Monday, March 4, 2024
Homeউপন্যাসইন্দুবালা ভাতের হোটেল - কল্লোল লাহিড়ী

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল – কল্লোল লাহিড়ী

কুমড়ো ফুলের বড়া

জানালার কাছে বসন্তের নরম রোদে সার দিয়ে সাজানো আছে কাঁচের বড় বড় বয়াম। মুখগুলো ঢাকা আছে পরিষ্কার সাদা কাপড়ের ফেট্টিতে। বয়ামগুলোকে বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না তার মধ্যে কী রসদ লুকিয়ে আছে। কিন্তু যারা এই বাড়িতে রোজ ভাত খেতে আসে তারা ঠিক জানে। ভাতের পাতে লেবু, নুন, লঙ্কা দেওয়ার পাশাপাশি উড়ে বামুন ধনঞ্জয় একটু করে শালপাতায় ছুঁয়ে দিয়ে যায় বয়ামের সেই লুকোনো সম্পদ। কামরাঙা, কতবেল, জলপাই কিংবা কোনোদিন পাকা তেঁতুলের আচার। নতুন কাস্টমাররা অবাক হয়ে যায়। আর পুরোনো লোকেরা ভাবে আজ কোনটা পাতে আসবে? শুধু আচারের টানেই না, এই হোটেলে ভিড় লেগে থাকে পুব বাংলার এক বিধবা মহিলার হাতের রান্না খেতে। ইন্দুবালা কবে যে এই ভাতের হোটেল শুরু করেছিলেন আর কেন করেছিলেন নিজেও ঠিক মনে করতে পারেন না। তবু ভাসা ভাসা ছবির মতো মনে পড়ে অনেক কিছু। শুধু সেবার যখন কোলের এক মেয়ে আর ছোট্ট দুই ছেলেকে নিয়ে বিধবা হলেন, সেদিন থেকে বুঝতে শুরু করেছিলেন যারা এতদিন ঘিরে রাখতো তাঁদের, যারা সুযোগ সুবিধা ঠিক মতো আদায় করে নিয়ে যেত, তারাই এখন ছায়ার মতো সরে যাচ্ছে। স্বামীর জুয়া আর মদের নেশায় এতদিন যারা আট-কপাটি পর্যন্ত বিক্রি করায় সায় দিয়েছিলো তাদেরও আর দেখা গেল না বড় একটা। বরং সবাই কেমন যেন হারিয়ে গেল চারপাশ থেকে। বলা যায় ছেড়ে চলে গেল।

তখনও খুলনা থেকে মাঝে মাঝে ভাই এসে খোঁজ খবর নিয়ে যেত ইন্দুবালার। মা পোঁটলা করে পাঠাতো ভাজা চিড়ে, মুড়ি, বাড়ির সজনের ডাটা, চুইঝাল। তারপর সেটাও বন্ধ হলো। যুদ্ধ বাধলো। বাড়ির অনেক দিন কোনো খোঁজ পেলেন না। একদিন সকাল বেলায় গাঁয়ের থেকে পালিয়ে আসা এক পাগলাটে লোকের কথায় জানতে পারলেন পুড়িয়ে দিয়েছে সব কিছু পাকিস্তানি মিলিটারি খান সেনারা। ভাই বাড়ির লোকজন আর কেউ বেঁচে নেই। এমনকি ভিটেটাও না। বাড়ির সামনের রাস্তাটায় বসে যুদ্ধের বীভৎসতার তাপ পোয়ানো লোকটা বিড়বিড় করে বকছিল। আর ইন্দুবালা তাঁর সমস্ত সত্তা নিয়ে মন দিয়ে শুনছিলেন কয়েকটা প্রিয় মানুষের তাঁর চারপাশ থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়ার গল্প। ইন্দুবালা একা হয়ে পড়ছিলেন। বড় একা। একটা শহরে তিন ছেলে-মেয়ে আর পুরোনো বাড়িতে নিজের শরীরের সমস্ত যৌবন নিয়ে এক্কেবারে একা। না ইন্দুবালা কাঁদেননি। কাঁদার মতো সময় তাঁর ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি ছিল না। ভেতর থেকে কেমন যেন শুকনো হয়ে গিয়েছিল সব কিছু। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা যেদিন উড়লো সে দেশের মাটিতে, এদেশে ইন্দুবালা ছেনু মিত্তির লেনের নীচের ঘর ঝাঁট দিয়ে উনুন ধরালেন। ভাঁড়ারে চাল ছিল বাড়ন্ত। ছেলেমেয়েগুলো খিদের জ্বালায় তারস্বরে কাঁদছিল। পাওনাদারের দল দাঁড়িয়েছিল রাস্তায়। লছমী মাছওয়ালী শেষ বাজারে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিল। আর থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল নোনা ধরে ক্ষয়ে যাওয়া দোতলা বাড়িটার সামনে। লছমী দেখেছিল একটা বছর পঁচিশের মেয়ে সদ্য বিধবার সাদা ধবধবে শাড়িতে এলোচুলে চুপ করে বসে আছে ধরে ওঠা উনুনটার সামনে। উনুনে গুলের আঁচে ফর্সা মেয়েটার মুখ লাল হয়ে আছে। ওদিকে দূরে দাঁড়িয়ে আছে চিল শকুনের মতো পাওনাদাররা। লছমীর যেন কী একটা মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তে। এই বাড়িতে মাছ বিক্রি করেছে সে বহুদিন। এই বাড়ির নুন খেয়েছে সে। একটুও সময় নষ্ট করেনি লছমী। সোজা এসে দাঁড়িয়েছিল ইন্দুবালার সামনে। গ্যাঁট থেকে দু টাকা বার করে মেঝের ওপর রেখে দিয়ে বলেছিল, “আজ তোমার বাড়িতে দুটো ভাত মুখে দেব মাজি। কছু মনে করো না। বারোটা পঁচিশের ক্যানিং লোকাল ছুঁড়ে গেল যে। এখন দুটো পেটে না পড়লে বাড়ি ফিরতে সাঁঝ হয়ে যাবে। আর শলীল চলবে না মাজি”।

ইন্দুবালা হ্যাঁ না কিছু বলেননি। তাঁদের খুলনার বাড়িতে অতিথিরা কোনোদিন ভাত না খেয়ে যায়নি। আজও তিনি লছমীকে ফেরত পাঠাতে পারলেন না। বলতে পারলেন না তাঁর ভাঁড়ারে ফোঁটাবার মতো চালটুকু নেই। লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে এক আনাও নেই যা দিয়ে তিনি তাঁর দোরে আসা লছমীকে মুড়ি কিনে খাওয়াতে পারেন। সাত-পাঁচ না ভেবে একটু কুণ্ঠা নিয়েই ইন্দুবালা লছমীর দেওয়া টাকাটা আঁচলে বাঁধলেন। উনুনে চাপালেন এক হাঁড়ি জল। ছোটো মেয়েকে দোতলার ঘরে ঘুম পাড়িয়ে এসে বড় ছেলে প্রদীপকে পাঠালেন সামনের মুদিখানার দোকানে। খিড়কির দরজা খুলে নিজে বাড়ির পেছনের বাগান থেকে নিয়ে এলেন সবে কচি পাতা আসা কুমড়ো শাক। গাছের পাকা লঙ্কা। শাশুড়ির আমলের পুরোনো ভারী শিলটা পাতলেন অনেক দিন পরে। যত্ন করে ধুয়ে সেই কবেকার প্রাচীন হিমশীতল পাথরটার ওপর রাখলেন সর্ষে দানা। শিল আর নোড়ার আদিম ঘর্ষণে খুলনা থেকে পাঠানো মায়ের শেষ সর্ষেটুকু বেটে ফেললেন ইন্দুবালা অল্পক্ষণের মধ্যেই। লোহার কড়াইতে জল মরতে থাকা সবুজ ঘন কুমড়োশাকের ওপর আঁজলা করে ছড়িয়ে দিলেন সর্ষের মণ্ড। কয়লার আঁচে টগবগ আওয়াজে ফুটতে থাকলো কচি শাকগুলো। তার নরম পাতাগুলো। সাঁতলানোর ঝাঁঝ ছড়িয়ে পড়লো গোটা বাড়িতে। দোতলার ঘরে খুকি চোখ মেলে হাত পা নেড়ে খেলতে থাকলো। ছোটো দুই ছেলে গরম ভাত খাওয়ার বাসনায় থালা নিয়ে এসে বসে পড়লো রান্নাঘরের দরজায়। তখনও লাল লঙ্কা গুলোর গা থেকে ঝাল মিশছে কুমড়ো শাকের হালকা সবুজ মাখো মাখো সর্ষে ঝোলে।

রান্নার পাট শেষ হলে ইন্দুবালা ওপরের ঘরের তাক থেকে পাড়লেন গতবারের তেঁতুলের আচার। আসন পেতে লছমীকে যত্ন করে খাওয়ালেন। ফেরার সময় বাকি পয়সা ফেরত দিতে গেলে লছমী বললো, “এ কীরম বাত হলো মাজি? কাল যে আবার খাবো। হর রোজ পয়সা দেব না কি তোমায়? ওটা তুমি রেখে দাও”। লছমী সেই যে গেল পরের দিন ফিরে এলো আরও তিন জনকে সঙ্গে নিয়ে। এইভাবে আস্তে আস্তে বাজারের সবাই এসে খাওয়া শুরু করলো ইন্দুবালার নীচের ঘরে। একদিন উড়িষ্যা থেকে এলো ধনঞ্জয়। কেউ তাকে ডাকেনি। কেউ কথা বলেনি। দরজার কাছে শুধু ভাত খাওয়ার জন্য বসেছিল বেচারা। বড় মায়া হয়েছিল তাকে দেখে ইন্দুবালার। ওই বয়সের একটা ভাই ছিল যে তার। যুদ্ধের সময় খান সেনারা জ্বালিয়ে দিয়েছে নাকি তাকে। আর একটুও মনে করতে চাননি সেসব কথা। অনেকটা ভাত আর ডাল দিলে চেটে পুটে খেয়ে নিয়েছিল সবটা ধনঞ্জয়। ছেলেদের খাইয়ে, মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে রান্নাঘর পরিষ্কার করতে এসে ইন্দুবালা দেখেছিলেন সব কিছু সাফসুতরো। থালা বাটি বোয়া। এমনকি মাটির উনুনটা পর্যন্ত সুন্দর করে ল্যাপা। সেই থেকে ইন্দুবালার সংসারে থেকে গেল উড়িষ্যার কোন এক খরাপীড়িত অজ গাঁয়ের ধনঞ্জয়। সিঁড়ির নীচটা সাজিয়ে নিল তার নিজের মতো করে। সেখানেই থাকতে শুরু করলো সে। একদিন হঠাৎ রান্নার গন্ধে চলে এলেন সামনের কালেক্টর অফিসের বড়বাবু। ইন্দুবালার হাতের রান্না খেয়ে তাঁর কবেকার মরে যাওয়া মায়ের কথা মনে পড়লো। নিদান দিলেন তাঁর অফিসের সবাই এখানে খেতে আসবে। শুধু তাই নয় নিজে থেকে খুশি হয়ে একটা হলুদ রঙের এনামেল বোর্ড টাঙিয়ে দিয়ে গেলেন ইন্দুবালার বাড়ির বাইরের দরজার ঠিক ওপরে। সেখানে জলজল করে লেখা থাকলে ইন্দুবালা ভাতের হোটেল। পুরসভা থেকে লাইসেন্স হলো। দুই ছেলে বড় হলো। তারা দিব্য লেখাপড়া শিখে সুন্দর বিয়ে করে টুপটাপ সরে পড়লো। মেয়ে গেল জামাইয়ের সাথে পাঞ্জাবে, হিল্লিতে দিল্লিতে ঘুরে ঘুরে সংসার করতে। ইন্দুবালা একা থেকে গেলেন তাঁর ভাতের হোটেল নিয়ে। একদম একা।

একা কেন থাকলেন? তার একটা বিস্তৃত ব্যাখ্যান দেওয়া যেতই। গল্পের পরিসর জটিল করার জন্য প্যাঁচ পয়জার কম ছিল না। কিন্তু তাহলে এক তরফা ইন্দুবালার কথা শুনলে চলতো না। তার সাথে তাঁর দুই ছেলে এবং এক মেয়ের কথাও শুনতে হতো। চার পক্ষের কথা শুনলে মনে হতো বাঙালির চেনা গল্প। মা মানিয়ে নিতে পারছেন না ছেলেদের সংসারে। কেমন যেন পরপর মনে হচ্ছে নিজেকে। আজ পর্যন্ত সংসারের যে চাবিটা নিজের আঁচলের খুঁটে বাঁধা থাকতো তা যেন চলে গেছে অন্য কারো হাতের মুঠোয়। ওদিকে ছেলেরা বলতো মা বড় বেশি নিজের মতো করে চলতে চাইছে। কারও কথাই শুনছে না। বয়সেরও তো একটা ছায়া নিবিড় শান্তি আছে। কিন্তু ইন্দুবালার নিজের থেকেই সেসবের কোনো বালাই ছিল না। আর কোনো কালেই তো মেয়ের বাড়িতে বাঙালি মায়েরা থাকতে খুব আহ্লাদিত হননি। সব সময় কিন্তু কিন্তু করেছেন। কাজেই মেয়ের দিকের দরজায় অনেক আগেই খিল তুলে দিয়েছিলেন ইন্দুবালা। যদিও খোঁজ খবর নেওয়া, এসে দেখাশুনো করা এই সবই তারা করেছে। এমনকি মায়ের নিয়মিত ডাক্তারি চেক-আপও। নাতিরাও আহ্লাদ করে নাত বউ নিয়ে আসে মাঝেমাঝে। ঠামুনের খবর রাখে। কিন্তু বুড়ি নিজে এইসব জাগতিক মায়ার ছেদো বাঁধনে একটুও আটকা পড়তে চান না। একদিনও ভাতের হোটেল বন্ধ হয়নি লছমীর খাওয়ার দিন থেকে। বন্যা, কলেরা, ডেঙ্গু, দাঙ্গা, কারফিউ কোনো কিছুতেই ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের উনুনে আঁচ নেভেনি। ভাঁড়ারে বাড়ন্ত হয়নি চাল। বাড়ির পেছনের বাগানের কুমড়ো শাক। আজ ইন্দুবালার বয়েস যখন সাতের ঘর ছুঁয়ে ফেলেছে তখন ছেলেরা মাকে এই ব্যবসা বন্ধ করতে বললে, নিজের হাতে রান্না-বান্না না করার ফরমান জারি করলে অশান্তি বাধে কালবৈশাখীর মতো। ফলে বেশ কিছুদিন মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকে দু-পক্ষের। তখন শিব রাত্রির সলতের মতো বিজয়া, পয়লা বৈশাখের নমস্কারটুকু টিকিয়ে রাখে নাতি-নাতনিরা। ছেলেরা দূর থেকে ফোন করে খবর নেয়। ধনঞ্জয়কে বকাঝকা করে মায়ের ঠিক মতো দেখাশুনো করার জন্য। আর ইন্দুবালাও তখন নিজের সামনে একটা পাঁচিল তুলে দেন। অভিমানের আদান প্রদান বেশ কিছুদিন অব্যাহত থাকে। কিন্তু তার মধ্যেই ইন্দুবালার রান্নাঘরে মরশুমি পদের কোনো বিরাম হয় না। সেখানে কৌটো ভর্তি হতে থাকে পৌষের পিঠেতে। বর্ষায় ভাপা ইলিশে। গরমের মুড়ি ঘন্টতে। ধনঞ্জয় সব দিয়ে আসে বুড়ির নাম করা টিফিন কৌটোতে ছেলে-মেয়ে প্রত্যেকের বাড়ি-বাড়ি। পূর্ণিমায় বুড়ির গাঁটে বাতের ব্যথা বেড়ে যায়। অমাবস্যায় হাঁটতে পারেন না প্রায়। তবু মলম লাগিয়ে গরম জলের সেঁক নিয়ে রান্না করেন ইন্দুবালা। অতগুলো লোক আসবে। আঙুল চেটে চেটে খাবে। বায়না করবে একটু শুক্তোর জন্য। একটু মাছের মাথা দিয়ে করা ডালের জন্যে। পরিতৃপ্ত চাঁদপানা মুখগুলো দেখতেও ভালো লাগে যেন। এদের খাইয়েও সুখ। ইন্দুবালা তাই কোনোদিন কোনো তীর্থে যাননি। ধম্মে কম্মো করেননি। ঠাকুরের কথামৃতের বাণী মনের মধ্যে আউড়ে গেছেন। নারায়ণ সেবা। জীবে প্রেম।

তবে আজকে পূর্ণিমা, অমাবস্যা গ্রহণের মারপ্যাঁচ না থাকলেও পায়ের ব্যথাটা যেন বড় বেড়েছে ইন্দুবালার। সকালে পাঁজি খুলে আতিপাতি দেখেছেন কোথাও কোনো বক্র দৃষ্টি নেই গ্রহের। তবুও বাড়ির পেছনে বাগানের সিঁড়িটা দিয়ে নামতেই হড়কে যাচ্ছিলেন আর একটু হলে। কবে থেকে ধনঞ্জয়কে বলে যাচ্ছেন ওরে চুন ফ্যাল। একটু নারকেল ঝাঁটা দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার কর। তা কে শোনে কার কথা। থাকতো সেই আগের বয়স, কারও কাজের জন্য তিনি বসে থাকতেন নাকি? ওই দশ কেজি চালের ভাত নিজে করেননি এক সময়? ফ্যান গালার সময় বাজারের লোকগুলো এসে দাঁড়িয়ে থাকতো জুই ফুলের মতো ভাত দেখার জন্য। ওই কাঁড়ি কাঁড়ি ফ্যান টেনে তুলে দিয়ে আসতেন না পাড়ার কুস্তির আখড়ায়! ছেলেগুলো খেতো পরিতৃপ্তি করে। মা শিখিয়েছিল ভাত হলো লক্ষ্মী। তার কিছু ফেলা যায় না। কিছু ফেলতে নেই। কত মানুষ ওই ফ্যানটুকু খেয়ে বেঁচে আছে দুবেলা। এইসব বকতে বকতে ইন্দুবালা সিঁড়ি দিয়ে নামেন। খিড়কির দরজা খোলেন। সেখানেই তো সেই শাশুড়ির আমলের একটা ছোট্ট বাগান। একটা আমগাছ। একটা পেয়ারা। একটা লিকলিকে নারকেল গাছ খাড়াই হয়ে উঠেছে। এইসব ছাড়াও কয়েক ছটাক জমিতে ইন্দুবালা সাজিয়ে নিয়েছেন তার রান্নাঘরে কাজে লাগার মতো টুকিটাকি সবজি। যেন ফকিরের ঝুলি। কিছু না কিছু তুমি পাবেই। প্রচণ্ড পা ব্যথা নিয়ে এতটা সিঁড়ি ঠেলে বাগানে এসে ইন্দুবালার মন ভালো হয়ে যায়। গোটা বাগান আলো করে ফুটে আছে কুমড়ো ফুল। তার ওপর বিন্দু বিন্দু শিশির। এই ভরা বসন্তে এই সুন্দর সকালে শহরের ইট, কাঠ, পাথরের মধ্যে কোথা থেকে যেন ডেকে উঠলো একটা কোকিল। ইন্দুবালা কুমড়ো ফুলের ওপর হাত বোলালেন। কোথা থেকে যেন পুরোনো কলকাতার ছেনু মিত্তির লেনের এঁদো গলির দোতলা বাড়ির ছোট্ট বাগান হয়ে গেল খুলনার কলাপোতার নিকানো উঠোন। মাটির উনুনে শুকনো খেজুর পাতার জিরানো আঁচ। আর চাটুর ওপর ছ্যাঁক ছুক করে ভাজতে থাকা কুমড়ো ফুলের মিঠে বড়া। নামানোর সময় ঠাকুমা তার ওপর যত্ন করে ছড়িয়ে দিতেন অল্প কিছু পোস্তর দানা। পাশে বাটি হাতে করে বসে থাকা ছোট্ট ইন্দুবালা আর তার ভাই। ঝপ করে একটা সকাল নিমেষে পালটে দিল ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের আজকের মেনু। এক ঝুড়ি কুমড়ো ফুল তুলে নিয়ে এসে দোকানের সামনের কালো বোর্ডে চক নিয়ে লিখলেন ভাত, ডাল, কুমড়ো ফুলের মিঠে বড়া, সরষে মাছ, জলপাইয়ের চাটনি। ধনঞ্জয় গাঁক গাঁক করে উঠলো তার দেশওয়ালি ভাষায়। রেগে গেলে বাংলা তার ঠিক আসে না। আলুভাজা হওয়ার কথা ছিল। সরষে মাছের জায়গায় পটল আলু ফুলকপির ঝোল হওয়ার কথা ছিল। এইসব কিছু ছেড়ে কিনা কুমড়ো ফুলের মিঠে বড়া? ইন্দুবালা কোনো কথা কানে তুললেন না। উত্তর দিলেন না। স্নান করে ধবধবে সাদা কাপড়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন।

বেলা যত বাড়তে থাকলো চারিদিকের আকাশ-বাতাস ছেয়ে গেল কুমড়ো ফুলের মিঠে বড়া ভাজার গন্ধে। সামনের মেস বাড়ির ছেলে-মেয়েগুলো আজ বড় তাড়াতাড়ি ভাত খেতে এলো। কালেক্টর অফিসের কেরানিকুল বাড়ি থেকে খেয়ে এসেও দুপুরে চাড্ডি ভাত বেশি খেতে চাইলো। কবেকার খুলনার এক উঠোন রান্না জড়ো হলো ইন্দুবালার হোটেলে। সবার খাওয়ার তারিফ যখন তিনি রান্না ঘরের মধ্যে থেকে পাচ্ছিলেন, ছেলে-ছোকরাগুলো দিদা বলে এসে যখন জড়িয়ে ধরে আদর করে চলে যাচ্ছিল, বাড়ি যখন ম ম করছে গন্ধে ঠিক তখনই তাঁর সেই পড়ন্ত বেলার হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ালো একটা ক্যাব। নেমে এলো যে মেয়েটি সেও প্রায় বছর দশেক পরে ফিরছে কলকাতায়। মেয়েটির ছোটো করে কাটা চুল, মেয়েটির হাব-ভাব, মেয়েটির পোশাক, তার বিদেশি লাগেজ, কাস্টমারের ভাত খাওয়ার ছন্দপতন ঘটায়। সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকে অবাক হয়ে। এই সময়ে এই ছেনু মিত্তির লেনে পরী এলো কোথা থেকে? মেয়েটি সটান গটমট করে এগিয়ে আসে। চোখের রোদ চশমাটা মাথার ওপর তোলে। হেলে যাওয়া ক্ষয়টে এনামেলের বোর্ডে ইন্দুবালা ভাতের হোটেল তার আমেরিকার প্রবাস জীবনে হারিয়ে যাওয়া বর্ণপরিচয়ে পড়তে অসুবিধে হয় না। দরজার সামনে এক ঘর লোকের মধ্যে অস্ফুট স্বরে ডাকে “ঠাম্মি”।

ইন্দুবালা তখন যত্ন করে শেষ কুমড়ো ফুলের বড়াটা ভাজছিলেন চাটুর ওপর। অনেক দিনের হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরে ঘুরে তাকান। তাঁর হাতে বেসনের প্রলেপ। কপালে উনুনের আঁচের বিন্দু বিন্দু ঘাম। সোনালি ফ্রেমের চশমাটা একটু ঠিক করে এগিয়ে আসেন। ভালো করে দেখেন এক পশলা রোদ ঢোকা রান্না ঘরে মেয়েটার মুখটাকে। “নয়ন না?” জড়িয়ে ধরে সুনয়নী তার ঠাম্মিকে। কোনো শব্দ যেন আর বেরোতে চায় না তার গলা থেকে। শুধু ফোঁপানো কান্নায় বোঝা যায় ভাঙা ভাঙা কথা। “আমায় একটু তোমার কাছে থাকতে দেবে ঠাম্মি?” ইন্দুবালা কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারেন না। তাঁর বড় ছেলের এই মেয়েটি ঠিক তাঁর মতোই। একরোখা। কারো কথা না শুনে, কাউকে তোয়াক্কা না করে কলেজ টপকে চলে গিয়েছিল বাইরে। কোন এক বিদেশিকে বিয়েও করেছিল মনে হয়। তারপর আর কেউ খবর রাখেনি। মেয়েটা যে এই বাড়ির কেউ ছিল, এই বাড়ির কেউ হয় সে কথা যেন ভুলেই গিয়েছিল সবাই। শুধু নতুন বছরে একটা করে কার্ড আসতো ইন্দুবালার কাছে। ফুল, লতা পাতা, সূর্য দেওয়া। ইংরাজিতে লেখা থাকতো অনেক কিছু। ইন্দুবালা ওগুলো সাজিয়ে রেখে দিতেন দেওয়ালে। সেই নয়ন? “আমাকে ভুলে যাওনি তো ঠাম্মি? সবাই ভুলে গেছে আমাকে। বাবা, ভাই, কাকু, পিসি সবাই”। ইন্দুবালা নাতনির থুতনি ধরে চুমু খান। তাকে শান্ত হয়ে বসতে বলেন রান্না ঘরের ছোট্ট টুলটায়। সামনের টেবিলে শালপাতার থালায় নিজের হাতে ভাত বাড়েন। মাটির গ্লাসে জল দেন। “আমার ঠাকুমা কী বলতো জানিস নয়ন? দুপুরের অতিথি হলো মেঘ না চাইতে জল। তাকে পেট পুরে না খাওয়ালে গেরস্তের অমঙ্গল হবে। মাঠ ভরা ধান হবে না। গোলা ভরা ফসল উঠবে না। মা লক্ষ্মী বিরূপ হবেন। ভিটে মাটি ছাড়া করবেন”। সুনয়নী ডুকরে কেঁদে ওঠে। তার যে ভিটে মাটি কিছু নেই আর। সব গেছে। ইন্দুবালা মেয়ের মাথায় হাত বোলান। মিষ্টি কুমড়ো ফুলের বড়া মুখের সামনে ধরে বলেন, “দ্যাখ তো দিদিভাই মনে পড়ে কিনা কিছু”? সুনয়নীর কিছু মনে পড়লো কিনা বোঝা যায় না। তখন সে তার সদ্য ছেড়ে আসা স্প্যানিশ বয় ফ্রেণ্ডের বিশ্বাসঘাতকতায় ব্যাকুল। কিন্তু ইন্দুবালার মনে পড়লো অনেক কিছু। সুনয়নীর জন্ম হয়েছিল এমনই এক ঝলমলে দুপুরে। সেদিন ছিল বাসন্তী পুজো। তিনি সারাদিন উপোস করেছিলেন। বাটিতে ভেজানো ছিল নতুন ছোলা। কুমড়ো গুলো ডুমো ডুমো করে কাটা ছিল। দয়া গোয়ালিনী দিয়ে গিয়েছিল বাড়িতে পাতা ঘি। ইচ্ছে ছিল কুমড়ো ছক্কা রাঁধার। সেদিনও এমন বিকেল হয়েছিল সব কিছু সারতে। বাড়িতে পাতা ঘি আর হিংয়ের গন্ধ ওঠা কুমড়োর ছক্কায় সারা বাড়ি যখন ম ম করছে। তখনই খবরটা এলো হসপিটাল থেকে। বাড়িতে কত দিন পর নতুন লোক এলো। নাতনির টানাটানা চোখ দেখে ভেবেছিলেন সত্যি ঠাম্মাই বুঝি ফিরে এসেছেন খুলনার কলাপোতার বাড়ির সব মায়াটুকু নিয়ে। চোখ চিকচিক করে উঠেছিল ইন্দুবালার। বড় আদর করে প্রথম নাতনির নাম রেখেছিলেন সুনয়নী।

সন্ধ্যেবেলা ধনঞ্জয় ধূপ দেখাতে এসে দেখলো কালো বোর্ডে লেখা আছে রাতের মেনু। রুটি, কুমড়োর ছক্কা, শিমাইয়ের পায়েস। ধনঞ্জয় আবার খিটখিট করতে পারতো বুড়ির মেনু চেঞ্জ করার জন্য। কিন্তু আজ সে টু শব্দটি করলো না। বরং বটিটা নিয়ে বড় একটা কুমড়ো কাটতে বসলো। আর কেউ না জানুক সে জানে বড় নাতনি সুনয়নী চলে যাবার পর থেকে আর একদিনও এই বাড়িতে কুমড়োর ছক্কা রাঁধেননি ইন্দুবালা।

বিউলির ডাল

ভাদ্রের যে এমন নাভিশ্বাসের গরম আছে ইন্দুবালা আগে কখনও জানতেন না। কিংবা ঠাহর করতে পারেননি তেমন। বিয়ের পর ছেনু মিত্তির লেনে এসে বুঝতে পেরেছিলেন শহুরে দমবন্ধ করা পরিবেশ কাকে বলে। গায়ে গায়ে ঠেকানো বাড়ি। চৌকো খোলা ছাদ। বাড়ির ভেতর থেকে একটুস খানি আকাশ। কর্পোরেশান কলের ছিরছিরে জল। শ্যাওলা ওঠা স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল। বড় সোঁদা সোঁদা গন্ধ। আশে পাশে কোনো নদী নেই। পুকুর নেই। তার বদলে বাড়ির সামনে আছে মুখ হাঁ করা বড় বড় নর্দমা। তার দুর্গন্ধ। হুল ফোঁটানো মশা। গা ঘিনঘিনে মাছি। আর সন্ধ্যে হলেই টিমটিমে বিজলিবাতি। এটাই নাকি কলকাতা। এখানে আসার জন্য মানুষ স্বপ্ন দেখে। গড় হয়ে প্রণাম করে না-দেখা কালীঘাটের মায়ের কাছে। বটতলায় সত্যপীরের সিন্নি চড়ায়। মুখের খাবার বন্ধক রাখে ঈশ্বরের কাছে। একবার কলকাতায় আসতে পারলে ট্রাম, বাস, মনুমেন্ট, ফেরিওয়ালার কাছে কাঁচের চুড়ি। এইটুকু সাধের জন্য এতটা কষ্ট করা? শ্বশুর বাড়ির কোনো এক সমবয়সী মেয়েকে কোনো একদিন হয়তো নিজের মনের এই কথাগুলো বলে ফেলেছিলেন ইন্দুবালা তাঁর সহজ সরল ভঙ্গিতে। তাঁর গেঁয়ো বিদ্যে তখনও শহরের মানুষের জটিল কুটিল মনের তল পায়নি। পরে যে পেয়েছিল তেমনটাও নয়। সারা বাড়ি ছড়িয়ে ছিল কোনো এক গাঁয়ের মেয়ের কলকাতাকে দুর-ছাই করার সংবাদে। শাশুড়ি মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছিলেন “কোথাকার কোন রাজরাজেশ্বরী এল রে। পাকা দালান কোঠায় পা পড়ে না। শুনেচি তো সেখানে শেয়াল কুকুর ঘুরঘুর করতো”। তা ঠিক খুলনার কলাপোতায় সন্ধ্যে হলে বাঁশ বাগানে শেয়াল ডাকতো। তুলসী তলায় জোনাকিরা ভিড় করে আলো জ্বালাতো। মাথার ওপর সারা আকাশ জুড়ে থাকতো তারা। লণ্ঠন লাগতো না। ভাদ্রের এই সময়ে কাঠচাঁপার গন্ধে আকাশ-বাতাস ভরে যেতো। বিয়ের যেদিন সম্বন্ধ এলো অশ্বথ তলায় সেদিন অষ্টপ্রহর। রাজশাহী থেকে এসেছে কীর্তনের নাম করা সব দল। ছানা এসেছে খুলনা শহর থেকে। বড় ভিয়েন বসেছে সামনের বিশালাক্ষী তলার ভোগের ঘরে। এদিকে বাড়িতে ঠাম্মা বানাচ্ছে তুলতুলে নরম মোমের মতো তালের পিঠে। কলাপাতায় গরম গরম সেই ভাপ ওঠা পিঠে আজও যেন ইন্দুবালার চোখে জলছবি হয়ে ঘুরে বেড়ায়। ততক্ষণে অষ্টপ্রহরের মালসা-ভোগের দই চিড়ের জন্য মানুষের কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। ইন্দুবালার তাড়া আছে। সে মালসা ভোগও খাবে। তার সাথে বাড়িতে গিয়ে ঠাম্মার তৈরী তালের পিঠে। এদিকে দূর থেকে ধূর্জটি পিওন আসছে সাইকেলে চেপে। তারস্বরে চিৎকার করছে। বাবার নাম ধরে “ও ব্রজমোহন বাবু … শুনছেন…চিঠি আছে”। চিঠির কথায় ইন্দুবালা ফিরে তাকায়। একটু আড়াল নিয়ে দেখতে পায় বাবার হাতে একটা পোস্টকার্ড। ধূর্জটি পিওন বলে, “মাস্টারবাবু এত ঘনঘন চিঠি আসছে কেন বলুন তো? ইণ্ডিয়াতে মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ করলেন নাকি? এদিকে কি ছেলের অভাব ছিল? আমার ভাইপো তো এখন ঢাকায় সুতোর কলে কাজ করছে”। উত্তরে বাবা কিছু বলেননি। তাকিয়ে ছিলেন দূরে কপোতাক্ষের ওপার থেকে ভেসে আসা কালো মেঘের দিকে। তিনি জানতেন ওই মেঘে ধরা আছে বৃষ্টির জল। ঠিকঠাক বৃষ্টি হলে ক্ষেতের ফসল ভালো হবে। মেয়ের বিয়ের আর চিন্তা থাকবে না। বিদ্যুৎ ঝিলিক দিলে তিনি পোস্টকার্ডখানা সাবধানে পকেটে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। বাবার পেছন পেছন দূরত্ব রেখে বাড়ির পথ ধরলেন ইন্দুবালা।

ওঁ মা সিদ্ধেশ্বরী সহায়
সম্মানীয়, ব্রজমোহনবাবু
মহাশয়, আশা করি ঈশ্বরের কৃপায় আপনারা সবাই ভালো আছেন। আপনার পত্রের উত্তর দিতে বিলম্ব হওয়ার ত্রুটি মার্জনা করিবেন। কলিকাতা হইতে খুলনার দূরত্ব বিস্তর। না হইলে আমি স্ব-শরীরে উপস্থিত থাকিয়া সমস্ত পাকা কথা আপনাকে জানাইয়া আসিতাম। ঈশ্বর সাক্ষী, ইতিমধ্যে অনেক বাক্যালাপই আমাদের পত্র মারফত হইয়াছে। পূর্বের পত্রে আপনার কন্যা ইন্দুবালার যে চিত্রখানি পাঠাইয়া ছিলেন তা আমার পুত্র মাস্টার রতনলাল মল্লিকের বড় পছন্দ হইয়াছে। পাত্রী গৌরবর্ণা, শিক্ষিতা, গৃহ কর্মে নিপুণা, আমার পুত্রের যথার্থ উপযোগী। আপনাদের অমত না থাকিলে এবং করুণাময় ঈশ্বরের কৃপা হইলে এই শ্রাবণে আমার পুত্রের সহিত আপনার কন্যার চারিহাত এক করিবার মনোবাসনা পোষণ করি। যত শীঘ্র সম্ভব আপনাদের মতামত জানাইবেন।

–নমস্কারান্তে
শেফালীরানী মল্লিক

পোস্টকার্ডটি এনে মায়ের হাতে দিয়ে ছিলেন বাবা। ততক্ষণে গোটা কলাপোতা জেনে গেছে ইন্দুবালার বিয়ের ঠিক হয়েছে কলকাতায়। একদিক থেকে ব্রজমোহনকে বেশ নিশ্চিন্ত লাগছিল সেদিন। কারণ পারতপক্ষে তিনি চাননি মেয়ের এদিকে বিয়ে হোক। ভেবেছিলেন তার সোনার বরণ কন্যের যথাযথ মর্যাদা করতে পারবে ওপারের লোজনেরা। তাই খুব ব্যস্ত সমস্ত হয়ে বয়সে বেশি দোজবরে ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন নিজের একমাত্র মেয়ের। বাড়িতে আপত্তি উঠেছিল তীব্র। ঠাম্মা নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। মা বলেছিল “এর চেয়ে মেয়েটাকে একটা কলসি আর গামছা দাও না। বোসদের পুকুরে ডুবে মরুক”। ভাইটা ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। হরিমতি দু-দিন দুধ দেয়নি। বিচালিও খায়নি। ভোলা কুকুরটা ঠায় শুয়েছিল দোর ধরে। তবুও কারও কথা শোনেননি বাবা। আর কেউ না জানুক তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন কোনো না কোনো সময়ে বাপ ঠাকুরদার এই ভিটে ছেড়ে তাঁদের একদিন চলে যেতেই হবে। সেদিনের ভয়ে তিনি সারাক্ষণ অতিষ্ঠ হয়ে থাকতেন শেষের দিকে। তাঁকে অবশ্য কষ্ট করে চোরের মতো রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পেরিয়ে এপারে আসতে হয়নি। খান সেনাদের ঢোকার অনেক আগেই তিনি চোখ বুজেছিলেন কপোতাক্ষের তীরে। বাপ-ঠাকুরদার ভিটেতে। কোনো এক অগ্রহায়ণের শিশিরে ভিজতে ভিজতে। আর বাকিরা জ্বলে পুড়ে মরেছিল স্বাধীনতার আগুনে। বাংলা ভাষার রাষ্ট্র হোক, এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে এক আশ্বিনের রাতে শিউলির গন্ধে।

ইন্দুবালার বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে পুজো-আচ্চা হতো বেশি। শনি নামের যে এক দেবতা আছে, তার যে প্রত্যেক শনিবার পুজো হয় ইন্দুবালা এখানে এসে তার কথা সঠিক ভাবে জানতে পারেন। সেদিন বাড়িতে নিরামিষ। শাশুড়ি বউয়ের উপোস। সন্ধ্যেবেলা বারের পুজো দিয়ে তার প্রসাদ উঠোনে দাঁড়িয়ে খেয়ে তবে উপোস ভাঙতো। এছাড়াও শাশুড়ি ছেলের মতি গতি ফিরিয়ে আনার জন্য নানা মন্দিরে হত্যে দিতেন। পাঁজি ধরে ধরে করতেন নানা নিয়ম উপাচার। পূর্ণিমায় রাধারমণের মন্দিরে দেওয়া হতো বাতাসার হরির লুঠ। অমাবস্যায় সিদ্ধেশরীর মন্দিরে পোয়াটাক চাল ডালের অন্নভোগ। এইসব কর্মকাণ্ড তিনি একা কখনই করতেন না। ছেলের নতুন বউকে সঙ্গে নিতেন। পাখি পড়ানোর মতো সব কিছু শেখাতেন। খুব কঠিন নিয়মে বেঁধে রাখতেন। ইন্দুবালার গ্রামে ষষ্ঠী, ওলাইচণ্ডী, পুণ্যি পুকুর ব্রতে এত অনুশাসন ছিল না। চাপড়া ষষ্ঠীতে কাঁঠাল পাতার ভেতরে গুড় আর কলা দিয়ে মাখা আটার সিন্নি খেতে দিব্যি লাগতো। বাড়িতে হতো খুদ চালের পায়েস। এইসব কথা শুনলে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা হাসাহাসি করতো। তাচ্ছিল্যের নামে অপমান করতো। সেসব গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল ততদিনে। পূর্ণিমা-অমাবস্যায়, তিথি নক্ষত্রের ফেরে ভালো দিনে ইন্দুবালাকে সঙ্গে নিয়ে মানুষে টানা রিক্সায় গঙ্গা স্নানে যেতেন শাশুড়ি। প্রথম দিনের ঘটনা আজও মনে আছে ইন্দুবালার। স্বামী ডেকে এনেছেন এমন এক জিনিস যা দেখতে আধভাঙা ঢাকাওয়ালা গাড়ির মতো। সামনে টানা দুটো শুড়ের মতো লাঠি। তার মাঝে দাঁড়িয়ে একটা সিঁড়িঙ্গে মতো লোক। তার হাতে একটা ঝুমঝুমি। “এরেই বুঝি টানা রিক্সা বলে”? স্বামীর সঙ্গে কথা হয় না শাশুড়ির সামনে। তা ছিল নিয়ম ভঙ্গের সামিল। শাশুড়ি জবাব দেন, “দেখেছো কখনও বাপের আমলে? নাও ওঠো এবার”। সেই বিষম বস্তুটায় উঠতে গিয়ে ইন্দুবালা কেঁদে ফেলেন আর কি! রিক্সায় বসার সাথে সাথে রিক্সা বুঝি উলটে যায়। শাশুড়ি চিৎকার করে বলেছিলেন, “বাঙাল মেয়ে কি সাধে বলি? রিফিউজির রক্ত যাবে কোথায়? আমারও যা কপাল”। উঠতে বসতে ইন্দুবালাকে ‘বাঙাল’ বলাটা এই বাড়ির রেওয়াজ ছিল। আর রিফিউজি’ তো তখন কলকাতার আকাশে বাতাসে। কান পাতলেই শোনা যেত। শাশুড়িই ধরিয়ে দিয়েছিলেন ‘বাঙাল’ শব্দটা। পরে বাড়ির লোকের অভ্যেসে পরিণত হয়। মানুষকে এভাবে যে সম্বোধন করা যায় সেটা ইন্দুবালা এপারে না এলে বুঝতে পারতেন না কোনোদিনও। এমনকি গায়ে পড়ে অপমানটাও। অনেক ছোটো বেলায় বাড়ির মাটির দাওয়ায় হেরিকেন জ্বালিয়ে এক সময়ের টোলে পড়ানো দাদু যখন কৃতদাসদের গল্প করতেন তখন শিউরে উঠতেন ইন্দুবালা। সারা দিন কাজ করতো মানুষগুলো। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। উঠতে বসতে মার। জাতের নামে অপমান। গায়ের রঙে অপমান। কাজ না পারলেই অন্ধকুঠুরিতে বন্ধ করে রাখা। এক এক সময় ছেনু মিত্তির লেনের বাড়িটাকে অন্ধকুঠুরি মনে হতো ইন্দুবালার। মনে পড়ে যেত সেই রাতগুলো। দাদুর গল্প বলার আসরের মাঝে ঠাম্মা এসে কড়া ধমক লাগাতো। “বাচ্চা গুলান রাতে ঘুমাবে সেই খেয়াল আছে তো? থামাও তোমার হাবিজাবি গল্প”। ইন্দুবালা রাতে স্বপ্ন দেখতেন তিনি সেই কৃষ্ণকায় দাসের মতো পিছমোড়া হয়ে বাঁধা আছেন। গায়ে লেখা কতগুলো সংখ্যা। প্রচণ্ড ভয়ে ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে ঠাম্মাকে পাশে খুঁজে পেতেন না। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে উঠোন পেরিয়ে ঠাম্মা তখন গোয়াল ঘরে। হরিমতির দুধ দুইছেন, বাছুরকে আদর করছেন। বিচালি আর ভেলি গুড় মাখিয়ে খাওয়াচ্ছেন। ঠাম্মার গা থেকে ভেসে আসছে খুলনার গন্ধ। কলাপোতার গ্রাম। চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকেন ইন্দুবালা। পাছে চোখ খুললে স্বপ্নটা যদি চলে যায়।

চোদ্দ গুষ্টি ঘটির মাঝে কেন যে তাঁর শাশুড়ি বাঙাল মেয়ে বউ করে নিয়ে এসেছিলেন সেই সময়ে বুঝতে পারেননি ইন্দুবালা। অনেক পরে বুঝেছিলেন। কিন্তু সেদিকে গল্পের মোড় ঘোরাতে গেলে অনেকটা পথ যেতে হবে। উনুনের আঁচ হবে নিভন্ত। যা ইন্দুবালা কোনোদিনই সহ্য করতে পারবেন না। তাঁর হোটেলে উনুনের আঁচ মানে সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। টগবগ করে ফোঁটা ভাতের গন্ধ মানে এই বাড়িতে প্রাণ আছে এখনও। এতদিন পরেও। বাড়িতে জমিদারি আমলের ভাঁড়ারে শাশুড়ি থাকাকালীন চালের অফুরান জোগান না থাকলেও ইন্দুবালার জীবনে প্রাণের অফুরান হয়নি কখনও। বাগবাজার ঘাটে গঙ্গার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম দিনে তাঁর কপোতাক্ষের কথা মনে পড়েছিল। বাড়ি থেকে লাল চেলী পড়ে, গা ভর্তি সোনা নিয়ে চলে আসার সময় মনে পড়েছিল ইচ্ছামতীর কথা। গ্রামের পাশে বোসদের বড় পুকুরটার কথা। সবার কথা স্মরণ করে ইন্দুবালা ছলছল চোখে গঙ্গায় ডুব দিয়েছিলেন। বিড়বিড় করে বলেছিলেন ভালো থাকুক ইচ্ছামতী…কপোতাক্ষ…বোসদের পুকুর। মাস ছয়ের মধ্যে বড় ছেলে পেটে এলে গঙ্গার পাট চুকলো তাঁর। শাশুড়িও অসুস্থ হলেন।

বুড়ি খিটখিটে হলেও বউয়ের নিন্দা অন্যলোকে তার সামনে করছে কোনোদিন সহ্য করতে পারতেন না। তৎক্ষণাৎ মুখের ওপর জবাব দিতেন। ঠাম্মা শিখিয়েছিল ওপারের রান্না। আর শাশুড়ি খুব যত্ন করে, চিৎকার চেঁচামেচি করে, বাড়ি মাথায় উঠিয়ে শেখালেন এপারের রান্না। ওপারের রান্নায় যেখানে মিষ্টতার অভাব ছিল এপারে এসে সেগুলোতে একটু একটু মিষ্টি পড়লো। আর এপারের রান্নায় মিষ্টি সরে গিয়ে কাঁচা লঙ্কা বাটা এলো। মরিচ ঝাল এলো। চুইঝালের গন্ধ এলো। মৌরির ফোড়ন এলো। সারা বাড়ি ম ম করতে থাকলো ঘটি বাঙালের রান্নার সুবাতাসে। জ্ঞাতি কুটুমরা আড়ালে আবডালে কানাকানি করতো। কিন্তু হাঁড়ির খবর কিছুতেই বাড়ির বাইরে বেরোতে দিতেন না শাশুড়ি। তিনি জানতেন শকুনের চেয়েও হিংস্র হলো ওরা। যারা তার ছেলেকে নরকের দরজায় নিয়ে গেছে। মুখে হাঁ গো কী গো করলেও সারাক্ষণ শাপ শাপান্ত করতেন কুটুমদের নামে। ইন্দুবালাকে পই পই করে শিখিয়েছিলেন, “চিনে রাখ বউ এদের। কোনো শলা পরামর্শ করতে যাবি না ওদের সাথে”। ইন্দুবালা কোনোদিন যাননি। জীবনের চরম বিপদের সময়ও না। শাশুড়ি বুঝেছিলেন এই সংসার ডোবার হাত থেকে যদি কেউ বাঁচাতে পারে তাহলে সে এই বাঙাল মেয়েই। সাধে কি ছবি আসা ইস্তক তিনি ছুটেছিলেন গঙ্গার ধারে মায়ের বাড়িতে? মহারাজ ছবি দেখে বলেছিলেন “শেফালী, তোমার ঘর দুয়ার উত্তরসূরীদের বাঁচাবে এই মেয়ে। লক্ষ্মীমন্ত জেনে রেখো।” একটুও সময় নষ্ট করেননি তিনি আর। নিজের পেটের ছেলেকে ভালো করে চিনতেন। সংসারটা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে খুলনার কলাপোতা গ্রামে চিঠি লিখতে বসেছিলেন। চোখের সামনে উজাড় হয়ে ছিল নাতি পুতিদের স্বপ্ন। ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েগুলো ঘর আলো করে তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা নিজের চোখে দেখার জন্য বিভোর হয়ে থাকতেন বুড়ি। ইন্দুবালা তাঁর সেইসব স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন যা যা তিনি চেয়েছিলেন ছেলের বউয়ের কাছ থেকে। মুখ ফুটে কোনোদিনও শাশুড়ির মুখের ওপর কথা বলেননি। এক এক সময় নিজেই আশ্চর্য হয়েছেন। কলাপোতার সেই কলবলে মেয়েটা এই ছেনু মিত্তির লেনে এসে কী করে চুপ হয়ে গেল একদম? আসলে হতেই হতো। যে তীব্র যন্ত্রণা আর লাঞ্ছনার অভিঘাত তাঁর ওপর দিয়ে চলেছিল দিনের পর দিন সেই সবের জন্য কোনো প্রস্তুতি ছিল না। নিজেও কোনোদিন ভাবতে পারেননি এমনটা ঘটতে পারে। যে নির্মল ছন্দে জীবনের শুরু হয়েছিল তার পরিণতি দেখে শিউরে উঠেছিলেন। চারপাশে এমন একটা মানুষও ছিল না, যাকে মনের কথা বলেন। এরও অনেক দিন পরে এক মাছওয়ালীকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন। যে না থাকলে আজকের ইন্দুবালা এমন ভাবে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারতেন না। কিন্তু সেতো গল্পের ধরতাইয়ের দিক। আর এখন এই মুহূর্তে বুকের চাপা কষ্ট কাকে বলবেন ইন্দুবালা? সেইসব কথা কিছুটা জানে কর্পোরেশানের ওই ছিরছিরে জল পড়া কল আর বাগানের আমগাছ, নারকেল গাছ। তার ডালে কদাচিৎ এসে পড়া পাখিগুলো। কান্নার শব্দ যাতে বাইরে না বেরোয় মুখের ভেতর কাপড় খুঁজে নিতেন ইন্দুবালা। শুকনো মাটিতে চোখের জল পড়লে বৃষ্টি নামতো শহর জুড়ে। শাশুড়ি জল ভরা মেঘের দিকে তাকিয়ে তাঁর সংসারের মঙ্গল কামনা করতেন।

সেদিন এমনই ছিল ভাদ্রের আকাশ। ঘরে ছিল গুমোট গরম। দুই ছেলের পর মেয়েটা তখন পেটে। শাশুড়ি আর হাঁটতে চলতে পারেন না। খুবই অসুস্থ। ঘরের বিছানায় শুয়ে সব কিছু। ইন্দুবালা প্রাণপণে সেবা করেন তাঁর এই ভরা অবস্থায়। তখন দুদিন প্রায় খাওয়া নেই বুড়ির। হঠাৎ একদিন সকালে ইন্দুবালার কাছে আবদার করলেন, “বউ একটু বিউলির ডাল রাঁধলে দুটো ভাত খেতে পারতুম”। ইন্দুবালা তাড়াতাড়ি উনুন ধরিয়েছিলেন সেদিন। ডাল সেদ্ধ করে মৌরি ফোড়ন দিয়েছিলেন। নামানোর আগে একটুখানি চিনি। বুড়ি ওঘর থেকে চিৎকার করছিলেন হাঁপ ধরা গলায়। “হলো তোর বউ? আর কত দেরী?” পদ্মকাটা বাটিতে ডাল ঢেলে, কাঁসার থালায় ভাত বেড়ে যত্ন করে খাইয়েছিলেন শাশুড়িকে। সবটুকু ভাত আর ডাল বিছানার সাথে মিশিয়ে যাওয়া বুড়ি কোথায় যে নিয়ে নিচ্ছিলো ইন্দুবালা নিজেও তা বুঝতে পারছিলেন না। খাওয়া শেষ হলে বুড়ির চোখ গড়িয়ে নেমেছিল করুণাধারা। আশীর্বাদ করেছিলেন, “সবাইকে এইভাবে খাইয়ে পরিয়ে সুখী রাখিস বউ”। কথিত আছে মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের শেষ কথা খনার বচনের থেকেও নাকি ফলপ্রদ। সত্যি তা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল ইন্দুবালার জীবনে। না হলে এতগুলো মানুষকে এই বয়সেও খাওয়াতে পারেন? তবে যেটা তিনি এখনও বুঝতে পারেননি মানুষ কী করে জানতে পারে এটাই তার শেষ খাওয়া? না হলে সেই ভাত খাওয়ার পর বুড়ি আর মুখে কুটোটি নাড়েনি সারাদিন। পরের দিন সকাল বেলায় চা নিয়ে শাশুড়ির ঘুম ভাঙাতে গিয়ে শুধু দেখেছিলেন পাঁচিলের গা ঘেষা জানলার দিকে তাকিয়ে আছেন বুড়ি অপলক দৃষ্টিতে। আকাশে তখন ভাদ্রের জল ভরা মেঘ। মা… মা… বলে দুবার ডেকেছিলেন ইন্দুবালা। শেফালীরানী আর কোনোদিন সাড়া দেননি। ছেনু মিত্তির লেনের অনেক পুরোনো বাড়ির মতো ইতিহাস হয়ে রয়ে গিয়েছেন মনের মণিকোঠায়।

ধনঞ্জয় হাঁপাতে হাঁপাতে দোতলায় আসে। হড়বড় করে বলে যায় কথা। “আমি কত বারণ করলাম। শুনুচি না আমার কথা। ওই ছেলেগুলানরে আরও মাথায় তুলুচি…। তো এমন হউচি”। ইন্দুবালা হেসে পারেন না। ধনঞ্জয়ের ভাষা ঘটি, বাঙাল ওড়িয়া মিলে মিশে একাকার। মাথার চুলগুলো সব সাদা ধবধবে। তাও ছোটো ছোটো করে ছাঁটা। আবার যত্ন করে একটা টিকিও রেখেছে। গামছা ছাড়া অন্য কিছু তিনি পরতে দেখেননি ধনঞ্জয়কে। শীতকালে শুধু গায়ে উঠতো একটা চাদর। তাও খুব জোরাজুরি করার পর। ইন্দুবালার জীবনে যেন অন্ধের যষ্টি এই ধনঞ্জয়। জীবনের নাড়ি নক্ষত্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। ধনার কাছ থেকে সবটা শোনার আগেই সিঁড়িতে ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ পান ইন্দুবালা। কারা আসছে? এইসময় তো কোনো পুজো নেই। চাঁদার বালাই হওয়ার কথা নয়। আর ছেলে ছোকরাগুলো চাঁদা চায় না তার কাছে। আবদার করে এটা ওটা নিয়ে যায়। কিংবা দুবেলা খেয়ে যায় সবাই মিলে এসে। বড় একটা কেউ দোতলায় ওঠে না নাতি-নাতনি ছাড়া। কিন্তু তাদেরও তো এখন আসার সময় নয়। কিছুদিন আগেই তো সুনয়নীকে ঠেলে পাঠালেন নিজের বাবার বাড়ি। শুনেছেন কোনো কলেজে নাকি পড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে সে এসে পড়লেও এখন তার মোটেই আসার কথা নয়। ইন্দুবালা এগিয়ে যান দোতলার সিঁড়ির কাছে। সামনেই যাকে দেখতে পান, সে কিংশুক। উলটো দিকের মেসে থাকে। কলেজে পড়ছে। মাঝে মাঝেই রান্না খেয়ে দিদা বলে জড়িয়ে ধরে। ফরসা দেখতে। চোখে আবার গান্ধি ফ্রেমের কালো চশমা। শহরে নতুন উঠেছে। আর চাঁদি পর্যন্ত ছাঁটা ফুলকাট চুল। তার ওপরটায় আবার ঢেউ খেলানো বাবড়ি। বড় ভালো লাগে এমন সব আজব সাজগোজ দেখতে ইন্দুবালার। ছেলেটা দোতলার একেবারে বারান্দার কাছে এসে দাঁড়ায়। ধনঞ্জয় তেড়ে আসে। এরপর সে এগোতে দেবে না কাউকে। হড়বড় করে বলে যাওয়া কথায় যেটুকু বোঝা যায় কিংশুক হোটেলের সামনে টাঙানো কালো বোর্ডের লেখা মুছে দিয়েছে। যেখানে প্রতিদিনের মেনু লেখা থাকে। ইন্দুবালা বলেন “এ তো ভারী অন্যায় কিংশুক। আমার লেখা মোছো কী করে?” কিংশুক তখনও হাঁপাচ্ছে। তার সদ্য তারুণ্য হার মানতে শেখার নয়। “শোনো দিদা। সত্যি বলছি। আমি তো ছিলামই না কয়েকদিন। বাড়ি গিয়েছিলাম। কাল লাস্ট ট্রেনে বর্ধমান থেকে ফিরেছি। মুড়ি জল খেয়ে শুয়ে পড়েছি…। না না প্লিজ তুমি আগে আমার কথা শোনো। আজ সকালে উঠে দেখি ইন্দুবালা ভাতের হোটেল রান্না হবে কচুর ডালনা, মুসুরির ডাল, আর ট্যাঙরা মাছ? এ কেমন কথা দিদা? আজ সুজিতের জন্মদিন ও খাবে কী? এ্যাই সুজিত তুই আবার রূপম, সাবেরের পেছনে লুকোচ্ছিস কেন? এদিকে আয়”। পেছনের ছোট খাটো ভিড় ঠেলে যে ছেলেটা এগিয়ে আসে তাকে দেখে চমকে ওঠেন ইন্দুবালা। কোঁকড়ানো চুল। গালে হালকা দাড়ি। কালো বার্নিশে গায়ের রঙ। হাসলে টোল পড়ে গালে। চোখে শুধু চশমাটুকু নেই। এতোদিন পরে এইভাবে কেউ ফিরে আসে? সত্যি কি আসা যায়? তিনি শুধু জানেন অলোক কোনোদিন ফিরবে না। ফিরতে পারে না। কারণ অলোকের বুক ফুড়ে ঢুকে গিয়েছিল পাঁচ-ছটা গুলি। তার দেহটাকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশের জিপ। অন্ধকারে ডুবে থাকা এই কলকাতা শহর শুধু সাক্ষী ছিল তার। “কী হলো দিদা? কথা বলছো না কেন?” কিংশুক সমেত ছেলেদের দলটা তাকিয়ে থাকে ইন্দুবালার দিকে। “সুজিতকে আগে কখনও তো দেখিনি”। বিড়বিড় করে বলে ওঠেন ইন্দুবালা। কিংশুক হেসে ফেলে। “ও এই কথা … তা দেখবে কী করে? ওকে তো হোস্টেল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।” হো হো করে হেসে ওঠে ছেলের দল। আর যে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছেন ইন্দুবালা অপলক দৃষ্টিতে যেন বহু যুগের ওপার থেকে সে যেন লজ্জায় মিশে যাচ্ছে মাটির সাথে। স্টুডেন্ট হোস্টেলের খাবার নিয়ে আন্দোলন করছিল বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাড়িয়ে দিয়েছে সুজিতকে। ছেলেটা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো ইন্দুবালাকে। এমনিতে কারও প্রণাম নিতে চান না তিনি। কিন্তু আজ নিলেন। কেন নিলেন নিজেও ঠিক জানেন না। আপত্তি করার সময় হয়তো দেয়নি ছেলেটা। শুধু মনে মনে ইন্দুবালা জানতে চাইলেন, “অমন ভাসা ভাসা চোখ নিয়ে এতোদিন পরে ফিরে এলে কেন অলোক?”

বড় বেতের ঝুড়ি দিয়ে খাবার ঢাকা দেওয়া থাকতো রান্নাঘরে। অনেক রাতে শহর নিশুতি হলে ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের পেছনের দরজায় কড়া পড়তো একবার। ওটা সাংকেতিক শব্দ। মানে “জেগে আছো কমরেড ইন্দুবালা?” “কমরেড? সেটার আবার কী মানে?” অলোক ফস করে সিগারেট জ্বালায়। “বন্ধু …সাথী..সহযাত্রী…সহযোদ্ধা…এক এক সময় এক এক রকমের মানে। আপনি দেখছি কিছুই জানেন না। তা না জেনে আমাদের খাওয়াচ্ছেন কোন সাহসে? গোটা শহর আমাদের কী বলে জানেন?” ইন্দুবালা ঘাড় নাড়েন, না জানেন না। অলোক শিড়দাঁড়া সোজা করে বলে “নকশাল”। ইন্দুবালার চকিতে মনে পড়ে যায় অলোকের সাথে দেখা হওয়ার প্রথম দিনের কথা। সবেমাত্র হাতের সব কাজ সেরে হোটেল বন্ধ করে দোতলায় উঠবেন। দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ শুনতে পেলেন। ধনঞ্জয় সে সময়ে কয়েকদিনের জন্য দেশে গেছে। হাওয়ার শব্দ ভেবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন দোতলার সিঁড়ির দিকে ইন্দুবালা। কিন্তু আবার শব্দটা হলো। হ্যাঁ এবার স্পষ্ট শুনতে পেয়েছেন তিনি। থমকে দাঁড়াতেই হলো। রান্নাঘরের পেছনের দরজার দিক থেকে আসছে শব্দটা। ওদিকটায় বাগান। বাগানের শেষে পাঁচিল। লোকজন আসবার হলে সামনের দরজা দিয়ে আসে তারা। পেছনের দরজা সচরাচর কেউ ব্যবহার করে না ইন্দুবালা আর ধনঞ্জয় ছাড়া। তাহলে কি অন্য কেউ? কোন মতলবে? সেই সময়ে ইন্দুবালার বাড়ি নিয়ে শরিকি ঝামেলা তুঙ্গে। স্বামী নেই, শাশুড়ি নেই, মাঝে মাঝেই কেউ না কেউ বাড়িতে এসে হম্বিতম্বি করে চলে যায়। একলা বিধবা পেয়ে লিখিয়ে নিতে চায় সবকিছু। প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। তারাই আবার গুণ্ডা পাঠালো না তো! আঁশ বটিখানা হাতে তুলে নেন ইন্দুবালা। একটাকে শেষ না করে আজ নিজেও শান্তি পাবেন না। তারপর না হয় বাচ্চাগুলোকে সঙ্গে করে নিজেই যাবেন থানায়। আর নিজে মরে গেলে তো শেষ হয়ে গেল সব কিছু। পরক্ষণেই মনে হয় তাহলে বাচ্চাগুলোকে দেখবে কে? ওরা যে বড্ড ছোটো। নিজের মারা যাওয়ার চিন্তাটাকে আপাতত সরিয়ে রাখেন ইন্দুবালা। মনে প্রচণ্ড সাহস জুগিয়ে এগিয়ে যান দরজার দিকে। “কে? কে ওখানে?” উত্তর আসার বদলে আবার একবার কড়া নাড়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। আর নিজেকে সামলাতে পারেন না ইন্দুবালা। রাগের মাথায় খুলেই ফেলেন দরজা। “আয় তোদের শেষ করবো আজকে আমি”। কিন্তু সেই লোডশেডিং-এর রাতে সামনে এরা কারা? বাগানের মধ্যে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে সব। নড়েও না, চড়েও না। কুপিখানা তুলে ধরেন ইন্দুবালা। আর ঠিক তখনই আলোছায়ার মধ্যে উপলব্ধি করেন এরা তো গুণ্ডা নয়। তার চারপাশে জ্ঞাতি কুটুমদের মতো সম্পত্তি লোভী কুলাঙ্গার নয়। চোখগুলো ভাসা ভাসা যেন কোনো এক স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। সবচেয়ে রোগা ছেলেটা এগিয়ে আসে। “কিছু মনে করবেন না। এতো রাতে বিরক্ত করলাম আপনাকে। আমার নাম অলোক। আর এরা আমার বন্ধু। আমাদের একটু খেতে দেবেন? দু-দিন কিছু খাওয়া হয়নি।” অনেক রাতে ভাত বসিয়েছিলেন ইন্দুবালা। সাথে ছিল একটু আলু পোস্তর চচ্চড়ি। চেটেপুটে খেয়ে চলে গেল ছেলে মেয়েগুলো। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই আসতে থাকলো অনেক রাতে। কখনও অলোক একা। অথবা সঙ্গে করে দু তিনজনকে নিয়ে। ওরা খাবারের পয়সা দিতে পারতো না। চাইতেন না ইন্দুবালা কোনোদিন। কিন্তু একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন নিজের চারপাশ জুড়ে। আর বদমায়েশ আত্মীয়রা তার ওপর খবরদারি দেখাতে আসতো না। ভয় দেখাতে তো নয়ই। বরং তাঁকে দেখলে সরে পড়তে টুপটাপ। লছমী কোথা থেকে খবর এনে দিল, “আচ্ছাসে ওদের ডরা দিয়া মাজি তোর ওই ছেলে মেয়ে গুলো। তুইও সাবধানে থাকিস। ওরা নকশাল আছে। কখন আবার পুলিশ আসে।” কাঁটা দিয়ে উঠেছিল ইন্দুবালার গা। “নকশাল”? আজকেই তো কালেক্টর অফিসের কেরানিরা খেতে এসে কি সব ফিসফিস করে আলোচনা করছিল। “কটা ছেলে মারা গেছে। গঙ্গার ঘাটে বোমা। সব নকশাল … নকশাল…। বিপ্লব করে দিন দুনিয়া পালটে দেবে”।

অলোক তাকিয়ে থাকে ইন্দুবালার দিকে। “এইবার তো জেনে গেলেন আমরা কে? নিশ্চই এর পরের বার থেকে আর দরজা খুলবেন না।” ইন্দুবালা কি সেদিন কিছু বলতে পেরেছিলেন? নাকি তার চোখ ভারী হয়ে আসছিল জলে। মনে পড়ে যাচ্ছিল ভাইয়ের কথা। বাংলা ভাষার রাষ্ট্র গড়ার দাবিতে সেও তো তখন মুক্তি যোদ্ধা। অনেক দিন পরে লুকিয়ে বাড়িতে এসেছিল দুটো ভাত খাবে বলে। মাও সেদিন বেড়ে দিয়েছিল গরম ভাত। প্রথম গ্রাস মুখে তোলার আগেই বাড়িটা দাউ দাউ করে জলে ওঠে। মাকে, ভাইকে কাউকেই বেরোতে দেয়নি খান সেনারা ওই জ্বলন্ত কুণ্ড থেকে। মালাউন পুড়িয়ে পুণ্য করেছিল তারা। ভাই কি সেদিন চিৎকার করেছিল? নাকি সেই লেলিহান শিখার মধ্যে মাকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসেছিল? মা কি তাকে সেদিন রাখালের পিঠে খাওয়ার গল্পটা বলছিল? নাকি ঘুম পাড়ানিয়া গান শোনাচ্ছিল সুর করে করে? এগুলো সেই পাগলাটে লোকটার কাছে জানা হয়নি সেদিন। জানতে পারেননি ইন্দুবালা। তার আগেই সে চলে গিয়েছিল। কোথায়? কেউ জানে না। “আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না কমরেড। ধরে নিচ্ছি আপনি আর চান না আমরা এখানে আসি।” দরজার দিকে পা বাড়িয়েছিল অলোক। ইন্দুবালা অস্ফুটে বলেছিলেন, “একদিন রাতে যখন দরজা ধাক্কিয়ে ভাত খেতে এসেছিলে তখন তো জানতে চাইনি কিছু। আজ কেন জানাচ্ছ? মা বলতো অতিথির কোনো পরিচয় হয় না। ধর্ম হয় না। তাঁরা হন ঈশ্বর”। তাকাতে পারেনি অলোক ইন্দুবালার দিকে। সে সাহস তার ছিল না। যদিও দুটো ঘোরেল পুলিশ ইন্সপেক্টর আর গোটা একটা গোয়েন্দা দপ্তরকে সে আদাজল খাইয়ে ঘোরাচ্ছিল সেই সময় কলকাতার রাস্তায়। অলিতে গলিতে। লালবাজারে একজন তাঁদেরও ওপরের লোক হাতে লোহার বেড়ি নিয়ে বসে ছিলেন এইসব বেয়াদপ ছেলে মেয়েদের কাছে নিজের সাদা-কালো আমিকে চিনিয়ে দেবার জন্য। রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল তারা। এতো সব দস্যিপনা করা ছেলেটা সেই নিশুতি রাতে এক সহজ সরল গেঁয়ো বাঙাল বিধবার কথার পিঠে কথা জুড়তে পারেনি। শুধু বিড়বিড় করেছিল “ঈশ্বরে আমি বিশ্বাস করি না কমরেড। কিন্তু আপনারা থাকুন। আপনারা থাকলে আমরা থাকব।”

অনেক রাত পর্যন্ত কান পেতে থাকতেন ইন্দুবালা। অপেক্ষা করতেন অলোকের জন্য। তার সঙ্গীদের জন্য। সারাদিন ওরা খালি পেটে, পুলিশের তাড়া খেয়ে ছুটে বেড়িয়ে অধিকার আদায় করছে। মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার। চাড্ডি ভাত-ডালের অধিকার। অপমানিত না হয়ে স্পর্ধায় মাথা তুলে দাঁড়াবার অধিকার। ঠুক শব্দ শুনলেই নিজে ঘুম থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেন ইন্দুবালা। ছেলেটা সাতদিনের ভাত একদিনে খেয়ে কোথায় যে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে চলে যেত কে জানে! মজা করে ইন্দুবালা তার একটা ছদ্ম নাম দিয়েছিলেন, প্যাঁচা। প্যাঁচার জন্য রোজ ভাত বাড়া থাকতো। কিন্তু প্যাঁচা রোজ আসতো না। তার আসা সম্ভব ছিল না। রাতের অন্ধকারে শুধু একটা গলা ফিসফিস করে ভেসে বেড়াতো “কমরেড ইন্দুবালা আপনারা থাকলে আমরা থাকবো।” কিন্তু কই। ইন্দুবালা তো আছেন। তাহলে অলোক নেই কেন? সুশান্ত নেই কেনো? গোরা নেই কেন? কৃষ্ণা নেই কেন? প্যাঁচার দলটা যে আর ভাত খেতে আসেনি কোনোদিন। এরও অনেক পরে শুনেছিলেন বরানগর ঘাটে পিচ আর ব্লিচিং দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল রক্ত। অলোকের দেহটা দুবার নড়ে উঠে স্থির হয়ে গিয়েছিল সেদিন। চোখদুটো খোলা ছিল আকাশের দিকে। তারায় ভরা আকাশ দেখছিল কি অলোক? নাকি বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন শহর জুড়ে? ধুয়ে যাচ্ছিল রক্ত। মিশে যাচ্ছিল গঙ্গার জলের সাথে। ভেসে চলছিল নিথর দেহগুলো ঢেউয়ের তালে তালে সপ্ত ডিঙার মতো। অজানা এক স্বপ্নে। সত্তরের দশক মুক্তির দশক হতে পেরেছিল কিনা ইতিহাস তার মূল্যায়ন করেনি কোনোদিন। করবে কিনা তাও জানা যায় না। কিন্তু সেদিনও এক বিধবা হোটেল মালিক হাঁড়িতে কিছুটা চাল বেশি নিয়েছিলেন। যদি ফিরে আসে ছেলে-মেয়েগুলো। যদি তার কাছে এসে আবার ভাত চায়। অপেক্ষায় ছিলেন রাতের পর রাত। কিন্তু তারা কেউ ফেরেনি।

কেউ যেন একটা হাত ধরে ইন্দুবালার। ছানি না পাকা ঘোলাটে চোখে সামনে তাকান তিনি। কিংশুক দাঁড়িয়ে। পাশে সুজিত। আরও পেছনে ইন্দুবালার সব চাঁদপানারা। “দেখবে না দিদা তোমার বোর্ডে কী লিখেছি? তারপরে তুমি ডিসিশান নিও এইগুলো আজ রান্না করবে নাকি করবে না”। ওরা দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নামে। ইন্দুবালা কি আর অত তড়বড় করতে পারেন? হাঁটুর ব্যথা, গেঁটে বাত নিয়ে এক দঙ্গল ছেলের সঙ্গে যখন সেই কবেকার কালো সিমেন্টের বোর্ডের সামনে এসে দাঁড়ান তখন তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে ভাদ্রের বৃষ্টির মতো। কবেকার অলোক, গোরা, সুশান্ত, কৃষ্ণা যেন কিংশুক, সুজিত, রূপম, সাবেরের হাত ধরে এসে লিখে গেছে তার বোর্ডে। ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের আজকের মেনুতে জ্বলজ্বল করছে ভাত, বিউলির ডাল, আলুপোস্ত, কালো জিরে দিয়ে পার্শে মাছের ঝোল, বিলাতি আমড়ার চাটনি। ইন্দুবালা জানেন এরপর তিনি আর স্বস্তিতে থাকতে পারবেন না। যতক্ষণ না ছেলেগুলোর মুখে হাপুস হুপুস শব্দ ওঠে। যতক্ষণ না সারা বাড়ি ছড়িয়ে যায় বিউলির ডালে মৌরি ফোড়নের গন্ধে। পার্শে মাছে কালো জিরের পাশে কাঁচা লঙ্কার আবেশ করা ঝোলে। আলু পোস্তর একটু কাঁচা তেলের সুবাসে। বিলাতি আমড়ার টকে সর্ষের মনকাড়া তীব্র ঝাঁঝে। টেবিলে কলাপাতা পাতা হয়। মাটির গ্লাসে জল। লেবু, নুন, লঙ্কা। এক পেট খিদে আর চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে কবেকার হারিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েদের হয়ে এখনকার প্রজন্ম ভাত খায় ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে। ইন্দুবালা আজও বিশ্বাস করেন অতিথির কোনো ধর্ম হয় না। বর্ণ হয় না। জাত, গোত্র কিছু না। অতিথি হন ঈশ্বর।

ছ্যাঁচড়া

কোনো এক আষাঢ়ের সকালে জন্ম হয়েছিল ইন্দুবালার। মায়ের মুখে শুনেছিলেন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন। কাঁঠাল গাছের গুঁড়ি বেয়ে বৃষ্টির জল ঢুকেছিল আঁতুড় ঘরে। জল থইথই মেঝেতে সদ্য জন্মানো শিশুটি সাঁতার কাটছিল যেন। ঠাম্মা কোলে তুলে নিতেই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। “এমন চাঁদপানা মুখ তুই পেলি কোত্থেকে এই বংশে”? সোহাগ করে নাতনির নাম রাখলেন ইন্দুবালা। তারও বছর পাঁচেক পরে মাঘের কুয়াশা ভরা ধান ক্ষেতের আল দিয়ে হেঁটে বাবার হাত ধরে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। শুধু এইটুকু মনে আছে ফুল ফুল ছাপ একটা ফ্রক পরেছিলেন। গায়ে ছিল মায়ের বোনা সোয়েটার। মাথায় উলের টুপি। ঠাম্মার কাছে শোনা রূপকথার রানী বলে মনে হচ্ছিল সেদিন নিজেকে। ঠাকুরদার টোলটা তখনও চলছে টিম টিম করে। সেই টোলে বর্ণপরিচয়, ধারাপাত এইসব টুকটাক শিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু বেশি দিন সেখানে পড়া হলো না। আমের গাছে মুকুল ভরিয়ে, সরস্বতী পুজোয় হাতেখড়ি দিয়ে দাদুর বড্ড তাড়াতাড়ি ছিল হয়তো এক্কেবারে চলে যাওয়ার। শিশিরে ভিজেছিল টোলের রাস্তাটা। সেদিন কেউ আর দাওয়া ঝাঁট দেয়নি। উঠোন লেপেনি। পাশের মুকুল ভর্তি বুড়ো আমগাছটা কাটা হয়েছিল দাদুর সৎকারের জন্য। ঠিক এর পরেই দুটো গাঁ পেরিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন ছোট্ট ইন্দুবালা। পড়াশুনোয় তাঁর বেজায় মন ছিল। দাদু সেই ছোট্টবেলাতেই তাঁকে স্বপ্ন দেখিয়ে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ইয়া বড় বাড়ি। সামনে কত কত গাড়ি। বেণী দুলিয়ে, শাড়ি পরে ইন্দুবালা কলেজ করছে। এমন একটা ঝাপসা ছবি যেন আলপনার মতো আঁকা থাকতো মনে। ওইটুকুনি মেয়ে এত সব কিছু যে বুঝতো তেমনটা ঠিক না। শুধু অনেক দূরে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকতো। এক্কা-দোক্কা, লুকোচুরি, খেলনা বাটির বয়েস পার করে ইন্দুবালা প্রবেশ করলেন এবার হাইস্কুলে। সেখান মেয়ে বলতে হাতে গোনা ওই কজন। মাঝের পাড়া, পুবের গাঁ আর কলাপোতা মিলিয়ে মেয়ের সংখ্যা তেমন একটা ছিল না। থাকবেই বা কী করে? সবাইকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দিতো না বাড়ির লোকজন। ছেলের পালের মধ্যে মেয়ে বসবে শুনেই হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতো অনেকের। ইন্দুবালার মা’র পছন্দ ছিল না স্কুলটা। কোনোদিনই। বাড়িতেই তো পড়াশুনা করা যায়। অনেক বার সে কথা বলেছেন স্বামীকে। কিন্তু যার বাবার টোল ছিল, যে নিজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক কালে পড়াশোনা করেছে; কিন্তু ভাগ্যের ফেরে মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে এসে সংসারে হাত লাগিয়েছে, সে তার মেয়েকে পড়াবে না তা হতে পারে। তাই লেখাপড়া, স্কুলে যাওয়াটা চলছিল ইন্দুবালার দিনের অন্যান্য কাজের মতোই। সেটাও অবশ্য বেশি দিন স্থায়ী হলো না। মায়ের খানিকটা চিল চিৎকারেই হোক, আর চারপাশের পরিস্থিতি দ্রুত পালটে যাওয়ার কারণেই হোক কোনো এক সূত্র ধরে বাবা চিঠি লিখেছিলেন তাঁর বনগ্রামের এক বন্ধুকে। কন্যার বিবাহ তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করিতে চাই। ভালো পাত্ৰ থাকিলে জানাইও’। সেখান থেকে উত্তর পেতে দেরি হয়নি। ছেলে একেবারে ‘মাস্টার। নিজেদের দোতলা বাড়ি। বনেদী বংশ। বন্ধুর বিশেষ পরিচিত। শুধু একটু খুঁত আছে। “খুঁত?” ঠাম্মা সেদিন বাড়িতে তালের ভাপা পিঠে করেছিলেন। গ্রামে অষ্ট প্রহরের জন্য বাড়িতে ছিল নিরামিষ রান্না। হাঁড়িতে সেদিন বসেছিল আতপ চালের খিচুড়ি। আলুগুলো ডুমো ডুমো করে কাটা ছিল। বাগান থেকে ইন্দুবালা তুলে এনেছিলেন অসময়ের কাঁচা টমেটো। নামানোর আগে ঠাম্মা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন হরিমতির দুধে তোলা বাড়ির ঘি। কলাপাতায় ঘিয়ের গন্ধ ওঠা খিচুড়ি খেতে বসে ‘দোজবরে’ শব্দটা জীবনে প্রথম শুনেছিলেন ইন্দুবালা। ছাদনা তলায় ছেলেকে দেখে ডাকাত মনে হয়েছিল তাঁর। ইয়া গোঁফ, বাবরি চুল। চোখ লাল টকটকে। দাঁতগুলো খয়েরের ছোপে মলিন। নিশ্বাসে দুর্গন্ধ। ছেলে বরণ করে এসে এই প্রথম মা বাবার হাত ধরে জানতে চেয়েছিলেন “সব খবর নিয়ে দিচ্ছো তো মেয়েকে? গা দিয়ে যে গন্ধ বেরোয়। সবাই ফিসফিসাচ্ছে। বলছে মাতাল বর”। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাসর ঘরে কড়ি খেলা শুরু হয়ে গেছে। একটু পরেই বউয়ের পাশে দোজবরে স্বামী ঘুমে ঢলে পড়লে ইন্দুবালা ভালো করে তাকিয়েছিলেন লোকটার মুখের দিকে। হাঁ করে ঘুমোচ্ছিলেন বাবু মাস্টার রতনলাল মল্লিক। নাক ডাকার চোটে বাইরে এসে বসেছিলেন ইন্দুবালা। চারিদিকের অন্ধকারে সেই শেষবারের মতো জোনাকিগুলো যখন আলো জ্বালিয়ে তাঁকে ঘিরে ধরলো তখন নিজেকে আর সামলাতে পারেননি তিনি। ভেঙে পড়েছিলেন। একটা মেয়ে তার যাবতীয় শেষ স্বপ্নটুকু নিয়ে কাঁদছে। তার সাক্ষী কোনো কাছের মানুষ ছিল না সেদিন। কোনোদিনই অবশ্য থাকেনি ইন্দুবালার পাশে কেউ। কিন্তু জামগাছটা ছিল। তুলসীতলা ছিল। পুকুর পাড়ের কাঁচা মিঠে আমগাছটা যেন ডালপালা নেড়ে বলেছিল “কাঁদিস না ইন্দুবালা। একটুও কাঁদিস না। এটা তোর নিয়তি”। এরপর ইন্দুবালার আর কোনোদিন বসা হবে না নিজের বাড়ির এই দাওয়ায়। ফেরা হবে না জন্মভূমিতে। কলাপোতা গ্রামটা সশরীরে মুছে যাবে তার ভৌগোলিক স্থাবর অস্থাবর সব কিছু নিয়ে। ইন্দুবালার শুধু মনে রয়ে যাবে এক অলৌকিক অনুভূতি। দেশ নামের স্পর্শ না করা এক স্বপ্নকে।

মেয়ের হাত থেকে কনকাঞ্জলি নিয়ে মা আর ফিরে তাকাননি। নিয়মও ছিল না। এক রাতের মধ্যেই তিনি বুঝেছিলেন কার হাতে মেয়েকে তুলে দিলেন শেষ পর্যন্ত। নিজের স্বামীকে বেশি কিছু বলতে পারনেনি। এমনকি দায় চাপাতেও না। কারণ তিনি জানতেন তাঁর মেয়ে দিন-দিন একটা আগুনের গোলা তৈরী হচ্ছে। ওই রূপ এই পাড়া গাঁয়ে, খাল বিল পুকুরের পাশে, শাপলা গন্ধরাজের মতো যত ফুটে বেরোবে, তত বাড়ির বিপত্তি বাড়বে। এমনিতেই রাত বিরেতে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। এগিয়ে গিয়ে দেখেন দরজার হুড়কো ভালো করে দেওয়া আছে কিনা। বাড়িতে আগুন রাখলে তার সাথে যে পর্যাপ্ত জলও রাখতে হয় সেটা মনে করেই হাত পা সিঁধিয়ে যেত তাঁর। পাশের গ্রাম থেকে মনিরুল মাঝে মাঝেই আসতো ইন্দুবালার কাছে পড়া দেখতে। সমবয়সী তারা। এক্কেবারে পছন্দ হতো না মায়ের। ইন্দুবালা সেটা বুঝতেন। কিন্তু মনিরুলকে খুব মিষ্টি লাগতো তাঁর। গুটি আমে সরষের তেল, কাঁচা লঙ্কা, চিনি মাখিয়ে খেলে যেমন মনিরুল ঠিক তেমন। লজ্জায় মুখে লাল হয়ে যায় ইন্দুবালার। এইসব কী ভাবছেন তিনি? তড়িঘড়ি বাইরের দাওয়ায় আসন পেতে, কাঁসার গ্লাসে জল দিয়ে বসতে দিতেন মনিরুলকে। এই বাড়িতে ছোঁয়াছুঁয়ির বাধ বিচার তেমন না থাকলেও মনিরুলের জায়গা কোনোদিন বাড়ির অন্দরে হয়নি। হতোও না কোনো কালে। যদিও ধর্ম-জাত এইসব নিয়ে বড় একটা মাথা ঘামাতেন না দাদু। কিন্তু বাবা মা ছিলেন উলটো পথের পথিক। ছুত্সর্গের বাছ বিচার যে কত দূর যেতে পারে তা ইন্দুবালা দেখেছিলেন কলকাতায় এসে। শাশুড়ির সংসারে। তার জীবন থেকে সবাই চলে যাবার পর ইন্দুবালা এই সব এঁটো কাটা পরিষ্কার করেছিলেন দু হাত দিয়ে। তাঁর কাছে মানুষ মানে ছিল জীব। তিনি পেট ভরে খাইয়ে জীবে প্রেম করতেন।

মনিরুলের তখন সদ্য গোঁফ উঠেছে। কেষ্ট ঠাকুরের মতো বাঁশি বাজায়। চোখ গোল গোল করে বাতাবি লেবু গাছের তলায় চন্দ্রবোড়ার বাসার গল্প করে। নৌকায় দাঁড় বেয়ে নিয়ে যায় পাশের গ্রামে। শুধু তাই নয় সুর করে মাঝে মাঝে কবিতাও বলে …

“আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে
নীরবে বসিয়া কোন কথা যেন কহিতেছে কানে কানে।
মধ্যে অথই শুনো মাঠখানি ফাটলে ফাটলে ফাটি,
ফাগুনের রোদে শুকাইছে যেন কি ব্যথারে মূক মাটি।
নিঠুর চাষীরা বুক হতে তার ধানের বসনখানি
কোন সে বিরল পল্লীর ঘরে নিয়ে গেছে হায় টানি!”

‘নক্সী কাঁথার মাঠ’-এ সাজু আর রুপাইয়ের করুণ পরিণতি বারবার যেন শুনতে চান ইন্দুবালা মনিরুলের কণ্ঠে। জসীমউদ্দিন যে তাঁর বড় ভালোলাগা কবি। বাবার কাছে কত গল্প শুনেছেন। একবার যখন ইন্দুবালা খুব ছোটো, এই গ্রামে এসেছিলেন নাকি কবি। তাঁর বাড়ির দাওয়ায় বসে চিড়েভাজা খেয়েছিলেন। ঠাম্মা দিয়েছিল কোঁচড় ভরা নাড়। আমসত্ত্ব। তাল পাটালি। মনিরুলের এইসব গল্প শুনতে ভালো লাগে। আর ইন্দুবালার ভালো লাগতো মনিরুলের গলায়, ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ শুনতে। চোখ ভিজে আসে সাজু আর রূপাইয়ের দুঃখে। ঝি ঝি ডেকে ওঠে। ঠাম্মা চুপ করে সলতে পাকান। ভাই কবিতা শুনতে শুনতে হাঁ করে বসে থাকে সবে সন্ধ্যে নামা কলাপোতার মাটির বাড়ির দাওয়ায়। দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসে পাশের বাড়ির সন্ধ্যের শাঁখে। চেয়ে থাকেন ইন্দুবালা মনিরুলের দিকে। কবেকার মনিরুল তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে সহজ সরল টানাটানা চোখে তাকায়। আর এদিকের সত্তর পেরোনো ইন্দুবালা যেন একটুও নড়তে পারেন না বিছানা থেকে। চুপ করে শুয়ে থাকেন। উনি জানেন এই ঘোরটুকু নিয়েই এখনও বেঁচে আছেন। যেদিন এই ঘোর কেটে যাবে, সেদিন তিনিও চিরকালের মতো ছেনু মিত্তির লেন ছেড়ে কোথায় কোন দূরের পথে পা বাড়াবেন।

ধনঞ্জয় নীচ থেকে ডাকছে। তাকে বাজারের টাকা দিতে হবে। ফর্দ করতে হবে। কিন্তু আজ তাঁর যেন কিছুই শুনতে ইচ্ছে করছে না। কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। বর্ষার বেলা গড়াচ্ছে, তিনি চুপটি করে শুয়ে আছেন। কারণ ওদিকে মা গ্রামের সেই সন্ধ্যে হয়ে আসা ভালোবাসার পরিবেশে শুধু শুধু তাড়া লাগাচ্ছে। মা বুঝতে পারছেন লক্ষণ ভালো না। আগুনের গোলা হয়ে উঠছে মেয়ে। সবার চোখ তার দিকে। এমনকি এই একরত্তি ছেলেটারও। শেষকালে কিনা মেয়ে বিধর্মী হবে? বাড়ি থেকে পালাবে? কিংবা পাশের গ্রামের স্বর্ণলতার মতো দেহটা ভেসে উঠবে পুকুরে? ছেলেটাকেও তো ছাড়েনি বাড়ির লোকেরা। ধান ক্ষেতে কুপিয়ে রেখে দিয়েছিল। ভাবতে পারেন না আর। একটা ছোট্ট ভুলের জন্য বেঘোরে যাবে দুটো প্রাণ। ছোট্ট ভুল? হ্যাঁ তাই তো। কবে আর কার জীবনে ভালোবাসা অনেক বড় হয়ে এলো? আর যদি আসতোই তাহলে চারপাশটা পালটে যেত না খুব তাড়াতাড়ি? মুখ দিয়ে বেরিয়েই যায় “এবার তুই উঠে পড় মনিরুল। অনেকটা পথ যাবি। তোর মায়েরও তো চিন্তা হয় তাই না?” কথাগুলো বলতে পেরে যেন শান্তি পান ইন্দুবালার মা। মনিরুল গুছিয়ে নেয় তার বই। ব্যাগ। হাতের বাঁশি। লণ্ঠন নিয়ে উঠোনটা পার করে দিয়ে আসেন ইন্দুবালা। দাঁড়িয়ে থাকেন বেড়ার দরজায়। যতক্ষণ না মনিরুল সামনের আলটা পেরিয়ে অন্ধকারে মিশে যায়। মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছিলেন কি মনিরুলকে ইন্দুবালা? বেসেছিলেনই তো। না হলে কে লুকিয়ে লুকিয়ে মনিরুলের জন্য নাড় নিয়ে যেত? মুড়ির মোয়া। কুলের আচার। গপ গপ করে ছেলেটা খেত। আর এক টানা গল্প করে যেতো। কত যে গল্প ছিল মনিরুলের ওই ছেঁড়া কাপড়ের ব্যাগে ঠাহর করতে পারতেন না ইন্দুবালা। তাহলে কেন কোনোদিন মনিরুলকে নিজের ভালোলাগা, ভালোবাসার কথা বলতে পারেননি? ভয় করেছিল তাঁর? নাকি বড় অভিমান করেছিলেন। মনিরুলের ওপরে? মা আসতে বারণ করেছিল মনিরুলকে। তাই বলে সে আর এই পথই মাড়াবে না? স্কুলেও কথা বলবে না? লুকিয়ে লুকিয়ে থাকবে সব সময়? চোখ ফেটে জল আসতো ইন্দুবালার। টিফিন কৌটোতে পড়ে থাকতো আমলকি, নলেন গুড়ে পাকানো রুটি। তারা যে এক সাথে বসে দুজনে খেত। সে কথা কি মনিরুল ভুলে গেছে? খিদে পায় না বুঝি ইন্দুবালার? একদিন স্কুলে আসাই বন্ধ করে দিল মনিরুল। কারা যেন রটিয়ে দিল কলাপোতার ইন্দুবালার সাথে সাতদিঘি গ্রামের মনিরুলের প্রেম হয়েছে। চিঠিও নাকি পেয়েছে তারা। বাড়িতে বন্দি হলেন ইন্দুবালা। আলের ধারের জানলার কাছে চুপ করে বসে থাকতেন। সন্ধ্যের শাঁখ বাজতো। আজান তার ঠিক সময় মতোই হতো। কিন্তু মনিরুলকে আর আলোর পথে দেখা যেত না। এতটাও কেন ভালোবাসতো মনিরুল ইন্দুবালাকে? যে ভালোবাসার দাম দিতে গিয়ে হারিয়ে যেতে হয়েছিল তাকে।

বিয়ের অনেকদিন পরে শাশুড়ি যখন আর নেই। স্বামীর বাইরে থাকা এবং নেশার মাত্রা পাল্লা দিয়ে যখন আরও বেড়েছে। সংসারের হাল হয়েছে না খেতে পাওয়া মানুষগুলোর মতো। ইন্দুবালা হিমশিম খাচ্ছেন ছোট্ট দুটো ছেলে আর কোলের মেয়েকে নিয়ে, তখন একজন ভদ্রলোক দেখা করতে এলেন তাঁর সঙ্গে। সন্ধ্যের আলোতে জীবনের প্রথম প্রেমকে চিনতে একটুও দেরি হয়নি তাঁর। মনিরুলকে আরও সুন্দর লেগেছিল সেদিন। চশমা পরে চুপটি করে দাঁড়িয়েছিল দরজার সামনে সে। হাতে ছিল একটা চিরকুট। সেখানে পেন্সিলে অস্পষ্টভাবে লেখা ছিল ছেনু মিত্তির লেনের ঠিকানা। এত গল্প করা ছেলেটা এত শান্ত হয়ে যায় কী করে? বাড়ির ভেতরে এনে বসিয়েছিলেন মনিরুলকে। রান্নাঘরে ঢুকে আতিপাতি খুঁজছিলেন কী দিতে পারেন খেতে। অসহায় লাগছিল তাঁকে। বড়। কৌটোর তলানিতে পড়েছিল একটু চিড়ে সেইটুকুই ভাজলেন। সঙ্গে দিলেন চা। মনিরুলেরও বসার সময় ছিল না সেদিন। আত্মগোপন করে আছে যে সে কলকাতায়। পাকিস্তানের ঝানু গুপ্তচর ঘুরছে তাদের পেছনে। বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে একটা বড় দায়িত্ব নিয়ে এসেছে সে ইণ্ডিয়ায়। বালিগঞ্জের কোথাও ওরা একটা রেডিও স্টেশন খোলার চেষ্টা করছে। স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার। ইণ্ডিয়া সরকার তাদের সব রকম সাহায্য করছে। “একটা স্বাধীন দেশ পেতে চলেছি ইন্দু.. আর কোনো ভাবনা নেই…।” চোখ মুখ যেন জ্বলজ্বল করছে মনিরুলের। ইন্দুবালারও কি ইচ্ছে হচ্ছে না? আজ ওর হাত ধরে যদি সে সত্যিই বেরিয়ে যেতে পারতো। দেশের কাজে। কী ভালোই না হতো! কিন্তু যে চক্রব্যুহের মধ্যে তিনি তখন আটকে পড়েছেন সেখান থেকে বেরোবেন কী করে? একদিকে মাতাল নেশাতুর স্বামী। অন্যদিকে ছোটো ছোটো তিন ছেলে মেয়ে। ইন্দুবালার জগৎ তখন অন্য। মল্লিক বাড়ির বউ তিনি। চলে যাবার আগে ইন্দুবালার হাতে মনিরুল দিয়ে গিয়েছিল ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ বইটা। তার প্রথম পাতায় সই করে লেখা ছিল “ইন্দুকে..জসীমউদ্দিন”। চোখে জল ভরে এসেছিল ইন্দুবালার। এমন উপহার আজ পর্যন্ত কেউ তাকে দেয়নি। মনিরুল বলেছিল কবির সাথে দেখা হওয়ার বিস্তারিত গল্প। বলেছিল ইন্দুবালার বাড়ির কথা। তাদের ছোট্ট গ্রাম কলাপোতার কথা। তাল পাটালি আর তিলের নাড়র কথা। কবির চোখে যেন জল দেখেছিল মনিরুল। সঙ্গে সঙ্গে লিখে দিয়েছিলেন তিনি। এখনও মনে আছে তাহলে সব কিছু মনিরুলের? ভোলেনি সে কিছুই? না, মনিরুল ভুলে যায়নি। মনিরুল ভুলতে পারে না। বিয়েও করেনি সে। করতে পারতো না মণিরুল। রূপাই কি বিয়ে করেছিল আর? কবরে মাথা রেখে মরেছিল সে। মনিরুল মরবে দেশের জন্য। স্বাধীনতার জন্য। বাংলা ভাষার রাষ্ট্র গড়ার জন্য। এটা তার ভালোবাসার দিব্যি। এত কথা সেদিন মনিরুল ইন্দুবালাকে বলে আসতে পারেনি। বলে আসা যায় না। কিছুটা সঙ্গোপনে বয়ে বেড়াতে হয়। আর কিছুটা হারিয়ে যায়। মনিরুল সেটা জানতো। এরপর থেকে ইন্দুবালা পাগলের মতো খুঁজে চলতেন স্বাধীন বাংলার রেডিও স্টেশন। পেয়েও যেতেন মাঝে মাঝে। বাঁশির সুরে চিনতে পারতেন মনিরুলকে। হঠাৎই মনে পড়ে যেত কপোতাক্ষের ঘাট। সন্ধ্যেতে বাড়ির দাওয়া। স্কুলের মাঠ। বিশালাক্ষী তলা। মনিরুলকে ভোলা যায় না। মনিরুলকে ভুলতে পারেননি ইন্দুবালা। কিন্তু সেই মনিরুলও সত্যি সত্যি হারিয়ে গিয়েছিল একদিন চিরকালের মতো। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো দেখা হয়েছিল ইন্দুবালার সাথে। সে তো আরও একটা ভুবন কাঁপানো গল্প। সেদিকে এখন প্রবেশ করলে ইন্দুবালার প্রথম জীবন অধরা থেকে যাবে। সংসারটা আর যে আর ঠিক করে করা হয়ে উঠবে না।

সেই যে এক ভরা বর্ষায় বিয়ে হয়ে ছেনু মিত্তির লেনের স্যাঁতসেঁতে বাড়িটায় ঢুকলেন তারপর তো আর কোথাও যাওয়া হয়নি তাঁর। একটিবারের জন্যেও না। বাপের বাড়ি যাওয়া কঠিন ছিল। খরচ ছিল, ভিসার ব্যাপার ছিল। এক এক করে সব গয়না বিক্রি করে সংসার চালাতে গিয়ে নিজের দেহকে অলঙ্কারহীন করে ফেলেছিলেন ইন্দুবালা। মায়ের সামনে দাঁড়ালে তক্ষুনি বুঝে যাবে যে। তাই বিয়ের পর একমাত্র গঙ্গাস্নান ছাড়া আর কোথাও যাননি ইন্দুবালা। সেই যে এসে মল্লিক বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকেছিলেন আজও আছেন। কিন্তু তার জন্য কোনো খেদ নেই তাঁর মনে। বিয়ের পরে নতুন বউকে স্বামীর বাড়িতে এসে প্রথম দিনই দেখতে হয় রান্নাঘর ভরা আছে তোলা তোলা খাবারে। ডেকচি ভরা ডাল। কড়া ভরা মাছ। হাঁড়ি ভরা ভাত। দই, মিষ্টি। পেতলের পাত্র থেকে উথলে ওঠা দুধ। চারিদিকে ভরা ভরা সব কিছু। ভরা দেখলে তবেই না গেরস্থের সংসার সব ভরে উঠবে। কোলে-কাঁখে মা ষষ্ঠী কৃপা করবেন বছরের পর বছর। “শ্বশুরবাড়িতে প্রথমে রান্নাঘরে গিয়েই যেন হ্যাংলার মতো চোখ বড় বড় করে সব কিছু দেখো না।” পাখি পড়ানোর মতো শিখিয়ে দিয়েছিলেন মা। “যা লোভী মেয়ে একটা। হয়তো দেখা গেল রান্নাঘরে ঢুকেই শুক্তোর পাত্র নিয়ে বসে গেল। পাঁচ ভাজা থেকে নারকেলগুলো তুলে তুলে খেতে শুরু করলো। আনারসের চাটনি আর কারোর জন্যে একটুও রইলো না। তখন কি বেইজ্জতিটাই না হতে হবে কুটুম বাড়িতে।” ছোটো ভাই পাশ থেকে বলে “আর রসগোল্লা মা? কলকাতার বড় বড় মিষ্টি। সেগুলো দিদিভাই খাবে না? কিরে খাবি না?” বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়েছিলেন ইন্দুবালা। বয়ে গেছে তাঁর একটা অপরিচিত বাড়িতে গিয়ে শুক্তোর হাঁড়ি নিয়ে বসতে। নারকেল ভাজা খেতে। কত যে আনারসের চাটনি করো? ওই তো গাছেই পচ্ছে ফলগুলো। বয়ে গেছে… বয়ে গেছে… বয়ে গেছে। খাবেন না ইন্দুবালা কিছু। সামনে এসে বাবা, বাছা করলেও নয়। তখন অবশ্য বুঝতে পারেননি এতসব কিছু ইন্দুবালার কপালে জুটবে না কোনোদিন। প্রথম বউ মারা যাবার এক বছরের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে বলে সব কিছু লুকিয়ে রেখেছিল শ্বশুরবাড়ি। এমনকি বিয়েটাও। হঠাৎ হয়ে গেলে যেমনটা হয় ঠিক তেমনটা। অথচ এইভাবে কলাপোতায় বিয়ে হয়নি ইন্দুবালার। রীতিমতো জাঁক করে তিন গ্রামের মানুষ খাইয়ে নিজের মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন ব্রজমোহন। ঠাম্মা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। বরযাত্রী বলতে বরের সাথে মোটে চারটে মানুষ এসেছে? পুরোহিত, নাপিত আর বরের দুই বন্ধু? ব্যস? বাবা বলেছিল “বুঝতে পারছো না কেন মা পাসপোর্ট ভিসার খরচ নেই? ওদিকেও তো ওদের অনুষ্ঠান আছে নাকি?” কিন্তু এদিকে সত্যিই কোনো অনুষ্ঠান ছিল না। কোনো লোকজন আসেনি। সানাই বাজেনি। একটা ন্যাড়া বাড়ি দেখে বাবার শুধু চোখ উজিয়ে জল এসেছিল। বাড়ির বাইরে থেকে মেয়েকে বিদায় জানিয়ে ভাইয়ের হাত ধরে তক্ষুনি ফিরে গিয়েছিলেন দেশে। মেয়ের মুখের দিকেও তাকাতে পারেননি। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন কী মারাত্মক ভুলটা সত্যি তিনি করে ফেলেছেন এই বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিয়ে। ইন্দুবালার ইচ্ছে করছিল ছুটে চলে যান বাবা-ভাইয়ের সাথে। যেতে পারেননি। তারও বেশ কিছুদিন পরে পোস্টকার্ডে পেয়েছিলেন বাবার মৃত্যু সংবাদ। তখন আর যেতে পারেননি। শাশুড়ি ছিলেন অসুস্থ। গয়না বিক্রি করে যাওয়ার মতো অবলম্বনটুকুও ছিল না। নদীর ধার থেকে বিদায় দিয়ে এসেছিলেন মা-ঠাম্মাকে। বাবাকে বিদায় দিয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ির দরজায়। ভাই এসে দিদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সেও জানে কোথায় নিয়ে যাবে তার দিদিকে? আর কীভাবে? ততদিনে যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে। একের পর এক গ্রাম জ্বলছে। ভাইকে সেবারে ঠিক মতো খাওয়াতেও পারেননি ইন্দুবালা। কবেকার সেই পুরোনো কথা এখনও এঁটুলির মতো আটকে থাকে ইন্দুবালার সাথে। সবাইকে হারিয়ে এখন তিনি একা। তার কলাপোতার ভিটেবাড়ির মতো। ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের মতো। বাগানের পেছনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছটার মতো একা।

এইসব কিছু ভাবলে এখনও চিকচিক করে ওঠে ইন্দুবালার চোখ। মাথা ঢিপ ঢিপ করে। শরীর করে আনচান। মনে হয় প্রেশারের ওষুধ খেতে বুঝি ভুলে গেছেন। বেতের ছোট্ট ঝাঁপি খোলেন। ওষুধ খান। ওপরের জানলা দিয়ে সকালের বাগানটাকে এই ছেনু মিত্তির লেনেও স্বপ্নের মতো মনে হয়। রান্নাঘর ভরা খাবার শাশুড়ি দেখাতে পারেননি ঠিকই। কিন্তু তাঁর দূরদৃষ্টি ছিল প্রখর। বুড়ি হাত ধরে নিয়ে এসেছিলেন নতুন বউকে বাড়ির পেছনের বাগানটায়। বলেছিলেন, “চোখ ভরে দেখ বউ। কেমন উপোছাপা হয়ে আছে আমার সংসার। বেধবা মানুষ আমি। শুভকাজে ভাতের হাঁড়ি চাপানোর অধিকার নেই আমার। নিজের সংসারে অমঙ্গল করতেও চাইনে। বাগান থেকে নিজের ইচ্ছে মতো যেটা মনে হয় সেটা তুলে আন গে। নিজের বউভাতের রান্নাটা যে আজ তোকেই করতে হবে”। কেমন যেন চমকে ওঠেন ইন্দুবালা। এর আগে কলাপোতায় রান্না করেননি এমনটা নয়। জোর করে ঠাম্মা রান্না করাতো নিজের কাছে নিয়ে বসে। কখনও সখনও নিজেরও ইচ্ছে করতো। ভাইকে বলতেন “যা তো কলাপাতা কেটে নিয়ে আয়। আজ চড়ইভাতি হবে”। ভাই আরও কয়েকজনকে জুটিয়ে একগাদা শুকনো খেজুরের পাতা টানতে টানতে নিয়ে চলে আসতো। খেজুরের শুকনো পাতার আঁচে ইন্দুবালা খুদ জাল দিতেন। ছোটো ছোটো আলু কেটে, নতুন ওঠা পেঁয়াজ কুচো করে, লঙ্কা চিরে লাল করে ভাজতেন। সবাই মিলে উঠোনে বসে যেন অমৃত খাচ্ছেন বলে মনে হতো। কিন্তু তাই বলে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতে ঢুকতেই তাকে রান্না করতে হবে? এমনকি নিজের বউভাতের রান্নাটাও? এই যে বাবা বলেছিল ছেলে নাকি মাস্টার? শিক্ষাদীক্ষা আছে। দোতলা পাকা বাড়ি। জমিদারের বংশ। রাজ্যের চাকর-ঝি। “আমাদের ইন্দু খাটের ওপর পা তুলে বসে খাবে”। খুব একটা বেশি দিন লাগেনি নিজের শ্বশুরবাড়ির স্বরূপ চিনতে ইন্দুবালার। যে স্বামীকে ‘মাস্টার’ বলে পরিচয় করানো হয়েছিল মেয়ের বাড়িতে সম্বন্ধ পাতানোর সময়, তিনি মাস্টার ছিলেন বটে তবে তাস, পাশা, জুয়ার। চিৎপুর যাত্রা পাড়াতেও বেশ যাতায়াত ছিল তাঁর। রথের পরে পরেই আর ঘরে মন টিকতে চাইতো না। মুখে বলতেন পালাকার। কিন্তু আদপেই তার ধারে কাছে কোনো কলম কোনোদিন দেখেননি ইন্দুবালা। এমনকি এক ছত্র লিখতেও না। কাজেই স্বামী মাস্টার রতনলাল মল্লিক যাই বলতেন তাই যে ইন্দুবালা বিশ্বাস করে যেতেন তেমনটা নয়। কিছুটা বিদ্যে তাঁর পেটেও ছিল। শুধু প্রথম যেদিন তাঁর সামনে কাবুলিওয়ালা রতনলালকে পিটলো সেদিনই সব কিছু আরও পরিষ্কার হল। হেন নেশা ছিল না যা স্বামী করতেন না। এপাড়া বেপাড়ায় তাঁর ভালোবাসার মানুষের অভাব ছিল না। শুধু তারা ভালোবাসতো টাকার বিনিময়ে। আর টাকা যেত ইন্দুবালার গয়না বিক্রি করে। কাবলিওয়ালা যখন বাড়ির সামনে অমন বড় মানুষটাকে বেধড়ক জুতো খুলে মারছে কেউ এগিয়ে যায়নি। অন্য শরিকরা মুখ চাপা দিয়ে হাসাহাসি করছিল। শাশুড়ি গিয়েছিলেন গঙ্গা স্নানে। ইন্দুবালা কী করবেন বুঝতে না পেরে মাথায় ঘোমটা টেনে সটান রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। কী মনে হয়েছিল কাবলিওয়ালাটার কে জানে। রতনলালকে ফেলে রেখে দু দিনের নোটিশ দিয়ে চলে গিয়েছিল সে। যাবার আগে বলে গিয়েছিল “এমন ছ্যাঁচড়া আদমির সাথে আছিস কী করে মা তুই?” সেদিনই মাস্টার রতনলাল মল্লিকের অন্য নামটাও জেনে যান ইন্দুবালা। সবাই তাকে অলক্ষ্যে ছ্যাঁচড়া বলে ডাকে। দৈব্যের কী পরিহাস বিয়ের পরে প্রথম দিন শ্বশুরবাড়ির ছোট্ট বাগানে শাশুড়ি যখন ইন্দুবালাকে একা দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে গেলেন তখন ইন্দুবালা দেখেছিলেন মাচার ওপরে পুঁইশাকের নতুন পাতা ওঠা ডগা। মাথা উঁচু করে যেন আকাশ দেখতে চায় তারা। ঝুড়ি ভরে পুইশাঁক তুলে নিয়ে এসেছিলেন মনের আনন্দে। কারণ তিনি জানতেন বাবা মেয়েকে দিয়ে যাওয়ার সময় মিষ্টি, কাপড় আরও অনেক কিছুর সাথে দিয়ে গেছেন দুটো বড় ইলিশ। ইলিশের মাথা আর পুঁইশাক দিয়ে অসাধারণ ছ্যাঁচড়া রান্না করেছিলেন সেদিন ইন্দুবালা। অত বড় ডাকাত চেহারার স্বামী আধ কড়াই ছ্যাঁচড়া একা নিজেই সাবাড় করেছিলেন। প্রথম রাতে তাই সোহাগ উঠেছিল তার দিক থেকে মাত্রা ছাড়া। ইন্দুবালা এত সবের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। যখন ঘাড়ের ওপর ওই দশাসই চেহারা চেপে বসে একটু একটু করে কৌমার্য শুষে নিচ্ছিল তাঁর, তখন একবারের জন্যেও মনিরুলকে মনে পড়েনি ইন্দুবালার। ব্যথায় চোখ বন্ধ করলে উঠোনের জোনাকি গুলোকে দেখতে পেয়েছিলেন স্পষ্ট। পুকুর পাড়ের কাঁচা মিঠের আম তার ডালপালা নেড়ে ফিসফিস করে বলেছিল “নিয়তি…ইন্দুবালা..নিয়তি…”।

সামনের ভটচাজ বাড়ি থেকে গিন্নি তাঁর নাতনি রাকাকে পাঠিয়েছে। সে নাকি এবার সায়েন্স না কীসব নিয়ে পড়ছে। কলেজে ভর্তি হয়েছে। একটা সুন্দর দেখতে ট্যাব তার হাতে। ইন্দুবালা আঁচলে চশমা মোছেন। এগিয়ে আসেন রাকার দিকে। এক্কেবারে মায়ের মুখ বসানো। থুতনি ধরে চুমু খান। “ভালোই হয়েছে। ভাগ্যিস শান্টুর মতো হোসনি। যা দস্যু ছিল ছেলেটা। মেয়েরা মায়ের মুখ পেলে জীবনে শান্তি পায়। জানিস কি সেটা?” রাকা মাথা নাড়ে। এইসব কিছুই সে জানে না। জামশেদপুরে থাকতো। বাবা কলকাতার কলেজে ভর্তি করে দিয়ে বললো এখানেই পড়াশুনো করো। পড়াও হবে আর দাদু-ঠাম্মাকে দেখাও। হাসেন ইন্দুবালা। “তা ভালো। তারা ছাড়া আর ওদের কেই বা আছে বল? তা সায়েন্স নিয়ে পড়ছিস। অতবড় কলেজ। আমি তোকে কী পড়াবো? ছেলেদেরই আমি পড়াতে পারিনি কোনদিন। সব লোক রাখতে হয়েছিল। ইতু তো দাদাদের কাছেই পড়েছে। আমি কী শেখাবো বলতো তোকে?” আমতা আমতা করে বলেন ইন্দুবালা। এমনিতেই গা টা ম্যাজম্যাজ করছিল বলে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। আচারের বয়ামগুলো জানলার রোদে রাখেন। মাথার ওপর কাপড়ের সাদা ঢাকনাগুলোকে পালটান। ধনঞ্জয়কে উনুন ধরাতে বলেন। রাকা পেছন পেছন ঘুরঘুর করে। ভালো লাগে ইন্দুবালার। নিজের নাতি-নাতনিগুলোর থেকেও বয়সে কত ছোটো। বাড়িতে এমন একটা কেউ না থাকলে চলে? কেমন যেন ছেলেগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। মেয়েটার কথাও। নাতি নাতনি-নাতবউ ভরা সংসার তাঁর। কী এমন ক্ষতি হতো এই বাড়িটায় সবাই মিলে একসাথে থাকলে? ঠিক আছে। না থেকেছে ভালো হয়েছে বাবা। তারপর সেই তো কাটাকাটি, লাঠালাঠি। কম ঝক্কি পোহাতে হয়েছে এক সময়ে এই বাড়ির ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে। ভাগ্যিস উনি বেঁচে থাকতে থাকতে ব্যাপারটা সেরে গিয়েছিলেন না হলে তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে গঙ্গায় গিয়ে ডুবে মরতে হতো। ভালোবাসতেন কি বাবু মাস্টার রতনলাল ইন্দুবালাকে? জিজ্ঞেস করেননি কোনোদিন ইন্দুবালা। স্বামীর সাথে কথা হতো কতটুকু? শুধু শেষ কয়েকদিন বিছানার সাথে যখন মিশে গিয়েছিলেন নিজের মায়ের মতোই, পেটটা ফুলে উঠেছিল বেঢপ। ডাক্তার বলেছিল জল জমেছিল পেটে। অথচ মধ্যরাতে যখন গঙ্গার জল খেতে চেয়েছিলেন, ইন্দুবালা জল গড়িয়ে এনে দেখেছিলেন সব শেষ। বাচ্চাগুলোর তখনও বোঝার বয়েস হয়নি কী ক্ষতি হল তাদের জীবনে। নাকি এই নরক থেকে চিরকালের মুক্তিলাভ!

ইন্দুবালা রোয়াকে নেমে রান্নার বাসনগুলোকে ভালো করে জল ঝরাতে দেন। রাকা অবাক হয়ে জানতে চায় “এই এতকিছু ইউজ হয় তোমার হোটেলে দিদা?” ইন্দুবালা হাসেন। কী আর উত্তর দেবেন ওইটুকু মেয়েকে? দোতলার ঘরে বড় কাঠের সিন্দুকটা দেখালে তো অক্কা পাবে। সব নিজের টাকায় বানানো। হাজার লোককে এখনও এক বেলায় খাওয়াতে পারেন ইন্দুবালা। রান্না ঘরে ঢুকে উনুনের আঁচ দেখেন। রাকা যাই দেখছে তাতেই অবাক হয়ে যাচ্ছে “ওহ মাই গড। কয়লার উনুন? গ্যাস থাকতে এখনও তুমি এইভাবে রান্না করো দিদা? আমার কলেজে বললে সবাই এক্ষুনি ছুটে আসবে দেখতে। ইভ আমাদের ম্যামও।” ঘুরে তাকান ইন্দুবালা। “এই তো বললি কীসব সায়েন্স নিয়ে পড়ছিস, তাতে উনুন দিয়ে কী হবে? আর তোর কলেজের লোকজনই বা দেখতে আসবে কেন?” রাকা হেসে ফেলে। “তুমিও দিদা। পড়ছি তো হোম সায়েন্স নিয়ে। কুকিং আমার স্পেশাল পেপার। এক্কেবারে হান্ড্রেড মার্শ। উইথ প্র্যাকটিকাল। তাই না তোমার কাছে এসেছি।” ইন্দুবালা এতক্ষণে যেন ব্যাপারটা ঠাহর করতে পারেন। “রান্না নিয়ে পড়ছিস নাকি তুই? সেটা আগে বলবি তো মেয়ে। সায়েন্স টায়েন্স শুনে আমার তো হাত-পা ঠাণ্ডা”। ভটচাজ গিন্নি চালাক চতুর। ঠিক বুঝেই নাতনিকে পাঠিয়েছে ইন্দুবালার কাছে। “বই-পত্তর, আর তোদের ওই কম্পিউটারের থেকে বেশি জানে বুড়ি। শিখে নিতে পারলে আর তোকে ঠেকায় কে”। ততক্ষণে ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের প্রথম আঁচ গনগনে হয়ে যায়। আগুনের পাশে পেতলের থালায় সিধে রাখা। আতপ চাল। একটা গোটা পান। কাঁঠালি কলা। একটা আস্ত সুপারি। কোনোদিন মিষ্টি জোটে তো ভালো। না হলে বাতাসা। এতে অগ্নিদেব খুশি হয়। গেরস্থ বাড়িতে অনুষ্ঠানে হাঁড়ি চাপানোর আগে রান্নার ঠাকুররা এইসব চেয়ে চিনতে নিত। এখনও হয়তো নেয়। কিন্তু ইন্দুবালা এই আচার মেনে চলেন প্রতিদিন। মানুষের মুখের অন্ন বিক্রি করেন। যা তা কথা নয়। সামর্থ্য যদি থাকতো সবাইকে বিনা পয়সায় খাওয়াতেন ইন্দুবালা। তেমন খদ্দের যে নেই তা নয়। সেই লিস্টের খাতা না হয় অন্য কোনোদিন খোলা যাবে। ইন্দুবালার ঠাম্মা উনুনের প্রথম আঁচে কয়লার ওপর ছড়িয়ে দিতেন অল্প করে চিনি। এতে আঁচটাও ভালো হয় আর অগ্নিদেবকে তুষ্টও করা হয়। ইন্দুবালা উনুনের পাশে ধূপ জ্বেলে দেন। উনুনের ওপর মুঠো করে ছড়িয়ে দেন চিনি। আঁচের ওপর ধক করে জ্বলে ওঠে আগুন। হাতজোড় করে প্রণাম করেন। “সবার পাতে অন্ন জুগিও ঠাকুর”। রাকা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে দেখে। এইসব তাদের কলেজে শেখায়নি কোনদিন। তাদের তো সব মডিউলার কিচেন। মর্ডান ইকুইপমেন্ট। জল গরম করতে হলে জাস্ট টাইমার দিয়ে দাও। ইন্দুবালা বড় হাঁড়িতে জল বসান। দুমুখো উনুনে আর একটাতে বসান বড় লোহার কড়াই। গরম হয়ে গেলে মুগের ডাল ভাজতে থাকেন। কেমন করে ডাল আন্দাজ করতে হয়। কেমন করে জল। মাথা গুনে ভাতে চালের পরিমাপ ইন্দুবালা শেখান রাকাকে। মনে মনে ভাবেন এইভাবে একদিন তাঁর ঠাম্মা তো তাঁকে রান্না শেখাতো। শুধু কত রকমের ফোড়ন হতো সেগুলো সব মনে রেখে দিতেন। এখনকার রাকা সেগুলো তার ট্যাবে লিখে রাখে চটপট। ছবি তোলে। ভিডিও করে। বাড়ির বাইরে গাড়ি এসে থামে। কেউ মা বলে ডাকে। ইন্দুবালা ঘুরে তাকান। বড় ছেলে, মেজো ছেলে তাদের বউদের নিয়ে এসেছে। যাক বাবার মারা যাবার দিনটা তাদের তাহলে মনে আছে। যদিও মনে থাকার কথা নয়। ইন্দুবালা মনে করিয়ে রাখতেন সেই ছোট্ট বেলা থেকে। রক্তকে অস্বীকার করা মানে নিজেকে অস্বীকার করা। ছেলেরা এসেছে অবশ্য তারিখটাকে লক্ষ্য করেই। বাবাকে তো তাদের মনে নেই। কিন্তু বিশেষ দিনটা মনে আছে। এই দিনে মা যে ছ্যাঁচড়াটা রান্না করে তা সারা বছর যেন মুখে লেগে থাকে।

আম তেল

বিয়ের পর সবুজ রঙের একটা ট্রেনে করে ইন্দুবালা যখন শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেছিলেন তখন তাঁর কাছে ইণ্ডিয়া দেশটা নতুন। খুলনার কলাপোতা গ্রামের বাড়ির উঠোনে নিভু নিভু আঁচের সামনে ঠাম্মা, বাবার কাছে শোনা গল্পের সাথে তার ঢের অমিল। এত বড় স্টেশন আগে কোনোদিন দেখেননি ইন্দুবালা। দেখবেনটাই বা কী করে? এই যে প্রথম ট্রেনে উঠলেন তিনি। নামলেনও। মাথার ওপর রাজপ্রাসাদের মতো ছাদ দেখলেন। এতবড় বাড়ি দেখলেন। এত লোক! সবাই যেন মাথা নীচু করে সামনের দিকে ছুটছে। কেউ কারো সাথে দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে একটুও কথা বলছে না। কুশল বিনিময় করছে না। যে যার খেয়ালে আছে। সামান্য অসতর্ক হলে, চলাফেরার একটু এদিক ওদিক হলে সবাই বুঝি সবার গায়ে হুড়মুড়িয়ে পড়বে। তখন ইন্দুবালার জিনিসপত্রের কী হবে? নেই নেই করেও তো সঙ্গের জিনিস কম নয়। মা বারবার বলে দিয়েছিল “চোখ ছাড়া করবি না ইন্দু”..। ঠাম্মা বলে দিয়েছিল “আগলে রাখবি সব কিছু”..। যদিও অদৃষ্ট বড় নির্মম খেলা খেলেছিল ইন্দুবালার জীবন নিয়ে। কোনো কিছুই তিনি আগলে রাখতে পারেননি, একমাত্র এই ভাতের হোটেলটা ছাড়া। তবুও সব কিছুর ওপর বড় মায়া তাঁর। ঘরের কোণে দাঁড় করিয়ে রাখা ক্ষয়ে যাওয়া নারকেলের ঝাঁটা থেকে পোড়া দেশলাইয়ের কাঠি। কিছুতেই মন চায় না কোনো কিছু ফেলতে। সব কিছু বুড়ি জমিয়ে রাখেন নিজের করে। তাঁর উপচে পড়া স্মৃতির মতোই।

মাঝে মাঝে এইসব জিনিসপত্র নিয়ে যে গোল বাধে না তেমনটা নয়। বেশ ভালোই চিৎকার চেঁচামেচি হয়। ধনঞ্জয় তখন তোক ডেকে নিয়ে এসে রেগেমেগে কিলো হিসেবে বিক্রি করে সব কিছু। বুড়ি ঘুরঘুর করে চারপাশ। “ওরে মূর্খ তুই কী করে জানবি .. ঠাম্মা বলতো বাড়ির আগাছাটাও তো দরকারি। নাহলে হরিমতি খাবে কী? আর দুধ দেবেই বা কী করে?” ধনঞ্জয় কাঁই মাই করে ওঠে। “বারবার তোমার খুলনার কলাপোতার গল্প শুনিও না তো মা। এখানে তোমার কোথায় হরিমতি? পোড়া দেশলাইয়ের কাঠি তোমার কাছে আগাছা? এই এত এত ঘিয়ের খালি শিশি? রঙ চটে যাওয়া টিনের বাক্স?” টান মেরে উঠোনে ফেলেছিল ধনঞ্জয়। কেমন যেন আর্তনাদ করে উঠেছিল সেই কতদিন আগের ফুলছাপ তোরঙ্গটা। ডালাটা হাঁ করে খুলে পড়েছিল উঠোনে। ঠিক মরে যাওয়া মানুষের মতো। তার মুখ দিয়ে কিলবিল করে বেরোচ্ছিল আরশোলা। তারাও যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম খুলনার কলাপোতার স্বপ্ন নিয়ে বংশ বিস্তার করে চলেছে। “এটা তুই কী করলি ধনঞ্জয়? আমার এত দিনের জিনিসটা তোর কাছে পুরোনো মনে হলো?” ইন্দুবালা এগিয়ে যাচ্ছিলেন একটু একটু করে তোরঙ্গটার দিকে। ধূসর হয়ে যাওয়া সবুজ রঙের ওপর লাল লাল ফুল। সেগুলোও কেমন যেন ঝরে পড়ার আগে তাকিয়ে আছে ইন্দুবালার দিকে। “আমার বিয়ের সময় বাবা কিনেছিলেন ঢাকা থেকে। তারপর তিনটে নদী পার করে নিয়ে গিয়েছিলেন খুলনা। সেখান থেকে এই কলকাতা।” ধনঞ্জয় ক্ষয়ে যাওয়া নারকেল ঝাঁটায় আরশোলা মারতে মারতে বলে “তাহলেই বুঝে দেখো আর ওর জেবন প্ৰেদীপ থাকতে পারে? নিবে গেছে গিয়ে কবে।” ছ্যাঁৎ করে বুকে বাজে যেন ধনঞ্জয়ের কথা। তোরঙ্গের জীবন প্রদীপ নিভতে পারে তাহলে ইন্দুবালার নয় কেন? তাঁরও তো কম পথ অতিক্রম করা হলো না। এখনও কোন মায়ায় আটকে আছেন তিনি? কেনই। বা আছেন? কেমন যেন দম বন্ধ লাগে তাঁর। ঘাড় তুলে তাকান ইন্দুবালা এক টুকরো আকাশ দেখার জন্য। কিন্তু এখানে আকাশ কোথায়? ওই তো চার কোণের চৌখুপ্পি। তার ওপরে বাড়ির পেছনের আম গাছটা ঝাঁকড়া হয়ে এসে পড়েছে খানিকটা ভেতরে। কাঁচা আম গুলো পুরুষ্টু হয়েছে গ্রীষ্মের রোদের খর তাপে। মন খারাপটা যেন কোথাও ঝুপ করে গায়েব হয়ে যায় ইন্দুবালার। আম দেখার আনন্দে এগিয়ে যেতে গিয়ে পায়ে কিছু একটা ঠেকে। নীচু হয়ে কুড়িয়ে নেন। সেই কবেকার প্রথম ট্রেনে চড়ার টিকিট!

“বিলাতি আমড়া খাবে গো নতুন বউ? বিলাতি আমড়া?” ফেরিওয়ালা হাঁক দিয়ে যায় ট্রেনের কামরায়। মুখের সামনে এনে দেখায় আমড়াগুলো। ততক্ষণে ইন্দুবালার কপালের চন্দন ফিকে হয়ে গেছে। গলায় রজনীগন্ধার মালা বাসি। চোখের কাজল কিছুটা ধেবড়ে গেছে। বাকিটা রাখা আছে বিস্ময়ে মাখামাখি হয়ে। মাথা নাড়েন ইন্দুবালা। না, তিনি খাবেন না। জানলার দিকে তাকিয়ে ভাবেন এই ফল আবার কিনে খেতে হয় নাকি? তাঁদের গ্রামে ফেলা-ছড়া যেত। কাঁচা কাঁচা পেঁসো আমড়া পেড়ে আনতো ভাই। মা চাটনি করতো। নুন দিয়ে কুটি কুটি করে কেটে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে দিদি ভাইতে খেতো বোসদের পুকুর পাড়ে বসে। বৃষ্টির জল মেখে আমড়া পাকতো অম্বুবাচি পার করে। সেই সময় ঠাম্মার প্রায় সারাদিন উপোস। এক বেলা ফলাহার। কখনও ছাতু ভিজে। কিংবা সারাদিন মিছরির জল। বাবা এনে দিতেন সন্দেশ, কলা। সেইসব মুখে তুলতেন না তিনি বড় একটা। সব যেত নাতি নাতনির পেটে। অত বার চা খাওয়া যার অভ্যেস ছিল, সেও ওই কটা দিন চা না খেয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিত। ইন্দুবালা বিধবা হবার পর এতসব কিছু মানেননি। তাঁর পক্ষে সম্ভবও ছিল না। আর লছমী থাকতে তা করতেও দিত না। মাস্টার রতনলাল মল্লিক তাঁকে অনেক ছোটো বয়সে বিধবা করে কেটে পড়েছিলেন পরপারে। দায় ফুরিয়েছিল তাঁর। বড় ছেলেটাও এত ছোট তখন যে মালসায় ফুটিয়ে হবিষ্যির ভাত খাবে কী করে! মাঝরাতে মরেছিলেন মাস্টার রতনলাল মল্লিক। সকাল গড়িয়ে গেলেও কোনো আত্মীয় কুটুম কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। এমনকি যাদের সাথে নেশা করে ভাসিয়ে দিতেন সেই ইয়ারদোস্তরাও না। মাছ বিক্রি করতে এসে দরজা ধাক্কিয়ে ছিল লছমী। নীচে সাড়া শব্দ না পেয়ে সটান ওপরে উঠে এসেছিল সে। দেখেছিল মরা আগলে বসে আছে মল্লিক বাড়ির বাঙাল বউ ইন্দুবালা। দৃষ্টি স্থির। চুল এলোমেলো। চোখে জলের আভাসটুকু পর্যন্ত নেই। পাথরের মতো বসে আছে একটা মানুষ। মড়ার পাশেই ঘুমোচ্ছে তিন-তিনটে বাচ্চা। লছমী ডেকেছিল “মা..”। ইন্দুবালা ফিরে তাকিয়ে ছিলেন তার দিকে। সেই চাহনি দেখে লছমী কী বুঝেছিল কে জানে? বাজার থেকে জড়ো করে নিয়ে এসেছিল লোক। তারাই খাট, ফুল, খই জোগাড় করেছিল। শ্মশানে গিয়েছিলেন ইন্দুবালা তিন ছেলে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে। নিজে হাতে স্বামীর মুখাগ্নি করেছিলেন। শ্রাদ্ধও।

নিয়মভঙ্গের দিন লছমীর এনে দেওয়া ট্যাঙরা মাছ আর বাড়িতে দেওয়া বড়ি দিয়ে একটা তরিজুতের ঝোল বেঁধেছিলেন। অনেক দিন পর ছোটো ছোটো ট্যাঙরার মাথাগুলো চুষে চিবিয়ে খাওয়ার সময় মনে পড়েছিল ঠাম্মার কথা। অম্বুবাচিতে সারাদিন উপোস করে থাকার পর ছাতু খেতে খেতে তাঁর যখন আর কিছু মুখে রুচতো না তখন খোসা ছাড়িয়ে পাকা আমড়া মুখের কাছে ধরতেন ইন্দুবালা। ঠাম্মা চুষে চুষে সেই বুনো ফলের সব রসটুকু খেয়ে নিতো। সারা ঘর ম ম করতো পাকা আমড়ার গন্ধে। এসব কথা কোনোদিন ইন্দুবালা কাউকে বলতে পারেননি। এমনকি ছেলে-মেয়েদেরকেও না। নাতি নাতনি তো অনেক দূরের কথা। কিছু কিছু জানতো মাছওয়ালী লছমী, কিন্তু সে তো আজ কোন সুদূরের অতিথি।

সেদিনের সেই ট্রেনের কামড়ায় বিলাতি আমড়াই শুধু উঠেছিল তাই নয়। তার সাথে ছিল চিরুনি, পাতাবাহারে ফুল গাছ, সূঁচ, বশীকরণের ওষুধ, কৃষ্ণনগরের সরভাজা, বসিরহাটের কাঁচাগোল্লা আরও কত কিছু। ভাই মাঝে মাঝে বাবার কাছে বায়না করে খাচ্ছিল। কিন্তু ইন্দুবালার নিজের খেতে ইচ্ছে করেনি কিছু। এমনকি নতুন জরির চুল বাঁধার ফিতে দেখেও কিনতে ইচ্ছে হয়নি। জানলার পাশ দিয়ে তখন বেরিয়ে যাচ্ছিল মাঠ-ঘাট, নদী, নৌকা, গ্রাম। ইঞ্জিনের কয়লার কালো ধোঁয়া। চোখ বড় বড় করে দেখছিলেন তাঁর বয়সী মেয়েরা কাজে যাচ্ছে। কলেজে যাচ্ছে। ইন্দুবালা কলেজ যেতে চেয়েছিলেন। পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোথা থেকে যে কী হলো! মনিরুলের সজল কালো চোখ দুটো বাঁধা থাকলো তাঁর অন্তরে। নক্সী কাঁথার মাঠের সাজুর মতো তাকে সব স্মৃতি উপড়ে নিয়ে চলে আসতে হলো এপারে। রূপাই থেকে গেল অনেক দিনের পুরোনো অতীত হয়ে।

ট্রেনটা জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো কোন একটা স্টেশনে। কান ফাটানো আওয়াজ শোনা গেল বোমার। পুলিশের বন্দুকের। ঝুপ ঝুপ করে ট্রেনের জানলাগুলো পড়তে শুরু করলো। ইন্দুবালা তারই মধ্যে দেখলেন একদল ছেলে-মেয়েকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠি চালালো। কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়লো। এইসব চেঁচামেচিতে পাশে বসে ঝিমোতে থাকা মাস্টার রতলনাল মল্লিকের ঘুম গেল ভেঙে। তিনিও বিরক্ত হয়ে ইন্দুবালার সামনের জানলা ফেলে দিলেন। গোটা কামরায় অসহ্য গুমোট গরম। বাইরে চোখ জ্বালা করা ধোঁয়া। কানে এলো গর্জনের মতো স্লোগান “পুলিশ তুমি যতই মারো/মাইনে তোমার একশো বারো।” আবার একটা কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটলো। কামরার ভেতরের লোকগুলো কেমন যেন ভয়ে কুঁকড়ে গেছে। তারই মধ্যে কয়েকটা ছেলে মেয়েকে হুড়মুড়িয়ে ট্রেনের কামরায় উঠতে দেখলেন ইন্দুবালা। ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করলো। এক নতুন দেশে বউ হয়ে আসার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বেশ মনে রাখার মতো হলো তাঁর। যে ছেলে-মেয়েগুলো হুড়মুড়িয়ে ট্রেনে উঠেছিল তাদের মধ্যে একজনের মাথা ফেটেছে। কোনো রকমে সে হাত দিয়ে চেপে আছে ক্ষত জায়গাটা। রক্তে ভাসছে জামা কাপড়। তারই পাশ থেকে একটা ছেলে চিৎকার করে বললো, “ভয় পাবেন না বন্ধুরা..যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দিনে একবেলা করে খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে নিজের ক্যাবিনেটের মন্ত্রীদের পেট ভরাচ্ছেন সেই শাসনের অবসান চাই আমরা। যে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে গোটা রাজ্য জুড়ে সেটা আর যাই হোক এই সরকার সামলাতে অপারগ…তাও আমরা যারা দুবেলা দুমুঠো এখনও খেতে পাচ্ছি.. রেশনে গিয়ে পচা চাল আর গম কিনতে পারছি; তাঁরা যদি এগুলো যারা একদম পারছেন না তাদের সাহায্যে কিছু দান করেন তাহলে লোকগুলো না খেয়ে অন্তত মরবে না। দয়া করে ভুলে যাবেন না এখনও এই দেশে একবেলাও খাবার না-জোটা লোকের সংখ্যাটা অনেক।” একটা ছিপছিপে ছেলে এতক্ষণ পুলিশের সাথে লড়ে শিরদাঁড়া সোজা করে বলে চলেছিল কথাগুলো। আর তারই বন্ধুরা ট্রেনের যাত্রীদের সামনে গিয়ে হাতে একটা টিনের কৌটো নাড়িয়ে অনুদান চাইছিলো। সবটাই ইন্দুবালার কাছে নতুন। ধনধান্য পুষ্প ভরা গ্রাম থেকে এ কোন দেশে এলেন তিনি, যেখানে সরকার বলছে একবেলা খাও! পাশ থেকে খবর কাগজ পড়া মধ্যবয়স্ক লোকটা মাস্টার রতনলাল মল্লিককে বললেন, “খাদ্য আন্দোলন চলছে বুঝলেন কিনা। আইন হবে নাকি একবেলা ভাত আর এক বেলা রুটি খাবার। সরকার চাকরিও দিতে পারছে না। খেতেও দিতে পারছে না। দেশটার কী অবস্থা হয়েছে বুঝুন তাহলে…।” মাস্টার রতলনাল মল্লিক লোকটাকে পাত্তা দিলেন না। দ্বিতীয় বিয়ের ধাক্কা সামলাতে তিনি বেশ ক্লান্ত। ট্রেনের দুলুনির সাথে আবার ঝিমোতে শুরু করলেন। একজন তারই বয়সী মেয়ে ইন্দুবালার সামনে এসে যখন অনুদানের কৌটো ধরলো তখন খুব ইচ্ছে করলো মেয়েটির সেই কৌটোতে দু আনা হলেও দিতে। কিন্তু সেই মুহূর্তে ইন্দুবালার কাছে কোনো নয়া পয়সাও ছিল না। অথচ গা ভর্তি ছিল সোনার গয়নায়। হকৌটো ধরা মেয়েটা কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল ইন্দুবালার দিকে। একটা বালা কিংবা হার খুলে যদি দিতে পারতেন তিনি। মানুষগুলো না খেয়ে আছে যে।

তাঁর গ্রামে কপোতাক্ষের জল ঢুকে পড়লে বন্যা হতো। স্কুল বাড়ির পাকা দাওয়ায় গিয়ে উঠতো লোকজন। ঠাম্মা বাবাকে দিয়ে তার অনেক আগে থেকে চাল, ডাল পাঠিয়ে দিতেন বাড়িতে যা থাকতো। গ্রামের লোকেরাও মজুত করতো। সবাই এক সাথে রান্না খাওয়া হতো তখন। কত দূর দূর থেকে বুক পর্যন্ত জল ঠেলে মানুষগুলো খিচুড়ি নিতে আসতো। বড় যত্ন করে রাঁধতেন ইন্দুবালার ঠাকুমা। “অন্ন হচ্ছে লক্ষ্মী। মানুষের পাতে তুলে দিলে পুণ্যি হয়। যে দেশের সব মানুষ দুবেলা দুটো অন্ন পায় সে দেশের ভাণ্ডার ধন ধান্যে পূর্ণ হয়” বলেছিলেন ঠাকুমা। ইন্দুবালা সবেমাত্র তাঁর হাতের বালাটা খুলতে যাবেন বলে মনস্থির করছিলেন আর ঠিক সেই সময়ে তাঁর স্বামী মাস্টার রতনলাল মল্লিক খিঁচিয়ে উঠলে সরে গিয়েছিল অনুদান চাইতে আসা মেয়েটা। খারাপ লেগেছিল ইন্দুবালার। মানুষগুলোর পেটের ভাতের জন্য ওরা রাস্তায় নেমেছে। ভিক্ষে করছে। তারা যদি দুবেলা ভরপেট খেতে পারে তাহলে যে দোরগোড়ায় এসে অভুক্ত দাঁড়াচ্ছে, সে পাবে না কেন? সেই ইন্দুবালা তখনও জানতেন না তিনি একদিন একটা ভাতের হোটেলের মালিক হবেন। দুবেলায় তাঁর হোটেলে পাত পড়বে অসংখ্য মানুষের। সেই হোটেল থেকে বিনা পয়সাতেও খাবার বিলির বন্দোবস্ত থাকবে। সেটা সত্তরের জ্বালাময়ী দিনগুলোতেই হোক কিংবা তারও অনেক পরে মানুষগুলোর কাজ হারানোর সময়, সবাই জেনে গিয়েছিল এই একটা জায়গায় এমন এক অন্নপূর্ণা আছেন যাঁর ভাতের হাঁড়ি কারও জন্যে কোনোদিন খালি হয় না।

নতুন কনে ইন্দুবালার সঙ্গে মালপত্র হিসেবে এসেছিল বড় নক্সা করা একটি তোরঙ্গ। দানের বাসনের বড় ঘড়াটা। বাবার হাতে ছিল ওপারের বাজারের জোড়া ইলিশ। ভাইরের হাতে দইয়ের বড় হাঁড়ি। বাবু মাস্টার রতনলাল মল্লিকের হাতে ছিল বিয়ের ছাতা নিপাট ভাঁজ করা। কাঁধে ফেলা ছিল দানের শাল। হাতে চকচক করছিল আশীর্বাদের দু ভরি সোনার আংটিটা। স্টেশনে ট্রেন থামলে বরের বাড়ি থেকে লোক আসা দস্তুর ছিল। নতুন কনেকে যেভাবে গল্প শুনিয়েছিল তার বাড়ির লোকেরা, সে আরও অনেক কিছু ভেবে রেখেছিল। ব্যাণ্ড পার্টি। রঙ মশাল। ফানুস। কলকাতার রাজপথে শোভাযাত্রার মতো বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। “তুই শুনলাম বনেদি বাড়ির বউ হলি ইন্দু। পা পড়বে তো মাটিতে”। ফুট কেটেছিল গাঁয়ের হিন্দু বাড়ির মেয়েরা। বন্ধুরা কেউ কেউ বলেছিল “আতসবাজি ফাটাবে নিশ্চয়। ঘোড়ার গাড়ি আসবে। ফুল ছড়াবে। আতরদানি থেকে আতর।” কিন্তু এইসবের ছিটেফোঁটাও ইন্দুবালার আশেপাশে ছিল না। নতুন বউকে নিয়ে যাওয়ার জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে কাউকে আসতে দেখেননি তিনি। বাবা একটু কুণ্ঠা নিয়েই জানতে চেয়েছিলেন “বাবা রতন… তোমার বাড়ির থেকে…?” কথা শেষ করতে দেয়নি মাস্টার রতনলাল মল্লিক। তাঁর সযত্নে লালিত বাবরি চুলের গোছা নেড়ে বলেছিলেন “তাই তো…তাই তো…এখন যে কী করি? বউভাতের যোগাড় যত্নে লেগে গেল কিনা লোকজন…। পুরুষ বলতে বাড়িতে আমি তো একাই…।” বাবা বিচলিত হতে বারণ করেছিলেন জামাইকে। তিনি থাকতে চিন্তার তো কিছু নেই। “শুধু এত জিনিস বলে লোকজনের খোঁজ করা। তা একটা কুলি নিলেই হয়ে যায় আর কি।” বাবা কুলি ডেকে তার মাথায় তুলে দিয়েছিলেন প্রায় সবকিছু। আর যেটুকু ছিল কুড়িয়ে বাড়িয়ে সবার হাতে হাতে ধরে গেল। কপোতাক্ষর গাঁয়ের মেয়ে যখন ভাগীরথীর পাড়ে এসে প্রথম পা দিলো তখন কেউ শাঁখ বাজালোনা। কালো পাথরের থালায় দুধে আলতা মিশিয়ে কেউ পা ছোঁয়াতে বললো না। ঈশ্বরী পাটনীর মতো কেউ আদর করে পার করে দিল না শ্বশুরবাড়ির দোরটা। কিন্তু সে গল্প আমাদের জানা। যতই মাস্টার রতনলাল মল্লিক বলুন না কেন বউভাতের আয়োজনে বাড়ির সবাই ব্যস্ত আছে। আমরা তো জানি ইন্দুবালার বউভাতই হয়নি। কাকপক্ষীটিও টের পায়নি ইন্দুবালার শাশুড়ি এক বংশ ঘটির মাঝে একটা বাঙালি মেয়ে বউ করে নিয়ে আসছেন। জানাজানি হলে মুশকিল হতো। আগের বউটা বাচ্চা হতে গিয়ে মরেছিল নাকি মাস্টার রতলনাল মল্লিক গলা টিপে খুন করেছিলেন সে নিয়ে বিস্তর কানাঘুষো আছে। তাই বাড়তি কোনো আয়োজনের দিকে যাননি শাশুড়ি। নতুন বউয়ের সাথে তার বাবা আর ভাইকে দেখে মেজাজ তিরিক্ষে হয়েছিল তাঁর। আপদগুলোর আবার আসার দরকার কী ছিল! মেয়েটাকেই চেয়েছিলেন তিনি। পরিবারকে নয়। আর ইন্দুবালা দেখেছিলেন বাড়ির সামনে থেকে বাবা ছোট্ট ভাইয়ের হাত ধরে চলে যাচ্ছেন অপমানিত হয়ে। তাদের কেউ একটু জল-মিষ্টি খাওয়ার কথা দূরে থাক বসার জন্য পর্যন্ত বলছে না। ছেনু মিত্তির লেনের গলিটা দিয়ে যেতে যেতে ভাইটা কাঁদছে। বাবা ফিরে ফিরে তাকাচ্ছেন। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। তখনও জানেন না ইন্দুবালা এই তাঁর শেষ দেখা বাবার সাথে। এরপর আর কোনোদিন দেখতে পাবেন না বাবাকে। ইন্দুবালার বাড়ি ছেড়ে আসার বছর কয়েকের মধ্যেই মারা যাবেন বাবা। ঠাম্মা নাতনির মুখটা দেখতে চেয়েও পাবেন না। শেষ কদিন ইন্দু ইন্দু করে ঢলে পড়বেন চিরঘুমে। আর মায়ের কথা? সেগুলো যত্ন করে ইন্দুবালা শাড়ির ভাঁজে, আঁচলের ছোঁওয়ায় তুলে রেখেছেন। যেমন পঞ্চ প্রদীপের তাপ আঁচলে পুইয়ে গিঁট বেঁধে রাখতেন মা ঠিক তেমন করেই। ভাইটা তারও অনেক পরে যোগ দিয়েছিল স্বাধীনতার যুদ্ধে। চিঠি পত্রের আদান প্রদান অল্প বিস্তর যা ছিল যুদ্ধ শুরু হলে সেসবের পাটও চুকলো। জন্মভূমির সাথে যোগাযোগ একেবারে ছিন্ন হলো ইন্দুবালার।

কলকাতা শহর তখন বেশ সরগরম। মিছিলের পর মিছিল চলেছে রাস্তা জুড়ে। মানুষের পাতে ভাত নেই। মনে সুখ নেই। খাবার নিয়ে যে আন্দোলন হতে পারে ইন্দুবালা জানতেন না এই শহরে না এলে। স্টেশনের বাইরে থেকে অনেক দরদাম করে বাবা একটা ট্যাক্সি ভাড়া করেছিলেন। সেই ট্যাক্সির মধ্যে ইন্দুবালা, ভাই, বাবা আর মাস্টার রতলনাল মল্লিক ঠিক এঁটে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল সেইসব জিনিসগুলো যা আজ ধনঞ্জয় কুড়িয়ে বাড়িয়ে ফেলে দিতে চাইছে। ও কতটুকু জানে এইগুলোর মাহাত্ম? গজগজ করতে করতে বুড়ি ভাঙা তোরঙ্গটার সামনে বসেন। ততক্ষণে ডালে ফোড়ন পড়েছে। নটা বাজতে চললো। কলেজের ছেলেগুলো খেতে এলো বলে। ইন্দুবালার কাজের তাড়া পড়ে যায়।

ট্যাক্সির জানলার পাশ আর ট্রেনের জানলার ধার ঠিক এক জিনিস নয়। ট্রেনের জানলার ধারে কত গ্রাম, নদী, জলা, জঙ্গল আর ট্যাক্সির পাশে শুধুই শহর। খেতে না পাওয়া মানুষের মিছিল। তখনও প্রথম ট্রেনে ওঠার ঘোরটা যেন কাটেনি ইন্দুবালার। অল্প অল্প মাথাটাও কি টলছিল ট্রেনের দুলুনির সাথে? তার রেশ রয়ে গিয়েছিল অনেক দিন। কলকাতায় এসেই লুকিয়ে মনিরুলকে একটা না পাঠানো চিঠি লিখেছিলেন ইন্দুবালা। “জানিস মনিরুল ট্রেন যে কী ভীষণ বস্তু তোকে না বলে বোঝাতে পারবো না। আমাদের সেই বাঁশ গাছে দোল খাওয়ার মতো। তুই নিশ্চয়ই এতদিনে ঢাকায় পড়তে চলে গিয়েছিস। অনেক কিছু দেখা হয়ে গেছে তোর। অনেক নতুন বন্ধু হয়েছে। আমার কথা মনে পড়ে আর? বোসদের পুকুর? খানার ধারের ল্যাঙড়া..? গাজনের মাঠ..? কপোতাক্ষের ঘাট? আমি কিছু ভুলিনি মনিরুল। এখনও কি নানি সন্ধ্যে হলে বিষাদসিন্ধু পড়েন? তুই কি এখনও রাতের আঁধারে বাঁশি বাজাস? লণ্ঠনের আলোয় পড়িস নক্সীকাঁথার মাঠ? ঢাকাতে কি তোর দেখা হলো আমাদের প্রিয় কবি জসীমউদ্দীনের? আমার যে সব কথা…সব কিছু বড় জানতে ইচ্ছে করছে মনিরুল…। আমি যে তোকে…।” এরপর আর লেখা এগোতে পারেননি ইন্দুবালা। তিনি মনিরুলকে কী? ভালোবাসেন? পছন্দ করেন? একসাথে থাকতে চেয়েছিলেন? নিজের কাছে উত্তরগুলো স্পষ্ট নয়। যেমন ঠিক স্পষ্ট নয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা আদৌও হয় কিনা। কিংবা ভালোবাসার অপর নাম শুধু শরীর কিনা। যে শরীরটাকে মাস্টার রতনলাল মল্লিক তার কয়েক বছরের বিবাহিত জীবনে তিন তিনটে বাচ্চার মা বানানোর ফ্যাক্টরি করে দিয়ে হঠাৎ উবে যাবেন কর্পূরের মতো হাওয়ায়। শরীরের সেই না পাওয়া কিংবা প্রচণ্ড পাওয়া কষ্টগুলো নিয়ে ইন্দুবালাকে বেঁচে থাকতে হবে দিনের পর দিন। তাও মলিন হবে না স্মৃতিগুলো। মানুষগুলো।

টগবগ করে ভাত ফোটে। ডাল ফোটে। মাছের ঝোলে মাছগুলো যেন ফুটতে ফুটতে ফড়ফড় করে নিজেদের মধ্যে কথা বলে। তিন তিনটে উনুন জ্বেলে সেই স্মৃতি সম্ভাষণের আসন সাজান ইন্দুবালা।

নতুন যে দেশটায়, শহরটায় তিনি এসে পড়লেন, এই দেশ নিয়ে, শহর নিয়ে এর আগে তিনি কম গল্প শোনেননি। বাবার বাবা মানে ইন্দুবালার দাদু এক সময়ে নাকি কাজ করতেন কলকাতার বন্দরে। সেখানে সাহেব সুবোর খাতা লিখে তাঁর দিন গুজরান হতো। বড় বড় জাহাজে করে কত শত যে জিনিস আসতো তার কোনো ইয়ত্তা ছিল না। মেমসাহেবের ছোট্ট চিরুনি থেকে বেলজিয়াম কাঁচের আয়না। ইন্দুবালার গ্রামের বাড়িতে ঠাকুর দেবতার যা মূর্তি ছিল লক্ষ্মী থেকে শুরু করে শিব সব কিছু তার দাদুর আনা। চিনেমাটিতে বানানো সব হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি। কলকাতার বড়লোক বাড়িতে ছেলে মেয়েদের খেলার জন্য বিদেশ থেকে আনা হতো। অনেক সময় বিয়ের তত্ত্ব যেত এইসব পুতুল সাজিয়ে। প্রত্যেকটা পুতুলের গায়ে লেখা থাকতো মেড ইন জার্মানি। বেশ নামডাক ছিল এই শিল্পের। এগুলো বাড়িতে রাখাও সম্মানের ব্যাপার ছিল তখন। ঠাম্মার খেলার জন্য দাদু এইসব পুতুল মাঝে মাঝে নিয়ে গেলেও ঠাম্মা সব কিছু সাজিয়ে রাখতেন পুজোর ঘরে। লক্ষ্মী, শিব, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর নিয়ে কেউ খেলে নাকি? শুক্রবার হলেই দাদু বাড়ি ফিরতেন শিয়ালদহ স্টেশন হয়ে খুলনায়। একটা সবজেটে ট্রেন দাদুকে নামিয়ে দিত কপোতাক্ষের ওপারে। শনি রবি বাড়ি থেকে আবার সকালের ট্রেন ধরে কলকাতায়। বাবাও দাদুকে অনুসরণ করেছিলেন। দাদুর কাছে কাজ শিখতে শিখতে কলকাতায় পড়াশুনো চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ মাঝখান থেকে দেশটা স্বাধীন হলো। শুধু স্বাধীন হলো তাই না দেশটা দু-টুকরো করে ভাগ করা হলো। দেশের নেতারা সেই দেশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষদের কাছে অনুমতি নিল না, জানতে চাইলো না। এক মুহূর্তে ভিটে মাটি সব কিছু হয়ে গেল বিদেশ। রাতের আঁধারে, দিনের আলোয় মানুষ দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো। কে কোন অংশে যেতে পারবে তার যেন মারাত্মক মরিয়া প্রতিযোগিতা। তার সাথে বাধলো দাঙ্গা। রক্তক্ষয়ী। ভাই ভাইয়ের বুকে ছুরি মারলো। মেয়ে লাঞ্ছিত হলো পড়শির কাছে। গোটা ভূখণ্ড জুড়ে চললো নরহত্যা। তিনশো বছরের ইংরেজ রাজত্বের পর স্বাধীনতা উদযাপনের সে কী ভয়ঙ্কর উৎসব।

নীল আকাশে আগুনের লেলিহান শিখা দেখে দাদু প্রশ্ন করেছিলেন “এই স্বাধীনতাই কি চেয়েছিলাম আমরা? এই স্বাধীনতার স্বপ্নই কি দেখেছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভ্যুত্থানের বীর শহীদ মাস্টারদা সূর্য সেন?” ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে যাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল? তারপর দড়িতে ঝুলিয়ে দেহটাকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বুড়িগঙ্গার গভীর জলে? অত ছোট্ট মেয়ে প্রীতিলতাকেই বা মরতে হলো কেন? এত এত শহীদ কেন দ্বীপান্তরে গেলেন? জাতীয় পতাকা যদি সেই উড়লো দেশের স্বাধীন ভূমিতে তাহলে তখন দেশ বলে গড় করতে পারলাম না কেন? মনে অনেক প্রশ্ন, কষ্ট আর হতাশা নিয়ে দাদু ফিরে এলেন খুলনার কলাপোতায়। স্টেশনে আসার পথে দেখেছিলেন একদল লোক চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছে “ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়”। খাবার নেই, জল নেই, নিজেদের বলতে কিচ্ছুটি নেই। হাতের সামনে যে যা পেরেছে শেষ সম্বলটুকু নিয়ে উঠে পড়েছে ট্রেনে। কোথায় যাচ্ছে, এরপরে কীভাবে থাকবে তার কিচ্ছুটি জানা নেই কারও কাছেই।

বাবা আসতে চাননি কলকাতা ছেড়ে। তাঁর কাছে তখন নতুন দুটো ভূখণ্ড ভারতবর্ষ আর পাকিস্তান। বাবা থেকে যেতে চেয়েছিলেন ভারতবর্ষে। আর দাদু চেয়েছিলেন যে গ্রামের মাটিতে তাঁর বাবা, মা পূর্বজরা পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে আছেন, যে নদীর জলে ডুব দিলে জীবনে শান্তি পাওয়া যায় সেই কলাপোতায়। তখনও হয়তো তিনি মনে মনে বিশ্বাস করতেন এটা মানুষের সাময়িক ভ্রম। দেশ নেতাদের অলীক কল্পনা। “দেশ কখনও ভাগ করা যায় নাকি? এটা কি তোমার লাউটা, মুলোটা কাটলেই ভাগ হয়ে গেল?” সামনের বর্ষার দিকে তাকিয়ে থাকতেন তিনি। “বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাবে দুই দেশের সীমানা। তখন দেখো আবার আমি কেমন করে শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে স্টেশনে নামি। বাড়ির দোরে এসে ডাক দিই…কোথায় ব্রজের মা…? হাতের ব্যাগখানা ধরো দেখি। তোমার জন্য বড় বাজারের মশলা আর ভীম নাগের সন্দেশ আছে।” বর্ষার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দাদুর চোখে ছানি পড়েছিল। কিন্তু দুটো দেশ জোড়া লাগেনি। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন দাদুকে একা রেখে এইভাবে তিনি ইণ্ডিয়া চলে যেতে পারবেন না। কাজেই অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও তাঁকে থেকে যেতে হয়েছিল। তার মধ্যে বুদ্ধি খরচ করে তিনি দাদুর জমানো টাকায় বেশ কিছু জমি কিনে নিলেন। চাষবাস দেখাশুনো করতে শুরু করলেন। আর দাদুর জন্য খুলে দিলেন একটা টোল। সেখানে দাদু পড়াতে শুরু করলেন গ্রামের বাচ্চাদের। না হলে মানুষটার সময় কাটবে কী করে? ভাবতে ভাবতে শেষকালে পাগল হয়ে যাবে না তো? টোল থেকে কোনো কোনো দিন দাদু বাড়ি ফিরতেন না। সবাই জানতো তিনি এখন চুপ করে বসে আছেন কপোতাক্ষের ধারে। ওপারের দিকে তাকিয়ে। মাঝিদের জিজ্ঞেস করতেন ওদিকের ট্রেন চলতে শুরু করেছে কিনা। এইসব ইন্দুবালা দেখেননি। শুনেছিলেন সব সেই ছোট্ট থেকে। শ্রুতিমালার সেই গল্পগুলো রয়ে গিয়েছিল তাঁর মনে। দাদুকে তিনি যখন দেখেছিলেন তখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে মানুষটা। তবুও তাঁর সেই টোলের বারান্দায় চুপ করে বসে থাকা, মাঝে মাঝে দিদিভাই বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ভুলতে পারেননি ইন্দুবালা। এখন ভাবেন এত কষ্ট নিয়ে কী করে বেঁচে ছিলেন দাদু? বন্ধু বান্ধব যা ছিল সবই ওপারে। আর এপারে ছিল প্রতিশ্রুতির বন্ধন। দাদু তাঁর বাবাকে কথা দিয়েছিলেন থাকবেন তিনি এই পিতৃপুরুষের ভিটেতেই। সেই কথার খেলাপ তিনি কোনোদিন করেননি। অসম্মান তো দূরের কথা। তার অবিচল সিদ্ধান্ত থেকে কেউ টলাতে পারেনি। তাহলে যেখানে সবাই রয়ে গেল ওই পারে, সেখানে একমাত্র ইন্দুবালা তাঁদের পিতৃপুরুষের স্মৃতি তর্পণের জন্য কেন রয়ে গেলেন এপারে? কেন বাবার মনে হয়েছিল একমাত্র ইন্দুবালাকেই ওপারে পাঠাতে হবে? অনেকের মতো কেন বাবা নিজেও সিদ্ধান্ত নিলেন না এপারে চলে আসার? ইন্দুবালা জানতেন বাবা শিকড় ছাড়া হতে পারতেন না। মাও না। ঠাম্মাও না। আর ভাই? তার কথা সোনার আখরে ইতিহাসে না লেখা থাকলেও ইন্দুবালা জানেন ওই যে মুক্তোর মতো বর্ণপরিচয়, সেখানেই লুকিয়ে আছে তাঁর ভাই। ভাষা শহীদ হওয়া কি মুখের কথা? সে তো জন্ম জন্মান্তরের পুণ্যের ফল। তাঁদের গোটা পরিবারের মাতৃভূমির কাছে ঋণ মোচন।

ঝোড়ো হাওয়ায় বাড়ির সব জানলা দরজাগুলো হুটোপাটি করে পড়ার শব্দে ইন্দুবালার ঝিমুনি কাটে। দুপুরে হোটেলের কাজ কম্ম শেষ করে তাঁকে এখন একটু বিশ্রাম নিতে হয়। না হলে রাতের দিকে আর উনুনের সামনে দাঁড়াতে পারেন না। ভেতরে কীরকম যেন একটা কষ্ট হয়। এইসব যদি ঘুণাক্ষরেও ধনঞ্জয় জানতে পারে তাহলে ছেলেদের বলে দেবে। তারা তখন মাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। ডাক্তার বদ্যি নিয়ে অযথা ছুটোছুটি শুরু হয়ে যাবে। নিয়ম দিয়ে মাকে বেঁধে ফেলতে চাইবে ওরা সাত তাড়াতাড়ি। এইসব ভাবলেও বিরক্ত বোধ হয় ইন্দুবালার। ঝিম ধরা চোখে তাকান বাইরের দিকে। আকাশ কালো করে মেঘ করেছে। কালবৈশাখী। কোনোরকমে গাঁটের ব্যথা সামলে উঠে পড়েন তিনি। ধনঞ্জয়কে ডেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। বাজার করতে গেল নাকি? এখন এতগুলো জানলা বন্ধ করবেন কী করে? তাও কোনোরকমে ওপরের ঘরের জানলাগুলো বন্ধ করতে পারেন তিনি। আর ঠিক তখনই নজর পড়ে উঠোনের দিকে। বাগানের গাছটা থেকে টুপ টুপ করে আম পড়ছে ঝড়ে। সেদিনও কি এমন ঝড়টাই হচ্ছিল না? তবে সেটা ছিল ভোর। আর আজ বিকেল। ইন্দুবালা ভুলে যান তাঁকে বন্ধ করতে হবে বাড়ির আরও জানলা দরজা। ভুলে যান তাঁর বয়েস ছুঁয়ে গেছে সত্তরের ওপার। ঝোড়ো হাওয়া আর টুপটুপ আম পড়ার শব্দ তখন তাঁকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সিঁড়ির দিকে। ইন্দুবালা নামছেন সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে। কোথায় তাঁর পায়ের ব্যথা? গাঁটের বাত? যেন ছুটছেন তিনি এক ঘোরের মধ্যে দিয়ে উঠোনের দিকে। ছুটছেন ইন্দুবালা। ছুটছেন তীর বেগে। ঝোড়ো হাওয়ায় কেঁপে উঠছে হাতের লণ্ঠনের শিখা। কড়কড় করে বাজের শব্দ কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে। ভোর হতে তখন অনেক দেরি। পেছনে ছুটছে ছোট্ট ভাইটা। তার পেছনে মা, তারও অনেক পেছনে ঠাম্মা। গোটা আমবাগান জুড়ে কলাপোতার লোকজন জড়ো হয়েছে ওই আঁধার ভোরে। প্রায় একশো গাছের বাগান যাদের তারাও এসেছে। গাঁয়ের লোকের আম কুড়োনোতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। এমনিতেই নষ্ট হয় কত। শিলের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে আম পড়ছে হাওয়ায়। কেউ মারামারি করছে না। রেষারেষি না। সবার কোঁচড় ভরে উঠছে কাঁচামিঠে, ল্যাঙরা, বোম্বাই আমে। ঝড়ের সাথে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। কড়কড় করে বাজ পড়ছে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইটা ঠকঠক করে কাঁপছে। বারণ করেছিলেন ইন্দুবালা। বাবার সাথে বাড়িতে থাকতে বলেছিলেন। শোনেনি ভাই। তাঁর সাথেই ছায়ার মতো থাকে যে। চলে এসেছে ছুটে ছুটে দিদির পেছন পেছন। এবার বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাধালেই হলো আর কি। তাড়াতাড়ি গিয়ে নিজের আঁচলে জড়িয়ে ধরেন ইন্দুবালা ভাইকে। তাও কি বৃষ্টির থেকে রক্ষা পাওয়া যায়? বিড়বিড় করেন, “লেবু পাতায় করম চা যা বৃষ্টি থেমে যা”। কিন্তু বৃষ্টি থামার নাম নেই। বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে যেন বরফ জলের ঠাণ্ডা। ভাই বোন ঠকঠক করে কাঁপে। দুজনে আগলে রাখে কোঁচড়ে জমানো আমগুলোকে। একটা সময়ে ইন্দুবালা ইঠাই বুঝতে পারেন চারপাশে বৃষ্টি পড়ছে কিন্তু তাঁদের মাথায় বৃষ্টি নেই কেন? ওপর দিকে তাকাতে ইন্দুবালা দেখলেন একটা বড় কচু পাতা। সেটা ধরে আছে মনিরুল। কী যে ভালো লেগেছিল সেদিন, ইন্দুবালা বলে বোঝাতে পারেননি কাউকে। বলার সুযোগ ছিল না। রুমালের ওপর সুতা দিয়ে একটা ছেলেকে এঁকেছিলেন তিনি। তার হাতে দিয়েছিলেন একটা কচু পাতা। আর মেয়েটাকে রেখেছিলেন দূরে। এলোচুলে। বৃষ্টির মধ্যে। ইচ্ছে ছিল মনিরুলকে নিজে হাতে করে দেবেন রুমালটা। সেটা আর দেওয়া হয়নি। কেন দিতে পারেননি মনিরুলকে? মা দেখতে পেয়ে গিয়েছিল কি? বকেছিল খুব? মনে করতে বসেন ইন্দুবালা। নাকি তিনি নিজেই মিথ্যে বলেছিলেন মাকে? ভাইয়ের জন্য রুমাল করেছেন। ভাই সেই রুমালে সারাদিন নাক ঝেড়ে ঝেড়ে ভর্তি করেছিল। আর ইন্দুবালা পড়েছিলেন জ্বরে। বেজায় শরীর খারাপ হয়েছিল সেবার। সারছিলো না মোটেই। সাতদিনের মাথায় পথ্যি পেয়ে তবে মেয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছিল। গ্রীষ্মের রোদে ঘর থেকে বেরিয়ে মন ভালো হয়ে গিয়েছিল ইন্দুবালার। ঠাম্মা ততদিনে সেই ঝড়ে কুড়োনো আমগুলোকে কেটে, ধুয়ে হলুদ নুন মাখিয়ে কিছুটা আচার করে ছিলেন আর বেশ খানিকটা আমতেল বসিয়েছিলেন রোদে। সুয্যিদেব গোটা গ্রীষ্মকাল জুড়ে রোদে তাতিয়ে তেলে মিশিয়ে কাঁচা আমগুলোকে জারিয়ে দেবেন। তারপর সেই তেল দিয়ে সারা বছর যা খাওয়া দাওয়া চলবে তার কোনো হিসেবের কুল কিনারা পাওয়া যাবে না। আম তেল মুড়ি দিয়ে মাখা হবে। গরমভাতে ঘিয়ের বদলে খাওয়া হবে। মাছের ঝোলে বিশেষ করে সরল পুঁটিতে আমের গন্ধ দেওয়ার জন্য আমতেল ব্যবহার হবে। আর গ্রামে পোয়াতির সংখ্যা নেহাৎ কম থাকে না সম্বৎসর। তারাও পাবে। পাতা কুড়োতে এসে খেন্তির মা পাবে। টিফিনে মনিরুল পাবে। ফকিরি গান গাইতে আসা অন্ধ কানাই পাবে। চুরি করে ঠাম্মার আম তেল আর আচার খেতে খেতে গরমের ছুটির দুপুরগুলো কেটে যাবে।

বৃষ্টিটা সবে ধরেছে। তবে হাওয়ার বেগ এখনও বেশ ভালোই। ঝিরঝিরে জোলো বাতাস চারিদিকে যেন ঘুরপাক খাচ্ছে। ইদানিং হয়েছে কী, কলকাতার এই ধরনের হুট করে আসা বৃষ্টিতে সবাই কেমন যেন তালকানা হয়ে যায়। ট্রাফিক সার্জেন্ট থেকে শুরু করে অটো চালক- সবাই। ইন্দুবালার বড় ছেলে প্রদীপ হঠাৎ নিজেই ড্রাইভ করে মায়ের সাথে দেখা করতে এসেছে। অন্যান্য বার আগে ফোন করে জানিয়ে রাখে মাকে কিংবা ধনঞ্জয়কে। এবার সেসব কিছুই করেনি। ভেবেছিল মাকে একটু চমকে দেবে। সদর দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বলবে, “আজ কিন্তু বাড়ি যাবো না মা। থাকবো তোমার কাছে।” এমন কথা শুনলে তার মা কী বলবে এই বুড়ো ছেলেকে সেটা জানার জন্য তার খুব ইচ্ছে করছিল। যদিও জানে প্রদীপ, মা তাকে কোনোদিনই বউ বাচ্চা ছেড়ে থাকতে দেয়নি। এমনকি অন্যান্য মায়েরা যেমন খুব আদিখ্যেতা করে বাচ্চাদের আদর করে, খাওয়ায়; ইন্দুবালা তাঁর ছেলেদের বা মেয়েকে কোনোদিনই তেমন করে বড় করেননি। কিন্তু তাঁর ভালোবাসা ছিল চোরাস্রোতের মতো। সেটা তিন ছেলে মেয়েই খুব ভালো করে টের পেতো। শরীর খারাপ করলে, জ্বর হলে ঠায় মাথার কাছে বসে থাকতেন। সারা রাত জাগার পর আবার সারাদিন হোটেলে ওই গনগনে উনুনের সামনে রান্না করা। মায়ের কষ্ট তারা বুঝতো। তাই জীবনের প্রথম চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়েই প্রদীপ মাকে হোটেল বন্ধ করতে বলেছিল। দিল্লিতে যে কোয়ার্টারটা সে পাবে তাতে সবাই মিলে থাকা যাবে। ইন্দুবালা হাসি মুখে শুধু বলেছিলেন “এবার তুই ছেনু মিত্তির লেনের মায়া কাটিয়ে নতুন জীবন শুরু কর বড় খোকা”।

চাকরি পাওয়ার পর যেদিন প্রথম সে বাড়ি থেকে বেরোলো বড় মন কেমন করেছিল। ভাই, বোন এমনকি ধনাদা পর্যন্ত গিয়েছিল তার দিল্লির কোয়ার্টার গুছিয়ে দিতে। মা একবারও যায়নি। বিয়ের আগেও না। পরেও না। কেউ নড়াতে পারেনি তাকে এই বাড়ি ছেড়ে। হোটেল বন্ধ থাকা মানে যেন মায়ের প্রাণ চলে যাওয়া। ভাই আর খুকি বুঝিয়েছিল দাদাকে। মা যেমন আছে থাক। মেনে নিয়েছিল প্রদীপ। কিন্তু এখন তার মাঝে মাঝেই ভয় হয় এই বয়সে অতটা আগুনের সামনে একটা বিপদ যদি হয়ে যায়। কলকাতায় পোস্টিং হওয়ার পরে এমনও হয়েছে সপ্তাহে দুবারও এসেছে সে। কিন্তু লক্ষ্য করেছে তাতে মা বিরক্ত হয়। ভাবে বুঝি নজর রাখতে এসেছে ছেলে। মার পছন্দ হয় না এমন কোনো কাজ প্রদীপ করতে চায় না। কিন্তু না জানিয়ে এসে সেকি আজ ভুল করলো? ধনঞ্জয়কে অন্তত ফোন করে আসলে ঠিক সময় মতো ও দাঁড়িয়ে থাকতো। গাড়ি পার্ক করার অসুবিধে হতো না। আজ বেজায় ঝামেলা হচ্ছে।

ইন্দুবালার ভাতের হোটেলের সামনে একটু বৃষ্টিতেই গোড়ালি সমান জল। সেখানে আবার কোথায় গর্ত আছে, নর্দমা আছে সেইসব দেখে গাড়ি রাখতে প্রদীপের অনেকটা সময় লেগে যায়। এতক্ষণে বাড়িটার দিকে তাকানোর ফুরসৎ হয় তার। শহরের এক পুরোনো পাড়ায় বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যেয় দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা কেমন যেন একলা হয়ে। কোথাও আলোটুকু পর্যন্ত নেই। তার মন কেমন যেন কু গেয়ে ওঠে। গোটা বাড়ি জুড়ে অন্ধকার। কেউ কোথাও নেই। এমনকি সামনে যে দু তিনটে খদ্দের ঘোরাঘুরি করে তারাও আজ নেই। বোর্ডে লাগানো আলোটাও আজ জ্বলছে না। প্রদীপ অনেক দিন পর মায়ের সাথে দেখা করতে এলো। আসবো আসবো করে তার আসাই হয় না। আজ এইটা কাল ওইটা লেগেই থাকে। তার আজকে আসার আরও একটা বড় কারণ হচ্ছে এইবার পাসপোর্টটা ফারদার রিনিউ করার আগে সে একবার বাংলাদেশ ট্যুর করতে চায়। একটা প্যাকেজও পাচ্ছে প্রায় কিছু খরচ না করেই। ছেলে বুবাই বললো “যাও না ঠাম্মির দেশে! কীসব তোমাদের কলাপোতা…ফোতা।” আইডিয়াটা খারাপ লাগেনি প্রদীপের। বউ সম্পূর্ণাও রাজি হয়ে গিয়েছিল। কর্মসূত্রে স্বামীর সাথে তার বাইরের অনেক দেশ ঘোরা। কিন্তু বাংলাদেশ যাওয়া হয়নি। নিজের চোখে হাতে করে একটু ঢাকাই মসলিন দেখে আসার ইচ্ছে আছে তার। সাথে কিছু কেনারও। এবার মা রাজি হলে তাহলে পাসপোর্টের একটা ঝামেলা থাকবে। মায়ের পুরোনো পাসপোর্টটা আছে কিনা সেটাও দেখা দরকার। প্রদীপ যদিও জানে পাসপোর্ট করাতে সময় লাগবে না। বুবাইয়ের বন্ধু কাজ করে পাসপোর্ট অফিসে। তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে সব। সম্পূর্ণই তাকে ঠেলে পাঠালো। একবার কথা তোলবার জন্য। মেজাজ যা মাঝে মাঝে থাকে বুড়ির!

প্রদীপ বাড়ি থেকে যখন বেরিয়েছিল বৃষ্টি ছিল না। এই দিকেই হয়েছে তাহলে ভালো। গরমের বৃষ্টি কোথায় যে কখন হয় বোঝা যায় না। প্রদীপ এগিয়ে গেল ভেতরের দরজার দিকে। সিঁড়ির আলো জ্বালানো। বাইরের বারান্দার। না কোথাও কেউ নেই। দুবার ডাকলো “মা..মা” বলে। কোন সাড়া শব্দ পেলো না। প্রদীপ চিৎকার করে ডাকলো ধনঞ্জয়কে। “ধনাদা..”। উত্তর নেই। কেমন যেন ভয়ে পেয়ে গেলো প্রদীপ। যদি মা সত্যি না থাকে? এই কথাটা যেন প্রথম ভাবলো সবে সিনিয়র সিটিজেনের তালিকায় প্রবেশ করতে যাওয়া প্রদীপ। এমন ভাবে কোনোদিন এর আগে মনে হয়নি। মা থাকলে জগৎটা তার এক রকম। আর মা না থাকলে অন্য রকম। বাবাকে ঝাপসা মনে পড়ে। ঘুড়ি ওড়ালে বাবা লাটাই ধরা শেখাতো। ব্যস, ওইটুকুই। তার তো তাও এটা মনে আছে, ভাই আর বোনের সেটুকুও তো মনে নেই। সবটাই তো তিনজনের মাকে ঘিরে। একবার কি ফোন করবে তাহলে ভাইকে? খুকুকে? কিন্তু কী বলবে? ছেনু মিত্তির লেনে ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে সে এসেছে অথচ ইন্দুবালাকে খুঁজে পাচ্ছে না? দোতলা ঘুরে এসে পিছনের দিকে কুয়োতলায় উঠোনের কাছে এসে আর একবার কাঁপা কাঁপা গলায় ডেকে উঠলো প্রদীপ “মা…”। এবার খুব শান্ত গলায় উত্তর ভেসে এলো “আয়..”। প্রদীপ তার মায়ের গলা শুনতে পেল কিন্তু মাকে সে দেখতে পেলো না তখনই। মোবাইলের টর্চ জ্বালালো। “কোথায় তুমি মা?” একটু এগিয়ে যেতেই সে তার মাকে খুঁজে পেলো। কাক ভিজে হয়ে সন্ধ্যের উঠোনে ঝাঁকড়া আমগাছের ডালটার নীচে বসে আছেন ইন্দুবালা। চারপাশে জড়ো করা ঝড়ে পড়া কাঁচা আম। প্রদীপ এগিয়ে যায়। জড়িয়ে ধরে তার মাকে। “মা তুমি ঠিক আছে তো? তোমার শরীর ঠিক আছে তো? পড়ে গিয়েছিলে নাকি? আমাকে ধরো মা..প্লিজ আমাকে ধরো…শক্ত করে ধরো…।” ইন্দুবালা ছেলের হাত ধরেন। সেই আধো আলো আধো অন্ধকারে, আধুনিক মোবাইলের এল ই ডি লাইটে ইন্দুবালা বলে ওঠেন “আমাকে একটু তেল কিনে দিবি বড় খোকা? আম তেল করবো…।”

এমনটা নয় যে ইন্দুবালার তেল কেনার টাকা নেই। এমনটা নয় ইন্দুবালা এইভাবে ছেলেদের কাছে টাকা চান। কোনোদিন কারো কাছে একটা টাকাও হাত পেতে চাননি সেই প্রথম দিন লছমী টাকা দিয়ে ভাত খেয়ে যাওয়ার পর থেকে। তারপর মা লক্ষ্মীর দয়ায় ক্যাশবাক্স ভর্তি থেকেছে সবসময়। তাই প্রদীপ একটু আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। তার মনে ভয় ছিল ছোটোখাটো কোনো সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছে কিনা। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে আছে মা। ততক্ষণে সারা রাজ্যের বাজার ঘুরে ধনঞ্জয় এসে পড়েছিল। প্রদীপ একটুও দেরি না করে অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছিল। সোজা নিয়ে গিয়েছিল কাছের নার্সিংহোমে। এমার্জেন্সির ডাক্তার বরং উলটে কথা শোনালো প্রদীপকে “আমতেল করার জন্য টাকা চেয়েছেন বলে সোজা এখানে নিয়ে চলে এলেন মাকে? আচ্ছা ছেলে তো মশাই”। প্রদীপ ইচ্ছে করলে ডাক্তারকে বোঝাতে পারতো তার মা কোন ধাতে গড়া মানুষ। কিন্তু সেই পথে সে হাঁটলোই না। কোনো কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকলো। তারও যেন এক ঘোর লেগেছে চোখে। আমের স্কুপের মধ্যে বৃষ্টি ভেজা মাকে একা বসে থাকতে দেখে তার কি কান্না পেয়েছে? কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজেকে লুকোয় প্রদীপ। আর ওদিকে ডাক্তার অবাক হয়ে শোনেন দুবেলা এখনও তিনশো করে লোকের রান্না করা, কুটনো কাটা ইন্দুবালার দিনলিপি। আতিপাতি খোঁজ নিয়ে হোটেলের ঠিকানা চেয়ে দুটো এন্টাসিড লিখে ডাক্তার ছেড়ে দিলেন ইন্দুবালাকে। তার সাথে ইন্দুবালা তাঁকে বলে এলেন সকালে উঠে লেবুর জলের সাথে মধু খাওয়ার নিদান। তাও যে সে মধু নয়। সর্ষে ফুলের মধু। গরম জলের মধ্যে ঘুরবে তার ঝাঁঝ। চর্বি যাবে কমে। মন থাকবে ফুরফুরে। বাড়ি ফেরার পথে বড় খোকার গাড়ি থামিয়ে পাঁচ কিলো সর্ষের তেল কিনলেন। ততক্ষণে ছোট খোকা, খুকি বেসবাই ফোন করতে শুরু করে দিয়েছে। ইন্দুবালার মুখে হাসি। তিনি এক্ষুনি মরছেন। নাকি? বড় খোকার গাড়িতে এই প্রথম উঠে বেশ লাগলো তাঁর। চারপাশটা কেমন যেন ঠাণ্ডা। কী সুন্দর জুই ফুলের গন্ধ গাড়ির মধ্যে। হুশ হুশ করে কত জায়গায় বেড়াতে যায় ওরা। অথচ সবাই কত কষ্টে বড় হয়েছে। ঈশ্বর করুন যেন এমন থাকে সবাই। দুধে, ভাতে, সুখে, আনন্দে। ওদের এই শ্রী বৃদ্ধি দু চোখ ভরে দেখার আশায় ঈশ্বরের কাছে আরও কয়েকটা বছরের আয়ু চেয়ে নেন তিনি মনে মনে।

ইন্দুবালার শরীর এখন বেশ ভালো। আদৌ কখনও খারাপ হয়েছিল কিনা বোঝা যায় না। তেলের মধ্যে আমগুলো যখন বেশ চুবো চুবো হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রদীপ তার বউকে নিয়ে এলো একদিন। সেদিন যে কথাটা পাড়া হয়নি এবার বলেই ফেললো সাহস করে। “যাবে মা আমাদের সাথে বাংলাদেশ?” ইন্দুবালা খুব যে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিলেন তেমনটা নয়। এঁচোড় কাটছিলেন হাতে তেল মেখে আঠা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে। কুটনো কাটা থেমে গেল তাঁর। বিয়ের পরে যখন দেশ থেকে এসেছিলেন তখন সেটা ছিল পূর্ব পাকিস্তান। আর আজ সেটা বাংলাদেশ। তাঁর ছেলে বলছে মাকে একবার বাংলাদেশ ঘোরাবে। সত্যি কানে ঠিক শুনছেন তো তিনি? কোনো ছলনায় এরা আবার এসে জোটেনি তো এই সাত সকালে? উঠে পড়েন ইন্দুবালা। পড়ে থাকে আধ কাটা এঁচোড়। ডালনার না কাটা আলু। মোচা। আরও অনেক তরিতরকারি। ছেলের কাছে এগিয়ে এসে জানতে চান “হঠাৎ বাংলাদেশ যাওয়ার কথা বলছিস কেন? আমি না মরা পর্যন্ত এই বাড়ি তোমরা বিক্রি করতে পারবে না বড় খোকা”। প্রদীপ হো হো করে হাসে। “তুমি কী করে ভাবলে আমি বাড়ি বিক্রি করার জন্য তোমাকে বাংলাদেশের লোভ দেখাবো?” ইন্দুবালার বিশ্বাস হয় না বড় ছেলের কথা। “এই তো সামনের চক্কোত্তিবাড়ির মেয়ে দুটো বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়ে বাড়ি বিক্রি করে ফ্ল্যাট তুলে দিলো।” সম্পূর্ণা এবার এগিয়ে আসে। ইন্দুবলার বড়ছেলের বউ কম কথা বলে। কিন্তু যেটুকু বলে কাটা কাটা, তীক্ষ্ণ, নুন ছড়ানোর মতো। “আপনি ভুল বুঝছেন মা। চক্কোত্তি বাড়ির সাথে আপনার ছেলে-মেয়েদের গোলাবেন না। আমরা বাংলাদেশের ট্যুর প্ল্যান করছিলাম। আপনার ছেলে তাই ভেবেছিল আপনি গেলে আমাদের ভালো লাগবে। ও তো কোনোদিন দেখেনি…। কলকাতা স্টেশন থেকে এখন ট্রেনও ছাড়ছে। মৈত্রী এক্সপ্রেস। এর মধ্যে বাড়ি বিক্রির কথা আসছে কী করে? আর আমাদের সবার তো বাড়ি আছে মা…।” ট্রেন ছাড়ছে বাংলাদেশের জন্য এই বড় খবরটা ইন্দুবালার কাছে ছিল না এতদিন? “ট্রেনে করে যাওয়া যাবে খুলনা?” বড় ছেলে বলে যাবে। ইন্দুবালা প্রশ্ন করেন “জানলার ধারে সিট পাবো খোকা?” প্রদীপ জানিয়ে দেয় “পাবে। একটা কূপ রিজার্ভ করে নেবো মা। সেখানে আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউ থাকবে না।” কেমন যেন ফুরফুরে মেজাজের হয়ে যান ইন্দুবালা। বাড়ির সামনের তুলসী মঞ্চটাকে স্পষ্ট দেখতে |||||||||| পান। মাকে…বাবাকে…ঠাম্মাকে…ভাইকে…মনিরুলকে…।

বড় ছেলে, বউকে এঁচোড়ের ডালনা, মোচার ঘন্ট, পাবদার ঝোল আর কাঁচা আমের চাটনি খাইয়ে বাড়ি পাঠান ইন্দুবালা। সঙ্গে দিয়ে দেন এক শিশি আম তেল। ভাত খেতে আসা কালেক্টর অফিসের কেরানি থেকে শুরু করে সামনের মেসের ছেলেগুলো এমনকি পাগলা পাঁচুও জেনে যায় ট্রেনে করে ইন্দুবালা বাংলাদেশ যাবেন। সারা রাত ওপরের ঘরে খটর মটর করে কীসের যেন আওয়াজ হয়। ধনঞ্জয় যতক্ষণ জেগেছিল শুনেছে। অনেক ভোরে ইন্দুবালার ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে যায় তার। “কী হয়েছে মা? এত ভোরে?” চোখ কচলায় ধনঞ্জয়। দেখে ইন্দুবালার পরিপাটি করে চুল বাঁধা। নতুন কাপড় পরা। কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি। “কী হলো কি মা তোমার? নাতি পাসপোর্টের ফটো তোলার জন্য তোমাকে নিয়ে যাবে বেলা নটায়। এখন থেকে কাপড় পরে বসে আছো কেন?” ইন্দুবালা হুকুমের সুরে বলে “একটা ট্যাক্সি ডাক। আমি কলকাতা স্টেশন যাবো।” ধনঞ্জয় বলে “এ্যাঁ? এতো সকালে কলকাতা স্টেশনে? দেশে যাওয়ার নামে তোমার মাথা কি সত্যিই খারাপ হলো?” ইন্দুবালা কোনো কথা না বলে দরজার দিকে এগোলে কোনোরকমে উঠে জামা পরে দৌড় লাগায় ধনঞ্জয়। এই মুড তার অনেক দিনের চেনা। বেশি কথা বললে জেদ আরও বাড়বে। নিজেও চলে যেতে পারে। তখন হিতে বিপরীত হবে। দাদাবাবুদের কাছে কৈফিয়ৎ দিতে দিতে জান কাবার হবার জোগাড়। তাই কথা না বাড়িয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে নিজেও চেপে বসে ধনঞ্জয়।

দুটো প্ল্যাটফর্ম টিকিট কাটা হয়। ইন্দুবালা বলেন “জিজ্ঞেস কর মৈত্রী এক্সপ্রেস কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে?” একজন টিটি দেখিয়ে দেয়। “ওই তো… দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ওদিকে তো যেতে পারবেন না। সময় হয়নি এখনও। টিকিট আছে তো? পাসপোর্ট, ভিসা? সব চেক হবে কিন্তু।” ইন্দুবালার ওইসব কিছু নেই। তিনি দূর থেকে দেখেন মৈত্রী এক্সপ্রেসকে। ট্রেনের গায়ে বড় বড় করে বোর্ডে লেখা কলকাতা-খুলনা। কিন্তু সেই আগের ট্রেনটার মতো সবজেটে নয়তো। কেমন যেন ধূসর নীল। ইন্দুবালার বিশ্বাস হয় না। এবার নিজেই এগিয়ে যান টিটির কাছে, “আচ্ছা আপনি ঠিক বলছেন তো ভাই? এই ট্রেনটাই যাবে খুলনা?” বিরক্ত হয় টিটি। একে ইন্টারন্যাশানাল ট্রেন। তার ওপরে ঝক্কি আছে অনেক। সিকিউরিটির দিকে সব সময় খেয়াল রাখতে হয়। তার মাঝে কিছু লোক এসে দেশ দেশ করে এমন ন্যাকামো করে না। ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে, “দেখতেই তো পাচ্ছেন লেখা আছে সব কিছু”। ইন্দুবালা অবাক হন নাতির বয়সী ছেলেটার বিরক্তি দেখে। “ওকি রেগে যাচ্ছো কেন বাবা? ধনা, ওনাকে দুটো নাড়ু দে। ট্রেন দেখতে আসলে কেউ এরম করে বকে?” কী বলবে বুঝতে পারে না বছর সাতাশের অখিলেশ। নতুন চাকরির প্রথম পোস্টিং তার। হাতে নাড় নিয়ে দিদার মতো এক মহিলাকে একটু দূর থেকে ট্রেনটা দেখতে বলে এগিয়ে যায় সে নিজের কাজে। ইন্দুবালা অবাক হয়ে দেখেন ট্রেনটাকে। এর কত ভাগ্য। কতবার ছুঁয়ে আসছে দেশটাকে। আর তিনি? সেই যে চলে এসেছিলেন আর একটি বারের জন্যেও যাওয়া হয়নি। বলা যেতে পারে যাননি। ধনঞ্জয় তাড়া দেয় “হলো মা তোমার? হোটেলের দেরি হয়ে যাবে যে। রান্না বসাবে কখন?”। ইন্দুবালা ধমকান, “তুই থাম। কিচ্ছু দেরি হবে না। সব আমি সামলে নেবো। কী জানিস তুই এই ট্রেনের?” ধনঞ্জয় মনে মনে ভাবে জানার আর কী আছে? সেও তো দেশের বাড়িতে ট্রেনে করেই যায়। আর মা এখন আদেখলার মতো ট্রেন ঘুরে ঘুরে দেখছে। যেন কোনোকালে ট্রেন দেখেনি। ইন্দুবালার ইচ্ছে করছিল একবার ট্রেনটার গায়ে স্পর্শ করতে। দুই দেশের মধ্যে যখন সব যোগাযোগ বন্ধ তখন সেই সবজেটে ট্রেনটাই কি একটা থমকে থাকা সময়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতো না শিয়ালদার স্টেশনে? মাঝে মাঝে লছমীর সাথে শুধু সেই ট্রেনটাকে দেখবেন বলে চলে আসতেন ইন্দুবালা। সেই ট্রেনের গায়ে হাত দিলে তিনি তার দেশকে দেখতে পেতেন। গ্রামটাকে দেখতে পেতেন। গন্ধ পেতেন মায়ের আঁচলের। প্ল্যাটফর্ম এখনও ফাঁকা। ছোকরা টিটিকেও দেখা যাচ্ছে না আর। ইন্দুবালা আরও এগিয়ে যান ট্রেনটার দিকে। কাঁপা কাঁপা হাতে স্পর্শ করেন তার গা। কিন্তু কোথায়? ভেসে আসছে না তো তার দেশের গন্ধ। কলাপোতার গ্রাম। বোসদের পুকুর। কপোতাক্ষ নদ। ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকির মিটমিট করে জ্বলে থাকা। না না না এই ট্রেন তাঁর সেই সবুজ কাঁচা আমতেল রঙের ট্রেন নয়। এই ট্রেনে করে তিনি দেশ ছেড়ে আসেননি। এই ট্রেন তাঁর দাদুকে শেষবারের মতো নামিয়ে দেয়নি কপোতাক্ষের ধারে। এই ট্রেন তো এখন বেড়াতে যাওয়ার। দেশে ফেরার নয়। উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করা নয় সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোকে দেখার জন্য। চোখ দিয়ে টিপটিপ করে বৃষ্টির মতো পড়তে থাকে জল। অনেক দিন আগে একাত্তরে তাঁদের কলাপোতার বাড়িটা পুড়িয়ে দিয়েছিল খানসেনারা। বাড়ির সাথে পুড়েছিল মা, ভাই আরও অনেকে। সেই চিতাভস্ম আর হাজার হাজার শহীদের রক্তে যে দেশটা গড়ে উঠেছে নতুন করে সেখানে আজ গিয়ে দাঁড়ালে তাঁর বাড়িটাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না ইন্দুবালা নিশ্চিত জানেন। এবার যদি গিয়ে গ্রামটাকেই না খুঁজে পান? যদি বোস পুকুরটাই আর না থাকে? কপোতাক্ষের ঘাট? মনিরুলের বাড়ির উঠোন? বড় মাঠের ফলসা গাছ? তাহলে কার কাছে ফিরে যাবেন ইন্দুবালা? কার আঁচলে মুখ লুকোতে? যারা ছিল অথচ আজ নেই? নাকি যারা মরেও বেঁচে আছেন ইন্দুবালার মধ্যে? নীরবে কাঁদেন ইন্দুবালা। কোনো সদুত্তর পান না অন্তর থেকে। শুধু এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া মানুষদের ভিড় বাড়ে। পাসপোর্টে ছাপ পড়ে। বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার করে মানুষ। এক সময়ে যে দেশটা নিজের দেশ ছিল সেটারই বেড়া টপকায়। প্রত্যেক বছর বৃষ্টি আসে নিয়ম করে দু দেশেই। তবুও সীমান্তের দাগ মুছে যায় না সেই জলে। ওটা ইন্দুবালার দাদুর স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়।

কলকাতা স্টেশনে যাত্রীদের আনন্দের আতিশয্যের ফাঁকে সেদিন ট্রেনে ওঠার আগে কেউ কেউ লক্ষ্য করলেন এক সত্তর পেরোনো মহিলাকে। যার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে করুণাধারা। যিনি চুপ করে বসে আছেন দেশ নামের এমন এক স্বপ্ন নিয়ে, যে দেশে তাঁর জন্যে আজ আর অপেক্ষা করে থাকবার কেউ নেই। মনে মনে আরও একবার প্রতিজ্ঞা করলেন ইন্দুবালা। ভাতের হোটেল ছেড়ে তিনি কোত্থাও কোনোদিন যাননি। আজও যাবেন না। শত প্রলোভনেও না। হনহন করে হাঁটতে থাকেন তিনি ওভার ব্রিজ দিয়ে। এক্ষুনি তাঁর মনে পড়ে গেছে আজকের মেনুতে আম-কই এর কথাটা বোর্ডে লিখতে ভুলে গেছেন। ধনঞ্জয় শুধু জানে এই একটা পদ খেতেই আজ ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের সামনে লাইন পড়বে। কই মাছের মাখো মাখো ঝোল থেকে সুবাস উঠবে আম তেলের।

মালপোয়া

ভোর থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার অনেক আগেই। অন্ধকার ঘরটায় শুয়ে বৃষ্টির আওয়াজ শুনছিলেন ইন্দুবালা। অল্প অল্প বাতাসে দুলছিল জানলার হালকা পর্দাগুলো। তার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছিল একটু একটু করে ফর্সা হতে থাকা মেঘলা আকাশ। একতলায় ভাতের হোটেলের ওপরে তাঁর এই ঘরটা ছোট্ট হলেও বেশ খোলামেলা। অন্তত এই বাড়ির অন্যান্য ঘরগুলোর থেকে তো বটেই। ঘরের চারিদিক বরাবর বেশ কয়েকটা জানলা। সামনের দিকে এগিয়ে গেলে ছেনু মিত্তির লেন। হরেক মানুষ, গাড়ি ঘোড়ার যাতায়াত, সার সার বাড়ি। আর পেছন দিকটা শাশুড়ির আমলের ছোট্ট বাগান। সিঁড়িঙ্গে নারকেলগাছ। উঠোনের আমগাছের ডালপালা আরও কয়েকটা জানলায় ছড়ানো ছিটানো। এই ঘরটা আসলে ছিল ইন্দুবালার স্বামী মাস্টার রতলনাল মল্লিকের আমোদের জায়গা। তিনি তাঁর ইয়ার বন্ধুদের ডেকে নিয়ে এসে এই ঘরেই তুলতেন। দিন রাত তাস পেটা চলতো। তার সাথে গেলাসের পর গেলাস হুইস্কি আর সোডা। ঘরখানায় ঢুকলে তখন মনে হতো কেউ যেন সক্কালের আঁচ ধরিয়েছে। ঝাঁট দিয়ে জড়ো হতো রাশিকৃত পোড়া সিগারেট, বিড়ি, আরও কত কী। শাশুড়ি উঠতে বসতে খোঁটা দিতো বউয়ের গতর নিয়ে। যে গতরে তাঁর বাহিরমুখো ছেলে অন্দরে মন বসাতে পারলো না। যে গতর দেখে তিনি ভিসা পাসপোর্ট করে ওপার বাংলা থেকে ছেলের জন্য বাঙাল বউ নিয়ে এলেন। অথচ যে গতর বিলিয়ে সংসারে নাতি নাতনির অভাব হলো না মোটেও। তিন তিনটে সন্তানকে রেখে মাস্টার রতলনাল মল্লিক যখন ইহ জীবনের মায়া ত্যাগ করলেন তখন ইন্দুবালা ভেতরের ঘর থেকে বাইরের এই ঘরে এসে থাকতে শুরু করলেন। শুধু কি অনেক আলো, হাওয়া, বাতাসের জন্য? না, তা মোটেই না। এই ঘরে থাকলে তিনি নীচের হোটেলের রান্নাঘর থেকে ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের উপস্থিতি টের পেতেন। সিঁড়ির মুখ থেকে এই ঘরের দিকে নজর রাখা যেত খুব সহজে। আর এই ঘরটায় এলেই যেন ইন্দুবালার কলাপোতার বাড়ির দাওয়াখানা মনে পড়ে যেত। চারিদিকে সবুজের চাঁদোয়া।

ইন্দুবালা পাশ ফিরলেন। এই এত বয়সেও স্মৃতিগুলো কেন এলোমেলো হয়ে যায়? ভুলেও তো যেতে পারে মানুষ অনেক কিছু? অনেকে ভুলেও যায়। শুনেছেন তিনি। এমনকি নিজে কে ছিল। নাম কী। বাড়ির লোকজন পর্যন্ত সবাইকে ভুলে যায়। কিছু নাকি আর মনে থাকে না রোগটা হলে। চারপাশটাকে তখন কি আরও নতুন লাগে? পুনর্জন্মের মতো? কে জানে? আয়নার সামনে এই যে নিজেকে দেখে না চেনার বিড়ম্বনা। কিংবা নতুন আমিকে চিনে নেওয়া। সেটা কি আরও যন্ত্রণাদায়ক নয়? হয়তো। কিন্তু প্রতিদিনের, প্রতিক্ষণের এই স্মৃতির বোঝা টানা আরও কষ্টকর ইন্দুবালার কাছে। নিয়তিকে দোহাই দেন ইন্দুবালা। হয় ভুলিয়ে দাও। না হলে ভুলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। অদৃষ্টকে সাত গাল পাড়লেও অনেক কিছু ভোলা হয় না ইন্দুবালার। ভাগ্যিস ভোলা হয় না। তাই তো আনাজের চুবড়ি থেকে, সূঁচ সুতোর কৌটো থেকে, ভাতের হাঁড়ির সুবাস থেকে বেরিয়ে আসে কত কত গল্প। ইন্দুবালা চোখ বন্ধ করে আবার একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করলেন। ঠাম্মা সন্ধ্যেবেলায় আফিম খেতো। ছোটো ছোটো কালো কালো গুলি করা থাকতো পিতলের কৌটোতে। বাবা খুলনা শহরের বড় এক আড়তদারের কাছ থেকে নিয়ে আসতেন। ফুরিয়ে আসতে থাকলেই ঠাম্মার মাথা যেত খারাপ হয়ে। একটানা আবদার চলতো তার। ধুয়ো টেনে টেনে ঠাম্মা বলে চলতো, “ও ব্রজ, নিয়ে আয় না বাবা। শেষ হয়ে গেল যে গুলি”। সেই কাতর চাহনি এখনও যেন মনে পড়ে ইন্দুবালার। ঠিক মরে যাওয়া মানুষের চাহনির সাথে তার কি কোনো মিল ছিল? ছ্যাঁৎ করে ওঠে বুকটা। শাশুড়ির কথা মনে পড়ে। স্বামীর কথাও। মৃত মানুষের চাহনি ইন্দুবালাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। ঘিরে ধরে এক বৃষ্টি ভেজা সকালে।

মুকুলে ভরা আম গাছের তলায় শোয়ানো হয়েছিল দাদুকে। বসন্তের আগমনের আগাম জানান দিচ্ছিল দু একটা কোকিল দূরের কোনো গাছ গাছালির শাখায় বসে। ইন্দুবালা তখন খুব ছোটো। কিছুক্ষণ আগে ঠাম্মা ভাজছিলেন দাওয়া আলো করে নতুন গুড়ের মালপোয়া। গোটা গ্রামে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল গন্ধ। তেলের ছাঁক ছুক আওয়াজে উমনো ঝুমনোর পিঠে খাওয়ার গল্পটা আগাগোড়া বলে চলেছিল ঠাম্মা। হাঁ করে বসে শুনছিল ছোট্ট ইন্দুবালা। দাদু স্নান করতে যাচ্ছিল বোসদের পুকুরে। বাবা গিয়েছিল ধান বিক্রি করতে হাটে। মা ছিল শোওয়া। ভাই তখন পেটে। দাদুর ইচ্ছে হয়েছিল অসময়ে মালপোয়া খাওয়ার। মুখ ফুটে যে মানুষ কিছু চায় না কোনোদিন, সেই মানুষ যখন মালপোয়া খেতে চেয়েছে ইন্দুবালার ঠাম্মার আনন্দ আর গোপন থাকে না। নিজেই গম পিষিয়ে নতুন আটা বের করেছেন জাঁতি ঘুরিয়ে। চাল কুটেছেন ঢেকিতে। বেটেছেন শিলনোড়ায় মিহি করে। নতুন গুড়ের হালকা একটা রস করেছেন। কয়েকদিন খুব ব্যস্ত থেকেছেন নানা তরিজুতের ছোটোখাটো উপকরণ নিয়ে। আর ছোট্ট ইন্দুবালা ঠাম্মার আঁচল ঘিরে, কাপড় জড়িয়ে, কোলে শুয়ে সেই আখ্যানের অংশীদার হয়েছে। উমনো ঝুমনোর গল্প যখন ফুরিয়ে এসেছে, শেষ মালপোয়া যখন তেলের ওপর লাল হয়ে ফুলে উঠছে, মৌরির সুবাস যখন কলাপোতা গ্রামে ম ম করে উঠছে, দাদু স্নান সেরে এসে তুলসী প্রণাম করতে গিয়ে বসে পড়লেন দাওয়ায়। জীবনের শেষ প্রার্থনা আর তাঁর করা হলো না। একদিন কথা বন্ধ রেখে পরের দিন ভোরের সূর্য ওঠার আগে দাদু চলে গেলেন। আমতলায় শোয়ানো থাকলে তাঁর দেহ। হরিনাম সংকীর্তনের দল গোল হয়ে ঘিরে ঘিরে ইনিয়ে বিনিয়ে সুর তুললো। বাড়ি থেকে কেউ মরা কান্নার চিৎকার করলো না। ঠাম্মা বসে থাকলেন চুপ করে পাথরের মতো। বাবা কী করবে বুঝতে পারলো না। মায়ের তখন সবে প্রসব যন্ত্রণা উঠেছে। ইন্দুবালা চুপি চুপি দাওয়ার পাশে ছোট্ট বেড়া দিয়ে ঘেরা রান্নাঘরে তখন। কাঁসার রেকাবিতে চাপা দেওয়া আছে গতকালের মালপোয়া। রসে ফুলে ততক্ষণে সেগুলো টইটম্বুর। এদিক ওদিক তাকিয়ে হাতে তুলেছিল সবে ছোট্ট মেয়েটা। গ্রামের কোন এক বউ দেখে ফেলেছিল। রে রে করে উঠে এসে ধরেছিল হাত। “অশৌচের বাড়িতে খেতে আছে কোনো কিছু? ফ্যাল হাত থেকে। ফ্যাল বলছি”। ইন্দুবালা ফেলতে পারেননি সেই মালপোয়া। গোটা রাত ধরে নতুন গুড়ের রসে ভাসতে ভাসতে সেগুলো যেন ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল। হালকা গন্ধ বেরোচ্ছিল মৌরির। এতক্ষণ যে ঠাম্মা কারো সাথে কোনো কথা বলেননি, তিনি উঠে এলেন রান্নাঘরে। খুব শান্ত অথচ কঠিন গলায় বললেন, “ছেড়ে দাও ওকে পাঁচুর মা। ওর খাওয়া মানে ওর দাদুর আত্মার শান্তি পাওয়া। আত্মা না জুড়ালে মায়া কাটবে কী করে?” গপ গপ করে গোটা তিনেক মালপোয়া খেয়ে নিয়েছিলেন ইন্দুবালা। তাঁর হাতে মুখে লেগেছিল রস। ঠাম্মা গড়িয়ে দিয়েছিলেন জল। নিজে হাতে খাইয়েছিলেন নাতনিকে। মুখ হাত ধুইয়ে, মুছিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, “ভালো লেগেছে ইন্দু তোর?” একটা বড় হ্যায় মাথা নেড়েছিলেন ছোট্ট ইন্দুবালা। ঠিক সেই সময় আঁতুর ঘর থেকে ভেসে এসেছিল নবজাতকের কান্নার শব্দ। ঠাম্মা নাতির মুখ দেখে বলেছিলেন, “সেই ফিরে আসতে হলো তো? কোথায় যাবে আমায় ছেড়ে?” তাঁর বিশ্বাস ছিল দাদু ফিরে এসেছেন আম, জাম, কাঁঠাল, মালপোর গন্ধ বুকে নিয়ে। বাবা ফিরেছিলেন শ্মশান বন্ধুদের সাথে বিকেলেরও পরে। ততক্ষণে ঠাম্মার সাদা থান পরা হয়ে গেছে। ছোট্ট ভাইটা হাঁ করে ঘুমোচ্ছে তার কোলে। এদের কারো মৃত মুখ দেখেননি ইন্দুবালা। ভাগ্যিস সেই চরম দুর্ভাগ্য হয়নি তাঁর।

খাটের ওপর চিৎ হয়ে শোন ইন্দুবালা। পিঠের ব্যথাটা আরও বাড়ে। রাতের নেওয়া হট ওয়াটারের ব্যাগটা তখনও অল্প অল্প গরম। কাছে টেনে নেন। পিঠের কাছে রাখলে আরাম পান। যন্ত্রণা শুধু স্মৃতির নয় শরীরেরও। সব যন্ত্রণা শেষ হলে মানুষ মুক্তি পায়। তাই হয়তো সেই অন্তিম লগ্নে মুখের ওপর ছেয়ে থাকে পরম শান্তির ছায়া। এখনও কি জীবনে শান্তি নেই ইন্দুবালার? দিব্যি শান্তি আছে। না হলে নিজেকে এইভাবে জিইয়ে রেখেছেন কী করে? শুয়ে শুয়েই বুঝতে পারেন রাস্তার উলটো দিকে কর্পোরেশানের কলে জল নিতে আসছে টুকটাক করে বাজারের লোকজন। উঠতে ইচ্ছে করছে না। সারা দেহের অবসাদ আজ যেন মনে নেমে এসেছে। ঠাম্মার মৃত্যু সংবাদ যেদিন ভাই নিয়ে এসেছিল সেদিন ইন্দুবালার সাধ। বাড়ি ভরতি লোক বিয়েতেই হয়নি সাধে হবে ভাবাটাও বোকামো। নিজের বউভাতের রান্না যেমন ইন্দুবালাকে নিজেই করতে হয়েছিল ঠিক তেমনি সাধের রান্নাটাও। গোনাগুন্তি মাছের দাগা ছিল। চাল নেওয়া হয়েছিল মাথা গুনে। শাশুড়িকে খাইয়ে, স্বামীকে খাইয়ে যখন ইন্দুবালা নিজে খেতে বসতে যাবেন দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। ওই ভরা অবস্থায় রান্নাঘর থেকে উঠে এসে সদর খুলতে হলো তাঁকেই। শ্রাবণের চড়া রোদ আর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাইটা তাঁরই সামনে। কতদিন পরে। চোখে তখন দিদির কপোতাক্ষের টলটলে জল। ইচ্ছামতী গাল বেয়ে গড়াচ্ছে। বাড়িতে ঢুকতে বলবেন কী! ভাষাই হারিয়ে ফেলেছেন যেন ইন্দুবালা এতদিন পরে ভাইকে দেখে। ঠোঁটের ওপর গোঁফের রেখা। গালে কচি ঘাসের মতো দাড়ি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। ঠিক যেন মনিরুল সেজে দাঁড়িয়ে আছে ভাই। “ভেতরে আসতে বলবি না? এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো?” ইন্দুবালা ভাইকে জড়িয়ে ধরেন। ঝুপ করে যেন তাকে ছুঁয়ে ফেলে কলাপোতার গ্রামটা। বোসদের পুকুর। তেপান্তরের ধানক্ষেত। কতবেলের আচার। আর ভাই দেখে তার দিদি আরও সুন্দর হয়েছে। গা থেকে খসে গেছে অজ গাঁয়ের পুরোনো চাদর। নতুন মা হবার যাবতীয় সব কিছু যেন গা থেকে তেড়েফুঁড়ে বের হয়ে আসছে তার। ঠিক এই সময়েতো ইন্দুবালার থাকা উচিত ছিল গ্রামে। ঠাম্মা কী খুশি হতো! উঠোন ভরে উঠতো আচারের বয়ামে। মা বিশালাক্ষ্মী তলায় পুজো দিতো। আর বাবা? সবার বাড়িতে গিয়ে মিষ্টি দিয়ে বলে আসতো, “এই যে শুনছো আমার ইন্দু মা হবে। তোমরা ওকে সবাই আশীর্বাদ করো। সব যেন ঠিক মতো হয়ে যায়। নাতনির সন্তান দেখার আশায় ঠাম্মা ছিলেন না। এত সৌভাগ্য তাঁর কপালে জুটবে না সেটা হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তিনি শুধু চেয়েছিলেন তাঁর এই শেষ শয্যায় মেয়েটা এসে একটু বসুক। বাবা চিঠি দিয়েছিলেন বেশ কয়েকটা। নিজেই আসতে পারতেন মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিন্তু তাঁর শরীরটা তখন ভালো নয়। ভাইটা পরীক্ষা দিচ্ছে। তার পক্ষে আসাও সম্ভব ছিল না। প্রত্যেকটা চিঠি আসার পরেই ইন্দুবালার শাশুড়ি মুখ ভার করে থাকতেন। এই বুঝি তাঁর ছেলেকে ফুসলে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায় বউ। কিন্তু সেই আশার আগুনে জল পড়তো বারে বারেই। ছেলে দু দিন পর পর যাও বা বাড়ি ফিরতো কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিত সারাদিন। শাশুড়ির তখন ছেলেকে খাওয়ানোর ধুম লেগে যেত। ইন্দুবালাকে উনুনের সামনে বসিয়ে ফিরিস্তি মতো এটা সেটা রান্না করিয়ে নিতেন। ছেলেও তখন দিন কতক ঘুমিয়ে, রাশিকৃত গিলে, পাউডার সেন্ট মেখে বউয়ের গা থেকে যেকোনো একটা গয়না খুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়তো। সেই যে বেরোতো, টাকা না ফুরানো পর্যন্ত বাড়ি ফিরতো না। ছেলে না ফিরলে শাশুড়ির কাজও যেত কমে। একমাত্র বসে বসে দুশ্চিন্তা করা ছাড়া তখন আর তাঁর কিছু করার থাকতো না। এমনকি নাতিগুলো কী খেয়েছে না খেয়েছে সেসব দিকেও নজর থাকতো না তাঁর। ডালে চালে ফুটিয়ে চলে যেত সংসার। কোনো কোনো দিন লছমী এলে মাছ জুটতো বাচ্চাদের পাতে। এইসময় ইন্দুবালা সংসারের কাজ থেকে একটু অবসর পেলেই চিঠিগুলো চোখের সামনে নিয়ে বসে থাকতেন। অক্ষরগুলোর গায়ে হাত বোলালে মানুষগুলোকে স্পর্শ করছেন বলে মনে হতো। কত কত রাত যে জেগে কাটিয়েছেন একা একা ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েগুলোকে নিয়ে, সঙ্গী থেকেছে তো এই স্মৃতিই। মনে মনে বুনে চলেছেন সেই কবে থেকে এক নক্সীকাঁথা। যতই অতীতকে গাল পাড়ুন না কেন সেই নক্সীকাঁথায় নিজেকে জড়ালে চার পাশে না থাকা মানুষগুলোর ওম পেয়েছেন ইন্দুবালা। ঠিক এখন যেমন পাচ্ছেন হট ওয়াটার ব্যাগের। এক বর্ষার ভোরে চোখে কেঁপে নামছে যেন সারা রাতের ঘুম।

ভাইকে দেখে বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন শাশুড়ি। “বলি কোন কাণ্ডজ্ঞান আছে তোমাদের? শুভ বাড়িতে অশৌচে এগোচো নাকি?” মাথা নেড়েছিল ভাই। শ্রাদ্ধ, নিয়মভঙ্গ সব কাজকর্ম মিটিয়ে তারপরে সে এসেছে। আরও বিরক্ত হয়ে বুড়ি বলেছিল “তাহলে আর কী! গেলাও কোটাও এবার ভাইকে।” খারাপ লেগেছিল ইন্দুবালার কথাটা শুনতে। ভাইয়েরও কি খারাপ লাগেনি? নিশ্চয়ই লেগেছিল। সে চলে যেতে চেয়েছিল তখনই। ইন্দুবালা বুঝিয়েছিলেন অনেক, “বয়েস হয়েছে তো। তাই এমন হয়ে গেছে মানুষটা। তুই রাগ করিস না ভাই। চট করে স্নানটা সেরে আয় দেখি”। ভাই চলে গেলে ইন্দুবালা খাবার জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই কতদূর থেকে তেতে পুড়ে এসেছে ছেলেটা। অমন ভাবে না বললেও হয়তো পারতেন শাশুড়ি। কিন্তু তিনি জানেন এই সংসারে একটা লোক বেশি খাওয়া মানে ভাঁড়ার ঘরে টান পড়া। ছেলের নেশা বেড়েছে। বাইরে মতি গতিও। কেমন যেন কঙ্কালসার হয়ে উঠছে বাড়ির চেহারাটা আস্তে আস্তে। বুড়ি সারাদিন তাই খিটখিট করেন। নিজের যা গয়না ছিল সেগুলো অনেক দিন আগেই গেছে। বউয়েরগুলো ছেলে নিচ্ছে। তাই এবার হাত পড়েছে বাসনের বাক্সে। ভারী ভারী সব গামলা, ঘড়া বিক্রি চলছে। এগুলো গেলে আর কিছু থাকবে না তাঁর আমলের। পাছে পোয়াতি বউয়ের অভুক্ত মুখটা দেখতে হয় তাই বুড়ি গিয়ে শুলো ওপরের বারান্দার ঘরে। আর এদিকে ইন্দুবালা আসন পেতে কাঁসার থালায়, বাটিতে সাজিয়ে দিলেন নিজের খাবারটুকু। পরম আদরে খাওয়ালেন ভাইকে। খুব ছোট্ট থেকেই ছেলেটা বড্ড আস্তে আস্তে খায়। তার খাওয়া নিয়েও ছিল নানান ঝামেলা। এটা খাবো না। ওটা খাবো না। মা বড় বড় দলা করে ভাতের গ্রাস গালের মধ্যে পুড়ে দিতেন। ঠাম্মা ওদিক থেকে চিৎকার করতো, “ও বউমা করো কী? মেরে ফেলবে নাকি দুধের বাচ্চাটাকে?” আর একটু বড় হলে এক থালায় ভাত নিয়ে স্কুলে যাওয়ার আগে ইন্দুবালা আর তার ভাই খেয়ে নিত। ভাইকে খাওয়াতে বড় ভালো লাগতো তাঁর। ছোটো ছোটো দাঁতগুলো আঙুলে ঠেকতেই কেমন যেন সুড়সুড় করে উঠতো হাত। সেই ভাই কী পরিপাটি করে আজ নিজে নিজেই খাচ্ছে। বসার ভঙ্গীটাও ঠিক বাবার মতো। বাবু হয়ে, সামনের দিকে মাথাটা বেশ খানিকটা ঝুঁকিয়ে। খাওয়ার সময় বাবা কথা বলতো না একটুও। ভাইও না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ইন্দুবালা। যতক্ষণ না খাওয়া শেষ হয়। ভাইয়ের মধ্যে ইন্দুবালা কাকে খুঁজছিলেন সেদিন? বাবাকে? মনিরুলকে? নাকি নিজের ফেলে আসা অতীতকে? চলে যেতে চেয়েছিল ভাই সেদিনই। কলেজ স্ট্রিট। সেখান থেকে কোনো এক বন্ধুর বাড়ি। এখানে আবার তোর বন্ধু হলো কী করে?” সন্দেহ হয়েছিল ইন্দুবালার। “বল থাকতে ভালো লাগছে না দিদির বাড়ি। আদর যত্ন হচ্ছে না একটুও।” ভাই মিটিমিটি হেসেছিল। “তুইও দেখছি কলকাতার মতো কথা বলতে শিখে গেছিস দিদি”। সেদিন ভাইয়ের আর ফিরে যাওয়া হয়নি। বরং বলা ভালো যেতে দেননি ভাইকে ইন্দুবালা। “একটু ঘুমিয়ে নে ভাই। তারপরে বিকেলে না হয় কলেজ স্ট্রিটের দিকে বেরোস। চিনতে পারবি তো রাস্তা”। ভাই যতক্ষণ না ঘুমিয়ে পড়ে ইন্দুবালা ঠায় বসে থাকেন তার মাথার কাছে। হাত পাখা দিয়ে বাতাস করেন। অনেক কিছু জানতে ইচ্ছে করে তাঁর। কিন্তু কিছুই জানা হয় না। একটু কথা বলেই ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্ত ভাই। দিদির কোলের কাছে তার মাথাটা। চুলগুলো এলিয়ে পড়েছে কপালে। ঘুমিয়ে থাকা মুখের প্রশান্তি বড় ভালো লাগে ইন্দুবালার। এই প্রশান্তি কি তিনি দেখেননি স্বর্ণলতার মুখেও? পুকুরে ভাসছিল দেহটা। বউ সাজার বড় শখ ছিল তার। রিয়াজও ভালোবাসতো মেয়েটাকে খুব। স্বর্ণলতার ফুলে ওঠা দেহটাকে জল থেকে তোলা হয়েছিল বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার মুখটায়। বন্ধ করা চোখ দুটোয় ছিল নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ার শান্তি। ঠোঁটের কোনায় ছিল এক টুকরো হাসি। যেন জলের তলা থেকে ঘুমন্ত রাজকন্যেকে তোলা হলো এক্ষুনি। কথা ছিল রিয়াজ দাঁড়িয়ে থাকবে খেয়া ঘাটে। রাতের নৌকা তাদের পার করে দেবে সভ্য জনপদ। দূরে কোথাও তারা ভালোবাসার জঙ্গলের মধ্যে আশ্রয় নেবে। যেখানে কেউ তাদের চেনে না। জানে না। ধর্মের পরিচয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে না। স্বর্ণলতা ঠিক পে ছৈছিল সময়েই। খেয়াও ছিল ঘাটে বাঁধা। শুধু রিয়াজ আসেনি। অনেক ভোরে আকাশ যখন সবে ফর্সা হতে শুরু করেছে স্বর্ণলতা রিয়াজকে পেয়েছিল ধানক্ষেতের আলের ধারে। রিয়াজের কাছে সব কিছুই ছিল শুধু প্রাণটুকু ছাড়া। কারা যেন তার শ্বাসনালিটা কেটে দিয়েছিল এফোঁড় ওফোঁড় করে। এত রাগ ছিল তাদের রিয়াজের ওপরে, জানে মেরেও শান্তি পায়নি তারা। কুপিয়ে রেখে গিয়েছিল দেহটাকে। নিজের ভালোবাসার মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে স্বর্ণলতার তখন কান্নায়, দুঃখে লুকিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু কোথায় লুকোবে সে? যেখানেই যাবে ভালোবাসাহীন মানুষগুলো তাকে কুরে কুরে খাবে। তাই ডুব সাঁতার দিয়েছিল সে জলে। যখন ভেসে উঠেছিল তখন বেলা গড়িয়ে গেছে। জালের মধ্যে ঘুমন্ত রাজকন্যেকে দেখার জন্য আশেপাশের গাঁ থেকে ভিড় করে এসেছিল মানুষ। খবরটা প্রথমে এনেছিল মনিরুল। ইন্দুকে বলার পর ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল মেয়েটা। সেদিনও যে সৰ্বর্ণলতা স্বপ্ন দেখতো সংসারের। রিয়াজের সাথে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে কোথাও। বলেছিল চিঠি দেবে ইন্দুকে। সংসার সাজিয়ে তার খুঁটি-নাটি নিয়ে লিখবে অনেক কথা। পুণ্যি পুকুর ব্রত করতে গিয়ে বিড়বিড় করে মানত করতে স্বর্ণলতা। রিয়াজের সাথে সংসার যেন হয় তার। কেউ কথা শোনেনি মেয়েটার। এমনকি ঈশ্বরও না। এর আগে কোনোদিন মনিরুল ইন্দুকে কাঁদতে দেখেনি। যদিও প্রথম চিঠিটা ততদিনে দেওয়া হয়ে গেছে দুজনের। সেখানে ভালোবাসার কথা কোথাও লেখা ছিল না। ছিল শুধু বাংলার মাঠ ঘাট সবজেটে রঙের জীবনের কথা। ছিল এক দিন দেখা না হলে অন্যদিনের অনেক না বলা দুঃখ, মন কেমনের কথা। সেটাই কি ভালোবাসা নয়? ছটফট করে ওঠেন ইন্দুবালা। তাহলে কি এতক্ষণ ভাইয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি মনিরুলের কথাই চিন্তা করছিলেন? উঠে পড়েন। পেটের ভেতর থেকে লাথি মারছে বাচ্চাটা। যেমন খিদে পেয়েছে তার মায়ের। তেমনি তারও। রান্নাঘরে এসে দেখেন চাল বাড়ন্ত। ভাত বসাবেন তার যোগাড়টুকু নেই। এই এত বেলায় কী খাবেন? নজরে পড়লো বেতের ঝুড়ি শালপাতায় মোড়া। ভাই এনেছে। তাকে এতক্ষণ যত্ন-আত্তি করতে গিয়ে সেদিকে নজরও পড়েনি। ভুলেই গিয়েছিলেন ইন্দুবালা। শালপাতায় বাঁধা টুকরিটা খুললেন। তার মধ্যে থরে থরে সাজানো আছে মালপোয়া। চোখ ফেটে জল এলো ইন্দুবালার। গোগ্রাসে খেতে থাকলেন তিনি। যেন কত জন্মের খিদে নিয়ে দাদু ঢুকে পড়েছেন তাঁর পেটে। ঠাম্মার হাতে না হোক গাঁয়ের ভোলা ময়রার দোকানের মালপোয়া খেতে চাইছে গোটা শরীর তোলপাড় করে। অনেকটা খাওয়ার পর যখন থামলেন ইন্দুবালা তখন জলতেষ্টা পেয়েছে খুব। কিন্ত জল গড়িয়ে দেওয়ার মতো কেউ নেই হাতের কাছে। শুনেছিলেন ঠাম্মাকেও শেষ সময়ে জল খাওয়াতে পারেনি কেউ। গড়িয়ে পড়েছিল গালের পাশ দিয়ে সব জলটুকু। ঠিক তখনই সেই মুহর্তে বুক ছাপিয়ে, গলা কাঁপিয়ে কান্না পেলো ইন্দুবালার মৃত ঠাম্মার জন্য। পায়ের তলায় গোটা পৃথিবীটা যেন নড়ে উঠলো হঠাৎ। চোখে অন্ধকার দেখলেন। যা খেয়েছিলেন উগড়ে দিলেন সব। রান্নাঘর ভেসে গেল সাধ না-খাওয়া নতুন মায়ের বমিতে।

দরজা খোলার শব্দ পেলেন ইন্দুবালা। ধনঞ্জয় ঘর ঝাঁট দিতে এসেছে। নীচের রান্নাঘরে উনুনের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে আকাশের দিকে। “বাজার কিন্তু কিচ্ছুটি করা নেই মা। কী রান্না হবে?” ধনঞ্জয় জানতে চায়। ইন্দুবালা চুপ করে থাকেন। “কী গো বলল কিছু? শরীর খারাপ নাকি তোমার?” ইন্দুবালা তখন উনুনের ধোঁয়া দেখছেন। জানলার বাইরে সেই ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে ওপরে উঠছে। বাজারের লোকেরা এসে বলেছিল, “নিমতলার ইলেকট্রিক চুল্লীতে কাজ চলছে মা। বডি কাঠে পোড়াতে হবে।” তখনও শ্মশানে স্বামীর খাট ছুঁয়ে বসে আছেন ইন্দুবালা। দূরে লছমী ছেলে-মেয়েদের সামলাচ্ছে। “তোমরা যা ভালো বোঝো করো।” এইটুকুই বলতে পেরেছিলেন তিনি। মাস্টার রতনলাল মল্লিকের দেহ যখন চিতায় তোলা হলো তখনও ইন্দুবালা আঁচ করতে পারেননি কাঠে পোড়ানোর বীভৎসতা। মনের মানুষ ছিলেন না কোনোদিনই মাস্টার। কিন্তু যে মানুষটা চারপাশে ঘুরে বেড়াতো, এদিক ওদিক থেকে যন্ত্রণা দিতে; সময় নেই অসময় নেই ঘাড়ের ওপর চেপে বসতো; জোর করে সরিয়ে দিত শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ, সেই মানুষটা আগুন পাওয়ার সাথে সাথে কেমন যেন চড়বড় করে উঠতে শুরু করলো তেলে পড়া মাছের মতো। শরীর ছুঁড়ে বেড়িয়ে আসতে থাকলো জল। যেন সারা জীবনের হুইস্কি, সোডা এক্ষুনি এই জ্বলন্ত সর্বগ্রাসী চিতাকে নিভিয়ে দেবে। লছমী এসে মুখ ঝামটা দিয়েছিল। “কী করছিস কি এখানে দাঁড়িয়ে তুই? আমাদের কি এসব দেখতে আছে? চল মেয়েটাকে দুধ খাওয়াবি চল। বড় কাঁদছে যে।” শ্মশানের মধ্যে বসে মেয়েকে দুধ খাওয়ালেন। স্বামীর চিতাভস্ম ভাসালেন গঙ্গায়। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে এসে নিজেই ভাঙলেন শাঁখা পলা সব কিছু। জোরে জোরে ইটের বাড়ি মেরে। সাবান দিয়ে মাথা ঘষে তুলে ফেললেন সিঁদুর। সাদা থান পরে নিজেকে যখন দেখলেন আয়নায় আর সামলাতে পারলেন না। হাউ হাউ করে চিৎকার করে কাঁদলেন ইন্দুবালা। সে শোক মাস্টার রতনলাল মল্লিকের জন্য নয়। মনিরুলের জন্য নয়। নিজের মুখটায় তিনি অবিকল ঠাম্মাকে দেখতে পেলেন।

ইন্দুবালা পাশ ফিরে শুয়ে ধনঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলেন, “উনুন ধরিয়েছিস কেন? গ্যাস কি ফুরিয়েছে?” ধনঞ্জয় হাতের ঝাঁটাখানা মেঝেতে রেখে বলে “ওই দেখো। আজকের দিনটা কি ভুলে গেলে মা তুমি?” ইন্দুবালা হাতড়াতে থাকেন মনের মধ্যে। “আজকে আবার কী?” ধনঞ্জয় মাথায় হাত দিয়ে বলে “সত্যি এবার তোমার বয়েস হয়েছে মা। আজ যে রথ। কুমোরটুলিতে দুর্গার কাঠামোয় মাটি পড়বে। ইস্কনের লম্বা রথ বেরোবে। কত সাহেব সুবো নাচানাচি করবে। হোটেলের বোর্ডে তো গতকাল লিখে রেখেছো…।” উঠে পড়েন ইন্দুবালা এবার তাড়াতাড়ি করে। “কী লিখেছি রে?” ধনঞ্জয় উত্তর দেয়, “খিচুড়ি, পাঁপড় ভাজা, আনারসের চাটনি আর কাঁঠালের ক্ষীর”। বিড়বিড় করে জানতে চান ইন্দুবালা, “আর মালপোয়া? লিখিনি সেটা?” ধনঞ্জয় রে রে করে ওঠে। “না না ওইসব একদম কিছু লেখা ছিল না। হাঙ্গামা বাধিও না মা। চিনির দাম বড় বেড়েছে। আটা বাড়ন্ত। ময়দা বাড়ন্ত। গোল মরিচ আনা নেই।” ইন্দুবালা জানতে চান “আর মৌরি?” ধনঞ্জয়ের জবাবে জানা যায় সেটাও বাড়ন্ত। তাহলে সব কিছু এখনি আনতে হবে ফর্দ করে। ইন্দুবালা পাশ থেকে চশমা নেন। পেন খাতা নিয়ে বসে পড়েন ফর্দ করতে। আর একটু হলে কী মারাত্মক ভুলটাই না করতেন তিনি! মালপোয়া হবে না রথে তাও কি হয়? খাটনির বহরটার কথা একবার চিন্তা করে চিরকালের অভ্যেস মতো ধনঞ্জয় আবার কাকে যেন একটা গাল পাড়ে। সেই অদৃশ্য মানুষটাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করে ইন্দুবালার। যে ধনঞ্জয়ের গাল শুনেও মুখে রাটি কাটে না।

অনেক রাতে কলেজ স্ট্রিট পাড়া ঘুরে বাড়ি ফিরে আসে ভাই। হাতে তার একখানি চটি বই। তিন পাহাড়ের স্বপ্ন। “বেড়াতে যাওয়ার বই বুঝি?” ইন্দুবালা জানতে চান। ভাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে দিদির দিকে। “ধুর বেড়াতে যাওয়ার বই কেন হবে? খুলে দেখলেই বুঝতে পারবি”। এগিয়ে দেয় বইটা। ইন্দুবালা অবাক হন। “কবিতা পড়িস নাকি তুই আজকাল”? ঘাড় নাড়ে ভাই। “পড়ি তো। তুই আর মনিরুলদা যেমন পড়তিস”। কথা বাড়াতে চান না ইন্দুবালা। এরপর কথা বললে আরও অনেক কথা উঠবে। সেই কথা মনের মধ্যে হাওয়ার সাথে উথাল পাথাল হলে রাতে ঘুম হবে না। এই ভরো ভরো অবস্থায় মাস্টার রতনলাল মল্লিক তখন ঘুম না আসা বউকে আঁকড়ে ধরতে চাইবেন। দম বন্ধ হয়ে আসবে ইন্দুবালার। মাটিতে এখন তাই বিছানা। শরীরটাকে ক