Wednesday, July 29, 2026
Homeগোয়েন্দা গল্পমুকুন্দপুরের মনসা - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

মুকুন্দপুরের মনসা – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

মুকুন্দপুরের মনসা – ১

বছর পনরো আগের কথা। বেশ-কিছুদিন আগেই পাক-ভারত যুদ্ধ শেষ হয়েছে। প্রতিষ্ঠা হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের। খান-সেনাদের অত্যাচারে যারা সীমান্ত পার হয়ে এদিকে চলে এসেছিল, তাদেরও অধিকাংশই আবার যে যার জায়গায় ফিরে গেছে। বাতাসে আর বারুদের গন্ধ নেই।

আমি তখন পার্ক সার্কাস এলাকার একটা গলিতে থাকি। খবরের কাগজে কাজ করি; তা ছাড়া আছে নিজের লেখালেখির কাজ। পুজো-সংখ্যা বেরিয়ে যাওয়ায় হাত তখন অনেকটা হালকা। বারোয়ারি পুজোর হট্টগোলে অবশ্য দিন কয়েক আগেও প্রাণ একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সত্যিই তা-ই। আমাদের এই সরু গলির মধ্যেও একটা বারোয়ারি পুজো হয়। সেখানে অষ্টপ্রহর যে ফিল্মি গানার দাপট চলছিল, তাতে প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছিল যে, আর নয়, প্রাণপাখি এবারে নির্ঘাত খাঁচা ভেঙে পালাবে।

তা সেই হট্টগোল এখন অনেকটা ঝিমিয়ে এসেছে। লক্ষ্মীপুজোও শেষ। রেলগাড়িতেও আর সেই আগের মতো ভিড় নেই। এর মধ্যে এক আত্মীয়কে একদিন দিল্লি মেলে তুলে দেবার জন্যে হাওড়া স্টেশনে যেতে হয়েছিল। গিয়ে দেখলুম, তিনি যেখানে জায়গা পেয়েছেন, সেই কিউবিকূলের চারটে বার্থের মধ্যে দুটোই খালি। দেখে মনে হল, রিজার্ভেশনের জন্যে এখন আর তিন মাস আগে থাকতে লাইন লাগাবার, কি সেটা না-পারলে রেল কোম্পানির কোনও কর্তাব্যক্তির কাছে গিয়ে উমেদারি করবার, দরকার নেই। তা হলে তো দিন পনরো-কুড়ি ছুটি নিয়ে আমিও একটু বাইরের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে আসতে পারি। দফতরে এখন কাজের চাপও অনেক কম। হাওড়া স্টেশন থেকে ফিরে আসতে-আসতে তাই ভাবছিলুম যে কলকাতা থেকে এবারে বেরিয়ে পড়লে নেহাত মন্দ হয় না।

সেদিন রাত্তিরেও তাই নিয়ে কথা হচ্ছিল। খাওয়ার পাট চুকিয়ে, মুখে এক কুচি সুপুরি ফেলে, একটা সিগারেট ধরিয়ে ইজিচেয়ারে এসে গা ঢেলে দিয়েছি, ছেলেপুলের মা বললেন, “বেরিয়ে যে পড়বে বলছ, যাবেটা কোথায়?”

“কেন, সে তো ঠিক করাই আছে। ব্যাঙ্গালোর। চারু ভাদুড়ি ফি-বছর বিজয়ার চিঠিতে শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখেন যে, এবারে যেন দিন কয়েকের জন্যে ওঁর ওখানে গিয়ে ছুটি কাটিয়ে আসি। তা কোনও বারেই কি আমাদের যাওয়া হয়? হয় না। একটা-না-একটা ঝঞ্ঝাটে শেষ পর্যন্ত আটকে যাই। চলো, এবারে গিয়ে ওঁকে চমকে দেব।”

“তা হলে তো ভালই হয়। তবে কিনা মাদ্রাজ হয়ে তারপর যাব।”

ভদ্রমহিলা যে কেন মাদ্রাজ যেতে চান সেটা আর তাঁকে ব্যাখ্যা করে বলতে হল না। মাদ্রাজে তাঁর দিদি থাকেন। তিনিও ফি-বছর বিজয়ার চিঠিতে মাথার দিব্যি দিয়ে জানান, দিন কয়েকের জন্য আমরা যেন অতি অবশ্য তাঁর কাছে গিয়ে ছুটি কাটাই। যদি যাই, তা হলে মাদ্রাজের স্নেক-পিট আর ক্রোকোডাইল পার্কে তো তিনি আমাদের নিয়ে যাবেনই, উপরন্তু গোল্ডেন বিচ রিজর্ট থেকে মহাবলীপুরম পর্যন্ত ধারেকাছে যা-কিছু দর্শনীয় জায়গা আছে, সবই দেখিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন।

বললুম, “বেশ তো। দিন কয়েক মাদ্রাজে থেকে তারপরেই নাহয় ব্যাঙ্গালোর যাওয়া যাবে। বৃন্দাবন এক্সপ্রেসের নাম শুনেছ তো? অতি চমৎকার ট্রেন। মাদ্রাজ থেকে ব্যাঙ্গালোর যাওয়াটা কোনও ব্যাপারই নয়।”

“কবে নাগাদ রওনা হব?”

“যে-দিন বলবে, সেই দিনই। কী জানো, আমারও মন বড্ড যাই-যাই করছে। বলো তো পরশু দিনই রওনা হতে পারি। টুকিটাকি যা-কিছু কেনাকাটা করবার, কাল করে নেব। তারপর পরশু দিনই ট্যাক্সি ডেকে হাওড়া স্টেশন। গুডবাই ক্যালকাটা!”

“বা রে, রিজার্ভেশন করতে হবে না?”

“রিজার্ভেশন এখন আর কোনও সমস্যাই নয়। ভিড় কেটে গেছে।”

“ঠিক আছে, পরশু না-হলে তরশু। তবে কিনা…।”

“আবার ‘তবে’ কেন? আটকাচ্ছেটা কোথায়?”

“আটকাবার কথা তো বলিনি। তবে কিনা ভাদুড়িমশাই এখন ব্যাঙ্গালোরে আছেন কি না, সেটা ঠিক জানো তো?”

“নেই, এমন কথা ভাবছ কেন?”

“এই জন্যে ভাবছি যে, ফি-বছর তো বিজয়ার পর দিন-দুয়েকের মধ্যেই তাঁর চিঠি পাই। এবারে কিন্তু লক্ষ্মীপুজোও চলে গেল, তবু তাঁর চিঠি পাইনি।”

ভদ্রমহিলা ভুল বলেননি। সত্যিই এবার চিঠি আসেনি ব্যাঙ্গালোর থেকে। কেন আসেনি, কে জানে। ভাদুড়িমশাই অসুস্থ হয়ে পড়েননি তো? নাকি ব্যাঙ্গালোর থেকে কোনও কাজ নিয়ে তিনি অন্য কোথাও গেছেন? নাকি চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু ডাক-বিভাগের গাফিলতিতে সে-চিঠি আজও আমাদের কাছে এসে পৌঁছয়নি? সেও কিছু বিচিত্ৰ নয়।

বললুন, “তাই তো, বড় চিন্তায় ফেললে দেখছি। যাঁর কাছে থাকব বলে যাওয়া, গিয়ে যদি দেখি যে, তিনিই নেই, তবে তো চিত্তির!”

ভদ্রমহিলা বললেন, “এত ভাবছ কেন? ওঁর ব্যাঙ্গালোরের বাড়ির ফোন নাম্বার তো তোমার ডায়েরিতে টোকাই আছে, রাতও বেশি হয়নি, একটা ট্রাঙ্ক-কল করলেই তো হয়।”

পকেট-ডায়েরি থেকে ফোন-নাম্বারটা দেখে নিয়ে রিসিভার তুলতে যাব, ঠিক তখনই আমাকে চমকে দিয়ে ঝন্‌ঝন্‌ করে ফোন বেজে উঠল।

“হ্যালো…”

“কেমন আছেন মশাই?”

গলা শুনে চমকে উঠলুম। চারু ভাদুড়ি। এমন কিছু মানুষ আছেন, আড়াল থেকে কথা বললেও যাঁদের কন্ঠস্বর থেকেই চোখের কৌতুক আর ঠোঁটের বঙ্কিম রেখাটি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখে নেওয়া যায়। ভাদুড়িমশাই সেই রকমের মানুষ। বললুম, “আগে বলুন, কোত্থেকে ফোন করছেন। তারপরে আমি বলব, ভাল আছি না মন্দ আছি।”

“ব্যাঙ্গালোর থেকে নয়, আপনাদের এই কলকাতা শহর থেকেই।”

“তা হলে আমি ভাল নেই।”

“কেন, কেন?”

“আরে, মশাই, আমি তো কলকাতা থেকে বেরিয়ে পড়বার প্ল্যান এঁটেিেছ। এখান থেকে মাদ্রাজ যাব। তারপর সেখানে বাসন্তীর দিদির বাড়িতে দিন তিন-চার কাটিয়ে চলে যাব ব্যাঙ্গালোর। সেঁই জন্যে আপনাকে ট্রাঙ্ক-কলও করতে যাচ্ছিলুম। তা ঠিক তক্ষুনি আপনার ফোন এল। কোত্থেকে এল? না কলকাতা থেকে। অর্থাৎ কিনা আমি যাঁর টানে ব্যাঙ্গালোর যাবার প্ল্যান আঁটছিলুম, ছুটি কাটাবার জন্যে তিনিই চলে এসেছেন কলকাতায়। তা হলে আর ব্যাঙ্গালোর যাওয়া হল না, প্ল্যানের দফা রফা হয়ে গেল। এই অবস্থায় আর ভাল থাকি কী করে?”

শুনে হোহো করে হেসে উঠলেন চারু ভাদুড়ি। তারপর বললেন, “এই কথা? তা হলে নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনার প্ল্যান মোটেই ভেস্তে যাচ্ছে না। আমি মোটেই ছুটি কাটাতে আসিনি। একটা কাজ নিয়ে এসেছিলুম। সেটা মিটেছে। কালই ফিরে গেলে হয়।”

“কবে এসেছেন?”

“তা দিন পনরো তো হবেই।”

“আমাকে জানাননি কেন?”

“সময় পেলুম কোথায়? আরে মশাই, সকাল থেকে রাত বারোটা অবধি হন্যে হয়ে গোটা শহর ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। না না, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঠাকুর দর্শনের জন্যে নয়, মহা ধুরন্ধর এক স্মাগলারের খোঁজে। এর মধ্যে একদিন আবার চন্দননগরেও যেতে হয়েছিল। সময় পেলে কি আর আপনাকে একটা ফোন করতুম না? নিশ্চয় করতুম। তা মশাই, বিশ্বাস করুন, দম ফেলবারও সময় পাইনি। যাই হোক, কাজটা আজ বিকেলে মিটল।”

“কালই চলে যাবেন?”

“কালও যেতে পারি, পরশু গেলেও ক্ষতি নেই। কী জানেন, অনেক কাল বাদে এলুম তো, তাই ভাবছিলুম যে, আরও দু’চারটে দিন এখানে কাটিয়ে গেলে নেহাত মন্দ হত না। আবার কবে আসা হবে, কে জানে।”

“আমি তো পরশুই কলকাতা ছাড়ার কথা ভাবছি।”

“বটে? তা বেশ তো, আপনারা মাদ্রাজে গিয়ে তিন-চারদিন কাটিয়ে তারপর ব্যাঙ্গালোরে চলে আসুন। তার আগেই আমি ব্যাঙ্গালোরে পৌঁছে আপনাদের প্রতীক্ষায় থাকব।”

“কোথায় উঠেছেন?”

“যতীন বাগচি রোডে, আমার ছোট বোন মালতীর বাড়িতে।”

“তারা তো বেহালায় থাকত, যতীন বাগচি রোডে উঠে এল কবে?”

“তা বছর তিন-চার তো হলই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিন, নম্বরটা লিখে রাখুন… চোদ্দর সাতের দুয়ের বি। হলদে রঙের তিনতলা বাড়ি, পার্কের খুব কাছে। বোনের ফ্ল্যাট দোতলায়। কাল তো রবিবার। হাতে কোনও জরুরি কাজ না থাকলে সকাল সাতটার মধ্যেই এখানে চলে আসুন। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।”

বললুম, “অত সকালে যাব কী করে? আমি দেরিতে ঘুমোই, আটটার আগে ঘুম ভাঙে না। চা-টা খেয়ে ওখানে পৌঁছতে পৌঁছতে অন্তত নটা বাজবে।”

“আরে মশাই,” ভাদুড়িমশাই অনুযোগের গলায় বললেন, “বাড়ি থেকে চা খেয়ে বেরুবেন কেন, ও-বস্তু কি আমরা খাই না? এখানে এসে চা খাবেন। আর চেষ্টা যদি করেন, তা হলে একটা দিন নিশ্চয়ই একটু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠাও বিশেষ শক্ত হবে না। দরকার হয় তো ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে শোবেন। দাঁড়ান, দাঁড়ান, একটু ধরুন তো…”

বুঝলুম,পাশে কারও সঙ্গে কথা বলছেন। একটু বাদেই আবার তাঁর গলা পাওয়া গেল। “শুনুন কিরণবাবু, কাল আমার ভাগ্নে কৌশিকের জন্মদিন, তাই মালতী বলছে, দুপুরের খাওয়াটাও আপনাকে এখানেই সেরে নিতে হবে। …না না, বিশেষ কিছু আয়োজন করা হয়নি। আর হ্যাঁ, মালতী বলছে, বাসন্তীকেও নিয়ে আসুন।”

“বাসন্তী কী করে যাবে? পরশু মাদ্রাজ যাব, তার গোছগাছ আছে না?

“ঠিক আছে, তা হলে আপনি একাই আসুন। মোট কথা,দেরি করবেন না, আটটার মধ্যে আপনাকে এক্সপেক্ট করছি।”

ভাদুড়িমশাই ফোন নামিয়ে রাখলেন।

ছেলেপুলের মা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। সব শুনে তিনি বললেন, “কী গেরো রে বাবা! পরশু কলকাতা ছাড়ছি, ভাবলুম কাল দু’জনে মিলে কিছু কেনাকাটা করে নেব, তা তুমি তো কাল সারাটা দিনই আড্ডা দিয়ে কাটাচ্ছ, রাজ্যের ঝক্কি এখন আমাকে একাই সামলাতে হবে। তাও নাহয় সামলালুম, কিন্তু ছুটির দরখাস্তটা তো তোমাকেই করতে হবে, সেটা করবে কখন?”

“ওটা এখনই করছি না। সন্তোষকে কাল এক সময় ফোন করে জানিয়ে দেব যে, দিন কয়েকের জন্যে একটু বাইরে যাচ্ছি, তাড়াহুড়োর মধ্যে এখন লিভ অ্যাপ্লিকেশনটা দিয়ে যেতে পারলুম না, ফিরে এসে দেব।”

“অর্থাৎ কিনা তুমি একটা বেআইনি কাজ করবে, তোমার বন্ধুরা সেটার সামাল দেবেন, এই তো? চমৎকার চাকরি।”

ভদ্রমহিলা মুখ টিপে হাসলেন। আমিও হাসলুম। এইসব টিপ্পনী শুনে এককালে খুব রেগে যেতুম, এখন আর রাগি না।


রবিবারের সকাল। ঘুম থেকে উঠতে-উঠতে বেলা হয়ে গেল। ভাদুড়িমশাই ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে শুতে বলেছিলেন। বাসন্তীই এ-বাড়ির অ্যালার্ম ঘড়ি, তাকে বলেছিলুম, ভোর ছ’টায় যেন আমাকে তুলে দেয়। তা তুলে দেবার চেষ্টা সে নাকি করেছিল, কিন্তু আমিই নাকি উঠিনি। যতবার আমাকে ঠেলাঠেলি করেছে, ততবারই আমি নাকি পাশ ফিরে শুয়ে বলেছি, ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ হবেও বা।

এখনও শীত পড়েনি। গরম জলের দরকার হয় না। চটপট দাড়ি কামিয়ে, মাথায় দু মগ জল ঢেলে কাকস্নান সেরে যখন বাথরুম থেকে বার হলুম, রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বাসন্তী তখন জানিয়ে দিল, ‘সাড়ে সাতটা’। এ যখনকার কথা বলছি, ‘সুকুমার সমগ্র’ তখন সদ্য বেরিয়েছে। আর-একজনকে দেব বলে তার প্রথম খন্ড কিনে রেখেছিলুম, কৌশিকের জন্মদিনের উপহার হিসেবে সেটাই একখানা রঙিন কাগজে মুড়ে নিয়ে, গলি থেকে বড়রাস্তায় বেরিয়ে, অনেক কষ্টে একটা ট্যাক্সি ধরে যখন যতীন বাগচী রোডের ফ্ল্যাটে গিয়ে কলিং বেল টিপলুম, ঘড়িতে তখন একেবারে কাঁটায় কাঁটায় আটটা।

মালতীই দরজা খুলে দিল।

চারু ভাদুড়ির ভাই নেই। থাকবার মেধ্যে তিন বোন। তাদের মধ্যে একমাত্র এই ছোটটিকেই আমি চিনতুম। এম. এ. পাশ করে আমাদের কাগজে ট্রেনি হয়ে ঢুকেছিল, কিন্তু শিক্ষানবিশির পর্ব শেষ করেনি। অধ্যাপনার চাকরি পেয়ে খবরের কাগজ ছেড়ে দেয়। কাগজে যখন কাজ করত, তখন অবশ্য জানতুম না যে, চারু ভাদুড়ি ওর দাদা। পরে একদিন ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে যখন তাঁর ভবানীপুরের বাড়িতে গিয়ে কড়া নাড়ি, আর দোতলার জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে মালতী বলে যে, দাদা বাড়িতে নেই, তখন অবাক হয়ে যাই। ভবানীপুরের সেই বাড়িতে থাকতেই মালতীর বিয়ে হয়েছিল। স্বামী ডাক্তার। শ্বশুরবাড়ি শুনেছিলুম বেহালায়। সে কি আজকের কথা! মালতী অবশ্য তার দাদার সঙ্গে আমার পরিচয়ের কথা জানত। কিন্তু কাগজে কাজ করবার সময়ে ঘুণাক্ষরেও তা আমাকে জানায়নি।

দরজা খুলে দিয়ে, একপাশে একটু সরে দাঁড়িয়ে মালতী বলল, “আসুন, কিরণদা।”

আমি তো অবাক। মালতী বলল, “কী হল, চিনতে পারছেন না?”

চেনা সত্যিই শক্ত। বেণী-দোলানো ছিপছিপে যে মেয়েটিকে আমি চিনতুম, এ তো সে নয়, রীতিমতো ভারিকে চেহারার এক ভদ্রমহিলা। বললুম, “মা যা হইয়াছেন!”

মালতী বলল, “মা যা হইয়াছেন নয়, মালতী এখন মা হইয়াছেন!” বলে হো হো করে হেসে উঠল। তাতে বুঝলুম, চেহারা পালটেছে বটে, কিন্তু হাসিটা কিছুমাত্র পালটায়নি।

কথা শুনে ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। এগিয়ে এসে বললেন, “আরে আসুন, আসুন।” তাঁর সঙ্গেও অনেক বছর বাদে দেখা। কিন্তু ভদ্রলোকের চেহারা দেখলুম সেই আগের মতোই রয়েছে। বয়স হয়েছে। অথচ শরীরে কোথাও বাড়তি একটুও মেদ নেই। তেমনি সটান, ঋজু দেহ। তেমনি জ্বলজ্বলে দুটি চোখ, আর তেমনি তীক্ষ্ণ চাউনি।

ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে প্রথম যখন আমার সাক্ষাৎ হয়, তখন ওই চোখ দুটি দেখেই বুঝতে পেরেছিলুম যে, মানুষটি নেহাত সাধারণ নন, আর পাঁচজন লোকের থেকে একটু আলাদা। সাক্ষাৎটা হয়েছিল বিষাণগড়ে। বি. এ. পাশ করবার পর কিছুদিন স্রেফ বেকার বসে ছিলুম। তারপর বিষাণগড়ের রাজবাড়িতে একটা কাজ পেয়ে যাই। কেয়ার টেকারের কাজ। কাজটা অবশ্য বেশিদিন করিনি। তবে ‘করিনি’ না বলে ‘করা সম্ভব হয়নি’ বললেই হয়তো ঠিক বলা হয়। সেখানকার পোলিটিক্যাল এজেন্ট যে পাকা চোর, তা বুঝবার সঙ্গে সঙ্গে স্রেফ প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে আমি বিষাণগড় থেকে পালিয়ে আসি। চুরিটা ধরে ফেলেছিলেন ভাদুড়িমশাই। কিন্তু ধরেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এর পরে আর ওই ভয়ঙ্কর জায়গায় থাকা তাঁর পক্ষে বিশেষ নিরাপদ হবে না। ফলে, চাকরি ছেড়ে তিনিও কলকাতায় চলে আসেন। এখানে তিনি একটা প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির হয়ে কাজ করতেন। গোটা দুই-তিন রহস্যের কিনারা করে তখন তাঁর খুব নামও হয়েছিল। তবে কলকাতাতেও তিনি বেশিদিন থাকেননি। বড় একটা চাকরির অফার পেয়ে ব্যাঙ্গালোরে চলে যান। মাঝেমধ্যে কলকাতায় আসতেন। এলে যোগাযোগও করতেন। তা ছাড়া, বিজয়ার চিঠি লিখতেন নিয়মিত। এবারে তা প্রায় বছর-পাঁচেক বাদে তিনি কলকাতায় এলেন।

ড্রইংরুমে ঢুকে বললুম, “ডাক্তারবাবু কোথায়?”

চারু ভাদুড়ি বললেন, “কে, অরুণ? কল্-এ বেরিয়েছে। এক্ষুনি এসে পড়বে। …তারপর বলুন খবর কী? সবাই ভাল আছেন তো?”

“বেঁচেবর্তে আছি, এই বাজারে এটাই সবচেয়ে ভাল খবর।”

ট্রে-র উপরে চা আর জলখাবার সাজিয়ে মালতী ইতিমধ্যে ড্রইংরুমে এসে ঢুকেছিল। বলল, “খাবারগুলো ফেলে রাখবেন না। খেতে-খেতে গল্প করুন। একটু বাদে আবার আমি চা দিয়ে যাব।”

গল্প জমে উঠতে দেরি হল না।

কার্তিক মাস। হেমন্তকাল। গরম এখনও কাটেনি, তবে আকাশ ধোঁয়াটে, সকালে আর সন্ধেবেলায় ময়দানে, গঙ্গায় আর লেকের ধারে অল্পস্বল্প কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। বারোয়ারি পুজোর জগঝম্পের ঠেলায় কিছুদিন আগেই সকলের কানের পর্দা ফাটবার জোগাড় হয়েছিল। তারপর লক্ষ্মীপুজোও শেষ হয়েছে। আপাতত কোথাও ঢাকের বাদ্যি শোনা যাচ্ছে না। পুজোর ছুটির চারটে দিনের সঙ্গে আরও কয়েকটা দিন জুড়ে দিয়ে যাঁরা মারদাঙ্গা করে ট্রেনের টিকিট কেটে বাইরে পাড়ি দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আবার গুটিগুটি এই শহরের খাঁচায় এসে ঢুকতে আরম্ভ করেছে, আর সেই সঙ্গে ফের শুরু হয়েছে কলকাতাবাসীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ইস্কুল-কলেজ বন্ধ বটে, তবে অফিস-কাছারি বিজয়ার পরেই খুলে গেছে। রাস্তাঘাটে জ্যাম যে একেবারেই হচ্ছে না তা নয়, তবে কিনা পুজোর দিনগুলোর মতো গাড়িগুলো আর ঘন্টার পর ঘন্টা কোথাও নট নড়নচড়ন-নট-কিচ্ছু হয়ে আটকে থাকছে না। অর্থাৎ আবহাওয়া এখন আর সরগরম নয়, মোটামুটি ঠান্ডা।

কালীপুজোর দিন-দুই আগে পর্যন্ত এই ঠান্ডা ভাবটাই বজায় থাকবে বটে, কিন্তু তারপরেই আবার আকাশে হাউই উড়বে, মাথার উপরে আচমকা নেমে আসবে উড়ন-তুবড়ির খোল, ছুঁচোবাজির দাপটে রাস্তাঘাটে সবাইকে একেবারে তটস্থ হয়ে থাকতে হবে, মুহুর্মুহু পটকা, দোদমা আর বোমা ফাটবে, আর শহর জুড়ে চলতে থাকবে শ্যামা-মায়ের চেলাচামুন্ডাদের উদ্দাম নৃত্য।

ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে তাই নিয়ে আক্ষেপ করায় তিনি অবাক হয়ে বললেন, “আরে, এতে এত রেগে যাচ্ছেন কেন?”

“আপনার রাগ হয় না?”

“মোটেই না। আমি তো এই হইচইটা ভীষণ মিস করি কিরণবাবু। ব্যাঙ্গালোরে থাকি, সেখানে সারাটা বছরই যে খুব নিরানন্দে কাটে তা বলব না, আমোদ-আহ্লাদ উৎসব-টুতসবের বিস্তর উপলক্ষ আছে সেখানেও, আলো জ্বলে, মাইক বাজে, সবই হয়, কিন্তু বিশ্বাস করুন মশাই, এই পুজোর সিজনটা এলেই মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। খালি মনে হয়, দুর ছাই, কেন যে দুটো পয়সার লোভে এখানে এলুম, কলকাতায় থাকলেই ভাল হত।”

মালতীর স্বামী অরুণ সান্যাল ইতিমধ্যে রোগী দেখে ফিরেছিলেন। হাসিখুশি মানুষ। বসবার ঘরে ঢুকে স্টেথোস্কোপ আর ব্লাড প্রেশার মাপবার যন্ত্রটাকে সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন, “তা কলকাতায় থাকলে যে ভাল হয়, সে তো আমরাও বলি। থাকেন না কেন?”

“উপায় নেই রে ভাই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যেখানে যার ভাতের থালা, সেখানেই তাকে থাকতে হবে। ভগবান অমার জন্যে ব্যাঙ্গালোরে ভাত বেড়ে রেখেছেন, ফলে সেইখানেই আমাকে থাকতে হয়। তবে কিনা খুব-একটা আনন্দে থাকি না। মনটা বড্ড ছটফট করে।”

বললুম, “এই হুল্লোড়ের জন্যে?”

“সব কিছুর জন্যে। এমন কী, যে ঢাকের বাজনায় এত আপত্তি আপনার, সেই বাজনাটা শুনবার জন্যেও মাঝে-মাঝে বড় ব্যাকুল হয়ে পড়ি, মশাই। আপনি একাই যে অ্যান্টি-ঢাক, তা অবশ্য নয়, দলে হয়তো আপনারাই ভারী, এই তো…মালতীও সেদিন কানে আঙুল দিয়ে বলছিল যে, ঢাকের বাজনা থামলে মিষ্টি, কিন্তু কী জানেন, এই বাজনাটা আমার জীবনে একেবারেই থেমে গেছে তো, তাই এবারে দু’কান ভরে শুনে নিলুম।”

মালতী ইতিমধ্যে দ্বিতীয় প্রস্ত চা নিয়ে এসেছিল। ট্রে থেকে তুলে হাতে-হাতে চায়ের পেয়ালা ধরিয়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “আর হাসিও না, দাদা! এমনভাবে কথা বলছ যে মনে হচ্ছে, ব্যাঙ্গালোর বোধহয় ইউরোপ কি আমেরিকার কোনও শহর। কেন, ব্যাঙ্গালোরে বুঝি ঢাক বাজে না?”

“তা কেন বাজবে না? একশো বার বাজে!” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কিন্তু তেমন করে বাজে না।”

অরুণবাবু বললেন, “অ্যা, টাকডুম টাকডুম বাজে’ বলে শচীন দেববর্মনের একটা গান আছে না? সেই গানের মধ্যে যেন এই রকমের একটা কথা শুনেছি।”

চারু ভাদুড়ি বললেন, “ঠিকই শুনেছ। তেমন করে বাজে না।”

আমি বললুম, “যার জন্মদিন, তাকে দেখছি না কেন? কৌশিক কোথায়?”

মালতী বলল, “দাদার সঙ্গে জগিং করতে বেরিয়েছিল। এমনিতে তো বাবুর ঘুমই ভাঙতে চায় না। কিন্তু দাদা আসবার পর থেকেই দেখছি ভোর পাঁচটায় বিছানা থেকে উঠে দাদার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজও আমরা মামা-ভাগ্নে ঠিক পাঁচটাতেই উঠেছি। তারপরে মাইল দুয়েক দৌড়েছিও। লেক থেকে ফেরার পথে ও রিক্তাদের বাড়িতে ঢুকল। বলল, রিক্তামাসি ওর জন্যে পায়েস রেঁধে রেখেছে। খেয়ে ফিরবে।

আমি বললুম, “রিক্তা কে মালতী?”

“আমার বন্ধু। ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে পড়তুম। ওর ছেলে বুবনু আর কৌশিক তীৰ্থপতিতে একই ক্লাসে পড়ে। দুজনে খুব বন্ধুত্ব। ওদের বাড়িতে গেলে তাই আর আসতেই চায় না। আজ অবশ্য তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে বলেছি।”

বলতে-না-বলতে কৌশিক এসে পড়ল। সুকুমার সমগ্র’ পেয়ে সে দারুণ খুশি। বইয়ের পাতা ওলটাতে-ওলটাতে বলল, “যাই মা, বুবনুকে একবার দেখিয়ে আনি। এক ছুটে যাব আর চলে আসব।”

মালতী বলল, “কিরণদা, আমার মাংস রান্না হয়ে গেছে। একবার এসে একটু টেস্ট করে যান তো আমার কর্তাটি তো কিছুই বোঝেন না, আপনি ঠিক বলতে পারবেন, আর একটা স্টিম লাগবে, নাকি এই ঠিক আছে।”

বলে আমাকে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে গেল মালতী। গিয়ে প্রেশার কুকারের ভিতর থেকে হাতায় করে এক টুকরো মাংস তুলে একটা প্লেটে ঢেলে প্লেটটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “আসলে কিন্তু ঠিক এইজন্যে আপনাকে ডেকে আনিনি, কিরণদা। অন্য একটা কথা আছে।”

অবাক হয়ে বললুম, “কী কথা?”

“অরুণের স্বাস্থ্য মোটেই ভাল যাচ্ছে না। মাস খানেক আগে ছোটখাটো একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে। ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলছে, ও নিজেও ডাক্তার, জানে যে, বিশ্রাম নেওয়া দরকার, তবু নেবে না। ভেবেছিলুম, ওকে আর কৌশিককে নিয়ে দাদার সঙ্গে আমিও মাসখানেকের জন্যে ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে থাকব। কিন্তু ও রাজি নয়। বলে, ওর রোগীদের মধ্যে দু-তিনজনের অবস্থা মোটেই ভাল যাচ্ছে না, এই সময়ে ও যদি কলকাতা ছেড়ে বাইরে যায় তো তাদের কী হবে।”

বললুম, “ওর জানাশোনা অন্য কোনও ডাক্তারের হাতে ওদের তুলে দিয়ে গেলেই তো পারে। সেটাই তো রীতি।”

মালতী বলল, “তো সেই কথাটাই ওকে একটু বুঝিয়ে বলুন। দাদা আর আপনি, দু’জনে মিলে যদি বলেন তো আমার মনে হয় আপনাদের কথা ও ফেলতে পারবে না।”

বললুম, “বলব।” তারপর প্লেট থেকে তুলে মাংসের টুকরোটা মুখে ফেলে বললুম, “ঠিক আছে, আর স্টিম দেবার দরকার নেই।”

বসবার ঘরে ফিরে এসে দেখি, বাংলাদেশের ঢাকের বাজনা থেকে ভাদুড়িমশাই এসে শান্তিপুরী শাড়ির প্রসঙ্গে ঢুকেছেন। শাড়ির থেকে সঙ্গীত। সঙ্গীত থেকে মন্দির-স্থাপত্য। এমনকি, তাতেও নাকি বাঙালির প্রতিভার স্বাক্ষর একেবারে জ্বলজ্বল করছে।

এই শেষ কথাটায় অরুণবাবু আর আমি একটু সংশয় প্রকাশ করেছিলুন। ভাদুড়িমশাই আমাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, “সত্যিই তা-ই। আরে বাবা, আমি কি কোণার্কের সূর্য-মন্দির দেখিনি? নাকি ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ টেম্পল না-দেখেই আমি আমাদের মন্দির-স্থাপত্যের মহিমা কীর্তন করতে বসেছি? শুধু ওই দুটি মন্দির কেন, ভারতবর্ষের হরেক এলাকায় এমন আরও বিস্তর মন্দির রয়েছে, যার উচ্চতা তো বটেই, শিল্পশোভা দেখেও আমাদের তাক লেগে যায়। তা থাক না। আমরা সমতল এলাকার বাসিন্দা, আমাদের এদিকে পাহাড় নেই, তাই পাহাড় কেটে পাথর এনে বড় বড় সব মন্দিরও আমরা বানাতে পারিনি। কিন্তু তাতে হলটা কী? মাটি পুড়িয়ে ইট বানিয়ে তাই দিয়ে যে-সব মন্দির আমরা গড়েছি, তার স্থাপত্যের বাহার কি কারও চেয়ে কিছু কম? আর শিল্প-শৈলীর কথাই যদি তোলেন কিরণবাবু, তো আমি বলব, আমাদের টেরাকোটার মন্দিরের কোনও তুলনাই আমি খুঁজে পাই না। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, এবারে যে আমি কলকাতায় এলুম, তাও আসলে একটা মন্দিরের ব্যাপারেই।”

“মন্দিরের ব্যাপারে?” অবাক হয়ে বললুম, “মানত-টানত ছিল নাকি?”

“আরে না, মশাই,” একগাল হেসে চারু ভাদুড়ি বললেন, “মন্দিরের ব্যাপারে মানে তার বিগ্রহের সন্ধানে। তিনশো বছরের পুরনো অষ্টধাতুর বিগ্রহ, হঠাৎ একদিন দেখা গেল, তিনি উধাও।”

“খোঁজ পেলেন?”

“পেলুম বই কী। কোথায় পেলুম জানেন? স্ট্র্যান্ড রোডের এক গুদামের মধ্যে। সেখান থেকে সেটিকে ক্যালকাটা এয়ারপোর্টে নিয়ে গিয়ে প্লেনে তুলে দেবার ব্যবস্থা হচ্ছিল। যদি আর একটা দিনও দেরি হত, তা হলে আর দেখতে হত না, বীরভূমের মন্দিরের বিগ্রহ তা হলে আমস্টার্ডামের মিউজিয়ামের শোভাবর্ধন করত।”

বললুম, “বিগ্রহ চুরির যেন একটা হিড়িক পড়ে গেছে, তাই না?”

“পড়েছেই তো। এই তো, আজকের কাগজটাই দেখুন না। একই দিনে দু’দুটো মন্দির থেকে বিগ্রহ উধাও। একটা খবর আলিপুরদুয়ারের কাছের এক গ্রামের, আর একটা খবর বাঁকুড়ার।”

অরুণবাবু বললেন, “এ তো দেখছি সর্বনেশে কান্ড!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সর্বনাশ বলে সর্বনাশ, এককালে এ-দেশ থেকে হিরেমুক্তো যেভাবে লোপাট হয়েছে, এখন সেইভাবে লোপাট হচ্ছে আমাদের প্রত্নদ্রব্য। আসলে ব্যাপারটা কী জানো, অরুশ, এ-সব মোটেই ছোটখাটো ছিঁচকে চোরের কান্ড নয়, এর পিছনে বড়-বড় সব মাথা রয়েছে। দেশের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে বিদেশে বেচে দিতে তাদের বিবেকে কিছুমাত্র বাধে না। বিদেশিরাও কোটি-কোটি টাকা ঢালছে। তিনশো বছরের পুরনো একটা গণেশমূর্তির জন্যে তারা কত টাকা অফার করেছিল জানেন কিরণবাবু?”

জানা হল না, কেন না তার আগেই কৌশিক এসে বলল, “মামাবাবু, তোমার ফোন, শিলিগুড়ি থেকে কারা যেন কথা বলতে চান। বললেন যে খুব জরুরি।”

ফোনে কথা বলে ড্রইংরুমে ফিরে ভাদুড়িমশাই বেজার গলায় বললেন, “ওই যে একটা কথা আছে না, আমি যাই বঙ্গে তো আমার কপাল যায় সঙ্গে, তা সেই কথাটা একেবারে অক্ষরে-অক্ষরে ফলে গেল। ব্যাঙ্গালোর থেকে বঙ্গে এলুম, কিন্তু কপালের লেখা তো আর খন্ডানো যায় না, একটা তদন্তের কাজ শেষ হতে না হতেই আর-একটা তদন্তের কাজ ঘাড়ে চাপল। ছুটির বারোটা বেজে গেল, মশাই।”

আমি বললুম, “কোথায়? কিসের তদন্ত?”

“ফের সেই বিগ্রহ-চুরির তদন্ত। একটু আগেই আলিপুরদুয়ারের কাছে এক গ্রামের মন্দির থেকে বিগ্রহ উধাও হবার কথা বলছিলুম না? ওই যে মশাই, আজকের কাগজে যার খবর বেরিয়েছে। আসলে ওটা এক ধনী ব্যবসায়ীর পৈতৃক বাড়ির মন্দিরের বিগ্রহ। ব্যবসায়ী ভদ্রলোক তাঁর গাঁয়ের বাড়িতে থাকেন না, শিলিগুড়িতে থাকেন। সেখান থেকেই ফোন করেছিলেন। মূর্তিটা উদ্ধার করে দিতে হবে, তা সে যত টাকাই লাগুক।”

“যাবেন?”

‘যেমন কাতর গলায় অনুরোধ জানালেন, তাতে আর ‘না’ বলতে পারলুম না। পরশুর বদলে দিন-সাতেক বাদে মাদ্রাজ গেলে হয় না কিরণবাবু?”

“তা হয়। কিন্তু এ-কথা কেন বলছেন বলুন তো?”

“আপনিও তা হলে আমার সঙ্গে চলুন না। সাত দিন হয়তো লাগবে না, তার অগেই হয়তো ফিরে আসব।”

“কবে যেতে হবে?”

“কালকেই। সকালের ফ্লাইটে।” চারু ভাদুড়ি বললেন, “আপনি রেডি হয়ে থাকবেন, এয়ারপোর্টে যাবার পথে আমি আপনাকে তুলে নেব।”


সাংবাদিকতার কাজে মাঝে-মাঝেই আমাকে বাইরে যেতে হয়। যখনই যাই, হালকা হাতে যাই, বোঝা বাড়াই না। এবারে যে-জন্যে যাচ্ছি, তার সঙ্গে অবশ্য আমার কাজের কোনও সম্পর্ক নেই। যাঁর কাজ, আমি তাঁর সঙ্গী মাত্র। কোথায় থাকব, কে জানে। তবে থাকব তো মাত্রই কয়েকটা দিন। তাও, যতদূর আঁচ করতে পারছি, গাঁয়ের মধ্যেই থাকতে হবে। রোজ-রোজ অতএব ধুতি-পাঞ্জাবি পালটাবার কোনও দরকার হবে না!

বাসন্তীও সে-কথা বুঝতে পেরেছিল। একটা হ্যান্ড-ব্যাগের মধ্যে যৎসামান্য জামাকাপড় গুছিয়ে দিতে দিতে সে তাই বলল, “মনে হচ্ছে, এতেই হয়ে যাবে। তবে কিনা যাচ্ছ তো নর্থবেঙ্গলে, সেখানে এই সময়ে একটু একটু শীত পড়ে, তাই একটা সোয়েটার আর হাল্কা একটা আলোয়ানও দিয়ে দিলুম। আর এই দেখে নাও, গতবারে তো বাইরে যাবার সময় শেভিং কিট্‌টা নিতে ভুলে গিয়েছিলে, সেটাও এখানে ব্যাগের এই একধারে ঢুকিয়ে দিয়েছি। একটা চিরুনি আর তোয়ালেও রইল। একটা টর্চও দিলুম। দ্যাখো, আর-কিছু লাগবে?”

লাগবে কি না, ভাবার সময় পাওয়া গেল না, রাস্তায় হর্ন বেজে উঠল। বোঝা গেল, ট্যাক্সি নিয়ে ভাদুড়িমশাই হাজির।

ছেলেমেয়েরা তখনও ঘুমোচ্ছে। বাসন্তীকে বললুম, “মাদ্রাজ যাওয়ার দিনটা দু’-চার দিন পিছিয়ে গেল। ভালই হল। তুমি এবারে ধীরে-সুস্থে গোছগাছ করে নিতে পারবে।”

বাসন্তী বলল, “সন্ধের পরে যদি বাইরে বেরুতে হয় তো টর্চটা সঙ্গে নেবে; আলোয়ান মুক্তি না-দিয়ে বেরুবে না!”

বললুম “হ্যাঁ, হ্যাঁ, একেবারে আপাদমস্তক একটি নকুড়মামা হয়ে বেরুব।” বলে নীচে এসে গাড়িতে উঠে পড়লুম।

সকালবেলার শহর। রাস্তায় ভিড়ভাট্টা নেই। মোড়ের দোকান থেকে দু’প্যাকেট সিগারেট কিনে নিলুম। তারপরেই বড়রাস্তায় পড়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে আমাদের ট্যাক্সি ছুটল এয়ারপোর্টের দিকে।

রাত্ত্বির থেকেই একটা কথা মাঝে-মাঝে মনে হচ্ছিল। কাল তো ছিল রবিবার, তা হলে প্লেনের টিকিট জোগাড় হল কীভাবে?

কথাটা ভাদুড়িমশাইকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, “টিকিট তো জোগাড় হয়নি।”

“তা হলে?”

“অত ভাবছেন কেন, টিকিট অনেক সময় এয়ারপোর্টেও পাওয়া যায়। তবে হ্যাঁ, আসন খালি থাকা চাই। তা যদি না থাকে তো পাওয়া যাবে না।”

“ধরুন পাওয়া গেল না। সে-ক্ষেত্রে কী করব?”

“সে-ক্ষেত্রে আজ না-গিয়ে কাল যাব। শিলিগুড়ির ক্লায়েন্টকেও সে-কথা জানিয়ে রেখেছি। তবে এখনই সে-কথা উঠছে কেন? দেখাই যাক না, কপালে থাকলে পেয়েও তো যেতে পারি। অনেকেই তো পেয়ে যায়।… আর হ্যাঁ, এয়ারপোর্টে পৌঁছে আগেই দুজনের ভিতরে ঢুকবার দরকার নেই। আপনি বরং হ্যান্ড-ব্যাগ দুটো নিয়ে বাইরে একটু অপেক্ষা করবেন, আমি ভিজিটর’স টিকিট কেটে ভিতরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসব যে, বাগডোগরার দুটো টিকিট পাওয়া যাবে কি না।”

ভিজিটর’স টিকিট কাটবার অবশ্য দরকারই হল না। এয়ারপোর্টে নেমে ট্যাক্সি ভাড়া মেটাচ্ছি, এমন সময় এক ভদ্রলোক আমাদের সামনে এসে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি কি মিঃ ভাদুড়ি।”

“হ্যাঁ,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু আপনাকে তো চিনতে পারলুম না।”

“নমস্কার।” ভদ্রলোক বললেন, “আমার নাম বিপিনবিহারী সেন। শিলিগুড়ির মিঃ চৌধুরিকে তো আপনি চেনেন, তা কাল বিকেলে তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, আপনারা দুজন আজ সকালের ফ্লাইটে বাগডোগরা যাবেন, আমি যেন এয়ারপোর্টে এসে দুখানা টিকিট আপনাদের পৌঁছে দিই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু আমিই যে চারু ভাদুড়ি, তা আপনি জানলেন কী করে?”

বিপিন সেন বললেন, “খুব সহজেই জানা গেল। আজকের ‘দৈনিক সমাচার’ দেখেননি বুঝি? তাতে বীরভূমের মন্দির থেকে চুরি যাওয়া মূর্তির উদ্ধারের খবর ছাপা হয়েছে। সেই সঙ্গে বেরিয়েছে এ-ব্যাপারে আপনার কৃতিত্বের কাহিনি আর ফোটোগ্রাফ। তা ফোটোগ্রাফ যখন দেখেছি, আসল মানুষটাকে তখন চিনতে পারব না কেন?”

আমি বললুম, “খবরের কাগজের ছাপা আজকাল অনেক পরিষ্কার হয়েছে, তাই চিনতে পারলেন, আগেকার দিন হলে পারতেন না। সেকালের এক নিউজ এডিটরের কাছে শুনেছি, তিনি যখন তাঁর চাকরি-জীবন শুরু করেন, অনেক কাগজই তখন নাকি আন্দাজে পড়তে হত। আর ছবি যা ছাপা হত, তা দেখে নাকি বোঝাই যেত না যে, কোনটা সম্রাট পঞ্চম জর্জের ছবি আর কোনটা…”

বলতে যাচ্ছিলুম ‘হিন্ডেনবুর্গের’। কিন্তু বলা হল না। বিপিনবাবু আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “দাঁড়ান দাঁড়ান, কী একটা অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে।”

“এয়ারপোর্টের প্রবেশ-পথের ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলুম আমরা। পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে যা ঘোষণা করা হচ্ছিল, তার প্রথমটা ভাল করে শুনতে পাইনি। শুধু শেষটা শুনলুম, প্রসিড ফর ইয়োর সিকিওরিটি চেক্।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমাদের ফ্লাইট। তা হলে আর দেরি করব না। মিঃ সেন, আপনার কোনও মেসেজ আছে? মানে শিলিগুড়িতে মিঃ চৌধুরিকে কিছু বলতে হবে?”

বিপিনবাবু বললেন, “না না, তেমন কিছু বলবার নেই। শুধু জানিয়ে দেবেন যে, আমার আর সঞ্জীববাবুর তো এই ফ্লাইটে বাগডোগরা যাবার কথা ছিল। তা আমাদের টিকিট দুখানা তো আপনাদের দিয়ে দিলুম, আমরা তাই এ-সপ্তাহে না-গিয়ে সামনের সপ্তাহে গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করব। ব্যাবসার কথাবার্তা যা হবার, তা তখনই হবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “টিকিট দুখানার দামটা তা হলে রাখুন।”

“আরে ছি ছি,” বিপিনবাবু তিন-পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “দাম নিয়ে আপনি ব্যস্ত হবেন না। ও-সব আমার আর চৌধুরির ব্যাপার, আমরা বুঝব। আচ্ছা, তা হলে আমি চলি। আপনারা এগোন।”

বিপিনবাবুকে ধন্যবাদ দিয়ে আমরা ভিতরে ঢুকে কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম।

যাঁদের সঙ্গে মালপত্রের ঝামেলা নেই, তাঁদের জন্যে আলাদা লাইন। সেখানে নেহাতই জনা পাঁচ-ছয় লোক দাঁড়িয়ে আছেন। ফলে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। টিকিট দেখিয়ে বোর্ডিং কার্ড নিয়ে সিকিওরিটি পেরিয়ে আমরা ডিপার্চার লাউঞ্জে ঢুকে পড়লুম।

ঢুকেই আমাদের কাগজের রিপোর্টার চন্দ্রমাধবের সঙ্গে দেখা। চন্দ্রমাধব বাগডোগরা থেকে দার্জিলিং যাবে। বলল, “আপনিও দার্জিলিং যাচ্ছেন নাকি কিরণদা?”

বললুম, “না চাঁদু, আমি তোমার মতো ভাগ্যবান নই। গেলে অবশ্যই ভাল হত, কিন্তু না, অন্তত এ যাত্রায় আমি দার্জিলিং যাচ্ছি না।”

“তা হলে কোথায় যাচ্ছেন?”

“আপাতত শিলিগুড়ি যাচ্ছি।”

“সে তো আপাতত। শিলিগুড়ি থেকে যাচ্ছেন কোথায়?”

বললুম, “তুমি যে পুলিশের লোকেদের মতো জেরা করতে শুরু করলে! তা হলে শোনো, আমার বন্ধুটি যদি শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় ফিরতে চান তো কলকাতায় ফিরব। আর যদি শিলিগুড়ি থেকে জলপাইগুড়ি যেতে চান তো অগত্যা আমাকেও সেখানে যেতে হবে।”

ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যে আমাদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়েছিলেন। হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা ম্যাগাজিন বার করে নিয়ে চুপচাপ তার পাতা ওলটাচ্ছিলেন তিনি। চন্দ্রমাধব একবার আড়চোখে তাঁকে দেখে নিয়ে বলল, “আপনি কিছু লুকোচ্ছেন দাদা। নিশ্চয় কোনও ক্রাইম-ডিটেকশানের ব্যাপারে কোথাও যাচ্ছেন। কিন্তু কোথায় যাচ্ছেন, সেটা ফাঁস করছেন না।”

হেসে বললুম, “ডিটেকশানের কথা উঠছে কেন?”

নিচু গলায় চন্দ্রমাধব বলল, “আপনার বন্ধুটি তো একজন ফেমাস ডিটেকটিভ। সেইজন্যেই উঠছে।”

আশ্চর্য হয়ে বললুম, “বটে? তা তুমি সে-কথা কী করে জানলে?”

“বা রে,” চন্দ্রমাধব বলল, “আমাদের কাগজেই তো আজ তিনের পাতায় ওঁর ছবি বেরিয়েছে। কেন, আপনি দেখেননি?”

“কাগজ পড়বার সময় পেলে তো দেখব।”

ছবিটা মনে হচ্ছে সবাই দেখেছে, একমাত্র আমি আর ভাদুড়িমশাই ছাড়া। ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা বলতে তিনি বললেন, “আপনার বন্ধুটি আমাকে চিনতে পেরেছেন?”

“নিশ্চয়।”

“এবং এটাও তিনি দেখলেন যে, আমরা বাগডোগরা যাচ্ছি।”

“তা তো দেখলই! কেন, তাতে কি কোনও ক্ষতি হবার আশঙ্কা আছে?”

“ক্ষতি কেন হবে?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বরং আপনার বন্ধুটি এই ফ্লাইটে আমাদের সহযাত্রী হওয়াতে আমি নিশ্চিন্ত বোধ করছি। না মশাই, ক্ষতির আশঙ্কা আর নেই।”

কথাটার মানে বুঝতে পারলুম না।

প্লেন ছাড়ল আরও আধ ঘন্টা বাদে।

মাথার উপরকার লকারের মধ্যে হ্যান্ডব্যাগ দুটোকে ঢুকিয়ে রাখতে-রাখতে দেখলুম, চন্দ্ৰমাধব যেখানে জায়গা পেয়েছে, আমরা তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে রয়েছি। অর্থাৎ আমাদের কথাবার্তা যে ও শুনতে পাবে, এমন কোনও সম্ভাবনা নেই। ভাদুড়িমশাইও সেটা লক্ষ করেছিলেন। সিট-বেলট বাঁধতে-বাঁধতে তবু তিনি গলাটা একটু নামিয়ে নিয়ে বললেন, “ওই যে তখন আপনাকে বললুম, আপনার বন্ধুটি এই ফ্লাইটে যাওয়াতেই বরং আমি নিশ্চিন্ত বোধ করছি, আমার এই কথাটার অর্থ বোধহয় আপনি ধরতে পারেননি। তাই না?”

টফি আর লজেন্সের থালা নিয়ে এয়ার-হোস্টেস আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। থালা থেকে দুটো লজেন্স তুলে নিয়ে একটি ভাদুড়িমশাইকে দিলুম, তারপর নিজেরটাকে মুখের মধ্যে চালান করে দিয়ে বললুম, “সত্যিই পারিনি। কেন ও-কথা বললেন বলুন তো?”

“বলছি। তার আগে বরং আর-একটা কথা বলি। এই ফ্লাইটে যারা আমাদের সহযাত্রী, তারা সব্বাই যে নিজের-নিজের টিকিটে যাচ্ছে, তা ভাববেন না। যেমন আমরা দুজনে, তেমনি আরও দু’-চারজন প্যাসেঞ্জার নিশ্চয় অন্যের টিকিটে ট্রাল করছে।”

“তা করুক না। তাতে ক্ষতি কী।”

“কাজটা বেআইনি।”

“তা হোক না, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের তো তাতে কোনও লোকসান হচ্ছে না। যার নামে যে-ই ট্রাল করুক, টিকিটের দাম তো তারা পেয়েই গেছে।”

“তা যে পেয়েছে, সে তো আমিও জানি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কিন্তু বিপদ তাতে কমছে না। কাজটা শুধু বেআইনি নয়, ঘোর বিপজ্জনকও বটে।”

“এ-কথা বলছেন কেন?”

‘এইজন্যে বলছি যে, আমি একটু সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মানুষ। সেটা অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। যে-ধরনের কাজ আমাকে করতে হয়, তাতে কাউকেই একেবারে ষোলো-আনা বিশ্বাস করা চলে না।”

অবাক হয়ে বললুম, “এ-ক্ষেত্রে কাকে অবিশ্বাস করছেন?”

প্লেন আকাশে উঠে পড়েছে। সিট-বেল্ট খুলতে খুলতে চারু ভাদুড়ি বললেন, “কাকে নয়? এই ধরুন, শিলিগুড়ি থেকে যিনি আমাকে ফোন করেছিলেন, সেই সত্যপ্রকাশ চৌধুরিকে কি আমি চিনি? চিনি না। তারপরে এই যে বিপিনবিহারী সেন নামে যে ভদ্রলোকটি এয়ারপোর্টে এসে দুখানা টিকিট আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেলেন, তিনিও আমার সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ। বিপিনবাবু আমাদের যে দুটি টিকিট দিয়েছেন, তার একখানা তাঁর নিজের নামে, আর অন্যখানা সঞ্জীব বিশ্বাসের নামে কেনা হয়েছিল।”

“তাতে হয়েছে কী?”

“কিছুই হত না, যদি এঁরা আমার চেনা মানুষ হতেন। মুশকিল এই যে, এঁদের একজনও আমার চেনা নন। সত্যি বলতে কী, এঁরা ভাল লোক না মন্দ লোক, সরল লোক না মতলববাজ, সে-বিষয়ে কোনও ধারণাই আমার নেই। হতে পারে যে, এঁরা খুবই ভাল লোক; আবার শেষ পর্যন্ত যদি দেখা যায় যে, এঁরা প্রত্যেকেই একেবারে হাড়ে-বজ্জাত, তো তাতেও আমি অবাক হব না। আসলে এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটার কথা ভেবেই আমি প্রথম-দিকটায় একটু সতর্ক থাকার পক্ষপাতী।”

“তা তো বুঝলুম, কিন্তু চন্দ্রমাধব এই ফ্লাইটে থাকায় আপনি নিশ্চিন্ত হচ্ছেন কেন?”

“বলছি। ধরুন, আমরা তো এখন কলকাতার বাইরে, তা আজই দুপুরে বিপিন বিহারী সেন কলকাতায় একটা ব্যাঙ্ক লুঠ করলেন কি কাউকে খুন করলেন।”

শিউরে উঠে বললুম, “সে কী?”

“অবাক হচ্ছেন কেন?” চারু ভাদুড়ি বললেন, “এমনটা তো হতেই পারে। কিন্তু ভদ্রলোক যদি পরে কখনও ধরাও পড়েন, তো আদালতে ওঁর অপরাধের কথাটা প্রমাণ করা সহজ হবে না।”

“কেন হবে না?”

“এইজন্যে হবে না যে, খুব সহজেই উনি একটা অ্যালিবাই খাড়া করতে পারবেন। উনি বলতে পারবেন যে, ব্যাঙ্ক লুঠ কিংবা খুনটা যে দিন হয়, উনি সেদিন কলকাতায় ছিলেন না, সকালের ফ্লাইটে উনি বাগডোগরা চলে গিয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসও তাদের খাতাপত্র দেখে বলবে যে, হ্যাঁ, ওই নামের একজন প্যাসেঞ্জার সেদিন বাগডোগরার ফ্লাইটে ছিলেন বটে।”

“ফলে ব্যাঙ্ক লুঠ কিংবা খুন করেও উনি বেকসুর খালাস পেয়ে যাবেন?”

“না, তা পাবেন না।” চারু ভাদুড়ি হেসে বললেন, “কেননা, আপনার বন্ধুটিই সে-ক্ষেত্রে আদালতে এই সাক্ষ্য দেবেন যে, টিকিটটা বিপিনবাবুর নামে কাটা হয়েছিল বটে, কিন্তু সেই টিকিটে বিপিনবাবুর বদলে আমি সেদিন বাগডোগরা গিয়েছিলুম। তবে হ্যাঁ, বাগডোগরায় নেমেই আপনার বন্ধুকে সে-কথা জানিয়ে রাখতে হবে।”

একটু বাদেই আমাদের প্লেন বাগডোগরায় ল্যান্ড করল। প্লেন থেকে নেমেই চন্দ্রমাধবকে জানিয়ে দিলুম যে, আমরা অন্যের টিকিটে বাগডোগরায় এসেছি। চন্দ্রমাধব বলল, “সে তো অনেকেই অন্যের টিকিটে ট্রাভল করে, তাতে হয়েছে কী?”

কী যে হতে পারে, ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে সেটা বুঝতে পেরেছিলুম। তাই গম্ভীর গলায় চন্দ্রমাধবকে বললুম, “না হে চাঁদু, কাজটা তারা ভাল কবে না।”


কথা বলতে-বলতে এয়ারপোর্টের বাইরে চলে এসেছিলুম।

চন্দ্রমাধব তার লাগেজ কালেক্ট করতে গিয়েছে। তাকে বলেছিলুম যে, আমাদের জন্যে সম্ভবত একটা গাড়ি আসবে। ইচ্ছে করলে সেই গাড়িতে সে শিলিগুড়ি শহর পর্যন্ত একটা লিফ্‌ট পেতে পারে। তাতে সে বলল, “আমার দেরি হবে কিরণদা। আপনারা এগোন।”

এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই ট্যাক্সিওয়ালারা ছেঁকে ধরেছিল আমাদের। তাদের সরিয়ে দিয়ে মধ্যবয়সী একজন ভদ্রলোক আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আশা করছি আপনারাই মিঃ ভাদুড়ি আর মিঃ চ্যাটার্জি?

ভাদুড়িমশাই ‘হ্যাঁ’ বলতেই ভদ্রলোক বললেন, “নমস্কার। আমি সত্যপ্রকাশ চৌধুরি। পথে কোনও কষ্ট হয়নি তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, কষ্ট হবে কেন? তা ছাড়া প্লেন আজকে ঠিক সময়েই ছেড়েছিল, দমদম এয়ারপোর্টে অনর্থক বসে থাকতে হয়নি।”

“বিপিন ঠিক সময়ে টিকিট পৌঁছে দিয়েছিল?”

“বিলক্ষণ। ভদ্রলোক আমাদের আগেই এয়ারপোর্টে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু উনি কে?”

“বিপিন আর সঞ্জীব আমার অনেক দিনের চেনা লোক। কলকাতায় ওদের দুজনেরই মস্ত বড় কাঠের ব্যাবসা। পরস্পরের ওরা খুব বন্ধুও বটে। ওরা আমার কাছ থেকে কাঠ কিনে সেই কাঠ চেরাই করে বিক্রি করে। কাঠ কেনার ব্যাপারেই মাঝে-মাঝে ওদের শিলিগুড়িতে আসতে হয়। যখন আসে তখন একসঙ্গেই আসে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল আমাকে ফোন করে আপনি যখন জানলেন যে, আমরা দুজনে আসব, তখন টিকিটের জন্যে ওঁকে ফোন করলেন বুঝি?”

“হ্যাঁ।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমি তো জানতুমই ওরা আজ সকালের ফ্লাইটে শিলিগুড়িতে আসবে। তাই ফোন করে বিপিনকে বললুম যে, তার আর সঞ্জীবের টিকিট দুখানা যেন আপনাদের দিয়ে দেয়। ওরা দু-চার দিন পরে এলেও ক্ষতি নেই।”

“ভদ্রলোককে টিকিটের দাম দিতে গিয়েছিলুম। কিন্তু উনি নিলেন না।”

“কেন নেবে? ওদের সঙ্গে তো আমার টাকা-পয়সার লেনদেন হয়, সেই খাতে এই টিকিট দুখানার দাম অ্যাডজাস্ট করে নেব। এমন তো আমরা হামেশাই করি।”

প্রাইভেট গাড়িগুলো যেখানে পার্ক করা রয়েছে, কথা বলতে বলতে সেইখানে এসে দাঁড়িয়েছিলুম আমরা। সত্যপ্রকাশ একটা অ্যাম্বাসাডারের দরজা খুলে দিয়ে বললেন, “উঠে পড়ুন। গাড়ি আমি নিজেই চালাই, সুতরাং একজন এসে সামনে বসতে পারেন।”

কাল সকালে যখন চারু ভাদুড়িকে ফোন করেন, সত্যপ্রকাশ তখন তাঁর ব্যাবসার বিবরণও জানিয়ে রেখেছিলেন। ভদ্রলোক মূলত কাঠের কারবারি। তা ছাড়া, শিলিগুড়ি শহরের যে-বাজারটাকে ‘হংকং বাজার’ বলে, অর্থাৎ যেখানে দোকানে দোকানে বিদেশি জিনিসপত্রের ছড়াছড়ি দেখে তাক লেগে যায়, তার খুব কাছেই তাঁর একটা বড়সড় হোটেলও রয়েছে। আর আছে গোটা পাঁচেক ট্রাক। তার মধ্যে দুটো তাঁর নিজেরই কারবারের কাজে লাগে, বাকি তিনটেকে তিনি ভাড়া খাটান।

সত্যপ্রকাশের বয়স বছর-পঁয়তাল্লিশের বেশি হবে না। চেহারা এখনও শক্তসমর্থ, তবে মাথার চুল সামনের দিকে কিছুটা পাতলা হয়ে এসেছে। মানুষটি যে শৌখিন, তা তাঁর গাড়ি দেখলেই বোঝা যায়। এয়ার-কন্ডিশন্ড গাড়ি, ড্যাস-বোর্ডে ইলেকট্রিক ঘড়ি বসানো, আমরা উঠে বসতেই ক্যাসেটে কিশোরকুমারের গান শুরু হয়ে গেল। ক্যা হুয়া, ক্যায়সে হুয়া…। ‘অমর প্রেম’-এর হিট্-গান।

ভদ্রলোকের পোশাকও একেবারে ফিটফাট। মিহি সুতোর ধুতির সঙ্গে সাবুদানার কাজ করা আদ্দির পাঞ্জাবি পরেছেন, পায়ে জরির কাজ করা কোলাপুরী চপ্পল। স্টিয়ারিং হুইল ডাইনে-বাঁয়ে ঘোরানোর সঙ্গে-সঙ্গে বাঁ বাতের অনামিকায় যে আংটিটি বার-বার ঝকমক করে জ্বলে উঠছিল, তার নীলচে আভাযুক্ত হিরেটা নেহাত ছোট নয়।

বাগডোগরা থেকে গাড়ি চালিয়ে সত্যপ্রকাশ একেবারে সরাসরি তাঁর হোটেলে আমাদের নিয়ে এলেন। হোটেলের বার-লাইসেন্স রয়েছে, আর শিলিগুড়ি তো কাঁচা-পয়সার জায়গা, ফলে সন্ধের পর এই হোটেলে নাকি কাঁঠালে মাছি পড়ার মতো ভিড় জমে যায়। সত্যপ্রকাশ আমাদের ড্রিংকস অফার করেছিলেন, আমরা ও-রসে বঞ্চিত শুনে আর পীড়াপীড়ি করলেন না, নিজের জন্যে একটা জিন অ্যান্ড লাইম নিয়ে বেয়ারাকে বললেন, “তা হলে যা, কে কী খাবেন জেনে নিয়ে লাঞ্চের ব্যবস্থা কর।”

খাওয়া-দাওয়া শেষ হবার পরে সত্যপ্রকাশ বললেন, “একটা ডাল-বেড ঘর আপনাদের খুলে দিচ্ছি, আপনারা একটু বিশ্রাম করে নিন, আর সেই ফাঁকে আমি আমার ব্যাবসার কাজটা একটু দেখে আসি। বিকেল নাগাদ শিলিগুড়ি থেকে আমরা বেরিয়ে পড়ব।”

সত্যপ্রকাশ চলে গেলেন।

হোটেলে যে ঘরটা আমাদের দেওয়া হয়েছিল, সেটা চারতলায়। যে বেয়ারাটি আমাদের সঙ্গে এসেছিল, তার কাছে শুনলুম, আকাশ যেদিন পরিষ্কার থাকে, সেদিন সকালবেলায় আমাদের ঘরের সামনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে কাঞ্চনজঙ্ঘা একেবারে স্পষ্ট দেখা যায়। বেলা বাড়লে অবশ্য কিছুই আর চোখে পড়ে না।

ঘরখানা চমৎকার। অ্যাটাচ্‌ড বাথ তো আছেই, তার ফিটিংসও একেবারে হ’ল-ফ্যাশানের। বিছানার পাশে একটা টেলিফোনও দেখলুম। মস্ত জানালা। তাতে ব্রোকেডের কাজ করা মোটা কাপড়ের বাহারি পর্দা ঝুলছে। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, এটা বেশ চড়া-ভাড়ার শৌখিন হোটেল : তা শিলিগুড়িতে এখন এমন হোটেলও নেহাত একটি-দুটি নয়, বেশ কয়েকটি রয়েছে। তাও নাকি আগে থাকতে বুক্ করে না রাখলে ঘর মেলে না।

সেটা অবশ্য অস্বাভাবিকও নয়। তার কারণ দেশ স্বাধীন হবার পরে জলপাইগুড়ি শহরের যদিও বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি, শিলিগুড়ি একেবারে হু-হু করে বেড়েছে। যেমন বেড়েছে ব্যাবসা, তেমনি বেড়েছে লোকসংখ্যা, আর লোকসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শহরের আয়তন। তিপ্পান্ন সালে একবার শিলিগুড়িতে এসেছিলুম। মনে আছে, রাত আটটার সময়ে সেবারে স্টেশন থেকে বেরিয়ে শুধু অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই বিশেষ চোখে পড়েনি। সেই শিলিগুড়ির সঙ্গে এই শহরের বিস্তর ফারাক। ব্যাবসার সঙ্গে বেড়েছে চোরাই কারবার। তার সূত্রেও নেহাত কম লোক এখন শিলিগুড়িতে আসে না। থলি বোঝাই করে যেমন তারা টাকা নিয়ে যাচ্ছে এখান থেকে, তেমনি আবার উড়িয়েও দিচ্ছে তাড়া-তাড়া নোট। শিলিগুড়িও তাই আর সেই মফস্বল-বাংলার ছোট শহরটি নেই, ভারতবর্ষের হরেক এলাকা, হরেক কিসিমের ব্যবসায়ী আর ধান্দাবাজ মানুষদের সে এখন নতুন আর-একটি বড়বাজার।

ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “কী ভাবছেন এত?”

বললুম, “শিলিগুড়ির কথা। সত্যি, জায়গাটা একেবারে পালটে গেছে। কিন্তু সে-কথা থাক, আপনি কী ভাবছিলেন বলুন।”

“আমি ভাবছিলুম সত্যপ্রকাশবাবুর কথা।”

“মানুষটিকে কেমন লাগল?”

“এখনও খারাপ লাগেনি। উদ্যমী, পরিশ্রমী মানুষ। তা ছাড়া, কথাবার্তাতেও বেশ সজ্জন বলেই মনে হয়। তবে হ্যাঁ, কাজের কথা তো কিছুই হল না।”

বললুম, “সেটা বোধহয় ওঁদের সেই গ্রামের বাড়িতে যেতে-যেতে হবে।”

বলতে-না-বলতে সত্যপ্রকাশ এসে গেলেন। হাতে একটা প্যাকেট। বললেন, “এখানকার কোন মিষ্টি বিখ্যাত, আপনারা জানেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ক্ষীরের শিঙাড়া।”

“শাবাশ!” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনাদের জন্যে সেই ক্ষীরের শিঙাড়া নিয়ে এসেছি। খেয়ে নিন, তারপরেই আমরা মুকুন্দপুর রওনা হব।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন খাব না। প্যাকেটটা সঙ্গে নিয়ে চলুন, যেখানে যাচ্ছি, সেখানে পৌঁছে খাওয়া যাবে।”

আমি বললুম, “আপনাদের গ্রামের নাম কি মুকুন্দপুর?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ, এই মুকুন্দপুরেই আমাদের পৈতৃক বাড়ি। জায়গাটা আলিপুরদুয়ারের খুব কাছে।”

বেরিয়ে পড়লুম। রাস্তা নেহাত কম নয়। ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে খানিকটা এগোবার পরে ময়নাগুড়িতে একবার গাড়ি থামানো হল। কিনা সেখানকার রসগোল্লা অতি চমৎকার। রসগোল্লার সঙ্গে খেতে হল চা। বলা বাহুল্য, এর চেয়ে খারাপ কম্বিনেশন আর কিছুই হতে পারে না, কিন্তু তবু যে একেবারে সুবোধ বালকের মতো খেয়ে নিলুম, তার কারণ, আমার মনে হচ্ছিল যে, একে তো ক্ষীরের শিঙাড়া এখনও খাইনি, তার উপরে যদি রসগোল্লাও না-খাই তো ভদ্রলোক খুবই দুঃখিত হবেন।

ময়নাগুড়ির পরে গয়েরকাটা এবং আরও কয়েকটা জায়গা ছুঁয়ে হাসিমারা ছাড়িয়ে বাঁ-দিকে মোড় নিয়ে, হাইওয়ে থেকে সরু একটা রাস্তায় পড়ে আরও বেশ কয়েক মাইল পেরিয়ে যখন আমরা মুকুন্দপুরে পৌঁছলুম, তখন রাত হয়ে গেছে।

কৃষ্ণপক্ষের রাত। চাঁদ ওঠেনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, এই কার্তিকমাসেও বিশেষ কুয়াশা জমেনি, নক্ষত্রগুলি যেন হিরের কুচির মতন ঝকমক করছে। নীচের অন্ধকার তাতে অবশ্য কিছুমাত্র কাটছে না। গাড়ি যেখানে থামল, তার কাছেই বড়-বড় ঝুপসি কয়েকটা গাছ। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে তবে গাছপালার আড়ালে কয়েকটা ঘরবাড়ি চোখে পড়ে। তবে সে-সব ঘরবাড়ি যেন অন্ধকারের মধ্যে ডুবে আছে। রেডিয়াম-ডায়ালের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, ন’টা বাজে। এরই মধ্যে কি সবাই ঘুমিয়ে পড়ল নাকি?

একটু বাদেই অবশ্য একটা আলো দুলে উঠল। লন্ঠন হাতে কে একজন এগিয়ে এল আমাদের দিকে। কাছে এসে দাঁড়াতে সত্যপ্রকাশ বললেন, ‘কী রামদাস, এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলে?”

রামদাসের মাথার চুল যেমন ধবধপে সাদা, গায়ের রং তেমনি কুচকুচে কালো। বয়স মনে হল সত্তর-পঁচাত্তর, তবে শরীর এখনও সটান। সত্যপ্রকাশের কথা শুনে একটু কুণ্ঠিতভাবে বলল, “না খোকাবাবু, ঘুমোব কেন? মা আর পিসিমা এই খানিক আগে শুয়ে পড়েছেন, কিন্তু আমি তো জানি যে, তোমার কথার নড়চড় হয় না, যখন আসবে জানিয়েছ তখন ঠিকই আসবে। তাই জেগেই ছিলুম।”

“তা হলে আলো নিয়ে আসতে এত দেরি হল কেন? গাড়ির শব্দ পাওনি?”

“পেয়েছিলুম। কিন্তু রঙ্গিলার জ্বর নিচ্ছিলুম তো। তাই একটু দেরি হয়ে গেল।”

হঠাৎ পালটে গেল সত্যপ্রকাশের গলা। একটু ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছে রঙ্গিলা এখন? জ্বর নেই তো?”

“আছে। তবে কম। একশো।”

“কথা বলছে?”

রামদাস বলল, “না, যখন জেগে থাকে, তখন শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কাউকে যে চিনতে পারছে, তাও মনে হয় না।”

ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “রঙ্গিলা কে?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “রামদাসের নাতনি।”

মুকুন্দপুরের মনসা – ৫

শিলিগুড়ির হোটেলেই ভাদুড়িমশাই একবার সত্যপ্রকাশকে তাঁদের বিগ্রহের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাতে সত্যপ্রকাশ বলেছিলেন, “এখন আপনারা খেয়ে-দেয়ে একটু বিশ্রাম করুন, পরে সব বলব।”

পরে আর বলা হয়নি। শিলিগুড়ি থেকে মুকুন্দপুরে আসবার পথে প্রসঙ্গটা আবার উঠেছিল। কিন্তু তখনও সত্যপ্রকাশ বলেছিলেন, “দেখুন ভাদুড়িমশাই; যা ঘটেছে, তার জিটা আমি বলতে পারি; কিন্তু এইভাবে সাঁটে বললে তো ব্যাপারটার তাৎপর্যই আপনারা বুঝতে পারবেন না। সেটা বুঝতে হলে গোটা ব্যাকগ্রাউন্ড আপনাদের জানা দরকার। ব্যাকগ্রাউন্ড মানে আমাদের ফ্যামিলি হিস্ট্রির সঙ্গে এই মূর্তির সম্পর্ক, আবার এই মূর্তির সঙ্গে মুকুন্দপুর গ্রামের মঙ্গল-অমঙ্গলের সম্পর্ক, কোনওটাই তো বাদ দেওয়া চলবে না, সবই আপনাদের জানা চাই। তা সে-সব কি আর গাড়ি চালাতে-চালাতে আমি আপনাদের বলতে পারব?”

পারা সত্যিই সম্ভব নয়। একে তো হাইওয়ের উপরে মাঝে-মাঝেই দেখা যাচ্ছে বিরাট-বিরাট সব গর্ত, তার উপরে আবার উল্টোদিক থেকে যে রকম কড়া হেডলাইট জ্বেলে ঝড়ের বেগে সব বিশাল বিশাল ট্রাক ছুটে আসছিল, আর সত্যপ্রকাশকে সারাক্ষণ রাস্তার উপরে চোখ রেখে যে রকম সন্তর্পণে তাদের সঙ্গে সংঘাত বাঁচিয়ে চলতে হচ্ছিল, তাতে আমার অন্তত মনে হল যে, স্টিয়ারিং হুইল যাঁর হাতে রয়েছে, তাঁকে আর এখন পারিবারিক ইতিহাস বলবার জন্য অনুরোধ না করাই ভাল।

বললুম, “ঠিক আছে। পরেই না হয় শুনব।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “সেটাই ভাল। খানিক বাদেই তো আমরা মুকুন্দপুর পৌঁছে যাচ্ছি, সুতরাং তাড়াহুড়ো করে লাভ নেই, রাত্তিরে খাওয়া-দাওয়ার পরে বরং ধীরেসুস্থে ডিটেলসে সব বলব। একটা ছবি আপনাদের দেখা দরকার। সেটাও তখন দেখানো যাবে।”

স্বীকার করা ভাল যে, মুকুন্দপুরে পৌঁছে আমি প্রথমটায় একটু দমে গিয়েছিলুম। জানি না মুকুন্দপুরে এখন ইলেকট্রিক লাইট আছে কি না, তবে এ যখনকার কথা বলছি, তখন ছিল না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই অবশ্য ঘরে-ঘরে হ্যারিকেন আর শেজবাতি জ্বলে উঠল। তা ছাড়া উঠোনের ঠিক মাঝ বরাবর দুটি খুঁটি পুঁতে তাতে একটা তার খাটিয়ে রাখা হয়েছিল, সেই তারে ঝুলিয়ে দেওয়া হল মস্ত বড় হ্যাজাক বাতি। তার ফলে অন্ধকার তো দূর হলই, সারা বাড়ি একেবারে আলোয় আলো হয়ে গেল।

বাড়িটা অবশ্য সেদিন রাত্তিরে ভাল করে দেখা হয়নি, দেখেছিলুম তার পরদিন ভোরবেলায়। তবু এখানেই তার একটা বর্ণনা দিয়ে রাখি।

চৌধুরিদের বাড়িটা বেশ ছড়ানো গোছের। এদিকে গ্রামাঞ্চলে পাকাবাড়ি করবার রেওয়াজ নেই। সত্যবাবুরাও পাকাবাড়ি করেননি। ভিতরের ও বাইরের উঠোন ঘিরে ঘর দেখলুম অনেকগুলি। অধিকাংশ ঘরই একতলা। ঘরগুলির ভিত যেমন বাঁধানো, মেঝেগুলিও তেমনি পুরোদস্তুর মোজেইক করা, তবে সে-সব ঘরের দেওয়াল যেমন ইটের নয়, কাঠের, উপরেও তেমনি ঢালাই করা ছাতের বদলে রং-করা করোগেটেড টিনের চাল। ভিতরের উঠোনের চারদিকে চারটে ঘর; প্রতিটি ঘরের সামনে কাঠের রেলিং-এ ঘেরা বারান্দা। যেটা সবচেয়ে বড় ঘর, সেটা অবশ্য একতলা নয়, দোতলা, তার একতলার মেঝে বাঁধানো হলেও দোতলার মেঝে পালিশ করা কাঠের। একতলার ঘরেরই একদিক থেকে চমৎকার কাজ করা একটা কাঠের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। এটা সত্যপ্রকাশের এলাকা। একতলাটা তাঁর বসবার ঘর, দোতলাটা শোবার। উঠোনের বাদবাকি তিন-দিকের তিনটে ঘরই একতলা। তার একটায় সত্যবাবুর মা আর পিসিমা থাকেন, একটায় কোনও অতিথি এলে তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়। আর বাকি ঘরটার মাঝখানে পার্টিশান করা। পার্টিশানের একদিকে রান্নাঘর আর ভাঁড়ার, অন্যদিকে ডাইনিং টেবিল।

চৌধুরিদের উপাস্য দেবী মনসা। বাইরের উঠোনের একদিকে রয়েছে তাঁর মন্দির; অন্য দু’দিকের দুটো ঘরের একটায় থাকে সত্যপ্রকাশের বাবার আমলের পুরনো ভৃত্য রামদাস, আর অন্যটায় থাকেন পুরোহিত গোবিন্দ ভট্টাচার্য। ভট্টাচার্যমশাই এঁদের বেতনভোগী পুরোহিত, নিত্যপূজা ছাড়া তাঁর আর অন্য কোনও কাজ নেই। মন্দিরের একপাশে একটি বাঁধানো ইঁদারা। ভিতর-বাড়ির পিছনে একটি পুকুর কাটানো হয়েছিল। তবে সেটা এতই ছোট যে, পুকুর না বলে ডোবা বললেই ঠিক হয়। তাতে বাসন-কোসন মাজা ছাড়া অন্য কোনও কাজ হয় না। বাড়িতে একটা টিউবয়েলও আছে। কিন্তু তার জল কেউ খায় না। তার কারণ, মন্দিরের পাশের ওই ইঁদারার জল শুনলুম দারুণ ভাল। ও-জল খেলে নাকি পাথরও হজম হয়ে যায়। খিদেও হয় প্রচন্ডরকম। সত্যবাবু অন্তত খুব জাঁক করে তাঁদের ইঁদারার জলের এই গুণের কথাটা আমাদের শুনিয়ে রেখেছেন।

ভোরবেলায় উঠে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যখন গোটা বাড়িটা ঘুরে দেখছি, তখন মন্দিরের পিছনে অর্থাৎ বাড়ির উত্তরদিকে একটা বিশাল বাগানও আমাদের চোখে পড়েছিল। বাগানের মধ্যে আর-একখানা ঘরও দেখেছিলুম আমরা। কিন্তু সে-কথায় পরে আসছি। রাত্তিরের কথাটাই বরং আগে সেরে নিই

ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে রবিবার সকালবেলায় টেলিফোনে কথা বলবার পরে সত্যপ্রকাশ সেইদিনই লোক পাঠিয়ে তাঁর মাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, সোমবার সকালের ফ্লাইটে আমরা শিলিগুড়িতে পৌঁছচ্ছি, তবে শিলিগুড়িতে আমরা রাত কাটাব না, সেখানে দুপুরের খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নেব মাত্র, তারপর সেখান থেকে সত্যপ্রকাশের সঙ্গে রওনা হয়ে মুকুন্দপুরে চলে আসব, আর রাত্তিরের খাওয়া সারব মুকুন্দপুরেই। আমাদের জন্য রান্নাবান্না তাই করেই রাখা হয়েছিল। তবে পৌঁছতে দেরি হচ্ছে দেখে বাড়ির লোকেরা ভাবছিলেন যে, প্লেন হয়তো সেদিন খুবই দেরি করে শিলিগুড়িতে পৌঁছেছে, আমরা আর সেখান থেকে রওনা হতে পারিনি, রাতটা শিলিগুড়িতে কাটিয়ে পরদিন সকালে আমরা মুকুন্দপুরের দিকে রওনা হব।

আমরা এসে পড়ায় তাই সবাই দেখলুম দারুণ খুশি। সবচেয়ে বেশি খুশি রামদাস। তার কারণ, একমাত্র সে-ই নাকি বলেছিল যে, খোকাবাবুর কথার কখনও নড়চড় হয় না, একবার যখন আসবে বলেছে, তখন যত রাতই হোক, খোকাবাবু আসবেই।

সত্যপ্রকাশ তাঁর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সত্যি নাকি মা?”

মা বললেন, “তা রামদাস একথা জাঁক করে বলতে পারে বটে। আমি তো এত দেরি দেখে ভাবছিলুম যে, আজ আর তোদের আসা হল না। কাজের লোকদের ছুটি দিয়ে তোর পিসিমাকে নিয়ে শুয়েও পড়েছিলুম। তা রামদাস বলল, ‘শুয়ে তো পড়ছ কর্তা-মা, একটু বাদেই তোমাকে আবার উঠতে হবে।’ এখন দেখছি, ঠিকই বলেছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল সকালে এলেই পারতুম। রাত্তিরে এসে আপনাদের অসুবিধে ঘটানো হল।”

মা বললেন, “অসুবিধে আবার কিসের। রান্নাবান্না তো করাই আছে, শুধু একটু গরম করে দিতে হবে। আপনারা ততক্ষণে হাত-মুখ ধুয়ে নিন।”

বাথরুমে জল ধরে রাখাই ছিল। হাতমুখ ধুয়ে যে যার হ্যান্ডব্যাগ থেকে একপ্রস্ত পায়জামা আর পাঞ্জাবি বার করে নিয়ে, জামাকাপড় পালটে আমরা ডাইনিং টেবিলে এসে এক-একখানা চেয়ার টেনে বসে পড়লুম।

সত্যপ্রকাশ দেখলুম পাঞ্জাবির উপরে হালকা একটা জাম্পার চড়িয়ে এসেছেন। বললেন, “আপনারাও গরম কিছু পরলে পারতেন। একটু-একটু হিম পড়ছে, রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ঠান্ডাও বাড়বে। তার মানে যে শাল-দোশালার দরকার হবে তা নয়, পাতলা-মতো কিছু একটা গায়ে জড়িয়ে নেবেন, এখনকার ঠান্ডায় তাতেই কাজ চলে যাবে। তেমন কিছু সঙ্গে আছে তো? না থাকলে বলুন, আমি দিয়ে দিচ্ছি।”

বললুম, “না না, সঙ্গে করে বা এনেছি তা-ই যথেষ্ট।”

রামদাস এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। সত্যপ্রকাশ তাকে বললেন, “বাবুদের বিছানার মশারি

খাটিয়ে দিয়েছ তো?”

“দিয়েছি খোকাবাবু।”

“গায়ে দেবার জন্যে হালকা একটা করে লেপও দিও। শেষ রাত্তিরে দরকার হতে পারে।”

“দুটো লাইসাম্পি দিয়েছি, তাতেই হবে।”

“তা হলে তুমি দাঁড়িয়ে থেকো না, রঙ্গিলার কাছে যাও, মেয়েটা একা রয়েছে।”

“একা থাকবে কেন, সেখানে তো আয়াই রয়েছে। তোমাদের খাওয়া শেষ হোক, তারপর এই বাবুদের শোবার ঘরে পৌঁছে দিয়ে আমি যাব।”

রামদাস দাঁড়িয়েই রইল। বোঝা গেল, আমাদের খাওয়া যতক্ষণ না শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ সে এখান থেকে নড়বে না।

যে মেয়েটি পরিবেশন করছিল, তার নাম বোঝা গেল নিরু। সুশ্রী চেহারা, চালচলন সপ্রতিভ। বয়েস মনে হল বছর তিরিশ হবে। সিঁথিতে সিঁদুর নেই। তা সে বিধবা বলেও হতে পারে, আবার আদৌ বিয়ে হয়নি বলেও হতে পারে।

নিরু এঁদের কে হয়। রঙিলারই বা অসুখটা আসলে কী হয়েছে, এই দুটো প্রশ্ন আমার মনের মধ্যে দু-একবার উঁকি মেরেছিল ঠিকই, কিন্তু ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, মুখ নিচু করে একেবারে চুপচাপ তিনি খেয়ে যাচ্ছেন, আমিও আর তাই এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলুম না। শুধু একবার বলেছিলুম যে, রান্না অতি চমৎকার হয়েছে, সবই কি এই মেয়েটি করেছে কি? তাতে সত্যপ্রকাশ বললেন, “আরে না, মশাই, তার জন্যে তো আলাদা লোকই রয়েছে, এই গ্রামের লোক, সকালবেলায় এসে সারাটা দিন থাকে, তারপর রাতের রান্নার পাট চুকিয়ে আটটা নাগাদ নিজের বাড়িতে চলে যায়।”

রান্না সতিই চমৎকার হয়েছিল। সত্যপ্রকাশ যে আমাদের জন্যে পঞ্চাশ ব্যঞ্জনের ফরমাশ দিয়ে রেখেছিলেন, তা নয়, তবে মাছই দেখলুম তিনরকম। তার মধ্যে রুই আর চিংড়িটাকে শনাক্ত করা গেল বটে, তবে তৃতীয়টাকে চিনতে পারলুম না।

সত্যপ্রকাশকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, “এখানকার নদীর মাছ। চেপটি। সর্ষে-ঝালের পক্ষে একেবারে আদর্শ। খেয়ে নিন। এ মাছ কলকাতায় পাবেন না।” তারপর একটু থেমে বললেন, “মাংস না থাকায় একটু অসুবিধে হল, তাই না?

আমি বললুম, “সে কী কথা, এত চমৎকার মাছ পেলে কেউ মাংস চায়?”

“চাইলেও পেতেন না মশাই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “এ তো শহর নয়, গ্রাম। এখানে মাছ মেলে, মাংস মেলে না। মাংস যদি খেতে চান তো সেই আলিপুরদুয়ার থেকে কিনে আনতে হবে।”

ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি, এইবারে মুখ তুলে বললেন, “আলিপুরদুয়ার এখান থেকে কতদূর?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা নেহাত কম হবে না, বরং হাসিমারাই কাছে।”

“মুকুন্দপুর কোথায়, সেটা বোঝাতে গিয়ে তা হলে আপনারা ‘আলিপুরদুয়ারের কাছে’ বলেন কেন?”

“হাসিমারার চেয়ে আলিপুরদুয়ার যেহেতু বেশি বিখ্যাত, তাই ওই নামটাই করতে হয়।” সত্যপ্রকাশ হাসলেন।

খাওয়ার পর্ব চুকেছে। রামদাস বলল, “চলুন, আপনাদের শোবার ঘর দেখিয়ে দিই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যবাবু কি এখনই শুয়ে পড়বেন?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আরে না মশাই। সবে তো দশটা বাজে। এত সকাল-সকাল আমি ঘুমোই না। আমার ঘুমোতে-ঘুমোতে সেই রাত বরোটা-একটা বাজবে।”

“এখন তা হলে কী করবেন?”

“সঙ্গে একটা হ্যাডলি চেজ রয়েছে। সেইটে পড়ব।”

“তার চেয়ে বরং যে কাজে এসেছি, সেই কাজে আমাদের সাহায্য করুন।” চারু ভাদুড়ি বললেন, “ঘুণ আমাদেরও পায়নি, সুতরাং সময়টাকে কাজে লাগানো যাক। মনসাদেবীর মূর্তি কীভাবে নিখোঁজ হল, শুনি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “বেশ তো, চলুন, ড্রইংরুমে গিয়ে বসা যাক।”

মশলার ডিবে হাতে নিরু এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। ডিবের ভিতর থেকে এক টিপ মৌরি আর এলাচদানা তুলে নিয়ে সদ্য খাবার-ঘরের বাইরে পা বাড়িয়েছি। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা চিৎকার শোনা গেল।

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কী ব্যাপার? চিৎকারটা তোমারই ঘরের দিক থেকে এল না রামদাস? চলো তো একবার।”

আমরাও ওঁদের সঙ্গে যাচ্ছিলুম, সত্যপ্রকাশ আমাদের বাধা দিয়ে বললেন, “ব্যস্ত হবেন না, নিরুর সঙ্গে আপনারা ড্রইংরুমে গিয়ে বসুন, আমরা এখুনি গিয়ে দেখে আসছি ব্যাপারটা কী।”


মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সত্যপ্রকাশ ফিরে এলেন। মুখ গম্ভীর। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল?”

“ঝামেলা হল।” হাতের টর্চটা নামিয়ে রেখে সত্যপ্রকাশ বললেন, “যে মেয়েটি আয়ার কাজ করে, সে আর এখানে থাকতে চাইছে না।”

“সে-ই চেঁচিয়ে উঠেছিল বুঝি?”

“হ্যাঁ। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল।”

“কীসের ভয়?”

“ভূতের। বলছে, জানলা দিয়ে কে যেন ঘরের মধ্যে উঁকি মেরেছিল। সে চেঁচিয়ে উঠতেই লোকটা পালিয়ে যায়। আয়া বলছে, মানুষ নয়, ভূত।”

“হঠাৎ ভূতের কথা উঠল কেন?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আর বলবেন না। এরা গ্রামের লোক, এমনিতেই এক-একটা কুসংস্কারের ডিপো, সন্ধে হতে না হতেই ভূতপেত্নির ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে থাকে, তার উপরে আবার মন্দির থেকে বিগ্রহ চুরি যাওয়ার পরে এদের ভয়টা আরও বেড়েছে। গাছ থেকে পাতাটা খসে পড়লেও বলছে যে, ভূতে পাতা ফেলছে।”

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “বিগ্রহের কথা বলুন। ঠিক কবে ওটি উধাও হয়েছে?”

“বলছি।” সত্যপ্রকাশ একটি সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর বললেন, “সবই আপনাদের বলব। প্রথমে ভেবেছিলুম, দু-একটা কথা চেপে গেলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু পরে মনে হল, সবই আপনাদের জানা দরকার, তা নইলে এই ব্যাপারটার তাৎপর্য আপনারা ঠিক ধরতে পারবেন না। আবার সব কথা যদি শোনেন, তা হলে এমনও আপনাদের মনে হতে পারে যে, কুসংস্কার আমারও কিছু কম নয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অত কিন্তু-কিন্তু করবেন না। কুসংস্কার সকলেরই কিছু-না-কিছু থাকে। ইউরোপ-আমেরিকার লোকরা তো ভাবে….শুধু ভাবে কেন, খোলাখুলি বলওে যে, এই প্রাচ্য পৃথিবীই হচ্ছে কুসংস্কারের সবচেয়ে বড় আড়ত। অথচ…”

আমি বললুম, “অথচ কুসংস্কার ইউরোপ-আমেরিকাতেও কিছু কম নেই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নেই-ই তো। সেখানকার বিস্তর লোক আজও কালো-বেড়ালকে অমঙ্গলের দূত বলে ভাবে, আর পারতপক্ষে তেরো-তারিখে কোনও শুভকর্মে হাত দিতে চায় না।”

“তা ছাড়া,” আমি বললুম, “এ দেশে এলে মঘা-অশ্লেষাকেও তারা এড়িয়ে চলে। প্রভাত মুখুজ্যে মশাই এই নিয়ে বড় চমৎকার একটি গল্প লিখেছিলেন।”

“সুতরাং কুণ্ঠিত হবেন না, সত্যবাবু।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা বলবার, নির্ভয়ে বলুন।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “প্রথমেই জানিয়ে রাখি যে, আমরা এই অঞ্চলের মানুষ নই। অনেক কাল এদিকে আছি তো, তাই এখানকার লোকদের কথাবার্তায় যে একটা অন্যরকমের টান থাকে, আমাদের কথাবার্তাতেও সেটা ঢুকে পড়েছে। আমরা আসলে অন্য জায়গা থেকে এখানে এসেছি।”

আমি বললুম, “সে তো অনেকেই এসেছে। বিশেষ করে পার্টিশানের পর থেকে। আপনারাও নিশ্চয় পুব-বাংলা থেকে এসেছিলেন?”

“না না, আমরা পুব-বাংলার লোক নই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “পার্টিশানের অনেক আগে থেকে আমরা এখানে আছি। তা সেই নাইনটিন্‌থ সেঞ্চুরির একেবারে শেষ দিক থেকে।”

“ওরে বাবা,” চারু ভাদুড়ি বললেন, “এ তো দেখছি মহারানি ভিক্টোরিয়ার আমলের ব্যাপার।”

“তা বলতে পারব না, তবে এগজ্যাক্ট সময়টা বলতে পারি, এইট্রিন নাইনটিওয়ান।”

“আপনাদের আদি বাড়ি কোথায় ছিল?”

“বর্ধমান জেলায়।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “গ্রামের নামটা আর বলছি না, বললেও আপনারা চিনতে পারবেন না। তা সেই গ্রাম থেকে আমার ঠাকুরদাই প্রথমে এদিকে এসে এই মুকুন্দপুর গ্রামে বসবাস করতে শুরু করেন। সঙ্গে টাকাপয়সা বেশি আনেননি, তবে যা এনেছিলেন তা-ই যথেষ্ট। সেই টাকায় যেমন এখানে, তেমনি আশেপাশেও একেবারে জলের দরে কিছু জমিজমা কিনেছিলেন। তার কিছুটা তিনি ভাগচাষিদের দিয়েছিলেন বটে, তবে বেশির ভাগই মাইনে-করা লোক দিয়ে চাষ করাতেন। ফসল যা পেতেন, তাতে সংসারের দরকার তো মিটতই, বিক্রিও হত প্রচুর। সত্যি বলতে কী, বর্ধমানে থাকতে আমার ঠাকুর্দার অবস্থা খুব ভাল ছিল না, এখানে আসবার পর থেকেই তাঁর কপাল ফিরে যায়।”

ঘরের মধ্যে হ্যারিকেন জ্বলছে। তাতে খানিকটা জায়গা আলো হয়েছে বটে, কিন্তু বাকিটা অন্ধকার। তাই, নিরু যে কখন ঘরে এসে ঢুকেছে, আমরা বুঝতে পারিনি। সত্যপ্রকাশ বললেন, “কিছু বলবে?”

নিরু বলল, “আপনাদের কি কিছু লাগবে, দাদাবাবু? উনুনে আগুন রয়েছে, বলেন তো কফি করে দিতে পারি।”

সত্যপ্রকাশ আমাদের দিকে তাকালেন। আমরা মাথা নাড়লুম দেখে সত্যপ্রকাশ বললেন, “না, আর কিছু লাগবে না। মা আর পিসিমা শুয়ে পড়েছেন তো?”

“হ্যাঁ।”

“তুমিও শুয়ে পড়ো গিয়ে।”

চারু চলে গেল। সত্যপ্রকাশ বললেন, “যা বলছিলুম। আমার ঠাকুর্দার নাম মহেশ্বর চৌধুরি। তাঁর দুই ছেলে। নিত্যপ্রকাশ আর চিত্তপ্রকাশ। মেয়ে একটি। নাম সত্যভামা। ঠাকুর্দা খুব ঘটা করে জলপাইগুড়িতে এক বড়লোক ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দাম্পত্য জীবন খুব সুখের হয়নি। জামাতা বাবাজীবনের হরেক রকমের দোষ ছিল, তার মধ্যে একটা হচ্ছে মাত্রাহীন সুরাসক্তি। অতি অল্প বয়স থেকেই তিনি মদ্যপান করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু ওই যা বলছিলুম, এ ব্যাপারে তাঁর কোনও মাত্রাজ্ঞান ছিল না। ফলে তিরিশে পৌঁছবার আগেই লিভারের বারোটা বাজিয়ে তিনি ফৌত হয়ে যান। আমার পিসিমার বয়স তখন কুড়ি-বাইশ। তারপরে আর তিনি জলপাইগুড়িতে থাকেননি। ছেলেপুলে না-হওয়ায় শ্বশুরবাড়ির উপরে তাঁর বিশেষ টানও ছিল না। বিধবা হবার মাসখানেকের মধ্যেই তিনি বাপের বাড়িতে চলে আসেন।”

আমি বললুম, “তিনিই তো আপনার একমাত্র পিসিমা। খাবার ঘরে তা হলে আপনার মায়ের সঙ্গে তাঁকেই আমরা দেখেছি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার মা আর পিসিমার বয়েস প্রায় একই, এক-আধ বছর এদিক-ওদিক হতে পারে। দুজনে খুব ভাব। পিসিমা যেমন শ্বশুরবাড়িতে যাননি, তেমনি মা-ও কখনও তাঁকে যেতে দেননি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই নিরু মেয়েটি কে? আপনাদের কোনও আত্মীয়া?”

“না মশাই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “নিরু আমাদের কেউ নয়। পাশের গাঁয়ের মেয়ে। ওর বয়েস যখন কুড়ি-বাইশ, তখন টাইফয়েডে ওর স্বামী মারা যায়। তা সে প্রায় বছর দশেক আন্দ্রে কথা। একটা দেওর ছিল, কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর দিন-দশেকের মধ্যেই নিরু বুঝতে পেরে যায় যে, দেওরের মতলব খুব ভাল নয়। আমার মা-কে সেই কথা বলে এখানে আশ্রয় চেয়েছিল। বাস, সেই থেকে নিরু এ-বাড়িতে রয়েছে।”

“ওর ছেলেপুলে নেই?”

“একটা ছেলে ছিল। কিন্তু ছেলেটা মারা গিয়েছিল স্বামীর মৃত্যুর আগের বছরেই। সেও টাইফয়েডের ব্যাপার।”

“নিরু এ-বাড়িতে কী কাজ করে?”

“মা আর পিসিমার সেবাযত্ন করে। দুজনেই বুড়োমানুষ, নিরুকে পেয়ে ওঁদের ভালই হয়েছে।”

“আপনার ঠাকুর্দার কথা বলুন। আপনি তাঁর জমিজমার কথা বলেছেন। কিন্তু আপনাদের আয় তো শুধু জমি-জমা থেকে নয়, ব্যাবসাও বেশ বড় মাপের। এই ব্যাবসার পত্তনও কি তাঁর আমলেই হয়েছিল?”

“না।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার ঠাকুর্দার চরিত্র যা আমি আন্দাজ করতে পারি, তাতে মনে হয়, শুধু জমিজমা বাড়িয়ে সন্তুষ্ট থাকবার মতো মানুষ তিনি ছিলেন না, জমি থেকে যা আয় হত, তার থেকে কিছু-না-কিছু সঞ্চয় করে সেই পুঁজি নিয়ে হয়তো ব্যাবসাতেও নামতেন তিনি। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। আসলে তাঁর মন ইতিমধ্যে ভেঙে গিয়েছিল।”

“কেন?”

“একটা কারণ আমার পিসিমা। একমাত্র মেয়ে, মাত্র কুড়ি-বাইশ বছরে সিঁথির সিঁদুর মুছে, হাতের শাঁখা ভেঙে, থানকাপড় পরে সে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে এল, বলতে গেলে কোনও সাধ-আহ্লাদ তার মিটল না, এই ধাক্কাটা ঠাকুর্দা সামলে উঠতে পারেননি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার কথা থেকে বুঝতে পারছি, মহেশ্বর চৌধুরির মন ভেঙে যাওয়ার আরও একটা কারণ ছিল। সেটা কী?”

“দ্বিতীয় কারণ আমার কাকা।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনাদের আমি বলেছি যে, আমার ঠাকুর্দার পুত্রসন্তান হয়েছিল দুটি। বড় ছেলে নিত্যপ্রকাশ আমার বাবা। তাঁর লেখাপড়া বিশেষ এগোয়নি। সেই তুলনায় ছোট ছেলে চিত্তপ্রকাশ ছিলেন অনেক মেধাবী ছাত্র। আলিপুরদুয়ার থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে তিনি জলপানি পান। ঠাকুমা তখন জিদ করতে থাকেন যে, তাকে কলকাতায় রেখে পড়াতে হবে।”

“তা-ই হয়েছিল?”

“ঠাকুর্দার তাতে মোটেই সায় ছিল না। কিন্তু মায়ের সঙ্গে ছেলেও বায়না ধরে বসল যে, কলকাতায় সে যাবেই। ফলে ঠাকুর্দা তাকে কলকাতার এক নাম-করা কলেজে ভর্তি করে দিয়ে আসতে বাধ্য হলেন। কলেজের কাছেই হস্টেল। সেইখানে তাকে রাখার ব্যবস্থা হল।”

“তারপর?”

“তারপর সেই হস্টেল থেকেই একদিন নিখোঁজ হয়ে গেলেন চিত্তপ্রকাশ। গেলেন তো গেলেনই, কোনও খোঁজই আর তাঁর পাওয়া গেল না। পিসিমার বিয়ের বছর দুই-তিনের মধ্যেই এই ঘটনা। বুঝতেই পারেন, ঠাকুর্দা এই ঘটনায় কতটা আঘাত পেয়েছিলেন। তারপর তাঁর একমাত্র মেয়েরও যখন কপাল পুড়ল, শোকে দুঃখে ঠাকুর্দা তখন প্রায় উন্মাদ হয়ে যান। মায়ের কাছে শুনেছি, দিবারাত্রি ঠাকুর্দা তখন নাকি ঠাকুরঘরেই পড়ে থাকতেন। কারও সঙ্গে কোনও কথা বলতেন না, শুধু মাঝে-মাঝে তাঁর বুক-ফাটা হাহাকার শোনা যেত—মা, এ .তুই আমার কী করলি?”

সত্যপ্রকাশ আবার একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “রাত এগারোটা বাজে। আপনাদের ঘুম পায়নি তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না। আপনার বাবার কথা বলুন।”

“বাবার লেখাপড়া যে বিশেষ এগোয়নি, তা তো আপনাদের বলেছি। তবে তিনি উদ্যোগী মানুষ ছিলেন। পিসিমা বিধবা হয়ে এখানে চলে আসার পরে আমার ঠাকুর্দা বেশিদিন বাঁচেননি, তার বছর দুয়েকের মধ্যেই তিনি মারা যান। সংসারের দায়িত্ব তখন পুরোপুরি বাবার উপরে এসে পড়ে। তাঁরই আমলে পত্তন হল আমাদের কাঠের ব্যাবসার। জমিজমার উপরে নির্ভর করে যে বেশিদিন থাকা যাবে না। সেটা তিনি বুঝতে পরেছিলেন। তা ছাড়া তাঁর ব্যাবসা-বুদ্ধি ছিল খুবই ধারালো। সেইসঙ্গে জনাকয় সৎ লোকের সাহায্য পেয়েছিলেন তিনি। ফলে, জঙ্গলের ইজারা নেওয়া কি কাঠ কেনা-বেচার ব্যাপারে কখনও তিনি মার খাননি। বছর কয়েকের মধ্যেই তাঁর ব্যাবসার ভলুম হু হু করে বেড়ে যায়। বছর দশেক আগে তিনি মারা গেছেন।”

“শিলিগুড়িতে যে আপনার হোটেল আর ট্রাকের ব্যাবসার কথা শুনেছি, তারও শুরু কি আপনার বাবার আমলেই?”

“না, ও দুটো আমি শুরু করেছি।” সত্যপ্রকাশ বলেলেন, “টাকা তো ফেলে রাখতে নেই, তাকে খাটাতে হয়। শিলিগুড়িতে এখন হোটেলের ব্যাবসায় মার খাবার কোনও ভয় নেই, আর ট্রাকের ব্যাবসার সঙ্গে তো এখানকার কাঠের ব্যাবসা একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, ফলে সেখানেও কোনও লোকসানের কথা উঠছে না। আমি তো আরও গোটা দুই-তিন ট্রাক কেনার কথা ভাবছি।”

আমি বললুম, “মাঝে-মাঝে যে ট্রাক থেকে মাল লুঠ হয়ে যাবার খবর পড়ি?”

“সে তো ইনসিওর-করা মালপত্র। লুঠ হলেই বা লোকসান কী? অন্তত ব্যক্তিগতভাবে তো কারও কোনও লোকসান হবার কথা নয়।” সত্যপ্রকাশ হাসতে লাগলেন।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা ব্যক্তিগত কথা জিজ্ঞেস করছি। আপনার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা কি শিলিগুড়িতেই থাকেন?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “বছর পাঁচেক আগে আমার স্ত্রী মারা গেছেন। ছেলেমেয়ে তিনটি। দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে। ছেলেটিই সবার ছোট।”

“তারা কোথায় থাকে?”

“বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সে কলকাতায় থাকে। ছোট মেয়ে আর ছেলেটি থাকে দার্জিলিঙে। দুজনেই হস্টেলে থেকে পড়াশুনো করে।”

“আপনার ভাইবোনেরা?”

“আমার ভাইও নেই, বোনও নেই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “বাপ-মায়ের আমিই একমাত্র সন্তান।”

“স্ত্রী মারা যাবার পরে আপনি আর বিয়ে করার কথা ভাবেননি?”

“আমি ভাবিনি, তবে মা আর পিসিমা ভেবেছিলেন। ভাবছিলেন আমার বন্ধুবান্ধবরাও।” সত্যপ্রকাশ হাসতে-হাসতেই বললেন, “ওই যে একটা কথা আছে না, যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই, এ হল সেই ব্যাপার। আমার বিয়ের ভাবনায় আমার বন্ধুবান্ধবদের ঘুম হচ্ছিল না। তা ঘুম তাঁদের না-হতেই পারে। খোঁজ নিয়ে দেখুন, তাঁদের প্রত্যেকেরই একটি করে গলগ্রহ ভাগ্নি কি ভাইঝি কি শালি রয়েছে, সেটিকে আমার ঘাড়ে না চাপানো পর্যন্ত তাঁদের ঘুম হবার আশা নেই। না মশাই, ব্যাবসা-ট্যাবসা নিয়ে এই দিব্যি আছি। ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে, বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, দু-দিন বাদে তারও ছেলেপুলে হবে, এখন বুড়োবয়সে টোপর পরে আমি যদি ছাঁদনাতলায় গিয়ে দাঁড়াই, লোকে তো তা হলে ছ্যা-ছ্যা করবে!”

“এখানে আপনাদের এই পৈতৃক বাড়িতে তা হলে থাকেন কে?”

“থাকেন আমার মা আর পিসিমা! তা ছাড়া থাকে রামদাস আর তার নাতনি রঙ্গিলা। তা ছাড়া থাকে নিরু। আর হ্যাঁ, বাড়িতে নিত্যপূজার একটা ব্যবস্থা আছে তো, তাই একজন পুরুতঠাকুরও থাকেন। শিলিগুড়িতে খুব কাজের চাপ না থাকলে সপ্তাহান্তে আমিও একবার করে আসি। শনিবার রাতে চলে আসি। তারপর রোববারটা এখানে কাটিয়ে সোমবার আবার শিলিগুড়িতে ফিরে যাই। তবে কিনা ওই যা বললুম, হাতে তেমন কাজ না থাকলে আসি, কাজের চাপ থাকলে আসতে পারি না।”

“এখানেও তো অনেক কাজ। সে-সব কে করে?”

“বাড়ির কাজকর্ম যারা করে, তারা গ্রামেরই লোক। কেউ রান্নার কাজ করে, কেউ কাপড় কাচে, কেউ বাসন-কোশন মাজে, কেউ জল তোলে, কেউ ঝাঁট-পাট দেয়। তবে তারা কেউ রাত্তিরে এ-বাড়িতে থাকে না, কাজকর্ম সেরে যে যার বাড়িতে চলে যায়।”

“জমিজমার কাজ?”

“কিছুটা ভাগচাষিরা করে, আর নিজেরা জন খাটিয়ে যে জমিতে চাষ করাই, তার তদারকি করে রামদাস। ও আমার বাবার আমলের বিশ্বাসী লোক,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “ওকে নিয়ে কোনও চিন্তা নেই। জানেন, আমি যখন ইস্কুলে পড়ি, তখন ও একবার বাঘের মুখ থেকে আমাকে ছিনিয়ে এনেছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বটে?”

সত্যপ্রকাশ তাঁর পাঞ্জাবির আস্তিন গুটিয়ে বাঁ-হাতটা আমাদের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই দেখুন।”

কনুই আর কব্জির মাঝখানে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে একটা শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতচিহ্ন। চামড়া এখনও কুঁচকে আছে। দেখে বোঝা যায়, জখমটা বেশ বড় রকমেরই হয়েছিল। হাতটা সরিয়ে নিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “লছাড়া হয়ে একটা লেপার্ডের মুখে পড়ে গিয়েছিলুম। রামদাস যদি না টাঙ্গি নিয়ে লাফিয়ে পড়ত, তা হলে সেইদিনই আমার খেল খতম হয়ে যেত।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর কেউ তা হলে থাকেন না আপনাদের এই বাড়িতে?”

সত্যপ্রকাশ একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “থাকতেন না, কিন্তু এখন থাকেন।”

“কে?”

“আমার সেই কাকা। চিত্তপ্রকাশ। মূর্তিটি যেদিন নিখোঁজ হয়, তার দিন সাতেক আগে ফিরে : এসেছেন।”


সত্যপ্রকাশের কথা শুনে তো আমি অবাক। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে কিন্তু মনে হল যে, এই রকমের একটা তাজ্জব ব্যাপারও তাঁকে বিশেষ বিচলিত করতে পারেনি। যেন এমন কান্ড নিত্যই ঘটছে, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

তবে, মুখের রেখা পালটে না-গেলেও, তাঁর চোখের চাউনিটা যে পালটেছে, ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এক-পলক তাকিয়েই সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলুম। তীব্র চোখে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি; যেন সত্যপ্রকাশকে নয়, তাঁর ভেতর দিয়ে আর-কাউকে তিনি দেখে নিচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ সেইভাবে তিনি তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে-ধীরে তাঁর দৃষ্টি আবার স্বাভাবিক হয়ে এল। সত্যপ্রকাশকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “যিনি ফিরে এসেছেন, তিনিই যে আপনার সেই হারানো-কাকা, তা আপনি বুঝলেন কী করে?”

“আমি বুঝতে পারিনি। মা আর পিসিমা বুঝতে পেরেছিলেন। আর বুঝতে পেরেছিল রামদাস। সে-ই শিলিগুড়িতে লোক পাঠিয়ে আমাকে খবর দেয় যে, কাকা ফিরে এসেছেন।”

“ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছিল বলুন তো।”

“ব্যাপার আর কী, জটাধারী একজন বুড়োমতন লোক একদিন আমাদের এই বাড়িতে এসে বললেন, যে, তিনি চিত্তপ্রকাশ চৌধুরি, মহেশ্বর চৌধুরির ছোট ছেলে। সকলকে একবার দেখবার জন্যে তিনি নাকি হরিদ্বার থেকে কামাখ্যা যাওয়ার পথে এখানে এসেছেন, হপ্তাখানেক এখানে থেকে কামাখ্যা যাবেন, তারপর কামাখ্যা থেকে আবার হরিদ্বারে ফিরবেন।”

“সকলেই সে-কথা বিশ্বাস করল?”

“প্রথমটায় করেনি।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “কিন্তু মা যখন রামদাসকে বললেন যে, ছেলেবেলায় পেয়ারাগাছ থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর দেও বের কপাল ফেটে গিয়েছিল, সেই দাগটা এখনও মিলিয়ে যায়নি, আর রামদাস যখন দেখল যে, যিনি এসেছেন তাঁর কপালে সত্যি মস্ত একটা কাটা-দাগ রয়েছে, তখন আর তাঁকে চিত্তপ্রকাশ বলে মেনে নিতে কারও আপত্তি হল না।”

“অর্থাৎ তিনি এখানেই রয়ে গেলেন?”

“হ্যাঁ,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “সবাই মেনে নিল যে, এটা ইপার্সোনেশানের ব্যাপার নয়। সত্যিই তিনি মহেশ্বর চৌধুরির কনিষ্ঠ পুত্র – নিত্যপ্রকাশের ছোট ভাই।”

“আপনার মা তাঁকে ছেলেবেলায় পেয়ারাগাছ থেকে পড়ে যেতে দেখেছিলেন?”

“তা কী করে দেখবেন? মা’র তো তখনও বিয়েই হয়নি। তবে হ্যাঁ, পিসিমা দেখেছিলেন। মা শুনেছিলেন বিয়ের পরে তাঁর শাশুড়ি অর্থাৎ আমার ঠাকুমার কাছে।”

“খাবার সময়ে তো তাঁকে দেখলুম না। আগেই খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়েছেন নাকি?”

“তিনি সন্নিসি মানুষ, তাই আমাদের সঙ্গে খান না। আমাদের এই বাড়ির মধ্যে থাকেনও না তিনি।”

“আপনারা থাকতে বলেছিলেন?”

“বিলক্ষণ।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “তিনি আমার কাকা, তাঁকে থাকতে বলব না?”

“তাতে তিনি কী বললেন?”

“বললেন, ওরেব্বাবা, একবার যখন সংসারের খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়েছি, তখন আর ওর মধ্যে ঢুকি? আমাকে নিয়ে ভাবিস না, আমি গাছতলাতেই দিব্যি থাকব।”

“তা-ই রয়েছেন?”

“তাও কি হয়? মন্দিরের উত্তরে আমাদের একটা ফলের বাগান আছে, লোকজন ডেকে সাত-তাড়াতাড়ি সেই বাগানের মধ্যে একটা একচালা ঘর তুলে দেওয়া হল। কাকা এখন তাতেই থাকেন। পুজো-আচ্চা করেন, আর মাঝে-মাঝে হাঁক ছাড়েন ‘জয় শিবশম্ভু, জয় শঙ্কর’।”

“আপনার কাকার বয়েস এখন কত?”

“দাঁড়ান মশাই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “একটু হিসেব করে বলতে হবে। আমার যখন জন্ম হয়, আমার মায়ের বয়েস তখন সতেরো। তা আমার বয়স এখন ছেচল্লিশ। তা হলে আমার মায়ের বয়স হল গিয়ে ছেচল্লিশ প্লাস সতেরো অর্থাৎ তেষট্টি বছর। কাকা শুনেছি আমার মায়ের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। তা হলে হি শুড বি সিক্সটি এইট নাউ।

“অর্থাৎ কলেজে পড়তে-পড়তে যিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন, বছর পঞ্চাশেক বাদে তিনি ফিরে এসেছন। তা এই পঞ্চাশটা বছর তিনি ছিলেন কোথায়?”

“হরিদ্বার, কনখল, ঋষিকেশ, এইরকম নানান জায়গায়। এক রমৃতা সাধুর সঙ্গে হস্টেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন, এলাহাবাদে তাঁর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। সেখান থেকে যান হরিদ্বারে। বলেন যে, ওই হরিদ্বারেই এক শৈব সাধুর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন।”

“শৈবদের তো নানান সম্প্রদায় রয়েছে,” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “ইনি কোন সম্প্রদায়ের সাধু?”

“তা তো জানি না। তবে শুনেছি যে, সেই সাধুর সঙ্গেই তিনি ভৈরোঘাটে গিয়েছিলেন। ভৈরোঘাটের নাম শুনেছেন নিশ্চয়, জায়গাটা গঙ্গোত্রীর খুব কাছে। সেখানে এক গুহার মধ্যে বসে নাকি পুরো পাঁচ পছর একটানা তপস্যাও করেছেন। আর তার ফলে এমন একটা শক্তি পেয়েছেন, যা নাকি কেউ পায় না।”

“শক্তিটা কী?”

“তা কিছুতেই বলতে চান না। জিজ্ঞেস করলে শুধু হাসেন, আর বলেন, ‘জয় শঙ্কর’।”

“কদ্দিন এখানে থাকবেন বলেছিলেন?”

“হপ্তাখানেক। এদিকে দিন দশ-বারো তো কেটে গেল, কিন্তু…”

“কিন্তু এখান থেকে আর নড়তে চাইছেন না, কেমন?”

“ঠিক ধরেছেন,” সত্যপ্রকাশ একটু কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “আর সেটাই হয়ছে সমস্যা।”

ভাদুড়িমশাইয়ের চাউনিটা আবার ধারালো হয়ে উঠল। বললেন, “সমস্যা কীসের?”

সত্যপ্রকাশ সেই একইরকম কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “এমনিতে তো কোনও সমস্যা হবার কথা নয়। খান তো শুধু ফলমূল আর দুধ, যার জোগান আমরা হাসিমুখেই দিচ্ছি। আর থাকেনও তো বাড়ির বাইরে, বাগানের মধ্যে; কারও তাতে কোনও অসুবিধা হবার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। আর তা ছাড়া, এটাও তো ঠিক যে, এখানকার যা-কিছু জমিজমা, তা আমার বাবা করেননি, করেছেন আমার ঠাকুর্দা। এই বাড়িও তাঁরই করা। তার মানে এই ভূসম্পত্তি আর এই ঘরবাড়ি, এর উপরে আমার যতটা অধিকার, কাকার অধিকার তার চেয়ে এক-কড়াও কম নয়। একেবারে ফিটি-ফিফটি মালিকানার ব্যাপার। সুতরাং তিনি তো থাকতেই পারেন।”

“তা হলে তো মিটেই গেল, সমস্যাটা কোথায়?”

“সমস্যা ওঁর চালচলন নিয়ে, সমস্যা ওঁর বিশ্বাস নিয়ে, সমস্যা ওঁর কথাবার্তা নিয়ে। মনসা আমাদের উপাস্য দেবী, আমার প্রপিতামহ বীরেশ্বর চৌধুরীর সময় থেকে আমরা মা-মনসার পুজো করে আসছি, সেই মনসাকেই উনি দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। কী বলেন জানেন?”

“কী বলেন?”

“বলেন যে, ওটা দেবী নয়, ওটা ব্যাং-খেকো সাপ! শুধু যে আমাদের বাড়ির লোককেই বলেন, তা নয়, ত্রিশূল হাতে নিয়ে গোটা গাঁয়ে টহল মেরে বেড়ান, আর প্রত্যেককে বলেন, ‘ওটাকে ফেলে দে, তারপর ওই মন্দিরের মধ্যে শিব প্রতিষ্ঠা করে শিবের পুজো শুরু কর!’ মূর্তিটি নিখোঁজ হওয়ায় সবাই যখন ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে আছে, আর ভাবছে যে, গোটা গ্রামের এতে ঘোর অমঙ্গল হবে, তখন কাকা কিন্তু দারুণ খুশি। আনন্দে তিনি লাফিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভাবতে পারেন?”

“পারব না কেন, খুব পারি। রামকৃষ্ণদেব বলেছেন, যত মত তত পথ। কিন্তু তাঁর মতো সহিষ্ণুতা আর ক’জন সাধক দেখাতে পেরেছেন? সাধকরা যদি-বা পারেন, তাঁদের চেলারা পারে না। চেলারা ভাবেন যে, তাঁরা যে ধর্মপন্থায় চলেছেন সেটাই ঠিক, আর বাদবাকি সমস্ত পথই ভুল পথ। অন্যের মত, অন্যের পথকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ না করে তাঁদের শান্তি নেই। যদ্দুর বুঝতে পারছি, আপনার খুড়োমশাইটিও এই রকমের অসহিষ্ণু একজন মানুষ। তিনি সাধু হতে পারেন, কিন্তু সহিষ্ণু নন।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “সহিষ্ণু নয় এখানকার গ্রামের লোকজনও। রামদাসের কাছে শুনলুম, মা-মনসা সম্পর্কে কাকা যে-সব ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে বেড়াচ্ছেন, তারা তাতে খেপে গেছে। এমন কথাও তারা নাকি বলছে যে, এবারে ওই বাগানে ঢুকে তারা চালাঘরে আগুন লাগিয়ে দেবে। মা-মনসার নিন্দে তারা সহ্য করবে না।”

ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আপনি বলছিলেন যে, আপনার প্রপিতামহ বীরেশ্বর চৌধুরির আমল থেকে আপনারা মনসার পুজো করে আসছেন। তাই না?”

“হ্যাঁ।”

“তাঁর আগে আপনাদের পরিবারে এই পুজোর প্রচলন ছিল না?”

“হয়তো ছিল, আমি জানি না।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “তবে এইটে জানি যে, মনসা দেবীর এই মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমার প্রপিতামহের আমলেই। মূর্তিটি তিনি কীভাবে পেয়েছিলেন, সেই গল্পও আমি বাবার মুখে শুনেছি। বাবা শুনেছিলেন আমার ঠাকুর্দার কাছে।”

“কীভাবে পেয়েছিলেন? কোনও সাধু-সন্নিসির কাছ থেকে?”

“না না,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনারা হয়তো বিশ্বাস করবেন না, আর বিশ্বাস না করলে আমি আপনাদের দোষও দেব না, তার কারণ, আমার নিজের মনেই এ নিয়ে অনেক দ্বিধা-সংশয় আর সন্দেহ রয়েছে। আমি বিশ-শতকের মানুষ; যা শুনেছি, আমি নিজেই তা বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি। কোনও সাধু-সন্নিসি যদি একদিন আমার প্রপিতামহের দরজায় এসে দাঁড়াতেন আর তাঁর ঝোলার থেকে একটা মনসা মূর্তি বার করে আমার প্রপিতামহের হাতে তুলে দিয়ে বলতেন, ‘নে ব্যাটা, এই যে মুর্তিটা তোকে দিলুম, একে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতে থাক, তাতেই তোর দুঃখ-কষ্ট ঘুচে যাবে,’ তো সেটাকে আমি খুব অবিশ্বাস্য ব্যাপার বলে মনে করতুম না। এমন তো কতই ঘটে। কিন্তু যা শুনেছি, তা যে সত্যিই অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কী বলব, এটা একেবারে অলৌকিকের পর্যায়ে পড়ে।”

আবার সেই একই রকম তীব্র চোখে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকালেন ভাদুড়িমশাই— বললেন, “কী শুনেছেন?”

তখনই এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না সত্যপ্রকাশ। খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আমার প্রপিতামহ একদিন রাত্তিরে একটা স্বপ্ন দেখেন। অদ্ভুত সেই স্বপ্ন। যেন এক। অন্ধকার পথ দিয়ে তিনি হাঁটছেন। কোথাও কোনও বাড়িঘর নেই, দু’পাশে শুধু উঁচু-উঁচু সব গাছ। যেন সেটা কোনও লোকালয় নয়, বিরাট একটা জঙ্গল। সেই জঙ্গল হঠাৎ আলোয় ঝলমল করে উঠল। ‘অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ যখন তীব্র কোনও আলোর ঝলক এসে পড়ে, তখন প্রথমটায় কিছুই ঠাহর হয় না। আমার প্রপিতামহেরও কিছু ঠাহর হয়নি। তাঁর দৃষ্টি বাঁধিয়ে গিয়েছিল, তিনি চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন। তারপর যখন চোখ খুললেন, তখন দেখতে পেলেন যে, সেই আলোর মধ্যে এক নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁর গায়ের রঙ আবলুস কাঠের মতো কালো, কিন্তু রঙ কালো হলে কী হয়, তাঁর রূপের নাকি কেনাও তুলনা হয় না। চোখ দুটি টানা-টানা, নাকটি টিকোলো, ঠোঁট দুটি পাতলা, আর শরীর অসম্ভব রকমের সরু।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “জরৎকারু নামটা তো এইজন্যেই।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তার মানে?”

“পরে বলব। স্বপ্নের সবটা আগে শুনি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “স্বপ্নে আমার প্রপিতামহ নাকি এও দেখতে পেয়েছিলেন যে, একটি সাপ সেই নারীমূর্তিকে বেষ্টন করে রয়েছে। সেই নারী তবু সারাক্ষণ হাসছিলেন। হাসতে হাসতেই আমার প্রপিতামহকে তিনি বললেন, ‘বীরেশ্বর, আমাকে তুমি উদ্ধার করো।’ প্রপিতামহ বললেন, তুমি কে?’ সেই নারী বললেন, ‘আমি মনসা। যে গ্রামে তুমি থাকো, তার দক্ষিণে যে ডাঙাজমি রয়েছে, তার বটগাছের তলায় আমি বন্দি হয়ে আছি। তুমি আমাকে উদ্ধার করে আনো।’ বলেই তিনি আলোর মধ্যে মিলিয়ে গেলেন, আর আমার প্রপিতামহেরও ঘুম তৎক্ষণাৎ ভেঙে গেল। তিনি দেখলেন যে, সকাল হয়েছে, সূর্য উঠেছে, জানলা দিয়ে রোদ্দুর এসে পড়েছে তাঁর ঘরের মধ্যে।”

আমি বললুম, “তারপর?”

“তারপরেই ঘটল আশ্চর্য সেই ঘটনা।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার প্রপিতামহ যে অমন একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন, এর মধ্যে তো বিস্ময়ের কিছু নেই, এই ধরনের দেবদেবীর স্বপ্ন অনেকেই দেখে থাকে। কে জানে, সেই সময়ে তাঁদের গ্রামে হয়তো সাপের উপদ্রব খুব বেড়ে গিয়েছিল, গ্রামের লোকেরাও হয়তো বলাবলি করছিল যে, মা-মনসা নিশ্চয়ই খুব কুপিত হয়েছেন, তা নইলে এমন হত না, আমার প্রণিতামহের মনও হয়তো এই ধরনের চিন্তাতেই তখন তোলপাড় হচ্ছিল, আর তারই ফলে হয়তো অমন একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। না মশাই, এমন স্বপ্ন অনেকেই দেখতে পায়, শুধু যে দেখতে পায় তা নয়, ঘুম ভাঙবার পরে স্বপ্নের উপরে আরও কিছু রং চড়িয়ে ফলাও করে সবাইকে তা বলেও বেড়ায় তারা। এই ধরনের স্বপ্নের গপ্পো আমি অনেক শুনেছি, আপনারাও নিশ্চয় শুনে থাকবেন। কিন্তু বীরেশ্বর চৌধুরির ক্ষেত্রে ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, বাস্তবের সঙ্গে সেটা মিলে গেল। তাঁদের গ্রামের দক্ষিণ দিকের মাঠের মধ্যে সতিই একটা উঁচু ডাঙাজমি ছিল। ডাঙাজমির উপরে বটগাছও ছিল একটা। সেই বটগাছের কাছে, স্বপ্নে যেমন-যেমন নিশানা পেয়েছিলেন সেই অনুযায়ী হাত-চারেক গভীর করে মাটি খুঁড়তেই ঠং করে একটা আওয়াজ হল, আর বীরেশ্বর চৌধুরিও অমনি শাবল ফেলে দিয়ে হাত দিয়ে সেখানকার ঝুরো-মাটি সরিয়ে গর্তের ভিতর থেকে তুলে আনলেন একটি পাথরের মুর্তি।”

সত্যপ্রকাশ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। আমরাও কেউ কোনও কথা বলছিলুম না। হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করলেন সত্যপ্রকাশ। সেটা ধরিয়ে বেশ বড় করে একটা টান দিলেন। গলগল করে ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “স্বপ্নে যে নারীমূর্তি তিনি দেখেছিলেন, অবিকল সেই মুর্তি। অতি অশ্চর্য মুর্তি। …এই ছবিটা দেখুন, তা হলেই বুঝতে পারবেন।”

সত্যপ্রকাশ তাঁর টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি ফোটোগ্রাফ বার করে আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আমাদের মন্দির থেকে এই মূর্তিটা চুরি হয়েছে। মিঃ ভাদুড়ি, যেমন করেই হোক, এই মূর্তি আপনাকে উদ্ধার করে দিতে হবে।”


ফোটোগ্রাফটির দিকে তাকিয়ে আমার নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। ভারতবর্ষের নানা জাদুঘরে আর মন্দিরে-মন্দিরে কত অসংখ্যা দেবদেবীর কত অসংখ্য মূর্তিই তো দেখেছি, কিন্তু এত অপরূপ মুর্তি আমি এর আগে কখনও দেখেছি বলে মনে হল না। দেবীমূর্তি এত অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর হয়। মনসার যে শারীর বিভঙ্গ এই বিগ্রহের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে, শুধু তা-ই যে আমার বিস্ময় জাগিয়েছিল, তা নয়, আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলুম তার গঠনসৌকর্য দেখেও। মূর্তিটির গড়ন একেবারে ষোলো-আনা নিখুঁত। কে এই কষ্টিপাথরের মূর্তি তৈরি করেছিলেন, তা হয়তো কোনও কালেই কেউ জানবে না, কিন্তু সেই ভাস্করের যে রূপকল্পনা এই মূর্তির মধ্যে ধরা পড়েছে, শুধু সেইটুকুর পরিচয় পেয়েই তাজ্জব মানবেন যে-কোনও শিল্প-সমালোচক। দন্ডায়মানা মনসা দেবীর কটিদেশ বেষ্টন করে তাঁর বক্ষের উপরে উঠে এসেছে একটি সাপ, আর সেই সাপের মুন্ডটিকে দক্ষিণ হস্তে ধারণ করে দেবী তার প্রসারিত ফণার দিকে তাকিয়ে আছেন। যেমন তাঁর চোখে, তেমনি তাঁর ওষ্ঠের বঙ্কিম ভঙ্গিমায় একটু হাসির আভাস। সে হাসি স্নেহের হাতে পারে, প্রশ্রয়ের হতে পারে, আবার কৌতুকেরও হতে পারে।

চারু ভাদুড়ির চোখে যেন পলক পড়ছিল না। স্থির দৃষ্টিতে তিনি ফোটোগ্রাফটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একসময়ে তিনি মুখ তুলে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকালেন, তারপর মস্ত একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “পালযুগের মূর্তি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “অ্যাবসলিউটিলি রাইট।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পন্ডিতদের কেউ-কেউ বলেন যে, মনসা পূর্ব-ভারতের দেবী নন, দক্ষিণ-ভারতে ‘মন্‌চা-অন্মা’ অর্থাৎ ‘মন্‌চা মা’ বলে যে দেবীর পুজো হত, তিনিই পরে এক সময়ে ‘মনসা’ নামে এই পূর্ব-ভারতের ধর্মজীবনের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। তবে অনেকেই এ-মত মানতে চান না। একটা কথা অবশ্য ঠিক। সেটা এই যে, আমাদের এই বঙ্গভূমিতে এ-পুজোর প্রচলন বিশেষ ছিল না। অন্তত সমাজের যেটা উঁচু স্তর, তাতে ছিল না। দ্রাবিড়ভূমি থেকেই আসুক আর অন্য যে-কোনও জায়গা থেকেই আসুক, সমাজের সেই উঁচু স্তরে এ পূজার প্রচলন হয়েছে মোটামুটি পালযুগ থেকেই। তবে সেক্ষেত্রেও বলতে হবে যে আপনাদের এই মনসা-মূর্তির বয়স নেহাত কম হবে না।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “মাস কয়েক আগে এক অধ্যাপক এদিকে এক চা-বাগানে তাঁর আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। ভদ্রলোক ইতিহাসের অধ্যাপক, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে এনসেন্ট ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি পড়ান। তা খবর পেয়ে তিনি এই মূর্তিটিকে দেখতে আসেন। বললেন যে, ইন্ডিয়ার সব ক’টা বিখ্যাত মিউজিয়াম তাঁর দেখা আছে, কিন্তু কষ্টিপাথরে গড়া এমন আশ্চর্য মনসা-মূর্তি তিনি কোথাও দেখেননি।”

আমি বললুম, “সত্যিই আশ্চর্য।”

চারু ভাদুড়ি বললেন, “ভদ্রলোক আর-কিছু বলেননি?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তখন-তখন বলেননি। পরে বলেছিলেন। আমি তো অনেকদিন আগেই এই মনসামূর্তির ফোটো তুলে অনেকগুলি প্রিন্ট করিয়ে রেখেছি, তা তার থেকে একটি প্রিন্ট তিনি চেয়ে নিয়ে যান। তার মাসখানেক বাদে কলকাতা থেকে একখানা চিঠি লিখে ভদ্রলোক আমাকে জানান যে, পালযুগ সম্পর্কে যে দু’জন অধ্যাপককে একালে অথরিটি বলে গণ্য করা হয়, তাঁদের দু’জনকেই তিনি প্রিন্টটি দেখিয়েছেন, আর দু’জনেই একবাক্যে বলেছেন, এ মূর্তি পালযুগের; সম্ভবত প্রথম মহীপালের সময়ে এটি তৈরি হয়েছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রথম মহীপাল তো পালবংশের দশম রাজা, যদ্দুর মনে পড়ছে ৯৮৮ থেকে ১০৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর আমলের একেবারে শেষ বছরেও যদি তৈরি হয়ে থাকে তো এ মূর্তির বয়েস তা প্রায় সাড়ে ন’শো বছর হল।”

আমি বললুম, “একে তো এত সুন্দর মুর্তি, তায় আবার এত পাচীন, বিদেশের যে-কোনও জাদুঘর তো এমন মূর্তি পেলে সঙ্গে-সঙ্গে লুফে নেবে।”

“জাদুঘর তো আছেই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্যে যারা যে-কোনও দাম দিতে রাজি, আছে সেই কোটিগতিরাও। সত্যি বলতে কী, প্রত্নদ্রব্যগুলিকে আগলে রাখার ব্যাপারে আমাদের মতো গরিব দেশগুলির পক্ষে এখন ইউরোপ-আমেরিকার এই প্রাইভেট কালেকটররাই সবচেয়ে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিউজিয়ামগুলো তবু আইন-কানুন মেনে চলে, এরা সে-সবের ধারই ধারে না।”

“আপনাদের কি মনে হয় যে, তাদেরই কেউ এই মুর্তিটি সরিয়েছে?”

সত্যপ্রকাশের প্রশ্ন শুনে ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “নিজের হাতে তারা সরাবে কেন, তার দরকারই বা কী? তাদের হয়ে যারা দেশের শিল্প চোরাই পথে বিদেশে চালান করে, সেই এজেন্টরাই তো রয়েছে।”

“এটা তাদেরই কাজ?”

“তাদের কাজ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাদের মনসামূর্তির উপরে হামলাটা এসে থাকতে পারে একেবারে অন্যদিকে থেকেও।”

দরজায় কে যেন টোকা মারল।

হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, সাড়ে বারোটা বাজে। এত রাতে কার কী দরকার পড়ল?

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কে?”

চাপা উত্তর এল, “আমি নিরু।”

সত্যপ্রকাশ উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার? …ও, এইজন্যে? তা ভালই করেছ।”

নিরু এসে ঘরে ঢুকল। হাতে মস্ত ট্রে। তাতে তিন কাপ কফি, আর বড় দুটো প্লেট। একটা প্লেটে কিছু বিস্কুট, আর একটা প্লেটে শিলিগুড়ি থেকে আনা সেই ক্ষীরের শিঙাড়া।

সেন্টার টেবিলে ট্রেটা নামিয়ে রাখল নিরু, তারপর সত্যপ্রকাশকে বলল, “খানিক আগে মা একবার ঘুম থেকে উঠেছিলেন। জানলা দিয়ে দেখলেন যে, আপনার বসবার ঘরে আলো জ্বলছে। তাই আমাকে তুলে দিয়ে বললেন, ‘সতু এখনও ঘুমোয়নি, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে, রাত জাগলে খিদে পায়, ওদের জন্যে বরং কফি আর হালকা কিছু খাবার দিয়ে আয় নিরু।’ আপনাদের যদি আরও কফি লাগে তো আমাকে ডাকবেন, আমি এসে দিয়ে যাব।”

ভাদুড়িমশাই শশব্যস্ত হয়ে বললেন, “না না, এই যথেষ্ট, আর লাগবে না।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমারও লাগবে না। তোমাকে তো সকাল-সকাল উঠতে হয়, তুমি শুয়ে পড়ো গিয়ে। মায়ের ঘরেই আজ শুয়েছ তো?”

মৃদু গলায় নিরু বলল “হ্যাঁ।” তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সত্যপ্রকাশ দরজা বন্ধ করে ফিরে এলেন।

রাত জাগলে সত্যিই অনেকের খিদে পেয়ে যায়। সারা রাত্তিরের ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে এইজন্যেই হয়তো ডিনার সার্ভ করার পরেও ঘন্টা তিন-চার বাদে আবার স্টুয়ার্ডেসরা হালকা কিছু-না-কিছু খাবার নিয়ে আসে। আমার অন্তত একটু-একটু খিদে পাচ্ছিল। প্লেট থেকে তাই একটা ক্ষীরের শিঙাড়া তুলে নিলুম। ভাদুড়িমশাই কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “যা বলছিলা। মুর্তিটা যে চোরাই পথে চালান দেবার জন্যেই সরানো হয়েছে, এমন নাও হতে পারে। এমনও হতে পারে যে, বিদেশি ধনকুবেরদের কাছে বিক্রি করে পয়সা পিটবার কোনও অভিসন্ধিই এক্ষেত্রে ছিল না, অন্য কোনও কারণে আপনাদের মনসা-মূর্তি চুরি করা হয়েছে। তা-ই যদি হয়, তো আমি অন্তত অবাক হব না।”

কফি খেতে-খেতে যেন বিষম খেলেন সত্যপ্রকাশ। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “অন্য কোনও কারণে? কী বলছেন আপনি, আমি তো ঠিক বুঝতে পারছি না। আর কী কারণ থাকতে পারে মশাই?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পরে বলব। আর তা ছাড়া, এখনই যে আমি তেমন কোনও কারণ সম্পর্কে একেবারে নিশ্চিত হতে পারছি, তাও তো নয়। সুতরাং পরে তা নিয়ে ভাবলেও কোনও ক্ষতি নেই। অর্থলোভে এই ধরনের চুরি আজকাল আকছার হচ্ছে, এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার, সুতরাং আপাতত এই নিয়েই ভাবনা-চিন্তা করা যাক। কিন্তু তার আগে একটা কথা আমায় বলুন। জরৎকারু তো বর্ধমানের গ্রামে ছিলেন, সেখান থেকে এই মুকুন্দপুরে তিনি এলেন কবে?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “দেখুন মশাই, হেঁয়ালি করবেন না। এই জরৎকারু নামটা আপনি আগেও একবার বলেছেন, কিন্তু আমি তো ও নামে কাউকে চিনি না। কে তিনি?”

ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকালেন। চোখে কৌতুকের ঝিলিক। বললেন, “আপনি জানেন কিরণবাবু?”

বললুম, “আমার কৌলিক পদবি যখন চাটুজ্যে, আর গোত্র যখন কাশ্যপ, তখন আর আমার না জেনে উপায় কী?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাক থাক, যেটুকু বলেছেন, তাতেই বুঝতে পারছি যে, আপনি জানেন। শুনুন সত্যপ্রকাশবাবু, মনসা হচ্ছেন মহর্ষি কশ্যপের মানসী কন্যা, আর এই কন্যাটির আর-এক নাম হল জরৎকারু। তবে কিনা জরৎকারু নামে এক মুনিও ছিলেন, আর সেই মুনির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল মনসা দেবীর। ব্যাপারটা তা হলে কী দাঁড়াল?”

হেসে বললুম, “কী আর দাঁড়াল, জরৎকারুর সঙ্গে জরৎকারুর বিয়ে হল।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “যাচ্চলে, স্বামী-স্ত্রীর একই নাম? এমনও হয় নাকি?”

“হবে না কেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ যেখানে কলকাঠি নাড়ছেন, সেখানে সবই হয়। আসলে আমাদের এই জরৎকারু-মুনি ছিলেন খুবই রোগাভোগা পাতলা চেহারায় মানুষ। হয়তো সেই জন্যই তিনি ঠিক করেছিলেন যে, বিয়ে-থা করবেন না। পরে অবশ্য পাঁচজনের চাপে পড়ে তিনি মত পালটালেন, কিন্তু সেই সঙ্গে আবার এমন একটা শর্ত দিলেন যা মেটানো শক্ত। কিনা যাঁকে বিয়ে করবেন, সেই কন্যাটির নামও জরুৎকারু হওয়া চাই। মুনি বোধহয় ভেবেছিলেন যে, অমন নামের মেয়ে কোথাও মিলবে না, ফলে তাঁকেও আর বিয়ের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হবে না।”

“কিন্তু পড়তে তো হল।”

“হবেই তো। না হয়ে উপায় কী। কশ্যপের একটি কন্যা হয়েছে শুনে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে দেখতে এলেন। দেখে বললেন, আরে, মেয়ে তো অতি সুন্দরী, তবে কিনা বড্ড রোগা, একেবারে জরুৎকারু মুনির মতো হয়েছে দেখেছি। ঠিক আছে, আমি ওকে জরৎকারু বলেই ডাকব।”

আমি বললুম, “আমার তো মনে হয় কৃষ্ণ এ-কাজটা সব জেনেশুনেই করেছিলেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে আর বলতে! জরৎকারুর শর্তের কথাটা জেনে গিয়েছিলেন নিশ্চয়, তাই মনসার ওই একই নামকরণ করে পথটা একেবারে মেরে রাখলেন, যাতে কিনা বিয়েটা মুনিকে করতেই হয়, কিছুতেই তিনি ছটকে বেরিয়ে যেতে না পারেন।”

বললুম, “তা-ই হবে। নইলে ভাবুন, ‘মনসা’র মতো সুন্দর যাঁর নাম, তাঁকে আবার ‘জরৎকারু’র মতো বিদঘুটে নাম দেবার কোনও মানে হয়?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “এ যেন যে-মেয়ের এক নাম সুহাসিনী, তার আর-এক নাম জগদম্বা।”

আমি বললুম, “প্রাচীন পুরাণে অবশ্য মনসার কোনও উল্লেখ নেই। দেবী মনসার জন্ম, বিবাহ আর নামের যে-কথা ভাদুড়িমশাই শোনালেন, তার সবই পাওয়া যাচ্ছে অনেক পরবর্তী কালের পুরাণে। সেখানেও অবশ্য মতভেদের অন্ত নেই।”

“ও কথা থাক,” ভাদুড়িমশাই হাই তুলে বললেন, “একটা বাজে। আমার প্রশ্নের উত্তরটা এখনও পাইনি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “মনসা-মূর্তি কবে বর্ধমানের গ্রাম থেকে এখানে এল, এই তো? এখুনি সেটা বলছি। বাকি কথা না হয় কাল হবে। মনে হচ্ছে আপনাদের ঘুম পেয়েছে। তা হলে বরং শুয়ে পড়ুন।” চারু ভাদুড়ি বললেন, “না না, ঘুম একটু পাচ্ছিল বটে, তবে কফি খেয়ে সেটা কেটে গেছে। আপনি বলে যান।”

“বলুন বলুন, ভাদুড়িমশাইয়ের একটা হাই উঠেছিল বটে,” আমি বললুম, “কিন্তু আমার একটুও ঘুম পায়নি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার প্রপিতামহ বীরেশ্বর চৌধুরি খুব বেশিদিন বাঁচেননি। মাটি খুঁড়ে এই মনসা-মূর্তি উদ্ধার করবার বছর পাঁচেক বাদেই তিনি মারা যান। তাঁর বয়স তখন বছর পঞ্চাশ, আর আমার পিতামহ মহেশ্বর চৌধুরির বয়স তখন বছর কুড়ি।”

ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “বীরেশ্বর চৌধুরির কি তিনিই একমাত্র সন্তান?”

“না,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার পিতামহের জন্মের আগে আরও দুটি ছেলে হয়েছিল বীরেশ্বরের, কিন্তু শৈশব পেরোবার আগে তাদের মৃত্যু ঘটে। ছেলে বলতে একমাত্র আনার ঠাকুর্দাই তখন জীবিত। আর ছিল এক মেয়ে। মেয়েটি বালবিধবা। আমার ঠাকুর্দার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। দশ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়েছিল; তার মাত্র এক বছর বাদেই তাঁর সিঁথির সিঁদুর মুছে যায়। যেমন আমার গিসিমা, তেমনি আমার বাবার পিসিমাও তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর আর শ্বশুরবাড়িতে থাকেননি, পিত্রালয়ে চলে এসেছিলেন।”

“আপনার ঠাকুর্দার ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়?”

“না। বিয়ে করবার কোনও ইচ্ছাও তখন নাকি তাঁর ছিল না। সংসারে এই বিধবা বোনটিই তখন তাঁর একমাত্র আপনজন। বোনকে তিনি ভীষণ ভালবাসতেন। হয়তো তাঁর ভয় ছিল যে, দাদার সংসারে বোন যতটা স্নেহ আর আদর-যত্ন পাচ্ছে, বৌদির সংসারে সেটা পাবে না। হয়তো সেইজন্যেই তিনি বিয়ে করতে চাননি। হয়তো ভেবেছিলেন যে, বিয়ে না করেও তো স্বচ্ছন্দে কত লোকের জীবন কেটে যায়, তাঁরও কেটে যাবে।”

“কিন্তু কাটেনি, কেমন?”

“সত্যিই কাটেনি।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার প্রপিতামহের মৃত্যুর মাত্র বছর দেড়েক বাদেই তিনি গৃহত্যাগ করেন। যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তি পিছনে পড়ে রইল। শুধু যা-কিছু তিনি সঞ্চয় করেছিলেন কিংবা আমার প্রপিতামহের কাছ থেকে পেয়েছিলেন, সেই টাকাকড়ি আর মনসাদেবীর মূর্তিটিকে সঙ্গে নিয়ে একদিন রাত-দুপুরে তিনি তাঁর গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়লেন। প্রথমে বর্ধমান শহর, তারপর কলকাতা, তারপর আরও কয়েকটা জায়গায় ঠেক খেতে-খেতে চলে এলেন এই মুকুন্দপুরে।”

জিজ্ঞেস করলুম, “চলে তো এলেন। কিন্তু কেন? নেহাতই ভাগ্যান্বেষণে?”

এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন সত্যপ্রকাশ। তারপর ভীষণ ক্লান্ত গলায় বলেন, “সকলকে আমরা তা-ই বলি বটে, কিন্তু আপনারা তো আর সকলের মতো নন, ভীষণ একটা বিপদে পড়ে আমি আপনাদের ডেকেছি, সেই বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করবার জন্যে আপনারা এখানে এসেছেন, তাই আপনাদের কাছে কিছু গোপন করা আমার উচিত হবে না।”

ভাদুড়িমশাই ব্যস্ত হয়ে বললেন, “না না, আপনার যদি কোনও অসুবিধে থাকে তো…”

সত্যপ্রকাশ সেই একই রকমের ক্লান্ত গলায় বললেন, “সুবিধে-অসুবিধের ব্যাপার তো নয় মিঃ ভাদুড়ি, এটা একটা লজ্জার কথা, যা হয়তো আমাদের পরিবারেও আর কেউ জানে না, সম্ভবত আমার বাবাও জানতেন না, একমাত্র আমিই জানি। আসলে আমাদের পরিবারের একটা স্ক্যান্ডাল এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”


ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন সত্যবাবু, মূর্তি উধাও হবার সঙ্গে যদি আপনাদের এই পারিবারিক ঘটনা…মানে ওই যাকে আপনি ‘স্ক্যান্ডাল’ বলছেন সেই ব্যাপারটার কোনও সম্পর্ক না থাকে, তা হলে তার বিষয়ে আমাদের কোনও কৌতূহল থাকবে কেন? না না, ও-সব আমরা শুনতে চাই না।”

সত্যপ্রকাশ ইতিমধ্যে কিছুটা সামলে উঠেছিলেন। বললেন, “বলতে যখন বসেছি, তখন সবটাই বলব। আর তা ছাড়া মূর্তিটিকে সঙ্গে করে আমার ঠাকুর্দা কেন তাঁর পৈতৃক ভিটে ছেড়ে হঠাৎ উত্তরবঙ্গে চলে এসেছিলেন, সব কথা খুলে না বললে হয়তো তা নিয়েও আপনাদের মনের মধ্যে কিছু না কিছু সন্দেহ থেকে যেতে পারে।”

আমি বললুম, “আরে ছিছি, সন্দেহ আবার কিসের?”

“এই ধরুন, আপনারা ভাবতে পারেন যে, ও-সব স্বপ্নাদেশ-টপ্নাদেশ সব বাজে গালগপ্পো, আসলে একেবারে গোড়াতেই এই মনসামূর্তি একটি চোরাই মাল, যা কিনা বর্ধমানের কোনও মন্দির থেকে আমার কোনও পূর্বপুরষ একদিন হাপিস করে দিয়েছিলেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা আমরা ভাবব না।”

“কেন ভাববেন না? ভাবাটা তো কিছু অস্বাভাবিক নয়।”

“এই জন্যে ভাবব না যে, চোরাই মালের পাবলিসিটি কেউ চায় না। তাই না?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অথচ আপনি যখন কলকাতার সেই ইতিহাসের অধ্যাপককে আপনাদের মনসামূর্তির একটি ফোটোগ্রাফ দিয়েছিলেন, তখন আপনি ভালই জানতেন যে, মূর্তিটি যদি সত্যিই খুব প্রাচীন হয়, তা হলে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হবে, চাই কী খবরের কাগজে সেই ছবিটা হয়তো ছাপাও হয়ে যেতে পারে। আর তা যদি হয়, তা হলে বর্ধমান থেকেই কেউ হয়তো বলে বসবে যে, সেখানকার এক মন্দির থেকে ওই মূর্তি চুরি গিয়েছিল। বলুন, এমন একটা সম্ভাবনা কি ছিল না?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ, তা ছিল বটে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তবু আপনি ফোটোগ্রাফটি তাঁকে দিয়েছিলেন। ফোটোগ্রাফটি যে ছাপা হতে পারে, তা জেনেও দিয়েছিলেন। তার কারণ, আপনি একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিত ছিলেন যে, অমন কথা কেউ বলবে না, কেননা মূর্তিটি সত্যিই মাটি খুঁড়ে পাওয়া, ওটি চোরাই মাল নয়।”

“তা হলে কি সেই ঘটনাটার কথা বলব না?”

“বলবার দরকার এমনিতে নেই। কিন্তু ঠিক আছে, না-বলা পর্যন্ত যখন একটা অস্বস্তি আপনার থেকেই যাচ্ছে, তখন বলুন।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ, বলাই ভাল। ব্যাপারটা আসলে আমার বাবার সেই বালবিধবা পিসিকে নিয়ে। আমি তো বলেছি যে, মাত্র এগারো বছর বয়সে তাঁর স্বামীকে হারিয়ে তিনি বাপের বাড়ি চলে আসেন। আমার পিসির সঙ্গে আমার বাবার পিসির এইখানে মস্ত মিল। আর মস্ত অমল এইখানে যে, আমার পিসি যেমন এই সংসারটাকে তাঁর নিজের সংসার করে নিলেন, আর সেই সঙ্গে পুজো-আচ্চা নিয়েই হাসিমুখে কাটিয়ে দিলেন তাঁর জীবন, আমার বাবার পিসি সেটা পারেননি।”

এই পর্যন্ত বলে একটুক্ষণের জন্য চুপ করে রইলেন সত্যপ্রকাশ। আবার একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ সিগারেট টানলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “আমার পপিতামহ বীরেশ্বর চৌধুরির মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সেই বালবিধবা কন্যাটি গৃহত্যাগ করেন।”

আমি বললুম, “এই ব্যাপার? এর জন্যে আপনি এত সংকোচ বোধ করছিলেন কেন? এ তো অতি স্বাভাবিক ঘটনা। একটি মেয়ের স্বামী মারা গেছে, তাও সে মারা গেছে মেয়েটির বয়স যখন নেহাতই অল্প, তখন। স্বামীর সঙ্গে তার যে কোনও সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাও নয়। নতু। করে সে যদি আবার কারও সঙ্গে সংসার পাততে চায় তো পাতুক না, এর মধ্যে তো অস্বাভাবিক কিছু নেই। আর তা ছাড়া, যদ্দুর মনে পড়ছে বিদ্যাসাগরমশাইয়ের চেষ্টায় ১৮৫৬ সালেই তো বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়েছিল। তাই না?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা হয়েছিল।”

“তবে আর তার গৃহত্যাগেরই বা দরকার হল কেন? আইনমোতাবেকই তো আপনার প্রপিতামহ আর পিতামহ একটু উদ্যোগী হয়ে তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারতেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি কি স্বপ্নলোকে বাস করছেন নাকি কিরণবাবু? সেখান থেকে একটু বাস্তবে নেমে আসুন। নামলে বুঝতে পারবেন যে, আইন পাশ করানোই যথেষ্ট নয়, সমাজকে দিয়ে সেটা গ্রহণ করিয়ে নেওয়া চাই। বিদ্যাসাগরমশাই তার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কষ্টও নেহাত কম ভোগ করেনি, কিন্তু এই পোড়া সমাজ যে তবু বিধবা বিবাহের ব্যাপারটাকে দীর্ঘকাল ধরে মেনে নেয়নি, এখনও নানা জায়গায় মেনে নেয় না, এটাই হচ্ছে সত্যি কথা। তার উপরে আবার যেখানকার কথা হচ্ছে, সেটা কলকাতা শহর নয়, নেহাতই গ্রামঞ্চল।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ঘটনাটা নিয়ে গোটা তলাটে একেবারে ঢিঢি পড়ে যায়। সমাজের যাঁরা কর্তাব্যক্তি, আমার পিতামহকে তাঁরা জাতিচ্যুত করলেন, তাঁকে একঘরে করা হয়েছিল। তাঁর বাড়িতে কেউ জলগ্রহণ করত না, তাঁরও কোনও অধিকার ছিল না অন্য কারও বাড়িতে ঢুকবার। এই যে ঘটনা, এর বেদনা, অপমান আর গ্লানি তিনি সহ্য করতে পারেননি! জমিজমা ঘরবাড়ি সব পিছনে ফেলে রেখে শুধু কিছু টাকাকড়ি আর মনসামূর্তিটি সঙ্গে নিয়ে একদিন গভীর রাত্রে তিনি তাঁর পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে চলে আসেন।”

“তখনও তিনি বিবাহ করেননি?”

“না। সে-কথা বোধহয় আগেই আপনাদের বলেছি। বিবাহ করেন তার বেশ কিছুকাল পরে।”

“আপনি এত সব কথা জানলেন কী করে সত্যবাবু?” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “বিশেষ করে আপনার প্রপিতামহের বালবিধবা কন্যাটির গৃহত্যাগের কথা? একটু আগেই আপনি বলছিলেন যে, আপনাদের এই পারিবারিক স্ক্যান্ডালের কথা আপনার বাবাও সম্ভবত জানতেন না। তা হলে আপনি কী করে জানলেন?”

“আমি জেনেছি আমার পিতামহের ডায়েরি পড়ে।” সত্যপ্রকা। বললেন, “পুরনো কিছু বইপত্তর, পঞ্জিকা আর কাগজপত্রের সঙ্গে এই ডায়েরিখানাও একটা তোরঙ্গের মধ্যে আমি পেয়ে যাই। ঠাকুর্দার মৃত্যুর পর বাবা একদিন তোরঙ্গটা খুলেছিলেন। কিন্তু বই-টই সম্পর্কে তাঁর তো স্টিশেষ আগ্রহ ছিল না, তাই আর কিছু হাট্‌কে দেখেননি। যেমন খুলেছিলেন, তেমনি আবার ডাল। বন্ধ করে তালাচাবি দিয়ে দেন। আমি একদিন তোরঙ্গটা সম্পর্কে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলুন, শতে তিনি বললেন, ওর মধ্যে সেকানে লেখা গুটিকয় বই ছাড়া আর কিছু নেই।”

“তোরঙ্গটা ছিল কোথায়?”

“এই বাড়িতেই ছিল। আমাদের ঘরগুলো সব দেখেছেন তো, এর ছাত টিনের, কিন্তু সিলিং কাঠের। ওই টিন আর কাঠের মাঝখানে বিস্তর জায়গা থেকে যায়, ওই মানে নিচু ছাতের অ্যাটিকের মতন অনেকটা জায়গা। নিত্য যেসব জিনিসের দরকার হয় না, সেগুলো আমরা ওইখানে তুলে রাখি। তোরঙ্গটাও ছিল ওইখানেই।”

“ওটা খুলবার কথা আপনার মনে হল কেন?”

“এমনিতে তো মনে হবার কথা নয়,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “মনে হতও না। কিন্তু হল কী, বছর তিনেক আগে কলকাতা থেকে এক ভদ্রলোক এদিকে এলেন। ভদ্রলোক পুরনো বইয়ের কারবারি। যে-কোনও পুরনো বই নয়, ওই যাকে আপনারা ‘দুষ্প্রাপ্য’ বলেন আর কী। তা জেলায় জেলায় তিনি সেই ধরনের রেয়ার বুকসের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।”

বললুম, “পেয়েও যাচ্ছিলেন নিশ্চয়?”

“তা পচ্ছিলেন বই কী! বেশির ভাগই পাচ্ছিলেন পুরনো আমলের সব জমিদার-বাড়ি থেকে। সেকালের জমিদারদের সব্বাই যে শুধু ফূর্তিফার্তা করে আর বাই নাচিয়ে সময় কাটাতেন তা ভাববেন না, তাঁদের অনেকেই রীতিমতো লেখাপড়ার চর্চা করতেন, বাইরে থেকে নিয়মিত বই আনাতেন, বাংলা বই তো ছিলই, থ্যাকার স্পিংক আর নিউম্যানের দৌলতে তাঁদের ইংরেজি বইনের কালেকশন ও নেহাত খারাপ ছিল না।”

“ভদ্রলোক সে-সব বই কিনে নিচ্ছিলেন?”

“জলের দরে কিনছিলেন।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “বংশধরদের অনেকেই তো অপদার্থ। ফলে যা হয় আর কি।”

ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার সঙ্গে তাঁর আলাপ হল কোথায়?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কোচবিহারে। একটা কাজে ওদিকে গিয়েছিলুম। ঘটনাচক্রে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। তা আলাপ হবার পরে তাঁর পরিচয় জেনে ভাবলুম, ভদ্রলোক তো জহুরি মানুষ, আমার ঠাকুর্দার তোরঙ্গে যে-সব বই রয়েছে, সেগুলি একবার ওঁকে দেখিয়ে নিলে মন্দ হয় না। তা তিনিও খুব উৎসাহ করে আমার সঙ্গে আমাদের এই বাড়িতে চলে এলেন। রামদাসকে দিয়ে সিলিংয়ের উপর থেকে নামানো হল সেই তোরঙ্গ। খুলে দেখা গেল, বই যা রয়েছে, তার কোনওটাই খুব দুষ্প্রাপ্য নয়, বাজারে তার প্রায় সবগুলিরই রিপ্রিন্ট পাওয়া যায়, ওই শুধু ফার্স্ট এডিশনের বই বলেই তার যা-কিছু দাম। বইয়ের সঙ্গে অবশ্য পুরনো দুখানা পুঁথিও পাওয়া গিয়েছিল। দুখানাই মনসামঙ্গলের। মূল নয়, সে-কথা বলাই বাহুল্য। হাতে লেখা কপি। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলের কপি। তা সেই কপির বয়সও নাকি তা প্রায় আড়াইশো বছর হল। ভদ্রলোক সে দুখানা কিনতে চেয়েছিলেন। আমি বেচিনি। ভাবছি, এশিয়াটিক সোসাইটিকে দিয়ে দেব। তোরঙ্গের মধ্যে আর যে বস্তুটি পেয়েছি, তা আমার পিতামহের ওই ডায়েরি।”

“ডায়েরিটি এখন কোথায়?” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন।

সত্যপ্রকাশ বললেন, “পাছে আর কারও হাতে পড়ে, তাই শিলিগুড়িতে আমার ব্যাঙ্কের লকারে রেখে দিয়েছিলুম। তবে আপনাদের কাজে লাগতে পারে ভেবে লকার থেকে আজই বার করে আমার সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আপনারা দেখবেন?”

“এখন দেখব না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যদি দরকার বুঝি তো পরে দেখব। আপাতত শুধু দুটি প্রশ্ন করব আপনাকে।”

“করুন।”

“আমার প্রথম প্রশ্ন, আমি যে কলকাতায় আছি, তা আপনি জানলেন কী করে? কলকাতার কোন্ ফোন-নম্বরে ট্রাঙ্ককল করলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে তা-ই বা আপনাকে কে জানাল?”

একগাল হেসে সত্যপ্রকাশ বললেন, “আরে মশাই, আপনি বিখ্যাত লোক, বীরভূমের মন্দির থেকে উধাও হওয়া বিষ্ণুমূর্তির সন্ধান করতে যে আপনি ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় এসেছেন, সে খবর তো দিন সাতেক আগেই কাগজে দেখেছিলুম।”

বললুম, “মূর্তিটি যে উদ্ধার হয়েছে তা জানেন?”

“জানি বই কী। যে প্লেনে আপনারা কলকাতা থেকে এলেন, সেই প্লেনেই তো আজকের কাগজ এল। আপনাদের হোটেলে রেখে আমার অফিসে ফিরে গিয়ে কাগজ খুলে দেখি, খবরটা তাতে খুব ফলাও করে বেরিয়েছে।”

“কিন্তু কলকাতায় যে বাড়িতে আমি উঠেছি,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার ফোন নাম্বার আপনাকে কে দিল?”

“দিল আমার বড়মেয়ে সুজাতা। একে তো তার শ্বশুরবাড়ি আপনার বোনের বাড়ির খুব কাছেই, ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের দক্ষিণে, তার উপরে আবার তার ছোট দেওর রন্টু নাকি আপনার ভাগ্নের ক্লাস-ফ্রেন্ড। সকালবেলা সুজাতাকে ফোন করেছিলুম, তাতে সে রন্টুর কাছ থেকে আপনার বোনের বাড়ির ফোন-নাম্বারটা জেনে নিয়ে আমাকে বলল, ‘এক্ষুনি এই নাম্বারে একটা ফোন করো, বাবা, রন্টুর বন্ধুর মামা মিঃ ভাদুড়ি একজন নামজাদা গোয়েন্দা, তিনি নিশ্চয় আমাদের মনসামূর্তি উদ্ধার করে দিতে পারবেন।’ ব্যাস, তার আধঘন্টার মধ্যেই সেই নাম্বারে আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করলুম।”

বলে হোহো করে হেসে উঠলেন সত্যপ্রকাশ। হাসতে হাসতে বললেন, “ইট্‌স এ স্মল ওয়ার্লড, মিঃ ভাদুড়ি!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন রঙ্গিলা সম্পর্কে। তার অসুখটা কীসের?”

সত্যপ্রকাশের হাসিটা নিমেষে মুছে গেল। বিষণ্ণ গলায় বললেন, “মূর্তিটি চুরি করবার জন্য মন্দিরে যে ঢুকেছিল, রঙ্গিলা তার সামনে পড়ে যায়, মেয়েটাকে জখম করে সে পালিয়েছে। মাথা ফেটে মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে যায়।”

“এখন কেমন আছে?”

“বেঁচে আছে। কিন্তু কাউকে চিনতে পারছে বলে মনে হয় না। সম্ভবত স্মৃতিভ্রংশের ব্যাপার। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কোনও কথাও বলছে না।”

“চোরকে সে দেখেছিল?”

“মনে তো হয় দেখেছিল। অবশ্য পিছন থেকে যদি আঘাত করে থাকে তো অন্য কথা। তবে মাথার যে জায়গায় লেগেছে তাতে মনে হয়, সামনে থেকেই ভারী কিছু দিয়ে মেরেছে।”

ভাদুড়িমশাইয়ের চাউনি আবার ধারালো হয়ে উঠেছে। তবে একটু বাদেই সেটা আবার স্বাভাবিক হয়ে এল। বললেন, “রঙ্গিলা যদি সুস্থ হয়ে ওঠে, তা হলে একমাত্র ওর পক্ষেই মূর্তিচোরকে শনাক্ত করা সম্ভব, তাই না?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “সে তো বটেই। অবশ্য চোর যদি স্থানীয় লোক হয় তবেই রঙ্গিলা তাকে শনাক্ত করতে পারবে।”

“আমার ধারণা, চোর স্থানীয় লোক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অন্তত সেই সম্ভাবনাই চোদ্দো আনা।”

“কিন্তু ও তো এখন কাউকে চিনতেও পারছে না, কথাও বলতে পারছে না।”

এতক্ষণে একটু হাসি ফুটল চারু ভাদুড়ির মুখে। রহস্যময় হাসি। বললেন, “সেই জন্যেই আপাতত ওকে নিয়ে আমার কোনও দুশ্চিন্তা নেই।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কথাটার মানে বুঝলাম না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন আপনার না-বুঝলেও ক্ষতি নেই। শুনুন সত্যবাবু, আপনাদের পারিবারিক ইতিহাস তো শুনলুম, মনসামূর্তির পশ্চাৎপট সম্পর্কে স্পষ্ট একটা ধারণাও তাতে হল, তবে চুরির ব্যাপারে ডিটেলস আর এখন শুনব না, কালকের জন্যে ওটা মুলতুবি থাক। রাত দুটো বাজে, এবারে আমরা শুয়ে পড়ব।”

তারপব কিছু একটা ভেবে বললেন, “ঠিক আছে, ডায়েরিটা দিন, কিছু একটা ক্ল হয়তো ওর মধ্যে পেয়েও যেতে পারি।”

সত্যপ্রকাশ তাঁর টেবিলের টানা থেকে ডায়েরিটা বার করে আনলেন। মোটা লাল কাপড়ে মোড়া একটা খাতা। সেই খেরোর খাতাখানা ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে দিয়ে বললেন, “সাবধানে রাখবেন, আপনারা ছাড়া আর কারও হাতে না পড়ে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিলক্ষণ। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। কোথায় শোব, সে তো জেনেই গেছি। আপনাকে আর কষ্ট করে পৌঁছে দিতে হবে না। আসি তা হলে।”

সত্যপ্রকাশ তবু বারান্দা পর্যন্ত এলেন।

উঠোনে যে হ্যাজাক জ্বালানো হয়েছিল, সেটা নিবিয়ে দেওয়া হয়েছে। টর্চের আলোয় পথ দেখে আমরা ভিতরকার উঠোনের পুব দিকের ঘরে এসে ঢুকলুম।

ঘরের মধ্যে হ্যারিকেন জ্বলছে। তবে জানালাগুলো সবই বন্ধ। সম্ভবত ঠান্ডা আটকাবার জন্য। ঘরের দরজায় খিল তুলে দিয়ে বললুম, “বড্ড গুমোট লাগছে। অন্তত একটা জানালা খুলে দেওয়া দরকার।”

ভাদুড়িমশাই চাপা গলায় বললেন, “তার আগে হ্যারিকেনটা নেবান। এক্ষুনি। কথা বলবেন না।” আলোটা নিবিয়ে দিতে-দিতেই লক্ষ করলুম, ভাদুড়িমশাই ভিতরের উঠোনের দিকের একটা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ঘর অন্ধকার। তবু তারই মধ্যে ঠাহর করা গেল যে, সেই জানালার একটা পান্না সামান্য ফাঁক করে সেখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। মিনিট দুয়েক সেইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি পাল্লাটা ফের নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিয়ে আপন মনেই বললেন, “ও, এই ব্যাপার।”

আমি বললুম, “কী ব্যাপার?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিছু না। নিন, এবারে আলো জ্বালুন। তারপর যতগুলি খুশি জানালা খুলে দিন।”

মুকুন্দপুরের মনসা – ১০

পকেট থেকে দেশলাই বার করে ফের হ্যারিকেনটা জ্বাললুম। তারপর ভাল করে একবার দেখে নিলুম ঘরখানা। পাশাপাশি দুটি খাট। ঘরের দু’দিকে দুটি টেবিল আর চেয়ার। টেবিলের উপরে এক প্যাকেট করে সিগারেট, একটা ছাইদান, এক বাক্স দেশলাই, লেখার প্যাড আর ডট পেন। দুটি টেবিলেরই পাশে একটা করে ইজিচেয়ার

খাটের উপরে টান করে বিছানা পাতা। ইংলিশ নেটের মশারি খাটিয়ে বিছানায় বেশ যত্ন করে গুঁজে রাখা হয়েছে। পায়ের কাছে একটি করে লাইসাম্পি। খাটের দু’দিকে দুটি টিপাই। তাতে জলের জাগ আর কাচের গেলাশ। গেলাশের উপরে চিনেমাটির রেকাবি।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যত্নের ত্রুটি নেই দেখছি। প্রয়োজন আর স্বাচ্ছন্দ্য, দু’দিকেই নজর রাখা হয়েছে।”

বললুম, “তা যা বলেছেন।”

জাগ্ থেকে গেলাশে জল ঢেলে ঢকঢক করে খেয়ে নিলেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “বড্ড তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল। নিন, আর কথা নয়, এবারে শুয়ে পড়ুন। আলোটা বরং ওদিকের টেবিলে নিয়ে যাচ্ছি, আমি একটু পরে শোব।”

শুয়ে তো পড়লুম। কিন্তু তক্ষুনি-তক্ষুনি যে ঘুম এসে গেল, তা নয়। সায়েবরা এই অবস্থায় ভেড়া শুনতে বলে। আমার ঠাকুমা শিখিয়েছিলেন পাখি গুনতে। ‘মনে-মনে ভাববি যে, মস্ত একটা খাঁচার মধ্যে হাজার খানেক পাখিকে আটকে রাখা হয়েছে। মনে-মনেই তুই সেই খাঁচার দরজাটা খুলে দিবি, তারপর দেখবি যে, একটার পর একটা পাখি সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তুইও অমনি গুনে যাবি এক….দুই…তিন…চার…।’

গুনতে গুনতে ঘুম এসে যায়। আজ কিন্তু এই ওষুধটা একেবারেই কাজ দিচ্ছিল না। যতবার পাখি শুনবার চেষ্টা করি, ততবারই সেই মনসামূর্তি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। গ্রামদেশে আমি মনসাদেবীর যে মাটির প্রতিমা দেখেছি, তাতে তাঁর গায়ের রং হলুদ। কোথাও-কোথাও সেই হলুদের মধ্যে একটু লালের আভাস পাওয়া যায়। এ-মূর্তি সে-ক্ষেত্রে মাটির নয়, পাথরের। তাও কষ্টিপাথরের গাত্রবর্ণ তাই নিকষ কালো। কিন্তু সেই কালো কী আশ্চর্য কালো! কী উজ্জ্বল, কী লাবণ্যময়! চোখ আর ঠোঁটের হাসিটাই বা কী অসামান্য! স্নেহের সঙ্গে মিশেছে প্রশ্রয়; প্রশ্রয়ের সঙ্গে মিশেছে কৌতুক। চাপা সেই হাসির কথাটাই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল আমার।

ঘুম আসছিল না। পাশ ফিরে দেখলুম, ভাদুড়িমশাই তখনও শুয়ে পড়েননি। ওদিকের টেলিসে চুপচাপ কিছু পড়ছেন। পিঠ আমার দিকে, তাই কী পড়ছেন, ঠিক বুঝতে পারলুম না। সম্ভবত মহেশ্বর চৌধুরির সেই ডায়েরি।

আমি যে ঘুমোইনি, ভাদুড়িমশাই সে-কথা বুঝতে পেরেছিলেন। পড়তে-পড়তেই জিজ্ঞেস করলেন, “ঘুম আসছে না বুঝি কিরণবাবু?”

বললুম, “না।”

“কী ভাবছেন এত?”

“মূর্তিটির কথা। মন থেকে যেন মনসাদেবী কিছুতেই বিদায় দিতে চাইছেন না। ফলে ঘুমও আসছে না।”

“খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।” চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে বসলেন ভাদুড়িমশাই। মশারির জালির মধ্যে দিয়ে তাঁকে আবছা-আবছা দেখতে পাচ্ছিলুম। আলোটা এখন তাঁর পিছনে, তাই তাঁকে একটা সিলুয়েট ছবির মতো লাগছিল। মুখ-চোখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। মনে হল তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। সেইভাবেই বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “কশ্যপ মুনির যিনি মানসী কন্যা, তাঁর ‘মনসা’ নামের তাৎপর্য কী, সেটা জানেন তো?”

কন্ঠস্বরে যেন কিছুটা কৌতুক মেশানো রয়েছে। বললুম, “না।”

“শাস্ত্রে বলেছে, মনুষ্যমনে তিনি ক্রীড়া করেন, তাই তাঁর নাম ‘মনসা’। আপাতত আপনার মনের উপরে তাঁর খেলা চলছে। খেলাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনার ঘুম আসবে না।”

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে আমি আবার পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করে পাখি গুনতে লাগলুম।

ঘুম এসেছিল একেবারে শেষ রাত্তিরে। তাও অতি গোলমেলে ঘুম। খুবই বিচ্ছিরি রকমের স্বপ্ন দেখেছিলুম। এমন স্বপ্ন, যার কোনও মাথামুন্ডু হয় না। স্বপ্নের মধ্যেই আমি ফিরে গিয়েছিলুম আমার ছেলেবেলায়। ‘লতা’ শব্দের তুর্থীর বহুবচন কী, সেটা বলতে পারিনি, তাই পন্ডিতমশাই একটা মস্ত বড় খাঁচার মধ্যে আমারে আটকে রেখেছেন, আর বেত উঁচিয়ে তাঁর নস্যিতে জড়ানো গলায় বললেন, ‘নর থেকে সাধু পর্যন্ত সকটা শব্দরূপ মুখস্থ বলা চাই, নইলে তোকে ছাড়ছি না।’ বলতে না বলতে এসে গেল কুচকুচে কানের এক মুশকো জোয়ান। হাতিবাগন বাজারের পাখিওয়ালা কালীচরণ। সে এসে এক ধাক্কা মেরে পন্ডিতমশাইকে হটিয়ে দিয়ে বলল, “না না, ওকে আটকে রাখা চলবে না। এতক্ষণ ও পাখি গুনছিল, এবার ও খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসুক, আমরাই ওকে গুনে ফেলব।’ বলেই সে খাঁচার দরজা খুলে দিয়ে গুনতে শুরু করল, ‘থ্রি… সিকস… নাইন… টুয়েলভ… ফিফটিন…. এইট্রিন… টুয়েন্টি!’ আমিও ততক্ষণে খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসেছি। বেরিয়ে দেখি, কোথায় কালীচরণ, এ তো আমার ইস্কুলের বন্ধু পশুপতি, যার ডাকনাম বিল্টু। বিল্টু বলল, “পন্ডিতমশাই মারা গেছেন, তাই আজ ইস্কুল ছুটি, এখন আমরা মার্বল খেলব। আমি গিয়ে ভবানী আর বিষ্টুচরণকে ডেকে আনছি, তুই বরং গাব্বু খুঁড়ে রাখ।’ কিন্তু গাব্বুর জন্য যেই মাটি খুঁড়তে শুরু করেছি অমনি সেই গর্তের ভিতর থেকে একটা সাপ বেরিয়ে পড়ল। সাপটার মাথার উপরে কী যেন ঝকমক করছিল। পিছন থেকে কে যেন বলল, “ওটা সাতরাজার ধন মাণিক্য। আমি তো আছি, তবে আর তোর ভয় কী, ওটা তুলে নে।’ কিন্তু যেই না মণিটা তুলে নিয়ে আমার পকেটে পুরেছি, অমনি সামনের বাড়ির দরজা খুলে সত্যপ্রকাশবাবু বেরিয়ে এসে বললেন, “এই কী হচ্ছে, ওটা সাপের মাথার মণি নয়, আমার আংটির হিরে; দিয়ে দে বলছি. এক্ষুনি দিয়ে দে!’ আমি তো সত্যপ্রকাশবাবুকে দেখে অবাক। পাজামা পাঞ্জাবির বদলে তিনি একটা গেরুয়া আলখাল্লা পরেছেন, মাথার চুল জট পাকানো, হাতে একটা মস্ত ত্রিশূল। ‘কী হল, দিবি না? তবে দ্যাখ মজা!’ বলেই সেই ত্রিশূলটা আমার বুকের দিকে তাগ করে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘জয় শঙ্কর।’

‘জয় শঙ্কর!’

বিকট একটা চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। মড় করে বিছানার উপরে উঠে বসলুম আমি। প্রথমটায় কিছুই ঠাহর হল না। এমন কী, কোথায় এসে কার বিছানায় শুয়ে আছি, তাও না। একটু বাদেই মনে পড়ে গেল যে, এটা কলকাতা নয়, মুকুন্দপুর।

ভাদুড়িমশাইয়ের টেবিলে তখনও আলো জ্বলছে। কিন্তু তাঁকে সেখানে দেখলুম না। কোথায় গেলেন তিনি? চাপা গলায় ডাকলুম, “ভাদুড়িমশাই।”

ঘরের লাগোয়া বাথরুম। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল?”

“কিছু না। আপনি ঘুমোননি?”

“ডায়েরি পড়ছিলুম। এমন চমৎকার লেখা যে, শোবার কথা মনেই ছিল না। এইমাত্র শেষ হয়েছে। বাথরুমে গিয়ে চোখমুখে একটু জলের ঝাপটা দিয়ে এলুম। কিন্তু আপনি উঠে পড়লেন কেন?”

“একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল। বিচ্ছিরি স্বপ্ন। যেন সত্যপ্রকাশবাবু আমার বুকের উপরে ত্রিশূল উঁচিয়ে ধরে ‘জয় শঙ্কর’ বলে চেঁচাচ্ছেন।”

ভাদুড়ি মশাই হেসে বললেন, “স্বপ্ন দেখেছেন ঠিকই, তাতে সত্যবাবুকে ত্রিশূল ধারণ করতেও হয়তো দেখে থাকতে পারেন, তবে চিৎকারটা স্বপ্নের ব্যাপার নয়।”

“তার মানে?”

“মানে এই যে ‘জয় শঙ্কর’ চিৎকারটা আমিও শুনেছি।”

“কে চেঁচাল?”

“সম্ভবত সত্যবাবুর সেই খুড়োমশাই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “শেষ রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে দেবাদিদেব মহাদেবের জয়ধ্বনি দিচ্ছেন।”

বলতে না বলতে আবার সেই পিলে কাঁপানো চিৎকার শোনা গেল: ‘জয় শঙ্কর, জয় শিবশম্ভু।’

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রাত পুইয়ে এসেছে। চলুন, একটু হেঁটে আসা যাক।”

ঘড়ি দেখে বললুম, “তা প্রায় পাঁচটা বাজে। আপনি একটু ঘুমিয়ে নেবেন না? আমি তবু ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়েছি, আপনার তো একটুও ঘুম হয়নি। একটু ঘুমিয়ে নিন মশাই, নইলে নির্ঘাত অসুস্থ হয়ে পড়বেন।”

“পড়লেই হল?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “শরীরকে অত আশকরা দিতে নেই। একটা রাত্তির ঘুমোইনি তো কী হয়েছে। দুপুরে ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিলেই হবে। আপনিও তখন বাকি ঘুমটা পুষিয়ে নেবেন। চলুন এখন বেরিয়ে পড়ি।”

অগত্যা উঠতেই হল। ঘরের সঙ্গেই অ্যাটাচ্‌ড্ বাথ। তাতে বিশাল বিশাল দুই ড্রাম জল ধরে রাখা হয়েছে। জলের কল নেই বটে, তবে বেসিন রয়েছে একটা। চটপট মুখহাত ধুয়ে, দাড়ি কামিয়ে গায়ে জাম্পার চড়িয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে চারদিকটা একটু ঘুরে দেখবার জন্যে বেরিয়ে পড়লুম।

বাইরে তখনও আবছা অন্ধকার, ভাল করে আলো ফোটেনি, বাতাসে হালকা কুয়াশা। গাছের পাতা আর টিনের চাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় হিম গড়িয়ে পড়ছে। শিশিরে ভিজে রয়েছে পায়ের তলার মাটি আর ঘাস। পাখি ডাকছে, তবে মানুষজনের গলা কোথাও শোনা যাচ্ছে না। সাধুবাবা জেগেছেন ঠিকই, কিন্তু গোটা গ্রাম এখনও ঘুমে অচৈতন্য।

যে-ঘরটায় আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে, তার একদিকে ভিতরের উঠোন, আর অন্যদিকে বাইরের উঠোন। আমরা বাইরের দিকের দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছি। উত্তরে মন্দির। উঠোন পেরিয়ে আমরা মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম।

আমার কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু অস্বস্তিটা যে কীসের তা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলুম না।

১১
কাল রাত্তিরে যখন আমরা শিলিগুড়ি থেকে মুকুন্দপুরে এসে পৌঁছই, অন্ধকারের মধ্যে তখন .কানও কিছু খুব ভাল করে দেখতে পাইনি। অন্ধকার অবশ্য এখনও পুরোপুরি কাটেনি, পুবের আকাশে সদ্য খানিকটা রক্তের ছোপ লেগেছে মাত্র। কিন্তু যে মন্দিরটির সামনে এসে আমরা দাঁড়িয়েছি, তার গঠনশৈলী যে কত সুন্দর, সূর্যোদয়ের ঠিক আগের মুহূর্তের এই কোমল আলোটুকুই তা যেন আরও স্পষ্ট করে আমাদের বুঝিয়ে দিল।

মনসাদেবীর মূর্তিটি যতই প্রাচীন হোক, তাঁর এই মন্দির যে মোটেই পুরনো নয়, তা আমরা জানি। কতই বা বয়স হবে এর? মহেশ্বর চৌধুরি এখানে এসেইছিলেন তো ১৮৯১ সালে, আর এসেই নিশ্চয়ই এই মন্দির তোলেননি, সত্যপ্রকাশের কাছে যা শুনেছি তাতে মনে হয় মন্দির তুলবার মতো অবস্থাই তখন তাঁর ছিল না। যদি ধরে নিই যে, অবস্থা ফিরতে তা অন্তত বছর কুড়ি লেগেছিল, তো বুঝতে হবে ১৯১০ সালের আগে এ-মন্দির তৈরি হয়নি, সম্ভবত তারও পাঁচ-দশ বছর পরে তৈরি হয়ে থাকবে।

চারু ভাদুড়ি বললেন, “এ যে তাক-লাগানো ব্যাপার মশাই!”

আমি বললুম, “যা বলেছেন। মন্দিরটি যে এত সুন্দর তা তো ভাবতেই পারিনি।”

“আমিও না। তবে কী জানেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এমন এক-একটা ব্যাপার দেখছি মাঝে-মাঝেই ঘটে যায়! যেখানে যেটা দেখব বলে কল্পনাও করিনি, সেখানে হঠাৎ—বলা নেই কওয়া নেই—ঠিক সেটাই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। গত মাসের গোড়ার দিকে একবার পুনে যেতে হয়েছিল…ওই আর কী, ব্ল্যাকমেলের একটা নোংরা কেস, সেই সূত্রেই যাওয়া…তা সেখানে একটা মস্ত সারপ্রাইজ।”

“কী দেখলেন?”

“সেও একটা মন্দির। শহরতলি এলাকায় ঘুরতে-ঘুরতে হঠাৎ চোখে পড়ে গেল। শহরতলি বলে যেন আবার ভাববেন না যে খুব খোলামেলা জায়গা; যেমন সব বড়-বড় শহর, তেমনি তাদের আউটস্কার্টগুলোও আজকাল সমান ঘিঞ্জি, ঘ্যাচবক্স-আর্কিটেকচারের দশতলা-বারোতলা সব পেল্লায়-পেল্লায় বাড়ি সেখানেও আকছার আজকাল চোখে পড়বে…তা তারই মধ্যেই হঠাৎ এককালি জমির উপর এই মন্দির দেখে তো আমি তাজ্জব। ছোট্ট মন্দির, কিন্তু কী যে সুন্দর মন্দির, সে আর কী বলব। যেমন চমৎকার তার গড়ন, তেমনি তার দেয়ালের আর পিলারের কাজ। চারদিকের ওইসব মনস্ট্রসিটির মধ্যে যে অমন একটা মন্দির থাকতে পারে, তা আমি কল্পনাও করিনি।”

“কার মন্দির?”

“লক্ষ্মী-ঠাকরুনের।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বালাজি বিশ্বনাথের কথা মনে আছে তো?”

“পেশোয়া বালাজি বিশ্বনাথ?”

“আরে হ্যাঁ মশাই, ওই যিনি শিবাজির নাতি শাহুর মন্ত্রী ছিলেন। তাঁরই অনুরোধে তাঁর এক জমিদার-বন্ধু নাকি এই মন্দিরটি তৈরি করিয়েছিলেন। শিবের ভক্ত হয়ে তিনি হঠাৎ লক্ষ্মীর মন্দির তৈরি করাতে বললেন কেন, তাই নিয়ে একটা গল্প শুনলুম।”

গল্পটা শোনা হল না। ঘুম থেকে উঠবার পরে কেন যে অস্বস্তি বোধ করছিলুম, এতক্ষণে সেটা মনে পড়েছে। বললুম, “শিবের ভক্ত কেন লক্ষ্মীর মন্দির তৈরি করাতে বললেন, সেটা কোনও প্রশ্ন নয়, তার কারণ শিবের যিনি ভক্ত, লক্ষ্মীর ভক্ত হতেও তার কিছুমাত্র বাধা নেই, লক্ষ্মী তো শিবেরই মেয়ে। আসল প্রশ্নটা হচ্ছে, যাঁরা শিবের ভক্ত, তাঁরা মনসার উপরে খাপ্পা কি না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সব ভক্তই খাপ্পা কি না, তা আমার জানা নেই, তবে একজন খুবই খাপ্পা ছিলেন। বুঝতেই পারছেন, শিবের সেই ভক্তটি হচ্ছেন চাঁদ সদাগর। তাঁর কাছ থেকে পুজো আদায় করবার জন্যে মনসা কী না করেছেন! তাঁর নৌকো ডুবিয়েছেন, তাঁকে একেবারে পথের ভিখিরি বানিয়ে ছেড়েছেন, এমনকী বাপকে শায়েস্তা করবার জন্যে ছেলের প্রাণ সংহার করতেও ছাড়েননি। কিন্তু চাঁদের তবু ধনুর্ভঙ্গ পণ, কিছুতেই তিনি মনসার পুজো করবেন না। ‘মনসামঙ্গল’ পড়েছেন তো, সেখানে চাঁদ বলছেন, ‘যেই হাতে পূজি আমি শঙ্কর-ভবানী সেই হাতে পুজিব কি চ্যাংমুড়ি কানি?” আরে ছিছি, একটা কানিকে তিনি পুজো করবেন? কভি নেহি!”

“মনসাকে তিনি কানি বলছেন কেন?”

“বলছেন এইজন্য যে, চাঁদের কাছে মনসা তা মোটেই দেবী নন, নেহাতই সাপ!”

“বেশ তো তা-ই না হয় হলেন, কিন্তু সাপকেই বা কানি বলবার মানে কী? সাপেরও তো দু’দুটো চোখ রয়েছে।”

“ও, আপনি জানেন না বুঝি?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “দু’দুটো চোখ আছে ঠিকই, কিন্তু আমরা যেমন কোনও কিছু দেখবার সময়ে দু’দুটো চোখকে একইসঙ্গে কাজে লাগাই, সাপ তা পারে না। সাপ যা-কিছু দেখুক, একচোখে দেখে। কখনও বাঁ চোখে দেখে কখনও ডান চোখে। একই সঙ্গে দু’ চোখে দেখে না। চাঁদ সদাগর যে মনসাকে কানি বলে গাল দিয়েছেন, সেটা এই জন্যেই।”

“বুঝলুম। কিন্তু একা চাঁদ সদাগরই যে কেন মনসার সঙ্গে ঝগড়া করতে গিয়েছিলেন, সেইটে বুঝতে পারছি না। পুরনো আমলের গল্পে কি কবিতায় ঠিক এই রকমের আর-কোনও চরিত্রের কি উল্লেখ আছে?”

“থাকতে পারে, আমি জানি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু ও-সব কথা থাক, মন্দিরটি ভাল করে দেখে নিন।”

এ-শড়িতে শুধু এই মন্দিরটিই টাকা। দেওয়াল যেমন ইটের, তেমনি ছা হও ঢালাই। ছাতের উপরে ঢালা;-করা চুড়ো। দেওয়াল জুড়ে পোড়ামাটির কাজ।

সূর্য উঠেছে। মন্দিরের গায়ে এসে পড়েছে তার প্রথম রশ্মি। সবকিছুই এখন পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন দেখুন, একটু আগেই তো চাঁদসদাগরের কথা হচ্ছিল, মনসার সঙ্গে তাঁর যে বিরোধ, তারই কাহিনির নানান ঘটনাকে কী চমৎকারভাবে এখানে এই পোড়ামাটির কাজের মধ্যে ধরে রাখা হয়েছে।”

মন্দিরটি বড় নয়, ছোট। দেওয়ালগুলোও অপরিসর। পোড়ামাটির স্ল্যাব বসাবার জন্যেও তাই ঢালাও জায়গা ছাড়া যায়নি। অথচ তারই মধ্যে দেখলুম বিস্তর ঘটনাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছদ্মবেশে মনসার পুজো নেওয়া, জাহাজডুবি, লখিন্দরের বিয়ে, লোহার বাসরে সর্পদংশন, সমীর মৃতদেহ নিয়ে বেহুলার স্বর্গযাত্রা, লখিন্দরের আবার বেঁচে ওঠা, আর সর্বশেষে মনসার পূজায় চাঁদের সম্মাত, এই বড়-বড় ঘটনাগুলো তো আছেই, অনেক ছোটখাটো ঘটনাও বাদ পড়েনি।

পোড়ামাটির কাজগুলো কে করেছেন তা জানি না, তবে কিনা যিনিই করে থাকুন, তিনি যে একজন উঁচু ধবের শিল্পী তাতে সন্দেহ নেই। অবশ্য যাঁরা বাঁশবেড়ের প্রাচীন মন্দিরের পোড়ামাটির কাজ দেখেছেন, তাঁরা হয়তো বলবেন, এ আর এমন কী। তা বলুন, কিন্তু আমার তো মনে হল, ইনি নেহাত কম যান না।

ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা বলতে তিনি বললেন, “অন্যান্য কাজও পাকা হাতের। যেমন মেঝের পাথরের কাজ, তেমনি পিলারের মোজাইক। চাঁদোয়ায় ঢাকা পড়েছে বলে সিলিংয়ের পঙ্কের কাজ অবশ্য সবটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু যেটুকু দেখতে পাচ্ছি, তাতেই বুঝতে পারছি যে, এই মন্দিরের জন্যে একেবারে এ-ওয়ান সব লোককে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। পয়সা ঢালবার ব্যাপারে দেখছি মহেশ্বর চৌধুরি কিছুমাত্র কার্পণ্য করেননি।”

মন্দিরের বারান্দার অংশ গি দিয়ে ঘেরা বটে, তবে বন্ধ নয়। জুতো খুলে বারান্দায় উঠে আমরা মেঝে, সিলিং, পিলার, পোড়ামাটির কাজ ইত্যাদির উপরে চোখ বুলিয়ে আবার উঠোনে নেমে এলুম। ভিতরের ঘরটা বন্ধ। দরজায় তা। ঝুলছে। তাই ভিতরে কী আছে, বোঝা গেল না। মূর্তিটি যে নেই, তা অবশ্য আমরা জানি।

এ-বাড়িতে ইতিমধ্যে কাজের লোকজনেরা আসতে শুরু করেছে। রাত্তিরে যে ঘরে ছিলুম, সেই ঘরটাই দু’দিকে ভাগ করে রেখেছে ভিতরের উঠোন আর বাইরের উঠোনকে। ভিতরের উঠোন থেকে সেটা পুবদিকের ঘর, আবার বাইরের উঠোন থেকে পশ্চিম দিকের। বাইরের উঠোনের উত্তরে এই মন্দির। পুবে আর দক্ষিণে দুটি ঘর রয়েছে। পূবের ঘরে থাকে রামদাস আর দক্ষিণের ঘরে পুরোহিত গোবিন্দ ভট্টাচার্য।

পুবের ঘর থেকে রামদাস বেরিয়ে এল। আমরা তার আগেই উঠে পড়েছি দেখে হন্তদন্ত হয়ে আমাদের কাছে এসে বলল, “বাবুরা কি অনেক আগেই উঠেছেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই তো খানিক আগে উঠলুম, বেশিক্ষণ হয়নি। তা তোমার নাতনির খবর কী?”

“ওই একইরকম বাবু। কাউকে চিনতে পারছে না, কথাও বলছে না।

“ওকে দেখছেন কে?”

“হাসিমারার ডাক্তারবাবু। রোজ বিকেলে এসে দেখে যান। আজও আসবেন। …আপনাদের চা কি ঘরে দেব? বলেন তো এখানেই এনে দিই।”

“এক্ষুনি চা খাব না। চারপাশে একবার চক্কর দিয়ে আসি। ফিরে এসে চা খাব।”

মন্দিরের উত্তরে ফলের বাগান। ভেবেছিলুম বাগানের ভিতর দিয়ে ওদিকে বেরিয়ে যাব। কিন্তু তা আর সম্ভব হল না।

বাগানটি অবশ্য এমনিতে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। যাকে আন্ডারগ্রোথ বলে, বড়-বড় গাছের তলায় সেই ঘাস আর আগাছার জঙ্গল একেবারে নেই বললেই হয়। দেখলেই বোঝা যায় যে, বাগানের দেখাশোনা করবার দায়িত্ব যাকে দেওয়া হয়েছে, হয় সে নিজেই এর পিছনে বেশ খাটাখাটনি করে, নয়তো নিয়মিতভাবে লোক লাগিয়ে গোটা বাগানটা ফিটফাট করে রাখে। ভিতরে না ঢুকে কোমরসমান উঁচু বেড়ার এদিকে দাঁড়িয়ে বাগানটার উপরে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলুম আমরা। দেখলুম, নাম জাম সফেদা আর লিচুর সঙ্গে গুটিকয় কমলা আর বাতাবিলেবুর গাছও রয়েছে। একদিকে একটা কলাগাছের ঝাড়ও চোখে পড়ল। নারকেল আর সুপুরির সংখ্যাও নেহাত কম নয়। গাছগুলো যে উল্টোপাল্টা লাগানো হয়নি, সেটা বুঝতে মোটেই অসুবিধে হয় না। যিনিই করে থাকুন, সবটাই একেবারে প্ল্যান-মাফিক করেছিলেন। জঞ্জাল বলতে নেহাতই কিছু ঝরে যাওয়া পাতা এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। তা ছাড়া কোথাও এক-টুকরো ময়লা কাগজ পর্যন্ত নেই। সত্যি বলতে কী, নিজের উঠোনটুকু পর্যন্ত অনেকে এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখে না।

তবু যে আমরা বাগানে ঢুকলুম না, তার কারণ আর কিছুই নয়, কাদা। বেড়ার এ-পাশ থেকেই বোঝা গেল যে, বাগানের মধ্যে স্বচ্ছন্দে হাঁটাচলা করবার কোনও উপায় নেই। ক’দিন ধরে খুব বৃষ্টি হয়েছিল নিশ্চয়, বাগানের ভিতরকার পথটা তাই কাদায় পিছল হয়ে আছে। মাটি কোথাও শুকনো কিংবা শক্ত নয়।

“অথচ মজা দেখুন।” ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “বাগানের বাইরে এদিককার মাটি একেবারে খটখটে।”

“তা তো হবেই।”

গলাটা ভাদুড়িমশাই নয়, আর কারও। চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখি, বুড়োমতন একজন ভদ্রলোক আমাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। পরনে খাটো ধুতি, গায়ে মোটা খদ্দরের হাফ-হাতা পাঞ্জাবি, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো। সম্ভবত মন্দিরের পুবদিকের পথটা দিয়ে এসেছেন, তাই আমরা দেখতে পাইনি। ভদ্রলোক বললেন, “বাগানের মধ্যে বিস্তর গাছ-গাছালি রয়েছে তো, তাই খানিকটা আওতামতন হয়ে আছে, মাটি ততটা রোদ্দুর পায় না, তাই শুকোয়নি। এদিকের উঠোন সারাটা দিন রোদ্দুর পায়, তাই এদিকের মাটিও খটখটে। কিন্তু আপনাদের তো চিনলুম না। সত্যপ্রকাশের সঙ্গে এসেছেন বুঝি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ। আমরা কলকাতার লোক। সত্যপ্রকাশবাবু অনেকক্ষন ধরেই আসতে বলেছিলেন, কিন্তু আমাদের আসা হচ্ছিল না। তাই এবারে ভাবলুম, দিন কয়েকের জন্যে ঘুরেই যাই।”

“ভাল সময়ে আসেননি।” ভদ্রলোক বললেন, “এ-বাড়ির মনসামূর্তি চুরি হয়ে গেছে, সক্কলের তাই মন খারাপ। সত্যপ্রকাশ বলেনি আপনাদের?”

“হ্যাঁ, শুনেছি। ওঁকে তো আমরা আগে থাকতে জানিয়ে আসিনি, এখন এসে শুনছি এই ব্যাপার! আপনি বুঝি এখানেই থাকেন?”

“হ্যাঁ, এখানেই এখন থাকি। আসলে আমি মুকুন্দপুরের লোক নই। আমার পৈতৃক ভিটে গয়েরকাটার কাছে একটা গ্রামে। কাঠের ঠিকেদারির কাজ নিয়ে এদিকে এসেছিলুম, তাতে সুবিধে না-হওয়ায় আলিপুরদুয়ারের একটা প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারির কাজে ভর্তি হয়ে যাই। সে কি আজকের কথা? রিটায়ারই তো করেছি তা প্রায় বছর পাঁচেক হল। ভেবেছিলুম এবারে গয়েরকাটায় ফিরে যাব, তা সত্যপ্রকাশই ফিরতে দিল না। বলল, মুকুন্দপুরে তো লেখাপড়া শেখাবার কোনও ব্যবস্থা নেই, আপনি বরং আমাদের পাঠশালাটার দায়িত্ব নিন। ব্যস্, আমিও রয়ে গেলুম। সত্যই পাঁচ কাঠা জমির উপরে দুখানা ঘর তুলে দিয়েছে। ছেলেপুলের ঝামেলা নেই, আমরা বুড়োবুড়ি সেখানে দিব্যি আছি।’

“আপনার পাঠশালা কখন বসবে?”

“পাঠশালা এখন ছুটি। ভাইফোটার পরে খুলবে। চলুন, হাঁটতে-হাঁটতে কথা বলা যাক। মর্নিং ওয়াক হবে, সেই সঙ্গে গ্রামটাও আপনাদের দেখা হয়ে যাবে।”

১২
মুকুন্দপুর গ্রামটা দেখলুম বড় নয়। বাড়ির সংখ্যা ষাট-সত্তরের বেশি হবে না। কিছু কমও ত পারে। বাসিন্দাদের পনেরো-আনাই কৃষিজীবী। কারও বা নিজের দু-পাঁচ বিঘে জমি আছে, কেউ বা অন্যের জমিতে চাষ করে, ফসলের একটা ভাগ পায়। গ্রামে অবশ্য ছোট একটা ডাকঘর আছে। একটা মাইনর স্কুলও থাকতে পারত। নেই। থাকবার মধ্যে আছে একটা পাঠশালা।

পাঠশালা এখন বন্ধ। পুজোর ছুটি চলছে। টিনের চালওয়ালা লম্বাটে একটা ঘরের সামনে চৌকোনা একখানা ফলক আঁটা। কাঠের ফ্রেমে টিনের ফলক। তাতে লেখা রয়েছে অন্নপূর্ণা বিদ্যালয়’। শুনলুম, মহেশ্বর চৌধুরির স্ত্রীর নামে বছর পনেরো আগে এটি খোলা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রের অভাবে দু-তিন বছর পরেই বন্ধ হয়ে যায়। বছর পাঁচেক আগে সত্যপ্রকাশ এটিকে আবার নতুন করে চালু করছেন। মাস্টারমশাইটিও তখন থেকে এই মুকুন্দপুরে বাসিন্দা।

ভদ্রলোকের নাম রঙ্গনাথ মজুমদার। এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের চোখ দেখলেই মনে হয় যে, ইনি একেবারে স্বচ্ছ চরিত্রের মানুষ, এঁর মনে কোনও কূটকাপট্য নেই। রঙ্গনাথকে দেখেও ঠিক সেইরকমেরই একজন মানুষ বলে মনে হয়। বর্ষার দিনে পুকুরে যেমন কালো মেঘের ছায়া পড়ে, রঙ্গনাথের চোখেও তেমনি একটা বিষাদের ছায়া আমি প্রথম থেকেই দেখতে পেয়েছিলুম। ভদ্রলোক যে হাসেন না, তা নয়, কিন্তু যখন হাসেন তখনও দেখলুম যে, সেই ছায়াটা পুরোপুরি সরে যায় না। পাঠশালা এখন কেমন চলছে; ভাদুড়িমশাইয়ের এই প্রশ্নের উত্তরে রঙ্গনাথ বললেন, “কই আর চলছে। সত্যপ্রকাশ তো নতুন করে আবার পাঠশালা চালু করল, সেই বাবদে খরচও করল নেহাত কম নয়। চাল ছিল খড়ের, সেখানে টিনের চাল হয়েছে, মেঝেটাও বেশ পোক্ত করে বাঁধিয়ে দিয়েছে, বইপত্তর কি খাতা-পেনসিলও কাউকে কিনতে হয় না, যার যা-কিছু দরকার, সত্যই সব কিনে দেয়, কিন্তু সবই আসলে ভস্মে ঘি ঢালার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

“এ-কথা বলছেন কেন?”

“বড় দুঃখে বলছি। গ্রামের ছেলেপুলেরা এসে ভর্তি হয় ঠিকই, কিন্তু দু’চার দিন বাদে তাদের বেশির ভাগই পালিয়ে যায়। একে তো মাইনে দিতে হয় না, ফ্রি ইস্কুল, তায় তাদের বইপত্রের খরচও অন্যে জোগাচ্ছে, তবু থাকে না।”

“থাকে না কেন?”

“কী করে থাকবে?” ক্লিষ্ট হেসে রঙ্গনাথ বললেন, “পাঠশালার নামটা কী, সেটা দেখেছেন তো? অন্নপূর্ণা বিদ্যালয়। অর্থাৎ কিনা আগে অন্ন, তারপর বিদ্যা। তা মশাই, অন্নচিন্তা চমৎকারা। সেই চিন্তাতেই যারা অস্থির হয়ে রয়েছে, সেই পরিবারের ছেলেপুলেরা আর বিদ্যার পিছনে ব্যয় করবার শতো সময় কোথায় পাবে

“বাচ্চারাও সময় পায় না?”

“তারাও পায় না। পাঠশালা তো বসে সকালবেলায়। বড়রা তখন মাঠে। সেখানে তারা মুগুর দিয়ে পিটিয়ে শক্ত ঢেলামাটি গুঁড়ো করছে, কি লাঙল টানছে, কি বীজ বুনছে, কি ফসল কাটছে। সেইখানে তাদের সকালের ভাতটা পৌঁছে দেওয়া চাই তো। কে আর দেবে? আমার ছাত্রদেরই তাই নামতার ক্লাসে না-এসে বাবা-কাকার ভাত নিয়ে মাঠে দৌড়োতে হয়।”

হাঁটতে-হাঁটতে কথা বলছিলেন রঙ্গনাথ। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ফের সেই একই রকমের ক্লিষ্ট গলায় বললেন, “তার উপরে আছে ভাগ-রাখালি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা আবার কী বস্তু?”

রঙ্গনাথ বললেন, “আপনারা শহরে থাকেন তো, তাই শুধু ভাগচাষের কথাটাই আপনাদের কানে গিয়ে পৌঁছয়। তাও পৌঁছত না, যদি না আজকাল ভাগচাষ নিয়ে এত ফৈজত লেগে থাকত। আসলে ভাগ-রাখালিও ভাগেরই ব্যাপার। তফাত শুধু এই যে, এটা ফসলের ভাগ নয়, দুধের ভাগ।”

“তার মানে?”

“মানে আর কী, ধরুন আপনার গোরু কিনবার পয়সা আছে, কিন্তু গোরু চরাবার কি তার পরিচর্যা করবার সময় নেই। তখন আপনি কী করবেন? না গোরুটা আপনি এমন-কাউকে রাখতে দেবেন, যার গোরু কেনবার পয়সা নেই, কিন্তু গোরু চরাবার সময় আছে। সে আপনার গোরু চরাবে, তার পরিচর্যা করবে, তারপর সকালবেলায় গোরু দুইয়ে যে দুধ পাবে, তার অর্ধেকটা নিজে রেখে বাকি অর্ধেকটা আপনাকে দিয়ে আসবে। ওই যে অর্ধেকটা নিজে রাখল, তাও যে তার পেটে যাবে, তা নয়, সেটুকুও সে আর-কাউকে বেচে দেবে। তা নইলে সে চাল কিনবে কী দিয়ে? কিন্তু সে-কথা থাক। যা বলছিলাম, সেই কথা বলি। গ্রামদেশে এই ভাগ-রাখালির কাজটা সাধারণত সাত-আট বছরের বাচ্চারাই করে। তা এত সব খাটা াটনি করে আর লেখাপড়া করবার সময় তারা কোত্থেকে পাবে?”

হাসিমারার কাছে হাইওয়ে থেকে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে যে সরু রাস্তা ধরে কাল রাত্তিরে আমরা মুকুন্দপুরে এসে পৌঁছেছিলুম, সরু হলেও সেটা পিচ দিয়ে বাঁধানো। রাত্তিরে ঠিক ঠাহর হয়নি, এখন সকালবেলায় বোঝা গেল যে, মুকুন্দপুরকে পুব আর পশ্চিম, এই দুটো পাড়ায় ভাগ করে দিয়ে সেই রাস্তাটা সোজা উত্তরে চলে গিয়েছে।

উত্তরে কোন পর্যন্ত গিয়েছে, জিজ্ঞেস করতে রঙ্গনাথ বললেন, “কথা তো ছিল যে, দমনপুর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যে-পথটা ভুটানের দিকে চলে গিয়েছে, এটাকে টেনে নিয়ে তার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সে তো এখানে আসবার পর থেকেই শুনছি, কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। খানিকটা এগোলেই দেখবেন যে, পিচ নেই, থাকবার মধ্যে আছে খোয়া, তারপরে সেই খোয়াও নেই। স্রেফ কাঁচা রাস্তা। কে যেন একটা মামলা ঠুকে দিয়েছিল। ব্যস্, বছরের পর বছর সেই মামলা চলছে, রাস্তার কাজ বন্ধ।”

বললুম, “মাঝে-মাঝে তো ট্রাক চলতে দেখছি। ওগুলো আসছে কোত্থেকে? এদিকে যাচ্ছেই বা কোথায়?”

রঙ্গনাথ বললেন, “ওগুলো দূরপাল্লার ট্রাক নয়। কাছেই একটা শালজঙ্গলের ইজারা নিয়ে ঠিকেদাররা গাছ কাটছে, তারপর ট্রাক বোঝাই করে কাঠ চালান দিচ্ছে শিলিগুড়িতে। জঙ্গল তো প্রায় সাফ হয়ে গেল, শুনছি ডিসেম্বর নাগাদ ঠিকেদারদের কাজ ফুরোবে। তারপর যতদিন না আবার নতুন করে কাছেপিঠে কোনও জঙ্গল সাফ করা হয়, ততদিন আর এই রাস্তায় ট্রাক দেখা যাবে না।”

গল্প করতে করতে আমরা রঙ্গনা নবাবুর বাড়িতে চলে এসেছিলুম। বাড়ির দাওয়ার একটা বাদুর বিছিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “বসুন। একটু চা করি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, চায়ের জন্য ব্যস্ত হবেন না।”

রঙ্গনাথ হেসে বললেন, “আরে মশাই, চা আমিও খাব। আপনারা বসে গল্প করুন, শামি এক্ষুনি আসছি।” বলে তিনি উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

বাড়িটি ছোট, কিন্তু পরিচ্ছন্ন। ঘর মাত্র দুটি। একটি শোবার, একটি রান্নার। দুই ঘরের মধ্যে উঠোন। উঠোনের একদিকে লাউমাচা। মাচার পাশে দুটি পেঁপেগাছ। অন্যদিকে ফুলবাগান। বেশির ভাগই গোলাপ। কিছু বেলফুলের চারাও রয়েছে। আর রয়েছে লতানে জুঁই। রান্নাঘরের চালে একটি চালকুমড়োও দেখা গেল।

রঙ্গনাথ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। হাতে কাঁসার থালা। তার উপরে কাচের গেলাসে চা। আমরা দুটো গেলাস তুলে নিলুম। রঙ্গনাথ বললেন, “আমার গিন্নিকে চা দিয়ে এক্ষুনি আসছি।” ঘরে ঢুকে চা দিয়ে বেরিয়ে এসে আমাদের পাশে বসে নিজের গেলাসটা তুলে নিয়ে বললেন, “চায়ের সঙ্গে কিছু দিতে পারলুম না। কী করেই বা দেব। ভদ্রমহিলা বাতের ব্যথায় শয্যাশায়ী। আজ একাদশী তো, ব্যথাটা বেড়েছে। নড়তে পারছেন না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি, কিছু মনে করবেন না তো?”

রঙ্গনাথ হেসে বললেন, “কিন্তু-কিন্তু করছেন কেন? আমরা গ্রামের মানুষ, অত মনে-করাকরির ব্যামোতে ভুগি না। কী জিজ্ঞেস করবেন করুন, উত্তরটা দিতে পারলে দেব, না দিতে পারলে দেব না, ব্যস্।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যপ্রকাশবাবুদের মনসামূর্তি যে চুরি হয়ে গিয়েছে, তা আমরা জানতুম না, এখানে এসে শুনছি। শুনে অবধি ভাবছি যে, এ-কাজ কে করতে পারে। তা আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?”

“কাউকে মানে এই গ্রামের কাউকে?

“হ্যাঁ।”

“গাঁয়ের লোক এ-কাজ করবে কেন?”

“টাকার জন্যে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “জানেন তো, এখানে-ওখানে বিস্তর মূর্তি চুরি করে আজকাল বিদেশিদের কাছে বেচে দেওয়া হচ্ছে, আর তার জন্যে টাকাও পাওয়া যাচ্ছে বিস্তর।”

চায়ের গেলাসে শেষ চুমুক দিয়ে গেলাসটা নামিয়ে রাখলেন রঙ্গনাথ। তারপর বললেন, “কাগজে এইরকম খবর দেখেছি বটে। কিন্তু এ-গাঁয়ের লোকদের তো দেখছেন, খবরের কাগজ পড়বার মতন বিদ্যে এদের নেই। সুতরাং মূর্তিও যে বিক্রি করা যায়, আর দামও পাওয়া যায় প্রচুর, তা এদের জানবার কথা নয়।”

“বাইরের লোক এসে এদের জানাতে পারে।”

“তেমন কোনও লোক এলে নিশ্চয় দেখতে পেতুম। কিন্তু কই, দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”

“সত্যপ্রকাশবাবুর খুড়োমশাইটি তো এক হিসেবে বাইরের লোক।”

“খুড়োমশাই?” অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন রঙ্গনাথ। তারপর বললেন, “মানে ওই সাধুবাবা?”

“হ্যাঁ। তা ‘খুড়োমশাই’ শুনে অবাক হয়ে গেলেন কেন?” ভাদুড়িমশাই লিলেন, “উনি যে সত্যপ্রকাশের সেই হারিয়ে-যাওয়া কাকা চিত্তপ্রকাশ, তা নিয়ে আপনার সন্দেহ আছে নাকি?”

আচমকা এই রকমের একটা প্রশ্ন করা হবে তাঁকে, বঙ্গনাথ সম্ভবত তা আঁচ করতে পারেননি। অন্তত আমার মনে হল, ধীরস্থির ঠান্ডা স্বভাবের মানুষটি যেন হঠাৎ একটু সংকুচিত হয়ে পড়েছেন। কুণ্ঠিত গলায় বললেন, “না না, আমার কেন সন্দেহ থাকবে? আমি তো ওঁর ছেলেবেলায় ওঁকে দেখিইনি, তাই সন্দেহ থাকা না-একার কোনও প্রশ্নই আমার ক্ষেত্রে, উঠছে না। আর তা ছাড়া সত্যপ্রকাশের আমি আশ্রিত, সে যখন তার কাকা বলে সাধুবাবাকে মেনে নিয়েছে, তখন সেটাই তো আমার পক্ষে যথেষ্ট।”

ব্যাপারটা এখানেই মিটে যেতে পারত। ভাদুড়িমশাই কিন্তু মিটে যেতে দিলেন না। বললেন, “চিত্তপ্রকাশের ছেলেবেলায় আপনি তাঁকে না-দেখে থাকতে পারেন, কিন্তু এই গ্রামের বেউ-কেউ দেখেছেন নিশ্চয়? মানে যারা বুড়োমানুষ, তাদের কথা বলছি। তাদের কারও মনে সন্দেহ নেই?”

“এ-সব কথা না উঠলেই ভাল ছিল।” রঙ্গনাথ বললেন, “কিন্তু যখন উঠেছেই, আর আপনারা যখন সত্যপ্রকাশের বন্ধু, তার ভালই চান, তখন বোধহয় বলা-ই ভাল। হ্যাঁ, সন্দেহ তো আছেই, রাগও আছে। রাগ অবশ্য শুধু বুড়োদের নয়, বলতে গেলে প্রায় সকলেরই।”

“রাগ কেন?”

“বাঃ, রাগ হবে না? আপনি যাঁকে দেবতা বলে মানেন, যাঁকে পুজো করেন, যিনি আপনাকে বিপদ-আপদ থেকে বাঁচাচ্ছেন বলে আপনি বিশ্বাস করেন, কেউ তাঁর নিন্দেমন্দ করলে আপনার রাগ হবে না?”

“সাধুবাবা আপনাদের মনসাদেবীর খুব নিন্দেমন্দ করছেন বুঝি?”

“অতি বিচ্ছিরি ভাষায় করছেন,” রঙ্গনাথ বললেন, “তার উপরে আবার সেটা করছেন একেবারে প্রকাশ্যে। ত্রিশূল উঁচিয়ে গাঁয়ের এ-মুড়ো থেকে ও-মুড়ো পর্যন্ত চেঁচিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন যে, ব্যাঙখেকো কানিটা বিদেয় হয়েছে, বাঁচা গেছে। ফের যদি ফিরে আসে তো ত্রিশূল দিয়ে তিনি ওটাকে গেঁথে ফেলবেন।”

“ওরেব্বাবা,” আমি বললুম, “এ তো খুবই ভয়ঙ্কর ব্যাপার!”

“তা তো বটেই, কিন্তু আসল ভয় তো সেখানে নয়,” রঙ্গনাথ বললেন, “ভয়টা এইখানে যে, ব্যাপারটা এখন গ্রামের লোকদেরও সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন রঙ্গনাথ। তারপর নিচু গলায় বললেন, “যা বুঝতে পারছি, একটা খুনোখুনি হয়ে যাওয়াও কিছু বিচিত্র নয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বটে? তা সত্যপ্রকাশবাবুকে কথাটা আপনি বলছেন না কেন? ব্যাপারটা যে এতদূর গড়িয়েছে, এটা জানলে তিনি হয়তো তাঁর খুড়োমশাইকে একটু সাবধান করে দিতে পারেন।”

রঙ্গনাথ আবার সেই কুণ্ঠিত গলায় বললেন, “সত্য আমাকে শ্রদ্ধাভক্তি করে ঠিকই, কিন্তু আমি তো ওর মাইনে খাই, সেদিক থেকে আমি ওর কর্মচারী। বুঝতেই পারছেন, কর্মচারী হয়ে মনিবকে তার কাকার বিরুদ্ধে কিছু বলা আমার শোভা পায় না।”

কথা আর এগোল না, কেননা বছর চল্লিশেক বয়সের একটি বউ এই সময়ে রঙ্গনাথের বাড়িতে এসে ঢুকল। ঢুকে আমাদের দেখে হকচকিয়ে গেল একটু। তারপর ঘোমটা টেনে রঙ্গনাথকে বলল, “ঠানদি’র সঙ্গে একটা কথা ছিল। তিনি কোথায়?”

রঙ্গনাথ বললেন, “ঠানদি আজ আর উঠতে পারছেন না, শুয়ে আছেন।”

বউটি গিয়ে ঘরে ঢুকল। কিছু একটা কথা বলল রঙ্গনাথের স্ত্রীকে। তারপর ঘোমটা টানা অবস্থাতেই ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়ে এসে রঙ্গনাথকে বলল, “ঠানদি আপনাকে ডাকছেন।”

রঙ্গনাথ আমাদের বললেন, “গাঁয়ের লোকেরা আপদে-বিপদে আমাদের কাছে পরামর্শ চাইতে আসে। এরও কোনও সমস্যা হয়েছে নিশ্চয়। আপনারা একটু বসুন। আমি এখুনি আসছি।”

রঙ্গনাথ ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

ঘরের মধ্যে নিচু গলায় কথা হচ্ছিল। কিন্তু এতটা নিচু গলায় নয় যে, একেবারেই শোনা যাবে না।

মিনিট তিন-চার বাদেই রঙ্গনাথ বেরিয়ে এলেন। বললেন, “অনর্থক আপনাদের বসিয়ে রাখলুম। বউটির সঙ্গে আমাকে একবার ওদের বাড়িতে যেতে হবে।”

আমরাও উঠে পড়েছিলুম। ভাদুড়িমশাই বলঢ়োন, “অনেক বেলা হল। ত্যপ্রকাশবাবু হয়তো আমাদের অপেক্ষায় রয়েছেন। আমরাও চাল রঙ্গনাথবাবু। পরে আবার কথা হবে।”

বাড়ির বাইরে এসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঘরের মধ্যে কী কথা হচ্ছিল, শুনলেন কিছু?”

বললুম, “সবটা শুনিনি। তবে শেষের দিকে রঙ্গনাথ যা বললেন, সেটা শুনেছি।”

“কী বললেন?”

“বললেন, ‘যেখান থেকে নিয়ে এসেছ, সেইখানেই আবার রেখে এসো।’ তারপরেই উনি মর থেকে বেরিয়ে এলেন।”

“কথাটার মানে কিছু বুঝতে পারছেন?”

বললুম, “ঠিক যে বুঝতে পারছি তা নয়, তবে আন্দাজ করতে পারছি।”

ভাদুড়িমশাই তাঁর তালুতে জিভ ঠেকিয়ে আক্ষেপের শব্দ করে বললেন, “সবটাই শোনার দরকার ছিল। তা হলে আর আন্দাজ করতে হত না, স্পষ্ট বুঝতে পারতেন।”

১৩
রোদ্দুর এখন আর তত মোলায়েম নয়, আস্তে-আস্তে তেতে উঠছে। জাম্পারটা পরে থাকায় একটু যেন অস্বস্তি হচ্ছিল, রঙ্গনাথের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সেটা খুলে ফেললুম।

আটটা বাজে। সকালে স্রেফ এক গেলাস চা ছাড়া আর কিছুই পেটে পড়েনি। একটু-একটু খিদে পাচ্ছিল। খিদের কথাটা ভাদুড়িমশাইকে জানাতে তিনি বললেন, “এ তো মহা মুশকিলে পড়া গেল, গ্রামটা আর-একটু ঘুরে দেখব না?”

বললুম, “আপনি ঘুরে দেখুন, আমার খিদে পেয়েছে, কিছু খাওয়া দরকার, আমি ফিরে যাচ্ছি।”

“ফিরলেই কি আর ব্রেকফাস্ট মিলবে? কাল অত রাত্তিরে শোওয়া হল, সত্যপ্রকাশের ঘুম সম্ভবত ন’টা-দশটার আগে ভাঙবে না।”

“সত্যপ্রকাশের ঘুম ভাঙবার দরকার কী, কাল শিলিগুড়ি থেকে বিশাল এক প্যাকেট ক্ষীরের শিঙাড়া আনা হল, তার উপরে আবার ময়নাগুড়ি থেকে এক হাঁড়ি রসগোল্লা। তার সবই নিশ্চয় সাবাড় হয়ে যায়নি। রামদাসকে ডেকে বলব, ‘ভাঁড়ার-ঘরসে আভি চার-পাঁচঠো সামোসা অওর রসগুল্লা লে আও।’ তাতে কাজ হবে না?”

“একশোবার হবে,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তবে হিন্দির বদলে বাংলায় বললে কাজটা আরও সহজে হবে। রামদাস যে বাঙালি, সেটা ভুলে যাচ্ছেন কেন?”

“ঠিক আছে, তা হলে বরং বাংলাতেই বলব।”

“আমার মতে অবশ্য বাংলায় বলারও দরকার নেই,” ভাদুড়িমশাই তাঁর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা চকোলেট-স্ল্যাব বার করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আপাতত এইটে দিয়েই পিত্তরক্ষা রুন।”

“তা নয় করলুম, কিন্তু এখন আর ঘোরাঘুরি করতে পারব না।”

“ঠিক আছে, ঘোরাঘুরি করব না, তবে কিনা বাড়িতে গিয়ে ঢুকবার আগে একবার ফলের বাগানে ঢুঁ মারব :”

“ফলের বাগানে কেন?”

“আরে মশাই, ফল খাবার জন্যে নয়।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ফল খেতে হয় তো সত্যপ্রকাশ খাবেন, আমার যে শুধু কর্মেই অধিকার. মা ফলেষু কদাচন, তা কি আর আমি জানি না?”

“ঠাট্টা ছাড়ুন, ফলের বাগানে যাব কেন?”

“বা রে, সাধুবাবার কথা ভুলে গেলেন? ওই বাগানেরই তো এক ধারে তাঁর আখড়া! চলুন, তাঁর সঙ্গে একবার দেখা কার দরকার।

বেলা বেড়েছে। পথঘাট এখন আর নির্জন নয়। লোকজন হাঁটাচলা করছে। সবাই স্থানীয় লোক। আমাদের দেখে যেভাবে তারা দাঁড়িয়ে পড়ছিল, তারপর হাঁ করে তাকিয়ে থাকছিল আমাদের দিকে, ভাতে মনে হল যে, গ্রামের পথে হঠাৎ দুজন অপরিচিত মানুষকে দেখে”,তারা একেবারে অবাক হয়ে গেছে।

বললুম, “মুকুন্দপুরে বোধহয় বাইরের লোকের দেশ। বিশেষ মেলে না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা কেন হবে? একে তো এই গ্রামটা হাইওয়ে থেকে খুব দূরে নয়, তার উপরে আবার, যতই সরু হোক, হাইওয়ে থেকে একটা পিচের রাস্তাও এই গাঁয়ের ভিতর দিয়ে চলে গেছে। তা ছাড়া ভাবুন, যেমন হাসিমারা তেমনি আলিপুরদুয়ারেও আপনি চট্ করে এখান থেকে পৌঁছে যেতে পারছেন। অর্থাৎ কিনা গ্রাম হিসেবে মুকুন্দপুর খুবই ছোট হতে পারে, তবে ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ইন দা মিড্ল অব নোহোয়্যার’, ঠিক সেই রকমের জায়গা এটাকে বলা যাচ্ছে না। বাইরের জগতের সঙ্গে এর যোগাযোগ রয়েছে, আর সেটা যখন রয়েছে, তখন নানা ধান্ধায় সেখান থেকে কিছু-না-কিছু লোকও এখানে মাঝেমধ্যে আসে নিশ্চয়।”

“তা যদি আসে, তবে এখানকার জিনিসেরই বা বাইরে যাওয়া বিচিত্র কী!”

“যেতেই পারে। যারা আসে, তারা সবাই কি একেবারে খাঁটি সাধুপুরুষ? তা তো আর বলা যাচ্ছে না। নকল থাকে তাদের মধ্যেও।”

শুনে আমি চমকে উঠলুম। ভাদুড়িমশাই কি তা হলে সত্যপ্রকাশের খুড়োমশাইকে সন্দেহ করছেন? রঙ্গনাথের যে-কথাটা আমি আচমকা শুনে ফেলেছি, তাতে তো আমার অন্য রকম সন্দেহ হয়েছিল।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল, সাধুদের মধ্যেও যে কিছু-না-কিছু ঝুটো মাল থাকে, এই কথাটা শুনে চমকে গেলেন বুঝি?”

বললুম, “অত আভাসে-ইঙ্গিতে কথা বলছেন কেন? খোলাখুলি বলুন তো, মুর্তি-চুরির ব্যাপারে কি চিত্তপ্রকাশকে আপনি সন্দেহ করছেন?”

“করাই তো স্বাভাবিক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মনসার উপরে উনি যে-রকম খাপ্পা, তাতে পুজোটা বন্ধ করবার জন্যে মুর্তি যদি উনি সরিয়ে থাকেন, তাতে অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু না, এখনও আমি তেমন-কোনও সন্দেহ করছি না।”

“কেন করছেন না?”

“এই জন্যে করছি না যে, মনসার উপরে ওঁর বিদ্বেষের কথাটা তা হলে উনি আর ফলাও করে বলে বেড়াতেন না। বরং এমন একটা ভাব দেখাতেন যে, মনসা-মুর্তি চুরি যাওয়ায় আর-সকলের মতো উনিও ভীষণ মুষড়ে পড়েছেন। …তবে কিনা এরও একটা অন্য ব্যাখ্যা সম্ভব।”

“সেটা কী?”

“বুঝলেন না? এই যে উনি মনসাকে গালাগাল করে বলে বেড়াচ্ছেন যে, মূর্তিটা বিদেয় হওয়ায় বাঁচা গেছে, এটাই হয়তো ওঁর মস্ত চালাকি। অর্থাৎ উনি ভাবছেন যে…কী ভাবছেন বলুন তো কিরণবাবু?”

“ভাবছেন যে, এইভাবে গালমন্দ করলে লোকে চটবে বটে, কিন্তু ওঁকে মুর্তি-চোর বলে সন্দেহ করবে না। এই তো?”

“ঠিক বলেছেন! একেবারে দশে দশ, ফুল মার্কস! … ব্যাপারটা তা হলে কী দাঁড়াল কিরণবাবু? “

“এই দাঁড়াল যে, সাধুবাবাকে এখনই আপনি মূর্তি-চোর বলে ভাবছেন না, আবার ওঁর অ্যাটি-মনসা হল্লা যে একটা চালাকির ব্যাপার হতে পারে, এই সম্ভাবনাটাকেও আপনি হিসেবের মধ্যে রাখনে। কেমন, ঠিক বলেছি?”

“অ্যাবসলিউটলি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আরও ঠিক কবে বলতে গেলে বলতে হয় যে, কাউকেই যেমন আমি চোর ভাবছি না, তেমনি কাউকেই আমি সাধুও ভাবছি না। এমন কী, সাধুবাবাকেও না। আই অ্যাম জাস্ট কিপিং মাই মাইন্ড ওপ্‌ন।”

কথা বলতে-বলতে আমরা বাগানের ধারে পৌঁছে গিয়েছিলুম। বাগানের এটা উত্তর দিক। কিছুটা কাদামাটি না-মাড়িয়ে বাগানের মধ্যে চলাফেলা করা শক্ত হবে, সে-কথা আগেই বলেছি। দিন কয়েক আগে খুব বৃষ্টি হয়েছিল নিশ্চয়, মাটি এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি। তবে চারপাশে একটু নজর করে দেখে এখন মনে হল যে, পুব দিক থেকে যদি বাগানে ঢুকি, পায়ে কাদা না-লাগিয়েও তা হলে সাধুবাবার ডেরায় পৌঁছনো হয়তো অসম্ভব হবে না। উত্তর দিকে থেকে খানিকটা ঘুরে তাই পুবদিকে চলে এলুম। এ দিক থেকে পঁচিশ-তিরিশ পা হাঁটলেই সাধুবাবার চালাঘর।

কিন্তু পাঁচ-পা হাঁটবারও দরকার হল না। মাটির দিকে চোখ রেখে, কাদা বাঁচিয়ে, অতি সন্তপর্ণে দু-তিন পা এগিয়েছি মাত্র, হঠাৎ সেই হুঙ্কার শোনা গেল : জয় শিবশম্ভো, জয় শঙ্কর!

বুকটা যে ধড়াস করে উঠেছিল, সে-কথা স্বীকার করাই ভাল!

সেকালের ডাকাতরা শুনেছি হাঁড়ির মধ্যে মুখ রেখে এমন বিকট আওয়াজ ছাড়ত যে, বনের বাঘও সেই হাঁকার শুনে পালাবার পথ খুঁজে পেত না। এও বলতে গেলে প্রায় সেই রকমেই পিলে চমকানো ব্যাপার।

মুখ ফিরিয়ে দেখি, সাধুবাবা আমাদের পিছনেই দাঁড়িয়ে আছেন। পায়ে খরম, জট পাকানো চুল মাথার উপরে চুড়ো করে বাঁধা, বুকের উপরে নেমে এসেছে ধপধপে সাদা দাড়ি, হাতে ত্রিশূল।

শেষ-রাত্তিরে প্রথম যখন তাঁর হাঁকার শুনি, তখন আমার স্বপ্নের সঙ্গে ব্যাপারটা একেবারে তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে বুঝতে পারি যে, ওটা স্বপ্নের মধ্যে শুনিনি, সত্যপ্রকাশের খুড়োমশাই আসলে তাঁর আরাধ্য দেবতার জয়ধ্বনি দিচ্ছেন। তখন মনে হয়েছিল, বাপ রে, এমন যাঁর গলার জোর, সেই মানুষটি একজন দশাসই পুরুষ না হয়ে যান না।

এখন কিন্তু দেখলুম যে, মানুষটি মোটেই লম্বাচওড়া নন। রোগাপাতলা শরীর, কপালের উপর মস্ত একটা কাটা দাগ, চোখ দুটি গর্তে বসা। দৃষ্টি অবশ্য ভীষণ ধারালো। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন গর্তের ভিতর থেকে জ্বলন্ত দুটো কাঠকয়লা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কখন কোথা থেকে এই মানুষটি যে হঠাৎ আমাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, আমরা তা বুঝতেই পারিনি।

কিছু একটা বলতে হয় বলেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “নমস্কার।”

সাধুবাবা যে তাঁর কথা শুনতে পেয়েছেন, এমন মনে হল না। সত্যি বলতে কী, একেবারে অচেনা দুজন মানুষ যে তাঁদের বাগানের মধ্যে তাঁর ডেরার কাছে এসে ঢুকেছে, এই ব্যাপারটাকেও যেন গ্রাহ্যই করলেন না তিনি। জ্বলন্ত চোখে খানিকক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থেকে তাঁর চালাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

নিচু গলায় ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “এই রকম টিংটিঙে লোকের ওই রকম বাজখাঁই গলা?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ তো দেখছি বেবি-অস্টিনের মধ্যে একেবারে মিলিটারি ট্রাকের হর্ন বসিয়ে নিয়েছে।”

“চোখ দুটো দেখলেন? বাপ্ রে, ওই চোখে যদি আর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেন তো নির্ঘাত আমরা ভস্ম হয়ে যেতুম। চলুন, কেটে পড়ি।”

“কেটে পড়ব কেন?” চারু ভাদুড়ি বললেন, “এসেছি যখন, তখন কথা না-বলে যাব না।”

সাধুবাবা ইতিমধ্যে তাঁর চালাঘরের একেবারে সামনে গিয়ে পৌঁছেছিলেন। অতদূর থেকে আমাদের কথাবার্তা কারও পক্ষে শোনা সম্ভব নয়। তা ছাড়া আমরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলুম, তাও খুব চাপা গলায়। অথচ, তাজ্জব ব্যাপার, ঘরের মধ্যে না ঢুকে সাধুবাবা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন, তারপর সেই বাজখাঁই গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী কথা?”

ভাদুড়িমশাই গলা তুলে বললেন, “সে তো এত দূর থেকে বলা যাবে না। একটু কাছে যেতে পারি?”

“চলে আয়।”

সাধুবাবার এই ঘরটা শুনেছি রাতারাতি তোলা হয়েছিল। মেঝেটা বাঁধানো নয়, তবে মাটিরও নয়। জমির লেভেল থেকে ফুট তিন-চার ফাঁকা রেখে, শালের খুঁটির সঙ্গে ফ্রেম করে নিয়ে তার উপরে পাতা হয়েছে কাঠের পাটাতন। উত্তরবঙ্গে এই রকমের ঘর প্রচুর দেখা যায়। রাস্তার ধারে নিচু জমিতে খুঁটি পুঁতে যে সব দোকানঘর বানানো হয়, অথচ যার মেঝে থাকে রাস্তার লেভেলের থেকেও খানিকটা উঁচুতে, সেগুলোও অনেকটা এই রকমেরই।

ঘরের সামনে এক ফালি বারান্দাও রয়েছে। তাতে একটা কম্বল বিছানো। সাধুবাবা সেই কম্বলের উপরে আমাদের বসতে বললেন, তারপর ঘরের ভিতর থেকে একটা বাঘছাল নিয়ে এসে তার উপরে বসে বললেন, “কী কথা?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কথা তো একটাই। মনসার উপরে আপনার এর রাগ কেন?”

প্রশ্ন শুনে হেসে উঠলেন সাধুবাবা। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “চাঁদ বেনের গপ্পো জানিস?”

“জানি। কিন্তু চাঁদ যখন তাঁর পুজো করতে রাজি হননি, দেবী হিসেবে মনসার তখন বিশেষ প্রতিষ্ঠাও তো ছিল না। আর তা ছাড়া, মনসা যে ছলে-বলে তাঁর কাছ থেকে পুজো আদায় করতে চেয়েছিলেন, শিবের ভক্ত চাঁদের সেটাও পছন্দ হয়নি।”

“আরে বেটা, আমিও তো শিবের ভক্ত, আমিই বা তা হলে ব্যাং-খেকো ওই কানিটাকে পাত্তা দেব কেন?”

“কেউ তো আপনাকে পাত্তা দিতে বলছে না। কিন্তু সরল বিশ্বাসে যারা তাঁর পূজা করছে, তাদের সেই বিশ্বাসে আপনি আঘাত করছেন কেন? এই গ্রামের লোকেরা বিশ্বাস করে যে, মনসার পুজো করলে সাপের কামড়ে মরতে হবে না। কেন সেই বিশ্বাসটা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করছেন আপনি?”

“সাপের কামড়ে মরবার কথা উঠছে কেন?” সাধুবাবা অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে-ধীরে সেই অবাক ভাবটা কেটে গিয়ে তাঁর মুখের উপরে একটা অদ্ভুত হাসি ছড়িয়ে পড়ল। বললেন, “এখানে আবার সাপ আছে নাকি? কই, আমি তো কখনও দেখিনি। কেউ দেখেছে বলেও শুনিনি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাও কি হয় নাকি? এ তো বড় অদ্ভুত কথা আপনি বলছেন। গ্রামে সাপ থাকবে না?”

সাধুবাবা বললেন, “আমি তো আর সব গ্রামের কথা বলছি না, আমি মুকুন্দপুরের কথা বলছি। এখানে সাপ নেই। কখনও ছিল না। সত্য তবু সাপের ভয় দেখিয়ে মনসার পুজো আদায় করে। এইটে আর আমি হতে দেব না। মনসার পুজো আমি বন্ধ করে ছাড়ব।”

“কী করে বন্ধ করবেন? বিগ্রহ উদ্ধার করতে পারলেই তো ফের পুজো শুরু হবে।” সাধুবাবার চোখ দুটো হঠাৎ সেই আগের মতো জ্বলে উঠল। চাপা গলায় বললেন, “উদ্ধার করবার জন্যেই যে তোরা এসেছিস, তা কি আর আমি জানি না? ভাল চাস তো পালিয়ে যা! নইলে, মনসাকে যেভাবে মন্তর দিয়ে মেরেছি, তোদেরও সেইভাবে মারব!”

১৪
সাধুবাবার হুঙ্কার শুনে যে আমার বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠেছিল, আগেই সে-কথা বলেছি। এখন মনে হল যে, তাঁর চাপা-গলার শাসানিটাও সেই হাঁকারের চেয়ে কিছু কম ভয়ঙ্কর ব্যাপার নয়।

বাগান থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে এগোতে এগোতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল কিরণবাবু? ভয় পেলেন নাকি?”

বললুম, “ভয় পাবার মতোই তো ব্যাপার। কেন, আপনি ভয় পাননি?”

“কেন পাব না? চোখ পাকিয়ে একটা লোক বলছে যে, আমাকে মেরে ফেলবে, আর আমি ভয় পাব না? তবে হ্যাঁ, ওই যে মন্তর দিয়ে মারবে বলল, ওটা স্রেফ গাঁজাখুরি গপ্পো।”

“আপনি বলছেন, গাঁজাখুরি গপ্পো’, কিন্তু এই বিশ শতকেও বিস্তর মানুষ বিশ্বাস করে যে, মন্তর দিয়ে মানুষ মারা যায়।”

“তা করে।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কিন্তু অষ্টাদশ শতকের মানুষ হয়েও ভলতের বিশ্বাস করতেন না। মন্তর দিয়ে ভেড়া মারা যায় কি না, একজনের এই প্রশ্নের জবাবে ভলতের কী বলেছিলেন জানেন?”

“কী বলেছিলেন?”

“বলেছিলেন যে, তা হয়তো যায়, তবে কিনা মন্তরের সঙ্গে খানিকটা সেঁকোবিষ মিশিয়ে দিলে আর ভাবনার কিছু থাকে না। তখন একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিন্ত হয়ে বলা যায় যে, ভেড়াটা মরবেই।”

বললুম, “তা সাধুবাবাও যে মন্তরের সঙ্গে বিষ মেশাবার কথা ভাবছেন না, তা আপনি জানছেন কী করে? …ও হ্যাঁ, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করি। সাধুবাবার ওখানে যখন বসে ছিলুম আমরা, তখন একটা গন্ধ পেয়েছিলুম। আপনি পাননি?”

“পেয়েছিলুম বই কী?”

“কীসের গন্ধ বলুন তো?”

“কারবলিক অ্যাসিডের।” ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “নাঃ, সাধুবাবা বড় চিন্তায় ফেললেন দেখছি।”

বাগানের পুব দিক দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে ততক্ষণে আমরা চৌধুরি-বাড়ির বাইরে উঠোনে এসে ঢুকেছি। দেখলুম, রামদাসের ঘরের সামনে একটি বউ আর একজন ষন্ডামতন লোক দাঁড়িয়ে আছে। বউটির বয়স বছর পঁয়ত্রিশ। চেহারা বেশ চটকদার। রামদাস তাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। মনে হল, সে একটু উত্তেজিত। কথা বলতে-বলতেই হঠাৎ সে তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ষন্ডামতন লোকটি বেশ রাগত ভঙ্গিতে কী যেন বলল বউটিকে। কিন্তু বউটি তার উত্তরে কিছু বলল না। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেইখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটি তাকে আরও কিছু বলত হয়তো, কিন্তু হঠাৎ আমাদের দিকে চোখ পড়ে যাওয়াতেই বোধহয় আর মুখ খুলল না। হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দক্ষিণ দিকের রাস্তায় গিয়ে নামল।

ভিতরের উঠোনে ঢুকতেই একেবারে হই-হই করে উঠলেন সত্যপ্রকাশ। দোতলার বারান্দায় একটা ইজিচেয়ারে তিনি বসে ছিলেন। সেইখানে থেকেই চেঁচিয়ে বললেন, “আরে মশাই, কোথায় গিয়েছিলেন আপনারা? আপনাদের কি খিদে-তেষ্টা পায় না? সেই কখন থেকে আপনাদের জন্যে বসে আছি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেই কখন থেকে মানে ঠিক কখন থেকে বসে আছেন বলুন তো?”

“তা মিনিট দশ-পনেরো তো হবেই।” সত্যপ্রকাশ লজ্জিতভাবে বললেন, “এই মানে প্রায় শেষ-রাত্তিরে শুয়েছিলুম তো, উঠতে-উঠতেই সাড়ে আটটা বেজে গেল।”

“তা যে বাজবে, সেটা জানতুম বলেই আমরা একটা লম্বা-গোছের চক্কর মেরে এলুম।”

“বেশ করেছেন, বেশ করেছেন,” সত্যপ্রকাশ তাঁর আরাম-কেদারা থেকে উঠে পড়ে বললেন, “ব্রেকফাস্ট রেডি, আমিও রেডি, আপনারা তা হলে আর দেরি করবেন না, ডাইনিং হলে গিয়ে বসে পড়ুন।”

দোতলা থেকে নেমে এলেন সত্যপ্রকাশ। সবাই মিলে ডাইনিং হলে ঢুকে এক-একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লুম। থালা গেলাস বাটি সাজানোই ছিল। নিরু পরিবেশন করতে লাগল। ব্রেকফাস্ট মানে অবশ্য বিলিতি কায়দার ছোটা হাজরি নয়, একেবারে বনেদি বাঙালি কেতার লুচি, আলুর চচ্চড়ি, মাছভাজা আর পায়েস। মা আর পিসিমাও চেয়ার টেনে বসে পড়েছিলেন, তবে তাঁরা বিধবা মানুষ, আমিষের ছোঁয়া রয়েছে বলেই সম্ভবত আমাদের সঙ্গে কিছু খেলেন না, বসে-বসে শুধু নজর রাখতে লাগলেন যে, কারও পাত যেন না খালি থাকে।

ব্রেকফাস্টের পালা চুকিয়ে আমরা আবার সত্যপ্রকাশের বসবার ঘরে এসে জমায়েত হলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাদের পারিবারিক ইতিহাস তো কাল রাত্তিরেই আপনার কাছে শুনলুম। ডায়েরিটাও কালই পড়ে ফেলেছি। এখন আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই, চুরিটা কখন হল, কীভাবে হল, আপনিই বা কখন খবর পেলেন, সব এবারে খুলে বলুন।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আজ তো মঙ্গলবার, চুরিটা হয়েছে আজ থেকে ছ’দিন আগে, গত বুধবারে, যদ্দুর বুঝতে পারছি, ভোর হবার একেবারে আগের মুহূর্তের ঘটনা। ওই যাকে খনার বচনে বলে মঙ্গলে উষা বুধে পা, ঠিক সেই সময়ের ব্যাপার।”

“আপনি কখন খবর পেলেন?”

“বুধবার বিকেলে। শিলিগুড়িতে লোক পাঠিয়ে খবর দেওয়া হয়েছিল।”

“খবর পেয়েই আপনি চলে আসেন?”

“না,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমি ব্যবসায়ী লোক, হুট্ বলতেই কি আর চলে আসতে পারি, -্যাবসার কাজকর্ম অন্যদের বুঝিয়ে না-দিয়ে আসি কী করে? তাই খবরটা পাবার পরেও কিছুক্ষণ—তা ধরুন ঘন্টাদেড়েক কি ঘন্টাদুয়েক সময় –আমি শিলিগুড়িতেই আটকে ছিলুম।’

“খবরটা যেখানে বাইরের কাউকে বলেছিলেন?”

“তা বলেছিলুম বই কী। গ্রামের বাড়িতে সাধারণত আমি শনিবার-শনিবার আসি, তারপর শনি-রবি দু’রাত এখানে কাটিয়ে সোমবার সকালে আবার শিলিগুড়িতে ফিরে যাই। এবারে হঠাং বুধবার আসছি কেন, বন্ধুবান্ধবরা জিজ্ঞেস করায় সব খুলে বলতে হয়।”

অর্থাৎ খবরটা তখুনি চাউর হয়ে যায়, কেমন?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ। কলকাতার হরেক কাগজের যে-সব করেসপন্ডেন্ট শিলিগুড়িতে থাকেন, তাঁরাও হয়তো আমার বন্ধুদেরই কারও কাছে খবরটা পেয়ে গিয়ে কলকাতায় জানিয়ে থাকবেন?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, পরশু অর্থাৎ রোববার আমরা কলকাতার কাগজে এই খবরটা দেখেছি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমি দেখেছি পরশু বিকেলবেলায়। আপনাদের হোটেলে রেখে আমার অফিসে ফিরে গিয়ে দেখলুম। কাগজ এখানে সকালের ফ্লাইটেই আসে বটে, তবে বিকেল তিনটের আগে তো আর ডেলিভারি হয় না। খবরটা যে ছেপে বেরিয়েছে, তা অবশ্য পরশু সকালেই আমার বড় মেয়ে আমাকে ট্রাঙ্ককল করে জানিয়েছিল।”

“যাক্ গে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুধবারের কথা হচ্ছিল, সেটাই আগে শুনি। মুকুন্দপুরে সেদিন আপনি কখন এসে পৌঁছলেন?”

“কর্মচারীদের কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে সেই রাত্তিরেই এখানে চলে এলুম। আসতে বেশ রাত হয়েছিল, তবে আমার জন্যেই বসে ছিল সবাই, কেউ ঘুমোয়নি। ঘুমোবার উপায়ও অবশ্য ছিল না।”

“কেন?”

“রঙ্গিলার জন্যে। মেয়েটার তখন যাকে বলে যায়-যায় অবস্থা। বেঁচে থাকবে, এমন আশাই তো কেউ +রেনি। ওই যে বলেছি, মন্দিরে ঢুকে মেয়েটা একেবারে মূর্তি-চোরের সামনে পড়ে গিয়েছিল, ওর মাথা কাটিয়ে চোর পালিয়ে যায়।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই! কী যেন ভাবলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “সবই বুঝলুম, কিন্তু একটা কথা এখনও বুঝতে পারছি না। শেষ রাত্তিরে রঙ্গিলা হঠাৎ মন্দিরে ঢুকতে গিয়েছিল কেন?”

“হঠাৎ তো ঢোকেনি,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “রোজই ঢোকে। বড় লক্ষ্মী মেয়ে। কাউকে কিছু বলতে পর্যন্ত হয় না, রাত থাকতেই ঘুম থেকে উঠে, চান করে, বাসী কাপড় ছেড়ে, মন্দিরে গিয়ে কাজে লেগে যায়।”

“সেখানে ওর কী কাজ?”

“বিস্তর কাজ। কাজের কি আর শেষ আছে। পুজোর বাসন-কোশন, কোষাকুষি, পেতলের ঘড়া, গঞ্চপ্রদীপ, ধূপদান, সব তো রঙ্গিলাই মাজে। তা ছাড়া ঠাকুরঘরের মেঝে আর বারান্দা সেই ভোর-রাত্তিরেই ও য়েমুছে একেবারে ঝকঝকে করে রাখে। তারপর চন্দন ঘষে, পুজোর ফুল তোলে, পুরুতমশাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দেয়…কাজ কি কম?”

“তারপর?”

“তারপরেই সেই সর্বনেশে ব্যাপার। রোজকার মেতো বুধবারও সে রাত থাকতেই ঘুম থেকে উঠেছিল. চান করেছিল, বাসী কাপড় পালটে মন্দিরে গিয়ে ঢুকেছিল। আর তারপরেই তার ভয়ঙ্কর চিৎকারে বাড়ির সক্কলের ঘুম ভেঙে যায়। চিৎকার শুনে রামদাস ছুটেও এসেছিল। তবে কিনা একে তো রামদাসের বয়স হয়েছে, চোখে ভাল দেখতে পায় না, তার উপরে আবার তখন রাত পুরোপুরি কাটেনি, চতুর্দিকে অন্ধকার, তাই লণ্ঠন জ্বেলে তার মন্দিরে এসে পৌঁছতে পৌঁছতেই সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেল।”

“রামদাস এসে কী দেখল?”

“দেখল যে ঠাকুরঘরের মেঝে একেবারে রক্তে ভেসে গেছে, আর সেই রক্তের উপরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে রয়েছে তার নাতনি।”

“মুর্তিটিও যে উধাও হয়েছে, তা তখনও বুঝতে পারেনি রামদাস?”

“বোঝবার মতন অবস্থাই তখন তার ছিল না।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “রঙ্গিলার ওই অবস্থা দেখে সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। নিরু ইতিমধ্যে তার ঘর থেকে ছুটে চলে এসেছিল। এসে পড়েছিলেন আমার মা, পিসিমা আর পুরুতঠাকুরও। তবে, মূর্তিটি যে নেই, নিরুই সেটা প্রথম টের পায়।”

“রঙ্গিলা কি চোরকে চিনতে পেরেছিল?” আমি প্রশ্ন করলুম, “সানে রঙ্গিলা কি তেমন কোনও কথা বলেছে?”

“কথা?” অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন সত্যপ্রকাশ। বললেন, “সে তো এখনও কথাই বলছে না। বলতে গেলে সে তো এখনও বেহুঁশ হয়েই পড়ে আছে।”

“একবারও জ্ঞান ফেরেনি তার?” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন।

“তবে আর বলছি কী,” হাত উলটে সত্যপ্রকাশ বললেন, “গত বুধবার ভোর রাত্তিরের ঘটনা এটা…তারপর পুরো ছ-ছ’টা দিন কেটে গেল, অথচ অবস্থা এখনও যথাপূর্বম্। জ্ঞান যে একেবারেই ফেরেনি, তা অবশ্য নয়, তবে কিনা এখনও একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে… মানে একটা ট্রমাটিক এক্সপিরিয়েন্স তো, ধকলটা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ফ্যালফ্যাল করে শুধু এদিক-ওদিক দেখছে, কিন্তু কাউকে যে চিনতে পারছে, এমন মনে হয় না।”

“হাসপাতালে দেননি কেন?”

“কী করে দেব? এখানে হাসপাতাল বলতে তো সেই আলিপুরদুয়ার। কাছাকাছি একটা রুর‍্যাল হেল্থ সেন্টার আছে বটে, কিন্তু একে তো মাস তিনেক হল সেখানে ডাক্তার নেই, তার উপরে আবার যন্ত্রপাতি আর ওষুধপত্রের স্টকও যৎসামান্য, পারতপক্ষে তাই সেখানে কেউ যেতে চায় না।”

“তা হলে ওকে দেখছে কে?”

“হাসিমারার ডাক্তার সরকার। মানুষটি ভাল, অভিজ্ঞও বটেন, তা ছাড়া তাঁর দায়িত্ববোধের তুলনা নেই। রোজ বিকেলে এসে দেখে যান। মাথায় স্টিচ যা করবার তিনিই করেছেন। ব্যান্ডেজ-ট্যান্ডেজ সব তিনি নিজের হাতে করেন। আবার তা পালটাবার দরকার হলেও নিজের হাতেই পালটে দেন।”

“তিনিই তা হলে প্রথম থেকে দেখছেন?”

“একদম প্রথম থেকে। খবর পেয়েই ভদ্রলোক ছুটে এসেছিলেন। ওই যে বললুম, মানুষটির দায়িত্ববোধের সত্যি তুলনা হয় না।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই! তারপর প্রসঙ্গ পালটে জিজ্ঞেস করলেন, “রাত্তিরে নিশ্চয় মন্দিরের দরজায় তালা দেওয়া থাকত?”

“বাইরের গেটে থাকত না, থাকত শুধু যে-ঘরে বিগ্রহের পুজো হয়, সেই ঘরে।”

“তার চাবি কার কাছে থাকত?”

“রঙ্গিলার কাছে। শেষ-রাত্তিরে সে-ই গিয়ে ঠাকুরঘরের দরজা খুলত। কিন্তু বুধবার ভোর রাত্তিরে তার আগেই কেউ নিশ্চয় তালা ভেঙে ঠাকুরঘরে ঢুকেছিল।”

“কিন্তু বিগ্রহ নিয়ে পালাবার আগেই সে রঙ্গিলার সামনে পড়ে যায়, কেমন?”

“তা-ই তো মনে হয়।”

“ভাঙা তালাটা খুঁজে পেয়েছিলেন?”

“না,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “বিস্তর খুঁজেও সেটা পাওয়া যায়নি। এখন যেটা লাগিয়ে রাখা সেটা নতুন তালা।”

“আগের তালার চাবিটা নিশ্চয় হারিয়ে যায়নি?”

“সেটা কেন হারাবে, সেটা তো রঙ্গিলার কাছেই ছিল, সেই চাবি দিয়েই তো সেদিনকার মতো সেদিনও তালা খুলে ঠাকুরঘরে ঢুকতে গিয়েছিল। আমি সেটা রেখে দিয়েছি।”

“চাবিটা একবার দেখতে পারি?”

টেবিলের টানা খুলে বেশ বড় সাইজের একটা পেতলের চাবি বার করে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন সত্যপ্রকাশ। বললেন, “রঙ্গিলার মুঠোর মধ্যেই ছিল এটা।”

চাবিটা হাতে নিয়ে মাত্র এক পলক সেটাকে দেখেই ভাদুড়ি শশাই বললেন, “বুঝেছি।”

মুকুন্দপুরের মনসা – ১৫

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কী বুঝেছেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বলছি। কিন্তু তার আগে একবার রামদাসকে ডাকুন।”

একটা প্লেটে সুপুরি, লবঙ্গ আর এলাচদানা নিয়ে নিরু এসে বসবার ঘরে ঢুকেছিল। প্লেটটাকে সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রেখে সে-ই গিয়ে ডেকে আনল রামদাসকে।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রামদাস, এই চাবিটা তুমি চেনো?”

পেতলের চাবিটা হাতে নিয়ে রামদাস বলল, “এটা তো সেই তালার চাবি, যা ভেঙে চোর সেদিন ঠাকুরঘরে ঢুকেছিল।”

“এ-চাবি কার কাছে থাকত?”

“রঙ্গিলার কাছে।”

“সব সময়ে তারই কাছে থাকত? ভাল করে ভেবে দ্যাখো।”

“ভাববার কিছু নেই বাবু,” রামদাস বলল, “সব সময়ে তারই কাছে থাকত।”

“আর কেউ এই চানি দিয়ে ঠাকুরঘরের দরজা কখনও খোলেনি কিংবা বন্ধ করেনি?”

“রঙ্গিলা তা আর-কাউকে করতে দিলে তো করবে। না বাবু, এ-চাবি সে কক্ষনো কাউকে দিত না। আমাকেও না। শেষ-রাত্তিরে নিজে গিয়ে ঠাকুরঘরের দরজা খুলত, তারপর সন্ধের পরে নিজেই আবার দরজায় তালাচাবি লাগাত।”

“এ-কাজ ও কতদিন থেকে করছে?”

“তা বছর সাতেক হল।”

“রঙ্গিলার বয়েস এখন কত?”

একটু ভেবে নিয়ে রামদাস বলল, “গত আষাঢ় মাসে ও সতেরো পেরিয়ে আঠারোর পড়েছে।”

“তার মানে ওর বয়েস যখন বছর-দশেক, তখন থেকেই রঙ্গিলা এ-কাজ করছে, কেমন?”

“হ্যাঁ বাবু,” রামদাস বলল, “ঠাকুরঘরের কাজ তার আগে কর্তা-মা আর পিসিমাই করতেন। তাঁরাই ভোর-রাতে দরজা খুলতেন, তারপর সন্ধের আরতি হয়ে গেলে দরজায় তালা-চাবি লাগিয়ে দিতেন। তা বয়েস হয়েছে তো, সেইজন্যে আর এত সব ঝক্কি ওঁরা সামলাতে পারছিলেন না। বছর সাতেক আগে একদিন রঙ্গিলার হাতে ঠাকুরঘরের চাবি তুলে দিয়ে ওঁরা বললেন, ‘নাগ- পঞ্চমীর রাত্তিরে তোর জন্ম, মা-মনসার কাজকর্ম এবারে তুই-ই বুঝে নে। ঠাকুরঘরের দরজা খোলা, দরজা বন্ধ করা, পুজো-আচ্চার জোগাড়যন্তর করা, সবকিছুর ভার এখন থেকে তোর উপরেই রইল।’ তা সেই চাবি ও-মেয়ে একদিনের তরেও হাতছাড়া করেনি।”

“নাগ-পঞ্চমীর রাত্তিরে ওর জন্ম বুঝি?”

উত্তরটা সত্যপ্রকাশ দিলেন। বললেন, “হ্যাঁ, আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমীতে এখানে মস্ত মেলা হয়, সেই মেলার রাত্তিরেই ও জন্মেছিল।”

ভাদুড়িমশাই কী যেন ভাবলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “মন্দিরের কাজ তো নেহাত কম নয়। দশ বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে এত সব কাজ একাই করত?”

রামদাস বলল, “একা করত না, বাবু, ওকে সাহায্য করবার জন্যে খোকাবাবু দু’দুজন লোক দিয়েছিলেন। এই গাঁয়েরই লোক। তা বছর দুয়েক আগে রঙ্গিলা গিয়ে কর্তা-মা’কে বলল, ‘ওদের তুমি অন্য কাজে লাগাও ঠাকুমা, ওদের কাজকর্ম আমার পছন্দ হয় না, যা পারি আমি একাই করব।’ তা সেই থেকে ও একাই সবকিছু সামলাচ্ছে।”

“কিন্তু ছোটখাটো জ্বরজারিও তো লোকের হয়। তাও কি গত দু’বছরে ওর হয়নি।”

“তা কেন হবে না,” রামদাস বলল, “ওরও হয়েছে। কিন্তু সে-সব যেন ও গেরাহ্যিই করত না। তারই মধ্যে শেষ-রাত্তিরে উঠে ও ঠাকুরঘরের দরজা খুলেছে, বাসনপত্র মেজেছে, ঘর-বারান্দা ধুয়ে-মুছে সাফ রেখেছে, পুজোর জোগাড়যন্তর করেছে, তারপর আরতি হয়ে গেলে সন্ধের পরে আবার চাবিও লাগিয়েছে নিজের হাতে।”

“অর্থাৎ চাবিটা ও কক্ষনো কাউকে দিত না, কেমন?”

“কক্ষনো দিত না।”

“কিন্তু আমরা যখন তালা কিনি, প্রত্যেকটা তালার সঙ্গেই তখন দু-দুটো চাবি পাওয়া যায়। সত্যবাবু, আপনাদের এই তালারও নিশ্চয় দু-দুটো চাবি ছিল। অন্য চাবিটা কোথায়? সেটা বেহাত হয়নি তো?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “না, বেহাত হয়নি। যে-সব দলিলপত্র কি চাবি আমার রোজ-রোজ দরকার হয় না, গয়নাগাঁটির সঙ্গে সেগুলোও আমি লকারে রাখি। এইরকম আরও কয়েকটা চাবির সঙ্গে সেটাও শিলিগুড়িতে আমার ব্যাঙ্কের লকারে রয়েছে। না না, সেটা বেহাত হয়নি, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”

“চোর তা হলে তালা ভেঙেই ঢুকেছিল, কেমন?” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞাসা করলেন।

“তা ছাড়া আর কীভাবে ঢুকবে?”

“চাবি দেখে বুঝতে পারছি, তালাটা ছোট নয়, বেশ বড় মাপের। তার উপরে আবার নামী কোম্পানির তালা। ভাঙতে গেলে একটা শব্দ তো হবে।”

“সেইটেই তো আশ্চর্য ব্যাপার বাবু,” রামদাস বলল, “কোনও শব্দই আমরা শুনিনি। ঠাকুরমশাই বলছেন, তিনি লোকজন ছুটে পালাবার শব্দ শুনেছেন, একটা গাড়ির শব্দও পেয়েছিলেন। কিন্তু তেমন-কোনও শব্দ না শুনেছেন পিসিমা, না শুনেছেন কর্তা-মা, না শুনেছে নিরুদিদি। আর আমি যে শুনিনি, সে তো বললুমই।”

“ঠাকুরমশাই কে?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমাদের মন্দিরের পুরুতঠাকুর। গোবিন্দ ভট্‌চাজ।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভদ্রলোককে এখনও দেখিনি। দেখা হবে নিশ্চয়। তখন জিজ্ঞেস করা যাবে। এখন যা বলছি, একটু ভেবে দেখুন, মিঃ চৌধুরি। এমন হওয়া কি একেবারেই অসম্ভব যে, তালা ভাঙবার কোনও দরকারই চোরের হয়নি?”

অবাক হয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “তার মানে? যে-চাবি রঙ্গিলার কাছে থাকে, সেটা সে হাতছাড়া করেনি, আর তার ডুপ্লিকেটটা রয়েছে আমার ব্যাঙ্কের লকারে, অথচ চোরেরও দরকার হল না তালা ভাঙবার। তা কী করে হয়? এ কি পি.সি. সরকারের ম্যাজিক?”

ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “ম্যাজিক কেন হবে? খুবই সহজ ব্যাপার। ধরুন, মঙ্গলবার সন্ধের সময় রঙ্গিলা যখন ঠাকুরঘরের দরজায় তালাচাবি দেয়, তার আগে থাকতেই চোর হয়তো সেখানে লুকিয়ে ছিল। তারপর বুধবার ভোর হবার আগে রঙ্গিলা যখন ঠাকুরঘরের দরজা খুলে ভিতরে ঢোকে, চোর তখন তার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। কী, এমনটা কি হতেই পারে না?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “না, তা পারে না। তার কারণ, ঠাকুরঘরের মধ্যে শুধু ওই মূর্তি আর কিছু বাসনপত্র ছাড়া কিছুই থাকে না। মূর্তিটিও তো বড় নয়, নেহাতই ছোট। হাইট মেরেকেটে ফুট খানেক। এক-আধ ইঞ্চি কমও হতে পারে। তার পিছনে লুকোনো যায় না। চোর তা হলে কোণায় লুকিয়ে বসে থাকবে? না না, সেটা সম্ভব নয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দরজার পাল্লার পিছনেও কি লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়?”

রামদাস বলল, “তাও সম্ভব নয়, বাবু।”

“কেন?”

উত্তরটা সত্যপ্রকাশ দিলেন। বললেন, “ঠাকুরঘরটা খুব ছোট তো, এমনিতেই চলাফেরার জায়গা বড় কম, তার উপরে আবার দরজার পাল্লা খোলে ভিতরের দিকে, তা সেই পাল্লা দুটো যদি ঘরের মধ্যে বেরিয়ে থাকে তো জায়গা আরও কমে যাচ্ছে। সেইটে যাতে না হয়, তার জন্যে দরজার পাল্লায় এমনভাবে ফোল্ডিং কব্জা লাগানো হয়েছে, যাতে পাল্লা দুটো ভিতরের দিকে পুরোপুরি ঘুরে গিয়ে একেবারে দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে যায়। দরজার পাল্লার পিছনে কারও লুকিয়ে থাকার কোনও প্রশ্নই তাই উঠছে না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক্, মঙ্গলবার সন্ধেয় ঠাকুরঘরের দরজা বন্ধ হবার আগেই যে চোর সেখানে ঢুকে পড়েনি, অন্তত এই একটা ব্যাপারে তা হলে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। তাতেও অবশ্য প্রমাণ হচ্ছে না যে, ঠাকুরঘরে ঢুকবার জন্যে চোরকে তালা ভাঙতেই হয়েছিল।”

আমি চুপ করে রইলুম।

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না, মিঃ ভাদুড়ি। আগে থাকতেও ঢোকেনি, আবার তালাও ভাঙেনি, চোর তা হলে ঢুকল কী করে?”

ভাদুড়িমশাই এ-কথার সরাসরি কোনও উত্তর না দিয়ে বললেন, “চোর যদি তালা ভেঙেহ ঢুকে থাকে, তো সেই ভাঙা তালাটা কোথায়? ভাঙা তালাটা তো আর এমন-কিছু মূল্যবান জিন্সি নয় যে, মূর্তির সঙ্গে সেটাকেও সে নিয়ে যাবে। তালাটা ওখানে পড়ে থাকবার কথা। তাই না?”

মাথা চুলকে সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা বটে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এক হতে পারে যে, তাঙা-তালায় পাছে তার আঙুলের ছাপ থেকে যায়, তাই তালাটাও সে সরিয়েছে। সে-ক্ষেত্রে আমাকে ধরে নিতে হয় যে, চোর শুধুই লোভী নয, খুব চালাকও বটে। কিন্তু অত চালাকই যদি হবে, তো খালি হাতে সে তালা ভাঙবে না, হাতে এটা দস্তানা পরে নেবে, কি অন্তত একটা কাপড় জড়িয়ে নেবে, যাতে তালায় কিছুতেই তার আঙুলের ছাপ থেকে না যায়।”

সত্যপ্রকাশের মুখ দেখে মনে হচ্চিল, তিনি বিভ্রান্ত বোধ করছেন। চোর কীভাবে ঠাকুরঘরে ঢুকেছে, তা নিয়ে যেমন রামদাসের, তেমনি তাঁরও ছিল অতি সহজ সিদ্ধান্ত। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, এটা স্রেফ তালা ভেঙে ঘরে ঢোকার ব্যাপার। ব্যাপারটাকে যে আরও হরেক দিক থেকে দেখা যেতে পারে, তা তাঁর ধারণাতেই ছিল না। সত্যি বলতে কী, ধারণায় ছিল না আমারও। ব্যাণ্ডারটা যেন ক্রমেই আরও তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল।

বললুম, “আপনার কী মনে হয় বলুন দেখি। চোর কি সত্যিই খুব চালাক?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “চালাক তো হতেই পারে, আবার না-ও পারে। কিন্তু আপাতত তা নিয়ে গবেষণা করে লাভ নেই। আপাতত যা বুঝতে পারছি, সেটা এই যে, ভাঙা-তালাটা পাওয়া যায়নি। তাই না মিঃ চৌধুরি?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “এটা আপনি ঠিকই বলেছেন। সত্যিই সেটা পাওয়া যায়নি। তবে খোঁজাখুঁজি করবার ব্যাপারে কোনও গাফিলতি ছিল না। আমরা তো খুঁজেছিই, পুলিশও নেহাত কম খোঁজেনি। কিন্তু না, কোথাও সেটা পাওয়া গেল না।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “না-পাওয়াই স্বাভাবিক। তালাটা আসলে ভাঙা হয়নি, খোলা হয়েছিল।”

সত্যপ্রকাশ অবাক হয়ে বললেন, “খোলা হয়েছিল? এ তো বড় আশ্চর্য কথা বলছেন আপনি! কী দিয়ে খুলবে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন, যা দিয়ে সবাই তালা খোলে। চাবি দিয়ে।”

“চাবি সে পাবে কোথায়?”

ভাদুড়ি শাইয়ের উত্তরটা আর শোনা হল না। নিরু এসে ঘরে ঢুকল। সত্যপ্রকাশকে বলল, “দাদাবাবু, গোপালের মা এসে বলল, থানা থেকে লোক এসেছে। এখানে পাঠিয়ে দিতে বলব?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আরে না না, ভিতর-বাড়িতে আর পুলিশ ঢোকাবার দরকার নেই। কাচারি ঘরে বসাতে বলে দাও। আমি আসছি।”

তারপর সোফা ছেড়ে উঠতে-উঠতে বললেন, “আপনারাও চলুন না। পুলিশের লোক কদ্দুর কী হদিস করল, শুনবেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ, পুলিশের লোকেরা আমাদের বিশেষ ছিন্দ করে না। কী জানি কেন, আমাদের সম্পর্কে ওদের একটু অ্যালার্জি আছে। না মশাই, আমার আর গিয়ে কাজ নেই। এমন কী, চুরির কিনারা করতে যে আমাদের এখানে ডাকা হয়েছে, তাও বোধহয় ওদের এখন না জানালেই ভাল। আপনারা যান, আমি বরং এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে ততক্ষণ একটু কথা বলি।”

রামদাসকে নিয়ে সত্যপ্রকাশ বেরিয়ে গেলেন।

ভাদুড়িমশাই নিরুকে বললেন, “দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন।”

মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল নিরু। বসল না। বলল, “আমি এ-বাড়িতে কাজ করি, আমাকে ‘আপনি’ বলবেন না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, তুমিই বলব। তবে তুমি এ-বাড়ির কাজ করো বলে নয়, বয়সেও তুমি আমার চেয়ে অনেক ছোট, তাই বলব। তা নিরু, তোমাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করবার ছিল যে।”

নিরু বলল, “পরে করলে হয় না? আমাকে এখুনি আবার রান্নাঘরে ফিরতে হবে।”

“কেন, রান্নার লোক আজ আসেনি?”

‘এসেছে, কিন্তু তাকে সব দেখিয়ে দিতে হয়। নইলে সে যা রান্না করবে, আপনারা তা মুখে তুলতে পারবেন না।”

ঘরের দেওয়ালে এক সধবা ভদ্রমহিলার একটি রঙিন ফোটোগ্রাফ ঝুলছে। ছবির ফ্রেম ঘিরে ঝুলছে ফুলের মালা। কার ছবি, জানি না। তবে মালা দেখে মনে হয়, ভদ্রমহিলা বেঁচে নেই। কাল রাত্তিরে ছবিটা আমার চোখে পড়েনি। সম্ভবত ভাদুড়িমশাইয়েরও পড়েনি। আজ কিন্তু তিনি কথা বলতে-বলতেই ছবিটা বারবার দেখছিলেন।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, কয়েকটা কথা জানবার ছিল, তবে পরে জানলেও ক্ষতি নেই। আপাতত শুধু দুটো প্রশ্নের জবাব দাও। বেশিক্ষণ তোমাকে আটকে রাখব না। কী, তাতে আপত্তি আছে?”

“না না, আপত্তি থাকবে কেন, কী বলবেন বলুন?”

“এ-বাড়িতে তুমি কত দিন হল কাজে ঢুকেছ?”

“তা বছর পাঁচেক হল।”

“বাঃ,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর মাত্র একটা প্রশ্ন করব। বাস্, তারপরেই তোমার ছুটি। দেওয়ালে টাঙানো ওই ছবিটা কার?”

মুখ না তুলেই নিরু বলল, “দাদাবাবুর স্ত্রীর।”

“তোমার দিদির নয়?”

এতক্ষণে মুখ তুলল নিরু। স্থির, বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে। তারপর আবার মুখ নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

১৬
ঘরে এখন আর কেউ নেই। চুপচাপ আমরা বসে আছি। মুখ ফুটে একবার জিজ্ঞেস করেছিলুম, “কী ব্যাপার বলুন তো,” কিন্তু ভাদুড়িমশাই আমার কথার কোনও জবাব দেননি। গম্ভীর থমথমে মুখ। বুঝতে পারছিলুম, কিছু একটা বিষয়ে তিনি চিন্তা করছেন। আমার প্রশ্নটা যে তিনি শুনতে পেরেছেন এমনও মনে হল না।

মিনিট পাঁচ-দশ পরে তিনি আমার দিকে তাকালেন। দেখলুম, অদ্ভুত একটা হাসি ছড়িয়ে গিয়েছে তাঁর মুখে। চোখে ঝিলিক দিচ্ছে কৌতুকের আলো। বললেন, “কিরণবাবু, আমার অবস্থা এতক্ষণ ছিল দৃষ্টিহীন সেই মানুষটির মতো, অমাবস্যার রাত্তিরে জানালা-দরজা-বন্ধ একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে যে কিনা একটা কালো বেড়ালকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।”

বললুম, “তার মানে?”

“তার মানে একদিকে মূর্তি উধাও, অন্য দিকে চাঁদসদাগর দি গ্রেট। আবার তারই মাঝখানে এই ব্যাপার! না মশাই, আমি আর এখন অন্ধ নই, চোখ ফুটেছে, অমাবস্যার রাত পুইয়েছে, ঘরের মধ্যে একটু-একটু আলোও ঢুকছে; তা এই রকম যদি চলতে থাকে তো বেড়ালটাকে নিশ্চয় ধরে ফেলতে পারব।”

কিছুই বুঝতে পারলুম না। তবে এইটুকু বুঝলুম যে, কিছুক্ষণ এখন চুপ করে থাকাই ভাল।

সত্যপ্রকাশ ফিরলেন প্রায় আধ ঘন্টা বাদে। ফিরেই ধপাস করে সোফায় বসে পড়ে বললেন, “দূর দূর, যত সব অপদার্থ! কাজের কাজ কিছু করতে পারেনি, নাহক শুধু বকর-বকর করে আমার সময় নষ্ট করা! …আর এক প্রস্ত চা হয়ে যাক্, কেমন?”

“হোক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু পুলিশ একটা-কিছু আন্দাজ করে তো এগোচ্ছে। সেটা কী?”

সত্যপ্রকাশ দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, “আর-এক পট চা দিয়ে যাও।” তারপর ফিরে এসে ফের সোফায় বসে হাত উলটে বললেন, “কি আন্দাজ করতে পারেনি। সাধে কি আর অপদার্থ বলছি! এদিনে আবার বায়নার অন্ত নেই! কেন এসেছিল জানেন?”

“কেন? কিছু-একটা সুবিধে আদায় করতে?”

“ঠিক ধরেছেন! ঠিক ধরেছেন! এ্যাবসলিউটলি রাইট! কী করে বুঝলেন মশাই?”

“এর আর বোঝাবুঝির কী আছে?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা বায়নাটা কী?”

“আর বলেন কেন, দারোগাবাবুর মেজো শালা আলিপুরদুয়ারে চাকরি করে, সেখান থেকে তাকে শিলিগুড়িতে ট্রান্সফার করা হয়েছে। তা আলিপুরদুয়ারের পাট তুলে সংসারের যাবতীয় লটবহর নিয়ে তাকে এখন শিলিগুড়িতে যেতে হবে তো, তাই বলছিল যে, একটা দিনের জন্যে আমার একটা ট্রাক যদি তাকে দিই তো বেচারার বড্ড উপকার হয়।”

“বেচারাই বটে!”

“শুধু কি তা-ই,” তেতো গলায় সত্যপ্রকাশ বললেন, “শিলিগুড়িতে পৌঁছেই তো আর সব গুছিয়ে উঠতে পারবে না, মেজো শালাবাবুটিব হোল্ ফ্যামিলিকে তাই অন্তত দুটো দিনের জন্যে আমার হোটেলে নাকি থাকতে দিতে হবে। দু’দুটো বর চাই। বুঝুন বা পার।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ট্রাকের ভাড়া আর হোটেল চার্সে দেবে তো?”

“তা হলে আর বলছি কী। কিস্তু দেবে না মশাই, কিসু দেবে না।”

“যাচ্চলে! তবে আর আপনি ট্রাকই বা দেবেন কেন” হোটেলেই বা রাখবেন কেন?”

“উপায় কী,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “জলে থেকে এদি-বা কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করা চলে, ডাঙায় থেকে পুলিশকে চটানো চলে না। ও হ্যাঁ, একটা কণা আপনাদের বলা হয়নি। শিলিগুড়ি থেকে আমার হোটেলের ম্যানেজার সুবিমল এই খানিক আগে এখানে একটা মেসেজ নিয়ে এসেছে। তার সঙ্গে একটু বাদেই আমাকে শিলিগুড়ি যেতে হবে। এখন তো এগারোটা বাজে। এই ধরুন মোটামুটি বারোটা নাগাদ আমরা রওনা হব।”

জিজ্ঞেস করলুম, “আমরা মানে?”

“আমরা মানে আমি আর সুবিমল। আপনারা এখানে থাকুন, ভাবুন, বিশ্রাম করুন। আর হ্যাঁ, সুবিমল গাড়ি নিয়ে এসেছে. সেই গাড়িতেই আমি যাচ্ছি। আমার গাড়িটা রইল। ইচ্ছে হলে বিকেলে আলিপুরদুয়ার থেকে একটু ঘুরও আসতে পারেন। আপনারা ড্রাইভ করতে পারেন তো?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “পারি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “না-পারলেও ক্ষতি ছিল না। রামদাস অতি চমৎকার গাড়ি চালায়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজ আর আমরা কোথাও যাচ্ছি না। কিন্তু শিলিগুড়ি থেকে আপনি ফিরছেন কবে?”

“কবে মানে?” সত্যপ্রকাশ বললেন, “কাজটা জরুরি, না গিয়ে উপায় নেই, তাই যাচ্ছি, তবে সময় বেশি লাগবে না, রাত্তিরেই ফিরে আসছি। অবশ্য একটু বেশি-রাত হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আপনারা খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়বেন, আমার জন্যে বসে থাকবেন না।”

“ঠিক আছে। কিন্তু ‘শাপনি থাকছেন না বলেই দু-একটা কথা আপনাকে জানাতে চাই, কেননা সেই অনুযায়ী কিছু ব্যবস্থা করা দরকার।”

চা এসে গিয়েছিল। যে নিয়ে এল, সে যে নিরু নয়, সেটা লক্ষ করলুম। পট থেকে চা ঢেলে দুধ-চিনি মেশাতে মেশাতে স্ত্যপ্রকাশ বললেন, “গোপালের মা, রান্নাঘরে বলে দাও যে, একটু বাদেই আমরা খেতে বসব।”

গোপালের মা বেরিয়ে গেল। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “এবারে বলুন কী বলবেন।”

“খুড়োমশাইয়ের উপরে সবাই খাপ্পা হয়ে আছে, সেটা তো জানেন?”

“জানি বই কী।”

“কিন্তু কতটা খাপ্পা হয়ে আছে, তা হয়তো জানেন না। যা বুঝতে পারছি, তাঁর উপরে একটা বিচ্ছিরি রকমের হামলা হওয়া কিছু বিচিত্র নয়। সেটা আটকাতে হবে। আপনাকে এখানে ভালবাসে সবাই। তাই সবাইকে আপনি বুঝিয়ে বলুন, দু-একটা দিন তারা একটু ধৈর্য ধরে থাকুক। সবাইকে যদি না বলা সম্ভব হয়, তো দু-চারজন প্রবীণ লোককে বলুন। নিজে যদি না সময় পান তো রঙ্গনাথবাবুকে ডেকে পাঠান। তিনি বুঝিয়ে বললেও কাজ হবে।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “এই ব্যাপার? এতটা তো আমি বুঝতে পারিনি। ঠিক আছে। যাবার আগে রঙ্গনাথবাবুকে আমি বলে যাচ্ছি। এনি আদার প্রবলেম?”

“অন্তত আজকের রাতটার জন্যে রঙ্গিলার ঘরে একটা ভাল রকমের পাহারার ব্যবস্থা করে দিন।”

“কেন?”

“বুঝতে পারছেন না? চোর যদি বাইরে থেকে এসে থাকে তো ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু সে তো এই গ্রামেরও কেউ হতে পারে। তা যদি হয় তো একটা মারাত্মক বিপদের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।”

“এ-কথা বলছেন কেন?”

“এই জন্যে বলছি যে, রঙ্গিলা সে-ক্ষেত্রে চোরকে যে শুধুমাত্র দেখেছে, তা নয়, চিনতে ও পেরেছে। অর্থাৎ রঙ্গিলা য?ি সুস্থ হয়ে ওঠে, তো চোরকে সে শনাক্ত করতে পারবে। চোর যে তার আগেই রঙ্গিলাকে খতম করতে চাইলে, এটা আপনি বুঝতে পারছেন না?”

“ওরে বাবা,” শিউরে উঠে সত্যপ্রকাশ বললেন, “এটা তো আমি ভেবে দেখিনি। ঠিক আছে, জগদীশকে আমি ডেকে পাঠাচ্ছি। সে এসে আপনার সঙ্গে শো করুক। পাহারার ব্যাপারে যা-কিছু ইনস্ট্রাকশন দেবার, তাকে দেবেন।”

“জগদীশ কে?”

“আমার হোটেলের দরোয়ান। সুবিমলের সঙ্গে শিলিগুড়ি থেকে এসেছে। খুনের আসামি। পাঁচ বছর জেল খেটেছে। তবে বিশ্বাসী লোক।”

“আর একটা কথা ছিল।”

“বলুন।”

“রঙ্গিলার ডাক্তারবাবু আজ বিকেলে আসবেন তো?”

“নিশ্চয় আসবেন।”

“তিনি তো শুনেছি হাসিমারার লোক, আর আপনারাও তো হাসিমারা হয়েই শিলিগুড়ি যাচ্ছেন, তা যাবার পথে তাঁকে একটু বলে যাবেন যে, আমার একটু সর্দি-জ্বরের মতো হয়েছে, রঙ্গিলাকে দেখবার আগে যেন আমাদের ঘরে এসে আমাকে একটু দেখে যান।”

“সত্যি জ্বর হয়েছে নাকি?”

“আরে না! আসলে ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার।”

“ঠিক আছে,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমি বাথরুমে ঢুকছি। আপনারাও চটপট চান করে নিন। রাত্রিরের খাওয়া। হয়তো একসঙ্গে বসে হবে না, অন্তত দুপুরেরটা একসঙ্গে হোক।”

স্নান করে বেরিয়ে ডাইনিং হলে ঢুকে দেখলুম, সত্যপ্রকাশ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন। তাঁর পাশে যিনি বসে আছেন, থ্রি-পিস স্যুট পরা সেই যুবকটির বয়স বছর ত্রিশ পঁয়ত্রিশের বেশি হবে না। সত্যপ্রকাশ আলাপ করিয়ে দিলেন। “ইনি মিঃ সুবিমল সেন, আমাদের হোটেলের ম্যানেজার। আর এঁরা হচ্ছেন মিঃ ভাদুড়ি আর মিঃ চ্যাটার্জি। আমার বন্ধু। কলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছেন, এদিকটা একটু ঘুরে দেখবেন।”

লক্ষ করলুম, আমরা যে মনসামূর্তি উদ্ধারের কাজে এসেছি, সত্যপ্রকাশ সেটা চেপে গেলেন। Tমস্কার বিনিময়ের পরে অবশ্য সুবিমল সেনের সঙ্গে আমাদের আলাপ বিশেষ এগোল না। সুবিমল যে খবর নিয়ে এসেছেন, বলতে গেলে সারাক্ষণ শুধু তারই সূত্রে তাঁর মালিকের সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলে যেতে লাগলেন। তার থেকে যা বুঝতে পারলুম, সেটা এই যে শিলিগুড়িতে সত্যপ্রকাশ আরও ‘একটা হোটেল খুলতে চান, তার জন্যে জমি কিনেছেন, গাঁটের কড়ি খরচা করে তার ফার্স্ট ফেজের কাজ চুকিয়েও রেখেছেন, কিন্তু টাকার অভাবে কাজটা এগোচ্ছে না। ব্যাঙ্ক লোনের জন্যে যে চেষ্টা করছিলেন, তাতে বিশেষ সুবিধে হচ্ছিল না, হরেক গাঁটে আটকে গিয়ে ব্যাপারটা গত এক বছর ধরে ঝুলে ছিল। তবে কিনা এবারে হয়তো একটা সুরাহা হতে পারে। ব্যাঙ্কের জেনারেল ম্যানেজার কলকাতা থেকে মাত্র দু’দিনের জন্যে শিলিগুড়িতে এসেছেন, সত্যপ্রকাশ আজই বিকেলের মধ্যে যদি একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেন তো খুব ভাল হয়।

সত্যপ্রকাশ যে খুব-একটা কথা বলছিলেন, তা নয়। যা বলবার সুবিমলই বলে যাচ্ছিলেন, আর সত্যপ্রকাশ বাঝে-মাঝে হুঁ-হ্যাঁ দিয়ে যাচ্ছিলেন মাত্র। খাওয়া যখন শেষ হয়ে এসেছে, তখন তিনি বললেন, “হোটেলের বুকিং এখন কীরকম?”

“একসেলেন্ট। এইটেই তো সিজন স্যার।”

“দিন দুয়েকের জন্যে দুটো ঘর দিতে পারবে? …না না, ভাল ঘরগুলো চাইছি না, আলো-বাতাস ঢোকে না, এমন এঁদো ঘরও তো গোটা কয়েক আছে, তার থেকে দুটো ছেড়ে দেওয়া যায়?”

“দিন পনরোর মধ্যে পারব না, স্যার। এখন একেবারে টোটাল বুকিং চলছে। …কেন, কার জন্যে ঘর চাই স্যার?”

“এক দারোগার শালাবাবুর জন্যে। ব্যাটা আবার শিলিগুড়িতেই পোস্টিং পেয়েছে।”

“ও, এই ব্যাপার?” মালিকের সামনে যতটা উঁচু গায় হাসা যায়, সুবিমল ঠিক ততটা উঁচু গলায় হেসে বললেন, “তা হলে তো একে পয়সা দেবে না, তার উপরে আবার যেখানে-সেখানে জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো ফেলে কার্পেট দুটোও পুড়িয়ে ছাড়বে!”

বিষণ্ণ গলায় সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ, তা তো পোড়াতেই পারে।”

“তার চেয়ে এক কাজ করা যাক,” সুবিমল বললেন, “আমাদের হোটেলে না-ঢুকিয়ে বরং কাছাকাছি কোনও শস্তার হোটেলে চালান করে দিই। তার চার্জেস না হয় আমরাই মিটিয়ে দেব।”

“যা ভাল বোঝো করো।”

সত্যপ্রকাশের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তিনি উঠে পড়লেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা বিশ্রাম করুন। যাকে যা বলবার, সব বলে তবেই আমি শিলিগুড়ি রওনা হব; তার আগে একবার দেখাও করে যাব আপনাদের সঙ্গে। চিন্তার কিছু নেই। রাত্তিরেই তো ফিরছি। তখন সব শুনব।”

হাতমুখ ধুয়ে আমরা আমাদের ঘরে গিয়ে ঢুকলুম।

১৭
দুপুরের খাওয়ার পাট চুকতে আজ বিশেষ দেরি হয়নি। কিন্তু ঘরে ঢুকেই বুঝতে পারা গেল যে, তারই মধ্যে কেউ এখানে এসে যত্ন করে সব গুছিয়ে রেখেছে। বিছানা একেবারে টান করে পাতা, পায়ের কাছে ভাঁজ করা লাইসাম্পি, ছাইদান পরিষ্কার, বালিশে একটা ভাঁজ পর্যন্ত নেই। শিয়রের দিকের দেওয়ালে যে দুটি ওয়াল-ভাস রয়েছে, কাল রাত্তিরে তো নয়ই, আজও এতক্ষণ সেটা খেয়াল করিনি। এখন দেখলুম, কেউ তার মধ্যে টাটকা দু’গুচ্ছ গোলাপ সাজিয়ে রেখেছে।

ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খেয়ে নিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে সবে ভাবছি যে, এবারে একটু গড়িয়ে নিলে মন্দ হয় না, এমন সময়ে জগদীশ এল।

এমন-কিছু মানুষ আছে, যাদের দেখলেই কেমন যেন অস্বস্তি হয়, গা’টা একটু শিরশির করে। ‘হোটেলের দরোয়ান’ শুনে ভেবেছিলুম লম্বা-চওড়া বিশাল গালপাট্টাওয়ালা জবরদস্ত পালোয়ান হবে। তা তো নয়ই, বরং সিড়িঙ্গে-গোছের চেহারা। মাঝারি হাইট, রং কালো, দুই ভুরুর একটার নীচে চোখ আছে, অন্যটার নীচে নেই। যে-চোখটা আছে, তারও চাউনি স্থির। এত স্থির যে, মানুষের চোখ বলে মনেই হয় না।

নিজের পরিচয় দিয়ে জগদীশ বলল, “বড়বাবু আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে বললেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা পাহারা দেবার কাজ আছে জগদীশ।”

“কোথায় পাহারা দিতে হবে বলুন।”

“এই বাড়িতেই।”

“গোটা বাড়ি?”

“না, না, ভাদুড়িমশাই বললেন, “গোটা বাড়ি নয়, শুধু একটা ঘরের উপর নজর রাখলেই চলবে। বাইরের উঠোনের পুবদিকের ঘরটা।’

জগদীশের স্থির চোখে যেন এতক্ষণে একটু বিস্ময় ফুটল। কিন্তু সেও মাত্র এক লহমার জন্য। পরমুহূর্তেই তার চাউনি আবার সেই আগের মতোই স্থির। বলল, “যে-ঘরে রামদাসদাদা থাকে?”

‘হ্যাঁ, যে-ঘরে রামদাস আর তার নাতনি থাকে। এখন অবশ্য আয়াও আছে একজন। সেই ঘরটার উপরে নজর রাখতে হবে তোমাকে। তবে এখন নয়, সন্ধের পর থেকে সারা রাত। নজর রাখবে, কেউ যেন ওই ঘরের ধারেকাছেও যেতে না পারে। কেউ যদি যাবার চেষ্টা করে, তাকে আটকাতে হবে। পারবে?”

“পারব, বাবু।’

“কী দিয়ে আটকাবে? লাঠি চালাতে জানো?”

আমি লাঠি চালাই না,” জগদীশ বলল, “ছোরা চালাই।”

“বটে?”

“আগে আমি সার্কাসে ছোরার খেলা দেখাতাম, নির্বিকার নিরুত্তাপ গলায় জগদীশ বলল, “মাঝরাত্তিরে কেউ যদি ওই ঘরের কাছে যায়, তাকে গেঁথে ফেলব।”

“না, না,” শিউরে উঠে ভাদুড়িমশাই বললেন, “একেবারে গেঁথে ফেলবার দরকার নেই। সত্যিই যদি কেউ আসে তো তাকে আটকে দিলেই চলবে।”

“ঠিক আছে, তা হলে আটকে দেব।”

“মনে রেখো, কাজটা খুব জরুরি। সারা রাত জেগে থাকা চাই, আর জেগে থেকে নজর রাখা চাই ওই ঘরটার উপরে। পারবে তো?”

জগদীশ বলল, “রাত্তিরে আমি ঘুমোই না।

আর একটাও কথা না বলে ঘর থেকে সে বেরিয়ে গেল।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী মনে হয় কিরণবাবু?”

“কী আর মনে হবে, গেঁথে ফেলার কথাটা যে-ভাবে বলল, তাতে তো আমি কেঁপে গিয়েছিলুম মশাই। উরেব্বাবা, এ তো ডেঞ্জারাস লোক।”

“এ ডেঞ্জারাস মানে উইথ এ ওয়ান-ট্র্যাক মাইন্ড,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবং সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে ডেঞ্জারাস ব্যাপার। এ-সব মানুষ দু’রকম বোঝে না, যা-কিছু বুঝবার একরকম বোঝে। অনেকটা যেন দম-দেওয়া সেই গাড়ির মতো, যার কোনও ড্রাইভার নেই। সামনে যে-ই পড়ুক, তাকে চাপা দিয়ে বেরিয়ে যাবে।”

“ঠিক ঠিক,” আমি বললুম, “আপনি যদি না স্পষ্ট করে নিষেধ করে দিতেন তো রাত্তিরে কেউ রঙ্গিলাদের ঘরের কাছে গেলে নির্ঘাত ও তার লাশ ফেলে দিত।”

“অর্থাৎ চুরির কিনারা করতে এসে খুনের মামলায় জড়িয়ে যেতুম আমরা।”

ভাদুড়িমশাই হাসতে লাগলেন।

আমি বললুম, “কিন্তু চুরির কিনারাই বা হচ্ছে কোথায়? আচ্ছা, রঙ্গনাথবাবু সেই বউটিকে যা বললেন, তার থেকে কোনও সন্দেহ হয় না আপনার?”

“কী বললেন যেন রঙ্গনাথ?”

“ওই যে তিনি বউটিকে বললেন, ‘যেখানে থেকে নিয়ে এসেছ সেইখানেই আবার রেখে এসো।’ কথাটা আপনার মনে নেই?”

“ও, সেই কথাটা? তা কথাটা তো আপনি পুরো শোনেননি। তাই না?”

“তা শুনিনি ঠিকই, কিন্তু যেটুকু শুনেছি, সেইটুকুও তো কম সন্দেহজনক নয়।”

ভাদুড়িমশাই স্থির চোখে আমাকে দেখলেন কিছুক্ষণ। তারপর তাঁর চোখে একটু কৌতুক যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল। বললেন, “কথাটা শুনে আপনার কী মনে হল?”

“মনে হল যে, লোভে পড়ে ওই বউটিই সম্ভবত মনসামূর্তি চুরি করেছে।”

“শুধু চুরি করলেই তো হবে না, সেটা বিক্রি করা চাই।”

“বা রে, বিক্রি করবে বলেই তো চুরি করেছিল।”

“আমার কাছে করবে?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ তো আর মাচার লাউ কি পুকুরের মাছ্ নয় যে, হাটে নিয়ে গেলেই খদ্দের মিলে যাবে। তা হলে?”

“হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রির কথা উঠছে কেন? বাইরের লোক তো এখানে আসেই। তাদের মধ্যে মতলববাজ লোক দু’চারজন থাকাও কিছু বিচিত্র নয়। তাদেরই কেউ হয়তো বউটিকে বুঝিয়েছে যে, মূর্তিটা চুরি করে তার হাতে তুলে দিতে পারলেই বউটিকে সে হাজার দু’চার পাইয়ে দেবে। সেটা কি খুবই অসম্ভব?”

“অসম্ভব হবে কেন? তবে কিনা মূর্তিটা চুরি হবার পরেও তো পুরো ছ’ছটা দিন কেটে গেল। বউটি তা হলে এখনও সেই লোকের হাতে মূর্তিটা তুলে দেয়নি কেন?”

“লোকটা আর ইতিমধ্যে আসেনি হয়তো। মানে সে হয়তো সুযোগের অপেক্ষায় আছে। হয়তো ভাবছে যে, উত্তেজনাটা একটু থিতিয়ে আসুক, তারপরে এক ফাঁকে সে ফের এই গ্রামে এসে বউটির কাছ থেকে ওই চোরাই মূর্তি হাতিয়ে নেবে।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কথাটা নেহাত মন্দ বলেননি কিরণবাবু। অর্থাৎ কিনা আপনার থিয়োরিটা একেবারে হেসে উড়িয়ে দেবার মতো নয়।”

“তা হলে আপনি হাসছেন কেন?”

“হাসছি এইজন্যে যে, তার পরেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়।”

“এর মধ্যে আবার প্রশ্ন কীসের?”

“প্রশ্নটা এই যে, মুর্তিটা যেখান থেকে সে নিয়ে এসেছে, রঙ্গনাথবাবু সেইখনেই আবার মূর্তিটা তাকে রেখে আসতে বলছেন কেন?”

এবারে আমার হাবার পালা। বললুম, “তারও একটা সহজ ব্যাখ্যা আছে ভাদুড়িমশাই। কেন রেখে আসতে বলছেন জানেন?”

“জানি না। আপনি বুঝিয়ে বলুন।”

“বলছি। আমার ধারণা, গ্রামের চাষিবাড়ির বউ তো, আসলে খুবই ধর্মভীরু, বাইরের লোকের উশকানিতে লোভে পড়ে হঠাৎ মনসামূর্তি চুরি করেছিল, কিন্তু তারপর থেকেই সে ভয়ে ভয়ে রয়েছে। শুধু ধরা পড়বার ভয় নয়, ছেলেপুলের অকল্যাণ হতে পারে, এই ভয়টাও রয়েছে পুরোমাত্রায়।”

“তা তো থাকতেই পারে।”

“পারে তো? ব্যাস, সেইজন্যেই সে এখন ঘোর অশান্তির মধ্যে রয়েছে। ঠিক বুঝতে পারছে না যে, এখন কী করা যায়। আর তাই রঙ্গনাথবাবুর কাছে সব কথা খুলে বলে সে একটা পরামর্শ চাইতে গিয়েছিল।”

“তারপর?”

“তারপর আর কী, রঙ্গনাথ সৎ লোক, যে রকমের পরামর্শ দেওয়া তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক, ঠিক সেই রকমের পরামর্শই তিনি দিলেন। বললেন যে, যেখানে থেকে নিয়ে এসেছ, সেইখানেই আবার রেখে এসো।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ব্রেভো। শাবাশ। চমৎকার। তা হলে তো কাজ মিটেই গেল। বউণ্ট যদি আজই এক ফাঁকে মূর্তিটাকে ফের মন্দিরের মধ্যে রেখে যায়, তা হলে আব ভাবনা কী, ‘মামবা কলকাতা ফিরে যেতে পারি।”

ভাদুড়িমশাইয়ের কথার মধ্যে যে একটা ঠাট্টার সুর বেজে উঠল, তাতেই বুঝতে পারলুম যে, আমার থিয়োরিটা তাঁর মোটেই পছন্দ হয়নি। বললুম, “বেশ তো, আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয়, তো আপনি কী ভাবছেন, সেটা অন্তত খুলে বলুন।”

“আমি কি আর একরকম ভাবছি,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি ভাবছি পাঁচ-ছ রকত্বের ভাবনা। কিন্তু মুশকিলটা কী হয়েছে জানেন, যতই ভাবছি, ততই যেন ভাবনাগুলো আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছে। এক-একবার মনে হচ্ছে, এইবারে বোধহয় জট খুলবে; কিন্তু না, খুলছে না।”

“বউটি তা হলে চুরি করেনি?”

অন্যমনস্কভাবে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী জানি, করতেও পারে।”

“রঙ্গনাথবাবুকে খোলাখুলি জিজ্ঞেস করব?”

ভাদুড়িমশাই সরাসরি আমার মুখের দিকে তাকালেন। তাঁর মুখে ফের হাসি ছড়িয়ে পড়ল। বললেন, “বেশ তো, তাঁকে জিজ্ঞেস করুন।”

রামদাস এসে ঘরে ঢুকল। বলল, “আপনাদের কিছু লাগবে? মানে সিগারেট কি দেশলাই?”

বললুম, “সবই তো রয়েছে। কিচ্ছু লাগবে না।—ও হ্যাঁ, সত্যপ্রকাশবাবু কি শিলিগুড়ি রওনা হয়ে গেছেন?”

“না, খোকাবাবু এখন কাগজপত্তর সব গুছিয়ে নিচ্ছেন। রওনা হবার আগে আপনাদের সঙ্গে দেখা করে যাবেন।”

“ঠিক আছে, তুমি যেতে পারো।”

রামদাস তবু দাঁড়িয়ে রইল। বুঝলুম যে, কিছু বলতে চায়। বললুম, “আর-কিছু বলবে?”

“হ্যাঁ, বাবু,” রামদাস বলল, “মাস্টারমশাই এসেছেন। আপনাদের সঙ্গে একবার দেখা করতে চান।’

“মাস্টারমশাই মানে?”

“ওই মানে আমাদের রঙ্গনাথবাবু। বললেন যে, একবার দেখা করতে পারলে ভাল হত।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আচ্ছা রামদাস, এই রঙ্গনাথবাবু মানুষটি কেমন?”

“খুব ভাল মানুষ, বাবু।” রামদাস বলল, “সাতে-পাঁচে থাকেন না, পয়সাওলা মানুষ তো নন, তবু সাধ্যিমতো গাঁয়ের লোকদের সাহায্য করেন। আপদে বিপদে সকলেই তাই ওঁরই কাছে ছুটে যায়। আমাদের খোকাবাবুও ওঁকে খুব ভালবাসেন।”

“তা তো বাসেনই, “ভাদুড়িমশাই বললেন, বিশ্বাসও করেন খুব। তা নইলে আর ওঁকে এখানে ডেকে এনে ইস্কুলের ভার দেবেন কেন? আর তা ছাড়া মানুষটি দেখলুম খুব হাসিখুশি। কারও বিরুদ্ধে কোনও নালিশ নেই।

“ঠিক বলেছেন বাবু। মাস্টারমশাই একেবারে সদানন্দ মানুষ।” রামদাস বলল, “তবে কিনা দুঃখ ওঁরও কম নেই। একটামাত্র ছেলে, সেটা মানুষ হয়নি। নিজে মাস্টার, পাঁচজনের ছেলেপুলেকে লেখাপড়া শেখান, অথচ কী কান্ড দেখুন, নিজের ছেলেটা লেখাপড়া শিখল না, ইস্কুলের পড়া শেষ হবার আগেই কুসঙ্গে গিয়ে ভিড়ল।”

“সে এখন কোথায় থাকে?”

“তা তো জানি না। তবে শুনতে পাই যে, কোথায় কোন এক গুন্ডার দলে গিয়ে নাম লিখিয়েছে। বুড়ো বাপ-মায়ের একটা খোঁজ পর্যন্ত নেয় না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী আর করা যাবে, সবই অদৃষ্ট।…..তো ঠিক আছে, তুমি গিয়ে রঙ্গনাথবাবুকে পাঠিয়ে দাও।”

রামদাস চলে গেল।

একটু বাদে রঙ্গনাথ এসে ঘরে ঢুকলেন। কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বললেন, “আপনাদের বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটালুম, তার জন্যে ক্ষমা চাইছি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে, অত কিন্তু-কিন্তু করছেন কেন? বসুন।”

রঙ্গনাথ বললেন, “বেশিক্ষণ বসব না। আপনাদেরও বিশ্রাম করা দরকার, ওদিকে আমিও দুজন রোগীকে আমার বাড়িতে রেখে এসেছি, ফিরে গিয়ে তাদের ওষুধ দিতে হবে।”

বললুম, “তার মানে? আপনি তো এখানকার মাস্টারমশাই, সেই সঙ্গে ডাক্তারিও করেন নাকি?”

রঙ্গনাথ যেন আরও কুঁকড়ে গেলেন। বললেন, “ওই মানে একটু হোমিওপ্যাথি করি আর কি। এখানে তো ধারেকাছে কোনও ডাক্তার নেই, ভাল ডাক্তার বলতে সেই এক হাসিমারার ডাক্তার সরকার। মানুষটি তিনি অবশ্য খুবই ভাল, ভিজিট না-নিয়েও চিকিচ্ছে করেন, তবে কিনা সামান্য জ্বরজারিতে তো আর তাঁকে কল দেওয়া যায় না, তাই ছোটখাটো অসুখ-বিসুখ হলে…..এই ধরুন সর্দিদুর কি ওই রকমের কিছু হলে এরা আমার কাছেই ছুটে আসে…..যা-ই হোক, যে-কথাটা বলতে এসেছিলুম ..আপনারা কোনও চিন্তা করবেন না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অর্থাৎ সত্যপ্রকাশবাবু আপনাকে সব বলেছেন?”

রঙ্গনাথ বললেন, “হ্যাঁ, বলেছেন। আমিও এখানকার লোকজনদের বুঝিয়ে বলব যে, ক’টা দিন তারা একটু ধৈর্য ধরে থাকুক, হঠাৎ রেগে গিয়ে যেন সাধুবাবার উপরে হামলা-টামলা না করে।”

“আমরা যে আসলে মনসামূর্তির সন্ধান করতে এসেছি, তা বলেছেন?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ, তাও বলেছেন। তবে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি ছাড়া আর-কেউ তা জানে না। জানবেও না।”

রঙ্গনাথ উঠে পড়লেন। তারপর পকেট থেকে একটা কৌটো বার করে একই রকমের কুণ্ঠিত গলায় বললেন, “সকালে আপনারা আমার বাড়িতে পরের ধুলো দিয়েছিলেন, কিন্তু তখন শুধু চা ছাড়া আর-কিছু আপনাদের দিতে পারিনি। আমার স্ত্রী তাই ক’টা নারকোলের নাড়ু পাঠিয়ে দিয়েছেন। আপনারা খেলে আমরা দুজনেই খুব তৃপ্তি পাব।”

ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে কৌটোটা তুলে দিয়ে বিদায় নিলেন রঙ্গনাথ। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আবার বামদাস এসে ঘরে ঢুকল।

১৮
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী ব্যাপার রামদাস?”

“খোকাবাবু আমাকে দেখতে পাঠালেন আপনারা ঘুমিয়ে পড়েছেন কি না। আসলে সুবিমলবাবুকে দিয়ে গোটা দুই চিঠি টাইপ করিয়ে নিচ্ছেন তো, তাই আসতে একটু দেরি হচ্ছে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হোক, আমি বরং সেই ফাঁকে তোমার সঙ্গে দু-একটা কথা সেরে নিই।”

রামদাস বলল, “কী কথা?”

“ওই চাবির কথা। আচ্ছা রামদাস, রঙ্গিলা যে ঠাকুরঘরের চাবিটা কক্ষনো কাউকে দিত না, তা তো তুমি বলেইছ। এখন বলো তো, ঢাবিটা কি গত দু’বছরের মধ্যে কক্ষনো সে হারিয়েও ফেলেনি? মানে এক-আধ ঘন্টার জন্যেও না?”

অবাক হয়ে রামদাস বলল, “এক-আধ ঘন্টার জন্যে? তার পর মাথা চুলকে একটু ভেবে বলল, ও হ্যাঁ, এই সেদিনই একবার হারিয়েছিল বটে, তবে ঘন্টাখানেকের মধ্যে আবার পেয়েও যায়।”

ভাদুড়িমশাইয়ের চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠল হঠাৎ। বললেন, “এটা কবেকার কথা?”

“বুধবার তো সর্বনাশটা হল, এটা তার একদিন…..না না, একদিন নয়, দু’দিন আগের ব্যাপার।”

“অর্থাৎ সোমবার চাবিটা হারিয়েছিল?”

“হ্যাঁ বাবু, কাল সোমবারের আগের সোমবার। তবে ওই যে বললুম, খানিক বাদে আবার পেয়েও গিয়েছিল।”

“কোথায় হারিয়েছিল?”

“ঠাকুরঘরের মধ্যে।”

“পেল কোথায়?”

“সেইখানেই। হোম করবার জন্যে নরম মাটির দরকার হয় তো। বালি হলেও অবিশ্যি চলে। তবে এখানে আর নিত্যি-নিত্যি বালি পাওয়া যাবে কোথায়। তাই নেঝের উপর নরম মাটির বেদীমতন করে তার উপরে ইট সাজিয়ে হোমের আগুন জ্বালতে হয়, নইলে মেঝের শান ফেটে যাবার ভয় থাকে। তো ঠাকুরঘরের মেঝেয় এক তাল নরম মাটি রাখা ছিল, খুঁজতে খুঁজতে দেখা গেল যে, সেই মাটির উপরেই চাবিটা পড়ে রয়েছে।”

“ব্যাস, আর-কিছু জিজ্ঞেস করবার দরকার নেই। এবারে তুমি যেতে পারো।”

রামদাস ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ভাদুড়িমশাই একগাল হেসে বললেন, “জট অন্তত একটুখানি খুলে গেল। এতক্ষণ তো শুধুই সন্দেহ করছিলুম, কিরণবাবু, এবারে নিশ্চিত হয়ে বলি তালাটা ভাঙা হয়নি। যে ঢুকেছিল, সে চাবি দিয়ে তালা খুলেই ঢুকেছিল।”

“কিন্তু সে কে?”

“তা কী করে বলব? তবে আপনি যাকে সন্দেহ করছেন সেই বউটি বোধহয় নয়। গাঁয়ের এক চাষিবাড়ির বউয়ের মাথায় কি আর এত প্যাঁচ খেলবে? ও হ্যাঁ, রঙ্গনাথ তো এসেছিলেন, কিন্তু কই, আপনি তো তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।”

“ভুলে গিয়েছিলুম।”

“তার জন্যে আক্ষেপ করবেন না। মাঝে-মাঝে এমন এক-আধটা কথা ভুলে যাওয়াহ্ ভাল।”

“এ-কথা বলছেন কেন?”

“এইজন্যে বলছি যে, চাষিবাড়ির বউটিকে রঙ্গনাথ যা বলেছেন, তার ব্যাখ্যা শুনলে আপনার পিলে চমকে যেত।”

বুঝতে পারলুম, ভাদুড়িমশাই এখন আর কিছু বলবেন না, স্রেফ য়ালির ভালায় কথা চালিয়ে যাবেন। তা হলে বরং একটু ঘুমিয়ে নেওয়াই ভাল।

কিন্তু ঘুমোনো গেল না। চেয়ার ছেড়ে বিছানার দিকে এগোবার উপক্রম করতে-না-করতেই সত্যপ্রকাশ ঘরে ঢুকে বললেন, “একটু দেরি হয়ে গেল। রঙ্গনাথবাবু এসেছিলেন তো?”

“তা এসেছিলেন।”

“ওঁকে যা বলবার সব বলে দিয়েছি। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন, ছেটকাকার উপরে অন্তত এখুনি কোনও হামলা হবে না। …..ও হ্যাঁ, জগদীশকে যা ইসস্ট্রাকশন দেবার, তা আশা করি দিয়েছেন?”

“তা দিয়েছি,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু লোকটা সত্যি নির্ভরযোগ্য তো?”

“একেবারে হানড্রেড পার্সেন্ট।”

“রঙ্গিলার উপরে হামলা হলে আটকাতে পারবে?”

“ওকে আপনি ছুরি চালাতে দেখেননি বলেই প্রশ্নটা করলেন। অন্ধকারেও ওর তাক কখনও ফশকায় না। জগদীশ যে খুনের আসামি, তা কি বলেছি আপনাদের?”

“বলেছেন।”

“কিন্তু কেন খুন করেছিল, তা বোধহয় বলিনি। আসলে খুনটা না করলে ও নিজেই সেদিন খতম হয়ে যেত। রাত্তিরবেলা ভাটিখানা থেকে একটা অন্ধকার পথ দিয়ে বাড়ি ফিরছিল, সেই সময়ে ওর উপরে হামলা হয়। লাঠি চালিয়েছিল। তবে লাঠিটা ওর মাথায় পড়েনি, কাঁধ ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। বাস, অন্ধকারের মধ্যেই ছুরি চালিয়ে দেয় জগদীশ। চিৎকার শুনে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে আসে। এসে টর্চ ফেলে যা দেখতে পায়, তাতে তাদের চক্ষুঃস্থির। কুলিবস্তির রাজদেও কুর্মি রাস্তার উপরে চিত হয়ে পড়ে আছে। আর তার গলার মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে রয়েছে একটা ছুরির ফলা।”

বললুম, “বটে?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তবে আর বলছি কী। তবে কিনা স্রেফ ওই ছুরিটার জন্যেই জগদীশ ধরা পড়ে গেল। ফাঁসিই হয়ে যেত, কিন্তু আমি ভাল ল-ইয়ারের ব্যবস্থা করেছিলুম তো, তিনি প্রমাণ করে ছাড়লেন যে, ছুরিটা চালানো হয়েছিল ইন সেল্ফ ডিফেন্স। লাঠির বাড়ি লেগে ভাগ্যিস ওর কাঁধটা জখম হয়েছিল, তা সেইটেই হয়ে দাঁড়াল আমাদের ল-ইয়ারের তুরুপের তাস। ফলে আর ফাঁসি হল না, তার বদলে হল পাঁচ বছরের জেল। তারও কিছুটা মকুব হয়ে গিয়ে মাস কয়েক আগে ছাড়া পেয়েছে।”

আমি বললুম, “ওরে বাবা, এ যে ভয়ানক ব্যাপার।”

“ভয়ানক বলে ভয়ানক,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা ছুরি চালাবার ব্যাপারে ওর হাতযশের কথাটা এখানেও সবাই জানে তো, তাই রাত্তিরে ও যদি পাহারায় থাকে, তো রঙ্গিলার ঘরের ধারেকাছেও কেউ ঘেঁষবে না।

বুঝতে পারছিলুম যে, ভদ্রলোক আমাদের একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিন্ত করতে চাইছেন। হয়তো সেই কারণেই কথাবার্তাও বলছেন একটু বেশি-মাত্রায় সপ্রতিভ ভঙ্গিতে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, কিংবা হয়তো সেইজন্যেই, আমার মনে হচ্ছিল যে, এ-ব্যাপারে সত্যপ্রকাশ নিজেও বিশেষ নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। রঙ্গিলার উপরে যে হামলা হতে পারে, ভাদুড়িমশাইয়ের মুখে এই সম্ভাবনার কথাটা শুনে একটু ভয়ও পেয়েছেন হয়তো।

ভাদুড়িমশাইও সেটা বুঝতে পেরে থাকবেন। সম্ভবত সেইজন্যেই তিনি সত্যপ্রকাশকে বললেন, “জগদীশ যখন এতই নির্ভরযোগ্য লোক, তখন আর ভয় কী। যান, তা হলে শিলিগুড়িতে গিয়ে কাজটা সেরেই আসুন।”

সত্যপ্রকাশ বলেন, “কী জানেন, শিলিগুড়িতে যে আজই যেতে হবে, সেটা আগে বুঝতে পারিনি। যাবার বিশেষ ইচ্ছেও আমার নেই। কিন্তু …..”

“না গেলে ব্যাবসার ক্ষতি হবে, এই তো?”

“এমনিতে কোনও ক্ষতি হবার কথা নয়, মিঃ ভাদুড়ি,” সত্যপ্রকাশ অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘ব্যাবসার কাজকর্ম যাকে যা বোঝাবার সব বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি, এখন যদি তিন-চার দিন শিলিগুড়িতে না যাই তো কোনও অসুবিধে হবে না, ওরা ঠিকই চালিয়ে নিতে পারনে।”

“তা হলে আর যাচ্ছেন কেন?”

“সুবিমল কী বলল শুনলে না?”

“শুনেছি। একটা ব্যাঙ্ক-লোনের কথা বলছিলেন।”

“ঠিকই শুনেছেন। নতুন যে হোটেলটার কাজে হাত দিয়েছি, তার জন্যে এখুনি অন্তত লাখ পঞ্চাশেক টাকা দরকার। অথচ ব্যাঙ্ক থেকে এই কাজের জন্যে যে লোন পাবার কথা, প্রায় এক বছর ধরে সেটা আটকে আছে।”

“আটকে আছে কেন?”

“সেইটেই বুঝতে পারছি না।” হাত উল্টে সত্যপ্রকাশ বললেন, “কাগজপত্র পরিষ্কার, কেউ কোনও অবজেকশান দেয়নি, প্ল্যানও সেই কবেই পাশ হয়ে গেছে, অ্যান্ড ইয়েট দে আর সিটিং টাইট অন মাই অ্যাপ্লিকেশান। ন্যাশনালাইজড হবার পরে ব্যাঙ্কগুলো একেবারে গোল্লায় গেছে মশাই।”

“ঘুষ চায়?”

“চাইতেই পারে। কাট-মানির কারবার সর্বত্র চলে, এখানেই বা চলবে না কেন? আমি তোমাকে পঞ্চাশ লাখ পাইয়ে দিচ্ছি, তার থেকে তুমিও আমাকে হাজার পাঁচ-দশ পাইয়ে দাও, এ তো অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। পঞ্চাশ হাজার চেয়ে বসলেও কিছু বলবার নেই। তা সেটা খুলে বলবে তো। তাও বলছে না, আবার লোনটাকেও নাহক আটকে রেখেছে।”

“কেন আটকে রেখেছে, আন্দাজ করতে পারছেন কিছু?”

“একেবারে যে পারছি না, তা নয়, সত্যপ্রকাশ বললেন, “দমদম এয়ারপোর্টে তো বিপিনবিহারী অনেকে আপনারা দেখেছেন। বিপিন যে শুধু আমার কাস্টমার, তা নয়, বন্ধুও বটে। সে তো বলছে, কলকাতার এক অবাঙালি ব্যবসায়ীও শিলিগুড়িতে একটা থ্রি-স্টার হোটেল খুলতে চায়। লোটা আসলে লোহার কারবারি, এখন সে তার কালো টাকাকে সাদা করবার জন্যে অন্য দিকে হাত বাড়াতে চাইছে। বিপিনের খবর, আমিও যে আর-একটা লাক্সারি হোটেল খুলতে চলেছি, এটা তার পছন্দ নয়। লাইন থেকে লোকটা আমাকে হটাতে চায়। তাই আমার ব্যাঙ্কের লোকাল এজেন্টকে ঘুষ খাইয়ে হাত করেছে, যাতে আ’মি লোনটা না পাই।”

“কিন্তু সেটা না-পেলে তো আপনি খুবই অসুবিধেয় পড়বেন, তাই না?”

“পড়ব কী মশাই, অলরেডি পড়েছি।” তেতো গলায় সত্যপ্রকাশ বললেন, “নিজের বলতে যেখানে যা-কিছু ছিল সবই তো ওর মধ্যে ঢেলেছি আমি। ফার্স্ট ফেজের কনস্ট্রাকশানও কমপ্লিট, এখন ব্যাঙ্ক যদি না লোনটা স্যাংশান করে, তা হলে তো একেবারে ধনেপ্রাণে মারা পড়ব। একদিকে যেমন আমার বিস্তর টাকা ওই লোহা আর সিমেন্টের খাঁচার মধ্যে ব্লকড হয়ে রইল, অন্যদিকে তেমনি ক্রেডিটেও তো নেহাত কম কাজ হয়নি, সেকেন্ড ফেজের কনস্ট্রাকশান শুরু হবার আগে তার অন্তত বারো-আনা পেমেন্ট করা চাই, সেটার ব্যবস্থা না হলে পাওনাদারেরা কী করবে জানেন?”

বললুম, “মামলা করবে?”

“সবাই করবে না। আগে যারা আমার সঙ্গে কাজ-কারবার করেনি, একমাত্র তাদেরই কেউ-কেউ হয়তো করতে পারে। কিন্তু তা নিয়ে আমি ভাবছি না, মামলার ফয়সালা তো আর তক্ষুনি-তক্ষুনি হয় না, ফরসালা হতে বছরের পর বছর কেটে যায়, তার মধ্যে আমি টাকা তোলার একটা ব্যবস্থা নিশ্চয় করে ফেলতে পারব। আমার ভাবনা লেবার-কনট্রাক্টর সম্পৎলালকে নিয়ে। তাকে আপনারা চেনেন না, সে মামলা-মোকদ্দমার ধার ধারে না, কালীপুজোর আগেই যদি না তার পাওনা মেটাই তো তিনবাত্তির কাছে গাড়ি আটকে দিয়ে সে আমার মাথা ফাটাবে।”

ফ্লাশ খেলাকে অনেকে তিনপাত্তির খেলা বলে, সেটা জানতুম। কিন্তু এই। তিনবাত্তিটা আবার কী ব্যাপার? কথাটা জিজ্ঞেস করতে সত্যপ্রকাশ ক্লিষ্ট হেসে বললেন, “বড়রাস্তার একটা মোড়। ওই মোড় ঘুরেই তো কাল শিলিগুড়ি থেকে বেরুলুম।”

ভাদুড়িমশাই কিছু ভাবছিলেন। বললেন, “সম্পৎলাল সম্পর্কে যা বললেন, তাতে লোকটা সম্পর্কে একটু কৌতূহল হচ্ছে। কেমন দেখতে বলুন তো? রং টকটকে ফর্সা?”

“হ্যাঁ। কিন্তু এ-সব কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?” সত্যপ্রকাশ বললেন, “লোকটাকে আপনি চেনেন নাকি?”

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভুরু নেই, কপালে মস্ত জরুর। কী, মিলছে?”

সত্যপ্রকাশ হাঁ করে, কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে। তারপর বললন, “বুঝতে পারছি, সম্পৎলালকে আপনি চেনেন।”

“চিনি বই কী।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বছর বারো আগে ধানবাদে যে ব্যাঙ্ক-ডাকাতি হয়, ব্যাঙ্কের তরফে তার তদন্তের ভার আমার উপরেই পড়েছিল যে। ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার খুন হয়েছিলেন। খুন করেছিল শুনীশ্বর। সে অবশ্য ডাকাত দলের লিডার ছিল না। লিডারের নাম ফকিরা সিং। ওযান অব দা মোস্ট নোটোরিয়াস নাফিয়া লিডারস অব ধানবাদ। আগে ছিল ওয়াগন-ব্রেকার। সেইসঙ্গে রেল-কলোনির প্রতিটি দোকান থেকে প্রোটেকশান-মানি আদায় করত। হঠাৎ পুলিশ-পাহারায় কড়াকড়ি হওয়ায় দিন কয়েক একটু চুপচাপ থেকে তারপর একদিন এই ব্যাঙ্কে এসে হানা দেয়। তাও ধরা পড়ত না, ক্যাশিয়ারটি যদি না তাঁর ডাইং ডিক্লারেশনে ফকিরার গ্যাঙের একটা লোকের চেহারার একেবারে নিখুঁত ডেসক্রিপশান দিতেন। ডেসক্রিপশান অনুযায়ী লোকটিকে তো ধরা হল। তারপর সে-ই হয়ে গেল রাজসাক্ষী। ভাগ্যিস হয়েছিল। নইলে মুনীশ্বরেরও ফাঁসি হত না আর ফকিরাকেও দশ বছরের জন্যে ঘানি ঘোরাতে হত না। সত্যি বলতে কী, লোকটা যদি না মুখ খুলত, গ্যাঙের একজনও ধরা পড়ত না তা হলে।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “এ-সব কথা উঠছে কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এইজন্যে উঠছে যে, ধানবাদের সেই রাজসাক্ষীটিরও গায়ের রং ছিল টকটকে ফর্সা, তারও ভুরু বলতে কিছু ছিল না, আর তারও কপালে ছিল মস্ক জরুল। শুধু তা-ই নয়, নাম ছিল তারও সম্পৎলাল। অর্থাৎ কিনা ধানবাদের ওয়াগন-ব্রেকার এখন শিলিগুড়িতে এসে মিস্ত্রি-মজুর সাপ্লাইয়ের কারবার চালাচ্ছে। আশ্চর্য, লোকটা নিজের নাম পর্যন্ত পালটায়নি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ওরেব্বাবা, লোকটা যে দাঙ্গাবাজ, তা আমি জানতুম, কিন্তু ওর অ্যান্টিসিডেন্ট যে এইরকম, তা তো কল্পনাও করিনি। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার!”

আমি বললুম, “নামটা কেন পালটায়নি বলুন তো?”

বললুম,”নামটা

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পালটাবার কোনও দরকার আছে বলেই হয়তো মনে করেনি। শিলিগুড়িতে “ আর জানতে যাচ্ছে যে, ধানবাদে কী হয়েছিল। আর তা ছাড়া, সম্পৎলালের ভয় তো একমাত্র ফকিরাকে। তা সেই ফকিরারও দশ বছর জেল হয়ে গেল। দশ বছর তো আর নেহাত কম সময় নয়। তার মধ্যে কত কী ওলটপালট হয়ে যায়। যায় না?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা যায় বটে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যায়, আবার সব ক্ষেত্রে যে যায় না, তাও ঠিক। বিশেষ করে পালটে যায় না আন্ডারওয়ার্লডের কয়েকটা নিয়মকানুন, যা মান্য না-করার শাস্তি বড় ভয়ঙ্কর। যাদের সঙ্গে সে ওয়াগন ভেঙেছে, ব্যাঙ্ক লুঠ করেছে, লুঠের বখরা নিতেও ছাড়েনি, তাদের ধরিয়ে দিয়ে সেই নিয়ম ভেঙেছে সম্পৎলাল। তার শাস্তি তাকে পেতে হবে।”

“কে শাস্তি দেবে?” আমি জিজ্ঞেস করলুম।

“যে দেবে, বছর খানেক আগে সে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। … মিঃ চৌধুরি, সম্পংলাল যে শিলিগুড়িতে রয়েছে ফকিরা ত। নিশ্চয় জানে না। কিন্তু তা না-ই জানুক, আপনি যদি কালীপুজোর আগে সম্পৎলালের পাওনা না-ও মেটাতে পারেন, তবে তাতেও আপনার ভয় পাবার কিছু নেই।”

“এ-কথা বলছেন কেন?”

“ট্রেচারি করে কোনও নাফিয়োসো কখনও পার পায় না বলেই বলছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন শুধু একটা কাজই আপনাকে করতে হবে।”

“কী কাজ?”

“যে-কাউকে দিয়ে সম্পৎলালের কানে ধু এই কথাটা একবার তুলে দিতে হবে যে, ফকিরা সিং নামের একটা লোক শিলিগুড়িতে এসে সম্পৎলালের খোঁজ করছে। বাস, তারপর কী হয় দেখুন।”

সত্যপ্রকাশ তবুও যেন ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। বললেন, “তারপর কী হবে?”

“আর-কিছু হবে না, স্রেফ ফকিরার হাত থেকে জান বাঁচাবার তাগিদেই সম্পৎ অন্তত কিছুদিনের জন্যে শিলিগুড়ি থেকে সরে পড়বে।”

“তারপর যখন জানতে পারবে যে, ফকিরা বলে কেউ শিলিগুড়িতে আসেনি?”

“তখন সে আবার শিলিগুড়িতে ফিরে আসবে। তা আসুক না, আপনি তো ইতিমধ্যে বেশ কিছুটা সময় পেয়ে যাচ্ছেন। তার মধ্যে কি আর ব্যাঙ্ক-লোনের একটা হিল্লে হয়ে যাবে না?”

এতক্ষণে সত্যপ্রকাশের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন, “বাঁচালেন মশাই। কথাটা আমি আজই সম্পৎলালের কানে তুলে দেবার ব্যবস্থা করছি। ঠিক আছে, তা হলে আর দেরি করব না, বেরিয়ে পড়ি। যাবার পথে হাসিমারায় ডাক্তার সরকারকে বলে যাচ্ছি যে, বিকেলে এখানে এসে প্রথমেই যেন আপনার সঙ্গে দেখা করেন। চলি তা হলে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুধু একটা কথা বলে যান। সম্পৎলালের মতন লোককে আপনি লেবার-কনট্রাক্টের কাজটা দিয়েছিলেন কেন?”

“সাধে কি আর দিয়েছি,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “কাজটা ও নিজে এসে চাইল যে। মুশকিল কী জানেন, একবার যে-কাজ ও-লোকটা চেয়ে বসে, অন্য-কোনও লেবার-কনট্রাক্টর সে-কাজ আর ছুঁতেও সাহস পায় না।”

সত্যপ্রকাশ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

১৯
সত্যপ্রকাশের গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। বুঝতে পারলুম, সুবিমলকে নিয়ে তিনি শিলিগুড়ি রওনা হয়ে গেলেন।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রওনা হবার কথা ছিল বারোটায়, সেখানে দুটো বাজল। শিলিগুড়িতে পৌঁছে ব্যাঙ্কের জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে হবে; তা নেহাত শুকনো কথায় তো আর চিঁড়ে ভিজবে না, তাই ভদ্রলোককে হোটেলে নিয়ে এসে যথাসাধ্য খাতিরযত্নও করতে হবে নিশ্চয়। তার উপরে আবার শিলিগুড়ি পর্যন্ত যখন এসেছেন, ম্যানেজার-মশাই তখন কি আর একদিনের জন্যে দার্জিলিং থেকে বেড়িয়ে আসতে চাইবেন না?”

বললুম, “চাইতেই পারেন।”

“তার জন্যে গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সেটা অবশ্য সুবিমলই করে দিতে পারবে। তবে হ্যাঁ, লোনটা যাতে এবারে পাওয়াই যায়, তার জন্যে আজ রাত্তিরে যে একটা জব্বর ডিনারের ব্যবস্থা থাকবে, সেটাও আমরা ধরে নিতে পারি। ঠিক কি না?”

“বিলক্ষণ। ডিনারের ব্যবস্থা তো থাকবেই।”

“তার হোস্ট হচ্ছেন সত্যপ্রকাশ। সুতরাং ডিনারের পর্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ছুটি নেই। কেমন, ঠিক বলছি তো?”

“ষোলো-আনা বললে কমই বলা হয়, আঠারো আনা ঠিক।”

“ভাল। তা ডিনার-পর্ব শেষ হবে কখন?”

“এ-সব ডিনারে কি অ’র শুধু চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য থাকে ভাদুড়িমশাই?” হেসে বললুম, “পঞ্চাশ লাখ টাকা লোনের ব্যাপার তো, তাই ধরেই নেওয়া যায় যে, পেয়ও থাকবে প্রচুর। সুতরাং…”

আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সুতরাং রাত বারোটার আগে ডিনার শেষ হবার আশা নেই; আর তা যদি না থাকে, তো সত্যপ্রকাশ আজ আর মুকুন্দপুরে ফিরছেন না।”

“তা হলে?”

“তা হলে আর কী, কাল রাত্তিরে তো আপনার ঘুম হয়নি, এখন বরং একটু ঘুমিয়ে নেবার চেষ্টা করুন।”

বললুম, “ঘুম তো কাল আপনারও হয়নি, আপনিও একটু শুয়ে পড়লে পারেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দুপুরে আমার ঘুম হয় ন।।”

বললুম, “আমার হয়, তবে আজ আর হবে না। খাওয়ার পরে দুচোখের পাতা একটু জুড়ে আছিল ঠিকই, কিন্তু যে-ভাবে লোক আসতে শুরু করল, তাতে কি আর ঘুম হয়। প্রথমে এলেন রঙ্গনাথ, তারপর এলেন সত্যপ্রকাশ। আর রামদাস তে. কাজে-অকাজে মাঝে-মাঝেই আসছে। তার উপরে আবার যে-সর্দিজ্বর আপনার হয়নি, তার ওষুধ দিতে ডাক্তার সরকারও বোধহয় খানিক বাদেই এসে পড়বেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ডাক্তার সরকার আসার আগে এ-ঘরে সম্ভবত আরও একজন আসবে।”

“কে আসবে?”

“নিরু। দেখা যাক আমার অনুমানটা ঠিক কি না।”

নিরুর কথা তুলেই গিয়েছিলুম। বললুম, “সত্যপ্রকারে স্ত্রী কি সত্যি ওর দিদি হতেন নাকি?”

“আমার তো তা-ই মনে হয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি অবশ্য মুখ-চোখের মিল দেখে আন্দাজে একটা ঢিল ছুড়েছিলুম। কিন্তু সেটা বোধহয় ঠিক জায়গাতেই লেগেছে। তার ফলে কী হল বলতে পারেন?”

“কী হল?”

“কেসটা আরও জটিল হয়ে দাঁড়াল। অর্থাৎ এটা আর নেহাত একটা চুরির ব্যাপার হয়ে থাকল না। যা ছিল শুধুই একটা মূর্তি-চুরির ঘটনা, হঠাৎ তা একেবারে আলাদা একটা ডাইমেনশন পেয়ে যাচ্ছে।”

“আলাদা ডাইমেনশানের কথা পরে হবে। আগে বরং চুরির কথাটাই হোক। ওটার কিনারা হবে তো?”

“না-হবার কী আছে?” ভাদুড়িমশাই নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, “চাবির ব্যাপারট। যখন ধরতে পেরেছি, তখন ওটার কিন’র।ও করে ফেলতে পারব।”

“চাবির ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলুন দেখি।”

“বুঝিয়ে বলবার তো বিহু নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “চাবির গায়ে মাটি লেগে ছিল। শুকনো কাদামাটি। সেটা নদি আপনার নজরে পড়ত, তো আপনিও ব্যাপারটা বুঝতে পারতেন। কথা হচ্ছে, মাটি এল কোত্থেকে।”

“আপনার কী মনে হয়

“রামদাসের যা মনে হয়, আমার তা মনে হয় না।”

“অর্থাৎ?”

“রামদাস কী বলণ শুনলেন না? ওর ধারণা, সোমবার চাবিটা হারিয়ে গিয়েছিল। তবে কিনা হারানো-চাবিটা আবার খানিক বাদেই খুঁজে পাওয়া যায়। কোথায় পাওয়া যায়? না মেঝেয় ইট পেতে তার উপরে হোমের আগুন জ্বালে তো, তা সেই ইট পাতার জন্যে যে নরম মাটির দরকার হয়, ঠাকুরঘরের মধ্যে রাখা সেই মাটির উপরেই চাবিটা পড়ে ছিল। এবারে আমার কথাটা শুনুন। আমার ধারণা, চাবিটা হারিয়ে যায়নি, ওটা সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।”

“কে সরিয়েছিল?”

“যে-কেউ সরিয়ে থাকতে পারে। সারাদিন ধরে তো ঠাকুরঘরের মধ্যে লোকজন নেহাত কম ঢোকে না। তাদের যে-কারও পক্ষেই কাজটা করা সম্ভব। কিন্তু মজাটা কী জানেন?”

“কী?”

“এমনভাবে ওটা সরানো হয়েছিল, যাতে কারও কোনও সন্দেহ না হয়।”

আবার জিজ্ঞেস করলুম, “কে সরিয়েছিল?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে মশাই, সেটাই যদি জানতুম, তবে আর ভাবনা ছিল কী? এক্ষুনি গিয়ে শ্যাক করে তার ঘাড় কামড়ে ধরতুম। সেই সকাল থেকেই ভেবে যাচ্ছি যে, কে হতে পারে। আপনিও ভাবতে থাকুন। তবে কিনা, কে সরিয়েছিল, শুধু এইটুকু ভাবলেই হবে না। কেন সরিয়েছিল, অর্থাৎ মতলবটা কী, আর সেই মতলব কীভাবে হাসিল হওয়া সম্ভব, সেটাও আপনাকে ভাবতে হবে।”

“আমার তো ধারণা, ওই বউটাই চাবি সরিয়েছিল।”

“তা হলে আবার খানিক বাদেই চাবিটা ওখানে পাওয়া গেল কেন?”

“কী জানি।”

“কী জানি বললে হবে না। আসলে ওই যে একটুক্ষণের জন্যে চাবিটা সরানো হয়েছিল, তারই মধ্যে চোরের মতলব হাসিল হয়ে যায়। অন্তত এইটুকু আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সে যে কে, সেটা বুঝতে পারছি না।”

“বউটাকে সন্দেহ করছেন না কেন?”

“সন্দেহের কারণ নেই বলেই করছি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ-কাজ ওর দ্বারা হয়নি।”

“কী করে বুঝলেন?”

ভাদুড়িমশাই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু উত্তরটা আর শোনা হল না। নিরু এসে ঘরে ঢুকল। হাতে মশলার ডিবে। টিপয়ের উপর ডিবেটাকে রেখে মুখ না তুলেই বলল, “আমার কয়েকটা কথা ছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ তো, বলো।….কিন্তু দাঁড়িয়ে রইলে কেন, ঘরে তো বসবার জায়গার অভাব নেই। ওই তো, ওদিকের ওই টেবিলের সামনে যে চেয়ারটা রয়েছে, ওটায় বোসো। তারপর বীরেসুস্থে বলো কী বলবে।”

নিরু বসল না। বলল, “এখন নয়। সন্ধের সময় আপনারা কি ঘরে থাকবেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাকব।”

“মা আর পিসিমা তখন ঘন্টা দেড়-দুই ঠাকুরঘরে বসে জপ করেন। তখন আমার কোনও কাজ থাকে না। যদি বলেন তো তখন আসতে পারি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ তো, তখনই এসো।”

নিরু বেরিয়ে গেল।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখলেন তো, ঠিকই আন্দাজ করেছিলুম। বলেছিলুম যে, ডাক্তার সরকার আসার আগেই নিরু আসবে। ভুল বলিনি, কেমন?”

বললুম, “ঠিকই বলেছিলেন।” তারপর নিরু এসে ঘরে ঢুকবার আগে যে আলোচনা হচ্ছিল, তার জের টেনে বললুম, “দেখা যাচ্ছে, একমাত্র ওই চাষি-বউটিকেই আপনি সন্দেহ করছেন না। কী, ঠিক বলছি তো?”

“পুরোপুরি ঠিক বলছেন না।”

“তার মানে আরও দু-চারনকে সন্দেহ করছেন না। কেমন?”

“আরও দু-চারজনকে নয়, তারও একজনকে।”

“সেই ভাগ্যবানটি কে?”

“তাঁকে ভাগ্যবানই বা ভাবছেন কেন? ভাগ্যবতীও তো তিনি হতে পারেন।” একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন ভাদুড়িমশাই। তারপর হঠাৎ একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “দেখুন, ঘটনা ঘটবার সময়ে মুকুন্দপুরে যারা ছিল না, এক হিসেবে তাদের কাউকেই আমার সন্দেহ করা উচিত নয়। কিন্তু তবু যে শেহ করছি, তার কারণ, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও তারা দূর থেকে কলকাঠি নাড়তে পারে, মানে নিজের হাতে চুরি না করে অন্যকে দিয়ে করিয়ে থাকতে পারে এই কাজ। সেটা কি খুবই অসম্ভব ব্যাপার?…কী, অমন হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?”

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলুম। বলল, “ব্যাপার কী বলুন তো? আপনি কি সত্যপ্রকাশকেও সন্দেহ করছেন নাকি?”

“কেন করব না? ভদ্রলোক যদি সত্যি কথা বলে থাকেন, তা হলে ঠিক আছে। কিন্তু তিনি যে সত্যি কথা বলছেন তার প্রমাণ কী? এমন তো হতেই পারে যে, মঙ্গলবার রাত্তির তা ধরুন এগারোটা বারোটা পর্যন্ত তিনি শিলিগুড়িতে ছিলেন, তারপর গাড়ি হাঁকিয়ে চলে এসেছিলেন মুকুন্দপুরে। নিজে হয়তো তিনি মন্দিরে ঢোকেননি, কিন্তু যে-লোক ঢুকেছিল, সে তাঁরই লোক। মনসামূর্তি চুরি করে সে সত্যবাবুর গাড়িতে সেটা পৌঁছে দেয়। তারপর সত্যবাবু ফের গাড়ি হাঁকিয়ে শিলিগুড়িতে চলে আসেন।……কী, এটা কি হতেই পারে না?”

আমার মন কিছুতেই ভাদুড়িমশাইয়ের কথায় সায় দিচ্ছিল না। বললুম, “কিন্তু মূর্তিটা তিনি চুরি করবেন কেন?”

“বা রে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যপ্রকাশের টাকার দরকার নেই? শুনলেনই তো যে, তিনি একটা লাক্সারি-হোটেল খুলতে চান। সেই দ্বিতীয় হোটেলের পিছনে তিনি অলরেডি বিস্তর টাকা ঢেলে বসে আছেন, অথচ কাজটা শেষ করানোর জন্যে ব্যাঙ্ক থেকে যে লোন পাওয়া দরকার, সেটা পাচ্ছেন না। অর্থাৎ কিনা প্রচুর টাকার দরকার আছে তাঁরও।”

“তার জন্যে তিনি নিজের জিনিস চুরি করবেন?”

“কেন করবেন না? বিষাণগড়ের দেওয়ানের কথা ভাবুন। অর্থলোভে নিজেদের হিরে তিনি কি নিজেই চুরি করেননি?”

“সেখানে তো ইনসিওরেন্স কোম্পানিকে ধোঁকা দিয়ে ক্ষতিপূরণ পাবার লোভ ছিল।”

“এখানেও তেমনি বিদেশিদের কাছে মূর্তি বেচে টাকা পাবার লোভ থাকতে পারে। মূর্তিটার ইতিহাস তো শুনলেন, ফোটোও দেখেছেন, অমন একটি জিনিস পাবার জন্যে পঞ্চাশ লাখ টাকা দেবার মতো বিদেশি ধনকুবেরের অভাব নেই মশাই। আর তাদের দালাল হয়ে যারা কাজ করে, তাদের সংখ্যাও বাড়ছে বই কমছে না। বলতে গেলে এখন গোটা দেশ জুড়েই তাদের জাল পাতা।”

“তা হলে কি আপনার ধারণা সত্যপ্রকাশই চোর?”

“অমন কথা কিন্তু আমি একবারও বলিনি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমি যেমন কাউকে সাধু বলছি না, তেমনি আবার কাউকে চোরও বলছি না। আমি শুধু আমার সন্দেহের কথাটাই বলছি। তবে হ্যাঁ, যাদের সম্পর্কে আমার সন্দেহ, তাদের মধ্যে সত্যপ্রকাশও আছেন বই কী।”

আমার মুখ দিয়ে যেন কথাই সরছিল না। ভাদুড়িমশাইও চুপ করে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন, “দেখুন কিরণবাবু, একটা কথা তা হলে খুলেই বলি। লেবার কনট্রাক্টর হিসেবেই হোক আর যে-হিসেবেই হোক, সালালের সঙ্গে সত্যপ্রকাশের যোগাযোগটা আমার ভাল ঠে না। লোকটাকে আমি চিনি। ও একটা হাড়ে বজ্জাত লোক। ফকিরার কথা তো বলেছি; তার গ্যাংয়ের লোকরা শুধুই যে ওয়াগন ভাঙত তা নয়, ড্রাগসও পাচার করত। কখনও কোনও মূর্তি-টুর্তি পাচার করেছে বলে অবশ্য শুনিনি। তবে কিনা করতে কতক্ষণ। বিশেষ করে নেপালের বর্ডার যখন শিলিগুড়ি থেকে কাছেই। না মশাই, সত্যবাবুর সঙ্গে সম্পৎলালের কোনও যোগাযোগ না-থাকলেই ‘আমি খুশি হতুম।”

মুকুন্দপুরের মনসা – ২০

একটা মোটর-সাইকেলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। অওাজটা ক্রমেই উঁচু থেকে আরও উঁচু পর্দায় উঠতে-উঠতে তারপর আমাদের ঘরের পুবদিকের দরজার বাইরে এসে থেমে গেল। খানিক বাদেই টোকা পড়ল দরজায়।

দরজা খুলে যাঁকে দেখলুম, তাঁকে আগে কখনও দেখিনি। তবে হাতের ব্যাগটা দেখে আন্দাজ করলুম যে, ইনিই ডাক্তার সরকার। ভদ্রলোকের বয়স ষাট-পঁয়ষট্টি হবে। মাথায় মস্ত টাক। কানের পাশে কিছু চুল রয়েছে বটে, কিন্তু তাও প্রায় না-থাকার মতন। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। পরণে ঢোলা ট্রাউজার্স আর মোটা কাপড়ের হাওয়াই শার্ট। শার্টের পকেটে গোটা চারেক কলম। মুখ দেখে মনে হয় কোনও কূট-কাপট্য নেই। দিলদরিয়া হাসিখুশি মানুষ।

পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে রামদাস। ভদ্রলোক তাকে বললেন, “তুমি গিয়ে আয়াকে সব রেডি করতে বলো। আমি আগে মিঃ ভাদুডিকে দেখি, তারপর তোমার নাতনির ব্যান্ডেজ পালটে দেব।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আসতে পারি?”

বললুম, “আসুন, আসুন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বসুন ডাক্তার সরকার। আমার অসুখের কথা তো সত্যপ্রকাশবাবুর কাছেই শুনেছেন।”

“হ্যাঁ, শুনেছি যে, আপনার কিসসুই হয়নি, তবু নাকি আপনাকে খুব ‘লি করে দেখে আমাকে ওষুধ দিতে হবে। কী ব্যাপার বলুন তো?”

“বলছি। কিন্তু ডাক্তারবু, তার আগে বরং আর-একটা কথা বলি।”

“বেশ তো, বলুন।”

“সবাইকে কি অবিশ্বাস করা চলে : তা হলে কাজ করব কাকে নিয়ে? অন্তত এক-আধজনকে তো বিশ্বাস করা চাই। ঠিক কি না?”

ডাক্তার সরকারকে তাঁর চিকিৎসক-জীবনে সম্ভবত আর-কখনও এমন কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়নি। মনে হল, ভদ্রলোক একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিহ্বল গলায় বললেন, “মানে….আমি তো বুঝে উঠতে পারছি না যে….”

ভাদুড়িমশাই হাসতে-হাসতে বললেন, “ঠিক আছে, অতশত আপনাকে বুঝতে হবে না। শুধু বলুন যে, আপনাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি কি না, বাস।”

“একশোবার পারেন, হাজারবার পারেন। আরে, বিশ্বাস তো আমাকে করতেই হবে। আপনি হচ্ছেন রোগী, আর আমি হচ্ছি ডাগের। আমাকে বিশ্বাস না করে আপনার উপায় কী। কিন্তু এ-কথা উঠছে কেন?”

“উঠছে এইজন্যে যে, আপনাকে আমি বিশ্বাস করে কয়েকটা কথা বলব। না না, রোগের কথা নয়। সত্যপ্রকাশ তো আপনাকে বলেই দিয়েছেন যে, আমার কিছু হয়নি। আমার কথা অন্য ব্যাপারে, যার আঁচ সত্যপ্রকাশ আপনাকে হয়তো দিয়ে থাকতে পারেন।”

“কই না, আর কিছু তো তিনি বলেননি আমাকে। শুধু বললেন যে, আপনারা ইনভেস্টিগেশানে এসেছেন। আর হ্যাঁ, যদিও আপনার জ্বরজারি হয়নি, তবু আজ এই বাড়িতে এসে প্রথমেই যেন এই ঘরে ঢুকে আপনার শরীরটা খুব ভাল করে পরীক্ষা করি।….কী যে ব্যাপার, কিছুই তো মশাই বুঝতে পারছি না। একটু খুলে বলুন তো।”

“বলছি। একটা ব্যাপারে আমি আপনার সাহায্য চাই।”

“কী ব্যাপার?”

“রঙ্গিলার ব্যাপার। ডাক্তারবাবু, ওর অবস্থাটা এখন ঠিক কেমন?”

“আগের চেয়ে অনেক ভাল। আজ তো এখনও দেখিনি। তবে কাল যা দেখেছিলুম, তাতে বলতে পারি যে, প্রাণের আশঙ্কা আর নেই। কাউকে অবশ্য চিনতে পারছে না, কথাও বলতে পারছে না। তবে আমার মনে হয়, দি ওয়র্স্ট ইজ ওভার, দু-এক দিনের মধ্যে সবাইকে চিনতে পারবে, কথাও বলতে পারবে।”

“ঠিক এই কথাটাই কাউকে আপনার বলা চলবে না, ডাক্তারবাবু।” ভাদুড়িমশাই অনুনয়ের গলায় ডাক্তার সরকারকে বললেন, “অন্তত আজ কিছুতেই বলা চলবে না।”

ডাক্তার সরকার অবাক হয়ে বললেন, “কেন?”

“এইজন্যে বলা চলবে না যে, রঙ্গিলার বিপদ তাতে বাড়বে। ডাক্তারবাবু, এই সহজ কথাটা আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেন যে, একমাত্র রঙ্গিলাই চোরকে দেখেছিল, ভাল হয়ে উঠলে একমাত্র রঙ্গিলাই তাকে শনাক্ত করতে পারবে। আর তাই, রঙ্গিলা যে শিগগিরই ভাল হয়ে যেতে পারে, এই কথাটা যদি চাউর হয়ে যায়,তা হলে রঙ্গিলাকে সে-ই ভাল হয়ে উঠতে দেবে না। ভাল হয়ে উঠবার আগেই রঙ্গিলাকে সে খতম করে দেবার চেষ্টা করবে।”

“বলেন কী?”

“একটুও বাড়িয়ে বলছি না, ডাক্তারবাবু।”

“ঠিক আছে।” ডাক্তার সরকার বললেন, “ব্যাপারটা আমাদের প্রফেশানের দিক থেকে একটু আনএথিক্যাল ঠিকই, কিন্তু আপনি যা বললেন, তাতে মনে হচ্ছে, সত্যিকথাটা আপাতত না-বলাই ভাল। আফটার অল, রোগীর ভালমন্দটাই প্রথমে ভেবে দেখা দরকার।…..নিন, এবারে একটু শুয়ে পড়ুন দেখি, আপনার প্রেশারটা একবার দেখব।”

ডাক্তারবাবু প্রেশার দেখলেন, টেম্পারেচার নিলেন, বুকে আর পিঠে স্টেথোস্কোপ বসিয়ে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনলেন, জিভ বার করতে বললেন, চোখের পাতা টেনে দেখলেন, অর্থাৎ যা-যা করা দরকার, সবই করলেন; তারপর হেসে বললেন, “সব নর্মাল। তবে কিনা আপনি যখন অসুখের ভান করে পড়ে আছেন, তখন গোটাকয় ট্যাবলেট দিয়ে যাচ্ছি। খাবার দরকার নেই। তবে খেলেও কিছু ক্ষতি হবে না। ভিটামিন ট্যাবলেট।”

ব্যাগ খুলে একটা শিশি থেকে গোটা চারেক ট্যাবলেট বার করে নিলেন ডাক্তার সরকার। তারপর একখন্ড কাগজে সেগুলো মুড়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বেশ উঁচু গলায় বললেন, “নিয়ম করে খাবেন মশাই। একটু জ্বর হয়েছে, তবে ভয়ের কিছু নেই, কাল সকালেই টেম্পারেচার সাতানব্বইয়ে নেমে যাবে।”

ডাক্তার সরকার উঠে পড়লেন। ভাদুড়িমশাই ওঠার উপক্রম করছিলেন। আমি বললুম, “থাক থাক, আপনি আর উঠবেন না, আমি বরং ডাক্তারবাবুকে এগিয়ে দিচ্ছি।”

উঠোন পেরিয়ে আমরা রঙ্গিলাদের ঘরের দরজায় গিয়ে উঠলুম। এটা যে বাইরের উঠোনের পুবদিকের ঘর, সে-কথা আগেই বলেছি। একতলা ঘরগুলো সব একই রকমের। এ-ঘরটারও সামনে টানা-বারান্দা, তাতে কাঠের রেলিং বসানো। ঘরের ভিতরটা দেখলুম পার্টিশান করা। কাঠের পার্টিশান, তার একধারে একটা এক-পাল্লার সরু দরজা। ওই দরজা দিয়েই পার্টিশানের এ-দিক থেকে ও-দিকে যাওয়া-আসা করতে হয়। ঘরটাকে একেবারে সমান মাপে দু’ভাগ করা হয়নি, পার্টিশানের দক্ষিণ-দিকের ভাগটা একটু ছোট। সে-দিকটায় সরু একটা তক্তাপোশ পাতা, তার উল্টোদিকে একটা ইজিচেয়ার। ঘরের এককোণে রয়েছে একটা মিটসেফ। তার উপরে গোটাকয় ওষুধের শিশি, কয়েক

পাতা ট্যাবলেট আর ক্যাপসুল, তা ছাড়া দু’বাণ্ডিল ব্যান্ডেজ আর লিউকোপ্লাস্ট।

তক্তাপোশে যে মেয়েটি শুয়ে আছে, সে-ই যে রঙ্গিলা, সেটা বুঝে নেওয়া গেল। মেয়েটির গায়ের রং একেবারে কুচকুচে কালো, তার উপরে ভীষণ রোগা। সম্ভবত অসুস্থ বলেই আরও রোগা দেখাচ্ছে। মাথা আর কপাল জুড়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা। বলতে গেলে বিছানার সঙ্গে একেবারে মিশে রয়েছে মেয়েটি। চোখ দুটি খোলা, কিন্তু তাতে কোনও অভিব্যক্তির চিহ্নমাত্র দেখা গেল না। শূন্য, ভাবলেশহীন চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল; আমরা গিয়ে ঘরে ঢুকবার পরেও চোখ ফেরাল না, সিলিংয়ের দিকেই তাকিয়ে রইল।

নার্স কাম আয়াটি মাঝবয়সী। শিলিগুড়ির এক নার্সিংহোমে কাজ করে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সত্যপ্রকাশই একে সঙ্গে নিয়ে শিলিগুড়ি থেকে মুকুন্দপুরে চলে এসেছিলেন। ডাক্তারবাবু যে এসেছেন, এই খবর পেয়েই সে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ছিল। জিজ্ঞাসু চোখে ডাক্তার সরকার তার দিকে তাকাতেই সে বলল, “কাল রাত্তিরে আবার জ্বর এসেছিল।”

“টেম্পারেচার নিয়েছিলে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“কত?”

“একশো দুই পয়েন্ট চার। সকালেই অবশ্য ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যায়।”

“এখন কত?”

“সাড়ে সাতানব্বই।”

“ঠিক আছে। কাল তো ক্যাপসুলটা পড়েনি। ওটা আবার আজ থেকে দাও। আজ াত্তিরে একটা, কাল দুবেলা দুটো। যেমন আগে দিচ্ছিলে। জল গরম করেছ?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি এসেছেন শুনেই গরম করে রেখেছি।”

“ঠিক আছে। জলটা তা হলে গামলায় ঢেলে দাও।”

গামলায় গরম জল ঢালা হল। ডাক্তার সরকার তাতে খানিকটা ডেটল ঢাললেন। তারপর আয়াকে বললেন, “নাও, এবারে ব্যান্ডেজটা খোলো। তারপর গরম জলে তুলো ভিজিয়ে ইনজুরির জায়গাগুলো বেশ ভাল করে পরিষ্কার করে দাও। ব্যান্ডেজটা আজ আবার নতুন করে বেঁধে দিয়ে যাব।”

ড্রেসিংয়ের কাজ শেষ হতে প্রায় তিরিশ-চল্লিশ মিনিট লাগল। লক্ষ করলুম যে, ক্ষতস্থানগুলি এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি; অন্তত দু-একটি জায়গা থেকে অল্প-স্বল্প রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। রঙ্গিলা যে সারাক্ষণই একেবারে স্থির হয়ে শুয়ে আছে, তার দৃষ্টিও যে এক লহমার জন্যেও সে অন্যদিকে ফেরায়নি, তাও আমার চোখ এড়াল না। তবে তার ঠোঁট দুটি একটু-একটু নড়ছিল। ডাক্তারবাবু সেটা লক্ষ করেছেন কি না, কে জানে।

কাজ শেষ করে, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ডাক্তার সরকার ঘর থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়লেন। তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে রামদাস জিজ্ঞেস করল, “কেমন দেখলেন ডাক্তারবাবু?”

“একই রকম।”

রামদাস কেঁদে ফেলল। বলল, “মেয়েটা বাঁচবে তো?”

“কিছুই বলা যাচ্ছে না।” ডাক্তার সরকার বললেন, “ফের জ্বরটা এসেই মুশকিল হল। আর দু-একটা দিন দেখি।”

আয়াও ইতিমধ্যে বাইরে চলে এসেছিল। একটু ইতস্তত করে বলল, “আমি আর এখানে কাজ করব না ডাক্তারবাবু।”

“কেন?”

“কাল রাত্তিরে কে যেন জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে উঁকি মেরেছিল।”

“বটে?” ডাক্তার সরকার বললেন, “সেইজন্যে কাজ ছেড়ে দেবে তুমি?”

“হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু, আমার ভয় করছে।”

রামদাসের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার সরকার বললেন, “কী ব্যাপার রামদাস?”

“কিছু না, ডাক্তারবাবু।” রামদাস বলল, “মিছিমিছি ভয় পাচ্ছে। পাড়ারই কেউ হয়তো উঁকি মেরেছিল। তা মারুক না। আমি তো রয়েছি। ভয় কীসের?”

আয়া তবু গোঁ ধরে রইল। সে যাবেই।

ডাক্তারবাবু বললেন, “বেশ তো, যেতে হয় তোমার কিন্তু সত্যপ্রকাশবাবু শিলিগুড়ি গেছেন, তাঁকে ফিরে আসতে দাও, তিনি অন্য-কোনও লোক দিয়েছেন, তারপর যেও। হুট বললেই কি আর যাওয়া হয় রে বাবা, দুটো দিন সবুর করো।”

আয়া ফিরে গেল রঙ্গিলার কাছে। মুখ দেশে বোঝা গেল, সে খুশি নয়।

ডাক্তারবাবু তাঁর মোটর-সাইকেলে উঠে বললেন, “কাল আবার এই সময়ে আমি আসব। তার মধ্যে যদি দরকার হয় তো রামদাসকে দিনে আমাকে একটা খবর পাঠাবেন।….আরে, তুমি কখন এলে?”

শেষ কথাটা যাকে উদ্দেশ্য করে বলা, এতক্ষণ সে উঠোনের দক্ষিণ দিকের কাচারি ঘরের বারান্দায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। সকালবেলা রামদাসের ঘরের সামনে যাকে দেখেছিলুম, সেই চটকদার চেহারার বউটি। তখন তার সঙ্গে একজন জোয়ান পুরুষ ছিল। এখন সে একা। কুন্ঠিত ভঙ্গিতে সে ডাক্তারবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর চোখ না তুলেই জিজ্ঞেস করল, “রঙ্গিলা কেমন আছে?”

একটু ইতস্তত করে ডাক্তার সরকার বললেন, “খুব একটা ভাল নয়। যাও, ভিতরে গিয়ে একবার দেখে এসো।”

কথাটা বলে ডাক্তারবাবু আর দাঁড়ালেন না। মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

বউটির কিন্তু ভিতরে ঢোকা হল না। ঢুকতে বাচ্ছিল, কিন্তু রামদাস এবারেও সেই সকালবেলার মতোই তার মুখের উপরে দরজা বন্ধ করে দিল।

২১
ঘরে ঢুকতেই ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “রঙ্গিলাকে কেমন দেখলেন?”

বললুম, “ঠিক বোঝা গেল না। কাল রাত্তিরে নাকি আবার জ্বর এসেছিল।’

“ডাক্তারবাবু কিছু বললেন?”

“বললেন যে, অবস্থা খুব-একটা ভাল নয়। তবে কিনা ওই রকমের কথাই তো আপনি তাঁকে বলতে বলেছিলেন। জ্বর যাতে আর না আসে, তার জন্যে একটা ক্যাপসুল ফের রিপিট করতে বললেন।”

ভাদুড়িমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, “ভাবিয়ে তুলন দেখছি। কে জানে, অবস্থা সত্যিই খারাপ কি না।”

বললুম, “সকালে একটি বউ আর একজন জোয়ান পুরুষকে রঙ্গিলাদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলুম। মনে পড়ছে?”

“পড়বে না কেন? কে ওরা?”

“জানি না। তবে বউটি এ-বেলাও এসেছিল দেখলুম। ঘরে ঢুকতে গিয়েছিল। কিন্তু রামদাস তাকে ঢুকতে দিল না।”

“ও-বেলাও দেয়নি। মুখের উপরে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।”

“এ-বেলাও সেই একই ব্যাপার।”

শুনে ভাদুড়ি শাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “চলুন, একটু ঘুরে আসা যাক।” বললুম, “সে কী মশাই, আপনি তো সর্দিজ্বরের ভান করে পড়ে আছেন। বাইরে বেরুলে লোকে সন্দেহ করবে না?”

“সন্দেহ করার কী আছে? সর্দিজ্বরে কি পায়চারি করাও নিষেধ নাকি?”

“সন্ধের সময় নিরুর আসবার কথা।”

“সন্ধের এখনও অনেক বাকি। সবে তো সাড়ে চারটে বাজে। ছটার মধ্যে ফিরে এলেই চলবে। চলুন, চলুন, আর দেরি করবেন ন।”

পায়জামা আর পাঞ্জাবি পরাই ছিল। তার উপরে একটা জাম্পার চড়িয়ে নিচ্ছি, এমন সময় চায়ের ট্রে নিয়ে রামদাস এসে ঘরে ঢুকল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, চা-ও এসে গেছে দেখছি।”

ট্রে থেকে চায়ের কাপ আর বিস্কিটের প্লেট টেবিলে নামিয়ে রেখে রামদাস বলল, “আপনারা কি এক্ষুনি বেরুবেন?”

বললুম, “চা-না খেয়ে নিশ্চয় বেরুব না। কেন, তোমার কোনও কথা ছিল?”

“মেয়েটার জন্যে বড় চিন্তায় আছি, বাবু। বাঁচবে তো?”

“নিশ্চয় বাঁচবে। শুনলুম কাল রাত্তিরে নাকি আবার জ্বর এসেছিল। তাতে ভয় পাবার কিছু নেই। ক্যাপসুলটা পড়লে আর জ্বর আসবে না।”

চায়ে চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি, রামদাস। সকালবেলায় একটি বউকে তোমাদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলুম। শুনলুম সে নাকি এ-বেলাও আবার এসেছিল। বউটি কে?”

রামদাস বলল, “একটা বাজে মেয়েছেলে।”

“এসেছিল কেন?”

রামদাস এ-কথার স্পষ্ট কোনও জবাব না-দিয়ে বলল, “মাঝে-মাঝেই আমাদের জ্বালাতে আসে, বাবু। হয়তো আপনাদের কাছেও আসবে। ওকে পাত্তা দেবেন না।”

আমাদের চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ট্রের উপরে কাপ আর প্লেট তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল রামদাস। ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, বেরিয়ে পড়ি।”

ফলের বাগানটাকে বাঁয়ে রেখে বাড়ির পুব দিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে-যেতে দূর থেকেই লক্ষ করলুম যে, সাধু-বাবা তাঁর ঘরের বারান্দায় পায়চারি করছেন। তিনিও আমাদের দেখতে পেয়েছিলেন। বারান্দা থেকেই চেঁচিয়ে বললেন, “কোথায় যাচ্ছিস?”

আমিও গলা চড়িয়ে বললুম, “এই একটু ঘুরতে বেরিয়েছি।”

সাধুবাবা হাহা করে হেসে উঠে বললেন, “ঘোর ঘোর, এই গোলকধাঁধার মধ্যে ঘুরে মর।”

ভাদুড়িমশাই হাঁটতে-হাঁটতেই নিচু গলায় বললেন, “ইনি তো দেখছি তুই-তোকারি ছাড়া কথাই বলেন না।”

বললুম, “সাধু হবার এটাই একটা মস্ত সুবিধে।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কথাটা নেহাত মন্দ বলেননি। তবে কিনা সাধু হয়েছেন বলেই ইনি তুই-তোকারি করে বেড়াচ্ছেন, নাকি তুই-তোকারি করবার সুবিধে হবে বলেই সাধুর ভেক ধারণ করেছেন, সেটাই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

উল্টো দিক থেকে একজন লোক আসছিল। আমাদের কাছাকাছি এসে লোকটা একটু থমকে দাড়াল, তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল চৌধুরিদের বাড়ির দিকে।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “চিনতে পারলেন?”

বললুম, “বিলক্ষণ। সকালবেলায় সেই বউটি যখন রঙ্গিলাদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, একে তখন তার সঙ্গে দেখেছি। এ-বেলায় অবশ্য এ-লোকটি তার সঙ্গে ছিল না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু দাঁড়ান, ব্যাপারটা বুঝতে হচ্ছে।” বলে, পথের মধ্যে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে, চৌধুরিদের বাড়ির দিকেই আবার ফিরে গেলেন।

এক-একা দাঁড়িয়ে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছিল। বেশিক্ষণ অবশ্য অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ভাদুড়িমশাই ফিরে এলেন। বললেন, “চলুন, রঙ্গনাথবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করে আসি।”

বললুম, “লোকটা গেল কোথায়? চৌধুরিদের বাড়িতে?”

“না, বাড়িতে নয়, বাগানে।

“তার মানে?”

“তার মানে সে সাধুবাবার আখড়ায় গিয়ে ঢুকল।”

কথা বলতে-বলতে আমরা রঙ্গনাথবাবুর বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলুম। দেখলুম, ভদ্রলোক একটা ঝারি হাতে নিয়ে ফুলগাছের উপর জল ঢালছেন। আমাদের দেখে ঝারিটা নামিয়ে রেখে বললেন,

“কী সৌভাগ্য, আসুন আসুন।”

বারান্দায় মাদুর পাতাই ছিল। আমাদের সেখানে বসিয়ে রঙ্গনাথ বললেন, “গিন্নি এ-বেলা অনেক সুস্থ। একটু চা করতে বলি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “টা খেয়েই বেরিয়েছি। এখন আর খাব না। তা ছাড়া বসবও না বেশিক্ষণ। একটা কথা জিজ্ঞেস করবার ছিল।”

“বেশ তো, বলুন।”

“আজ সকালে যখন আপনার এখান থেকে চৌধুরিদের বাড়িতে ফিরে যাই, একটি বউ আর একজন জোয়ান মানুষকে তখন রামদাসের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলুম। মনে হল, রামদাস তাদের উপরে বিশেষ খুশি নয়। বউটি এ-বেলাও এসেছিল। আমি দেখিনি, তবে আমার এই বন্ধুটি দেখেছেন। তা এঁরই কাছে শুনলুম যে, এ-বেলাও নাকি রামদাস তার সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করেনি।”

চিন্তিতভাবে রঙ্গনাথ বললেন, “আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না। রামদাস তো এমনিতে খুবই শান্ত আর ভদ্র স্বভাবের মানুষ। তাকে তো কারও সঙ্গে কখনও দুর্ব্যবহার করতে দেখিনি। একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সকালবেলায় এই বউটির মুখের উপরে রামদাসকে আমরা দরজা বন্ধ করে দিতে দেখেছি।।-বেলাও নাকি সেই একই ব্যাপার। রামদাসকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, বউটি কে। তা রামদাস বলল, একটা বাজে মেয়েছেলে।”

রঙ্গনাথ বললেন, “কী রকম দেখতে বলুন তো?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “প্রশ্নটা আপনি বরং কিরণবাবুকে করুন। মেয়েদের চেহারার বর্ণনা আমার ঠিক আসে না মশাই, ও-কাজটা কিরণবাবু অনেক ভাল পারবেন।”

আমি বললুম, “সুন্দরী নয়, তবে বেশ চটকদার চেহারা।”

“বয়েস?”

“বছর পঁয়ত্রিশ হবে। এক-আধ বছর বেশিও হতে পারে।”

“রং?”

“ফর্সা। একটু বেশি রকমের ফর্সাই বলতে হবে।”

বউটির চেহারা যে চটকদার আর বয়স যে বছর-পঁয়ত্রিশ, এইটে শুনেই রঙ্গনাথবাবুর ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল। রং ফর্সা শুনে বললেন, “বটে?” তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সকালবেলায় তার সঙ্গে যাকে দেখেছিলেন, সেই পুরুষটি কি খুব ষণ্ডামতো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক বলেছেন। চিনতে পেরেছেন নিশ্চয়?”

রঙ্গনাথ বললেন, “ও তো ঝুমরি। সহদেব মারা যাবার মাস-খানেকের মধ্যেই ঘর ছেড়ে পালিয়েছিল।”

আমি বললুম, “সহদেবটি আবার কে?”

“দেখুন মশাই,” রঙ্গনাথ বললেন, “মুকুন্দপুরে আমি মাত্র বছর-পাঁচেক হল এসেছি। এখানকার সব কথা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়, জানিও না। তবে গাঁয়ের লোকেরা হরেক ব্যাপার নিয়ে বলাবলি করে তো, তাই কিছু-কিছু কথা আমার কানেও পৌঁছে যায়। ঝুমরির ব্যাপারটাও ওইরকম। তা ওর সম্পর্কে যা শুনেছি, তাতে বলতে পারি যে, রামদাস কিছু অন্যায় করেনি। সত্যিই অতি বাজে মেয়েছেলে। তার উপরে আবার ঘোর বেহায়া। তা নইলে আর ওই মুখ এখানে দেখায় কী করে?”

রঙ্গনাথবাবু কী যে বলছেন, কিছুই বুঝতে পারছিলুম না। ভাদুড়িমশাইয়ের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যে, তাঁর অবস্থাও তথৈবচ। তবে রঙ্গনাথ চুপ করতেই তিনি যে প্রশ্ন করলেন, তাতেই বুঝলুম, ব্যাপারটা তিনি আঁচ করতে পেরেছেন।

“সহদেব নিশ্চয় রামদাসের ছেলে, তাই না?”

“একমাত্র ছেলে। টাইফয়েডে মারা যায়। শুনেছি রঙ্গিলার বয়েস তখন মাত্র এক বছর। তা সেই দুধের বাচ্চাকে ফেলে রেখেই ঝুমরি পালিয়ে গিয়েছিল। অমানুষ আর কাকে বলে!”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন রঙ্গনাথ। তারপর, বললেন, “অবশ্য ঝুমরির যা হিসটি তাতে বোধহয় মানুষের মতো আচরণ ওর কাছে আশাও কর যায় না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কীরকম?”

“কাছেই একটা চা-বাগান রয়েছে। দক্ষিণবাড়ি টি এস্টেট। মুকুন্দপুরে ঢুকবার পথে হয়তো আপনাদের চোখে পড়ে থাকতে পারে। বাগানটা ছিল সাহেবদের। ম্যানেজারও ছিল সাহেব। ঝুমরির মা ওখানে ম্যানেজারের বাড়িতে কাজ করত। বাপ ছিল চৌকিদার। লোকে বলে, সেই ম্যানেজারই ঝুমরির আসল বাপ। তা ঝুমরির গায়ের রং দেখে তো মনে হয়, কথাটা তারা মিথ্যে বলে না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারপর?”

“তারপর আর কী, রামদাসের ছেলের সঙ্গে বিয়ে হল ঝুমরির। আর তারপর যা হল তা তো আগেই বলেছি। বিয়ের বছর দুই বাদে স্বামী ও মরল আর তার মাস তিনে েমধ্যেই দুধের বাচ্চাটাকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেল ঝুমরি। কিন্তু আবার বলি, এ-সবই আমার শোনা-কথা।”

“কার সঙ্গে পালিয়ে গেল?”

“তা কেউ বলতে পারে না। কোথায় গিয়েছিল, তাও না। তবে গত পাঁচ-ছবছর ধরে নাকি হিরালালের সঙ্গে আছে।”

“ওই যণ্ডামতন লোকটাই বুঝি হিরালাল?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। রঙ্গনাথ বললেন, “হিরালালও দক্ষিণবাড়ি টি এস্টেটে কাজ করে। কুলির সর্দার।”

“বটে! ওরই সঙ্গে ঝুমরি তা হলে এসেছিল।”

“সেইটেই তো মজার ব্যাপার।” রঙ্গনাথ বললেন, “ঘর-পালানো বউ, তার তো আর শ্বশুরবাড়িতে এসে মুখ দেখাবার কথা নয়, অথচ পালিয়ে যাওয়ার পরেও নাকি ঝুমরি এ-গাঁয়ে বার কয়েক এসেছিল। রঙ্গিলা জখম হবার পরে তো প্রায়ই আসছে শুনি। রামদাস তাড়িয়ে দেয়। তবু আসে।”

আমি বললুম, “কী আর করবে। মেয়ের টানে আসতেই হবে।”

রঙ্গনাথ বললেন, “এতই যদি টান, তো এক-বছরের মেয়েকে ফেলে রেখে পালিয়েছিল কেন?”

ভাদুড়িমশাই ক্লিষ্ট হেসে বললেন, “তা বটে।”

২২
রঙ্গনাথবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চাষিবউটিকে রঙ্গনাথ সেই যে কোথায় কী রেখে আসতে বলেছিলেন, তা নিয়ে কিন্তু এবারেও আপনি কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না!”

বললুম, “ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করব নাকি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাক, সন্ধে হয়ে আসছে, এখন ফিরে যাওয়াই ভাল।”

চৌধুরিদের বাড়িতে ফিরে আমাদের ঘরে ঢুকে সদ্য ইজিচেয়ারে গা ঢেলে দিয়েছি, এমন সময় কোথায় যেন শাঁখ বেজে উঠল। খানিক বাদেই পাওয়া ণেল ঘন্টার আওয়াজ।

তারও খানিক বাদে নিরু এসে ঘরে ঢুকল।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বোসো নিরু। ওই চেয়ারটায় বোসো। কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে আমার বড় অস্বস্তি হয়।”

নিরু বসল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু আগে শাঁখ আর ঘন্টা বাজতে শুনলুম। মনে হল, আওয়াজটা বাইরের উঠোনের দিক থেকে আসছে।”

নিরু বলল, “ঠাকুরমশাই পুজোয় বসেছেন।

“মা আর পিসিমা কোথায়?”

“একটু আগে জপ করতে বসলেন। এখন অন্তত ঘন্টা দেড়েক আমার ডাক পড়বে না। সেই জন্যেই কয়েকটা কথা আপনাকে জানাতে এলুম”

“সত্যি তুমি তা হলে সত্যপ্রকাশবাবুর স্ত্রীর ছোট বোন?”

“হ্যাঁ, আমি তাঁর ছোট বোন। আমার আসল নাম কিন্তু নিরু নয়। আমার নাম…..”

ভাদুড়িমশাই হাত তুলে বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও, দেখা যাক এটাও আমি আঁচ করতে পারি কি না। তোমার আসল নাম সম্ভবত সুহাসিনী। কী, ঠিক বলেছি তো?”

চমকে উঠে নিরু বলল, “কী করে জানলেন?”

“এ তো জানার ব্যাপার নয়, আন্দাজ করবার ব্যাপার। আন্দাজে একটা ঢিল ছুড়লুম, সেটা লেগে গেল, ব্যস্।”

“কিন্তু আন্দাজটাই বা করলেন কীভাবে? এ-নাম তো এক জামাইবাবু ছাড়া এ-বাড়িতে কারও জানবার কথা নয়।”

“তা হলে ধরে নাও যে, তোমার জামাইবাবুরই একটা কথা থেকে এটা আমি আন্দাজ করেছি।….ওই মানে হঠাৎ তাঁর মুখ ফশকে বেরিয়ে যাওয়া একটা কথা থেকে।”

ভুরু কুঁচকে গেল নিরুর। বলল, “কী কথা?”

“না-শুনে ছাড়বেই না?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ তা হলে শোনো। মনসার তো অনেক ভাল-ভাল নাম আছে। এই যেমন ধরো পদ্মাবতী। মনসামঙ্গলের আর-এক নাম যে পদ্মাপুরাণ, সেটা এইজন্যেই। মনসামঙ্গল কার লেখা জানো তো?….. বিজয় গুপ্তের। মনসা তাঁকে নাকি স্বপ্নে দেখা দিয়ে লিখতে বলেছিলেন এই পুঁথি। বলেছিলেন, ‘মনে ভয় না করিও দেখিয়া নাগজাতি/মহাদেবের কন্যা আমি নাম পদ্মবতী।’ তা সে-কথা থাক। আসল কথা হল, যেমন পদ্মাবতীর মতোই আরও বেশ কিছু সুন্দর নাম আছে মনসাদেবীর, তেমনি আবার একটা বিদঘুটে নামও আছে। নামটা হল জরৎকারু। কাল রাত্তিরে তোমার জামাইবাবুর কাছে আমি কথায়-কথায় এই জরৎকারু নামটার উল্লেখ করেছিলুম। তাতে তিনি কী বললেন জানো?”

“কী বললেন?”

“বললেন, এ যেন যে-মেয়ের এক-নাম সুহাসিনী, তার অন্য-নাম জগদম্বা।”

হঠাৎ যেন নিরু একেবারে পাথরের মতো স্থির হয়ে গিয়েছে। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে সে। কিন্তু কোনও কথা বলছে না।

আমি বললুম, “বাস, অমনি আপনি বুঝে গেলেন যে, নিরুর নাম আসলে সুহাসিনী?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না-বুঝবার কী আছে। আমরা যাকে হঠাৎ মুখ ফশকে বেরিয়ে যাওয়া কথা ভাবি, সত্যিই তো আর সেগুলি আমাদের মুখ ফশকে বেরোয় না, তার পিছনেও কাজ করে আমাদের ইচ্ছা। আর সেইজন্যেই আমার মনে হল যে, বিদঘুটে নামের বিপরীত কোনও সুন্দর নামের কথা বলতে গিয়ে সত্যপ্রকাশ হঠাৎ ‘সুহাসিনী’ নামটাই বা বললেন কেন? নিশ্চয় এটা এমন কারও নাম, যাকে তিনি খুব স্নেহ করেন, ভালবাসেন।”

বললুম, “সুহাসিনী নামটা তো সত্যপ্রকাশের দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়েরও হতে পারত। তাদেরও তো তিনি কম স্নেহ করেন না। তা হলে আপনি তাদের কথা না-ভেবে বিশেষ করে নিরুর কথাই বা ভাবতে গেলেন কেন?”

“এটা কি আপনি খুব বুদ্ধিমানের মতো কথা বললেন, কিরণবাবু?” ওঁর বড় মেয়ে…..মানে ওই কলকাতায় যার বিয়ে হয়েছে…… মালতীদের বাড়ির কাছে ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের দক্ষিণে যার শ্বশুরবাড়ি…. তার নাম যে সুজাতা, তা তো আমরা শুনেইছি। বাকি রইল তার বোন। তা সুজাতার বোনের নাম হবে সুগতা কি সুলতা কি সুনন্দা কি ওই রকমেরই তিন অক্ষরের অন্য কোনও নাম।”

মৃদু গলায় নিরু বলল, “সুরূপা।”

ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হল তো? আর তা ছাড়া সুহাসিনী যতই সুন্দর হোক, একটু সেকেলে তো, একেবারে এ-কালের মেয়েদের ও-নাম হয় না। তা হলে ও-নাম এ-বাড়িতে কার হতে পারে? তখন মনে হল, নিরুর হওয়া কিছু বিচিত্র নয়।…..কী নিরু, ঠিক বলিনি? হাহা!”

নিরু যখন জড়সড় হয়ে বসে আছে, ভাদুড়িমশাই তখন এত হাল্কা গলায় কথা বলছেন কেন আর হাহা করে হাসছেনই বা কেন, প্রথমটায় আমি তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলুম না। পরে মনে হল, এটা ইচ্ছাকৃত ব্যাপার। আসলে নিরুর সঙ্কোচটাই ভেঙে দিতে চাইছেন ভাদুড়িমশাই। যাতে কিনা তার অস্বস্তিটা সে কাটিয়ে উঠতে পারে, লজ্জা না করে সমস্ত কথা খুলে বলতে পারে।

নিরু বলল, “ঠিক বলেছেন। জামাইবাবু সত্যিই আমাকে খুব স্নেহ করেন।”

হাসতে-হাসতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক তা হলে নামের ধাঁধাটা মিটল। এখন একটা কথা বলো তো। এ-বাড়িতে কি একমাত্র সত্যপ্রকাশই তোমার আসল পরিচয়টা জানেন? আর কেউ জানে না?”

মুখ তুলে নিরু বলল, “রামদাসও জানে। কিন্তু জামাইবাবু নিষেধ করে দিয়েছেন তো, তাই মরে গেলেও সেটা সে কাউকে বলবে না।”

“মা আর পিসিমা জানেন না কেন?”

“কী করে জানবেন। আমি এসে এ-বাড়িতে ঢুকবার আগে তো তাঁরা আমাকে দেখেননি।”

“সত্যপ্রকাশের শ্বশুরবাড়িতে কখনও যাননি তাঁরা?”

“কোনও দিনই যাননি।”

“কেন?”

“এ-বাড়ির গিন্নিরা কখনও ছেলে কিংবা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান না, যাবার নিয়মই নেই। জামাইবাবুর মা যেমন কখনও ছেলের শ্বশুরবাড়ির চৌকাঠ মাড়াননি, তেমন জামাইবাবুর ঠাকুমাও কখনও চৌকাঠ মাড়াননি পিসিমার শ্বশুরবাড়ির। দিদির বড় মেয়ের কথাই ধরুন। বছর তিনেক হল সুজাতার বিয়ে হয়েছে, বিয়েটা আমার দিদি দেখে যেতে পারেনি, তার দু’বছর আগেই সে মারা যায়। কিন্তু যদি বেঁচে থাকত, তা হলেই কি দিদি কক্ষনো সুজাতার শ্বশুরবাড়িতে যেত?”

“যেতেন না?”

“কক্ষনো যেত না। জামাইবাবুর সঙ্গে কলকাতায় গেলে হয় জামাইবাবুর কোনও বন্ধুর বাড়িতে উঠত, নয়তো কোনও হোটেলে। কিন্তু মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কক্ষনো নয়।”

“তা তো বুঝলুম, কিন্তু সুহাসিনী নামে যে সত্যপ্রকাশের একটি শ্যালিকা রয়েছে, মা আর পিসিমা অন্তত সেটুকু নিশ্চয় জানতেন। তাই না?”

“জানতেন বই কী। কিন্তু আমিই যে সেই সুহাসিনী, তা জানতেন না।”

“তাতেও কিন্তু ব্যাপারটা পরিষ্কার হচ্ছে না, একটা খিঁচ থেকে যাচ্ছে।”

“কেন?”

“কোথায় খিঁচ থেকে যাচ্ছে, বুঝতে পারছ না?”

“না তো।”

“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝিয়ে বলছি। মা আর পিসিমা নাহয় এ-বাড়ির নিয়ম মেনে কখনও সত্যপ্রকাশের শ্বশুরবাড়িতে যাননি, কিন্তু তোমার ব্যাপারটা কী? দিদির শ্বশুরবাড়িতে বোনের আসাটা তো আর কোনও পরিবারেই একটা নিয়মবিরুদ্ধ ব্যাপার বলে গণ্য হয় না, অন্তত হয় বলে আমি শুনিনি। দিদি বেঁচে থাকতে তুমিই বা তা হলে এ-বাড়িতে কখনও আসোনি কেন? অনায়াসেই তো আসতে পারতে, দু’চার দিন থেকেও যেতে পারতে। তাই না?”

নিরু এবারে সরাসরি ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকাল। বলল, “হ্যাঁ, তা পারতুম বটে।”

“তা হলে আসোনি কেন?”

“এই প্রশ্নের জবাব কি আমাকে দিতেই হবে?”

“মোটেই না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “জবাব তোমাকে দিতেই হবে, এমন কথা কি আমি বলেছি? বলিনি। জবাব দিতে তোমার যদি কোনও অসুবিধে থাকে তো দিও না।”

আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সত্যিই কিছু অসুবিধে আছে এই মেয়েটির নিজের থেকে সব বলতে এসেও, যে-জন্যে ও সব কথা আমাদের খুলে বলতে পারছে না।

ইজিচেয়ার থেকে আমি উঠে পড়লুম। টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দে গলাইটা কুড়িয়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “আপনারা বরং কথা বলুন, আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”

নিরুই বাধা দিল আমাকে। বলল, “বসুন, আপনাকে বাইরে যেতে হবে না। সব কথা খুলে বলতে আমার একটু অসুবিধে আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা আপনার জন্যে নয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কার জন্যে?”

“যাঁর জন্যে, দুপুরে তিনি শিলিগুড়ি রওনা হয়ে গেছেন।”

“অর্থাৎ সত্যপ্রকাশের জন্যে। তাই না?”

মৃদু গলায় নিরু বলল, “হ্যাঁ, জামাইবাবুর জন্যে। তিনি অবশ্য তাঁর নিজের মান-সম্মান নিয়ে খুব টিন্তিত নন; এ-ব্যাপারে তাঁর যা-কিছু দুর্ভাবনা, আমি খুব ভালই বুঝতে পারি যে, তা শুধু আমারই জন্যে। আমারই মান-সম্মানের কথা ভেবে তিনি অনেক ব্যাপার তাঁর মা আর পিসিমার কাছ থেকে তো বটেই তাঁর ছেলেমেয়েদের কাছ থেকেও গোপন করে রেখেছেন। আমি যে কে, তা পর্যন্ত কাউকে কখনও জানাননি।”

একটুক্ষণের জন্যে চুপ করে রইল নিরু। তারপর মস্ত একটা নিশ্বাস ফেলে ম্লান হেসে বলল, “অথচ মজা কী জানেন, নিজের মান-অপমানের কথা আমি আর এখন ভাবছি না, আমি শুধু ভাবছি যে, শিলিগুড়ির যে নরক থেকে উনি আমাকে তুলে নিয়ে এসেছেন, দরকার হয় তো সেই নরকেই আমি আবার ফিরে যাব, তবু আমার জন্যে যেন ওঁর গায়ে কোনও কলঙ্কের দাগ না লাগে।

২৩
ঘর একেবারে নিস্তব্ধ। কেউই কোনও কথা বলতে পারছিলুম না। না আমি, না ভাদুড়িমশাই। নিরুর কথা শুনে আমার আরও খারাপ লাগছিল এই ভেবে যে, একটা জীবনের এমন কোনও জায়গা আমরা ছুঁয়ে ফেলেছি, যে জায়গাটা বড় বেদনার। কে জানে, কত দিনের কত অসম্মান, অপমান আর গ্লানির জজ্ঞাল সেখানে পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে। সেই জঞ্জালকে এইভাবে বাইরে টেনে আনবার কি সত্যি কোনও অধিকার আছে আমাদের।

ভাদুড়িমশাইয়ের উপরে একটু-একটু রাগও যে আমার- না হচ্ছিল, তা নয়। যে-কাজে তিনি এসেছেন, সেইটে ঠিকমতো করলেই তো গোল মিটে যায়। তা না- করে ঝোপের এদিকে-ওদিকে লাঠি চালিয়ে অনর্থক কেন আবহাওয়াটাকে এইভাবে আরও অস্বস্তিকর করে তুলছেন তিনি? সত্যপ্রকাশের ড্রইংরুমের দেওয়ালে তাঁর পরলোকগতা স্ত্রীর ফটো দেখেই তিনি আন্দাজ করেছিলেন যে, কাজের লোক বলে নিরুর পরিচয় দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আসলে সে ওই ভদ্রমহিলারই ছোট বোন। কিন্তু আন্দাজ করলেই নিরুকে সে-কথা বলতে হবে? বলে এইভাবে তাকে আরও অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিতে হবে? না না, কাজটা ভাদুড়িমশাই মোটেই ভাল করেননি।

নিরুর কথায় আমার চমক ভাঙল।

“যাঁর জন্যে আমার এত ভাবনা, সেই জামাইবাবু মানুষটা কী সাদাসিধে আর সরল দেখুন। দিদির সঙ্গে আমার মুখের এই যে মিল, এটা কি আর মা পিসিমা আর ছেলেপুলেদের চোখে পড়েনি? পড়েছে। কিন্তু তাঁরা ভেবেছেন যে, এমন মিল তো কত লোকের সঙ্গেই কত লোকের থাকে। এর বেশি আর কিছু ভাবেননি তাঁরা। কিন্তু তাঁরা না-ভাবলেও নামজানা একজন গোয়েন্দা যে ঠিকই এটা নিয়ে ভাববেন….শুধু যে ভাববেন, তা নয়, মিলের কারণটাও ধরে ফেলতে পারবেন, এই সহজ কথাটা পর্যন্ত জামাইবাবু বুঝতে পারেননি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝতে পারলে তিনি কী করতেন? যে ক’দিন আমরা এখানে আছি, অন্তত সেই ক’টা দিনের জন্যে তোমার দিদির ফটোখানাকে তিনি বোধহয় ড্রইং রুম থেকে সরিয়ে রাখতেন। তাই না?”

নিরু বলল, “কী জানি। না-ও সরাতে পারতেন। যে-রকম লোক, হয়তো বলতেন, কী দরকার, বাইরের কেউ যদি বোঝে তো বুঝুক না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা তো হল, কিন্তু অন্য-একটা প্রশ্ন তোমাকে করেছিলুম, তার জবাব এখনও পাইনি।”

“দিদি বেঁচে থাকতে এ-বাড়িতে আমি কখনও আসিনি কেন, এই তো?”

“হ্যাঁ, আসোনি কেন?”

“উপায় ছিল না, তাই আসিনি।”

নিরু আবার মুখ নিচু করল। তাকে দেখে কষ্ট হচ্ছিল আমার। ভেবেছিলুম, ভাদুড়িমশাই আর এগোবেন না, তাঁর প্রশ্নে এবারে ছেদ টানবেন। ব্যাপারটা শুধুই অস্বস্তিকর নয়, প্রায় নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছচ্ছে। মনে হচ্ছিল, নিতান্ত অসহায় আর দুর্বল একটা প্রাণীকে যেন খাঁচার মধ্যে আটকে ফেলেছেন তিনি, আর তারপর খাঁচার বাইরে দাঁড়িয়ে চোখা একটা বল্লম দিয়ে ক্রমাগত তাকে খুঁচিয়ে চলেছেন।

কিন্তু না, প্রশ্নে তিনি ছেদ টানলেন না। বললেন, “উপায় ছিল না-ই বা কেন?”

নিরু মুখ তুলল। এবারে তাকে দেখে যেন ধাঁধা লাগল আমার। মনে হল, যতটা দুর্বল তাকে ভাবছিলুম, ঠিক ততটা দুর্বল হয়তো সে নয়। তার চোখে একটু আগে একটা অসহায়তার ছায়া ভাসতে দেখেছিলুম। সেই ছায়াটা হঠাৎ সরে গেছে। ধারালো চোখে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “তার আভাস যে আপনাদের দিইনি, তা নয়। কিন্তু আপনার কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে যে, ওইভাবে বললে হবে না, স্পষ্ট করে সবিস্তারে সবটাই আপনাকে বলতে হবে। তাই না?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোনও-কিছু অস্পষ্ট না-রাখাই তো ভাল।”

দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিরু বলল, “ঠিক আছে, সবটাই তা হলে বলব। প্রথমেই জেনে রাখুন আমার দিদি আর আমি একই বাবার মেয়ে বটে, তবে একই মায়ের মেয়ে নই।”

আমি বললুম, “তার মানে?”

“মানে অতি সহজ। আলিপুরদুয়ারের জনার্দন বিশ্বাস তাঁর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে আবার বিয়ে করেছিলেন। দিদি তাঁর প্রথম স্ত্রীর মেয়ে, আর আমি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর। দিদি আমার চেয়ে দশ বছরের বড়। বেঁচে থাকলে তাঁর বয়েস এখন চল্লিশ হত। দিদির বিয়ে হয়েছিল সতেরো বছর বয়েসে। আমার বয়েস তখন সাতের বেশি নয়। কিন্তু তখনই আমাকে দেখে সবাই বলত যে, মেয়েটা একেবারে দিদির মতো হয়েছে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা তো হয়েছই। নইলে আর আমি সম্পর্কটা আন্দাজ করলুম কী করে?”

নিরু বলল, “না-ও কিন্তু হতে পারতুম। আমরা দুবোন যদি যে-যার মায়ের মতো দেখতে হতুম, কিংবা আমাদের যে-কোনও একজন তার মায়ের মতো, তা হলেই আর মিলটা থাকত না। অথচ মজা কী জানেন, আমরা কেউই আমাদের মায়ের আদল পেলুম না, আমাদের দুজনের মুখেই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল আমাদের বাবার মুখের ছাপ। তফাত শুধু একটাই। দিদি ফর্সা, আমি কালো।”

আমি বললুম, “সে কী, তেমন কালো তো তুমি নও।”

এতক্ষণে হাসি ফুটল নিরুর মুখে। যেন আমার কথাটা শুনে খুব মজা পেয়েছে, এইরকমের হাল্কা গলায় বলল, “ঠিক ঠিক, কাঠকয়লার মতো কালো তো আর নই, ওই যাকে কালো মেয়ের বাবা-মায়েরা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বলে চালাতে চায়, তা-ই আর কি। তা আমার মাও দেখেছি চিঠিপত্রে কক্ষনো ‘কালো’ লিখতেন না। লিখতেন ‘মেয়ে আমার উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা’। ভারী মজার ব্যাপার, তাই না?”

ভাদুড়িমশাই দেখলুম, নির্বিকার। বললেন, “কিসের চিঠি?”

“কীসের আবার,” সেই একইরকমের হাল্কা গলায় নিরু বলল, “বিয়ের সম্বন্ধের। বাবা তো বেশিদিন বাঁচেননি। দিদির বিয়ের বছর তিনেক বাদেই তিনি মারা যান। আমান বয়েস তখন দশ। তার বছর ছ’সাত বাদেই শুরু হল আমার বিয়ের চেষ্টা। বাবা বেঁচে নেই, তাই কাগজে ওই যে সব বিয়ের বিজ্ঞাপন বেরোয়, তাই দেখে-দেখে মাকেই অগত্যা পাত্রপক্ষের কাছে চিঠি লিখতে হত। চিঠি পেয়ে তাদের কেউ যে আমাকে দেখতে আসত না, তাও নয়। আসত, রসগোল্লা-সন্দেশ খেত, কিন্তু পছন্দ করত না। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। একে তো মেয়ের গায়ের রং কালো, তার উপরে আবার গরিব বিধবার মেয়ে, চট করে কারও পছন্দ হবেই বা কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দাঁড়াও, দাঁড়াও ব্যাপারটা একটু বুঝে নেওয়া দরকার। নিজেকে তুমি ‘গরিব বিধবার মেয়ে’ বলছ কেন? সত্যপ্রকাশবাবুদের অবস্থা তো যদ্দুর বুঝতে পারছি খুবই ভাল। তাঁর তো নেহাত গরিব-ঘরে বিয়ে হবার কথা নয়। তা হলে?”

নিরু বলল, “এতে এত অবাক হচ্ছেন কেন? রূপকথার রাজপুত্তুররা কি কখনো ঘুঁটেকুডুনির মেয়েকে বিয়ে করে না? তা নইলে তাদের মহত্ত্ব প্রকাশ পাবে কী করে? তবে হ্যাঁ, আমার মতো পেত্নি হলে চলবে না, কুঁচবরণ কন্যে হওয়া চাই। তা জামাইবাবু যেমন রূপকথার রাজপুত্তুর, আমার দিদিও তেমনি ডাকসাইটে সুন্দরী। যেমন দুধে-আলতা রং, তেমনি টানা-টানা চোখ, তেমনি টিকোলো নাক, আর তেমনি নিখুঁত মুখের গড়ন। তা হবে না-ই বা কেন, বাপ আর মা, দুজনের যা-কিছু ভাল, দিদি সবই পেয়েছিল যে। চোখে তো দেখিনি, তবে সব্বাইকে বলতে শুনেছি যে, আমার বড়মার রং ছিল নাকি মেমসাহেবদের মতো। তার উপরে দিদির আবার গুণও ছিল অনেক।”

“যেমন?”

“যেমন ছিল লেখাপড়ায় ভাল, তেমনি ছিল রান্না আর সেলাই-ফোঁড়াইয়ের হাত, আবার তেমনি ছিল গানের গলা। মনটাও ছিল খুব নরম। ঘটকের মুখে নিশ্চয় জামাইবাবুর বাবা সবই শুনে থাকবেন। আলিপুরদুয়ারেও তো ব্যাবসার কাজে মাঝে-মাঝে যেতেন, তাই সেখানকার লোকেদের কাছেও হয়তা শুনে থাকতে পারেন। নইলে আর আমাদের মতো গরিবমানুষের ঘরে তাঁর পায়ের ধুলো পড়বে কেন। তা মেয়ে দেখে তো তিনি মুগ্ধ। ঠিকুজি মিলে যেতেই আমার বাবাকে বললেন, ‘আপনাকে কিছু দিতে হবে না, বিশ্বাসমশাই, আপনি শুধু পুরুত ডেকে বিয়ের দিনটা ঠিক করে ফেলুন। খাপত্তর সব আমার। আমিই আমার মা-লক্ষ্মীকে রাজরানির মতো সাজিয়ে আমাদের ঘরে নিয়ে তুলব।’ তা তিনি তুলেওছিলেন।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইল নিরু। তারপর একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “মুশকিল কী জানেন, আমাদের জীবনটা তো সত্যিই একটা রূপকথা নয়, সবরকমের দয়া দাক্ষিণ্য আর মহত্ত্বের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত তাই একটা ‘কিন্তু’ থেকে যায়।”

“কী রকম?”

“এই যে-রকম হয় আর কি। হাতের মুঠো হয়তো খোলাই থাকে, আর তাই দেখেই আমরা ধন্যি-ধন্যি করতে থাকি, ওদিকে মনের দরজায় যে খিল পড়ে গিয়েছে, সেইটে আমরা বুঝতে পারি না। আমার বাবা অবিশ্যি বুঝেছিলেন। জামাইবাবুর বাবা যেদিন বিয়ের কথা পাকা করে আসেন, আমার বাবা সে-দিন থাকে বলেছিলেন, কাজটা ভাল হল কি না কে জানে। মা যখন জিজ্ঞেস করলেন যে, হঠাৎ এমন কথা তাঁর মনে হচ্ছে কেন, তখন বাবা বললেন, “সম্পর্কটা সমানে-সমানে হলেই টেকসই হয়, তা নইলে বড়-একটা ধোপে টেকে না। বড়ঘরে যাচ্ছে বটে, কিন্তু মেয়েটা পর হয়ে গেল।” মা অবশ্য বাবার কথায় কান দেননি। সত্মা হলে কী হয়, দিদিকে ভীষণ ভালবাসতেন তো, তাই মা-মরা যে মেয়েটাকে তিনি একদিন কোলে টেনে নিয়েছিলেন, সে যে বড়লোকের বাড়ির বউ হতে চলেছে, মা তখন তাতেই দারুণ খুশি।”

“কিন্তু পরে বুঝলেন যে, বাবার কথায় কান দিলেই ভাল হত, কেমন?”

“কী জানি। তবে বাবা যে ভুল বলেননি, বিয়ের পরেই সেটা স্পষ্ট হয়ে গেল। কী হন। জানেন, খুব ঘটা করে আর দয়াদাক্ষিণ্য দেখিয়ে গরিবঘরের মেয়েটিকে তো চৌধুরিমশাই তাঁর ছেলে। বউ করে এ-বাড়িতে নিয়ে এলেন, কিন্তু তার পরে আর একদিনের জন্যেও তাকে তার বাপের বাড়িতে যেতে দিলেন না।”

আমি বললুম,”সে কী!”

নিরু বলল, “আপনারা হয়তো ভাবছেন যে, আমি বাড়িয়ে বলছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এক বিন্দুও আমি বাড়িয়ে বলছি না। দিদিকেও যেতে দেননি, জামাইবাবুকেও যেতে দেননি। এমন শী অষ্টমঙ্গলাতেও না। সরাসরি জানিয়ে দিলেন যে, অষ্টমঙ্গলার নিয়মই নাকি এঁদের নেই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাও কি হয় নাকি?”

নিরু বলল, “হবে না কেন? যেখানে আপনি সম্পর্ক রাখতে চাইছেন না, সেখানে সবই হয়। নিয়ম কি আর নেই। আছে। তা নইলে আর বিয়ের পরে জোড় খুলবার জন্যে সুজাতা তার বরকে নিয়ে কলকাতা থেকে এখানে এসেছিল কেন। নিয়ম আছে নিশ্চর। যেমন আমাদের আছে, তেমনি এঁদের আছে। কিন্তু আমার বাবা যখন মেয়ে-জামাইকে তাঁর ওখানে নিয়ে যাবার জন্যে মুকুন্দপুরে এলেন, জামাইবাবুর বাবা তখন স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে, অমন কোনও নিয়মই এঁদের বাড়িতে নেই।”

“অর্থাৎ তিনি সত্যি-সত্যিই তোমাদের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখতে চাইছিলেন না?” ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে হেসে উঠল নিরু। বলল, “সত্যি-সত্যি নয় তো কি মিছিমিছি?” তারপরেই হঠাৎ বিষণ্ণ গলায় বলল, “বাবা বুঝে গেলেন যে, শুধু তাঁর মেয়েটিকে এঁরা চেয়েছিলেন আর-কারও সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতে চাননি। বুঝে গিয়ে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু তাঁর তো কিছু করারও ছিল না। ….কী জানেন, আমার বাবার তো ঠিক মরবার বয়েস হয়নি, তবু যে এরপরে আর খুব বেশিদিন তিনি বাঁচেননি, তারও হয়তো এটাই কারণ। বড়লোকের দরজায় এসে ফিরে যাবার এই অপমানটাই তিনি সহ্য করতে পারলেন না।”

“সত্যপ্রকাশেরও কি তাঁর বাবার কথায় সায় ছিল?”

“ছিল কি না, তখন সেটা আমরা জানতে পারিনি। পরে জেনেছি যে, ছিল না। কিন্তু সায় না থাকলেই বা জামাইবাবু কী করবেন? বলতে গেলে তিনিও তো তখন নেহাতই ছেলেমানুষ, অন্তত নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতো ক্ষমতা তাঁর তখনও হয়নি। এই বাড়িতে এসে ঢুকবার পরে তাঁরই কাছে শুনেছি যে, ব্যাপারটা নিয়ে কষ্ট যে শুধু দিদির ছিল, তা নয়, কষ্ট ছিল জামাইবাবুরও। কিন্তু বাবার অমতে বউকে নিয়ে আলিপুরদুয়ারে যাবেন, এমন সাহসই তাঁর ছিল না।”

“সত্যপ্রকাশের বাবা ছেলে-বউকে যেমন তোমাদের বাড়িতে যেতে দেননি, তেমনি তোমাদেরও কখনও বলেননি এখানে এসে কয়েকটা দিন কাটিয়ে যেতে?”

“কক্ষনো বলেননি। কিন্তু বললেই কি আমরা আসতে পারতুম? বাবা যেভাবে অপমানিত হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন এই বাড়ি থেকে, তারপরেও কি আসা সম্ভব?”

আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইল নিরু। তারপর বলল, “আপনি তো জানতে চাইছিলেন, দিদি বেঁচে থাকতে এ-বাড়িতে আমি কখনও আসিনি কেন। এখন আপনিই বলুন, এই অবস্থায় কেউ আসতে পারে? আসতে কি আর ইচ্ছে হত না? ‘হত। কিন্তু সাহস হত না। দিদি তো ভীষণ ভালবাসত আমকে। বাসবে না-ই বা কেন, আমাদের তো আর কোনও ভাইবোন নেই, শুধু দিদি আর আমি। তাই দিদিকে ছেড়ে থাকতে আমারও খুব কষ্ট হত। তখন তো কিছু বুঝতে পারতুম না। রোজই বাবাকে বলতুম,দিদির কাছে নিয়ে চলো। বাবা কিছু বলতেন না, চুপ করে থাকতেন।”

নিরু উঠে দাঁড়াল। বলল, “আপনারা কি এখুনি আবার বেরোবেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখুনি নয়। পরে হয়তো একবার রঙ্গিলাদের ওখান থেকে ঘুরে আসব।”

নিরু বলল, “তা হলে একটু বসুন। মা আর পিসিমাকে দেখে আসি একবার। সেইসঙ্গে আপনাদের চা’ও নিয়ে আসছি। এক্ষুনি যেন আবার বেরিয়ে পড়বেন না।”

২৪
চা আর জলখাবার নিয়ে মিনিট কুড়ি বাদেই নিরু ফিরে এল। ট্রেটা টেবিলের উপরে নামিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাইকে বলল, “জামাইবাবু বলছিলেন, আপনার সর্দিজ্বর হয়েছে। চায়ে তাই একটু আদার রস দিয়েছি। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন, জড়িয়ে গেলে বিচ্ছিরি লাগবে।”

আমি বললুম, “আমার তো আর সর্দি-টর্দি হয়নি, তা হলে আমি কেন আদা-চা খাব?”

নিরু বলল, “খেয়ে নিন, খারাপ লাগবে না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “জ্বর তো আমারও হয়নি।”

নিরু বলল, “জানি।

“কী করে জানলে?”

“জামাইবাবু বলেছেন।”

“জ্বর না-হওয়া সত্ত্বেও কেন জ্বরের ভান করছি, তাও বলেছেন নিশ্চয়?”

নিরু হাসল। বলল, “তাও বলেছেন।” তারপর রঙ্গনাথবাবু যে কৌটোটা দিয়ে গিয়েছিলেন, সেটার উপরে চোখ পড়তে বলল, “ওটা কী?”

“নারকোলের নাড়ু। রঙ্গনাথবাবু দিয়েছেন।”

“তা-ই? মজুমদার-মাসিমা চমৎকার নাড়ু করেন। নারকোলের সঙ্গে ক্ষীর বাদামগুঁড়ো এলাচদানা, কর্পূর আরও কী-কী যেন দেন উনি। দারুণ লাগে। নাড়ু তো আমরাও করি, কিন্তু অত ভাল হয় না।….না না, আমি খাব না, আপনারা খান।”

নাড়ুর কৌটাটা তুলে নিরুর দিকে এগিয়ে দিয়েছিলুম। খাবে না শুনে সেটা আবার টেবিলে রেখে দিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “মা আর পিসিমা এখন কী করছেন?”

“জপ হয়ে গেছে। এখন পড়ছেন মনসার পাঁচালি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রোজই এইসময়ে পাঁচালি পড়েন ওঁরা?”

“আগে পড়তেন না,” নিরু বলল, “গত বুধবার থেকে রোজ এই সময়ে পড়ছেন। আসলে ব্যাপার কী জানেন, জামাইবাবু তো বলেই দিয়েছেন যে, যতদিন না ওই মূর্তি উদ্ধার হয়, পুজোও ততদিন বন্ধ থাকবে, তাই এখন মন্দিরে আর পূজো হয় না, শুধু পাঁচালি পড়া হয়।”

“খানিক আগে ওই যে শাঁখের আওয়াজ আর ঘন্টার শব্দ শুনলুম, ও তা হলে ঠাকুরমশাই কার পূজো করছিলেন?”

“মা-মনসারই।”

“তার মানে?”

নিরু হাসল। বলল, “ঠাকুরমশাই ভিতু মানুষ। বলেন, মূর্তি থাক আর না-ই থাক পুজো বন্ধ করাটা উচিত হবে না। বন্ধ করলে অমঙ্গল হবে। নন্দিরে অবশ্য যান না। নিজের ঘরে মা-মনসার একখানা পট রয়েছে, তার সামনে বসে পূজো করেন।”

“সত্যপ্রকাশের নিষেধ সত্ত্বেও করেন?”

“তা করেন বই কী। তবে জামাইব।বু যখন এখানে থাকেন তখন শাঁখও বাজে না, ঘন্টার শব্দও শোনা যায় না, ঠাকুরমশাই তখন একেবারে নিঃশব্দে তাঁর পুজোটা সেরে নেন। আজ তো দুপুর থেকেই জামাইবাবু নেই, তাই শাঁখ বাজাতে আর ঘন্টা নাড়তে ঠাকুরমশাইয়ের কোনও ভয়ও নেই।”

“সত্যপ্রকাশের নিষেধ যে উনি মানছেন না, রোজই পুজো হচ্ছে, সেটা তাঁকে কেউ বলেনি?”

“কেন বলবে? বললেই তো জামাইবাবু রেগে যাবেন। তাঁকে রাগিয়ে কার কী লাভ? আর তা ছাড়া, ঠাকুরমশাই তো কারুর কিচ্ছুমাত্র ক্ষতিও করছেন না। পুজোটা যে তিনি বন্ধ করেননি, সে তো এই চৌধুরি-পরিবারের মঙ্গলের কথা ভেবেই।”

“তা বটে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু নিরু, আমাদের কথাটা ক্রমেই অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। চৌধুরিবাড়ির সঙ্গে তোমাদের সম্পর্কের কথা হচ্ছিল। তোমার জামাইবাবু আর দিদিকে এঁরা বিয়ের পরে আর তোমাদের বাড়িতে পাঠাননি, তোমাদেরও কখনও আসতে বলেননি এখানে, তাই তো?”

“হ্যাঁ।”

“অর্থাৎ দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক কি যোগাযোগ বলতে আর কিছু রইল না, কেমন?”

“কী করে আর থাকবে।”

“দিদি কোনও চিঠিও লিখতেন না তোমাদের?”

“বিয়ের পরে খান দুয়েক চিঠি লিখেছিল। তার উত্তরও দিয়েছিলুম আমরা। কিন্তু তারপরে আর কোনও চিঠি পাইনি।”

“ফেন পাওনি কিছু আন্দাজ করতে পারো?”

“আন্দাজই করতে পারি, কিন্তু সেটা সত্যি না মিথ্যে, তা কী করে বলব? হতে পারে যে, আমরা যে চিঠি লিখেছিলুম, তা দিদির হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়নি। আবার এমনও হতে পারে যে, দিদি যে-চিঠি লিখত, ডাকবাক্সে না ফেলে সেগুলো মাঝপথেই ছিঁড়ে ফেলত এরা। ঠিক করে তো কিছু বুঝবার উপায় নেই।”

“এ-বাড়িতে এসে ঢুকবার পরে জামাইবাবুকে এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করোনি?”

“একদিন করেছিলুম। কিন্তু জামাইবাবু তাতে এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে যে, বুঝতে পারলুম, গোটা ব্যাপারটা নিয়ে একটা চাপা কষ্ট রয়েছে ওঁর মনে। সেটা বুঝবার পরে আর আমি কথাটা কখনও তুলিনি। আর তা ছাড়া, কথাটা তুলতে হলে অন্তত খানিকক্ষণের জন্যেও তো ওঁকে একা পাওয়া দরকার। তা আমি পাচ্ছি কোথায়?”

“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে বলো তারপরে কী হল?”

“তারপরে আর কী হবে? তারপরে আমার বাবা মারা গেলেন। এ হল দিদির বিয়ের তিন বছর পরের কথা। আমার বয়েস তখন দশ বছরের বেশি হবে না। বাড়িতে শুধু মা আর আমি। অবস্থাটা বুঝে দেখুন।”

“তোমার বাবার শ্রাদ্ধেও এঁরা কেউ যাননি?”

“কেউ না। মেয়েকে তো চতুর্থীর কাজ করতে হয়। দিদি সে-কাজ এই বাড়িতেই করেছিল। তবে হ্যাঁ, রামদাসদার হাত দিয়ে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এঁরা। মা অবশ্য সে টাকা নেয়নি।”

“আলিপুরদুয়ারে তোমাদের কোনও আত্মীয়স্বজনও নেই?”

“কেউ না। আসলে আমরা পুব-বাংলার লোক। পার্টিশনের সময়ে মা আর আমাদের দুই বোনকে নিয়ে বাবা এ-দিকে চলে আসেন। এ হল সাতচল্লিশ সালের কথা। দিদির বয়েস তখন চোদ্দ আর আমার চার।”

“তোমাদের পরিবারের আর-কেউ তখন পুব-বাংলা থেকে চলে আসেননি? মানে তোমার কাকা-জ্যাঠাদের কেউ?”

“তখন আসেননি। বাবার কাছে শুনেছি যে, দু’চার বছর বাদে তাঁরা এসেছিলেন। তাঁরা নাকি কেউ মালদায় আছেন, কেউ বালুরঘাটে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই।”

শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপরে বললেন, “তোমাদের অবস্থা তো যদ্দুর বুঝতে পারছি মোটেই ভাল ছিল না। তা হলে কী করে চলত তোমাদের?”

“গরিবদের যেভাবে চলে। ইস্কুল থেকে আমাকে ছাড়িয়ে আনা হল। বাড়িতে সেলাইয়ের কল ছিল একটা। পাড়ার লোকেরা ছিট-কাপড় দিয়ে যেত, মা তাই দিয়ে ফ্রক, ব্লাউজ আর সায়া বানিয়ে দিতেন। আমার কাজ ছিল মা’কে সাহায্য করা। তবে মজুরি তো বিশেষ পাওয়া যেত না, বাড়িটা ছাড়া বাবাও বিশেষ-কিছু রেখে যাননি, ‘তাই কষ্টেসৃষ্টে চালিয়ে নিতে হত।”

“তারপর?”

“তারপর আমি বড় হতে লাগলুম। কাগজে বিয়ের বিজ্ঞাপন দেখে মা চিঠি লিখতে লাগলেন। তারপর চিঠি লিখতে-লিখতে, আর নিজেদের উপোসি রেখে পাত্রপক্ষের লোকদের রসগোল্লা খাওয়াতে-খাওয়াতে একদিন তিনিও মারা গেলেন।”

“বাড়িতে তুমি তখন একা?”

“একেবারে একা।”

“পাড়া-প্রতিবেশীরাও কেউ আশ্রয় দিলেন না তোমাকে?

“কেউ না। আর তা দেবেই বা কেন। মা যখন মারা যান, আমার বয়েস তখন ষোলো-সতেরো। ওই বয়সের মেয়েকে কেউ কখনও নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয়? প্রতিটি বাড়িতেই তো উঠতি-বয়সের ছেলে রয়েছে, আমি তাদের মাথাগুলোকে চিবিয়ে খাব, এই ভয় নেই তাদের?”

ভাদুড়িমশাই স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলেন নিরুর দিকে। বললেন, “তারপর?”

“তারপর আর কী,” নিরু বলল, “তারপর আমাদের বাড়ির জানলায় রাত-দুপুরে টোকা পড়তে লাগল। দিনের বেলাতেও স্বস্তি ছিল না। রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটতুম, তখন বুঝতে পারতুম যে, পিছন থেকে কয়েক জোড়া চোখ আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। যারা তাকিয়ে থাকত, তাদের সবাই যে নেহাত ছেলে-ছোকরা, তাও নয়, তার উপরে আবার বাসদেও এসে জুটে গেল তাদের সঙ্গে।”

“বাসদেও কে?”

“ট্রাক-ড্রাইভার। পাড়ায় তখন নতুন-নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। সেইসব বাড়ির জন্য শিলিগুড়ি থেকে ট্রাকে করে লোহা, সিমেন্ট আর পাথরকুচি নিয়ে আসত বাসদেও। কুলিরা যখন তার ট্রাক থেকে মাল নামাত, তখন সেই যে সে আমাদের বাড়ির বারান্দায় এসে বসত, সহজে আর সেখান থেকে নড়তে চাইত না। অনেক সময় সে আলিপুরদুয়ারেই রাত কাটাত, আমাদের বাড়ির সামনে ট্রাক রেখে তারই মধ্যে শুয়ে থাকত সে। বিচ্ছিরি-বিচ্ছিরি গান গাইত। তাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পেতুম আমি। সন্ধের পর থেকেই ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে থাকতুম। সাপের ভয়…ভূতের ভয়…রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ভয়ও যেন বেড়ে যেত…সারা রাত আমি দু’চোখের পাতা এক করতে পারতুম না। উঃ,

সে যে কী ভয়, তা আমি আপনাদের কী করে বোঝাব! মনে হতে, যে-দিকে দু’চোখ যায়, পালিয়ে যাই!” আবার খানিকক্ষণ চুপ করে রইল নিরু। কী যেন ভাবল। তারপর বলল, “এ-সব কথা শুনতে নিশ্চয় খুব খারাপ লাগছে আপনাদের?”

আমার খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু ভাদুড়িমশাই দেখলুম নির্বিকার। বললেন, “কেমন লাগছে, সেটা কোনও ব্যাপার নয়। তোমার যদি মনে হয় যে, আমার শোনা দরকার, তা হলে বলো। যা তোমার বলবার আছে, সবই আমি শুনব।”

নিরু বলল, “হ্যাঁ, আপনার শোনা দরকার। না-শুনলে আমাকে আপনি ভুল বুঝবেন, জামাইবাবুকেও ভুল বুঝবেন।”

“বেশ তো, তা হলে বলো।”

“হ্যাঁ, আমি বলব, সবটাই বলব।… কোন্ পর্যন্ত বলেছি যেন?”

“যে-দিকে দু’চোখ যায়, পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করত তোমার।”

“হ্যাঁ, ইচ্ছে করত। যত রাজ্যের ভয় তো আমাকে পাগল করে তুলেছিল, তা একদিন রাতদুপুরে সেই ভয়ের হাত ধরেই আমি পালিয়ে গেলুম। পালিয়ে যে কোথায় যাচ্ছি, কোন্ ঘাটে, না কোন্ আঘাটায়, তাও তখনও জানি না। এখানে-ওখানে ঠেক খেতে-খেতে শেষ পর্যন্ত কোথায় এসে উঠলুম জানেন? শিলিগুড়ির এক বস্তিতে। একটা বাচ্চা হয়েছিল। বাঁচেনি। বাচ্চাটার বাপ মরল তার বছর খানেক বাদে। হঠাৎ একদিন জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরল, সেই জ্বর আর সারেনি।…কী জানেন, বাসদেও লোকটা যে খুব খারাপ ছিল, তা নয়। ওই মানে বস্তির আর-পাঁচটা মাতাল যতটা খারাপ হয় আর কি, তার চেয়ে বেশি কিছু খারাপ ছিল না। একটু বোকা, একটু গোঁয়ার, একটু রাগী, একটু সন্দেহবাতিগ্রস্ত, ..আর হ্যাঁ, আকন্ঠ মদ গিলে যে-দিন বাড়ি ফিরত, সে-দিন তো আর কান্ডজ্ঞানের বালাই থাকত না, তখন তাই বউকে ধরে খুব ঠ্যাঙাত। তা সে তো মারা গেল। তখন উড়ে এসে জুড়ে বসল তার এক ভাই। কোত্থেকে উড়ে এল, ভগবান জানেন…বাসদেও যখন বেঁচে ছিল, তখন তো তাকে একদিনও এসে তার দাদার খোঁজখবর করতে দেখিনি। তা বস্তির লোকেরা বলল, হ্যাঁ, বাসদেওয়েরই ভাই বটে। তখন আর কী করি। সাক্ষাৎ দেওর যখন, তখন তো আর থাকতে না-দিয়ে উপায় নেই। কিন্তু বিপদ কী হল জানেন, থাকতে পেলেই লোকে শুতে চায় তো, তা এই দেওরটির দেখলুম একা শুতে খুব আপত্তি।”

টিপাইয়ের উপরে জলের জাগ ছিল। কাচের গেলাসও ছিল একটা। জাগ থেকে গেলাসে জল ঢালল নিরু। তারপর গেলাসটা উঁচু করে ঢকঢক করে জলটা খেয়ে নিয়ে গেলাসটা নামিয়ে রেখে আঁচলে মুখ মুছে বলল, “আরও শুনবেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যপ্রকাশ এ-সব কথা কিছুই জানতেন না?”

“মা যে মারা গেছেন, এই খবর শুনে আলিপুরদুয়ারে এসেছিলেন। নিজের চোখেই দেখে গিয়েছিলেন যে, আমি একেবারে একা হয়ে গেলুম। দিদি তাঁর সঙ্গে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল যে, আমি যেন মুকুন্দপুরে চলে আসি। যেমন করেই হোক, মুকুন্দপুরে আমাকে যাতে থাকতে দেওয়া হয়, তার জন্যে সে তার শ্বশুরকে যে রাজি করাবে, তাও জানিয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি।”

“রাজি হওনি কেন?”

সাপের গায়ে খোঁচা লাগলে যেমন হয়, একেবারে সেইভাবেই যেন হঠাৎ ফুঁসে উঠল নিরু। বলল, “তাও আমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে? তা হলে জেনে রাখুন যে, গরিবদেরও মান-অপমান বোধ থাকে, রাগ-অভিমান থাকে। কে জানে, হয়তো বড়লোকদের চেয়ে একটু বেশিই থাকে। সব কথা আপনি শোনেননি ভাদুড়িমশাই। ধুলো-পা’র ব্যাপারটা জানেন তো, বিয়ের দিন কয়েক বাদে মেয়ে-জামাইকে একবার নিয়ে আসতে হয়। বাবা যে তারই জন্যে মুকুন্দপুরে গিয়েছিলেন, সে-কথা বলেছি। জামাইবাবুর বাবা তখন তাঁকে কী বলেছিলেন জানেন?”

“বলেছিলেন যে, চৌধুরি পরিবারে এ-সব নিয়ম নেই। তাই না?”

“শুধু তা-ই নয়, বলেছিলেন যে, আলিপুরদুয়ারে গেলে তাঁর ছেলে আর ছেলের বউয়ের থাকা-খাওয়ার বড় কষ্ট হবে। বলেছিলেন, “বিশ্বাসমশাই, এখানে ওরা যে-ভাবে রয়েছে, সে-ভাবে তো আপনি ওদের রাখতে পারবেন না, তা হলে কেন নিতে এসেছেন?’ বলুন ভাদুড়িমশাই, এর পরেও এখানে আসা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল?”

“সত্যপ্রকাশের বাবা যে ও-কথা বলেছিলেন, তা তুমি জানলে কী করে?”

“বাবাই একদিন দুঃখ করে মা’কে সব বলেছিলেন, আমি আড়াল থেকে শুনেছি।”

“মায়ের মৃত্যুর পরেও তাই সত্যপ্রকাশের সঙ্গে তুমি এখানে চলে আসতে রাজি হওনি, কেমন? “

“হ্যাঁ।” নিরু বলল, “ওইভাবে অপমানিত হয়ে আমার বাবা একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। তা নইলে যে আরও কয়েকটা বছর হয়তো বাঁচতেন তিনি, আমার মায়ের জীবনটাও আর-একটু স্বস্তিতে কাটতে পারত, এই কথাটা যেন কিছুতেই আমি ভুলতে পারছিলুম না। জামাইবাবুকে আমি সেদিন বসতে পর্যন্ত বলিনি। বলেছিলুম, আপনি ফিরে যান, না-খেয়ে মরতে হয় তো তাতেও আমি রাজি, তবু আমি মুকুন্দপুরে যাব না।”

“তারপর?”

“তার কিছুদিন পরেই দিদির শ্বশুর মারা যায়। শুনেছি, দিদি নিজেই সেদিন আলিপুরদুয়ারে ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে আর আমার খোঁজ পায়নি। কী করে পাবে, তার আগেই তো আমি বাসদেওয়ের সঙ্গে ঘর ছেড়েছি।…দিদি নাকি ভীষণ কেঁদেছিল সব শুনে। জামাইবাবুকে খুব গালমন্দও করেছিল। বলেছিল, “তোমরা বড়লোক হতে পারো, কিন্তু মানুষ নও। তোমাদেরই জন্যে আমার বাবা মরেছেন, মা মরেছেন, এবারে হাসিটাও হারিয়ে গেল।’ কয়েকটা দিন দিদি নাকি তখন মুখেও কিছু তোলেনি। শুধু হাপুস নয়নে কাঁদত।”

“এ-সব কথা কার কাছে শুনলে?”

“জামাইবাবুর কাছে। জামাইবাবু নাকি কাগজে কাগজে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। কিন্তু বস্তিতে তো আর কাগজ যায় না, তাই আমার চোখে পড়েনি। আর চোখে পড়লেই যে তক্ষুনি আমি মুকুন্দপুরে চলে আসতে পারতুম, তাও তো নয়।”

এতক্ষণে কথা ফুটল আমার মুখে। বললুম, “তোমার ডাক-নাম বুঝি হাসি?”

“হ্যাঁ। সুহাসিনী থেকে হাসি। দিদির ভাল নাম সুভাষিণী। ডাক-নাম সুভা। দিদি কিছু ভুল বলেনি। ওদের জীবন থেকে সত্যিই তো আমি হারিয়ে গিয়েছিলুম। শেষ পর্যন্ত সেই হারানো মেয়েটার খোঁজ অবশ্য পাওয়া গেল।”

বললুম, “কবে?”

“আজ থেকে পাঁচ পছর আগে। দিদি আব তখন বেঁচে নেই। সুজাতার তখনও বিয়ে হয়নি, আর-দুটো ছেলেমেয়ে তো অনেক ছোট। শুনেছি মরবার আগে দিদি নাকি জামাইবাবুকে মাথার দিব্যি দিয়ে বলেছিল, ‘আমার বাপের বাড়ির জন্যে তা তোমরা কিছু করলে না, অন্তত নিজের ছেলেমেয়ে তিনটের কথা ভেবে হাসিকে তুমি খুঁজে বার করো, নইলে এদের কে দেখবে?’ তা জামাইবাবুও আমার খোঁজ কিছুতেই পেতেন না, যদি না আমি নিজের থেকেই তাঁকে একদিন খবর পাঠাতুম।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোথায় খবর গাঠালে?”

“কেন, শিলিগুড়ির হোটেল ফ্লোরায়। হোটেলটা তো আপনারা দেখেছেন। শুনেছি কলকাতা থেকে শিলিগুড়িতে পৌঁছবার পরে সেইখানেই কাল আপনাদের তোলা হয়েছিল। আমি অবশ্য হোটেলের কথা জানতুম না। বাসদেও কন্তু সমস্ত খবর রাখত। মাতাল অবস্থায় সে-ই একদিন আমাকে বলেছিল যে, শিলিগুড়ির হংকং বাজারের কাছে জামাইবাবু একটা মস্ত হোটেল খুলেছেন। তা সে মারা যাবার দিন কয়েক বাদেই আমি বস্তির একটা ছেলেকে দিয়ে জামাইবাবুর কাছে আমার খবর পাঠাই। না পাঠিয়ে তখন আর আমার উপায় ছিল না।”

“কেন?”

“তা তো একটু আগেই বলেছি।” মুখ নিচু করে নিরু বলল, “বাসদেওয়ের ভাইটা বড় উৎপাত করছিল। তা চিঠি পেয়েই জামাইবাবু ‘মামাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাবার জন্যে তাঁর একজন কর্মচারীকে পাঠিয়ে দেন। সেদিন অবশ্য আমি আসতে পারিনি। ঠিক সেই সময়ে আমি ঘরে ছিলুম না, টিউবওয়েল থেকে জল ধরতে একটু দূরে যেতে হয়েছিল। ফিরে এসে শুনি, কে একজন নাকি আমার খোঁজ করতে এসেছিল, তা বাসদে “য়ের ভাই তাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারপর?”

নিরু বলল, “কথাটা শুনে আহার মনে হয়েছিল যে, ওই নরক থেকে আর কোনও দিনই আমি বেরিয়ে আসতে পারব না। কিন্তু সেই রাত্তিরেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বাসদেওয়ের ভাই তখনও বাড়ি ফেরেনি, হঠাৎ একটা চিত্রার-চেঁচামেচি কানে যেতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে শুনতে পেলুম যে, ‘কে একটা লোক নাকি আমারে বস্তির সামনের রাস্তার উপরে খুন হয়ে পড়ে আছে। লোকটা যে কে, খানিক বাদে তা-ও জানা গেল। বাসদেওয়ের ভাই। পরদিন সকালেই জামাইবাবু আবার লোক পাঠিয়ে আমাকে তাঁর হোটেল নিয়ে যান। তারপর সেইদিনই সেখান থেকে নিয়ে আসেন মুকুন্দপুরে।”

ঘর একবারে নিঃশব্দ। আমি কোনও কথা বলতে পারছিলুম না। ভাদুড়িমশাইও চুপ করে বসে আছেন। কপালে ভাঁজ পড়েছে কয়েকটা। মনে হল, তিনি কিছু ভাবছেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনিই প্রথম মুখ খুললেন। বললেন “সুহাসিনী, তোমার আর কিছু বলার নেই?”

“না।” নিরু বলল, “আনার যা বলবার ছিল, সব বলেছি, কিন্তু দোহাই আপনাদের, জামাইবাবু যেন কিছুতেই এ-কথা জানতে না পারেন।”

এতক্ষণে হাসি ফুটল ভাদুড়িমশাইয়ের মুখে। বললেন, “সত্যপ্রকাশকে কতটা কী বলব না বলব, সেটা তুমি আমার উপরে ছেড়ে দাও। তবে তোমাকে বলি, সব কথা আমাদের জানিয়ে তুমি খুব বুদ্ধির কাজ করেছ, না-জানালেই ভূল করতে। এখন যাও, মা আর পিসিমা হয়তো তোমার খোঁজ করতে পারেন।”

ট্রে-র উপরে কাপ-ডিশ গুছিয়ে নিয়ে নিরু বেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ কী ভেবে ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু দাঁড়াও।”

দরজা থেকে আবার ফিরে এল নিরু। দেখলুম, তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। স্খলিত গলায় বলল, “কিছু বলবেন আমাকে?”

স্থির চোখে নিরুর দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “তুমি তো আমাদের অনেক কথাই বললে। এবারে বরং আমি তোমাকে একটা কথা বলি। বাসদেওয়ের যে ভাইটা আজ থেকে পাঁচ বছর আগে শিলিগুড়ির একটা অন্ধকার রাস্তায় খুন হয়েছিল, তার নাম নিশ্চয় রাজদেও কুমি। তাই না?”

চারুর চোখে যেন আতঙ্ক ফুটে উঠল হঠাৎ। চাপা গলায় সে বলল, “আপনি কী করে জানলেন?”

“বা রে, আমি জানব না কেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সব কিছু জানাই তো আমার কাজ।”

মুকুন্দপুরের মনসা – ২৫

নিরু চলে যাবার পরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললুম, “রাত তো আটটা বাজতে চলল, এখন তা হলে কী করব?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিরু এখন একটু অস্থির হয়ে আছে, ন’টার আগে খাবার ডাক পড়বে বলে মনে হয় না। টর্চটা বার করুন।”

“কেন, এখন আবার বেরুবেন নাকি?”

“বেরুব, তবে দূরে যাব না, বাড়িটার চারদিকে একটা চক্কর দিয়ে আসব শুধু। আর তা ছাড়া ভট্‌চাজ-মশাইয়ের সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার।”

“ভট্‌ট্চাজ-মশাই মানে?”

“এঁদের পুরুতঠাকুর গোবিন্দ ভট্‌চাজ। ভদ্রলোকের সঙ্গে এখনও দেখা হয়নি। অথচ সেদিন শেষরাত্তিরে একমাত্র উনিই নাকি চোর পালাবার শব্দটা শুনতে পেয়েছিলেন। দেখি উনি কী বলেন।”

জাম্পারটা খুলে রেখেছিলুম : পাঞ্জাবির উপরে আবার সেটাকে চড়িয়ে নিয়ে বললুম, “চলুন।”

ভাদুড়িমশাই গলায় একটা মাফলার জড়ালেন। আমাকে বললেন, “আপনি মাফলার এনেছেন তো?”

বললুম, “শুধু মাফলার কেন, একটা আলোয়ানও এনেছি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আলোয়ানের দরকার হবে না, তবে মাফলারটা জড়িয়ে নিন। বাইরে হিম পড়ছে, ঠান্ডা সাধারণত গলাতেই লাগে।”

সুটকেশ খুলে মাফলারটা বার করে বললুন, “আমি রেডি।”

ঘরের পুব দিকের দরজা খুলে আমরা বেরিয়ে এলুম। এ-ঘরের পুব আর পশ্চিম, দু’দিকেই দু’টি টানা বারান্দা। এ-দিকের বারান্দার পরেই বাইরের উঠোন। বাইরের এই উঠোনটা অন্দরের উঠোনের চেয়ে অনেক বড়। এরই উত্তরে মন্দির, পুবে রামদাসের ঘর আর দক্ষিণে কাচারি। কাচারি ঘরটাও রামদাসের ঘরের মতোই ছোট আর বড় দু’টি অংশে ভাগ করা। বড়-অংশটা বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, বাইরের লোকজনেরা সেইখানেই বসেন। ছোট-অংশটায় থাকেন পুরুতঠাকুর। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, পুরুতঠাকুরের থাকার একটা ব্যবস্থা করে দেবার জন্যেই ঘরটার মধ্যে একটা কাঠের পার্টিশান বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

পার্টিশানের ব্যাপারটা অবশ্য আগে বুঝিনি। পুরুতঠাকুরের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে যখন তাঁর ঘরে ঢুকি, তখন বুঝেছিলুম। সে-কথায় একটু বাদেই আসব।

বারান্দা পেরিয়ে উঠোনে নামলুম আমরা। ঠাহর করে দেখলুম, একমাত্র রামদাসের ঘরের মধ্যেই ক্ষীণ একটা আলোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা ছাড়া আর কোনও দিকেই আলোর কোনও চিহ্ন নেই। চতুর্দিকে একেবারে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। এতটুকু শব্দ কোথাও শোনা যাচ্ছে না। গাছপালাগুলোও একেবারে ছবির মতো স্থির। গাছপালার পাতা নড়লে তারও একটা শব্দ পাওয়া যায়। তাও পেলুম না। অন্ধকারের মধ্যে নড়াচড়া করতে তারাও সম্ভবত ভয় পাচ্ছে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে কিন্তু চোখ জুড়িয়ে গেল। এমন ঝলমলে আকাশ অনেক কাল দেখিনি। কার্ত্তিক মাস। অথচ এতটুকু কুয়াশা নেই। তারাগুলি একেবারে হিরের কুচির মতো ঝকঝক করছে। দু’দিন বাদেই কালীপুজো। চাঁদ ওঠেনি, জোৎস্নার কণামাত্র নেই কোনওখানে। কিন্তু তারই ফলে আজ নক্ষত্রের বাহার আরও বেশি খুলেছে। নক্ষত্র তো নয়, (খন লক্ষ-লক্ষ শমা-চুমকি। আর সেই শমা-চুমকি বসানো নিকষ কালো রঙের শালখানাকে গায়ে জড়িয়ে আকাশটা যেন খলখল করে হাসছে।

টর্চটা নিবিয়ে দিয়ে বললুম, “দেখেছেন? কলকাতার আকাশে এর অর্ধেক তারাও আমাদের চোখে পড়ে না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা পড়ে না ঠিকই, তবে কিনা একটা চাঁদে যত কাজ হয়, লক্ষ-লক্ষ তারায় তার সিকির-সিকি কাজও হয় না। একশ্চন্দ্রস্তমোহস্তি, চন্দ্রবিহনে পৃথিবী একেবারে অন্ধকার। টর্চটা জ্বালুন মশাই।”

জ্বালবার আগেই অন্ধকারের ভিতর থেকে কে যেন আমার কব্জিতে হাত রেখে চাপা গলায় বলল, “এখন জ্বালবেন না। আমি আগে সরে যাই, তারপর জ্বালবেন।”

চমকে গিয়েছিলুম। তার পরেই অবশ্য বুঝতে পারা গেল যে, লোকটি জগদীশ। আমাদের বারান্দার ঠিক বাইরে, উঠোনে নামবার সিঁড়ির একধারে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

ভাদুড়িমশাইও চাপা গলায় বললেন, “সারাক্ষণ নজর রাখতে হবে ওই ঘরটার উপরে, মনে আছে তো?”

“আছে বাবু।”

“কেউ যেন ওর ধারেকাছেও যেতে না পারে।”

জগদীশ বলল, “কেউ পারবে না।” বলেই সে হঠাৎ নিঃশব্দে সরে গেল।

তারও খানিক বাদে টর্চ জ্বাললুম আমি।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “জগদীশ যদি ঠিক কথা বলে থাকে তো এদিকটা নিয়ে ভাববার কিছু নেই। চলুন, মন্দিরের পুব দিকের রাস্তাটা ধরে একবার ঘুরে আসা যাক।” তারপর বললেন, “সাবধানে পা ফেলবেন। এখনও তেমন শীত পড়েনি, তার উপরে জংলা জায়গা, পথের উপরে সাপখোপ থাকাটা কিছু বিচিত্র নয়।”

“তাতে ভয়ের কী আছে,” হেসে বললুম, “সত্যপ্রকাশ তো বলেই দিয়েছেন যে, মনসামূর্তি প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে মুকুন্দপুরে কাউকে সাপে কাটেনি।”

“তা বলেছেন ঠিকই, তবে কিনা কোটা কার্যকারণ আর কোন্টা সমাপতন, সেটাও বোঝা চাই। আমার তো মনে হয়, সাপে কাউকে না-কাটার সঙ্গে মনসামূর্তি প্রতিষ্ঠার কোনও সম্পর্কই নেই। এটা নেহাতই সমাপতন…অর্থাৎ ইংরেজিতে ওই যাকে বলে কোইনসিডেন্স, সেই রকমের ব্যাপার আর কি।”

“মানে সাদা-বাংলায় কাকতালীয় ঘটনা, কেমন?”

“ঠিক বলেছেন। ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে’ বলে একটা প্রবাদ আছে না, এও একেবারে তা-ই।”

“অর্থাৎ সাবধান থাকাই ভাল। কেমন?”

“বিলক্ষণ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সাধুবাবার ব্যাপারটা দেখলেন না? মুখে বলছেন মুকুন্দপুরে সাপই নেই, অথচ সাপের ভয়ে নিজে তো একেবারে কাঁটা হয়ে আছেন।”

“সেটা কী করে বুঝলেন?”

“আরে মশাই, সাপের ভয় যদি ওঁর না-ই থাকবে, তো ঘরের চারপাশে কারবলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে রেখেছেন কেন?”

“তাই তো, এটা তো খেয়াল করে দেখিনি।”

ভাদুড়িমশাই যে হাসছেন, অন্ধকারের মধ্যেও সেটা বুঝতে পারা গেল। হাসতে-হাসতেই বললেন, “শুধু এটা কেন, অনেক কিছুই আপনি খেয়াল করে দেখেন না। কী করেই বা দেখবেন, মাটির দিকে তো আর আপনার চোখ নেই, চোখ পড়ে আছে আকাশের নক্ষত্রের দিকে!”

এবারে আমিও হেসে উঠলুম। বললুম “ঠিক আছে, ঠিক আছে, এখন থেকে তা হলে মাটির দিকেই সারাক্ষণ চোখ রাখব।”

“সারাক্ষণ না-রাখলেও এখন অন্তত রাখুন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মুখে আওড়ান আস্তিকস্য মুনের্মাতা’র মন্ত্র, কিন্তু পা ফেলুন মাটির দিকে চোখ রেখে। অর্থাৎ সাবধান থাকুন।”

“তা না হয় থাকলুম, কিন্তু ‘আস্তিকস্য মুনের্মাতা টা কী ব্যাপার?”

আবার হেসে উঠলেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “বামুনের ঘরে জন্মেছেন, অথচ সংস্কৃতটাও জানেন না? এ তো বড় লজ্জার কথা মশাই! ‘আস্তিকস্য মুনেমার্তা’র অর্থ হল আস্তিক মুনির মা।”

“তিনি আবার কে?

“তিনি মনসা। ছেলের নাম আস্তিক হল কেন জানেন?”

“নাস্তিক নামটা যেহেতু সুবিধের নয়, সেইজন্যে?”

“আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না! তা হলে শুনুন, এই নামটা নিয়েও একটা গপ্পো রয়েছে। মনসার সঙ্গে যে জরৎকারু মুনির বিয়ে হয়েছিল, সে তো আগেই বলেছি। তা মনসা একদিন তাঁর স্বামীকে বললেন, আমাকে একটি পুত্রসন্তান দাও। স্ত্রীর প্রার্থনার উত্তরে মুনি বললেন, ‘অস্তি।’ অর্থাৎ কিনা ‘তোমার গর্ভেই রয়েছে আমার ছেলে’। বাস্, ওই ‘অস্তি’ থেকেই ছেলের নাম হয়ে গেল আস্তিক। তাবৎ সাপকে মারবার জন্যে রাজা জনমেজয় সর্পযজ্ঞ করেছিলেন, সে তো জানেন। এই আস্তিকের জন্যেই সাপেরা সেবারে রক্ষে পেয়ে যায়।”

কথা বলতে-বলতে আমরা মন্দিরের উত্তর দিকের বাগানটাকে পাক দিয়ে আবার উঠোনে চলে এসেছিলুম। শুনেছিলুম, বাইরের উঠোনের দক্ষিণ দিকের ঘরে থাকেন পুরুতঠাকুর। আমাদের ঘর থেকে যখন উঠোনে এসে দাঁড়াই, এদিকে একমাত্র রামদাসদের ঘর ছাড়া আর-কোথাও তখন আলো জ্বলতে দেখিনি। এখন দেখলুম, রামদাসের ঘরটা অন্ধকার, তবে দক্ষিণের ঘরে আলো জ্বলছে।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভট্‌ট্চাজমশাই জেগে আছেন মনে হয়। চলুন, একবার দেখা করা যাক।”

যেমন অন্যান্য ঘরের, তেমনি দক্ষিণের এই ঘরের সামনেও কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা টানা বাবান্দা। বারান্দায় উঠে দরজায় টোকা দিতে লন্ঠন হাতে নিয়ে ভিতর থেকে যিনি বাইরে এসে দাঁড়ালেন, বুঝতে পারলুম, তিনিই এ-বাড়ির নিত্যপুজার পুরোহিত গোবিন্দ ভট্টাচার্য। একে পুরোহিত, তায় নাম গোবিন্দ, ভেবেছিলুম যে, মানুষটি নিশ্চয় বৃদ্ধ হবেন। এখন দেখলুম, বৃদ্ধ তো ননই, এমনকী প্রৌঢ়ও নন। নেহাতই ছেলেমানুষ। বয়স মেরেকেটে সাতাশ-আঠাশ। পরনে ধুতি আর মলমলের হলুদ ফতুয়া। ফতুয়ার কাপড় পাতলা বলেই বোঝা গেল, যে, তার আড়ালে মোটা একটা পৈতে ঝুলছে। গোবিন্দ ভট্টাচার্যের গায়ের রং টকটকে ফর্সা, মুখখানিও মিষ্টি।

আমাদের দেখেই বললেন, “আসুন, আসুন।”

ঘরটি ছোট। একদিকে একটা সরু তক্তাপোশ। তার সামনে দুটি মোড়া। অন্যদিকের দেওয়ালে মনসার একখানা পট টাঙানো। তার সামনে মেঝের উপরে পশমের একখানি আসন পাতা। আসনের পাশে ধূপদান, কোষাকুষি, একটি শাঁখ, একটি কাঁসর আর পিতলের একটি পঞ্চপ্রদীপ।

আমরা মোড়ায় বসলুম, গোবিন্দ ভট্টাচার্য বসলেন তক্তাপোশের একধারে। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার সঙ্গে এই আমাদের প্রথম দেখা হল।”

ভট্‌চাজমশাই হেসে বললেন, “আন্দ সকালেই হতে পারত। ভেবেছিলুম চৌধুরিমশাই আমাকে ডেকে পাঠাবেন। কিন্তু পাঠাননি। আমিও তাই যাইনি। উনি না-ডাকলে আমার নিজের থেকে যেতে বড় সঙ্কোচ হয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে চৌধুরিমশাই আপনাকে ডেকে না-পাঠালেও আপনার কথা আমাদের বলেছেন।”

গোবিন্দ ভট্‌চাজ বললেন, “কী বলেছেন? ওঁর নিষেধ সত্ত্বেও যে নিত্য আমি আমার ঘরে বসেই পুজো করে যাচ্ছি, সেটা আবার উনি জেনে ফেলেননি তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, ও-কথা কেউ তাঁকে বলেনি। কথা হচ্ছিল মূর্তি-চুরির ব্যাপারটা নিয়ে। চৌধুরিমশাই বললেন, একটা শব্দ আপনার কানে গিয়েছিল। লোকজন ছুটে পালাবার শব্দ। তা ছাড়া একটা গাড়ির শব্দও আপনি নাকি শুনেছিলেন। সত্যি?”

আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে, চৌধুরিমশাই নন, আজ সকালে এই কথাটা বলেছিল রামদাস। কিন্তু ভাদুড়িমশাই তবু যখন রামদাসের নাম না-করে সত্যপ্রকাশের নাম করলেন, তখন তার একটা কারণ আছে নিশ্চয়। হয়তো তিনি ভাবছেন যে, চৌধুরিমশাইয়ের নাম করলে কথাটা আরও জোর পাবে। যা-ই হোক, ভুলটা আমি আর শুধরে দিলুম না।

গোবিন্দ ভট্‌ট্চাজ বললেন, “চৌধুরিমশাই ঠিকই বলেছেন। সত্যিই আমি শব্দটা ওনেছিলুম।”

“শুনে আপনার কী মনে হয়েছিল?”

“মনে হয়েছিল, জনাকয় লোক যেন দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।”

“কোনদিকে পালাচ্ছে?”

“মন্দিরের উত্তর দিকে।”

“তার মানে ফলবাগানের দিকে। তাই না?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ, বাগানের মধ্যে দিয়েই যেন হুড়মুড় করে পালিয়ে গেল তারা।”

“আর ওই গাড়ির শব্দ?”

“হ্যাঁ, সেটাও শুনতে পেয়েছিলুম। লোকজন পালাবার শব্দের প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই শুনেছিলুম।”

“তা হলে তো বুঝতে হয় যে, মুর্তিচোরেরা ওই গাড়িতে করেই পালিয়েছে।”

কথাটা বলে একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “আপনি এখানে কতদিন হল পুজো করছেন?”

“তা প্রায় বছর তিনেক হল।”

“আপনার আগে এখানে কে পুজো করতেন?”

“আমার বাবা। দু’বছর হল তিনি গত হয়েছে। তবে গত হবার আগে তা প্রায় এক বছর তিনি পুজো করতে পারেননি। করবার সামর্থ্যই তাঁর ছিল না। তখন থেকে আমিই পুজো করে যাচ্ছি।”

“আপনারা কি এদিকের লোক?”

ভট্‌চাজমশাই বললেন, “না, আমাদের বাড়ি বর্ধমান জেলায়। বাবাকে এঁরাই সেখান থেকে চিঠি লিখে আনিয়ে নিয়েছিলেন। বাবা আবার বছর তিনেক আগে আমাকে আনিয়ে নেন।”

“বর্ধমানে আপনার কে আছেন?”

“দাদারা আছেন, বৌদিরা আছেন, তাঁদের ছেলেপুলেরা আছে।”

“আপনার মা?”

“আমার বয়স যখন মাস ছয়েক, মা তখনই মারা যান। বাবা তার পরের বছরই মুকুন্দপুরে চলে আসেন। আমি মানুষ হয়েছি আমার এক পিসির কাছে।”

“পিসিমা কোথায়?”

“তিনিও বেঁচে নেই।”

আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “এদিকে কেউ নেই আপনার?”

“এক মামাতো দাদা থাকেন হাসিমারায়। তাঁর সেখানে দোকান আছে একটা। আগে তো আমি সেখান থেকেই রোজ যাতায়াত করতুম। কিন্তু তাতে বড় ধকল হয়। চৌধুরিমশাইকে কথাটা বলতে তিনি তাঁর কাচারিঘরটাকে পার্টিশান করে আমাকে বললেন, তুমি তা হলে এখানে থাকো। সেই থেকে এখানেই আছি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা বুঝতে পারছি। সেটা এই যে, যাঁদের বাড়িতে আছেন, তাঁদের মঙ্গল-অমঙ্গলের কথাটা আপনি ভাবেন। তা নইলে নিশ্চয় চৌধুরিমশাইয়ের নিষেধ সত্ত্বেও পুজোটা আপনি চালিয়ে যেতেন না।”

গোবিন্দ ভট্‌ট্চাজ হেসে বললেন, “তাই বলে আবার কথাটা ওকে জানিয়ে দেনে না যেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পাগল! তাই কখনও বলি!”

ভট্‌চাজমশাইয়ের ঘর থেকে নেমে উঠোন পেরিয়ে আমরা আমাদের ঘরে এসে ঢুকলুম।

২৬
সাড়ে নটায় খাবার ঘরে ডাক পড়ল। নিরুই ডাকতে এসেছিল। বলল, “জামাইবাবু আজ আর বোধ হয় ফিরতে পারবেন না, শিলিগুড়িতেই থেকে যাবেন।”

আমারও তা-ই মনে হচ্ছিল। তবু বললুম, “আর কিছুক্ষণ দেখলে হত না?”

চারু বলল, “আপনারা খেয়ে নিন। নইলে মা আর পিসিমাও খাবেন না।”

“রাত্তিরে ওঁরা কী খান?”

“একটু দুধ আর খই। দিতে তো গিয়েছিলুম। তা ওঁরা বললেন, আপনাদের খাওয়া আগে হয়ে যাক, তারপরে ওঁরা খাবেন।”

নিরুকে একটু লজ্জিত দেখাচ্ছিল। খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। ঝোঁকের মাথায় এমন অনেক কথা সে আজ বলেছে, একমাত্র সত্যপ্রকাশ ছাড়া আর কাউকেই যা হয়তো সে এতদিন বলেনি। তাঁকেও সব কথা বলেছে কি না কে জানে! লজ্জা নিশ্চয় তারই জন্যে। তবে কথা বলছিল হালকা গলায়। তাতে মনে হল, যা সত্য, বছরের পর বছর তাকে গোপন করে রাখার মধ্যে একটা গ্লানি থাকে তো, আর-কিছু না হোক, সেই গ্লানিটা সে আজ ধুয়ে ফেলতে পেরেছে। তারই ফলে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে হয়তো।

সত্যপ্রকাশ ছিলেন বলেই কাল খাবার টেবিল একেবারে জমজমাট ছিল। আজ তিনি নেই, তাই ছবিটা একেবারে অন্যরকম। মা আর পিসিমা অবশ্য যথারীতি এসে দুটি চেয়ার টেনে বসে আমাদের খাওয়ার তদারক করতে লাগলেন, কার কী লাগবে বলে দিতে লাগলেন নিরুকে, পেট ভরে খাওয়া সত্ত্বেও আরও কিছু-না-কিছু নেবার জন্যে আমাদের বারকয়েক অনুরোধ করলেন। রামদাসও যথারীতি এসে একধারে ঠায় সমস্তক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু সত্যপ্রকাশ না-থাকায় আহার-পর্বটা বিশেষ জমল না। প্রায় নিঃশব্দে খেয়ে উঠে বেসিনে হাত ধুয়ে আমরা ঘরে ফিরে এলুম।

মশলার ডিবে হাতে নিয়ে একটু বাদেই এল নিরু। ডিবেটা টিপয়ের উপরে রেখে দিয়ে বলল, “আপনারা তো একটু আগে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। সেই ফাঁকে আপনাদের বিছানা আবার নতুন করে পেতে রাখা হয়েছে, জগের জলও পালটে দেওয়া হয়েছে। আর হ্যাঁ, জামাইবাবুর কথামতো দু প্যাকেট সিগারেট আর দুটো দেশলাই আপনাদের দুজনের টেবিলে রেখে দিয়েছি। এখন বলুন, আর কিছু লাগবে? কাগজ কি কলম কি অন্য কিছু? লাগে তো বলুন, এনে দিচ্ছি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিচ্ছু লাগবে না। তুমি এবারে গিয়ে মা আর পিসিমাকে খেতে দাও।”

নিরু চলে গেল।

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরিয়ে নিঃশব্দে টানলেন কিছুক্ষণ। জিজ্ঞেস করলুম, “এবারে কি শুয়ে পড়া যায়?”

ভাদুড়িমশাই কোনও উত্তর দিলেন না। বুঝলুম, তিনি কিছু ভাবছেন।

সিগারেটটা শেষ হবার পরে তার গোড়ার দিকটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে হঠাৎ তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, “আপনার টর্চটা একবার দিন তো।”

টর্চটা এগিয়ে দিয়ে বললুম, “আবার বেরুতে হবে নাকি?”

“আপনার আর বেরুবার দরকার নেই। আপনি বিক্রাম করুন। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল, তাই ভাবছি যে, একটু ঘুরে আসব। যাব আর আসব, দেরি হবে না।”

টর্চটা হাতে নিয়ে বাইরের উঠোনের দিকের দরজা খুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন ভাদুড়িমশাই। একবার ভেবেছিলুম আমিও তাঁর সঙ্গে যাই। কিন্তু গেলুম ন’। ভাদুড়িমশাইয়ের কথা থেকে আমি বুঝতে পেরেছিলুম যে, যে-কোনও কারণেই হোক, একাই তিনি বেরুতে চাইছেন।

শুয়ে পড়লে ঘুম এসে যেতে পারে। অথচ ভাদুড়িমশাই যেহেতু বাইরে, তাই দরজায় খিল দেবারও উপায় নেই। এই অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়াটা উচিত হবে না। কলকাতা থেকে যে ম্যাগাজিনগুলো নিয়ে এসেছিলুম, বসে-বসে তারই একটার পাতা ওলটাতে লাগলুম।

ভাদুড়িমশাই অবশ্য আধ ঘন্টার মধ্যেই ফিরে এলেন। বললেন, “যাক, ঘুমিয়ে পড়েননি দেখছি।”

“এই অবস্থায় ঘুম হয়?… তা ঘুরে তো এলেন, কিছু চোখে পড়ল আপনার?”

“দুটো জিনিস চোখে পড়ল। এক, সাধুবাবার ঘর থেকে আমাদের রঙ্গনাথবাবু বেরিয়ে এলেন। দুই, রামদাসের কান খুবই সজাগ। অন্ধকারে আমাকে দেখতে পায়নি, কিন্তু ওদের ঘরের পিছনে গিয়ে চুপ করে একবার দাঁড়িয়েছিলুম তো, তখন আমার পায়ের একটা হালকা শব্দ নিশ্চয় পেয়ে থাকবে।”

“কী করে বুঝলেন?”

“তক্তাপোশে বসে ছিল, হঠাৎ ‘কে ওখানে’ বলে চেঁচিয়ে উঠল।”

“জগদীশকে দেখতে পেলেন?”

“পেয়েছি, কথাও হয়েছে। লোকটা যেন একটা ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়। বলতে গেলে প্রায় সারাক্ষণই আমার কাছে-কাছে ছিল, অথচ প্রথম পাঁচ-সাত মিনিট সেটা আমি বুঝতেই পারিনি। ওকে নিয়ে কোনও ভাবনা নেই। ও যতক্ষণ পাহারায় আছে, রঙ্গিলার ধারেকাছে যাবারও ক্ষমতা কারও হবে না।”

“রঙ্গনাথের ব্যাপারটা কিছু বুঝলেন? এত রাত্তিরে উনি সাধুবাবার আখড়ায় গিয়েছিলেন কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী করে বলব? আমরা শুধু আশা করতেই পারি।”

“কী রকম?”

“এই যেমন আমি আশা করছি যে, কোনও বদ মতলব নিয়ে উনি ওখানে যাননি। গিয়েছিলেন সাধুবাবাকে একটা অনুরোধ করতে।”

“কী অনুরোধ?”

“স্পষ্ট করে সেটা জানবার তো উপায় নেই। তবে অনুমান করতে পারি যে, গ্রামের লোকেরা যে সাধুবাবার উপরে বেজায় খাপ্পা হয়ে গেছে, সেটা বুঝিয়ে বলতে গিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে এই অনুরোধটাও ওঁকে হয়তো করেছেন যে, এই অবস্থায় উনি যেন আর মনসাদেবীর নিন্দেমন্দ করে না বেড়ান।… আর-কিছু জিজ্ঞেস করবেন?”

“না।”

“এবারে তবে আমি একটা প্রশ্ন করি আপনাকে।”

বললুম, ‘আপনার আবার কী প্রশ্ন?”

“দমদম এয়ারপোর্টে আপনার এক কলিগের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল। ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে বাগডোগরা পর্যন্ত আসেন। আপনিই বলেছিলেন যে, উনি আপনাদের কাগজের রিপোর্টার। নাম চন্দ্রমাধব। ঠিক বলেছি?”

“হ্যাঁ। তা চন্দ্ৰমাধব আবার কী করল?”

“কিছু করেনি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ভদ্রলোক দার্জিং যাবেন বলছিলেন না?”

“হ্যাঁ, তবে এখনও হয়তো যায়নি। চন্দ্রমাধব আসলে শিলিগুড়ির ছেলে। শিলিগুড়িতে দু’চার দিন না-কাটিয়ে নিশ্চয় দার্জিলিং যাবে না।”

“আপনার সঙ্গে ওঁর কথা শুনে অন্তত সেইরকম মনে হয়েছিল। তা কাল যদি আমি একবার শিলিগুড়ি যাই, ওঁর দেখা পাওয়া যাবে?”

“মনে তো হয় পাবেন।”

“শিলিগুড়িতে কোথায় থাকেন উনি?”

“বাবুপাড়ায়। ওর বাবা খুবই নামজাদা ডাক্তার। সূর্যশঙ্কর সেন। তবে বাবার পরিচয় দেবার দরকার হবে বলে মনে হয় না, বাবুপাড়ায় ঢুকে চন্দ্রমাধবের নাম করলেই চলবে। কিন্তু কাল আপনি শিলিগুড়ি যাবেন কেন?”

“এখানকার কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে, এখন একবার শিলিগুড়ি থেকে ঘুরে এলেই ছবিটা একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। আপনার যাবার দরকার নেই। একাই যাব। বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসব আবার।…নিন, এবারে শুয়ে পড়ুন।”

.

রামদাস না-ডাকলে নিশ্চয় ঘুম ভাঙতে অনেক দেরি হত। চোখ খুলে দেখি, হাতে চায়ের কাপ নিয়ে রামদাস দাঁড়িয়ে আছে।

জিজ্ঞেস করলুম, “কটা বাজে?”

“সাতটা”

ভাদুড়িমশাইয়ের বিছানার দিকে তাকিয়ে তাঁকে দেখতে পেলুম না। বললুম, “তোমাকে দরজা খুলে দিল কে?”

রামদাস বলল, “দরজা তো খোলাই ছিল, বাবু।”

বুঝতে পারলুম যে, ভাদুড়িমশাই আমার আগেই ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে বেরিয়েছেন। ভদ্রলোক নিশ্চয় ভেবেছেন, আগের রাত্তিরে ঘুম না-হওয়ায় আমার মন-মেজাজ বিশেষ ভাল নেই, তাই আমাকে আর ডাকেননি।

বললুম, “ভাদুড়িমশাইকে চা দিয়েছ রামদাস?”

“চায়ের কথা জিজ্ঞেস করেছিলুম,” রাদাস বলল, “তা বাবু বললেন যে, এখন আর চা খাবেন না, ফিরে এসে খাবেন।”

চা শেষ করে রামদাসের হাতে পেয়ালা-পিরিচ ধরিয়ে দিয়ে বললুম, “রঙ্গিলা কেমন আছে?”

“কাল রাতে আর জ্বর আসেনি বাবু, সকালেও দেখলুম যে, গা একেবারে পাথরের মতো ঠান্ডা। আমাকে দেখে একটু হাসলও যেন। মনে তো হয় চিনতে পেরেছ। তবে কথা বলছে না।”

“তাও বলবে নিশ্চয়। জ্বরটা যখন ছেড়েছে, তখন আর চিন্তা কোরো না, এবারে ঠিকই সুস্থ হয়ে উঠবে।”

“তা-ই বলুন, বাবু। মেয়েটার বাপ মারা গেছে, মা’টা থেকেও নেই, পুজো-আচ্চা নিয়ে ছিল, তার মধ্যে এই কান্ড।”

রামদাস চলে যাচ্ছিল। যেতে-যেতে দরজা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “হাত-মুখ ধুয়ে নিন বাবু, গোপালের মা’কে দিয়ে কাগজ পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

“কাগজ মানে?”

“কলকাতা থেকে শিলিগুড়িতে যে খবরের কাগজ আসে, সেই কাগজ। খোকাবাবু কাল শিলিগুড়ি থেকে নিয়ে এসেছে।”

“বলো কী! সত্যপ্রকাশবাবু কি রাত্তিরেই ফিরে এসেছেন নাকি?”

“হ্যাঁ বাবু,” রামদাস একগাল হেসে বলল, “বারোটা নাগাদ ফিরেছে। আপনাদের কথা জিজ্ঞেস করেছিল। ঘুমিয়ে পড়েছেন শুনে আর ডাকেনি।”

রামদাস ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি গিয়ে বাথরুমে ঢুকলুম। মুখ-হাত ধুয়ে, দাড়ি কামিয়ে, স্নান-টান সেরে বেরিয়ে দেখি, ভাদুড়িমশাই ফিরে এসেছেন। ইতিমধ্যে কাগজ দিয়ে গিয়েছিল, ইজিচেয়ারে বসে তার উপরে চোখ বুলোচ্ছেন তিনি।

বললুম, “কোথায় গিয়েছিলেন?”

কাগজ থেকে চোখ না তুলেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই একটু ঘুরে এলুম।”

“হাত-মুখ ধুয়েছেন?”

“শুধু হাত-মুখ ধোয়া কেন, স্নানও সেরে নিয়েছি। আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন, টের পাননি। “সত্যপ্রকাশ শুনলুম রাত্তিরেই ফিরে এসেছেন।”

“তাও শুনেছি। তবে দেখা হয়নি। দেখা হলে ব্যাঙ্কের ব্যাপারটা বোঝা যাবে।”

চুল আঁচড়াবার জন্যে টেবিল থেকে চিরুনিটা তুলতে গিয়ে দেখি, সেখানে একটা চুলের কাঁটা পড়ে আছে। বললুম, “আরে, এটা আবার কোত্থেকে এল?”

ভাদুড়িমশাই কাগজে চোখ রেখেই বললেন, “কাঁটার কথা বলছেন? কাল রাত্তিরে তো একা একবার ঘুরতে বেরিয়েছিলুম। তখন রঙ্গিলাদের ঘরের পিছনে এটা কুড়িয়ে পেয়েছি।”

“কার চুলের কাঁটা?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ভূতের।” তারপর একেবারে অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে বললেন, “একটু বাদেই ব্রেকফাস্টের ডাক পড়বে। আজ কী খাব বলুন তো?”

“কী জানি।”

“পরোটা আর আলুর দম। তার সঙ্গে থাকবে আতা-ক্ষীর।”

“কী করে বুঝলেন?”

“খুব সহজেই বোঝা গেল। সাত-সকালে ঘুম থেকে উঠে ভিতরের উঠোনের দিকের দরজা খুলে বারান্দায় এসে দেখি, মা আর পিসিমা আমার আগেই উঠে পড়েছেন। পিসিমা মুখ ধুচ্ছেন উঠোনের টিউবওয়েলে, আর মা রয়েছেন রান্নাঘরে। সেখান থেকে মা বললেন, ‘তোমার হাতের আলুর দম তো সতুর ভারী পছন্দ ঠাকুরঝি, তা তুমি এসে সেটার ব্যবস্থা করো, আর আমি এদিকে পরোটার জন্যে ময়দা ঠেসে রাখি।’ তাতে টিউবওয়েল থেকে পিসিমা বললেন, ‘পরোটা আর আলুর দম না হয় হল, কিন্তু মিষ্টির কী হবে বৌদি? আমি বলি কী, ঘরে তো বড়-বড় গোটাকয় আতা রয়েছে, তুমি বরং আতা-ক্ষীর করো, সতুর ওটাও খুব পছন্দের খাবার।’ তো কিরণবাবু, এই হচ্ছে ব্যাপার।”

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শেষ হতে-না-হতেই ভেজানো দরজায় টোকা পড়ল। সেই সঙ্গে সত্যপ্রকাশের গলা শোনা গেল, “আসতে পারি?”

বললুম, “আসুন, আসুন। আপনি যে রাত্তিরেই ফিরেছেন, সে-খবর একটু আগে পেলুম।”

সত্যপ্রকাশ একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। বললেন, “ব্রেকফাস্ট রেডি। চলুন, খাবার ঘরে গিয়ে কথা বলা যাক।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজ হল?”

সত্যপ্রকাশ শুকনো হেসে বললেন, “জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করেছিলুম, তা লোনের ব্যাপারে তিনি কিছু কমিট করেননি। ডিনারে ডেকেছিলুম। বললেন যে, সময় হবে না। অর্থাৎ লক্ষণ সুবিধের নয়। তা আমি দেখলুম, তবে আর শিলিগুড়িতে রাত কাটিয়ে কী হবে, তাই রাত্তিরেই ফিরে এলুম।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সম্পৎলালকে খবরটা দেবার ব্যবস্থা করেছেন?”

“যাকে পাঠিয়েছিলুম, সম্পৎলালের সঙ্গে সে যোগাযোগই করতে পারেনি।”

“ব্যাঙ্কের জেনারেল ম্যানেজার কি কলকাতায় ফিরে গেছেন?”

“না। শুনলুম যে, আরও দু’দিন তিনি শিলিগুড়িতে থাকবেন। এখানকার ব্রাঞ্চের ট্রানজাকশানে নাকি কীসব গন্ডগোল ধরা পড়েছে। সেইজন্যেই আরও দু’দিন থেকে যাবেন তিনি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার এখানকার কাজ মোটামুটি শেষ করে এনেছি। এখন একবার শিলিগুড়ি যাওয়া দরকার।”

“শিলিগুড়ি কেন?”

“ওখান থেকে বর্ডার খুব কাছে তো, মাল পাচার করার তাই মস্ত সুবিধে। একটু খোঁজখবর নিতে চাই।”

“কিছু আন্দাজ করতে পেরেছেন?”

“কিছুটা পেরেছি। মনে হচ্ছে কালকের মধ্যে বাকিটাও পেরে যাব। সেইজন্যেই একবার শিলিগুড়ি যেতে চাইছি। আপনার গাড়িটা যদি পাই, তো বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসতে পারব।”

“স্বচ্ছন্দে নিয়ে যান।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “অ্যাম্বাসাডারটা তো আছেই, কাল আবার সুবিমলের ফিয়াটটা নিয়ে চলে এসেছি। দুটোই রয়েছে। যেটা আপনার খুশি।”

“আর-একটা কথা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আয়াটি যখন থাকতে চাইছে না, ওকেও তখন শিলিগুড়িতে নিয়ে যাই। যার থাকার ইচ্ছে নেই, তাকে না-রাখাই ভাল। শিলিগুড়ি থেকে বরং আর-কোনও আয়াকে নিয়ে আসব।”

“সুশীলা একেবারেই থাকতে চাইছে না?”

“না। কাল বিকেলে ডাক্তারবাবুকে অন্তত সেই কথাই বলেছিল।”

সত্যপ্রকাশের মুখখানা একটু কঠিন দেখাল। একটু ভেবে বললেন, “ঠিক আছে, ওকে তা হলে নিয়েই যান। রামদাসকে বলে দিচ্ছি, ওকে তৈরি হয়ে নিতে বলুক।”

কথা বলতে-বলতে আমরা খাবার ঘরে এসে ঢুকলুম। ব্রেকফাস্টের ব্যাপারে ভাদুড়িমশাই দেখলুম ঠিকই বলেছিলেন। পরোটা আর আলুর দম তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল আতা-ক্ষীর। তবে খাওয়ার ব্যাপারে ভাদুড়িমশাইয়ের বিশেষ উৎসাহ দেখা গেল না।

চটপট ব্রেকফাস্ট শেষ করে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। রামদাস এসে বলল, আয়া তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করছে। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি তা হলে ফিয়াটটা নিয়ে যাচ্ছি।”

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তিনি শিলিগুড়ি রওয়া হয়ে গেলেন।

২৭
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, সাড়ে আটটা। জিজ্ঞেস করলুম, “ভাদুড়িমশাই কতক্ষণে শিলিগুড়ি পৌঁছবেন বলে মনে হয়?”

সত্যপ্রকাশ হারলেন। বললেন, “সেটা নির্ভর করছে কী স্পিডে উনি গাড়ি চালাবেন, তার উপরে।”

“আমাদের সেদিন শিলিগুড়ি থেকে মুকুন্দপুরে পৌঁছতে কতক্ষণ লেগেছিল?”

“সেদিন মানে পরশুর কথা বলছেন?”

“হ্যাঁ।”

“তিন ঘন্টা। আমার সাধারণত তিন ঘন্টাই লাগে। অবশ্য এখানে-ওখানে এক-আধবার আমাকে থামতে হয়। সেদিন যেমন ময়নাগুড়িতে থেমেছিলুম।”

“সেদিন আপনি যে-স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, ভাদুড়িমশাই মোটামুটি সেই স্পিডেই চালান। তবে পথের মধ্যে উনি কোথাও থামবেন বলে মনে হয় না।”

“নন-স্টপ চালালে আড়াই ঘন্টার বেশি লাগবার কথা নয়। অর্থাৎ কিনা এগারোটার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন। কেন যাচ্ছেন, কিছু বুঝতে পারলেন?”

“না। যাবার ব্যাপারে যা বললেন, সে তো আপনিও শুনেছেন।”

“হ্যাঁ। কিন্তু তার থেকে তো স্পষ্ট কিছুই বোঝা গেল না।” খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন সত্যপ্রকাশ। তারপর বললেন, “উনি বোধহয় সন্দেহ করছেন যে, শিলিগুড়ি দিযে মূর্তিটা পাচার করা হয়েছে। বর্ডারের কথাটা বোধহয় সেইজন্যেই বললেন। তাই না?”

“বর্ডার তো এদিক থেকেও দূরে নয়।” আমি বললুম, “ওদিক থেকে নেপালের বর্ডার কাছে পড়ে, এদিক থেকে ভুটানের বর্ডার। মূর্তি যদি পাচার হয়েই থাকে, তবে যে তা নেপালের বর্ডার দিয়েই হয়েছে, এমন কথা তো জোর করে বলবার উপায় নেই।”

কথাটা সত্যপ্রকাশের পছন্দ হয়েছে বলে মনে হল। সম্ভবত সেই কারণেই বলেন, “তা হলে তো ভূটানের বর্ডারের কথাই ওঁর আগে ভাবা উচিত ছিল।”

তার বদলে ভাদুড়িমশাই কেন শিলিগুড়ির দিকে ছুটলেন, স্পষ্ট করে সেটা না-বুঝলেও একটা কারণ অবশ্য আমি অনুমান করতে পারছিলুম। আমার মনে হচ্ছিল, আসলে তিনি সম্পৎলালকে সন্দেহ করছেন। লোকটা যে কুখ্যাত স্মাগলার, ভাদুড়িমশাই সেটা জানেন। সুতরাং মুর্তি-চুরির ব্যাপারে সম্পৎলালকে সন্দেহ করাটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। বরং সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক।

কিন্তু চুরিটা সে কীভাবে করল? হঠাৎ একটা সম্ভাবনার কথা উঁকি দিয়ে গেল আমার মনের মধ্যে। গোবিন্দ ভট্‌চাজ শুধু চোর পালানোর শব্দ নয়, শেষ রাত্তিরে একটা গাড়ির আওয়াজও শুনতে পেয়েছিলেন। তা হলে কি সে-গাড়ি সম্পৎলালেরই? সে নিজে হয়তো আসেনি। কিন্তু যারা এসেছিল, তারা তারই দলের লোক। মুর্তিটা হাতিয়ে নিয়ে তারা নিশ্চয় সম্পৎলানের হাতে তুলে দিয়েছে। আর তা যদি দিয়ে থাকে, তা হলে শিলিগুড়ি থেকে সে-মূর্তি নেপালে পাচার করা তো তার পক্ষে আদৌ শক্ত হবার কথা নয়।

তার পরেও অবশ্য একটা প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্নটা আর কিছুই নয়, সম্পৎলাল এই মূর্তির কথা জানল কী করে? সে তো শিলিগুড়িতে লেবার কনট্রাক্টের কাজ করে। থাকে শিলিগুড়িতেই। এখানকার এই প্রাচীন মনসামূর্তির কথা তা হলে সে কার কাছে শুনল? তবে কি সত্যপ্রকাশই…

উত্তেজনায় যেন বুকের মধ্যে টিপ-টিপ করছিল আমার। সম্পৎলালের সঙ্গে সত্যপ্রকাশের যোগাযোগের ব্যাপারটা তা হলে এইজন্যেই ভাদুড়িমশাইয়ের ভাল লাগেনি। সম্ভবত তিনি ভেবেছেন যে, নিজের হাতে সরাবার সাহস হয়নি বলে সম্পৎলালের সাহায্যে মুর্তিটিকে সরিয়ে ফেলবার ব্যবস্থা করেছেন সত্যপ্রকাশ। সম্পৎলাল তাঁর কাছে প্রচুর টাকা পায়, অথচ ব্যাঙ্ক-লোনের ব্যবস্থা না-হওয়া টাকাটা সত্যপ্রকাশ দিতে পারছেন না। অগত্যা তাঁকে ভাবতে হয়েছে মনসামূর্তি বিক্রি করে টাকা তুলবার কথা। শাঁসালো কোনও বিদেশি খদ্দেরের কাছে যদি বেচতে পারেন তা হলে ওই মূর্তির যে দাম মিলবে, তাতে সম্পৎলালের পাওনা মেটাবার ব্যবস্থা তো হবেই, উদ্বৃত্ত হিসেবে তাঁর নিজের হাতেও নেহাত কম টাকা আসবে না। ব্যাপারটা যদি তা-ই হয়, তা হলে এই যে মুর্তি-চুরির ব্যাপারটা নিয়ে থানায় ডায়েরি করেছেন সত্যপ্রকাশ, আর তার উপরে আবার ভাদুড়িমশাইকেও কলকাতা থেকে এখানে আনিয়েছেন, এ তো নেহাতই লোক-দেখানো ব্যাপার।

আমার মনে হচ্ছিল, ভাদুড়িমশাই ঠিকই সন্দেহ করেছেন। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি নিশ্চয় ভাবছেন যে, মুর্তিটি হয়তো এখনও নেপালে পাচার হয়নি, হয়তো সম্পৎলালের কাছেই সেটা আছে এখনও। সম্ভবত সেইজন্যেই এমন তাড়াহুড়ো করে তিনি শিলিগুড়ি চলে গেলেন।

কিন্তু গ্রামের সেই চাষিবউটি? তার তা হলে কী ব্যাপার? রঙ্গনাথ যে তাকে বললেন ‘…যেখান থেকে নিয়ে এসেছ, সেইখানেই আবার রেখে এসো’, ও-কথার তাৎপর্য তা হলে কী?

আবার যেন সব জট পাকিয়ে যেতে লাগল। একটু আগেই ভাবছিলুম যে অন্ধকারের মধ্যে যেন এখানে-ওখানে গোটাকয় আলো জ্বলে উঠছে। কিন্তু এখন আবার সব অন্ধকার।

“কী ভাবছেন এত?”

সত্যপ্রকাশের কথায় আমি চমকে উঠলুম। বললুম, “না, তেমন-কিছু না।”

“আর-এক রাউন্ড চায়ের কথা বলি?”

“চা?…ও হ্যাঁ, আর-এক কাপ হলে তো ভালই।”

“তা হলে চলুন ড্রইং রুমে গিয়ে বসা যাক, চা ওখানেই দিয়ে আসবে।”

খাবার ঘর থেকে সত্যপ্রকাশের বসবার ঘরে চলে এলুম আমরা।

আগেই বলেছি, অন্দরের উঠোনের উত্তর-দিকের এই ঘরটা দোতলা। উপরে সত্যপ্রকাশের শোবার ঘর আর নীচে তাঁর বসবার ব্যবস্থা। উপরটা এখনও দেখিনি, নীচতলাটা বেশ সাজানো-গোছানো। ঘরের উত্তর-দিকটায় দেওয়াল-বরাবর বুক-সমান উঁচু করে টানা হয়েছে বই রাখবার জন্যে কাচের পাল্লা-বসানো টানা-র্যাক। পশ্চিম-দিকে, ঘরের ভিতর থেকেই, একটা পালিশ-করা কাঠের সিঁড়ি উপরে উঠে গিয়েছে। তার উল্টো-দিকে পুরু গালচের চার পশে সাজানো সোফা-সেটি। একপাশে একটা ডিভান। আর এক পাশে একটা ছোট রাইটিং টেবিল আর হালকা একটা চেয়ার। এই রাইটিং টেবিলের দেরাজ থেকেই পরশু রাত্তিরে মনসা-মূর্তির ফোটোগ্রাফ বার করে সত্যপ্রকাশ আমাদের দেখিয়েছিলেন।

যে-সোফাটায় আমি বসে ছিলুম, সেখান থেকে পুব-দিকের খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই মন্দিরের চুড়োটা আমার চোখে পড়ল। উঠে গিয়ে জানালার ধারে দাঁড়ালুম আমি। মন্দির আর এই ঘরের মাঝখানে একটা বড়সড় চত্বর। চত্বরটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। তার মাঝখানে ইঁদারা। এরই জলের গুণের কথা সত্যপ্রকাশ খুব গর্ব করে বলেছিলেন।

চত্বরের উত্তরে ফলের বাগান। বাগান যেখানে শুরু হয়েছে, তার এদিকে পাশাপাশি দুটি উঁচু গাছ যেন থামের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর তার পত্রপল্লব সারাক্ষণ ছায়া বিস্তার করে রেখেছে চত্বরটির উপরে। দেখে মনে হয়, গাছ দুটি যেন গোটা জায়গাটার উপরে দুটো ছাতা ধরে আছে।

এই ধরনের গাছ এ-গ্রামে আরও অনেক দেখেছি, কিন্তু কীসের গাছ তা জানি না। সত্যপ্রকাশকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, “এ হল মুচুকুন্দ চাঁপা। এখানে এ-গাছ বিস্তর দেখবেন। কেন, কলকাতায় এ-গাছ চোখে পড়েনি?”

বললুম, “পড়েছে বলে মনে হয় না।”

সত্যপ্রকাশ হেসে বললেন, “আমার কিন্তু পড়েছে। আমরা তো কলকাতার লোক নই, কাজেকর্মে মাঝেমধ্যে কলকাতায় যেতে হয়, তাও চোখে পড়েছে।”

“কোথায়?”

“টালা পার্কের ওদিকে গেছেন কখনও?”

“মাঝেমধ্যেই তো যাই। কেন, ওদিকে এ-গাছ আছে নাকি?”

“টালা পার্কের উত্তরের দিকটায় বেশ কয়েকটা আছে। অন্তত বছর পাঁচেক আগেও ছিল। সিক্সটি সেভেন… না না, সিক্সটি এইটে একবার কলকাতায় গিয়ে মণীন্দ্র রোডে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে দিন তিনেক ছিলুম। রোজ সকালে তখন টালা পার্কে বেড়াতে যেতুম। মনে আছে, চাঁপার গন্ধে বাতাস যেন ভারী হয়ে থাকত। আর ওই গন্ধ আমাকে মনে পড়িয়ে দিত মুকুন্দপুরের কথা। একটা মজার কথা কী জানেন?”

“কী?”

“আমাদের এই গ্রামের নামও আসলে মুচুকুন্দপুর। সরকারি নাথিপত্রে আর ডাকঘরের ছাপেও দেখবেন মুকুন্দপুরের কোনও উল্লেখই নেই। সর্বত্র মুচুকুন্দ।”

“লোকে তা হলে মুকুন্দপুর বলে কেন?”

“বলে, তার কারণ, মুখে-মুখে অনেক কাল ধরে মুকুন্দপুর নামটাই চালু হয়ে গেছে। মুকুন্দ মানে তো বিষ্ণু, নারায়ণ। তা এখানে কোনও বিষ্ণুমন্দির দেখলেন?”

“কই, দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”

“থাকলে তো দেখবেন। মুকুন্দর নামে গ্রামের নাম হলে একটা বিষ্ণুমন্দিরও এখানে থাকত। কিন্তু তা তো আর হয়নি। গ্রামের নাম হয়েছে গাছ থেকে। যেমন অনেক জায়গাতেই হয়। কলকাতাতেও তালতলা, বেলতলা, নেবুতলা, এইসব আছে না? সবই গাছের নামে নাম। এও তেমনি। মুচুকুন্দ ফুলের গাছ থেকে মুচুকুন্দপুর। আবার সেই মুচুকুন্দপুর থেকে লোকের মুখে-মুখে মুকুন্দপুর।”

ভাবলুম, ভাদুড়িমশাই ফিরলে এটা তাঁকে বলতে হবে। অনেক-কিছুই তিনি জানে। বটে, কিন্তু এটা নিশ্চয় জানেন না।

গোপালের মা চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল। সেন্টার টেবিলে ট্রেটা নামিয়ে রেখে বলল, “মাস্টারমশাই এসেছেন, দাদাবাবু। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। তাঁকে এখানে নিয়ে আসব?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “বেশ তো, এখানেই নিয়ে এসো। আর হ্যাঁ, পটে ক’কাপ চা দিয়েছ?”

“চার কাপের মতন হবে।”

“ঠিক আছে, তা হলে আর চা দেবার দরকার নেই। শুধু আর-একটা কাপ দিয়ে যাও। এতেই আমাদের তিনজনের হয়ে যাবে।”

গোপালের মা কুণ্ঠিত গলায় বলল, “বলেন তো আর এক পট চi দিয়ে যাচ্ছি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “দরকার হবে না। যাও, মাস্টারমশাইকে নিয়ে এসো।”

মাস্টারমশাইকে ডাকবার আগে গোপালের মা এসে আর-এক জোড়া কাপ-প্লেট রেখে গেল। তার একটু পরেই মাস্টারমশাই এসে ঘরে ঢুকলেন।

তাঁর বসবার জন্যে আমার পাশের সোফাটা দেখিয়ে দিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “কী খবর মাস্টারমশাই? আর-কোনও গন্ডগোল নেই তো?”

মাস্টারমশাই বললেন, “একেবারে যে নেই, তা নয়। বুড়োরা আমাকে মান্যি করে, হুট করে আমার কথাটা তারা কেউ ফেলবে বলে মনে হয় না। তবে ছোকরাদের রক্ত গরম, তারা বেজায় খেপে আছে। তার উপরে আবার খুড়োমশাইটিও বড্ড অবুঝ। এত করে তাঁকে বললুম যে, এইভাবে মা-মনসার নিন্দেমন্দ করাটা তাঁর ঠিক হচ্ছে না, তবু কাল সন্ধেবেলায় রথতলায় গিয়ে একগাদা লোকের সামনে তিনি জাঁক করে একটা বিচ্ছিরি কথা বলে বসলেন।”

“কী বললেন?”

“বললেন যে, তিনি মন্তর দিয়ে ব্যাংখেকো কানিটাকে ভ্যানিশ করিয়ে দিয়েছেন। ভাগ্যিস আমি সেখানে ছিলুম। নইলে সেখানেই একটা রক্তারক্তি ব্যাপার হতে যেত।।ন্তু এইভাবে আর কতদিন চলবে সত্য? একটা কিছু ব্যবস্থা করা দরকার।”

মাস্টারমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ব্যবস্থাটা যত তাড়াতাড়ি করা যায়, ততই ভাল।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কী যে করব, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। উনি আমার কাকা হন। যতই অন্যায় করুন, সম্পর্কে গুরুজন, ওঁকে কোনও কড়া কথা বলা তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

“বেশ তো, কড়া কথা বলবার দরকার নেই। কিন্তু বুঝিয়ে তো বলতে পারো যে, এখান থেকে এবারে ওঁর চলে যাবার সময় হয়েছে। না-গেলে যে ওঁরই বিপদ ঘটতে পারে, সেটাই বা বুঝিয়ে বলতে বাধা কোথায়?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ঠিক আছে, একটু ভেবে দেখি।”

ভদ্রলোককে এমন অসহায় দেখাচ্ছিল যে, একটু মায়া বোধ না-করে পারলুম না।

চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। মাস্টারমশাই উঠে পড়লেন। আমিও বললুম, “আপনি বিশ্রাম করুন মিঃ চৌধুরি। খাওয়ার সময়ে আবার দেখা হবে।”

বলে নিজের ঘরে চলে এসে একটা ম্যাগাজিন টেনে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লুম। শুয়েই মনে পড়ল, সত্যপ্রকাশের ঠাকুর্দার ডায়েরিটা তো এই ঘরেই রয়েছে। এই ফাঁকে সেটার উপরে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যেতে পারে। টেবিলের ড্রয়ার থেকে ডায়েরিটা বার করে আনলুম আমি।

২৮
লাল রঙের মোটা কাপড় দিয়ে মোড়া শক্ত-করে বাঁধানো খাতাখানার উপরে চোখ বুলিয়ে বোঝা গেল যে, জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে পৌঁছে মহেশ্বর চৌধুরি এই ডায়েরি লিখতে শুরু করেন। তাও যে রোজ লিখতেন, তা নয়। মেরেকেটে মাত্রই পঞ্চাশ-ষাট দিন লিখেছিলেন। তবে অনেক লেখাই বেশ বড় মাপের। তার মধ্যে প্রথম লেখার তারিখ দেখছি ‘পহেলা বৈশাখ, সন ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ’ আর শেষ লেখার তারিখ ‘চৌঠা আষাঢ়, সন ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ’। অর্থাৎ ১৯৩০ সালের এপ্রিলে যার সূচনা, ১৯৩২ সালের জুনের পরে তা আর এগোয়নি।

লেখার ধাঁচটা যে ঠিক রোজনামচার, তাও নয়। যে-দিনের লেখা, খুব গুরুত্বপূর্ণ না হলে সে-দিনের কোনও ঘটনার কথা সাধারণত আসেনি; যেখানে এসেছে, সেখানেও দেখছি মহেশ্বর চৌধুরি সেই ঘটনার সূত্র ধরে চলে গিয়েছেন তাঁর অতীত জীবনের প্রসঙ্গে। পড়তে-পড়তে আমার মনে হল যে, বর্ধমানের যে গ্রামকে একদিন তিনি ছেড়ে চলে এসেছিলেন, সেই গ্রামের কথা তিনি কোনও দিনই ভুলতে পারেননি, যেন সেই গ্রাম, যেখানে তিনি তাঁর শৈশব, বাল্য, কৈশোর, এমনকী তাঁর যৌবনেরও উন্মেষ পর্ব কাটিয়ে এসেছিলেন, সেই গ্রামের স্মৃতিই তাঁর উত্তর-জীবনেও এক প্রকান্ড প্রচ্ছায়া বিস্তার করে রেখেছে।

মাত্রই দু’বছর এই ডায়েরি লিখেছিলেন মহেশ্বর চৌধুরি। কিন্তু তারই ভিতর থেকে যে মানুষটির মুখ বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, সেই মানুষটি বড় দুঃখী, বড় বিধ্বস্ত। এমন নয় যে, ভাগ্য তাঁকে সাচ্ছল্য দেয়নি। হয়তো যা তশা করেছিলেন, তার চেয়ে ঢের বেশি পরিমাণেই দিয়েছিল। কিন্তু শান্তি দেয়নি কণামাত্র। ভাগ্য তাঁকে বিত্ত দিয়েছিল, কিন্তু বেদনা দিয়েছিল তার চতুর্গুণ। ডায়েরির প্রথম লেখাতেই পড়েছে সেই বেদনার ছাপ।

“জলপাইগুড়ি হইতে গত ২৭ চৈত্র যে দুঃখের খবর আসিয়া পঁহুছিয়াছে, তেমন মর্মান্তিক দুঃখ যেন কাহাকেও কখনও পাইতে না হয়। সুরেন্দ্রনাথ মারা গিয়াছে, কলিকাতার মেডিক্যাল কলেজ হইতে বড় ডাক্তার আনানো হইয়াছিল, কিন্তু যাহার যকৃৎ নষ্ট হইয়া গিয়াছে, কে তাহাকে বাঁচাইবে।

“বড় আশা করিয়া মাত্রই বারো বৎসর বয়সে আমার প্রাণাধিক প্রিয় কন্যা সতীর বিবাহ দিয়াছিলাম। এত অল্প বয়সে আজিকালি বড় কেহ কন্যাকে পাত্রস্থ করে না। আমিই বা করিয়াছিলাম কেন? হেতু আর কিছুই নহে, পাত্রটিকে সতীর মাতাঠাকুরানির তো বটেই, আমারও বড় পছন্দ হইয়াছিল। একে তো পাত্রের পিতা ভূধরবাবু সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি, উপরন্তু ধনাঢ্য ভূস্বামীও বটেন, তায় পাত্রটিও সাতিশয় কান্তিমান ও অল্পবয়স্ক। ভাবিয়াছিলাম, সতী সুখী হইবে।

“হায়, যে-যুবক এত রূপবান, তাহার অন্তর যে এত অন্ধকারময় এবং আচরণ এত কদর্য, তাহা কে জানিত! তাও আশা করিয়াছিলাম যে, বিবাহের পরে সুবেন্দ্রনাথের চরিত্র ধীরে-ধীরে সংশোধিত হইবে। কিন্তু বিধাতা বিরূপ, তাহা হইল না। কৈশোর হতেই সে অমিতাচারী, ক্রমে ক্রমে সেই অমিতাচার আরও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।

“সতী কখনও ঘুণাক্ষরেও আমাকে ইহার আভাস দেয় নাই। সমস্ত গ্লানি ও অপমান সে নীরবে সহ্য করিত। কিন্তু এ-সব কথা কাকের মুখে ছড়ায়। ভাল খবর কেহ দিক আর না-ই দিক, বাড়ি বহিয়া মন্দ খবর পঁহুছিয়া দিবার লোকের কখনও অভাব হয় না। সবই তাই আমার কানে আসিত। যাহা শুনিতাম, তাহাতেই বুঝিয়া গিয়াছিলাম যে, অল্প বয়স হইতেই এত যাহার সুরাসক্তি, দীর্ঘায়ু হওয়া তাহার পক্ষে সম্ভব হইবে না। কিন্তু তাই বলিয়া যে মাত্র সাতাইশ বৎসর বয়সেই তাহার আয়ু ফুরাইবে, এমন ভাবি নাই।

“সতী সবেমাত্র কুড়ি বৎসর অতিক্রম করিয়া একুশে পড়িয়াছে। এই বয়সেই তাহার সিঁথির সিঁদুর মুছিয়া গেল। আমি তো পাষাণ নহি, তাই তাহাকে দেখিতে যাই নাই, ভয় ছিল তাহার বৈধব্যবেশ আমি সহ্য করিতে পারিব না। সতীর মাতৃদেবীকে ভাগ্যবতী বলিব, একমাত্র কন্যার বৈধব্যদশা তাঁহাকে দেখিতে হইল না, গত বৎসরই তিনি স্বর্গারোহণ করিয়াছেন।

“রামদাসকে সঙ্গে দিয়া নিত্যপ্রকাশকে জলপাইগুড়ি পাঠাইয়াছিলাম। গত পরশ্ব তাহারা ফিরিয়া আসিয়াছে। তাহাদেরই মুখে শুনিলাম, মদ্যপ পুত্রের মৃত্যুর জন্য বৈবাহিকা মহাশয়া এখন পুত্রবধূকে অহোরাত্র গালি পাড়িতেছেন ও বলিতেছেন যে, সতীর নিশ্চিত বৈধব্যযোগ ছিল, নহিলে এত অল্প বয়সে সুরেন্দ্রনাথের মৃত্যু হইত না। বলিবার কিছু নাই। আমরা তো কার্যকারণে বিশ্বাস করি না। হয় সমস্ত কিছুর জন্য ভাগ্যকে দোষ দিই, অথবা একের অপরাধ চাপা দিবার জন্য অন্যকে দোষী সাজাই।

“কিন্তু ওই বাড়িতে সতী এখন থাকিবে কীভাবে? একটি সন্তান যদি থাকিত, তবে অন্তত তাহাকে বুকে চাপিয়া সে তাহার দুঃখভার ত্ন করিতে পারিত। কিন্তু তাহাও তো তাহার নাই। নিত্যকে বলিয়াছি, শ্রাদ্ধশান্তি চুকিয়া যাউক, তাহাার পরেই সে যেন সতীকে এখানে লইয়া আসে।”

পরের এন্ট্রির তারিখ ৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৭। মহেশ্বর সেখানে লিখছেন :

“কয়েক দিন হইল সতী মুকুন্দপুরে আসিয়াছে। নিত্যই লইয়া আসিয়াছে। নিত্যর উপরে আমার বড় আস্থা নাই। কিন্তু বধুমাতাটি খুবই বুদ্ধিমতী। সতী এই গৃহে আসিবামাত্র বধুমাতা তাঁহার নিজের সন্তানটিকে যেভাবে সতীর কোলে তুলিন দিলেন, তাহাতেই তাঁহার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আবার নূতন করিয়া পাইলাম। সতীও যেভাবে তাহার দুই বৎসর বয়স্ক দুগ্ধপোষ্য ভ্রাতুষ্পুত্রটিকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া অশ্রুমোচন করিতে লাগিল, তাহতে আশা হয়, এই শিশুটিই তাহার পিতৃষ্বসার বেদনাভার অনেকাংশে লাঘব করিতে পারিবে।

“কাল ঝড় উঠিয়াছিল। জ্যৈষ্ঠ মাস। সারাদিন খুব গরম গিয়াছিল। তাহার পর মধ্যরাতে উঠিল প্রবল ঝড়। ঝড়ের পর বৃষ্টি নামিল। ঘন্টা দুই-তিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাতের ফলে গরম অনেক কমিয়া গিয়াছে, সকালের বাতাসেও একটা ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব।

“তরঙ্গিণীর কথা মনে পড়িতেছে। রোজই পড়ে। তবে আজ একটু বেশি করিয়া মনে পড়িতেছে। সেই অভাগিনীও এমনই এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাত্রিকালে গৃহত্যাগ করিয়াছিল। সে যদি না গৃহত্যাগ করিত, আমার জীবন যে তবে সম্পূর্ণ অন্যখাতে বহিত, তাহাতে সন্দেহ নাই : তরঙ্গিণী এখন কোথায় আছে? সে কি আদৌ বাঁচিয়া আছে? কিছুই জানি না। …

“তরঙ্গিণীর কথা অদ্যাবধি কাহাকেও বলি নাই। না বলিয়াছি আমার স্ত্রীকে, না আমার পুত্রকন্যাকে। অন্য কাহাকেও বলিবার তো কোনও প্রশ্নই উঠে না। সকলেই জানে যে, আমার মাতাপিতার আমি একমাত্র সন্তান, বাল্যবয়সে অনাথ হইবা ভাগ্যান্বেষণে নানা স্থানে ঘুরিতে-ঘুরিতে এই উত্তরবঙ্গে আসিয়া নতুন করিয়া জীবনারম্ভ করিয়া। তরঙ্গিণী নামে যে আমার একটি বালবিধবা ভগ্নি ছিল, এবং সেই ভগ্নিটিকে যে আমি প্রাণাপেক্ষা ভালবাসিতাম, তাহা কেহ জানে না।…

“তাহার কথা কাহাকেও জানাই নাই কেন? জানাইবার উপায় ছিল না, তাই জানাই নাই। তরঙ্গিণী যেদিন আমাদের কর্মচারী দিবানাথের সঙ্গে গোপনে গৃহত্যাগ করে, জগৎ-সংসার আমার চক্ষে সেদিন শূন্য হইয়া গিয়াছিল। ভগিনী কুলত্যাগিনী, গ্রাণে তাই আমাকে একঘরে করা হয়। খুব অপমান যোগ করিয়াছিলাম। কেহ আমার সহিত কথা কহিত না, আমাকে উদ্দেশ করিয়া দূর হইতে ব্যঙ্গবিদ্রুপের বাণ নিক্ষেপ করা হইত। আরও কত যে লাঞ্ছনা সহিয়াছিলাম! মাঝে-মাঝে তরঙ্গিণীর উপরে রাগও হইত খুব। সে শুধু নিজের কথাই ভাবিয়াছে; কই, আমার কী দশা হইবে, তাহা তো ভাবিয়া দেখে নাই।

“আজ আর রাগ হয় না। আজ সতীকে দেখি, আর ভাবি, সতীই বা তাহার বৈধব্যযন্ত্রণা আমৃত্যু সহ্য করিবে কেন? তরঙ্গিণীর মতো সতীও যদি তাহার জীবনসঙ্গী হিসাবে দ্বিতীয় কাহাকেও বাছিয়া লয়, তবে লউক। না, তরঙ্গিণীর মতো কোনও ঝড়ের রাত্রে তাহাকে গৃহত্যাগ করিতে হইবে না, আমি পুরোহিত ডাকিয়া তাহার পুনর্বিবাহের ব্যবস্থা করিয়া দিব।”

মুকুন্দপুরে কেন বসতি স্থাপন করেছিলেন, তার উল্লেখ দেখলুম ১৩৩০ বঙ্গাব্দের ১৭ শ্রাবণের লেখায়। মহেশ্বর সেখানে জানাচ্ছেন:

“ঠিক ছিল যে কোচবিহারে যাইব। তথায় যাইয়া যদি মহারাজের দর্শন পাই, তবে আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইতে পারে। রাজকোষ হইতে কিছু সাহায্য পাইলে মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ সহজ হয়! তখন অন্তত তাহাই ভাবিয়াছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর কোচবিহারে যাওয়া হইল না। পথিমধ্যে এই মুকুন্দপুরের মায়াবন্ধনে আবদ্ধ হইয়া এখানেই রহিয়া গেলাম।

“সেই সন্ধ্যাটির কথা অদ্যাপি ভুলি নাই। চল্লিশ বৎসর অতিক্রান্ত হইল, অথচ তাহার স্মৃতি আজও চিত্তপটে জাগরূক রহিয়াছে। গ্রামের নাম কী, তখনও তাহা জানিতাম না। এক চাষিগৃহস্থের বাড়ির দাওয়ায় বসিয়া আছি। ভাবিতেছি, পরদিবস প্রত্যুষে আবার কোচবিহারের পথে রওয়ানা হইব। হঠাৎ

এক ঝলক বাতাস বহিল, আর তখনই চতুর্দিক আমোদিত হইয়া উঠিল এক চিত্তহারী সৌরভে।

“এই গন্ধ আমার পরিচিত। গৃহস্থকে জিজ্ঞাসা করিতে সে জানাইল যে, এই গ্রামে চাপাগাছ রহিয়াছে অজস্র, গাছে ফুল আসিয়াছে, তাই কয়েকটা মাস এখন চাপাফুলের গন্ধে বাতাস একেবারে ভরপুর হইয়া থাকিবে।

“ঠিক কথা। চাঁপাই বটে। তবে মুচুকুন্দ চাঁপা। মুচুকুন্দ চাঁপার গাছ খুবই দীর্ঘ হয়। ফুলগুলিও হয় বেশ বড় মাপের। পুরু, লম্বাটে পাপড়ি। আমাদের বর্ধমানের গ্রামেও এ-গাছ অনেক ছিল!

“যে গ্রাম ছাড়িয়া আসিয়াছি, যেখানে আমার লাঞ্ছনা-অপমানের সীমা ছিল না, সহসা যেন তাহারই জন্য আমার মনের মধ্যে কেমন আকুলিবিকুলি করিতে লাগিল। সে-রাত্রে আমার ঘুম হইল না। স্থির করিলাম, কোচবিহারে যাইব না, এইখানেই থাকিব।

“এই গ্রামের নাম অবশ্য মুকুন্দপুর নহে, প্রকৃত নাম মুচুকুন্দপুর। সে-কথা পরে জানিয়াছি।” পাতাগুলি দ্রুত উল্টে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ এক জায়গায় চোখ আটকে গেল। তারিখ দেওয়া রয়েছে ২৩ ভাদ্র, ১৩৩৮। মহেশ্বর সেই তারিখের নীচে লিখছেন:

“ভাদ্রমাস শেষ হইতে চলিল। উত্তরবঙ্গ এমনিতেই বড় শ্যামল জায়গা। বৃষ্টিধারায় স্নাত হইবার ফলে তাহার নিবিড় অরণ্যানীর শ্যামশোভা যেন আরও উজ্জ্বলতা প্রাপ্ত হইয়াছে। আকাশে আজ মেঘ নাই। গোটা আকাশ যেন নীলকান্তমণির ন্যায় ঝকমক করিতেছে। শারদীয় মহাপূজার লগ্নও প্রায় আসিয়া পড়িল।

“প্রতি বৎসরই এই সময়ে বড় বেদনা বোধ করি। চিত্তপ্রকাশ যে সংসার-আশ্রম পরিত্যাগ করিয়াছে, এই বেদনা যেন এই সময়েই আরও বেশি করিয়া বাজে। কেন যে তাহার সন্ন্যাসে মতি হইল, কে জানে। ছাত্রাবাস হইতে নিরুদ্দেশ হইবার অনেক দিন পরে হরিদ্বার হইতে সে একখানি চিঠি লিখিয়াছিল। তাহাতে কোনও ঠিকানা দেয় নাই। শুধু জানাইয়াছিল যে, ঈশ্বর-সাধনাকেই সে তাহার একমাত্র ব্রত হিসাবে গ্রহণ করিয়াছে। ঘরে থাকিয়া কি সেই ব্রতের উদ্যাপন করা যাইত না? মাতাপিতার বুকে বেদনার শেল বিদ্ধ না করিয়া যাহার উদযাপন হয় না, সে কেমন ব্রত?

“নিত্যপ্রকাশ আর চিত্তপ্রকাশ, আমার দুই পুত্রের অবস্থান যেন পরস্পরের একেবারে বিপরীত দুই বিন্দুতে। বাল্যবয়স হইতেই নিত্যপ্রকাশ ভোজনবিলাসী, পোশাক-পরিচ্ছদেও অতিমাত্রায় শৌখিন। চিত্তপ্রকাশ তো তাহারই ভ্রাতা। অথচ আহার্যের ব্যাপারে চিত্ত কখনও কোনও বায়না করিয়াছে বলিয়া মনে পড়ে না, তাহার পরিধানেও কোনও বাবুয়ানা কখনও লক্ষিত হয় নাই। বুদ্ধি কিংবা মেধা যে নিত্যর কিছু কম, এমন বলি না, তবে লেখাপড়ায় সে কখনও মনোনিবেশই করিল না। চিত্ত সে-ক্ষেত্রে অধ্যয়নকেই তাহার তপস্যা বলিয়া জানিয়াছিল। সে ছিল সংসারে একেবারেই অনাসক্ত; আর এদিকে নিত্যর বিষয়াসক্তি দিনে-দিনে বাড়িতেছে বই কমিতেছে না।”

সত্যপ্রকাশের কাছে শুনেছিলুম যে, এই পরিবারে ব্যাবসার পত্তন হয়েছিল তাঁর বাবার আমলে। ঠাকুর্দা নাকি জমিজমা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন, ব্যাবসার জনে: যে সময় দেওয়া চাই, তা তাঁর ছিল না। আগ্রহও যে ছিল না, মহেশ্বর চৌধুরির ডায়েরি পড়তে-পড়তে সেটা বোঝা গেল। ৫ অগ্রহায়ণ ১৩৩৮ তারিখে তিনি লিখছেন :

“চিত্তপ্রকাশকে হারাইয়াছি। এখন নিত্যপ্রকাশকে লইয়াও বড় আশঙ্কা হয়। এই আশঙ্কার প্রকৃতি অবশ্য একেবারেই ভিন্ন। সে ব্যবসায় করিতে চাহে। সেই কারণে আমার কাছে টাকা চাহিয়াছিল। অঙ্কটা ছোট নহে। দশ হাজার। বলিলাম, অত টাকা কোথায় পাইব, নগদ যাহা ছিল তাহা তো মন্দির নির্মাণ করিতেই ব্যয়িত হইয়া গিয়াছে। নিত্য এ-কথা শুনিয়া কহিল, চাষবাস করিয়া আমাদের কী-ই বা লাভ হয়, জমি বিক্রয় করিয়া টাকা দিন, ব্যবসায়ে খাটাইলে ও-টাকা দ্বি, হইয়া ফিরিবে। কথাটা শুনিয়া আমি স্তম্ভিত। াণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ, ইহা কে না জানে। ব্যবসায়ে-বাণিজ্যে অবশ্যই বিস্তর লাভ। কিন্তু বিস্তরে আমার দরকার নাই, কৃষিকর্মে তদর্থং পাইয়াই আমি পরিতৃপ্ত। আর তা ছাড়া, জমি বিক্রয় করাকে আমরা মাতৃবিক্রয়ের সমতুল্য পাপকর্ম বলিয়া গণ্য করিয়া থাকি।

“হায়, নিত্যকে সে-কথা কে বুঝাইবে! অর্থই তাহার একমাত্র উপাস্য, অর্থই তাহার ধ্যানজ্ঞান। তাহাপেক্ষাও আশঙ্কার কথা এই যে, যে-ব্যক্তির অর্থসম্পদ নাই, নিত্য তাহাকে মনুষ্যপদবাচ্য বলিয়াই মনে করে না। তাহার মাতুলেরা অতি সজ্জন। কিন্তু তাহাদের সহস্র অনুরোধ সত্ত্বেও নিত্য যে কখনও মাতুলালয়ে যাইতে চাহে না, তাহার কারণ শহারা দরিদ্র। কী আর বালন, ঈশ্বর নিত্যকে সুমতি দিন।”

মহেশ্বরের লেখার মধ্যে এতই ডুবে গিয়েছিলুম যে, ঘরের মধ্যে আর-একজনের উপস্থিতির ব্যাপারটা প্রথমে টেরই পাইনি।

“খেতে আসুন। জামাইবাবু আপনার জন্যে বসে আছেন।”

চমকে উঠে দেখলুম, নিরু দাঁড়িয়ে আছে। বলল, “স্নান হয়ে গেছে তো?”

বললুম, “সে তো সাত-সকালেই সেরে নিয়েছি।”

“তা হলে আর দেরি করবেন না। আসুন।”

বখাওয়ার টেবিলে গল্প বিশেষ জমল না। সত্যপ্রকাশ দু-একটা প্রশ্ন করেছিলেন। মামুলি প্রশ্ন। সংক্ষেপে তার জবাব দিয়ে চটপট খেয়ে নিলুম। খাওয়ায় যে বিশেষ মন ছিল, তাও নয়। তবে তারই মধ্যে লক্ষ করলুম যে, পাতে আজ নানারকমের শাকভাজা। তার সঙ্গে অন্য সব পদও অবশ্য ছিল। খাওয়া শেষ করে সত্যপ্রকাশ তাঁর নিজের ঘরে চলে গেলেন। যাবার আগে আমাকে বললেন, “আপনিও একটু গড়িয়ে নিন।” ঘরে ফিরে আমি আবার ডুবে গেলুম সেই ডায়েরির মধ্যে।

১৬ই মাঘ ১৩৩৮ তারিখে মহেশ্বর লিখছেন :

“আজ সতীর জন্মদিন। বড় আশা করিয়া আমার এই একমাত্র কন্যার নাম রাখিয়াছিলাম সত্যভামা। ভাবিয়াছিলাম, স্বামী পাইবে কৃষ্ণের মতো। যেমন প্রেমিক, তেমনই বিচক্ষণ। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। কয়েক দিন ধরিয়া একটা কথা চিন্তা করিতেছি। নিদ্রাভঙ্গের পর প্রত্যুষেই সতী আমাকে প্রণাম করিতে আসিয়াছিল। তখন কথাটা তাহাকে জানাইলাম। বলিলাম, আজিকালি তো আকছার বিধবাবিবাহ হইতেছে, সুতরাং উদার চরিত্রের একটি পাত্র দেখিয়া পুনরায় আমি তাহার বিবাহ দিতে চাই। এমনও বলিলাম যে, সতীর কোলে যদি একটি সন্তানও থাকিত, তবে হয়তো পুনর্বিবাহে তাহার সংকোচ হইতে পারিত, কিন্তু তাহা যখন নাই, তখন তাহার সংকুচিত বোধ করিবার কোনও কারণ থাকিতে পারে না।

“আমার কথা শুনিয়া সতী যেন চমকিয়া উঠিল। পরক্ষণে সংযত শান্ত স্বরে কহিল, ‘কে বলিল আমার সন্তান নাই? সতু কি শুধু বৌদির ছেলে? ও আমারও ছেলে। আমরা দুইজনে মিলিয়া উহাকে মানুষ করিয়া তুলিব। বৌদি আমাকে বলিয়াছে যে, আমরা দুইজনেই উহার মা। না বাবা, সতুকে লইয়া আমি দিব্য আছি। আর তুমি আমাকে পরের ঘরে পাঠাইয়ো না।’ বুঝিলাম, কপালগুণে এমন পুত্রবধূ পাইয়াছি, যে শুধুই বুদ্ধিমতী নহে, হৃদয়বতীও বটে। হৃদয় আছে বলিয়াই সতীর দুঃখ সে বুঝিয়াছে, এবং দুঃখ যাহাতে দূরীভূত হয়, তজ্জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা লইতেও তাহার ভূল হয় নাই।

“সতুও দেখিতেছি তাহার পিতৃম্বসার কোল হইতে বড় একটা নামিতে চাহে না। পিসি স্নান না-করাইলে সে স্নান করে না, পিসি খাওয়াইয়া না-দিলে খায় না, ঘুমাইবার সময়েও পিসিকে তাহার কাছে থাকিতে হইবে।”

সতু যে সত্যপ্রকাশ, সেটা সহজেই বুঝলুম। সোমবার রাত্রি থেকে মা আর পিসিমা, দু’জনের মুখেই সত্যপ্রকাশের এই ডাক-নাম আমরা শুনছি। মা আর পিসিমার পারস্পরিক ভাব-ভালবাসার কথা সত্যপ্রকাশের কাছেই জেনেছিলুম, এবারে মহেশ্বর চৌধুরির ডায়েরি পড়েও সে-কথা জানা গেল। ডায়েরিতে সত্যপ্রকাশের সম্পর্কেও কিছু প্রশংসা দেখতে পাচ্ছি। ১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৯ তারিখে মহেশ্বর লিখছেন:

“সতুর বয়স এখনও চারি বৎসর পূর্ণ হয় নাই। কিন্তু ইতিমধ্যে তাহার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার নানা প্রমাণ পাইয়াছি। সেদিন একটা বাঘের গল্প বলিয়াছিলাম। আজ সেই গল্পটা সে আমাকে আদ্যন্ত শুনাইয়া দিল। এখনও হাতেখড়ি হয় নাই, অথচ অন্যের ‘বর্ণপরিচয়’ দেখিয়া একটি লোহার শিকের সাহায্যে মাটির উপরে দিব্য অ-আ-ক-খ লিখিতে আরম্ভ করিয়াছে। স্মৃতিশক্তিও দেখিলাম কম নয়। যেমন বাংলায়, তেমনি ইংরাজিতেও এক হইতে একশত পর্যন্ত নির্ভুল বলিয়া যায়।

“সেদিন কোথা হইতে একটা সাপের খোলস কুড়াইয়া আনিয়াছিল। আমার সন্মুখে ফেলিয়া দিয়া বলিল, ‘দাদু, তুমি তো বলো যে, আমাদের গ্রামে সাপ নাই, তবে এই সাপের খোলস কোথা হইতে আসিয়াছে?’ হাসিয়া বলিলাম, ‘সাপ নাই, এমন কথা তো বলি না। বলিয়াছি যে মনসা দেবীর আশীর্বদে এই গ্রামে কাহাকেও সাপে কাটে না। কথাটা মিথ্যা নহে। এককালে এদিকে সত্যই সাপের বড় উৎপাত ছিল। আশপাশের গ্রামে এখনও সাপের কাড়ে লোক মারা যায়। অথচ যেদিন মনসাদেবীর প্রতিষ্ঠা হইয়াছে, সেদিন হইতে অদ্যাবধি এই মুকুন্দপুর গ্রামে কাহাকেও সাপে কাটে নাই।”

পাতার পর পাতা দ্রুত পড়ে যাচ্ছিলুম, তবু শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ে ওঠা গেল না। বাইরের উঠোনের উপরে একটা গাড়ি এসে থামল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, ছ’টা বাজে। ডায়েরি বন্ধ করে জানালা খুলে দেখলুম, ভাদুড়িমশাই ফিরে এসেছেন।

ঘরে এসে ঢুকতেই জিজ্ঞেস করলুম, “খবর কী?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন নয়, পরে বলব।”

জামা-কাপড় পালটে তিনি বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন।

তার আধ-ঘন্টাটাক বাদে মোটর-সাইকেলের ভট্-ভট্ আওয়াজ শুনে বুঝলুম যে, ডাক্তার সরকারও এসে গিয়েছেন।

২৯
ডাক্তারবাবুকে আজ এ-বেলায় আর-কোথাও রুগি দেখতে যেতে হয়েছিল নিশ্চয়, তাই দিনের আলো থাকতে-থাকতে মুকুন্দপুরে আসতে পারেননি। হেমন্তকাল, দিনের আলো এখন ফুরিয়েও যায় খুব তাড়াতাড়ি, দুপুরের খানিক বাদেই যেন ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। বাইরের উঠোন অবশ্য এখন আর অন্ধকার নয়। ডাক্তারবাবু এসেছেন শুনেই সত্যপ্রকাশ হ্যাজাক জ্বালিয়ে বাইরের উঠোনের মাঝ বরাবর ঝুলিয়ে দিতে বলেছিলেন। চারিদিক তাই একেবারে দিনের আলোর মতো ফটফট করছে।

ডাক্তারবাবু আজ আর কাউকে রঙ্গিলার ঘরে ঢুকতে দেননি। পার্টিশানের এদিকে রামদাসের ঘর। সেখানে তিনটে চেয়ার আনিয়ে আমরা তিনজন বসে আছি। আমি, ভাদুড়িমশাই আর সত্যপ্রকাশ। বাইরের বারান্দার একদিকে একটা তক্তাপোশ পাতা। তাতে বসে আছেন গোবিন্দ ভট্‌ট্চাজ আর রঙ্গনাথ। পার্টিশানের দরজার কাছে রামদাস একেবারে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যেখানে বসে আছি, সেখান থেকে রঙ্গিলার ঘর পালানো মা ঝুমরিকেও দেখতে পাচ্ছিলুম। ঝুমরি আজ বারান্দায় উঠে এসেছে। রামদাস তাকে বাধা দেয়নি।

রঙ্গিলার ঘর থেকে ডাক্তারবাবু বেরিয়ে আসতেই আমরা, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালুম। যারা বারান্দায় ছিল, তারাও দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সকলের মুখেই উদ্বেগের ছাপ। ডাক্তারবাবু কখন রঙ্গিলার ঘর থেকে বার হন, কী বলেন, তারই জন্যে সবাই চুপচাপ এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল। কিন্তু এখন যেন কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে ভরসা পাচ্ছে না।

ডাক্তারবাবু বললেন, “আরে, কী ব্যাপার, সবাই এত গম্ভীর কেন?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “রঙ্গিলা কেমন আছে?”

“ভাল।… কই হে রামদাস, সাবানটা দাও।”

রামদাস সাবান এগিয়ে দিল। ডাক্তারবাবু হাত ধুয়ে, রামদাসের হাত থেকে তোয়ালেখানা টেনে নিয়ে মুখ তুলে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকালেন। তারপর একগাল হেসে বললেন, “ভাল মানে খুব ভাল। চমৎকার, একসেলেন্ট! সেদিন বলেছিলুম, দি ওয়র্স্ট ইজ ওভার। তারপর ফের জ্বরটা আসায় একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলুম ঠিকই, তবে এখন বলছি, রঙ্গিলাকে নিয়ে আর আমি একটুও চিন্তা করছি না।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “জ্বরটা আর আসেনি তো?”

“না। গা একেবারে পাথরের মতো ঠান্ডা। কিন্তু তার চেয়েও বড় খবর, জ্ঞান ফিরে আসছে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা কী করে বুঝলেন?”

“আমাকে যে চিনতে পেরেছে, সেটা ওর চাউনি থেকেই বুঝেছি। তা ছাড়া ঠোঁট নড়ছে। একটু গুঙিয়ে উঠল। মনে হচ্ছে, কিছু বলতে চায়…মানে জরুরি কিছু… কিন্তু ওয়র্ড-ফর্মেশানের একটা ব্যাপার আছে তো, সেটা ঠিক পেরে উঠছে না। কিন্তু পারবে, কাল সকালের মধ্যেই পেরে যাবে।…কী, আপনারা খুশি তো?”

রামদাস হাত জোড় করে দাঁড়ি েছিল। এখানে আসা অবধি তাকে হাসতে দেখিনি। এই প্রথম তার মুখে একটু হাসি ফুটতে দেখা গেল।

বারান্দা থেকে উঠোনে নামলেন ডাক্তারবাবু। মোটরসাইকেলে উঠে স্টার্ট দিলেন। তারপর কী যো ভেবে স্টার্ট থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আয়া যে চলে গেছে, সে তো এসেই শুনলুম। নতুন আয়া কখন থেকে কাজে লাগবে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “শিলিগুড়িতে নতুন একজনের সঙ্গে কথা বলেছি। ভেবেছিলুম, আমার সঙ্গে করেই তাকে নিয়ে আসব, কিন্তু নার্সিংহোমে হঠাৎ একজন হার্টের পেশেন্ট এসে পড়ায় মেয়েটি আজ ছাড়া পেল না। তবে টাকা দিয়ে এসেছি, কাল সকালে নিজেই বাসে উঠে এখানে চলে আসবে।”

ডাক্তারবাবু বললেন, “তার মানে রঙ্গিলার ঘরে আজ রাত্তিরে কেউ থাকছে না, কেমন?”

রামদাস বলল, “আমি থাকব।”

ঝুমরি এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি। এবারে অস্ফুট গলায় বলল, “বলেন তো আমিও থাকতে পারি।”

ডাক্তারবাবু কী যেন চিন্তা করলেন কয়েক মুহূর্তে। তারপর বললেন, “সুস্থ অবস্থায় রঙ্গিলা তো ও-ঘরে একাই থাকত, তাই না?”

রামদাস বলল, “হ্যাঁ।”

“তা হলে একাই থাক।” ডাক্তারবাবু বললেন, “জ্ঞান হয়তো আজ রাত্তিরেই পুরোপুরি ফিরে আসবে। তখন যদি ঘরের মধ্যে আর-কাউকে দেখতে পায়, তা হলে হয়তো অবাক হয়ে যাবে। তার একটা খারাপ এফেক্ট হওয়া কিছু বিচিত্র নয়…মানে হঠাৎ একটা সেট-ব্যাক হয়ে যেতে পারে। সব দিক ভেবে তাই মনে হচ্ছে যে, আজকের রাতটা ওর একা থাকাই ভাল। লেট্স কিপ থিংস অ্যাজ নর্মাল অ্যাজ পসিবল।”

রামদাস বলল, “আমিও থাকব না?”

ডাক্তারবাবু বললেন, “বললুম তো, না-থাকাই ভাল। আর তা ছাড়া দরকারই বা কী। তুমি তো পাশের ঘরেই আছ। যদি ওর দরকার হয় তা হলে তুমি জানতেই পারবে। ঘরের মধ্যেই যে থাবতে হবে, এমন তো কোনও কথা নেই।…আর হ্যাঁ, কাল সকালেই আমি একবার আসব।”

কুণ্ঠিত গলায় ঝুমরি বলল, “ডাক্তারবাবু, আপনি তো হাসিমারায় খাচ্ছেন?”

‘হ্যাঁ। কেন বলো তো?”

“এখন তো আর বাস পাব না, আপনি যদি ওই পর্যন্ত আমাকে নিয়ে যান তো ওখান থেকে আমি হেঁটেই আমাদের বাগানে চলে যেতে পারব।”

“ওহো, তুমি তো দক্ষিণবাড়ি চা-বাগানে থাকো, তাই না?”

“হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু।”

“বেশ, তা হলে উঠে পড়ো।”

মোটরসাইকেলের পিছনের সিটে ঝুমরিকে বসিয়ে নিয়ে ডাক্তারবাবু চলে গেলেন।

ডাক্তারবাবু যতক্ষণ ছিলেন, চুপ করে সবাই তাঁর কথা শুনছিলুম আমরা। এবারে রঙ্গনাথ তাঁর বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। গোবিন্দ ভট্‌চাজও পা বাড়ালেন তাঁর ঘরের দিকে। সম্ভবত এবারে তিনি পুজোয় বসবেন। তবে সত্যপ্রকাশ যেহেতু বাড়িতেই রয়েছেন, তাই শাঁখ হয়তো বাজবে না, ঘন্টার আওয়াজও শোনা যাবে না। আমরা তিনজন বাইরের উঠোন পেরিয়ে ভিতর-বড়িতে চলে এলুম। আসতে-আস্পতেই দেখলুম, রামদাস হ্যাজাকটা নিবিয়ে দিচ্ছে। নিরুকে ঢায়ের কথা বলে দিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “চলুন, একটু বসা যাক।”

ভাদুড়িমশাই শিলিগুড়ি থেকে ফিরবার পর থেকে এখনও পর্যন্ত সত্যপ্রকাশের সঙ্গে তাঁর কোনও কথা হয়নি। এবারে সত্যপ্রকাশই জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু হদিস করতে পারলেন?”

“কীসের হদিস?”

“সে কী!” সত্যপ্রকাশ অবাক হয়ে বললেন, “মনসামূর্তির খোঁজেই তো আপনি শিলিগুড়ি গিয়েছিলেন, তাই না?”

“শুধু মূর্তির খোঁজে যাব কেন? অন্য কয়েকটা ব্যাপার নিয়েও একটু খোঁজখবর করবার দরকার ছিল। তার মধ্যে দুটো খবর শুনে আপনি খুশি হবেন।”

“কীসের খবর?”

“প্রথম খবর ব্যাঙ্ক-লোনের। লোনটা আপনি সামনের মাসেই পেয়ে যাচ্ছেন।”

শুনে একেবারে হাঁ হয়ে গেলেন সত্যপ্রকাশ। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, “সত্যি? খবরটা কার কাছে শুনলেন আপনি?”

“ব্যাঙ্কের জেনারেল-ম্যানেজারের কাছে। ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করেছিলুম। তিনিই জানালেন।”

“আপনাকে চেনেন উনি?”

“বা রে, ব্যাঙ্গালোরের লোক, অথচ চারু ভাদুড়িকে চিনবে না, তাও কি হয় নাকি?”

সত্যপ্রকাশের মুখ দেখেই মালুম হচ্ছিল যে, তিনি কিছুই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছেন না। কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে একটু কিন্তু-কিন্তু করে বললেন, “কত পার্সেন্ট দিতে হবে ওঁকে?”

“কিচ্ছু দিতে হবে না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সকলকেই আপনারা ঘুষখোর ভাবেন কেন বলুন তো? বিশ্বসুদ্ধ সব্বাই কি ঘুষখোর নাকি?”

“কিচ্ছু দিতে হবে না?” সত্যপ্রকাশ যেন ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।

“এক আধলাও না।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কী জানেন মিঃ চৌধুরি, দোষ আপনাদেরও কম নয়, ঘুষ দিতে-দিতে স্বভাবটাই আপনাদের নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বুঝতে পারেন না যে, সংসারে যেমন বিস্তর চোর-জোচ্চোর রয়েছে, তেমনি আবার সৎ লোকেরও অভাব নেই।”

সত্যপ্রকাশ ইতিমধ্যে নিজেকে একটু সামলে নিয়েছিলেন। বললেন, “কিন্তু একটা কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ভদ্রলোককে ডিনারে ডেকেছিলুম। বলেছিলুম যে, আমিই গাড়ি পাঠিয়ে দেব। কিন্তু তিনি নেমন্তন্নটা অ্যাকসেপ্টই করলেন না। বললেন, ফরগেট্ ইট। এটা কেন করলেন বলুন দেখি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটাও আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে? আশ্চর্য! আরে মশাই, আপনাদের এইসব ডিনার-ফিনারও আসলে ঘুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। নানজাপ্পা সেটা ভালই বোঝে, তাই অ্যাকসেপ্ট করেনি। কী জানেন চৌধুরিমশাই, বিয়িং অনেস্ট ইজ নট এনাফ, লোকে যাতে অসৎ না ভাবে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়। আপনার হোটেলে গিয়ে ডিনার খেয়ে তারপর আপনার কাজটা করে দিলে সবাই বলত, লোকটা নির্ঘাত ঘুষ খেয়েছে। ধরে নিন, সেইজন্যেই নানজাপ্পা আসেনি।…ও হ্যাঁ, একটা কথা বলা হয়নি। লোনটা ন্যাংশান করার দুটো শর্ত আছে কিন্তু।”

“কী শর্ত?”

“প্রথমটা ওঁদের ইঞ্জিনিয়ারের। আপনাদের প্ল্যান দেখে ব্যাঙ্কের ইঞ্জিনিয়ার যে নোট দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে যে, হোটেলে আগুন লাগার ঘটনা আজকাল আকছার ঘটছে। অথচ আপনাদের প্ল্যানে সে-দিকটায় তেমন নজর দেওয়া হয়নি। আর কিছু না করুন, ইমার্জেন্সি স্টেয়ারকেসটা আরও অন্তত এক ফুট আপনাকে চওড়া করতে হবে।”

আমি বললুম, “সেটা করা যাবে তো?”

সত্যপ্রকাশ হেসে বললেন, “ইট্স এ মাইনর ম্যাটার। জায়গা যা রয়েছে, তাতে এক ফুট কেন, আরও দেড় ফুট চওড়া করতে পারি। করে দেব। দ্বিতীয় শর্ত?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা ওঁরা লিখিত-পড়িতভাবে আপনাকে জানাবেন না। নানজাপ্পা বলল, শিলিগুড়িতে পৌঁছে অবধি তিনি শুনতে পাচ্ছেন যে, কনট্রাক্টর হিসেবে সম্পৎলালের বিশেষ সুনাম নেই, অনেক সময় ওরই জন্যে নাকি কন্সট্রাকশনের কাজ মাসের পর মাস পিছিয়ে যায়। তাই লেবার-কনট্রাক্টের কাজটা যদি সম্পৎলালের বদলে আর কাউকে…মানে অন্য যে-কোনও বড় কনট্রাক্টরকে দেন, ব্যাঙ্ক তা হলে নিশ্চিন্ত হতে পারে যে, কাজটা সময়মতো শেষ হবে। ফলে ক এখনকার এস্টিমেটের মধ্যেই থাকবে, ধাপে-ধাপে চড়ে যাবে না, আপনারও আর নতুন করে লোনের দরকার হবে না।”

“সম্পৎলালকে সরিয়ে দিয়ে আর কাউকে কাজ দিতে হবে?” সত্যপ্রকাশ যেন শিউরে উঠলেন, “ওরে বাবা, তাও কি হয়?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন হবে না, খুব হয়। আর তা ছাড়া, সম্পৎলালকে আপনি পাচ্ছেনই বা কোথায়? কাল শিলিগুড়িতে গিয়ে আপনি যে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি, তার কারণ জানেন?”

“কেন, সে কোথায় গিয়েছিল?”

“আপনার পক্ষে সেটাই হচ্ছে দ্বিতীয় সুখবর। সম্পৎলালের মতো লোকরা শেষ পর্যন্ত যেখানে যায়, সেখানেই গিয়েছিল। আপাতত আছেও সেইখানেই। নরকে। পরশু বিকেলে তো শিলিগুড়ি থেকে আমাদের নিয়ে আপনি মুকুন্দপুরে চলে আসেন। সেদিন রাত থেকেই নাকি সম্পৎলালের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। থানায় গিয়ে শুনলুম, আজই সকালে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের রেল-ইয়ার্ডের একটা ওয়াগনের মধ্যে তার লাশের সন্ধান মিলেছে। গলাটা একেবারে দু-ফাঁক করা। খুন হয়েছে সম্ভবত পরশু রাত্তিরেই।”

সত্যপ্রকাশকে দেখে মনে হচ্ছিল তাঁর মুখ থেকে যেন সমস্ত রক্ত কেউ নিংড়ে বার করে নিয়েছে। স্খলিত গলায় তিনি বললেন, “সে কী!”

ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “এতে এত অবাক হচ্ছেন কেন? আমি তো বলেইছিলুম যে, নিজের গ্যাংকে ফাঁসিয়ে কোনও মাফিয়োসো কখনও পার পায় না। শয়তানদেরও একটা কোড অভ কনডাক্ট থাকে, মিঃ চৌধুরি। সেই কোড যে ভাঙে, একদিন না একদিন তাকে এইভাবেই মারা পড়তে হয়।”

সত্যপ্রকাশ কথা বলতে পারছিলেন না।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজটা ফকিরাই করুক আর যে-ই করুক, আপনি আপাতত নিশ্চিন্ত। যা-ই হোক, আমি এখন ঘরে যাচ্ছি। দু’একটা কাজ পড়ে রয়েছে, চটপট সেরে ফেলতে হবে। চা এলে বরং আমাদের ঘরে পাঠিয়ে দেবেন। চলুন, কিরণবাবু।”

আমরা আমাদের ঘরে চলে এলুম।

তার মিনিট দুয়েক বাদেই চায়ের ট্রে নিয়ে নিরু আমাদের ঘরে এসে ঢুকল। ভাদুড়িমশাই তার হাত থেকে ট্রেটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন, “কী খবর সুহাসিনী?”

নিরু বলল, “ভাল। কিন্তু জামাইবাবু এমন হতভম্ব হয়ে বসে আছেন কেন? কী হয়েছে ওঁর?”

ভাদুড়িমশাই কপট ধমকের গলায় বললেন, “ও-সব নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না, তুমি একেবারে চুপ করে থাকো।”

নিরু বেরিয়ে গেল। চায়ে চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “চাঁদুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”

“তার আর দরকার হয়নি। অনেকদিনের চেনা একজনকে পেয়ে গিয়েছিলুম। আদালত, থানা, ব্যাঙ্ক…মানে যেখানে যেখানে যাওয়া দরকার, সে-ই নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। এগারোটায় শিলিগুড়ি পৌঁছলুম, কাজ শেষ হতে-হতে তিনটে। নন্-স্টপ কাজ আর কাজ। বুড়ো এক উকিলের বাড়িতেও গিয়েছিলুম। রাজদেও কুর্মি কীভাবে খুন হয়েছিল, ভদ্রলোকের কাছে তার ডিটেল্স শোনা গেল।”

“তার মানে দুপুরে আজ আর ভাত খাওয়া হয়নি।”

“হয়নি তো কী হয়েছে? আরে মশাই, রোজ দু’বেলাই তো ভাত খাচ্ছি, একটা বেলা না হয় না-ই খেলুম। তবে কিনা আজ শাকভাজাটা খাওয়া উচিত ছিল।”

হঠাৎ মনে পড়ে গেল, দুপুরে আজ ভাতের পাতে গুচ্ছের শাকভাজা দেওয়া হয়েছিল। বললুম, “কী ব্যাপার বলুন তো, হাজার রকমের সুখাদ্য থাকতে হঠাৎ শাকভাজা নিয়ে এত মাতামাতি কেন?”

“বাঃ কিরণবাবু, আপনিও কি সাহেব হয়ে উঠলেন নাকি? কালীপুজোর আগের দিন যে চোদ্দোশাক খেতে হয়, ও বেমালুম ভুলে গেছেন?”

তাই তো, কালই কালীপুজো।

খানিক বাদেই নিরু আবার ঘরে এসে ঢুকল। চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। টেবিল থেকে ট্রেটা তুলে নিয়ে ভাদুড়িমশাইকে বলল, “একটু পরেই খেতে ডাকছি। ও-বেলা সম্ভবত আপনার কিছু খাওয়া হয়নি। এ-বেলা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন।”

নিরু বেরিয়ে গেল।

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ টানলেন কিছুক্ষণ। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দুপুরে কী করলেন আজ?”

বললুম, “ডায়েরিটা পড়লুম। সবটা নয়, ওই কিছু-কিছু জায়গা। গ্রামটার নাম যে আসলে মুকুন্দপুর নয়, মুচুকুন্দপুর, আজই সকালে সত্যপ্রকাশের মুখে এই কথাটা শুনে ভেবেছিলুম যে, অনেক কিছু জানলেও অন্তত এটা আপনি এখনও হয়তো জানতে পারেননি।”

“তা ডায়েরি পড়ে দেখলেন যে, কথাটার ওখানে উল্লেখ রয়েছে। তাই না?”

হেসে বললুম, “বিলক্ষণ। আর তা দেখেই বুঝলুম যে, ডায়েরিটা যখন আমার আগেই আপনি পড়েছেন, তখন এটাও আপনি আমার আগেই জেনে বসে আছেন।

ভাদুড়িমশাই কিছু বললেন না। হাসতে লাগলেন।

মুকুন্দপুরের মনসা – ৩০

রাত সাড়ে আটটায় সত্যপ্রকাশ আমাদের ডাকতে এলেন। চেহারা দেখেই বুঝতে পারছিলুম যে, ভদ্রলোক একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছেন। পর-পর যে-সব খবর তাঁকে দেওয়া হয়েছে, তার ধাক্কা তিনি এখনও ঠিক সামলে উঠতে পারেনি। যার আশা তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, সেই পঞ্চাশ লাখ টাকা ব্যাঙ্ক-লোনের ব্যবস্থা হয়ে গেল, অথচ তার জন্যে একটা পয়সাও কাউকে খাওয়াতে হল না, তার উপরে আবার দাঙ্গাবাজ যে পাওনাদারটির ভয়ে ভদ্রলোক একেবারে কাঁটা হয়ে ছিলেন, সেই সম্পৎলালও বেঁছে নেই, তিনবাত্তির মোড়ে মাথা ফাটবার আশঙ্কাটাও অতএব এক নিমেষে ঘুচে গেল, সত্যপ্রকাশ সম্ভবত বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, স্রেফ একটা দিনের মধ্যেই পর-পর এমন চমৎকার সব ঘটনা ঘটে যেতে পারে!

বললেন, “খেতে আসুন।”

খাওয়ার পর্ব যে একেবারে নিঃশব্দে সমাধা হল, তা নয়। তবে বেশির ভাগ কথা বলছিলেন মা আর পিসিমা-ই। তাও আমাদের খাওয়া নিয়েই। ভাদুড়িমশাইয়ের পাতে একটা বাড়তি-পদ দেওয়া হয়েছিল। শাকভাজা। পিসিমার দেখলুম সব দিকেই সমান নজর। বললেন, “আজ ভূত-চতুদশী, চোদ্দোশাক খেতে হয়। তুমি তো বাবা ও-বেলা এখানে ছিলে না, তাই ঠাকুরকে তোমার জন্যে আলাদা করে এ-বেলা ভাজতে বলে দিয়েছিলুম।”

সত্যপ্রকাশের মা বললেন, “একটুখানি মুখে দাও বাবা, দিতে হয়। তাই বলে আবার বেশি খাবার দরকার নেই, অন্য-সব পদ তা হলে পাতেই পড়ে থাকবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার ভাগ্যকে হিংসে হয় সত্যপ্রকাশবাবু, কী মা আর কী পিসিমাই না পেয়েছেন! ইচ্ছে ছিল, আর ক’টা দিন থেকে ওঁদের আদর-যত্নে ভাগ বসাই। কিন্তু তা তো হবার নয়, কালকেই আমাদের কলকাতায় ফিরতে হচ্ছে।”

শেষ কথাটা শুনে সত্যপ্রকাশ যেন একটু অবাক হয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন একবার। কিন্তু পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নিলেন। কিছু বললেন না।

খাওয়া শেষ হল। মশলার ডিবে হাতে নিয়ে দরজার কাছে নিরু দাঁড়িয়ে ছিল। বেসিনে মুখ ধুয়ে একটিপ করে এলাচ-মৌরি মুখে ফেলে আমরা ঘরে ফিরে এলুম। সত্যপ্রকাশও আমাদের সঙ্গে এলেন। মিনিট দশেক বসলেন। একটা সিগারেট ধরালেন। এখানে থাকার ব্যাপারে আমাদের সুবিধে নসুবিধে নিয়ে খুচরো কয়েকটা প্রশ্ন করলেন। তারপর, আমরা যখন ভাবছি যে, এবারে তিনি বিদায় নেবেন, তখন উঠে দাঁড়িয়ে, বলা নেই কওয়া নেই, ড়িমশাইয়ের হাত দুখানা হঠাৎ জড়িয়ে ধরলেন তিনি। বললেন, “আপনাকে যে কী বলে আমার কৃতজ্ঞতার কথা জানাব, ভেবে পাচ্ছি না। আপনি…আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আরে দূর মশাই, আমি আবার কী করলুম!”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ও-কথা বলবেন না, মিঃ ভাদুড়ি। যা করবার, আপনিই করেছেন। আমি বেশ ভালই বুঝতে পারছি যে, নানজাপ্পা আপনার শুধু চেনা মানুষ নয়, ভদ্রলোক আপনাকে যথেষ্ট মান্যি করেন। এও বুঝতে পারছি যে, আমার হয়ে এ-ব্যাপারে আপনি পার্সোন্যালি তাঁকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন।… না না, আপনি ভাববেন না যে, এটুকু বোঝবার মতো বুদ্ধিও আমার নেই। নিশ্চয় তাঁকে আপনি বলেছিলেন যে, এটা তাঁকে করে দিতেই হবে। যে-লোন এতদিন ধরে আটকে আছে, তা নইলে কি আর আজই হঠাৎ এইভাবে সেটা স্যাংশান হয়ে যায়?”

সত্যপ্রকাশের মুঠো থেকে নিজের হাত দুখানা ছাড়িয়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে না মশাই, আমি কেন এ-সব ব্যাবসার ব্যাপারে নাক গলাতে যাব? আর তা ছাড়া এটা তো একটা নর্মাল প্রসিডিওর। ব্যাঙ্কের কাজ লোন দেওয়া। আপনি আপনার ব্যাবসার জন্যে লোন চেয়েছেন, তারা দিয়েছে। ব্যস্, মিটে গেল।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনার যা বলবার আপনি বলুন; আমার যা বুঝবার, তা আমি ঠিকই বুঝেছি। শুধু একটা কথা। আমি জানি যে, আপনি ব্যস্ত মানুষ, অনেক দাম আপনার সময়ের। তবু একটা প্রার্থনা না-জানিয়ে পারছি না। আপনি আমার জন্যে অনেক করেছেন। কিন্তু এতই যখন করলেন, তখন মুর্তিটিও উদ্ধার করে দিন। নইলে আমার পূর্বপুরুষের কাছে আমি অপরাধী হয়ে থাকব।…না না, আমি আর কোনও কথা শুনছি না। কাল আপনারা চলে যাবেন না, দয়া করে আর ক’টা দিন থেকে যান। এই শেষ কাজটা করে দিন। মিঃ ভাদুড়ি, আপনি সব পারেন। একটু যদি চেষ্টা করেন তো এটাও আপনি পারবেন।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “পারব কি না জানি না, তবে কাজটা যখন নিয়েছি, তখন চেষ্টা তো করতেই হবে। মিঃ চৌধুরি, আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে, চেষ্টার কোনও ত্রুটি হবে না। কাল অবশ্য কলকাতায় একটা কাজ রয়েছে, ফিরতে পারলে ভাল হত, এমন দেখি কদ্দুর কী হয়।” তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওরেব্বাবা, এরই মধ্যে দশটা বেজে গেল! যান মশাই, আর রাত জাগবেন না, এবারে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”

সত্যপ্রকাশ চলে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে ভাদুড়িমশাই তাঁকে ডাকলেন। বললেন, “সিগারেট প্রায় ফতুর, পারেন তো কাউকে দিয়ে এক প্যাকেট পাঠিয়ে দিন।”

“এখুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি।” বলে সত্যপ্রকাশ বেরিয়ে গেলেন।

সিগারেট নিয়ে নিরু তার মিনিট পাঁচেক বাদেই ঘরে এসে ঢুকল।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যপ্রকাশ কী করছেন?”

“জামাইবাবু এইমাত্র দোতলায় উঠে গেলেন।” নিরু বলল, “কেন, তাঁকে কিছু বলতে হবে?”

“না, থাক, দরকার নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা জানাবার ছিল, তা সেটা কাল সকালে জানালেও চলবে। তুমি বরং একটা কাজ করো। তোমার খাওয়া হয়েছে তো?”

“এইমাত্র খেয়ে উঠলুম।”

“তা হলে বরং রামদাসকে একটু ডেকে আনো। সেদিনকার চুরির ব্যাপারটা নিয়ে আরও দু-একটা কথা ওকে জিজ্ঞেস করতে চাই।”

“এত রাত্তিরে?”

“যা বলছি, করো তো সুহাসিনি। এক্ষুনি গিয়ে রামদাসকে ডেকে আনো। বলো, জরুরি দরকার।”

নিরু বেরিয়ে গেল।

খানিক বাদেই বাইরের দিকের দরজায় টোকা পড়ল। আমিই উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলুম। রামদাস এসে ঘরে ঢুকল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “দরজাটা ভেজিয়ে দাও, রামদাস।”

দরজা ভেজিয়ে দিয়ে রামদাস বলল, “আমাকে ডাকছিলেন বাবু?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ, রামদাস। একটা খুব জরুরি কথা বলবার জন্যেই ডেকেছি। আমি একটা কাজ করতে চলেছি। কিন্তু সে-কথা যদি ঘুণাক্ষরেও কেউ জানতে পারে, তা হলে রঙ্গিলা তো মারা পড়বেই, মনসাকেও উদ্ধার করা যাবে না, ফলে তোমাদের খোকাবাবুরও সর্বনাশ হয়ে যাবে। তাই আমাকে কথা দাও যে, ব্যাপারটা একমাত্র তুমি ছাড়া আর কেউ জানবে না।”

মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলুম যে, ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে রামদাস ভীষণ ঘাবড়ে গেছে। অস্ফুট গলায় সে বলল, “খোকাবাবুকেও জানাতে পারব না?”

“খোকাবাবু ঘুমিয়ে পড়েছেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাঁকে কাল সকালে জানালেই চলবে। কিন্তু তুমি এখন কাউকে এ-ব্যাপারে কিছু বোলো না। কী, মনে থাকবে?”

“থাকবে বাবু, কাউকে কিচ্ছু বলব না।”

লক্ষ করছিলুম, রামদাসের মুখের উপর থেকে পলকের জন্যেও ভাদুড়িমশাইয়ের নজর অন্যদিকে সরে যাচ্ছে না। অজগরের দৃষ্টির ফাঁদে একটা খরগোশের ছানা যেভাবে আটকে যায়, রামদাসকে যেন প্রায় সেইভাবেই একেবারে নজরবন্দি রেখেছেন তিনি। আরও খানিকক্ষণ তিনি একইভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “ঠিক আছে, তা হলে জেনে রাখো যে, রঙ্গিলার আয়াকে ইচ্ছে করেই এখান থেকে সরিয়ে দিয়েছি। যদি আমরা জোর করতুম, সুশীলা তা হলে হয়তো আরও দু-চার দিন এখানে থেকে যেত; কিন্তু ও যদি রঙ্গিলার ঘরে থাকত, তা হলে কাজের অসুবিধে হত আমার, তাই আমিই চাইনি যে, ও এখানে থাকুক। শুধু সুশীলা বলে কথা নেই, রঙ্গিলার ঘরে আজ রাত্তিরে আর কেউ থাকুক, এটাই আমি চাই না।”

“কেউ থাকবে না?”

“আমি আর কিরণবাবু থাকব। তুমি থাকবে পার্টিশানের এদিকে, তোমার ঘরে। আর পার্টিশানের ওদিকে অর্থাৎ রঙ্গিলার ঘরের এক কোণে আমাদের দুজনের জন্যে দুটো মোড়া রেখে দেবে। তোমার কাছে ঘড়ি আছে?”

“না বাবু।”

“ঠিক আছে, আমার হাতঘড়িটা তুমি নিয়ে যাও। কিরণবাবুর ঘড়িতেই আমার কাজ চলে যাবে। এখন দশটা পঁয়ত্রিশ। রাত্তির ঠিক বারোটায় আমরা রঙ্গিলার ঘরে গিয়ে ঢুকব। তোমাদের দরজাটা যেন খোলা থাকে। স্রেফ ভেজিয়ে রেখো, ভিতর থেকে যেন খিল এঁটে দিয়ো না। কিন্তু আবার বলছি, কথাটা যেন কেউ জানতে না পারে।…ব্যাস্, এখন তুমি যাও। তবে জেগে থাকো, আমরা না-যাওয়া পর্যন্ত ঘুমিয়ে পোড়ে। না।”

রামদাস বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ করে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “আপনার মতলবটা কী বলুন তো?”

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “আজ ভূত-চতুর্দশী না?”

“হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে?”

“হুঁশিয়ার থাকুন, কিরণবাবু, আজ রাত্তিরে আমরা ভূত ধরব।”

তারপর একটু থেমে গম্ভীর গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “কে জানে, ভূতের বদলে শেষ পর্যন্ত একটা পেত্নিকেও হয়তো পাকড়াও করতে পারি।”

৩১
ভাদুড়িমশাই বললেন, “পৌনে এগারোটা বাজে। ঠিক বারোটায় আমরা রঙ্গিলার ঘরে গিয়ে ঢুকব। তার মানে আমাদের হাতে এখনও সওয়া এক ঘন্টা সময় রয়েছে। কিরণবাবু, স্বচ্ছন্দে আপনি এখন ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিতে পারেন।”

বললুম, “খেপেছেন নাকি? বারোটায় যাকে ভূত ধরতে বেরোতে হবে, এগারোটায় তার পক্ষে ঘুমোনো সম্ভব? কেউ পারে?”

“কেন, না-পারবার কী আছে?”

“বেশ তো, আপনি যদি পারেন তো ঘুমিয়ে নিন; ঠিক পৌনে বারোটায় আমি আপনাকে তুলে দেব। কিন্তু, মশাই, একটা কথা ভেবে দেখুন, বারোটার আগেই কিছু ঘটে যাবে না তো?”

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “বারোটা কেন, দু’টো-আড়াইটের আগে কিছু ঘটবে না।”

“কেন, তার আগে ঘটতেই বা বাধা কোথায়?”

“বাধা নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে কিনা রাত্তিরের প্রথম দিকটায় মানুষের ঘুমটা থাকে একটু পাতলা-রকমের, যার জন্যে চোর ওই সময় গেরস্তবাড়িতে পারতপক্ষে ঢুকতে চায় না। তারও ধরা পড়বার ভয় আছে তো। মানুষের ঘুম সবচেয়ে গাঢ় হয় কখন জানেন? রাত দু’টো-আড়াইটে থেকে চারটে-সাড়ে চারটের মধ্যে। ফলে চুরিও হয় ওই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি। আমার বিশ্বাস, এক্ষেত্রেও যা ঘটবার, তা ওই সময়েই ঘটবে।”

“ঠিক আছে, তা হলে আপনি শুয়ে পড়ুন।”

“থাক, আপনি যখন ঘুমোচ্ছেন না, তখন আমিও না হয় জেগেই রইলুম। ঠিক আছে, দরকারি জিনিসগুলোও এই ফাঁকে গুছিয়ে নিতে পারব। তবে আলোটা একেবারে কমিয়ে দিন, জানলাগুলোও বন্ধ করুন। আমরা যে জেগে আছি, বাইরে থেকে তা কেউ বুঝতে না পারে।”

“তা তো হল, কিন্তু ঘর অন্ধকার হয়ে গেলে গোছগাছ করবেন কী করে?”

“ও নিয়ে ভাববেন না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অন্ধকারেও আমি মোটামুটি দেখতে পাই। তা ছাড়া, শিলিগুড়ির হংকং-বাজারে আজ যা-যা সওদা করেছি, তার মধ্যে একটা পেনসিল-টর্চও আছে। তবে কিনা এখুনি তার দরকার হবে না। ও হ্যাঁ, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, আপনার আলোয়ানটা কী রঙের?”

“নস্যি-রঙের।”

“বাঃ, ভালই হল। সাদা পোশাক পরে বার হবেন না, অন্ধকারেও দেখতে পাওয়া যাবে। ঘুমোবার সময় যে নীল পায়জামাটা পরেন, ওইটে পরে নেবেন। জামাটাও সাদা হওয়া চলবে না। রঙিন শার্ট কি পাঞ্জাবি না-থাকলে বলুন, আমার থেকে একটা দিয়ে দেব। তার উপরে ওই নস্যি-রঙা আলোয়ান দিয়ে নিজেকে যতটা পারেন ঢেকে নেবেন।”

“আপনি কী পরবেন?”

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “আমার জন্যে ভাববেন না। যেখানেই যাই, কালো এক সেট পায়জামা-পঞ্জাবি আমি সঙ্গে রাখি। অর্ডার দিয়ে কালো সিল্কের একটা মুখ-ঢাকা মাঙ্কি ক্যাপও বানিয়ে নিয়েছি। সে-সব যখন আমি পরে নেব, অন্ধকার রাতে এক-হাত দূর থেকেও তখন বুঝতে পারবেন না যে, একটা লোক আপনার একেবারে সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।…কিন্তু না, আর কথা নয়। এবারে জানালাগুলো বন্ধ করুন, আলোটাও একেবারে কমিয়ে দিন।”

জানালা বন্ধ করে, হ্যারিকেনের ফিতেটাকে যথাসম্ভব নামিয়ে দিয়ে একদিকের একটা চেয়ারে এসে বসলুম আমি। হ্যারিকেনটা একেবারে নিবু-নিবু হয়ে জ্বলছে। আলো এখন এতই কম যে, ঘরের মধ্যে স্পষ্ট করে কিছুই ঠাহর হচ্ছিল না। শুধু আবছা-আবছা যা দেখছিলুম, তাতে মনে হল, ভাদুড়িমশাই একটা ব্যাগের মধ্যে কিছু তরে নিচ্ছেন।

বারোটা বাজতে যখন মাত্র দু-তিন মিনিট বাকি, ঠিক তখনই নিঃশব্দে আমাদের ঘর থেকে আমরা বেরিয়ে এলুম। আর বেরিয়েই মনে হল যেন ঝুপ করে একেবারে অন্ধকারের অতলে আমরা তালিয়ে গিয়েছি। ঘরের মধ্যেও যে আলো ছিল, তা নয়, কিন্তু এ একে বারে মিশকালো নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। ভাদুড়িমশাই আমার সামনে, হাত বাড়িয়ে তাঁর কাঁধটা আমি ছুঁয়ে আছি, নইলে তিনি যে আমার থেকে মাত্র এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, সেটাও আমি বুঝতে পারতুম না। আজন্ম যারা শহরের মানুষ, এমন জমাট অন্ধকার তারা কস্মিনকালেও দেখেনি। দেখা সম্ভবই নায়।

কথায় বলে অন্ধের কিবা রাত্রি কিবা দিন। খুবই সত্যিকথা। তবে কিনা বড়-বড় সব শহরের ক্ষেত্রে এই কথাটা একেবারে উল্টোদিক থেকেও সত্যি। সেখানেও দিন আর রাত্রির মধ্যে কোনও ফারাক নেই। থাকলেও সেই ফারাকটা খুব বড়-রকমের নয়। সেখানেও রাত্রি নামে বটে, তবে অন্ধকার নামে না। কী করে নামবে। ঘরবাড়ি আর রাস্তাঘা`ের আলো তো আছেই, তার উপরে আবার বিজ্ঞাপনের নিয়ন-সাইনের দপদপানিই যেন অন্ধকারকে কাছে আসতে দেয় না, রক্তচক্ষুর নিঃশব্দ ধমক মেরে তাকে শহরের সীমানার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে। এই রকমের প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারের কথা সেখানে ভাবাই যায় না।

মিনিট খানেক একেবারে ঝিম মেরে আমি দাঁড়িয়ে রইলুম। ভাদুড়িমশাই বলে দিয়েছিলেন, অন্ধকারটা যতক্ষণ পর্যন্ত না চোখে একটু সয়ে আসছে, ততক্ষণ যেন এক পাও না এগোই। তা আস্তে-আস্তে সেটা সয়ে এলও। কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী। চাঁদ নেই। কিন্তু গোটা আকাশ জুড়ে আজও অজস্র অসংখ্য নক্ষত্র একেবারে বিজবিজ করছে। মনের যা অবস্থা, তাতে আজ অবশ্য তারাগুলোকে আর হিরের কুচি বলে ভাবা গেল না,—মনে হল ওগুলো যেন আকাশের গা-ভর্তি ঘামাচি। তারই আবছা আলোয় চারপাশটা যেন একটু-একটু করে ঠাহর হতে লাগল। ঘষা কাচের মধ্যে দিয়ে কাউকে দেখলে যেমন একটা আবছা আভাসমাত্র পাওয়া যায়, এও অনেকটা সেইরকম।

বারান্দা থেকে আস্তে-আস্তে পা ফেলে আমরা বাইরের উঠোনে নেমে এলুম। কিন্তু উঠোনটা সরাসরি পার না হয়ে বারান্দার ধার ঘেঁষে ঘেঁষে চলে গেলুম ইঁদারাটার দিকে। তারপর ইঁদারার চত্বর পেরিয়ে, মন্দিরের পিছন দিয়ে খানিকটা এগিয়ে, ডাইনে ঘুরে আবার উঠোনে এসে পড়লুম। দু’পা এগোলেই রামদাসের ঘর। দরজা খোলাই ছিল। পাল্লাটা আস্তে ঠেলে ভিতরে ঢুকলুম আমরা; ঢুকেই আবার পাল্লাটা নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিলুম।

ভাদুড়িমশাই তাঁর পেনসিল-টর্চটা জ্বেলেই আবার নিবিয়ে দিলেন। রামদাস ঘুমোয়নি। চুপ করে সে তার তক্তাপোশের উপরে বসে আছে। আবার টর্চ জ্বাললেন ভাদুড়িমশাই। রামদাস কিছু বলতে যাচ্ছিল; ভাদুড়িমশাই ঠোঁটে আঙুল রেখে তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, এখন একটাও কথা চলবে না। পার্টিশানের দরজা দিয়ে রঙ্গিলার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লুম আমরা।

রামদাসের ঘরে আলো ছিল না। এ-ঘরে কিন্তু একটা হ্যারিকেন জ্বলছে। তবে তার ফিতেটা নামানো, আলোও তাই জোরালো নয়। ভাদুড়িমশাই ফিতেটা আরও নামিয়ে দিলেন।

এ-ঘর আগেও দেখেছি। এর দক্ষিণ আর পুব, দু’দিকে দুটো জানালা। রোগীর ঠান্ডা লাগতে পারে, সম্ভবত এই আশঙ্কাতেই জানালা দুটো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ঘরের এক দিকে, পার্টিশান ঘেঁষে, পুবে-পশ্চিমে লম্বালম্বি করে পাতা একটা তক্তাপোশ। পুব দিকের জানালাটা সেই তক্তাপোশের শিয়রে। তক্তাপোশের বিছানার উপরে পাতলা নাইলনের একটা মশারি খাটানো। ম্লান আলোতেও মোটামুটি ঠাহর করা গেল যে, পুবের জানালার দিকে মাথা রেখে রঙ্গিলা ঘুমিয়ে আছে। ঘরটার উপরে একবার চোখ বুলিয়ে পুবের জানালাটা খুলে দিলেন ভাদুড়িমশাই। দক্ষিণের জানালা বন্ধই রইল।

ঘরের পশ্চিম দিকের দেওয়াল যেখানে দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে গিয়ে মিশেছে, সেখানে কোণ-বরাবর দুই দিকের দুই দেওয়ালে দুটো পেরেক পুঁতে খাটানো রয়েছে একটা দড়ি। ঘরে আলনা নেই, দড়িটাই আলনার কাজ করে। তাতে গোটা দুই শাড়ি আর ব্লাউজ ঝুলছে। ভাদুড়িমশাই কী যেন ভাবলেন, তারপর আমার গা থেকে আলোয়ানখানা খুলে নিয়ে সেই দড়ির উপরে সেটাকে একটা পর্দার মতো করে ঝুলিয়ে দিলেন। তাঁর নির্দেশ-মতো ঘরের এক দিকে আমাদের বসবার জন্যে রামদাস দুটো মোড়া রেখে দিয়েছিল। মোড়া দুটোকে ঝুলন্ত আলোয়ানের “পছনে সরিয়ে দিলেন ভাদুড়ি মশাই। তারপর হ্যারিকেনটা একেবারে নিবিয়ে দিয়ে, পেনসিল-টর্চ জ্বেলে, একটা মোড়ায় নিজে বসে অন্যায় আমাকে বসতে ইঙ্গিত করলেন। পেনসি।-টর্চ নিবে গেল। প্রায় অস্ফুট গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “চুপ করে বসে থাকুন। যা-ই ঘটুক, ভয় পাবেন না।”

ভাদুড়িমশাই বুঝতে পেরেছিলেন, আমি ভয় পেয়েছি। পাবারই কথা। আমাদের ঘর থেকে যখন বেরিয়ে আসি, তখন থেকেই মনে হচ্ছিল যে, আজ রাতে ভয়ঙ্কর কোনও ঘটনা ঘটবে। তা ছাড়া, ডান-পায়ের হাঁটুর ব্যথাটা ক্রমেই যেন বেড়ে যাচ্ছিল। মন্দিরের পিছন দিয়ে আসবার সময় একটা হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। তখনই হাত বুলিয়ে বুঝতে পারি যে, হাঁটুটা ছড়ে গিয়ে রক্ত পড়ছে। ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা জানাতে তিনি পেনসিল-টর্চ জ্বেলে তাঁর ঝোলা থেকে একে-একে কয়েকটা জিনিস বার করলেন। একটা ডেটলের শি িা, ছোট্ট একটা কাঁচি আর লিউকোপ্লাস্টের ছোট্ট একটা কাটিম। তারপর ঝোলাটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এটাকে খুব সাবধানে ধরুন।” ক্ষতস্থানে ডেটল লাগিয়ে কাঁচি দিয়ে একটুকরো লিউকোপ্লাস্ট কেটে নিয়ে সেই টুকরোটাকে ক্ষতস্থানে সেঁটে দিলেন ভাদুড়িমশাই। তিনি যখন এইসব করছেন, ঝোলার ভিতরে হাত চালিয়ে তখন বুঝতে পেরেছিলুম, যে, তার মধ্যে আরও তিনটে জিনিস রয়েছে। খুব বড় মাপের একটা টর্চ, এক বান্ডিল দড়ি আর একটা ভীষণ রকমের ভারী জিনিস। হাত বুলিয়ে মনে হল, একটা পিস্তল। সত্যি বলতে কী, আমার ভয় তাতে আরও বেড়েই গিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলুম, আজ রাত্তিরে সম্ভবত গুলিগোলা চলবে।

চাপা গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুব ভয় পেয়ে গেছেন। তাই না?”

“পাবারই কথা। পিস্তলটা এনেছেন কেন?”

“কেন এনেছি, সেটা খানিক বাদেই বুঝতে পারবেন। তবে পিস্তল নয়, ওটা রিভলভার আর কথা নয়।”

আমার বুক ঢিপঢিপ করছিল। মনে হচ্ছিল, গলাটা যেন শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে আছে। একটু জল খেতে পারলে ভাল হত। কিন্তু সে-কথা কাকে বলব? কথা বলাই তো বারণ। উঠে গিয়ে রামদাসের ঘরে ঢুকে জল খেয়ে আসব, এমন সাহস হচ্ছিল না।

ঘরে এক ফোঁটাও আলো নেই। শুধু ঘর বলে কথা কী, গোটা বিশ্বভুবনই যেন অন্ধকার এক মহাসমুদ্রের মধ্যে ডুবে গেছে। পুবের জানালাটা হাট করে খোলা, তবু ঘরের সঙ্গে বাইরের কোনও তফাত আমার চোখে পড়ছে না। যেদিকে মুখ ফেরাই, সব অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকারও আস্তে-আস্তে সয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, আলোয়ানের পর্দাটাকে একটু সরিয়ে দিয়ে স্থির চোখে জানালাটার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ভাদুড়িমশাই। পেনসিল-টর্চটা মাঝখানে মাত্র এক লহমার জন্যে একবার জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু তারই মধ্যে দেখতে পেয়েছিলুম যে, ঝোলার ভিতর থেকে সন্তর্পণে দুটি জিনিস তিনি বার করে নিলেন। বিশাল সেই টর্চ আর রিভলভার। বাঁ হাতে টর্চ আর ডান হাতে রিভলভার নিয়ে পাথরের একটা মূর্তির মতন তিনি এখন বসে আছেন।

আমার হাতে রেডিয়াম-ডায়ালের ঘড়ি। মাঝে-মধ্যেই ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলুম। চারদিক শুধু যে অন্ধকার, তা নয়, একেবারে নিঃশব্দ। একমাত্র আমার বুকের ঢিপঢিপ ছাড়া আর কোনও শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি না। অনেকক্ষণ বাদে-বাদে অবশ্য ট্রাক চলার একটা আওয়াজ পাওয়া যায়। দূব থেকে ঝড়ের মতো ছুটে এসে আবার দূরে চলে যাওয়ার শব্দ। শুনেছি এখানকার জঙ্গলে নাকি রাত্তিরেও কাঠ কাটার কাজ চলে। কাঠ কেটে ট্রাকে বোঝাই করা হয়। তারপর সেই কাঠবোঝাই ট্রাক এই রাস্তা দিয়ে ছুটতে থাকে হাইওয়ের দিকে। হাতঘড়িতে এখন পৌনে তিনটে। খানিক আগে একটা মোটর-বাইকের শব্দও যেন শুনেছিলুম। দূরে একটা কুকুরও যেন কঁকিয়ে উঠেছিল একবার। তারপরেই আবার সব স্তব্ধ।

ঘরের মধ্যে গোটা তিন-চার জোনাকি হঠাৎ ঢুকে পড়েছে। একটা গিয়ে মশারির গায়ে বসল। অন্যগুলো ওড়াউড়ি করে বেড়াচ্ছে। কুকুরটা আবার কঁকিয়ে উঠল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, অন্ধকারের জমাট বিশাল পর্দাটাকে ফ্যাস করে ছিড়ে ফেলে, জ্বলে উঠল পাঁচ ব্যাটারির বিশাল টর্চ। টর্চের আলো পুবের জানালার উপরে গিয়ে পড়েছে। সেই আলোয় যে মুখখানা আমার চোখে পড়ল, তাতে একেবারে থ হয়ে গেলুম আমি। গোবিন্দ ভট্‌ট্চাজ।

ভাদুড়িমশাইয়ের ডান হাতে রিভলভার। তিনি দাঁড়িয়ে উঠলেন না পর্যন্ত। বাঁ হাতের জ্বলন্ত টর্চের আলোটাকে নিষ্কম্পভাবে জানালার উপরে ধরে রেখে, স্থির কঠিন গলায় বললেন, “তোমার হাতে যা-ই থাক, সেটা ফেলে দিয়ে হাত দুখানা মাথার উপরে তুলে ধরো গোবিন্দ। পালাবার চেষ্টা করলেই গুলি চালাব।”

গোবিন্দর হাতে একটা ডান্ডার মতো দেখতে পেয়েছিলুম। সেটা মোটা একটা লাঠিও হতে পারে, লোহার মোটা শিক কি শাবলও হতে পারে। ভাদুড়িমশাই তাকে সেটা ফেলে দেবার হুকুম দেবার পর-মুহূর্তেই ঝন্‌ঝন্ করে একটা শব্দ হল। আর প্রায় তৎক্ষণাৎ ‘উঃ, মরে গেলুম’ বলে এমনভাবে চেঁচিয়ে উঠল গোবিন্দ যে, মনে হল, আমার হৃৎপিন্ডটা যেন একটা লাফ মেরে হঠাৎ একেবারে গলার কাছে উঠে এসেছে। সে এমন আর্ত চিৎকার যে, শুনবামাত্র বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।

কয়েকটা ঘটনা এরপর প্রায় একইসঙ্গে ঘটে গেল। পাশের ঘর থেকে পার্টিশানের দরজা ঠেলে ছুটে এল রামদাস। যে রঙ্গিলা জখম হবার পর থেকে একটা কথাও বলেনি, বিছানায় উঠে বসে সে তারস্বরে চেঁচাতে লাগল, “কে, কে, আমার ঘরে কে তোমরা?” ভাদুড়িমশাই আর আমি একলাফে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালুম।

টর্চের জোরালো আলো মাটির দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন ভাদুড়িমশাই। সেই আলোয় আমরা দেখতে পেলুম, জানালার বাইরের বারান্দার মেঝেয় শুয়ে ছটফট করছে গোবিন্দ, আর তার পায়ের কাছ থেকে কুচকুচে কালো একটা সাপ এঁকেবেঁকে, অতি দ্রুত গতিতে, বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে মাটির দিকে নেমে যাচ্ছে। একটু বাদেই সাপটাকে আর দেখা গেল না।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেউটে!”

গোবিন্দ ভট্‌চাজকে বাঁচাবার চেষ্টায় কোনও ত্রুটি হয়নি। সাপ তার বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলে দাঁত বসিয়ে বিষ ঢেলে দিয়েছিল। ঝোলার মধ্যে যে দড়ির বান্ডিল ছিল, তৎক্ষণাৎ সেটা বার করে নিয়ে ভাদুড়িমশাই তার হাঁটুর নীচে আর উপরে খুব শক্ত করে কয়েকটা বাঁধন লাগিয়ে দেন। রামদাস ইতিমধ্যে ভিতরবাড়িতে গিয়ে সকলের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল। খবর পেয়ে সবচেয়ে আগে ছুটে এসেছিল নিরু। তার পিছনে-পিছনে প্রথমে এলেন সত্যপ্রকাশ, তার একটু পরেই মা আর পিসিমা। ঘুম থেকে উঠে এসেছেন, সত্যপ্রকাশের পরনে স্রেফ পায়জামা আর গেঞ্জি। কিন্তু তিনি পোশাকটা পর্যন্ত পালটালেন না। যে-অবস্থায় ছিলেন, সেই অবস্থাতেই গোবিন্দকে তাঁর ফিয়াটে তুলে নিয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি চালিয়ে হাসিমারার পথে রওনা হয়ে গেলেন।

পুরুতমশাইকে সাপে কাটায় গোটা বাড়ি স্তম্ভিত। তারই মধ্যে শুনতে পাচ্ছি রঙ্গিলার গলা। ভাদুড়িমশাইয়ের কথা মতো রামদাস গিয়ে বসে আছে তার কাছে। রঙ্গিলা তাকে ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করছে, “কী হয়েছে দাদু, কী হয়েছে? তোমরা আমাকে কিছু বলছ না কৈন?”

মা আর পিসিমা অঝোরে কাঁদছেন। মাঝে-মাঝেই গিয়ে মন্দিরের সামনে দাঁড়াচ্ছেন তাঁরা, আর ফুঁপিয়ে বলে উঠছেন, “হে মা মনসা, এ কী হল?”

সত্যপ্রকাশের অপেক্ষায় আমরা বসে আছি।

৩২
মহেশ্বর চৌধুরি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, কাকের মুখে খবর ছড়ায়। ঠিকই লিখেছিলেন। গোবিন্দকে যখন সাপে কাটে, রাত ফুরোতে তখনও কয়েক ঘন্টা বাকি। অথচ খবরটা দেখলুম রাত না-কাটতেই ছড়িয়ে পড়েছে। তা নইলে আর সূর্যোদয়ের আগেই চৌধুরি-বাড়ির বাইরের উঠোনে গাঁয়ের লোকেদের ভিড় জমে যাবে কেন।

সবার আগে এলেন রঙ্গনাথ। তারপরে একে-একে আরও অনেকে। সাধুবাবাকে অবশ্য কোথাও দেখতে পেলুম না। শেষ-রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে, ত্রিশূল হাতে নিয়ে, ‘জয় শঙ্কর’ হাঁকার পেড়ে যিনি গোটা গাঁয়ে টহল মারতে বেরোন, খবরটা তো তাঁরই সবচেয়ে আগে পাবার কথা। অথচ তাঁকেই কিনা দেখতে পাচ্ছি না। ব্যাপার কী? রঙ্গনাথকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, বাগানের ধার দিয়ে আসবার সময়ে ভিতরে ঢুকে সাধুবাবাকে বারকয়েক ডেকেছিলেন, কিন্তু সাড়া পাননি। “দরজা খোলাই ছিল, কিন্তু মনে হল ভিতরে কেউ নেই; কে জানে হয়তো পাশের গাঁয়ে টহল মারতে গেছেন।”

ইতিমধ্যে নিরু একবার উঠোনেই আমাদের চা দিয়ে গিয়েছিল। মা আর পিসিমা খানিক আগে ভিতর-বাড়িতে চলে গিয়েছেন। আমরা আর উঠোন থেকে নড়িনি।

সত্যপ্রকাশের ফিরে আসতে-আসতে আটটা বাজল। একাই ফিরেছেন। তাঁর মুখচোখের ভাব দেখেই সব বোঝা যাচ্ছিল, আগ বাড়িয়ে তাই আর কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলুম না। শুধু ভাদুড়িমশাই বললেন, “গোবিন্দর আত্মীয়স্বজনদের একটা খবর দেওয়া দরকার।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “হাসিমারায় ওর এক দাদা থাকে। বলত তো মামাতো দাদা, তবে গোবিন্দর আপন মামার ছেলে কি না, তা জানি না। যাই হোক, বর্ধমানের গ্রামে খবর পাঠাবার দায়িত্ব সে-ই নিয়েছে।” তারপর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ডাক্তার সরকারের বাড়ি তো পথেই পড়ে, ঘুম থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে হেল্থ সেন্টারে গিয়েছিলুম। এ-সব হেল্থ সেন্টারের স্টকে তো বলতে গেলে কোনও ওষুধই থাকে না, তা অ্যান্টি-ভেনম সিরাম ছিল, যাওয়ামাত্র ইঞ্জেকশান দেওয়াও হয়েছিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না, ভোর হবার আগেই সব শেষ।”

“ডেড বডি এখন কোথায়?”

“হেলথ সেন্টারেই ছিল। তা সেই দাদা নিশ্চয় লোকজন জুটিয়ে এনে এতক্ষণে সেখান থেকে শ্মশানে নিয়ে গেছে। আমি তো একেবারে একবস্ত্রে এখান থেকে বেরিয়ে পড়েছিলুম, টাকা পয়সা নিয়ে যাবারও সময় পাইনি। অথচ এখন কিছু খর্চা-পত্তর হবে, তাই ডাক্তার সরকারের কাছ থেকে পাঁচশো টাকা নিয়ে গোবিন্দর দাদাকে দিয়ে এসেছি। এখনকার মতো ওতেই সব কুলিয়ে যাবে। এরপরে শ্রাদ্ধশান্তির জন্যে যা দরকার হয়, সবই দেব। গোবিন্দর দাদাকে বলেও দিয়ে এসেছি যে, শ্মশানের কাজ মিটে যাক, তারপর কাল যেন একবার সময় করে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে।”

নিরু আবার চা নিয়ে এসেছিল। চায়ের কাগটা হাতে নিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “নিরু, ডাক্তার সরকার একটু বাদেই একবার রঙ্গিলাকে দেখতে আসবেন। পিসিমার কাছ থেকে পাঁচশো টাকা নিয়ে রাখো, ডাক্তারবাবুর কাছে ধার করেছি, সেটা মেটাতে হবে।”

নিরু ভিতর-বাড়িতে চলে গেল। সত্যপ্রকাশ বললেন, “চলুন, আমরাও ভিতরে গিয়ে বসি।” বেলা বাড়ছে; তার সঙ্গে বাড়ছে রোদ্দুর। ইঁদারার চত্বরটা ছায়ায় ঢাকা বলে উঠোন থেকে খানিক আগে আমরা সরে এসেছিলুম। এবারে সত্যপ্রকাশের কথায় সেখান থেকে তাঁর ড্রইংরুমে এসে বসলুম।

সত্যপ্রকাশকে খুব টিন্তিত দেখাচ্ছিল। বললেন, “গোবিন্দকে নিয়ে এখান থেকে রওনা হবার সময় তাড়াহুড়োর মধ্যে একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি। কিন্তু মনে হল যেন চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে রঙ্গিলার গলাও তখন পেয়েছিলুম। ওর জ্ঞান কি তা হলে ফিরে এসেছে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুরোপুরি ফিরেছে। কথাও বলছে খুব স্বাভাবিকভাবে।”

“বটে? এটা কী করে সম্ভব হল?”

ভাদুড়িমশাই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। বলা হল না। মোটর-বাইকের শব্দ শুনে বোঝা গেল, ডাক্তারবাবু এসে পড়েছেন। ড্রইংরুম থেকে আমরাও তাড়াতাড়ি বাইরে চলে এলুম। ডাক্তারবাবু সরাসরি রঙ্গিলার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। রঙ্গিলার দৃষ্টি আজ স্বাভাবিক। ডাক্তারবাবুকে দেখে ক্লান্তভাবে একটু হাসলও। ডাক্তার সরকার তার জ্বর নিলেন, প্রেশার মাপলেন, চোখের পাতা টেনে দেখলেন, তারপর একগাল হেসে বললেন, “বাবা, খুব চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলি! কেমন লাগছে এখন?”

“খুব দুর্বল লাগছে।” রঙ্গিলা বলল, “কী হয়েছিল আমার?”

ডাক্তারবাবু বললেন, “কেন, তোর কিছু মনে নেই?”

“না তো।”

ডাক্তার সরকার এক পলকের জন্যে আমাদের দিকে তাকালেন। তারপর রঙ্গিলাকে বললেন, “শেষ-রাত্তিরে উঠেছিলি তো, ঘুম-চোখে ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলি।”

“কবে?”

“এই তো, কালই তো পড়ে গেলি। কেন, তোর মনে পড়ছে না?”

“কই, কিচ্ছু মনে পড়ছে না তো।”

“থাক, এখন আর কিছু মনে করবার দরকার নেই। চুপচাপ শুয়ে থাক। তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে উঠতে হবে। নইলে পুজোর কাজ কে কর1ে?”

“এখন পুজোর কাজ কে করছে?”

নিরু যে কখন ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল করিনি। রঙ্গিলার কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “আমি করছি, তবে তোর মতো অত সুন্দর করে তো করতে পারি না। তাড়াতাড়ি তাই ভাল হয়ে ওঠ, তারপর তোর কাজ তুই বুঝে নে।”

রঙ্গিলার ঘর থেকে বেরিয়ে ফের সত্যপ্রকাশের বসবার ঘরে চলে এলুম আমরা। ডাক্তারবাবু আমাদের সঙ্গে এলেন। নিরু ইতিমধ্যে সত্যপ্রকাশকে একটা খাম দিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার সরকারের হাতে সেটা ধরিয়ে দিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “সেই টাকাটা। ধার কক্ষনো ফেলে রাখতে নেই।…কিন্তু তা তো হল, রঙ্গিলাকে কেমন দেখলেন বলুন?”

ডাক্তারবাবু বললেন, “যা দেখলুম, তাকে একটা মিরাকল বললেই হয়। ও একেবারে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। খুব দুর্বল, তবে তা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, দু’দিনে ঠিক হয়ে যাবে।” তারপর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কাল রাত্তিরেও তো ওকে দেখে গিয়েছিলুম। বাত্তিরের মধ্যেই যে ওর জ্ঞান পুরোপুরি ফিরে আসবে, তা তো তখন কল্পনাও করতে পারিনি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “সে কী, কাল রাত্তিরেই তো আপনি বললেন যে, জ্ঞান তো ফিরে আসছেই, সকালের মধ্যেই কথা বলতেও পেরে যাবে। এখন তা হলে এতে এত অবাক হচ্ছেন কেন?”

ডাক্তারবাবু ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী মশাই, বলব?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এখন আর বলতে বাধা কীসের, বলেই দিন।”

ডাক্তারবাবু বললেন, “তা হলে শুনুন মিঃ চৌধুরি, রঙ্গিলা সম্পর্কে কাল যা আমি বলেছিলুম, সেটা মোটেই ডাক্তার হিসেবে আমার ওপিনিয়ন নয়, ভাদুড়িমশাই আমাকে যা-যা বলতে হবে বলে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, ঠিক তা-ই আমি কাল বলেছি।

কথাটা শুনে আমরা অর্থাৎ আমি আর সত্যপ্রকাশ তো অবাক। তারপর দু’জনে প্রায় একই সঙ্গে বললুম, “তার মানে?”

ডাক্তারবাবু উঠে দাঁড়ালেন। ঘড়ি দেখে সত্যপ্রকাশকে বললেন, “আমার একটা জরুরি কল রয়েছে, এখুনি বেরিয়ে পড়তে হবে। মানেটা আপনারা বরং ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে জেনে নেবেন। যাবার আগে দুটো কথা বলে যাচ্ছি। প্রথম কথাটা এই যে, রঙ্গিলাকে নিয়ে সত্যি আর চিন্তার কিছু নেই। না, এটা কারও শেখানো কথা নয়, ডাক্তার হিসেবেই এটা বলছি। তবে ওকে এখন আসল কথা না জানানোই ভাল। আর দ্বিতীয় কথাটা এই যে, গোবিন্দর জন্যে দুঃখ করে লাভ নেই। লোকটা একে চোর, তায় অকৃতজ্ঞ, তার উপরে আবার রঙ্গিলাকে খুন করতে এসেছিল। ওকে সাপে কেটে এক পক্ষে ভালই হয়েছে। মরতে তো ওকে হতই,–”থ্যাঙ্ক গড, রিভলভারের গুলি খেয়ে মরতে হয়নি।”

কথাটা বলে ডাক্তারবাবু আর দাঁড়ালেন না, ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

ভাদুড়িমশাই হাসছিলেন। সত্যপ্রকাশ বললেন, “ব্যাপারটা কী বলুন দেখি।”

হাসতে-হাসতেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে মশাই, কাল শিলিগুড়ি যাবার পথেই হাসিমারায় গাড়ি থামিয়ে ডাক্তারবাবুকে আমি বলে গিয়েছিলুম যে, রঙ্গিলার জ্ঞান যে ফিরে আসছে, আর রাত্তিরের মধ্যেই যে সে কথাও বলতে পারবে, এই কথাটাই মুকুন্দপুরে এসে সক্কলের সামনে এঁদে বলতে হবে।”

“কেন, অমন কথা ওঁকে বলতে বলেছিলেন কেন?”

“সেটাও বুঝলেন না? রঙ্গিলাকে যে জখম করেছিল, তাকে আমি ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিলুম। আমি বুঝতে পেরেছিলুম, রঙ্গিলার জ্ঞান ফিরে আসছে আর শিগগিরই সে কথাও বলবে, ডাক্তারবাবুকে দিয়ে এই কথাটা সকলের সামনে বলিয়ে নিতে পারলেই মূর্তিচোর ভীষণ ভয় পেয়ে যাবে। ভয়টা যে শনাক্ত হবার, সে তো বুঝতেই পারছেন। আর সেই ভয়েই সে চেষ্টা করবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রঙ্গিলাকে খতম করে দেবার। ডাক্তারবাবুকে দিয়ে ওই কথাটা কেন বলিয়েছিলুম, এবারে সেটা ধরতে পেরেছেন আশা করি। আসলে ভয় পাইয়ে দিয়ে কালপ্রিটকে আমি রঙ্গিলার দিকে টেনে আনতে চেয়েছিলুম।”

“তাতে অবশ্য রঙ্গিলারও ভালই হল। তাই না?”

“তা তো হলই। হিতে বিপরীত বলে একটা কথা আছে না? এ হল তার উলটো ব্যাপার। বিপরীতে হিত। সাপে কেটেছে বুঝতে পেরে গোবিন্দ এমন ভীষণভাবে চেঁচিয়ে ওঠে যে, রঙ্গিলার ঘুম তাতে আচমকা ভেঙে গিয়েছিল। জেগে উঠে ও ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। ওর গোটা চেতনায় ভয়ঙ্কর একটা ঝাঁকুনি লেগেছিল। তাতে ভালই হয়েছে—মানে একটা শক-থেরাপির কাজ হয়েছে। ওর জ্ঞান ফিরে এসেছে, ও কথা বলতে পারছে। এ-রকম হয়।”

সত্যপ্রকাশ দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন। কার উদ্দেশে প্রণাম জানালেন, বুঝলুম না। সম্ভবত নিজের ভাগ্যকে, অথবা হয়তো মনসাদেবীকে। তারপর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কিন্তু মিঃ ভাদুড়ি, কালপ্রিট রঙ্গিলাকে খুন করতে আসবে, এইটে আঁচ করে যে আপনি ফাঁদ পেতে তার জন্যে ওখানে বসে অপেক্ষা করছিলেন তা তো বুঝলুম, কিন্তু গোবিন্দই যে কালপ্রিট, সেটা আপনি বুঝলেন কী করে?”

“বুঝিনি তো, সন্দেহ করেছিলুম মাত্র। তা সেটাও তো শুধু গোবিন্দকে নয়, আরও কাউকে-কাউকে করেছিলুম।” ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়লেন। কী যেন ভাবলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর সত্যপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী জানেন, যখনই দেখি যে, কোনও একটা ক্রাইমের ঘটনার পরে-কাছে যারা ছিল, কিংবা সেটা করা যাদের পক্ষে সম্ভব ছিল, কিংবা সেই ঘটনাটা ঘটবার ফলে াদের পক্ষে লাভ হবার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ-একজন মিথ্যে কথা বলছে, আমাদের সন্দেহটাও তখন স্বাভাবিকভাবে তারই উপরে গিয়ে পড়ে। তা এ-ক্ষেত্রে আমি কী দেখলুম?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কী দেখলেন আপনি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখলুম যে, মিথ্যেকণা যে শুধু গোবিন্দই বলছে, তা নয়, বলছেন অন্তত আরও তিনজন। আলিবাবার গপ্পোটা জানেন গে? ডাকাতরা এসে আলিবাবার বাড়ির দরজায় ঢ্যারা দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মর্জিনা তাদের মতলবটা বুঝতে পেরে সব বাড়িতেই ঢ্যারা দিয়ে রাখল। কেন? না আলিবাবার বাড়িটা তা হলে আর অলাদা করে চিনতে পারা যাবে না।। আমার হল উলটো ফ্যাসাদ। এত লোক যদি মিথ্যেকথা বলে, তো তাদের ভিতর থেকে চোরকে ‘মামি আলাদা করে চিনে নেব কী করে? কখনও যদি একে।ন্দেহ হয়, তো কখনও ওকে। তারপর তেবে দেখলুম যে, অনেকেই মিথ্যে বলছে বটে, তবে এক-একজন বলছে এক-এক কারণে। ছবিটা ত ন একটু-একটু করে পরিষ্কার হতে লাগল।”

নিরু এসে ঘরে ঢুকল। বলল, “আপনাদের জলখাবার দিতে বলি?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “দাঁড়াও, দাঁড়াও, ও সব পরে হবে। ভাল করে মুখই ধোয়া হয়নি, এখন কিছু দাঁতে কাটতে পারব না। ঘুমও ভাল হয়নি। বরং পারো তো বেশ কড়া করে একটু চা খাওয়াও দেখি।’

নিরু চা আনতে গেল। সত্যপ্রকাশ বললেন, “থামলেন কেন মিঃ ভাদুড়ি, বলে যান।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা বলছিলুম…….ওই মানে এক-এক জনের মিথ্যে এক-এক রকমের। প্রথমেই ধরা যাক সাধুবাবার কথা। আমি আপনাকে বলেছিলুম যে, অর্থলোভই হয়তো একমাত্র কারণ নয়, অন্য কোনও কারণেও মনসাব মূর্তিটি কেউ হয়তো সরিয়ে থাকতে পারে। এটা বলেছিলুম আপনারই মুখে এই কথাটা শুনে যে, মনসার উপরে উনি বেদম খাপ্পা। ভদ্রলোক শৈব সন্ন্যাসী। সাধনমার্গে কদ্দুর এগিয়েছেন ঈশ্বর জানেন, তবে কিনা ওঁর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলুম যে, মানুষটি বড় অসহিষ্ণু। তার উপরে আবার চাঁদসদাগরের সঙ্গে মনসার ঝগড়ার গপ্পোটা কে না জানে। উনিও জানেন। কিন্তু তার থেকে ওঁর এই একটা উদ্ভট বিশ্বাস জন্মে গিয়েছে যে, মনসাকে যে যত গালমন্দ করতে পারবে, শিবের সে তত বড় ভক্ত। তাই এক সময়ে আমার মনেও হয়েছিল যে, কী জানি, মনসামূর্তিটিকে উনিই হয়তো মন্দির থেকে সরিয়ে কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন। তার উপরে আবার এটাও দেখলুম যে, মানুষটির কথায় আর কাজে কোনও মিল নেই। কিরণবাবুকে সে-কথা বলেওছি। সাধুবাবা মুখে বলছেন যে, মুকুন্দপুরে সাপ নেই, এদিকে কিন্তু সাপের ভয়ে নিজের ঘরের চারদিকে কারবলিক অ্যাসিড ছড়াতেও তাঁর ভুল হচ্ছে না।”

আমি বললুম, “সত্যি সত্যপ্রকাশবাবু, ওঁর আখড়ায় সেদিন আমরা কারবলিক অ্যাসিডের ঝাঁঝালো গন্ধে একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলুম।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা তো হল, কিন্তু মিথ্যে কথাটা উনি কী বললেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা যে আপনি ধরতে পারেননি, তাতেই আমি অবাক হচ্ছি। আপনাকে উনি জানিয়েছেন যে, কলকাতায় হস্টেল থেকে বেরিয়ে সেই যে এক সাধুর সঙ্গে উনি পশ্চিমে চলে গিয়েছিলেন, তারপর থেকে এতকাল উনি শুধু পশ্চিমের নানান তীর্থে ঘুরে বেড়িয়েছেন, এদিকে একবারও আসেননি, বাংলার মাটিতে অ্যাদ্দিন বাদে এই প্রথম ফিরলেন। তাই না?”

“হ্যাঁ।”

“এটাই তো একটা ডাহা মিথ্যেকথা।”

“কী করে বুঝলেন?”

“আরে মশাই, ওঁর কথা শুনেই সেটা বোঝা যায়। পঞ্চাশ বছর একটানা যদি উনি পশ্চিমে থাকতেন, তো ওঁর কথাবার্তার মধ্যে নির্ঘাত একটা পশ্চিমী টান এসে যেত। তা কিন্তু একেবারেই আসেনি। উনি যে বাংলা বলছেন, সে তো একেবারে চাঁচাছোলা বাংলা।”

চায়ের ট্রে নিয়ে নিরু এসে ঘরে ঢুকল। তারপর ট্রে-টা সেন্টার টেবিলের উপরে নামিয়ে রেখে একেবারে মুখস্থ বলার মতন করে বলল, “চা খেয়েই আপনারা চান করে নিন। জলখাবার খেতে হবে না; চান করে দুটি ডাল-ভাত মুখে দিয়ে ঘুমিয়ে নিন কিছুক্ষণ। রাত্তিরে ঘুম হয়নি, এখন খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম করুন। নইলে শরীর খারাপ হবে।

পট থেকে পেয়ালায় চা ঢালতে ঢালতে সত্যপ্রকাশ বললেন, “এ-সব কথা তোমাকে কে বলতে বলল? মা, না পিসিমা?”

“পিসিমা।”

“ওরে বাবা,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা হলে তো একেবারে সুপ্রিম কোর্টের অর্ডার। ঠিক আছে, ঠিক আছে, পিসিমাকে গিয়ে বলো, এক্ষুনি আমরা চান করে নিচ্ছি।”

৩৩
দুপুরের খাওয়া চটপট মিটে গেল। খাবার টেবিলে মা আর আজ আসেননি; কাকে কী দিতে হবে, পিসিমাই সব বলে দিচ্ছিলেন। পিসিমা দেখলুম শক্ত ধাতের মানুষ। পুরুতঠাকুরকে সাপে কাটায় যেমন মা তেমনি পিসিমাও প্রথমটায় ভেঙে পড়েছিলেন বটে, কিন্তু পিসিমা ইতিমধ্যেই ধাক্কাটা সামলে নিয়েছেন।

শুধু তা-ই নয়, সত্যপ্রকাশ তাঁর মায়ের কথা জিজ্ঞেস করায় পিসিমা বললেন, “বৌদির মন যে কত নরম, তা তো জানিস সতু, এখনও মন খারাপ করে শুয়ে আছে আর বলছে, এমন হল কেন। তা আমি বললুম, হবে না-ই বা কেন, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, পুরুত হোক আর যা-ই হোক, চোর তো বটে, তার উপরে আবার ধরা পড়বার ভয়ে ওই নির্দোষ মেয়েটাকে খুন করতে গিয়েছিল, ওর উচিত-শান্তি হয়েছে, তুমি আর ও নিয়ে মন খারাপ কোরো না ‘

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজ কালীপুজো। ভেবেছিলুম, কাজ মিটিয়ে আজ কলকাতায় ফিরব, সে আর হল না। কালকের ফ্লাইটে কিন্তু যেমন করেই হোক ফিরতে হবে।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “সে কী। মূর্তি উদ্ধার না করেই?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মূর্তি এখন বিশ-বাঁও জলের তলায়।”

কথাটা শুনে যেন এক্ট্রোরে ভেঙে পড়লেন সত্যপ্রকাশ। কাতরভাবে বললেন, “না না, ও কথা বলবেন না। আপনি মশাই সব পারেন। আমার জন্যে আপনি অনেক করেছেন, এমনকি চোরও ধরে দিয়েছেন, এবারে মূর্তিটাও দয়া করে উদ্ধার করে দিন। নইলে আপনাকে ছাড়ছি না।”

খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ভাদুড়িমশাই উঠে পড়লেন। ঘড়ি দেখে বললেন, “বারোটা বাজে। কাল আমি ঘুমোইনি। কিরণবাবুও সারারাত জেগে ছিলেন। এখন আমরা ঘরে গিয়ে ঝাড়া তিন ঘন্টা ঘুমোব। নিরু, সাড়ে তিনটেয় যদি আমাদের বেশ কড়া করে দুকাপ কফি দাও তো বড্ড ভাল হয়। দুধ দেবে না, চিনিও দেবে না। স্রেফ কড়া লিকার।”

ঠিক সাড়ে-তিনটেতেই টোকা পড়ল। আমরা অবশ্য তার খানিক আগে ঘুম থেকে উঠে, চোখ-মুখ ধুরে একেবারে রেডি হয়েই ছিলুম। ঘন্টা তিনেক একটানা ঘুমিয়ে নেওয়ায় শরীরটাও বেশ ঝরঝরে লাগছিল আমার। দরজা খুলে দিতেই কফি নিয়ে নিরু এসে ঢুকল; তার পিছনে পিছনে সত্যপ্রকাশও এসে গেলেন।

টেবিলের উপরে ট্রে-টা নামিয়ে রেখে নিরু বেরিয়ে যাওয়ার পরে সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমি মশাই দুধ-চিনি ছাড়া কফি খেতে পারি না। ও-বস্তু আপনারা খান, আমার কফি আমি আগেই খেয়ে নিয়েছি।”

পট থেকে দুটো পেয়ালায় ব্ল্যাক কফি ঢেলে একটা পেয়ালা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন ভাদুড়িমশাই, তারপ নিজের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে সত্যপ্রকাশকে বললেন, “আপনিও একটু ঘুমিয়ে নিয়েছেন তো?”

“তা নিয়েছি, কিন্তু ব্যাপারটা এখনও বোঝা গেল না। মানে সবটা আপনি এখনও বুঝিয়ে বলেননি।”

“ওই মিথ্যেকথা বলবার ব্যাপারটা তো?’

“হ্যাঁ, গোবিন্দ ছাড়া আরও অন্তত তিনজন নাকি মিথ্যেকথা বলেছে। তার মধ্যে খুড়োমশাইয়ের

কথাটা আপনি মনে হচ্ছে ঠিকই ধরেছেন। কিন্তু বাকি দুজন কে?”

“বাকি দুজনের একজন অবশ্যই রঙ্গনাথ।”

“সে কী।” সত্যপ্রকাশ যেন আঁতকে উঠলেন। ‘উনি তো নিপাট ভালমানুষ!”

“রনাথবাবু যে খারাপ মানুষ, তা তো আমি বলিনি, মিঃ চৌধুরি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “পরোপকারী লোক, গাঁয়ের লোকেরা সেজন্যে ওঁকে মান্যিও নেহাত কম করে না।…..কী জানেন, আপদে-বিপদে পরামর্শ দিতে পারেন, হাতের কাছে এমন কেউ থাকলে লোকে স্বস্তি পায়, সেটাই স্বাভাবিক। তা আপনি তো মশাই বলতে গেলে শিলিগুড়িতেই থাকেন, গাঁয়ের লোকেবা হাতের কাছে আপনাকে পাচ্ছে কোথায়, তাই পরামর্শ নেবার দরকার হলে ওঁর কাছে ছুটে যায় তারা। মঙ্গলবার সকালে ওঁর বাড়িতে গিয়েছিলুম তো, বেশিক্ষণ বসিনি, কিন্তু তারই মধ্যে দেখলুম যে, গাঁয়ের এক চাষি-বউ ওঁর কাছে পরামর্শ নিতে এসেছে। কিরণবাবুও দেখেছেন ব্যাপারটা।”

আমি বললুম, “দেখেছি, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারিনি। রঙ্গনাথবাবু ওই যে বললেন, যেখান থেকে নিয়ে এসেছ, সেইখানেই আবার রেখে এসো, ও কথাটার অর্থ কী?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রঙ্গনাথবাবু তখন ঘরের মধ্যে কথা বলছিলেন, আর আমরা বসে ছিলুম দাওয়ায়। তাঁর কথার সবটা আপনি শোনেননি, তাই যেটুকু শুনেছেন, তার ভুল অর্থ করেছেন। কনটেক্সট থেকে আলাদা করে নিয়ে কোনও-কিছুর অর্থ করার ওই হচ্ছে মস্ত বিপদ। সবটা শুনলে বুঝতে পারতেন যে, এটা একেবারেই অন্য ব্যাপার।”

“অন্য ব্যাপার মানে কী ব্যাপার?”

“একটা পারিবারিক সমস্যার ব্যাপার।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওই যে চাষিবউটিকে দেখলেন, ওর মেয়ের বিয়ে হয়েছে পাশের গাঁয়ে, কিন্তু শাশুড়ির সঙ্গে মেয়েটির বনিবনা হচ্ছে না, একটু-আধটু অশান্তিও হয়ে থাকবে, তাই বোধহয় কাউকে দিয়ে বাপের বাড়িতে খবর পাঠিয়েছিল। আর মেয়ের বাপও অমনি ছুটে গিয়ে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি থেকে এখানে নিয়ে এসেছে। এ হল দিন দশ-বারো আগের ব্যাপার। তা এই দশ-বারো দিনের মধ্যে শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ আর মেয়েটিকে ফিরিয়ে নিতেও আসেনি, খোঁজখবরও করেনি। মেয়ের বাপ সম্ভবত গোঁয়ার টাইপের লোক। কিন্তু মা’টি বুদ্ধিমতী, সে ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে, লক্ষণ সুবিধের নয়। তাই রঙ্গনাথকে জিজ্ঞেস করতে এসেছিল যে, এখন কী করা উচিত। রঙ্গনাথও বুঝতে পেরেছেন, গোঁয়ার্তুমির ফল ভাল হবে না, তাই বললেন, ‘যেখান থেকে নিয়ে এসেছ, সেইখানেই আবার রেখে এসো।’ অর্থাৎ মেয়েটিকে আবার নিজেরাই গিয়ে শ্বশুরবাড়িতে রেখে আসবার পরামর্শ দিলেন তিনি। আমার তো মনে হয়, ঠিক-পরামর্শই দিয়েছেন।”

যাচ্চলে, এই ব্যাপার। আর আমি কিনা ভাবছিলুম যে, মনসামূর্তি ওই চাষিবউটি চুরি করেছে, আর রঙ্গনাথ তাকে পরামর্শ দিচ্ছেন মূর্তিটিকে আবার যথাস্থানে ফিরিয়ে রেখে আসতে।

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা তো হল, কিন্তু মিথ্যে কথাটা উনি কী বললেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুনুন তা হলে। ভদ্রলোক তো মানুষ মোটেই খারাপ নন, আপনি ওঁকে কাজ দিয়েছেন, বুড়ো বয়সে মাথা গোঁজার মতো একটা আশ্রয়ও দিয়েছেন, রঙ্গনাথ তার জন্যে কৃতজ্ঞও খুব। তবে কিনা ওঁর কোনও দুঃখ নেই, সেইটে জানাবার জন্যে ওই সেদিন সকালেই কথায়-কথায় উনি বলে বসলেন যে, ছেলেপুলের ঝামেলা ওঁদের নেই তো, তাই আপনি যে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ওঁদের জন্যে, ওঁরা বুড়োবুড়ি সেখানে দিব্যি আছেন। তা ওঁরা আছেন ঠিকই, তবে কিনা ওই যে উনি বললেন, ছেলেপুলের ঝামেলা নেই, ওই কথাটা কিন্তু সত্যি নয়। রামদাসের কাছে শুনলুম, রঙ্গনাথের একটি ছেলে আছে; শুধু তা-ই নয়, ছেলেটাকে নিয়ে ঝামেলাও আছে বিস্তর। তখন মনে হল, সেই ছেলেটা? এই মূর্তিচুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় তো, আর ছেলেপুলের ঝামেলা নেই বলে রঙ্গনাথ সেই ছেলের অস্তিত্বকে আমাদের কাছে গোপন করতে চাইছেন না তো?” শুনে সত্যপ্রকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “কিছুই দেখছি আপনার নজর এড়ায় না। তা খুড়োমশাই আর রঙ্গনাথের ব্যাপারটা তো বুঝলুম, তৃতীয় মিথ্যুকটি কে?”

“তৃতীয়জনের কথা পরে হবে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আগে বরং গোবিন্দর কথাটাই বলি। মঙ্গলবার সকালে আপনার ঘরে বসে যখন কথা হচ্ছিল, তখন রামদাস বলল, আর-কেউ কিছু শুনতে পায়নি বটে, তবে গোবিন্দ নাকি বাগানের দিক দিয়ে লোকজন ছুটে পালাবার শব্দ শুনেছিল। একই দিক থেকে পেয়েছিল একটা গাড়ির শব্দও। মঙ্গলবার রাত্তিরে গোবিন্দুকে জিজ্ঞেস করতে সেও বলল যে, হ্যাঁ, লোকজন ছুটে পালাবার আর একটা গাড়ি স্টার্ট নেবার শব্দ সে শুনেছিল ঠিকই। সেই সঙ্গে এটাও বলল যে, শব্দ এসেছিল ফলের বাগানের দিক থেকে। একেবারে ডাহা মিথ্যে কথা!”

“কী করে বুঝলেন?

“আরে মশাই, এমন শব্দ যদি হতই, তা হলে একা গোবিন্দ কেন, অন্যেরাও তা শুনতে পেত। নিরু তো পেতই, রামদাসও পেত। শুনতে পেতেন মা আর পিসিমাও। মিঃ চৌধুরি, আপনি সম্ভবত ভাবছেন যে, রামদাস, মা আর পিসিমা বুড়ো মানুষ, কানে খাটো, তাই কিছু শুনতে পাননি, তাই না?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা তো হতেই পারে।’

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “না, পারে না। রামদাস যে কানে মোটেই খাটো নয়, পরশু রাতে ওদের ঘরের পিছনে টল মারতে গিয়েই সেটা আমি টের পেয়েছি। অন্ধকারে আমাকে দেখতে পায়নি ঠিকই, কিন্তু সামান্য একটু পায়ের শব্দ হয়েছে।ক হয়নি, তাতেই দেখলুম ঘরের ভিতর থেকে রামদাস হঠাৎ ‘কে ওখানে’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। এবারে মা আর পিসিমার কথা বলি। কাল সকালে দেখলুম ননদ-ভাজে কথা হচ্ছে। একজন কথা বলছেন উঠোনের টিউবওয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে, আর অন্যজন কথা বলছেন রান্নাঘর থেকে। দুটো জায়গার মধ্যে দূরত্ব অন্তত পনেরো ফুট, কেউ যে খুব উঁচু গলায় কথা বলছিলেন তাও নয়, অথচ দুজনের কারুরই যে অন্যের কথা শুনতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে, এমন কিন্তু মনে হল না। আর নিরুর কথা তো ছেড়েই দিচ্ছি। এঁরা কেউই কিন্তু কোনও শব্দ শোনেননি। শুনেছে নাকি একমাত্র গোবিন্দ। আসলে গোবিন্দও কিছু শোনেনি।”

“তা হলে সে শুনেছে বলল কেন?”

“বলল আমাদের সন্দেহটাকে একেবারে অন্য দিকে চালান করে দেবার জন্যে। কিন্তু মিথ্যেটাও একটু ভেবেচিন্তে বলবে তো। গোবিন্দ কিন্তু ভাবনাচিন্তার ধারই ধারেনি ফলে সে ধরা পড়ে গেল। গোবিন্দ যদি হ্ শব্দ শোনার কথা বলত, তাতেও হয়তো আমার ততটা সন্দেহ হত না, অন্তত তক্ষুনি-তক্ষুনি হত না; এমনকি যদি ও বলত যে, লোক পালাবার আর গাড়ি স্টার্ট নেবার শব্দটা এ-বাড়ির দক্ষিণ দিক থেকে অর্থাৎ রাস্তার দিক থেকে এসেছিল, তবে সেটাও হয়তো তখনকার মতো আমি বিশ্বাস করে নিতুম। ভাবতুম যে, হবেও বা, ভোর-রাত্তিরে এ-বাড়ির বাদবাকি সবাই এমন অঘোরে ঘুমোচ্ছিল যে, শব্দটা তারা শোনেনি। কিন্তু ওই যে গোবিন্দ বলল, লোক পালাবার আর গাড়ির স্টার্ট নেবার শব্দটা এসেছিল বাগানের দিক থেকে, তাতেই আমি বুঝে গেলুম যে, লোকটা একেবারে ঘোর মিথ্যেবাদী।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কেন, বাগানের দিক দিয়েও তো পালানো যায়। ওদিক দিয়েও তো পৌঁছনো যায় রাস্তার উপরে।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা যায়, কিন্তু মাটিতে সে-ক্ষেত্রে মানুষের পায়ের আর গাড়ির টায়ারের ছাপ থাকবে তো। সেটা আরও এইজন্যে থাকবে যে, যে-দিন চুরি হয়, তার আগের কদিন এখানে খুব বৃষ্টি হয়েছিল শুনলুম। এমনকি, আমরা যখন এখানে এসে পৌঁছই, উঠোন দুটো তার মধ্যে শুকিয়ে খটখটে হয়ে গিয়েছিল বটে, কিন্তু বড়-বড় সব গাছপালার আওতায় ছিল বলে বাগানের মাটি তখনও ভাল করে শুকোয়নি। অথচ সেখানে না দেখলুম কারও পায়ের ছাপ, না দেখলুম কারও জুতোর ছাপ, না দেখলুম কোনও গাড়ির টায়ারের ছাপ।”

গোপালের মা ইতিমধ্যে চা আর ঘরে-ভাজা নিমকি দিয়ে গিয়েছিল। আমি একটা নিমকি তুলে নিয়ে বললুম, “তারপর?”

ভাদুড়িমশাই ঢায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “তারপর আর কী, চাবিটা তো আগেই দেখেছিলুম।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ঠিক, ঠিক, ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। চাবিটা দেখেই আপনি বলেছিলেন, ‘বুঝেছি’। ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন তো।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুলে বলবার তো কিছু নেই। চাবির গায়ে অল্প-একটু মাটি লেগে ছিল, কাদামাটি শুকিয়ে গেলে যেমন হয় সেইরকম আর কি। ওই মাটি দেখেই সন্দেহ হয়েছিল আমার। অথচ শুনলুম, চাবিটা রঙ্গিলা সব সময়ে যত্ন করে নিজের কাছে রাখত, কক্ষনো হাতছাড়া করত না। তবে হ্যাঁ, আপনি তো মঙ্গলবার শিলিগুড়ি গেলেন, কথায়-কথায় রামদাস সেদিন বলল যে, চাবিটা এর মধ্যে একদিন ঘন্টাখানেকের জন্যে হারিয়ে গিয়েছিল। কবে? না বুধবার ভোর রাত্তিরে তো চুরিটা হল, এটা তার দু’দিন আগের অর্থাৎ সোমবারের ঘটনা। কোথায় পাওয়া গেল? না হোম করবার জেন্য আনা নরম মাটির উপরে।”

“তাতে কী বুঝলেন?”

“বুঝলুম যে, চাবিটা আসলে হারায়নি, ওটাকে সরানো হয়েছিল। সরিয়ে ওই মাটির উপরে রেখে দেওয়া হয়েছিল। আর রাখবার সময়ে একটু চাপও দেওয়া হয়েছিল, নরম মাটির উপরে যাতে চাবিটার একটি ছাপ পড়ে যায়। গোবিন্দ নিশ্চয় মাঝে-মাঝেই হাসিমারায় তার মামাতো দাদার কাছে যেত, তাই না?”

“তা যেত বই কী।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “মাঝে-মাঝেই যেত।”

“বাঃ, তা হলে তো কথাই নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার ধারণা, নরম মাটিতে তো চাবির ছাপ পড়েছিল, শুকিয়ে যাবার পরে সেইদিন কি তার পরদিন সেই মাটি নিয়ে হাসিমারায় গিয়েছিল গোবিন্দ। গিয়ে সেখানকার কোনও কামারশালা থেকে সে নিশ্চয় ওই ছাপমতন একটা ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে আনে। ফলে তাকে আর তালা ভাঙতে হয়নি, ডুপ্লিকেট চাবি দিয়েই ভোর-রাত্তিরে গিয়ে ঠাকুরঘরের তালা খুলে সে ভিতরে ঢুকেছিল।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ওরেব্বাবা, এই ব্যাপার? তারপর?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারপরেই দেখা দিল সমস্যা। এমনই যোগাযোগ যে, রঙ্গিলা সেদিন নিশ্চয়ই অন্যান্য দিনের চেয়ে আরও খানিক আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছিল। ঠাকুরঘর থেকে একটা শব্দও পেয়েছিল নিশ্চয়। তাই তক্ষুনি সে মন্দিরের দিকে ছুটে যায়, আর গিয়েই পড়ে যায় গোবিন্দর সামনে। বেদী থেকে মূর্তি তুলে নিয়ে গোবিন্দ তখন পালাচ্ছে। সেই অবস্থায় রঙ্গিলাকে জখম না-করে আর তার উপায় কী। একেবারে খতম করতেই চেয়েছিল, তবে পারেনি। কী দিয়ে জখম করল ভেবে দেখুন।”

আমি বললুম, “সেটা পরে ভাবলেও চলবে। আগের কথাটা আগে ভাবা দরকার। মুর্তিটা গেল কোথায়?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোথায় গেল, সে তো ভাবতেই হবে। কিন্তু তারও আগে যা ভাবা চাই, তা হচ্ছে গেল কী কবে? যদি ভুটানে কি নেপালে কি কলকাতায় ও-মূর্তি পাচার হয়ে থাকে, তা হলে বুঝতে হবে, কাজটা একা গোবিন্দর নয়, তার অন্তত একজন সঙ্গী ছিল। কেন না, গোবিন্দ তো আর মুকুন্দপুর থেকে কোথাও যায়নি।……দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন। রঙ্গিলা চেঁচিয়ে উঠল, তাকে জখমও করা হল। কিন্তু রঙ্গিলার চিৎকার শুনে রামদাস যে একেবারে তক্ষুনি সেখানে ছুটে আসতে পেরেছিল তা তো নয়, ঘুম থেকে ধড়মড়িয়ে জেগে উঠে আলো জ্বেলে তবেই সে আসে। ইতিমধ্যে অন্তত দেড়-দুই মিনিট সময় নিশ্চয় কেটে গিয়ে থাকবে। হতে পারে যে, তারই মধ্যে সেই সঙ্গীর হাত দিয়ে মূর্তিটা পাচার করেছে গোবিন্দ। সঙ্গী সরে পড়ে, কিন্তু গোবিন্দ পালায় না। মন্দির থেকে সে বেরিয়ে এসেছিল, ঢুকেও পড়েছিল নিঃশব্দে নিজের ঘরের মধ্যে। কিন্তু আলো নিয়ে রামদাস তার ঘর থেকে বেরোবার সঙ্গে-সঙ্গে গোবিন্দও নিজের ঘর থেকে আবার এমনভাবে মন্দিরের দিকে ছুটে যায়, যেন সেও ওই চিৎকার শুনেই তার ঘর থেকে ছুটে এসেছে।…..এ হল রিকনস্ট্রাকশন। যা আমরা চোখে দেখিনি, অনুমানের ভিত্তিতে তাকে আমরা রিকনস্ট্রাকট করে নিলুম, ঐতিহাসিকেরাও এইভাবে অনেক প্রাচীন ঘটনার চেহারাকে আবার নতুন করে বানিয়ে নেন। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে যে ঠিক এইরকম হয়েছিল, তা আমার মনে হয় না।”

“কেন হয় না?” সত্যপ্রকাশ জিজ্ঞেস করলেন।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দি রিজন ইজ সিম্পল। গোবিন্দর যদি সত্যি কোনও সঙ্গী থাকত, তা হলে কেউ যখন কারও পালানোর শব্দ শোনেনি, গোবিন্দও তখন আগ বাড়িয়ে ওই অন্য-লোকের পালানোর শব্দ শুনতে পাবার কথা বলত না। না মশাই, আমার ধারণা, গোবিন্দ এ-কাজ একাই করেছে, আর সন্দেহটা যাতে তার উপরে না পড়ে, তারই জন্যে বলেছে যে, অন্য লোকজনের পালানোর শব্দ সে শুনেছিল।’

বললুম,”মূর্তি তা হলে বাইরে পাচার হয়নি?”

“হয়নি বলেই তো মনে হয়।”

সত্যপ্রকাশ ব্যাকুলভাবে বললেন, “মূর্তিটা তা হলে কোথায়?”

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বড় রহস্যময় সেই হাসি। একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “আমি তো গতকার নই, তাই মূর্তিটি এখন কোথায়, খড়ি পেতে তা আপনাকে বলতে পারব না। তবে হ্যাঁ, আন্দাজ একটা করতে পারি। আন্দাজের কথাটা যে আপনাকে জানাইনি, তাও নয়, দুপুরবেলায় খাবার ঘরে বসেই জানিয়েছি যে, মূর্তি এখন বিশ বাঁও জলের তলায়।”

“তার মানে সেটা আর পাওয়া যাবে না?” আর্ত গলায় সত্যপ্রকাশ জিজ্ঞেস করলেন।

“যাবে,যাবে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার আন্দাজে যদি ভুল না থাকে তো নিশ্চয় পাওয়া যাবে।”

“কোথায় পাওয়া যাবে?”

“অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? এক বাঁও মানে চার হাত, তা হলে বিশ বাঁওয়ের মানে দাঁড়াচ্ছে আশি হাত। তা আপনাদের ইঁদারাটা ঠিক অতটা গভীর না হলেও অন্তত দশ বাঁও গভীর তো হবেই।”

যেমন সত্যপ্রকাশ, তেমনি আমিও যেন ঘোর অন্ধকারের মধ্যে এতক্ষণে একটা আলোর রেখা দেখতে পেলুম। কিন্তু তবু যেন কথাটা বিশ্বাস করতে ঠিক ভরসা হচ্ছিল না। সত্যপ্রকাশ বললেন, “মূর্তিটিকে ইঁদারার মধ্যে ফেলে দিলে তো খুব জোরে একটা শব্দ হবার কথা। কিন্তু কই, তেমন কোনও শব্দ তো হয়নি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হবার কথা, কিন্তু হয়নি। কেন হয়নি, সেটাও আন্দাজ করা কঠিন নয়। মূর্তির হাইট তো মাত্র এক ফুট। ওজনও তাই খুব বেশি নয়। ইঁদারার জলের লেভেলও বিশেষ নীচে নেমে যায়নি। তা মূর্তিটিকে একটা দড়িতে বেঁধে ইঁদারার জল পর্যন্ত নামিয়ে দিয়ে যদি দড়িটা ছেড়ে দিই, তো শব্দ হবে কেন? টুপ করে সেটা তলিয়ে যাবে। চৌধুরিমশাই, আর দেরি না করে ইঁদারায় লোক নামান।”

তা-ই নামানো হল। আর মাত্র আধ ঘন্টার মধ্যেই ইঁদারা থেকে উঠে এল সেই কষ্টিপাথরের মনসামূর্তি। ভাদুড়িমশাই ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন। মূর্তির কোমরে লম্বা একটা দড়ি বাঁধা।

সত্যপ্রকাশের মা নরম মনের মানুষ। ব্যাপার দেখে আবার তিনি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। এবারকার কানা অবশ্য দুঃখের নয়, আনন্দের। পিসিমা বললেন, “মাগো, আমার ঠাকুর্দা তোমাকে মাটির তলা থেকে তুলে এনেছিলেন, আর আজ তোমাকে জলের তলা থেকে তুলে আনা হল। আর তুমি কোথাও চলে যেও না, মা, এই চৌধুরি-বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেও না।”

স্থির চোখে আমি মুর্তিটিকে দেখছিলুম। দেবীর ক্ষীণ কটিদেশ বেষ্টন করে তাঁর বক্ষের উপরে উঠে এসেছে একটি সাপ, আর সেই সাপের মুণ্ডটিকে দক্ষিণ হস্তে ধারণ করে দেবী তার প্রসারিত ফণার দিকে তাকিয়ে আছেন। যেমন তাঁর চোখে, তেমনি তাঁর ওষ্ঠের বঙ্কিম ভঙ্গিমায় একটু হাসির আভাস। সে-হাসি স্নেহের হতে পারে, প্রশ্রয়ের হতে পারে, আবার কৌতুকেরও হতে পারে।

সত্যপ্রকাশের ড্রইংরুমের আমরা বসে আছি। এ হল ঘন্টা-দুই পরের কথা। ইতিমধ্যে রঙ্গনাথবাবুকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। মূর্তি আবার শোধন করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, নতুন একজন পুরোহিতেরও দরকার হবে, এইসব ব্যাপার নিয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল তাঁর। রঙ্গনাথ কথা দিয়ে গিয়েছেন, ব্যবস্থা যা যা করবার, তিনিই সব করে দেবেন। ধূপগুড়িতে তাঁর খুব চেনা একটি পরিবার নাকি রয়েছে, তাঁদের পেশাই হল পুজো-আচ্চা করা, বিশ্বাসী লোক, তাঁদেরই কাউকে এখানে নিত্য-পূজার জন্যে তিনি আনিয়ে দেবেন, সত্যপ্রকাশকে ও-সব নিয়ে কিছু ভাবতে হবে না।

এসেছিল গোবিন্দর সেই মামাতো দাদাটিও। সে বলল, গোবিন্দর শ্রাদ্ধশাস্তির জন্যে অন্তত হাজার খানেক টাকা দরকার। নিরুকে ডেকে সত্যপ্রকাশ বলে দিলেন, পিসিমার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে সে যেন গোবিন্দর মামাতো দাদাকে দিয়ে দেয়।

ঘরে এখন শুধুই আমরা তিনজন মানুষ। সত্যপ্রকাশ ভাদুড়িমশাই আর আমি। সত্যপ্রকাশ ভাদুড়িমশাইকে বললেন, “অনুমতি দেন তো একটা কথা জিজ্ঞেস করি।”

“করুন না। যা খুশি জিজ্ঞেস করুন। অত কিন্তু-কিন্তু করছেন কেন?”

“মানে ওই যে ডাক্তারবাবু আজ সকালবেলায় এসে বললেন, থ্যাঙ্ক গড, গোবিন্দকে রিভলভারের গুলি খেয়ে মরতে হয়নি, ও-কথাটার অর্থ কী? আপনি কি সত্যি রিভলভার নিয়ে চোরের প্রতীক্ষায় বসে ছিলেন নাকি?”

“তা ছিলুম বই কী, তবে কিনা সেটা ‘একটা জাপানি টয়-রিভলভার, শিলিগুড়ির হংকং-বাজার থেকে কাল কিনে নিয়ে এসেছিলুম। না মশাই, ওটা ভয় দেখাবার অস্ত্র, মারবার অস্ত্র নয়।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই, তারপর মুখ তুলে তীব্র চোখে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিঃ চৌধুরি, কথাটা যখন উঠল, তখন বলা-ই ভাল। যে রিভলভার দিয়ে মানুষ মারা যায়, আমার তা নেই ঠিকই, তবে আপনার বোধহয় আছে। যদি বলি যে, তা-ই দিয়ে একটা মানুষকে আপনি মেরেওছেন, তা হলে কি ভুল বলা হবে? অবশ্য মানুষ না বলে তাকে অমানুষও বলা যায়।”

সত্যপ্রকাশ চমকে উঠলেন। বললেন, “তার মানে?”

ভাদুড়িমশাই তাঁর চোখ সরিয়ে নিলেন না, যে-ভাবে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, ঠিক সেইভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন, “মানেটা মোটেই জটিল নয়, মিঃ চৌধুরি, ববং খুবই সহজ। কাল তো আমি শিলিগুড়িতে বেশিক্ষণ থাকিনি, নেহাত ঘন্টা কয়েক ছিলুম। কিন্তু তারই মধ্যে জোগাড় করেছি দুটো জরুরি খবর। প্রথম খবরটা এই যে, রাজদেও কুর্মির উপরে জগদীশ কেন, কেউই ছোরাছুরি চালায়নি; আসলে কুলি-বস্তির কাছাকাছি সেই অন্ধকার রাস্তায় সেদিন রাত্তিরে তাকে গুলি করে মারা হয়েছিল। শিলিগুড়িতে শুনলুম ব্যাপারটা নিয়ে তখন হৈ-চৈ হয়েছিল খুব।”

সত্যপ্রকাশ কিছুই বলছিলেন না। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে তা হলে দ্বিতীয় খবরটা বলি। সেটা এই যে, রাজদেও ছিল সম্পৎলালের ডান হাত। সুতরাং সম্পৎ যে এই খুনের বদলা নেবে, এটাই স্বাভাবিক। বদলা নেবার কথাটা সে নাকি প্রকাশ্যে বলেওছিল। কীভাবে বদলা নেবে? না আদালতে সে প্রমাণ করে ছাড়বে যে, জগদীশ খুনি নয়, সে ছুরি চালাতে পারে ঠিকই, কিন্তু জীবনে কখনও ফায়ার আর্মস চালায়নি, আসলে সে অন্যের হয়ে আসামি সেজে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে।”

সত্যপ্রকাশ চুপ। পাথরের একটা মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে তিনি বসে আছেন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “সম্পৎলাল নাকি এমন কথাও তখন তিনবাত্তির মোড়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল যে, আদালতে সে-কথা যদি প্রমাণ করা না-ও যায়, তো রাজদেওয়ের খুনির তাতেও রেহাই মিলবে না। তাঁকে তো সে চেনেই, ওই তিনবাত্তির মোড়েই সে তাঁর মাথার খুলি উড়িয়ে দেবে।”

আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “আসলে কিন্তু কিছুই হল না। জগদীশ রিভলভার চালাতে জানে কি না, আদালতে তা নিয়ে কোনও প্রশ্নই তুলল না কেউ। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জগদীশ বলল, সে-ই গুলি চালিয়ে রাজদেওকে মেরেছে, আর তার হয়ে লড়বার জন্যে কলকাতার যে নামজাদা ল-ইয়ারকে লাগানো হয়েছিল, তিনি প্রমাণ করে ছাড়লেন যে, গুলি না-চালিয়ে জগদীশের উপায় ছিল না, হি হ্যাড টু ডু ইট ইন সেলফ ডিফেন্স। এদিকে সম্পৎলালও দেখা গেল নট নড়ন-চড়ন নট কিচ্ছু। অত তো সে লম্ফঝম্প করেছিল; বলেছিল যে, বদলা নিয়ে ছাড়বে। কাজের বেলায় সে কিন্তু কিছুই করল না। না গেল আদালতে সাক্ষ্য দিতে, না ওড়াল তিনবাত্তির মোড়ে আসল-খুনির খুলি।”

সত্যপ্রকাশের মুখ একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ঘরের মধ্যে এমন জমাট নৈঃশব্দ্য যে, একটা পিন পড়লেও বোধ করি তার শব্দ শোনা যেত। সেই স্তব্ধতাকে ভাদুড়িমশাই-ই ভাঙলেন। বললেন, “ঘটনাটাকে সম্ভবত এই চেহারা দেওয়া হল যে, রিভলভারটা আপনারই, কিন্তু দিন-কয়েক আগে সেটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। তাই না?”

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু গলায় সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, সত্যপ্রকাশবাবু। যদ্দুর বুঝতে পারছি, জগদীশ অমানুষ নয়। সে যখন জেল খাটছিল, তার সংসারকে তখন আপনিই দেখেছেন। তার ছেলেকে আপনার কাঠের কারবারে চাকরি দিয়েছেন বলেও শুনেছি। জগদীশ কৃতজ্ঞ মানুষ, আসল কথাটা সে প্রাণ গেলেও কাউকে বলবে না। আর আমার কথা যদি জিজ্ঞেস করেন তো বলি, রাজদেও কুর্মি কীভাবে মারা গেল, ছুরি খেয়ে না গুলি খেয়ে, তার তদন্ত করতে তো ডাকা হয়নি আমাকে। আমি এসেছিলুম মূর্তি-চুরির তদন্তের কাজ নিয়ে, তো সে-কাজ মিটে গেছে। ব্যাস, অন্য কোনও ব্যাপারে আমি মাথা ঘামাতে যাব কেন?”

ফ্যাকাশে ভাবটা কেটে গিয়ে সত্যপ্রকাশের মুখচোখ আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল। বললেন, “রাজদেওকে মেরে কি আমি অন্যায় করেছি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটা আপনার হিসেব, আপনি আমার চেয়ে ভাল বুঝবেন, আমার কিছু না-বলাই ভাল। আমি বরং আমার একটা আন্দাজের কথা বলি।”

“বলুন।”

“সম্পৎলাল যে আদালতেও গেল না, সরাসরি বদলাও নিল না, তার কারণ আর কিছুই নয়, ইউ সিম্পলি পারচেজড ইয়োর প্রোটেকশান। সম্পৎলালও বুঝে গিয়েছিল যে, আপনাকে জেলে পাঠিয়ে কি খুন করে ‘তার লাভ নেই, তার চেয়ে বরং আপনি বহাল-তবিয়তে থাকলেই তার সুবিধে। তা গত পাঁচ বছর ধরেই সে আপনাকে চুষে খাচ্ছিল, তাই না?’

করুণ হেসে সত্যপ্রকাশ বললেন, “চুষে চুষে আমাকে একেবার ছিবড়ে করে ফেলেছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, সম্পৎলাল তো মরেছে, সুতরাং সে-দিক থেকেও এখন আপনি নিশ্চিন্ত। যা-ই হোক, এখন তা হলে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে, তৃতীয় মিথ্যেবাদীটির নাম আমি করছিলুম না কেন?”

“বুঝেছি।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনি টের পেয়ে গিয়েছিলেন যে, আমিই সেই তৃতীয় ব্যক্তি।” ভাদুড়িমশাই হো-হো করে হেসে উঠে বললেন, “বিলক্ষণ। রাজদেওয়ের মৃত্যুর ব্যাপারটা নিয়ে আপনি মিথ্যে কথা বলেছিলেন, সম্পৎলালের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের ব্যাপারেও আপনি সত্য গোপন করেছিলেন। আর হ্যাঁ, নিরুর ব্যাপারেও আপনি সত্যি কথা বলেননি।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “সেটাও আপনি বুঝতে পেরেছেন?”

“বুঝব না কেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি বলেছিলেন, নিরু এ-বাড়িতে বছর-দশেক হল কাজে ঢুকেছে। অথচ আমি জানতে পারলুম যে, নিরু এ-বাড়িতে কাজ করছে মোটামুটি পাঁচ বছর। আর, কাজের মেয়ে বলতে যা আপনি বুঝিয়েছেন, নিরু যে সত্যি তা নয়, আসলে সে যে আপনার স্বৰ্গতা স্ত্রী সুভাষিণী দেবীর ছোট বোন, সে তো ওই ফোটোতে আপনার স্ত্রীর মুখ দেখেই আমি বুঝেছি।”

সত্যপ্রকাশ মস্ত একটা নিশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, “ভুল করেছি। নিরুর ব্যাপারে আগাগোড়া আমি ভুল করেছি!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা তো করেইছেন। কিন্তু সেটা যখন বুঝতে পেরেছেন, তখন দয়া করে আর সেই ভুলের জের টেনে চলবেন না। মা আর পিসিমাকে আজই জানিয়ে দিন যে, ও নিরু নয়, হাসি। আর ওকে ছাড়া যে আপনার চলবে না, সেও তো আমি প্রথম দিনই বুঝতে পেরেছি। স্ত্রীর মৃত্যুর পরে দ্বিতীয়বার বিয়ে না-করার যে-সব কারণ আপনি দেখিয়েছেন, তার একটাও তো সত্যি নয়, আসল কারণ হল হাসি, যার জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে আপনি জড়িয়ে ফেলেছেন। তা আমি বলি কী, হাসিকে আপনি বিয়ে করে ফেলুন। লোকে কী বলবে না-বলবে, তা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আমার তো ধারণা, যেমন আপনাব মা আর পিসিমা, তেমনি আপনার ছেলেময়েরাও তাতে খুশিই হবে। হাসির আসল পরিচয় এ-বাড়িতে একমাত্র রামদাস জানে, এবারে অন্যদেরও জানিয়ে দিন।”

সত্যপ্রকাশ কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, ভাদুড়িমশাই তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “আর কথা নয়, চলুন রঙ্গিলাকে একবার দেখে আসা যাক।”

ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের উঠোনে পৌঁছে দেখলুম, ঝুমরি আজও শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ভাদুড়িমশাই তার দিকে এগিয়ে গেলেন, তারপর রঙ্গিলাদের ঘরের পিছনে কুড়িয়ে-পাওয়া সেই চুলের কাঁটা তাঁর পাঞ্জাবির পকেট থেকে বার করে ঝুমরির দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, “এটা নিশ্চয় তোমার জিনিস। সোমবার রাত্তিরে সম্ভবত পিছনের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে তোমার মেয়েকে তুমি দেখতে গিয়েছিলে, আর রঙ্গিলার আয়াও নিশ্চয় তোমাকে দেখেই তখন ভূতের ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল। তা অমন অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে দেখবার দরকার কী, মেয়ে তো তোমারই। ভয় পেও না, আমার সঙ্গে এসো, তোমার মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছে, কথা বলছে, তাকে দেখে যাও, কেউ তোমাকে বাধা দেবে না।”

৩৪
এই কাহিনির আর মাত্র একটুখানি বাকি, এবারে সেইটুকু বলব। তার আগে আর দু-একটা কথা সংক্ষেপে বলে নিই। সাধুবাবার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। যেমন হঠাৎ তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ আবার সেদিন থেকেই তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। রঙ্গিলা ভাল আছে, তবে সেদিন ভোর-রাতে যে কী হয়েছিল, কিছুই তার মনে নেই। শিলিগুড়ি থেকে তার নতুন আয়া এসে পৌঁছেছে। নিরু যে সুহাসিনী, মা আর পিসিমাকে তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দু’জনেই খুব খুশি। কাল কালীপুজো গেল। মুকুন্দপুরে কালীপুজো হয় না, তাই বোমা-পটকাও ফাটেনি। রাত্তিরে তাই চমৎকার ঘুম হয়েছিল। আজ সকালবেলায় সত্যপ্রকাশ নিজেই গাড়ি চালিয়ে আমাদের বাগডোগরায় নিয়ে এসেছেন। মুকুন্দপুর থেকে রওনা হবার সময় সুহাসিনী যে-রকম কৃতজ্ঞ চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল, চট করে সেটা ভোলা যাবে না।

প্লেন লেট। সত্যপ্রকাশ ব্যস্ত মানুষ। তবু বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি চলে যাননি, এয়ারপোর্টের রেস্তোরাঁয় বসে অপেক্ষা করছেন আমাদের সঙ্গে। কথায়-কথায় তিনি বললেন, “আমি আপনাদের বলেছিলুম যে, মনসামূর্তি প্রতিষ্ঠিত হবার পর মুকুন্দপুরে কাউকে সাপে কাটেনি। ওটা কিন্তু মিথ্যে কথা নয়। সত্যিই আমাদের গ্রামে সাপে কাটার ঘটনা তার পরে এই প্রথম ঘটল।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সে আর কী করা যাবে। গোবিন্দ একটা মারাত্মক খারাপ কাজ করেছিল। তার জন্যে একটা শাস্তিও পাওনা ছিল তার। তবে কিনা, মানুষের দরবারে সে-শাস্তি কবে হবে না-হবে, মনসাদেবী সম্ভবত ধৈর্য ধরে তার জন্যে আর অপেক্ষা করতে পারলেন না, নিজেই পেয়াদা পাঠিয়ে তাকে ছুলে দেবার ব্যবস্থা করলেন।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর সত্যপ্রকাশ বললেন, “মেয়েটাকে গোবিন্দ কী দিয়ে জখম করল বলুন তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হলফ করে সেটা বলতে পারব না, তবে গোবিন্দ তো তখন মূর্তি নিয়ে পালাচ্ছিল, সেই অবস্থায় রঙ্গিলার সামনে পড়ে যায়। তা আমার বিশ্বাস, মূর্তিটা দিয়েই সে রঙ্গিলার মাথা ফাটিয়ে দেয়।”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা-ই হবে। সম্ভবত সেইজন্যেই মূর্তিটা একটু ড্যামেজড হয়েছে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাই নাকি?”

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ইঁদারা থেকে তুলে আনার পর মূর্তিটা দেখলেন না? মূর্তিকে যে সাপটা জড়িয়ে রয়েছে, তার লেজের একেবারে ডগার খানিকটা অংশ ভেঙে গেছে। তবে কিনা এমনও হতে পারে যে, ইঁদারা থেকে তুলবার সময়েই হয়তো অসাবধানে ভেঙে গিয়ে থাকবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাও হতে পারে।”

আমি আর কিছু বললুম না। কুচকুচে কালো যে সাপের কামড়ে গোবিন্দ মরেছে, ছোবল মেরে সেটা পালিয়ে গেলেও তার লেজের ডগাটাকে আমি গোবিন্দর শাবলের পাশে পড়ে থাকতে দেখেছিলুম। গোবিন্দ তার হাতের শাবলটা যখন ফেলে দেয়, তখন তারই আঘাতে হয়তো সাপের লেজের ডগার দিকটা কেটে গিয়ে থাকবে। কিন্তু সে-কথা এখন চেপে যাওয়াই ভাল। সব কণা কি সব সময় বলা যায়? না বলা উচিত?

তা ছাড়া, বলবার সময়ই বা এখন কোথায়? এই মাত্র ঘোষণা করা হল, প্লেন এসে গেছে, ‘প্যাসেঞ্জারস ফর ক্যালকাটা, প্লিজ প্রসিড ফর ইয়োর সিকিওরিটি চেক।’

রচনাকাল ১৩৯৫

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments