Friday, April 12, 2024
Homeভৌতিক গল্পধুমলগড়ের হাণ্টিং লজ - সত্যজিৎ রায়

ধুমলগড়ের হাণ্টিং লজ – সত্যজিৎ রায়

মাথায় অনেকরকম উদ্ভট শখ চাপে মানুষের, বললেন তারিণীখুড়ো, কিন্তু আমার যেমন চেপেছে, তেমন কজনের চাপে জানি না।

আমরা পাঁচজন ঘিরে বসেছি খুড়োকে। বাইরে এক পশলা বেশ ভাল বৃষ্টি হয়ে গিয়ে এখন সেটা অবিরাম ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়েছে। আষাঢ় মাস, তার উপর লোডশেডিং, টিম টিম করে দুটো মোমবাতি জ্বলছে, দেয়ালে আমাদের সকলের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ছায়া পড়েছে–সব মিলিয়ে তারিণীখুড়োর গল্প শোনার পক্ষে আইডিয়াল পরিবেশ। খুড়োর মতে তাঁর গল্পগুলো সবই সত্যি। এ ব্যাপারে গ্যারান্টি দেবার সাধ্যি আমার নেই, তবে গল্পগুলো যে রঙদার তাতে কোনও সন্দেহ নেই, আর তারিণীখুডোর যে গত চল্লিশ বছর ধরে সারা ভারতবর্ষ ঘুরে নানারকম অভিজ্ঞতা হয়েছে সে কথা বাবা আমাদের বলেছেন, কাজেই সেটা অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই।

ন্যাপলা বলেই বসল, আজ কিন্তু ভূতের মতো আর কোনও গল্প জমবে না।

তারিণীখুড়ো ইস্কুল মাস্টারি ঢং-এ বললেন, ভূত সচরাচর চার প্রকার হয়। এক অশরীরী আত্মা, যাকে চোখে দেখা যায় না; দুই ছায়ামূর্তি; তিন, নিরেট ভূত–দেখলে মনে হবে জ্যান্ত মানুষ, কিন্তু চোখের সামনে ভ্যানিশ করে যাবে; আর চার, নরকঙ্কাল–যদিও সে কঙ্কাল চলে ফিরে বেড়ায় এবং কথা বলে। আমার চাররকম ভূতেরই অভিজ্ঞতা হয়েছে।

আজ কোন প্রকার ভূতের গল্প বলছেন আপনি? ন্যাপলা প্রশ্ন করল।

সে কথায় কান না দিয়ে, দুধ-চিনি ছাড়া গরম চায়ে একটা চুমুক দিয়ে খুড়ো তাঁর গল্প শুরু করলেন।

তোরা তো পত্রিকা-টত্রিকা পড়িস, নিশ্চয়ই লক্ষ করেছিস যে আজকাল এই সময় ডেকান হেরাল্ডের ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বছর সাতেকের পুরনো একটা লেখা চোখে পড়ল। লেখক এক সাহেব–নাম রবার্ট ম্যাকার্ডি। লেখার বিষয় হল ধুমলগড়ের হাণ্টিং লজ। ধুমলগড় মধ্যপ্রদেশের একটা ছোট্ট শহর, চাঁদা থেকে সত্তর কিলোমিটার পশ্চিমে। চারিদিকে জঙ্গল, আর সেই জঙ্গলেরই একটা অংশে একটা টিলার উপর রাজার হাণ্টিং লজ বা শিকারাবাস–দিব্যি আরামে রাত্রিবাস করা যায় এমন একটা বাড়ি, আবার তার খোলা ছাতে বসে জন্তুজানোয়ারও মারা যায়। ভারতবর্ষের বহু প্রদেশে বহু মৃগয়াপ্রিয় রাজাদের এইরকম হাণ্টিং লজ আছে; ম্যাকার্ডি সাহেব এইগুলো স্টাডি করতেই ভারতবর্ষে এসেছিলেন। ৪১৬

ধুমলগড়ের হাণ্টিং লজে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন যে লজটি হন্টেড। অর্থাৎ সেখানে একটি প্রেতাত্মা বাস করে। ম্যাকার্ডি খবর নিয়ে জানেন যে ওই হাণ্টিং লজেই ধুমলগড়ের বড়কুমার আদিত্যনারায়ণের মৃত্যু হয়। ছোটকুমার প্রতাপনারায়ণ সেটা ভেরিফাই করে।

লেখাটা পড়ার পর থেকেই আমার মাথায় একটা অদ্ভুত ফন্দি ঘুরতে লাগল। এটা আমার বিশ্বাস এবং অনেকেরই বিশ্বাস যে মানুষ মরে গেলে ভূত হয় তখনই যখন মৃত্যুটা স্বাভাবিক না হয়ে হয় অপঘাত জাতীয় কিছু। খুন, আত্মহত্যা, বাজ পড়ে মরা, মোটর ক্র্যাশে মরা, জলে ডুবে মরা, হিংস্র জানোয়ারের হাতে মরা–এ সব ক্ষেত্রেই মৃত ব্যক্তির আত্মার টেনডেন্সি হয় যে তল্লাটে মৃত্যু হয়েছে তারই আশেপাশে ঘোরাফেরা করা–যেন সে অকালে প্রাণ হারিয়ে পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারছে না।

ডেকান হেরাল্ডের পুরনো ফাইলেই জানতে পারলাম যে দশ বছর আগে ধুমলগড়ের বড় কুমার আদিত্যনারায়ণ হাণ্টিং লজে বন্দুক সাফ করার সময়ে অকস্মাৎ গুলি ছুটে গিয়ে মারা যান। অবিশ্যি মৃত্যুটা আত্মহত্যাও হতে পারে, কিন্তু সঠিক জানার কোনও উপায় ছিল না, অপঘাত ঠিকই, আর তাই প্রেতাত্মার উপস্থিতিতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

আমার মনে হল, এই প্রেতাত্মার দেখা পেলে তার একটি সাক্ষাৎকার নিলে কেমন হয়? কী কারণে সে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে উঠতে পারছে না সেটা জানা যাবে কি? কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছিল তার সঠিক বর্ণনা পাওয়া যাবে কি? তার অতৃপ্ত বাসনা কিছু আছে কি এবং সে বাসনা পূর্ণ হলেই কি সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকে প্রস্থান করতে পারবে?

আমার কাগজের সম্পাদক জগন্নাথ কৃষ্ণানকে বলে সাতদিনের ছুটি নিয়ে ধুমলগড় পাড়ি দিলাম। যারা অন্ধকার ঘরে টেবিলের চারপাশে ঘিরে বসে প্ল্যানচেট করে, তারাও প্রেতাত্মার সঙ্গে কথোপকথন চালায়, কিন্তু সেটা হয় একটি তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে, যাকে বলে মিডিয়াম। এখানে ভূতকে দেখা যায় না, ফলে মিডিয়াম যদি খাঁটি না হয় তা হলে বুজরুকির অনেক সুযোগ থাকে। প্ল্যানচেটে তাই আমার বিশ্বাস নেই। তবে ভূতে বিশ্বাস আছে কারণ তোরা তো জানিস, ভূতের অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই অনেকবার হয়েছে।

ধুমলগড়ের ছোটকুমার প্রতাপনারায়ণ এখন গদিতে বসেছে, কারণ বাপ শঙ্করনারায়ণ মারা গেছেন। বছর পাঁচেক হল। বড় ছেলে আদিত্য হাণ্টিং লজে মারা যাওয়ায় বাপের সম্পত্তি ও সিংহাসন ছোটকুমারই পেয়েছে।

এস্টেটের ম্যানেজারকে আগেই চিঠি লিখে আমার আসার কথা জানিয়ে দিয়েছিলাম। ধুমলগড় পৌঁছে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করে আমার অভিপ্রায় জানালাম। ম্যানেজার ঈশ্বরীপ্রসাদ বললেন যে একবার রাজার সঙ্গে কথা বলে নেওয়া দরকার। সকলকে হাণ্টিং লজে ঢুকতে দেওয়া হয় না।

ঈশ্বরীপ্রসাদই রাজার সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দিল। রাজার সুসজ্জিত আপিসঘরে সকালে প্রতাপনারায়ণের সঙ্গে দেখা করলাম। বয়স চল্লিশের বেশি না, চাড়া দেওয়া গোঁফ, শরীরে চর্বি যেন একটু বেশি। পোশাক একেবারে সাহেবি ধরনের, তার সঙ্গে দুহাতের আঙুলের আংটির বহর কেমন যেন বেমানান।

রাজাসাহেব আমাকে আসার কারণ জিজ্ঞেস করাতে অকপটে তাকে সব বলে দিলুম। রাজা শুনে বললেন, এ তোমার খুবই উদ্ভট শখ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে আমায় জিজ্ঞেস করলে আমি বলব যে আমার দাদা লজে ভূত হয়ে অবস্থান করছেন এটা আমি মোটেই বিশ্বাস করি না। ভূত জিনিসটাতেই আমি বিশ্বাস করি না। আর সে ভূত থাকলেও সে তোমার সঙ্গে কথা বলবে, তোমার প্রশ্নের জবাব দেবে, এমন আশা করাটাই বোধ হয় ঠিক না।

আমি তখন ম্যাকার্ডি সাহেবের কথা বললাম। প্রতাপনারায়ণ বলল, ম্যাকার্ডির ধারণা ভারতবর্ষ হচ্ছে ভূত-প্রেতের ডিপো। তাকে বলে বোঝাতে পারিনি যে এ ধারণা ভুল। পোড়োবাড়ি দেখলেই সাহেব সেটাকে ভূতের বাড়ি বলে ধরে নিত। সাহেবের পুরো ব্যাপারটাই কল্পনাভিত্তিক।

আমি বললাম, তাও একবার যাচাই করতে ক্ষতি কী? এতদূর যখন এসেছি, তখন, কোনওরকম অনুসন্ধান না করেই ফিরে যাব?

আমার গোঁ দেখে প্রতাপনারায়ণ শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন। রাজবাড়ি থেকে হাণ্টিংলজের দূরত্ব। দেড় মাইল। পাতলা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে নাকি সেখানে পৌঁছাতে হয়। ঈশ্বরীপ্রসাদকে বলে রাজা আমার জন্য একটা জিপের বন্দোবস্ত করে দিলেন। সেটা আমাকে রাত দশটা নাগাত পৌঁছে দিয়ে আবার ভোরবেলা গিয়ে নিয়ে আসবে।

বিকেলে ঈশ্বরীপ্রসাদের সঙ্গে বসে একটু আলাপ আলোচনা করলাম। লোকটা অনেকদিন ম্যানেজারি করেছে, বয়স সত্তরের কাছাকাছি। দুই কুমারকেই সে ছেলেবেলা থেকে বড় হতে দেখেছে। বলল দুই ভাইয়ের স্বভাবচরিত্রে অনেক বেমিল থাকলেও দুজনের মধ্যে বেশ হৃদ্যতা ছিল। দাদার মৃত্যুতে প্রতাপনারায়ণ খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছিল। আত্মহত্যার কোনও কারণ ছিল না। ঈশ্বরীপ্রসাদ নিজেও খুবই আঘাত পেয়েছিল। বড়কুমার এভাবে অকস্মাৎ মরবে সেটা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। শিকারি হিসাবে সে ছিল খুব পাকা। হাত ফসকে গুলি ছুটে গিয়ে নিজের গায় লাগবে সেটা বিশ্বাস করা খুব কঠিন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, বড়কুমারের মৃত্যুর ব্যাপারে কোনও তদন্ত হয়েছিল কি?

ঈশ্বরীপ্রসাদ বললেন, পুলিশ ইন্সপেক্টর মহাদেব দেওয়ান তদন্ত করেছিলেন। তাঁর ধারণা–এটা অপঘাত মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই না। কারণ আদিত্যনারায়ণের হাতে বন্দুক ছিল, এবং তার ডান হাতের তর্জনী বন্দুকের ট্রিগারের সঙ্গে লাগানো ছিল। কাজেই আত্মহত্যা বা অ্যাক্সিডেন্টু দুটোই সম্ভব। আসলে কী হয়েছিল তা বলা মুশকিল।

বর্তমান রাজা প্রতাপনারায়ণ কি শিকার করেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

না, বললেন ঈশ্বরীপ্রসাদ। ছোটকুমার চিরকালই একটু আয়েশী প্রকৃতির। খেলাধুলা বা শিকার-টিকারে তাঁর ঝোঁক নেই। সে গান বাজনা নিয়ে থাকে। তাকে হাণ্টিং লজে যেতে হয় না কখনও।

রাত্রে লক্ষ্মীবিলাস হোটেলে চাপাটি আর মুরগির মাংস খেয়ে, খাতা পেনসিল নিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ দ্রুত ভেসে যাবার পথে মাঝে মাঝে চাঁদটাকে আড়াল করছে। পৌনে দশটায় জিপ এসে গেল, আমি হাণ্টিং লজের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

মিনিট খানেকের মধ্যেই শহর পিছনে ফেলে জিপ জঙ্গলের পথ ধরল, আর তার দশমিনিট পরেই একটা দোতলা বাড়ির গাড়ি বারান্দার তলায় এসে জিপটা থামল। অর্থাৎ হাণ্টিং লজে এসে গেছি। বুঝতে পারলাম বাড়ির পিছন দিকের জমিটা ঢালু হয়ে জঙ্গলের দিকে নেমে গেছে।

জিপের ড্রাইভার গুরমীত সিং বলল যে দরকার হলে সে সারারাত থাকতে পারে। প্রস্তাবটা আমার ভাল লাগল না। পরিবেশ যত নিরিবিলি হয়, ভূতের আবির্ভাবের সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়। বললুম, তুমি এখন যাও, কাল ভোরে ছটায় এসে আমাকে নিয়ে যেয়ো। জিপ চলে গেল।

আমি চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলুম। একটা টিলার মাথাটা চেঁছে সমতল করে তার উপর তৈরি হয়েছে হাণ্টিং লজটা। পাথরের তৈরি মোগলাই প্যাটার্নের বাড়ি, বয়স নাকি দেড়শো বছর।

পাঁচ ধাপ সিঁড়ি উঠে সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে জানালা দিয়ে আসা ফিকে চাঁদের আলোয় দেখলাম কার্পেট বিছানো এক সুদৃশ্য বৈঠকখানায় এসে পড়েছি। চারিদিকে আসবাবের ছড়াছড়ি, দেয়ালে টাঙানো স্টাফ করা বাইসন হরিণ বাঘ-ভাল্লুকের মাথা। বৈঠকখানার পরে একটা চওড়া বারান্দা, তার ডানদিকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। আন্দাজ করলুম সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই খোলা ছাতে পৌঁছনো যাবে। সেখান থেকে বাড়ির পিছনের জঙ্গল দেখা যায়, আর সেখানেই বড় কুমারের মৃত্যু হয়েছিল।

মুখের মতো টর্চটা সঙ্গে আনিনি। চাঁদের আলো আছে ঠিকই, কিন্তু সে আর সব জায়গায় প্রবেশ করবে কী করে? তখন আমার চুরুট খাওয়া অভ্যেস। দেশলাই-এর আলোতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় পৌঁছলুম।

যা ভেবেছিলুম তাই। একপাশে পশ্চিমদিকে খোলা ছাত, তার নিচু পাঁচিলের ধারে গিয়ে দাঁড়ালেই সামনে ঢালু জমির ওপারে গভীর জঙ্গল শুরু হয়েছে। একবার মনে হল যেন বাঘের ডাকও শুনতে পেলুম জঙ্গলের দিক থেকে।

ছাত ছাড়াও একটা বড় ঘর রয়েছে নীচের বৈঠকখানার ঠিক ওপরে। এখানে একটা ফরাস পাতা দেখে বুঝলুম যে শিকারির যদি ঘুম পায় তাই এই ব্যবস্থা। ঘরের দেয়ালে বড় বড় অয়েল পেন্টিং, তার বেশির ভাগই মনে হল এই পরিবারের পূর্বপুরুষদের ছবি। ফরাসের পাশে একটা আরাম কেদারা ছাড়া আরও কয়েকটা ছোট ছোট সোফা রয়েছে।

আমি আরাম কেদারায় বসে একটা চুরুট ধরালুম। পকেট থেকে নোট বই বার করে চেয়ারের হাতলে রাখলুম। শর্টহ্যান্ড লেখার অভ্যাস আছে, দরকার হলে অন্ধকারে লিখতেও কোনও অসুবিধে হবে না। আরেকটা জিনিস আমার কাছে ছিল সেটা হল এক ফ্লাস্ক ভর্তি গরম চা। নভেম্বর মাস, বেশ শীত, ফ্লাস্কের ঢাকনায় চা ঢেলে খেয়ে শরীরটাকে একটু গরম করে নিলুম।

চির-প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী আমারও বিশ্বাস ছিল যে ভূতের আবিভাব যদি হয়ই, তবে সেটা। মাঝরাতে, অর্থাৎ বারোটায়। বাইরে ক্রমে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে, তার মধ্যে মাঝেমাঝে শেয়াল গোষ্ঠী কেয়া হুয়া হুয়া করে সরব হয়ে উঠছে। খবরের কাগজের আপিসে কাজ করে রাত জাগার অভ্যেস হয়ে গেছে, তবে এ পরিবেশ কেমন যেন ঝিমধরা। তার উপরে দরজা-জানলা দিয়ে আসা আবছা চাঁদের আলো ঘরটাকে কেমন যেন একটা স্বপ্নরাজ্যের চেহারা এনে দিয়েছে। তাই বোধহয় ঘাড়টা। একবার একটু নুয়ে পড়েছিল, এমন সময় একটা ব্যাপারে সজাগ হয়ে উঠলুম।

আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে ঘরে একটি নতুন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে।

আমি ছাতের দরজার দিকে দৃষ্টি ঘোরালাম।

সমস্ত দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ছায়ামূর্তি।

মূর্তি নিঃশব্দে প্রবেশ করে ধীরপদে এগিয়ে এসে ঘরের মাঝখানে দাঁড়াল। মুখ বোঝার উপায় নেই, আন্দাজে বোঝা যায় পরনে শিকারির পোশাক।

তোমার কী প্রয়োজন? ইংরাজিতে গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন এল।

আমি কি ধুমলগড়ের বড়কুমারের সঙ্গে কথা বলছি?

হ্যাঁ, আবার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর।

বললাম, আমি আপনার সঙ্গেই সাক্ষাৎ করতে এসেছি।

কী প্রয়োজনে?

আমি একজন সাংবাদিক। আপনাকে দু-একটা প্রশ্ন করতে চাই।

কী প্রশ্ন?

প্রথম হল–আপনি কেমন আছেন?

উত্তর এল, মৃত ব্যক্তির আত্মা কেমন আছে সেটা কোনও প্রশ্ন নয়।

তা হলে দ্বিতীয় প্রশ্ন করছি।

করুন।

আপনার কি কোনও অতৃপ্ত বাসনা আছে, যে কারণে আপনি এই হাণ্টিং লজ থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না?

মোটেই না। আমার আয়ু আমার জন্মের মুহূর্তেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। আমি জানতাম আমার মৃত্যু হবে সাতই অগ্রহায়ণ, আমার বত্রিশ বছর বয়সে। আমি এই মৃত্যুর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলাম, এবং মৃত্যুর আগে আমার সব সাধ মিটিয়ে নিয়েছিলাম। অবিশ্যি কী ভাবে যে মরব সেটা আগে থেকে জানা ছিল না।

বলা বাহুল্য, আমি সব কিছুই শর্টহ্যান্ডে লিখে নিচ্ছি।

এবার প্রশ্ন করলাম, আপনি তা হলে আত্মহত্যা করেননি?

উত্তর এল, না। আমার মৃত্যু হয় অকস্মাৎ আমার নিজের অসাবধানতা হেতু। আমি বন্দুক সাফ করছিলাম, কিন্তু সে বন্দুকে যে টোটা ছিল সেটা আমি–

প্রেতাত্মার কথা হঠাৎ থেমে গেছে, কারণ তার কথা ছাপিয়ে আরেকটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেছে।

মিথ্যা কথা!

আমি তো থ! এ আবার কার কণ্ঠস্বর? কোন তৃতীয় ব্যক্তি এসে ঢুকল ঘরে?

আমার দৃষ্টি আবার দরজার দিকে ঘুরে গেছে। হ্যাঁ, দরজার মুখে দণ্ডায়মান আরেকটি মূর্তি। যদিও আমি নিজের সাহসের বড়াই করি, কিন্তু যখন দেখলাম এই দ্বিতীয় মূর্তিটি নিরেট নয়, এর পাঁজরের হাড়ের ফাঁক দিয়ে ফাঁক দিয়ে পিছনের আকাশ দেখা যাচ্ছে, তখন গলাটা যে একটু শুকিয়ে যায়নি, তা বলব না। আসলে আগন্তুক একটি নরকঙ্কাল এবং আরও আশ্চর্য এই যে এই কঙ্কালের হাতে একটি বন্দুক।

এবার কঙ্কাল ধীরে ধীরে এগিয়ে এল প্রথম মূর্তির দিকে। এদিকে প্রথম মূর্তি যেন সভয়ে পিছিয়ে যেতে শুরু করেছে দেয়ালের দিকে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছি এই ছায়াছবি। মিথ্যে কথা! আবার সজোরে বলে উঠল কঙ্কাল। আমার মৃত্যু আকস্মিক নয়, আমার অন্যমনস্কতার জন্য নয়। বন্দুক চালাতাম আমি তেরো বছর বয়স থেকে; আমি অতটা অসাবধান হতে পারি না।

আমার মন বলছে এই কঙ্কালই আসলে বড়কুমারের প্রেতাত্মা। আমি জিজ্ঞেস করলাম। তা হলে আপনার মৃত্যু হয় কী ভাবে?

আমাকে খুন করা হয়েছিল! গর্জিয়ে উঠল কঙ্কাল। সম্পত্তির লোভে, সিংহাসনের লোভে! এই অন্যায়ের প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত আমি এই বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পাচ্ছিলাম না। আজ সেই মুক্তির সুযোগ এসেছে। আজ আমার হত্যার প্রতিশোধ আমি নিজেই নিচ্ছি। পুলিশ সন্দেহ করেছিল আমাকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু টাকা দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করা হয়েছিল, এই সব পাপের শাস্তি দেবার সুযোগ আজ এসেছে। ইষ্টনাম জপ করো প্রতাপ, তোমার অন্তিমকাল উপস্থিত!

প্রথম ছায়া মূর্তির ঘর থেকে বাইরে পালাবার চেষ্টা বিফল করে দিল বন্দুকের গর্জন। ফরাসের উপর লুটিয়ে পড়ল প্রথম ছায়ামূর্তির নিস্পন্দ দেহ। সঙ্গে সঙ্গে কঙ্কাল আমাকে উদ্দেশ করে বলে উঠল, সত্য ঘটনা প্রকাশ হলে আমি শান্তি পাব। আমার এই উপকার করার জন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

এই কথাটা বলে বন্দুকধারী কঙ্কাল অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমি একটা দেশলাই জ্বালিয়ে ফরাসের কাছে গিয়ে ধরতেই প্রথম ছায়ামূর্তির রহস্য উদঘাটিত হল। ইনি ছায়ামূর্তি নন; ইনি রক্তমাংসের দেহসম্পন্ন সদ্যোমৃত ধুমলগড়ের রাজা প্রতাপনারায়ণ, যিনি আজ থেকে দশ বছর আগে সম্পত্তি আর গদির লোভে নিজের দাদা আদিত্যনারায়ণকে খুন করে সেটাকে অপঘাত মৃত্যু বলে চালিয়েছিলেন।

এই খুনের অবিশ্যি তদন্ত হয়েছিল, এবং স্বভাবতই তাতে আমাকেও জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। কারণ আমি ছাড়া আর কোনও তৃতীয় ব্যক্তি ছিল না প্রতাপনারায়ণের সঙ্গে। অথচ যে অস্ত্র দিয়ে তাকে খুন করা হয়েছে তার কোনও চিহ্ন নেই ত্রিসীমানায়, তাই শেষ পর্যন্ত বেকসুর খালাস পেয়ে গেলাম।

সন্দেশ, শ্রাবণ ১৩৯১

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments