতে! আচ্ছা, সে যদি এমন কিছু করে, তাহলে কী করবেন মাহমুদ?
আসবে? কিন্তু কাল না তোমার একটা সেমিনার? বলল সুমি।
হুম, সেটাই ভাবছি। কিন্তু ভালোও লাগছে না।
আজ একটু কষ্ট করো, প্লিজ?
মাহমুদ খানিক চুপ করে থেকে বললেন, তুমি না হয় কিছুক্ষণ থেকে চলে আসো?
আজ?
হুম। রাতে।
পাগল তুমি? এত দিন বাদে এলাম। মায়ের শরীরটা খারাপ। আর এখুনি যদি আবার চলে যাই, তখন মা কী ভাববে?
তাও তো কথা। তাহলে আসতেই পারবে না?
আজ একটু থাকো, প্লিজ। আমি কাল সকাল সকাল চলে আসব।
সকাল সকাল এসে কী হবে? আমি তো বের হয়ে যাব।
ওহ্। তাহলে এক কাজ করো, তুমি সেমিনার থেকে ফেরার পথে আমাকে নিয়ে যেয়ো?
প্রস্তাবটা পছন্দ হলো মাহমুদের। তারপরও তিনি মলিন গলায় বললেন, আচ্ছা।
.
সুমির ফোনটা রাখার পর যেন খানিক স্বস্তি পেলেন মাহমুদ। অন্তত এই একটা ব্যাপারে এখন তিনি নিশ্চিত যে সুমি আর আজ রাতে ফিরবে না। কিন্তু এটি কেন নিশ্চিত হতে চাইলেন তিনি? তিনি কি তবে চাইছেন যে রিয়া আজ রাতে এখানে থাকুক? এই বাসায়?
কথাটা ভাবতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো মাহমুদের। সেই অনুভূতি একই সঙ্গে শঙ্কা ও শিহরণের যুগপৎ যুদ্ধে তাকে এলোমেলো করে দিতে লাগল।
রিয়া এল তার কিছুক্ষণ পরই। মাহমুদ বিচলিত ভঙ্গিতে বললেন, তুমি?
কেন, অন্য কারোর আসার কথা ছিল নাকি?
না না। কিন্তু তুমি যে এভাবে সত্যি সত্যি চলে আসবে, তা কিন্তু আমি ভাবি নি।
আপনাকে বাইরে থেকে যতটা সাদাসিধে মনে হয়, ভেতরে ভেতরে কিন্তু আপনি তেমন নন। বসতে বসতে বলল রিয়া।
মানে?
মানে, আপনি জানেন কী করে কাউকে মুখে না বলেও কাছে ডাকা যায়। প্রলুব্ধ। করা যায়।
আমি কি তেমন কিছু করেছি?
অবকোর্স করেছেন। আপনি চাইছিলেন আমি যেন আসি। আবার সেটা এমনভাবে চাইছিলেন যেন পরে আমি আপনাকে ব্লেমও করতে না পারি। এই ধরনের আচরণ কারা করে, জানেন?
কারা?
যারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোত্রের প্রাণী।
মাহমুদ এবার আর কথা বললেন না। এই মেয়েটার কাছে কেন তিনি বারবার এভাবে হেরে যাচ্ছেন? এমন না যে সুমি ছাড়া আর কোনো মেয়ে তার জীবনে আসে। নি। কিন্তু তারা সকলেই তার ব্যক্তিত্ব, আচরণের সামনে মিইয়ে থাকত। তাকে তুষ্ট করতে তটস্থ থাকত। একমাত্র রিয়ার কাছেই উল্টোটা ঘটে। এখানে তিনিই বরং গুটিয়ে যান। তার সপ্রতিভ, স্পষ্ট আচরণ, কথার কাছে বিনা যুদ্ধে সমর্পণ করেন।
রিয়া বলল, ওল্ড ম্যানের কি মন খারাপ হলো?
মাহমুদ এবারও কথা বললেন না। রিয়া তার পাশে এসে বসল। তারপর বলল, আপনি যেমন হোন, তেমনই আমার ভালো লাগে। এই ভালো লাগাটা বিরল এক অসুখের মতো। আপনি ছাড়া এর আর কোনো ওষুধ নেই।
মাহমুদ চুপ করে আছেন। রিয়া বলল, এবার বলুন আপনি কেন চেয়েছিলেন যে আমি আসি?
আমি একবারও তোমাকে আসতে বলি নি, রিয়া।
বলেছেন। স্পষ্ট করেই বলেছেন। আপনার কী ধারণা, আপনি সত্যি সত্যি না চাইলে এ সময়ে আমি এখানে আসতে পারতাম? সুমি বাসা থেকে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপনি মনে মনে ঠিক করে ফেলেছেন যে আমাকে এখানে আসতে বলবেন। আপনি চেয়েছেন আমি এখানে আসি। কিন্তু আপনি এটাও চান নি যে আপনার সেই আমন্ত্রণ আর দশজন সাধারণ পুরুষের মতো সরাসরি হোক। অশোভন উপায়ে উপযাচকের আমন্ত্রণ হোক।
তোমার কথা ঠিক নয়। আমি কিন্তু তোমাকে ফোন করি নি। ফোনটা তুমিই আমাকে করেছ।
কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আমি ফোন করার আগে আপনি ইচ্ছে করেই আমাকে একটা ব্ল্যাঙ্ক মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, যাতে পরে বলতে পারেন যে ওটা ভুল করে চলে গেছে। আর আমি ওই ব্ল্যাঙ্ক মেসেজের কারণ জানতে আপনাকে ফোন করি। আমি তা ই করেছি। আপনি নির্ভুল টোপ ফেলেছেন। কারণ, আপনি জানতেন যে ওই টোপ আমি গিলবই। কথা কি মিথ্যা?
মেসেজটা ভুল করেই গিয়েছিল।
রিয়া হাসল। শ্লেষাত্মক হাসি। মাহমুদ বললেন, আর আমি বারবার তোমাকে বলছিলাম যে তুমি এসো না। এখন উল্টো আমাকেই অভিযুক্ত করছ তুমি!
একদমই না। মানুষ অভিযোগ কখন করে? যখন কোনো কিছু তার বিরুদ্ধে চলে যায়। কিন্তু এই যে বাসা ফাঁকা হওয়ামাত্রই আপনি আমাকে এখানে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন…। বলে সামান্য থামল রিয়া। তারপর বলল, ওয়েল…ইনডিরেক্ট ইনভাইটেশন পাঠিয়েছেন, তাতে তো আমি বরং খুশিই হয়েছি। সো, আমার কোনো অভিযোগ নেই মি. ওল্ড ম্যান। আই অ্যাম হোল হার্টেডলি হ্যাপি।
মাহমুদ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। রিয়া তার আরও কাছে সরে এল। তারপর কেমন ঘোরলাগা গলায় বলল, আপনি ভালো হতে পারেন। আমি তো আত্মস্বীকৃত খারাপ মেয়ে। খারাপ মেয়েদের কথায় মন খারাপ করতে নেই।
কিন্তু তুমি যা বললে তা মোটেই ঠিক নয়, রিয়া। আমার বরং এখন গিল্টি ফিলিং হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি কেন তোমাকে আরও শক্ত করে নিষেধ করলাম না! কেন বললাম যে সুমি বাসায় নেই!
কেন বলেছেন, বলব?
তুমি যেটা বলবে, সেটা সত্যি নয়। কিন্তু তোমার ভাবনা আমি বদলাতে পারব না।
হবেও না। পৃথিবীর সব মানুষের ভাবনা কি আমরা বদলাতে পারি? পারি না। আমাকে নিয়েও তো কতজন কত কিছু ভাবে। কই, আমি তো সেসব পাত্তা দিই না। অবন্তী কী বলে, জানেন?
কী?
ওর ধারণা, আমি মানসিকভাবে অসুস্থ। আপনারও তো তেমনই ধারণা। না?
মাহমুদ কথা বললেন না। রিয়া বলল, অসুস্থ হই আর যা হই, কিন্তু এটাও তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে আপনার জীবনে আমার চেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর কোনো মেয়ে আর কখনো আসে নি। এমন করে কেউ কখনো আপনাকে ভেঙেচুরে দিতে পারে নি। পেরেছে?
রিয়ার কথা মিথ্যে নয়। মাহমুদ জীবনভরই মেয়েদের আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকা মানুষ। তার চারপাশে অসংখ্য বিকল্প। মেঘ না চাইতেই ঝড়-জল-বৃষ্টিতে বারবার ভিজে গেছেন তিনি। ফলে সহসা কেউ তাকে নাড়িয়ে দিতে পারে নি। মুগ্ধ করতে পারে নি। বরং তিনি যেমন চাইতেন, তেমন করেই অন্যরা নিজেদের সাজাত। তার মনমতো নিজেদের উপস্থাপন করতে চাইত। কিন্তু এই একটিমাত্র মেয়ে, যে তার সহজাত আচরণে, স্বাতন্ত্রে, ঔদ্ধত্যে তাকে ভেঙেচুরে দিয়েছে। কেবল এই মেয়েটির কাছেই তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছেন।
যে শক্ত ব্যক্তিত্বের আবরণে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাইতেন তিনি, সেই আড়াল থেকে যেন মুহূর্মুহূ তাকে বের করে নিয়ে এসেছে রিয়া। যেন তার চোখে তাকিয়েই বুকের ভেতর অবধি দেখতে পায় সে। ফলে রিয়ার সামনে নিজেকে আজকাল ভীষণ নিরাভরণ, নগ্ন মনে হয় তার। নাহলে খানিক আগেই কী অকপটে কত কত কথা বলে গেল সে! কী অবলীলায় তার ভাবনা, আচরণ সব ব্যাখ্যা করে ফেলল! সেসব কি মিথ্যে?
রিয়া বলল, আমার সঙ্গে মিথ্যা বললেও ক্ষতি নেই। ওসব নিয়ে ভাবি না আমি। আমি কেবল আমার প্রাপ্তি নিয়েই ভাবি। আপনি অস্বীকার করলেও এটা সত্যি যে আপনি ইচ্ছে করেই কৌশলে আমাকে এখানে ডেকে এনেছেন। আর এতে আমি খুশিই হয়েছি। সুতরাং আপনার ওই অভিনয়টুকু নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। এখন বলুন, কী চাই?
কী চাইব?
কিছুই না?
মাহমুদ কথা বললেন না।
রিয়া বলল, একটি সুন্দরী তরুণী একা বাসায় আপনার গা ঘেঁষে বসে আছে, আর আপনি তার কাছে কিছু চাইবেন না?
মাহমুদ এবারও চুপ। তবে তিনি টের পাচ্ছেন তার নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। গলা শুকিয়ে আসছে। রিয়া আরও খানিক ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। তার শরীরের মোহনীয় সুগন্ধির সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে ঘরময়। সেই সুবাসে মাহমুদের চিন্তাভাবনা সব এলোমেলো হয়ে যেতে লাগল। তিনি নিজের অজান্তেই যেন রিয়ার আরও কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতে চাইলেন।
রিয়া গাঢ়, গম্ভীর গলায় বলল, কী, চাই কিছু?
মাহমুদ প্রায় কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললেন, কী চাইব?
অন্তত চা কিংবা বিস্কুট? বলেই খিলখিল করে হেসে ফেলল রিয়া। তারপর অকস্মাৎ উঠে দাঁড়াল। বলল, রান্নাঘরটা কোন দিকে?
মাহমুদ হতভম্ব ভঙ্গিতে রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই জীবনে কখনো এত বিব্রত আর হন নি তিনি। রিয়া চা বানিয়ে এসে দেখে মাহমুদ তার পড়ার ঘরের টেবিলে বসে আছেন। এখানে আলো কম। বাইরে ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। ফলে জানালাগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন মাহমুদ। টেবিলে একটা নরম আলোর ল্যাম্প জ্বলছে। সেই আলোতে মাহমুদের মুখোমুখি বসল রিয়া। তারপর বলল, সুমি আজ রাতে ফিরবে না, তাই না?
মাহমুদ চমকে উঠলেন, মানে?
মানে আপনি আগে থেকেই জানতেন যে সুমি আজ রাতে ফিরবে না।
কে বলল তোমাকে?
কে বলল সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, গুরুত্বপূর্ণ হলো আমার কথা সত্যি কি না।
নিজেকে আচমকা ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতো মনে হতে লাগল মাহমুদের। তিনি মিনমিন করে বললেন, কিন্তু তুমি কী করে বুঝলে?
রান্নাঘর দেখে। বারান্দা, শোবার ঘর, খাবার টেবিল দেখে। সে যাওয়ার আগে সব গোছগাছ করে রেখে গেছে। বারান্দায় একটাও কাপড় ঝোলানো নেই। সব ভাজ করে তুলে রেখে গেছে সে। সন্ধ্যার আগেই রাতের খাবার রেডি করে রেখেছে। আরও অনেক ব্যাপার আছে। সে যদি আজই ফিরে আসত, তবে সবকিছু অন্য রকম থাকত।
মাহমুদ কী বলবেন ভেবে পেলেন না। রিয়া বলল, আমার অনুমান কি ঠিক?
মাহমুদ এবারও কথা বললেন না। তবে কাঁপা কাঁপা হাতে রিয়ার হাত ছুঁয়ে দিলেন তিনি। এই প্রথম কোনো মেয়ের কাছে এমন সর্বৈব পরাজয় ঘটল তার; কিংবা আত্মসমর্পণ। এত দিন অন্যরা তার কাছে নিঃশেষে নিজেদের সমর্পণ করত। কিন্তু আজ এই অল্প বয়সের প্রগল্ভ, আপাতদৃষ্টে অগভীর, চঞ্চল মেয়েটার কাছে তিনি কী করে এমন নিঃশর্তে নিরঙ্কুশভাবে পরাজিত হলেন?
.
রিয়া সেই রাতটা থেকে গেল সেখানেই। সুমি মাহমুদকে মাঝরাতে চমকে দেওয়ার কথা ভাবলেও তা আর করা হলো না। বরং পরদিন সেমিনার থেকে ফেরার পথে তাকে সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরলেন মাহমুদ। সবকিছুই যেন আগের মতো। কিন্তু মাহমুদ জানেন, রিয়া নামের ওই ডানপিটে, দুরন্ত স্বভাবের মেয়েটির কাছে তিনি ক্রমশ উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। নিজের সহজাত শক্তিশালী সত্তাটাকে তার কাছে আর খুঁজে পান না। নতজানু হয়ে থাকেন এবং একটা অব্যাখ্যেয় ভয়ও কাজ করতে থাকে সারাক্ষণ। এই ভয়টা কিসের কে জানে!
তবে ভয়টা অন্যভাবেও ধরা দিল। বেশ কিছুদিন বাদে সুমি হঠাৎই একদিন তাকে জিজ্ঞেস করল, বাসায় কি কেউ এসেছিল, মাহমুদ?
৩০. অবন্তীর মন খারাপ
অবন্তীর মন খারাপ। তার নামে চিঠি এসেছে। চিঠিতে ঝকঝকে মুক্তোর মতো হাতের অক্ষরে লেখা, শোনো কাজল চোখের মেয়ে, আমার দিবস কাটে বিবশ হয়ে তোমার চোখে চেয়ে…।
এই একটিমাত্র লাইন। আর কিছু লেখা নেই। এমন চিঠি পেয়ে যেকোনো মেয়েরই মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অবন্তীর হয় নি। বরং মন খারাপ হয়েছে। এই মন। খারাপের কারণ চিঠিটা বেনামি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই নিয়মিত আসছে। অনেক চেষ্টা করেও সে প্রেরকের নাম আবিষ্কার করতে পারে নি। ফলে প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও এখন বিরক্ত লাগছে। মনে হচ্ছে, পরিচিত কেউ দুষ্টুমি করছে। হয়তো তার ক্লাসেরই কেউ। যদি তা-ই হয়, তবে বিষয়টা খুবই খারাপ হবে।
সেদিন সন্ধ্যায় হলের গেটে মঈনকে দেখে যে অস্বস্তিটা তার হয়েছিল, তা এখনো কাটে নি। মঈন কার জন্য ওখানে অপক্ষো করছিল? আর তাকে দেখে ওভাবে সরেই বা গেল কেন? অনেক ভেবেও এর উত্তর পায় নি অবন্তী। রিয়ার পাশে শুয়ে ঘুমের ভান করে রাতটা কাটিয়ে দিলেও আসলে একটুও ঘুমাতে পারে নি সে। বারবারই কেবল মনে হয়েছে, মঈন কি তবে অন্য কারও জন্য অপেক্ষা করছিল? কে সে? সে কি তবে আর কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে?
যদি যায়ও, তাতে তার কী? সে তো মঈনের কাছ থেকে দূরেই সরে এসেছে। মঈন তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে তাকে ধরে রাখার। কিন্তু অবন্তী সেই সুযোগটাই আর দেয় নি। এখন সে যদি অন্য কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তাতে তো তাকে দোষ দেওয়া যায় না। নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার আছে।
সমস্যা হচ্ছে, এত সব বুঝেও নিজের ভেতর খোঁচাতে থাকা প্রবল অস্বস্তির কাঁটাটাকে সে উপড়ে ফেলতে পারে না। সে কি তবে মঈনকে এখনো ভালোবাসে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অথই জলে হাবুডুবু খেতে থাকে অবন্তী। মঈনকে ভালো না বাসার কারণ কি আদৌ তার আছে? আর যদি থেকেও থাকে, তবে সেই কারণটা তার মঈনকে অবশ্যই বলা উচিত। অসংখ্যবার বলবে বলেও ভেবেছে সে। কিন্তু অতিসংবেদনশীল, সদা অন্তর্মুখী অবন্তী তা পারে নি।
সে জানে, প্রতিটি মানুষের জীবনেই এমন অসংখ্য দুঃখ থাকে, গোপন অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকে, যার কথা সে কখনো কাউকে বলতে পারে না। মানুষ ভাবে, সে বুঝি সব সময় যৌক্তিক, ন্যায্য আচরণটাই করে। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। চাইলেও সব সময় সে তা পারে না। জীবন কখনো কখনো এমন গভীর অন্ধকারের ঘূর্ণিপাকে মানুষকে নিমজ্জিত করে ফেলে যে সেখান থেকে উত্তরণের পথ আর তার জানা থাকে না।
মঈনকে নিয়ে অবন্তীর দ্বন্দ্বটাও সেখানেই। যে অন্তর্ঘাতে সে প্রতিমুহূর্তে পুড়ে যাচ্ছে, তার কথা এই পৃথিবীতে কখনো কাউকে বলতে পারবে না সে। মঈনকে তো নয়ই। কিন্তু মঈন ওখানে কী করছিল সেদিন সন্ধ্যায়?
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই অবন্তী আবিষ্কার করল, মঈন প্রায়ই ওখানে আসে। কিন্তু কেন আসে, সেই রহস্য সে ভেদ করতে পারল না। আর তারপর হঠাত্র একদিন এই বেনামি চিঠি আসা শুরু করল তার নামে। তত দিনে হলে সিট পেয়ে গেছে অবন্তী। নিজের আলাদা ঘুমানোর জায়গা হয়েছে। নতুন বিছানা-বালিশ কিনে এনে যত্ন করে সব সাজিয়েছে। এত দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছন্নছাড়া হলজীবনটাকে তার আপন নিবাস বলে মনে হতে শুরু করল।
কিন্তু কে তাকে এভাবে চিঠি লেখে? মঈন নয়তো? প্রশ্নটা চকিতে একবার মাথায় ঘুরে গেলেও নিশ্চিত হতে পারল না অবন্তী। মঈনকে সে যতটুকু চেনে, তাতে এমন কাজ তার করার কথা নয়। সে মোটেই এতটা সংবেদনশীল, রোমান্টিক মানুষ নয়। অবন্তীর এখনো স্পষ্ট মনে আছে, প্রথম দিন মঈন যখন তার সঙ্গে কথা বলেছিল, সেই কথা বলার ভঙ্গিটা ছিল ভয়ানক রূঢ়, অশোভন।
অবন্তী সেদিন খানিক আগে আগেই পড়তে গিয়েছিল। শীতের দুপুর তখন চট করে বিকেল হওয়ার অপেক্ষায়। মঈনদের উঠানের পেয়ারাগাছটার পাতার ফাঁক গলে তেরছা সোনালি এক ফালি আলো এসে পড়েছে ঘরের দাওয়ায়। সেখানে বসে বাসি পত্রিকা পড়ছিল মঈন। অবন্তী কী করবে বুঝতে পারছিল না। মঈন সরে গিয়ে তাকে জায়গা না করে দিলে সে ঘরেও ঢুকতে পারছিল না।
অবন্তী খানিক দাঁড়িয়ে থেকে বলল, মজিবর চাচা আছেন?
যেন ঠিকভাবে শুনতে পায় নি, এমন ভঙ্গিতে তাকাল মঈন। তবে কথা বলল না। বরং আবারও পত্রিকার পাতায় মনোযোগ দিল সে। অবন্তী দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল, চাচা। বাড়িতে আছেন?
কোন চাচা? পত্রিকা থেকে মুখ না তুলেই বলল মঈন।
মজিবর চাচা।
তার কাছে কী দরকার?
আমি তার কাছে পড়ি।
কারও কাছে পড়লে তাকে স্যার বলতে হয়, চাচা নয়। এইটুকু আদবকায়দা না জানলে পড়ে কী হবে?
অবন্তীর হঠাৎ কান্না পেয়ে গেল। তাকে এমন রূঢ় ভাষায় কেউ কখনো কিছু বলে। নি। সে কী বলবে ভেবে পেল না। মঈন বলল, বলল, মজিবর স্যার বাসায় আছেন?
অবন্তী বলতে পারল না। তার হাত-পা কাঁপছিল। গলা শুকিয়ে আসছিল। রাগে, দুঃখে, অপমানে দিশেহারা লাগছিল। একবার মনে হচ্ছিল না পড়েই বাড়ি ফিরে আসবে। সে। আর কখনোই ও বাড়িতে যাবে না। কিন্তু সেই শক্তিটুকুও যেন আর নেই।
মঈন অবশ্য তাকে চমকে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর দরজার সামনে থেকে চেয়ারটা সরাতে সরাতে বলল, এত অল্পতেই এমন নার্ভাস হলে চলবে? এখন উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের যুগ। মেয়েদের আরও চটপটে, স্মার্ট হতে হবে। উইমেন। এমপাওয়ারমেন্ট মানে কী, জানো?
অবন্তী কথা বলল না। শীতের বিকেলেও তার কানের পাশ দিয়ে সরু ঘামের। প্রস্রবণ উঁকি দিতে শুরু করেছে। এরপর মঈনের সঙ্গে আর কথা হয় নি তার। তবে যতক্ষণ সে ও বাড়িতে থাকত, ততক্ষণই আড়চোখে মঈনকে খুঁজত। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মঈনের আর দেখা মিলল না। যতটা ভয়, ঠিক ততটাই কৌতূহল নিয়ে অদ্ভুত এক অপেক্ষায় সময় কেটে যেতে লাগল তার। মঈনের দেখা মিলল এরও বেশ কিছুদিন পর। তখন তার মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথায় লম্বা চুল। আরও রুক্ষ, কঠিন ভাব। মানুষটাকে দেখে এবার ভয়ের সঙ্গে একটা বিরক্তিও তৈরি হলো অবন্তীর। সেই বিরক্তি আরও বাড়ল যখন সে কারণে-অকারণে কথা বলার চেষ্টা করল। অথচ সেই। কথায় কোনো কোমলতা নেই, সৌজন্যবোধ নেই। ঠোঁটকাটা, চাঁছাছোলা কথা। একদিন হুট করেই তার পড়ার টেবিলের সামনে এসে বলল, আব্বা, এই মেয়ে তো মনে হয় না পাসটাস কিছু করতে পারবে?
মজিবর চাচা চোখ তুলে ছেলের দিকে তাকালেন, কেন?
আমি গতকাল তার ইংরেজি বই দেখলাম। পুরো বইতে কোথাও একটা দাগ পর্যন্ত নেই। যেন আজই দোকান থেকে কিনে এনেছে। একে এত যত্ন করে পড়িয়ে তো লাভ নেই। পাস তো করবেই না, উল্টো দোষ হবে আপনার।
অবন্তী সেদিন কেঁদেই ফেলেছিল। তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন মজিবর চাচা। ছেলেকে ভর্ৎসনা করে তার মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন, ওকে। নিয়ে তোর অত মাস্টারি করতে হবে না। ও খুবই ভালো ছাত্রী। অবশ্যই সে ভালো রেজাল্ট করবে।
জবাবে শ্লেষাত্মক হাসি হেসেছিল মঈন। তারপর আবার হুট করে উধাও। দীর্ঘদিন কোনো খবর নেই। সমস্যা হচ্ছে, অবন্তী হঠাৎ আবিষ্কার করল, ও বাড়িতে গেলে সে অবচেতনেই মঈনকে খোঁজে। এই খোঁজা কোনোভাবেই তার প্রতি কোনো অনুরাগ থেকে নয়, তেমন কারণও নেই। প্রথম প্রথম সেটি একধরনের ভয় কিংবা বিরক্তি থেকেই। এই বুঝি কোথাও থেকে হঠাৎ ভূতের মতো এসে উদয় হলো! তারপর আলটপকা কিছু কথা বলে তার মন খারাপ করে দিল।
ওই ভয়টাই সারাক্ষণ আতঙ্কিত করে রাখত তাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পরও যখন সে এল না, তখন কেমন একটা অব্যাখ্যেয় শূন্যতার অনুভূতি ক্রমশ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখতে লাগল। রোজই মনে হতো, আজ বুঝি মঈনের সঙ্গে দেখা হবে। এই বুঝি পেছন থেকে এসে কঠিন কিছু বলবে সে! কিন্তু তার এই আশঙ্কা যখন রোজই ভুল প্রমাণিত হতে লাগল, তখন নিজের অজান্তেই ওই আতঙ্ক একসময় অপেক্ষায় পরিণত হতে লাগল কিংবা প্রত্যাশায়ও। তবে এই উপলব্ধির ব্যাখ্যা অবন্তীর কাছে নেই।
একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে হঠাই তার সামনে এসে দাঁড়াল মঈন। তার ঠোঁটে সিগারেট। মুখভর্তি ধোঁয়া গলগল করে ছাড়তে ছাড়তে সে বলল, তুমি কি আমার ওপর বিরক্ত?
অবন্তী কথা বলল না। মঈন বলল, একটা বিষয় আমি কিছুতেই বুঝি না, আমার আশপাশে সবাই কেন আমার ওপর বিরক্ত হয়? আব্বা আমাকে কী বলেছে, জানো?
অবন্তী কথা না বললেও তাকাল।
আব্বা বলেছে তোমাকে পড়ানোর সময় আমি যেন বাড়িতে না থাকি। তুমি নাকি আমাকে ভয় পাও। এটা কি সত্যি?
অবন্তী এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। মঈন বলল, অন্যরা আমার ওপর বিরক্ত হলে, ভয় পেলে আমার কিছু এসে-যায় না। ওসব আমি গ্রাহ্যই করি না। কিন্তু আব্বা যখন কথাটা বলল, তখন থেকে আমার কেন যেন খুব খারাপ লাগছে। এমন তো এর আগে কখনো হয় নি! এমন কেন হচ্ছে, বলো তো?
কী বলবে অবন্তী, এই প্রশ্নের উত্তর যে তার কাছে নেই। মঈন হাসল। ফ্যাকাশে, বিব্রত হাসি। তার সঙ্গে এমন হাসি যায় না। তাকে খানিক নার্ভাসও মনে হচ্ছিল। সম্ভবত তার ওই সলজ্জ, বিব্রত হাসিটুকুই অবন্তীর মনে গেঁথে রইল। মনে হলো, কঠিন, রূঢ় ওই মানুষটার ভেতরও তার জন্য বিশেষ একটা অনুভব হয়তো আছে। কিন্তু কেন? মঈন বলল, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর কখনো আমি তোমার সামনে যাব না। তুমি আমার ওপর বিরক্ত হলে, ভয় পেলে আমার খারাপ লাগে।
সেদিনের কথা ওইটুকুই। এরপর আর মঈন তার সামনে আসে নি। কিন্তু অবন্তীর বুকের ভেতর এক অনির্ণেয় অনুভূতি ক্রমশ বাসা বাঁধতে লাগল। তার রোজ মনে হতো, কেন সে আসে না? কেন সে আর আগের মতো হুটহাট এটা-সেটা বলে তাকে চমকে দেয় না?
সেই শুরু। তবে শুরুর ওই গল্পটা কখনোই এর থেকে আলাদা কিছু হয় নি। কখনো কখনো সে নিজে থেকেই খানিক উপযাচকের ভূমিকা পালন করত। মঈন তখন কিছুটা এগিয়ে আসত। আবার পরক্ষণেই দূরে সরিয়ে দিত অবন্তী। মঈনও তখন বিনা প্রতিবাদে, অভিযোগহীন দূরে সরে যেত। অবন্তীর ভেতর শুরু হতে থাকত প্রবল শূন্যতা। দ্বিধাদ্বন্দ্বের খেলা। সেই খেলায় রোজ হেরে যেত সে। আবার কাছে ডাকত। মঈনও চুপচাপ পাশে এসে যেত। তাদের সম্পর্কটা এমনই। মঈন তার জন্য কখনো এমন কিছু করে নি যে তাতে মুগ্ধ হয়ে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল সে। কিন্তু তারপরও তারা জানত, একটা বিশেষ অনুভব পরস্পরের জন্য বয়ে বেড়ায় তারা।
সেই মঈন তাকে বেনামে চিঠি লিখবে। সেই চিঠিতে লেখা থাকবে–
শোনো, কাজল চোখের মেয়ে,
আমার দিবস কাটে বিবশ হয়ে
তোমার চোখে চেয়ে…।
কিংবা
তোর জন্য ফুল কুড়িয়ে নিলে,
সাথে খানিক ভুল কুড়িয়ে নিলে,
ভুল করেই বললে ভালোবাসি,
তুই কি তবু হাসবি অমন হাসি?
কিংবা
এই যে মেয়ে কাজল চোখ,
তোমার বুকে আমায় চেয়ে
তীব্র দাবির মিছিল হোক।
এ রীতিমতো অসম্ভব। অবন্তীর চেয়ে ভালো এ কথা আর কেউ জানে না। তাহলে কে তাকে এই চিঠি পাঠাচ্ছে? বিষয়টা নিয়ে কারও সঙ্গে কথাও বলতে পারছে না সে। এর কারণও আছে। চট করে যে কারও সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চায় না সে। হয়তো দেখা যাবে এটা নিয়ে অন্যরা তখন হাসাহাসি করছে। তা ছাড়া রিয়া আবার হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। ফোন করেও পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। কী যে হয় মাঝে মাঝে মেয়েটার! কবে যে আবার তার দেখা পাবে কে জানে!
অনেক ভেবে মঈনের সঙ্গেই কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল অবন্তী। সে তাকে ফোন করে বলল, আপনি কি আমার সঙ্গে একটু দেখা করতে পারবেন?
মঈন বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। যেন এমন অভাবিত ব্যাপার ঘটতে পারে, এটা সে চিন্তাও করে নি। ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল সে। কিন্তু বিষয়টা অবন্তীকে বুঝতে দিতে চাইল না। তা ছাড়া কিছুদিন আগেই রিয়ার সঙ্গে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও তার ঘটে গিয়েছিল। নিজেকে সেদিন আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি সে। ফলে মঈন ভেবেছিল, কথাটা হয়তো কোনোভাবে অবন্তীর কান অবধিও পৌঁছে গেছে। যদিও রিয়ার তাকে চেনার কথা নয় যে সে বিষয়টা আলাদা করে অবন্তীর কাছে বলবে বা তার কথা উল্লেখ করবে। তারপরও ভেতরে ভেতরে বেশ গুটিয়েই গিয়েছিল সে।
এসব নানা ঘটনা মিলিয়ে যতটা সম্ভব সংযত হয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করেছিল মঈন। কিন্তু নিজেকে যতটা দূরে সরিয়ে রাখতে চায়, যতটা আড়ালে লুকাতে চায়, ততটাই যেন ক্লান্ত, অসহায়, দমবন্ধ লাগে তার। মনে হয়, যদি একমুহূর্তের জন্যও কথা বলতে পারত অবন্তীর সঙ্গে দেখা করতে পারত!
এ এক বিভীষণ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে এখন অবধি সংশপ্তক সে। ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলেও বাইরে তা প্রকাশ করে নি। কিন্তু অবন্তী কি তা বুঝতে পারে? সে কি তার এই ইচ্ছাবিরুদ্ধ জোর করে দূরে থাকা টের পায়? হয়তো পায় না কিংবা পায়। না হলে এই এত দিন বাদে হঠাই কেন সে দেখা করতে চাইবে? নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে তার অনুপস্থিতি অনুভব করছে সে।
মঈন শান্ত গলায় বলল, কেন?
একটু দরকার ছিল।
ফোনেই বলো।
নাহ্। সামনাসামনি বলব।
মঈন ভেবেছিল সে আরও কঠোর হবে। দেখা করতে চাইবে না। কথাও বলবে না বেশিক্ষণ। হঠাৎ ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোন রেখে দেবে। কিন্তু তেমন কিছুই করতে পারল না সে। বরং রণে ভঙ্গ দিয়ে বলল, আচ্ছা।
তারা দেখা করল পরদিন। রিয়ার বিষয়টা নিয়েও খানিক সন্ত্রস্ত হয়ে ছিল মঈন। তবে অবন্তী সেসব কিছুই বলল না। সে সরাসরিই চিঠির প্রসঙ্গটা তুলল। বলল, আপনি কি আমাকে চিঠি লেখেন?
চিঠি! হতভম্ব চোখে তাকাল মঈন।
হুম, চিঠি। হাতে লেখা চিঠি।
আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।
সত্যিই বুঝতে পারছেন না, নাকি না বোঝার ভান করছেন?
আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না। আর তোমাকে আমি চিঠি কেন লিখব?
প্রশ্নটা অবন্তী নিজেকেও করেছে। মঈনের তাকে চিঠি লেখার আসলেও কোনো কারণ নেই। আর তাও আবার দু-তিন লাইনের কবিতা লেখা চিঠি। তাতে স্পষ্ট কোনো কথা নেই। ঘটনা কিংবা বক্তব্য নেই। মঈন যদি তাকে লিখতও, তবে তাতে তাদের সম্পর্কের কথা থাকত, বিচ্ছিন্নতার কথা থাকত। থাকত তাকে বোঝানোর চেষ্টাও। আর
সে ক্ষেত্রে সে অবশ্য নিজের নামেই চিঠি লিখত। তা ছাড়া মঈনের হাতের লেখা সে। চেনে। ওই হাতের লেখা তার নয়। অন্য কাউকে দিয়ে এমন চিঠি লেখানোর কোনো কারণও তার নেই।
অবন্তী বলল, জানি না। কিন্তু কেউ একজন আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখছে।
কে?
জানি না। বেনামে।
কী লিখছে?
তেমন কিছু না।
কেমন কিছু?
হাবিজাবি কবিতার লাইন।
ওহ্! তোমার পরিচিত কেউই হয়তো। হয়তো তোমাকে পছন্দ করে।
আপনিও তো আমার পরিচিতই। কথাটা বলেও হঠাৎ থমকে গেল অবন্তী। এভাবে বলা বোধ করি ঠিক হয় নি তার।
হ্যাঁ। আমিও তো তোমার পরিচিত কেউই। বলে হাসল মঈন। ফ্যাকাশে, মলিন হাসি। সম্ভবত এই হাসিটাই সেই প্রথম যেদিন রাস্তায় মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল তারা, সেদিন হেসেছিল। কিন্তু আমি যে চিঠি লেখার মতো মানুষ নই, তা বোধ করি তুমি জানো। আর যদি লিখিও, তবে বেনামে কেন লিখব? তাতে আমার লাভ কী?
এই প্রশ্নে চুপ করে রইল অবন্তী। মঈনের কথা যুক্তিসংগত। সে নিজেও জানে, কাজটা মঈন নয়, হয়তো অন্য কেউই করছে। কিন্তু সেই অন্য কেউটা কে?
কিন্তু আপনি যে প্রায়ই আমার হলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আমাকে দেখলেই আড়ালে চলে যান, তা কেন?
মঈন এবার যেন থতমত খেয়ে গেল। বলল, সব প্রশ্নের উত্তর সবার কাছে থাকে? আর থাকলেও সেটা সবার ভালো না-ও লাগতে পারে।
আমার ভালো লাগবে না?
না।
কেন?
কারণ, এই তুমি সেই তুমি নও, যাকে আমি চিনতাম।
আপনি আমাকে চেনেন না?
নাহ্।
কেন?
সেটা তুমি জানো। আর এটা খুব কষ্টেরও। তার চেয়েও বেশি কষ্টের যখন তুমি বুঝবে যে তুমি যাকে একটুও চেনো না, বুঝতে পারো না, অথচ সেই মানুষটা তোমাকে হাতের তালুর মতো চেনে।
আমি আপনাকে হাতের তালুর মতো চিনি?
হুঁ। আর সেটা তুমি ভালো করেই জানো। আমার মাঝে মাঝে কী মনে হয়, জানো?
কী?
আমার মনে হয়, আমি যদি তোমাকে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিতে পারতাম, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারতাম।
তাহলে কী হতো?
তাহলে যদি দেখা যেত ঠিক কী কারণে তুমি এমন হয়ে গেলে!
আপনিই তো বললেন সব কারণ জানতে নেই। সব উত্তরও না। শুনতে ভালো লাগবে না। চেনা পৃথিবীটা হঠাৎ চোখের সামনে এলোমেলো হয়ে যাবে।
মঈন আর কথা বলল না। তার জীবন যে পুরোপুরি শুদ্ধ, তা নয়। বরং সেখানে। আলোর চেয়ে অন্ধকারই হয়তো বেশি। বেপরোয়া, উদ্দাম, অসংযত এক জীবন সে কাটিয়েছে। সেই জীবনের কত কত গলিঘুজির কথা সে নিজেই ভুলে গেছে। পত্রিকায় তাকে নিয়ে খবর বেরোনোর পর তার অনেক কিছুই নতুন করে সামনে এসেছে। সেই সব খবরে নানান রং লাগিয়ে রসালোভাবে প্রকাশও করা হয়েছে। অবন্তী হয়তো তেমন। কিছুর কথাই জানে। কিন্তু সেই কথাটা সে কেন বলছে না? অন্তত বলে দিলেও নিজেকে প্রবোধ দিতে পারত সে।
মানুষ যা জানে, তার সব কি সব সময় সত্য হয়, অবন্তী? এমনকি যা দেখে, তা ও?
না। হয় না। কিন্তু তাই বলে পৃথিবীতে কি সত্য নেই?
তা আছে। কিন্তু সত্যের উল্টো পিঠে হয়তো আরও অনেক সত্য থাকে। আমরা কি সেই সত্যটা কখনো জানতে চাই?
সব আলাদা করে জানতে হয় না। কিছু সত্য চোখের মতো, তা চোখে না দেখা গেলেও আমরা জানি যে ওটা আছেই।
কথাটা ভাবাল মঈনকে। মাত্র কদিনেই সেই ভীরু, লাজুক, ছোট্ট অবন্তী কেমন বড়, সপ্রতিভ হয়ে গেছ। অবন্তী কি জানে সে তাকে কত ভালোবাসে? নাকি এই ভালোবাসার পুরোটাই কেবল তার উপেক্ষার কারণে সৃষ্টি? না হলে এমন তো এর আগে কখনো কারও জন্য হয় নি তার?
.
সেদিন আর কথা এগোয় না। দুজনই দুজনের কাছে অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন রেখে বিদায় হয়। কিন্তু রাতে রুমে ফিরে আরও একবার তালাবন্ধ ট্রাংক থেকে চিঠিগুলো বের করে অবন্তী। সে এখন নিশ্চিত যে এগুলো মঈন লেখে নি। কে লিখেছে তাহলে? লোকটার প্রতি একটা দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করে সে। কৌতূহলও। কী সুন্দর গোটা গোটা হাতের অক্ষরে লেখা
তুমি তার কাছে যেয়ো রোদ, যে জানে আলো কত দামি,
তুমি তার কাছে যেয়ো মন, যার কাছে শুধু দামি আমি!
কিংবা
অমন কাজল চোখে তুমি চেয়ে রোজ
ওই চোখে জীবনের হিসেব সহজ।
সেই রাতে অবন্তী আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর যেন নিজের অজান্তেই চোখে কাজল পরার চেষ্টা করে। তার চোখ কি আসলেই অত সুন্দর? কে সে, যে এমন করে রোজ তার চোখ দেখে কবিতা লেখে? মুগ্ধ হয়?
গত তিন সপ্তাহে সে সাতটি চিঠি পেয়েছে। প্রতিবারই ভেবেছে এই চিঠি কুচিকুচি করে ছিঁড়ে চারতলা থেকে নিচে ফেলে দেবে। ফেলে দেওয়ার সময় বাতাসে ভেসে টুকরো কাগজগুলো কী করে উড়ে উড়ে নিচে পড়ে, তা দেখবে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, একবারও তা করা হয় নি। প্রতিবারই রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে চিঠি ফেলতে গিয়েও ফেলতে পারে নি।
কবিতার কথাগুলো কেমন যেন! প্রথম প্রথম যে তেমন ভালো লাগে, তা নয়। কিন্তু তারপর সময় যত গড়াতে থাকে, ততই মাথায় ঘুরতে থাকে। বিধতে থাকে আলপিনের মতো। একটা প্রবল অস্বস্তির অনুভূতি দিতে থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয়, কোনো একটা শব্দ হয়তো ভুলে গেছে। সেই শব্দ মনে করার জন্য মাঝরাতে লুকিয়ে একা সে তার ট্রাংক খুলে চিঠিগুলো বের করে। তারপর ভুলে যাওয়া শব্দের লাইনটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে। এই একটা শব্দ পড়তে গিয়ে আবারও তার সবগুলো চিঠি পড়া হয়ে যায়। আর তারপর রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে সে বিড়বিড় করে বলে, কী আশ্চর্য! আমার না কাল পরীক্ষা? এগুলো আমি কী করছি?
এই অবধি ঘটনা সরলই ছিল। খানিক বিরক্তিকর রহস্য, অস্বস্তিকর ভালো লাগা, আর একটু দ্বিধান্বিত রোমান্টিসিজম। কিন্তু ঘটনা গুরুতর আকার ধারণ করল পরের সপ্তাহে।
.
এখন সাধারণত ছুটির দিনটাতে হৃদিদের বাড়িতে যায় অবন্তী। ওই বাড়িটা তার ভীষণ পছন্দের। ঢাকা শহরে যে এখনো এমন বাড়ি আছে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। বাড়ির সামনে অতটা খোলা জায়গা। সেখানে পাতাবাহার, দোলনচাঁপা, বাগানবিলাসের ঝোঁপ। ছাদে চেয়ার পেতে বসলে হাত বাড়িয়ে বিশাল আমগাছের ডাল-পাতা ছুঁয়ে দেওয়া যায়। আমের মৌসুমে টুপটাপ আমও পেড়ে ফেলা যায়। চারপাশজুড়ে অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য। একটা শান্তি শান্তি ভাব। মন খারাপ হলে এই বাড়ির উঠোনে হাঁটলে মন ভালো হয়ে যায়। শেওলা ধরা সবুজাভ উঠানে বর্ষার সময় খুব সাবধানে পা ফেলে ফুল কুড়াতে হয়।
অবন্তী মফস্বলে বড় হলেও কখনো চালতা ফুল দেখে নি। অথচ ঢাকা শহরের এই বাড়িতে একটা বড় চালতাগাছও আছে। সেই গাছের ফুল যে এত সুন্দর হতে পারে, তা তার জানা ছিল না। সে উঠোনে ছড়িয়ে থাকা চালতা ফুল কুড়ায়। কখনো-সখনো। কানের কাছে চুলের ভেতর খুঁজে দেয়। তখন তার নিজেকে পুষ্পকুমারী মনে হয়। আচ্ছা, এই পুষ্পকুমারী শব্দটা সে কোথায় শুনেছে? অবন্তী ঠিক মনে করতে পারে না। কোনো বইয়ে পড়েছে হয়তো। কিন্তু পুষ্পকুমারী দেখতে কেমন? কে সে? অবন্তী তা ও জানে না। তবে কল্পনায় একটা ছবি এঁকে নেয়। নিজেকে তখন তার সেই কল্পিত পুষ্পকুমারী মনে হয়।
এখন এ বাড়িতে সবচেয়ে বড় সুবিধা যেটি, সেটি হলো হৃদির ঘরটা ফাঁকা। বিয়ের পর সে নেহালের সঙ্গে দেশের বাইরে গেছে। ফলে অবন্তী এখানে এলে তার ঘরেই থাকে। রুমটা বড়। অ্যাটাচড বাথ। আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, এসি–সবই আছে। তবে তার আগ্রহ ড্রেসিং টেবিলের ওপর থাকা বড় ঝকঝকে আয়নাটায়। সে ইচ্ছে হলেই ওই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে কাজল দিতে পারে। চোখ জ্বালা করলে কিংবা চোখে পানি চলে এলে আরাম করে মুছে ফেলতে পারে। কেউ দেখে ফেলবে বলে তটস্থ হয়ে থাকতে হয় না।
রিয়ার মতো কেউ পেছন থেকে হঠাৎ ফিক করে হেসে দিয়ে বলে না, কী রে নিশিকন্যা, রাতের অভিসারে যাচ্ছিস নাকি? তা রেট কত তোর?
কী বিচ্ছিরি কথা! এমন জঘন্য কথা কেউ কাউকে বলতে পারে? কিন্তু রিয়া পারে। সে এমনই। তার মুখে কিছু আটকায় না। সে ছেলেদের সামনেও অকপটে জগতের সবচেয়ে অশ্লীল কথাটা বলে দিতে পারে। হাঁটু ভাজ করে আচমকা বেজায়গায় লাথি কষাতে পারে। এসবে তার আড় নেই। ফলে আর সবার মতো এসব বিষয়ে রিয়ার সামনে সে-ও জড়সড় হয়ে থাকে। আজ অবশ্য সেসবের বালাই নেই। এই ঘরের একচ্ছত্র অধিপতি আজ সে নিজে। কোনো দ্বিধা, ভয়, সংকোচ ছাড়াই এখন গুনগুন করে গান গাইতে পারবে।
আর কাজল আঁকতে পারবে চোখে।
.
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই কাজটা সে কেন করছে? এমন তো নয় যে সে পনেরো-ষোলো বছরের কিশোরী কোনো মেয়ে! ওই সামান্য কয়েকটি লাইন পড়েই তার মন এমন উচাটন হওয়ারও কথা নয়। তারপরও এই অতি বিরক্তিকর, হাস্যকর কাজটা সে। করছে। আজ দুপুর থেকে বেশ কয়েকবার ওই চিঠি খুলে পড়েছে অবন্তী। সে জানে না। কেন লাইনগুলো সারাক্ষণ তার মাথায় ঘুরঘুর করতে থাকে। অজস্র বিরক্তি, রহস্য, দ্বিধার প্রাচীর পেরিয়েও কীভাবে কীভাবে যেন একটা অবচেতন ভালো লাগা আলগোছে। ছুঁয়ে যেতে থাকে তাকে। এই অনুভবটাকে কিছুতেই এড়াতে পারে না সে। বরং তার ভাবতে ভালো লাগে যে কেউ একজন তাকে আড়াল থেকে দেখে। ভালোবাসে। আর কে না জানে, প্রকাশ্যের চেয়ে গোপন প্রেমই বেশি সম্মোহনী।
কিন্তু মানুষটা কে? পরিচিত কেউ নয় তো?
জানালার কাঁচে শব্দটা হলো ঠিক তখুনি। আনমনা অবন্তী শব্দটা প্রথমে শুনতে পায় নি। তবে দ্বিতীয়বার শুনল। কিন্তু যতক্ষণে শুনেছে, ততক্ষণে তার বাঁ দিকের জানালাটা খুলে গেছে। একটা বিঘুঁটে মুখ কিংবা মুখোশ ঝুঁকে আছে জানালায়। সম্ভবত দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো গাছ বেয়ে উঠেছে সে। তার এক হাত জানালার গ্রিলে। কিন্তু অন্য হাতে ওটা কী? বিষয়টা বুঝতে একটু সময় লাগল অবন্তীর। লোকটার অন্য হাতে কুচকুচে কালো একটা পিস্তল। লোকটা কি তাকে গুলি করবে? কিন্তু কেন? চুরি করতে এলে তো গুলি করার কথা নয়। বড়জোর ভয় দেখানোর কথা। তা সে ভয় পেয়েছেও।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গেছে সে। তীব্র আতঙ্কে তার গলা থেকে কোনো চিৎকারও বের হলো না। তবে লোকটা তাকে ভুল প্রমাণ করে প্রথম গুলিটা করল তার বুক বরাবর। অবন্তী লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। দ্বিতীয় গুলিটা ছিটকে এসে পড়ল তার ঠিক পাশে। অবন্তীর অবশ্য ততক্ষণে আর কিছু মনে নেই। সে নিথর হয়ে পড়ে রইল মেঝেতে।
৩১
পুলিশ অফিসারের নাম আবছার আহমেদ। বয়স চল্লিশের কোটায়। মাথায় কাঁচা-পাকা চুলের কারণে তাকে আরও বয়স্ক লাগে। রোখসানা বেগম বসে আছেন তার সামনে। আবছার আহমেদ বললেন, আপনার কয় ছেলেমেয়ে?
এক ছেলে, দুই মেয়ে।
আপনার বড় মেয়ের নাম হৃদি?
জি।
ছেলে?
রাতুল। দেশের বাইরে থাকে।
আরেক মেয়ে?
তিথি।
হুম। বলে খানিক চুপ করে রইলেন আবছার। তারপর বললেন, কিছু মনে করবেন না, একটা প্রশ্ন করি?
জি।
আপনার বড় মেয়ে হৃদির রিসেন্টলি বিয়ে হয়েছে?
হ্যাঁ।
ছেলের নাম নেহাল? জার্মানি থাকেন? কিছুদিন হলো দেশে এসেছেন?
জি।
কত দিন থাকবেন?
এখনো সেভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে কী একটা প্রজেক্টে এসেছে। প্রজেক্ট শেষ হলে পুরোপুরি চলে যাবে। তার আগে হয়তো যাওয়া-আসার মধ্যেই থাকবে। এখন হানিমুনে বার্লিন গিয়েছে।
আচ্ছা। আপনার মেয়ে হৃদির কি এর আগেও একবার বিয়ে হয়েছিল? না, মানে গোপন বিয়ে?
এই প্রশ্নে যেন খানিক থতমত খেয়ে গেলেন রোখসানা বেগম। বললেন, ওই রাতের ঘটনার সঙ্গে সেটির সম্পর্ক কী?
সম্পর্ক যে আছেই, তা বলছি না। আবার একেবারেই যে নেই, তা-ও না।
মানে?
মানে…। বলে কী ভাবলেন পুলিশ অফিসার। তারপর বললেন, আচ্ছা, আমি বুঝিয়ে বলছি। তার আগে আপনি কি আমাকে হৃদির বিয়ের ঘটনাটা বলবেন?
এই প্রশ্নে যেন তেতে উঠলেন রোখসানা বেগম। বললেন, ওটাকে কি বিয়ে বলা যায়? আপনারা তো আইনের লোক। আপনিই বলুন, একটা অল্প বয়সের মেয়েকে কেউ ফুসলিয়ে কাজি অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করলেই কি তাকে বিয়ে বলা যায়?
আবছার আহমেদ এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। তবে গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন, আপনার কী মনে হয়, হৃদির আগের হাজব্যান্ড প্রতিহিংসাবশত এমন কিছু করতে পারে?
অনিক? কী বলছেন আপনি? অনিক করবে এই কাজ? বলে সামান্য থামলেন তিনি। তারপর প্রায় স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে গজগজ করতে লাগলেন, এতই যদি তার। সাহস থাকত তো সে তা ডিভোর্সের আগেই করত।
কিন্তু ধরুন…অনেক সময় এমন হয় না যে কিছু করতে না পারার কারণেই আমরা ভেতরে ভেতরে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠি? বেশির ভাগ সময় কিন্তু অক্ষমতা থেকেই আক্রোশ তৈরি হয়। তাই না?
রোখসানা বেগম কথা বললেন না। তবে পুলিশ অফিসারের কথা শুনে এখন তারও কিঞ্চিৎ সন্দেহ হচ্ছে। না হলে অনিকের অমন শান্ত থাকা মোটেই স্বাভাবিক কিছু নয়।
এই যে বিয়ের এত দিন পর হৃদিকে দিয়ে আপনারা ডিভোর্স দেওয়ালেন, তারপর আবার বিয়েও দিয়ে দিলেন–এতে তার প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠার যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে না?
পারে। কিন্তু তাই বলে সে খুন করতে চাইবে? মানে…আপনি বলতে চাইছেন। যে হৃদি ভেবেই সে ওই রাতে অবন্তীকে গুলি করেছে?
আমি সম্ভাবনার কথা বলছি। হৃদিকে তো সে ভালোই বাসত, তাই না? ভালোবাসার কাউকে অন্য কারও সঙ্গে দেখতে আমাদের কারোরই ভালো লাগার কথা। নয়। আর সে যদি হয় দীর্ঘদিনের বিয়ে করা বউ, তাহলে কেমন লাগার কথা?
রোখসানা বেগম এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে অনিকের মতো গোবেচারা, সাত চড়ে রা নেই, এমন কেউ এতটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে!
এখন বলুন, ওভাবে ভাবার সুযোগ আছে কি না? রোখসানা বেগমকে চুপ থাকতে দেখে বললেন আবছার আহমেদ। নাকি আপনি অন্য কিছু ভাবছেন?
আসলে…। ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন রোখসানা। ঘটনা যদি সত্যি সত্যিই ওদিকে যায়, মানে কাজটা যদি অনিকই করে থাকে…তাহলে আমাদের সিরিয়াস কিছু ঝামেলায় পড়তে হবে।
কী ঝামেলা?
অনিক আর হৃদির ওই গোপন বিয়ের ব্যাপারটা আমরা এই মুহূর্তে সামনে আনতে চাইছি না।
কেন?
কারণ, ওর হাজব্যান্ড ছাড়া এই ব্যাপারটা আর কেউ জানে না। এমনকি তার বাবা-মাও না। আর সে-ও চায় না বিষয়টা এখুনি তার পরিবারের কেউ জানুক। ইচ্ছে করেই মিথ্যে কথাটা বললেন রোখসানা বেগম। নেহালকেও বিয়ের বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলা হয় নি। এখন এই ঘটনায় যদি অনিক আর হৃদির বিষয়টা সামনে চলে আসে, তাহলে কী হবে বুঝতে পারছেন?
হুম। বলে গম্ভীর হয়ে গেলেন পুলিশ অফিসার। বললেন, কিন্তু আপনি কি বুঝতে পারছেন বিষয়টা কতটা ভয়ংকর?
রোখসানা বেগম কথা বললেন না।
আপনাদের মতো নির্বিরোধ, নিরীহ কারও বাড়ির দেয়াল টপকে, দোতলার কার্নিশ বেয়ে উঠে কেন কেউ কাউকে খুন করতে চাইবে? তাও গুলি করে?
বিষয়টা রোখসানা বেগমেরও মাথায় ঢুকছে না। ঘটনার ভয়াবহতা তিনি বুঝতে পারছেন। কিন্তু হৃদি তার ভুল জীবনকে পেছনে ফেলে সত্যিকারের জীবন খুঁজে পেয়েছে। এই জীবনে তিনি আর তার অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে চান না।
আবছার আহমেদ বললেন, আপনাদের তো আর কোনো শত্রু নেই?
শত্রু সবারই থাকে। তবে রাতের আঁধারে গুলি করে খুন করতে পারে, এমন কেউ নেই।
হুম। বলে থম মেরে রইলেন পুলিশ অফিসার। তারপর বললেন, আমি আপনাদের সমস্যাটা বুঝতে পারছি। কিন্তু ধরুন, যদি সত্যি সত্যিই এই ঘটনা অনিক ঘটিয়ে থাকে, তাহলে?
রোখসানা বেগম কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। বাইরে যতই শান্ত, স্থির থাকার চেষ্টা করুন না কেন, ভেতরে ভেতরে তীব্র এক আতঙ্ক ঘিরে ধরেছে তাকে। ঘটনার পর প্রায় দুটো দিন কেটে গেছে, কিন্তু এর মধ্যেও একমুহূর্তের জন্য স্থির হতে পারেন নি তিনি। সারাক্ষণ মনে হচ্ছে, কেউ একজন উদ্যত পিস্তল হাতে তাকে অনুসরণ করছে। যেকোনো সময় ছুটে আসবে প্রাণঘাতী বুলেট।
আবছার আহমেদ অবশ্য রোখসানা বেগমকে আর প্রশ্ন করলেন না। তিনি চোখের ইশারায় কনস্টেবলকে কিছু নির্দেশ করলেন। কিছুক্ষণ বাদেই ঘরে ঢুকল অবন্তী। তাকে দেখে ঝড়ে বিধ্বস্ত পাখির মতো মনে হচ্ছে।
আবছার আহমেদ বললেন, আমরা খুবই দুঃখিত যে এমন ভয়াবহ একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আপনাকে যেতে হয়েছে।
অবন্তী কথা বলল না। তবে ধীরে তার সামনে রাখা চেয়ারটাতে বসল। আবছার আহমেদ বললেন, আসলে বিষয়টা যে খুব সিরিয়াস, সেটি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন?
জি। ম্লান গলায় বলল অবন্তী।
আপনি কি ঘটনাটা একটু বিস্তারিতভাবে বলতে পারবেন?
জি। পারব।
একদম যা যা ঘটেছে, ঠিক তা-ই বলবেন। কমও না, বেশিও না।
আচ্ছা। বলে খানিক সময় নিল অবন্তী। তারপর যতটুকু সম্ভব বিস্তারিত বলার চেষ্টা করল। সেদিন রাতে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিল সে। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। কিন্তু প্রবল আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়েছিল সে।
আপনার কী মনে হয়, ইউনিভার্সিটিতে বা বাইরে আপনার এমন কোনো শত্রু আছে, যে আপনাকে খুন করতে চাইতে পারে?
উঁহু। মাথা নাড়ল অবন্তী।
কেন?
আমি কখনো কারও এমন কোনো ক্ষতি করি নি যে সে আমাকে গুলি করে খুন করতে চাইবে।
আপনাকে কি কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?
জি।
আপনার কি কোনো সম্পর্ক আছে? মানে প্রেমট্রেম টাইপ কিছু…?
নাহ্।
আগে ছিল?
এই প্রশ্নে থমকে গেল অবন্তী। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে অবশেষে মাথা নাড়ল সে, উঁহু। ও রকম কিছু না।
একদম কিছু না?
না।
কিন্তু আপনি দেখতে ভালো। আপনাকে পছন্দ করার মানুষের তো অভাব থাকার কথা নয়?
ও রকম যে ছিল না, তা না। মানে…স্কুল-কলেজে যা হয় আরকি!
ক্লাসমেট? কাজিন বা পাশের বাড়ির কেউ…এ রকম?
জি। সিরিয়াস কিছু না।
আচ্ছা। বলে চুপ করে রইলেন আবছার আহমেদ। এই ঘটনায় অনিককে ছাড়া আর কাউকে সন্দেহ করার কোনো সুযোগই তার নেই। কথাটা তিনি রোখসানা বেগমকেও বললেন, কিছু মনে করবেন না, ম্যাডাম, আপনি না চাইলেও অনিককেই আমাদের চার্জ করতে হবে। এত বড় একটা ঘটনাকে তো আর আমরা আপনার পারিবারিক ইস্যুর কথা বিবেচনা করে চেপে যেতে পারি না। তাই না?
জি। বলে মাথা নাড়লেন রোখসানা বেগম।
আপনার হয়তো বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু এর চেয়েও অবিশ্বাস্য ঘটনা আমরা অহরহই দেখি। আপনি ভাবতেও পারবেন না মানুষের মনে কী ভয়ংকর সব চিন্তাভাবনা ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ হয়তো সাহসী বলে বাস্তবে প্রয়োগ করে ফেলে। বাকিরা দুর্বল বলে পারে না। কিন্তু দুর্বল বা ভিতুরাও কখনো কখনো নির্দিষ্ট কোনো ঘটনায় হঠাৎ খুব ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এ রকম বহু এভিডেন্স আমাদের কাছে আছে।
রোখসানা বেগম কথা বললেন না। আবছার আহমেদ বললেন, আজ তাহলে আপনারা আসুন। প্রয়োজন হলে আমি আবার ডাকব বা নিজেই বাসায় চলে আসতে পারি। এর মধ্যে অবন্তীও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠুন। ওনার মানসিক ধকলটা কাটিয়ে ওঠাটা জরুরি। আমি খুবই দুঃখিত অবন্তী যে এই অবস্থায়ও আপনাকে বিরক্ত করলাম।
অবন্তী কথা বলল না। সে-ও উঠে দাঁড়াল। রোখসানা বেগম ততক্ষণে দরজার কাছে পৌঁছে গেছেন। অবন্তীও। কিন্তু খানিকটা গিয়েই অবন্তী আচমকা থমকে দাঁড়াল। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, একটা কথা।
জি? কৌতূহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন আবছার আহমেদ।
অবন্তী দুই পা ঘুরে আবার আবছার আহমেদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, না, তেমন কিছু না। এই চেয়ারটাতে বসতে খুব সমস্যা হচ্ছিল। সম্ভবত ফোমের ভেতর থেকে একটা পেরেক বের হয়ে আছে। চেয়ারটা বদলে নেবেন।
৩২
অনিক ঢাকায় এসেছে মাসখানেক হলো। সে ভেবেছিল তার টিউশনটা বুঝি আর নেই। কিন্তু সুমি তাকে অবাক করে দিয়ে বলল, তুমি চাইলে আরও কিছুদিন গ্যাপ দিতে পারো, অনিক। এই সময়ে চট করে আগের জীবনে ঢুকে যাওয়া সহজ নয়।
কিন্তু জিতুর তো খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
সেটা তোমার ক্ষতির চেয়ে বড় কিছু নয়। তুমি যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলে, তার সঙ্গে কি এর তুলনা চলে?
তা চলে না। কিন্তু…।
তুমি ওটা নিয়ে ভেবো না। ওর তো আর তোমার সঙ্গে পড়াশোনার বিষয় তেমন ছিল না। আমরা আসলে ওর একটা ভালো কম্প্যানিয়ন নিশ্চিত করতে চাইছিলাম। যেহেতু আমরা দুজনই খুব ব্যস্ত।
তারপরও।
সুমি হাসল। বলল, ঠিক আছে। তুমি আবার আসতে শুরু করো।
অনিকের আসলে কিছু টাকার দরকার ছিল। কিন্তু কথাটা সে মুখ ফুটে বলতে পারছিল না। আয়েশাকে আবারও মামার বাসায় রেখে এসেছে সে। তার জন্য টাকা পাঠাতে হবে। গত কয়েক মাসে তার নিজের অবস্থাও ভালো না। বাসাভাড়া বাকি পড়ে গেছে। হাতখরচের অবস্থাও যাচ্ছেতাই।
আজ ঘরে ঢুকতেই মাহমুদ বললেন, কী খবর অনিক, এখন কেমন আছেন আপনি?
অনিক মাথা নাড়ল, জি স্যার, ভালো।
এই পরিস্থিতিতে কেউ ভালো থাকতে পারে না। আপনিও ভালো নেই। সেটা আপনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু অনিক, জীবন তো এমনই, না? আমাদের সবারই তো একদিন না একদিন চলে যেতে হবে। তাই না?
জি।
আপনার চাকরিবাকরির কিছু হলো?
হয়ে যাবে।
আচ্ছা। মাহমুদ আর কথা বাড়ালেন না। তিনি কফির মগ হাতে বারান্দায় চলে গেলেন। অনিক জিতুকে পড়াতে বসল। সমস্যা হচ্ছে, পড়ানোতে মন বসাতে পারছে না। সে। তার সকল মনোযোগ সুমির ওপর। সুমিকে আজ টাকার কথা কী করে বলবে সে?
সুমি তাকে বিকেলের নাশতা দিয়ে গেল। যাওয়ার সময় বলল, তোমার কি আজ তাড়া আছে, অনিক?
না তো।
পড়ানো শেষে কী করবে?
এখনো জানি না। বিশেষ কোনো কাজ নেই।
আচ্ছা। বলে ভেতরে চলে গেল সুমি।
কিন্তু বাকিটা সময় আর স্থির হতে পারল না অনিক। তার কেবলই মনে হতে লাগল, সুমি কি তাকে কিছু বলবে? এ রকম অনেকবারই হয়েছে যে সুমি তাকে এটা-সেটা কিনতে পাঠিয়েছে। তারপর বাকি টাকাগুলো আর ফেরত নেয় নি। এমন নয় যে অনিক চুপচাপ সেই টাকা পকেটস্থ করেছে। বরং সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে সেগুলো ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু সুমি নেয় নি। অনিকের কেন যেন মনে হয়, এই কাজটা সে ইচ্ছে করেই করত। বিশেষ করে মাসের শেষের দিকে। যখন অনিকের পকেটের অবস্থা বিশেষ ভালো থাকত না এবং তার মা অসুস্থ ছিল, তখন। আজও কি তেমন কিছু হবে?
অনিক প্রবল অস্থিরতা নিয়ে জিতুকে পড়ানো শেষ করল। সে চাইলে এখন চলে যেতে পারে। সুমি তাকে থাকতেও বলে নি। তারপরও সে গেল না। চুপচাপ ড্রয়িংরুমে বসে রইলে। সুমি এল দীর্ঘ সময় পর। তার পরনে কলাপাতা রঙের শাড়ি। কপালে ছোট্ট টিপ। চোখে কাজল। তাকে দেখতে সুন্দর লাগছে। অনিক সুমিকে দেখেই হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। সুমি বলল, তুমি এখনো যাও নি? আমি তো ভেবেছিলাম চলে গেছ।
অনিক বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, আপনি কিছু বলবেন ভেবে যাই নি।
আমি? যেন মনে করার চেষ্টা করল সুমি। আমি কি কিছু বলার কথা বলেছিলাম?
না…। তা বলেন নি। তবে পড়ানো শেষে আমার কোনো কাজ আছে কি না। জিজ্ঞেস করেছিলেন।
ওহ! ওটা এমনিই জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলে কাজের বুয়াকে ডাকল সুমি, আমি একটু বেরোচ্ছি। তুমি দেখো তোমার স্যারের কিছু লাগে কি না। আর জিতুর দিকে খেয়াল রেখো। ওকে একদম কম্পিউটার ধরতে দেবে না।
মেয়েটি মাথা নেড়ে সায় জানাল। অনিক আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বলল, আমি কি তাহলে চলে যাব?
যাবেই তো। বলে হাসল সুমি। এখানে কি পড়ানোর মতো আর কেউ আছে?
এবার চুপসে গেল অনিক। সে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল, না না। আচ্ছা, আমি যাই। বলেই ঘুরে হাঁটতে শুরু করল সে। সুমি মৃদু কণ্ঠে বলল, তুমি নিচে গিয়ে দাঁড়াও। আমি আসছি।
অনিক সুমির আচরণে খুবই অবাক হয়েছে। সে বুঝতে পারছে, সুমি ইচ্ছে করেই তার সঙ্গে খানিক হেঁয়ালি করেছে। কিন্তু কেন করছে, সেটি সে বুঝতে পারছে না।
সুমি এল মিনিট পাঁচেক পর। বলল, তুমি তো মোহাম্মদপুরের দিকে থাকো?
জি।
এখান থেকে ধানমন্ডি হয়েই তো যেতে হয়?
জি।
আচ্ছা। একসঙ্গে যাই তাহলে। আমাকেও একটু ওদিকে যেতে হবে।
অনিক মাথা নেড়ে সায় জানাল। তার টাকাটা ভীষণ দরকার। কিন্তু কীভাবে চাইবে বুঝতে পারছে না। তা ছাড়া সুমিকে ভীষণ অন্য রকম লাগছে আজ। এই সময়ে হুট করে টাকার কথা বলা ঠিক হবে না। আচ্ছা, এমন কি হতে পারে যে সুমি কিছু কিনতে। বের হয়েছে? যদি তা-ই হয়, তাহলে সে নিজেই তো তা কিনে এনে দিতে পারে! সে ক্ষেত্রে না চেয়েও কিছু টাকা পেয়ে যেতে পারত সে। চট করে কথাটা জিজ্ঞেসও করে ফেলল অনিক। সুমি অবশ্য উত্তর দিল না। গ্যারেজ পেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর বলল, আজ ড্রাইভার নেই। তুমি কি একটা রিকশা ডাকতে পারবে?
অনিক রিকশা ডাকল। রিকশায় যতটা সম্ভব আড়ষ্ট হয়েই বসল সে। সুমি বলল, তুমি কি সবার সঙ্গেই এভাবে বসো? নাকি শুধু আমার সঙ্গে?
জি? না মানে…। খানিক থতমত খাওয়া গলায় বলল অনিক।
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমি অশুচি, অদ্ভুত কিছু। আমার ছোঁয়া লাগলেই তোমার জাত চলে যাবে। বলে খিলখিল করে হাসল সুমি।
অনিক কথা বলল না। তবে ভেতরে ভেতরে আরও গুটিয়ে গেল সে। সুমি এর আগে কখনো তার সঙ্গে এমন আচরণ করে নি। আজ হঠাৎ কী হয়েছে তার? অনেক। ভেবে অবশেষে প্রশ্নটা করল সে, আপনার কি কোনো কারণে মন খারাপ?
উমম? যেন শুনতে পায় নি এমন প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে তাকাল সুমি।
অনিক দ্বিরুক্তি করল, আপনার কি মন খারাপ?
মন খারাপ কেন হবে?
না মানে…। বলে থমকে গেল অনিক। যেন মনস্থির করতে পারছে না সে। সুমি বলল, বলো?
না, কিছু না।
সুমি অবশ্য আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। হঠাৎ কেমন আনমনা হয়ে গেল সে। তারপর মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল। ঝকঝকে নীল আকাশ। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে টুকরো মেঘ। সে সেই মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা, মেঘের যদি কখনো আকাশ ভালো না লাগে, তাহলে মেঘ কী করবে?
অনিক সুমির কথার কিছুই বুঝল না। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সুমিই বলল, মেঘের তো ওই এক আকাশ ছাড়া যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই, না? ওই তো একটাই আকাশ। ওই আকাশ ছেড়ে সে আর কোথায় যাবে? বলে সামান্য থামল সে। তারপর গাঢ় গলায় বলল–
দূরে যাও, উড়ে যাও, পুড়ে যাও মেঘ
তবু এ আকাশ ছেড়ে যেতে পারো নাকো–
খুঁজে নিয়ে আকাশ আরেক!
অনিক কথা বলল না। সুমি বলল, মেঘেদের আসলে যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না, বুঝলে? তা যতই তার বুকে যন্ত্রণা থাকুক। তাদের ওই এক আকাশেই এখান থেকে সেখানে ভেসে বেড়াতে হয়। তাই না?
বৃষ্টি হয়ে ঝরে গেলেই তো মুক্তি। বলল অনিক।
সব মেঘে কি বৃষ্টি হয়?
তা হয় না।
বেমানুষও অমন। সব মেঘে যেমন বৃষ্টি হয় না, তেমনি সব মানুষও কাঁদতে পারে না। কেবল যন্ত্রণা জমা করে রাখে বুকে।
অনিক কথা বলল না। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে সুমির কোনো কারণে মন খারাপ। এমন অবস্থায় কারও কাছে টাকা ধার চাওয়া যায় না। সুমি বলল, আমি সামনের দোকানটায় নামব। তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে?
অনিক মাথা নাড়াল। সে যাবে। যেন যেকোনো মূল্যে সুমির সঙ্গে আরও খানিকটা সময় কাটাতে চায় সে। যদি এর মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টায়, টাকা চাওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়, কিংবা সুমি নিজ থেকেই কিছু বলে! সুমি অবশ্য তেমন কিছু বলল না। সে বরং তিনটা পাঞ্জাবি কিনল। সঙ্গে দুটো শার্ট আর প্যান্টও। অনিক অবাক হয়ে লক্ষ করল, কাপড়গুলো ঠিক তার মাপেই কিনেছে সুমি। কিন্তু মাহমুদ তো তার চেয়েও লম্বা! তাহলে? সম্ভবত অন্য কারও জন্য কিনেছে সে।
অনিক অবশ্য অবাক হলো বিদায় নিতে গিয়ে। সুমি কাপড়ের প্যাকেটগুলো তার হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বলল, কাল থেকে আর এই এক পাঞ্জাবি পরে রোজ পড়াতে আসবে না।
মানে?
মানে এখন থেকে এগুলো পরে পড়াতে আসবে।
অনিকের যতটা অবাক হওয়ার কথা ছিল, ততটা অবাক সে হলো না। বরং অদ্ভুত এক কাজ করল সে। সুমি চলে যেতেই দৌড়ে এসে আবার দোকানটাতে ঢুকল। তারপর ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়ানো ছেলেটাকে বলল, আমি এইমাত্রই কাপড়গুলো কিনেছিলাম। কিন্তু এখন হঠাৎ অন্য একটা কাজে টাকাটা খুব দরকার হয়ে পড়েছে আমার, আপনি যদি কাপড়গুলো ফেরত নিতেন, তাহলে খুব উপকার হতো।
ছেলেটা বিরক্ত ভঙ্গিতে হাসল। বলল, স্যার, আপনি চাইলে এগুলো বদলে অন্য কিছু নিতে পারেন। কিন্তু ক্যাশ রিটার্ন হয় না।
আমি অর্ধেক দামে দিয়ে দিচ্ছি। প্রায় কাতর কণ্ঠে বলল অনিক।
সরি স্যার। আমাদের সিস্টেমে স্পষ্ট বলা আছে, এটা সম্ভব না।
অনিক হয়তো আরও কিছু বলত। কিন্তু তার আগেই তিথির গলা শুনে চমকে গেল সে।
বদলাতে হবে না। এদিকে এসো তুমি।
অনিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তিথি তার একদম পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে। অনিক বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, তুই?
হুম। আসো, এদিকে আসো।
অনিক কাউন্টার থেকে সরে এল। তিথি বলল, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে। জরুরি কথা।
জরুরি কী কথা?
আগে বাইরে চলো, বলছি।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিথির সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল অনিক। তিথি বলল, তোমাকে আমি কতবার ফোন করেছি, তুমি ফোন ধরছ না কেন?
অনিক এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। তিথি বলল, তুমি কি ভেবেছ, আমি হৃদি আপুকে নিয়ে কিছু বলব? এই জন্য ফোন ধরো নি?
হুম। বলল অনিক।
তুমি হৃদি আপুর বিষয়ে কোনো কথা শুনতে চাও না?
ঠিক তা না। আসলে…।
তোমার হৃদি আপুর জন্য খুব কষ্ট হয়, তাই না?
অনিক হাসল, এটাই তোর জরুরি কথা?
না।
তাহলে?
চলো, আগে রিকশা নিই। নিরিবিলি একটা জায়গা দেখে কোথাও বসি।
তারা চলে এল ধানমন্ডি লেকের দিকটায়। তারপর চুপচাপ নির্জন একটা জায়গা দেখে বসল। তিথি সরাসরি প্রসঙ্গে চলে গেল। বলল, তুমি একটা ভয়াবহ বিপদে পড়ে গেছ।
বিপদে? আবার কী বিপদ? অনিকের কণ্ঠে যেন খানিক শ্লেষ।
তোমাকে পুলিশ খুঁজছে।
পুলিশ? আমি আবার পুলিশকে কী করলাম? ভ্রু কুঁচকে তাকাল অনিক। যেন তিথির কথা বুঝতে পারছে না সে। ফান করিস না, তিথি। আজকাল আর ফান করার মুড নেই আমার।
আমারও নেই। সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল তিথি।
পুলিশ আমাকে খুঁজবে কেন?
হৃদি আপুকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে। অ্যাটেম্পট টু মার্ডার।
মানে কী!
অনিক এবার সত্যি সত্যিই বিভ্রান্ত বোধ করছে। সে ফ্যালফ্যালে চোখে তিথির দিকে তাকিয়ে আছে। তিথি বলল, সপ্তাহখানেক আগে এক রাতে অবন্তী আপুকে কেউ
জানালা দিয়ে গুলি করেছিল। পরপর দুবার।
কী?
হুম। অবন্তী আপু ছিল হৃদি আপুর ঘরে। ভাগ্য ভালো যে তার খারাপ কিছু হয় নি। লোকটাকেও ঠিকঠাক দেখতে পায় নি ও। সম্ভবত মাস্ক পরা ছিল। কিন্তু পুলিশের ধারণা, এটা তোমার কাজ।
অনিকের মনে হলো, বহু বছর পর কোনো ঘটনায় সে সত্যি সত্যিই বাদ্ধ হয়ে গেছে। এতটা অবাক সে এর আগে কখনো হয় নি। এমনকি তিথির কথাও কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না তার। বরং মনে হচ্ছে আষাঢ়ে কোনো গল্প শুনছে সে।
তিথি বলল, মা প্রথমে বিষয়টা বিশ্বাস করতে চায় নি। কিন্তু তোমার আর হৃদি আপুর বিষয়টা এখন অনেকটাই জানাজানি হয়ে গেছে। মানে অন্তত আমরা যারা কাছের, তারা জানি। পুলিশও জানে বিষয়টা। ফলে তাদের ধারণা ঘটনাটা তুমিই ঘটিয়েছ। প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে কাজটা করেছ তুমি।
অনিক দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল। তারপর চোখ তুলে তাকাল তিথির চোখে। বলল, তোর কী মনে হয়?
তিথি সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল না। সে একদৃষ্টে অনিকের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে অদ্ভুত এক কান্না বরফের মতো জমাট বেঁধে আছে। যেন ঢেউহীন জলের নিষ্কম্প পুকুর। সেই পুকুরে থমথমে মেঘের ছায়া পড়েছে। কিন্তু সেই মেঘ কিছুতেই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে পারে না।
সে আচমকা হাত বাড়িয়ে অনিকের গাল ছুঁয়ে দিল। তারপর চোখ ছুঁয়ে দিল আঙুলের ডগায়। একটা জলের ফোঁটা আচমকা টুপ করে তার সেই আঙুলের গা বেয়ে নেমে আসতে লাগল। তিথি প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমি তোমাকে চিনি। আমি তোমার সবটুকু চিনি।
অনিক যেমন বসে ছিল, তেমন বসেই রইল। তিথি খানিক সরে এল তার কাছে। তারপর দুহাতে অনিকের গাল চেপে ধরে বলল, তুমি এমন কেন? আজকাল এমন কেউ হয়? এত ভালো?
অনিক কথা বলল না। তবে হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছল সে। যেন উপচে ওঠা জলের ঢেউটাকে চোখের তীর ভাসাতে দিতে চায় না।
তিথি বলল, তুমি একটু অন্য রকম হতে পারো না?
অন্য রকম হলে কী হতো?
তাহলে হৃদি আপু তোমাকে ছেড়ে যেতে পারত না। আর…।
আর কী?
তিথি এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। চুপ করে থাকে। তবে সে চোখ সরায় না অনিকের চোখ থেকে। অনিক বলে, আর কী?
তোমার জন্য এত কষ্ট হতো না আমার। এমন কেন তুমি?
কেমন?
এমন অসহ্য রকম ভালো!
অনিক হাসে। তবে তার সেই হাসি কান্নার চেয়েও করুণ। তিথি বলে, তুমি কি জানো, তোমার জন্য আমার কেমন কষ্ট হয়?
অনিক জবাব দেয় না। তিথি আবার বলে, জানো তুমি? বুঝতে পেরেছ কখনো?
সবকিছু বুঝতে নেই, তিথি।
কেন?
সব বুঝলে জীবন আরও জটিল হয়ে যায়। যন্ত্রণা বাড়ে।
তোমার জীবন কি সহজ? যন্ত্রণাহীন?
যন্ত্রণাহীন কি না জানি না। তবে সহজই হয়তো।
এই কথায় তিথি চুপ করে থাকে। বেশ খানিকটা সময়। তারপর বলে, তাও ঠিক। হলে এত এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরও তুমি এমন শান্ত থাকো কী করে! এমন চুপচাপ, স্থির, নির্বিকার? তোমার খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে না কখনো? সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলতে ইচ্ছে হয় না?
অনিক আবারও হাসার চেষ্টা করে। মলিন, ফ্যাকাশে, বিবর্ণ এক হাসি। তারপর অকস্মাৎ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, যার যন্ত্রণা যত গভীর, তার কান্নার শব্দ তত কম।
৩৩
ঘটনা শুনে চুপ করে রইল সুমি। এখন রাত প্রায় দশটা। তার সামনে বসে আছে অনিক। বিকেলের দিকেই তার সঙ্গে একসাথে ধানমন্ডি পর্যন্ত গিয়েছিল সে। এইটুকু সময়ের মধ্যে যে কারও জীবন এমন ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে, এটা তার দূরতম কল্পনায়ও ছিল না। খানিক আগে অনিক তার বাসায় এসেছে। তাকে দেখে চমকে গেছে সুমি। অনিকের চোখমুখ শুকনো। তবে আচরণ ধীরস্থির। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ সোফায় বসে রইল সে। তারপর বলল, আমাকে একটু পানি দেবেন?
সুমি নিজে তাকে পানি এনে দিল। অনিক ধাতস্থ হতে খানিক সময় নিল। এই শহরে তেমন কেউ নেই তার, যার কাছে সে এই বিপদে গিয়ে সাহায্য চাইতে পারে। তিথির কাছে ঘটনা শোনার পর বিষয়টা বুঝতে সময় লেগেছে তার। কিন্তু এখন সে কী করবে? অনেক ভেবে অবশেষে এখানে এসেছে সে। যদিও জানে না এরা কেউ তাকে কোনো সাহায্য করতে পারবে কি না।
সুমি বলল, এসব কী বলছ তুমি?
জি।
আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এ তো ভয়াবহ অবস্থা।
অনিক কথা বলল না। সুমি বলল, আমার মাথায় তো কিছু আসছে না। তুমি কি পুলিশের কাছে ধরা দেবে?
জানি না।
কিন্তু জানতে তো হবে।
আপনার কী মনে হয়, পুলিশ আমার কথা বিশ্বাস করবে?
সুমি এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। তার উচিত বিষয়টা নিয়ে মাহমুদের সঙ্গে কথা বলা। কিন্তু বেশ কিছুদিন হলো মাহমুদের সঙ্গে কথা বলে না সে বা বললেও তা শীতল, নিস্পন্দ।
অনিক বলল, আপনি কি একটু স্যারের সঙ্গে কথা বলবেন?
অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠল সুমি। মাহমুদ তার ঘরে কাজ করছিলেন। সুমিকে দেখে ভ্র কুঁচকে তাকালেন তিনি। সুমি বলল, একটু এদিকে আসবে?
মাহমুদ এলেন। ঘটনা শুনে তিনিও হতভম্ব হয়ে গেলেন। বললেন, এ তো ভয়াবহ ব্যাপার!
অনিক কথা বলল না। সুমি বলল, এটা যে ভয়াবহ ব্যাপার, সেটা আমরা সবাই বুঝতে পারছি। কিন্তু এই ভয়াবহ ব্যাপার থেকে মুক্তির উপায় কী, সেটা বললে ভালো হয়।
মাহমুদ সঙ্গে সঙ্গেই কথা বললেন না। চুপচাপ অনিকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন, আমরা কি আপনাকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করতে পারি?
অনিক মুখ তুলে তাকাল। এই প্রশ্নের উত্তরে কী বলবে বুঝতে পারছে না সে। মাহমুদ বললেন, না, মানে রাগের মাথায় কিন্তু আমরা এমন অনেক কিছুই করে ফেলি
যে সেটার কনসিকুয়েন্স নিয়ে ভাবি না। এমন হয় না?
জি।
এমন কিছু তো হয় নি? মানে আপনি সত্যি সত্যিই তো কিছু করেন নি?
নাহ্। মাথা নাড়ল অনিক।
মাহমুদ চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। সুমি বলল, তোমার তো অনেক পরিচিত লোকজন আছে। পুলিশেও আছে। তুমি কি একটু তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখবে কিছু করা যায় কি না?
কথা বলে কিছু হবে না। তুমি বিষয়টা বুঝতে পারছ না। এটা সাধারণ কোনো ব্যাপার নয়। তখন বরং এর জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। তা ছাড়া…। বলে একটু থামলেন মাহমুদ। তারপর বললেন, এটাও তো সত্য যে অনিককে আমরা সেই অর্থে চিনি না। তাই না? সে এখানে জিতুকে পড়ায়। এর বাইরে তার সম্পর্কে আমরা কী জানি? কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও সত্য। তাই না?
সুমি কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে রইল। মাহমুদের কথা মিথ্যে নয়। কিন্তু সে এটাও জানে যে অনিক এমন কিছু করতেই পারে না। মাহমুদ বললেন, অনিক?
জি স্যার?
পুলিশ কি এখনো আপনার খোঁজ করছে?
না। ঘটনা ঘটেছে চার-পাঁচ দিন। আমি আজই জানলাম। তিথির কাছে।
হুম। বলে আবার চুপ করে রইলেন মাহমুদ। তার মানে ওনারাও হয়তো একটু কনফিউজড। ফলে আরেকটু নিশ্চিত হয়েই এগোতে চাইছে তারা। এ ক্ষেত্রে আপনি দুটো কাজ করতে পারেন। এক, পুলিশ আপনার কাছে আসা অবধি অপেক্ষা করতে পারেন। তারপর ধরা দিয়ে কোর্টে কেস লড়তে পারেন। কিন্তু সেটা আপনার জন্য কঠিন। মানে বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়ায় যা হয় আরকি! আপনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও তাতে বছরের পর বছর লেগে যাবে।
অনিক কথা বলল না। সুমি বলল, আরেকটা কী?
আরেকটা…। বলে সময় নিলেন মাহমুদ। তারপর বললেন, আরেকটা হচ্ছে আপনি কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দিতে পারেন। এতে অবশ্য আপনার ওপর সন্দেহটা আরও গাঢ় হবে। তবে কাজটি যেহেতু আপনি করেন নি আর পুলিশও এখনো তেমন কোনো অ্যাটেম্পট নেয় নি, তার মানে তারা হয়তো অন্য কিছুও ভাবছে। মানে অন্য কোনো সন্দেহভাজন বা আর কারও ইনভলভমেন্ট। আর এর মধ্যে যদি সেটি প্রমাণিতও হয়ে যায়, তাহলে তো আর আপনার কোনো সমস্যা নেই। আপনি তখন নির্বিঘ্নেই ফিরে আসতে পারবেন। আর তখন প্রয়োজনে পুলিশের কাছে গিয়ে বলবেন যে আপনি ভয় পেয়ে পালিয়েছিলেন।
মাহমুদ থামলেও কেউ কোনো কথা বলল না। তিনি যে দুটি উপায়ের কথা
বলেছেন, তার একটিও কারও মনঃপূত হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবতা আসলেই কঠিন। এর বাইরে আপাতত আর কোনো উপায়ও নেই। এই নিয়ে দীর্ঘ সময় কথাবার্তা হলো। তবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল না।
সুমি বলল, ও তাহলে কী করবে এখন?
সেই সিদ্ধান্ত তো অন্য কেউ দিতে পারবে না। ইটস আ সিরিয়াস ইস্যু। সেন্সিটিভ অ্যাজ ওয়েল। ফলে সিদ্ধান্তটা ওনাকেই নিতে হবে।
কিছু ভেবেছ অনিক? বলল সুমি।
ভাবছি পুলিশের কাছে গিয়ে ধরা দিয়ে দেব। এই চোর-পুলিশের জীবন আর ভালো লাগছে না আমার। হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল অনিক।
কিন্তু…সেটা কি ঠিক হবে? এরপর যদি ওরা আর তোমাকে না ছাড়ে?
এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না অনিক। এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে পড়ার অভিজ্ঞতা তার নেই। এমনিতে সব সময় স্থির, শান্ত থাকার চেষ্টা করে সে। এখনো করছে। কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না। একটা অবর্ণনীয় অস্থিরতা ভেতরটা ভেঙেচুরে দিচ্ছে তার।
সুমি বলল, আমার মনে হয় কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দাও তুমি। তারপর পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিয়ো। প্রয়োজনে যেকোনো সময়ে চলে আসতে পারবে। যদি সিচুয়েশন তোমার ফেভারেও না আসে, তারপরও এটা তো অন্তত বলা যাবে যে তুমি ঘটনার কিছুই জানতে না। এমনকি এই ঘটনায় পুলিশ যে তোমাকে খুঁজছে, তাও না। হয়তো অন্য কোনো কাজে তুমি ঢাকার বাইরে ছিলে। কোনো গ্রামে বা কোথাও। মানে যেখান থেকে সহজে তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কিন্তু তেমন কোথায় যাব আমি?
তোমার গ্রামে?
সেটা কি ঠিক হবে? পুলিশ আমাকে ঢাকায় না পেলে সবার আগে ওখানেই খুঁজবে।
তা-ও তো কথা। বলে মাহমুদের দিকে তাকাল সুমি। তুমি কিছু বলছ না কেন? তোমার তো পরিচিত জায়গার অভাব নেই। মানুষও আছে অনেক। তুমি তো একটা ব্যবস্থা করতে পারো?
হুম। বলে গম্ভীর হয়ে গেলেন মাহমুদ। তারপর বললেন, তুমি আসলে বিষয়টাকে যত সহজ ভাবছ, তত সহজ নয়, সুমি। যদি কোনোভাবে অনিকের এই আত্মগোপনের সঙ্গে পুলিশ আমাদের ইনভলভমেন্ট খুঁজে পায়, তখন কী হবে, ভেবেছ?
কী হবে? অনিক তো আর সত্যি সত্যিই কোনো দোষ করে নি!
সেটা তুমি-আমি জানি। কিন্তু পুলিশ তো আর জানে না। তারা বরং তাকেই সন্দেহ করছে।
সুমি কথা বলল না। মাহমুদ বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আপনি একটা কাজ করতে পারেন, অনিক।
জি স্যার?
আমার এক বন্ধু আছে। দীর্ঘদিন বিদেশে ছিল। এখন দেশে ফিরে এখানেই কিছু করার চেষ্টা করছে। বহুদিন আগে একবার আমার কাছে এসেছিলও। সম্ভবত গাজীপুর বা মানিকগঞ্জের দিকে মাছের খামার বা এ-জাতীয় কিছু একটা করতে চাইছিল সে। সঙ্গে আরও কী সব প্ল্যান…।
করেছে? কৌতূহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল সুমি।
শুনেছি মাছের খামারটা নাকি শুরু করেছে। আমার কাছে একবার একটা ছেলেও চেয়েছিল। শিক্ষিত কিন্তু গ্রামে গিয়ে কাজ করতে পারবে, এমন…।
তুমি কি অনিককে ওখানে পাঠানোর কথা ভাবছ?
শিওর না এখনো। আগে ওর সঙ্গে কথা বলে দেখতে হবে এখনো ওর লোক দরকার আছে কি না। অনেক দিন তো কোনো যোগাযোগ নেই। আজ অনিকের কারণেই হঠাৎ মনে পড়ল। আসলে বিদেশে থাকা লোকজন তো এমন কত কিছু করার কথাই বলে। দুয়েকজন চেষ্টাও করে। কিন্তু সেসব শেষ পর্যন্ত আর আলোর মুখ দেখে না। এ কারণে বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দিই নি আমি। বলে সামান্য থামলেন মাহমুদ। তারপর বললেন, অনিক রাজি থাকলে আমি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি।
সুমি উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল, এটাই সবচেয়ে ভালো হয়। তুমি একটু কথা বলে দেখো।
মাহমুদ কথা বললেন সেই রাতেই। স্বস্তির বিষয় হলো সেদিনই অনিকের একটা ব্যবস্থা হয়ে গেল সেখানে। সে যাবে পরদিন রাতে। তাকে গাড়ি এসে নিয়ে যাবে। তার আগে টুকটাক কিছু কাজ সারতে হলো তাকে। সুমি কিছু টাকা দিয়েছে। সেই টাকা দিয়ে বাসাভাড়া মেটাল সে। আয়েশাকে কিছু পাঠাল। নিজের জন্য খুব প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করল। মাহমুদ তাকে তার ফোন আর সিমকার্ড ব্যবহার করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। সবচেয়ে ভালো হয় ফেলে দিলে। কাজটা করতে কেন যেন খারাপ লাগছিল অনিকের।
.
ভরদুপুরে বছিলা ব্রিজের ওপর গিয়ে দাঁড়াল সে। তার মাথার ওপর খাঁ খাঁ রোদ। পায়ের তলায় কংক্রিটের পাটাতন। তার নিচে কালো জল। সেই জলের দিকে তাকিয়ে নিজেকে হঠাৎ ভীষণ অর্থহীন মনে হতে লাগল অনিকের। আচ্ছা, তার এই আদ্যোপান্ত ব্যর্থ জীবনটার কি আসলেই কোনো মানে আছে? অনেক ভেবেও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল না সে।
বছরখানেক আগে, যেদিন তারা ধলেশ্বরীর তীরে ঘুরতে গিয়েছিল, সেদিন ঠিক এখানে এসে একবার হৃদির সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল সে। হৃদি বলেছিল, তোমার কী মনে হয়, মানুষ জীবনের কাছে কী চায়?
মানুষের চাওয়ার কোনো শেষ নেই।
এটা সত্যি নয়, অনিক। বলেছিল হৃদি।
কেন?
আমি তো জীবনের কাছে আর কিছু চাই না।
সত্যি চাও না?
উঁহু।
কেন?
কারণ, আমি সব পেয়ে গেছি।
কীভাবে সব পেলে? আর মানুষ সব পেলেও ভাবে তার কিছুই পাওয়া হয় নি। তাই সে জীবনভর আরও আরও চায়। চাইতেই থাকে। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত।
আমি চাই না। এই যে আমি তোমাকে পেলাম, মাকে পেলাম, এখন আর কিছু চাই না আমার। সব পাওয়া হয়ে গেছে।
অনিক কথা বলে নি। তবে হৃদির ওই কথাটুকু কেন যেন খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়েছিল তার। হয়তো করেও ছিল। না হলে আজ এই অবেলায়, ঠিক এখানে দাঁড়িয়েই ওই কথাগুলোর প্রতিটা শব্দ কেন মনে পড়বে তার?
অনিক দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়েও লুকায়। জীবন যে পথে তাকে নামিয়েছে, সেই পথের বিপরীতে হেঁটে যাওয়ার ক্ষমতা তার নেই। ফলে সে ভেসে যাচ্ছে স্রোতের অনুকূলে। কচুরিপানার মতো। কিন্তু এই স্রোতের গন্তব্য কোথায়? সে কি কখনো স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে?
অকারণেই বাবার কথা খুব মনে পড়ে তার। বাবা কি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন? তার ফলাফলই কি মৃত্যু? যদি ওভাবে ভাগ্য কিংবা স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে চাইতেন, তাহলে হয়তো বেঁচে থাকতে পারতেন আরও কিছুদিন। কিন্তু মানুষ যেভাবে অপ্রাপ্তি, দারিদ্রকে মহান করে তুলতে চায়, জীবন কি আসলেই তেমন? যদি তা-ই হতো, তাহলে তার জীবনটা এমন কেন? সে তো কখনোই কিছু চায় নি। এমনকি জোর করে নি। দাঁড়াতে চায় নি স্রোতের বিপরীতে। বরং ভেসে গেছে যে যেদিকে নিয়ে গেছে, ঠিক সেদিকেই। কিন্তু কই, তাতেও তো তার বেঁচে থাকাটা এমন মহান কিছু হয়ে ওঠে নি। এমনকি উপলব্ধির দিক থেকেও না। বরং দিন শেষে সে পালিয়ে যাচ্ছে বীভৎস এক অতীত পেছনে ফেলে। সেই অতীতে তার আর সব অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা, দুঃখ আড়াল হয়ে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে নতুন এক পরিচয়। সেই পরিচয়ের নাম কী? খুনি? হৃদিকে খুন করতে চেয়েছিল সে?
অনিক আর ভাবতে চায় না। তারপরও মায়ের কথা মনে পড়ে তার। মনে পড়ে আরও কত কত স্মৃতি-বিস্মৃতির কথা। সেসব কেন বারবার ফিরে আসে?
ফোনটা হাতে নেয় সে। এখুনি সেটা ছুঁড়ে ফেলবে বুড়িগঙ্গার অতল কালো জলে। কিন্তু তার আগে শেষবারের মতো ফোনের নম্বরগুলো দেখে নেয় সে। ছবি, মেসেজ, আরও কত কী! আচ্ছা, হৃদির কোনো কিছুই কেন এত দিনেও মুছে ফেলে নি সে? এই প্রশ্নের উত্তর জানে না অনিক। নিজেকে এর আগে কখনো জিজ্ঞেসও করে নি। ফলে নতুন করে আর সেসব ভাবতেও চায় না। আর মুহূর্তকাল পরই এই সবকিছু আক্ষরিক অর্থেই বিস্মৃত হয়ে যাবে। কোথাও আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না।
সমস্যা হচ্ছে, ফোনে জমে থাকা স্মৃতি, ছবি, কথা ইচ্ছে হলেই মুছে ফেলা যায়। কিন্তু বুকে জমে থাকা স্মৃতি চাইলেও মুছে ফেলা যায় না। তিথির ফোনটা এল তখুনি। কী মনে করে ধরল অনিক।
তিথি হড়বড় করে বলল, তুমি কোথায়?
কেন?
জরুরি কথা আছে তোমার সঙ্গে।
কী কথা?
দেখা করে বলব।
অনিক ঠিক জানে না তার ভাবনায় তখন কী কাজ করছিল। কিন্তু সে বিড়বিড় করে তার ঠিকানাটা বলল। তিথি এল ঘণ্টাখানেক পর। এই পুরোটা সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল অনিক। শূন্য, একা, নিস্তব্ধ। তিথি বলল, এখানে কী করছ তুমি?
অনিক জবাব দিল না। মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল সে। খাঁ খাঁ রোদের দুপুর শেষে মেঘলা বিকেল নেমেছে। একটা চিল ঘুরে বেড়াচ্ছে আকাশে। তিথি বলল, হৃদিপু আজ ফোন করেছিল।
অনিক তাকিয়ে আছে ব্রিজের তলায় জলের দিকে। সেখানে একদল কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে। তার ওপরে একটা বক। বকটা ইতিউতি কী খুঁজছে। তিথি বলল, আপু তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। রাত থেকে অনেক চেষ্টা করেও নাকি তোমাকে ফোনে। পাচ্ছে না?
অনিক কথা বলল না। তাকালও না তিথির দিকে। তবে সে তার হাতের ফোনটা হঠাৎ ছেড়ে দিল। তারপর গভীর মনোযোগে তাকিয়ে রইল নিচে। ফোনটা টুপ করে জলের গভীরে গিয়ে পড়ল। তারপর ডুবে যেতে লাগল দ্রুত। তিথি হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল।
অনিক বলল, তোর জরুরি কী কথা?
হৃদিপু হঠাৎ তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে, এটা জরুরি কথা না?
অনিক জবাব দিল না। তিথি বলল, কী হয়েছে তোমার? তোমাকে এমন লাগছে কেন?
অনিক হাসল, কেমন লাগছে?
তা জানি না। কিন্তু তোমাকে দেখে আমার ভয় হচ্ছে।
ভয় হচ্ছে কেন?
তুমি কেমন করে যেন তাকাচ্ছ! এমন কখনো দেখি নি তোমাকে।
অনিক হঠাৎ হাসল। তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে হেঁটে যেতে লাগল দূরে।
৩৪
অবন্তী বলল, তুই আমার ফোন ধরছিস না কেন, রিয়া?
না ধরলে এখন কথা বলছিস কী করে?
তোকে আমি গত এক-দেড় মাসে কম করে হলেও এক শ বার ফোন করেছি।
ওহ্। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল রিয়া।
ওহ্ কী?
খেয়াল করি নি।
খেয়াল করিস নি? এই এত দিনে একবারও খেয়াল করিস নি যে আমি তোকে ফোন করেছি?
বুঝতে পারছি না।
কী হয়েছে তোর?
তাও বুঝতি পারছি না। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছি মনে হয়। সারাক্ষণ কেমন ঝিমঝিম লাগে।
এখন কী করছিলি?
ঘুমাচ্ছিলাম।
ঘুমাচ্ছিলি? অবাক গলায় বলল অবন্তী। এখন কটা বাজে, জানিস?
না। কটা?
ছটা।
তো ছটা তো ঘুমেরই সময়।
ভোর ছটা না, সন্ধ্যা ছটা।
ওহ। বলে হাই তোলে রিয়া। সন্ধ্যা আর ভোর এখন আমার কাছে একই লাগে।
মানে কী?
মানে বুঝতে পারছি না। সারাক্ষণ খালি ঘুম পায়। আমার মনে হয় কিছু একটা হয়েছে, অবন্তী।
কী হবে?
তা তো জানি না। তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।
কী কথা?
রিয়া হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলে, সিক্রেট। যে কথা যায় না বলা।
না বলা গেলে আমাকে বলবি কেন?
ওল্ড ম্যানকে নিয়ে কথা। তার কথা তুই ছাড়া আর কাকে বলা যায়?
তোর কথা তুই শোন। আমার খবর কিছু রাখিস তুই?
আমার এখন কারও খবরই রাখার সময় নেই গো অবন্তী দেবী। আমি এখন ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে আমি বনফুল গো…। বলে হাসে রিয়া। অবন্তী কথা বলে না। চুপ করে থাকে। তবে রিয়াকে তার কেমন অসংলগ্ন মনে হয়ে। রিয়া বলে, তুই কি আমার ওপর রেগে আছিস? নাকি ওল্ড ম্যানের ওপর? তুই কি এখন আমাদের দুজনের ওপরই বিরক্ত?
আমি বিরক্ত হব কেন?
তোর না কত কত নীতি-গীতি আছে। আমি তো আবার সেই সব নীতি-গীতির ধার ধারি না। তবে ওল্ডম্যান কিন্তু ভালো মানুষ। আর তোকে ভীষণ পছন্দও করেন। বলেন, মেয়েটা এত চুপচাপ, শান্ত। আমাকেও বলেন তোর মতো হতে। হা হা হা। চিন্তা কর, একটা সমুদ্রকে যদি কেউ চুপচাপ গ্লাসে ঢুকে যেতে বলে, তা কি সম্ভব?
অবন্তী কথা বলে না। তার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এত দিন ধরে রিয়া তার একটা খোঁজ অবধি নেয় নি। ফোন ধরে নি। আর এখনো কিনা সে তার নিজের এলোমেলো, অসংলগ্ন কথাই বলে যাচ্ছে!
সে কি জানে গত একটা সপ্তাহে কী ঘটে গেছে তার জীবনে? এমন বিভীষিকাময় ঘটনা যে তার জীবনে ঘটতে পারে, এ কথা সে দুঃস্বপ্নেও কখনো ভাবে নি। আতঙ্কে এখনো দুচোখের পাতা পর্যন্ত বন্ধ করতে পারে না অবন্তী।
রিয়া বলল, কী হলো? এমন থম মেরে গেলি কেন?
তুই কি একটু আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবি?
আমি?
হুম।
কোথায়, কবে?
আজই। খালার বাসায়। অবন্তীর গলা থমথমে। ভারী। রিয়া হঠাৎ বলল, এই, কী হয়েছে তোর?
তুই আয়। বলছি।
.
রিয়া এল সন্ধ্যাবেলায়। বাড়ির সামনে পুলিশের গার্ড দেখে অবাক হলো সে। কী হয়েছে এ বাড়িতে? অবন্তীর কিছু হয় নি তো?
অবন্তী অবশ্য রিয়াকে দেখে চমকে গেল। এমন ফ্যাকাশে বিবর্ণ রিয়াকে সে এর আগে কখনো দেখে নি। বলল, এ কী অবস্থা তোর?
কেন?
তোর চেহারার এই অবস্থা কেন? মনে হচ্ছে শুকনো কাঠ।
রিয়া চোখ টিপে হাসল, জীবন, যৌবন, মৌবন সব তো একজনকে নিঃশেষ করে দিলাম। তাকে জিজ্ঞেস করে দেখ।
মানে কী?
মানে পরে বলছি। আগে বল তোর কী হয়েছে?
অবন্তী ঘটনা খুলে বলল। শুনে থ হয়ে রইল রিয়া। মুখ থেকে খানিক আগের দুষ্টু-ি মর চিহ্ন দূর হয়ে গেল। বলল, এসব কী বলছিস তুই?
হুম।
এখন? পুলিশ কি তাহলে অনিক নামের ওই লোকটাকে ধরেছে?
এখনো ধরতে পারে নি। তবে খুঁজছে।
ধরতে পারে নি কেন?
সে কোথাও নেই। হঠাত্র যেন ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গেছে সে।
হুম। বলে ঠোঁটে চিমটি কাটতে লাগল রিয়া। তোর কী মনে হয়, কাজটা উনিই করেছেন?
জানি না। তবে আমার মনে হয় না উনি এমন কিছু করার মতো মানুষ। আমার বরং মনে হচ্ছে, এখানে অন্য কোনো ঘটনা আছে। তিথির সঙ্গে কথা বলেছি আমি, ওরও ধারণা এই কাজ ওনার না। উনি মানুষ হিসেবে এমন না।
তাহলে?
অবন্তী এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইল সে। রিয়া বলল, উনি যদি না-ই করবেন, তাহলে পালাবেন কেন?
সেটাও একটা প্রশ্ন। হতে পারে পুলিশের ভয়ে।
কিন্তু এটা বোকামি হয়ে গেল না? এখন তো তার ওপর সন্দেহ আরও বাড়বে।
হুম। বলে চুপ করে রইল অবন্তী।
রিয়া বলল, এখন কী করবি?
বুঝতে পারছি না।
পুলিশ কিছুই করতে পারছে না?
ওই তো, বাসার সামনে গার্ড বসিয়েছে। হয়তো দুয়েক দিনের মধ্যে উঠিয়ে নেবে। আর অনিক ভাইকে ধরার চেষ্টা করছে।
আশপাশে সিসি ক্যামেরা ছিল না?
এ বাড়িতে তো নেই। সম্ভবত আশপাশটা ফাঁকা বলে বাইরেও কিছু ছিল না। তারপরও তারা চেষ্টা করছে। কিন্তু এখনো তেমন কিছু ট্রেস করতে পারে নি। তা ছাড়া লোকটার মুখে মাস্কও ছিল।
ওহ্। হতাশ ভঙ্গিতে বলল রিয়া।
তোকে একটা কথা বলা হয় নি।
কী?
গত মাসখানেক ধরে কেউ একজন আমাকে চিঠি লিখছে। বেনামি চিঠি।
কী বলছিস?
হুম।
কী লেখা চিঠিতে?
তেমন কিছু না। এই হাবিজাবি কবিতার লাইন।
অন্য সময় হলে হয়তো এই নিয়ে হাসিঠাট্টায় মেতে উঠত রিয়া। কিন্তু আজ তেমন কিছুই করল না। বরং বলল, শুধুই কবিতার লাইন?
হুম।
কী ধরনের কবিতা?
বেশির ভাগই আমার চোখ নিয়ে।
ওহ্। ওই যে একটা ছেলের কথা একবার বলেছিলি, তোদের এলাকার, নামও ভুলে গেছি–ওই ছেলেটা নয় তো?
নাহ্।
তাহলে?
বুঝতে পারছি না। ভাবছি বিষয়টা পুলিশকে জানানো উচিত কি না।
অবশ্যই জানানো উচিত। তুই এখনো জানাস নি কেন, সেটাই তো বুঝতে পারছি না আমি।
অবন্তী চুপ করে রইল। রিয়া বলল, তা ছাড়া অনিক ছেলেটা যদি আসলেই নির্দোষ হয়ে থাকে, তাহলে সে কেন বিনা কারণে অপরাধী হবে?
অবন্তী এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। সে বুঝতে পারছে বিষয়টা পুলিশকে জানানো উচিত। কিন্তু এই নিয়ে সূক্ষ্ম অথচ তীব্র একটা শঙ্কাও কাজ করছে তার মধ্যে। সে জানে, ঘটনা সেদিকে গেলে এর চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না।
৩৫
আপনি কি জানেন যে অনিক ঢাকাতে নেই? বললেন আবছার আহমেদ।
তাহলে? কোথায় গিয়েছে সে? বললেন রোখসানা বেগম।
সেটা এখনো জানা যায় নি। আমরা তার ফোন ট্র্যাক করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারা যায় নি। সে সম্ভবত ফোন বন্ধ করে বা কোথাও ফেলেটেলে দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে।
কী বলছেন? তার মানে…। বলতে গিয়েও চুপ করে রইলেন রোখসানা বেগম। আগবাড়িয়ে কিছু বলতে চান না তিনি।
হুম। আমরা যা সন্দেহ করেছিলাম, সম্ভবত তা-ই। না হলে সে আগেভাগেই পালাবে কেন?
রোখসানা বেগম এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। আবছার আহমেদ বললেন, আমি আপনার বাসায় এসেছি বিশেষ একটা কারণে।
কী কারণ?
অবন্তী ফোন করেছিলেন।
অবন্তী? কপাল কুঁচকে তাকালেন রোখসানা বেগম। অবন্তী আপনাকে ফোন করেছিল?
হুম।
কেন?
উনি কিছু একটা বলতে চান।
কী?
এখনো জানি না। তবে তার কথা শুনে মনে হলো জরুরি কিছু।
রোখসানা বেগম ঘটনার কিছুই বুঝলেন না। হৃদি গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকবার ফোন করেছে। কিন্তু তার সঙ্গে তেমন কথা হয় নি। কথা হয়েছে তিথির সঙ্গে। তিথিও তাকে পরিষ্কার করে কিছু বলে নি। বিষয়টা নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার। পরে তিনি হৃদিকে ফোনও করেছিলেন। কিন্তু ধরে নি সে।
আবছার আহমেদ বললেন, আপনি একটু অবন্তীকে ডাকুন, প্লিজ।
অবন্তী এল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে এখনো দ্বিধাগ্রস্ত। আবছার আহমেদ বললেন, আপনি কি আমার সঙ্গে একা কথা বলতে চান?
না না, সমস্যা নেই। বলল অবন্তী।
আচ্ছা। বলুন।
আমি আসলে বুঝতে পারছি না যে কথাটা আপনাদের জন্য আসলেই গুরুত্বপূর্ণ কি না। একবার মনে হচ্ছে হয়তো আপনাদের কাজে লাগবে। আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে শুধু শুধু আপনাদের বিরক্ত করছি।
আপনি বলুন।
আমি বেশ কিছুদিন থেকেই বেনামি চিঠি পাচ্ছি।
বেনামি চিঠি? দ্রু কুঁচকে গেল আবছার আহমেদের।
জি।
কী ধরনের চিঠি?
খুব সাধারণ। চিঠিতে তেমন কিছু লেখা নেই। কেবল কবিতার লাইন লেখা থাকে।
কবিতার লাইন!
হুম।
সব চিঠিতেই?
জি।
ইন্টারেস্টিং। বলে পকেট থেকে কাগজ-কলম বের করলেন আবছার আহমেদ। বললেন, কবিতার লাইনগুলো আপনার মনে আছে?
অবন্তীর এই মুহূর্তে কবিতার লাইনগুলো আর বলতে ইচ্ছে করছে না। তার ধারণা, ওই কবিতার লাইনগুলো সে আর কখনোই মনে করতে পারবে না। বরং ভাবলেই শরীর-মনজুড়ে প্রবল এক আতঙ্ক ছড়িয়ে যাবে। সে ম্লান গলায় বলল, উঁহু। এখন মনে পড়ছে না।
একদম কিছু না?
না।
কিন্তু ওগুলো আমার দরকার।
আমার কাছে এখন নেই।
কোথায় আছে?
ইউনিভার্সিটির হলে। আমার রুমে।
আচ্ছা। আপনি কত দিন ধরে চিঠি পাচ্ছেন?
মাসখানেক হবে। মানে শেষ যেটা পেয়েছিলাম, তখন ও রকমই ছিল। তারপর তো এ বাড়ি থেকে আর হলে যাওয়া হয় নি।
তার মানে এরপর আর এসেছে কি না, আপনি জানেন না?
নাহ।
যেগুলো পেয়েছেন, তার সব কি একই হাতের লেখা?
হুম।
প্রেরকের নাম-ঠিকানা, ফোন নম্বর কিছু নেই?
না।
আপনার ইউনিভার্সিটির হলের ঠিকানায় আসে চিঠিগুলো?
জি।
কবিতাগুলোর টপিক কী? মানে স্পেসিফিক কিছু? নাকি র্যানডম?
স্পেসিফিক।
কী?
চোখ।
চোখ? আবারও প্রু কোঁচকালেন আবছার আহমেদ। চোখ নিয়ে কবিতা? সবগুলোই?
জি। মানে বেশির ভাগই। তবে দু-একটা অন্য রকমও আছে।
আবছার আহমেদ কথা বললেন না। তিনি স্থির চোখে অবন্তীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, আপনার চোখ সুন্দর। কেউ যদি ওই চোখ দেখে কবিতা লিখে ফেলে, তবে তাকে তো দোষ দেওয়া যায় না।
.
অবন্তীর হলে পরদিন খোঁজ নেওয়া হলো। এ কদিনে আরও তিনটি চিঠি এসেছে। সে চিঠিগুলো খুলল না। বিকেলে আবছার আহমেদ এলেন বাসায়। বললেন, সবগুলো এনেছেন?
জি।
নতুনগুলো এখনো খোলেন নি?
না।
খুলুন, প্লিজ।
অবন্তী খুলল। প্রথম চিঠিতে গোটা গোটা সুন্দর হাতের অক্ষরে লেখা
তোমার চোখ চেয়েছি বলে এমন ডুবল আমার চোখ,
অমন অথই জলে রোজ আমার ডুবসাঁতারটা হোক।
শোনো কাজল চোখের মেয়ে, আমি তোমার হব ঠিক,
তুমি ভীষণ অকূল পাথার, আমি একরোখা নাবিক।
আবছার আহমেদ চিঠিটা হাতে নিলেন। তারপর দীর্ঘ সময় ধরে বোঝার চেষ্টা করলেন এই কবিতা বা হাতের অক্ষরের আড়ালে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে কি না? কিন্তু তেমন কিছুই খুঁজে পেলেন না।
পরের চিঠিটা খুলল অবন্তী। সেখানে লেখা–
শোনো জল ছলছল কাজল চোখের কন্যা সর্বনাশী
আমি তোমায় ভালোবাসি!
পরের চিঠিতেও এমন দুই লাইনের একটা কবিতাই। আবছার আহমেদ একে একে বাকি চিঠিগুলোও দেখলেন। তারপর বললেন, আপনি এত দিন এই চিঠির কথা আমাদের জানান নি কেন?
আমি ভাবি নি এটা তেমন ইম্পর্ট্যান্ট কিছু হতে পারে।
এখন কেন মনে হলো যে এটা ইম্পর্ট্যান্ট?
বিশেষ কোনো কারণ নেই।
তার মানে আপনি ইচ্ছে করে চিঠির বিষয়টা আমাদের কাছে লুকান নি?
না না। একদমই না। সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে বলল অবন্তী।
আবছার আহমেদ কথা বললেন না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর চিঠিগুলো আরও একবার খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, কিন্তু অন্য একটা কথা আপনি আমাদের কাছে ইচ্ছে করেই লুকিয়েছিলেন।
আমি! অবাক গলায় বলল অবন্তী।
হুম।
কী?
আপনাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে আপনার সঙ্গে কারও কোনো বিশেষ সম্পর্ক আছে কি না, আপনি বিষয়টা অস্বীকার করেছিলেন।
জি।
কিন্তু কথাটা কি সত্যি?
হ্যাঁ।
তাহলে মঈন কে?
এই প্রশ্নে রীতিমতো কেঁপে উঠল অবন্তী। কথা বলল না সে। আবছার আহমেদ বলল, মঈনের সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?
তেমন কিছু না।
তাহলে সে কেন প্রায় রোজই এসে আপনার হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত? অবন্তী চুপ।
আবছার আহমেদ বললেন, শুধু তা-ই না, আপনি কখন হল থেকে বের হন, কখন আসেন–এই সব খবরও সে হলের দারোয়ানের কাছ থেকে নিয়মিত সংগ্রহ করত। কেন?
এবার সত্যি সত্যিই বিভ্রান্ত হয়ে গেল অবন্তী। আসলেই মঈন এসব নিয়মিত করত? করলে কেন করত? এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও নেই। আবছার আহমেদ বললেন, আমরা আপনার সম্পর্কে অল্পবিস্তর খোঁজখবর নিয়েছি। সেই খোঁজ নিতে গিয়েই জেনেছি যে মঈন ছেলেটার সঙ্গে আপনার একটা সম্পর্ক ছিল। আপনারা অনেক আগে থেকেই পূর্বপরিচিত। এমনকি আপনাদের বাড়িও একই জায়গায়। তার চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার, মঈনের একটা রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এবং সেটি ভালো কিছু নয়। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি মঈনের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের বিষয়টি কেন লুকালেন?
আসলে আমাদের সম্পর্কটা শেষ হয়ে গিয়েছিল।
কেন?
ওনার পলিটিক্যাল নানা ইস্যুর কারণেই। বেশ কিছুদিন আগে একটা বিষয় নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও হয়। আর এসব কারণে আমার বাড়িতেও তাকে নিয়ে অনেক ঝামেলা হচ্ছিল।
হুম। বলে চুপ করে রইলেন আবছার আহমেদ। তারপর বললেন, তার মানে সম্পর্কটা আপনার দিক থেকে ক্লোজড হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মঈনের দিক থেকে নয়?
জি।
সে চাইছিল কন্টিনিউ করতে?
হ্যাঁ।
এই নিয়ে আপনাকে উত্ত্যক্ত বা জোর করত? ভয়ভীতি দেখাত কোনোভাবে?
না।
তাহলে সে আপনার হলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকত কেন?
আগেরবার এই একই প্রশ্নের উত্তরে চুপ করে থাকলেও এবার কথা বলল অবন্তী। বলল, কারণ, উনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, এটা আমি চাইতাম না।
আপনার সঙ্গে কখনো খারাপ ব্যবহার করেছে সে?
না। তবে আমি করেছি।
আপনি?
হুম। উনি কখনো কিছু করেন নি। বরং চুপচাপ সব শুনতেন। শেষের দিকে আমি ওনার ফোনও ধরতাম না। দেখা হলে কথাও বলতাম না। হয়তো এসব কারণেই।
এসব কারণে কী?
হয়তো এসব কারণেই অন্যদের মাধ্যমে আমার খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করতেন।
আপনি জানতেন যে সে আড়াল থেকে আপনার খোঁজখবর নেয়?
সেভাবে জানতাম না। তবে একদিন দেখেছিলাম।
আপনি কারণ জিজ্ঞেস করেন নি?
করেছি। কিন্তু উনি কোনো উত্তর দেন নি।
আবছার আহমেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, কিন্তু অবন্তী, যে যুক্তিতে বা সন্দেহে আমরা এই ঘটনায় অনিককে অভিযুক্ত ভাবছি, ঠিক একই যুক্তিতে কিন্তু মঈনকেও অভিযুক্ত করা যায়। যায় না?
অবন্তী কথা বলল না। তার হঠাই মনে হলো সে যা আশঙ্কা করছিল, পরিস্থিতি এখন সেদিকেই যাচ্ছে।
আবছার আহমেদ বললেন, অনিকের বিরুদ্ধে এর আগে কিন্তু কারও কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু মঈন সম্পর্কে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক নানান অভিযোগের তথ্য আমাদের কাছে আছে। ফলে বিষয়টা হালকা করে দেখার সুযোগ আসলে নেই।
বলে খানিক চুপ করে রইলেন আবছার আহমেদ, যেন পরের কথাটা বলার জন্য সময় নিচ্ছেন তিনি। আর অবন্তীর মনোভাব বোঝার চেষ্টার করছেন। অবন্তী অবশ্য কথা বলল না। তবে তার চোখেমুখে একটা স্পষ্ট ভয়ের ছাপ ফুটে উঠেছে।
আবছার আহমেদ বললেন, আপনি কি জানতেন যে আপনার বান্ধবী রিয়ার সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল মঈনের?
কী! হতভম্ব চোখে তাকাল অবন্তী। এটা তার কাছে পুরোপুরি অভাবিত এক ব্যাপার।
হুম। শুধু যোগাযোগই নয়, সে নিয়মিত তার ওপরও নজর রাখত। বিষয়টা তার ডিপার্টমেন্টেরও অনেকেই জানে।
অবন্তী রীতিমতো দিশেহারা বোধ করতে লাগল। এসব কথা তো রিয়াও তাকে কখনো বলে নি! সেদিন বাসায় আসার পরও না। অবশ্য রিয়ার বলার কথাও না। সে মঈনকে চেনে না। তা ছাড়া গত মাসখানেকের বেশি সময় ধরে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগও হয় নি রিয়ার। কিন্তু মঈন কেন রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছিল? বিষয়টা ভারি গোলমেলে ঠেকতে লাগল অবন্তীর। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, এই পুরো বিষয়টা হঠাৎ করেই দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে শুরু করেছে এবং সে নিজেও একটি অজানা আশঙ্কার অনিবার্য অংশ হয়ে উঠছে। অথচ এর কিছুই জানে না সে। মঈন কি জানে?
প্রশ্নটা নিজেকেই নিজে করল অবন্তী। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর মিলল না।
৩৬
রাশু পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। লাল চান বেডিং স্টোরের এক পাশে তোশক বানানোর কাজ চলছে। ফটফট শব্দে তুলো ছাড়ানো হচ্ছে। সেই তুলো ছড়িয়ে পড়ছে।
ঘরজুড়ে। রাশু তার পায়ের আঙুলের ডগায় মেঝেতে পড়ে থাকা তুলোর টুকরোগুলো জড়ো করছে। লাল চান ফাঁসফেঁসে গলায় বলল, তুই আমার বাপ লাগস। আপনা বাপ। এই আমি তোর পায় ধরতেছি, তুই তাও আমারে সত্য কথা বল। কোরান শরিফ ধইরা বল। জিনিস তোর কাছে আছে। তোর কাছেই আছে, তাই না বাপ?
রাশু কথা বলল না। লাল চান বলল, ওই জিনিসের যদি কিছু হয়, তাইলে আমি শ্যাষ। তুই জামশেদরে চেনস না, সে আমারে জায়গায় খুন করে ফেলবে।
রাশু তাও কথা বলে না। তার দৃষ্টি মেঝেতে। সেখানে ফ্যানের বাতাসে হুটোপুটি খাচ্ছে অজস্র তুলোর টুকরো। লাল চান তার জায়গা ছেড়ে উঠে এল। তারপর হাঁটু ভাঁজ করে বসল রাশুর পায়ের কাছে। বলল, তুই আমার দিকে দেখ। এই যে চাইয়া দেখ, আমার কইলজা দেখা যাইতেছে না? দেখছস, কইলজায় কোনো পানি আছে? নাই। ভয়ে আমার কইলজা শুকাই গেছে। ওই মাল যদি হারায়, আমার কী হইব তুই জানস?
রাশু বসে আছে একটা লালরঙা প্লাস্টিকের টুলের ওপর। তার দুই উরুতে হাত রেখে অসহায় ভঙ্গিতে মেঝেতে বসে আছে লাল চান। তার চোখ ফ্যাকাশে। গলার স্বর অস্বাভাবিক রকম কাঁপছে। চোখেমুখে তীব্র অবিশ্বাস। ভয়। সে প্রায় ফিসফিস করে। বলল, ওই খানকির পোলা, ওই মাদারচোদ্দ… শুয়োরের বাচ্চা, জিনিস তাইলে কই? কই জিনিস?
লাল চানকে হঠাৎ হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো মনে হতে লাগল। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর আচমকা লাথি বসাল রাশুর কোমরে। রাশু ছিটকে পড়ল মেঝেতে। লাল চান উঠে গিয়ে তার চোখেমুখে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি বসাতে লাগল। রাশু অবশ্য কিছু বলল না। সে যেমন ছিল তেমনই শুয়ে রইল। মেঝের ঠান্ডা কনকনে শীতল স্পর্শে তার চোখ বুজে আসতে লাগল। সে অবশ্য চোখ বন্ধ করল না। বরং স্থির তাকিয়ে রইল লাল চানের মুখের দিকে। তারপর অকস্মাৎ উঠে বসল।
বলল, জিনিস আমার কাছে নাই।
জিনিস তোর কাছে নাই! যেন আর্তনাদ করে উঠল লাল চান। তোর কাছে থাকব না কেন? আমি নিজে তোর কাছে জিনিস দিয়া গেছি। চারখান ছোট্ট কাঁচের জার। এই মধ্যম আঙুলের সাইজ লম্বা একেকটা। তোর মনে নাই?
রাশু কথা বলল না। লাল চান প্রায় কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল, পুলিশ আমারে তাড়া করল। রাইতের বেলা। জামশেদ স্যার খামার থেকে আমার কাছে দিয়া পাঠাইল। কথা। ছিল আমি চানখারপুলে এক লোকের কাছে দিয়াসবো। কিন্তু পারলাম না। পুলিশ পিছ নিল। তখন তোর কাছে দিয়া বললাম কিছুদিন তোর কাছে রাখ। খবরদার, কেউ যেন। কিছু না জানে। তুই রাখলি। আমি গা ঢাকা দিলাম। আইজ দুই মাস পর আইসা শুনি জিনিস তোর কাছে নাই?
ছিল। কিন্তু এখন নাই।
না থাকলে কই গেছে? তুই নিজে বেইচা দিছস? তোর এত সাহস? কইলজায় ডর নাই তোর?
রাশু আবারও চুপ। লাল চান তার বাহু ধরে ঝাঁকাতে লাগল, তোর এত লোভ? এত লোভ থাকলে আমারে বলতি। আমি যা টাকাপয়সা পাইতাম, তাও তোরে দিয়া দিতাম। কিন্তু এইটা তুই কী করলি? আমার জীবনের উপরে দিয়া খেলাটা খেললি তুই? একবারও আমার কথা ভাবলি না?
আমি জিনিস বেচি নাই।
তাইলে? তাইলে কী করছস তুই?
হারাই ফেলছি।
এবার রীতিমতো চিৎকার করে উঠল লাল চান, তুই আমার লগে দোতারি খেলস? দোতারি খেলস আমার লগে? ওই জিনিস হারায় কেমনে? মিথ্যা কথার আর জায়গা পাস না? বল যে তুই চুরি করছস। নিজে বেচছস। বল?
আমি বেচি নাই।
না বেচলে গেছে কই?
এই প্রশ্নে আবারও চুপ করে রইল রাশু। লাল চান হঠাৎ পাগলের মতো গালির তুবড়ি ছোটাল মুখে। বলল, ওই খানকির পুত। ওই বেশ্যা মাগির পুত। তোর মা বেশ্যা, বেশ্যাখানায় জন্ম তোর। তুই ভালো হবি কেমনে? যার জন্মের ঠিক নাই, তার কথার ঠিক থাকব কেমনে? খানকি মা…।
লাল চান হয়তো আরও কিছু বলত। কিন্তু কথা শেষ করতে পারল না সে। তার আগেই রাশুর হাতের বিরাশি সিক্কা ওজনের এক চড়ে উল্টে গেল সে। রাশু অবশ্য আর কিছু বলল না। সে শীতল কণ্ঠে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর উঠে দাঁড়াল মেঝে থেকে। লাল চান হতভম্ব চোখে রাশুর দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেকে সে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে তুলে এনেছিল? এইটুকু এক ছেলেকে? সে আজ তাকে এই প্রতিদান দিল?
রাশু অবশ্য ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও পারল না। ফিরে এসে লাল চানের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর ভারী গলায় বলল, আমি জিনিসের খোঁজে আছি। চেষ্টা করতেছি পাওয়ার।
লাল চান কথা বলল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। রাশুর চোখ লাল। মুখ থমথমে। চোয়াল শক্ত। খানিক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য সে দুঃখিত কি না, বোঝা গেল না।
রাশু শান্ত গলায় বলল, আর…আপনের কিছু হবে না। আমি থাকতে আপনের কেউ কিছু করতে পারব না। শেষ পর্যন্ত যদি মাল না-ই পাই, তাইলে আমি নিজে গিয়া জামশেদ স্যারের কাছে ধরা দিব। বলব, মাল আমি সরাইছি।
বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। লাল চান হতভম্ব ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
.
রাশু অবশ্য তার কথা রাখতে পারল না। লাল চান খুন হয়ে গেল পরদিন মাঝরাতে। তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন জামশেদ। সঙ্গে রাশুকেও। তারা বৈদ্যবেলঘরিয়ার উদ্দেশে রওনা করল রাত দশটার দিকে। তবে ঢাকা থেকে তাদের সঙ্গে আরও একটি ছেলে। গাড়িতে উঠল। ছেলেটির নাম অনিক। সে এখনো জানে না সে কোথায় যাচ্ছে। মানিকগঞ্জে এক মাছের খামারে তার কাজ করার কথা। তবে তার আসল উদ্দেশ্য কিছুদিনের জন্য সেখানে আত্মগোপনে থাকা।
গাড়িতে লাল চান আর রাশু থম মেরে বসে রইল। তাদের পেছনে বসেছে অনিক। গাড়িতে উঠে দুজনকেই সালাম দিয়েছে সে। কিন্তু তারা কেউ তার সালামের উত্তর দিল না। বরং জামশেদের সামনে গিয়ে কী বলবে, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে রইল। যদিও জামশেদ এখনো জিনিস হারানোর কথা জানেন না। তিনি জানেন, লাল চানকে পুলিশ সন্দেহ করেছিল। ফলে পিছু নিয়েছিল তার। বাধ্য হয়েই গা ঢাকা দিতে হয়েছিল তাকে। তবে যাওয়ার আগে জিনিসগুলো নিরাপদ স্থানেই রেখে গেছে সে। প্রায় দুই মাস পর ফিরে এসেছে লাল চান। এখন তার সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অনিক জায়গাটা দেখে হকচকিয়ে গেছে। এমন গহিন গোপন জায়গায় কেউ মাছের খামার করতে পারে, এটা তার ধারণা ছিল না। তারা আখখেত পেরিয়ে বড় পুকুরের পাড়ে এসে পৌঁছাল। এখানে টিমটিম করে বাতি জ্বলছে। তবে তাতে আঁধার না কেটে বরং একটা গা-ছমছমে পরিবেশ তৈরি করেছে। পুকুরের ওপরই বাঁশ দিয়ে তৈরি একখানা টংঘর। এ ছাড়া আশপাশে কিছু চোখে পড়ল না অনিকের। এখানে সে থাকবে কোথায় তাহলে? ওই টংঘরে?
হঠাই পুরো বিষয়টা তার কাছে ভয়ংকর মনে হতে লাগল। সেই ভয় আরও বাড়ল যখন তারা বড় পুকুরটা পার হয়ে জঙ্গলের কাছে এসে দাঁড়াল। ভেতর থেকে সামান্য। আলোর আভাস এলেও ভয়ে অনিকের দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল।
জামশেদ অবশ্য অনিককে খেয়াল করলেন না। হয়তো তার কথা মনেও নেই তার। মাহমুদ হাসান তার দীর্ঘদিনের বন্ধু। গত রাতে তিনি হঠাত্র ফোন করে ছেলেটার কথা বলেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টা মাথায় গেঁথে গিয়েছিল জামশেদের। ছেলেটাকে যেহেতু পুলিশ খুঁজছে, সেহেতু চট করে আর এখান থেকে কোথাও চলে যেতে পারবে না সে। এমনকি অবাধ্যও হতে পারবে না। ফলে তাকে ইচ্ছেমতো কাজে লাগানো যাবে। তা ছাড়া দুয়েকজন বাধ্যগত, বিশ্বস্ত লোক তার দরকার। এই ছেলেটা হয়তো দারুণ কাজে লেগে যাবে।
কিন্তু বিষের জারগুলোর চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকা জামশেদ যেন অনিকের কথা বেমালুম ভুলেই গেলেন। এমনকি লাল চান আর রাশুর কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরে অন্ধকারে দাঁড়ানো অনিককে খেয়ালও করলেন না তিনি।
লাল চান বলল, কেমন আছেন, স্যার?
আমি তোমার ওপর খুবই বিরক্ত, লাল চান।
জি স্যার।
জি স্যার বললে হবে না। তুমি এত দিন ধরে কাজ করো কিন্তু পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে পারো না? পুলিশ কীভাবে তোমাকে সন্দেহ করে?
ওই সময়েই স্যার ঢাকায় কাদের জানি দুইটা চালান ধরা পড়ছে। একটাতে নাকি পঁচাত্তর কোটি টাকার সাপের বিষ ছিল। এই জন্য পুলিশ খুব সতর্ক হয়ে গেছে।
হুম। বলে চুপ করে রইলেন জামশেদ। তারপর বললেন, কই? জিনিস কই? আনছ? তোমারে দিয়ে আর এই চালান পাঠাব না। এবার কাজ করবে রাশু।
লাল চান এই প্রশ্নের উত্তর দিল না।
জামশেদ বললেন, কই? জিনিস বের করো? দেখি কী অবস্থায় আছে। কাঁচের জার। যদিও পোক্ত আছে। বিদেশ থেকে আনা। তারপরও খুব সাবধান। জায়গা বেজায়গায় রাখলে কিন্তু ভেঙে যেতে পারে। আর এক ফোঁটা বিষের দাম জানো?
লাল চান এবারও কথা বলল না। জামশেদের হঠাৎ কী হলো, তিনি তার হাতের টর্চ দিয়ে লাল চানের মুখে আলো ফেললেন। তারপর বললেন, কই? জিনিস বের করছ না কেন? তোমার সঙ্গে তো কোনো কিছু দেখতে পাচ্ছি না? রাশুর কাছেও না। ঘটনা কী?
স্যার। কাঁপা গলায় বলল লাল চান। একটু সমস্যা হয়ে গেছে।
সমস্যা? কী সমস্যা?
লাল চান কী বলবে ভেবে পেল না। সে জানে না কথাটা বলার পর কী হবে। রাশু অবশ্য তাকে বলতেও দিল না। সে হেঁটে লাল চানের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, স্যার, একটা ভুল হয়ে গেছে।
কী ভুল?
ভুলটা লাল চান চাচার না, আমার। জিনিসগুলা আমি হারাই…।
জামশেদ আচমকা স্থির হয়ে গেলেন। তিনি রাশুর কথা শেষ করতে দিলেন না। ঠান্ডা গলায় বললেন, তুই আমার সামনে থেকে সর, রাশু।
রাশু সরল না। জামশেদ বললেন, রাশু…যা বলার লাল চানকে বলতে দে। আমি তারে জিনিস দিছি। তোকে না।
রাশু তাও সরল না। চোখের পলকে জামশেদের হাতে পিস্তল উঠে এল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। কপালের শিরা দপদপ করে কাঁপছে। তিনি হিসহিসে গলায় বললেন, লোভ খুব খারাপ জিনিস, রাশু। মিথ্যা কথাও। সর আমার সামনে থেকে, সর।
রাশু তাও সরল না। জামশেদ আচমকা রাশুর মুখে আঘাত করলেন। চকিতে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল রাশু। কিন্তু পারল না। শেষ মুহূর্তে তার কপালের বাঁ দিকে আঘাতটা লাগল। দরদর করে রক্ত ছুটতে লাগল ক্ষতস্থান থেকে। লাল চান হঠাৎ ছুটে গিয়ে জামশেদের পায়ের কাছে বসে পড়ল। তারপর হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল সে। জামশেদ অবশ্য কিছু বললেন না। স্থির, নিষ্কম্প চোখে কেবল তাকিয়ে রইলেন।
জামশেদ কান্নাজড়ানো গলায় কী কী সব বলার চেষ্টা করলেন। সেসবের বেশির ভাগই অবশ্য শোনা গেল না। তবে রাতের ওই নিস্তব্ধতায় গুলির শব্দটা বড় কানে বাজল। লাল চান কাত হয়ে পড়ে গেল ডোবার দিকটায়। তার কপালে তৈরি হওয়া ছোট্ট গর্তটা বেয়ে রক্তের একটা স্রোত বেরিয়ে এল। তবে জামশেদ সেদিকে খেয়াল করলেন না। তিনি পা দিয়ে ঠেলে তার নিথর শরীরটা ডোবার ভেতর ফেলে দিলেন। রাশুর বিমূঢ় অবস্থা তখনো কাটে নি। তার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা আসলেই সত্যি! সে পৃথিবীর সকল অবিশ্বাস নিয়ে অন্ধকারে ডোবাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
ডোবার ভেতরে ততক্ষণে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। ঝাঁকে ঝাঁকে রাক্ষুসে জীব যেন রক্তমাংসের গন্ধে উন্মাদ হয়ে গেছে। লাল চানের মৃত শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা। রাশু চুপচাপ তাদের সেই উন্মত্ততার শব্দ শুনতে লাগল। অন্ধকারে তার চোখ জোড়া শূন্য, নিষ্প্রাণ, জলহীন।
তার পেছনে তখন আরও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। বিবশ, বিমূঢ়, নির্বাক। মানুষটার নাম অনিক। সে জানে না এতক্ষণ ধরে সে তার চোখের সামনে যা দেখেছে, তা সত্যি কি না। সে হঠাৎ হড়বড় করে বমি করে দিল। তারপর লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
বিস্মিত জামশেদ আলো ফেললেন সেখানে। প্রথমে খানিক দ্বিধান্বিত হলেও মুহূর্তেই সামলে নিলেন নিজেকে। অনিকের কথা হঠাৎ মনে পড়েছে তার। ভালোই হয়েছে। আজকের এই মুহূর্তের কথা এই জীবনে আর কখনো ভুলতে পারবে না সে। বেরও হতে পারবে না এই ভয়াবহ আতঙ্ক থেকে।
জামশেদের হঠাৎ মনে হলো, এই ছেলেকে তিনি আগে থেকেই চেনেন। দেখেছেন কোথাও। কিন্তু কোথায় দেখেছেন, সেটি এই মুহূর্তে চট করে মনে করতে পারছেন না।
৩৭
সুমির খুব ইচ্ছে ছিল বাসাটা নতুন করে সাজাবে। নিজের মনের মতো করে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করাবে। বাথরুমগুলো ভেঙে বড় করতে হবে। দুটো রুমের দেয়াল সরিয়ে এদিক-সেদিক করতে হবে। রান্নাঘরটা পুরোপুরি ভেঙে সাজাতে হবে। এমন নানা বিষয়। মাহমুদের অবশ্য এ নিয়ে আগ্রহ নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই সব পরিকল্পনা করেছিল সুমি নিজে। অ্যাডভান্স টাকাও দিয়ে দেওয়া হয়েছিল ইন্টেরিয়রের লোকদের। কাজের ডেটও ঠিক করা হয়ে গিয়েছিল বেশ আগে।
কিন্তু কাজ শুরুর মাত্র সপ্তাহখানেক আগেই সুমি সিদ্ধান্ত নিল যে সে আর এই বাসায় থাকবে না। নির্দিষ্ট করে বললে মাহমুদ হাসানের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবে না সে। এর আগেও অল্পবিস্তর নানান ঘটনা ঘটেছে। তবে সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল সে। কিন্তু এবারকার ঘটনা গুরুতর।
মাহমুদ বহুমুখী মানুষ। সৃষ্টিশীল, মেধাবী। এই বয়সেও দেখতে যথেষ্ট আকর্ষণীয় তিনি। ফলে তার আশপাশে মেয়েদের আনাগোনা সব সময়ই ছিল। কিন্তু তাতে সুমির প্রতি ভালোবাসার অভাব কখনো দেখা যায় নি। বরং দীর্ঘ এই বিবাহিত জীবনে তারা সুখী, ঝামেলাহীন দাম্পত্যই কাটিয়েছেন। সেখানে মাঝেমধ্যে দুয়েকটি অনাকাক্ষিত ঢেউ যে আসে নি, তা নয়। কিন্তু তাতে মাহমুদের চেয়েও অন্য প্রান্তের নারীটির ভূমিকাই যেন ছিল বেশি।
ফলে, সেসব নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্যও করে নি সুমি। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে একই ঘটনা বারবার ঘটেছে। বিষয়টা প্রথম প্রথম গুরুত্ব না দিলেও একটা সময় গিয়ে সচকিত হয়ে উঠল সে। প্রথম দিন বাসায় ফিরে বাথরুমের আয়নায় একটা টিপ দেখতে পেয়ে থমকে গিয়েছিল। সাধারণত টিপ পরে না সে। তাহলে? এই টিপটা এখানে এল কী করে? প্রশ্নটা মাথায় খচখচ করতে থাকলেও মাহমুদকে কিছু বলল না। বলল না ঘরের বিছানা-বালিশে একটা অপরিচিত প্রসাধনী, সুগন্ধির অস্তিত্ব টের পাওয়ার পরও। হতে পারে এটা তার মনের ভুল!
নাকি আসলেই অন্য কিছু?
বিষয়টা নিয়ে একটা অস্বস্তিকর দ্বিধাদ্বন্দ্বেই সময় কেটে যেতে লাগল সুমির। কিন্তু ঘটনা ঘটতে থাকল নিয়মিতই। দিনের বেলায় বাসাটা সাধারণত ফাঁকাই থাকে। স্থায়ী কোনো কাজের বুয়া নেই তাদের। খুব ভোরে আর সন্ধ্যার দিকে এসে কিছু কাজ করে দিয়ে চলে যায় ছুটা বুয়া। জিতুও দিনের বেলাটা তার ক্লাস, কোচিং, স্পোর্টস নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ফলে এই সময়টা মোটামুটি নিরাপদই।
সেদিন বাইরে থেকে এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থমকে গেল সুমি। এক জোড়া অপরিচিত জুতো সেখানে। ঘরে ঢুকে কথাটা মাহমুদকে বললও সে। মাহমুদ অবশ্য গুরুত্ব দিলেন না। বললেন, পাশের ফ্ল্যাটের কারও হবে হয়তো। কিংবা কেউ হয়তো তোমার জুতা বদলে ওটা রেখে গেছে।
ঘটনা দেখা গেল আসলেই তাই। সুমির এক জোড়া জুতো নেই। বিষয়টা সুমি এবং মাহমুদ দুজনকেই অস্বস্তিতে ফেললেও তারা কেউ আর সেটি নিয়ে সরাসরি কোনো কথা বলল না।
তবে মাহমুদ পরদিন রিয়াকে ঘটনাটা বললেন। রিয়া স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাসল। বলল, সুমি সেদিন দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসবে বলে তুমি হঠাৎ আমাকে যেভাবে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে, তাতে যে আমি তোমার বাসায় আমার আন্ডারগার্মেন্টস ফেলে রেখে আসি নি, তা-ই ঢের।
কিন্তু আমাদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত, রিয়া।
তোমারও হওয়া উচিত। মাহমুদকে আজকাল তুমি করেই বলে রিয়া।
আমি আবার কী করলাম?
কী জানি কী করেছ? তোমার বাসায় গেলেই আমার কেমন ঝিমঝিম লাগে। সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। মনে হয় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। বাসায় আসা যাওয়ার পরও ওই ঘোর কাটে না। দেখা গেল কোনো দিন এমন হবে যে তোমার বিছানায় এমনভাবে ঘুমিয়ে গেছি যে সুমি এসে ডেকেও আমাকে ওঠাতে পারছে না।
এটা একদমই হাসিঠাট্টার বিষয় নয়, রিয়া।
সরি। বলে যেন খানিক সিরিয়াস হলো রিয়া। বলল, এর পর থেকে সতর্ক থাকব।
কিন্তু যত সতর্কই তারা থাক, বিষয়টা যেন ক্রমশ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে লাগল। মাহমুদের কোনো অনুরোধ কিংবা বিধিনিষেধকেই আর গ্রাহ্য করতে চায় না রিয়া। তার সারাক্ষণই কেবল মনে হয়, ওই মানুষটার সঙ্গে আরও খানিকটা সময় যদি সে থাকতে পারত, আরও খানিকটা স্পর্শ, অনুভব তার দরকার। ব্যাপারটা যেন নেশার মতো হয়ে গেছে তার কাছে।
মাহমুদ নিজেও যে পুরোপুরি কঠোর হতে পারেন, তা নয়। বরং রিয়ার এই প্রগল্ভতা, বাঁধনহারা উচ্ছ্বাস, বেপরোয়া সর্বগ্রাসী ভালোবাসা তাকে এই বয়সেও যেন নতুন করে জীবনের আস্বাদ দিতে থাকে। ফলে যতবার তিনি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেন যে এবারই শেষ, এরপর আর কখনোই রিয়াকে বাসায় আসতে বলবেন না, যোগাযোগ কমিয়ে দেবেন কিংবা সম্পর্কটা স্বাভাবিক করে ফেলবেন, ততবারই তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত, অব্যাখ্যেয় এক শূন্যতায় ভরে ওঠে। তীব্র এক হাহাকার তাকে এলোমেলো করে দিতে থাকে। ওই হাহাকার থেকে আর মুক্তি মেলে না তার।
সুমি অবশ্য একদিন সরাসরিই জিজ্ঞেস করল, বাসায় কি কেউ এসেছিল, মাহমুদ?
কে আসবে?
তোমার কাছে আসার লোকের অভাব আছে?
ওহ্। তা কতজনই তো আসে। শিক্ষক, ছাত্র, বন্ধুরা।
ছাত্রীরা আসে না?
এটা কেন জিজ্ঞেস করছ? ছাত্রছাত্রী কি আলাদা কিছু?
আলাদা না?
না।
আচ্ছা। বলে মাহমুদের সামনে গোলাপি রঙের একটা চুল বাঁধার রাবার ব্যান্ড ছুঁড়ে দিল সুমি। বলল, ছাত্ররা তো আর বাসায় এসে তাদের চুলের ব্যান্ড, আন্ডারগার্মেন্টস রেখে যেতে পারে না। ছাত্রীরা পারে।
সুমির কথায় হতভম্ব হয়ে গেলেন মাহমুদ। বললেন, এটা কেমন কথা?
সুমি অবশ্য তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ঠান্ডা গলায় বলল, কেন? খারাপ কী বলেছি? চুড়ি, টিপ, রাবার ব্যান্ডের মতোই ওগুলোও তো পোশাকই। এগুলো রেখে যেতে পারলে ওগুলো কেন পারবে না? একদিন হয়তো ওগুলোও রেখে যাবে।
মাহমুদ যেন এই কথায় একটু মিইয়ে গেলেন। তিনি রাবার ব্যান্ডটা হাতে নিয়ে বললেন, এটা কার?
আমার যে নয়, তা তো আমি জানি। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল সুমি।
কাজের মেয়েটার হতে পারে।
ওটা কাজের মেয়ে না। মহিলা। তার মাথায় এসব জিনিস কখনো দেখেছ?
মাহমুদ থতমত খেয়ে গেলেন। তিনি এটা অবশ্য খেয়াল করেন নি। সুমি বলল, তোমার ছাত্ররা বোধ করি টিপ পরে না। এই যে এটা আমাদের বাথরুমের আয়নায় পেলাম। আর এই যে একগাছি চুড়িও আছে। আর কাঁচের ভাঙা কয়েকটা টুকরো খাটের তলায় পড়ে ছিল। দেয়ালের দিক দিয়ে।
মাহমুদ কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তবে তাদের সম্পর্কের শীতলতা সেই শুরু। মাহমুদ নানাভাবে চেষ্টা করেছেন বিষয়টা স্বাভাবিক করতে। কিন্তু সুমি যেন ভেতরে ভেতরে ক্রমশ গুটিয়ে যেতে থাকল। কিছু না বললেও তার আচরণে সেটি স্পষ্টই প্রতিভাত হচ্ছিল। যদিও তখনো সিরিয়াস কোনো সিদ্ধান্ত সে নেয় নি। সেই সিদ্ধান্তটা এল আরও বেশ কিছু মাস পরে।
সেদিন সুমির কলেজে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলছিল। দুই শিফটের পরীক্ষা নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে তার। ড্রাইভারকেও সেভাবেই বলে দেওয়া আছে। বিকেলের দিকে কলেজে গিয়ে ম্যাডামকে নিয়ে আসবে সে। সুযোগটা হারাতে চাইলেন না মাহমুদ। সুমি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় চলে এল রিয়া। পুরো একটা দিনের জন্য তারা নিশ্চিন্ত। ড্রাইভার না যাওয়া পর্যন্ত সুমি আসতেও পারবে না। ফলে তার অপ্রত্যাশিত আগমনের আশঙ্কাও নেই। কিন্তু ঘটনা ঘটল তেমনই।
ঠিক দুপুরবেলা বাসার কলিং বেল বাজল। হতভম্ব মাহমুদ কি-হোলে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সুমি। তিনি কী করবেন ভেবে পেলেন না। রিয়া অবশ্য ভদ্র মেয়ের মতো ড্রয়িংরুমে এসে বসল। তারপর চারপাশে বই-খাতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে ক্লাসের গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রজেক্টের কাজ করতে বসে গেল। তার ভাবখানা এমন যে জটিল, দুর্বোধ্য কোনো টপিক বুঝতে না পেরে সে স্যারের বাসায় এসেছে।
মাহমুদ দরজা খুলে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই হাসলেন। বললেন, তুমি? শরীর খারাপ নাকি?
সুমি কথা বলল না। রিয়া তার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। আগের সেই উদ্ধত, দুর্বিনীত ভাবটা আর দেখাল না সে। বরং উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিল, মালিকুম ম্যাম।
সুমি বলল, ওয়ালাইকুম সালাম।
কেমন আছেন?
হ্যাঁ, ভালো। আপনি?
রিয়া একটু অবাকই হলো। সুমি কেন তাকে আপনি করে বলছে? সম্ভবত আগেরবারের ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে সে।
রিয়া বলল, জি ভালো।
চা খাবেন? শান্ত গলায় বলল সুমি।
প্রশ্নটা শুনে মাহমুদ ও রিয়া, দুজনই ভারি অবাক হলো। সুমির কাছ থেকে এমন আচরণ তারা আশা করে নি। সেটি স্বাভাবিকও নয়।
রিয়া বিড়বিড় করে বলল, না না। আমি এখুনি চলে যাব। একটা জরুরি বিষয় বুঝতে না পেরে এসেছিলাম। কালই টপিকটার ওপর পরীক্ষা।
না না, চা বানিয়ে আনছি। খেয়ে যান।
সুমি চা বানিয়ে আনল। তারপর রিয়াকে পাশে বসিয়ে চা খাওয়াল। মাহমুদ রাজ্যের দুশ্চিন্তা নিয়ে তাদের সামনে বসে রইলেন। চা খাওয়া শেষে রিয়া বলল, আমি তাহলে আজ যাই, ম্যাম?
এখুনি যাবেন কি? বসুন, আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করি?
তারা গল্প করতে বসলেও কেউ যেন কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। যেন সকলেই বুঝতে পারছিল তাদের পরস্পরের মনের কথা। রিয়া যাওয়ার আগে সুমি তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেল। তারপর আচমকাই দরজার সঙ্গে চেপে ধরল তাকে। তারপর মাথা ঠুকে দিতে লাগল দেয়ালে। একবার, দুবার, তিনবার। মাহমুদ ছুটে এসে সুমিকে। ঠেকানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু পুরোপুরি পারলেন না। রিয়ার কপালে, মুখে থেঁতলে যাওয়ার চিহ্ন। এখানে-সেখানে রক্ত জমে গেছে। এই সুমিকে এর আগে কখনো দেখেন নি মাহমুদ। যেন সাক্ষাৎ উন্মাদিনী সে। হাতের কাছে থাকা চায়ের কাপটা হঠাৎ মাহমুদের মুখে ছুঁড়ে মারল সে। তবে কাপটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। একটুর জন্য এড়িয়ে যেতে পারলেন মাহমুদ।
সুমি সেদিনই বাসা ছেড়ে চলে গেল। মাহমুদ অবশ্য হাল ছাড়লেন না। পরদিনই শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উঠলেন তিনি। কিন্তু সুমিকে আর কিছুতেই বোঝানো সম্ভব হলো না। সে আর এলই না। মাহমুদ ভগ্নমনোরথে বাসায় ফিরে এলেন। দিন দুই থাকলেন। একা একাই। তারপর একদিন রিয়াকে ফোন করে ডাকলেন। ওই দিনের ঘটনার পর আর রিয়ার সঙ্গে কথা হয় নি তার। তা ছাড়া বিষয়টা এখন গুরুতর আকার ধারণ করেছে। ফলে এ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলাও জরুরি। রিয়া অবশ্য সেদিন এল না। এল পরদিন। তার মুখের আঘাতগুলো বীভৎসভাবে ফুটে উঠেছে। ছটফটে, উচ্ছল মেয়েটা মাত্র কয়েক দিনেই যেন শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মতো বিবর্ণ হয়ে গেছে। মাহমুদ তাকে যতটা সম্ভব বোঝালেন। রিয়া অবশ্য কথা বলল না। চুপচাপ শুনল। তারপর চলে গেল সে। এল পরদিন বিকেলে। তারপর আবার পরদিন। মাহমুদের স্টাডিরুমেই সময় কাটতে লাগল। মাহমুদ তাকে নানা কিছু বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু তাতে তার কোনো ভাবান্তর হলো না। বরং ভেতরে ভেতরে কোথায় যেন পুরোপুরি নিস্তেজ, নির্জীব হয়ে গেল সে।
আশ্চর্য বিষয় হলো, এরপর আর রিয়ার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। কোথাও না। যেন ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গেল সে।
৩৮
হৃদির কপাল কেটে রক্ত ঝরছে। থুতনির কাছেও আঘাতের চিহ্ন। নেহাল অবশ্য তাতে দমল না। সে তার কোমর বরাবর লাথি বসাল। হৃদি ছিটকে পড়ল বিছানায়। নেহাল ছুটে গিয়ে তার মাথা চেপে ধরল। তারপর হিসহিসে গলায় বলল, আর কখনো ঢুকবি ওই ঘরে? ঢুকবি আর কখনো?
হৃদি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, না।
এর আগেও বলেছিলি ঢুকবি না। তারপরও কেন ঢুকলি?
আমি বুঝি নি।
কী বুঝিস নি?
আমি বুঝি নি যে এভিলিন ওখানে আছে।
এভিলিন না থাকলেও ঢুকবি না। ফের ওখানে ঢুকলে আমি তোকে জ্যান্ত খেয়ে ফেলব। বুঝেছিস?
হৃদি মাথা নাড়ল। সে বুঝেছে। তার সামনে সোফায় যে মেয়েটা বসে আছে, তার চুল সোনালি। লম্বা নাক। গায়ের রং ধবধবে ফরসা। ঈষৎ নীল চোখ। সচরাচর এমন সুন্দর মেয়ে দেখা যায় না। মেয়েটি কথা বলে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে। তবে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না হৃদির। যদিও সে এখন আর কিছুই বুঝতে চায় না। দেখতেও চায় না কিছু। যা যা দেখার, বোঝার, তা কয়েক মাসেই বুঝে গেছে সে।
নেহাল যে মৃত এভিলিনের কথা বলেছিল, সে এখন তার সামনে বসে আছে। অপূর্ব রূপবতী এক মেয়ে। কিন্তু এই জীবনে এমন নৃশংস, বিকৃত মানসিকতার মানুষ। আর দেখে নি সে।
নেহাল এভিলিনের দিকে তাকাল, একে নিয়ে তো ভারি যন্ত্রণায় পড়া গেল। কী করব এখন?
এভিলিনের ঠোঁটে সিগারেট। সে বৃত্তাকারে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, তুমি কি বাংলাদেশে বিয়ে করতে গিয়েছিল?
নেহাল হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, এই এক কথা আর কতবার বলব? না।
তাহলে?
তাহলে আর কী! স্নেক ভেনমের প্রজেক্ট আর লংটার্ম প্ল্যানিংগুলো দেখতে।
আর?
আর…ওখানে স্নেক ভেনম থেকে ড্রাগস ও মেডিকেল রিলেটেড এক্সপেরিমেন্টগুলো ঠিক করতে।
কিন্তু ফ্রাঙ্কফুর্টে বসে এত এত বছর ধরে এত কিছু প্ল্যান করলে, অথচ কখনো আমাকে কিছু বললেও না?
নেহাল একটু থমকাল। তারপর বলল, ওই সময়টার কথা তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে?
হুম, আছে। গম্ভীর গলায় বলল এভিলিন। আই ওয়াজ আউট অব এভরিথিং। ইন আ ডিপ ডার্কনেস।
নেহাল খানিক চুপ করে রইল। তারপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, মাদক নিয়ে আমারও বিচিত্র ধরনের এক্সপেরিমেন্ট আছে। নিয়েছিও। কিন্তু এটা আমাকে যতটা আরও মাদক নিতে অ্যাডভেঞ্চারাস করেছে, তার চেয়েও বেশি করেছে ইনোভেশনে। আমি কখনোই তোমার মতো পুরোপুরি ডুবে যাই নি। নিয়ন্ত্রণহীন হই নি।
এভিলিন কথা বলল না। সে জানে, নেশার যে অতল অন্ধকারে সে ডুবে গিয়েছিল, তা থেকে এখনো পুরোপুরি বের হতে পারে নি। বরং সুদীর্ঘ চিকিৎসায় প্রায় মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেও ওই ঘোর এখনো কাটাতে পারে নি সে।
নেহাল বলল, বেশ কয়েক বছর আগে ফ্রাঙ্কফুর্ট ইউনিভার্সিটিতেই এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইন্টারেস্টিং একটা বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। তার কারণেই চট করে চিন্তাটা মাথায় আসে।
কী চিন্তা? থমথমে মুখে বলল এভিলিন।
বলছি। কিন্তু তার আগে বলো, তুমি কি তত দিনে সেই অবস্থাতে ছিলে যে আমি বিষয়টা নিয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলব?
এভিলিন কথা বলল না। বছরের পর বছর বিচিত্র সব মাদক সে গ্রহণ করেছে। সেই মাদক ধীরে ধীরে তাকে তার বাস্তব পৃথিবী থেকে উধাও করে দিয়েছিল। ডুবিয়ে দিয়েছিল ভয়াল এক নেশার জগতে। সেই নেশা থেকে আর বের হতে পারছিল না সে। তবে মাস ছয়েক হলো দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষে আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে। সে। কিন্তু এ কদিনে এভিলিনকে যতটুকু দেখেছে নেহাল, তাতে তার মনে হয়ে নি যে আসলেই কোনো লাভ হবে। বরং একটু একটু করে যেন আবারও পূর্বের জীবনে ফিরে যেতে শুরু করেছে এভিলিন।
নেহাল বলল, ফ্রাঙ্কফুর্টে তখন একদল তরুণকে মাদক গ্রহণের দায়ে আটক করেছিল পুলিশ। ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, তাদের মাদকে সাপের বিষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।
আমি নিতে পারব? উষ্ণ গলায় বলল এভিলিন। আই ওয়ান্ট টু গেট দ্যাট এক্সপেরিয়েন্স!
ওয়েট। আমাকে আগে শেষ করতে দাও। তখনই ইউনিভার্সিটিতে ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় আমার। তিনি আমাকে এ বিষয়ে আরও কিছু তথ্য দেন। ফলে বিষয়টা নিয়ে ভীষণ কৌতূহলী হয়ে উঠি আমি। পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখি আঠারো শতকের দিকে নেশা হিসেবে চীনে আফিমের ব্যবহার ভয়াবহ রকম বেড়ে যায়। কিন্তু মানুষ সেখানে এত আফিম গ্রহণ করত যে একটা সময় গিয়ে আফিমের নেশা আর তাদের ওপর কাজ করত না। তাদের নার্ভ তখন এমন একটা অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল যে আরও কড়া নেশার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময়ে চীনা রাজকর্মচারীরা ভয়ংকর এক কাজ করতে শুরু করে।
সাপের বিষের নেশা করতে শুরু করে?
হুম। আফিমের সঙ্গে সাপের বিষ ব্যবহার করে নেশা করার চেষ্টা করে তারা।
ইন্টারেস্টিং। ঠোঁট গোল করে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল এভিলিন।
ইন্টারেস্টিং হলেও ব্যাপারটা বিপজ্জনক। কারণ, কী পরিমাণ সাপের বিষ নেশায় ব্যবহার করা যাবে, এটা তারা জানত না। ফলে বেশির ভাগ মানুষই মারা যেত। কারণ, এটা খুব সেন্সিটিভ এবং বিপজ্জনক ড্রাগ। একটু এদিক-সেদিক হলেই সব শেষ। আসলে একেক সাপের বিষ একেক রকম। কিছু বিষ হেমোটক্সিক–এটা রক্তে ক্ষতিকর। প্রভাব ফেলে। কিছু মায়োটক্সিক–পেশির ক্ষতি করে। আর কিছু হচ্ছে নিউরোটক্সিক– এটা স্নায়ু বা মস্তিষ্ক আক্রান্ত করে। নেশায় মূলত এটারই ব্যবহার হয়ে থাকে। ফলে এটা আলাদা করার ব্যাপার থাকে। আবার এগুলো কিন্তু সরাসরি শরীরে নেওয়াও যায় না। অন্য কোনো মাদকের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হয়। তবে এর পরিমাণ নির্ধারণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ খুবই কঠিন। স্পর্শকাতর। আমি একটা প্রতিবেদনে দেখলাম, এক শ লিটার মদে মাত্র অল্প কয়েক গ্রাম ফ্রিজ ড্রাইড স্নেক ভেনম গুঁড়ো করে ইউজ করলেই সেটা পর্যাপ্ত পরিমাণ নেশার কাজ করে। মাত্র কয়েক গ্রাম। সো, বুঝতেই পারছ, এর বাজারমূল্য কী অস্বাভাবিক বেশি হতে পারে?
হুম। কপাল কুঁচকে বলল এভিলিন।
বাংলাদেশে তখন সাপের বিষ পাচারের প্রচুর ঘটনা পত্রপত্রিকায় আসতে শুরু করেছে। ধরাও পড়েছে কোটি কোটি টাকার বিষ। এখনো হচ্ছে। সব মিলিয়ে আইডিয়াটা মাথায় আসে আমার। এখানে যে কাজটা কঠিন, সেটা হয়তো বাংলাদেশে তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কনভেনিয়েন্টও। দেন, উই স্টার্টেড দ্য প্রজেক্ট।
কিন্তু তুমি সেদিন বলেছিলে, হৃদির বাবাকে তুমি গিনিপিগ বানাতে চাইছিলে? তার ওপর কিছু একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে চেয়েছিলে?
হুম। সেটাও একটা চিন্তা ছিল। হয়তো ছেলেমানুষি চিন্তা। বাট, আমি ওটাও ভাবছিলাম। আমি আসলে কেবল মাদক রিলেটেড ইমপ্যাক্টই না, একই সঙ্গে ওষুধে এটার প্রভাবটাও এক্সপেরিমেন্ট করতে চেয়েছিলাম। যেহেতু আমার একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড এই রিলেটেড, আর এটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছে, এমন মানুষের সঙ্গেও তত দিনে আমার পরিচয় হয়েছে…।
বলে থামল নেহাল। হৃদিকে ছুঁড়ে দিল দেয়ালের দিকে। তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে সোফায় এসে এভিলিনের মুখোমুখি বসল। বলল, ধরো, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের অন্যতম কারণ হলো থ্রম্বোসিস বা রক্ত জমাট বাঁধা। তো ফ্রাঙ্কফুর্টেরই একজন জীবরসায়নবিদ ইয়োহনেস এব্লের। উনি বলেন যে সাপের বিষেই আছে রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধের ওষুধ, যা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকের ঝুঁকি রোধে কাজ করবে। কিন্তু এই এক্সপেরিমেন্ট অত্যন্ত বিপজ্জনকও। কারণ, সাপের বিষে রয়েছে নানা ধরনের হাজার হাজার মলিকিউল বা অণু। এদের থেকে প্রয়োজনীয় মলিকিউল আলাদা করা সহজ নয়। এটা খুঁজে বের করাও দীর্ঘ গবেষণার কাজ। যেহেতু তারা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন, সো, মোটামুটি একটা বেজ রেডিই ছিল। সো, উই স্টার্টেড। আর আমার চিন্তা ছিল এমন যে–এটা হলে হবে, না হলে নাই। কারণ, সাপের বিষ উৎপাদন আর পাচার তো আমরা করবই। আর সেটা থেকে বিশাল অঙ্কের টাকাও আসবে। অর্থনৈতিকভাবে বিরাট লাভের ব্যাপার। ফলে একই সঙ্গে দুটো কাজই শুরু করি আমরা। একদিকে মাদক ও ওষুধ তৈরির এক্সপেরিমেন্ট, অন্যদিকে স্নেক ভেনম পাচার।
হুইই! বলে অদ্ভুত শব্দে উল্লাস প্রকাশ করল এভিলিন। ইউ আর অ্যাম্বিশিয়াস। অ্যাডভেঞ্চারাস অ্যাজ ওয়েল। কিন্তু…। বলে থামল সে। তারপর চোখ নাচিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলল, কিন্তু… তারপর তুমি সেখান থেকে ফিরলে বিয়ে করে বউ নিয়ে! টোটাল ব্যাপারটাই ফানি হয়ে গেল না?
হয়তো। হ্যাঁ, আমি স্বীকার করছি যে হৃদির ওপর আমার একটা দুর্বলতা ছিল। একটা ভালো লাগাও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট টাইপ। তা ছাড়া মা-বাবাও চাইতেন যে আমি বাঙালি কোনো মেয়েকেই বিয়ে করি। তো সেটাও একটা কারণ ছিল। তবে এর সঙ্গে তাৎক্ষণিক অন্য একটা চিন্তাও মাথায় আসে।
এভিলিন হাসল। মৃদু, মাপা হাসি। বলল, পৃথিবীর সব দেশের পুরুষের জাতই আসলে ওই এক। তারা প্রাণী হিসেবে মাংসাশী। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নারী মাংসই তাদের সবচেয়ে প্রিয়।
উফ! হতাশ ভঙ্গিতে বলল নেহাল। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে একটা বিয়ের প্রোগ্রামে। দেখেই পছন্দ হয়ে গেল। সেখানে ওর মায়ের সঙ্গেও কথা হয়। আর তখন একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপারও ঘটে।
কী?
কথা প্রসঙ্গেই ওর বাবার অসুখ সম্পর্কে জানতে পারি আমি। রক্তে জন্মগতভাবেই সমস্যাটা ছিল তার। জমাট বেঁধে যাচ্ছিল রক্ত। বিষয়টা কাকতালীয় হলেও সত্য যে আমি এমন কারও ওপরই স্নেক ভেনম থেকে বানানো ওষুধটার ইমপ্যাক্ট দেখতে চাইছিলাম। এটা নিয়ে যারা কাজ করছে, তাদের কারোরই হিউম্যান বডিতে এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ হয়েছিল কি না, আমি জানি না। কারণ, এই এক্সপেরিমেন্ট নিষিদ্ধ। ভয়াবহ অপরাধ। কিন্তু আমার মনে হলো, আমার একটা সুযোগ আছে। কেউ বুঝতেও পারবে না। ও রকম সহজ সুযোগ আর কোথায় পেতাম আমি?
হুম। বলে নেহালের দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকাল এভিলিন। বলল, তারপর এই বাঙালি ললনার প্রেমে পড়ে গেলে?
হুম। ঠোঁট চেপে বলল নেহাল।
তো প্রেমিকার বাবাকে কেউ গিনিপিগ বানায়?
এ ছাড়া আর কী করতে পারতাম আমি? এই সুযোগ কি আর কোথাও পেতাম? ওনার রক্তে জমাট বাধার কারণে ছোট-বড় বেশ কয়েকটা স্ট্রোকও হয়েছিল। ফলে শরীরের কিছু অংশ অসাড়ও হয়ে গিয়েছিল। সব শুনে চট করেই বুদ্ধিটা মাথায় চলে এল। কিন্তু ওনার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ তো আমার ছিল না। ছিল? আমার তো পুরো এক্সপেরিমেন্টটা চালাতে দীর্ঘ একটা সময় দরকার ছিল। তার সুবিধা, অসুবিধা, নানান কন্ডিশন বোঝ। অবজার্ভ করা। তাই না?
এ কারণেই তুমি ওকে বিয়ে করতে চাইলে?
ঠিক এ কারণেই না, ওকে আমার ভালো লেগে গিয়েছিল। সঙ্গে এটাও যুক্ত হয়। তবে পরে একটা জেদও কাজ করছিল।
জেদ! অবাক গলায় বলে এভিলিন।
হুম।
কী জেদ?
শি রিফিউজড মি।
হোয়াট! বিস্মিত কণ্ঠে বলল এভিলিন।
শি রিফিউজড ইউ?
হুম। বিষয়টা আমি নিতে পারি নি। তুমি তো আমাকে চেনেনা। খুব ইগো হার্ট হয়েছিল আমার। ফলে একটা সময় ব্যাপারটা আমার কাছে চ্যালেঞ্জও হয়ে দাঁড়ায়। তুমি জানো, চ্যালেঞ্জ নিতে আমার ভালো লাগে। আর আমি তা জিততেও চাই।
তা শেষ পর্যন্ত কী মনে হয়? জিতেছ?
এই প্রশ্নে চুপ করে গেল নেহাল। সে বাংলাদেশে যে উদ্দেশ্যে গিয়েছিল, তা এখনো সফল হয় নি। মাঝখান থেকে বরং হৃদির ব্যাপারটা তাকে বেশ খানিকটা এল পিছিয়েই দিয়েছে। তার এখন সত্যি সত্যিই মনে হচ্ছে, পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বড় দুর্বলতা আর নেই। কথাটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সে।
নেহাল ভেবেছিল মাসখানেক এখানে থেকেই হৃদিকে নিয়ে আবার দেশে ফিরে যাবে। তারপর নির্বিঘ্নে নিজের বাকি কাজগুলো শেষ করবে সে। কিন্তু আপাতত সেটি আর হচ্ছে না। আসার কিছুদিনের মধ্যেই অঘটনটা ঘটে গেল। নেহালের আই প্যাডে থাকা একটা ছবি দেখে চমকে গেল হৃদি। ঠিক এই ছবিটাই বছরখানেক আগে অনিকের ফোনে দেখেছিল সে। সেই একই ছবি নেহালের কাছে এল কী করে? এতটা অবাক আর কখনো হয় নি হৃদি। ফলে বিষয়টা জানার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠল সে।
নেহালকে কিছু না বললেও পরে গোপনে ছবিটা দেখতে গিয়ে গা শিউরে উঠল হৃদির। ছবিটা অনিকের বাবা শাখাওয়াত হোসেনের। জামশেদ নামের একজন নেহালকে মেইল করে লিখেছে, কী করব এখন? এই লোক আমাদের ট্র্যাফিকিংয়ে কিছুদিন হলো কাজ শুরু করেছে। ইমার্জেন্সি অল্টারনেটিভ হিসেবে। বাট হি ইজ বিট্রেয়িং।
জবাবে নেহাল লিখেছে, সিদ্ধান্ত আপনার। কিন্তু মনে রাখবেন, নেভার লিভ ইয়োর ট্রায়াল ইন হাইডিং। লুকাতে গিয়ে কখনো পথের চিহ্ন রাখা যাবে না।
হৃদির চোখের সামনের পৃথিবীটা মুহূর্তেই যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল তার। কাঁদলও সে। কিন্তু এই বিদেশ বিভুঁইয়ে তার সেই কান্না শুনবে কে? আর এই কথা তো সে কাউকে বলতেও পারবে না। না মা, বাবা, তিথি। কিংবা অন্য কাউকে। বাবা তো নেই-ই। আর অনিককে তো সে নিজে তার জীবন থেকে সমাধিস্থ করে রেখে এসেছে। তাহলে?
তারপরও অনিককেই ফোনটা করল সে। কিন্তু তার ফোন বন্ধ। কোনোভাবেই পাওয়া গেল না তাকে। তিথিকে ফোনে পাওয়া গেলেও নেহালকে নিয়ে এই কথা বলতে পারল না সে। মা শুনে কী করবে? তার চেয়ে যেকোনোভাবেই হোক, আগে দেশে ফিরে আসতে হবে তাকে। তত দিনে অবশ্য বাড়িতে ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটে গেছে। কিন্তু দুশ্চিন্তা করবে বলে হৃদিকে কেউ কিছু জানাল না।
সমস্যা হলো, হৃদি যে এর মধ্যেই নেহাল সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে গেছে, সেটা প্রকাশিত হয়ে গেল হঠাত্ব এবং সেই দোষটা হৃদিরই। বার্লিনের বাসায় পা দিয়েই সবকিছু কেমন অস্বাভাবিক লাগতে লাগল হৃদির। নেহাল এখানে তার বাবা-মার সঙ্গে থাকে না। আলাদা বাসা আছে তার। সেই বাসায় কিছুদিন পরই এক মেয়ে এসে উঠল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মেয়েটির নাম এভিলিন।
এই এভিলিনকে নিয়েই কি হৃদির কাছে গল্প ফেঁদেছিল নেহাল? হৃদি জানে না। তবে সে তত দিনে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেছে, এই নেহাল সেই মানুষটি নয়, যার জন্য সে সব ছেড়েছিল। এ অন্য এক মানুষ। ভয়ংকর, অননুমেয়, নিষ্ঠুর। নিজের ইচ্ছে পূরণে সে অনমনীয়, সর্বগ্রাসী। যে নেহালকে সে ভালোবেসেছিল, সে কেবল এক ভ্রমের নাম।
ভুলে হোক কিংবা ইচ্ছে করে, নেহাল নিজেই হৃদির সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিল। ভালো বন্ধু হলেও নানা কারণেই দীর্ঘদিন তাদের যোগাযোগ ছিল না। হাসপাতালেও ভর্তি থাকতে হয়েছিল এভিলিনকে। হৃদি অবশ্য কিছুই বলল না। সব জেনেবুঝেও না বোঝার ভান ধরে চুপ করে রইল সে।
এভিলিন আসতে থাকল নিয়মিতই। যেন এই ঘর, বাড়ি, বিছানা-বালিশ সবকিছুতেই তার অবাধ অধিকার। হৃদির সঙ্গে অবশ্য খুব একটা কথা বলে না সে। সারা দিন গুম হয়ে থাকে কোনার ওই ছোট্ট অন্ধকার ঘরখানায়। সেদিন নেহাল বাসায় ছিল না। সন্ধ্যার দিকে হৃদি চুপি চুপি এভিলিনের ঘরটায় ঢুকল। আর সঙ্গে সঙ্গেই বুঝল মেয়েটা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। একটা নীল মৃদু আলো জ্বলছিল ঘরে। সেই আলোতে পুরোপুরি নগ্ন হয়ে শুয়ে ছিল সে। তার পাশে নানা রকম কৌটা। তাতে ছড়ানো-ছিটানো ওষুধ। কতগুলো সিরিঞ্জ। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘর। বিকট দুর্গন্ধ। সব মিলিয়ে গা গুলিয়ে, উঠেছিল হৃদির।
নেহাল ফিরেছিল একটু রাত করেই। তবে হৃদি তাকে কিছু বলল না। তত দিনে যা বোঝার বুঝে গেছে সে। পরদিন অবশ্য জরুরি কাজের কথা বলে এভিলিনকে নিয়ে বের হলো নেহাল। ফিরল সন্ধ্যায়। কিন্তু ঘরে ঢুকে হৃদির সঙ্গে কোনো কথা বলল না। কেমন গম্ভীর, থমথমে হয়ে রইল। বিষয়টা খুব অস্বস্তি দিতে লাগল হৃদিকে। কোনো ঝামেলা হয় নি তো?
পরিস্থিতি বোঝার জন্যই কথাটা জিজ্ঞেস করল সে, কী হয়েছে?
নেহাল হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। প্রথম বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল না সে। ফিরেও তাকাল না। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল, ইউ চিটেড অন মি।
হোয়াট? অবাক গলায় বলল হৃদি। কী করেছি আমি?
তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছ।
মিথ্যে? হৃদির বুক কেঁপে উঠল।
ইউ চিট…!
মানে কী, নেহাল? নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল হৃদি।
মানে…। বলে থামল নেহাল। তারপর শীতল কণ্ঠে বলল, তোমার দুবছরের বেশি আগে বিয়ে হয়েছিল। কোর্ট ম্যারেজ। হাউ ইউ হাইড ইট ফ্রম মি?
হৃদি হঠাৎ থমকে গেল। এই আশঙ্কাটাই করছিল সে। কিন্তু খবরটা এত দ্রুত নেহালের কাছে পৌঁছাল কী করে? দেশের থানা-পুলিশের ঘটনা তখনো জানে না সে।
নেহাল বলল, আমার তো মানুষ চিনতে সহজে ভুল হয় না। তাহলে তোমাকে চিনতে ভুল হলো কীভাবে?
হৃদি চুপ করে রইল।
নেহাল বলল, আমার নিজেকে বোকা বোকা লাগছে, হৃদি। কারও কাছে বোকা হতে আমার একদম ভালো লাগে না। একদম ভালো লাগে না।
হৃদি বুঝতে পারছিল না সে কী বলবে। তবে এত বড় ঘটনার পরও নেহালের এমন শান্ত, স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া তাকে অবাক করছিল।
কিন্তু নেহাল হঠাৎ পাগলের মতো মাথা নাড়াতে লাগল। আর বলতে লাগল, কেউ আমাকে বোকা বানাতে পারে না। কেউ না। কেউ না। আই অ্যাম নট আ ফুল। ননা ওয়ান মেড মি…। নো ওয়ান।
হঠাই যেন উন্মাদনা ভর করতে লাগল তার ওপর। সে থক করে এক দলা থুতু ফেলল। তারপর বলল, এত নোংরা, জঘন্য একটা মানুষ তুই। নিজেকে ঘেন্না লাগে না তোর? বমি পায় না?
কথাটা খুব গায়ে লাগল হৃদির। নিজের সম্পর্কে এমন কথা কেউ বলতে পারে, এটা কখনো ভাবে নি সে। নেহাল এক পা এগিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর সাপের মতো হিসহিসে গলায় বলল, ইউ বিচ। স্লট। ইউ ব্লাডি হোর।
কী বললে তুমি আমাকে! কী বললে? হৃদি যেন হঠাৎ নিজের স্থান, কাল, পরিস্থিতি ভুলে গেল। এত জঘন্য কথা কেউ আর কখনো বলে নি তাকে। সে-ও এগিয়ে এল নেহালের দিকে।
নেহাল খপ করে তার চুলের মুঠি ধরে ফেলল। তারপর বলল, ইউ ব্লাডি হোর। ইউ আর আ প্রস…! তোকে আমি রাস্তার কুত্তা…। বাকিটুকু শেষ করতে পারল না নেহাল। তার আগেই উন্মাদের মতো নিজেকে ছাড়িয়ে ছুটে এল হৃদি। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। এলোপাতাড়ি হাত-পা চালাতে লাগাল। নেহাল ধাক্কা দিয়ে তাকে বিছানায় ফেলে দিল। বলল, তোর মতো মেয়ে, স্রেফ টাকার জন্য নিজের হাজব্যান্ডকে ডিভোর্স দিয়ে…।
হৃদি এবার ফুঁসে উঠল। বলল, আর একটা বাজে কথা আমাকে নিয়ে বলবে না তুমি। একটাও না।
নেহাল হাসল। ঠান্ডা ক্রুর হাসি। কেন? বললে কী করবি? বেশ্যাকে বেশ্যা বলা। যাবে না? তুই তো একটা রাস্তার মাগি। মাগিকে মাগি বলা যাবে না?
হৃদি এক ঝটকায় উঠে বসল। তারপর বলল, তুই কত সাধু, তা-ও আমি জানি। সব জানি আমি…সব। আই নো এভরিথিং। আই নো হু একচুয়ালি ইউ আর! নিজেকে আর সামলাতে পারল না সে। কিন্তু তার ওই একমুহূর্তের ক্রোধ, রাগ আর নিয়ন্ত্রণহীনতাই তাকে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করাল। গত কয়েক মাসে সে
নেহাল সম্পর্কে যা যা জেনেছে, তা একের পর এক বলে যেতে লাগল। যা জানে নি, তা-ও অনুমানে বলতে লাগল। হতভম্ব, ক্রুদ্ধ নেহাল যেন হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। তারপর আচমকা লাথি বসাল হৃদির কোমর বরাবর। হৃদি ছিটকে পড়ল মেঝেতে। নেহাল তার মাথা চেপে ধরে বলল, ইউ নো এভরিথিং। এভরিথিং অ্যাবাউট মি? বলে বীভৎস ভঙ্গিতে হাসল সে। তারপর বলল, ইউ নো নাথিং অ্যাবাউট মি। নাথিং। আই উইল লেট ইউ নো মেনি মোর থিংস। মেনি মোর থিংস। কাম অন…।
শুরু হলো হৃদির জীবনের ভয়াবহ এক অধ্যায়। এই অধ্যায়ের যবনিকা কিসে, হৃদি তা জানে না। হয়তো জানে না নেহালও।
৩৯
আবছার আহমেদ অবন্তীকে থানায় ডেকেছেন। অবন্তী বলল, আমার সঙ্গে রিয়ার শেষ কথা হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। আপনার সঙ্গে কথা বলার আগে।
কী কথা হয়েছিল?
ওই চিঠির বিষয়েই।
তাকে দেখে কী মনে হয়েছিল, স্বাভাবিক, নাকি কিছু নিয়ে ভীত ছিলেন তিনি?
না। তেমন কিছু না। তবে…।
তবে কী?
ও যেন একটু কেমন হয়ে যাচ্ছিল। আগের সেই ছটফটে ভাবটা আর ছিল না।
আপনাকে মঈন সম্পর্কে কিছু বলেছিল সে?
না।
মঈন যে তার বাসায় গিয়েছিল, এটা সে বলেছিল?
মঈন ভাই রিয়ার বাসায় গিয়েছিলেন? কী বলছেন আপনি? কেন? অবাক গলায় বলল অবন্তী।
হুম। বলে থামলেন আবছার আহমেদ। তারপর বললেন, মঈনের সঙ্গে কোনো একটা ঝামেলা হয়েছিল তার।
কী ঝামেলা?
সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে মঈন তাকে দীর্ঘদিন থেকেই অনুসরণ করত এবং একদিন সে সরাসরি রিয়াদের বাসার গেটে গিয়ে হাজির হয়। সেখানে তীব্র কথা কাটাকাটি হয় তাদের। মঈন একপর্যায়ে রিয়াকে আঘাত করে বসেছিল।
এসব কী বলছেন আপনি?
হুম। রিয়ার মুখে কিছু আঘাতের চিহ্নও ছিল এবং এর কয়েক দিন পরই হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় রিয়া।
অবন্তীর মাথা ঝিমঝিম করছে। কান বেয়ে যেন উঠে আসছে উষ্ণ হাওয়া। সে দিশেহারা গলায় বলল, মঈন ভাই এখন কই?
তাকে আজ ভোররাতেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
অবন্তী আর বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেল না। সে বুঝতে পারছে না তার আশপাশে এসব কী হচ্ছে। আবছার আহমেদ বললেন, সে এখনো তেমন কিছুই স্বীকার করে নি রিয়ার ওপর নজর রাখার ওই ঘটনা ছাড়া। তবে আমরা আশা করছি, শীঘ্রই সে আমাদের সব বলবে।
আপনাদের ধারণা মঈন ভাই রিয়ার কোনো ক্ষতি করেছে?
সেটা এখুনি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কি আছে?
কিন্তু মঈন ভাই কেন এটা করবে?
সে বারবার একটি কথাই বলছে যে আপনার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করতে পেরে রিয়ার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে সে। তার সঙ্গে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে চায়, যাতে মঈনের হয়ে রিয়া আপনাকে বোঝায়। কিন্তু রিয়া তাকে সেই সুযোগটাই দেয় নি। এমনকি কোনো কথাই বলতে চায় নি সে!
কিন্তু এই জন্য মঈন ভাই রিয়াদের বাসায় গিয়ে তাকে…।
সে বলছে ওটা ইচ্ছাকৃত ছিল না। মুহূর্তের উত্তেজনায় হয়ে গেছে। কারণ, রিয়া তার সঙ্গে প্রতিবারই খুব বাজে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সে তারপরও কিছুতেই নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারছিল না। তার ধারণা ছিল, রিয়া যদি একবার তার সব কথা মন দিয়ে শোনে, তাহলে রিয়া কোনো না কোনোভাবে আপনাকে বোঝাতেই পারবে। এই কারণেই অত কিছুর পরও রিয়ার পেছনে লেগে ছিল সে। কিন্তু রিয়া ওই দিন। এতটাই বাজে ব্যবহার করেছিল যে আর নিজেকে সামলাতে পারে নি সে।
আপনাদের কী মনে হচ্ছে?
হতে পারে মঈনের কথাই সত্যি। কিন্তু…।
কিন্তু কী?
মুহূর্তের উত্তেজনায় যদি সে কোনো মেয়েকে আঘাত করতে পারে, তবে সেই মুহূর্তের উত্তেজনায় অন্য কিছুও ঘটিয়ে ফেলা অসম্ভব কিছু না।
অন্য কিছু কী? শঙ্কিত কণ্ঠে বলল অবন্তী।
খুন!
খুন? আর্তনাদ করে উঠল অবন্তী।
না মানে আমি আশঙ্কার কথা বলছি। এমন তো হতেই পারে, তাই না? আমাদের কাছে যত খুনের কেস আসে, তার সবই যে খুনি ইচ্ছে করেই করেছে, তা কিন্তু নয়। অনেক খুনই কিন্তু আছে যে ঘটনাচক্রে হয়ে গেছে। মঈনের ক্ষেত্রেও এমন হতে পারে। কিংবা না-ও হতে পারে। অন্য কিছুও হতে পারে।
অন্য কী হতে পারে? অবন্তী ফ্যাকাশে গলায় বলল।
একটা মেয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ কী কী হতে পারে? খুন, গুম, রেপ-এই তো?
অবন্তী আর কিছু বলতে পারল না। তার মাথা কাজ করছে না। চারপাশের পৃথিবীটা যেন বনবন করে ঘুরছে। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না মঈন এমন কিছু করতে পারে। কিন্তু সে যে দীর্ঘদিন ধরেই রিয়াকে অনুসরণ করছিল, তা তো মিথ্যে নয়! রিয়াকে আঘাত করেছিল, তা-ও না। তাহলে?
কিন্তু এসব কেন করতে গেল সে? এই প্রশ্নে এসেই থমকে গেল অবন্তী। তার হঠাৎই নিজেকে ভীষণ অপরাধী লাগতে লাগল। মনে হতে লাগল, এসবের জন্য। আসলে সে নিজেই দায়ী। তার কারণে আজ সবকিছু এ রকম হয়ে গেছে। এমনকি মঈনও। কেবল তার সঙ্গে কথা বলার জন্য, তার হঠাৎ এমন বদলে যাওয়ার কারণটা জানার জন্যই মঈন এমন বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল। সে যদি কারণটা মঈনকে খুলে বলত, তাহলে আর এই সব কিছু হতো না। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হতে লাগল অবন্তীর। কিন্তু মঈন কি সেই সত্যিটা নিতে পারত? অসহ্য যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েও যে ভয়াল সত্যিটা সে নিজের ভেতর পুষে রেখেছে? প্রতিমুহূর্তে ছাইচাপা আগুনে পুড়ে গেছে। পারত মঈন সেই সত্যিটা মেনে নিতে?
অবন্তী ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আর কোনো কিছুই গুছিয়ে চিন্তা করতে পারছে না। রিয়ার জন্য তার দুশ্চিন্তা হচ্ছে। দুশ্চিন্তা হচ্ছে মঈনের জন্যও। অথচ এই দুজন মানুষই এখন পরস্পরের জন্য ভয়াল এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে এখন কী করবে?
অবন্তী উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, কিন্তু একটা কথা।
কী কথা? বললেন আবছার আহমেদ।
সেদিন রাতে তাহলে কে আমাকে গুলি করেছিল? মঈন?
আবছার আহমেদ এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না।
অবন্তী বলল, যেই মানুষটা আমার সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য, যোগাযোগ করার জন্য, আমাকে একটু বোঝানোর জন্য এত কিছু করেছে, সেই মানুষটাই আবার আমাকে খুন করার জন্য রাতের অন্ধকারে গুলি করবে, এটা আপনার বিশ্বাস হয়?
আবছার আহমেদ কথা বললেন না। এটা তারও বিশ্বাস হয় না। তিনি বললেন, আপনি তো আবার বাসা থেকে হলে উঠে গেছেন?
জি। কিছুদিন হলো। আসলে আমার পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।
কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?
না।
আচ্ছা। বলে চুপ করে রইলেন আবছার আহমেদ। তারপর হঠাই প্রশ্ন করলেন, আপনি কি আর ওই চিঠিগুলো পাচ্ছেন?
অবন্তী আচমকা থমকে গেল। বলল, না।
আবছার আহমেদ কথা বললেন না। তবে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
৪০. রাশু চুপচাপ বসে আছে
রাশু চুপচাপ বসে আছে। তার সামনে বসে আছে মতিন মিয়া। দূরে অনিক দাঁড়ানো। মতিন মিয়া বলল, খুব সাবধান, রাশু। একচুলও যেন কিছু এদিক-সেদিক না হয়।
রাশু কথা বলল না। সে হাতের আঙুলে উদ্দেশ্যহীন নকশা আঁকছে মাটিতে। মতিন মিয়া বলল, যা হইছে হইছে। তুমি নিজে যে এখনো ঠিকঠাক আছ, এইটার জন্য আল্লাহর কাছে শোকর করো।
রাশু চোখ তুলে তাকাল। তারপর বলল, একটা জায়নামাজ নিয়াসেন।
জায়নামাজ নিয়াসবো কেন? এখন কি নামাজের সময়?
তাইলে কিসের সময়?
তোমার সাবধান হওনের সময়।
আমি তো সাবধানই।
কিন্তু তোমারে দেখে তো তা মনে হয় না।
আমারে দেখে তাইলে কী মনে হয়?
মনে হয় তোমার ভেতরে আগুন, বাইরে পানি।
পানির নিচে আগুন থাকতে পারে?
পারে। শুনছি সমুদ্রের নিচেও নাকি আগ্নেয়গিরি আছে। সেই আগ্নেয়গিরিতে আগুনও জ্বলে।
তাতে পানির কী ক্ষতি হয়!
পানির না হলেও মাছের হয়।
আমার মধ্যে তো মাছ নাই যে ক্ষতি হবে।
আমরা নিজেরাই এইখানে মাছ। জামশেদ স্যাররা হইছেন পানি। তোমার ওই আগুনে তাদের কোনো ক্ষতি হইব না। ক্ষতি হইব আমাদের নিজেদেরই। লাল চানের ঘটনায় বোঝো নাই?
বুঝছি।
কী বুঝছ?
বুঝছি যে সব মাছের ক্ষতি হয় না। কিছু মাছ আগুনে পোড়া মাছ খাইতেও পায়।
এই কথায় মতিন চুপ করে গেল। তারা বসে আছে ডোবাটার পাশে। মাছগুলো এখন শান্ত, চুপচাপ। কিছুদিন আগেই যে এখানে একটা আস্ত মানুষকে তারা ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে, তা বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই। বিষয়টা ভাবলেই মতিন মিয়ার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। রাশু বলল, ওই ভাইরে ডাকেন।
কোন ভাইরে?
ওই যে নতুন আসছে। মাছের পুস্কুনির টংঘরে থাকে।
মতিন পেছন ফিরে তাকাল। অনিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে পুকুরপাড়ে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এই জগৎ সংসারের কোথাও নেই। একটা ঘোর তাকে আচ্ছন্ন। করে রেখেছে। রাশু বলল, সে কি এইখানে মাছ চাষ করতে আসছে?
এইখানে মাছ বলতে তো আলাদা কিছু নাই। সবই সাপ চাষ।
ডাকেন তারে।
অনিক এসে দাঁড়াল। ন্যুজ, শঙ্কিত। রাশু বলল, অনিক ভাই, কেমন আছেন?
জি, ভালো।
সব ঠিকঠাক তো?
অনিক জবাব দিল না। রাশু বলল, আপনের এইখানে কাজটা কী?
এখনো বুঝতে পারছি না।
জামশেদ স্যারে কিছু বলে নাই?
না।
কেন?
সেই প্রথম দিন রাতের পর তো আর দেখা হয় নাই তার সঙ্গে। এইখানে আর আসেনও নাই উনি।
ওই দিনও কথা হয় নাই?
না। সেই পরিস্থিতিই তো ছিল না।
হুম। তা-ও কথা। জায়গা কেমন লাগতেছে?
অনিক এই প্রশ্নের জবাব দিল না। রাশু বলল, আপনের সমস্যাটা কী, বলেন তো?
কী সমস্যা?
আপনি এই সবের মধ্যে আসলেন কেন?
অনিক চুপ করে রইল। রাশু উঠে দাঁড়াল। বলল, চলেন, আশপাশ থেকে একটু হাঁইটা আসি।
তারা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল। কিছু দূর যেতেই পাতলা হয়ে এল জঙ্গল। তারপর আবার খোলা মাঠ। সেই খোলা মাঠ ধরে দীর্ঘ সময় হাঁটল তারা। মাঠের পরে নদী। নদীর ধারে ঘেসো জমি দেখে বসল রাশু। বলল, আপনে তো শিক্ষিত মানুষ। আপনেরে একটা প্রশ্ন করি?
কী প্রশ্ন?
মানুষের এত দুঃখ কেন?
অনিক জবাব দিল না। রাশু বলল, আমার মায়ে ছিল বেশ্যা। আমার জন্মও বেশ্যাপাড়ায়। মাদারীপুর শহরে বড় এক পাড়া আছিল। পরে পুলিশ সেইটা ভাইঙ্গা দিছে। সেইখানে আমার জন্ম। আমি বড়ও হইছি সেইখানে। তারপর আমার মায়ে কই জানি চইলা গেল। আমার তো বাপের ঠিক নাই। এই জন্য আমার যাওয়ারও কোনো জায়গা রইল না। আমি তখন মায়রে খুঁজতে কই গেলাম, জানেন?
কই?
দৌলতদিয়া। লোকে কইল, তুই ওইখানে খোঁজ। ওইখানে একটা পতিতালয় আছে।
পেয়েছিলেন?
না।
অন্য কোথাও খোঁজেন নাই?
অন্য কই খুঁজব?
আর যে পতিতালয়গুলা আছে, ওই সব জায়গায়?
এই প্রশ্নে রাশু চুপ করে গেল। বেশ কিছুটা সময়। তারপর বলল, বিষয়টা কেমন না?
কী?
আমি জানি আমার মায়ে কোথায় আছে। আপনেও জানেন।
আমি তো জানি না। অনুমান করে বললাম।
রাশু হাসল, ওইটাই। ধরেন কেউ যদি কারও মায়ের খোঁজ না পায়, হারাই ফেলে, তাইলে সে তারে তার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজে। মামাবাড়ি, খালাবাড়ি। নানিবা ড়ি, চাচিবাড়ি খোঁজে। এইগুলাই তার যাওয়ার জায়গা। খুঁজে পাওয়ার ঠিকানা। আর আমি খুঁজি পতিতালয়ে।
অনিক কথা বলল না।
রাশু বলল, কারণ, ওইটাই আমার মায়ের ঠিকানা। তার আর কোনো ঠিকানা নাই। বলে চুপ করে থাকে রাশু। তারপর আচমকা একটা ঢিল ছুঁড়ে মারে নদীতে। বলে, এইটা নিয়া তো আমার দুঃখ হওনের কথা না। কারণ, আমিও তো ওই একই ঠিকানার মানুষ। আমারও তো কোনো ঠিকানা নাই। তারপরও আমার দুঃখ হয় কেন, কন তো?
অনিক এই প্রশ্নের কী জবাব দেবে?
রাশু বলল, আপনার কোনো দুঃখ নাই, অনিক ভাই?
অনিক কথা বলল না। সে নদীর জলে ভেসে থাকা রোদের বিচ্ছুরণ দেখতে লাগল। রাশু বলল, আপনার দুঃখের কথা কন। শুনি।
অনিক মৃদু হাসল। বলল, আমার দুঃখের কথা বলতে ভালো লাগে না।
তাইলে সুখের কথা বলেন।
সুখের কথা হলো আমি মানুষকে সহসা ঘৃণা করতে পারি না। রাশু হাসল, এইটা কোনো কথা হইল?
কেন, কথা হবে না কেন?
ঘৃণা করতে না পারলে বাঁইচা থিকা লাভ কী? ধরেন কেউ আপনের কোনো ক্ষতি করল, ঠকাইল। তারে আপনে ঘৃণা করবেন না?
ঘৃণা করলে কী হয়? পাল্টা প্রশ্ন করল অনিক।
মনে শান্তি আসে। প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা হয়।
আর ক্ষমা করে দিলে?
সব অপরাধ কি ক্ষমা করন যায়? এই যে জামশেদ স্যার লাল চান চাচারে খুন করল। এখন আমি তারে ক্ষমা কইরা দিব? তারপর শান্তিতে থাকব?
তাহলে কী করবেন?
রাশু এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। সে আবারও ঢিল ফেলল জলে। অনিক বলল, খুন ক্ষমা করার মতো অপরাধ না। কিন্তু…।
কিন্তু কী?
খুনের প্রতিশোধ আপনি কী করে নেবেন?
রাশু জবাব দিল না। অনিক বলল, খুন ছাড়া তো অন্য কোনোভাবে খুনের প্রতিশোধ নিয়ে আপনি শান্তি পাবেন না। তার মানে আপনাকেও একটা খুন করতে হবে, তাই না?
রাশু আচমকা উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, খুন আমি তারে করব না।
তাহলে? ক্ষমা করে দেবেন?
রাশু বাঁকা ঠোঁটে হাসল। জবাব দিল না। সেই রাতেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। অনিক প্রথমবারের মতো খামারের বাইরে বের হতে পারল। গ্রামের দিকটাতে রাতের বেলায় হুট করে ঠান্ডা নেমে আসে। সেই কারণেই হোক কিংবা অন্ধকারে নিজেদের আরও আড়াল করতেই হোক, কালো দুখানা চাদরে নিজেদের আবৃত করে নিয়েছে মতিন আর অনিক। অন্ধকারে একটা বড় কাভার্ড ভ্যান সামান্য সময়ের জন্য চট করে থামল বড় রাস্তার ধারে। সেখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল তারা। গাড়ি দেখামাত্রই মতিন মিয়া বলল, তাড়াতাড়ি ওঠেন, অনিক ভাই। তাড়াতাড়ি।
এই গাড়িতে?
হুম।
এই গাড়িতে উঠব কী করে? এটা তো গার্মেন্টসের মালামাল বহনের গাড়ি। সামনে লেখা জরুরি রপ্তানি কাজে নিয়োজিত?
ওইটা নিয়া আপনের ভাবতে হইব না। আপনে আমার পেছন পেছন ওঠেন। ড্রাইভারের পাশে দুই সিট আছে। আমি উঠতেছি।
অনিক মতিন মিয়ার পেছন পেছন গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করল। তবে পুরোপুরি পারল না। তার আগেই ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। ফলে বাইরের হাতল ধরে বেশ। কিছুক্ষণ চলন্ত গাড়িতে ঝুলে থাকতে হলো তাকে। পাহাড়ের মতো উঁচু ভিমসাই গাড়ি। এবড়োখেবড়ো রাস্তায় বার কয়েক প্রায় ছিটকে যাওয়ার উপক্রম হলো তার। তবে শেষ পর্যন্ত পড়ল না সে। বরং মতিন মিয়ার সহায়তায় উঠে বসল। সম্ভবত কোনো সমস্যা হয়েছে কোথাও। ড্রাইভার তীব্র গতিতে গাড়ি ছোটানোর চেষ্টা করছে। তার পুরো মনোযোগ রাস্তায়। আশপাশে কোনো দিকে তাকাচ্ছে না সে। অনিক অবশ্য বসে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে নিল। তারপর তাকাল ড্রাইভারের দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই জায়গায় জমে গেল সে।
ড্রাইভারের আসনে এ কে বসে আছে?
৪১
রোখসানা বেগম বললেন, হৃদি ফোন ধরছে না কেন, বাবা?
ঘুমাচ্ছে মা। বলল নেহাল।
কিন্তু ও গতকালও ফোন ধরে নি। তার আগের দিনও না।
ওর শরীরটা একটু খারাপ, মা।
কেন, কী হয়েছে?
তেমন কিছু না,। এখানে হঠাৎ অনেক ঠান্ডা পড়েছে। প্রচণ্ড স্নো পড়তে শুরু করেছে। এই জন্য একটু জ্বর জ্বর।
ওহ্। সাবধানে থেকো, বাবা। মায়ের মন তো! সন্তান দূরে থাকলে সারাক্ষণ হাঁস ফাঁস লাগে। টেনশন হয়। মনে হয় কী জানি কী হলো!
আপনি একদম চিন্তা করবেন না। ও ভালো আছে। সুস্থ আছে।
আচ্ছা। বলে ফোন রাখলেন রোখসানা বেগম। তার হঠাৎ করেই হৃদির জন্য খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। পরপর কয়েক রাত ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। এদিকে হৃদিও ফোন ধরছে না। এই নিয়ে খুব অস্থির লাগছে। বিষয়টা তিথির কাছেও ভালো লাগছে না। হঠাৎ সেদিন ফোন করে অনিককে কেন চেয়েছিল হৃদি? এত কিছুর পরও অনিকের সঙ্গে কথা বলতে চাওয়াটা মোটেই স্বাভাবিক কিছু নয়। তাহলে?
কথাটা সে বার কয়েক দিকে জিজ্ঞেসও করেছিল। কিন্তু উত্তর দেয় নি সে। এদিকে অনিকও হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছে। কদিন পরপরই অবন্তীকে থানায় ডেকে নিচ্ছে পুলিশ। চারপাশে কী যেন কী হচ্ছে। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারছে না।
রোখসানা বেগম বললেন, আমার মন কেমন করছে।
কেন?
বুঝতে পারছি না। হৃদির জন্য খুব অস্থির লাগছে।
এত অস্থির হয়ো না তো, মা। জামাইর সঙ্গে বিদেশে গেছে। হানিমুন। এই সময়ে তুমি যদি সারাক্ষণ ফোন করে বিরক্ত করো, কার ভালো লাগবে?
তাও কথা। কিন্তু তারপরও নিজেকে বোঝাতে পারেন না রোখসানা বেগম। তিনি দিন দুই বাদে আবার ফোন করলেন হৃদিকে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এবারও ফোন ধরল না সে।
নেহাল ধরল। বলল, মা?
হ্যাঁ, বাবা। কেমন আছ?
এই তো মা। ভালো-মন্দ মিলিয়ে।
হৃদি কোথায়?
ও একটু বাজার করতে বেরিয়েছে। আমার ঠান্ডা লেগেছে।
ওহ! কিন্তু ওকে ফোন করলে পাওয়াই যায় না।
সারাক্ষণ যে কী সব করে, কে জানে! আচ্ছা, বাজার থেকে এলে আমি ফোন করতে বলছি।
একটু বোলো, বাবা। আর নিজের দিকে খেয়াল রেখো।
আচ্ছা মা।
হৃদি ফোন করল পরদিন সন্ধ্যায়। তবে প্রথমে কথা বলল নেহাল। বলল, মা, আমাদের বাসায় একটা পার্টি আছে তো আজ। এই জন্য গত কয়েক দিন বাজারটাজার করতেই কেটে গেছে। হৃদিই সব করেছে। ওর আবার এসবে খুব আগ্রহ।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। সে খুব চটপটে। ইউনিভার্সিটিতে তো ডিপার্টমেন্টের বেশির ভাগ আয়োজন সে-ই করত। রোখসানা বেগম যেন একটু ভালো বোধ করতে লাগলেন।
জি মা। এখানেই তাই। আমাকে তো কিছু করতেই দিচ্ছে না।
ওকে একটু দাও। কথা বলি।
দিচ্ছি মা। কিন্তু কথা ঠিকমতো বুঝতে পারবেন কি না, জানি না। বাসায় প্রচুর হইচই, গান-বাজনা হচ্ছে। এখনো পার্টি চলছে। বলেই হৃদিকে ফোনটা দিল নেহাল। রোখসানা বেগম বার কয়েক হ্যালো হ্যালো করলেও ঠিকঠাক হৃদির কথা শুনতে পেলেন না। ফোনের অপর প্রান্তে উচ্চ স্বরে গান বাজছে। তা ছাড়া হৃদির কণ্ঠও কেমন অনুচ্চ। ম্রিয়মাণ।
রোখসানা বেগম বললেন, কী হলো, আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস না?
বলো মা।
তুই ফোন ধরিস না কেন?
ধরলাম তো!
এ কদিন ধরিস নি কেন?
ঘুমিয়ে ছিলাম।
সারাক্ষণই কি ঘুমিয়ে ছিলি? কবে থেকে ফোন দিচ্ছি তোকে?
জানি না, মা। খেয়াল নেই।
খেয়াল নেই মানে কী? বিদেশে গিয়ে মা-বোনকে পর্যন্ত ভুলে গেলি?
ভুলে যাই নি, মা।
তাহলে?
আমি তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব। এখানে অনেক শব্দ। আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না। বলে ফোন রেখে দিল হৃদি। কিন্তু রোখসানা বেগমের হঠাৎ মনে হলো, হৃদি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। কিছু একটা হয়েছে তার। কিন্তু সেই কিছু একটা পরিষ্কার ধরতে পারলেন না তিনি।
তিথি বলল, আপুর সঙ্গে কী কথা হলো, মা?
এই তো। কেমন আছে, কী করছে।
এত দিন ফোন ধরে নি কেন?
বলল তো খেয়াল করে নি।
এত দিনে একবারও খেয়াল করে নি?
তা-ই তো বলল। রোখসানা বেগম বুঝতে পারছেন না তিনি কী বলবেন। নিজ থেকে কাউকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চান না তিনি।
তিথি বলল, তুমি কি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছ, মা?
কী লুকাব?
আপুর কি কিছু হয়েছে?
এই প্রশ্নে রোখসানা বেগম চুপ করে রইলেন। তিথি বলল, তোমাকে একটা কথা বলা হয় নি, মা।
কী কথা?
আপু না মাঝখানে কয়েক দিন আমাকে খুব ফোন দিত?
হুম।
তখন সে কী করত, জানো?
কী?
সারাক্ষণই কেবল অনিক ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলতে চাইত!
কী বলছিস তুই? ওই ছেলের সঙ্গে কেন কথা বলতে চাইবে?
তা তো জানি না। আমাকে খুলে কিছু বলে নি। জিজ্ঞেস করলেই বলত, তোকে যেটা বলছি, সেটা কর।
কথা বলেছিল?
না। অনিক ভাইয়াকে আমি বলেছিলাম। উনি কিছু বলেন নি। আবার কথাও বলতে চান নি। চুপ করে ছিলেন।
ছেলেটা কই এখন?
তা তো জানি না। অনেক দিন কোনো খোঁজ নেই। সে তার ফোনও আর ব্যবহার করে না।
রোখসানা বেগম আর কথা বললেন না। তবে তার বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা চিনচিনে তীক্ষ্ণ ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। তিথি মায়ের কাছে এসে বসল। বলল, আপুর কি খারাপ কিছু হয়েছে, মা?
খারাপ কিছু হলে তো সে বলতই। তেমন কিছু না মনে হয়। তবে কেমন একটা ঘুম ঘুম ভাব ওর গলায়। আর চারপাশে অনেক উচ্চ শব্দে গান বাজছিল। নেহাল বলছিল, বাসায় পার্টি চলছে।
ওহ্! তাহলে তো মজাই। আপুর তো এসব খুব পছন্দ।
হুম। সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বললেন রোখসানা বেগম। তারপর খানিক চুপ থেকে বললেন, আমার কেন জানি ভয় হচ্ছে।
কিসের ভয়?
ওকে তো চিনিস। নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যা মন চায়, তা-ই করে বেড়াবে। ওখানে গিয়ে আবার মদটদ খাওয়া শুরু করে নি তো?
তিথি হাসল, তা একটু-আধটু তো খাবেই। ওসব দেশে সবাই খায়।
একটু-আধটু না। ওর কথা বলার ভঙ্গি শুনে আমার ভালো লাগে নি। মনে হচ্ছিল ও অনেক দূর থেকে টেনে টেনে কথা বলছে। কে জানে, ওই সব পার্টিফার্টিতে কী চলে? তা ছাড়া ও নাকি সারাক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে।
ধুর। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করো। এখন ও বড় হয়েছে, এত ভেবো না। আর ভাবলেও দেশে এলে ভেবো। তখন ইচ্ছেমতো বকাঝকা করতে পারবে।
কথাটা বললেও তিথি নিজেও মনে মনে শঙ্কিতই হয়ে রইল। তারও কেন যেন মনে হচ্ছে, কোথাও না কোথাও একটা ঝামেলা হচ্ছে।
তাদের সেই শঙ্কা যেন কিছুটা হলেও সত্যি হলো দিন দুই বাদে। নেহাল হঠাৎ ফোন করে বলল, মা, একটা খারাপ খবর আছে।
কী খারাপ খবর, বাবা? আঁতকে ওঠা গলায় বললেন রোখসানা বেগম।
হৃদির ছোটখাটো একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।
কী বলছ, বাবা? কী অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে ওর? কেমন আছে ও? নেহাল, আমার মেয়ে কেমন আছে? কী হয়েছে ওর? আতঙ্কিত কণ্ঠে হড়বড় করে বলতে লাগলেন। রোখসানা বেগম। কাঁদছেন তিনি।
নেহাল অবশ্য তাকে আশ্বস্ত করল। বলল, মা, আপনি ঘাবড়াবেন না। তেমন কিছু না। বাংলাদেশে যেমন বৃষ্টি, এখানে তেমন স্নো। এর আগে তো কখনো স্নো পড়তে দেখে নি ও। প্রথমবার দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারে নি। খুব ছোটাছুটি করছিল। বাচ্চাদের মতো। তারপর হঠাৎ পা পিছলে পড়ে একটু আঘাত পেয়েছে।
ওহ্! যেন বুকে আটকে রাখা দমটা ছাড়লেন রোখসানা বেগম। বললেন, বেশি কিছু না তো?
না মা। এই ঘাড়ে-মাথায় সামান্য আঘাত পেয়েছে। তারপরও সাবধানতাবশত আমি সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।
কেমন আছে এখন? কথা বলা যাবে?
অবশ্যই যাবে, মা। তবে ও তো এখন ঘুমাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠলেই আপনার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিচ্ছি।
আচ্ছা বাবা। বিড়বিড় করে বললেন রোখসানা বেগম। তবে তাকে খুব একটা আশ্বস্ত মনে হলো না। হৃদির সঙ্গে তার কথা হলো বিকেলের দিকে। হৃদি বলল, মা, কেমন আছ?
এই তো ভালো। তুই?
আমিও ভালো।
তোর শরীর এখন কেমন?
ভালো।
কী হয়েছিল তোর?
বুঝতে পারছি না। মাথাটা ঝিমঝিম লাগছে।
তুই নাকি বরফে পা পিছলে ব্যথা পেয়েছিস।
মনে হয়। বলে চুপ করে রইল হৃদি। বেশ কিছুক্ষণ। তারপর বলল, নেহাল বলেছে?
হুম।
তাহলে ঠিক আছে। ও হা হা, মনে পড়েছে। আমি বরফের মধ্যে হঠাৎ পড়ে গিয়েছিলাম। এখনো নতুন তো। কীভাবে শোর মধ্যে হাঁটতে হয় জানি না। মা?
হ্যাঁ।
আমার না মাথা কাজ করছে না, মা। ঘুম পাচ্ছে। আমি তোমার সঙ্গে পরে কথা
বলি?
তুই ঠিক আছিস, মা?
আছি।
তুই আমাকে সত্যি করে বল, ওখানে তোর কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?
না মা। আমার খালি ঘুম পায়। আমি ঘুমাই, মা?
বলেই ফোন রেখে দিল হৃদি। নেহাল ফোন নিয়ে বলল, মা, ওর কথায় আপনি কিছু মনে করেন না। ব্যথা কমাতে ওকে প্যাথেড্রিন দেওয়া হয়েছে। এই জন্য কথাবার্তা
একটু এমন। ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।
রোখসানা বেগম কিছু বললেন না। তিনি দীর্ঘ সময় ফোন কানে চেপে ধরে বসে রইলেন। তিথি বলল, কী হয়েছে, মা?
হৃদির কিছু হয়েছে, তিথি।
কী হয়েছে?
তা জানি না। তবে হৃদি ওখানে ভালো নেই।
কী বলছ তুমি? কোনো ঝামেলা হয়েছে? নেহাল ভাইয়া কিছু বলেছে?
না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি। নেহালের সঙ্গে হৃদির কিছু হয়েছে। কিন্তু হৃদি সেটা আমাকে বলার মতো অবস্থায় নেই।
মানে কী?
ওর গলা শুনে মনে হচ্ছে ও ঘুমের মধ্যে কথা বলছে। আগের চেয়েও অবস্থা খারাপ। যেন কেউ কিছু শিখিয়ে দিচ্ছে, আর ও সেটা ঘুম ঘুম গলায় বলে যাচ্ছে। ভয়ও পাচ্ছে।
কে শিখিয়ে দেবে? কাকে ভয় পাবে ও?
নেহালকে।
নেহাল ভাইয়াকে?
নেহাল ভাইয়াকে কেন ও ভয় পাবে?
তা তো জানি না। এমন কি হতে পারে যে নেহাল কোনোভাবে হৃদির বিয়ের কথাটা জেনে গেছে?
তাহলে সেটা সবার আগে তোমাকেই বলত, তাই না?
রোখসানা বেগম কথা বলল না। তিথি বলল, তুমি ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করো?
এখন না। আগে ও দেশে ফিরুক। ও দেশে ফেরার আগে কিছু করা যাবে না। যেভাবেই হোক, আগে হৃদিকে দেশে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। নেহালকে কিছু বলা। যাবে না তার আগে। তুইও বলিস না। একদম স্বাভাবিক। রোখসানা বেগমের গলা কাঁপছে। চোখ ছলছল করছে।
মা! তিথি গাঢ় গলায় ডাকল। তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন?
কারণ, আমার মন কু ডাক ডাকছে।
কী কু ডাক?
হৃদির খারাপ কিছু হয়েছে। খুব খারাপ কিছু এবং সেটা করেছে নেহাল। আমার ধারণা, হৃদিকে কোনো ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। হাই ডোজের ওষুধ অথবা নেশাজাতীয় কিছু।
কী বলছ তুমি?
রোখসানা বেগম কথা বললেন না।
তবে দিন দশেক পর একদিন হঠাৎ হৃদি ফোন করল। ফোন ধরল তিথি। সে বলল, আপু?
হৃদি অবশ্য তার কথা শুনল কি না বোঝা গেল না। সে হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। তিথি বলল, তোর কী হয়েছে, আপু? তুই কাঁদছিস কেন?
হৃদি ভয়ার্ত গলায় বলল, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, মা। আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। মা, ও মা। মা গো।
তিথি কী বলবে ভেবে পেল না। হৃদি কান্নাজড়ানো গলায় বলল, আমাকে একবার অনিকের সঙ্গে দেখা করিয়ে দাও। খালি একবার। আমি মরে যাওয়ার আগে এক সেকেন্ডের জন্য হলেও তার সঙ্গে দেখা করতে চাই। ও মা, মা। সে ঝরঝর করে কাঁদছে। কান্নায় তার গলা বুজে আসছে।
তিথি বলল, তোর কী হয়েছে, আপু? আমাকে বল? কী হয়েছে তোর?
আমার কিছু হয় নি। আমাকে একবার অনিকের সঙ্গে দেখা করিয়ে দাও। ও মা? মা? আমাকে একবার অনিকের সঙ্গে দেখা করিয়ে দাও। দেবে মা? একবার? দেবে?
তিথি ডাকল, আপু, আপু!
হৃদি তিথির কথা শুনল কি না বোঝা গেল না। সে হাউমাউ করে বলতে লাগল, আমি অনিকের কাছে যাব, অনিকের কাছে যাব আমি। আমি ওর পায়ের কাছে গিয়ে বসে থাকব। মা, আমি অনিকের পায়ের কাছে গিয়ে কুকুরের মতো বসে থাকব, ও মা…
৪২
জামশেদ বললেন, মালের কোনো খোঁজ মিলল, রাশু?
জি না, স্যার।
লাল চান কিন্তু বলছিল যে সে মাল তোর কাছে দিয়েছিল?
মিথ্যা কথা বলছে।
মিথ্যা কথা বলছে? অবাক গলায় বললেন জামশেদ। লাল চান তোরে নিয়া মিথ্যা কথা বলছে?
আমারে নিয়া তার মিথ্যা কথা বলতে সমস্যা কী? জানের ভয়ে মানুষ নিজের পোলাপানরে নিয়া পর্যন্ত মিথ্যা কথা বলে। আর আমি তো সেইখানে তার কিছুই না।
কিন্তু সে তো তোরে খুব ভালোবাসত।
হহ। টাকাপয়সা কামাই করতে পারলে দুনিয়ার সবাই সবাইরে ভালো পায়। আপনে আমারে যত টাকা দিছেন এখন পর্যন্ত, সেই টাকা কই? একটা টাকাও আছে। আমার কাছে? নাই।
কই গেছে তাহলে?
সব সে নিয়া গেছে?
সব?
জে। শুধু তা-ই না, সে আমারে ভয় দেখাইয়াই রাজি করাইছিল যে আমি যাতে আপনের কাছে মিথ্যা কথা বলি যে মাল আমি হারাইছি। তাতে সে-ও বাঁচল, আমিও বাঁচলাম।
তুই বাঁচলি কেমনে? তখন তো আমি তোকে ধরতাম?
তার ধারণা আপনে আমারে খুব পছন্দ করেন, এই জন্য আমারে কিছু বলবেন না। বড়জোর চড়-থাপ্পড় মারতে পারতেন। কিন্তু খুন তো করবেন না।
হুম। বলে গম্ভীর হয়ে গেলেন জামশেদ। বললেন, আমার সঙ্গে চালাকি করবি। চালাকি আমার পছন্দ না। মাল যে-ই হারাক, তুই মাল খুঁইজা বাইর কর। আমার ধারণা, তুই জানস, মাল কই আছে? সে তোরে না জানাই কিছু করে নাই।
আমি কী করে জানব?
রাশু! ঠান্ডা কণ্ঠে বললেন জামশেদ। তোরে আমার দরকার। তোর জাত আলাদা। অনেক সাপের মধ্যে যেমন জাতসাপ চেনা যায়, তুইও তেমন। কিন্তু আমি চাই, তুই আমাকে ভয় পা। সাপ যেমন সাপুড়েরে ভয় পায়, তেমন।
রাশু কথা বলল না। জামশেদ বললেন, আমার ধারণা ছিল অন্তত লাল চানের অবস্থা দেখে তুই ভয় পাবি। কিন্তু সেই লক্ষণ তোর মধ্যে নাই। বিষয়টা স্যাড। বাট, মনে রাখিস, দিস ইজ ইয়োর লাস্ট চান্স। আমি পেছনে চিহ্ন রেখে সামনে এগোই না।
রাশু নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। সামনে দাঁড়ানো লোকটার কথা ঠিক নয়। সে এই পৃথিবীতে এত ভয় কখনো কাউকে পায় নি। জামশেদ এগিয়ে এসে রাশুর কোমরে হাত রাখলেন। তারপর বললেন, সব ঠিক আছে তো?
হুম।
যেখানে-সেখানে অযথা শক্তি ক্ষয় করবি না। জিনিস খুঁজে বের কর।
রাশুর শিরদাঁড়া হঠাৎ টানটান হয়ে গেল। তার মনে হলো, জামশেদ যেকোনো সময় তার কোমরে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রটার ট্রিগার টেনে দেবেন।
.
অনিক থমথমে মুখে বসে আছে পুকুরপাড়ে। রাশু বলল, কী হইছে, ভাই?
কিছু না।
বলেন আমারে। আপনেরে আমার পছন্দ। যেকোনো কথা আপনি আমারে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন।
আমি একটা খুন করতে চাই।
খুন! অবাক গলায় বলল রাশু। আপনে?
হুম।
কারে?
সেটা শুনে আপনার কাজ নাই।
তাহলে আমার কাজ কী?
হেল্প করবেন।
খুনের সহযোগী? চোখ টিপে হাসল রাশু। কী হেল্প?
আপনার কাছে একটা পিস্তল আছে। পিস্তলটা আপনি আমাকে দেবেন।
রাশু তার কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে অনিককে দিল। বলল, নেন। চালাইতে জানেন? আমি বহুদিন ধইরা সঙ্গে রাখি, কিন্তু চালাইতে জানি না।
অনিক কথা বলল না। রাশু বলল, আপনে না ক্ষমা পার্টি? আপনে হঠাৎ খুন পার্টি হইলেন কেমনে?
অনিক জবাব দিল না। রাশু বলল, খুন কিন্তু আমরা সবাই করি। কিন্তু সেইগুলা সব দেখি না। দেখি শুধু শইলের খুন। কথা ঠিক কি না?
অনিক চোখ তুলে রাশুর দিকে তাকাল। ছেলেটার প্রতি তার একধরনের সমীহ রয়েছে। কিন্তু সেই সমীহের কারণ সে জানে না। তবে তার মাঝে মাঝেই মনে হয়, এই ছেলের ভেতরে কিছু একটা আছে। কিন্তু সে ভুল সময়ে ভুল জায়গায় জন্মেছে। আর এখন সে এসে পড়েছে আরও এক ভুল জায়গায়।
রাশু বলল, ধরেন, আমরা কারও বিশ্বাস ভাঙলাম, এইটাও তো খুনই। খুন না? বা ধরেন, কথা দিয়া কথা রাখলাম না? ঠকাইলাম কাউরে। এইগুলা সবই কিন্তু খুন। কিন্তু দোষ হয় খালি গুলি কইরা মানুষ খুন করলে। এই এক খুনেরই খালি শাস্তি আছে, বাকিগুলার কোনো শাস্তি নাই। এইটা কোনো কথা, বলেন? ওইগুলায় দোষ হয় না?
কথাটা অনিকের কানে আলপিনের মতো বিঁধে রইল। রাশুর কথা সত্য। আর সব খুন মানুষ দেখে না। তার শাস্তিও হয়তো নেই। কেবল এই এক খুনেরই শাস্তি আছে। অথচ সেই সকল খুনও কম ভয়ানক কিছু নয়। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়েও লুকায়। পলাতক এই জীবনে আর কত লুকাবে সে?
সেদিন রাতে কাভার্ড ভ্যানে উঠেও নিজেকে লুকাতে হয়েছিল তাকে। গাড়িতে তার পাশে বসেছিল মতিন মিয়া। মতিন মিয়ার পাশে ড্রাইভার। অনিক সেই ড্রাইভারকে দেখে চমকে গিয়েছিল। এই জীবনে এত অবাক আর হয় নি সে! ড্রাইভারের সিটে বসে গাড়ি চালাচ্ছে ছাত্তার চাচা! তার দৃষ্টি সামনের অন্ধকার রাস্তায়। গভীর মনোযোগে গাড়ি চালাচ্ছেন তিনি। চট করে মুখ ঘুরিয়ে পাশের জানালায় তাকিয়ে ছিল অনিক। তারপর নিজের মুখ ঢেকে ফেলেছিল চাদরে। তারা এসে নেমেছিল ঘণ্টাখানেক পর। জায়গাটা গাজীপুরের দিকে। সেখানে রাস্তার পাশে অন্ধকারে তাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল ছাত্তার চাচা। অনিকের হঠাৎ মনে হলো, সে তার বাবার হঠাৎ অত টাকাপ্রাপ্তি এবং মৃত্যুর কারণ বুঝে গেছে। ভাগ্য কী আশ্চর্য উপায়েই না তার সামনে সেই রহস্য উন্মুক্ত করল। কিন্তু এই ভাগ্য তার জন্য আর কী কী রেখেছে?
জামশেদের সঙ্গে তার দেখা হলো শেষরাতের দিকে। তারা মুখোমুখি বসে ছিল একটা পুরোনো গাড়ির গ্যারেজে। সেখানে মৃদু হলুদ আলো। সেই আলোতে জামশেদ হঠাৎ বললেন, তোমাকে কি আগে কোথাও দেখেছি আমি? মানে…। বলতে গিয়েও হঠাৎ থমকে গেলেন তিনি। থমকে গেল অনিকও। তারও মনে হলো, এই লোকটাকে সে এর আগেও কোথাও দেখেছিল। কিন্তু কোথায়?
জামশেদ অবশ্য বেশিক্ষণ বসলেন না। কিছু জরুরি কথাবার্তা বলে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই উঠে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে ক্যাপটা ঠিকঠাক মাথায় পরে নিলেন তিনি। অনিকের আচমকা মনে হলো, বাবার লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে গভীর রাতে ফেরিতে এই লোকটির সঙ্গেই তার দেখা হয়েছিল!
সম্ভবত বাবার বিষয়ে আরও নিশ্চিত হতে চাইছিলেন জামশেদ। বাবার সঙ্গে অন্য কেউও জড়িত কি না। কিংবা আর কোনো তথ্য নিশ্চিত হতেই সেই রাতে ফেরি পর্যন্ত গিয়েছিলেন তিনি!
৪৩
রিয়ার বিষয়ে পুলিশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মঈনকে তিন দফায় রিমান্ডে নিয়েও তেমন কোনো তথ্য পায় নি পুলিশ। বিষয়টা আবছার আহমেদকে ভারি অবাক করেছে। একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে এই পরিমাণ জিজ্ঞাসাবাদের পরও তথ্য না দিয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মঈন নতুন তেমন কিছুই বলে নি। সে অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে যে অবন্তীর কারণেই রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছিল সে এবং তারপর ঘটনাচক্রেই তাদের মধ্যে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। কিন্তু এর বেশি কিছু আর সে জানে না। এই নিয়ে একদিন অবন্তীরও মুখোমুখি করা হলো তাকে।
মঈনের সারা শরীরে কলশিটে দাগ। চোখের কোলে কালি জমে গেছে। মাত্র কদিনেই কণ্ঠার হাড় পর্যন্ত উঁকি দিচ্ছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না সে। তাকে। দেখে হতভম্ব হয়ে গেল অবন্তী। এ কাকে দেখছে সে? মঈন অবশ্য কিছু বলল না। সে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইল। অবন্তী কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। এত দিশেহারা আর কখনো লাগে নি তার! এত অসহায়, শূন্য, ব্যথাভার। মঈন তাকাল। ফ্যাকাশে, ক্লান্ত চোখ। অবন্তী সেই চোখে চোখ রাখতে পারল না। সে হঠাৎ তার মাথার ওপর ঘুরতে থাকা পুরোনো সিলিং ফ্যানটা দেখতে থাকল। কিংবা কে জানে, হয়তো লুকাতে চাইল নিজের চোখ।
মঈন হঠাৎ বিড়বিড় করে বলল, আমি কিছু করি নি। আমি সত্যি কিছু করি নি। ওরা শুধু শুধু আমাকে মারল।
অবন্তীর মনে হলো তার বুক ফেটে যাচ্ছে। চোখের ভেতর অজস্র ঘুণপোকা একনাগাড়ে জেগে উঠেছে। মঈন বলল, আমি সত্যিই কিছু করি নি। আমি শুধু তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাইছিলাম। আর কিছু না। ওরা আমায় শুধু শুধু মেরেছে। এই দেখো?
সে তার পেটের কাছের জামাটা তুলে ধরার চেষ্টা করল। হাতা গুটিয়ে কনুই বের করার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। তার হাত কাঁপছে। বুক হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আঙুলগুলো বীভৎসভাবে ফুলে আছে। প্রচণ্ড ব্যথায় কুঁচকে গেছে মুখ। মঈন বলল, আমি আর কখনো তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইব না। বিশ্বাস করো। আর কোনো দিন না। তুমি একটু ওদের বলবে যে আমি কিছু করি নি? মঈনের গলা কাঁপছে। চোখ টলমল করছে। প্রচণ্ড আতঙ্কে বিবর্ণ হয়ে আছে সে। কিন্তু কী করবে অবন্তী?
মঈন বলল, তুমিও আমার কথা বিশ্বাস করো না, তাই না?
আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, মঈন। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। কম্পিত কণ্ঠে দ্বিরুক্তি করল অবন্তী, আমি জানি তুমি কিছু করো নি। আমি তোমার কথা কাউকে কিছু বলিও নি…। অবন্তী হঠাৎ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। মঈনকে অবচেতনেই তুমি করে বলতে শুরু করেছে সে। মঈন অবশ্য কথা বলল না। সে আবারও মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
অবন্তী দিশেহারা ভঙ্গিতে বলল, আমি এখন কী করব? আমি কী করলে ওরা তোমাকে ছেড়ে দেবে? তুমি বলো, প্লিজ। আমাকে বলে দাও…আমি তা-ই করব। প্লিজ, আমাকে বলে দাও তুমি।
মঈন এবারও কথা বলল না। অবন্তী হঠাৎ মঈনের কাছে ছুটে এল। তাদের দুজনের মাঝখানে একটা টেবিল। সে সেই টেবিল ডিঙিয়ে মঈনের কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর দুহাতে আলতো করে তার মাথা চেপে ধরল। বলল, আমাকে বললা…। বলো আমাকে।
মঈন মুখ তুলে অবন্তীর চোখের দিকে তাকাল। তার সেই চোখ গড়িয়ে টুপটাপ। অশ্রু ঝরে পড়ছে। আর সেই অশ্রুতে ভিজে যাচ্ছে মঈন। তার চোখ, ঠোঁট, গাল। অবন্তী ফিসফিস করে বলল, ওরা তোমাকে এত মেরেছে! আমি কী করব, আমাকে একটু বলে দাও?
মঈন বিড়বিড় করে বলল, আমি রিয়ার কিছু করি নি। আমি শুধু ওর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। আর কিছু করি নি আমি।
কেন তুমি ওর সঙ্গে কথা বলতে গেলে?
আর যাব না। আর কোনো দিন যাব না।
তুমি আমার সঙ্গে কেন কথা বলতে গেলে না? কেন তুমি ওর সঙ্গে কথা বলতে গেলে? তুমি আমার সঙ্গেই কথা বলতে যেতে…। আমি না চাইলেও যেতে। প্রতিদিন যেতে…তুমি কেন ওর সঙ্গে…। অবন্তী কাঁদছে। কান্নায় তার কথা জড়িয়ে আসছে।
আর যাব না। আমি তোমার সঙ্গেও আর কখনো কথা বলতে যাব না।
মঈন! বলে আচমকা তার পায়ের কাছে বসে পড়ল অবন্তী। তারপর দুহাতে জড়িয়ে ধরল তাকে। বলল, আমি কী করব, বলো? আমি কী করলে ওরা তোমাকে ছেড়ে দেবে? আমি তা-ই করব। তুমি যা বলবে তা-ই করব আমি। শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়ল অবন্তী।
মঈন উত্তর দিল না। তবে এই মুহূর্তে ঘরে ঢুকলেন আবছার আহমেদ। বললেন, অবন্তী, এখানে এমন করবেন না। এমনিতেই এভাবে আসামির সঙ্গে দেখা করার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও আমি চেয়েছি যে আপনি যদি কোনো তথ্য বের করতে পারেন। সে কারণেই এভাবে দেখা করতে দেওয়া।
ও রিয়ার কোনো ক্ষতি করে নি। আমি আপনাকে লিখে দিতে পারব। আমি ওকে চিনি। বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল অবন্তী। আপনি বিশ্বাস করুন, ও ও রকম মানুষ না। একটা মানুষ এই পরিমাণ টর্চারের পরও তার মুখ বন্ধ রাখতে পারে?
আবছার আহমেদ হাসলেন, এটা তো তেমন কিছুই না। এর চেয়ে ভয়ানক জিজ্ঞাসাবাদেও অপরাধীরা টু শব্দটা পর্যন্ত করে না।
কিন্তু ও পেশাদার কোনো অপরাধী না। আমি বলছি ও অপরাধী না। ও সেই রাতে আমাকে গুলিও করে নি। এমনকি রিয়ারও কোনো ক্ষতি ও করে নি। আপনি চাইলে আমি লিখে দিতে পারি। আমাকে কী করতে হবে, বলুন?
আপনি বললেই তো আর হবে না, অবন্তী। আইনের কিছু নিয়মকানুন আছে। আমাদের কিছু বোঝাপড়া আছে। বিষয়টা সেই অ্যাঙ্গেলেই এগোবে।
তাই বলে একটা মানুষকে বিনা অপরাধে…।
বিচারে প্রমাণিত হওয়ার আগেই আপনি তাকে নির্দোষ বলে দিতে পারেন না!
আপনিও কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাকে এভাবে…। অবন্তী নিজেকে সামলাতে পারল না। দুহাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল সে। মঈন ফ্যালফ্যালে চোখে তাকিয়ে আছে।
আবছার আহমেদ বললেন, তার আত্মীয়স্বজন এসেছেন। তারা তার পক্ষে লইয়ারও ঠিক করেছেন। সো, তিনি দোষী না নির্দোষ, তা কোর্টে ঠিক হতে হবে। তাই না?
কিন্তু আপনিই বলুন, ও ঠিক কী কারণে রিয়ার কোনো ক্ষতি করবে? একটা কারণ বলুন?
আবছার আহমেদ হঠাৎ বিরক্ত হলেন। বললেন, ক্ষতি করার পক্ষে চাইলে একশটা কারণ আমরা খুঁজে বের করতে পারি। না করার পক্ষে যেমন কারণ আছে, করার পক্ষেও আছে। কিন্তু সে আসলেই করেছে কি না, সেটা প্রমাণ করবে আদালত।
অবন্তী আর কথা বলল না। সে চুপচাপ টেবিলে মাথা দিয়ে বসে রইল। আবছার আহমেদ বললেন, আপনার সময় শেষ।
.
রিয়ার বিষয়ে তার ডিপার্টমেন্টেও খোঁজখবর নেওয়া হলো। জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও। সেই জিজ্ঞাসাবাদে অবধারিতভাবেই উঠে এল মাহমুদ হাসানের নাম। এমনিতেই বিষয়টি নিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভয়াবহ ভেঙে পড়েছেন। কারও সঙ্গে কথা বলেন না। ঠিকমতো ক্লাসেও আসেন না। এর মধ্যে পুলিশ যখন তার সঙ্গে কথা বলতে এল, তখন তিনি শারীরিক-মানসিকভাবে ভয়ানক বিপর্যস্ত।
আবছার আহমেদ বললেন, স্যার, কিছু মনে করবেন না, আমরা যতটুকু খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছি, তাতে অনেকেই বলেছেন যে আপনার সঙ্গে রিয়ার বেশ একটা বোঝাপাড়া ছিল।
মাহমুদ হাসান কথা বললেন না। তিনি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তার চোখ লাল। মুখ ফ্যাকাশে। আবছার আহমেদ বললেন, আমাদের তো একটু সহায়তা করতে হবে, স্যার। বুঝতে পারছি বিষয়টা নিয়ে আপনি খুব আপসেট! আপনার খুব প্রিয় ছাত্রী ছিল সে। এ কারণেই আপনার দায়িত্বটা আরও বেশি।
মাহমুদ এবারও কথা বললেন না। একটা প্যাডে আনমনে বাঁ হাতে কাটাকুটি করছেন তিনি। এতটা বিষণ্ণ আর কখনো লাগে নি তাকে। যেন তার জগৎসংসার সব শূন্য হয়ে গেছে। তিনি স্লান চোখে আবছার আহমেদের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, আমি রিয়ার কথা কিছু বলতে পারছি না। আমি কোনো কথাই গুছিয়ে আনতে পারছি না। সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে আমার।
স্যার! বলে তার হাতখানা আলতো ছুঁয়ে দিলেন আবছার আহমেদ। তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন, বিপদে যদি আমরা ভেঙে পড়ি, তাহলে স্টুডেন্টরা কী করবে, স্যার?
তিনি কথা বললেন না। প্যাডের ওপর এলোমেলো দাগ কাটতেই থাকলেন। অর্থহীন এটা-সেটা লিখে যেতে থাকলেন। যেন এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে কোথাও লুকানোর পথ খুঁজছেন। বিরাম চাইছেন খানিক। কিন্তু কিছুতেই পারছেন না। রিয়ার সঙ্গে তার অসংখ্য স্মৃতি। অসংখ্য অনুভব, স্পর্শ। সেসব থেকে নিজেকে কী করে লুকাবেন তিনি? কী করে আড়াল করবেন তার বুকে বয়ে চলা এই অথই জলের কান্না? উথালপাতাল ঝড়? এই কথা কাউকে বলতেও পারবেন না তিনি। কাউকে না।
মাহমুদ হাতের কলমটা খানিক রাখলেন। তারপর নিজেকে যতটা সম্ভব সামলে নিয়ে বললেন, রিয়া মাঝেমধ্যেই আমার বাসায় যেত। ওর কিউরিসিটি একটু বেশি ছিল। বলতে শুরু করলেন মাহমুদ।
জি।
আর আমি সব সময়ই স্টুডেন্টদের জন্য ওপেন। যার যেকোনো সমস্যা, আমাকে অকপটে বলা যেত। বলেও তারা। রাতদুপুরে ফোন করেও নানাজন নানান সমস্যার কথা বলে আমাকে।
জি স্যার। অনেকেই সেটা বলেছে আমাদের। আপনি তাদের সবার কাছেই অসম্ভব প্রিয়।
শুধু যে ক্লাসের বিষয় নিয়ে কথা হয়, তা-ও না। ক্লাসের বাইরের নানা বিষয়েও তারা আমার সঙ্গে কথা বলে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, প্রেম, ক্যারিয়ার–সবকিছু নিয়ে। তবে এর মধ্যেও রিয়া একটু আলাদা ছিল। অন্য রকম।
কীভাবে?
ও খুব ছটফটে আর ডানপিটে ছিল। ভীষণ বেপরোয়া। কারও কোনো কথাই শুনতে চাইত না সে। তবে আমাকে অসম্ভব পছন্দ করত। রেসপেক্ট করত। ফলে এমনও হয়েছে যে ওর বাবা-মা আমাকে ফোন করে বলেছেন ওকে বোঝাতে। ও যখন ইচ্ছে করেই ফাস্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে আবারও ফাস্ট ইয়ারেই রয়ে গেল, তখনো।
জি। আপনার সঙ্গে ওর শেষ কবে দেখা হয়েছিল?
মাহমুদ বললেন, ও আমার বাসায় এসেছিল সেদিন সকালের দিকে। তারিখটা এক্সাক্ট মনে নেই। আমি বাসায় একা ছিলাম। আমার স্ত্রী তার বাবার বাড়ি। এদিকে বাসায় ইন্টেরিয়রের কাজ শুরু হবে। সবকিছু এলোমেলো। ফলে, আমি সময় দিতে পারি নি। কিন্তু ওকে খুব আপসেট মনে হচ্ছিল। বলছিল, কিছু একটা বলতে চায় সে আমাকে। আমি বললাম, পরে ডিপার্টমেন্টে এলে আমি কথা বলব।
এটুকুই?
হুম।
এরপর একদিন ফোন করেছিলাম। কিন্তু বন্ধ পেলাম। ওদিকে বাসা নিয়ে ব্যস্ততায় আমার মোটামুটি পাগল হওয়ার দশা। কাঠমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি থেকে শুরু করে রাজমিস্ত্রি, ডিজাইনার। এগুলো চলল প্রায় দিন পনেরো। রাত-দিন একাকার অবস্থা। ফলে পরে আর আমার ফোন করা হয় নি।
তারপর আর যোগাযোগ হয় নি?
নাহ্। আর ফোন করে নি সে। বিভাগেও আসে নি।
হুম। বলে গম্ভীর হয়ে গেলেন আবছার আহমেদ। বললেন, থ্যাংক ইউ স্যার। প্রয়োজন হলে আমি আবার আপনার সঙ্গে কথা বলতে আসব।
মাহমুদ কথা বললেন না। চশমার ফাঁকে জল ভরে ওঠা চোখ জোড়াকেও আড়াল করতে পারলেন না তিনি।
৪৪
হৃদি শুয়ে আছে একটা খোলা মাঠে। মাঠভর্তি সবুজ ঘাস। তবে সেই ঘাসের বুকে রংবেরঙের বুনো ফুল। ফুলগুলো আকারে তেমন বড় নয়। হৃদির কপালে যে টিপ, সেই টিপের চেয়ে সামান্য কিছু বড়। মৃদু হাওয়ায় ফুলগুলো তিরতির করে কাঁপছে। যত দূর চোখ যায়, কেবল ওই ফুল ফুটে আছে। দেখে মনে হচ্ছে রঙের মেলা বসেছে দিগন্তজুড়ে। মাথার ওপর ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ। সেই আকাশের এখানে-সেখানে তুষারশুভ্র মেঘ। তার ফাঁকে সূর্যের বিচ্ছুরিত আভা। কোথাও থেকে অদ্ভুত মোহময় সুরে গান ভেসে আছে, দেয়ার ইজ সামওয়ান ফর মি সাহোয়ার, অ্যান্ড আই স্টিল মিস সামওয়ান।
সে-ও কি কাউকে মিস করছে? হৃদি উঠে বসল। তার চারপাশে সে ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু এখানে কার সঙ্গে এসেছে সে? ওই যে নদী, নদীর ধারে গাঙচিলদের মেলা। নাম-না-জানা ফুল। চিরলবিরল পাতা। তুলোর মতো নাও। নাওয়ের ওপর বইঠা হাতে কে?
কে ওখানে? হৃদি আচমকা উঠে দাঁড়ায়। তারপর ছুটতে থাকে রুদ্ধশ্বাসে। লম্বা গাছ পেরোলেই ছোট্ট কখান ঘর। ঘরের পাশে উঠোন। উঠোনজুড়ে নানান রঙের পাখি। তার ওপাশে নদী। নদীর ঘাটে নৌকা ভেড়ায় কে?
সে সবুজ ঘাসের শেষে দাঁড়ায়। জলের ভেতর ছায়ার মতো মানুষ। ভাসে, ডোবে। ডোবে, ভাসে। কে ওখানে? অনিক? বুকের ভেতর হঠাৎ কেঁপে ওঠে। অচেনা এক ঝড়, তুমুল হাওয়ায় দানব হয়ে আসে। ছলকে ওঠে জল। ভিজিয়ে দেয় মন। অনিক?
হুম।
তুমি এখানে?
হুম?
কী করে এলে?
তোমায় খুঁজতে খুঁজতে।
কিন্তু পথ চিনলে কী করে?
তা তো জানি না।
না জানলে আসা যায়?
আমি তো এলাম।
কীভাবে?
মন জানে।
কী জানে মন?
অচেনা পথেও কী করে পথ চিনতে হয়।
ভুল হয় না?
হয়।
তাহলে? এই পথ যদি ভুল হয়?
ভালোবাসায় ভুল পথ বলে কিছু নেই, হৃদি।
কিন্তু কেউ যদি তোমায় ঠকায়?
তাতে কী? আমি তো ঠকাই নি! ঠকেছ তো? অন্যজন তো তোমায় ঠকিয়েছে?
উঁহু।
তাহলে?
মানুষ কখনো অন্যকে ঠকাতে পারে না, জানো তো?
কেন?
কারণ, অন্যকে ঠকাতে গিয়ে সে আসলে নিজেকেই ঠকায়।
তুমি তাহলে ঠকো নি?
নাহ্। যার তোমাকে ভালোবাসতে ভালো লাগে, তুমি যেমনই হও না কেন, তারপরও যে তোমাকে ভালোবাসতে পারে, তাকে তুমি ঠকাবে কী করে! তাকে কখনোই ঠকানো যায় না। বরং তাকে ঠকানোর চেষ্টা করা মানে তো নিজেকেই ঠকানো, তাই না?
হৃদি কথা বলল না। অনিক বলল, পৃথিবীতে সত্যিকারের ভালোবাসার বড় অভাব, জানো তো?
হুম।
এই যে জগজুড়ে এত এত মানুষ ভালোবাসে, তার কতটুকু নির্ভেজাল? নিঃশর্ত, নিঃস্বার্থ? তুমি জানো?
হৃদি জবাব দেয় না।
অনিক বলে, খুব সামান্যই। পৃথিবীতে ওই নির্ভেজাল ভালোবাসার খুব অভাব। বলে থামে সে। তারপর বলে, কেউ যদি অমন ভালোবাসা পেয়েও তা দূরে ঠেলে দেয়, তাহলে সে আসলে কাকে ঠকাল?
নিজেকেই।
হ্যাঁ। যে ভালোবাসে সে কখনো ঠকে না, হৃদি। ঠকে সে, যে লোভ করে সেই ভালোবাসা পায়ে দলে চলে যায়।
হৃদি কথা বলে না। অনিকও না। কোথাও থেকে এসে একটা ঘুমঘুম হাওয়া বয়ে যেতে থাকে। একটা পাখি টুপ করে মাছ তুলে নিয়ে যায় নদীর জল থেকে। আর ঠিক তখুনি মেয়েটাকে দেখতে পায় হৃদি। অবিকল তার মতোই দেখতে, কিন্তু সে নয়। নৌকার কাছে এসে দাঁড়ায় সে। অনিক তাকে হাত ধরে তোলে। তারপর পাল তুলে দেয় হাওয়ায়। তারপর হৃদির দিকে তাকিয়ে হাসে। বলে, ভালো থেকো, হৃদি। ওই যে, নেহাল আসছে। সে তোমাকে ডাকছে।
হৃদি ফিরে তাকায়। নেহাল মাঠ পেরিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। নেহালের হাতে রংবেরঙের অনেকগুলো কৌটা। কৌটাভর্তি ওষুধ। তার সঙ্গে এভিলিন। এভিলিনের হাতভর্তি সিরিঞ্জ। তারা এগিয়ে আসতে থেকে। হৃদি হঠাৎ চিৎকার করে অনিককে ডাকতে থাকে, অনিক, অনিক। কাঁদছে সে। কিন্তু অনিক ততক্ষণে অনেক দূর চলে গেছে। জলের বুকে দিগন্তরেখায় ক্রমশ বিন্দুতে পরিণত হচ্ছে সে। হৃদি অকস্মাৎ ছুটতে শুরু করল। সে এই জল পেরিয়ে নদীর ওপারে পৌঁছে যেতে চায়। দূরে চলে যেতে চায় নেহাল আর এভিলিনের কাছ থেকে। কিন্তু অতটা দূর সে যাবে কী করে?
ততক্ষণে আকাশ অন্ধকার হয়ে আসতে থাকে। নিভে যেতে থাকে দিনের আলো। কিন্তু লাল, নীল, হলুদ আলোর রশ্মি নেমে আসতে থাকে আকাশ থেকে। সেই আলোয় হৃদির দৃষ্টিবিভ্রম হতে থাকে। সে আর সামনে এগোতে পারে না। তার হঠাই মনে হয়, সতার ভুলে গেছে সে। ডুবে যাচ্ছে অতল জলের গভীরে। তাকে সেই গভীর জলের ভেতর থেকে টেনে তোলে নেহাল। হৃদি চোখ মেলে তাকায়। নেহাল বলে, ওঠ। ওঠ। না খেয়ে মরে গেলে হবে? তোকে নিয়ে আমার বাংলাদেশে যেতে হবে না?
হৃদিকে খাওয়ায় নেহাল। কিন্তু কী খাওয়ায়, তা বুঝতে পারে না সে। তার স্বাদ নেই, গন্ধ নেই, অনুভব নেই। সে মৃত মানুষের মতো পড়ে থাকে। আর তারপর ভেসে যেতে থাকে আকাশে আকাশে, মেঘে মেঘে। জলের ভেলায়। তার আর কিছুই মনে থাকে না। সে মাঝে মাঝে গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠে। কিন্তু তখনো সেই ঘুমের ঘোর তার কাটে না। বরং নিজেকে এক অদ্ভুত দ্বিধার পৃথিবীতে আবিষ্কার করে সে। সেই পৃথিবীর কোনটি সত্যি আর কোনটি মিথ্যে, তা আলাদা করতে পারে না সে। সবকিছুই স্বপ্ন মনে হয়। কিংবা সাবানের ফেনার রঙিন বাবলের মতো। ধরতে গেলেই নিমেষে উধাও হয়ে যায়। তার ওই পৃথিবীটাও অমন। সেখানে সত্যি-মিথ্যা, বাস্তব-অবাস্তব কিছু আলাদা করতে পারে না হৃদি। তবে এত কিছুর মধ্যেও তার অনিকের কথা মনে পড়ে। আর কখনো অনিকের সঙ্গে দেখা হবে তার? একমুহূর্তের জন্য? একপলকের জন্য?
যদি দেখা হয়ই, তাহলে কী করবে সে?
হৃদি এরপর আর ভাবতে পারে না। তার ভাবনা গুলিয়ে যায়। এলোমেলো হয়ে যায় সব। নেহাল বলে, আমাকে বাংলাদেশে যেতে হবে, হৃদি। তার আগে তোমাকে পুরোপুরি আমার কথা শোনার মতো অবস্থায় পৌঁছে যেতে হবে। পারবে না?
হৃদি মাথা নাড়ে। সে পারবে। আজকাল পারেও। এমন নয় যে সে ইচ্ছে করেই সব করে। বরং কেন যেন নেহাল যা বলে তা-ই শুনতে ইচ্ছে করে তার। সে যা শিখিয়ে দেয়, তা-ই বলতে ইচ্ছে করে। এমন কেন হয় তার? তারা তাকে একটা অন্ধকার ঘরে আটকে রাখে। ঘুমের ওষুধ দেয়। শরীরে সুই ফোঁটায়। দুয়েকবার নাকেও এটা-সেটা গুঁজে দিয়েছে। ধোঁয়ার মতো। তারপর তার পৃথিবীটা ধোঁয়ার মতোই কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে যেতে থাকে। আর তখন সবই ভালো লাগে হৃদির। নেহালকেও। এভিলিনকেও। তারা যা বলে, তা-ই শুনতে ইচ্ছে হয়। করতে ইচ্ছে হয়। বলতে ইচ্ছে হয়।
আচ্ছা, এমন কেন হয় তার?
তবে মাঝে মাঝে ওই গভীর ঘোর থেকে জেগে ওঠে সে। তখন অকস্মাৎ বুকের ভেতর অব্যাখ্যেয় এক শূন্যতার বান ডাকে। সেই বানে ভেসে যায় একূল-ওকূল। তখন মায়ের জন্য কান্না পায়। তিথির জন্য কষ্ট হয়। আর অনিকের জন্য?
এরপর আর ভাবতে পারে না হৃদি। তার দমবন্ধ লাগে। চোখের কোণে জল জমতে থাকে। গলা রুদ্ধ হয়ে আসে। বুকের ভেতর থেকে ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে। উঠতে থাকে তীব্র যন্ত্রণা। ওই যন্ত্রণা থেকে উপশম কিসে কে জানে! সে তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, অনিক, অনিক।
জোরে কাঁদতে ভয় পায় সে। নেহাল যদি শোনে? সে যদি এসে কিছু বলে! যদি আবারও ওষুধ দিয়ে দেয়? কিংবা মারে? কিংবা এভিলিন তাকে নগ্ন করে ঠান্ডায় ফেলে রাখে? কিংবা…। আর ভাবতে পারে না হৃদি। সে বরং কাঁদতেই থাকে। নীরব, নিঃশব্দ কান্না। এই কান্নার শেষ নেই। শুরু নেই। এ যেন আদি ও অনন্ত। এই জীবন থেকে মুক্তি কিসে তার? কিংবা আদৌ কি মুক্তি আছে?
হৃদির প্রথম দিন মনে হয়েছিল, নেহাল বুঝি তাকে মেরেই ফেলবে। তার সব গোপনীয়তাই তত দিনে জেনে গেছে সে। ফলে তাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। কিন্তু তার ধারণা সত্যি হয় নি। নেহাল তাকে খুন করে নি। বরং এক অদ্ভুত উপায়ে সে তাকে বশংবদ করে রাখতে চাইল। নিমজ্জিত করে রাখতে চাইল গভীর এক ঘোরে। কারণ, নেহাল জানে তাকে আবার দেশে ফিরে আসতে হবে এবং হৃদিকে ছাড়া সে কিছুতেই দেশে আসতে পারবে না। ফলে সে হৃদির চিন্তা ও চেতনার জগত্তাকে এলোমেলো করে দিতে লাগল। ওই জগৎ থেকে সহজে বের হতে পারবে না সে। অনুগত হয়ে থাকবে নেহালের। তা থাকেও। বেশির ভাগ সময়ই ওই ঘোর থেকে বের হতে পারে না হৃদি। নেহাল তাকে ওষুধ দেয়। আর সে ডুবে যায় ঘোর থেকে ঘোরে।
৪৫
আবছার আহমেদ জরুরি ভিত্তিতে অবন্তীকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তার মুখ থমথমে। কপালে চিন্তার রেখা। অবন্তী বলল, কোনো সমস্যা?
একটু।
রিয়ার কোনো খবর?
না।
তাহলে?
কোথাও কোনো একটা বড় সমস্যা আছে, অবন্তী। কিন্তু সমস্যাটা আমরা পুরোপু রি ধরতে পারছি না।
মানে?
মানে…। বলে থামলেন আবছার আহমেদ। তারপর বললেন, আপনার বিষয়টা একটু জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কী হয়েছে?
রিয়ার বিষয়টা নিয়ে আমরা হলের কয়েকজন দারোয়ান, আয়া, মালি–এদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছি এবং জিজ্ঞাসাবাদে তারা একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে।
চাঞ্চল্যকর তথ্য? কপাল কুঁচকে তাকাল অবন্তী। কী?
রিয়াকে নয়, বরং আপনার সম্পর্কে কেউ খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছিল। বেশ কয়েকবার। এমনকি তারা আপনার হলের রুম নম্বর, রুমের লোকেশন পর্যন্ত জানতে চেয়েছিল।
কী বলছেন আপনি?
হুম।
অবন্তী হঠাৎ চুপ করে গেল। দীর্ঘ সময়। তারপর ভীত কিন্তু শান্ত কণ্ঠে বলল, আমি জানতাম, মঈন এর সঙ্গে যুক্ত নয়। এমনকি রিয়ার বিষয়েও না। আপনারা ওকে শুধু শুধু…।
এখনো সেটা বলার সময় আসে নি, অবন্তী। তবে এটাও তো সত্যি যে অনিক যেমন পালিয়ে গিয়ে আমাদের দ্বন্দ্বে ফেলেছে, তেমনি মঈনও নানা কারণেই তার প্রতি আমাদের সন্দিগ্ধ করেছে। তাই না?
কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়াই কেবল সন্দেহের বশে কি কাউকে এভাবে…। অবন্তীর গলা আর্দ্র হয়ে উঠল।
আবছার আহমেদ বললেন, আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, যাতে তার প্রতি কোনো অন্যায় না হয়। কিন্তু অবন্তী, তার আগে আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।
কী কাজ?
আপাতত কিছুদিনের জন্য আপনি হল থেকে বাসায় চলে আসবেন। পুরোপুরি। মানে ভাবটা এমন যে আপনি আর কখনোই হলে ফিরে যাবেন না। আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের।
এটা কেন করব?
আমরা দেখতে চাই এতে আপনাকে যারা অনুসরণ করেছে, তাদের মুভমেন্ট পাল্টায় কি না। আমার ধারণা, আপনি আবার বাসায় থাকতে শুরু করলে তারা সময় সুযোগ বুঝে আবারও কোনো একটা অ্যাটেম্পট নিতে চাইবে। আপনি ভয় পাবেন না। পুলিশ সাদাপোশাকে আপনার আশপাশেই থাকবে।
অবন্তী কোনো কথা বলল না। ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছে সে। কিন্তু মঈনের জন্য হলেও সে এই কাজটা করবে। যেকোনোভাবেই হোক, তাকে সন্দেহমুক্ত করতে চায় সে। অবন্তী হল ছেড়ে দিল পরদিন দুপুরেই। এমনকি তার হলের বিছানা, বালিশ, নিজের কেনা চেয়ার, টুকিটাকি জিনিস, লেপ-তোশক, বইপত্র–সব নিয়েই সে চলে এল। বুদ্ধিটা অবশ্য আবছার আহমেদেরই। তিনি চাইছেন তার এই স্থানান্তর যেন। প্রকাশ্যে সরবে হয়। কেউ যদি এখনো তার ওপর নজর রেখে থাকে, তবে তারা যেন। বুঝতে পারে যে সে এখন থেকে খালার বাসাতেই থাকবে।
হৃদির রুমটা আপাতত বন্ধই আছে। ফলে অবন্তী উঠল তিথির সঙ্গে। কিন্তু বেশ কয়েক দিন কেটে গেলেও তেমন কিছুই ঘটল না। সাদাপোশাকের কয়েকজন পুলিশ সারাক্ষণ নজর রাখতে লাগল বাড়ির আশপাশে। আবছার আহমেদও যতটা সম্ভব সতর্ক হয়ে রইলেন। কিন্তু তাতে লাভ কিছু হলো না। বরং সবকিছুই যেন অবিশ্বাস্যরকম শান্ত। অবন্তীর নামে কোনো চিঠিও আর এল না।
তবে এক সন্ধ্যায় অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। এই ঘটনার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল। না অবন্তী বা অন্য কেউ।
কাজের মেয়েটা ঘরদোর পরিষ্কার করছিল। অবন্তীর জিনিসপত্র সব গুছিয়ে। রাখছিল সে। এই মুহূর্তে হঠাৎ চিৎকার করে অবন্তীকে ডাকল সে। বলল, খালা, এইদিকে দেইখা যান।
অবন্তী সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে এল। বলল, কী হয়েছে?
কী হইছে এখনো জানি না। তবে বড়ই আচানক কাণ্ড।
কী আচানক কাণ্ড।
দেখেন, এইখানে হাত দিয়া দেখেন।
অবন্তী মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল। সে তার হল থেকে আনা মোটা তোশকটার একটা অংশ ধরে আছে। অবন্তী বলল, কী হয়েছে?
আপনের তোশক সরাই রাখতে গেছিলাম। এত মোটা আর ভার যে খুব কষ্ট হইতেছিল।
হুম।
তারপর হঠাই দেখি তোশকের এই কোনায় জানি শক্ত শক্ত কী?
তোশকের ভেতরে আবার শক্ত কী থাকবে?
আপনে এই কোনার দিকে হাত দিয়ে দেখেন।
তোশকের মাঝখানের দিকটাতে ঘুমানো হয় বলে সেদিকটা অনেকটাই মিইয়ে গেছে। কিন্তু দেয়ালের দিকে থাকা কোনার অংশটা তখনো বেশ ফুলেফেঁপে আছে। অবন্তী সেই জায়গায় হাত দিয়ে চাপ দিতেই শক্ত কিছুর অস্তিত্ব টের পেল। একটা দুটো নয়, বরং বেশ কিছু শক্ত উপাদানের অস্তিত্ব সেখানে। যেন তোশকের ভেতর কিছু রেখে সেলাই করে দিয়েছে কেউ। জায়গাটা পরখ করে দেখল অবন্তী। অন্যান্য জায়গার তুলনায় এই কোনার অংশের সেলাইটাও আলাদা। সে বেশ কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, যা, রান্নাঘর থেকে একটা ছুরি নিয়ে আয়।
মেয়েটা ছুরি নিয়ে এল। অবন্তী খুব সাবধানে তোশকের ওই প্রান্তটা কাটল। তারপর অবাক বিস্ময়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইল। ছোট ছোট চারটা কাঁচের কৌটা বেরিয়ে এল তোশকের ওই কাটা অংশ থেকে। সে হতভম্ব চোখে সেই কৌটার দিকে তাকিয়ে রইল। কী এই কৌটার ভেতর? কে রেখেছে এসব?
খবর পেয়ে পুলিশ অফিসার আবছার আহমেদ এলেন তখুনি। তিনি কাঁচের কৌটাগুলো হাতে নিয়ে দীর্ঘ সময় বসে রইলেন। তারপর বললেন, এই তোশক আপনি কোথা থেকে কিনেছেন?
লাল চান বেডিং স্টোর।
কোথায় এটা?
নীলক্ষেত।
হুম। বলে গম্ভীর হয়ে গেলেন আবছার। বললেন, আমার মনে হয় ঘটনা আমি বুঝতে পেরেছি।
কী ঘটনা?
সেটা এখুনি না বলি। কিন্তু আপনি খুব সাবধান থাকবেন। বিষয়টা আমরা যতটা হালকাভাবে দেখেছি, এটা মোটেই ততটা হালকা কিছু নয়। এ এক ভয়াবহ ঘটনা!
কী ঘটনা?
আমি সব বলব। তবে তার আগে এই কথা আপনি কাউকে বলবেন না। আর এই বাড়ির নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরও জোরদার করছি আমি। দয়া করে আপনারা কেউ আপাতত আর বাড়ির বাইরে যাবেন না।
কিন্তু কেন?
আমি বলেছি, তাই।
বলে উঠে দাঁড়ালেন আবছার আহমেদ। অবন্তী বলল, মঈন ছাড়া পাবে তো? ও কিছু করে নি তো?
আবছার আহমেদ এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। তিনি হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার চোখেমুখে হতবিহ্বল ভাব। খানিক ভয়ও। এত দিন কেঁচো খুঁড়তে সাপ পাওয়ার গল্প শুনেছেন। এবার সরাসরি দেখলেন।
৪৬
জামশেদ বললেন, এটা কী হলো?
রাশু কথা বলল না। তিনি রাশুর দিকে দুই পা এগিয়ে এলেন। তারপর বললেন, পুলিশ এত বড় ঘটনা কী করে জানল? তারা লাল চানের বেডিংয়ের দোকানে কেন সার্চ করল? আর এখন নাকি আবার লাল চান আর তোর খোঁজ করছে?
জি।
তুই লাল চানের বিষয়ে কাউকে কিছু বলেছিস?
রাশু মাথা নাড়ল, না।
পুলিশ তাহলে জানল কী করে? তারা লাল চানের দোকানে কাকে খুঁজতে গিয়েছিল? কী খুঁজতে গিয়েছিল?
রাশু কথা বলল না।
জামশেদ আরও দুই পা এগোলেন। তারপর বললেন, রাশু! ঘটনা কী? তুই আমাকে ঘটনা খুলে বল?
রাশু কথা বলল না। জামশেদ অবশ্য তার উত্তরের অপেক্ষাও করলেন না। তিনি বললেন, এদিকে আয়।
কোথায়?
তোকে আজকে আমি একটা খেলা দেখাব।
কী খেলা?
সেটা নিজেই দেখতে পাবি।
তিনি তাকে সাপের ঘরটার দিকে নিয়ে গেলেন। ঘরটা আরও বড় করা হয়েছে। ভেতরে সাপের সংখ্যা বেড়েছে। চারদিকে কিলবিল করছে তারা। জামশেদ বললেন, তুই একটা কাজ কর।
কী কাজ?
জামাকাপড় খুলে ন্যাংটা হ।
রাশু ভয়ার্ত গলায় বলল, স্যার! স্যার! সত্যি আমি কাউরে কিছু বলি নাই। লাল চান চাচার খুনের কথা আমি কাউরে কিছু বলি নাই।
বলিস নাই?
না।
তাহলে কী বলছিস?
কিছু বলি নাই। আল্লাহ-খোদার কসম।
না বললে তারা জানল কী করে? তারা লাল চানের দোকানে কী করতে গেছে? কারে খুঁজতে গেছে?
রাশু কথা বলল না। জামশেদ বললেন, তুই জামাকাপড় খোল। রাশুর ধারণা সে জামশেদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছে।
জামশেদ বললেন, এখন বাজে বিকেল পাঁচটা। তুই কাল সকাল পাঁচটা পর্যন্ত এই ঘরে ন্যাংটা অবস্থায় সাপের সঙ্গে বসবাস করবি। পারবি না?
রাশু এবারও কথা বলল না। সে দৃশ্যটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। তার শরীর হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে আসতে শুরু করেছে। হাত-পা শিথিল হয়ে আসছে। জামশেদ বললেন, কাল সকালে তোকে আমি এখান থেকে বের করব। ততক্ষণ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবি না?
ভয়ে রাশুর গলা থেকে কথা বেরোল না। জামশেদ অকস্মাৎ তার তলপেটে লাথি বসালেন। তারপর বললেন, শুয়োরের বাচ্চা, তুই আমাকে চিনিস নাই। তুই এখনো জামশেদরে চিনিস নাই।
রাশু পেট চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল। তীব্র যন্ত্রণায় তার মুখ কুঁচকে আছে। জামশেদ বললেন, বসবাস করতে না পারলে আমি তোকে সাপের সঙ্গে সহবাস করাব। খোদার কসম, আমি তোর পেছন দিক দিয়ে এক ডজন রাসেল ভাইপার…।
রাশু ভয়ে, আতঙ্কে জড়সড় হয়ে বসে রইল। সে এখান থেকেই সাপগুলোর হিসহিস শব্দ শুনতে পাচ্ছে। প্রতিটি শব্দ যেন তার কানের ভেতর দিয়ে হৃৎপিণ্ডে গিয়ে আঘাত করছে। জামশেদের পরের লাথিটা পড়ল রাশুর কাঁধে। সে এবার পুরোপুরি মাটিতে শয্যাশায়ী হয়ে গেল। জামশেদ বললেন, হারামজাদা, খানকির…, বল। পুলিশ এই সব জানল কী করে, বল?
রাশু এবারও কথা বলল না। জামশেদ হঠাৎ এলোপাতাড়ি লাথি মারতে লাগলেন তাকে। তারপর পা দিয়ে মাথা চেপে ধরলেন মাটিতে। হিসহিসে গলায় বললেন, তুই আমাদের এই ক্ষতিটা কেন করলি? বল, কেন করলি? তুই জানিস, কত বছরের কত কত প্ল্যান আমাদের? এত বছরে কেউ ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পায় নাই। আর আজ তোর। জন্য আমাদের এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল! শুয়োরের বাচ্চা, পুলিশ এখন কী করবে, বল? তারা কিছু টের না পেলেই দোকানে সার্চ করছে? তোকে আর লাল চানকে খুঁজছে?
রাশুর মনে হচ্ছিল তার মাথাটা ফেটে যাচ্ছে। দম নিতে পারছে না সে। জামশেদ বললেন, বল, কী করেছিস তুই, বল? পুলিশ কেন লাল চানকে খুঁজছে? লাল চানের দোকানে কেন আসছে?
আমার কারণে। গুঙিয়ে উঠল রাশু।
কী করেছিস তুই? লাল চানের খুনের কথা বলেছিস?
না।
তাহলে?
আমি অন্য একটা ভুল করে ফেলছিলাম।
কী ভুল? পা সামান্য শিথিল করলেন জামশেদ।
লাল চান চাচায় ওই জিনিসগুলা আমার কাছেই দিছিল। চারটা কাঁচের ছোট্ট কৌটা।
কী!
হুম।
তারপর? তুই সেই জিনিস কী করেছিস?
বলতেছি। বলে ঢোঁক গিলল রাশু। সম্ভবত মুখের ভেতর কোথাও কেটে গেছে। তার। জামশেদ উন্মাদের মতো মেরেছেন তাকে।
বল।
সে তো তারপর পুলিশের ভয়ে পালাই গেল। আমারে বলল সে ফিরা না আসা পর্যন্ত মালগুলা যেন আমি নিরাপদে লুকাই রাখি।
হুম।
আমি কী করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তারপর…। বলে গোঙাতে লাগল রাশু। তেষ্টায় তার বুক ফেটে যাচ্ছে। মাথাটা যেন তীব্র যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ে যেতে চাইছে। জামশেদ বললেন, তারপর? কী করেছিলি তুই?
উপায়ান্তর না দেইখা দোকানেই এখানে-ওখানে রাখা শুরু করলাম। কিন্তু একটু পরপরই আবার মনে হইতে লাগল যে কেউ যদি হঠাৎ দেইখা ফালায়! দোকানে তো অনেক কর্মচারীও আছে। তা ছাড়া দোকান ছাড়া রাখার তো আর জায়গাও নাই।
তারপর?
কারও কাছে আবার ওই জিনিসের কথা বলাও যাইব না। খুক খুক করে কাশল রাশু। কাশির সঙ্গে রক্ত বেরিয়ে এল তার মুখ দিয়ে। জামশেদ তার মাথার ওপর থেকে পা সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। রাশু যেন খানিক স্বস্তি পেল। বলল, হঠাই বুদ্ধিটা মাথায় আসল। আমাদের দোকানের পিছন দিকে কিছু বানানো তোশক আছিল। রেডিমেড। বিক্রি হয় নাই দেইখা অনেক দিন থিকাই পইড়া আছে। আমি রাতে একলা একলা একটা কাজ করলাম।
কী কাজ?
সেই স্তূপ কইরা রাখা তোশকের সবচাইতে নিচের তোশকটার এক কোনার সেলাই কাটলাম। বলে হাঁপাতে লাগল রাশু।
তারপর সেই তোশকের মধ্যে রাখলি জিনিস?
জে।
তারপর?
তারপর আরও কী কী কাজে যেন ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কয় দিন পর দোকানে গিয়া দেখি সেই তোশক নাই!
জামশেদ কথা বললেন না। থক করে একদলা থুতু ফেললেন রাশুর মুখের সামনে। রাশু বলল, দোকানের ছেলেটা তো আর ঘটনা জানে না। সে ওই তোশক বিক্রি করে দিছে।
কার কাছে? থমথমে কণ্ঠে বললেন জামশেদ।
ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রীর কাছে।
তারপর?
আমি তো পাগলের মতো হয়ে গেলাম। ওরে অনেক বকাঝকা করলাম। কিন্তু ওর দোষ কী? ও তো আর ঘটনা জানে না। মেয়েটার হলের নাম লেখা আছিল মানি রিসিপ্টে। আমি সেই মানি রিসিপ্ট থিকা ঠিকানা নিয়া তার খোঁজখবরের চেষ্টা করতে লাগলাম। তার হলের সামনে গিয়া দাঁড়াই থাকতাম। বোঝার চেষ্টা করতাম, কিছু করন যায় কি না। এমনই এক বিষয় যে কাউরে সাহায্য করতেও বলা যাইব না। আবার ওই মেয়েদের হোস্টেলে ঢোকাও যাইব না। বাসাবাড়ি বা অন্য কোথাও হইলে তাও না হয় একটা ব্যবস্থা করা যাইত। কিন্তু মেয়েদের হলে আমি ঢুকব কী করে!
তো তারপর তুই কী করলি?
আমি তখন দিনের পর দিন খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম, বোঝার চেষ্টা করলাম যে কী করা যায়।
তারপর?
তারপর…। বলে আবার খকখক শব্দে কাশল রাশু। প্রচণ্ড ব্যথায় পেট কুঁকড়ে আসছে তার। মাথা ভার হয়ে আছে। ফুলে গেছে চোখও। ঠিকভাবে তাকাতে পারছে না সে। তারপর বুঝলাম যে আর কোনো উপায় নাই। ওইখান থিকা ওই জিনিস বাইর করন যাইব না। যদি না…। বলে থামল রাশু। তার মাথাটা বনবন করে ঘুরছে। চোখের সামনের পৃথিবীটা যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। সে হড়বড় করে বমি করে ফেলল। জামশেদ অবশ্য সেসব গুরুত্ব দিলেন না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, কী?
যদি না মেয়েটারে খুন করা যায়।
মানে! কী বলছিস তুই? ওই মেয়েরে খুন করলে তুই জিনিস পাবি কেমনে? আরও তো ঝামেলায় পড়বি।
না। আমি খোঁজ নিয়া জানলাম, কেউ যদি মারা যায়, মানে কোনো ছাত্রী, তাহলে হল কর্তৃপক্ষ হল থেকে তার নিজের কেনা জিনিসপত্র সব হিসাব করে বুঝাইয়া দেয়।
জামশেদ আগুনচোখে রাশুর দিকে তাকিয়ে আছেন, তার মানে তুই তখন ওই মেয়েরে খুন করার চেষ্টা করলি?
এইটা ছাড়া আর উপায় কী আমার? জিনিস বাইর করতে তো আর কোনো উপায় নাই।
তারপর?
আমি তক্কে তক্কে থাকলাম। তারপর একদিন রাতে মেয়ের খালার বাসায় গেলাম। জানালা দিয়া গুলিও করছিলাম। দুইটা। কিন্তু গায়ে লাগাইতে পারি নাই। যন্ত্র আপনে আমারে দিছিলেন, কিন্তু যন্ত্র ঠিকঠাক চালানো তো শিখান নাই!
জামশেদ কথা বললেন না। তিনি হতভম্ব চোখে রাশুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই ছেলে বলে কী!
রাশু বলল, পুলিশ কোনোভাবে ওই মালের খোঁজ পাইয়া গেছে এবং তারা জানছে যে ওই তোশক কই থেকে কেনা হইছে। এই জন্যই কাল দোকানে আসছিল তারা!
জামশেদ অকস্মাৎ সজোরে লাথি বসালেন রাশুর পাঁজরের হাড় বরাবর। রাশুর মুখ থেকে কোত করে একটা শব্দ বের হলো। সে গড়িয়ে গেল পাশে। জামশেদ অবশ্য থামলেন না। বললেন, তোর জন্য এখন আমার সব শেষ। সব শেষ। পুলিশের এখন এই জায়গা খুঁজে বের করতে লাগব বড়জোর এক সপ্তাহ। তোকে আমি…তোকে আমি…। জামশেদ তার কথা শেষ করতে পারলেন না। রাগে-ক্রোধে যেন অন্ধ হয়ে গেছেন। চট করে কোমর থেকে পিস্তল বের করলেন তিনি। তারপর হ্যাঁমার টানলেন। বললেন, ওঠ। ওঠ কুত্তার বাচ্চা। আমি আজ তোকে সাপের পাঁচ পা দেখাব। ওঠ। কাপড় খুলে ন্যাংটা হ।
তিনি হঠাৎ অনিক আর মতিন মিয়াকে ডাকলেন। অনিক ভীত চোখে তাকিয়ে আছে। জামশেদ বললেন, এই কুত্তার বাচ্চাকে ন্যাংটা কর। তারপর ওই ঘরে ঢোকা। ওই রাসেল ভাইপারের ঘরে। তারপর সারা রাত এই হারামজাদারে ওইখানে আটকাই রাখবি।
রাশু বুঝতে পারছিল আজ তার ভাগ্যে খারাপ কিছু আছে। কিন্তু সেই খারাপ কিছু যে এত খারাপ হতে পারে, এটা সে চিন্তাও করতে পারে নি। জামশেদ যখন তাকে প্রথম প্রশ্নটা করেছিলেন, ঠিক তখুনি বুঝে গিয়েছিল রাশু, দোকানের ওই ঘটনার জের তাকে টানতে হবে। কিন্তু তাই বলে অমন সাপভর্তি একটা ঘরে তিনি তাকে আটকে রাখবেন!
রাশুর মনে হলো তার মেরুদণ্ড বেয়ে তীব্র ভয়ের হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। সে উঠে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু জামশেদ এবার লাথি বসালেন তার মুখে। ঠোঁট কেটে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এল রাশুর। পরের লাথিটা বসালেন গলা বরাবর। অনিক আর মতিন মিয়ার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠছেন জামশেদ। যেন তার মাথায় উন্মাদ ভর করেছে। মতিন মিয়া আর অনিক ছুটে এল। তারপর রাশুকে ধরে দাঁড় করাল। তারা। কিন্তু রাশুর ততক্ষণে আর দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থা নেই। সে হাঁটু ভাঁজ করে আবার বসে পড়ল।
জামশেদ বললেন, ওকে এইভাবেই ওই ঘরে নিয়ে যা। ওই ঘরে।
মতিন রাশুর বাঁ হাত ধরে টানছিল। কিন্তু অনিক হঠাৎ আড়ষ্ট হয়ে গেল। তার চকিতে মনে হলো রাশু তার ডান হাতটাকে নিচু করার চেষ্টা করছে। সে কি তবে তাকে কিছু ইঙ্গিত করছে? মুহূর্তের জন্য থমকে গেল অনিক। রাশুর কোমরের পিস্তলটা উঁকি দিচ্ছে। সে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে অনিকের কোমর ছুঁয়ে দিল। তারপর যেন ইশারায় বোঝাতে চাইল কিছু। অনিক কী বুঝল কে জানে। হঠাৎ তার ধরে রাখা হাতটা ছেড়ে দিল। একদিকে কাত হয়ে গেল রাশু।
মতিন বলল, কী হইল?
আপনি এই পাশে আসেন, মতিন ভাই। আমি ওই হাত ধরি।
কেন? ওই হাতে সমস্যা কী?
সমস্যা কিছু না। এই দিক থেকে এত ওজন তুলতে আমার কষ্ট হয়। ওই পাশটা সহজ।
মতিন মিয়া বিরক্ত ভঙ্গিতে হাতটা ছেড়ে দিল। রাশু ততক্ষণে খানিক বিরাম পেয়ে গেছে। তার দুই হাতই মুক্ত। অনিক ইচ্ছে করেই অন্য হাতটা ধরতে খানিক বিলম্ব করল। দেরি করিয়ে দিল মতিন মিয়াকেও। জামশেদ ততক্ষণে বেশ কিছুটা সামনে এগিয়ে গেছেন। রাশুর গতি ধীর। হাত জোড়া প্রায় অবশ। তা ছাড়া সে এখনো ঠিকভাবে পিস্তল চালাতে পারে না। তারপরও ঝুঁকিটা নিল সে। এ ছাড়া আর উপায় নেই তার। এমনিতেও মরবে সে। কিন্তু শেষ চেষ্টাটা করে দেখতে চায়। তারপর যা হওয়ার হবে। সমস্যা হচ্ছে অনিক। যদি কোনোভাবে সে ব্যর্থ হয়, তবে বিপদে পড়বে অনিকও। কারণ, রাশুর গতি ধীর। সে জানে কাজটা করতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগবে তার। ফলে মতিন মিয়াকে আটকাতে হবে অনিকের। কিন্তু এই নিয়ে অনিকের সঙ্গে তার আগে কোনো কথা হয় নি। পুরো ব্যাপারটাই তাৎক্ষণিক। ফলে বিষয়টা নির্ভর করছে কে কতটুকু পরিস্থিতি বুঝতে পারবে, তার ওপর। অনিক কি ওইটুকু সময় মতিন মিয়াকে আটকে রাখতে পারবে? সে কি নিজ থেকে বুঝতে পারবে ব্যাপারটা?
অনিক বহু কষ্টে কোমর থেকে পিস্তলটা বের করল। কিন্তু হাতে কোনো সাড়া পাচ্ছে না সে। যেন বিবশ, বিমূঢ়। মতিন মিয়ার অবশ্য ঘটনা বুঝতে একটু সময় লাগল। সে যতক্ষণে পিস্তলটা দেখে ফেলেছে, ততক্ষণে অনিক তার কাছে চলে এসেছে। তারপরও চিৎকার করে জামশেদকে সতর্ক করল সে। জামশেদ চকিতে ঘুরলেন। অনিকের হাতে উদ্যত পিস্তল দেখে হঠাৎ থমকে গেলেন তিনি। মতিন মিয়াকে ততক্ষণে জাপটে ধরেছে অনিক। তারপরও সমানে হাত-পা ছুঁড়ে ছোটার চেষ্টা করছে সে। জামশেদ অবশ্য ভড়কে গেলেন। বরং তার ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি ফুটে উঠল। কপাল বেয়ে নেমে। আসা রক্তের স্রোতে রাশুর এক চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। তার হাত কাঁপছে। জামশেদ। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসতে লাগলেন, যেন তিনি নিশ্চিত যে রাশু শেষ পর্যন্ত গুলি ছুঁড়তে পারবে না। সেই শক্তি কিংবা সাহস কোনোটিই তার নেই। তার ধারণাই সত্যি। হলো, রাশু গুলি ছুঁড়তে পারল না। বরং তার কম্পিত হাত ক্রমশ শিথিল হয়ে যেতে লাগল। জামশেদ খানিক ঝুঁকলেন। অনিক চাইলেই এখন তার বুক বরাবর গুলি করতে পারে। মাত্র হাত কয়েক দূরত্ব তাদের মধ্যে। কিন্তু রাশু তা করল না। সে হঠাৎ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
জামশেদের চোখেমুখে একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল। তিনি আরও এক পা এগোলেন। তারপর নিচু হয়ে রাশুর হাত থেকে পিস্তলটা তুলে নিতে চাইলেন। রাশু নড়ে উঠল ঠিক তখনই। সে পরপর দুবার গুলি করল। জামশেদ গুলির ধাক্কায় চরকির মতো আধপাক ঘুরে গেলেন। তারপর ছিটকে পড়লেন মাটিতে।
অনিক ভেবেছিল গুলি তার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে। সে মতিন মিয়াকে ছেড়ে দিল। ভীত, আতঙ্কিত মতিন মিয়া অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। জামশেদ অবশ্য মারা গেলেন না। কারণ, রাশু শেষ পর্যন্ত তার বুকে গুলি করে নি। সে গুলি করেছে তার পায়ে। অত কাছ থেকে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় নি। তার দুটো পা ই মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। হতবিহ্বল মতিন, বিমূঢ় অনিক আর আহত জামশেদকে চমকে দিয়ে উঠে দাঁড়াল রাশু। তার চোখ, মুখ, নাক দিয়ে তখনো রক্ত ঝরছে। ব্যথায় কুঁকড়ে আছে শরীর। তারপরও সে জামশেদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর তার হাত থেকে ছিটকে যাওয়া পিস্তলটা মাটি থেকে তুলে নিল। জামশেদের চোখেমুখে তীব্র ব্যথার চিহ্ন। তবে সেই ব্যথার ভেতর থেকেও একটা প্রবল অবিশ্বাস যেন ঠিকরে বের হতে লাগল। তিনি এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যে রাশু তাকে সত্যি সত্যিই গুলি করেছে!
রাশু হাঁপাচ্ছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে খানিক ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করল সে। তারপর মতিন মিয়ার দিকে ফিরে তাকাল। বলল, স্যাররে এদিক নিয়াসেন, মতিন ভাই।
মতিন মিয়া কী করবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। খানিক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার। ঘোর এখনো কাটাতে পারছে না সে। রাশু শীতল কণ্ঠে বলল, কী হইল, মতিন মিয়া? কথা কানে যায় না? তার সেই কণ্ঠে কিছু একটা ছিল। মতিন মিয়া ছুটে গিয়ে জামশেদের পাশে দাঁড়াল। তারপর তাকে টেনে নিয়ে এল বেশ খানিকটা সামনে। রাশু ততক্ষণে সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। জামশেদ এতক্ষণে যেন রাশুর উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন। তিনি হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে লাগলেন রাশুর কাছে। রাশু সেসব শুনতে পেল কি না বোঝা গেল না। তবে সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে একটা গাছের গুঁড়ির ওপর বসল। তারপর মতিন মিয়াকে ডাকল, মতিন ভাই।
জে স্যার। মুহূর্তেই যেন ভোল পাল্টে গেল তার।
জামশেদ স্যার কি মারা গেছেন?
না, স্যার।
তাইলে?
জে স্যার?
তাইলে উনি যদি এখন মারা যায়, সেই দোষ কার?
মতিন মিয়া কথা বলল না। রাশু বলল, সেই দোষ আপনেরও হইতে পারে। আপনে যদি এখন তারে ধাক্কা দিয়া ওই ডোবাতে ফালাই দেন, তাইলে তারে খুন করনের দোষ হইব আপনের। কথা পরিষ্কার?
মতিন মিয়া বিস্ফারিত চোখে রাশুর দিকে তাকিয়ে রইল। রাশু বলল, ভয় নাই। শুধু ঝামেলা কইরেন না।
বলে উঠে দাঁড়াল সে। জামশেদ তুমুল কান্নায় তার প্রাণভিক্ষা চাইতে লাগলেন। অনুনয়-বিনয় করতে লাগলেন। রাশু বলল, স্যার, আমার ইচ্ছা ছিল আমি আপনেরেই ন্যাংটা কইরা ওই রাসেল ভাইপারের ঘরে রাখব। কিন্তু তাতে লাল চান চাচার উপর অন্যায় হয়ে যাবে। ঠিক না?
জামশেদ কিছু বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। তীব্র কান্নায় তার কথার কিছুই বোঝা গেল না। রাশু তার শরীরটা ধাক্কা দিয়ে পাশের ডোবার মধ্যে ফেলে দিল। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে। সেই অন্ধকারে জামশেদের ভয়ানক আর্তচিৎকার বড় কানে বিধল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই চিৎকার ঢেকে গেল পচা জলের বুকে জেগে ওঠা তীব্র জলকেলির শব্দে। যেন উৎসবের মেলা বসেছে সেখানে।
রাশু চুপচাপ সেই অন্ধকারে বসে রইল। আর কান পেতে শুনতে লাগল ওই জলের শব্দ। তার হঠাৎ মনে হলো, জলের বুকে জেগে ওঠা ওই ছলাৎ ছলাৎ শব্দের চেয়ে। সুমধুর কোনো সংগীত আর এই পৃথিবীতে নেই।
৪৭
সেই রাতেই দেশে এল নেহাল। সে তখনো ঘটনার কিছুই জানে না। রোখসানা বেগম হৃদিকে দেখে কাঁদলেন না। নেহালকে কিছু জিজ্ঞেসও করলেন না। কেবল চুপচাপ মেয়ের পাশে বসে রইলেন। হৃদি মায়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। খুব একটা কথা বলে না সে। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা যা বলে, তা-ও অসংলগ্ন। নেহাল অবশ্য বোঝানোর চেষ্টা করে, মা, আপনি একদম আপসেট হবেন না। ও কিছুদিনের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে। আপনি তো প্রথম দিকের অবস্থা দেখেন নি। তখন দেখলে স্থির থাকতে পারতেন না। এই জন্যই আমি আপনাকে তেমন কিছু জানাই নি।
রোখসানা বেগম কথা বলেন না। নেহাল বলে, ওকে তো চেনেন আপনি। যতই বারণ করেন, কিছুই শুনবে না সে। যেই স্নো পড়তে দেখল, অমনি বাচ্চাদের মতো লাফাতে লাফাতে নেমে গেল। এত বারণ করলাম, শুনল না। সাবধানে পা ফেলতে বললাম, কিন্তু কে শোনে কার কথা! সে হাত-পা ছুঁড়ে নাচানাচি করতে লাগল। তাও কোনো ধরনের সেফটি কিটস ছাড়া।
রোখসানা বেগম নেহালের কথা শুনছেন কি না বোঝা গেল না। তবে নেহাল বলতেই থাকল, তারপর হঠাই পা পিছলে পড়ল সে। আর সঙ্গে সঙ্গে ব্ল্যাকআউট। আঘাতটা লেগেছে মাথা আর ঘাড়ে। ডাক্তার তো প্রথম দেখে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন। তারপর মাসখানেক বলতে গেলে একদম কোমায়ই চলে গিয়েছিল। দেন দ্য মিরাকল হ্যাঁপেনড। অনেকে তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিল। শুধু আমি আর ডাক্তার, আমরা দুজন আশা ছাড়ি নি। তো এখন যেটা হয়েছে, ওর বিশেষ ট্রিটমেন্ট চলছে। খুবই সেন্সিটিভ ট্রিটমেন্ট। ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। সিডেটিভও আছে। ফলে ওর কথাবার্তা একটু অসংলগ্ন মনে হতে পারে। স্লিপি লাগবে। ডাক্তারের অনেক শর্ত মেনেই তবে ওকে দেশে আনতে পেরেছি, শুধু আপনার কথা ভেবে।
বলে থামল নেহাল। সে রোখসানা বেগমের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করছে। যদিও তাকে দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
নেহাল বলল, ডাক্তারের প্রধান শর্ত হলো ওর সঙ্গে বেশি কথা বলা যাবে না। বাইরের মানুষের সঙ্গে একদম কথাবার্তা, দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ। মানে যত বেশি একা থাকা যায় আরকি! দুই হচ্ছে, অন্য কোথাও এখন কোনো চিকিৎসাও করানো যাবে না। বাংলাদেশে তো না-ই। মানে ওর অবস্থা একটা পর্যায়ে না যাওয়া পর্যন্ত। তো এই দুটো জিনিস মাথায় রাখতে হবে, মা। যেভাবেই হোক, আপাতত বাইরের সবকিছু থেকে তাকে আলাদা রাখতে হবে। আমরা মাসখানেক থেকেই আবার চলে যাব। তখন ওখানে গিয়ে বাকি চিকিৎসা।
বলে সামান্য থামল নেহাল। রোখসানা বেগমের ভাবভঙ্গি খুব একটা সন্তোষজনক মনে হচ্ছে না। মেয়ের অবস্থা দেখে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছেন তিনি। সেই ধাক্কা সামলে উঠতে পারছেন না।
নেহাল তারপরও যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগল। বলল, আপনি একটু দেখবেন, মা। সবাই যেন হৃদিকে নিয়ে এই কথাগুলো মেনে চলে। না হলে সামান্য ভুলেও কিন্তু অনেক বড় বিপদ হয়ে যেতে পারে। সো, খুব সাবধান থাকতে হবে আমাদের সবার।
রোখসানা বেগম নেহালের কোনো কথারই উত্তর দেন না। কেবল চুপচাপ শোনেন। কিংবা শোনেন না। কিংবা শোনার ভান করেন। নেহাল অবশ্য তারপরও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে। হৃদিকে খুব যত্ন-আত্তিও করে সে। সহসা তার কাছছাড়া হয় না। প্রথম কদিন বাসার বাইরেও গেল না সে। ফলে হৃদির সঙ্গে কথা বলারও তেমন সুযোগ পেলেন না রোখসানা বেগম।
তবে সেদিন খুব ভোরে হঠাই বাইরে বের হলো নেহাল। আর এই সুযোগে মেয়ের কাছে গেলেন রোখসানা বেগম। হৃদি ঘুমিয়ে ছিল। তিনি তাকে ডাকলেন না। বসে রইলেন পাশে। ঘুমন্ত হৃদিকে এত প্রাণহীন আর ফ্যাকাশে লাগছে! চোখের কোলে কালি পড়ে গেছে তার। ঘুমের মধ্যেও যেন বারবার ভয়ে আঁতকে উঠছে। রোখসানা বেগম আলতো হাতে মেয়ের কপাল ছুঁয়ে দিলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, মা। মারে।
হৃদি অবশ্য তার ডাক শুনল না। জেগেও উঠল না। বেঘোরে ঘুমাতে লাগল সে। তার সেই ঘুম ভাঙল বিকেলে। এই পুরোটা সময় মেয়ের পাশে বসে রইলেন রোখসানা বেগম। সন্ধ্যার পরপর ঘুমের মধ্যেই কেমন অস্থির হয়ে উঠতে লাগল হৃদি। বারবার এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। ক্ষণে ক্ষণে মুখের অভিব্যক্তি বদলে যেতে লাগল। যেন প্রচণ্ড ভয়ের কিছু দেখছে সে। বার কয়েক হাত তুলে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেও লাগল। রোখসানা বেগম নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। তিনি হঠাৎ আধো ঘুম, আধো জাগরণে থাকা মেয়েকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন।
হৃদি সঙ্গে সঙ্গেই জেগে উঠল। তারপর তীব্র চিঙ্কারে উঠে বসল সে। রোখসানা বেগম কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছিটকে সরে গেল দূরে। বিছানার এক পাশের দেয়ালের সঙ্গে মিশে গিয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ভীত হরিণের মতো কাঁপতে লাগল। রোখসানা বেগম বললেন, কী হয়েছে, মা?
হৃদি কথা বলল না। তার চোখে তীব্র ভয়। মুখ ফ্যাকাশে। হাত দুখানা মুখের কাছে জড়ো করা রাখা। কাঁপছে সে। রোখসানা বেগম মেয়ের কাছে এগিয়ে যেতে চাইলেন। এগোলেনও খানিক। আর সঙ্গে সঙ্গেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল হৃদি। তার চোখের কোল গড়িয়ে নেমে আসতে লাগল জলের ধারা। যেন সে কিছুতেই চায় না কেউ তার কাছে আসুক, তাকে স্পর্শ করুক, তার সঙ্গে কথা বলুক। কিংবা তার শরীরে সুই ফুটিয়ে দিক। জোর করে কিছু খাইয়ে দিক। কিংবা অন্য কিছু। সে তা কিছুতেই চায় না। তার খুব ভয় হতে থাকে। সে আরও পিছিয়ে দেয়ালের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে চায়। কিন্তু পারে না। আর পারে না বলেই তীব্র আতঙ্ক নিয়ে অসহায় চোখে কাঁদতে থাকে সে। তার সেই কান্না রোখসানা বেগমের বুকের ভেতরটা ভেঙে চৌচির করে দিতে থাকে। পৃথিবীর কোনো মা-ই তার সন্তানের এমন কান্না সহ্য করতে পারেন না। দেখতে পারেন না চোখের সামনে।
তিথি দরজায় এসে দাঁড়াল। বলল, কী হয়েছে, মা?
রোখসানা বেগম কথা বললেন না। তবে চোখের ইশারায় হৃদিকে দেখালেন। তিথি বলল, কী হয়েছে, আপু? এই আপু?
হৃদি কথা বলল না। তবে তার কান্না থামল। যেন সে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে স্থান-কাল-পাত্র বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল তার। তিথি বলল, আপু। আপু?
হৃদি এবারও কথা বলল না। তবে ধীরে ধীরে দেয়াল ঘেঁষেই বসল সে। তিথি বলল, তোর কী হয়েছে, আপু?
কিছু হয় নি তো।
কিছু হয় নি, তাহলে এমন করছিস কেন?
আমি মনে হয় পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলাম। তারপর সব অন্ধকার হয়ে গেছিল। বলল হৃদি।
আপু! তিথির গলায় কান্না। তুই সত্যি করে বল তো তোর কী হয়েছে?
হৃদি কথা বলল না। রোখসানা বেগম বললেন, নেহাল তোকে মেরেছে? তোর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে?
হৃদি অকস্মাৎ তীব্র গতিতে ডানে-বাঁয়ে মাথা ঝাঁকাতে লাগল, না না। নেহাল আমাকে মারবে কেন? সে খুব ভালো, মা। খুব ভালো।
নেহাল কি তোকে কোনো ইনজেকশন দিত? তোর হাতে-পায়ে এত দাগ!
এগুলো ওষুধ, মা। আমার যে মাথায় আঘাত হলো! এই জন্য ডাক্তার ওষুধ দিতে বলেছিল। নেহাল আমাকে বলেছে। ভেঙে ভেঙে সময় নিয়ে কথাগুলো বলল হৃদি। তবে তার চোখ থেকে ভয়টা কাটে নি। বরং সে এদিক-সেদিক তাকিয়ে যেন কিছু খুঁজতে লাগল।
রোখসানা বেগম ধীরে ধীরে মেয়ের দিকে এগোলেন। হৃদি প্রথমে দূরে সরে যেতে চাইলেও পরে কী বুঝে আবার থমকে গেল। রোখসানা বেগম তার পাশে এসে বসলেন। তারপর তার হাতের দাগগুলোতে আলতো করে হাত ছুঁয়ে দিতে লাগলেন। হৃদি প্রথমে গুটিয়ে গেলেও পরে ধীরে ধীরে তার হাত বাড়িয়ে দিল। সে তীক্ষ্ণ চোখে রোখসানা বেগমকে দেখছে। যেন বোঝার চেষ্টা করছে, মানুষটা তার জন্য ক্ষতিকর কি না! তাকে আঘাত করবে কি না! কিংবা অন্য কোনো দুর্বোধ্য দ্বিধায় ভুগছে সে।
মারে। নরম গলায় ডাকলেন রোখসানা বেগম।
হৃদি তাকাল। তবে মুখে জবাব দিল না। তোর কী হয়েছে?
আমার কিছু হয় নি, মা। মৃদু হাসল হৃদি।
তুই আমাকে বল।
কী বলব?
কী হয়েছে তোর?
হৃদি চকিতে আবার এদিক-সেদিক তাকাল। যেন কাউকে খুঁজছে সে। রোখসানা বেগম বললেন, বল?
কী বলব? আমার কিছু হয় নি তো।
এখানে তোর কোনো ভয় নেই। এখানে কেউ তোকে কিছু বলবে না। বল মা।
হৃদি মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। অপলক, নির্নিমেষ। যেন মায়ের কথার কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
রোখসানা বেগম বললেন, নেহাল কী করেছে তোকে? কেন করেছে?
হৃদি তা-ও জবাব দিল না। তবে খাঁচায় বন্দী পাখির মতো বাইরে ইতিউতি তাকাতে লাগল সে। যেন এই ঘর, ওই বারান্দা, ওই দরজার ওপাশে কিছু দেখার চেষ্টা করছে। কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করছে কোনো শব্দ। কারও অস্তিত্ব। তিথিও এগিয়ে এল বোনের দিকে। বলল, আপু?
হৃদি তাকাল না। তার চোখও স্থির হলো না। কেবল ঘুরে বেড়াতে লাগল এদিক সেদিক। তবে হঠাই রোখসানা বেগমের উন্মীলিত বাহুর ভেতর নিজেকে এলিয়ে দিল সে। তারপর শান্ত শিশুর মতো মিশে যেতে লাগল তার বুকে। রোখসানা বেগমেরও হঠাৎ মনে হলো, তিনি যেন বহু বহু বছর বাদে আবার তার সেই ছোট্ট হৃদিকে বুকের ভেতর খুঁজে পেলেন। সেই ছোট্ট, এতটুকু এক হৃদি। এমন করেই শিমুল তুলোর ওমের মতন মায়াময় তুলতুলে আদুরে স্পর্শে মিশে থাকত সে। তিনি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলেন। তার সেই কান্নায় শব্দ নেই, কিন্তু স্পন্দন আছে।
হৃদিকে সেদিন নিজ হাতে তুলে খাওয়ালেন রোখসানা বেগম। গোসল করিয়ে দিলেন। নতুন কাপড় পরতে দিলেন। ছাদের বেঞ্চিটাতে বসে মাথা আঁচড়ে দিলেন। হৃদি চুপচাপ সব করল। তবে কথা বলল না খুব একটা। কেবল মাঝে মাঝে হঠাৎ আঁতকে ওঠা গলায় বলল, নেহাল কই? নেহাল এখনো আসে নি?
কেন?
হৃদি এই প্রশ্নের জবাব দিল না। তবে হুটহাট এদিক-সেদিক তাকাল। চমকে উঠল। তারপর আবার চুপ হয়ে গেল। তারপর ছোট্ট শিশুর মতোই কখন যে ঘুমিয়ে গেল, টেরই পেল না। তবে নেহাল এলে আর ঘর থেকে বের হয় না সে। একা অন্ধকারে কোনো এক অচেনা ঘোরের দেশে কুঁদ হয়ে থাকে।
.
সেদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। তিথি বলল, আপু, তুই কি ছাদে যাবি?
হৃদি তাকিয়ে থাকে। নির্বাক। নিস্পন্দ। তিথি বলল, তোর কি মনে আছে তুই একদিন ফোন করে খুব কেঁদেছিলি?
হৃদি চুপ। তিথি বলল, তুই ভেবেছিলি, আমি মা। আমাকে মা মনে করেই কাঁদছিলি তুই। মনে আছে?
হৃদি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। যেন তিথির কথা কিছুই বুঝতে পারছে না সে। তিথি বলল, তোর কিছু মনে নেই? ওই যে ফোন করে খুব কাঁদলি? বললি, মা, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও? আমার খুব ভয় হচ্ছে। মনে নেই তোর?
হৃদি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। যেন তিথির এমন আবোলতাবোল কথার কিছুই বুঝতে পারছে না সে। তিথি হঠাই বলল, তুই কাঁদতে কাঁদতে বলছিলি, অনিক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাস। একবার হলেও তার সঙ্গে দেখা করতে চাস। মনে আছে তোর?
তিথি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হৃদির চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে যদি কোনো স্পন্দন ধরা পড়ে! কোনো চিহ্ন। যেই চিহ্ন তাকে গভীর গহিন অন্ধকারের ঘোর থেকে ফিরে আসবার পথ দেখাবে। কিন্তু তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। হৃদি বরং একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। যেন শূন্য, নিষ্প্রাণ এক জোড়া চোখ। তিথি হঠাৎ পেছন ফিরে তাকায়। বারান্দার গ্রিলে একটা পাখি এসে বসেছে। চড়ুই পাখি। হৃদি সেই পাখির দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। তার মানে এতক্ষণ সে তার কথা কিছুই শোনে নি! দেখেও নি তাকে! সে তাকিয়ে ছিল পেছনের ওই পাখিটির দিকে! অথচ সে কিনা ভেবেছিল হৃদি তাকিয়ে আছে তার দিকেই। তার কথাই শুনছে!
তিথি হাত বাড়িয়ে হৃদির চোখের সামনে বাধা সৃষ্টি করল। হাত নাড়াল। তার দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা করল। সে কিছুতেই আর ওই পাখিটা দেখতে দিতে চায় না হৃদিকে। সে চায় হৃদি তার কথা শুনুক, অনুভব করুক। কিন্তু তাতে লাভ হলো না। হৃদির দৃষ্টি তাতে সরল না। বরং ওই একই জায়গাতে নিবদ্ধ হয়ে রইল। এমনকি পাখিটি তাড়িয়ে দেওয়ার পরও।
তিথি তারপরও চেষ্টা করে যেত থাকল। বলল, তোর অনিক ভাইয়ের কথা মনে আছে?
হৃদি হঠাৎ কথা বলল, নেহাল এসেছে।
কই?
আসে নি?
না।
তাহলে কে ওখানে? নেহালই তো।
তিথি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। তাদের বাসার সামনে একটা গাড়ি এসে থেমেছে। গাড়ি থেকে নামছে নেহাল। এই গাড়িটি নেহালের নয়। হয়তো ভাড়া করা গাড়ি। তাহলে অত দূর থেকে এত আগেভাগেই বুঝল কী করে হৃদি? নাকি সে সারাক্ষণই নেহালের ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে? কোথাও কোনো কম্পন কিংবা স্পন্দন দেখলেই ভেতরে ভেতরে আতঙ্কে গুটিয়ে যায় সে?
হৃদি হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তারপর পাগলের মতো ছুটতে শুরু করল তার দোতলার ঘরের দিকে। তিথি বলল, কী হলো, অমন ছুটছিস কেন?
হৃদি জবাব দিল না। সে ছুটতেই লাগল। তারপর উঠতে শুরু করল দোতলার সিঁড়ি বেয়ে। তিথিও বোনের পেছন পেছন ছুটল। চিৎকার করে বলল, তুই তো পড়ে যাবি, আপু! ওভাবে ছুটিস না।
কিন্তু হৃদি তার কথা শুনল না। সে দৌড়ে উঠে গেল দোতলায়। তারপর তার ঘরে গিয়ে দরাম করে দরজা বন্ধ করে দিল। তিথি ভারি অবাক হলো হৃদির আচরণে। এমন কেন করল সে? তবে কি হৃদি যে এ কদিন তাদের সঙ্গে একটু-আধটু মিশেছে, সেটা পছন্দ হয় নি নেহালের? এ কারণে হৃদিকে কিছু বলেছে সে? কিংবা কোনোভাবে ভয় দেখিয়েছে তাকে বা অন্য কিছু?
বিষয়টা মাথায় গেঁথে রইল তিথির। পরদিন নেহালকে কথাটা বলল সে।
হৃদিপুর শরীরটা তো খারাপ। ও কটা দিন যদি মা বা আমার সঙ্গে ঘুমায়, তাহলে সমস্যা আছে?
না না, সমস্যা থাকবে কেন? সেটাই তো বরং ভালো।
তাহলে আজ থেকে থাকবে আমাদের সঙ্গে?
অবশ্যই থাকবে। কোনো সমস্যা নেই। তবে…।
কী?
ওকে তো অনেকগুলো ওষুধ খেতে হয়। খুব টাইম মেইনটেইন করতে হয়। ওগুলো খুব সেন্সিটিভ। আর সমস্যাটাও তো বুঝতে পারছ। আঘাতটা ব্রেনে। সো, আর কটা দিন যাক। আরেকটু ধাতস্থ হোক। কী বলে?
আপনি শিখিয়ে দিলে আমরা পারব না ওগুলো মেইনটেইন করতে?
কেন পারবে না, কিন্তু আমার নিজেরই সারাক্ষণ টেনশন লাগবে। মনে হবে, যদি একটু এদিক-সেদিক হয়ে যায়? তা ছাড়া ডক্টরের সঙ্গেও আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকছে। তিনি নানা অ্যাডভাইস দিচ্ছেন। সেসব ফলো করতে হচ্ছে। বুঝতেই পারছ। আমি আসলে চাই না দিনের বেলাও ও খুব একটা বেশি কথাবার্তা বলুক। সিঁড়ি ভেঙে নিচে বা ওপরে যাক। নড়াচড়া করুক। ও যত মুভমেন্টে থাকবে, তত ওর জন্য ক্ষতি। ওর আসলে বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়েই থাকা উচিত। এতে ব্রেনও বিশ্রাম পায়। মনে রেখো, সামান্য এদিক-সেদিক হলেই কিন্তু ওর মহা বিপদ তিথি!
তিথি বলার মতো আর কথা খুঁজে পেল না। তবে মাকে কথাটা বলল সে, তোমার কি মনে হয় না আমাদের কিছু একটা করা উচিত?
কী করব?
ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াস কোনো অ্যাকশন নেওয়া উচিত না? অ্যাটলিস্ট আপুকে ডাক্তারের কাছে তো নেওয়া যায়?
যায়। কিন্তু নেহাল কী বলল তুই শুনিস নি? কারও সঙ্গে কথা বলা যাবে না। এখানে ডাক্তার পর্যন্ত দেখানো যাবে না। তাতে বরং ওর ক্ষতি হতে পারে!
ক্ষতির আর বাকি কী আছে, মা? আর নেহালের কথা তুমি এখনো বিশ্বাস করো?
বিশ্বাস না করে আমি যাব কোথায়? এই কথা আত্মীয়স্বজন কারও কাছে বলতে পারব? হৃদির আগের বিয়ের ঘটনাটাও এখন সবাই জেনে গেছে। সেই বিয়ে ভেঙে এনে এখানে বিয়ে দিলাম। এখন এখানেও আবার এই অবস্থা! লোকে কী বলবে? বলবে মেয়ে পাগল হয়ে গেছে বা নেশা করে…।
লোকের বলার কারণে তুমি এত বড় একটা ঘটনা এভাবে চেপে রাখবে?
রোখসানা বেগম জবাব দিলেন না। তিনি যে বিষয়টা নিয়ে ভাবেন না, তা নয়। কিন্তু হৃদির এই ঘটনা তাকে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও নানা ঘটনা। বিশেষ করে হৃদি ও অবন্তীর ঘটনায় অনিক নামের ছেলেটার জীবন যে এলোমেলো হয়ে গেল, এটা তার ভেতরে প্রবল এক আত্মদহন তৈরি করেছে। কোথায় আছে ছেলেটা? এই জীবনে এমন শান্ত জলের মতো স্বচ্ছ, নরম, সহজ মানুষ আর তিনি দেখেন নি। এমন কেন ছেলেটা?
মাঝে মাঝে অনিকের জন্য একধরনের মায়াও অনুভব করেন তিনি। সেই মায়ায় চুপি চুপি হৃদিও এসে যায়। মনে হয়, কী অসাধারণ একটি মানুষই না জীবনভর পাশে পেত পারত হৃদি! অথচ তিনি নিজে সেই জীবনটা টুকরো কাগজের মতো হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন। নিজেকে এত অপরাধী কখনো লাগে নি তার।
তিনি তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ওই ছেলেটার আর কোনো খবর পেলি, তিথি?
কোন ছেলেটার, মা?
অনিকের।
অনিক ভাইয়ের খবর দিয়ে তুমি কী করবে?
কিছু করব না। এমনি জানতে ইচ্ছে হলো।
তিথি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না। বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, না।
পুলিশও কিছু জানে না?
না।
রোখসানা বেগম আর কথা বললেন না। আর কিছু বলার মতো খুঁজেও পান না তিনি। কিংবা সেই সাহসও তার নেই।
৪৮
আবছার আহমেদ বসে ছিলেন অফিসে। এই সময়ে খবরটা এল। কেউ একজন তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। জরুরি প্রয়োজন। তিনি আসতে বললেন। ছেলেটার বয়স উনিশ-কুড়ি। শুকনো টিনটিনে। প্রথম দর্শনে আলাদা কিছু মনে না হলেও তার চোখের দিকে তাকালেই ধাক্কা খেতে হয়। হালকা বাদামি রঙের চোখ। সেই চোখের দৃষ্টি গভীর, অন্তর্ভেদী। ছেলেটার চোখেমুখে অসংখ্য ক্ষত। আবছার আহমেদ বললেন, কী চাই?
পানি। রাশু শুকনো কণ্ঠে বলল।
পানি! ক্রু কুঁচকে বললেন আবছার আহমেদ। এটা পানি খাওয়ার জায়গা?
পানি যেকোনো জায়গায় খাওয়া যায়, স্যার। নবীজি বলেছেন, মানুষরে পানি খাওয়ানো উত্তম সদকা।
ছেলেটার কথা বলার ভঙ্গি দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন আবছার আহমেদ। বয়সের তুলনায় তার চলন-বলন পরিণত। মনে মনে রেগে গেলেও সেটি প্রকাশ করলেন না তিনি। বরং কী ভেবে সেন্ট্রিকে পানি আনতে নির্দেশ দিলেন। রাশু সময় নিয়ে পানি খেল। তারপর হাতের উল্টো পিঠে মুখ মুছতে মুছতে বলল, আপনে আমারে খুঁজতেছিলেন। আমার নাম রাশু। লাল চান বেডিং স্টোরে কাজ করি।
মুহূর্তেই শিরদাঁড়া শক্ত হয়ে গেল আবছার আহমেদের। তিনি উত্তেজিত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতে চাইছিলেন। ডাকতে চাইছিলেন কাউকে। কিন্তু রাশু তাকে হাত তুলে নিবৃত্ত করল। বলল, আমি তো ধরা দিতেই আসছি, স্যার। তাড়াহুড়ার কিছু নাই। তবে তার আগে কিছু কথা বলব।
কী কথা? রাশুর মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বসে পড়লেন তিনি।
আপনে যেই কারণে আমারে খুঁজতেছেন, আমি তার চেয়েও বড় অপরাধ করছি।
কী অপরাধ?
খুন। আমি দিন কয়েক আগে জামশেদ নামের একজনরে খুন করছি। তার লাশ আছে বৈদ্যবেলঘরিয়া নামের এক জায়গায়। কিন্তু আপনে সেইখানে গিয়া তার লাশ পাবেন না। পাবেন হাড্ডি।
মানে? বিস্মিত গলায় বললেন আবছার আহমেদ। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। এই সব কী বলছে এই ছেলে! সেইখানে একটা আফ্রিকান মাগুর মাছের পুকুর আছে। আমি তারে গুলি করে সেই পুকুরে ফেলে দিছি।
কী!
হুম। সে লাল চান চাচারে খুন করছিল।
লাল চান কী হয় তোমার?
সে আসলে কী যে হয় আমার! বলে যেন চিন্তায় পড়ে গেল রাশু। তারপর বলল, আমার জন্ম খারাপ জায়গায়। মায়ের পরিচয় আছে, কিন্তু বাপের পরিচয় নাই। লাল চান চাচা আমারে বাপের পরিচয় দিছিলেন। নিজের পোলার মতো আদর করতেন। কিন্তু জামশেদ স্যার তারে গুলি কইরা খুন করছেন আমার সামনে। খুন কইরা লাশ ওই মাগুর মাছের ডোবায় ফালাইছিলেন। এই জন্য আমিও তারে মাগুর মাছ দিয়া খাওয়াইছি। বলে থামল রাশু। আবছার আহমেদের মুখ হাঁ হয়ে গেছে। এমন ভয়ংকর ঘটনা তিনি এর আগে আর কখনো শোনেন নি। তার ঘাড়ের কাছটা শিরশির করছে। কিন্তু ঘটনা জানার কৌতূহলও সংবরণ করতে পারছেন না তিনি।
রাশু শান্ত গলায় বলল, ওই পুস্কুনিতে সে লাল চান চাচারে মাইরা তারপর ফালাইছিল। আর আমি তারে ফালাইছি জ্যাতা। অর্ধেক জ্যাতা।
আবছার আহমেদ বেশ খানিকক্ষণ কথা বলতে পারলেন না। তীক্ষ্ণ চোখে রাশুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, চালাকি করতেছ? মিথ্যা গল্প সাজাইছ? উদ্দেশ্য কী?
রাশু হাসল, মিথ্যা না। যা বলছি, সব সত্য। আর উদ্দেশ্যও কিছু না। জীবন ভাল্লাগে না। ভালো না লাগলে মানুষ কী করে, ভালো লাগানোর চেষ্টা করে। আমি ভালো লাগার সন্ধানে এইখানে আসছি।
মানে! আবছার আহমেদ বিভ্রান্ত বোধ করছেন।
মানে…। খুন করার আগে খুব অশান্তি লাগত। ঘুমাইতে পারতাম না। চোখ বন্ধ করলেই লাল চান চাচার ওই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাইসা উঠত। তারে গুলি করনের দৃশ্য। তার লাশ ডোবায় ফালানোর দৃশ্য। আর তারপর মাছের ছপছপানির শব্দ। চাইরদিকে অন্ধকার। কানে খালি ছপছপ শব্দ। একটুও ঘুমাইতে পারতাম না। অস্থির লাগত। লাল চান চাচার জন্য বুকে যন্ত্রণা হইত। এত চেষ্টা করছি ভুলতে, পারি নাই। তখন ভাবলাম, জামশেদ স্যাররে খুন করলে মনে হয় শান্তি পাব। সবকিছু আবার ঠিকঠাক হইয়া যাইব। এই জন্য খুন করলাম।
তাহলে ধরা দিতে আসছ কেন?
এই কথায় রাশুর মন খারাপ হয়ে গেল। প্রবল বিষাদের ছাপ ফুটে উঠল তার চোখেমুখে। সে বেশ খানিকটা সময় চুপ করে থেকে বলল, লাভ হয় নাই।
লাভ হয় নাই মানে?
শান্তি পাই নাই। এখনো বুক জ্বলে। রাইতে ঘুমাইতে পারি না। চাচার জন্য সারাক্ষণ খালি অস্থির লাগে। মনে হয়, দুনিয়ায় কিছু নাই। কোথাও কিছু নাই। চাইরদিকে খালি অশান্তি আর অশান্তি। খুন কইরা লাভ হয় নাই। অশান্তি আরও বাড়ছে।
এই জন্য ধরা দিতে আসছ?
জে।
রাশুকে গ্রেপ্তার করা হলো। তবে গ্রেপ্তারের আগে আরও একটা ঘটনা ঘটল। সে বলল, আমার সঙ্গে একজন লোক আছে। আপনে অভয় দিলে তারে ভিতরে আসতে বলব।
কে?
তারে আপনে চিনবেন।
কীভাবে?
আপনেরা তারে মিথ্যা অভিযোগে খুঁজতেছেন। তার সঙ্গে আমার পরিচয় বৈদ্যবেলঘরিয়া। আপনেদের থিকা পালাইতে গিয়া শেষে ওইখানে আশ্রয় নিছে সে। নির্দোষ, ভালো মানুষ। কিন্তু ভাগ্য তারে কই থিকা কই নিয়া গেল। তারে দেইখাই আমি বুঝছি। সে ওইখানে থাকনের লোক না। অনেক জিজ্ঞাস করছি ঘটনা। কিন্তু কিছুতেই কিছু বলে না। শেষে আসল ঘটনা জানলাম।
কী ঘটনা?
রাশু হাসল, দুনিয়া বড় আজব জায়গা। মানুষ যে বলে দুনিয়া গোল, কথা সত্য। নাইলে আমারে চেনে না, জানে না, এমন একজন কেন আমার দোষের বোঝা টানব? আবার তার সঙ্গেই কেন এমন কইরা দেখা হইব আমার?
ঘটনা খুলে বল?
দোষ আমার, জানালা দিয়া গুলি করছি আমি, আর আপনেরা সেই দোষে এই লোকরে ধরার জন্য খুঁজতেছিলেন। বলে সামান্য থামল রাশু। তারপর বলল, গতকালই তার কাছ থিকা ঘটনা জানলাম আমি। সে তো আর জানে না যে আমিই সেই লোক যে ওই ঘটনা ঘটাইছে। হা হা হা। মানুষটা ভালো। শুধু শুধু তার জীবনটা আপনেরা তামা তামা কইরা দিলেন।
কে? অনিক?
জে।
আবছার আহমেদ কুঞ্চিত কপালে তাকিয়ে রইলেন। অনিক ওখানে গেল কী করে!
.
সেদিনই চাঞ্চল্যকর সব তথ্য পাওয়া গেল। বৈদ্যবেলঘরিয়ায় অভিযান চালাল পুলিশ। সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হলো মতিন মিয়াসহ আরও কয়েকজনকে। পুলিশ অল্প সময়ের মধ্যেই জামশেদের ঠিকানা বের করে ফেলল। তার বাসায় থাকা বিভিন্ন ডিভাইস থেকে নানান তথ্যও উদ্ধার করা হলো। সেই তথ্যের সূত্র ধরেই নাম উঠে এল নেহালের। উঠে এল এই পুরো প্রকল্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যুক্ততাও। বিষয়টা রীতিমতো হতভম্ব করে দিল আবছার আহমেদকে। তিনি নেহালের বিষয়টা জেনে স্তম্ভিত হয়ে রইলেন।
.
সেদিন একটু আগেভাগেই বাড়ি ফিরেছে নেহাল। হৃদি তখন বসে ছিল বারান্দায়। তার সাথে বসে ছিল তিথি। কিন্তু নেহালকে দেখেই পাগলের মতো ছুটতে আরম্ভ করল সে। তারপর উঠে গেল দোতলায়। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল হৃদি। নেহাল দরজায় আঘাত করল, দরজা খোলো। তাড়াতাড়ি খোলো।
আমি বাইরে যাই নি। হৃদি ভীত গলায় বলল।
দরজা খোল। তাড়াতাড়ি খোল। কুইক। এবার কঠিন হলো নেহালের গলা।
আমি সত্যি যাই নি।
ওহ্ গড! তুই দরজা খুলবি, না ভাঙব আমি? এবার চেঁচাল নেহাল।
হৃদি দরজা খুলল। তারপর প্রচণ্ড আতঙ্কে ছুটে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে মিশে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভেবেছিল নেহাল তাকে কিছু বলবে। ভয়ংকর কিছু। কিন্তু নেহাল তার দিকে ফিরেও তাকাল না। তার মুখ থমথমে। কপালে চিন্তার রেখা। প্রচণ্ড রাগে, ক্রোধে, হতাশায় কটমট করছে চোয়াল।
দেশে আসার আগের দিনই জামশেদকে ই-মেইল করেছিল সে। জামশেদ তার রিপ্লাইও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর আর যোগাযোগ হয় নি তাদের। সাবধানতাবশতই ফোন কলটা এড়িয়ে চলত নেহাল। তা ছাড়া এবার এসে ইচ্ছে করেই সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল সে। একটু সময় নিয়ে হৃদির পরিস্থিতিটা সামলে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় বৈদ্যবেলঘরিয়ার খবর কানে এসেছে তার। সেই খবর শোনার পর থেকে দিশেহারা হয়ে গেছে নেহাল। কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। ঝট করে একবার হৃদির দিকে তাকাল সে। যেন এই সবকিছুর জন্য সে-ই দায়ী। যেন সে না হলে এসব কিছুই হতো না। কিংবা হৃদির কারণেই বৈদ্যবেলঘরিয়ার ঘটনাটা এত দেরিতে জানতে পেরেছে সে। কিংবা অকারণেই তার সব রাগ গিয়ে পড়ল হৃদির ওপর। হৃদি অবশ্য কিছুই বুঝল না। সে তীব্র আতঙ্কে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। বলল, আমি আর যাব না। আর বাইরে যাব না আমি।
নেহাল অবশ্য তাকে কিছু বলল না। সে একটা ছোট্ট ব্যাগে ঝড়ের বেগে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঢোকাতে লাগল। তারপর অকস্মাৎ উঠে দাঁড়াল। হৃদি অবাক ও ভীত চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। নেহালের হঠাৎ কী যে হলো! সে তার হাতের কাছে যা কিছু পেল ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। যেন তার মাথায় উন্মাদনা ভর করেছে। আতঙ্কিত হৃদি থরথর করে কাঁপতে লাগল।
সেই কম্পিত হৃদিকে দেখেই যেন রাগে, ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল নেহাল। সে আচমকা হৃদির গলা টিপে ধরল। হৃদি চিৎকার করতে গিয়েও পারল না। তার মুখ থেকে একনাগাড়ে গোঁ গোঁ শব্দ বের হতে লাগল। কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে লাগল চোখ। ফুসফুসটা বাতাসের অভাবে হাঁসফাঁস করতে লাগল। তারপর হঠাই সে নেতিয়ে পড়ল নেহালের হাতের ওপর। নেহাল তার শরীরটা বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। উঠানে তার গাড়ি প্রস্তুত। সে এখন কোথায় যাবে। ইতিমধ্যেই মনস্থির করে ফেলেছে। কিন্তু ততক্ষণে উঠানে একটা পুলিশের গাড়ি এসে থেমেছে। আবছার আহমেদ সেই গাড়ি থেকে নামলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন মি. নেহাল?
৪৯
আবছার আহমেদ বললেন, কিছু মনে করবেন না, স্যার, বিষয়টা সিরিয়াস। এই জন্যই আপনাকে আবার বিরক্ত করছি।
মাহমুদ হাসান বললেন, জি।
আপনি কি অনিক নামে কাউকে চেনেন?
হ্যাঁ।
কীভাবে চেনেন?
সে আমার ছেলেকে পড়াত।
মানে হাউস টিউটর?
জি।
এর বাইরে তার সঙ্গে আপনার আর কোনো সম্পর্ক ছিল?
না।
আপনি কি জানতেন যে তাকে পুলিশ খুঁজছিল?
এই প্রশ্নে চুপ করে রইলেন মাহমুদ হাসান। আবছার বললেন, স্যার, চুপ করে থাকবেন না, প্লিজ। আপনি খুবই সম্মানিত একজন মানুষ। আমরা আপনার সঙ্গে অসম্মানজনক কোনো আচরণ করতে চাই না।
জি, জানতাম।
তারপরও আপনি তাকে কেন পালিয়ে থাকতে হেল্প করেছেন?
বিষয়টার জন্য আমি দুঃখিত। আসলে আমার স্ত্রীর ধারণা ছিল দোষটা অনিক করে নি। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। অনিক তখন ভয়াবহ মানসিক-আর্থিক দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ওর বাবা-মা দুজনই মারা গেলেন কিছুদিনের ব্যবধানে। চাকরিবাকরি, পড়াশোনা নিয়ে খুব স্ট্রাগল করছে। সব মিলিয়ে ওর ওই অবস্থা দেখে আমাদের সবারই একটু সিম্প্যাথি ছিল ওর ওপর। ফলে, আমার স্ত্রী যখন আমাকে খুব অনুরোধ করলেন যে আমি যেন তাকে একটা লুকিয়ে থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে দিই, তখন আর আমি না করতে পারি নি।
আপনার কি মনে হয় না কাজটা আপনি অন্যায় করেছেন?
আইনের দৃষ্টিতে তো অবশ্যই। বলে চুপ করে রইলেন মাহমুদ হাসান। তবে ও যে ও রকম একটা কাজ করতে পারে, সেটা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছিল না।
কিন্তু স্যার, সেটা তো আইন বিচার করবে। তাই না?
জি।
স্যার…। বলে থামলেন আবছার আহমেদ। তারপর বললেন, তবে এর চেয়েও একটা বড় অপরাধের অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে আছে।
আমার বিরুদ্ধে? বড় অপরাধের অভিযোগ? অবাক ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে বললেন মাহমুদ হাসান।
জি স্যার।
কী?
আপনি অনিককে কার কাছে পাঠিয়েছিলেন?
আমার বন্ধু জামশেদের কাছে।
জামশেদ আপনার কেমন বন্ধু?
আমরা ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে পড়েছি।
উনি কি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন? জার্মানিতে?
হুম।
দেশে উনি কী করতেন, আপনি জানতেন?
জানতাম। মানে ও আমাকে বলেছিল আরকি! মানিকগঞ্জের বা গাজীপুরের দিকে কী একটা মাছের খামার ছিল তার। সঙ্গে আরও নানান ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করার প্ল্যান ছিল।
আপনি কখনো গিয়েছিলেন সেখানে?
না। তবে ও অনেকবারই বলেছিল। কিন্তু যাব যাব করেও আর যাওয়া হয় নি।
তার মানে আপনি এখনো কিছুই জানেন না?
কী জানব! অবাক চোখে তাকালেন মাহমুদ।
ওখানে মাছের খামারের আড়ালে কী হতো?
মাহমদু হাসান ভ্রু কুঁচকে বললেন, মাছের খামারের আড়ালে কী হতো মানে কী?
তার মানে আপনি কিছু না জেনেশুনেই অনিককে ওখানে পাঠিয়েছিলেন?
আসলে জামশেদ অনেক দিন আগে আমাকে বলেছিল যে ওর একটা কর্মঠ, শিক্ষিত ছেলে দরকার, যাকে বিশ্বাস করা যায়। তো অনিকের সমস্যাটা শুনে আমার স্ত্রী যখন আমাকে খুব প্রেশার দিচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই ওর কথা মনে পড়ল আমার।
তারপর আপনি তাকে ফোন করে বললেন?
হা। কেন, কী হয়েছে, বলুন তো!
অনিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
আগের ঘটনায়?
না।
তাহলে?
আপনি আসলেই কিছু জানতেন না?
মাহমুদ অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
আবছার আহমেদ বললেন, আপনার বন্ধুর মাছের খামারের আড়ালে স্নেক ভেনম উৎপাদন, পাচার আর তা দিয়ে ড্রাগ ও মেডিসিন এক্সপেরিমেন্ট চলছিল।
কী বলছেন আপনি! চোখ বড় বড় করে তাকালেন মাহমুদ হাসান। বারবার মাথা নাড়তে লাগলেন তিনি।
কিছু মনে করবেন না, স্যার। আমরা স্যার একটু আপনার বাসাটা তল্লাশি করতে চাই। আজই। আমাদের কাছে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। আশা করছি আপনি আমাদের সহযোগিতা করবেন।
মাহমুদ হাসান সম্ভাব্য সকল উপায়েই তাদের সহযোগিতা করলেন। কিন্তু তার বাসায় কোথাও কিছু পাওয়া গেল না। বরং আবছার আহমেদ বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মাহমুদ হাসান হঠাৎ তার হাতখানা ধরে ফেললেন। তারপর প্রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, রিয়ার কোনো খবর কি পেলেন, অফিসার? মেয়েটা হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল? কী হলো তার?
চশমার আড়ালে ছলছল করছে মাহমুদের চোখ। তিনি হাত তুলে সেই চোখ আড়াল করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। তার হাত কাঁপছে। তিনি হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বললেন, মেয়েটা এত ভালো ছিল, অফিসার! চটপটে, কিন্তু মানুষ হিসেবে খুব ভালো। শিশুর মতো ভোলা মন। তবে অভিমানীও ছিল খুব। সারাক্ষণ শুধু ভাবত, ওর ওই দুরন্তপনার কারণে অন্যরা বুঝি ওকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করে। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে।
আবছার আহমেদ কী বলবেন ভেবে পেলেন না। তিনি আলতো করে তার। হাতখানা হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলেন। তারপর গাঢ় গলায় বললেন, সরি স্যার। কিন্তু আমরা চেষ্টার ত্রুটি রাখছি না।
.
সেদিনই সুমির বাবার বাসায় গেলেন আবছার আহমেদ। তিনি সুমিকে বললেন, আপনি আর আপনার হাজব্যান্ড দীর্ঘদিন থেকেই আলাদা থাকছেন, এই কথা কি সত্যি?
সত্যি।
আপনারা কি ডিভোর্স নিয়েছেন?
না।
তাহলে আলাদা কেন থাকছেন?
আশ্চর্য! আমরা কেন আলাদা থাকছি, সেটাও পুলিশকে বলতে হবে? এটা আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ইস্যু। অন্যের প্রাইভেসিকে আপনাদের সম্মান করা। উচিত।
সরি ম্যাডাম। আসলে আমরা অকারণে আপনার কাছে আসি নি। প্রয়োজনেই এসেছি।
কী প্রয়োজন?
আপনি রিয়াকে নিশ্চয়ই চিনতেন?
জি।
রিয়া নিখোঁজ। আপনি সম্ভবত পত্রপত্রিকা পড়েন না। এই জন্য জানেন না।
ওহ্! অস্ফুটে বলল সুমি। কবে থেকে?
বেশ কয়েক মাস। নিখোঁজের আগে তার নাকে-মুখে আঘাতের চিহ্নও ছিল।
এই কথায় সতর্ক হয়ে গেল সুমি। শেষ দিন রিয়াকে করা তার আঘাতের কথা চট করে মনে পড়ে গেল তার। এখন রিয়া যদি সেই ঘটনার পরপরই নিখোঁজ হয়ে গিয়ে থাকে, তবে বিষয়টার দায়ভার তার দিকেও আসতে পারে। সে সাবধানী ভঙ্গিতে বলল, কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক?
সম্পর্ক যে আছেই, তা নয়। তবে কিছু ফিসফাস আমরা শুনতে পেয়েছি।
কী ফিসফাস?
আপনার হাজব্যান্ডের সঙ্গে রিয়ার একটা ভালো সম্পর্ক ছিল। আর তার জের ধরেই আপনাদের আলাদা থাকা?
সুমি ততক্ষণে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে। সে বলল, মাহমুদের সঙ্গে কেবল তার ডিপার্টমেন্টেরই না, অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের অনেক স্টুডেন্টের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক। এটা আলাদা কিছু না। সে যতটা সম্ভব নিজেদের নিরাপদ রেখেই কথাটা বলল। নিজেকে কিছুতেই এই ঘটনার সঙ্গে জড়াতে চায় না সে। আর নিজেকে নিরাপদ রাখতে হলে রিয়ার ঘটনাটা কিছুতেই সামনে আনা যাবে না।
আবছার আহমেদ বললেন, কিন্তু রিয়া নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন আগেও সে আপনাদের বাসায় গিয়েছিল।
আমাদের বাসায় মাহমুদের বন্ধু, কলিগ, স্টুডেন্টরা রোজই আসে। তো এই জন্য তাদের কেউ নিখোঁজ হলে তার দায়ভার আমাদের?
তা না। বলে থামলেন আবছার আহমেদ। আর কথা বাড়ালেন না তিনি। তবে অনেক দিন পর সুমি মাহমুদকে হঠাৎ ফোন করল। বলল দেখা করতে চায় সে। তারা দেখা করল সেই দিনই। মাহমুদের কাছ থেকে ঘটনা সব শুনল সুমি। শুনে সে-ও হতভম্ব হয়ে গেল, মেয়েটা তাহলে কোথায় গেল?
বুঝতে পারছি না। হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেল সে।
ওই দিনের ঘটনায় রাগ বা অভিমান করে কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে নি তো?
কী দুর্ঘটনা?
ধরো সুইসাইড-টুইসাইড?
তাহলে লাশটা তো অন্তত পাওয়া যেত?
হুম। তা-ও কথা। কিন্তু তাহলে মেয়েটি গেল কোথায়?
বুঝতে পারছি না আমি। মাহমুদ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন। নিজের ভেতরে কী চলছে, তা তিনি সুমিকে বুঝতে দিতে চান না।
সুমি চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, তাহলে গেল কোথায় মেয়েটা? এমন কি হতে পারে যে কোনো ব্রিজট্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়ে সুইসাইড করল? লাশ ভেসে গেল নদীতে। এমনও তো হতে পারে। পারে না? আজকালকার ছেলেমেয়েরা কিছু হলেই সুইসাইড করে!
মাহমুদ কথা বললেন না। চুপ করে রইলেন। সুমি বলল, তোমার খুব মন খারাপ, না?
মাহমুদ বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন, না না।
তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তুমি খুব আপসেট। মানুষ সবকিছু লুকাতে পারে না, বুঝলে?
হুম। তুমি এখন কী করবে ভাবছ? জিজ্ঞেস করল মাহমুদ।
কিছু করব না। তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি বলে ভেবো না আমি সব ভুলে গেছি। কিছু ভুলি নি আমি। আমি জাস্ট এসেছি নিজেকে সেভ করতে। তুমি কাইন্ডলি রিয়ার সঙ্গে আমার ইনসিডেন্টের কথা পুলিশকে বোলো না।
বলব না। মলিন গলায় বললেন মাহমুদ। তুমি তাহলে ফিরবেই না?
না। আমি কিছুদিনের মধ্যেই ডিভোর্সের ফাইল রেডি করছি।
মাহমুদ কথা বললেন না। তার বুকটা হঠাৎ ভার লাগতে লাগল। তিনি আচমকা বললেন, আমি সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে কোথাও চলে যাব, সুমি। এমন কোথাও, যেখানে কেউ আমাকে চেনে না। একা।
যাও। তবে তুমি একা কোথাও থাকতে পারবে না। তোমার নিত্যনতুন নারীসঙ্গ দরকার। বলে ভ্রুকুটি করল সুমি।
মাহমুদ অবশ্য সেটা গায়ে মাখলেন না। তিনি বললেন, দিন শেষে ওই বাসাটাতেও আমার আর ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। তোমার ডিজাইন অনুযায়ী সাজানোর কাজও চলছিল। কিন্তু আমি পরে ওটা অর্ধসমাপ্ত অবস্থাতেই বন্ধ করে রেখেছি।
কেন?
তুমি যেখানে নেই, সেখানে অত আয়োজনও দরকার নেই আমার।
সুমি কথা বলল না। সে তার সিদ্ধান্তে অটল। মাহমুদ বললেন, ভাবছি বাইরে কোথাও চলে যাব।
আর তোমার ফ্ল্যাট?
জানি না। ও রকমই তালাবদ্ধ থাকবে। শূন্য ঘর। শূন্য মানুষ। অথবা বিক্রিও করে দিতে পারি। কী হবে রেখে?
সুমি জবাব দিল না। উঠে দাঁড়াল আচমকা।
৫০. আইনি বাধ্যবাধকতা
অনিককে এখন যেকোনো মুহূর্তে ছেড়ে দিতে পারে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে আদতে শক্ত কোনো অভিযোগ নেই। তারপরও কিছু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ছাড়া পায় নি সে। তার সঙ্গে একদিন দেখা করেছিল তিথি। কিন্তু সেদিন ভিড়ের মধ্যে ঠিকঠাক কথা বলতে পারে নি। কেবল নেহাল আর হৃদির অবস্থা জানিয়েছিল সে। অনিক অবশ্য কিছু বলে নি। চুপচাপ শুনেছে। আজ বেশ কিছুদিন পর আবার দেখা করতে এল তিথি। আবছার আহমেদ তাদের একটু আলাদা কথা বলার ব্যবস্থা করে দিলেন। তিথি বলল, কেমন আছ?
ভালো।
রোগা হয়ে গেছ অনেক।
অনিক হাসল, বল স্লিম হয়ে গেছি।
চোখের কোণে কালি পড়ে গেছে।
ছেলেবেলায় মা কত কাজল দিয়ে দিতেন!
তুমি তো মেয়ে নও!
মার শখ ছিল বলে তখন তা-ই ছিলাম।
এখান থেকে ছাড়া পেয়ে কী করবে?
বাড়ি চলে যাব।
ঢাকায় আর ফিরবে না?
না।
কী করবে বাড়ি গিয়ে?
মা আর বাবার কবরের পাশে বসে থাকব।
তারপর?
তারপর বেঁচে থাকতে শুরু করব।
কবরের পাশ থেকে বেঁচে থাকতে শুরু করবে?
হুম।
কেন?
কারণ, কবরই মানুষকে বাঁচতে শেখায়।
কীভাবে?
মৃত্যু ছাড়া জীবন তো মিনিংলেসই, তাই না? কবর ওটা অনুভব করায়।
তিথি কথা বলল না। অনিক বলল, মানুষ যত দিন বাঁচে, তত দিন তো সে ওই মাটিটুকুকে বঞ্চিত করেই বাঁচে। আর বাঁচে মৃত্যুকে মেরে।
কথাটা কানে গেঁথে রইল তিথির। সে বলল, তোমার কষ্ট হয় না?
কিসের কষ্ট?
এই যে এত এত কিছু হয়ে গেল?
কী হলো?
এত মানুষ তোমায় ঠকাল? ইনজাস্টিস করল।
অনিক কথা বলে না।
আপুর ওপর খুব রাগ হয় তোমার, না? কিংবা অন্যদের ওপর? যারা তোমায় এমন ভেঙেচুরে এলোমেলো করে দিল?
অনিক ম্লান হাসল, আগে হতো।
এখন হয় না?
নাহ্।
কেন?
কারণ, আজকাল সারাক্ষণ মনে মনে একটা মন্ত্র জপি আমি।
কী মন্ত্র?
একটা কবিতা।
কবিতা কখনো মন্ত্র হয়?
কবিতাই মন্ত্র হয়।
শোনাবে?
অনিক খানিক চুপ করে রইল। তারপর আচমকা চোখ বন্ধ করে গাঢ় গলায় পড়তে লাগল–
একটা দুঃসংবাদ আছে–
যারা আমাকে ভেঙেচুরে টুকরো কাঁচের মতো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, তাদের জন্য।
দুঃসংবাদটি তাদের জন্যও, যারা ভেবেছিলে–
আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে আর কখনো উঠে দাঁড়াতে পারব না।
মুখ থুবড়ে পড়ে থাকব গা-ঘিনঘিনে কাদায়।
আমাকে ছিঁড়ে কাগজের মতো কুচিকুচি করে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলে–
আমি হারিয়ে যাব দিকশূন্যপুর।
যে আমাকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে দিতে চেয়েছিল অতলান্তিক বিষাদ সমুদ্রে,
ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিল এক পৃথিবী বিবমিষায়।
যে আমাকে অযুত রাতের কান্না লিখে দিয়ে বুকের ভেতর–
খুঁড়ে দিতে চেয়েছিল শেওলা জমা স্যাঁতসেঁতে এক মজা পুকুর।
যে আমাকে দুঃখ দিয়ে, পুড়িয়ে শেষে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলে ছাইয়ের মতন,
তাদের জন্য দুঃসংবাদ।
আমি এখন পাখির মতন, আমায় ছিঁড়ে কুচিকুচি ভাসিয়ে দিলে–
এখন আমি ডানা মেলে আকাশজুড়ে উড়তে জানি।
কাটা যায় না, ভাঙা যায় না, আমি এখন জলের মতন–
ভেসে যেতে যেতেও হঠাৎ জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দিতে আমিও জানি।
আমিও জানি ছড়িয়ে থাকা টুকরো কাঁচের শরীর থেকে, দুফলা এক ছুরি হতে।
এই যে মানুষ দুঃখ দিতে দক্ষ ভীষণ, সে-ও জানুক আমি এখন হাসতে জানি,
শেওলা জমা পুকুরজুড়ে আমিও এখন রোদের মতো ভাসতে জানি,
প্রস্থানের গল্প লিখেও ইচ্ছে হলেই আবার ফিরে আসতে জানি।
আমি এখন পুড়ে যাওয়া ছাইয়ের ভেতর জেগে ওঠা ফিনিক্স পাখি–
আমি এখন মৃত্যু মেরে বাঁচতে জানি।
অনিক থামলেও তিথি কথা বলল না। তবে সে আবিষ্কার করল, অনিকের চোখের কোনায় যেন টুপ করে এক ফোঁটা জল এসে জমা হয়েছে। সে বলল, তুমি হৃদি আপুকে খুব ঘৃণা করো, তাই না?
অনিক জবাব দিল না। তিথি বলল, একটা সত্যি কথা বলবে?
কী?
এই যে হৃদি আপুর জীবনটা এমন হয়ে গেল, নেহাল ভাই এমন ভয়ানক জঘন্য এক মানুষ–এসব শুনে তুমি খুব খুশি হয়েছ, তাই না?
অনিক জবাব দিল না। তিথি বলল, সেটাই তো স্বাভাবিক। আমি হলেও তা-ই হতাম।
অনিক এবারও চুপ। তিথিও। যেন সে অনিকের বুকে জমে থাকা ক্ষত ও ক্রোধের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছে। দীর্ঘ সময় নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে রইল সে। আচ্ছা, এই মানুষটা কি জানে এই জীবনে কী আশ্চর্য মায়াময় এক অনুভব সে তার জন্য বয়ে বেড়ায়? মাঝে মাঝে একাকী নিঃশব্দ রাত্রিতে চরাচর ভাসিয়ে নেওয়া হাহাকার বুক ওলট-পালট করে ফেলে! জীবন এমন কেন?
এখানে ভুল মানুষের জন্য ভুল সময়ে কেন ভালোবাসা জেগে ওঠে? হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠার এই জটিল সমীকরণের অর্থ তিথি জানে না।
তবে এত কিছুর পরও সে চায় অনিক হৃদি আপুর পাশে গিয়ে একটু দাঁড়াক। একমুহূর্তের জন্য হলেও তার সঙ্গে কথা বলুক। আলতো করে হাত রাখুক তার মাথায়। সে খুব চায়, এমন কিছু ঘটুক।
আচ্ছা, যদি সত্যি সত্যি কখনো এমন হয়, তাহলে হৃদি আপু তখন কী করবে?
ওই দৃশ্যটা খুব দেখতে ইচ্ছে করে তিথির। কিন্তু সে এ-ও জানে, এর চেয়ে অন্যায় কোনো ইচ্ছে আর হয় না। যে মানুষটা অমন অকপটে, অমন জঘন্য নিষ্ঠুরতায় তাকে ছুঁড়ে ফেলে রেখে গেছে, দিয়ে গেছে এক দুঃসহ যন্ত্রণার জীবন, তার কাছে এমন কিছু সে কী করে চাইবে? সেই সাধ্য তার নেই। হয়তো নেই কারোরই। তিথি তারপরও বলে, তুমি কি একটা কথা জানো?
অনিক তাকায়।
হৃদি আপু একদিন সুযোগ পেয়ে বার্লিন থেকে ফোন করে হাউমাউ করে কেঁদেছিল।
অনিক কথা বলে না। তিথি বলল, সে কী বলেছিল, জানো?
অনিক জানতে চায় না। হৃদিই বলে, বলেছিল, এই জীবনে অন্তত একবারের জন্য হলেও সে তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। একমুহূর্তের জন্য তোমার পায়ের কাছে। চুপচাপ বসে থাকতে চায় তার আগে মরতে চায় না সে।
অনিক বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে বলে, তিথি?
হুম।
আজ তাহলে যা?
তিথি জবাব দেয় না। অনিক বলে, পৃথিবীতে মানুষ সবচেয়ে বেশি কী ভালোবাসে, জানিস?
কী?
নিজেকে।
কিন্তু তুমি তখন হৃদি আপুকে তোমার নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে। তাই না?
অনিক জবাব দিল না। তিথি বলল, আর এখন?
অনিক এবারও কথা বলল না। তিথিই বলল, এখন তুমি নিজেকে ভালোবাসতে শিখে গেছ। সবচেয়ে বেশি। তাই তো?
অনিক হাসল। এবারও কথা বলল না সে।
৫১
মঈনদের বাড়ি থেকে একটা দুঃসংবাদ এসেছে। কিন্তু সেই দুঃসংবাদের খবর কেউ কাউকে বলতে চাইছে না। বরং সকলেই একে অন্যের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখছে। কানে কানে ফিসফাস করছে। মঈনের মামলা নিয়ে তার মা, খালা, মামারা দিনভর দৌড়ঝাঁপ করছেন। কিন্তু গ্রামের বাড়িতে কেউ নেই বলে তার বাবাকে প্রায়ই বাড়ি যেতে হচ্ছে। সেখানে তার স্কুল, ছাত্রছাত্রী, জমিজমা আছে। হাঁস-মুরগিসহ নানান। গবাদিপশু আছে। ফলে তিনি একনাগাড়ে বেশি দিন ঢাকায় থাকতে পারেন না। ছোটাছুটির মধ্যে আছেন।
তার এই ছোটাছুটির মধ্যেই ঘটনাটা প্রথম কানে এসেছে মঈনের মামার। তিনি সেই খবর বলেছেন তার ছোট বোনকে। তার ছোট বোন বলেছেন মঈনের মাকে। সেই থেকে তিনি কাঁদছেন। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছেন না। এদিকে মঈনের মামলার কোনো কিছুই হচ্ছে না। যেন একটা জায়গায় এসে থেমে আছে।
অবন্তী মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। কিন্তু তাদের কথা হয় খুব অল্প। বেশির ভাগ সময়ই তারা কেবল পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মঈনের মুখ শুকিয়ে। এতটুকু হয়ে গেছে। আগের সেই ডাকাবুকো মানুষটা আর নেই। এ যেন তার ছায়া। তবে সেই ছায়াজুড়ে আশ্চর্য এক মায়ার বসতি টের পায় অবন্তী।
ওই মায়াটুকু শিশিরের শীতল স্পর্শের মতো লেপ্টে থাকে বুকে। রাতভর ঘুমাতে পারে না সে। জেগে থাকে একা একা। আর মঈনের জন্য তার মন কেমন করে। বুকের ভেতর আশ্চর্য এক হাহাকার বয়ে যায়। কিন্তু তার জন্য কী করবে সে?
মঈন যদি সত্যি সত্যি ছাড়া পায়, তবে আর একমুহূর্তও দেরি করবে না সে। পেছনের সবকিছু ভুলে যাবে। অবন্তী জানে, কিছু ক্ষত কখনোই ভোলা যায় না। এর উপশমও নেই। ফলে জীবনভর তা বয়ে বেড়াতে হয়। হয়তো সে-ও বেড়াবে। কিন্তু তার কারণে যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগটা পোহাতে হলো মঈনকে, যে শাস্তিটা ভোগ করল সে, তা তার প্রাপ্য নয়। ফলে মঈনের এই অভাবিত যন্ত্রণা আর দুঃস্বপ্নের জীবন থেকে মুক্তির জন্য হলেও নিজের ওই ক্ষতটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা সে করবে।
.
জীবন কেমন মেঘলা দিনের মতো। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া। সেই হাওয়ায় চারপাশ ভেঙেচুরে একাকার। সঁতসেঁতে শেওলা জমা মনের উঠোন। সেখানে জল জমে ভার হয়ে থাকে দুপুর, রাত্রি, সকাল-সন্ধ্যা। যেন কান্না ছাড়া কোথাও কিছু নেই। হাসি নেই, আনন্দ নেই, রোদ কিংবা মন ভালো করে দেওয়া বসন্তবাতাস নেই। সবকিছু হঠাৎ কেন এমন হয়ে গেল?
গত কয়েক মাসে রিয়ার জন্যও কম কাঁদে নি অবন্তী। দিনের পর দিন কেঁদেছে। অমন একটা জলজ্যান্ত, হাসিখুশি মানুষ কী করে এমন উধাও হয়ে গেল? কী হয়েছে তার? সে কি বেঁচে আছে? অবন্তী এখনো নিয়ম করে রিয়ার বন্ধ ফোনে ফোন করে। তারপর কানে চেপে ধরে রাখে। তার কেন যেন মনে হয়, রিয়া হঠাৎ কথা বলে উঠবে। ফোন ধরে বলবে, কী রে মিয়াও, কেমন ভয় দেখালাম?
তখন কী করবে সে? কেঁদেই ফেলবে। তারপর ইচ্ছেমতো বকাঝকা করবে। হাওয়া উড়ে ছুটে যাবে দেখা করতে। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবে। তা সে রাস্তা হোক, মাঠ কিংবা শপিং মল। তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদবে, হাসবে। তারপর আবার কাঁদবে। যা ইচ্ছে তা-ই করবে তারা। অবন্তীর হঠাৎ কান্না পেয়ে গেল। চোখের কোল গড়িয়ে নেমে আসতে থাকল জলের ধারা। আচ্ছা, রিয়া কি বেঁচে আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না।
তবে তার পরদিন বিস্ময়কর এক ঘটনা ঘটল। আবছার আহমেদ ফোন করলেন অবন্তীকে। তারপর উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, আপনি এখুনি একটু আমার অফিসে আসুন।
এখুনি?
হুম।
বিকেলে আসি?
নাহ্। এখুনি মানে এখুনি।
অবন্তী কিছুই বুঝতে পারল না। সে বলল, আচ্ছা।
শুনুন। আসার সময় আপনার চিঠিগুলো সঙ্গে নিয়ে আসবেন।
অবন্তী কিছুই বুঝল না। তবে সে থানায় গেল। আবছার আহমেদ গম্ভীর মুখে বসে আছেন। কিন্তু তার চোখ চকচক করছে। যেন অভাবিত কোনো সম্ভাবনার আলো দেখতে পেয়েছেন তিনি। তার সামনে টেবিলে ছড়ানো-ছিটানো অনেক কাগজপত্র। অবন্তী বসতেই তিনি বললেন, একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।
কী অদ্ভুত ঘটনা।
বলছি। তার আগে দেখুন তো এই হাতের লেখাটা আপনি চেনেন কি না?
বলে অবন্তীর দিকে একটা রাইটিং প্যাড এগিয়ে দিলেন আবছার আহমেদ। অবন্তী রাইটিং প্যাডটা হাতে নিয়ে দীর্ঘ সময় বসে রইল। বোঝার চেষ্টা করল ঘটনা। প্যাডে জেলপেনে কেউ এলোমেলো কাটাকুটি করেছে। অর্থহীন আলপনা, ছবি। তবে সেসবের মধ্য থেকেও কয়েকটি শব্দ স্পষ্ট হয়ে আছে। শব্দগুলো পরখ করে দেখল অবন্তী। তারপর বলল, আপনি বলছেন যে আমাকে চিঠি লিখত, এটা তারই হাতের লেখা?
আপনার কী মনে হয়?
বুঝতে পারছি না। একবার মনে হয় এক, আরেকবার মনে হয় কোথাও না কোথাও একটু পার্থক্য আছে।
ধরেন আপনি যখন আনমনে, কোনো কিছু না ভেবে কোথাও কিছু লেখেন, তখন সেটার সঙ্গে কি আপনার খুব যত্ন করে লেখা কোনো কিছুর একটু পার্থক্যও থাকবে না?
তা থাকবে। বলে আবার লেখাটা দেখল অবন্তী। তারপর বলল, তার মানে এই প্যাডে উনি আনমনে কাটাকুটি করে কিছু লিখছিলেন?
হুম।
কে উনি?
ওয়েট। তার আগে আপনার সন্দেহ পুরোপুরি দূর করি। নিন, এই দেখুন।
বলে অবন্তীর হাতে কখানা কাগজ এগিয়ে দিলেন আবছার আহমেদ। অবন্তী কাগজগুলো হাতে নিয়ে চমকে উঠল। হুবহু সেই এক হাতের লেখা। একই আকার, অক্ষরের আদল। একই কাগজ এবং সেই একই রকম চোখ নিয়ে কবিতা। সে ঝট করে। আবছার আহমেদের দিকে তাকাল, এগুলো কোথায় পেলেন?
আবছার আহমেদ সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিলেন না। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে হাসলেন। তারপর হাসতে হাসতেই বললেন, প্রথম থেকেই কিছু একটা সন্দেহ। হচ্ছিল আমার। কিন্তু ভদ্রলোককে কিছুতেই বাগে পাচ্ছিলাম না আমি। যেন আগে থেকেই সব নিখুঁত প্ল্যান করে রাখা। কোন প্রশ্নে কোন উত্তর দেবেন, কীভাবে সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত থেকেও আবার নিজেকে বিচ্ছিন্ন দেখাবেন!
আপনি আগে ঘটনা বলুন, প্লিজ। অবন্তী অধৈর্য হয়ে উঠল। কে এই লোক?
আবছার আহমেদ আবারও হাসলেন। পরিমিত হাসি। তারপর বললেন, প্রফেসর ড. মাহমুদ হাসান!
হোয়াট! বসা থেকে প্রায় উঠে দাঁড়াল অবন্তী। কী বলছেন আপনি? উনি কেন আমাকে বেনামে চিঠি পাঠাবেন?
কারণ, আপনাকে তার পছন্দ।
আমাকে! রিয়ার সঙ্গে প্রফেসরের সম্পর্কটা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল অবন্তী। এই মুহূর্তে আর কোনো জটিলতা তৈরি করতে চায় না সে।
হুম। মানে উনি সম্ভবত আপনার চোখের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন।
কী বলছেন আপনি?
আবছার আহমেদ হাসলেন, মানুষের মন বড় বিচিত্র। আমরা তো কেবল তার বাইরেটাই দেখতে পাই। ভেতরটা থাকে আড়ালে। ফলে সেখানে কার কী আছে, সেটা কেবল সে নিজেই জানে। তাই না?
তাই বলে উনি আমাকে চিঠি…! কথাটা কিছুতেই হজম করতে পারছে না। অবন্তী।
এর আগেও তিনি বিচিত্র সব কাজ করেছেন। তবে সেসব বেশির ভাগই ছাত্রছাত্রীরা উপভোগ করত বলে কেউ কিছু বলে নি। বিশেষ করে ছাত্রীরা। তারা তাদের সাথে ঘটা কোনো ঘটনা কখনোই বলত না। বরং খুশিই হতো। কারণ, মাহমুদ হাসান মানুষ হিসেবে আরাধ্য। অন্যকে আকর্ষণ করার প্রচণ্ড ক্ষমতা তার রয়েছে। ফলে তিনি কাউকে আলাদা করে গুরুত্ব দিলে তার নিজেকে স্পেশাল ভাবার যথাযথ কারণ আছে।
অবন্তীর এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। সে বলল, আপনি এগুলো কোথায় পেয়েছেন?
আমি তার অফিসে গিয়েছিলাম তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। সম্ভবত তখন নোট নিতে গিয়ে ভুলে তার টেবিল থেকেই প্যাডটা নিয়ে এসেছিলাম। অফিসে ফিরে প্যাডের এই এলোমেলো লেখাগুলো দেখে তখনই কী যেন একটা খচখচ করছিল মাথায়। কিন্তু ধরতে পারছিলাম না। পরে একদিন তার বাসায় তল্লাশির সময় আমরা তার অজান্তেই কিছু কাগজপত্র, ফাইল নিয়ে এসেছিলাম। তার মধ্য থেকে অনেক ফাইলই গত মাসখানেক ধরে আমরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। কিন্তু কোথাও সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় নি। আমরা খুঁজছিলাম জামশেদের সাথে তার সম্পৃক্ততা। কিন্তু পাই নি। আজ হঠাত্র একটি ফাইলের ভেতর এই চিঠিগুলো পাই আমি। উনি সম্ভবত একসঙ্গে অনেকগুলো চিঠি লিখে রাখতেন। তো এগুলো থেকে কিছু পোস্ট করা হয়েছিল, আর কিছু নানা কারণেই পাঠানো হয় নি।
কিন্তু একটা কথা। আমি কিন্তু রিয়ার কাছে ওনার হাতে লেখা লেকচার শিট দেখেছি। এমনকি দুয়েক দিন দুষ্টুমি করে ওদের ক্লাসেও বসেছি। সেখানেও বোর্ডে ওনাকে সরাসরি লিখতে দেখেছি আমি। সেই হাতের লেখা আর এই হাতের লেখা কিন্তু এক নয়।
আবছার আহমেদ হাসলেন। বললেন, আপনার কি মনে হয় যে উনি অতটাই বোকা?
কতটা?
যতটা বোকা হলে সবার সামনে যেভাবে লেখেন, ঠিক সেভাবেই আবার উনি কাউকে গোপনে চিঠি লিখবেন?
তাহলে?
অ্যাম্বিডেক্সটারিটি–এই টার্মটার কথা শুনেছেন? বললেন আবছার আহমেদ।
না। মাথা নাড়ল অবন্তী।
Ambidexterity হলো একই সঙ্গে দুই হাতে কাজ করার ক্ষমতা। পৃথিবীতে শতকরা মাত্র এক ভাগ মানুষের এই ক্ষমতা রয়েছে। যারা দুই হাতেই সমান কাজ করতে পারে। লিখতে পারে।
তার মানে উনি দুই হাতেই লিখতে পারতেন?
হুম। কারণ, উনি ক্লাসে লিখতেন ডান হাতে। অথচ সেই দিন প্যাডে উনি বা হাতে লিখছিলেন। যেহেতু কাজটা করার সময় উনি আনমাইন্ডফুল ছিলেন, সেহেতু খেয়াল করেন নি। আমার ধারণা, উনি আপনাকে চিঠিও লিখেছেন বাঁ হাতেই।
কিন্তু উনি যদি নিজেকে লুকিয়েই চিঠি লিখতে চাইতেন, তাহলে তো টাইপ করেই লিখতে পারতেন?
তাহলে সেটা কি খুব ইউনিক কিছু হতো? হাতে লেখা অটোগ্রাফ বা চিঠির যে আবেদন, তা কি কম্পিউটারে টাইপ করা চিঠির আছে?
না। তা নেই।
এটা একটা কারণ। আরেকটা কারণ যে উনি জানতেন উনি খুব বিরল মানুষদের একজন। মেধাবীও। ফলে বিষয়টা উনি নানাভাবে উপভোগ করতে চাইতেন। আপনি কি জানেন, দুই হাতে লিখতে পারা বিরল এই মানুষদের যে তালিকা পৃথিবীতে আছে, তাতে কার কার নাম আছে?
কার কার?
আলবার্ট আইনস্টাইন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, নিকোলা তেসলা, লেওনার্দো দা ভিঞ্চি!
ওহ্ গড!
হুম। হতে পারে এ কারণেই ওভাবে চিঠি লেখার প্রতি একটা ফ্যাসিনেশন ওনার ছিল।
কিন্তু এখন আপনারা তাহলে কী করবেন? মানে এটার সঙ্গে কি অন্য কিছুর কোনো যোগসূত্র আছে মনে হচ্ছে?
আমি জানি না। তবে আজ একবার ওনার সঙ্গে দেখা করতে চাই আমি। দুপুরে ওনার বাসায় যাব।
.
দুপুরে মাহমুদ হাসানের বাসায় গিয়ে থমকে গেলেন আবছার আহমেদ। মাহমুদ হাসানের বাসার দরজায় বিশাল তালা মারা। ফোনও বন্ধ। বিষয়টাতে ভারি অবাক হলেন তিনি। তবে তার চমকে যাওয়া আরও বাকি ছিল। তিনি মাহমুদ হাসানের বিভাগে খোঁজ নিতে গিয়ে শোনেন, তিনি দেশে নেই। মাসখানেকের ছুটি নিয়ে প্যারিসে গেছেন। তবে সেখানে গিয়েই আরও দীর্ঘ ছুটির জন্য আবেদন করেছেন তিনি। অর্থাৎ খুব শিগগির আর দেশে ফেরার পরিকল্পনা তার নেই।
এই ঘটনায় থমকে গেলেন আবছার আহমেদ। তার হঠাই মনে হলো, তিনি বড়সড় কোনো ভুল করেছেন। কিন্তু এই ভুল শোধরানোর সুযোগ আর তার নেই। এ জন্যই মানুষ বলে, চোখের সবচেয়ে কাছে থাকা জিনিসটাই আমরা লক্ষ করি না। এড়িয়ে যাই। আমরা দেখতে চাই দূরের জিনিস। মাহমুদ হাসানের ক্ষেত্রেও কি তারা এমন কোনো ভুলই করেছেন?
বিষয়টা স্বাভাবিক মনে হলো না আবছার আহমেদের। তার সেই অস্বাভাবিকতার অনুভূতি আরও ঘনীভূত হলো যখন তিনি শুনলেন যে যাওয়ার আগে নিজের ফ্ল্যাটটাও বিক্রি করে দিয়ে গেছেন মাহমুদ হাসান!
.
নেহাল মুখ খুলল এক মাস তেরো দিনের মাথায়। আবছার আহমেদ বললেন, জামশেদের সঙ্গে আপনার পরিচয় ফ্যাঙ্কফুর্টে?
এই কথা আমি আপনাদের এই নিয়ে নব্বইবার বলেছি।
প্রয়োজন হলে আরও এক হাজার নব্বইবার বলবেন। ক্লিয়ার?
নেহাল জবাব দিল না। আবছার আহমেদ বললেন, একটা বিষয় খুব ইন্টারেস্টিং।
কী?
এই এত দিনেও আপনি কেন একটা নাম কিছুতেই আমাদের বলেন নি?
কী নাম?
আপনিই বলুন কী নাম?
আমি যা জানি, সবই আপনাদের বলেছি।
ফাঙ্কফুর্ট ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সে আপনার আরও একজন বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল।
আর কারও সঙ্গে আমার পরিচয় হয় নি।
আবছার আহমেদ বললেন, মূলত জামশেদই আপনাকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। অ্যাকচুয়ালি হি ওয়াজ দ্য মাস্টারমাইন্ড অব অল দিজ থিংস। আমি ফ্রাঙ্কফুর্টের ওই ইউনিভার্সিটিতেও খোঁজ নিয়েছি। আপনি তার সঙ্গে কিছুদিন রিসার্চ অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে কাজও করেছেন।
এই কথায় চুপ করে গেল নেহাল। আবছার আহমেদ বললেন, নামটা আপনিই বলুন এবং বলুন যে এত কিছুর পরও ওই নামটা কেন কোথাও নেই?
নেহাল সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না। বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, প্রফেসর মাহমুদ হাসানের একটা শর্ত ছিল।
কী?
পুরো কাজে তার সঙ্গে কখনো কোনো যোগাযোগ করা যাবে না। তার নাম ব্যবহার করা যাবে না। বিনিময়ে তিনি আমাদের তার পুরো প্ল্যান আর এ-সংক্রান্ত তার রিসার্চ ফাইন্ডিংস শেয়ার করবেন।
কেন?
উনি খুব অ্যাম্বিশিয়াস। কিন্তু নিজে ইনভলভড হতে চান নি।
টাকাপয়সাতেও না?
না। উনি জাস্ট নতুন কিছুর অ্যাডপটেশন নিয়েই এক্সাইটেড ছিলেন।
আপনি কি জানেন যে তিনি দেশে নেই?
এখন জানি।
কীভাবে? অবাক গলায় বলল নেহাল।
এমনই প্ল্যান ছিল।
কী?
আমরা কেউ একজন ধরা পড়লে অন্যদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। সেই পর্যন্ত মুখ বন্ধ রাখতে হবে।
৫২
হৃদি বসে আছে ছাদে। খানিক আগেই তাকে গোসল করিয়ে দিয়েছেন রোখসানা বেগম। বিকেলের তেরছা মোলায়েম একটা রোদের আলো এসে পড়েছে তার পায়ের। ওপর। সে সেই আলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। রোখসানা বেগম বললেন, এখন একটু ভালো লাগছে, মা?
হৃদি জবাব দিল না। রোখসানা বেগম বললেন, ঘুম পাচ্ছে?
হৃদি মাথা নাড়াল। তার ঘুম পাচ্ছে না।
এখন তাহলে কী করবি? এখানে বসে থাকবি?
হুম।
আমি চলে যাব?
না।
তোর এখনো ভয় করছে?
হুম।
আমার সঙ্গে ঘুমাতে তোর খারাপ লাগে?
না।
তোর মাথায় বিলি কেটে দেব?
হুঁ।
রোখসানা বেগম হৃদির চুলে বিলি কেটে দিতে লাগলেন। হৃদি হঠাৎ মাকে ডাকল, মা।
রোখসানা বেগমের মনে হলো, তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠেছে। তিনি বললেন, কী মা? কী হয়েছে?
হৃদি কথা বলল না। তার শরীর শক্ত হয়ে গেছে। তবে সে হাত বাড়িয়ে কিছু একটা দেখাল। রোখসানা বেগম তাকিয়েও কিছু বুঝতে পারলেন না। তিনি ঘুরে হৃদির সামনে এসে বসলেন। তারপর বললেন, কী হয়েছে? তুই এমন করছিস কেন?
হৃদি ততক্ষণে কাঁপতে শুরু করেছে। ভয়ে তার দুচোখ প্রায় কোটর থেকে বেরিয়ে। আসছে। মুখের এক পাশ দিয়ে লালার মতো বের হচ্ছে। রোখসানা বেগম আতঙ্কিত গলায় বললেন, কী হয়েছে, মা? মা রে, কী হয়েছে তোর?
হৃদি তার আঙুল তুলে কিছু একটা দেখাতেই লাগল। আর গোঁ গোঁ শব্দ করতে লাগল। রোখসানা বেগম যেন হঠাই মানুষটাকে দেখলেন। গেটের বাইরে কেউ একজন গাড়ি থেকে নেমেছে। তবে এখান থেকে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। মানুষটাকে দেখে হঠাৎ ভয় পেয়ে গেছে হৃদি। রোখসানা বেগম বললেন, কী হলো? ভয়ের কী আছে?
ও এসেছে, মা। ও এসেছে।
কে?
নেহাল। আমাকে নিচে নিয়ে যাও, মা। আমাকে ঘরে নিয়ে যাও। তারপর দরজা জানালা সব বন্ধ করে দাও। আলো নিভিয়ে দাও। মা, মা, আমাকে নিয়ে যাও।
ও নেহাল না, মা। নেহাল আর কখনো এ বাড়িতে আসতে পারবে না। তোর কাছেও আসতে পারবে না আর কোনো দিন।
না মা, ও নেহালই। ওই যে নেহাল। ও আমাকে মারবে, মা। অনেক মারবে। তারপর গায়ে সুচ ফুটিয়ে দেবে…। তারপর আবার আমি ঘুমিয়ে পড়ব। মা…ও মা। বলে হঠাৎ কাঁদতে লাগল হৃদি। তবে তার সেই কান্নাজুড়েও তীব্র আতঙ্ক। ভয়, অসহায়ত্ব। ফলে চিৎকার করে কাঁদতে পারছে না সে। যেন কেউ তার মুখ চেপে ধরে আছে, এমন বিভীষিকাময় শব্দে কাঁদছে সে। রোখসানা বেগম হৃদির দিকে তাকিয়ে চমকে গেলেন, হৃদি নিজে দুহাতে তার মুখ চেপে ধরে আছে। সে চাইছে না তার কান্নার শব্দ কেউ শুনুক। কেউ জানুক। তার মানে, নেহাল তাকে কান্নার সময় শব্দও করতে দিত না! চাইত না তার কান্নার কথা অন্য কেউ জানুক! নিশ্চয়ই তখন আরও ভয়ানক কোনো শাস্তি তাকে দিত সে। কান্না পেলে তাই এভাবে নিজের মুখ চেপে ধরে যতটা সম্ভব নিঃশব্দেই কাঁদতে হতো তাকে!
তিনি হঠাৎ মেয়েকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, এখানে কেউ তোকে মারবে না। এই যে মা তোকে বুকের ভেতর নিয়ে রেখেছে। আর কেউ কখনো তোকে কিছু করতে পারবে না।
হৃদি তারপরও থামল না। সে মায়ের বুকের ভেতর গুটিসুটি মেরে কাঁদতেই লাগল। তাকে ডাক্তার দেখানো শুরু হয়েছে। ডাক্তার জানালেন, উচ্চ মাত্রার সিডেটিভসহ নানা ধরনের সাইকেডেলিক ড্রাগ দিয়ে তাকে পুরোপুরি হ্যালুসিনেশনের জগতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার মনোজগৎকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল নেহাল এবং সেখানে সে নানাভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল। নেহাল ছাড়া বাইরের জগতের আর কাউকেই তার কাছে বাস্তব মনে হতো না। মনে হতো সবই বিভ্রম।
এই অবস্থা থেকে ফিরে আসাটা সহজ নয়। কারণ, যে মাত্রার সাইকেডেলিক ড্রাগস ও সিডেটিভ হৃদিকে দেওয়া হয়েছে, তা বিপজ্জনক। এর থেকে স্থায়ী মানসিক ক্ষতি হওয়াটাও বিচিত্র কিছু নয়।
রোখসানা বেগম তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন ডাক্তারের নির্দেশনা অনুসরণ। করতে। কখনো কখনো মুহূর্তের জন্য মনে হয়, এই বুঝি হৃদি খানিক স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই বুঝি তার চোখে লেগে থাকা বিভ্রমাত্মক দৃষ্টিটা কেটে যাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার গভীর বিষাদে ডুবে যান তিনি। হৃদি তখন আগের চেয়েও বেশি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, ছটফট করতে থাকে ওই ঘোরে ডুবে যাওয়ার জন্য। তার মধ্যে একটা দ্বৈত সত্তা কাজ করে। একটা সত্তা ওই জগক্টাকে ভয় পায়। ওখান থেকে। বেরিয়ে আসতে চায় বা যেতেই চায় না। আরেকটা সত্তা তাকে তার ওই অভ্যস্ত ঘোের বা নেশার জগৎ থেকে বের হতে দেয় না। বারবার আহ্বান করতে থাকে। হৃদিও যেন ওই আহ্বান এড়াতে পারে না। ফলে কখনো ভীষণ বেপরোয়া আর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে সে। আবার কখনো হয়ে যায় শিশুর মতো অসহায়, ভীত, আতঙ্কিত।
যেমন এই মুহূর্তে বাইরের দেয়ালের ওপাশে কাউকে দেখেই সে নেহালের ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। কাঁদল। ছুটে যেতে চাইল নিচে। কিন্তু রোখসানা বেগম তাকে ছাড়লেন না। শক্ত করে ধরে রইলেন বুকের মধ্যে। তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। এমনই এক সন্ধ্যায় হৃদি একা বসে ছিল এই ছাদে। আর নেহাল চুপি চুপি এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। কী অদ্ভুত মোহময় সেই সন্ধ্যা। কিন্তু কে জানত, সেই সন্ধ্যার ভেতর এমন অদেখা আততায়ী লুকিয়ে ছিল!
আজও তেমনই এক সন্ধ্যা। সেই সন্ধ্যায় হৃদি আর রোখসানা বেগমের পেছনে এসে দাঁড়াল কেউ। রোখসানা বেগম তাকালেন। তারপর ওই অন্ধকারের চেয়েও বেশি জমে গেলেন তিনি। তার সামনে দাঁড়ানো এই ছেলেটাকে চেনেন তিনি। বহু বহুদিন আগে এ বাড়িতেও এসেছিল। কিন্তু সেই মানুষটা আর এই মানুষটার ভেতর অনেক তফাত। এই মানুষটা শীর্ণ, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত কিন্তু দ্বিধাহীন। তার দাঁড়িয়ে থাকার ওই ভঙ্গিটা ঋজু। সেখানে উঁকি দিচ্ছে নিজের প্রতি বিশ্বাস কিংবা ভালোবাসা। তিনি অনিকের সঙ্গে কথা বললেন না। সেই সাহসও তার নেই। তবে হৃদিকে রেখে ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। তিনি। সিঁড়ির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে তিথি। আমগাছাটার ঝাকড়া ডালপালার ফাঁকে কী সুন্দর আলপনা আঁকা আলো। সেখানে বসে আছে হৃদি। অনিক আরও দুই পা এগোল। তার পায়ের শব্দে সচকিত হয়ে উঠল হৃদি। ঝট করে মুখ তুলে তাকাল সে। তারপর ভয় পেয়ে কাঁদতে গিয়েও আচমকা থমকে গেল। কে এই মানুষটা?
আবছা আলোয় মানুষটাকে কেন চিনতে পারছে না সে? ফ্যালফ্যালে চোখে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে রইল হৃদি। তার মন ও মগজজুড়ে অসংখ্য হিজিবিজি রেখা, স্মৃতি, ভাবনা পরস্পরের সঙ্গে গলাগলি ধরে ছুটে আসতে লাগল। তারপর হারিয়ে যেতে লাগল। আবার ফিরে আসতে লাগল। কিন্তু সেই অসংখ্য রেখার কোনো একটাকেও যেন ঠিকঠাক আলাদা করতে পারল না সে।
হৃদি হঠাৎ আবিষ্কার করল, তার খুব অস্থির লাগছে। কষ্ট হচ্ছে। যেন সে শ্বাস নিতে পারছে না। বুকের ভেতর তীব্র একটা যন্ত্রণা। একটা অবর্ণনীয়, অব্যাখ্যেয় শূন্যতার অনুভব। ওই অনুভব থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু পারছে না। তার তীব্র কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, মাথাটা ফেটে গিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে। সে। হঠাৎ দুহাতে মুখ চেপে ধরে মাথা ঘুরিয়ে নিল। সে জানে, এই মানুষটাকে চেনে সে। খুব চেনে। কিন্তু কেন যেন কিছুতেই উঠে দাঁড়াতে পারছে না সে। কথা বলতে পারছে না। বরং একটা অমোঘ শক্তি জলের ঘূর্ণির মতো পাক খেয়ে খেয়ে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে গভীর কোনো অন্ধকারের অতল গহ্বরে। এমন কেন হচ্ছে তার?
অনিক ডাকল, হৃদি?
হৃদি কথা বলল না। তবে সে আরও অন্ধকারে লীন হয়ে যেতে থাকল। অনিক এগিয়ে এল। এক পা। দুই পা। তারপর আরও খানিক কাছে। তারপর ডাকল সে, হৃদি, হৃদি?
হৃদি তার দুই হাঁটুর ভঁজে মুখ লুকিয়ে ফেলল। মাথা চেপে ধরল হাতে। যেন অজস্র ঝিঁঝি পোকা কোথা থেকে উড়ে এসে তার কান ঝালপালা করে দিতে লাগল। কর্কশ শব্দে ডেকে যেতে লাগল অসংখ্য কাক। অনিক সেই এলোমেলো শব্দের ভেতর থেকেই আবার ডাকল, হৃদি, আমি অনিক।
শব্দগুলো কি হঠাৎ থেমে গেল? নিঃশব্দ হয়ে গেল কোনো অসীম শূন্য চরাচর? সেখানে কি হঠাৎ জেগে উঠল জলের শব্দ? পাখির কলতান? ফুলের সৌরভ?
হৃদি তা জানে না। তবে সে ফিরে তাকাল। অনিক অবশ্য আর এগোল না। সে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল। হৃদি তা শুনতে পেল না। সে কেবল তার মাথায় অনিকের হাতের আলতো স্পর্শ পেল। তারপর গালে। ওই স্পর্শটুকু কী ঠান্ডা, শীতল বরফের মতো। কিন্তু হৃদির মনে হচ্ছিল ওই অনুভবটুকু যেন শিরশির করে ছড়িয়ে পড়তে লাগল তার মন ও শরীরজুড়ে। শীতল করে দিতে থাকল তার সকল যন্ত্রণা। ওই হাতটাও খুব ধরতে ইচ্ছে হচ্ছিল তার। কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু সেই শক্তিটুকু নেই তার। সেই নিয়ন্ত্রণও না। একটা আধো আলো-আধো অন্ধকারের জগতে বসবাস করে সে। সেখানে তুমুল ঘোর। বিভ্রম। অনেক চেষ্টা করেও সে সেই বিভ্রমের জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে পারল না। তবে অনিকের দিকে তাকিয়েই রইল সে। নিষ্পলক, শূন্য, নির্বাক। মানুষটা কি তাকে হাত ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবে?
অনিক অবশ্য তেমন কিছুই করল না। সে হঠাৎ ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। তারপর নামতে শুরু করল সিঁড়ি বেয়ে। আর ঠিক তখুনি সিঁড়ির ওপর থেকে নেমে এল তিথি। সে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল ওখানেই। হেঁটে অনিকের কাছাকাছি চলে এল সে। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলল, অন্তত এই সময়টুকুর জন্য হলেও আমি তোমার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
অনিক কথা বলল না। ফিরেও তাকাল না আর। সে নেমে যেতে থাকল বাকি সিঁড়ি বেয়ে। কে জানে, ছাদের ওই আবছা অন্ধকারে হৃদি তখন কী করছে!
৫৩
মঈন জামিনে ছাড়া পেয়েছে। তবে ছাড়া পেয়ে ভীষণ চুপচাপ হয়ে গেছে সে। অবন্তী বার কয়েক তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েও তেমন সাড়া পেল না। রিয়ার উধাও রহস্যেরও এখনো কোনো সমাধান হয় নি। এই নিয়ে সকলেই ভীষণ উদ্বিগ্ন। সেদিন কথাটা বললেনও আবছার আহমেদ। কিন্তু অবন্তী বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। পুরো বিষয়টাই একটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয় তার কাছে। যেন যেকোনো সময় ওই দুঃস্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠবে সে। আর দেখবে সবকিছু ঠিকঠাক। কিন্তু কিছুতেই কিছু ঠিক হয় না। বরং চারপাশ যেন আরও থমথমে, আরও বেশি দুঃখভার হয়ে রয়।
মঈনকেও কিছু বলা হয় না তার। সে কি তার ওই দুঃসহ জীবন, যন্ত্রণাকাতর ক্ষত, অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর কখনো ভুলতে পারবে? পারার কথা নয়। আর সে কারণেই নিজের ভেতর আরও সেঁধিয়ে যায় সে। অবন্তী বেশ কয়েকবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। মঈন যে তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে, তা নয়। বরং সে হয়ে ছিল অচেনা মানুষ। অবন্তী সেদিন বলল, আপনি এখন কেমন আছেন?
ভালো।
শরীর?
ভালো।
বাসার সবাই?
মঈন এই প্রশ্নের জবাব দেয় নি। অবন্তী ভেবেছিল সে যে মঈনকে এখন আবার আপনি করে বলছে, এটা মঈন খেয়াল করবে। তারপর এই নিয়ে কিছু বলবে সে। কিন্তু মঈন তেমন কিছুই করল না। সে যেন সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। তবে একদিন মঈন নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, রিয়ার খবর কি কিছু পাওয়া গেল?
উঁহু। বলে চুপ করে রইল অবন্তী। মঈনও। তারপর হঠাৎ সে বলল, কী যে হলো মেয়েটার! আমি না কিছুই বুঝতে পারছি না।
কী বুঝতে পারছেন না?
কিছুই না। সবকিছু কেমন অসহ্য লাগছে।
অবন্তী আর কথা বলল না। মঈনও না। তারা জানেও না আর কী নিয়ে কথা বলবে তারা।
অবন্তী অবশ্য আরও একবার চেষ্টা করল। সেদিন ফোন করে বলল, আপনি কি একদিন আমার সঙ্গে একটু দেখা করবেন?
কেন?
কারণ নেই।
তাহলে?
কারণ ছাড়া দেখা করা যায় না?
আমার না কিছু ভালো লাগছে না, অবন্তী।
নিজেকে একটু সময় তো দিতে হবে। কী ভয়ংকর একটা ঝড়ই না গেল আপনার ওপর দিয়ে।
ওটার জন্য না।
তাহলে।
এ কথা আমি কাউকে কখনো বলতে পারব না, অবন্তী। তোমাকেও না।
এই কথায় অবন্তী চুপ করে রইল। তারপর বলল, তাহলে সব মানুষের জীবনেই এমন কিছু কথা থাকে, যা কখনো কাউকে বলা যায় না?
হয়তো। বলে থামল মঈন। তারপর বলল, হয়তো না। থাকেই।
আমার কথাটাও যে তেমনই ছিল! যেটা আমি কোনো দিন আপনাকে বলতে চাই। নি। আসলে পারতাম না।
এখন পারবে?
জানি না। তবে আপনি যখন জেলখানায় ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, আমি কথাটা আপনাকে বলব। যত খারাপই হোক, আমি বলব। আর তারপর, আপনি আমাকে যা করতে বলবেন, আমি তা-ই করব।
মঈন কথা বলল না। চুপ করে রইল দীর্ঘ সময়। তারপর হঠাৎ বলল, কেন যেন এখন আর তোমার ওই কথাটা আমার জানতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে, আমি যেমন। আমার খুব গোপন, কুৎসিত একটা কথা তোমাকে বলতে পারছি না, ঠিক তেমনই তোমার কথাটাও হয়তো অমন কিছুই!
কিন্তু আমার এখন কি মনে হয়, জানেন?
কী?
মনে হয়, যদি আমরা নিজেরা কোনো অন্যায় না করি, তাহলে অন্যের কুৎসিত কিছুর দায় আমরা কেন নেব?
এ কথা কেন বললে?
কারণ, আমি তো কোনো অন্যায় করি নি। তাহলে অন্যজনের অন্যায়কে কেন আমি বয়ে বেড়াব? তার জন্য কেন আমি আমার প্রিয় মানুষের থেকে দূরে সরে যাব?
কী হয়েছে, অবন্তী?
বলব। আপনার সঙ্গে এরপর দেখা হলেই বলব। অনেক অনেক কিছু বলব।
অবন্তী সেদিন আর কিছু বলল না। তবে তারা দেখা করল তার দুদিন বাদেই।
.
আশুলিয়ার এই রাস্তাটা সুন্দর। দিনটাও ঝলমলে। রাস্তার পাশে টলটলে জল। সেই জলে ফুরফুরে হাওয়া মৃদু ঢেউ তুলছে। অবন্তী বলল, আপনার মন খারাপ কেন?
মঈন কথা বলল না। একটা ঢিল ছুঁড়ে ফেলল জলে। অসংখ্য তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। অবন্তী বলল, মানুষের জীবনের বড় দুঃখ এবং আনন্দ ওই ঢিলটার মতো।
কীভাবে?
যখন বড় কোনো আনন্দের ঘটনা ঘটে, তখন তা অমন করে অসংখ্য ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তখন সবকিছুই আনন্দময় মনে হয়। আবার খুব খারাপ কিছু ঘটলে সেটাও অমন ছড়িয়ে গিয়ে বাকি সব বিষাদময় করে তোলে।
মঈন অবন্তীর দিকে তাকাল। কথাটা পছন্দ হয়েছে তার। কিন্তু জীবনের কোনো দুর্বিপাকই তাকে এতটা ভেঙে দিতে পারে নি, যতটা ভেঙে দিয়েছে বলতে-না-পারা এই কুৎসিত ঘটনাটা। তার পুরো জীবন, বিশ্বাস, ভাবনা–সবকিছুই মুহূর্তে টালমাটাল করে দিয়েছে। ভেতরে ভেতরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে সে। এই জীবনে নিজের ওই ভাঙা টুকরোগুলোকে এক করে কি আর কখনো উঠে দাঁড়াতে পারবে সে? দীর্ঘশ্বাস ফেলল মঈন।
অবন্তী হঠাৎ বলল, আপনার বলতে হবে না। আমি জানি আপনার কেন মন খারাপ?
মঈন ঝট করে তাকাল, তুমি জানো?
হুম।
কী করে?
মা জানিয়েছে।
তোমার মা?
হুম।
উনি কী করে জানলেন?
ময়না যে মেয়েটা, ওর মা-ই বলেছে।
তাহলে কি গ্রামের সবাই এখন জানে?
মনে হয় না। আমি অবশ্য জিজ্ঞেস করি নি আর। ওটুকু শুনেই নিজেকে বরং ভাগ্যবান মনে হয়েছে আমার।
মানে! ভ্রু কুঁচকে তাকাল মঈন। এই ঘটনায় তোমার নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে মানে কী?
অবন্তী কথা বলল না। মঈন বলল, আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না, অবন্তী।
অবন্তী এবারও কথা বলল না। দূরে একটা চিল উড়ে যাচ্ছে। তার ছায়া পড়েছে নদীর জলে। সেই ছায়া ঢেউয়ের স্পন্দনে কাঁপছে। তার ওপারে একটা নৌকা। একা একটা রেইনট্রিগাছ। আকাশে ঠিক নৌকার মতোই ভেসে যাচ্ছে মেঘ। সবকিছুই ছবির মতো সুন্দর। অথচ সেই সুন্দর ছবির ভেতরও কোথায় যেন একটা তীব্র বিষাদ। অবন্তী কিংবা মঈন তারা কেউ সেই বিষাদটুকু ধরতে চায় না। কিন্তু বিষাদ এমন ভয়ংকর যে তা আলগোছে, অগোচরে বুকের ভেতর বসত গাড়তে থাকে সন্তর্পণে। তারপর নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে সদর্পে। মেঘলা আকাশের মতো থমথমে করে দেয় সব। এই অবন্তীকে যেমন।
মঈন বলল, কী হলো, বলো?
অবন্তী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর সোজা হয়ে বসল। বলল, আপনার মনে আছে আমি এইচএসসির পর কোচিং করতে ঢাকায় এসেছিলাম?
হ্যাঁ। কেন মনে থাকবে না, তারপর এসেই তো শুনলে যে আমাকে পুলিশে ধরেছে।
হুম।
আব্বা আর তুমি এসেছিলে। লঞ্চে।
হুম।
বলে আবার চুপ করে রইল অবন্তী। হঠাই তার চোখের কোলে জল জমতে শুরু করেছে। থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে শরীর। মঈন যেন মুহূর্তেই কিছু একটা আঁচ করতে পারল। সে দুহাতে অবন্তীকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও হঠাৎ থমকে গেল। বলল, অবন্তী? অবন্তী?
উ? যেন বহু দূর কোনো দেশ থেকে উত্তর দিল সে।
আব্বা কি সেদিন লঞ্চে তোমার সঙ্গে…। কথাটা শেষ করতে পারল না মঈন। তার আগেই ঝড়ে উপড়ে পড়া বৃক্ষের মতো সমূলে উপড়ে পড়ল অবন্তী। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল সে। মঈন চেষ্টা করেও আর তাকে স্পর্শ করতে পারল না। যেন নিজেকে হঠাৎ ঘৃণ্য, অচ্ছুৎ, জঘন্য গা-ঘিনঘিনে এক প্রাণী মনে হতে লাগল তার।
অবন্তী কাঁদছে। মঈন নিঃসাড়ে তাকিয়ে আছে আকাশে উড়ে চলা নিঃসঙ্গ একা চিলটার দিকে।
অবন্তী কান্নাজড়ানো গলায় বলল, এই কথা আমি আপনাকে কী করে বলতাম? আপনিই বলেন, এই কথা কি কাউকে বলা যায়? ওনাকে আমি বাবাই ভাবতাম। নিজের বাবা। অথচ সেই মানুষটা। বলে আবারও কাঁদতে লাগল সে। বলল, আমি এই কথা আপনাকে বলতে পারতাম না। আমি যা পারতাম, তা হলো আপনার কাছ থেকে চুপচাপ দূরে সরে আসতে। সেটাই করেছিলাম আমি।
মঈন কী বলবে, জানে না। তার জগৎসংসার সব লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সে দাঁড়িয়ে আছে এক অসীম অতল শূন্যতায়। এই শূন্যতা থেকে এই জীবনে আর পরিত্রাণ নেই তার। বাবা সম্পর্কে জেলে থাকতেই ভয়াবহ জঘন্য এক খবর সে শুনেছে। কিন্তু কথাটা কিছুতেই বিশ্বাস হয় নি তার। কিন্তু আজ এখন অবন্তীর কাছে এ সে কী শুনছে!
অবন্তী নিজেকে খানিক সামলে নিল। তারপর বলল, তবে হ্যাঁ, আপনাদের বাড়ির কাজের মেয়েটার চেয়ে আমি ভাগ্যবানই ছিলাম। আমার বড় কোনো ক্ষতি উনি করতে। পারেন নি। তার আগেই ঘটনা বুঝে ফেলেছিলাম আমি। কিন্তু ধাক্কাটা প্রথমে সামলাতে পারি নি। দুঃস্বপ্নেও ভাবি নি উনি এমন কিছু করতে পারেন। ফলে একটু সময় লেগেছিল বুঝতে। কিন্তু বোঝামাত্রই কৌশলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম আমি। তারপর সারা রাত আর ফিরি নি। লঞ্চের ডেকে অনেক মানুষের সঙ্গে রাতভর বসে থেকে ঢাকায় পৌঁছেছিলাম।
একটা অসহ্য নীরবতা জমাট অন্ধকারের মতো ওই দিনের আলোতেও যেন গাঢ় থেকে গাঢ় হতে লাগল। অবন্তী বা মঈন কেউ আর কোনো কথা বলল না। তবে তিরতির করে বয়ে যাওয়া জলের ঢেউ, ফুরফুরে হাওয়া, পাতার শব্দ, পাখির গান কী সব বলে যেতে লাগল। অবন্তী আর মঈন অবশ্য সেসব আর শুনল না। তারা কেবল নিজেদের বুকের ভেতর বয়ে যাওয়া অতল যন্ত্রণার অবিনাশী কান্নায় বুঁদ হয়ে রইল।
.
তারা ফিরল সন্ধ্যার আগে। ফিরতে ফিরতেই মঈন বলল, আমি এখন কী করব?
অবন্তী জবাব দিল না। এই প্রশ্নের উত্তর অবন্তীর কাছে নেই। মঈন বলল, আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
মৃত্যুই কি সবকিছুর সমাধান?
তাহলে?
বেঁচে থাকা। বলল অবন্তী। সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা।
কিন্তু সেটা তো আর নেই আমার। আই লস্ট এভরিথিং। আমি গ্রামে কাউকে মুখ দেখাতে পারব?
ইউ ক্যান গেইন এভরিথিং।
কীভাবে?
আমরা সবাই একটা অদ্ভুত কাজ করি, জানেন? সবাই।
কী কাজ?
অন্য কেউ অপরাধ করলে আমরা যেমন হইচই করি, নিজেদের কেউ করলে কিন্তু তেমন করি না। বরং আড়াল করে রাখার চেষ্টা করি। নিজের বাবা, সন্তান, ভাই, বোন, বন্ধু বা রিলেটিভ করলে তখন আমরা সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করি তাকে রক্ষা করতে। আড়াল করতে। তাই না?
মঈন কথা বলল না। অবন্তী বলল, ওতে বরং অপরাধীকে উসকে দেওয়া হয়। অথচ আমরা সবাই যদি সবার আগে এই জায়গাটায় শক্ত হতাম, আমাদের নিজেদের ঘরের অপরাধীদের প্রতি, তাহলে দেখতেন পৃথিবীটা অন্য রকম হতে পারত। অন্য রকম সুন্দর।
কী করব আমি?
বাড়ি যাবেন। গিয়ে ময়নাকে থানায় নিয়ে গিয়ে আপনি নিজে আপনার বাবার নামে একটা ধর্ষণ মামলা করাবেন।
আমি?
হুম। আপনি। দেখবেন, হাউ ইউ লিভ উইথ ইয়োর ডিগনিটি। মাথা উঁচু করে বাঁচবেন তখন।
মঈন কথা বলল না। চুপ করে তাকিয়ে রইল রিকশার প্যাডেলের দিকে। চাকার দিকে। রাস্তার দিকে। দীর্ঘ সময়। তারপর বলল, আমি কি একটু তোমার হাত ধরতে পারব?
অবন্তী কথা বলল না। তবে সে সসংকোচে তার হাতটা মঈনের দিকে বাড়িয়ে দিল। মঈন বলল, আমার আরও একবার জেলে যেতে খুব ভয় হচ্ছে, অবন্তী।
আপনি আবার জেলে কেন যাবেন?
তুমি শব্দটা শুনবার জন্য।
মানে?
মানে আরেকবার তোমার কাছ থেকে তুমি শুনতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু আমি জেলে না গেলে তো আর…।
অবন্তী হঠাৎ হেসে ফেলল। মৃদু কিন্তু প্রাণবন্ত সেই হাসি। তার আচমকা মনে হলো, এমন আনন্দময় নির্ভেজাল হাসি সে বহুদিন হাসে নি।
৫৪
ফোনটা এল ঠিক দুপুর দুইটা কুড়ি মিনিটে। দুপুরের খাবার খেয়ে রুমেই বসে ছিলেন আবছার আহমেদ। একটু ঝিমুনির মতোও এসেছিল। এই সময়ে ফোন দেখে ভারি বিরক্ত হলেন তিনি। তারপরও ধরলেন। ফোনের ওপারের কণ্ঠটা শুনে হঠাৎ ঘুম কেটে গেল। কেউ একজন আতঙ্কিত গলায় বলছে, স্যার, স্যার?
জি, কে বলছেন?
লোকটা তার কথা শুনল কি না বোঝা গেল না। তবে সে হড়বড় করে বলতে লাগল, স্যার, এখুনি একটু আমার বাসায় আসতে হবে। এখুনি। ভয়াবহ ঘটনা, স্যার। এমন ঘটনা কেউ কোনো দিন দেখে নি, স্যার। স্যার। লোকটার গলা কাঁপছে। প্রবল। আতঙ্কে জড়িয়ে যাচ্ছে কথা।
আবছার আহমেদ বললেন, কী হয়েছে?
আমি মুখে বলতে পারব না, স্যার। আপনি আসেন, স্যার। এখুনি আসেন।
কোথায় আসব? কে আপনি?
আমার নাম মোহাম্মদ আশরাফুদ্দিন। প্রফেসর ড. মাহমুদ হাসানের বাসাটা আমি কিনেছি, স্যার।
.
আবছার আহমেদ ঘরে ঢুকে দেখেন চারপাশে সব এলোমেলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কয়েকজন মিস্ত্রি ফ্যাকাশে মুখে বসে আছে। ঘরের প্রতিটি মানুষের চোখেমুখে তীব্র আতঙ্ক, অবিশ্বাস।
কী হয়েছে? জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
আশরাফুদ্দিন বললেন, এই তিন-চার মাস হলো এই বাসা আমি প্রফেসর সাহেবের কাছ থেকে কিনেছি। খুবই অল্প দাম। ঢাকা শহরে এই দামে এখন টিনের ঘরও পাওয়া যায় না।
হুম।
তো উনি যখন বাসাটা ছাড়েন, তখনই এইখানে-ওইখানে ভাঙাচোরা ছিল। মানে ইন্টেরিয়রের কাজ করতে শুরু করেও কী কারণে যেন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ফলে ওই টয়লেট আর দুইটা রুমের দেয়ালটেয়াল ভাঙা ছিল। তো আমি ভাবলাম, এত কম দামে যেহেতু পাচ্ছি, পরে না হয় কিছু টাকা খরচ করে নিজের মতো সাজিয়ে নেব।
তারপর? একটু অধৈর্য হয়ে উঠেছেন আবছার আহমেদ।
গত কয়েক দিন ধরে মিস্ত্রি নিয়েছি কাজ করতে। আজ খেয়াল করলাম, বেডরুমের বাথরুমের ওপরে যে ফলস ছাদ আছে, ওই ছাদের প্রায় অর্ধেকটা সিমেন্ট করে প্লাস্টার করা। অতিরিক্ত জিনিসপত্র যে ওইখানে রাখব, সেই সুযোগ নাই। অত বড় বাথরুমের ওপরে এত ছোট ফলস সিলিং তো হয় না।
আবছার আহমেদ কৌতূহলী ভঙ্গিতে বেডরুমে ঢুকলেন। আশরাফুদ্দিন বললেন, তো ভাবলাম ফলস সিলিংয়ের বাকি অর্ধেক কেন আলাদা করে সিমেন্ট আর প্লাস্টার করা একটু দেখি। প্রয়োজনে ওটা ভেঙে জায়গাটা আরেকটু বড় করব। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ওই সিমেন্ট-প্লাস্টার বেশি দিন হয় নাই করেছে। এবড়োখেবড়ো। আনফিনিশড। কেউ তাড়াহুড়া করে কোনো রকমে করেছে।
তারপর?
তারপর…। তারপর ভাঙতে যেতেই দেখি ওই সিমেন্টর ভিতর একটা লাশ। প্লাস্টার করা!
হোয়াট! কী বলছেন আপনি? আবছার আহমেদের বুকে যেন রক্ত ছলকে উঠল। লাশ?
জি স্যার।
বাথরুমের ফলস সিলিংয়ের ভেতরে আলাদা সিমেন্ট করে সেটার ভেতর লাশ রেখে প্লাস্টার করা?
জি স্যার।
আবছার আহমেদ আর কথা বললেন না। তিনি মই দিয়ে সিলিং অবধি উঠলেন। তারপর যে দৃশ্যটা দেখলেন, সেই দৃশ্য তিনি আর তার এই জীবনে কখনো ভুলতে পারবেন না। সেখানে হাতুড়ি দিয়ে সিমেন্টের আস্তরণ কিছুটা ভাঙা হয়েছে। সেই আস্তরণের ভেতর থেকে একটা মেয়ের মুখ বেরিয়ে আছে। মুখটা দেখে পুরো শরীর শিরশির করে উঠল আবছার আহমেদের। মেরুদণ্ড বেয়ে তিরতির করে নেমে গেল ভয়ের তীব্র শীতল স্রোত। মেয়েটার চোখ বন্ধ। তারপরও মনে হচ্ছে সে যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে। বীভৎস সেই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারলেন না আবছার আহমেদ। তিনি কোনোমতে মই বেয়ে নেমে এলেন।
.
মাহমুদ হাসান কেন রিয়াকে খুন করলেন, সেই রহস্য থেকে গেল অজানাই। অজানা হয়ে রইল তার অনুভবের আখ্যানও। স্ত্রী সুমির জন্য তার মন খারাপের দিন যাপন কখনোই বিবর্ণ হয় নি। বরং ওই যন্ত্রণাটুকু বুকে নিয়েই তিনি রিয়াকে ভালোবেসেছিলেন। সেই ভালোবাসার স্পর্শটুকুও কখনোই অকিঞ্চিৎকর ছিল না। বরং রিয়া তাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছিল। যেন তার জীবনের সকল তেষ্টা, অপূর্ণতাকে লীন করে দিয়েছিল অপার আনন্দে। এ জীবনে যা কখনো পাওয়া হয় নি, তার সবটুকুই যেন অঢেল ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ করে দিয়েছিল সে। তারপরও কেন এমন করলেন তিনি?
এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছেই নেই। হয়তো নেই মাহমুদ হাসানের কাছেও। আবছার আহমেদের ধারণা, রিয়া তার কোনো গোপন গল্প জেনে গিয়েছিল। জেনে গিয়েছিল তার রহস্যাবৃত জীবনের অসংখ্য গলিখুঁজিও। সেই গল্প কিংবা গলিখুঁজিতে কী ছিল কে জানে!
তবে ওই ছাদের গায়ে অস্পষ্ট করে লিখে রাখা কয়েকটি লাইন দেখে চমকে গিয়েছিলেন তিনি। এ যেন রিয়ার ওই বিভৎস বিভীষিকাময় কবরের গায়ে লেখ অদ্ভুত এক এপিটাফ।
আমাকে চেয়ে পাবে ধুলো, থেমে যাওয়া মৃত নদীগুলো
আমাকে চেয়ে পাবে ভুল, জলে ডোবা ক্লান্তির চক্ষু দুকূল।
আমাকে চেয়ে পাবে ব্যথা–
অঝোর শ্রাবণ জলে লেখা, বিরহ বসন, দুঃখগাথা।
৫৫
টিনের চালে শিশিরের শব্দটা কান্নার মতো। টুপ করে ঝরে পড়ে। তারপর গাল বেয়ে নেমে আসার মতো নেমে আসতে থাকে টিনের নিথর শীতল শরীর বেয়ে। রাত হলে অনিক খুব মন দিয়ে ওই শিশিরের শব্দ শোনে। শোনে পাতাঝরার শব্দও। চারপাশটা তখন এত শূন্য, এত অর্থহীন মনে হতে থাকে। এমনকি এই সব দুঃখ, অপ্রাপ্তি, ভালোবাসা, ঘৃণা কিংবা আর সব ব্যক্তিগত অনুভূতিও। মনে হয়, এইটুকু নশ্বর জীবনে দুঃখ ও দহন, বিষাদ ও বিবমিষা কেন অবিনশ্বর হয়ে থাকবে? আর ভালোবাসা পড়ে রইবে আড়ালে, আবডালে, অভিমানে স্পর্শহীন?
হয়তো এ কারণেই এই সব অর্থহীন ভাবনার অনুভব পেরিয়ে হৃদির জন্য তার মন কেমন করে। তিথির ওই শেষ কথাটুকু কানে বাজে তার, এই জীবনে অন্তত একবারের জন্য হলেও হৃদি তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। একমুহূর্তের জন্য তার পায়ের কাছে বসে থাকতে চায় তার আগে মরতে চায় না সে।
কিন্তু কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর অনিকের কাছে নেই। যে হৃদির সঙ্গে তার সেই সন্ধ্যার অন্ধকারে, ছাদে একমুহূর্তের দেখা হয়েছিল, সে কি আসলেই হৃদি ছিল? নাকি হৃদির ছায়া? কিন্তু হৃদি তো তার ছায়া হয়ে দেখা করতে চায় নি। তাহলে? অনিক কি আর কখনো ওই ঘুমঘোর ভাঙা সত্যিকারের হৃদির মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াবে? শুনতে চাইবে কেন সে একবারের জন্য হলেও দেখা করতে চেয়েছিল?
আচ্ছা, হৃদিকে কি সে ঘৃণা করে? অনিকের ধারণা, এর উত্তর সে জানে না। কিংবা বিষয়টা খুব গোলমেলে। হৃদি তার সঙ্গে যা করেছে, তাতে তাকে ঘৃণা করা অবশ্যম্ভাবীই। কিন্তু সে তাহলে পারে না কেন?
হৃদি কি তবে তার কাছে বদলে যাওয়ার আগের স্মৃতিতেই আটকে আছে? সেই হৃদি, যে তার অসুস্থ মায়ের কাছে দিনমান বসে থাকত আদরে-আহ্লাদে, যার চোখেমুখে লেগে থাকত আশ্চর্য মায়ার বিভা। আর চোখের তারায় ভেসে উঠত স্বচ্ছ জলের আয়না। সেই আয়নায় মুখ দেখা যেত, মন দেখা যেত, দেখা যেত মানুষও।
অনিক কেন এখনো সেই মানুষটাকেই বুকের ভেতর এমন যত্ন করে সঞ্চয় করে রেখেছে? তার জন্য কেন তার কষ্ট হয়? কেন সে চেষ্টা করেও এই বদলে যাওয়া হৃদিকে চোখের সামনে এনে দাঁড় করাতে পারে না? ঘৃণায়, অবজ্ঞায় অপাক্তেয় করে রাখতে পারে না!
কেন এখনো এই রাতদুপুরের একাকী নিঃসঙ্গতায় ভোরের কুয়াশা ভেঙে জানালার ফাঁক গলে মেঝেতে গড়িয়ে পড়া অমল আলোর মতো ভেসে ওঠে হৃদি? সেই যে ধলেশ্বরীর মাঠ, মাঠের পাশে নদী, নদীর বুকে শব্দ ছলছল। আকাশজোড়া মেঘ, মেঘের বুকে বৃষ্টি নামের নদী, ডাকছে অবিরল?
কেন ডাকে? কেন সে ধূসর হয়ে যায় না ঘৃণায়, ক্রোধে? কেন সে জেগে থাকে অবিরাম, অনিবার অসুখের মতো? এ কেমন অসুখ, যার যন্ত্রণায় বুকের ভেতর জ্বলে ওঠে উনুন। সেই উনুনের আঁচে দগ্ধ হতে থাকে সব অভিমান, ঘৃণা, ক্রোধ। তারপর মায়াময় ছায়া হয়ে ডেকে যায় অমোঘ আহ্বানের মতো। অনিকের সাধ্য কি তা এড়ায়?
অনিক এক মাঝরাতে ঘর থেকে বেরোয়। উদ্দেশ্যহীন। যেন এই জীবনে কোথাও আর যাওয়ার নেই তার। কিন্তু তারপরও সে পৌঁছে যায় এক অমোঘ গন্তব্যে।
মাথার ওপর ছাতার মতো ছড়িয়ে থাকা আমগাছওয়ালা বাড়িটার সামনে গিয়ে সে যখন দাঁড়ায়, তখন কেবল ভোরের আলো ফুটেছে। কিন্তু বাড়ির দরজা পেরোতেই সে অবাক তাকায়। উঠানে মানুষের ভিড়। তার ওপাশে মিহি সুরের কান্না। তার ওপাশে আগরবাতির ঘ্রাণ। তার ওপারে বাতাসে ভেসে যেতে থাকে কারও হৃদয়। সেই হৃদয় অনিক আর ছুঁতে পারে না। কিংবা ছুঁয়ে দিলেও ধরে রাখতে পারে না। স্টেইনলেস স্টিলের খাঁটিয়াতে হৃদি তাই নিথর হয়ে পড়ে থাকে সফেদ কাফনে।
শুভ্র শামিয়ানার নিচে অনিক গিয়ে দাঁড়ায়। তার পায়ের তলায় অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। সেই অনুভূতির নাম সে জানে না। কোথা হতে অজস্র কান্না এসে তাকে ঘিরে ধরে। কিন্তু কাঁদে না সে। আলগোছে বসে দুহাতে শক্ত করে ওই খাঁটিয়াটা ধরে রাখে। তারপর বসেই থাকে। অনন্তকাল। যেন থমকে থাকে সময়। কান্না ও ক্লান্তি। জরা ও যন্ত্রণা।
কেউ তার পেছনে এসে দাঁড়ায়। অনিক ফিরে তাকায়। তিথি। সে কিছু বলে না। তিথিও না। কেবল ওই আগরবাতির ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারপাশে। মিশে যেতে থাকে হাস্নাহেনা, বকুল ফুলের সঙ্গে। কোথা থেকে এসে এক হয়ে যায় গোলাপ ও গোলাপজলও। তার সঙ্গে খানিক হৃদয়।
তিথি হঠাৎ ফিসফিস করে বলে, ও প্রায় সেরে গিয়েছিল। ভালো হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ওর আর সব অসুখের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল অন্য এক অসুখ। সেই অসুখ সারানোর সাধ্য তো কারও ছিল না!
কী অসুখ?
সব অসুখ তো আর চোখে দেখা যায় না! কিছু অসুখ কেবল অনুভব করা যায়। কিন্তু আমাদের সাধ্য কী আমরা তা বুঝি?
অনিক তাকায় না। সে বসে থাকে নিশ্চল পাথুরে মূর্তির মতো। তিথি বলে, ওই অসুখটাই ওকে আর ছাড়ল না।
অনিক আবার তাকায়। তিথি বলে, ওই অসুখ কেউ সারাতেও পারত না। নিজের বোধের আগুনে যে পুড়ে যায়, তাকে কে রক্ষা করবে?
অনিক কাঁদল। এক ফোঁটা জল টুপ করে পড়ল ওই সাদা শুভ্র কাফনের ওপর। তিথি বলল, ওই অসুখটাই ছিলে তুমি। হয়তো ওর প্রিয়তম অসুখও।
.
সময় ও জীবন কোন অগোচরে বয়ে যায় মানুষ তা জানে না। মানুষ কেবল জানে জীবনজুড়ে যে গভীর ক্ষত সে বয়ে বেড়ায়, সেই ক্ষতের যন্ত্রণা ক্রমশই মুছে দিতে থাকে সময়। মুছে দিতে থাকে বেদনায় বিদীর্ণ হৃদয়ের ক্ষত। কিন্তু ক্ষত মুছে গেলেও থেকে যায় দাগ। সেই দাগে লেখা থাকে কত কত স্মৃতি-বিস্মৃতির গল্প। সেই গল্প মানুষ ভুলবে কী করে?
আর তাই তো এই জনমের কোনো একাকী দুপুর, বিষণ্ণ সন্ধ্যা কিংবা মন খারাপের রাত্তির বয়ে আনে উত্তরে হিম হাওয়া। সেই হাওয়ায় অনিক জেগে থাকে একা। আর তার বুকের বাঁ পাশে আলগোছে জেগে থাকে তৃষিত হৃদয়।
সেই হৃদয় সব ভুলে অকূলে আকুল হয়ে যেন হাওয়াদের গানে গানে কানে কানে বলে যায়–
সে এসে বসুক পাশে, যেভাবে অসুখ আসে
তারপর হয়ে যাক যন্ত্রণা অনায়াসে
তবুও আসুক সে।
জানুক–প্রিয়তম অসুখ সে!
সেই আহ্বান হৃদি কি শুনতে পায়?
(সমাপ্ত)
