Saturday, April 20, 2024
Homeউপন্যাসকোজাগর - বুদ্ধদেব গুহ

কোজাগর – বুদ্ধদেব গুহ

কোজাগর – ১

তখন গোধূলির আলোয় জঙ্গল-পাহাড়ের অসমান দিগন্তের ওপরের সমস্ত আকাশ এক বিধুর লালিমায় ভরে উঠেছে। চলে-যাওয়া বাসটার পিছনে পিছনে কিছুক্ষণ লাল ধুলোর মেঘ বাসটাকে তাড়া করে গিয়ে, এলোমেলো উড়ে; আলতো হয়ে পথের পাশের গাছ-গাছালিতে, পাথরে, নিঃশব্দে থিতু হল।

বাস থেকে নেমে একটু হাঁটতেই মানিয়ার সঙ্গে দেখা। ও শাল জঙ্গলের ভিতরের সুঁড়িপথ বেয়ে এসে, একবোঝা কাঠ কাঁধে নিয়ে বড় রাস্তায় উঠল। মানিয়া মানে, মানি ওরাওঁ।

বলল, কোথায় গেছিলে বাবু?

ডালটনগঞ্জ।

তোমার জন্যে একটা মুরগি এনেছিলাম সকালে। কিন্তু তিতলি বলল, বাবু মোরগা রাখতে বলে যায়নি। আমি রাখতে পারব না।

ভালোই হয়েছে। ঔরঙ্গাবাদ থেকে আমার যে মেহমানদের আসার কথা ছিল, তাঁরা আসবেন না। ওটা তুই কালকের চিপাদোহরের হাটে বিক্রি করে দিস্। ভালো দাম পাবি। আমাকে তো সস্তাতেই দিতিস!

তোমার কথা আলাদা। ভালোবেসে বলল, মানি।

তারপরই বলল, পা চালাও জোর। অন্ধকার হয়ে’ এলো।

পালামৌর এই জঙ্গল-পাহাড়ের আড়াআড়ি-আসা শীতের সন্ধেকে একটা অশ্রাব্য দেহাতি গাল দিয়ে ও আবার ওর পথে এগোল।

আমিও আমার ডেরার পথ ধরলাম।

সূর্যটা ডুবতে-না-ডুবতেই এখানে শক্ত হাতে শীতটা দু-কান মোচড়াতে থাকে। নাসারন্ধ্রের মধ্যে দিয়ে মস্তিষ্কের কোষে কোষে শীতের ফুঁ ছড়িয়ে যায়। এই শেষ আশ্বিনেই!

পথের দু-পাশে লিট্‌পিটিয়ার জঙ্গল। ঢেঁাওটা, ঢেঁাটর। মাঝে মাঝে রাহেলাওলার গোল গোল নরম লালচে বেদানার মতো ফুল। তারপরই জঙ্গল গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। কতরকম গাছ-গাছালি! বনজ সন্ধ্যায় গায়ের নিজস্ব গন্ধ উঠেছে চারদিক থেকে। রহসম্যয় এক অচিন গন্ধ। দু-রে….পাহাড়ের নিচে নিচে, যেখানে জঙ্গল খুবই গভীর, সেখান থেকে টিটির্-টি, টিটির্-টি—টিটি টিটি করে একজোড়া টিটি পাখি ডেকে ফিরছে। তাদের গলার আগু-পিছু ক্ষীণ স্বর ভেসে আসছে ভালুমার বস্তির ক্ষেত-খামার, আর জঙ্গলভরা টানা-টাড়ের ওপর দিয়ে। পশ্চিমাকাশে- সন্ধ্যাতারাটা জ্বল জ্বল করছে।

সিম আর লাউয়ের লতা-ছাওয়া বাঁশের বেড়ার দরজা খুলে আমি ভিতরে ঢুকলাম। লালু ভুক্ ভুক্ করে দু-বার ডাকল লেজ নাড়িয়ে। ও এর মধ্যেই খড়ের গাদার ভিতরে সেঁধিয়েছিল। আমার ডেরার বেড়ার পাশেই আগুন জ্বেলেছে রাস্তা মেরামত করা কুলিরা, ওদের ঝুপড়ির লাগোয়া। লালু আমাকে অভ্যর্থনা করেই খড়ের গাদা সেই আগুনের কাছে গিয়ে বসল। দীর্ঘ হিমেল রাতের জন্যে নিজেকে তৈরি করছিল ও।

তিতলি দরজা খুলেই অভিভাবকসুলভ গলায় বলল, এতক্ষণে এলে?

বাস তো এক্ষুনি এলো! শব্দ পাসনি? জানিস না ট্রাক নেই আজকে?

যাওয়ার সময় খুব যে বলে গেলে দুপুরে আসবে। তোমার জন্যে আমারও খাওয়া হল না!

দুপুরেই ফিরব বলে গেছিলাম মনে পড়তেই আমার খুব লজ্জা হল। বললাম, আমার খুব অন্যায় হয়ে গেছে। ক্ষমা করে দে।

তিতলি ভীষণ লজ্জিত হয়েই, উত্তেজিত হয়ে উঠল। বলল, ছিঃ, ছিঃ, এ কী! তোমার সঙ্গে কথাই বলব না তুমি এরকম করে কথা বললে!

অন্যায়? তোমার? অবাক গলায় বলল তিতলি।

যেন আমি কখনও কোনো অন্যায় করতেই পারি না।

হাতের জিনিসপত্র রেখে, মুখ-হাত ধুয়ে, জামা-কাপড় বদলাতে গেলাম। ঐ ঘরের পাশে রান্নাঘরে তিতলি আটা মাখছিল, তার শব্দ পাচ্ছিলাম। এ-ঘর থেকেই জিজ্ঞেস করলাম, কী রেঁধেছিস রে আজ?

লাউকির তরকারি আর চানার ডাল।

খুব খিদে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি রুটি সেঁকে ফ্যাল্। বেশি করে। দুপুরে তুই খাস নি? কোনো মানে হয়! সত্যিই খাসনি?

সাচ্ না ক্যা ঝুট? উষ্মার সঙ্গে বলল ও।

ওর হাতের বালার সঙ্গে পিতলের থালার ঘষা লাগতে নিক্বণ উঠল।

তারপর নীচু গলায় বলল, আমি তো ভাতই খাব। দুপুরের ভাত কি নষ্ট হবে? হাত-মুখ ধুতে-না-ধুতে মিনিট দশেকের মধ্যে জায়গা করে দিয়ে খাবার নিয়ে এল ও। গরম গরম হাতে-সেঁকা আটার রুটি, লাউয়ের তরকারি, ছোলার ডাল। কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা। মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছি, এমন সময় চুপি চুপি যেন কোনও গোপন কথা বলছে, এমনই গলায় ও বলল, গাড়ুর রেঞ্জার সার্ তোমার জন্যে নিম্বু, আমলকী আর মিরচার আচার পাঠিয়েছেন। দিই একটু?

তাড়া দিয়ে বললুম, দে দে। দিস নি কেন এতক্ষণ? লেবুর আচার তো তুই-ই দু’দিনে শেষ করে দিবি চুরি করে খেয়ে। আমার জন্যে তো কিছুই থাকবে না।

ও গাল ফুলিয়ে বলল, হ্যাঁ। আমি তো হলাম গিয়ে চোর-ডাকাইত্। তোমার সর্বনাশ! তাহলে আমাকে জেনে-শুনে রাখাই বা কেন?

এখানের সব লোকই তো চোর। ভালো লোক পাই না বলেই রাখি। বাধ্য হয়ে। হ্যারিকেনের আলোয় আলোকিত ওর ব্যথিত মুখের ওপর এক ঝঙ্কায় ত্ৰস্ত বাঁ-হাতে আঁচলটা টেনে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, তুমি দেখো তোমার চাকরি সত্যিই ছেড়ে দেবো কাল থেকে। আমরা চোর তো চোর! না খেয়ে থাকব, তাও ভি আচ্ছা। আর একটু ডাল দে। তোকে আমি ছাড়লে তো! তোর ইচ্ছেয় কি চাকরি হয়েছিল যে তোর ইচ্ছেয় যাবে?

ও এবার কপট রাগের সঙ্গে পিতলের হাতা করে গরম ডাল এনে বাটিতে ঢেলে দিয়ে বলল, অনেক পাপ করলে তোমার মতো মনিব পায় লোকে।

এমন সময় বাইরে টেটরার গলা শোনা গেল।

টেটরা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, এসে গেছিরে তিতলি।

তিতলি বলল, কুলিদের ঝুপড়িতে একটু আগুন পোয়াও বাবা। বাবুর খাওয়া হয়নি এখনও।

টেটরাকে ভিতরে এসে বসতে বললাম। ঘরের মধ্যে মাটির মাল্সাতে কাঠকয়লার আগুন রাখাই ছিল। সন্ধে থেকে না-রাখলে ঘর গরম হতে বড় সময় নেয়। টেটরা পাশের ঘরে বসেই আমার সঙ্গে কথা বলতে লাগল। নানা কথা ডালটনগঞ্জে আটার কেজি কত? কাড়ুয়া তেল আর মিট্টি তেলের আমদানি কীরকম! শুখা মহুয়ার দাম কি আরো বেড়েছে এ বছর?

মেঝেতে শালকাঠের পিঁড়িতে আসন করে বসে আমি খাচ্ছিলাম। তিতলি হ্যারিকেনটা একটা কাঠের টুকরোর ওপর রেখে আমার সামনে বসে ছিল।

ঐ ঠোঙায় কী এনেছ আমার জন্যে?

তুই-ই বল।

ওর মুখ খুশিতে ঝল্‌মল্ করে উঠল।

আমি জানি। বলব? বাজি!

খুলে দ্যাখ্।

ও আস্তে আস্তে উঠে আমার ঘর থেকে প্যাকেটটা এনে খুলে ফেলল। খুশিতে ওর মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বলল, ওমাঃ, এত্ত! এত্ত কেন আনলে?

সকলে মিলে ফোটাবি। মজা করবি। তোর জন্যে একটা শাড়িও এনেছি। দেওয়ালির দিনে পরবি। নিয়ে যা। বাজিগুলোও নিয়ে যা।

না, না, এখন কিছুই নেবো না। দেওয়ালির দিন সকালে দিও, তোমাকে প্রণাম করব যখন। দেওয়ালির আর কতদিন বাকি?

ছ’দিন। রাতে অন্ধকার কেমন চাপ বেঁধে থাকে দেখিসনি? চাঁদ ওঠে সেই শেষ রাতে, তাও একটুখানি

ও কিছু না বলে, ঠোঙাটা ঘরে রেখে আসতে গেল।

আমার খাওয়া হয়ে গেলে, তিতলি থালায় ওর খাবার গুছিয়ে নিয়ে বাঁ-হাতে তুলে ধরে বাঁ-কাঁধের ওপর নিল, আর ডান হাতে কেরোসিনের কুপিটা। তারপর এক ঝাঁকিতে বাচ্চা শিমুলের মতো সটান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষারত টেটরাকে ডাক দিয়ে বলল, চল্ বাবা!

এসব জায়গায় সন্ধের পর কেউ ঘর থেকে বেরোয় না বড় একটা। যদি-বা কখনও বেরোতেই হয়, খালি হাতে এবং আলো ছাড়া কখনওই না। টেটরার কাঁধে টাঙ্গি তিতলির হাতে আলো।

খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম, টেটরা আলো হাতে পথ-দেখানো মেয়ের পিছন পিছন বড় বড় পা ফেলে মোড়ের ঝাঁকড়া মহুয়া গাছটার কাছে পৌঁছে পাকদণ্ডীর পথ ধরল বস্তির দিকে।

আমি জানি, তিতলি যেটুকু খাবার নিয়ে যায়, মানে যেটুকু ওকে দিই; ওর মতন, তা তিতলি তার মা-বাবার সঙ্গে ভাগ করেই খায়। হয়তো ওর নিজের পেটও ভরে না। ওরা সারা বছর এ-বেলা ও-বেলা যা খায়, তা না-খাওয়ারই মতো। অথচ আমার এমন সামর্থ্য নেই যে, ওর পরিবারের সমস্ত লোককে আমি খাওয়াই। সে সামর্থ্য থাকলে আমার মতো খুশি কেউই হত না। দু-বেলা খাওয়ার পরই রোজ আমার ওদের কথা মনে হয়। এবং মনে হওয়ায় বেশ অনেকক্ষণ মনটা খারাপ থাকে। নিজে পেট ভরে দু-বেলা ভালো-মন্দ খেতে পাই বলে একটা অপরাধবোধও জাগে মনে।

দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। অন্ধকারে, শীতার্ত তারা-ভরা রাত; বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। খাপ্পার চাল, মাটির দেওয়ালের ঘরে দড়ির চৌপাইতে বসে আমি একটা পান মুখে দিলাম। চৌপাই-এর নিচে মাল্সায় কাঠ-কয়লার আগুনের উষ্ণতা ধীরে ধীরে শরীরকে গরম করে তুলছিল। শীতের রাতে সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই এধারের ঘরের বাইরের জীবন স্তব্ধ হয়ে যায়। সবাই খেয়ে-দেয়ে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়ে। শুধু ক্ষেতে ক্ষেতে রাখওয়ার ছেলেদের ক্যানেস্তারা পিটিয়ে শুয়োর হরিণ তাড়ানোর আওয়াজ পাওয়া যায় এদিক-ওদিক থেকে। কুথি আর অড়হর ক্ষেতে শম্বরের দল আসে। যেদিন হাতি আসে, সেদিন আছাড়ী পট্‌কা, মাদল, ক্যানেস্তারার সম্মিলিত শব্দে মাঝ রাতে আচমকা ঘুম ভেঙে যায়। সকলেই যে যার মাটির ঘরে উৎকর্ণ, উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকে। একসময় বাইরের রাখওয়ারদের চিৎকার চেঁচামেচি স্তিমিত হয়ে থেমে যায়। তখন পাশ ফিরে সকলে আবার ঘুমোয়।

ঘুমোতে পয়সা লাগে না। একমাত্র ঘুমোতেই! তাই, ওরা খুব ঘুমোয়।

কোজাগর – ২

দেওয়ালির পরই ঝড়-বৃষ্টি হয়ে গেল একচোট। গাছ-গাছালি পড়ে গেল ঝড়ে। নালার পাশের নিচু জমিতে ধানগুলো তৈরি হয়ে গেছিল প্রায়, প্রায় সবই ঝরে গেল। পাখিও মরেছিল অনেক।

একটা নীলকণ্ঠ পাখিও।

মুঞ্জরী বলেছিল, এ বড় অলক্ষুণে ব্যাপার। মানিয়া শোনেনি সে-কথা। ঠিক শোনেনি বললে ভুল হয়। শুনেছিল, কিন্তু বিশ্বাস করতে সাহস হয়নি ওর। সমস্ত লক্ষণ শুভ থাকতেই এই ক’টা পেট চালানো বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই যথেষ্ট কষ্টের। তাই অশুভ লক্ষণ আরও কী বয়ে আনবে, ভাবতেই ভয় করে মানির। আগে আগে রাতে একটা কুপি জ্বালিয়ে রাখত ঘরের কোণায়। যখন ছেলেমেয়ে হয়নি। কেরোসিনের দাম সস্তা ছিল তখন। এখন সারারাত কুপি জ্বালিয়ে রাখার কথা ভাবতেও পারে না। রাত-ভর জ্বললে পঞ্চাশ পয়সার কেরোসিন পুড়বে। জ্বালাবার সামর্থ্য যেমন নেই, আবার না-জ্বালিয়ে রাখলে অস্বস্তিও কম নয়। শীতকালটায় তাও সাপের ভয় নেই। কিন্তু বর্ষার দিনে বড় ভয় করে। খাপ্পার চালে ইঁদুরের দৌরাত্ম্য। জল ছুঁয়োয় জোরে বৃষ্টি হলে। সাপ এসে ইঁদুর ধাওয়া করে চালময়। কয়েক বছর আগে একটা কালো গহুমন্ সাপ ঝুপ্ করে পড়েছিল বুলকির মাথার কাছে। কোনোক্রমে সেটাকে মারে মানি। নিজেও মরতে পারত। তার ফণাধরা চেহারাটা মাঝে মাঝে এখনও মনে পড়ে। ওদের ঘরের পাশেই যে ঝাঁকড়া আম আর তেঁতুল গাছ-দুটো আছে, তাদের পাতা থেকে টুপটাপ করে শিশির ঝরে খাপ্পার ওপরে, ঘরের আশে-পাশে, ওদের আস্তানার চৌহদ্দির বাইরের ঘন জঙ্গলে, ফিস্ ফিস্ করে। বলদ দুটো যেখানে থাকে, সেই চালার মাথায়; জঙ্গল থেকে কিছু ডাল-পাতা কেটে এনে দিয়েছিল। এবারে যা ঠান্ডা! গরুটা বিইয়েছে। বাছুরটা আর গরুকে যত্নে রাখে মানিয়া।

পরেশনাথটার বড় নাক ডাকে। এতটুকু ছেলের এরকম নাকডাকা ভালো নয়। প্রথম রাতেই ঘুমোতে না পারলে আজকাল ঘুমই হয় না মানিয়ার। রাজ্যের চিন্তা এসে মাথায় ঘুরপাক খায়। মাথার মধ্যে অসহায়তার মোম গলে পুট্-পাট্ শব্দ করে। কিছু করার নেই। তবুও কেন যে ভাবনাগুলো মাথায় ভিড় করে আসে, জানে না মানিয়া। ওর জীবনটাও ঐ বলদ দুটোরই মতো হয়ে গেছে। স্থবির, পরনির্ভর। মুঞ্জরী কাৎ হয়ে শুয়ে আছে ন-বছরের মেয়ে বুলকিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে, বিচালির ওপর ছেঁড়া কম্বলটা গায়ে দিয়ে। একদিন মানিও অমনি করে মুঞ্জরীকে জড়িয়ে শুয়ে থাকত। বুকের মধ্যে যুবতী মুঞ্জরীর নরম শরীরের সমস্ত উষ্ণতা কেন্দ্রীভূত হত। দু’জনে দুজনকে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে, বাইরের শীত, ওদের অন্তরের সমস্ত শীতকে একে অন্যের শরীরের ওমে সহনীয় করে তুলত তখন। সে সবও অনেক দিনের কথা। এখন পরেশনাথ ওর সঙ্গে শোয়। বয়স প্রায় সাত হয়ে গেল দেখতে। বড় বাপ-ন্যাওটা ছেলে। মানিয়া ঘুমন্ত পরেশনাথের কপালে একবার হাত বোলায় অন্ধকারে। মাল্সার মধ্যে কাঠ-কয়লার আগুনটাকে পরেশনাথের গায়ের আরও কাছে এনে দেয়। তারপরে কী মনে করে আবার সরিয়ে রাখে। শোওয়া বড় খারাপ পরেশনাথের। ঘুমের মধ্যে আগুনে হাত-পা না পোড়ায়! একবার পুড়িয়েছিল ওদের বড় মেয়ে জীরুয়া। জীরুয়ার কথা মন থেকে মুছে ফেলতে চায় মানিয়া। বড় কষ্ট পেয়ে মরেছিল মেয়েটা। সে-সব অনেক কথা। মনে আনতে চায় না। মাথার মধ্যে বড় ব্যথা করে ওর।

হঠাৎই ওর কান খাড়া হয়ে ওঠে। বাইরের ঘাস-পাতায় শিশির পড়ার শব্দ ছাপিয়ে অন্য একটা শব্দ শুনতে পায় ও। শিশির পড়ার শব্দের মতোই নরম। কিন্তু প্রাকৃতিক শব্দ নয় কোনো। নাঃ! আবার এসেছে। দাঁতে দাঁত ঘষে একটা আওয়াজ করল মানিয়া। উঠে বসে, নিভিয়ে-রাখা লণ্ঠনটাকে জ্বালাল। তিন চারটে কাঠি খরচ হয়ে গেল। আজকালকার দেশলাই! কত কাঠি-ই যে জ্বলে না! তার ওপর হিমে বারুদটা নেতিয়ে গেছে একেবারে। লণ্ঠনটা জ্বালিয়ে, পরেশনাথকে ডাকবে ভাবল। কিন্তু বড় মায়া হল। এই শীতের রাতে শত্রুকেও বাইরে যেতে বলতে মন সরে না। চোর-ডাকাতরাও ঘর ছেড়ে এক পা নড়ে না এমন রাতে। কিন্তু উপায় নেই। লিটা খুলল দরজার। একটা পাল্লা খুলতেই সারা গা হিম হয়ে গেল। টাঙ্গিটা কাঁধে ফেলে, লাঠিটা ডান হাতে নিল। আর বাঁ-হাতে লণ্ঠনটা। তারপর দরজাটা টেনে ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে বেরোতে যাবে, এমন সময় মুঞ্জরী ঘুমভাঙা গলায় বলল, কওন্‌ চি?

মানি স্বগতোক্তির মতো বলল, খরগোশ।

মুঞ্জরী একটা পুরুষ-সুলভ অশ্লীল গাল দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল একবার। তারপর পাশ ফিরে শুলো গুটি-শুটি হয়ে।

এই পাহাড়-জঙ্গলের শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, এই খিদে, বছরের পর বছর এই অভাব মুঞ্জরীকে হিজড়ের মতো রুক্ষ করে দিয়েছে। সবই মানিয়ার দোষে। তার মরদের দোষ। যে মরদ আওরাতকে সুখে রাখতে পারে না, সে আবার মরদ কীসের?

লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে যখন চীনেবাদামের ক্ষেতে পৌঁছল মানি, তখনও খরগোশগুলোর ভ্রূক্ষেপ নেই। পাট্‌কিলে-রঙা ধেড়ে দুশমনগুলো প্রায় আধখানা ক্ষেত সাবড়ে দিয়েছে। দেখেই অন্ধ ক্রোধে দৌড়ে গেল মানি। ধপাধপ্ লাঠি পিটল। যেন লাঠি দিয়েই ও মারতে পারবে ওদের। এবং ওর অন্য সমস্ত শত্রুদেরও।

দৌড়োতে গিয়ে, একটা গর্তে পা পড়ে, আছাড় খেল। বুকে চোট লাগল খুব। কিন্তু বুঝতে পেল না তেমন। সারা শরীর ঠান্ডায় অবশ হয়ে গেছে। লণ্ঠনটা ছিট্‌কে পড়ে গেল ওর হাত থেকে। কাচটা কোনোক্রমে বাঁচল। কিন্তু আলো নিভে গেল। উল্টে গিয়ে তেল গড়াতে লাগল। হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে হাতড়ে হাতড়ে লণ্ঠনটাকে সোজা করল মানিয়া। কেরোসিন তেল গড়ানোর চেয়ে ওর বুকের রক্ত গড়ানোও যে ভালো। লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে যখন উঠে দাঁড়াল তখন খরগোশ সব পালিয়ে গেছে। ঢুকে গেছে লিপিটিয়ার ঝোপ পেরিয়ে ওপাশের ঢালের গভীর জঙ্গলে। একচিলতে চাঁদ মারমারের ঢালের দিকের আকাশে ঝুলে ছিল। চাঁদটাও শিশির লেপে কুঁকড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছিল। পশ্চিমের চড়াই থেকে হঠাৎ হাতি ডেকে উঠল। বন-পাহাড় সেই তীক্ষ্ণ ও সংক্ষিপ্ত আওয়াজে চমকে উঠল। শিশির-ভেজা বনপাহাড়ে শব্দটা অনেক দূর অবধি গড়িয়ে গেল। ঝিঁ-ঝিঁ ডাকতে থাকল। একটা একলা টি-টি পাখি হুলুক্ পাহাড়ের দিক থেকে ডাকতে ডাকতে এদিকে উড়ে আসতে লাগল। জঙ্গলে কোনো চলমান কিছু দেখে থাকবে পাখিটা। শিশির-ভেজা আধ-ফোটা চাঁপাফুলের মতো আবছা-হলুদ ভিজে আলোয় পথ দেখে আবার ঘরে ফিরে এল মানিয়া। তারপর আগুনের মাল্সাটার ওপরে পায়খানায় বসার মতো করে বসল। পিছনটা ভালো করে সেঁকে নিল। ওর নাক দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। হিমে নাকের ডগাটা যেন খসে গেছে। হাত দুটো প্রাণপণ ঘষতে থাকল। সেঁকা পাঁপড়ের সঙ্গে অন্য সেঁকা পাঁপড় ঘষলে যেমন আওয়াজ হয়, মানিয়ার হাত ঘষার তেমনি আওয়াজ হল।

পরেশনাথের বোধহয় ঘুম ভেঙে গেল। অস্ফুটে বলে উঠল, বাবা!

কিছু না রে, কিছু না। ঘুমো তুই! বলেই, মানিয়া ঘুমন্ত পরেশনাথের পিছনে আদরের চাপড় দিল। এই ‘বাবা’ ডাকটা মানিয়ার বুকের মধ্যে আজকাল কী-সব পাথর বাঁধা জিনিস তোলপাড় করে দেয়। শক্ত বড় কঠিন অনেক কিছু বোধ যেন বুকের মধ্যে গলে যেতে থাকে। প্রথম যৌবনে ও কখনও ছেলেমেয়ের প্রতি এমন অন্ধ টান অনুভব করেনি। আগুন সেঁকতে-সেঁকতে মানিয়া বুঝতে পারছিল, ও বুড়ো হয়ে আসছে। ওর দিন ফুরিয়ে আসছে। লণ্ঠনে তেল শেষ। এইবার দপ্ করে জ্বলে উঠেই, কোনো একদিন হঠাৎ নিভে যাবে মানি ওরাওঁ।

কিছুক্ষণ আগুন সেঁকে পরেশনাথের গায়ের সঙ্গে ঘেঁষে কাঁথাটা সর্বাঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ল মানিয়া।

নাবালক ছেলের ধুলো মাখা গায়ের গন্ধে নিজের নাক ভরে নিয়ে মানিয়া ভাবতে লাগল, যদি বেঁচে থাকে, তবে আর কয়েক বছর বাদেই ও নিশ্চিত বিশ্রাম পাবে। মাদল বাজাবে, বড় জোর বজ্রা ক্ষেতে রাতের বেলায় মাচায় বসে শুয়োর হরিণ তাড়াবে, নয়তো দিনের বেলা সুগা তাড়াবে, মকাইয়ের ক্ষেতে সবাই ঘাসের মাদুর বানাবে আর সারাদিন রোদে বসে থাকবে। বস্তির বুড়োরা যেমন থাকে! তখন খুব করে রোদ পোয়াবে মানি। ওর একমাত্র ছেলে, বেটা, ওর বংশধর, ওর মরা-মুখে আগুন দেওয়ার জন্য দেখতে দেখতে জোয়ান যুবকে রূপান্তরিত হবে। সেদিন ওর জোয়ান লেড়কার ভরসা করতে পারবে মানিয়া। মানিয়া আজকাল প্রায়ই অনুভব করে পরেশনাথই ওর বীজ, বার্ধক্যের অভিভাবক রক্ষাকর্তা, ওর ভরন্ত ভবিষ্যৎ।

এতসব ভাবতে ভাবতে ঐ শীতের রাতেও মানিয়ার গা গরম হয়ে উঠল। ভালো লাগল খুব, ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তারপরই, খারাপ লাগল হঠাৎ। চীনাবাদামগুলো সব গেল। যতটুকু বাকি আছে, তাও যাবে কয়েক রাতের মধ্যে। অথচ করার নেই কিছুমাত্র। নিজের ঔরসজাত পরেশনাথের গায়ের গন্ধে বুঁদ হয়ে ঐ প্রচণ্ড শীতার্ত অস্পষ্ট ভিজে রাতে, এক দারুণ সূর্যভরা উজ্জ্বল, উষ্ণ, স্পষ্ট ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতে একসময় মানিয়া ওরাওঁ যখন ঘুমিয়ে পড়ল, তখন নালার মধ্যের মৈথুনরত শেয়ালরা হুক্কা হুয়া রবে মধ্যরাত ঘোষণা করল।

কোজাগর – ৩

ভোর হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ঘুম ভাঙার পর লেপের নিচে শুয়ে সামান্য সময় একটু আমেজ করি রোজ। তারপর কুয়োর ধুয়ো-ওঠা জলে চান করি। ততক্ষণে তিতলি চলে আসে। ওকে বলেছিলাম, আমার কাজ করতে হলে নোংরা হয়ে থাকলে চলবে না। শাড়ি অবশ্য আমিই কিনে দিয়েছি। সাবান-তেলেরও পয়সা দিতাম ওকে আলাদা করে। প্রথম আমার কাজে বহাল হওয়ার পর দেখতে দেখতে মাসখানেকের মধ্যেই ওর চেহারা বদলে গেল। রুক্ষ মুখে লাবণ্যর চিকণতা লাগল। চুলে সুগন্ধি তেলের গন্ধ। গোলা সাবানে, ঝরনার পাথরে সান-বাঁধানো কুয়োতলায় কাচা, পরিষ্কার শাড়ি-জামা পরত ও। ভোরের রোদ্দুরের গন্ধ গায়ে মাথায় মেখে সুস্নাতা তিতলি যখন বাঁশের বেড়ায় দরজা ঠেলে আমার এই পর্ণ-কুটিরের আঙিনায় হাসিমুখে ঢুকত তখন আমার মন খুশিতে ভরে উঠত। ও হাসত, গোলাপের পাপড়ির ওপরে রাত-ভর জমা-হওয়া টল্টলে শিশিরের মতো পবিত্রতায়। মুখে বলত, পরনাম বাবু।

আমি বলতাম, পরনাম

ওদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীরা কিন্তু কেউই ভোরে চান করে না। ও আমার দেখাদেখি ভোরে চান করার অভ্যেস করে ফেলেছিল।

উঠোনের একপাশে একটা ঝুমকো জবার গাছ ছিল। তাতে দুর্গা-টুনটুনি আর মৌটুসি পাখিদের মেলা বসত। সেই জবা গাছ থেকে কয়েকটা জবা, পাশের গ্যাঁদার ঝাড় থেকে গ্যাদা ছিঁড়ে এনে বসবার ঘরের ফুলদানিতে সাজাত। ওকে বলিনি কখনও। নিজেই করত। ওর মধ্যে এক আশ্চর্য সহজাত বুদ্ধি, সৌন্দর্য-জ্ঞান ও সুরুচি ছিল, যা ও, ওর পরিবেশ থেকে পায়নি। ওর সঙ্গে যে আমার শ্রেণীগত এক প্রচণ্ড বিভেদ আছে, ও তা জানত। আমি শিক্ষিত, “ভদ্রলোক”, শহুরে বামুনের ছেলে। আর ও অশিক্ষিতা, গ্রাম্য, এক “ছোটলোক” কাহারের মেয়ে। ও পরের কাছে কাজ করে খায়-পরে। আর আমি ওকে রুজি দিই। এটা ছিল আর্থিক-শ্রেণীগত বিভেদ। ও যেন সবসময়ই আমার খুব কাছে আসার চেষ্টা করত। সংকীর্ণ লোকেরা যাকে বলে “জাতে-ওঠা”-র চেষ্টা! কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে নয়। এমনিই। ঐ সদ্য-যুবতী মেয়েটির কাছে আমিই ছিলাম বাইরের পৃথিবীর একমাত্র জানালা। জানালা খোলা রেখে ও আলো বাতাস পেতে চাইত। আমাদের রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার, আমাদের শহুরে বাঙালি-রান্না আমার কাছ থেকে শুনে-শুনে রপ্ত করার খুবই চেষ্টা করত ও। মিষ্টি হেসে বলত, আমি পারছি? তোমার মনের মতো হতে পারছি?

আমি হাসতাম বন্য যুবতীর কথা শুনে।

বলতাম, এখনও পারিসনি। চেষ্টা করতে করতে কখনও হয়তো হয়ে উঠবি। তবে, আশা কম। সকলের দ্বারা কি সব হয়?

ও বলতো, দেখো। একদিন নিশ্চয়ই, পারব।

চান সেরে, ঘরে আমি জামা-কাপড় পরছিলাম। একটু পরেই ট্রাক আসবে। হুলুক্‌ পাহাড়ের ওপরে আমাদের কাজ হচ্ছে। এতক্ষণে মেট, মুনশী, কুলিরা সব কাজে লেগে গেছে। তাড়াতাড়ি নাস্তা করেই ট্রাকে উঠে চলে যাবো। ফিরব, সেই সূর্য ডোবার আগে! ততক্ষণ তিতলি আমার একার সংসারের মালকিন্ হয়ে থাকবে। ঘরের দেওয়ালে গেরুয়া মাটি আর রঙ মিলিয়ে ছবি আঁকবে। গোবর দিয়ে উঠোন নিকিয়ে রাখবে। আমার গামছা-পাজামা-পাঞ্জাবি ধুয়ে দেবে। অন্যান্য কাপড়-জামা, লেপ-বালিশ, প্রয়োজন মতো রোদে দেবে। চৌপাইতে খামল বাড়লে, চৌপাই বাইরে বের করে তাতে ফুটন্ত জল ঢেলে ছারপোকা মারবে। আমার জন্যে অনেক যত্নে রান্না করবে। সারাদিন এ-ঘর ও-ঘর, উঠোন কুয়োতলা এই-ই করে ও। ওর হাতের গুণে এই লক্ষ্মীছাড়া একা মানুষের সংসারও শ্রীময়ী হয়ে উঠেছে। আমার মতো ওরও খুব ফুলের শখ। ম্যানেজারবাবুকে বলে কলকাতার সাটস্ থেকে কিছু সিজন, ফ্লাওয়ারের বীজ আনিয়ে ছিলাম। পুর্টোলেকা, ডালিয়া, অ্যাস্টার এই সব। যত্ন করে লাগিয়েছে ও। উঠোনের দু-পাশে দুটো বোগোন-ভোলিয়া। রাধাচূড়া দুটো। ওগুলো সব ফরেস্ট বাংলোর মালির কাছ থেকে জোগাড় করা। ও-ই করেছে। মাঝে মাঝে আমি জঙ্গলে কোনো নতুন ফুল বা গাছ দেখতে পেলে চারা বা বীজ সংগ্রহ করে নিয়ে আসতাম। খুব আগ্রহ সহকারে ও সেগুলো বাঁচাবার এবং বড় করার চেষ্টা করতো। কিন্তু আশ্চর্য পাখি সম্বন্ধে ওর কোনো উৎসাহ ছিল না। ওদের কারোই নেই। জঙ্গলের মধ্যে যারা বাস করে, তারা তাদের পরিবেশ ও জগৎ সম্বন্ধে এতো কম উৎসুক যে নিজের চোখে না-দেখলে বিশ্বাস করাও মুশকিল। কোনো অপ্রধান গাছ দেখিয়ে নাম জিজ্ঞেস করলে এরা সকলেই বলে, কওন জান্তা? নতুন পাখি দেখালে বলে, কওন চিড়িয়া, কওন জানে? আসলে ওরা নিজেরাই জানে না যে ওরা নন্দনকাননের বাসিন্দা। অথচ নন্দনকাননের বাসিন্দাদেরই চোখ আর কান দিয়ে পাঠাননি বিধাতা। কিংবা হয়তো শরীরের যে একটা ন্যাক্কারজনক অংশ যার নাম জঠর, সেই জঠরের দাবাগ্নিতেই ওদের আর-সব শুভবোধ ও ঔৎসুক্য বুঝি চাপা পড়ে গেছে চিরতরে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি ঐ একই চিন্তা। অন্ন চিন্তা। দোষ দেখি না কোনো ওদের

জামা-কাপড় পরতে পরতে একটা পাখির ডাক শুনলাম। পাখিটা থেমে থেমে ডাকছিল প্রথমে। তারপরই ঘন ঘন ডাকতে লাগল দুটি পাখি। গলার আওয়াজে মনে হয় কোথাও কোনো চীনেমাটির জিনিস ভেঙে-চুরে যাচ্ছে বুঝি। ধাতব শব্দের কাছাকাছি একটা শব্দ। পাখি দুটো ডাকছে রাস্তার পাশের কোনো গাছ থেকে। এমন ডাক এর আগে কখনও শুনিনি।

তাড়াতাড়ি জামা-কাপড় পরে বাইরে এসেই দেখি, মানি প্রায় দৌড়তে দৌড়তে আসছে, হাতে দুধের লোটা নিয়ে। ক্ষমা-চাওয়া হাসি হেসে বলল, বড়ী দের্ হো গেল মালিক।

বললাম, তিতলি আছে। দুধ দিয়ে এসো ভিতরে।

আস্তে আস্তে গাছটার দিকে এগোলাম। একটা কাঠ টগরের মতো দেখতে বুনো ফুলের গাছ। এই গাছগুলো ভালুমার অঞ্চলেই বেশি দেখি। পাহাড়ের ওপরের দিকে ও নেই। আরো নীচে নেমে গেলেও নয়। পাখিটা নজরে এলো। অনেকটা ফিঙের মতো দেখতে। গলার কেশর ফুলিয়ে সঙ্গিনীর সঙ্গে প্রেম করছে। লেজটা একটা ত্রিকোণের মতো দেখাচ্ছে পিছন থেকে। পাখি দুটোকে নজর করার পর আস্তে আস্তে সাবধানে পিছিয়ে এসে হাঁক দিলাম, তিল, তিল….।

রান্নাঘর থেকে জবাব এলো, নাস্তা তৈয়ার হ্যায়।

নাস্তা নয়, বইটা আন্।

তিতলি রান্নাঘরে বারান্দায় এসে শুধোল, কওসা কিতাব? চিড়িয়াওয়ালা?

হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি আন্।

তিতলি দৌড়ে সালিম আলির বইটা এনে দিলো। দিয়ে, আমার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল।

বইটার পাতা খুলে পরপর তাড়াতাড়ি উল্টোতে উল্টোতে এক জায়গায় এসে থেমে গেলাম। তারপর পাতাটা খোলা অবস্থাতেই আস্তে আস্তে আবার পাখি দুটোর দিকে এগিয়ে গেলাম। ওরা প্রেমের খেলায় এমনই মেতে ছিল যে চারপাশের কোনো কিছুর প্রতিই ওদের হুঁশ ছিল না। আমি মিলিয়ে দেখলাম, হুবহু ছবির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। গলার স্বরের বর্ণনার সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে। পাখি দুটোর নাম র‍্যাকেট্রেইল্ড ড্রঙ্গো। পাখি দুটোকে চিনতে পেরে ভারি ভালো লাগল।

কতক্ষণ ওখানেই উবু হয়ে বসে ছিলাম খেয়াল নেই। হঠাৎ পিছ থেকে কে যেন আমার কাঁধে হাত দিলো। ফিস্ ফিস্ করে ভয়ে ভয়ে বলল, বাবু

তাকিয়ে দেখি, তিতলি। তারপর তিতলির আঙুল যেদিকে তোলা ছিল, সেদিকে তাকিয়েই দেখি আমার সামনেই একটা খহি বাঁশের ঝাড়ের মধ্যে বাঁশে জড়িয়ে একটা প্রকাণ্ড শঙ্খচূড় সাপ রোদ পোয়াচ্ছে!

তিতলি কাঁধে খিচে আমাকে সজোরে পিছনে আকর্ষণ করল।

আমরা দু’জনেই সরে এলাম। ডেরার দিকে ফিরতে লাগলাম।

তিতলি বলল, তুমি এই করেই একদিন মরবে। নাস্তা ঠান্ডা হয়ে নেতিয়ে গেল। উনি পাখি দেখে বেড়াচ্ছেন! তোমার মা, মরে বেঁচে গেছেন তোমার হাত থেকে।

উঠোনে ঢুকলাম। ওর কথার কোনো জবাব দিলাম না।

ও এরকম করে প্রায়ই বলে। আমার শুনতে যে খারাপ লাগে, তা বলব না। এই সম্পূর্ণ অনাত্মীয়া মেয়েটির চোখে-মুখে আমার জন্যে দরদ, শঙ্কা, সহানুভূতি সব এমন করে হঠাৎ হঠাৎ আমার অন্ধকার অনাদরের জীবনে তারার মতো ফুটে ওঠে। বুকের মধ্যেটা যেন কীরকম করে ওঠে।

কত কীই যে ও বয়ে বেড়ায় ওর বুকে আমার জন্যে, ভেবে অবাক হই। ভালোলাগায়, এবং লজ্জাতেও মরে যাই। ভালোলাগাটা, ভালোলাগার কারণেই। লজ্জাটা, আমার জন্যে ও যা করে, যা ভাবে, আমি ওর জন্যে তার কণামাত্রই করি না; বা ভাবি না বলে।

ও যখন নাস্তা দিচ্ছিল, আমি বললাম, ঐ যে ট্রাকের শব্দ আসছে পাহাড়ের আড়াল থেকে। ইস্ ট্রাক এসে গেল। পাখি দেখতে গিয়ে, দেরি হয়ে গেল আজ

ট্রাক দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলে রামের বনবাসের মেয়াদ বাড়বে না। তুম্ ডাকে নাস্তা করকে, তব্‌ যাওগে। সারাদিনের জন্যে খেয়ে একেবারে বেরোনো! এমন- করলে শরীর থাকবে?

ধমক দিয়ে বললাম, তুই চুপ কর তো। বড় বেশি কথা বলিস।

ও আর কথা বলল না। দু-হাত হাঁটুর ওপর ছড়িয়ে দিয়ে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বসে, চোখ নীচু করে আমার পাতে ও খাবার ঠিক ঠিকই দিচ্ছিল, কিন্তু তাকাচ্ছিল না আমার মুখে।

ট্রাকটা একটা প্রাগৈতিহাসিক দাঁতাল শুয়োরের মতো আওয়াজ করছিল ডেরার সামনে। ডিজেলের ট্রাক। কোম্পানির। ড্রাইভার রহমত্ এঞ্জিন বন্ধ করার প্রয়োজন মনে করে না। তেল পুড়লে তো মালিকের পুড়বে! ওর কী?

খাওয়া শেষ হলে তিতলি উঠে বলল, দুধ আনছি।

দুধ খাবো না।

কেন? ও আমার চোখের দিকে তাকালো। নীরবে কৈফিয়ৎ চাইল।

বিরক্তি গলায় বললাম, সময় নেই।

আমার ভাবটা এমনই, যেন দুধ খেয়ে আমি ওকেই ধন্য করব।

ও কথা না-বলে, দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে টাটকা জ্বাল দেওয়া দুধ নিয়ে এলো

কাচের গ্লাসে করে। এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকল।

আমি রুক্ষ চোখে একবার ওর দিকে তাকালাম।

ও আবার চোখ নামিয়ে নিলো। কিন্তু দুধের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে। কথা না-বলে, বারান্দার লোটাতে তোলা জলে মুখ ধুয়ে, তোয়ালেতে হাতমুখ মুছে, ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

শঙ্খচূড় সাপটা ট্রাকের শব্দ পেয়ে নিশ্চয়ই এতক্ষণে জঙ্গলের গভীরে চলে গেছে। প্রেমিক কালো পাখিটাও আর নেই। নেই তার সঙ্গিনীও।

ট্রাকের সামনের উঁচু সিট থেকে আমার ডেরার ভিতরটা দেখা যায়। রহমত্ যখন ট্রাকটা স্টার্ট করে হুলুক্ পাহাড়ের দিকে চলল, তখন ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে দেখলাম, বারান্দার বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে ঐভাবেই দু-হাতে দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে তিতলি তখনও দাঁড়িয়ে আছে। মুখ নামানো। চোখ আনত। ও যেন কতদূরে চলে গেছে। ওখানে থেকেও ওখানে নেই।

হঠাৎ আমার বুকের মধ্যে বড় কষ্ট হলো ওকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। ওর সঙ্গে বড়ই খারাপ ব্যবহার করি আমি। বিনা কারণে। সংসারে যাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা যায়, তেমন আপনজন কি খুব বেশি থাকে? কারোই? আসলে, ওকে কষ্ট দিয়ে আমি খুব আনন্দিত হই। ও যেন আমার পোষা হরিণ। বা আমার ছাগল-ছানা। কী কাকাতুয়া!

কোজাগর – ৪

আমাদের বাঁশের কুপে এসে হুলুক্ পাহাড়ের গায়ে যখন ট্রাক থেকে নামলাম, তখন গা-মাথা ধুলোয় ভর্তি হয়ে গেছে। কুলির দল পৌঁছে গেছে আগেই। মেট ও মুনশীরা কাজের তদারকি করছে। বারোশো দশ নম্বর ট্রাকে বাঁশ লোডিং হচ্ছে।

প্রতি বছর কালীপুজোর পর থেকেই কাজ শুরু হয়। জঙ্গলের পথ-ঘাট খোলে! লাতেহার, চাঁদোয়া, চিপাদোহর, রাংকা, মারুমার, ভালুমার, প্রায় দু-হাজার বর্গমাইল জুড়ে কাজ হয় কোম্পানির। ডালটনগঞ্জ থেকে এক এক জায়গার দূরত্বও কম নয়। ডেহরি একশো বত্রিশ কিলোমিটার। চাতরা, টোরী এবং বাঘড়া মোড় হয়ে একশো পঞ্চাশ কিলোমিটার। মহুয়াডার, চিপাদোহর হয়ে একশো কিলোমিটার। বানারী একশো দশ কিলোমিটার। অন্যদিকে ভাণ্ডারীয়া ও রাংকার জঙ্গল দেড়শো কিলোমিটার। বেশিরভাগই জঙ্গলের মধ্যে কাঁচা রাস্তা। তাই এত বড় এলাকা সামলে কাজ করা বড় সোজা নয়। আমাদের কোম্পানির মালিকের বয়স পঞ্চাশ হবে। তা হলেও এত বড় ব্যবসা চালানো সোজা কথা নয়। আমাদের মতো যারাই আছে, তাদেরও মালিক নিজের লোকের মতোই দেখেন। তা-না হলে এই পাহাড়-জঙ্গলে বছরের পর বছর আমাদের পক্ষে পড়ে থাকা সম্ভব হয়তো হতো না। অবশ্য আমার কথা আলাদা। আদিমতম এই আশ্চর্য মেয়ের প্রেমে পড়ে গেছি যে আমি। আমাকে তাড়িয়ে দিলেও যাবো না এখান থেকে। এই মায়াবিনীর জালে যে একবার ধরা দিয়েছে, তার পালাবার সব পথই বন্ধ। এ জীবনের মতো জঙ্গলের সঙ্গে বুঁদ হয়ে জংলি হয়ে গেছি। জংলি হয়েই থাকতে হবে।

প্রতি বছর খুবই ধুমধাম করে কালীপুজো হয় ডালটনগঞ্জে। কোম্পানির হেড অফিসে। তারপরই সকলে যে যার চলে যায় নিজের কাজের জায়গায়। আমার এবার কালীপুজোয় যাওয়াই হলো না। ঔরঙ্গাবাদ থেকে সমীর তার বৌ-বাচ্চা নিয়ে জঙ্গল দেখতে আসবে লিখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এলোই না। কোনো খবর দিলো না।

বড় মামা উঠে-পড়ে লেগেছেন আমার বিয়ে দেওয়ার জন্যে। বাবা ছোটবেলাতেই মারা গেছেন। গত বছর মা মারা যাবার পর থেকে গুরুজন বলতে এই মামারাই। আমারই কোনো সহকর্মী উড়ো চিঠি লিখেছিল তাঁকে, কলকাতায়। বাঙালির যা ধর্ম লিখেছিল : আমি এক কাহার ছুঁড়ির সঙ্গে দিব্যি ঘর-গেরস্থালি গুছিয়ে বসেছি। এ-জন্মে সভ্যতার আলো নাকি আর দেখবারই সম্ভাবনা নেই! জানি না, তিতলি ও টেটরা একথা শুনলে আমাকে কী ভাববে। বড় মামার উৎসাহে ছোট মামা ও মামীমা পাত্রীর দাদা বৌদি ও পাত্রীকে নিয়ে এখানে আসবেন লিখেছিলেন কালীপুজোর সময়ে। সরেজমিনে তদন্ত করে যেতে। পাত্রীও পাত্রকে দেখতে পাবে চাক্ষুষ। জঙ্গলের এই দু-পেয়ে জানোয়ারকে! দেখতে পাবে তার ঘর-গেরস্থালি! বিয়ে হলে, যেখানে তাকে থাকতে হবে বাকি জীবন, সেই জংলি জায়গা। দেখা তো উচিত নিজের চোখে।

মাঝে মাঝে ভাবি, বিয়ে ব্যাপারটা সত্যি-সত্যিই ঘটে গেলে বোধহয় মন্দ হতো না। একজন কন্‌সিডারেট, বুদ্ধিমতী সঙ্গিনী। শিক্ষিতা, ঋতু গুহর মতো না হলেও মোটামুটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারে; এমন চলনসই একজন সুশ্রী, নরম-স্বভাবের মিষ্টি মেয়ে। খিচুড়ি এবং ডাল-রুটি রাঁধতে পারলেই চলে যাবে।

মাঝে-মাঝেই অনেক কিছু কল্পনা করছি আজকাল। যাকে বলে, ইমাজিনিং থিংগস্। আমার না-হওয়া অ-দেখা বৌ-এর সঙ্গে অনেক গল্পটল্পও করছি। এমনকী মাঝে-মাঝে ছোটখাটো আদর-টাদরও করে দিচ্ছি। মনে মনে দু’জনে মিলে আবৃত্তি করছি, গান গাইছি। অদেখা, অনুপস্থিতকে পাশে নিয়ে, ঘুরে ঘুরে আমার এই আদিগন্ত নির্মল, আশ্চর্য সাম্রাজ্য দেখাচ্ছি। আর সে ভালোলাগায় শিহরিত হয়ে উঠেছে। কতরকমই না অভিব্যক্তি তার। সে আমাকে বলছে, আমি সারাজীবন তোমার এই সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হয়ে তোমারই পাশে পাশে থাকতে চাই।

আমার এই এলাকাচিহ্নহীন সাম্রাজ্য ছোটই-বা কী? আই অ্যাম দ্য লর্ড অফ অল আই সার্ভে। আদিগন্ত। চতুর্দিকে।

মেয়েটিকে আমি দেখিনি। ছোটমামীমা লিখেছিলেন, চেহারার ও গুণের বর্ণনা দিয়ে। ছোটমামীর বর্ণনার সঙ্গে আমার কল্পনা মিশিয়ে আমার ভাবী বৌকে গড়ে নিয়েছি আমি। চোখে না-দেখে, বলতে গেলে, অন্যের বাঁশি শুনেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছি। নিজেকে দেখাবার জন্য তার আমার কাছে কষ্ট করে আসার দরকার ছিল না আদৌ একদল লোকের সঙ্গে। বরং বিয়ের পর একা আমারই সঙ্গে এলে, এই হুলুক্ পাহাড়ের ভালুক-রঙা পিঠের ওপর মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে থাকা সকালের সূর্য, ফানুসের মতো ভাসতে-থাকা পূর্ণিমার চাঁদ, এই জঙ্গল, নদী, গাছ-গাছালি, পাখির জগতে তাকে চমৎকৃত, বিস্মিত, বিহ্বল করে দিতাম। এবং তার সেই সমস্ত প্রথম বিহ্বলতার সুযোগ, একলা স্বার্থপর এক্সপ্লোরারের মতো পুরোপুরি একাই এক্সপ্লয়েট করতাম।

আসলে, কাহার-ছুঁড়ির ব্যাপারটা যে কী, তা সকলে নিজ চোখে দেখে যান, সেটাই চাই বলে ওঁদের আসতে মানা করিনি। আমার মামারও কেউ কখনও আসেননি এইদিকে। ছোট মামা এলে খুশিই হবো! উনিও খুশি হবেন। কবি-প্রকৃতির মানুষ! ছোটমামাকে দেখে মনে হয়, মানসিকতায়, সার্থকদের চেয়ে ব্যর্থ কবিরাই বোধহয় অনেক বেশি কবি থাকেন।

ওঁদের তদন্তে বেচারি তিতলির চরিত্রে কী কলঙ্ক রোপিত হবে জানি না। তবে নিজের চরিত্র নিয়ে আমার নিজের কখনোই মাথা ব্যথা ছিল না। অ্যাকাউন্ট্যান্টরা বলেন যে, চরিত্র নাকি এমনই এক ইনট্যানজিবল অ্যাসেট যে থাকলেও প্রমাণ করা যায় না যে আছে, এবং না থাকলেও নেই বলে। মোস্ট ইনট্যানজিবল অফ অল ইনট্যানজিবল অ্যাসেটস্। তাই-ই, তা থাকাথাকি নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভালো।

জঙ্গলের গভীর থেকে নীলরঙা লুঙির ওপর লাল সোয়েটার গায়ে মুনশী ইয়াসিন এগিয়ে এসে রেক্ এসেছে কিনা তার খবর করল।

ট্রাকে বাঁশ বোঝাই হয়ে এখান থেকে চলে যায় চিপাদোহরের ডিপোতে। সেখানে ইয়ার্ডে ওয়াগন লোডিং হবে। ওয়াগন শর্টেজের জন্যে কাজের খুবই ব্যাঘাত হয়। আজকাল রেক্ পাওয়া মহা ঝামেলা। পেলেও, তা অনিয়মিত। সবচেয়ে টেনশান হয় গরমের শেষে বা বর্ষার আগে। বৃষ্টি নেমে গেলে বাঁশ পচে যায়। কোনো কোনো বছর বৃষ্টির আগে আগে জঙ্গল থেকে বাঁশ ঢোলাই করে ডিপোতে সময় মতো পৌঁছে দিলেও, তা রেকের অভাবে বৃষ্টি নামার আগে পাঠানো সম্ভব হয় না। জঙ্গল-পাহাড়ের গরিব-গুরবোরা জুন মাসের প্রথমে যখন দু-হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, বৃষ্টি নামাও হে ভগবান, বৃষ্টি নামাও, দুটো গোঁদনি বা সাঁওয়া ধান বুনি, আর কতদিন কান্দা গেঠি খুঁড়ে খেয়ে কাটাবো? বৃষ্টি নামাও! ঠিক তখনই ডালটনগঞ্জের বিড়িপাতা আর বাঁশের গুজরাটি ব্যবসায়ীরা বৃষ্টি না-নামার জন্যে পুজো দেয়। প্রার্থনা করে। ভগবান ঘুষে তৃপ্ত হন কি না জানি না, কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, তিনিও পয়সাওয়ালা ব্যবসাদারদের কথাই শোনেন। আর গরিব ভোগ্‌তা, মুণ্ডা, কাহার, ওরাওঁ, খাঁরওয়ার, লোহার, ভুঁইয়াররা সবাই হাহাকার করে।

যাঁরা বেলার ডানলোপিলো লাগানো, গিজার-বসানো বৈদ্যুতিক আলো ঝল্‌ বাংলোয় সবান্ধবে ও সপরিবারে থেকে, অভয়ারণ্যের ছাগলের মতো চরে-বেড়ানো পালে পালে হরিণ, বাইসন এবং অন্যান্য জীবজন্তু দেখেন, তাঁদের অনেকেই প্রাণিতত্ত্বরই মতো বাঁশতত্ত্বরও কোনো খোঁজ রাখেন না। অবশ্য না-রাখাই স্বাভাবিক। আর যে বাঁশ কথাটা মোটেই প্রীতিপ্রদ নয়, সেই বাঁশ নিয়েই আমার কাজ। অনেক রকম বাঁশই হয় পালামৌর জঙ্গলে-পাহাড়ে। খহি, সর্হি, বড়হি আর টেরা। ব্যাসের তফাত অনুযায়ী নামের তফাত। খহি বাঁশ হয় সরু। আঙুলের মতো। এইগুলোই ঘর-বাড়ি বানাতে লাগে। খহির চাহিদাও তাই বেশি। গয়া-রাজগীরের মগধী পানের বরজওয়ালারা পানের বরজ বানাবার জন্যে এই বাঁশ কেনেন। খহি আর সহির বান্ডিল হয় পঁচিশটায়। বড়হির বান্ডিল বারো এবং তেরোটা বাঁশে। টেরার বান্ডিলের আবার মজা আছে। দুটো বান্ডিল হয় আট বাঁশের। একটা ন-বাঁশের। ছ-বাসা বাঁশের বান্ডিল হয় ছ-বাঁশের। পাঁচ-বাসা হয় পাঁচ বাঁশের। টিরার তিন বান্ডিল মিলিয়ে ষোলো, আর নয় নিয়ে পঁচিশ হয়।

প্রত্যেকটি বাঁশ কাটা হয় বারো ফিট করে, বান্ডিল বাঁধবার সময়। বাকি টুকরোগুলোকে টোনিয়া বলে। এই টোনিয়া বা টুকরো বাঁশই চালান যায় কাগজের কলে মণ্ড তৈরির জন্য। কাগজ কল ভালো পয়সা দেয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ও রয়্যালটি পান, আমাদের কোম্পানি পায় হ্যান্ডলিং-এর পয়সা। পয়সা আগামও দেয় কোনো কোনো পেপার মিল। টোনিয়ার চেয়ে বেশি লাভ হয় খর্হি, সর্হি-বড়হি ইত্যাদিতে। এই সব বাঁশের্ গোড়া, ইংরেজিতে যাকে ‘ব্যাম্বু শুটস্’ বলে, তা দিয়ে দেহাতি মানুষেরা তরকারি ও আচার করে খায়

করিল্ হচ্ছে বাঁশের এক বছরের গোড়া। ছাল তুললে সাদা পাউডারের মতো বেরোয় তখন। দোর্সা, দু বছরের গোড়া। এ-দিয়ে নতুন বাঁশগাছ হয়। অথচ তিন বছরের গোড়া তোর্সা লাগালেও কিন্তু গাছ হয় না।

সমস্ত উদ্ভিদ জগতে ফুলই পরিপূর্ণতার প্রতীক। সার্থকতারও। তাই সাহিত্যে, উপমাতে আমরা মঞ্জরিত পুষ্পিত এইসব কথা দেখি। বাঁশ কিন্তু এর ব্যতিক্রমের অন্যতম। বাঁশগাছে ফুল এলে তার সঙ্গে যমদূতের পদধ্বনিও শোনা যায়। ফুল ফুটিয়েই বাঁশ তার অস্তিত্ব অনস্তিত্বে পর্যবসিত করে।

কুলি মেট, মুনশী সবাই ওরা কাজ করে। বহুদিনের সব শিক্ষিত, বিশ্বস্ত কর্মচারী। রহমত্ এবং অন্যান্য ড্রাইভাররা গাছের ছায়ায় বসে বিড়ি খায়। গল্প করে। কামিনদের সঙ্গে রসিকতা করে। এ-গাছ থেকে ও-গাছে মৌটুসী, বুলবুলি, টিয়া, মুনিয়া, ক্রো-ফেজেন্ট উড়ে উড়ে বেড়ায়। সহি বাঁশের চিকণ ডাল আর ফিফিনে পাতা তাদের উড়ে যাওয়ার ছন্দে ছন্দোবদ্ধ হয়ে দোল খায়। হাওয়া দিলে বাঁশে বাঁশে ঘষা লেগে কট্‌ট্ করে আওয়াজ ওঠে। হলুদ রোদে ফিকে হলুদ প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়। প্রজাপতিকে এখানের মানুষ তিতলি বলে। কখনও দূরের বনে হনুমানের দল হুপ্ হুপ্ হুপ্ হুপ্ করে ডেকে ওঠে। ঝুপ্-ঝাপ্ করে এ-গাছ থেকে ও-গাছের মগডালে ঝাঁপিয়ে যায়। ক্বচিৎ বাঘের ডাকও ভেসে আসে। সেই ডাকে পাহাড় গম্ গম্ করে ওঠে।

সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পরেই ওরা কাজ শুরু করে। শীতের দুপুরে একটুক্ষণ রোদে এবং গ্রীষ্মকালে ছায়ায় বসে, সঙ্গে করে নিয়ে-আসা কিছু খাবার খেয়ে নেয়। খিচুড়ি বা অন্যকিছু। ঝরনার জল খায় আঁজলা ভরে। আবার কাজ শুরু করে। কাজ ঠিক তেমন সময়ই শেষ হয়, যাতে সূর্য ডোবার আগে আগে কূপ-কাটা কুলিরা নিজ নিজ গ্রামে জঙ্গলের পথ বেয়ে পৌঁছতে পারে। যাদের গ্রাম, ট্রাকের ফেরার পথে, তারা বাঁশ-গাদাই করা ট্রাকের মাথায় চড়ে গান গাইতে গাইতে চলে যায়। তারপর যার যার গ্রামের কাছে রাস্তায় নেমে পড়ে।

এখানে যখন আমি প্রথম আসি, অনেক বছর আগে, তখন পুরো এলাকার চেহারাটাই একেবারে অন্যরকম ছিল। অনেকই সুন্দর ছিল। এখন তো গাড়ুবাজার অবধি রাস্তা পাকা হয়ে গেছে। মস্ত ব্রিজ হয়ে গেছে কোরেলের ওপরে। যে বেতলাতে এখন পাকা বাংলো, রাঁচি-কলকাতার নম্বরে-ভরা মোটর গাড়ি আর বৈদ্যুতিক আলোর জেল্লা; সেই বেলার পথে দিনের বেলাতেও হাতি, বাইসন, বাঘের জন্যে পথ-চলা মুশকিল ছিল। দু-পাশে জঙ্গল ঝুঁকে থাকতো, কাঁচা পথের লাল মাটির কী বিচিত্র গন্ধ বেরুত, বিভিন্ন ঋতুতে। পিচের রাস্তার গায়ের অমন গন্ধ নেই। প্রতি ঋতুতে তারা নতুন গন্ধবতী হয় না। পিচ রাস্তারা ব্যক্তিত্বহীন।

একবার নিউমোনিয়া হয়েছিল। গাড়ু থেকে চৌপাইতে করে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কোরেল পার করে গাড়ুর উল্টোদিকে। সেখান থেকে ছোট্ট বেডফোর্ড পেট্রোল-ট্রাকে করে ডালটনগঞ্জের সদর হাসপাতালে। আর এখন তো মহুয়াডার অবধি বাসই যাচ্ছে রোজ ডালটনগঞ্জ থেকে। আসছেও সব জায়গা ছুঁয়ে। যদিও দিনে একটি করে। এখন ডিজেল মার্সিডিসের গাঁগাঁক আওয়াজে নিস্তব্ধ জঙ্গল চমকে যায়। তখনকার ছোট ছোট পেট্রোলের গাড়িগুলোর আওয়াজও যেন মিষ্টি ছিল। মিষ্টি লাগতো পেট্রোলের গন্ধ। ডিজেলের ধোঁয়ায় এখন নাক জ্বালা করে।

সেইসব আশ্চর্য নিবিড় রহস্যময়তা, ভয় ও আনন্দ মিশ্রিত অসহায়তার সুখভরা দিনগুলি মরে গেছে। তাই এখন এই আজকের ভালুমারে এসেও কোনো শিক্ষিত শহুরে লোক নাক কোঁচকান, বলেন, থাকেন কী করে মশাই এমন গড় ফরসেক্ জায়গায়? তখন তাঁকে অনেক কথাই বলতে ইচ্ছা হয়।

কিন্তু সব কথা সকলের জন্য নয়।

আমাদের এই জঙ্গল-পাহাড়কে চাঁদনি রাতে অনেকই ভারি সুন্দর দেখেন। আমিও দেখি। কিন্তু জঙ্গল-পাহাড়ের অন্ধকার রাতের বুকের কোরকে যে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সুপুরুষ তাঁর সমস্ত আপাত দুজ্ঞেয়তা নিয়ে প্রতিভাত হন, তাঁর সৌন্দর্যও বড় কম নয়। পৌরুষের সংজ্ঞা বলেই মনে হয় এই নিরেট জমাট-বাঁধা অন্ধকারকে। সেই কালো সুপুরুষের পরিপ্রেক্ষিতেই চন্দ্রালোকিত রাতের নারীসুলভ মোহিনী সৌন্দর্য পরিপুতি পায়।

অন্ধকার রাতে, শীত খুব বেশি না-থাকলে জঙ্গলের মধ্যে অপেক্ষাকৃত খোলা জায়গায় কোনো উঁচু পাথরে বসে অথবা আমার মাটির বারান্দায় নারকোল দড়ির ইজিচেয়ারে বসে আকাশের দিকে চেয়ে থাকি। কত গ্রহ-নক্ষত্র, কাছে দূরে। একে অন্যকে ঘিরে ঘিরে ঘুরে চলেছে অনন্তকাল ধরে। ভালুমারের সকলের ‘পাগলা সাহেব’, যাঁর আসল নাম রথী সেন; সেই রথীদা বলেন, আকাশের দিকে তাকাবি, ভগবানকে প্রত্যক্ষ করবি।

ভগবান বলতে কী বোঝায়, এখনও নিজে তা বুঝিনি নিজের মতো করে। কখনও বুঝব কিনা, তাও জানি না। কিন্তু এত বছর জঙ্গলে-পাহাড়ে, প্রকৃতির মধ্য থেকে কোনো প্রচণ্ড শক্তিমান অদৃশ্য অপ্রত্যক্ষ কিন্তু অনুভূতিসাপেক্ষ কেউ যে আছেন, যিনি এই অসীম ব্রহ্মাণ্ডকে করতলগত করে কোটি কোটি বছর ধরে এই গ্রহ-নক্ষত্র নিচয়ের পরিবারকে শাসন করছেন, পালন করছেন; তাঁর প্রভাব এখানে নিশ্চিত অনুভব করি অমোঘ ভাবে। লক্ষ লক্ষ গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে অতি নগণ্য এই আমাদের ছোট্ট পৃথিবী। সেই পৃথিবীর কীটাণুকীট, এই মনুষ্যাকৃতির একটি প্রাণী আমি। আমার একটা নামও আছে। সায়ন। সায়ন মুখার্জী। আমার ভূমিকার নিদারুণ নগণ্যতা নিজের কাছেই নিজেকে হাস্যাস্পদ করে তোলে মাঝে মাঝে। আমার স্বার্থপরতা, আমার অহমিকা, আমার ঈর্ষা, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা এসব নিয়ে কখনও উত্তেজিত হলেই আমি ভালুমারের আকাশে তাকাই। রাতের দিগন্তরেখার ওপরে হুলুক্ পাহাড়ের পিঠটা একটা অতিশয় প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ারের পিঠ বলে মনে হয়। দিগন্তের কোনো দিকে হঠাৎ-ই কোনো তারা খসে যায়। শিহরিত হই। হাহাকার করি। পরমুহূর্তেই মনে মনে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠি। ঐ দূরের একটি অনামা অচেনা প্রজ্বলিত নক্ষত্র হয়তো পৃথিবী থেকে কোটি গুণ বড়। তার জ্বলে উঠেই ফুরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে তার লীলাখেলার মেয়াদ শেষ হওয়ার তাৎক্ষণিক মুহূর্তেই, আমি আমার সামান্যতা সম্বন্ধে নতুন করে সচেতন হই। বড়ই কৃতজ্ঞ বোধ করি। বড় খুশি হয়ে উঠি। আনন্দে, এক নিঃস্বার্থ পবিত্র আনন্দে; আমার দু-চোখের কোণ ভিজে ওঠে। আমরা সকলেই সামান্য। কিন্তু এই পরিবেশে না-থাকলে, চোখ ও কানের আশীর্বাদে সম্পৃক্ত না হতে পারলে, কেমন করে জানতাম আমার ক্ষুদ্রতার মাপটা ঠিক কতখানি ক্ষুদ্র।

আকাশ ভরা কত তারা, কত অসংখ্য নক্ষত্রপুঞ্জ। কী সুন্দর সব তাদের নাম। কী উজ্জ্বল চোখে, কোটরা হরিণের ভয়-পাওয়া ডাকে গগম্-করা অন্ধকার রাতে তারারা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন জিজ্ঞেস করে, কেমন আছো? যেন বলে, তুমি যে তোমার ভূমিকা সম্বন্ধে সচেতন, সে কারণে আমরা তোমাকে ভালোবাসি। তাই-ই তো মাঝে মাঝে নিজের ডাইরিতে লিখি : “যে পাখির ভালোবাসা পেয়েছে, ফুলের ভালোবাসা, চাঁদের ভালোবাসা; তার অভাববোধ কি থাকতে পারে কোনো?”

চিত্রা, পূর্বফাল্গুনী, উত্তরফাল্গুনী, বিশাখা, অনুরাধা, কৃত্তিকা, রোহিণী শ্রবণা, শতভিষা, ক’টা নামই-বা আমি জানি? কতো ছায়াপথ? অয়নপথের কতো বিচিত্র সব লীলাখেলা চলেছে সৃষ্টির আদি থেকে? এই মহাবিশ্ব এবং এই মহাকালের প্রতি এক সুগভীর শ্রদ্ধা কি জন্মাত আমার এই তিরিশ বছরের হাস্যকর রকমের ছোট্ট জীবনে? এখানে না থাকলে? আমি যদি ভাগ্যবান না হব তো ভাগ্যবান কে?

রথীদা, কেন কী কারণে সব ছেড়ে-ছুড়ে এই জঙ্গলে টালির বাংলো-বাড়ি বানিয়ে একা এসে বসলেন, তা কেউই জানে না। এখানে কারোই সে-সব কথা জিজ্ঞেস করারও সাহস নেই তাঁকে। প্রতি মাসে ডালটনগঞ্জে যান একবার। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলেন, সারা মাসের খরচ। সেদিনেই ফিরে আসেন। তিনি বলতে গেলে ভালুমারের বাসিন্দাদের লোকাল গার্জেন। অসুখে হোমিওপ্যাথিক্ ওষুধ দেন। বিপদে পাশে দাঁড়ান। বিবাদে মধ্যস্থতা করেন। সমস্ত গরিব গুরবোর রক্ষাকর্তা তিনি।

কোন্ জাত? জিজ্ঞেস করলে বলেন, বজ্জাত।

বাড়ি কোথায়? বললে বলেন, পৃথিবী।

আত্মীয়স্বজন কেউ নেই? শুধোলে বলেন, আত্মীয় কথাটার ডেরিভেশান্ জানিস? যে আত্মার কাছে থাকে; সেই-ই তো আত্মীয়। তোরাই আমার আত্মীয়।

অদ্ভুত মানুষ। তাঁর কথা বলে শেষ করা যায় না। সাদা দাড়ি। ঘাড় অবধি নামানো সাদা চুল। খুব লম্বা। দোহারা।

কোন্ ধর্মাবলম্বী জিজ্ঞেস করলে, রথীদা হাসেন। বলেন, আমার ধর্ম, স্বধর্ম।

‘পূজা-পার্বণ’ বলে বহু পুরনো একটা মলাট-ছেঁড়া চটি বই উনি আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। রাতে পড়লাম সেদিন; “যদি খ্রীস্টপূর্ব চার হাজার পাঁচশো অব্দে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় উত্তরায়ণ হয়, তাহা হইলে অন্তত ইহার দুই সহস্র বৎসর পূর্বে চৈত্রী পূর্ণিমায় উত্তরায়ণ হইত। অতএব আশ্বিন পূর্ণিমায় দক্ষিণায়ন হইত।

“ইহা হইলে পাইতেছি, অশ্বিনীর চতুর্দশ নক্ষত্র পশ্চিমে চিত্রা নক্ষত্রে রবি আসিলে দক্ষিণায়ন হইত। এখন আর্দ্রা প্রবেশে দক্ষিণায়ন হইতেছে। আর্দ্রা ছয়, চিত্রা চোদ্দ নক্ষত্র—আট নক্ষত্রের ব্যবধান। অতএব এখন হইতে অন্তত আট সহস্র বৎসর পূর্বের কথা। পুরাণ ইহার প্রমাণ, আশ্বিনী পূর্ণিমায় কোজাগরী ও আশ্বিনী অমাবস্যায় দীপালি পাইতেছি। ঋগ্‌বেদে এই কালের প্রমাণ অবশ্য আছে। কিন্তু সেখানে অশ্বিনী ও চিত্রার নামগন্ধও নাই। নক্ষত্রগুলি আছে, অন্য নামে আছে। যাঁহার চক্ষু আছে, তিনি দেখিতে পান, যাঁহার বর্ণজ্ঞান হইয়াছে তিনি পড়িতে পারেন। যে অন্ধ, সে কী দেখিবে! যে বধির, সে কী শুনিবে! ভারতের অতীত প্রত্যক্ষ হইয়া কথা কহিতেছেন…।”

আমি নিজে সর্বাংশে অশিক্ষিত। কোনো বিষয়েই বলবার মতো জ্ঞান আমার কিছু মাত্র নেই। কিন্তু এই সব দেখে-শুনে এবং পড়ে জানার ইচ্ছা, দেখার-ইচ্ছা, বড় প্রবল হয়ে ওঠে বারে-বারে। জীবনের তিরিশটা বছর বৃথাই নষ্ট করলাম বলেই মনে হয়, জানার মতো কিছুমাত্র না-জেনেই। এই দুঃখটাও যে হয়, এটাই একমাত্র সান্ত্বনা। জঙ্গলে, পাহাড়ে, প্রকৃতির বুকে শিশুর মতো লালিত-পালিত না হলে এই দুঃখবোধটুকু থেকেও হয়তো-বা বঞ্চিত হতাম। বঞ্চিত হয়ে, কূপমণ্ডূক আত্মসর্বস্ব, উচ্চমন্য, কেবলমাত্র স্বর্ণমুদ্রা অর্জনের শিক্ষাতেই শিক্ষিত হয়ে ডিজেলের ধুঁয়ো-ভরা কোনো বড় শহরে সারাজীবন খাই-খাই করে কাটিয়ে, ইঁদুরের মতো স্বার্থপরতায়, নিজেদের একে অন্যকে কাটাকুটি করে এই মানবজীবন শেষ করতাম। অসীম ব্রহ্মাণ্ড থেকে গ্রহ-নক্ষত্রের আকস্মিক স্খলনে, তাদের নিরুচ্চার নিঃশব্দ মৃত্যু এ-জন্মে তাহলে আর দেখা হতো না।

আমার এই ভালুমারে অতীত কথা বলে। সত্যিই কথা বলে। ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে কেবলই মনে হয়, এই অতীতের যথার্থ অনুভবেই আমাদের প্রত্যেকের ভবিষ্যৎ নিহিত আছে। ছিল চিরদিন। এবং থাকবে।

কোজাগর – ৫

সমস্ত আকাশ আলোয় ভরে দিয়েছে রোদ। ঘন নীল উজ্জ্বল আকাশ। পাহাড়ী বাজ উড়ছে ঘুরে ঘুরে। কয়েক দানা শুকনো মকাই চিবিয়ে, একটা মকাই কোঁচড়ে নিয়ে পরেশনাথ কি পাহাড়ে যাচ্ছিল গোরুগুলোকে চরিয়ে আনতে। ফিরবে সেই সন্ধ্যাবেলা। মাহাতোর গোরু চরানোর ভার তার উপর। সাদা-লালে মিলিয়ে গোটা পনেরো গোরু। দিনে পঁচিশ নয়া করে পায় পরেশনাথ মাহাতোর কাছ থেকে।

ওদের বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে পাহাড়ে পাকদণ্ডীর পথ ধরবে ও, এমন সময় বুলকি পিছু ডাকল, এই ভাইয়া!

কা রে দিদি? পরেশনাথ দাঁড়িয়ে পড়ে শুধোলো।

বুলকি বলল, পাহাড়ে যাচ্ছিস? আমার জন্যে এক কোঁচড় কাঁকোড় ফল নিয়ে আসিস। মালা গাঁথব।

পরেশনাথ বিজ্ঞের মতো বলল, এতগুলো গোরু নজরে রাখা কী কম কথা? আমার সময় কই? ….আচ্ছা দেখবো, যদি হাতের কাছে পাই ত আনবো।

বুলকি বলল, বেশি বেশি, না?

পরেশনাথ গম্ভীর গলায় বলল, তুই বড় অবুঝ দিদি। তোর যা চাই, তা এক্ষুণি চাই! বলছি তো দেবো এনে। তবে আজই দেবো কি-না বলতে পারছি না।

বুলকি জেদ ধরল, না, আজই চাই, কাল হাট না? হাটে যাবো কাঁকোড়ের মালা

পরে।

পরেশনাথ জবাব না দিয়ে, একটা গোরুর পিঠে লাঠির বাড়ি মারল। তারপর একবারও ফিরে না-তাকিয়ে গভীর জঙ্গলের মধ্যের পাকদণ্ডীতে মিলিয়ে গেল।

এই পাহাড়-জঙ্গলের নেশায় বুঁদ হয়ে যায় পরেশনাথ। পেটের খিদে, পরনের কাপড়ের অভাব, সবকিছু ভুলে যায় ও।

একটু এগিয়ে যেতেই পাকদণ্ডীর বাঁকে শুকনো পাতা মাড়াবার মচ্‌মচ্ আওয়াজ হলো। বাঁক ঘুরতেই দেখলো টেটরা-চাচা। একটা ফালি-হওয়া জামা গায়ে দিয়ে কি পাহাড় থেকে পাকদণ্ডী বেয়ে নেমে আসছে।

পাহাড়ের ওপরে মুলেন সাহেবের বাংলো ছিল একসময়। শিকারে আসতো নাকি সাহেব। পরেশনাথ কখনও দেখেনি, তার বাবার মুখে শুনেছে। জন্ম থেকেই পরেশনাথ দেখে আসছে ঘন জঙ্গলের মধ্যে এই ভেঙেপড়া বাংলো: জঙ্গলের সঙ্গে আর আলাদা করা যায় না আজকাল। শুধু কিছু-কিছু শৌখিন গাছ মনে করিয়ে দেয় যে, একসময় এখানে মানুষের বাস ছিল। মাঝে-মাঝেই শোনচিতোয়া এসে আস্তানা নেয় এখানে। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির দিনে। একবার পরেশনাথ মুখোমুখি পড়ে গেছিল শাওন মাসের এক সকালে, একটার সামনে। চোখ দুটো কটা-হলুদ। তাহলে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়। শোনচিতোয়াটা কিছু বলেনি, পথ ছেড়ে নেমে গেছিল পাথরের আড়ালে পরেশনাথ ভয়ে আর এগোয়নি। এক-এক পা করে অনেকদূর পিছিয়ে এসে দৌড় লাগিয়েছিল বাড়ির দিকে।

টেটরা-চাচা ফলের ব্যবসা করে। টেটরা-চাচার মেয়ে তিতলি ঠিকাদার কোম্পানীর বাবুর বাড়িতে কাজ করে। বাঁশবাবু যাঁর নাম। পরেশনাথের বাবা মানিয়া তাঁকে ভালো চেনে। দুধ দেয় তাঁর বাড়ি। মাথায় একটা ঝুড়ি নিয়ে গেছিল টেটরা-চাচা মুলেন সাহেবের বাংলোর হাতায় এখনও যে পেয়ারা গাছ আছে, তা থেকে পেয়ারা পাড়তে। আমের দিনে আমও পাড়ে। ভাল্লুকদের সঙ্গে তখন টেটরা-চাচার রেষারেষি। গরমের সময় এইসব আমগাছের দখল নেয় ভাল্লুকেরা। মুলেন সাহেব মরার সময় সমস্ত আমবাগান যেন ওদেরই ইজারা দিয়ে গেছিল। গভীর জঙ্গলের মধ্যে বলে দিনের বেলাতেও ভাল্লুকেরা এখানে আমগাছে আম পেড়ে খায়। একবার একটা ভাল্লুক টেটরা-চাচাকে তাড়া করে পিছন থেকে এক খাবলা মাংস তুলে নিয়েছিল। একদিন ধুতি তুলে পিছনের গর্ত হয়ে-যাওয়া জায়গাটা দেখিয়েছিল টেটরা, পরেশনাথকে।

কোথায় চললে চাচা? পরেশনাথ হাসিমুখে বলল।

টেটরা হাসল। বলল, বাসারীয়া।

তারপর বলল, যাওয়া-আসাই সার। বস্তিতে পয়সা দিয়ে আমরুত্ খাবে এমন লোক কই? যেতে পারতাম যদি চিপাদোহর, তাহলে হয়তো স্টেশনে কী হাটে বিক্রি করতাম কিছু। যাওয়া-আসা অনেক খরচের। কিছুই নাফা থাকে না। সময়ও লাগে বিস্তর। দিনকাল বড় খারাপ রে পরেশনাথ!

পরেশনাথ বলল, হুঁ। ও জানে। ওর বাবা-মা সব সময়েই, উঠতে-বসতে খালি এই কথাই বলে : দিনকাল বড় খারাপ। দিন আর কাটতেই চায় না।

টেটরা মাথার ঝুড়িটা পথের পাশের পাথরে নামিয়ে রেখে একটা বিড়ি ধরালো। পরেশনাথকে শুধলো, তোর বাবা কেমন আছে? অনেকদিন দেখা হয়নি। আগের সপ্তাহে যখন হাটে গেছিলাম, তখন হাট ভেঙে গেছে। গোদা শেঠ পয়সা দিতে এতই দেরি করল যে, হাটে গিয়ে কিছু কিনতেই পারলাম না। অথচ সেই সকাল থেকে বসেছিলাম তার গদির বারান্দায়। বেচা-কেনা করল, হিসেব মেলাল, তারপর বাড়িতে খেতে গেল। খেয়ে-দেয়ে এসে ঢেকুর তুলতে তুলতে যখন পয়সা দিলো, তখন বেলা শেষ।

টেটরার এই কথায় কোনো অভিযোগ, অনুযোগ বা রাগ ছিল না। ঘটনা বলার মতো, যা ঘটেছিল, তাই-ই বলেছিল পরেশনাথকে। আস্তে আস্তে, থেমে থেমে, বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে।

টেটরা পরেশনাথের বাবা মানিয়া, তাদের গ্রাম ও আশ-পাশের গ্রামের যত লোককে জানে-শোনে মানিয়ারা, তাদের কারো মধ্যেই কোনো উত্তেজনা নেই। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, ঝড়, দুর্যোগের মতোই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে এখানকার সকলেই যার যার নিজের জীবনে এইরকমই হয়, বা হবে মনে মেনে নিয়েছে। পরেশনাথের বাবা যেমন নিয়েছে, পরেশনাথ, হয়তো পরেশনাথের ছেলে ও এই নির্লিপ্ত সর্বংসহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হবে। শিশু থেকে যুবক, যুবক থেকে বৃদ্ধ, তারপর একদিন নিদিয়া নদীর পাড়ের শ্মশানে চৌপাইতে করে চলে যাবে। জঙ্গলের পথে-পথে, পথের ধুলোয়, কাঠপুত্রী গাছের পাতায়, কাঁকোড়ের ঝোপে-ঝোপে ‘রাম নাম সত্ হ্যায়,’ ‘রাম নাম সত্ হ্যায়’ কথাগুলো কিছুক্ষণ ঠিকরে ফিরবে। তারপরই, আবার মন্থর, চাঞ্চল্যরহিত ঝিঁঝির ডাক, কথাগুলোকে গ্রাস করে ফেলবে।

টেটরা বিড়িটা শেষ করে উঠল।

ঝুড়ি থেকে দুটো পেয়ারা তুলে বলল, নেঃ, তুই একটা খাস, বুলকিকে একটা দিস। তারপর, চলে যাওয়ার আগে বলল, গাই-বয়েলগুলোকে ঢালের দিকে যেতে দিস না আজ। হাতি আছে। আমি আমরুত্ পাড়ার সময় ডাল ভাঙার শব্দ শুনেছি। পুরো দল আছে। কান খাড়া করে রাখিস আজ।

যখন পরেশনাথ একা বসে থাকে অলস দুপুরে, গাই-বয়েলগুলো যখন গলায় কাঠের ঘণ্টা দুলিয়ে চারিদিকে পটাস পটাস্ করে ঘাস পাতা ছিঁড়ে খায়, নরম রোদটা পিঠের ওপরে পড়ে, বুই-বুঁ-বুঁইই-ই-ই করে রোদের মধ্যে কাচপোকা ওড়ে, জঙ্গল থেকে নানারকম ফুলের গন্ধ, পাখির ডাক ভেসে আসে, কাঠের ঘণ্টাগুলো ঘুমপাড়ানি সুর তোলে, তখন পরেশনাথের ঘুম পেয়ে যায়। ঘুমের মধ্যে ও শোনে, তারা যেন কানের কাছে বলে, ‘রাম নাম সত্ হ্যায়’।

কথাটার মানে কী? মানে ও জানে। কিন্তু কথাটা বলা হয় কেন? রাম কি আছে? পরেশনাথের বাবা কথায় কথায় বলে, হায় রাম! বা হায় ভগ্যান।

ভগবান কি আছে? থাকলে, পরেশনাথের বাবা-মার এত কথার একটাও ভগবান শোনে না কেন? কেন খরগোশ এসে চীনেবাদাম খায়? দিনে হরেকরকম পাখি এসে কেন ফসল খেয়ে যায়?’ আর রাতে শুয়োর, হরিণ, শজারু? কেন এত কষ্টে পাথর-কেটে-করা বস্তির আশেপাশের ধানের ক্ষেতেও হাতির দল নেমে এক রাতে সমস্ত ফসল সাবাড় করে? কেন্ গোদা শেঠ টেটরা-চাচার সঙ্গে, তার বাবার সঙ্গে, এত এত লোকের সঙ্গে, এমন ব্যবহার করে? কেন এত ইচ্ছে থাকতেও ও একটাকা দিয়ে বুলকি দিদিকে একটা পুঁতির মালা কিনে দিতে পারে না? কেন? কেন?

পরেশনাথ ওর দিদিকে ভালোবাসে। দিদির মুখটা কী সুন্দর! মায়ের চেয়েও সুন্দর। কী সুন্দর করে কথা বলে দিদি। একবার পরেশনাথ বাসারীয়ার হাটে মোটরে করে কোথা থেকে যেন বেড়াতে-আসা দিদিরই সমবয়সি একটি মেয়েকে দেখেছিল। বাবুদের মেয়ে। তার কী সুন্দর জামাকাপড়, কী দারুণ লাল জুতো, মাথার চুল, হাসি, সব। আহা! পরেশনাথ ভাবে, ওর দিদির যদি অত সব থাকতো, তবে বুলকি দিদিকে না-জানি কী সুন্দরই দেখাতো!

ঠিক আছে, আজ কাঁকোড়ের ফল নিয়েই যাবে দিদির জন্যে। নেবেই খুঁজে পেতে, এক কোঁচড়।

কোজাগর – ৬

মানি ওরাওঁ-র বউ, পরেশনাথের মা মুঞ্জরী, তার মেয়ে বুলকিকে পাঠিয়েছিল গোদা শেঠের দোকানে। একটু নুন, আর সরগুজার তেল আনতে। বহুদিন হয়ে গেছে সর্ষের তেলের স্বাদই ভুলে গেছে ওরা। স্বাদ ভুলে গেছে জিভ; ভুলে গেছে শরীর। তেল মাখলে যে কেমন দেখায় তাকে, মুণ্ড্রী আজ তা মনেও করতে পারে না। রুক্ষ দিন, রুক্ষ চুল, রুক্ষ শরীর, রুক্ষ মেজাজ। প্রকৃতিতে রুক্ষতা।

সর্ষের তেল দিয়ে আলু ভেজে খেতে কেমন লাগে? ভাবতেও জিভে জল আসে মুঞ্জরীর। ওর নিজের জন্যে আজকাল আর কোনো কষ্ট নেই। কচি-কচি ছেলেমেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকানো যায় না। মাথায় তেল নেই, পরার জামা-কাপড় নেই, পেটের খাবার নেই। অথচ, তবু বেঁচে থাকতে হয়। শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য সূর্য ওঠা থেকে সূর্যাস্ত অবধি কী-ই না করতে হয়!

একমাত্র চৌপাইটা ঘরের বাইরে এনে, গায়ে দেওয়ার কাঁথা-কম্বলগুলো সব রোদে দিচ্ছিল মুঞ্জরী। যা-হোক করে দুটো মকাই ফুটোতে হবে। দুপুরের জন্যে। কিছু জংলি মূল আছে ঘরের কোণায়। পরেশনাথ আর বুলকিই নিয়ে এসেছিল খুঁড়ে খুঁড়ে জঙ্গল থেকে। তাই একটু ভেজে দেবে সরগুজার তেলে। ওদের খাওয়া-দাওয়ার সাধ চলে গেছে। কিন্তু পরেশনাথ আর বুলকি? ওরা যে বড়ই ছোট!

হঠাৎই ওর বুকের মধ্যেটা ধক্ করে উঠল। হাতের কাঁথা মাটিতে ফেলেই দৌড়ে গেল মুঞ্জরী মকাই ক্ষেতের দিকে। দিগন্তের ওপারে সবুজ গাছ-গাছালির মাথা ওপরে এক চিলতে সবুজ মেঘ কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে আসছে।

সুগা! সুগা! হারামজাদা! মনে মনে মুঞ্জরী বলল

কিন্তু একা কী করবে বুঝতে পারল না ও। এই মকাইটুকুই সামনের বছরের ভরসা। যে মকাই খেয়ে আছে এ-বছরে, তা গত বছরের শুকনো মকাই। এতবড় টিয়ার ঝাঁক কী করে ও সামলাবে একা? মুঞ্জরী কাকতাড়ুয়াটা এদিক-ওদিক ঘোরাতে লাগল। আর শরীরের সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ করে সেই আগন্তুক অসংখ্য শত্রুর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইল।

এখন বুলকিটা থাকলে ভালো হতো। কোথায় যে আড্ডা মারতে বসল ছুঁড়ি! মুঞ্জরী চেঁচিয়ে ডাকল, এ বুলকিয়া বুলকিয়া রে…..। কিন্তু চোখ সরালো না ওদিক থেকে। সবুজ মেঘটা কাঁপতে কাঁপতে আসছে। এখন আর মেঘ নেই, কতকগুলো ছোট ছোট সবুজ কম্পমান বিন্দু ক্রমশ ছোট থেকে বড় হচ্ছে আর তিরবেগে এগিয়ে আসছে। বড় বয়ের গাছটার আড়ালে খুব ধীরে-সুস্থে আসতে দেখল ও বুলকিয়াকে। যেন ঘুমের মধ্যে হেঁটে আসছে ছুঁড়ি।

চিৎকার করে উঠল মুঞ্জরী, এতক্ষণ কী করছিলি?

এতক্ষণে বুলকিরও চোখ গেছে আকাশে।

এবারে টিয়াগুলোর ডাক শোনা যাচ্ছে—ট্যা ট্যা ট্যা। ডাক নয়, যেন কর্কশ চাবুক! বুলকি জোড়ে দৌড়ে আসছিল। গায়ে কোনোক্রমে জড়িয়ে-রাখা দেহাতি ময়লা মোটা শাড়িটার আঁচলটা পিছনে লুটোতে লাগল। একহাতে নুন আর অন্যহাতে তেলের শিশি ধরে দৌড়ে আসছিল বুলকি মায়ের দিকে।

মুঞ্জরী চেঁচিয়ে উঠল, আস্তে আয় মুখপুড়ি! তেল যদি পড়ে, তাহলে তোর চুলের ঝুঁটি ছিঁড়বো আমি।

বুলকির চোখ দুটো স্থির। দুই আদেশ একই সঙ্গে মেনে নিয়ে যথাসম্ভব সাবধানে মায়ের পাশে এসে দাঁড়ালো। তেলের শিশি আর নুনটা তাড়াতাড়ি পাথরের ফাঁকে রেখেই।

ততক্ষণে টিয়াগুলোও এসে গেল।

মা ও মেয়ে একই সঙ্গে দু-হাত নেড়ে যতো জোরে পারে চিৎকার করতে লাগল। কাকতাড়ুয়ার কালো হাঁড়ির মাথায় সাদা চুনে আঁকা মুখ-চোখ-কান বোঁ-বোঁ করে ঘুরতে লাগল। ন্যাকড়া আর খড়ের তৈরি হাত দুটো বাঁই-বাঁই করে চক্রাকারে আন্দোলিত হতে লাগল। কিন্তু সর্বনেশে সুগার ঝাঁক কিছুতেই ভয় পেলো না। পাখিগুলো প্রায় পেকে-আসা মকাইগুলোর ওপরে এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মকাই গাছগুলো টিয়াদের শরীরের ভারে বেঁকে গেল। হেলতে-দুলতে লাগল। গাছে দু-পা বসিয়ে লাল-লাল বীভৎস ঠোঁট বেঁকিয়ে টিয়াগুলো মকাই খেতে লাগল।

মুঞ্জরী আর্তনাদ করে উঠল। পাগলের মতো দু-হাত তুলে এদিকে-ওদিকে দৌড়োতে লাগল। ওর শাড়ির আঁচল খসে গেলো। দুটি রুক্ষ, খড়ি-ওঠা স্তন ঝুলে পড়ল। দুলতে লাগল। চুল উড়তে লাগল রুক্ষ হাওয়ায়। আর ওর বিস্ফারিত চোখের সামনে টিয়াগুলো মকাই খেতে লাগল। এত বড় টিয়ার দল আগে দেখেনি কখনও মুঞ্জরী। পুঙ্গপালের মতো। মুঞ্জরী বুঝতে পারল, এইভাবে চললে আর পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে সব মকাই শেষ করে দেবে সুগাগুলো। মা ও মেয়ে দু-জনেই রণচণ্ডী মূর্তিতে আপ্রাণ আস্ফালন করছিল। কিন্তু নিষ্ফল। আকুল হয়ে বধির ভগবানকে ডাকতে লাগল মুঞ্জরী।

ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ দু-ম্ করে একটা আওয়াজ হলো। তার পরেই পরপর কয়েকটা বোমা ফাটার মতো আওয়াজ।

মুঞ্জরী ও বুলকি চমকে উঠল। চমকে উঠল টিয়াগুলোও। ওরা পড়ি-কি-মরি করে মকাই ক্ষেত ছেড়ে পাখার ভর্র্র্র্, ভর্র্র্র্, শব্দ করে, ট্যা…টা…করে ডাকতে ডাকতে এক এক করে উঠলে লাগল। হঠাৎ ভার মুক্ত হওয়ায় মকাইয়ের মাথাগুলো জোরে আন্দোলিত হতে লাগল। দেখতে দেখতে পলাতক টিয়াগুলো সবুজ কম্পমান অসংখ্য বিন্দুতে আবার রূপান্তরিত হয়ে গিয়ে একাত্ম হয়ে গেল দ্রুত অপসৃয়মাণ এক সবুজ মেঘে।

মুঞ্জরী ও বুলকি দু-জনেই এদিক-ওদিক চাইল, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলো না। ওদের দুজনেরই ভারি অবাক লাগছিল। কী করে এরকম হলো: কে এই সময় এমন করে তাদের বাঁচালো! কেউ কোথাও নেই। মাথার ওপরে ঝক্‌ঝক্ করছে রোদ্দুর। দোলাদুলি-করা মকাই গাছগুলো, নীল আকাশে সবুজ দিগন্ত মেশা। কে এই দেবদূত?

এমন সময় ক্রিং-ক্রিং করে একটা সাইকেলের ঘণ্টা বাজল। আর ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই হোঃ হোঃ করে যেন হেসে উঠল। উদ্দাম, আগল-খোলা হাসি।

অ্যাই!

বুলকিই প্রথম দেখেছিল।

মুঞ্জরী তাড়াতাড়ি শাড়ি ঠিক করে নিলো।

একটা ঘন নীল-রঙা ফুল প্যান্টের ওপর ঘন লাল-রঙা ফুল হাত। শার্ট পরে এক পা মাটিতে নামিয়ে অন্য পা প্যাডেলে রেখে নানকুয়া হাসছিল তখনও হোঃ হোঃ করে।

মুঞ্জরী আদর ও প্রশংসা মেশানো গলায় বলল, নানকুয়া। অ্যাই নানকুয়া। ভগবানই তোকে পাঠিয়েছিল রে নানকুয়া। বলতে বলতে দৌড়ে গিয়ে নানকুয়ার মাথাটাকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো।

নানকুয়া বলল, আরে, আমার চুল, চুল ছাড়ো মাসি।

বলেই, নিজের মাথাটাকে মুঞ্জুরীর হাত থেকে মুক্ত করেই বুক-পকেট থেকে একটা হলুদ-রঙা প্লাস্টিকের চিরুনি বের করে সাট্ সাট্ করে চুলটা আঁচড়ে নিলো। তারপর দাঁড়-করানো সাইকেল থেকে নেমে পড়ে বলল, ভগবান পাঠালো মানে? আমিই তো ভগবান।

তারপর বলল, চলো মাসি।

নানকুয়া মুঞ্জুরীর আপন বোনপো নয়। বোনপোর বন্ধু। ওরা দুজনেই কয়লাখাদে কাজ করতো। মুঞ্জরীর বোন-ভগ্নীপতি, ছেলে বদলি হওয়াতে চলে গেছে কার্কা কোলিয়ারীতে। সে, শুনেছে নাকি বহুদূরে। তিন টাকা নাকি ভাড়া লাগে বাসে, ফুলদাওয়াই স্টেশন থেকে। মহুয়ামিলন স্টেশন থেকে দু টাকা ট্রেনে। কার্কা ঠিক কোনদিকে, মুঞ্জরী জানে না। তার বোনপো আশোয়া চলে গেছে বটে, কিন্তু এই ভালুমারের এক অপাংক্তেয় ছেলে নানকুয়া ওদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে। ভালুমার গ্রামে নানকুয়াকে সকলেই জানে। ভালোবাসে।

নানকুয়ার ঠেলে-আনা সাইকেলের চাকায় কিকির্ আওয়াজ হচ্ছিল। ওরা তিনজনে মুঞ্জুরীর ঘরের দিকে হেঁটে চলল।

একটা দাঁড়কাক ডাকছে আমগাছের মগডাল থেকে কা-খা করে। এখন সূর্য ঠিক মাথার ওপরে। এর পরেই সূর্য পশ্চিমে হেলতে শুরু করবে। তখন সব কাজই তাড়াতাড়ি হাত চালিয়ে করতে হবে ওদের। রাতকে ওদের বড় ভয়। অনেক কারণে।

নানকুয়া বলল, মেসো কোথায়?

মুঞ্জরী বিরক্ত গলায় বলল, তোর মেসোই জানে। বলদ দুটো ভাড়া দিয়েছিল মাহাতোর জমি চাষের জন্যে। তার ক’টা টাকা পাওনা আছে। তিন মাস হলো সে টাকা আদায় করতে পারছে না। গেছে, সেই টাকার তাগাদায়। ফেরার সময় কাঠ কেটে আনবে। শীতটা এবারে এত তাড়াতাড়ি পড়েছে! সন্ধের পর আগুন না জ্বালালে…।

নানকুয়া সাইকেলটা একটা পেয়ারা গাছে ভর দিয়ে রেখে চৌপাইতে এসে বসল। আসার সময় সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলানো একটা থলি নিয়ে এলো। বুলকিকে বলল, এটা নিয়ে যা বুলকি।

এতে কী আছে রে? মুঞ্জরী শুধোলো।

তাচ্ছিল্যের সুরে নানকুয়া বলল, এই একটু খাবার-দাবার।

কেন এসব করিস তুই! রোজ রোজ এরকম করা ভালো না। তুই ঘর করবি, সংসার করবি, এমন করে পরের জন্যে টাকা নষ্ট করতে নেই।

ছাড়ো! বলল নানকুয়া।

মুঞ্জরী বলল, বোস্, আমি এক্ষুনি আসছি।

বুলকিকে নানকুয়া বলল, বাছুরটা কবে হলো?

সাদা বাছুরটার দিকে তাকিয়ে বুলকি বলল, প্রায় মাসখানেক। একটাই তো গাই আমাদের। বাঁশবাবু আর পাগলা সাহেবের কাছে দুধ বিক্রি করছে বাবা।

নানকুয়া বলল, ভালো। তাও যতদিন গোরুটার বাঁটে দুধ থাকে, কিছু রোজগার হবে।

ঘরে গিয়ে থলিটাকে উপুড় করল মুঞ্জরী। চোখ দুটো আনন্দে, লোভে, চক্‌চক্‌ করে উঠল। বুলকি ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল ঘরে। খুশিতে বুলকি দাঁত বের করে হাসল। অনেকখানি চাল, চানার ডাল, আলু-পেঁয়াজ এবং চোখকে বিশ্বাস হলো না—শুয়োরের মাংস! কত দিন যে মাংস খায়নি ওরা। কতদিন, তা মনেও পড়ে না।

মুঞ্জরী মুখ থেকে লোভ ও খুশির ভাব মুছে ফেলে, মুখে স্বাভাবিক ভাব ফুটিয়ে বাইরে এসে বলল, আজ তো হাটিয়া ছিল না। আনলি কোথা থেকে?

ছিল ত! টিমার-এ। কাজে গেছিলাম। তাই, তোমাদের জন্যে…

ওহো! মুঞ্জরী বলল। খেয়ে যাবি তো?

নাঃ, নাঃ, আমি ফিরে যাবো। ট্রেন ধরব মহুয়ামিলন স্টেশন থেকে। গ্রামে তো সব হপ্তাতেই আসি। কিন্তু তোমার কাছে বহুদিন আসা হয় না। এলাম তাই। তোমার বাড়িটা বড় দূরে।

গ্রামের মধ্যে থাকব এমন সামর্থ্য কোথায়? সারা জীবন তো পরের জমিতে আবাদ ফলিয়েই কাটল।

নানকুয়া কথা ঘুরিয়ে বলল, মেসো আসবে কখন? কথা ঘোরাল, কারণ নানকুয়ার এই হতাশা ভালো লাগে না। এখানকার সব ক’টা মানুষই এরকম!

তোমার মেসোই জানে। তারপর বলল, টুসিয়ার সঙ্গে দেখা হয়? কই আর হয়! বহুদিন দেখা হয় না। আছে কেমন ওরা সব?

মিথ্যে কথা বলল নানকুয়া।

ভালোই আছে।

নানকুয়া বলল, কেনই বা খারাপ থাকবে? যার এমন কেউ-কেটা ভাই!

মুঞ্জরী হাসল। বলল, তার ভাইয়ের কথা বুঝি না। কিন্তু তোর মনের কথা বুঝি। শুধোলো, ডাকতে পাঠাবো নাকি ওকে? …যা ত বুলকি, টুসিয়া দিদিকে ডেকে নিয়ে আয়। বলবি, নানকু ভাইয়া এসেছে।

বুলকি উঠে চলে গেল।

বেশ কিছুদূর গেছে বুলকি, এমন সময় মুঞ্জরী ধমক দিল ওকে, অ্যাই ছুড়ি, আবার! তোর ঠ্যাং ভেঙে দেবো আমি।

হঠাৎ ধমকে, বুলকি চমকে উঠল।

বুলকি ও পরেশনাথকে বার বার মানা করা সত্ত্বেও ওরা কখনোই কথা শুনবে না। সরগুজার ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ওদের শর্ট-কাট না করলেই নয়। কতোগুলো গাছকে যে শুইয়ে ফেলেছে তা বলার নয়। দুই ভাইবোনে রীতিমতো আলাদা একটা পায়ে-চলা পথ বানিয়ে ক্ষেতের ওপর দিয়ে যাতায়াত করে। পরিষ্কার দেখা যায় সেই পথের চিহ্ন। সবুজ সতেজ গাছে হলুদ ফুল। তার মধ্যে দিয়ে পায়ে-চলা মাটির পথ। ফসল থাকুক কী না-থাকুক ওরা গ্রাহ্য করবে না কখনও। সব সময়ই নিজেদের পায়ে-বানানো ঐ পথেই যাবে বজ্জাত দুটো।

বুলকি ধমক খেয়ে সোজা রাস্তা ধরল। কিন্তু মুঞ্জরী জানে যে, দুই ছেলেমেয়ের কেউই, ওর কি মানিয়ার কথা শোনো না। এতো কষ্ট, এতো খিদে, তবুও কী যে ঘোরের মধ্যে থাকে দু ভাইবোনে সব সময়, কী নিয়ে যে এত হাসাহাসি করে, এ ওর গায়ে ঢলে পড়ে, তা ওরাই জানে। দেখলে গা জ্বালা করে মুঞ্জরীর।

বুলকি চলে গেলে মুঞ্জরী বলল, তুই সময় মতো না এসে পড়লে আজ বড় সর্বনাশ হয়ে যেতো। কিন্তু কী দিয়ে আওয়াজ করলি রে?

নানকু পকেট থেকে লাল-নীল পাতলা কাগজে মোড়া একমুঠো আছাড়িপকা বের করল।

বলল, এই নাও। রেখে দাও।

মুঞ্জুীকে চিন্তিত দেখালো। বলল, ফরেস্ট গার্ড ধরবে না?

ধরলেই-বা কি? মানুষ কি মরে যাবে নাকি? বাঘের বংশ বৃদ্ধি হচ্ছে হোক, কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই থেকে রইস্ আদমিরা এসে জানোয়ার দেখে যাচ্ছে যাক। তা বলে কি তোমরা জানোয়ারের চেয়েও অধম? মানুষ মেরে জানোয়ার বাড়াতে হবে, এ-কথা কোন আইনে বলে?

কিন্তু…। মুঞ্জরী বলল, তোর মেসো একবার হাতি তাড়াবার জন্য চিপাদোহর থেকে নিয়ে আসা পটকা ফুটিয়েছিল বলে তার পরের দিন ফরেস্ট গার্ড ওকে ধরে নিয়ে গেল। খুব মারপিট করেছিল ওকে। বলেছিল, কোনো জানোয়ারকে যেন একটুও বিরক্ত করা না হয়। করলে দাঁত খুলে নেবে।

মেসো কিছু বলল না? কাঠের কূপ্ কাটা তো এ তল্লাটে প্রায় বন্ধই! যা কাটা হচ্ছে, তা বহু দূরে। কূপ্ কেটে যে ক’মাস কিছু রোজগার হতো, তা তো গ্রামের লোকের এখন নেই। যার যতটুকু জমি আছে, তাতে বছরের দু-মাসের ফসলও হয় না। তা লোকেরা খাবে কী? …তোমরা এত লোক যে প্রায় না-খেয়ে আছো, সব ফসল নষ্ট করছে জানোয়ারে, তোমরা কেন দরবার করো না ওপরে?

মুঞ্জরী বলল, ওপরওয়ালা যে কে তাই-ই তো জানা নেই। তাছাড়া, কে করবে? আমরা কি লেখাপড়া জান্?ি তা সত্ত্বেও কাকে ধরে যেন আর্জি পাঠিয়েছিল সকলে মিলি। তোর মেসোও টিপ সই দিয়েছিল। সেই দরখাস্তে নাকি ওরা বলেছিল যে, বাঘোয়া পোজ আর দেখনেওয়ালাদের থেকে যে পয়সা পাচ্ছ, তার কিছু জঙ্গলের মধ্যের গরিব লোকদের দেওয়া হোক, যাতে তারা না-খেয়ে মারা না যায়। কিন্তু কই? কিছু তো হলো না।

নানকু একটা সিগারেট বের করল প্যাকেট থেকে। টিনের লাল-নীল রঙা পেট্রল-লাইটার বের করে ফিচিক্ আওয়াজ করে সিগারেটটা ধরাল। তারপর অনেকখানি ধুঁয়ো ছেড়ে বলল, দেখি, আমি কী করতে পারি!

মুঞ্জরী নানকুর দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, নানকুর মতো বিদ্বান, বুদ্ধিমান ও সাহসী ছেলে এ-অঞ্চলের দশটা গাঁয়ে নেই। নেশা করে না নান্‌কু। শুধু সিগারেট খায়। তাই তো এত পয়সা জমাতে পারে। মাইনে তো কয়লাখাদের সকলেই ভালো পায়, কয়লাখাদগুলো সরকার নিয়ে নেওয়ার পর। কিন্তু রোজের দিনেই তার অনেকখানিই উড়ে যায় ভাঁটিখানায়। তার ওপর যেদিন হাট, ওদের মধ্যে অনেকই ভালো-মন্দ কেনে। সেরা জিনিসটা। মোর্গা কেনে। ধার শোধ করে। হপ্তার মাঝামাঝি এসে আবার ধার হয়ে যায়। তবুও বাবুদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যে নানকুয়ারা অনেক কিছু কিনতে পারে আজকাল, একথা ভেবেও ভালো লাগে মুঞ্জরীর। যুগ-যুগান্তর ধরে যে বাবুরাই ওদের চোখের সামনে সবকিছু কিনে নিয়ে গেছে।

এখন ওদের দিন।

সরকার এখন ওদের নিয়ে নাকি অনেক ভাবছেন। অনেক আইন-কানুন হচ্ছে নাকি! নানকু বলে, ওরাই ত দেশের নিরানব্বই ভাগ। শহুরে বাবুরা ত এক ভাগও নয়। এই সাঁওতাল, ওরাওঁ, চামার, মুচি, কাহাররা। এই দোসাদ, ভোগতা, মুণ্ডারা। আরো কতো আছে ওদের মতো। ওরা ভালো না-থাকলে, বড়লোক না-হলে দেশ এগোবে কী করে? অনেক নাকি ভালো দিন পড়ে আছে ওদের সামনে। নানকু একদিন বলেছিল যে, মুঞ্জরীর পরেশনাথও স্কুলে লেখাপড়া শিখে কলেজ থেকে পাস করেই কী একটা ইম্‌তেহানে বসলেই নাকি পুলিশ সাহেব, ডি-এফ-ও সাহেব এমনকী ম্যাজিস্টের সাহেবও হয়ে যেতে পারে।

পরেশনাথটাকে স্কুলে পাঠানো গেল না।

মুঞ্জরীর চোখের দৃষ্টি বিকেলের রোদের মতো বিধুর হয়ে উঠল। একটা চিফিচিয়া পাখি চিফিচ্ করে ডাকছিল ওদের ঘরের পেছন থেকে।

আহা! ওদের দু’জনের জীবন তো প্রায় শেষ হয়েই এসেছে। ভালো থাকুক নানকুয়ারা। ভালো থাকুক পরেশনাথ। বড় হোক। বড় কষ্ট ওদের, এতো কষ্ট মা-বাবা হয়ে চোখে দেখা যায় না। ভালো বিয়ে হোক বুলকির। সাবান মাখুক, তেল, মাখুক, রোজ ভাত-রুটি খেতে পাক। সুন্দর ছেলে-মেয়ে হোক। এমন ধুলোর মধ্যে, লজ্জা মধ্যে, খিদের মধ্যে, এমন অবহেলায় হেলাফেলায় যেন পরেশনাথ আর বুলকির ছেলেমেয়েরা বড় না হয়। এই জীবন ত জানোয়ারদের চেয়েও অধম।

পরেশনাথ আর বুলকির ভবিষ্যৎ-এর কথা ভাবতে ভাবতে নানকুয়ার সামনে মাটিতে ছেঁড়া চাটাই পেতে বসে বাজার দানা থেকে ধুলো বাছছিল মুঞ্জরী কুলোর মধ্যে করে। রোদে পিঠ দিয়ে, আধশোয়া হয়ে।

এমন সময় হঠাৎ মানিয়াকে আসতে দেখা গেল। মানিয়া বেড়ার পাশ দিয়ে হেঁটে আসছে, কিন্তু পা-দুটো যেন ঠিক মতন পড়ছে না। ও যেন ভেসে আসছে।

সোজা হয়ে বসল মুঞ্জরী। চোখের দৃষ্টি রুক্ষ হয়ে উঠল ওর। মানিয়ার সঙ্গে কাঠ নেই। খালি হাত। টাঙ্গিয়া পিঠে টাঙানো

নানকু বলল, পিয়া হুয়া হ্যায় মালুম হোতা!

তারপর স্বগতোক্তির মতো বলল, বুঝলে মাসি, নেশাই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। আমাদের কাউকেই কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না এই ভাঁটিখানাগুলো। পারলে, আমি কয়লাখাদের বুলডোজার দিয়ে সব ভাঁটিখানা ভেঙে গুঁড়ো করে মাটিতে মিশিয়ে দিতাম। যারা খেতে পায় না, বউকে খাওয়াতে পারে না, ছেলেমেয়েকে খিদের সময় একমুঠো বাজা দিতে পারে না, তাদের নেশা করার কী যুক্তি আছে? বড় খারাপ, বড় খারাপ এসব।

মুঞ্জরী ছেলেমানুষ নানকুর সামনে মানিয়ার এরকম বেলেল্লাপনা সহ্য করতে পারলো না। ঐ আসছে আর স্বামী, মাতাল, অপদার্থ, নচ্ছার। মানিয়ার দিকে তাকিয়ে ঘেন্নায় মুঞ্জরীর গা রি-রি করতে লাগল। মানিয়া আমগাছটার কাছে এসে পৌঁছেছে, এমন সময় মুঞ্জুরী হাতের কুলোটা মাটিতে ফেলে দিয়ে ঝড়ের মতো দৌড়ে গেল মানিয়ার দিকে। কুলো থেকে বাজরাগুলো সব গড়িয়ে পড়ে ধুলোয় মিশে গেল।

দূর থেকে মানি তার পরিচিত শাড়ি পরা বউয়ের চেহারাটা দেখতে পেয়েছিল একটা অস্পষ্ট ছবির মতো। ওদের ঘর, আমগাছটা, তেঁতুল গাছটাও। কে যেন বসে আছে চৌপাইতে।

কে?

মানিয়া একটা ঘোরের মধ্যে হেঁটে আসছিল। মাথায় বড় ভার।

এতদিন পরে অনেকবার ঘুরিয়ে মাহাতো তাকে আজ টাকা দিয়েছিল। পনেরো টাকা। যদিও, পাওনা হয়েছিল পঁয়তাল্লিশ। এতগুলো টাকা হাতে পেয়ে বড় আনন্দ হয়েছিল ওর। বড় কষ্টে থাকে মানি। জন্ম থেকেই বড় কষ্ট করেছে। সে-কষ্ট লাঘব করার কোনো ক্ষমতা ওর দুর্বল হাতে নেই। ও জানে, যে-ক’দিন বাঁচবে এমনি করেই মরে মরে বাঁচতে হবে। এই মরে থাকার মধ্যে এক ঘণ্টা, দু-ঘণ্টা, তিন ঘণ্টার একমাত্র খুশি এই মদ; পচাশী।

মাহাতোর বাড়ি থেকে সোজা ভাঁটিখানায় গেছিল ও। শুঁড়ি বলেছিল, কী ব্যাপার রে মানিয়া? আজ তো হাটবার নয়?

মানিয়া বহুবছর বাদে একটু বড়লোকের মতো হেসেছিল।

আয়না নেই ওর। ওর বড় ইচ্ছে করে বড়লোকের মতো হেসে একদিন আয়নায় দেখে ওকে কেমন দেখায়। হেসেই ও পাঁচ টাকার নোটটা বাড়িয়ে দিয়েছিল শুঁড়ির দিকে। তারপর বাকি টাকা পয়সা ফেরত নিয়ে বোতল দুটো নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে একটা নির্জন জায়গায় এসে বসেছিল, শুকিয়ে-যাওয়া পাহাড়ী নদীর বালিতে। পাথরে পিঠ দিয়ে বসে রোদের মধ্যে আরাম করে আস্তে-আস্তে ছোট-ছোট চুমুকে অনেকক্ষণ ধরে শেষ করেছিল বোতল দুটো। পাখি ডাকছিল জঙ্গলের গভীর থেকে। বুলবুলি, টিয়া, ফিফিচিয়া, পাহাড়ী ময়না। ফিসফিস্ করছিল অস্পষ্ট হাওয়াটা পাতায় পাতায় করাউনির হলুদ ফুলগুলো হাওয়ায় দোলাদুলি করছিল। লজ্জাবতী লতার মতো লতানো সবুজ লতার গায়ে গায়ে লাহেলাওলার লাল ফুলগুলো নড়ছিল আস্তে আস্তে। মানিয়ার নেশাও হচ্ছিল আস্তে আস্তে। ওর মধ্যে কবিত্ব জাগছিল। লাহেলাওয়ার লাল গুটি ধরা ফুলের দিকে চেয়ে হঠাৎ মানিয়ার মনে হলো, ওদের বিয়ের সময় মুণ্ড্রীর বুকের বোঁটার রং এমনি লাল ছিল। এখন কেমন বয়ের ফলের মতো কালো, দড়কচ্চা মেরে গেছে। সব ওরই দোষ। ও মরদ নয়। আওরাতকে যত্নে রাখতে পারেনি মানিয়া! একজোড়া রাজঘুঘু, বড় পাণ্ডুক এসে বসল সামনের পন্ননের ডালে। ঘুঘুর বুক কী রকম নরম, পেলব। মুঠি করে ধরতে কী আরাম। সারা গা গরম হয়ে ওঠে। কী যেন একটা মনে করতে চাইলো, ঘুঘুর বুকের সমতুল্য। মনে পড়ল না ঘুম ঘুম পেতে লাগল ওর। ঐ রোদে বসে নেশা যেমনই চড়তে লাগল, তেমনই মানিয়ার মনে হতে লাগল, এই জঙ্গলেরই উল্টো-পিঠের পাহাড়ে এখন তার সাত বছরের ছোট ছেলে একটা শুকনো মকাই খুঁটে খাচ্ছে গাই-বয়েলের মধ্যে বসে। সারাদিন, সকাল থেকে সূর্যাস্ত অবধি ও পাহাড়েই থাকবে, পঁচিশ নয়া পয়সার জন্যে! আর মানিয়া? সেই ছোট্ট পরেশনাথের বাপ? যে কিনা পাঁচ টাকার মদ কিনে একা একা গিলেছে চোরের মতো! ওদের কারোই জামা নেই গায়ে দেওয়ার। বুলকিটা বড় হচ্ছে। মুঞ্জরী লজ্জায় বাইরে বেরোতে পারে না। আর সে? পাঁচ টাকার পচাশী মদ গিলল!

না, না! বড় খারাপ রে মানিয়া, তুই বড় খারাপ। নিজেকে বলেছিল ও।

ফেরার সময় নিজের হুঁশে পথ চলে নি। সন্ধেবেলায় গোরু যেমন পথ চিনে গ্রামে ফেরে, গুলিখাওয়া জানোয়ার যেমন অর্ধচেতন অবস্থায় নিজের গুহায় ফেরে; ও তেমন করে নিজের বাড়ির দিকে ফিরে আসছিল।

মুণ্ড্রী বাঁ-হাতে মানিয়ার চুলগুলো মুঠিতে ধরে ডান হাতে ধপধপ্ করে মুখে, পিঠে, বুকে বেদম মার মারতে লাগল।

নানকুয়া ভাবছিল, একটু মার খাক। মার খাওয়া দরকার। তারপর ছাড়াবে মানিয়াকে। কিন্তু ইতিমধ্যে বুলকি কোথা থেকে দৌড়ে এলো। ওর আঁচল উড়ছিল হাওয়ায়। মা, মা, মা! কী করছ—বলতে বলতে বুলকি ওর বাবাকে আড়াল করে দাঁড়াল। জোরে বলল, মা, তুমি কী করছ?

মুঞ্জুরীকে রাক্ষুসীর মতো দেখাচ্ছিল। শনের মতো রুক্ষ চুল উড়ছিল বাতাসে। ও বলল, ছুঁড়ি! তোকে জবাবদিহি করতে হবে? ঠাস্ করে এক চড় বসালো মুঞ্জরী বুলকিকে! পাঁচটা আঙুলের দাগ বসে গেল মেয়েটার নরম গালে। এক ধাক্কা মেরে বুলকিকে মাটিতে ফেলে, মানিয়ার পকেট থেকে টাকা-পয়সা সব কেড়ে নিয়ে নিজের আঁচলে আগে বাঁধল, তারপর এক ঠেলা দিলো মানিয়াকে। মুঞ্জরী এতক্ষণ তার চুল ধরে ছিল বলে পড়েনি। এবার ঠেলা খেয়েই মানিয়া দু-পা ছড়িয়ে অসহায় ও হাস্যোদ্দীপক ভঙ্গিতে মাটিতে পড়ে গেল। পড়ে গিয়েই হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।

নানকুয়া গিয়ে ওকে হাত ধরে তুলল। তুলে এনে চৌপাইতে বসালো।

তারপর নরম গলায় বলল, কেন এরকম করিস মেসো। কেন খাস?

মানিয়ার দু-চোখে জল গড়িয়ে পড়ছিল গাল বেয়ে।

মানিয়া জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, দ্যাখ্ নানকুয়া, সে-সব অনেক কথা। তুই ছেলেমানুষ; তুই বুঝবি না। তারপর নানকুর মুখের সামনে ডান হাতের তর্জনী নাড়াতে নাড়াতে, বারবার একই কথা বলে চলল, বড় দুঃখে খাই রে নানকু, বড় দুঃখে খাই; আমার অনেক দুঃখ। বড় দুঃখে খাই। একটা হেঁচকি তুলল মানিয়া। আবারও হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।

নানকুয়া রাগের সঙ্গে বলল, তোমার দুঃখ জীবনেও ঘুচবে না। আমার কী? যত খুশি খাও। শরম বলে কিছু কি নেই তোমার?

মুঞ্জরী ঘরের অন্ধকারে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নানকুর কথা শুনে দেওয়ালে মাথা হেলালো মুঞ্জরী। নিচের দাঁত দিয়ে ওপরের ঠোঁটটাকে জোরে কামড়ে ধরল ও। ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল নিঃশব্দে। লোনা জলে ওর মুখ বুক ভিজে যেতে লাগল। পাছে মুখ ফুটে কোনো শব্দ বেরোয়, তাই ও ঠোঁট কামড়ে রইল। নানকু ছেলেমানুষ। ভাবল মুঞ্জরী। নিরুচ্চারে বলল, তুই অনেক বুঝিস্, কিন্তু সব বুঝিস্ না। তুই এখন বড়লোক। অন্যরকম। তুই আমাদের কথা, এই হতভাগ্য স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের কথা কতটুকু বুঝিস্ রে ছোঁড়া?

যে-হাতে মানিয়াকে মেরেছিল, সেই ডান হাতটা হঠাৎ জোরে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল মুঞ্জরী।

কোজাগর – ৭

হলুক্ পাহাড়টা রীতিমতো উঁচু। সমুদ্র সমতা থেকে কতো উঁচু হবে জানি না, কিন্তু এই পাহাড়ী জনপদ থেকেও হাজার দুয়েক ফিট উঁচু। শীতের জ্যোৎস্না-রাতে চাঁদ ঝুলে থাকে এর মাথার ওপরে ফানুসের মতো। পায়ের কাছে কুয়াশার আঁচল জমে মাঝ রাতে, নীল হয়ে। আর সেই কুয়াশার ওপরে শিশির-ভেজা চাঁদের আলো পড়ে সমস্ত বিশ্ব চরাচর কেমন এক অপার্থিব মোহময় সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। তখন মনে হয় পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো গ্রহেই বুঝি এসে পড়েছি।

এমন রাতে একা একা ঘুরে বেড়াই বনের পথে। শীতের রাতে অদৃশ্য সাপ ও বিছের ভয় নেই বললেই চলে। আর যারা আছে, তাদের পায়ের শব্দ শুনতে না পেলেও অন্য, জানোয়ার ও নিশাচর পাখিদের স্বরে, শুকনো পাতার মচ্‌মচানিতে, কী ডাল ভাঙার আওয়াজে তাদের আনাগোনার খোঁজ পেয়ে যাই আগে ভাগেই। এতো বছর জঙ্গলে থেকে চোখ ও কানের সদ্ব্যবহার করতে শিখেছি।

প্রথম প্রথম খুব শীত লাগে। কিন্তু একটু হাঁটার পরই গা গরম হয়ে যায়। বেরোবার সময় বেশি করে কালাপাত্তি জর্দা দিয়ে দু-খিলি পান মুখে পুরে নিই। গা-গরম করার ওষুধ।

চলতে চলতে থামি। কোথাও বসি। উঁচু এবং ঋজু বড় শিমুলের সমকোণে ছড়ানো ডালের ওপর লেজ ঝুলিয়ে ময়ূর-ময়ূরী বসে থাকে। তাদের পাখা শিশিরে ভিজে যায়। তার ওপর চাঁদের আলো পড়ে বড় ভূতুড়ে দেখায় তখন। কখনও হাততালি দিয়ে উড়িয়ে দিই তাদের মজা দেখার জন্যে। ন্যাপেতে ভারী শরীরে লম্বা লেজে ও বড় বড় ডানায় সপ্ সপ্ শব্দ করে জ্যোৎস্না-স্নাত শিশির-ভেজা গা-ছম্-ছম্ উপত্যকার ওপরে উড়ে গিয়ে ওরা অন্য গাছে বসে। ময়ূর নেহাত দায়ে না-ঠেকলে একসঙ্গে বেশি ওড়ে না। অতবড় শরীর আর লেজ নিয়ে একবারে বেশিদূর উড়তে বোধহয় কষ্ট হয় ওদের।

বছর কয়েক আগে কাড়ুয়া একবার ময়ুরের মাংস খাইয়েছিল। খেতে চমৎকার। মানে এতোই ভালো যে, বলার নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো হোয়াইট মিট। কিন্তু কী করে মানুষে ময়ূর মারে তা ভাবতেও আমার কষ্ট হয়। কী করে মারতে পারে?

টাইগার প্রোজেক হয়ে যাওয়ার পর সমস্ত শিকারির ওপরই কড়া নজর বন বিভাগের। ওয়ালেবস্-এর টাওয়ার বসেছে বেলাতে। আর্ম-গার্ড রাইফেল নিয়ে থাকে সেখানে। কোথাও চোরা-শিকারের খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে জিপ নিয়ে চলে যায় তারা। কাড়ুয়া চোরা-শিকারি। কাড়ুয়ার একটা মুঙ্গেরী দো-নলা গাদা বন্দুক আছে। সেটা এখন আর বাড়িতে রাখে না ও। পাহাড়ের মধ্যের এক গুহায় লুকিয়ে রাখে। সন্ধে হয়ে গেলে ছায়ামূর্তির মতো বেরিয়ে পড়ে বন্দুকটাকে ওখান থেকে নিয়ে। শুরু হয় তার রাতের টহল।

গরমের দিনে শিমুল ফুল খেতে আসে কোটরা হরিণ। তখন পাথরের আড়ালে ওঁত পেতে কাড়ুয়া। শিমুল ফুল আমিও খেয়ে দেখেছি। ফুলের গোড়াটা কষা কষা লাগে। গরমের দিনে জঙ্গলের গভীরে কোনো জলের জায়গায় এসেও বসে থাকে কাড়ুয়া। শুয়োর আর হরিণের ওপরই লোভ বেশি ওর। বাঘকে ও কখনও ভয় পায়নি। কিন্তু জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে নিজের দায়িত্বে বেশি বাঘ আগেও মারেনি। এখন সব চোরা-শিকারিরই বাঘের ভয়ের চেয়েও, বন বিভাগের ভয়টাই বেশি। বাঘ মারার কথা ভাবে না এখন কেউই।

গরমের সময় জঙ্গল ফাঁকা হয়ে যায়। তাই কাড়ুয়াকে তখন যেতে হয় পাঁচ-দশ মাইল দূরের গভীরতর ছায়াচ্ছন্ন জঙ্গলে। যেখান থেকে বন্দুকের শব্দ কারোই শোনার কথা নয়। কাড়ুয়া জানে, ধরা পড়লে শুধু বেদম মার খাবে যে তাই-ই নয়, তার জেলও হবে। এই জঙ্গল-পাহাড়, জঙ্গল-পাহাড়ের তাবৎ জানোয়ার এবং চিড়িয়ার রাহান্ সাহান্ এ-অঞ্চলে ওর মতো ভালো কেউই জানে না। টাইগার প্রোজেকট্ এবং স্যাংচুয়ারী হওয়ার আগে বনবিভাগের বড়কর্তাদের এবং শিকার-কোম্পানিদের শিকার খেলিয়ে তার আমদানি ভালোই হতো। ও কিন্তু এইসব জানোয়ার এবং পাখিদের অন্য অনেকের চেয়েই বেশি ভালোবাসে। কারণ ও তাদের জানে। মায়া ওরও কম নেই কারো প্রতি। কিন্তু পেট বড় বেইমানি করে। ও নিরুপায় হয়েই তাই এতো ঝুঁকি নিয়ে এখনও লুকিয়ে শিকার করে। চাষবাসের, কী কাঠ কাটার কাজ সে কখনও শেখেনি। গোলামী করেনি কারুর। ও স্বাধীন।

যখন বন্দুকটা ওর ঘরে থাকতো, এক বর্ষার দিনে, ওর সঙ্গে কথা বলেছিল বন্দুকটা। ঝারিতালাওয়ের পাশের কচুক্ষেতে তার এক শিকারি বন্ধুকে বড়কা দাঁতাল শুয়োরে ফেড়েছিল। তার নাম ছিল রামধানীয়া। সে-রাতে বৃষ্টি পড়ছিল টিপ্‌টিপ্ করে সন্ধে থেকে। কাড়ুয়া তার মাটির ঘরে চাটাই পেতে ঘুমিয়ে ছিল। এমন সময় ওর মনে হলো হঠাৎ ফিফিস্ করে রহস্যময় স্বরে কে যেন ওকে ডাকল। ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে উঠেই কাড়ুয়া দেখল, কাছে-পিঠে কেউই নেই। বন্দুকটা যেন ওকে ফিফিস্ করে বলল, শটি খেতোয়ামে বড়ুকা শুয়ার আও।

রামধানীয়ার কথা মনে পড়ে গেল। পেটটা চিরে দিয়েছিল শুয়োরটা। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছিল তার। নিদিয়া নদীর পাশের শ্মশানে বসে কাড়ুয়া তার জিগরী দোস্তের খুনের বদলা নেবে বলে শপথ করেছিল মড়া ছুঁয়ে।

সেই টিপ্‌টিপে বৃষ্টিতে গাদা-বন্দুকে তিন-অংগলী বারুদ গেদে সামনে একটা মরচে ধরা লোহার গুলি ঠেসে বনদেওতার নাম করে বেরিয়ে পড়েছিল কাড়ুয়া। ঝারিতালাও-এর কাছে আসতেই শুয়োরের কচু গাছ উপড়ানো শব্দ পেয়েছিল ও। তারপর প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে কাদার মধ্যে এগিয়ে গিয়ে হুম্মকে দেগে দিয়েছিল তার বন্দুকোয়া। হড়হড়িয়ে পা পিছলে গুচ্ছের কাদা ও শটি গাছ ছিটিয়ে-মিটিয়ে উল্টে পড়েছিল বড়কা এক্রা দাঁতাল শুয়োরটা।

বন্ধুর মৃত্যুর বদলা নিয়েছিল কাড়ুয়া।

মাঝে মাঝে এমন রাতে একা টহলে বেরিয়ে পালসা-খেলা কাড়ুয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতো আমার। অন্ধকারে ছায়ার মতো, সাবধানী নিশাচরে শিকারি জানোয়ারের মতো নিঃশব্দে মাংসল পায়ে ও চলাফেরা করতো। কখনও মুখোমুখি হলে আমাকে হঠাৎ দেখা ভূতের মতো হাত তুলে বলতো, পরর্‌নাম বাবু।

বলতাম, পরর্‌নাম।

তারপরই বলতাম, পেলে কিছু?

নেহী! কুচ্ছু না মিললই।

বুঝতাম, দূরের জঙ্গলের মধ্যে কোনো জানোয়ার মেরে গাছের ডাল চাপা দিয়ে রেখে এসেছে সে। দিনের বেলায় বিশ্বস্ত একজন অনুচরকে নিয়ে সেখানে ফিরে যাবে কাল।

কাড়ুয়া আমাকে বিশ্বাস করে না। ওদের বিশ্বাস ছোটবেলা থেকে এতলোক ভেঙেছে নির্দয়ভাবে যে, কাউকেই আর বিশ্বাস করে না ওরা।

হুলুক্ পাহাড়ের দারুণ ঘন জঙ্গলের মধ্যে গভীর ছায়াচ্ছন্ন স্যাঁতসেঁতে জায়গা আছে একটা। বড় গাছ-গাছালির পাতার চন্দ্রাতপের ফাঁক-ফোক দিয়ে রোদ এসে পড়ে তাদের ওপরে। জারির মতো প্যাটার্ন হয় ঘন সবুজ জঙ্গলে হলদে-সাদা রোদের সেই আলো-অন্ধকারের কাটাকুটির আড়ালে বাঘ তার সাদা-কালো ডোরা শরীর নিয়ে বাঘিনীর সঙ্গে মিলিত হয় নানা ফুলের সুগন্ধে সুরভিত নিভৃতে। বাঘিনী বাচ্চা দেয় মাঝে মাঝে ঐখানে। তারপর পাশের বিরাট গুহায় বাচ্চা নিয়ে আশ্রয় নেয়। গড়ে তিন-বছরে একবার করে ব্যাঘ্র-শিশুমঙ্গলের জায়গা হয়ে ওঠে গুহাটা। ঐ জায়গাটা বাঘের বড় প্রিয় জায়গা বলে লোকজন ঐ দিকটা এড়িয়ে চলে। পথও বড় দুর্গম এবং দূরের। একদিন রথীদা আর আমি খুব সকালে সঙ্গে হ্যাভারস্যাকে খাবার ও জল নিয়ে ঐ গুহা দেখতে গেছিলাম। ট্রাকে করে যতোটা যাওয়া যায় গিয়ে, বাকিটা হেঁটে গেছিলাম। কে জানে, কতোদিন আগে খাঁরওয়ার বা চেরোরা এই গুহাতে এসে আশ্রয় নিয়েছিল? কতো হাজার বছর ধরে কতো আদিম উপজাতির আনাগোনা ছিল এইখানে তার খবর কে রাখে? গুহার মধ্যে যেসব কারুকার্য আছে উপজাতিদের আঁকা, তা দেখলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। কী দিয়ে তারা কালো পাথরের ওপর এঁকেছিল; বেশিই জন্তু-জানোয়ারের ও শিকারির ছবি, তা নিরূপণ করবার মতো জ্ঞান আমার ছিল না। কতো হাজার বছর আগে যে ঐসব ছবি আঁকা হয়েছিল, তাও অনুমান করা অসম্ভব ছিল আমার মতো সাধারণ লোকের পক্ষে।

স্থানীয় একটা জনশ্রুতি আছে, মুলেন সাহেবের শ্বশুর জনস্টন সাহেব ঘোড়ায় চড়ে কাঁধে ভারী রাইফেল ঝুলিয়ে ঐদিকে যেতেন। সঙ্গে অনেক গাছ-গাছালি নিয়ে। আজকে আমরা যে গাছ-গাছালি দেখি এই ভয়াবহ জঙ্গলের গভীরে তা এক বিদেশি সাদা চামড়ার মানুষের অবদান। ওরা আমাদের রক্ত চুষতে এসেও এই দেশকে যেভাবে ভালোবেসেছিল, যেভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে এ-দেশীয় বন-পাহাড় নখদর্পণে রেখেছিল, যে পরিশ্রম ও অসুবিধে স্বীকার করে বিভিন্ন জেলার গেজেটিয়ায় আশ্চর্যভাবে লিখে গেছিল সেই নিষ্ঠা আমরা স্বাধীনতার এতো বছর পরেও দেখাতে পারলাম কই!

এসব দেখে মনে হয়, যে ভালোবাসে, ভালোবাসতে জানে, যার জ্ঞানের স্পৃহা আছে, আবিষ্কারের তাগাদা আছে, সে মালিকানার কথা হয়তো সবসময় ভাবে না। আপন পর জ্ঞানও করে না। ভালোবাসার আনন্দেই তেমন মানুষ ভালোবাসে।

এই জায়গাটাতে কতোরকম যে গাছ-গাছালি, মনে হয় কোনো হর্টিকালচারাল গার্ডেনে ঢুকে পড়েছি বুঝি। এক এক দিকে, পাথরে,জমিতে, পাহাড়ের গায়ে গায়ে এক এক রকম প্ল্যান্টে ভরে আছে। তাকালে, চোখ ফেরানো যায় না। ‘ডিফিওন্-বিচিয়া’, ‘জেব্রা প্ল্যান্ট’, ‘বেবী’জ টিয়ারস্’ আরো কত কী প্ল্যান্ট! জেব্রা প্ল্যান্টরা ব্রাজিলের নেটিভ্।

লজ্জাবতীরও কতোরকম বাহার। ‘বেবী’জ টিয়ারস্’ বা ‘মাইন্ড ইওর ওওন বিজনেস’ প্ল্যান্টের পাতাগুলো সবুজের ওপর সাদা ডোরা। জেব্রার গায়ের ডোরার মতো। বড় উজ্জ্বল হলুদ ফুল ফুটে ছিল তাতে। এখানে ফার্নও-বা কতোরকম। ‘হেয়ারস্ ফুট ফার্ন’ ‘মেইডেনহেয়ার’, আমার ভারি ভালো লাগে। হালকা ছোট ছোট গোল পাতাগুলো এই ফার্নের। ব্রোমেলিয়াসও ছিল এক রকম। ক্রিপ্‌টান্‌থাস্ জোনাটাস্। সবুজের ওপরে হালকা হলুদ আর সাদার ডোরা। বড় বড় পাতা।

আর অর্কিডের তো শেষ নেই। এতো কম উচ্চতায় এতোরকম অর্কিড দেখে রথীদা তো অবাক! সুন্দর অর্কিডগুলোর কটমটে সব নাম বলেছিলেন : “ক্রিস্টোফার লিন’, ‘মিল্‌টোনিয়া ভেক্সিলারিয়া’—অবাক বিস্ময়ে পর পর নাম বলে যাচ্ছিলেন রথীদা।

অর্কিড আমি চিনি না। অন্য প্ল্যান্ট-ট্যান্টও অতো চিনি না। চিনতে চেয়েছি চিরদিন। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা হয়নি তেমন। রথীদার কাছ থেকে জেনে নিই। চিনে নিই। পালামৌর বন পাহাড়ে অর্কিড বিশেষ দেখিনি, এক নেতারহাট অঞ্চল ছাড়া। এই জায়গাটা একটা আশ্চর্য ব্যতিক্রম।

আমরা যখন গুহার কাছে পৌঁছেছিলাম, তখন দুপুর হয়ে গেছে। কতো রকমের যে প্রজাপতি ফুলে পাতায় উড়ে বসছে। মনে হচ্ছিল, কোনো স্বর্গরাজ্যে যেন এসে পড়েছি।

নিস্তব্ধ, গহন অরণ্যের বুকের কোরকে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা দু-জন মুগ্ধ বিস্ময়ে।

গুহায় ঢোকার আগে গুহার সামনের নরম মাটি ভালো করে পরীক্ষা করে নিলাম। রথীদা গাছ, ফুল, তারা চেনে। জানোয়ার বা পাখি সম্বন্ধেও ওঁর ঔৎসুক্য কম দেখলাম না। বাঘের পায়ের দাগ আছে। কিন্তু পুরনো।

রথীদাকে বললাম, চলুন এগোই। ঝরনার জল-চোয়ানো নরম মাটিতে পায়ের দাগ না-ফেলে এই গুহাতে ঢোকা বা বেরুনো কোনো জানোয়ারের পক্ষেই সম্ভব নয়। সেইটাই বাঁচোয়া।

গুহাটার মুখটা প্রকাণ্ড বড়। ভিতরে গিয়ে আস্তে আস্তে সরু হয়ে এসেছে। সাবধানে টর্চ জ্বেলে এগোচ্ছিলাম আমরা। কথা বললে গগম্ করে উঠছিল। নিজেদের গলার স্বরে নিজেরাই চমকে যাচ্ছিলাম। দুর্গন্ধি চামচিকে টর্চের আলোয় ও আমাদের শব্দে বিরক্ত হয়ে এদিকে-ওদিকে উড়ে বেড়াচ্ছিল। বাঘের গায়ের গন্ধ এবং হিসির গন্ধেও গুহাটা ভরে ছিল।

কিছুটা এগিয়েই আলো দেখতে পেলাম। কাছে যেতেই দেখি, গুহাটা আরও চওড়া ও উঁচু হয়ে গেছে। এবং আলো আসছে ওপরের স্কাইলাইটের মতো পাথরের ফাঁক-ফোক দিয়ে। সেই ফাঁক-ফোকরগুলো এমন, আলোই আসতে পারে শুধু। বৃষ্টির জল নয়।

আরও এগিয়েই দেওয়ালের সেই আশ্চর্য ছবিগুলো চোখে পড়লো। একজন আদিবাসী শিকারিকে একটি বুনো মোষ তাড়া করেছে। বিরাট-বিরাট বন্য বরাহ—মুখ ব্যাদান করে দাঁত বাগিয়ে ছুটে যাচ্ছে। তির-ধনুক নিয়ে বাঘ শিকার করছে আদিবাসী শিকারিরা। শিকার-করা বাঘ পড়ে আছে তাদের পায়ের কাছে

মোহাবিষ্টর মতো অনেকক্ষণ আমরা গুহার মধ্যেই রইলাম।

বাইরে বেরিয়ে, ঐ ছায়াচ্ছন্ন জায়গা ছেড়ে এসে অপেক্ষাকৃত আলোকিত জায়গায় আসন্ গাছের নিচে, পরিষ্কার একটা বড়ো কালো পাথরের ওপর খাবারদাবার সামনে নিয়ে সতরঞ্জি বিছিয়ে বসা গেল।

রথীদা বলছিলেন, বুঝলি সায়ন, বড়ো অদ্ভুত ব্যাপার। এই গুহার ছবিগুলোর কথা এ-অঞ্চলের কেউই জানে না। বহু বছর হয়ে গেল কেউ আসেও না এদিকে। জানি না, আগে লোকে এর খোঁজ জানতো কি-না। স্থানীয় লোকে জানতো নিশ্চয়ই।

তারপর আত্মমগ্ন হয়ে বললেন, আমরা কী ভাগ্যবান। ইতিহাসের সঙ্গে দেখা হলো আমাদের। ইতিহাসও নয়। বলা উচিত, প্রাক্ ইতিহাসের সঙ্গে।

খেতে খেতে রথীদা নানা কথা বলছিলেন। বলছিলেন আজকে সভ্য মানুষ শিকারকে একটা অমানবিক ব্যাপার বলে মনে করে। শিকার ব্যাপারটাই এখন ন্যক্কারজনক। হয়তো যথার্থভাবেই। কিন্তু আর্টের ইতিহাসের স্ফূরণ বা আর্টের প্রথম বিকাশ কিন্তু এই প্রাগৈতিহাসিক প্রস্তরযুগের শিকারিদের হাতেই। এমন সব গুহায় গুহায় পৃথিবীর কোণায় কোণায় সেইসব শিকারিরা যা এঁকে রেখেছিল, যা খোদাই করে গেছিল; তাই-ই পৃথিবীর আর্টের উৎস। আমাদের পূর্বসূরি, সব শিল্পীর পূর্বসূরিরাই শিকারি ছিলেন। ভাবা যায় না! তাই না?

প্যালেওলিথিক বা প্রাথমিক প্রস্তর যুগ বলতে যা বুঝি আমরা, তাতেও কিন্তু শিকারিরাই ছিল মুখ্য। সেটা ছিল শিকারিদেরই যুগ। কারণ মানুষের আদিমতম পূর্বপুরুষরা শিকার করেই বেঁচে থাকতো। তার অনেক পরে চাষ-বাস করা শিখেছিল মানুষ। তারও অনেক পর আগুন আবিষ্কার করেছিল। ক্রুড আর্টিফ্যাকটস্ থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা আস্তে আস্তে অসীম সৌন্দর্যসম্পন্ন শিল্পে পৌঁছান

একটা রুটি আর আলুর দম মুখে পুরে রথীদা বললেন, স্পেনে কতো সব বিখ্যাত গুহা আছে। তার মধ্যে আল্টা-মিরা একটা। এই হুলুক পাহাড়ের গুহাটা দেখে যে কতো কথাই মনে হচ্ছে! আমরা যে হোমো-ফ্যাবার থেকে হোমো স্যাপিয়েনে উন্নীত হলাম, ভাবতে শিখলাম, ভাবনাকে ভাষান্তরিত করতে, আর্টের মাধ্যমে রূপান্তরিত করতে শিখলাম—এই প্রক্রিয়ার গোড়ায় শিকারিরাই। যদিও একথা বলছি বলে, তুই আমার ওপর হয়তো চটে যাবি। হয়তো কেন, নিশ্চয়ই চটেছিস ইতিমধ্যেই।

আমি বললাম, চটবো কেন? সত্যেরে লও সহজে…।

এটা আমার আর রথীদার মধ্যে একটা স্ট্যান্ডিং জোক্। রথীদা রথীন্দ্রনাথের কণিকার সব কবিতা চমৎকার আবৃত্তি করেন। শুধু আবৃত্তিই যে করেন, তাই-ই নয়। বলেন, “দিস্ ইজ্ মাই ম্যানুয়াল অফ রাইট সিভিলিজেশান।”

“ভালোমন্দ যাহাই ঘটুক সত্যেরে লও সহজে”–এ-পংক্তিটি রথীদার মুখে সব সময়ই ঘোরে। সুযোগ পেলাম, আমিও রথীদাকে বলে দিলাম।

রথীদা হেসে উঠলেন। বললেন, স্পেনের আল্টা-মিরার গুহায় যেসব ছবি আছে জানোয়ারের শিকারের, সে-সব ছবি আমি একটু আগে যা বললাম, তাই-ই প্রমাণ করে। এসব আমার কথা নয়। গুণী-জ্ঞানীদেরই কথা। আমার মতো করে তোকে বলছি। আমাদের দেশেও এরকম অনেক সব গুহা-চিত্র আছে, যেমন মধ্যপ্রদেশের ভীমবৈকায়।

রথীদাকে বলেছিলাম, পরে একদিন আপনার কাছে ভালো করে এসব শুনব। এখন খাওয়া সারা যাক। ট্রাক থেকে নেমেও আমাদের দুঘণ্টা লেগেছিল গুহা পৌঁছতে পায়ে হেঁটে। তারপর ট্রাকেও লাগবে আধঘণ্টা ভালুমারে ফিরতে।

ঠিক বলেছিস। বলেই, খাওয়াতে মন দিয়েছিলেন রথীদা।

আসলে, আমি এসব দেখেশুনে এতো উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম যে, তোকে বোধহয় খুব জ্ঞান দিয়ে দিলাম একচোট। বোরড় হয়ে গেলি?

কী যে বলেন? কতো কী শিখলাম! কতো নতুন গাছ চিনলাম, পাতা চিনলাম কতো অর্কিড। আপনার সঙ্গে না-এসে একা এলে এসব দেখতাম ঠিকই। কিন্তু কী দেখলাম তার তাৎপর্যই বুঝতাম না।

হুলুক্ পাহাড়ের গুহামুখে বসে সেদিন আর্টের জন্ম আর তার বিকাশ নিয়ে আর কিছু শোনার সুযোগ হয় নি রথীদার কাছ থেকে। তবে বেশ কয়েক মাস পরে, এক কৃষ্ণপক্ষের গরমের হাতে রথীদার বাংলোর সামনে হাতায় বসে যখন আমরা গল্প করছিলাম আর দুজনে মিলে একসঙ্গে তারা দেখছিলাম, চিনছিলাম; তখন ঐ পাহাড়ের দিকে চোখ পড়ায় উনি নিজের থেকেই আবার ওই প্রসঙ্গ তুলেছিলেন।

সেদিন বলেছিলেন যে, প্রস্তর যুগের দ্বিতীয় অধ্যায়, সেটাকে শিকারি যুগই বলা চলে। সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে আর্টের আবিষ্কার। আবিষ্কারও না বলে, উদ্ভাবন বলাটাই ঠিক। এই আশ্চর্য উদ্ভাবন প্রাগৈতিহাসিক মানুষের বিবর্তনধারায় এক ল্যাণ্ডমার্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুস্তেরীয় যুগের (Mousterian ) গুহাগুলোতে কিন্তু কোনো শিল্পকর্মের নিদর্শন পাওয়া যায় নি। প্রথম এর সূচনা দেখা গেছিল অরিগ্‌নিসিয়ান—পেরিগর্ডিয়ান সময় থেকে

রথীদাকে থামিয়ে দিয়ে বলছিলাম, কী সব যে বলছেন, জার্মান ল্যাটিন এই অশিক্ষিত লোককে। আমি মানেই বুঝতে পারছি না। সোজা করে, আমার মতো সাধারণ বুদ্ধির মানুষের বোঝার মতো করে বলুন।

রথীদা হেসে ফেলে বলেছিলেন সরি। না বুঝলেও চলে যাবে। সকলকে সব যে বুঝতে হবেই এমন কোনো কথা নেই। মোটা কথাটা বুঝলেই হলো। বুঝলি, অরিগ্‌নিসিয়ান— পেরিগডিয়ান যুগ থেকেই হঠাৎ যেন শিকারি যুগের লোকেরা রাতারাতি কোনো দৈবশক্তিতে ভর করে আর্টিস্ট হয়ে গেল। তার অব্যবহিত আগের যুগেও কিন্তু আর্টের এমন উৎকর্ষতার অঙ্কুর যে কিছুমাত্রও ছিল, তেমন কোনো প্ৰমাণ নেই। এইটেই বিস্ময়ের।

তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ সিগার খেয়ে, যেন নিজের মনেই বলছেন, এমনভাবে বলেছিলেন, প্রস্তরযুগের দ্বিতীয় পর্বের প্রথম থেকে শেষ পর্যায়ের পুরো সময়েই ভাস্কর্যের সঙ্গে আমরা পরিচিত। তখন ভাস্কর্য বলতে প্রধানত নারীমূর্তি। পৃথুলা নিতম্বিনীই ছিল সব ভাস্কর্যের নারী।

আমাদের দেশের ভাস্কর্যের নারীরাও তো পৃথুলা; নিতম্বে তো বটেই। ঠিক। রথীদা বললেন।

তারপর আলোচনার গম্ভীর বিষয়কে হালকা করতে বললেন কিনা জানি না, বললেন, জানিস তো, দক্ষিণ আমেরিকার বুশ-কান্ট্রির মেয়েদের ওটা একটা বিশেষত্ব। নিতম্বে অস্বাভাবিক মেদ জমে ওদের। যাকে বলে স্ট্রিপ্টোপিগিয়া।

আপনি যে নিতম্বের ওপর এমন অথরিটি তা তো আগে জানতাম না।

রথীদা হাসলেন। বললেন, শুধু নিতম্ব কেন হে ছোকরা? অনেক কিছুর ওপরেই।

রথীদা আবার শুরু করলেন। কিছু কিছু জায়গার গুহাতে যেসব ভাস্কর্য ছিল, তার বেশির ভাগই অন্তঃসত্ত্বা নারীদের। অথবা ভেবে দ্যাখ, ঘোড়াদের মিলনের। হোয়াট আ কন্‌ট্রাসট্। তবে ঐরকম সব বিষয়ের প্রবণতা দেখে পণ্ডিতেরা অনুমান করেন যে, নারীর সন্তান-ধারণের ক্ষমতাকে, মানে উর্বরতাকে, তখন বিশেষ তাৎপর্য দেওয়া হতো। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার কন্দর গুহার অন্ধকারতম কোণগুলিতে পণ্ডিতেরা নানারকম জানোয়ার, ম্যমথস্, জংলি ঘোড়া বল্গা হরিণ, বুনো শুয়োর, জংলি ষাঁড় আর মেয়েদের ছবির ভাস্কর্য দেখতে পেয়েছেন। স্পেনের আল্টা-মিরা গুহার কথাও তো তোকে আগেই বলেছি।

স্বগতোক্তির মতো বললাম, জংলি জানোয়ারের ছবিই আর্টের গোড়ার আর্ট? আশ্চর্য! কিন্তু জানোয়ারের ছবি কেন আঁকতো প্রথম হোমো স্যাপিয়েনরা? এর কি কোনো তাৎপর্য ছিল? ছবিতেও কল্পনারই প্রাধান্য থাকা উচিত ছিল। জানোয়ার শিকার তো করতোই তারা। সেই বাস্তব জানোয়ারের ছবি নিয়ে অত বাড়াবাড়ি কী?

মুশকিলে ফেললি আমাকে। অত কী জানি? তবে মনে হয়, মস্তিষ্কের প্রথম বিকাশের সময় হোমো স্যাপিয়েনদের কল্পনার ক্ষমতা তখনও ফোটে নি তেমন তাছাড়া পণ্ডিতেরা এও বলেন, যে জন্তু-জানোয়ার আঁকার আসল তাৎপর্য ছিল জাদু। বশীকরণ। ধর্, বুকে তির-বেঁধা একটা বিরাট দাঁতাল শুয়োর এঁকে দিল। অন্ধকার গুহার গায়ে এই ছবি আঁকা মানে জীবন্ত বন্য-বরাহকে জাদু করা। হয়তো ওই ছবি দেখতে দেখতে আগেকার দিনের সামান্য হাতিয়ার-সম্বল মানুষগুলোর আত্মবিশ্বাসও বাড়তো। ওরা হয়ত ভাবতো, সাংঘাতিক বলশালী ও হিংস্র জন্তুদের সামান্য হাতিয়ার নিয়েও বাস্তবে মারা খুব সহজ হবে, জাদুর ঘোরে!

বাঃ!

যেসব জানোয়র ওরা খেতো, পাথরের ওপর সেগুলোর ছবি এঁকে, বা তাদেরই হাড়ে তাদের চেহারা খোদাই করে ওরা প্রার্থনা করতো যেন সেই জন্তু-জানোয়ারদের ধরা বা মারা তাদের পক্ষে সহজতর হয়। তখন জীবন বড় সংগ্রামের ছিলো তো।

আমি বললাম, আহা! যেন এখনও সংগ্রামের নয়।

তা নয়, তবে বুঝে দ্যাখ, ঘোড়া পর্যন্ত বশ মানে কি তখনো। মানুষের প্রধান খাদ্যই ছিল তখন ঐসব জন্তু-জানোয়ার। একমাত্র জীবিকাই ছিল শিকার।

তাহলে কাড়ুয়া বেচারীর আর দোষ কী।

রথীদা হাসলেন। বললেন, কোনোই দোষ নেই। আসলে কাড়ুয়া যখন অনন্ত-ঘুম ঘুমোচ্ছিল তখন হোমো স্যাপিয়েনরা এক দারুণ ফাস্ট ট্রেনে চড়ে আজকে আমি-তুই যেখানে পৌঁছেছি, সেখানে পৌঁছে গেছে। কাড়ুয়া হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে দেখে সেই প্রস্তর যুগেই প্রায় রয়ে গেছে ও। কোন স্টেশনে, কোন্ ট্রেনে তার ওঠার কথা ছিল, ও জানে নি। উন্নতির মধ্যে, পাথরের টুকরো বা তির-ধনুকের বদলে ওর হাতে মুঙ্গেরী গাদা-বন্দুক। আমরা যে-স্টেশনে, যে-ট্রেনে পৌঁছেছি কাড়ুয়ার সেখানে আর পৌঁছুনো হয় নি। হলো না।

আমি বললাম, আমরাও কি ঠিক ট্রেনে চেপেছিলাম রথীদা? আমি? আপনি? সংখ্যায় আমরা যারা গরিষ্ঠ, তারা যে-ট্রেনে চড়ে দ্রুতগতিতে কোটি কোটি বছর পেরিয়ে এসে আধুনিক নগরভিত্তিক সভ্যতানামক গোলমেলে স্টেশনে পৌঁছেছি এবং পৌঁছতে পেরে গর্বে বেঁকে রয়েছি বর্তমান মুহূর্তে, সেই গন্তব্যটাই কি হোমো- স্যাপিয়েদের সঠিক গন্তব্য ছিল? আমরা সকলেই কি নিশ্চিত সে বিষয়ে?

রথীদা নড়ে চড়ে বসলেন।

সিগার থেকে প্রচুর ধুঁয়ো ছাড়লেন।

অনেকক্ষণ তারা-ভরা আকাশের দিকে চেয়ে গভীর গলায় বললেন, বড় দামি কথা বলেছিস রে একটা। কথাটা ভাববার মতো। হয়তো অনেকেই পৃথিবীর নানা কোণে বসে এই মুহূর্তে এই কথাটাই ভাবছে। কে জানে? হয়তো কাড়ুয়াই আমাদের সকলের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান্। আমরাই সকলে হয়তো ভুল ট্রেনে চড়েছিলাম।

কোজাগর – ৮

নানকুয়া ওর সমবয়সি সব ছেলের থেকে একেবারেই আলাদা। যখন অন্যান্যরা কয়লাখাদে কাজ করে প্রচুর পয়সা হাতে পেয়ে জামা-কাপড় ট্রানজিস্টর ঘড়ি, সানগ্লাস ইত্যাদি কিনে এবং মদ খেয়ে ওদের যুগ-যুগান্ত ধরে সঞ্চিত অতৃপ্ত সাধ-আহ্লাদের দিকে দ্রুতবেগে ধেয়ে যায় তখন ও একা বসে অনেক কিছু ভাবে। নিজের গ্রামে, অন্যদের গ্রামে, ঘুরে বেড়ায়। কী করে ওদের ভালো করা যায়, ওদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর, ওদের সমস্ত শ্রেণীর; সেইসব নিয়ে মাথা ঘামায়।

নানকুয়ার বাবা টিগা অল্প বয়সে বসন্তের প্রকোপে অন্ধ হয়ে প্রায় পনেরো বছর পৃথিবীর আলো থেকে বঞ্চিত থেকে বিনা চিকিৎসায়, বিনা শুশ্রূষায় মারা যায়। অন্ধ স্বামী ও শিশুপুত্রকে ওর ধনহীন, জমিহীন, সহায়-সম্বলহীন মা কোনোক্রমে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। স্বামী, সুস্থ ও সক্ষম থাকাকালীনও বেঁচে থাকা তাদের পক্ষে দুঃসাধ্যই ছিল।

নানকুয়া মায়ের রঙ পায়নি, কিন্তু মুখশ্রী পেয়েছে। কাটা-কাটা, রাগী। মা ছিল এ তল্লাটের নামকরা সুন্দরী। সোনালি মিষ্টি গুড়ে যেমন মাছি পড়ে, তেমন করে কামার্ত পুরুষ পড়ত মায়ের ওপরে। ভন্ ভন্ করত তারা। জঙ্গলের সুঁড়িপথে, ঝরনার পাথরে, ফরেস্ট বাংলোর ঘরে মাকে নিয়ে ওরা চিরে চিরে মা-র সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণ করত। আধুলিটা, টাকাটা ধরে দিত হাতে। মা ফেরার সময় শেঠের দোকান থেকে শুখা-মহুয়া বা বাজরার ছাতু কিনে আনত।

নানকুয়ার একটি ভাই অথবা বোন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় একসময়। তখন বুঝত না ও, এখন বোঝে যে, সেই অনাগত সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে তার নিজের অন্ধ বাবার পিতৃত্বে হত না। জারজ সন্তানের জন্ম দিত তার মা, রসিয়া।

কিন্তু গোদা শেঠের দাদা, জোদা শেঠ তখন বেঁচে। মায়ের ঐরকম শারীরিক অবস্থাতেই সে মত্ত অবস্থায় তার লোকজনকে দিয়ে মাকে পাকড়াও করে নিয়ে গিয়ে এক কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে ঝুম্‌রিবাসার নির্জন বাংলোয় রসিয়ার ওপর অত্যাচার করে। একা নয়, ইয়ার-দোস্তে মিলে। ওরা আদরই করতে চেয়েছিল। কিন্তু আদরের রকম ও আদরের বাড়াবাড়ি হলেই অত্যাচার ঘটে। এক্ষেত্রেও তাই-ই ঘটেছিল।

মা যখন বাড়িতে ফিরে আসে, তখনও আকাশে কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ ছিল। তিনদিন অবিরল রক্তস্রাবের পর বিনা-চিকিৎসায় নানকুয়ার মাথায় হাত রেখে তার মা রসিয়া মারা যায়। নানকুয়ার জীবনের মহাকাশ থেকেও তার সবচেয়ে পরিচিত তারা খসে যায় নিঃশব্দে। সেই হারিয়ে যাওয়া প্রজ্বলিত তারা এক বিশেষ ভূমিকা রেখে যায় নানকুয়ার জন্যে, নানকুয়ার জীবনে। সেদিন থেকে কোজাগরী পূর্ণিমার ওপরই একটা আক্রোশ জন্মে গেছে নানকুয়ার।

নানকুয়া জানে ওই দারিদ্র্য ও অসহায়তার ইতিহাস ওর একার নয়। ওদের সকলের। নানকুয়া যতটুকু পড়াশুনা করেছে, তা পাগলা সাহেবেরই দয়ায়। স্কুলে পড়েছিল, ক্লাস সেভেন অবধি। কিন্তু স্কুল যা শেখায় নি তাকে, খুব কম স্কুল-ই যা শেখায় তা শিখেছে সে পাগলা সাহেবের কাছে। মানুষ হওয়ার শিক্ষা পেয়েছে নানকুয়া। মানুষকে মানুষ জ্ঞান করার শিক্ষা।

যে সময়ে এবং যে-দেশে অধিকাংশ শিক্ষাব্রতী, সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক এবং রাজনীতিকরা কেউ-ই নিজেদের কোনো দায়িত্বই পালন করেন না যে শুধু তাই-ই নয়, সে দায়িত্বকে আপন আপন স্বার্থ-কোলাহলের আবর্তের মধ্যে থেকে স্বচ্ছন্দে এবং উচ্চকণ্ঠে অস্বীকার পর্যন্ত করেন, পরম নিলজ্জতায়, সেই সময়ে এবং সেই দেশে জন্মেও নিজের অতিশয় সামান্য ক্ষমতার সমস্ত পরিপূর্ণতায় নিজের দায়িত্বটুকুকে ওর অজানিতেই স্বীকার করে ও। ওর শিরা-উপশিরার রক্তের এলোমেলো দৌড় ওকে সব সময় বলে যে, এই দেশে একটা বড়ো রকমের ওলট-পালট ঘটবার সময় এসেছে। হয়ত ঘটাবারও।

এক ছুটির দিনে বুলুক পাহাড়ে কিছুটা উঠে যখন ও একা বসে রোদ পোয়াচ্ছে, তখন হঠাৎ যেন তার ঘাড়ে ও পিঠে রোদের নরম আঙুলের পরশের সঙ্গে ওদের লক্ষ লক্ষ স্বজাতির, ওপর পিতা-প্রপিতামহের, ওর দুঃখিনী বহুচারিণী মায়ের আশীর্বাদের পরশ লাগে ওর পিঠে। পাহাড়ের ওপর থেকে আদিগন্ত জঙ্গল, গ্রাম, ক্ষেত-খামার, নদী চোখে পড়ে। গোরু ছাগল চরিয়ে বেড়ায় গাঁয়ের ছোট ছেলে-মেয়েরা। মাটির ঘরের সামনে ছেঁড়া মাদুর বিছিয়ে বসে, দেওয়ালে হেলান দিয়ে, অশক্ত, শীতবস্ত্রহীন বৃদ্ধ, রামধানীয়া চাচা সূর্য থেকে প্রতিকণা অণুপরমাণু উষ্ণতা, তা শক্ত হয়ে-যাওয়া খট্‌খটে হাড়ে শুষে নিতে চায় রাতের হিমের সঙ্গে লড়বার জন্যে। মকাই, অড়হর আর বাজরার ক্ষেতে রাখওয়ার ছেলেরা মন-উদাস-করা বাঁশি বাজায় মাচায় বসে। ঝরনা থেকে কলসী করে জল আনে লাল, হলুদ, নীল শাড়ি-পরা গাঁয়ের মেয়েরা। পাহাড়ের নিচে ঘন জঙ্গল থেকে ময়ূর ডেকে ওঠে কেঁয়া কেঁয়া কেঁয়া রবে। নানকুয়ার পাশের কেলাউন্দার ঝোপ থেকে ভরর্ ভরর্ করে বনমুরগির ঝাঁক উড়ে যায়, হঠাৎ। তাদের সোনালি, হলুদ-কালচে ডানায় শীতের রোদ রামধনু হয়ে চমকিয়ে যায়। নিচের পাহাড়ী নদীর শুকনো সাদা পেলব বালির বুক ধরে ভাব-গম্ভীর হেঁটে যায় একলা পাঁশুটে-রঙা শিঙাল গম্বর। দূরে গ্রামের কুয়োয় কেউ জল তোলে-ক্ষেতে জল দেয়। অবিরাম লাটাখাম্বার ওঠা-নামার ঘুমপাড়ানি ছন্দোবদ্ধ ক্যাচোর-ক্যাঁচোর শব্দ আসে কানে। খড় বোঝাই বয়েল গাড়ি গড়িয়ে যায় পথ বেয়ে, ধুলো উড়িয়ে, ক্যাচ-কোঁচ্ শব্দ করে। পথের ধুলোর গন্ধ, বয়েলের গায়ের মিষ্টি গন্ধ খড়ের মিষ্টি গন্ধে মিলেমিশে সমস্ত বেলা-শেষের দিনকে গন্ধবিধুর করে তোলে। এইসব টুকরো-টুকরো ছবি দেখতে দেখতে শব্দকণা শুনতে শুনতে নানকুয়ার চোখ ও কানের মধ্যে দিয়ে একটা ঘুমভাঙা দারুণ দেশের স্বয়ম্ভু ছবি সমস্ত শব্দ, গন্ধ অনুভূতিতে মঞ্জরিত হয়ে ওর মস্তিষ্কের কোষে কোষে ছড়িয়ে যায়। ওর নাকের পাটা ফুলে ওঠে, নিঃশ্বাস দ্রুততর হয়। এই হতভাগা লোকগুলোর জন্যে কিছু একটা করার জন্যে ওর সমস্ত মন, ওর হাত দুটো, ওর বোধ আকুলি-বিকুলি করে, কিন্তু কী করবে, কেমন করে করবে, তা ও বুঝতে পারে না।

নানকুয়া তার গ্রামের, তার দেশের আদিগন্ত, সূর্যস্নেহে সুধন্য বড় সুন্দর সেই রূপের দিকে অবাক স্তুতির চোখে চেয়ে ভালোবাসায় বুঁদ হয়ে থাকে।

নানকুয়া যেখানে বসেছিল, তার কিছু দূরেই একটি ঝরনা ছিল। এটি মীরচাইয়া প্রপাত থেকে নেমে এসেছে। ঝির্ ঝির্ করে জল চলছে পাথরের আড়ালে। কতরকম ফার্ন, শ্যাওলা, লতাপতা জন্মেছে-ঝরনার পাশে পাশে, পাথরের আনাচে কানাচে। তিনটি শিরীষ গাছ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে ঝরনার প্রবেশদ্বারে। জায়গাটার নাম নেই আলাদা। লোকে বলে মীরচাইয়াকা বেটি। মুখে মুখে মীরচাবেটিতে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ সেখান থেকে ঠুং করে একটা আওয়াজ হল। কার পায়ের মল বাজল যেন পাথরে।

নানকুয়ার অন্যমনস্কতা কেটে গেল। হঠাৎ একটা দু-লাইনের গান মনে এলো ওর :

‘বিছিয়া ঠোক্‌লে টোঙ্গড়ী কা
শুন্‌কে জিয়া লাগ্ গিয়া।’

পাহাড়ের ওপরে কোথায় যেন মলের শব্দ শুনলাম। শুনেই মন ছুটে গেল সেখানে।

নানকুয়া উঠে পড়ে দেখতে গেল কে এসেছে ওখানে। তার গাঁয়ের সব মেয়েকেই সে চেনে। গ্রাম ছেড়ে এত দূরে ঘন জঙ্গলের মধ্যের মীরচা-বেটিতে কেউই জল নিতে আসে না। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া আসে না এখানে কেউই। কী কারণে? কে এলো?

আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগল নানকুয়া। ছোটবেলা থেকে নিঃশব্দ পায়ে চলা-ফেরা করা অভ্যেস হয়ে গেছে ওদের। কিন্তু শীতকালে শুকনো পাতা মচ্‌মচ্ করে পায়ে পায়ে। পায়ের তলার চামড়া, জুতোর চামড়ার মতোই শক্ত হয়ে থাকে বন-জঙ্গলের মেয়ে-পুরুষের। খালি পায়ে পাথুরে জমিতে, পাহাড়ে পথ চলে চলে গোড়ালি অবধি সাদা হয়ে যায়। কী পুরুষ, কী মেয়ের। কিন্তু নানকুর পায়ে হাট থেকে কেনা প্লাস্টিকের জুতো। তবু সাবধানে যথাসম্ভব কম শব্দ করে আড়ালে আড়ালে এগোতে থাকল ও। যেই-ই এসে থাকুক, তাকে চমকে দেবে ও। মজা হবে।

যখন একটা খয়ের গাছের গোড়ায় পৌঁছে ও ঝরনার দিকে তাকালো, তখন উত্তেজনায় মনে হল ওর হৃৎপিণ্ডটা ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবে।

বিস্ফারিত চোখে দেখল নানকুয়া, টুসিয়া একটা পাথরে বসে জলে পা ডুবিয়ে গায়ে সাবান মাখছে। শিরীষ গাছের পাতা পিছলে রোদ এসে পড়ছে তার কুঁচফল-লাল বুকে। পাশে ফিরে বসে আছে টুসিয়া। খোলা চুল নেমে এসেছে কোমর অবধি। চুলে আধো-ঢাকা তার নিতম্বকে একটা অতিকায় বাদামি লাল গোঁড় লেবুর মতো মনে হচ্ছে। একটা পা পাথরের ওপরে রেখে অন্য পা ডুবিয়ে দিয়েছে বহমান জলে।

নানকুয়া স্থাণুর মতো তাকিয়ে রইল সেখানে! না পারল পালাতে, না পারল এগোতে।

একটা ফিচফিচিয়া পাখি খয়ের গাছে বসেছিল। পাখিটা হঠাৎ নানকুয়াকে দেখতে পেয়ে ফিচ্‌ফিচ্ করে উত্তেজিত গলায় ডেকে খয়েরের সরু ডাল দুলিয়ে টুসিয়ার দিকেই উড়ে গেল।

টুসিয়াকে জামা-কাপড় পরা অবস্থায় ছোটবেলা থেকেই দেখেছে নানকুয়া। অনাবৃত, অন্যমনস্ক, তার ভালবাসার জনকে এই ঝরনাতলায় নরম রোদের মধ্যে দেখে টুসিয়ার নগ্ন নিভৃত বড় হয়ে-ওঠা সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেল নানকুয়া।

বিধাতা মেয়েদের এক আশ্চর্য ষষ্ঠবোধ দিয়ে পাঠান পৃথিবীতে। তাদের চোখ যা দেখতে পায় না, তাদের বোধ তা দেখতে পায়। ভালো শিকারিদের ষষ্ঠেন্দ্রিয়র মতো। হঠাৎ টুসিয়া মুখ ঘুরিয়ে খয়ের গাছের দিকে তাকাল। ফিফিচিয়া পাখিটার হঠাৎ ভয়-পাওয়া ডাক তার সহজাত বুদ্ধিকে বলেছিল পাখিটা কোনো জানোয়ার বা মানুষ দেখে ভয় পেয়েছে।

নানকুয়াকে দেখেই লজ্জায়, প্রায় কেঁদে ফেলল টুসিয়া। অজান্তে মুখ ফকে বেরিয়ে গেল, অসভ্য! কী অসভ্য!

নানকুয়া কী করবে ভেবে না পেয়ে দু হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। টুসিয়াও তখন দু-হাতে বুক ঢেকে নায়ার দিকে পিছন ফিরে একলাফে পাথরের আড়ালে চলে গেছিল।

মুখ-ঢাকা অবস্থাতেই নানকুয়া বলল, আমি মলের শব্দ শুনে দেখতে এসেছিলাম, এসে দেখি…।

টুসিয়া রেগে বলল, তুমি যাবে কি-না বলো এখান থেকে, নইলে পঞ্চায়েতে বলব।

নানকুয়া বলল; বললে তো ভালোই হয়। আমার সঙ্গে তোর বিয়ে দেবে শাস্তি হিসেবে। আমি তো তোকে বিয়ে করতেই চাই।

করাচ্ছি বিয়ে? রাগের গলায় বলল টুসিয়া।

আবারও বলল, অসভ্য কোথাকার!

নানকুয়া যাবার সময় বলে গেল, টুঙরিতে বসে আছি। চান করে আয়। এক সঙ্গে নিচে নামব দুজনে।

টুসিয়া রেগে বলল, তুমি ভাগো। আমার তোমার সঙ্গে যেতে বয়েই গেছে।

টুঙরির ওপরে কিছুক্ষণ বসে রইল নানকুয়া। নানকুয়া জানত যে টুসিয়াকে এই পথেই নামতে হবে নিচে। এবং এও জানত যে, টুসিয়া খুশি হয়েছে ওকে দেখে! যদিও ঐ অবস্থায় দেখা দিতে চায় নি সে। মেয়েরা যে প্রিয়জনের অনেক অনুরোধে, অনেকে সোহাগে, নিজেকে চার দেওয়ালের নিশ্চিন্ততায় অনাবৃত করে, তাই বিনা আয়াসে কেউ তাদের উন্মুক্ত আকাশের নিচে অনাবৃত বে-আব্রু দেখতে পাক, তা তারা কখনও চায় না। স্বামীর ব্যবহারে ব্যবহারে পুরনো হয়ে যাওয়া স্ত্রী পর্যন্ত চায় না। আর টুসিয়া তো অনাঘ্রাতা!

এটা মেয়েদের সংস্কার। জন্মগত, যুগ-যুগ ধরে সঞ্চিত সংস্কার। এমন বিনা নোটিশে নিরাবয়ব হয়ে ধরা দিতে ওদের বড় অভিমানে লাগে। বোধহয় মনে করে সস্তা হয়ে গেল।

এতসব নানকুয়া জানতো না। ও শুধু ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে বসে ছিল। তখনও ওর দু-কানের লতি গরম হয়ে ছিল। ওর শরীরের মধ্যে যে এমন সব রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটতে পারে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি সব এমন হঠাৎ জীবন্ত ও মহাপরাক্রান্ত হয়ে উঠতে পারে, ওর পাথরের মতো শক্ত চ্যাটালো বুকও যে এমন ধুক্‌ধুক্ করতে পারে এক তীব্র বেদনামিশ্রিত কিন্তু গর্হিত আনন্দের বাঙ্ময়বোধে, তা জঙ্গলের পথে বহুবার বাঘের মুখোমুখি হয়েও সে কখনও জানে নি। এ ভয় সে-ভয় নয়। এ একটা অন্যরকম, নতুন রকম, গা-শিরশিরানো ভয়

কুড়ি বছরের নানকুয়া এই প্রথম প্রকৃতির কোলের মধ্যে অন্য পরমা প্রকৃতির, নারী প্রকৃতির অনাবৃত রূপ দেখে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠল। আজ দুপুরে ওর জীবনে একটা বিশেষ ধাপ অজানিতেই অতিক্রম করল ও। গোঁফ-দাড়ি গজালেই পুরুষ, পুরুষ হয় না। আজ এই মুহূর্তে বড় তীব্র, এক মিশ্র বোধের মধ্যে সে কথা জানল।

শীতের বেলা ঝুপ্ করে পড়ে যায়। সূর্যটা হুলুক্ পাহাড়ের আড়ালে গেলেই সমস্ত টাড়ে, ক্ষেতে, জঙ্গলে ছায়ার আঁচল লুটোয়। ঝাঁটি জঙ্গল থেকে তিতির আর বটের ডাকতে থাকে। চিহাঁ চিহাঁ চিহাঁ করে। টিয়ার ঝাঁক দ্রুত পাখায় ছোটো ছোটো সবুজ তিরের মতো উড়ে যায় রাতের আশ্রয়ে। গ্রাম থেকে গোরু-বাছুর চরাতে যাওয়া বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের উচ্চৈঃস্বরে ডাকে মায়েরা। গোরুর গলার গম্ভীর হাম্বা—আ-আ রব সন্ধ্যাকে স্বাগত জানায়। গোরু-ছাগলের পায়ে পায়ে ধুলো ওড়ে। মাটির ঘরগুলোর সমষ্টি থেকে উনুন ধরানোর ধুয়ো ওঠে কুণ্ডলী পাকিয়ে। সন্ধ্যার আগে আগে কুয়াশা, ধুলো, ধুঁয়ো ও নানা মিশ্র গন্ধ মিলে মিশে আসন্ন রাতের কালো বালাপোশে কোনো অনামা আতরের খুশ্ব মাখায়।

অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল নানকুয়া। হুলুক্ পাহাড়ের পিঠের ছায়া পড়েছে নিচের ঘন জঙ্গলের গায়ে।

এমন সময় পিছ থেকে রিনরিনে গলায় টুসিয়া বলল, কত দিন, এই সব গুণ হয়েছে তোমার! ছিঃ ছিঃ। এই নাকি পাগলা সাহেবের শিক্ষা!

নানকুয়ার রক্ত মাথায় চড়ে গেল। খুব একটা খারাপ গাল দিয়ে বলল, মুখ সামলে কথা বল্।

কী বললে? টুসিয়া আহত গলায় বলল।

এইই দোষ নানকুয়ার। বড় মাথা গরম ওর। একটুতেই বড় রেগে যায়। এ জন্যেই ওর কিছু হবে না। ও জানে।

পরক্ষণেই ও হাত জোড় করে বলল, গাল দিলাম বলে রাগ করিস না। তুই তো জানিস্ তোকে আমি কত ভালোবাসি! তোকে এ কথা বলতে চাই না। তুই পাগলা সাহেবকে এর মধ্যে আনলি কেন?

টুসিয়া বলল, আমার কিছু বলার নেই।

সেদিন মুঞ্জরী মাসীর বাড়িতে গেছিলাম। মাসি বুলকিকে পাঠিয়েও ছিল তোকে ডেকে আনতে। তুই বাড়ি ছিলি না?

তুমি কি নিজে আসতে পারতে না? বুলকি কি তোমার দূত? আমি বাড়ি ছিলাম। ইচ্ছে করে আসিনি।

ইচ্ছে করে? কেন? নানকুয়া আবার ফুঁসে উঠল।

টুসিয়া বলল; এমনিই। আমার খুশি।

বলেই বলল, পথ ছাড়ো। কাল রাতে বাঘ খুব ডাকাডাকি করেছে পাহাড়ে। অন্ধকার হয়ে যাবে। আমার তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছতে হবে।

নানকুয়া ওর পাশে পাশে পাকদণ্ডী দিয়ে পাহাড়ে নামতে লাগল।

ছায়াচ্ছন্ন সোঁদা-গন্ধ পথের পাশে লজ্জাবতীর মতো একরকম ঝোপে লাল লাল ফুল ফুটেছে। নানকুয়া জানে না গাছটার নাম। কবে কোন সাহেব বীজ বা চারা এনে লাগিয়েছিল শিকার করেত এসে, কে জানে? গাছটা লজ্জাবতীর মতো। একরকমের লজ্জাবতীই। গায়ে হাত ছোঁয়ালেই পাতা বুজে যায়, লাজুকে মেয়ের চোখের মতো। সুন্দর লাল ময়ূর-শিখার মতো ফুল ফোটে গাছটায়। নানকুয়া দুটো ফুল ছিঁড়ে টুসিয়ার কাছে এগিয়ে গেল। বলল, তোকে চান করে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। ফুল দুটো খোঁপায় গুঁজে নে।

থাক্। বলল টুসিয়া।

কিন্তু ফুল দুটো হাতে নিলো।

নানকুয়া বলল, আমাকে দে, আমিই গুঁজে দিচ্ছি।

বলে, নিজেই টুসিয়াকে দাঁড় করিয়ে গুঁজে দিলো ফুল দুটি। গুঁজে দিয়েই জোর করে টুসিয়াকে বুকের মধ্যে নিয়ে চুমু খেল।

ঐ দোষ ওর। বড় দোষ! কোনো কিছুই ভদ্রভাবে ধীরে সুস্থে করতে পারে না! জংলি তো!

এর আগেও দুবার চুমু খেয়েছিল নানকুয়া টুসিয়াকে। একদিন জেঠ শিকারের দিনে। অন্য দিন দশেরাতে। আজ টুসিয়াকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে একেবারে অন্যরকম অনুভূতি হল নানকুয়ার। এতদিন ওর পাথরের মতো শক্ত বুকের মধ্যে টুসিয়ার অদেখা বুকের ছোঁয়াই পেয়েছিল সে শুধু। আজ টুসিয়ার শাড়ি-জামার আড়ালে তা যেন দেখতে পেলো। ওর চোখে ভেসে উঠল জল-ভেজা রোদ-পিছলানো অনাবৃত টুসিয়ার নিভৃত শরীরটা।

টুসিয়া ভালোলাগর শব্দ করে উঠল যদিও, তবুও দু-হাত দিয়ে ওকে ঠেলে দিলো। বলল, চল্‌, হঠ।

তারপর নিচে নামতে নামতে টুসিয়া বলল, দাদা আসছে কালকে।

টুসিয়ার দাদা হীরু শহরে কলেজ থেকে বি.এ. পাস করেছে। তারপর তফসিলি উপজাতিদের জন্যে সংরক্ষিত আসনে সরকারি অফিসার হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ অফিসার। পাটনাতে পোস্টেড এখন। দাদার জন্যে টুসিয়া এবং তার মা-বাবার অত্যন্ত গর্ব। হীরু পুরো গ্রামেরই গর্ব। ক’টা গ্রামের ওরাওঁ কাহার, দোসাদ, ভোগত, মুণ্ডাদের ছেলে এত ভারি অসর হয়?

দাদা যদি টুসিয়াদের সকলকে নিয়ে পাটনায় চলে যেতো, তাহলে খুব ভালো হতো। তার দাদা অনেক বড় হয়েছে, কিন্তু ওরা যেমন তেমনই রয়ে গেছে—তাই এই টানাপোড়েনে পড়ে ওদের অবস্থাটা অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। অনেকদিন হল ভাইয়ার চিঠির রকম-সকম দেখে মনে হচ্ছিল টুসিয়ার ভাইয়া বদলে গেছে অনেক। আগের মতো আর নেই। আজকাল টাকা-ফাকাও বিশেষ পাঠায় না। মাঝে মাঝে একশো টাকা করে পাঠায়, তাও কয়েক মাস বাদে বাদে। অবশ্য ওদের কাছে তাই-ই অনেক টাকা। তবু পরিবারের একমাত্র ছেলে ও কৃতী ছেলে হিসেবে ভাইয়ার ওর জন্যে এবং বাবা-মায়ের জন্যে অনেক কিছুই করার ছিল।

টুসিয়ার দাদা হীরু যে এইবার তার এক বন্ধুকে সঙ্গে করে নিয়ে আসছে, সে খবরের বিশেষ তাৎপর্য ছিল টুসিয়ার মা-বাবার কাছে। টুসিয়ার কাছে তো নিশ্চয়ই। বাবাকে দাদা কী লিখেছিল জানে না টুসিয়া। কিন্তু মনে মনে স্বপ্ন দেখা শুরু করে দিয়েছিল। তার দাদার বন্ধু কেমন দেখতে হবে কে জানে? দেখতে যাই-ই হোক, পুরুষ মানুষের আবার রূপ! বিয়ের পর কোন ভারী শহরে থাকবে, কী ভাবে সেখানের আদব-কায়দা, রীতি-নীতিতে রপ্ত করবে নিজেকে, তা নিয়ে চিন্তাও করেছিল। তার ভাবা স্বামীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে যাতে সে ক্যাবলা গ্রাম্য মেয়ে বলে ইম্‌তেহানে অকৃতকার্য না হয়, তার জন্যে একা একা জঙ্গলে টাড়ে এ ক’দিন অনেক মহড়াই দিয়েছে সে।

মা এই ক’দিন টুসিয়ার চুল বড় যত্নে বেঁধে দিচ্ছে। কোনো কাজই প্রায় করতে দিচ্ছে না। সব কাজই নিজে হাতে করছে। মুখে গোঁড়লেবু কেটে ঘষে লাগাচ্ছে। করৌঞ্জের তেল মাখাচ্ছে মুখে, শোবার সময়। এত যত্ন তার শরীর যে কখনও পেতে পারে, তা টুসিয়া স্বপ্নেও ভাবে নি। তার শরীরকে সুন্দর করা হচ্ছে ভবিষ্যতে একজনের ভোগের জন্যে। সে টুসিয়ার জীবনের পরম পুরুষ। তার পতি। দেওতা!

শিগগিরিই দাদা আসবে, আর ঠিক আজই এমন ভাবে, এমন পরিবেশে নানকুয়ার সঙ্গে তার দেখা হল বলে মনে মনে বড় বিরক্ত হয়েছিল টুসিয়া। ভীষণ আতঙ্কিতও ও। এতদিন ও ব্যাপারটাকে সকলের কাছেই গোপন করতে চেয়েছিল। নানকুয়াকে গোপন করে যদি তার বিয়ে পাকা হয়ে যেত তাহলে নানকুয়া হয়ত তাকে খুনই করে ফেলত। কে জানে? যা বদ্রাগী মানুষ! যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। দেওতা যা করেন মঙ্গলের জন্যে। নানকুয়াকে যা বলার বলে তার অপরাধী মনের ভার লাঘব করতে পারলে সে হালকাই বোধ করবে এখন

নানকুয়া চুপ করে ছিল। চুপচাপ হাঁটছিল।

হঠাৎ টুসিয়া নানকুয়ার হাতটা আদরে জড়িয়ে ধরল। বলল, অ্যাই তুমি কোনো বাগড়া দেবে না তো? আমার যদি ভালো বিয়ে হয়, সুখে থাকি আমি, তুমি… ।

নানকুয়াকে যেন সাপে কামড়েছে এমন ভাবে ও ছিটকে সরে গেল টুসিয়ার কাছ থেকে।

তারপর ঘৃণায় ভুরু কুঁচকে বলল, আমাকে তুই কী মনে করিস? আমি কি তোর মতো কামিনা? আমার নাম নান্‌কু। নানকু ওরাওঁ!

তারপর পথের পাশের একটা আমলকী গাছের ডাল থেকে আচমকা এক মুঠো পাতা ছিঁড়ে ফেলে নিজের মুঠির মধ্যে পিষতে-পিষতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তুই আমার যোগ্য নোস্, আমার যোগ্য নোস্; একেবারেই নোস্।

বাকি পথ কেউই কোনো কথা বলল না। জঙ্গলের শেষে বড়ো মহুয়া গাছটার কাছে এসে পথটা যেখানে দু-দিকে ভাগ হয়ে গেছে, সেখানে পৌঁছে দুজনে দু-দিকে চলে গেল। নিঃশব্দে।

নানুক্ নিঃশব্দে বলল, তুই সত্যিই আমার যোগ্য নোস্ টুসি। তুই আমাকে চিনতে পারিসনি। হয়তো কখনওই চিনতে পারবি না! ভালোই হয়েছে। যা হচ্ছে তা ভালোই।

কোজাগর – ৯

চিপাদোহরে কাজ ছিল। আমাদের কোম্পানির মালিক রোশনলালবাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে সেখানে। মুনাব্বর কাল বলে গেছে।

ডালমিয়া নগর, পাটনা, রাঁচি বা কলকাতায় না গেলে উনি রোজই বিকেলবেলায় ডালটনগঞ্জ থেকে চিপাদোহরে আসেন। প্রথমেই ডিপোতে ঘুরে আসেন একবার আলো থাকতে থাকতে। কত বাঁশ কোন্ জঙ্গল থেকে লাদাই হয়ে এসে সেখানে ঢোলাই হল, রেক্ কেমন পাওয়া যাচ্ছে? কত ওয়াগন মাল কোথায় গেল? সব খোঁজখবর নিয়ে তারপর ডেরায় ফেরেন।

এখন শীত, তাই সূর্য ডোবার আগে থেকেই ডেরার সামনে আগুন জ্বালানো হয়। ভয়সা ঘিয়ে ভাজা দুটি পানতুয়া এবং অনেকখানি চিনি দিয়ে এক কাপ দুধ খান উনি। চিপাদোহরের রোজকার বাঁধা বৈকালিক রুটিন রোশনবাবুর, এখানের সকলেই জানে।

যখন আসেন, তখন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কিছু লোক, রোহাটাস্ ইন্ডাস্ট্রিস, ইনডিয়ান পেপার পার্-এর কোনো লোক এবং স্থানীয় এবং ডালটনগঞ্জী বাঁশ-কাঠের ঠিকাদারদের কেউ কেউ আসেন। আগুন মধ্যে রেখে গোল হয়ে বসেন সকলে বেতের চেয়ারে। শীত বেশি থাকলে অফিস ঘরের খাপ্পার চালের নিচে মাথা বাঁচিয়ে আগুনের দিকে পা করে বসেন। টুকটাক গল্প হয়, কাজ শেষ হলে।

জংলি জায়গা, ছোটখাট খবর; কূপমণ্ডূকতার জগৎ এখানে।

শীতের দিনে মালিক রাত আটটা নাগাদ আর গরমের দিনে ন’টা নাগাদ উঠে চলে যান গাড়ি চালিয়ে। চল্লিশ কিলোমিটার পথ।

যতক্ষণ উনি চিপাদোহরে থাকেন, মেট মুনাব্বর, জঙ্গি জওয়ানের মতো চেহারা, ছ’ফিট লম্বা, সু-গঠিত কুচকুচে কালো পেটা শরীরের নীরব কর্মী, খাকি পোশাকে সটান দাঁড়িয়ে থাকেন গভর্নরের এ-ডি-সির মতো তার মালিকের ইজি চেয়ারের পাশে।

পাঁড়েজি ধবধবে ফিনফিনে, ফর্সা; খাঁটি ব্রাহ্মণ। বাড়ি আরা জেলায়। বেজাতের হাতে জল খান না। উনিও পায়ে নাগরা এঁটে, ধুতির ওপর গলাবন্ধ গরম দেহাতি পশমের কোট পরে প্রাণের দায়ে সিঁড়িতে উবু হয়ে বসে আগুন পোহান।

নানা জায়গা থেকে বেপারীরা আসে বাঁশ ও কাঠ কিনতে। সকলেরই খাওয়া-দাওয়া কোম্পানির ডেরায়, নিখরচায়। দূর দূর থেকে জঙ্গলের মধ্যে আসেন সকলে, যাঁরা দিনে দিনে ফিরতে না পারেন, তাঁদের রাতের শোওয়ারও ব্যবস্থা করতে হয়।

আমার মালিক লোক খারাপ নন। আমার বোন রানুর বিয়ের রাতে, আসবার সময় মা’কে তিনি বলেছিলেন, আপনি খুশি তো? কোনো কিছুতে খুঁত থাকলে আমাকে জানাবেন। ফুলশয্যার তত্ত্বের টাকাও আমি সায়নাবাবুকে দিয়ে গেলাম। কোনো ভাবনা নেই।

মা হাত তুলে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, সুখী হও বাবা।

কতরকম মানুষ দেখলাম এই দুনিয়ায়। আলাদা আলাদা তাদের চাওয়া, তাদের পাওয়া। একের কাছে যা সুখ, অন্যের কাছে তাই-ই অসুখ। যার সব আছে বলে অন্যদের ধারণা, তার মতো হাহাকারে ভরা মানুষ হয়ত দ্বিতীয় নেই। সুখ বা দুঃখকে আমরা নিজের নিজের পরিবেশ, মানসিকতা এবং অভিজ্ঞতা দিয়েই নিরূপণ করি, তাই নিজের সুখটাই অন্যের সুখ বলে মনে করি। ব্যক্তি বিশেষে, অবস্থা বিশেষে, পরিবেশ বিশেষে সুখের সংজ্ঞা যে কত পরিবর্তনশীল তা হৃদয় দিয়ে বোঝার ক্ষমতা আমাদের অনেকেরই নেই।

আজই দুপুরে এসেছিলাম ভালুমার থেকে ট্রাকে। আজ রাতটা চিপাদোহরেই কাটিয়ে ভোরে আবার মুনাব্বর-এর সঙ্গে ট্রাক নিয়ে গিদাই ড্রাইভারের সঙ্গে ভালুমার ফিরে যাব। এই চিপাদোহরেরই মেস্-এর রাঁধুনি বামুন লালটু পাণ্ডে। এমন একজন সৎ, পবিত্র চরিত্রের, কবি-স্বভাবের শান্ত চেহারার নির্মল মানুষ খুব কমই দেখেছি। লালটুর উজ্জ্বল অপাপবিদ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে আমার চিরদিনই নিজেকে বড়ো ছোটো লাগে। মানুষটার ছোটখাটো চেহারাও এই বন-পাহাড়েরই মতো খোলামেলা। মনে কোথাও এতটুকু কলুষ নেই।

লালটুর বাড়ি গাড়োয়াতে, খিলাওন্ গ্রামে। জাতে ও পূজারী বামুন। পূজাপাঠ করার কথা, আর করছে রাঁধুনি বামুনের কাজ। কিন্তু যে যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে ও রান্না করে, এবং এক-একবেলা পঞ্চাশ-ষাটজন লোককে আদর করে খাওয়ায়; তাতে তার পূজা-পাঠের চেয়ে কিছু কম পূর্ণ হয় বলে আমার মনে হয় না।

দোষের মধ্যে লালটুর একমাত্র দোষ একটু ভাঙ খাওয়া। ওকে ভালোবাসি বলে একটু বললাম কিন্তু ভাঙ ও বেশ বেশিই খেতো। মৌরী, গোলমরিচ, গোলাপ ফুল, শশার বীচি, পোস্ত এসব দিয়ে ভাঙ বেটে এবং সন্ধে লাগতে না লাগতেই তা খেয়ে মত্ত হয়ে থাকে ও। এবং ভাঙ খেলেই লালটুর মন বিরহী হয়ে ওঠে। মনে মনে সে তার প্রোষিতভর্তৃকা স্ত্রীকে কবিতা লেখে এবং তার স্ত্রীর জবাবও নিজেই রচনা করে।

গভীর জঙ্গলের মধ্যে কুলি মজুরদের সঙ্গে দিন কাটায় বলেই কাউকে অশিক্ষিত বলা যায় না। তাছাড়া স্কুল-কলেজে আমরা যা শিখেছি, সেইটেই শিক্ষা আর যারা স্কুলে-কলেজে পড়ার সুযোগ পায় না তাদের সব কিছুই অশিক্ষা একথা মনে করাটা বোধহয় ঠিক নয়। ঠিক নয় এই কারণে যে লালটু পাণ্ডের মতো অনেক মানুষকেই আমি নিজের চোখে দেখেছি। তাদের গ্রাম্য, নির্মল, নির্লিপ্ত পরিবেশ তাদের দারুণ কলুষহীন শিক্ষায় সুস্নাত করেছে। রামায়ণ মহাভারত থেকে তারা যে শিক্ষাকে নিজ নিজ জীবনে গ্রহণ করেছে, তাদের সঙ্গে আমার মতো দু-পাতা ইংরিজি-পড়া কেরানির ফালতু শিক্ষার কোনো তুলনাই হয় না। এ হচ্ছে একজন ভারতীয়র জন্মগত, সুসংস্কারগত শিক্ষা। তেমন লেখাপড়া শেখার সুযোগ পেলে লালটু যে যশস্বী কবি হতো এমন মনে করার যথেষ্টই কারণ ছিল।

রাতে খেতে বসে চিপাদোহরের লালটুকে নিয়ে অনেকেই রসিকতা করতেন। পরেশবাবু অনেকদিনের লোক। খেতে খেতে বললেন, আরে লালটু, শুনলাম তুই নাকি আজকাল হিদু-ড্রাইভারের বৌ-এর সঙ্গে লটর-পটর্ করছিস। তোর বৌ-এর প্রতি প্রেম কি উবে গেল?

গজেনবাবু বললেন, লেহ্ লটকা!

কিন্তু আমরা সকলেই জানতাম যে এসব মিথ্যে কথা। লালটু এবং লালটুর স্ত্রীর মতো দম্পতিই আদর্শ দম্পতি। এমন বিশ্বস্ততা এবং প্রেমই ভারতের আদর্শ। যা আমরা ভাবতেও পারি না। ক’জন শহুরে শিক্ষায় শিক্ষিত লোক শপথ করে বলতে পারেন যে, বিবাহিত জীবনে নিজের স্ত্রী এবং স্বামী ছাড়া অন্য কারো প্রতিই জীবনের দীর্ঘ পথে তাঁরা কখনও আকর্ষিত হননি? অথচ লালটুর মতো অরণ্যবাসের জীবনে, যেখানে পা-পিছলানো যায় এক টাকার বিনিময়ে জঙ্গলে, ঝোপে বা খড়ের গাদায় অক্লেশে এবং বিনা সমালোচনায়, সেখানেও সে পুরোপুরি বিশ্বস্ত। তার বিবাহিতা স্ত্রীই তার স্বপ্ন, তার আদর্শ। লালটু পাণ্ডের বুকে বসন্তের চাঁদনি রাতে তারই বিরহ-ভাবনা, প্রচণ্ড শীতের রাতে তারই কবোষ্ণতার উষ্ণতার স্বপ্ন। লালটু লালটুই!

পরেশবাবু যখন ঐ কথা বললেন, তখন লালটু খেসারির ডালের হাঁড়িতে হাতায় করে মনোযোগ সহকারে গাওয়া ঘি ঢালছিল। ঘুরে দাঁড়িয়েই হঠাৎ সে বলে উঠল—

“রোওশনী সুরজ সে হোতা হ্যায়
সিঁতারো সে নেহী,
মুহব্বত্ এক সে হোতা হ্যায়,
হাজারোসে নেহী।”

আমার গলায় রুটি আটকে গেল। এই শীতের রাতের লণ্ঠন-জ্বলা রান্না ঘরে কাঠের পিঁড়িতে বসে খেতে খেতে হঠাৎ এক আশ্চর্য জগৎ আমার চোখের সামনে খুলে গেল।

“আলো কেবল সূর্যই দিতে পারে।
তারারাও আলো দেয়; কিন্তু সে আলো কি আলো?
প্রেম হয় জীবনে একজনেরই সঙ্গে,
হাজার লোকের সঙ্গে কি প্রেম হয়?”

পরেশবাবু কথা ঘুরিয়ে বললেন, কি লালটু? তোর বউ এর চিঠি এলো না আর? কী লিখল সে চিঠিতে?

লালটুর স্ত্রী লেখাপড়া জানতো না। লালটুও জানে সামান্যই। কিন্তু লালটুর কল্পনাতে তার দূরের গ্রাম খিলাওন্ থেকে তার স্ত্রী নিত্য নতুন কবিতায় চিঠি পাঠাতো এবং লালটু তার জবাবও দিত কবিতায়। প্রতি সপ্তাহেই এমনি করে নতুন কবিতা শোনা যেত লালটুর কাছ থেকে।

পরেশবাবু বললেন, কী হল লালটু? এ সপ্তাহে খত্ আসে নি বুঝি?

এসেছে এসেছে। বলল, লালটু।

তারপর বলল, বউ লিখেছে :

“জল্‌কি শোভা কমল হ্যায়
ঔর থকি শোভা ফুল
ঔর মেরী শোভা আপ হ্যায় পতিদেব
হামে না যাইয়ে ভুল।”

অর্থাৎ, “জলের শোভা হচ্ছে গিয়ে পদ্ম আর স্থলের শোভা ফুল, আর আমার শোভা আপনি, আমার পতিদেব; আমাকে ভুলে যাবেন না।”

পরেশবাবু বললেন, জবাবে কী লিখলি তুই?

কী লিখেছি শুনুন—

“দিল্ তো করতা আউর মিঁলু
পরবীন্ উড়া না যায়,
কেয়া কহুঁ ভগওয়াসে কি
পঙ্খ দিয়া না জমায়।”

মানে, “প্রাণতো সবসময়েই করে যে তোমার সঙ্গে দেখা হোক, কিন্তু কী করব বল? আমি তো কবুতর নই যে, তোমার কাছে উড়ে যাব? ভগবান যে আমায় পাখাই দেন নি।”

আমাদের কোম্পানিতে যাঁরাই জঙ্গলের কাজে আছেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় সবাই-ই অল্পবয়সি এবং ব্যাচেলর। এর মধ্যে গজেনবাবুই একমাত্র কনফার্মড ব্যাচেলর। বয়স হয় নি কিছুই, কিন্তু এরই মধ্যে কেমন বুড়োটে মেরে গেছেন। রসিক লোক। কিছু বটতলার বই, আর কামিনদের সঙ্গেই তাঁর সময় কাটে ভালো। মুখ দিয়ে সব সময় মদের গন্ধ বেরোয়। একেবারে ওরিজিনাল মানুষ। বিধাতা গজেনবাবুর প্রোটোটাইপ পৃথিবীর এদিকটিতে আর একটিও সৃষ্টি করেননি।

চিপাদোহরের রেলস্টেশনের ছোকরা অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টার গণেশবাবু রোজ রাতে আসেন আড্ডা মারতে, এই ঠান্ডাতেও। মাথায় বাঁদুরে টুপি চাপিয়ে, হাতে টর্চ নিয়ে, লুঙ্গির ওপরে শেয়ালরঙা র‍্যাপার জড়িয়ে। ঘরের মধ্যে মাল্সার আগুনে ঘিরে বসে ওঁরা তাস-টাস খেলেন।

আমি কিছু পড়ার চেষ্টা করি।

রথীদা পাবলো নেরুদার ‘মেমোয়ার্স’, বইটা দিয়েছিলেন। মাঝামাঝি এসেছি। নেরুদার গদ্যটাও কবিতারই মতো। এর আগে রাসেলের ‘অটোবায়োগ্রাফি’ পড়িয়ে ছিলেন। তার আগে বার্নার্ড জিমিকের ‘সেরেঙ্গিটি শ্যাল নেভার ডাই’, তারও আগে থর হায়ারডালের ‘প্যাপিরাস্, কটিকি’। অদ্ভুত সব বিষয়ের ওপর বই। বিষয়ের কোনো সাযুজ্য অথবা মাথামুণ্ডু নেই।

অল্প ক’দিন আগে একটা বই পড়তে দিয়েছিলেন, গাছ-গাছালির যৌন জীবন, সংবেদনশীলতা এবং মানসিকতার ওপরে। বইটা এখনও পড়া হয় নি, পড়েই আছে। পড়তে হবে সময় করে। মাঝে মাঝে ভাবি, রথীদা এখানে না থাকলেও আমাকেও বোধহয় তাস পিটে, মাঝে মধ্যে মহুয়া বা রাম্ গিলে এবং সিনেমার ম্যাগাজিনে চোখ বুলিয়ে একবারেই অন্যদের মতো হয়ে যেতে হত। আমার “আমিত্ব” বলে কিছুই থাকতো না।

গজেনবাবু তাস ফেরাতে ফেরাতে বললেন, বাদলের বোনের বিয়ের কথা হচ্ছে কিন্তু গণেশ। এইবেলা মা-বাবাকে লিখে একটা ফয়সালা করে ফ্যাল। নইলে আঙুল চুষতে হবে পরে।

বাদল আমাদের টৌরীর কাজ দেখাশোনা করে। যদিও তার ওপরে আছেন কন্ঠেবাবু। নাম রেখেছেন গজেনবাবু, ক্যাট-জ্যাম্পিং রাইস। অর্থাৎ, উনি যে পরিমাণ ভাত থালায় নিয়ে খেতে বসেন তা কোনো হুলো বেড়ালের পক্ষেও লাফিয়ে ডিঙোনো সম্ভব নয়। বাদলের ছোট বোন চুমকি একবার চিপাদোহরে এসেছিল বাদলের সঙ্গে। কলেজে পড়ে। হাজারিবাগে না কোথায় যেন। চেহারাতে জয়া-ভাদুড়ী-জয়া-ভাদুড়ী ছাপ ছিল সামান্যই। মিষ্টি গলায় আরতি মুখার্জীকে নকল করে আধুনিক গান গাইত ভীষণ কাঁচা তেঁতুল খেতে ভালোবাসত। শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো আর নুন মিশিয়ে।

চুমকির প্রেমে পড়ার পর চুরি জন্যে তেঁতুল পাড়তে গিয়ে গণেশ তেঁতুলগাছে উঠে পা-পিছলে ডালসুদ্ধ নিচে পড়েছিল। অতএব পা-ভেঙে তিনমাস ডালটনগঞ্জের হাসপাতালে। প্রাণ যে যায়নি, এই যথেষ্ট। কিন্তু বাদলের বোন চুম্‌কি অন্যান্য অনেক চুমকির মতোই আরো তেঁতুল খেয়ে ও আধুনিক গান গেয়ে ছুটি ফুরোলে আবার স্বস্থানে ফিরে গেছিল। গণেশকে হাসপাতলে একদিন দেখতে পর্যন্ত যায়নি।

গণেশ মাস্টার ছেলেটি একটু বেশিমাত্রায় রোম্যান্টিক। চাঁদ উঠলেই দেবব্ৰত বিশ্বাসের ঢঙে ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’ গান গাইতে শুরু করে। শীতেই হোক, কী বর্ষাতেই হোক। তার মনে চুক্তি সম্বন্ধে একটা স্বপ্নিল কিছু গড়ে উঠেছিল। বাদলেরও আপত্তি থাকার কথা ছিল না, যদিও চুমকিকে কেউ বাজিয়ে দেখেনি, এই প্রস্তাবে সে চায় কি না

কিন্তু বাধা ছিল অন্যখানে।

লক্ষ লক্ষ নিরুপায় মধ্যবিত্ত বাঙালি চাকুরিজীবীর যেখানে বাধা। গণেশের বাবা সবে রিটায়ার করেছেন। দুটি ছোট বোন আছে, একজন অনেকদিনই বিবাহযোগ্যা। অন্যজনও বড় হয়ে উঠেছে। বোনেদের বিয়ে না হলে গণেশের বিয়ের প্রশ্নই ওঠে না।

আমাদের সকলেরই জানাশোনা এমন অনেক ছেলেও আছে যারা তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন, নিজেদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে নি মা-বাবা, বা ভাই- বোনেদের মুখ চেয়ে। নিজের নিজের খুশিমতো বিয়ে করেছে, ছোট্ট সুখী স্বার্থপরতার দেওয়াল তুলে সংসার গড়েছে যারা। আশ্চর্য! তারা কিন্তু আজও ব্যতিক্রম। বেশিরভাগই গণেশদেরই মতো।

গণেশের বয়স হয়ত চল্লিশ পেরিয়ে যাবে দু-বোনের বিয়ে দিতে দিতে। তবুও হয়ত তাদের বিয়ে হবে না, কারণ তাদের মুখশ্রী নাকি গণেশরই মতো। যদিও গায়ের রঙ ফর্সা। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার জেনেও গণেশ অপেক্ষা করছে। এবং অপেক্ষা করবে।

ওদের ওইটুকুই আনন্দ। সারাদিন কাজের পর, এই তাসখেলা, এই গালগল্প, এই ছোটো জায়গার নানান কুৎসা ও রসের ভিয়েনে কোনোক্রমে হাঁপিয়ে-ওঠা অবকাশকে ভরিয়ে তোলা। সকালে দুটো আর বিকালে দুটো প্যাসেঞ্জার ট্রেন আসে যায় আপ-ডাউনে, আর কিছু মালগাড়ি। মাইনে ছাড়াও যে সামান্য উপরি রোজগার আছে তা দিয়েও বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে লাউকির তরকারি আর অড়হড়ের ডাল ছাড়া কিছু খাওয়া জোটে না গণেশের। ওর ছুটির দিনে আমাদের চিপাদোহরের ডেরাতেই খায় গণেশ।

রোশনলালবাবু আমাদের সকলের কাছে বাদলের সমস্যার কথা শুনে একদিন বলেছিলেন, বুঝলে বাদল, দিয়ে দাও বোনের বিয়ে, গণেশের সঙ্গে। খরচের কথা ভেব না। কিন্তু সমস্যাটা বাদলের বোনের বিয়েজনিত ছিল না। ছিল, গণেশের দুই বোনের বিয়ে নিয়ে। সে কথা জেনে রোশনলালবাবু এও বলেছিলেন, লাগাও হে মাস্টার, এক বোনের বিয়ের খরচ আমিই দেব। যদি তাতে তোমার বিয়ে নির্বিঘ্ন হয় সেইমতো বাড়িতে চিঠিও লিখেছিল গণেশ বেচারা। কিন্তু বড়ো বোনের বিয়ে দেওয়া গেলেও ছোটো বোনের বয়স তখন পনেরো। মা, দুই বোনের বিয়ে দেওয়ার আগে ছেলের বিয়ের কথা মোটেই ভাবছেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন।

আজকের দিনের অর্থনৈতিক কাঠামো মধ্যবিত্তদের মানসিকতার খোল-নলচে পালটে দিয়েছে। স্বামীর অবসর গ্রহণের পর পরিবারের রোজগারের একমাত্র উৎস, অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টার ছেলের বিয়ে দিয়ে অজানা চরিত্রর পুত্রবধূর দয়া-নির্ভর হয়ে সেই উৎস হারাবার মতো সাহস গণেশের মায়ের ছিল না। আর্থিক অবস্থা অতি স্নেহময়ী বাঙালি মায়েদেরও বড়ো নিষ্ঠুর করে তুলেছে। পরেশবাবুর কাছে শুনেছি যে, গণেশের মা নাকি এ-ও লিখেছিলেন যে, বড়ো মেয়ের বিয়ের পর ছোটো মেয়ের এবং গণেশের বিয়ে একই সঙ্গে দেবেন যাতে ছেলের বিয়ের পণের টাকা দিয়েই ছোট মেয়ের বিয়েটাও হয়ে যায়।

লালচে বাঁদুরে-টুপি পরে বেঁটে-খাটো, ফর্সা, ছিপ্‌ছিপে গণেশ জোড়াসনে বসে তাস খেলছিল। ছোট্ট নাকটা বেরিয়ে ছিল টুপি থেকে আর মুখের একটা অংশ। লণ্ঠনের আলোটা স্থির হয়ে ছিল গণেশ-মাস্টারের মুখে। ঘরের কোণে, বসে, ওর দিকে চেয়ে, আমার হঠাৎই মনে হল যে, যারা যুদ্ধ করে, পাহাড় চড়ে, সমুদ্র ডিঙোয়, তারাই কি শুধু বীর? আর যারা তিল তিল করে নিজেদের যৌবন, নিজেদের সব সাধ-আহ্লাদ, নিজেদের খাওয়ার সুখ, পরার সুখ, শরীরের সব সুখকে এমন নির্বিকার নির্লিপ্তচিত্তে প্রতিদিন নিঃশব্দে গলা টিপে মারে, নিজের জন্মদাতা বা দাত্রী এবং ভাইবোনদের কারণে তারা কি বীর নয়? প্রতি মুহূর্তে নিজের সঙ্গে যুদ্ধে যে যোদ্ধা নিজেকে বার বার পরাজিত করে, সেও কি মহান যোদ্ধা নয়?

বাইরে পেঁচা ডাকছিল দুরগুম্ দুরগুম্ করে। কুকুরগুলো ভুক্ ভুক্ করে উঠলো। শেয়াল বা চিতা-টিতা দেখেছে হয়তো। দূরের রেল লাইনে ডিজেলের ভারী মালগাড়ি একটানা ঘড় ঘড় আওয়াজ তুলে রাতের শীতের হিমেল শিশির-ভেজা নিস্তব্ধতাকে মথিত করে চলে গেল বাড়কাকানার দিকে।

ওরা দান দিচ্ছিল, কথা বলছিল, তাস ফেটাচ্ছিল। আমি বইটা মুড়ে রেখে বালিশে মাথা দিয়ে আধো শুয়ে কম্বল গায়ে টেনে বসে ভাবছিলাম কী আশ্চর্য সুন্দর, প্রাগৈতিহাসিক অথচ কী দারুণ আধুনিক আমাদের দেশ।

এই ভারতবর্ষ!

কোজাগর – ১০

সকালে চান করে আটার ফুলকা আর আলুর চোকা খেয়ে মুনাব্বরের সঙ্গে ট্রাকে বসলাম। মুনাব্বর ভিতরে, আমি বাঁয়ে। রোদ আসছিল বাঁদিক দিয়ে। কিছুক্ষণ পর পথটা ডাইনে বাঁক নিতেই শীত শীত করতে লাগল। সকালের শীতের বনের গা থেকে ভারি একটা সোঁদা সোঁদা মিষ্টি গন্ধ ওঠে। কী সব ঠুকরে খেতে খেতে বনমুরগি, ময়ূর, তিতির পথের মাঝ থেকে দুধারে সরে যায়, ট্রাকের শব্দ শুনে।

ডানদিকের সেগুন প্ল্যানটেশানে একদল বাইসন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লাগানো কুল্থী ক্ষেতে কুল্থী খাচ্ছিল রোদ পোয়াতে পোয়াতে। রাতের শিশির ওদের মোটা অথচ রেশমি চামড়াতে তখনও মাখা ছিল। রোদ পড়ে, ওদের কালচে বাদামি শরীর চক্‌চক্‌ করছিল। কপালের সাদা জায়গাগুলো আর পায়ের সাদা লোমের মোজাও।

পথে সানদীয়া পড়ে। একই নদী পথটাকে কেটে গেছে সাতবার ঘুরে ফিরে সাত-সাতটা কজওয়ে নদীর ওপর মাইলখানেকের মধ্যে। জল চলেছে তিরতির করে শ্যাওলা-ধরা নুড়ি পাথরের গা বেয়ে। বর্ষায়, বিশেষ করে বৃষ্টির পর, এই সাদীয়াতে এসে অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় আমাদের, আধঘণ্টা, কখনও বা একঘণ্টাও; বা তার চেয়েও বেশি। তখন পথ ভাসিয়ে কজওয়ের ওপর দিয়ে বেগে লালরঙা ঘোলা বানের জল কাঠকুটো ডালপালা আর নুড়ি ভাসিয়ে গড়িয়ে গর্জন করে বয়ে যায়। যতক্ষণ না জলের তোড় কমে, ততক্ষণ পার হবার উপায় থাকে না। একবার এক কলকাতার র‍্যাফিং-করা বাঙালিবাবু বাহাদুরি দেখানোর জন্যে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও অবিবাহিতা শালিসমেত অ্যাম্বাসাডার গাড়ি করে বর্ষায় এই নদী পেরোতে গিয়ে সপরিবারে ডুবে মারা গেছিলেন। গাড়িসুদ্ধু তাঁদের ভাসিয়ে নিয়ে গেছিল নদী, অনেক দূরে। একমাত্র শালিই বেঁচে যান। জামাইবাবুরা চিরদিনই শালিদের জন্যে নানাভাবে করে থাকেন। সেটা কিছু নূতন বা আশ্চর্য ঘটনা নয়। কিন্তু সেই দুর্ঘটনার পরই রমেনবাবু সানদীয়ার নাম বদলে দিয়ে এই নদীর নাম রেখেছেন জামাই-মারা নদীয়া।

গাড়ুর কাছে কোয়েলের ওপরের ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ু বাজার হয়ে ট্রাক চলল ভালুমারের দিকে। মুনাব্বর আমাকে ভালুমারে নামিয়ে দিয়ে হুলুক্‌ পাহাড়ে চলে যাবে। আমি মাস্টার-রোল্স তৈরি করে, খাওয়াদাওয়া করে নিয়ে বসে থাকব। মুনাব্বর আবার ট্রাক পাঠাবে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। আজ পেমেন্টের দিন। চিপাদোহর থেকে টাকা ও সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছে। নতুন মার্সিডিস্ ট্রাক, ভালুমার বস্তির মাইল খানেক আগে হৃদয়-ঘটিত গোলমালে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। জঙ্গলে যে সব মানুষ চাকরি করবার জন্যে যায়, তাদের নিতান্ত দায়ে ঠেকেই সর্বজ্ঞ হতে হয়। তাই মুনাব্বরও একজন মেকানিক্। ড্রাইভার ও হেল্পার তো আছেই। কেবল আমার দ্বারাই কিছু শেখা হল না। যন্ত্রপাতির সঙ্গে আমার একটা জন্মগত বিরোধ আছে। জানি না, ছোটবেলায় বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে এই কারণেই বিস্তর মাঞ্জা দেওয়া সত্ত্বেও আমার সব ঘুড়ি ভো-কট্টা হয়ে যেত কি-না। কোন ফুটোয় তেল ঢালে, কোন ফুটোয় মবিল, সেটুকুও শিখে ওঠা হল না, তাই গজেনবাবু আমাকে ডাকেন বাঁশবাবু, ‘দ্যা পারপেচুয়াল আনপড়’ বলে।

ওরা যখন বলল, কমপক্ষে আধ ঘণ্টাটাক লাগবে ট্রাক ঠিকঠাক করতে, আমি তখন মুনাব্বরকে বলে নেমে গেলাম। ভাবলাম পায়ে হেঁটেই এগিয়ে যাই। যদি ওদের আসতে দেরিও হয়, তাহলে মাস্টার-রোল নিয়ে একেবারে তৈরি হয়ে থাকব। দুপুরে মেট-মুনশিদের সঙ্গেই কিছু খেয়ে নেব না হয় জঙ্গলে। অনেকদিন হয়ে গেছে সকালের দিকে এই পথে হাঁটি নি। আমার যাওয়া-আসা সবই ভালুমারের অন্য দিকটাতে।

শীতের ফসল লেগেছে ঢালে ঢালে, পাহাড়ের গায়ে গায়ে। ভরন্ত সবুজের পটভূমিতে সরগুজা আর কাড়ুয়ার নরম হলুদ ভারি এক স্নিগ্ধতায় ভরে দিয়েছে। অড়হরের ক্ষেতে ফুল এসেছে। রাহেলাওলা আর পুটুসের ফুলে পথের দু-পাশ ভরে আছে। ফিফিচিয়া পাখি ডাকছে থেকে থেকে। ছোটো ছোটো টুই পাখিগুলো ফুরুৎ ফুরুৎ করে উড়ে বেড়াচ্ছে চঞ্চল ভাবনার মতো। কিছুদিন আগে জিনোর লেগেছিল। কিন্তু হলে কী হয়, গাঁয়ের বেশির ভাগ লোকই জিনোর ঘরে তুলতে পারে নি গত বছরে হাতির অত্যাচারে। মকাইকে পালামৌ জেলাতে জিনোর বলে। অথচ পাশের হাজারিবাগ জেলাতে মকাই-ই বলে। পুজোর সময় এই পথেরই দু-পাশে ভরে ছিল হলুদ-সবুজ ফসলে ফসলে। দিন ও রাতে রাখওয়ার ছেলেরা টিয়া ও জানোয়ার তাড়াত তখন। দুপুরে বা রাতে তাদের বাঁশির সুর বা দেহাতি গানের কলি ভেসে আসত দু-পাশ থেকে। গোঁদনি ও সাঁওয়া ধানও যে যা করেছিল, নষ্ট করে দিয়েছিল হাতিতে। এখন কুল্থী মটর-ছিম্মি, অড়হড় এই সব লেগে আছে।

পদের কালভার্টের নিচে দিয়ে বয়ে-যাওয়া তিরতিরে নালাতে ছোট ছোট অর্ধ-উলঙ্গ ছেলেরা চেত্নী মাছ ধরছে ছেঁকে ছেঁকে। ছোটো ছোটো পাহাড়ী পুঁটি রোদ পড়ে ঝিক্-মিকিয়ে উঠছে ছটফট্-করা ছোটো মাছগুলোর রুপোলি শরীরে। আর সেই রোদই মিলিয়ে যাচ্ছে ছেলেগুলোর কালো কালো রুখু খড়িওঠা অপুষ্ট গায়ে। রোদই ওদের নিখরচার ভিটামিন।

রাম্‌ধানীরা বুড়ো, কষ্টে কঁকিয়ে নিচু হয়ে হেঁটে আসছিল। ও হাঁটলে ওর হাড়ে হাড়ে হাওয়া-লাগা কঙ্কটি বাঁশের মতো কট্‌ক শব্দ হয়। এই-ই নানকুয়ার রামধানীয়া চাচা। সারারাত ধরে এই শীতে ঔরঙ্গা নদীতে চালোয়া মাছ ধরেছে। তাও মাত্র এক কেজির মতো। বুড়োর শরীরে এখনও রাতের শীত জড়িয়ে আছে। এতক্ষণ রোদে হেঁটেও গরম হয়নি ও। আমি একটা সিগারেট দিলাম। বুড়ো কালভার্টে বসল। সিগারেটটা দুহাতের মধ্যে নিয়ে আদর করে ধরল, তারপর মহামূল্য জিনিসের মতো একবার টানল, তারপর জোরে জোরে টানতে লাগল।

বলল, নেবে নাকি বাঁশবাবু? মাছ? আমার স্থানীয় নাম বাঁশবাবু। যার যেমন কপাল। চলিতার্থে এ জীবনে কাউকেই বাঁশ দেওয়ার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা না থাকলেও কাগজ কলে আর মালিকের ডিপোতে বাঁশ সাপ্লাইয়ের কাজে বহু বছর লেগে আছি বলে সকলেই আমাকে বাঁশবাবু বলে ডেকে থাকে। বাঁশের মতো আমিও ফুল ধরলেই মরে যাব। বিয়ে-টিয়ে আমার না-করাই ভাল।

কত করে নিচ্ছ?

বুড়ো বলল, দামের কি কোনো ঠিক আছে। সারা রাত এই শীতে নদীর জলে দাঁড়িয়ে, বিবেচনা করে যা হয় দাও। তুমি কি আর ঠকাবে আমাকে? তুমি তো শহুরে বাবু নও।

আমি অনেকই বেশি দিতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু ওদের চেয়ে ভালো জামাকাপড় পরি, আর দু-পাতা ইংরিজিই পড়েছি। নইলে ওদের তুলনায় খুব যে একটা বড়লোক আমি এমনও নয়।

বললাম, কত পেলে খুশি হও। কোথায় নিয়ে চলেছিলে বেচতে?

বুড়ো বলল, শীত একেবারে হাড়ের ভিতরে ঢুকে গেছে গো! কোথাওই আর বেচতে টেচতে যেতে পারব না। পথেই কেউ নিয়ে নিলে, নেবে। ফরেস্ট বাংলোতে গেছিলাম—সেখানে কোনো মেহমান নেই। চৌকিদার, মাত্র আট আনায় কিনতে চাইল, তার চেয়ে নিজে খাওয়াই ভালো। তাও শরীরে একটু তাগৎ হবে। তা তুমি যদি দু-টাকা দাও, তো দিয়ে দিই সবটা। তোমার কথা আলাদা।

দু টাকাই দেব, কিন্তু সবটা দিও না। তুমি এত কষ্ট করে ধরলে, আদ্দেক তুমি খেও, আদ্দেক আমাকে দাও।

রাম্‌ধানীরা হাসল। বলল, আরেকটা সিগারেট খাওয়াও। আমিও হাসলাম। সিগারেট বের করে দিলাম, তারপর বললাম, গান শোনাবে নাকি একটা?

বুড়ো টাকা দুটো পেয়ে গাছ-থেকে-ছিঁড়ে-নেওয়া শালপাতায় অর্ধেক মাছ ঢেলে দিয়ে সিগারেটে বড় বড় দুটো টান দিয়ে রোদে পিঠ দিয়ে ঝুমুরের গান ধরল, রামচন্দ্রর বিয়ের গান।

যে ছেলেগুলো মাছ ধরছিল, তারা মাছ-ধরা ছেড়ে দিয়ে বুড়োর কাছে উঠে এল, এসে রাস্তায় বুড়োকে ঘিরে বসল, মোষের গাড়ির পিঠে খড় বোঝাই করে দূর গ্রামের একজন লোক চলেছিল, মোষের পায়ে পায়ে মিষ্টি-গন্ধ-ধুলো উড়িয়ে গাড়ুর দিকে। সেও গাড়ি থামিয়ে দিল পথের মধ্যিখানে। কিছুক্ষণের জন্যে নিজের নিজের দুঃখ-কষ্টের কথা ভুলে গিয়ে বুড়োর গান শুনতে জমে গেল সকলে।

এখানের জীবন এমনই! সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খেটেও কোনো লাভ হয় না। তাই কিছু সময় নষ্ট করতে ওদের গায়ে লাগে না। আনন্দ আহ্লাদ করতে ওদের ঐটুকুই। হঠাৎই—পড়ে-পাওয়া।

বুড়ো গান ধরল, ভাঙা ভাঙা খনখনে গলায়। যৌবনে রামধানীয়ার নাকি নাম—ডাক ছিল গাইয়ে হিসেবে। দশটা গ্রামের মধ্যে এমন গাইয়ে ছিল না নাকি!

“জর্ গেল রাজা তোর জিন্দ্‌গী,
কী তোর ঘরে রাম হ্যায় ত কুঁয়ার;
উত্তরে খোঁজলি, দক্ষিণে খোঁজলি,
তব খোঁজলি চারো পরগনা,
নাই মিলল কান্যিয়া কুঁয়ার।”

যন্ত্র নেই, কিছু নেই; শুধু শীতের মন্থর হাওয়ায় পাথরে ঝরে-পড়া শুকনো শালপাতার মচমচানির শব্দের মধ্যে এই প্রাকৃত গান সমস্ত পরিবেশকে এমন এক অকৃত্রিমতায় ভরে দিল যে, মনে হল এই সব গান বুঝি এমন হঠাৎ বায়নায়, আচমকাই শুনতে হয়।

ছেলেগুলো হল্লা করে উঠল, আর একটা হোক, আরেকটা। বুড়ো আবার ধরল-

“ওরে গঙ্গা পাড়ে যমুনা,
সেই বীচে গোখুলা নগর,
ঔর উহে নগরে হ্যায় হাঁসা-হাঁসানীয়া
ওকরে ঘরে কন্যিয়া কুঁয়ার।”

গান শোনার পর চুপ করে থাকলাম কিছুক্ষণ। মোষের গাড়ি আবার চলতে লাগল, ছেলেগুলো মাছ ধরতে নেমে গেল।

বললাম, এবার এগোই। একদিন এসো বাড়িতে। ভালো করে গান শুনব চাচা। বুড়ো বলল, যাব। তিতলিকে বোলো, আদা আর এলাচ দিয়ে চা খাওয়াবে। ও সেদিন যা চা খাইয়েছিল না, আমার মেজাজই চাঙ্গা হয়ে গেল। সর মারীজই ওই ইলাজে ভালো হয়ে যাবে।

আমার মামাবাড়ি ছিল বিহারের গিরিডিতে। তাই আমার মা, দিদিমার কাছ থেকে দারুণ মোহনভোগ, নানারকম নোন্তা খাবার আর ওই রকম চা বানাতে শিখেছিলেন। আমার কাছ থেকে শুনে শুনে তিতলি এখন মা’র মতোই এক্সপার্ট হয়ে গেছে। আমার ছোট-বড় পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা-না-লাগা নিয়ে মেয়েটার কেন যে এমন ঝোঁক তা বুঝতে পারি না। মা বেঁচে থাকলে খুশি হতেন খুব ওই চা খেয়ে ওর হাতে।

পথের পাশে পাশে কুল গাছ, পলাশের বন, একটা দুটো বড়ো সটান শিমুল। ডানা-মেলা সাদা চিলের মতো রোেদ বসে আছে শিমুলের ডালে ডালে। ডানা ঝাড়ছে উত্তুরে হাওয়ায়। অভ্রর কুচির মতো রোদের টুকরো ঠিকরে যাচ্ছে চারদিকে।

সামনে থেকে টিহুল হেঁটে আসছিল। ফরেস্ট-বাংলোর চৌকিদারের কাছে রোজ-এ কাজ করে ও। বাংলোতে অতিথি থাকলে,—জলের ট্যাংকে কুয়ো থেকে বালতি করে জল এনে ভরে দেয়। ফাই-ফরমাশ খাটে। বাসন-পত্র ধোওয়া-ধুয়ি করে। রান্না-বান্নায় সাহায্য করে। বাংলোর চৌকিদারটা মহা ধূর্ত। অতিথি এলেই খোঁড়া শেয়ালের মতো পা টেনে টেনে সামনে দাঁড়ায় রাতেরবেলা। একটু কাশে আর ফিস ফিস করে বলে, ঔর কুছ চাহিয়ে হুজোর।

অনেক সাদা-মাটা হুজৌর বলেন, নেহি ভাই, থ্যাঙ্ক উ্য্য। যাঁরা বিশেষ রসের রসিক, তাঁরা পাঁঠার মাংস দর করার মতো বন-পাহাড়ের, বুনো-গন্ধময় নারীমাংস রকম-সকম নিয়ে দামদর করেন। ফরেস্ট বাংলোর পুরানো ঝাঁকড়া মহুয়া গাছগুলো আজ অবধি অনেকেই দেখেছে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় এই বন-পাহড়ের কত গ্রামের কত বিভিন্ন রূপের, বিভিন্ন বয়সি মেয়ে, চুপিসাড়ে এসে হঠাৎ বারান্দায় উঠে পড়েছে রাতের অন্ধকারে বা জ্যোৎস্নাতে। তারপর শেষরাতে চৌকিদারকে রোজগারের সিংহভাগ গুণে দিয়েছে করুণ মুখ করে।

গাছেদের চোখ বড়ো সজাগ। গাছেরা সব দেখে; সব মনে রাখে।

টিহুলের গায়ে একটা শতচ্ছিন্ন জামা। যেখানে আমাদের ট্রাক খারাপ হয়েছে, অরই কাছাকাছি ঘন জঙ্গলের মধ্যে ওর ঘর। সামান্য একফালি রুখু জমি আছে সেই ভগ্নপ্রায় ঘরের লাগোয়া। তাতেই যা পারে তা বোনে, আর বাংলোয় অতিথি থাকলে, সেখানে দিন হিসাবে কাজ করে। ভালো-বাবু-টাবু এলে মাঝে মাঝে বকশিস টকশিসও পায়।

বললাম, কিরে টিহুল, কী বুনেছিলি ক্ষেতে এবারে? চলছে সব কেমন?

টিহুল মাথায় হাত দিয়ে বলল, সে-কথা আর বোলো না বাঁশবাবু। হাতি, শম্বর, শুয়োর, হরিণ আর খরগোসের অত্যাচারে ফসল করাই মুশকিল।

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আর চলছে না বাবু। প্রায় থেমে এসেছে। এত দূরের বাংলোতে অতিথি-টতিথি বড়ো একটা আসেও না। এবার ভাবছি তোমার কাছেই যাব।

টিহুলকে অনেক আগেই বলেছিলাম যে, ইচ্ছে করলে ও আমাদের জঙ্গলেই কূপ কাটতে পারে। কিন্তু ঘরে টিহুলের পরমা সুন্দরী যুবতী বউ আছে। টিহুল যে চৌকিদারকে একটুও বিশ্বাস করে না। ও ভোর থেকে সন্ধে অবধি দূরের জঙ্গলে বাঁশ কাটলে তার বউকে যে কী ভাবে ফুসলিয়ে কার ভোগে লাগিয়ে দেবে চৌকিদার, তা বলা যায় না। দুপুর বেলা তো, দুপুর বেলাই সই। কত রকম বাবু আসে বাংলোতে! আর চৌকিদারটা তো একটা মহা জাঁবাজ লুম্বী।

বেচারা! মাঝে মাঝে বউ সুন্দরী বলে, খুব রাগ হয় ওর নিজের ওপরে। মাঝে মাঝে টিহুলের মনে হয় যে, গরিবের ঘরে সুন্দরী মেয়েদের জন্মানো বা বিয়ে হওয়া বড়ো পাপের। এখানের প্রত্যেকেরই সমস্যা আছে অনেক। কিন্তু টিহুলের এই সমস্যাটা একটা অন্যরকম সমস্যা। অন্য সব সমস্যার ওপরে সব সময়েই মাথা উঁচিয়ে থকে। এ সমস্যার কথা কাউকে বলা যায় না, এমন কী বউকেও নয়; তাই নিজের বুকেই বয়ে বেড়াতে হয়।

টিহুল একদিন আমাকে বলেছিল, টাকা বড় খারাপ জিনিস বাঁশবাবু। অভাবী লোক টাকার জন্যে করতে পারে না, এমন কাজই নেই।

আমি ওকে বলি নি যে, অভাবহীন লোকেরাও আরো টাকার, অনেক টাকার জন্যে করতে পারে না এমন কাজও নেই। টিহুল জানে না তা, এই যা।

ও বলল, আমরা সকলে মিলে একদিন আপনার কাছে যাব। আমাদের একটা ভালো দরখাস্ত লিখে দিতে হবে ইংরিজিতে।

কার কাছে?

ফরেস্ট ডিপার্টে। কতবার হিন্দিতে লিখিয়ে তাতে গ্রামের সকলের টিপসই লাগিয়ে পাঠালাম। কেউই তো কোনো কথা শুনল না। ফরেস্ট ডিপার্ট কিছু ভরতুকি দেবে বলেছিল তারও নাম-গন্ধ নেই। এদিকে টাইগার পোজেটের জন্যে বেশির ভাগ জায়গাতেই কুপে সবরকম কাজই বন্ধ। ফসল, সামান্য জমিতে যে যা করে, সবই খেয়ে নেবে বুনো জানোয়ারে, ঘর ফেলে দেবে হাতিতে; আমরা তাহলে বাঁচি কী করে বলতো বাঁশবাবু?

সেদিন ডালটনগঞ্জে কাগজে দেখেছিলাম যে, পালামৌ জেলায় তেরোটা বাঘ বেড়েছে। কিন্তু এই তেরোটা বাঘের কারণে হয়ত তেরোশো লোক মরেছে টিহুলের মতো। এখানে মানুষ ঝরাপাতার মতো মরে, নিঃশব্দে, অলক্ষে। সেটা কোনোই খবর নয়।

আমি দায়িত্ব এড়িয়ে গেলাম। আমার মালিকের স্ট্যান্ডিং ইনস্ট্রাকশান আছে যে, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে আমাদের কাজ; তাই তাদের সঙ্গে কোনোক্রমেই ঝগড়া-বিবাদ যেন না করি। জলে বাস করে, কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করা আমাদের পোষায় না। মালিক বলেন, ব্যবসা করলে এসব নিয়ম মেনে চলতে হয়ই। টাকা রোজগার করতে হলে মাথা ঝুঁকিয়েই করতে হয়। সে ব্যবসা, সামান্য পানের দোকানেরই হোক কী ওকালতিই হোক। ব্যবসা আর পেশা সবই সমান।

আমি টিহুলকে বললাম, তোরা পাগলা সাহেবের কাছে যাস না কেন? সকলকে নিয়েই যা। উনি কেমন করে লিখতে পারবেন, আমি কি আর তা পারব?

সরল টিহুল আমার দায়িত্ব এড়ানোটা ধরতে না পেরে বলল, অনেকদিন আগেই তাঁর কাছে যাওয়া উচিত ছিল। আমরা শুধু পঞ্চায়েতের ভরসায়ই ছিলাম এতদিন। অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেল।

হঠাৎ টিহুল দূরে তাকিয়ে কালভার্টের কাছে ভিড় দেখে আমাকে শুধোল, ওখানে কীসের ভিড়? বললাম, রামধানীয়া চাচা বোধহয় আবার গান ধরেছে; ঝুমুরের গান।

টিহুলের চোখমুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বলল, তাই?

তারপরই বলল, যাই।

বলেই, দৌড় লাগাল।

আমি ওকে থামিয়ে বললাম, শোন, তোর ঘরের কাছে কোম্পানির ট্রাক খারাপ হয়ে আছে। মুনাব্বরকে বলিস, বেশি দেরি হলে ও যেন হেঁটে আমার ডেরায় চলে আসে। আমার সঙ্গেই খেয়ে নেবে।

আচ্ছা! বলেই ও আবার দৌড় লাগাল।

গান শুনতে দৌড়ে-যাওয়া টিহুলের দিকে তাকিয়ে বোঝার উপায় রইল না আর যে, ওর এত দুঃখ, এত কষ্ট।

অদ্ভুত, এই মানুষগুলো। এত সহজে এরা সুখী হয়, এত সহজে সব গ্লানি ও অপমান ভুলে যায়!

আর একটু এগোলেই ভালুমারের এলাকা। বাঁদিকে ফরেস্ট বাংলো, তার পাশ দিয়ে আরেকটা পথ বেরিয়ে গেছে ঝুম্রীবাসার দিকে। ডাইনে একটা বুড়ো বয়ের গাছের নিচে গোদা শেঠের দোকান।

সিগারেট নেওয়ার ছিল, তাড়াতাড়িতে, চিপাদোহরে নিতে ভুলে গেছিলাম। ওখানে তাও দুটো-একটা অন্য ব্রান্ড পাওয়া যায়, এখানে শুধুই বিড়ি আর চারমিনার, নাম্বার টেন, পানামা। ব্যস্। গোদা শেঠের বয়স পঁয়তাল্লিশ হবে। লালচে, ফর্সা গায়ের রঙ। পরনে পায়জামা আর গেঞ্জি। গেঞ্জি বেশির ভাগ সময়েই নাভির ওপর পাকিয়ে তোলা থাকে গরমের দিনে। গোদা শেঠের শেঠানি, বছর বছর ভালো গাইয়ের মতো বাচ্চা বিয়োয় আর অবসর সময়ে বড়ি দেয়, পাঁপড় বানায় এবং আচার শুকোয়। স্বামী ও গুচ্ছের ছেলেমেয়ের জন্যে রান্না করে। তার নিম্নাঙ্গে সে হস্তিনী। ঊর্ধ্বাঙ্গে পদ্মিনী। ভগবানের আশ্চর্য সৃষ্টি!

এখন শীতকাল, তাই একটা নোংরা ফুল-হাতা খয়েরি-রঙা সোয়েটার পরে রয়েছে গেঞ্জির ওপর গোদা শেঠ। ওর শীত কম, বোধহয় টাকার গরমেই গরম থাকে সব সময়! চোখ দুটো সবসময়ই লাল জবাফুলের মতো। টাকা বানানো ছাড়াও ওর অন্য অনেক রকম নেশা আছে বলে শুনেছি। তার লাল মোটর সাইকেলটা দোকানের পাশের বয়ের গাছের গায়ে দাঁড় করানো থাকে।

কোথাও নিঃশব্দে যেতে হলে ও সাইকেলেই যায় এখনও। সশব্দে যেতে হলে এই ঝকঝকে মোটর সাইকেলে। তবে মোটর সাইকেলের বিপদ একটা আছে। বেলার দিকে এই ভট্‌ভট্ শব্দ শুনলেই হাতি তাড়া করে মোটর সাইকেলকে। চড়ুক আর না-ই চড়ুক এটা একটা স্ট্যাটাস্-সিম্বল। এই বস্তিতে আর কারোরই নেই মোটর সাইকেল। এমন কি মাহাতোরও নেই। ভূমিহার জমিদাররা আজকাল নিঃশব্দে সরে যাচ্ছে, ব্যবসাদারদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে গ্রামেগঞ্জে, শহরে। ব্যবসাদাররাই রাজা-মহারাজা এখন।

অনেক জায়গা-জমি গোদা শেঠের। চড়া সুদে দাদন-টাদনও দেয়। পরে সেইসব জমি, এমনকী ঘটিবাটি পর্যন্ত লিখিয়ে নেয়। মানুষটা যে ভালো নয়, তা তার কাছে এলেই বোঝা যায়। খারাপ মানুষদের চোখ থেকে, শরীর থেকে, পরিবেশ থেকে কোনো অদৃশ্য কিছু বিকিরিত হয়। মানুষটার সঙ্গে দেখা হলে ওর কাছাকাছি এলেই আমার কেমন দম বন্ধ হয়ে-আসে। দোকানের মধ্যে থেকে, কেরোসিন তেল, কাড়ুয়া তেল, শুখা মকাই, চাল, শুখা মহুয়া, নানারকমের ডাল, সস্তার সাবান, শুকনো লংকা, পেঁয়াজ, জিরে, হলুদ, গোলমরিচ, আখের গুড় ইত্যাদির এবং মেঝের মাটির একটা মিশ্র গন্ধ ওঠে। সেই মিষ্টি মিষ্টি, ঝাঁঝ-ঝাঁঝ, ঝাল-ঝাল গন্ধটা দোকানে যে ঢোকে তার গায়েও যেন লেগে যায়।

শেঠ মাঝে মধ্যে ডালটনগঞ্জে গিয়ে হিন্দি সিনেমা দেখে আসে। কথায়বার্তায় আজকাল হিন্দি ছবির হিরোদের ডায়ালগ এর ঢঙ লেগেছে।

দোকানে ঢুকতেই গোদা শেঠ বলল, কা বাঁশবাবু, আপকি দর্শনই নেহি মিতি আজকাল।

এমনভাবে বলল, যেন আমি ওর একজন ইয়ার।

এইই কাজে কর্মে থাকি।

গোদা বলল, আমরা কি সব নিষ্কর্মা?

কথা ঘুরিয়ে বললাম, সিগারেট, এক প্যাকেট।

আর কথা না বলে, সিগারেট এগিয়ে দিতে দিতে দোকানের সামনে দাঁড়ানো একজন দেহাতি লোককে বলল, কান খোল্ কর শুনলে রে বাবুয়া, ই তেরা চ্যারিটিব ডিপিন্‌সারি নেহি বা। রূপাইয়া সবহি ওসুল করেগা হাম। যেইসা হো তেইসা। তেরা গরু ইয়া জরু ভি উঠানা হোগা ঘরসে, তো উভি উঠাকে লায়গা। ইয়াদ রাখা। গোদা শেসে মজাক্ মত্ উড়ানা।

এ লোকটা মানি ওরাওঁ-এর কীরকম আত্মীয় হয়। নামটা আমার জানা নেই, মহুয়া ডারের রাস্তার কাছাকাছি থাকে।

করুণ গলায় সে বলল, কা করে মালিক। ঈয়ে হাথ্বী ত জান খা লেল। জিনোর সহি বরবাদ হো গেল; সাঁওয়া ভি। ঔর কুছ রোজ মদত দে মালিক। তোরা গোড় লাগ্‌লথু।

গোদা শেঠ একটা অশ্রাব্য গালি দিয়ে লোকটাকে ওর সামনে থেকে সরে যেতে বলল, এবং সেই একই নিঃশ্বাসে আমার দিকে তাকিয়ে মেকি বিনয়ের গলায় শুধোল, চাত্রা থেকে ভালো মুগের ডাল এসেছে। লাগবে না কি?

এখন লাগবে না।

শেঠ হঠাৎ বলল, তিতলি ভালো আছে? তারপরই ও যেন টেটরার পরম হিতৈষী এমন স্বরে বলল, সেদিন টেটরা বলছিল, আমার জওয়ান মেয়ে, বাঁশবাবুর বাড়ি কাজ করছে, বয়সও হল অনেক। অনেক আগেই বিয়ে দেওয়ার ছিল। নানাজনে নানা কথা বলতে পারে। বলে না যদিও। বাবু একেবারে একা থাকে তো!

একটু চুপ করে থেকে বলল, আমি একটা পাত্র দেখেছি, ওর জন্যে!

খুব ভালো! কোথাকার পাত্র? কী করে? আমি বললাম।

ট্রাকের কুলি। গিধারী।

হেসে বলল, আপনার অসুবিধের কারণ নেই কোনো। আপনার সেবা যেমন করছে ও তেমনই করবে। ওর বাবাকে কেবল কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করা দরকার। বিয়েতে আবার কিছু ধারও দিতে হবে টেটরাকে। হলে হবে। গাঁয়ের কোন্ লোকটাই বা না ধারে আমার কাছে?

ছেলেটা কেমন? ভালো তো?

ও বলল, ভালো। কাজ থাকলে দিনে চার টাকা তো পায় আমারই কাছ থেকে। কাজ অবশ্য রোজ থাকে না। ছেলেটা নরম-সরম। বোকা সোকা।

তারপর বলল, ছোটলোক কুলি-মজুর কি আপনাদের মতো ভালো হবে? ওরা ওদেরই মতো ভালো। তিতলির পক্ষে যথেষ্ট ভালো, টেটরার মেয়ের বিয়ে আবার এর চেয়ে ভালো কী হবে?

ভালো হলেই ভালো।

বলেই, দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এসে ডেরার পথে পা বাড়ালাম।

বাড়ি পৌঁছে বাঁশের বেড়ার দরজা দিয়ে উঠোনে ঢুকলাম। ঢুকেই চমকে উঠলাম।

আমার পায়ের শব্দ তিতলি টের পায়নি। দেখি, ও বারান্দার কোণায় রোদে পিঠ দিয়ে বসে, আমার ঘর থেকে দাড়ি কামানোর আয়নাটা এনে খুবই মনোযোগ সহকারে নিজের মুখ দেখছে।

ডাকলাম, তিতলি।

তিতলি চমকে উঠে পিছন ফিরল।

ও খুব সুন্দর করে সেজেছিল। সামান্য আভরণে ও আবরণে। প্রায় শূন্য প্রসাধনে। কিন্তু ওর কাটা-কাটা চোখ মুখকে, ওর বুদ্ধি এবং বন্য সরলতা এক আশ্চর্য অদৃশ্য প্রসাধনে প্রসাধিত করেছিল।

সাত সকালে এত সাজ-গোজ কীসের? তোর