Wednesday, June 19, 2024
Homeউপন্যাসইছামতী - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

ইছামতী – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

১. ইছামতী একটি ছোট নদী

ইছামতী একটি ছোট নদী। অন্তত যশোর জেলার মধ্য দিয়ে এর যে অংশ প্রবাহিত, সেটুকু। দক্ষিণে ইছামতী কুমির-কামট-হাঙ্গর সংকুল বিরাট নোনা গাঙে পরিণত হয়ে কোথায় কোন সুন্দরবনে সুঁদরি-গরান গাছের জঙ্গলের আড়ালে বঙ্গোপসাগরে মিশে গিয়েচে, সে খবর যশোর জেলার গ্রাম্য অঞ্চলের কোনো লোকই রাখে না।

ইছামতীর যে অংশ নদীয়া ও যশোর জেলার মধ্যে অবস্থিত, সে অংশটুকুর রূপ সত্যিই এত চমৎকার, যাঁরা দেখবার সুযোগ পেয়েছেন তারা জানেন। কিন্তু তারাই সবচেয়ে ভালো করে উপলব্ধি করবেন, যাঁরা অনেকদিন ধরে বাস করচেন এ অঞ্চলে। ভগবানের একটি অপূর্ব শিল্প এর দুই তীর, বনবনানীতে সবুজ, পক্ষী-কাকলিতে মুখর।

মড়িঘাটা কি বাজিতপুরের ঘাট থেকে নৌকো করে চলে যেও চাঁদুড়িয়ার ঘাট পর্যন্ত–দেখতে পাবে দুধারে পলতেমাদার গাছের লাল ফুল, জলজ বন্যেবুড়োর ঝোপ, টেপাপানার দাম, বুনো তিৎপল্লা লতার হলদে ফুলের শোভা, কোথাও উঁচু পাড়ে প্রাচীন বট-অশ্বত্থের ছায়াভরা উলুটি-বাচড়া-বৈঁচি ঝোপ, বাঁশঝাড়, গাঙশালিখের গর্ত, সুকুমার লতাবিতান। গাঙের পাড়ে লোকের বসতি কম, শুধুই দূর্বাঘাসের সবুজ চরভূমি, শুধুই চখা বালির ঘাট, বনকুসুমে ভর্তি ঝোপ, বিহঙ্গকাকলি মুখর বনান্তস্থলী। গ্রামের ঘাটে কোথাও দু’দশখানা ডিঙি নৌকো বাঁধা রয়েছে। ক্বচিৎ উঁচু শিমুল গাছের আঁকাবাঁকা শুকনো ডালে শকুনি বসে আছে সমাধিস্থ অবস্থায়–ঠিক যেন চীনা চিত্রকরের অঙ্কিত ছবি। কোনো ঘাটে মেয়েরা নাইচে, কাঁখে কলসি ভরে জল নিয়ে ডাঙায় উঠে, স্নানরতা সঙ্গিনীর সঙ্গে কথাবার্তা কইচে। এক-আধ জায়গায় গাঙের উঁচু পাড়ের কিনারায় মাঠের মধ্যে কোনো গ্রামের প্রাইমারি ইস্কুল; লম্বা ধরনের চালাঘর, দরমার কিংবা কঞ্চির বেড়ার ঝাঁপ দিয়ে ঘেরা; আসবাবপত্রের মধ্যে দেখা যাবে ভাঙ্গা নড়বড়ে একখানা চেয়ার দড়ি দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা, আর খানকতক বেঞ্চি।

সবুজ চরভূমির তৃণক্ষেত্রে যখন সুমুখ জ্যোৎস্নারাত্রির জ্যোৎস্না পড়বে, গ্রীষ্মদিনে সাদা খোকা খোকা আকন্দফুল ফুটে থাকবে, সোঁদালি ফুলের ঝাড় দুলবে নিকটবর্তী বনঝোপ থেকে নদীর মৃদু বাতাসে, তখন নদীপথ-যাত্রীরা দেখতে পাবে নদীর ধারে পুরোনো পোড়ো ভিটের ঈষদুচ্চ পোতা, বর্তমানে হয়ত আকন্দঝোপে ঢেকে ফেলেচে তাদের বেশি অংশটা, হয়ত দু-একটা উইয়ের ঢিপি গজিয়েচে কোনো কোনো ভিটের পোতায়। এইসব ভিটে দেখে তুমি স্বপ্ন দেখবে অতীত দিনগুলির, স্বপ্ন দেখবে সেইসব মা ও ছেলের, ভাই ও বোনের, যাদের জীবন ছিল একদিন এইসব বাস্তুভিটের সঙ্গে জড়িয়ে। কত সুখদুঃখের অলিখিত ইতিহাস বর্ষাকালে জলধারাঙ্কিত ক্ষীণ রেখার মতো আঁকা হয় শতাব্দীতে শতাব্দীতে এদের বুকে। সূর্য আলো দেয়, হেমন্তের আকাশ শিশির বর্ষণ করে, জ্যোৎস্না-পক্ষের চাঁদ জ্যোৎস্না ঢালে এদের বুকে।

সেইসব বাণী, সেইসব ইতিহাস আমাদের আসল জাতীয় ইতিহাস। মূক-জনগণের ইতিহাস, রাজা-রাজড়াদের বিজয়কাহিনী নয়।

১২৭০ সালের বন্যার জল সরে গিয়েচে সবে।

পথঘাটে তখনো কাদা, মাঠে মাঠে জল জমে আছে। বিকেলবেলা ফিঙে পাখি বসে আছে বাবলা গাছের ফুলে-ভর্তি ডালে।

নালু পাল মোল্লাহাটির হাটে যাবে পান-সুপুরি নিয়ে মাথায় করে। মোল্লাহাটি যেতে নীলকুঠির আমলের সাহেবদের বটগাছের ঘন ছায়া পথে পথে। শ্রান্ত নালু পাল মোট নামিয়ে একটা বটতলায় বসে গামছা ঘুরিয়ে বিশ্রাম করতে লাগলো।

নালুর বয়স কুড়ি-একুশ হবে। কালো রোগা চেহারা। মাথার চুল বাবরি-করা, কাঁধে রঙিন রাঙা গামছা-তখনকার দিনের শৌখিন বেশভূষা পাড়াগাঁয়ের। এখনো বিয়ে করে নি, কারণ মামাদের আশ্রয়ে এতদিন মানুষ হচ্ছিল, হাতেও ছিল না কানাকড়ি। সম্প্রতি আজ বছরখানেক হল নালু পাল মোট মাথায় করে পান-সুপুরি বিক্রি করে হাটে হাটে। সতেরো টাকা মূলধন তার এক মাসিমা দিয়েচিলেন যুগিয়ে। এক বছরে এই সতেরো টাকা দাঁড়িয়েছে সাতান্ন টাকায়। খেয়ে দেয়ে। নিট লাভের টাকা।

নালুর মন এজন্যে খুশি আছে খুব মামার বাড়ির অনাদরের ভাত গলা দিয়ে ইদানীং আর নামতো না। একুশ বছর বয়সের পুরুষানুষের শোভা পায় না অপরের গলগ্রহ হওয়া। মামিমার সে কি মুখনাড়া একপলা তেল বেশি মাথায় মাখবার জন্যে সেদিন।

মুখনাড়া দিয়ে বললেন–তেল জুটবে কোত্থেকে এত? আবার বাবরি চুল রাখা হয়েচে, ছেলের শখ কত–অত শখ থাকলে পয়সা রোজগার করতে হয় নিজে।

নালু পাল হয়ত ঘুমিয়ে পড়তো বটগাছের ছায়ায়, এখনো হাট বসবার অনেক দেরি, একটু বিশ্রাম করে নিতে সে পারে অনায়াসে–

কিন্তু এই সময় ঘোড়ায় চড়ে একজন লোক যেতে যেতে ওর সামনে থামলো।

নালু পাল সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে উঠে বললে–রায়মশায়, ভালো আছেন?

–কল্যাণ হোক। নালু যে, হাটে চললে?

–আজ্ঞে হ্যাঁ।

-–একটু সোজা হয়ে বোসো। শিপটন্ সাহেব ইদিক আসচে—

–বাবু, রাস্তা ছেড়ে মাঠে নেমে যাবো? বড্ড মারে শুনিছি।

–না না, মারবে কেন? ও সব বাজে। বোসো এখানে।

–ঘোড়ায় যাবেন?

–না, বোধ হয় টমটমে। আমি দাঁড়াবো না।

মোল্লাহাটি নীলকুঠির বড়সাহেব শিপটনকে এ অঞ্চলে বাঘের মতো ভয় করে লোকে। লম্বাচওড়া চেহারা, বাঘের মতো গোল মুখখানা, হাতে সর্বদাই চাবুক থাকে। এ অঞ্চলের লোক চাবুকের নাম রেখেছে ‘শ্যামচাঁদ’। কখন কার পিঠে শ্যামচাঁদ অবতীর্ণ হবে তার কোনো স্থিরতা না থাকাতে সাহেব রাস্তায় বেরুলে সবাই ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে।

এমন সময়ে আর একজন হাটুরে দোকানদার সতীশ কলু, মাথায় সর্ষে তেলের বড় ভাঁড় চ্যাঙারিতে বসিয়ে সেখানে এসে পড়লো। রাস্তার ধারে নালুকে দেখে বললে–চল, যাবা না?

–বোসো। তামাক খাও!

–তামাক নেই।

–আমার আছে। দাঁড়াও, শিপটন্ সাহেব চলে যাক আগে।

–সায়েব আসচে কেডা বললে?

–রায়মশায় বলে গ্যালেন—বোসো—

হঠাৎ সতীশ কলু সামনের দিকে সভয়ে চেয়ে দেখে ষাঁড়া আর শেওড়া ঝোপের পাশ দিয়ে নিচের ধানের ক্ষেতের মধ্যে নেমে গেল। যেতে যেতে বললে–চলে এসো, সায়েব বেরিয়েছে–

নালু পাল পানের মোট গাছতলায় ফেলে রেখেই সতীশ কলুর অনুসরণ করলে। দূরে ঝুমঝুম্ শব্দ শোনা গেল টমটমের ঘোড়ার। একটু পরে সামনের রাস্তা কাঁপিয়ে সাহেবের টমটম কাছাকাছি এসে পড়লো এবং থামবি তো থাম একেবারে নালু পালের আশ্রয়স্থল ওদের বটতলায়, ওদের সামনে।

বটতলায় পানের মোট মালিকহীন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে সাহেব হেঁকে বললে–এই! মোট কাহার আছে?

নালু পাল ও সতীশ কলু ধানগাছের আড়ালে কাঠ হয়ে গিয়েচে ততক্ষণ। কেউ উত্তর দেয় না।

টমটমের পেছন থেকে নফর মুচি আরদালি হাঁকল-কার মোট পড়ে রে গাছতলায়? সাহেব বললে–উট্টর ডাও–কে আছে?

নালু পাল কাঁচুমাচু মুখে জোড়হাতে রাস্তায় উঠে আসতে আসতে বললে–সায়েব, আমার। সাহেব ওর দিকে চেয়ে চুপ করে রইল। কোনো কথা বললে না।

নফর মুচি বললে–তোমার মোট?

–আজ্ঞে হ্যাঁ।

–কি করছিলে ধানক্ষেতে?

–আজ্ঞে আজ্ঞে

সাহেব বললে–আমি জানে। আমাকে ডেখে সব লুকায়। আমি সাপ আছি, না বাঘ আছি হ্যাঁ?

প্রশ্নটা নালু পালের মুখের দিকে তাকিয়েই, সুতরাং নালু পাল ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলে–না সায়েব।

–ঠিক! মোট কিসের আছে?

–পানের, সায়েব।

–মোল্লাহাটির হাটে নিয়ে যাচ্ছে?

–হ্যাঁ।

–কি নাম আছে টোমার?

–আজ্ঞে, শ্রীনালমোহন পাল।

–মাথায় করো। ভবিষ্যতে আমায় ডেখে লুকাবে না। আমি বাঘ নই, মানুষ খাই না। যাও–বুঝলে!

–আজ্ঞে

সাহেবের টমটম চলে গেল। নালু পালের বুক তখন ঢিপঢিপ করছে। বাবাঃ, এক ধাক্কা সামলানো গেল বটে আজ। সে শিস দিতে দিতে ডাকলো–ও সতীশ খুড়ো!

সতীশ কলু ধানগাছের আড়ালে আড়ালে রাস্তা থেকে আরো দূরে চলে গিয়েছিল। ফিরে কাছে আসতে আসতে বললে–যাই।

বাবাঃ, কতদূর পালিয়েছিলে? আমায় ডাকতে দেখে বুঝি দৌড় দিলে ধানবন ভেঙ্গে?

-কি করি বলো। আমরা হলাম গরিব-গুরবো নোক। শ্যামচাঁদ পিঠে বসিয়ে দিলে করচি কি ভাই বলো দিনি। কি বললে সায়েব তোমারে?

–বললে ভালোই।

–তোমারে রায়মশায় কি বলছিল?

-বলছিল, সাহেব আসচে। সোজা হয়ে বসো।

–তা বলবে না? ওরাই তো সায়েবের দালাল। কুটির দেওয়ানি করে সোজা রোজগারটা করেচে রায়মশাই! অতবড় দোমহলা বাড়িটা তৈরি করেছে সে-বছর।

.

রায়মশায়ের পুরো নাম রাজারাম রায়। মোল্লাহাটি নীলকুঠির দেওয়ান। সাহেবের খয়েরখাঁই ও প্রজাপীড়নের জন্যে এদেশের লোকে যেমন ভয় করে, তেমনি ঘৃণা করে। কিন্তু মুখে কারো কিছু বলবার সাহস নেই। নিকটবর্তী পাঁচপোতা গ্রামে বাড়ি।

বিকেলের সূর্য বাগানের নিবিড় সবুজের আড়ালে ঢলে পড়েছে, এমন সময় রাজারাম রায় নিজের বাড়িতে ঢুকে ঘোড়া থেকে নামলেন। নফর মুচির এক খুড়তুতো ভাই ভজা মুচি এসে ঘোড়া ধরলে। চণ্ডীমণ্ডপের দিকে চেয়ে দেখলেন অনেকগুলো লোক সেখানে জড়ো হয়েচে। নীলকুঠির দেওয়ানের চণ্ডীমণ্ডপে অমন ভিড় বারো মাসই লেগে আছে। কত রকমের দরকার করতে এসেছে নানা গ্রামের লোক, কারো জমিতে ফসল ভেঙ্গে নীল বোনা হয়েচে জোর-জবরদস্তি করে, কারো নীলের দাদনের জন্যে যে জমিতে দাগ দেওয়ার কথা ছিল তার বদলে অন্য এবং উৎকৃষ্টতর জমিতে কুঠির আমীন গিয়ে নীল বোনার জন্যে চিহ্নিত করে এসেচে–এইসব নানা রকমের নালিশ।

নালিশের প্রতিকার হত। নতুবা দেওয়ানের চণ্ডীমণ্ডপে লোকের ভিড় জমতো না রোজ রোজ। তার জন্যে ঘুষ-ঘাষের ব্যবস্থা ছিল না। রাজারাম রায় কারো কাছে ঘুষ নেবার পাত্র ছিলেন না, তবে কার্য অন্তে কেউ একটা রুই মাছ, কি বড় একটু মানকচু কিংবা দুভাড় খেজুরের নলেন গুড় পাঠিয়ে দিলে ভেটস্বরূপ, তা তিনি ফেরত দেন বলে শোনা যায় নি।

রাজারামের স্ত্রী জগদম্বা এক সময়ে বেশ সুন্দরী ছিলেন, পরনে লালপেড়ে তাঁতের কোরা শাড়ি, হাতে বাউটি পৈঁছে, লোহার খাড় ও শাঁখা, কপালে চওড়া করে সিঁদুর পরা, দোহারা চেহারার গিন্নিবান্নি মানুষটি।

জগদম্বা এগিয়ে এসে বললেন–এখন বাইরে বেরিও না। সন্দে আহ্নিক সেরে নাও আগে।

রাজারাম হেসে স্ত্রীর হাতে ছোট একটা থলি দিয়ে বললেন–এটা রেখে দাও। কেন, কিছু জলপান আছে বুঝি?

–আছেই তো। মুড়ি আর ছোলা ভেজেছি।

–বাঃ বাঃ, দাঁড়াও আগে হাত-পা ধুয়ে নিই। তিলু বিলু নিলু কোথায়?

–তরকারি কুটচে।

–আমি আসছি। তিলুকে জল দিতে বলো।

–সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পর রাজারাম আহ্নিক করতে বসলেন রোয়াকের একপ্রান্তে। তিলু এসে আগেই সেখানে একখানা কুশাসন পেতে দিয়েচিল। অনেকক্ষণ ধরে সন্ধ্যা-আহ্নিক করলেন–ঘণ্টাখানেক প্রায়। অনেক কিছু স্তব-স্তোত্র পড়লেন।

এত দেরি হওয়ার কারণ এই সন্ধ্যা-গায়ত্রী শেষ করে রাজারাম বিবিধ দেবতার স্তবপাঠ করে থাকেন। দেবদেবীর মধ্যে প্রতিদিন তুষ্ট রাখা উচিত মনে করেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, রক্ষাকালী, সিদ্ধেশ্বরী ও মা মনসাকে। এঁদের কাউকে চটালে চলে না। মন খুঁতখুঁত করে। এঁদের দৌলতে তিনি করে খাচ্ছেন। আবার পাছে কোনো দেবী শুনতে না পান, এজন্যে তিনি স্পষ্টভাবে টেনে টেনে স্তব উচ্চারণ করে থাকেন।

তিলু এসে বললে–দাদা, ডাব খাবে এখন?

–না। মিছরির জল নেই?

-–মিছরি ঘরে নেই দাদা।

–ডাব থাক, তুই জলপান নিয়ে আয়।

তিলু একটা কাঁসার জামবাটিতে মুড়ি ও ছোলাভাজা সর্ষের তেল দিয়ে জবজবে করে মেখে নিয়ে এলো–সে জামবাটিতে অন্তত আধকাঠা মুড়ি ধরে। বিলু নিয়ে এলো একটা কাঁসার থালায় একথালা খাজা কাঁঠালের কোষ। নিলু নিয়ে এলো এক ঘটি জল ও একটা পাথরের বাটিতে আধ পোয়াটাক খেজুর গুড়।

রাজারাম নিলুকে সস্নেহে বললেন–বোস নিলু, কাঁটাল খাবি?

–না দাদা, তুমি খাও। আমি অনেক খেয়েছি।

–বিলু নিবি?

–তুমি খাও দাদা।

জগদম্বা আহ্নিক সেরে এসে কাছে বসলেন–তুমি সারাদিন খেটেপুটে এলে, খাও না জলপান। না খেলে বাঁচবে কিসে? পোড়ারমুখো সায়েবের কুঠিতে তো ভূতোনন্দী খাটুনি।

রাজারাম বললে–কাঁচালঙ্কা নেই? আনতে বলো।

–বাতাস করবো? ও তিলু, তোর ছোট বৌদিদির কাছ থেকে কাঁচালঙ্কা চেয়ে আন–ডালে ধরা গন্ধ বেরুলো কেন দ্যাখো না, ও নেত্যপিসি? ছোট বউ, গিয়ে দ্যাখো তো–

জগদম্বা কাছে বসে বাতাস করতে করতে বলেন–ওগো, জলপান খেয়ে বাইরে যেও না, একটা কথা আছে–

–কি?

–বলচি। ঠাকুরঝিরা চলে যাক।

–চলে গিয়েচে। ব্যাপার কি?

–একটি সুপাত্র এসেচে এই গ্রামে। ঠাকুরঝিদের বিয়ের চেষ্টা দ্যাখো।

–কে বলো তো?

–সন্নিসি হয়ে গিইছিল। বেশ সুপুরুষ। চন্দ্র চাটুয্যের দূর সম্পর্কের ভাগ্নে। সে কাল চলে যাবে শুনচি–একবার যাও সেখানে

–তুমি কি করে জানলে?

–আমাকে দিদি বলে গেলেন যে। দুবার এসেছিলেন আমার কাছে।

–দেখি।

–দেখি বললে চলবে না। তিলুর বয়েস হোলো তিরিশ। বিলুর সাতাশ। এর পরে আর পাত্তর জুটবে কোথা থেকে শুনি? নীলকুঠির কিচিরমিচির একদিন বন্ধ রাখলেও খেতি হবে না।

-তাই যাই তবে। চাদরখানা দ্যাও। তামাক খেয়ে তবে বেরুবো।

চণ্ডীমণ্ডপের সামনে দিয়ে গেলেন না, যাওয়ার উপায় থাকবে না। মহরালি মণ্ডলের সম্পত্তি ভাগের দিন, তিনিই ধার্য করে দিয়েছেন। ওরা এতক্ষণ ঠিক এসে বসে আছে–রমজান, সুকুর, প্রহ্লাদ মণ্ডল, বনমালী মণ্ডল প্রভৃতি মুসলমান পাড়ার মাতব্বর লোকেরা। ও পথে গেলে এখন বেরুতে পারবেন না তিনি।

চন্দ্র চাটুয্যে গ্রামের আর একজন মাতব্বর লোক। সত্তর-বাহাত্তর বিঘে ব্রহ্মোত্তর জমির আয় থেকে ভালোভাবেই সংসার চলে যায়। পাঁচপোতা গ্রামের ব্রাহ্মণপাড়ার কেউই চাকরি করেন না। কিছু না কিছু জমিজমা সকলেরই আছে। সন্ধ্যার পর নিজ নিজ চণ্ডীমণ্ডপে পাশা-দাবার আড্ডায় রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত কাটানো এঁদের দৈনন্দিন অভ্যাস!

চন্দ্র চাটুয্যে রাজারামকে দাঁড়িয়ে উঠে অভ্যর্থনা করে বললেন– বাবাজি এসো। মেঘ না চাইতেই জল! আজ কি মনে করে? বোসো বোসো। একহাত হয়ে যাক।

নীলমণি সমাদ্দার বলে উঠলেন–দেওয়ানজি যে, এদিকে এসে মন্ত্রীটা সামলাও তো দাদাভাই–

ফণী চক্কত্তি বললেন–আমার কাছে বোসো ভাই, এখানে এসো। তামাক সাজবো?

রাজারাম হাসিমুথে সকলকেই আপ্যায়িত করে বললেন–বোসো দাদা। চন্দর কাকা, আপনার এখানে দেখচি মস্ত আড্ডা

চন্দ্র চাটুয্যে বললেন–আসো না তো বাবাজি কোনোদিন! আমরা পড়ে আছি একধারে, দ্যাখো না তো চেয়ে।

রাজারাম শতরঞ্চির ওপর পা দিতে না দিতে প্রত্যেকে আগ্রহের সঙ্গে সরে বসে তাঁকে জায়গা করে দিতে উদ্যত হল। নীলমণি সমাদ্দার। অপেক্ষাকৃত হীন অবস্থার গৃহস্থ, সকলের মন রেখে কথা না বললে তাঁর চলে না। তিনি বললেন-দেওয়ানজি আসবে কি ওর চণ্ডীমণ্ডপে। রোজ সন্ধেবেলা কাছারি বসে। আসামী ফরিয়াদীর ভিড় ঠেলে যাওয়া যায় না। ও কি দাবার আড্ডায় আসবার সময় করতে পারে?

ফণী চক্কত্তি বললেন–সে আমরা জানি। তুমি নতুন করে কি শোনালে কথা।

নীলমণি বললেন–দাবায় পাকা হাত। একহাত খেলবে ভায়া?

রাজারাম এগিয়ে এসে হুঁকো নিলেন ফণী চক্কত্তির হাত থেকে। কিন্তু বয়োবৃদ্ধ চন্দ্র চাটুয্যের সামনে তামাক খাবেন না বলে চণ্ডীমণ্ডপের ভেতরের ঘরে হুঁকো হাতে ঢুকে গেলেন এবং খানিক পরে এসে নীলমণির হাতে হুঁকো দিয়ে পূর্বস্থানে বসলেন।

দাবা খেলা শেষ হল রাত দশটারও বেশি। লোকজন একে একে চলে গেল।

চন্দ্র চাটুয্যেকে রাজারাম তাঁর আগমনের কারণ খুলে বললেন। চন্দ্র চাটুয্যের মুখ উজ্জ্বল দেখালো।

রাজারামের হাত ধরে বললেন–এইজন্য বাবাজির আসা? এ কঠিন কথা কি! কিন্তু একটা কথা বাবা। ভবানী সন্নিসি হয়ে গিইছিল, তোমাকে সে কথাটা আমার বলা দরকার।

–বাড়ি গিয়ে আপনার বৌমাদের কাছে বলি। তিলুকে জানাতে হবে। ওরাই জানাবে—

–বেশ।

পরে সুর নিচু করে বললেন–একটা কথা বলি। ভবানীকে এখানে বাস করাবো এই আমার ইচ্ছে। তুমি গিয়ে তোমার তিনটি বোনের বিয়েই ওর সঙ্গে দ্যাও গিয়ে–বালাই চুকে যাক। পাঁচবিঘে ব্রহ্মোত্তর জমি যতুক দেবে। এখুনি সব ঠিক করে দিচ্চি

রাজারাম চিন্তিত মুখে বললেন–বাড়ি থেকে না জিজ্ঞেস করে। কোনো কিছুই বলতে পারবো না কাকা। কাল আপনাকে জানাবো।

–তুমি নির্ভয়ে বিয়ে দাও গিয়ে। আমার ভাগনে বলে বলচি নে। কাটাদ বন্দিঘাটির বারুরি, এক পুরুষে ভঙ্গ, ঘটকের কাছে কুলুজি শুনিয়ে দেবো এখন। জ্বলজ্বলে কুলীন, একডাকে সকলে চেনে।

–বয়েস কতো হবে পাত্তরের?

–তা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তোমার বোনদেরও তো বয়েস কম নয়। ভবানী সন্নিসি না হয়ে গেলি এতদিনে সাতছেলের বাপ। দ্যাখো আগে তাকে–নদীর ধারে রোজ এক ঘণ্টা সন্দে-আহ্নিক করে, তারপর আপন মনে বেড়ায়, এই চেহারা! এই হাতের গুল!

–ভবানী রাজি হবেন তিনটি বোনকে এক সঙ্গে বিয়ে করতে?

–সে ব্যবস্থা বাবাজি, আমার হাতে। তুমি নিশ্চিন্দি থাকো।

একটু অন্ধকার হয়েছিল বাঁশবনের পথে। জোনাকি জ্বলছে কচু আর বাবলা গাছের নিবিড়তার মধ্যে। ছাতিম ফুলের গন্ধ ভেসে আসচে বনের দিক থেকে।

.

অনেক রাত্রে তিলোত্তমা কথাটা শুনলে। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠেছে নদীর দিকের বাঁশঝাড়ের পেছন দিয়ে। ছোট বোন বিলুকে ডেকে বললেও বিলু, বৌদিদি তোকে কিছু বলেচে?

-বলবে না কেন? বিয়ের কথা তো?

–আ মরণ, পোড়ার মুখ, লজ্জা করে না!

-লজ্জা কি? ধিঙ্গি হয়ে থাকা খুব মানের কাজ ছিল বুঝি?

–তিনজনকেই একক্ষুরে মাথা মুড়তে হবে, তা শুনেচ তো?

–সব জানি।

–রাজি?

–সত্যি কথা যদি বলতে হয়, তবে আমার কথা এই যে হয় তো হয়ে যাক।

–আমারও তাই মত। নিলুর মতটা কাল সকালে নিতে হবে।

–সে আবার কি বলবে, ছেলেমানুষ, আমরা যা করবো সেও তাতে মত দেবেই।

.

তিলু কত রাত পর্যন্ত ছাদে বসে ভাবলে। ত্রিশ বছর তার বয়েস হয়েচে। স্বামীর মুখ দেখা ছিল অস্বপনের স্বপন। এখনো বিশ্বাস হয় না; সত্যিই তার বিয়ে হবে? স্বামীর ঘরে সে যাবে? বোনেদের সঙ্গে, তাই কি? ঘরে ঘরে তো এমনি হচ্চে। চন্দ্ৰকাকার বাপের সতেরোটা বিয়ে ছিল। কুলীন ঘরে অমন হয়েই থাকে। বিয়ের দিন কবে ঠিক করেচে দাদা কে জানে। বরের বয়স পঞ্চাশ তাই কি, সে নিজে কি আর খুকি আছে এখন?

উৎসাহে পড়ে রাত্রে তিলুর ঘুম এল না চক্ষে। কি ভীষণ মশার গুঞ্জন বনে ঝোপে!

তিলু যে সময় ছাদে একা বসে রাত জাগছিল, সে সময় নালু পাল মোল্লাহাটির হাট থেকে ফিরে নিজের হাতে রান্না করে খেয়ে তবিল মিলিয়ে শুয়ে পড়েছে সবে।

নালু এক ফন্দি এনেচে মাথায়।

ব্যবসা কাজ সে খুব ভালো বোঝে এ ধারণা আজই তার হল। সাত টাকা ন আনার পান-সুপুরি বিক্রি হয়েচে আজ। নিট লাভ এক টাকা তিন আনা। খরচের মধ্যে কেবল দুআনার আড়াই সের চাল, আর দুপয়সার গাঙের টাটকা খয়রামাছ একপোয়া। আধসের মাছই নেবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু অত মাছ ভাজবার তেল নেই। সর্ষের তেল ইদানীং আক্রা হয়ে পড়েছে বাজারে, তিন আনা সের ছিল, হয়ে দাঁড়িয়েছে চোদ্দ পয়সা; কি করে বেশি তেল খরচ করে সে?

হাতের পুঁজি বাড়াতে হবে। পান-সুপুরি বিক্রি করে উন্নতি হবে না। উন্নতি আছে কাটা কাপড়ের কাজে। মুকুন্দ দে তার বন্ধু, মুকুন্দ তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। ত্রিশ টাকা হাতে জমলে সে কাপড়ের ব্যবসা আরম্ভ করে দেবে।

নালু পালের ঘুম চলে গেল। মামার বাড়িতে গলগ্রহ হয়ে থাকার দায় থেকে সে বেঁচেছে! এখন সে আর ছেলেমানুষ নয়, মামিমার মুখনাড়ার সঙ্গে ভাত হজম করবার বয়েস তার নেই। নিজের মধ্যে সে অদম্য উৎসাহ অনুভব করে। এই ঝিঁঝিপোকার-ডাকে-মুখর জ্যোৎস্নালোকিত ঘুমন্ত রাত্রে অনেক দূর পর্যন্ত যেন সে দেখতে পাচ্চে। জীবনের কত দূরের পথ!

.

রাজারাম সকালে উঠেই ঘোড়া করে নীলকুঠিতে চলে গেলেন। নীলকুঠি যাবার পথটি ছায়াস্নিগ্ধ, বনের লতাপাতায় শ্যামল। যজ্ঞিডুমুর গাছের ডালে পাখির দল ডাকচে কিচকিচ্ করে, জ্যৈষ্ঠের শেষে এখনো ঝাড়-ঝাড় সোঁদালি ফুল মাঠের ধারে।

নীলকুঠির ঘরগুলি ইছামতী নদীর ধারেই। বড় থামওয়ালা সাদা কুঠিটা বড়সাহেব শিপটননের। রাজারাম শিপটননের কুঠির অনেক দূরে ঘোড়া থেকে নেমে ঝাউগাছে ঘোড়া বেঁধে কুঠির সামনে গেলেন, এবং উঁকিঝুঁকি মেরে দেখে পায়ের জুতোজোড়া খুলে রেখে ঘরের মধ্যে বড় হলে প্রবেশ করলেন।

শিপটন ও তাঁর মেম বাদে আর একজন কে সাহেব হলে বসে আছে! শিপটন বললেন–দেওয়ান এডিকে এসে–Look here, Grant, this is our Dewan Roy

অন্য সাহেবটি আহেলা বিলিতি। নতুন এসেছেন দেশ থেকে। বয়েস ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে, পাদ্রিদের মতো উঁচু কলার পরা, বেশ লম্বা দোহারা গড়ন। এর নাম কোলসওয়ার্দি গ্র্যান্ট, দেশভ্রমণ করতে ভারতবর্ষে এসেছেন। খুব ভালো ছবি আঁকেন এবং বইও লেখেন। সম্প্রতি বাংলার পল্লীগ্রাম সম্বন্ধে বই লিখচেন। মিঃ গ্র্যান্ট মুখ তুলে দেওয়ানের দিকে চেয়ে হেসে বললেন–Yes, he will be a fine subject for my sketch of a Bengalee gentleman, with his turban

শিট সাহেব বললেন–That is a Shamla, not turban

– I would never manage it. Oh!

-You would, with his turban and a good bit of ro guery that he has

– In human nature I believe so far as I can see him-no more.

-All right, all fight-please yourself

মিসেস শিপটন–I am not going to see you fall out with cach other-wicked men that you are!

মিঃ গ্র্যান্ট হেসে বললেন–So I beg your pardon, madam!

এই সময় ভজা মুচির দাদা শ্রীরাম মুচি বেয়ারা সাহেবদের জন্যে কফি নিয়ে এল। সাহেবদের চাকর বেয়ারা সবই স্থানীয় মুচি বাগদি প্রভৃতি শ্রেণী থেকে নিযুক্ত হয়। তাদের মধ্যে মুসলমান নেই বললেই হয়, সবই নিম্নবর্ণের হিন্দু। দু-একটি মুসলমান থাকেও অনেক সময়, যেমন এই কুঠিতে মাদার মণ্ডল আছে, ঘোড়ার সহিস।

রাজারাম দাঁড়িয়ে গলদঘর্ম হচ্ছিলেন। শিপটন বললেন–টুমি যাও ডেওয়ান। টোমাকে ডেখে ইনি ছবি আঁকিটে ইচ্ছা করিটেছেন। টোমাকে আঁকিটে হইবে।

–বেশ হুজুর।

–ডাডন খাটাগুলো একবার ডেখে রাখো।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরে দপ্তরখানায় কার্যরত রাজারামকে শ্রীরাম মুচি এসে ডাকলে–রায়মশায়, আপনাকে ডাকছে। সেই নতুন সায়েব আপনাকে দেখে ছবি আঁকবে–ওই দেখুন, দুপুরে রোদে নদীর ধারে বিলিতি গাছতলায় কি সব টেঙিয়েছে। গিয়ে দেখুন রগড়! রায়মশায়, বড় সায়েবকে বলে মোরে একটা ট্যাকা দিতে বলুন। ধানের দর বেড়েচে, ট্যাকায় আট কাঠার বেশি ধান দেচ্ছে না। সংসার চলছে না।

–আচ্ছা, দেখবো এখন। বড়সাহেবকে বল্লি হবে না। ডেভিড সাহেবকে বলতি হবে।

রাজারাম রায় বিপন্ন মুখে নদীর ধারে গাছতলায় এসে দাঁড়ালেন। গাছটা হল ইন্ডিয়ান–কর্ক গাছ। শিপটন সাহেবের আগে যিনি বড়সাহেব ছিলেন, তিনি পাটনা জেলার নারাণগড় নীলকুঠিতে প্রথমে ম্যানেজার ছিলেন। শখ করে এই গাছটি সেখান থেকে এনে বাংলার মাটিতে রোপণ করেন। সে আজ পঁচিশ বছর আগেকার কথা। এখন গাছটি খুব বড় হয়েচে, ডালপালা বড় হয়ে নদীর জলে ঝুঁকে পড়েছে। এ অঞ্চলে এ জাতীয় বৃক্ষ অদৃষ্টপূর্ব, সুতরাং জনসাধারণ এর নাম দিয়েচে বিলিতি গাছ।

রাজারাম তো বিলিতি গাছতলায় গিয়ে দাঁড়ালেন। নাঃ, মজা দ্যাখো একবার। এ সব কি কাণ্ড রে বাপু! ওটা আবার কি খাঁটিয়েচে? ব্যাপার কি? রাজারাম হেসে ফেলতেন, কিন্তু শিপটন সাহেবের মেম ওখানে। উপস্থিত। মাগী কি করে এখানে, ভালো বিপদ!

কোলসওয়ার্দি গ্র্যান্ট এক টুকরো রঙিন পেন্সিল হাতে নিয়ে টাঙানো ক্যানভাসের এপাশে ওপাশে গিয়ে দুবার কি দেখলেন। মেমসাহেবকে বললেন–Will he be so good at to stand erect and stand still, say for ten minutes, madam?

মেম বললেন–সোজা হইয়া ডাঁড়াও ডেওয়ান!

–আচ্ছা হুজুর।

রাজারাম কাঁচুমাচু মুখে খাড়া হয়ে পিঠ টান করে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেই গ্র্যান্ট সাহেব বললেন–No, no, your Dewan wears a theatrical mask, madam. Will he just stand at ease?

মেমসাহেব হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন–অটখানি লম্বা হয় না। বুক ঠিক করো।

রাজারাম এ অদ্ভুত বাংলার অর্থগ্রহণ করতে না পেরে আরো পিঠ টান করে বুক চিতিয়ে উল্টোদিকে ধনুক করে ফেলবার চেষ্টা করলেন দেহটাকে।

গ্র্যান্ট সাহেব হেসে উঠলেন–oh, no, my good man! This is how–বলে নিজেই রাজারামের কাছে গিয়ে তাকে হাত দিয়ে ঠেলে সামনের দিকে আর একটু ঝুঁকিয়ে সিধে করে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

-I hope to goodness, he will stick to this! Gods death!

তখনি মেমসাহেবের দিকে চেয়ে বললেন–I ask your pardon madam, for my words a moment ago.

মেমসাহেব বললেন–Oh, you wicked man! রাজারাম এবার ঠিক হয়ে দাঁড়ালেন। ছবিওয়ালা সাহেবটা প্রাণ বের করে দিয়েছেন, মেমসাহেবের সামনে, বাবাঃ! আবার ছুঁয়ে দিল! ভেবেছিলেন আজ আর নাইবেন না। কিন্তু নাইতেই হবে। সায়েব টায়েব ওরা স্লেছ, অখাদ্য-কুখাদ্য খায়। না নাইলে ঘরে ঢুকতেই পারবেন না।

ঘণ্টাখানেক পরে তিনি রেহাই পেয়ে বাঁচলেন। বা রে, কি চমৎকার করেচে সাহেবটা! অবিকল তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তবে এখনো মুখ চোখ হয় নি। ওবেলা আবার আসতে বলেচে। আবার ওবেলা ছোঁবে নাকি? অবেলায় তিনি আর নাইতে পারবেন না।

.

কোলসওয়ার্দি গ্র্যান্ট বিকেলে পাঁচপোতার বাঁওড়ের ধারের রাস্তা ধরে বড় টমটমে বেড়াতে বার হলেন। সঙ্গে ছোটসাহেব ডেভিড ও শিপটন সাহেবের মেম। রাস্তাটি সুন্দর ও সোজা। একদিকে স্বচ্ছতোয়া বাঁওড়া আর একদিকে ফাঁকা মাঠ, নীলের ক্ষেত, আউশ ধানের ক্ষেত। গ্র্যান্ট সাহেব শুধু ছবি-আঁকিয়ে নয়, কবি ও লেখকও। তাঁর চোখে পল্লীবাংলার দৃশ্য এক নতুন জগৎ খুলে দিলে। বন্ধনহীন উদাস মাঠের। ফুলভর্তি সোঁদালি গাছের রূপ, ফুলফোঁটা বন-ঝোপে অজানা বনপক্ষীর কাকলি–এসব দেখবার চোখ নেই ওই হাঁদামুখো ডেভিডটার কি গোঁয়ারগোবিন্দ শিপটনের। ওরা এসেছে গ্রাম্য ইংলন্ডের চাষাভুষো। পরিবার থেকে। ওয়েস্টার্ন মিডল্যান্ডের রাই ও ফেয়ারিংফোর্ড গ্রাম। থেকে। এখানে নীলকুঠির বড় ম্যানেজার না হলে ওরা পানটকস্ ম্যানরের জমিদারের অধীনে লাঙল চষতো নিজের নিজের ফার্ম হাউসে। দরিদ্র কালা আদমীদের ওপর এখানে রাজা সেজে বসে আছে। হায় ভগবান! তিনি এসেছেন দেশ দেখতে শুধু নয়, একখানা বই লিখবেন বাংলা দেশের এই জীবন নিয়ে। এখানকার লোকজনের, এই চমৎকার নদীর, এই অজানা বনদৃশ্যের ছবি আঁকবেন সেই বইতে। ইতিমধ্যে সে বইয়ের পরিকল্পনা তাঁর মাথায় এসে গিয়েচে। নাম দেবেন, Anglo-Indian life in Rural Bengal. অনেক মাল-মসলা যোগাড় করে ফেলেছেন।

ঠিক সেই সময় নালু পাল মোল্লাহাটির হাট থেকে মাথায় মোট নিয়ে ফিরচে। আগের হাটের দিন সে যা লাভ করেছিল, আজ লাভ তার দ্বিগুণ। বেশ চেঁচিয়ে সে গান ধরেছে–

হৃদয়-রাসমন্দিরে দাঁড়া মা ত্রিভঙ্গ হয়ে

এমন সময় পড়ে গেল গ্র্যান্ট সাহেবের সামনে। গ্র্যান্ট সাহেব ডেভিডকে বললেন–লোকটাকে ভালো করে দেখি। একটু থামাও। বাঃ বাঃ, ও কি করে?

ডেভিড সাহেব একেবারে বাঙালি হয়ে গিয়েচে কথাবার্তার ধরনে। ঠিক এ দেশের গ্রাম্য লোকের মতো বাংলা বলে। অনেকদিন এক জায়গাতে আছে। সে মেমসাহেবের দিকে চেয়ে হেসে বললে–He can have his old yew cut down, cant he, madam?

পরে নালু পালের দিকে চেয়ে বললে–বলি ও কর্তা, দাঁড়াও তো দেখি–

নালু পাল আজ একেবারে বাঘের সামনে পড়ে গিয়েচে। তবে ভাগ্যি ভালো, এ হল ছোট সায়েব, লোকটি বড় সায়েবের মতো নয়, মারধর করে না। মেমটা কে? বোধ হয় বড় সায়েবের।

নালু পাল দাঁড়িয়ে পড়ে বললে–আজ্ঞে, সেলাম। কি বলছেন?

–দাঁড়াও ওখানে।

গ্র্যান্ট সাহেব বললেন–ও কি একটু দাঁড়াবে এখানে? আমি একটু ওকে দেখে নিই।

ডেভিড বললে–দাঁড়াও এখানে। তোমাকে দেখে সাহেব ছবি আঁকবে।

গ্র্যান্ট সাহেব বললে–ও কি করে? বেশ লোকটি! খাসা চেহারা চলো যাই।

–ও আমাদের হাটে জিনিস বিক্রি করতে এসেছিল। You wont want him any more?

-No, I want to thank him David. or shall 1–

গ্র্যান্ট সাহেব পকেটে হাত দিতে যেতেই ডেভিড তাড়াতাড়ি নিজের পকেট থেকে একটা আধুলি বার করে নালু পালের সামনে ছুঁড়ে দিয়ে বললে–নাও, সাহেব তোমাকে বকশিশ করলেন–

নালু পাল অবাক হয়ে আধুলিটা ধুলো থেকে কুড়িয়ে নিয়ে বললে– সেলাম, সায়েব! আমি যেতে পারি?

–যাও।

সুন্দর বিকেল সেদিন নেমেছিল পাঁচপোতার বাঁওড়ের ধারে। বন্যপুষ্প-সুরভিত হয়েছিল ঈষত্তপ্ত বাতাস। রাঙা মেঘের পাহাড় ফুটে উঠেছিল অস্ত-আকাশপটে দূরবিস্তৃত আউশ ধানের সবুজ ক্ষেতের ও-প্রান্তে। কিচ মিচ করছিল গাঙশালিক ও দোয়েল পাখির ঝাঁক। কোলস্ওয়ার্দি গ্র্যান্ট কতক্ষণ একদৃষ্টে অস্তদিগন্তের পানে চেয়ে রইলেন। তাঁর মনে একটি শান্ত গভীর রসের অনুভূতি জেগে উঠলো। বহুদূর নিয়ে যায় সে অনুভূতি মানুষকে। আকাশের বিরাটত্বের সচেতন স্পর্শ আছে সে অনুভূতির মধ্যে। দূরাগত বংশীধ্বনির সুস্বরের মতো করুণ তার আবেদন।

গ্র্যান্ট সাহেব ভাবলেন, এই তো ভারতবর্ষ। এতদিন ঘুরে মরেচেন বোম্বাই, পুনা ক্যান্টমেন্টের পোললা খেলার মাঠে আর অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ক্লাবে। এরা এক অদ্ভুত জীব। এদেশে এসেই এমন অদ্ভুত জীব হয়ে পড়ে যে কেন এরা! যে ভারতবর্ষের কথা তিনি শকুন্তলা নাটকের মধ্যে পেয়েছিলেন (মনিয়ার উইলিয়ামসের অনুবাদে), যে ভারতবর্ষের খবর পেয়েছিলেন এডুইন আর্নল্ডের কাব্যের মধ্যে, যা দেখতে এতদূরে তিনি এসেছিলেন–এতদিন পরে এই ক্ষুদ্র গ্রাম্য নদীতীরের অপরাহুটিতে সেই অনিন্দ্যসুন্দর মহাকবিত্বময় সুপ্রাচীন ভারতবর্ষের সন্ধান পেয়েছেন। সার্থক হল তাঁর ভ্রমণ!

.

রাজারামের ভগ্নী তিনটির বয়স যথাক্রমে ত্রিশ, সাতাশ ও পঁচিশ। তিলুর বয়স সবচেয়ে বেশি বটে কিন্তু তিন ভগ্নীর মধ্যে সে-ই সবচেয়ে দেখতে ভালো, এমন কি তাকে সুন্দরী-শ্রেণীর মধ্যে সহজেই ফেলা যায়। রং অবিশ্যি তিন বোনেরই ফর্সা, রাজারাম নিজেও বেশ সুপুরুষ, কিন্তু তিলুর মধ্যে পাকা সবরি কলার মতো একটু লালচে ছোপ থাকায়। উনুনের তাতে কিংবা গরম রৌদ্রে মুখ রাঙা হয়ে উঠলে বড় সুন্দর দেখায় ওকে। তন্বী, সুঠাম, সুকেশী,–বড় বড় চোখ, চমৎকার হাসি। তিলুর দিকে একবার চাইলে হঠাৎ চোখ ফেরানো যায় না। তবে তিলু শান্ত পল্লীবালিকা, ওর চোখে যৌবনচঞ্চল কটাক্ষ নেই, বিয়ে হলে। এতদিন ছেলেমেয়ের মা ত্রিশ বছরের অর্ধপ্রৌঢ়া গিন্নি হয়ে যেত তিলু। বিয়ে না হওয়ার দরুন ওদের তিন বোনেই মনে-প্রাণে এখনো সরলা বালিকা।–আদরে-আবদারে, কথাবার্তায়, ধরন-ধারণে–সব রকমেই।

.

জগদম্বা তিলুকে ডেকে বললেন–চাল কোটার ব্যবস্থা করে ফেলো ঠাকুরঝি।

–তিল?

–দীনু বুড়িকে বলা আছে। সন্দেবেলা দিয়ে যাবে। নিলুকে বলে দাও বরণের ডালা যেন গুছিয়ে রাখে। আমি একা রান্না নিয়েই ব্যস্ত থাকবো।

–তুমি রান্নাঘর ছেড়ে যেও না। যজ্ঞিবাড়ির কাণ্ড। জিনিসপত্তর চুরি যাবে।

তিন বোনে মহাব্যস্ত হয়ে আছে নিজেদের বিয়ের যোগাড় আয়োজনে। ওদের বাড়িতে প্রতিবেশিনীরা যাতায়াত করচেন। গাঙ্গুলীদের মেজবৌ বল্লেও ঠাকুরঝি, বলি আজ যে বড় ব্যস্ত, নিজেরা বাসরঘর সাজিও কিন্তু। বলে দিচ্ছি ও-কাজ আমরা কেউ করবো না। আচ্ছা দিদি, তিলু ঠাকুরঝিকে কি চমৎকার দেখাচ্ছে। বিয়ের জল গায়ে না পড়তেই এই, বিয়ের জল পড়লে নাজানি কত লোকের মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেয় আমাদের তিলু-ঠাকুরঝি!

গাঙ্গুলীদের বিধবা ভগ্নী সরস্বতী বললে–বৌদিদির যেমন কথা। মুণ্ডু ঘুরিয়ে দিতে হয় ওর নিজের সোয়ামীরই ঘোরাবে, অপর কারে আবার খুঁজে বার করতে যাচ্চে ও!

সবাই হেসে উঠলো।

.

পরদিন ভবানী বাঁড়ুয্যের সঙ্গে শুভ গোধূলি-লগ্নে তিন বোনেরই একসঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল। হ্যাঁ, পাত্রও সুপুরুষ বটে। বয়স পঞ্চাশই বোধ হয় হবে কিন্তু মাথার চুলে পাক ধরে নি, গৌরবর্ণ সুন্দর সুঠাম সুগঠিত দেহ। দিব্যি একজোড়া গোঁফ। কুস্তগিরের মতো চেহারার বাঁধুনি।

বাসরঘরে মেয়েরা আমোদ-প্রমোদ করে চলে যাওয়ার পরে ভবানী বাঁড়ুয্যে বললেন–তিলু, তোমার বোনেদের সঙ্গে আলাপ করাও।

তিলোত্তমার গৌরবর্ণ সুঠাম বাহুতে সোনার পৈঁছে, মণিবন্ধে সোনার খাড়, পায়ে গুজরীপঞ্চম, গলায় মুড়কি মাদুলি–লাল চেলি পরনে। পৈঁছে নেড়ে বললে–আপনি ওদের কি চেনেন না?

–তুমি বলে দাও নয়!

–এর নাম স্বরবালা, ওর নাম নীলনয়না।

–আর তোমার নাম কি?

–আমার নাম নেই।

-বলো সত্যি। কি তোমার নাম?

–তি-লো-ও-মা। –বিধাতা বুঝি তিলে তিলে তোমায় গড়েছেন?

তিলু, বিলু ও নিলু একসঙ্গে খিলখিল করে হেসে উঠলো। তিলু বললে–না গো মশাই, আপনি শাস্তরও ছাই জানেন না

বিলু বললে–বিধাতা পৃথিবীর সব সুন্দরীর

নিলু বললে–রূপের ভালো ভালো অংশ

তিলু বললে–নিয়ে–একটু একটু করে

ভবানী হেসে বললেন–ও বুঝেচি! তিলোত্তমাকে গড়েছিলেন।

তিলু হেসে বললে–আপনি তাও জানেন না।

নিলু ও বিলু একসঙ্গে বলে উঠলো–আমরা আপনার কান মলে দেবো

তিলু বোনেদের দিকে চেয়ে বললেও কি? ছিঃ

বিলু বলে–ছিঃ কেন, আমরা বলবো না? সতীদিদি তো কান মলেই দিয়েছে আজ। দেয় নি?

ভবানী গম্ভীর মুখে বল্লেন–সে হোলো সম্পর্কে শ্যালিকা। তোমরা তো তা নও। তোমরা কি তোমাদের স্বামীর কান মলে দেবার অধিকারী? বুঝেসুজে কথা বলো।

নিলু বললে–আমরা কি, তবে বলুন।

তিলু বোনের দিকে চোখ পাকিয়ে বললে–আবার!

ভবানী হেসে বল্লেন–তোমরা সবাই আমার স্ত্রী। আমার সহধর্মিণী।

বিলু বললে–আপনার বয়েস কত?

ভবানী বললেন–তোমার বয়েস কত?

–আপনি বুড়ো।

তিলু চোখ পাকিয়ে বোনের দিকে চেয়ে বললে–আবার!

.

ভবানী বাঁড়ুয্যে বাস করবেন রাজারাম-প্রদত্ত জমিতে। ঘরদোর বাঁধবার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েচে, আপাতত তিনি শ্বশুরবাড়িতেই অবিশ্যি। এ এক নূতন জীবন। গিয়েছিলেন সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে, কত তীর্থে তীর্থে ঘুরে এসে শেষে এমন বয়সে কিনা পড়ে গেলেন সংসারের ফাঁদে।

খুব খারাপ লাগছে না। তিলু সত্যি বড় ভালো গৃহিণী, ভবানী ওর কথা চিত্তা করলেই আনন্দ পান। তাকে যেন ও দশ হাত বাড়িয়ে ঘিরে রেখেচে জগদ্ধাত্রীর মতো। এতটুকু অনিয়ম, এতটুকু অসুবিধে হবার জো নেই।

রোজ ভবানী বাঁড়ুয্যে একটু ধ্যান করেন। তাঁর সন্ন্যাসী-জীবনের অভ্যাস এটি, এখনো বজায় রেখেছেন। তিলু বলে দিয়েচে, ঠাণ্ডা লাগবে, সকাল করে ফিরবেন। একদিন ফিরতে দেরি হওয়াতে তিলু ভেবে নাকি অস্থির হয়ে গিয়েছিল। বিলু নিলু ছেলেমানুষ ভবানী বাঁড়ুয্যের চোখে, ওদের তিনি তত আমল দিতে চান না। কিন্তু তিলুকে পাবার জো নেই।

সেদিন বেরুতে যাচ্চেন ভবানী, নিলু এসে গম্ভীর মুখে বললে– দাঁড়ান ও রসের নাগর, এখন যাওয়া হবে না

–আচ্ছা, ছ্যাবলামি করো কেন বলো তো? আমার বয়েস বুঝে কথা কও নিলু।

–রসের নাগরের আবার রাগ কি!

নিলু চোখ উল্টে কুঁচকে এক অদ্ভুত ভঙ্গি করলে।

ভবানী বললেন–তোমাদের হয়েচে কি জানো? বড়লোক দাদা, খেয়ে-দেয়ে আদরে-গোবরে মানুষ হয়েচো। কর্তব্য-অকর্তব্য কিছু শেখো নি। আমার মনে কষ্ট দেওয়া কি তোমার উচিত? যেমন তুমি, তেমনি বিলু। দুজনেই ধিঙ্গি, ধুরন্ধর। আর দেখ দিকি তোমাদের দিদিকে?

–ধিঙ্গি, ধুরন্ধর–এসব কথা বুঝি খুব ভালো?

–আমি বলতাম না। তোমরাই বলালে।

–বেশ করেচি। আরো বলবো।

–বলো। বলচই তো। তোমাদের মুখে কি বাধে শুনি?

এমন সময়ে তিলু একরাশ কাপড় সাজিমাটি দিয়ে কেচে পুকুরঘাট থেকে ফিরচে দেখা গেল। পেয়ারাতলায় এসে স্বামীর কথার শেষের দিকটা ওর কানে গেল। দাঁড়িয়ে বললে–কি হয়েচে?

ভবানী বাঁড়ুয্যে যেন অকূলে কূল পেলেন। তিলুকে দেখে মনে আনন্দ হয়। ওর সঙ্গে সব ব্যাপারের একটা সুরাহা আছে।

–এই দ্যাখো তোমার বোন আমাকে কি সব অশ্লীল কথা বলচে!

তিলু বুঝতে না পারার সুরে বললে–কি কথা?

–অশ্লীল কথা। যা মুখ দিয়ে বলতে নেই এমনি কথা।

নিলু বলে উঠলো–আচ্ছা দিদি, তুইই বল। পাঁচালির ছড়ায় সেদিন পঞ্চাননতলায় বারোয়ারিতে বলে নি রসের নাগর? আমি তাই বলেছি। দোষটা কি হয়েচে শুনি? বরকে বলবো না?

ভবানী হতাশ হওয়ার সুরে বল্লেন–শোন কথা!

তিলু ছোটবোনের দিকে চেয়ে বললে–তোর বুদ্ধি-সুদ্ধি কবে হবে নিলু?

ভবানী বললেন–ও দুই-ই সমান, বিলুও কম নাকি?

তিলু বললে–না, আপনি রাগ করবেন না। আমি ওদের শাসন করে দিচ্চি। কোথায় বেরুচ্চেন এখন?

–মাঠের দিকে বেড়াতে যাবো।

–বেশিক্ষণ থাকবেন না কিন্তু সন্দের সময় এসে জল খাবেন। আজ বৌদিদি আপনার জন্যে মুগতক্তি করচে

–ভুল কথা। মুগতক্তি এখন হয় না। নতুন মুগের সময় হয়, মাঘ মাসে।

–দেখবেন এখন, হয় কি না। আসবেন সকাল সকাল, আমার মাথার দিব্যি

নিলু বললে–আমারও

তিলু বললে–যা, তুই যা।

.

ভবানী বাড়ির বাইরে এসে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। শরৎকাল সমাগত, আউশ ধানের ক্ষেত শূন্য পড়ে আছে ফসল কেটে নেওয়ার দরুন। তিৎপল্লার হলদে ফুল ফুটেছে বনে বনে ঝোপের মাথায়। ভবানীর বেশ লাগে এই মুক্ত প্রসারতা। বাড়ির মধ্যে তিনটি স্ত্রীকে নিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত হতে হয়। তার ওপর পরের বাড়ি। যতই ওরা আদর করুক, স্বাধীনতা নেই–ঠিক সময়ে ফিরে আসতে হবে। কেন রে বাবা!

ভবানী অপ্রসন্ন মুখে নদীর ধারে এক বটতলায় গিয়ে বসলেন। বিশাল বটগাছটি, এখানে-সেখানে সব জায়গায় ঝুরি নেমে বড় বড় গুঁড়িতে পরিণত হয়েচে। একটা নিভৃত ছায়াভরা শান্তি বটের তলায়। দেশের পাখি এসে জুটেছে গাছের মাথায়; দুরদুরান্তর থেকে পাখিরা যাতায়াতের পথে এখানে আশ্রয় নেয়, যাযাবর শামকুট, হাঁস ও সিল্লির দল। স্থায়ী বাসস্থান বেঁধেচে খোড়ো হাঁস, বক, চিল, দুচারটি শকুন। ছোট পাখির ঝাঁক–যেমন শালিক, ছাতারে, দোয়েল, জলপিপিএ গাছে বাস করে না বা বসেও না।

ভবানী এ গাছতলায় এর আগে এসেচেন এবং এসব লক্ষ্য করে গিয়েচেন। দু-একটা সন্ধ্যামণির জংলা ফুল ফুটেচে গাছতলায় এখানে ওখানে। ভবানী এদিক-ওদিক তাকিয়ে গাছতলায় গিয়ে চুপচাপ বসলেন। একটু নির্জন জায়গা চাই। চাষীলোকেরা বড় কৌতূহলী, দেখতে পেলে এখানে এসে উঁকিঝুঁকি মারবে আর অনবরত প্রশ্ন। করবে, তিনি কেন এখানে বসে আছেন। তিনি একা বসে রোজ। এ-সময়ে একটু ধ্যান করে থাকেন–তার সন্ন্যাসী-জীবনের বহুদিনের অভ্যাস।

আজও তিনি ধ্যানে বসলেন। একটা সন্ধ্যামণি ফুলগাছের খুব। কাছেই। খানিকটা সময় কেটে গেল। হঠাৎ একটা অপরিচিত ও বিজাতীয় কণ্ঠস্বরে ভবানী চমকে উঠে চোখ খুলে তাকালেন। একজন সাহেব গাছের গুঁড়ির ওদিকে একটি মোটা ঝুরি ধরে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে বিস্ময়ে ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।

সাহেবটি আর কেউ নয়, কোলসওয়ার্দি গ্র্যান্ট–তিনি বটগাছের শোভা দূর থেকে দেখে ভালো করে দেখবার জন্যে কাছে এসে আরো আকৃষ্ট হয়ে গাছের তলায় ঢুকে পড়েন এবং এদিক-ওদিক ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ ধ্যানরত ভবানীকে দেখেই থমকে দাঁড়িয়ে বলে ওঠেন, An Indian Yogi!

সাহেবের টমটম দূরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে; সঙ্গে কেউ নেই। ভজা মুচি সহিস টমটমেই বসে আছে ঘোড়া ধরে।

কোলস্ওয়ার্দি গ্র্যান্ট ভবানীর সামনে এসে আশ্বাসের সুরে বললেন Oh, I am very sorry to disturb you. Please go on with your meditations. ভবানী বাঁড়ুয্যে যে কিছুই না বুঝে অবাক হয়ে সাহেবের দিকে চেয়ে রইলেন। তিনি সাহেবকে দুএকদিন এর আগে যে না দেখেছেন এমন নয়, তবে এত কাছে থেকে আর কখনো দেখেন নি।

-I offer you my salutations-I wish I could speak your tongue.

বটতলায় কি একটা ব্যাপার হয়েচে বুঝে ভজা মুচি টমটমের ঘোড়া সামলে ওখানে এসে হাজির হল। সেও ভবানীকে চেনে না। এসে দাঁড়িয়ে বললে–পেরনাম হই বাবাঠাকুর! ও সাহেব ছবি আঁকে কিনা, তাই দেখুন সক্কালবেলা কুঠি থেকে বেরিয়ে মোরে নিয়ে সারাদিন বন বাদাড় ঘোরচে। আপনাকে দেখে ওর ভালো লেগেচে তাই বলচে। ভবানী হাত জুড়ে সাহেবকে নমস্কার করলেন ও একটু হাসলেন।

গ্র্যান্টও দেখাদেখি সেভাবে নমস্কার করবার চেষ্টা করলেন, হল affi Tom-Let me not disturb you–I sincerely regret, I have trespassed into your nice sanctuary. May I have the permission to draw your sketch?–You man, will you make him understand? ভজা মুচিকে গ্র্যান্ট সাহেব হাত পা নেড়ে ছবি আঁকার ব্যাপারটা বোঝাবার চেষ্টা করলেন।

ভজা মুচি ভবানীর দিকে চেয়ে বলল–ও বলচে আপনার ছবি আঁকবে। মুই জানি কিনা, এই সায়েবটা ওই রকম করে–একটুখানি চুপটি মেরে বসুন–

কি বিপদ। একটু ধ্যান করতে বসতে গিয়ে এ আবার কোন হাঙ্গামা এসে হাজির হল দ্যাখো। কতক্ষণ বসতে হবে? মরুক গে, দেখাই যা রগড়। ভবানী বসেই রইলেন।

গ্র্যান্ট সাহেব ভজা মুচিকে বললেন–Dont you stand agape, just go on and bring my sketching things from the cart

পরে হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন–যাও—

এতদিনে ঐ কথাটি গ্র্যান্ট ভালো করে শিখেছেন।

.

দেরি হল বাড়ি ফিরতে, সুতরাং ভবানী নিজের ঘরটিতে ঢুকে দেখলেন তিলু দোরের চৌকাঠে কি একটা নেকড়া দিয়ে পুঁছচে। ভবানী বললেন–কি ওখানে?

তিলু মুখ না তুলেই বললে–রেড়ির তেল পড়ে গেল, পিদিমটা ভাঙ্গলো,–জল পড়লো মেজেতে।

এ-সময়ে সমস্ত পল্লীগ্রামে দোতলা প্রদীপ বা সেজ ব্যবহার হত। তলায় জল থাকতো, ওপরের তলায় তেল। এতে নাকি তেল কম পুড়তো। ভবানী দেখলেন তাঁর খাটের তলায় দোতলা পিদিমটা ছিটকে ভেঙ্গে পড়ে আছে।

–সবই আনাড়ি! ভাঙ্গলে তো পিদিমটা?

–আমি ভাঙ্গি নি।

–কে? নিলু বুঝি?

–আজ্ঞে মশায়, না। চুপ করুন। কথা বলবো না আপনার সঙ্গে।

–কেন, কি করিচি?

–কি করিচি, বটে! আমার কথা শোনা হোলো? সন্দের সময় এসে জল খেতে বলেছিলুম না?

–শোনো, আসবো কি, এক মজা হয়েচে, বলি। কি বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম যে!

তিলু কৌতূহলের দৃষ্টিতে স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে বললে কি বিপদ? সাপ-টাপ তাড়া করে নি তো? খড়ের কাঠে বড্ড কেউটে সাপের ভয়–

–না গো, সাপ নয়। এক পাগল সাহেব। টমটমের সইস বললে নীলকুটির সাহেবদের বন্ধু, দেশ থেকে বেড়াতে এসেছে। আমি বটতলায় বসে আছি, আমার সামনে এসে হাঁ করে দাঁড়িয়েছে। কি সব হিট মিট টি বলতে লাগলো। সইসটা বললে–আপনার ছবি আঁকবে–

–ও, সেই ছবি-আঁকিয়ে সায়েব! হ্যাঁ হ্যাঁ, দাদার মুখে শুনেচি বটে। আপনার ছবি আঁকলে?

–আঁকলে বৈ কি। ঠায় বসে থাকতে হোলো চার দণ্ড।

–মাগো।

–এখন বোঝো কার দোষ।

পরক্ষণেই তিলুর দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলেন। কি সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে!

নিখুঁত সুন্দরী নয় বটে, কিন্তু অপুর্ব রূপ ওর। যেমন হাসি-হাসি মুখ, তেমনি নিটোল বাহুদুটি। গলায় খাঁজকাটা দাগগুলি কি চমৎকার– তেমনি পায়ের রং। সন্দেবেলা দেখাচ্ছে ওকে যেন দেবীমূর্তি।

বললেন–তোমার একটা ছবি আঁকতো সাহেব, তবে বুঝতে যে রূপখানা কাকে বলে।

–যান। আপনি যেন

পরে হেসে বললে–দাড়াঁন, খাবার আনি–সন্দে-আহ্নিকের জায়গা করে দিই?

–হুঁ।

–ও নিলু, শোন ইদিকে–আসনখানা নিয়ে আয়

নিলু এসে আসন পেতে দিলে। গঙ্গাজলের কো-কুশি দিয়ে গেল। তিলু যত্ন করে আঁচল দিয়ে সন্দে-আহ্নিকের জায়গাটা মেজে দিলে।

ভবানী মনে মনে যা ভাবছিলেন, আহ্নিকের সময়েও ভাবছিলেন, তা হচ্চে এই কালও সাহেব তাঁকে বটতলায় যেতে বলেচে। সাহেবের হুকুম, যেতেই হবে। রাজার মতো ওরা। তিলুকে নিয়ে গেলে কেমন হয়? অপূর্ব সুন্দরী ও। ওর একটা ছবি যদি সাহেব আঁকে, তবে বড় ভালো হয়। কিন্তু নিয়ে যাওয়াই মুশকিল। যদি কেউ টের পেয়ে যায়–তবে গাঁয়ে শোরগোল উঠবে। একঘরে হতে হবে সমাজে তাঁর শ্যালক রাজারাম রায়কে।

তিলু একখানা রেকাবিতে খাবার নিয়ে এল, নারকেলের সন্দেশ, চিরেভাজা আর মুগতক্তি। হেসে বললে–কেমন! মুগতক্তি যে বড় হয় না এ সময়ে। এখন কি দেবেন তাই বলুন—

নিলু বললে–এখন কান মলে দেবো যে

–দূর! তুই যে কি বলিস কাকে, ছি! ও-কথা বলতে আছে?

বিলু আড়াল থেকে বার হয়ে এসে খিলখিল করে হেসে উঠলো। ভবানী বিরক্তির সুরে বললে–আর এই এক নষ্টের গোড়া! কি যে সব হাসো! যা-তা মুখে কথাবার্তা তোমাদের দুজনের, বাধে না। ছিঃ

বিলু বললে–অত ছিঃ ছিঃ করতে হবে না বলে দিচ্চি

নিলু বললে–হ্যাঁ। আমরা অত ফেলনা নই যে সর্বদা ছিছিক্কার শুনতে হবে।

তিলু বললে–আপনি কিছু মনে করবেন না। ওরা বড্ড আদুরে আর ছেলেমানুষ–দাদা ওদের কক্ষনো শাসন করতেন না। আদর দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেচেন–

নিলু বললে–হ্যাঁ গো বৃন্দে। তোমাকে আর আমাদের ব্যাখ্যান কতে হবে না, থাক্।

বিলু বললে–দিদি সুয়ো হচ্চে ভাতারের কাছে, বুঝলি না?

ভবানী বললে–ছিঃ ছিঃ, আবার অশ্লীন বাক্য!

বিলু রাগের সুরে বললে–হ্যাঁ গো, সব অশ্লীন বাক্য আর অশ্লীন বাক্য! তবে কি কথা বলবে শুনি? দুটো কথা বলেচো কিনা, অমনি অশ্লীন বাক্য হয়ে গেল। বেশ করবো আমরা অশ্লীন বাক্য বলবো আপনি কি করবেন শুনি?

তিলু ধমকে বললে–যা এখান থেকে। দুজনেই যা। পান নিয়ে এসো।–আর মুগতক্তি দেবো? কেমন লাগলো? বৌদিদি আপনার জন্যে মুগতক্তি রসে ফেলচে। ভাত খাবার সময় দেবে।

–একটা কথা বলি তিলু

–কি?

–কেউ নেই তো এখানে? দেখে এসো।

–না, কেউ নেই। বলুন—

–কাল একবার আমার সঙ্গে বটতলায় যেতে পারবে?

–কেন?

সায়েবকে দিয়ে তোমার ছবি আঁকাবো। ঢাকাই শাড়িখানা পরে যেও। পারবে?

–ও মা!

–কেন কি হয়েচে?

–সে কি হয়? দিনমানে আপনার সঙ্গে কি করে বেরুবো? এই দেখুন আপনার সামনে দিনমানে বার হই বলে কত নিন্দে করচে লোকে। গাঁয়ে সেই রাত্তির ছাড়া দেখা করার নিয়ম নেই। আমাকে বেরুতে হয়। বাধ্য হয়ে, বৌদিদি পেরে ওঠেন না একা সবদিক তাংড়াতে।

–শোনো। ফন্দি করতে হবে। আমাকে যেতে হবে বিকেলে। আজ যে সময় গিয়েছিলুম সে সময়। তুমি নদীর ঘাটে গা ধুতে যেও ঘড়া গামছা নিয়ে। ওখান থেকে নিয়ে যাবো, কেউ টের পাবে না। লক্ষ্মীটি তিলু, আমার বড্ড ইচ্ছে।

–আপনার আজগুবী ইচ্ছে। ওসব চলে কখনো সমাজে? আপনি সন্নিসি হয়ে দেশ-বিদেশ বেড়িয়েছেন বলে সমাজের কোনো খবর তো রাখেন না। আমার যা ইচ্ছে করবার জো নেই।

.

শেষ পর্যন্ত কিন্তু তিলুকে যেতে হল। স্বামীর মনে ব্যথা দেওয়ার কষ্ট সে সইতে পারবে না। ঢাকাই শাড়ি পরে ঘড়া নিয়ে ঘাটের পথ আলো করে যাবার সময় তাকে কেউ দেখে নি, কেবল বাদা বোষ্টমের বৌ ছাড়া।

বোষ্টম-বৌ বললেও দিদিমণি, এ কি, এমন সেজেগুজে কোথায়? রূপে যে ঝলক তুলেচো?

–যাঃ, ঘাটে গা ধোবো। শাড়িখানা কাচবো। তাই

তিলুর বুকের মধ্যে দুরদুর করছিল। অপরাধীর মতো মিথ্যা কৈফিয়তটা খাড়া করলে। ভাগ্যিস যে বোষ্টম-বৌ দাঁড়ালো না, চলে গেল। আর ভাগ্যিস, ঘাটে শেষবেলায় কেউ ছিল না।

গ্র্যান্ট সাহেব দূর থেকে তিলুকে দেখে তাড়াতাড়ি টুপি খুলে সামনে এসে সম্ভ্রমের সুরে বললেন–Oh, she is a queenly beauty! Oh! I am grateful to you, sir, —

তারপর তিনি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তিলুর সলজ্জ মুখের ও অপূর্ব কমনীয় ভঙ্গির একটা আগা রেখাচিত্র আঁকতে চেষ্টা করলেন।

১৮৬৪ সালে প্রকাশিত কোলসওয়ার্দি এ্যান্টের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান লাইফ ইন রুরাল বেঙ্গল নামক বইয়ের চুয়ান্ন পৃষ্টায় ও সাতান্ন পৃষ্ঠায় এ বেঙ্গলি উম্যান ও অ্যান ইন্ডিয়ান ইয়োগী ইন্ দি উডস্ নামক দুখানা ছবি যথাক্রমে তিলু ও ভবানী বাঁড়ুয্যের রেখাচিত্র।

গ্রামে কেউ টের পায় নি। মুশকিল ছিল, রাত্রি জ্যোৎস্নাময়ী। এ মাঠ দিয়ে ও মাঠ দিয়ে ঘুরে তিলু স্বামীকে নিয়ে এল; ভবানী বিদেশী লোক, গ্রামের রাস্তাঘাট চিনতেন না। ভজা মুচি সইসকে ভবানী সব খুলে বলে বারণ করে দিয়েচিলেন। তিলু বল্লে–বাবা, কি কাণ্ড আপনার! শিশির পড়চে। ঠাণ্ডা লাগাবেন না। সায়েবটা বেশ দেখতে! আমি এত কাছ থেকে সায়েব কখনো দেখি নি। আপনি একটি ডাকাত।

–ও সব অশ্লীল কথা স্বামীকে বলতে আছে, ছিঃ।–

.

রাজারাম রায়কে ছোটসাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন। কেন ডেকে পাঠিয়েছেন রাজারাম তা জানেন। কোনো প্রজার জমিতে জোর করে। নীলের মার্কা মেরে আসতে হবে। রাজারাম দুর্ধর্ষ দেওয়ান, প্রজা কি করে জব্দ করা যায় তাঁকে শেখাতে হবে না। আজ আঠারো বছর এই কুঠিতে তিনি আছেন, বড়সাহেবের প্রিয়পাত্র হয়েচেন শুধু এই প্রজা জব্দ রাখবার দক্ষতার গুণে।

পাচু শেখের বাড়ি তেঘরা শেখহাটি। সেখানকার প্রজারা আপত্তি জানিয়ে বলেচে,দেওয়ানজি, আপনাদের খাসের জমিতে নীল বুনুন, প্রজার জমিতে এবার আমরা নীল বুনতি দেবো না।

রাজারাম জোর করে নীলের দাগ মেরে এসেছেন পাঁচু শেখের ও তার শ্বশুর বিপিন গাজি ও নবু গাজির জমিতে। এরা সে গ্রামের মধ্যে অবস্থাপন্ন গৃহস্থ, বিপিন গাজির বাড়িতে আটটি ধানবোঝাই গোলা, বিশ-পঁচিশটি হালের বলদ, ছজোড়া লাঙল। তার ভাই নবু গাজি তেজারতি কারবারে বেশ ফেপে উঠেছে আজকাল। কমপক্ষেও একশো বিঘে আউশ ধানের চাষ হয় দুই ভায়ের জোতে। গ্রামের সব লোকে ওদের সমীহ করে চলে, এরাও বিপদে-আপদে সবসময় বুক দিয়ে পড়ে।

নবু গাজি আজ ছোটসাহেবের কাছে এসে নালিশ করেছে। তাই বোধ হয় ছোটসাহেব ডেকেচেন। কি জানি। রাজারাম ভয় খান না। নবু গাজি কি করতে পারে করুক।

ছোটসাহেব অনেকদিন এদেশে থেকে এদেশের গ্রাম্যলোকের মতো বাংলা বলতে পারে। রাজারামকে ডেকে বললে–কি বলছিল নবু গাজি, ও রাজারাম!

–কি বলুম হুজুর

–ওর তামাকের জমিতে নাকি দাগ মেরে এসেচ।

–না মারলি ও গাঁ জব্দ রাখা যাবে না হুজুর।

–ও বলচে ওদের পীরির দরগার সামনের জমিও নিয়ে?

–মিথ্যে কথা হুজুর। আপনি ডাকান ওকে।

নবু গাজি বেশ জোয়ান মর্দ লোক, ঠাণ্ডা প্রকৃতির লোকও সে নিতান্ত নয়। কিন্তু ছোটসাহেব ও দেওয়ানজির সামনে সে নিরীহের মতো এসে দাঁড়ালো নীলকুঠির চতুঃসীমার মধ্যে দাঁড়িয়ে মাথা তুলে কথা বলবার সাধ্য নেই কোনো রায়তের।

ছোটসাহেব বললে–কি নবু গাজি, এবার গুড়-পাটালি করেছিলে?

নবু গাজি বিনম্ৰসুরে বললে–না সায়েব, মোরা এবার গাছ ঝুড়ি নি এখনো।

–পাটালি হলি খাতি দেবা না?

–আপনাদের দেবো না তো কাদের দেবো বলুন।

–দেবা ঠিক?

–ঠিক সায়েব।

–রাজারাম, তুমি এদের দরগাতলার জমিতে দাগ মেরেচ?

–না হুজুর। জমির নাম দরগাতলার জমি, এই পর্যন্ত। পুরানা খাতাপত্রে তাই আছে। সেখানে পীরের দরগা বা মসজিদ আছে কি না ওকেই জিজ্ঞেস করুন না। আছে সেখানে তোমাদের দরগা?

–ছেল আগে। এখন নেই দেওয়ানবাবু।

–তবে? তবে যে বড় মিথ্যে কথা বললে সায়েবকে?

–বাবু, আপনি একটু দয়া করুন, ও জমিতি মোরা হাজৎ করি। অঘ্রান মাসের সংক্রান্তির দিন পীরের নামে বেঁধে বেড়ে খাই। হয়–হয় আপনি একদিন দেখে আসবেন। মুই মিথ্যে কথা কেন বলবো আপনারে, আপনারা হলেন দেশের রাজা। আমার জমিটা ছেড়ে দ্যান দয়া করে।

ছোটসাহেব রাজারামের দিকে চেয়ে সুপারিশের সুরে বললে–যাক গে, দাও ছেড়ে জমিটা। ওরা কি যে করে বলচে

নবু গাজি বললে–হাজৎ।

–সেটা কি আবার?

-ওই যে বললাম সায়েব, খোদার নামে ভাত-গোস্ত বেঁধে ফকির মিচকিনিদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে যা থাকে মোরা সবাই মেলে খাই।

ছোট সাহেব খুশি হয়ে বলে উঠলো–বেশ, বেশ। আমারে একদিন দেখতি হবে।

–তা দেখাবো সায়েব।

–বেশ। রাজারাম, ওর জমিটা ছেড়ে দিও। যাও

নবু গাজি আভূমি সেলাম করে চলে গেল! কিন্তু সে বোকা লোক নয়, দেওয়ান রাজারামকে সে ভালোভাবেই চেনে। বাইরে গিয়ে গাছের আড়ালে অপেক্ষা করতে লাগলো।

রাজারাম ছোটসাহেবকে বললেন–হুজুর, আপনি কাজ মাটি করলেন একেবারে।

–কেন?

–ও জমি এক নম্বরের জমি। বিঘেতে সাড়ে তিনমণ খুঁড়ো পড়তা হবে। ও জমি ছেড়ে দিতে আছে? আর যদি অমন করে আস্কারা দ্যান। প্রজাদের, তবে আমারে আর কি কেউ মানবে?–না কোনো কথা আমার কেউ শুনবে?

ছোটসাহেব শিস দিতে দিতে চলে গেল। রাজারাম রাগে অভিমানে ফুলে উঠলেন। তখনি সদর আমিন প্রসন্ন চক্কত্তির ঘরে গিয়ে কি পরামর্শ করলেন দুজনে। প্রসন্ন চক্কত্তির বয়েস চল্লিশের ওপরে, বেশ কালো রং, দোহারা গড়ন, খুব বড় এক জোড়া গোঁফ আছে, চোখগুলো গোল গোল ভাঁটার মতো। সকলে বলে অমন বদমাইশ লোক নীলকুঠির কর্মচারীদের মধ্যে আর দুটি নেই। হয়কে নয় এবং নয়কে হয় করার ওস্তাদ। আমিনদের হাতে অনেক ক্ষমতাও দেওয়া আছে। সরল গ্রাম্য প্রজারা জরিপ কার্যের জটিল কর্মপ্রণালী কিছুই বোঝে না, রামের জমি শ্যামের ঘাড়ে এবং শ্যামের জমি যদুর ঘাড়ে চাপিয়ে মিথ্যে মাপ। মেপে নীলের জমি বার করে নেওয়াই আমিনের কাজ। প্রজারা ভয় করে, সুতরাং ঘুষও দেয়। রাজারামের অংশ আছে ঘুষের ব্যাপারে। প্রসন্ন চক্কত্তি থেলো হুঁকোয় তামাক টানতে টানতে বললেন–এ রকম কল্লি তো আমাদের কথা কেউ শোনবে না, ও দেওয়ানজি!

রাজারাম সেটা ভালোই বোঝেন। বললেন–তা এখন কি করা যায়। বলো, পরামর্শ দাও।

বড়সায়েবকে বলুন কথাটা।

–সে বাঘের ঘরে এখন যাবে কেডা?

–আপনি যাবেন, আবার কেডা?

বড়সাহেব শিপটন বেজায় রাশভারী জবরদস্ত লোক। ছোটসাহেবের মন একটু উদার, লোকটা মাতাল কিনা। সবাই তো তাই বলে। বড়সাহেবের কাছে যেতে সাহস হয় না যার তার। কিন্তু মানের দায়ে যেতে হল রাজারামকে। শিপটন মুখে বড় পাইপ টানছেন বসে, হাতখানেক লম্বা পাইপ। কি সব কাগজপত্র দেখছেন। তক্তপোশের মতো প্রকাণ্ড একটা ভারি টেবিলের ধারে কাঁঠাল কাঠের একটা বড় চেয়ার। সাতবেড়ের মুসাব্বর মিস্ত্রিকে দিয়ে টেবিল চেয়ার বড়সাহেবই। তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন, নিজের হাতে পালিশ আর রং করেছেন। টেবিলের একধারে মোটা চামড়াবাঁধানো একরাশ খাতা। দেওয়ালে। অনেকগুলো সাহেব-মেমের ছবি। এই ঘরের এক কোণে ফায়ার প্লেস, তেমন শীত না পড়লেও কাঠের মোটা মোটা ডালের আগুন মাঘের শেষ পর্যন্ত জ্বলে।

বড়সাহেব চোখ তুলে দেয়ালের দিকে চেয়ে বললেন–গুড মর্নিং।

রাজারাম পূর্বে একবার সেলাম করেছেন, তখন সাহেব দেখতে পান। নি ভেবে আর একবার লম্বা সেলাম করলেন। জিভ শুকিয়ে আসচে তার। ছোটসাহেবের মতো দিলখোলা লোক নয় ইনি। মেজাজ বেজায় গম্ভীর, দুর্দান্ত বলেও খ্যাতি যথেষ্ট। না-জানি কখন কি করে বসে। সাহেবসুবো লোককে কখনো বিশ্বাস করতে নাই। ভালো ছিল সেই ছবি আঁকিয়ে পাগলা সাহেবটা। তিলুর ও ভবানী ভায়ার ছবি এঁকেছিল লুকিয়ে। যাবার সময় সেই কথার উল্লেখ করে রাজারাম পাগলা সাহেবটার কাছে পঁচিশ টাকা বকশিশ আদায় করেও নিয়েছিলেন। অবিশ্যি ভবানী তার কিছু জানে না। যেমন সেই পাগলা সাহেব, তেমনি ভবানী, দুই-ই সমান। আপন-খেয়ালমতো চলে দুজনেই।

রাজারাম বললেন–আপনার আশীর্বাদে হুজুর ভালোই আছি।

–কি ডরকার আছে এখানে? বিশেষ কোনো কাজ আছে? আমি এখন খুব বিজি আছি। সময় কম আছে।

–অন্য কিছু না হুজুর। আমি তেঘরার একটা প্রজার জমিতে দাগ মেরেছিলাম, ছোটসায়েব তাকে মাপ করে দিয়েচেন।

শিপটন ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন–যা হুকুম ডিয়াছেন, টাহাই হইবে। ইহাটে টোমার কি অমান্য আছে।

বড়সাহেব এমন উল্টোপাল্টা কথা বলে, ভালো বাংলা না জানার দরুন। ভালো বালাই সব! রাজারামের হয়েচে মহাপাপ, এইসব অদ্ভুত চিজ নিয়ে ঘর করা। সাহেবের ভুল সংশোধন করে দেওয়া চলবে না, চটে যাবে। বালাইয়ের দল যা বলে তাই সই। তিনি বললেন–আজ্ঞে না, অন্যায় আর কি আছে? তবে এমন করলে প্রজা শাসন করা যায়।

–কি হবে না?

–প্রজা জব্দ করা যাবে না। নীলের চাষ হবে না হুজুর।

–নীলের চাষ হবে না টবে টোমাকে কি জন্য রাখা হইল?

–সে তো ঠিক হুজুর। আমাকে প্রজাদের সামনে অপমান করা হলে আমার কাজ কি করে হয় বলুন হুজুর

অপমান? ওহো, ইউ আর ইন্ ডিসগ্রেস ইউ ওল্ড স্কাউন্ডেল, আই আন্ডারস্ট্যান্ড। টোমাকে কি করিটে হইবে?

–আপনি বুঝুন হুজুর। নবু গাজি বলে একজন বদমাইশ প্রজার। জমিতে দাগ মেরেছিলাম, উনি হুকুম দিয়েচেন জমি ছেড়ে দিতে। ও গাঁয়ে আর কোনো জমিতে হাত দেওয়া যাবে না। নীলের চাষ হবে কি করে?

–কটো জমি এ বছর ডাগ দিয়াছ, আমাকে কাল ডেখাটে হইবে। ইমপ্রেশন্ রেজিস্টার টৈরি করিয়াছ?

–হাঁ হুজুর।

–যাও। না ডেখাইতে পারিলে জরিমানা হইবে। কাল লইয়া আসিবে।

বাস, কাজ মিটে গেল। প্রসন্ন চক্কত্তির কাছে মুখ ভারি করে ফিরে গেলেন রাজারাম।–না কিছুই হোলো না। ওরা নিজের জাতের মান অপমান আগে দেখে। পাজি শূওরখোর জাত কিনা। তোমার আমার অপমানে ওদের বয়েই গেল।

প্রসন্ন চক্কত্তি ঘুঘু লোক। আগেই জানতেন কি হবে। তামাক টানতে টানতে বললেন–অপমানং পুরস্কৃত্য মানং কৃত্ব চ পৃষ্টকে–ছেলেবেলায় চাণক্যশ্লোকে পড়েছিলাম দেওয়ানজি। ওদের কাছে এসে মান-অপমান দেখতে গেলে চলবে না। তা যান, আপনি আপনার কাজে যান–

–আবার উল্টে জরিমানার ব্যবস্থা

–সে কি! জরিমানা করে দিলে নাকি?

–সেজন্যে জরিমানা নয়। দাগের খতিয়ান হাল সনের তৈরি হয়েচে কি না, কাল দেখাতি হবে, না দেখাতি পারলে জরিমানা করবে।

–ভালো। ওদের অমনি বিচার।

–উল্টে কচু গালে লাগলো–

রাজারাম অপ্রসন্ন মুখে বার হয়ে গিয়ে দেখলেন নবু গাজি দলবল নিয়ে সদর ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে কারকুন রামহরি তরফদারের সঙ্গে একগাল হেসে কি বলচে। রাজারামকে সে এখনো বুঝতে পারে নি। স্বয়ং সাহেবও বোঝেন না। রাজারাম গম্ভীর স্বরে হাঁক দিয়ে বললেন–এই নবু গাজি, ইদিকি শুনে যাও।

নবু গাজির হাসি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। সে আজকের ব্যাপার নিয়ে হাসছিল না। সে সাহস তার নেই। তার একটা গোরু চুরি করে নিয়ে গিয়ে তারই জনৈক অসাধু কৃষাণ নহাটার হাটে বিক্রি করে, কি ভাবে সেই গোরুটা আবার নবু গাজি উদ্ধার করেছিল, তারই গল্প ফেঁদে নিজের কৃতিত্ত্বে আত্মপ্রসাদের হাসি হাসছিল সে। রাজারামের স্বরে তাঁর প্রাণ উবে গেল। তাড়াতাড়ি এসে সামনে দাঁড়িয়ে সম্ভ্রমের সুরে বললে–কি বাবু?

–যে জমিতে দাগ মেরেচি, সেটাতেই নীলের চাষ হবে। বুঝলে?

নবু গাজি বিস্ময়ের সুরে বললে–সে কি বাবু, ছোটসায়েব যে বললেন–

–ছোটসায়েব বলেচেন বলেচেন। বাবার ওপরে বাবা আছে। এই বড়সায়েবের হুকুম। এই আমি আসছি বড়সায়েবের দপ্তর থেকে। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া চলে না, বুঝলে নবু গাজি? তোমাকে নীলকুঠির চুনের গুদোমে পুরে ধান খাওয়াবো, তবে আমার নাম রাজারাম চৌধুরী, এই তোমায় বলে দিলাম। তুমি যে কি রকম– তোমার ভিটেতে ঘুঘু যদি না চরাই

নবু গাজি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেল। দেওয়ান রাজারামকে ভয় করে না এমন রায়ত নীলকুঠির সীমানা সরহদ্দের মধ্যে কেউ নেই। তিনি ইচ্ছে করলে অনেক কিছু করতে পারেন। সে হাতজোড় করে বললে–মাপ করুন দেওয়ানজি, ক্ষ্যামা দ্যান। আপনি মা-বাপ, আপনি মারলি মারতে পারেন রাখলি রাখতে পারেন। মুই মুরুক্ষু মানুষ, আপনার সন্তানের মতো। মোর ওপর রাগ করবেন না। মরে যাবো। তা হলি–

–এখনই হয়েচে কি? তোমার উঠোনে গিয়ে নীলের দাগ মারবো। তোমার সায়ের বাবা যেন উদ্ধার করে তোমায় দেখি তোমার কতদূর

নবু গাজি এসে রাজারামের পা দুটো জড়িয়ে ধরলে।

রাজারাম রুক্ষ সুরে বললেন–না, আমার কাছে নয়। যাও তোমার সেই সায়েব বাবার কাছে।

নবু গাজি তবুও পা ছাড়ে না।

রাজারাম বললেন–কি?

–আপনি না বাঁচালি বাঁচবো না। মুরুক্ষু মানুষ, করে ফেলেছি এক কাজ। ক্ষ্যামা দ্যান বাবু। আপনি মা-বাপ।

–আচ্ছা, এবার সোজা হয়ে এসো। তোমার জমি ছেড়ে দিতে পারি। কিন্তু

–বাবু সে আমায় বলতি হবে না। আপনার মান রাখতি মুই জানি।

–যাও, জমি ছেড়ে দিলাম। কাল আমিনবাবু গিয়ে ঠিক করে আসবে। তবে মার্কা-তোলার মজুরিটা জরিপের কুলিদের দিয়ে দিও। যাও–

নবু গাজি আভূমি সেলাম করলে পুনরায়। চলে গেল সে কাঁটপোড়ার বাঁওড়ের ধারে ধারে। দেওয়ান রাজারাম রায় ও সদর আমিন প্রসন্ন চক্কত্তির মুখে হাসি ফুটে উঠলো।

এই রকমই চলচে এদের শাসন অনেকদিন থেকে। বড়সাহেব ছোটসাহেব যদি বা ছাড়ে, এরা ছাড়ে না। চাষীদের, সম্পন্ন সম্ভ্রান্ত গৃহস্থদের ভালো ভালো জমিতে মার্কা দিয়ে আসে, সে জমিতে নীল পুঁততেই হবে। না পুঁতলে তার ব্যবস্থা আছে।

বড়সাহেব এ অঞ্চলের ফৌজদারি বিচারক। সপ্তাহে তিন দিন নীলকুঠিতে কোর্ট বসে। গোরু চুরি, ধান চুরি, মারামারি, দাঙ্গাহাঙ্গামার অভিযোগের বিচার হবে এখানেই। বড় কুঠির সাদাঘরে এ সময় নানা গ্রাম থেকে মামলা রুজু করতে লোক আসে। তেমাথার মোড়ে সনেকপুরের মাঠে একটা ফাঁসিকাঠ টাঙানো হয়েচে সম্প্রতি। রাজারামু বলে বেড়াচ্ছেন চারিদিকে যে এবার বড়সায়েব ফাঁসির হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা পেয়েচেন। গভনমেন্ট থেকে।

বড়সাহেব কিন্তু সুবিচারক। খুব মন দিয়ে উভয় পক্ষ না শুনে বিচার করে না। রায় দেবার সময় ভেবে দ্যায়। অপরাধীর কম, লঘুপাপে গুরুদণ্ড সর্বদাই লেগে আছে। নীলকুঠির কাজের একটু শ্রুতি হলে স্বয়ং দেওয়ানেরও নিষ্কৃতি নেই। তবু ছোটসাহেবের চেয়ে বড়সাহেবকে পছন্দ করে লোকে। দেয়ানকে বলে– টোমাকে চুনের প্রডামে পুরিয়া রাখিলে তুমি জড় হইবে।

রাজারাম বলেন–আপনার ইচ্ছা হুজুর। আপনি করলি সব করাত পারেন।

-You have a very oily tongue I know, but that wouldnt cut ice ihis time–টোমাকে আমি জবড করিটে জানে।

–কেন জানবেন না হুজুর। হুজুর মা-বাবা

–মা-বাবা! মা-বাবা! চুনের গুড়ামে পুরিলে টোমার জড ঠিক হইয়া যাইবে।

–হুজুরের খুশি।

–যাও, ডশ টাকা জরিমানা হইল।

–যে আজ্ঞে হুজুর।

রাজারামের কাজ এ ভাবেই চলে।

.

কুঠিতে জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট বাহাদুর আসবেন। দেওয়ান রাজারাম ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছেন আজ সকাল থেকে। ভেড়া, মাছ, ভালো আম ও ঘি যোগাড় করবার ভার তাঁর ওপর। মাঝে মাঝে এ রকম লেগেই আছে, সাহেব-সুবো অতিথি যাতায়াত করচে মাসে দুবার তিনবার!

মুড়োপাড়ার তিনকড়িকে ডাকিয়ে এনেছেন তার একটি নধর শূওরের জন্যে। তিনকড়ি জাতে কাওরা, শূওরের ব্যবসা করে অবস্থা ফিরিয়ে ফেলেচে। দোতলা কোঠাবাড়ি, লোকজন, ধানের গোলা, পুকুর। অনেক ব্রাহ্মণ কায়স্থ তাকে খাতির করে চলে। রাজারামকে উপহার দেওয়ার জন্যে সে বাড়ি থেকে ঘানি-ভাঙ্গা সর্ষের তেল এনেছিল প্রায় দশ সের, কিন্তু রাজারাম তা ফেরত দিয়েছেন, কাওরার দেওয়া জিনিস তাঁর ঘরে ঢুকবে না।

তিনকড়ি বললে–একটা আছে পাঁচ মাসের আর একটা আছে দু বছরের। যেটা পছন্দ করেন বলে দেবেন। তবে বলতি নেই, আপনারা ওর সোয়াদ জানেন না, দেওয়ানবাবু, একবার খেলি আর ভুলতি পারবেন না। ওই পাঁচ মাসের বাচ্চাড়া শুধু ভেজি খাবেন ঘি দিয়ে–

রাজারাম হেসে বললেন– দূর ব্যাটা, কি বলে। বামুনদের অমন বলতি আছে? তোদের পয়সা হলি কি হবে, জাতের স্বধম্মো যাবে কোথায়?

–বাবু, ঐ যা! আপনারা যে খান না, সে কথা ভুলে গিইচি, মাপ করবেন।

-না না, তোর কথায় আমার রাগ হয় না। তা হলি শূওরের সরবরাহ করতি হবে তোমাকেই, এই মনে রাখবা।

–মনে রাখারাখি কি, কালই আমি পাঁচ মাসের বাচ্চা আর দুবছরেরডা পেঠিয়ে দেবো এখন। কোথায় পেঠিয়ে দেবো বলুন, এখানেই আপনার বাড়ি আমার নোকে নিয়ে আসবে?

-না না, আমার বাড়ি কেন? কুঠিতে পাঠিয়ে দেবা। ব্রাহ্মণের বাড়ি শূওর? ব্যাটাকে কি যে করি–

তিনকড়ি বিদায় নেবার উদ্যোগ করতেই রাজারাম বললেন– ব্রাহ্মণবাড়ি এসেচ, পেরসাদ না পেয়ে যাবে, না যেতি আছে? পয়সা হয়েচে বলে কি ধরাকে সরা দেখছো নাকি?

তিনকড়ি জিভ কেটে বললেও কথাই বলবেন না। বেরাহ্মণের পাত কুড়িয়ে খেয়ে মোরা মানুষ দেওয়ানজি। মুখ থেকে ফেলে দিলি সে ভাতও মাথায় করে নেবো। তবে মোর মনটাতে আজ আপনি বড় কষ্ট দেবেন।

–কেন, কেন?

–ভালো তেলটা এনেলাম আপনার জন্যি আলাদা করে, তেলডা নেলেন না।

–নিলাম না মানে, শুদুরের দান নিতি নেই আমাদের বংশে, সেজন্যে মনে দুঃখু করো না তিনকড়ি। আচ্ছা তুমি দুঃখিত হচ্চ, কিছু দাম দিচ্চি, নিয়ে তেলটা রেখে যাও

–দাম? কত দাম দেবেন?

–এক টাকা।

–তা হলে তো পাঁচসের তেলের দাম দিয়েই দেলেন কত্তা। মুই কি তেল বিক্রি করতি এনেলাম বাবুর কাছে? এটুদয়া করবেন না? আছিই না নয় ছোটনোক–

–না তিনকড়ি। মনে করো না সেজন্যি কিছু। একটা টাকাই তোমারে নিতি হবে। তার কম নিলি আমি পারব না। ওরে, কে আছিস। সীতেনাথ–বাবা ইদিকি তিনকড়ির কাছ থেকে তেলের ভাঁড়টা নাও

এই সময়ে ছোটসাহেব ব্যস্তসমস্ত হয়ে সেখানে এসে হাজির হল। রাজারামকে দেখে কি বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তিনকড়িকে দেখে থেমে গেল।

রাজারাম দাঁড়িয়ে উঠে বললেন–পাঁচ মাসের শূওরের বাচ্চা একটা যোগাড় করা গেল হুজুর

–oh, the sucking pig is the best.-পাঁচ মাসের বাচ্চা বড় হোলো। মাই খায় এমন বাচ্চা দিতে পারব না তুমি?

–না, তেমন নেই সায়েব। এত ছোট বাচ্চা কনে পাবো?

–জেলা থেকে হাকিম আসচে, এখানে খাবে। বাচ্চা হলি খাবার জুত হোত।

–এবার হলি রেখে দেবো। সায়েব, সেলাম। মুই চল্লাম। পেরনাম হই দেওয়ানজি।

রাজারাম সাহেবকে দেখেই বুঝেছিলেন একটা গুরুতর ব্যাপারের খবর নিয়ে সে এখানে এসেচে। তিনকড়ি বিদায় নেবার পরক্ষণেই তিনি সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন–কি হয়েচে সায়েব?

-খুব গোলমাল। রসুলপুর আর রাহাতুনপুরির মুসলমান চাষীরা ক্ষেপে উঠেছে নীল বুনবে না।

–কে বললে?

কারকুন গিয়েছিল নীলির দাগ মারতি তারা দাগ মারতি দেয় নি, লাঠি নিয়ে তাড়া করেচে

–এতবড় আস্পদ্দা তাদের?

–তুমি ঘোড়া আনতি বলো। চলো দুজনে ঘোড়া করে সেখানে _ যাবো। বড়সাহেবকে কিছু বলো না এখন।

–যদি সত্যি হয় তখন কি করা যাবে সে আমাকে বলতি হবে। না সায়েব। আপনি দয়া করে শুধু ফজদুরি মামলা থেকে আমারে বাঁচাবেন।

-না না, তুমি বড় rash, কিছু করে বসবা। ওই জন্যি তোমারে আমার বিশ্বেস হয় না।

একটু পরে দুটো ঘোড়ায় চড়ে দুজনে বেরিয়ে গেল। কখন দেওয়ান ফিরে এসেছিলেন কেউ জানে না। পরদিন সকালে চারিধারে খবর রটে গেল রাত্রে রাহাতুনপুর গ্রাম একেবারে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গিয়েচে। বড় বড় চাষীদের গ্রাম, কারো বাড়ি বিশ-ত্রিশটি পর্যন্ত ধানের গোলা ছিল–আর ছিল ছচালা আটচালা ঘর, সব পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গিয়েচে। কি ভাবে আগুন লেগেছিল কেউ জানে না, তবে সন্ধ্যারাত্রে ছোটসাহেব এবং দেওয়ানজি রাহাতুলপুরের মোড়লের বাড়ি গিয়েছিলেন; সেখানে প্রজাদের ডাকিয়ে নীল বুনবে না কেন তার কৈফিয়ৎ চেয়েছিলেন। তারা রাজি হয় নি। ওঁরা ফিরে আসেন রাত এগারোটার পর। শেষরাত্রে গ্রামসুদ্ধ আগুন লেগে ছাইয়ের ঢিবিতে পরিণত হয়েচে। এই দুই ব্যাপারের মধ্যে কার্যকরণ-সম্পর্ক বিদ্যমান বলেই সকলে সন্দেহ করচে।

পরদিন জেলা-ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ ডঙ্কিনসন নীলকুঠির বড় বাংলোতে সদলবলে এসে পৌঁছুলেন। তিনি যখন কুঠির ফিট গাড়ী থেকে নামলেন, তখন শুধু বড়সাহেব ও ছোটসাহেব সদর ফটকে তাঁকে অভ্যর্থনা করবার জন্যে উপস্থিত ছিলেন–দেওয়ান রাজারাম নাকি চুরুটের বাক্স এগিয়ে দেওয়ার জন্যে উপস্থিত ছিলেন বৈঠকখানার টেবিলের পাশে। ডঙ্কিন্স এসেছিলেন শুধু নীলকুঠির আতিথ্য গ্রহণ করতে নয়, বড়সাহেব একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই ম্যাজিষ্ট্রেটকে এখানে এনেছিলেন।

রাজারামকে ডেকে বড়সাহেব বললেন–টুমি কি ডেখিলে ইহাকে বলিটে হইবে। ইনি জেলার ম্যাজিস্ট্রেট আছে–this man is our Dewan, Mr. Duncinson, and a very shrewd old man too go on, বলিয়া যাও–রাহাটুনপুরে কি ডেখিলে–

রাজারাম আভূমি সেলাম করে বললেন–সায়েব, ওরা ভয়ানক চটেচে। লাঠি নিয়ে আমাকে মারে আর কি! নীল কিছুতেই বুনবে না। আমি কত কাকুতি করলাম–হ্যাঁতে-পায়ে ধরতে গেলাম। বললাম

ডঙ্কিনসন সাহেব বড়সাহেবের দিকে চেয়ে বললেন–What he did, he says?

-Entreated them,

-I understand. Ask him how many people were there

–কটো লোক সেখানে ছিল?

–তা প্রায় দুশো লোক সায়েব। সব লাঠিসোঁটা নিয়ে এসেছিল–

-Came with lathis and other weapons.

-Oh, they did, did they? The scoundrels!

–টারপরে টুমি কি করিলে?

–চলে এলাম সায়েব। দুঃখিত হয়ে চলে এলাম। ভাবতি ভাবতি এলাম, এতগুলো নীলির জমি এবার পড়ে রইলো। নীলচাষ হবে না। কুঠির মস্ত লোকসান।

কিছুক্ষণ পরে সদর-কুঠির সামনের মাঠ জনতায় ভরে গেল। ওরা এসেচে ম্যাজিষ্ট্রেট সায়েবের কাছে নালিশ জানাতে–দেওয়ানজি ওদের গ্রাম রাহাতুনপুর একেবারে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে এসেছেন।

ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ান রাজারামকে ডেকে পাঠালেন। বললেন–টুমি কি করিয়াছে? আগুন ডিয়াছে?

রাজারাম আকাশ থেকে পড়লেন। চোখ কপালে তুলে বললেন– আগুন! সে কি কথা সায়েব! আগুন!

আগুন জিনিসটা কি তাই যেন তিনি কখনো শোনেন নি।

ম্যাজিষ্ট্রেটের সন্দেহ হল তিনি রাজারামকে অনেকক্ষণ জেরা করলেন। ঘুঘু রাজারাম অমন অনেক জেরা দেখেছেন, ওতে তিনি ভয় পান না। রাহাতুনপুর গ্রামের লোকদের অনেককে ডাক দিলেন, তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। কিন্তু কুঠির সীমানায় দাঁড়িয়ে ওরা বেশি কিছু বলতে ভয় পেলে। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আজ এসেছে, কাল চলে যাবে, কিন্তু ছোটসাহেব আর দেওয়ানজি চিরকালের জুজু। বিশেষত দেওয়ানজি। ওঁদের সামনে দাঁড়িয়ে ওঁদের বিরুদ্ধে কথা বলতে যাওয়া–সে অসম্ভব। রাহাতুনপুর গ্রামে ম্যাজিষ্ট্রেট স্বয়ং গেলেন দেখতে। সঙ্গে বড়সাহেব ও ছোটসাহেব। মস্ত বড় হাতী তৈরি হল তাঁদের যাবার জন্যে দু-দুটো। লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। রাহাতুনপুরের মাঠ।

খুব বড় গ্রাম নয় রাহাতুনপুর, একপাশে খড়ের মাঠ, খড়ের মাঠের পূর্বদিকে এই গ্রামখানি–একখানাও কোঠাবাড়ী ছিল না। চাষী গৃহস্থদের খড়ের চালাঘর গায়ে গায়ে লাগা। পুড়ে ভস্মসাৎ হয়ে গিয়েচে। কোনো কোনো ভিটেতে পোড়া কালো বাঁশগুলো দাঁড়িয়ে আছে। মাটির দেওয়াল পুড়ে রাঙ্গা হয়ে গিয়েচে, কুমোর বাড়ীর হাঁড়ি পোড়ানো পনের মত দেখতে হয়েচে তাদের রং। কবীর শেখের গোয়ালে দুটো দামড়া হেলে গোরু পুড়ে মরেচে। প্রত্যেকের উঠানে আধ-পোড়া ধানের গাদা, পোড়া ধানের গাদা থেকে মেয়েরা কুলো করে ধান বেছে নিয়ে ঝাড়ছিল–মুখের ভাত যদি কিছুটা বাঁচাতে পারা যায়।

অনেকে এসে কেঁদে পড়লো। দেওয়ানজির কাজ অনেকে বললে, কিছু প্রমাণ তো তেমন কিছু নেই। কেউ তাঁকে বা তাঁর লোককে আগুন দিতে দেখেচে এটা প্রমাণ হোল না। ম্যাজিষ্ট্রেট তদন্ত ভালোভাবেই করলেন। বড়সাহেবকে ডেকে বললেন–আই অ্যাম রিয়্যালি সরি ফর। দি পুওর বেগার্স–উই মাষ্ট ডু সামথিং ফর দেম।

বড়সাহেব বললে–আই ওয়ানডার হু হ্যাঁজ কমিটেড় দিস ব্ল্যাক ডিড়–আই সাসপেক্ট মাই অয়েলি-টাংড় দেওয়ান।

–ইউ থিংক ইট ইজ এ কেস্ অফ আর্সন?

–আই কান্ট টেল–ইয়ার্স এগো আই স এ কেস্ লাইক দিস, অ্যান্ড দ্যাট ওয়াস এ কেস অফ আর্সন–মাই ডেওয়ান ওয়াজ রেসপনসিবল ফর দ্যাট-দি ডেভিল।

ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব একশো টাকা মঞ্জুর করলেন সাহায্যের জন্য, বড়সাহেব দিলেন দুশো টাকা। সাহেবদের জয়জয়কার উঠলো গ্রামে।

সকলে বললে–না, অমন বিচারক আর হবে না। হাজার হোক রাঙা মুখ।

.

সেই রাত্রে কুঠির হলঘরে মস্ত নাচের আসর জমলো। রাঙামুখ সাহেবরা সবাই মদ খেয়েচে। মেমদের কোমর ধরে নাচচে, ইংরিজি গান করচে। সহিস ভজা মুচি উর্দি পরে মদ পরিবেশন করচে। নীলকুঠিতে কোনো অবাঙালি চাকর বা খানসামা নেই। এইসব আশপাশের গ্রামের মুচি, বাগদি, ডোম শ্রেণীর লোকেরা চাকর-খানসামার কাজ করে। ফলে সাহেব মেম সকলেই বাংলা বলতে পারে, হিন্দি কেউ বলেও না, জানেও না।

আমিন প্রসন্ন চক্রবর্তী বার-দেউড়িতে তাঁর ছোট কুঠুরিতে বসে তামাক টানছিলেন। সামনে বসে ছিল বরদা বাগদিনী। বরদার বয়স প্রসন্ন চক্রবর্তীর চেয়ে বেশি, মাথার চুল শণের দড়ি। বরদাকে প্রসন্ন। চক্রবর্তী মাঝে মাঝে স্মরণ করেন নিজের কাজ উদ্ধারের জন্যে।

প্রসন্ন বললেন–গয়া ভালো আছে?

–তা একরকম আছে আপনাদের আশীর্বাদে।

–বড় ভালো মেয়ে। এমন এ দিগরে দেখি নি। একটা কথা বরদা দিদি

–কি বলো–

–এক বোতল ভালো বিলিতি মাল গয়াকে বলে আনিয়ে দাও দিদি। আজ অনেক ভালো জিনিসের আমদানি হয়েচে। সায়েব-সুবোর খানা, বুঝতেই পারচো। অনেক দিন ভালো জিনিস পেটে পড়ে নি—

–সে বাপু আমি কথা দিতে পারবো না। গয়া এখন ইদিকি নেই–সায়েবদের খানার সময় গয়া সেখানে থাকে না–

-লক্ষ্মী দিদি, শোনবো না, একটু নজর করতিই হবে–উঠে যাও দিদি। দ্যাখো, যদি গয়াকে বলে নিদেনে একটা বোতল যোগাড় করতি পারো

বরদা বাগদিনী চলে গেল। এ অঞ্চলে বরদার প্রতিপত্তি অসাধারণ, কারণ ও হল সুবিখ্যাত গয়ামেমের মা। গয়ামেমকে মোল্লাহাটি নীলকুঠির অধীন সব গ্রামের সব প্রজা জানে ও মানে। গয়া বরদা বাগদিনীর মেয়ে বটে, কিন্তু বড়সাহেবের সঙ্গে তার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা, এইজন্যেই ওর নাম এ অঞ্চলে গয়ামেম।

গয়া খারাপ লোক নয়, ধরে পড়লে সাহেবকে অনুরোধ করে। অনেকের ছোটবড় বিপদ সে কাটিয়ে দিয়েছে। মেয়েমানুষ কিনা, পাপপথে নামলেও ওর হৃদয়ের ধর্ম বজায় আছে ঠিক। গয়ার বয়স বেশি নয়, পঁচিশের মধ্যে, গায়ের রং কটা, বড় বড় চোখ, কালো চুলের ঢেউ ছেড়ে দিলে পিঠ পর্যন্ত পড়ে, মুখখানা বড় ছাঁচের কিন্তু এখনো বেশ টুলটুলে। সর্বাঙ্গের সুঠাম গড়নে ও অনেক ভদ্রঘরের সুন্দরীকে হার মানায়। পথ বেয়ে হেঁটে গেলে ওর দিকে চেয়ে থাকতে হয় খানিকক্ষণ।

গয়ামেমকে কিন্তু বড়সাহেবের সঙ্গে কেউ দেখে নি। অথচ ব্যাপারটা এ অঞ্চলে অজানা নয়। সে হল বড়সাহেবের আয়া, সর্বদা থাকে হলদে কুঠিতে, যেটা বড়সাহেবের খাস কুঠি। ফর্সা কালাপেড়ে শাড়ি ছাড়া সে পরে না, হাতে পৈঁছে, বাজুবন্ধ, কানে বড় বড় মাকড়ি-ঘন বনের বুকচেরা পাহাড়ি পথের মতো বুকের খাঁজটাতে ওর দুলছে সরু মুড়কি-মাদুলি, সোনার হারে গাঁথা।

ডোম-বাগদির মেয়েরা বলে–গয়া দিদি এক খেলা দেখালো ভালো! ওদের মধ্যে ভালো ঘরের ঝি-বৌয়েরা নাক সিটকে বলে–অমন। পৈঁছে বাজুবন্ধের পোড়া কপাল!

নিশ্চয় ওদের মধ্যে অনেকে ঈর্ষা করে ওকে। এর প্রমাণও আছে। অনেকে প্রতিযোগিতায় হেরেও গিয়েচে ওর কাছে। ঈর্ষা করবার সঙ্গত কারণও আছে বৈ কি!

আমিন প্রসন্ন চক্কত্তির ঘরে এহেন গয়ামেমের আবির্ভাব খুবই অপ্রত্যাশিত ঘটনা। প্রসন্ন চক্কত্তি চমকে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন–এই যে গয়া। এসো মা এসো–বসতি দিই কোথায়—

গয়া হেসে বললে–থা খুড়োমশাই–আমি ঝঙ্কাঠের ওপর বসচি–তারপর কি বললেন মোরে?

–একটা বোতল যোগাড় করে দিতি পারো মা?

–দেখুন দিকি আপনার কাণ্ড। মা গিয়ে মোরে বললে, দাদাঠাকুরকে একটা ভালো বোতল না দিলি নয়। এই দেখুন আমি এনিচি কেমনধারা দেখুন তো?

গয়া কাপড়ের মধ্যে থেকে একটা সাদা পেটমোটা বেঁটে বোতল বার করে প্রসন্ন চক্কত্তির সামনে রাখলো। প্রসন্ন চক্কত্তির ছোট ছোট চোখ দুটো লোভে ও খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে বোতলটা ধরে বললে–আহা, মা আমার–দেখি দেখি–কি ইংরিজি লেখা রয়েছে পড়তে পারিস?

–না খুড়োমশায়, ইঞ্জিরি-ফিঞ্জিরি আমরা পড়তি পারি নে।

প্রসন্ন চক্কত্তি গয়ার দিকে প্রশংসমান দৃষ্টিতে চাইলেন। কিঞ্চিত মুগ্ধ দৃষ্টিতেও বোধ হয়। গয়ামেমের সুঠাম যৌবন অনেকেরই কামনার বস্তু। তবে বড় উঁচু ডালের ফল, হাতের নাগালে পাওয়া সকলের ভাগ্যে ঘটে কি?

প্রসন্ন চক্কত্তি বললে–হাঁরে গয়া, সাহেব মেমের নাচের মধ্যি হোলো কি? দেখেচিস কিছু?

–না খুড়োমশায়। মোরে সেখানে থাকতি দ্যায় না।

–শিপটন সায়েবের মেম নাকি ছোটসাহেবের সঙ্গে নাচে?

–ওদের পোড়া কপাল। সবাই সবার মাজা ধরে নাচতি নেগেছে। ঝাঁটা মারুন ওদের মুখি। মুই দেখে লজ্জায় মরে যাই খুডোমশায়।

–বলিস কি।

–হ্যাঁ খুড়োমশাই, মিথ্যে বলচি নে। আপনি না হয় গিয়ে একটু দেখে আসুন, বড়সায়েবের চাপরাসী নফর মুচি বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আছে।

–ভজা মুচি কোথায়? ও আমার কথা একটু-আধটু শোনে।

–সেও সেখানে আছে।

–বড়সায়েবও আছে?

–কেন থাকবে না! যাবে কনে?

–ভেতরে ভেতরে কেমন লোক বড়সায়েব?

গয়া সলজ্জ চোখ দুটি মাটির দিকে নামিয়ে বললে–ওই এক রকম। বাইরে যতটা গোঁয়ারগোবিন্দ দেখেন ভেতরে কিন্তু ততটা নয়। বাবাঃ, সব ভালো কিন্তু ওদের গায়ে যে–

–গন্ধ?

–বোটকা গন্ধ তো আছেই! তা নয়, গায়ে বড় ঘামাচি। ঘামাচি পেকে উঠবে রোজ রাত্তিরি। মোর মাথার কাঁটা চেয়ে নিয়ে সেই ঘামাচি রোজ গালবে। কথাটা বলে ফেলেই গয়ার মনে পড়লো, বৃদ্ধ প্রসন্ন আমিনের কাছে, বিশেষত যাকে খুড়োমশাই বলে ডাকে তাঁর কাছে, এ কথাটা বলা উচিত হয় নি। মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লজ্জা হল। বড়–সেটা ঢাকবার চেষ্টায় তাড়াতাড়ি উঠে বললে–যাই খুড়োমশায়, অনেক রাত হোলো। বিস্কুট খাবেন? খান তত এনে দেবো এখন। আর এক জিনিস খায়–তারে বলে চিজ। বড় গন্ধ। মুই একবার মুখি দিয়ে শেষে গা ঘুরে মরি। তবে খেলি গায়ে জোর হয়।

গয়ামেম চলে গেলে প্রসন্ন আমিন মনের সাথে বোতল খুলে বিলিতি মদে চুমুক দিলেন। হাতে পয়সা আসে মন্দ নয় মাঝে মাঝে, দেওয়ানজির কৃপায়। কিন্তু এসব মাল জোটানো শুধু পয়সা থাকলেই বুঝি হয়? হদিস জানা চাই। দেওয়ানজির এসব চলে না, একেবারে কাঠখোট্টা লোক। ও পারে শুধু দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধাতে। কি ভাবেই রাহাতুনপুরটা পুড়িয়ে দিলে রাত্তিরে। এই ঘরে বসেই সব শলাপরামর্শ ঠিক হয়, প্রসন্ন আমিন জানে না কি। ম্যাজিস্ট্রেট আসুক আর যেই আসুক, নীলকুঠির সীমানার মধ্যে ঢুকলে সব ঠাণ্ডা।

তা ছাড়া রাজার জাত রাজার জাতের পক্ষে কথা বলবে না তো কি বলবে কালা আদমিদের দিকে?

খাও দাও, মেমেদের মাজা ধরে নাচো, ব্যস, মিটে গেল।

.

ভবানী বাঁড়ুয্যে বেশ সুখে আছেন।

দেওয়ান রাজারাম রায়ের বাড়ি থেকে কিছুদূরে বাঁশবনের প্রান্তে দুখানা খরের ঘর তৈরি করে সেখানেই বসবাস করচেন আজ দুবছর; তিলুর একটি ছেলে হয়েচে। ভবানী বাঁড়ুয্যে কিছু করেন না, তিন-চার বিঘে ধানের জমি যৌতুকস্বরূপ পেয়েছিলেন, তাতে যা ধান হয়, গত বছর বেশ চলে গিয়েছিল। সে বছর সেই যে সায়েবটি তাঁদের ছবি এঁকে নিয়ে গিয়েছিল, এবার সে সায়েব তাকে একখানা চিঠি আর একখানা বই পাঠিয়েছে বিলেত থেকে। রাজারাম নীলকুঠি থেকে বই আর চিঠি এনে ভবানীর হাতে দেন। হাতে দিয়ে বলেন–ওহে ভবানী, এতে তিলুর ছবি কি করে এল? সাহেব এঁকেছিল বুঝি? চমৎকার একেচে, একেবারে প্রাণ দিয়ে এঁকেচে। কি সুন্দর ভঙ্গিতে একেচে ওকে। ওর ছবি কি করে আঁকলে সাহেব? থাক্ থাক্‌, এ যেন আর কাউকে দেখিও না এ গাঁয়ে। কে কি মনে করবে। ইংরিজি বই। কি তাতে লিখচে কেউ বলতে পারে না, শুধু এইটুকু বোঝা যায় এই গাঁ এবং যশোর অঞ্চল নিয়ে অনেক জায়গার ছবি আছে। সাহেবটা ভালো লোক ছিল।

তিলু হেসে বললে–দেখলেন, কেমন ছবি উঠেচে আমার!

–আমারও।

–বিলু-নিলুকে দেখাবেন। ওরা খুশি হবে। ডাকি দাঁড়ান

নিলু এসে হৈচৈ বাধিয়ে দিলে। সব তাতেই দিদি কেন আগে? তার ছবি কি উঠতে জানে না? দিদির সোহাগ ভুলতে পারবেন না রসের গুণমণি–অর্থাৎ ভবানী বাঁড়ুয্যে।

তবে আজকাল ওদের অনেক চঞ্চলতা কমেছে। কথাবার্তায় ছেলেমিও আগের মতো নেই। বিলুর স্বভাব অনেক বদলেচে, দুএক মাস পরে তারও ছেলেপুলে হবে।

তিলু কিন্তু অদ্ভুত। অবস্থাপন্ন গৃহস্থের ঘরের আদুরে আবদেরে মেয়ে হয়ে সে ভবানী বাঁড়ুয্যের খড়ের ঘরে এসে কেমন মানিয়ে নিয়ে ঘর আলো করে বসেছে। এখানে কুলুঙ্গি, ওখানে তাক তৈরি করচে নিজের হাতে। নিজেই ঘর গোবর দিয়ে পরিপাটি করে নিকুচ্চে, উনুন তৈরি করচে পুকুরের মাটি এনে, সন্ধের সময় বসে কাঁপাস তুলোর পৈতে কাটে। একদণ্ড বসে থাকবার মেয়ে সে নয়। চরকির মতো ঘুরচে সর্বদা।

বিলুও অনেক সাহায্য করে। দিদি রাঁধে, ওরা কুটনো কুটে দেয়। বিলু ও নিলু দিদির নিতান্ত অনুগত সহোদরা, দিদি যা বলে তাই সই। দিদি ছাড়া ওরা এতদিন কিছু জানতো না–অবিশ্যি আজকাল স্বামীকে চিনেচে দুজনেই। স্বামীর সঙ্গে বসে গল্প করতে ভারি ভালো লাগে।

বৌদিদি জগদম্বা বলেন–ও নিলু, আজকাল যে এ-বাড়ি আর আসিস নে আদপে?

নিলু সলজ্জসুরে বলে–কত কাজ পড়ে থাকে ঘরের। দিদি একা– আমরা না থাকলি–

–তা তো বটেই। আমাদের তো আর ঘরসংসার ছিল না, কেবল তোদেরই হয়েচে, না?

–যা বলো।

–তিলুকে ওবেলা তাই বলছিলাম–

–ও বাবা, দিদি তোমার জামাইকে ফেলি আর খোকনকে ফেলি স্বগুগে যেতি বল্লিও যাবে না।

–তা জানি।

–দিদি একা পারে না বলে খোকনকে নিয়ে আমাদের থাকতি হয়।

–বড্ড ভালো মেয়ে আমার তিলু। সন্দের পর একটু পাঠিয়ে দিস্। উনি কুঠি থেকে আগে আগে ফিরে এলে তিলুই ওঁর তামাক সেজে দিতো জানিস তো। উনি রোজ ফিরে এসে বলেন, তিলু বাড়ি না থাকলি বাড়ি অন্ধকার।

–দিদিকে বলবো এখন।

–খোকাকে নিয়ে যেন আসে না, সন্দের পর।

–তোমাদের জামাই না ফিরে এলি তো দিদি আসতে পারবে না। তিনি গুণমণি ফেরেন রাতে।

–কোথা থেকে?

–তা বলতে পারি নে।

–সন্ধান-টন্ধান নিবি। পুরুষের বার-দোষ বড় দোষ

–সে-সব নেই তোমাদের জামাইয়ের বৌদি। ও অন্য এক ধরনের মানুষ। সন্নিসি গোছের লোক। সন্নিসি হয়েই তো গিয়েছিল জানো তো! এখনো সেই রকম। সংসারে কোনো কিছুতেই নেই। দিদি যা করবে তাই।

–আহা বড্ড ভালোমানুষ। আমার বড্ড দেখতি ইচ্ছে করে। সন্দের সময় আজ দুজনকেই একটু আসতি বলিস। এখানেই আহ্নিক করে জল খাবেন জামাই।

ভবানী নদীর ধার থেকে সন্দের পর ফিরে আসতেই নিলু বললে– শুনুন, আপনাকে আর দিদিকে জোড়ে যেতি হবে ও-বাড়ি–বৌদিদির হুকুম

–আর, তুমি আর বিলু?

–আমাদের কে পোঁছে? নাগর-নাগরী গেলেই হোললা–

–আবার ওইসব কথা?

–ঘাট হয়েচে। মাপ করুন মশায়।

এমন সময়ে তিলু এসে দুজনকে দেখে হেসে ফেললে। বললে, বেশ তো বসে গল্পগুজব করা হচ্ছে। আহ্নিকের জায়গা তৈরি যে–

ভবানী বললেন–নিলু বলচে তোমাকে আর আমাকে ও-বাড়ি যেতে বলেচে বৌদিদি।

তিলু বললে–বেশ চলুন। খোকনকে ওদের কাছে রেখে যাই।

দিব্যি জ্যোৎস্না উঠেছে সন্ধ্যার পরেই। শীত এখনো সামান্য আছে, গাছে গাছে আমের মুকুল ধরেছে, এখনো আম্রমুকুলের সুগন্ধ ছড়াবার সময় আসে নি। দুএকটি কোকিল এখনো ডেকে ওঠে বড় বকুল গাছটায় নিবিড় শাখা-প্রশাখার মধ্যে থেকে।

ভবানী বললেন–তিলু, বসবে? চলো নদীর ধারে গিয়ে একটু বসা যাক।

তিলুর নিজের কোনো মত নেই আজকাল। বললে–চলুন। কেউ দেখতি পাবে না তো?

–পেলে তাই কি?

–আপনার যা ইচ্ছে–

–রায়দের ভাঙ্গাবাড়ির পেছন দিয়ে চলো। ও পথে ভূতের ভয়ে। লোক যায় না।

নদীর ধারে এসে দুজনে দাঁড়ালো একটা বাঁশঝাড়ের তলায়, শুকনো পাতার রাশির ওপরে; তিলু বললে–দাঁড়ান, আঁচলটা পেতে নিচে বসুন–

-তুমি আঁচল খুলো না, ঠাণ্ডা লাগবে

–আমার ঠাণ্ডা লাগে না, বসুন আপনি

–বেশ লাগচে, না?

তিলু হেসে বললে–সত্যি বেশ, সংসার থেকে তো বেরুনোই হয় আজকাল–কাজ আর কাজ। বিলু নিলু সংসারের কি জানে? ছেলেমানুষ। আমি যা বলে দেবো, তাই ওরা করে। সব দিকেই আমার ঝক্কি।

তিলুর কথার সুরে যশোর জেলার গ্রাম্য টানগুলি ভবানী বাঁড়ুয্যের এত মিষ্টি লাগে। তিনি নিজে নদীয়া জেলার লোক, সেখানকার বাংলার উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি সুমার্জিত। এদেশে এসে প্রথমে শুনলেন এই ধরনের কথা।

হেসে বললেন–শোনো, তোমাদের দেশে বলে কি জানো? শিবির মাটি, পুবির ঘর–মুগির ডালি ঘি দিলি ক্ষীরির তার হয়–

–কি, কি?

–মুগির ডালি মানে মুগের ডালে, ঘি দিলি মানে ঘি দিলে–

–থাক্ ও, আপনার মানে বলতি হবে না। ও কথা আপনি প্যালেন কোথায়?

–এই দেখচি দেশের বুলি ধরেচ, বলতি হবে না, প্যালেন কোথায়! তবে মাঝে মাঝে চেপে থাকো কেন?

–লজ্জা করে আপনার সামনে বলতি–

ভবানী তিলুকে টেনে নিলেন আরো কাছে। জ্যোৎস্না বাঁকা ভাবে এসে সুন্দরী তিলুর সমস্ত দেহে পড়েচে, বয়স ত্রিশ হলেও স্বামীকে পাবার দিনটি থেকে দেহে ও মনে ও যেন উদ্ভিন্নযৌবনা কিশোরী হয়ে গিয়েচে। বালিকাজীবনের কতদিনের অতৃপ্ত সাধ, কুলীনকুমারীর। অতি দুর্লভ বস্তু স্বামী-রত্ন এতকালে সে পেয়েছে হাতের মুঠোয়। তাও এমন স্বামী। এখনো যেন তিলুর বিশ্বাস হয় না। যদিও আজ দুবছর হয়ে গেল।

তিলু বললে–আমার মনে হয় কি জানেন? আপনি আসেন নি বলেই আমাদের এতদিন বিয়ে হচ্ছিল না–কুলীনের মেয়ের বিয়ে

–আচ্ছা, একটা কথা বুঝলাম না। রায় উপাধি তোমাদের, রায়। আবার কুলনী কিসের! রায় তো শ্রোত্রিয়

–ওকথা দাদাকে জিজ্ঞেস করবেন। আমি মেয়েমানুষ, কি জানি। আমরা কুলীন সত্যিই। আমার দুই পিসি ছিলেন, তাঁদের বিয়ে হয় না কিছুতেই। ছোট পিসি মারা যাওয়ার পরে বড় পিসিকে বিয়ে করে নিয়ে গেল কোথায় আজ বাঙাল দেশে–ভালো কুলীনের ছেলে–

–আহা, তোমরা আর বাঙাল দেশ বোলো না। যশুরে বাঙাল কোথাকার! মুগির ডালি ঘি দিলি ক্ষীরির তার হয়। শিবির মাটি, পুবির ঘর–

–যান আপনি কেবল ক্ষ্যাপাবেন–আর আপনাদের যে গেলুম মলুম হালুম হুলুম-হি হি হি হি

–আচ্ছা থাক! তারপর?

-তখন বড় পিসির বয়েস চল্লিশের ওপর। সেখানে গিয়ে আগের সতীনের বড় বড় ছেলেমেয়ে, বিশ-ত্রিশ বছর বয়েস তাদের। সতীন ছিল না। ছেলেমেয়েরা কি যন্ত্রণা দিত। সব মুখ বুজে সহ্যি করতেন বড় পিসি। নিজের সংসার পেয়েছিলেন কতকাল পরে। একটা বিধবা বড় মেয়ে ছিল, সে পিসিকে কাঠের চ্যালার বাড়ি মারতো, বলতো তুই আবার কে? বাবার নিকের বৌ, বাবার মতিচ্ছন্ন হয়েচে তাই তোকে বিয়ে করে এনেচে। তাও পিসি মুখ বুজি সয়ে থাকতো। অবশেষে বুড়ো বাহাত্তরে স্বামী তুলোে পটল।

–তারপর?

–তারপর সতীনপো সতীনঝিরা মিলে কি দুর্দশা করতে লাগলো পিসির। তারপর তাড়িয়ে দিলে পিসিকে বাড়ি থেকে। পিসি কাঁদে আর বলে–আমার স্বামীর ভিটেতে আমাকে একটু থান দ্যাও। তা তারা দিলে না। পথে বার করে দিলে। সেকালের লজ্জাবতী মেয়েমানুষ, বয়েস হয়েছিল তা কি, কনেবৌয়ের মতো জড়োসড়ো। একজনেরা দয়া করে তাদের বাড়িতে আশ্রয় দিলে। কি কান্না পিসির! তারাই বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল। তখনো স্বামী ধ্যান, স্বামী জ্ঞান। বাড়ি এসে পিসিকে একাদশী করতে হয় নি বেশিদিন। ভগবান সতীলক্ষ্মীকে দয়া করে তুলে নিলেন।

–এ কতদিন আগের কথা?

–অনেক দিনের। আমি তখন জন্মিচি কিন্তু আমার জ্ঞান হয় নি। পিসিমাকে আমি মনে করতে পারি নে। বড় হয়ে মার মুখে বৌদির মুখে শুনতাম। বৌদি তখন কনেবৌ, সবে এসেচে এ বাড়ি।

তিলু চুপ করল, ভবানী বাঁড়ুয্যেও কতক্ষণ চুপ করে রইলেন। ভবানী বাঁড়ুয্যের মনে হল বৃথাই তিনি সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। সমাজের এই অত্যাচারিতদের সেবার জন্যে বারবার তিনি সংসারে আসতে রাজি আছেন। মুক্তি-টুক্তি এর তুলনায় নিতান্ত তুচ্ছ।

কতদিন আগের সেই অভাগিনী কুলীন কুমারীর স্মৃতি বহন করে ইছামতী তাঁদের সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে, তাঁরই না-মেটা স্বামী সাধের পুণ্য-চোখের জল ওর জলে মিশে গিয়েচে কতদিন আগে। আজ এই পানকলস ফুলের গন্ধ মাখানো চাঁদের আলোয় তিনিই যেন স্বর্গ থেকে নেমে বললেন–বাবা, আমার যে সাধ পোরে নি, তোমার সামনে যে বসে আছে এই মেয়েটির তুমি সে সাধ পুরিও। বাংলা দেশের মেয়েদের ভালো স্বামী হও, এদের সে সাধ পূর্ণ হোক আমার যা পুরলো না–এই আমার আশীর্বাদ!

ভবানী বাঁড়ুয্যে তিলুকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন।

.

যখন ওরা দেওয়ানবাড়ি পৌঁছলো তখন সন্ধ্যা অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েচে, একদণ্ড রাত্রিও কেটে গিয়েচে। জগদম্বা বললেন–ওমা, তোরা ছিলি কোথায় রে তিলু? নিলু এসেছিল এই খানিক আগে। বললে, তারা কতক্ষণ বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। আমি জামাইয়ের জন্যে আহ্নিকের জায়গা করে জলখাবার গুছিয়ে বসে আছি ঠায়, কি যে কাণ্ড তাদের

তিলু বলে–কাউকে বোলো না বৌদিদি, উনি নদীর ধারে নিয়ে। গিয়েছিলেন। তাড়াতাড়ি ওঁকে জলখাবার খাইয়ে দাও। আমার মন কেমন করচে খোকনের জন্যে। কতক্ষণ দেখি নি। নিলু কি বললে, খোকন কাঁদছে না তো।

–না, খোকন ঘুমিয়ে পড়েছে নিলু বলে গেল। তুই খেয়ে নে—

–উনি আহ্নিক করুন আগে। দাদা আসেন নি?

–তাঁর ঘোড়া গিয়েচে আনবার জন্য।

জলখাবার সাজিয়ে দিলেন জগদম্বা জামাইয়ের সামনে। শালাজ-বৌ হলেও ভবানী তাঁকে শাশুড়ির মতো সম্মান করেন। জগদম্বা ঘোমটা দিয়ে ছাড়া বেরোন না জামাইয়ের সামনে! মুগের ডাল ভিজে, পাটালি, খেজুরের রস, নারকেল নাড়, চন্দ্রপুলি, ক্ষীরের ছাঁচ এবং ফেনিবাতাসা। তিলু খেতে খেতে বললে–বিলু-নিলুকে দিয়ে?

–নিলু এসে খেয়ে গিয়েচে, বিলুর জন্যি নিয়ে গিয়েচে।

–এবার যাই বৌদি। খোকন হয়তো উঠে কাঁদবে।

–জামাইকে নিয়ে আবার পরেও আসবি। দুখানা আঁদোসা ভেজে জামাইকে খাওয়াবো। খেজুরের রসের পায়েস করবো সেদিন। আজ মোটে এক ভাড় রস দিয়ে গেল ভজা মুচির ভাই, নইলে আজই করতাম।

–শোনো বৌদি। তোমাদের জামাই বলে কিনা আমার বাঙালে কথা। বলে–শিবির মাটি, পুবির ঘর। আবার এক ছড়া বার করেচে মুগির ডালি ঘি দিলি নাকি ক্ষীরির তার হয়–হি হি

–আহা, কি শহুরে জামাই! দেবো একদিন শুনিয়ে। তবুও যদি দাড়িতে জট না পাকাতো! আমি যখন প্রথম দেখি তখন এত বড় দাড়ি, যেন নারদ মুনি।

–তোমাদের জামাই তোমরাই বোঝো বৌদি। আমি যাই, খোকন ঠিক উঠেছে। আবার আসবো পরশু।

পথে বার হয়ে ভবানী আগে আগে, তিলু পেছনে ঘোমটা দিয়ে চলতে লাগলো। পাড়ার মধ্যে দিয়ে পথ। এখানে ওদের একত্র ভ্রমণ বা কথোপকথন আদৌ চলবে না।

চন্দ্র চাটুয্যের চণ্ডীমণ্ডপের সামনে দিয়ে রাস্তা। রাত্রে সেখানে দাবার আজ্ঞা বিখ্যাত। সম্পর্কে চন্দ্র চাটুয্যে হলেন তিলুর মামাশ্বশুর। তিলুর বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো, যদি মামাশ্বশুর দেখে ফেলেন? এত রাতে সে স্বামীর সঙ্গে পথে বেরিয়েছে!

চণ্ডীমণ্ডপের সামনাসামনি যখন ওরা এসেচে তখন চণ্ডীমণ্ডপের ভিড়ের মধ্যে থেকে কে জিজ্ঞেস করে উঠল–কে যায়?

ভবানী গলা ঝেড়ে নিয়ে বললেন–আমি।

–কে, ভবানী?

-হ্যাঁ।

–ও।

লোকটা চুপ করে গেল। তিলু আরো এগিয়ে গিয়ে ফিফিস্ করে বললে–কে ডাকলে?

মহাদেব মুখুয্যে।

–ভালো জ্বালা। আমাকে দেখলে নাকি?

–দেখলে তাই কি? তুমি আমার সঙ্গে থাক, অত ভয়ই বা কিসের?

–আপনি জানেন না এ গাঁয়ের ব্যাপার। ঐ নিয়ে কাল হয়তো রটনা রটবে। বলবে, অমুকের বৌ সদর রাস্তা দিয়ে তার স্বামীর সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিল গটগট করে।

–বয়েই গেল! এসব বদলে যাবে তিল, থাকবে না, সেদিন আসচে। তোমার আমার দিন চলে যাবে। ঐ খোকন যদি বাঁচে ওর বৌকে নিয়ে ও পাশাপাশি হেঁটে বেড়াবে এ গায়ের পথে–কেউ কিছু মনে করবে না।

.

নালু পাল একখানা দোকান করেচে। ইছামতী থেকে যে বাঁওড় বেরিয়েছে, এটা ইছামতীরই পুরোনো খাত ছিল একসময়ে। এখন আর সে খাতে স্রোত বয় না, টোপাপানার দাম জমেচে। নালু পালের দোকান এই বাঁওড়ের ধারে, মুদির দোকান একখানা ভালোই চলে এখানে, মোল্লাহাটির হাটে মাথায় করে জিনিস বিক্রি করবার সময়ে সে লক্ষ্য করেছিল।

নালু পালের দোকানে খদ্দের এল। জাতে বুনো, এদের পূর্বপুরুষ নীলকুঠির কাজের জন্যে এদেশে এসেছিল সাঁওতাল পরগণা থেকে। এখন এরা বাংলা বেশ বলে, কালীপূজো মনসাপূজো করে, বাঙালি মেয়ের মতো শাড়ি পরে।

একটি মেয়ে বললে–দুপয়সার তেল আর নুন দ্যাও গো। মেঘ উঠেচে, বিষ্টি আসবে–

একটি মেয়ে আঁচল থেকে খুললে চারটি পয়সা। সে কড়ি ভাঙ্গাতে এসেচে। এক পয়সায় পাঁচগণ্ডা কড়ি পাওয়া যায়–আজ সবাইপুরের হাট, কড়ি দিয়ে শাক বেগুন কিনবে।

নালু পাল আজ বড় ব্যস্ত। হাটবারের দিন আজ, সবাইপুর গ্রাম এখান থেকে আধমাইল, সব লোক হাটের ফেরত ওর দোকান থেকে জিনিস কিনে নিয়ে যাবে। পয়সার বাক্স আলাদা, কড়ির বাক্স আলাদা– সে জিনিস বিক্রি করে নির্দিষ্ট বাক্সে ফেলছে।

এখানে বসে সে সস্তায় হাট করে। একটি মেয়ে লাউশাক বিক্রি করতে যাচ্ছে, নালু পাল বললে–শাক কত?

–আট কড়া।

–দূর, ছকড়া কালও কিনিচি। শাক আবার আটকড়া। কখনো বাপের জন্মে শুনি নি। দে ছকড়া করে।

–দিলি বড় খেতি হয়ে যায় যে টাটকা শাক, এখুনি তুলি নিয়ে অ্যালাম।

–দিয়ে যা রে বাপু। টাটকা শাক ছাড়া বাসি আবার কে বেচে?

দুটি কচি লাউ মাথায় একটা ঝুড়িতে বসিয়ে একজন লোক যাচ্ছে। নালুর দৃষ্টি শাক থেকে সেদিকে চলে গেল।

–বলি ও দবিরুদ্দি ভাই। শোনো শোনো ইদিকি–

–কি? লাউ তুমি কিনতি পারবা না। ছস্তায় দিতি পারবো না।

–কত দাম?

–দুপয়সা এক একটা।

দোকানের তাবৎ লোক দর শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল। সকলেই ওর দিকে চাইতে লাগল। একজন বললে–ঠাট্টা করলে নাকি?

দবিরুদ্দি মাথার লাউ নামিয়ে একজনের হাত থেকে কল্কে নিয়ে হেসে বললে–ঠাট্টা করবো কেন! মোরা ঠাট্টার যুগ্যি নোক?

নালু হেসে বললে–কথাটা উল্টো বলে ফেললে। আমরা কি তোমার ঠাট্টার যুগ্যি লোক? আসল কথাটা এই হবে। এখন বল কত নেবা?

–একপয়সা দশ কড়া দিও।

-না, এক পয়সা পাঁচ কড়া নিও। আর জ্বালিও না বাপু, ওই নিয়ে খুশি হও। দুটো লাউই দিয়ে যাও।

বৃদ্ধ হরি নাপিত বসে তামাকের গুল একটা পাতায় জড়ো করছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলে ভূধর ঘোষ–ও কি হচ্চে?

–দাঁত মাজবো বেবেলা। লাউ একটা কিনবো ভেবেলাম তা দর দেখে কিনতি সাহস হোল না। এই মোল্লাহাটির হাটে জনস সাহেবের আমলে অমন একটা লাউ ছকড়া দিয়ে কিনিচি। দশ কড়ায় অমন দুটো লাউ পাওয়া যেত। আমার তখন নতুন বিয়ে হয়েচে, পার্শ্বনাথ ঘোষের বাড়ী ওর বড় ছেলের বৌভাতে একগাড়ি তরকারি এয়েল, এক টাকা দাম পড়ল মোটমাট। অমন লাউ তার মধ্যি পনেরো-বিশটা ছিল। পটল, কুমড়ো, বেগুন, ঝিঙে, থোড়, মোচা, পালংশাক, শশা তো অগুতি। এখন সেই রকম একগাড়ি তরকারি দুটাকার কম নয়।

অক্রূর জেলে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে–নাঃ, মানুষের খাদ্যখাদক কেরমেই অনাটন হয়ে উঠেছে। মানুষের খাবার দিন চলে যাচ্ছে, আর খাবে কি? এই সবাইপুরে দুধ ছিল ট্যাকায় বাইশ সের চব্বিশ সের। এখন আঠারো সেরের বেশি কেউ দিতি চায় না।

২. সন্দেশ–ছানা

নালু পাল বললে–আঠারো সের কি বলচো খুড়ো? আমাদের গাঁয়ে ষোল সেরের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। একটু সন্দেশ করবো বলে ছানা কিনতি গিয়েছিলাম অঘোর ঘোষের কাছে, তা নাকি দুআনা করে খুলি! এক খুলিতে বড় জোর পাঁচপোয়া ছানা থাকুক

অক্রূর জেলে হতাশভাবে বললে–নাঃ আমাদের মত গরীবগুরবো না খেয়েই মারা যাবে। অচল হয়ে পড়লো কেরমেশে।

–তা সেই রকমই দাঁড়িয়েছে।

দবিরুদ্দি নিজেকে যথেষ্ট তিরস্কৃত বিবেচনা করে এক একটা লাউ এক এক পয়সা হিসাবে দাম চুকিয়ে নিয়ে হাটের দিকে চলে গেল। নালু পাল তাকে একটা পয়সা দিয়ে বললে–অমনি এক কাজ করবা। এক পয়সার চিংড়ি মাছ আমার জন্যে কিনে এনো। লাউ দিয়ে চিংড়ি দিয়ে তবে মজে। বেশ ছটকালো দেখে দোয়াড়ির চিংড়ি আনবা।

হরি নাপিত বললে–চালখান ছেয়ে নেবো বলে ঘরামির বাড়ি গিইছিলাম। চার আনা রোজ ছেল বরাবর, সেদিন সোনা ঘরামি বললে কিনা চার আনায় আর চাল ছাইতে পারবো না, পাঁচ আনা করি দিতি হবে। ঘরামি জন পাঁচ আনা আর একটা পেটেল দুআনা–তা হলি একখানা পাঁচচালা ঘর ছাইতে কত মজুরি পড়লো বাপধনেরা? পাঁচ-ছ টাকার কম নয়।

বর্তমান কালের এই সব দুর্মূল্যতার ছবি অক্রূরকে এত নিরাশ ও ভীত করে তুলোে যে সে বেচারি আর তামাক না খেয়ে কল্কেটি মাটিতে নামিয়ে রেখে হহ করে চলে গেল।

কিন্তু কিছুদূর গিয়েই আবার তাকে ফিরতে হল। অক্রূর জেলের বাড়ি পাশের গ্রাম পুস্তিঘাটায়। তার বড় ছেলে মাছ ধরার বাঁধাল দিয়েচে সবাইপুরের বাঁওড়ে। হঠাৎ দেখা গেল দূরে ডুমুরগাছের তলায় সে আসচে, মাথায় চুপড়িতে একটা বড় মাছ।

অক্রূর চুপ করে দাঁড়িয়ে গেল। অত বড় মাছটা কি তার ছেলে পেয়েছে নাকি? বিশ্বাস তো হয় না! আজ হাট করবার পয়সাও তার হাতে নেই। যত কাছে আসে ওর ছেলে, তত ওর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল। হয়ে ওঠে। ওঃ, মস্ত বড় মাছটা দেখচি!

দূর থেকে ছেলে বললে-কনে যাচ্চ বাবা?

বাড়ি যাচ্ছিলাম। মাছ কাদের?

–বাঁধালের মাছ। এখন পড়লো।

–ওজন?

–আট সের দশ ছটাক। তুমি মাছটা নিয়ে হাটে যাও।

–তুই কনে যাবি?

–নৌকো বাঁওড়ের মুখে রেখে অ্যালাম যে। ঝড় হলি উড়ে বেরিয়ে যাবে। তুমি যাও।

নালু পালের দোকানে খদ্দেরের ভিড় আরম্ভ হবে সন্দে বেলা। এই সময়টা সে পাঁচজনের সঙ্গে গল্পগুজব করে দিন কাটায়। অক্রূর জেলেকে দোকানের সবাই মিলে দাঁড় করালে। বেশ মাছটা। এত বড় মাছ অবেলায় ধরা পড়ল?

নালু বললে–মাছটা আমাদের দিয়ে যাও অক্রূরদা

-ন্যাও না। আমি বেঁচে যাই তা হলি। অবেলায় আর হাটে যাই

–দাম কি?

–চার ট্যাকা দিও।

-বুঝে-সুজে বল অক্রূরদা। অবিশ্যি অনেকদিন তুমি বড় মাছ। বিক্রি কর নি, দাম জানো না। হরি কাকা, দাম কত হতে পারে?

হরি নাপিত ভালো করে মাছটা দেখে বললে–আমাদের উঠতি বয়েসে এ মাছের দাম হত দেড় ট্যাকা! দাও তিন টাকাতে দিয়ে। যাও।

–মাপ করো দাদা, পারবো না। বড় ঠকা হবে।

–আচ্ছা, সাড়ে তিন টাকা পাবা। আর কথাটি বোলো না, আজ দুট্যাকা নিয়ে যাও। কাল বাকিটা নেবে।

মাছ কিনে কেউ বিশেষ সন্তুষ্ট হল না, কারণ অক্রর মাঝিকে এরা বেশি ঠকাতে পারে নি। ন্যায্য দাম যা হাটেবাজারে তার চেয়ে না হয় আনা-আটেক কম হয়েচে।

নালু পাল বললে–কে কে ভাগ নেবা, তৈরি হও। নগদ পয়সা। ফ্যালো কড়ি, মাখো তেল, তুমি কি আমার পর?

পাঁচ-ছজন-নগদ দাম দিয়ে মাছ কিনতে রাজি হল। সবাই মিলে মাছটা কেটে ফেললে দোকানের পেছনে বাঁশতলার ছায়ায় বসে। এক-একখানা মানকচুর পাতা যোগাড় করে এনে এক এক ভাগ মাছ নিয়ে গেল প্রত্যেকে।

নালু পাল নিলে এক ভাগের অর্ধেকটা।

অক্রূর জেলে বললে–পাল মশায়, অর্ধেক কেন, পুরো নিলে না?

–না হে, দোকানের অবস্থা ভালো না। অত মাছ খেলেই হোলো!

–তোমরা তো মোটে মা ছেলে, একটা বুঝি বোন। সংসারে খরচ কি?

–দোকানটাকে দাঁড় না করিয়ে কিছু করচি নে দাদা।

–বৌ নিয়ে এসো এই সামনের অঘ্রানে। আমরা দেখি।

–ব্যবসা দাঁড় করিয়ে নিই আগে। সব হবে।

নালু পাল আর কথা বলতে সময় পেলে না। দোকানে ওর বড় ভিড় জমে গেল। কড়ির খদ্দের বেশি, পয়সার কম। টাকা ভাঙ্গাতে এল না একজনও। কেউ টাকা বার করলে না। অথচ রাত আটটা পর্যন্ত দলে দলে খদ্দেরের ভিড় হোল ওর দোকানে। ভিড় যখন ভাঙ্গলো তখন রাত অনেক হয়েচে।

এক প্রহর রাত্রি।

তবিল মেলাতে বসলো নালু পাল। কড়ি গুনে গুনে একদিকে, পয়সা আর এক দিকে। দুটাকা সাত আনা পাঁচ কড়া।

নালু পাল আশ্চর্য হয়ে গেল। একবেলায় প্রায় আড়াই টাকা বিক্রি। এ বিশ্বাস করা শক্ত। সোনার দোকানটুকু। মা সিদ্ধেশ্বরীর কৃপায় এখন এই রকম যদি চলে রোজ রোজ তবেই।

আড়াই টাকা একবেলায় বিক্রি। নালু পাল কখনো ভাবে নি। সামান্য মশলার বেসাতি করে বেড়াতো হাটে হাটে। রোদ নেই, বর্ষা নেই, কাদা নেই, জল নেই–সব শরীরের ওপর দিয়ে গিয়েচে। গোপালনগরের বড় বড় দোকানদার তার সঙ্গে ভালো করে কথা বলতো না। জিনিস বেসাতি করে মাথায় নিয়ে, সে আবার মানুষ!

আজ আর তার সে দিন নেই। নিজের দোকান, খড়ের চালা, মাটির দেওয়াল। দোকানে তক্তপোশের ওপর বসে সে বিক্রি করে গদিয়ান। চালে। কোথাও তাকে যেতে হয় না, রোদ বৃষ্টি গায়ের ওপর দিয়ে যায় না। নিজের দোকানের নিজে মালিক। পাঁচজন এসে বিকেলে গল্প করে বাইরে বাঁশের মাচায় বসে। সবাই খাতির করে, দোকানদার বলে সম্মান করে।

আড়াই টাকা বিক্রি। এতে সে যত আশ্চর্যই হোক, এর বেশি তাকে তুলতে হবে। পাঁচ টাকায় দাঁড় করাতে যদি পারে দৈনিক বিক্রি, তবেই সে গোবর্ধন পালের উপযুক্ত পুত্র। মা সিদ্ধেশ্বরী সে দিন যেন দেন।

নালু পাল কিছু ধানের জমির চেষ্টায় ঘুরচে আজ কিছুদিন ধরে। রাত্রে বাড়ী গিয়ে সে ঠিক করলে সাতবেড়ের কানাই মণ্ডলের কাছে কাল সকালে উঠেই সে যাবে। সাতবেড়েতে ভালো ধানী জমি আছে বিলের ধারে, সে খবর পেয়েছে।

–বিয়ে?

ও কথাটা হরি নাপিত মিথ্যে বলে নি কিছু। বিয়ে করে বৌ না আনলে সংসার মানায়?

তার সন্ধানে ভালো মেয়েও সে দেখে রেখেছে–বিনোদপুরের অম্বিক প্রামাণিকের সেজ মেয়ে তুলসীকে।

সেবার তুলসী জল দিতে এসে বেলতলায় দাঁড়িয়ে তার দিকে চেয়েছিল। দুবার চেয়েছিল, নালু লক্ষ্য করেচে। তুলসীর বয়স এগার বছরের কম হবে না, শ্যামাঙ্গী মেয়ে, বড় বড় চোখ-হাতপায়ের গড়ন কি চমৎকার যে ওর, চোখে না দেখলে বোঝানো যাবে না। বিনোদপুরের মাসির বাড়ী আজকাল মাঝে মাঝে যাতায়াত করার মূলেই যে মাসিদের পাড়ার অম্বিক প্রমাণিকের এই মেয়েটি–তা হয়তো স্বয়ং মাসিও খবর রাখেন না। কিন্তু না, কথা তা নয়।

বিয়ে করতে চাইলে, তুলসীর বাবা হাতে স্বর্গ পাবেন সে জানে। বিয়ে করতে হলে এমন একটি শ্বশুর দরকার যে তার ভালো অভিভাবক হতে পারে। সে নিজে অভিভাবকশূন্য, তার পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে উৎসাহ দেবার কেউ নেই। বিপদে আপদে পরামর্শ করবার কেউ নেই। বাবা মারা যাওয়ার পর একা তাকে যুঝতে হচ্ছে সংসারের মধ্যে। বিনোদ প্রামাণিক ওই গ্রামের ছোট আড়তদার, সর্ষে, কলাই, মুগ কেনাবেচা করে, খড়ের চালা আছে খান-দুই বাড়িতে। এমন কিছু অবস্থাপন্ন গৃহস্থ নয়, হঠাৎ হাত পাতলে পঞ্চাশ-একশো বার করবার মত সঙ্গতি নেই ওদের। নালুর এখন কিন্তু সেটাও দরকার। ব্যবসার জন্যে টাকা দরকার। মাল সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে, এখুনি বায়না করতে হবে–এ সময়ে ব্যবসা আরো বড় করে কাঁদতে পারতো। ব্যবসা সে। বুঝেছে–কিন্তু টাকা দেবে কে?

নালুর মা ভাত নিয়ে বসে ছিল রান্নাঘরের দাওয়ায়। ও আসতেই বললে–বাবা নালু এলি? কতক্ষণ যে বসে বসে ঢুলুনি নেমেচে চকি।

–ভাত বাড়ো। খিদে পেয়েছে।

–হাত পা ধুয়ে আয়। ময়না জল রেখে দিয়েচে ভেঁচতলায়।

–ময়না কোথায়?

–ঘুমুচ্ছে।

–এর মধ্যি ঘুম?

–ওমা, কি বলিস? ছেলেমানুষের চকি ঘুম আসে না এত রাত্তিরি?

–পরের বাড়ি যেতে হবে যে। না হয় আর এক বছর। তারা খাঁটিয়ে নেবে তবে খেতে দেবে। বসে খেতে দেবে না। চকি ঘুম এলি তারা শোনবে না।

নালু ভাত খেতে বসলো। উচ্ছে চচ্চড়ি আর কলাইয়ের ডাল। ব্যস, আর কিছু না। রাঙা আউশ চালের ভাত আর কলাইয়ের ডাল মেখে খাবার সময় তার মুখে এমন একটি তৃপ্তির রেখা ফুটে উঠলো যা বসে দেখবার ও উপভোগ করবার মতো।

ময়না এসে বললে–দাদা, তামাক সাজি?

–আন।

–তুমি নাকি আমায় বছিলে ঘুমুইচি বলে, মা বলচে।

-বকচিই তো। ধাড়ী মোষ, সংসারে কাজ নেই–এত সকালে ঘুম কেন?

–বেশ করবো।

–যত বড় মুখ নয়, তত বড় কথা–আ মোলো যা–

–গাল দিও না দাদা বলে দিচ্ছি। তোমার খাই না পরি?

–তবে কার খাস পরিস, ও পোড়ারমুখী?

–মার।

–মা তোমাকে এনে দেয় রোজগার করে! বাঁদূরি কোথাকার, ধুচুনি মাথায় দোজবরে বুড়ো বর যদি তোর না আনি–

–ইস বুঁটি দিয়ে নাক কেটে দেবো না বুড়ো বরের? হাঁ দাদা, তুমি আমাদের বৌদিদিকে কবে আনচো?

–তোমায় আগে পার করি। তবে সে কথা। তোমার মতো খাণ্ডার ননদকে বাড়ি থেকে না তাড়িয়ে

–আহা হা! কথার কি ছিরি! খাণ্ডার ননদ দেখো তখন বৌদিদির কত কাজ করে দেবে। আমার পালকি কই?

–পালকি পাই নি। পোড়ানো থাকে না তো। পুরো পোটোকে বলে রেখেছি। রথের সময় রং করে দেবে।

–পুতুলের বিয়ে দেব আষাঢ় মাসে। তার আগে কিনে দিতে হবে পালকি। না যদি দাও তবে–

–যা যা, তামাক সেজে আন। বাজে বকুনি রেখে দে।

ময়না তামাক সেজে এনে দিল। অল্প কয়েক টান দিয়েই নালু পাল একটা মাদুর দাওয়ায় টেনে নিয়ে শুয়ে পড়লো।

গ্রীষ্মকাল। আতা ফুলের সুমিষ্ট গন্ধ বাতাসে। আকাশে সামান্য একটু জ্যোৎস্না উঠেছে কৃষ্ণাতিথির।

নন্দীদের বাগানে শেয়াল ডেকে উঠলো। রাত হয়েচে নিতান্ত কমও নয়। এ পাড়া নিম্নতি হয়ে এসেছে।

ময়না আবার এসে বললে–পা টিপে দেবো?

–না না, তুই যা। ভারি আমার

–দিই না।

রাত হয়েচে। শুগে যা। কাল সকালে আমায় ডেকে দিবি। সাতবেড়েতে যাবো জমি দেখতি।

–ডাকবো। পা টিপতি হবে না তো?

–না, তুই যা।

নালু পাল বাড়ি ফিরবার পথে সন্নিসিনীর আখড়ায় একটা করে আধলা পয়সা দিয়ে যায় প্রতি রাত্রে। দেবদ্বিজে ওর ভক্তি, ব্যবসায় উন্নতি তো হবে ওঁদেরই দয়ায়। সন্নিসিনীর আশ্রম বাঁওড়ের ধারের রাস্তার পাশে প্রাচীন এক বটবৃক্ষতলে, নিবিড় সাঁইবাবলা বনের আড়ালে, রাস্তা থেকে দেখা যায় না। সন্নিসিনীর বাড়ি ধোপাখোলা, সে নাকি হঠাৎ স্বপ্ন পেয়েছিল, এ গ্রামের এই প্রাচীন বটতলার জঙ্গলে শ্মশানকালীর পীঠস্থান সাড়ে তিনশো বছর ধরে লুকোনো। তাই সে এখানে এসে জঙ্গল কেটে আশ্রম বসিয়েছিল বছর সাতেক আগে। এখন তার অনেক শিষ্যসেবক, পুজোআচ্চা ধন্না দিতে আসে ভিন্ন গ্রামের কত লোক।

সন্ধ্যার পরে যারা আসে, বৈঁচি গাছের জঙ্গল ঘেঁষে যে খড়ের নিচু ঘরখানা, যার মাথার উপর বটগাছের ডালটা, যেখানে বাসা বেঁধেছে অজস্র বাবুই, যেখানে ঝোলে কলাবাদুড়ের পাল, রাত্রের অন্ধকারে সেই ঘরটির দাওয়ায় বসে ওরা গাঁজার আড্ডা জমায়।

নালুকে বললে ছিহরি জেলে, কেডা গা? নালু?

–হ্যাঁ।

–কি করতি এলে?

–মায়ের বিত্তিটা দিয়ে যাই। রোজ আসি।

–বিত্তি?

–হ্যাঁ গো।

–কত?

–দশকড়া। আধপয়সা।

–বসো। একটু ধোঁয়া ছাড়বা না?

–না, ওসব চলে না। বোসো তোমরা। আর কে কে আছে?

–নেই এখন কেউ। হরি বোষ্টম আসে, মনু যুগী আসে, দ্বারিক কর্মকার আসে, হাফেজ আসে, মনসুর নিকিরি আসে।

নালু কি একটা কথা বলতে গিয়ে বড় অবাক হয়ে গেল। তার চোখকে যেন বিশ্বাস করা শক্ত হয়ে উঠলো। দেওয়ানবাড়ির জামাই বাঁড়ুয্যে মশায়কে সে হঠাৎ দেখতে পেলে অশ্বথতলার দিকে আসতে। উনিও কি এখানে গাঁজার আডড়ায়?

নালু দাঁড়ালো চুপ করে দাওয়ার বাইরে হেঁচতলায়।

ভবানী বাঁড়ুয্যে এসে বটতলায় বসলেন আসনের সামনে। মূর্তি নেই, ত্রিশূল বসানো সিঁদুরলেপা একটা উঁচু জায়গা আছে গাছতলায়, আসন বলা হয় তাকেই। ভবানী বাঁড়ুয্যে একমনে বসে থাকবার পরে সন্নিসিনী সেখানে এসে বসলো তার পাশেই। সন্নিসিনীর রং কালো, বয়েস পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ, মুখশ্রী তাড়কা রাক্ষসীকে লজ্জা দেয়, মাথার দুদিক থেকে দুটি লম্বা জট এসে কোলের ওপর পড়েচে।

ভবানী বললেন–কি খেপী, খবর কি?

–ঠাকুর, কি খবর বলো।

–সাধনা-টাধনা করচো?

–আপনাদের দয়া। জেতে হাড়িডোম, কি সাধনা করবো আমরা ঠাকুর? আজও আসনসিদ্ধি হোলো না দেবতা।

-আমি আসবো সামনের অমাবস্যেতে, দেখিয়ে দেবো প্রণালীটা।

–ওসব হবে না ঠাকুর। আর ফাঁকি দিও না। আমাকে শেখাও।

–দূর খেপী, আমি কি জানি? তাঁর দয়া। আমি সাধন-ভজন করিও নে, মানিও নে–তবে দেখি তোমাদের এই পর্যন্ত।

–আমায় ঠকাতে পারবে না ঠাকুর। তুমি রোজ এখানে আসবে, সন্দের পর। যত সব অজ্ঞান লোকেরা ভিড় করে রাতদিন; নিয়ে। এসো ওষুধ, নিয়ে এসো মামলা জেতা, ছেলে হওয়া–

–সে তোমারই দোষ। সেটা না করতেই পারতে গোড়া থেকে। ধন্না দিতে দিলে কেন?

–তুমি ভুলে যাচ্চ। এ জায়গাটা গোরাসাহেবের বাংলা নয়–তবে এত লোক আসে কেন? ধর্মের জন্যে নয়। অবস্থা ঘোরাবার জন্যে! মামলা জেতবার জন্যে!

–সে তো বুঝি।

–একটু থেকে দেখবেন না দিনের বেলায়। এত রাতে আর কি আছে? চলে গেল সবাই। কি বিপদ যে আমার। সাধন-ভজন সব যেতে বসেচে, ডাক্তার বদ্যি সেজে বসেচি। শুধু রোগ সারাও, আর রোগ সারাও।

নালু পাল এ সব শুনে কিছু বুঝলে, কিছু বুঝলে না। ভবানী বড়য্যেকে সে অনেকবার দেখেচে, দেওয়ান মহাশয়ের জামাই সুচেহারার লোক বটে, দেখলে ভক্তি হয়। বাড়ি ফিরে মাকে সে বল্লে–একটা চমৎকার জিনিস দেখলাম আজ! সন্নিসিনীর গুরু হলেন আমাদের দেওয়ানজির ভগ্নিপতি বড়দিদি-ঠাকরুনের বর। তিন দিদি-ঠাকরুনেরই বর। সব কথা বোঝলাম না, কি বল্লেন, কিন্তু সন্নিসিনী যে অত বড়, সে একেবারে তটস্থ।

তিলু বললে–এত রাত করলেন আজ! ভাত জুড়িয়ে গেল। নিলু ইদিকি আয়, জায়গা করে দে–বিলু কোথায়?

নিলু চোখ মুছতে মুছতে এল। রান্নাঘরের দাওয়া ঝাঁট দিতে দিতে। বললে–বিলু ঘুমিয়ে পড়েছে। কোথায় ছিলেন নাগর এত রাত অবধি? নতুন কিছু জুটলো কোথাও?

ভবানী বাঁড়ুয্যে অপ্রসন্ন মুখে বললেন–তোমার কেবল যতো–

-হি হি হি

–হ্যাঁ-হাসলেই মিটে গেল।

–কি করতি হবে শুনি তবে।

দ্যাখো গে লোকে কি করচে। মানুষ হয়ে জন্মে আর কিছু করবে না ? শুধু খাবে আর বাজে বকবে?

–ওগো অত উপদেশ দিতি হবে না আপনার। আপনি পরকালের ইহকালের সর্বস্ব আমাদের। আর কিছু করতি হয়, সে আপনি করুন গিয়ে। আমরা ডুমুরের ডালনা দিয়ে ভাত খাবো আর আপনার সঙ্গে ঝগড়া করবো। এতিই আমাদের স্বগৃগো। খেয়ে উঠে খোকাকে ধরুন।

ভবানী খেয়ে উঠে খোকনকে আদর করলেন কতক্ষণ ধরে। আট মাসের সুন্দর শিশু। তিলুর খোকা। সে হাবলার মতো বিস্ময়ের দৃষ্টিতে বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর অকারণে একগাল হাসি হাসে দন্তবিহীন মুখে, বলে ওঠে—গ-গ-গ-গ

ভবানী বলেন–ঠিক ঠিক।

–হেঁ-এ-এ-ইয়া। গ-গ-গ-গ-।

–ঠিক বাবা।

খোকা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে নিজের হাতখানা নিজের চোখের সামনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে–যেন কত আশ্চর্য জিনিস। ভবানীর সামনে অনন্ত আকাশের এক ফালি। বাঁশবনে জোনাকি জ্বলচে। অন্ধকারে পাকা ফুলের গন্ধের সঙ্গে বনমালতী ও ঘেঁটকোল ফুলের গন্ধ। নক্ষত্র উঠেচে এখানে ওখানে আকাশে। কত বড় আকাশ, কত নক্ষত্র– চাঁদ উঠেচে কৃষ্ণা তৃতীয়ার, পূর্ব দিগন্ত আলো হয়েচে। এই ফুল, এই অন্ধকার, এই অবোধ শিশু, এই নক্ষত্র-ওঠা-আকাশ সবই এক হাতের তৈরি বড় ছবি। ভবানী অবাক হয়ে যান ওর খোকার মতোই।

.

তিলু বললে–খোকনের ভাত দেবেন কবে?

–ভাত হবে উপনয়নের সময়।

–ওমা, সে আবার কি কথা! তা হয় না, আপনি অন্নপ্রাশনের দিনক্ষ্যাণ দেখুন। ও বললি চলবে না।

–তোমাদের বাঙাল দেশে এক রকম, আমাদের আর এক রকম। ওসব চলবে না আমাদের নদে-শান্তিপুরের সমাজে। তুমি ওকে একটু আদর কর দিকি?

তিলু তার সুন্দর মুখোনি খোকনের মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে কানের। মাকড়ি দুলিয়ে দুলিয়ে অনবদ্য ভঙ্গিতে আদর করতে লাগলো–ও খোকন, ও সনলু, তুমি কার খোকন? তুমি কার সলু, কার মানকু? সঙ্গে সঙ্গে খোকা মায়ের চুল ক্ষুদ্র একরক্তি হাতের মুঠো দিয়ে অক্ষম আকর্ষণে টেনে এনে, মায়ের মাথার লুটন্ত কালো চুলের কয়েক গাছি নিজের মুখের কাছে এনে খাবার চেষ্টা করলে। তারপর দন্তবিহীন একগাল হাসি হাসলে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে।

ভবানী বাঁড়ুয্যে একবার আকাশের দিকে চাইলেন, নক্ষত্রখচিত অনন্ত আকাশ–নিচে এই মা ও ছেলের ছবি। অমনি স্নেহময়ী মা আছেন এই বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে, নইলে এই মা, এই স্নেহ এখানে থাকতো না–ভবানী বাঁড়ুয্যে ভাবেন।

ভবানী কত পথে পথে বেড়িয়েচেন, কত পর্বতে সাধু-সন্নিসির খোঁজ করেচেন, কত যোগাভ্যাস করেচেন, আজকাল এই মা-ছেলের গভীর যোগাযোগের কাছে তাঁর সকল যোগ ভেসে গিয়েচে। অনুভুতি সর্বাশ্রয়ী, সর্বমঙ্গলকর সে অনুভূতির দ্বারপথে বিশ্বের রহস্য যেন সবটা চোখে পড়লো। ক্ষণশাশ্বতীর অমরত্ব আসা-যাওয়ার পথের এই রেখাই যুগে যুগে কবি, ঋষি ও মরমী সাধকেরা খোঁজেন নি কি?

তিনি আছেন তাই এই যা আছে, ছেলে আছে, ফুল আছে, স্নেহ আছে, আত্মত্যাগ আছে, সেবা আছে, প্রেমিকা আছে, প্রেমিক আছে।

ভবানীর মনে আছে তিনি একবার কানপুরে একজন প্রসিদ্ধ খেয়াল গায়কের গান শুনেছিলেন, তাঁর নাম ছিল কানহাইয়া লাল সান্তারা, প্রসিদ্ধ গায়ক হনুমানদাসজীর তিনি ছিলেন গুরুভাই। আস্থায়ীর বাণীটি শ্রোতাদের সামনে নিখুঁত পাকা সুরে শুনিয়ে নিয়ে তারপর এমন সুন্দর অলঙ্কার সৃষ্টি করতেন, এমন মধুর সুরলহরী ভেসে আসতো। তাঁর কণ্ঠ থেকে সুরপুরের বীণানিক্কণের মতো–যে কতকাল আগে শুনলেও আজও যখনি চোখ বোজেন ভবানী শুনতে পান ত্রিশ বছর আগে শোনা সেই অপূর্ব দরবারি কানাড়ার সুরপুঞ্জ।

বড় শিল্পী সবার অলক্ষ্যে কখন যে মনোহরণ করেন, কখন তাঁর অমর বাণী দরদের সঙ্গে প্রবেশ করিয়ে দেন মানুষের অন্তরতম অন্তরটিতে!

ভবানী বিস্মিত হয়ে উঠলেন। এই মা ও শিশুর মধ্যেও সেই অমর। শিল্পীর বাণী, অন্য ভাষায় লেখা আছে। কেউ পড়তে পারে, কেউ পারে না।

বাইরে বাঁশগাছে রাতচরা কি পাখি ডাকচে, জিউল গাছের বউলের মধু খেতে যাচ্ছে পাখিটা। জেলেরা আলোয় মাছ ধরছে বাঁওড়ে, ঠকঠক শব্দ হচ্ছে তার। আলোয় মাছ ধরতে হলে নৌকার ওপর ঠকঠক শব্দ করতে হয়–এ ভবানী বাঁড়ুয্যে এদেশে এসে দেখছেন। বেশ দেশ। ইছামতীর স্নিগ্ধ জলধারা তাঁর মনের ওপরকার কত ময়লা ধুয়ে মুছে দিয়েছে। সংসারের রহস্য যারা প্রত্যক্ষ করতে ইচ্ছে করে, তারা চোখ খুলে যেন বেড়ায় সব সময়। সংসার বর্জন করে নয়, সংসারে থেকেই সেই দৃষ্টি লাভ করতে পারার মন্ত্র ইছামতী যেন তাকে দান করে। কলম্বনা অমৃতধারাবাহিনী ইছামতী!…যে বাণী মনে নতুন আশা আনন্দ আনে না, সে আবার কোন্ ঈশ্বরের বাণী?

তিলু বললে–সত্যি বলুন, কবে ভাত দেবেন?

–তুমিও যেমন, আমরা গরিব। তোমার বাপের বাড়ির মান বজায় রেখে দিতে গেলে কত লোককে নেমন্তন করতে হবে। সে এক হৈ-হৈ কাণ্ড হবে। আমি ঝামেলা পছন্দ করি নে।

–সব ঝামেলা পোয়াবো আমি। আপনাকে কিছু ভাবতি হবে না।

–যা বোঝো করো। খরচ কেমন হবে?

–চালডাল আনবো বাপের বাড়ি থেকে। দুটাকার তরকারি একগাড়ি হবে। পাঁচখানা গুড় পাঁচসিকে। আধ মন দুধ এক টাকা। এক মন। মাছ বারো পনের টাকা। আবার কি?

–কত লোক খাবে?

–দুশো লোক খাবে ওর মধ্যে। আমার হিসেব আছে। দাদার লোকজন খাওয়ানোর বাতিক আছে, বছরে যভিজ্ঞ লেগেই আছে আমাদের বাড়ি। তিরিশ টাকার ওপর যাবে না।

–তুমি তো বলে খালাস। তিরিশ টাকা সোজা টাকা! তোমার কি, বড় মানুষের মেয়ে। দিব্যি বলে বসলে।

তিলু রাগভরে ঘাড় বাঁকিয়ে বললে–আমি শুনবো না, দিতিই হবে খোকার ভাত।

নিলু কোথা থেকে এসে বললে–দেবেন না ভাত? তবে বিয়ে করবার শখ হয়েছিল কেন?

ভবানী তিরস্কারের সুরে বললেন–তুমি কেন এখানে? আমাদের কথা হচ্ছে—

নিলু বললে–আমারও বুঝি ছেলে নয়?

–বেশ। তাই কি?

–তাই এই–খোকনের ভাত দিতে হবে সামনের দিনে।

.

ভবানী বাঁড়ুয্যের নবজাত পুত্রটির অন্নপ্রাশন। তিলু রাত্রে নাড় তৈরি করলে পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে পুরো পাঁচ ঝুড়ি। খোকা দেখতে খুব সুন্দর হয়েচে, যে দেখে সে-ই ভালবাসে। তিলু খোকার জন্য একছড়া সোনার হার গড়িয়ে দিয়েছে দাদাকে বলে। রাজারাম নিজের হাতে সোনার হারছড়া ভাগ্নের গলায় পরিয়ে দিলেন।

তিলুদের অবস্থা এমন কিছু নয়, তবুও গ্রামের কাউকে ভবানী বাঁড়ুয্যে বাদ দিলেন না। আগের দিন পাড়ার মেয়েরা এসে পর্বতপ্রমাণ তরকারি কুটতে বসলো। সারারাত জেগে সবাই মাছ কাটলে ও ভাজলে।

গ্রামের কুসী ঠাকরুণ ওস্তাদ রাঁধুনী, শেষরাতে এসে তিনি রান্না চাপালেন, মুখুয্যেদের বিধবা বৌ ও নঠাকরুণ তাঁকে সাহায্য করতে লাগলেন।

ভাত রান্না হল কিন্তু বাইরে বান কেটে। আর ছিরু রায় এবং হরি নাপিত বাকি মাছ কুটে ঝুড়ি করে বাইরের বানে নিয়ে এল মাছ ভাজিয়ে নিতে। ভাত যারা রান্না করছিল, তারা হাঁকিয়ে দিয়ে বললে– এখন তাদের সময় নেই। নিজেরা বান কেটে মাছ ভাজুক গিয়ে। এই কথা নিয়ে দুই দলে ঘোর তর্ক ও ঝগড়া, বৃদ্ধ বীরেশ্বর চক্কত্তি এসে দুদলের ঝগড়া মিটিয়ে দিলেন শেষে।

রাজারামের এক দূরসম্পর্কের ভাইপো সম্প্রতি কলকাতা থেকে এসেচে। সেখানে সে আমুটি কোম্পানীর কুঠিতে নকলনবিশ। গলায় পৈতে মালার মতো জড়িয়ে রাঙা গামছা কাঁধে সে রান্নার তদারক করে বেড়াচ্ছিল। বড় চালের কথাবার্তা বলে। হাত পা নেড়ে গল্প করছিল–কলকাতায় একরকম তেল উঠেচে, সাহেবরা জ্বালায়, তাঁকে মেটে তেল বলে। সায়েবরা জ্বালায় বাতিতে। বড় দুর্গন্ধ।

রূপচাঁদ মুখুয্যে বললেন-পিদিম জ্বলে?

–না। সায়েব বাড়ীর বাতিতে জ্বলে। কাচ বসানো, সে এখানে কে আনবে? অনেক দাম।

হরি রায় বললেন–আমাদের কাছে কলকেতা কলকেতা করো না। কলকেতায় যা আছে তা আগে আসবে আমাদের নীলকুঠিতে। এদের মতো সায়েব কলকেতায় নেই।

–নাঃ নেই! কলকাতায় কি দেখেছ তুমি? কখনো গেলে না তো। নৌকো করে চলো নিয়ে যাবো।

–আচ্ছা নাকি কলের গাড়ী উঠেচে সায়েবদের দেশে? নীলকুঠির নদেরচাঁদ মণ্ডল শুনেচে ছোটসায়েবের মুখে। ওদের দেশ থেকে নাকি কাগজে ছেপে ছবি পাঠিয়েছে। কলের গাড়ি।

ভবানী বাঁড়ুয্যে খোকাকে কোলে নিয়ে পাড়া প্রদক্ষিণ করতে চললেন, পেছনে পেছনে স্বয়ং রাজারাম চললেন ফুল আর খই ছড়াতে ছড়াতে। দীনু মুচি ঢোল বাজাতে বাজাতে চললো। বাঁশি বাজাতে বাজাতে চললো তার ছেলে। রায়পাড়া, ঘোষপাড়া, ও পুবেরপাড়া ঘুরে এলেন ভবানী বাঁড়ুয্যে অতটুকু শিশুকে কোলে করে নিয়ে। বাড়ী বাড়ী শাঁখ বাজতে লাগলো। মেয়েরা ঝুঁকে দেখতে এল খোকাকে।

ব্রাহ্মণভোজনের সময় নিমন্ত্রিতদের মধ্যে পরস্পর প্রতিযোগিতা হতে লাগলো। কে কত কলাইয়ের ডাল খেতে পারে। কে কত মাছ খেতে পারে। মিষ্টি শুধু নারকোল নাড়। খেতে বসে অনেকে বললেন এমন নারকোলের নাড়ু তাঁরা অনেককাল খান নি। অন্য কোন মিষ্টির রেওয়াজ ছিল না দেশে। এক একজন লোক সাত আট গণ্ডা নারকোল নাড়ু, আরো অতগুলো অন্নপ্রাশনের জন্য ভাজা আনন্দনা উড়িয়ে দিলে অনায়াসে।

ব্রাহ্মণভোজন প্রায় শেষ হয়েচে এমন সময় কুখ্যাত হলা পেকে বাড়ীতে ঢুকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলে ভবানী বাঁড়ুয্যেকে। ভবানী ওকে চিনতেন না, নবাগত লোক এ গ্রামে। অন্য সকলে তাকে খুব খাতির করতে লাগলো। রাজারাম বললেন–এসো বাবা হলধর, বাবা বসো

ফণি চক্কত্তি বললেন–বাবা হলধর, শরীর-গতিক ভালো?

দুর্দান্ত ডাকাতের সর্দার, রণ-পা পরে চল্লিশ ক্রোশ রাস্তা রাতারাতি পার হওয়ার ওস্তাদ, অগুনতি নরহত্যাকারী ও লুঠেরা, সম্প্রতি জেলফেরৎ হলা পেকে সবিনয়ে হাতজোড় করে বললে–আপনাদের ছিচরণের আশীব্বাদে বাবাঠাকুর–

–কবে এলে?

–এ্যালাম শনিবার বেনবেলা বাবাঠাকুর। আজ এখানে দুটো পেরসাদ পাবো ব্রাহ্মণের পাতের

–হ্যাঁ হ্যাঁ, বাবা বোসো।

হলা পেকে নীলকুঠির কোর্টের বিচারে ডাকাতির অপরাধে তিন বৎসর জেলে প্রেরিত হয়েছিল। গ্রামের লোকে সভয়ে দেখলে সে খালাস পেয়ে ফিরেচে। ওর চেহারা দেখবার মত বটে। যেমন লম্বা তেমনি কালো দশাসই সাজোয়ান পুরুষ, একহাতে বন্ধ করে টেকি ঘোরাতে পারে, অমন লাঠির ওস্তাদ এদেশে নেই–একেবারে নির্ভীক নীলকুঠির মুডি সাহেবের টমটম গাড়ী উল্টে দিয়েচিল ঘোড়ামারির মাঠের ধারে। তবে ভরসা এই দেবদ্বিজে নাকি ওর অগাধ ভক্তি, ব্রাহ্মণের বাড়ী সে ডাকাতি করেছে বলে শোনা যায় নি, যদিও এ-কথায় খুব বেশী ভরসা পান না এ অঞ্চলের ব্রাহ্মণেরা।

হলা পেকে খেতে বসলে সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়াল। সবাই বলতে লাগলো, বাবা হলধর, ভালো করে খাও।

হলধর অবিশ্যি বলবার আবশ্যক রাখলে না কারো। দুকাঠা চালের ভাত, দুহাঁড়ি কলাইয়ের ডাল, একহাঁড়ি পায়েস, আঠারো গণ্ডা নারকেলের নাড়, একখোরা অম্বল আর দুঘটি জল খেয়ে সে ভোজন পর্ব সমাধা করলে।

তারপর বললে–খোকার মুখ দেখবো।

তিলু শুনে ভয় পেয়ে বললে–ওমা, ও খুনে ডাকাত, ওর সামনে খোকারে বার করবো না আমি!

শেষ পর্যন্ত ভবানী বাঁড়ুয্যে যে নিজে খোকাকে কোলে নিয়ে হলা পেকের কোলে তুলে দিতেই সে গাঁট থেকে একছড়া সোনার হার বের করে খোকার গলায় পরিয়ে দিয়ে বললে–আমার আর কিছু নেই দাদা-ভাই, এ ছেল, তোমারে দিলাম। নারায়ণের সেবা হোলো আমার!

ভবানী সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে হারছড়ার দিকে চেয়ে বললেন–না, এ হার তুমি দিও না। দামি জিনিসটা কেন দেবে? বরং কিছু মিষ্টি কিনে দাও–

হলা পেকে হেসে বললে–বাবাঠাকুর, আপনি যা ভাবছেন, তা নয়। এ লুটের মাল নয়। আমার ঘরের মানুষের গলার হার ছেল, তিনি। স্বগৃগে গিয়েচে আজ বাইশ-তেইশ বছর। আমার ভিটেতে ভাঁড়ের মধ্যে পোঁতা ছেল। কাল এরে তুলে তেঁতুল দিয়ে মেজেচি। অনেক পাপ করেছি জীবনে। ব্রাহ্মণকে আমি মানি নে বাবাঠাকুর। সব দুষ্ট্র। খোকাঠাকুর নিষ্পাপ নারায়ণ। ওর গলায় হার পরিয়ে আমার পরকালের কাজ হোলো; আশীর্বাদ করুন।

উপস্থিত সকলে খুব বাহবা দিলে হলা পেকেকে। ভবানী নিজেকে বিপন্ন বোধ করলেন বড়। তিলুকে নিয়ে এসে দেখাতে তিলু ও বললে–এ আপনি ওকে ফেরত দিন। খোকনের গলায় ও দিতি মন। সরে না।

–নেবে না। বলি নি ভাবচো? মনে কষ্ট পাবে। হাত জোড় করে বললে।

–বলুক গে। আপনি ফেরত দিয়ে আসুন।

–সে আর হয় না, যতই পাপী হোক, নত হয়ে যখন মাপ চায়, নিজের ভুল বুঝতে পারে, তার ওপর রাগ করি কি করে? না হয় এরপর হার ভেঙ্গে সোনা গলিয়ে কোনো সৎকাজে দান করলেই হবে।

তিলু আর কোনো প্রতিবাদ করলে না। কিন্তু তার মুখ দেখে মনে। হল সে মন খুলে সায় দিচ্ছে না এ প্রস্তাবে।

হলা পেকে সেই দিনটি থেকে রোজ আসতে আরম্ভ করলে ভবানী বাঁড়ুয্যের কাছে। কোনো কথা বলে না, শুধু একবার খোকনকে ডেকে দেখে চলে যায়।

একদিন ভবানী বললেন–শোনো হে, বোসো—

সামান্য বৃষ্টি হয়েচে বিকেলে। ভিজে বাতাসে বকুল ফুলের সুগন্ধ। হলা পেকে এসে বসে নিজের হাতে তামাক সেজে ভবানী বাঁড়ুয্যেকে দিলে। এখানে সে যখনই এসে বসে, তখন যেন সে অন্যরকম লোক হয়ে যায়। নিজের মুখে নিজের কৃত নানা অপরাধের কথা বলে কিন্তু। গর্বের সুরে নয়, একটি ক্ষীণ অনুতাপের সুর বরং ধরা পড়ে ওর কথার মধ্যে।

–বাবাঠাকুর, যা করে ফেলিচি তার আর কি করবো। সেবার গোসাঁই বাড়ির দোতলায় ওঠলাম বাঁশ দিয়ে। ছাদে উঠি দেখি স্বামী স্ত্রী শুয়ে আছে। স্বামী তেমনি জোয়ান, আমারে মারতি এলো বর্শা তুলে। মারলাম লাঠি ছুঁড়ে, মেয়েটা আগে মলো। স্বামী ঘুরে পড়লো, মুখি থান-থান রক্ত উঠতি লাগলো। দুজনেই সাবাড়।

-বলো কি?

-হ্যাঁ বাবাঠাকুর। যা করে ফেলিচি তা বলতি দোষ কি? তখন যৈবন বয়েস ছেল, তাতে বোঝতাম না। এখন বুঝতি পেরে কষ্ট পাই মনে।

–রণ-পা চড়ো কেমন? কতদূর যাও?

–এখন আর তত চড়িনে। সেবার হলুদপুকুরি ঘোষেদের বাড়ি লুঠ করে রাতদুপুরির সময় রণ-পা চড়িয়ে বেরোলাম। ভোরের আগে নিজের গাঁয়ে ফিরেলাম। এগারো কোশ রাস্তা।

–ওর চেয়ে বেশি যাও না?

–একবার পনেরো কোশ পজ্জন্ত গিইলাম। নদীপুর থেকে কামারর্পেড়ে। মুরশিদ মোড়লের গোলাবাড়ি।

–এইবার ওসব ছেড়ে দাও। ভগবানের নাম করো।

-তাই তো আপনার কাছে যাতায়াত করি বাবাঠাকুর, আপনাকে দেখে কেমন হয়েচে জানি নে। মনডা কেমন করে ওঠে আপনাকে দেখলি। একটা উপায় হবেই আপনার এখানে এলি, মনডা বলে।

–উপায় হবে। অন্যায় কাজ একেবারে ছেড়ে না দিলে কিন্তু কিছুই করতে পারা যাবে না বলে দিচ্চি।

হলা পেকে হঠাৎ ভবানী বাঁড়ুয্যের পা ছুঁয়ে বললে–আপনার দয়া, বাবাঠাকুর। আপনার আশীৰ্বাদে হলধর যমকেও ডরায় না। রণ-পা চড়িয়ে যমের মুণ্ডু কেটে আনতি পারি, যেমন সেবার এনেলাম ঘোড়ের ডাঙ্গায় তুষ্ট্র কোলের মুণ্ডু–শোনবেন সে গল্প

হলা পেকে অট্টহাস্য করে উঠলো।

ভবানী বাঁড়ুয্যে দেখতে পেলেন পরকালের ভয়ে কাতর ভীরু হলধর ঘোষকে নয়, নির্ভীক, দুর্জয়, অমিততেজ হলা পেকেকে–যে মানুষের মুণ্ডু নিয়ে খেলা করেচে যেমন কিনা ছেলেপিলেরা খেলে পিটুলির ফল নিয়ে! এ বিশালকায়, বিশালভুজ হলা পেকে মোহমুরের শ্লোক শুনবার জন্যে তৈরি নেই–নরহন্তা দস্যু আসলে যা তাই আছে।

.

ভবানী বাঁড়ুয্যে দেড় বছরের মধ্যেই এ গ্রামকে, এ অঞ্চলকে বড় ভালবাসলেন। এমন ছায়াবহুল দেশ তিনি কোথাও দেখেন নি। জীবনে। বৈঁচি, বাঁশ, নিম, সোঁদাল, রড়া, কুঁচলতার বনঝোপ। দিনে রাতে শালিখ, দোয়েল, ছাতারে আর বৌ-কথা-কও পাখির কাকলি। ঋতুতে ঋতুতে কত কি বনফুলের সমাবেশ। কোনো মাসেই ফুল বাদ যায় না–বনে বনে ধুন্দুলের ফুল, রাধালতার ফুল, কেয়া, বিপুষ্প, আমের বউল, বকুল, সুয়ো, বনচকা, নাটাকাঁটার ফুল।

ইছামতীর ধারে এদেশে লোকের বাস নেই, নদীর ধারে বনঝোপের সমাবেশ খুব বেশি। ভবানী বাঁড়ুয্যে একটি সাধন কুটির নির্মাণ করে সাধনভজন করবেন, বিবাহের সময় থেকেই এ ইচ্ছা তাঁর ছিল। কিন্তু ইছামতীর ধারে অধিকাংশ জমি চাষের সময় নীলকুঠির আমিনে নীলের চাষের জন্য চিহ্নিত করে যায়। খালি জমি পাওয়া কঠিন। ভবানী বাঁড়ুয্যেও আদৌ বৈষয়িক নন, ওসব জমিজমার হাঙ্গামে জড়ানোর চেয়ে নিস্তব্ধ বিকেলে দিব্যি নির্জনে গাঙের ধারে এক যজ্ঞিডুমুর গাছের ছায়ায় বসে থাকেন। বেশ কাজ চলে যাচ্চে। জীবন কদিন? কেন বা ওসব ঝাটের মধ্যে গিয়ে পড়বেন। ভালোই আছেন।

তাঁর এক গুরুভ্রাতা পশ্চিমে মির্জাপুরের কাছে কোন পাহাড়ের তলায় আশ্রমে থাকেন। খুব বড় বেদান্তের পণ্ডিত-সন্ন্যাসাশ্রমের নাম চৈতন্যভারতী পরমহংসদেব। আগে নাম ছিল গোপেশ্বর রায়। ভবানীর সঙ্গে অনেকদিন একই টোলে ব্যাকরণ পড়েছেন। তারপর গোপেশ্বর কিছুকাল জমিদারের দপ্তরে কাজ করেন পাটুলি-বলাগড়ের সুপ্রসিদ্ধ রায় বাবুদের এস্টেটে। হঠাৎ কেন সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে চলে যান, সে খবর ভবানী জানেন না, কিন্তু মির্জাপুরের আশ্রমে বসবার পরে ভবানী বাঁড়ুয্যেকে দুচারখানা চিঠি দিতেন।

সেই সন্ন্যাসী গোপেশ্বর তথা চৈতন্যভারতী পরমহংস একদিন এসে হাজির ভবানী বাঁড়ুয্যের বাড়ি। একমুখ আধপাকা আধকাঁচা দাড়ি, গেরুয়া পরনে, চিমটে হাতে, বগলে ক্ষুদ্র বিছানা। তিলু খুব যত্ন আদর করলে। ঘরের মধ্যে থাকবেন না। বাইরে বাঁশতলায় একটা কম্বল বিছিয়ে বসে থাকেন সারাদিন। ভবানী বললেন–পরমহংসদেব, সাপে কামড়াবে। তখন আমায় দোষ দিও না যেন।

চৈতন্যভারতী বলেন–কিছু হবে না ভাই। বেশ আছি।

–কি খাবে?

–সব।

–মাছমাংস?

–কোনো আপত্তি নেই। তবে খাই না আজকাল। পেটে সহ্য হয় না।

–আমার স্ত্রীর হাতে খাবে?

–স্বপাক।

–যা তোমার ইচ্ছে।

তিলুকে কথাটা বলতেই তিলু বিনীতভাবে সন্ন্যাসীর কাছে এসে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে বললে–দাদা

পরমহংস বললেন–কি?

–আপনি আমার হাতের রান্না খাবেন না?

–কারো হাতে খাই নে দিদি। তবে ইচ্ছে হয়ে থাকে বেঁধে দিতে পারো। মাছমাংস কোরো না।

–মাছের ঝোল।

–না।

–কই মাছ, দাদা?

–তুমি দেখচি নাছোড়বান্দা। যা খুশি কর গিয়ে।

সেই থেকে তিলু শুচিশুদ্ধ হয়ে সন্ন্যাসীর রান্না রাঁধে। বিলু-নিলু যত্ন করে খাবার আসন করে তাঁকে খেতে ডাকে। তিন বোনে পরিবেশন। করে ভবানী বাঁড়ুয্যে ও সন্ন্যাসীকে।

.

ইছামতীর ধারে যজ্ঞিডুমুর গাছতলায় সন্ধ্যার দিকে দুজনে বসেছেন। পরমহংস বললেন–হ্যাঁ হে, একে রক্ষা নেই, আবার তিনটি!…

–কুলীনের মেয়ের স্বামী হয় না জানো তো? সমাজে এদের জন্য আমাদের মন কাঁদে। সাধনভজন এ জন্মে না হয় আগামী জন্মে হবে। মানুষের দুঃখ তো ঘোচাই এ জন্মে। কি কষ্ট যে এদেশের কুলীন ব্রাহ্মণের মেয়ের।

–মেয়ে তিনটি বড় ভালো। তোমার খোকাকেও বেশ লাগলো।

–আমার বয়েস হোলো বাহান্ন। ততদিন যদি থাকি, ওকে পণ্ডিত করে যাবো।

তার চেয়ে বড় কাজ–ভক্তি শিক্ষা দিও।

–তুমি বৈদান্তিক সন্ন্যাসী। ভূতের মুখে রামনাম?

–বৈদান্তিক হওয়া সহজ নয় জেনো। বেদান্তকে ভালো ভাবে বুঝতে হলে আগে ন্যায়মীমাংসা ভালো করে পড়া দরকার। নইলে বেদান্তের প্রতিপাদ্য বিষয় তা বোঝা যায় না। ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করা বড় কষ্টসাধ্য।

–আমাকে পড়াও না দিনকতক?

–দিনকতকের কর্ম নয়। ন্যায় পড়তেই অনেকদিন কেটে যাবে। তুমি ন্যায় পড়, আমি এসে বেদান্ত শিক্ষা দেবো। তবে সাধনা চাই। শুধু পড়লে হবে না। সংসারে জড়িয়ে পড়েচ; ভজন করবে কি করে? এ জন্মে হোলো না।

–কুছ পরোয়া নেই। ওই জন্যেই ভক্তির পথ ধরেচি।

–সেও সহজ কি খুব? জ্ঞানের চেয়েও কঠিন। জ্ঞান স্বাধ্যায় দ্বারা লাভ হয়, ভক্তি তা নয়। মনে ভাব আসা চাই, ভক্তির অধিকারী হওয়া সবচেয়ে কঠিন। কোনোটাই সহজ নয় রে দাদা।

–তবে হাত পা গুটিয়ে চুপ করে বসে থাকবো?

–তেষাং সতত যুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বক

–গীতায় বলেছেন শ্রীকৃষ্ণ। তাঁতে চিত্ত নিযুক্ত রাখলে তিনিই তাঁকে পাবার বুদ্ধি দান। করেন–দদামি বুদ্ধিযোগং তং–

–তুমিই তো আমার উত্তর দিলে।

–বিয়েটা করে একটু গোলমাল করে ফেলেচো। জড়িয়ে পড়বে। একেবারে তিনটি–একেই রক্ষা থাকে না।

–পরীক্ষা করে দেখি না একটা জীবন। তাঁর কৃপায় দৌড়টাও তো বোঝা যাবে। ভাগবতে শুকদেব বলেচেন–গৃহৈারাসুতৈষনাং গৃহস্থের মতো ভোগ দ্বারা পুত্র স্ত্রী নিয়ে ঘর করবার বাসনা দূর করবে। তাই করচি।

-তা হলে এতকাল পরিব্রাজক হয়ে তীর্থে বেড়ালে কেন? যদি গৃহস্থ সাজবার বাসনাই মনে ছিল তোমার?

–ভেবেছিলাম বাসনা ক্ষয় হয়েচে। পরে দেখলাম রয়েছে। তবে ক্ষয়ই করি। শুকদেবের কথাই বলি–তক্তৈবনাঃ সর্বে যযুধীরাস্তপোবনম সকল বাসনা ত্যাগ করে পরে তপোবনে যাবে। কিন্তু বাসনা থাকতে নয়। সংসার করলে ভগবানকে ডাকতে নেই তাই বা তোমায় কে বলেচে?

–ডাকতে নেই কেউ বলে নি। ডাকা যায় না এই কথাই বলেচে। জ্ঞানও হয় না, ভক্তিও হয় না।

–বেশ দেখবো। ভগবান তোমাদের মতো অত কড়া নয়। অন্তত আমি বিশ্বাস করি না যে সংসারে থাকলে ভক্তি লাভ হয় না। সংসার তবে ভগবান সৃষ্টি করলেন কেন? তিনি প্রতারণা করবেন তাঁর অবোধ সন্তানদের? যারা নিতান্ত অসহায়, তিনি পিতা হয়ে তাদের সামনে ইচ্ছে করে মায়া ফাঁদ পেতেছেন তাদের জালে জড়াবার জন্যে? এর উত্তর দাও।

–এষাবৃতির্ণাম তমোগুণস্য–তমোগুণের শক্তিই আবরণ, বস্তু যথার্থ ভাবে প্রতিভাত না হয়ে অন্য প্রকারে প্রতিভাত হয়–এই জন্যে তমোগুণের নাম বৃতি। ভগবানকে দোষ দিও না। ওভাবে ভগবানকে ভাবছো কেন? বেদান্ত পড়লে বুঝতে পারবে। ওভাবে ভগবান নেই। তিনি কিছুই করেন নি। তোমার দৃষ্টির দোষ। মায়ার একটা শক্তির নাম বিক্ষেপ, এই বিক্ষেপ তোমাকে মোহিত করে রেখে ভগবানকে দেখতে দিচ্ছে না।

–তাঁর শরণাগত হয়ে দেখাই যাক না। তাঁর কৃপার দৌড়টা দেখবো বলিচি তো। মায়াশক্তি-ফক্তি যত বড়ই হোক, তাদের চেয়ে তাঁর শক্তি বড়। মায়াশক্তি কি ভগবান ছাড়া? তাঁর সংসারে সবই তাঁর জিনিস। তিনি ছাড়া আবার মায়া এল কোথা থেকে? গোঁজামিল হয়ে যাচ্চে যে।

–গোঁজামিল হয় নি। আমার কথা তুমি বুঝতেই পারলে না। শ্বেতাশ্বতর শ্রুতিতে বলেচে অজামেকাং অজ্ঞান কারো সৃষ্টি নয়। যিনি সমষ্টিরূপে ঈশ্বর, তিনিই ব্যষ্টিতে কার্যরূপে জীব। অদ্বৈত বেদান্ত বলে, সমষ্টিতে বর্তমান চৈতন্য তাই হোলো কার্য। অর্থাৎ ঈশ্বর কর্তা, জীব কার্য। কিন্তু স্বরূপে উভয়েই এক। কেবল উপাধি ভিন্ন। তুমিই তোমার ঈশ্বর। আবার ঈশ্বর কে?

–একবার এক রকম বল্লে, গীতার শ্লোক ওঠালে–আবার এখন অদ্বৈত বেদান্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে এসে ফেল্লে?

–গীতার শ্লোক ওঠানোতে কি অন্যায় করলাম?

–গীতা হোলো ভক্তিশাস্ত্র। অদ্বৈত বেদান্ত জ্ঞানের শাস্ত্র। দুয়ে মিলিও না।

–ও কথাই বোলো না। বড় কষ্ট হোলো একথা তোমার মুখে শুনে। বেদান্তে ব্রহ্মই একমাত্র প্রতিপাদ্য বিষয়। অন্য সব দর্শনে ঈশ্বরকে স্বীকারই করে নি। একমাত্র বেদান্তেই ব্ৰহ্মকে খাড়া করে বসেছে। সেই বেদান্ত নিরীশ্বরবাদী!

–নিরীশ্বরবাদী বলি নি। ভক্তিশাস্ত্র নয় বলিচি।

–তুমি কিছুই জানো না। তোমাকে এবার আমি চিৎসুখী আর খণ্ডনখণ্ড খাদ্য পড়াবো। তুমি বুঝবে কি অসাধারণ শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁরা ব্রহ্মকে সন্ধান করেছেন। তবে বড় শক্ত দুরবগাহ গ্রন্থ। তর্কশাস্ত্র ভালো করে না পড়লে বোঝাই যাবে না। দেখাবে বেদান্তের মধ্যে অন্য কোনো কুতর্কের বা বিকৃত ভাষ্যের ফাঁক বুজিয়ে দিয়েছে কি ভাবে। আর তুমি কিনা বলে বসলে–

–আমি কিছুই বলে বসি নি। তুমি আর আমি অনেক তফাৎ। তুমি মহাজ্ঞানী–আমি তুচ্ছ গৃহস্থ। তুমি যা বলবে তার ওপর আমার কথা কি? আমার বক্তব্য অন্য সময়ে বলবো।

–বোলো, তুমি অনুরাগী শ্রোতা এবং বক্তা। তোমাকে শুনিয়ে এবং বলে সুখ আছে।

–তোমার সঙ্গে দুটো ভালো কথা আলোচনা করেও আনন্দ হোলো। এ গ্রাম একেবারে অন্ধকারে ডুবে আছে। শুধু আছে নীলকুঠি আর সায়েব আর জমি আর জমা আর ধান আর বিষয়–এই নিয়ে। আমার শ্যালকটি তার মধ্যে প্রধান। তিনি নীলকুঠির দেওয়ান। সায়ের তাঁর ইষ্টদেব। তেমনি অত্যাচারী। তবে গোবরে পদ্মফুল আমার বড় স্ত্রী।

–ভালো?

–খুব। অতিরিক্ত ভালো।

–ভালো, তবে এখনো ছেলেমানুষি যায় নি। আদুরে বোন কিনা। দেওয়ানজির! এদিকে সৎ।

.

ভবানী বাঁড়ুয্যে আর পরমহংস সন্ন্যাসীকে দিনকতক প্রায়ই নদীর ধারে বসে থাকতে দেখা যেত। ঠিক হল যে সন্ন্যাসী তিলু বিলু নিলুকে দীক্ষা দেবেন। তিলু রাত্রে স্বামীকে বললে–আপনি গুরু করেছেন?

-কেন?

–দীক্ষা নেবেন না?

–কি বুদ্ধি যে তোমার! আহা মরি! এই সন্নিসি ঠাকুর আমার গুরুভাই হোলো কি করে যদি আমার দীক্ষা না হয়ে থাকে?

–ও ঠিক ঠিক। আমি ও দীক্ষা নেবো না।

–কেন? কেন?

তিলু কিছু বললে না। মুচকি হেসে চুপ করে রইল। প্রদীপের আলোর সামনে নিজের হাতের বাউটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিজেই দেখতে লাগলো। একটা ছোট ধুনুচিতে ধুনো গুঁড়ো করে দিতে লাগলো ছড়িয়ে। এটি ভবানীর বিশেষ খেয়াল। কোনো শৌখিনতা নেই যে স্বামীর, কোনো আকিঞ্চন নেই, কোনো আবদার নেই–স্বামীর এ অতি তুচ্ছ। খেয়ালটুকুর প্রতি তিলুর বড় স্নেহ। রোজ শোবার সময় অতি যত্নে ধুনো গুড়ো করে সে ধুনুচিতে দেবে এবং বারবার স্বামীকে জিজ্ঞেস করবে–গন্ধ পাচ্চেন? কেমন গন্ধ–ভালো না?

তিলুকে হঠাৎ চলে যেতে উদ্যত দেখে ভবানী বললেন–চলে যাচ্চ যে? খোকা কই?

তিলু হেসে বললে–আহা, আজ তো নিলুর দিন। বুধবার আজ যে–মনে নেই? খোকা নিলুর কাছে। নিলু আনবে।

–না, আজ তুমি থাকো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।

–বা রে, তা কখনো হয়! নিলু কত শখের সঙ্গে ঢাকাই শাড়িখানা পরে খোকাকে কোলে করে বসে আছে।

–তুমি থাকলে ভালো হত তিলু। আচ্ছা বেশ। খোকনকে নিয়ে আসতে বলো।

একটু পরে নিলু ঘরে ঢুকলো খোকনকে কোলে নিয়ে। ওর কোলে ঘুমন্ত খোকন। খোকনের গলায় হলা পেকের উপহার দেওয়া সেই হারছড়াটা। অতি সুন্দর খোকন। ভবানী বাঁড়ুয্যে এমন খোকা কখনো দেখেন নি। এত সুন্দর ছেলে এবং এত চমৎকার তার হাবভাব। এক এক সময় আবার ভাবেন অন্য সবাই তাদের সন্তানদের সম্বন্ধে ঠিক এই কথাই বলবে নাকি? এমন কি খুব কুৎসিত সন্তানদের বাপ মাও? তবে এর মধ্যে অসত্য কোথায় আছে? নিলু খোকাকে সন্তর্পণে শুইয়ে দিলে, ভবানী চেয়ে চেয়ে দেখলেন–কি সুন্দর ভাবে ওর বড় বড় চোখ দুটি বুজিয়ে ঘুমে নিতিয়ে আছে খোকন। তিনি আস্তে আস্তে সেই অবস্থায় তাকে উঠিয়ে বসিয়ে দিতেই খোকা নিমীলিত চোখেই বুদ্ধদেবের মতো শান্ত হয়ে রইল, কেবল তার ঘাড়টি পিছন দিকে হেলে পড়তে দেখে ভবানী পিছন থেকে একটা হাত দিয়ে ওর ঘাড় ধরে রাখলেন। নিলু তাড়াতাড়ি এসে বললে–ওকি? ওর ঘাড় ভেঙ্গে যাবে যে! কি আক্কেল আপনার!

ভবানীর ভারি আমোদ লাগলো, কেমন সুন্দর চুপটি করে চোখ বুজে একবারও না কেঁদে কেষ্টনগরের কারিগরের পুতুলের মতো বসে রইল।

নিলুকে বললেন–দ্যাখো দ্যাখো কেমন দেখাচ্ছে–তিলুকে ডাকো তোমার দিদিকে ডাকো

নিলু বললে–আহা-হা মরে যাই। কেমন করে চোখ বুজে ঘুমিয়ে আছে, কেন ওকে অমন কষ্ট দিচ্ছেন? ছি ছি–শুইয়ে দিন

তিলু এসে বললে–কি?

দ্যাখো কেমন দেখাচ্চে খোকনকে?

–আহা বেশ!

–মুখে কান্না নেই, কথা নেই।

–কথা থাকবে কি? ও ঘুমে অচেতন যে। ও কি কিছু বুঝতে পাচ্চে, ওকে বসানো হয়েচে, কি করা হয়েচে?

নিলু বললে–এবার শুইয়ে দিন। আহা মরে যাই, সোনামণি আমার শুইয়ে দিন, ওর লাগচে। দিদি কিছু বলবে না আপনার সামনে।

খোকাকে শুইয়ে দিয়ে হঠাৎ ভবানীর মনে হল, ঠিক হয়েচে, শিশুর সৌন্দর্য বুঝবার পক্ষে তার বাপ-মাকে বাদ দিলে চলবে কেন? শিশু এবং তার বাপ-মা একই স্বর্ণসূত্রে গাঁথা মালা। এরা পরস্পরকে বুঝবে। পরস্পর পরস্পরকে ভালো বলবে–সৃষ্টির বিধান এই। নিজেকে বাদ দিলে চলবে না। এও বেদান্তের সেই অমর বাণী, দশমস্তমসি। তুমিই দশম। নিজেকে বাদ দিয়ে গুনলে চলবে কেন?

তার পরদিন সকালে এল হলা পেকে, তার সঙ্গে এল হলা পেকের অনুচর দুর্ধর্ষ ডাকাত অঘোর মুচি। অঘোর মুচিকে তিলুরা তিন বোনে দেখে খুব খুশি। অঘোর ওদের কোলে করে মানুষ করেচে ছেলেবেলায়।

তিলু বললে–এসো অঘোর দাদা, জেল থেকে কবে এলে?

অঘোর বললে–কাল এ্যালাম দিদিমণিরা। তোমাদের দেখতি এ্যালাম, আর বলি সন্নিসি ঠাকুরকে দেখে একটা পেরনাম করে আসি। গঙ্গাচ্যানের ফল হবে। কোথায় তিনি?

–তিনি বাড়ি থাকেন কারো? ওই বাঁশতলায় ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছেন দ্যাখো গিয়ে। অঘোর দাদা বোসো, কাঁটাল খাবা। তোমরা দুজনেই বোসো।

–খোকনকে দেখবো দিদিমণি। আগে সন্নিসিঠাকুরকে দণ্ডবৎ করে আসি। বাঁশতলার আসনে চৈতন্যভারতী চুপ করে বসেছিলেন। ধুনি জ্বালানো ছিল না। হলা পেকে আর অঘোর মুচি গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।

সন্ন্যাসী বললেন–কে?

–মোরা, বাবা।

হলা পেকে বললে–এ আমার শাকরেদ, অঘোর। গারদ থেকি কাল খালাস পেয়েছে। এই গাঁয়েই বাড়ি।

–জেল হয়েছিল কেন?

–আপনার কাছে নুকুবো কেন বাবা। ডাকাতি করেলাম দুজনে। দুজনেরই হাজত হয়েল।

–খুব শক্তি আছে তোমাদের দুজনেরই। ভালো কাজে সেটা লাগালে দোষ কি?

–দোষ কিছু নেই বাবা। হাত নিশপিশ করে। থাকতি পারি নে।

চৈতন্যভারতী বললেন–হাত নিশপিশ করুক। যে মনটা তোমাকে ব্যস্ত করে, সেটা সর্বদা সৎকাজে লাগিয়ে রাখো। মন আপনিই ভালো হবে।

হলা পেকে বসে বসে শুনলে। অঘোর মুচির ওসব ভালো লাগছিল। না। সে ভাবছিল তিলু দিদিমণির কাছ থেকে একখানা পাকা কাঁঠাল চেয়ে নিয়ে খেতে হবে। এমন সময় নিলু সেখানে এসে ডাকলেও সন্নিসি দাদা

চৈতন্যভারতী বললেন–কি দিদি?

–পাকা কলা আর পেঁপে নিয়ে আসবো? ছ্যান হয়েচে?

–না হয় নি। তুমি নিয়ে এসো, এতে কোনো আপত্তি নেই। আচ্ছা। এ দেশে ছ্যা করা বলে কেন?

–কি বলবে?

–কিছু বলবে না। তুমি যাও, যশুরে বাঙাল সব কোথাকার! নিয়ে এসো কি খাবার আছে।

–অমনি বললি আমি কিন্তু আনবো না সেটুকু বলে দিচ্চি দাদা।

হলা পেকে দাঁড়িয়ে উঠে বললে–তা হলে মুই রণ-পা পরি?

সন্ন্যাসী হেসে বললেন–রণ-পা পরে কি হবে?

–আপনার জন্যি কলা-মুলো সংগেরো করে নিয়ে আসি। নিলু দিদি তো চটে গিয়েচে।

অঘোর মুচি বললে–মোর জন্য একখানা পাকা কাঁটাল। ও দিদিমণি, বড্ড খিদে নেগেছে।

নিলু বললে–যাও বাড়ি গিয়ে বড়দিদি বলে ডাক দিয়ো। বড়দি দেবে এখন।

–না দিদি, তুমি চলো। বড়দি এখুনি বকবে এমন। গারদ খেটে এসিচিকেন গিইছিলি, কি করিছিলি, সাত কৈফিয়ৎ দিতে হবে। আর সবাই তো জানে, মুই চোর ডাকাত। খাতি পাই নে তাই চুরি ডাকাতি করি, খাতি পেলি কি আর করতাম। গেরামে এসে যা দেখচি। চালের কাঠা দু আনা দশ পয়সা। তাতে আর কিছুদিন গারদে থাকলি হত ভালো। খাবো কেমন করে অত আক্ৰা চালের ভাত? ছেলেপিলেরে বা কি খাওয়াবো। কি বলেন বাবাঠাকুর?

সন্নিসি বললেন–যা ভালো বোঝো তাই করবে বাবা। তবে মানুষ খুন করো না। ওটা করা ঠিক নয়।

হলা পেকে এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। মানুষ খুনের কথায় সে এবার চাঙ্গা হয় উঠলো। হলা আসলে হল খুনী। অনেক মুণ্ডু কেটেছে। মানুষের খুনের কথা পাড়লে সে উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

চৈতন্যভারতীর সামনে এসে বললে–জোড়হাত করি বাবাঠাকুর। কিছু মনে করবেন না। একটা কথা বলি শুনুন। পানচিতে গাঁয়ের মোড়লবাড়ি সেবার ডাকাতি করতে গেলাম। যখন সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠচি, তখন ছোট মোড়ল মোরে আটকালে। ওর হাতে মাছমারা কোঁচ। এক লাঠির ঘায়ে কোঁচ ছুঁড়ে ফেলে দেলাম–আমার সামনে লাঠি ধরতি পারবে কেন ছেলেছোকরা? তখন সে ইট তুলি মারতি এল। আমি ওরে বললাম আমার সঙ্গে লাগতি এসো না, সরে যাও। তা তার নিয়তি ঘুনিয়ে এসেছে, সে কি শোনে? আমায় একটা খারাপ গালাগালি দেলে। সঙ্গে সঙ্গে এক লাঠিতে ওর মাথাটা দোফাঁক করে দেলাম। উল্টে পড়লো গড়িয়ে সিঁড়ির নিচে, কুমড়ো গড়ান দিয়ে।

নিলু বললে–ইস্ মাগো!

চৈতন্যভারতী মশায় বললেন–তারপর?

–তারপর শুনুন আশ্চয্যি কাণ্ড। বড় মোড়লের পুতের বৌ, দিব্যি দশাসই সুন্দরী, মনে হোলো আঠারো-কুড়ি বয়স–চুল এলো করে দিয়ে এই লম্বা সড়কি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দোতলার মুখি সিঁড়ির নিচে, যেখান থেকে চাপা সিঁড়ি ফেলবার দরজা।

ভারতী মশায় অনেকদিন ঘরছাড়া, জিজ্ঞেস করলেন–চাপা সিঁড়ি কি?

নিলু বললে–চাপা সিঁড়ি দেখেন নি? আমার বাপের বাড়ি আছে, দেখাব। সিঁড়িতে ওঠবার পর দোতলায় যেখানে গিয়ে পা দেবেন, সেখান থেকে চাপা সিঁড়ি মাথার ওপর দিয়ে ফেলে দেয়। সে দরজার কবাট থাকে মাথার ওপর। তা হলে ডাকাতেরা আর দোতলায় উঠতি পারে না।

–কেন পারবে না?

হলা পেকে উত্তর দিলে এ কথার। বললে–আপনাকে বুঝিয়ে বলতি পারলে না দিদিমণি। চাপা সিঁড়ি চেপে ফেলে দিলি আর দোতলায় ওঠা যায় না। বড় কঠিন হয়ে পড়ে। এমনি সিঁড়ি যা, তার মুখের কবাট জোড়া কুড়ল দিয়ে চালা করা যায়, চাপা সিঁড়ির কবাট মাথার ওপর থাকে, কুড়ুল দিয়ে কাটা যায় না। বোঝলেন এবার?

–যাক, তারপর কি হোলো?

–তখন আমি দেখচি কি বাবাঠাকুর, সাক্ষাৎ কালী পিরতিমে। মাথার চুল এলো, দশাসই চেহারা, কি চমৎকার গড়ন-পেটন, মুখচোখ– সড়কি ধরেচে যেন সাক্ষাত দশভুজা দুগগা। ঘামতেল মুখে চকচক করচে, চোখ দুটোতে যেন আলো ঠিকরে বেরুচ্চে। সত্যি বলচি বাবাঠাকুর, অনেক মেয়ে দিখিচি, অমন চেহারা আর কখনো দেখি নি। আর সড়কি চালানে কি? যেন তৈরি হাত। ব্যাঁকা করে খোঁচা মারে, আর লাগলি নাড়িভুড়ি নামিয়ে নেবে এমনি হাতের ট্যাৰ্চা তাক। মনে মনে ভাবি, শাবা মা, বলিহারি! দুধ খেয়েলে বটে!

-তারপর? তারপর?

চৈতন্যভারতী অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। সোজা হয়ে উঠে বসলেন ধুনির সামনে।

–একবার ভাবলাম যা থাকে কপালে, লড়ে দেখবো। তারপর ভাবলাম, না, পিছু হটি। গতিক আজ ভালো না। আমি পিছিয়ে পড়িচি, বীরো হাড়ি বললে,–

পরক্ষণেই জিভ কেটে ফেলে বললে–ওই দ্যাখো দলের লোকের নাম করে ফেলেলাম! কেউ জানে না যে ব্যাটা আমাদের সাংড়ার লোক ছিল। যাক, আপনারা আর ওর কথা বলে দিতি যাচ্ছেন না নীলকুঠির সায়েবের কাছে–

ভারতী মশায় বললেন–নীলকুঠির সায়েব কি করবে?

–সে কি বাবাঠাকুর? এদেশে বিচের-আচার সব তো কুঠির সায়েবেরা করেন। আমার আর অঘোরের গারদ হয়েল, সেও বিচার করেন ওই বড়সায়েব। তারপর শুনুন। বীরো হাড়ি ব্যাটা এগিয়ে গেল। আমাদের বললে, দুয়ো! মেয়েলোকের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে গেলি এনি মরদ?.সিঁড়ির ওপরের ধাপে দুপ দুপ করে উঠে গেল। আমি ঘুরে দাঁড়িইচি,-মেয়েলোকের গায়ে হাত দিলি বীরো হাড়ির একদিন না আমার একদিন-মুই দেখে নেবো! এমন সময়–বাপরে! বলে বীরো। হাড়ি একেবারে চিৎ হয়ে সিঁড়ির মুখে পড়ে গেল। তারপরই উঠে দু হাত তলপেটে দিয়ে কি একটা টানচে দড়ির মতো–আমি ভাবচি ওটা আবার কি? কাছে গিয়ে দেখি তলপেট হাঁ হয়ে ফুটো বেরিয়েছে, সেই। ফুটো দিয়ে পেটের রক্তমাখা নাড়ি দড়ির মতো চলে গিয়েচে ওপরে সড়কির ফলার আলোর সঙ্গে গিঁথে।-সড়কি যত টান দিচ্চে বৌমা, ওর পেটের নাড়ি ততই হড় হড় করে বেরিয়ে বেরিয়ে চলেছে ওপর বাগে। আর বেশিক্ষণ না, চোখ পাল্টাতি আমি গিয়ে ওরে পাঁজাকোলা করে তুলি বাইরে নিয়ে এসে বসলাম। এটু জল পাই নে যে ওর মৃত্যুকালে মুখে দিই, কারণ আমি তো বুঝচি ওর হয়ে এল–

ভারতী মশায় বললেন–সেই সড়কিতে গাঁথা নাড়িটা?

লাঠির এক ঝটকায় নাড়ি ছিঁড়ে দিইচি, নইলে আনচি কোথা থেকে? তা বড় শক্ত জান হাড়ির পোর। মরে না। শুধু গোঙায় আর বোধ হয় জল জল করে,বুঝতি পারি না। ইদিকে নোক এসে পড়বে, তখন বড় হৈচৈ হচ্চে বাইরে। কি করি, বাড়ির পেছনে একটা ডোবা পর্যন্ত ওরে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গ্যালাম, তখনো ও গোঁ গোঁ করে হাত নেড়ে কি বলে। রক্তে ধরণী ভাসচে বাবাঠাকুর। লোকজন এসে পড়বার আর দ্রিং নেই। তখন বেছো মুচির কাতানখানা চেয়ে নিয়ে এক কোপে ওর মুণ্ডুটা ঝটকে ফেলে ধড়টা ডোবায় টান মেরে ফেলে দেলাম–মুণ্ডুটা সাথে নিয়ে এলাম। কেননা তা হলি লাশ সেনাক্ত করতি পারবে না–ব্যাটা বীরো হাড়ির মুণ্ড চোখ চেয়ে মোর দিকি চেয়ে বলে–যেন আমারে বকুনি দেচ্চে–এখনো যেন চোখ দুটো মুই দেখতি পাই, যেন মোর দিকি চেয়ে কত কি বলচে মোরে

-তারপর সে বৌটির কি হোলো?

–কিছু জানি নে। তবে দুমাস পরে ফকির সেজে আবার গিয়েছিলাম মোড়লবাড়ি সেই বৌটারে দেখবো বলে।–দুটো ভিক্ষে দাও মা ঠাকরুন, যেমন বলিচি অমনি তিনি এসে মোরে ভিক্ষা দেলেন। বেলা তখন দুপুর, রাত্তিরি ভালো দেখতি পাই নি; মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি, জগদ্ধাত্তিরি পিরতিমে। দশাসই চেহারা, হর্তেলের মতো রং, দেখে ভক্তি হোলো। বললাম–মা খিদে পেয়েছে।

মা বললেন–কি খাবা?

বললাম–যা দেবা। তখন তিনি বাড়ির মধ্যি গিয়ে আধ-খুঁচি চিড়ে মুড়কি এনে আমার ঝুলিতে দেলেন। মুই মোছলমান সেজেচি, গড় হয়ে পেরণাম করলি সন্দেহ করতি পারে, তাই হাত তুলে বললাম সালাম, মা–বলে চলে এ্যালাম। কিন্তু ইচ্ছে হচ্ছিল দুপায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে লুটিয়ে পেরণাম করি। তারপর চলে এ্যালাম–

নিলু এতক্ষণ কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে শুনছিল, এইবার বললে–সে যদি মরেই গিয়েচে দাদা, তবে আবার তোমাদের দলের লোক বলে জিভ কাটলে কেন? সে কিসে মরেচে তা আজও কেউ জানে না।

–দিদিমণি তুমি কি বোঝে। নীলকুঠির লোক গিয়ে তার দুটো ছেলেকে উস্তোনকুস্তোন করবে। বলবে, তোর বাবা কনে গিয়েচে। এ আজ ছসাত বছরের কথা। লোক জানে বীরে হাড়ি গঙ্গার ধারে আর একটা বিয়ে করে সেখানেই বাস করচে। মোর সাংড়ার লোক রটিয়ে দিয়েচে। ওর ছেলে দুটো এখন লাঙ্গল চষতি পারে। বড় ছেলেডা খুব জোয়ান হবে ওর বাবার মতো।

–বৌটিকে আর দ্যাখো নি?

–না, তারপরই দুবছর গারদ বাস। সে অন্য কারণে। এ ডাকাতির কিনারা হয় নি!

চৈতন্যভারতী বললেন–তোমার মুখে এ কাহিনী শুনে ভাবচি বৌমার সঙ্গে আমি দেখা করে আসবো। তারা কি জাত বললে?

–সদগোপ।

–আমি যাবো সেখানে। শক্তিমতী মেয়েরা জগদ্ধাত্রীর অবতার। তুমি ঠিকই বলেচ।

–বাবাঠাকুর, আপনি বোধ হয় ইদিকি আর কখনো আসেন নি, থাকেনও না। অমন কিন্তু এখানে আরো দু-চারটে আছে। তবে ভদ্দর গেরস্ত বাড়িতে আর দেখি নি ওই বৌটি ছাড়া। বাগদি, দুলে, মুচি, নমশুদুরের মধ্যে অনেক মেয়ে পাবেন যারা ভালো সড়কি চালায়, কোঁচ চালায়, ফালা চালায়, কাতান চালায়।

নিলু বললে–আমি জানি। সেবার নীলকুঠির দাঙ্গায় দাদা স্বচক্ষে দেখেছেন, খড়ের ছোট্ট চালাঘরের মধ্যে থেকে দুটো দুলেদের বৌ এমন তীর চালাচ্চে, নীলকুঠির বরকন্দাজ হটে গেল।

–বাঃ বাঃ, বড় খুশি হলাম শুনে দিদি। ব্রহ্মদর্শনের আনন্দ হয় যদি এই শক্তিমতী মায়েদের একবার সাক্ষাৎ পাই। জয় মা জগদম্বা।

ভবানী বাঁড়ুয্যে এই সময় গাড় হাতে কোথা থেকে আসছিলেন, সেখান থেকে বলে উঠলেন–আরে, ও কি ভায়া! একেবারে মা জগদম্বা! নাঃ বৈদান্তিক জ্ঞানীর ইয়েটা একেবারে নষ্ট করে দিলে?

–ভাই, নিত্য থেকে লীলায় নামলেই মা বাবা। বৈদান্তিকের তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল! বলেচি তো তোমাকে সেদিন। বেদান্ত অত সোজা জিনিস নয়। অদ্বৈত বেদান্ত বুঝতে বহুদিন যাবে। জীব গোস্বামীর বেদান্ত বরং কিছু সহজ।

–ও কথা থাক। কি নিয়ে কথা বলছিলে?

লীলার কথা। এদেশের মেয়েদের শক্তি-সামর্থ্যের কথা। সবই মায়ের লীলা।

নীলু বলে উঠল–হ্যাঁ, ভালো কথা–বড়দি ভালো ঢাল আর লাঠির খেলা জানে। একবার আকবর আলি লেঠেলের সঙ্গে লড়ি চালিয়েছিল ঢাল আর লড়ি নিয়ে। নীলকুঠির বড় লেঠেল আকবর আলি। বড়দি এমন আগলেছিল, একটা লড়ির ঘাও মারতি পারে নি ওর গায়ে। শরীরে শক্তিও আছে বড়দির। দুটো বড় বড় ক্ষিতুরে ঘড়া কাঁকে মাথায় করে নিয়ে আসতে পারে। এখনো পারে।

ভবানী বাঁড়ুয্যে হলা পেকে ও অঘোর মুচিকে নিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে ডাক দিলেন–ও তিলু, শুনে যাও–ও তিলু, ও বড়বৌ

তিলু খোকাকে দুধ খাওয়াচ্ছিল। একটু পরে খোকাকে কোলে করে এসে বললেবাপরে, এসব ডাকাতের দল কেন আমার বাড়িতে।

হলা পেকে উত্তর দিলে বড়দি, পেটের জ্বালায় এইচি। খাতি দ্যাও, নইলে লুঠ হবে।

তিলু হেসে বললে–আমি লাঠি ধরতি জানি।

–সে তো জানি।

–বার করি ঢাল লড়ি?

–কিসের লড়ি?

–ময়না কাঠের।

অঘোর মুচি বললে–সত্যি বড়দি, হাত বজায় আছে তো?

–খেলবি নাকি একদিন? মনে আছে সেই রথতলার আখড়াতে? তখন আমার বয়েস কত–সতেরো-আঠারো হবে–

–উঃ, সে যে অনেকদিনের কথা হয়ে গেল। তখন রথতলার আখড়াতে মোদের বড্ড খেলা হোত। মনে আছে খুব।

–বসো, আমি আসচি।

একটু পরে দুটি বড় কাঁঠাল দু হাতে বোঁটা ঝুলিয়ে নিয়ে এসে। তিলু ওদের সামনে রাখলে। বললে–খাও ভাই সব, দেখি কেমন জোয়ান

হলা পেকে বললে–কোন্ গাছের কাঁটাল দিদি?

–মালসি।

–খাজা না রসা?

–রস খাজা। এখন আষাঢ়ের জল পেলে কাঁটাল আর রসা থাকে? খাও দুজনে।

মিনিট দশ-বারোর মধ্যে অঘোর মুচি তার কাঁঠালটা শেষ করলে। হলা পেকের দিকে তাকিয়ে বললে–কি ওস্তাদ, এখনো বাকি যে?

–কাল রাত্তিরি খাসির মাংস খেয়েলাম সের দুয়েক। তাতে করে ভালো খিদে নেই।

তিলু বললে–সে হবে না দাদা। ফেলতি পারবে না। খেতে হবে সবটা। অঘোর দাদা, আর একখানা দেবো বার করে? ও গাছের আর কিন্তু নেই। খয়েরখাগীর কাঁটাল আছে খানচারেক, একটু বেশি খাজা হবে।

–দ্যাও, ছোট দেখে একখানা।

হলা পেকে বললে–খেয়ে নে অঘরা, এমন একখানা কাঁটালের দাম হাটে এক আনার কম নয়, এমন অসময়ে। মুই একখানা শেষ করে আর পারবো না। বয়েসও তো হয়েচে তোর চেয়ে। দ্যাও দিদিমণি, একটু গুড় জল দ্যাও

তিলু বললে–তা হলে সারেদের কাছে হেরে গেলে দাদা। গুড় জল এমনি খাবে কেন, দুটো ঝুনো নারকোল দি, ভেঙ্গে দুজনে খাও গুড় চিরে। তবে বেশি গুড় দিতি পারবো না। এবার সংসারে গুড় বাড়ন্ত। দশখানা কেনা ছিল, দুখানাতে ঠেকেচে। উনি বেজায় গুড় খান।

দিনটা বেশ আনন্দে কাটল।

হলা পেকে এবং অঘোর মুচি চলে যাওয়ার সময় চৈতন্যভারতী মহাশয়কে আর একবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে চলে গেল।

.

ভবানী বাঁডয্যে যে তিলুকে নিয়ে রোজ নদীতে নাইতে যান সন্ধ্যাবেলা আজও গেলেন। ইছামতীর নির্জন স্থানে নিবিড় নলখাগড়ার ঝোপের মধ্যে দিয়ে মুক্তো খোঁজা জেলেরা (কারণ ইছামতীতে বেশ দামি মুক্তাও পাওয়া যেত) গত শীতকালে যে সঁড়িপথটা কেটে করেছিল, তারই নিচে বাবলা, যজ্ঞিডুমুর, পিটুলি ও নটকান গাছের তলায় ভবানী ও তিলু নিজেদের জন্যে একটা ঘাট করে নিয়েছে, সেখানে হলদে বাবলা ফুল ঝরে পড়ে টুপটাপ করে স্বচ্ছ কাকচক্ষু জলের ওপর, গুলঞ্চের সরু ছোট লতা নটকান ডাল থেকে জলের ওপরে ঝুলে পড়ে, তেচোকো মাছের ছানা স্নানরতা তিলু সুন্দরীর বুকের কাছে খেলা করে, হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলে নিমেষের মধ্যে অন্তর্হিত হয়; ঘনান্তরাল বনকুঞ্জের ছায়ায় কত কি পাখি ডাকে সন্ধ্যায়। ওদের কেউ দেখতে পায় না ডাঙার থেকে।

ভবানী বাঁড়ুয্যে জলে নেমে বললেন–চলো সাঁতার দিয়ে ওপারে যাই

তিলু বললে–চলুন, ওপারের ক্ষেত থেকে পটল তুলে আনি–

–ছিঃ, চুরি করা হয়। পাড়াগেঁয়ে বুদ্ধি তোমার–চুরি বোঝ না?

–যা বলেন। আমরা কত তুলে আনতাম।

–দেবে সাঁতার?

–চলুন। গো-ঘাটার দিকে যাবেন? মাঠের বড় অশথতলার দিকে?

তিলু অদ্ভুত সুন্দরভাবে সাঁতার দেয়। সুন্দর, ঋজু তনুদেহটি জলের তলায় নিঃশব্দে চলে, পাশে পাশে ভবানী বাঁড়ুয্যে চলেন।

হঠাৎ এক জায়গায় গহিন কালো জলে ভবানী বাঁড়ুয্যে বলে। ওঠেন–ও তিলু, তিলু!

তিলু এগিয়ে চলেছিল, থেমে স্বামীর কাছে ফিরে এসে বললে–কি? কি?

ভবানী দু হাত তুলে অসহায়ের মতো খাবি খেয়ে বললেন–তুমি পালাও তিলু। আমায় কুমিরে ধরেচে–তুমি পালাও! পালাও! খোকাকে দেখো!…

তিলু হতভম্ব হয়ে বললে–কি হয়েচে বলুন মা! কি হয়েচে? সে কি গো!

জল খেতে খেতে ভবানী দুহাত তুলে ডুবতে ডুবতে বললেন খো-কা-কে দেখো! খোকাকে দেখো–খো-ও-ও

তিলু শিউরে উঠলো জলের মধ্যে, বর্ষা-সন্ধ্যার কালো নদীজল এক্ষুনি কি তার প্রিয়তমের রক্তে রাঙা হয়ে উঠবে? এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেল জীবনের সব কিছু সাধ-আহ্লাদ?

চক্ষের নিমেষে তিলু জলে ডুব দিলে কিছু না ভেবেই।

স্বামীর পা কুমিরের মুখ থেকে ছাড়িয়ে নেবে কিংবা নিজেই কুমিরের মুখে যাবে।

ডুব দিয়েই স্বচ্ছ জলের মধ্যে সে দেখতে পেলে, প্রকাণ্ড এক শিমুলগাছের গুঁড়ি জলের তলায় আড়ভাবে পড়ে, এবং তারই ডালপালার কাঁটায় স্বামীর কাপড় মোক্ষম জড়িয়ে আটকে গিয়েচে! হাতের এক এক ঝটকায় কাপড়খানা ছিঁড়ে ফেললে খানিকটা। আবার জলের ওপর ভেসে স্বামীকে বললে–ভয় নেই, ছাড়িয়ে দিচ্ছি, শিমুল কাটায় বেঁধেছে–

আবার দম নিয়ে আরো খানিকটা কাপড় ছিঁড়ে ফেললে। জলের মধ্যে খুব ভালো দেখাও যায় না। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসচে জলের তলায়, কি করে কাপড় বেঁধেছে ভালো বোঝাও যায় না। আবারো ডুব দিলে, আবার ভেসে উঠলো। তিন-চার বার ডুব দেওয়ার পর স্বামীকে মুক্ত করে অবসন্নপ্রায় স্বামীকে শক্ত হাতে ধরে ভাসিয়ে ডাঙার দিকে অল্প জলে নিয়ে গেল।

ভবানী বাঁড়ুয্যে হাঁপ নিয়ে বললেন–বাবাঃ! ওঃ!

তিলুর কাপড় খুলে গিয়েছিল, চুলের রাশ এলিয়ে গিয়েছিল, দুহাতে সেগুলো এঁটেসেঁটে নিলে, চুল জড়িয়ে নিলে, সেও বেশ হাঁপাচ্ছিল। কিন্তু তার সতর্ক দৃষ্টি স্বামীর দিকে। আহা, বয়েস হয়ে গিয়েচে ওঁর,

হেসে স্বামীর দিকে চেয়ে বললে–বাপরে, কি কাণ্ডটা করে বসেছিলেন সন্দেবেলায়!

ভবানী বাঁড়ুয্যেও হাসলেন।

–খুব সাঁতার হয়েচে। এখন চলুন বাড়ি

–তুমি ভাগ্যিস ডুব দিয়ে দেখেছিলে! কে জানত ওখানে শিমুলগাছের। গুঁড়ি রয়েচে জলের তলায়? আমি কুমির ভেবে হাত পা ছেড়ে দিয়েচিলাম তো–

প্রায়ান্ধকার নির্জন পথ দিয়ে দুজন বাড়ী ফিরে চলে।

তিলু ভাবছিল–উঃ, আজ কি হোত, যদি সত্যি ওঁর কিছু হত।

তিলু শিউরে উঠলো।

স্বামী চলে গেলে সে কি বাঁচতো?

.

নীলকুঠির বড় সাহেবের কামরায় দেওয়ান রাজারামের ডাক পড়েছিল। সম্প্রতি তিনি হাতজোড় করে বড়সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে।

বড়সাহেব কাঠে-খোদা পাইপ খেতে খেতে বলেন–টোমার কাজ ঠিকমট হইটেছে না। তবু কি সুন্দর চেহারা! আজ কি হতো আর একটু হলে?

–কেন হুজুর?

–নীলের চাষ এবার এট লো ফিগার–কম হইল কি ভাবে?

–হুজুর, মাপ করেন তো ঠিক কথা বলি। সেবার সেই রাহাতুনপুরির কাণ্ডকারখানার পর

জেন বিলস শিপটন হঠাৎ টেবিলের ওপর দুম করে ঘুষি মেরে বললেও সব শুনিট চাই না–আই ডোন্ট উইশ ইউ স্পিন দ্যাট রিগম্যারোল ওভার হিয়ার এগেন–কাজ চাই, কাজ। ডুশো বিঘা জমিতে এ বছর নীল বুনটে হইবে। বুঝিলে? বাজে কথা শুনিটে চাই না।

হজুর!

–মিঃ ডঙ্কিনসন বদলি হইয়া গেল। নটুন ম্যাজিষ্ট্রেট আসিল। এ আমাদের ডলে আছেন। নীলের ডাড়ন এ বছর ব্রিস্কলি আরম্ভ করিটে হইবে, ফিগার চাই। ডাডনের খাটা রোজ আমাকে ডেখাইবে।

-হজুর!

শ্রীরাম মুচি এ সময়ে সাহেবের কফি নিয়ে ঘরে ঢুকল। তাকে দেখে রাজারাম বললেন–হুজুর, এ লোককে জিজ্ঞেস করুন। এদের চরপাড়া গ্রামের মুচিপাড়ার লোকে কিছুতে নীল বুনতি দেবে না, আপনি জিজ্ঞেস করুন ওকে

সাহেব শ্রীরাম মুচিকে বললেন–কি কঠা আছে?

শ্রীরাম বড়সাহেবের পেয়ারের খানসামা, বড়সাহেবকেও সে ততটা সম্ভ্রম ও ভয়ের চোখে দেখে না অন্য লোকের কথা বলাই বাহুল্য। সে। বললে–কথা সবই ঠিক।

–কি ঠিক?

-গলু আর হংস দল পেকিয়েছে হুজুর। নীলের দাগ মারতি দেবে না।

জেন্ বিলস্ শিপটন রেগে উঠে দেওয়ালের দিকে চেয়ে বললেন ইউ আর নো মিল্কসপ–মুচিপাড়ার জমি সব ডাগ লাগাও–টো ডে আজই। আমি ঘোড়া করিয়া দেখিটে যাইব। শ্যামচাঁদ ভুলিয়া গেলো? রামু মুচি লিডার হইয়াছে–টাহাকে সোজা করিবে।

এই সময়ে শ্রীরাম মুচি হাতজোড় করে বললে–সায়েব, আমার তিন বিঘে মুসুরি আছে, রবিখন্দ। আমার ওটা দাগ যেন না দেন দেওয়ানজি। রামু সর্দারের বাড়ী আমি যাইনে, তার ভাত খাইনে।

–আচ্ছা গ্র্যান্টেড, মঞ্জুর হইল। ডেওয়ান, ইহার জমি বাদ পড়িল।

রাজারাম বললেন–হজুরের হুকুম।

–আচ্ছা যাও।–দ্যাট ডেভিল অফ এ্যান আমিন শু্যড গো উইথ ইউ–প্রসন্ন আমিন টোমার সাথে যাইবে। হরিশ আমিন নয়।

–হুজুরের হুকুম।

প্রসন্ন চক্রবর্তী নিজের ঘরে ভাত রাঁধছিল। দেওয়ান রাজারাম ঘরে ঢুকতেই প্রসন্ন তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো। তবু ভালো, কিছুক্ষণ আগে তার এই ঘরেই নবু গাজিদের দল এসেছিল। নীলের দাগ কিছু কম করে যাতে এ বছর তাদের গাঁয়ে দেওয়া হয়, সেজন্যে অনুরোধ জানাতে।

শুধু হাতেও তারা আসে নি।

আর একটু বেশিক্ষণ ওরা থাকলে ধরা পড়ে যেতে হোত। ঘুঘু রাজারামের চোখ এড়াত না কিছু।

রাজারাম বললেন–কি? ভাত হচ্ছে?

–আসুন। আজ্ঞে হ্যাঁ।

–শিগগির চলো চক্কত্তি, মুচিদের আজ শেষ করে আসতি হবে। বড়সায়েব রেগে আগুন। আমারে ডেকে পাঠিয়েছিল।

–একটা কথা বলবো? রাগ করবেন?

–না। কি?

–দাগ শেষ।

–সে কি?

প্রসন্ন চক্রবর্তী ভাতের হাত ধুয়ে গামছা দিয়ে মুছে ঘরের কোণের টিনের ক্ষুদ্র পেঁটরাটা খুলে দাগ-নক্সার বই ও ম্যাপ বার করে হাত দিয়ে দেখিয়ে বললে–সাত পাখি জমি এই, দু পাখি জমি এই-আর এই দেড় পাখি–একুনে তিরিশ বিধে সাত কাঠা।

রাজারাম প্রশংসমান দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে বললেন–বাঃ, কবে করলে?

–রবিবার রাতদুপুরের পর।

–সঙ্গে কে ছিল?

–করিম লেঠেল আর আমি। পিম্যান ছিল সয়ারাম বোষ্টম।

–রিপোর্ট কর নি কেন? আগে জানাতি হয় এ সব কথা। তা হলি বড়সায়েবের কাছে আমাকে মুখ খেতি হত না। যাও–

–কিছু মনে করবেন না দেওয়ানজি। কেন বলি নি শুনুন, ভরসা পাই নি, ঠিক বলচি। রাহাতুনপুরির সেই ব্যাপারের পর আর কিছু

–সে ভয় নেই। ম্যাজিস্ট্রেট বদলে গিয়েচে। বড়সাহেব নিজে বললে আমাকে।

.

কিন্তু সেদিন সকালেই চরপাড়ায় গোলমাল বাধলো।

পাইক এসে খবর দিলে চরপাড়ার প্রজারা দাগ উপড়ে ফেলেছে। রাজারাম রায় বড়-সাহেবকে কথাটা জানালেন না। তাঁর দূর সম্পর্কের সেই ভাইপো রামকান্ত রায়, যে কলকাতায় আমুটি কোম্পানীর হৌসে নকলবিশি করে এবং যে অদ্ভুত কলের গাড়ী ও জাহাজের কথা বলেছিল, সে নীলকুঠিতে এসেছিল দেওয়ানের সঙ্গে দেখা করতে।

প্রসন্ন চক্রবর্তী আমিন যে কাজ একা করে এসেছে, তাতে দেওয়ান রাজারাম নিজেও কিছু ভাগ বসাতে চান, রিপোর্ট সেইভাবেই লিখছিলেন, প্রসন্ন চক্রবর্তীকে অবিশ্যি হাওয়া করে দিচ্ছিলেন একেবারে।

রাজারাম তখুনি ঘোড়া ছুটিয়ে বেরুলেন চরপাড়ার দিকে। সেখানে এক বটতলায় বসে একে একে সমস্ত মুচিদের ডাকলেন। যার যত জমিতে আগে দাগ ছিল, তার চেয়ে বেশি দাগ স্বীকার করিয়ে টিপসই নিলেন প্রত্যেকের। কারো কিছু কথা শুনলেন না।

রামু সর্দারকে ডেকে বললেন–এবার পাঁচপোতার বাঁওড়ে বাঁধাল দিইছিলে তুমি?

–আজ্ঞে হ্যাঁ রায়মশাই। ফি বছর মোর বাঁধাল পড়ে।

হুঁ।

রামু সর্দারের বুক কেঁপে গেল। দেওয়ানজিকে সে চেনে। ঘোড়ায় উঠবার সময় সে দেওয়ানকে বললে–মোর কি দোষ হয়েচে? অপরাধ নেবেন না যদি কেউ কিছু বলে থাকে।

দেওয়ানজি ঘোড়ায় চেপে উড়ে বেরিয়ে গেলেন।

সন্ধের পর পাঁচপোতার বাঁওড়ের বাঁধালে রামু সর্দার বসে তামাক খাচ্ছে আর চার-পাঁচজন নিকিরি ও চাষীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে, এমন সময়ে হঠাৎ কোথা থেকে আট-দশজন লোক এসে ওর বাঁধাল ভাঙ্গতে আরম্ভ করলে।

রামু সর্দার খাড়া হয়ে উঠে বললে–কে? কে? বাঁধালে হাত দেয় কোন সুমুন্দির ভাই রে?

করিম লাঠিয়াল এগিয়ে এসে বললে–তোর বাবা।

–তবে রে–

রামু সর্দার বাগদি পাড়ার মোড়ল। দুর্বল লোক নয় সে। লাঠি হাতে সে এগিয়ে যেতেই করিম লাঠিয়ালের লাঠি এসে পড়লো ওর মাথায়। রামু সর্দার লাঠি ঠেকিয়ে দিতেই করিম হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলো– সামলাও!

আবার ভীষণ বাড়ি।

রামু সর্দার ফিরিয়ে বাড়ি দিলে।

–শাবাশ! সামলাও।

রামু সর্দার ফাঁক খুঁজছিল। বিজয়গর্বে অসতর্ক করিম লাঠিয়ালের মাথার দিকে খালি ছিল, বিদ্যুৎ বেগে রামু সর্দার লাঠি উঠিয়ে বললে– তুমি সামলাও কমে খানসামা।

সঙ্গে সঙ্গে রামুর লাঠি ঘুরে গেল বোঁ করে ওর বাঁকা আড়-করা লাঠির ওপর দিয়ে, বেল ফাটার মতো শব্দ হল। করিম পেঁপেগাছের ভাঙ্গা ডালের মতো পড়ে গেল বাঁধালের জালের খুঁটির পাশে। কিন্তু রামু সামলাতে পারলে না। সেও গেল হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অমনি করিম লাঠিয়ালের সঙ্গী লাঠিয়ালরা দুড়দাড় করে লাঠি চালালে ওর উপর যতক্ষণ রামু শেষ না হয়ে গেল। রক্তে বাঁধালের ঘাস রাঙা হয়ে ছিল তার পরদিন সকালেও। চাপ চাপ রক্ত পড়ে ছিল ঘাসের ওপর–পথযাত্রীরা দেখেছিল। বাঁধালের চিহ্নও ছিল না তার পরদিন সেখানে। বাঁশ ভেঙ্গেচুরে নিয়ে চলে গিয়েছিল লাঠিয়ালের দল।

এই বাঁধালের খুব কাছে রামকানাই চক্রবর্তী কবিরাজ একা বাস করতেন একটা খেজুর গাছের তলায় মাঠের মধ্যে। রামকানাই অতি গরিব ব্রাহ্মণ। ভাত আর সোঁদালি ফুল ভাজা, এই তাঁর সারা গ্রীষ্মকালের আহার–যতদিন সোঁদালি ফুল ফোটে বাঁওড়ের ধারের মাঠে। কবিরাজি জানতেন ভালোই, কিন্তু এ পল্লীগ্রামে কেউ পয়সা দিত না। খাওয়ার জন্য ধান দিত রোগীরা। তাও শ্রাবণ মাসে অসুখ সারলো তো আশ্বিন মাসের প্রথমে নতুন আউশ উঠলে চাষীর বাড়ি বাড়ি এ-গাঁয়ে ও-গাঁয়ে ঘুরে সে ধান নিজেকেই সংগ্রহ করতে হত তাঁকে।

রামকানাই খেজুরতলায় নিজের ঘরটিতে বসে দাশু রায়ের পাঁচালি পড়ছিলেন, এমন সময় হৈচৈ শুনে তিনি বই বন্ধ করে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তারপর আরো এগিয়ে দেখতে পেলেন, নীলকুঠির কয়েকজন লাঠিয়াল বাঁধালের বাঁশ খুলচে। একটু পরে শুনতে পেলেন কারা বলচে খুন হয়েচে। রামকানাই ফিরে আসচেন নিজের ঘরে, তাঁর পাশ দিয়ে হারু নিকিরি আর মনসুর নিকিরি দৌড়ে পালিয়ে চলে গেল।

রামকানাই বললেন–ও হারু, ও মনসুর, কি হয়েচে? কি হয়েচে?

তাদের পেছনে অন্ধকারে পালাচ্ছিল হজরৎ নিকিরি। সে বললে– কে? কবিরাজ মশায়? ওদিকি যাবেন না। রামু বাগদিকে নীলকুঠির লেঠেলরা মেরে ফেলে দিয়ে বাঁধাল লুঠ করচে।

রামকানাই ভয়ে এসে ঘরের দোর বন্ধ করে দিলেন।

একটা খুব আশ্চর্য ব্যাপার ঘটলো এই উপলক্ষে। খুনের চেয়েও বড়, হাঙ্গামার চেয়েও বড&