Saturday, June 15, 2024
Homeকিশোর গল্পমাউই-এর গল্প: মল্লিকা ধর

মাউই-এর গল্প: মল্লিকা ধর

গল্প: ১

মাউই হলেন পলিনেশিয়ার পুরাণের এক দারুণ বুদ্ধিমান চরিত্র । ইনি ওদের সত্যিকারের হিরো । বীর নায়ক । কিন্তু এই বীর নায়ক যখন জন্মান, তখন তিনি ছিলেন খুব দুর্বল, অসুস্থ – সময়ের আগেই জন্মেছিলেন যে ! তাঁর মা, তারাঙ্গাদেবী, তিনি এই দুর্বল বাচ্চাটি বেঁচে থাকলে সারাজীবন অসুখে ভুগবে ও কষ্ট পাবে ভেবে একে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিলেন । কিন্তু সমুদ্রতীরবাসী একজন সাধু তাকে কুড়িয়ে নিয়ে মানুষ করেন । দিনে দিনে দারুণ বুদ্ধিমান ও শাণিত হয়ে উঠতে থাকেন মাউই ।

বড়ো হয়ে বহু কীর্তি তিনি করে যান । সেইসব কীর্তির কথা বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে । আমরা ওগুলোর থেকে দুটি বেছে নিয়েছি । প্রথমটি হলো সমুদ্র থেকে একটি দ্বীপ তুলে আনা আর দ্বিতীয়টি হলো সূর্যের ছোটাছুটি কমিয়ে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে দেওয়া ।

মাউই একদিন নৌকো নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে বেরিয়েছিলেন । অবশ্য মাছ ধরতে বেরোবার আগে তিনি তার এক অতি বৃদ্ধা দিদিমার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন । সেই দিদিমার ছিল অনেক জাদুশক্তি । তার কাছে মন্ত্রপূত নানারকম হাড় ছিল, সেগুলি থেকে অনেক আশ্চর্য ক্ষমতাওয়ালা জিনিস তিনি তৈরি করতেন ।

মাউই তো দিদিমার সঙ্গে দেখা করে তাকে প্রথমেই একটি প্রণাম ঠুকে নিল । তারপরে তার জন্য বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া পিঠে ইত্যাদি উপহার দিল । দিদিমা তো আনন্দে আত্মহারা । তিনি তার এই ছোটো নাতিটিকে এমনিতেও খুব ভালোবাসতেন ।

“দিদিমা, সমুদ্রে মাছ ধরতে বেরোব আমরা । তোমার আশীর্বাদ চাই ।”

দিদিমা ফোকলা দাঁতে একগাল হাসলেন, বললেন “আহা বাছা আমি তো আশীর্বাদ করবই । যাও ভালোয় ভালোয় মনস্কামনা সিদ্ধ করে ফিরে এসো বাছা ।”

“কিন্তু দিদিমা, তোমার একটা মন্ত্রপূত হাড় যে আমায় দিতে হবে । নইলে ভালো বঁড়শি বানাবো কি করে ?”

“আরে, কি যে তুই বলিস নাতি তার ঠিক নেই । কতকিছু আছে বঁড়শি বানাবার জন্য, তুই কিনা চাস মন্ত্রপূত হাড় । ওসব নিয়ে ছেলেখেলা নয় নাতি, ওসব বড়ো সাংঘাতিক জিনিস ।”

“কে বলেছে আমি ছেলেখেলা করছি ? সত্যিই দরকার গো দিদিমা, নইলে আমার খুব বিপদ হবে । তুমি দেবে না আমায় ?”

মাউইএর করুণ মুখ দেখে মন গলে গেল বৃদ্ধার । তিনি কিন্তু সতর্ক করে দিলেন যে খুব সাবধানে এইসব নাড়াচাড়া করতে হবে । আর খুউব দরকার না থাকলে যেন ব্যবহার না করা হয় ।

মাউই তো মহানন্দে সেই হাড় নিয়ে ফিরে এলো আর বানালো এক সুন্দর বঁড়শি । সেই বঁড়শি ছিপে লাগিয়ে ভালো টোপ গেঁথে শুভদিনে সে রওনা হয়ে পড়লো সমুদ্রে মত্স্যশিকারে ।

দিন প্রায় কেটে গেল, কোনো মাছ এলো না চারে । মাউই তো হতাশ হয়ে প্রায় হাল ছেড়ে দেবো দেবো করছে, এমন সময় কিসে যেন আটকালো বঁড়শি । মাউই সাবধানে প্রথমে সুতো ছাড়তে লাগলো, তারপরে দিল টান । উরে বাবা, এ যে ভীষণ ভারি ! এ কি বিশাল মাছ, এতো ভারি ! অবাক হয়ে ভাবছিল মাউই ।

হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে যে বিশাল জিনিসটি জলের উপরে টেনে তুললো মাউই আদতে সেটা মাছই নয়, সেটা একটা গোটা দ্বীপ । দিদিমার মন্ত্রপূত বঁড়শিতে আটকে উঠে এসেছে এক বিরাট দ্বীপ ।

সেই দ্বীপ আজও আছে সেইখানেই, নাম তার নিউজীল্যাণ্ড – মাউইএর মত্স্য ।

গল্প: ২

দ্বিতীয় কাহিনীটি সূর্যকে নিয়ে । বহুকাল আগে সেই মাউইএর যুগে দিন ছিল খুব ছোটো । কারণ সূর্য বেশ জোরে ছুটে পার হয়ে যেত আকাশ – তাই দিনের আলো ফুরিয়ে যেত খুব তাড়াতাড়ি । মাউই তো একদিন মহা বিরক্ত হয়ে গেলেন – তিনি জাল বানাচ্ছিলেন – বানাবার অর্ধেকের মাথাতেই সূর্য ডুবে গিয়ে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল ।

মাউই ভাবলেন যে এবার একটা কিছু না করলেই নয় । এই ভেবে তিনি নারকেল ছোবড়ার এক বিশাল দড়ি বানালেন । সেই দড়িতে ফাঁস লাগালেন । সকালবেলা পূর্ব সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কখন সূর্য ওঠে সেই অপেক্ষায় । যথাসময়ে সূর্য দেখা দিলেন হাসিমুখে ।

মাউই তৈরি ছিলেন, তিনি অমনি সেই দড়িটার ফাঁস ছুঁড়ে দিলেন সূর্যের মাথা লক্ষ করে । আটকে গেল ঠিকই কিন্তু সূর্যের তেজে সে দড়ি মহূর্তে পুড়ে ছাই হয়ে গেল । সূর্য হাসতে হাসতে আকাশপথে ছুটে চলে গেলেন পশ্চিমের দিকে ।

মাউই কি আর করেন, বিরসমুখে বাড়িতে ফিরে এলেন । এরপরে তিনি খান না, দান না, সারাদিন বসে বসে ভাবেন কি করা যায় ।

মাউইএর স্ত্রীর নাম ছিল হিনা । সেও ছিল অতি বুদ্ধিমতী মেয়ে আর তারও ছিল নানারকম জাদুক্ষমতা ।

হিনার চুল ছিল দেখবার মতো, একেবারে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা । সমুদ্রের ঢেউএর মতো বিপুল কেশরাশি । ভগবানের কাছে হিনা বর পেয়েছিল যে তার এই পবিত্র চুল কখনো নষ্ট হবে না । আগুনে পুড়ে জলে ভিজে বা অন্য কোনোভাবে এর কোনো ক্ষতি হবে না ।

মাউইকে দিনরাত চিন্তা করতে দেখে সে জানতে চাইলো কেন মাউই এরকম শুকনো মুখে দিনরাত ভাবে । মাউই তাকে খুলে বললো সবকিছু ।

শুনে হিনা হেসে বললো, “ও এই কথা ? তা এই নিয়ে এতো ভাবছো তুমি ? আমার এ চুল থেকে বানাও না তোমার দড়ি ?”

বলেই পত্রপাঠ হিনা তার বিশাল চুলের ঝরনা একেবারে গোড়া থেকে কেটে দিয়ে দিল মাউইকে । মাউই একটু কিন্তু কিন্তু করছিলেন প্রথমে – হিনার এমন সুন্দর চুল এভাবে কেটে ফেলতে হচ্ছে – কিন্তু হিনা বলে, “তাতে কি হয়েছে ? এ চুল আবার গজাবে । এর জন্য অত ভাবনা কি ?”

মাউই হিনাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে সেই চুল থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে তৈরি করলেন বিশাল একগাছা দড়ি, তাতে ফাঁস লাগালেন ।

সকালবেলা আগের মতই পুব সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি । যেই না সূর্য দেখা দিয়েছেন তার টুকটুকে মুখটি নিয়ে, অমনি সেই দড়ির ফাঁস ছুঁড়ে দিলেন তিনি । অব্যর্থ লক্ষ্য । ফাঁস আটকে গেল ।

এবারে আর দড়ি পুড়ে গেল না দেখে সূর্য খুব ঘাবড়ে গেলেন । তারপরে তিনি তাঁকে ছেড়ে দেবার জন্য মাউই এর কাছে কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন ।

মাউই কিন্তু কিছুতেই তাঁকে ছাড়তে রাজি হলেন না । শেষে সূর্যকে দিয়ে কড়ার করিয়ে নিলেন যে সূর্য খুবই আস্তে আস্তে আকাশপথে চলবেন, মোটেই ছুটোছুটি করবেন না, তবে তিনি ছাড়া পাবেন ।

সূর্য বললেন, “তা আর বলতে ? আর কখনো ছুটি ? এবার থেকে আমি খুব সুবোধ বালকের মতো আস্তে আস্তে গুটি গুটি পায়ে পথ চলবো । শীগগির ছেড়ে দাও, বডেডা লাগছে । “

মাউই হেসে বললেন, “মনে থাকে যেন । যদি আর কখনো ছুটেছ তাহলে আবার ধরবো তোমায় । তখন হাজার কাকুতি মিনতিতেও আর ছেড়ে দেবো না । “

সূর্য বললেন, “না না আর কখনো এরকম করবো না ।”

মাউই তাকে ছেড়ে দিলেন, সেই থেকে সুর্য আকাশপথে ধীরে ধীরে চলেন । আমরা তাই পেয়েছি অনেক বড়ো দিন – প্রায় বারো ঘন্টার দিন ।

মাউই-দের উপকথাটি নীল ফিলিপ-এর “দ্য ইলাসট্রেটেড ফেয়ারি টেল্স্‌” বইতে সংকলিত ।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments