Wednesday, June 19, 2024
Homeউপন্যাসফেরা - তসলিমা নাসরিন

ফেরা – তসলিমা নাসরিন

১. প্লেনের সিঁড়ি বেয়ে

প্লেনের সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে চারদিক তাকায় কল্যাণী। পেছন থেকে দীপন বলে—‘কই তুমি না নেমেই জল খাবে?’

হ্যাঁ, কল্যাণী জল খাবে, জল না খেলে তার হৃদয় জুড়োবে না। দেশের জলের যে স্বাদ, সে স্বাদ কি আর অন্য জলে মেলে? তিরিশ বছর কলকাতায় অমন স্বাদের জল সে একঢোকও পান করেনি।

আঠারো বছর বয়স ছিল কল্যাণীর। আনন্দমোহনে পড়ত। এই কলেজে তার বাবা পড়েছে, দাদা পড়েছে, কলেজটির আলাদা একটি দাপট ছিল বটে। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, জামালপুর, গৌরীপুর থেকে ছেলেরা পড়তে আসত, টিনের ফুলতোলা পেটরা নিয়ে গ্রাম থেকে আসা ছেলেগুলো যখন শহরের রাস্তায় হাঁটত, সাইকেল রিক্সার টুংটুং শব্দ ঠিক বুঝে উঠতে পারত না, এলোপাতাড়ি ছুটত—আর তাল সামলাতে না পেরে আরোহীসহ সাইকেলও হুমড়ি খেয়ে পড়ত ওদের গায়ের ওপর, দেখে কল্যাণীর দাদা জ্যোতিপ্রকাশ ওদের নাম দিয়েছিল ‘বলদ’। ওরা প্রথম দিকে চুলে সর্ষের তেল মেখে ক্লাসে আসত, সার্টের পকেটে ভাঁজ করা ‘ভুলো না আমায়’ লেখা রুমাল রাখত, আর ফাঁক পেলেই সেই রুমাল দিয়ে পাউডার মাখা ঘাড়ের ঘাম মুছত, পেছনের বেঞ্চে বসে হাঁ করে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকত, স্যারদের কথা অর্ধেক বুঝত, অর্ধেক বুঝত না, মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে গলা কাঁপত, অফ পিরিয়ডে ছাত্ররা যখন করিডরে বা মাঠে বসে আড্ডা পেটাত, ওরা ছোটবেলার ‘আমাকে খেলায় নেবে?’ মুখ করে দূরে দাঁড়িয়ে থাকত। আর এই বলদগুলোই পরীক্ষায় গিয়ে শহুরে স্মার্ট ছাত্রদের কাত করে দিত। ততদিনে ওরা চুলে টেরি কেটে কলেজে আসে, সার্টের দুটো-তিনটে বোতাম অবসর মত খোলে, ইংরেজিতে কিছু বাক্যও আওড়ায়, মেয়েদের সঙ্গে ‘আই লভ য়্যু’ চিরকুটের চালান এমনকি থামে হেলান দিয়ে কথাও বলতে শেখে। জ্যোতিপ্রকাশ কথায় কথায় দিনে দুবেলা ওদের ল্যাং মারত, পরে ফেরে পড়ে ওদের কাছেই পড়া বুঝতে যেত, যে দাবা খেলায় ওর অনেকদিনের হাতযশ, ওতেও সে নীতিশ নামের এক তারাকান্দার পাঁঠার সঙ্গে হেরে যায়। এইসব কারণে জ্যোতিপ্রকাশের এত রাগ হত যে ওদের বিরুদ্ধে সে লোকাল ছাত্রদের এক হবার পরামর্শ দেয়, কেউ অভিযোগ জানতে চাইলে বলে কলেজের মাঠ নোংরা করে ফেলে, দেওয়ালে পানের পিক ছোঁড়ে, পুকুরের জল ঘোলা করে। আন্দোলন শেষ অবধি জমত না। কারণ ততদিনে ওই বলদগুলো কেবল পড়ালেখায় নয়, গানবাজনা খেলাধুলাতেও বেশ নাম করে ফেলেছে। জ্যোতিপ্রকাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও শেষে গিয়ে ওদের পেছনে ঘুরঘুর করত। আনন্দমোহনে যখন প্রথম ক্লাস করতে যায় কল্যাণী, জ্যোতিপ্রকাশ বলেছিল—‘দেখিস ওদের ফাস্ট-সেকেন্ড হইতে দিস না যেন। খাইটা পড়ালেখা করবি। ওরা কোন ক্ষেতের ভেতর কুপি জ্বাইলা নামতা পড়ত, আর এইখানে আইসা দিব্যি আমাদেরই টেক্কা দিয়া যায়।’ পরিমল তখন জেলা স্কুলের ছাত্র, কল্যাণীর কানে কানে বলেছিল—‘জুতসই গেঁয়ো দেইখা তুই একটা প্রেম করিস তো এইবার, দেখি দাদার কী অবস্থা দাঁড়ায়।’ কল্যানী হেসে বলেছিল—‘পাগল হইছস?’ সেই কল্যাণীই, কী অবাক কাণ্ড, কলেজ ভরা মাখন মাখন ছেলে থাকতে জুটল গিয়ে ঘোরকালো বাদলের সঙ্গে। নালিতাবাড়ির ছেলে, গা থেকে তখনও ধানসেদ্ধর গন্ধ যায়নি—সার্টের বুকপকেটে ফাউন্টেন পেন থাকে, গোল ফ্রেমের চশমা পরে, চুল বেয়ে তেল নামে ঘাড়ে সেই বাদলই কল্যাণীর ফিজিক্স বই ধার নিয়ে তিনদিন পর ফেরত দিয়েছিল। বইয়ের ভেতর একটি চিঠি ছিল, লেখা—‘কল্যাণী প্রিয়বরেষু, তুমি আকাশের চাঁদ সে আমি জানি, আমি কিন্তু বামন নই। ইতি বাদল।’ কল্যাণীর রাতে রাতে ঘুম হত না, দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে আকাশ দেখত, ইজিচেয়ারে শুয়ে সারারাত পূর্ণিমার চাঁদ দেখত। জ্যোতিপ্রকাশ তখন কী জানত কার কথা ভেবে ভেবে কল্যাণী ইনসোমনিয়ায় ভোগে! কলেজে ঢুকেই মনে মনে আগে সে বাদলকে খুঁজত, একদিন না দেখলে অস্থির অস্থির লাগত। কল্যাণী নিজেই অবাক হত কই আর কারও জন্য তো তার এমন হয় না। বাদলকে একবার দেখবার জন্য, একবার তার সঙ্গে কথা বলবার জন্য বুকের মধ্যে যেন কেমন করে। সেই গোবেচারা তেল চিটচিটে ছেলে বাদল একদিন ভরদুপুরবেলা কেমেস্ট্রি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কল্যাণীকে কলেজ ক্যাম্পাসের উত্তরে শিমুলগাছের তলে দেখা করতে বলে, কী নাকি জরুরি কথা আছে—কল্যাণী সেই মত যায়, বাদল মাথার নিচে বই-খাতা রেখে সটান শুয়ে ছিল ঘাসের ওপর, কল্যাণীকে দেখে গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে বসে, বাদলকে দেখতে তখন আর অত গেঁয়োও লাগেনি, বরং ওর খাড়া নাক, বড় বড় চোখ, একমাথা ঘন কালো চুলের দিকে বারবারই চোখ পড়ে কল্যাণীর। কেউ দেখে ফেললে যে কী সর্বনাশ হবে এই কথা কল্যাণীকে প্রায় ঢোক গিলে গিলে বলতে হয়। অথচ বাদল নির্বিকার, মুখ চোখে আতঙ্কের লেশ নেই, ঠোঁট উল্টে বলে—ছোঃ আমি কেয়ার করি না।’ জরুরি কথাটি কী জানতে চাইলে সে কোনও রাখঢাক না করেই বলে বসে—‘তোমাকে আমি ভালবাসি।’ শুনে কল্যাণীর বুকের মধ্যে জল ছলকে ওঠে। সে দাঁত দিয়ে নখ কাটে, খাতা খুলে অযথাই আঁকিবুকি করে, ঘাস ছেঁড়ে—‘ভালবাসা’ শব্দটি মানুষকে কী এমনই এলোমলো করে দেয় কল্যাণী বুঝে পায় না। ক্লাসে তার মন বসে না, বাড়ির ছাদে উদাস হেঁটে বেড়ায়, লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠি লেখে, দেখে বাড়ির সবচেয়ে যে বেখেয়াল ছেলে সেই জ্যোতিপ্রকাশও একদিন বলে— ‘তোর হয়েছে কী বল তো, প্রেমে-ট্রেমে পড়িসনি তো?’ কলেজ পালিয়ে তারা তখন লেডিস পার্কে দেখা করে, নৌকো করে ওইপার চলে যায়, নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায় এমন ঘন হয়ে বসে বাদল তার হাত ছোঁয়, বলে—‘তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না কল্যাণী।’ সেই বুক ধুকপুক করা তুমুল সময়ে কল্যাণীর বাবা কোর্টের দাপুটে ম্যাজিস্ট্রেট হরিনারায়ণ রায় একদিন বাড়িতে ঘোষণা করলেন—‘বাঁধাছাঁদা কর, ইন্ডিয়া যাইতে হইব।’ কল্যাণী ফুঁসে উঠেছিল—‘কিসের ইন্ডিয়া? ইন্ডিয়া আমি যাইতাম না।’

এখনও কান পাতলে সদরঘাট থেকে ভেসে আসা স্টিমারের ভোঁও শব্দটি শোনে সে, শব্দটি কি বাতাসে ভাসে নাকি তার বুকের মধ্যে বাজে ওই তীব্র হাহাকার—ছ’ বছর বয়সে কল্যাণী বাবার হাত ধরে স্টিমারঘাটে গিয়েছিল পিসিদের বিদায় দিতে, পিসিরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, পিসিদের চেনা, বাবার চেনা আরও অনেক দেশ ছেড়ে যাবার লোক ছিল স্টিমারে, ঘাট ছেড়ে যাবার জন্য যখন ভোঁ বাজল, আকাশ-ফাটা চিৎকার ভেসে এল স্টিমার থেকে, স্টিমারের তীব্র ভোঁ শব্দ ম্লান হয়ে গেল সেই করুণ কাতর আর্তনাদের কাছে। ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিল পিসি, পিসেমশাই, পিসতুতো দাদা, দুই দিদি। স্টিমার নড়ে উঠতেই, কল্যাণী স্পষ্ট দেখল, ওরা লুটিয়ে পড়ে ডুকরে কাঁদছে। বাবার কাছে সে জিজ্ঞেস করেছিল—‘ওরা কাঁদে কেন বাবা?’ হরিনারায়ণ সার্টের হাতায় চোখ মুছে বলেছিলেন—‘তুই বুঝবি না।’ কলকাতায় নামকরা স্কুল কলেজ আছে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আছে, গড়ের মাঠ, ইডেন গার্ডেন, সাহেবদের বানানো বড় বড় বাড়িঘর, হাওড়া ব্রিজ আছে—তবু যাবার সময় মানুষ কাঁদে কেন এ কথা সে জ্যোতিদাকেও জিজ্ঞেস করেছিল, জ্যোতিদা বলেছিল—‘নিজে যখন যাইবি বুঝবি, যে না যায় সে কখনও বুঝব না যারা যায় তারা কান্দে কেন।’ কল্যাণী যাবার দিন সকালে পালিয়েছিল, শরিফাদের বাড়ির চিলেকোঠায় গুটিসুটি বসেছিল যেন কেউ না দেখে, যেন খুব শিগরি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, যেন তাকে ইন্ডিয়া পাঠাবার ষড়যন্ত্রটি বাতিল হয়ে যায়। কল্যাণী ধরা পড়েছিল হরিনারায়ণের হাতেই, তাকে হিড়হিড় করে টেনে নামিয়েছিলেন তিনি। কল্যাণী একবার তার ঘরের দরজা, একবার বারান্দার থাম, একবার সরলাবালার হাত, একবার তুলসীতলা আঁকড়ে ধরে হু হু করে কাঁদছিল, ঘাট ছেড়ে যাওয়া স্টিমারে অমন মর্মন্তুদ আর্তনাদ কেন ওঠে, কল্যাণী সেদিন বুঝেছিল।

জ্যোতিদা, পরিমল, নীলোৎপল কাকা আর তাঁর মেয়ে বাণীর সঙ্গে কল্যাণীকে ট্রেনে উঠতে হয়েছে, হরিনারায়ণ ময়মনসিংহ জং-এর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে তাঁর পুত্র কন্যা ভাই ভাইঝির উদ্দেশ্যে যখন হাত নাড়ছিলেন তিনি কি জানতেন এদের সঙ্গে এই তাঁর শেষ দেখা! কল্যাণীও কি ভেবেছিল বাদলকে যে সে যে করেই হোক শিগরি ফিরে আসবে কথা দিয়েছে এই কথা সে আর রাখতে পারবে না! শরিফা, শাহানা, মুন্নিকেও কল্যাণী বলেছিল—‘দেখিস পালাইয়া হইলেও চইলা আসব।’ পালাবার সুযোগ কি এই তিরিশ বছরে কল্যাণী পায়নি! নাকি ওদের সে ফাঁকি দিয়েছে, কল্যাণীর মাঝে মধ্যে মনে হয় ফাঁকি আসলে সে নিজেকেই দিয়েছে।

তিলজলায় গাদাগাদি করা কয়েকটি ঘরে উঠেছিল কল্যাণীরা। প্রথম প্রথম তার বড় দমবন্ধ লাগত। মনে হত যেন গাছের পাতা নড়ছে না, হাওয়া বইছে না, কানের কাছে যানবাহন আর মানুষের বিচ্ছিরি চিৎকার, মানুষগুলোর কথা বোঝা যায় না, হাঁটাচলাও কেমন অদ্ভুত, সারাক্ষণ যেন কোথায় দৌড়চ্ছে, বড়মামার মেয়েরা তাকে খুব একটা কাছে ডাকত না, মামি একটি স্কুলে পড়াতেন, সকালে বাড়ি থেকে বেরোবার আগে কল্যাণীকে বলে যেতেন—‘ঘরদোর দেখ কেমন নোংরা হয়ে আছে, ঘরেই তো আছ, একটু ঝাঁট দিয়ে দিও। আর ভাল কথা, কলঘরে আমার একটা শাড়ি রাখা আছে, স্কুলের দেরি হয়ে গেল বলে ধুতে পারলাম না। তুমি স্নানের আগে কেচে দিও।’ কালিবাড়ির বাড়িতে কল্যাণীর যখন তেরো-চৌদ্দ বছর বয়স, সরলাবালা মাঝে মধ্যে মেয়েকে রান্নাঘরে ডাকতেন, বলতেন—‘মেয়ে হইয়া জন্মাইছিস, কাজকাম কিছু না শিখলে চলে?’ শাকসবজি কাটাবাছার কাজ দিতেন কল্যাণীকে, হরিনারায়ণ দেখে একদিন বলেছিলেন—‘মেয়ে আমার লেখাপড়া করবে, তারে দাসী বাঁদি হওয়ার ট্রেনিং দিও না।’ যে মেয়ে নিজের কাপড়ই কখনও কাচেনি, সে কলকাতায় গিয়ে প্রথমে মামির ধীরে ধীরে মামাতো বোনদের কাপড়ও কাচল। রান্নাঘরেও তাকে ঢুকতে হয়েছে, নুন মশলার আন্দাজ ভুল হলে মামি বলেছেন—‘বাঙাল মেয়ে হয়েও রান্না শেখোনি!’ মামাতো বোনরা রান্না খেয়ে ‘ওয়াক’ করেছে, মামি তখন কল্যাণীর পিঠ চাপড়ে বলেছেন—‘ও কিছু না। ক’দিন শিখলেই ঠিক হয়ে যাবে।’ কল্যাণী দেশে চিঠি লিখল—‘বাবা, আমাকে নিয়ে যাও, এখানে আমার কষ্ট হচ্ছে খুব।’ হরিনারায়ণ উত্তরে লিখলেন—‘বায়নাপত্র হইয়া গিয়াছে। বাড়ি বিক্রির আর দেরি নাই। তোমার বড়মামাকে বলিও বাসন্তী দেবী কলেজের চেয়ে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ ভাল হইবে, উহাতে যেন তোমার ভর্তির ব্যবস্থা করেন। জ্যোতির হাতে ননীগোপালকে দিবার জন্য টাকা দিয়াছি। তিনি যেন তোমার এবং পরিমলের খরচ নিয়া চিন্তিত না হন। শরীরের প্রতি নজর রাখিও। আমরা শীঘ্রই আসিতেছি। ইতি তোমার বাবা।’

জ্যোতিপ্রকাশের একটি চাকরি হবার কথা ছিল, এই দিচ্ছি এই হচ্ছে বলে ননীগোপাল তাকে অনেকদিন ঘুরিয়ে শেষে বলে দিলেন, ‘বুঝলে হে জ্যোতিবাবু, হরিদা তো ভাবছেন কলকাতায় বোধহয় এখনও দু টাকা মন চাল, আনায় দু সের ঘি পাওয়া যায়। দিন বদলেছে, চারদিকে যে কী কমপিটিশন তা তো টের পাচ্ছই। আজকাল ঘুষ ছাড়া কোথাও কথা বলার যো আছে? হরিদা আর চিঠিপত্তরও লিখছেন না। দেখ কী করবে, তোমার পিসে তত বেশ দাঁড়িয়ে গেছেন, তাঁর কাছেই বা যাও না কেন। কল্যাণীরও একটা বিয়ে-টিয়ে হওয়া দরকার।’ জ্যোতিপ্রকাশ এরপর পিসের কাছেও গেল না, বাড়িও ফিরল না। হঠাৎ হঠাৎ কল্যাণীর কাছে টাকা চাইতে আসত, ‘দিবিরে দুটো টাকা দিবি?’ কল্যাণী না পারত দিতে, না পারত অমন আমুদে মানুষটির মলিন মুখের দিকে তাকাতে। পরিমলও আগের মত আর দিদির নেওটা নয়, ওর বরং শান্তি সুনীতির সঙ্গে ভাব হয়েছে বেশি। কলেজেও কল্যাণী একা বোধ করত, আনন্দমোহনের গেঁয়ো ছাত্রদের মত। পেছনের বেঞ্চে বসে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত কলকাতার স্মার্ট স্মার্ট মেয়েদের দিকে, জ্যোতিদা যেমন তারাকান্দা মুক্তাগাছা থেকে আসা ছেলেদের ‘বলদ’ বলে খেপাত, ব্রেবোর্নের মেয়েরাও কল্যাণীকে ঠাট্টা করে ‘বাঙাল’ বলত। কল্যাণীর বড় একা লাগত। বাড়িতে শান্তি সুনীতিরা যখন গলা ছেড়ে গান গাইত, তাকে রান্নাঘরে একা বসে আলুর দম নয়ত হিং দেওয়া ডাল রাঁধতে হত, বাড়িসুদ্ধ সিনেমায় চলে গেলে একা কল্যাণীকে বাড়ি পাহারা দিতে হত। তার নিঃসঙ্গতা কেউ ছুঁয়েও দেখত না। রোববার সারাদিন ঘরের ঝুল ঝাড়া, লেপ তোষক রোদে দেওয়া, মশারি-চাদর কাচা, ঠাকুরঘর ধোয়ামোছা আর রাঁধাবাড়ার কাজ করতে করতে অথবা সপ্তাহের বাকি ছটা দিন কলেজ ছুটির পর দুপুরের রোদে পিচ গলে যাওয়া সড়কে ট্রামের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে যখন খুব জলতেষ্টা পেত, দেশের কথা খুব মনে পড়ত কল্যাণীর। দেশের জলের স্বাদ কলকাতার কোনও জলে সে পায়নি।

২. নতুন এয়ারপোর্ট

কল্যাণী এয়ারপোর্টটি দেখে আর অবাক হয়। নতুন এয়ারপোর্ট, কী বড় আর ঝকঝকে! দমদম কি এর ধারে কাছে দাঁড়াতে পারবে? ঢাকার তেজগাঁ এয়ারপোর্ট থেকে প্লেনে চড়ে কল্যাণী একবার চট্টগ্রাম গিয়েছিল মাসতুতো বোনের বিয়েতে, তখন ওই এয়ারপোর্টকেই তার বিশাল মনে হয়েছিল। ছোটবেলার চোখ, তা হয়ত মনে হবেই, যে মাঠকে একসময় জগতের সবচেয়ে বড় মাঠ মনে হয়, পরে সেটিই দেখতে একরত্তি লাগে। ইমিগ্রেশন আর কাস্টমস পার হয়ে কল্যাণী যখন বাইরে এসে দাঁড়ায়, তার বিশ্বাসই হয় না তার তিরিশ বছরের স্বপ্ন আজ সত্যি সত্যিই সফল হল। কল্যাণী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, যেন তিরিশ বছর সে কোনও অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে দম আটকে পড়ে ছিল। দীপনকে বলে—’বুক ভরে শ্বাস নাও তো বাবা, এত ফ্রেশ এয়ার কলকাতায় পাবে না।’

তিলজলার বাড়িতে কোনও গাছপালা ছিল না। একটু সবুজের ছোঁয়া পেতে তাকে যেতে হত গোবরা ঝিলের কাছে, শশিকান্তর বাড়িতে যেমন বিশাল বিশাল বৃক্ষ ছিল, ঠিক তেমন বৃক্ষে ছাওয়া ছিল এলাকাটি। হঠাৎ হঠাৎ তার চোখে পড়ত টুপি পাঞ্জাবি পরা লোকেরা খাটিয়া কাঁধে নিয়ে লোবানের ঘ্রাণ ছড়িয়ে ছড়িয়ে কাছের গোরস্থানে যায়। দেখে তার মনে পড়ে, শরিফার বাবা মারা গেলে এরকম খাটিয়া এসেছিল নিতে। বুড়ো এক লোক শরিফার বাবার ওপর ঝুঁকে তোতাপাখির মত বলে যাচ্ছিলেন—‘লাইলাহা ইল্লাললাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’, গোবরায় খাটিয়া গেলে মৌমাছির গুঞ্জনের মত লাইলাহা শব্দ হত আর কল্যাণীর চোখের সামনে ভেসে উঠত শরিফার নির্বাক চেয়ে থাকা, খাটিয়া কাঁধে নিয়ে আনিস, বুলবুল, কবিরদের গুলকিবাড়ি গোরস্থানের দিকে হেঁটে যাওয়া, যেন সে বিষণ্ণ মুখে তাদের কালিবাড়ির বাড়ির জাম গাছতলায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছে। সে যে কলকাতায়, সে যে গোবরায় একা নিঃসঙ্গ এক মানুষ একথাক সবুজ দেখবে বলে ছুটে এসেছে, তিলজলার স্যাঁতসেঁতে জীবন থেকে পালিয়ে সে যে একটু কেবল হাওয়া চাইত, শীতল একটু হাওয়া—তাকে যে আবার ফিরতে হবে টিমটিমে বাতির বাড়িতে—এ সে ভুলেই বসত। ননীগোপালকে কল্যাণী আগে কখনও দেখেনি, নাম শুনেছিল কেবল। সরলাবালা বলতেন তাঁর ছোটভাই সিভিল সাপ্লাইয়ের কাজ নিয়ে দেশভাগের আগেই কলকাতা চলে গেছে। ওখানে ক’দিন চন্দননগর, ক’দিন মানকুণ্ডু কাটিয়ে বিয়ে-টিয়ে করে সংসারী হয়েছে। তিলজলায় জমি কিনে ঘরও তুলেছে। কল্যাণী যখন তার মায়ের মুখে না-দেখা মামার গল্প শুনত, তার খুব কাছের মনে হত সব কিছু, যেন হাত বাড়ালেই তিলজলা ছাঁওয়া যায়, চাইলেই মামার কোলে কাঁখে চড়া যায়, যেন দেখা হলে মামা তাকে পাহাড় দেখাতে নেবে। বিকেলে কালিবাড়ির ছাদে দাঁড়ালে নদীর ওইপারের আকাশে কালো কালো ছায়া ভাসত। জ্যোতিপ্রকাশ বলত ওই যে দেখা যায় আবছা গারো পাহাড়। ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে ওই পাহাড়ের কাছে একদিন সে যাবেই মনে মনে ভাবত। জ্যোতিপ্রকাশকে বলেছিল, ‘চল নৌকা কইরা ওই পার যাই, দৌড়ে ছুঁইয়া আসি পাহাড়টারে।’ শুনে জ্যোতিপ্রকাশ বলেছে, ‘দূর বোকা, ক-ত দূরে ওই পাহাড়, শম্ভুগঞ্জ তারাকান্দা ফুলপুর তারপর কংশ নদী, কংশ পার হলে হালুয়াঘাট, জয়রামকুরা, তারপর পাহাড়, পাহাড়ের ওই পারে মেঘালয়।’ কল্যাণী অবাক হত অত দূরের পাহাড়কে এত কেন কাছের মনে হয়। তিলজলায় এসে মনে ভাবা কাছের মানুষগুলোকে তার যখন দূরের খুব দূরের বলে বোধ হল জ্যোতিদার কথা কানে বাজত—‘বোকা মেয়ে, দূরের জিনিসকে কী চাইলেই ছোঁওয়া যায়!’

একচিলতে উঠোন ঘিরে টালির ছাদঅলা ঘর ছিল কয়েকটি, দু পশলা বৃষ্টি হলেই এত কাদা হত উঠোনে যে ইট বিছিয়ে হাঁটতে হত। কল্যাণী কাদাকে ‘প্যাক’ বলত বলে শান্তি সুনীতি তো হাসতই, মামিও হাসত। শুনিয়ে শুনিয়ে বলত—‘হাঁস ডাকে প্যাঁক প্যাঁক।’ ওরা উচ্চারণে এত ভুল ধরত যে কল্যাণী কথা বলতেই লজ্জা পেত। ওখানে বেঁচে থাকতে হলে যে ওদের মত চলা-বলা রপ্ত করতে হবে তা সে ঠিকই বুঝেছিল। বাড়িতে, বাড়ির বাইরে তার মুখের ‘আইছিলাম গেছিলাম’ নিয়ে তাকে কম অপদস্থ হতে হয়নি। সে চোরকে চুর বলে, কাটারিকে দাও, বাড়িকে বাসা—অবসরে এসবই ওদের হাসিরসের খোরাক ছিল। কল্যাণী আর পরিমল যে ঘরের মেঝেয় ঘুমোত, সে ঘরে একটি চৌকি পাতা ছিল, ওতে কখনও সৌমিত্র, কখনও তার বুড়ো দিদিমা ঘুমোত। সৌমিত্র দিনে লেকমার্কেটের দোকানে বসত, রাতে নাইট কলেজে ল’ পড়ত। শান্তি সুনীতির মত কল্যাণীকে ঘিরে সে ফড়িং ফড়িং নাচত না। প্যাঁক প্যাঁক বলেও হাসত না। কথাও কম বলত। কল্যাণীকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল—‘তোমাদের দেশের ওরা তো উর্দু বলে তাই না?’

কল্যাণী বলেছিল—পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা বলে।

—আর ইস্টের নন-বেঙ্গলিগুলো?

—ইস্টে আবার নন-বেঙ্গলি কোত্থেকে আসল?

—আই মিন মুসলমানরা?

—ওরা উর্দু কইব কেন? ওরা তো বাঙালি!

—বাঙালি? সৌমিত্র যেন অসম্ভব একটি সংবাদ শুনেছে এমন মুখ করে তাকিয়েছিল।

দেখতে ভালমানুষ এই ছেলেই, একরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে কল্যাণী দেখে, তার শরীরে হাত বুলোচ্ছে; সে ছিটকে সরে আসতে গেলে সৌমিত্র তাকে শক্ত হাতে চেপে ধরে, পেটিকোটের ফিতে ধরে টান দেয়, আতঙ্কে কল্যাণীর গলায় স্বর বেরোয় না। সে দুহাতে যতটুকু কুলোয় সৌমিত্রকে গা থেকে ঠেলে সরিয়ে পরিমলের দিকে গড়িয়ে গিয়েছিল, দ্রুত শ্বাস পড়ছিল তার। যে ঝিঁঝিঁ ডাকা রাতে নিজের মামাতো ভাই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই রাত পার হয়ে যখন সকাল হয়, কাক ডাকে, সূর্য ওঠে, সকলে কাজে বেরোয়, তখন ডাকপিয়ন সরলাবালার চিঠি দিয়ে যায়। চিঠিতে লেখা— ‘মা কল্যাণী, আশা করি কুশলেই আছ। মামার বাড়িকে আপন বাড়ি মনে করিয়াই থাকিবে। যাহা খাইতে ইচ্ছা করে খাইবে। লজ্জা করিও না। তোমার বাবা নিয়মিত ননীগোপালের কাছে লোক মারফত টাকা পাঠাইতেছেন, তোমাদের যাহাতে ভবিষ্যতে কোনও অসুবিধা না হয় তিনি তাহারই চেষ্টা করিতেছেন। নিরাপত্তার জন্যই তোমাদের কলকাতায় পাঠাইয়াছি, বিশেষ করিয়া তোমার। মেয়ে বড় হইলে বাপ-মা’র যে কী দুশ্চিন্তা হয়, তুমি যখন মা হইবে বুঝিবে। মন দিয়া পড়াশুনা করিও। তুমি নিরাপদে আছ ইহা ভাবিয়া আমরা শান্তি পাই। ননীকে চিঠি লিখিতে বলিও। পরিমলকে দেখিয়া রাখিও। অনেকদিন তোমার চিঠি পাই না, চিঠি দিও। মন খারাপ হইলে শান্তি সুনীতির সাথে বেড়াইতে বাহির হইও। জ্যোতির কোনও খবর পাইলে জানাইও।

তোমার বাবার প্রেসার বাড়িয়াছে। ডায়বেটিস ধরা পড়িয়াছে। বাড়ি বিক্রির কাজ আপাতত বাদ দেওয়া হইয়াছে। তোমার বাবা সুস্থ হইলে আমরা চলিয়া আসিব। আমাদের জন্য চিন্তা করিও না।

ইতি তোমার মা।’

চিঠিটি মাত্র একবার পড়েই ছিঁড়ে ফেলেছিল কল্যাণী। ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি তাকে ভোগায় বেশ, জন্মের মাটি ছেড়ে, নিজের ঘরবাড়ি চৌদ্দ পুরুষের ভিটে ফেলে এক অচেনা অদ্ভুত দেশের উদ্বাস্তু হয়ে কী নিরাপত্তা সে পেয়েছে—আজ যদি এই প্রশ্ন সে করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হরিনারায়ণ রায় এবং তাঁর স্ত্রী সরলাবালা দেবীকে? কি জবাব তাঁরা দেবেন যদি সে জানিয়ে দেয় তিলজলায় তিল তিল করে তাকে বোবা কালা বধির করে দেবার গল্প? যে কল্যাণী রুই কাতল ইলিশ ছাড়া খেতে বসে নাক সিঁটকাতো, সে এখন মুখ বুজে এক চিমটি কুচো চিংড়ি দিয়ে ভাত মাখায়। কী নিরাপত্তা তবে পেয়েছে কল্যাণী, যদি বিধর্মী মুসলমান যুবকদের ধর্ষণ থেকে বাঁচবার জন্য ভিন শহরের এঁদো গলিতে এসে তাকে স্বজন দ্বারাই ধর্ষিতা হতে হয়!

দেশ থেকে আসা চিঠিপত্রও কল্যাণীর হাতে সব আসত না। হরিনারায়ণ এক চিঠিতে লিখলেন ‘পাঁচটি চিঠি লিখিয়াও তোমার কোনও উত্তর পাই নাই।’ পাঁচটির মধ্যে হয়ত সে একটি পেয়েছে। একদিন সৌমিত্রর সার্ট ধুতে গিয়ে দেখে বুকপকেটে বাদলের একটি চিঠি! একটি চিঠির অপেক্ষায় সে কত দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী কাটিয়েছে। বাদল তাকে আজও মনে রেখেছে, আজও সে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে একা বসে থাকে, চোখের সামনে ডিঙি নৌকো দুলতে দুলতে যায়, আর সে তার স্মৃতিগুলো চোখের জলে ধুয়ে বুকের কৌটোয় তুলে রাখে। কলঘরে দাঁড়িয়ে চিঠি পড়তে পড়তে কল্যাণীর বুক ভেঙে কান্না নামে, কান্নার শব্দ বাড়িতে যদি কোনও অঘটন ঘটায় সে কল ছেড়ে দেয় যেন জলের শব্দের তলে সেটি হারিয়ে যায়। তিলজলার জীবনকে নিয়তি মেনে সে তার পালিয়ে আসবার ইচ্ছেকে ধীরে ধীরে লালচক্ষু কসাইয়ের মত কাটে। কল্যাণী পালিয়ে আসতে পারত না বলেই কি আসেনি নাকি চরম অনিশ্চয়তার কাছে তার হাসি-আনন্দ, সুখ-স্বপ্ন সব বিকিয়ে দিয়েও সে বাবা-মাকে ‘নিশ্চিন্তি’ দিয়েছে!

বিচ্ছেদের অভিমান তাকে এত বেশি ছেয়ে ফেলেছিল যে হরিনারায়ণ, সরলাবালা, শরিফা, মুন্নি, অনিলকাকা, বাদল—কারও চিঠির উত্তর সে দেয় না। বড়জোর ভাল আছি ধরনের দায়সারা চিঠি লিখে গা বাঁচায়। হ্যাঁ গা-ই বাঁচায় বৈকি। যে গা বাঁচাবার জন্য তাকে প্রিয় শহর, প্রিয় নদীর কোল থেকে ছুঁড়ে ফেলা হল—সেই গা-ই তো তার বাঁচানো উচিত।

রাতে রাতে একটি নীল নেকড়ে তাকে তাড়িয়ে ফিরত। পায়ে কুটো পড়লেও চমকে উঠত সে। লজ্জায় বেদনায় আশঙ্কায় সঙ্কোচে সে এত কুঁকড়ে থাকত যে মনে হত এই পাপ তারই, জন্মের পাপে তার উড়োখুড়ো এই জীবন। জোনাকির পেছনে যে মেয়ে দৌড়োয়, সেই মেয়েকেই রাত হলে ঝোপঝাড়ে লুকোতে হয়েছে। সে এত সেঁধিয়ে থাকত নিজের ভেতর, কারও চোখের দিকে চোখ তুলত না। অনির্বাণ সেই ক্ষুদ্র, সীমাবদ্ধ, একলা জীবন থেকে তাকে হঠাৎই উদ্ধার করে। উল্টোডাঙায় পিসির বাড়িতে দেখা, ঠিক পিসির বাড়ি নয়, পিসি উঠেছিল তার ননদের বাড়ি, সেই ননদের বাড়িতে; ননদের ছেলে নিমাই, তারই বন্ধু অনির্বাণ, শ্যামলা গায়ের রঙ, চোখে হাই পাওয়ার চশমা, ছ’ফুটের কাছাকাছি লম্বা, ঘন ঘন সিগারেট ফোঁকে—কল্যাণীর মুখের দিকে পলকহীন তাকিয়েছিল, কী নাম, কোন কলেজে পড়া হয়, কোথায় থাকা হয় জিজ্ঞেস করবার পর বলল—‘আপনি খুব লাজুক নয়ত কথা কম বলেন।’ কল্যাণী বলেছিল—‘কেন বলুন তো!’ অনির্বাণ হেসে বলেছিল—‘এই দেখুন আপনি কিন্তু এখনও আমার নাম রাঘব বোয়াল কি না, আমি ঘোড়ার ঘাস কাটার কাজ করি কি না কিছুই জানতে চাননি।’ পরে নিজে থেকেই অনির্বাণ বলেছে—‘অধমের নাম অনির্বাণ দাশ, গড়িয়াহাটের ব্যাঙ্কে কাজ করি।’ এর দিন সাতেক পর কল্যাণী বাসস্টপে একা বসে বাসের অপেক্ষা করছিল, আর তখনই রোদে ভিজে অনির্বাণ আসে, কল্যাণীকে দেখে ওর চোখে আনন্দ উপচে পড়ছিল, পিসির বাড়িতে আর যাওয়া হয় কি না, নিমাই কেমন আছে এসব সৌজন্য দ্রুত সেরে বলল—‘সেদিন বাড়ি ফিরে আপনার কথা খুব মনে পড়েছে।’ কল্যাণী বলল—‘আমি তো কথাই তেমন বলিনি!’ অনির্বাণ হেসে বলল—‘আপনার না-বলা কথাগুলো।’ এরপর প্রায়ই দুজনের দেখা হয় ট্রামে বাসে রাস্তায়, কল্যাণী তখন বাঙাল-জিভের জড়তা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে, দিবামকে দোবো, নিবামকে নোবো, করেন বলেন চলেনকে করুন বলুন চলুন, নাস্তাকে জলখাবার, দাওয়াতকে নেমন্তন্ন দিব্যি তার রপ্ত হয়ে গেছে। দেখা হলে অনির্বাণের সঙ্গে সে অনর্গল কথা বলে। অনির্বাণ প্রায়ই ভুলে যেত যে কল্যাণী পশ্চিমের মেয়ে নয়। একদিন সে কল্যাণীকে বলে—‘চলুন কোথাও বসা যাক,’ ব’লে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে তাকে নিয়ে যায়, নিরালা দেখে বসে, বলে—‘জীবন খুব ছোট, তাই না কল্যাণী?’

কল্যাণী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল—‘আমার কাছে জীবন খুব দীর্ঘ মনে হয়। যেন কাটছে না। যেন দিন যাচ্ছে না। এই জীবন কোনও রকম ফুরিয়ে গেলে বাঁচি।’

—বল কী, তুমি তো হতাশায় ভুগছ।

কল্যাণী ম্লান হাসে।

অনির্বাণ একদিন বলল—চল সিনেমা দেখি।

কল্যাণী তখনও কলকাতার কোনও ছবিঘরে যায়নি। শান্তি সুনীতিরা মাঝরাত অব্দি সিনেমার গল্প করত, কল্যাণী ওইসব গল্পের কতক বুঝত, কতক বুঝত না। এক রোববারে মৌলালির মোড়ে বাস থেকে নেমে হেঁটে গিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় বসল দুজন। অনির্বাণ অর্ডার দিল ব্রেস্ট কাটলেট। কল্যাণী বুঝে পেল না জিনিসটি কী। খেতে গিয়ে সে একটু দ্বিধায় পড়েছিল। অনির্বাণ হেসে বলল—‘এই কাটলেট ভাজলে বাদামি হয়, বুঝলে! ব্রেইজড কাটলেট।’ নিজের কাটলেট থেকে একটুকরো কল্যাণীর মুখে তুলে দিয়ে সে বলল—‘ভালবাসাকে শেষ অব্দি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেতে হল, কী বল?’

—রাস্তা থেকে? নাকি নিমাইদের বাড়ি থেকে?

—ও এক কথাই।

—ছুঁড়ে ফেলে দিলেই হয়।

—ওইসব ছোঁড়াছুঁড়িতে আমি নেই। যা পেয়েছি সেইটুকুতেই খুশি আমার মন।

কল্যাণীর বড় ভাল লেগেছিল দেখতে উদাস উদাস ভেতরে গোছানো মানুষটিকে। সেদিন ‘প্রাচী’তে দুজন ঘন হয়ে বসে ছবি দেখল আর হল খানিকটা আঁধার হলেই অনির্বাণ যখন হাত রাখছিল তার সরু সরু আঙুলগুলোয়, তার তখন এমনও মনে হয়েছে স্বপ্নকে দূরের করে রাখলে আবছা হয়ে যায়, না হয় নাগালের মধ্যে কিছু সুখ আসুকই মাঝে মধ্যে।

অনিবার্ণকে ভুলে থাকবার উপায় ছিল না। একদিন বলল—‘আজ ব্যাঙ্ক হলিডে, চল গড়িয়া যাই।’ গড়িয়া থেকে জয়নগর মজিলপুরের বাসে চড়ে অনিবার্ণ সারা পথ ভালবাসা হলে মন উড়ু উড়ু করে, কাজে মন বসে না, গোনায় ভুল হয় বারবার—এসব শোনাল। জয়নগরের অপেরা হাউস ঘুরে দেখতে গিয়ে কল্যাণীর খুব মুক্তাগাছার জমিদার জীবন কৃষ্ণ আচার্যের নাটমন্দিরের কথা মনে পড়ছিল। জ্যোতিপ্রকাশ বলত—এই যে দেখছিস ঘোরানো স্টেজ, এখানে আগে নাচ হত, নাটক হত; জমিদাররা পায়ের ওপর পা তুলে বসে নাটক দেখতেন।

হঠাৎ একদিন, কল্যাণী নিজেও জানে না কেন, দেখতে সে ফর্সা বলেই কি না, তার শরীরের গড়ন আঁকবাঁক চমৎকার বলেই কি না, অথবা সে সোজা-সাপটা কথা বলে, মনে কোনও প্যাঁচ-গোচ নেই বলেই কি না অনির্বাণ তাকে একদিন বলা নেই কওয়া নেই বলে বসে—‘চল কোর্টে যাই, বিয়ে করি।’

বিয়ে শব্দটি শুনে ধুলোর ঝড় যেমন বয়—ডাল-পাতা মুচড়ে নিয়ে যায়, তেমন তছনছ ঝড় বইছিল তার ভেতরে কোথায় যেন। ভেতরে কোথায় যেন একটি পাথর এসে থেমেছিল, ঝড়ে উড়ে বাদল নামের একটি নিঃসঙ্গ পাথর।

অনির্বাণ তাড়া দিত—ওদিকে কিন্তু নবদ্বীপের মেয়ে দেখা প্রায় সারা, বাড়িতে তোমার কথা তুলেছিলাম সামান্য, বৌদি বলেছে রিফিউজি-টিফিউজি চলবে না। অগত্যা গান্ধর্ব মতে চল দেখি কিছু করা যায় কি না। দেরি করলে শেষ অব্দি নবদ্বীপেই সাতপাক ঘুরতে হয় কি না কে জানে!

সে কারণেই যে কল্যাণী দেরি করেনি তা নয়। তিলজলার অন্ধকার ঘরে গাদাগাদি শুয়ে সারারাত ঢিপঢিপ করে বুক বাজবে, কেউ একটু পাশ ফিরলেই চমকে তাকাবে, পায়ের কাছে বেড়াল এসে বসলেও ধড়ফড় করে উঠে বসবে, ভোর না হওয়াতক শ্বাস বন্ধ করে পড়ে থাকবে—এমন আর কতদিন! কল্যাণী তাই আপত্তি করেনি। বিকেলে সে পার্ক সার্কাসে দুটো টিউশনি করত, টিউশনির টাকা উঠিয়ে গড়িয়াহাট থেকে দুটো শাড়ি কেনে। নতুন শাড়ি পরে বাড়ি থেকে বেরোবার সময় পরিমলকে বলে—‘জ্যোতিদার কাছে পারলে চলে যাস।’ জ্যোতিপ্রকাশ বর্ধমানে কাপড়ের ব্যবসা করে, পিসি একদিন বলেছিল। গায়ে গায়ে লেগে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে এ শহর যে কত বেশি দূরত্ব তৈরি করেছে—তা কল্যাণী তার সমস্ত একাকীত্ব দিয়ে টের পায়। ময়মনসিংহের বাড়িতে জ্যোতিপ্রকাশ, পরিমল আর সে তাসের ম্যাজিক নিয়ে হো হো করে হাসত, আড্ডায় পড়ে দুপুরের খাওয়ার কথা ভুলে যেত, পুকুরে বড়শি ফেলে সারা বিকেল তিনজোড়া চোখ পাতাকাঠির দিকে স্থির তাকিয়ে থাকত—এমন মনেই হয় না। যেন জন্ম থেকেই যোজন দূরত্ব নিয়ে তাদের বয়স বেড়েছে।

বিয়ে জিনিসটি যে খুব মূল্যবান কিছু—এ সে মন থেকে মুছেই অনিবার্ণকে বিয়ে করতে গিয়েছিল। হরিনারায়ণ মাঝে মধ্যে বলতেন—‘আমার একটাই মেয়ে, এই মেয়েকে আমি ব্যারিস্টারি পড়াইবাম, মেয়ের বিয়া এমন ঘটা করে দিয়াম যে পুরা শহরের লোক কইব শহরে একটি বিয়া হইতাছে বটে, জামাইকে আমি ঘরজামাই রাখবাম।’ কেবল বেঁচে থাকবার জন্য যে নোংরা তাকে ঘাঁটতে হয়েছে, যে আপস সে করেছে নির্মম নিষ্ঠুর মানুষের সঙ্গে, তার মত আদরে আহ্লাদে বড় হওয়া মেয়ের পক্ষে এ কী করে সম্ভব হল—কল্যাণী অবাকই হয়। কল্যাণী এখন জানে জীবন কী জিনিস। ব্রহ্মপুত্রের হাওয়ায় ভাসা জীবন নয় এটি। এখানে একটি আস্ত মানুষের চেয়ে ঘসা একটি সিকির দাম বেশি। দেশ থেকে যেদিন টেলিগ্রম এল হরিনারায়ণ গত হয়েছেন, কল্যাণী সেদিনই বুঝেছিল এ বাড়ির পাট তাকে শিগরি চুকোতে হবে। ততদিনে ব্রেবোর্ন থেকে তার বি. এ. পাশ হয়েছে, ব্যারিস্টারি হয়নি। আর স্বয়ং হরিবাবুই যখন ইহজগতে নেই তখন ‘ঘটা’র বিয়ের আশা বাদ দিয়ে চেনা-শোনা কেউ নেই এমন ঘরে কোর্টের উকিলের সামনে অনির্বাণকে স্বামী স্বীকার করে রেজিস্ট্রি খাতায় সই করেছে।

বিয়ে হয়ে গেল। জীবন যেভাবে গড়ায়, সেভাবে গড়াল। বড়মামা, মামি, পিসি, পিসেমশাই, নীলোৎপল কাকাকে একদিন অবসরমত প্রণাম করেও আসা হল। মামি বললেন—‘কেমন ফাঁকি দিয়ে চলে গেলি। তোর বড় বোনগুলোরই বিয়ে বাকি রয়ে গেল। একটু ভাবলি ওদের কথা!’ কল্যাণ নিঃশব্দে হেসেছে। সে কী শান্তি সুনীতিকে ফাঁকি দিয়েছে, নাকি নিজেকেই দিয়েছে ফাঁকি, নিজের পুষে রাখা স্বপ্নকে সে কায়দা করে ঠকিয়েছে! কী লাভ হয়েছে তার এতে! বাদলের সঙ্গে রিক্সায়, নৌকোয়, ঘাসে বসে যখন গল্প করত, লজ্জায় আনন্দে মুখ তার রঙিন হয়ে উঠত, বুকের মধ্যে রিমঝিম রিমঝিম করে সুখের বৃষ্টি হত। কই অনির্বাণের সঙ্গে গায়ে গা লেগে বসেও ওরকম তো কখনও লাগেনি! কেউ দেখে ফেলবার ভয় ছিল না, যখন তখন বেরিয়ে যেখানে খুশি সেখানে চলে যাওয়া যেত। ঘরের কাজ সারা হলে আর কল্যাণী কোথায় যায় কি করে এ নিয়ে হল্লা করেনি মামি, তা ছাড়া কল্যাণী টিউশনি করে, তার তো যেতেই হবে বাইরে, টিউশনিতে তো তার আপত্তি চলে না। আপত্তি করবেই বা কেন, গুনে গুনে অর্ধেকের বেশি টাকা তো মামির হাতেই দিতে হত। অনির্বাণের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্বিঘ্নে কেটে গেছে ঘুরে বেড়িয়ে। বাদলের ব্যাপার অন্যরকম, বাদলের বেলায় বাড়িতে বলতে হত কলেজে প্র্যাকটিক্যাল আছে, নয়ত বান্ধবীর জন্মদিন। সাতদিন আগে থেকে জানা থাকত কবে তারা কোথায় যাবে, দিন ঘনিয়ে আসত আর বুকের ধুকপুকুনি বাড়ত। লুকিয়ে প্রেম করবার আলাদা একটা স্বাদ আছে, কল্যাণীর তাই মনে হয়। নদী-ঘেরা, বৃক্ষ-ঘেরা, পড়শি-ঘেরা, স্বজন-ঘেরা প্রাণবান একটি জীবনকে যদি আচমকা কোনও ঝড়ো হাওয়া নিরুদ্দেশে উড়িয়ে নেয়, তবে তার ভাবনার সংসারে ধুলো আর ঝরাপাতা ছাড়া থাকে কী! কোথায় শরিফা—কোথায় তার গা ছুঁয়ে ফিরে আসবার কথা দিয়ে আসা, কোথায় বাদল—কোথায় তার সঙ্গে জীবন গড়বার স্বপ্ন, ডিঙি নৌকোয় বসে তার থই থই কণ্ঠে গাওয়া ‘কোথায় পাব কলসি কইন্যা কোথায় পাব দড়ি। তুমি হও গহীন গাঙ, আমি ডুইবা মরি’ কলকাতার হাওয়ায় ধুলোর মত উড়ে গেছে। বিয়ের পর টালিগঞ্জের একটি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি জোগাড় করে নিয়েছে, চাকরিটি পেতে জুতোর সুকতলা থেকে শুরু করে মাংস মেদ মেধা সব তার খরচা গেছে। সেই স্কুলের কাজে তাকে একবার বনগাঁ যেতে হয়েছিল। বনগাঁয় হাঁটতে হাঁটতে সীমান্তের অনেকটা কাছে যখন চলে আসে, দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থেকে তার হঠাৎ, সে জানে না, বুকের মধ্যে হু হু করে ওঠে। ওইতো আকাশ—একই তো আকাশ—হাত বাড়ালেই ছোঁওয়া যায় এমন—ওই আকাশের তলে তার স্বপ্নরা এখন কেমন আছে—কেমন আছে বাদল শরিফা মুন্নি অনিলকাকা রুখসানা—কেমন আছে তার জন্মের শহর-বাড়িঘর-ব্রহ্মপুত্র—এখনও কি তার মত কোনও দুরন্ত উচ্ছল বালিকা মাঠ জুড়ে কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলে, সেই বালিকার চোখে কানামাছির রুমাল বেঁধে তাকে কি এখনও পৃথিবীর নিষ্ঠুর লোকেরা দেশান্তরী করে?

জ্যোতিপ্রকাশ গিয়েছিল হরিনারায়ণের মুখাগ্নি করতে, গিয়ে পায়নি। দেরি হচ্ছে বলে পাড়ার লোকেরাই দায়িত্ব নিয়ে নেয়, তা নেবে না কেন, অসুখ হলে যারা হাসপাতালে নিল, ডাক্তারের পেছন পেছন দৌড়ল, ওষুধপথ্য খাওয়াল, শিয়রের কাছে রাত জেগে বসে রইল, লাশ ঘরে রেখে তারা পচতেই বা দেবে কেন—‘বলো হরি হরি বোল’ বলে কাঁধে তুলে শ্মশানে নিয়ে গিয়েছে হরিনারায়ণের নিস্পন্দ শরীর। অনিল মুখার্জির ছেলে সৌমেন চিতা জ্বালবার কাজ সেরেছে। সরলাবালাকে কলকাতায় নিয়ে আসবার অনেক চেষ্টা করেও জ্যোতি সফল হয়নি। ‘জীবনের বাকি কয়টা দিন স্বামী শ্বশুরের ভিটায় কাটাইতে দে, আমি আর বাঁচবই বা কয়দিন! আমারে নিয়া টানা হেঁচড়া আর না করলি।’—এসব বলে সরলাবালা কাঁদছিলেন, জ্যোতিপ্রকাশকে অগত্যা একাই ফিরে আসতে হয়েছে। পরে যখন সরলাবালারও খবর এল, জ্যোতিপ্রকাশ যায়নি, বলেছে—‘শ্মশানঘাটে যেতে আমার ভাল লাগে না। জ্যেষ্ঠ ছেলে হবার এই বিপত্তি—মুখে জল দেবার যো নেই, আগুন দিয়ে ফিরতে হয়।’ কল্যাণী যেতে চেয়েছিল, অনির্বাণ বলেছে—‘তুমি যাবে কী, তোমার তো এডভান্সড স্টেজ!’

দেশ থেকে অনিল মুখার্জির চিঠি আসে—‘তোমরা আসিয়া বাড়িটির একটি ব্যবস্থা কর। দরজায় তালা লাগাইয়া দিয়াছি। আমার বয়স হইয়াছে। চোখে ভাল দেখি না। সব দিক সামলাইতে পারিব না। এইভাবে বাড়ি ফেলিয়া রাখা ঠিক না। বাড়িটি বিক্রি না করিলে পরে বেদখল হইবার আশঙ্কা আছে। ভগবান তোমাদের মঙ্গল করুন।’

কল্যাণী জ্যোতিপ্রকাশকে বাড়ি বিক্রির কথা জানালে সে বর্ধমান থেকে চিঠি লিখে জানায়—নিজের হাতে ওই বাড়ি আমি বিক্রি করতে পারব না। এতটা পাষণ্ড আমি এখনও হইনি। আমার অত টাকার দরকার নেই যে স্মৃতিগুলো সের দরে কারও কাছে বেচে আসব। তার চেয়ে পড়ে আছে থাক, মনে মনে জানব যে আছে, ওখানে আমাদের কিছু হলেও আছে।

পরিমলকে বলাতে বলল—ওখানে শুনছি শত্রু সম্পত্তি আইন করেছে। দেশ ছাড়লে সরকার জায়গা-জমি নিয়ে নিচ্ছে। কী দরকার ঝামেলায় গিয়ে, ও বাড়ি এনিমি প্রপার্টির ভয়ে কেউ কিনবে না এখন।

—হ্যাঁরে পরিমল, আমাদের প্রপার্টি বুঝি এনিমি প্রপার্টি! আমরা দেশের শত্রু ছিলাম?

পরিমল আর কথা বাড়ায় না। চলে যায়। তার ব্যস্ততাও বেড়েছে। একটি অ্যাড ফার্মে কপি লিখবার কাজ করে। পরিমল খুব প্রয়োজন ছাড়া কল্যাণীর বাড়িতে আসত না। থাকত নাকতলায়। জ্যোতিপ্রকাশের কাছে যায়নি যে তা নয়, গিয়ে দেখেছে ঠিকানা দশ ফুট বাই দশ ফুট, অর্ধেক রাত অব্দি পাড়ার লোক নিয়ে সে ঘরে বসে জুয়ো খেলে। জ্যোতিপ্রকাশ রাখঢাক না করে পরিমলকে বলে দিয়েছে—‘এ বাড়িতে থাকলে তুই মানুষ হবি না, তা ছাড়া আমার নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তার চেয়ে বরং কল্যাণীর কাছে যা।’ কল্যাণী একদিন অনির্বাণকে বলেছিল—‘আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে কী যে মিল ছিল! পূর্ণিমায় আমরা সারারাত ছাদে বসে গান গাইতাম। লোকে বলত দুই পাতা এক কুঁড়ি। এখন তো বছরেও একবার দেখা হয় না। পরিমলটা কী খায় কোথায় থাকে, শুকিয়ে দড়ি দড়ি হয়ে গেছে। আমাদের এখানে তো এসে থাকতে পারে, কী বল?’

অনির্বাণের মুখের দিকে বড় আশা নিয়ে তাকিয়েছিল কল্যাণী। অনির্বাণ তাকে সরাসরি বলেনি পরিমলকে এ বাড়িতে এনো না। বলেছে—‘তিলজলায় থেকে তো দেখেছই জীবন কী টাফ। এভরিওয়ান শুড স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স। কলকাতায় কত লোক ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে তা জানো?’

কল্যাণী এর সরল উত্তরটি বুঝে নিয়েছে।

দশটা-পাঁচটা চাকরি করে, সংসার সামলে, বাচ্চা জন্ম দিয়ে—লালন করে, স্বামীর আদেশ-আবদার সয়ে, ছোটখাট সুখ দুঃখে অনেকগুলো বছর কল্যাণী পার করে দিয়েছে। জয়িষার জন্মের আগে তিনবার স্পনটেনিয়াস এবরশন হয়েছে তার, অনির্বাণ তখন এমন মুখ করে থাকত যেন দোষ কল্যাণীরই, গত জনমে সে কোনও পাপ করেছিল, গত জনম বলতে কল্যাণীর ময়মনসিংহের জীবনই হয়ত বোঝায়। এরপর জয়িষা হলেও অনির্বাণের মন অত ভরেনি, দীপন হলে যত ভরেছে। জয়িষার পর দীপন হতে সময় লেগেছে বারো বছর। এই বারো বছর কম মেজাজ করেনি অনিবার্ণ। কিন্তু ছেলে পেটে না এলে কী-ই বা করবার ছিল কল্যাণীর! ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেছেনও যে বাচ্চা না হবার কোনও কারণ নেই, ধৈর্য ধরুন, হবে। তবু তর সইত না অনির্বাণের। মাস মাস জিজ্ঞেস করত—কী এবারও কি লাল পতাকা উড়িয়েছ?

কল্যাণীর লজ্জা হত শুনে। যেন ছেলে না হবার সব দোষ কল্যাণীর, ছেলে না জন্ম দিলে সংসারে যে মেয়েমানুষের কোনও মূল্য নেই তা সে ভাল বুঝতে পেরেছিল। জয়িষা তরতর করে বাড়ছিল। ওর লেখাপড়া, নিজের চাকরি এসব নিয়ে কল্যাণী ব্যস্ত থাকত তবু অনির্বাণের দীর্ঘশ্বাস তাকে রাতে রাতে ঘুমোতে দিত না। জয়িষাও বুঝত তাকে দিয়ে মন তেমন ভরছে না বাবার। একটি ছেলের আশায় অনির্বাণের মত আধুনিক ছেলে তারাপীঠ পর্যন্ত দৌড়েছে। শ্বশুরবাড়ির লোক এসে চুক চুক দুঃখ করে যেত, বলত—‘বউ-এর কোনও শক্ত অসুখ আছে কি না কে জানে!’ কল্যাণী এসব কথায় ফিরে না তাকালে কি হবে অনিবার্ণ কিন্তু ছাড়ত না। বংশের বাতি জ্বালবে কে, জয়িষাকে বিয়ে দিলেই পর হয়ে যাবে, আপন তবে কে থাকল—এসব নিয়ে মাঝরাত অব্দি অনির্বাণ আর দশটা সাধারণ মানুষের মত হা-পিত্যেস করত। দেখে কল্যাণী কতবার বলেছে—আমি কি এখন ছেলে বানাবো?

—না, তা বানাবে কেন? মা’র বয়স হয়ে গেছে। নাতির মুখ যদি দেখে যেতে পারেন তাই ভাবছি।

—জয়িষার মুখ তো দেখেছেনই তোমার মা, তাতে হবে না?

—ও তো নাতনি। নাতির মুখের কথা বলছি। মায়েরা নাতির মুখ দেখতে চান সে তো জানই।

কল্যাণীর তখন মনে পড়ত সরলাবালা নিজের মেয়ের বিয়ে, নাতি-নাতনি কিছুই তো দেখে গেলেন না। সেই যে মেয়ে পার করলেন বাষট্টিতে। চার বছর পর নিজে মরলেন। তাঁর কি নাতি দেখবার কোনও বাসনা ছিল না মনে? মেয়ে তাঁর পড়ালেখা করবে, জজ ব্যারিস্টার হবে, কালো কোট পরে বাবার মত কোর্টে যাবে, এরকম স্বপ্ন হরিনারায়ণের মত সরলাবালাও দেখতেন। এসব স্বপ্নের চাপে নাতির মুখ দেখবার ইচ্ছে তাঁর কতটুকু টিকে ছিল কে জানে। দীপন জন্মাবার পর ঝাড়গ্রামে যত কাছের দূরের আত্মীয় ছিল অনির্বাণের, ভেঙে পড়েছে কলকাতার বাড়িতে। যেন বাঁজা একটি মেয়েমানুষের বাচ্চা হয়েছে, একে না দেখলে চলে না। ছেলের হাত পা ঠিক ঠিক আছে কি না, জোড়া শক্ত কি না, বুকের শ্বাস সময়মত পড়ছে কি না এসব পরখ করে যেত আত্মীয়রা। অনির্বাণের সঙ্গে দীর্ঘ সংসার জীবনে বড় কোনও খিটিমিটি বাঁধেনি কল্যাণীর, আপসের একটি অভ্যেস সে কলকাতার ভাষার মত রপ্ত করেছিল বলেই হয়ত। তিলজলা থেকে বেরিয়ে সুস্থ একটি জীবন সে যাপন করছে—নিজেকে সে এমন বোঝাতে চেয়েছে অনেক। সে খুব নিমগ্ন হতে চাইত বিষয়-আশয়ে কিন্তু তার মন ঘুরত দূরে দূরে। সংসারে একটি ছেলে জন্ম দেওয়ায় কল্যাণীর মান কিছু বেড়েছিল, আদর করে তাকে চুড়ি মালা দিয়ে যেত অনেকেই, এমনও বলত তোমার নারীজন্ম সার্থক হয়েছে গো। এসব সে শুনত, কিন্তু মনে যেন ঠিক স্পর্শ করত না কিছু। জীবন তো তার আর হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি যে সে যে কোনও কিছুতে আহ্লাদিত হয়ে উঠবে! উদ্বাস্তুর জীবন ঘরদুয়োর পেল, বাঁধা একটি চাকরিও জুটল, সব পেয়েও তবু তার মনে হত কী যেন কী পাওয়া হয়নি। কল্যাণী মনে যেন শুনত পেছন থেকে তাকে কেউ ডাকছে। সে নিজেও এলোপাতাড়ি খুঁজে বেড়াত কী বা কে তাকে এত ডাকে। পেছনে কিসের ডাক তার গুছিয়ে তোলা জীবনকেও হঠাৎ হঠাৎ এলো করে দেয়। প্রায় সবটুকু জীবন কাটিয়ে এসে কল্যাণীর এই বোধ জন্ম নেয় জীবন আসলে বৃক্ষের মত, বৃক্ষ যেমন এক মাটি থেকে উঠে নতুন মাটিতে ডালপালা-পত্র-পুষ্প মেলে আগের মত বাঁচে না, জীবনও তেমনি, কেটে যায় হয়ত, কিন্তু বড় এক ফাঁকি থেকে যায়।

গড়িয়াহাট, কাঁকুড়গাছি, টালিগঞ্জ ঘুরে ঘুরে শখের জীবন এসে থেমেছে সল্টলেকে। ঝাড়গ্রামের দুটো ধানি জমি বিক্রির টাকার সঙ্গে আরও কিছু টাকা যোগ করে সল্টলেকে আড়াই কাঠা জমি কিনেছে অনির্বাণ। সেই জমিতে প্রথম যেদিন কোদালের কোপ পড়ে, কল্যাণী বলেছিল—গেটের দুপাশে মাধবীলতা লাগাতে হবে।

এ আর এমন কী, মাধবীলতা দুর্লভ কিছু নয়। ক্যাকটাস হত, খুঁজে পেতে সময় লাগত। অনির্বাণ বলেছিল—ঠিক আছে, দেখি।

এর দিন দুই পর অনির্বাণ একদিন মাঝরাতে জল খেতে উঠে দেখে কল্যাণী জেগে আছে, কি ব্যাপার ঘুমোওনি বলতেই সে বলল—তুমি বুঝবে না অনির্বাণ, কালো গেটের ওপর সবুজ পাতা ছাওয়া লাল মাধবীলতা কী অপূর্ব লাগে!

—এত রাতে তুমি মাধবীলতার কথা ভাবছ!

আহ্লাদি বউ স্বামীর কাছে যে সুরে শাড়ি-গয়না চায় কল্যাণী সেই সুরে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষে নারকেল সুপুরির গাছ পুঁততে হবে কিন্তু। মনে মনে বলল—আর জানালার পাশে একটি কামিনী গাছ। জায়গা থাকলে একটি পুকুরও কাটা যায়। পুকুরের ধারে যদি কাঠগোলাপের একটি গাছ থাকে, জলের ওপর শাদা শাদা ফুল পড়ে ভাসতে থাকবে আর ফাঁকে ফাঁকে লাফিয়ে উঠবে খলসে মাছ।

অনির্বাণ পাশ ফিরে একটু বিরক্ত হয়েই জবাব দিয়েছিল—নারকেলের শেকড় বড্ড ছড়ায়, বাড়ির ফাউন্ডেশনে ক্ষতি করবে।

কল্যাণী অনির্বাণের দিকে ঝুঁকে বলল—কী যে বল ছাই, আমাদের বাড়িতে কি ফাটল ধরেছিল? আম জাম তাল লিচু নারকেল সুপুরি কী ছিল না সেখানে?

বুকের মধ্যে অবচেতনেই যে স্বপ্ন সে লালন করে, সেটি যখন সব দেওয়াল ভেঙে সামনে দাঁড়ায়, কল্যাণী এতই ঘোরে থাকে যে সে বোঝে না সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সে বোঝে না কলকাতার স্রোতে ভাসা কচুরিপানার জীবনে মাথা গুঁজবার ঠাঁই পাওয়াই যেখানে ঝক্কির ব্যাপার, সেখানে নারকেল সুপুরির বাগান করা একরকম বিলাসিতাই বটে—এত মাটিই বা কোথায়, আর এত সময়ই বা কার আছে!

পল্যুটেড কলকাতায় কল্যাণী হাওয়া খুঁজে বেড়াত। মুক্ত হাওয়া। কোথাও গাছপালা দেখলে দু দণ্ড থামত। জয়িষা যখন ছোট, ভাড়াবাড়ির একচিলতে বারান্দা পাতাবাহারের টব দিয়ে ভরে ফেলেছিল কল্যাণী। দেখে অনির্বাণ বলেছিল—এই কবুতরের খোপেও হাঁটাচলার জায়গা বন্ধ করে দিলে!

—বাচ্চাটা নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। কলের ধোঁয়া ওর কচি ফুসফুস কালো করে দিচ্ছে।

—আমরা সবাই তো এই হাওয়ায়ই বড় হলাম।

—তুমি বড় হয়েছ। আমি হইনি। আমার চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ ছিল, আমি খোলা হাওয়া পেয়েছি, একেবারে নদী থেকে উঠে আসা। আমাদের ওখানে মানুষ তাই বাঁচেও বেশিদিন। ঠাকুরদা বেঁচেছিলেন একশ পাঁচ বছর। ওই বয়সে ওঁর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে পঁচিশের যুবকরাও হেরে যেত।

অনির্বাণ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলেছিল—পঁচিশের যুবকরাই বা হারত কেন? ওরা তো ওখানেরই লোক। ওরা কি হাওয়া খায়নি?

কল্যাণী বিষণ্ণ মুখে বলেছিল—তা হয়ত খেয়েছে তবে আমাদের বাড়ির কথা আলাদা।

—ও তাই বল। অনির্বাণ বাঁকা ঠোঁটে হাসত।

দীপন বড় বড় শ্বাস নেয়। কৈশোরে বৌচি খেলতে গিয়ে দম নিয়ে দৌড়বার আগে যেমন শ্বাস নিত কল্যাণী, এখনও তেমন টেনে শ্বাস নেয়। এই শ্বাসের সঙ্গে মুক্ত হাওয়া আসে, সুগন্ধ আসে, ঝেঁপে স্মৃতিও আসে।

৩. অনির্বাণ মেদিনীপুরের লোক

অনির্বাণ মেদিনীপুরের লোক, কড়া হিসেবি। টাকা হাতে এলে কল্যাণী দু হাতে খরচা করে ফেলে বলে কল্যাণীর সঙ্গে বড় বাধে ওর। দীপনকে একটির জায়গায় দুটো জামা বা জুতো কিনে দিলেই ও বলে—কী দরকার ছিল। খামোকা পয়সা খরচা।

—না হয় কিছু পয়সা খরচা করলামই। তোমাদের ঘটিদের কিপ্টেমি নিয়ে আমি আর পারছি না গো!

কল্যাণী রাগ করে।

—বাঙালরা বুঝি খুব উদার?

—হ্যাঁ উদারই তো। বাড়িতে ভাল কিছু রান্না হলে পাড়া-পড়শিকে না খাইয়ে মুখে খাবার উঠত না। কারও গাছের ফল কেউ কাউকে না দিয়ে খাইনি। পুকুরের মাছ তুলে কখনও একা খেয়েছি এরকম মনে পড়ে না। কত মাছ উঠত; বড় বড় শোল টেংরা পুঁটি শিং কৈ, আহা চেপা শুটকির ভর্তা কতদিন খাইনি। শরিফা ফ্রক বানালে একরকম দুটো বানাত, একটি আমার একটি ওর। ঝাড়গ্রামের মানুষ তোমরা, এসবের বুঝবে কী, কেবল শিখেছ অন্যকে ঠকিয়ে কী করে নিজের পেট ভরা যায়। শরিফার বড় ভাই বিয়ে করতে গিয়েছিল হাতির পিঠে চড়ে, লাখ টাকার সাজবহর নিয়ে, বিয়েতে দু হাজার লোকের নেমন্তন্ন ছিল। দুদিন ধরে আমরা বিয়েবাড়িই সাজিয়েছিলাম। আর তুমি যে বিয়ে করলে, সাকুল্যে খরচা হল ষাট কী পঁয়ষট্টি টাকা।

অনির্বাণ হেসে জিজ্ঞেস করে—আর কী কী করতে তোমরা?

—ঝড়ের রাতে দল বেঁধে শিল কুড়োতাম। বৃষ্টি ভিজে জ্বর এলে পড়শিরা কমলালেবু আর আঙুর নিয়ে জ্বর দেখতে আসত, ডাক্তার ডেকে আনত, শিয়রে বসে কপালে জলপট্টি দিত, তোমাদের দেশে এমন পড়শি পেয়েছ?

কল্যাণীর চোখে আনন্দ চিকচিক করে।

—পড়শিদের কারও সঙ্গে প্রেম-ট্রেম হয়নি?

—এ কথা কেন জিজ্ঞেস করছ?

—এত টান কি আর ব্রহ্মপুত্রের জন্যই নাকি আর কোনও মনুষ্যপুত্র-টুত্র…

—তুমি ক্রিটিসাইজ করছ?

—না তা কেন।

—তোমাকে আসলে বোঝানোর উপায় নেই অনির্বাণ, মানুষ তো এখানে এসে অনেকই দেখা হল, কই আমার দেশের মত সরল সোজা ভালমানুষ তো দেখি না।

—এত যখন ভাল, তবে আর এলে কেন দেশ ছেড়ে?

—সে কি আর শখে এসেছি?

অনিবার্ণ তাকে মাঝে মধ্যেই খোঁচায়। বলে—তোমাদের গাছের পেয়ারা তো লোকেরা চুরি করে খেয়ে ফেলত।

—-সে তো লক্ষ্মীপুজোয়!

—পরিমল তো বলে কারা নাকি ঢিলও ছুঁড়ত তোমাদের বাড়ি!

—বাজে কথা। ঢিল ছুঁড়বে কেন।

কল্যাণী কপাল কুঁচকে উত্তর দেয়।

—পাড়ার লোকেরাই নাকি?

অনির্বাণ আবার প্রশ্ন করে।

—পরিমল ডাহা মিথ্যে বলে। পাড়া-পড়শি ঢিল ছুঁড়বে? পারলে জীবন দেবে।

—চৌষট্টির দাঙ্গায় কিছু হয়নি তোমাদের?

—ও তো বাঙালি বিহারিদের দাঙ্গা। বাঙালি বাঙালিতে হয়নি কিছু। মফস্বলে কোথাও বোধহয় কিছু হয়েছিল, আমরা টের পাইনি।

—তুমি তখন কলকাতায় না?

—কলকাতায়, তাতে কি? বাবা মা ছিলেন তো, যখনের খবর তখনই পেয়েছি।

তিরিশ বছর কল্যাণী তার বুকের মধ্যে গাছপালা-ঘেরা ছায়া সুনিবিড় একটি দোতলাবাড়ির সামনে অপর পাড় দেখা যায় না এমন বিশাল স্রোতময় ব্ৰহ্মপুত্রকে লালন করেছে। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বালুর ঘর বানানো, জলে দাপাদাপি খেলা, পাড় ঘেঁষে দিগন্তের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড়, হু হু হাওয়ায় চুল উড়িয়ে নেওয়া আর সন্ধের মুখে হাঁটু অব্দি ধুলো মেখে বাড়ি ফেরা তার এখনও মনে হয় এই সেদিনের ঘটনা। এখনও তাকে নিবিড় স্পর্শ করে কোঁচড় ভরে শিউলি কুড়োনো ভোর, ধোঁয়া ওঠা ভাপাপিঠে, দল বেঁধে রাধাসুন্দরী স্কুলের দিকে হেঁটে যাওয়া, দু পয়সায় মালাই আইসক্রিম কেনা, ঘুঙুর পরে ঝুমঝুম হেঁটে যাওয়া চানাচুরঅলাকে পটিয়ে বাকিতে এক ঠোঙা চানাচুর খাওয়া, কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে বায়স্কোপ দেখা, শীতের রাতে মাঠে ইট বিছিয়ে বসে পাবলিসিটির বোবা ছবি দেখা।

দীপনের স্কুল সামারের ছুটি। সে মায়ের সঙ্গে দেশ দেখতে যাবে গোঁ ধরেছে। কল্যাণী ভেবেছিল অনিবার্ণও আসবে। অথচ অনির্বাণ কোনও উৎসাহ দেখায়নি, এত গল্প শুনেছে, কল্যাণী খানিকটা অন্যমন হলেই বলেছে ‘বাড়ির কথা ভাবছ বুঝি, মাইরি বড় দেখতে ইচ্ছে করে তোমাদের সেই অট্টালিকা, বাগানবাড়ি’—-একটু বাড়িয়েই হয়ত বলেছে তবু তো বলেছে—ইচ্ছে করলে আসতে পারত, শরিফাদের বাড়িতে থাকা, অনিলকাকা, সৌমেন, মুন্নি, সেলিম, রুখসানাদের সঙ্গে দেখা হওয়া, তা ছাড়া কল্যাণীদের বাড়িঘর কোথায় ছিল, কেমন ছিল তার শৈশব কৈশোর—তার খেলার মাঠ, নদী—অনির্বাণের তো ফি বছর পুরী যাওয়া চাই, একবার যাত্রাটির মোড় একটু ঘুরিয়ে দিলে এমন কী হয়! মাত্র আধ ঘণ্টার উড়ান দূরত্ব! হাওড়া যেতেও তো এর চেয়ে সময় বেশি লাগে। কল্যাণী যখন স্কুলে বেতন পেতে শুরু করে, নিজের উপার্জনের ওপর কিছু হলেও দাবি করা যায় বলে তার মনে হয়, তখন থেকেই তার থেকে থেকেই বলা ‘চল যাই একদিন চল না যাই।’ সে তো আজকের কথা নয়, জয়িষার জন্মেরও আগে থেকে। আর সেই জয়িষার এখন আঠারো বছর বয়স। অনির্বাণ প্রথম দিকে বলত—‘সংসার ফেলে কী করে যাবে বল, কে সামলাবে এসব।’ পরে বলত—‘বাচ্চাটা আরও বড় হোক তারপর যেও।’ বাচ্চা বড় হলে বলেছে—‘পাসপোর্ট টিকিটের ঝামেলা—খামোকা এত পয়সা খরচ করবে কেন, কী আর দেখার আছে ওখানে বল, কেউ নেই কিছু নেই পথঘাট চিনবে না, যাওয়ার চিন্তা বাদ দাও বরং।’ অনির্বাণ কী বুঝবে সেখানে কি আছে কি নেই। সে এও বলত ‘ঘুরতে চাও তো দার্জিলিং ঘুরে এস, ভাল লাগবে।’ কল্যাণী হাসত শুনে। শেষ দিকে অনির্বাণ বলেছে—‘ওখানে যাওয়াটা তোমার ঠিক হবে না, পলিটিক্যাল সিচ্যুয়েশন ভাল না।’ কল্যাণী বুঝেছিল অনির্বাণ তাকে কোনওদিনই বলবে না, চল যাই, বা যাও ঘুরে এস। শেষে যখন কল্যাণী সিদ্ধান্ত নিয়েই নিল সে যাবেই, অনির্বাণ প্রথম হ্যাঁ না কিছু বলেনি, পরে বলেছে—‘ছুটি পেলে আমি ঠিকই যেতাম তোমার সঙ্গে, অফিসে যে কী রাজ্যির ঝামেলা, তুমি বরং দীপনকে নিয়েই যাও। জয়িষার এম. এ. ফাইনাল সামনে, আমি গেলে ওর একা লাগবে।’ ইচ্ছে করলে অনির্বাণ সঙ্গে আসতে পারত। ময়মনসিংহ নিয়ে তার কোনও আবেগ কাজ করে না বলেই হয়ত আসেনি। অনির্বাণ কিন্তু কল্যাণীকে ঝাড়গ্রামে নিয়ে যায়, ঘুরে ঘুরে দেখায় এই আমার শোবার ঘর, এই মাঠে খেলেছি, আর ওই যে লাল ইটের দালান ওটি আমার ইস্কুল ছিল। এই যে দেখছ আমবাগান, এখানে বসে আমরা গান গাইতাম। কল্যাণী মগ্ধ চোখে অনির্বাণের শৈশব কৈশোর ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে।

টালিগঞ্জ ছেড়ে এখন বিধান সরণী স্কুলে পড়ায় কল্যাণী। সল্টলেকে স্থায়ী হবার পর এই স্কুলে এসেছে, আগের চেয়ে বেতন এখানে ভাল। সংসারে খরচা করেও কিছু সে জমাতে পারে। ছ’ মাস জমিয়ে দুটো পাসপোর্ট, দুটো টিকিট আর একশ ডলার অবধি পেরেছে, অনির্বাণের কাছে সে একটি টাকাও চায়নি। চাইলে হয়ত না করত না। কল্যাণী ভেবেছিল যাবার আগে অনির্বাণ নিজেই আগ বাড়িয়ে কিছু দেবে। ওর থেকে হাজার দুই পেলে জয়িষাকেও সঙ্গে আনা যেত। কল্যাণী পনেরো দিনের ছুটি নিয়েছে, অনির্বাণ শুনে চোখ কপালে তুলে বলেছে—‘তোমার কী মাথা খারাপ, এত দিন তুমি বিদেশে থাকবে?’ অনির্বাণের ভুল শুধরে বলেছে সে—বিদেশে নয়, আমার দেশে থাকব।

—একাই যাবে নাকি?

—দীপনকে নেব।

—দীপনের প্রি-টেস্ট না কি ছিল যেন সামনে?

—সে দেরি আছে। আরও আড়াই মাস বাকি।

—বাংলাদেশ যাবে, আজকাল ও দেশে কেউ যায়? তা ছাড়া আমি বুঝি না কে আছে ওখানে তোমার যে যেতে চাইছ।

—সে তুমি বুঝবে না অনির্বাণ।

—তোমার কথা তো কেবল তুমিই বোঝ। আমাকে কি আর বুঝতে দেবে? নিজে যা ভাল মনে কর, কর। আমার কী!

—তোমার কিছু না? এতকাল তো সব ব্যাপারে তোমার কিছু ছিল, যখন আমার বাড়ি যাবার সময় হল তখন বলছ তোমার কিছুই না?

—তোমার বাড়ি আবার কি? কে ওখানে তোমার জন্য বাড়ি সাজিয়ে রেখেছে শুনি?

—আবারও বলছি অনির্বাণ, তুমি এসব বুঝবে না। এ তোমার ঝাড়গ্রাম নয় যে তুমি নেই তো সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

—ঠিক আছে যাও। শখ মেটাও গিয়ে।

—তাই মেটাব। কেন ভাব যে আমার কোনও শখ-টখ নেই? কেন ভাব আমার কোনও বাড়িঘর নেই। ভিটেমাটি নেই। তুমি যেমন তোমার মাকে দেখতে মাস মাস ঝাড়গ্রাম যাও, আমারও তো কোথাও যেতে ইচ্ছে করে। আমারও তো কাউকে দেখতে ইচ্ছে করে।

—তোমার মা তো আর নেই, তিনি থাকলেও কথা ছিল।

—মা মারা গেছেন। তাই বলে কি মা’র রেখে যাওয়া জিনিসপত্তর কিছু নেই? শরিফারা নিশ্চয়ই প্রিজার্ভ করেছে কিছু। তা ছাড়া অনিলকাকা, তিনি কি আর বাড়িটা আগলে রাখছেন না!

কল্যাণী বুঝে পায় না অনিবার্ণ এত নাক সিটকায় কেন? সে কি ঈর্ষা করে? হতে পারে। ঈর্ষা ছাড়া এ আর কী? তিরিশ বছর কল্যাণী তার বুকের স্বপ্ন বুকেই রেখেছে। বিয়ে হল, মেয়ে হল, সেই মেয়ে স্কটিশচার্চ থেকে মাস্টার্স করছে, সংসারের ঝামেলা কল্যাণীর অনেকটাই দূর হয়েছে, তারপরও তার সময় হয় না কোথাও যাবার, সংসার তাকে এমনই আটকেছে। আসলে অনির্বাণের গোয়ার্তুমি তাকে এতদিন সংসার এবং সীমান্ত কোনওটাই পার হতে দেয়নি। চুল আঁচড়াতে গিয়ে আজকাল পাকা চুল চোখে পড়ে কল্যাণীর, বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে, তবে কি সময় ফুরিয়ে আসছে! তবে কি একটু একটু করে শ্মশানের দিকে এগোতে হবে তার? শ্মশান শব্দটি শুনলে তার গা হাত পা কেঁপে ওঠে। কোন শ্মশানে সে যাবে, কেওড়াতলা? নিমতলা? নাকি ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে শম্ভুগঞ্জ ব্রিজের তলে যে শ্মশান, ওতে? যেখানে ঠাকুরদা ঠাকুরমা জ্যাঠামশাই বাবা কাকা মা’র চিতা জ্বলেছে! হঠাৎ হঠাৎ সে বলেও অনির্বাণকে যে আমি মরলে আমাকে ওখানেই রেখে এসো।

অনিবার্ণ বলে—ওখানে মানে?

—ওখানে মানে যেখানে জন্ম। জন্ম মৃত্যু এক মাটিতে হওয়াই ভাল।

—মরলে তুমি তো আর মানুষ থাকবে না। মস্ত বড় এক বোঝা হবে। তুমি ভাবলে কি করে যে সেই বোঝা কাঁধে করে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া যাবে!

—আরেক দেশ আরেক দেশ করো না তো অনির্বাণ। রাগ ধরে।

—তবে কি এক দেশ বলব?

—সেদিন তো আগরতলা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত হেঁটে এলে। মাটির কোনও রং দেখেছ আলাদা? ঘাসের রং? ভাষা পেয়েছে আলাদা? পোশাক-আশাক? নিজেই বললে এপারের গাছ থেকে ফুল ঝরছে ওপারে, ওপারের পাখি আসছে এপারে। দুপারের গরু ছাগল দুপারেই যাচ্ছে আসছে। কেবল যে মানুষের বেলায় আপত্তি উঠছে সে তো জেনে বুঝেই এলে। তারপরও ফাঁক পেলেই আলাদা আলাদা বল কেন?

—তুমি কি ইতিহাস অস্বীকার চাও? অনির্বাণ চোখের চশমাটি খুলে টেবিলে রাখে। আজকাল উত্তেজিত হয়ে গেলে সে চোখের চশমা আর চোখে রাখে না।

একশ ডলার ভাঙিয়ে টাকা করে নেয় কল্যাণী। ট্যাক্সি-স্কুটারের লোকেরা ঘিরে ধরে তাকে। ময়মনসিংহে কী করে যেতে হবে জিজ্ঞেস করলে ওরা একযোগে বলে—‘মহাখালির বাসস্ট্যান্ড থেইকা বাসে উঠবেন, ব্যস সোজা ময়মনসিংহ, কোনও থামাথামি নাই।’ ময়মনসিংহের কথা ভাবতে বড় নির্ভার লাগে তার। সে একটি স্কুটার নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যায়। এখানকার কারুকে আগে থেকে সে জানায়নি কিছু, আসবার কথা জানিয়ে একটি পোস্টকার্ডও ছাড়েনি। কল্যাণী আসছে জানলে ওরা নিশ্চয়ই এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে আসত। তার চেয়ে এই ভাল হঠাৎ চমকে দেওয়া। এতদিন পর কল্যাণীকে দেখে নিশ্চয়ই সারা পাড়ায় হইচই পড়ে যাবে, মাত্র ক’দিনের জন্য আসা, তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি না হয়েই যায় না। একবার সে চট্টগ্রামে মাসির বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল, কথা ছিল এক মাস থাকবে কিন্তু তের দিনের মাথায় তাকে ফিরে আসতে হয়েছিল কারণ ময়মনসিংহ থেকে খবর এল শরিফার নাওয়া খাওয়া বন্ধ—তার নাকি কিছুই ভাল লাগে না। ফিরে এসে তের দিনের অদর্শন-শোক ঘোচাতে দু মাস মত সময় লেগেছিল। চট্টগ্রামে কী কী দেখল—পতেঙ্গা বিচ, ফয়েজ লেক, পোর্ট, পাহাড়—সব গল্প করতে হল—জামগাছে হেলান দিয়ে ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশের মেঘ দেখতে দেখতে তারা কত কথা বলত তবু কথা ফুরোত না। দীর্ঘ তিরিশ বছরের গল্প তবে ক’দিনে শেষ করবে সে?

কল্যাণীকে যেদিন চলে আসতে হয় দেশ ছেড়ে, শরিফা ধুলোয় গড়িয়ে কাঁদছিল, তাকে ছুঁয়ে সে বলেছিল একদিন যে করেই হোক ফিরে আসবে। আজ এতদিন পর শরিফা তাকে দেখে কী বাকরুদ্ধ হবে না? জীবন ফুরিয়ে এ তার কেমন ফিরে আসা—ভাবতে ভাবতে কল্যাণীর চোখ ভেসে যায় চোখের জলে। স্কুটারে বসে দীপনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে কল্যাণী বলে—‘এই দেশটা আমার, জানিস তো দীপন?’ দীপন মাথা নাড়ে অর্থাৎ সে জানে। কল্যাণীর গা কাঁপছে। গলাও শুকিয়ে এসেছে। তার আসলে জল খাওয়া চাই। দেশের জল। দীপনের চোখ-মুখ খুশিতে নাচে, বলে—দেখেছ মা, গাড়ির নম্বর প্লেটগুলোও বাংলায় লেখা। আর সাইনবোর্ডগুলোও বাংলায়।

—হ্যাঁ তাই তো থাকবে, এখানে সবাই বাংলায় কথা বলে। সবাই বাঙালি।

—সবাই বাঙালি? আমাদের ওখানে তো সবাই বাঙালি না!

—তোমাকে বলিনি এ দেশের মানুষ ভাষা আন্দোলন করেছে বাহান্নোয়? একাত্তরে যুদ্ধ করেছে? ওরা সবাই যেন বাংলায় কথা বলতে পারে—তাই তো করেছে যুদ্ধ। বলতে বলতে এই দেশের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধায় তার মাথা নুয়ে আসে।

—তা হলে আমরা যুদ্ধ করি না কেন? দীপন জিজ্ঞেস করে।

—কি করে করবে, ওটা তো অনেক বড় দেশ! অনেক ভাষা, অনেক মানুষ!

দীপন চারপাশে মুগ্ধ চোখে তাকায়, বলে—নতুন দেশে এসেছি মনেই হয় না, তাই না মা?

দীপনের বিস্ময় এবং আনন্দ দেখে কল্যাণী তাকে আরও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে। এ যেন তার অবোধ শিশুকাল, তার দুরন্ত কৈশোর, তার শরিফা, তার বাদলকে জড়িয়ে ধরা। ফুটবে বলে একটি কলি ছিল বুকে সেটি দীর্ঘদিন জল হাওয়া না পেয়ে বুকেই মরে ছিল, আজ সেই মরা ফুল কার জাদুস্পর্শে শত পাপড়ি মেলে ফোটে! কল্যাণীর হৃদয়ে একটি উচ্ছল ঝর্ণা বইছে। কী সুন্দর প্রশস্ত পরিচ্ছন্ন পথ, দুপাশে কৃষ্ণচূড়া আর দেবদারুর সারি। এই দেশ নতুন দেশ হবে কেন! হরিনারায়ণ বলতেন বয়সকালে হাতে পয়সা এলেই গিলে করা পাঞ্জাবি আর ফিনফিনে ধুতি কিনতে তিনি কলকাতা চলে যেতেন। কারও তো দিনের বাজার-সওদাটাও কলকাতার না হলে চলত না। কাঁচাগোল্লার লোভে মালদহের লোক চলে আসত নাটোরে। দেশ তো একটিই ছিল, কল্যাণীর জন্মও একটি অখণ্ড দেশে। ভাগ কর, সীমান্তে চৌকি বসাও—এসব ঘটেছে কল্যাণী যখন খুব ছোট, তখন। বুদ্ধি হবার পর সে দেখেছে হরিনারায়ণ বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে গড়গড়ায় টান দিতেন, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন—সরলা, বড় সব্বনাশ হইয়া গেল, বড় সব্বনাশ। ভারত ব্রিটিশ তাড়াইল ঠিকই, নিজেরে টুকরা কইরা তাড়াইল।

কল্যাণী দেশভাগের সবটুকু যন্ত্রণা নিজে ভোগ করেছে। সে বোঝে হরিনারায়ণ কেন দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। এই দেশ থেকে উর্দুঅলা মুসলমানদের তাড়ানো হল, নিজের দেশ থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে তবে কেন চলে যেতে হয়েছিল হিন্দুদের? মুসলমানের হোমল্যান্ড না হয়ে দেশ তো শেষ পর্যন্ত বাঙালিরই থেকে গেছে। দেশটি তিরিশ লাখ বাঙালির রক্ত দিয়ে গড়া। কল্যাণী এই ভেবে গর্ব অনুভব করে, ভারত যারা ভেঙেছিল, যারা এই দেশকে মুসলমানের হোমল্যান্ড করেছিল, যাদের কূটবুদ্ধি এই দেশের মানুষকে দেশছাড়া করেছে, তাদের গালে কড়া একটি থাপ্পড় মেরেছে একাত্তরের পাকিস্তানি খেদানো যুদ্ধ, প্রমাণ করেছে এই দেশ বাঙালির, মুসলমানের নয়; ভাষা এখানে বড়, ধর্ম নয়।

দীপন আনন্দে হাততালি দেয়, বলে—কী সুন্দর তোমার দেশ মা। এত সুন্দর দেশে আমরা সবাই কেন থাকি না?

কল্যাণীরও এই এক প্রশ্ন এত সুন্দর দেশে সবাই মিলে থাকি না কেন? এই দেশ ছেড়ে তাকে কেন চলে যেতে হল? সে কি এই দেশে বাস করবার যোগ্য ছিল না? কী তার অপরাধ ছিল যে তাকে জন্মের মাটি ছেড়ে পালাতে হয়, সে কি খুনের আসামি ছিল? সে কী এমন অপরাধ করেছিল যে তাকে এত বড় শাস্তি পেতে হয়েছে! কই শরিফাকে তো কোথাও পালাতে হয়নি, সে তার স্মৃতি আর স্বপ্নের গভীর নিকটে বাস করছে। তাকে তো রাতভর কাঁদতে হয়নি ব্রহ্মপুত্রের জল ছোবার তৃষ্ণায়, তাকে তো খেলার মাঠ—-মার্বেল লাটিম পুতুল—কাঠগোলাপের কোনও গাছ হারাতে হয়নি। তাকে তো হারাতে হয়নি একটি তিরতির জলের পুকুর, যে পুকুরের জলে চোখ রাখলে দেখা যায় সারাদুপুর সাঁতার কাটা শিশুকাল, কৈশোর। তাকে তো হারাতে হয়নি কামিনীফুলের সেই গাছ, সেই জাম, পেয়ারা, আম, কাঁঠাল আর নারকেল সুপুরির বন! তাকে তো হারাতে হয়নি ট্রেনের পুঁ-ঝিকঝিক শব্দ! হারাতে হয়নি আচার চুরি করে গুমটিঘরে বসে থাকা দুরন্ত সেই দিন! সেই গুমটিঘর, সেই ট্রেন, সেই মাঠ, সেই পুকুর, গাছ, ব্রহ্মপুত্রে কি তার অধিকার কিছু কম ছিল? তবে?

কল্যাণীর ইচ্ছে করে স্কুটার থামিয়ে মাটিতে নামতে। মাটি তুলে সারা গায়ে মাখতে। এই মাটির প্রতি ভালবাসা তাকে আর কোনও মাটিকে নিজের ভাবতে দেয়নি। এক মাটিতে মন পড়ে থাকলে আরেক মাটিতে বুঝি মন বসে! এক মন মানুষ ক’জনকে দেবে! দেশের হাওয়া কল্যাণীর চোখ মুখ ধুয়ে দেয়। ‘আহ’ বলে একরকম সুখের ধ্বনি করে সে। তার এই সুখধ্বনি দীপনকেও স্পর্শ করে, সে তার মায়ের গা ঘেঁষে বলে—চল একটা সারপ্রাইজ দিই বাবাকে, আমরা আর ফিরব না জানিয়ে।

কল্যাণী হেসে বলে—ওর কাছে এটা কোনও সারপ্রাইজ নয়, বরং ফিরে গেলেই ও অবাক হবে।

দীপন হাসে। কত আর বয়স ওর। তবু ও বুঝতে পারে এই দেশ নতুন কোনও দেশ নয়। অথচ অনির্বাণের এই বোধটুকুও জন্মায়নি। ওর জন্য একরকম করুণাই হয় কল্যাণীর। মানুষটা কি পাথর দিয়ে গড়া? হবে হয়ত। কলকাতার প্রায় মানুষকে তার পাথর পাথর লাগে। মায়া নেই, কিছু নেই। যে যার স্বার্থের ঘোলা জলে সারাদিন নাক ডুবিয়ে পড়ে থাকে। দেখতে দেখতে ঘেন্না ধরে গেছে কল্যাণীর। আসলেই তার আর ফিরতে ইচ্ছে করে না স্বার্থপর মানুষের ভিড়ে, তার আর হাঁটতে ইচ্ছে করে না ঘিঞ্জি কলকাতার রাস্তায়। সেদিন পাশের বাড়ির বৌদি, দিনরাত গায়ে পড়ে ভালবাসতে আসেন, আর কল্যাণী ট্যাক্সি মেটাতে গিয়ে খুচরো ছিল না বলে পাঁচটি টাকা চাইল, তাতেই এমন ভাব করলেন তিনি যেন কল্যাণীকে চেনেন না, যেন কোথাকার কোন হাভাতে ভিক্ষুক এসেছে দয়া চাইতে। বললেন—টাকা? টাকা তো নেই।

বাসস্ট্যান্ডে ঢাকা টু ময়মনসিংহ লেখা মিনিবাস দাঁড়িয়ে ছিল, কল্যাণী একটিতে ওঠে। বাসে যাত্রী বসা পনেরো-ষোলো জন। ওরা নিজেদের মধ্যে যে ভাষায় কথা বলে, কল্যাণী জানে এটি ময়মনসিংহের ভাষা। তার স্কুলের হেডক্লার্কের বাড়ি ময়মনসিংহে ছিল জানবার পর সে ফাঁক পেলেই তাঁর অফিস-ঘরে যায়, বলে—‘আপনার কাছে এলে দেশের গন্ধ পাই, দেশের ভাষায় চলুন দুজন কথা বলি।’ হেডক্লার্ক সম্ভবত বুঝে পান না শেকড় উপড়ে চলে এলেও কী আর থাকে পেছনে যে বারবার ঘাড় ঘুরে তাকাতে হয়। লোকটি একবার টাকাপয়সার ঝামেলায় পড়েছিলেন, কল্যাণী নিজের কাজ ফেলে তাঁর ঝামেলাটি মেটাবার জন্য লেগে থাকে; বোর্ড বসে, কল্যাণী সেই বোর্ডে হেডক্লার্কের পক্ষে জোর চ্যালেঞ্জ করে। অনিবার্ণকে জানালে বলেছে—‘অনর্থক তুমি এই ঝামেলায় জড়ালে, লোকটি ঠিকই টাকাপয়সা এদিক-ওদিক করেছে, আর তুমি কি না দিব্যি একটি ডিসঅনেস্টকে সাপোর্ট করে বসলে!’ কল্যাণী বলেছে—‘ডিসঅনেস্ট হবে কেন, ময়মনসিংহের লোক…।’

যাত্রীদের ‘আইবাম যাইবাম খাইবাম, আইছুইন গেছুইন’-এর মিঠে সুর তাকে টেনে নিয়ে যায় মেছুয়াবাজারের গলিতে, বিদ্যাময়ীর মাঠে, পুরোহিতপাড়ার পুকুরঘাটে। কল্যাণী মনে মনে দৌড়ে ফেরে কাচিঝুলি থেকে কেওয়টখালি, স্টেশন রোড থেকে পুলিশ লাইন, আকুয়ার তিনকোণা পুকুর থেকে স্বদেশিবাজার। পেছনে তার ফ্রক উড়তে থাকে, উড়তে থাকে ফিতে বাঁধা দুই বেণী।

বাসের লোকগুলো তার নিজের দেশের লোক। তার জন্মের শহরে ওদের বাস। ওদের সবার প্রতি কল্যাণী অদ্ভুত এক টান অনুভব করে, দু-একজনকে জিজ্ঞেসও করে—আপনারা হরিনারায়ণ রায়কে চেনেন, কালিবাড়ির হরিনারায়ণ, সেই যে বড় একটি মাঠ, গাছপালা-ঘেরা দোতলা বাড়ি, দোতলায় ওঠার লোহার সিঁড়ি। এখন কারা থাকে বাড়িটিতে?

ওরা মাথা নাড়ে। জানে না।

দীপনকে কিছু কলা বিস্কুট কিনে দেয় কল্যাণী। ও খুব মন দিয়ে যাত্রীদের কথা শোনে আর ফিসফিস করে কল্যাণীর কান তার মুখের কাছে নামিয়ে জিজ্ঞেস করে—ওরা এভাবে কথা বলে কেন?

—এটা হচ্ছে ময়মনসিংহের ভাষা। আমাদের অরিজিনাল ভাষা।

—বুঝেছি এটা হল বাঙাল ভাষা।

—কে বলল তোমাকে?

—তীর্থ আছে না আমার বন্ধু? ওর ঠাকুরমা এরকম কথা বলে। তীর্থ আর ওর বোন নম্রতা বলে, কী যে বাঙাল ভাষায় কথা বলে ঠাকুরমা আমরা কিছু বুঝি না।

—বাঙাল আবার কী? এ হচ্ছে বাংলা ভাষা। কিছু কিছু আঞ্চলিকতা তো থাকেই। কলকাতার সঙ্গে চব্বিশ পরগনার, চব্বিশ পরগনার সঙ্গে মুর্শিদাবাদের দেখবে খুব সামান্য হলেও পার্থক্য আছে। তারপর ধর ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ, যারা ইংলিশ বলে সবাই কি একরকম বলে? কিছুটা এদিক-ওদিক নেই? আমেরিকান আর ব্রিটিশদের ইংলিশে তো বেশ পার্থক্য আছে, তাই বলে কি ইংলিশ ভাষা না বলে কোনওটিকে আংলাশ বলা হয়?

আংলাশ শব্দ শুনে দীপন হেসে ওঠে। কলার খোসা জানালার ওপারে শূন্যে ছুঁড়ে দিতে দিতে সে বলে—আংলাশ।

—এই ভাষা তোমার না বোঝার কী আছে? ঘরে তো আমিও মাঝে মধ্যে বলি। তুমি কি একেবারেই বুঝতে পারছ না দীপন? কল্যাণী নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।

—কিছু কিছু পারছি। সবটা নয়।

কল্যাণী সামান্য আহত হয়। সন্তান যদি তার মায়ের দেশের ভাষা না বোঝে, দুর্ভাগ্য তবে কার? সন্তানের না ভাষার? কল্যাণীর কপালে সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শাঁখা, পরনে নীল সুতিশাড়ি, বাসের অনেকে ফিরে ফিরে দেখে তাকে। এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক সামনের সিট থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করেন—যাইবেন কই?

কল্যাণী হেসে বলে—ময়মনসিংহ।

—ঢাকায় থাকেন?

—না। কলকাতায়। আমাদের বাড়ি ময়মনসিংহে। কালিবাড়ি। হরিনারায়ণ রায়ের বাড়ি চেনেন? ব্রহ্মপুত্রের পাড়েই।

লোকটি মাথা নাড়লেন। তিনি চেনেন না।

এক সময় শহরের সবাই এক নামে চিনত হরিনারায়ণকে। আজ এতগুলো মানুষের মধ্যে একজনও তাঁকে চেনে না এ কেমন আশ্চর্য কথা। কল্যাণীর মন খারাপ হতে চায় কিন্তু নিজেকে এই বলে সে প্রবোধ দেয় বোধহয় এরা ঠিক ময়মনসিংহের লোক নয়, কিছু দূরের।

—‘আপনার নাম কি দাদা?’ কল্যাণী সামনের সিটে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে।

—‘আবদুল জব্বার।’ লোকটি ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দেন। কল্যাণীর কলকল করে কথা বলতে ইচ্ছে করে। লোকটি মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ায় তাকে চুপ হয়ে যেতে হয়। কল্যাণীর পিছনের সিট থেকে এক যুবক প্রশ্ন করে—কোন হরিনারায়ণ? কাপড়ের ব্যবসা আছে?

—‘না। না। আমার বাবা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন।’ কল্যাণী পেছনে তাকিয়ে বলে।

—ও। স্টেশন রোডের গৌরহরি বস্ত্রালয়ের মালিকের নামও হরিনারায়ণ।

—হরিনারায়ণ কি? রায়?

—তা জানি না।

—আমার বাবাকে সবাই চেনে শহরের।

—উনি কি জজকোর্টেই আছেন?

—‘বাবা তো নেই। বাবা নেই আজ ক’বছর হল…আঙুলের কড়ায় গুনে কল্যাণী বলে—‘আজ সাতাশ বছর।’

—সাতাশ বছর আগে মারা গেছেন? বলেন কি?

—হ্যাঁ সাতাশ বছর আগে।

কল্যাণী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সাতাশ বছর যেন চোখের নিমেষে কেটে গেল। হরিনারায়ণের কোলে বসে লেবেনচুষ খেতে খেতে মনে হয় এই সেদিনের ঘটনা। সরলাবালা বলতেন—‘এত আদর কইরা ওরে মাথায় উঠাইও না তো।’

—‘ক্ষতি কী। মেয়েরে আমি মাথায় তুলতেই তো চাই।’ হরিনারায়ণ হেসে বলতেন।

কোথায় আর মাথায় তোলা হল তাকে! তিলজলার জলে ফেলে ওঁরা ভাবলেন মেয়ে বুঝি সাঁতার জানে। মেয়ে পুকুরের জলে সাঁতরাতে জানে, তাই বলে জীবনের কাদাঘাঁটা জলে সে হাত পা ছুঁড়তে জানে এ কথা ওঁরা ভাবলেনই বা কেন? কল্যাণী স্থবির বসে ছিল। হাত পা বেঁধে চোরাবালিতে ফেললে যেমন অবস্থা হয় কল্যাণীর তেমন হয়েছে।

বাস চলতে শুরু করে। কল্যাণী জানালার পাশে বসে চোখের নাগালে যা আসে, চোখ মেলে দেখে। টঙ্গী, জয়দেবপুর, রাজেন্দ্রপুর পার হয়ে বাস চলতে থাকে নিবিড় ঘন শালবনের আলো-আঁধার পথ বেয়ে। দীপন দেখে আর বলে—‘দিদিটা এলে খুব ভাল হত, তাই না মা?’ কল্যাণী মাথা নাড়ে। ভাল তো হতই, মায়ের দেশ দেখবে, নিজের মায়ের দেশ—এর চেয়ে আনন্দ আর কী আছে। কল্যাণী অনুভব করে সে এখন আর দীপন জয়িষার মা নয়, অনির্বাণের বউ নয়, স্রেফ কল্যাণী রায়, হরিনারায়ণ রায়ের কন্যা। সে যে বাইশ বছর ধরে সংসার সমাজে কল্যাণী দাশ হিসেবে পরিচিত এটি সে শ্রীপুর, ভালুকা, কাজির শিমলা, ভরাডোবার স্নিগ্ধ হাওয়ায় প্রায় ভুলতে বসে। ছোটবেলায় কল্যাণী মাঝে মধ্যে হরিনারায়ণের সঙ্গে ঢাকা শহরে যেত, ময়মনসিংহ জংশন থেকে ছেড়ে সুতিয়াখালি, গফরগাঁও, কাওরাইদ, ভাওয়াল, জয়দেবপুর, ধীরাশ্রমে জিরোতে জিরোতে ট্রেন থামত ফুলবাড়িয়া স্টেশনে। কল্যাণীরা উঠত দুলেন্দ্রর বাড়িতে, গোপীবাগে। দুলেন্দ্র হরিনারায়ণের পিসতুতো দাদার ছেলে। সেই বাড়ির ছেলেমেয়েরা কল্যাণীকে দেখলেই অদ্ভুত ভাষায় কথা বলত। চিচচিলচিওচিকেচিভচিয়চিদেচিখাচিই—এইসব বলে ওরা খিল খিল হেসে উঠত। কল্যাণী বুঝত না কিন্তু অপমানে লাল হয়ে উঠত। তাকে নিয়েই যে ওরা কথা বলছে এবং কথাগুলো যে তার মোটেই পক্ষে যাচ্ছে না এ কথা সে বুঝতে পারত, ভাষাটা শিখবার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কেউ তাকে শেখাচ্ছিল না, গোপনে একে ওকে ধরেও কিছুতেই কাজ হল না যখন—বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে মশারির নিচের অল্প আলোয় কাগজ কলম নিয়ে সে অদ্ভুত ভাষাটি লিখত আর পরীক্ষা করত কী আছে এতে। একদিন ঠিকই খুলে যায় রহস্য। ওরা কল্যাণীর সামনেই বলল— চিওচিরচিজুচিতাচিপুচিকুচিরেচিফেচিলেচিদাচিও। এরপরই দেখল তার জুতোজোড়া নিয়ে একজন ভোঁ দৌড়। জুতোর পেছনে না দৌড়ে সে লম্বা শব্দটি মুখস্থ করে খাতায় লিখে রাখল, পরে এই শব্দের মধ্য থেকে জুতো শব্দটি উদ্ধার করে পুরো শব্দের জট খুলে ফেলল। অত রাতে রহস্যটি আবিষ্কার করবার আনন্দে কল্যাণী ওদের গভীর ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলল—চিতোচিমরিচিখুচিবচিখাচিরাচিপ। এরপর থেকে ওদের তেমন আমল দেয় না সে। ভাবটা এমন যে আমার পেছনে লেগে পারবে না, খামোকা লেগ না।

আবদুল জব্বার আর পিছন ফিরছেন না। কল্যাণী খুব আগ্রহ বোধ করে লোকটির প্রতি। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহে। কল্যাণীর বাড়িও। কলকাতা থেকে তিরিশ বছর পর সে দেশে ফিরছে। কেন ফিরতে তার তিরিশ বছর লাগল, কল্যাণী কি ইচ্ছে করলে সব ফেলে ভেঙে বাঁধা ডিঙিয়ে চলে আসতে পারত না? ইচ্ছে করলে আরও আগেই তো সে আসতে পারত। অনির্বাণের অনুমতির অপেক্ষাই বা করতে হল কেন? এত বছর সে কেন আসেনি জন্মের মাটি, নদী, মাঠ, ভরা ফসলের ক্ষেত আর শ্যামল সবুজ বৃক্ষ আর ঘরের পিছনে ঝোপে- জঙ্গলে বড় অবহেলায় বেড়ে ওঠা কলাবতি ফুলের কাছে! পাষণ্ড না হলে কেউ ভুলে থাকে কাঁঠাল-পাকা দুপুরে বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে পাজামার চোরকাঁটা তোলা! গেছে যে দিন সে দিন কী একেবারেই গেছে! কল্যাণীর বড় ইচ্ছে করে কেউ একটি ফুঁ দিয়ে দিক, আর মুহূর্তে সে তার মুঠোর মধ্যে শৈশব কৈশোর—যেন হাত ভরে উপচে পড়ে—ফিরে পাক। ফিরে পাক সেই দিনগুলি, বাঁশি বাজানোর দিনগুলি, ভাটিয়ালির দিনগুলি, বাউলের দিনগুলি, কুলভাঙা গাঙের বাঁকে তাল সুপারির ফাঁকে ফাঁকে…

রাস্তার দুপাশে শাল সেগুনের বন পার হয়, ভাওয়ালের গড় পার হয়, দীর্ঘ অনাবাদি লালমাটির জমি ভাওয়াল পার হলে মাইল মাইল কাঁঠালের বন, এক-একটি গাছে দশ বারোটি কাঁঠাল ঝুলে আছে, আমগাছে আমও, কলকাতার রাস্তার ধারে গাছে আম কাঁঠাল ঝুলে থাকবে-কল্পনাই করা যায় না। কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে সরলাবালা কী চমৎকার এচোড় রান্না করতেন, এখনও তার স্বাদ লেগে আছে জিভে। চারদিক ঘন সবুজে ছেয়ে আছে। ত্রিশাল বাজারে বাস থামে কিছুক্ষণ, দীপন জানালায় মাথা গলিয়ে ধান চাল, শাকসবজি, আলু পটল, আর রকমারি মাছের হাট দেখে। কল্যাণী বলে—এরা গরীব কিন্তু মানুষ বড় ভাল, যদি কারও বাড়িতে যাও, সবাই তোমাকে বসতে দেবে, খেতে দেবে, ক’দিন থাকতেও বলবে।

—তাই নাকি? দীপন বড় বড় চোখ করে তাকায়।

—হ্যাঁ রে।

—কেন এরা আমাদের খেতে দেবে, থাকতে দেবে?

—এরা খুব সরল মানুষ তো, তাই।

—বোকাও বুঝি?

—তুমি কি অনেস্টকে ফুল বল?

—ও নো ডিয়ার। দীপন হেসে মাথা গুঁজে দেয় কল্যাণীর কোলে।

দরিরামপুর এলে কল্যাণী জানালায় আঙুল বাড়িয়ে দেখায়—দেখ দেখ দীপন, কাজী নজরুল ইসলাম এখানে ছিলেন। এখানের এক স্কুলে পড়তেন।

কিন্ডারগার্টেনে পড়া ছেলে কাজীকে চিনতে দেরি করলে কল্যাণীর তর সয় না। বলে—‘পড়নি বাবুদের তাল পুকুরে হাবুদের ডালকুকুরে…’ দীপন হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে মায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলে—‘সে কী বাস করলে তাড়া বলি থাম একটু দাঁড়া পুকুরের ওই কাছে না লিচুর এক গাছ আছে না…’

কল্যাণীর ঘোর কেটে যায় বাসের গায়ে কন্ডাক্টরের থাপ্পড় মারবার শব্দে। ছোকরাটি তারস্বরে চেঁচাতে থাকে—‘এই চরপাড়া চরপাড়া।’ চরপাড়ায় জঙ্গল ছিল একসময়। রাতে শেয়াল ডাকত। আর এখন পাড়া জুড়ে উঁচু উঁচু বাড়ি, ওষুধপথ্যের দোকান, পলিটেকনিক্যাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশাল ক্যাম্পাস। রাস্তায় বাস, রিক্সা আর মানুষের ভিড়। তখন হাসপাতাল একটিই ছিল—সূর্যকান্ত হাসপাতাল। ব্রাহ্মপল্লীতে ছিল লিটন মেডিকেল স্কুল। কল্যাণীর এক খুড়তুতো দাদা পড়ত ওই স্কুলে। দাদার হাত ধরে সে কয়েকদিন ওই হলুদ দালানের স্কুলে গিয়েছিল, দাদার বন্ধুরা তাকে আইসক্রিম খাওয়াত আর বলত—‘মানুষের কঙ্কাল দেখবা? মরা মানুষ কাটি, দেখবা?’ কল্যাণী মাথা নেড়ে বলত না সে দেখবে না। তার চেয়ে বরং ঘাটে বসে ওদের সাঁতার কাটা দেখতে ভাল লাগত ওর। সুড়সুড় করে বাস থেকে চরপাড়া মোড়ে প্রায় অর্ধেক যাত্রী নেমে গেল, আবদুল জব্বারও নেমে গেলেন, একবার পিছনে তাকালেন না। দুজন মহিলা ছিল বাসে, একজনের কালো বোরখায় গা ঢাকা, আরেকজন পরনে লাল সিল্কের শাড়ি। ওদের দিকে তাকিয়ে কল্যাণী হাসে। জিজ্ঞেস করে—আপনাদের বাড়ি কি এখানেই?

লাল সিল্কের মহিলা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেই মুখ ঘুরিয়ে নেয় অন্যদিকে। কল্যাণী কন্ডাক্টরকে বলে—আমি কালিবাড়ি নাবব।

—কালিবাড়ি বাস যায় না। কন্ডাক্টর ধাতব কণ্ঠে উত্তর দেয়।

—তবে নাবব কোথায়?

—প্রেস ক্লাবের সামনে। কন্ডাক্টর টাকা গুনতে গুনতে বলে।

শহরটিকে বড় অচেনা লাগে, প্রেস ক্লাবের দিকে যেতে দুটো সিনেমা হল পড়ে—অজন্তা আর ছায়াবাণী। ছায়াবাণীই কি অমরাবতী নাট্যমন্দির? কল্যাণীরা অলকা হলে ছবি দেখত। তখন ওই একটি হলই ছিল শহরে। হিন্দি, উর্দু, বাংলা সব ছবিই চলত। একসময় কলকাতা-বোম্বের ছবি আসা বন্ধ হয়ে গেল, বড়রা দাওয়ায় বসে দিলীপকুমার আর মধুবালার শোকে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। কল্যাণীর মনে আছে ছবি উঠে যাওয়ার আগে আগে লোকে লাইন দিয়ে শাপমোচন, সবার ওপরে, অগ্নিপরীক্ষা দেখত। শরিফার এক খালা ‘সবার ওপরে’ ছবিটি কল্যাণীকে দুবার দেখিয়েছিলেন, কল্যাণী হলে বসে দুবারই রুমাল ভিজিয়েছিল কেঁদে। ‘ফিরিয়ে দাও আমার সেই বারোটি বছর’ শুনে সেদিনের অবুঝ কল্যাণীর চোখে যে জল ঝরেছিল, সেই জলই আবার তার চোখে নতুন করে ঝরে, ছবি বিশ্বাসের জন্য নয়, নিজের জন্য—নিজের হারিয়ে যাওয়া তিরিশ বছর ফিরে পাবার জন্য মনে মনে সে দু হাত বাড়ায়—শূন্যতাকে ছুঁয়ে ফিরে আসে তার তৃষ্ণার্ত আঙুল। ‘প্রেস ক্লাব প্রেস ক্লাব’ বলে চেঁচাতেই মহিলা দুজন উঠে দাঁড়ায়, কল্যাণীও দাঁড়ায়। কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করে—কালিবাড়ি কোন দিকে? ছেলেটি থুতনি উঁচু করে দেখিয়ে দেয় ওই সোজা। নেমে দাঁড়াতেই বাস দ্রুত বাঁয়ে ঘুরে যায়। সামনেই লাল ইটের উঁচু জলের ট্যাঙ্ক, ট্যাঙ্কটি চেনে কল্যাণী, ছোটবেলায় সে জ্যোতিপ্রকাশের কাছে নাকি সুরে আবদার করত তাকে যেন একদিন সে ট্যাঙ্কটির মাথায় ওঠায়, ওই উঁচুতে দাঁড়িয়ে সে পুরো শহর দেখবে। ট্যাঙ্কটি দেখে সেই অপূর্ণ ইচ্ছেটি এই চুল-পাকা বয়সেও, এই ঘোর অবেলায় তার ভেতরে নিঃশব্দে জেগে ওঠে। এর পাশেই ছিল অলকা হল, তার পাশে বিদ্যাময়ী স্কুল। শহরটি বদলে গেছে, ছায়া সুনিবিড় নিঝুম নির্জন নিখুঁত নেই আর। মানুষের ভিড় চেঁচামেচি, রিক্সার জ্যাম। কল্যাণী একটি রিক্সা ডাকে। তার ক্ষিধেও পেয়েছে খুব, ঘড়িতে দুটো বাজে, আধ ঘণ্টা এগিয়ে নিলে আড়াইটা। দীপন বিস্মিত চোখে তার মায়ের শহরটি দেখে, ক্ষিধের কথা ভুলে যায়।

রিক্সা কালিবাড়ির দিকে যেতে থাকে। রিক্সাঅলার পরনে লুঙ্গি গেঞ্জি, ঠোঁটের ফাঁকে আধ-খাওয়া বিড়ি, জিজ্ঞেস করে—‘কালিবাড়ির কুন জায়গায় নামবেন?’ আগে তো হরিনারায়ণ রায়ের বাড়ি বললে রিক্সাঅলারা চিনত, এখন কী আর চিনবে? কল্যাণী বিপিন পার্কের নাম বলে। রিক্সাঅলা ভিড়ের মধ্যে কেড়ি কেটে কেটে ছোটে। দীপন মন দিয়ে রাস্তার সাইনবোর্ড পড়তে পড়তে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে—মা, তোমার ব্রহ্মপুত্র কতদূর?

—এই তো সামনে।

—তোমার ব্রহ্মপুত্রে তুমি অনেকদিন পর সাঁতার দেবে, তাই না মা? তোমার ব্রহ্মপুত্রে স্টিমার চলে না? আচ্ছা মা, ওই পার কি এমনি চোখে দেখা যায়? আমি যে দূরবীনটা আনিনি, কি করে দেখব? ওই পারে তুমি না বলেছ কাশবন আছে! অপু-দুর্গা রেল দেখতে যেরকম কাশবনে দৌড়েছিল, সেরকম কাশবন?

—হ্যাঁরে।

—এখনও তোমার সাঁতার মনে আছে মা?

—দূর বোকা, ছোটবেলায় যা শেখা যায়, তা কি কেউ ভোলে?

—তবে যে দিদির ট্রান্সলেশন করে দিতে পারোনি একবার, দিদি বলল।

—ও তো কলকাতার কঠিন কঠিন সব ট্রান্সলেশন। আর এ তো সাঁতার, আমি তো সারাদিন পুকুরে সাঁতরাতাম, গল্প করিনি তোমার সঙ্গে?

—সারাদিন সাঁতরাতে? আমিও তোমাদের পুকুরে সাঁতার দেব।

—নিশ্চয়ই।

—আমি যে সাঁতার জানি না মা!

—তোমাকে শিখিয়ে দেব। আমাকেও জ্যোতিদা সাঁতার শিখিয়েছিল, কলাগাছ ধরে সাঁতার।

—মা তুমি কাঁপছ কেন?

—কই, না তো!

—এই যে কাঁপছ। এই যে আমার হাত ধরে আছ, তোমার হাত কাঁপছে।

—আমার খুব আনন্দ হচ্ছে দীপন। এই যে দেখছ রাস্তা, জানো এই পথ দিয়ে আমি স্কুলে যেতাম।

দীপন রাস্তার সাইনবোর্ড পড়তে পড়তে বলে—এই জায়গার নাম দুর্গাবাড়ি, এখানে দুর্গাপূজা হয়, তাই না?

—হ্যাঁ।

ব্রহ্মপুত্রের জন্য কল্যাণীর মন বড় আকুল হয়। আহা, নদী এত টানে কেন মানুষকে! তিরিশ বছর পর সে শৈশবের প্রিয় নদীকে দেখবে, তার শরীর থিরথির করে ভালবাসায় কাঁপে, দু চোখ জলে ভরে ওঠে। অষ্টমী স্নানের দিন সাঁতরে সাঁতরে সে প্রায় মাঝনদীতে চলে যেত। বর্ষায় দুকূল ভাসা নদী বারবারই মন উপচে ওঠে তার, কলকাতায় যাকে পেয়েছে তাকেই সে ব্রহ্মপুত্রের গল্প শুনিয়েছে, জয়িষা আর দীপনকে বলেছে–গঙ্গার চেয়েও বড় একটি নদী আছে জানো তো? ব্রহ্মপুত্র নাম।

অনির্বাণ কখনও শুনে বলত—নদীর রচনা শেখাবে, সেটা শেখাও। বরং ওদের কাজে দেবে।

তিরিশ বছর নদী বলতে তার কাছে এই ব্ৰহ্মপুত্ৰই। জল বলতে ময়মনসিংহের টিউবওয়েলের জল। কলকাতার জলে স্নান করলে এখনও কেমন গা আঁষটে লাগে। চুলে জট বেঁধে যায়। অনির্বাণ তাকে বিয়ের পর পর গঙ্গার ধারে নিয়ে যেত। কল্যাণী বলত—আমাদের ব্রহ্মপুত্রের প্রাণ আছে গো।

অনির্বাণ কপাল কুঁচকে বলত—আর গঙ্গায় বুঝি নেই?

কল্যাণী উদাসীন চোখে এদিক-ওদিক তাকাত, আর নাকে আঁচল চেপে বলত—চল চল, গাঁজার ধোঁয়ায় এখানে দাঁড়ানো যাচ্ছে না।

—তুমি না বললে একটু নদীর ধারে দাঁড়াবে?

—সে কি আর এই নদী?

কল্যাণী ব্ৰহ্মপুত্রের কথা ভাবত। তার বুক থেকে উঠে আসা উতল হাওয়া গভীর একাকী রাতে স্বপ্নের ভেতর তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে। ভরা নদীর ওপর গুন টানা নৌকো যায়, দূর থেকে ভেসে আসে ভাটিয়ালির সুর—‘নাইয়ারে নাওয়ের বাদাম তুইলা কোন দেশে যাও চইলা।’ গঙ্গার যান্ত্রিক জীবন আর ঘোলা জলের সামনে দাঁড়িয়ে কল্যাণী কখনও একফোঁটা স্বস্তি পায়নি। সে কখনও কাউকে বোঝাতে পারেনি হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রের স্বচ্ছ শুদ্ধ গভীর জলের স্নিগ্ধতা। অনির্বাণ বলত—‘তুমি এত বেশি নস্টালজিয়ায় ভোগো কল্যাণী!’ কল্যাণী দীর্ঘশ্বাস ফেলত।

—দীপন, তোর ক্ষিধে পায়নি?

দীপন মাথা নাড়ে। তার ক্ষিধে পেয়েছে।

কল্যাণী বলে—‘এই তো এসে গেছি বাবা। দেখিস ওরা তোকে কত কী খেতে দেবে, তোকে কোলে কোলে রাখবে, কত কিছু কিনে দেবে দেখিস।’ কল্যাণীর ছেলে দীপন, ওরা তো করবেই—কল্যাণীর ছেলের জন্য করবে না তো কার জন্য করবে! এই তো সেই স্বদেশি বাজার, ছোটবাজার, বড়বাজার। বড়বাজারে যে একটি মন্দির ছিল, সেটি কোথায়—হুডখোলা রিক্সায় বসে আশেপাশে খোঁজে কল্যাণী। বড় একটি ঝকমকে মিনার চোখে পড়ে। কল্যাণী জিজ্ঞেস করে—ওটি কি মন্দির নাকি?

রিক্সাঅলা ধমকে ওঠে—মন্দির মানে? ওইটা বড় মসজিদ।

—এখানে যে একটি মন্দির ছিল, ওটি কোথায়?

—মন্দির? মন্দিরের খোঁজ দিতে রিক্সাঅলার উৎসাহ নেই তেমন। এটি নিয়ে কল্যাণীরও যে খুব আগ্রহ তাও নয়। তবে পুরনো একটি জিনিস, বড়বাজার পেরোলেই তো চোখের সামনে ঢ্যাঙাদার মত দাঁড়িয়ে থাকত! ঢ্যাঙাদা—সেও এক মজার জিনিস। কল্যাণী যখন ফোর-ফাইভে পড়ে, নেত্রকোণা থেকে লিকলিকে এক ছোকরা এসেছিল, ষোল বছর বয়সে ছ’ ফুট লম্বা, কল্যাণীদের লতায়-পাতায় আত্মীয় হয়, কাচারিঘরে রাতদিন শুয়ে থাকত, বিকেলে কাঁথা গায়ে দিয়ে জামগাছের নিচে এসে বসত, দাঁতে দাঁতে শব্দ হত এমন কাঁপত সে, কল্যাণীরা খেলতে খেলতে দেখত সে খুক খুক কাশছেও। অনেকদিন কল্যাণী কাছে এসে বসেছে, জিজ্ঞেস করেছে—তুমি কোন ক্লাসে পড় ঢ্যাঙা।

ঢ্যাঙা মুখ গম্ভীর করে বলেছে—টু-তে!

টু-তে পড়ে এত বড় ছেলে হেসে গড়াত কল্যাণী! সে বুঝে পেত না। এত বড় একটি ছেলে কী করে অত নিচের ক্লাসে পড়ে।

সে-ও সরল স্বরে বলত—ও, তুমি বুঝি খুব ফেল কর?

ঢ্যাঙা বলত—না। আমি অঙ্কতে একশয় একশ পাই!

ছেলেটিকে বাড়িসুদ্ধ লোক ঢ্যাঙা বলে ডাকত, সেও দিব্যি ঢ্যাঙা ডাক শুনে এগিয়ে যেত। বলত—‘কি কন?’ বড়দের মত কল্যাণীও ঢ্যাঙাকে ঢ্যাঙা বলত। শুনে সরলাবালা চোখ রাঙাতেন। বলতেন—ঢ্যাঙা কি রে? ঢ্যাঙা কি? নাম নাই ওর? ও তর ছোট না বড়? দাদা কইয়া ডাকবি।

কল্যাণী এরপর থেকে ‘দাদা’ কইয়া ডাকল বটে তবে ‘জয়ন্ত’ আর ডাকল না। ডাকল, ঢ্যাঙাদা। কল্যাণীর সন্দেহ ঘুচত না। একদিন সরলাবালাকে জিজ্ঞেস করল—ঢ্যাঙাদা অঙ্কে নাকি একশয় একশ পায় মা?

—পায় বোধহয়।

—তাইলে ওরে আমি বাঁশের অঙ্কটা করতে দিলে ও কি মিলাইতে পারব?

—পারতেও পারে।

—কচ্ছপের অঙ্কটা মনে হয় পারব না।

—তা জানি না।

—ও এত বড়, টু-তে পড়ে কেন?

—ঢ্যাঙার বড় অসুখ হইছে। হাসপাতালে ভর্তি হইব। ও যে টু-তে পড়ে এইটাই তো বেশি।

কল্যাণী নিজেই পরে শুনেছে রাতে রাতে ঢ্যাঙাদা কাশে, জ্যোতিদা বলেছিল, কাশির সঙ্গে ঢ্যাঙার গলা থেকে রক্তও বেরোয়। একদিন বাড়ির বড়মানুষেরা ঢ্যাঙাদাকে হাসপাতালে রেখে এল। ঢ্যাঙাদ আর ফেরেনি।

ঢ্যাঙাদা জামগাছের তলে দাঁড়িয়ে থাকলে প্রায় আকাশে তাকাবার মত করে তার মুখের দিকে তাকাতে হত। কালিবাড়ির মন্দিরের দিকেও একইরকম তাকাত কল্যাণী। হুড খোলা রিক্সায় বসে কল্যাণী এদিক ওদিক দেখে, ঢ্যাঙাদার মত দেখতে কিছু খোঁজে। অসুখে ভোগা টু-তে পড়া ছেলে ঢ্যাঙাদার জন্য বড়বাজারের রাস্তায় শৈশব কৈশোর যৌবন পার হওয়া কল্যাণীর হঠাৎ মায়াই হয়। বড়বাজার পেরিয়ে কালিবাড়ির রাস্তায় উঠতে গিয়ে মন্দিরটি চোখে পড়ে তার। শ্যাওলা ধরা, ভাঙা, শরীর ফুঁড়ে বটগাছ বেরিয়েছে। রিক্সাঅলা হঠাৎ ব্রেক কষে, বলে—‘এই যে আইসা গেছে আপনের বিপিন পার্ক।’ রিক্সা থেকে নেমে সে পার্কে হাঁটে। আহা, এই পার্কে কত কত বিকেল সে কাটাত, বাড়িতে ‘এমপ্রেস’ খেলতে গিয়ে হঠাৎ সে লুকোতে লুকোতে বাড়ি ছেড়ে চলে আসত। পার্কের ঘাসে শুয়ে কখনও কখনও ঘুমিয়ে পড়ত। জলের যে মিষ্টি একটি ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হত, তাতে কী ঘুম না এসে পারে! কিন্তু সেই অবাধ সবুজ আর স্নিগ্ধ নির্জনতা কোথায়? তিন-চারটে গরু শুয়ে আছে, ভাসমান মানুষের বস্তি ছড়ানো, হাড় বেরনো শিশুরা ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছে। পরনে কাপড় নেই, কোমরের নিচে কালো সুতোয় ঝুনঝুনি বাঁধা। কলকাতার ফুটপাতে কল্যাণী এমন উদ্বাস্তুর ঢল দেখেছে। তবে কি তার দেশও সংক্রামিত হচ্ছে? সব ভুলে সে তার ব্রহ্মপুত্রের কাছে যেতে চায়, হৃদয়ের একূল ওকূল ভেসে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রকে আজ সে দু চোখ ভরে দেখবে। এই ব্রহ্মপুত্রে দিন নেই রাত নেই জলকন্যার মত ডুবেছে ভেসেছে সে। কোথায় ব্রহ্মপুত্র, সে অবাক তাকিয়ে থাকে শীর্ণ একটি জলধারার দিকে। ধূ ধূ চর, মানুষ হেঁটে যাচ্ছে এপার থেকে ওপার। ব্রহ্মপুত্র তো এখানেই ছিল, বিপিন পার্কের সামনে, কল্যাণী নিশ্চয়ই ভুল করছে না, তার ভুলই বা হবে কেন —তিরিশ বছর সে এই নদী, নদী পাড়ের মাঠ, জলঘাসই তো বুকের মধ্যে লালন করেছে, তবে? তবে তার শৈশব কৈশোরের উতল ব্ৰহ্মপুত্ৰই কী এই শীর্ণ জলধারা? এই ঘোলা স্থির নিথর ক্লান্ত জল ব্রহ্মপুত্রের—এও কী তার ভাবতে হবে! নাকি সে ভুল দেখছে, ভুল হবার কথা তো নয়। স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকা কল্যাণীকে দীপন গা ঠেলে জিজ্ঞেস করে—ওখানে জল কেন মা? নালা বুঝি?

লজ্জায়, বেদনায় কল্যাণীর কণ্ঠ বুজে আসে, বলে—‘বোধ হয়।’ বলে দীপনের হাত ধরে সে উল্টো দিকে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে সে দুপাশে তাকায়, গুদারাঘাট, ডাকবাংলো, এস কে হাসপাতাল সব আগের মত আছে, কোতয়ালি থানাটিও মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছে, কল্যাণীর এক জ্যাঠামশাই ছিলেন এখানকার বড় দারোগা, কল্যাণীর যখন পাঁচ-ছ’ বছর বয়স সেই জ্যাঠা তাকে হাজত দেখাতে নিতেন, লোহার গরাদের আড়ালে উড়োখুড়ো কিছু মানুষ দেখিয়ে বলেছিলেন—‘এরা হচ্ছে চোর’, সে অবাক হয়ে বলেছিল—‘চোর কই, এরা তো মানুষ!’ জ্যাঠামশাই ঠা ঠা করে হেসেছিলেন। থানার সামনে খানিক দাঁড়ায় কল্যাণী, কান পাতলে এখনও যেন সেই হাসির শব্দ কানে আসে। চেনা দালানকোঠার ফাঁকে ফাঁকে নতুন বাড়িঘর উঠেছে। কুমার উপেন্দ্রকিশোরের একতলা বাড়িটি আগের মতই আছে। দূরে দেখা যায় শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ। বড় একা, শান্ত, রোদে পুড়ে যাওয়া রেলব্রিজটির জন্য তার বড় মায়া হয়। কল্যাণীর মনে ছবির মত আঁকা এ শহর। চোখ বুজলেই জগৎ ছাপিয়ে মনে ভাসে একটি ছোট্ট শান্ত শহর, শহরের প্রায় সবাই সবার চেনা, কেউ কাউকে ডিঙিয়ে ছুটছে না, রাস্তাঘাটে মাঠে বাজারে সবাই সবার কুশল জিজ্ঞাসা করছে। এ একটা সারপ্রাইজও বটে, তার হঠাৎ এসে যাওয়া। উত্তেজনায় কল্যাণী ভেতরে ভেতরে কাঁপে। তার স্মৃতি ও স্বপ্ন খুঁজতে সে দৌড়ে যায়, দু হাত বাড়ায়, হাতড়ায়। মাটি ফুঁড়ে থোকা থোকা হাহাকার উঠে আসে, তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার বাড়িটি সে পায় না। তবে কী ব্রহ্মপুত্রের মত এটিও উধাও হয়ে গেছে? কোথায় হরিনারায়ণ রায়ের বাড়ি? কালো গেট, গেটের দুপাশে মাধবীলতা, বাড়ির প্রাচীর ঘেঁষে আম জাম সুপুরি নারকেলের সারি?

৪. শরিফাদের বাড়ি

শরিফাদের বাড়িটি সে চিনতে পারে, পলেস্তারা খসে গেছে, তবু সেই বারান্দা সেই সদর দরজা সেই খিড়কি ভুল হবার নয়। দীপনের হাত ধরে সোজা সেই বারান্দায় উঠে আসে কল্যাণী, দরজায় কড়া নাড়ে। দরজার কড়া যখন নাড়ে তার মনে পড়ে এরকম যখন তখন কড়া নাড়ত সে, ঘরে অপেক্ষা করত শরিফা, সকাল নেই বিকেল নেই শরিফা ও শরিফা খেলতে আয়, ও শরিফা জাম পড়েছে আয়, ও শরিফা সাপ খেলা দেখবি আয়, বানর নাচ আয়, ওরে শরিফা দাড়িয়াবান্ধা কোট কাটা হইছে শিগরি আয়। শরিফাও পাখির মত উড়ে আসত। শরিফার মা ভেতর থেকে চেঁচাত শসাটা কাট উঠানটা ঝাঁট দে বিছানাটা গুছা, কে শোনে কার কথা। এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় ফাঁক পেলেই দৌড় দৌড়। এর বাড়ির করমচা ওর বাড়ির কদবেল নিয়ে আরেক বাড়ি বসে হা হা হি হি করে সাবাড় করা। কড়ায় হাত ধরেই দাঁড়িয়েছিল কল্যাণী যেন আগের সেই শরিফা পাখির মত এক্ষুনি ছুটে আসবে, কল্যাণীও বলবে চল যাই ঘুট্টি ওড়াই। ঘুট্টি? কল্যাণী আকাশ দেখে, এখন কি ঘুড়ি ওড়াবার সময়? আকাশে মেঘ ভাসছে, কোন মাসে যেন ওড়াতে হয় ঘুড়ি? শরৎ নাকি বসন্ত?

দীপন ফিসফিস করে বলে—এটিই বুঝি তোমাদের বাড়ি ছিল!

—আরে না না। আমাদের বাড়ি ছিল পাশে। অনেক বড় বাড়ি। এ পাড়ার সবচেয়ে বড়। দু বিঘা জমির ওপর। এ রকম বাড়ি কলকাতার কোথাও নেই।

—অশেষদাদের বাড়ির মত বড়?

—দূর, অশেষদের বাড়ি কোনও বাড়ি হল? আমাদের বাড়ি ওদের চেয়ে দশগুণ।

কল্যাণী আড়চোখে দেখে বাড়িটি নেই, কতগুলো নতুন বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে। সে আড়ে দেখে কারণ ভয় লাগে তার। ভয় লাগে যদি সত্যি সত্যি বুঝতে হয় বাড়িটি নেই। কল্যাণীর চোখে সব ঝাপসা লাগে। এত বদলে গেছে সব, এত কেন বদলাবে, মরা নদীর মত হাড় জিরজিরে বাড়িঘর, গাছগুলো বোধ হয় জল না পেয়ে মরে গেছে। কল্যাণী চোখ মুছে আবার তাকায়। বারবার তার ঝাপসা লাগে সব।

ভেতর থেকে সতেরো আঠারো বছর বয়সের এক ছেলে দরজা খুলে দেয়। পাজামা আর শার্ট পরা, লিকলিকে। ছেলেটি কোনও প্রশ্ন করবার আগেই কল্যাণী বলে—শরিফা আছে?

—শরিফা?

—এটা শরিফাদের বাড়ি নয়?

—ছেলেটি দুপাশে মাথা নাড়ে।

—অনেক আগে এ বাড়িতে শরিফারা ছিল না? শরিফা, মুন্নি?

—হ্যাঁ।

—তাই বল। তুমি তো আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে গো। এত বছর আগের, তাতে কি হয়েছে? আমার তো ভুল হবার কথা নয়। সেই বাড়ি, সেই দরজা, জানালা। ভুল হবে কেন?

ছেলেটি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। সে কিছু বুঝে ওঠার আগে কল্যাণী আবার বলে—শরিফা কোথায় এখন?

—নওমহল। ছেলেটি নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দেয়।

—এ বাড়িতে এখন কে থাকে?

—আমরা। শরিফা আমার ফুপু হয়।

—ফুপু হয়। তার মানে তুমি আনিস ভাইয়ের ছেলে। তুমি কি আনিস ভাই-এর ছেলে?

—হ্যাঁ।

কল্যাণী ছেলেটিকে কাছে টেনে পিঠে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে—তোমার নাম কি বাবা?

—ইয়াসির।

—তোমার বাবাকে বল কল্যাণী এসেছে, কলকাতা থেকে।

—আব্বা চিটাগাং গেছে।

—ও, আর তোমার মা?

—আম্মা ঘুমায়।

—ঘুমোচ্ছে? ও। আচ্ছা, শরিফাকে একবার খবর পাঠানো যায় না?

ইয়াসির চুপ হয়ে থাকে।

—ঠিক আছে, তুমি একটু নিয়ে যেতে পারবে আমাকে ওর বাড়িতে?

এবারও ইয়াসির কথা বলে না। ও সম্ভবত ভাবছে কোথাকার কে, এসে বলল চল, আর সে চলে যাবে এ হয় নাকি।

কল্যাণী হেসে বলে—তোমার মাকে ডাকো, বল আমার নাম কল্যাণী। পাশেই আমাদের বাড়ি ছিল। আমার বাবার নাম হরিনারায়ণ। হরিনারায়ণ রায়।

ইয়াসির এবার মুখ খোলে। বলে—ভিতরে আইসা বসেন।

কল্যাণী দীপনকে নিয়ে ঘরে ঢোকে। এখন একটু হাত পা ধোয়া দরকার, ক্ষিধেও পেয়েছে খুব। বিকেল গড়াচ্ছে, সারাদিনে দুটো কলা-বিস্কুট ছাড়া দীপনের পেটে কিছু পড়েনি। বেচারা ক্ষিধের জন্যও মোটে কাতরাচ্ছে না। সল্টলেক হলে ও এতক্ষণে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করত। আর কল্যাণীর তো ক্ষিধের বোধই নেই। ক্ষিধে তার মনে। চোখে। ক্ষিধে তার পেটে নয়।

—মুন্নি শাহানা ওরা থাকে কোথায়? কল্যাণীর কণ্ঠে আগ্রহ উপচে পড়ে।

ইয়াসির দাঁতে নখ কাটতে কাটতে বলে—ছোটফুপু সৌদি আরব থাকে।

—আর মুন্নি?

—ঢাকায়।

—ঢাকার কোথায় গো?

—ধানমণ্ডি।

—ধানমণ্ডি? ছোটবেলায় ধানমণ্ডি যেতাম। কী বড় বড় মাঠ আছে ওখানে, তাই না? বাবা নিয়ে যেতেন, আমরা ওখানে দৌড়তাম। একদিন মনে আছে, দৌড়চ্ছি দৌড়চ্ছি, বাবা বললেন, চল ঘোড়দৌড় দেখি গিয়ে। রেসকোর্সের মাঠে নিয়ে গেলেন বাবা। বাবা আমাকে একটি ঘোড়ার পিঠে চড়িয়েছিলেন, উফ খুশিতে চিৎকার করেছিলাম।

ইয়াসির নখ কাটে দাঁতে। দীপন মায়ের আরও কাছে সরে এসে বলে—আমি রেসকোর্সে যাব।

—ভয় পাবে না ঘোড়ার পিঠে চড়তে?

—বাহ আমি কি দিদি যে ভয় পাব? সেদিন দেখলে না সাইকেল রাইডিং-এ দিদিটা কেমন পিছিয়ে গেল। ও তো একটা ভীতুর ডিম। জু-তে হাতির পিঠে দু দিন চড়েছি। ঘোড়ার পিঠে পারব না বুঝি?

—ঠিক আছে দেখি শরিফার কাছে আগে তো যাই। তারপর কোথায় কোথায় যাব প্রোগ্রাম সেট হবে।

ইয়াসির আড়চোখে তাকায় কল্যাণীদের দিকে। কল্যাণী তাকে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করে—ইয়াসির, তুমি আমার নাম শোননি কখনও? কেউ বলেনি? তোমার বাবা, ফুপুরা?

ইয়াসির না বোধক মাথা নাড়ে। কল্যাণী হেসে বলে—আসলে তুমি বোধ হয় শোননি। এই বয়সের ছেলেরা কি আর বাবাদের গল্পে বসে! তুমি বসলে শুনতে আমরা মানে আমি আর শরিফা কি ভীষণ দস্যি ছিলাম। আচ্ছা তোমার বয়স কত হবে ইয়াসির? তুমি কোন বছর জন্মেছ বল তো? আনিস ভাইয়ের বিয়ে তো আমরাই দিয়েছি। তোমার বাবা হাতির পিঠে চড়ে বিয়ে করতে গিয়েছিল জানো তো? আমরা ছোটরা হাতির পিছন পিছন সে কী দৌড়! সঙ্গে ব্যান্ডপার্টি ছিল। গান বাজছিল বিউগলে। বিয়ে হল গোলপুকুর পাড়। এই যে দরজাটা, এই দরজায় আমরা সব দাঁড়িয়েছিলাম বধূবরণ করব বলে। বউ এল লাল বেনারসি পরে। মনে হয় এই সেদিনের ঘটনা। আমি আর শরিফা সেদিন সারারাত ছাদে বসে গল্প করেছি। নতুন বউকে আমরা কী কী গান শোনাবো সে নিয়ে উদ্বেগের সীমা নেই আমাদের। নাকের ওপর বউয়ের জরুল ছিল একটি। তাই না ইয়াসির নাকের ওপর তোমার মার একটি জরুল…অনিলকাকা, সৌমেন? রুখসানা, সেলিম ওরা কেমন আছে ইয়াসির?

—জানি না।

শরিফা, মুন্নি, শাহানা ওরা কেমন আছে, কাদের সঙ্গে বিয়ে হল, ছেলেমেয়েরা কী করে, কী পড়ে ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দিতে ইয়াসির উদাসীনতা দেখায়। আনিসের স্ত্রীকে ডেকেও যদি গল্প করা যেত, অন্তত তিনি তো শরিফাদের খোঁজ রাখেন। ভাইফোঁটার সময় পরিমল আর জ্যোতিপ্রকাশের মত আনিসের কপালেও কল্যাণী চন্দনের ফোঁটা দিত। সরলাবালা বলতেন—‘ভাই কি কেবল মায়ের পেটের ভাইরাই হয়, কত পরকে আপন হইতে দেখলাম, কত আপনকে পর।’

পাশের এই ভিটেয় ছিল হরিনারায়ণ রায়ের বাড়ি। নামকরা লোক ছিলেন রায়বাবু, এক ডাকে সবাই চিনত। কালিবাড়ির প্যাঁড়ার দোকান থেকে প্রতি সকালে এক সের প্যাঁড়া আসত বাড়িতে। ইসলামপুর থেকে জগৎ ঘোষাল ফি সপ্তাহে দেড় সের ঘি পাঠাত। কালিজিরা চাল আসত মোহনগঞ্জ থেকে। আর মিঠে পুকুরের মাছ তো সারাবছর লেগেই থাকত। নিজের ছেলেমেয়েকে বিদেশ পাঠিয়ে হরিনারায়ণ যাবেন বলেও কেন যাননি? কেবল কি অসুস্থতাই তাঁর না যাবার কারণ? কল্যাণী অনুমান করে হরিনারায়ণ আসলে দেশের মায়াই ছাড়তে পারেননি। ছেলেমেয়ে আত্মীয়-স্বজনের চেয়ে তাঁর কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল দেশ, দেশের মাটি, তাঁকে টেনেছিল সেই মাটির তলে খুব গোপনে রয়ে যাওয়া একটি শক্ত শেকড়। নিজের বাবা-মা’র মৃত্যুতে যে কাছে থাকতে পারে না, তার মত দুর্ভাগা আর কে আছে! কল্যাণী বড় একটি দীর্ঘশ্বাস গোপন করে। ইয়াসির ভেতর-ঘরে চলে যায়, সম্ভবত তার মাকে ডাকতে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করবার পরও আনিসের স্ত্রীর পায়ের শব্দ শোনা যায় না। তার শ্বশুরবাড়ির পাশের বাড়িতে কবে কোন কল্যাণী বাস করত—তাকে নিয়ে তার কোনও আগ্রহ থাকবার কথা নয়। কল্যাণী অস্থির হাঁটে বারান্দায়। সুতোয় টান পড়লে ঘুড়ি যেমন বাতাসে গুঁতো খেয়ে খেয়ে নাটাইয়ের দিকে যায়—কল্যাণী তেমন চৌকাঠে, সিঁড়িতে হোঁচট খেতে খেতে পাশের দালানগুলোর দিকে এগোয়। হলুদ রঙের এইসব বাড়ি কোনও চিহ্ন বহন করে না তার স্মৃতির। দালানগুলোর ধার ঘেঁষে যে ঘাসে ছাওয়া মাটি, কল্যাণী সেই মাটিতে নেমে দাঁড়ালেই কচি নেবু পাতা আর বাতাবি ফুলের ঘ্রাণ পায় হাওয়ায়। রান্নাঘরের পিছনে ছিল কাগজি নেবুর গাছ, সরলাবালা নেবু পাতা দিয়ে ছোটমাছ রাঁধতেন, জ্যোতিপ্রকাশ হাসি চেপে বলত—‘কী মা, মাছ বুঝি নরম ছিল?’ সরলাবালা বলতেন—‘আরে না, কাটবার সময় মাছগুলা ফাল পারতাছিল। এক্কেরে তাজা মাছ।’ মাছের দোষ নিজের কাঁধে নিয়ে আরও বলতেন—‘রান্দা ভাল হয় নাই বোধহয়। হলুদ বেশি হইয়া গেছে।’ সিঁড়িতে সকালের রোদ এসে পড়ত, সরলাবালা ছেলেমেয়েদের গায়ে চাদর পেঁচিয়ে ঘাড়ের পেছনে গিঁট দিয়ে দিতেন, সেই চাদর পরে শীতের রোদে জলচৌকিতে বসে কল্যাণীরা গা পোহাত, সরলাবালা ধোঁয়া ওঠা চা এনে দিতেন, সঙ্গে মুড়ি, জ্যোতিপ্রকাশের মুখে কখনও মেছোভূত মামদোভূত কখনও নিউটন আইনস্টাইনের গল্প শুনতে শুনতে কল্যাণীরা চায়ে মুড়ি ভিজিয়ে চামচে তুলে তুলে খেত। রান্নাঘরটি নেই। রোদ পড়া সিঁড়িটিও নেই। মনে আছে তিন সিঁড়ি রোদ নেমে এলে কল্যাণী স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হত। উঠোনে তুলসীর বেদি ছিল, বেদির সামনে নত হয়ে শাদা শাড়ি পরে সরলাবালা সন্ধে-প্রদীপ জ্বালাতেন, উলু দিতেন, তুলসীতলাটি নেই, কল্যাণীর ইচ্ছে করে বেদির জায়গাটি খুঁড়ে দেখতে—যদি কিছু খোয়াও মেলে! হরিনারায়ণ রায়ের এক পিসতুতো দাদা অখিলচন্দ্র সরকার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করতেন, তিনি কার্তিক মাসের এক দুপুরে পুকুরের পশ্চিম দিকে একটি তালগাছ লাগিয়েছিলেন, এই গাছ ছিল কল্যাণীদের চোর চোর, গোল্লাছুট আর বৌচি খেলার গোল্লা। এর গোড়ায় বসে জ্যৈষ্ঠের কড়া দুপুরে জিহ্বায় ট্টা ট্টা শব্দ করে তারা নুন লঙ্কামাখা তেঁতুল খেত। সরলাবালাকে লুকিয়ে খেতে হত, তিনি দেখলেই বলতেন—‘তেঁতুল ফালা। তেঁতুল খাইলে শইলের রক্ত জল হইয়া যায়।’ হঠাৎ হঠাৎ তাল পড়ত গাছ থেকে। কুড়িয়ে নিয়ে মাকে দেওয়া মানে রান্নাঘরের বারান্দায় গামছায় তালের রস ঝুলে থাকা আর টুপ টুপ করে গামলায় সারারাত ধরে পড়া, সেই রস জাল দিয়ে মা পিঠে তৈরি করতেন। এখনও জিভে সেই স্বাদ লেগে আছে। তালের পিঠে কলকাতায় কখনও খেয়েছে কল্যাণী—মনে করতে পারে না! সুপুরি গাছগুলো এখন আর নেই, আগে সুপুরিগাছের পাতা পড়লে এক ধরনের মজা হত। খোলের ওপর কল্যাণী বসত, আর পরিমল পাতা ধরে টেনে টেনে পুরো মাঠ ঘুরত। আবার কখনও পরিমল বসত, কল্যাণী টানত। খোলটা মাটির ঘষায় ঘষায় না ছেঁড়া অবধি খেলা চলত। আহা এখনও কি মাটিতে সেই দাগ নেই সুপুরির খোলের? কল্যাণী সবুজ ঘাসের ফাঁকে আঙুল ডুবিয়ে মাটিতে সেই খোলের দাগ খোঁজে। এই মাটিতে জল পড়লে সোঁদা ঘ্রাণ বেরোত, খুব বড় করে শ্বাস টানলে সেই ঘ্রাণ এখনও পায় সে। কল্যাণী জল পড়া মাটি থেকে এক খাবলা মাটি তোলে। আগে এমন মাটি তুলে তারা রান্নাবাড়ির চুলো বানাতো। স্কুলের ড্রয়িং স্যার আম কাঁঠাল বানাতে দিতেন, মাটি শুকিয়ে ওর ওপর রং করতে হত। স্কুল থেকে ফিরেই কল্যাণী দৌড়ে চলে যেত পুকুর পাড়ে। পুকুরের ধার থেকে এঁটেল মাটি তুলে পুতুল বানাত, অষ্টমী স্নানের দিন মেলায় যেরকম পুতুল পাওয়া যায়, সেরকম পুতুল। আম কাঁঠাল পেঁপে বানিয়ে রোদে শুকোতে দিত। এখন পুকুর পাড়ের সেই এঁটেল মাটি নেই। কল্যাণী তার হাতের মাটিটি হাতের তেলোয় চেপে চেপে দেখে এটি ঠিক কমলালেবুর মত লাগছে। স্কুলে ভূগোল স্যার পড়াতেন পৃথিবী হচ্ছে গোল, ওপর নিচে কমলালেবুর মত সামান্য চ্যাপ্টা। হাতের গোল মাটিটুকুর দিকে তাকিয়ে ভূগোল স্যার প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের মুখখানা মনে পড়ে। স্যার কি বেঁচে আছেন? একবার যদি পায়ের ধুলো নেওয়া যেত!

টুকরো মাঠে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে দল বেঁধে এই মাঠে বন্দি বন্দি, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, গোলাপ পদ্ম খেলত ওরা—দুজন হাত উঁচু করে ধরলে হাতের নিচ দিয়ে লাইন করে বাকিরা যেত আর হাত উঁচু করারা সুর করে বলত—অপেনটো বায়স্কোপ নাইনটেন তেইস্কোপ চুলটানা বিবিয়ানা সাহেব বাবুর বৈঠকখানা…, মনে হয় খুঁজলে এখনও এক্কাদোক্কা, ষোলগুটির দাগ পাওয়া যাবে, হাওয়ায় এখনও গায়ের সেই ঘ্রাণ পাওয়া যাবে। পুকুর নেই, পুকুরের পাড়ে ছিল একটি কাঠগোলাপের গাছ, নক্ষত্রের মত শাদা শাদা ফুল ফুটত—নেই, বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়—বাঁশঝাড়ের উত্তরে ছিল গোপালভোগের দুটো আর ফজলি আমের চারটে গাছ, নেই; পেয়ারা আতা কামরাঙা কিছু নেই। খেজুরগাছও ছিল একটি, শীতের সময় গাছ কেটে মাটির কলসি বেঁধে রাখা হত, ভোরের ঘন কুয়াশায় দাঁড়িয়ে থিরথির কেঁপে রসের কলসি নামানো দেখত কল্যাণীরা, কথা বললে মুখ থেকে শাদা ধোঁয়া বেরোত। মাঠে একটি শিউলি ফুলের গাছ ছিল, শীতের ভোরে ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথত সইরা মিলে। সরলাবালা শিউলির হলুদ বোঁটা রোদে শুকিয়ে রঙ বানাতেন, পোলাও-এ জাফরানের মত ছিটিয়ে দিতেন। কামিনী ফুলের গাছটিও নেই, রাতে কামিনী ফুলের গন্ধে ম ম করত ঘর, সরলাবালা গভীর রাতে দরজায় টোকা দিয়ে বলতেন—‘ও কল্যাণী, জানলা বন্ধ কইরা দে, ফুলের গন্ধে সাপ আসে।’

কিছু নেই। বাড়ি নেই। বৃক্ষ নেই। সামনের মাঠে জামগাছটি কেবল আছে। একা নিঃসঙ্গ জামগাছ। কল্যাণী তার পূর্বপুরুষের ভিটেয় দাঁড়িয়ে নিজেও বড় একা বোধ করে। বড় একা।

৫. কল্যাণী আর দীপন

ইয়াসির একটি রিক্সা করে কল্যাণী আর দীপনকে নওমহল পৌঁছে দেয়। এই বাড়িতে শরিফা থাকে—সেই শরিফা-লম্বাটে মুখ, চোখদুটো বড় বড়, মাথা ভরা কোঁকড়া চুল। শরিফা তাকে চিঠিতে লিখত—‘আমার কিছু ভাল লাগে না কল্যাণী, এখানে আমার কোনও বন্ধু নেই। তুই চলে আয়। আমি যদি ইন্ডিয়া যাবার রাস্তা চিনতাম, তোর কাছে চলে যেতাম। তোর বোধ হয় নতুন নতুন বন্ধু হয়েছে। তুই ছাড়া আমার কোনও বন্ধু নেই। আমাদের খেলা আর জমে না। তোকে ছাড়া খেলতে যেতে ভাল লাগে না। আম্মা বলে বড় হয়েছিস এখন ঘরে বসে রান্না কর, সেলাই কর, খেলা-টেলা বাদ। তুই না থাকায় আমার সব অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। আমার আর গান গাওয়াও হয় না। তোর বাড়িতে দুজন নেচে নেচে গাইতাম—‘ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে আমি বনফুল গো’—এই গান কোথাও শুনলে আমার বড় কান্না পায়। তোর সঙ্গে কবে দেখা হবে বল তো! তোর মামা যদি না নিয়ে আসেন একাই চলে আয়। তুই না একা একা একবার নদীর ওই পার গিয়েছিলি, তা হলে আর ভয় কিসের! রাতবিরেতে শ্মশানঘাটেও তো গেলি একবার। শান্তি সুনীতির সঙ্গে তোর মেশার দরকার নেই। পরিমলকেও বলিস না মিশতে। অহঙ্কারী মেয়েদের আমার দুই চোখে দেখতে ইচ্ছে করে না।’

কল্যাণীও সব জানিয়ে লিখত। গোবরার ঝিল, ট্রামলাইন, বাসে চড়া, ব্রেবোর্ন কলেজে বন্ধুহীন দিন, কিছুই ভাল না লাগা, বাবার ওপর অভিমান, জ্যোতিদার নিরুদ্দেশ, ব্রহ্মপুত্র, জানলার পাশে কামিনীগাছে ফুল ফুটেছে কি না। —ছ-সাত পাতা ভরে যেত এসবেই।

সেই শরিফাকে এত বছর পর দেখবে সে—বুক কেমন ধুকপুক করে, যেন সে হাতের মুঠোয় এক্ষুনি তার সতেরো বছর বয়সটি পেয়ে যাবে। যেন সে এটি বন্ধক দিয়ে গিয়েছিল কারও হাতে। এখন ফেরত নিতে এসেছে। কল্যাণীর চলে যাবার দিন ধুলোয় গড়িয়ে কেঁদেছিল শরিফা, ফিরে আসবার কথা ছিল তার, ফিরে সে আসলই কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

বসবার ঘরে ভারি কাঠের সোফা পাতা। কাঠের একটি সেলফে কাচের বাসনপত্র সাজানো। দুটো ছ-সাত বছর বয়সের মেয়ে দরজায় উঁকি দিয়ে সরে যায়। দেওয়ালে একটি কাবাশরিফের ছবি, মখমলের, বাঁধানো। ইয়াসির ভেতরে গেছে শরিফাকে ডাকতে। কল্যাণী কেন শরিফার বাড়িতে অতিথির মত বসবার ঘরে বসবে! তার তো ভেতরে ঢুকে ওকে আগে জড়িয়ে ধরা উচিত। দীর্ঘ অদর্শনশোক কী সহজে কাটবে তাদের! এসব ভেবে যখনই সে ভেতরের ঘরে ঢুকতে যাবে তখনই যে স্থূল শরীরের ভদ্রমহিলা কুঞ্চিত দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে কল্যাণী চিনতে চেষ্টা করে সে শরিফা কি না; ফর্সা লম্বাটে মুখ, বড় বড় চোখ কি না তার, কোঁকড়া চুলে ঝুঁটি বেঁধে ‘ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে’ গেয়ে গেয়ে নেচে উঠবার সেই কিশোরী কি না সে। চোখদুটো চেনা যায়—সেই চোখ, সেই বিষন্ন সুন্দর চোখ আর চিবুকের কাছে কালো তিল—এই তো শরিফা, এই তো সেই শরিফা, তাকে ছোঁবার জন্য দু হাত বাড়িয়ে দৌড়ে যায় কল্যাণী, কিন্তু শরিফার কপালের ভাঁজ মেলায় না, সে বলে—আপনারে তো চিনতে পারলাম না।

—আমি কল্যাণী। আমাকে ভুলে গেছিস তুই? আমি কল্যাণী। কল্যাণী।

শরিফার কোলে একটি বাচ্চা। তার গায়ের গৌরবর্ণটি নেই আর, তামাটে হয়ে গেছে। কপালে ভাঁজ বাড়ে শরিফার, জিজ্ঞেস করে—কোন কল্যাণী?

—কালিবাড়ির। হরিনারায়ণ রায় আমার বাবা, তোদের পাশের বাড়ি। আমরা খুব বন্ধু ছিলাম।

শরিফার বিস্ময় কমে। কপালের ভাঁজ কপালে থাকে না। সে হেসে বলে—ও। কেমন আছেন?

—তুই আমাকে আপনি করে বলছিস শরিফা?

শরিফা অপ্রস্তুত হাসি হাসে। কোলের বাচ্চাটা হঠাৎ কেঁদে ওঠে। শরিফা বাচ্চার দিকে মনোযোগ দেয়। ‘না না কান্দে না’ বলে বাচ্চাকে দোলায়। কল্যাণীর চেয়ে এই বাচ্চাটির ক্রন্দন তাকে বেশি আকৃষ্ট করে। সে তার কান্না থামাতে দূরে সরে যায়। দীপন পরম আগ্রহে সব দেখছে, সেও কত শুনেছে শরিফার নাম, খেলায় হেরে গেলে শরিফা কাঁদত শুনে দীপন বলেছে—‘শরিফা আন্টি জানে না ফেইলুর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস?’ কল্যাণী কখনও বিমর্ষ বসে থাকলে দীপন বলেছে—‘কার জন্য মন খারাপ মা, দাদু দিদিমা? শরিফা আন্টি?’

শরিফা বাচ্চাটি কোথাও রেখে আসে। এসে আবার সেই অপ্রস্তুত হাসি। ওর দাঁতের ফাঁকে কালো দাগ, পান-জর্দার দাগ। হেসে বলে—কবে আসা হইল?

—আজই এলাম। সকালে রওনা দিয়েছি।

—এইটা ছেলে বুঝি? বাচ্চার নাম কী?

—দীপন। তোর বাচ্চা ওটি? তোর কটি বাচ্চা রে?

—আল্লার রহমতে আমার পাঁচ মেয়ে দুই ছেলে।

—তোর সাত বাচ্চা?

শরিফা মুখে আঁচল চেপে বলে—দুই মেয়ের বিয়াও হইয়া গেছে।

—তাই নাকি? কবে বিয়ে দিলি? কী আশ্চর্য তাই না। আমারও বোধহয় মেয়ে বিয়ে দেবার সময় হল। কত বড় হয়ে গেছি আমরা, তাই না শরিফা? মনে হয় এই সেদিন, এই সেদিন আমরা এক্কা দোক্কা খেলেছি। এক্কা দোক্কা তেক্কা চৌকা পঞ্চা যমুনা দিল্লি। তুই জানিস, এখনও মাঝে মধ্যে স্বপ্নের মধ্যে কুতকুত খেলি। তোরও কী এরকম হয়?

—ওর আর ভাই বোন নাই? শরিফা দীপনকে দেখিয়ে বলে।

—হ্যাঁ। বড় মেয়ের নাম জয়িষা।

—ও।

কল্যাণী আকুল চোখে তাকায় শরিফার মুখের দিকে, শরিফা মেঝেয় চোখ রেখে চুপচাপ বসে থাকে। শরিফার হাত ধরে বিকেল হলেই কল্যাণী চলে যেত নদীর ধারে। হাতটির দিকে তাকায় সে, দু হাতে মোটা দুটো অনন্তবালা। হঠাৎ, কোনও প্রসঙ্গ নেই, কল্যাণীর মনে পড়ে—বাড়িতে নারকেলগাছ পরিষ্কার করবার লোক আসত, নারকেল পাতা ফেলে ফেলে স্তূপ বানিয়ে রাখত মাঠে, সরলাবালা উঠোনে দু-তিনজন লোক বসিয়ে দিতেন পাতা কেটে কেটে শলা বের করতে, সেই শলা দিয়ে বাড়ির ঝাড়ু বানানো হত, কল্যাণী আর শরিফা ছেটে রাখা নারকেল পাতা দিয়ে হাতের ঘড়ি আর বাঁশি বানাত। ওরা হাতে ঘড়ি পরে প্যাঁ পুঁ প্যাঁ পুঁ শব্দে বাঁশি বাজিয়ে ফিরত সারা বাড়ি। এই হাতই তো সেই হাত। শরিফা কি ভুলে গেছে সবুজ পাতার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঘড়ি না-বোঝা বয়সে তারা দশটা বাজলে বলত ছ’টা বাজে, আর দুটো বাজলে ন’টা বাজে? এই নিয়ে জ্যোতিদা আনিস ভাই তুমুল হাসত।

শরিফাকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয় যে সেই যে নারকেল পাতার বাঁশি বানাতাম মনে আছে? জিজ্ঞেস করবার আগেই শরিফা হঠাৎ উঠে ভেতর-ঘরে চলে যায়। যখন আসে, তার পিছন পিছন ট্রে হাতে ঢোকে একটি ছেলে। ট্রেতে চা, টোস্ট বিস্কুট আর চানাচুর। কল্যাণী আর দীপন দুপুরে খায়নি কিছু। শরিফার আর দোষ কী, ও তো আর জানে না যে তারা এখনও না-খাওয়া। দীপন চানাচুরের প্লেটটি কাছে টেনে নেয়। কল্যাণী চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলে—‘শরিফা, ঘরে ভাত-টাত নেই? আমরা দুপুরে কিন্তু খাইনি কিছু।’ কল্যাণী বলতে কোনও সঙ্কোচ করে না। তার কেন শরিফার কাছে ভাত চাইতে দ্বিধা হবে! একসময় এ ওর বাড়িতে সে দুপুর হোক রাত হোক খেতে বসে পড়ত। ছোটবেলার বন্ধুর কাছে আবার রাখঢাক কী! শরিফাই বরং লজ্জা পেয়ে ‘দেখি’ বলে উঠে যায়। ও এত কম কথা বলছে কেন? ও কি ভুলে গেছে সেই সব দিন? সেই সব…সেই সব…ভোকাট্টা ঘুড়ির পিছনে সেই সারা দুপুর দৌড়নো দিন একাই কল্যাণী লালন করেছে তবে! আর সবার কাছে তা ধূসর! একদিন ফিরে আসবে বলে সে যে গুছোচ্ছিল জীবন, সে কী এরকম ফিরে আসা—যে, শরিফা তাকে দেখেই আনন্দে উল্লাস করবে না, কলকল করে তিরিশ বছরের গল্প করবে না দুজনের হাতদুটো দুজনে জড়িয়ে, যেন কেউ আর ছুটে যেতে না পারে! এ কেমন ফিরে আসা তবে কল্যাণীর! অনির্বাণ এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে বলেছিল—কী তুমি ফিরবে তো, নাকি থেকে যাবে!

কল্যাণী হেসে বলেছিল—-আমি তো দেশে ফিরছি। আর কলকাতায় তো আসতে হবেই। সংসারে যখন আটকে গেছিই।

—সংসারে না আটকালে মনে হয় আসতে না?

কল্যাণী হেসেছিল। ওই হাসির কী অর্থ অনির্বাণ করেছে তা অনিবার্ণই জানে।

বারবার বাদলের কথা মনে পড়ে তার। বাদল কোথায় থাকে, সেও কী খুব পাল্টে গেছে! সেও কী হঠাৎ দেখলে চিনবে না, ভ্রু কুঁচকে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে। কল্যাণীর বলতে হবে—সেই যে আমরা কলেজ ফাঁকি দিয়ে নৌকো করে ব্রহ্মপুত্রে ভেসে বেড়াতাম। আর বাবুইপাখির মত ঘর বাঁধতে চাইতাম, ছোট্ট একটি ভালবাসার ঘর। আমি সেই দুর্ভাগা কল্যাণী!

চা দেবার ছেলেটি দুটো প্লেটে ভাত আর ডিমভাজা রেখে যায়। কল্যাণী জিজ্ঞেস করে—শরিফা কোথায়?

ছেলে বলে নামাজ পড়ে।

শরিফা নামাজ পড়ে? কল্যাণীর মনে পড়ে না শরিফাকে সে কখনও নামাজ পড়তে দেখেছে। বরং দুর্গাপুজোয়-কালীপুজোয় সে কল্যাণীর সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়াত। জ্যোতিপ্রকাশ, সৌমেন, মাখনদের আরতি দেখে খুশিতে হাততালি দিত। বিসর্জনের দিন কল্যাণীর সঙ্গে সেও মহাদেবের গায়ের ওপর দাঁড়ানো লাল জিভ বের করা কালীমূর্তির পিছন পিছন নদীতে যেত। দীপন ডিম খেতে পছন্দ করে না। কল্যাণী বলে—ডিম খুব ভাল জিনিস বাবা, প্রোটিন, খেয়ে নাও।

দীপন ভাতগুলো নাড়ে-চাড়ে, কল্যাণীও মেখে রেখে দেয়। শরিফা নামাজ শেষে ফিরে এসে বসে, যোজন দূরত্ব নিয়ে বসে। কল্যাণী আকুল স্বরে বলে—কালিবাড়ি যাই চল। আমাদের বাড়িতে।

শরিফা ঠাণ্ডা গলায় বলে—কিছু তো নাই এখন।

—তবু যা আছে। জামগাছটি আছে দেখলাম।

শরিফা অবাক হয়—জামগাছ দেইখা কী হইব?

কল্যাণী নির্বাক তাকিয়ে থাকে, বোঝাতে পারে না, জামগাছ দেখে তার কী হবে। জামগাছে দেখার মত কী-ই বা আছে। দীপন উসখুস করছিল, কল্যাণী বলে—‘যাও বাবা, বারান্দায় ওদের সঙ্গে খেলা কর গিয়ে।’ দীপন বারান্দায় চলে যায়। কল্যাণীর পায়ের কাছে পড়ে আছে কাপড়চোপড়ের ব্যাগটি। তার মুখ হাত ধোয়া দরকার। বাসের জার্নি। ধুলোয় ভরে গেছে গা। শরিফা গলা উঁচু করে বলে—এই রে লতিফা, নিম্মি, নাদিরা অযু কইরা শিগরি নামাজ পড়তে যা।

সালোয়ার কামিজ ওড়না পরা টিন এজ তিনটে মেয়ে মায়ের গলা শুনে ভেতরে আসে। বড় বড় চোখ করে কল্যাণীকে দেখে। কল্যাণী জিজ্ঞেস করে—তোর মেয়ে বুঝি ওরা?

সুড়সুড় করে মেয়েগুলো ভেতর-ঘরে চলে যায়। কল্যাণী ডাকে ওদের—শোন শোন।

কেউ দাঁড়ায় না। ওড়নায় মুখ আড়াল করে চলে যায়।

কল্যাণী বলে–মেয়েগুলো খুব লাজুক নাকি? তোর একেবারে উল্টো, তাই না?

শরিফা সম্ভবত ‘উল্টো’ শব্দটিতে খুশি হয় না। হ্যাঁ না কিছু বলে না।

কল্যাণী জিজ্ঞেস করে—তুই পড়াশুনা কতদর করলি রে শরিফা?

—আই এ পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। বিয়া হইয়া গেল, পরীক্ষা আর দেওয়া হয় নাই।

—কালিবাড়ি যাস না?

—খুব কম।

—আমাদের বাড়িটা কারা নিল রে, কারা থাকে এখন? বাড়িটা ভাঙল কারা? গাছগুলো কাটল কারা শরিফা?

শরিফা ঠোঁট উল্টে বলল—জানি না।

—এই দেখ দেখ মাটি এনেছি। আমাদের বাড়ির মাটি। কল্যাণী ব্যাগ খুলে মাটির ডেলাটি বের করে।

শরিফা ছুঁয়ে দেখে না। বলে—ও। যেন তৈমুম করার মাটি।

—তৈমুম? তৈমুম কি রে?

—শরীল অসুস্থ থাকলে পানি না ছুইয়া তৈমুম করলেও নামাজ হয়। ঘরে আমিও মাটি রাখি।

কল্যাণীর মনে হয় এটিও অনেকটা তৈমুম করবার মাটি। এটি ছুঁলেও গা পবিত্র হয়। এই মাটিতে তাদের গোল্লাছুটের গন্ধ আছে। এই মাটি যদি পবিত্র নয়, পবিত্র তবে কী!

কল্যাণীর বুক ভেঙে যায়। শরিফা মুখ মলিন করে বসে থাকে।

সে আরও কাছে সরে আসে শরিফার। আবারও আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করে—রুখসানা কেমন আছে? সেলিম? মাখন? সৌমেন? ওরা কোথায়? অনিলকাকার খবর জানিস?

—সংসার নিয়া এত ঝামেলা। ওই দিকে আর যাইতে পারি কই!

—মুন্নিটা কেমন আছে? শুনলাম ঢাকায় থাকে। অতটুকুন মেয়ে ঘর সংসার করছে? মনে আছে একবার কলতলায় আছাড় খেয়ে পড়েছিল, পরনে হলুদ একটা হাফপ্যান্ট ছিল তার?

শরিফা অবাক চোখে তাকায়। কবে আছাড় খেয়েছিল মুন্নি, কোন ছোটবেলায়, তার পরনে কী রঙের প্যান্ট ছিল না ছিল কে জানে। এত তুচ্ছ ঘটনা কি কেউ মনে রাখে?

—ফুলদানি ছুঁড়েছিল শাহানা। ওর কপাল কেটে গিয়েছিল। দাগ কি শেষ অবধি মিলিয়েছিল?

—কি জানি! তা তো জানি না।

—তোর মনে আছে শরিফা, আমরা একবার তোদের বাড়ির ছাদে শুয়ে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সারারাত আমাদের কেউ খুঁজে পায়নি! বাবা থানায় ডায়রি করে এলেন। সকালে আমরা চোখ ডলতে ডলতে নামলাম।

‘ডলতে ডলতে’ শব্দদুটো ব্যবহার করবার পর কল্যাণীর চেতনা হয়, তার আসলে ময়মনসিংহের ভাষায় কথা বলা উচিত। জয়িষা দীপনের সঙ্গে কল্যাণী মাঝে মধ্যে ‘কিরে তরা খাইবি না?’ ‘ভাল কইরা লেখাপড়া না করলে পরীক্ষায় লাড্ডু পাইবি কইলাম।’ এরকম কথা বলে। শুনে অনির্বাণ বিরক্ত হয়ে বলে—ছেলেমেয়েদের কী শেখাচ্ছ বল তো! তুমি কি এদের মানুষ হতে দেবে না?

কল্যাণী মনে মনে হাসে মানুষ কি আমরা হইনি? অনির্বাণটা বোকাও বটে। ওর বোকামোর কথা ভেবে কল্যাণীর আবার হাসি পায়। হেসেই সে বলে—টয়লেটটা দেখাইয়া দে তো শরিফা, চান কইরা ফালাই।

কল্যাণী কোনও ফাঁক রাখতে চায় না। ভাষার দূরত্বটুকু ঘুচিয়েও সে শরিফার কাছাকাছি আসতে চায়। ব্যাগ থেকে নিজের সাবান তোয়ালে বের করে টয়লেটে যায়। শরিফা পিছন পিছন আসে, কল্যাণী এক চিলতে উঠোনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে—তোদের টিউবওয়েল নেই?

শরিফা দ্রুত মাথা নাড়ে যেন টিউবওয়েল একেবারেই ছোটলোকদের জিনিস, ভদ্রলোকের বাড়িতে এটি থাকে না। কল্যাণী ময়মনসিংহের টিউবওয়েল চেপে জল খাবে বলে কতকাল অপেক্ষা করে ছিল। স্নানঘরে দাঁড়িয়ে সে ভাবে, শরিফার কী কোনও কারণে মন খারাপ? সে তো এখনও তাদের জন্য কোনও ঘর দেখিয়ে দেয়নি। একবারও বলেনি তার বাড়িতে থাকতে, ভাত খাওয়ার কথা—এমন কি স্নান করবার কথাও যেচে বলল কল্যাণী। এত কেন নিস্পৃহ শরিফা? ওর কি বড় কোনও অসুখ হয়েছিল, স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে? কী তবে হয়েছে শরিফার, শৈশব কৈশোর তো হাজার বছর আগে তারা পেরিয়ে আসেনি যে ভুলে যেতে হবে সব! আর ওসব কি ভুলে যাওয়ার জিনিস? কেউ পারে ভুলে যেতে? পারে কেউ ভুলে যেতে দুজনে বড় বিজ্ঞানী হবে, তারপর পিঠের পিছনে দুটো পাখা লাগাবে, উড়ে বেড়াবে আকাশময়, সেইসব স্বপ্ন? তারা খাবে না পরবে না, জগতের পার্থিব জিনিস নিয়ে তারা ভাববে না, কেবল উড়ে বেড়াবে এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে। চাঁদে যাবে, মঙ্গলগ্রহ, বুধ, বৃহস্পতি, নেপচুন সব দেখবে ঘুরে ঘুরে। সেই চাঁদে তো শেষ অবধি গেলই মানুষ। মানুষ যাবার আগে মনে মনে অনেকবার গিয়েছে ওরা, শরিফা আর কল্যাণী। শরিফা কি ভুলে গেছে সব? যাহ, মানুষ কি ভুলে যেতে পারে এত কিছু? ভুললে এ তার নিজেকেই ভুলে যাওয়া। কল্যাণী মন ভরে স্নান করে। কতদিন দেশের জলে সে স্নান করেনি। না হোক পুকুর বা টিউবওয়েলের জল, তবু তো দেশেরই জল। জলে সে দেশ দেশ গন্ধ পায়। এখনও তার জল খাওয়া হয়নি। বুকের মধ্য থেকে তৃষ্ণাটি কিছুতেই যাচ্ছে না। স্নানের জলকেই সে আঁজলা ভরে নিয়ে দেখে, তার পলক পড়ে না।

স্নান সেরে কল্যাণী বলে—শহরটা ঘুরে দেখতে ইচ্ছে করছে। চল ঘুরি।

শরিফা শোবার ঘরের খাটে বসেছিল, নিরুদ্বেগ কণ্ঠে বলে—আমি তো যাইতে পারব না। বাচ্চার বাপের কাছে না জিগাস কইরা আমার যাওয়া হইব না।

—না জিগাস কইরা গেলে তোরে কী করবে শুনি?

শরিফা ম্লান হাসে। কল্যাণী বুঝে পায় না তার এখন কী করা উচিত। সে কি শরিফার শীতল শরীরটি ঝাঁকুনি দিয়ে একবার বলবে কী তুই মরে গেছিস নাকি?

৬. দীপন চোখ বন্ধ করে আছে

দীপন চোখ বন্ধ করে আছে, ঘুমোচ্ছে না—বুঝতে পেরে কল্যাণী জিজ্ঞেস করে—ওদের সঙ্গে খেললে বুঝি? কি খেললে?

দীপন ভাঙা কণ্ঠে বলে—আমি খেলিনি। ওরা পিঁপড়ে পিঁপড়ে খেলছিল।

—পিঁপড়ে পিঁপড়ে আবার কী খেলা, এই নাম শুনিনি তো!

—দেওয়ালে যখন লাইন ধরে পিঁপড়ে যায়, ওরা বেছে বেছে লাল পিঁপড়ে মারে, কালো পিঁপড়ে মারে না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কালোগুলো মারছ না কেন? ওরা বলল কালো পিঁপড়ে তো মুসলমান, তাই। তবে লালগুলো কী, ওরা বলল হিন্দু।

কল্যাণীর বুক কেঁপে ওঠে। দীপনের মুখে কী শুনছে সে! শরিফার ছেলেমেয়েরা হিন্দু পিঁপড়ে মারে? দীপন পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। কল্যাণীর সারারাত ঘুম আসে না। ঘরটিতে কোনও ভেন্টিলেটর নেই, গা তার ভিজে যায় ঘামে। খাটের নিচে পিঁয়াজ রাখা, হঠাৎ হঠাৎ ইদুর দৌড়য়। সপসপ করে সাপের মত কিছু নড়ে। কল্যাণীর ঘুম আসতে চায় না। সে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকে।

ভোরবেলা দরজা খুলে সে বেরোয়। অত ভোরেই বারান্দায় বসে শরিফার বাচ্চারা আরবি পড়ছে, টুপি পাঞ্জাবি পরা এক লোক সুর করে বলছে—‘আলহামদুলিললাহ হি রাব্বিল আল আমিন আর রাহমানির রাহিম।’ বাচ্চারাও সঙ্গে সঙ্গে একই সুর ধরছে। কল্যাণী বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়ায়। ভোরের ঝিরঝির হাওয়া তাকে অল্প অল্প ছুঁয়ে যায়। সে দাঁড়াবার পরই থেমে যায় ওদের পড়া। কল্যাণী শোনে হুজুর ফিসফিস করে বলছে—হিন্দু নাকি?

বাচ্চাদের একজন গলা চেপে বলে—হ। ইন্ডিয়া থেইকা আইছে।

ফিসফিস বাড়ে। রাস্তার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা কল্যাণী বুঝে ফেলে, সে না সরলে ওদের পড়া আর এগোবে না। ফিরে আসবার সময় সে লক্ষ করে প্রতিটি চোখ তার আপাদমস্তক দেখছে।

গত রাতেও এ ধরনের গুঞ্জন সে শুনেছে শরিফা আর তার স্বামীর মধ্যে। স্বামীটি বলছে—তুমি তো কুনোসময় কও নাই ছোটকালে তুমার একটা হিন্দু বান্ধবী ছিল!

—কই নাই মনে ছিল না।

—কয়দিন থাকবে মনে অয়?

—জানি না।

—বাড়িঘর নাই, আত্মীয়স্বজন নাই, তাইলে আইছে কেন সে?

—এইটাই তো বুঝলাম না।

বাড়িঘর নেই, আত্মীয়স্বজন নেই, কী দেখতে তবে এসেছে কল্যাণী—এই প্রশ্ন অনেকের চোখে। কল্যাণী আসলে বোঝাতে পারছে না কেন তবু এসেছে সে। এসে কী লাভ হয়েছে তার।

রাতে খেতে বসে কল্যাণী বলেছিল—শরিফা, বিরুই চালের ভাত খাইতে বড় ইচ্ছা করতাছে, সাথে চেপা শুটকির ভর্তা। কই মাছের ঝোল করা যায় না? জ্যোষ্ঠি মাসের শেষ, ইলিশ উঠে নাই? ওই দেশে যে কী রান্না করে, মুখে দিতে পারি না, সুক্ত ছ্যাকা পঞ্চব্যাঞ্জন থোকা যত্তসব। মনে আছে আমরা বড়শি দিয়া মাছ ধরতাম? লাটি মাছের ভর্তা যে কী ভাল বানাইত খালাম্মা। কুমড়া পাতা দিয়া নুনা ইলিশ!

আতাহার তাকিয়ে ছিল কল্যাণীর দিকে। কল্যাণীকে দেখতে শরিফার চেয়ে অনেক কম বয়স লাগে। ছিপছিপে শরীর। মেদ নেই। আতাহারের চোখের তীর কল্যাণীর বুক, পেট, তলপেট, কোমর, নিতম্ব ছুঁয়ে যায়—ভেতরে শিউরে ওঠে সে। এরকম ছুঁচোলো দৃষ্টি সে তিলজলায় সৌমিত্রর চোখে দেখেছিল। সকালেই সে বেরোবার জন্য তৈরি হয়। দীপনকে কাপড়চোপড় পরিয়ে শরিফাকে ‘একটু কালিবাড়ির দিকে যাই’ বলে সে বেরিয়ে যায়। সকালেও শরিফার নির্লিপ্ত সেই মুখ। এককাপ চা খেতে ইচ্ছে হয়েছিল খুব। চায়ের তৃষ্ণাটি সে সঙ্গে নিয়ে বেরোয়। হাঁটতে থাকে, হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ধারের গাছে দেখে কদমফুল ফুটেছে। এ কি আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের কদম ফুল! ঝেঁপে বৃষ্টি আসত যদি আজ। কল্যাণীর বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ইচ্ছে করছে, বৃষ্টি এলে আগে উঠোন জুড়ে দৌড়ে বেড়াত সে। পুকুরঘাটে বসে জলের ওপর জল পতনের শব্দ শুনত। সরলাবালা বলতেন—উইঠা আয় জলদি। জ্বর উঠব।

কল্যাণীর একবার জ্বর হয়েছিল। সাতদিন কলেজে যায়নি। কী যে ছটফট লাগছিল। বাদলের কথা জ্বরের ঘোরে বারবার বলেছে। কত কেউ কপালে জলপট্টি দিয়েছে, কত কেউ হাতের পিঠে কপাল ছুঁয়ে দেখেছে। যার স্পর্শের জন্য তার প্রাণ শুকিয়ে থাকত, সে বাদল। বাদল তো আর বাড়ি এসে তার জ্বর দেখতে পারে না। সরলাবালা নুন মাখা আদা দিতেন খেতে, কল্যাণী খেত আর উদাস তাকিয়ে থাকত জাম পাতার ফাঁকে টুকরো টুকরো আকাশের দিকে। তার মনে হত বাদল যদি ওই আকাশে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ তার জানালায় একবার তাকায়, দেখবে শুকনো মুখে কল্যাণী শুয়ে আছে। তার শিয়রে আঙুর আর কমলালেবু পড়ে আছে না খাওয়া, তার খেতে ইচ্ছে করে না। তার জ্বর-শরীরে চলে যেতে ইচ্ছে করে দূরের কোনও গ্রামে, সেই গ্রামের কোনও ঝোপঝাড়ে জোনাক জ্বলা রাতে তার গান গাইতে ইচ্ছে করে—‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী।’ বাদল খুব কাছে বসে শুনবে আর বিহ্বল চোখে তাকে দেখবে। মনে হত তার যদি পাখা থাকত, পাখা মেলে সবটা আকাশ সে উড়ে বেড়াতে পারত। উড়তে উড়তে বাদল আর সে সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে চলে যেত অন্য এক অচেনা দেশে। কল্যাণী আকাশের দিকে তাকায়, এই আকাশ যেন তার বেশি চেনা। এই আকাশের সঙ্গে মনে মনে তার কত কথা হত। তার নাগালের মধ্যে এখন সবটুকু প্রিয় আকাশ। স্বপ্নের পুরোটা শহর তার হাতে। এখন তো শাসন করবার কেউ নেই। সরলাবালা নেই, হরিনারায়ণও নেই, কে কল্যাণীকে টেনে তুলে দেবে ট্রেনে! ময়মনসিংহ জংশন থেকে ঢাকার ফুলবাড়িয়া স্টেশন, ফুলবাড়িয়া থেকে নারায়ণগঞ্জ, শীতলক্ষার ঘাট থেকে স্টিমারে খুলনা, খুলনা থেকে ব্রডগেজের লাইন ধরে বেনাপোল, থমথমে সীমান্ত হেঁটে পার হয়ে বনগাঁ থেকে শিয়ালদার উদ্দেশ্যে আবার ট্রেন। এখনও মনে হলে কল্যাণীর গা কেঁপে ওঠে। রাস্তায় এত লোক হাঁটে, বাদল হাঁটে না! এই যারা মর্নিং ওয়াক সেরে, কেউ বাজার সেরে ফিরছে—এদের মধ্যে বাদলের থাকা অসম্ভব কিছু নয়। বাদলও তো সংসার করছে নিশ্চয়ই, তারও ঘর ভরে ছেলেমেয়ে হয়েছে। সেই যে সে বলেছিল তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। বাদল কি কল্যাণীকে ছাড়া বেঁচে নেই! আসলে ওরকম বলে সবাই, মনে হয় কিছু তার চাই-ই চাই, তা না হলে বোধ হয় সে বাঁচবে না, বেঁচে মানুষ যায়ই শেষ পর্যন্ত। কারও জন্য কারও জীবন বসে থাকে না, জীবন এত ছোট যে কাকে ছাড়া বাঁচব, কাকে ছাড়া বাঁচব না এসব হিসেব কষতে কষতেই জীবন ফুরিয়ে যায়। জীবনে যাকে সবচেয়ে প্রয়োজন আজ, তাকেই হয়ত কাল অচ্ছুৎ মনে হয়। কড়া রোদ পড়েছে। কল্যাণী একটি রিক্সা ডাকে। রিক্সাকে বলে যেদিকে খুশি যাও। মাঝে মাঝে শরিফাকে নিয়ে কল্যাণী এরকম বেরিয়ে পড়ত, রিক্সায় উঠে বলত যেদিকে খুশি যাও। যেদিকে খুশি সেদিকে চলে যাবার ইচ্ছে তার অনেকদিনের। কিন্তু যেদিকেই যেত ফিরে সে আসতই। যাবার আনন্দ তার যেমন ছিল ফেরার তাড়াও তার ছিল। একবার বাদলের সঙ্গে রিক্সা চড়েছিল কল্যাণী, যেতে যেতে অনেক দূর চলে গিয়েছিল। ভয়ে বুক কাঁপছিল তার, কে না কে দেখে ফেলে, শহর ভর্তি হরিনারায়ণের চেনা লোক, খবর পৌঁছে গেলে সর্বনাশ। শহর পার হয়ে খাগডহরের কাছে গিয়ে মুখ থেকে হাত সরিয়েছিল সে। বাদল বারবারই বলছিল—‘তুমি একটা ভীতুর ডিম। তোমারে দিয়া কিচ্ছু হবে না। দেখুক না সবাই, দেখুক। কী হবে! বলুক তোমার বাবার কাছে, বলুক। কী হবে!’ কল্যাণীকে দিয়ে হয়নি কিছুই। তার ফেরা হয়নি বাদলের উদ্যাম ভালবাসার কাছে, বাদলের ঘোর কালো শরীরের কাছে। ফেরা হয়নি ছুঁই ছুঁই করেও ছোঁয়া হয়নি এমন স্বপ্নের কাছে। রিক্সা করে ওরা মুক্তাগাছা গিয়েছিল, জমিদারবাড়ি, কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ, মন্দির ঘুরে এসে যখন পুকুরঘাটে থামল, বাদল বলল—‘এই পুকুরে সূর্যকান্ত মহারাজা যখন গোসল করতেন, পুকুরের চার কিনারে মোমবাতি হাতে মহারাজার উপপত্নীরা দাঁড়াত, তারা শ্বাস বন্ধ করে রাখত যদি শ্বাস লেগে মোমবাতি নিবে যায়, যার মোমবাতি নিবত না তার সাথে মহারাজা সেই রাতে থাকতেন।’ শুনে কল্যাণী বলেছিল—‘আমি হলে ফুঁ দিয়ে নিজেই বাতি নিবিয়ে দিতাম।’ গোপালের দোকানে বসে মণ্ডা খেয়েছিল দুজন। আহা কী স্বাদ সেই মণ্ডায়! কলকাতার রসগোল্লা নিয়ে লোকের আহা আহা ভাব দেখলে রাগ ধরে কল্যাণীর। মুক্তাগাছার মণ্ডা একবার যদি সে খাওয়াতে পারত ওখানে! শান্তি সুনীতিরা কলকাতার সন্দেশ নিয়ে হইহুল্লোড় করলে একবার সে ঠোঁট উল্টে বলেছিল—‘আমাদের মণ্ডা কত মজা!’ শুনে ওরা হো হো করে হেসে ওঠে। বলে—‘মজা কী গো। খাবার জিনিস আবার মজার হয় নাকি? মজার হয় গল্প, মজার হয় লোক।’ কল্যাণী বড় লজ্জা পেয়েছিল। মণ্ডা ছেড়ে ওর ‘মজা’ শব্দ নিয়ে ওরা মজা করেছিল। মুক্তাগাছা থেকে ফিরবার পথে ঘনশ্যামপুরের কাছে বাদল তার হাত ছুঁয়ে বলেছিল—‘আমরা এখানে শনের একটি ঘর করে থাকব।’ কল্যাণী আঁতকে উঠেছিল—‘এই ধানক্ষেতের মধ্যে?’ শনের ঘর নিয়ে তার কোনও আবেগ ছিল না, কিন্তু বাদল তার স্বপ্ন দিয়ে এমন নিবিড় করে বেঁধেছিল কল্যাণীকে যে দিগন্ত ছোঁয়া সবুজ ধানক্ষেতের ওপর টকটকে লাল শাড়ি পরে কল্যাণী মনে মনে সারাদিন দৌড়ে বেড়াত। নতুন বাজার, পণ্ডিতবাড়ি, টাউন হল, সার্কিট হাউসের পাশ ঘুরে এসে কলেজ রোডে ওঠে রিক্সা। গাছে বরই পাকলে ডাল ধরে ঝাঁকুনি দিলে যেমন টপটপ করে পড়ে, তেমনি তার স্মৃতির বৃক্ষ ধরে কেউ বোধহয় ঝাঁকালো হঠাৎ। তার মনে পড়তে থাকে এই পথ ধরে সে কলেজে যেত। আনন্দমোহন কলেজ। লাল ইটের বিল্ডিংটি বাঁদিকে পড়তেই সে রিক্সা থেকে নেমে পড়ে—মাঠের কড়ইগাছটি আছে এখনও। ছেলেমেয়েরা বসে আছে, হাঁটছে। সোনার খনি খুঁজে পাবার আনন্দ হয় কল্যাণীর। সে এলোমেলো হাঁটতে থাকে মাঠে, কলেজের করিডোরে, পুকুরঘাটে, দূরের শিমুলগাছটি খোঁজে, পায় না। বাদলকে খোঁজে, কারও কারও মুখ অনেকটা বাদল-বাদল লাগে। করিডোরে দাঁড়িয়ে বাদল তার হাতের পিঠে একবার চুমু খেয়েছিল, কী যে শিরশির লেগেছিল সেদিন। দু দিন সে বাঁ হাতখানায় জল ছোঁয়ায়নি। যদি মুছে যায়! কল্যাণী লক্ষ করে তার পিছন পিছন একদল ছেলে আসছে, তাদের কেউ শিস দিচ্ছে, কেউ গান গাইছে—‘দেখা হ্যায় পহলি বার সাজন কি আখো মে পেয়ার।’ কল্যাণী পিছন ফিরে ওদের একজনকে জিজ্ঞেস করে—তোমরা কোন ইয়ারের ছাত্র?

—ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ার।

—জানো আমি এই কলেজে পড়েছি। অনেক আগে। তোমাদের জন্মেরও আগে। এখনও কি নিচের তলায় বাংলা ক্লাস হয়?

ছেলেরা এ ওর মুখের দিকে তাকায়। যেন খুব হাসির কথা শুনছে ওরা। আঠারো-উনিশ হবে ওদের বয়স। ওদের একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করে—এই বাংলা ক্লাস কোথায় হয় রে?

যাকে জিজ্ঞেস করে, সে হেসে বলে—স্যারের বাংলোয়।

—ঠিক কইরা বল। দুষ্টামি রাখ।

—বললাম ত।

পিছন থেকে একজন বলে—দোতলায়।

কল্যাণী হেসে জিজ্ঞেস করে—তোমরা বুঝি ক্লাস ফাঁকি দাও?

শুনে হাসির রোল ওঠে। কল্যাণীর বুক চিরে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরোয়। পিছনের একটি ছেলে চিৎকার করে ওঠে—‘ল যাই গা’ বলে, সঙ্গে সঙ্গে বাকি ছেলেরা শব্দ করে হেসে ওঠে। কল্যাণী ঠিক বুঝে পায় না কাকে নিয়ে হল্লা করছে ওরা? পাশ কেটে একদল মেয়ে চলে গেল, ওদের উদ্দেশ্যেই কি? তার আরও জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল—কেমেস্ট্রির ল্যাবরেটরি কি আগের জায়গায় আছে? তোমরা এখন ফিজিক্স কার বই পড়? জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল—পুকুরপাড়ে যে একটি শিমুলগাছ ছিল, ওটি নেই কেন? শিমুল কি ফুটত না? তার বলতে ইচ্ছে করছিল—জানো তো, আমাদের সময় মেয়েরা স্যারের পিছন পিছন ক্লাসরুমে যেত। ক্লাস শেষ হলে আমরা বসে থাকতাম কমনরুমে। ঘোরাফেরা করতে হত লুকিয়ে। আর এখন মেয়েরা দিব্যি এদিক ওদিক হেঁটে বেড়াচ্ছে, ভাল লাগছে দেখতে। আচ্ছা, পুকুরে কি সাঁতার খেলা হয় না আগের মত? আমরা কিন্তু ছাত্র ইউনিয়ন করেছি। দল বেঁধে গণসঙ্গীত গেয়েছি। উই শ্যাল ওভারকাম…তোমরা গাও না আমরা করব জয়…তারপর ধর কারার ওই লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট?

এসব আর বলা হয় না কল্যাণীর। ঠোঁটের কাছে কথাগুলো নিয়ে এসেও আবার গিলে ফেলে। কলেজ গেটের দিকে বড় উদাস হেঁটে যায় সে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি গেলে যেমন লাগে, তেমন লাগে তার। কী যেন খুব নেই নেই লাগে।

‘লাগবে চুড়ি ফিতা’ কাচের বাক্সে চুড়ি ফিতে ক্লিপ সাজিয়ে ফেরিঅলা যেত আগে, জিভে নিলে মিলিয়ে যায় গোল গোল গোলাপি হাওয়াই মিঠাই যেত, বাইরে ‘হাওয়াই মিঠাই’ ডাক শুনলে কল্যাণী দৌড়ে বেরোত ঘর থেকে। রাস্তায় হাওয়াই মিঠাই, চুড়ি ফিতে কোনও ফেরিঅলা চোখে পড়ে না। শপিং সেন্টার বেড়েছে। শাড়ি কাপড় কসমেটিকস কনফেকশনারি বেড়েছে। অনেক বদলে গেছে নদী ঘেঁষা স্নিগ্ধ শহরটি। পণ্ডিতবাড়ি, কোর্ট-কাছারি, সাহেব কোয়ার্টারে ঘুরতে ঘুরতে জজকুঠিতে চোখ পড়ে কল্যাণীর। এই কুঠিতে ছোটবেলায় কত সে এসেছে, অনিল মুখুজ্জে সেই কতকাল আগে এই কুঠির সামনে দাঁড়িয়ে একদিন বলেছিলেন—‘এখানে একজন জজসাহেব ছিলেন, তিনি এই কুঠির দোতলায় বসে তাঁর মানস সরোবর দেখতেন। বল তো মানস সরোবরটা কী?’ কল্যাণী বলেছিল—‘থুক্ক’। অনিল মুখুজ্জে বলেছিলেন—‘ব্রহ্মপুত্র। একদিন সেই জজের দেড় বছরের মেয়ে একটি জবাকুসুম তেলের শিশি ভেঙে ফেলেছিল, দেখে জজসাহেব ছড়া লিখলেন—‘তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ কর, তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ কর, তার বেলা?’ বল তো এই জজসাহেবের নাম কী?’ কল্যাণী আবার ‘থুক্ক’ বলেছিল। অনিল মুখুজ্জে বলেছিলেন—‘অন্নদাশংকর রায়। কত আড্ডা দিয়েছি দুজনে দোতলার বারান্দায় বসে। মানুষ বড় ভাল ছিলেন।’ কল্যাণী দীপনকে জজকুঠির দোতলা দেখিয়ে বলে—‘ওখানে বসে একজন খুব বড় রাইটার একটি ছড়া লিখেছিলেন, স্কুলের প্রাইজ গিভিং সেরিমনিতে পড়বার জন্য একটি ছড়া শিখিয়েছিলাম তোমাকে, বল তো ছড়াটি’; দীপন থুক্কু বলে না, চোখ বুজে বলে যায়—‘…তোমরা যে সব ধাড়ি খোকা ভারত ভেঙে ভাগ কর, তার বেলা?’ ভারত ভেঙে ভাগ করলে দীপনের কিছু এসে যায় না বলে ছড়াটি বলতে পেরে সে হেসে ওঠে। এদিকে বুক ভেঙে যায় কল্যাণীর। এই হৃদয়-ছোঁওয়া আপন শহরটি কেমন পর পর লাগছে। আজ কার জন্য এ শহর তার নিজের হয়েও নিজের নয়? কার দোষে সে আজ পথে পথে পরশপাথরের মত কিছু খুঁজছে? জন্মের পর নাড়ি ফেলা হয় মাটিতে, সেই নাড়ি খুঁজছে সে? নাকি গন্ধ খুঁজছে, মায়ের বুকের গন্ধ? শশাবার ঘরের জানালার পাশে যে কামিনীগাছ ছিল, সেই কামিনীর গন্ধ খুঁজছে সে? কি খুঁজছে কল্যাণী বুঝে পায় না। কাছারি রোড, পণ্ডিতবাড়ি, নতুনবাজার, স্বদেশি বাজার, মেছুয়াবাজার, স্টেশন রোড, আমলাপাড়া, আমপট্টি, মহারাজা রোড, পাটগুদাম ঘুরতে ঘুরতে রিক্সাঅলা মোটা গলায় বলে—‘কুন জাগায় নামবাইন ঠিক কইরা কইন। চরকির মত ঘুর পারলে চলব নি?’ ছোট্ট ম্যাচবাক্সের মত শহর, দুবার ঘুরে এলেই শহরটি শেষ হয়ে যায়। অথচ ছোটবেলায় এই শহর ফুরোতে চাইত না। হাঁটতে হাঁটতে হাঁটুতে ব্যথা ধরত, দীর্ঘ পথ তবু না দেখা থেকেই যেত। শ্মশানঘাটে এসে কল্যাণী রিক্সা ছেড়ে দেয়। সামনে শম্ভুগঞ্জের ব্রিজ, কল্যাণী বলে—‘দীপন, ওই যে দেখ রেল ব্রিজ, গভীর রাতে ওই সেতুর ওপর দিয়ে ঝমঝম করে ট্রেন যেত। মা বলতেন—বড়লাট যায় গৌরীপুরের জমিদারবাড়ি দেখতে। শুনে শুনে পরিমল বলত—দিদি দিদি বললাট দায় গৈলিপুলে…।’

দীপন শুকনো মুখে হাসে।

এই শ্মশানেই ওঁদের পোড়ানো হয়েছে। হরিনারায়ণ আর সরলাবালার হতভাগ্য সন্তান কল্যাণী, তিরিশ বছর পর সে এসেছে চিতার আগুন দেখতে, পোড়াকাঠ দেখতে। চারদিক শুনশান। জনমনুষ্যি নেই। দু-একটি কুকুর কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। হু হু হাওয়া আসছে বিরান ব্ৰহ্মপুত্র থেকে।

‘দীপন, তোমার দাদু দিদিমাকে এই শ্মশানে দাহ করা হয়েছে’—কল্যাণী তার ছেলেকে কাছে টেনে ঘাস উঠে যাওয়া এবড়ো-খেবড়ো মাটি আর ধুলোর জমিন দেখিয়ে বলে। দাদু দিদিমা দীপনের কাছে কেবল গল্পই। রূপকথার ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর মত। ওর চোখে কোনও হাহাকার নেই বরং ও সামান্য কেঁপে উঠে বলে—ওমা এটি শ্মশান!

শ্মশানে আসতে ভীষণ ভয় পেত কল্যাণী, পরিমল একবার বাজি ধরেছিল—শ্মশানে যাইতে পারবি একলা একলা?

—তুই পারবি? কল্যাণী পাল্টা প্রশ্ন করেছিল।

পরিমল তখন তেরোয় পড়েছে। সে বলেছিল—পারবাম।

রাত যখন নটা, কল্যাণী বলল—‘এইবার যা। শ্মশান ছুঁইয়া আয়। পারলে হাড়গোড় কিছু আনিস।’

পরিমল দম নিয়ে দৌড়ল বটে, কিন্তু ওর জন্য দুশ্চিন্তায় কল্যাণীর তখন ঘাম ছোটে। সে ওই রাতে কাউকে কিছু না বলে, একাই বেরিয়ে গিয়েছিল পরিমলকে ডাকতে, একাই সে অন্ধকারে দৌড়েছিল শ্মশানের দিকে। নিঝুম শ্মশানে দাঁড়িয়ে ‘পরিমল পরিমল’ বলে ডেকেছিল, ঘোর অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল তার শরীর। তার মনে হচ্ছিল শ্মশানের ভূত বুঝি পরিমলকে টেনে নিয়ে জলে ডুবিয়ে দিয়েছে। চোখের জল মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরেছে কল্যাণী, ফিরে দেখে সরলাবালার কোলে বসে পরিমল গুড়ের সন্দেশ খাচ্ছে, সে নাকি চুপিচুপি ছাদে শুয়েছিল, বাড়ি থেকে মোটে বেরই হয়নি।

সেই রাতের মত কল্যাণী ঊর্ধ্বশ্বাস ছোটে কালিবাড়িতে, তার বাড়ির দিকে। যেন বাড়ি গেলেই এখন পাওয়া যাবে সরলাবালাকে, তাঁর কোলে বসা পরিমলকে। যেন বাড়ি গেলেই দেখবে ছাদে দাঁড়িয়ে জ্যোতিপ্রকাশ নক্ষত্র গুনছে। নিচতলার বৈঠকঘরে রেক্সিনে বাঁধা বই-এ মুখ গুঁজে বসে আছেন হরিনারায়ণ। কল্যাণী দ্রুত হাঁটে। সন্ধে নামলে যে মেয়ে বাড়ির বাঁশঝাড়ের কাছেই যেত না, ঘুরঘুট্টি শেয়াল-ডাকা রাতে সে মেয়ে ভূত-প্রেতের ভয় ভুলে দৌড়েছিল কার জন্য? কার জন্যই বা এখন দৌড়চ্ছে সে? দৌড়লেই কী সব ঠিক ঠিক পাওয়া যায়? কামিনী ফুলের ঝাঁকড়া গাছ, রান্নাঘরের পেছনে কাগজি নেবু? দল বেঁধে গোল্লাছুট? মায়ের ওম ওম বুকের ঘ্রাণ?

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় জোড়া সিংহের ওপর। তাদের বাড়ির উত্তরে ছিল অনিল মুখুজ্জের বাড়ি। সেই বাড়ির গেটে ছিল জোড়া সিংহের মূর্তি। সেই বাড়িই, সেই সিংহঅলা বাড়িই এটি। বাড়িটি আগের মতই আছে। দু পাশে দুটো গোল ঘর, অনিল মুখুজ্জে বলতেন—‘আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা এইসব ঘরে বসে বাঈজিদের নাচ দেখতেন, বাঈজি আসত কলকাতা থেকে।’ বাড়িটির সদর দরজা হাঁ করে খোলা, কল্যাণী গেট পেরিয়ে খোলা দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে। যেন এ বাড়িতেও সে তার অনিলকাকাকে পাবে। একগাদা বই-এর ভেতর ডুবে থাকবে ধুতি ফতুয়া পরা আলাভোলা মানুষটি। বাড়িতে গাদা গাদা বই ছিল। বিছানায়, টেবিলে, চেয়ারে, মেঝেয়, শীতলপাটিতে বই গড়াত। এত বই দেখে কল্যাণী বলত—‘এত যে বই পড়েন, আপনার মাথা ধরে না?’ অনিল মুখুজ্জে বলতেন—‘বই না পড়লেই বরং মাথা ধরে।’ তিনি তাকে মাঝে মধ্যেই সাহেব কোয়ার্টারের দিকে বিকেলে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। জজসাহেবের কুঠির দক্ষিণে নলিনী সরকারের বাড়ি, বাড়ির কাছে কৃষ্ণচূড়া, তার তলায় বসে পুরো ঠাকুরমার ঝুলি শুনিয়েছিলেন অনিকাকা। দীপন জয়িষাকে গল্প শোনাতে গিয়ে কল্যাণীকে আর দক্ষিণারঞ্জন পড়তে হয়নি। কল্যাণী যে ঘরে এসে দাঁড়ায় ঘরটি ভরে বড় বড় সোফা, বড় খাট, আলনা, টেলিভিশন, ভি সি আর, ফুলদানিতে থোকা থোকা প্লাস্টিকের ফুল। সে যখন ঘুরে ঘুরে বই খুঁজছিল, তার বিস্মিত চোখের সামনে দাঁড়ায় এসে একুশ-বাইশ বছর বয়সের একটি মেয়ে।

কল্যাণী জিজ্ঞেস করে—এটি অনিল মুখুজ্জের বাড়ি না?

মেয়েটি বলে—না তো!

—ওঁরা কোথায়?

—শুনেছি যাঁর বাড়ি তিনি মারা যাবার পর তাঁর ছেলেরা বাড়ি বিক্রি করে ইন্ডিয়া চলে গেছে। আপনি?

—আমি কলকাতা থেকে এসেছি, সামনে বাড়িঘর দেখছেন, সবই আমাদের জায়গা ছিল, দু বিঘা জমির ওপর ছিল আমাদের বাড়ি।

মেয়েটি কৌতূহলী চোখে প্রশ্ন করে নিজেদের বাড়িঘর দেখতে এসেছেন বুঝি?

কল্যাণী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে—হ্যাঁ।

—বসেন বসেন। মেয়েটি কল্যাণীকে চেয়ার এগিয়ে দেয়। দীপনের চিবুক নেড়ে বলে—আপনার ছেলে, তাই না? কি নাম তোমার বাবু?

—ওর নাম দীপন।

—বাহ খুব সুন্দর নাম তো। কোন ক্লাসে পড় তুমি?

—সিক্সে পড়ে।

—কোথায় উঠেছেন আপনারা? মেয়েটি আবার প্রশ্ন করে।

—ছোটবেলার এক বন্ধু আছে আমার, ওর বাড়িতে। আমাদের বাড়ির একেবারে লাগোয়া বাড়িটি ছিল ওদের।

—তা হলে তো কাছেই, তাই না?

—ও এখন নওমহল থাকে।

—আপনার একা একা ঘুরে বেড়াতে অসুবিধা হচ্ছে না?

—তা হবে কেন? শহরের সবই তো চিনি আমি।

—ও তাই তো। তবে ময়মনসিংহ তো একেবারে ডেভেলপ করেনি। আপনি যদি ঢাকা আর চট্টগ্রাম দেখেন, ভাল লাগবে।

—আমি কি আর ডেভেলপমেন্ট দেখতে এসেছি? আমি আগের সেই…

—চা-টা কিছু খাবেন কি? ছেলেটার মুখ শুকিয়ে আছে।

—আমপট্টির সুধীর ঘোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে লুচি হালুয়া খেয়েছি। দই আর মালাইকারির স্বাদ আগের মতই আছে।

—স্বাদ কেমন ছিল আপনার মনে আছে? মেয়েটির চোখে সরল কৌতুক।

কল্যাণী মলিন হাসে। মেয়েটি ভেতর-ঘর থেকে দুটো বাটি করে পায়েস আনে, সঙ্গে দু গ্লাস ডাবের জল। দুজনের হাতে পায়েসের বাটি তুলে দিয়ে মেয়েটি বলে—আমার নাম নীপা। বি. এ. পড়ি। মুমিনুন্নিসায়। সামনে পরীক্ষা আমার। এখানে কি কি দেখলেন? ঘুরে ঘুরে দেখেছেন তো! এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি গেছেন? মেয়েদের ক্যাডেট কলেজ দেখেন নাই? দেখার অবশ্য বেশি কিছু নাই ময়মনসিংহে। নতুন ব্রিজ হয়েছে, ওটা দেখতে পারেন।

কল্যাণী ডাবের জলে চুমুক দিয়ে বড় তৃপ্তি পায়। যেদিন গাছ কাটানো হত, কচি ডাবে ভরে যেত বাড়ি। বারান্দায় স্তুপ করে রাখা হত ডাব। কল্যাণীর পছন্দ ছিল ডাবের শাঁস, সে লুকিয়ে জল ফেলে চামচে তুলে শাঁস খেত। বাড়ি বাড়ি বিলিয়েও নারকেল ফুরোত না, খাটের তল বোঝাই হয়ে থাকত নারকেলে। ঝুনা নারকেল কুরিয়ে পুজো-পার্বণে চমৎকার নাড়ু বানাতেন সরলাবালা।

—থাকছেন তো কয়েকদিন? নীপা জিজ্ঞেস করে।

কল্যাণী হঠাৎ বুঝে পায় না এর উত্তর সে কী দেবে। সে ক্লান্ত চোখে তাকিয়েছিল খোলা দরজার ওই পাশে যেটুকু ঘাস, ঘাস উঠে যাওয়া মাটির যেটুকু পথ দেখা যায়, সেদিকে।

আশঙ্কায় আর আশায় কণ্ঠ তার কাঁপে—কিছুই তো নেই আর। একটি গাছ আছে শুধু। আচ্ছা, ওরা যদি গাছটা কেটে ফেলে? তোমরা বলে কয়ে রাখতে পার না? বলবে পুরনো গাছ, না হয় থাকুক। তা ছাড়া জাম তো ধরছে। এই গাছের জাম আগে কত লোকে খেত। পাড়ার বাচ্চারা কুড়িয়ে নিয়ে যেত। আমরা টিনের থালায় নুন লঙ্কা মেশানো জাম নিয়ে আরেকটি থালা দিয়ে ঢেকে জোরে ঝাঁকুনি দিতাম, জামগুলো ভর্তা হয়ে যেত।

এ তো এখন আর আপনাদের নয়? নীপা হেসে বলে—কেটে ফেললেই বা কী।

—তবু আমাদের তো ছিল। কাটলে কষ্ট হবে না?

—আপনি কি অনেকদিন থেকে কলকাতায়?

—হ্যাঁ তিরিশ বছর।

—তিরিশ বছর পরও গাছের কথা মনে রেখেছেন? নীপা খিলখিল হেসে ওঠে।

কল্যাণী ম্লান হাসে। উঠে বারান্দায় যায়, দেওয়ালে হাত বুলোয়, বলে—‘অনিলকাকার এ বাড়িতে আমরা কত এসেছি। ওঁর কথা বড় মনে পড়ছে। বড় ভাল লোক ছিলেন।’ বলতে বলতে কল্যাণীর চোখ ভিজে যায় চোখের জলে।

সে তার বাড়ির দিকে হাঁটে, কালো গেটটি নেই, গেটের ওপর মাধবীলতা ফুটে থাকত, কার নিষ্ঠুর আঙুল সব টেনে ছিঁড়েছে! বাড়িটির একটুকরো চুন সুরকিও যদি পাওয়া যেত—মেঝেয় সোনামুখি সুঁই পড়লে লোকে যেমন করে খোঁজে, কল্যাণীও গভীর মন দিয়ে কিছু ছিটেফোঁটা খোঁজে ধান দুব্বার ভেতরে। দেখে সেগুন কাঠের বড় পালঙ্ক, সিন্দুক, টেবিল, চেয়ার, মেহগিনি কাঠের আলমারি, ঝাড়বাতি—এ সবের কোনও চিহ্ন কোথাও পাওয়া যায় কি না। দোতলার জানলার পাশে কল্যাণীর শোবার ঘর ছিল, ওই ঘরে সারাদিনই ব্রহ্মপুত্রের উতল হাওয়া বইত। দোতলার ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওই পার দেখা যায় না অমন কুলকুল জলের দিকে বিভোর তাকিয়ে থাকত, নৌকো করে ওই পার থেকে সকালে ভাগীরথীর মা আসত দুধ নিয়ে, কলাপাতায় ঢাকা দুধ। রাতে দুধ ভাত খেতে দিয়ে সরলাবালা ছড়া কাটতেন—‘নদীর পাড়ে যাইও না ভাই ফটিং টিং এর ভয়, তিন মানুষের মাথা কাটা পায়ে কথা কয়।’ রাতে ফটিং টিং-এর ভয়ে ঘুম ভেঙে যেত। পরদিন আলো ফুটলে আর কোনও ভয় থাকত না। বিকেল হলে মাঠে হুল্লোড় করে খেলতে নামা, নয়ত নদীর পাড়ে দৌড়ানো! একবার কল্যাণী অনিলকাকার কাছে জিজ্ঞেস করেছিল—‘ফটিং টিং দেখতে কেমন?’ তিনি তখন দু হাত মেঝেয় রেখে পা ওপর দিক তুলে মাথাকে বুকের কাছে ডুবিয়ে এনে এমন এক অদ্ভুতুড়ে আকৃতি বানালেন যে কল্যাণী সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভাবলে এখনও তার গা ছমছম করে।

এই এক চিলতে মাঠের মধ্যে, যদিও সেই বাড়ির কোনও চিহ্ন নেই, কল্যাণী পায়ের জুতো খুলে হাঁটে। মাঠ জুড়ে একটি বারো-তেরো বছর বয়সের মেয়ে বেণী দুলিয়ে দৌড়চ্ছে, মেয়েটিকে সে ছুঁতে চায়, ছুঁতে পারে না। সে যেন নিজেই নিজের নাগাল পায় না। আগে মাঠে দাঁড়ালে ব্রহ্মপুত্রের হাওয়া এসে গা কাঁপিয়ে যেত, এখন স্পর্শও করে না। হাওয়া কোত্থেকে আসবে, সরু একটি সুতোর মত নদী, কল্যাণীর বিশ্বাস হয় না ওই নালাটিই তার প্রিয় ব্রহ্মপুত্র! তার মনে হয় সবাই মিথ্যে বলছে, ব্রহ্মপুত্র এত দরিদ্র হতে পারে না। আস্ত একটি নদী লোকে হেঁটে পার হচ্ছে। নদীর ওপর ধানক্ষেত, সবজিক্ষেত—ও কি নদী নাকি অন্য কিছু?

চৌচালা একটি টিনের ঘর ছিল বাড়ির পিছন দিকে, টিনের চালে বৃষ্টি পড়লে কী চমৎকার শব্দ হত, কলকাতার কংক্রিট আর টালির ছাদে কী আর সেই রিমঝিম শব্দ মেলে! পুকুরের পাশ দিয়ে সরু একটি পথ ছিল, ওই পথে রুখসানাদের বাড়ি যাওয়া যেত। একদিন ভরদুপুরে চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছিল, আকাশে কালো মেঘ, গুড়ুম গুড়ুম শব্দ, ঠাণ্ডা হাওয়া তীরের মত শরীরে বিঁধছিল—তখন রুখসানা ওই পথ ধরে পা টিপে টিপে এসে বলল—‘আম পড়তাছে, চল যাই।’ ওদের বাড়িতে ছ’টা কাঁচামিঠে আমের গাছ ছিল। রুখসানার সঙ্গে কাঠগোলাপ গাছের তল দিয়ে কল্যাণী যখন দৌড়ে যাচ্ছিল, পিছন থেকে সরলাবালা ডাকছিলেন—‘গাছের ডাইল ভাইঙ্গা মাথায় পড়ব, যাইস না কল্যাণী।’ গাছগুলো এত ভীষণ দুলছিল ঝড়ো হাওয়ায়, দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে থিরথির কাঁপছিল সবাই, আর সে দৌড়ে চলে গিয়েছিল রুখসানাদের উঠোনে। শিল পড়ে শাদা হয়ে ছিল ওদের উঠোন, আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল আর তার আলোয় দু হাতে আম কুড়িয়েছিল দুজন। এখনও তো ঝড় হয়, এখনও কী আগের মত বালিকারা ফ্রক ভরে ঝড়ে পড়া আম কুড়োয়? রুখসানাদের গাছে বড় বড় পেয়ারা হত, পেয়ারাগাছে চড়ে ওরা পা দুলিয়ে দুলিয়ে গল্প করত আর পেয়ারা খেত। ওর ছোট দুভাই নিচে দাঁড়িয়ে থাকত, ওদেরও ছুঁড়ে ছুঁড়ে পেয়ারা দিত ওরা। রুখসানার আম্মার অবশ রোগ ছিল, সারাদিন শুয়ে থাকত। বাড়ির লোকেরা বলত—‘জিনের বাতাস লাগছে।’ কল্যাণী আর রুখসানাকে গাছে উঠতে দেখে আম্মা চিকনগলায় চেঁচাত—‘মেয়েমানুষ গাছে উঠলে গাছ কিন্তু মইরা যায়।’ রুখসানা ঠোঁট উল্টে বলত—‘ছাই মরে।’ কল্যাণীর চোখের সামনে সেই দস্যি রুখসানার বিয়ে হয়ে গেল, ও তখন বিদ্যাময়ী স্কুলে এইটে পড়ে, ওকে ইস্কুল ছাড়িয়ে বাড়িতে বসিয়ে রাখা হল, তারপর একদিন চেনা নেই—শোনা নেই এক বুড়ো মত লোকের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিল। বিয়ের দিন ও একফোঁটা কাঁদেনি। কল্যাণীর কানে কানে বলেছিল—‘দেখিস কালই আমি পালাইয়া চইলা আসব।’ কল্যাণী অপেক্ষা করেছিল, রুখসানা আসেনি। বছর দুই পর শাড়িপরা মহিলা হয়ে ঘোমটা মাথায় কোলে একটি বাচ্চা নিয়ে যখন সামনে দাঁড়িয়েছিল, কল্যাণী প্রথম চিনতে পারেনি যে এ রুখসানা। নিজেকে অনেকটা রুখসানার মত মনে হয় তার—পালিয়ে চলে আসবে তো সেও বলে গিয়েছিল, আসেনি। রুখসানার মত সেও বছর গেলে বয়স গেলে ফিরেছে। রুখসানাকে যেমন চেনা যায়নি, কল্যাণীকেও বোধ হয় চেনা যাচ্ছে না।

হঠাৎ কল্যাণী নিজেই জানে না তার ভেতরে শৈশব কৈশোর এত তীব্র জেগে ওঠে যে সে মাটিতে নুয়ে পড়ে। এটি তার নিজের মাটি, এই মাটিতে তার দীর্ঘ দীর্ঘ দিনের পায়ের ছাপ লাগা, মাঠের এই দক্ষিণ দিকটিতে জামগাছটির দু হাত দূরে কল্যাণী মাটি থেকে সেই ঘ্রাণ পাচ্ছে। সে মাটির ঘ্রাণ শুঁকতে যেয়ে নত হতে হতে মাটিতে উবু হয়ে মাটিকেই দু হাতে আঁকড়ে ধরে। কালো কালো জাম থেতলে পড়ে আছে ঘাসের ওপর। পাড়ার লোকেরা এই গাছের জাম কত কুড়িয়ে নিয়েছে, নিমগাছের ডাল ভেঙে নিয়ে যেত, কল্যাণীরাও আনত, শরিফাদের গাছ থেকে পুজোর জন্য বেল পাতা আনত। দু-একজন অলস হাঁটছিল হয়ত, কল্যাণীর নত শরীরের কাছে এসে দাঁড়ায়—সন্দিগ্ধ, উৎসুক দৃষ্টি ওদের। কেউ হাসে, কেউ এর ওর কাছে জানতে চায় ঘটনাটি কী! কল্যাণী কি এখানে এখন উদ্ভট কোনও বস্তু! হরিনারায়ণ রায়ের মেয়ে সে। লোকে বলত রায়বাবু আছে বলে শহরে বিচার আছে। রায়বাবুকে মনে রাখবার জন্য এই শহরে এখন কেউ বসে নেই। কল্যাণীকেও কেউ চেনে না এখন।

ওইখানে কে? কে ওইখানে? বলে দোতলার জানালা থেকে কর্কশ কণ্ঠে একটি লোক চেঁচিয়ে ওঠে। লোকটি খালি গায়ে লুঙ্গি পরে নিচে নেমে প্রশ্ন করে—কি চাই? তখন নিজেদের জামগাছটিকে আঁকড়ে ধরে যেটি তার ঠাকুরদা পুঁতেছিল এই মাটিতে, ডুকরে কেঁদে ওঠে কল্যাণী। ভিড় যত বাড়ে, বুক ভেঙে কান্না নামে তার। সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারে না সে কেন কাঁদছে। তার কেবল মনে হচ্ছিল এই মাটির সে মানুষ। সরলাবালা নামে কোনও মা তার ছিল না, এই মাটি কুঁড়ে সে আটচল্লিশ বছর আগে জন্মেছে। সে নেই বলে এখন আগের মত বৃক্ষ নেই, বৃক্ষেরা আগের মত সবুজ নেই, সে নেই বলে ব্রহ্মপুত্রেও জল নেই। দাঁড়ানো লোকগুলো নিজেদের মধ্যে বলতে থাকে—মেয়েলোকটা কে, কান্দে কেন?

কেউ বলে—আরেকদিনও আইছিল, হিন্দু।

শুনে একজন বলে—হিন্দু বেটি এইখানে আইসা কান্দে কেন?

একজন মিনমিন করে বলে—ইন্ডিয়া থেইকা আইছে, বাড়িঘর নাকি এইখানে ছিল।

—এইখানে ছিল? এইখানে বাড়ি আবার কবে ছিল? ব্রিটিশ আমলে?

—কি জানি কে জানে?

—নাকি পাগল?

—তাই বা কে জানে?

—এইখানে আগে হিন্দু বাড়ি ছিল বুঝি?

—তাই তো কয়।

—থাকলে ছিল। কত কারও তো ছিল। এই জন্য কানতে হয় নাকি? ইন্ডিয়া থেইকা মুসলমানরা আসে নাই সব ছাইড়া ছুইড়া? কই তারা অইগুলা এখন দখল করতে যায় নাকি?

—কাদেররা জমিদারি ছাইড়া চইলা আসল না? গাঙ্গিনার পাড়ে সোনার দোকান দিছে ‘ক্যালকাটা মুসলিম জুয়েলার্স।

—আসলে বোধ হয় মায়ায় কান্দে। বয়স হইয়া গেছে। বাপ-মা’র কথা মনে পড়ে। চেক লুঙ্গি পরা একটি যুবক গাছে হেলান দিয়ে বলে।

একটি ভারী কণ্ঠ আর সব সংলাপ হটিয়ে দিয়ে বলে—যতসব ফাইজলামি, থাকতে চায় ইন্ডিয়ায় আবার দেশের ভাগটাও লইতে চায়।।

বুড়োমত একজন কাছে এসে বলে—কী নাম তোমার মা? বাবার কী নাম? কত দূর থেকে আসছ মা, কারও বাসায় বস, খাওয়াদাওয়া কর। এইসব কী শুরু হইছে এইখানে, মানুষ তো না এরা, সব অমানুষ হইয়া গেছে। সব অমানুষ। বাড়িঘর না থাক মা, দুইটা ভালমানুষ তো এখনও আছে দেশে। নাইলে দেশ কি কইরা টিইকা আছে কও। উঠ উঠ। কাইন্দো না মা। কানবা কেন? কান্দনের কি হইল। যারা তোমারে এইসব বলতাছে তারা কি আর বুইঝা বলতাছে? জিভের ডগায় যা আসে বইলা ফেলে। দোষ নিও না মা।

আর তখন ভিড় ভেঙে দীপন এসে দাঁড়ায় গাছের গোড়ায় গড়িয়ে কাঁদা কল্যাণীর সামনে। চোখে বিস্ময় তার, সে বুঝে পাচ্ছে না কেন একটি গাছকে ধরে তার মা কাঁদছে, আর ভিড় করে লোকে তা দেখছে। দীপন তাকে হাত ধরে টানে—মা চল।

ইন্দ্রনাথ রায়ের পুত্র সতীনাথ রায়, তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ রায়, তাঁর পুত্র হরিনারায়ণ রায়, আর হরিনারায়ণের জীবন থেকে ছিন্ন হয়ে যাওয়া কল্যাণী আজ তার জন্মের মাটি শুকঁতে এসেছে। সে এই মাটি ফুঁড়ে জন্ম নিয়েছে। কোনও নারীর গর্ভে তার জন্ম হয়নি। সে এই বৃক্ষের মত একা। নিঃসঙ্গ। আর কেউ তাকে না চিনুক, বৃক্ষ নিশ্চয় চিনতে পেরেছে, বৃক্ষ তো আর মানুষের মত নিষ্ঠুর নয়। কল্যাণী তার কান্না থামাতে পারে না, সে দীপনের হাত ধরে একঝাঁক তীক্ষ্ণ চোখের সামনে চোখের জল চোখে নিয়েই রাস্তায় নামে।

দ্রুত হাঁটতে থাকে কল্যাণী। হাতে তার শক্ত করে ধরে রাখা দীপনের হাত। কতদূর হেঁটেছে সে নিজেও খেয়াল করেনি, হঠাৎ পেছন থেকে ‘দিদি দিদি’ ডাক শুনে সে থমকে দাঁড়ায়। তাকে কী ডাকছে কেউ! কে ডাকবে, এই শহরে কেউ তো নেই তাকে দিদি বলে ডাকবার। আবার হাঁটতে থাকে, আবার সেই ডাক, দিদি। পরিমলের মত লাগে, কিন্তু ও এখানে কোত্থেকে আসবে! ও তো সেই নাকতলায়, আসবার আগে সেধেছিল কল্যাণী—‘চল যাই।’ পরিমল বলেছে—‘তুমি যাও, আমার আবার বোম্বে দৌড়তে হবে।’ তবে কে ডাকে, নাকি হ্যালুসিনেশন? অডিটরি হ্যালুসিনেশন? তবু পিছন ফিরে দেখে কল্যাণী, একটি ছেলে দৌড়ে আসছে, তার দিকেই আসছে। পরিমল নয়, চেনা কেউই নয়। কে তবে? ও বাড়ির মাঠ থেকে ভিড় করা লোকদের কেউ? ভয় ভয় লাগে তার, দ্রুত পা চালায়, দীপনকে টানতে টানতে বলে—‘হাঁটো দীপন।’ দীপন না হেঁটে দাঁড়িয়ে যায়, বলে—‘তোমাকে ডাকছে মা।’

—আরে না। আমাকে এখানে কে ডাকবে?

—দাঁড়াও। তোমাকেই ডাকছে।

এর মধ্যে ছেলেটি দৌড়ে সামনে এসে থামে। কল্যাণীকে দিদি বলে ডাকে যদি এই ছেলে, একে তো চেনে না সে, ছেলেটি একটু হাঁপাচ্ছিল, বলল—আপনি কি কল্যাণীদি?

কল্যাণী হতবাক। কে তাকে চিনেছে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে! সে প্রথম বলতে চায় না সে কল্যাণী। দ্বিধা, আশঙ্কা তার জিভ ভার করে রাখে। ছেলেটির দু চোখ থেকে থোকা থোকা কামিনীর স্নিগ্ধতা ফুটে ওঠে, দেখে কল্যাণী বলে—হ্যাঁ।

—আমার নাম স্বপন।

—স্বপন? কোন স্বপন?

—রুখসানার ভাই। আপনাদের বাড়ির পেছনেই ছিল তো আমাদের বাড়ি। মনে নাই?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন!

—আমি ভিড় দেখে জিগাস করলাম কি হইছে এইখানে ভিড় কেন? লোকগুলা বলল এই জায়গায় বাড়ি ছিল তাদের, ইন্ডিয়া থেকে আসছে, মেয়েলোক। তখনই দেখি আপনি চইলা যাইতাছেন। আমি তো জানিই কাদের বাড়ি ছিল এইটা। তাই আপনারে ডাকলাম।

—তোমরা কি ওই বাড়িতেই আছ?

—হ্যাঁ আগের বাসাতেই। আসেন, আসেন, আমাদের বাসায় আসেন।

—তোমার বড় ভাই সেলিম কোথায়?

—মনে আছে ওর নাম? স্বপন শিশুর মত হাসে।

কল্যাণীও হাসে। স্বপনের কথা তার মনেও পড়েনি। সেই ছোট্ট একরত্তি ছেলেটি, পেয়ারাতলায় দাঁড়িয়ে থাকত, দিদিরা কখন ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেবে আশায়। কত বড় হয়ে গেছে এখন ও! কল্যাণীরও মাথা ছাড়িয়ে গেছে। স্বপনের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আবার তার ভাবতে ভাল লাগে এই যে শহর, এটি তার; এই যে সামনেই বাড়িঘর—এটি তারই, তারই পূর্বপুরুষের ভিটে এই। তারই পড়শি তিরিশ বছর না দেখেও দিদি বলে ডেকেছে তাকে। আর কী চাওয়ার আছে তার! পুকুরের ধার দিয়ে চলে যাওয়া যেত রুখসানাদের বাড়ি। আর এখন ঘুরে ছোট একটি গলির ভিতর ঢুকে এ বাড়ি ও বাড়ির গা ঘেঁষে তাকে সেই বাড়িতে পৌঁছতে হল। বাড়ির কিছুই সে চিনতে পারে না। উঠোনে পেয়ারাগাছ নেই, আমগাছগুলো নেই, সেই টিনের বাড়িটি উধাও আর নতুন একটি তিনতলা বাড়ি উঠেছে, স্বপন বলে—উপরে আসেন, উপরে আমরা থাকি, নিচের তলা ভাড়া দেওয়া।

দোতলায় উঠেই সে হইচই শুরু করে। —কই লিপি কোথায়, দেখ কে আসছে। কল্যাণীকে দেখতে লিপি আর ফুটফুটে একটি ছ’ বছরের বাচচা ছুটে আসে।

—বসেন দিদি, ওরা সবাই আপনার গল্প শুনেছে।

—আমার গল্প?

—হ্যাঁ আপনি আর রুখসানা আপা সে যে কী গেছো ছিলেন, সেইসব। মনে আছে আমাদের টিনের চালে আমলকি পড়ার শব্দ হইত আর আপনি বলতেন, আপনার একটা পালা ভূত আছে, সেই ভূত বলছে বাচ্চারা যেন ঘুমাইয়া যায়, না ঘুমাইলে সে বাচ্চাদের ঝোলায় ভইরা খোক্কশের দেশে নিয়া যাবে। বাচ্চারা ঘুমাইয়া যাইত, আমি চোখ বন্ধ কইরা শুনতাম আপনি আর রুখসানা আপা হাসতেছেন। দিন পাল্টে গেছে দিদি, ভূতের গল্পে আজকালের বাচ্চারা আর ভয় পায় না।

—রুখসানা কোথায় থাকে?

—নরসিংদি।

—ওর যেন কোথায় বিয়ে হয়েছিল, জামালপুর…না কোথায় যেন?

—হ্যাঁ, জামালপুরের মধ্যেই। শেরপুরে। সেই বিয়া তো ভাইঙা গেল। জামাই তালাক দিল। পরে আবার বিয়া হইল নরসিংদি। এই জামাইও সুবিধার না দিদি, মারধর করে।

—বল কী, রুখসানাকে মারে, ও চলে আসে না কেন?

—কোথায় চলে আসবে, এতগুলো বাচ্চা নিয়া? বাবা মা নাই। উঠলে ভাইয়ের সংসারে উঠতে হয়। আমার আপত্তি নাই দিদি, আমি ঠিকই তার দায়িত্ব নিব, অন্য ভাইরা হয়ত নিবে না। কিন্তু ও বোধ হয় কারও সংসারে বোঝা হইতে চায় না।

কল্যাণীর মনে পড়ে রুখসানার সেই ছুটে বেড়ানো স্বভাব। এর গাছের বরই পাড়ো, ওই বাড়িতে খেলতে যাব। কল্যাণীর খেলা করবার পুতুল ছিল। রুখসানা বলত, ‘এইসব ফালা ত, চল দাড়িয়াবান্ধা খেলি।’ রুখসানা মাঠ পছন্দ করত, বড় মাঠ, হাত পা ছুঁড়ে খেলতে চাইত। পুকুরে নামলে এক ডুবে ওই পাড়ে চলে যেত। কল্যাণীরা ঘাটে বসে হাততালি দিত। মেয়েটি এখন মার খায়, বাড়ি থেকে বেরোতে দেয় না তাকে। কী করে মেনে নিচ্ছে সে এই সব? কল্যাণী বোঝে রুখসানা পড়াশুনা করেনি বেশি, চাকরিবাকরি করে যে নিজের মত থাকবে তাও সম্ভব নয়। কার জীবন যে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, আগে থেকে কিছুই ধারণা করা যায় না। কল্যাণীরও হয়ত পড়াশুনা হত না। ননীগোপাল যদি জানতেন হরিনারায়ণ কলকাতায় আর আসবেন না তবে হয়ত কলেজে পড়বার খরচও কল্যাণীকে দেওয়া হত না।

লিপি মেয়েটি ঝকঝকে সুন্দরী। সে বলল—দিদি কী খাবেন বলেন।

—না খাবো না কিছু। ক্ষিধে নেই।

—ক্ষিধা থাকব না কেন? বেলা কম হইল?

—বেলার জন্য নয়। খেতে আসলে ইচ্ছে করছে না। কলকাতায় দুপুরের খাবার খেতে বিকেল হয়। ও আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে।

—এইটা একটা কথা হইল খাবেন না! আমাদের বাসায় আইসা কেউ না খাইয়া যায় না। কলিকাতায় কি করেন, সেইটা কলিকাতার ব্যাপার। আমরা ময়মনসিংহের মানুষ। এইখানে আমাদের নিয়ম মাইনা চলতে হইব।

—তুমিই বুঝি ময়মনসিংহের মানুষ? আমি নই?

—ও তাই তো। আপনিও তো। লিপি সশব্দে হেসে ওঠে।

কল্যাণী ঘরদোর দেখে, বারান্দায় দাঁড়ালে জানালার ফাঁক গলে ফাঁকে ফাঁকে চোখ চলে যায় নিজেদের ভিটের দিকে। হরিনারায়ণের ভিটে জুড়ে দালান উঠেছে, সেইসব দালানের হলুদ পিঠ দেখে কল্যাণী। দেখে আর ভীষণ পিপাসায় তার হৃদয় শুকিয়ে যায়।

স্বপন আর লিপির ছোট সংসারে সে আসবে এরকম কোনও স্বপ্ন তার ছিল না। অথচ রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে এসেছে তাকে স্বপন। তাকে যার মনে রাখবার কথা নয়, সে-ই তাকে মনে রেখেছে, বউ ছেলেমেয়ের কাছে গল্পও করেছে। এমন অপ্রত্যাশিত পাওয়া কল্যাণীকে ভাবায় খুব, ভাবায় যে কলকাতায় কি এরকম ঘটনা ঘটে কখনও যে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে বাড়িতে বসায়, খেতে বলে, কণ্ঠ উপচে আবেগ ঝরে কারও? এ দেশ ছাড়া আর কোথায় তা সম্ভব!

—দিদি, এ আমার ছেলে। প্রি-ক্যাডেটে পড়ে।

—প্রি-ক্যাডেট কোথায় বল তো। এই নামে কোনও স্কুলের নাম তো শুনিনি!

—কয়েক বছর হয় হইল। কাছেই, কালিবাড়িতে।

—আমাদের সময় এ পাড়ায় শুধু কুমার উপেন্দ্রকিশোর বিদ্যাপীঠ ছিল।

—হলুদ দালান তো? আছে এখনও। তবে অনেক কিন্ডারগার্টেন হইছে।

—আমার খুব রাধাসুন্দরী স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে। মৃত্যুঞ্জয় স্কুলেও। রাস্তার দু পাশে দুটো স্কুল। একবার বৃক্ষ রোপণ উৎসবে স্কুলের মাঠে আমি জবা ফুলের চারা লাগিয়েছিলাম। গাছটা কি আর নেই স্বপন?

—জবাগাছ বুঝি এতদিন থাকে? শাল সেগুন লাগালে থাকত।

—মাঠের দক্ষিণ দিকে ছিল গাছটি। গাছটিতে আমি থাকতেই ফুল ফুটেছিল।

স্বপন হাসে। এই হাসিতে কল্যাণী বুঝতে পারে না কল্যাণী যে গাছটি লাগিয়েছিল সেই আনন্দ নাকি গাছে যে ফুল ফুটেছিল সেই আনন্দ কাজ করে। নাকি এ স্বপনের স্রেফ তার কথায় সঙ্গ দেওয়া!

—রুখসানার ছেলেমেয়েরাও অনেক বড় হয়েছে বুঝি?

—কি বলেন, আপা তো নানী হইয়া গেছে।

—বল কি? সেই ছোট রুখসানা, ও নানী হয়েছে? কল্যাণী অবাক হয়।

—নানী কি মা? দীপন জিজ্ঞেস করে। সে সোফায় শুয়ে কথা শুনছিল।

—নানী বোঝ না? নানী হচ্ছে দিদিমা। তোমার দিদিমাকে তুমি তো দেখইনি।

—ও বুঝেছি, দিদির বাচ্চা হলে ও তোমাকে দিদিমা ডাকবে। তাই না মা?

—হ্যাঁ বাবা। কল্যাণী দীপনের চিবুক নেড়ে দেয়।

স্বপনের ছেলেটিকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে কল্যাণী। বলে—কি নাম তোমার সোনা?

—সৌখিন।

—তুমি বুঝি খুব সৌখিন ছেলে?

—হ্যাঁ আব্দুর মত সৌখিন।

—তুমি আমার নাম জানো?

—হ্যাঁ। ঘাড় কাত করে সৌখিন।

—তোমার নাম কল্যাণী রায়। তোমার বাবার নাম হরিনারায়ণ রায়। তোমার ভাইয়ের নাম জ্যোতিপ্রকাশ রায়।

সৌখিনকে বুকের আরও কাছে টানে কল্যাণী।—বাহ এত নাম তোমার মনে আছে? এই স্বপন, তোমার ছেলে তো খুব ব্রিলিয়ান্ট।

—হ্যাঁ দিদি। কিন্তু হইলে কি হইব। পরিবেশ বড় খারাপ। ছেলেটারে বাইরে খেলতে দিতে পারি না। দৌড়ঝাপ দিয়া না খেললে বাচ্চাদের মন ছোট হইয়া যায়।

কল্যাণীর মন খারাপ হয়ে যায়। বলে—পরিবেশ খারাপ এ কথা বলছ কেন? এখানকার পরিবেশ বুঝি কখনও খারাপ ছিল?

—না দিদি, ভাল মানুষের সংখ্যা খুব কম আজকাল। হাতে গোনা কয়জন মাত্র ভাল, যাদের সঙ্গে ওঠা-বসা করা যায়।

—কি জানি আমার এরকম মনে হয় না। আচ্ছা তোমার বা তোমাদের কি এরকম কখনও মনে হয় স্বপন, যে, আমরা আলাদা কেন?

—আলাদা মানে?

—মানে ধর আমরা একরকম কথা বলছি, বাংলায়, তো আমরা দুই দেশে থাকি কেন, দুই দেশ বানিয়েছি কেন?

—দুই দেশ কি আর আমরা বানাইছি?

—যারাই বানাক, বানিয়েছে তাদের স্বার্থের জন্য। কিন্তু আমাদের স্বার্থ কি ছিল বল তো? আমরা ভাই-বোনেরা নিজেদের বাড়ি ফেলে কোথায় কোন দূরে কার বাড়িতে পড়ে রইলাম, আমাদের কি কষ্ট কম হয়েছে?

—তা তো ঠিকই।

—তারপর ধর, এই যে তোমরা, তুমি সেলিম রুখসানা, এদের সঙ্গে আমার মন চাইছে কথা বলতে অথচ কথা বলতে পারছি না। আমার খুব ইচ্ছে করে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসে থাকতে, পারি না। তুমি বুঝবে না স্বপন আমার যে কি রকম ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি পারি না কেন, বল?

উত্তেজনায় কল্যাণী উঠে দাঁড়ায়, হাঁটে। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে হলুদ দালানের পৃষ্ঠদেশ দেখে।

—আচ্ছা বল তো তোমার কি মনে হয় না আমরা আবার এক হয়ে যাব?

—এক হওয়া মানে?

—মানে কোনও পাসপোর্ট ভিসা থাকবে না, কাঁটাতার থাকবে না।।

—ও দুই দেশ এক হওয়ার কথা বলতাছেন? সেইটা কি আর এখন সম্ভব?

—কেন সম্ভব নয়? জার্মানিতে হল না?

—জার্মানি আর বাংলাদেশ এক হইল? ধর্ম এইখানে প্রধান বাধা দিদি।

—ধর্ম আর ক’দিন? ধর্ম কি আর সারাজীবন বয়ে বেড়াব আমরা? এক ভাষা আর এক সংস্কৃতি নিশ্চয়ই ধর্মের বাধা দূর করতে পারবে। কি বল?

স্বপন হাসে। তার হাসিতে না বোধক কিছু ফুটে ওঠে কি না, নাকি তার হাসির আড়ালে কল্যাণীর কথায় সায় দেবার কিছু আছে কল্যাণী ঠিক বুঝতে পারে না। কল্যাণীর এও মনে হয় স্বপন দেশভাগের পরের প্রজন্ম। তার এই কষ্ট বয়ে বেড়াবার কিছু নেই হয়ত। সে হয়ত জানে একটি মানুষকে দু টুকরো করে ফেললে মানুষটি প্রাণে বাঁচে, কিন্তু সত্যিকার যে বাঁচে না তা জানে না। কী করে জানবে, স্বপনের তো আর হারাতে হয়নি কিছুই। সে তার বাবা মা আত্মীয়স্বজন সবাইকেই কাছে পেয়েছে, পাচ্ছে। কিন্তু কল্যাণীর ছিটকে গেল সবই। সুখের লাগি এ ঘর বাঁধিনু, অনলে পুড়িয়া গেলর মত। ভেতরে তার লালন করা স্বপ্ন স্বপনের বাড়ির ভালবাসা পেয়ে বানের জলের মত ফুলে ওঠে। জানালার কাছে দাঁড়ালে ছবির মত ভেসে ওঠে নিকোনো উঠোন, টিনের চৌচালা, পুকুর, পুকুরের পাড়ে কাঠগোলাপ। পরিমল একবার পুকুরে প্রায় ডুবতে বসেছিল, সাঁতার জানে না, শখ করে নেমেছে, জল-টল খেয়ে সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা, সরলাবালা চিৎকার করছিল, ‘গেল রে আমার ছেলে মরল রে।’ কল্যাণী জানালায় দাঁড়িয়ে ঠিক সরলাবালার কান্না যেন শুনতে পায়, কে কাঁদে সরলাবালার মত সুর করে? কারও ছেলে কি পুকুরে ডুবছে?

স্বপন তাকে ফেরায়, বলে—কী দেখেন এত? গবরমেন্ট তো সব নিয়াই নিছে। আমার কিন্তু এখনও মনে আছে আপনাদের বাড়িটা, চোখে ভাসে। দোতলা দালান ছিল, অনেক গাছ ছিল। আমরা বলতাম বড়লোকের বাড়ি। আমরা তো বড় হইয়াও আপনাদের বাড়ির মাঠে ক্রিকেট খেলছি।

—তখন বাবা বেঁচে ছিলেন?

—না। তখন বাড়িটা খালি পইড়া থাকত। মাঠের ঘাসগুলা বড় বড় হইয়া যাইত। নদীর ওই পার থেইকা বিহারী গোয়ালারা আইসা ঘাস কাইটা নিত।

—আমাদের সময় ভাগীরথীর মা দুধ দিত। আচ্ছা ওরা এখনও আছে কি না জানো? ভাগীরথী, ভাগীরথীর বোন পার্বতী?

—না দিদি। ওদের খবর জানি না।

দীপনের হাত ধরে সৌখিন তার পড়বার ঘরে যায়। দেখে মন ভরে যায়। কল্যাণীর। এদিকে স্বপনও শিশুর মত হেসে আনন্দমোহনে পড়েছে সে, তারপর ব্যবসা করছে, ব্যবসায় ভালই লাভ হয়, প্রায়ই তার ইন্ডিয়া যেতে হয়—এসব বলে।

আনন্দমোহনের নাম শুনে চমকায় কল্যাণী। চমকায় আবার চোখে তার থিকথিক সুখও। —আনন্দমোহনে পড়েছ? আনন্দমোহনে আমার সঙ্গে পড়ত বাদল। পরে কোথায় কী পড়েছে জানি না। বাদলকে চিনতে তুমি?

—এক বা