Wednesday, September 30, 2026
Homeছোট গল্পলক্ষ্মীপ্যাঁচা - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

লক্ষ্মীপ্যাঁচা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

লক্ষ্মীপ্যাঁচা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ওঃ, এ যে, একেবারে হরিপদ জিনিস রে!

আজ্ঞে, ভালো জিনিস বলেই তো আপনার কাছে আসা। এসব জিনিসের কদর ক-জন করতে পারে বলুন? আর দামই বা দিতে পারে ক-জন?

তা আনলি কোথা থেকে? বাজারি জিনিস নয় তো! তোকে বাপু বিশ্বাস নেই।

কী যে, বলেন। কবে নেমকহারামি করেছি বলতে পারেন? দ্বিজপদ আর যাই হোক বিশ্বাসঘাতক নয়। সত্যি কথাই বলছি, গেরস্ত ঘরেরই মেয়ে। আতান্তরে পড়েছে। এঁটোকাঁটা হয়নি এখনও।

গেরস্তঘরের মেয়ে বলছিস? পরে আবার পুলিশের ঝামেলা হবে না তো! দেখিস বাপু। আমার একটু চরিত্রের দোষ আছে বটে, তা বলে আমি মেয়েছেলে দেখলেই কান্ডজ্ঞান হারিয়ে বসি না।

সে আর বলতে। আপনার সঙ্গে তা ধরুন তিন বছরের কাজ-কারবার আমার। আপনাকে চিনতে কি আর বাকি আছে? এ ভালো মেয়ে বাবু, সরল-সোজা, গরিব ঘরের মেয়ে। নিজের ইচ্ছেতেই এসেছে। ও নিয়ে। ভাববেন না।

ওরে তাই কখনো হয়! আমার একটা নিয়ম আছে তো! ঘরে ওর কে কে আছে সব খতেন দে। বাপ কী করে?

নেই।

মরেছে?

কবে।

আর কে আছে?

মা আছে, দুটো ছোটো ছোটো ভাইবোন আছে।

চলে কী করে?

গতর খাটিয়ে ওর মা খেতের কাজটাজ করে, মুড়িটুড়ি ভাজে। চলে না। বড্ড অসুবিধের মধ্যে আছে।

মেয়েটাকে কাছে ডাক, একটু কথা কয়ে দেখি।

মেয়েটা একটু দূরে মালঘরের দরজার কাছে জড়সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কথাটথাগুলো শুনতে পেয়েছে কি না বোঝা গেল না। কোনো ভাবান্তর নেই। তবে দেখতে বেশ। ছোটোখাটো চেহারা, তেমন কালো নয়, মুখের ডৌলটুকু ভারি মিঠে। যোগেনের চোখে লেগে গেছে।

মেয়েটা কাছাকাছি এসে হেঁটমুন্ডু হয়ে দাঁড়াতেই যোগেন জিজ্ঞেস করে, বলি নিজের ইচ্ছেয় এসেছ, নাকি এ হতভাগা ধরেবেঁধে এনেছে? দ্যাখো বাপু, আমি ঝুট-ঝামেলা পছন্দ করি না। বুঝেসুঝে এসে থাকলে ভালো, নইলে বাপু আমার পোষাবে না।

মেয়েটা কথা কইল না। যেমন দাঁড়িয়ে ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে রইল।

ও দ্বিজু, কথা কয় না কেন রে? বোবা নাকি?

না না, বোবাকালা, হাবাগোবা ওসব কিছু নয়। তবে মুখরা নয় আর কী।

মুখরা নয় সে না হয় হল, তা বলে বোবা হলে চলে কী করে? তোমার নাম কী গো মেয়ে?

বোবা যে নয় তা বোঝা গেল। ক্ষীণকণ্ঠে জবাব এল, অধরা।

অধরা! বাঃ বেশ নাম। তা দ্বিজপদর কাছে সব ভালো করে শুনে বুঝেসুঝে নিয়েছ তো!

মেয়েটা আবার চুপ।

দ্যাখো বাপু, আমার লুকোছাপা কিছু নেই। সব দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। দেশের বাড়িতে আমার বিয়ে-করা বউ আছে, ছেলেপুলে আছে। আমার বয়সও ধরো এই উনপঞ্চাশ চলছে। বাড়ি ছেড়ে কারবার আঁকড়ে পড়ে থাকি। রসকষহীন জীবন, বুঝলে? তাই মেয়েমানুষের দরকার হয়ে পড়ে। পয়সা ন্যায্যই পাবে, কিন্তু পরে আবার ঝামেলা পাকিয়ে তুলো না। আগেরজন তো গয়নাগাটি, সম্পত্তির ভাগ চেয়েও ক্ষান্ত হল না। পরে বিয়ে করার জন্য চাপাচাপি শুরু করে দিল। ওসব মতলব থাকলে আগে থেকেই খোলসা হও।

মেয়েটা চুপ।

দ্বিজপদ কাঁচুমাচু মুখে বলে, আহা, আনকোরা মেয়েটাকে এমন পষ্টাপষ্টি বলতে আছে! ঘাবড়ে যাবে যে বাবু। ওসব যা বলা-কওয়ার তা বলে-কয়েই এনেছি। আপনাকে ভাবতে হবে না।

দেখ দ্বিজপদ, পুতুলকেও তো তুই বলে-কয়েই এনেছিলি। তাতে কাজ হয়েছিল? কী হাঙ্গামাটাই বাধাল, বল!

তা বাবু, কিছু মনে যদি না করেন, পুতুল থাকলেও আপনার ওই সরস্বতীর সঙ্গে মাখামাখি করাটা ঠিক হয়নি।

যোগেন ফুঁসে উঠে বলে, কেন, ঠিক হয়নি কেন? সরস্বতীর সঙ্গে কী আর কার সঙ্গে মাখামাখি করলুম তাতে ওর কী? ও কি আমার মাগ নাকি? পয়সার সঙ্গে সম্পর্ক, ব্যস পয়সাতেই সম্পর্ক শেষ।

আচ্ছা সেসব কথা একটু আবডালে বলবেন। এ একেবারে আনকোরা, কাঁচা মেয়ে। ভয় খেয়ে যাবে।

যোগেন নরম হল। আসলে মেয়েটিকে তার বেশ ভালোই লাগছে। বাইশ-তেইশ বছরের বেশি বয়স নয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আছে। উলোঝুলো নোংরা ভিখিরির চেহারা নয়।

তা ওহে মেয়ে, সব বুঝলে তো! কথা না কও, একটু ঘাড়খানা নাড়তেও তো পারো।

মেয়েটা ঘাড় নাড়ল না, কথাও কইল না।

মুশকিলে ফেললে দেখছি। অমন কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু কি বুঝবার জো আছে? বলি কালা নও তো!

দ্বিজপদ বলে, না কালা নয়। ওই যে বললুম, একটু লাজুক আছে। মনটাও ভালো নেই, এই প্রথম বাড়ির বাইরে আসা।

একটা শ্বাস ফেলে যোগেন বলে, সঙ্গে জিনিসপত্র কিছু আছে? শাড়ি সায়াটায়া?

দ্বিজপদ শশব্যস্তে বলে, না না, ওসব থাকবে কোত্থেকে? যা পরনে দেখছেন তাই সম্বল।

যোগেন একটু হাসল, ওহে দ্বিজপদ, এতবড়ো কারবারটা যে চালাই তাতে একটু বুদ্ধির দরকার হয়। এর আগে তুই আরও দুজন এনেছিলি, তাদেরও ওই পরনেরটুকু ছাড়া আর কিছু ছিল না। ওসব কি আর আমি বুঝি না? শুরুতেই আদায় উসুল করতে লেগে পড়া।

কী যে বলেন বাবু।

ঠিকই বলি। ওহে মেয়ে, যাও, ওই পিছনদিকে গুদোম-ঘরের লাগোয়া ডানহাতি একখানা ঘর পাবে। সেখানে গিয়ে বোসো।

মেয়েটি ভারি সংকোচের সঙ্গে পায়ে পায়ে চলে গেল।

যোগেন মুখ তুলে বলে, বন্দোবস্ত কীরকম?

আজ্ঞে ওই যা দেন, তাই দেবেন আর কী! মাসে হাজার টাকা, আর খাওয়া-পরা। বাড়তি শুধু দশটি হাজার টাকা।

আঁতকে উঠে যোগেন বলে, তার মানে?

দ্বিজপদ কাঁচুমাচু হয়ে বলে, বললুম না, ওরা বড়ো বিপাকে পড়েছে! কিছু জমি বাঁধা পড়ে আছে। ছাড়াতে হলে দশ হাজার টাকা না-হলেই নয়। ওর মা চেয়েছে।

বলি, টাকা কি গাছে ফলে রে দ্বিজপদ?

বাবু, মেয়েমানুষের রেট কি এক জায়গায় বসে আছে? তা ছাড়া দেখছেন তো জিনিসটি একেবারে হরিপদ। তা হরিপদ জিনিসের জন্য দরটাও তো হরিপদই হবে, নাকি?

পাগল হলি নাকি? দশ হাজার টাকা মুখের কথায় ফেলে দেব, আমি সেই বান্দা নই।

তা হলে হল না বাবু। ওর মা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মেয়েকে এসব নোংরামির মধ্যে নামানোর তার মোটে ইচ্ছে নেই। পেটের দায়ে রাজি হয়েছে। ওই দশটি হাজার টাকা পুরোপুরি চাই। নইলে মেয়ে ফেরত নিয়ে যেতে বলে দিয়েছে।

যোগেন কেমন যেন কাহিল হয়ে পড়ল। মিনমিন করে বলল, না, এটা বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।

আজ্ঞে সে আপনি যা মনে করেন। বাড়াবাড়ি মনে করলে ও মেয়ের দায় আপনাকে ঘাড়ে নিতে হবে না। মেলা লোক গেঁজে হাতে করে বসে আছে।

ওঃ, খুব যে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা হচ্ছে! বলি এ-তল্লাটে খপাৎ করে দশ হাজার টাকা ফেলার লোক পাবি তুই?

হাসালেন বাবু। আপনি তো মান্ধাতার আমলে পড়ে আছেন দেখছি।

তার মানে?

সাহাগঞ্জ কি আর আগের মতো আছে? দু-দুটো কোল্ড স্টোরেজ, পাঁচখানা চালকল, তিনটে পাউরুটির কারখানা, সাতটা লেদ মেশিন, সাতটা পোলট্রি, হাইওয়েতে পুব-পশ্চিমে দু-দুটো পেট্রোল পাম্প, পয়সাওয়ালা লোকের অভাব বলে আপনার মনে হয়?

যোগেন বৃথা একটু তড়পাল, ওরে চিনি তোর পয়সাওয়ালাদের। ওই তো মদন গুছাইত, হরেন মন্ডল, চিনি ঘোষ আর সুধীর পুততুন্ড। এই তো! দশ হাজার টাকা ফেলতে কাত হয়ে যাবে তারা।

কিন্তু অধরার মা যেন একটি আধলাও কম নেবে না বাবু। তা হলে মেয়েটাকে ডাকুন, বেলাবেলি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাই।

যোগেন একটু বিপাকে পড়ল। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর রাতটা সে একটু ভোগসুখে কাটাতে চায়, বহুঁকালের অভ্যেস। বরাবর তার রাখা মেয়েমানুষ ছিল। এমন কিছু লুকোনো-চুরোনো ব্যাপার নয়। পুতুল বেশ মেয়ে ছিল। সে বিদেয় হওয়ার পর হাড়হাভাতে জুটল একটা তার নাম লক্ষ্মী। সেটা চুরি করত খুব। তাকে তাড়ানোর পর এখন বড্ড ফাঁকা যাচ্ছে।

দেখ দ্বিজপদ, পরে যদি টের পাই যে, লাইনের মেয়ে গছিয়ে গেছিস তাহলে কিন্তু ভালো হবে না।

ওই যে বললুম বাবু, দ্বিজপদ আর যা-ই হোক নেমকহারাম নয়। চাই তো ওর গাঁয়ে গিয়ে তল্লাশ নিয়ে আসতে পারেন। বেশি দূরেও নয়, রেলরাস্তা পার হয়ে মেটে পথ ধরলে দু-ক্রোশ দূরে বিষ্ণুপুর। খেতের ওপর দিয়ে রাস্তা, সাইকেল, ভ্যান, অ্যাম্বাসাডার সব যেতে পারে।

দশ হাজার টাকা না হয় দিলুম, তারপর যদি মেয়েটা বিগড়োয় বা পালায়? ভালো করে তো বুঝেই উঠতে পারলুম না এখনও।

বিগড়োবার মেয়ে নয়। স্বভাব ভারি ভালো। পালানোর কথাও ওঠে না। আর পালালে তো আমি আছি।

সবদিক বিবেচনা না করে কাজ আমি করি না, তুই তো জানিস।

তা আর বলতে! তবে টাকাটা আজ-ই গিয়ে হাসিমাসির হাতে দিতে হবে। তার বড়ো ঠেকা।

কাল আসিস।

না বাবু, আজই। আপনার কারবার নগদে চলে, আমি জানি। টাকাটা ফেলুন, চলে যাই। বিষ্ণুপুর ঘুরে ফিরতে রাত হয়ে যাবে আমার।

বেজার মুখে উঠল যোগেন। আলমারি খুলে টাকাটা দিয়ে দিল। আহাম্মকিই হল বোধহয়। মেয়েটার মুখখানা বড়ো ভালো লেগে গেল যে! টুলটুলে মুখ, ভারি মিষ্টি।

যাওয়ার সময় দ্বিজপদ বলে গেল, বাবু, একেবারে কুমারী মেয়ে! ঘরও ভালো। পেটের দায়ে নানা ধান্দাবাজি করে বেড়াই, নরকবাস আমার কপালে আছেই। কিন্তু এ-কথাটা বিশ্বাস করবেন, দশ হাজার টাকা আপনার জলে ফেলা হচ্ছে না।

বেলা চারটার পর মালঘর খোলে। তখন খদ্দেরের ভিড় লেগে যায়। বস্তা বস্তা ভুসিমাল, চটের বস্তা, দড়ি এইসব বোঝাই হয় লরি, টেম্পো আর ভ্যানে। যোগেনের তখন দম ফেলার সময় থাকে না।

মেয়েটাকে একটু বাজিয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল, তা সেটা আর রাত আটটা অবধি হয়ে উঠল না। খাজাঞ্চি আর সে মিলে, রাত আটটা নাগাদ যখন হিসেব-নিকেশ করে উঠল তখন দেখল আজকের আদায়-উসুল বড্ডই যেন ভালো। মালও গেছে প্রচুর। এত বড়ো মালঘর ফাঁকা হয়ে যেন হাঁ-হাঁ করছে।

খাজাঞ্চি বলল, উঃ, আজ বিক্রিটাও হয়েছে বটে! তাই দেখছি। কত হল বল তো? বাহান্ন হাজার টাকার বেশি। সব নগদ আদায়। মাত্র চারজন খাতা লিখিয়েছে। তা সেখানেও না হোক আরও দশ-বারো হাজার টাকা হবে।

হুঁ। বড্ড ভালো।

খাজাঞ্চি বিদেয় হলে সদর দরজা বন্ধ করে মালঘরের পেছনে নিজের ঘরখানায় এসে জামাটামা ছাড়ল। যোগেন। আশ্বিন মাসেও আজ ঘাম হচ্ছে। টাকার গরম-ই হবে। পুজোর আগে বিক্রিবাটা ভালোই হয়। কিন্তু এত ভালো নয় তা বলে। যোগেন হিসেব দেখে অনুমান করল, কম করেও আজ তার পনেরো হাজার টাকা থাকবে।

দিনে পনেরো হাজার টাকা রোজগারটা যদি বজায় থাকে, তা হলে আর ভাবতে হবে না। দুটো মেয়ের বিয়ে লাগিয়ে দেবে আর সনাতন মুহুরির সম্পত্তিটাও খরিদ করতে পারবে। বায়না করে রেখেছে মাস দুয়েক হল। আরও কিছু শখ-আহ্লাদ আছে। তা সেসব হবেন।

যোগেন মালঘরেই থাকে। পেছন দিকটায় গোটা দুই খুপরি বানিয়ে নিয়েছে। রান্নাঘর, টিউবওয়েল, পায়খানা সবই আছে। এখানে থাকায় মালঘরে পাহারাও হয়, আর ব্যাবসাটার সঙ্গে নিজেকে সেঁটে রাখতেও সুবিধে হয়।

হাতমুখ ধুয়ে এসে ঘরে-রাখা সিংহাসনে গুচ্ছের ঠাকুর দেবতাকে আজ খুব পেন্নাম ঠুকল সে। দিনটা বড়ো পয়া।

প্রণাম করে ওঠার সময় মাথায় বজ্রাঘাতের মতো মেয়েটার কথা মনে পড়ল। তাই তো! আশ্চর্য! কাজকর্মে মেয়েটার কথা মনেই ছিল না তার। সাড়াশব্দও তো পাওয়া যাচ্ছে না! তাহলে কি পালাল নাকি? উরেব্বাস, দশ দশটি হাজার টাকা গুনে দিয়েছে যে, একটু আগে দ্বিজপদকে!

তাড়াতাড়ি উঠে সে ওপাশের ঘরটায় ঢুকে দেখল, না, পালায়নি। চৌকিতে পাতা বিছানায় পড়ে নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে। দুটো পা চৌকির বাইরে ঝুলে আছে। আর জানলা দিয়ে আসা পূর্ণিমার দুধের মতো চাঁদের আলায় বিছানা ভেসে যাচ্ছে। আর মুখখানা যেন খুব ফুটে উঠেছে জ্যোৎস্নায়।

দাঁড়িয়ে দেখছিল যোগেন। এ কে? এ আসলে কে? অমন মুখ, অমন পায়ের গড়ন, অমন চমৎকার চুলের ঢল। এ কি রাখা মেয়েমানুষের রূপ!

মাথায় ফের একটা বজ্রাঘাত। সর্বনাশ! এ এল আর সঙ্গে সঙ্গে তার বিক্রিবাটা চৌগুণে উঠে গেল যে! কী করে হয়? অ্যাঁ! কী করে?

ঘুনধুন করে একটা পেঁচা ডাকছিল বাইরে। রোজই ডাকে। রাতের বেলাতেই তাদের কাজকর্ম কিনা! কিন্তু হঠাৎ সেই পেঁচার ডাকটা কানে বড়ো লাগল যোগেনের। পেঁচাটা কি কোনো সংকেত দিচ্ছে তাকে? কিছু বলছে?

পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল যোগেন। দরজার কাছে উপুড় করে রাখা লোহার বালতিটায় পা লেগে খটাং করে শব্দ হল একটা।

সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা চমকে জেগে গেল।

জ্যোৎস্নায় সব দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা চোখ চেয়ে অবাক হয়ে চারদিক দেখছে। তারপর তাকে দেখে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। অপরাধী গলায় বলল, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম।

যোগেনের মুখে কথা এল না। কেমন যেন শ্বাস আটকাচ্ছে গলার কাছটাতে। সে দাঁড়িয়ে রইল।

মেয়েটা তার ভাঙা খোঁপাটি ফের বেঁধে নিল। তারপর যোগেনের দিকে চেয়ে মিষ্টি গলায় বলল, এখানে কি টিপকল আছে?

আছে বই কী, এই তো পিছন দিকটায় উঠোন। এসো, পাম্প করে দিচ্ছি।

বুকটা বড়ো ধক ধক করছে যোগেনের। বড়ো ভয়-ভয় করছে, বড়ো অদ্ভুত লাগছে। মেয়েটা আঁজলা করে জল খেল, চোখে-মুখে জলের ঝাঁপটা দিল।

তারপর বড়ো বড়ো দুটি চোখ তুলে তাকাল তার দিকে।

ওই চোখে চোখ রাখে সাধ্যি কী যোগেনের? শরীরে কাঁপুনি দিল তার।

মেয়েটা আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বলল, এই বুঝি ঘরদোর?

যোগেনের কাঁপুনি থামছে না। বলল, হ্যাঁ।

মেয়েটা একটা শ্বাস ফেলে বলল, এখানেই থাকতে হবে বুঝি আমাকে?

যোগেনের মাথায় কথা আসছে না। সে আমতা আমতা করে বলে, তা-ইয়ে-ইচ্ছে হলে—

আমার আবার ইচ্ছে অনিচ্ছে বলে কিছু আছে নাকি? নষ্ট হতে এসেছি, আমার ইচ্ছেয় কি কিছু হবে?

যোগেন হঠাৎ শুনতে পেল, অশ্বথ গাছ থেকে পেঁচাটা খুব ডেকে উঠল। খুব ডাকছে। ভীষণ ডাকছে। ভয়টা যেন সমস্ত বুক আর মাথা গ্রাস করে নিল তার। শরীরের কাঁপুনিটাও এমন বেড়ে গেল যেন, মূৰ্ছা হবে। কিন্তু মুখে কথা আসছে না।

মেয়েটা জ্যোৎস্নায় ঊর্ধ্বমুখে চেয়ে থেকে বলল, মা বেচে দিল আমাকে। আপনি কিনে নিলেন। আমি যেন একটা কী। এখনও বিশ্বাস হয় না। কখন নষ্ট করবেন আমাকে?

এইবার যোগেনের মুখে কথা এল, নষ্ট! নষ্ট হবে কেন? নষ্ট হওয়ার কথা নাকি তোমার?

মেয়েটা ধীরে মুখ নামিয়ে তার দিকে ফিরে বলল, তাই তো কথা!

যোগেন পেঁচার ডানার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। জ্যোৎস্নায় উড়ে বেড়াচ্ছে পাখিটা। তার ছায়া একবার যেন স্পর্শ করে গেল তাকে। শিউরে উঠল যোগেন। ছায়াটা ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে। সাবধান করছে তাকে। ভয়। দেখাচ্ছে।

না না, তোমার কোনো ভয় নেই।

মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, টাকা দিলেন যে!

তাতে কী!

মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, আপনি যে বললেন আপনার একজন মেয়েমানুষ না হলে চলে না।

বলেছি! কথাটা ধোরো না মা, বড় ভুল হয়ে গেছে।

মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, মা! মা বলে ডাকছেন আমাকে?

যোগেন মাথা নেড়ে বলে, তাই তো ডাকলুম।

ওমা! কেন?

কী হচ্ছে তা বুঝতে পারল না যোগেনও। সে নয়, তার ভেতর থেকে যেন অন্য কেউ কথা কইছে। থতোমতো খেয়ে সে বলে, মুখ থেকে বেরিয়ে গেল যে!

মেয়েটা হেসে বলে, তা হলে কী হবে?

কিছু হবে না মা। ঘরে এসো, কিছু খাও।

খাব? হ্যাঁ, আমার বড্ড খিদে পেয়েছে।

তা খেল মেয়েটা। ডাল, ভাত, তরকারি, কী যত্ন করে ছোটো ছোটো গরাসে খেল দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল যোগেন। নাঃ, তার মনে আর কোনো ধন্দ নেই। সে যা বোঝার বুঝে গেছে।

আমাকে কি দিয়ে আসবেন মায়ের কাছে?

যোগেন গর্জন করে উঠল, পাগল!

তা হলে?

লক্ষ্মীকে হাতে পেলে ছাড়তে আছে? আমার একটা ছেলে আছে মা। ব্যাবসা-বাণিজ্যে মন নেই, তার লেখাপড়ায় মন। ছেলে বড়ো ভালো। তার সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব।

মেয়েটা লজ্জায় মাথা নোয়াল।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments