Wednesday, May 29, 2024
Homeউপন্যাসকালসন্ধ্যা - মনোজ সেন

কালসন্ধ্যা – মনোজ সেন

সেদিন রবিবার। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার মুখে। বাইরে ঝিমঝিম করছে শরতের রোদ। আমরা ক্লাবঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছি। আমাদের মধ্যে কয়েক জনের দুপুরের খাওয়াটা একটু বেশি হয়ে গেছে, তাই তারা একটা টেবিলের ওপর লম্বা হয়ে দিবানিদ্রা দিতে শুরু করে দিয়েছে। এমন সময় ছাতা হাতে ঘরে ঢুকলেন চিত্তপ্রসাদ রায়।

অতীতের বিপ্লবী, পরে খ্যাতনামা আইনজ্ঞ আর সবশেষে সাংসদ, অশীতিপর চিত্তপ্রসাদ এখন অবসর নিয়ে আমাদের ক্লাবে দাবা খেলে সময় কাটাচ্ছেন।

চিত্তপ্রসাদের জীবনে বহু অবিশ্বাস্য রকমের ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে, যার কিছু কিছু গল্প অনেক চাপাচাপি করলে তিনি আমাদের বলেন। তবে এটা ঠিক যে সেগুলি এতই অসম্ভব রকমের বিস্ময়কর যে সেসব গল্প বলতে দ্বিধা হওয়াই স্বাভাবিক।

ক্লাবে ঢুকে নিদ্রাগত সদস্যদের দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তাদের ছাতা দিয়ে খোঁচা মেরে বললেন, ‘উঠুন, উঠুন, একজন ইয়ংম্যান দুপুর বেলা ঘুমোয় না। আমাদের শাস্ত্রে বলেছে, দিবানিদ্রা ভয়াবহ।’

খোঁচা খেয়ে আমাদের ঘুমন্ত সদস্যরা টেবিলের ওপর তড়াক করে উঠে বসল। চিত্তপ্রসাদকে দেখে রেগে না-গিয়ে বরং অত্যন্ত পুলকিত হয়ে বলল, ‘আপনি এসে গেছেন। তাহলে তো আর দিবানিদ্রার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। শাস্ত্রের কথা ছাড়ুন। ওসব মান্ধাতার আমলের লেখা। সব বাজে উপদেশ। ওসব এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না। আপনি বরং ওই ভয়াবহ অংশটা থেকে একটা গল্প বলুন। আপনার দাবাড়ু বন্ধুরা কেউ আপত্তি করবে না।

দাবাড়ু প্রভাতকিরণবাবু ঘরের এককোণে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। মাথা নেড়ে আমাদের কথায় সম্মতি জানালেন।

দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চিত্তপ্রসাদ বললেন, ‘আপনাদের ধারণা যে প্রাচীন লেখা সব অর্থহীন প্রলাপ, বিশ্বাসের অযোগ্য, তাই না? একসময় অবশ্য আমিও তাই ভাবতুম। আজ আর তা ভাবি না। তাহলে, কেন ভাবি না সেই গল্পই বলি, শুনুন।’

সে বছরটা ছিল ১৯৭৪ কী ১৯৭৫ সাল। আমি তখন দিল্লিতে। লোকসভার অধিবেশন চলছিল তখন। হঠাৎ ডাক এল খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে। আমি তো অবাক। যাহোক, গেলুম।

মন্ত্রীমহোদয়ের ঘরে দেখলুম প্রতিরক্ষামন্ত্রী আর একজন আর্মি ইউনিফর্মপরা মেজর র‌্যাঙ্কের অফিসারও বিদ্যমান। আমি তো আরও অবাক।

মন্ত্রীমহোদয় বললেন, ‘আমি একটা বিশেষ কারণে আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছি। ব্যাপারটা গুরুতর, বিপদজনক এবং গোপনীয়। আশা করি, আপনাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি।’

বললুম, ‘তা অবশ্যই পারেন। আপনি নিশ্চিন্তে আমাকে বলতে পারেন। তবে, মনে হচ্ছে ব্যাপারটা দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত। সেখানে বোধ হয় উকিল হিসেবে আমাকে আইনের বিষয়ে আমার মতামত জানাতে হবে। তাই কি?’

মন্ত্রীমহোদয় বললেন, ‘একেবারেই তা নয়। আমরা আপনাকে একটা অভিযানে পাঠাতে চাই।’

‘অভিযানে?’ আমি তো স্তম্ভিত। বলে কী? কোনো রকমে বললুম, অভিযানে, মানে এক্সপিডিশনে?’

মন্ত্রীমহোদয় মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, তাই বটে। এটা একটা অত্যন্ত গোপনীয় কাজ। হয়তো আমরা আপনাকে ভীষণ বিপদের মুখে পাঠাচ্ছি।’

বললুম, ‘বিপদের কথা আমি ভাবছি না। বিপদের মোকাবিলা করবার অনেক অভিজ্ঞতা আমার আছে। সেটা কোনো ব্যাপার নয়। আমি ভাবছি, আপনার হাতের মাথায় আর্মড ফোর্সেস উপস্থিত। তাদের বাদ দিয়ে আমার মতো একজন অসামরিক সাংসদকে পাঠাতে চাইছেন কেন?’

মন্ত্রীমশাই দেখলুম আমার অনেক খবরই রাখেন। আমার সাহস, নির্ভরযোগ্যতা আর দেশপ্রেম সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা বলে বললেন, ‘আমাদের আপনাকে সবচেয়ে যোগ্য লোক বলে মনে হয়েছে। এই সমস্ত ব্যাপারটা অত্যন্ত গোপনীয়। আর আমরা জানি যে শত্রুর হাতে ধরা পড়লেও আপনি প্রাণ গেলেও মুখ খুলবেন না। পরাধীনতার সময়, পুরন্দরপুর ষড়যন্ত্রে ধরা পড়ার পর লাহোর জেলে আপনার ওপরে যে অমানুষিক অত্যাচার হয়েছিল, তার কথা আমরা জানি। তা ছাড়া, আর্মিও আপনার সঙ্গে যাবে, তবে একজন অফিসার।’

বলে আর্মি ইউনিফর্মপরা অফিসারটির দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘ইনি মেজর অনিরুদ্ধ মিত্র, ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর গোয়েন্দাবিভাগ ‘আর্মি ইন্টেলিজেন্স কোর’-এর অফিসার। একজন দুঃসাহসী, কর্তব্যপরায়ণ, বহুবার পুরস্কৃত অফিসার। ওনাকে সব বলা আছে। উনি আপনাকে আজকেই সব বুঝিয়ে দেবেন। আপনি ওঁর সঙ্গে যান। পারলে আগামী সোমবারই রওনা হয়ে যাবেন আপনারা। টাকার কোনো অসুবিধে হবে না। আর মেজর মিত্র তিন-চারটে রাজস্থানি ডায়ালেক্টে অনর্গল কথা বলতে পারেন। কাজেই ভাষা বাবদেও আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।’

বলে মন্ত্রীমশাই মাথা নীচু করে ফাইলে মনোনিবেশ করলেন। বুঝতে পারলুম, আলোচনা শেষ। ভদ্রলোক আমাকে ‘যাব না’ বলবার সুযোগ দিতে রাজি নন।

ইতিমধ্যে মেজর মিত্র উঠে দাঁড়িয়েছেন। ইশারায় বললেন, ‘আসুন আমার সঙ্গে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে বেরিয়ে অনিরুদ্ধর গাড়িতে যেতে যেতে আমাদের পরিচয়পর্ব সারা গেল।

আগেই বলেছি, মেজর অনিরুদ্ধ মিত্র ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর গোয়েন্দাবিভাগ আর্মি ইন্টেলিজেন্স কোর-এর অফিসার। বিরলকেশ, অনতিদীর্ঘ, চোখে চশমা, এই আপাতনিরীহ ভদ্রলোকটিকে অসামরিক পোশাকে দেখলে একবারও কারোর মনে হয় না যে, তিনি একজন দুঃসাহসী কর্তব্যপরায়ণ আর্মি অফিসার যিনি অনেক বার তাঁর কাজের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। বরং, তাঁকে একজন বিদগ্ধ অধ্যাপক বলেই মনে হয়।

সেটা অবশ্য খুব ভুল নয়। সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেবার আগে তিনি একবছর অধ্যাপনাই করেছেন। তাঁর বিষয় ছিল প্রাচীন ইতিহাস এবং তা নিয়ে অবসর পেলেই এখনও পড়াশুনো করে থাকেন। তা, এতই যদি তাঁর ইতিহাসে আগ্রহ ছিল, তাহলে তিনি সৈন্যবাহিনীতে গেলেন কোন কর্মে? তার কারণ ভগ্নহৃদয়। সেই ইতিহাস অনিরুদ্ধর কাছ থেকে দফায় দফায় আমি জানতে পারি আমাদের অভিযানের সময় আর তারপরে দিল্লিতে ফিরে এসে।

অধ্যাপক তাঁর কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী কল্যাণী চট্টোপাধ্যায়ের প্রেমে পড়েছিলেন। কফিহাউসে পকোড়া আর কোল্ডকফি সহযোগে সেটা অনেকদূর গড়িয়েও ছিল। কিন্তু তুবড়িটা হঠাৎ একদিন ফুস করে নিভে গেল। কারণ, কল্যাণীর বাবা, সেই সময়ের বিখ্যাত শিল্পপতি ভবানী চট্টোপাধ্যায় তাঁর মে-ফেয়ারের বাড়ি থেকে মার্সিডিস চড়ে বাগবাজারের রামময় সরকার লেনে এসে অনিরুদ্ধর বাবা অনিল মিত্রকে একগাদা যাচ্ছেতাই সব কথা বলে গেলেন। সেদিন বোঝা গিয়েছিল যে তেলে আর জলে কখনোই মিশ খেতে পারে না।

এই ঘটনার পরেই অনিরুদ্ধ সৈন্যদলে যোগ দিয়ে কলকাতার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করলেন।

এর পরে যা ঘটল, ভবানীবাবুর সেই খবরগুলো আমার জানা ছিল কিন্তু অনিরুদ্ধ এসব কিছুই জানতেন না। প্রথম পরিচয়ে আমিও তখন তাঁকে এসব কথা জানাইনি।

আশ্চর্য ব্যাপার, প্রায় সেই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ভবানী চাটুজ্জের বিশাল ব্যাবসার পতন আরম্ভ হল। এর মধ্যে কোনো আধিদৈবিক বিচার ব্যবস্থার হস্তক্ষেপ ছিল কি না জানি না, তবে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তাঁর চ্যাটার্জি প্রিসিশন ইন্সট্রুমেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড নিলাম হয়ে গেল, মে-ফেয়ারের বাড়ি বিক্রি হয়ে গেল, ভবানীবাবু তিন বছরের জন্য জেলে গেলেন, সেখানেই হার্ট অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হল আর সদ্য এমএ পাশ করে কল্যাণী রামপুরহাট গভর্নমেন্ট কলেজে অধ্যাপনার কাজ নিয়ে মা আর ভাইকে নিয়ে কলকাতা থেকে বিদায় নিল।

অফিসে পৌঁছে দুটো কোল্ডড্রিঙ্কের বোতল খুলে অনিরুদ্ধ বলল, ‘প্রথমে আপনাকে সমস্যাটা কী সেটা বলি। থর মরুভূমি সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন?’

আমি বললুম, ‘থর মরুভূমি? না, প্রায় কিছুই জানি না।’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘তাহলে, সবার প্রথমে এই মরুভূমি সম্পর্কে আপনাকে কিছু বলা দরকার।’

‘আমাদের অভিযান তবে ওখানেই, তাই তো?’

‘হ্যাঁ। তবে সে কথা পরে হবে। আগে থর মরুভূমি। সাতাত্তর হাজার বর্গমাইল জুড়ে এই মরুভূমির পঁচাত্তর ভাগ ভারতবর্ষে আর বাকি পঁচিশ ভাগ পাকিস্তানে। এই মরুভূমি শব্দটা আমাদের মনে যে ছবি তৈরি করে তা হল একটা বিশাল বালির সমুদ্র, গাছ নেই, পালা নেই, জন্তুজানোয়ার পোকামাকড় কিচ্ছু নেই, মানুষ তো নেইই। থর ঠিক এরকম নয়। বালির সমুদ্র ঠিকই কিন্তু জায়গায় জায়গায় ঝোপঝাড় তো আছেই, তা ছাড়া খেজরি ইত্যাদি নানারকম গাছও হয়। খেজরি কিন্তু খেজুর গাছ নয়। হরিণ, শেয়াল, নেকড়ে আরও নানা রকমের জন্তুজানোয়ার আছে। পোকামাকড়, সাপও আছে। যেসব জায়গায় গাছপালা ঝোপঝাড় গজায়, সেইসব জায়গায় মানুষের বসতি আছে। তাদের প্রধান জীবিকা পশুপালন আর ছোটোখাটো চাষ-আবাদ।’

‘পশুপালন? কী পশু, উট?’

‘শুধু উট কেন, ছাগল আছে, ভেড়া আছে, অনেকে গোরুও পালে।’

‘এরা কি বাঞ্জারা বা যাযাবর?’

‘এককালে হয়তো ছিল। এখন তারা মোটামুটি স্থায়ী বাসিন্দা। গাছের ডালপালা বা শুকনো ঝোপ কেটে এরা ঝুপড়ি মতন ঘর বানায়। এই ঘরে কোনো জানলা থাকে না, নীচু একটা দরজা থাকে। রোদের তাপ বাড়লে এর ভেতরে গ্রামের সবাই ঢুকে যায়, রাতটা বাইরেই শুয়ে কাটায়। আমাদের গন্তব্য এইরকমই একটা গ্রামে। তার নাম নাসারা। বারমের শহর থেকে প্রায় আঠারো মাইল দূরে গভীর মরুভূমির ভেতরে। ওখান থেকে পাকিস্তানের সীমান্ত প্রায় সাত মাইল।’

‘গভীর মরুভূমি মানে কী?’

‘মানে, মরুভূমি বলতে আমরা যা বুঝি, সেইরকম। চারদিকে শুধু বালি আর বালি। কেবল নাসারা গ্রামের চারপাশে কিছু গাছপালা আর চাষের খেত আছে। কাছাকাছি শহরে আসতে গেলে উটে চড়ে আসে।’

‘সেখানে লোক বাস করে কী করে? জল পায় কোত্থেকে?’

‘গ্রামটার উত্তর দিকে একটা লম্বাটে টিলা আছে, শ-দেড়েক ফুট উঁচু। সেটা দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটা লোক পাশ ফিরে শুয়ে আছে। সেই টিলাটার একপাশে গোটা তিনেক গুহা আছে। তাদের একটির ভেতরে একটা স্বাভাবিক কুয়ো আছে। সেটা কত গভীর তা কেউ জানে না। কিন্তু তার নীচে জল আছে। সেটা গ্রীষ্মকালেও শুকোয় না। তা ছাড়া, সারা বছরে যে সামান্য বৃষ্টি হয়, তার সমস্ত জল টিলার গা বেয়ে সেই কুয়োয় পড়ে। তখন জলস্তর অনেকটাই ওপরে উঠে আসে।’

‘অদ্ভুত তো!’

‘অদ্ভুত কিছু নয়। পৃথিবীর অনেক জায়গায় এরকম বহু ফর্মেশন দেখা যায়। আসলে কয়েক লক্ষ বছর আগে যখন গণ্ডোয়ানা ল্যান্ড তৈরি হচ্ছিল, তখন এই টিলাটা একটা আগ্নেয়গিরির অংশ ছিল। এই গুহাগুলি সেই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ আর কুয়োটা লাভার বাইরে বেরিয়ে আসবার পথ ছিল।’

‘বেশ, তারপর?’

‘গ্রামের লোক সেই কুয়োর জল খুব সাবধানে ব্যবহার করে। নিজেরা খায়, তাদের জন্তুজানোয়ারদের খাওয়ায়, সামান্য চাষবাসও করে, আর কোনো অবাঞ্ছিত লোককে সেই গুহায় ঢুকতে দেয় না। এমনকী গ্রামের ছেলেপুলেদেরও না। সেইজন্যে তারা নাসারা গ্রামে কোনো অতিথি এলে বিরক্ত হয়, তাকে ফেরত পাঠানোর জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করে।’

আমি হেসে বললুম, ‘সেটা অস্বাভাবিক নয়।’

অনিরুদ্ধ কিন্তু হাসলেন না। বললেন, ‘সেটা স্বাভাবিক হত, যদি সেটাই নাসারা গ্রামে বাইরের অতিথিকে ঢুকতে না দেবার একমাত্র কারণ হত। কিন্তু তা নয়। অন্য কোনো কারণও আছে। সেই কারণটাই খুঁজে বের করা আমাদের এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।’

‘অন্য কোনো কারণ যে আছে এবং সেটা একটা অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপার— এরকম সন্দেহ আপনাদের হল কেন?’

অনিরুদ্ধ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘চলুন, আমরা আমার কোয়ার্টার্সে যাই। সেখানে এই ধড়াচূড়ো ছেড়ে আমি সিভিলিয়ান পোশাক পরে নেব। তারপর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনাকে সব কথা বলব। মাঝখানে কোথাও কফি খেয়ে নেওয়া যাবে।’

আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললুম, ‘ওই নাসারা গ্রামে আমরা যাব কী করে? হেলিকপ্টারে না কি?’

এইবার অনিরুদ্ধ হেসে উঠলেন। বললেন, ‘সেটাও রাস্তায় বলব।’

বুঝলুম ব্যাপার সত্যিই গুরুতর।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যা জানা গেল সেটা এইরকম—

নাসারা গ্রামে অতিথি যে একেবারে আসে না, তা কিন্তু নয়। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর বিমান থেকে মাঝে মাঝে গ্রামের বাইরে পিঠে রংচঙে আসন বাঁধা কিছু উট ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে, যেগুলো ওই গ্রামের তো নয়ই— ভারতীয় কোনো জায়গারই নয়। মাঝে মাঝেই সীমান্ত রক্ষীবাহিনী ওখানে সার্চ অপারেশন চালিয়েছে কিন্তু কিছু পাওয়া যায়নি।

তার মানে হল, পাশের দেশ থেকে কিছু ব্যবসায়ী ওখানে আসে দু-এক দিনের জন্যে কোনো গোপনীয় ব্যাবসার উদ্দেশ্যে। কীসের ব্যাবসা তা গ্রামের লোকদের জেরা করে জানা যায়নি। এমনকী ওই উটগুলো কাদের তাও জানা যায়নি। গ্রামের লোকেদের মতে আকাশ থেকে যা দেখা গেছে তা মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়।

তাহলে ব্যাবসাটা কীসের হতে পারে, যা গ্রামসুদ্ধু লোক আপ্রাণ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে? ড্রাগ-জাতীয় কিছু নয়, কারণ ওই গ্রামের আশেপাশে বিস্তীর্ণ এলাকা খুঁজে সেরকম আবাদ কিছু পাওয়া যায়নি। ওখানে বাজরা-জাতীয় শস্যের কিছু খেত আছে। সেটাতে ফসল যা হয় তা গ্রামের লোকেদের পক্ষেই পর্যাপ্ত নয়। অর্থাৎ, ওখানে এমন একটা কিছু তৈরি হয় বা পাওয়া যায় যা গ্রামের লোকেরা তাদের নিজের দেশে বিক্রি করতে চায় না বা পারে না কিন্তু পাশের দেশকে বিক্রি করতে পারে এবং সেটাও অত্যন্ত গোপনে। সেটা কী হতে পারে? গোপন সামরিক সংবাদ হলে একটা কথা ছিল। কিন্তু ওখানকার লোকেদের সেরকম কোনো সংবাদ জানবার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। আর যদি থাকেও, তার জন্যে শত্রুপক্ষের লোক এতটা পথ উটে চড়ে আসতে যাবে কেন? এর চেয়ে অনেক সহজতর আর দ্রুততর রাস্তা আছে। এই উটে চড়ে আসবার একটাই কারণ থাকতে পারে, তা হল জিনিসটা ওয়ারলেসে পাঠানো যায় না আর তার বিনিময় মূল্য টাকা নয়, চালডালতেলনুন-জাতীয় কোনো পণ্য। এই রহস্যের সমাধান করাই আমাদের অভিযানের উদ্দেশ্য।

আমি বললুম, ‘আমি কী আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘অবশ্যই পারেন। আপনি তো এখন আমাদের লোক।’

‘প্রথমত, আপনি বললেন যে বিনিময়টা টাকা দিয়ে হয় না। সেটা খুবই স্বাভাবিক কারণ অন্য তরফ ভারতীয় টাকা তো দিতে পারবে না; তাই চালডালতেলনুন বিনিময়ের মাধ্যম হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, ব্যাবসাটা যদি এতই গোপনীয়, তাহলে উটের পিঠে রংচঙে আসন কেন যা আকাশ থেকে দেখা যায়? তাহলে কি এই ব্যাবসাটার সঙ্গে উভয় দেশেরই সামরিকবাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই? যদি থাকত তবে যারা আসে তারা এই সামান্য সাবধানতাটুকু অবহেলা করত কি? অথবা ভারতীয় টাকার কোনো অভাব থাকত কী?’

অনিরুদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, ‘সংগত প্রশ্ন। আপনি বলছেন যে দুই দেশেরই সরকারের চোখ এড়িয়ে তাদের সাধারণ নাগরিকরা নিজেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া করে ব্যাবসাটা চালাচ্ছে। তাই তো? আপনার অনুমান খুব সম্ভবত সঠিক। আর কোনো প্রশ্ন?’

‘এই বিদেশি বণিকরা কি খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে ঘুরে আসে?’

‘আমরা যতদূর জানি, এদের আসবার কোনো বাঁধা টাইমটেবিল নেই।’

‘বেশ। তাহলে দেখা যাচ্ছে, যে জিনিসের ব্যাবসা হচ্ছে সেটা খেতের ফসল নয়। কোনো বড়ো, ছোটো বা কটেজ ইন্ডাস্ট্রির প্রোডাক্ট নয়। তাহলে সেটা কী হতে পারে? অবশ্যই সেটা কোনোভাবে সংগ্রহ করা কোনো মূল্যবান পদার্থ; যা মাঝে মাঝে পাওয়া যায় আর সেই খবর পেলেই ওপারের ব্যবসায়ীরা এপারে আসে সেটা নিজের দেশে নিয়ে যাবার জন্যে। এবং, এটা খুব ইমপর্ট্যান্ট, সেটা ভারতের বাজারে বিক্রি করা বিপদজনক বা অসম্ভব। থর মরুভূমির ওই অঞ্চলে এরকম কোনো জিনিসের অস্তিত্বের কথা কি আমরা জানি, যা খনি থেকে তোলা হয় বা আকাশ থেকে পড়ে কিংবা বাতাসে ভেসে আসে?’

অনিরুদ্ধ আবার হেসে উঠে বললেন, ‘বোধ হয় না। তবু কাল এ ব্যাপারে একটু বিশদ খোঁজখবর নেওয়া যাবে। আর কিছু?’

‘শেষ দুটো প্রশ্ন। প্রথম, নাসারায় আমরা যাব কীভাবে?’

‘এখান থেকে প্রথমে যাব যোধপুর, সেখান থেকে পোখরান হয়ে জয়শলমির, জয়শলমির থেকে বারমের। সবটাই ট্রেনে। বারমের থেকে নাসারা জিপে।’

‘একটু যেন ঘুরপথ হয়ে গেল না?’

‘একটু নয়, অনেকটা। শত্রুপক্ষের চোখে ধুলো দেবার জন্যে। এই সমস্ত অঞ্চলটাই গুপ্তচরে থিকথিক করছে। তারা সবসময়েই আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে।’

‘শেষ প্রশ্ন। আমরা যে ঠিক এই সময়েই অভিযানে যাচ্ছি, তার কোনো বিশেষ কারণ আছে? মানে, এটা দু-মাস আগে বা দশদিন পরে হল না কেন?’

‘আপনার প্রশ্নটা আমি বুঝতে পেরেছি। হ্যাঁ, একটা কারণ আছে। আমরা অনেকদিনই এই ব্যাপারটার ওপরে নজর রাখছি। বুঝতে পারছি যে সীমান্তের ওপার থেকে কিছু লোক গোপনে ওই গ্রামে আসে। সেখানে কিছু-একটা হয়। কী হয় সেটা জানবার জন্যে সরকারি লোক ওখানে গেছে। কিন্তু কিছু জানা যায়নি আর ব্যাপারটা বন্ধও হয়নি। যেহেতু, গোলযোগ কিছু হয়নি এবং গ্রামের লোকেদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তাই রাজনৈতিক নেতারা ওখানে পুলিশ বা সৈন্য পাঠিয়ে একটা হুলুস্থুল করাটা পছন্দ করছিলেন না। কিন্তু সম্প্রতি আমাদের কাছে কিছু খবর এসেছে যাতে যথাসাধ্য গোপনে এই অভিযান পাঠানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।’

‘খবরটা কি আমি জানতে পারি?’

অনিরুদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, ‘পারেন। নাসারা থেকে সবচেয়ে কাছে যে শহরটা আছে সেটা সীমান্তের ওপারে, নাম ওয়াজিদাবাদ। সেটা একটা নিতান্তই ছোটো শহর কিন্তু বেশ বর্ধিষ্ণু। সকলেই জানে, স্মাগলিং এখানকার রমরমার উৎস। তবে বুঝতেই পারেন, আমাদের দেশের মতোই মাঝে মাঝে পুলিশ রেড সত্ত্বেও সেই ব্যাপারটা বন্ধ করা যায়নি। সেই রেডগুলো সত্যি হতে পারে আবার লোক দেখানোও হতে পারে। এইরকমই চলে আসছিল। কিন্তু সম্প্রতি, পুলিশ নয়, একেবারে পাকিস্তানি আর্মি বেশ তিন-চারদিন ধরে রেড চালায় ওখানে। কেন এবং তার ফল কী দাঁড়াল, তা আমরা জানতে পারিনি। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে ওই অঞ্চলে পাকিস্তানি আর্মির অ্যাক্টিভিটি বেশ বেড়ে গেছে। আমার ধারণা নাসারার গোপন কর্মকাণ্ড এর সঙ্গে জড়িত। হয়তো, শিগগিরি পাকিস্তানি আর্মি রাত্রির অন্ধকারে সীমান্ত পেরিয়ে নাসারা গ্রামে এসে উপস্থিত হবার তাল কষছে। আমাদের গুপ্তচরদের এ বিষয়ে খবর জোগাড় করতে বলা হয়েছে; তবে তার কোনো বিবরণ এখনও পাওয়া যায়নি। তার মানে, বিশেষ গোপনীয়তার সঙ্গে এই সামরিক অ্যাক্টিভিটি ওপারে চলছে।’

বললুম, ‘তাই যদি হবে, তাহলে আগেভাগে আমাদের সৈন্যরা নাসারায় গিয়ে সেখানে গ্রামটিকে রক্ষা করবার ব্যবস্থা করছে না কেন?’

অনিরুদ্ধ থেমে থেমে বললেন, ‘যদি পাকিস্তানি আর্মি নাসারায় পৌঁছোনোর আগেই আমরা তাদের আটকে দিই, তাহলে যে রহস্যটা আমরা খুঁজছি তার সন্ধান অধরাই থেকে যাবে।’

‘তার মানে, আপনি চোরের ওপর বাটপাড়ি করতে চান। আগে ওরা খুঁজে বের করুক, তারপরে আমরা ওদের গলা টিপে ধরে সন্ধানটা জেনে নেব।’

অনিরুদ্ধ সহাস্যে বললেন, ‘ব্যাপারটা অনেকটা সেরকমই বটে।’

‘কিন্তু ওদের খুঁজে বের করা আর আমাদের গলা টিপে ধরার মধ্যে কয়েকটা নিরীহ গ্রামবাসীর প্রাণ চলে যেতে পারে তো?’

‘সেই সম্ভাবনার কথাও আমরা চিন্তা করেছি। আমরাও চুপ করে বসে নেই। আমরা যখন ওখানে পৌঁছোব, ততক্ষণে আমাদের প্রায় চার-শো সৈন্যের একটি ব্যাটালিয়ন আর বালির ওপর দিয়ে দ্রুতবেগে চলবার উপযুক্ত কিছু সাঁজোয়া ট্রুপ-ক্যারিয়ার নাসারা থেকে প্রায় এক-শো কিলোমিটার দূরে পৌঁছে যাবে। আর ছ-টি হেলিকপ্টার গানশিপ প্রস্তুত থাকবে যোধপুরে। আমার কাছ থেকে রেডিয়ো সিগন্যাল পেলে তারা ঘণ্টা চারেকের মধ্যে নাসারা পৌঁছে যাবে। পাকিস্তানি আর্মি গা-জোয়ারি করছে দেখলেই আমি সিগন্যাল পাঠাব।’

‘পাকিস্তানি আর্মি আপনাদের অত সময় দেবে কী?’

‘দেবে। দিতে বাধ্য। নাসারার লোকেদের আপনি চেনেন না। ওদের পেট থেকে কথা বের করতে অনেক সময় লাগবে। তার আগে গ্রামবাসীদের ওপরে অত্যাচার হয়তো চলবে কিন্তু তাদের হত্যাকাণ্ড শুরু হবে না। পাকিস্তানি আর্মি অতটা মাথামোটা নয়। তাও যদি দেখি যে অত্যাচারটা সীমা ছাড়াচ্ছে তখনও আমার সিগন্যাল চলে যাবে।’

‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, যেন আপনি নাসারার ভিতরে কী হচ্ছে তা নাসারার বাইরে থেকে লক্ষ করবেন।’

অনিরুদ্ধ হেসে বললেন, ‘ঠিক তাই।’

আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, ‘তাহলে কি আমরা নাসারায় গিয়ে সেখানে না-থেকে মরুভূমিতে রাত কাটাব?’

‘হতে পারে। সেটা ওখানে গেলে দেখতে পাবেন।’

‘কিন্তু কত দিন থাকতে হবে ওখানে? আমরা গেলাম আর ওনারা এসে হাজির হলেন, তা তো হতে পারে না।’

অনিরুদ্ধ দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘তাই হবে। আমরা গিয়ে পৌঁছোনোর দু-তিন দিনের মধ্যেই তাঁরা উদয় হবেন, সেইরকমই আমাদের কাছে খবর। ও ভালো কথা। আপনি বন্দুক পিস্তল চালাতে জানেন তো?’

আমি এই প্রশ্নের কোনো জবাব না-দিয়ে চুপ করে রইলুম।

অনিরুদ্ধ একটু অপেক্ষা করে বলল, ‘ওহো, সরি, সরি! কাকে জিজ্ঞাসা করছি? এই প্রশ্নটার তো কোনো মানেই হয় না।’

আমাদের তৈরি হতে চারদিন লাগল। শ্যাম্পু করে চুলটা যথাসাধ্য উশকোখুশকো করে ফ্যালা হল। আমার মার্কা মারা মোটা ফ্রেমের চশমার বদলে চোখে উঠল সরু সোনার গিল্টি করা ফ্রেমের চশমা। খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবি আর জহরকোটের বদলে এল খাকি হাফ প্যান্ট আর রংচঙে হ্যান্ডলুমের হাওয়াই শার্ট। পায়ে পাহাড়ে চড়ার মোটা চামড়ার জুতো। মাথায় বাহারে টুপি। আর কাঁধে ঝোলানো স্ট্র্যাপ দেওয়া চামড়ার ব্যাগে কতগুলো নকল ক্যামেরা আর আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি। তখন আমাকে দেখলে কারোর সাধ্যি ছিল না যে আমাকে চিনতে পারে। আমি তখন বোম্বাইয়ে বাঙালি সিনেমা পরিচালক চিত্রপ্রসাদ রায়। নাসারার পাশে সেই পাশ ফিরে শুয়ে থাকা মানুষের মতো পাহাড়ে লোকেশন শ্যুটিং করা যায় কিনা সেটা দেখা আমার উদ্দেশ্য।’

মলয় জিজ্ঞাসা করল, ‘মেজর মিত্র কোনো ছদ্মবেশ নেননি?’

‘তেমন কিছু নয়। রাজস্থানি কায়দায় পরা ধুতি, কুর্তা আর মাথায় সুতোর কাজ করা টুপি। একেবারে একজন স্থানীয় ব্যবসাদার শেঠ। সে যাই হোক, পঞ্চমদিন সোমবারে আমাদের যাত্রা শুরু হল। দিল্লি থেকে সকাল বেলা ট্রেনে উঠলুম ফার্স্টক্লাসে। যোধপুরে নামলুম সন্ধ্যের মুখে। সেখান থেকে মালপত্র কাঁধে তুলে হেঁটেই স্টেশনের কাছে একটা লজে চলে গেলুম। সেখানে অনেক রাতে দু-জন স্থানীয় লোক আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তাঁদের কাছে খবর পাওয়া গেল যে, অন্তত দু-জন সন্দেহভাজন লোক আমাদের ফলো করে এই লজ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। আপাতত, তারা লজের একতলার ভেজিটেরিয়ান রেস্টুরেন্টে না-খেয়ে কাছেই তাজমহল নামে একটা হোটেলে খেতে গেছে। একথা শুনে অনিরুদ্ধ কিছুমাত্র বিচলিত হলেন বলে মনে হল না। আমাকে শুয়ে পড়তে বলে অতিথিদের সঙ্গে গলা নামিয়ে কী সব আলোচনা শুরু করলেন। আমি ঘুমোতে চলে গেলুম।

পরের দিন যোধপুর থেকে জয়শলমির। মাঝে পোখরানে একদিন ব্রেকজার্নি। সেখানেও অনিরুদ্ধ কী সব সংবাদ সংগ্রহ করলেন। আমার সেসব জানবার কথা নয়, আমিও কোনো কৌতূহল দেখাইনি।

যোধপুর আর পোখরানের মধ্যে সামান্য একটা গোলমাল হয়েছিল। সেটা এখানেও বলা দরকার। অনিরুদ্ধের ডিপার্টমেন্টের সাংগঠনিক ক্ষমতা যে কতটা— সেটা আপনারা বুঝতে পারবেন।

আমার যতদূর মনে পড়ে, যোধপুর থেকে পোখরান ছিল তিন-চার ঘণ্টার রাস্তা। ট্রেনটা ছিল শ্রেণিহীন লোকাল। প্রচণ্ড ভিড়। যোধপুরে আমরা ঠেলেঠুলে একটা কামরায় উঠলুম। ওঠা মাত্র দেখলুম দু-জন গাঁট্টাগোট্টা লোক তাদের সিট থেকে উঠে খুব বিনয়ের সঙ্গে আমাদের সেখানে বসিয়ে দিয়ে দু-জনে কামরার দুটো দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বোঝা গেল এরা শেঠজির কর্মচারী, বাবুজির জন্যে জায়গা ধরে রেখেছিল।

ট্রেন ছাড়া মাত্র শেঠজি সহযাত্রীদের সঙ্গে তেড়ে আড্ডা জুড়ে দিলেন। আমি আন্দাজে বুঝতে পারছিলুম যে দেশ এবং ধান্দার দুরবস্থাই আলোচ্য বিষয়। এদিকে ট্রেন একটার পর একটা ছোটো ছোটো স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে আর ছেড়ে দিচ্ছে। কারোর নামার নাম নেই কিন্তু প্রায় প্রত্যেক স্টেশনেই একজন দু-জন করে লোক উঠছে আর কামরার ভেতরে ভিড় বেড়েই যাচ্ছে।

পোখরানের দু-তিনটে স্টেশন আগে একটা স্টেশনে ঠিক ট্রেন ছাড়ার সময় আমাদের কামরায় একজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ অফিসার উঠলেন, সঙ্গে জনাতিনেক বন্দুকধারী কনস্টেবল। তিনি উঠেই ঘোষণা করলেন যে, যাত্রীরা সবাই যেন যে যার জায়গায় থাকে, চলন্ত ট্রেন থেকে নামবার চেষ্টা না-করে। করলে গুলি চলবে।

বলতে-না-বলতেই আমাদের বেঞ্চের সামনে বেঞ্চে বসে থাকা দু-জন নিরীহ মতন লোকের কোলের ওপরে রাখা দুটো সাদামাটা রেক্সিনের ব্যাগ ছোঁ মেরে তুলে নিল কনস্টেবলরা। লোকদুটো হাঁ হাঁ করে উঠে দাঁড়াল। তারা কোনো কিছু করে ওঠবার আগেই দেখলুম ব্যাগদুটো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা পালোয়ানদের হাতে চলে গেছে, দু-জন কনস্টেবল লোকদুটোকে জাপটে ধরেছে আর তিন নম্বর কনস্টেবলটি ফটাফট তাদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিয়েছে।

ততক্ষণে কামরায় মহাগোলমাল শুরু হয়ে গেছে। অনেকেই চ্যাঁচাচ্ছে। কেউ উত্তেজনায়, কেউ রাগে, কেউ-বা কৌতূহলে। দারোগাসাহেব সকলের সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য ব্যাগদুটো খুলে ফেললেন। যা বেরোল তা দেখে সবাই স্তম্ভিত। ব্যাগদুটোর ভেতরে জামাকাপড়ের তলায় ছিল দুটো সাইলেন্সার লাগানো চকচকে পিস্তল, দুটো অদ্ভুতদর্শন বাইনোকুলার আর বিস্তর টাকা। এ ছাড়া একটা ব্যাগ থেকে বের হল একটা ছোট্ট রেডিয়ো ট্রান্সমিটার আর ম্যাপ-জাতীয় কিছু ড্রয়িং। আর অন্য একটা ব্যাগ থেকে বেরোল মক্কার পবিত্র কাবার বাঁধানো ছবি।

দারোগাসাহেব যাত্রীদের সম্বোধন করে বললেন, ‘এরা গুপ্তচর। কোথাকার বুঝতেই পারছেন সবাই। আমি এদের থানায় নিয়ে যাচ্ছি।’

বলে হাতকড়া পরানো নতমস্তক দুই গুপ্তচরকে নিয়ে পরের স্টেশনে সদলবলে নেমে গেলেন। পালোয়ান দু-জন কিন্তু কামরায় থেকেই গেল।

পোখরানে নেমে অনিরুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘এরা কারা?’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘দুটো স্পাই। দিল্লি থেকে আমাদের ফলো করছিল। একেবারে হাঁদা, ঘটে বুদ্ধি বলে কিচ্ছু নেই! কীভাবে ফলো করতে হয়, সেই ট্রেনিংই নেই। কেন যে এই বাজে মাথামোটা লোকগুলোকে পাঠায়, বুঝি না!’

‘ওদের থানায় নিয়ে খুব পিটবে, না?’

‘থানায় নিয়ে যাবে না। ওরা এতক্ষণে দিল্লিতে আমাদের হেডকোয়ার্টার্সের পথে চালান হয়ে গেছে।’

‘দারোগাসাহেব যে বললেন ওদের থানায় নিয়ে যাবেন?’

‘ও দারোগা নয়। আমাদের লোক।’

এরপর পোখরান থেকে জয়শলমির হয়ে বারমের যাত্রা নির্ঝঞ্ঝাটেই কাটল। বারমেরে আমরা গলির মধ্যে একটা ধর্মশালায় উঠলুম। সারদিন কাটল গুচ্ছের প্রাচীন মন্দির দেখে। তাদের কোনোটা পাঁচ-শো, কোনোটা সাত-শো বছরে পুরোনো। একটার বয়েস তো বলল ন-শো বছর। বেশিরভাগই ভগ্নদশা। কয়েকটার অবস্থা ভালো ছিল। অনিরুদ্ধ তাদের এমন মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখলেন যেন সম্রাট আলাউদ্দিন রানি পদ্মিনীকে দেখছেন।

পরদিন ভোর বেলা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আমরা যথাসাধ্য নিঃশব্দে ধর্মশালা থেকে বেরিয়ে পড়লুম। পশ্চিম ভারত বলে আকাশ তখনও ঘন অন্ধকার। মরুভূমি থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে।

ইতিমধ্যে আমাদের পোশাক পালটে গেছে। জিনস আর টি-শার্ট, তার ওপরে পশমের লাইনিং দেওয়া মোটা ক্যানভাসের উইন্ডচিটার, বুকপকেটে এভিয়েটর সানগ্লাস। ব্যাগ কাঁধে আমরা একটু হেঁটে গলির মুখে পৌঁছে মেন রাস্তার আলোয় দেখলুম আমাদের পূর্বদৃষ্ট দুই পালোয়ান একটা জিপের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

জিপটা ঠিক সাধারণ জিপের মতো নয়। চওড়ায় একটু বেশি, সামনে তিনজন আরামসে বসা যায়। পেছনটা পিক-আপ ভ্যানের মতো, মালপত্র নেবার উপযোগী। সেটা দেখলুম একটা বড়ো ড্রাম, তিনটে ঢাউস জেরি ক্যান আর একগাদা মালপত্রে ঠাসা। মনে হল, সেখানে কিছু না হলেও এক সপ্তাহের রসদ রাখা রয়েছে।

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ‘ওখানে কী আছে? তাঁবু না কি?’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘না। তাঁবু নেই।’

বলে, পালোয়ানদের একজনের দিকে হাত বাড়ালেন। লোকটি তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা ছোটো পিস্তল বের করে তাঁর হাতে দিল। অনিরুদ্ধ সেটা আমাকে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা কি জানেন?’

আমি বললুম, ‘১৯২৮ মডেলের পয়েন্ট থ্রি ফাইভ ক্যালিবর কোল্ট?’

অনিরুদ্ধ হতাশ মুখ করে বললেন, ‘এই প্রশ্নটা করে আবার ভুল করলুম। ওটা অবশ্যই চালাতেও জানেন। যাকগে, ওটা সবসময় পকেটে রাখবেন। নেহাত দরকার না-হলে বের করবেন না।’

বলেই হেসে উঠে বললেন, ‘অবশ্য সেটাও বলাই বাহুল্য।’

আমি পিস্তলটা পকেটস্থ করে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘এর কার্তুজ?’

অনিরুদ্ধ জিপের সিটটা তুলে তার তলায় রাখা একটা ব্রাউন খাম দেখিয়ে বললেন, ‘ওটা এখন লোডেডই আছে। আর আরও দশটা কার্তুজ এখানে আছে।’

আমি বললুম, ‘ঠিক আছে। ওটা ওখানেই থাক।’

এরপর থেকেই আমি হয়ে গেলুম চিত্তদা আর মেজর তার র‌্যাঙ্ক পরিত্যাগ করে হয়ে গেল অনিরুদ্ধ।

আমরা রওনা হলুম পাঁচটা পঞ্চাশ নাগাদ। জিপ যখন শহর ছাড়িয়ে মরুভূমিতে ঢুকল, সামনে তখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। অনিরুদ্ধ বেশ খোশমেজাজে গল্প করতে করতে মধ্যমগতিতে গাড়ি চালাতে লাগল।

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ‘এই অন্ধকারে তুমি চালাচ্ছ কী করে? আকাশের তারা দেখে নাকি?’

অনিরুদ্ধ হেসে বলল, ‘কিছুটা তাই। তার বেশিটা হল এই ড্যাশবোর্ডের ওপরে আটকানো এই কম্পাসটা দেখে। এর পয়েন্টারে রেডিয়াম লাগানো আছে। তাই অন্ধকারেও কোনো অসুবিধে নেই।’

‘ড্যাশবোর্ডে আলো নেই কেন? থাকলে অন্তত তোমার মুখ দেখতে পেতুম।’

‘সিকিউরিটি। সাবধানতা। দেখছেন না, হেড বা সাইড কোনো আলোই জ্বালাইনি।’

বললুম, ‘ও, তাই বলো। আমি তো ভাবছিলুম এটা একটা লজঝড় গাড়ি, তার আলো নেই, ব্রেক কাজ করে কি না ঈশ্বর জানেন। এই গাড়ি নিয়ে আমরা চলেছি এই মরুভূমি পার হতে! কপালে আজ অনেক দুঃখ আছে।’

অনিরুদ্ধ উচ্চৈস্বরে হেসে উঠল। বলল, ‘দুঃখ আছে কিনা সেটা পরে জানা যাবে।’

তারপর চলল বকর বকর। বুঝতে পারছিলুম যাতে ঘুমিয়ে না-পড়ে তাই এত বাক্যবিন্যাস। আমিও এই সুযোগে ওর মনের কথা বেশ অনেকটা জেনে নিলুম। শোনা যায়, দিনের বেলাতেও যদি কোনো রাস্তা না-থাকে, তাহলে বালির এই সমুদ্রে একা একা গাড়ি চালাতে গিয়ে অনেকে পাগল হয়ে যায়। আর মরুভূমিতে স্রেফ বালির ওপর দিয়ে এমন অন্ধকারে গাড়ি চালানো তো আরও বিপদজনক ব্যাপার। কাজেই মাথা ঠান্ডা রাখতে গেলে হয় সুরে-বেসুরে গান গাইতে হবে নয়তো বকর বকর করে যেতে হবে। তা না-হলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেতে পারে।

অনিরুদ্ধ অবশ্য একটা নাইট-ভিশন চশমা চোখে লাগিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিল, কাজেই কাছের গাছপালা ঝোপঝাড় দেখতে পাচ্ছিল। ওটা না লাগালে অনেক আগেই কোনো গাছের সঙ্গে ধাক্কা মেরে বসত নয়তো কোনো কাঁটাঝোপের ভেতরে গাড়ি ঢুকিয়ে দিত। আমার তো সে বালাই ছিল না। কাজেই, আমি যেন একটা ভয়ানক অন্ধকারের একটা অন্তহীন শুঁড়িপথ দিয়ে ছুটে চলেছি বলে মনে হচ্ছিল।

সে যে কী ভয়ংকর অন্ধকার আপনাদের বোঝাতে পারব না। মনে হয় যেন গিলে খেয়ে ফেলবে। মাথার ওপরে তারাভরা আকাশ; কিন্তু তার আলো মাটি পর্যন্ত পৌঁছোয় না। চাঁদ তো অনেক আগেই ডুব মেরেছে। থাকলে কী হত তখন বুঝতে পারিনি। চলতে চলতে মাঝে মাঝে দূরে দু-একটা টিমটিমে ভূতুড়ে আলো দেখা গেল বটে। অনিরুদ্ধ বলল সেগুলো না কি ওখানে কোনো গ্রামের আলো। সত্যি বলল কি না কে জানে!

সাড়ে ছ-টা নাগাদ আকাশ একটু পরিষ্কার হল, দিকচক্রবালে সামান্য রঙের ছোঁয়া লাগল। চারদিকে যা-কিছু বা যেটুকু দেখবার ছিল, তারা আস্তে আস্তে নিজেদের প্রকাশিত করতে শুরু করল। এইসময় অনিরুদ্ধ হঠাৎ কথা আর জিপের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল। আমি কোনো প্রশ্ন করবার আগেই এদিক-ওদিক ভালো করে দেখে গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামল। তারপর পকেট থেকে একটা ভীষণদর্শন ফ্লিপ ড্যাগার বের করে ক্ষিপ্র হাতে কাছেই একটা কাঁটাঝোপ থেকে কিছু ডালপালা কেটে নিয়ে এসে জিপের চারদিকে সাজিয়ে দিয়ে আবার সিটে উঠে বসল।

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ‘এটা করলে কেন? এই অঞ্চলে কি নেকড়ে বা বুনো কুকুরের মতো মাঝারি সাইজের কোনো হিংস্র জানোয়ার আছে?’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘থাকতে তো পারে। জানেন তো, সাবধানের মার নেই।’

বলে একদিকে আঙুল তুলে বলল, ‘ওইদিকে তাকিয়ে থাকুন, ওইখানে সূর্যদেব উদয় হবেন আর কিছুক্ষণের মধ্যে। যে দৃশ্য দেখবেন তা জন্মজন্মান্তরেও ভুলবেন না, এই গ্যারান্টি দিলুম।’

বুঝলুম নেকড়ের কথাটা চেপে যেতে চাইছে। কাজেই ওই প্রসঙ্গ আর না-তুলে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘তুমি দেখবে না?’

মাথা নেড়ে অনিরুদ্ধ বলল, ‘নাঃ। অনেকবার দেখেছি। এখন একটু ঘুমিয়ে নেব। একঘণ্টা মতো ক্রমাগত গাড়ি চালিয়েছি। এইবার একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার।’

বলে উইন্ডচিটারটা খুলে গায়ের ওপর ফেলে সিটের ব্যাকরেস্টের ওপরে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ বুজে বলল, ‘আর একটা কথা। পিস্তলটা রেডি রাখবেন। বালির ওপরে কোনো কিছু নড়ছে দেখলেই সঙ্গেসঙ্গে গুলি চালাবেন। সেটা কী তা পরে দেখা যাবে। আর, ভুলেও যেন বালির ওপরে পা রাখবেন না বা গাড়ি থেকে ঝুঁকে নীচু হয়ে বালিতে হাত দেবেন না।’

বলেই অনিরুদ্ধ ঘুমিয়ে পড়ল।

আমি বেশ ধাঁধায় পড়ে গেলুম। কী বলতে চাইছে অনিরুদ্ধ? প্রকাশ্য দিনের আলোয় এমন কী আমাদের দিকে আসতে পারে যা আমি চিনতেই পারব না? হতে পারে মরুভূমির কোনো জন্তু, আমরা সাধারণত যাদের দেখে থাকি তাদের থেকে আলাদা। কিন্তু, তাদের চিনতে পারব না— এটা কি একটা কথা হল? আর, সেটা যে খুব একটা বিশালকায়, তাও তো কাঁটাঝোপের উচ্চতা দেখে মনে হল না। তাহলে, সেটা আমাকে খোলসা করে বলল না কেন? হয়তো ভেবেছে যে পাঁচটা পাওয়ালা সাপ বা দুইল্যাজওয়ালা কাঁকড়াবিছে শুনলে আমি বিশ্বাস করব না। ও তো জানে না যে আমার অভিজ্ঞতা এমনই যে আমি কোনো কিছুতেই আর আশ্চর্য হই না।

ওসব চিন্তা করে কোনো লাভ নেই ভেবে আমি সূর্যোদয়ের দিকে তাকিয়ে রইলুম। খুব আস্তে আস্তে সূর্যদেব উদয় হলেন। দিকচক্রবালে প্রথমে একটা টকটকে সিঁদুরে লাল রেখার আবির্ভাব হল। তারপরে কাঁপতে কাঁপতে তার বাকি অংশটা ওপরে উঠে এল। বোঝা গেল, মরুভূমির ওপরে তখন একটা আবছায়া কুয়াশার স্তর লেগে আছে। বালি তখনও প্রবল ঠান্ডা আর ওপরের বাতাস গরম হতে শুরু করেছে। ফলে বাতাসে যে পরিচলন স্রোত বা কনভেকশন কারেন্ট সৃষ্টি হয়েছে তারই ফল এই কুয়াশা আর তাই সেই কম্পমান পর্দার পেছনে স্পন্দিত হয়ে ওপরে উঠছেন সহস্রাংশু। একটু পরেই কুয়াশার স্তরের ওপরে উঠে এলেন সূর্যদেব আর সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক যেন ঝলমল করে উঠল। দৃশ্যটা সত্যিই আজীবন মনে রাখবার মতো।

সূর্য তো উঠলেন। সেইসঙ্গে চড়চড় করে বাড়তে লাগল গরম। একটুও সময় নষ্ট না-করে দিবাকর সারাদিনে ভূলোক দ্যুলোক আর অন্তরীক্ষে যে কী কাণ্ড করবেন, সেটা পত্রপাঠ জানিয়ে দিলেন। আমি উইন্ডচিটার খুলে ফেললুম আর সঙ্গে সঙ্গে অনিরুদ্ধও তার গায়ের ওপর থেকে সেটা সরিয়ে উঠে বসল। তারপরেই এক লাফে জিপ থেকে নেমে তার সামনে রাখা কাঁটাঝোপগুলো সরিয়ে দিল। গাড়িতে উঠে বলল, ‘যাবার সময় হল। আর দশ-বারো মিনিটের মধ্যেই নাসারা পৌঁছে যাব।’

পনেরো মিনিটে নাসারা পৌঁছানো গেল।

একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখা গেল, সারা গ্রামটা একটা ফুট পাঁচেক উঁচু পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে তৈরি করা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সেই পাঁচিলের ওপর দিয়ে অনেকটা ডালের বড়ি আকৃতির কুঁড়ে ঘরগুলোর মাথা দেখা যাচ্ছিল। গ্রামে ঢোকবার জন্যে পাঁচিলটার গায়ে একটা মোটা তক্তার দরজা। রাস্তায় যে ক-টি গ্রাম নজরে পড়েছিল, তাদের কোনোটাতেই এরকম পাঁচিল দেখিনি।

আমি অনিরুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘এখানে কি ডাকাতের উপদ্রব আছে নাকি? এরকম পাঁচিল কেন?’

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘জানি না।’

বুঝলুম, চেপে গেল, সত্যি কথা বলল না।

যখন দরজাটার কাছাকাছি এসে গাড়ি দাঁড়াল, তখন খুব সন্তর্পণে দরজা খুলে জনাতিনেক গ্রামবাসী বেরিয়ে এলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে যাঁকে বয়স্ক বলে মনে হল, তাঁর পাকা চুলের ওপরে পাকানো রঙিন কাপড়ের পাগড়ি, সাদা ভুরু, প্রকাণ্ড পাকানো সাদা গোঁফ। তিনি এগিয়ে এসে অনিরুদ্ধকে হিন্দতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এনেছো?’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘এনেছি।’

বলে পেছনে রাখা নানা রকমের মালপত্রের মধ্যে একটা বড়ো ড্রাম দেখিয়ে দিল। সবুজ রঙের ড্রাম, তার ওপরে সাদা রঙে লেখা ‘ট্যাকটিক্স পাউডার’।

পরের প্রশ্ন, ‘এবার কতদিন থাকবে?’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘বড়োজোর তিনদিন।’

‘সঙ্গে কে?’

‘আমার বন্ধু, বম্বের ফিলম ডিরেক্টর। বাঙালি। এখানে লোকেশন দেখতে এসেছেন।’

প্রশ্নকর্তার তরুণ সঙ্গী দু-জন এতক্ষণ বিনাবাক্যব্যয়ে জিপের পেছন থেকে ড্রাম নামানোর কাজে ব্যাপৃত ছিলেন। তাঁদের একজন পুলকিত মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এখানে সিনেমা তোলা হবে? আমরা পার্ট পাব?’

অনিরুদ্ধ উত্তর দেবার আগেই প্রথম প্রশ্নকর্তা অগ্নিবর্ষী দৃষ্টিতে তাঁর সঙ্গী দু-জনকে প্রায় ভস্ম করে দিয়ে বললেন, ‘সিনেমা তুলতে তো অনেক দিন লাগে বলে শুনেছি। অনেক লোকও লাগে। অত জল কোথায় পাবে? লোকজন থাকবে কোথায়? খাবে কী?’

‘অনেক দিন লাগবে না। দু-দিনেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। ওরাও আমাদের মতো নিজেদের রসদ আর জল নিজেরা নিয়ে আসবে। থাকবে তাঁবুতে। আপনাদের কোনো অসুবিধে হবে না।’

‘তাঁবুতে থাকবে? না না, তা হতে পারে না। আমাদের অসুবিধের কথা বলছি না? যখন একরাত্রের মধ্যে সবাই বেপাত্তা হয়ে যাবে তখন আমাদের কী অবস্থা হবে, ভেবে দেখেছ? পুলিশ আর বিএসএফ এসে সারাটা গ্রাম তছনছ করে দিয়ে জোয়ান ছেলেগুলোকে ধরে নিয়ে যাবে। হয়তো আমাদের এতদিনের গ্রামটার আর কোনো চিহ্নই থাকবে না।’

অনিরুদ্ধ হাত নেড়ে বলল, ‘আহা, আপনি অত চিন্তা করছেন কেন, সিংজি? ওদের কাছেও ট্যাকটিক্স পাউডার থাকবে। কিচ্ছু হবে না।’

আষাঢ়ের মতো মুখ করে সিংজি বললেন, ‘তুমি তো বলেই খালাস। কিছু হলে তোমার লোকজনই এসে আমাদের ওপর চড়াও হবে। যাই হোক, তোমার বন্ধুকে বলে দিও এখানে সিনেমা তুলতে এলে তার দলবল আমাদের কাছ থেকে কোনোরকম সাহায্য যেন প্রত্যাশা না-করে। আর আমাদের জলে যেন হাত না-পড়ে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি তোমরা সিনেমার আশা ছেড়ে এখনই ফিরে যাও।’

মৃদু হেসে অনিরুদ্ধ বলল, ‘এতদূর এসে কোনো কাজ না-করে বিদেয় হব, তা তো হয় না। আপনি বরং প্রার্থনা করুন যেন আমার বন্ধুর জায়গাটা পছন্দ না-হয়। তাহলেই আর কোনো ঝামেলা থাকবে না।’

সিংজি আর কথা না-বলে পেছন ফিরে হনহন করে চলে গেলেন। কাঠের দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল।

অনিরুদ্ধ গাড়ি চালাতে শুরু করল। আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ‘এই ট্যাকটিক্স পাউডার ব্যাপারটা কী বলোতো? তুমি শহর থেকে এতটা পথ গাড়ি করে এনে দিলে অথচ ওই সিংজি তোমাকে একটা কৃতজ্ঞতা জানানো তো দুরস্থান, দড়াম করে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। আমি বিচলিত হয়ে পড়ছি অথচ তোমার কোনো বিকার নেই। আবার ফিকফিক করে হাসছো!’

এবার অনিরুদ্ধ সশব্দে হেসে উঠল। বলল, ‘আপনি যে চটে গেছেন সেটা আপনার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছি। কি জানেন, আপনি যদি সিংজির অবস্থায় পড়তেন তাহলে হয়তো আপনিও ওইরকম ব্যবহারই করতেন। এই গ্রামটা একটা অতিভয়ংকর অবলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই বিভীষিকার গুরুত্ব যে কতটা তা সিংজি বিলক্ষণ জানেন, গ্রামের অন্যান্যরাও জানেন তবে ততটা হয়তো নয়। কার ভাবতে ভালো লাগে বলুন তো যে, আমার এই প্রিয় গ্রামবাসীরা একটা সামান্য অসাবধানতার জন্য কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যেতে পারে? কিন্তু, সিংজি এই গ্রামের প্রধান। তাঁকে ভাবতে হয়, কারণ এর প্রত্যেকটি মানুষের ভালো-মন্দের দায়িত্ব তাঁর। কাজেই ভদ্রতার বিলাসিতা করতে গিয়ে তাদের অস্তিত্বকে তিনি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারেন না।’

আমি বললুম, ‘তুমি যে কী বলছো, আমি তার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারলুম না। আমাকে একটু খোলসা করে বলবে? তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন এখানে কাছাকাছি কোনো প্রাগৈতিহাসিক মাংসাশী সরীসৃপ টরিসৃপ জাতীয় কিছু-একটা আছে। হয়তো ওই পাহাড়ের কোনো গুহায়। তা, সেটাকে তোমরা নিকেশ করতে পারছো না? ড্রামে করে যেটা আনলে, সেটা কী? বিষ?’

অনিরুদ্ধ জিপটা পাহাড়ের পাশে একটা পাথুরে চাতালের ওপর পার্ক করতে করতে বলল, ‘দেখাচ্ছি। আগে তো গাড়ি থেকে নামুন, আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। গাড়ি থেকে একটু দূরে দাঁড়াবেন।’

বলে জিপের পেছনে মালপত্রের ভেতর থেকে চাষের জমিতে কীটনাশক ছড়াবার জন্যে যেরকম পিঠে ঝোলানো পাম্প ব্যবহার করা হয় সেরকম একটা যন্ত্র বের করে সেটা পিঠে ঝুলিয়ে নিল। সেই যন্ত্রের হাতল টেপামাত্র তার স্পাউটের ভেতর থেকে একটা অত্যন্ত কটুগন্ধ হলদে রঙের টুথপেস্টের মতো বস্তু বেরিয়ে এসে নীচে পাথরের ওপরে পড়ল। অনিরুদ্ধ সেটা দিয়ে তার জিপের চারদিকে ঘুরে ঘুরে গোটা তিনেক গণ্ডি দিতে দিতে বলল, ‘এই হল আপনার ট্যাকটিক্স।’

আমি নীচু হয়ে আঙুল দিয়ে সেটা ছুঁতে যাচ্ছিলুম, অনিরুদ্ধ বলল, ‘ওটা না-ছুঁলেই ভালো। ছুঁলে চার-পাঁচদিন ধরে জ্বালা করবে।’

আমি তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিয়ে বললুম, ‘বলো কী? গন্ধটা তো অনেকটা গ্যামাক্সিনের মতো। এটা দিয়ে গণ্ডি দিচ্ছ কেন? এখানে কি অনেক পোকামাকড় আছে না কী?’

‘তা তো আছেই। এখানে বিশেষ করে পিঁপড়ে আর গুবরে পোকার উপদ্রব খুব বেশি। এই গণ্ডি না-দিলে এখানে যে খাবার আছে, তা এরা কয়েক ঘণ্টায় সাবাড় করে দিতে পারে। বোঝেনই তো, মরুভূমির পোকামাকড়, খেতে পায় না বেচারিরা।’

‘মরুভূমির এই গরমে, এরা বেঁচে থাকে কী করে?’

‘থাকতেই হয়। গুবরে পোকা সত্তর ডিগ্রি পর্যন্ত টেম্পারেচার সহ্য করতে পারে। ওদের পিঠে যে খুব শক্ত একটা আস্তরণ আছে সেটা ওদের বাঁচিয়ে রাখে। সত্তরের ওপরে উঠলে ওরা ঝোপঝাড়ে বা গাছের কোটরে ঢুকে পড়ে। আর পিঁপড়ে পঞ্চাশ ডিগ্রির ওপরে টেম্পারেচার উঠলে বালি খুঁড়ে অনেকটা তলায় চলে যায়। সে জায়গাটা বেশ ঠান্ডা। সেখানে সারাদিন ঘুমোয় আর সূর্যাস্তের পর খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে আসে।’

‘আমরা কী ওই পিঁপড়েদের মতো বালির নীচে বেসমেন্টে থাকব না কি গুবরে পোকাদের মতো কোনো গাছের কোটরে?’

অনিরুদ্ধ সহাস্যে বলল, ‘না, না, আমরা থাকব ফাস্ট ফ্লোরে। একেবারে ফাইভস্টার এ্যাকোমোডেশন। আসুন আমার সঙ্গে।’

এই আলোচনার একটা নিষ্ঠুর বাস্তব প্রদর্শন যে সেদিন রাতেই দেখব তা তখন বুঝতে পারিনি।

অনিরুদ্ধ দু-হাতে আমাদের ব্যাগদুটো আর পিঠে ইন্সেক্টিসাইড ছড়ানোর যন্ত্রটা নিয়ে টকটক করে পাথর থেকে পাথরের ওপরে পা দিয়ে দিয়ে অবলীলাক্রমে টিলার গা বেয়ে উঠে গেল। পেছনে পেছনে আমি কিছুটা হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা হাঁচোড়-পাঁচোড় করতে করতে ওপরে উঠলুম। আমরা যেখানে থামলুম সেটা টিলার ওপর মাঝামাঝি জায়গায় একপাশে ছোটো একটা চৌরস করা জায়গা। তার অন্যপাশে একটা মাঝারি সাইজের গুহা। চৌরস করা জায়গাটা নিতান্তই অপটু হাতের কাজ। এবড়োখেবড়ো, কোনোরকমে সমতল করা হয়েছে।

আমি একটা পাথরের ওপর বসে দম নিচ্ছিলুম, অনিরুদ্ধ মালগুলো গুহার ভেতরের রেখে এসে উঠোনের মতো জায়গাটার চারদিকে ট্যাকটিক্সের গণ্ডি দিতে দিতে বলল, ‘চিত্তদা, এই আমাদের ফাইভস্টার এ্যাকোমোডেশন। দেখেছেন তো, সঙ্গে আবার একটা ব্যালকনিও আছে। এখান থেকে মরুভূমির দৃশ্য অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়।’

‘বড্ড গরম!’

‘এখানে তো গরম লাগছে, গুহার ভেতরটা দেখবেন ঠান্ডা, একেবারে এয়ারকন্ডিশনড।’

আমি বলুলম, ‘তোমার এই ব্যালকনিটা বানাল কে? তোমার লোকজনেরা না কি?’

অনিরুদ্ধ হাত নেড়ে কেমন একটা উদাস গলায় বলল, ‘না, না। কী যে বলেন! এটা বানিয়েছে যারা পঁচিশ থেকে তিরিশ হাজার বছর আগে এই গুহাটায় থাকত, সেই গুহামানবেরা। ভেবে দেখুন, সারাদিন ধরে শিকার করে আর গাছের ফলমূল জোগাড় করে এনে রাত্রি হলে তারাভরা আকাশের নীচে এই ব্যালকনিতে তারা আগুনের চারদিকে বসে নাচগান করত বা গল্প করত। হয়তো—’

আমি বললুম, ‘দ্যাখো বাপু, আমার তোমার মতো কল্পনাশক্তি নেই। তার ওপরে পেটে যখন কয়েক-শো ছুঁচো ডন মারে, তখন তোমার গুহামানবেরা হাজার হাজার বছর আগে রাত্তির বেলা কী করতেন বা না করতেন, এই ঠা ঠা রোদে বসে সেটা ভেবে ওঠার ক্ষমতা তো আমার একেবারেই থাকে না।’

অনিরুদ্ধ গণ্ডি কাটা বন্ধ করে বলল, ‘অবশ্যই, অবশ্যই। আমার কাজ আপাতত শেষ। এবার ভেতরে চলুন, লাঞ্চ একেবারে রেড করেই এনেছি।’

‘তোমার সবদিকে যেরকম নজর তাতে আমি এইরকমই আশা করছিলুম।’

গুহাটা ফুট সাতেক উঁচু আর তলায় আট ফুট মতন চওড়া। আকৃতিটা খানিকটা প্যারাবলিক বা অধিবৃত্তাকার। দেওয়াল আর মেঝে মোটামুটি মসৃণ। প্রথমে ফুট দশেক সোজা ভেতরে ঢুকে হঠাৎ সমকোণে ঘুরে গেছে। এই দ্বিতীয় অংশটার দৈর্ঘ্য প্রায় কুড়ি ফুট এবং চওড়াতেও বেশি। সূর্যের আলোয় প্রথম অংশটা আলোকিত তাই কিছুটা গরম। দ্বিতীয় অংশের প্রথম দিকের কয়েক ফুটে আলো আছে বটে কিন্তু তারপরে অন্ধকার। এই আলো যেখানে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে সে জায়গাটা থেকে ঠান্ডা শুরু এবং ভারি আরামের। অনিরুদ্ধ দেখলুম এই আলো-আঁধারি জায়গাটাতেই আমাদের মালপত্র রেখেছে।

খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘এই গুহাটা ওদিকে কতদূর গেছে? আরও ফুট বারো হবে, তাই না?’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘হ্যাঁ, তবে ওখানেই শেষ নয়। ওখান থেকে গুহাটা ইংরেজি ওয়াই-এর মতো দু-ভাগ হয়ে নীচের দিকে নেমে গেছে। সেটা কতদূর গেছে তা বলতে পারব না। ওদিকে যেতে সাহস হয়নি।’

শেষ কথাগুলো বলবার সময় এমন ঘাড় গোঁজ করে নতনেত্রে গভীর মনোযোগ দিয়ে খেতে খেতে বলল যে আমার মনে হল আবার কিছু চেপে গেল।

তা গেল তো গেল। আমি আর কথা বাড়ালুম না। ভারত সরকারের প্রজেক্ট, অনিরুদ্ধ সরকারের প্রতিনিধি। সে তার কতটা আমাকে জানাবে আর কতটা চেপে যাবে, সেটা তার ব্যাপার। তবে, প্রজেক্টটা শেষ হলে একটা বোঝাপড়া করা হবে অবশ্যই।

আমার যখন ঘুম ভাঙল, তখন দেখি গুহার বাইরে থেকে আসা আলোটা গোলাপি হয়ে এসেছে। আমি তাড়াতাড়ি স্লিপিং ব্যাগ থেকে বেরিয়ে সেটা ভাঁজ করে একপাশে রেখে বাইরে বেরিয়ে এলুম। দেখলুম, পাথুরে চাতালটার একপাশে অস্তগামী সূর্যের দিকে মুখ করে অনিরুদ্ধ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার বুকের ওপরে দু-হাত আড়াআড়ি করে রাখা।

আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে বললুম, ‘কী অপূর্ব দৃশ্য!’

আমার দিকে না-তাকিয়ে অনিরুদ্ধ বলল, ‘হ্যাঁ, যা বলেছেন। শূন্য মরুভূমিতে অবনতমুখী সন্ধ্যা। এ যে না দেখেছে, তাকে বোঝানো যাবে না।’

আমি বললুম, ‘ও বাবা, তুমি কবিতা টবিতা পড়ো না কি?’

এইবার অনিরুদ্ধ আমার দিকে ফিরল। করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, ‘কেন যে আপনারা মনে করেন যে ফৌজিমাত্রই রসকসহীন শুষ্কং কাষ্ঠং হবে, তা তো বুঝি না। স্বর্গ থেকে তো অনেক দিনই বিদায় নিয়েছি; কিন্তু মনটা তো মরে যায়নি। কিছু রসদ ছাড়া সেটা বাঁচে কী করে বলুন তো? সারাদিন ধরে শুধু ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা, রক্তপাত আর শয়তানি নিয়ে থাকা যায়? তাই যখনই সুযোগ পাই, যেমন এখন এই নির্জন মরুভূমিতে, দিবা অবসানে দিগন্তের দিকে উদাসিনী সন্ধ্যার প্রস্থানের দৃশ্য থেকেই যতটা সম্ভব আনন্দ তুলে নিতে চেষ্টা করি।’

আমি লজ্জিত হয়ে বললুম, ‘আহা, আমি সেকথা বলিনি। আমি বলতে চাইছিলুম যে তোমাকে যে একটা বিশাল জটিল কর্মকাণ্ড সামলাতে হয়, এত খুঁটিনাটি মনে রাখতে হয়, তার মধ্যেও যে কবিতা একটা জায়গা করে নিতে পারে, সেটাই আশ্চর্য। একেবারে নিয়মবাঁধা জীবন তো তোমার নয়। তা হলে না-হয় বুঝতে পারতুম।’

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা চিত্তদা, আপনি তো আমার সবকথা শুনেছেন। বলুন তো, কল্যাণীকে কিছু না জানিয়ে কলকাতা ছাড়া কি আমার ঠিক হয়েছিল?’

আমি গোধূলির ম্লান রক্তিম আলোয় অনিরুদ্ধর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলুম সেখানে সুস্পষ্ট যন্ত্রণা। সেটা আশ্চর্য কিছু নয়। সঙ্গীরিক্ত মরুভূমির সেই অনন্ত গোধূলিলগ্নে অতীতের তীর থেকে দীর্ঘশ্বাস উঠে তো আসবেই।

বললুম, ‘না, ঠিক হয়নি। তোমার ওর সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল।’

‘কী হত কথা বলে? ওর বাবা যে ওকে কিছু না জানিয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, সেটা একেবারেই অবিশ্বাস্য। হয়তো আমাদের অবস্থার কথা বিবেচনা করে কল্যাণীই ওর বাবাকে পাঠিয়েছিল। আমি যোগাযোগ করবার চেষ্টা করলে হয়তো আমাকে অপমানিত হতে হত। না, চিত্তদা, এই ভালো হয়েছে। কল্যাণীর উজ্জ্বল মূর্তিটাই আমার মনের মধ্যে থেকে গেল চিরদিনের মতো।’

আমি একটু উত্তেজিত হয়ে বললুম, ‘হয়তো, হয়তো আর হয়তো। তুমি না একজন ডিটেকটিভ? তুমি জানো না যে অঙ্গাঙ্গিভাব না-জেনে কোনো কিছুরই সামর্থ্য নির্ণয় করা যায় না? স্রেফ কতগুলো হয়তোর ওপরে তুমি একটা ডিসিশন নিয়ে নিলে?’

অনিরুদ্ধ আবার অস্তাচলগামী সূর্যের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ‘কী জানি, ভুলই করেছি হয়তো। তবে সেই সময়ে আমার মনের অবস্থা আপনি জানেন না চিত্তদা।’

বলতে বলতেই হঠাৎ ঝপ করে যেন সন্ধ্যা নেমে এল। একটার পর একটা তারা সেই সন্ধ্যার ম্লান আলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে অন্ধকার আকাশ ভরে ফেলল। অনিরুদ্ধ পকেট থেকে একটা টর্চ বের করে আলো জ্বেলে তাড়াতাড়ি গুহার মধ্যে ঢুকে গেল। বেরিয়ে এল একটু বাদেই। গলায় নাইট-ভিশন বাইনোকুলার, হাতে দুটো উইন্ডচিটার এবং আরও কয়েকটা জিনিস।

আমি তখন একটা পাথরের ওপর বসে আকাশে আলো-আঁধারির খেলা দেখছিলুম। অনিরুদ্ধ আমার পাশে বসে আমার হাতে একটা টর্চ, উইন্ডচিটার আর পিস্তলটা দিয়ে বলল, ‘টর্চটা নিতান্ত দরকার না-হলে জ্বালাবেন না।’

হঠাৎই আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে অনিরুদ্ধ বলল, ‘চিত্তদা, জানেন আমার মন বলছে আজকের এই সন্ধ্যাটা নিশ্চয়ই কালসন্ধ্যা হয়ে উঠবে।’

আমি বললুম, ‘কালসন্ধ্যা? সে আবার কি?’

‘যে রাত্রে মানুষের ওপর মৃত্যু অপ্রত্যাশিতভাবে নেমে আসে, তাকে বলে কালরাত্রি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই সন্ধ্যায় আমাদের আশেপাশেই কিছু মানুষের ওপর অকাল মৃত্যু নেমে আসছে। তারা কারা আমি জানিনা। আমরা হতে পারি, নাসাবার লোকেরা হতে পারে, অন্য কেউও হতে পারে। আজ সন্ধ্যায় নিশ্চয়ই তাদের কিছু লোক অমোঘ মৃত্যুর দিকে পা বাড়িয়েছে। কেউ তাদের আটকাতে পারবে না। তাই বললুম, এই সন্ধ্যা কালসন্ধ্যা। হয়তো আমারই আজ শেষ প্রহর সমাগত। তাই কল্যানীর কথা মনে পড়ল।

আমি অনিরুদ্ধর কাঁধে হাত রেখে বলললুম, ‘তুমি কেন বুঝতে পারছ না যে তুমি যতই এই সৈন্যবাহিনীর একজন হও না কেন, তোমার অন্তরাত্মা একটা নিশ্ছিদ্র নিঃসঙ্গতার মধ্যে ঢুবে রয়েছে। হয়তো সোজা ধলেশ্বরী নদীর ধারে, যার কাছে তুমি মনোভার নামাতে চাও, সেই অপেক্ষা করে আছে তোমার জন্যে। কিছুই শেষ হয়নি অনিরুদ্ধ। শেষ হয়না। আশা আর বিশ্বাস যদি হারতে থাকে তাহলে এই সব অস্বাস্থ্যকর চিন্তা তোমাকে আস্তে আস্তে পঙ্গু করে ফেলবে যে।’

অনিরুদ্ধ ম্লান হেসে বলল, ‘আপনি বোধ হয় ঠিকই বলেছেন। থ্যাংক য়ু।’

তারপর গুনগুন করে ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই’ গাইতে শুরু করে দিল। সেই শুরু, এর পরে চলল একটার পর একটা খুব নীচু গলায় গান। খুব যে একটা ভালো গাইছিল তা নয়, কিন্তু সেই আশ্চর্য পরিবেশে তাই শুনতে অসম্ভব ভালো লাগছিল।

রাত বাড়তে লাগল। আমরা গায়ে উইন্ডচিটার চড়িয়ে নিলুম। মাথায় টুপি উঠল। একটু বাদে চাঁদ উঠল। একটা ম্লান হলদেটে আলোয় আমাদের পায়ের নীচে মরুভূমি কিছুটা আবছায়া দৃশ্যমান হল। নিস্তব্ধ নাসারা গ্রামটা সিল্যুয়েটে দেখা দিল।

অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘যান, গিয়ে শুয়ে পড়ুন। সকাল হলে তুলে দেব আপনাকে।’

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ‘তুমি কী করবে?’

‘আমাকে সারারাত জাগতে হবে। আপনাকে তুলে দিয়ে শুতে যাব।’

আমি উঠে দাঁড়ালুম। সঙ্গেসঙ্গে অনিরুদ্ধ হিসহিস করে উঠল, ‘একটু দাঁড়ান। কিছু শুনতে পাচ্ছেন? বর্ডারের দিক থেকে আসছে।’

আমি প্রথমটা কিছুই শুনতে পাইনি। তারপরে মনে হল একাধিক গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষীণ আওয়াজ। উত্তেজিত হয়ে বললুম, ‘হ্যাঁ, কতগুলো গাড়ির আওয়াজ বলে মনে হচ্ছে। আওয়াজটা যেন বাড়ছে। এই দিকে আসছে।’

অনিরুদ্ধ ইতিমধ্যে নাইট-ভিশন বাইনোকুলার পরে নিয়েছে। স্থির হয়ে শব্দটা যেদিক থেকে আসছিল, সেইদিকে তাকিয়ে শান্ত সংযত গলায় বলল, ‘ঠিক তাই। ভালো বুঝতে পারছি না, তবে মনে হচ্ছে, একটা জিপ আর দুটো লরি। এখনও অনেকটা দূরে। দু মাইল মতন। দাঁড়িয়ে গেছে। কেন? শব্দটা বন্ধ হয়ে গেছে। তার মানে, ওরা কিছুর অপেক্ষা করছে। আরও ফোর্স আসবে? নাসারা গ্রামটার অস্তিত্ব থাকবে তো? এতগুলো নিরীহ মেয়ে পুরুষ বাচ্চা। নাঃ, আর দেরি করা যায় না। আপনি দেখতে থাকুন, আমি ভেতর থেকে ট্রান্সমিটারটা নিয়ে আসি।’

অনিরুদ্ধ চশমা খুলে রওনা হতে যাবে, ঠিক সেইসময়ে আমাদের পাহাড়ের নীচ থেকে একটা সড়সড় ছড়ছড় করে শব্দ শুরু হল। আমরা ওপর থেকে দেখলুম যেন পাহাড়ের তলা থেকে একটা নিকষ কালো জলের স্রোত মরুভূমির ওপর দিয়ে বইতে শুরু করে দিল। বন্যার জলের মতো প্রায় নিঃশব্দে নাসারার দু-পাশ দিয়ে বেরিয়ে দ্রুতবেগে বয়ে চলল যেদিক থেকে শব্দ আসছিল সেইদিকে।

আমি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে অনিরুদ্ধকে বললুম, ‘ওটা কী, অনিরুদ্ধ, ওটা কীসের স্রোত?’

অনিরুদ্ধ দু-হাত ঘষতে ঘষতে বলল, ‘ওটা আমি যা সন্দেহ করেছিলুম, ঠিক তারই স্রোত। আপনাকে পরে সব বলব। বোধহয় আমার কল্পনার কালসন্ধ্যা সত্যি হতে যাচ্ছে।’

বলে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে বলল, ‘ওই দেখুন, গাড়িগুলোর পেছন থেকে বেরিয়ে তিনটে উটে চড়ে কারা এদিকে আসছে। উটগুলো দাঁড়িয়ে গেল। ভীষণ ছটফট করছে। স্রোতটা ওদের দিকেই যাচ্ছে। আরে, উট তিনটে পেছন ফিরে ঊর্ধশ্বাসে পালাচ্ছে! ওই যাঃ, একটা সওয়ারি ওপর থেকে পড়ে গেল যে! স্রোতের মধ্যে হারিয়ে গেল। এবার স্রোতটা চলেছে গাড়িগুলোর দিকে। তিনজোড়া হেডলাইট জ্বলে উঠেছে।’

এবার আমিও দেখতে পেলুম। একটা জিপ আর দুটো লরিই বটে। তিনটেই মুখ ঘুরিয়ে বর্ডারের দিকে যাবার চেষ্টা করল কিন্তু অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় কালো স্রোতটা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মিনিট পনেরো পরেই স্রোতটা পেছোতে শুরু করল। ততক্ষণে চাঁদ আকাশের একপাশে হেলে পড়েছে। তার যেটুকু জ্যোতি ছিল তার আর বিশেষ অবশিষ্ট নেই। তবুও, তার আলোয় দেখলুম, মিনিট দশেকের মধ্যেই স্রোতটা পাহাড়ের নীচে অদৃশ্য হয়ে গেল। আর সেই অন্ধকারে দূরে তিনটে গাড়ির হেডলাইটগুলো কেমন যেন ওলটপালট হয়ে জ্বলেই রইল।

ঘটনাটা যখন শেষ হল, তখন আমাদের দু-জনেরই দাঁড়াবার ক্ষমতা আর নেই। দু-জনে দুটো পাথরের ওপরে বসে পড়লুম। বেশ কিছুক্ষণ বাদে দম নিয়ে বললুম, ‘ব্যাপারটা কী হল? তুমি যে বললে যে তুমি যা সন্দেহ করেছিলে ঠিক তাই হল, সন্দেহটা কী? আর, তা ছাড়া আমাদের তো একবার নীচে গিয়ে ব্যাপারটা ইনভেস্টিগেট করা উচিত।’

অনিরুদ্ধরও নার্ভগুলো ততক্ষণে শান্ত হয়েছে বলে মনে হল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘একটু বসুন। আমি আসছি। এসে বলব। আর ইনভেস্টিগেশন যা করবার তা সূর্য ওঠার পরে। আগে তো কোনো মতেই নয়।’

বলে হনহন করে হেঁটে গুহার ভেতরে ঢুকে গেল। একটু পরেই বেরিয়ে এল বগলে একগুচ্ছ কাঠ নিয়ে।

আমি বললুম, ‘ওগুলো দিয়ে কী করবে?’

আমার পায়ের সামনে কাঠগুলো গোল করে সাজাতে সাজাতে অনিরুদ্ধ বলল, ‘আগুন জ্বালব। আপনাকে এখন যা বলতে যাচ্ছি তা গুহার ভেতরে বসে বলা যায় না। বলতে হয় তারাভরা আকাশের নীচে আগুনের চারদিকে ঘিরে বসে।’

‘তোমার গুহামানবদের মতো?’

অনিরুদ্ধ এই প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না।

অনিরুদ্ধ শুরু করল, ‘চিত্তদা, আপনি হেরোডোটাসের নাম শুনেছেন?’

আমি বললুম, ‘সে আবার কী? কোনো প্রাগৈতিহাসিক গুহামানব।’

অনিরুদ্ধ সহাস্যে বলল, ‘আরে, না না। বিশ্বের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক হলেন হেরোডোটাস। তাঁর আগেও অনেক মনীষী ইতিহাস রচনা করে গেছেন, কিন্তু তাঁদের লেখা আজ আর পাওয়া যায় না। অগত্যা তাঁকেই প্রাচীনতম বলতে হয়।’

বললুম, ‘বুঝলুম। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আজকের এই ঘটনার সম্পর্ক কোথায়?’

‘সম্পর্ক আছে। খুব গভীর সম্পর্ক। এঁর ইতিহাস না জানলে আজকের নাসারা কাণ্ডের ব্যাকগ্রাউন্ডটা আপনি ধরতে পারবেন না।’

আমি সনিশ্বাসে বললুম, ‘ঠিক আছে। বলুন, স্যার। প্রাচীন ইতিহাসের অধ্যাপকের পাল্লায় যখন পড়েছি, তখন আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর উপায় কী?’

অনিরুদ্ধ সজোরে হেসে উঠে বলল, ‘হ্যাঁ, শুনুন। ৪৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হ্যালিকারনেসাসে হেরোডোটাসের জন্ম হয়। এ জায়গাটা ছিল গ্রিক সাম্রাজ্যের পূর্বপ্রান্তে এশিয়া মাইনরে বা আজকের তুরস্কে। সে সময় তিনটি মহাশক্তিশালী দেশ ভূমধ্যসাগরের চতুর্দিকে নিজেদের ক্ষমতা বিস্তারের জন্য পরস্পরের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাচ্ছিল। তারা হল মিশর, পারস্য আর গ্রিস। এই তিনটে দেশের সীমান্তই হ্যালিকারনেসাস থেকে খুব একটা দূরে নয়। কাজেই, হেরোডোটাস ছোটোবেলা থেকেই এদের ঝগড়াঝাঁটি যুদ্ধবিগ্রহ দেখে আসছেন। তিনটি দেশেরই লোকজনদের সঙ্গে মেলামেশা করবার আর তাদের সংস্কৃতির পরিচয় পাবার সুযোগ পেয়েছেন। খুবই কাছ থেকে দেখেছেন তাদের। তার ফলে, নিজের দেশ গ্রিসের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকা সত্ত্বেও, অন্যান্য দেশের প্রতিও তাঁর শ্রদ্ধা আর সম্মানবোধ গড়ে উঠেছিল।

কুড়ি বছর বয়েসে রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। তখন থেকে আর প্রায় ষাট বছর বয়েসে থুরিয়া শহরে মারা যাওয়া পর্যন্ত তিনি দেশবিদেশে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন। গেলেন মিশরে, টায়ারে, ব্যাবিলনে, এথেন্সে, আরও কত জায়গায়।

এই সময়েই তিনি গ্রিসের হাতে পারস্য সম্রাট ক্সেরেক্সেসের বিশাল আন্তর্জাতিক বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের ইতিহাস লিখতে শুরু করেন। এই কাহিনি লিখতে গিয়ে স্বভাবতই যে সমস্ত দেশ এই যুদ্ধের ঘূর্ণাবর্তে এসে পড়েছিল, তাদের কথাও তাঁকে লিখতে হল। সেইসব দেশগুলির অন্যতম ছিল ভারতবর্ষ; কারণ সম্রাটের সৈন্যবাহিনীর একটা বড়ো অংশ ছিল ভারতীয় সেনা।

এই ইতিহাস লিখতে গিয়ে হেরোডোটাসকে অনেকক্ষেত্রে নির্ভর করতে হল জনশ্রুতি বা শোনা কথার ওপরে। এ ছাড়া আর উপায়ই বা কী ছিল? সে সময়ে এক দেশ থেকে অন্যদেশে যাওয়া মোটেই সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না। তখন তাঁর পক্ষে ভারতে আসা, তাও একা একা, ছিল অসম্ভব ব্যাপার। তাঁর কাছে ভারত ছিল বহুদূরের আবছায়া অদ্ভুত এক জায়গা।

পারস্যের বণিক বা পর্যটকদের কাছ থেকে শোনা কথার ওপরে নির্ভর করতে হয়েছিল বলে ভারত সম্পর্কে তাঁর বর্ণনাগুলো অনেক জায়গাতেই ভয়ানক অতিরঞ্জিত অথবা স্রেফ গাঁজাখুরি বলে মনে হয়। হতেই পারে। পারস্য সাম্রাজ্যের পূর্বসীমান্ত থেকে যেসব কাহিনি নানা লোকের মুখে মুখে পশ্চিমসীমান্ত পার হয়ে গ্রিসে এসে পৌঁছোত, তাদের যে খোলনলচে পালটে যাবে তাতে আর আশ্চর্য কী? শতপথব্রাহ্মণে ইরানি ব্যবসায়ী আর ভারতীয় ক্রেতার সোম বেচা-কেনার যে অদ্ভুত প্রথার বর্ণনা আছে, তাতে মনে হয় সাত-শো বা ছ-শো খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ভারত আর পারস্যের মধ্যে বাণিজ্যের স্রোত কমে আসছিল। তার এক-শো বছর বাদে হেরোডোটাসের আমলে তা বোধ হয় একেবারেই শুকিয়ে গিয়েছিল। তার মানে হেরোডোটাস পারস্যের লোকেদের কাছে যা শুনেছেন তাও তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা নয়, শোনা কথা বা লোকশ্রুতি।

তা না-হলে, ভারত সম্পর্কে হেরোডোটাস বলতেন না যে, থর মরুভূমির ওপারে আর কোনো জনবসতি নেই। তখন বুদ্ধদেবের মহাপরিনির্বাণ হয়েছে মাত্র শ-খানেক বছর আগে, মগধের রাজধানী রাজগৃহ থেকে সরে এসেছে পাটলিপুত্রে, সারা ভারতবর্ষ জুড়ে বৈশালী, রাজগৃহ, কৌশাম্বী, মাহিষ্মতী, উজ্জয়িনী, শ্রাবস্তী প্রভৃতি বড়ো বড়ো শহর ধনরত্নে লোকজনে গমগম করছে, অথচ তাদের কথা তিনি আদৌ শোনেননি।

একটা কথা বলি আপনাকে। হেরোডোটাস কিন্তু প্রকৃত ঐতিহাসিক ছিলেন। যা-কিছু তিনি নিজে দেখেননি, তারা যে জনশ্রুতি সেটা অসংকোচে জানিয়ে দিয়ে গেছেন।’

চিত্তপ্রসাদ চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বললেন, ‘এবার আপনাদের বলছি সেই রাত্রে অনিরুদ্ধর মুখে শোনা হেরোডোটাসের কাহিনি। তিনি যা লিখেছেন তা এইরকম—

আমাদের পরিচিত পৃথিবীর বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী ভারতীয়রা পারস্য সম্রাট দারায়ুসকে, পাঁচ-শো একুশ থেকে চার-শো পঁচিশ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত, তিন-শো ষাট তালন্ত স্বর্ণচূর্ণ কর দিত। যে সমস্ত জাতি তাঁকে কর দিত— এটা ছিল তার ভেতরে সব চেয়ে বেশি।

ভারতীয়রা কীভাবে এই বিপুল পরিমাণ সোনার গুঁড়ো সংগ্রহ করে? এটা তো সবাই জানে যে এশিয়ার যত জাতি বাস করে; যাদের সম্পর্কে আমরা মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য খবরাখবর রাখি, তাদের মধ্যে সবচেয়ে পূবদিকে থাকে ভারতীয়রা। ভারতের পূর্বপ্রান্তে রয়েছে এক বিশাল মরুভূমি। সেখানে আর তার ওপারে আর কোনো জনবসতি নেই।

ভারতের উত্তর দিকে প্যাকট্যিকা রাজ্যের ক্যাসপাতাইরাস নামে একটি শহর আছে। এখানে যারা থাকে তাদের জীবনযাত্রাপ্রণালী অনেকটা মধ্য এশিয়ার ব্যাকট্রীয়দের মতো। এরা খুব শক্তিশালী আর লড়াকু। এরাই এদের রাজ্য সংলগ্ন মরুভূমি থেকে সোনার গুঁড়ো সংগ্রহ করে।

এই মরুভূমিতে একধরনের প্রকাণ্ড বড়ো পিঁপড়ে বাস করে। এগুলো শেয়ালের থেকেও অনেক বড়ো। এদের কয়েকটাকে ধরা গিয়েছিল। সেগুলো পারস্য সম্রাটের প্রাসাদে বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসেবে রাখা ছিল। এই পিঁপড়েগুলো মাটির অনেক নীচে গর্ত করে থাকে আমাদের দেশের পিঁপড়ের মতোই। এদের মতো একইভাবে গর্ত খোঁড়ার সময় তারা নীচের থেকে বালি তুলে এনে গর্তের মুখে বালির স্তূপ তৈরি করে। এই বালি সোনার গুঁড়োয় ভরতি। এর সন্ধানেই ভারতীয়রা মরুভূমির ভেতরে অভিযান চালায়।

প্রত্যেকটি অভিযাত্রী তিনটে উট পাশাপাশি বেঁধে নিয়ে যায়। সে মধ্যের উটটায় চড়ে আর অন্য দুটো থাকে দু-পাশে। মধ্যেরটাকে সদ্য বাচ্চা হওয়া উটনী আর অন্যদুটোকে পুরুষ উট হতে হয়। এইভাবে প্রস্তুত হয়ে অভিযাত্রীরা মরুভূমির ভেতরে চলে যায়। দিনে যখন সবচেয়ে গরম, সেইসময় তারা তাদের গন্তব্যস্থলে গিয়ে পৌঁছোয় কারণ তখন পিঁপড়েরা তাদের গর্তের গভীরে ঢুকে বসে থাকে রোদের তাপ থেকে বাঁচবার জন্য। এখানে সকাল বেলা সূর্যের তেজ সবচেয়ে বেশি। দুপুরের পর থেকে গরম কমতে থাকে আর সূর্যাস্তের পরে তো রীতিমতো শীত।

অভিযাত্রীরা তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছোনোর সঙ্গে সঙ্গে থলের মধ্যে সোনা মেশানো বালি ভরতে শুরু করে আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শেষ করে ঊর্ধ্বশ্বাসে পেছন ফিরে দৌড় লাগায়। কারণ, পিঁপড়েগুলো মানুষের গন্ধ পেলে তাড়া করে আসে। পারস্যের লোকেরা বলে যে পিঁপড়েগুলো এত জোরে দৌড়য় যে কোনো মানুষ বা জীবজন্তু তাদের সঙ্গে পেরে ওঠে না। কাজেই, অভিযাত্রীরা তাদের মাটির তলা থেকে উঠে বেরিয়ে আসার বেশ আগেই যদি পালিয়ে যেতে না-পারে, তাহলে তাদের আর বেঁচে বাড়ি ফেরা সম্ভব হয় না। পালাবার সময় পুরুষ উটগুলো, যারা একটু শ্লথগতি হয়, ক্রমে ক্রমে পিছিয়ে পড়ে পিঁপড়েগুলোর শিকারে পরিণত হয়ে যায়। আর, মা-উটেরা তাদের পেছনে রেখে আসা সদ্যোজাত বাচ্চাদের কথা ভেবে প্রাণপণে দৌড়ুতেই থাকে। পিঁপড়েগুলো তাদের আর ধরতে পারে না।

পারস্যের লোকেরা বলে যে ভারতীয়রা নাকি এইভাবেই তাদের বেশিরভাগ সোনা সংগ্রহ করে।’

হেরোডোটাসের কাহিনি শেষ করে অনিরুদ্ধ বলল, ‘আমি এতদিন ভাবতুম যে এই গল্প হয় ইরানি বণিকদের দেওয়া ঢপ নয়তো তাদের ভারতীয় গাঁজা খেয়ে বলা কল্পনা।’

আমি বললুম, ‘তুমি বলতে চাও ওই কালো স্রোতটা অতিকায় পিঁপড়ের পাল? আর তারা এই পাহাড়ের নীচে বাসা বেঁধে আছে? তুমি বললে যে এইরকম একটা সন্দেহ তুমি করেছিলে। তা, সে সন্দেহ তোমার হল কী করে?’

‘আমি এখানে এর আগে বেশ কয়েক বার এসেছি তা আপনাকে বলেছি। প্রত্যেকবারই থেকেছি এই গুহাটায়। এটার সন্ধান দিয়েছিলেন সিংজিই। যেভাবেই হোক, তার বিশ্বাস হয়েছিল যে তাঁর বা তাঁর গ্রামের লোকেদের কোনো ক্ষতি করবার উদ্দেশ্য আমার নেই। আর বলেছিলেন যে আমি যেন সারারাত গুহার মুখে আগুন জ্বেলে রাখি। প্রথমে ভেবেছিলুম বন্যজন্তুর হাত থেকে বাঁচবার জন্যে।’

‘পিঁপড়ে বুঝলে কী করে?’

‘প্রথম দিনেই গুহার ভেতরটা চেক করতে গিয়ে বেশ অনেকটা ভেতরে গিয়ে দেখি সেখানে দেওয়ালের একটা অংশে গোটা আষ্টেক গুহাচিত্র আঁকা। অনেকটা মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকার মতো। বেশিরভাগই যুদ্ধ বা শিকারের ছবি। শিকারের মধ্যে রয়েছে হরিণ, ঘোড়া বা গাধা-জাতীয় কোনো জন্তু। শুধু একটা ছবিতে আছে পিঁপড়ে। সেগুলো বিশাল। তাদের উচ্চতা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ওপরে। শিকারিরা তাদের সঙ্গে বর্ষা হাতে লড়াই করছে। একপাশে একটা শিকারি মরে পড়ে আছে।’

‘বলো কী? আমাকে দেখিও তো?’

‘হ্যাঁ। আজকেই দেখাব। আমি কিন্তু এই গুহাচিত্রগুলোকে বিশেষ পাত্তা দিইনি। ভেবেছিলুম, ওইগুলো সে যুগে প্রচলিত কোনো উপকথার ছবি। সেই উপকথাই হেরোডোটাস ইরানি ব্যবসায়ী মারফত শুনেছিলেন।’

‘তুমি তখনই হেরোডোটাসের নাম জানতে?’

‘অবশ্যই। আমি প্রাচীন ইতিহাসের ছাত্র। আমার তো জানারই কথা। তবুও, আমার কোনো খটকা লাগেনি যখন সিংজি আমাকে পিঁপড়ে মারার সবচেয়ে জোরালো ওষুধ জোগাড় করে এনে দিতে অনুরোধ করলেন। বললেন, পিঁপড়ে ধরে তাঁদের সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কয়েক বছর ধরে। সাধারণ অ্যান্টকিলারে না কি মরুভূমির এই পিঁপড়েগুলো মারা যায় না। তখন অবশ্য হেরোডোটাসের দানবিক পিঁপড়ের ওপরে আমার অশ্রদ্ধা এতই বেশি ছিল যে তাদের কথা আমার মনেই আসেনি। আমি সাধারণ পিঁপড়ের কথাই ভেবেছিলুম।’

‘তাই তুমি ট্যাকটিক্সের ড্রাম এনে দিলে? আর তাই এত পাঁচিলের ঘটা?’

‘হ্যাঁ। তবে, পাঁচিলটা কিন্তু বহু প্রাচীন। এর সাইক্লোপিয়ান কন্সট্রাকশন দেখলে বোঝা যায় যে এটা প্রায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের শেষদিকে তৈরি হয়েছিল। পরে কোনো সময়ে পরিত্যক্ত হয়। আর ট্যাকটিক্সের ড্রাম? সে এর আগেও এনে দিয়েছি। পাঁচিলের বাইরে চারদিকে এই ওষুধ লাগানো থাকে। আজ বুঝতে পারছি কেন গ্রামের লোক সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকে যায়। কারোর যদি ঢুকতে দেরি হয়ে যায়, তখন সে কেঁদে মরে গেলেও দরজা খোলা হয় না। একজনের জন্যে সমস্ত গ্রামটাকে তো বিপন্ন করা যায় না।’

আমি বললুম, ‘একটা সমস্যা হল, থরে তো অনেক গ্রাম আছে। তারা কেউ এই পিঁপড়েদের কথা জানে না কেন?’

‘আমার মনে হয়, তারা এদের কথা জানে, কিন্তু একেবারেই বিশ্বাস করে না। যেহেতু নাসারায় বাইরের লোককে রাত কাটাতে দেওয়া হয় না, তাই এই দুঃস্বপ্নের সঙ্গে তাদের কারোর মোলাকাত হয়নি। ইংরেজিতে বলে না যে চোখে দেখলে তবেই বিশ্বাস করা যায়? গত শতাব্দীতেই দেখুন না, কর্নেল ফসেট আমাজন অববাহিকায় অভিযান সেরে লন্ডনে ফিরে এসে রয়াল সোসাইটিতে বক্তৃতা দেবার সময় বললেন যে দক্ষিণ আমেরিকায় অ্যানাকন্ডা নামে একরকম অতিকায় সাপ আছে যেটা একটা ছোটোখাটো নদী যখন পার হয় তখন তার মাথাটা থাকে এক তীরে আর ন্যাজটা থাকে অন্য তীরে, তখন শ্রোতারা তাঁকে পচা ডিম ছুড়ে মেরেছিল। তবে, আজ যা দেখলুম তাতে আমার অনেকগুলো সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।’

‘যা বলেছো। আমরা দিল্লিতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতার কথা বললে সবাই আমাদের কোলে-কাঁখে করে পাগলাগারদে পৌঁছে দিয়ে আসবে। কিন্তু, তোমার কোন সমস্যার সমাধান হল?’

‘ধরুন, এক নম্বর, পিঁপড়েগুলো আছে। কিন্তু কিছুদিন আগেও ছিল না। দু-নম্বর, তারা সারদিন বালির নীচে ঘুমায় আর সারারাত মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ায় খাবারের সন্ধানে। তবে বোধ হয়, বেশিদূর যেতে পারে না ওদের গতরের জন্য। পোকামাকড়, সাপ, গিরগিটি, ছোটো ছোটো জন্তুজানোয়ার যা পায় তুলে নিয়ে আসে। আর, আজকে যা রসদ জোগাড় হল, তাতে তো অনেক দিন চলে যাবে বলে মনে হচ্ছে। তিন নম্বর, আমরা গাঁজাখুরি গল্প ভাবলেও, হেরোডোটাস এদের সম্বন্ধে যা বলে গেছেন, তা সর্বাংশে সত্যি না হলেও অনেকাংশেই সত্যি।’

আমি মাথা চুলকিয়ে বললুম, ‘কী করে বুঝলে সেটা যদি একটু বিশদভাবে বলো।’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘প্রথমত, নাসারা গ্রামের গোপন ব্যাবসা সম্প্রতি শুরু হয়েছে। পিঁপড়েরা যদি হেরোডোটাসের আমল থেকেই থাকত, তাহলে তাদের স্বর্ণভাণ্ডারের কথা শক, হুনদল, পাঠান, মোগল, ইংরেজ, আমাদের সরকার, কেউ-না-কেউ অনেক আগেই খবর পেয়ে যেত। তাই মনে হয় যে বর্তমান পিঁপড়েরা আগের পিঁপড়েদের বংশধর হলেও তাদের জন্ম হয়েছে সম্প্রতি। মাঝখানে একটা বিশাল সময়ের ব্যবধান রয়ে গেছে।’

আমি বললুম, ‘তা কী করে হয়? এ অসম্ভব।’

‘একেবারে অসম্ভব নয়। হতে পারে যে বহুবছর আগে এরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তার কারণ খুব সম্ভবত খাবারের অভাব। বিরাট শরীরের জন্য এরা বেশি দূর যেতে পারে না। কারণ সূর্য ওঠার আগেই ঘরে ফিরতেই হবে। নইলে রোদের তাপে মৃত্যু অবধারিত। কাজেই, ওদের খাবারের সন্ধান করবার সময় ছিল সীমাবদ্ধ। খাবার পাওয়ার ক্ষেত্রটাও ছিল তাই। সেই এলাকার জীবজন্তু পোকামাকড় যা ছিল তা হাজার বছরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। তাই অনাহারে মৃত্যু।’

‘এদের সৃষ্টি হয়েছিল কীভাবে?’

‘সেটা বলা আমার পক্ষে অসম্ভব নয়। চপলমতি প্রকৃতিদেবী কেন যে ডাইনোসর সৃষ্টি করলেন আবার তাদের কেন যে টিকটিকিতে পরিণত করলেন তার সন্ধান শুধু তিনিই জানেন।’

‘তোমার থিয়োরিটা একেবারে অযৌক্তিক নয়। দ্যাখো, এই মরুভূমির অন্যান্য গ্রামগুলো এদের অস্তিত্বের কথা জানে না। তার মানে এদের কর্মক্ষেত্র শুধু এই নাসারা গ্রামের আশেপাশে। এটা হতে পারে যে তোমার ওই গুহার বাসিন্দারা যখন চাষবাস করতে শিখল, তখন তারা নীচে নেমে গিয়ে নাসারার পত্তন করেছিল। তখনও এই পিঁপড়েরা নিশ্চয়ই টিকে ছিল, আর তাদের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে গ্রামের চারদিকে পাঁচিল তোলা হয়েছিল। কিন্তু, প্রশ্ন থাকে যে এত বছর বাদে এদের পুনরাবির্ভাব হল কোত্থেকে?’

অনিরুদ্ধ হাত নেড়ে বলল, ‘আকাশ থেকে পড়েনি, চিত্তদা। এদের পূর্বপুরুষ অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছে ঠিকই কিন্তু তাদের ডিমগুলো মাটির অনেক নীচে ঠান্ডায় ছিল বলে নষ্ট হয়ে যায়নি বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বরং, আমাদের রেফ্রিজারেশনে রাখা খাবারের মতো টাটকাই ছিল, ফসিল হয়ে যায়নি। যে প্রাকৃতিক অবস্থায় এদের সৃষ্টি হয়েছিল আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে, আজ হয়তো আমাদের অজ্ঞাতসারে আবার সেই পরিবেশ ফিরে এসেছে। অথবা, কয়েক বছর আগে এই মরুভূমির নীচে যে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, তার বিকিরণ সেই ডিমের মধ্যে সুপ্ত প্রাণকে জাগিয়ে তুলেছে।’

ঠান্ডা তখন বেশ বেড়ে গেছে। টুপি আর আগুনে বিশেষ লাভ কিছুই হচ্ছে না। পেটের ভেতর থেকে কাঁপুনি উঠে আসছে। বললুম, ‘আজ এই পর্যন্তই থাক। বড্ড ঠান্ডা। বাকিটা কাল। এখন শুয়ে পড়া যাক।’

অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমার দু-একটা কাজ আছে, সেটা সেরেই আমিও আসছি।’

আমি শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়লুম। অনিরুদ্ধ বোধ হয় সারারাত কাজ করল।

ঘুম যখন ভাঙল তখন বাইরে গনগন করছে রোদ। ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে অনিরুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘কাল রাত্রে কী কাজ করলে? হেডকোয়ার্টার্সে রিপোর্ট পাঠালে?’

অনিরুদ্ধ হাসতে হাসতে বলল, ‘ঠিক উলটো। রিপোর্ট একটা পাঠিয়েছি ঠিকই কিন্তু সেটা সত্যের চূড়ান্ত অপলাপ বলতে পারেন। বলেছি, সব ঠিক আছে। কোনো গণ্ডগোল নজরে পড়েনি। শত্রুপক্ষের কোনো হদিশ নেই। হয়তো আগামি কাল, মানে আজ, কিছু ঘটবে।’

‘ওরা কী বলল?’

‘ওরা যা বলল সেটা খুবই ইন্টারেস্টিং। হেডকোয়ার্টার্স বলল যে ওদের কাছে খবর এসেছে যে অন্যপক্ষের একটা আগাপাস্তলা সশস্ত্র দল একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের অধীনে ওয়াজিদাবাদের শহরতলির সেনাছাউনি থেকে কাল গভীর রাত্রে সীমান্ত পার হবার জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল। এটা যাতে কাকপক্ষীও টের না-পায় তার সবরকম ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাদের গতিমুখের অভিমুখ ছিল নাসারার দিকে। তাই, হেডকোয়ার্টার্স প্রতি মুহূর্তে আমার কাছ থেকে একটা খবর আশা করছিল। শেষপর্যন্ত যখন ওরাই আমাকে ডাকতে যাচ্ছে ঠিক তখনই আমার সঙ্গে ওদের যোগাযোগ হয়।’

আমি বললুম, ‘এখন কী হবে বলে তুমি মনে করো? এই যে এতগুলো সৈন্য ভোগে গেল, এখন ওরা কি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করবে?’

‘ছাই করবে। কিল খেয়ে কিল হজম করা কাকে বলে জানেন? ওরা তাই করবে। শান্তির সময়ে, কোথাও কিছু নেই, আমি প্রতিবেশীর সীমান্ত লঙ্ঘন করে একদল সৈন্য অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে চোরের মতো ঢুকিয়ে দিলুম, আর তারা যখন সেখানে বেপাত্তা হয়ে গেল, তখন হুংকার দিয়ে যুদ্ধঘোষণা করলুম— এ কখনো হয় নাকি? এখন কম্বলে মুখ ঢেকে নীরবে অশ্রুবিসর্জন করা ছাড়া আর কিস্সু করবার নেই।’

বলে অনিরুদ্ধ একটা বিরাট হাই তুলে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঢুকে গেল। বিড়বিড় করে বলল, ‘আপাতত সামনে দুটো কাজ—এক, সিংজির সঙ্গে মিটিং আর দুই, ভালো বাংলায় যাকে বলে ঘটনাস্থল সরেজমিনে তদন্ত করা।’

সারাদিন ঘুমল অনিরুদ্ধ। উঠল যখন বিকেল প্রায় শেষ হয়ে আসছে। ওর মুখ দেখে মনে হল, যেন একটা বোঝা ওর মনের থেকে নেমে গেছে।

সিংজির সঙ্গে আমাদের গোপন মিটিং শুরু হল পরের দিন বেলা এগারোটা নাগাদ। উভয়পক্ষকেই প্রতিজ্ঞা করতে হল যে সেখানে যা আলোচনা হবে তার কোনো কথা কেউ ঘূণাক্ষরেও বাইরে কোথাও কোনোভাবে প্রকাশ করবে না। সিংজি মন দিয়ে আমাদের কাছে পরশু রাতের সমস্ত ঘটনার বিবরণ শুনলেন। হ্যাঁ-না কোনো কথাই বললেন না।

অনিরুদ্ধ বিবরণ শেষ করে বলল, ‘পরশু রাতের ঘটনার পর আমাদের দু-জনের কাছে আপনারা যা করছেন তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। আপনি যা করছেন তার গুরুত্ব কি আপনি জানেন? আপনি নিজের দেশের সোনা শত্রু রাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এটা দেশদ্রোহিতা এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

সিংজি বলল, ‘আমি জানি, মিত্রা সাব, যে আমি যা করেছি তা আমাদের দেশের আইন মোতাবেক অপরাধ। কিন্তু আমার আর অন্য উপায় কিছু ছিল কী? বেশ ছিলুম আমরা। চাষবাস করে আমাদের খাওয়াটা জুটে যেত। কাছে পিঠে যে সব গ্রাম আছে যেমন ফুলিয়া, মেহারোঁ কী ধনি ইত্যাদি বা বাড়মের থেকে কাপড় এনে রং করে দিয়ে আর দুধ আর ছাগলের চামড়া বিক্রি করে আমাদের অন্যান্য খরচখরচা উঠে যেত। বছর তিনেক আগে কোত্থেকে এল এই হতচ্ছাড়া পিঁপড়ের দল, আমাদের সব ফসল খেয়ে ফেলল, দু-চারজন অসাবধানী লোক জঘন্যভাবে মারাও গেল। আমাদের গ্রাম থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল। অন্যান্য গ্রামগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ আর ব্যাবসাও বন্ধ। আমাদের না-খেয়ে ইঁদুরকলে ইঁদুরের মতো মরবার অবস্থা হল।’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘আপনারা শহরে পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন?’

সিংজি বললেন, ‘দিইনি আবার? কেউ আমাদের কথা বিশ্বাস করেনি। ঘোড়ার মতো বড়ো পিঁপড়ে? পাগল না কি? না আমাদের উল্লু বানাতে এসেছ? এক্ষুনি দফা হয়ে যাও নইলে জেলে ভরে দেব। পালিয়ে আসবার পথ আর পাই না। এমনকী, আমরা আমাদের এমএলএ-র সঙ্গেও দেখা করতে গিয়েছি। আমরা গাঁওয়ার বলে আমাদের দপ্তরের ভেতরে ঢুকতেই দেয়নি। তাই আমরা আর ভোট দেব না বলে ঠিক করেছি। আসুক সে ব্যাটা আমাদের কাছে। এবারে মজা টের পাবে।’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘ঠিক আছে, ও কথা পরে হবে। এবারে বলুন সোনা পেলেন কী করে?’

সিংজি বললেন, ‘আজ থেকে আড়াই বছর আগে একদিন দুপুরের একটু পরে আমি পিঁপড়েগুলো কোথায় যায় তার খোঁজে ওই পাহাড়টার ওপাশে গিয়েছিলুম। ওদিকে পাহাড়ের তলায় কতগুলো বড়ো বড়ো ফাটল আছে। আমরা জানি যে সেই ফাটলগুলোর ভেতরে বেশিদূর যাওয়া যায় না। কারণ, ভেতরটা ভয়ানক অন্ধকার আর গুমোট। দম বন্ধ হয়ে আসে। হঠাৎ সূর্যের আলোয় দেখলুম, একটা ফাটলের দু-পাশে বালির ভেতরে কী যেন ঝিকমিক করছে। অথচ, অন্য ফাটলগুলোর পাশের বালিতে সেরকম কিছু নেই। আমি সেই বালি একমুঠো তুলে হাতের তেলোর ওপরে রেখে পরীক্ষা করে দেখলুম বালির ভেতরে মিশে আছে সোনার গুঁড়ো। সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথার ওপরে যেন হাজারটা বাজ ভেঙে পড়ল। আমি কোনোরকমে টলতে টলতে বাড়ি ফিরে এলুম।’

আমি বললুম, ‘সে কী? সোনা পেয়েছেন, সে তো সৌভাগ্যের কথা। বাজ ভেঙে পড়বে কেন?’

সিংজি বেশ কিছুক্ষণ মাথা নেড়ে বললেন, ‘না, রায়বাবু না। ভেবে দেখেছেন, সোনা পাওয়া আর সেটা সরকারি দপ্তরকে জানানো মানে কি ? আমার কর্তব্যবোধ আর দেশপ্রেমের ফলে সেই সোনার জন্যে এখানে সরকারি অফিসাররা আর তাদের লোকজন তো আসবেই; সেইসঙ্গে আসবে কনট্রাক্টরের লোকজন। তাদের বেশিরভাগই সন্দেহজনক চরিত্রের লোক। তারা আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়বেই। আমাদের এই ছোট্ট সুন্দর গ্রামটা বরবাদ হয়ে যাবে। মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে যাবে, ছেলেগুলোকে ক্রিমিনাল বানাবে। আমি চোখের সামনে সেই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব, কিচ্ছু করতে পারব না। আমাদের দেশপ্রেমের কথা তখন আর কেউ মনে রাখবে না।’

আমরা দু-জনেই চুপ করে রইলুম। কোনো কথা বলতে পারলুম না।

সিংজি বলে চললেন, ‘তার ওপরে এই পিঁপড়ের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাবে। তখন পকেটভরতি টাকা নিয়ে ভিনদেশি লোকেরা দলে দলে আসতে থাকবে। তখন নাসারায় আমাদের স্থান আর থাকবে না। আমাদের সরকারই আমাদের এখান থেকে রিফিউজি ক্যাম্প, সেখান থেকে কোনো শহরের নরককুণ্ডে আশ্রয় নিতে বাধ্য করবে। আপনাদের শহুরে সভ্যতার চাপে ওই পিঁপড়েগুলোর সঙ্গে আমাদেরও নিঃশেষ হয়ে যেতে হবে।’

একটু চুপ করে থেকে সিংজি আবার বললেন, ‘মিত্রা সাব, আমার মনে হল যে এটা আমাদের ভবিতব্য হতে পারে না। আমি আমার সততার নামে এতগুলো নারী-পুরুষকে একটা ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারি না। তাই আমি এমন একটা কাজ করলুম যা আমার দেশের আইন শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে করে।’

অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা করল, ‘আর কোনো রাস্তা পেলেন না?’

‘না, মিত্রা সাব। অনেক ভেবেছি কিন্তু পাইনি। আমাদের তখন চাল, ডাল, তেল, নুন সবই ফুরিয়ে আসছে। হাতে আছে সোনা। টাকা নেই। সোনা খেয়ে তো আর বাঁচা যায় না। সেটা বেচতে হবে আর তার বিনিময়ে টাকা নিয়ে তাই দিয়ে জিনিসপত্র কিনতে হবে। বাড়মের বা জয়শলমিরে সোনা বেচতে গেলে সেটা জানাজানি হবেই। অমনি শকুনির পাল আমাদের গ্রামে এসে নামবে। বর্ডারের ওপারের ফড়েদের কাছে বেচতে গেলেও সেই একই অবস্থা। কাল রাত্রের ঘটনাটাই তার প্রমাণ। তা ছাড়া, ওপারের টাকা আমাদের কোনো কাজেই লাগবে না। কাজেই, অনেক ভেবে যে রাস্তা বেরোল, আমার মনে হল সেটা ন্যায় বা অন্যায় যাই হোক না কেন, সেই পথে চললেই আমরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারব। এটাও মনে রাখা দরকার যে এই ব্যাবসা আর মাত্র কয়েক মাস চলবে, তার পরেই বন্ধ হয়ে যাবে। ততদিনে আমরা আবার আমাদের চাষ-আবাদ আর অন্যান্য কাজ শুরু করে দিতে পারব।’

আমি বললুম, ‘তার মানে? পিঁপড়েগুলো কোথায় যাবে?’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘মরে যাবে। সিংজি ঠিকই ধরেছেন।’

সিংজি বললেন, ‘ হ্যাঁ, আমি লক্ষ করছি যে পিঁপড়েদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। যেভাবে কমছে, তাতে এদের কয়েক মাস বাদে আর দেখা যাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু আপনি বুঝলেন কী করে?’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘আপনি জানেন কি না জানি না, পিঁপড়েদের যে দল মাটির তলায় শহর বানিয়ে থাকে তাদের মধ্যে কয়েকটি শ্রেণিবিভাগ থাকে। প্রথম হল রানি পিঁপড়ে। সে কেবল অসংখ্য ডিম পেড়ে যায়, নড়াচড়া করে না। দ্বিতীয় হল পুরুষ পিঁপড়ে। তারা সেই ডিমগুলো ফার্টিলাইজ করে বা প্রাণ সঞ্চার করে। সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এই পুরুষ পিঁপড়েরা কোনো কাজ করে না, খায়দায় আর ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। আর তৃতীয় হল শ্রমিক পিঁপড়ে। এরাও স্ত্রীজাতীয়। এরাই পুরো দলটার খাবার সংগ্রহ করে ও যাবতীয় শ্রমসাধ্য কাজ করে। আমার মনে হয়, যে প্রাকৃতিক কারণে বা পারমাণবিক বিকিরণে একটা বিপুল পরিমাণে ডিম ফার্টিলাইজড হয়ে এই দলটার সৃষ্টি হয়েছে তবে তার মধ্যে কোনো পুরুষ পিঁপড়ে নেই।’

আমি বললুম, ‘সেটা বুঝছো কী করে?’

‘পুরুষ পিঁপড়ের ডিম ফার্টিলাইজ করবার আগে ডানা গজায়। তখন তারা গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে বেশ কিছুটা উড়ে টুড়ে ফিরে এসে কাজ শুরু করে। আমাদের বাড়ির বাগানের পুরুষ পিঁপড়েরা এই ওড়ার সময় বেশিরভাগই পাখির পেটে ভবলীলা সাঙ্গ করে। গুটিকয় ফিরে আসে। তা না-হলে হয়তো সারা পৃথিবী পিঁপড়েয় ছেয়ে যেত। এই দানবিক পিঁপড়েদের খাওয়ার মতো ঈগল বা কগুরের মতো পাখি এই মরুভূমিতে নেই। সেক্ষেত্রে এই উড়ন্ত পিঁপড়েদের কথা শুধু নাসারা নয়, আশেপাশের গ্রামগুলোও জানতে পেত। সেরকম কোনো রিপোর্ট কিন্তু আমাদের কাছে নেই। কাজেই, এই সমস্ত দলটা যে আর কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে সেটা ধরেই নেওয়া যেতে পারে।’

‘তোমার ব্যাপারটা কী বলোতো? তোমার প্রাচীন ইতিহাসের সিলেবাসে কি পিঁপড়েদের জীবনযাপনপ্রণালীও আছে না কি?’

অনিরুদ্ধ সহাস্যে বলল, ‘স্কুলে ক্লাস সেভেনে বিজ্ঞানের বইয়ে পড়েছিলুম। সে যাক গে। এ ছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে। স্বাভাবিক বাগানের পিঁপড়ে বেশিদিন বাঁচে না। শ্রমিক পিঁপড়ের জীবন এক সপ্তাহের বেশি নয়। এই অতিকায় পিঁপড়েরা, ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, তাদের ছোটো আত্মীয়ের চেয়ে অনেক বেশিদিন বাঁচে। তা হলেও কত আর বেশি হতে পারে? এক বা দু-বছর। কিন্তু এক্ষেত্রে ছোটো আত্মীয়দের মতো নতুন বাচ্চারা এই পিঁপড়ের মৃত শ্রমিক বা পুরুষদের স্থান পূরণ করে না। ফলে, রানি যদি নতুন ডিম পেড়েও যায়, তাতেও লাভ কিছু হয় না। তাই মনে হয়, এরা আর বেশিদিন নেই।’

সিংজি প্রবলবেগে ওপরে-নীচে মাথা নেড়ে বললেন, ‘আপনি একেবারে ঠিক বলেছেন।’

আমি খুব বিনীতভাবে বললুম, ‘সিংজি, আপনার প্ল্যানটা ঠিক কী ছিল সেটা যদি একটু বলেন।’

সিংজি বললেন, ‘সেটা আজ আপনাদের বলতে আমার আর কোনো দ্বিধা নেই। আমি যা স্থির করেছিলুম তা হল এইরকম।— ওয়াজিদাবাদে আমার এক পিসতুতো ভাই থাকে। আমার এক পিসেমশাই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তাই তাঁর বাবা তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। সে অনেক দিন আগের কথা। তিনি তখন পিসিমাকে নিয়ে ওয়াজিদাবাদে চলে যান। কিন্তু তিনি খুব ভালো লোক ছিলেন আর আমাদের ভাইবোনেদের খুব স্নেহ করতেন। তাই, বাবার অজান্তে, তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। দেশভাগের পরেও। তার ছোটোছেলে আক্রাম বখে গিয়েছিল। সে পরে স্মাগলার হয়ে যায়। আর হবে না-ই বা কেন? ওয়াজিদাবাদ অনেক দিনই স্মাগলারদের আড্ডা। আমি আক্রামের সঙ্গে যোগাযোগ করলুম।’

অনিরুদ্ধ প্রশ্ন করল, ‘এই আক্রাম ছেলেটিকে আপনি বিশ্বাস করলেন?’

‘হ্যাঁ, করলুম। সে সকলের চোখে বখে যাওয়া খারাপ ছেলে; কিন্তু আমি জানি সে আমাকে খুব শ্রদ্ধা করে ও ভালোবাসে। সে মরে গেলেও এমন কাজ করবে না যাতে আমার বা আমার ছেলেমেয়েদের কোনো ক্ষতি হয়। তার সঙ্গে আমার কথা হল যে আমি যখন তাকে খবর দেব সে বর্ডার ডিঙিয়ে চলে আসবে। আমি তাকে এক থলে সোনার গুঁড়ো দেব। সে তখন তার সমান দামের শস্যদানা, আনাজ, কাপড়চোপড় ইত্যাদি এনে দেবে। কোনো টাকাপয়সার লেনদেন হবে না। আজ পর্যন্ত আমি তাকে পাঁচ থলে সোনার গুঁড়ো দিয়েছি এবং সে তার উপযুক্ত দামে যা আমাদের প্রয়োজন তা এনে দিয়েছে। তবে একটা শর্ত ছিল। সোনার গুঁড়ো কোথা থেকে আসে সেটা সে কখনো জানতে চাইবে না।’

আমি বললুম, ‘পরশু রাত্রে যা ঘটল, তার পরে আক্রামকে আর পাবেন বলে তো মনে হয় না। তাহলে, আপনাদের এই লেনদেন আর চলবে কী?’

সিংজি আবার মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘না চলবে না। এমনিতেও শেষ হয়ে যেত। সোনার গুঁড়ো মেশানো বালির স্তূপ প্রায় শেষ হবার মুখে। পিঁপড়ের তো এখন জায়গার অভাব নেই। কাজেই ওদের গর্তটাকে বাড়াবারও কোনো প্রয়োজন নেই।’

‘এখন আপনারা কী করবেন?’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘ক্ষেত্রে কর্ম বিধিয়তে। বাংলায় যাকে বলে অকুস্থল সেটা দেখে এসে স্থির করা যাবে। সিংজি, আপনিও আমাদের সঙ্গে চলুন।’

আমাদের রওনা হতে হতে প্রায় সাড়ে বারোটা বাজল। ‘অনিরুদ্ধর অকুস্থলে’ পৌঁছোতে মিনিট পাঁচেক লাগল।

আমরা দেখলুম জিপ আর লরিদুটো কিছুটা কাত হয়ে বালির মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের ছাউনিগুলোর চিহ্নমাত্র নেই। সৈন্যদের ইউনিফর্মও নেই। বোঝা গেল থর মরুভূমির প্রবল ঝোড়ো হাওয়ায় সেগুলো বর্ডারের দিকে উড়ে চলে গেছে। গাড়িগুলোর চারপাশে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে একগাদা অস্ত্রশস্ত্র। তাদের মধ্যে স্বয়ংস্ক্রিয় পিস্তল আর অ্যাসল্ট রাইফেল তো আছেই, তা ছাড়াও আছে হালকা আর ভারী মেশিনগান, ডিনামাইটের স্টিক, হ্যান্ড গ্রেনেড আর ফ্লেম থ্রোয়ার। অথচ জুতো, বেল্ট— এসবও নেই। সেগুলোরও বোধ হয় খাদ্য হিসেবে সদব্যবহার হয়ে গেছে।

অনিরুদ্ধ পর্যবেক্ষণ শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত হাসি হাসল। সে হাসিতে আনন্দের চিহ্নমাত্র ছিল না, ছিল নির্ভেজাল ঘৃণা। বলল, ‘এরা… এরা এইসব নিয়ে কতগুলো নিরস্ত্র অসহায় গ্রামবাসীর মোকাবিলা করতে এসেছিল? আপনি ঠিকই বলেছিলেন চিত্তদা, গ্রামবাসীদের বাঁচানোর সময় আমরা পেতুম না। ঠিক সময়ে পিপীলিকা-বাহিনী যদি এসে না পড়ত তাহলে যে কী হত তা আমি ভাবতে পারছি না। এরা গ্রামের লোকেদের সঙ্গে কথা বলতে আসছিল না। ওদের উদ্দেশ্য ছিল, সবার আগে শিশুছেলেবুড়ো সবাইকে গুলি করে মেরে সমস্ত গ্রাম খুঁড়ে আর পাহাড় ফাটিয়ে সোনা নিয়ে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী পৌঁছোনোর আগেই বর্ডারের ওপারে চলে যাওয়া।’

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ‘তুমি এখন কী করবে?’

অনিরুদ্ধ পকেট থেকে একটা ছোটো ক্যামেরা বের করে সমস্ত দৃশ্যটার ছবি তুলতে তুলতে বলল, ‘আমি যা ঘটেছে তার পূর্ণবিবরণ আমার অফিসকে দেব। শুধু কয়েকটা জিনিস ছাড়া। এক পিঁপড়ে। আমি এদের বিন্দুবিসর্গও জানি না। দুই, পিঁপড়ে না থাকলে সোনাও নেই। তিন, ব্যাবসা। আমরা যতদূর জেনেছি তা হল, ব্যাবসা-ট্যাবসা কিছু নয়; সিংজির পিসতুতো ভাই আক্রাম মাঝে মাঝে তার দাদার সঙ্গে দেখা করতে আসত। তার প্রধান কারণ সে তার ভাবির হাতের পায়েস খেতে ভীষণ ভালোবাসত।’

সিংজি হাসতে হাসতে বললেন, ‘একদম ঠিকঠাক।’

আমরা দু-জন চমকে উঠে বললুম, ‘একী! আপনি বাংলা বোঝেন না কি?’

সিংজি পূর্ববৎ হাসতে হাসতে হিন্দিতেই বললেন, ‘নিশ্চয়ই। আমি যৌবনে কলকাতায় পনেরো বছর শ্যামবাজারে ড্রাইভারি করেছি।’

আমি বললুম, ‘তা বেশ করেছেন। এখন তোমার রিপোর্টের ফাইনাল বক্তব্য কী হবে, অনিরুদ্ধ?’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘আমার রিপোর্টের বক্তব্য হবে যে, যেমন আমরা আক্রামের গোপনে বর্ডার পেরিয়ে আনাগোনা লক্ষ করছিলুম, পাকিস্তানি আর্মিও তেমনি করছিল। তারা আক্রামকে গ্রেপ্তার করে তাকে জেরা করে। কিন্তু তারা তার কথা বিশ্বাস তো করেইনি উলটে গভীরতর কোনো ষড়যন্ত্র সন্দেহ করেছিল। তার কী হয়েছে তা আমরা জানি না। আর এই ছবিগুলো প্রমাণ করবে যে পাকিস্তানি আর্মির একটি দল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাতের অন্ধকারে বর্ডার পার হয়ে নাসারার দিকে আসছিল। তারা খুব সম্ভবত সন্দেহ করেছিল যে পাথরের পাঁচিল ঘেরা দুর্গের মতো নাসারার ভেতর থেকে তাদের ওপরে হামলা হবে। কিন্তু নাসারার কাছে আসতেই তাদের কাছে এমন কোনো খবর আসে যা শুনে তৎক্ষণাৎ অপারেশন বন্ধ করে ভারী অস্ত্রশস্ত্র আর গাড়ি ফেলে রেখে পত্রপাঠ তারা গা ঢাকা দেয়। তারা পাকিস্তানে ফিরে যেতেও পারে নাও পারে।’

আমি বললুম, ‘তোমার ওপরওয়ালারা এটা খাবে? কী এমন খবর হতে পারে যাতে সব ফেলে গা ঢাকা দিতে হবে?’

অনিরুদ্ধ বলল, ‘খাবে চিত্তদা। এখন পাকিস্তানের ভেতরের অবস্থা যে কী তা তো আপনি জানেন। সদ্য বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে। পাকিস্তান খণ্ডিত হয়ে গেছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা টালমাটাল। ষাট হাজার যুদ্ধবন্দি দেশে ফেরেনি। প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো আর সেনাপ্রধান জিয়াউল হকের ঝগড়া তুঙ্গে। এই সময়ে যদি কোনো অত্যন্ত বিপদজনক খবর আর্মির কাছে আসে তাতে আশ্চর্য হবার কী আছে? আমি লিখব যে সীমান্ত লঙ্ঘন করে যে সমস্ত সৈন্য ভেতরে ঢুকেছিল, তারা সম্ভবত ফিরে যায়নি, থরের ভেতরেই কোনো গ্রামে লুকিয়ে আছে। এবার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কাজ তাদের খুঁজে বের করা।’

এরপর আমরা মোটামুটি নির্বিঘ্নেই দিল্লি ফিরে আসি।

গল্প শেষ করে চিত্তপ্রসাদ বললেন, ‘এই অভিজ্ঞতার পর থেকে আমি এটা বিশ্বাস করি যে প্রাচীন লেখকরা যা লিখে গেছেন তার মধ্যে যা আমাদের অবিশ্বাস্য বা অসম্ভব বা স্রেফ গাঁজাখুরি বলে মনে হয় সেসব তা নাও হতে পারে। মিথ রূপকথা নয়। মিথের উৎস সবসময়ে যে অবাস্তব কল্পনা, তা নয়। প্রায় সবক্ষেত্রেই তা বাস্তব অভিজ্ঞতা।’

বলে ছাতায় ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন চিত্তপ্রসাদ। দাবার টেবিলের দিকে যেতে যেতে বললেন, ‘ব্যাস, আজ এই পর্যন্ত।’

শ্রোতারা সমস্বরে হাহাকার করে উঠল, ‘আরে, আরে করেন কী? এইপর্যন্ত বললেই হল? আপনার গল্পের শেষটা বলবেন তো?’

চিত্তপ্রসাদ বললেন, ‘এই তো শেষ। আপনারা পুরোনো কথা বিশ্বাস করেন না। সেটা যে ঠিক নয়— সেটাই তো বললুম আপনাদের।’

অর্ণব হাত-পা ছুড়ে বলল, ‘দুত্তোর পুরোনো কথা! মেজর মিত্রের কী হল সেটা বলবেন তো? মানে, কল্যাণীর সঙ্গে বিয়েটা হল কি না সেটা না জানলে তো দিনের খাওয়া রাতের ঘুম সব মাটি।’

ছাতায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বললেন চিত্তপ্রসাদ, ‘ও এই ব্যাপার। সেটা তেমন বিশেষ কিছু নয়। দিল্লি ফিরেই আমি কলকাতায় চলে আসি। রামপুরহাট কলেজের প্রিন্সিপাল ড. মহাদেব চট্টোপাধ্যায় আমার বাল্যবন্ধু, আমার গ্রামের ছেলে। একটা ছুতো বানিয়ে তার কাছে চলে গেলুম। থর অভিযানের অংশটুকু বাদ দিয়ে কথায় কথায় তাকে অনিরুদ্ধ আর কল্যাণীর ব্যাপারটা বললুম। মহাদেব আবার কবি, ছদ্মনামে নানা পত্রিকায় কবিতা লিখত। সে তো এই কাহিনি শুনে অত্যন্ত পুলকিত। বলল, পরের দিনই কলেজে গিয়ে চেম্বারে কল্যাণীকে ডেকে পাঠিয়ে তার সঙ্গে কথা বলবে।’

সবাই আবার সমস্বরে প্রশ্ন করল, ‘তারপরে?’

চিত্তপ্রসাদ বললেন, ‘তারপরের ঘটনা যদি জানতে চান, তাহলে আপনাদের একটা টেলিফোন নম্বর দিচ্ছি, সেখানে ফোন করুন। সেটা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অধুনা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অনিরুদ্ধ মিত্রের বাড়ির ফোন। সেখানে দিল্লির একটি মহিলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ড. কল্যাণী মিত্রকে চাইবেন। তাঁর কাছেই সব খবর পাবেন।’

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments