Wednesday, July 29, 2026
Homeছোট গল্পলাস্ট টার্মিনাস - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

লাস্ট টার্মিনাস – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পেছনের দরজার বাঁ-পাশ থেকে লম্বা আসন সামনের দরজার ডান পাশ পর্যন্ত চলে গেছে। হাফ লেডিজ, হাফ জেন্টস। এইরকম স্টেটবাস শহরে অনেক আছে। বিকেল। অফিস ভাঙা বাবুদের। ভিড়। সবাই বিপ্লবী। হৃদয়ে তাল মারছে স্লোগান-লড়াই লড়াই লড়াই। একখানা ছাগুলে গোঁত্তা, তারপর টরপেডো। তারপরে নিতম্ব ঘূর্ণন। ধুমধাড়াক্কা হয়ে যাওয়ার পর নিজেকে খুঁজে পেলুম। পেরেছি, নিজেকে বসাতে পেরেছি। দু-ধরনের বসা আছে, দুটোর জন্যেই আমরা। ব্যাকুল। নিজেকে যেভাবেই হোক বাসে বসাব, আর নিজে মরে পরিবারকে পথে বসাব।

এদিকে-সেদিকে অল্প স্বল্প কেটে-ছড়ে গেছে। ও যাবেই। বাস তো আর ভেলভেট দিয়ে মোড়া যাবে না! আজও বসেছি এইটাই এক মহা সাফল্য। আমার বাঁদিক থেকেই মহিলামহলের শুরু। একটি মেয়ে বসে আছে। মহিলা বা রমণী নয়, ভারী সুন্দর একটি মেয়ে। আড়চোখে এক লহমার তাকানো। ওর বেশি—অভদ্রতা। ড্যাব ড্যাব করে তাকাতে নেই। মনে মনে তাকাও। অ্যায়সা। চাপ এপাশ থেকে ওপাশ থেকে, মেয়েটির কাঁধে আমার কাঁধ ঠেকে গেছে। ওপর বাহুতে ঠেকে গেছে ওপর বাহু। বাসে এমন হয়। কিছু মনে করতে নেই। কত বয়েস! কুড়ি হতে পারে, পঁচিশ হতে পারে, না, তিরিশ কখনই নয়। তিরিশে শীত আসে। এ বসন্ত।

বাসে গাদাই হচ্ছে শয়ে শয়ে লাশ। খ্যাঁও ম্যাঁও। কথার টেনিস। নুড়ি পাথর। সামনেটা হয়ে গেল দুর্ভেদ্য চাইনিজ ওয়াল। আমার বাঁ-পাশে বসন্ত, ডান পাশে একটা পিপে। নাক দিয়ে ভসভস হাওয়া ছাড়ছেন। লাংস তো নয় হারমোনিয়ামের বেলো। মাঝে মাঝে গ্রাউন্ড ফ্লোর থার্ড ফ্লোর ঢেকুর। বুঝেছি পার্টির পয়সার বিরিয়ানি হয়েছে।

সুইচ অফ করে দিলুম। বাসযাত্রী, ট্রেনযাত্রীদের তাই করতে হয়। দেহ থেকে নিজেকে তুলে নিতে হয়। কলকাতার বাস নামক মর্গে লাশটা আছে, মন চলে গেছে লাস ভেগাসে। মনকে অত দূরে পাঠাতে হল না। বাঁদিকে ঠেলে দিলুম। কাঁধ থেকে ওপর বাহু। কোমল, শীতল, অনুকম্পার মতো। চোখ বুজে ফেললুম। রোজ যা করি। সহযাত্রীদের দেখতে চাই না। ধূর্ত মুখ, বোকা মুখ, সন্দেহবাদী মুখ, নিরীহ মুখ, বড় দাঁত, ভাঙা দাঁত, মরা চোখ, উগ্র চোখ। চোখ বোজানো মাত্র সব অদৃশ্য। মাংসের পাঁচিল, ফারনেসের উত্তাপ, শব্দের ককটেল, ভ্যাপসা গন্ধ। অমৃতের পুত্ররা দলা পাকিয়ে চলেছে। ইঞ্জিনের আর্তনাদ শোনা গেল। সামনের আর পেছনের কন্ডাকটার একই সঙ্গে বাসের লোহার চাদরে গোটা দুই চাপড় আর কয়েকবার ঘণ্টা টেনে যাত্রা শুরু করলেন। দু পাশের ফুটবোর্ডে পাকা ফলের মতো মানুষ নয় ভোটার ঝুলছে। ডান বাঁ সব কদমা হয়ে গেছে। পায়ে পায়ে কাঁচি চলছে।

টার্মিনাস চক্কর মেরে বাস রাস্তায় গিয়ে পড়ল। একটু যায় একটু থামে। কখনও গাড্ডায়, কখনও সমতলে। গেল, গেল, সামাল সামাল। দণ্ডায়মান পাঁচিল কখনও হেলে ফর্টিফাইভ, কখনও নাইনটি। ম্যালেরিয়া থাকলে কুলকুল ঘামে ছেড়ে গেল। অতীতের পাপ এক পোয়া কমল। নরকের কম্পিউটারে মেয়াদ মাইনাস হল। স্বর্গে ফিক্সড ডিপোজিটে কিছু যোগ হল।

পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পথ, এক, দেড়, দুই লেগে যেতে পারে। দমদম থেকে দিল্লি চলে গেল, ধর্মতলা থেকে দক্ষিণেশ্বর পৌঁছোল না। গাঁটের পর গাঁট। তবে বাঁ দিকের কথা ভেবে মনে হল, এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত! এই হঠাৎ পাওয়া অনুভূতি। এ তো অসভ্যতা নয়, অবস্থিতি। অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল!

যাঁরা ইনসোমনিয়ায় ভুগছেন তাঁরাও যদি বাসে বসতে পান তো ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমের ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বেড়া টপকানো ভেড়া গোনারও প্রয়োজন নেই। আমার ডান পাশের বস্তাটি ঢুলতে শুরু করেছেন; কিন্তু আমার বাঁ পাশেকী হচ্ছে! শরীরের সঙ্গে সেঁটে থাকা হাতটা আরও কোমল হয়ে উঠছে। গরমে নরম হয়ে আসা আইসক্রিমের মতো। মেয়েটির দেহভার আমার শরীরের ওপর ক্রমশই বাড়ছে। মাথাটা আমার কানের কাছে চলে এসেছে। চুল সুড়সুড়ি দিচ্ছে। মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে নাকে। আড়ে তাকালুম। ঘুমিয়ে পড়েছে, যাকে বলে ঘুম কাদা। মাথা নামছে আমার বাঁ কাঁধের দিকে। ভয়ংকর কাণ্ড। পাবলিকের সামনে। ধাক্কা মারতে পারছি না। পাশের বস্তাটাকে ইতিমধ্যে দু-একবার মেরেছি। কাজ হয়নি কিছু। মেয়েটির বেলায় যে কারণে পারছিনা, তা হল ধড়মড় করে জেগে উঠে যদি বলে, অসভ্য। যদি বলে, কাঁধটা কেন এগিয়ে দিয়েছেন, বদ মতলব। তারপর গণধোলাই! দ্বিতীয় কারণ, খুব মায়া হচ্ছে। কোন অফিসে কী কাজ করে তা তো জানি না, হয়তো খুব খাটায়। কতই বা মাইনে দেয়। ভালোমন্দ কী-ই বা খেতে পায়! ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে ঢুলে পড়েছে। কে-ই বা একটু স্নেহ করে, কে-ই বা ভালোবাসে! দশভুজা সংসার কেবল দেহি দেহি করছে—টাকা দাও, সেবা দাও। মেয়েটিকে আমার খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করল। এক নজরে যা দেখেছি—অনেক চুল, ঝিনুকের মতো কপাল, সুন্দর নাক, ভুরু, চোখ। শান্ত মুখ। ভালোবাসার মতোই একটি মেয়ে। একটা ছেলে একটা মেয়েকে যদি ভালোবাসতেই না পারল তা হলে মাটির পৃথিবী পনপন করে ঘুরছে কেন, ফুলই বা ফুটছে কেন, নদীই বা বইছে কেন ইত্যাদি।

মেয়েটির মাথা আমার বাঁ কাঁধে নেমে পড়েছে। শুধু পড়েইনি, বেশ জুতসই ভাবে চেপে বসেছে। চুলে ভরা সুন্দর একটি মাথা। কাঠ হয়ে চোখ বুজিয়ে আছি। নট নড়নচড়ন, নট কিছু। তিনটে কারণ। প্রথম কারণ, পাবলিক। পরস্ত্রীকাতর, পরস্ত্রীকাতর। একজন একটু সুখে আছে দেখলেই বাগড়া দেবে। নিজে খাবে না অন্যকেও খেতে দেবে না। বললেই হল, কাঁধে মাথা পড়েছে, ঠেলে তুলে দিন। বসে বসে মজা মারছেন। খুব রস, তাই না! যেন নিজেদের চোখে বালি পড়েছে! দ্বিতীয় কারণ, দোলাদুলি করলেই ঘুম ভেঙে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা তুলে নেবে। অবশ্য এ-ও জানি, আবার চুল আসবে, আবার মাথা হেলবে, আবার কাঁধে আসবে। মাঝের এই বিরতিটা আমি চাইছি না। বাসে নিত্য যাওয়া-আসা করতে করতে চুল সম্পর্কে আমি যথেষ্ট গবেষণা। করেছি। রাজনীতির মতে এতেও ডান বাঁ আছে। কেউ ডাইনে হেলেন, কেউ বাঁয়ে। মেয়েটি দক্ষিণপন্থী। তৃতীয় কারণ, মেয়েরা নিজেদের দোষ অন্যের ঘাড়ে চালান করে দিতে একখানি। চাং করে জেগে উঠেই বলতে পারে, আপনার কাঁধ আমার মাথায় কেন! কিছুতেই বোঝাতে পারব না, মাথায় কাঁধ থাকতে পারে না, কাঁধেই মাথা থাকে। মাথাই ঢোলে, কাঁধ ঢেলে না। দেহের কনস্ট্রাকশানটাই এমন! একমাত্র ব্যতিক্রম পায়ের জুতো। সময় সময় মাথায় ওঠে, গালেও। উঠতে পারে। আমার এক সহপাঠীর যেমন হয়েছিল। দোলের দিন রঙের আবেগে পাড়ার একটি মেয়েকে বলেছিল, দোয়েল, আই লাভ ইউ। বেরসিক দোয়েল দাঁড়কাকের মতো গলায় বলেছিল, তোমার মুখে জুতো। তারপর স্যান্ডেল খুলে পটাপট। সেই থেকে আমার সেই বন্ধুর নাম হয়ে গেল, স্যান্ডেল। সে এখন আমেরিকায়। এক মেক্সিকান সুন্দরীকে বিয়ে করে মহাসুখে আছে। আমি যেন যোগাসনে ধ্যানে বসে আছি অর্ধনারীশ্বর। ডানদিকটা পুরুষ, বাঁ দিকটা রমণী। হরগৌরীর শহর সংস্করণ। শঙ্করাচার্যের হরগৌরী অষ্টকের একটি-দুটি স্তবক মনে পড়ছে। আধখানা শিব আধখানা শিবানী।

কস্তুরিকাচনলেপনায়ৈ
শ্মশানভঙ্গবিলেপনায়
সকুন্তলায়ৈ ক্ষণিকুন্তলায়।

বাঁ-দিকে কস্তুরিকাচন্দনলিপ্ত গৌরী, ডান দিকের শরীর শ্মশানের ছাই মাখা, বাঁ দিকের সুন্দর খোঁপা, ডান দিকে সাপের কুন্তল। কলকাতার বাসের কী বাহাদুরি ক্ষমতা! বাড়িওলা, ভাড়াটে, সিপিএম, কংগ্রেস কিছুক্ষণের জন্যে হলেও, হলাহলি, গলাগলি। কোলাকুলি অবস্থাতেই বলছে বউকে বিধবা করে দেব। পাদানিতে যার পায়ের ওপর পা রেখে হাঁচোর-পাঁচোর ঝোলো, তার সঙ্গেই পাঁয়তাড়া। বহু আগেই বাঙালির এই স্বভাব ধরা পড়েছে প্রবাসে—যার শিল যার নোড়া তারই ভাঙি দাঁতের গোড়া। আমিও তো সেই বাঙালির বাঙালি।

বাস যত টার্মিনাসের দিকে এগোচ্ছে ততই হালকা হচ্ছে। কাঠের মেঝে, টিনের ছাত, উলটোদিকের আসন, যাত্রী দেখা যাচ্ছে। আর তখনই আমার ভয় বাড়ছে। চলমান গণ-আদালত বিচারে নামলেই হল। মাথাটা যারই হোক, কাঁধটা তো তোমার! মানুষ না মরা পর্যন্ত কাঁধ দেওয়াটা অপসংস্কৃতির মধ্যে পড়ে। অতিশয় অপকর্ম।

অতএব আমি এমন সহজ ভাব করছি, যেন স্বামী-স্ত্রী, হনিমুনে আছি। দণ্ডায়মান এক সরল মানুষ বলেই ফেললেন, আপনার স্ত্রী খুব ক্লান্ত। এই সময়টায় অমন হয়। আয়রন টায়রন খাওয়ান, সঙ্গে জিঙ্ক। লোহা আর দস্তা না খেলে ধস্তাধস্তি করবে কী করে! এই সময়টা মানে! প্রায় প্রবীণ মানুষটি কী বোঝাতে চাইছেন! একটু বোঝার চেষ্টা করেই মনে মনে আধ হাত জিভ কাটলুম। আমি যত।

এগিয়েছি, ভদ্রলোক তার চেয়ে তিন, চার বছর এগিয়ে গেছেন। একবার আড়-চোখে বাঁ পাশে তাকালুম। কী গভীর, নিশ্চিন্ত নিদ্রা! হয়তো স্বপ্নও দেখছেন। রাজবাড়িতে সানাই বাজছে। বড় বড় রাজহাঁস ঘুরছে।

আমার স্টপেজ এসে গেছে। দশ মহাবিদ্যালন্ড্রি, অবলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। আমার নাম হল না। কাঁধে যে দায়িত্ব নিয়েছি, সেই দায়িত্ব না নামাতে পারলে মুক্তি নেই। কিছু নামল, কিছু উঠল। বাস চলল। নিজের জায়গাটা ঘোঁত-ঘোঁত করে পেছনে চলে যাচ্ছে দেখে মন ছটফট করল। তবু বসে রইলুম। খোঁটায় জড়িয়ে গেছে ঝুমকো লতা। খোঁটা কি আর সরতে পারে!

টার্মিনাস প্রায় এসে গেল। কেউ আর দাঁড়িয়ে নেই। যে ক-জন বসে আছেন, বসে আছেন। সকলের মুখের ওপর দিয়েই অপরাধীর মন নিয়ে চোখ ঘোরালুম। কোনও মুখেই কোনও সন্দেহ নেই। সকলেই ধরে নিয়েছেন, আমরা স্বামী-স্ত্রী। স্ত্রী ছাড়া এমন নির্ভয়ে প্রকাশ্য স্থানে পুরুষের। কাঁধে মাথা ফেলে কে ঘুমোতে পারে! হিন্দু বিবাহ ব্যবস্থাই শিবের সংসার রচনার পথ করে দেয়। স্বামী-স্ত্রী হরগৌরী।

এই সব ভাবতে ভাবতেই টার্মিনাস এসে গেল। সবাই দুমদাম নেমে গেলেন। তখনও ঘুম ভাঙেনি। আস্তে আলতো হাত মাথায় রেখে নাড়া দিলুম। শুনছেন, বাস শেষ হয়ে গেছে।

মাথাটা তড়াক করে কাঁধ ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। ভাগ্য ভালো কন্ডাক্টার সায়েব সব আলো নিবিয়ে দেননি। একটা আলো নাইট লাম্পের মতো জ্বলছিল।

হতচকিত মেয়েটি জিগ্যেস করল, এটা কোথায়!

লাস্ট টার্মিনাস।

সে কী, আমি তোদু-স্টপেজ আগে নামব।

আপনি দু-স্টপেজ। আর আমার যে পাঁচ স্টপেজ আগে নামার কথা। আপনার মাথা ফেলে নামতে পারিনি।

ছিঃ ছিঃ। অ্যান্টি অ্যালার্জিক খেয়ে আমার এই অবস্থা! কিছু মনে করেননি তো!

কিচ্ছু না।

দুজনে নেমে এলুম। আর একটা বাস ধর্মতলায় যাওয়ার জন্যে তৈরি। আলো, লোক, ঘণ্টা, চিকার।

চলুন ওইটায় উঠে পড়ি।

মেয়েটি বলল, আজ মঙ্গলবার, এতদূর যখন এসেই গেছি, দক্ষিণেশ্বরে মাকে একবার দর্শন করে যাই।

আমাকে আপনার সঙ্গে নেবেন!

কথাটা বোমা ছোড়ার মতো দুম করে বলে সিঁটিয়ে রইলুম। কীভাবে ফাটে, কতটা শব্দ হয়! সে বললে—মায়ের কাছে সবাই যেতে পারে। চলুন না।

হাঁটছি দুজনে পাশাপাশি। প্রথমে অ্যালার্জির কথা হল। কেন অ্যালার্জি, কী অ্যালার্জি। তারপরে নিত্য যান-যুদ্ধের কথা। তারপর চাকরির কথা। ক্রমশই সহজ হচ্ছি। মন্দিরের প্রবেশ পথে প্রায়। অন্তরঙ্গ যেন কত কালের পরিচয়। যেন ওই সুন্দর মাথাটা আমার কাঁধের জন্যেই তৈরি। ওই লম্বা লম্বা আঙুল আমার মুঠোয় ধরার জন্যেই। একজন প্রেমিকের যা যা ভাবা উচিত, আমি তাই ভাবছি। সামনে সে, একটু পেছনে আমি। তরতর করে হাঁটছে। সাহসী পদক্ষেপ। আত্মনির্ভর। ন্যাকা ন্যাকা, থ্যাসথেসে নয়। বাতাসে আঁচল উড়ছে। সার সার দোকানের আলোয় সে হাঁটছে। পৃথিবীটা বেবাক স্বপ্ন হয়ে গেল। কোথায় ডালহৌসি, কোথায় আমার নোনাধরা দেয়াল, শ্যাওলা ধরা কলতলা, কোথায় রাজপথের সংগ্রামী মিছিল, কোথায় সেই প্রবীণদের নিত্য প্যানপ্যানানি, মানুষ বাঁচবে কী করে, যা দিনকাল। ওসব চুলোয় যাক। ওমর খৈয়াম ভেতরে এসে পড়েছেন—

আজ ফাগুনের আগুন-জ্বালে
হুতাশ-বোনা শীতের বাস
পুড়িয়ে সে সবে ছাই করে দাও
দাও আহুতি দুখের শ্বাস!
আয়ু-বিহম—খোঁজ রাকো কি
মেলিয়া ডানা উড়ল হায়,
পেয়ালাটুকু শেষ করে নাও
এক চুমুকেই ফাগুন যায়।।

আরতি শুরু হয়ে গেছে। নাটমন্দিরে লাইন। আমার সামনে সে, পেছনে আমি। ভবতারিণী সামনে ঝলমলে। মানুষের কাণ্ড দেখে জিভ কেটে হাসছেন। আমি মা দেখছি, খোঁপা দেখছি। আমি মা দেখছি, ঘাড় দেখছি। মা দেখছি, কাঁধ ঢালু চওড়া পিঠ দেখছি। আমি মা দেখছি, ব্লাউজের পেছনের হুক দেখছি। মনের এমন একটা অবস্থা হল, স্থান, কাল বোধটাই চলে গেল। মনে হতে লাগল, আমরা বহুদিন বিবাহিত। কোথাও আমাদের একটা প্রাচীন সংসার আছে, কোনও বটতলায়। বেড়া আছে, গাছ আছে, তুলসীমণ্ডপ আছে, ছাগল আছে।

বেকসুর সেই রাত। বকুলতলার ঘাটে জোয়ার ছলাত ছলাত নদীর ধারে, ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়ার আবহ শব্দে, কথাটা বলেই ফেললুম, ওই মাথাটা কাঁধে নয় বুকে চাই।

ভেবেছিলুম, ভুরু দুটো কোঁচকাবে। মুখ কঠোর হবে। ঠাস করে দরজাটা বন্ধ হয়ে যাবে। হল না। মোলায়েম একটা হাসি। খুব অর্থমাখানো দুটো চোখ। এক ঝলক চাঁদের আলো। সাদা পায়রার ফটফট ডানা। অবশেষে দুর্দান্ত ঝাল শিঙাড়া, জিভ-ছ্যাঁকা চা।

ফ্যামিলি কোর্ট বা পারিবারিক আদালতের বিচারক চোখ তুলে বললেন—এত সুন্দর শুরুটাকে। মাঝপথে এমন জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেললেন কী করে। কাঁধও রয়েছে, মাথাও রয়েছে, বাসও আছে। তাহলে বাঁধনটাকে হাতুড়ি মেরে দু-টুকরো করতে চাইছেন কেন? কাঁধটা মাথা থেকে সরাতে চাইছেন কেন?

আমি যে গাড়ি কিনেছি।

অ বড়লোক হয়েছেন?

নল দিয়ে ছোড়া আলপিনের মতো বড়লোক শব্দটা প্যাঁক করে আঁতে এসে ফুটল। বড়লোক না হলে এত ছোট হলুম কী করে। প্রেম হল মধ্যবিত্তের জুয়েল। আর ভোগ হল বড়লোকের। বিড়ম্বনা। নিজের শরীরটার দিকে তাকাতে ঘেন্না করে। জল ভরা ভিস্তির মতো অশ্লীল। কামুকের চোখ। নেকড়ের থাবা। প্রেতের মতো নিঃসঙ্গ।

বিচারে বসেছেন, নামজাদা এক সাহিত্যিক। একটা সমাধানের রাস্তা তিনি খুঁজে বের করতে চাইছেন। মামলাটা ঝুলে আছে বেশ কিছুকাল। এর মধ্যে আমি অনেকটা উঠেছি। একতলার এঁদো বাড়ি ছেড়ে সাত তলায় উঠেছি। আকাশের কাছাকাছি। উত্তর, দক্ষিণ, পুব, পশ্চিম সব খোলা। খিদিরপুরের জাহাজ, মাস্তুল খাড়া, দমদমের প্লেন নামা, গল্ফগ্রিনের টি টি মাস্তুল, সব দেখা যায়। অনেক আলো, অনেক বাতাস, ঝড় এলে সব দক্ষযজ্ঞ। আমি এখন ভালো খাই, ভালো পরি। তবে, সত্যিই উঠেছি, না পড়েছি, ঠিক বুঝতে পারি না। অন্ধকারের বাণিজ্য, অন্ধকারের টাকা। লালুদা, ভুলুদাদের রাজনৈতিক উপদ্রব। কষে বেল্ট বাঁধা, উর্দিপরা, ঘর্মাক্ত আইনের প্রভুদের নিত্য নৈবেদ্য, প্রেমহীন দেহসেবা। আমি লোকটা নষ্ট হয়ে গেছি একেবারে।

সাহিত্যিক বিচারক বলছেন, শুনতে পাচ্ছি, এই উথালপাতাল ভাবনার মধ্যেও বুঝলেন, প্রথম বিয়েটাই বিয়ে, পরের সব তাপ্পি। কাপের হাতলটা ভেঙে গেলে সেটা আর কাপ থাকে না, হয়ে। যায় গেলাস। বাইরে বড়লোক হলেও, ভেতরে একটু গরিব হওয়ার চেষ্টা করুন না। আপনার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দেখেছেন?

তাকাতে পারিনি, কারণ, বিবেকটাকে কিছুতেই খুন করতে পারছি না। সে যে মনের কোন করে বসে আছে জানি না। যেই একা হই সঙ্গে বেরিয়ে আসে। বৃদ্ধ পিতার মতো, বৃদ্ধা মাতার মতো। ছানি পড়া, মৃত মাছের মতো চোখ। কেবল তাকিয়ে থাকে। বলে না কিছুই। আর তখনই আমি নিজেকে নিজেই বলতে থাকি, থাকবে না কিছুই। প্রোমোটারের তৈরি বাড়ির মতো হঠাৎ একদিন ভেঙে পড়বে।

মাধুরীর দিকে তাকালুম। রোগা হয়েছে। আগের সেই রং নেই। চুল কমে গেছে। মুখের আদল শক্ত হয়েছে। কষ্টে আছে, অভাবে আছে, আগুনে আছে। দশ বছর আগের সেই রাত ফিরে। আসছে। মন্দির, আরতির শঙ্খঘণ্টা, আলোছায়া, গঙ্গার জলের শব্দ, ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়া। গরম শিঙাড়ার দাঁতে ধরা অংশের ফিকে ধোঁয়া, পেছন থেকে দেখা খোঁপা, কাঁধ, পিঠ, ব্লাউজের ভি-কাট। একটু প্রেম, একটু কাম।

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লুম। মাধুরীর হাতটা ধরে বললুম, ‘ওঠো!’

সাহিত্যিকের দিকে তাকিয়ে বললুম, ‘লাস্ট টার্মিনাস’ পর্যন্তই যাব।

—খুলে যাবে না তো!

–খোলার চান্স নেই, টিল ডেথ ডু আস পার্ট। কে কখন নেমে যাব, সেটা বলি কী করে। কার কাছে কত দূরের টিকিট, সে আমিও জানি না, ও-ও জানে না!

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments