Wednesday, July 29, 2026
Homeগোয়েন্দা গল্পচশমার আড়ালে - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

চশমার আড়ালে – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

চশমার আড়ালে – ১

জানলার ধারে সিট পেয়েছিলুম। বাইরে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, রানওয়ে পড়িমরি পিছনে ছুটছে। একটু বাদেই প্লেন আকাশে উঠে পড়ল। এখন সব শান্ত। একটুও কাঁপুনি নেই, গতির ঝড়টাও টের পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু কানে আসছে চাপা একটা গোঁগোঁ শব্দ।

বোয়িং নয়, এয়ারবাল। আগের এয়ারবাসগুলোর তুলনায় আকারে একটু ছোট। কিন্তু ছিলছাম। ব্যাঙ্গালোরের দুর্ঘটনার পরে এই নতুন কেনা প্লেনের বহরকে একেবারে পুরোপুরি বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ক্ষতি হচ্ছিল কোটি-কোটি টাকা। দিল্লির জমানা তার কিছুদিন পরেই পালটে যায়। তা নইলে এই চমৎকার প্লেনগুলোকে যে আরও কতকাল বেকার বসিয়ে রাখা হত, কে জানে।

৫ মার্চ, মঙ্গলবার। দুপুর এখন দুটো। দেড়টায় টেক-অফের কথা ছিল। আধ ঘন্টা দেরিতে ছেড়েছে। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই আগরতলায় পৌঁছে যাব।

পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে এদের আনুষ্ঠানিক স্বাগত সম্ভাষণ শেষ হয়েছে। প্রথমে হিন্দি, তারপর ইংরেজি। ক্যাপ্টেনের নাম কী বলল, বুঝলাম না। এখন রুটিনমাফিক বলা হচ্ছে, প্লেনের মধ্যে হঠাই যদি অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় তো কী করতে হবে। একজন এয়ার হস্টেস হাতে কলমে সেটা দেখিয়েও দিচ্ছেন। কেমন যেন প্যান্টোমাইমের মতো মনে হয়। কেউ কি দেখছে? বুঝবার চেষ্টা করছে কিছু?

জলপান’ এসে গেল। হাতে-হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। আমারটা পড়েই রইল। বাড়ি থেকে খেয়ে বেরিয়েছি। খিদে নেই।

একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভাল হত। কিন্তু আজকাল তো এত অল্প সময়ের ‘উড়ান’-এ ধূমপান করতে দেওয়া হয় না। সিগারেটের প্যাকেটটা ফের পকেটে ঢুকিয়ে তাই সামনের জালি ব্যাগ থেকে খবরের কাগজ বার করে নিলুম একটা। তাতেও অবশ্য মন বসানো গেল না।

আসলে শুধু দুটো প্রশ্নই কাল রাত্তির থেকে আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। ভাদুড়িমশাই কোথায় গেলেন? আমিই বা এখন কোথায় যাচ্ছি? আগরতলাই আমার শেষ গন্তব্য জায়গা নয়, সেখান থেকে অন্য কোথাও আমাকে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু কোথায়? এ-দুটো প্রশ্নের উত্তর যতক্ষণ না পাচ্ছি, কোনও কিছুতেই ততক্ষণ আমি মন বসাতে পারব না।

ব্যাপারটা যে গোলমেলে, তাতে সন্দেহ নেই। কাল সওয়া দশটায় যখন অফিসে রওনা হই, তখন কি আমি ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পেরেছিলুম যে, এই রকম একটা ব্যাপার ঘটতে চলেছে? মোটেই না। রাত দশটায় বাড়ি ফিরেও কিছু বুঝতে পারিনি।

পৌনে এগারোটায় অফিসে পৌঁছই। শোলদা-পাড়ায় থাকি, সেখান থেকে অফিসে পৌঁছতে পনেরো মিনিটের বেশি সময় লাগবার কথা নয়। লাগেও না। কিন্তু কাল ফ্লাই-ওভার ছিল জ্যাম-জমাট, চৌরঙ্গি পাড়ায় পৌঁছতে পৌঁছতে আধ ঘন্টা কাবার।

অফিসে ঢুকে নিজের ঘরে গিয়ে বসতে-না-বসতেই ফোন বেজে উঠল।

“হ্যালো…..”

“আপনার একটা ফোন এসেছিল।”

গলা শুনে বুঝলুম, পি.বি. এক্স.-এর অপারেটর। বললুম, “কখন?”

“মিনিট পাঁচ-সাত আগে।”

“নাম বলেছে?”

“হ্যাঁ, মালতি সান্যাল। বললেন যে, খুব জরুরি দরকার। একটু বাদে আবার ফোন করবেন।”

“কী দরকার কিছু বললেন?”

“না!” অপারেটর-মেয়েটি আমতা-আমতা করে বলল, “না….মানে আমি ঠিক জিজ্ঞেস করিনি।”

“ঠিক আছে।” ফোন নামিয়ে রেখে কাজে বসে গেলুম।

মালতী আর ফোন করেনি। আমার করা উচিত ছিল। কিন্তু করা হয়নি। হরেক কাজে এমন জড়িয়ে গিয়েছিলুম যে, মালতীর কথা মনেই ছিল না।

মনে পড়ল রাত-দশটায় বাড়ি ফিরে। তাও হয়তো মনে পড়ত না, বাসন্তীর সঙ্গে কথা বলতে-বলতে যদি না অরুণ সান্যালের অর্থাৎ মালতীর স্বামীর প্রসঙ্গটা উঠত। ক’দিন ধরেই আমার শরীর বিশেষ ভাল যাচ্ছে না। মাথা ঘোরে, দুর্বল বোধ করি, ঘন্টা দুই-আড়াই একটানা কাজ করলেই হাঁফ ধরে যায়। বাসন্তীকে সে-কথা বলতে বলল, “অরুণবাবুকে দিয়ে তোমার ব্লাড প্রেশারটা একবার দেখিয়ে নাও।”

বাস, অমনি মনে পড়ল মালতীর কথা। বললুম, “মালতী কি ফোন করেছিল?”

“কই, না তো।” বাসন্তী বলল, “কেন, কিছু হয়েছে?”

কিছু না-বলে টেলিফোনের কাছে উঠে গিয়ে ডায়াল ঘোরাতে লাগলুম। লাইন পাওয়া গেল না। যতবার ডায়াল করি, ওদিক থেকে এনগেজড টোন বাজতে থাকে।

ফিরে এসে বাসন্তীকে বললুম, “মালতী আজ আমাদের অফিসে ফোন করেছিল। তখনও আমি অফিসে গিয়ে পৌঁছইনি। অপারেটর-মেয়েটি বলল, খুব নাকি জরুরি দরকার।”

“তুমি ফোন করেছিলে?”

“করা উচিত ছিল। কিন্তু করা হয়নি। ভুলে গিয়েছিলুম।”

“কৌশিকের কিছু হয়নি তো?”

“কৌশিককে নিয়ে ভাবছি না। সে তো ব্যাঙ্গালোরে ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে রয়েছে। মামার কাছে রয়েছে যখন, তখন ভাবনার কিছু নেই। আমি ভাবছি অরুণের কথা। ডাক্তার-মানুষ, অথচ নিজেরই শরীরের যত্ন নেয় না। এদিকে কিছুদিন আগে ওর একটা ছোটখাটো স্ট্রোক হয়ে গিয়েছে। ভাবনা তো ওকে নিয়েই। কী করা যায় বলো তো?”

বাসন্তী বুঝতে পেরেছিল, মাথার মধ্যে দুশ্চিন্তা নিয়ে যদি শুতে যাই, তো রাত্তিরে আমার ঘুম হবে না। নিজেই ফোনের কাছে উঠে গিয়ে বার কয়েক ডায়াল করল। তারপর ফিরে এসে বলল, “না, এনগেজড!”

বললুম, “খবরটা তা হলে পাই কী করে?”

বাসন্তী বলল, “চলো, গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়া যাক। রাত প্রায় এগারোটা বাজে, রাস্তায় ভিড়ভাট্টা নেই, ঝট করে ঘুরে আসতে পারব।”

ছোট মেয়ে পারুল গেছে এলাহাবাদে, তার দাদার কাছে। স্বচ্ছন্দে অতএব বেরিয়ে পড়া যেতে পারে। বাসন্তী চটপট কাপড় পালটে নিল। তারপর দরজায় তালা লাগিয়ে সিঁড়ির ধাপে পা রেখেছি কি রাখিনি, শুনতে পেলুম, টেলিফোন বাজছে। নিশ্চয়ই মালতী, তক্ষুনি আবার তালা খুলে ভিতরে ঢুকে ফোনের রিসিভার তুললুম। কিন্তু ‘হ্যালো’ বলতেই ওদিক থেকে যাঁর কথা ভেসে এল, গলা শুনে তাঁকে চিনতে পারলুম না।

“মিঃ চ্যাটার্জি?”

“হ্যাঁ…..আপনি কে বলছেন?”

ওদিক থেকে যিনি কথা বলছিলেন, তিনি হাসলেন। এক মুহূর্ত পরে বললেন, “আমাকে আপনি চিনবেন না।”

“তা হলে?”

“যা বলছি শুনুন। মিঃ ভাদুড়িকে আজ সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।”

বললুম, “সে কী, ব্যাঙ্গালোর থেকে কেউ ফোন করেছিল?”

“ব্যাঙ্গালোর থেকে ফোন করবার কথা উঠছে কেন, এটা কলকাতার ব্যাপার।”

“তার মানে?”

“মানে আর কিছুই নয়, একটা কাজে কাল তিনি ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় আসেন। উঠেছিলেন মিঃ সান্যালের বাড়িতে। আজ সকালে যথারীতি লেকের ধারে জগিং করতে যান। বাস, তারপর থেকে আর তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।”

“আপনি এসব কথা জানলেন কী করে?”

“আমি মিঃ সান্যালের প্রতিবেশী। শুনলুম মিসেস সান্যাল আপনাকে সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ একবার ফোন করেছিলেন, কিন্তু আপনি তখন অফিসে ছিলেন না। তার খানিক বাদেই ওঁদের বাড়ির ফোনটা ডেড হয়ে যায়। একটু আগে ওঁরা অবশ্য একটা খবর পেয়েছেন।”

“লোক মারফত?”

“না, ফোন এসেছিল।”

“ফোন তো বলছেন ডেড, তা হলে ফোনে খবর এল কী করে?”

“মিঃ সান্যালের ধর্মতলার চেম্বারে। সেখানকার ফোন ঠিক আছে।”

“খবরটা ভাল তো?”

“মিঃ সান্যাল তো তা-ই বললেন। তিনি এই খানিকক্ষণ হল বাড়ি ফিরেছেন। বাড়ির ফোন ঠিক নেই বলে আমাকেই বললেন, আপনাকে সব জানাতে। …..তো যা বলছিলুম। মিঃ সান্যাল বলছেন, কালই দুপুরের ফ্লাইটে আপনি একবার আগরতলা যেতে পারলে ভাল হয়।”

“কেন? আগরতলার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?”

ভদ্রলোক আবার হাসলেন। তারপর বললেন, “তা তো জানি না।”

“আপনার নামটা জানতে পারি?”

“স্বচ্ছন্দে। প্রমোদ সেন। আমি ওঁর দু-তিনটে বাড়ি পরে থাকি।….আচ্ছা, নমস্কার।”

ভদ্রলোক ফোন ছেড়ে দিলেন। ফলে আর-কিছু জিজ্ঞেস করা গেল না।

রিসিভারটা নামিয়ে রেকে বাসন্তীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালুম। বাসন্তী বলল, “কী ব্যাপার? কোনও খারাপ খবর?”

বললুম, “কিছু বুঝতে পারছি না। ভাদুড়িমশাই কাল কলকাতা এসেছেন। আজ সকালে জগিং করতে বেরিয়েছিলেন, তারপর থেকে নিখোঁজ।”

“সে কী! কে বলল?”

“মালতীদের এক প্রতিবেশী। নাম বললেন প্রমোদ সেন। বলছেন, কাল দুপুরের ফ্লাইটে আমাকে আগরতলা যেতে হবে। নাকি অরুণ তাই-ই চায়। যাব?”

“অরুণবাবুকে জিজ্ঞেস না করে যেয়ো না।”

“তাকে পাচ্ছি কোথায়? ওদের ফোন তো খারাপ।….তবে হ্যাঁ, চেম্বারের ফোনটা নাকি ঠিক আছে।”

“বেশ তা হলে কাল সকালে অরুণবাবুর চেম্বারে ফোন করে ব্যাপারটা জেনে নাও। আটটা নাগাদ উনি চেম্বারে বসেন।…..মোট কথা, ওঁকে জিজ্ঞেস না করে কিছু করাটা ঠিক হবে না।”

বললুম “অরুণ যদি যেতেও বলে, তাতেও কিন্তু ঝামেলা মিটছে না।”

“কীসের ঝামেলা?”

বললুম “টিকিটের। আগরতলায় বইমেলা চলছে। প্লেনের টিকিট পাওয়া শক্ত হবে।”

শেষপর্যন্ত অবশ্য না-করতে হল অরুণের চেম্বারে ফোন, না কাটতে হল টিকিট। আজ সকালে কলিং বেল বাজতে দরজা খুলে আমি অবাক। দেখি, শশাঙ্ক দাড়িয়ে রয়েছে।

অরুণের চেম্বারে শশাঙ্ক রিসেপশনিস্টের কাজ করে। বললুম, “কী ব্যাপার শশাঙ্ক?”

শশাঙ্ক আমার হাতে একটা লম্বাটে খাম তুলে দিয়ে বলল, “ডাক্তারবাবু পাঠিয়েছেন। ওর মধ্যে একটা চিঠি আছে, আর আগরতলার একটা টিকিট।”

খাম খুলে চিঠিটা বার করলুম। সংক্ষিপ্ত চিঠি। দুপুরের ফ্লাইটে আমি আগরতলা যেতে পারলে ভাল হয়। ভাদুড়িমশাই ভাল আছেন, তবে কোথায় আছেন, এখুনি সেটা জানা যাচ্ছে না। এত অল্প সময়ের মধ্যে আমার টিকিট পেতে অসুবিধে হতে পারে ভেবে কালই সে শশাঙ্ককে দিয়ে টিকিট কাটিয়ে রেখেছে। আমি যদি যেতে না পারি, তা হলে টিকিটটা যেন শশাঙ্কের হাতেই ফেরত দিই, অন্তত কিছু টাকা সে-ক্ষেত্রে রিফান্ড পাওয়া যাবে।

টিকিটের সঙ্গে চিঠিখানা একটা ক্লিপ দিয়ে আঁটা।

চিঠি পড়ে শশাঙ্কের দিকে তাকিয়ে বললুম, “তুমি আসায় ভালই হল। আর-একটু বাদেই ডাক্তারবাবুকে আমি তাঁর চেম্বারে ফোন করতে যাচ্ছিলুম।”

শশাঙ্ক বলল, “ফোন করলে তো তাঁকে পেতেন না।”

“কেন?”

“ডাক্তারবাবুর মায়ের খুব অসুখ।” শশাঙ্ক বলল, “আজ সকালেই ওঁরা বেহালা চলে গেলেন। চেম্বারও তাই বন্ধ।”

অরুণের পৈতৃক বাড়ি বেহালায়। সেখানকার ফোন-নম্বর আমার জানা নেই। শশাঙ্কও জানে না বলল। তবে বাড়িটা চেনে। এখান থেকে ও নাকি বেহালাতেই যাবে। বলল, “ডাক্তারবাবুকে যদি কিছু জানাবার থাকে তো আমাকে বলতে পারেন, আমি জানিয়ে দেব।”

বললুম, “এমনিতে কিছু জানাবার নেই। শুধু বোলো যে, আমি যাচ্ছি।”

শশাঙ্ক চলে গেল।

দরজা বন্ধ করে খাবার ঘরে ফিরে দেখলুম, বাসন্তী টেবিল সাজাচ্ছে। পট থেকে কাপে চা ঢালতে ঢালতে মুখ না তুলেই বলল, “ব্যাপারটা আমার ভাল ঠেকছে না।”

ভাল কি আমারই ঠেকছে? সবটাই কেমন যেন গোলমেলে ব্যাপার। আমাকে ফোন করবার পরেই বিগড়ে গেল মালতীদের ফোন। রাত্তিরে সে-কথা যিনি আমাকে জানালেন, সেই প্রমোদ সেনকে আমি চিনি না। সকালে শশাঙ্ক অবশ্য অরুণের চিঠি নিয়ে এসেছে। কিন্তু সে-চিঠির হস্তাক্ষর অরুণের না অন্য-কারও তাও আমার জানবার উপায় নেই। অরুণের গোটাকয় প্রেসক্রিপশন আমাদের বাড়িতে আছে ঠিকই, কিন্তু সে তো ইংরেজিতে লেখা, তার বাংলা হাতের লেখা আমি কখনও দেখিনি। এদিকে আবার মায়ের অসুখের খবর পেয়ে সে নাকি বেহালায় চলে গেছে। ফলে তার ধর্মতলার চেম্বারেও একটা ফোন করা গেল না। স্রেফ অন্যের কথার উপরে নির্ভর করে আমি আগরতলা যাচ্ছি। কেন যাচ্ছি, সেটুকু পর্যন্ত কেউ আমাকে জানায়নি। গিয়ে যে কী করব, কোথায় উঠব, কার সঙ্গে কথা বলব, তাও আমার জানা নেই। এ তো একেবারে বুনো হাঁস তাড়া করে বেড়াবার ব্যাপার

পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমটা ফের ‘জ্যান্ত’ হয়ে উঠতে আমার চমক ভাঙল। ওড়ার পালা শেষ হয়ে এল, ‘থোড়া বাদসে’ আমরা আগরতলার মাটি ছোঁব। একটু বাদেই ঘড়ঘড় করে শব্দ হল একটা। প্লেনের নোজ-হুইল এতক্ষণ গোটানো ছিল, সেটা আবার খুলে যাবার শব্দ। জানলায় চোখ রেখে দেখলুম, গাছপালা বাড়িঘরের আকার ক্রমেই বড় হয়ে চলেছে। তারপরে মৃদু একটা ঝাঁকুনি। প্লেন এখন আর পাখি নয়, রানওয়ের উপর দিয়ে সে এখন একটা চিতাবাঘের মতন দৌড়চ্ছে।

দৌড়ের সেই গতিও একসময় কমতে কমতে স্তব্ধ হয়ে গেল। যাত্রীরা উঠে দাঁড়িয়েছেন। মাথার উপরে লকার থেকে যে যাঁর জিনিসপত্র নামিয়ে নিচ্ছেন। প্লেনের দরজায় সিঁড়ি লেগেছে। এবারে আমরা নীচে নামব

নীচে নেমে টার্মিনালের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলুম যে, আগরতলায় তো আসা গেল, এবার এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে মোটামুটি শস্তা একটা হোটেলের খোঁজ করতে হবে। ঠিক এই সময়েই টার্মিনাল-বিল্ডিং থেকে ট্রাউজার্স আর শার্ট পরা বছর তেইশ-চব্বিশের একটি ছেলে আমার দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “মিঃ চ্যাটার্জি?”

বললুম, “হ্যাঁ।”

ছেলেটি বলল, “প্লিজ কাম উইথ মি। জিজাজি আপনার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন।”


মালপত্রের ঝামেলা নেই, যা পরে আছি তা ছাড়া আমার হ্যান্ডব্যাগের মধ্যে রয়েছে গোটা-দুই ট্রাউজার্স আর শার্ট। বেশি দিনের জন্যে তো আর আসিনি। কেন এসেছি তার আঁচ না পেলেও এটুকু আন্দাজ করে নিয়েছি যে, দু-তিন দিনের বেশি আমাকে এখানে থাকতে হবে না, ওতেই অতএব চলে যাবে। হ্যান্ডব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে আমরা এয়াপোর্টের বাইরে এসে দাঁড়ালুম।

জিজাজি অর্থাৎ এর জামাইবাবু লোকটি যে কে, তা এখনও জানা হয়নি। তবে এটা বোঝা গেল যে, তিনি আমাকে চেনেন। তা নইলে আর এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে নিয়ে যাবার জন্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন কেন

ওদিকে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটি আম্বাসাডার আর প্রিমিয়ার গাড়ি। লাল রঙের একটা মারুতিও দেখলুম। আমাদের দেখে মারুতি গাড়িটা এগিয়ে এল। ছেলেটি তার পিছনের দরজা খুলে দিয়ে বলল, “উঠুন।”

গাড়িতে ঢুকে হ্যান্ডবাগটা পিছনের লাগেজ-স্পেসে নামিয়ে রাখলুম। ভেবেছিলুম, ছেলেটি আমার পাশে এসে বসবে। সে কিন্তু সামনের দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে বসল। তারপর আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, “এর আগে আপনি কভি আগরতলায় এসেছেন?”

বললুম, “না।…..কিন্তু আপনার নামটাই তো এখনও জানা হয়নি।”

“দীপক মালহোত্রা। আপনি আমাকে দীপক বলবেন।”

ড্রাইভার বলল, “তা হলে কি শহরটা ওঁকে একটু দেখিয়ে নিয়ে তারপর সিপাহিজলার দিকে যাব?”

দীপক তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “মোটে তো সাড়ে-তিনটে বাজে। জিজাজির কথা শুনে যা মালুম করলুম, সাগরমহল থেকে তাঁর বন্ধুকে নিম্নে সাতটা সাড়ে সাতটার আগে তিনি সিপাহিজলায় লোটবেন না। তব তো এখন ঘন্টা দুয়েক আমরা আগরতলায় কাটাতে পারি। অবশ্য এখানে দেখবার মতো কিছু নাই।….ঠিক আছে, চলো, সময়টা তো যা হোক করে কাটাতে হবে।”

গাড়ি চলতে শুরু করল।

দীপক যে বাঙালি নয়, সেটা তার নাম জানবার আগেই বুঝতে পেরেছিলুম। হিন্দির মিশেল দিয়ে বাংলা মোটামুটি ভালই বলে, কিন্তু উচ্চারণ একটু ভাঙা-ভাঙা।

বললুম, “তোমার নাম তো জানা গেল, কিন্তু তোমার জিজাজির পরিচয় এখনও পাইনি।”

সামনের সিট থেকে আবার মুখ ঘোরাল দীপক। বলল, “সে কী, জিজাজিকে আপনি চিনেন না?”

“না।”

“বাট আই থট হি ওয়জ এ ক্লোজ ফ্রেন্ড অব ইয়োর্স। বঙ্কু ঘোষের নাম আপনি শুনেন নাই?”

বললুম, “বঙ্কুবিহারী ঘোষ? ওই মানে যাঁকে একালের এক ফিনানসিয়াল উইজার্ড বলা হয়, তিনি তো?”

“হাঁ, হাঁ, উইজার্ড।” দীপক হেসে বলল, “টেক্সটাইল, ট্রান্সপোর্ট, কেমিক্যালস, হর কিসিমের বিজনেসে তাঁর টাকা খাটছে। তা ছাড়া রয়েছে তিন-তিনটা সিনেমা হল। গোটা চার-পাঁচ ফিল্ম ভি প্রোডিউস করেছেন। তার মধ্যে তিনটেই হিট।”

হেসে বললুম, “তাঁকে কেন চিনব না? তবে তিনিই যে তোমার জিজাজি, তা কী করে জানব? তা ছাড়া আমি নাহয় তাঁকে চিনলুম, কিন্তু আমার মতো সামান্য লোককে তো তাঁর চিনবার কথা নয়। তাতেই একটু অবাক হচ্ছি।”

দীপক বলল, “ও নো, মিঃ চ্যাটার্জি, ইউ আর আন্ডার এস্টিমেটিং ইয়োরসেলফ।

“কী করে বুঝলে?”

“আপনি তো একজন রাইটার, তাই না?”

“ওই একটু লেখালেখি করি।”

“বাস,” দীপক হেসে বলল, “ওরই জন্য জিজাজি আপনাকে চিনেন, আর ওরই জন্যে তিনি আপনাকে ক্লকাতা থেকে এখানে আনিয়েছেন।”

বললুম, “কেন, লেখক দিয়ে তাঁর কী কাজ হবে?”

“বা রে, নতুন যে ফিল্মটা তিনি করবেন, তার কহানির স্ক্রিপট লিখাতে হবে না?”

“তা তো হবেই।”

“তো সেটা আপনি লিখবেন। হা হা।”

জীবনে কখনও ফিল্মের স্ক্রিপট লিখিনি। অথচ, আর-কিছু নয়, স্রেফ স্ক্রিপট লেখাবার জন্য আমাকে কিনা কলকাতা থেকে আগরতলায় নিয়ে আসা হয়েছে। বিশ্বাস হল না।

দীপক সম্ভবত ভেবেছিল যে, কথাটা শুনে আমি খুব উল্লসিত হব। উল্লাসের লক্ষণ না-দেখে বলল, “কী হল মিঃ চ্যাটার্জি, কিছু বলছেন না যে?”

“কী বলব?”

“বাঃ, গল্পটা কী, কার লিখা, কাস্টের কথা কী ভাবা হচ্ছে, কে হিরো কে হিরোইন, লোকেশন-শুটিং কোথায় চলবে, কিচ্ছু জানবেন না?”

শুকনো গলায় বললুম, “জেনে তো লাভ নেই, স্ক্রিপট যে লিখব তার সময় কোথায়? কলকাতায় আমি বিস্তর কাজ ফেলে এসেছি, যত তাড়াতাড়ি পারি এখান থেকে আমাকে ফিরে যেতে হবে।”

কথাটাকে আমলই দিল না দীপক। বলল, “আরে, সাত দিনের তো মামলা। আমার দিদির লিখা কহানি, তাঁর সঙ্গে বসবেন, এক হপ্তার মধ্যে আপনাকে স্ক্রিপট লিখার কাজ খতম হয়ে যাবে। ব্যস, আপনার ছুট্টি।”

বুঝলুম, পাগলের পাল্লায় পড়েছি, প্রতিবাদ করে কোনও লাভ হবে না। ‘ঠিক আছে’ বলে তাই জানলায় চোখ রেখে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলুম।

এর আগে আর কখনও আমার আগরতলায় আসা হয়নি। তবে অনেক বছর আগে একবার আগরতলার মাটি ছুঁয়েছিলুম বটে। এদিকে তখন এয়ারবাস চলত না, বোয়িংও না। সেই সময়ে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের ফকার ফ্রেন্ডশিপ প্লেনে একবার শিলচর যেতে হয়েছিল। সে-প্লেন দমদম থেকে আকাশে উঠে প্রথমে নামত আগরতলায়, তারপর আধ-ঘন্টাটাক সেখানে থেমে থেকে তারপর যেত শিলচর। যাঁরা শিলচরের যাত্রী, প্লেন থেকে তাঁদের আগরতলায় নামতে দেওয়া হত না। কিন্তু নেমেছিলুম। জানলা থেকে দেখেই জায়গাটা আমার এত ভাল লেগে যায় যে, পাইলটের অনুমতি নিয়ে টার্মিনাল বিল্ডিং থেকে ঘুরে এসে আমি আবার প্লেনে উঠি।

দীপক বলছিল এখানে দেখবার মতো কিছু নেই। ও কিছু জানে না। আসলে দেখবার মতো কিছু কোথাও আছে কি না, তা নির্ভর করে কে কী দেখতে চায়, তার উপরে। যদ্দুর বুঝতে পারছি, এই ত্রিপুরায় ও বোম্বাইয়ের মেরিন-ড্রাইভের মতন একটা তেল-চুকচুকে রাস্তা দেখতে চায়, রাস্তার ধারে সারি-সারি ফাস্ট-ফুডের দোকান আর ভিডিও গেমের পার্লার দেখতে চায়। সে-সব দেখছে না বলেই ও বেজার হয়ে জানিয়ে দিচ্ছে যে, এখানে দেখবার মতো কিছু নেই।

কিন্তু ওর বয়েস আর আমার বয়েসের মাঝখানে তো বিস্তর ফারাক। দু’দিকে তাকিয়ে আমার তাই দিব্যি লাগছিল। পথটা একটু ঢেউ-খেলানো, কিন্তু কোথাও খানাখন্দ নেই। দু’দিকে মস্ত-মস্ত দালানকোঠার জঙ্গল নেই, বরং ফাঁকা জমিজায়গা রয়েছে প্রচুর। অনেক বাড়িতেই কাঠের বেড়া, টিনের চাল। ঢেউ-খেলানো চালগুলো রং করা, তাতে বেশ বাহার খুলেছে। গাছপালাও বিস্তর। শহরের এলাকায় ঢুকতে গাছপালা খানিকটা কমে গেল বটে, কিন্তু রাস্তায় যে তেমন ভিড়ভাট্টা নেই, এইটে দেখে খুব আরাম পাওয়া গেল।

ড্রাইভারটির বয়স মোটামুটি বছর তিরিশেক। গাড়ি চালাতে চালাতেই আমাকে সে সব চিনিয়ে দিচ্ছিল। ….এই হল লাটসাহেবের বাড়ি। আর ও-পাশে ওই যে বাগানটা দেখছেন, ওটা হয়েছে রবিঠাকুরের নামে। বাগানের একদিকে একটা খেলনা-ঘর রয়েছে, সেখানে আছে নানান জায়গার পুতুল। পারেন তো একদিন এসে দেখে যাবেন স্যার। বাগানের সামনে, রাস্তাটা দেখছেন তো, ওই রাস্তার ডান দিকে পড়ছে সার্কিট হাউস। এ দিকে দেখুন গান্ধীজির স্ট্যাচু। বাগানের মধ্যে রবিঠাকুরেরও একটা খুব সুন্দর স্ট্যাচু রয়েছে।….

ত্রিপুরার রাজবাড়িটা চমৎকার। এখন অবশ্য আর রাজবাড়ি নয়, বিধানসভা। রাজবাড়ির লোকেরা তা হলে এখন কোথায় থাকেন? ড্রাইভার বলল, “রানিমা তো এখানকার একজন মন্ত্রী, তাঁরা থাকেন পিছন-দিকের আর-একটা বাড়িতে। তবে সেটা এর চেয়ে অনেক ছোট।”

রাজবাড়ির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে আমরা ইতিমধ্যে আর-একটা পথ ধরে এগোচ্ছিলুম। এক জায়গায় দেখলুম বেশ ভিড়। আগরতলায় আসা ইস্তক কোথাও এইরকম মানুষজন আর যানবাহনের ঠেলাঠেলি দেখিনি, তাই জিজ্ঞেস করলুম, “ব্যাপার কী? এখানে এত ভিড় কেন?”

দীপক বলল, “নিশ্চয় গুরুজির কোনও বই রিলিজ হচ্ছে।”

তাতে আমি আরও অবাক হয়ে বললুম, “গুরুজি! তিনি আবার কে?”

ড্রাইভারটিকে এতক্ষণ হাসতে দেখিনি। এবারে সে হোহো করে হেসে উঠল। তারপর হাসি থামিয়ে বলল, “দীপকবাবুর গুরুজি হচ্ছেন অমিতাভ বচ্চন। কিন্তু না স্যার, ওটা সিনেমা হলের ভিড় নয়, ওখানে বইমেলা চলছে। ভিতরে গিয়ে দেখবেন?”

যাবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু দীপকের দেখলুম তার গুরুজির বই নিয়ে যত উৎসাহ, বইমেলা নিয়ে উৎসাহ তার সিকির সিকিও নয়। বলল, “না না, অত সময় নেই। পাঁচটা বেজে গেছে। বরং কোনও হোটেলে নিয়ে চলো, সেখানে কিছু খেয়ে নিয়ে তারপর সিপাহিজলার দিকে রওনা হওয়া যাক। মিঃ চ্যাটার্জির নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে।”

প্লেনে কিছুই খাইনি। একটু-একটু খিদে যে পাচ্ছিল না, তা নয়, কিন্তু কী জানি কেন, কিছুই খেতে ইচ্ছে করছিল না। বললুম, “তোমাদের যদি খিদে পেয়ে থাকে তো খেয়ে নাও, আমার জন্যে ভাবতে হবে না, আপাতত আমার এক কাপ চা পেলেই চলবে।”

যেমন কলকাতা, তেমনি আগরতলাও একটা পুরো রাজ্যের রাজধানী বটে, কিন্তু কলকাতার গা থেকে যেমন গ্রামীণ সৌরভ একেবারে নিঃশেষে মুছে গেছে, আগরতলায় সেটা হয়নি। লোকজনের কথাবার্তা আর আচার-আচরণে এখনও সারল্য আর আন্তরিকতার ছোঁয়া মেলে, মস্ত কোনও শহরে যেটা আশাই করা চলে না। তার একটা কারণ হয়তো এই যে, আগরতলায় এখনও শিল্পের বিশেষ প্রসার ঘটেনি; সেটা যখন ঘটবে, কল-কারখানার দাপটে এই সারল্য আর আন্তরিকতাও যে তখন শুকিয়ে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার এখনও অনেক দেরি। আগরতলা এখনও সুখী, শান্ত, ছোট্ট একটি শহর, তার চৌহদ্দি ছাড়াবামাত্র আপনি নির্ভেজাল কোনও গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়বেন। এমন গ্রাম, যার চাষের জমির উপরে এখনও ইটখোলা তার থাবা বসায়নি।

শহরের পাশেই বাংলাদেশের বর্ডার। ইতিমধ্যে সেখান থেকেও ঘুরে এসেছি। দেখেছি, যেমন এদিকে তেমন ওদিকেও ঘন-ঘন সাইকেল রিকশা এসে থামছে, তারপর মাঝখানের জমি হেঁটে পার হচ্ছে মানুষজন। যাতায়াতের বিরাম নেই। দীপক খানিকক্ষণ আমার সঙ্গে ছিল না, আড়ালে গিয়ে সিগারেট খাচ্ছিল বোধহয়। ড্রাইভারটির নাম শঙ্কর। পূর্ববঙ্গের ছেলে। একাত্তরে যখন খান-সেনাদের অত্যাচার একেবারে চরমে ওঠে, তখন ওরা বর্ডার পেরিয়ে আগরতলায় এসে ঢুকেছিল, তারপরে আর ফিরে যায়নি। শঙ্করই আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাচ্ছিল। বলল “এখান দিয়ে বর্ডার পেরোতে হলে তো কাগজপত্র লাগে, ওদিকে ও-সবের দরকার হয় না।”

“ওদিকে মানে?”

“কসবার কালীবাড়ির দিকে। আজ তো আমরা সিপাহিজলায় যাচ্ছি। কাল কালীবাড়ি দেখবেন চলুন। ওইসঙ্গে কালীবাড়ির পাশে কমলাসাগরও দেখা হয়ে যাবে।”

“সাগর মানে? মস্ত বড় দিঘি?”

“মস্ত বড়। তবে উদয়পুরের দিঘির মতন অত বড় নয়। কমলাসাগরে জল আসা নিয়ে অবিশ্যি একটা গল্প আছে।”

শঙ্করের সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছিল। বললুম, “কী গল্প? স্বপ্নাদেশের?”

অবাক হয়ে শঙ্কর খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপব বলল, “ঠিক ধরেছেন। আপনি জানেন?”

হেসে বললুম, “না, জানি না।”

“তা হলে বললেন কী করে?

“পুরনো সবকিছু নিয়েই একটা-না-একটা গল্প থাকে তো, তাই আন্দাজ করেছিলুম। যা-ই হোক, তোমার কমলাসাগরের গল্পটা তুমি বলো।”

শঙ্কর বলল, “রাজা তো মন্দিরের কাছে দিঘি কাটালেন, কিন্তু দিঘিতে কিছুতেই জল আসে না। ব্যাপার দেখে সকলের মাথায় হাত। তো শেষপর্যন্ত মা-কালী এসে রাজাকে স্বপ্নে দেখা দিলেন। বললেন, রানিকে এসে নিজের হাতে এক কোদাল মাটি কাটতে হবে, তা নইলে এই দিঘিতে জল আসবে না।”

“তা রানি-মা এসে কোদাল চালালেন?”

“না চালিয়ে উপায় আছে? বাপ রে!”

“জলও উঠল?”

শঙ্কর একগাল হেসে বলল, “উঠল বলে উঠল। রানি-মা এসে যেই না এক-কোদাল মাটি কেটেছেন, পাতাল ফুঁড়ে অমনি এমন তোড়ে জল বেরোতে লাগল যে, দেখতে না দেখতে দিঘি ভরাট।”

দীপকের সিগারেট খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। আড়াল থেকে সে এই সময়ে সামনে এসে পড়ায় গল্পটা আর এগোয়নি। এখন আমরা মোটামুটি ভদ্র-গোছের একটা হোটেলে বসে চা খাচ্ছি। চা খাওয়া শেষ হলেই আমরা সিপাহিজলার দিকে রওনা হব।

রওনা হতে-হতে তা প্রায় ছ’টা। সবে মার্চ মাস শুরু হয়েছে, কলকাতায় এই সময়ে গরম পড়ে যায়, কিন্তু এখানে মোটামুটি ঠান্ডাই চলতে থাকে শুনেছি, কিন্তু হোটেলের মধ্যে একটু-একটু গরম বোধ হচ্ছিল। বাইরে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তার কারণটা বোঝা গেল। দিব্যি মেঘ জমেছে। হঠাৎ এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া ছুটে এল, সঙ্গে-সঙ্গে উড়তে লাগল ধুলো। যে গাছপালাগুলো এতক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তারাও অমনি এমনভাবে মাথা ঝাঁকাতে শুরু করল যে, মনে হল প্রকৃতির রাজ্যে একটা-কিছু সর্বনাশের ঘটনা ঘটে গেছে।

দীপককে বললুম, “ঝড় উঠেছে দেখছি, এর মধ্যে গাড়ি চালানো ঠিক হবে?”

দীপক হেসে বলল, “ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। শঙ্কর খুব এক্সপার্ট ড্রাইভার। ও ঠিকই চালাতে পারবে, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”

ঝড় থামতেই শুরু হল বৃষ্টি। গেড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায়। তারপর একেবারে মুষলধারে।

তারই মধ্যে হেডলাইট জ্বেলে গাড়ি ছুটছে। বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচবার জন্যে জানলায় কাচ তুলে দেওয়া হয়েছে। সারাক্ষণ ওয়াইপার চালিয়ে সামনের উইন্ডস্ক্রিন থেকে জল সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কাচের ভিতরের দিকটা বাষ্পে কারবার ঢাকা পড়ে যাওয়ায় পথঘাটের প্রায় কিছুই আমার চোখে পড়ছিল না।

ঘন্টা দেড়েক গাড়ি চলবার পরে বুঝতে পারলুম যে, বৃষ্টি এবারে ধরেছে। আমার দু’পাশের জানলার কাচ দুটো নামিয়ে নিলুম। চারদিকে একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তবে মাঝে-মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। তাতে বুঝলুম যার উপর দিয়ে চলছি, সেটা মসৃণ একটা রাস্তাই বটে।

হাতঘড়ির রেডিয়াম লাগানো ডায়ালের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, আটটা দশ।

গাড়ির গতি ইতিমধ্যে অনেক কমে গিয়েছিল। বললুম, “আর কত দূর দীপক?”

দীপক বলল, “আমরা এসে গেছি।”

গাড়ি থামল। হেডলাইটের আলোয় সামনে যা আমার চোখে পড়ল, সেটা একটা বে। বড় মাপের দোতলা কাঠের বাড়ি। ভিতরে ইলেকট্রিক আলো জ্বলছে।

হর্ন বাজাতে হল না। গাড়ির শব্দ পেয়েই বাড়ির ভিতর থেকে যিনি বেরিয়ে এলেন, তিনি আমার চেনা মানুষ। আমাকে দেখে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়ে চারু ভাদুড়ি বললেন, “ওয়েলকাম টু সিপাহিজলা।”


এইখানে এই পরিবেশে, এমনভাবে যে ভাদুড়িমশাইয়ের দেখা পেয়ে যাব, তা আমি ভাবিনি। ভাদুড়িমশাই সাত-সকালে জগিং করতে বেরিয়ে নিরুদ্দেশ হলেন, আর সেইদিনই রাত্তিরে ফোন করে আমাকে বলা হল যে, পরদিন আমাকে আগরতলা যেতে হবে, এ দুটো ঘটনার মধ্যে যে একটা যোগসূত্র রয়েছে, তা আমি আন্দাজ করেছিলুম ঠিকই, কিন্তু আজই যে তাঁর দেখা পেয়ে যাব, তা আমার কল্পনাতেও ছিল না।

আনন্দে আমার মুখ দিয়ে যেন কথাই সরছিল না। আবার একইসঙ্গে রাগও হচ্ছিল খুব। রাগটাই প্রথমে প্রকাশ পেল। বললুম, “আপনি তো আচ্ছা লোক মশাই। এইখানে এই জঙ্গলে এসে লুকিয়ে রয়েছেন, আর ওদিকে কলকাতায় সকলের নাওয়া-খাওয়া বন্ধ!”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এটা জঙ্গল হবে কেন, অতি চমৎকার জায়গা : রাত্তির বলে বুঝতে পারছেন না, সকাল হলে বুঝবেন।…..আর হ্যাঁ, কারও নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হবারও তো কিছু নেই। কাউকে কিছু না-বলে কাল আগরতলায় চলে আসতে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখানে পৌঁছেই তো দীপককে দিয়ে কলকাতায় ফোন করানো হয়। কেন, মালতী কোনও ফোন পায়নি?”

দীপক এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবারে বলল, “আপনি তো কলকাতার দুটো নম্বর আমাকে দিলেন। একটা বালিগঞ্জের, একটা ধর্মতলার। বালিগঞ্জের নাম্বারটা লাগতে পারিনি।”

আমি বললুম, “কী করে লাগবে, মালতীদের বাড়ির নাম্বারটা কাল সকাল সাড়ে-দশটার পর থেকেই খারাপ।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাই?” তারপর দীপকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আর ধর্মতলার চেম্বারের নাম্বারটা?”

দীপক বলল, “সেটাও প্রথম দিকে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক চেষ্টা করে রাত আটটা নাগাদ পাওয়া গেল।”

“ডাক্তারবাবুকে পেয়েছিলে?”

“তা পেয়েছিলুম। কিন্তু আপনি যে ভাল আছেন, আর মিঃ চ্যাটার্জিকে যে আজ দুপুরের ফ্লাইটে আগরতলা আসতে হবে, এর বেশি আর কিছুই বলতে পারিনি। লাইন কেটে গেল।”

“তা হলে আজ সকালে আবার ফোন করলে না কেন? কাল থেকে আজ বিকেল পর্যন্ত তো তুমি আগরতলাতেই ছিণে। অনায়াসেই আজ একটা ফোন করে ডিটেলস জানাতে পারতে।”

আমি বললুম, “ফোন করে কোনও লাভ হত না। চেম্বার বন্ধ। অরুণের মায়ের খুব অসুখ। ওরা তাই বেহালার বাড়িতে চলে গেছে।”

“আপনাকে যে এখানে আসতে হবে, এ-কথা আপনাকে কে জানাল? অরুণ?”

“না। ওঁদের এক প্রতিবেশী। নাম বললেন, প্রমোদ সেন। তা ছাড়া অরুণের চিঠি নিয়ে শশাঙ্ক….মানে অরুণের চেম্বারের রিসেপশনিস্ট আজ সকালে আমাদের বাড়িতে এসেছিল। অরুণের চিঠি পড়ে শুধু এইটুকু জানা গেল যে, ‘আজই আমাকে এখানে আসতে হবে। আপনি যে ভাল আছেন, চিঠিতে তারও উল্লেখ ছিল। কিন্তু কোথায় আছেন, কাদের কাছে আছেন, কেনই বা জগিং করতে গিয়ে হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে গেলেন, সে-সব কিছু জানায়নি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিজে জানলে তো আপনাকে জানাবে। দীপকের কথা তো শুনলেন, অরুণকে সব কথা খুলে বলবার সুযোগই ও পায়নি, তার আগেই লাইন কেটে যায়।”

দীপক বলল, “লাইনে খুব ডিলটারব্যান্সও হচ্ছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাক, ও সব কথা পরে হবে। অরুণদের বেহালার বাড়ির ফোন-নাম্বারটা আমার কাছে আছে। তুমি বরং কাল সকালেই একবার আগরতলা গিয়ে বেহালায় একটা ফোন করে সব জানাও। অরুণের মা এখন কেমন আছেন, সেই সময়ে সেটাও জেনে নিয়ো।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই, ভিতরে চলুন। ওঁরা অপেক্ষা করছেন।”

একেবারে যে ভিতরে ঢুকলুম তা নয়। একতলার সামনের বারান্দাটা দেখলুম বেশ চওড়া, তার উপরে সোফা সেটি দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো। মেঝেতে দড়ির কার্পেট। চারদিকে কাচের দেওয়াল। কাঠের চৌকো চৌকো ফ্রেমের মধ্যে কাচগুলিকে বসানো হয়েছে, বাইরের দৃশ্য যাতে সহজেই চোখে পড়ে, চোখ আটকে না যায়। বাইরে অবশ্য এখন অন্ধকার, তাই কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। বারান্দার একদিক থেকে একটা কাঠের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। বুঝলুম এই বারান্দাটাকেই বসবার ঘর হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

মাঝখানের সোফাটায় যিনি বসে ছিলেন, কাগজে তাঁর ছবি আমি দেখেছি, তাই চিনতে অসুবিধে হল না। বঙ্কুবিহারী ঘোষ। একমাথা সাদা চুল, মুখ নিচু করে তিনি কিছু ভাবছিলেন। আমরা এসে ঢুকতে তিনি মুখ তুললেন, কিন্তু সোফা ছেড়ে উঠলেন না। যেমন বসে ছিলেন, তেমন বসে থেকেই জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বঙ্কু এসেছেন চারু?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ। হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি আরম্ভ হল তো, তাই পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে গেল।”

লক্ষ করলুম, প্রশ্নটা ভদ্রলোক ভাদুড়িমশাইকে করলেও তাঁর চোখ দুটি ছিল আমার দিকে। এবারে ভাদুড়িমশাইয়ের গলা শুনে তিনি তাঁর দিকে চোখ ফেরালেন। বললেন, “চা আনতে বলি। তোমার বন্ধুর তো ধকল নেহাত কম হয়নি। রাতটা উনি বিশ্রাম নিন, কাজের কথা কাল সকালে হবে। এখন চা খাও। আমিও তোমাদের সঙ্গে এক কাপ খাব।”

গাড়ির শব্দ পেয়েই সম্ভবত উনুনে চায়ের জল চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বঙ্কুবাবুকে তাই আর কাউকে ডেকে চায়ের কথা বলতে হল না, ট্রের উপরে চায়ের সরঞ্জাম সাজিয়ে ভিতরের দিকের দরজার পর্দা সরিয়ে উর্দি পরা একজন বেয়ারা এসে ঘরে ঢুকল। তার পিছন-পিছন এলেন একজন মহিলাও। বেয়ারাকে বললেন, “এখন তুমি যাও, দরকার হলে আমি ডাকব।”

ভদ্রমহিলার বয়স মনে হল বছর চল্লিশ। প্রসাধন একটু উগ্র রকমের। ঠোঁটে পুরু লিপস্টিক। ভুরু একেবারে ধনুকের মতো বাঁকানো। ওটা যে স্বাভাবিক ভুরু নয়, প্লাক করে ওকে ওই আকৃতি দেওয়া হয়েছে, দেখবামাত্র সেটা বোঝা যায়। পরনে স্লিভলেস ব্লাউস, শিফনের শাড়ি। পায়ে মখমলের চটি। বয়স যা-ই হোক, চেহারায় একটা খুকি খুকি ভাব অনেকেই বজায় রাখতে চান। ইনিও সম্ভবত তা-ই চাইছেন। মুখটা চেনা-চেনা মনে হল, কিন্তু কোথায় দেখেছি, তক্ষুনি তা মনে করতে পারলুম না।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বসুন মিসেস ঘোষ। একটা ভাল খবর দিচ্ছি। কাজটার জন্যে আমরা যাঁকে চাইছিলুম তিনি এসে গেছেন।”

ভদ্রমহিলা পট থেকে পেয়ালায় চা ঢালছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে মাথাটা একটু নোয়ালেন। তারপর আবার পেয়ালার দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, “ওঁরটা তো জানি, আপনারটাও এই দু’দিনে জেনে নিয়েছি, মিঃ চ্যাটার্জির কতটা দুধ-চিনি লাগবে?”

বললুম, “দুধ চিনি লাগবে না। আমি স্রেফ লিকার খাই।’

মিসেস ঘোষ আবার সামান্য হাসলেন। বললেন, “বাঃ, একেবারে আমারই মতন।”

কাপে কাপে চা ঢালা হয়ে গিয়েছিল। সোফা থেকে উঠে গিয়ে আমি আর ভাদুড়িমশাই আমাদের কাপ দুটো নিয়ে এলুম। ভদ্রমহিলা তাঁর স্বামীর দিকে একটা কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমারটা নাও।”

লক্ষ করলুম বঙ্কুবাবু হাত বাড়িয়ে দিলেন বটে, কিন্তু ঠিক যে কাপটার দিকেই, তা নয়। ফলে মিসেস ঘোষ তাঁর সোফা থেকে উঠে গিয়ে স্বামীর হাতে কাপটা ধরিয়ে দিলেন। বললেন, “খাওয়া হয়ে গেলে নিজেই যেন আবার কাপটা নামিয়ে রাখতে যেয়ো না। আমাকে বোলো, আমি নামিয়ে রাখব।”

যা সন্দেহ করেছিলুম, সেটাই তা হলে ঠিক। বঙ্কুবাবু হয় আদৌ কিছু দেখতে পান না, অথবা খুবই কম দেখতে পান।

ভাদুড়িমশাইয়ের চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সাইড টেবিলে কাপ-প্লেট নামিয়ে রেখে তিনি বললেন, “মিঃ চ্যাটার্জি তো এসেই গিয়েছেন, কিন্তু আমি বলি কী,কাজের কথাটা আজ না হয়ে কাল হলেও ক্ষতি নেই।

আমি বললুম, “কাজ তো একটা স্ক্রিপট লেখা, তাই না?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে তো দেখছি জানেনই। কিন্তু কথাটা আপনাকে কে বলল?”

হেসে বললুম, “আপনি অবশ্যই বলেননি।

“তা হলে?”

“দীপক বলেছে। ওর কাছেই শুনলুম যে, সেইজন্যই আমাকে তলব করা হয়েছে এখানে।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আহা-হা, ব্যাপারটা ওভাবে নিচ্ছেন কেন? আপনি একজন বিখ্যাত লেখক, আর আমরা নেহাতই ব্যাবসা করে খাই। আমরা কি আপনাকে তলব করতে পারি? ও নো নো, কাইগুলি এটাকে ওভাবে নেবেন না। আমরা আপনার সাহায্য চাই, আর আপনি আমাদের সাহায্য করতে কষ্ট করে এখানে এসেছেন। তার জন্যে আমরা কৃতজ্ঞ।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “অ্যান্ড অ্যাজ এ টোকেন অব আওয়ার গ্র্যাটিচিউড, উই শ্যাল পে ইউ হ্যান্ডসামলি।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আহা-হা ডলি, ইউ হ্যাভ এ টেনডেনসি অব সেয়িং দি রং থিং অ্যাট দি রং মোমেন্ট। এখুনি পেমেন্টের কথা তুলছ কেন? দয়া করে আগে উনি রাজি হোন, ও-সব কথা তার পরে উঠবে।”

আমি বললুম, “কী করে রাজি হব? আমি লিখি বটে, কিন্তু সব লেখাই কি এক গোত্রের? স্ক্রিপট লেখার একটা আলাদা টেকনিক আছে। আমি সে-সব জানি না। তা হলে আমি কী করে স্ক্রিপট লিখব?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “সে কী, আপনি কখনও ফিল্মের গল্পের স্ক্রিপট লেখেননি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিনয় খুবই ভাল জিনিস, কিরণবাবু, কিন্তু সেটা একটা মাত্রার মধ্যে থাকা চাই। আপনার বিনয় দেখছি মাত্র। হাড়িয়ে যাচ্ছে। ……ওহে বঙ্কু, আমার এই বন্ধুটির কথা বিশ্বাস কোরো না।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আরে আমি কেন বিশ্বাস করতে যাব? আমি মাল বেচে খাই, লোক চিনতে আমার ভুল হয় না। মিঃ চ্যাটার্জি যে সাচ্চা লোক, সে আমি ওঁর কথা শুনেই বুঝেছি। এখন তুমি ওঁকে রাজি করাও চারু।”

ঢোক গিলে বললুম, “কিন্তু……”

কথাটা শেষ করতে পারলুম না। ভাদুড়িমশাই একেবারে গর্জন করে উঠে বললেন, “ঢের হয়েছে, কিরণবাবু, আর কিন্তু-কিন্তু করবেন না। কী ভেবেছেন আপনি বলুন তো? ইতালিয়ান গবর্নমেন্টের হয়ে গোটা কয়েক ডকুমেন্টারি করবার প্রোজেক্ট নিয়ে যেহেতু গত কয়েক বছর আমি বিদেশে ছিলুম তাই দেশের কোনও খববই আমি রাখি না, কেমন? এই যে ভেনিসের ফিল্ম ফেস্টিভালে ‘প্রদীপের নীচে’ ফিল্মটা স্পেশ্যাল অ্যাওয়ার্ড পেল, তার চিত্রনাট্য তো আপনারই লেখা। তা হলে?”

ভাদুড়িমশাই গত কয়েক বছর বিদেশে ছিলেন? তাও আবার ডকুমেন্টারি করবার জন্যে? কই, আমি তো কিছুই জানি না। হ্যাঁ, মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে গত সেপ্টেম্বরে আমেরিকায় গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু সেখানে মাত্র মাসখানেক কাটিয়ে তারপর অক্টোবরেই তো দেশে ফিরে আসেন। আর এই ‘প্রদীপের নীচে’! ও-রকম কোনও ফিল্মের নামই আমি শুনিনি, চিত্রনাট্য লেখা তো দূরের কথা।

আমি একেবারে থ হয়ে গেলুম। বলতে যাচ্ছিলুম, ব্যাপার কী বলুন তো, আমি কি অ্যালিসের সেই আজব জগতে এসে পড়লুম নাকি, কোনও কিছুরই তো মাথামুণ্ডু আমি বুঝতে পারছি না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, ভাদুড়িমশাই তো আবোল-তাবোল কথা বলবার লোক নন, নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যাপার আছে এর মধ্যে। তাই, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের কিছু বলে অবস্থাটার আপাতত সামাল দেওয়াই ভাল।

আমতা আমতা করে বললুম, “ওটা…মানে ওই স্ক্রিপটটা তো? ওটা তো বছর কয়েক আগে লেখা, আসলে ওরাই বইটা তুলতে একটু দেরি করে ফেলল। কিন্তু ওটার স্ক্রিপট লিখতে পেরেছি বলেই যে এটারও পারব, তার তো কোনও মানে নেই। গল্পটাই তো এখনও দেখিনি।”

ভাদুড়িমশাই বঙ্কুবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী হে বঙ্কু, ঠিক বলেছিলুম কি না? না না, ও নিয়ে তুমি ভেবো না। কিরণবাবুকে যখন পেয়েছি, তখন আওয়ার প্রবলেম ইজ সল্ভড।” তারপর আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে, “আরে মশাই, গল্প নিয়ে ভাববেন না। গল্প মিসেস ঘোষেরই। তবে প্লটটা আমাকে শুনিয়েছেন মাত্র, এখনও লিখে ফেলতে পারেননি। দারুণ প্লট। স্রেফ ওরই জন্যে ফিল্মটা নির্ঘাত হিট হবে।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “প্লটটা আপনার বন্ধুকে বলব?”

“না, না, এখন নয়, এখন নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল তো আমরা লোকেশন ঠিক করতে সাগরমহল যাচ্ছি। সারাটা দিন ওখানে থাকব। রাত্তিরটাও ওখানেই কাটাবার ইচ্ছে। সুতরাং বিস্তর সময় তখন পাওয়া যাচ্ছে।”

আমি বললুম, “বলেন তো এখনও শুনতে পারি। আমার কোনও আপত্তি নেই।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “থাক, ডলি, আজ উনি খুব ক্লান্ত, সারাটা দিন জার্নির ধকল গেছে, আজ উনি তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়ুন। উই শুড়নট রাশ হিম। কী বলো চা, ঠিক বলিনি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তুমি তো এ পর্যন্ত বেঠিক কিছু বলোনি। এটাও ঠিকই বলেছ।”

মিসেস ঘোষ উঠে পড়লেন। বললেন, “আপনারা মুখ-হাত ধুয়ে নিন, আমি ওদিকে যাই। কিন্তু দীপক কোথায় গেল?”

ড্রইং রুমের লাগোয়া ঘরেই ছিল দীপক। সম্ভবত সেখানে থেকে কথা শুনছিল আমাদের। বেরিয়ে এসে বলল, “আমাকে কিছু বলবে?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “তুইও মুখ-হাত ধুয়ে নে। একটু বাদে খেতে দেব। আর হ্যাঁ, শঙ্কর কোথায়? তাকে দেখছি না যে? আগরতলায় ফিরে যায়নি তো?”

“ফিরে যেতে চেয়েছিল। আমি যেতে দিইনি। কাল তো তোমরা সবাই সাগরমহলে যাচ্ছ, তার জন্যে অন্তত দুটো গাড়ি লাগবে। শঙ্করকে তাই আটকে রেখেছি।”

“ঠিক করেছিস।”

কথাটা বলে মিসেস ঘোষ ভিতরে চলে গেলেন।

দীপক আর পাশের ঘরে ঢুকল না। আমার পাশের সোফাটায় বসে পড়ে বলল, “আমি তো কাল আবার আগরতলায় যাচ্ছি, আপনাদের সব ঠিক আছে তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অ্যাবসলিউটলি। মিঃ চ্যাটার্জি প্রথমটায় রাজি হচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছেন। নইলে খুব মুশকিলে পড়তুম।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “লেখক মানুষ তো, খুব সাবধানে তাই হ্যান্ডল করতে হয়। তোমার দিদি সেটা বোঝেন না। টাকার কথা তুলে এক্ষুনি সব ভণ্ডুল করে দিচ্ছিলেন। আরে বাবা, টাকা তো আমরা দেবই কিন্তু শুধু টাকা ঢাললেই কি মনের মতো কাজ পাওয়া যায়? নাকি টাকার লোভ দেখিয়ে রাজি করানো যায় সবাইকে?” এমনভাবে কথাটা বললেন বঙ্কুবাবু, যেন ব্যাপারটা তাঁর মতন আর কেউ বোঝে না। যেন সারা জীবন শুধু লেখক হ্যান্ডল করেই তিনি কাটিয়েছেন।

খানিকটা সময় গল্প করে কাটল। সিনেমার গল্প নয়, ত্রিপুরার মানুষজন আর বন-জঙ্গল পাহাড়-নদীর গল্প। শুনলুম বাইরে থেকে এখন যতটা শান্ত দেখাচ্ছে, এই অঞ্চল বরাবর ঠিক ততটাই শান্ত ছিল না। অশান্তির আগুন যে এখনও মাঝে-মাঝে জ্বলে ওঠে না, তা নয়, তবে তার মূলে রয়েছে সেই রকমের ইন্ধন, যা শুধু রাজনীতিকরাই জুগিয়ে থাকেন। সেটা যে কোথায় তাঁরা জোগান না বলা শক্ত। দেশের আর-পাঁচটা জায়গায় যে আগুন জ্বলছে, তার ইন্ধন তো তাঁরাই জোগাচ্ছেন। এ ব্যাপারে ত্রিপুরাকে অতএব আলাদা করে দেখবার জো নেই।

বেয়ারা একটু আগে এসে কাপ-প্লেট তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এবারে ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনারা আসুন, খেতে দেওয়া হয়েছে। ….মি চ্যাটার্জি, বেয়ারা আপনার হ্যান্ডব্যাগটা উপরে তুলে দিয়েছে, ওই মানে উপরে যে ঘরটায় আপনি থাকবেন। ইচ্ছে করলে আগনি জামাকাপড় পালটে আসতে পারেন।”

বললুম, “দরকার হবে না। খাওয়া শেষ করে তারপর উপরে যাব।”

দীপক বলল, “ভাঞ্জা কোথায়? তাকে দেখছি না যে?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “রামু? ওর একটু মাথা ধরেছিল, তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়েছে।”

ভিতরে ডাইনিং হল। আমরা গিয়ে খেতে বসলুম। খেতে-খেতেই লক্ষ করলুম যে, মিসেস ঘোষকে একটু গম্ভীর দেখাচ্ছে। কারণটা হয়তো এই যে, এখনও তিনি তাঁর গল্পের প্লটটা আমাকে শুনিয়ে দেবার সুযোগ পাননি।


দোতলায় পাশাপাশি দুটো ঘর। ঘরের সামনে, ঠিক একতলারই মতন, চওড়া ঘেরা-বারান্দা। যে-ঘরটায় আমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছে, তার লাগোয়া খানিকটা ফাঁকা জায়গা। ছাদ। দোতলায় সবখানি জায়গা জুড়ে ঘর তোলা হয়নি বলে ওই ছাদের সুবিধেটা পাওয়া যাচ্ছে। ছাদটা রেলিং দিয়ে ঘেরা।

একটা ঘরে ভাদুড়িমশাই থাকবেন, একটা ঘরে আমি। দুটো ঘরে দুটো সিঙ্গল খাট। তাতে পরিপাটি করে বিছানা পাতা। ঘরের সঙ্গে অ্যাটাচড বাথরুম। উঁকি মেরে দেখলুম, তাতে শাওয়ার ওয়াশ-বেসিন ইত্যাদি সবই রয়েছে। অর্থাৎ ব্যবস্থার কোনও ত্রুটি নেই।

একতলার মতন দোতলার ঘেরা বারান্দাটাও সোফা সেটি দিয়ে সাজানো। ভাদুড়িমশাই সেখানে বসে সিগারেট খাচ্ছিলেন। জামাকাপড় পালটে আমি তাঁর পাশের সোফায় এসে বসলুম। বললুম, “এবারে একটু খুলে বলুন তো ব্যাপারটা কী।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এমন কিছু জটিল ব্যাপার নয়। সকালে লেকে গিয়েছিলুম জগিং করতে। সেখানে বঙ্কুর সঙ্গে দেখা হয়। বঙ্কু আমার কলেজ-জীবনের বন্ধু। ছাত্র ভাল ছিল, কিন্তু গরিব-ঘরের ছেলে, পয়সার অভাবে পড়াটা চালিয়ে যেতে পারেনি, আই. এ. পাশ করবার পরে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ছোটোখাটো একটা ব্যাবসা শুরু করে। প্রথমটায় খুব সুবিধে হয়নি, পরে সেকেন্ড ওয়ার্লড ওয়রের সময় ওর কপাল খুলে যায়। ধুলোমুঠি সোনা বলে একটা কথা আছে না? একেবারে সেই ব্যাপার। কয়লা, লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, যা ধরে, তা-ই সোনা। আপনি খবরের কাগজে কাজ করেন, ওর এখনকার অবস্থা তো আপনার না-জানবার কথা নয়।”

“জানি বই কী, কিন্তু ওঁর জোরটা আসলে কোথায়?”

“আসল জোর হার্ড-ক্যাশ। ও তো ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট নয়, ট্রেডার। কিন্তু এমন কোনও ট্রেড নেই, যার থেকে ও কোটি-কোটি টাকা আদায় করে নিচ্ছে না। ওই হার্ড-ক্যাশের জন্যেই। অনেক ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টকেও এসে বঙ্কুর কাছে হাত পাততে হয়। দুকোটি টাকা দরকার, এক্ষুনি চাই। কে দেবে? বঙ্কু দেয়। কত পার্সেন্ট ইন্টারেস্টে দেয়, শুনলে আপনি আঁতকে উঠবেন। অথচ ওকে দেখুন, ওর কথাবার্তা শুনুন, ওর চালচলন খেয়াল করুন, কিচ্ছুটি আপনি বুঝতে পারবেন না।”

“কলেজ জীবন শেষ হবার পরেও আপনি ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন?”

“তা রেখেছিলুম বই কী।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সকলের সঙ্গেই আমি যোগাযোগ রাখি, বঙ্কুর সঙ্গেও রেখেছি। তাই বলে কি আর প্রায়ই ওর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়? তা হয় না। তবে ওর ব্যাবসার জাল তো সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। ব্যাঙ্গালোরেও বছরে একবার-দুবার যায়। তখন খবর দেয়, দেখা করে। ইতিমধ্যে আবার সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের একটা মালটিস্টোরিড বিল্ডিংয়ে দুটো ফ্ল্যাট কিনেছে। সেই সূত্রে কলকাতায় এসেছিল। ফলে লেকের ধারে দেখা হয়ে গেল। নইলে আবার কবে দেখা হত, কে জানে।”

“সাধারণত উনি থাকেন কোথায়?”

“ভুবনেশ্বরে। তবে শহরের মধ্যে নয়। শহর থেকে মাইল কয়েক দূরে। ওই যে হাইওয়েটা ভুবনেশ্বর থেকে পুরীর দিকে চলে গিয়েছে, তার ধারে বাড়ি করেছে। বিশাল বাড়ি।”

বললুম, “সেখান থেকেই ওঁর অন্যান্য জায়গার সব অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।”

চারু ভাদুড়ি হেসে বললেন, “অন্যান্য জায়গায় তো ওর কোনও অফিস নেই। অফিস তো ওর এজেন্ট আর সাব-এজেন্টদের। বছরে ও একবার দুবার তাদের কাছে যায়, পাওনাগণ্ডা বুঝে নিয়ে চলে আসে।”

অবাক হয়ে বললুম, “শুনেছি ওঁর বিশাল কারবার। তা হলে অন্য কোথাও অফিস খোলেন না কেন? খরচের ভয়ে?”

ভাদুড়িমশাই আবার হাসলেন। বললেন, “খর্চার ভয়ে নয়, ঝামেলার ভয়ে। বঙ্কু বলে, একগাদা অফিস খোলা মানেই একগাদা ঝামেলায় জড়িয়ে যাওয়া।”

“কিন্তু এজেন্টরা তো ওঁকে ঠকাতে পারে।”

“কেউ যে কখনও ঠকাবার চেষ্টা করেনি, তা নয়। কেউ ভুল-হিসেব দেখিয়ে ওকে কম টাকা দিয়েছে, কেউ টাকা ধার নিয়ে শোধ করেনি। তার ফল কী হয়েছে, জানেন?”

“কী হয়েছে?”

“বঙ্কু হ্যাজ সিম্পলি ড্রিভন দেম আউট অব দেয়ার বিজনেস। ব্যবসায়ী মহলে ওর ক্লাউটের কথা তো শুনলেন। একবার যদি কাউকে ও ব্লা্যকলিস্ট করে, তো তার হয়ে গেল, অন্য কোনও ব্যবসায়ী তাকে আর চিমটে দিয়েও ছুঁয়ে দেখবে না। ওভারনাইট হি বিকামস এ পারিয়া। অ্যান আউটকাস্ট।”

খানিকক্ষণ চুপচাপ কাটল। ফাল্গুন মাস। খানিক আগে ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাতাসে ঠাণ্ডার আমেজ। বেশ শীত-শীত করছিল। ঘরে গিয়ে একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে ফিরে এসে বললুম, “আসল কথাটা এখনও কিন্তু জিজ্ঞেস করিনি।”

ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যে আর-একটা সিগারেট ধরিয়েছিলেন। এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “হঠাৎ কাউকে কিছু না-বলে কেন বঙ্কুর সঙ্গে এখানে চলে এলুম এই তো?…..আসলে এমনটা যে হবে, তা আমিও জানতুম না। কী হল জানেন, লেক থেকে বঙ্কু আমাকে তার সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। যে-লোকটা ওর ফ্ল্যাটের দেখাশোনা করে, একমাত্র সে ছাড়া আর কেউ সেখানে ছিল না। সে-ই বঙ্কুকে লেকের ধারে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল। সে-ই আমাদের সঙ্গে আবার ফ্ল্যাটে ফিরে আসে।”

“কেন, ওঁর স্ত্রী সেখানে ছিলেন না?”

“না। ওর স্ত্রীকে আপনি দেখেছেন। শালাকেও দেখেছেন। তবে ওর বড়ছেলে রামু তো ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাকে তাই দেখেননি। তিনজনকে নিয়েই ও ভুবনেশ্বর থেকে কলকাতায় এসেছিল। ভেবেছিল, সবাই মিলে আগরতলায় যাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেটা হয়নি। ব্যাবসার একটা কাজে ও বাড়তি একটা দিনের জন্যে কলকাতায় আটকে যায়। ফলে, ওর বউ ছেলে আর শালা পরশুদিন আগরতলায় এসেছে আর আমরা এসেছি কাল।”

“তা তো বুঝলুম, কিন্তু আপনাকে আসতে হল কেন?”

“না এসে উপায় ছিল না যে!” ভাদুড়িমশাই হাসলেন। “কিন্তু সবটা আগে শুনুন। ওর জীবনে কয়েকটা প্রবলেম দেখা দিয়েছে। তাই নিয়ে কথা বলতে-বলতে সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। তখন ও উঠে দাঁড়িয়ে বলে, চলি রে, সাড়ে বারোটার মধ্যে আমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে। তুই আমার সঙ্গে গেলে বড় ভাল হত।”

“ব্যস, অমনি আপনি ওঁর সঙ্গে আগরতলায় চলে এলেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওর প্রবলেম যে কী, তা আপনি জানেন না কিরণবাবু। জানলে সম্ভবত আপনিও বলতেন যে, আসাটাই ঠিক হয়েছে, না এলে অন্যায় হত। …একেবারে একবস্ত্রে চলে এসেছিলুম। এখানে এসে রেডিমেড একজোড়া ট্রাউজার্স, দুটো শার্ট আর ওই কিছু আন্ডারগার্মেন্টস কিনে নিয়েছি।”

“কিন্তু মালতীকে একটা খবর না দিয়েই চলে এলেন কেন?”

“সাড়ে এগারোটায় ডিসিশন নিই যে, আমি আসব। তৎক্ষণাৎ মালতীকে ফোন করি। একবার নয়, তিন-চার বার। কিন্তু প্রত্যেকবারই এনগেজড টোন আসতে থাকে। তখন ঠিক করি, এয়ারপোর্টে তো মোটামুটি সাড়ে-বারোটার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি, সেখান থেকে ফোন করব। তা যে করিনি, তাও নয়। কিন্তু সেই একই ব্যাপার, এনগেজড।”

বললুম, “সাড়ে দশটার পরেই ওদের বাড়ির ফোনটা বিগড়ে গিয়েছিল যে!”

“সে তো এখন আপনার কাছে শুনছি। এদিকে সিকিউরিটি চেকের জন্যে বারবার ডাক পড়ছিল। তাই মনে হল, ঠিক আছে, আগরতলা থেকে ফোন করব। আসলে ওদের ফোনটাই যে বিগড়ে গিয়েছে তা তো আর তখন জানতুম না। তাই ভাগ্যিস বুদ্ধি করে অরুণের চেম্বারের নম্বরটা দীপককে দিয়েছিলুম। নইলে হয়তো আপনারা একটা হুলুস্থুলু বাধিয়ে দিতেন। মালতীদের বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে যেত, আর খবর না-পেয়ে আপনিও ভাবতেন যে, আমি গুমখুন হয়েছি।”

হেসে বললুম, “সত্যি বলতে কী, খবরটা পেয়েও আমি বিশেষ নিশ্চিন্ত হতে পারিনি। সারাটা পথ দুশ্চিন্তায় কেটেছে।”

চারদিকের গাছপালার ভিতর দিয়ে ঝরঝর করে হাওয়া বইছে। সামনে বাগান। তার মধ্যে এখানে-ওখানে কয়েকটা ল্যাম্পপোস্ট। নীচের লন আর কয়েকটা ফ্লাওয়ার বেডের উপরে তার আলো পড়েছে। ডালপালার নড়াচড়া ছাড়া আর কোথাও কোনও শব্দ নেই। চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলুম আমরা। তারপর ভাদুড়িমশাই-ই প্রথম কথা বললেন।

“এই যে হঠাৎ আপনি চলে এলেন, এতে আপনার কাজের কোনও ক্ষতি হবে না তো?”

বললুম, “না।”

“অফিসকে জানিয়ে এসেছেন, আশা করি।”

“তা জানিয়েছি।”

“কয়েকটা দিন কিন্তু এখানে থাকতে হতে পারে।”

“দরকার হলে থাকব। কিন্তু স্ক্রিপট লেখার ব্যাপারটা কী বলুন তো?”

“ওটা আপনাকে এখানে নিয়ে আসার একটা ফিকির মাত্র। ভয় নেই, আপনাকে ও-সব চিত্রনাট্য-ফাট্য লিখতে হবে না। তবে হ্যাঁ, লিখবার একটা ভান অবশ্যই করতে হবে।”

“আর আপনি কী করবেন?”

“শুনলেন তো,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বিদেশে গত কয়েক বছর ধরে আমি ফিল্ম তুলে বেড়িয়েছি, আর এখানে একটা ফিল্ম তুলতে পারব না? যে ছবির জন্যে এখানে লোকেশন বাছাই করতে আসা হয়েছে, আমি তার পরিচালক।”

“ব্যাপারটা কী বলুন তো? চেষ্টা করলে আমি যে একটা স্ক্রিপট লিখে দিতে পারব না, তা নয়, কিন্তু আপনার ব্যাপারটা তো ডাহা মিথ্যে। গত কয়েক বছর মোটেই আপনি বিদেশে ছিলেন না।”

“ঠিক। ওই লাস্ট ইয়ারে একবার বস্টনে গিয়েছিলুম। তাও মাত্র মাসখানেকের জন্যে।”

“ফিল্মের ব্যাপারেও ইউ নো নেক্সট টু নাথিং। যতই খারাপ হোক, কেঁদে ককিয়ে একটা স্ক্রিপট আমি ঠিকই খাড়া করতে পারব, কিন্তু ডিরেকশন? ওর তো আপনি অ-আ-ক-খও জানেন না।”

হাত উলটে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বোঝো ঠ্যালা। আরে বাবা, আপনাকে কি আমি বলেছি যে, ও-সব আমি জানি। জানি না মশাই, কিচ্ছুটি আমি জানি না। হল তো?”

“তা হলে এ-সব মিথ্যে কথা এদের বলছেন কেন। এঁরা তো ভাবছেন, আপনি একজন ত্রুফো কিংবা গোদার। ধরা পড়লে যে হাতে হাতকড়ি পড়ে যাবে মশাই। আপনি তো মারা পড়বেনই, আমিও রেহাই পাব না!”

সম্ভবত আমার গলাটা একটু উঁচুতে উঠে গিয়েছিল, ভাদুড়িমশাই বললেন, “অত উত্তেজিত হবেন না, যা বলবার আস্তে বলুন। একটা কথা আপনাকে মনে রাখতে বলি। এখানে যাঁদের দেখছেন, তাঁদের কাউকেই আমি শত্রু ভাবছি না, অন্তত ভাববার কোনও কারণ এখনও ঘটেনি; তবে কিনা, যার কথায় আমি আগরতলায় এসেছি, একমাত্র সেই বঙ্কুকেই আমি বিশ্বাস করছি, আর কাউকে নয়।”

“বঙ্কুবাবুকে তা হলে মিথ্যে-পরিচয় দিচ্ছেন কেন?”

“ওকে কেন মিথ্যে-পরিচয় দেব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও সব জানে।”

আমি তো অবাক। অনেক কষ্টে বলতে পারলুম, “বলেন কী!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিকই বলছি। সমস্যাটা ওর, যা-কিছু টাকা ঢালবার তা ও-ই ঢালছে আর ও কিছু জানবে না? তা কি হয় কিরণবাবু? তা হয় না। এই যে অরুণ আপনার টিকিট কেটে দিয়েছে, তার টাকাও বঙ্কু রিইমবার্স করে দেবে, তার অর্ডার হয়তো কলকাতার কোনও এজেন্টকে ইতিমধ্যে পাঠানোও হয়েছে, দীপক যে কাল বিকেল থেকে আজ আপনি এসে পৌঁছনো পর্যন্ত আগরতলায় ছিল, তার মধ্যেই যদি অর্ডারটা পাঠানো না হয়ে থাকে, তো বলব, বঙ্কুকে আমি চিনি না। ওকে তো অনেক কাল ধরে দেখছি। তাই জানি যে, নিজের প্রাপ্যটা ও যেমন গলায় গামছা বেঁধে আদায় করে নেয়, অন্যের পাওনা মেটাবার ব্যাপারেও ওর তেমন তর সয় না। ও যে একেবারে স্ক্র্যাচ থেকে এখানে উঠে এসেছে, এটাও তার একটা মস্ত কারণ।”

ভাদুড়িমশাই আবার একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর তাতে মস্ত একটা টান দিয়ে গলগল করে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “বঙ্কুর আর-একটা মস্ত গুণ, ওয়ান ক্যান টেক হিম ইনটু ওয়ান’স কনফিডেন্স। অতিবড় সন্দিগ্ধ ব্যবসায়ীও তার দু’নম্বর খাতা দেখিয়ে ওর কাছে লোন চায় শুনেছি। কথাটা বঙ্কুই আমাকে বলেছে, যদিও ব্যবসায়ীর নামটা জানায়নি।”

“আপনি জানতে চেয়েছিলেন?”

“চেয়েছিলুম।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “জেনে তো আমার লাভ নেই, তবু যে জানতে চেয়েছিলুমৃ তার কারণ আর কিছুই নয়, স্রেফ ওকে পরীক্ষা করা। তা দেখলুম, যতবার প্রসঙ্গটা তুলি, ততবারই ও কায়দা করে এড়িয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বলল, ‘দ্যাখো ভাই, তুমি তো ওর কম্পিটিটর নও, ব্যাবসা-জগতের লোকই নও তুমি, তাই আমি খুব ভালই জানি যে, নামটা তোমাকে বললেও আমার এই পার্টির কোনও ক্ষতি হবে না। তবু বলব না কেন জানো? বললে সেটা বিশ্বাসের খেলাপ হবে, নিজের কাছে আমি ছোট হয়ে যাব। কিরণবাবু, আমার প্ল্যানের কথা সাধারণত আমার ক্লায়েন্টকে আমি বলি না। কিন্তু বঙ্কুকে বলেছি। তার একটা কারণ, বঙ্কুকে বিশ্বাস করা যায়।”

“অর্থাৎ আরও কারণ আছে?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আছে। ফিল্ম তোলার নাম করে যে ছকটা আমি সাজিয়েছি, বঙ্কুর খুব কাছের অন্তত তিনজন মানুষ তাতে ইনভলভড।”

“অর্থাৎ ওঁর স্ত্রী, ছেলে আর শালা। মানে দীপক। এই তো?”

“কারেক্ট। তবে, ফিল্মের সূত্রেই যে ছক সাজালুম, তার কারণ কিন্তু মিসেস ঘোষ। ভদ্রমহিলার খুব ইচ্ছে, তাঁর গল্প নিয়ে এবারে একটা বাংলা ছবি হোক।”

“তার মানে এর আগেও ওঁর গল্প নিয়ে ফিল্ম হয়েছে নাকি?”

“হয়েছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বঙ্কু এর আগেও চারটে ফিল্ম প্রোডিউস করেছে। সব ক’টাই হিন্দি, আর সব ক’টারই স্টোরি মিসেস ঘোষের।”

হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আগরতলায় দীপকই এই ফিল্ম প্রোডাকশানের কথাটা প্রথম আমাকে জানিয়েছিল। বলেছিল যে, তার জিজাজি চার-পাঁচটা ফিল্ম প্রোডিউস করেছেন। বললুম, “দীপক বলছিল, তার তিনটেই নাকি হিট-ছবি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সব ক’টাই সুপার ফ্লপ। তবে বঙ্কুর তাতে কিছু আসে যায় না। ও ধরেই নিয়েছে, তরুণী ভার্যাটিকে খুশি রাখবার জন্যে মাঝে-মাঝে এইভাবে কিছু টাকা জলে ঢালতে হবে।”

“ছকটার কথা পরে হবে, আগে সমস্যাটার কথা শুনি। বঙ্কুবাবুর সমস্যাটা কী ধরনের? ব্যবসায়িক?”

“না, পারিবারিক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সমস্যার কথা পরে বলব। অল ইন গুড টাইম। আগে অন্য একটা কথা শুনুন।”

শোনা হল না। বাতাসে একটা মৃদু সুবাস ছড়িয়ে গিয়েছিল। পিছন ফিরে দেখলুম, মিসেস ঘোষ সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখাচোখি হতে মৃদু হেসে বললেন, “আপনারা এখনও শুয়ে পড়েননি?”

বললুম, “ঘুম আসছে না। তাই দুজনে বসে গল্প করছিলুম।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “তা হলে কি প্লটটা এখন বলব?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, না, আর রাত জাগাটা আপনার ঠিক হবে না। কাল তো ব্রেকফাস্টের পরেই আমরা বেরিয়ে পড়ছি, সকালে আপনার বিস্তর খাটাখাটনি রয়েছে, এখন আপনি শুয়ে পড়ুন।”

মিসেস ঘোষের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। আর একটিও কথা না বলে পিছন ফিরে তিনি সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন।

চশমার আড়ালে – ৫

ঘুম আসতে-আসতে সাড়ে বারোটা বেজে গিয়েছিল। হঠাৎ যেন কার মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল। ঘর অন্ধকার। বললুম, “কে?”

“আমি।”

ভাদুড়িমশাইয়ের গলা। বললুম, “কী ব্যাপার? এত রাতে?”

ভাদুড়িমশাই লাইট জ্বেলে দিলেন। বললেন, “রাত কোথায়, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখুন, সাড়ে চারটে বাজে। চটপট উঠে রেডি হয়ে নিন। পাঁচটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়ব।”

“সে কী, ব্রেকফাস্ট না-খেয়ে তো আমরা সাগরমহলের ওদিকে যাচ্ছি না, তা হলে এত তাড়া কীসের?”

পাশ ফিরে ফের ঘুমোবার উপক্রম করছিলুম, ভাদুড়িমশাই একটানে আমার গায়ের চাদরটা উঠিয়ে নিয়ে বললেন, “সাগরমহলে যখন যাব তখন যাব, এখন উঠে পড়ুন দেখি। এমন সুন্দর একটা াকাল এইভাবে ঘুমিয়ে নষ্ট করবেন না। চলুন চিড়িয়াখানার ওদিকটা আপনাকে দেখিয়ে নিয়ে আসি।”

অগত্যা উঠতেই হল।

না-উঠলে যে মস্ত লোকসান হত, সেটা বাইরে বেরিয়ে বুঝতে পারলুম। এমন চমৎকার একটা ভোর সত্যি অনেক কাল দেখা হয়নি। গোটা আকাশ স্লেট-রঙা, কিন্তু তারই মধ্যে পুবের আকাশে হঠাৎ লালচে রঙের ছোপ ধরল। অল্প-অল্প হাওয়া বইতে লাগল। গাছের পাতায় কোনও দৈব শিশু যেন ঝুমঝুমি বাজাতে থাকল। সামনে একটা পুকুর। তার জলেও দেখলুম শিরশিরে একটা কাঁপুনি ধরেছে।

চিড়িয়াখানা এখান থেকে আরও মাইল খানেক দূরে। ওদিকটা সরকারি এলাকা। শুনলুম, চিড়িয়াখানার খুব কাছেই একটা মস্ত ঝিল রয়েছে, আর সেই ঝিলের ধারে রয়েছে সরকারি রেস্ট হাউস

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পা চালিয়ে চলুন। এত সকালে তো চিড়িয়াখানায় ঢোকা যাবে না, তবে জায়গাটার একটা আন্দাজ পেয়ে যাবেন। সাতটার মধ্যেই ফিরে আসতে পারব।”

এখানকার চিড়িয়াখানার মস্ত আকর্ষণ নাকি চশমা-পরা বাঁদর। শুনে বললুম, “তাও হয় নাকি? বাঁদরদের তো বই পড়বার বদ-খেয়াল নেই, তা হলে চশমা পরবার দরকার হল কেন?”

ভাদুড়িমশাই হোহো করে হেসে বললেন, “চশমা পরাটা নেহাতই কথার কথা। বাঁদরগুলোর চোখের চারপাশ ঘিরে আসলে একটা সাদা রিঙের মতন থাকে, তাইতে মনে হয় যেন চশমা পরেছে। ভারী লাজুক বাঁদর, কেউ যদি ওদের দিকে তাকিয়েছে তো আর রক্ষে নেই, সঙ্গে-সঙ্গে দু-হাত তুলে মুখ ঢেকে ফ্লেবে।”

চিড়িয়াখানা বন্ধ ছিল, তাই সে-সব আর দেখা হল না। পাশের ঝিলটা অবশ্য চমৎকার। এই ঝিলের জন্যেই গোটা এলাকার নাম দাঁড়িয়েছে সিপাহিজলা। জলার পাশে এককালে যে সিপাইদের একটা ডেরা ছিল, সেটাও আন্দাজ করা গেল। ঝিলের মধ্যে বোটিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে দেখলুম।

সবচেয়ে ভাল লাগল ঝিলের ধারের সরকারি রেস্টহাউসটা দেখে। এটাও দোতলা কাঠের বাড়ি। দুটো তলাতেই বেশ কয়েকটা করে ফার্নিশড ঘর রয়েছে। বাড়ির চারপাশে বাগান। সামনের দিকে ধাপে-ধাপে ঝিলের মধ্যে নেমে গেছে বেশ চওড়া একটা সিঁড়ি। পরিবেশ এমন মনোরম যে, দেখলেই মনে হয় কয়েকটা দিন থেকে যাই।

কিন্তু থাকার তো উপায় নেই। রেস্টহাউসের সামনের বারান্দায় খানিক সময় বসেই আবার আমাদের ফেরার পথ ধরতে হল। হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলুম, “সাতটার মধ্যে ফিরতে পারব তো?”

ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দাড়ি তো কামিয়ে আসেননি দেখছি।”

“সময় পেলুম কোথায়। আপনি যা তাড়া লাগিয়ে দিলেন।”

“তাড়া না-লাগালে কি এই সুন্দর সকালটা আপনার দেখা হত? কিন্তু সে-কথা থাক। ব্রেকফাস্ট তো আটটায়। দাড়ি-ফাড়ি কামিয়ে স্নান করে, পোশাক পালটে ব্রেকফাস্ট টেবিলে আসতে আপনার কতক্ষণ সময় লাগবে?”

“আধ ঘন্টা।”

“ঠিক আছে, তা হলে তাড়াহুড়ো করবার দরকার নেই, সাড়ে সাতটায় ফিরলেই চলবে। ফিরেই বাথরুমে ঢুকে পড়বেন।”

বললুম, “তা নাহয় ঢুকে পড়ব, কিন্তু একটু আগে ফিরলে ক্ষতি কী?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “মস্ত ক্ষতি। মিসেস ঘোষ সম্ভবত তৈরি হয়ে বসে আছেন। যদি বোঝেন যে, আপনার হাতে কিঞ্চিৎ সময় রয়েছে, তা হলে নির্ঘাত তাঁর গল্পের প্লটটা আপনাকে শোনাতে চাইবেন।”

“তা শোনান না।”

‘অতি বিচ্ছিরি প্লট। শুনলে আপনার মেজাজ বিগড়ে যেতে পারে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যদি বা আপনাকে এখানে আনতে পেরেছি, তখন হয়তো আপনি আগরতলা ছেড়ে পালাতে চাইবেন। না মশাই, এক্ষুনি ও-সব ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই, তার চেয়ে বরং সমস্যাটার কথা বলি।”

বঙ্কুবাবুর সমস্যাটা যে পারিবারিক, এইটে শুনবার পরে আর ও নিয়ে আমি কোনও কৌতূহল দেখাইনি। রুচিতে বাধছিল। ভাবছিলুঃ যে, বলতে হয় তো ভাদুড়িমশাই নিজেই বলবেন, ও-সব ব্যাপারে আমার কোনও প্রশ্ন না-তোলাই ভাল।

আমি চুপ করে আছি দেখে ভাড়মশাই বললেন, “কী ব্যাপার, কথা বলছেন না কেন?”

“কী বলব?”

“কিছুই বলবেন না? তা হলে একটা প্রশ্ন করি। শুধু টাকাপয়সা থাকলেই কি মানুষ সুখী হয়?”

বললুম, “এ তো অতি পুরনো প্রশ্ন। উত্তরটাও পুরনো। হয় না।”

“বঙ্কুও হয়নি।” ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “হতে পারত, যদি ওর প্রথম বউ প্রভা বেঁচে থাকত। ডলি ওর দ্বিতীয় স্ত্রী।”

“সে তো ওঁদের বয়েসের ফারাক দেখলেই বোঝা যায়।”

“বলুন তো বঙ্কুর বয়েস এখন কত?”

বললুম, “সেটা বলা শক্ত হবে কেন? কলেজে আপনার ক্লাস মেট ছিলেন, তাই বয়েসও মোটামুটি আপনার মতোই হবে। এক-আধ বছর কম কিংবা বেশি।”

“না মশাই,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “উত্তরটা ঠিক হল না। বঙ্কু আমার চেয়ে পুরো পাঁচ বছরের বড়। আমার জন্ম নাইনটিন টুয়েন্টিওয়ানে, আর বঙ্কুর জন্ম নাইনটিন-সিক্সটিনে। আমার এখন সত্তর চলছে, আর ওর চলছে পঁচাত্তর। গরিব ঘরের ছেলে, দেরিতে পড়াশুনো আরম্ভ করেছিল। তবে. কিনা একসঙ্গে একই ক্লাসে পড়তুম তো, তাই নাম ধরে ডাকতে কি তুই-তোকারি করতে আটকায় না। বঙ্কুর প্রথম বিয়েটাও অবশ্য বেশ দেরিতেই হয়েছিল। আমরা আই. এ. পাশ করি থার্টি এইটে। আমার বয়েস তখন সতেরো, বঙ্কুর বাইশ। বি. এ. ক্লাসে অ্যাডমিশন না নিয়ে ও ব্যাবসা আরম্ভ করে। ছিটকাপড়ের ব্যাবসা। গরিবঘরের ছেলে, এ ছাড়া তখন ওর উপায় ছিল না। প্রথম-প্রথম খুব যে একটা সুবিধে করতে পারছিল তা নয়, তবে প্রত্যেকের জীবনেই একটা-না-একটা সুযোগ আসে তো, ওর সেই সুযোগটা এসে গেল একচল্লিশ সালে। ঊনচল্লিশে বাধল ওয়ার্লড ওয়ার। সে-সব দিনের কথা আপনি নিশ্চয় ভুলে যাননি?”

“ভোলা কি সম্ভব?”

“তবে তো এটাও আপনার মনে আছে যে, সেই সময়ে একদিকে যখন সর্বনাশের আগুন জ্বলছে, কাতারে কাতারে লোক মরছে, শহরের পর শহর ধ্বংস হচ্ছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছে, সাজানো সব সংসারগুলো শ্মশান হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তখন দু’হাতে পয়সা লুঠছে কিছু মানুষ। ফর্টিওয়ানে বঙ্কু তার ছিট-কাপড়ের ব্যাবসা ছেড়ে যুদ্ধের অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ ধরে। ব্যস, তার পরে আর ওকে ফিরে তাকাতে হয়নি। দেখতে দেখতে বঙ্কু একেবারে লাল হয়ে গেল।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “বঙ্কু অবশ্য তখন বিয়ে করেনি। যুদ্ধ শেষ হল ফর্টিফাইভে। বঙ্কুর বয়েস তখন উনত্রিশ-তিরিশ। আমরা বলতুম, কী রে বঙ্কু, বিয়ে করছিস না কেন? উত্তরে ও বলত, সময় কোথায়? আসলে ও তখন টাকা রোজগারের ধান্ধায় পড়ে গেছে। আরও টাকা চাই, আরও টাকা। হাজারে হবে না, লাখ চাই। লাখে হবে না, কোটি চাই। যুদ্ধের অর্ডার বন্ধ? তা হোক, অন্য পথে টাকা খাটাতে হবে। এমন পথ, যাতে টাকা খাটালে রাতারাতি সে-টাকা ডবল হয়ে যায়। তা তেমন পথও আছে বই কী। বিস্তর আছে। তা নইলে নিশ্চয় বঙ্কু আজ এইখানে এসে পৌঁছত না।”

বললুম, “বিয়েটা উনি কবে করলেন?”

“প্রথম বিয়েটা করে নাইনটিন সিক্সটিসিক্সে। তখন ওর বয়েস পাক্কা পঞ্চাশ। অবাক হচ্ছেন?”

“না, অবাক হচ্ছি না। শুধু ভাবছি যে, বিয়ে না-করে পঞ্চাশ বছরই যখন কাটাতে পারলেন, তখন বাকি জীবনটা কাটাতেই বা আটকাচ্ছিল কোথায়?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এ-কথা আমিও ওকে জিজ্ঞেস করেছিলুম। কিন্তু ও কোনও উত্তর দেয়নি। য়তবা জিজ্ঞেস করেছি, ততবারই একটু হেসে পাশ কাটিয়ে গেছে।”

“হয়তো ভাবছিলেন, এত যে টাকা করলেন, খাবে কে? হয়তো এই রকমের একটা চিন্তা ওঁর মাথায় ঢুকেছিল। হয়তো মাঝে-মাঝে মনে হচ্ছিল যে, একটা ছেলে কিংবা মেয়ে থাকলে মন্দ হত না।”

“আমার ধারণা, একটা নিঃসঙ্গতা বোধ ক্রমে-ক্রমে বাড়ছিল ওর। বাপ-মা মারা গেছেন, ভাই নেই, থাকবার মধ্যে গুটিকয়েক বোন ছিল, তাদের বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেপুলে নিয়ে মাঝেমধ্যে তারা আসে ঠিকই, এসে থেকেও যায় কিছুদিন, কিন্তু বঙ্কু বুঝতে পারে যে, সেই আসায় কোনও আন্তরিকতার কি মায়ামমতার টান নেই, যা আছে, তা নেহাতই কিছু টাকা হাতিয়ে নেবার ধান্ধা। মায়ের পেটের বোন, অথচ যা তারা বলে আর যেমনভাবে বলে, বঙ্কুর তাতে সন্দেহ হয় যে, এই সবই আসলে মন-রাখা কথা, সম্ভবত ভগ্নিপতিদের শেখানো। বঙ্কু ধীরে-ধীরে দূরে সরে আসতে থাকে।”

“এ সব আপনি কার কাছে শুনলেন?”

“বঙ্কুরই কাছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা ছাড়া আর কে আমাকে বলবে। তো যা বলছিলুম, পঞ্চাশে পৌঁছে ও তো বিয়ে করে ফেলল। সেই বিয়েতে আমি গিয়েছিলুমও। বউ দেখলুম। গরিব ঘরের মেয়ে, বয়েস মনে হল বছর-পঁচিশেক। সুন্দরী নয়, তবে মুখে খানিকটা বুদ্ধির ছাপ রয়েছে, এইটে দেখে ভাল লেগেছিল। তারপর আবার বছর দুয়েক ওর খোঁজ রাখিনি। হঠাৎ সিক্সটি এইটের নভেম্বরে ওর চিঠি পেলুম। ছেলের অন্নপ্রাশন। আমাকে আসতেই হবে। চিঠির সঙ্গে ব্যাঙ্গালোর ক্যালকাটা-ব্যাঙ্গালোরের রাউন্ড-ট্রিপ এয়ার-টিকেট। না এসে পারা যায়?”

“ভুবনেশ্বরের বাড়ি তখনও হয়নি?”

“বাড়ি হয়নি, তবে জমি কেনা হয়ে গিয়েছিল। কয়েক বিঘে জমি। কিন্তু বঙ্কু তখনও কলকাতা থেকে তার ব্যাবসা চালাচ্ছে। তো আসতে হল। এসে দেখি, ছেলে একটা নয়, এক জোড়া। যমজ ছেলে। শখ করে তাদের নাম রেখেছে রাম আর লক্ষ্মণ। যেটা মিনিট কয়েকের বড়, সেটা রাম, ছোটটা লক্ষ্মণ।”

“কাল খাবার টেবিলে মিসেস ঘোষ ‘রামু’ বলে যায় উল্লেখ করলেন, সে-ই কি বঙ্কুবাবুর বড় ছেলে? ওই মানে মাথা ধরেছে বলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে কাল যে ঘুমিয়ে পড়েছিল?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ। তাকে আপনি এখনও দেখেননি। তবে আজ নিশ্চয় দেখতে পাবেন।”

“আর লক্ষ্মণ? সে এখানে আসেনি?”

“তার কথা একটু পরে বলছি। ইতিমধ্যে বঙ্কুর বউয়ের কথা, অর্থাৎ সেই প্রথম বউয়ের কথাটা আপনার জানা দরকার।”

একটা সিগারেট ধরালেন ভাদুড়িমশাই। পোড়া-কাঠিটা ফেলতে গিয়েও ফেললেন না, সন্তর্পণে আবার দেশলাইয়ের বাক্সের মধ্যে গুঁজে রাখলেন। তারপর বললেন, “সেই বউটি বড় ভাল ছিল মশাই। বউভাতের দিন দেখে মনে হয়েছিল বুদ্ধিমতী মেয়ে। পরে দেখলুম, সত্যিই তা-ই। বঙ্কুর চরিত্রে অন্য কোনও দোষ না থাকলেও মদের নেশা ছিল মাত্রাতিরিক্ত। প্রভা সেটা ছাড়িয়ে দেয়। বঙ্কুর জীবনে শৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। প্রভা সেটা নিয়ে আসতে পেরেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, বঙ্কুকে সে এটা বোঝাতে পেরেছিল যে, দু-হাতে টাকা রোজগার করা ছাড়াও একটা মানুষকে অন্য-কিছু কাজ করতে হয়। সংসার তার কাছে টাকা তো চায়ই, কিন্তু শুধু টাকাই চায় না, আরও কিছু চায়।”

আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “এসব কথাও আমি বঙ্কুর কাছেই শুনেছি। বঙ্কু সত্যি সুখী হয়েছিল। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়েসের ফারাক পঁচিশ বছরের তবু যে প্রভা ওকে সুখী করতে পেরেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সুখ ওর কপালে বেশিদিন সইল না। হঠাৎ মাত্র তিন দিনের জ্বরে প্রভা মারা গেল। কী রকমের জ্বর, কীসের থেকে সেটা হয়েছে, তা বোঝা পর্যন্ত গেল না। এ হল সেভেনটিথ্রির কথা। প্রভার বয়েস তখন কতই বা হবে? এই ধরুন বত্রিশ-তেত্রিশ। আর তার যমজ ছেলে দুটোর বয়স মেরেকেটে পাঁচ বছর। এমনটা যে ঘটবে, বঙ্কু তা কল্পনাও করতে পারেনি। শোকে দুঃখে ও তখন প্রায় পাগল হয়ে যায়। তার বছর দুয়েক আগেই ওর ভুবনেশ্বরের বাড়ি কমপ্লিট হয়েছে। খবর পেয়ে আমি সেখানে ছুটে যাই। গিয়ে বুঝতে পারি যে, সেখানে থাকলে ও সত্যি-সত্যি পাগল হয়ে যাবে। হাউস কিপার তো একজন ছিলই, অন্যান্য সব কাজের লোকজনও সেখানে নেহাত কম ছিল না, তাদের হাতে বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বঙ্কু আর তার দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আমি ব্যাঙ্গালোরে চলে আসি।”

“তারপর?”

“তারপর আর কী, ভেবেছিলুম কয়েকটা মাস আমার কাছেই রেখে দেব, কিন্তু তা আর হল না।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আসলে কাজের লোক তো, কাজকর্ম ফেলে বসে থাকতে কদ্দিন তার ভাল লাগবে। মাস-খানেক যেতে-না-যেতেই বলল, “না রে, চারু ভুবনেশ্বরেই ফিরে যাই।’ তা ফিরে এসে ফের কাজের নেশায় মেতেও উঠল! চিঠি লিখেছিল। পড়ে জানা গেল, ছেলেদের দেখাশুনো করবার জন্যে বিস্তর মাইনে দিয়ে একজন গভর্নেস রেখে দিয়েছে। তার মাস কয়েক বাদে আমাকে একটা তদন্তের কাজে কটক যেতে হয়েছিল। গিয়ে ভাবলুম, ভুবনেশ্বর তো এখান থেকে মাত্র তিরিশ কিলোমিটার, একবার দেখে আসি, বঙ্কু কেমন আছে। তা দেখলুম, গভর্নেসই সেখানে এখন সর্বময়ী কর্ত্রী, বঙ্কু ফের সেই তার আগের জীবনে ফিরে গেছে, সংসারের কোনও ধারই আর সে ধারে না, টাকা রোজগার ছাড়া অন্য কোনও চিন্তাই তার নেই। আর হ্যাঁ, সে আবার মদও খাচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত।”

“সেই গভর্নেসই কি মিসেস ঘোষ?”

“কারেক্ট।”

“প্রভার শোকে পাগল হয়ে গিয়ে তারপর বছর ঘুরতে-না-ঘুরতেই বঙ্কুবাবু এঁকে বিয়ে কে ফেললেন, কেমন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন কিরণবাবু, ইংরেজিতে এই রকমের একটা কথা আছে যে, প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করাটাই হচ্ছে দ্য বেস্ট কমপ্লিমেন্টে দ্যাট এ ম্যান ক্যান পে টু হিজ ফার্স্ট ওয়াইফ। কেননা তার দ্বারা সে প্রমাণ করছে যে, প্রথম বারের দাম্পত্য জীবনে সে সুখী হয়েছিল, নইলে সে আবার নতুন করে ও-পথে পা বাড়াত না। কিন্তু না, বছর না ঘুরতেই বিয়ে করেনি, বিয়ে করেছিল আরও আট বছর বাদে, এইট্টিওয়ানে। বঙ্কুর বয়েস তখন পঁয়ষট্টি।”

“বিয়েটা কি বঙ্কুবাবু করলেন, না করতে বাধ্য হলেন?”

ইঙ্গিতটা ভাদুড়িমশাই ধরতে পেরেছিলেন। তীব্র চোখে আমার দিকে তাকালেন তিনি। যেন বুঝে নিতে চাইলেন আমাকে। তারপরেই তাঁর চাউনি আবার নরম হয়ে এল। বললেন, “ইউ রাইটারস আর এ হোল লট অব ডেঞ্জারাস পিপল। আরে না মশাই, সে-সব কিছু নয়। আর তা ছাড়া, ওকে আমি চিনি তো, ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করিয়ে নেবে, এমন মানুষ এখনও জন্মায়নি। তা নয়, আসলে একটা সময়ে মনে হয়েছিল যে, ডলি তো সবকিছু ছেড়েছুড়ে ওরই সংসার নিয়ে পড়ে রইল, অথচ মাসান্তে মাইনে আর চতুর্দিকে কুৎসা ছাড়া অন্য-কিছুই ওর জুটল না। কুৎসা বঙ্কুর বোনেরাও কিছু কম রটায়নি। বঙ্কুর বাড়িতে তারা মাঝেমধ্যে আসত, থেকেও যেত সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কখনও কখনও মাসের পর মাস, কিন্তু ডলির সঙ্গে পারতপক্ষে কথা বলত না। এমন একটা ভাব দেখাত যেন লিঙ্গরাজ টেম্পলে পুজো দেবার যা-কিছু পুন্যি, ডলির সঙ্গে কথা বললেই সেটা অমনি উবে যাবে। অ্যাজ ফার অ্যাজ দে ওয়্যার কনসার্নড শি ডিড নট এগজিস্ট অ্যাট অল।”

বললুম, “বঙ্কুবাবুর এটা ভাল লাগেনি নিশ্চয়?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মোটেই না। ওর মনে হল, কিছু একটা করা দরকার। কী করবে? ওর যে আবার বিয়ে করবার ইচ্ছে ছিল, তা নয়। তাই এমনও ভেবেছিল যে, ডলিকে কিছু টাকা দিয়ে অন্য-কোথাও কাজ খুঁজে নিতে বলবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, তা হলে ওর সংসার সামলাবে কে? বাচ্চা দুটোকেই বা কে দেখবে? ব্যস, তারপরে আর ডিসিশন নিতে ওঁর দেরি হয়নি। ডলিকে ও বিয়ে করল। ডলির তরফে আপত্তি হতে পারত। কিন্তু হয়নি। তার কারণ ওরও দরকার ছিল একটা স্থায়ী আশ্রয়ের। ওর আগের জীবনে তো সুবিধে করতে পারেনি, দেয়ার শি ওয়জ আ মিজারেবল ফেইলিওর।’

“আগের জীবন মানে?”

“মানে আগে যে কাজ করত। শি ওয়জ অ্যান অ্যাকট্রেস। …না না, হিরোইন-টিরোইন নয়, নায়িকার বান্ধবী কি নায়কের বোন, কি এই রকমের অন্য কোনও আনইম্পর্ট্যান্ট রোল। গোটা দুই-তিন ছবিতে নেমেছিল, আপনি হয়তো দেখেও থাকবেন।”

“তাই বলুম। তাই ওঁর চেহারাটা অমন চেনা-চেনা লাগছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, আপনি তা হলে দেখেছেন। আমি দেখিনি। কিন্তু মজা কী জানেন, বিয়েটা হয়ে যাবার পরেই নাকি ডলির মাথায় সেই ফিলমের নেশা আবার চাগাড় দিয়ে ওঠে। বঙ্কুকে দিয়ে চার-চারটে ছবি করায়। চারটেতেই ও হিরোইন। শুধু তা-ই নয়, ওরই লেখা কাহিনী নিয়ে ছবি। ফলং মড়কম্। চারটেই ফ্লপ। এখন আবার নতুন একটা ছবি করাচ্ছে। তার দেখাশোনা করবার জন্যে কোত্থেকে একটা ভাইকেও এখানে জুটিয়ে এনেছে। ওই যে দীপক……হ্যাঁ, ওর কথা বলছি…. ছোকরার নিজেরও খুব অ্যাকটিং করার শখ। বলে যে, একবার চান্স পেলেই ও বাজার মাত করে দেবে।”

“গল্প তো এবারও মিসেস ঘোষেরই।”

“হ্যাঁ, তবে পাঞ্জাবের মেয়ে, বাংলাটা বলে ভালই, কিন্তু লিখতে তো পারে না। প্লটটা ও আপনাকে বলবে, সেই অনুয়ারী গল্পটা লিখে ফেলে আপনি তার স্ক্রিপট তৈরি করে দেবেন। কী ভাবে করবেন সেটা আপনার ভাবনা, আমার ভাবনাটা অন্যরকম।”

“আপনার ভাবনা তো ডিরেকশন নিয়ে।”

“আরে দুর মশাই,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ডিরেকশান তো একটা ছুতো। আসলে কয়েকটা দিন সঙ্গে-সঙ্গে থেকে সকলের উপরে আমি নজর রাখতে পারব, তাতে আমার কাজের সুবিধে হবে।”

“কাজটা কী?”

“বলছি, বলছি, অত অস্থির হবেন না। আমার কাজ রামুকে প্রোটেকশন দেওয়া।…..ও কী, অমন হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন কেন? যা বলছি, শুনে যান। বছর খানেক আগে লক্ষ্মণ হঠাৎ নিখোঁজ হয়। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল, তারা কোনও হদিশ করতে পারেনি। কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। তাতেও কোনও সুরাহা হয়নি। বঙ্কু ধরে নিয়েছে, তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এখন রামুকে নিয়ে ওর ভাবনা। ছোট ছেলেটা তো গেছেই, এখন এটাও না যায়। সেই জন্যেই ডাক পড়েছে আমার। কিন্তু মিসেস ঘোষ তা জানেন না। তাঁকে বলা হয়েছে, আমি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্র-পরিচালক, তবে কিনা বিদেশে কাজ করি তো, তাই এ-দেশে আমার নাম এখনও তেমন. ছড়ায়নি।”

“মিসেস ঘোষ সেটা বিশ্বাসও করেছেন।

“করেছেন। তার কারণ, বঙ্কু যখন ব্যাঙ্গালোরে যায়, ডলিকে সঙ্গে নিয়ে যায় না। আর আমিও বার কয়েক ভুবনেশ্বরে গিয়েছি বটে, কিন্তু ডলিকে তার মধ্যে একবারও ভুবনেশ্বরে দেখিনি। তার উপরে আবার গত পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে একবারও ভুবনেশ্বরে যাওয়া হয়নি আমার।

বললুম, “এই ব্যাপার?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাড়িতে প্রায় পৌঁছে গেছি, এখন আর কোনও কথা নয়। …… কিন্তু কী ব্যাপার, বাড়ির দিক থেকে একটা চিৎকার শোনা গেল না?….আরে, অত হই-হল্লা কীসের?”


প্রায় ছুটে গিয়ে আমরা বাড়ির মধ্যে ঢুকলুম। আশ্চর্য ব্যাপার, একতলাটা একেবারে খাঁ-খাঁ করছে। অথচ, একগাদা লোকের গলার আওয়াজ যে পাওয়া যাচ্ছে, তাও ঠিক। ভাদুড়িমশাই বললেন, “দোতলায় চলুন।”

বলে আর তিনি দাঁড়ালেন না। এক-এক বারে সিঁড়ির দু-দুটো করে ধাপ টপকে দোতলায় উঠে গেলেন।

আমি ওঁর চেয়ে বয়েসে বছর তিনেকের ছোট। কিন্তু খানিকটা পথ ছুটে আসায় আমার বুক ধড়ফড় করছিল। মনে হচ্ছিল যে, দম আটকে আসছে। ওইভাবে উঠতে গেলে আমার হার্ট-অ্যাটাক না হয়ে যায়। একতলাতেই একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তাই আস্তে-আস্তে উপরে উঠলুম।

উঠে দেখি, আমারই ঘরটায় ভিড় জমে গেছে। বঙ্কুবাবু, মিসেস ঘোষ, দীপক, শঙ্কর—সবাইকে সেখানে দেখলুম। তা ছাড়া আরও পাঁচ-ছজন লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের আমি চিনি না। আন্দাজে বুঝে নিলুম যে, তারা এ-বাড়ির কাজের লোক।

দীপক আর শঙ্কর ভিড়টা একটু সরিয়ে দিতে দেখলুম, ঘরের মেঝের উপরে দীপকেরই বয়সী একটি ছেলে চিত হয়ে শুয়ে আছে, আর ভাদুড়িমশাই ক্রমাগত তার মুখেচোখে জলের ঝাপটা দিচ্ছেন।

শঙ্করকে জিজ্ঞেস করলুম, “কে এই ছেলেটি?”

শঙ্কর বলল, “রামবাবু। ঘোষসাহেবের ছেলে। অজ্ঞান হয়ে গেছেন।”

একটু বাদেই রামুর জ্ঞান ফিরল। তখন ঘটনার যে বিবরণ তার কাছে শোনা গেল, তাতে তো আমরা হতবাক। সকাল ছ’টায় সে ঘুম থেকে উঠেছিল। তারপর বেড-টি খেয়ে বাথরুমে যায়। দাড়ি কামিয়ে, মুখহাত ধুয়ে আধঘন্টা যোগব্যায়াম করে। তারপর বাগানে খানিক পায়চারি করে সওয়া সাতটা নাগাদ ঘরে ফিরে আসে। আগের দিনই নতুন-মা তাকে জানিয়ে রেখেছিলেন যে, সওয়া আটটার মধ্যে সাগরমহলে যাওয়া হবে, তাই চটপট সবাই যেন স্নান সেরে নেয়। কিন্তু স্নান করতে গিয়ে রামু দেখতে পায় যে, তার ঘরের অ্যাটাচড বাথরুমটা ভিতর থেকে বন্ধ। বাবা আর নতুন-মা’ও তখন স্নান করবার জন্যে যে-যার বাথরুমে ঢুকেছেন। ফলে, উপরতলার দুটো বাথরুমের অন্তত একটা খোলা পাবে ভেবে সে দোতলায় চলে যায়। দোতলায় সে আমাদের কাউকে দেখতে পায়নি। নিশ্চিন্ত মনে সে তাই আমার ঘরের বাথরুমটায় ঢুকতে গিয়েছিল। কিন্তু ঢুকবার উপক্রম করতেই ভিতর থেকে কেউ এমন জোরে তাকে ধাক্কা দেয় যে, সে মেঝের উপরে ছিটকে পড়ে।

ভাদুড়িমশাই মেঝে থেকে তুলে রামুকে ইতিমধ্যে আমার বিছানার উপরে শুইয়ে দিয়েছিলেন। রামু উঠে বসবার চেষ্টা করছিল। ভাদুড়িমশাই তাকে উঠতে নিষেধ করে বললেন, “আর কিছুক্ষণ পরে উঠবে, এখন একটু বিশ্রাম নাও। আর হ্যাঁ, এখন তোমাকে বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করব না, শুধু কয়েকটা কথার জবাব দাও।”

“বলুন।”

“মেঝের উপরে পড়ে গিয়ে তোমার কোথায় চোট লেগেছে?”

“মাথায়।”

শুনে সস্নেহে রামুর মাথার হাত বুলিয়ে দিতে-দিতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আহা, খুব লেগেছে নিশ্চয়! এই এখানটা তো দেখছি বেশ ফুলেও গেছে।”

“খুব ব্যথা করছে।”

“আহা।…আচ্ছা রামু, বাথরুমের ভিতর থেকে কে তোমাকে অমন ধাক্কা মেরে ফেলে দিল, তা তুমি জানো?”

“না।”

“তার মুখ দেখতে পেয়েছিলে?”

“না। মুখটা একটা কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল।”

“কিন্তু এতলায় তোমার নিজের বাথরুমটা কে আটকে রেখেছিল, সেটা নিশ্চয় জানো?”

“না, তাও জানি না।”

“বাইরে থেকে জিজ্ঞেসও করোনি?”

“না। মনে হয়েছিল, মামাজি হয়ত ঢুকেছে। ও তো মাঝে-মাঝেই আমার বাথরুমটা ব্যবহার করে।”

দীপক বলল, “না ভাঞ্জা, আমি আজ একবারও তোমার বাথরুমে যাইনি। আমি আর রাজেশ তো আউটহাউসে থাকি, সেখানকার বাথরুমেই আমরা আজ স্নান করে নিয়েছি।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “তা হলে? এ তো বড় মিস্টিরিয়াস ব্যাপার।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সবাইকে নিয়ে নীচে যাও, বঙ্কু। রামুর যা চোট লেগেছে দেখছি, তাতে মনে হয়, আজ আর আমাদের সাগরমহলে যাওয়া হবে না।”

মৃদু গলায় রামু বলল, “না না, এখন আর আমার তেমন ব্যথা নেই। আমি যেতে পারব।”

বলে সে আর দেরি করল না, বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে বলল, “এ কী, সবাই দাঁড়িয়ে রইলেন কেন?”

সবাই নীচে নেমে গেল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে আর আপনিই বা দেরি করছেন কেন? বাথরুমে ঢুকে তৈরি হয়ে নিন।”

বললুম, “আপনি স্নান করবেন না?”

“রাত চারটেতেই আমি স্নান সেরে নিয়েছি। তাবৎ কাজ না সেরে যে আমি ঘর ছেড়ে বেরুই না, তা আপনি খুব ভালই জানেন।”

যাওয়ার সময়টা একটু পিছিয়ে না-দিয়ে উপায় ছিল না। ব্রেকফাস্ট খেয়ে সবাই যখন বাইরে এসে জমায়েত হলুম, তখন ন’টা বাজে।

কথা ছিল, দীপক সাগরমহলে যাবে না। কলকাতায় অন্তত দুটো ফোন আজ করতেই হবে। একটা অরুণ সান্যালদের বেহালার বাড়িতে, আর একটা আমাদের বাড়িতে। দীপককে তাই যেতে হবে আগরতলায়। কিন্তু তার মুখ দেখে বুঝতে পারলুম যে, কাল রাত্তিরে সে যা-ই বলে থাকুক, এখন আর তার আগরতলায় যাবার বিশেষ ইচ্ছে নেই।

মিসেস ঘোষও তাঁর ভাইয়ের বেজার ভাবটা লক্ষ করেছিলেন। বললেন, “কী রে, অত গম্ভীর কেন? সাগরমহলে তোর যাওয়া হচ্ছে না বলে বুঝি মন খারাপ?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা আগরতলায় তো আর কাউকেও পাঠানো যায়। দীপক তা হলে আমাদের সঙ্গে যেতে পারে।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “কে যাবে? ড্রাইভার দুজনকে তো ছাড়া যাবে না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তোমার গাড়িটা কে চালাবে?”

“বিজয়নারায়ণ…..মানে বিজু। গত তিরিশ বছর ধরে বিজু আমার গাড়ি চালাচ্ছে। যেখানেই যাই, ও আমার সঙ্গে থাকে। মানে….শুধু গাড়িই চালায় না, হরেক কাজে ওকে আমার দরকার হয়। ওকে তো ছাড়তে পারব না।”

“তা হলে শঙ্কর যাক। কী হে শঙ্কর, আগরতলা থেকে কলকাতায় এই ফোন দুটো তুমি করে দিতে পারবে না?”

শঙ্কর বলল, “খুব পারব।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “ওহে চারু, শঙ্করকে তো খুব আগরতলায় পাঠাচ্ছে, তা হলে তোমাদের গাড়িটা কে চালাবে? দীপক তো গাড়ি চালাতে পারে না।”

এতক্ষণ আমি কোনও কথা বলিনি। এবারে আর না-বলে পারলুম না। হেসে বললুম, “সে কী দীপক, অমিতাভ বচ্চন তোমার গুরুজি, অথচ তুমি গাড়ি চালাতেও শেখোনি?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “সত্যিই তো। তা হলে তুই সাগরমহলে যাবি কী করে দীপক?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নো প্রবলেম। গাড়ি আমিও চালাতে পারি, কিরণবাবুও পারেন। শঙ্করকে তাই অক্লেশে ছেড়ে দেওয়া যায়। শঙ্কর বাসে উঠে আগরতলায় চলে যাক। গাড়ি আমিই চালাব।”

অন্য গাড়িটা অ্যাম্বাসাডার। সেটার পিছনে উঠলেন বঙ্কুবাবু, মিসেস ঘোষ আর রামু। বিজু গিয়ে ড্রাইভারের আসনে বসল। তার পাশের সিটে বসল পীতাম্বর। বঙ্কুবাবুর খাস-বেয়ারা।

মারুতির পিছনে বসল দীপক আর রাজেশ। যেমন কাল রাত্তিরে, তেমন আজ সকালেও খাবার টেবিলে এই ছেলেটিকে আমি দেখেছি, কিন্তু ওর সঙ্গে পরিচয় হয়নি। দীপকই পরিচয় করিয়ে দিল। শুনলুম ও দীপকের বঙ্কু, ভাল ফোটোগ্রাফার। আউটহাউসে দীপক আর রাজেশ একই ঘরে থাকে।

ভাদুড়িমশাই আর আমি বসলুম, সামানে। স্টিয়ারিং হুইল ধরে, জানলায় মুখ রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বঙ্কু, তোমরা এগিয়ে যাও, আমি তোমাদের ফলো করছি।”

দুটো গাড়ি প্রায় একই “ঙ্গে স্টার্ট দিল। বিজু এগিয়ে গেল, মোটামুটি একটা দূরত্ব বজায় রেখে আমরা তার পিছন পিছন চললুম।

রাস্তা যে একটানা একই রকমে: তা নয়। কখনও কখনও সমতল, আবার কখনও-কখনও ঢেউ খেলানো। কিন্তু খানাখন্দ কোথাও চোখে পড়ল না। ঝাঁকুনি নেই, গাড়ি বেশ মসৃণ গতিতে চলেছে, জানলায় চোখ রেখে আমি দু-দিকের বনজঙ্গল, ঘরবাড়ি খেতখামার আর মানুষজন দেখছি। মাঝে-মাঝে এক-একটা ঘন-বসতির জায়গা পেরিয়ে যাই। এক-আধ মিনিটের জন্যে দেখতে পাই যে, দু-পাশের দোকানপাটে কেনাবেচা চলেছে। তার পরেই আবার ফাঁকা রাস্তা। রাস্তার পাশে বাঁশঝাড়, পুকুর, ধানখেত।

দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম, দীপকের কথায় আমার চমক ভাঙল।

“আচ্ছা মিঃ চ্যাটার্জি, ফিল্মে নামতে হলে কি গাড়ি চালানো শিখতেই হবে?”

হেসে বললুম, “সেটা নির্ভর করছে কোন ভূমিকায় তুমি নামবে, তার উপরে।”

“গুরুজি যে-সব ভূমিকায় নামে, সেইরকম কোনও ভূমিকায় যদি নামতে চাই?”

“ওরেব্বাপ রে বাপ,” শিউরে উঠে বললুম, “তা হলে শুধু ড্রাইভিং কেন, শিখতে হবে আরও অনেক কিছু। নাচ জানো?”

“না।”

“সেটা শিখতে হবে। বক্সিং জানো?”

“না।”

“সেটা শিখতে হবে। হ্যান্ডগ্রেনেড ছুড়তে আর বন্দুক চালাতে শিখতে হবে। ফেন্সিংটাও শেখা চাই। তা ছাড়া আরও অনেক কিছু শেখা দরকার। চোদ্দোতলা বাড়ির ছাতের উপর থেকে কীভাবে ঝাঁপ খেতে হয়, জানো?”

“না।”

“ওটাও না শিখলে নয়। ওইভাবে তোমাকে ঝাঁপ খেতে হবে। তারপর, ফুটপাথ থেকে উঠে, যেন কিছুই হয়নি এইভাবে একটা আলতো টোকা মেরে তোমার জামাকাপড়ের ধুলো ঝেড়ে ফের লাফিয়ে পড়তে হবে ভিলেনের উপরে। মেরে তাকে তক্তা বানিয়ে ফেলতে হবে। তা ছাড়া শুধু মারলেই তো চলবে না, মারটা প্রথমদিকে আচ্ছারকম খাওয়াও চাই। কী করে মার খেতে হয় জানো?”

“না।”

যে-রকম ক্ষীণ গলায় দীপক ‘না না’ বলছিল তাতে বুঝতে পারছিলুম যে, তার গলা ক্রমেই শুকিয়ে আসছে। বললুম, “জল খাবে দীপক?”

“আছে আপনার সঙ্গে?”

ওয়াটার-বটলটা পিছনে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললুম, “দীপক, তোমার ধারণা ফিল্মের নায়ককে শুধু নাচা-গানা করতে হয়। আর মিঠি-মিঠি কথা বলতে হয়। বাস, তা ছাড়া আর তার কোনও কাজ নেই। না রে বাপু, অত সহজ নয়। বিস্তর হ্যাপা।”

“কিন্তু আপনি যে-সব কাজের কথা বললেন, ও-সব তো শুনেছি ডামিরা করে।”

বললুম, “তোমরা গুরুজি কিন্তু ডামি দিয়ে কাজ চালানো খুব একটা পছন্দ করেন না। অন্তত মারপিটের চোদ্দো আনা তিনি নিজেই করেন শুনেছি। তবে হ্যাঁ, চোদ্দোতলা বাড়ির ছাত থেকে তিনি লাফ মারেন না। ওটা ক্যামেরার কারসাজি।”

ভাদুড়িমশাই কথা বললেন, অনেকক্ষণ বাদে। সামনের গাড়িটা ডাইনে বাঁক নিতে তিনি বললেন, “আমরা সাগরমহলে পৌঁছে গেছি।”


সাগরমহলের সাগর আসলে একটা বিরাট জলা, আর মহল হচ্ছে একটা সরকারি টুরিস্ট লজ। দোতলা বাড়ি। দেখলে বোঝা যায় যে, সদ্য তৈরি হয়েছে। বিছানার চাদর থেকে বালিশের ওয়াড়, সবই একেবারে ধোপদুরস্ত। ওয়াশ-বেসিন থেকে চেয়ার-টেবিল, কোথাও একটা দাগ পর্যন্ত পড়েনি।

বঙ্কুবাবু আর ভাদুড়িমশাই কালও একবার সাগরমহলে এসেছিলেন। তখনই তাঁরা বুকিং করে যান। তিনটে ডাবল বেড আর একটা ট্রিপল-বেডের ঘর নেওয়া হয়েছে। ভাবা হয়েছিল, তিনটে ডাবল-বেডের ঘরের একটায় থাকবেন সস্ত্রীক বঙ্কুবাবু, একটায় ভাদুড়িমশাই আর আমি, একটায় রামু আর রাজেশ। ট্রিপল-বেডের ঘরটা নেওয়া হয়েছিল বিজু, পীতাম্বর আর শঙ্করের জন্য। শঙ্করের বদলে দীপক আসায় ব্যবস্থাটার একটু অদল বদল করতে হল। ডাবল-বেড ঘরটা বিজু আর পীতাম্বরকে ছেড়ে দিয়ে রামু, দীপক আর রাজেশ চলে গেল ট্রিপল-বেডের ঘরে। বঙ্কুবাবুর এই একটা ব্যাপার দেখে ভাল লাগল যে, ড্রাইভার আর বেয়ারার থাকার জন্যে তিনি আলাদা কোনও ব্যবস্থা করেননি।

ঘরগুলো সবই দোতলায়। বঙ্কুবাবুর সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। রেলিং ধরে আস্তে-আস্তে তিনি দোতলায় উঠলেন। দেখলুম, পীতাম্বর তাঁর সঙ্গে-সঙ্গে রয়েছে। মিসেস ঘোষ একটু আগেই দোতলায় উঠে গিয়েছিলেন। কী একটা কাজে পীতাম্বরকে তিনি ডেকেছিলেনও। কিন্তু লক্ষ করলুম, বঙ্কুবাবু দোতলায় না ওঠা পর্যন্ত পীতাম্বর তাঁর পাশ থেকে নড়ল না।

একতলার একপাশ থেকে শান-বাঁধানো খুব চওড়া একটা সিঁড়ি ধাপে-ধাপে যেখানে জলার মধ্যে নেমে গিয়েছে, সেখানে কয়েকটা নৌকো চোখে পড়ল। নৌকোগুলির খোলের দু’দিকে গদি-আঁটা বেঞ্চি পাত!

বললুম, “ওগুলো নিশ্চয় জলার মধ্যে ঘুরে বেড়াবার জন্যে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঘুরে যদি বেড়াতে চান তো কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার পাট না চুকিয়ে খামোখা এখন আপনি জলার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে যাবেন কেন? বরং দূরের ওই বাড়িটা ভাল করে দেখুন।”

বাড়িটা অনেক আগেই আমার চোখে পড়েছিল। বেশ কিছুটা দূরে, জলার একেবারে অন্য প্রান্তে, জলের তলা থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল একটা বাড়ি। এতই বিশাল যে, বাড়ি না বলে রাজপ্রাসাদ বললেই ঠিক হয়।

বললুম, “ও তো মনে হচ্ছে রাজবাড়ি মশাই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কারেক্ট, ওটা একটা প্রাসাদই বটে। ওর নাম নীরমহল। শখ করে ওটা তিরিশের দশকে তৈরি করা হয়েছিল। খাওয়া-দাওয়ার পরে নৌকো করে আমরা ওখানে বেড়াতে যাচ্ছি। রাজপ্রাসাদের অবস্থা যে ইতিমধ্যে কী দাঁড়িয়েছে, তখন সেটা স্বচক্ষে দেখবেন।”

দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলুম আমরা। হুহু করে বাতাস বইছে, কিন্তু বাতাসে দুপুরবেলার গরম ভাবটা নেই। তার উপরে আবার জলের উপর দিয়ে আসছে বলে ধুলো-ময়লাও নেই বিশেষ। জল অবশ্য কোনওখানেই খুব একটা গভীর বলে মনে হল না। জলার মধ্যে যেমন প্রচুর পাখি, তেমন কিছু-কি মানুষও চোখে পড়ল। বুক-সমান জল ঠেলে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রত্যেকের পাশেই একটা করে ডিঙি। ডিঙির মধ্যে কাঠি দিয়ে বানানো বাক্স। এক-একটা বাক্স নিয়ে তারা ডুব দিচ্ছে, তারপর জলের উপরে মাথা জাগিয়ে সেখানে পুঁতে রাখছে একটা করে নিশানা।

জিজ্ঞেস করলুম, “ব্যাপারটা কী বলুন তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝলেন না? জলের তলার বাক্সগুলোকে রেখে আসছে, তারপর কাল কি পরশু ওই নিশানা দেখে জায়গা চিনে ওরা এক-এক করে বাক্সগুলোকে আবার জলের তলা থেকে তুলবে। তখন দেখা যাবে যে, বাক্সগুলো চিংড়িমাছে বোঝাই হয়ে আছে। জল তো মোটেই গভীর নয়, তাই চিংড়ির চাষের এখানে খুব সুবিধে।”

বললুম, “লাঞ্চে তা হলে চিংড়ির মালাইকারি পাব?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কপালে থাকলে পাবেন।”

কপালে যে নেই, সেটা খানিক বাদে ডাইনিং হলে গিয়ে বোঝা গেল। চিংড়ি নয়, নিত্য যা খাই, সেই কাটাপোনা। লজেব ম্যানেজার আমাদের আক্ষেপের কথা শুনে বললেন, “ঠিক আছে, রাত্তিরে যাতে চিংড়ি মাছ পান, তার ব্যবস্থা করছি।”

খাওয়া শেষ হতে-হতে দেড়টা বাজল। বঙ্কুবাবু বললেন, “আধ-ঘন্টাটাক বিশ্রাম করে তারপর একটা নৌকো নিয়ে আপনারা নীরমহল থেকে ঘুরে আসুন। আমি অবশ্য যাচ্ছি না। বিজুও থাক। ও আমার দেখাশুনো করবে। মিঃ চ্যাটার্জি, জায়গাটা আপনি বেশ ভাল করে দেখুন। ডলি বলছিল, হিরো আর হিরোইন নৌকো করে ওখানে যাবে। নৌকো যখন চলছে, তখন একটা ডুয়েট গাইবে তারা। গান শেষ। নৌকো ওখানে পৌঁছে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে ওরা দুজন উপরে উঠছে। কাট। পরের দৃশ্যটা ভাইটাল। প্রাসাদের একেবারে হাইয়েস্ট পয়েন্ট, হঠাৎ মাথা ঘুরে গিয়ে হিরোইন সেখান থেকে পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু হিরো তৎক্ষণাৎ হাত বাড়িয়ে তাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল। এই সময়ে একটা গান থাকলে ভাল হয়। লাভ-সং। ডলি বলছিল, গানটা যদি পল্লিগীতি হয়, আর যদি মাঝিকে দিয়ে সেটা গাওয়ানো যায়, দৃশ্যটা তা হলে দারুণ জমবে। চারু তো ডিরেক্টর। ও বলছিল, ইটস এ ভেরি ব্রাইট আইডিয়া।….না না, মাঝিকে গাইতে হবে না, সে লিপ দেবে, গাইবার জন্যে নাম-করা কোনও ফোক-আর্টিস্টকে ধরা যাবে তাখন। …..তো মিঃ চ্যাটার্জি, আপনি তো ডলির এই আইডিয়াটাকে স্ক্রিপটে ট্রান্সফার করবেন, তাই আপনার ওপিনিয়নটাও জানা দরকার। আপনি কী বলেন?”

আমাকে কী বলতে হবে, সে তো ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে আমি জেনেই গিয়েছি। তাই উচ্ছ্বসিত গলায় বললুম, “দারুণ, দারুণ। এর আর কোনও জবাব নেই।”

দীপক বলল, “ফোক-সং না-দিয়ে ওইখানে একটা ফাইট দেওয়া যায় না?”

বঙ্কুবাবু তাঁর প্রায় নাতির বয়সী শ্যালকটির মন্তব্য শুনে বললেন, “ওটা একটা ডেজার্টেড রাজবাড়ি, ওখানে কে কার সঙ্গে লড়বে?”

“কেন, এমন তো দেখানো যায় যে, ওটা স্মাগলারদের আড্ডা, হিরো যে তাদের আড্ডার হদিশ পেয়েছে এইটে বুঝে গিয়ে হিরোকে তারা খতম করতে চায়। আর ওই হিরোইন, ও আসলে স্মাগলার-গ্যাঙের লিডারের মেয়ে। দিদি, তুই বরং এইভাবে তোর স্টোরি-লাইনটাকে পালটে নে। দেখিয়ে দে যে, হিরোকে লটকে ওখানে নিয়ে আসার জন্যেই হিরোইনকে কাজে লাগানো হয়েছিল। কিন্তু তার ড্যাডি যেই হিরোকে অ্যাটাক করেছে, সেও অমনি হিরোর পাশে দাঁড়িয়ে তার ড্যাডির এগেনস্টে ফাইট করতে লাগল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন? হিরোইন হঠাৎ দুম করে তার ড্যাডির এগেনস্টে ফাইট করতে যাবে কেন?”

“বুঝলেন না?” দীপক বলল, “হিরোর সঙ্গে তার মোহব্বত হয়ে গিয়েছে যে।”

ভাদুড়িমশাই বলনে, “অ।”

বঙ্কুবাবু তাঁর স্ত্রীর দিকে তাকাতে গিয়ে রাজেশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী গো, তোমার কী মনে হয়? তোমার ভাইটাকে আমি একেবারে গবেট ভাবতুম, কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে কথাটা নেহাত খারাপ বলেনি।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “একটু ভেবে দেখি। প্লটটাকে যেভাবে সাজিয়ে নিয়েছিলুম, ঠিক সেইভাবেই তো আর হবে না, এখানে-ওখানে মাইনর কিছু-কিছু চেঞ্জ তো করতেই হবে।”

আমি বললুম, “এটা কিন্তু একটা মেজর চেঞ্জ। ছবি একেবারে অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে।’

রাজেশ এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিল। এবারে বলল, “দীপক যা বলছিল, তাতে কিন্তু আমার কাজের অনেক সুবিধে হবে।”

গলা শুনতে পেয়েছিলেন, তাই বঙ্কুবাবু এবারে ভুল-লোকের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন না। সরাসরি রাজশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার আবার কী সুবিধে?”

“বিস্তর সুবিধে।” রাজেশ বলল, “নীরমহলে তো আমি আগেও এসেছি। ওখানে যদি ফাইট হয়, তো নানা অ্যাংগল থেবে আমি তার ছবি তুলতে পারব।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “অ্যাঁ, তুমি ছবি তুলবে মানে? তার জন্যে তো ক্যামেরাম্যানই রয়েছে।”

দীপকের দিকে ঘুরে দাঁড়াল রাজেণ। বলল, “সে কী, তুই তা হলে কলকাতা থেকে এখানে আমাকে আসতে বললি কেন? ক্যামেরাম্যানের কাজটা আমি পাব না?”

দীপক জানলার দিকে তাকিয়ে জলার শোভা দেখতে লাগল।

মিসেস ঘোষ বললেন, “আরে বাবা, এত ব্যস্ত হবার কী আছে। আগে লোকেশন ঠিক করি, স্ক্রিপট লেখা হোক, কাস্টের ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলি তা নয়, ক্যামেরার কাজ কে করবে, তাই নিয়ে ঝামেলা আরম্ভ হয়ে গেল।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “ঝামেলার তো কিছু নেই, ক্যামেরার কাজ অগের ছবিগুলোতে সুনীল গুপ্ত করেছেন, হি ইজ অ্যান এক্সেলেন্ট ক্যামেরাম্যান, এবারেও তিনিই কাজ করবেন। এ একেবারে পায়।”

রাজেশ বলল, “তা হলে আর আমার নীরমহলে গিয়ে কী হবে? আমি যাচ্ছি না।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “সে তোমার যেতে ইচ্ছে হয় যাবে, ইচ্ছে না হলে যাবে না। …..ও হ্যাঁ, বিজু কাল নীরমহল দেখে এসেছে, পীতাম্বরের দেখা হয়নি, ও আমার কাছে ছিল। তা পীতাম্বর আজ তোমাদের সঙ্গে যাক্, বিজু আমার কাছে থাকবে।”

কথাটা মিসেস ঘোষকে বলা। তিনি বললেন, “সে তো তুমি আগেই বলেছ।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “বলেছি বুঝি? মনে ছিল না। এখন আমি উপরে যাব। বিজু কোথায়?”

বিজু আর পীতাম্বর আড়ালে কোথাও অপেক্ষা করছিল। বঙ্কুবাবুর শেষ কথাটা শুনে সে সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, “চলুন স্যার।”

বঙ্কুবাবু দোতলায় চলে গেলেন। রামুকে কিছুক্ষণ ধরেই দেখা যাচ্ছিল না। মনে হল, খাওয়ার পাট চুকে যাবার পরেই সে দোতলায় উঠে গেছে। দীপক আর রাজেশও গম্ভীর মুখে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।

একতলার ডাইনিং হলে এখন শুধু আমি, ভাদুড়িমশাই আর মিসেস ঘোষ। ডাইনিং হলের পাশেই লাউঞ্জ। মিসেস ঘোষ বললেন, “চলুন, লাউঞ্জে গিয়ে বসা যাক।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু বিশ্রাম করে নিলে হত না? একটু বাদেই তো ফের বেরুতে হবে।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “আমি আর এখন উপরে যাব না। আপনারা বরং নিজেদের ঘরে গিয়ে একটু গড়িয়ে নিন।”

ভাড়িনশাই হেসে বললেন, “আমাদের কথা ভেবে ও-কথা বলিনি। আমাদের এ-সব অভ্যেস আছে, আমি আপনার কথা ভাবছিলুম। সকাল থেকে আপনার উপর দিয়ে ঝড় তো নেহাত কম গেল না।”

“ঝড় আবার কোথায় দেখান?”

আমি বললুম, “সে কী, সক্কালবেলায় রামুকে নিয়ে ওই কাণ্ড। তারপরে এতটা পথ আসতে হল। তারপর এখন আবার রাজেশকে নিয়ে এই ঝামেলা। যা রেগে গেছে, সত্যি-সত্যি চলে না যায়!”

মিসেস ঘোষ বললেন, “এ-সব ঝামেলা নিত্যি আমাকে পোহাতে হয়। তবে হ্যাঁ, ক্যামেরাম্যানের ক’টা রাজেশকে দিলেও ক্ষতি হত না। সুনীল গুপ্ত সম্পর্কে আপনাদের বঙ্কু মোটেই ঠিক কথা বলেননি। ভদ্রলোকের নামডাক আছে ঠিকই, কিন্তু কাজ এমন কিছু আহামরি নয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে এত নামডাক হল কী করে?”

মিসেস ঘোষ বললেন; “সে-সব আমার জানতে কিছু বাকি নেই। ফিল্ম-ম্যাগাজিনগুলো যারা চালায়, তাদের তো হাড়ে হাড়ে চিনি, কাকে কীভাবে তুষ্ট করতে হয়, সে-সব আমার জানা হয়ে গেছে। আপনাদের বঙ্কুর সঙ্গে পরিচয় হবার আগে যে আমি ফিল্মের লাইনেই ছিলুম সেটা ভুলে যাবেন না। লাইনটা কেন ছেড়ে দিয়েছিলুম জানেন?”

বললুম, “কেন?”

“স্রেফ ঘেন্নায়। দু-লাইন প্রশংসার জন্য কী দিতে হবে আর পাঁচ লাইন প্রশংসার জন্যে কী, তা কি জানি না ভেবেছেন? সব জানি। কাগজে-কাগজে সুনীল গুপ্তর অত প্রশংসা বেরোয় কেন, তাও জানি। সবই ওর শালির জন্যে। তাও তো সেটা দেখতে একটা কালপেঁচির মতো, কারও পাতে দেবার যুগ্যি নয়। বলব, সবই একদিন বলব।”

কথাটাকে অন্য দিকে ঘোরাবার জন্যে বললুম, “একটু বাদেই কিন্তু আমাদের নৌকোয় উঠতে হবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাও তো বটে। সওয়া দুটো বাজে। আমার খেয়ালই ছিল না। মিনিট পনেরোর মধ্যেই বেরোতে পারলে ভাল হয়। চলুন কিরণবাবু, জামাকাপড় পালটে আসা যাক।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “চলুন, আমিও যাচ্ছি। ও হ্যাঁ, প্লটটা আমি আজই শোনাতে চাই। ওখানে নিয়েই শোনাব। মিঃ চ্যাটার্জি, কাল রাত্তির থেকে আজ এখন পর্যন্ত তো আপনি সময় করে উঠতে পারলেন না। নীরমহলে পৌঁছে আবার ‘পরে হবে’ বলবেন না যেন।”

বললুম, “আরে ছিছি, এ আপনি কী বলছেন। স্ক্রিপট লিখতে এসেছি, আর আপনার প্লটটা শুনে নেবাব সময় হবে না? তবে কিনা, প্লটটা একটু মন দিয়ে শুনতে হবে তো, সেটা কি এত ডামাডোলের মধ্যে হয়! ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবনাচিন্তা করতে হবে, আপনার সঙ্গে ডিটেলস নিয়ে আলোচনা করতে হবে, তার একটা উপযুক্ত পরিবেশ চাই না?”

মিসেস ঘোষের মুখে যে একটা বেজার-ভাব দেখতে পাচ্ছিলুম, সেটা তবু কাটল না। বললেন, “আশা করি নীরমহলে সেটা পাওয়া যাবে।”

বললুম, “তবে তো খুবই ভাল। গল্পের আউটলাইনটা আপনি আমাকে বলবেন, তারপরে উই শ্যাল হ্যাভ এ থ্রেডবেয়ার ডিসকাশন, ভাদুড়িমশাইও যে তাতে যোগ দেবেন, সে-কথা বলাই বাহুল্য। তারপর যদি দেখা যায় যে, অধিকাংশ ব্যাপারেই আমরা একমত, তবে তো কথাই নেই, পরো কাহিনীর একটা খসড়া দাঁড় করাতে আমার তিন দিনের বেশি সময় লাগবে না। ব্যস, সেই াড়াটা যদি আপনাদের ভাল লাগে, তো পরদিন থেকেই আমি স্ক্রিপট লিখতে আরম্ভ করব।”

মিসেস ঘোষের মুখে এতক্ষণে হাসি ফুটল। বললেন, “চলুন তা হলে উপরে যাওয়া যাক।”

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে আমি হাসতে-হাসতে বিছানায় গড়িয়ে পড়লুম।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আস্তে, আস্তে। মিসেস ঘোষ বুঝতে পারলেই সর্বনাশ। আর যা-ই করুন, দয়া করে ওঁকে বোকা ভাববেন না।”

বললুম, “যা অভিনয় করলুম, তাতে একটা পুরস্কার নিশ্চয়ই আশা করতে পারি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা পারেন। তবে বেস্ট-অ্যাক্টিংয়ের পুরস্কারটা কাকে দেব, ভাবছি। আপনাকে না বঙ্কুকে।


টুরিস্ট লজ থেকে জলের উপর দিয়ে নীরমহলে পৌঁছতে আধঘন্টাও লাগল না। একটা নৌকোতেই হয়ে গেছে। দলে আমরা এখন সাতজন। আমি, ভাদুড়িমশাই, মিসেস ঘোষ, রামু, দীপক, পীতাম্বর আর রাজেশ। ভেবেছিলুম, রাজেশ বোধহয় আসবে না। কিন্তু সেও এসেছে দেখলুম। মুখে অবশ্য একটুও হাসি নেই। কথাও বিশেষ বলছে না।

ভিতটা জলের তলায়। সেই ভিতের উপরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই রাজপ্রাসাদ। উদয়পুরের লেক-প্যালেস দেখে ত্রিপুরার মহারাদের এই বাড়ি বানাবার শখ হয়েছিল কি না জানি না, তবে এটাও যে একটা তাক-লাগানো ব্যাপার, তাতে আর তার সন্দেহ কী। সামনে আর পিছনে, দু-দিক দিয়েই ঢোকা যায় এই রাজবাড়িতে। রাজার নৌকো সামনের ঘাটে ভেড়ানো হত, আর রানিমা’র নৌকো একটু ঘুরে গিয়ে ভিড়ত অন্দরমহলের সিঁড়ির সামনে। নৌকো থেকে সরাসরি সিঁড়িতে পা রেখে রাজপরিবারের মেয়েরা উপরে উঠে যেতেন।

এখন আর যান না। নীরমহল এখন আর শখের রাজবাড়ি নয়, ত্রিপুরার আর-পাঁচটা টুরিস্ট-স্পটের মতন এটাও একটা টুরিস্ট-স্পট। আজ অবশ্য পর্যটকদের ভিড় নেই। ঘুরে-ঘুরে আমরা সব দেখতে লাগলুম।

দেখলে অবশ্য দুঃখই হয়। ভাদুড়িমশাই বলেছেন যে, এ-বাড়ি খুব বেশিদিনের পুরনো নয় তিরিশের দশকে তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ এর বয়েস কিছুতেই ষাটের বেশি হতে পারে না। অথচ তারই মধ্যে নীরমহলের অবস্থা একেবারে যাচ্ছেতাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেওয়ালের পলস্তারা এখানে-ওখানে খসে পড়েছে, পাঁচিলে ফাটল, কার্নিশে অশথগাছ, মেঝে ফুটিফাটা। মেঝের উপরে এককালে নিশ্চয় দামি টালি ছিল, এখন নেই। বাগান একটা আছে ঠিকই, কিন্তু তার অবস্থাও খুব একটা উৎসাহিত হবার মতো নয়। তবে হ্যাঁ, মেরামতির কাজ চলেছে। এখানে-ওখানে জনাকয় মিস্ত্রি আর মজুর আমাদের চোখে পড়ল।

রামু রাজেশ আর দীপক নীরমহলের সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। আমি আর ভাদুড়িমশাইও সেদিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিলুম, মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনারা অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? ওরা ছেলেমানুষ, ওরা ওদের মতো ঘুরে বেড়াক। চলুন, আমরা বরং সামনের ওই বাগানটাতে একটু বসি।” বুঝলুম, অনেকক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে, আর পারা যাবে না। প্লটটা এবারে শুনতেই হবে। বললুম, “বেশ তো।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমারও কি থাকা দরকার?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনি ডিরেক্টর, আপনার মতামতটাই সবচেয়ে জরুরি। তবে আপনাকে তো একবার বলেইছি। এখন উনি শুনুন। শোনানো হয়ে গেলে আমরা একটু আলোচনায় বসব। তখন কিন্তু আপনাকে থাকতেই হবে।”

অর্থাৎ ‘এখন আপনার না থাকলেও চলে’। ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ, আপনারা তা হলে কাজে লেগে যান, আমি একটু ওদিক থেকে ঘুরে আসি। খানিক বাদে এসে আপনাদের সঙ্গে যোগ দেব।”

ভাদুড়িমশাই চলে যাবার পরে মিসেস ঘোষ আর কোনও ভণিতার মধ্যে গেলেন না। ভ্যানিটি ব্যাগের ভিতর থেকে ভাঁজ-করা এক শিট কাগজ বার করে বললেন, “গল্পের আউটলাইনটা আমি এখানে লিখে রেখেছি। বলি?”

“নিশ্চয়।”

বাংলাটা মিসেস ঘোষ বলতে পারেন ভালই, তবে লিখতে পারেন না। আউটলাইনটা তাই ইংরেজিতে লিখে রেখেছেন। সেটা বলতেও শুরু করেছিলেন ইংরেজিতেই।

“দ্য হিরোইন ইজ আ ভিলেজ বেল….শি কামস অব আ ভেরি পুয়োর ফ্যামিলি…..ইন ফ্যাকট হার ফাদার ইজ আ ডেইলি ওয়েজ-আর্নার অ্যান্ড হ্যাজ টু ওয়ার্ক ফ্রম ডন টু ডাস্ক ইন দ্য হাউস অব আ ভেরি রিচ ম্যান……দেন ওয়ান ডে…….”

এই পর্যন্ত বলে মিসেস ঘোষ হঠাৎ কাগজ থেকে মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। সম্ভবত বুঝে নেবার চেষ্টা করলেন যে, ইংরেজিটা আমার বোধগম্য হচ্ছে কি না। কী বুঝলেন তিনিই জানেন, কিন্তু পরমুহূর্তে যখন আবার মুখ নামিয়ে পড়তে শুরু করলেন কাগজটা, তখন দেখলুম ইংরেজি নয়, বাংলা তর্জমা করে গল্পটা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

“বাবা তো একদিন জ্বরে পড়ল….খুব জ্বর….কাজে যাবার তাগদ নেই…. অথচ না-গেলে সেদিনকার ওয়েজ মিলবে না….তো কী আর করবে….নিজে না গিয়ে মেয়েটাকে কাজে পাঠাল।…আপনি ফলো করছেন তো?”-

একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলুম। মিসেস ঘোষের কথায় চমকে উঠে বললুম, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, ফলো করছিল মেয়েটাকে। খারাপ লোকেদের ওই তো কাজ, সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তারা ফলো করে।”

“ও নো,” মিসেস ঘোষ প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, “মেয়েটাকে ফলো করার কথা হচ্ছে না। জিজ্ঞেস করছিলুম যে, যা বলছি, আপনি ফলো করতে পারছেন কি না।”

লজ্জিত হয়ে বললুম, “আইম সরি। আপনি বলে যান।”

মিসেস ঘোষ আবার তাঁর প্লটের খেই ধরলেন। “মেয়েটা তার বাপের বদলে সেই বড়লোকটার বাড়িতে কাজ করতে গেল…..কিন্তু বড়লোকটার ছেলের মতলব খুব খারাপ…..একা পেয়ে হি আউটরেজড দ্য মডেস্টি অব দ্যাট পুয়োর গার্ল!”

এবারে আর অন্যমনস্ক হইনি। বললুম, “বড়লোকের ছেলেরা তো ওই করতেই আছে। তারপরে?”

“মেয়েটা বাড়িতে ফিরল……বাবাকে সব বলল….বাবা গেল ভিলেজ-পঞ্চায়েতের কাছে…. কিন্তু পঞ্চায়েতের যে কর্তা, বড়লোকটা তো তাকে টাকা খাইয়ে রেখেছিল……সে তাই কোনও স্টেপ নিল না…..অ্যান্ড ইন আটার ডেসপেয়ার দ্য পুয়োর ফেলো লিভস দ্য ভিলেজ উইথ হিজ ডটার। গ্রাম থেকে ওরা শহরে গেল…… কাজ খুঁজতে লাগল…..তো একটা কাজ পেয়েও গেল। এক ইয়াং পুলিশ অফিসারের বাড়িতে নোকর আর নোকরানির কাজ। ….ব্যাপারটা ধরতে পারছেন তো?”

আবারও একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলুম। কিন্তু এবারে আর সেটা বুঝতে দিলুম না। বললুম, “চমৎকার এগোচ্ছে। ওই লাস্ট সেনটেন্সটা আর একবার বলুন তো।”

“ইয়াং এক পুলিশ অফিসারের বাড়িতে ওরা নোকর আর নোকরানির কাজ পেয়ে গেল। কিন্তু ওরা যে বাপ আর মেয়ে, পুলিশ অফিসারটিকে তা জানতে দিল না।”

বললুম, “একটা কথা ভাবছি।”

“বলুন।”

“নোকর আর নোকরানির ব্যাপারটা আমার খুব জুতসই ঠেকছে না। তার চেয়ে বরং দীপক যা বলছিল, ওরা স্মাগলার কিংবা ডাকাত হয়ে যাক।

মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনিও তা-ই মনে করেন?”

বললুম, “দীপক তো কিছু খারাপ বলেনি।”

“না, তা বলেনি। ইন ফ্যাক্ট হি হ্যাজ আ পয়েন্ট দেয়ার। তবে আমি ভাবছিলুম যে, এটাকে বিগ ল্যান্ডহোল্ডার আর ল্যান্ডলেস অ্যাগ্রারিয়ান লেবারারদের একটা মুখোমুখি লড়াইয়ের দিকে নিয়ে যাব …মানে এটা তো আর একটা বি-গ্রেড হিন্দি ফিল্ম নয়, বাংলা ছবি। তো বাঙালি দর্শকদের জন্যে কিছু ফুড ফর থট তো দেওয়া চাই। নইলে তারা নেবে কেন? দেয়ার অ্যান এনটায়ারলি ডিফারেন্ট কাইন্ড তাব কাস্টমার্স।”

ভদ্রমহিলা বঙ্কুবাবুকে বিয়ে করেছেন এইটি ওয়ানে। তার মানে দশ বছর হল উনি একজন টাকার কুমিরের ঘরণী। অথচ, বাঙালি দর্শকদের চিন্তার খোরাক জোগাবার জন্যে ওঁর ঘুম হচ্ছে না। এমন একটা ছবি করতে চাইছেন, যাতে গরিবের মেয়ে বড়লোকদের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে ধর্ষিত হবে, তারপর কিছুকাল কষ্টভোগ করে বড়লোকের বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামবে।

আমার হাসি পাচ্ছিল। বললুম, “ঠিক আছে। কিন্তু লড়াইটা হবে কীভাবে? মানে, খবর পেলেই তো পুলিশ ফোর্স এসে হাজির হবে সেখানে!”

“বাট দ্যাট ইয়াং পোলিস-অফিসার উইল বি অন হার সাইড। তার সঙ্গেই তো মেয়েটার মোহব্বত হয়ে গেছে।”

মনের মধ্যে একটা সন্দেহ অনেকক্ষণ ধরেই দানা বাঁধছিল। প্রশ্ন করলুম, “সবই তো হল, কিন্তু ঘটনাগুলো ঘটবে কোথায়?”

“কেন, ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল।”

“যাচ্চলে, তা হলে ত্রিপুরায় এসে লোকেশান বাছাই করবার দরকার হল কেন?”

“এত সুন্দর একটা জায়গা, এটাকে কাজে লাগাব না?”

“কিন্তু নীরমহল? এটাকে দেখলেই তো লোকে ধরে ফেলবে যে, জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গ নয়।”

মিসেস ঘোষ হাসলেন, “ওটা ম্যানেজ হয়ে যাবে। ডিটেলস তো আপনি লিখবেন। সেখানে দেখিয়ে দেবেন যে, দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে ওই পুলিশ-অফিসারটি ত্রিপুরায় বেড়াতে এসেছে।”

“নোকরানিকে সঙ্গে নিয়ে?”

“কেন, নোকরানিকে সঙ্গে নিয়ে কেউ বেড়াতে যায় না?”

“তা হয়তো যায়, কিন্তু ফিল্ম-ক্রিটিকদের আমি চিনি তো, এটা তাদের খাওয়ানো একটু শক্ত হবে। কেন, নীরমহলকে বাদ দিলে কী হয়?”

“না না,” মিসেস ঘোষ প্রায় আঁতকে উঠে বললেন, “নীরমহলকে বাদ দেওয়া চলবে না। সেইসঙ্গে সিপাহিজলার সরকারি রেস্ট-হাউস আর উদয়পুরের ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরকেও এই ছবির মধ্যে রাখতে হবে।”

“কেন?”

“বা রে,” মিসেস ঘোষ সলজ্জ গলায় বললেন, “তিন জায়গায় আমি তিন রকমের ড্রেস পরব যে। সিপাহিজলায় বোটিং করবার সময় পরব সবুজ সালোয়ার আর হলুদ কামিজ, এখানে….. মানে এই নীরমহলে পরব স্টোন-ওয়াশ জিনসের ট্রাউজার্স আর ব্যাগি শার্ট, আর উদয়পুরে ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাব তো, তাই সেখানে লালপেড়ে গরদের শাড়ি পরে নেব।”

আমার মুখ দিয়ে কোনও কথাই সরছিল না। অনেক কষ্টে বললুম, “এ ছবির হিরোইনও কি তা হলে আপনিই হচ্ছেন?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “তা ছাড়া আর কে হবে। সুটেবল কাউকেই তো খুঁজে পাচ্ছি না।”

ঢোক গিলে বললুম, “কিন্তু নায়িকার বয়েস তো যদ্দুর বুঝতে পারছি খুবই কম। ভিলেজ-গার্ল, বিয়ে হয়নি, বয়েস তা হলে কতই বা হতে পারে, এই ধরুন সতেরো আঠারো। কি মেরেকেটে কুড়ি। তার বেশি তো হতেই পারে না।”

“ও নিয়ে ভাববেন না।” মিসেস ঘোষ বললেন, “হেমা মালিনী ‘সোলে’ ফিল্মে ভিলেজ-বেল হয়নি? বাট হেমা ইজ আ ক্লোজ ফ্রেন্ড, সো প্লিজ ডোন্ট আসক মি হেমার বয়েস তখন কত ছিল। না না, ও নিয়ে আপনার ভাববার কিছু নেই, ও আমি ম্যানেজ করে নেব। আপনি শুধু একটা অনুরোধ রাখুন।”

“বলুন।”

“আপনাদের বঙ্কু….মানে মিঃ ঘোষকে একটু বুঝিয়ে বলুন যে, গুচ্ছের টাকা ঢেলে বাইরে থেকে কাউকে নেবার দরকার নেই। হিরোইন এবারেও আমাকে করলেই ভাল হয়। তাতে শ্যুটিং নিয়ে যেমন ঝামেলা হবে না, তেমন ঘরের টাকা ঘরেই থাকবে।”

বললুম, “ঠিক আছে। কিন্তু মিঃ ভাদুড়ি তো ডিরেক্টর, তাঁর সঙ্গেও একটু কথা বলে নিলে ভাল হয়।”

উত্তরে মিসেস ঘোষ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বলা হল না। তার আগেই নীরমহলের সামনের দিক থেকে বিকট একটা চিৎকার ভেসে এল।

মিসেস ঘোষ একেবারে থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার? কে চিৎকার করে উঠল? মনে হল যেন রামুর গলা?”

চিৎকারটা শুনেই আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলুম। বললুম, “কিছুই তো বুঝতে পারছি না। দাঁড়ান, দেখে আসি।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “চলুন, আমিও যাচ্ছি।”

চিৎকারটা সামনের দিক থেকে এসেছিল। খানিকটা এগোতেই চোখে পড়ল, দীপক আর রাজেশ একটা বারান্দা থেকে ঝুঁকে পড়ে কিছু দেখছে। পরক্ষণেই তারা সিঁড়ির দিকে ছুটল।

যেখান থেকে তারা নীচের দিকে ঝুঁকে কিছু দেখছিল, সেইখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে আমি নীচের দিকে তাকালুম। যা দেখলুম, তাতে বুকের মধ্যে ধড়ন করে উঠল আমার। নীচে, মাটির উপরে, একটা লোক সটান শুয়ে রয়েছে। পরক্ষণেই বুঝলুম যে, সে রামু। মিসেস ঘোষ কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন, বলে মনে হল না। বললুম, “তাড়াতাড়ি নীচে চলুন। রামুর কিছু একটা হয়েছে।’

সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে গিয়ে দেখলুম, পীতাম্বর আমার আগে-আগে নামছে। বললুম, “কোথায় যাচ্ছ পীতাম্বর?”

পীতাম্বর বলল, “একটা চিৎকার শুনতে পেলুম। কার চিৎকার জানেন?”

“সম্ভবত রামুর। চলো চলো, আর দাঁড়িয়ে থেকো না।”

একতলায় সামনের দিকটায় গিয়ে যখন পৌঁছলুম, রামু তখন আর শুয়ে নেই, দাঁড়িয়ে উঠে দীপক আর রাজেশকে হাত-পা নেড়ে খুব উত্তেজিতভাবে কিছু বলছে। আমাদের মাঝিটিও সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখলুম। বুঝতে পারলুম, হঠাৎ একটা চিৎকার শুনে সে আর নৌকোর মধ্যে বসে থাকতে পারেনি, নৌকো ছেড়ে সামনের খাড়াই পথটুকু পেরিয়ে নীরাহুলের ল গোয়া জমিতে উঠে এসেছে। ভাদুড়িমশাইকে কিন্তু সেখানেও দেখতে পেলুম না।

দীপক আর রাজেশকে জিজ্ঞেস করলুম, “মিঃ ভাদুড়ি কোথায় জানো?”

“এই তো আমি।”

চমকে উঠে পিছন ফিরে দেখলুম, ভাদুড়িমশাই প্যালেস থেকে বেরিয়ে আসছেন। কাছে এসে বললেন, “একটা চিৎকার শুনতে পেলুম। কী হয়েছে?”

দীপক বলল, “ভীষণ ব্যাপার। ভাঞ্জাকে কেউ ইট ছুড়ে মেরেছে!”

রামুর পাশেই পড়ে রয়েছে একটা আস্ত ইট। সেইটে দেখিয়ে রাজেশ বলল, “ওটা যদি মাথায় লাগ্ত; তা হলে আর দেখতে হত না, মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যেত।”

মিসেস ঘোষ ছুটে গিয়ে রামুকে জড়িয়ে ধরলেন।

ভাদুড়ি মশাই বললেন, “কী হলে কী হত, সেটা পরে শুনব। কী হয়েছে, সেটা আগে শুনি। কী হয়েছিল রামু?”

রামু বলল, “ভিতরে আমার ভাল লাগছিল না; তাই ভাবছিলুম যে, নৌকোয় বসে আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করব। প্যালেস থেকে তাই বেরিয়ে আসি। কিন্তু নৌকোর দিকে কয়েক পা এগিয়েছি কি এগোইনি, এমন সময় উপর থেকে হঠাৎ ওই ইটটা আমার পাশে এসে পড়ে। আমি হকচকিয়ে যাই। কিন্তু তারপরেই মনে হয়, কেউ নিশ্চয় আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে। তক্ষুনি দু’হাতে মাথা আড়াল করে আমি মাটিতে শুয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুদ্ধির কাজ করেছ। উপরে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেয়েছিলে?”

“না।” রামু বলল, “ইটটা এসে আমার পাশে পড়বামাত্র আমি উপরের দিকে তাকিয়েছিলুম। মনে হল, ছাতের কার্নিস থেকে চট করে একটা ছায়া যেন সরে গেল। কিন্তু না, কাউকে দেখতে পাইনি।”


রাত্তিরের খাওয়ার পর্ব মিটেছে। চিংড়িমাছের মালাইকারি ছিল, ম্যানেজার বারবার অনুরোধ করছিলেন আর এক প্লেট করে গলদা চিংড়ি নেবার জন্যে, কিন্তু খাওয়ার দিকে আর কারও বিশেষ মনোযোগ ছিল না। কথাবার্তাও হচ্ছিল খুব কম। বলতে গেলে একরকম নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করে আমরা যে যার নিজের ঘরে ফিরে এসেছি।

বঙ্কুবাবু আদৌ তাঁর ঘর ছেড়ে নীচে নামলেন না। রামুর খবর শুনে তিনি যে উত্তেজিত হবেন, সেটা জানাই ছিল। কিন্তু এতটাই যে বিচলিত হয়ে পড়বেন, তা ভাবিনি। বারবার বলছিলেন, “লক্ষ্মণটা তো গেছেই, এবারে এটাও যাবে!” তখনই শুনলুম যে ভুবনেশ্বরেও নাকি রামুকে নিয়ে ারাত্মক একটা ব্যাপার হয়েছিল। ঘটনাটা এইরকম। সন্ধের সময় রামু তাদের বাড়ির ছাতে পায়চারি করছিল। ছাতের মাঝ বরাবর একদিকে তাদের ওভারহেড জলের ট্যাঙ্ক। পায়চারি করতে-করতে ট্যাঙ্কটা ছাড়িয়ে এক পা এগোনো মাত্র পিছন থেকে কেউ তার গলা টিপে ধরে। তার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে অজ্ঞান হয়ে যায়। কিন্তু না, সেবারেও সে কাউকে দেখতে পায়নি। এ হল গত অগস্ট মাসের ঘটনা।

বললুম, “এই ক-মাসের মধ্যে তো আর-কিছু ঘটেনি, তাই না?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা ঘটেনি, তবে ওই ব্যাপারটা ঘটবার পরেই বঙ্কু সতর্ক হয়ে যায়। ভুবনেশ্বর ছেড়ে ওর বাইরে যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদি বা যেত, রামুকে সঙ্গে না নিয়ে যেত না। এই যে কলকাতা হয়ে আগরতলায় এল, এটা আসলে ওর ট্যুরের ব্যাপার। আপনাকে তো বলেইছি, পাওনা টাকা আদায়ের জন্য মাঝেমধ্যে ওকে এইরকম ট্যুরে বেরোতে হয়। কিন্তু লক্ষ করুন, এবারেও ও রামুকে সঙ্গে না নিয়ে আসেনি। রামুকে আর-সকলের সঙ্গে আগরতলায় পাঠিয়ে ওই যে একটা বাড়তি দিন ওকে কলকাতায় থাকতে হল, ওই দিনটা ওর ঘোর দুশ্চিন্তার মধ্যে কেটেছিল। আমাকে পেয়ে যেন বর্তে গেল। বলল, রামুর একটা প্রোটেকশন দরকার, তুমি আমার সঙ্গে চলো ভাই। একে পুরনো বঙ্কু, তায় দু-হাত জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করছে, না এসে কি পারা যায়?”

বললুম, “তা তো হল, কিন্তু আপনিই বা কতদিন এদের সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরবেন? আপনার আরও হাজারটা কাজ পড়ে রয়েছে, খুব বেশি দিন তো আপনি থাকতে পারবেন না!”

“তা তো পারবই না। যা বুঝতে পারছি, রামুর জন্যে একটা পার্মানেন্ট ব্যবস্থা করা দরকার। দু’চারদিন দেখি, তার মধ্যে যদি একটা ফয়সালা হয়ে যায় তো ভাল, নয়তো ব্যাঙ্গালোর ফিরে গিয়ে আমাদের ব্যুরো থেকে আর-কাউকে পাঠিয়ে দিতে হবে।…..কিন্তু ও-কথা থাক, এখন এই বিজ্ঞাপনটা একবার দেখুন দেখি।”

স্যুটকেস খুলে ভাদুড়িমশাই একটা কাগজ বার করে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। দিল্লির হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকার একটা পুরনো পৃষ্ঠা, তার একটা জায়গায় একটা বিজ্ঞাপনের চারপাশে ফেল্ট পেন দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকা। নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন। তাতে ইংরেজিতে যা জানানো হয়েছে, তার বাংলা মোটামুটি এই : ‘নিশাকর ঘোষ, ডাকনাম লক্ষ্মণ, বয়স ২২, দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি, ছিপছিপে, শ্যামবর্ণ, লম্বা চুল, ডান কাঁধে ছোট্ট জড়ুল, গত ২০ মে দুপুরবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আর ফেরেনি। সেই সময়ে তার পরনে ছিল বাদামি রঙের ট্রাউজার্স ও নীল ডোরাকাটা সাদা শার্ট। কেউ খোঁজ পেলে নিম্নোক্ত ঠিকানায় জানান। খবর নির্ভুল হলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার…’

বিজ্ঞাপনের সঙ্গে ফোটোগ্রাফ। ফোটোগ্রাফটাই প্রথম আমার চোখে পড়েছিল, এবং তৎক্ষণাৎ আমি চমকে উঠেছিলুম। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, “এ তো রামুর ফোটো। শুধু চুলটা একটু অন্যরকম। এর চোখে অবশ্য চশমাও নেই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, ও লক্ষ্মণ। ওরই ভাল নাম নিশাকর। দিবাকর অর্থাৎ রামু ওর যমজ ভাই।”

“যমজ সে তো জানি, তাই বলে এত মিল?”

“অবাক হয়ে যাচ্ছেন তো?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “গোড়ায় গোড়ায় আমিও অবাক হয়ে যেতুম। এক রকম হাইট, গায়ের রংও একরকম, আর মুখচোখের মিল তো দেখতেই পাচ্ছেন। পরের দিকে অবশ্য দুজনের অমিলটাও ক্রমে-ক্রমে ফুটে উঠতে থাকে। চেহারার নয়, চরিত্রের অমিল। রামু একটু নিরীহ গোবেচারা গোছের, লক্ষ্মণটা ডাকাবুকো। রামু সারাক্ষণ পড়াশুনো নিয়ে থাকে, ছাত্র হিসেবে খুবই ভাল, খেলাধুলোর ধার ধারে না। লক্ষ্মণের উৎসাহ খেলাধুলোয়, বিশেষ করে ক্রিকেটে। পড়াশুনোয় ওর তেমন মন নেই। রামু একটু চাপা স্বভাবের, লক্ষ্মণ খোলামেলা। রামুকে তো দেখছেন, সারাটা দিন আপন মনে থাকে, বই পড়ে। এই যে দীপক আর রাজেশ, ওরা তো ওর সমবয়সী, কিন্তু ওদের সঙ্গেও খুব-একটা মেলামেশা করে না। লক্ষ্মণ এলে কিন্তু এখানকার চেহারাই পালটে যেত, গল্পগুজব আর হই-হল্লায় সবাইকে মাতিয়ে রাখত সারাক্ষণ।”

“অর্থাৎ দু-ভাইয়ের চরিত্র একেবারেই আলাদা?”

“একেবারেই আলাদা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “চেহারার ব্যাপারেও পার্থক্যটা ইদানীং স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রামু চশমা পরে, লক্ষ্মণের চশমা নেওয়ার দরকার হয়নি। অন্তত আমি যখন বছর পাঁচ-সাত আগে ওকে শেষ দেখেছি, তখনও দরকার হয়নি। তা ছাড়া, রামু তো দেখতেই পাচ্ছেন ছোট করে চুল ছাঁটে, লক্ষ্মণ কিন্তু আজকালকার ছেলেদের কায়দায় বেশ লম্বা করে চুল রাখতে আরম্ভ করেছিল। তাতে একটা সুবিধে হয়ে গিয়েছিল এই যে, কে রামু আর কে লক্ষ্মণ চট করে আমি সেটা চিনতে পারতুম।”

বললুম, “তা তো হল, কিন্তু রামুর উপরে হঠাৎ আবার এইভাবে হামলা শুরু হয়ে গেল কেন?”

“হামলা অনেক কারণেই শুরু হতে পারে, সেটা কোনও প্রশ্ন নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রশ্ন হচ্ছে, হামলাটা করছে কারা? কে না বলে ‘কারা’ বলছি সকালবেলার ঘটনার জন্যে। ওটা কারও একার কাজ হতে পারে না। ওর জন্যে অন্তত দু’জন লোক চাই।”

“এ-কথা কেন বলছেন?”

“কেন বলছি? একটু মাথা খাটালে আর এই প্রশ্নটা আপনি করতেন না। নিজেই ব্যাপারটা বুঝে নিতেন।”

“অন্য ব্যাপারে মাথা খাটানো যাবে, আপাতত আপনি এটা বুঝিয়ে বলুন। রামু গিয়েছিল দোতলার বাথরুমে। সেখানে বাথরুমের ভিতর থেকে কেউ তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এ-কাজ তো একজন লোক করতে পারে, দু’জনের কথা ভাবছেন কেন?”

ভাবছি এইজন্যে যে, এমনিতে রামুর মোটেই উপরের বাথরুমে যাবার কথা নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু সে উপরের বাথরুমে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কেন বাধ্য হয়েছিল? না বাগান থেকে ঘুরে এসে সে দেখেছিল যে, তার একতলার ঘরের অ্যাটাচড বাথরুমটা ভেতর থেকে বন্ধ। তা সেটা যে-ই বন্ধ করে থাক, সে জানত যে, একতলার অন্য দুটো বাথরুমও তখন খালি নেই, ফলে উপরের বাথরুমে না-গিয়ে রামুর উপায় থাকবে না। তা হলেই বুঝতে পারছেন যে, এ কাজ কারও একার নয়। রামুকে যাতে দোতলায় যেতে হয়, তার জন্য একজন বন্ধ করে রাখবে একতলার বাথরুমের দরজা, আর দ্বিতীয়জন তখন দোতলার বাথরুমে রামুর জন্য অপেক্ষা করবে।”

বললুম, “তা নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু দোতলাতেও তো দু-দুটো বাথরুম রয়েছে। রামু ঢুকতে গিয়েছিল আমার বাথরুমটায়। তার বদলে সে তো আপনার বাথরুমেও ঢুকতে পারত।”

“তা পারত বই কী।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু আপনি বোধহয় লক্ষ করেননি যে, আপনার ঘরের লাগোয়া একটা ছাত রয়েছে বলে আপনার বাথরুমটাও অনেক বেশি খোলামেলা, অন্তত তাতে আমারটার তুলনায় আলো অনেক বেশি। সুতরাং এটা হয়তো ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে, দুটো বাথরুমের মধ্যে আপনারটাই রামু বেশি পছন্দ করবে।”

একটুক্ষণ চুপ রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “কিংবা কে জানে, আমার বাথরুমটায় ঢুকতে গেলেও হয়তো এই একই ব্যাপার হত। অর্থাৎ সেটাতেও হয়ত লোক মোতায়েন ছিল। সেক্ষেত্রে অবশ্য ধরে নিতে হবে যে দুজন নয়, মোট তিনজন এ-ব্যাপারে ইনভলভড। কিন্তু আপাতত ওটাও আমি ভাবছি না।”

“কী ভাবছেন?”

“ভাবছি যে, ধাক্কা যদি মারলই তো এত আস্তে মারল কেন? তা হলে কি ধরে নিতে হবে যে, ধাক্কাটা যে মেরেছে, রামুকে সে একেবারে খতম করে দিতে চায়নি? স্রেফ ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিল?”

“এমনও হতে পারে যে, খতম করতেই চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি।”

দু-দিকে মাথা নাড়লেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “একবার নয়, দু-বার নয়, তিন-তিনবার হামলা হল রামুর উপরে। একবার ভুবনেশ্বরে ওদের বাড়ির ছাতে, আর আজ দু-বার। তিন-তিনটে অ্যাটেমট, অথচ একটাও সাকসেসফুল হল না। না মশাই, বিশ্বাস করা শক্ত। ও তো আর পেল্লাদ নয়। মার্ডার অ্যাটেম্‌টই যদি হত, তা হলে তাগটা বারবার ফশকাত না, একটা-না-একটা ঠিকই লেগে যেত। আমার ধারণা, ওকে ভয় দেখানো হচ্ছে।”

“কে ভয় দেখাচ্ছে?”

“সেটা পরে ভাবা যাবে, এখন নীরমহলের কথাটা ভাবুন। আপনি তখন কোথায় ছিলেন?”

বললুম, “হিরোইনের রোলটা কাকে দেওয়া হবে, তাই নিয়ে আমি তখন মিসেস ঘোষের সঙ্গে কথা বলছিলুম।”

“চিৎকার শুনেই আপনারা ছুটে আসেন?

“এক-আধ সেকেন্ড দেরি হয়ে থাকতে পারে। একেবারে হকচকিয়ে গিয়েছিলুন তো। তারপরেই সামনের দিকে ছুটে যাই।”

“ছুটে আসবার সময় কাউকে দেখতে পেয়েছিলেন?”

“দীপক আর রাজেশকে দেখতে পেয়েছিলুম। বারান্দা থেকে ঝুঁকে পড়ে তারা নীচের দিকে কিছু দেখছিল।”

“তাদের কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন?”

“ভেবেছিলুম জিজ্ঞেস করব, কিন্তু সময় পাইনি। হঠাৎই সেখান থেকে সিঁড়ির দিকে ছুটে গিয়ে তারা নীচে নামতে থাকে। কী দেখে তারা ছুটল, সেটা বুঝবার জন্য আমি তখন অতক্ষণ তারা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে গিয়ে নীচের দিকে তাকাই। দেখি, নীচে মাটির উপরে রামু পড়ে আছে। আমিও সঙ্গে-সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আসি।”

“মিসেস ঘোষ কী করছিলেন?”

“তিনি আমার পিছন পিছন আসছিলেন।”

“সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় আর কাউকে দেখেছিলেন?”

“পীতাম্বরকে দেখেছিলুম। দেখলুম, সে আমার ঠিক আগে আগে নামছে। তবে তার আগে পর্যন্ত সে কোথায় ছিল জানি না।”

“পীতাম্বর আমার কাছাকাছিই ছিল।” একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চিৎকারটা শুনে ও আর দেরি করেনি, নীচে নামতে থাকে। যা-ই হোক, আপনি যা বললেন, দ্যাট অ্যাবাউট কভারস এভরিওয়ান।”

“আপনি কোথায় ছিলেন?”

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “ছাতে। তবে নজরটা আকাশের দিকে ছিল না, ওটা সারাক্ষণ মাটির দিকেই রেখেছিলুম।”

“কাকে সন্দেহ হয়? দীপককে?”

“না। অন্তত নীরমহলের ব্যাপারটায় না। সিপাহিজলার ঘটনা কারা ঘটিয়েছে, তা আমার জানা নেই। তবে নীরমহলের ব্যাপারে যেমন দীপক, তেমন রাজেশকেও আমার সন্দেহের বাইরে রাখছি। আর পীতাম্বর যে সারাক্ষণ আমার কাছাকাছিই ছিল তা তো বললুমই।”

“দীপক আর রাজেশকে আপনি সন্দেহ করছেন না কেন?”

“এইজন্যে করছি না যে, ছাত থেকে আমি ওদের দুজনের উপরেই নজর রেখেছিলুম। না, ওই ইট আর যে-ই ফেলে থাকুক, ওরা ফেলেনি।”

“কিন্তু ইটটা তো ফেলা হয়েছিল। কে ফেলল? ভূতে?”

ভাদুড়িমশাই আবার একগাল হাসলেন। তারপর সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে, সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে ফেলে, গলগল করে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “ঠিক দুক্কুরবেলা ভূতে মারে ঢেলা। না মশাই, পুরনো অনেক রাজবাড়িতে ভূতের উপদ্রব আছে বলে শুনেছি, কিন্তু নীরমহল তো তেমন পুরনো রাজবাড়ি নয়, ভেঙেচুরে গেছে ঠিকই কিন্তু বয়েস এখনও ষাট হয়নি। এ-সব অর্বাচীন বাড়ি ভূতেরা বিশেষ পছন্দ করে না।”

“তা হলে?”

“তা হলে আর কী, ওখানে যা ঘটেছে, তা মানুষই ঘটিয়েছে। কিন্তু সে-কথা এবং থাক। মিসেস ঘোষের সঙ্গে সময়টা কী রকম কাটল বলুন।”

“ওরে বাবা, উনি তো শুধু স্টোরির আউটলাইন লিখেই খুশি নন, হিরোইনের রোলটাও করতে চাইছেন। বলছেন যে, তাতে যেমন ঘরের টাকা ঘরেই থাকবে, তেমনি শ্যুটিংয়ের ডেট নিয়েও ঝামেলা পোহাতে হবে না।”

“আপনি ডিসকারেজ করেননি তো?”

অবাক হয়ে বললুম, “আপনিও কি পাগল হলেন নাকি? হিরোইন এক ভিলেজ বেল। সাদা বাংলায় গাঁয়ের এক সুন্দরী বালিকা। বয়েস কত? না মেরেকেটে কুড়ি। তা ওই রোলে ওঁকে মানাবে?”

“তা একটু বেমানান হবে ঠিকই।”

“একটু?” আমার চোখ প্রায় কপালে উঠবার জোগাড়। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে ললুম, “ওয়েল, দ্যাট টেকস দি কেক। আপনিই তো বলছিলেন যে, ওঁর বয়েস এখন পঁয়তাল্লিশ।”

“তা হয়তো বলেছি কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। কেউ কুড়িতেই বুড়িয়ে যায়, কেউ ষাটে সটান থাকে।”

“ও-সব কথা ছাড়ুন, মিসেস ঘোষের এখন মা-মাসির রোলে নামা উচিত, অন্তত এই গল্পের নায়িকার যে বয়েস, তাতে ওঁকে মানাবে না।”

“এই কথা আপনি ওঁকে বলেছেন?”

“তা অবশ্য বলিনি।….মানে ঠিক ওইভাবে বলিনি।”

“ঠিক কী হয়েছিল বলুন তো?”

“বলছি। গল্পের ঘটনাস্থল নাকি ওয়েস্ট বেঙ্গল। তাই শুনে আমি বললুম, ত্রিপুরার এইসব জায়গাগুলো তা হলে ছবির মধ্যে ঢুকবে কী করে? তাতে উনি বললেন, সিপাহিজলা নীরমহল আর উদয়পুরের ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর মন্দিরকে এ-ছবিতে ঢোকাতেই হবে, তার কারণ এই তিন জায়গায় হিরোইনের ভূমিকায় উনি তিন রকমের পোশাক পরবেন। শুনে আমি বলি, হিরোইনের বয়েস তো মাত্র সতেরো আঠারো। তাতে উনি ‘সোলে’ ছবিতে হেমা মালিনীর রোলের কথা তুলে বললেন যে, বয়েসটা কোনও ফ্যাক্টর নয়, ওটা নাকি মেক-আপে ম্যানেজ হয়ে যাবে।”

ভাদুড়িমশাই হাসছিলেন। বললেন, “বাস বাস, যা বলেছেন ওই যথেষ্ট। সরাসরি ওঁকে ‘মানাবে না’ বলে দেননি তো?”

“না না, তা কেন বলব? বলা কি যায়? কোনও ভদ্রমহিলাকে কেউ মুখের উপরে ওইভাবে কিছু বলতে পারে? না না, ওভাবে কিছু বলিনি।”

“বুদ্ধির কাজ করেছেন। আর তা ছাড়া একটা কথা মনে রাখুন। পাঁটা যার, সে-ই ঠিক করবে যে, পাঁটার মাথার দিকে কোপ মারা হবে, না ন্যাজের দিকে। হিন্দিতেও এই রকমের একটা কথা আছে। যাঁর বাদর, সে-ই নাচাবে। এ-ব্যাপারে আর কারও কথা বলবার কোনও এক্তিয়ার নেই।”

“তার মানে এ ছবিও ফ্লপ।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এর আগে চারটে ছবি ফ্লপ হয়েছে। আর-একটা হলে ক্ষতি নেই। মোট কথা, ‘এমন কিছু করবেন না যাতে ছবি তোলার এই তোড়জোড়টাই বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হলে মিসেস ঘোষের তো কোনও ক্ষতি নেই। উনি আর-একটা প্লট ঠিক করে আর-এক জায়গায় ছবি তুলবার বায়না ধরবেন। বঙ্কু হয়তো তাতে রাজি হবে না, কিন্তু আমাদের কাজটা যে পিছিয়ে যাবে, সেটা তো ঠিক।”

“আমাদের কাজটা আপাতত কী?”

“রামুকে কারা ভয় দেখাচ্ছে আর কেনই বা ভয় দেখাচ্ছে, সেটা বোঝা। যদি বুঝতে পারি, তা হলে…।”

ভাদুড়িমশাই কথাটা শেষ করলেন না। বললুম, “তা হলে কী?”

“এখন সেটা বলবার সময় আসেনি। তবে যদ্দুর মনে হয়, ‘আই’ম অন দ্য রাইট ট্র্যাক।”

“আমাকে কী করতে হবে?”

“আপনাকে মাত্র একটাই কাজ করতে হবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মিসেস ঘোষ যা-ই বলুন প্রতিবাদ করবেন না। জাস্ট প্লে অ্যালং।…নিন, অনেক রাত হয়েছে, এবারে ঘুমিয়ে পড়ুন।”

চশমার আড়ালে – ১০

আমার ঘুম ভাঙতে-ভাঙতে সাধারণত একটু দেরি হয়ে যায়। তাও বাসন্তী যতক্ষণ না এসে ঠেলা মেরে তুলে দিচ্ছে, ততক্ষণ আমি বিছানা ছেড়ে উঠি না, ঘুম ভাঙবার পরেও বেশ কিছুক্ষণ মটকা মেরে পড়ে থাকি। আজ ভাদুড়িমশাইও ঠেলাঠেলি করেননি, তবু ভাল করে রাত না পোহাতেই আজ ঘুম ভেঙে গেল। ঘরে একটা জিরো-পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। পাশ ফিরে দেখলুম, ভাদুড়িমশাইয়ের বিছানাটা খালি। বুঝতে অসুবিধে হল না, তিনি বাথরুমে ঢুকেছেন। ঘরের সামনে ছোট বারান্দা। বিছানা থেকে নেমে, চটিতে পা গলিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম। চোখ জুড়িয়ে গেল। আকাশে তখন অল্প-অল্প আলো ফুটছে। সেই আলো আর-একটু স্পষ্ট হতেই জলার ওদিকে ঝলমল করে উঠল নীরমহল। একটা পাখি কোথাও ডেকে উঠল। আর সঙ্গে-সঙ্গে সাড়া পড়ে গেল চতুর্দিকে। মনে হল ওই ডাকটার জন্যেই যেন প্রতীক্ষা করছিল হাজার-হাজার পাখি, একইসঙ্গে তারা এবারে সাড়া দিয়ে উঠেছে।

“চলুন, একটু ঘুরে আসা যাক।”

কখন যে ভাদুড়িমশাই আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, বুঝতে পারিনি। তাঁর গলা শুনে তাই চমকে উঠেছিলুম। বললুম, “আজ তো আমরা উদয়পুরে যাব, তাই না?”

“সে তো বেলা হলে। চা-জলখাবার না-খেয়ে তো আর বেরুনো হচ্ছে না, তার অনেক আগেই আমরা ফিরে আসতে পারব।”

নীচে নেমে জলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালুম। দেখা গেল, দুটো নৌকো সেখানে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। শিকল দিয়ে তালা লাগানোর ব্যাপার নয়, স্রেফ দড়ি দিয়ে বাঁধা। ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, নৌকা যখন রয়েছে, তখন আর ভাবনা কী। কাল যা কাণ্ড হল, তাতে তো জায়গাটা আপনার ভাল করে দেখাই হল না।”

“যাব যে, মাঝি কোথায়?”

“সম্ভবত ঘুমোচ্ছে। এখন যদি তার জন্যে বসে থাকি তো বেলা বেড়ে যাবে। আর তা ছাড়া, মাঝির দরকারই বা কী। লগি যখন রয়েছে, তখন আমিই চালিয়ে নিতে পারব।”

“কিন্তু চৌকিদারকে তো একবার জানিয়ে যাওয়া দরকার।”

“ফিরে এসে জানালেই হবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিন, আর দেরি করবেন না, উঠে পড়ুন।”

পাশাপাশি দুটো নৌকোর একটায় উঠে পড়লুম। তারপর খুঁটির সঙ্গে বাঁধা দড়ি খুলে, লগিটা হাতে নিয়ে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “নৌকোটা আমিই চালাচ্ছি। আমি পূর্ববঙ্গের মানুষ, অন্তত এ-কাজটা আপনার চেয়ে আমি বোধহয় ভাল পারব।”

নীরমহলে পৌঁছতে মিনিট কুড়িও লাগল না। নৌকোটা পাড়ে ভিড়িয়ে, একটা পাথরের সঙ্গে নৌকোর দড়ি বেঁধে রেখে খাড়াই পথ ধরে আমরা উপরে উঠে এলুম।

বিশাল বাড়ি। কাল তবু কিছু লোকজন ছিল, আজ মাত্র আমরা দুটি প্রাণী। মনে হচ্ছিল যেন বিশাল একটা প্রাসাদ নয়, ভয়ঙ্কর এক শূন্যতার হাঁয়ের মধ্যে এসে আমরা ঢুকেছি। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে আমরা উপরতলায় উঠে ‘লুম। তখনও ভাল করে আলো ফোটেনি, বাগানে, বারান্দায়, সিঁড়িতে আর প্রকাণ্ড এক-একটা ঘরের মধ্যে চলেছে রহস্যময় আলো-আঁধারির খেলা। যে-খেলা দেখে, কী জানি কেন, গা-ছমছম করে। কোনও কারণ নেই, তবু এইরকম একটা অনুভূতি ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকে যে, আমাদের চোখের আড়ালে, কিন্তু খুব কাছেই, কোনও একটা ষড়যন্ত্র চলেছে। ঘুলঘুলির ভিতর দিয়ে বাতাস বয়ে যাবার শব্দকেও চাপা-গলার কথা বলে মনে হয়। সেইসঙ্গে এমনও একটা আশঙ্কা জেগে ওঠে যে, কিছু একটা ঘটবে, তার আর খুব বেশি দেরি নেই।

প্রাসাদের যে-দিকটা অন্দরমহল, সেই দিকে দিয়ে আমরা দোতলায় উঠেছি। কয়েকটা চাতাল আর ঘর আমাদের দেখাও হয়ে গেছে। এবারে সামনের দিকে যাব। এক-টুকরো লনের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ওদিকে চলে গেছে। ঘর থেকে সেই রাস্তায় নামবার জন্যে পা বাড়াতে যাচ্ছি, হঠাৎ ভাদুড়িমশাই নিঃশব্দে আমাকে বাধা দিলেন। অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি মুখের সামনে একটা আঙুল তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ এখন কথা বলা চলবে না। পরক্ষণেই তাঁর ডান হাতের তর্জনী সামনের দিকে ঘুরে গেল। নির্দেশ মতো সামনের দিকে তাকাতেই ছলাত করে উঠল আমার বুকের রক্ত। বাগানের পাশের পথ ধরে সামনের দিকের যে ঘরটায় যাব বলে পা বাড়িয়েছিলুম, তার ভিতর থেকে একটি লোক বেরিয়ে আসছে। আকাশে আলো ফুটেছে, কিন্তু ওদিকটা এখনও ছায়াচ্ছন্ন। লোকটি যে কে, বুঝতে পারলুম না। ঘর থেকে বেরিয়ে, ডাইনে ঘুরে সে সিঁড়ি ধরে নীচে নেমে গেল।

একটু বাদেই নীচের তলা থেকে জলের শব্দ পাওয়া গেল। মনে হল, এককালে এই রাজবাড়ির অন্দরমহলের যে ঘাটে এসে নৌকো ভিড়ত শব্দটা সেইদিক থেকে আসছে। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেউ নৌকো নিয়ে এখানে এসেছিল, এখন ফিরে যাচ্ছে।”

বললুম, “লোকটাকে চিনতে পারলেন?”

“ভাল করে দেখতে পাইনি। একে তো অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছি, তার উপর ওর মুখটা ওদিকে ফেরানো ছিল তো, তাই দেখা গেল না। তবে হাঁটার ভঙ্গি আর অন্য দু-একটা জিনিস থেকেও কিছুটা আন্দাজ করা যায়।”

“কী আন্দাজ করলেন?”

“আন্দাজটা ঠিক কি না, সেটা আগে বুঝে নিই, তারপরে বলব।”

“লোকটা এখানে কী করতে এসেছিল, সেটা বুঝতে পারলেন?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সে তো শেষ-রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠেই বুঝেছি। আপনি যদি আর-একটু আগে শয্যাত্যাগ করতেন, তো আপনিও বুঝতে পারতেন।”

কিছুই বোধগম্য হল না। শুধু এইটুকু বুঝলুম যে, ভাদুড়িমশাই এখন আর এ নিয়ে কোনও কথা বলতে রাজি নন। বললুম “ঠিক আছে, তা হলে এখন ফেরা যাক। নাকি তারও কিছুক্ষণ থাকবেন এখানে?”

“এমনিতে তো থাকবার কোনও কারণ নেই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে এখুনি যদি ফিরি, তো লোকটা বুঝে ফেলবে। আগে ও জলাটা পার হোক।”

আমরা গিয়ে নৌকোয় উঠলুম আরও মিনিট পঁচিশেক বাদে। তখন সূর্য উঠে গেছে, রোদ্দুর পড়ে ঝিকমিক করছে গোটা জলা। টুরিস্ট লজে গিয়ে যখন পৌঁছলুম, তখন সাড়ে ছ’টা বাজে। অথচ, মজার ব্যাপার, আমাদের দলের অনেকেরই তখনও ঘুম ভাঙেনি।

ঘরে ঢুকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যান, আপনি এবারে স্নান করে নিন।”

স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলুম, ভাদুড়িমশাই ঘরে নেই। পাশের ঘরে সস্ত্রীক বঙ্কুবাবু থাকেন। জামাকাপড় পালটে তৈরি হয়ে বঙ্কুবাবুর ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকবার দরকার হল না, দরজা খোলাই ছিল। যা ভেবেছিলুম তা-ই। ভাদুড়িমশাই আর বঙ্কুবাবু সেখানে বসে গল্প করছেন। বঙ্কুবাবুর দৃষ্টিশক্তি যতই দুর্বল হোক, কান সজাগ। পায়ের শব্দে বুঝতে পেরেছিলেন, কেউ ঘরে ঢুকেছে। বললেন, “কে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিরণবাবু।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আরে আসুন, আসুন।”

এ-ঘরে গোটা দুই বাড়তি চেয়ার রয়েছে। তার একটায় বসে বললুম, “মিসেস ঘোষ কোথায়?”

“তিনি বাথরুমে ঢুকেছেন স্নান সেরে বেরুতে তাঁর সময় লাগবে। তাই চারুকে ডেকে পাঠিয়ে কথা বলছিলুম।”

“আপনার নিশ্চয় স্নান হয়নি এখনও?”

“তা হয়নি, তবে তাড়া তো নেই।”

বললুম, “আমাদের বাথরুমটা তো খালি। ইচ্ছে করলে সেখানে গিয়েও আপনি স্নান সেরে নিতে পারেন।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “তার দরকার হবে না।…..কিন্তু এদিকে একটা মুশকিল হয়েছে।”

“আবার কী মুশকিল হল?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর বলবেন না। এখানে যারা চিংড়িমাছের চাষ করে, তারা বলছে কাল রাত্তিরে কেউ এদিক থেকে একটা নৌকো নিয়ে নীরমহল গিয়েছিল। তা চিংড়িমাছ ধরবার জন্যে এই যে জলের তলায় বাক্স রেখে দেওয়া হয়, তার নিশানা থাকে তো। নৌকো চালাবার সময় সেই নিশানাগুলো বাঁচিয়ে চলতে হয়। তো যে-ই কাল রাত্তিরে নৌকো নিয়ে ওদিকে গিয়ে থাক, নিশানাগুলো সে বাঁচিয়ে চলেনি। নৌকোর ধাক্কা লেগে তা, অনেকগুলো নাকি ভেসে গেছে। ফলে তারা মুশকিল পড়েছে, কোথায় কোথায় বাক্স পুঁজেছিল, নিশান না থাকায় তার হদিশ করতে পারছে না।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “শুনলুম, আজ ভোর না-হতেই আনারা একবার নীরমহলে গিয়েছিলেন। তা-ই?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো তোমাকে বললুমই। কিন্তু না, আমি নজর রেখেছিলুম কিরণবাবু ও-সব নিশানার ধারেকাছেও যাননি।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “সে তো ওরাও বলছে। ওরা রাত জেগে মাছ পাহারা দেয়। ওরা তোমাদের কথা বলছে না। বলছে, তোমরা ওদিকে যাবার তা প্রায় ঘন্টা দুয়েক আগে একটা নৌকো নিয়ে এদিক থেকে কেউ নীরমহলে গিয়েছিল।”

বলতে যাচ্ছিলুম, যে গিয়েছিল, চিনতে না পারলেও তাকে আমরা দেখেছি। কিন্তু ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকাতে তিনি চোখের ইশারায় আমাকে চুপ করে যেতে বললেন। বঙ্কুবাবু বললেন, “কে গিয়েছিল, বুঝতে পারছি না। ওরা বলছে, সে আমাদেরই লোক। কথাটা হয়তো মিথ্যেও নয়। তার কারণ, ট্যুরিস্ট লজে কাল রাত্তিরে শুধু আমরাই ছিলুম।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিশানাগুলো ভেসে যাওয়ায় ওদের খুব ক্ষতি হল।”

বঙ্কুবাবু তাঁর একখানা হাত তুলে মাছি তাড়াবার মতন একটা ভঙ্গি করে বললেন, “তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। ক্ষতি যখন হয়েছে, তখন ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কি আর হবে না। যা-ই দাবি করুক, দিয়ে দেব। ইন ফ্যাক্ট, কত টাকা ওদের দিতে হবে, পীতাম্বরকে তা আমি জেনে আসতেও বলেছি। না না, ওটা কোনও ব্যাপার নয়। আমি ভাবছি, মাঝরাত্তিরে এখান থেকে কে ওদিকে গেল, আর সে গেলই বা কেন একে তো রামুর মাথা তাক করে ওখানে ইট ছোড়া হয়েছিল, তার উপরে আবার এই ব্যাপার। না হে চারু, এ-সব আমার একটুও ভাল লাগছে না। শেষে না হিতে বিপরীত হয়।”

“অর্থাৎ?”

“অর্থাৎ আর কী, ভুবনেশ্বরে ফিরে যাব।”

“মিসেস ঘোষের ফিল্মের কী হবে?”

“গুলি মেরে দাও। ফিল্ম হবে না।”

“না হলে কী হবে, সেটা ভেবে দেখেছ?” এমনিতেই নিচু গলায় কথা বলছিলেন ভাদুড়িমশাই। এবারে গলার স্বর আরও নামিয়ে বললেন, “গোটা প্ল্যানটাই তা হলে ব’নচাল হয়ে যাবে। আর তা ছাড়া, ভুবনেশ্বরই কি খুব সেফ জায়গা? সেখানেও যে রামুর উপরে হামলা হয়েছিল, সেটা ভুলে যাচ্ছ কেন?”

“তা বটে।” বঙ্কুবাবু কয়েক মুহূর্তে চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তা হলে আমাকে কী করতে বলো?”

“আমি বলি, উদয়পুরে চলো। তাতে আমি আরও একটা দিন সময় পাচ্ছি। এর মধ্যে হয়তো আরও দু-একটা ব্যাপার আমার নজরে আসবে। তেমন বুঝলে আমিই তোমাকে ভুবনেশ্বরে ফিরে যেতে বলব। হয়তো আমিও তখন যেতে চাইব তোমার সঙ্গে।”

বাথরুম থেকে জল পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল এতক্ষণ। শব্দটা বন্ধ হতেই ভাদুড়িমশাই উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “তা হলে ওই কথাই রইল। তুমি তৈরি হয়ে নাও। আমরা চলি।”

বঙ্কুবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা নিজেদের ঘরে চলে এলুম।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বললুম, “বঙ্কুবাবু খুব ঘাবড়ে গেছেন মনে হল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এমন অবস্থাতে পড়লে সবাই একটু ঘাবড়ায়। এটা কিছু আশ্চর্য ব্যাপার নয়। একটা ছেলে নিখোঁজ। অন্যটার উপরেও দুমদাম হামলা হচ্ছে। যা সব ঘটছে, তাতে কে না ঘাবড়ায় বলুন।”

“তা বটে।”

“এখন একটা কথা বলুন দেখি। আমি তো আপনার হয়ে খুব সাফাই গাইলুম, কিন্তু জলার ওই নিশানাগুলো ভাসিয়ে দেবার কাজটা আপনার দ্বারাই হয়নি তো?”

“মোটেই নয়।” জোরগলায় বললুম, “হতে পারত, যদি না কাল দুপুরেই আপনি আমাকে জানিয়ে দিতেন যে, ওই নিশানাগুলো দেখেই বুঝে নেওয়া হয়, মাছ ধরবার বাক্সগুলো জলের তলায় ঠিক কোন-কোন জায়গায় রেখে দেওয়া হয়েছে। সে-কথা জানবার পরেও নিশানাগুলোকে ডিসটার্ব করব কি ভাসিয়ে দেব, আমি কি এতই বোকা নাকি?

“অর্থাৎ, এ-কাজটা সে-ই করেছে, আমাদের বেশ খানিকটা আগেই একটা নৌকো নিয়ে যে কিনা এদিক থেকে নীরমহলে গিয়েছিল।”

বললুম, “তা তো বটেই। কিন্তু সে কে?”

“এর উত্তর তো সেই আগের কথাতেই দিতে হয়। তাকে আপনিও দেখেছেন, আমিও দেখেছি। কিন্তু একে তো দূর থেকে দেখেছি, তার উপরে আবার আবছা অন্ধকারের মধ্যে দেখা। তাও লোকটার মুখটা ছিল ফেরানো। মুখটা তাই দেখতে পাইনি। তা হলে আর কী করে বলব যে, সে কে। তবে হ্যাঁ, আন্দাজ একটা করেছি। আন্দাজটা যে আর-একটু আগে ঘুম থেকে উঠলে আপনিও করতে পারতেন, তাও বলেছি আপনাকে। কিন্তু না, স্রেফ আন্দাজের উপরে নির্ভর করে এখুনি তাকে শনাক্ত করাটা ঠিক হবে না। বরং আর-একটু দেখি। লক্ষণগুলো আর-একটু মেলাই।”

ন’টা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করতে নামলুম আমরা। উদয়পুরের পথে রওনা হতে-হতে প্রায় দশটা বাজল। গাড়ির সেই একই ব্যবস্থা। বঙ্কুবাবু, মিসেস ঘোষ, রামু আর পীতাম্বর অ্যাম্বাসাডারে। দীপক, রাজেশ আর আমি মারুতিতে। অ্যাম্বাসাডারটা বিজু চালাবে। মারুতির চালক ভাদুড়িমশাই। অ্যাম্বাসাডার আমাদের আগে রওনা হতেই মারুতি তার পিছু ধরল।

আগরতলা থেকে যে-পথ দিয়ে সিপাইহিজলায় এসেছিলুম, সিপাহিজলা থেকে সাগরমহলে আসার পথের সঙ্গে তার খুব-একটা তফাত চোখে পড়েনি। মাঝে-মাঝে ঢেউ-খেলানো হলেও দুটোই মোটামুটি সমতল। এবারে সাগরমহল থেকে উদয়পুরে যাবার সময় দেখলুম রাস্তার চেহারা ক্রমেই পালটে যাচ্ছে। যা ছিল সমতলভূমি, ক্রমে ক্রমে তার বিস্তার যেন গুটিয়ে যাচ্ছে। এখানে-ওখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে ছোট-বড় সব টিলা। আর একটু বাদেই শুরু হয়ে গেল পাহাড়িয়া পথ। দার্জিলিংয়ের মতো শার্প বেন্ড না-থাকলেও রাস্তাটা একটু ঘোরালোই বটে। ঘুরতে-ঘুরতে কখনও উপরে উঠে যাচ্ছি, কখনও নামছি নীচের দিকে।

দীপক আর রাজেশ এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি। এবারে পিছন থেকে দীপকের গলা পাওয়া গেল। “মিঃ চ্যাটার্জি, এই রাস্তাটাকে কাজে লাগাবেন না?”

‘কীভাবে লাগাব?’

“ধরুন সামনের ওই অ্যাম্বাসাডারটায় ভিলেন পালাচ্ছে। আর যে হিরো, সে এই মারুতি চালিয়ে ফলো করছে তাকে। একেবারে ব্রেক-নেক স্পিড। উঃ, পাহাড়ের একটু উপর থেকে কিন্তু দারুণ ছবি তোলা যায়।”

বললুম, “ছবি তো রাজেশের ব্যাপার। …ওহে রাজেশ, তুমি কী বলো?”

রাজেশ কোনও উত্তর দিল না। পিছন ফিরে দেখলুম, সে অকাতরে ঘুমুচ্ছে।

গোমতী নদী পেরিয়ে একটু বাদেই আমরা উদয়পুরে ঢুকলুম। ত্রিপুরার এটা পুরনো রাজধানী এখানে ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর মন্দিরের কাছে একটা রেস্ট-হাউসে আমাদের থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে। সেখানে গিয়ে যে যার ঘরে ঢুকে পড়লুম। আমাদের ঘরে একটা ইজিচেয়ার রয়েছে। ভাদুড়িমশাই তাতে গা ঢেলে দিয়ে বললেন, “রাজেশ কেন ঘুমুচ্ছিল জানেন?”

“কেন?”

ভাদুড়িমশাই রহস্যময় হাসলেন। বললেন, “কাল রাত্তিরে ওর একটুও ঘুম হয়নি।”

১১
এই গেস্ট-হাউসটা একতলা, তবে বেশ ছড়ানো। সামনে-পিছনে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। একটা বাগানও রয়েছে। সেটায় অবশ্য যত্নের ছাপ বিশেষ নেই। ফুলগাছগুলো যে-যার ইচ্ছেমতো ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে;দেখলেই বোঝা যায় যে, যত্ন করে কেউ তাদের ছাঁটে না। এখানে-ওখানে কিছু আগাছাও জন্মেছে। সেগুলো উপড়ে ফেলা দরকার। ঘাসগুলোও সমানভাবে ছাঁটা নয়। একদিকে একটা লন মোয়ার পড়ে রয়েছে। দেখেই বোঝা যায়, অনেক দিন সেটাকে কেউ কাজে লাগায়নি।

ম্যানেজারকে এই নিয়ে প্রশ্ন করেছিলুম। তিনি বললেন, যে-লোকটা মালির কাজ করে, পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে সে আগরতলায় গেছে, অথচ এদিকে এক মাস কেটে গেল, তবু ফিরবার নাম নেই। ফলে বাগানের এই হাল। এখন তো তবু বাগান বলে চেনা যাচ্ছে, আর-কিছুদিন যাক, তখন আর জঙ্গলের সঙ্গে এর বিশেষ তফাত থাকবে না।

বাগানের অবস্থা দেখে মন খারাপ হয়েছিল ঠিকই, তবে সামনে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। রাস্তার একদিকে এই গেস্ট হাউস, অন্যদিকে একটা বিশাল দিঘি। দিঘিতে নামবার জন্যে বাঁধানো ঘাট রয়েছে। টলটলে জলের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এক্ষুনি এই ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে দিঘিতে নেমে যাই।

ভাদুড়িমশাই আমার মনের কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন নিশ্চয়। তাই মৃদু হেসে বললেন, “সম্ভব নয়।”

“নয় কেন?”

“আধ ঘণ্টার মধেই লাঞ্চের ডাক পড়বে। তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা লোকেশন বাছাই করতে বেরিয়ে পড়ব।”

“ও হ্যাঁ, ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে যেতে হবে।” হেসে বললুম, “মিসেস ঘোষ যে লালপেড়ে গরদের শাড়ি পরে, কপালে একটা মস্ত সিঁদুরের টিপ চড়িয়ে পুজোর ডালি হাতে নিয়ে মন্দিরে যাবেন, ছবির এই ভাইটাল দৃশ্যটার কথাই আমার মনে ছিল না।”

“শুধু এই দৃশ্যটা কেন, অনেক কিছুই ইদানীং আপনার মনে থাকছে না। কিন্তু না, শুধু ত্রিপুরেশ্বরীর নন্দির নয়, খুব পুরনো একটা শিবমন্দিরও রয়েছে এখানে। পোড়ামাটির মন্দির। সেটাও দেখতে হবে। আর তা ছাড়া, এমনিতেও এই শহরটা একটু ঘুরে দেখা দরকার।”

“তা হলে কখন দিঘিতে নামব?”

“কেন, বিকেলের দিকে নামলে ক্ষতি কী। নাকি বিকেলে স্নান করলে আপনার শরীর খারাপ হবে?”

“আর ধুর মশাই, আমার শরীর অত পলকা নয়।”

“তা হলে ওই কথাই রইল। এখন চলুন, ঘরে যাওয়া যাক।”

গেস্ট হাউসে তিন-বিছানার ঘর নেই। ঘরগুলো বড়ও নয় বিশেষ। তাই বাড়তি একটা খাটও কোথাও ঢোকানো যাচ্ছে না। বঙ্কুবাবুকে এই কথাটা জানাতে তিনি বলেছিলেন, তার দরকারই বা কী, পাঁচটা ডাবল-বেডের ঘর নিয়ে নিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।”

তা-ই নেওয়া হয়েছে। একটা ঘরে সস্ত্রীক বঙ্কুবাবু থাকবেন, একটা ঘরে ভাদুড়িমশাই আর আমি, একটা ঘরে রাজেশ আর দীপক, একটা ঘরে পীতাম্বর আর বিজু। পঞ্চম ঘরটা একা রামুর দখলে। বঙ্কুবাবু তাতে অবশ্য রাজি হতে চাইছিলেন না। বারবার বলছিলেন, “রামু কেন একা থাকবে। বরং ও আর ডলি একঘরে থাক, আমি একা শোব।” কিন্তু বঙ্কুবাবু চোখে প্রায় দেখতেই পান না, তেষ্টা পেলে নিজে এক গ্লাস জল গড়িয়ে নেবার ক্ষমতাও তাঁর নেই, তাঁকে তাই একা থাকতে দিতে কেউই রাজি নয়। রামু নিজেই বলল, “না না, সেটা ঠিক হবে না। তা ছাড়া, ভুবনেশ্বরের বাড়িতেও তো আমি একাই থাকি, এখানেও থাকতে পারব।”

রামু এমনিতে খুবই কম কথা বলে। সত্যি বলতে কী, সিপাহিজলায় অজ্ঞান হয়ে পড়বার পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে আর নীরমহলের ইট ছোড়ার ব্যাপারটার বিবরণ দিতে গিয়ে সেই যে সে কয়েকটা কথা বলেছিল, তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত তাকে একবারও মুখ খুলতে দেখিনি। ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে অবশ্য শুনেছিলুম যে, সে একটু চাপা স্বভাবের ছেলে। তাই বলে যে এতই চাপা, সেটা ভাবিনি। তার উপরে লক্ষ করলুম, কথা যেমন কালেভদ্রে বলে, তেমন আবার সেটা বলে খুবই নিচু গলায়।

দুপুরের খাওয়া ঢুকে যাবার পরে ঘরে ফিরে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে রামুর বিষয়ে কথা হচ্ছিল। বললুম, “আপনি ঠিকই বলেছিলেন। ছেলেটার স্বভাব সত্যি বড্ড চাপা। পরশু সন্ধে থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত মাত্র দু-বার ওকে মুখ খুলতে দেখলুম। দুপুরবেলায় খাওয়ার কথাই ধরুন না। ঝোলটা নুনে-কাটা, ভাতটা ঠিকমতো সেদ্ধ হয়নি, ডালটাও মনে হয় একটু ধরে গিয়েছিল। তাই নিয়ে সবাই কত কথা বলল, ম্যানেজারকে ডেকে পাঠিয়ে ধমকানো হল পর্যন্ত, অথচ আমরা যে সবাই এত চেঁচামেচি করছি, সেদিকে ওর যেন কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই, নিঃশব্দে খেয়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল, সামান্য একটা টু-শব্দ পর্যন্ত করেনি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বরাবর কিন্তু এমন ছিল না ছেলেটা। কথা কম বলত ঠিকই, তবে এত কম নয়।”

“পরিবর্তনটা কবে থেকে হল?”

“বছর দুয়েক আগে থেকে। আরও স্পষ্ট করে বলি, ওর বি.কম. পাশ করবার খবর বেরুবার পর থেকে।”

“বি.কম. পাশ করলে কি কম কথা বলতে হয়?” হেসে বললুম, “কই, এমন তো কখনও শুনিনি।”

ভাদুড়িমশাইও হাসলেন। বললেন, “তা নয়, আসলে কী হয়েছিল বলি, গ্র্যাজুয়েট হবার পরেই বঙ্কুর সঙ্গে ওর ঝগড়া বেধে যায়।”

“কীসের ঝগড়া?”

“রামু বিলেত যেতে চেয়েছিল। বঙ্কু যেতে দেয়নি।”

“কেন? ওঁদের তো টাকার অভাব নেই। ইচ্ছে করলে শুধু নিজের ছেলে কেন, পাড়াপড়শির ছেলেদের তো অক্লেশে উনি বিলেত ঘুরিয়ে আনতে পারেন।”

“আরে মশাই, এটা টাকার ব্যাপার নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সবটা আগে শুনুন। নইলে আপনি কিছুই ধরতে পারবেন না। একে তো বঙ্কুর চোখ খারাপ, বিস্তর চিকিচ্ছে করিয়েও নাকি দৃষ্টিশক্তির কিছুমাত্র উন্নতি হয়নি, তার উপরে ওর শরীরও ভেঙে পড়েছে। বঙ্কু তাই কিছুদিন ধরেই ভাবছিল যে, বি-কম পাশ করবামাত্র রামুকে তার কারবারে টেনে নেবে। রামুকে সে-কথা স্পষ্ট করে ও জানিয়েওছিল। বলেছিল, বিলেতে গিয়ে লেখাপড়া করা মানে তো আরও বছর পাঁচেকের ধাক্কা, তদ্দিন ও বাঁচবে কি না তারই ঠিক নেই। ও-সব চলবে না। এম.কম. পড়েই বা কী হাতিঘোড়া হবে, বাপ যদি আই.এ. পাশ করে এতখানি করতে পেরে থাকে তো বুঝতে হবে, হাতে-কলমে যা শেখা যায়, সেটাই আসল শিক্ষা। সুতরাং বিলেতের চিন্তায় গুলি মেরে দিয়ে এক্ষুনি রামু তার বাপের সঙ্গে খাতাপত্তর নিয়ে বসে কাজ-কারবার বুঝে নিক।

“রামু তাতে রাজি হল না, কেমন?”

“তা-ই কখনও হয়? বঙ্কুরই ছেলে তো, সেও সমান জেদি। বিলেতে যাওয়া হল না বটে, কিন্তু এম.কম.ও পড়ল না, কারবারেও ঢুকল না। লাভের মধ্যে একেবারে গুম মেরে গেল। একটু চাপা স্বভাবের তো ছিলই, কম কথা বলত, নিচু গলায় কথা বলত, সবই মেনে নিচ্ছি, তাই বলে এত অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু ওই যে বিলেত যাওয়া আটকে দেওয়া হল, বাস, তারপর থেকেই একেবার মৌনী বাবা হয়ে গেছে।”

বললুম, “বঙ্কুবাবুই বা অমন করলেন কেন? কোনও মানে হয়? ছেলে তো তাঁর একটা নয়, দুটো রামুর ইচ্ছেয় বাধা না-দিয়ে লক্ষ্মণকে তিনি তাঁর কারবারে টেনে নিলেই তো গোল মিটে যেত। বয়েস তো দুজনের একই। তা হলে আটকাচ্ছিল কোথায়?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “লক্ষ্মণকে আপনি ভাল করে দেখেননি তো, তাই অমন কথা বলতে পারলেন। তার দ্বারা অনেক কিছুই হতে পারে, কিন্তু ব্যাবসা হওয়া সম্ভব নয়। তার ধাতে ওটা নেই সে যদি ইন্ডিয়ার টেস্ট-টিমে ঢুকে পড়ে আর ইনিংস ওপেন করতে নেমে রিচার্ড হ্যাডলির প্রথম বলেই ছক্কা মারে, আমি অবাক হব না। সে যদি মোহনবাগানের হয়ে আই.এফ.এ. শিল্ড খেলতে নেমে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে, আমি বলব, বাঃ, এইরকমই তো হবার কথা ছিল। সে যদি এর পরের এশিয়াডে সাঁতারের ইভেন্ট থেকে গোটা-তিনেক সোনা তুলে আনে, তাতেও আমি বলব, এতে এত অবাক হবার কী আছে। তাই বলে ব্যাবসা? না মশাই, সকলের দ্বারা সব কাজ হয় না, লক্ষ্মণের দ্বারা ব্যাবসা হওয়া সম্ভব নয়। বঙ্কু সে-কথা ভালই জানত। এদিকে রামুও বায়না ধরে বসল, সে বিলেত যাবে।”

“রামুর বিলেত যাবার কথায় কি এইজন্যেই বঙ্কুবাবু অত বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন?”

“এইজন্যেই।”

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “যাক, বঙ্কুর সমস্যাটা তা হলে এতক্ষণে আপনি ধরতে পেরেছেন। লক্ষ্মণ তো ক্রিকেট, টেনিস আর সাঁতার নিয়েই মত্ত। পড়াশুনো নামমাত্র করে, পরীক্ষা দেয়, টেনেটুনে পাশও করে যায়, কিন্তু সেই একেবারে বাচ্চা-বয়েস থেকে দেখেছি, খেলার মাঠ আর সুইমিং পুলই তার ধ্যানজ্ঞান। বঙ্কু বুঝে গিয়েছিল, লক্ষ্মণকে দিয়ে ব্যাবসা চলবে না, জোর করে চালাতে গেলে ব্যাবসা দু-দিনে লাটে উঠবে, সে তাই রামুর উপরে ভরসা করে বসে ছিল। তার ফল কী হয়েছে, সে তো দেখতেই পাচ্ছেন।”

“রাগারাগি না-করে একটু ভাল করে বুঝিয়ে বললে হয়তো কাজ হত। আমার ধারণা, বঙ্কুবাবু সেটা কখনও করেননি।”

“প্রথমটায় করেনি ঠিকই, কিন্তু পরে বিস্তর বুঝিয়েছে। এমনকী, বঙ্কু যখন দেখল যে, কিছুতেই কিছু হবার নয়, তখন একদিন এমনও বলেছিল যে, ঠিক আছে, রামুর কথাই থাক, বিদেশে গিয়ে পড়াশুনো করুক সে, তবে হ্যাঁ, একটা শর্ট কোর্স করে তাড়াতাড়ি তাকে ফিরে আসতে হবে, যাতে ফিরে এসে তার বাপকে সে জীবিত দেখতে পায়। যাতে বাপের জীবদ্দশায় সে ব্যাবসার কাজকর্ম বুঝে নিতে পারে।”

“এটা কবেকার ঘটনা?”

“এও গত অগস্ট মাসের ঘটনা।”

“যে-ভাবে বলছেন, তাতে মনে হয় গত অগস্টে আরও কিছু ঘটেছিল।”

ভাদুড়িমশাই ভর্ৎসনার গলায় বলনে, “আরে হি ছ, কিরণবাবু, আপনার হলটা কী বলুন তো? এককালে আপনার .মনারির আমি কত তারিফ করতুম, কিন্তু ইদানীং দেখছি অনেক-কিছুই আপনি মনে রাখতে পারেন না! কালই রাত্তিরে আপনাকে বললুম যে, ভুবনেশ্বরের বাড়ির ছাতে রামুর উপরে ফার্স্ট অ্যাটাকটা হয় গত অগস্ট মাসে, আর আজই সেটা আপনি ভুলে মেরে দিলেন? আরে ধুর মশাই, এই বয়েসে একেবারে বাঁধাকপি হয়ে যাচ্ছেন দেখছি!”

লজ্জিত গলায় বললুম, “তা হয়তো একটু হয়েছি। বয়েস তো সত্যি নেহাত কম হল না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ বাজে কথা ছাড়ুন তো, বয়েসে আপনি আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট বই বড় নন। আসল কথা, আপনার মনোযোগ কমে যাচ্ছে। এখন যা বলছি শুনুন। দুটো যে শুধু একই মাসের ঘটনা, তা নয়, একই দিনের ঘটনা। সকালবেলায় বঙ্কু বলল, রামুকে বিদেশে পাঠাতে তার আপত্তি নেই, তবে তাড়াতাড়ি দেশে করে এসে তাকে বাপের কাছ থেকে ব্যাবসার কাজকর্ম বুঝে নিতে হবে, আর সন্ধেবেলাতেই বাড়ির ছাতে রামুর গলা টিপে ধরা হল!”

“এর মধ্যে কি কোনও কার্যকরণের যোগ রয়েছে?”

“তা আমি কী করে বলব।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে থাকাটা কিছু বিচিত্র নয়। অন্তত সন্দেহ একটা হতেই পারে। সন্দেহটা ারও জোর পাচ্ছে কেন জানেন?”

“কেন?”

“ভেবে দেখুন, কাল খুব ভোরে তো আমরা সিপাহিজলায় একটু ঘুরতে বেরিয়েছিলুম। ফিরে দেখি আপনার ঘরের বাথরুমের সামনে রামু অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তো আজ ভোরবেলায় আপনি যখন স্নান করবার জন্যে বাথরুমে ঢুকেছেন, তখন আমি বঙ্কুর ঘরে চলে আসি। মিসেস ঘেষ তখন ঘরে ছিলেন না। তিনিও স্নান সেরে নিচ্ছিলেন। আপনি যখন আমার খোঁজে বঙ্কুর ঘরে আসেন, তখনও তিনি বাথরুম থেকে বেরোননি।”

বললুম, “সে তো জানি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা জানেন না, সেটা এবারে মন দিয়ে শুনুন। যাতে পরে আবার না ভুলে যান। আপনি আসবার আগে বঙ্কু আমাকে একটা কথা বলে, যে-কথার গুরুত্ব হয়তো বঙ্কু নিজেও জানে না।”

“কী বলেন উনি?”

“বঙ্কু বলে যে, শরীরের এই অবস্থায় সে যে আর খুব বেশিদিন ব্যাবসার কাজকর্ম সামলাতে পারবে, তা তার মনে হয় না। ছোট ছেলে নিখোঁজ, বড় ছেলে উদাসীন, সে এখন বুঝতে পারছে না যে, কী করা উচিত। তাতে আমি বললুম, রামুকে সে আর-একটু ভাল কবে বুঝিয়ে বলুক যে, বাবার কাছ থেকে এবারে তার সবকিছু বুঝে না-নিলেই নয়। তাতে বঙ্কু বলল, ‘মাগের দিনই সিপাহিজলায় বেড-টি খাবার পরে রামুকে ডেকে পাঠিয়ে কথাটা সে বলতে গিয়েছিল, কিন্তু ভাল করে কথাটা সে পাড়তে পর্যন্ত পারেনি। রামুকে যে এবারে ব্যাবসার কাজকর্ম বুঝে নিতে হবে, এই কথাটা বলবামাত্র সে নাকি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।”

“বঙ্কুবাবু যখন রামুর সঙ্গে কথা বলবার জন্যে তাকে ডেকে পাঠান, তখন সেখানে আর-কেউ ছিল কি না, বঙ্কুবাবুকে তা আপনি জিজ্ঞেস করেছেন?”

“তা করেছি বই কী। বঙ্কু বলল, মিসেস ঘোষ তো ছিলেনই, পীতাম্বরও ছিল।”

“পীতাম্বর লোকটি কেমন!”

“ভিতরে-ভিতরে কেমন জানি না, তবে বাইরে যা দেখেছি, তাতে খারাপ ক্লবার উপায় নেই। কিন্তু ও-কথা একটু পরে ভাবলেও চলবে। আপাতত যা ভাবছি সেটা ই যে, এগরেও সেই একই ঘটনা ঘটল। রামুকে ডেকে বঙ্কু যেদিন বলল যে, তাকে এবারে ব্যাবসার দায়িত্ব বুঝে নিতে হবে, সেইদিনই ফের হামলা হল রামুর উপরে। তাও একবার নয়, দু’দু-বার। প্রথম অ্যাটে সিপাহিজলা, দ্বিতীয অ্যাটেম্‌৳ নীরমহলে। একই দিনের সকালে আর বিকেলে। …কী মনে হয় আপনার? দুটো ব্যাপার কি আলাদা? মানে, রামুকে ব্যাবসার দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা আর এই মামলা হওয়া, এর মধ্যে কি কোনও যোগ-সম্পর্ক নেই?”

বললুম, “এটা একটা অ্যাকসিডেন্টাল ব্যাপারও তো হতে পারে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা তো হতেই পারে। তবে কিনা ইংরিজিতে এইরকম একটা কথা আছে যে, দ্য রিপিটিশান অব অ্যান অ্যাকসিডেন্ট রস দ্য অ্যাকসিডেন্ট অব্ ইটস অ্যাকসিডেন্টাল ক্যারেক্টার। তখন সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে, এটা কাকতালীয় ব্যাপার নয়, এর মধ্যে একটা কার্যকারণের যোগসম্পর্ক রয়েছে।”

ঘরের বাইরে কার গলা পাওয়া গেল। দরজা খুলে দেখলুম, দীপক দাঁড়িয়ে আছে। বলল, “জিজাজি বললেন, একটু বাদেই সবাই বেরিয়ে পড়ব। আপনারা তৈরি হয়ে নিন।”

বেরোতে বেরোতে চারটে বেজে গেল। প্রথমেই যাওয়া হল ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দিরে। পাশের দিঘিটি বিশাল। বিরাট-বিরাট সব মাছ তার ঘাটের কাছে কিলবিল করছে। রুই, কাতলা, মৃগেল। কোনওটার ওজন সের পাঁচ-ছয়ের কম হবে না। ওই যে একরকম ভুড়িওয়ালা হলদেটে মাছ আজকাল কলকাতার বাজারে প্রচুর ওঠে, তাও দেখলুম অগুন্তি। মস্ত একটা কচ্ছপও হঠাৎ ঘাটের রানার কাছে ভুশ করে ভেসে উঠল। এ-সব মাছ কেউ ধরে না, ধরবার নিয়মই নেই। ভক্তজনের ছুড়ে দেওয়া মুড়ি আর ময়দার গুলি এরা কপাকপ গিলছে আর নির্বিবাদে নিজেদের ওজন বাড়িয়ে চলেছে।

মন্দিরে ঢুকতে-ঢুকতে মিসেস ঘোষ হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যে সিঁড়িটা ধাপে-ধাপে উঠে গেছে, এটা দেখে রাখুন। হাতে পুজোর থালা নিয়ে এই ধাপগুলোতে পা ফেলে-ফেলে আমি যখন মন্দিরের দিকে এগোব, সামনে কোনও উঁচু জায়গা থেকে তখন ক্যামেরা চলবে। ক্যামেরা প্রথমে ধরবে গোটা ক্রাউডটাকে, তারপর ধীরে-ধীরে আমার চারপাশের লোকজনকে ছেঁটে ফেলে শুধু আমাকে। তারপর এক সময় আমার গোটা শরীরটা বাদ দিয়ে শুধু মুখখানা।”

মিসেস ঘোষ আজ লালপেড়ে গরদের শাড়ি পরে আসেননি। তবে মন্দিরে গিয়ে প্রণামটা খুবই ভক্তিভরে করলেন। শানের উপরে মাথা রেখে অনেকক্ষণ যেভাবে স্থির হয়ে রইলেন, তাতে মনে হল, কী জানি, যে-ছবিটা তুলবেন বলে এখানে এসেছেন, সেটা একটা ‘সুপার হিট’ হয়তো হলেও হয়ে যেতে পারে।

স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে অবশ্য এখানকার পুরনো শিবমন্দিরটি অনেক বেশি দ্রষ্টব্য। কয়েক শো বছরের প্রাচীন মন্দির, দেওয়ালে ফাটল ধরেছে, বটের চারাও শিকড় ছড়িয়েছে এখানে-ওখানে, কিন্তু সেই বিধ্বস্ত মহিমার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে যেন চোখের পলক পড়তে চায় না। পুরনো এই মন্দিরটি অবশ্য পরিত্যক্ত, তার পাশে একটি নতুন শিবমন্দির তৈরি করে সেখানে পুজোর ব্যবস্থা হয়েছে। ভক্তের ভিড় সেই নতুন মন্দিরেই বেশি, মিসেস ঘোষও সেখানেই পুজো দিতে ঢুকলেন। তারপর খানিক বাদে মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে বললেন, “এটিকেও কিন্তু গল্পের মধ্যে ঢোকানো চাই।”

বললুম, “কীভাবে ঢোকাব?”

“সে আর এমন শক্ত কী,” মিসেস ঘোষ বললেন, “একটা স্বপ্নাদেশের ব্যবস্থা করলেই তো হয়। হিরোইন যখন ঘুমোচ্ছে, তখন একটা ড্রিম-সিকোয়েন্স রাখুন। স্বপ্নের মধ্যে মহেশ্বর এসে বলবেন যে, হিরোইন তাঁর পুজো করলেই হিরোর বিপদ কেটে যাবে। আর ঘুম থেকে উঠেই হিরোইন ছুটে আসবে এই মন্দিরে… বাস্, আপনার কাজ হয়ে গেল।”

বললুম, “ঠিক আছে। হয়ে যাবে।”

গেস্ট হাউসে যখন ফিরলুম, বিকেল তখনও ফুরিয়ে যায়নি। সামনের বারান্দায় বসে চা খাওয়া হল সবাই মিলে। রাস্তার ওদিকে বিশাল দিঘি। ঘাটে নেমে স্নান করছে অনেকে। জলের উপর দিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে ঢেউয়ের বৃত্ত। দেখতে-দেখতে নেশা ধরে যায়। মনে হয়, যাই, খানিক জল ঝাঁপিয়ে আসি।

একই কথা দীপক আর রাজেশেরও মনে হয়েছিল নিশ্চয়। হঠাৎ একইসঙ্গে উঠে দাঁড়াল তারা। দীপক বলল, “আপনারা বসুন, আমি আর রাজেশ একটু সাঁতার কেটে আসি।” তারপর রামুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমিও যাবে নাকি ভাঞ্জা?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “না না, রামুর গিয়ে কাজ নেই। পরশু ওর একটু সর্দিজ্বর-মতো হয়েছিল, গলাও ভেঙেছে, এই অবেলায় স্নান করলে ফের জ্বর বাধিয়ে বসবে। তা ছাড়া ও তো সাঁতারই জানে না।”

দীপক বলল, “তাই তো, আমার খেয়ালই ছিল না। ভাঞ্জা তা হলে আপনাদের সঙ্গে কথা বলুক, আমরা যাই।”

রাজেশকে নিয়ে নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেল দীপক। খানিক বাদে দু’জনে যখন ফের বেরিয়ে এল, তাদের পরনে তখন সুইমিং ট্রাঙ্ক। গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে তারা দিঘির দিকে চলে গেল।

ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, “আমরাও ওদের সঙ্গে গেলে পারতুম।”

ভাদুড়িমাশাই বললেন, “থাক গে, এখন আর ইচ্ছে করছে না।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর বঙ্কুবাবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “জানো চারু, এইসব সময়েই যেন লক্ষ্মণের কথাটা আরও বেশি করে মনে পড়ে যায়। ছেলেটা দারুণ সাঁতার কাটত।”

আমরা চুপ করে রইলুম। রামু একবার মুখ তুলে তাকাল বাবার দিকে, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মুখ নামিয়ে নিল। কিছু বলল না।

ভাদুড়িমশাই সম্ভবত লক্ষ্মণের প্রসঙ্গটাকে চাপা দিতে চাইছিলেন। সম্ভবত তিনি চাইছিলেন না যে, যে-ছেলে হারিয়ে গেছে, যাকে আর ফিরে পাবার কোনও সম্ভাবনাই হয়তো নেই, তার কথা ভেবে-ভেবে বঙ্কুবাবু আরও মন খারাপ করুন। বললেন, “চলো বঙ্কু, ঘরে যাওয়া যাক।”

বারান্দা থেকে সবাই আমরা যে-যার ঘরে চলে এলুম।

সুরটা একটু কেটে গিয়েছিল, তাই ঘরে ফিরেও আর কথাবার্তা বিশেষ জমল না। ভাদুড়িমশাই তাঁর সুটকেস থেকে একটা ফাইল বার করে নিয়ে চুপচাপ তার কাগজপত্রগুলো পরীক্ষা করতে লাগলেন।

একটা ব্যাপার দেখে একটু অবাকই হয়েছিলুম। রাম আর লক্ষ্মণ, এদের কেউই মিসেস ঘোষের নিজের ছেলে নয়। কিন্তু তা না-ই হোক, পাঁচ বছর বয়েস থেকে তিনি যে এদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন, সেটা তো অস্বীকার করা যাচ্ছে না। সেই ছেলে দুটোর মধ্যে একটা নিখোঁজ, আর অন্যটার উপরেও ক্রমাগত হামলা হচ্ছে, মিসেস ঘোষ তবু নির্বিকার, তা নিয়ে যেন কোনও ভাবনাই তাঁর নেই। ভদ্রমহিলার একমাত্র ভাবনা দেখছি নিজেকে নিয়ে। কী করে তিনি হিরোইনের রোলটা পাবেন, কোন্ দৃশ্যে কী পোশাক পরবেন, কোত্থেকে তাঁর মুখের উপর ক্যামেরা চার্জ করতে হবে, বাস্, এসে অবধি দেখছি যে, স্রেফ এই নিয়েই তিনি মত্ত। দেখে যে শুধু অবাক হচ্ছিলুম তা নয়, ব্যাপারটা ঘোর বিসদৃশও লাগছিল। ভেবেছিলুম, ভাদুড়িমশাইকে যখন একা পাওয়া গেছে, তখন এই নিয়ে দু-একটা কথা বলব। কিন্তু যে-রকম একমনে তিনি তাঁর ফাইল দেখছেন, তাতে আর কিছু বলা গেল না। কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে কয়েকটা নিউজ-ম্যাগাজিন কিনে এনেছিলুম, এখনও সেগুলোর উপরে চোখ বুলোনো হয়নি। হ্যান্ডব্যাগ থেকে তারই একটা বার করে নিয়ে অন্যমনস্কভাবে তার পাতা ওলটাতে লাগলুম।

রাত্তিরের খাওয়ার ডাক পড়ল সাড়ে-নটায়। রান্না এবেলাও সুবিধের হয়নি। বঙ্কুবাবু তা নিয়ে দু-একটা মন্তব্যও করলেন। তা ছাড়া আর খাওয়ার টেবিলে বিশেষ কোনও কথা হল না।

খাওয়া শেষ হতে-হতে দশটা। ভেবেছিলুম, এবারে হয়তো ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে দু-একটা কথা বলা যাবে, কিন্তু তাও বলা গেল না। ঘরে ফিরেই আবার তিনি তাঁর ফাইল টেনে নিয়ে পড়তে বসে গেলেন।

বললুম, “ওটা শেষ হতে আর কতক্ষণ লাগবে?”

ফাইল থেকে চোখ না-তুলেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার দেরি হবে। আপনি শুয়ে পড়ুন। কাল আবার সকাল-সকাল উঠতে হবে।”

অগত্যা শুয়ে পড়লুম। ঘুমে চোখ বুজে এল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই। কতক্ষণ ঘু?য়েছিলুম, জানি না, হঠাৎ একটা মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল। বললুম, “কে?”

“আমি চারু। একটু উঠুন তো।”

ধড়মড় করে উঠে বললুম, “কী ব্যাপার?”

“আস্তে কথা বলুন। একটু বাইরে যেতে হবে।”

নিজেদের ঘর থেকে নিঃশব্দে বারান্দায় বেরিয়ে আমরা রামুর ঘরের সামনে গিয়ে থামলুম। সামান্য ঠেলতেই দরজা খুলে গেল। ভিতরে ঢুকে ভাদুড়িমশাই তাঁর পেনসিল-টর্চ জ্বাললেন। রামুর বিছানা খালি। অ্যাটাচ্‌ড বাথরুমটায় টর্চ ফেলে দেখা গেল, সেখানেও কেউ নেই।

কোথায় গেল ছেলেটা? জিজ্ঞাসু চোখে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকাতে তিনি ঠোঁটে আঙুল তুলে আমাকে কথা বলতে নিষেধ করলেন। টর্চ ঘুরিয়ে গোটা ঘরটা দেখে নিলেন কয়েকবার। টেবিলের উপরে অ্যাকাউন্টেন্সির একটা বই আর একজোড়া চশমা পড়ে রয়েছে। বই আর চশমাটা তুলে নিয়ে ভাদুড়িমশাই দেখলেন। আমাকে দেখালেন। তারপর আবার যথাস্থানে রেখে দিয়ে চাপা গলায় বললেন, “চলুন, ঘরে যাওয়া যাক।”

রামুর ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা ফের আগের মতোই ভেজিয়ে রেখে আমরা নিজেদের ঘরে ফিরে এলুম।

১২
ভোর পাঁচটায় ভাদুড়িমশাই আবার ঘুম ভাঙিয়ে দিলেন আমার। বললেন, “চলুন, একটু ঘুরে আসা যাক।”

বললুম, “দেখুন মশাই, কাল মাঝরত্তিরে একবার আপনি আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছেন। এখন আবার সেই এক কান্ড। এ তো দেখছি মহা জ্বালাতনের ব্যাপার হল!”

“সে তো মাত্র পাঁচ-সাত মিনিটের জন্যে ঘুম ভাঙিয়েছিলুম। তারপর ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়েই তো ঘুমিয়ে পড়লেন। নিন নিন, যথেষ্ট ঘুমিয়েছেন, এবারে লক্ষ্মীছেলের মতো উঠে পড়ুন দেখি।”

“বেড-টি না-খেয়েই?”

“বেড-টি এখানে সাতটার আগে দেবে না। ততক্ষণ কি ঘুমোবেন নাকি? চলুন, রাস্তার কোনও দোকান থেকে বরং চা খাওয়া যাবে।”

মুখে-চোখে জল দিয়ে, গেস্ট হাইস থেকে বেরিয়ে এসে অবশ্য মনে হল যে, কাজটা নেহাত খারাপ করিনি। বেরোবার আগে রামুর দরজাটা সামান্য ঠেলে দেখলেন ভাদুড়িমশাই। ভিতর থেকে সেটা বন্ধ। বাইরে ভোরের হাওয়া বইছে। এমন হাওয়া কলকাতায় আমরা পাই না। তার উপরে আবার আমি থাকি শেয়ালদা পাড়ার গলিতে, মানুষজনের নিশ্বাসে আর ডিজেলের ধোঁয়ায় বাতাস সেখানে সর্বক্ষণই গরম হয়ে থাকে। বছর কয়েক আগেও দেখেছি, অন্তত সন্ধের দিকে কলকাতায় একটা গা-জুড়োনো ঠান্ডা হাওয়া বইত। ইদানীং সেটার ছোঁয়াও আর বিশেষ পাই না।

দিঘির পশ্চিম পাড়ের রাস্তা দিয়ে আমরা এগোচ্ছিলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই রকমের আরও কয়েকটা বড়-বড় দিঘি রয়েছে এই উদয়পুরে। সবই রাজাদের আমলের।”

“সিপাহিজলাতেও তো বিশাল একটা দিঘি দেখলুম।”

“তা দেখেছেন। তবে কমলাসাগরটা এখনও দেখা হয়নি।”

“ওটা তো কসবার কালীবাড়ির কাছে। তাই না?”

“রাইট।”

“ওটার কথা শঙ্করের কাছে শুনেছি। কমলাসাগরে কীভাবে জল উঠল, তাই নিয়ে একটা গল্পও শুনেছি শঙ্করের কাছে। তবে দেখা হয়নি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজ তো আমরা আগরতলায় ফিরে যাচ্ছি। দেখি যদি ফেরার পথে কমলাসাগরটা আপনাকে দেখিয়ে দেওয়া যায়। জায়গাটা একেবারে বাংলাদেশের বর্ডারে।”

কথা বলতে-বলতে গেস্ট হাউসের সামনের দিঘিটা ত এরা পেরিয়ে এসেছিলুম। তারপরেই আবার আর-একটা দিঘি। সেটাও মস্ত বড়

বললুম, “ব্যাপার কী বলুন তো। কুমিল্লা সম্পর্কে এককালে শুনতুম যে, জায়গাটা নাকি ফেমাস ফর ইটস ব্যাঙ্কস অ্যান্ড ট্যাঙ্কস। তা ত্রিপুরার শহরগুলোও দেখছি, ব্যাঙ্ক না হোক, ট্যাঙ্কের ব্যাপারে মোটেই পিছিয়ে নেই। ওরেব্বাবা, এ তো দিঘির পর দিঘি!”

“তা যা বলেছেন!” ভাদুড়িমশাই হাসলেন, “এখানকার দিঘি সত্যি দেখার মতো।”

“এত দিঘি কেন? জলের কষ্ট মেটাবার জন্য?”

“সেটা অবশ্যই একটা কারণ, তবে আসল কারণ নয়।”

“আসল কারণটা কী?”

“আসল কারণ লোকজনকে কাজে লাগাবার এটাই ছিল একটা মস্ত উপায়। বিশেষ করে অজন্মার বছরে। ফসল ভাল হয়নি, দুর্ভিক্ষের লক্ষণ দেখা দিয়েছে, গাঁ-গঞ্জ ঝেঁটিয়ে লোকজন চলে আসছে রাজধানীতে, এই অবস্থায় রাজকোষ থেকে সাহায্য না-দিয়ে উপায় থাকত না। তো সেই সাহায্য কীভাবে দেওয়া হবে? ভিক্ষে হিসেবে দেওয়া যায়। কিন্তু কারও পক্ষেই সেটা সম্মানের হয় না। না রাজার পক্ষে, না প্রজার পক্ষে। তার চেয়ে বরং কাজের ব্যবস্থা করো। নতুন একটা দিঘি হোক, নতুন একটা রাস্তা হোক। প্রজাদের সেই দিখি কাটাবার কি রাস্তা বানাবার কাজে লাগিয়ে দাও। তারা কাজ করুক, কাজের বিনিময়ে রাজার গোলা থেকে ধান নিয়ে যাক। ওই যাকে টেস্ট রিলিফ বলা হয়, সেই ব্যাপার আর কী। এতে একদিকে যেমন প্রজারা বেঁচে যেত, অন্যদিকে তেমন দেখতে-দেখতে তৈরি হয়ে যেত বিশাল সব দিঘি, কিংবা বিরাট সব রাস্তা।”

বললুম, “রাজতন্ত্রের হয়ে ওকালতি করছেন না তো?”

ভাদুড়ি মশাই ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, “আপনি তা-ই বুঝলেন? বলিহারি বুদ্ধি আপনার। আরে মশাই, রাজতন্ত্র গেছে, আপদ গেছে। কিন্তু তাই বলে আবার এমন কথা ভাববেন না যে, রাজারা সবাই মানুষ হিসেবে ছিলেন অতি পাষন্ড। না মশাই, তাঁদের মধ্যেও বিস্তর ভাল মানুষ ছিলেন। এমন মানুষ, প্রজাদের সুখ-দুঃখের কথাটা যাঁরা ভাবতেন। শুধু ফূর্তিফার্তা করেই তাঁরা সময় কাটাতেন না। বাট দেয়ার রোল হ্যাজ বিন প্লেড আউট। পৃথিবী জুড়ে এখন চলছে মন্ত্রিতন্ত্র। কিন্তু সমস্যা কি তাতে মিটেছে? মন্ত্রীরাই যে সবাই একেবারে নিপাট সজ্জন, তাও কি আমরা বলতে পারছি? বুকে হাত দিয়ে বলুন দেখি, মন্ত্রীরা সবাই খুব অনেস্ট লোক? তাঁরা কি কেউ ঘুষ খান না? তাঁরা কেউ দলের স্বার্থে দেশকে ডোবান না? তাঁরা কেউ আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেন না? …কী হল, চুপ করে রইলেন কেন?”

বললুম, “আপনার কথাগুলো ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ঠিক আছে, এ-সব কথা তা হলে থাক। মিসেস ঘোষের ফিল্ম নিয়েই বরং আলোচনা করি।”

বললুম, “ফিল্ম যে কী হবে, সে তো বোঝাই যাচ্ছে। ও নিয়ে আর কোনও কথা বলে লাভ নেই। আর বললেই যে মিসেস ঘোষ সে-কথায় কান দেবেন তাও মনে হয় না। ওটাও তাই মুলতুবি থাক। আমি আসলে রামুর কথা ভাবছি।”

“অর্থাৎ মাঝরাতিরে রামু তার ঘর থেকে কোথায় গিয়েছিল, এই তো?”

“হ্যাঁ।”

“প্রশ্নটার উত্তর আমার জানা নেই, তবে জেনে যাব নিশ্চয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে অন্য একটা উত্তরের কিছুটা আভাস পেয়েছি।”

“সে কী?”

“এখন বলব না।” ভাদুড়িমশাই হাসলেন, “আগে নিশ্চিত হই যে, উত্তরটা কারেক্ট, তারপর বলব। …কিন্তু না, আর নয়। এবারে ফেরা যাক।”

“রাস্তার কোনও দোকান থেকে আমাকে চা খাওয়াবেন বলেছিলেন।”

“এদিকে তো একটাও দোকান এখনও চোখে পড়ল না। চলুন, গেস্ট হাউসে ফিরে গিয়ে বরং চা খাবেন।”

গেস্ট হাউসে ফিরতে-ফিরতে প্রায় সাতটা বাজল। দেখলুম, সামনের বারান্দায় বসে সবাই গল্প করছেন। আমাদের দেখে দীপক বলল, “আসুন, আসুন! আমাদের এক-রাউন্ড চা ইতিমধ্যে হয়ে গিয়েছে।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “বোসো, চারু। মিঃ চ্যাটার্জি, আপনিও বসুন। …ডলি, আর-এক রাউন্ড চা দিতে বলো।”

দীপক বলল, “দিদি তো একটু আগে ভিতরে চলে গেল।”

“ঠিক আছে, তা হলে তুমিই গিয়ে চায়ের অর্ডারটা দিয়ে এসো। …তারপর চারু, তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিশেষ কোথাও নয়। আসলে অনেক দিনের অব্যেস তো, ভোরবেলায় উঠে মাইল কয়েক হেঁটে না এলে আমার শরীরের জড়তা ঠিক কাটতে চায় না। …তা, কী নিয়ে তোমাদের কথা হচ্ছিল?”

চায়ের অর্ডার দিয়ে দীপক ইতিমধ্যে ফিরে এসেছিল। উত্তরটা সে-ই দিল। বলল, “সাঁতার নিয়ে। কাল সন্ধেয় সাঁতার কেটে খুব ভাল লেগে গিয়েছিল আমাদের। আমি আর রাজেশ মাঝরাত্তিরে তাই আবার গিয়ে দিঘিতে নেমেছিলুম। ভাঞ্জাও সঙ্গে ছিল। ওকে ডাকতে বলল, ‘আমি তো সাঁতার কাটতে জানি না, তবে চলো, সঙ্গে যাচ্ছি তোমাদের, পাড়ে বসে থাকব।’ তা, ভাঞ্জাও খুব এনজয় করেছে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, এ তো খুবই ভাল কথা। আমাদের যদি ডাকতে তো আমরাও গিয়ে নেমে পড়তুম। …তো রামু, আমি বলি কী, তুমিও এবারে সাঁতারটা শিখে নাও। ওর চেয়ে ভাল এক্সারসাইজ আর হয় না।”

রামু লাজুক হাসল। কিছু বলল না।

বঙ্কুবাবু বললেন, “তোমার চারুকাকা ঠিক কথাই বললেন। শুধু পড়াশুনোয় ভাল হলেই হয় না, শরীরটাও মজবুত রাখা চাই।”

চা এসে গিয়েছিল। চটপট খেয়ে ভাদুড়িমশাই উঠে পড়লেন। বললেন, “তোমরা কি আর কিছুক্ষণ “বসবে এখানে?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “একটু বসি। ঘরে গিয়ে আর কী করব, খানিক বাদেই তো ব্রেকফাস্টের ডাক পড়বে। ততক্ষণে বরং দীপক আর রাজেশের সঙ্গে কথা বলা যাক।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা তা হলে টুকিটাকি দু-একটা কাজ সেরে নিই ততক্ষণে। আসুন, কিরণবাবু।”

করিডর দিয়ে আমরা ঘরের দিকে পা বাড়ালুম। ভাদুড়িমশাই কিন্তু ঘরে ঢুকলেন না। বললেন, “আপনি ঢুকে যান, আমি এক্ষুনি আসছি।”

ভাদুড়িমশাই ঘরে ফিরলেন মিনিট খানেকের মধ্যেই। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বললেন, “মিস্টিরিয়াস ব্যাপার।”

বললুম, “কোথায় গিয়েছিলেন?”

“দীপকের ঘরে। মাঝরাত্তিরে যারা জলে নেমেছিল, তাদের সুইমিং ট্রাঙ্ক দুটো তো এর মধ্যেই শুকিয়ে যাবার কথা নয়। কিন্তু ওদের বাথরুমে যে দুটো সুইমিং ট্রাঙ্ক ঝুলছে দেখলুম, সে দুটো একেবারে শুকনো খটখটে। ঘরে কিংবা বাথরুমে অন্য কোনও ভিজে কাপড়ও দেখলুম না!”

“তার মানে?”

“তার মানে মাঝরাত্তিরে ওরা দিঘিতে নামেনি।”

১৩
ব্রেকফাস্ট টেবিলে বঙ্কুবাবু বললেন, “চারু, খানিক বাদেই তো আমরা রওনা হচ্ছি, তবে আজকের ফ্লাইটে কলকাতায়, ফিরব না। আজ আমাদের আগরতলায় থাকতে হবে। কলকাতায় ফিরব কাল বিকেলের ফ্লাইটে। তোমার কিংবা কিরণবাবুর তাতে কোনও অসুিবধে নেই তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। কিরণবাবুকে নিয়েও ভাববার কিছু নেই; বাড়তি এক-আধ দিন যে থাকতে হতে পারে, তা আমি ওঁকে বলেই রেখেছি।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “ধন্যবাদ। আপনার কাছে আমার অনেক ঋণ জমা হয়ে রইল।”

কথাগুলি অবশ্যই আমার উদ্দেশে বললেন, কিন্তু আমি যেহেতু এতক্ষণ কোনও কথা বলিনি, তাই বঙ্কুবাবু বুঝে উঠতে পারছিলেন না যে, ব্রেকফাস্ট টেবিলের ঠিক কোনখানে আমি বসে আছি। ধন্যবাদটা তাই খানিকটা স্বগতোক্তির মতো শোনাল।

আমি বললুম, “একটা দিন বাড়তি যদি আগরতলায় থাকি, তাতে আমার সুবিধেই হবে। আর-কিছু না হোক, স্টোরিটা কোত্থেকে কীভাবে শুরু হবে, সেটা অন্তত ভেবে নিতে পারব। বাট অফ কোর্স ইট উইল বি ডান্ অন দ্য বেসিস অব দ্য প্লট দ্যাট আই হ্যাভ রিসিভড ফ্রম মিসেস ঘোষ।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “আমার একটা আবদার আছে কিন্তু। সেটা আপনাকে রাখতে হবে।”

“বলুন।”

“ছবির টাইটেলে গল্পের ক্রেডিট-লাইনটা কিন্তু আমাকেই দিতে হবে।”

বললুম, “বিলক্ষণ। গল্প তো আপনারই, আমি সেটা লিখে দিচ্ছি বই তো নয়।”

মিসেস ঘোষ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে বললেন, “বাস্, তা হলে ওই কথাই রইল। আমি এখন ঘরে চললুম। একটু বাদেই তো রওনা হচ্ছি, তৈরি হয়ে নিতে হবে।”

রাজেশ, দীপক আর রামুও ডাইনিং হল থেকে নিজেদের ঘরে চলে গেল।

বঙ্কুবাবু ঘরে যাবেন বলে পীতাম্বরকে ডাকতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু বোসো, বঙ্কু। দু-একটা কথা আছে। তুমি কি আজ আমাকে ঘন্টা খানেক সময় দিতে পারবে? কয়েকটা প্রশ্ন ছিল। …না না, ঘরে এখন কেউ নেই। যা বলবার, স্বচ্ছন্দে বলতে পারো।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “প্রশ্নগুলো কী নিয়ে?”

“যে জন্যে তুমি আমার সাহায্য চাও, তাই নিয়ে। একটু ডিটেলসে তোমার সঙ্গে কথা বলা দরকার।”

“সেটা কি এখন সম্ভব? একটু বাদেই তো আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি।”

“ঠিকই বলেছ, এখানে সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যাপারটাকে আর পিছিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। আগরতলায় আমরা কোথায় থাকব?”

“হোটেলে। সেখানে পাঁচটা ঘর নিয়ে রাখা হয়েছে।”

“চমৎকার। সেখানে কোনও একটা সময়ে কোনও একটা অজুহাত দেখিয়ে আমাদের ঘরে তোমাকে চলে আসতে হবে।”

“কী অজুহাত দেখাব?”

“বলবে যে, ডিরেকশান আর স্ক্রিপ্‌ট-রাইটিংয়ের পেমেন্ট নিয়ে আমাদের সঙ্গে তোমার দু-একটা কথা বলা দরকার।”

“ঠিক আছে।” বঙ্কুবাবু বললেন, “কিন্তু একটা কথা সত্যি করে বলো। রামুর বোনও বিপদ ঘটবার আশঙ্কা নেই তো?”

“ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, ওর জন্যে তো ‘মামিই আছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে ওই কথাই রইল। …দাঁড়াও, নিজে উঠবার চেষ্টা কোরো না, পীতাম্বরকে ডেকে দিচ্ছি।”

পীতাম্বর ঘরের বাইরেই অপেক্ষা করছিল। ডাকবামাত্র সামনে চলে এল।।

ঘরে এসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোনও কাজ কি বাকি পড়ে আছে?”

চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললুম, “না। স্নান-টান সবই তো করে নিয়েছি। হ্যান্ডব্যাগে যা-কিছু ঢোকাবার ছিল, তাও ঢোকানো হয়ে গেছে।”

“অর্থাৎ আপনি রেডি?”

“একদম রেডি।”

“তা হলে শুয়ে পড়ুন।”

“বেরিয়ে পড়তে হবে না?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আপনার পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতাও দেখছি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।”

“তার মানে?”

“মানে আর কিছুই নয়, মিসেস ঘোষ যে প্রসাধন-পর্ব না-সেরেই আজ ব্রেকফাস্ট টেবিলে চলে গিয়েছিলেন, সেটাই আপনি খেয়াল করে দেখেননি। তাঁর মেক-আপ শেষ হতে অন্তত আধ ঘন্টা লাগবে। বঙ্কুদের ঘরের দরজা তো হাট করে খোলাই ছিল। আসবার সময় এটাও আপনার চোখে পড়তে পারত যে, সবকিছু সেখানে ছত্রখান হয়ে পড়ে আছে। সে-সব গোছগাছ করে নিতে তা ধরুন আরও আধঘন্টা তো লাগবেই। সব মিলিয়ে কী দাঁড়াল?”

“এক ঘন্টা।”

“এখন ন’টা বাজে। তার সঙ্গে এক ঘন্টা যোগ করলে হয় দশটা। কিরণবাবু, আপনি লম্বা হোন, দশটার আগে আমরা এখান থেকে রওয়া হচ্ছি না।”

শুয়ে পড়ে বললুম, “যা, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, আমি আপনাকে শুয়ে পড়তে বলেছি ঠিকই, কিন্তু তাই বলে যেন নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে পড়বেন না। বরং শুয়ে-শুয়ে একটু চিন্তা করুন।”

“কী নিয়ে চিন্তা করব? মিসেস ঘোষের ওই কিম্ভূত প্লটটা কীভাবে ডেভেলাপ করব, তাই নিয়ে?”

“ও নিয়ে চিন্তার কী আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যেভাবে প্রাণ চায়, ডেভেলাপ করুন। ড্রিম সিকোয়েন্সের মধ্যে যখন একবার মহাদেবের আবির্ভাব হয়েছে, তখন আর তাঁকে নেহাত স্বপ্নের মধ্যে আটকে রাখবেন না। তাঁকে বাস্তবে নিয়ে আসুন। দেখিয়ে দিন যে, বড়লোকটার লেঠেলরা যখন হিরোকে ধরে পেটাচ্ছে, তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে হিরোইন খুব করুণ গলায় একটা গান গাইতে লাগল। তা প্লে-ব্যাকে লতা মঙ্গেশকর গাইবে তো, মহাদেব তাই আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারলেন না। কৈলাস থেকে নেমে এসে তিনি লতার গানের সঙ্গে তাল রেখে তান্ডব নাচতে লাগলেন আর ত্রিশূল দিয়ে সমানে সেই লেঠেলগুলোকে বেধড়ক পেটাতে লাগলেন।”

বললুম, “আর ইউ সিরিয়াস?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে দূর মশাই, আপনিও যেমন! মিসেস ঘোষের কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছেন, বেশ করছেন, তাই বলে কি ওই রদ্দি প্লটের উপরে কোনও ছবি হয় নাকি? হয় না। আপনাকেও অতএব ওর উপরে স্টোরি-ফোরি লিখতে হবে না। তার বদলে একটা কথার জবাব দিন দেখি।”

“বলুন।”

“দীপককে আপনার কেমন লাগছে?”

“খারাপ কেন লাগবে। একটু সিনেমা-পাগ্‌লা আছে ঠিকই, তবে কিনা যা ব্যাকগ্রাউন্ড আর যা বয়েস, তাতে সেটাই তো স্বাভাবিক। দীপকের একটা কথা শুনলে অবশ্য হাসি পেয়ে যায়।”

“কোন্ কথাটা? ভাঞ্জা?”

“ঠিক ধরেছেন। যখনই ও রামুকে ভাঞ্জা বলে, তখনই আমার টিভি-সিরিয়ালের মহাভারতের কথা মনে পড়ে যায়। শকুনির ভুমিকায় গুপি পেন্টালের মুখখানাও তক্ষুনি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কী বলব মশাই, অনেক কষ্টে তখন হাসি চেপে রাখতে হয়।”

“ভাগ্নেকে ভাঞ্জা বলবে, তাতে হাসির কী আছে। ওটা বাদ দিন, এমনিতে ওকে আপনার কেমন লাগে?”

“বললুমই তো। খারাপ লাগে না।”

“টাকার জন্যে ও কাউকে খুন করতে পারে বলে আপনার মনে হয়?”

চমকে উঠে বললুম, “খুন? কাকে খুন করবে?”

“ধরা যাক রামুকে।”

“কেন, রামুকে ও খুন করবে কেন?”

“নাঃ, শুধু যে আপনার মেমারির ধার আর পাওয়ার অব অবজারভেশান কমে গেছে, তা নয়, কিরণবাবু, আপনার বুদ্ধিও আগের তুলনায় অনেক ভোঁতা হয়ে গেছে দেখছি।”

বুঝলুম, প্রতিবাদ করে কোনও লাভ হবে না। তা ছাড়া, কথাটা যে একেবারে মিথ্যে, তাও হয়তো নয়। অন্তত বাসন্তী এই কথাটা আজকাল প্রায়ই বলে। তাই মিনমিন করে বললুম, “আমার কথা ছাড়ুন। দীপক যে রামুকে খুন করতে পারে, এই কথাটা আপনার কেন মনে হচ্ছে?”

“আমার যে অমন কথা মনে হচ্ছে তা কিন্তু আমি বলিনি। আমি শুধু একটা সম্ভাবনার কথা ভেবে দেখছিলুম।”

“ঠিক আছে, ধরে নেওয়া গেল যে, দীপক রামুকে খুন করতে পারে। অন্তত এমন একটা সম্ভাবনার কথাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু একটা মোটিভ থাকা চাই তো। সেটা কী?”

“মোটিভ অনেক-কিছুই হতে পারে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার মধ্যে যেটা অভিয়াস, সেটার কথাই ভাবা যাক। আপনাকে যা বলেছি, তার থেকে আপনি নিশ্চয় বুঝেছেন যে, বঙ্কু এখন কোটি-কোটি টাকার মালিক।”

“তা বুঝেছি।”

“ভাল। এখন এটাও আপনি স্বচক্ষে দেখছেন যে, বঙ্কুর শরীর মোটেই ভাল যাচ্ছে না। একে তো ও চোখে খুবই কম দেখতে পায়, তার উপরে ওর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে।”

“হ্যাঁ, সে তো দেখতেই পাচ্ছি।”

“চমৎকার। তো বঙ্কু যদি এখন মারা যায়, তা হলে সেই কোটি-কোটি টাকা কে পাবে?”

বললুম, “এ কি একটা প্রশ্ন হল নাকি? বঙ্কুবাবু যদি অন্যরকম কোনও উইল না করে মারা যান, তা হলে টাকাটা পাবেন মিসেস ঘোষ আর বঙ্কুবাবুর দুই ছেলে।”

“বাঃ, ঠিক বলেছেন। কিন্তু বঙ্কুর ছোট ছেলে যে নিরুদ্দেশ, সেটা ভুলে যাবেন না। সে যদি আর ফিরে না আসে, তা হলে? টাকাটা তখন বঙ্কুর বউ আর বড় ছেলে পাচ্ছে। তাই না?”

“তা বটে।”

“এবারে বড় ছেলেটাকেও যদি সরিয়ে দেওয়া যায়?”

“ওরেব্বাবা, তা হলে তো সব টাকাটাই মিসেস ঘোষের হাতে এসে যায়।”

“কিন্তু মিসেস ঘোষের নিজের কোনও ছেলেপুলে নেই। বঙ্কুর তাবং টাকা তাঁর হাতে এসে গেলে অতএব শেষ পর্যন্ত কার লাভ হচ্ছে?”

আমার মুখ দিয়ে যেন কোনও কথাই সরছিল না। অনেক কষ্টে বললুম, “এটা তো ভেবে দেখিনি। সেইজন্যেই কি দীপক রামুকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছে?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কে বলল যে, সে রামুকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছে? আমি কিন্তু অমন কথা একবারও বলিনি।”

“ঠিক আছে, আপনি কিছু বলেননি, আমি বলেছি। কিন্তু এর মধ্যে কি রাজেশেরও হাত রয়েছে?”

“যাচ্চলে, কোথায় আমি প্রশ্ন করব, আপনি জবাব দেবেন, তা নয়, আপনিই দেখছি আমাকে জেরা করতে শুরু করলেন। রাজেশের কথা আপাতত ভুলে যান। বলুন, দীপককে আপনার কেমন লাগে? বেশ ভাল করে ভেবেচিন্তে বলুন।”

“ভালই তো লাগত।”

“পাস্ট টেন্স কেন? এখন কি আর তত ভাল লাগছে না?”

“না মানে…” আমতা-আমতা করে বললুম, “কাল মাঝরাত্তিরে সত্যি ও কি সাঁতার কাটতে দিঘিতে নামেনি?”

“বলল তো নেমেছিল, কিন্তু ঘরে কিংবা বাথরুমে তো ভিজে কিছুই দেখলুম না। এমনকী, তোয়ালেটা পর্যন্ত শুকনো। নাঃ, ব্যাপারটা সত্যি ভাবিয়ে তুলল! এক হতে পারে…”

কী হতে পারে, সেটা আর শোনা হল না। ভেজানো দরজায় টোকা দিয়ে পীতাম্বর এসে ঘরে ঢুকল। বলল, “সবাই রেডি। আপনাদের আসতে বললেন।”

১৪
ফিরতি পথে আমরা যে সিপাহিজলায় খানিকক্ষণ থেমে তারপর অগরতলায় যাব, আগেই সেটা বলে রাখা হয়েছিল। গাড়িতে উঠবার সময় বঙ্কুবাবু বললেন, “লাঞ্চ আমরা সিপাহিজলাতেই খেয়ে নেব। ঘন্টাখানেক ওখানে একটু বিশ্রাম করা যাবে।”

আসবার সময় পথের দু’দিকে খর নজর রেখেছিলুম, ফিরবার সময়ে তাই আর দৃশ্য-ট্রিশ্য দেখবার বিশেষ উৎসাহ ছিল না। তা ছাড়া মাঝ-রাত্তিরে ভাদুড়িমশাই কালও ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিলেন বলে এখন আবার চোখ দুটো যেন ঘুমে জড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু নিজেও গাড়ি চালাই বলে এটা খুব ভালই জানি যে, ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে কখনও ঢুলতে নেই। ওটা বড় ছোঁয়াচে ব্যাপার, ওতে ড্রাইভারের চোখও ঘুমে জড়িয়ে আসতে থাকে। এই পাহাড়িয়া পথে তা যদি হয়, তবেই তো সর্বনাশ।

ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “গাড়িটা একটু থামাবেন?”

সামনের দিক থেকে চোখ না ফিরিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন?”

“ওয়াটার-বল থেকে চোখে একটু ভাল করে জল ছিটিয়ে নেব।”

“ঘুম-ঘুম লাগছে নাকি?”

“হ্যাঁ।”

“তা বেশ তো, একটু ঘুমিয়ে নিন না।”

“আপনার গাড়ি চালাতে তাতে কোনও অসুবিধে হবে না তো?”

“কিছুমাত্র না।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমার অব্যেস আছে। শুধু একটা কাজ করুন। আপনার সিটটা তো অ্যাডজাস্টেবল, ঠেলে একটু পিছিয়ে দিন, তা হলে পা ছড়িয়ে ঘুমুতে পারবেন।”

দীপক আমার ঠিক পিছনেই বসে আছে। ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে সে বলল, “দাঁড়ান দাঁড়ান, আগে আমি একটু ডাইনে সরে বসি, তার পরে সিট অ্যাডজাস্ট করবেন, নইলে আমার হাঁটুতে চোট লাগবে।”

বললুম, “আরে ভাই, ভয় পেয়ো না, যেমন বসে আছি সেইভাবেই আমি ঘুমিয়ে নিতে পারবে। কাউকে নড়াচড়া করতে হবে না।”

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম জানি না। গাড়ি যে থেমে গেছে, তাও বুঝতে পারিনি। ভাদুড়িমশাইয়ের গলার আওয়াজে ঘুম ভাঙল। “নিন, এবারে উঠে পড়ুন।”

চোখ খুলে বললুম, “সিপাহিজলায় পৌঁছে গেছি?”

“বিলক্ষণ। চলুন, ভিতরে যাওয়া যাক।”

ভিতরে ঢুকে দেখলুম, ড্রইংরুমে সবাই বসে আছেন। মিসেস ঘোষ বললেন, “এরা তো জানত আমরা আসব, তাই রান্না করে রেখেছে। আপনারা হাতমুখ ধুয়ে নিন, তারপরে সবাই একসঙ্গে খেতে বসে যাব।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “ওহে চারু, আগরতলা থেকে শঙ্করও ফিরে এসেছে। এবারে নাকি কলকাতার লাইন পেতে অসুবিধে হয়নি। যাদের যাদের ফোন নাম্বার দিয়েছিলুম, সব্বাইকে খবর দিতে পেরেছে। ও নিয়ে আর কোনও চিন্তা কোরো না। তোমার ভগ্নিপতির মা’ও এখন অনেকটা ভাল আছেন।”

বললুম, “যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।”

গলা শুনে বঙ্কুবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ কিরণবাবু, আপনার জন্যে খবর আছে একটা। আপনার স্ত্রী জানিয়েছেন যে, এলাহাবাদ থেকে আপনার ছেলে অফিসের কাজে কলকাতায় এসেছে। তবে তাই বলেই যে আপনাকে এখুনি পড়িমরি করে আগরতলায় ছুটে আজ বিকেলের ফ্লাইট ধরতে হবে, তার কোনও মানে নেই। ছেলে এখন হপ্তাখানেক কলকাতায় থাকবে, তার আগে এলাহাবাদে ফিরবে না।”

বেয়ারা এসে খবর দিল, খাবার দেওয়া হয়েছে। মুখহাত ধুয়ে আমরা ডাইনিং হলে গিয়ে ঢুকলুম।

খেতে-খেতে কথা হচ্ছিল। এক ফাঁকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি একটা কথা ভাবছি বঙ্কু।”

“বলো।”

“তোমরা তো খেয়ে উঠে একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর আগরতলা রওনা হবে। তো আমি ভাবছিলুম যে, তোমরা বিশ্রাম নাও, সেই ফাঁকে আমি কিরণবাবুকে একবার কসবার কালীবাড়িটা দেখিয়ে দেব। …তারপর সেখান থেকে আগরতলার হোটেলে গিয়ে মিট করব তোমাদের সঙ্গে।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “তা বেশ তো। কিরণবাবুর যখন কসবার কালীবাড়ি দেখা হয়নি, তখন দেখিয়ে দেওয়াই তো উচিত। কমলাসাগরটাও দেখে নিতে পারবেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমিও তা-ই ভাবছিলুম। অবশ্য একটা প্রবলেম হচ্ছে…”

“কেন, এতে আবার প্রবলেম কীসের?”

“না মানে আনরা যদি যাই তো দীপক আর রাজেশকেও আমাদের সঙ্গে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে ওদেরও বিশ্রাম নেওয়া হয় না।”

বঙ্কুবাবু হোহো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “আরে দূর, ওরা ইয়াং ম্যান, ওদের আবার বিশ্রামের কী দরকার। না না, ও নিয়ে তুমি ভেবো না। আর তা ছাড়া, ওদের যে তোমার সঙ্গে যেতেই হবে, তাও নয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে ওরা যাবে কী করে? তোমার অ্যাম্বাসাডারে তো অলরেডি পিছনে তিনজন সামনে দু’জন রয়েছে। আরও দুজনকে যে গাদাগাদি করে ওর মধ্যে ঢোকানো যায় না, তা নয়। বড় গাড়ি যখন, জায়গা হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু তাতে তোমাদের কষ্ট হবে। না না, তার দরকার নেই।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আমার গাড়িতে ঢোকাতে হবে কেন? শঙ্কর আর-একটা গড়ি নিয়ে এসেছে আগরতলা থেকে। মানে ভাড়া করতেও হয়নি। কলকাতায় ক’টা ফোন করবার জন্যে আগরতলায় আমার এক এজেন্টের বাড়িতে শঙ্কর গিয়েছিল তো, তা সে নিজের থেকেই শঙ্করকে দিয়ে গাড়িটা পাঠিয়ে দিল।”

“তবে তো কথাই নেই। দীপক আর রাজেশ তা হলে শঙ্করের গাড়িতে আগরতলায় যাক। ওরা সেক্ষেত্রে একটু বিশ্রামও নিতে পারবে। আমি আর কিরণবাবু মারুতিটা নিয়ে কসবার পথে রওয়া হয়ে পড়ি, কেমন?”

“স্বচ্ছন্দে।” বঙ্কুবাবু বললেন, “আগরতলায় আমরা কোন হোটেলে উঠব, তা তো তুমিই জানোই।”

খাওয়া শেষ হতেই আমরা কসবার পথে বেরিয়ে পড়লুম। পিছনের সিট এ-যাত্রায় ফাঁকা।

সিপাহিজলা থেকে কসবা মোটামুটি কাছেই। বড় রাস্তায় পড়ে বাঁ-দিকে টার্ন নিলেন ভাদুড়িমশাই। তারপরেই দাঁতে জিব ঠেকিয়ে আক্ষেপের একটা শব্দ করে বললেন, “যাচ্চলে!”

বললুম, “কী হল?”

“বড্ড ক্ষতি হয়ে গেল! এবারেও আপনার চশমা পরা বাঁদর দেখা হল না! সিপাহিজলায় আবার যখন আাসতেই হল, স্বচ্ছন্দে একবার চিড়িয়াখানাটা আপনাকে ঘুরিয়ে আনা যেত।”

বললুম, “কিসসু ক্ষতি হয়নি। চশমা পরা বাঁদর দেখবার জন্যে চিড়িয়াখানায় যেতে হবে কেন, সে তো কলকাতা, দিল্লি, মাদ্রাজ, বোম্বাই, কোনওখানেই কিছু কম দেখি না।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তা বটে!”

যে-রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলুম আমরা, সেটা বিশেষ চওড়া নয়। তবে একে তো খানাখন্দ নেই, তার উপরে উলটো-দিক থেকে বাস কি ট্রাক খুব-একটা আসছিল না বলে গাড়ি চালাতে তেমন কিছু অসুবিধেও হচ্ছিল না। মাঝে-মাঝে দু-একটা ছোটখাটো টিলা আমাদের চোখ পড়ছিল। রাস্তাটা একেবারে ভারত-বাংলাদেশের বর্ডার ঘেঁষে তৈরি হয়েছে। টিলাটা যদি ভারতবর্ষের মধ্যে, তো তার নীচেই বাংলাদেশের ধানখেত।

বললুম, “ওদিককার লোক তো স্বচ্ছন্দেই এদিকে চলে আসতে পারে, মশাই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আসেও। এদিকে একটা মস্ত হাট বসে। তো প্রতি হাটবারে ওদিককার লোক দলে-দলে মুরগি, মাছ আর আনাজপত্র নিয়ে এদিকে চলে আসে; তারপর সে-সব বিক্রি করে যা পাওয়া।গল তাই দিয়ে দরকারি দু-একটা জিনিস… এই ধরুন ওষুধ কি জামাকাপড় কিনে নিয়ে আবার দলে-দলে ওদিকে ফিরেও যায়।”

বললুম, “শঙ্করও তা-ই বলছিল বটে। কিন্তু এ তো ঘোর বেআইনি ব্যাপার। পাসপোর্ট, ভিসা, এসব তবে কেন হয়েছে?”

“ও-সব বড়লোকদের জন্যে হয়েছে। গরিবেরা ও-সবের ধার ধারে না।”

কথা বলতে-লতে আমরা কমলাসাগরে পৌঁছে গিয়েছিলুম। মস্ত দিঘি। পাড়ে ছোটখাটো কয়েকটা চা-পান-মিষ্টির দোকান। খানিক এগিয়ে চওড়া শান-বাঁধানো সিঁড়ি। তার ধাপগুলিতে পা ফেলে-ফেলে কালীবাড়ির চাতালে উঠে যেতে হয়। একটা দোকানে দু-গ্লাস চায়ের কথা বলে দিয়ে আমরা দিঘির ধারের গাছতলায় গিয়ে দাঁড়ালুম। দিঘির ওদিকে খানিকটা উঁচু জমি। তারপরেই সেই জমি হঠাৎ নীচে নেমে গিয়েছে। শুরু হয়েছে ধু-ধু ধানখেত। ভাদুড়িমশাই আঙুল তুলে বললেন, “ওই যে ধানখেত দেখছেন, ওটা বাংলাদেশের মধ্যে।”

বললুম, “বর্ডার পাহারা দেবার ব্যবস্থা নেই?”

“আছে বই কী। কি গোটা বর্ডার পাহারা দিতে হলে পাঁচ ফুট অন্তর-অন্তর সেপাই দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়। তা কি সম্ভব? তার উপরে ভাবুন, আমাদের বর্ডার কি শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে? নেপাল রয়েছে, পাকিস্থান রয়েছে, চিন রয়েছে—কত পাহারা দেবেন?”

“অর্থাৎ রাত্তিরবেলায় আমি যদি এখানে আসি, আর বর্ডার টপকে নেমে যাই ওই ধানখেতের মধ্যে, কেউ আমাকে বাধা দেবে না?”

“রাত্তিরে নামবার দরকার কী,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এখন এই দিনের বেলাতেই নেমে দেখতে পারেন, কেউ আপনাকে বাধা দেবে না।”

বাধা দেবার মতো সত্যিই কেউ নেই। না এদিকে, না ওদিকে। বললুম, “এতে তো স্মাগলারদের মস্ত সুবিধে।”

“তা তো বটেই। রাত্তিরের অন্ধকারে আসিও পাচার হয়ে আসতে পারে। তাতেই বা বাধা দিচ্ছে কে? আপনি শুধু এই বর্ডার দেখছেন। পঞ্জাবে যান, কাশ্মীরে যান, সর্বত্র. আর্মস আসছে সীমান্ত পেরিয়ে। গাদা বন্দুক নয়, সফিসটিকেটেড মানে আর্মস। চিনা, মার্কিন, কোনও কিছুরই অভাব নেই। এক্সট্রিমিস্টদের কোমরের জোরটা কারা জোগাচ্ছে, সেটাও বুঝতে পারেন না?”

বললুম, “আর বুঝে দরকার নেই। চলুন, কালীবাড়ি থেকে ঘুরে আসি।”

চায়ের দোকানের একটি বাচ্চা ছেলে ইতিমধ্যে দু-গেলাস চা দিয়ে গিয়েছিল। দিঘির ধারে একটা।।ছতলায় বসে চা খাওয়া হল, তারপর চায়ের দাম মিটিয়ে আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলুম কালীবাড়ির চাতালে।

কালীমূর্তিটি শুনলুম বাংলাদেশ থেখে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেও অবশ্য হালের ব্যাপার নয়, অনেক কাল আগের ঘটনা। জায়গাটা মনোরম। বেশ নিরিবিলিও বটে। খানিকক্ষণ সেখানে কাঠিয়ে আমরা আবার গাড়িতে এসে উঠলুম।

খানিকটা এগোবার পরে জিজ্ঞেস করলুম, “রাত্তিরে যে বঙ্কুবাবুকে হোটেলে আমাদের ঘরে আসতে বললেন, তখন কি সেখানে আমার থাকা উচিত হবে?”

“নিশ্চয় হবে।” ভাদুড়িমশাই আমার দিকে মুখ না-ফিরিয়ে হেসে বললেন, “আমি চাইছি আপনি থাকুন। আসলে, ওর সঙ্গে আমার যে কথা হবে, আপনার সেটা শোনা দরকার।”

“কেন?”

“বা রে, আমিও বুড়ো হচ্ছি না? ওকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। উত্তরে ও যা বলবে, তারই মধ্যে থেকে হয়তো বেরিয়ে আসতে পারে এমন দু’একটা কথা, যা কিনা খুবই ভাইটাল। আমি হয়তো সেটা মিস্ করে যেতে পারি। আপনি একটু খেয়াল রাখবেন।”

এবারে আমার হাসবার পালা। বললুম, “ভাইটাল কথাটা আপনি মিস করে যাবেন আর আমি ধরে রাখতে পারব? খুব বিনয়ী হয়েছেন দেখছি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা নতুন কিছু নয়, বরাবরই আমি বিনয়ী। আপনারা সেটা নেঝেন না। ভাবেন যে, লোকটা নেহাত খারাপ নয়, তবে কিনা বড্ডই দাম্ভিক। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। কিন্তু সে-কথা থাক, আর কোনও প্রশ্ন করবেন?”

“কী নিয়ে বঙ্কুবাবুর সঙ্গে কথা বলবেন?”

“সে তো আপনার সামনেই আমি বঙ্কুকে বললুম। যে ব্যাপারে ও এ মার সাহায্যে চেয়েছে, তাই নিয়ে।”

“অর্থাৎ রামুর প্রোটেকশন নিয়ে?”

“হ্যাঁ। কিন্তু এখানে থেকে যে সেটা কী করে দেব, বুঝে উঠতে পারছি না ….বাস্, ‘এ নিয়ে এখন আর কোনও প্রশ্ন নয়। ইউ মে আস্ক মি ইয়োর নেকসট কোয়েশ্চেন।”

“আপাতত আর-কোনও প্রশ্ন নেই।”

“সে কী, রানিমহলে ওই যে লোকটাকে আমরা অধো-অন্ধকারের মধ্যে পিছন থেকে দেখতে পেলুম, সে কে, আর রাত্তিরে ওখানে সে কী করছিল, তাও জিজ্ঞেস করবেন না?”

লজ্জিত হয়ে বললুম, “ও হ্যাঁ, ওটা তো ভুলেই গিয়েছিলুম। তা…”

ভাদুড়িমশাই আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, “থাক্, থাক্, আপনাকে আর পশ্ন করতে হবে না! তবে কিনা এইজন্যেই বলছিলুম যে, আপনার বিস্মরণশক্তি ইদানীং অনেক বেড়ে গেছে।”

“তা তো বেড়ে গেছে। কিন্তু লোকটা কে?”

“রাজেশ।”

“অ্যাঁ! এলেন কী? রাজেশ ওখানে কী করছিল?”

“ছবি তুলছিল।”

“ছবি তুলছিল শেষরাতের অন্ধকারে?”

“কেন, অন্ধকারে কি ছবি তোলা যায় না? ফ্ল্যাশ তা হলে কী করতে আছে?”

“তা বুঝলুম, কিন্তু দিনের বেলাতেও তো আমাদের সঙ্গে রাজেশ ওখানে গিয়েছিল। তখন ছবি না-তুলে শেষরাতে যাবার দরকার হল কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দিনের বেলায় যে ছবি তোলেনি, তা নয়, তবে তার সবই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। তখন নাকি কালার ফিল্ম নিতে ভুলে গিয়েছিল। ফলে আবার যেতে হয়।”

“আপনাকে এই কথা বলছে?”

“না বললে আমি জানব কী করে?”

“আপনি বিশ্বাসও করেছেন?”

“না-করবার কোনও কারণ অন্তত এখনও খুঁজে পাইনি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমার তো রাত থাকতে ঘুম ভেঙে যায়, সেই সময় বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, নীরমহলে পরপর কয়েকবার আলো জ্বলে উঠল। খুব উজ্জ্বল আলো। তখনই আন্দাজ করেছিলুম যে, কেউ নিশ্চয় ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তুলছে। … তবে হ্যাঁ, ভিজে জামাকাপড় কি তোয়ালের সন্ধানে আজ সকালে একবার ওদের ঘরে ঢুকেছিলুম তো, তখন আর-একটা জিনিস আমার চোখে পড়ে যায়।”

“কী?”

“একটা পিস্তল। টেবিলের টানার মধ্যে ছিল। …কী হল, কথা বলছেন না যে? ঘাবড়ে গেলেন নাকি?”

বললুম, “ঘাবড়ে যাবারই তো কথা। তা পিস্তলটা কার?”

“কী করে বলব? রাজেশেরও হতে পারে, দীপকেরও হতে পারে। …কিন্তু ও নিয়ে এখন ভেবে কিছু লাভ নেই। তার বদলে আপনি একটা কাছ করুন দেখি। আমার হ্যান্ডব্যাগটা তো পিছনের সিটে রয়েছে। হাত বাড়িয়ে ওটা সামনে নিয়ে আসুন।”

ভাদুড়িমশাইয়ের হ্যান্ডব্যাগটা সামনের সিটে নিয়ে এসে আমার কোলের উপরে রেখে বললুম, “এবার কী করব? কিছু বার করতে হবে?”

“হ্যাঁ, ওর মধ্যে একটা ফাইল রয়েছে, সেটা বার করুন। দেখবেন, লক্ষ্মণের নিরুদ্দেশ হবার বিজ্ঞাপন যে ক’টা কাগজে বেরিয়েছিল, তার সবগুলিরই ক্লিপিং রয়েছে ওখানে। যে বিজ্ঞাপনে লক্ষ্মণের ছবিটা সবচেয়ে পরিস্কার ছাপা হয়েছে, সেটা দেখুন।…না না, দায়সারাভাবে দেখলে হবে না, বেশ ভাল করে দেখতে হবে।”

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শেষ হবার আগেই ফ্ল্যাট ফাইলে রাখা বিজ্ঞাপনের কাটিংগুলোর উপরে আমি চোখ বুলোতে শুরু করেছিলুম। মনে হল, কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকাতেই ছবিটা সবচেয়ে পরিষ্কার ছাপা হয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে ছবিটা দেখেও কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারলুম না।

বললুম, “কিছুই তো বুঝতে পারছি না। কী ব্যাপার বলুন তো?”

“কিচ্ছু মনে পড়ছে না?”

“কই, না তো।”

“ইডেন গার্ডেন। বারো বছর আগে। নাইনটিন সেভেনটিনাইন। তাও মনে পড়ছে না? …ভাবুন, ভাবুন।”

“ভাবছি তো, কিন্তু আপনার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই ধরতে পারছি না।”

“বেশ, তা হলে আরও কয়েকটা ক্লু দিচ্ছি। ক্রিকেট-টেস্ট, বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আমরা ক্লাব-হাউসে বসে খেলা দেখছিলুম… একটা বছর দশ-বারোর ছেলে আমাদের পাশে বসে…”

হঠাৎ যেন একটা পর্দা সরে গেল আমার চোখের সামনে থেকে।

চশমার আড়ালে – ১৫

চিৎকার-চেঁচামেচি সমানে চলেছে। সেটা স্বাভাবিক। কেননা, নানান গেট দিয়ে একে তো পিলপিল করে তখনও লোক ঢুকছে, তার উপরে আবার আগেভাগেই যারা স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়েছিল, তাদেরও সবাই তখনও নিজের-নিজের জায়গা খুঁজে পায়নি। কিন্তু সেই হট্টগোলও হঠাৎ থেমে গেল। দেখলুম, ক্লাব হাউসের যেখানে আমরা বসে আছি, তার পাশের সিঁড়ি দিয়ে ব্যাট হাতে দুজন খেলোয়াড় মাঠের মধ্যে নেমে গিয়ে উইকেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রথমজন বেঁটেখাটো, দ্বিতীয়জন অন্তত ছ-ফুট লম্বা। বেশ রোগাও বটে।

যে-মাঠ মুহূর্তের জন্যে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, পরক্ষণেই তা আবার উত্তাল হয়ে উঠল। ‘গাভাসকর! গাভাসকর!’

মনে হল যেন গোটা মাঠ একসঙ্গে চেঁচাচ্ছে।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বড়বাবুকে তো চিনলুম, তা ওঁর সঙ্গের ওই রোগা ঢ্যাঙা ছোকরাটি কে মশাই?”

আমাকে কিছু বলতে হল না। ভাদুড়িমশাই তাঁর যে বঙ্কুপুত্রটিকে সঙ্গে করে মাঠে এসেছেন, সে একেবারে ঝাঁঝিয়ে উঠল। “ও আঙ্কল, ইউ আর ইমপসিবল! উনি হচ্ছেন দিলীপ বেঙ্গসরকর। দারুণ খেলছেন! এটা নিয়ে সতেরোটা টেস্ট খেললেন, তবে কিনা এখনও পর্যন্ত একটাও সেঞ্চুরি করতে পারেননি।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সতেরোটা টেস্ট, অথচ সেঞ্চুরি করেনি, তবু বলছিস দারুণ খেলোয়াড়! তোরা বটে বাড়িয়ে বলতে পারিস।”

ছেলেটি একটুও দমে গেল না। বলল, “এটাতেও না করতে পারেন, তবু বলব, সুনীলের পরে এ-রকম ব্যাটসম্যান আর একজনও আসেননি। তবে আমার কী মনে হয় জানো আঙ্কল, ওঁর ব্যাড প্যাঁচটা কেটে গেছে, এবারে ঠিকই সেঞ্চুরিটা পেয়ে যাবেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “টাচ উড। কাগজ পড়ে তো যা বুঝলুম, গোটা চল্লিশ রানে এগিয়ে আছি, তাও এক উইকেট খুইয়ে।”

তা ভাদুড়িমশাই কিছু মিথ্যে বলেননি। প্রথম ইনিংসে আমরা করেছিলুম তিনশো, আর ওরা তিনশো সাতাশ, দ্বিতীয় ইনিংসের সূত্রপাতেই গন্ডগোল, অংশুমান গায়কোয়াড় মাত্র পাঁচ রান করেই ক্লার্কের বলে ক্লিন বোল্ড হয়ে যায়। তার পরে অবশ্য আর-কেউ আউট হয়নি। সুনীল চৌত্রিশ রানে নট আউট রয়েছে, দিলীপ সাতাশ রানে।

এ হল ১৯৭৯ সালের পয়লা জানুয়ারির কথা। সেদিন রাত্তিরেই ভাদুড়িমশাইয়ের ফোন পাই। কী একটা কাজে কলকাতায় এসেছিলেন। বললেন, “খেলাটা বড়ই ইন্টারেস্টিং একটা স্টেজে এসে পৌঁছেছে। দেখতে যাবে নাকি?”

বললুম, “কী ব্যাপার? আপনার মাথায় আবার ক্রিকেটের ভূত চাপল কবে থেকে?”

“আমার মাথায় নয়, আমার এক বঙ্কুপুত্রের মাথায়। ব্যাঙ্গালোর থেকেই ব্যাটা আমার সঙ্গ নিয়েছে। বলছে, এই টেস্টটা ওকে দেখাতেই হবে।”

“টিকিট পেলেন?

“তা পেয়েছি। ব্যাঙ্গালোর থেকেই লালবাজারের এক পুলিশ-অফিসারকে ফোন করে সব জানিয়ে রেখেছিলুম। তো আজ ফোর্থ ডে’র তিনটে টিকিট তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন। যাবেন নাকি?”

বললুম, “কেন, কৌশিক যাবে না?”

“ও তো অনেক আগেই টিকিট কেটে রেখেছে। বঙ্কুদের সঙ্গে রোজই যাচ্ছে, কালও যাবে। ওর জন্যে ভাববেন না, আপনি যাবেন তো বলুন।”

“যদি যাই তো কোথায় মিট করব?”

“আপনার অফিসে গাড়ি রেখে খানিকটা পথ হেঁটে আসুন। কার্জন পার্কে সুরেন বাঁড়ুজ্যের স্ট্যাচুর কাছে আমি ওয়েট করব। সাড়ে নটায় এলেই হবে।”

না এলে সত্যি পস্তাতে হত। একে তো গাভাসকরের এইট্টিথ আর বেঙ্গসরকরের মেডেন সেঞ্চুরিটা তা হলে দেখা হত না, তার উপরে আবার সাক্ষী হতে পারতুম না নতুন একটা বিশ্ব রেকর্ডের। একই টেস্টের দু-ইনিংসে সেঞ্চুরি আছে অনেকেরই; কিন্তু একটা নয়, দুটো নয়, তিন-তিনটে টেস্টের দু-ইনিংসেই সেঞ্চুরি একমাত্র সুনীল ছাড়া আর কারও নেই।

ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রটি দেখলুম ক্রিকেটের বিশ্বকোষ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের নামজাদা খেলোয়াড়দের অনেকেই এবারে খেলতে আসেনি। যারা এসেছে, তাদের মধ্যে কালীচরণ ছাড়া অন্য দু-একজনের নাম শুনেছি মাত্র, বেশির ভাগকেই চিনি না। অথছ দশ-বারো বছর বয়েসের এই ছেলেটি দেখা গেল প্রত্যেককেই চেনে। যারা বল করছিল, তাদের মধ্যে একজনকে দেখিয়ে বলল, “উনি হচ্ছেন মার্শাল। উঠতি পেসারদের মধ্যে সেরা। কিন্তু লাইন আর লেংথ ঠিক রেখে বল করতে পারছেন না তো, তাই মারও খাচ্ছেন খুব। অথচ ওরই মধ্যে কীভাবে একটা ইয়র্কার দিলেন দেখুন। দিলীপ ব্যাট তোলেননি, তাই বেঁচে গেলেন। নইলে আর দেখতে হত না, ব্যাটের তলা দিয়ে ও বল নির্ঘাত উইকেট ভেঙে দিত।”

আর-একজনকে দেখিয়ে বলল, “উনি হচ্ছেন হোল্ডার। এককালে খারাপ বল করতেন না, এখন একদম ফুরিয়ে গেছেন। বড্ড লুজ বল দেন। হোল্ডিং আসেননি, তাই ওঁকে আনা হয়েছে; কিন্তু দেখুন, বল যা করছেন, তাতে একটুও ধার নেই। আর তাই, সমানে পিটুনি খাচ্ছেন।”

পিটুনি অবশ্য একা হোল্ডারই যে খাচ্ছিল, তা নয়। উইকেটের দুই প্রান্ত থেকে সুনীল আর দিলীপ একেবারে পক্ষপাতহীনভাবে সবাইকে পিটিয়ে যাচ্ছিল। প্রথম দিকের খানিকটা সময় ফিল্ডিং ছিল উইকেট-ঘেঁষা, কিন্তু কিছুক্ষণ বাদেই সেই আঁটোসাঁটো ব্যূহ একেবারে তছনছ হয়ে যায়। পরপর কয়েকটা বাউন্ডারি হতেই ফিল্ডিং নিমেষে বাউন্ডারি লাইনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন আবার শুরু হয়ে যায় প্রতিটি বলে আলতো করে ব্যাট ছুঁইয়ে সিঙ্গল রান তুলবার পালা।

তারই মধ্যে একটা চিকি সিঙ্গল নিতে গিয়ে রান-আউট হতে-হতে বেঁচে গেল দিলীপ। ময়দান-এন্ড থেকে বল করা হচ্ছিল তখন। সুনীল নন্-স্ট্রাইকিং ব্যাটসম্যান। দিলীপ দেখলুম স্লিপের ভিতর দিয়ে একটা বল গলিয়ে দিয়েই কয়েক পা এগিয়ে এসেছে। সুনীল কিন্তু ঠিকই দেখে নিয়েছিল যে, বলটা বেশি দূরে যায়নি। তার ধমক খেয়ে দিলীপ তৎক্ষণাৎ ক্রিজে ফিরে যায়। না গেলে যে তাকে রান-আউট হতে হত, তাতে সন্দেহ নেই।

ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রটি বলল, “এত চমৎকার ব্যাট করেন, অথচ এইটেই ওঁর মস্ত দোষ। বড্ড ছট্‌ফটিয়া। একটু ঠান্ডা মাথায় খেলতে পারলে অ্যাদ্দিনে ওঁর তিন-চারটে সেঞ্চুরি হয়ে যেত। এটা ওঁর কত নম্বর ইনিংস জানেন?”

“কত?”

“থার্টিয়েথ। অর্থাৎ এর আগে ঊনতিরিশবার সেঞ্চুরি করবার সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু একটাও কাজে লাগতে পারেননি। অথচ কত বড় ব্যাটসম্যান!”

ঠাট্টা করে বললুম, “উনি যত বড় ব্যাটসম্যান, তুমি দেখছি তার চাইতেও বড় ভক্ত!”

শুনে ফ্যালফ্যাল করে ছেলেটি খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর বলল, “ওহ্ নো, আমি কারও ব্লাইন্ড সাপোর্টার নই। আমি জানি, ওঁরও কয়েকটা দোষ রয়েছে। একটা দোষ উনি কভার-ড্রাইভে খুব-একটা সুবিধে করতে পারেন না। তা আজ তো দেখছি, কভার দিয়েও কয়েকটা বল চমৎকার বাউন্ডারি-লাইনের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। তার মানে কী জানেন, চিঠিতে কাজ হয়েছে।”

“এই নিয়ে তুমি ওঁকে চিঠি লিখেছিলে?”

“শুধু এই নিয়ে কেন, অনেক কিছু নিয়েই লিখি। উনি উত্তরও দেন। এমনও বলেন যে, আমি যদি বোম্বাই গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করি, তো ক্রিকেটের ব্যাপারে উনি আমার জন্যে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করে দেবেন।”

“যাও না কেন?”

“বাবা যেতে দেন না যে।” বেজার মুখে ছেলেটি বলল, “যতবার বাবাকে বলি, তিনি কী উত্তর দেন জানেন?”

“কী?”

“বলেন যে, বি.এ.টা অন্তত পাশ করে নাও। তারপর যা খুশি কোরো। তা আমি তো এখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, কবে যে বি.এ. পাশ করব, কে জানে!”

“এখন যদি তোমার ক্লাস সিক্স হয়, বি.এ. পাশ করতে তা হলে তোমার… আর মাত্র নটা বছর লাগবে। কী, হিসেবটা ঠিক হল তো?”

উত্তরটা আর শোনা হল না, তার আগেই মাঠ জুড়ে একটা তুমুল চিৎকার উঠল। ভাদুড়িমশাই তাঁর বঙ্কুপুত্রটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “বেঙ্গসরকর নব্বইয়ের ঘরে পৌঁছে গেল। মনে হচ্ছে, তোর কথাই ঠিক, ছেলেটা আজ সেঞ্চুরি না করে ছাড়বে না। দিস টাইম ইট ওন্ট স্লিপ থ্র হিজ ফিঙ্গার্স।”

সুনীলের সেঞ্চুরি একটু আগেই হয়েছে। এই নিয়ে ওর আঠারোটা টেস্ট-সেঞ্চুরি হল। ইডেনের মাঠে সুনীল এর আগে তেমন সুবিধে করতে পারেনি, কলকাতার দর্শকদের তাই নিয়ে বিস্তর ক্ষোভও ছিল, কিন্তু আজ ওর একেবারে অন্য চেহারা। সম্ভবত মাথায় একটু খাটো বলেই হুকটা সাধারণত মারতে চায় না, তবে কিনা ওটা বাদে আর যত রকমের মার একজন ব্যাটসম্যানের থাকতে পারে, ঝুলি উজার করে সে-সব ও আজ একটার পর একটা দেখিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে দিলীপ দেখলুম ধীরস্থির। পরপর কয়েকটা বল স্রেফ ব্লক করে গেল, মারার কোনও চেষ্টাই করল না।

বললুম, “এরকম করলে কিন্তু আমি ঘুমিয়ে পড়ব।”

তা ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রটি অতি তুখোড় ছেলে। আমার মন্তব্য শুনে হেসে বলল, “আপনাকে জাগিয়ে রাখবার জন্যে উইকেটটা ওদের হাতে তুলে দিয়ে উনি কি হাসতে-হাসতে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসবেন নাকি? উনি এখন প্রতিটি বল দেখে-দেখে খেলবেন। যতক্ষণ না লুজ বল পাচ্ছেন, মারবেন না।”

আমাদের সামনে যিনি বসে ছিলেন, মুখ ঘুরিয়ে তিনি বললেন, “হি ইজ রাইট। এখন কি আর ধুমধাড়াক্কা পেটাবার সময়? নব্বুই পেরিয়েছে, বুঝতে পারছে যে, বারবার বোলার পালটে একটা সাইকোলজিক্যাল প্রেশার ক্রিয়েট করবার চেষ্টা হচ্ছে ওর উপরে, এখন ওকে দারুণ হুঁশিয়ার থাকতে হবে। নব্বুইয়ের ধাক্কা বড় মারাত্মক ধাক্কা মশাই। পঙ্কজ তো একবার এই ইডেনেই নিরানব্বই করে আউট হয়ে গেল। ওফ, মাত্তর একটা রান, তারই জন্যে সেঞ্চুরিটা করতে পারল না!”

বঙ্কুপুত্রটি ঝুঁকে পড়ে বলল, “ইউ মিন পঙ্কজ রায়? …মানে ভিনু মাকড়ের সঙ্গে এখনও যাঁর একটা ওয়ার্লড রেকর্ড রয়েছে?”

“তবে আর বলছি কী! দিব্বি নিরানব্বইয়ে পৌঁছে গেল। আমরা ভাবছি, যাক্, ঘরের ছেলে তা হলে মান রাখল বটে, সেঞ্চুরি না হয়ে যায় না। কিন্তু কোথায় কী, যেই না একটু অন্যমনস্ক হয়েছে, অমনি আউট! আরে বাবা, এ হচ্ছে কনসেনট্রেশনের খেলা। হুম্দো-হুম্দো সব বোলার, কে কখন কী করে বসে, তার তো ঠিক নেই। তাদের উপরে নজর রাখো, গ্রিপটা খেয়াল করো, বলটা ছাড়বার সময় কবজি ঘুরল না আঙুল ঘুরল, সেটা দেখে নাও, বলটাকেও একেবারে শেষ অব্দি দেখতে হবে, তার আগেই যদি ব্যাট তুলেছ তো মরেছ। তো তা-ই হল। মাত্তর একটা রান দরকার ছিল রে ভাই, ওফ্…”

“এটা কবে হয়েছিল বলব?”

বলা আর হল না। কবজির মোচড়ে বেঙ্গসরকর ততক্ষণে বাউন্ডারিতে বল পাঠিয়েছে। বোঝা গেল, অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পরে আবার সে রান তুলবার দিকে মন দিয়েছে। তার দরকারও আছে বই কী। রানের ব্যাপারে ভারতকে এখন চটপট একটা ব্যবধান গড়ে তুলতে হবে, নয়তো এ-খেলা ড্রয়ের দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া মোটেই বিচিত্র নয়।

সেঞ্চুরিটা এরপর তাড়াতড়িই এসে গেল, আর তারপরেই শুরু হল বেধড়ক পিটুনি। সুনীল সব সময়েই সতর্ক ব্যাটসম্যান, ওপেনারের ধর্ম আসলে সেটাই হওয়া উচিত, পারতপক্ষে সে ঝুঁকি নিয়ে ব্যাট চালায় না। সত্যি বলতে কী, এক বিজয় মর্চেন্ট ছাড়া আর কাউকেই আমি কখনও সুনীলের মতো এত ধীরস্থির ভঙ্গিতে বলের মোকাবিলা করতে দেখিনি। কিন্তু সেই সুনীলও যেন আজ হঠাৎ কেমন পালটে গেছে। মাঝে মাঝই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে আসছে সে, আর মধ্যপথেই সপাটে ব্যাট চালিয়ে বল পাঠিয়ে দিচ্ছে বাউন্ডারির সীমানায়। বেশ কিছুটা পালটে গেছে দিলীপও। ফলে রানও এখন একেবারে লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠেছে।

হাততালির শব্দে কানে তালা লাগবার উপক্রম। যেমন হাততালি, তেমন চিৎকার। বাউন্ডারি হলে তো বটেই, খুচরো এক-একটা রান করলেও সবাই গলা ফাটিয়ে ব্যাটসম্যানকে শাবাশ দিচ্ছে। আমার যে বয়েস হয়েছে, এই বয়েসে চেঁচানো যে আমার মোটেই শোভা পায় না, তার উপরে আবার ক্লাব-হাউসে যেখানে জায়গা পেয়েছি, সেখানে বসে চিৎকার করা যে ঘোর অশোভন ব্যাপার, সে-সব কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আমিও একবার গাভাসকরের দুর্দান্ত একটা স্ট্রেট ড্রাইভ দেখে “শাবাশ সানি” বলে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েছিলুম, কিন্তু ‘শাবাশ’ বলে তারপর আর বলা হয় না, ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রটির দিকে চোখ পড়তে দেখি, ছেলেটা একেবারে কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

ঢোক গিলে বললুম, “কী ব্যাপার?”

“চেঁচাচ্ছেন কেন?”

“বা রে, ওইরকম একটা স্ট্রেট ড্রাইভ দেখলে না- চেঁচিয়ে পারা যায়? বোলারের পাশ দিয়ে মাঠের ঘাস পুড়িয়ে বলটা কীভাবে বাউন্ডারি লাইন পেরিয়ে গেল, দেখলে? ও-বল আটকাতে গেলে হাতে নিশ্চয় ছ্যাঁকা লেগে যেত। তা ছাড়া, রান ওঠাও তো দরকার।”

“শুধু রান উঠলেই চলবে?”

“সুনীল একশো আশির ঘরে পৌঁছে গেছে, দিলীপও দেড়শো পেরিয়ে গেল। হাত সেট হয়ে গেছে তো, তাই মনে হচ্ছে, ওরা দুজনেই আজ ডবল সেঞ্চুরি করবে।”

“তা যদি ওঁরা করেন, ইন্ডিয়াকে তা হলে এ টেস্ট জিততে হচ্ছে না।”

ওরেব্বাবা, সময় বলেও যে একটা ব্যাপার বয়েছে, সেটা তো এতক্ষণ খেয়ালই করিনি। এ-ছেলের দেখছি সবদিকেই সমান নজর। বললুম, “তা হলে এখন ডিক্লেয়ার করাই ভাল।”

“নিশ্চয়। আজ ফোর্থ ডে। আর মাত্র একটা দিনের খেলা বাকি। অবশ্য কুড়িটা ম্যান্ডেটারি ওভার পাওয়া যাবে। কিন্তু তার মধ্যেই যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসটা মুড়িয়ে দিতে হবে, সেটা ভুলে গেলেই তো মুশকিল।”

“তা তো বটেই। তা হলে?”

ছেলেটি হেসে বলল, “অত ভাবনার কিছু নেই। গাভাসকর আর বেঙ্গসরকর খুব ভালই জানেন যে, এটা শুধু ওঁদের দুজনের খেলা নয়, গোটা দলের খেলা। দুজনেই টিম-ম্যান। দলের জন্যে ওঁরা যতটা করা যায় করেছেন, এখন দলের জন্যেই দানটা ওঁদের ছাড়তে হবে। তা ওঁরা ছেড়েও দেবেন।”

এ সব কথা যখন হচ্ছিল, চা-বিরতির পরের পর্যায়ের খেলা তখন আধ ঘন্টাটাক গড়িয়ে গেছে। আস্তে আস্তে কমে আসছে দিনের আলো। স্টেডিয়াম হবার আগেও এ মাঠে বিস্তর খেলা দেখেছি। মাঠের চারদিকে তখন মস্ত মস্ত গাছ ছিল। সূর্য একটু পশ্চিমে গড়িয়ে গেলেই মাঠের উপরে তার ছায়া পড়তে শুরু করত। মাথার মধ্যে তার স্মৃতি একটু-একটু নড়াচড়া করতে শুরু করেছিল। মাঝে-মাঝেই মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই আমলের সব মহারথীদের কথা। সি. কে. নাইডু, মুস্তাক আলি, মার্চেন্ট, হাজারে, কাকে খেলতে দেখিনি এই মাঠে?

একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম। ভাদুড়িমশাইয়ের বঙ্কুপুত্রের কথায় আমার চমক ভাঙল। “দেখুন, দেখুন, যা বলেছিলুম, তা-ই হল কি না। ইনংস ডিক্লেয়ার করে দেওয়া হল। খানিক বাদেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাঠে নামবে। এই শেষ বেলায় যদি কপিল ঝপাঝপ দুটো উইকেট নিয়ে নেন, তা হলে আর দেখতে হচ্ছে না, খেলাটা একেবারে হাতের মুঠোয় এসে গেল?”

কিন্তু দুটো কেন, একটা উইকেটও নেওয়া গেল না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেকেন্ড ইনিংস যারা ওপেন করতে নেমেছিল, ছেলেটিই চিনিয়ে দিল তাদের। বাকাস আর মারে। এক উইকেটে তিনশো একষট্টি রান তুলে আমরা যখন আমাদের সেকেন্ড ইনিংস ডিক্লেয়ার করেছিলুম, গাভাসকরের রান তখন একশো বিরাশি, বেঙ্গসরকরের একশো সাতান্ন। দুজনেই নট আউট। কিন্তু বাকাস আর মারে সেই যে মাটি কামড়ে পড়ে রইল, কিছুতেই আর তাদের একজনকেও নড়ানো গেল না।

খেলা ভাঙতে আমরা মাঠ থেকে আস্তে-আস্তে বেরিয়ে এলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, হাঁটতে-হাঁটতে এসপ্লানেড পর্যন্ত যাওয়া যাক। ওখান থেকে আপনি অফিসে ফিরবেন।”

“আর আপনারা?”

“আমরা একটা ট্যাক্সি নিয়ে বালিগঞ্জে চলে যাব। কালই আমরা বাঙ্গালোরে ফিরছি। এ যাত্রায় আর আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না।”

হাঁটতে-হাঁটতে অফিসে ফিরে এলুম। হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে, এতক্ষণ যে বাচ্চা ছেলেটির পাশে বসে খেলা দেখলুম, তার নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করা হয়নি।

১৬
সিপাহিজলা থেকে আগরতলায় যাবার পথে বাঁ-দিকে টার্ন নিয়ে, যে রাস্তা দিয়ে কসবার কালীবাড়ি যেতে হয়, সেই রাস্তা পেরিয়ে কখন যে আবার বড় রাস্তায় ফিরে এসেছি, কিছুই জানি না। বারো বছর আগেকার এক শীতের দিনের স্মৃতির মধ্যেই আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম। গাড়িটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে যেতেই আমার ভাবনার সুতোটাও সেইসঙ্গে ছিঁড়ে গেল। বললুম, “কী ব্যাপার, থেমে গেলেন যে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু চা খাবার ইচ্ছে হল।”

রাস্তার পাশেই চায়ের দোকান। দোকানের সামনে বটগাছ। বটগাছের তলায় বেঞ্চি পাতা। বেঞ্চিতে বসে দু’ গেলাস চায়ের অর্ডার দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেই উদয়পুর থেকে বলতে গেলে একরকম নন্-স্টপ গাড়িটা দৌড়চ্ছে। এখন ওর একটু বিশ্রাম পাওয়া দরকার।”

বললুম, “আপনিও তো নন-স্টপ গাড়ি চালাচ্ছেন। এবারে না হয় স্টিয়ারিং হুইলটা আমিই ধরি।”

“মাথা খারাপ?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “একটু বাদেই তো আগরতলার মধ্যে ঢুকব, সেখানকার পথঘাট আপনি কিছুই চেনেন না, ফলে পাশে বসে ক্রমাগত আমাকে বলতে হবে, এবারে ডাইনে ঘুরুন, এবারে বাঁয়ে। তার চেয়ে বরং এতটা যখন চালিয়ে এসেছি, তখন বাকি পথটুকুও আমিই চালাই।”

বললুম, “অর্থাৎ কিনা সুখের চেয়ে সোয়াস্তি ভাল, এই তো?”

“তা যা বলেছেন। কিন্তু এতক্ষণ কী ভাবছিলেন বলুন তো? সারাক্ষণ তো দেখলুম চুপ করে বসে রইলেন। কোনও জরুরি কথা?”

চা দিয়ে গিয়েছিল। আমার গেলাসটার একটা চুমুক দিয়ে বললুম, “কী ভাবছিলুম, আপনি জানেন না? আচ্ছা লোক মশাই আপনি!”

“আমি আপনাকে বিজ্ঞাপনের ছবিটা খুব ভাল করে দেখতে বলেছিলুম। সেইসঙ্গে বলেছিলুম ইন্ডিয়া ভার্সাস ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটা ক্রিকেট-টেস্টের কথা ভাবতে। খেলাটা বারো বছর আগেকার। হয়েছিল কলকাতায়। ক্লাব হাউসে বসে এই টেস্ট-ম্যাচের ফোর্থ ডে’র খেলাটা আমরা দেখেছিলুম। আপনি, আমি, আর…”

বাধা দিয়ে বললুম, “থাক্, থাক্, আর বলতে হবে না। আরে মশাই, নাইনটিন সেভেনটি নাইনের সেই দিনটার কথাই তো ভাবছিলুম এতক্ষণ।”

“কিছু মনে পড়ল? … মানে আমার সঙ্গে যে ছেলেটা ছিল, তার সম্পর্কে?”

“বিস্তর কথা মনে পড়েছে। বলব?”

“এখন বলতে হবে না। একটা কাজ করুন। একটু বাদেই তো আমরা হোটেলে পৌঁছে যাচ্ছি। সেখানে পৌঁছে আর সময় নষ্ট করবেন না, ছেলেটা সম্পর্কে যা-যা আপনার মনে পড়েছে, সব একটা কাগজে লিখে ফেলবেন। ঠিক আছে?”

“ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করি।”

“করুন।”

“আপনার সঙ্গে ওই যে বাচ্চা ছেলেটি সেদিন ইডেনে গিয়েছিল, তার কথা যতই ভাবছি, ততই আমার চোখ চলে যাচ্ছে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে ছাপা এই ছবিটার দিকে। দুজনের মুখের খুব মিল।”

“তা হতেই পারে।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আপনার দশ-বারো বছর বয়েসের ছবির সঙ্গে আপনার একুশ-বাইশ বছরের ছবির মিল থাকবে না? পুরোপুরি মিল না থাক, একটা আদল… সেটা তো থাকবেই।”

চমকে উঠে বললুম, “সে-ই তা হলে….

ভাদুড়িমশাই বললেন, “লক্ষ্মণ। বঙ্কুর ছোট ছেলে। মানে যমজদের মধ্যে যেটা ছোট।”

“কিন্তু যদ্দুর মনে করতে পারছি, আপনি তো সেদিন বলেছিলেন যে, বাঙ্গালোর থেকে আপনার বঙ্কুপুত্রটি আপনার সঙ্গে কলকাতায় এসেছে। তাই না?”

“তা-ই তো এসেছিল। আসলে দুই ছেলেকে নিয়ে বঙ্কু গিয়েছিল ব্যাঙ্গালোরে। আমার বাড়িতেই উঠেছিল। তখন হঠাৎ আমার কলকাতায় আসবার দরকার হয়। শুনে লক্ষ্মণ বলল, কলকাতায় টেস্ট-ম্যাচ চলছে, আমিও তোমার সঙ্গে যাব। তো কী আর করব। ব্যাটাকে নিয়ে আসতে হল। ….কিন্তু না, এখন আর কোনও কথা নয়, ওটা বোধহয় বঙ্কুর গাড়ি আসছে।”

বলতে-না-বলতে দু’দুটো অ্যাম্বাসাডার গাড়ি আমাদের সামনে এসে ব্রেক কষে পরপর রাস্তার উপরে দাড়িয়ে গেল। প্রথম গাড়িটায় পিছনের সিটে বঙ্কুবাবু আর মিসেস ঘোষ, সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে পীতাম্বর। দ্বিতীয় গাড়িটার পিছনের সিটে দীপক আর রামু, সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে রাজেশ। প্রথম গাড়িটা বিজু চালাচ্ছে, দ্বিতীয় গাড়িটা শঙ্কর।

কোনও গাড়িরই দরজা খুলবার লক্ষণ দেখা গেল না। আমরা এগিয়ে যেতে সামনের গাড়ির পিছনের সিটের জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনারা এখানে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই একটু চা খেয়ে নেবার ইচ্ছে হল।”

মিসেস ঘোষের পাশ থেকে বঙ্কুবাবু বললেন, “তবু ভাল, তোমাদের গাড়িটা এখানে দাঁড়িয়ে আছে শুনে আমি ভাবলুম, কলকব্জা বিগড়ে গিয়ে থাকবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে না না, ও-সব কিছু নয়, তোমরা এগোও, আমরা তোমাদের ফলো করছি।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আমরাও তো এখানে এক কাপ করে চা খেয়ে নিতে পারি।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “বলো কী, আবার চা? তা ছাড়া রাস্তার ধারের এ-সব দোকানে চা দেয়, না কীসের পাতা সেদ্ধ করে দেয় কে বলবে। চলো চলো, ঘেমে-নেয়ে তো সবাই একশা হয়ে আছি, এখন আর গাড়ি থামাবার দরকার নেই, একেবারে হোটেলে গিয়ে চা খাব।”

বঙ্কুবাবুর মুখ দেখে বুঝলুম, মিসেস ঘোষের কথায় তিনি অস্বস্তি বোধ করছেন। একটু রেগে ও গেছেন হয়তো। কিন্তু কিছু বললেন না।

গাড়ি দুটো চলে গেল।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিছু বুঝলেন?”

হেসে বললুম, “একটা কথাই বুঝলুম। বৃদ্ধ বয়েসে দারপরিগ্রহ না করাই ভাল।”

“কিছু দেখলেন?”

“কী দেখব?”

“তার মানে দেখেননি। দ্বিতীয় গাড়ির পিছনের সিটে রামুর গলায় একটা স্লিং বাঁধা রয়েছে দেখলুম। যে-দিক থেকে পৈতে গলায় দেওয়া হয়, তার উলটো-দিক থেকে স্লিংটা পরানো। অর্থাৎ কিনা গলার ডান দিকে থেকে। তার মানে বাঁ হাতে কিছু হয়েছে।”

“তেমন সিরিয়াস কিছু নিশ্চয় নয়। একটা বই পড়ছিল দেখলুম।”

“বইটা ডান-হাতে ধরা। গাড়িতে বসে যখন কেউ বই পড়ে, তখন বইটা সাধারণত কোলের উপরে না রেখে একটু উঁচু করে ধরতে হয়। গাড়িতে একটু-না-একটু ঝাঁকুনি থাকেই, তা ছাড়া বাতাসে বইয়ের পাতা উড়তে থাকে, সেটা সামলাবার জন্যে বইটাকে দু-হাতে না-ধরে উপায় থাকে না। ও কিন্তু একটা-হাতে বইটা ধরেছিল। ডান হাতে। বাঁ হাতটা জখম হয়েছে কি না, ভাবছি।”

“ওর উপরে আবার কোনও অ্যাটেম্‌ট হল না তো?”

“কী জানি।” চিন্তিতভাবে ভাদুড়িমশাই বলেলেন, “হতেও পারে। …কিন্তু আর নয়, চলুন এবারে রওনা হওয়া যাক।”

চায়ের দাম মিটিয়ে আমরা গাড়িতে গিয়ে উঠলুম।

গাড়ি স্টার্ট দেবার পরে কিছুক্ষণ কোনও কথা হল না। বুঝতে পারছিলুম, ভাদুড়িমশাই একটু অন্যমনস্ক। কিছু ভাবছেন। হঠাৎ এক সময়ে বললেন, “কেসটা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, কিরণবাবু।”

বললুম, “নতুন আবার কী হল? …ও হ্যাঁ, রামুর উপরে সম্ভবত আবার হামলা হয়েছে। কী জানেন, ওকে প্রোটেকশন দেবার জন্যেই তো আপনার এখানে আসা। সিপাহিজলায় ওকে ফেলে রেখে তাই আমাদের চলে আসা উচিত হয়নি। এ-যাত্রায় না হয় কমলাসাগর আর কসবার কালীবাড়ি না-ই দেখতুম। পরেও নিশ্চয় ত্রিপুরায় আসা হবে আবার। এখনকার মতো ব্যাপারটা মলতুবি রাখলেও কিছু ক্ষতি ছিল না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দূর মশাই, আপনার বড্ড ওয়ান-ট্রাক মাইন্ড। আমি রামুর কথা ভাবছি না। খালি অ্যাটেম্‌ট-অ্যাটেম্‌ফ্ট করছেন কেন? হঠাৎ কোথাও বেমক্কা পড়ে গিয়েও হাত ভেঙে থাকতে পারে। তা কি কেউ পড়ে না নাকি?”

ঢোক গিলে বললুম, “তাও কিছু বিচিত্র নয়। যাই-ই হোক, ঠিক কী যে হয়েছে, হোটেলে না পৌঁছনো পর্যন্ত সেটা বোঝা যাচ্ছে না।”

“এই এতক্ষণে আপনি একটা বুদ্ধিমানের মতো কথা বললেন। যতক্ষণ না হোটেলে পৌঁছচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত রামুকে নিয়ে ভেবে কোনও লাভ নেই।”

“তা হলে কার কথা ভাবব?”

পিছন থেকে একটা বাস ক্রমাগত হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার বাঁ দিকে সরে গিয়ে সেটাকে ‘পাস’ দিলেন ভাদুড়িমশাই, তারপর বললেন, “যে ছেলেটা নিখোঁজ হয়ে গেছে, তার কথাও তো একটু-আধটু ভাবতে হবে। আমি লক্ষ্মণের কথা ভাবছি। ও হ্যাঁ, লক্ষ্মণের সম্পর্কে আপনাকে যা বলেছি, মনে আছে তো?”

“হ্যাঁ। হোটেলে পৌঁছেই সব লিখে ফেলব। সব কথা অবশ্য আমার মনে নেই।”

যেটুকু মনে আছে, সেটুকু অন্তত লিখে ফেলুন। কিছু বাদ দেবেন না।”

রাস্তার উপরে গাড়িঘোড়া আর মানুষজনের সংখ্যা ইতিমধ্যে বেশ বেড়ে গিয়েছিল। মনে হল, আগরতলার কাছাকাছি এসে পড়েছি। ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা বলতে তিনি বললেন, “সামনে একটা নদী পড়বে। শুনে অবাক হবেন না, এখানে যেমন কসবা বলে একটা জায়গা আছে, তেমনি আবার হাওড়া বলে একটা নদী আছে। নদী পেরুলেই আগরতলা শহর।”

খানিক বাদেই নদীর উপরকার ব্রিজ পেরিয়ে আমরা আগরতলায় ঢুকলুম। নদীর ধারে শ্মশানঘাট। শ্মশান ছাড়িয়ে বাজার। সেই ঘিঞ্জি এলাকাও পার হয়ে আসা গেল। পথ এখন আবার মোটামুটি ফাঁকা। হোটেলের নাম জানাই ছিল। নিশানাটাও বঙ্কুবাবু জানিয়ে দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও গাড়ি থামিয়ে রাস্তার পাশের একটা ওষুধের দোকান থেকে জেনে নিলুম যে, ঠিক কোন রাস্তা ধরে আমাদের এগোতে হবে।

হোটেলে এসে যখন পৌঁছলুম, তখন সাড়ে ছ’টা বাজে।

রিসেপশান-কাউন্টারের সামনে প্রশস্ত জায়গাটা বেশ সাজানো-গোছানো। বঙ্কুবাবু সেখানে একটা সোফায় চুপচাপ বসে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে পীতাম্বর। আমাদের ঢুকতে দেখে পীতাম্বর তার মনিবকে বলল, “বাবুরা এসে গেছেন।” শুনে বঙ্কুবাবু তাঁর সোফা থেকে উঠে, সামনের দিকে তাকিয়ে, বললেন, “এসো চারু… আসুন কিরণবাবু।” আমরা যে ইতিমধ্যে তাঁর একবারে পাশে চলে এসেছি, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “চেক-ইন করা হয়েছে?”

“অনেকক্ষণ। ওরা যে যার ঘরে রয়েছে। …ও হ্যাঁ, পাঁচটা ঘরই তিনতলায়।”

পীতাম্বর একটা চাবি আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, “আপনাদের ঘরটা বাবুর ঘরের ঠিক পাশে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা বঙ্কু, তুমি আবার নীচে নেমে আসতে গেলে কেন? আবার তো কষ্ট করে উপরে উঠতে হবে।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “না হে, চিন্তা কোরো না, এখানে লিফ্ট রয়েছে।”

সবাই মিলে লিফটে করে উপরে উঠে এলুম। বঙ্কুবাবু নিজের ঘরে না গিয়ে আমাদের ঘরে এসে ঢুকলেন। তরপর পীতাম্বরকে বললেন, “তুই একটু বাইরে যা, মিনিট পনেরো বাদে আসবি, বাবুদের সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।”

পীতাম্বর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

বঙ্কুবাবু বললেন, “বলো কী বলবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে-সব কথা তো পনেরো মিনিটে শেষ হবে না, অনেক সময় লাগবে। ওটা বরং রাত্তিরেই খাওয়ার পরে হবে। এখন একটা কথা জিজ্ঞেস করি। রামুর উপরে কি ইতিমধ্যে ফের হামলা হয়েছিল?”

“না, না হামলা নয়। ছোট্ট একটা অ্যাকসিডেন্ট। কিন্তু তুমি সে-কথা জানলে কী করে?”

“গাড়িতে ওকে দেখলুম তো। মনে হল যেন গলায় একটা স্লিং বাঁধা।”

“আর বোলো না,” বঙ্কুবাবু বললেন, “এখানে আসা অবধি একটা-না-একটা লেগেই আছে। সিপাহিজলায় দুপুরের খাওয়ার খানিক বাদে একটু রেস্ট নেবার জন্যে দোতলায় যাচ্ছিল। তা সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ উঠতে-না-উঠতেই পা হড়কে পড়ে যায়।”

“তাতে বাঁ-হাতটা জখম হয়েছে?”

“ওই মানে ঠিক জখম নয়, একটু মচকে গিয়েছে আর কি।”

“ও তো দেখছি একতলায় থাকে। রেস্ট নেবার জন্যে হঠাৎ দোতলায় উঠতে গেল কেন?”

“কথাটা যে আমি জিজ্ঞেস করিনি, তা নয়,” বঙ্কুবাবু বললেন, “তাতে বলল যে, দোতলাটা অনেক খোলামেলা, হাওয়াও অনেক বেশি। তা সেই হাওয়া খেতে গিয়ে কী কান্ড বাধিয়ে বসল দ্যাখো। আসল ব্যাপারটা কী জানো চারু, সেই যে ওর বিলেত যাওয়ায় বাধা দিয়েছিলুম, তার পর থেকেই ও যেন কেমন হয়ে গেছে। একে তো আমার সঙ্গে কথাই বলতে চায় না, তার উপরে দারুণ একগুঁয়ে। আমি যেটা বলব, তার বিরুদ্ধে ওর যাওয়াই চাই। যেন তাতেই ওর শান্তি।”

কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ কাটল। তারপর ভাদুড়িমশাই বললেন, “হাতটা যে মচকে গেল, ডাক্তার ডেকেছিলে? …মানে ছড়ে-টড়ে যায়নি তো? তা হলে কিন্তু একটা অ্যান্টি-টিটেনাস সিরাম নিলে ভাল হত।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আরে না না, ছড়ে-টড়ে যায়নি। আর তা গেলেই বা এখানে এ.টি.এস. ইঞ্জেকশন কে দিত? ধারে কাছে ডাক্তারই নেই। না না, ও-সব কিছু নয়, জাস্ট একটু মচকে গিয়েছে। হাতটা অবশ্য নাড়াতে পারছিল না, খুব ব্যথাও করছিল নাকি। তো ডলির সঙ্গে এক বান্ডিল ব্যান্ডেজের কাপড় ছিল তো, দীপক তাই দিয়ে তক্ষুনি-তক্ষুনি একটা স্লিংয়ের ব্যবস্থা করে দিল।”

“ব্যথাটা কি এখনও আছে?”

“কী ব্যাপার বলো তো?” বঙ্কুবাবু বললেন, “হাতটা সামান্য একটু মচকে গেছে বই তো নয়, আমরা তো ছেলেবেলায় স্রেফ চুন-হলুদ লাগিয়ে দিতুম। এখন অবশ্য সাতশো রকমের মলম হয়েছে। তার একটা লাগিয়েও দিয়েছে দীপক। তো তাই নিয়ে তুমি এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন?”

“ব্যস্ত হবার কারণ আছে বলেই হচ্ছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “দ্যাখো বঙ্কু, ব্যথা যখন কমে না, তখন অনেক সময় দেখা যায় যে, একটা হাড় হয়তো ভেঙেছে। কিংবা না-ও যদি ভেঙে থাকে, তাতে চিড় ধরেছে। সত্যিই তেমন কিছু যে হয়েছে, তা কিন্তু আমি বলছি না। শুধু বলছি যে, ওকে একবার জিজ্ঞেস করা দরকার ব্যথাটা কমেছে কি না। যদি কমে গিয়ে থাকে, তো ল্যাঠা চুকে গেল। না কমে থাকলে কিন্তু আমি একটা এক্স-রে করিয়ে নিতে বলব। তা ব্যথাটা কমেছে কি না, এখানে এসে তা কি তুমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলে?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আমি জিজ্ঞেস করব? আমার সঙ্গে তো ও কথাই বলতে চায় না। ঠিক আছে, ডলিকে দিয়ে বরং জিজ্ঞেস করাচ্ছি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাক, কাউকে দিয়ে জিজ্ঞেস করাতে হবে না। খানিক বাদে তো ডাইনিং হলে ওর সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তখন আমিই জিজ্ঞেস করব তখন।”

“আর কিছু বলবে আমাকে?”

“এখন নয়। রাত্তিরের খাওয়ার পাট চুকে যাবার পরে তো তুমি ঘন্টা-খানেকের জন্যে আমাদের ঘরে আসছ, তখন কথা হবে। এখন তুমি ঘরে যাও। … কিরণবাবু, পীতাম্বর সম্ভবত দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ওকে ডেকে দিন।”

পীতাম্বর সত্যি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এসে বঙ্কুবাবুকে তাঁর ঘরে পৌঁছে দিল। দরজা বন্ধ করে ফিরে আসছি, ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু বাদেই খাওয়ার ডাক পড়বে। স্নান করে জামাকাপড় পালটে নিন। আপনি বেরুলে আমি বাথরুমে ঢুকব।”

খাবার ডাক পড়ল সাড়ে আটটা নাগাদ। আমার একটু মাথা ধরেছিল, তাই ভাবছিলুম যে, রুম সার্ভিস যখন রয়েছে, ফোন করে খাবারটা ঘরে আনিয়ে নেব। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে না, অত অল্পে কাতর হয়ে পড়বেন না তো, সবাই মিলে যখন একতলায় ডাইনিং হলে যাওয়া হচ্ছে, তখন আপনিও চলুন। আর তা ছাড়া, ঘরে বসে ডিনার খাবেন বলে আপনাকে এখানে আনানো হয়েছে নাকি? চারদিকে নজর রাখতে হবে না?”

অগত্যা নীচে যেতেই হলে। ডাইনিং হলটা বেশ বড়। জানলার ধারে দুটো টেবিল জোড়া লাগিয়ে আমাদের বসবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছলুম, মিসেস ঘোষ সদ্য তখন ওয়েটারকে খাবারের অর্ডার দিতে শুরু করেছেন। আমাদের দেখে বললেন, “এখানে সব রকমের খাবারই পাওয়া যায়। আমরা চাইনিজ নিচ্ছি। আপনারা কী নেবেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দ্য সেম অ্যাজ ইয়োর্স।”

টেবিলের অন্য দিকে রামু বসে আছে। বাঁ হাতটা স্লিংয়ে ঝোলানো। বললুম, “হাতটা শুনলুম মচকে গেছে। এখন কেমন আছ?”

রামু মৃদু হাসল। কিছু বলল না।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখনও ব্যথা করছে নাকি?”

রামু এবারেও মুখে কিছু বলল না। দু-দিকে মাথা নাড়ল শুধু।

বঙ্কুবাবু মাথা-নাড়াটা দেখতে পাননি। উদ্বেগের গলায় বললনে, “কী রে, তোর আলের কথার জবাব দিচ্ছিস না কেন?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “দিয়েছে। বলছে, যে, এখন আর ব্যথা নেই।”

সুপ এসে গিয়েছে। ভাদুড়িমশাই চামচ দিয়ে অল্প-একটু মুখে তুলে মিসেস ঘোষের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ক্র্যাব অ্যান্ড অ্যাসপ্যারাগাস। আমার প্রিয় সুপ। আপনার অবশ্য জানবার কথা নয়।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “জানব না কেন, আপনার বঙ্কুই বলেছে। এটাও শুনেছি যে, কলেজে পড়বার সময় প্রায়ই নাকি নানকিংয়ে যেতেন আপনারা। সত্যি?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আমার কি আর তখন নানকিংয়ে যাওয়ার মতন অবস্থা? চারুই আমাকে ধরে নিয়ে যেত। তা চারুও কেন যেত জানো? স্রেফ ওই ক্র্যাব অ্যান্ড অ্যাসপ্যারাগাস সুপের জন্যে।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আর-কিছু খাবার মতো পয়সা কি তখন আমারই ছিল? তবে একটা কথা বলব। কলকাতায় তো তখন আরও গোটাকয় চিনে রেস্তোরাঁ ছিল, পরে অবশ্য আরও অনেক হয়েছে, কিন্তু নানকিংয়ের মতন আর একটাও হল না। বঙ্কুর হয়তো মনে থাকতে পারে, পকেট-মানি জমিয়ে-জমিয়ে একদিন একটা ম্যান্ডারিন ফিশও ওখানে খেয়েছিলুম। উঃ, তার স্বাদ যেন এখনও মুখে লেগে আছে।”

ডাইনিং হলে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্রেফ খাওয়া নিয়েই কথাবার্তা হতে লাগল। অন্য প্রসঙ্গে একটাও কথা হল না। খাওয়া শেষ হতে-হতে সাড়ে নটা। নীচে আর কোনও কাজ ছিল না। আমরা উপরে এসে যে যার ঘরে এসে ঢুকলুম।

তারপর খানিক বাদে, রাত দশটা নাগাদ, আমাদের দরজায় টোকা পড়ল।

১৭
ঘরের মধ্যে চেয়ার যদিও দুটো, আর্মচেয়ার মাত্র একটাই। ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ সেটা দখল করে রেখেছিলেন। বঙ্কুবাবুকে সঙ্গে নিয়ে পীতাম্বর আমাদের ঘরে ঢুকতেই ভাদুড়িমশাই এগিয়ে গিয়ে বঙ্কুবাবুকে নিয়ে এসে সেই আর্মচেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললেন, “এবারে তুমি যেতে পারো, পীতাম্বর। তবে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকো না, নিজের ঘরে চলে যাও।”

পীতাম্বর চলে যাচ্ছিল। ভাদুড়িমশাই তাকে উদ্দেশ করে বললেন, “ও হ্যাঁ, ঘরে গিয়ে কিন্তু ঘুমিয়ে পোড়া না। ঘন্টাখানেক বাদে এসে তোমার বাবুকে আবার তাঁর ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “দরকার হবে না। পাশের ঘরেই তো থাকি। ও আমি একাই ঠিক চলে যেতে পারব।”

পীতাম্বর বেরিয়ে গেল। ভাদুড়িমশাই গিয়ে দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে এলেন। তারপর ফিরে আসতে-আসতে বললেন, “তোমার গিন্নিকে ওই কথাই বলে এসেছ তো?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “হ্যাঁ, বললুম যে, ডিরেকশান আর স্ক্রিপ্‌ট-রাইটিংয়ের পেমেন্ট নিয়ে কথাবার্তাটা চুকিয়ে ফেলা দরকার। তা ছাড়া কিছু আগামও দিয়ে রাখতে হবে। ডলিও আসতে চাইছিল। তাতে বললুম, না না, খুবই ডেলিকেট ব্যাপার তো, তুমি থাকলে ওঁরা অস্বস্তি বোধ করতে পারেন, আমার তাই একা যাওয়াই ভাল। …তো তোমার কী সব জিজ্ঞেস করবার আছে বলছিলে না?”

“হ্যাঁ, কিন্তু তার আগে একটা কথা বলো তো। কাল যে আমরা কলকাতায় যাচ্ছি, এটা একেবারে পাক্কা?”

“অ্যাবসলিউটলি।” বঙ্কুবাবু বললেন, “হোটেলে পৌঁছেই আমার লোককে… মানে আমার সেই এজেন্টকে ফোন করেছিলুম। সে বলল, ফ্লাইট কনফার্মড। কাল বিকেলের ফ্লাইটে। বিকেল মানে আড়াইটেয় টেক অফ্। দেড়টার মধ্যে আমাদের এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে।”

ভাদুড়িমশাই তক্ষুনি কিছু বললেন না। একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “দ্যাখো বঙ্কু, তোমার সমস্যা আসলে একটা নয়, দুটো। এক নম্বর সমস্যা, গত বছর মে মাস থেকে তোমার ছোট ছেলে নিরুদ্দেশ। তার খোঁজ পাবার জন্যে যা যা করা দরকার, তুমি করেছ। পুলিশে যেমন রিপোর্ট করেছ, বড়-বড় প্রতিটি কাগজে তেমন বিজ্ঞাপনও দিয়েছ। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয়নি। অন্তত এখনও পর্যন্ত হয়নি। কী, ঠিক বলছি তো?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “ঠিকই বলছ। কোনও খবরই তো পাওয়া গেল না। এমন কী, কেউ যে ওকে টাকার লোভে কিডন্যাপ করেছে, তাও মনে হয় না। সেটা করলে তা অনেক আগেই তারা র‍্যানসম বাবদে যা-হোক একটা অ্যামাউন্ট চেয়ে চিঠি দিত। নাঃ, তাও কেউ দেয়নি।”

“এবারে তোমার দু-নম্বর সমস্যাটার কথায় আসা যাক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “দু-নম্বর সমস্যা তোমার বড় ছেলেকে নিয়ে। বি.কম. পাশ করে সে বিলেতে যেতে চেয়েছিল। তুমি যেতে দাওনি। তোমার ইচ্ছে সে ব্যাবসার কাজকর্ম বুঝে নিক। তা সে নেয়নি। তোমার কাছে আছে বটে, কিন্তু সেটা না-থাকারই মতো। এমনিতেই চাপা স্বভাবের ছেলে, কথাবার্তা বরাবরই কম বলত, এখন যে তাও বলছে না, সেটাও এই ক’দিন লক্ষ করেছি। তার উপরে আবার ওকে নিয়ে দেখছি মাঝে-মাঝেই একটা-না-একটা মিস্টিরিয়াস ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। ভুবনেশ্বরে তোমার বাড়ির ছাতে যা ঘটেছিল, সেটার কথা তোমার কাছে শুনেছি। তার পরে সিপাহিজলা আর নীরমহলে যা ঘটল, সে তো স্বচক্ষে দেখলুম। আজ আবার শুনছি সিঁড়ির থেকে পড়ে গিয়ে বাঁ হাতটা মচকে গেছে। এর মধ্যে শুধু এই সিঁড়ির থেকে পড়ে যাবার ব্যাপারটাকেই একটা অ্যাক্সিডেন্ট বলে ধরে নেওয়া যায়। অন্য ঘনটাগুলোকে কিন্তু অ্যাকসিডেন্ট বলা যাচ্ছে না।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “তা তো যাচ্ছেই না। ভুবনেশ্বরের বাড়ির ছাতে ওর গলা টিপে ধরা হয়েছিল। সিপাহিজলায় ওকে বাথরুমের ভিতর থেকে কেউ ধাক্কা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। নীরমহলেও কেউ উপর থেকে ওর মাথা তাক করে ইট ছুড়ে মেরেছিল। এ তো বোঝাই যাচ্ছে যে, কেউ ওকে খুন করতে চায়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “চায় হয়তো, কিন্তু পারছে না। আমি ভাবছি, পারছে না কেন?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “পারছে না সে ওর কপাল। কিন্তু কপাল ওকে কতদিন বাঁচাতে পারবে? সত্যি বলতে কী, এইজন্যেই এখন আমি চাইছি যে, বরং ও বিদেশেই যাক। গিয়ে একটা শর্ট কোর্স করে ফিরে আসুক। তাতে আর-কিছু না হোক, ছেলেটা প্রাণে তো বাঁচবে। কিন্তু তাতেও তো ও রাজি হচ্ছে না। এই অবস্থায় আমি কী করব?”

রীতিমত বিচলিত দেখাচ্ছিল বঙ্কুবাবুকে। ভাদুড়িমশাই সেটা লক্ষও করেছিলেন। তিনি বললেন, “দাঁড়াও, দাঁড়াও, অত ব্যস্ত হলে চলে? আমাকে আর-একটু সময় দাও।”

“তুমি কিছু হদিস করতে পারলে?”

“কিসের হদিস?”

“এই মানে কে ওর উপরে হামলা করছে, কেনই বা করছে, সে-সবের কিছু আঁচ করতে পারছ?”

“এখনও পারিনি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু পারব নিশ্চয়। তবে একটা কথা এখনই বলতে পারি। লক্ষ্মণের নিরুদ্দেশ হওয়া আর রামুর উপরে এই হামলা হওয়া, এ দুটো ব্যাপারকে একেবারে আলাদা করে দেখাটা সম্ভবত ঠিক হচ্ছে না। আচ্ছা, লক্ষণ যে-দিন নিরুদ্দেশ হয়, তার আগের কয়েকটা দিনের কথা তোমার মনে আছে?”

“মোটামুটি মনে আছে। অনেকদিন হয়ে গেল তো, খুঁটিনাটি সব কথা হয়তো বলতে পারব না, তবে বড়-বড় ঘটনাগুলোর কথা যদি জিজ্ঞেস করো, তা হলে ঠিকই বলতে পারব।”

“খুটিনাটি ব্যাপারের কথা আমি জিজ্ঞেসও করছি না। আমি শুধু এমন ঘটনার কথাই জানতে চাইব, যা তোমার মনে থাকা সম্ভব।”

“বেশ তো, কী জানতে চাও বলো।”

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ সেটা টানলেন কিছুক্ষণ। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “লক্ষ্মণ নিখোঁজ হবার আগে কয়েকটা দিনের মধ্যে কি কোনও ব্যাপারে তাকে তুমি খুব বকাঝকা করেছিলে?”

“কী ব্যাপারে বকব?”

“এই ধরো পড়াশুনোর ব্যাপারে। তোমারই কাছে শুনেছি যে, পড়াশুনোয় তার একটুও মন ছিল না। মানে বুদ্ধি ছিল না, তা নয়, কিন্তু মহা ফাঁকিবাজ। আজ যদি কটকে ফুটবল খেলতে যাচ্ছে, তো কাল যাচ্ছে ভদ্রকে। আর ক্রিকেট-সিজন এলে তো কথাই নেই, কখনও-কখনও টানা পাঁচ-সাত দিনের জন্যে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেত। এসব কথা তুমিই আমাকে বলেছ। তা এই নিয়ে তাকে বকাঝকা করোনি তো?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “দ্যাখো চারু, লক্ষ্মণ যে বুদ্ধিমান ছেলে, সেটা মিথ্যে নয়। হয়তো অনেকের চেয়েই বেশি বুদ্ধিমান। এদিকে পড়াশুনোয় যে ঘোর অমনোযোগী, সেটাও ঠিক। তার জন্যে বকুনিও আমার কাছে কিছু কম খেত না। কিন্তু বকুনি খেয়ে যে কখনও মুখ ভার করে বসে থাকত, তাও নয়। বকলে বলত, ‘পড়াশুনো করি না তো কী হয়েছে? পাশ তো ঠিকই করে যাচ্ছি।’ তা সেটা যে করত, তা-ই বা কী করে অস্বীকার করি? কিন্তু না, পড়াশুনো করে না বলে বকতুম বটে, কিন্তু ওকে নিয়ে আমার আসল ভয়টা ছিল তার জন্যে নয়। আমি দেখতে পাচ্ছিলুম যে, যতই বুদ্ধিমান হোক, দিনে-দিনে ও অস্থিরমতি, অবিবেচক হয়ে উঠছে। ছেলেবেলা থেকেই ও একটু চঞ্চল। কিন্তু বয়স বাড়লে তো চঞ্চলতা ধীরে-ধীরে কমে যায়। অথচ ওর ক্ষেত্রে দিনে-দিনে সেটা যেন আরও বেড়েই যাচ্ছে। তা ছাড়া যেমন উড়নচন্ডে স্বভাব, তেমনি খামখেয়ালি। ইদানীং আবার কখনও-কখনও তা ধরো পনেরো-বিশ দিনের জন্যে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছিল। যাবার আগে বলে যেত অবশ্য, তবে কোথায় যাচ্ছে, সেটা বলত না, কেমন যেন এড়িয়ে যেত। এটা নিয়ে প্রায়ই আমি ওকে বকাঝকা করতুম, কিন্তু ও তা গ্রাহ্যই করত না। এখন তুমিই বলো, এমন ছেলের হাতে কি একটা ব্যাবসার দায়িত্ব তুলে দেওয়া যায়?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও সব কথা পরে হবে। লেট্স কাম টু দ্য পয়েন্ট। আমি তোমাকে যা জিজ্ঞেস করেছিলুম, তার স্পষ্ট জবাব দাও। আমার প্রশ্নটা ছিল, ও যে-দিন থেকে নিখোঁজ হয়, অর্থাৎ যে-দিন ভুবেনেশ্বরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেনি, সেই দিন কিংবা তার আগের কয়েক দিনের মধ্যে তোমার সঙ্গে ওর বড় রকমের কোনও বিরোধ হয়েছিল কি না, আর সেইজন্যেই তুমি ওকে একটু বেশি মাত্রায় বকাঝকা করেছিলে কি না।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “না, সেদিন কোনও বিরোধও ঘটেনি, বকাঝকাও করিনি।”

“তার আগের কয়েক দিনের মধ্যে?”

দু-দিকে মাথা নেড়ে বঙ্কুবাবু বললেন, “তার তো কোনও প্রশ্নই উঠছে না।”

“কেন?”

“আগের কয়েক দিন কি ও ভুবনেশ্বরে ছিল যে, তার মধ্যে আমার সঙ্গে ওর বিরোধ ঘটবে, কি তাই নিয়ে আমি ওকে বকাঝকা করব?”

“সে কী,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আগের কয়েকদিন ভুবনেশ্বরেই ছিল না লক্ষ্মণ? তা হলে কোথায় ছিল?”

“তা তো জানি না। হয়তো ফুটবল কি হকি খেলবার ডাক পেয়ে কোথাও গিয়েছিল। এমন তো মাঝে-মাঝেই যেত। মোট কথা, যেখানেই গিয়ে থাক, সেইদিনই সকালবেলায় ও ভুবনেশ্বরে ফিরে আসে।”

“সেইদিনই… মানে ২০ মে’র সকালবেলায়, এই তো?”

“হ্যাঁ, ২০ মে’র সকালবেলায়।” বঙ্কুবাবু বললেন, “সকালে বাড়ি ফিরল। জলখাবার খেল। বাড়ির পাশেই নদী। সেখানে গিয়ে সাঁতার কেটে এল। তারপর বারোটার মধ্যে দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়ে একা স্যুটকেস হাতে করে সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, আর ফেরেনি।”

“সেদিনও কোনও ব্যাপার নিয়ে তুমি বকোনি ওকে?”

“দেখা হলে তো বকব, দেখাই হয়নি। আমি ছিলুম আমার অফিস ঘরে। আগ্রা থেকে একজন ব্যবসায়ী তার আগের দিন মানে ১৯ মে তারিখে ভুবনেশ্বরে এসেছিল। একটা লোনের ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলছিলুম। আমার বাড়িতে ছিল। সেইদিনই রাত্তিরে পুরী এক্সপ্রেস ধরে তার কলকাতা যাবার কথা। সেখান থেকে দিল্লির ফ্লাইট ধরবে। তো তারই সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কত পার্সেন্ট সুদ দেবে, কী কী মর্টগেজ রাখবে, সেই সব কথা। তা এর মধ্যে লক্ষ্মণ কখন বাড়ি ফিরেছে, তারপর কখন আবার বেরিয়ে গেছে, কিছুই আমি জানতুম না।”

“কখন জানলে?”

“বিকেলবেলায়। পীতাম্বর ওই সময় আমাকে নিয়ে একটু বেড়াতে বেরোয়। বেড়ানো মানে বাড়ির মধ্যে লনের চারপাশে একটু হাঁটি আর কি। তো হাঁটতে-হাঁটতে পীতাম্বরকে জিজ্ঞেস করেছিলুম যে, হ্যাঁ রে, তোদের ছোটদাদাবাবু কবে বাড়ি ফিরবে, কিছু জানিস? তাতে পীতাম্বর বলল, তিনি তো সকালবেলাতেই ফিরেছিলেন। ফিরে জলখাবার খেয়ে, নদীতে চান করে এসে, দুপুরের খাওয়া সেরে তারপরে আবার স্যুটকেস হাতে নিয়ে বেরিয়েও গেছেন। …শুনেই আমার খটকা লাগল। খালিই মনে হতে লাগল যে, এর মধ্যে কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল রয়েছে।”

“কেন, হঠাৎ অমন কথা মনে হল কেন?”

তক্ষুনি এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না বঙ্কুবাবু। তাঁর চোখের চাউনি এমনিতে ভাবলেশহীন। সেই চোখেই ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এমনিতে তো কিছু মনে হওয়ার কথা নয়। ও তো নোঙর ফেলতে জানে না, বাড়ির উপরে বিশেষ টানও নেই, হঠাৎ-হঠাৎ আসত, আবার হঠাৎ-হঠাৎ চলেও যেত। তা হলে আর এই হঠাৎ এসে আবার হঠাৎ চলে যাওয়ায় আমার খটকা লাগবে কেন? তবু লেগেছিল। কেন লেগেছিল জানো? এর আগে যখনই কোথাও গিয়েছে, কিংবা বাইরে দু-চার দিন কাটিয়ে আবার বাড়ি ফিরেছে, আমাকে সেটা জানাতে ওর একবারও ভুল হয়নি। এই প্রথম দেখলুম যে, ছেলেটা বাড়িতে ফিরল, আবার ঘন্টাখানেক বাদে বাড়ি থেকে চলেও গেল, কিন্তু আমাকে সে-কথা জানাল না।”

“তুমি কি সেইদিনই পুলিশে খবর দিয়েছিলে?”

“না। ভাবলুম, হয়তো তাড়া ছিল, তাই খবরটা আমাকে দেয়নি। কিংবা এমনও হতে পারে যে, বাইরের লোকের সঙ্গে অফিস-ঘরে বসে আমি ব্যাবসার কথা বলছি শুনে আমাকে বিরক্ত করতে চায়নি। তো ঠিক আছে, যেমন মাঝে-মাঝেই যায়, এবারও তেমন কয়েকটা দিনের জন্যে কোথাও গেছে হয়তো। তখন অন্তত তা-ই ভেবেছিলুম। কিন্তু সাত-সাতটা দিন কেটে গেল, লক্ষ্মণ তবু ফিরল না। তখন মনে হল, তাই তো, আমাকে না-জানিয়ে চলে গেল কেন? এমন তো কখনও হয় না।”

“তখন তুমি পুলিশে খবর দিলে, কেমন?”

“হ্যাঁ। সেইসঙ্গে কলকাতা, দিল্লি, বোম্বাই, মাদ্রাজ আর বাঙ্গালোরের বড়-বড় সব কাগজগুলোতে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনও পাঠিয়ে দিলুম। সঙ্গে লক্ষণের ফোটোগ্রাফ। ফোন করে জেনে নিয়েছিলুম, কোন্ কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে কত টাকা লাগবে। বিজ্ঞাপনের সঙ্গে চেকও পাঠিয়ে দিই। ছেপে বেরুতে তাই দেরিও হয়নি।”

“পুলিশ কোনও হদিশ করতে পারেনি, কেমন?”

“কিচ্ছু না। সে তো তোমাকে কলকাতাতেই বলেছি। বিজ্ঞাপন দিয়েও লাভ হল না। একজনও এমন কোনও খবর দিল না, যার সূত্র ধরে এগোনো যায়। তাও বলেছি তোমাকে।”

“বলেছ। কিন্তু তখন তাড়াহুড়োর মধ্যে সব শুনেছি তো। তাই ভাবছিলুম যে, উই শুড গো ওভার অল দ্যাট ওয়ান্স এগেন। আর তা ছাড়া, কিরণবাবু তো সবটা জানেন না। ডিটেলগুলো ওঁরও জেনে নেওয়া ভাল।”

এতক্ষণ আমি একটাও কথা বলিনি। চুপ করে সব শুনে যাচ্ছিলুম। এবারে বললুম, “লক্ষ্মণ এই যে নিখোঁজ হয়ে গেল, এত দিনের মধ্যেও ওর যে একটা খবর পাওয়া গেল না, রামু এটাকে কীভাবে নিয়েছে?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “কী করে বলব। ও তো আমার সঙ্গে কথাই বলতে চায় না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা ঠিক কবে থেকে হয়েছে?”

“এইট্রিনাইন থেকে। রামু সেই বছর বি.কম. পাশ করে, লক্ষ্মণ বি.এ.। রামু ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল। রেজাল্ট বেরোবার পরেই বায়না ধরে বসে, বিলেত যাবে। আমি রাজি হইনি।”

রাজি না হবার কারণটা আমি ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে শুনেছিলুম। তবু বললুম, “কেন?”

বঙ্কুবাবু করুণ হেসে বললেন, “আমার অবস্থা তো দেখছেন। চোখে দেখতে পাই না, স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছে। লক্ষ্মণ যে ব্যাবসার কাজকর্ম দেখবে, সে-আশা কোনও দিনই ছিল না। যা-কিছু ভরসা ওই রামু। তো সেই রামুও বিলেত যেতে চাইছে, কবে ফিরবে কে জানে, ততদিন আমি বাঁচব কি না, তারও ঠিক নেই। আমি তাই চাইছিলুম যে, বাপ বেঁচে থাকতে-থাকতে ব্যাবসার দায়িত্ব ও বুঝে নিক। …কী করে রাজি হব বলুন?”

“বাস্, সেই থেকে এই অবস্থা?”

“সেই থেকে এই অবস্থা। এমনিতেই ও অবশ্য কম কথা বলে। তবে ওই যে ওর বিলেত যাওয়া আটকে দিলুম, তখন থেকে আর কথাই বলতে চায় না। কিছু জিজ্ঞেস করলে হাঁ-হুঁ করে উত্তর দেয়, এই পর্যন্ত।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝলুম। এবারে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। লক্ষ্মণ যেদিন নিখোঁজ হয়, সেদিন বাড়ি থেকে বেরুবার আগে কি রামুকে কিছু বলে গিয়েছিল?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “রামু তখন বাড়িতে থাকলে বলত নিশ্চয়। কিন্তু রামু তো তখন বাড়িতেই ছিল না।”

“কোথায় গিয়েছিল?”

“শহরে। …মানে আমাদের বাড়িটা যে ঠিক ভুবনেশ্বর-শহরে নয়, সেখানে থেকে মাইল কয়েক দূরে, তা তো তুমি জানোই। তো রোজ না-হলেও মাঝে-মাঝেই রামু সকালবেলার জলখাবার খেয়ে ভুবনেশ্বরে চলে যায়, আবার ফিরেও আসে দুপুর একটা-দেড়টার মধ্যেই। সেদিনও গিয়েছিল।”

“কীসে করে যায়? সেদিনই বা কীসে করে গিয়েছিল?”

“কেন, বাড়ির গাড়িতেই। বাড়িতে তো তিনটে গাড়ি। একটা আমার, আর দুটো ওদের দুই ভাইয়ের। দুজনেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে। নিজেরাই চালায়।”

“ঠিক আছে, কিন্তু ভুবনেশ্বরে কেন যায়, সেটা কখনও জিজ্ঞেস করেছ?”

“তা করেছি বই কী। বলে যে, বঙ্কুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করতে যায়। তা ছাড়া, লাইব্রেরিতেও যায় মাঝে-মধ্যে। তো যা বলছিলুম। রামু সেদিন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবার খানিক বাদে লক্ষ্মণ আসে। ফলে তখন দু-ভাইয়ের দেখা হয়নি। আবার, ভুবনেশ্বর থেকে সেদিন রামু যখন ফেরে, লক্ষ্মণ তার খানিক আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। ফলে তখনও দেখা হয়নি দু-ভাইয়ের।”

“এসব কথা তোমাকে কে বলেছে?”

“পীতাম্বর। ওর কাছে কথাটা শুনে যে আমি রামুকে ডেকে পাঠাইনি, তা নয়। ডেকে পাঠিয়েছিলুম। জিজ্ঞেসও করেছিলুম যে, হ্যাঁ রে, তোর ভাই তো আজ এসেছিল, তার সঙ্গে তোর দেখা হয়নি? তো রামু বললল, না।”

একটুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর বঙ্কুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আর-কিছু জানতে চাও?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন তোমার কী করা উচিত, সেটা কিছু ভেবেছ?”

বঙ্কুবাবু হাত উলটে বললেন, “কী যে করব সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছি না। রামুকে তো বারবার বলছি, ঠিক আছে, যা বাবা, এতই যখন ইচ্ছে, তখন যা বিলেতে। তবে তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস। তা তাতেও তো এখন রাজি হচ্ছে না। এর মধ্যে আবার ঠিক করেছিলুম যে, গোটা ব্যাবসাটা আমার নিজের নামে না-রেখে ওর সঙ্গে একটা পার্টনারশিপের ব্যবস্থা করিয়ে নেব। তার দলিলপত্রও একজন ছুঁদে লইয়ারকে দিয়ে তৈরি করিয়ে ফেলেছিলুম। কিন্তু ও তাতে সই করল না।”

“তুমি নিজে ওকে সই করতে বলেছিলে?”

“প্রথমে পীতাম্বরের হাতে কাগজপত্র দিয়ে সই করিয়ে আনতে বলেছিলুম। তো পীতাম্বর ফিরে এসে বলল, বড়দাদাবাবু বলে দিয়েছেন যে, আগে ছোটভাই ফিরে আসুক, তখন ও-সব সই-টইয়ের কথা ভাবা যাবে, তার আগে নয়।”

“তখন তুমি নিজেই সই করাতে গেলে?”

“তা যেতে হল বই কী।” বঙ্কুবাবু বললেন, “কিন্তু তাতে কি কোনও কাজ হল? হল না হে চারু, কিছুই হল না। রামু আমার সঙ্গে একটা কথা পর্যন্ত বলল না। কিন্তু আমি আর কতদিন বাঁচব? তুমি একবার বলে দ্যাখো না। আর কিছু না, একটা সই করে দিক। তোমাকে তো খুব মান্যি করে। আমার কথা রাখেনি, কিন্তু তোমার কথাটা নিশ্চয় রাখবে। একবার অনুরোধ করে দ্যাখো ভাই।”

“ঠিক আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এককালে ওরা দুজনেই আমার কথা শুনত। কিন্তু সে তো আজকের ব্যাপার নয়। ওদের শেষ দেখেছি পাঁচ-সাত বছর আগে। তখন শুনত। কিন্তু এই পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে তো ওদের নিয়ে একবারও তুমি ব্যাঙ্গালোরে আমার বাড়িতে আসোনি, আর আমারও যাওয়া হয়নি ভুবনেশ্বরে। ফলে ইতিমধ্যে ওরা পালটে গেছে, কি না, তাও আমার জানা নেই। কিন্তু ঠিক আছে, এত করে তুমি যখন বলছ, তখন রামুকে আমি একবার অনুরোধ করে দেখব নিশ্চয়ই। তা যাতে সই করাতে হবে, সেই কাগজপত্রগুলো তোমার সঙ্গে আছে তো?”

“তা তো সঙ্গে করে নিয়ে আসিনি। সেগুলো ভুবনেশ্বরে রয়েছে।”

“তা হলে তো আমাকেও ভুবনেশ্বরে যেতে হয়।”

“আবার কবে ভুবনেশ্বরে যাবে তুমি? দেরি হয়ে যাবে না?”

‘কিচ্ছু দেরি হবে না। কাল তো আমরা কলকাতায় ফিরছি। তোমরা সেখান থেকে ভুবনেশ্বরে কবে যাচ্ছ?”

“কালই জগন্নাথ এক্সপ্রেস ধরছি। অর্থাৎ পরশু ভোরে পৌঁছব।”

“ঠিক আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমিও পরশুই পৌঁছচ্ছি। তবে ভোরে নয়, দুপুরে। এই ধরো দুটো নাগাদ। …কী হল? এতে অত অবাক হবার কী আছে? …নাও, এখন ঘরে যাও, আপাতত আমার আর-কিছু জানবার নেই। …কিরণবাবু, ওকে ওর ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসুন।”

১৮
বঙ্কুবাবুকে তাঁর ঘরে পৌঁছে দিয়ে আমাদের ঘরে এসে ঢুকলুম। তারপর দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললুম, “উরে বাবা!”

ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যে আরাম-কেদারাটির দখল নিয়েছিলেন। সেখানে বসে তাঁর সেই ফাইলটা খুলে কী-সব কাগজপত্র দেখছিলেন তিনি। আমি যে ফিরে এসেছি, সেটা বুঝতে পেরেও ফাইল থেকে মুখ তুললেন না। যা পড়ছিলেন, তারই উপরে চোখ রেখে বললেন, “কী হল?”

“আর বলবেন না, মিসেস ঘোষ দেখলুম ঘুমোননি, জেগেই ছিলেন।”

“তা তো থাকতেই পারেন। রাত এখনও এগারোটাও বাজেনি।”

“এক কপি স্টারডাস্ট পড়ছিলেন।”

“আপনি কি ভেবেছিলেন যে, ঘুমোবার আগে উনি স্টারডাস্ট না পড়ে জেমস জয়েসের ইউলিসিস পড়বেন?”

“না, তা নয়, তবে বঙ্কুবাবুর উপরে খুব রেগে রয়েছেন বলে মনে হল।”

‘কেন, কেন,” ফাইলটা সারিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “অমন কথা মনে হল কেন? “

“একবার টোকা দিতে দরজা খোলেননি। দু-বার টোকা দিতেও না। তিনবারের বার দরজা খুলে দিলেন। ওঃ, সে এক রণচন্ডী মূর্তি! ভুরু নেই, নীচের পাটির সামনের দুটো দাঁত নেই! ওঃ, সে এক বীভৎস ব্যাপার!”

“যাদের আমরা সুন্দরী ভাবি, মেক আপ তুলে ফেললে তাদের অনেককেই ওরকম দেখাবে! কিন্তু বর্ণনা ছাড়ুন, রেগে রয়েছেন সেটা বুঝলেন কী করে?”

“দরজা খুলে দিতে কটমট করে বঙ্কুবাবুর দিকে তাকালেন। তারপর হাতের ম্যাগ্যাজিনখানা বঙ্কুবাবুর নাকের ডগায় উঁচিয়ে ধরে বললেন, অনেক রাত হয়েছে, যাও এবারে শুয়ে পড়ো গিয়ে!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বটে? কিন্তু বঙ্কু তাতে কী করল?”

“সেইটেই তো আশ্চর্যের ব্যাপার মশাই। আমি ভেবেছিলুম, বঙ্কুবাবু একেবারে সুড়সুড় করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়বেন। কিন্তু তা তো তিনি করলেনই না, উলটে মিসেস ঘোষকে ধমক দিয়ে বললেন, শাট আপ, ইউ সিলি উয়োম্যান! তারপর গলার স্বর একেবারে পালটে ফেলে আমাকে বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ ফর অ্যাকসেপটিং আওয়ার টার্ম… সত্যি আমরা খুব কৃতজ্ঞ রইলুম।”

“জাস্ট লাইক বঙ্কু।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কলেজে যা দেখেছিলুম, আজও… মানে এই পঁচাত্তর বছর বয়েসেও … ঠিক সেইরকমই আছে। একটুও পালটায়নি।”

টেবিলে জাগ আর গেলাস রাখা রয়েছে। সেলোফেনের মোড়ক থেকে গেলাসটা বার করে তাতে জল ঢেলে নিয়ে ঢকঢক করে পুরো এক গেলাস জল খেয়ে ফেললুম। তারপর টেবিলের সামনে থেকে চেয়ারটাকে সরিয়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের মুখোমুখি বসে জিজ্ঞেস করলুম, “ব্যাপারটা কী বলুন তো?”

“কীসের ব্যাপার?”

“এই যে রামুর উপর মাঝে-মাঝেই হামলা হচ্ছে, এটা নিয়ে বঙ্কুবাবুকে কি আরও কিছু প্রশ্ন করলে ভাল হত না?”

“কী প্রশ্ন করব?”

“এই যেমন টাকার লোভে… মানে বঙ্কুবাবুর সম্পত্তির লোভে… কেউ এ-কাজ করতে পারে কি না।”

“কে করবে?”

“কেন, দীপকই তো করতে পারে। আপনিই তো বলছিলেন…”

“মোটেই আমি অমন কথা বলিনি। আমি একটা সম্ভাবনার কথা ভাবছিলুম মাত্র। মেবি আই ওয়াজ থিংকিং অ্যালাউড। কিন্তু ওটা তো আরও অনেকের সম্বন্ধেই ভাবা যায়। আর তা ছাড়া, একটা কথা ভেবে দেখুন। দীপক কে? না বঙ্কুর শালা। তো বঙ্কুকে আমি কী জিজ্ঞেস করব? ‘ওহে বঙ্কু, দীপক যে রামুকে খুন করতে পারে, এই কথাটা ভেবে দেখেছ?” …আরে দূর মশাই, এসব কথা ওইভাবে কাউকে বলা যায় নাকি?”

“বেশ তো, ওইভাবে না হয় না-ই বললেন। কিন্তু দীপককে উনি কতটা বিশ্বাস করেন, একটু কায়দা করে সেটা তো জেনে নেওয়া যায়। যেমন ধরুন, এটা তো আপনি বলতেই পারেন যে, ওহে বঙ্কু, একা যখন সব সামলাতে পারছ না, তখন দীপককে তোমার ব্যাবসার মধ্যে ঢুকিয়ে নিচ্ছ না কেন?”

“ওভাবে বললে বঙ্কু কী জবাব দিত, সেটা জানি বলেই জিজ্ঞেস করবার দরকার বোধ করিনি।”

“কী জবাব দিতেন, সেটা আপনি জানেন?”

“জানি বই কী। বঙ্কু বলত, ‘অমিতাভ বচ্চন যার গুরুজি, তাকে দিয়ে ব্যাবসার কাজ চলবে না বলেই ঢোকাইনি।’ …কিন্তু, কিরণবাবু, দীপককে ব্যাবসায় ঢোকাতে চায় না বলেই যদি আপনি ভাবেন যে, সব ব্যাপারেই দীপককে ও অবিশ্বাস করে, তা হলে কিন্তু মস্ত ভুল করবেন। বঙ্কু মনে করে, ব্যাবসা-বাণিজ্যে ওর মাথা খুলবে না, কিন্তু তার থেকে কি এটা ইনফার করা যায় যে, বঙ্কুর ধারণা, খুন-খারাপির লাইনে দীপকের মাথা খুলবে? না না, তা নিশ্চয় ভাবা চলে না। আর তা ছাড়া, এই ক’দিন তো খুব কাছের থেকে ওদের দেখলুম। তাতে মনে হল, দীপককে বঙ্কু একটি আকাট অপদার্থ ভাবে ঠিকই, কিন্তু স্নেহও করে।”

“তা হলে কে হামলা করছে?”

“এর জবাব দুটো হতে পারে।”

“একটা-একটা করে বলুন।”

“বলছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এক নম্বর জবাব, এমন কেউ হামলা করছে, যে ওকে প্ৰাণে মারতে চায় না, শুধু ভয় দেখাতে চায়।”

“এটা আপনি আগেও আমাকে বলেছেন। এবারে দু-নম্বর জবাবটা দিন।”

ভাদুড়িমশাই সরাসরি আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “সম্ভবত কেউই হামলা করছে না।”

বললুম, “তার মানে?”

“মানেটা এখুনি জানা চাই?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এত তাড়া কীসের? অনেক রাত হয়েছে, এবারে লক্ষ্মী ছেলের মতো শুয়ে পড়ুন দেখি।”

১৯
হাওড়া স্টেশনে ঢুকে বড় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, পাঁচটা চল্লিশ। এইখানেই আমার দাঁড়াবার কথা।

বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হল না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ভাদুড়িমশাই এসে গেলেন। বললেন, “চলুন, ভিতরে যাওয়া যাক। গাড়ি ছাড়বে পাঁচটা পঞ্চান্নয়।”

তা ঠিক পাঁচটা পঞ্চান্নতেই ধৌলি এক্সপ্রেস ছাড়ল। এয়ারকন্ডিশন্ড ফার্স্ট ক্লাস চেয়ার-কারে আসন পেয়েছি। হ্যান্ডব্যাগ দুটোকে উপরে তুলে দিয়ে আরাম করে বসা গেল। স্টেশনে ঢুকবার সময় ভাদুড়িমশাই দুখানা খবরের কাগজ কিনে ফেলেছিলেন। তার একটা আমাকে দিয়ে অন্যটার হেডলাইনে চোখ বুলোতে লাগলেন তিনি।

খবরের কাগজে আমার মন বসছিল না। আমি ভাবছিলুম গত কয়েক দিনের কথা। ৫ মার্চ মঙ্গলবার আমি ত্রিপুরায় যাই। সেখানে ছিলুম মোট চার রাত্রি। ৫ মার্চ সিপাহিজলায়, ৬ মার্চ সাগরমহলে, ৭ মার্চ উদয়পুরে আর ৮ মার্চ আগরতলায়। কাল ৯ মার্চ বিকেলের ফ্লাইটে কলকাতায় ফিরেছি। কিন্তু বিশ্রাম পাইনি। মাত্র একটা রাত্রি কলকাতায় থেকেই আজ আবার শেষ-রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে ভোরবেলায় ট্রেন ধরে চলেছি ভুবনেশ্বরে।

ভুবনেশ্বরে যে যেতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা অবশ্য ছিল না। কিন্তু বাড়ি ফিরে শুনলুম, ছেলের এখুনি এলাহাবাদে ফিরবার দরকার নেই, আরও হপ্তাখানেক সে কলকাতায় থাকবে। তখন মন হল, যাই তা হলে, ভুবনেশ্বর থেকে ঘুরেই আসি। বাসন্তীও বলল, ‘দিন দুই-তিনের জন্যে যদি হয় তো ঘুরে আসতে পারো, তবে তার বেশি থেকো না।’ এদিকে ভাদুড়িমশাই বলেছিলেন যে এয়ারপোর্ট থেকে তিনি সরাসরি বেহালায় যাবেন। সেখানে অরুণবাবুর মায়ের খবর জেনে তারপর ফিরে আসবেন যতীন বাগচি রোডে। সেখানকার ফোন যদি না ইতিমধ্যে ঠিক হয়ে থাকে তো অন্য কোনও জায়গা থেকে রাত নটা থেকে দশটার মধ্যে আমাকে ফোন করে জেনে নেবেন যে, রবিবার সকালে আমার পক্ষে ভুবনেশ্বর যাওয়া সম্ভব হবে কি না। মোট কথা, আমার ফোন করবার দরকার নেই, তিনিই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবেন।

বাড়ি ফিরে ছেলের সঙ্গে দেখা হয়নি। বাসন্তী বলল, বঙ্কুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়েছে। সেটা স্বাভাবিক। অনেকদিন বাদে-বাদে কলকাতায় আসে, তাই যখনই আসে, রোজই একবার বঙ্কুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বেরোয়। ছেলে বাড়ি ফিরল সাতটা নাগাদ। তার খানিক বাদে এলেন সদানন্দবাবু। ঘরে ঢুকে একগাল হেসে বললেন, “ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে ত্রিপুরায় গিয়েছিলেন শুনলুম। কী ব্যাপার মশাই?”

সদানন্দবাবুকে আমার পাঠকরা আশা করি ভুলে যাননি। ভদ্রলোক আমাদের সামনে বাড়িতে থাকেন। পরোপকারী, সদাহাস্যময় মানুষ। অতিমাত্রায়া স্বাস্থ্যসচেতন, চায়ের সঙ্গে দুধ কিংবা চিনি খান না, রোজ ভোরবেলায় দু-মাইল হাঁটেন। বয়স সত্তরেরও বেশ কয়েক বছর বেশি, কিন্তু স্বাস্থ্য একটুও টসকায়নি। তো এই মানুষটি কিছুকাল আগে একটা খুনের মামলায় জড়িয়ে যান। ভাগ্যিস তখন ভাদুড়িমশাই কলকাতায় ছিলেন, নইলে আর সেই বিপদ থেকে তাঁকে উদ্ধার পেতে হত না। তো তখন থেকেই সদানন্দবাবু ভাদুড়িমশাইয়ের দারুণ ভক্ত।

বললুম, “ত্রিপুরায় গিয়েছিলুম ঠিকই, তবে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে যাইনি। ফিরেছি অবশ্য তাঁরই সঙ্গে। কিন্তু খবরটা আপনি কোথায় পেলেন?”

“কেন, বউমার কাছে। ভাদুড়িমশাই যে সেখানে ছিলেন, সেও তো তাঁরই কাছে শুনলুম। শুনেছি, খুব বিউটিফুল জায়গা। সত্যি?”

“ষোলো-আনার উপরে আঠারো-আনা সত্যি। বেড়াবার পক্ষে একেবারে আদর্শ।”

“কিন্তু আপনারা তো আর বেড়াবার জন্যে ত্রিপুরায় যাননি। ব্যাপারটা কী বলুন তো।”

বললুম, “অতি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। এক কোটিপতির ছেলে, তাকে মারবার জন্যে একদল গুন্ডা লাগানো হয়েছে, কিন্তু কিছুতেই তারা ছেলেটাকে ঘায়েল করতে পারছে না। যতবার তারা গুলি চালাচ্ছে, ততবারই ফশকে যাচ্ছে।”

“দূরমশাই, আপনি ঠাট্টা করছেন।”

“বা রে, এর মধ্যে আবার ঠাট্টা দেখলেন কোথায়?”

“ঠাট্টা নয়? গুলিই যদি চালাচ্ছে, তো বারবার ফশকে যাচ্ছে কেন?”

সদানন্দবাবুর প্রশ্নের জবাব দেওয়া গেল না। ফোন বেজে উঠল। ভাদুড়িমশাই। বললুম, “কী খবর? মালতীর শাশুড়ি ভাল আছেন তো?”

“পার্ফেক্টলি অল রাইট। লো ব্লাডপ্রেশার। মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। অরুণরা কালই যতীন বাগচি রোডে ফিরে এসেছে। ফোনও ঠিক হয়ে গেছে। ওদের বাড়ি থেকেই কথা বলছি।”

“ভুবনেশ্বরে কালই যাচ্ছেন তো?”

“কথা যখন দিয়েছি, তখন নিশ্চয় যাব। আপনার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হবে?”

“মনে হয়েছিল, হবে না। কিন্তু ছেলে আরও হপ্তাখানেক কলকাতায় থাকবে। তা হলে আর বাধা কী?”

“তা হলে চলুন। ধৌলি এক্সপ্রেসে যাচ্ছি। ভোর পৌনে ছটায় হাওড়া স্টেশনে বড় ঘড়ির নীচে অপেক্ষা করব। দেরি করবেন না। গাড়ি যে পাঁচটা পঞ্চান্নয় ছাড়ে এটা মনে রাখুন।”

জায়গা পাওয়া যাবে কি না, জিজ্ঞেস করতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “রিজার্ভেশন নেই। তবে চিন্তা করবেন না। খুব ভোরের ট্রেন তো, তাই ভিড় বড়-একটা হয় না। ব্যবস্থা একটা ঠিকই হয়ে যাবে।”

তা হলও। দিব্যি পা ছড়িয়ে ঠান্ডা কামরায় বসে আমরা ভুবনেশ্বরে চলছি।

খড়গপুর পর্যন্ত হকারদের ভিড় ছিল। হকার থাকলে যা না-থেকে পারে না, সেই চেঁচামেচিও ছিল। তার উপরে আবার মাঝে-মাঝেই কারা যেন চেন ট্রেনে থামিয়ে দিচ্ছিল ট্রেনটাকে। তা খড়গপুর ছাড়াবার পরে আর সে-সব উৎপাত নেই। কামরা একেবারে শান্ত। শেষ রাত্তিরে উঠে ট্রেন ধরতে হয়েছে বলে অনেকে ইতিমধ্যে ঘুমিয়েও পড়েছেন দেখছি।

খবরের কাগজখানাকে সামনের সিটের পিছনে লাগানো জালি ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যে একটা ইংরেজি নিউজ-ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাতে সম্ভবত মন বসাতে পারছিলেন না। তাই সেটাও একটু বাদেই তিনি জালি-ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলেন। হাত দুখানাকে বুকের উপরে জড়ো করে চোখ বুজে বসে রইলেন খানিকক্ষণ। আমি জানি, উনি ঘুমোচ্ছেন না। কিছু-একটা নিয়ে ভাবছেন। ওঁকে এখন বিরক্ত করা ঠিক হবে না। জানলায় চোখ রেখে আমি বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলুম।

এয়ার-কন্ডিশনড কামরা, তাই জানলায় কাচ লাগানো, ফলে একটু অস্বস্তি হয় ঠিকই, তবে বাইরের ঘরবাড়ি গাছপালা আর মানুষজন দেখতে কোনও অসুবিধে হয় না। দেখতে ভালই লাগছিল। গাছপালাগুলো এমন জোরে মাথা নাড়ছিল আর মাঝে-মাঝেই মাঠ জুড়ে এমন ধুলো উড়ছিল যে, বুঝতে পারছিলুম, বাইরে ঝোড়ো হওয়া বইছে। একটু আগে ভদ্রক ছাড়িয়েছি। ছোটবড় কয়েকটা নদীও পরপর পেরিয়ে এলুম। এ-সব নদীর কী নাম, কিচ্ছু জানি না। সদানন্দবাবুর কথা মনে পড়ল। ত্রিপুরা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন ‘বিউটিফুল জায়গা’। আসলে কিন্তু সব জায়গাই সুন্দর। তবে সৌন্দর্যেরও আছে রকমফের। সেইটে যিনি বোঝেন, নিষ্পাদপ মরুভূমিও তাঁর চোখে মোটেই অসুন্দর ঠেকে না।

কামরার মধ্যে ধূমপান নিষেধ। ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যে তাই সিগারেট খাবার জন্যে কামরা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে বললেন, “কী ভাবছেন এত?”

বললুম, “ভাবছিলেন তো এতক্ষণ আপনিই। কী নিয়ে ভাবছিলেন, তাও আন্দাজ করতে পারি। কিছু কিনারা হল?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ভাবনার কোটি হাত-পা, লাখো মাথা, প্রকান্ড হাঁ।”

“কাব্যি করতে হবে না। কিছু কিনারা হয়নি, কেমন?”

“একেবারেই যে হয়নি তা নয়। কিন্তু এখন থাক, এ-সব কথা পরে হবে। আপনি কী ভাবছিলেন বলুন।”

“আমি ভাবছিলুম সদানন্দবাবুর কথা।”

“কাল তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে?”

“না হয়ে পারে? আমি যে ত্রিপুরায় গিয়েছিলুম, আর আপনিও যে সেখানে ছিলেন, আগরতলা থেকে ফোনে আমাদের খবর পেয়ে বাসন্তীই তা ওঁকে জানিয়ে দিয়েছিল যে।”

“বটে? তা কেন আমরা ত্রিপুরায় গিয়েছিলুম, তা ওঁকে বলেছেন?”

“একটু অন্যভাবে বলেছি।”

“কী রকম?”

“ওই মানে আসল ঘটনাকে একটু পালটে নিয়ে বললুম যে, এক কোটিপতির ছেলেকে খতম করবার জন্যে গুন্ডা লাগানো হয়েছে। কিন্তু গুন্ডারা কিছুতেই তাকে খতম করতে পারছে না। যতবার গুলি চালাচ্ছে, ততবারই ফশকে যাচ্ছে।”

“সদানন্দবাবু তাতে কী বললেন?”

হেসে বললুম, “সদানন্দবাবু বললেন, গুলিই যদি চালাচ্ছে তো বারবার ফশকে যাচ্ছে কেন? ভাদুড়িমশাই গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, “অ্যাঁ, সদানন্দবাবু এই কথা বললেন? অব অল পার্সনস সদানন্দবাবু?”

বললুম, “বুঝুন ব্যাপার!”

“বুঝবার তো কিছু নেই। ভদ্রলোক যা বলেছেন, সেটাই হচ্ছে মোক্ষম কথা। হি হ্যাজ হিট দ্য নেইল রাইট অন ইটস হেড! গুলিই যদি চালাচ্ছে তো বারবার ফশকে যাচ্ছে কেন? ঠিক, ঠিক, এ একেবারে লাখ কথার এক কথা! গলাই যদি টিপে ধরছে তো দমবন্ধ করে মেরে ফেলছে না কেন? ধাক্কাই যদি মারছে তো মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে না কেন? ইটই যদি ছুড়ে মারছে তো সেটা মাথায় না পড়ে পাশে পড়ছে কেন? …বাঃ, বাঃ, চমৎকার! এক্সেলেন্ট! …আরে মশাই, এই কথাটা আমিও আপনাকে বলেছি, অথচ আপনি কিছুই বুঝতে পারেননি!”

এর পর আর কী বলব। গলা টিপে ধরলেই যে কেউ পটাং করে মরে যাবে তার কোনও মানে নেই, আচমকা একটা ধাক্কা মারলেই যে কারও মাথা ফাটবে তার কোনও মানে নেই, আবার ইট ছুড়ে মারলেই যে সেটা কারও মাথায় লাগবে, তারও কোনও মানে নেই। অথচ নীরমহলের ঘটনাটার পর থেকে দেখছি, এরই উপরে ভাদুড়িমশাই যত গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেন দিচ্ছেন, ঈশ্বর জানেন। কিন্তু ভদ্রলোক যে-রকম উত্তেজিত, তাতে মনে হল, এখন আর এ বিষয়ে কিছু না-বলাই ভাল। জানলায় মুখ রেখে চুপচাপ দেখতে লাগলুম যে, গাড়ি একটা মস্ত বড় নদী পার হচ্ছে।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নদীটার নাম জানেন?

মুখ না ফিরিয়েই বললুম, “না।”

“রাগের কিছু নেই। সদানন্দবাবু সত্যি একটা বুদ্ধির কথা বলেছেন। যা-ই হোক, এটা মহানদী। নদী পেরোলেই কটক, এ-রাজ্যের পুরনো রাজধানী। তা ভুবনেশ্বর তো প্রায় এসে গেল।”

কটকে ঢুকতে গেলেও নদী, আবার কটক থেকে বেরোতে গেলেও নদী। সেটা অবশ্য মহানদীর মতন এত চওড়া নয়। ভুবনেশ্বর এখান থেকে মাত্রই তিরিশ কিলোমিটার। সেই তিরিশ কিলোমিটার পথ পেরোতেই এক ঘন্টার মতো সময় লেগে গেল। কথায় বলে ‘তালগাছের আড়াই হাত’। শেষের ওই আড়াই হাত ওঠাই নাকি সবচেয়ে শক্ত। তা এও দেখছি সেই ব্যাপার। নামে যদিও এক্সপ্রেস, শেষ পথটুকু এল একেবারে প্যাসেঞ্জার-গাড়ির মতন ঢিকুস-টিকুস করে। যেন বড়ই অনিচ্ছেয় আমাদের ভুবনেশ্বরে এনে পৌঁছে দিল।

হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম দেড়টা বাজে। ঠিক ছিল, স্টেশনের বাইরে এসে আমরা একটা ট্যাক্সি ধরে নেব। তার আর দরকার হল না। ওদিকের প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বাইরে বেরোতে হবে। তার জন্যে লাইন পেরোনো দরকার। সেটা পেরোবার জন্যে ওভারব্রিজে উঠতে যাচ্ছি, হঠাৎ কোত্থেকে বিজ এসে আমাদের হাত থেকে হ্যান্ডব্যাগ দুটো ছিনিয়ে নিয়ে বলল, “আসুন স্যার, আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি।”

বললুম, “আমরা যে গাড়িতে আসব, তুমি তা জানলে কী করে?”

বিজু বলল, “আমরাও আজই সকালে এসে পৌঁছেছি। তো বাড়ি থেকে দুখানা গাড়ি স্টেশনে এসেছিল তখন। বাবুরা তার একটা নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন, আর আমাকে বললেন, তুই একটা গাড়ি নিয়ে শহরেই থেকে যা, ভাদুড়িসাহেব আর চ্যাটার্জিসাহেব হয়তো ধৌলি এক্সপ্রেসেই চলে আসবেন, যদি আসেন তা হলে একেবারে তাঁদের নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিবি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাবুদের ওই একটা গাড়িতেই হয়ে গেল?”

“তা কেন হবে না? ওঁরা তো মাত্র তিনজন।”

“তার মানে দীপক আর রাজেশ আসেনি?”

“দীপকবাবুর টিকিট কাল পাওয়া যায়নি। উনি আজ রাত্তিরের গাড়িতে উঠে কাল সকালে এসে পৌঁছবেন।”

“আর রাজেশ?”

“তিনি আসবেন না। কলকাতায় তাঁর কী কাজ রয়েছে।”

কিন্তু আমরা যে আজ ধৌলি এক্সপ্রেসে আসছি, বঙ্কুবাবু সে-কথা বুঝলেন কী করে? ভাদুড়িমশাইকে জিজ্ঞেস করলুম, “আপনি কি বঙ্কুবাবুকে বলে রেখেছিলেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ধৌলি এক্সপ্রেসেই যে আসব, তা বলিনি। শুধু বলেছিলুম যে, তোমরা যে-দিন পৌঁছচ্ছ, আমরাও সেইদিন পৌঁছব, তবে ভোরে নয়, দুপুরে। তা চালাক মানুষ তো, ওর থেকেই যা বুঝবার ঠিক বুঝে নিয়েছে।”

কথা বলতে-বলতে আমরা স্টেশনের বাইরে চলে এসেছিলুম। প্রাইভেট গাড়ি রাখবার জায়গাটা একটু দূরে। বিজু বলল, “আপনারা এখানে একটু অপেক্ষা করুন। আমি গিয়ে গাড়িটা নিয়ে আসছি।”

মিনিট দুই-তিনের মধ্যেই গাড়ি আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা খুলে দিয়ে বিজু বলল, “উঠুন স্যার।”

গাড়িতে উঠে ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি বিজু। সকাল থেকে তো এইখানেই রয়েছ, তোমার স্নান-খাওয়াদাওয়া নিশ্চয় হয়নি?”

বিজু বলল, “ও নিয়ে ভাববেন না স্যার, আমার বাড়ি তো এইখানেই, বাড়ি থেকে ও-সব সেরেসুরে এসেছি। রোজ আমি এইখান থেকে ডিউটি করতে যাই, তারপর ডিউটি সেরে ফের বাড়িতে ফিরে আসি।”

গাড়ি চলতে শুরু করল।

ভুবনেশ্বর যে কলকাতা কি বোম্বাইয়ের মতো মস্ত শহর, তা নয়, তবে স্বাধীনতার পরে এখানকার যে নতুন এলাকাটা গড়ে উঠেছে, সেটা বেশ ছড়ানো। রাস্তাগুলো চওড়া-চওড়া, বসতিগুলি ঘিঞ্জি নয়, জায়গায় তুলনায় লোকসংখ্যা এখনও কমই বলতে হবে, কেউ কারও ঘাড়ের উপরে নিশ্বাস ফেলছে না, নতুন বলেই কিছু বাড়ি বেশ হাল ফ্যাশনের, মাঝে মাঝেই পার্ক। সব মিলিয়ে রীতিমত ঝকঝকে চেহারা।

বিজু বলল, “আপনারা কি কয়েকটা দিন থাকবেন স্যার?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন বলো তো?”

“যদি থাকেন, তো এর মধ্যে একদিন নন্দনকানন থেকে আপনাদের ঘুরিয়ে আনি। এখানে যত সাদা বাঘ আছে, আর কোনও চিড়িয়াখানায় তা নেই।”

আমার দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “নন্দনকাননটা কী জানেন তো? এখানকার চিড়িয়াখানা।” তারপর বিজুর উদ্দেশে বললেন, “না হে বিজু, কথাটা তো ভালই বলেছ, কিন্তু এ-যাত্রায় বোধহয় সময় করতে পারব না।”

শহরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে গাড়ি একটু বাদেই হাইওয়েতে গিয়ে পড়ল। এই হাইওয়ে ধরে পুরী চলে যাওয়া যায়। দূরত্ব বেশি নয়, মাত্রই ষাট কিলোমিটার। এখন ভরদুপুর, কিন্তু টুরিস্ট বাস চলার কামাই নেই। পুরী, কোণার্ক, ভুবনেশ্বর—পর্যটক-পরিক্রমার এই যে ত্রিভুজাকৃতি পথ, আজকাল দেখছি অনেকে একে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল বলতে শুরু করেছেন! বলতেই পারেন, কারণ পুরী কিংবা ভুবনেশ্বরে যাঁরা ছুটি কাটাতে আসেন, নিতান্ত একটা জায়গা দেখে তাঁরা খুশি হন না, তিনটেই তাঁদের দেখা চাই। ফলে, কন্‌ডাকটেড টুরের অজস্র অফিস আজকাল গজিয়ে উঠেছে সর্বত্র। তাদের লাক্সারি কোচ এই রাস্তা দিয়ে অনবরত ছুটছে। এয়ার-কন্ডিশন্‌ড কোচ, ভিডিও কোচ, কোনওটারই কিছু অভাব নেই। পথেই পড়ে বলে যেমন খন্ডগিরি-উদয়গিরি তেমন ধৌলির জাপানি বুদ্ধমন্দিরও তারা টুরিস্টদের দেখিয়ে দেয়।

গাড়ির জানলা থেকেই পাহাড়চূড়ার সেই ধরধবে সাদা মন্দির আমি দেখতে পেয়েছিলুম। জায়গাটা যে ভুবনেশ্বরের খুব কাছে, ভাদুড়িমশাই সে-কথা আমাকে আগেই বলেছিলেন, কিন্তু তাই বলে যে এত কাছে, তা আমি ভাবিনি।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা ধৌলিতেই যাচ্ছি বটে, তবে মন্দিরের দিকে নয়। নদী পার হয়ে বাঁ-দিকে একটা রাস্তা পড়বে। সেই রাস্তা ধরে খানিক এগোলেই বঙ্কুর বাড়ি। একদম নদীর ধারে, কাছেপিঠে অন্য কোনও ঘরবাড়ি নেই। বঙ্কু আসলে একটু নিরিবিলি থাকতে ভালবাসে, ভিড়ভাট্টা পছন্দ করে না।”

বললুম, “সে তো বুঝতেই পারছি। ভিড়ভাট্টাই যদি পছন্দ করবেন, তা হলে আর এমন জায়গায় বাড়ি করবেন কেন, ভুবনেশ্বর শহরেই তো থাকতে পারতেন।

দেখতে দেখতে নদী এসে গেল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “নদীটার নাম জানেন?”

বললুম, “না।”

“দয়া। বড় বিচিত্র নাম।”

“নামটাকে বিচিত্র বলছেন কেন?”

“এইজন্যে বলছি যে, এই দয়া নদীর ধারেই বড় নির্দয় একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। নদীর পাশের মাঠটা দেখছেন তো? এই মাঠেই হয়েছিল অশোকের কলিঙ্গজয়ের যুদ্ধ। গোটা নদী ভরে গিয়েছিল মানুষের রক্তে। সেই রক্তধারা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন চন্ডাশোকও। তা নইলে আর তিনি ধর্মাশোক হয়ে উঠবেন কেন?”

দয়া নদীর ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ি বাঁ-দিকের পথ ধরল। বেশি দূর যেতে হল না। খানিকটা এগিয়েই বিজু বলল, “আমরা এসে গেছি স্যার।”

বঙ্কুবাবু যে বিরাট বড়লোক, সেটা জানতুম। তাই ধরেই নিয়েছিলুম যে, তাঁর বাড়িটাও বেশ বড় মাপেরই হবে। এখন দেখলুম, বাড়ি নেহাতই একটা নয়, তিনটে। গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলে বাঁ-দিকে আউটহাউস, ডানদিকে কাজের লোকদের কোয়ার্টার্স। তারপরে মস্ত লন। লনের দু-দিক দিয়ে দুটো চওড়া রাস্তা গিয়ে মূল বাড়ির গাড়িবারান্দার সামনে পৌঁছেছে। রাস্তার দু-দিকে দেবদারুর সারি। গাছগুলোর ফাঁকে-ফাঁকে নানা রকমের দেশি-বিদেশি ফুলের টব।

মূল বাড়িটা বাংলো প্যাটার্নের, দোতলা। বঙ্কুবাবু চোখে খুবই কম দেখেন বটে, কিন্তু তাঁর শ্রবণশক্তি নিশ্চয়ই খুব প্রখর। বাড়িতে গাড়ি ঢুকবার শব্দ পেয়েই তিনি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু আমরাই এসেছি, সম্ভবত সেটা বুঝতে পারেননি বলেই বিশেষ হাসছিলেন না। ভাদুড়িমশাই গাড়ি থেকে নেমে বললেন, “আমরা এসেছি বঙ্কু।”

এতক্ষণে হাসি ছড়িয়ে পড়ল বঙ্কুবাবুর মুখে। হাত বাড়িয়ে ভাদুড়িমশাইকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “তোমার কথার যে কখনও কোনও নড়চড় হয় না, সে তো সেই ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি। এসো, এসো।”

গাড়ি থেকে বিজু আমাদের হ্যান্ডব্যাগ দুটো নামিয়ে এনেছিল। ব্যাগ দুটো কোথায় রাখবে, জিজ্ঞেস করতে বঙ্কুবাবু বললেন, “দোতলার পুব-দক্ষিণ-খোলা ঘরটায় এঁরা থাকবেন, সেইখানেই রেখে আয়।” তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমরাও বিজুর সঙ্গে দোতলায় চলে যাও। কিন্তু দেরি কোরো না, হাতমুখ ধুয়েই নীচে চলে এসো। তোমরা তো নিশ্চয় স্নান করে বেরোওনি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি করেছি, কিন্তু কিরণবাবু সম্ভবত করেননি। তবে আমি বলি কী, এত বেলায় কিরণবাবুরও আর স্নান করে কাজ নেই, বরং বিকেলে স্নান করে নেবেন।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “সেই ভাল। আড়াইটে বাজে, উপর থেকে ঘুরে এসে তোমরা খেতে বসে যাও।”

বিজু আমাদের দোতলায় পৌঁছে দিয়ে বলল, “আমি বরং একটু দাঁড়াই। আপনারা মুখ-হাত ধুয়ে নিন, তারপরে আপনাদের খাবার ঘরে নিয়ে যাব।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দরকার হবে না, আমি তো এ-বাড়িতে আগেও এসেছি, তুমি যেতে পারো।”

বিজু চলে গেল।

আমরাও একটু বাদে নীচে নেমে এলুম। বঙ্কুবাবু ডাইনিং হলে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। বললেন, “ডলি আর রামু খেয়ে নিয়েছে। তোমরা যে সত্যিই এই ট্রেনে আসবে, তা ওরা বিশ্বাসই করতে পারেনি। নয়তো ওরাও তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করত।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তুমিও খেয়ে নিলেই বুদ্ধির কাজ করতে। তা ওরা কোথায়? একজনকেও তো দেখছি না।”

“ট্রেনে কাল ওদের একজনেরও ঘুম হয়নি। দুজনেই ঘুমিয়ে নিচ্ছে। ডেকে দেব?”

“আরে না না, ডাকবার দরকার নেই। রাত্তিরে তো দেখা হচ্ছেই।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “রাত্তিরে কেন, বিকেলেই দেখা হবে।”

“বিকেলে আমি থাকছি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “একবার ভুবনেশ্বরে যেতে হবে। ফিরতে-ফিরতে একটু রাত হয়ে যেতে পারে, তা নিয়ে ভেবো না। … ও হ্যাঁ, একটা কথা, বোম্বাইয়ে গোটা দুই-তিন ফোন করা দরকার।”

“সে তো তোমার ঘর থেকেই করতে পারো। এস টি ডি-র ব্যবস্থা রয়েছে। স্ট্রেট ডায়াল করবে, কোনও অসুবিধে নেই। বোম্বাইয়ের কোড নাম্বার হল জিরো ডাব্‌ল টু।”

“ঠিক আছে, তা হলে ওই কথাই রইল।”

খাওয়া শেষ হয়েছিল। আমরা উঠে পড়লুম।”

দোতলায় উঠে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, চট করে একবার ছাত থেকে ঘুরে আসি।” বিরাট ছাত। এ-বাড়ির কম্পাউন্ডটা যে কত বড়, ছাতে না উঠলে সেটাও আমি বুঝতে পারতুম না। যেমন সামনে, তেমন পিছন দিকেও বিস্তর জমি। সামনে যেমন লন, পিছনে তেমন সুইমিং পুল। তারও পিছনে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বাগান। পুব দিকের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াতে নদীটাও চোখে পড়ল। জমি সমতল নয়, একটু ঢেউ-খেলানো। গোটা কম্পাউন্ডই উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এতই উঁচু যে, কোনও দিক থেকেই পাঁচিল ডিঙিয়ে কারও ভিতরে ঢোকা সম্ভব নয়।

ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা বলতে তিনি বললেন, “যদি বা, কেউ ঢোকে, সে বেরুবে কী করে? অসম্ভব। অথচ এই ছাতেই নাকি রামুর গলা টিপে ধরা হয়েছিল। লোকটা কী করে পাঁচিল ডিঙিয়ে পালিয়ে গেল, তাই ভাবছি।”

বললুম, “কাজটা যে বাইরের কারও, তা ভাবছেন কেন? ভিতরের কারও তো হতে পারে।”

“তা পারে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভূতের হওয়াও কিছু বিচিত্র নয়। চলুন নীচে যাওয়া যাক।”

দোতলায় নেমে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে বোম্বাইয়ে তিনটে ফোন করতে হবে।”

“কাকে?”

“একটা আমাদের বোম্বাই-এজেন্টকে, আর দুটো দুই বঙ্কুকে। আজ তো রবিবার, অফিস ছুটি। দেখি বাড়িতে পাওয়া যায় কি না। যদি পাই তো ওদের ছুটির বারোটা বেজে গেল!”

দুজনকে পাওয়া গেল। বোম্বাই অফিসের এজেন্টকে আর দুই বঙ্কুর একজনকে। অন্যজন নাকি ছুটি কাটাবার জন্যে শুক্রবার বিকেলেই লোনাভুলা চলে গিয়েছেন, সোমবার সকালের আগে ফিরবার আশা নেই।

যে দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেল, ভাদুড়িমশাই তাঁদের একই কথা বললেন। বোম্বাইয়ে যাঁরা ক্রিকেট-কোচিং দেন, তাঁদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করতে হবে, নিশাকর ঘোষ নামের কোনও বাঙালি ছেলেকে তিনি কোচ করেন কি না। যদি তাঁদের কেউ এমন কথা বলেন যে, হ্যাঁ, ওই নামে কাউকে কিছুদিন আগেও তিনি কোচ করতেন, কিন্তু এখন আর করেন না, তা হলে জেনে নিতে হবে, কবে থেকে সে কোচিং ক্যাম্পে আসা বন্ধ করেছে।

ওদিক থেকে কে কী বলেছিলেন, জানি না, তবে ভাদুড়িমশাই দেখলুম ফোন নামিয়ে রাখবার আগে দুজনকে একেবারে একই নির্দেশ দিলেন। “ও ইয়েস, ই’ট্স এক্সট্রিমলি আর্জেন্ট, অ্যান্ড আই লুক ফরওয়ার্ড টু হিয়ারিং ফ্রম ইউ।”

কথা শেষ হল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু বাদেই আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। ফিরতে হয়তো রাত হবে। তার মধ্যে বোম্বাই থেকে কোনও কল্ আসবে বলে বিশ্বাস করি না। কিন্তু কাল সকালেও আমার এখানে থাকবার আশা কম। সম্ভবত আটটা নাগাদ বেরিয়ে গিয়ে বারোটা-একটার মধ্যে ফিরব। তো আমি থাকব না, সেই সময়ে যদি বোম্বাই থেকে কেউ আমার খোঁজ করে, তা হলে মেসেজটা আপনি রেখে দেবেন।”

বললুম, “আমাকে কোনও মেসেজ দিতে যদি ওরা রাজি না হয়?”

“দেবে। একটা কোড-নাম্বার মনে রাখুন, ফাইভ জিরো ডাব্‌ল এইট। এই নাম্বারটা কোট করলেই দেবে। …আপনি বিশ্রাম নিন, আমি ভুবনেশ্বরে চললুম।”

কোড-নাম্বারটা আমার পকেট-ডায়েরিতে টুকে নিতে-নিতে বললুম, “চলুন, আপনাকে নীচে পৌঁছে দিয়ে আসি।”

নীচে নেমে দেখলুম, বঙ্কুবাবু তখনও শুতে যাননি, ড্রইংরুমে বসে আছেন। সামনে দাঁড়িয়ে পীতাম্বর তাঁকে কিছু বলছিল। আমরা ঘরে ঢুকতে সে চুপ করে গেল।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি ভুবনেশ্বরে যাচ্ছি বঙ্কু। ফিরতে যদি বেশি রাত্তির হয়, তা হলে আর আমার জন্যে বসে না-থেকে তোমরা খেয়ে নিয়ো।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “একটু বোসো। ড্রাইভারদের কাউকে ডেকে পাঠাই।”

“ড্রাইভার শুধু গাড়িটা বার করে দিক, সঙ্গে যেতে হবে না। এদিককার পথঘাট তো সবই আমার চেনা।”

পীতাম্বর গিয়ে ড্রাইভারদের খবর দিয়ে এল। তার কয়েক মিনিট বাদেই একটা কটেসা দেখলুম গাড়িবারান্দার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ড্রাইভারের কাছ থেকে চাবিটা নিয়ে ভাদুড়িমশাই গিয়ে গাড়িতে উঠলেন। আমি আবার উপরে চলে এলুম।

চশমার আড়ালে – ২০

পুবে-দক্ষিণে খোলা হলেও ঘরটায় যে আলো জ্বেলে রাখা হয়ছে, তার কারণ আর কিছুই নয়, পুব আর দক্ষিণ দিকের জানলায় ঝুলছে মোটা কাপড়ের পর্দা। পীতাম্বরও আমার সঙ্গে উপরে উঠে এসেছিল। বলল, “পর্দা সরিয়ে দেব স্যার? বাইরে কিন্তু হাওয়া এখন গরম।”

বললুম, “এই মার্চ মাসে আর কত গরম হবে? পর্দা সরিয়ে অন্তত দক্ষিণের জানালা দুটো খুলেই দাও।”

জানালা খুলে দিতেই দক্ষিণের হাওয়া যেন হুহু করে ছুটে এল। পীতাম্বর বলল, “আপনি বিশ্রাম করুন। যদি কিছু দরকার হয়, বিছানা থেকে আপনাকে উঠতে হবে না, খাটের শিয়রে সুইচ লাগানো আছে, ওটা টিপলেই কেউ-না কেউ এসে যাবে।”

পীতাম্বর চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটা কথা মনে হওয়ায় পিছন থেকে তাকে ডেকে বললুম, “সাধারণত এই ঘরটায় কে থাকেন পীতাম্বর?”

“থাকবার কথা তো ছিল বড়দাদাবাবুর। কিন্তু এত হাওয়া তাঁর পছন্দ নয়। বলেন যে, বাতাস বইলেই খাতাপত্তর উড়ে যায়, তাতে তাঁর পড়াশুনোর ব্যাঘাত হয় বড্ড। প্রথম থেকেই তিনি তাই এই দোতলারই পিছন-দিককার একটা ঘরে থাকেন।”

“বড়দাদাবাবু খুব পড়াশুনোর ভক্ত বুঝি?”

“খুব।” পীতাম্বর বলল, “এতগুলো পাশ দিয়েছেন, তবু পড়াশুনোর কামাই নেই। এখনও দিনরাত্তির বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকেন। ছেলেবেলা থেকেই যে চোখ খারাপ, সে তো এইজন্যেই। চশমা ছাড়া এক দন্ড চলে না।”

কথাটা অন্য দিকে ঘুরে যাচ্ছিল। তাই বললুম, “কিন্তু এ-ঘরে তা হলে থাকেন কে?”

“আগে ছোটদাদাবাবু থাকতেন, এখন কেউ থাকে না। ওই মানে আপনাদের মতন কেউ যখন আসেন, তখন এ-ঘর খুলে দেওয়া হয়।”

“বাবু আর গিন্নিমা থাকেন কোথায়?”

“তাঁরা নীচেই থাকেন।”

“এ-বাড়িতে আর কে-কে থাকে?”

“আর যারা থাকে, তারা সবাই কাজের লোক। তা ধরুন, সব মিলিয়ে কাজের লোকও কম নয়, চোদ্দোজন। ড্রাইভারই তো তিনজন। তা ছাড়া মালি আছে, দরোয়ান আছে, রান্নার ঠাকুর আছে, বেয়ারা আছে, বাবুর্চি আছে, সেইসঙ্গে আমরাও আছি। তবে আমরা কেউই রাত্তিরে এই বড়বাড়িতে থাকি না, গেটের পাশে আমাদের আলাদা ঘর আছে। অনেকে আবার কাছেপিঠে থাকে, এখানকার কাজকর্ম সেরে তারা যে-যার বাড়িতে চলে যায়।”

পীতাম্বর চলে গেল। জানালার সামনেই লন। তরপরে গেট। গেটের সামনে রাস্তা। রাস্তার ওদিকে কোনও ঘরবাড়ি কি দোকানপাট নেই। ধুধু মাঠ। এখান থেকে সব স্পষ্ট চোখে পড়ে। হুহু করে ঘরে এসে বাতাস ঢুকছিল। পীতাম্বর যা-ই বলুক, এমন-কিছু গরম বাতাস নয়। গরম হবার কথাও নয়। একে তো এখন বসন্ত কাল, তার উপরে পাশেই নদী, বাতাস তা হলে গরম হবে কেন। ঘরের দেওয়ালে একটা এয়ার কন্ডিশনার যন্ত্র বসানো রয়েছে দেখলুম, কিন্তু সুইচ টিপে সেটা চালাবার কোনও দরকার আছে বলে মনে হল না। জানালা খোলা রেখে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লুম।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম জানি না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ফোন বাজছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম প্রায় ছটা বাজে। ফোন তুলে নিয়ে বললুম, “হ্যালো…”

“মিঃ ভাদুড়ি?”

“মিঃ ভাদুড়ি একটু বাইরে গেছেন, ফিরতে রাত হবে। আপনি কে কথা বলছেন?”

ওদিক থেকে যিনি কথা বলছিলেন, প্রশ্নটার তিনি কোনও জবাব দিলেন না। শুধু বললেন, “ঠিক আছে, রাত দশটার পরে আমি আবার ফোন করব।”

হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে, বোম্বাই থেকে ফোন আসবার কথা আছে। কোড নাম্বারটা মনে ছিল, তাই আর পকেট ডায়েরি খুলে সেটা দেখে নেবার দরকার হল না। বললুম, “কোড নাম্বার ফাইভ জিরো ডাব্‌ল এইট। কোনও মেসেজ আছে?”

জবাব এল, “এইটুকু জানিয়ে দেবেন যে, দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি, কিন্তু ওই নামের কাউকে তাঁরা কোচ করেননি। অন্য কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করবার চেষ্টা চলছে। খবর থাকলে জানাব। মেসেজ এন্ডস।”

লাইন কেটে গেল। বুঝলুম, ওদিক থেকে যিনি কথা বলছিলেন, তিনি রিসিভার নামিয়ে রেখেছেন।

খাটের মাথায় সুইচটা টিপতেই বাইরে থেকে দরজার পর্দা সরিয়ে যে ভিতরে এসে ঢুকল, সে পীতাম্বর নয়, অল্পবয়সী এক ছোকরা। বললুম, “চা খাব। চায়ে দুধ-চিনি থাকবে না। শুধু হালকা লিকার।”

লোকটি কোনও কথা বলল না। ঘরে ঢুকে যেমন একবার মাথা নুইয়েছিল, তেমনই আবার মাথা নুইয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে আমি আবার ঘরে ফিরে এলুম। চা এল মিনিট পাঁচেক বাদে। খাটের পাশের টিপয়ের উপরে চায়ের ট্রে নামিয়ে রেখে লোকটি বলল, “বড়বাবু আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। উপরে আসতে বলব?”

বললুম, “ওঁকে উপরে আসতে হবে না। বলো যে, আমিই একটু বাদে নীচে নামছি।”

এখানে এসে অবধি জামাকাপড় পালটানো হয়নি। চা খেয়ে ওয়ার্ডরোবের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। পশ্চিমের দেওয়ালে জানালা নেই। দু’দিকে দুটো ওয়ার্ডরোব। মাঝখানের জায়গাটা জুড়ে বিশাল একটা কাচের আলমারি। তাতে বই বোঝাই। এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এবারে নজর করে দেখলুম যে, প্রায় সবই খেলার বই। ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস, কোনও বিষয়েই বইয়ের কিছু কমতি দেখলুম না। উইজডেনের সঙ্কলনগুলোও একটা তাকে দেখলুম পরপর সাজানো রয়েছে। বইগুলোর প্রায় সবই যে খেলাধুলোর বিষয়ে, এইটে দেখে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলুম। পরক্ষণেই বিস্ময়টা কেটে গেল। মনে পড়ে গেল যে, এ-ঘরে লক্ষ্মণ থাকত। যা খেলা-পাগল ছেলে, তাতে রাজ্যের খেলার বই দিয়ে আলমারি বোঝাই করবে, এটাই তো স্বাভাভিক।

ওয়ার্ডরোব খুলে জামাকাপড় পালটে নীচে নামতে গিয়ে রামুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কাঁধ থেকে এখনও সেই স্লিং ঝোলানো। এক হাতে একটা বই ধরে সেটা পড়তে-পড়তে অন্যমনস্কভাবে একতলা থেকে দোতলায় উঠে আসছিল, প্রথমটায় আমাকে দেখতে পায়নি। আমিই বললুম, “কী খবর রামু?”

রামু নিশ্চয় বইখানার মধ্যে একেবারে ডুবে গিয়েছিল। নইলে আমার গলা শুনে অমন চমকে উঠত না। পরক্ষণেই হেসে বলল, “আপনারা যে এসেছেন তা জানি। তবে পীতাম্বর বলল, আপনি বিশ্রাম করছেন। তাই আর বিরক্ত করিনি। চারুকাকা কোথায়?”

“তিনি একটু ভুবনেশ্বরে গিয়েছেন। ফিরতে রাত হবে।”

আমার পাশ দিয়ে রামু আবার উপরে উঠতে যাচ্ছিল, বললুম, “একটু দাঁড়াও তো।”

“কিছু বলবেন?”

“মাত্র একটা কথাই বলব। সিপাহিজলায় তুমি যে কেন সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলে, এখন সেটা বুঝতে পারছি। বই পড়তে-পড়তে কেউ সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করে?”

রামু হাসল। তারপর উপরে উঠে গেল। পীতাম্বর মনে হল ঠিকই বলেছে। বঙ্কুবাবু তো বলতে গেলে চোখেই দেখেন না, এখন পড়তে-পড়তে রামুও না তার চোখের বারোটা বাজায়। বইখানার নাম দেখলুম, ‘মডার্ন মেথডস অব ডাটা প্রসেসিং’। বাবা রে বাবা, সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে-উঠতে ও-সব বই অত মগ্ন হয়ে পড়বার কোনও মানে হয়?

ড্রইংরুমে ঢুকে দেখি, বঙ্কুবাবু সেখানে সস্ত্রীক বসে আছেন। মিসেস ঘোষের ভুরুজোড়া আবার যথাস্থানে ফিরে এসেছে। ভদ্রমহিলা একটা ফিল্ম ম্যাগাজিন পড়ছিলেন। আমাকে দেখে ম্যাগাজিনটা পাশে নামিয়ে রেখে বললেন, “একটা কথা ভাবছি।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “বলো।”

“কথাটা আমি তোমাকে বলিনি, মিঃ চ্যাটার্জিকে বলছি।”

“কিরণবাবু এসে গেছেন নাকি?” ভিতরের দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে বঙ্কুবাবু বললেন, “আরে, আসুন, আসুন। একটু ঘুমিয়ে নিতে পেরেছেন তো?”

বললুম, “একটু কেন, বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছি।”

“তা হলে জলখাবার দিতে বলি?”

“কী যে বলেন! অত বেলায় খেয়েছি, তারপরে আর এখন কিছু খাওয়া সম্ভব? না না, এখন আর কুটোটিও দাঁতে কাটতে পারব না। তবে হ্যাঁ, একটু আগেই যদিও চা খেয়েছি, তবু আর এক কাপ হয়তো চলতে পারে।”

পীতাম্বরকে ডেকে মিসেস ঘোষ চায়ের অর্ডার দিলেন। তারপর বঙ্কুবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার কি আর-কিছু বলার আছে?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “এখন আর-কিছু বলার নেই। আগে উনি চা খান, পরে বরং অন্য বিষয়ে কথা বলা যাবে।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “তা হলে আমার কথাটা এবারে বলতে পারি, কেমন?”

“বিলক্ষণ।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “দেখুন কিরণবাবু, ভুবনেশ্বর ফিরে অবধি একটা কথা ভাবছি। এখানকার পাহাড়ে ওই যে জাপানি বুদ্ধ মন্দির রয়েছে, ওটাকে আমাদের স্টোরির মধ্যে কোনওভাবে ঢোকানো যায় না? মানে… কী জানেন… লিঙ্গরাজ টেম্পল আর জগন্নাথ টেম্পল তো সবাই দেখেছে, কিন্তু ওই বুদ্ধমন্দির অনেকেরই দেখা হয়নি। চমৎকার আর্কিটেকচার, ভিড়ভাট্টা নেই, শুটিংয়েরও তাই খুব সুবিধে, নানান অ্যাংগল থেকে ছবি তোলা যাবে, তাই ভাবছিলুম…”

বললুম, “এ আর বেশি কথা কী, বলেন তো নীরমহল কি ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দিরের বদলে এখানকার ওই বুদ্ধমন্দিরকেই ঢুকিয়ে দেব।”

মিসেস ঘোষ আমার কথা শুনে এমন আঁতকে উঠলেন যে, পরক্ষণেই নিজেকে শুধরে নিয়ে বললুম, “অবশ্য বদলাবদলিরই বা দরকার কী, সবই থাক না। দ্য মোর দ্য মেরিয়ার। …না না, ও নিয়ে আপনি ভাববেন না।”

চা এসে গিয়েছিল। যতক্ষণ এখানে থাকব, ততক্ষণই যে মিসেস ঘোষের পাগলামির সঙ্গে আমাকে পাল্লা দিতে হবে, সেটা বুঝতে পেরে গিয়েছিলুম বলেই প্রায় জিভ পুড়িয়ে চা খেয়ে উঠে পড়লুম আমি। বললুম, “ ও বেলা স্নান করা হয়নি। আপনারা বসুন, আমি বরং স্নানটা সেরে নিই।”

উপরে চলে এলুম। বাথরুমে ঢুকতে যাচ্ছি, হঠাৎ আবার ফোন বেজে উঠল। ফিরে এসে রিসিভার তুলে বললুম, “হ্যালো?”

“মিঃ ভাদুড়ি কি ফিরেছেন?”

সেই গলা। বুঝতে পারলুম, বোম্বাই থেকে সেই মানুষটিই আবার কথা বলতে চাইছেন। এবারে আর কোড নাম্বার জানাতে একটুও দেরি হল না। বললুম, “কোড নাম্বার ফাইভ জিরো ডাবল এইট। কোনও মেসেজ আছে? থাকলে আমাকে দিতে পারেন।”

“দিস ইজ ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট। মিঃ ভাদুড়ি ফিরবামাত্র তাঁকে মেসেজটা দেবেন। বলবেন যে, উনি যার খোঁজ চান, সে রমাকান্ত আচরেকরের কাছে কোচিং নিত। রেগুলারলি নিত না। ছ-মাস অন্তর অন্তর পনেরো দিনের জন্য বোম্বাইয়ে আসত। আচরেকর তখন তাকে কোচ করতেন। শুনলুম, হি ওয়াজ অ্যান এক্সেপশনালি ব্রাইট ট্রেনি অ্যান্ড ওয়াজ শিওর টু ফাইন্ড ও প্লেস ইন দ্য ইন্ডিয়ান ইলেভেন অ্যাজ অ্যান অলরাউন্ডার। কিন্তু গত মে মাসের গোড়ায় পনেরো দিনের কোচিং নিয়ে সেই যে চলে যায়, তারপরে আর গত ন-মাসের মধ্যে সে আসেনি। ….না, কোনও খবরও দেয়নি। মিঃ আচরেকর তাই নিয়ে খুব আক্ষেপ করছিলেন।….মেসেজ এন্ডস।”

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, আটটা। আর দেরি করা ঠিক হবে না। চটপট বাথরুমে ঢুকে পড়া দরকার, নইলে আবার নীচতলা থেকে ডাক পড়তে পারে। বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করলুম। বাথটাবে ঠাণ্ডাজল আর গরমজল মিশিয়ে নিয়েছি, তাই বড় আরাম লাগছিল। শুকনো তোয়ালে দিয়ে গা মুছে একেবারে পরিপার্টি হয়ে যখন বেরিয়ে এলুম, নটা বাজতে তখন আর বিশেষ বাকি নেই।

বাথরুম থেকে বেরিয়েই কিন্তু চমকে উঠতে হল। ভাদুড়িমশাই আরামদারায় গা ঢেলে দিয়ে কাগজ পড়ছেন। আমাকে দেখে কাগজখানা সরিয়ে রেখে বললেন, “স্নান করতে এত সময় লাগে আপনার? বাবা রে, আমার তো ভয় হচ্ছিল যে, আপনি বোধহয় বাথরুমের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছেন!”

বললুম, “সাধারণত এর অর্ধেক সময়ও লাগে না। আজ যে এত সময় লাগল, তার কারণ আর কিছুই নয়, মিসেস ঘোষ। ধৌলি পাহাড়কেও তিনি তাঁর ফিল্মের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু সে-কথা থাক, আপনি মনে হচ্ছে একটু তাড়াতাড়িই ফিরলেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজ তো কমপ্লিট। তা হলে আর ভুবনেশ্বরে বসে থেকে কী করব?”

“বম্বে থেকে ফোন করেছিল। দুবার। একবার ছটার একটু আগে, একবার আটটা নাগাদ। প্রথম মেসেজটা জরুরি নয়, দ্বিতীয়টা জরুরি।’

“বলে ফেলুন।”

“নিশাকর ঘোষ ছ-মাস অন্তর অন্তর বোম্বাইয়ে গিয়ে মিঃ আচরেকরের কাছে পনেরো দিনের জন্যে ক্রিকেটের কোচিং নিত। কিন্তু….

“গত ন-দশ মাসের মধ্যে আর যায়নি। তখন থেকেই সে ভ্যানিশ। কেমন?”

আমি তো তাজ্জব। বললুম, “ কী করে জানলেন?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এতে আর জানাজানির কী আছে। সেভেনটি নাইনের জানুয়ারিতে ওই যে একটা দুপুর আমরা কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে কাটাই, সে সম্পর্ক যতটা আপনার মনে আছে, তা আমি আপনাকে লিখে ফেলতে বলেছিলুম। তো আপনার লেখার মধ্যে দেখলুম অন্য নানা ঘটনার সঙ্গে একটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপার আপনি উল্লেখ করেছেন। লক্ষ্মণকে দিলীপ বেঙ্গসরকর বলেছিল যে, বোম্বাই গেলে লক্ষ্মণের একটা কোচিংয়ের ব্যবস্থা সে করে দেবে। তো সেই কথাটা যে লক্ষ্মণের মনে থাকবে, আর বছর-কয়েক বাদেই সে যে বোম্বাই গিয়ে কোচিং নিতে শুরু করবে, এ তো খুবই স্বাভাবিক।”

“কিন্তু কোচিং নিতে-নিতে সে নিখোঁজ হল কেন?”

“আপনার ওই লেখার মধ্যে কিন্তু এরও একটা উত্তর রয়েছে। ঠিক উত্তর নয়, বরং বলতে পারেন একটা ভাইটাল ক্লু, যা কিনা ওর চরিত্রকে মোটামুটি চিনিয়ে দেয়। আর সেটা যদি চিনতে পারেন, উত্তরটা আন্দাজ করাও তা হলে খুব শক্ত হয় না।”

“একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝতে পারছেন না? শুনুন তা হলে। সেই টেস্ট ম্যাচের ফোর্থ ডে-র শেষের দিকে এমন একটা সময় এসেছিল, ডাবল সেঞ্চুরি করতে গাভাসকরের যখন আর মাত্র আঠারো রান বাকি, অথচ তখনই যদি ইনিংস ডিক্লেয়ার করে দেওয়া হয়, ইন্ডিয়ার তা হলে জিতে যাবার একটা সম্ভাবনা থাকে। তো লক্ষ্মণ তখন আপনাকে যা বলেছিল, সে তো আপনি নিজেই লিখে রেখেছেন। ও বলেছিল, গাভাসকর আর বেঙ্গসরকর, দুজনেই টিম-ম্যান, দলের স্বার্থেই ইনিংসটা ওরা ডিক্লেয়ার করে দেবে।”

“তা বলেছিল বটে, কিন্তু তাতে কী বোঝা গেল?”

“এইটে বুঝলুম যে, টিম-ম্যানদের যারা শ্রদ্ধা করে, তারা নিজেরাও বড় একটা স্বার্থপর হয় না। আমার ধারণা, লক্ষ্মণ ইজ আ টিম-ম্যান হিমসেলফ, হি হেটস টু লেট দ্য টিম ডাউন।”

ভাদুড়িমশাই খুব মিষ্টি করে হাসলেন। তারপর বললেন, “এবারে বুঝলেন তো?”

কিছুই বুঝিনি। কিন্তু সেটা বলবার অবকাশ পাওয়া গেল না। পর্দা সরিয়ে পীতাম্বর এসে ঘরে ঢুকল। “খেতে দেওয়া হয়েছে। আপনারা আসুন বাবু।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সাড়ে নটা বাজে। চলুন, আর দেরি করা ঠিক হবে না।”

আমরা নীচে নেমে ডাইনিং হলে ঢুলুম।

খেতে-খেতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “তোমার অফিসটা কোথায় বঙ্কু?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আউটহাউসের একতলাটাই তো অফিস। কেন, তোমরা দ্যাখোনি?”

“খেয়াল করিনি।”

“না-করাই স্বাভাবিক। আজ তো রবিবার। অফিসে যারা কাজ করে, তারা কেউ আসেনি।”

“কজন কাজ করে ওখানে?”

“ম্যানেজারকে নিয়ে পাঁচজন। ওতেই চলে যায়। কাজ তো আসলে এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। তারা যে-সব চিঠিপত্র লেখে, সেগুলো পড়তে হয়, তার জবাব দিতে হয়। তা ছাড়াও কিছু কাজ আছে অবশ্য। সেগুলো ওরা হ্যান্ডল করে না, তার জন্যে একজন সেক্রেটারি রয়েছে। ….তা তোমার কাজ কেমন চলছে? ভুবনেশ্বরে যেজন্যে গিয়েছিলে, সেটা হল?”

“শুধু ভুবনেশ্বরে কেন, কটকেও গিয়েছিলুম।’

“কটকে কোথায়?”

“র‍্যাভেনশ কলেজের এক অধ্যাপকের বাড়িতে। লক্ষ্মণ তো ওখানেই বি.এ. পড়ত তাই না?”

“হ্যাঁ।” বঙ্কুবাবু বললেন, “ওখানে গিয়ে হদিশ পেলে কিছুর?”

“অধ্যাপক-ভদ্রলোকের কাছে পাইনি। তবে লক্ষ্মণের সঙ্গে কাদের বঙ্কুত্ব ছিল, ভদ্রলোকের কাছে সেটা জেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলুম। তো তাদের কাছে কিছু হদিশ পাওয়া গেল। এই যেমন কটকের কোন রেস্তোরাঁয় লক্ষ্মণ আড্ডা দিত, কি ধরো ভুবনেশ্বরের কোন সেলুনে সে চুল কাটত, এই ধরনের টুকিটাকি কিছু খবর।”

খেতে-খেতে রামু একবার মুখ তুলে তাকাল ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে। কিন্তু কিছু বলল না।

মিসেস ঘোষ বললেন, “ফিল্মটার বিষয়ে কিছু ভাবছেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, ডিরেকশানের দায়িত্ব নিয়েছি, আর ফিল্মের কথাটাই ভাবব না? তাও হয় নাকি? তবে কিনা বঙ্কু তো আমার ছেলেবেলার বঙ্কু তাই তার জীবনে এই যে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে, এটার কথাই বা ভুলে যাই কী করে?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “ভুলতে কি আমিই পারছি? আমি ওর মা নই, কিন্তু ছেলেবেলা থেকে নিজের হাতে মানুষ করেছি তো। কোথায় যে গেল ছেলেটা।”

বঙ্কুবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এতগুলো কাগজে বিজ্ঞাপন দিলুম, অথচ কেউ একটা খবর পর্যন্ত দিল না। ও কি আর ফিরবে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখা যাক।”

খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমরা উঠে পড়লুম।

দোতলায় এসে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “আগরতলা থেকে চলে আসবার আগের দিন রাত্তিরে বঙ্কুবাবু আপনাকে একটা অনুরোধ করেছিলেন, মনে আছে তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মনে থাকবে না কেন, পার্টনারশিপের দলিলে রামু যাতে সই করতে রাজি হয়, তার জন্যে তাকে বলতে হবে। তা বলব বই কী, নিশ্চয় বলব। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখুন কিরণবাবু। স্বয়ং ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বর যদি একসঙ্গে এসে অনুরোধ করেন, তা হলেও রামু ওই দলিলে সই করতে রাজি হবে না। কটকে আর ভুবনেশ্বরে কি আর আমি বেড়াতে গিয়েছিলুম মশাই? যে কাজে গিয়েছিলুম সেটা হয়েছে। আর হ্যাঁ, একটু বাদেই আমরা রামুর ঘরে যাব।”

ভাদুড়িমশাই হাসতে লাগলেন।

আমার মনে হল, ব্যাপারটা যেন ক্রমেই আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছে।

২১
একবারের বেশি টোকা দিতে হল না, দরজা খুলে রামু বলল, “কী ব্যাপার আঙ্কল?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?”

“মাত্র তো এগারোটা বাজে, এত তাড়াতাড়ি আমি ঘুমোই না, একটা বই পড়ছিলুম। কিন্তু আপনারা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, ভিতরে আসুন।”

ভিতরে ঢুকেই বুঝতে পারলুম যে, দক্ষিণখোলা যে-ঘরে আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে তার তুলনায় এই ঘরটা অনেক ছোট। একটু অগোছালোও বটে। আমাদের ঘরে দু’দুটো রাইটিং টেবিল আর চেয়ার ছাড়াও বসবার জন্য আলাদা একটা সোফা সেট রয়েছে। তার উপরে আর্মচেয়ারও রয়েছে একটা। রামুর ঘরে না আছে সোফা-সেট, না আছে আর্ম চেয়ার। একদিকের দেওয়াল ঘেঁষে একটা খাট, অন্যদিকের দেওয়ালে একটাই ওয়ার্ডরোব। তার পাশে কাচের বুক-কেস। তাতে মোটা মোটা বই ঠাসা। ঘরের মধ্যে ছোট একটা রাইটিং টেবিল আর তার সামনে একটা চেয়ারও রয়েছে, কিন্তু যেমন টেবিল তেমন চেয়ারের উপরেও ডাঁই করে রাখা হয়েছে একগাদা বই আর খাতা।

ব্যাবসা-বাণিজ্য নিয়ে যে-সব ম্যাগাজিন বেরোয়, খাটের উপরে তারই খান-তিনেক ছড়িয়ে আছে। বসবার অন্য কোনও ব্যবস্থা না থাকায় ম্যাগাজিনগুলোকেই একপাশে সরিয়ে দিয়ে রামু বলল, “আপনারা বরং খাটেই বসুন।……কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো, কোনও কথা ছিল?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ইট’স নো ইউজ বিটিং অ্যাবাউট দ্য বুশ। হাতে আর সময় নেই, কাল ধৌলি এক্সপ্রেসে আমরা কলকাতা ফিরছি।”

“কালই ফিরবেন? কেন? আরও দু-একটা দিন থেকে যান না। এবারে তো অনেকদিন বাদে এলেন?”

“পরে আবার আসব। এ-যাত্রায় একটা কাজ নিয়ে এসেছিলুম। সেটা মিটে গেছে। কিন্তু যাবার আগে তোমাকে দু’একটা কথা জিজ্ঞেস করা দরকার।”

“কী জিজ্ঞেস করবেন, আমি জানি।” মৃদু হেসে রামু বলল, “পার্টনারশিপের দলিলে আমি কেন সই করছি না, এই তো?”

এবারে ভাদুড়িমশাইও হাসলেন। তারপর রামুর চোখে চোখ রেখে বললেন, “না না, ও নিয়ে কোনও কথাই আমি বলব না। আই অ্যাম নো ফুল। কেন যে তুমি সই করছ না, তা তো আমি জানিই। তা হলে আর ও নিয়ে কোনও প্রশ্ন করতে যার কেন?”

রামু কি একটু চমকে উঠল? যদি বা চমকে উঠে থাকে, সেটা নেহাতই এক মুহূর্তের জন্য। কেননা, পরক্ষণেই দেখলুম, তার চোখ থেকে সেই মৃদু হাসির আলোটা আদৌ মিলিয়ে যায়নি। একই রকমের শান্ত গলায় সে বলল, “বেশ তো, জানেন যখন, তখন আপনিই বলুন যে, কেন আমি স‍ই করছি না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি তো কিছু বলতে আসিনি। আমি শুনতে এসেছি।”

“কী শুনবেন?”

“ভাই কোথায়?”

রামু এবারে স্পষ্ট করে হাসল, “সে তো পুলিশের জানবার কথা, আমি কী করে জানব?”

“পুলিশ না জানুক, আমি জানি। তুমি জানো, আজ আমি কটকে গিয়েছিলুম। কেন গিয়েছিলুম? না লক্ষ্মণের কলেজের এক অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করতে। দেখা করে কী লাভ হল? না তাঁর কাছে পাওয়া গেল লক্ষ্মণের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ বঙ্কুর ঠিকানা। আর-কিছু শুনতে চাও?”

“বলুন।”

“লক্ষ্মণের সেই বঙ্কুদের সঙ্গে আমি দেখা করি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন দেখা করেছিলুম? না কোন্ ব্যাপারে লক্ষ্মণ কোন্ দোকানকে পেট্রনাইজ করে, তাদের কাছে সেটা জেনে নেবার দরকার ছিল। সব রকমের দোকান নিয়ে অবশ্য আমার মাথাব্যথা ছিল না, আমি শুধু জানতে চাইছিলুম একটা বিশেষ ধরনের দোকানের খবর। তো বঙ্কুরা বলল যে, সে-দোকান তো কটকে নয়, ভুবনেশ্বরেই রয়েছে। ফলে তিরিশ মাইল উজিয়ে আমাকে আবার ভুবনেশ্বরেই ফিরতে হল।…..কী হল, কোনও কথা বলছ না যে?”

রামু বলল, “আমি আর কী বলব?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আর-কিছু না বললেও এটা অন্তত বলতে পারো যে, রবিবারে তো দোকানপাট বন্ধ থাকে, তাই দোকানের খোঁজে আজ রবিবার আমার ভুবনেশ্বরে যাওয়া উচিত হয়নি। কেমন?….কিন্তু না, তা তুমি বলবে না। কেননা তুমি খুব ভাল করেই জানো যে, যে-দোকানের খোঁজে আমি গিয়েছিলুম, অন্য সব দোকান বন্ধ থাকলেও সে-দোকানের কাজ-কারবার রবিবারে বন্ধ থাকে না। বরং ছুটির দিনেই ও-সব দোকানে খদ্দের আরও বেশি জোটে।”

দোকানের মালিক আপনাকে কিছু বলেছে?”

“প্রথমে বলতে চায়নি,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু কতক্ষণ আর চুপ করে থাকবে বলো। কড়কড়ে একখানা একশো টাকার নোট যখন তার হাতের মধ্যে গুঁজে দিলুম, গড়গড় করে সবই তখন বলে ফেলল।”

রামুর দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলুম। মনে হল, নিমেষে তার মুখ থেকে যেন সমস্ত রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে। স্খলিত গলায় সে বলল, “বাবাকে আপনি বলেছেন?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “খেপেছ? তোমার বাবা আমার বঙ্কু। আমি কি তাঁর হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারি? কলিকালের রাম আর লক্ষ্মণের মধ্যে একজনও যে পিতৃ-আজ্ঞা পালনে বিশেষ উৎসাহী নয়, বরং দুজনেই ঘোর পিতৃদ্রোহী, এটা জানলেই তো তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।”

“আমি তা হলে কী করব?”

“তোমাকে কিছু করতে হবে না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা করবার আমিই করব। তুমি শুধু বলো, নিখোঁজ ভাইটির খোঁজ আমরা কবে পাচ্ছি।”

রামু বলল, “একেবারে এগজ্যাকট তারিখ কি বলা সম্ভব আঙ্কল?”

“এগজ্যাকট তারিখ তো আমি জানতে চাইছি না, কিন্তু মাসটা এগজ্যাকট হওয়া চাই।”

“আই থিংক হি উইল সারফেস বাই দ্য এন্ড অব মে।”

“বাঃ, লক্ষ্মী ছেলে। আজ হল গিয়ে মার্চ মাসের দশ তারিখ। মাঝখানে এপ্রিল, তারপরেই মে এসে যাচ্ছে। চমৎকার। তোমার বাবাকে তা হলে কথাটা জানিয়ে দিই, কেমন?….আরে না না, তোমাকে আর এর মধ্যে টানছি না, আই শ্যাল কিপ ইউ আউট অব ইট।”

“ঠিক বলছেন তো আঙ্কল?”

“শতকরা একশো ভাগ ঠিক বলছি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আর হ্যাঁ, আমরা যখন চলেই যাচ্ছি, তখন কাঁধ থেকে ওই স্লিংটা ঝুলিয়ে রাখবার দরকার কী, ওটা খুলে ফ্যালো। ….চলুন কিরণবাবু, ঘরে যাওয়া যাক, আপনার নিশ্চয় ঘুম পেয়ে গেছে।”

ঘরে ফিরে বললুম, “ব্যাপার কী বলুন তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন কিছু বলব না। কাল সকালেও না। দুপুর দেড়টার ট্রেনে তো আমরা কলকাতা ফিরছি। যা বলবার তখন বলব। এখন ঘুমিয়ে পড়ুন।”

২২
আজও সেই ধাক্কা খেয়েই ঘুম ভাঙল।

চোখ মেলি দেখি খাটের পাশে ভাদুড়িমশাই দাঁড়িয়ে আছেন। বললুম “কটা বাজে?”

“সাড়ে সাতটা।”

ধড়মড় করে বিছানার উপরে উঠে বসলুম। গোটা ঘর রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে। বললুম, “আগেই ডেকে দেননি কেন?”

“ডাকতে গিয়ে মায়া হল। ভাবলুম, থাক, কাল থেকেই তো আবার অফিসে যাবে, লোকটা আজ একটু ঘুমিয়ে নিক।……তো আমি চায়ের কথা বলে দিয়েছি।”

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শেষ হতে না হতেই পর্দা ঠেলে কালকের সেই লোকটি ঘরে ঢুকল। হাতে চায়ের ট্রে। ট্রেটা খাটের পাশের টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, “ব্রেকফাস্ট কখন দেব?”

“এ বাড়িতে সবাই কখন ব্রেকফাস্ট করেন?”

“আটটায়।”

“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তোমাকে আর এ-ঘরে ব্রেকফাস্ট আনতে হবে না। আটটায় আমরা ডাইনিং হলে যাচ্ছি।”

লোকটি চলে গেল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাড়াতাড়ি চা খেয়ে মুখহাত ধুয়ে নিন তো। ঠিক আটটাতেই আমরা নীচে নামব।”

চায়ে চুমুক দিয়ে বললুম, “আজ তা হলে একাই মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছিলেন?”

“তাই তো সাধারণত বেরোই। কিন্তু না, সঙ্গে আজ লোক ছিল।”

“কে? রামু নিশ্চয়?”

“বাঃ বুদ্ধি বেশ খুলেছে দেখছি। কিন্তু না, এখন আর এ নিয়ে কোনও কথা নয়।”

চা শেষ করে বাথরুমে ঢুকে পড়লুম।

নীচে নামলুম ঠিক আটটাতেই। ব্রেকফাস্ট-পর্ব শেষ হবার পর যখন ঘর ফাঁকা হয়ে গেল, তখন বঙ্কুবাবুকে একা পেয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজ তো সোমবার। তোমার অফিস ঠিক কটায় বসবে?”

বঙ্কুবাবু বললেন, “অফিস তো সাড়ে দশটায় বসে, তবে আমি একটু আগে ….এই ধরো নটার মধ্যেই কাজে লেগে যাই। কয়েকটা ফোন করি, এজেন্টদের খোঁজখবর নিই। সেক্রেটারি আসে সাড়ে নটা নাগাদ, তাকে কিছু চিঠিপত্র ডিকটেট করতে হয়। এইসব করতে-করতে সাড়ে দশটা বেজে যায়, অন্য লোকজনেরা এসে পড়ে।”

“এখন তো সাড়ে আটটা বাজে। এখন কী করবে?”

“খবরের কাগজ পড়ব।….মানে আমি তো চোখে ভাল দেখি না, হেডলাইনগুলো পীতাম্বরই পড়ে শোনায়। পীতাম্বর অবশ্য ইংরিজি জানে না, তাই ওড়িয়া কাগজ পড়ে। তাতে অবশ্য আমার কোনও অসুবিধে হয় না। ওড়িয়া আমি ভালই বুঝি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজ আর এখন তোমাকে কাগজ পড়তে হবে না। পরে পড়বে।”

“এখন তা হলে কী করব?”

“এখন তুমি অফিস ঘরে গিয়ে বসবে। বসে আমাদের সঙ্গে কথা বলবে। চলো। না না, পীতাম্বরকে ডাকবার দরকার নেই, আমরাই তো তোমার সঙ্গে আছি।”

এ-বাড়িতে ঢুকবার মুখে বাঁ দিকে যে আউটহাউসটা পড়ে, বঙ্কুবাবুর অফিস তারই একতলায়। একটা বড় হলঘরের একদিকে বঙ্কুবাবুর নিজস্ব বসবার ঘর, বাদবাকি অংশ তাঁর স্টাফের জন্য। গোটা অফিসটাই এয়ার কন্ডিশন করা। বঙ্কুবাবুর ঘরের একদিকে তাঁর টেবিল-চেয়ার। অন্য দিকটা সোফা সেট দিয়ে সাজানো। বঙ্কুবাবু তাঁর চেম্বারে গিয়ে বসলেন না। আমাদের মতো তিনিও একটা সোফায় বসে বললেন, “কী ব্যাপার বলো তো চারু।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দুটো সুখবর আছে। কিন্তু দুটোর কোনওটা নিয়েই তোমার কোনও প্রশ্ন করা চলবে না। রাজি?”

“তোমার কোনও কথাতেই আমি কখনও অরাজি হইনি। কিন্তু ব্যাপারটা কী, তা তো বুঝতে পারছি না।”

“বোঝার কোনও দরকারও তোমার নেই। উই কেম হিয়ার টু ডেলিভার দ্য গুডস, অ্যান্ড উই আর ডেলিভারিং দেম। ব্যস, মিটে গেল। এখন খবর দুটো বলি। এক নম্বর খবর, তোমার নিখোঁজ ছেলেকে আগামী মে মাসের মধ্যেই তুমি ফিরে পাবে।….না না, একেবারেই উত্তেজিত হওয়া চলবে না। তোমার অবস্থা আমি বুঝতে পারছি, বঙ্কু, কিন্তু ভুলে যেয়ো না যে, তোমার স্বাস্থ্য মোটেই ভাল নয়, হঠাৎ যদি উত্তেজিত হও তো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারো। সুতরাং শান্ত হও…শান্ত হও।”

পকেট থেকে একটা কৌটো বার করে তার থেকে সাদামতন কী একটা ছোট্ট ট্যাবলেট বাঁ হাতের তালুতে ঢেলে নিলেন বঙ্কুবাবু। তারপর বললেন, “পীতাম্বরকে একবার ডাকো তো, ও বোধহয় বাইরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “জল চাই তো? তার জন্যে পীতাম্বরকে ডাকবার দরকার নেই। ওই তো, তোমার টেবিলের উপরেই তো এক বোতল মিনারেল ওয়াটার রয়েছে দেখছি।”

বোতলের পাশে কাচের গেলাশও ছিল একটা। আমিই উঠে গিয়ে বোতল থেকে গেলাশে জল গড়িয়ে নিয়ে এলুম। বঙ্কুবাবু ট্যাবলেটটা মুখে ফেলে দিয়ে ঢকঢক করে জল খেলেন খানিকটা তারপর মস্ত একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “চারু, তুমি যা বলছ তা সত্যি তো?”

“সত্যি না-হলে তোমাকে আমি বলতুম না। এখন দ্বিতীয় খবরটা শোনো। এর পরে আর সময় পাব না, আজই দুপুরের ট্রেনে আমরা কলকাতা ফিরে যাচ্ছি।”

“সে কী!” চমকে উঠে বঙ্কুবাবু বললেন, “আজই তুমি ফিরে যাচ্ছ মানে? রামুর প্রোটেকশানের তা হলে কী হবে?”

“সেটাই হচ্ছে দ্বিতীয় খবর।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওকে প্রোটেকশান দেবার আর কোনও দরকারই হচ্ছে না। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, বঙ্কু, হি ইজ কমপ্লিটলি সেফ নাউ, ওর উপর আর হামলা হবার কোনও সম্ভবনা নেই। সুতরাং আমরাও একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিন্ত চিত্তে এবারে যাত্রা করতে পারি।”

বঙ্কুবাবু একেবারে চুপ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “কিন্তু আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না চারু।”

ভাদুড়িমশাই তাঁর বঙ্কুর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “কোনটা বেশি দরকার, বঙ্কু? বোঝাটা বেশি দরকার, না হারানো-ছেলেকে ফিরে পাওয়াটা বেশি দরকার? বোঝাটা বেশি দরকার, না ছেলের উপরে ক্রমাগত যে হামলা চলছিল, সেটা বন্ধ হওয়া বেশি দরকার? তুমি তোমার হারানো-ছেলেকে ফিরে পাচ্ছ, সেইসঙ্গে আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি যে, যে-ছেলেটা তোমার কাছে রয়েছে, তার উপরেও আর হামলা হবে না। ব্যস, এটাই তো তুমি চাইছিলে। তোমার অত বোঝাবুঝির দরকার কী?”

বঙ্কুবাবুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে ধরা-গলায় তিনি বললেন, “কী করে যে তোমার ঋণ শোধ করব, জানি না…..

“একটা উপায় আছে।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “হারানো ছেলেটা মে মাসের শেষেই ফিরে আসছে তো, তখন বরং দুই ছেলে আর মিসেস ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে দিন-পনরোর জন্যে ব্যাঙ্গালোরে এসে ছুটি কাটিয়ে যেয়ো। তাতেই তোমার তাবৎ ঋণ শোধ হয়ে যাবে।”

“যাব। নিশ্চয়ই যাব।” বঙ্কুবাবু বললেন, “চোখে তো বলতে গেলে কিছুই দেখি না, তবু যাব।” ভাদুড়িমশাই বললেন, ও হ্যাঁ, একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি। ভুবনেশ্বরে কাল তোমার ডাক্তারের সঙ্গেও দেখা করেছিলুম। তিনি বললেন, তোমার ছানি পড়েছে, অপারেশন করা দরকার। তা তোমার নাকি অপারেশনের নামে বড্ড ভয়। ছিঃ বঙ্কু, আজকাল তো লেজারের ব্যবস্থা হয়েছে। ওটা কাটিয়ে নাও। যত দেরি করবে, তত ভোগান্তি হবে। একটুও দেরি করো না।……না না, এ নিয়ে আর একটা কথাও শুনতে চাইছি না আমি।”

ঘর থেকে আমরা বেরিয়ে আসছিলুম, বঙ্কুবাবু বললেন, “দাঁড়াও চারু। আজ আর অফিস করব না। চলো, আমিও তোমাদের সঙ্গে যাচ্ছি।”

অফিস থেকে নেমে আমরা মূল-বাড়িতে ফিরে এলুম।

.

বঙ্কুবাবু স্টেশন পর্যন্ত আসতে চেয়েছিলেন। ভাদুড়িমশাই তাঁকে আসতে দেননি। বলেছিলেন, “ব্যস্ত হবার দরকার নেই। আর হ্যাঁ, হারানো ছেলেটা তো মে মাসেই ফিরে আসছে, পার্টনারশিপের ব্যাপারে তখন যা করবার হয় কোরো, তার আগে আর ও-সব সই-টই নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না।”

কথা ছিল, বিজু আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রামু বলল, “বিজুদার যাবার দরকার নেই। ভুবনেশ্বরে আমার একটু কাজ আছে, আমিই গিয়ে আঙ্কলদের ছেড়ে দিয়ে আসছি।”

তো দেড়টা নাগাদ ধৌলি এক্সপ্রেস ভুবনেশ্বর থেকে ছাড়ল। রামু একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বসে ছিল আমাদের সঙ্গে। ট্রেনটা নড়ে উঠতে তবে প্ল্যাটফর্মে নামল সে। আমাদের প্রণাম করে যখন সে দরজার দিকে এগোচ্ছে, ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি কথা রেখেছি। এবারে তুমিও একটা কথা দাও। ভুবনেশ্বরের লিউয়িস রোডের কোন দোকান থেকে আমি আসল খবর পেয়েছি, তা তো তুমি জানোই, তার মালিককে যেন আবার ধমক-টমক দিয়ো না। ….আচ্ছা তা হলে ওই কথাই রইল। ভাল হয়ে থেকো, লক্ষ্মণ।”

রামু ট্রেন থেকে নেমে যাবার পরে বললুম, “যাচ্চলে, আপনারও তা হলে ভুল হয়? ভাদুড়িমশাই অবাক হয়ে বললেন, “কেন ভুলটা আবার কী করলুম?”

“রামুকে লক্ষ্মণ বললেন না?”

“আরে মশাই,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ও কেন রামু হতে যাবে? ওই তো লক্ষ্মণ।”

“অ্যাঁ?”

“অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ।”

“রামু তা হলে কোথায়?”

ভাদুড়িমশাই এবারে একেবারে হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসির দমকটা একটু কমতে বললেন, “সেটা আমিও আজ সকাল পর্যন্ত জানতুম না। তো লক্ষ্মণই বলল যে, রামু এখন বিলেতে। অ্যাকাউনটেন্সির একটা শর্ট কোর্স করছে। আর ফিরবে যে মে মাসের শেষ নাগাদ, সে তো কাল রাত্তিরে যেমন আমিও শুনেছি, তেমন আপনিও শুনেছেন।”

.

উপসংহার

ভাদুড়িমশাই যা বললেন, শুনে এমন বোকা বনে গিয়েছিলুম যে, অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোনও কথাই বলতে পারিনি। ট্রেন কটক, ছাড়বার পর বললুম, “এবারে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?”

ভুবনেশ্বর স্টেশন থেকে এক কপি ‘সান টাইম’ কিনেছিলেন ভাদুড়িমশাই। সেটাই পড়ছিলেন এতক্ষণ। আমার প্রশ্ন শুনে কাগজখানাকে ভাঁজ করে সরিয়ে রেখে বললেন, “স্বচ্ছন্দে।”

“ও যে রামু নয়, এই সন্দেহটা আপনার কখন থেকে হল?”

“সন্দেহটা প্রথম হয় সিপাহিজলাতে। নীরমহলে সেটা আরও জোর পেয়ে যায়। তখনও কিন্তু ওর আইডেনটিটি নিয়ে কোনও সন্দেহ আমার মনে দেখা দেয়নি।”

“একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

“বলছি। সিপাহিজলার দোতলার ওই ঘটনাটার কথাই ধরুন। বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে ভিতরে থেকে জোর একটা ধাক্কা খেয়ে ও উলটে পড়ল। কোথায় চোট লেগেছে, জিজ্ঞেস করতে ও কী বলেছিল? না মাথায় চোট লেগেছে। তো মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে-দিতে আমি বললুম, তাই তো, এই এখানটায় তো বেশ ফুলেও গেছে দেখছি। আসলে কিন্তু ওর মাথার কোনওখানেই কোনও ফোলা-টোলা ছিল না। ফলে, তখনই আমার মনে একটা সন্দেহ দেখা দেয়। এবারে নীরমহলের ঘটনাটায় আসুন। আমি তো ছাতে দাঁড়িয়ে ছিলুম, সেখানে থেকেই নজর রাখছিলুম নীচের দিকে। ফলে, কেউ যদি উপর থেকে ইট ছুড়ে মারত, তো আমি দেখতে পেতুম নিশ্চয়। কিন্তু না, কাউকেই আমি উপর থেকে সেদিন ইট ছুড়তে দেখিনি। তাও ভাবলুম, হয়তো আমারই চোখের দোষ। কিন্তু তখন আবার আর-একটা প্রশ্ন দেখা দিল আমার মনে। যেমন ভুবনেশ্বরে, তেমনি সিপাহিজলায় আর নীরমহলে সত্যিই যদি ওকে মারবার চেষ্টা করা হয়ে থাকে, তবে সেই চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে কেন? ও তো পেল্লাদ নয় যে, আগুনে ফেলে দিলেও ও পুড়বে না, গলায় পাথর বেঁধে সমুদ্রে ছুড়ে দিলেও ভেসেই থাকবে! আপনার সদানন্দবাবু বলেছেন, গুলিই যদি চালাচ্ছে, তো বারবার ফশকে যাচ্ছে কেন? আমারও সেই একই কথা। মারতেই যদি চাইছে, তো গায়ে একটা আঁচড়ও কেন লাগছে না? এর দুটো উত্তর হতে পারে। এক, এটা মারবার চেষ্টা নয়, স্রেফ ভয় দেখাবার চেষ্টা। আর দুই…….”

পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করলেন ভাদুড়িমশাই। তারপরেই তার মনে পড়ে গেল যে, এটা এয়ার-কন্ডিশন্ড কামরা। বললেন, “ ওরেব্বাবা, এখানে তো সিগারেট খাওয়া চলবে না।”

“বাইরে গিয়ে খেয়ে আসুন না।”

“থাক্,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই বদভ্যাসটা ছেড়েই দেব ভাবছি। …ও হ্যাঁ, কী যেন বলছিলুম?”

“দু-নম্বর উত্তরটা কী হতে পারে।”

“সেটা আপনাকে এখনও বলিনি। দু-নম্বর উত্তর হল, এই যে বাড়ির ছাতে গলা টিপে ধরা, বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে উলটে পড়া, উপর থেকে ইট ছুড়ে মারা, এর কোনওটাই সত্যি নয়, সবটাই আসলে ওর সাজানো ব্যাপার। তখন আবার প্রশ্ন দেখা দিল যে, সাজানো ব্যাপারই যদি হবে, তবে এর উদ্দেশ্যটা কী? ও কি এই রকমের একটা ধারণা সৃষ্টি করতে চাইছে যে, ওর জীবন মোটেই নিরাপদ নয়? যে-কোনও সময়ে ওর প্রাণ বিপন্ন হতে পারে? কিন্তু তেমন একটা ধারণাই বা সৃষ্টি করতে চাইবে কেন? তারও তো একটা উদ্দেশ্য থাকা চাই। সেটা কী?”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “দেখুন মশাই, আপনি লক্ষ করেছেন কি না জানি না, কিন্তু ভুবনেশ্বরে, সিপাহিজলায় আর নীরমহলে এই যে তিন-তিনবার ওর উপরে হামলা হবার কথা আমরা শুনলুম, এর মধ্যে কিন্তু একটা কমন ফ্যাক্টর রয়েছে। সেটা কী? না যে-দিনই বঙ্কু ওকে ব্যাবসার দায়িত্ব বুঝে নিতে বলে, কিংবা বলে যে, ঠিক আছে বাবা, আমি আর আপত্তি করছি না, তুমি বিলেতেই যাও বরং, কিন্তু বেশিদিন সেখানে থেকো না, একটা শর্ট টার্ম করে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, ঠিক সেইদিনই ওর উপরে হামলা হয়। তা হলে কি ও ব্যাবসার দায়িত্ব বুঝে নিতে চায় না বলেই কিংবা বিলেতে যেতে অনিচ্ছুক বলেই এইভাবে সব হামলার ব্যাপার সাজিয়ে তুলছে? মানে… ও কি এর মধ্যে দিয়ে ওর বাবার মনটাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে চায়?”

বললুম, “ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া মানে?”

“মানে প্রায়োরিটি বলে একটা ব্যাপার আছে না? কোটা বেশি জরুরি? ছেলের হাতে ব্যাবসার দায়িত্ব তুলে দেওয়া কি তাকে বিলেত পাঠানোর চাইতে কি তার প্রাণরক্ষার ব্যবস্থা করাটাই একজন বাবার কাছে বেশি জরুরি ব্যাপার নয়? কিন্তু ছেলেটা যে রামু নয়, লক্ষণ, তা তো আমি তখনও পর্যন্ত জানতুম না। তাই সে-দিক থেকে আবার আর-একটা প্রশ্ন দেখা দিল আমার মনে। ক্রমাগত আমি ভাবতে লাগলুম যে, ব্যাবসার দায়িত্ব বুঝে নিতে হবে বলেই তো রামু কমার্স নিয়ে পড়েছে। তা ছাড়া ওই বিষয়ে আরও পড়াশুনো করবে বলেই তো সে বিলেত যেতে চেয়েছিল। বাবার সঙ্গে ওর বিরোধও তো স্রেফ এইজন্য যে, বঙ্কু ওকে বিলেতে পাঠাতে তখন রাজি হয়নি। তা হলে?”

“তা হলে কী?”

“তা হলে ও ব্যাবসার দায়িত্বই বা বুঝে নিতে চাইছে না কেন, পার্টনারশিপের দলিলপত্রেই বা স‍ই করছে না কেন, আর আজ যখন বঙ্কু নিজেই ওকে বিলেত যেতে বলছে, তখন তাতেই বা ওর আপত্তি কীসের?”

বললুম, “তাও তো বটে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ রাপের উপরে ছেলের রাগ-অভিমান তো হতেই পারে, কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে যতই ভাবি, ততই আমার মনে হতে থাকে যে, এটা এমন একটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছচ্ছে, যার কোনও ব্যাখ্যাই হয় না। আর তা হয় না বলেই উদয়পুরের সেই মাঝরাত্তিরের ঘটনাটার পরে আমার মনে একেবারে বিদ্যুচ্চমকের মতোই একটা সন্দেহ হঠাৎ উঁকি দিয়ে যায়।”

“উদয়পুরে তো মাঝরাত্তিরে আমরা ওর ঘরে গিয়েছিলুম।”

“ তা তো গিয়েছিলুমই। কিন্তু কেন গিয়েছিলুম, তা হয়তো আপনি জানেন না। এবারে সব খুলে বলি শুনুন। আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আমার ঘুম আসছিল না। তাই ভেবেছিলুম, বাইরে গিয়ে একটু পায়চারি করব। কিন্তু বাইরে গিয়ে মনে হল, দিঘিতে কে যেন সাঁতার কাটছে। তৎক্ষণাৎ ঘরে ফিরে আপনাকে ডেকে তুলি। তার পরের ব্যাপার আপনি জানেন। দুজনে মিলে রামুর ঘরে যাই। রামু তখন ঘরে ছিল না। তা হলে কি দিঘিতে সে-ই সাঁতার কাটছে? কিন্তু তা-ই বা কী করে হয়? রামু তো শুনেছি সাঁতার কাটতেই জানে না। তবে? …অথচ, মজাটা কী জানেন? আমরা যে রামুর ঘরে গিয়েছিলুম, যেমন করেই হোক, দীপক সেটা টের পেয়ে থাকবে। তাই পরদিন সকালে নিজের থেকেই সে বলে বসল যে, আগের রাত্রে সে আর রাজেশ খুব সাঁতার কেটেছে, কিন্তু না, রামু সারাক্ষণ পাড়ে বসে ছিল, জলে নামেনি। এদিকে দীপকের কথা যদি সত্যি হয়, তাদের ঘরে তা হলে ভিজে সুইমিং ট্রাঙ্ক কি নিদেন একটা ভিজে তোয়ালে তো থাকবে। তা কিন্তু ছিল না। অর্থাৎ দীপক আর রাজেশ তা হলে মাঝরাত্তিরে দিঘিতে নামেনি। কে নেমেছিল তা হলে? রামুই নেমেছিল। এ আর কিছুই নয়, স্রেফ প্রসেস অব এলিমিনেশন।”

“কিন্তু রামু কী করে দিঘিতে নামবে? সে তো সাঁতারই জানে না।”

“সেই হচ্ছে কথা। বঙ্কুর কাছে আমরা শুনেছি যে, রামু সাঁতার কাটতে জানে না। অথচ, যে সেদিন মাঝরাত্তিরে দিঘিতে নেমে সাঁতার কেটেছিল, সে দীপক নয়, সে রাজেশও নয়। সে রামুই। এর থেকে আমরা দুটো সিদ্ধান্ত করতে পারি। এক, রামু সাঁতার কাটতে পারে, কিন্তু তার বাবা অর্থাৎ বঙ্কু সে-কথা জানে না। কিংবা জেনেও বঙ্কু আমাদের উলটো-কথা বলেছে। কিন্তু না মশাই, এ-দুটো সম্ভাবনার কোনওটাই আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি। অগত্যা আমাকে অন্য-একটা সম্ভাবনার কথা ভেবে দেখতে হল। সেটা এই যে, যাকে আমরা সবাই রামু বলে মনে করছি, আসলে সে হয়তো রামু নয়, আর-কেউ। বাস্, ওর আইডেনটিটি নিয়ে এই প্রথম একটা সন্দেহ দেখা দিল আমার মনে। তার উপরে আবার রাত্তিরে ওর ঘরে ঢুকে যা আমরা দেখতে পেয়েছিলুম, সেই কথাটা যখন মনে পড়ল, সন্দেহটা তখন বাড়ল বই কমল না।”

“ওর ঘরে ঢুকে তো বিশেষ কিছু আমরা দেখতে পাইনি।”

সে কী মশাই, ওর টেবিলে যে একখানা বই আর একজোড়া চশমা ছিল, তা কি ভুলে গেলেন নাকি?”

“ও হ্যাঁ, ও দুটো বস্তু ছিল বটে,” অবাক হয়ে আমি বললুম, “কিন্তু তাতে সন্দেহ করার মতো কী পেলেন?”

“বা রে, ওই চশমাজোড়াই তো সন্দেহজনক।

“কেন, কেন?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ যার চোখ খারাপ হয়েছে, ও চশমায় তার কাজ চলবার কথা নয়। ওর লেন্স দুটোয় কোনও পাওয়ারই নেই। স্রেফ কাচ।”

“অর্থাৎ কিনা…”

“অর্থাৎ কিনা ও যাকে ইমপার্সোনেট করতে চায়, সে হাই-পাওয়ার চশমা পরে। ওরও তাই চশমা পরা দরকার। কিন্তু সেটা পাওয়ারলেস চশমা হওয়া চাই, নইলে ও অসুবিধেয় পড়বে।”

ব্যাপারটা ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল। আর যতই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল, ততই তাক লেগে যাচ্ছিল আমার। বললুম, “ওরেব্বাবা, এ তো তাজ্জব কাণ্ড!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা ভুলে যাবেন না, রামু আর লক্ষ্মণ যমজ-ভাই। দেখতেও একেবারে একইরকম। তফাত যে নেই, তা অবশ্য নয়। রামু ছোট করে চুল ছাঁটে, লক্ষ্মণের চুল লম্বা; রামু চশমা পরে, লক্ষ্মণের চশমার দরকার হয় না। তা ও দুটো পার্থক্য তো অনায়াসেই মুছে ফেলা যায়। লক্ষ্মণ যদি ছোট করে চুল ছাঁটে আর পাওয়ারলেস একজোড়া চশমা পরে নেয়, তা হলেই হল, কে রামু কে লক্ষ্মণ, অন্তত চেহারা দেখে সেটা বুঝবার কোনও উপায়ই তখন আর থাকে না।”

বললুম, “কিন্তু শুধু চেহারা দেখেই কি আমরা মানুষ শনাক্ত করি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এতক্ষণে আপনি একটা প্রশ্নের মতো প্রশ্ন করলেন বটে। বুঝতে পারছি, আপনার বুদ্ধি এখনও পুরোপুরি তালগোল পাকিয়ে যায়নি। …না, শুধু চেহারা দেখে আমরা মানুষ শনাক্ত করি না। তা যদি করতুম, অন্ধকারে তা হলে কাউকে শনাক্ত করা একেবারে অসম্ভব হত। কিন্তু অন্ধকারেও আমরা মানুষ চিনি। স্রেফ গলা শুনে বলে দিই যে, এ হচ্ছে অমুক লোক আর সে হচ্ছে তমুক লোক। …এখন আপনি হয়তো জানতে চাইবেন যে, চেহারার ব্যাপারটা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু লক্ষ্মণ “তার গলার স্বরটা পর্যন্ত পালটে নিল কীভাবে? উত্তরে আমি বলব, সেটা পালটানো সম্ভব নয় বলেই পারতপক্ষে তার বাবা আর নতুন-মায়ের সামনে সে কথাই বলত না। এক-আধটা যে বলত না, তা নয়, কিন্তু খুবই নিচু গলায় বলত; তাও অধিকাংশ ব্যাপারেই কাজ চালাত স্রেফ ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ দিয়ে। বঙ্কুর ধারণা, বিলেত যেতে দেয়নি বলে ছেলের বড্ড অভিমান, তাই বুঝি সে কথা বলতে চায় না। ধারণাটা অস্বাভাবিকও নয়, কেননা ও যে রামু নয়, লক্ষ্মণ, সেটাই তো তার জানা নেই।”

একটা কথা ভেবে আমার অবাক লাগছিল। ভাদুড়িমশাইকে সেটা না-জানিয়ে পারলুম না। বললুম, “বঙ্কুবাবুর ব্যাপারটা বুঝতে পারছি। চোখে ছানি পড়েছে, তাই ও যে রামু নয়, সেটা আর তিনি কী করে ধরবেন? কিন্তু মিসেস ঘোষ? তিনি তো পাঁচ বছর বয়েস থেকে ছেলে দুটোকে মানুষ করেছেন, তিনি কেন এই ইমপার্সোনেশনের ব্যাপারটা ধরতে পারলেন না?”

“প্রশ্নটা আমার মনেও দেখা দিয়েছিল।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ কিন্তু পরে ভেবে দেখলুম, এরও একটা সহজ ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথম কয়েকটা বছর তিনি ওঁদের দেখাশোনা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওরা যখন বড় হয়ে উঠল, তখন সম্ভবত শি লস্ট ইন্টারেস্ট ইন দেম। তখন তিনি ফিল্ম নিয়ে ফের মত্ত হয়ে উঠলেন। তখন তাঁর মাথায় ঢুকেছে হিরোইন হবার নেশা। অন্য কোনও দিকেই মন দেবার মতো সময় আর নেই। সত্যি বলতে কী, আগ্রহও নেই।”

“বিজু কি পীতাম্বর? কিংবা অন্য যারা ও-বাড়িতে কাজ করে? বঙ্কুবাবুর অফিসের লোকজনদের কথা ছেড়ে দিচ্ছি, তারা না হয় মূল-বাড়িতে আসতই না। কিন্তু মালি, দারোয়ান, রাঁধুনি? তারা তো ছিল। নাকি তারাও কেউ কিছু ধরতে পারেনি?”

“হয়তো পারেনি। কিংবা এমনও হতে পারে যে, সবাই না-পারুক, এক-আধজন ঠিকই পেরেছিল। কিন্তু ধরতে পারলেই যে মুখ ফুটে সেটা জানাতে হবে, তা আপনাকে কে বলল? বড়লোকদের বাড়িতে যারা কাজ করে, তাদের সম্পর্কে এই একটা কথা জেনে রাখুন কিরণবাবু, মালিকদের ব্যাপারে পারতপক্ষে তারা মাথা গলায় না। কেন গলায় না জানেন? মাথাটা তার ফলে কাটা যাবার একটা আশঙ্কা থাকে।”

“কিন্তু দীপক? সে তো নেহাত কাজের লোক নয়। মিসেস ঘোষের ভাই, বঙ্কুবাবুর শালা। খুব তো ‘ভাঞ্জা ভাঞ্জা’ করত, তা এটা যে তার বড় ভাঞ্জা নয়, ছোট-ভাঞ্জা, সেও কি বুঝতে পারেনি?”

“গোড়া থেকেই পেরেছিল কি না, বলতে পারব না। হয়তো পেরেছিল, হয়তো পারেনি। হয়তো বা শেষের দিকেও সে জানতে পারত না, যদি না লক্ষ্মণই তাকে সব খুলে বলত। আবার এমনও হতে পারে যে, প্রথম থেকেই লক্ষ্মণ হ্যাড টেকন দীপক ইনটু হিজ কনফিডেন্স। তবে প্রথম থেকেই জানুক আর শেষের দিকেই জানুক, দীপক এটা জানত ঠিকই। তা নইলে আর উদয়পুরে সে অমন আগ বাড়িয়ে বলবে কেন যে, মাঝরাত্তিরে সে আর রাজেশ দিঘিতে সাঁতার কাটতে নেমেছিল, ভাঞ্জা নামেনি? আসলে লক্ষ্মণই যে সাঁতার কাটতে নেমেছিল, এই ব্যাপারটাকে ঢাকা দিতে চাইছিল সে। তো এই হচ্ছে মজা। বঙ্কু আমাকে ত্রিপুরায় নিয়ে গেল তার ছেলেকে প্রোটেকশান দিতে, আর উদয়পুরের ব্যাপার দেখে আমি বুঝি গেলুম যে, দীপকই সেই ছেলেকে আর-এক রকমের প্রোটেকশান দিচ্ছে। অর্থাৎ ডালমে কুছ কালা হ্যায়।”

বললুম, “উদয়পুরে দীপকদের ঘরে যে পিস্তলটা দেখেছিলেন, সেটা কার?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বঙ্কুর। নিজে তো চালাতে পারে না, তাই দীপককে রাখতে দিয়েছিল। বলে দিয়েছিল, রামুর উপরে ফের হামলা হলে ওটা কাজে লাগতে পারে। এটা অবশ্য আমার সঙ্গে বঙ্কুর সেই যে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল, তার আগের ব্যাপার।”

“ইমপার্সোনেশন নিয়ে কথা হচ্ছিল। সেইটে বলুন।”

“ইমপার্সোনেশন ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল, যখন বাবার ইচ্ছে সত্ত্বেও বিলেত যেতে রাজি না-হওয়া আর পার্টনারশিপের দলিলে ছেলের সই করতে অসম্মতির একট ব্যাখ্যা খুঁজে পেলুম। চট করে যে খুঁজে পেয়েছিলুম, তা অবশ্য বলব না। বিস্তর ভাবতে হয়েছিল। এত করে বঙ্কু বলছে, তবু কেন ও বিলেত যেতে চায় না? এত করে ও বলছে, তবু কেন পার্টনারশিপের দলিলে ও সই করে না? যত ভাবি, উত্তর মেলে না। শেষে হঠাৎই একসময় মনে হল যে, আসলে সই করতেই ওর আপত্তি। কেন আপত্তি? না এইজন্য আপত্তি যে, আসলে ও রামু নয়। অথচ পার্টনাশিপের দলিলে তো রামুর পরিচয়েই ওকে সই করতে হবে। সেই একই পরিচয়ে সই করতে হবে বিলেত যেতে হলেও। যেমন পাসপোর্টে, তেমন ট্রাভলারস চেকে। কিন্তু সে তো ঘোর জালিয়াতির ব্যাপার। বাস্‌, তখনই আমার সন্দেহ একেবারে চোদ্দো-আনা পাকা হয়ে গেল যে, ও রামু নয়, ও লক্ষ্মণ; যে-কোনও কারণেই হোক রামু সেজে সবাইকে ও ধোঁকা দিতে চাইছে, কিন্তু তাই বলে ও জাল-জোচ্চুরি করতে চায় না, বড়-ভাইকে বঞ্চিত করে সম্পত্তির মালিক হবার ইচ্ছেও ওর নেই।

“সন্দেহটাকে চোদ্দো-আনা পাকা বলছেন কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ তখনও দু-আনা বাকি ছিল যে! নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনটা তো দেখেছেন, আইডেনটিফিকেশন মার্কটার কথা আশা করি ভুলে যাননি। দরকার হলে লম্বা-চুল ছেঁটে ছোট করা যায়। কিন্তু মশাই, দরকার হলেই তো একটা জড়ুলকে ঘষে তুলে ফেলা যায় না। তো লক্ষ্মণের ডান কাঁধে একটা জড়ুল রয়েছে। তা, লক্ষ্মণের নিশ্চয় মনে হয়েছিল যে, সে যে রামু নয়, এই রকম একটা চিন্তা আমার মাথায় ঢুকেছে। অমনি সে কী করল? না ফিরতি পথে যেই আমরা সিপাহিজলা থেকে কসবার কালীবাড়ির পথে রওনা হয়েছি, অমনি সে সিঁড়ি থেকে পড়ে যাবার ভান করে বলল যে, তার বাঁ হাতটা মচকে গেছে; আর দীপক তক্ষুনি তার ডান কাঁধ ঢেকে চওড়া ব্যান্ডেজের কাপড় দিয়ে ঝুলিয়ে দিল একটা স্লিং, ওই জঙুলটা যাতে কোনওমতেই আর না আমার নজরে পড়ে। কিন্তু আমার যা বুঝবার, তা আমি ঠিকই বুঝে নিলুম। বাস্, আমি পনরো-আনা নিশ্চিন্ত।”

“এখনও…..মানে এর পরেও এক-আনা বাকি ছিল?”

“থাকবে না?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কিরণবাবু, ভুলে যাবেন না যে, ওরা যমজ-ভাই। তখনই যদি ওকে আমি বলতুম যে, তুমি রামু নও, তুমি লক্ষ্মণ, কেননা তোমার ডান কাঁধে একটা জড়ুল রয়েছে, স্লিং দিয়ে তুমি সেটা ঢেকে রেখেছ, আর তার উত্তরে ও যদি আমাকে বলত, আসলে দুই ভাইয়েরই ডান কাঁধে আছে জড়ুল, তা হলে আমার মুখটা কোথায় থাকত? আর তা ছাড়া, অন্য দিক থেকেও ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখুন। হাত মচকাবার ব্যাপারটা যদি মিথ্যে না হত, আর স্লিংটা খুলে ও যদি আমাকে দেখিয়ে দিত যে, না, ওর ডান-কাঁধে কোনও জঙুল নেই, তা হলে? তা হলে কি আমি ঘোর লজ্জায় পড়ে যেতুম না? না মশাই, আমি একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিন্ত হতে চাইছিলুম। আমার দরকার ছিল একেবারে ফুল-প্রুফ এভিডেন্সের। আর সেইজন্যেই দরকার হল ভুবনেশ্বরে চলে আসবার।”

“কাল আপনি সেই এভিডেন্সের খোঁজেই বেরিয়েছিলেন। কেমন?”

“সে তো কাল রাত্তিরেই বললুম। ও তো কটক র‍্যাভেনশ কলেজের ছাত্র। তাই কটকে গিয়ে র‍্যাভেনশ কলেজের এক অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করি। ভদ্রলোক আমার চেনা। লক্ষ্মণকেও চেনেন। তো তাঁরই কাছে পাওয়া গেল লক্ষ্মণের কয়েকজন বঙ্কুর ঠিকানা। তাদের সঙ্গে দেখা করলুম। ভাগ্যিস তাদের কাছে লিউইস রোডের দোকানটার সন্ধান পাওয়া গেল, নইলে গোটা ভুবনেশ্বর শহর জুড়ে আমাকে হাতড়ে বেড়াতে হত।”

“কীসের দোকান? ড্রাগ-ট্রাগের নয় তো?”

প্রশ্ন শুনে ভাদুড়িমশাই হো হো করে হাসতে লাগলেন। বললুম, “ অত হাসছেন কেন?”

“আরে মশাই, উত্তরটা শুনলে আপনিও না হেসে পারবেন না। ড্রাগ কি আর দোকান খুলে কেউ বিক্রি করে? ও-সব নেশার বস্তু চোরাই পথে হাতে-হাতে বিক্রি হয়। ও নো, সে-সব নয় কিরণবাবু, আমি খুঁজছিলুম একটা চুলদাড়ি কাটবার দোকান। ওই যাকে আপনারা সেলুন বলেন আর কি। বাস্, দোকানের খোঁজ পাবার পরে আর ওই এক-আনাও বাকি রইল না। দোকানের মালিকটি অবশ্য অতি ধুরন্ধর বক্তি। প্রথমে তো মুখই খুলতে চায় না। তারপর যেই না তার হাতে একখানা একশো টাকার নোট ধরিয়ে দিয়েছি, অমনি একেবারে তাজ্জব ব্যাপার। লক্-গেট খুলে দিলে বাঁধের জল কীভাবে বেরিয়ে আসে দেখেছেন তো? একেবারে সেইভাবে তার পেট থেকে হুড়হুড় করে সব কথা বেরিয়ে আসতে লাগল। আমার অবশ্য অত কথা জানবার কোনও দরকার ছিল না। দরকার ছিল মাত্র তিনটি প্রশ্নের উত্তর পাবার। এক, লক্ষ্মণবাবু তার দোকানেই চুল ছাঁটতে আসতেন কি না; দুই, আগে তিনি লম্বা-চুল রাখতেন কি না; তিন, মাস কয়েক আগে হঠাৎ একদিন তিনি লম্বা-চুল ছাঁটিয়ে একেবারে কদমছাঁট করে নেন কি না, আর সেই থেকেই তিনি ছোট করে চুল ছাঁটছেন কি না।”

“সব প্রশ্নেরই উত্তরে শুনলেন যে, হ্যাঁ, তা-ই বটে?”

“শুনলুম, এবং ষোলো-আনা নিশ্চিন্ত হয়ে কাল রাত এগারোটায় আপনাকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মণের ঘরে গিয়ে হাজির হলুম। আসলে কিন্তু ওটা রামুর ঘর। লক্ষ্মণের যেটা ঘর, তাতে আমরা ছিলুম। কিন্তু লক্ষ্মণকে এখন রামু সাজতে হচ্ছে তো, তাই বাধ্য হয়ে রামুর ঘরে থাকতে হচ্ছে।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যে কামরার বাইরে গিয়েছিলেন সিগারেট খাবার জন্যে। ফিরে এসে তিনি আবার সেই ‘সান টাইম’ খানা খুলে বসেছেন।

আমার অস্বস্তি কিন্তু কাটছিল না। বললুম, “ একটা প্রশ্ন করতে পারি?”

কাগজ থেকে চোখ তুলে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ স্বচ্ছন্দে।”

“লক্ষ্মণ যে রামুকে ইমপার্সোনেট করছে, সেটা নাহয় বুঝলুম, কিন্তু তার একটা কারণ থাকা চাই তো। সেই কারণটাই তো বুঝতে পারছি না। সেটা কী?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুব সঙ্গত প্রশ্ন। কারণটা আমি কালই আন্দাজ করতে পেরেছিলুম। আজ সকালে লক্ষ্মণ তো সবই খুলে বলেছে, তাতে দেখলুম, ভুল আন্দাজ করিনি। বি.কম. পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পাবার পরে রামু বিলেত যেতে চায়। কিন্তু বঙ্কু তাতে রাজি হয় না। এ পর্যন্ত আপনিও জানেন। যা জানেন না, এবারে সেটা শুনুন। বাবা রাজি না-হওয়ায় রামু এতই মুষড়ে পড়ে যে, লক্ষ্মণ তাকে বলে, তুই গোপনে বিলেত চলে যা, এদিকটা আমি ঠিক সামলে নেব। প্ল্যানটা তখনই ঠিক হয়ে যায়। কী প্ল্যান? না বাবা জানবেন যে, লক্ষ্মণই নিরুদ্দেশ হয়েছে। তবে হ্যাঁ, লক্ষ্মণ এটাও রামুকে জানিয়ে দেয় যে, বাবাকে খুব বেশিদিন এভাবে ধোঁকা দেওয়া যাবে না, দেওয়া উচিতও হবে না, তাই একটা শর্ট টার্ম করে তাড়াতাড়ি তাকে দেশে ফিরতে হবে। রামু রাজি হয়। তার পাসপোর্ট তো করাই ছিল, নিজের নামে টাকাও ছিল বেশ কিছু। হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে সে বিদেশে পাড়ি দেয়। কবে যাবে, একমাত্র লক্ষ্মণই তা জানত।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “এ হল গত মে মাসের কথা। লক্ষ্মণ তার কিছুদিন আগে বোম্বাই গিয়েছিল আচরেকবের কাছে কোচিং নিতে। কিন্তু রামু কবে ভুবনেশ্বর ছাড়বে, তা সে জানত তো, তাই ঠিক সেইদিনই সকালবেলায় সে একটা স্যুটকেস হাতে নিয়ে ভুবনেশ্বরের বাড়িতে এসে হাজির হয়। তারপর চটপট খাওয়া-দাওয়া সেরে রামুর ঘরে ঢুকে নিজের সুটকেসটা সেখানে রেখে রামুর সুটকেস হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এই যে সে বাড়িতে এল, আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, এই সময়টার মধ্যে রামুর সঙ্গে তার দেখা হয়নি। কেননা, রামু তখন বাড়িতে ছিল না, সে গিয়েছিল ভুবনেশ্বরে। আসলে সে ভুবনেশ্বর স্টেশনের ওয়েটিং রুমে লক্ষ্মণের জন্যে অপেক্ষা করছিল। লক্ষ্মণ সেখানে রামুর সঙ্গে দেখা করে তার হাতে সুটকেসটা তুলে দেয়। ওই সুটকেসের মধ্যে ছিল রামুরই গোটা দুই স্যুট, কিছু শার্ট, কিছু আন্ডারগারমেন্টস আর টুকিটাকি অন্য-কিছু জিনিস। রামু ধৌলি এক্সপ্রেসে উঠে কলকাতায় চলে আসে, আর পরের দিন কলকাতা থেকে ফ্লাইট নিয়ে বোম্বাই চলে যায়। সেখান থেকে সে লন্ডনের প্লেন ধরে।

“আর লক্ষ্মণ?”

“রামু গেল লন্ডনে, আর লক্ষ্মণ একটা সেলুনে ঢুকে তার লম্বা চুল ছাঁটিয়ে ছোট্ট করে ফেলল। পকেট থেকে চশমাটা বার করে পরে নিল। তারপর বাড়িতে ফিরে এল। সবাই ভাবল, রামুই ভুবনেশ্বর থেকে ফিরে এসেছে। সে যে রামু নয়, লক্ষ্মণ, কেউ তা টের পেল না।”

বললুম, “দুই ভাইয়ে এত ভাব?”

“শুধু ভাব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “রামুর জন্য লক্ষ্মণ কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, দেখুন। যা ওর নেশা, সেই খেলাধুলোর ধারেকাছেও ওর যাবার উপায় নেই। না ফুটবল, না ক্রিকেট, কিচ্ছু না। এমনকী, রামু যেহেতু সাঁতার কাটতে জানে না, তাই একজন চ্যাম্পিয়ন-সাঁতারু হওয়া সত্ত্বেও লক্ষ্মণকে কী করতে হয়? না সাঁতার কাটবার কথা শুনলেই আঁতকে ওঠার ভান করতে হয়। শুধু ওই একদিনই ও লোভ সামলাতে পারেনি, মাঝরাত্তিরে উদয়পুরের দিঘিতে গিয়ে নেমে পড়েছিল। আহা, বেচারা জানত না যে, আমি সেটা দেখে ফেলব। তার উপর আবার দেখুন, ব্যাবসা-বাণিজ্যে ওর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, তবু যেহেতু রামু সেজেছে তাই রামুর মতো ওকেও সারাক্ষণ পাতা ওলটাতে হচ্ছে ব্যাবসা-বাণিজ্যের বইয়ের।”

সেইসঙ্গে আর-একটা কথাও ভাবুন, গত মে মাসের পরে ও আর ক্রিকেটের কোচিংটা পর্যন্ত নিতে পারেনি। অথচ বোম্বাই থেকে আপনাকে যিনি ফোন করেছিলেন, তাঁর কথা শুনে তো মনে হল, অলরাউন্ডার হিসেবে ইন্ডিয়া ইলেভেনে ওর জায়গা ছিল একেবারে পাকা।”

ভাদুড়িমশাই বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন, “ভাইয়ের জন্য ও যা স্যাক্রিফাইস করল, সত্যি তার তুলনা হয় না। যমজ-ভাইদের যে জন্ম থেকেই পরস্পরের প্রতি একটা প্রবল টান থেকে যায়, সেটা অবশ্য শুনেছি, কিন্তু তাই বলে এতটা প্রবল সেই টান? ওরেব্বাবা, এ তো কল্পনাও করিনি।”

বললুম, “লক্ষ্মণ-ভাই বলে একটা কথা আছে। এ একেবারে সেই ব্যাপার। ও নামেও লক্ষ্মণ, কাজেও লক্ষ্মণ।”

লক্ষ্মণের কথা যতই ভাবছিলুম, মনটা ততই ভারী হয়ে উঠছিল। সম্ভবত সেটা বুঝতে পেরেছিলেন ভাদুড়িমশাই। বিষণ্ণ ভাবটাকে কাটিয়ে দেবার জন্যে তাই বললেন, “যা-ই হোক, সিপাহিজলায় আপনাকে তো চশমা পরা বাঁদর দেখাতে পারিনি। কিন্তু তার জন্যে আর এখন আক্ষেপ করছি না। চশমা-পরা একটা মানুষ তো অন্তত দেখতে পেলেন। চশমাটা নকল ঠিকই, কিন্তু মানুষটা একেবারে সাচ্চা।”

বালেশ্বর এসে গিয়েছিল। ভাদুড়িমশাই তাঁর আসন ছেড়ে উঠে পড়লেন। বললেন, “ যাই, দু-কাপ চায়ের ব্যবস্থা করে আসি।”

রচনাকাল : ১৩৯৮

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments