ভূমিকা
মানুষ রহস্যময়তা পছন্দ করে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সে সেটা বুঝতে পারে না। জীবনভর সে তার প্রিয়তম মানুষটিকেও পুরোপুরি বুঝে ফেলতে চায়, কিন্তু পুরোপুরি বোঝা হয়ে গেলে তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সে আসলে অবচেতনে সবসময়ই অনুদঘাটিত কিছু রহস্য উদঘাটন করতে চায়। যতক্ষণ অবধি সেই রহস্য থাকে, ততক্ষণ অবধি একটা প্রবল আগ্রহ, আকর্ষণ কাজ করে। রহস্য শেষ হয়ে গেলে আকর্ষণ ফুরিয়ে যায়। অথচ জীবনজুড়েই সে ভাবে, সে রহস্য পছন্দ করে না।
মানুষের ভেতরে এই দ্বান্দ্বিক সত্ত্বাটা আছে। মানুষ ভাবে, সে ভয় পেতেও পছন্দ করে না, নৃশংসতা পছন্দ করে না। কথা সত্য না। সে অতি আগ্রহ নিয়ে গা হিম হয়ে আসা হরর সিনেমা দেখে, ভূতের বই পড়ে, সিরিয়াল কিলারের ভায়োলেন্ট মুভি দেখে, সাহিত্য পড়ে।
এ কারণেই শিল্প-সাহিত্যে বৈচিত্র্যময় নানান ঘরানার সৃষ্টি হয়েছে। রহস্যোপন্যাস সাহিত্যের সেরকমই একটি সমৃদ্ধ শাখা। এই শাখাঁটির প্রতি আমার আগ্রহ একদম শৈশবেই। তবে তা শুধুই পড়ার জন্য, লেখার জন্য নয়। কারণ, এই ঘরানাটিকে আমার খুবই কঠিন এবং একই সাথে গাণিতিক ‘ক্যালকুলেটিভ’ মনে হয়। ফলে এতোদিনে কখনোই রহস্যোপন্যাস লেখার কথা আমি ভাবিনি।
তাহলে এই উপন্যাসটি কেন লিখেছি?
এই উপন্যাস লেখার কারণটা মজার। বহুবছর আগে এক দৈনিক পত্রিকায় হঠাৎ করেই একটি খুনের ঘটনা পড়েছিলাম। ঘটনাটি খুবই সাধারণ। পুলিশ লাশসহ খুনিকে গ্রেপ্তারও করেছে। কিন্তু তারপরও একটা রহস্য রয়ে গেছে। সেই রহস্যের কোনো কুল কিনারা করতে পারছে না পুলিশ। বিষয়টা আমার মাথায় গেঁথে গেলো। কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারছি না। অবচেতনেই ঘুরেফিরে বারবার মাথায় চলে আসতে লাগলো সেই ঘটনা। এই করতে করতেই আচমকা একদিন একটা গল্পও চলে এলো মাথায়। সেই গল্প লিখেও ফেললাম। লিখতে গিয়ে হঠাৎই আবিষ্কার করলাম, গল্পের প্রধান চরিত্রটিকে আমি বিশেষ পছন্দ করে ফেলেছি। এই চরিত্রটি নিয়ে আমি ধারাবাহিকভাবে আরো লিখতে চাই। প্রতিটি বইতে সে একেকটি রহস্যের সমাধান করবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, রহস্য গল্প লেখা কঠিন। এই কঠিন কাজটি আমি নিয়মিত করতে পারবো কিনা, সেটি নিয়ে খানিক সংশয়ও আছে। সেই সংশয় নিয়েই আমার প্রথম রহস্যোপন্যাস ‘ছদ্মবেশ’।
‘ছদ্মবেশ’ শেষ অবধি রহস্যোপন্যাস হয়ে উঠতে পেরেছে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত পাঠকের।
সাদাত হোসাইন
শ্যামলী, ঢাকা
০৬.০৭.২০১৯
০১-৫. বাড়ির নাম অপেক্ষা
বাড়ির নাম ‘অপেক্ষা’। অপেক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অধ্যাপক লতিফুর রহমান। তিনি এই বাড়ির মালিক। তার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চশমা ছাড়া তিনি খুব একটা ভালো দেখতে পান না, তারপরও চশমার ফাঁক দিয়েই তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শেষ মুহূর্তে বাড়ির নামটা আরেকবার দেখে নিলেন। তারপর সন্তুষ্ট গলায় বললেন, এবার ঠিক আছে।
যে ছেলেটা গেটের বা দিকের দেয়ালে খোদাই করে বাড়ির নাম লিখছিল, সে বিরক্ত গলায় বলল, বানাম লইয়া আপনে হুদাই পেরেশানি করলেন পোরবেচার সাব। এইটাতো আর আপনের কলেজের বাংলা কেলাস না যে মাইনষে আইসা এইখানে বানাম শিখব। অপেকথা লেখলে কী এমন সমস্যা আছিল সেইটাই বোঝলাম না।
লতিফুর রহমান মৃদু হাসলেন, তবে জবাব দিলেন না। তার সারা জীবনের সঞ্চয় এই বাড়ি। তিনি ছিলেন কলেজের বাংলার অধ্যাপক, প্রাইভেট টিউশন ছিল না, বাড়তি রোজগার ছিল না, তারপরও বাড়ির এই স্বপ্নটা তিনি সযত্নে বুকে পুষে রেখেছিলেন। স্বপ্নটা শেষ অবধি হয়তো অবিকল স্বপ্নের মতো করে ধরা দেয়নি, তারপরও চোখের সামনে যে তিনতলা অবয়বটি দাঁড়িয়ে আছে, তা এখনো অবিশ্বাস্যই লাগে লতিফুর রহমানের। জীবনভর অবর্ণনীয় কৃচ্ছতা আর শেষ বয়সের পেনশনের টাকাটাও যখন যথেষ্ট হলো না, তখন বিক্রি করে দিলেন গ্রামের ফসলি জমিটুকুও। তাতেও যে সব ঠিকঠাক হয়েছে এমন নয়, বরং বাড়িটা এখনো অনেকটাই অসমাপ্ত। তিনতলার একপাশের ছাদ এখনো বাকি। নিচতলার কিছু ঘরের প্লাস্টারও হয়নি। গেটটা যেমন করার ইচ্ছে ছিল, তাও পারেননি। নামফলকটাও না।
প্রায় দুই বছর ধরে আস্তে আস্তে এই বাড়ির কাজ চলেছে। লতিফুর রহমান নিজে এই বাড়ির কত কাজ যে করেছেন। মিস্ত্রিদের সঙ্গে থেকে থেকে তাদের বহু
কাজে সহায়তাও করেছেন। সামান্য খরচও যদি তাতে বাঁচে। একটা সুবিধাও অবশ্য এতে হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক কাজ তিনি শিখেও গিয়েছেন। সেদিন নিচের বাথরুমের সামনের জায়গাটা তিনি নিজে সিমেন্ট কিনে এনে ঢালাই করেছেন। হয়তো মিস্ত্রিদের মতো অমন মসৃণ হয়নি, কিন্তু তারপরও দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটা তিনি নিজে করেছেন।
বাড়ি নিয়ে অনেক আক্ষেপ থাকলেও মনের মতো করে যদি কিছু করে থাকেন, তাহলে দোতলাটা। দোতলার পুরোটাই লতিফুর রহমান আর তার স্ত্রী নাসিমা বেগমের। দোতলাজুড়ে খেলার মাঠের মতো বড় বড় ঘর। দখিন দিকের দেয়ালজুড়ে বিশাল জানালা। সেই জানালাটা খুলে দিলে মনে হয় ঘরের ভেতর আস্ত আকাশ ঢুকে গেছে। লতিফুর রহমান সেই আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেন, আহা, জীবন!
.
তবে তার এই ‘আহা জীবনে’র আনন্দময় নিঃশ্বাসেও বুকের ভেতর একটা ব্যথা চিনচিন করে বেঁধে। সেই ব্যথার নাম সৈকত। ঠিক ষোল বছর তিনি ছেলেটাকে দেখেন না। জীবন কখনো কখনো প্রিয়তম মানুষদের মধ্যেও অদ্ভুত অভিমানের দেয়াল তুলে দেয়। ভালোবেসে কাছে এসে সেই দেয়াল ভাঙা হয় না বলে তা ক্রমশই মহাপ্রাচীর হয়ে উঠতে থাকে। একসময় হয়ে ওঠে অলঙ্নীয়ও।
.
লতিফুর রহমান বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ঘিরে হাঁটতে হাঁটতে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আজকাল তার ডান পা-টা আবার সমস্যা করছে। বহু বছর আগে এক দুর্ঘটনায় ডান পায়ে ভয়াবহ চোট পেয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থও হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সেই পুরনো চোট যেন ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসছে। আজকাল কখনো কখনো তাই ক্র্যাচ নিয়েও হাঁটতে হয়।
.
লতিফুর রহমান হেঁটে বাড়ির পেছন দিকটায় চলে এলেন। বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে বাইরে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। তারপরই নদী। নদীর দুধারে প্রচুর ইটভাটা আর বালির ট্রলার। দ্রুত গড়ে উঠতে থাকা যেকোনো নতুন শহরের জন্যই সবচেয়ে লাভজনক দুই ব্যবসা। তবে সমস্যা হচ্ছে, এসব ব্যবসার বেশির ভাগেরই মালিক গোলাম মাওলা। গোলাম মাওলা এলাকার নব্য ধনী। ধীরে ধীরে রাজনীতিতেও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সম্ভবত এ কারণেই উপজেলা চেয়ারম্যান চুন্নু মিয়ার সঙ্গে তার সাপে-নেউলে সম্পর্ক। বর্ষকাল বলে নদীর দু’কূল ছাপিয়ে জল উঠে গেছে ইটভাটার ভেতরেও। ফলে ইটভাটাগুলো আপাতত বন্ধই রাখতে হয়েছে। শীতকাল এলে আবার জমে উঠবে নদীর দুই ধার।
লতিফুর রহমান ঘুরে বাড়ির সামনের দিকে চলে এলেন। তারপর বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সৈকত নিশ্চয়ই কোনো একদিন তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখানে আসবে। এই বিশাল বাড়িটা সেদিন ঝলমল করে উঠবে আলোয়, মুখরিত হয়ে উঠবে শব্দে, গানে। তিনি ভেবে পান না, বুকের ভেতর চোরা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বিদেশ বিভুঁইয়ে একজন মানুষ এত দীর্ঘ সময় ধরে থাকে কী করে!
.
নাসিমা বেগমের প্রেসারটা আবার বেড়েছে। তিনি বিছানায় শুয়ে জড়ানো গলায় বললেন, তুমি ডালিয়াকে বলো আমি রাতে তেতুলের রস ছাড়া আর কিছু খাব না।
লতিফুর রহমান বুক শেলফে বই সাজিয়ে রাখছিলেন। ঘরের মাঝখানের দেয়ালের পুরোটা জুড়েই বিশাল বুক শেলফ বানিয়েছেন তিনি। নাসিমা বেগমের কথা শুনে বললেন, কিন্তু কিছু না খেলে প্রেসারের ওষুধটা কী করে খাবে?
ওসব প্রেসারের ওষুধে কিছু হবে না, তার চেয়ে এটাতে ভালো কাজ হয়।
তুমি সবসময়ই কেন ডাক্তারের চেয়ে অন্যদের কথায় বেশি গুরুত্ব দাও?
কেন দিই, তা তুমি ভালো করেই জানো।
কিন্তু ভুলতো সবারই হয়, তাই না? আমরা এই যে এত কাজ করি, আমাদের ভুল হয় না? হয়। এত বছর বাংলার শিক্ষক ছিলাম, এখনো কত জানা বানানও লিখতে ভুল করে ফেলি। আর সেই কবে একবার এক ডাক্তার ভুল করেছে বলে, তুমি সেটা ধরে এখনো বসে থাকবে? তা ছাড়া, সে ভুল করেছে দেখে যে সব ডাক্তারই ভুল করবে তাতো না।
.
নাসিমা বেগম এই কথার পিঠে কোনো কথা বললেন না। তিনি নিজেই গলা উঁচু করে ডালিয়াকে ডাকলেন। ডালিয়ার বয়স সাতাশ আটাশ বছর। দেখতে সুশ্রী। গায়ের রং ফর্সা। তার একবার বিয়েও হয়েছিল, স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি না হলেও যোগাযোগ বন্ধ। কী কারণে যোগাযোগ বন্ধ, সে বিষয়ে অবশ্য লতিফুর রহমান বা নাসিমা বেগমের কোনো আগ্রহ নেই। তারা এই দুর্দিনে একজন কাজের মানুষ পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত। দুই নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ আর বৃদ্ধার নিরস সংসারে কোনো কাজের মেয়েই এসে বেশিদিন টেকে নি। ডালিয়া সেখানে আশ্চর্য ব্যতিক্রম। সে এসেছে প্রায় বছর খানেক হয়ে গেল। চুপচাপ শান্ত ধরনের মেয়ে ডালিয়ার যেন সাত চড়েও রা নেই। সম্ভবত এ কারণেই সে এ বাড়িতে টিকে গেছে। না হলে নাসিমা বেগমের মতো তিরিক্ষি মেজাজের কারো সঙ্গে একই বাড়িতে থাকা সহজ ব্যাপার নয়।
.
আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে। খোলা জানালায় সেই চাঁদ দেখে লতিফুর রহমানের মন খারাপ হয়ে গেল। এত বড় বাড়ি বানালেন, কিন্তু সেই বাড়ির ছাদে বসে চাঁদ দেখার উপায় নেই। ছাদটা মনের মতো করে বানাতে পারলেন না। অর্ধেকটা বানিয়েই ফেলে রাখতে হয়েছে। বাকি অর্ধেকের টাকা কী করে জোটাবেন, সেই চিন্তায়ই দিশেহারা অবস্থা। আপাতত উপায় বলতে নিচতলা আর তিনতলার অসমাপ্ত-অর্ধসমাপ্ত ঘরগুলোই ভাড়া দিয়ে দেয়া। সেই ভাড়ার টাকা থেকে যদি বাড়িটা সম্পূর্ণ করা যায়। এ কারণেই কাজ শেষ হওয়ার আগেই গেটের বাইরে ‘টু লেট’ও লাগিয়ে রেখেছেন তিনি।
এরমধ্যেই ভাড়া নেয়ার জন্য কিছু লোকও এসেছে। কিন্তু ঘরগুলোর কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে ভালো ভাড়াটেও পাওয়া যাচ্ছে না। আর যাদের পাওয়া যাচ্ছে, তারাও বেশির ভাগই এলেবেলে ধরনের লোক। এদের হাতে ঘরগুলো ছেড়ে দেয়ার ভরসাও পান না লতিফুর রহমান। তিনি আসলে অপেক্ষায় আছেন ভালো কোনো পরিবারের, যারা অ্যাডভান্স বেশ কিছু টাকা দিতে পারবে। সেই টাকাটা তিনি বাড়ি তৈরির কাজে লাগাতে পারবেন।
.
নতুন থানা শহর বলে বড় ভাড়াটে পাওয়া খানিক সমস্যাজনক। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো তেমন গড়ে ওঠেনি। তবে ব্যাংক, বীমা, টেলিকমের মতো নাগরিক সুবিধা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যে শীঘ্রই চলে আসবে, তার একটা পূর্বাভাসও পাওয়া যাচ্ছে। সেই আশায়ই বুক বেঁধে আছেন লতিফুর রহমান। এগুলো চলে এলেই ভালো ভাড়াটে পাওয়ায় আর অসুবিধা হবে না। যদিও শহর থেকে সামান্য কিছু দূরে বাড়িটা। তবে মূল রাস্তার সঙ্গেই হওয়ায় সুবিধাও আছে। তারপর চারপাশটা খোলামেলা। বারান্দা বা ছাদে গেলেই বুক ভরে যায় তাজা বাতাসে।
.
সম্ভবত এসব কারণেই আজকাল আগ্রহী ভাড়াটের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে কারো সঙ্গেই কথা খুব বেশি এগোয় না।
.
আজও প্রায় সাত-আটজন ভাড়াটে এসেছে। রোজকার মতো লতিফুর রহমান নিজেই ঘুরে ঘুরে তাদের ঘরগুলো দেখিয়েছেন। এই কাজটি করতে অবশ্য লতিফুর রহমানের বেশ ভালো লাগে। সারা জীবনের কাঁচুমাচু, সদাসন্ত্রস্ত ভাড়াটে থেকে মুহূর্তেই নিজেকে প্রবল প্রতাপশালী বাড়িওয়ালা মনে হয়। তার হাতের চামড়ার ব্যাগে এক ব্যাগ চ । এই ব্যাগ তিনি মুহূর্তের জন্য হাতছাড়া করেন না। নিজ হাতে দরজার তালা খুলে ঘর দেখান। গম্ভীর মুখে ঘরের গুণগান করেন। শেষ পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া দিলে যেসব নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে, তা অক্ষরে অক্ষরে বলে দিতে থাকেন। কিন্তু বাড়ি ভাড়াটা আর হয় না। অর্ধসমাপ্ত-অসমাপ্ত ঘরগুলো যেমন সচ্ছল পরিবারের পছন্দ হয় না, তেমনি কম আয়ের পরিবারগুলো লতিফুর রহমানের চাহিদানুযায়ী অগ্রিম টাকা দিতেও সক্ষম নয়।
.
এই নিয়ে লতিফুর রহমানের দুশ্চিন্তার কমতি নেই। তারপর নাসিমা বেগমের শরীরটাও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। গতকাল রাতে বাথরুমে পড়ে গিয়ে কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছেন। প্রেসারটাও যখন-তখন ভয়াবহরকম বেড়ে যাচ্ছে। লতিফুর রহমানের মাঝে মাঝে খুব অসহায় লাগে। এই যে এত কষ্ট করে, এই শেষ বয়সে এসে এত বড় বাড়ি করলেন, লাভ কী হলো! সেইতো জীবন ধু ধু বালুচরের মতো শূন্য। কোথাও যেন কোনো শান্তি নেই, স্বস্তি নেই, স্থিরতা নেই। কিংবা তিনি হয়তো এসব কখনো ঠিকভাবে চানই নি! প্রায় রাতেই এমন কত কত এলোমেলো ভাবনায় তার ঘুম হয় না। তিনি সেসব রাতে ঘুমান ফজরের নামাজ পড়ে এসে। মসজিদ থেকে বের হয়ে কষ্ট করে হলেও কিছুক্ষণ হাঁটেন। তারপর বাসায় ফিরে নাশতা করে ঘুমান। তার ঘুম ভাঙে জোহরের আজান শুনে। উঠে গোসল করে আবার নামাজে ছোটেন মসজিদে।
আজকাল অবশ্য এই ঘুমটায়ও সমস্যা হচ্ছে। ভাড়ার জন্য বাড়ি দেখতে আসা লোকজন যখন তখন কলিংবেল চাপে। লতিফুর রহমান ঘুম থেকে উঠে চাবির ব্যাগ হাতে দ্রুত নিচে নেমে যান। তারপর মূল ভবনের কলাপসিবল গেট খুলে ছোট্ট উঠানটা পেরিয়ে হেঁটে গিয়ে মেইন গেটের তালা খুলে দেন। এই কাজ তাকে দিনের মধ্যে অসংখ্যবার করতে হয়। নাসিমা বেগম মাঝে মাঝেই বিরক্ত গলায় বলেন, দারোয়ানের মতো প্রতিবার তোমাকেই গিয়ে কেন গেট খুলে দিতে হবে? ডালিয়াকে দিলেওতো হয়?
লতিফুর রহমান মৃদু হেসে বলেন, নিজের বাড়িতে দারোয়ানি করতেও আনন্দ বুঝলে?
অত বুঝে আমার কাজ নেই। একটা দারোয়ানওতো রাখতে পারো, পারো না?
দরকার হলে রাখতাম। শুধু শুধু পয়সা নষ্ট করারতো কোনো মানে নেই।
তোমার কাছেতো সব কিছুই শুধু শুধু পয়সা নষ্ট। সারাটা জীবন ধরে এই ইতো শুনলাম।
লতিফুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, আর কিছু শোনননি? আর কী শুনব?
এই যে দীর্ঘশ্বাস।
কারো দীর্ঘশ্বাস কেউ শোনে না।
শোনে না?
নাহ, শোনে না। তুমি আমার দীর্ঘশ্বাস কখনো শুনেছো?
এই প্রশ্নে এসে লতিফুর রহমান চুপ করে যান। তিনি জানেন, এখন অবধারিতভাবেই সৈকতের প্রসঙ্গ আসবে। সেই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নাসিমা বেগম হাউমাউ করে কাঁদবেন। তার সেই কান্না আর সারা রাতেও শেষ হবে না।
.
নিস্তরঙ্গ একঘেয়ে বাড়িতে শুক্রবার ভোরটা হঠাৎ জলোচ্ছ্বাস নিয়ে এলো। সাপ্তাহিক ছুটির দিন বলে লতিফুর রহমান আর ঘুমালেন না। আজ সারাদিনই লোকজন আসবে বাড়ি দেখতে। তিনি তাই নামাজ পড়ে এসে বসেছিলেন বারান্দায়। এই মুহূর্তে কলিংবেল বাজল। এত ভোরে কেউ বাড়ি দেখতে আসতে পারে, এটা লতিফুর রহমানের ধারণায় ছিল না। তিনি হন্তদন্ত হয়ে নিচে এসে গেট খুললেন। গেটের বাইরে আলী আকবর দাঁড়ানো। এই সাত সকালে অত দূর থেকে আলী আকবর এসেছে দেখে তিনি রীতিমতো চমকে গেলেন। চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, কীরে আলী, এই সাত সকালে, খবর কী!
আলী আকবর সাইকেল চালিয়ে এসেছে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আম্রিকা থেইক্যা চিডি আইছে ছার।
লতিফুর রহমান প্রথমে বুঝতে পারলেন না। আমেরিকা থেকে চিঠি আসলে আলী আকবর তার কাছে কেন এসেছে? তিনি দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বললেন, কিসের চিঠি? কার চিঠি?
আপনের চিডিই মনে হয়। আগে যেই বাসায় ভাড়া থাকতেন, সেই বাসার বাড়িওয়ালা গতকাইল রাইতে এই চিডিখান আব্বার কাছে দিয়া বলল আপনের কাছে পৌঁছাই দিতে।
আলী আকবর কলেজের দপ্তরির ছেলে। লতিফুর রহমান কলেজ থেকে রিটায়ার করলেও এতদিনকার কলেজ, কলেজের মানুষের সঙ্গে একটা সম্পর্ক রয়েই গেছে। এখান থেকে কলেজের দূরত্ব মাইল দশেক হবে। দীর্ঘ ত্রিশ বছর সেখানেই, কলেজের পাশে ভাড়া বাসাতেই ছিলেন তারা। বছরখানেক হলো সেই ভাড়া বাসা ছেড়ে এখানে এসে উঠেছেন। লতিফুর রহমান হাত বাড়িয়ে চিঠিখানা নিলেন। পুরনো বাড়ির ঠিকানায়ই চিঠি এসেছে। চিঠি কলেজের ঠিকানায়ও আসতে পারত। কিন্তু সৈকত ইচ্ছে করেই সেই ঠিকানায় চিঠি পাঠায়নি। সে বাবার নামে চিঠি পাঠাতে চায়নি। চিঠি পাঠিয়েছে মায়ের নামে। খামের ওপর প্রাপকের নামের জায়গায় ইংরেজিতে স্পষ্ট করে নাসিমা বেগমের নাম লেখা। নামের পাশে ব্র্যাকেটে সে লিখে দিয়েছে মা। এমনকি কেয়ার অব হিসেবেও লতিফুর রহমানের নাম নেই। লতিফুর রহমান দীর্ঘ সময় সেই চিঠির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ঘুরে বাড়িতে ঢুকলেন।
.
নাসিমা বেগম অবশ্য চিঠি খুললেন না। তিনি বন্ধ খাম হাতে নিয়ে বসে রইলেন। দুপুরের দিকে খানিক ঘুমিয়েও গেলেন। এমনিতেই তিনি বারো মাসই অসুস্থ থাকেন। তার মধ্যে গতরাত থেকেই শরীরটা ভীষণ খারাপ করছে। ভোরের দিকে বার দুই বমিও হয়েছে। তিনি বালিশের তলায় খামটা রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলেন। তার বন্ধ চোখের পাতায় বারবার সৈকতের ছবি ভেসে আসছে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, যে সৈকতের ছবি তিনি দেখছেন, সেই সৈকতের বয়স পাঁচ কী ছয়! বড় হয়ে যাওয়া সৈকতের ছবি তিনি কল্পনায় আনতে পারছেন না। অবশ্য আনবেনই বা কী করে! প্রায় ষোল বছর তিনি সৈকতকে দেখেন না। তবে সেই পনেরো ষোল বছর আগের সৈকতের চেহারাও তার কল্পনায় আসে না। তার কল্পনায় ভাসে সৈকতের একদম ছোট বয়সের ছবি। সৈকতের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ হয়েছিল, তাও বছর পাঁচেকের কম হবে না। সৈকতের বয়স কত হবে এখন? ছত্রিশ, সাইত্রিশ? নাসিমা বেগমের মাথা কাজ করছে না। তিনি গুছিয়ে এইটুকুও হিসেব করতে পারছেন না।
.
নাসিমা বেগম চিঠি খুললেন সন্ধ্যার দিকে। মাত্র চার পাঁচ লাইনের লেখা। কিন্তু সেই লেখাটুকুই যেন তার এতদিনকার এত এত অসুস্থতা নিমেষই কর্পূরের মতো হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। তিনি সন্ধ্যার পরপর উঠে দাঁড়ালেন। ডালিয়াকে ডেকে বললেন রান্নার ব্যবস্থা করতে। আজ তিনি নিজেই রান্না করবেন। রান্না শেষে তিনি ডালিয়াকে কাছে ডেকে নরম গলায় বললেন, আজ এতদিন পর আমি কেন রান্না করেছি, বলত?
ডালিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল, জানি না।
অনেক দিনতো রান্না-বান্না করি না, তাই দেখলাম, রান্না ভুলে গিয়েছি কি! রান্না কি ভুলে গিয়েছি?
না।
শুধু না বলছিস কেন, বল রান্না কেমন হয়েছে?
ভালো হয়েছে।
শুধু ভালো হয়েছে? কম না বেশি ভালো হয়েছে?
বেশি ভালো হয়েছে।
সত্যি বলছিস, না আমার ভয়ে বানিয়ে বানিয়ে বলছিস?
ডালিয়া এই কথার উত্তর দিল না। সে মাথা নিচু করে ফেলল। ডালিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখে নাসিমা বেগমের রেগে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল, কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো আজ তিনি রেগে গেলেন না। বরং শান্ত গলায় বললেন, রান্না খারাপ হয়েছেতো কী হয়েছে! অনেকদিন রাধি না বলে এই অবস্থা। এখন থেকে রোজ রাঁধব। দু চার দিন রাঁধলেই ঠিক হয়ে যাবে।
জি খালাম্মা।
এবার বল আমি হঠাৎ এতদিন পর রান্না করছি কেন?
ডালিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমেরিকা থেকে ভাইজান আসব, এইজন্য।
নাসিমা বেগম খুবই অবাক হলেন, এই কথা তুই জানলি কী করে? তোর খালুজান বলছে? সে আমার চিঠি আমার আগে নিজে খুলে পড়ছে?
আমারে কেউ কিছু বলে নাই খালাম্মা।
তাহলে বুঝলি কীভাবে?
সকালে চিঠি আসনের পর থেইকা আপনেরে দেইখা আন্দাজ করছি।
নাসিমা বেগম কিছুক্ষণ ডালিয়ার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, দুনিয়াতেতো দেখি আমি ছাড়া আর সকলেই বুদ্ধির মহাসাগর। আমিই একমাত্র গাধা!
.
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নাসিমা বেগম লতিফুর রহমানকে ডেকে বললেন, আমি গ্রামে যাব।
গ্রামে? এখন? বাড়ির এই অবস্থা রেখে?
বাড়ির কী অবস্থা?
এখনো ভাড়ার কোনো ব্যবস্থা হলো না। কত কাজ বাকি। এখন গ্রামে গেলে এসব দেখবে কে?
আমিতো বলিনি যে তোমাকেও যেতে হবে।
এই শরীরে তুমি একা অতদূর যেতে পারবে?
পারব। আমাকে বাসে তুলে দিলেই হবে।
কিন্তু এখনই গ্রামে কেন?
এখনতো বলিনি! আরো দিন পনেরো পর। আগেভাগেই জানিয়ে রাখলাম।
কিন্তু বাড়িতে কী?
নাসিমা বেগম এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। তিনি ঘর বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন। সৈকত দেশে আসছে, এটা তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। তিনি ভেবে পাচ্ছেন না, সৈকতের জন্য কী করবেন! সৈকত কি এখনো আগের মতো গুঁড়ো চিংড়ি দিয়ে কচুর লতি, ঝাঁজালো সর্ষে তেলে কচুমুখির ভর্তা, বোম্বাই মরিচ দিয়ে খেসারির ডাল পছন্দ করে? ইলিশের মাথা দিয়ে লাউ, কড়কড়ে ভাজা পুঁটি মাছ, আগের রাতে রান্না করা গরুর মাংসের তরকারির কথা মনে আছে তার? থাকলেও এখানে এগুলো কোথায় পাবেন তিনি? আর পেলেও সেগুলোতো আর সেই আগের মতো নেই। জমিতে কৃত্রিম সারের কারণে সব হাইব্রিড ফলন, বাজারে আসতে না আসতেই ফরমালিন, এসব তিনি তার ছেলেকে খাওয়াবেন না। নাসিমা বেগম নিজেই তাই গ্রামে যাবেন, দীর্ঘ সময় থেকে, দেখে বুঝে-শুনে সৈকত আসার আগে আগেই রাজ্যের খাবার-দাবার নিয়ে ফিরে আসবেন।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য নাসিমা বেগমের একা যেতে হলো না। লতিফুর রহমানই নিয়ে গেলেন নাসিমা বেগমকে। সঙ্গে গেল ডালিয়াও। অত বড় বাড়ি খালি ফেলে আসতে মন সায় দিচ্ছিল না লতিফুর রহমানের। যদিও বাড়ির সীমানাপ্রাচীর যথেষ্টই উঁচু এবং অনতিক্রম্য। তারওপর মূল ভবনের কলাপসিবল গেটখানাও দুর্ভেদ্যই। আর এখানে চিন্তারও অবশ্য কিছু নেই। বড়জোর ছিঁচকে চোরেদের উৎপাত হতে পারে। তবে অবস্থাদৃষ্টে তাও কঠিন।
.
দিন সাতেক গ্রামে থেকে তারা ফিরে এলেন। নাসিমা বেগম রাজ্যের তরি তরকারি, মাছ, খাবার নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন এনায়েত নামের সতেরো-আঠারো বছরের এক ছেলেকেও। এই ছেলে বাড়ির দারোয়ানের কাজটা অন্তত করতে পারবে। নাসিমা বেগমকে খুব ফুরফুরে লাগছে। বাড়িতে আসার পরপরই তিনি ঢুকে গেলেন রান্নাঘরে। লতিফুর রহমানও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। এই প্রতিটি দিন তিনি সারাক্ষণ বাড়ির চিন্তায় তটস্থ হয়ে ছিলেন। বাড়িতে ঢুকেই তাই চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। যেমন রেখে গিয়েছিলেন, সবকিছু ঠিক তেমনই আছে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই, পরিবর্তন নেই। বুকের ভেতর চেপে থাকা তীব্র অস্বস্তিকর অনুভূতিটা দ্রুতই কেটে গেল।
.
দুঃসংবাদ দুটি এলো এর পরপরই। বাড়ি ফিরেই সৈকতের আরো একটি চিঠি পেলেন নাসিমা বেগম। চিঠিতে সৈকত জানিয়েছে, সে আগামী মাসে দেশে আসতে পারছে না। স্কুল বাস দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে তার ছোট মেয়ে। প্রায় ছয় জন বাচ্চা মারাও গিয়েছে। যদিও সৈকতের ছোট মেয়েটির অবস্থা ততটা গুরুতর কিছু নয়, কিন্তু তারপরও এই ঘটনায় পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। ফলে এই মুহূর্তে দেশে আসার ডেট বলতে পারছে না সে।
.
দ্বিতীয় ঘটনাটি ভয়াবহ। গ্রাম থেকে ফেরার পরদিন দুপুরে আবার ভাড়াটে এলো। শহরে যে নতুন ব্যাংক এসেছে তার ম্যানেজার সাহেব এসেছেন বাসা দেখতে। তার সঙ্গে কথা বলে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলেন লতিফুর রহমান। তিনি আগ্রহ নিয়ে তাকে তিনতলার ঘরগুলো দেখাতে নিয়ে গেলেন। নিচের তুলনায় এখানকার ঘরগুলো বেশ বড়, খোলামেলা। অগ্রিম কিছু টাকা পেলে ঘরগুলোকে চমৎকার বসবাস উপযোগী করে দেয়া যাবে।
লতিফুর রহমান ঘরের তালা খুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন। নতুন তালা লাগিয়েছিলেন প্রতিটি দরজায়। সেই তালা প্রায় আট-দশ দিন ভোলা হয়নি বলে শক্ত হয়ে আটকে আছে। অনেক কসরত করে খুলতে হলো তালাগুলো। কিন্তু ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট দুর্গন্ধে লতিফুর রহমানের পেট গুলিয়ে উঠল। পাকস্থলী যেন ঠেলে বের হয়ে আসতে চাইছে। লতিফুর রহমান দুহাতে নাক মুখ চেপে ধরে দরজার কাছটায় খানিক দাঁড়িয়ে রইলেন। দীর্ঘ দিনের আকাঙ্ক্ষিত ভাড়াটে তার সঙ্গে। অথচ তার সামনেই এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি! এর চেয়ে বাজে, বিব্রতকর আর কিছু হতে পারে না।
.
লতিফুর রহমান হতভম্ব অবস্থা কাটানোর জন্য হাসতে চেষ্টা করলেন, ইঁদুর বেড়াল কিছু একটা পচে আছে, বুঝলেন ভাই সাহেব? এত বড় বাড়ি, মানুষ বলতে আমরা মাত্র দুজন। তাও আপনার ভাবি হলেন বারো মাসি রোগী। আমি একা তো এই বাড়ি দেখাশোনা করে রাখতে পারি না। আপনারা যদি আসেন, তাহলে একদম নিজেদের বাড়ি মনে করে থাকবেন, দেখাশোনা করবেন।
রুমালে নাক মুখ ঢেখে মুখভঙ্গি আড়াল করে রাখা নতুন ভাড়াটে তাতে সন্তুষ্ট হলেন কি না বোঝা গেল না।
লতিফুর রহমান ড্রইং, ডাইনিং, রান্নাঘরে তন্নতন্ন করে খুঁজলেন, কোথাও পচা-গলা কিছু দেখতে পেলেন না। দেখতে পেলেন না প্রথম দুটি বাথরুমেও। তৃতীয় বাথরুমটি মাস্টার বেডরুমের সঙ্গে। লতিফুর রহমান সেই বাথরুমের দরজাটা খুললেন। তারপর চিৎকার করতে গিয়েও আচমকা থমকে দাঁড়ালেন। তার হাত-পা কাঁপছে। তিনি টলছেন। মনে হচ্ছে তার চারপাশের জগৎটা চরকির মতো পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে। পেটের ভেতর গুলিয়ে বমি হয়ে উঠে আসছে নাড়ি-ভুঁড়ি। তিনি তীব্র আতঙ্ক নিয়ে আরো একবার চোখ মেলে তাকালেন।
বাথরুমের মেঝেতে কাত হয়ে পড়ে আছে একটা লাশ। লাশটার গলা থেকে মাথাটা প্রায় ছুটে এসে বিভৎসভাবে ঝুলে আছে বুকের ওপর। পচে যাওয়া লাশটার শরীর বেয়ে ভনভন করে উড়ছে মাছি।
.
০২.
লতিফুর রহমান ঝট করে বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করে ফেললেন। যেন আচমকাই বুঝতে পারলেন, এই ঘটনা এখুনি কাউকে জানতে দেয়া যাবে না। আগে বুঝতে হবে ঘটনা আসলে কী ঘটেছে! ব্যাংকার ভদ্রলোকের নাম রফিকুল ইসলাম। তিনি তখনো ড্রইংরুমেই দাঁড়িয়ে। তার ঘুণাক্ষরেও ধারণা নেই যে ঠিক পাশের ঘরেই কী অবিশ্বাস্য এক ভয়াবহ ঘটনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন লতিফুর রহমান। তিনি নাকে-মুখে রুমাল চেপে ধরেই বেড রুমের দরজায় উঁকি দিলেন, কিছু পেলেন স্যার?
লতিফুর রহমান যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললেন, কিছুতো পেলাম না। দেখি, বাইরের ঘরে বা ছাদে কিছু মরে পচে রয়েছে কি না!
রফিকুল ইসলামও আর বেশিক্ষণ এখানে থাকতে চাইছিলেন না। লতিফুর রহমানের সঙ্গে তিনিও তটস্থ ভঙ্গিতে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন।
.
রফিকুল ইসলামকে বাড়ির গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন লতিফুর রহমান। তারপর ‘টু লেট’ লেখা সাইনবোর্ডটা সরিয়ে ফেললেন গেট থেকে। তিনি চান না, এই মুহূর্তে আর কেউ বাড়ি ভাড়া নিতে আসুক। ঘটনা এখনো মাথায় ঢুকছে না লতিফুর রহমানের। এই বাড়ির প্রতিটি ঘরের চাবি প্রতি মুহূর্তে তার কাছেই থাকে। তিনি ছাড়া অন্য কারো কাছে কোনোভাবেই এই চাবি যাওয়ার সুযোগ নেই। শুধু তাই-ই না, গ্রামে যাওয়ার আগে তিনি নিজ হাতে প্রতিটি ঘরের দরজা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে তারপর গিয়েছিলেন। এরপর এই এতদিনে যে আর একটা ঘরও খোলা হয়নি সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। এমনকি এই ঘরটা আজ চাবি দিয়ে খুলতে গিয়েও প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়েছে তার। ঘরের কোনো দরজা কোথাও ভাঙা নেই, কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, তাহলে ঘটনা কী ঘটেছে? কীভাবে ঘটেছে?
লতিফুর রহমান বাকিটা সময় থম মেরে বসে রইলেন। জোহরের আজান হলেও তিনি উঠলেন না। তার মাথায় হাজারটা প্রশ্ন, কিন্তু সেসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এ যেন রীতিমতো ভৌতিক ঘটনা! মাঝখানে একবার মনে হলো তিনি ভুল দেখেছেন, এই বয়সে এসে হ্যাঁলুসিনেশন হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তিনি উঠে গিয়ে আবার দেখে এলেন। বাথরুমের দরজা খোলার সাহস এবার আর তার হলো না। কিন্তু পচা লাশের বিকট গন্ধেই তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন, তিনি ভুল কিছু দেখেননি।
লতিফুর রহমান সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। সারা জীবন পড়িয়েছেনও বাংলা সাহিত্য। সেই সুবাদেই প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস তার রয়েছে। কঠিন জীবনবোধ সম্পন্ন ধ্রুপদি সাহিত্য যেমন পড়েছেন, পড়েছেন নানা ধরনের গল্প, উপন্যাস, দেশি-বিদেশি থ্রিলারও। ঠিক এসব কারণেই কিনা কে জানে, এই পরিস্থিতিতেও খানিকটা হলেও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে ভাবতে পারছেন তিনি। স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারছেন, একটা অবশ্যম্ভাবী ভয়ংকর বিপদে পড়তে যাচ্ছেন তিনি। কিংবা পড়েই গেছেন। এই বিপদ এড়িয়ে যাওয়ার সহজ কোনো উপায় তার জানা নেই। মৃত মানুষটাকে তিনি চেনেন না, জানেন না। কীভাবে কী ঘটেছে সে সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই। অথচ তারপরও বিপদের পুরোটাই এখন তার ঘাড়ে। এই বিপদ থেকে সহজে মুক্তি নেই তার। পচা-গলা লাশটা এখনো পড়ে আছে তার বাড়িতে।
.
সেই সারাটা দুপুর-বিকেল তিনি থম মেরে বসেই রইলেন। কারো সঙ্গে কোনো কথা বললেন না। খেতে গেলেন না। এক মনে ঘণ্টার ঘণ্টা বসে রইলেন একা। কী জানি কী ভাবনায় বুঁদ হয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ উঠে নতুন ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরে মাগরিবের নামাজ পড়তে গেলেন পলাশবাড়ি শহরে। তার বাড়ি থেকে পলাশবাড়ি কিছুটা দূরে হলেও এই মসজিদে তিনি প্রায়ই নামাজ পড়তে আসেন। আজ নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে আবিষ্কার করলেন মসজিদের সিঁড়িতে রাখা তার জুতো জোড়া খুঁজে পাচ্ছেন না। কিছুদিন আগেও এই ধরনের সমস্যাগুলো এখানে ছিল না। যত দ্রুত শহর গড়ে উঠছে, তত দ্রুত মানুষ বাড়ছে, তারচেয়েও বেশি দ্রুত বাড়ছে অপরাধ। সঙ্গে আরো একটা জিনিস বেড়েছে, তা হলো শহরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি। এই বর্ষার মৌসুমেও যেন বিরাম নেই। মাসের পর মাস ধরে এই খোঁড়াখুঁড়ি চলছেই। রাস্তায় হাঁটতে গিয়েও ভারি বিড়ম্বনায় পড়তে হয় পথচারীদের।
চারদিকে গর্ত, খানাখন্দে ভরে গেছে রাস্তা। এই রাস্তায় এখন খালি পায়ে হেঁটে এতটা দূর পথ ফিরবেন কী করে তিনি! মসজিদের উল্টোদিকে রাস্তার পাশে হারাধন মুচির দোকান। শহরে মানুষের আনাগোনা ক্রমশই বাড়ছে। ফলে প্রায় ছ সাত মাস হলো আগের জায়গা থেকে ব্যবসা গুটিয়ে এখানে চলে এসেছে হারাধন। এখানে তার ব্যবসা জমেছেও ভালো। যদিও দোকানে ইলেক্ট্রিসিটির সংযোগ এখনো পায়নি। কেরোসিনের কুপির আলোয় কাজ করছে হারাধন আর তার দু’জন কর্মচারী। লতিফুর রহমান রাস্তা পার হয়ে হারাধনের দোকানের সামনে দাঁড়াতেই হারাধন মাথা তুলে তাকাল। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণামের ভঙ্গি করে বলল ছারের পাও খালি কেন? জুতা ছিঁড়ছে?
লতিফুর রহমান বললেন, নারে হারাধন, জুতা ছেড়ে নাই। নামাজ পড়ে বের হয়ে দেখি জুতাজোড়া নেই, এখন এতটা পথ খালি পায়ে হেঁটে যাব কী করে! তোর কাছে অতিরিক্ত স্যান্ডেল থাকলে একজোড়া দিতে পারিস। কাল দিয়ে যাব।
হারাধন কিছুক্ষণ কী ভাবল! তারপর একজোড়া স্যান্ডেল বের করে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এই জোড়া নিয়া যান স্যার। এই স্যান্ডেলের কাস্টোমার কবে আসে ঠিক নাই। অন্যদেরটা দিলে টেনশন। একটু পরেই আইসা আচমকা চাইয়া বইলে তখন কী করব?
লতিফুর রহমান স্যান্ডেল জোড়া পায়ে দিলেন। কম বয়সি ছেলেদের স্যান্ডেল হলেও পায়ে বেশ মাপ মতোই হয়েছে। হাঁটতেও সমস্যা হচ্ছে না।
.
শহর থেকে সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্রও কিনলেন লতিফুর রহমান। সঙ্গে কিনলেন নাইলনের শক্ত দড়ি আর একজোড়া গ্লাভস। তারপর মোবাশ্বেরের চায়ের দোকানে বসে এক কাপ চাও খেলেন। রাস্তার খনন কাজ করতে আসা শ্রমিকরা সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর এই সন্ধেবেলা একটু বিশ্রাম পায়। আর তারপরই মোড়ের এই চায়ের দোকানটাতে সস্তা বিড়ি-সিগারেট ধরিয়ে জমিয়ে আড্ডায় দেয়। তাদের কাছ থেকেই খবরটা প্রথম শুনলেন লতিফুর রহমান। এলাকার বর্তমান চেয়ারম্যান চুন্নু মিয়ার ভাগ্নে লিখনকে নাকি বেশ কিছুদিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! এই নিয়ে থানা পুলিশও হয়েছে। কিন্তু কোথাও তার কোনো খোঁজ নেই।
লতিফুর রহমান কান খাড়া করে বাকি আলোচনাও শুনলেন। শুনে বুঝলেন, শুধু শ্রমিকদেরই না, শহরের বাদ বাকি আর সবার আলোচনার বিষয়বস্তুই ওই একই। নানাজন একইসঙ্গে নানা কথা বলছে। কেউ কারো কথা শুনছে না। তবে লতিফুর রহমান মনোযোগ দিয়ে সবার কথাই শুনলেন। শুনে যা বুঝলেন, লিখন বছরখানেক ধরেই এখানে মামার বাসায় থাকছে। পড়াশোনায় ভালো না বলে তার মা তাকে বড় ভাই চুন্নু মিয়ার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, যদি চুন্নু মিয়া তাকে কোনো কাজে লাগতে পারেন! কিন্তু তিন-তিনবার ম্যাট্রিক ফেল করা লিখনকে কোনোভাবেই বশে আনতে পারেননি চুন্নু মিয়াও। শেষ অবধি সামনের নির্বাচনের জন্য যে নির্বাচনী প্রচারণা হবে, তার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন ভাগ্নের হাতে। সঙ্গে প্রচারণার কাজে খরচ করার জন্য বেশ কিছু টাকা-পয়সাও দিয়েছিলেন। সেই টাকা নিয়েই সম্ভবত ভেগেছে লিখন।
.
লতিফুর রহমান বাসায় ফিরে কারো সঙ্গে তেমন কোনো কথাবার্তা বললেন না। তিনি চুপচাপ বসে রইলেন বারান্দায়। আকাশে থেমে থেমে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। রাতে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি একদিক থেকে ভালো। তিনি মনে মনে বৃষ্টির অপেক্ষাই করছেন। আজ রাতে ঝড়-বৃষ্টি হলে তার জন্য খুব সুবিধা হয়। মনে মনে একটা পরিকল্পনা করেছেন তিনি। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঝড় বৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।
প্রকৃতি যেন তার ইচ্ছেটাই পূরণ করে দিল। রাত এগারোটার দিকে শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। সন্ধ্যে নামতেই ঘুমিয়ে জল হয়ে গেছে ডালিয়া। এমনিতে নাসিমা বেগমের রাতে ঘুম হয় না। সারারাত বলতে গেলে জেগেই থাকেন তিনি। কিন্তু আজ তাকে গোপনে ডাবল ডোজ ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন লতিফুর রহমান। ফলে তিনিও এখন বেঘোরে ঘুমুচ্ছেন। শত ডাকলেও এই রাতে আর তাদের ঘুম ভাঙবে না। লতিফুর রহমান অবশ্য তা চানও না।
.
তিনি গভীর রাতে তিনতলার ঘরটাতে গেলেন। তার এক হাতে টর্চ। আরেক হাতে প্লাস্টিকের শক্ত বস্তা। বস্তার ভেতর রাজমিস্ত্রিদের নানা যন্ত্রপাতি। এ বাড়িতে এখনো কিছু কাজ বাকি রয়ে গেছে বলে ছোটখাটো যন্ত্রপাতিগুলো তারা রেখে গিয়েছিল। লতিফুর রহমান ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। তারপর বেডরুমের বাথরুমটার সামনে দাঁড়িয়ে গামছা দিয়ে শক্ত করে নিজের নাক বেঁধে নিলেন।
সন্ধ্যায় শহর থেকে একজোড়া গ্লাভস কিনে এনেছিলেন, সেই গ্লাভসজোড়া হাতে পরে নিয়ে দরজাটা খুললেন তিনি। হাতের টর্চটা জ্বালাতেই দুপুরের সেই গা হিম করা অনুভূতিটা যেন শতগুণ বেশি হয়ে ফিরে এলো।
বাইরে তখন প্রচণ্ড শব্দে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝোড়ো হাওয়ায় আশপাশে কোথাও গাছের ডাল ভেঙে পড়ছে। একটানা বৃষ্টির শব্দ কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। লতিফুর রহমান জানেন না, এ কারণেই কি না, তিনি নিজেকে একটা ঘোরের মধ্যে আবিষ্কার করলেন। এরপরের ঘটনাগুলো যেন বাস্তবের লতিফুর রহমান নন, এক ঘোরগ্রস্ত মানুষ করে চললেন। অনেক কষ্টে লাশটাকে বস্তার ভেতর ঢোকালেন তিনি। হাতে গ্লাভস থাকলেও লাশের পচা মাংসে দেবে যাওয়া হাতজুড়ে বিশ্রি একটা গা ঘিনঘিনে অনুভূতি লেগে রইল। পেটের ভেতরের নাড়ির ভূড়িগুলো যেন সব বের হয়ে যেতে চাইছে বমি হয়ে।
.
লাশটাকে বস্তাবন্দি করে বস্তার দু পাশটা শক্ত করে নাইলনের দড়ি দিয়ে বেঁধে দিলেন লতিফুর রহমান। তারপর দু প্রান্তের দড়ি একসঙ্গে ধরে টেনে বের করে আনলেন বাথরুম থেকে। এবার পাশে সাজিয়ে রাখা ছোটখাটো যন্ত্রপাতিগুলোর ভেতর থেকে একটা ধারালো হ্যাক স’ ব্লেড বের করে নিলেন তিনি। তারপরের ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পেছনের দিকের বড় জানালাটার গ্রিল কেটে জানালাটা ফাঁকা করে ফেললেন। সেই ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিলেন লাশসহ বস্তাটা। উল্টাদিকের জানালার গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে রাখলেন বস্তার সঙ্গে বাঁধা নাইলনের দড়িগুলোর প্রান্ত। তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে লাগলেন দড়ির অবশিষ্ট অংশগুলো।
.
দড়িতে ঢিল দিতেই বস্তাসহ লাশটা তিনতলা ভবনের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে নেমে যেতে লাগল নিচে। সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা থেকেও বেশ খানিকটা নিচে নেমে আসতেই দড়িতে ঢিল দেয়া থামিয়ে দিলেন লতিফুর রহমান। দড়ির দু পাশের প্রান্তই আবার শক্ত করে বেঁধে দিলেন উল্টো দিকের জানালার গ্রিলে। তারপর টর্চ হাতে বের হয়ে গেলেন ঘর থেকে। হাতে একখানা কাস্তে নিয়ে আপাদমস্তক রেইন কোট আবৃত হয়ে সন্তর্পণে নেমে গেলেন বৃষ্টির মধ্যে। তারপর বা দিকটা ঘুরে চলে এলেন ভবনের পেছনে যেখানে দড়ির মাথায় বস্তাটা আড়াআড়ি ঝুলছে।
ছাদ ঢালাইয়ের সময় ব্যবহৃত অসংখ্য বাঁশ সেখানে স্থূপ করে রাখা হয়েছে। সেই বাশ থেকে একটা বাঁশ তুলে নিলেন লতিফুর রহমান। তারপর দড়ির মাথায় ঝুলতে থাকা বস্তাবন্দি লাশটাকে বাঁশের মাথায় ঠেলে দেয়ালের বাইরে নিয়ে গেলেন। এই বয়সে এসে এতটা মানসিক এবং শারীরিক পরিশ্রম তার শরীর নিতে পারছে না। প্রবল ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও কুলকুল করে ঘামছেন তিনি। ভারি নিঃশ্বাসের সঙ্গে হাপরের মতো কাঁপছে বুক। শ্বাস নিতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। কিন্তু এখনো অনেক কাজ বাকি।
লতিফুর রহমান এবার হাতের কাস্তেখানা বাঁশের মাথায় শক্ত করে বেঁধে নিলেন। তারপর আবার ঘুরে চলে এলেন বাড়ির সামনের দিকে। জায়গাটাতে এর মধ্যেই প্রায় হাঁটু পানি জমে গেছে। তিনি আলো না জ্বালিয়েই অন্ধকারে হেঁটে গেটের কাছে পৌঁছে গেলেন। বাড়ির নবনিযুক্ত দারোয়ান এনায়েত এরই মধ্যে ঘুমিয়ে জল হয়ে গেছে। এমন ঝড়-বৃষ্টি না থাকলে এতক্ষণে হয়তো তার নাসিক্যধ্বনিও শোনা যেত!
লতিফুর রহমানের অবশ্য এতে সুবিধাই হয়েছে। তিনি চান না, এই ঘটনা তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানুক। তাই খুব ভেবে-চিন্তে, সতর্ক ভঙ্গিতে পা ফেলতে হচ্ছে তাকে। সন্তর্পণে গেটের তালা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি। ডান পায়ে সমস্যা বলে জল-কাদায় হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। তারপরও যতটা সম্ভব দ্রুত সীমানাপ্রাচীরের পাশ ঘুরে বাড়ির পেছনে চলে এলেন। সেখানে দেয়ালের বাইরে দড়ির সঙ্গে লাশভর্তি বস্তাটা ঝুলছে। লতিফুর রহমান বাঁশের মাথায় বাঁধা কাস্তেখানা দিয়ে বস্তার দুই পাশে বাধা দড়িগুলো কেটে দিলেন। প্রথমে ঝপাৎ করে একটা শব্দ হলো। দেয়ালের গা ঘেঁষে পায়ে হাঁটা সরু পথের ওপর বস্তাটা পড়েই গড়িয়ে নেমে গেলে ও পাশের জলাশয়ে। বর্ষাকলে জলে টইটম্বুর নদীটা আশেপাশের খানাখন্দগুলোকেও গভীর জলাশয় বানিয়ে ফেলেছে।
লতিফুর রহমান বাঁশের মাথায় ঠেলে বস্তাটাকে আরো দূরে সরিয়ে দিলেন। প্রবল বৃষ্টির কারণে চারপাশের উঁচু ভূমি থেকে স্রোতের মতো নেমে আসছে জল। সেই জলের স্রোতে ডুবতে ডুবতেও ক্রমশই মূল নদীর দিকে চলে যেতে থাকল বস্তাবন্দি লাশটা! লতিফুর রহমানের শরীরে যেন আর বিন্দুমাত্র শক্তিও অবশিষ্ট নেই। প্রায় শেষ রাতের দিকে তিনি যখন তার নিজের ঘরে ফিরে এলেন, তখনো লতিফুর রহমানের বিশ্বাস হচ্ছে না, খানিক আগের কাজগুলো সত্যি সত্যিই তিনি করেছেন। মনে হচ্ছে, এই পুরো ঘটনাটাই তার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা। বাস্তবে এমন কিছুই ঘটেনি।
.
পরদিন লতিফুর রহমানের ঘুম ভাঙল বেলা করে। প্রচণ্ড জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা। সারা শরীরে অসহনীয় ব্যথা। কিন্তু তারপরও তিনি উঠে দাঁড়ালেন। কাল রাতের ঘটনা এখনো তার অবিশ্বাস্য লাগছে। মনে হচ্ছে পুরোটাই স্রেফ কল্পনা। লতিফুর রহমান টলতে টলতে উঠে তিনতলার ঘরটাতে গেলেন। সেখানে জানালার গ্রিলের সঙ্গে বাঁধা নাইলনের দড়ি জোড়া এখনো তেমনি আছে। উল্টোদিকের জানালার গ্রিল কাটা। কাটা গ্রিলখানা জানালার পাশেই দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখা। লতিফুর রহমান মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে উঠলেন। দড়িগুলো এখনো বাইরে ঝুলছে! তিনি দড়িগুলোকে টেনে ভেতরে নিয়ে এলেন। তারপর গ্লাস টেনে ভালো করে বন্ধ করে দিলেন জানালাটা, যেন বাইরে থেকে দেখে কিছুই বোঝা না যায়!
ওই ভয়াবহ অসুস্থ শরীরেও বাথরুমের মেঝেটা ধুয়ে মুছে ঝকঝকে করে ফেললেন। দরজাটা তালাবন্ধ করে যখন তিনি নিজের ঘরে ফিরলেন, তখন তার শরীরে আর দাঁড়িয়ে থাকারও শক্তি নেই। কোনো মতে নিজেকে টেনে নিয়ে ফেললেন বিছানায়। তারপর আর কিছু মনে নেই লতিফুর রহমানের।
.
লতিফুর রহমানের জ্ঞান ফিরল কিংবা ঘুম ভাঙল রাতে। তার পাশে বসে আছেন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার। তিনি জ্বরের ওষুধের সঙ্গে স্বল্পমাত্রার ঘুমের ওষুধও দিয়ে দিলেন। পরদিন দুপুর অবধি আবারো একটানা ঘুমালেন লতিফুর রহমান। জ্বরটা ততক্ষণে কমেছে। তবে শরীর ভীষণ দুর্বল। দুপুরে কিছু খাবার আর ওষুধ খেয়ে আবার ঘুমালেন তিনি। ঘুমের ভেতর আজেবাজে সব স্বপ্নও দেখলেন। তার ঘুম ভাঙল রাতে। সেই সারা রাত আর ঘুমাতে পারলেন না। মাথার ভেতর গিজগিজ করছে অসংখ্য প্রশ্ন, অসংখ্য জিজ্ঞাসা, সঙ্গে শঙ্কাও। লতিফুর রহমান এখনো ভেবে পাচ্ছেন না, ওই লাশটা তার বাড়ির তিনতলার ওই ঘরে এলো কী করে? এই বাড়িতে প্রতিটি মানুষকে তার চোখের সামনে দিয়ে ঢুকতে হয়। তার চোখের আড়ালে ঢোকার কোনো উপায় নেইও। অতি ধূর্ত, বেপরোয়া কেউ যদি কোনোভাবে দেয়াল টপকে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে, তারপরও সে মূল ভবনের কলাপসিবল গেট না ভেঙে কোনোভাবেই দোতলা-তিনতলায় উঠতে পারবে না। অথচ সেই তিনতলার একটি কক্ষেই জ্বলজ্বান্ত একটি মানুষকে খুন করা হয়েছে? কীভাবে? লতিফুর রহমান কোনোভাবেই, কোনো যুক্তিতেই হিসেব মেলাতে পারেন না। পুরো বিষয়টিই তার কাছে অসম্ভব মনে হয়, অবিশ্বাস্য লাগে!
.
এই বাড়ির চাবিগুলো কেবল তার কাছেই থাকে। ফলে তালা না ভেঙে অন্য কারো পক্ষে কখনোই ওই ঘরের দরজা খোলা সম্ভব না। লতিফুর রহমান তালাটা বারবার পরীক্ষা করে দেখেছেন। কোথাও সামান্য আঁচড় অবধি নেই। তাছাড়া, ওভাবে একটা মানুষকে একা একা কারো পক্ষে খুন করাও সম্ভব নয়। এর মানে খুনি একাধিক। তার চোখের অগোচরে এই বাড়িতে একাধিক মানুষ ঢুকে একজনকে খুন করে রেখে চলে গেল, আর তিনি কিছুই টের পেলেন না, এটা অসম্ভব! এমনও নয় যে তিনি যখন গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন তখন এই ঘটনা ঘটেছে। সে সম্ভাবনাও তিনি তলিয়ে দেখেছেন। কোনো উত্তর পাননি। বাড়ির মূল গেট, কলাপসিবল গেট এমনকি যে ঘরে ঘটনা ঘটেছে, সেই ঘরের চাবি অবধি তিনি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। এবং যেমন রেখে গিয়েছিলেন, প্রতিটি গেট অবিকল তেমনই ছিল। খুন হওয়া ঘরের দরজা, দরজার তালা, কোথাও সামান্য দাগও নেই। ফলে এটাও মেনে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই যে ওই সময়েই ঘটনাটা ঘটেছে। তা ছাড়া লতিফুর রহমান লাশটা দেখেছেন। ওই লাশ দু-চার-পাঁচ দিনের লাশ নয়। লাশ দেখে তিনি মোটামুটি নিশ্চিত যে খুনটা হয়েছে তারা গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আগেই। কিন্তু কিভাবে?
লতিফুর রহমান কিছুতেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেন না। তার খুব অস্থির এবং দিশেহারা লাগতে লাগল। সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হচ্ছে, এই ঘটনা তিনি কাউকে বলতেও পারছেন না।
.
০৩.
পলাশবাড়ি থানার নতুন সাব-ইন্সপেক্টরের নাম রেজাউল হক। রেজাউল হকের বয়স একত্রিশ। লোকে তাকে সংক্ষেপে রেজা বা হক সাহেব বলেই ডাকে। তিনি এ এলাকায় এসেছেন মাস চারেক হবে। নতুন থানার ওসি সাহেব এখনো আসেননি বলে রেজাউল হকের ওপর বেশ দায়িত্ব। তার নাকের নিচে বিছার মতো ছড়ানো গোঁফ। এই গোঁফের কারণেই তাকে দেখতে তার বয়সের চেয়ে ভারিক্কী লাগে। রেজা এই মুহূর্তে তার গোঁফ নিয়ে মহা বিরক্ত। তার অনেক বদ অভ্যাসের মধ্যে একটি হচ্ছে পিরিচে চা ঢেলে চুমুক দিয়ে চা খাওয়া। গত কয়েকদিনের নানা ঝামেলার কারণে তিনি তার গোঁফটা ঠিকঠাক মতো ছাটতে পারেননি। ফলে পিরিচে চুমুক দিয়ে চা খেতে গিয়ে পড়েছেন ঝামেলায়। যতবারই চায়ে চুমুক দিতে গিয়েছেন, ততবারই ঠোঁটের সঙ্গে সঙ্গে তার গোঁফও চুমুক দিয়েছে চায়ে। পিরিচ থেকে মুখ তুলতেই দেখা যাচ্ছে গোঁফ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় দুধ চা টুপটাপ ঝরে পড়ছে। ব্যাপারটা দেখতে বিশ্রী। এই মুহূর্তে আরো বেশি বিশ্রী লাগছে, কারণ তার সামনে পচা-গলা একটা লাশ পড়ে আছে।
.
এই লাশ পেয়েছে নদীর জেলেরা। তাদের জালে লাশ উঠে এসেছে। তবে ঘটনা হচ্ছে, লাশ মূল নদীতে পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেছে নদীর পাশের অগভীর জলাশয়ে। লাশের তীব্র গন্ধে কেউ কাছে ভিড়তে পারছে না। অথচ সেই লাশের
পাশে বসেই নির্বিকার ভঙ্গিতে পিরিচে ঢেলে চা খাচ্ছেন রেজাউল হক। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না, এই লাশ নিয়ে তিনি খুব একটা চিন্তিত।
তবে বিষয়টা চিন্তিত হওয়ার মতোই। লাশের চেহারা ছবি দেখে এখন আর পরিচয় বোঝার উপায় নেই। তবে পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান চেয়ারম্যান চুন্নু মিয়ার ভাগ্নে লিখনের লাশ এটি। চুন্নু মিয়া এলাকার প্রভাবশালী লোক। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা প্রবল। দিন দশেক আগে লিখন যখন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, তখনই বিষয়টা পুলিশকে জানিয়েছিলেন চুন্নু মিয়া। পুলিশ অবশ্য বিষয়টিকে তখন তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। দেখার কথাও না। লিখনের অতীত রেকর্ড ভালো নয়। যখন-তখন যেখানে-সেখানে ঝামেলা পাকানো ছিল তার স্বভাব। মামা এলাকার প্রভাবশালী লোক হওয়ায় ধরাকে সরাজ্ঞান করেই চলত সে। তার চরিত্রেও নানা দোষ ছিল। ফলে লিখনের নিখোঁজের খবর শুনে রেজাউল হক নিজেও ভেবেছিলেন মামার নির্বাচনী প্রচারণার টাকা নিয়েই সে হয়তো পালিয়েছে। কিন্তু এই শান্ত নিরুপদ্রব শহরে এমন করে একটা ছেলে খুন হয়ে যাবে তা তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি।
রেজা অনেকক্ষণ ধরেই চুন্নু মিয়ার অপেক্ষায় বসে আছেন। তিনি এলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। চুন্নু মিয়া এলেন ঘণ্টাখানেক পরে। লিখনকে চিনতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। লাশ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়াবহ চিঙ্কারে লাশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেন তিনি। তার সঙ্গের লোকেরা অবশ্য তাকে শক্ত করে ধরে রাখল। চুন্নু মিয়ার কান্নায় ভারি হয়ে উঠল চারপাশ। লিখনের গলায় অতি সূক্ষ্ম, তীক্ষ্ণ কোনো তার পেঁচিয়ে খুন করা হয়েছে। ধারালো তারের চাপে কণ্ঠনালির পুরোটাই কেটে গেছে।
এর পরের কয়েক দিনে শান্ত পলাশবাড়ি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতে লাগল। আগামী উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে চুন্নু মিয়ার প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ী গোলাম মাওলা। চুন্নু মিয়া এই খুনের জন্য সরাসরি গোলাম মাওলাকে অভিযুক্ত করে বসলেন। সমস্যা হচ্ছে তারা দুজনই একই রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা। পরের নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে সমর্থন আদায়ের জন্য দুজনই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দলের কাছে দুজনের গুরুত্বই সমান। উপজেলা নির্বাচনের বছরখানেক পরেই হবে সংসদ নির্বাচন। সুতরাং এই মুহূর্তে কেন্দ্র থেকে নীতিনির্ধারকরা চাইছেন না দলের মধ্যে
কোনো বিভেদ সৃষ্টি হোক। ফলে চুন্নু মিয়া মুখে মুখে গোলাম মাওলাকে অভিযুক্ত করলেও তার বিরুদ্ধে খুনের মামলা করার সবুজ সঙ্কেত দল থেকে পেলেন না। তা ছাড়া এই খুন যে গোলাম মাওলা করিয়েছেন এমন কোনো অকাট্য প্রমাণও চুন্নু মিয়ার কাছে নেই। তবে লিখনের খুনের বিচার চেয়ে মিছিল মিটিং, সভা-সমাবেশ হতে থাকল। সেই সভা সমাবেশে গোলাম মাওলার কর্মিদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে সংঘর্ষও হতে থাকল।
সবচেয়ে বেশি চাপে আছেন এসপি এবং এএসপি সাহেব। ঊর্ধ্বতন মহল থেকে তাদের চাপ দেয়া হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের খুঁজে বের করতে হবে। দিনের মধ্যে অসংখ্যবার এএসপি সাহেব রেজাকে ফোন করছেন। প্রতিবার ফোন করেই তিনি রেজাকে নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। শেষবার ঘন্টাখানেক আগে ফোন দিয়ে বললেন, শোনেন হক সাহেব।
জি স্যার।
আমার ধারণা খুনটা কে করেছে আমি সাসপেক্ট করতে পেরেছি।
কে করেছে স্যার?
আপনি বলুনতো কে হতে পারে?
আমি পারছি না স্যার।
গেজ করেন?
গেজ করতেও পারছি না স্যার।
আমার ধারণা খুনটা করেছেন চেয়ারম্যান সাহেব নিজেই।
তিনি খুন করবেন কেন?
কেন করবেন মানে? নির্বাচনের আগে আগে একটা ইস্যু তৈরি করে ফেললেন। পাবলিক সেন্টিমেন্ট তার নিজের দিকে চলে এলো। দলও তার প্রতি একটু সিমপ্যাথাইজড হয়ে গেল। বুঝলেন না বিষয়টা? রাজনীতি-রাজনীতি। রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। চুন্নু মিয়া আগেভাগেই বুঝতে পারছিলেন, এবার দল থেকে নমিনেশন পেতে তার খবর হয়ে যাবে। তা ছাড়া এতদিন চেয়ারম্যান ছিলেন, ভালো কাজতো কিছু করেন নাই। লোকজনও তার ওপর সন্তুষ্ট না, দলও না। কিন্তু এখন দেখেন? ঘটনার পর সবকিছু কিন্তু ভোজবাজির মতো পাল্টে গেছে। গেছে না?
রেজাউল হক এখন মগভর্তি করে চা খাচ্ছেন। ঠিক চা-না, তিনি আসলে মগভর্তি চায়ে ডুবিয়ে পুরি খাচ্ছেন। এটি তার খুব পছন্দের খাবার। তিনি পুরিতে কামড় বসাতে বসাতে বললেন, জি, স্যার।
একটু শার্প হতে হবে বুঝলেন হক সাহেব। এমনিতেই পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বদনামের অভাব নেই। এর মধ্যে যদি একটু চিন্তা-ভাবনা না করেন, তাহলে কেমনে হবে?
জি স্যার। রেজা পুরির বাকি অংশটুকু একসঙ্গে মুখে পুড়ে দিতে দিতে বললেন।
কী তখন থেকে শুধু জি স্যার জি স্যার করছেন? এএসপি সাহেব কিছুটা মনোঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন, বোঝা যাচ্ছে, এখন চিন্তা করে বের করেন, বিষয়টা প্রমাণ করবেন কিভাবে? অপরাধী কিন্তু প্রমাণ না রেখে অপরাধ করে না।
কিন্তু স্যার নিজের আপন ভাগ্নেকে কী কেউ…।
এএসপি সাহেব এবার যেন রেগেই গেলেন, আপনাকে পুলিশে আসতে কে বলেছে, বলেনতো রেজা সাহেব? আপনার উচিত ছিল স্কুলমাস্টার হওয়া। আদর্শলিপি পড়াতেন, আর আদর্শ প্রচার করতেন। এতদিন পুলিশে চাকরি করে এখন কী সব সাধু সন্তুর মতো প্রশ্ন করছেন, হ্যাঁ?
জি স্যার।
আরে ভাই, নিজের সন্তানকে পর্যন্ত খুন করে অন্যকে ফাঁসানোর ঘটনাও ঘটেছে, বুঝলেন?
জি স্যার।
শোনেন রেজা সাহেব, অপরাধী ধরতে হলে নিজেকে আগে অপরাধীর মতো হতে হবে। মানে, অপরাধীর মতো চিন্তা করতে হবে, বুঝলেন।
জি স্যার।
এএসপি বিরক্ত ভঙ্গিতে ফোন রেখে দিলেন। রেজা আরো কিছুক্ষণ ফোন কানে চেপে ধরে বসে রইলেন। তার খুব ইচ্ছে করছে এএসপি সাহেবকে ফোন করে নরম গলায় বলতে যে, স্যার, আপনি যদি দিনের মধ্যে আমাকে এত বার ফোন দেন, তাহলে আমি ইনভেস্টিগেশন করব কখন?
রেজা অবশ্য ফোন দিলেন না। তিনি আরো এক মগ চা এবং দুটো পুরির অর্ডার দিলেন। সবচেয়ে ভালো হতো কফি হলে। কিন্তু এখানে ভালো কফি বানাতে পারে এমন কেউ নেই।
.
০৪.
পরদিন খুব ভোরে হাঁটতে বের হয়েছেন রেজা। তার সঙ্গে পুলিশের হাবিলদার শরিফুল। অল্পদিনেই নতুন সাব ইন্সপেক্টরের ভক্ত বনে গেছে সে। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছে বলে বাতাস স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশিই ঠাণ্ডা। রেজার গায়ে পাতলা চাদর জড়ানো। তিনি ভোরের ফুরফুরে হাওয়ায় হাঁটতে হাঁটতে নদীর পারে এসে দাঁড়ালেন। ঠিক এখান থেকেই লাশটা তোলা হয়েছিল। রাস্তা থেকে সামনের জল থৈথৈ বিস্তীর্ণ এলাকাটিকেই নদী মনে হচ্ছে। যদিও রেজা জানেন, এটিও বর্ষার তৈরি একটি বিভ্রম। ছোট নদী উপচে বর্ষার জলে প্লাবিত হয়েছে দু পাড়ের নিচু জমি, খানা খন্দ, জলাশয়ও। রেজা রাস্তার পশ্চিম পাশে জল ছুঁই ছুঁই প্রান্তে এসে দাঁড়ালেন। তারপর চিন্তিত ভঙ্গিতে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, লাশটাতো এখানটাতেই পাওয়া গেছে, তাই না শরিফুল?
শরিফুল হাত তুলে খানিক বাঁয়ে ইশারা করে বলল, ওইখানে স্যার।
রেজা পশ্চিম দিকে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া সরু পথটার মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন। পথের গা ঘেঁষেই লতিফুর রহমানের বাড়ির দক্ষিণ দিকের সীমানাপ্রাচীর। তিনি সেই সীমানা প্রাচীরের দিকে মুহূর্তকাল তাকিয়ে থেকে আবার চোখ ফেরালেন তার সামনের বিস্তৃত জলরাশির দিকে। তারপর বললেন, কী মনে হয়, খুনটা কী পানিতেই হয়েছে, নাকি খুন করার পর লাশ পানিতে ফেলা হয়েছে?
শরিফুল চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, খুন করে এতদূর লাশ নিয়ে আসাটা রিস্কি না স্যার? আমারতো মনে হয় নদীতেই খুনটা হয়েছে।
রেজা বললেন, হুম।
শরিফুল বলল, ওইটাই সহজ। নৌকায় করে রাইতের বেলা বন্ধুবান্ধব ঘুরতে বের হইছে, বাকিরা বিষয়টা আগে থেকেই জানত। আচমকা তিন-চাইরজন মিলে ধরে…।
রেজা কথার মাঝখানে শরিফুলকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার কেন মনে হলো, বন্ধু-বান্ধব মিলে খুন করেছে? অন্য কেউওতো করতে পারে?
তা পারে। কিন্তু স্যার শরীরের আর কোথাও কিন্তু কোনো জখম নাই, আঘাতও নাই। তারপরও চিন্তা করে দেখেন, যেভাবে গলায় তার পেঁচিয়ে মারা হয়েছে, সে আগে থেকে ধারণাই করতে পারে নাই বিষয়টা। ঘটনা ঘটেছে একদম অপ্রস্তুত অবস্থায়। আচমকা।
এগুলো চিন্তা করে বের করেছো? রেজা মৃদু হাসলেন।
জি না স্যার। এমনি এমনিই মাথায় আসছে। আপনার কাছে বলতে ভালো লাগে।
আচ্ছা, কিন্তু শরিফ, যদি নদীর মাঝখানেই সে খুন হয়, তাহলে লাশ এখানে পাওয়া যাবে কেন?
নদীর যা স্রোত, ভাইসা চলে আসছে স্যার।
অত গভীর নদী থেকে এই তীরের অগভীর কোমর পানিতে ভেসে আসাটা কী স্বাভাবিক?
অস্বাভাবিকের কী হইল? এমনতো কতই হয়?
হ্যাঁ, হয়। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে লাশটা ভাসমান থাকে। এখানে লাশটা কিন্তু ডুবন্ত ছিল। ডুবন্ত লাশ নদীর ভেতর থেকে এখানে উঠে আসার কথা না।
তাইলে কী স্যার লাশটা এইখানেই ফালানো হয়েছে? শরিফুল আচমকা প্রশ্নটা করেই চুপ করে গেল, আবারো ভুল কিছু বলে ফেলেনিতো! কিন্তু রেজা তার কথাই সমর্থন করলেন, ঠিক! আমার ধারণা এটাই হয়েছে। খুনটা নদীতে হয়নি। খুন হয়েছে ডাঙায় এবং খুন করার পর লাশ এখানে ফেলে রাখা হয়েছে।
কিন্তু স্যার, তাহলে তো লাশ সবার চোখে পড়ে যাওয়ার কথা। অবশ্য ভারি কিছুতে বেঁধে ডুবাই দিয়া থাকলে ভিন্ন কথা!
একদম! কিন্তু সমস্যা হচ্ছে জেলেরা লাশের বা লাশের বস্তার সঙ্গে ভারী কিছু পায় নি, যা দিয়ে লাশটাকে ডুবিয়ে দেয়া হতে পারে।
তাহলে?
রেজা সামান্য চুপ করে থেকে বললেন, হতে পারে লাশটা যখন এখানে ফেলা হয়েছিল, তখন সেটির অবস্থা এমন ছিল যে, কোনোকিছু ছাড়াই সেটি আপনা আপনিই পানিতে ডুবে গেছে।
তার মানে খুন করার অনেক দিন পর পচা গলা লাশ ফালানো হইছে?
হুম, হতে পারে। হয়তো লাশটা যখন এখানে ফেলা হয়েছে, তখন সেটি পচা গলা অবস্থায়ই ছিল। তার মানে খুন করার দিন কয়েক পরে লাশটা এনে এখানে ফেলা হয়েছে!
কিন্তু এত রিস্ক নিয়া কেউ এইখানে কেন ফেলে রাখবে? রিস্ক যখন নিয়েছেই, সেতো তাহলে লাশটা মাঝ নদীতেই ফেলতে পারত, তাই না? সেইটাইতো সবচেয়ে সেফ হতো তার জন্য?
প্রশ্ন এটাই। তার মানে খুনটা যে করেছে, সে সময়মতো লাশটা সরাতে পারেনি। পরে তাড়াহুড়া করে কোনোমতে ফেলে গেছে।
কিন্তু স্যার এইখানেই কেন ফেলে যাবে?
রেজা খানিক চুপ করে থেকে বললেন, এক্ষেত্রে দুই ধরনের ঘটনা ঘটে। এক, অপরাধী তার কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে চায় ঘটনা বা প্রমাণ। যাতে কোনোভাবেই তাকে সন্দেহ করা না যায়। দুই, সময় এবং সুযোগের অভাবে অপরাধী প্রমাণটা তার কাছাকাছি রাখতে বাধ্য হয়। সেক্ষেত্রে হয় খুনটা যেখানে হয়েছে, বা যে খুন করেছে, তার কাছ থেকে এই জায়গাটা অনেক বেশি দূর। অথবা একদম কাছে।
শেষের কথাটা বলার সময় রেজা আচমকা লতিফুর রহমানের বাড়ির দিকে তাকালেন। তার কপালে একটা চিন্তার রেখা মুহূর্তের জন্য উঁকি দিয়ে আবার উধাও হয়ে গেল। শরিফুল বলল, স্যার, আপনার কি মনে হচ্ছে, কাছে না দূরে?
রেজা আনমনা ভঙ্গিতে বললেন, এটাইতো প্রফেসর সাহেবের বাড়ি, তাই না?
জি স্যার।
এই বাড়িতে কে কে থাকে, জানো?
উনার স্ত্রী, একটা কাজের মেয়ে আর উনি।
আর কেউ না?
না স্যার।
আচ্ছা, আমি একটু এই বাড়িটাতে যেতে চাই।
কখন স্যার?
এখুনি।
.
লতিফুর রহমানের শরীর এখন অনেকটাই সুস্থ। তবে এ কদিন আর মসজিদে নামাজ পড়তে যাননি তিনি, বাড়িতেই পড়েছেন। আজও নামাজ পড়ে বিছানায় শুয়েছিলেন। খানিক তন্দ্রামতোও লেগে এসেছিল। এই মুহূর্তে আতঙ্কিত ভঙ্গিতে ছুটে এলো দারোয়ান এনায়েত। সে এসে লতিফুর রহমানকে ঘুম থেকে ডেকে ওঠাল, খালুজান, পুলিশ আইছে, পুলিশ।
লতিফুর রহমান ধীরে-সুস্থে উঠে বসলেন। খুব একটা তাড়াহুড়া করলেন না, যেন পুলিশ আসবে এটি তিনি আগে থেকেই জানতেন! জানালার পর্দা ফাঁক করে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে নিচে। তাদের দেখে পুলিশ বলে মনে হচ্ছে না। পুলিশ হলেও তারা আছে সাদা পোশাকে। তিনি এনায়েতের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই বুঝলি কিভাবে এরা পুলিশ?
বাড়িতে ঢুকতে চাইল, আমি বললাম, পরিচয় দেন আগে। তখনই বলল, আমরা পুলিশ।
লতিফুর রহমান ঘরের দরজা খুলে দিলেন। একটা ক্র্যাচে সামান্য ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। রেজা সালাম দিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তারপর বসতে বসতে বললেন, সরি স্যার, এত ভোরে আপনাকে বিরক্ত করছি।
লতিফুর রহমান হেসে বললেন, না না। বিরক্ত কিসের?
ঘুমাচ্ছিলেন নিশ্চয়ই?
অবসর মানুষ, সারাদিনতো ওই শুয়ে-বসেই থাকি। বাড়িতেও তেমন লোকজন নেই। কেউ এলে বরং একটু গল্পগুজব করা যায়।
এত বড় বাড়ি, ভাড়া দিলেওতো পারেন। লোকজনও পেতেন কথা বলার।
এখনোতো পুরোপুরি কাজ শেষ হয়নি। আবার কাজ শেষ করার মতো টাকা পয়সাও এই মুহূর্তে হাতে নেই। কত কষ্টে যে এইটুকু করেছি, না দেখলে বোঝা যাবে না। গত একটা বছর, আমি নিজেও যেন মিস্ত্রিদের সঙ্গে থেকে থেকে তাদের কাজ শিখে-টিখে তাদের মতো মিস্ত্রিই হয়ে গেছি। হা হা হা। কত কাজ যে আমি নিজেই করেছি, আপনি দেখলে অবাক হয়ে যাবেন! এখন ভাড়া দিতে হলেওতো অন্তত মোটামুটি একটা থাকার মতো ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু আপনিতো আরো আগেই টু লেটও লাগিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, তা লাগিয়েছিলাম।
কিন্তু আজতো সেটা দেখলাম না। আমিতো আরো ভাবলাম, সব ঘর ভাড়া হয়ে গেছে বলে হয়তো সরিয়ে ফেলেছেন।
লতিফুর রহমান হাসলেন, না না, তা নয়। আসলে মনমতো ভাড়াটে পাচ্ছিলাম না বলে সরিয়ে ফেলেছি। যারা আসছিল, তাদের আমার পছন্দ হচ্ছিল না, আবার আমার যাদের পছন্দ হচ্ছিল, তাদের বাসা পছন্দ হচ্ছিল না। এই জন্য ভাবলাম, আস্তে আস্তে হলেও ঘরগুলো পুরোপুরি কমপ্লিট না করা পর্যন্ত আর ভাড়াটে খুঁজব না। তাই নোটিশটাও সরিয়ে দিলাম। রোজ রোজ শুধু শুধু লোকজনের যন্ত্রণা।
এলাকায় এখন ভাড়া বাসারতো খুব চাহিদা, তাই না?
তা আছে। শহর বাড়ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে। মানুষতো আসবেই। তবে ভালো ভাড়াটে পাওয়া খুব মুশকিল বুঝলেন?
ভালো ভাড়াটে কেমন?
মানে ধরেন শিক্ষিত, ছোট, নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার। ফাইন্যান্সিয়ালি সলভেন্ট। সারাজীবনের সঞ্চয়ের এই বাড়ি। ভাড়া দিতে কষ্টও লাগে। কিন্তু কী করব বলুন, উপায়তো নেই! ভেবেছিলাম, ভালো কিছু ভাড়াটে পেলে, অগ্রিম বাবদ কিছু টাকা নিয়ে বাকি কাজগুলো শেষ করব। কিন্তু তেমন ভাড়াটে আর পেলাম কই? এজন্যই একটু দেখে-শুনেই দিতে চাই।
তা অবশ্য ঠিক। এখন কি তাহলে পুরো বাড়িই ফাঁকা?
তা একরকম ফাঁকাই।
.
রেজা কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন। শরিফুল বলল, কিছুই বুঝলাম না স্যার।
কী বুঝলে না?
প্রফেসর সাবের বাড়িতে আসলেন কেন?
দেখা করতে এলাম। বয়সতো কম হলো না শরিফুল, এবার বিয়ে শাদিতো করতে হবে। তা বৌ নিয়ে এসে কই রাখব? তোমাদের ওই ভাঙা থানায়?
এইখানে বাসা ভাড়া নেবেন?
নিতেওতো পারি। অবশ্য প্রফেসর সাহেব দেবেন কি না, সেটা একটা প্রশ্ন।
দেবেন না কেন?
ওই যে বললেন যাদের বাসা পছন্দ হয়, তাদের প্রফেসর সাহেবের পছন্দ হয় না, আবার যাদেরকে প্রফেসর সাহেব পছন্দ করেন, তাদের বাসা পছন্দ হয় না।
আপনার কোনটা স্যার?
আমিতো বাসাই দেখতে পারলাম না। বুঝব কি করে পছন্দ হলো কি না?
শরিফুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কোন একটা ঝামেলা আছে স্যার, আপনি আমার কাছে গোপন করতেছেন?
তেমন সিরিয়াস কিছু না। পুলিশের এই এক সমস্যা বুঝলে, সব কিছুতেই সন্দেহ করে।
এইখানে সন্দেহ করার কী দেখলেন?
রেজা ফস করে সিগারেট ধরিয়ে এক গাল ধোয়া ছেড়ে বললেন, হঠাৎ করেই উনি টু লেটটা সরিয়ে ফেললেন কেন, সেটাই বুঝলাম না। উনি বললেন, ঘরের অনেক কাজই এখনো বাকি। আবার সেগুলো করার মতো পয়সাও ওনার হাতে নেই। তো এমন অবস্থায় যেকোনো বুদ্ধিমান মানুষই যেটি করবে, তা হলো যেকোনো উপায়ে বাসা ভাড়া দিয়ে সেই টাকায় আগে বাকি কাজগুলো শেষ করবে। কিন্তু উনি করলেন উল্টোটা, হঠাৎ করেই টু লেট সরিয়ে দিলেন। এবং…?
এবং কী?
ঠিক এই ঘটনার সময়টাতেই। ভুলে গেলে চলবে না, লাশটা কিন্তু উনার বাড়ির পাশেই পাওয়া গেছে। অতি সতর্ক হতে গিয়ে মানুষ অনেক অস্বাভাবিক আচরণ করে।
কিন্তু স্যার, প্রফেসর সাব এইসবের লোক না। তারে এই অঞ্চলের সবাই চেনে।
রেজা এবার আর জবাব দিলেন না। তার পকেটে ফোন বাজছে। নিশ্চয়ই এএসপি সাহেব ফোন দিয়েছেন। তিনি বিরক্ত মুখে পকেট থেকে ফোন বের করলেন। ফোন করেছেন তার মা রেহানা আখতার। রেজা ফোনটা ধরলেন না।
.
০৫.
চুন্নু মিয়া থানায় এসেছেন লোকজন নিয়ে। তার সঙ্গে রয়েছে তার সার্বক্ষণিক ছায়াসঙ্গী সোহরাব মোল্লাও। সোহরাব মোল্লা দেহরক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে চুমু মিয়ার পেছনে। চুন্নু মিয়া কথা বলছেন উত্তপ্ত ভঙ্গিতে, কী শুরু করছেন আপনারা? কী শুরু করেছেন? যে খুন করছে তার কোনো খবর নাই, মাঝখান থেকে নিরীহ লোকজনকে হয়রানি করা শুরু করছেন?
রেজা বললেন, আপনি একটু শান্ত হয়ে বসুন চেয়ারম্যান সাহেব।
শান্ত হয়ে বসব মানে? আমার ভাগ্নেকে খুন করা হলো, সেই খুনি আর তার লোকজন এখন আমার চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, আর আপনি আমাকে বলছেন শান্ত হয়ে থাকতে?
আমাদেরতো একটু সময় দিতে হবে। আর আপনিতো ভালো করেই জানেন, চাইলেই আমরা যখন খুশি যাকে গ্রেপ্তার করতে পারি না। আমাদেরওতো অনেক জায়গায় হাত-পা বাঁধা থাকে, এটুকুতো বোঝেন?
চুন্নু মিয়া আবারও উত্তেজিত গলায় কিছু বলতে চাইছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন, আমার একটা মাত্র ভাগ্নে, ছোট থাকতে বাবা মারা গেছে ছেলেটার। ওর জন্যই বোনটা আর বিয়ে-শাদিও করে নাই। সেই ছেলেটার…।
তিনি কথা শেষ করতে পারলেন না। ক্রোধে কিংবা কান্নায় তার গলা আটকে এলো। তিনি চাপা কিন্তু ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, দল আমাকে মামলা করার অনুমতি দেয়নি, তারা চায় আগে প্রমাণ। অযথা হয়রানি হোক এটা তারা চাচ্ছে না। কিন্তু আপনি বলেন, আপনি জানেন না, খুনটা কে করছে? জানেন না?
না, চেয়ারম্যান সাহেব। আমি সত্যিই জানি না।
আমি জানি। আমি জানি, কে খুন করছে, কেন খুন করছে? শুধু আমি না, সবাই ই জানে।
আমার ধারণা আপনিও জানেন না।
চুন্নু মিয়া এবার রীতিমতো চটে গেলেন, অবশ্যই জানি। গোলাম মাওলা, সে আমার ভাগ্নেকে খুন করেছে। সে…। সে আমাকে ভয় দেখাতে চেয়েছে, আমি যাতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই। আমার কাছে প্রমাণ আছে।
কী প্রমাণ আছে?
সে নিজে এক মিটিংয়ে বলেছে, আমি যেন সামনের বার নমিনেশন নিতে মুভ করি। আমাকে থ্রেটও করেছে সে। বলেছে, আমি যদি উল্টাপাল্টা কিছু করি, তাহলে আমার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। এমন ক্ষতি হবে, যা আমি চিন্তাও করতে পারব না।
তিনি এমন কিছু বলে থাকলে সেটা অবশ্যই আমরা খতিয়ে দেখব। কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব, এমন কথা আপনারা পলিটিক্যাল লিডাররা একে অন্যকে অহরহ বলেন। সবকিছু যে করে দেখানোর জন্য বলেন বা চিন্তা-ভাবনা করে বলেন, তা কিন্তু না।
আপনি কিন্তু এখন জোর করে তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছেন। আপনি বলেন, সে ছাড়া এই কাজ আর কে করবে? আমার ভাগ্নেকে খুন করার সাহস এই এলাকায় আর কার আছে? সে ছাড়া আর কার বুকের পাটা এত বড়? আমার ভাগ্নে আর কার কোনো ক্ষতি করছে? আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি, হি ইজ দ্যা মার্ডারার। দল বলুক আর না বলুক, আমি মামলা করব। আই উইল ফাইল আ মার্ডার কেস এগেইনস্ট হিম। দিস ইজ ফাইনাল।
তাতেও খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হচ্ছে না।
লাভ হবে না মানে?
আপনি ইমোশনালি কথা বলছেন। একটু লজিক্যালি চিন্তা করেন, সামনে ইলেকশন, আপনাদের দুজনেরই দল থেকে নমিনেশন পাওয়ার সুযোগ আছে। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্য যে এবার নমিনেশন পাওয়ার সম্ভাবনা মাওলা সাহেবেরই একটু বেশি। তার ফিল্ডও ভালো। একজন বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে, এই মুহূর্তে এত বড় একটা ভুল তিনি করবেন? আপনিই বলেন?
এখানে ভুলের কী দেখলেন?
রেজা বেল টিপে চা আনালেন। তারপর পিরিচে চা ঢালতে ঢালতে বললেন, আপনি ভালো করেই জানেন, এই ঘটনা ঘটলে উল্টো সব পাবলিক সিম্প্যাথি চলে যাবে আপনার দিকে, দলও আপনার প্রতিই সিম্প্যাথাইজড হয়ে পড়বে। এবং ঘটনা যে-ই ঘটাক, দোষটা শেষ পর্যন্ত আপনার প্রধান প্রতিপক্ষের ঘাড়েই পড়বে। আর যদি না-ও পড়ে, তারপরও আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে দোষটা তার ঘাড়ই চাপানোর। এই সুযোগটা অন্তত আপনি হাতছাড়া করতে চাইবেন না…।
দিয়াশলাইয়ের কাঠিতে আগুন ধরার মতো ফস করে জ্বলে উঠলেন চুন্নু মিয়া, তার মানে আপনি কী বলতে চাইছেন?
আমি বলতে চাইছি আপনি শান্ত হোন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। ওপর মহল থেকেও এর একটা সুষ্ঠু তদন্ত চাইছে। কোনো ধরনের ভুল ভ্রান্তি হোক, এটা তারা চাইছেন না। এখন আপনি যদি কোনো পার্টিকুলার ব্যক্তির বিরুদ্ধে দোষ চাপানোর জন্য এত তাড়াহুড়া করেন, তাহলে বিষয়টি কিন্তু
অন্যদিকে যায়।
অন্যদিকে যায় মানে? পুলিশ খুব খারাপ বুঝলেন? তাদের নানা রকম সন্দেহ হয়। আর উদ্ভট উদ্ভট সব অপরাধ দেখতে দেখতে আমাদের এখন আর কাউকেই বিশ্বাস হয় না। স্বার্থের জন্য মানুষ করতে পারে না, এমন কোনো কাজ নেই!
আপনার ধারণা আমি আমার ভাগ্নেকে খুন করেছি? আমি? নিজের ভাগ্নেকে নিজে খুন করেছি অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর জন্য? নির্বাচনে জেতার জন্য? নমিশেন পাওয়ার জন্য? আপনার কি মাথা ঠিক আছে? আপনি কি বুঝতে পারছেন, আপনি কার সামনে বসে কি কথা বলছেন? আমার সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে? আছে কোনো ধারণা?
রেজা জবাব দিলেন না। তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে পিরিচে চুমুক দিয়ে চা খাচ্ছেন। আজ তার গোঁফজোড়া সুন্দর করে ছাটা। চা খেতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না তার।
চুন্নু মিয়া ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন, আপনার ব্যবস্থা আমি করব ইন্সপেক্টার সাব। তলে তলে যে আপনি গোলাম মাওলার লোক, তাতো আমি এতদিন বুঝি নাই। কত টাকা খেয়েছেন তার কাছ থেকে? বলেন, কত?
রেজা এবারও জবাব দিলেন না। তিনি চা খাওয়া শেষে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কাপ-পিরিচ সরিয়ে রাখলেন পাশে। তারপর মৃদু হেসে বললেন, তারটা জেনে লাভ কী? আপনি কত দিতে পারবেন সেটা বলেন?
০৬-১০. গোলাম মাওলা ধীর-স্থির মানুষ
গোলাম মাওলা ধীর-স্থির মানুষ। কঠিন বিপদেও মেজাজ হারান না। শান্ত গলায়, হাসিমুখে কথা বলেন। এই কারণেই খুব দ্রুত তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি যে রাজনীতির সঙ্গে খুব বেশিদিন যুক্ত, তাও না। বরং তার জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ইতালিতে। খুব অল্প বয়সেই শ্রমিক হিসেবে ইতালিতে চলে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন প্রায় বছর কুড়ি পর। এই কুড়ি বছরে তিনি তার ভাগ্য ফিরিয়েছেন। ইতালিতে নিজের একাধিক রেস্টুরেন্ট হয়েছে তার। হয়েছে নানা ধরনের ব্যবসাও। এই ব্যবসা দেখাশোনার জন্য একে একে ছোট তিন ভাইকেও তিনি ইতালি নিয়ে গেছেন। তারা ব্যবসাটা বুঝে উঠতেই বেশ কবছর হয় দেশে ফিরে এসেছেন গোলাম মাওলা। এসে ইট-বালির ব্যবসা শুরু করেছেন গ্রামে। যদিও অর্থ তার যথেষ্টই হয়েছে, এখন দরকার সামাজিক সম্মান, পরিচিতি। সেই লক্ষ্যেই রাজনীতিতে নেমেছিলেন তিনি। দু হাতে টাকাও খরচ করেছেন।
বন্যা, খরা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত মানুষের দিকে সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। সঙ্গে বাড়িয়েছেন তাঁর স্বপ্নের জালও। যাদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন, মাত্র কয়েক বছরেই তাদের অনেককেই রাজনীতি থেকে ঝেরে ফেলেছেন গোলাম মাওলা। খুব দ্রুতই ওপর মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তার এই হঠাৎ উত্থান অনেকে মেনে নিতে না পারলেও সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি কেউই। একমাত্র ব্যতিক্রম চুন্নু মিয়া। গোলাম মাওলার কঠিন প্রতিপক্ষ। এই দুজনই জানেন, মুহূর্তের সুযোগে একজন আরেকজন ছিটকে ফেলে দেবেন খেলার মাঠ থেকে।
.
গোলাম মাওলা চুপচাপ বসে আছেন বারান্দায়। তাঁর সামনে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সবুর। সবুরের দশাসই শরীর। বিশাল বুকের ছাতি। সেই তুলনায় তার মাথা ছোট। চোখ দুটোও সরু, তাকায় পিটপিট করে। জগতে কাউকে যদি সে ভয় পায়, তবে তা তার সামনে থাকা ওই হাসি-খুশি চেহারার ছোটখাটো মানুষটাকে। গোলাম মাওলা বললেন, আর কি কি বলেছেন চুন্নু ভাই?
অনেক কিছু বলছে ভাই। সব আপনেরে বলন যাইত না।
কেন?
আপনে শুনলে কষ্ট পাইবেন।
যা শুনলে আমি কষ্ট পাব, সেগুলো আমাকে সবার আগে বলতে হবে। কেন বলতে হবে জানিস?
কেন?
তাহলে আমি বুঝতে পারব, আমার দুর্বলতাগুলা কী? কীসে কীসে আমি আঘাত পাই। আঘাতের বিষয় না জানলে শক্ত হওয়াও যায় না, বুঝেছিস?
জি ভাই, বুঝেছি।
বল।
আপনার নামে অনেক আজেবাজে কথা বলছে। বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজও করছে। আর বলছে, আপনে যে এই খুন করছেন, সেই প্রমাণ নাকি তার কাছে আছে।
আর?
সে নাকি আপনের নামে মামলা করব। মার্ডার কেসের মামলা।
গোলাম মাওলা কোনো কথা বললেন না। সবুরই বলল, এখন কি করবেন ভাই?
কোন বিষয়ে?
সে যদি মামলা করে?
মামলা করলে আর কী? জেলে যেতে হবে।
কিন্তু ভাই বিনা দোষে আমরা জেলে যাব কেন?
বিনা দোষে যাব কে বলল?
খুনতো আমরা করি নাই।
তাহলে কে করেছে?
এই প্রশ্নে সবুর থতমত খেয়ে গেল, বুঝলাম না ভাই।
আমরা না করলে তার ভাগ্নেরে খুনটা করল কে?
সবুর কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে হতবুদ্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। গোলাম মাওলা বললেন, এই এলাকায় চুন্নু ভাইয়ের ভাগ্নেরে যদি কেউ খুন করতে পারে, তবে তা একমাত্র আমরাই। আমরা ছাড়া এই কাজ করার সাহস আর কে করবে?
সবুর এবারেও জবাব দিল না। গোলাম মাওলা বললেন, আর যদি আমরাও না করে থাকি, তাহলেতো বিরাট চিন্তার বিষয়। চিন্তার বিষয় না?
জে ভাই। শুধু শরীর থাকলেই হবে না সবুর। মাথাও থাকতে হবে। মাথা খাটা। মাথা খাটালে এই শহর অন্যের হয়ে যেতে সময় লাগবে না।
জে ভাই।
দুনিয়ার সব বড় শহর হচ্ছে নদীর পারে। নদী মানেই জীবন, সম্ভাবনা। এই যে শহর, এই শহর গত কয়েক বছরে কেমনে পাল্টে গেল দেখেছিস?
জে ভাই।
এখনোতো আসল পাল্টানো শুরুই হয় নাই। আসল শুরু হবে সামনে। দেখেছিস, কত বড় বড় ব্যাংক, বীমা, নানা কোম্পানির ডিলার আসতেছে? মানে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে। আরো অনেকেই আসবে। খুব দ্রুতই বিশাল বড় শহর হবে এটা। তাই সাবধানে পা ফেলতে হবে, খুব সাবধানে।
.
গোলাম মাওলা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নুরু মিয়াকে ডাকলেন। নুরু মিয়া তার ইটের ভাটা আর বালির ব্যাবসাগুলো দেখে। সম্পর্কে গোলাম মাওলার চাচা হয় সে। কিন্তু বয়সে প্রায় সমান। তারা পরস্পরকে তুমি করে সম্বোধন করেন। নুরু মিয়ার চিমসানো গাল, থুতনিতো সামান্য দাড়ি। সে এসে দাঁড়াতেই গোলাম মাওলা শান্ত গলায় বললেন, হাতে কিন্তু সময় বেশি নাই, নুরু মিয়া।
নুরু মিয়া মিনমিন করে বললেন, আমি চেষ্টার কোনো ত্রুটি করতেছি না।
সারা জীবন পড়াশোনা করে পরীক্ষায় ফেল করলে কোনো লাভ নাই। চেষ্টা করতেছো, ভালো। কিন্তু ফল না দিলে চেষ্টার কিন্তু কোনো মূল্য থাকবে না।
বোঝোইতো, বিষয়টা কত সাবধানে করা লাগতেছে।
সেই জন্যইতো প্রেসার দিতেছি না। তবে খেয়াল রাইখো, লিখনের খুনের ঘটনায় কিন্তু আমরা বড়সড় রকমের ফাঁদে পড়ে গেছি।
মানে! সবুরের কথা তাহলে সত্যি?
কী কথা?
চুন্নু মিয়ার কাছে নাকি আমাদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আছে!
আরে ধুর, কীসের প্রমাণ থাকব? প্রমাণের কিছু নাই। কিন্তু সে যা চাইতেছে, তা সে আদায় করে নিতেছে। চেষ্টাও করতেছে জানপ্রাণ দিয়া। নির্বাচনের আগে আগে পাল্লাটা তার দিকে ভারী হয়ে গেল।
এখন?
এখন এই পাল্লা সমান করতে হবে।
বুঝছি।
তবে মাথা ঠাণ্ডা। তাড়াহুড়া করা যাবে না। মনে রাইখো, এখন তাড়াহুড়া মানেই ভুল।
জে, আচ্ছা।
খুব সাবধানে করবা যা করার। কিন্তু ব্যর্থ হওয়া যাইব না। বুঝলা?
হু।
এখন যাও। আমি দেখতেছি থানা-পুলিশের বিষয়টা নিয়ে কি করা যায়।
আচ্ছা।
.
গোলাম মাওলা শুয়ে পড়লেও তার ঘুম এলো না। লিখনের খুনের ঘটনা পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তিনি চিন্তিত। দলের নীতি নির্ধারক মহল থেকে এখনো তার প্রতি বিরূপ কোনো আচরণ তিনি পাননি। কিন্তু গত কয়েক বছরে চুন্নু মিয়ার প্রতি দলের ভেতরে ভেতরে যে একটা অনাস্থা তৈরি হচ্ছিল, সেটি যেন খানিকটা হলেও থমকে গেল। শুধু তা-ই না, দল হয়তো নির্বাচন নিয়ে নতুন করে ভাবতেও শুরু করবে। আর চুন্নু মিয়াও এই সুযোগ হেলায় হারানোর মানুষ না। দলের প্রভাবশালী এক নেতার সঙ্গে আজ তার কথাও হয়েছে। সেই নেতা আকারে ইঙ্গিতে গোলাম মাওলাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তারা লিখনের ঘটনায় একদমই সন্তুষ্ট না। এই ঘটনায় যে-ই জড়িত থাক, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি তারা নিশ্চিত করতে চান। কিন্তু দলের ভাবমূর্তির কথা চিন্তা করেই চুন্নু মিয়াকে তার বিরুদ্ধে মামলা করা থেকে আপাতত বিরত রাখা হয়েছে। তবে নির্বাচনের যত আগে সম্ভব, তারা এর একটা সুষ্ঠু, সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান চান। চুন্নু মিয়া দলের বহু পুরনো, পোড় খাওয়া নেতা, সুতরাং তার প্রতিও দলের একটা দায়িত্ব রয়েছে।
পরদিন বিকেলে থানায় গেলেন গোলাম মাওলা। তার সঙ্গে নুরু মিয়া ও সবুর। তারা দীর্ঘ সময় রেজার জন্য অপেক্ষা করলেন। রেজা জরুরি কাজে খুব ভোরে জেলা শহরে গিয়েছেন। তিনি ফিরলেন সন্ধ্যার আগে আগে। গোলাম মাওলাকে দেখে তিনি সালাম দিয়ে বললেন, ব্যাপার কী? এই মাসের বখরা নিয়ে একদম নিজে চলে আসলেন? প্রতি মাসেতো সবুর বা নুরু মিয়াকে দিয়ে পাঠান।
গোলাম মাওলা হাসলেন, এই মাসে বখরা দিতে না, নিতে আসছি।
পুলিশ বখরা দেয়, এই কথা শুনেছেন কোনোদিন?
কোনোদিন যা শুনিনি, তেমন কত কথাইতো আজকাল শুনি। এটাও না হয় শুনলাম।
আর কী কী শুনলেন এমন?
চুন্ন ভাই নাকি ইলেকশনের ফিল্ড নিজের দিকে নেয়ার জন্য নিজেই এই ঘটনা ঘটাইছে?
কোন ঘটনা?
লিখনের ঘটনা। ইলেকশনের জন্য নিজের আপন ভাগ্নেকে কেউ নিজে…।
কার কাছে শুনলেন এই কথা?
লোকজন হাটে-মাঠে ঘাটে বলাবলি করছে।
কার লোকজন? আপনার?
আমার লোকজন হবে কেন?
আপনার লোক না?
নাহ। এরা সাধারণ মানুষ।
আচ্ছা, তাহলে এমনই আরো কিছু সাধারণ মানুষ আছে, যারা হাটে-ঘাটে মাঠে বলে বেড়াচ্ছে যে এই খুন করিয়েছেন আপনি। তো এরা কারা?
এরা আবার কারা? এরা চুন্নু মিয়ার লোক। এগুলা অপপ্রচারের অংশ বুঝলেন? কথার ছলে মুখে মুখে মানুষের কানে মিথ্যা তথ্য পৌঁছে দেয়া। চুন্নু মিয়া তার লোকজনরে টাকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে এইসব ছড়াচ্ছে।
আর আপনি কী দিয়ে ছড়াচ্ছেন?
মানে?
মানে যারা হাটে-ঘাটে-মাঠে ছড়াচ্ছে যে চুন্নু মিয়া ইলেকশনের ফিল্ড নিজের দিকে নেয়ার জন্য নিজের ভাগ্নেকে নিজে খুন করেছে, তাদেরকে আপনি কি দিয়ে এগুলো বলাচ্ছেন? টাকা, না অন্য কিছু?
আমি বলাব কেন? তারা এমনি এমনিই বলছে।
রেজা চা-পুরির অর্ডার দিলেন। তারপর চায়ের কাপে পুরি ডুবিয়ে কামড় দিতে দিতে বললেন, এগুলো ছাড়েন বুঝলেন। দুজন মিলে যা শুরু করেছেন, তাতে মনে হচ্ছে খুনটা বুঝি দুইজন মিলেমিশেই করেছেন। এ ছাড়াতো কোনো হিসাব মিলাতে পারছি না।
রেজার কথা বলার ধরন দেখে গোলাম মাওলা কিছুটা দমে গেলেন। তিনি নিঃশব্দে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। রেজা হঠাৎ নুরু মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী খবর নুরু ভাই, আপনার ইটের ভাটাতো এবার শেষ। যে হারে পানি বাড়ছে নদীতে, এবারতো মনে হয় তুমুল বন্যা হবে।
তাতো মনে হয় হইবই।
তবে বন্যা হলেও একটা কারণে রক্ষা। চুন্নু ভাই নির্বাচন আসার আগেভাগেই একটা ভালো কাজ অন্তত করেছেন?
বন্যা রক্ষা বাঁধের কথা বলতেছেন? গোলাম মাওলা মাঝখান থেকে কথা বললেন।
হুম। এবার যদি ওই বন্যা রক্ষা বাঁধটা না থাকত তাহলে আশপাশের সব ফসলি জমি তলিয়ে যেত। লোকজন তাকে গালি দিক, অপছন্দ করুক, এই একটা কাজ কিন্তু তিনি ভালোই করেছেন।
এবার নুরু মিয়া কথা বলল, করছেন ভালো। কিন্তু এই বাঁধের জইন্য যেই পরিমাণ টাকা সরকারের বরাদ্দ ছিল, তার অর্ধেকও খরচ করছেন কিনা কে জানে! দেখেতো তা মনে হয় না। পানি আরেকটু বাড়লে কিন্তু বিপদই আছে।
সে দেখা যাক। এখনওতো মনে হচ্ছে, বাধটাই এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিবে।
ভালো হইলেই ভালো। তবে এই মেয়াদে নিজের পকেটও সে কম ভারী করে নাই।
রেজা গোলাম মাওলার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, এই দিক থেকে অবশ্য আপনি চেয়ারম্যান হলে ভালোই হয়, কী বলেন? আপনারতো আর টাকা-পয়সার দরকার নাই, আপনার দরকার ক্ষমতা, নাম, খ্যাতি।
নুরু মিয়া বলল, একবার হলেই দেখবেন, কেমন ধাই ধাই করে পলাশবাড়ির উন্নতি হয়। কিন্তু ভালো মানুষের ভালো কেউ সহ্য করতে পারে না। দেখেন না, এই জন্যই পেছনে কী পরিমাণ লোক লাগছে?
রেজা হাসলেন। গোলাম মাওলা আর তার মধ্যে আরো কিছুক্ষণ কথা হলো। থানা থেকে বের হতে গিয়েও গোলাম মাওলা আবার থমকে দাঁড়ালেন। তারপর বিগলিত হেসে পকেট থেকে একটা খাম বের করে রেজার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ভুলে গিয়েছিলাম রেজা সাব। এইখানে দুই মাসেরটা একসঙ্গে আছে।
রেজা বিনয়ী ভঙ্গিতে বললেন, সামনের মাসে বাড়ি যাব। এই সময়ে খামটা খুব দরকার ছিল, বুঝলেন? সঠিক সময়ে সঠিক কাজে আপনার কোনো জুড়ি নাই মাওলা ভাই।
.
০৭.
নতুন শহর হলেও রাত আটটা-নটার মধ্যেই ফাঁকা হয়ে যেতে থাকে পলাশবাড়ি। দোকানপাটও বেশির ভাগই বন্ধ হয়ে যায়। শুধু হারাধন মুচি আর মোবাশ্বেরের চায়ের দোকানটাতে তখনো আলো জ্বলে। হারাধন তার দুই কর্মচারীকে নিয়ে মাঝ রাত অবধি জুতা বানানোর কাজ করে। আর মোবাশ্বেরের চায়ের দোকানে সবসময় ভিড়ভাট্টা লেগেই থাকে। রাতে শরিফুলকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন রেজা। আকাশজুড়ে মেঘ করেছে বলে চারপাশে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। রেজা যখন মোবাশ্বেরের চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তখন প্রায় সব দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টির আশঙ্কায়ই সম্ভবত সবাই একটু আগেভাগে বাড়ি চলে গেছে। রেজা চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের কি অবস্থা মোবাশ্বের?
মোবাশ্বের হাতের গামছা দিয়ে দুধের ডেকচির ওপর পড়া মাছি তাড়াচ্ছিল, সে মুখ তুলে তাকিয়ে বলল, আল্লাহর রহমতে ভালোই চলতেছে ছার।
সামনেতো আরো ভালো চলবে, তাই না?
জে ছার, আশা করা যায়।
তোর দোকানের জায়গাটা কিন্তু ভালো হয়েছে। নতুন ব্যাংকটাও হলো ঠিক দোকানের পাশেই।
জে, ছার। এইটা একখান কাজের কাজ হইছে। ব্যাংকের সবাই এখন আমার বান্ধা কাস্টোমার।
শরিফুল বলল, দুপুরে ভাতের ব্যবস্থাও শুরু কর। অনেকেই এখনো পরিবার নিয়া আসতে পারে নাই। তোর এইখানে লাঞ্চ সাইরা নিতে পারব।
মোবাশ্বের দাঁত বের করে হাসল, এইটা একখান ভালো কথা বলছেন ছার। এই বুদ্ধিতো আগে মাথায় আসে নাই।
রেজা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, এইজন্য শরিফুলকে কমিশন দিস। এত ভালো বিজনেস আইডিয়া দিল, কমিশন না দিলে কিন্তু হবে না।
আইচ্ছা, দিমুনে।
চায়ের কাপ রেখে আরো একটা সিগারেট ধরালেন রেজা। প্রথম টানটা খুব আরাম করে দিলেন। তারপর কুণ্ডলি পাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন। ধোয়ার ছোট ছোট বৃত্ত দূরে ভেসে যেতে যেতে ক্রমশই মিলিয়ে যাচ্ছে। সেই মিলিয়ে যাওয়া বৃত্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন রেজা, যেন খুব জরুরি কিছু মনে পড়েছে! তাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে উঠে দাঁড়াল শরিফুলও। সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রেজার দিকে তাকাল। রেজা অবশ্য তাকে কিছু বললেন না। তিনি মোবাশ্বেরের দিকে তাকিয়ে বললেন, যাই রে মোবাশ্বের। ভাতের ব্যবসার কথা মাথায় রাখিস, মাঝে মাঝে আমিও এসে খাবো।
.
রেজা অন্ধকারে খানাখন্দ এড়িয়ে খুব সাবধানে হটছেন। হারাধনের দোকান, মসজিদ পেরিয়ে উত্তর দিকে মূল রাস্তার দিকে এগিয়ে গেলেন। রাতের নিস্তব্ধতায় হারাধনের দোকানের ভেতর থেকে একনাগাড়ে ঠোকাঠুকির শব্দ ভেসে আসছে। সম্ভবত নতুন কোনো জুতো বানাচ্ছে হারাধন। তার জুতা বানানোর হাত ভালো। তবে সে বানায় খুব অল্প। পরিমাণের চেয়ে মানের দিকে তার নজর বেশি। এই কারণেই তার বানানো এই হারাধন স্পেশাল জুতা স্যান্ডেলের খুব চাহিদা।
রেজা লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে তাল মেলাতে পারছে না শরিফুল। অনেকটা দূর গিয়ে সে হঠাৎ বলল, এত রাইতে এই দিকে আমরা কই যাইতেছি স্যার?
প্রফেসর সাহেবের বাড়ি।
এত রাতে সেই বাড়িতে কী? শরিফুল ভারি অবাক হলো।
এখনো জানি না, তবে আমার মনে হয় কোনো একটা ঘটনা আছে।
কী ঘটনা?
আমার ধারণা তাদের বাড়ির দারোয়ান ছেলেটাকে আমি কিছুক্ষণ আগে শহরে দেখেছি।
তাতে কী? শহরে আসা কী অন্যায় নাকি?
তা-না। ছেলেটা মাথায় করে কিছু একটা নিয়ে যাচ্ছিল। ভারী কিছু।
বুঝলাম না, স্যার। তাতে সমস্যা কি?
সমস্যা হয়তো কিছুই না, কিন্তু অনেক সময় হয় না, মন সতর্ক হয়ে যায়? তেমন একটা ফিলিংস হলো আমার। ইনফ্যাক্ট, প্রথমে ছেলেটাকে আমি চিনতেই পারিনি। সে অন্ধকারে হেঁটে যাচ্ছিল। মোবাশ্বেরের দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দোকানের লাইটের আলোতে মুহূর্তের জন্য তার মুখটা আমি দেখেছি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারিনি বলেই হয়তো আলাদা করে খেয়ালও করিনি। তবে মনের মধ্যে কি যেন একটা খচখচ করছিল। ছেলেটাকে যে আমি আগেও কোথাও দেখেছি, সেটাই সম্ভবত আমার ব্রেন মনে করিয়ে দিতে চাইছিল। তারপর আচমকা মনে পড়ে গেল। ছেলেটার মাথায় কী ছিল জানো?
কী?
আমার ধারণা জানালার গ্রিল। গ্রিল?
হুম।
তো, তাতে সমস্যা কী? এই দেশে রাতের বেলা জানালার গ্রিল কেনা-বেচা কি নিষিদ্ধ?
তা না। তবে কোথায় যেন একটা ঝামেলা আছে।
কী ঝামেলা?
সেটাইতো বুঝতে পারছি না। কিন্তু ঝামেলা একটা কিছু আছে।
তারা দুজন অনেকটা সময় পায়ে হেঁটে লতিফুর রহমানের বাড়ির সামনে এলেন। বাড়ির প্রধান গেট বন্ধ। অন্ধকারে সুনসান নিস্তব্ধ একটা বাড়ি। দেখলে কেমন গা ছমছমে একটা অনুভূতি হয়। রেজা হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দক্ষিণ দিকটায় চলে এলেন। এখানেই সেদিন ভোরে তারা দুজন এসেছিলেন। নদীর পানি আজ আরো বেড়েছে। এবার বন্যা না হয়ে যায়ই না। রাস্তা প্রায় ছুঁই ছুঁই হয়ে গেছে। পানি। রেজা সেখানে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ শিস দিয়ে উঠলেন, আমার ধারণা ঘটনা আমি বুঝতে পেরেছি।
শরিফুল বোকার মতো তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করল, কী বুঝতে পেরেছেন স্যার?
তিনি আঙুল তুলে তিনতলার একটা জানালার দিকে নির্দেশ করলেন, আমার ধারণা ওই জানালাটায় কোনো গ্রিল নেই। আর এই জন্যই লতিফুর রহমান দারোয়ান ছেলেটাকে দিয়ে গ্রিল আনতে পাঠিয়েছিলেন।
তো, গ্রিল না থাকলেতো গ্রিল আনতে পাঠাবেই! এতে এত আশ্চর্য হবার কী আছে স্যার?
জানালাটায় যে গ্রিল নেই, সেটি সম্ভবত আমি ওইদিন ভোরেই খেয়াল করে ছিলাম। কিন্তু ঠিকমতো ধরতে পারিনি। আজ ছেলেটাকে গ্রিল নিয়ে আসতে দেখার পর থেকেই ব্যাপারটা মাথায় ঘুরছিল। গ্রিলতো দিনের আলোতেই আনা যায়। এতরাতে অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে আনার কী দরকার?
শরিফুল এবার খানিক বিরক্তই হলো, এটা কোনো কথা বললেন স্যার? আপনে জোর করে প্রফেসর সাহেবকে দোষী বানাতে চাচ্ছেন। যে যার সুবিধা মতোইতো কাজ করবে, তাই না?
সেটাই। রাতের অন্ধকারে যেন কেউ না দেখতে পারে, সেটাও কিন্তু কারো সুবিধা হতে পারে। পারে না?
শরিফুল এবার আর জবাব দিল না। রেজার এমন আজগুবি এবং অতি সন্দেহবাতিকগ্রস্ত কথাবার্তা তার পছন্দ হচ্ছে না। বরং ক্ষেত্রবিশেষ বিরক্তই লাগছে।
রেজা বললেন, আবারও বলছি, মানুষ অতি সতর্ক হতে গিয়ে অনেক অস্বাভাবিক কাজ করে ফেলে। উনি যে সেদিন টু লেট’-টা সরিয়ে ফেলেছিলেন, হতে পারে সেটিও এমন অতিরিক্ত সতর্ক আচরণের ফল।
আপনি স্যার শুধু শুধু…।
হুম, শুধু শুধুও হতে পারে। হয়তো অযথাই সন্দেহ করছি, আজগুবি যোগসূত্র মেলাচ্ছি। তবে কথায় আছে না, যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখিবে তাই…?
শরিফুল এবার আর জবাব দিল না। রেজা বললেন, এক কাজ করলে কেমন হয়?
কী কাজ?
একটা বাজি ধরা যাক।
কীসের বাজি?
আমি একটা অনুমান করব। আমার অনুমান যদি সত্যি হয়, তুমি আমাকে পাঁচ শ টাকা দেবে। আর মিথ্যে হলে আমি তোমাকে এক হাজার টাকা দিব। ওকে?
শরিফুল কিছুক্ষণ ভেবে বলল, কি অনুমান?
আমার ধারণা, আজ গভীর রাতে প্রফেসর সাহেব একা একা জানালার গ্রিল লাগানোর চেষ্টা করবেন।
শরিফুল ভারি বিরক্ত হলো, উনি কেন জানালার গ্রিল লাগাবেন? উনি কী মিস্ত্রি নাকি? আর চাইলেই কি যে কেউ এই কাজ করতে পারবে?
উনি পারবেন। কেন তুমি শোনোনি, উনি সেদিন কি বললেন? মিস্ত্রিদের সঙ্গে থেকে থেকে উনি নিজেও রোজ কাজ করতেন। এটা-সেটা করে হেল্প করতেন। এমনকি এই বছরখানেকের কাজে অনেক কাজ উনি শিখেও গেছেন?
শরিফুল এবার আর কথা বলল না। চুপচাপ তিনতলার জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে রাজ্যের মশা। সেই মশার কামড় খেয়েই গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন রেজা আর শরিফুল। কিন্তু রেজার অনুমান ঠিক হলো না। রাতে লতিফুর রহমান গ্রিল লাগাতে এলেন না।
.
প্রায় ভোর রাতের দিকে তারা থানায় ফিরল। মশার কামড়ে হাত-পা ফুলে গেছে দুজনেরই। শরিফুল হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, স্যার টাকা।
রেজা বললেন, কিসের টাকা?।
বাজির এক হাজার টাকা।
রেজা হতাশ ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ শরিফুলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটা নোট বের করে শরিফুলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এই দিন দিন না, বুঝলে?
শরিফুল বত্রিশ দাঁত বের করে হাসল, বুঝব না কেন স্যার, বুঝেছি।
.
পরের সারাটা দিন থম ধরে বসে রইলেন রেজা। আপাতদৃষ্টিতে সহজ-সরল একটা ঘটনাকে তিনি কি খুব জটিল করে ফেলছেন? লতিফুর রহমানকে সন্দেহ করাটা কি পুরোপুরিই অযৌক্তিক? তিনি কি জোর করেই, বা নিজেকে নিজের কাছেই খুব তীক্ষ্ণ, আলাদা পুলিশ অফিসার হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছেন? রেজা নিজের ভেতরের এই দ্বন্দ্বটা সারা দিনেও তাড়াতে পারলেন না। বরং দুপুর নাগাদ তার মনে হলো, কেসটা মোটেই সহজ কোনো কেস নয়, তা এই খুনের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন!
সবচেয়ে সহজ হতে পারত যদি এই কেসের সঙ্গে গোলাম মাওলাকে সরাসরি অভিযুক্ত করা যেত। সেটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, সবচেয়ে যৌক্তিক বিষয় ছিল। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া সেটি সম্ভব নয়। অন্যদিকে, অস্বাভাবিক হলেও চুন্নু মিয়াকেও পুরোপুরি সন্দেহমুক্ত ভাবতে পারছেন না। তবে, যে বিষয়টি পুরো ঘটনাটিকে সবচেয়ে বেশি জটিল করে ফেলছে, তা হলো লতিফুর রহমানের প্রতি তার অনর্থক আগ্রহ। এই আগ্রহটি নিয়ে তিনি দ্বিধান্বিত, বিরক্ত। হয়তো এর কোনো যুক্তিসংগত কারণই নেই। কিন্তু রেজা এটিও জানেন, অপরাধ সবসময় সহজ, স্বাভাবিক, যৌক্তিক বা অনুমেয় পথেই ঘটেনা। ঘটে অননুমেয় পথেও।
এই দ্বিধা কাটাতেই পরদিন বিকেলে আবারো লতিফুর রহমানের বাড়ির দিকে গেলেন রেজা। কিন্তু পথে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল চুন্নু মিয়ার। বন্যার পানি এই একরাতেই আরো বেড়েছে। লতিফুর রহমানের বাড়ি থেকে শহরের দিকে আসার রাস্তাটা একটা জায়গায় সামান্য নিচু। সেই নিচু জায়গায় পানি উঠেছে। খবর পেয়ে চুন্নু মিয়া লোকজন নিয়ে রাস্তার অবস্থা দেখতে এসেছেন। নির্বাচনের আগে আগে এই রাস্তা, আর উত্তর দিকের বিস্তীর্ণ ফসলি জমির বন্যা রক্ষা বাঁধ নিয়ে তিনি ভীষণ চিন্তিত। এর কোনটা যদি এই বন্যায় ভেঙে যায় বা তলিয়ে যায়, তবে এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের যেমন সীমা থাকবে না, তেমনি নির্বাচনের আগেই পরাজয়েরও আর বাকি থাকবে না চুন্নু মিয়ার। আর সকলের মতো এই বাস্তবতা তিনি নিজেও জানেন।
রেজাকে দেখে চুন্নু মিয়া অবশ্য কথা বললেন না। সেদিনের পর থেকে রেজাকে তিনি এড়িয়ে চলছেন। তবে তার সঙ্গে থাকা সোহরাব মোল্লা এগিয়ে গিয়ে সালাম দিল, রাস্তা দেখতে আসছেন স্যার?
রেজার হয়ে জবাব দিল শরিফুল, আমরা রাস্তা দেখতে আসব কেন? রাস্তা দেখাতো আমাদের কাজ না।
সোহরাব মোল্লা বিব্রত ভঙ্গিতে হাসল, না না, সেইটা না, ভাবলাম খবর শুইনা আসছেন। চেয়ারম্যান সাব দুয়েকদিনের মইধ্যেই রাস্তার দুই পাশে ইট আর বালির বস্তা দিয়া উঁচু করার ব্যবস্থা নিতেছেন।
রেজা বললেন, বন্যার অবস্থাতো ভালো মনে হচ্ছে না। অপেক্ষা করার দরকার কী? গোলাম মাওলা সাহেবেরতো ইট বালির ব্যবসা আছে, ওখান থেকে কিছু বস্তা নিয়ে আসলেইতো হয়?
সোহরাব মোল্লা জিভ কেটে আঁতকে ওঠার ভঙ্গিতে বলল, এই কথা বইলেন না স্যার। চেয়ারম্যান সাব শুনলে মাইন্ড খাইব। গোলাম মাওলার কাছেরতন সে নিব ইট? জীবনেও না। চিন্তা কইরেন না, ইট-বালির ব্যবস্থা হইতেছে।
যা করার, তাড়াতাড়ি করেন, অবস্থা কিন্তু ভালো না।
সবই আল্লাহর ইচ্ছা। কথায় আছে না, আল্লাহর মাইর, আলমের বাইর?
তা অবশ্য ঠিক।
তা আপনেরা কই যাইতেছেন?
রেজার ইচ্ছে ছিল না বলে, কিন্তু পাশ থেকে শরিফুল ফট করে বলে বসলো, এই একটু প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে।
সেই বাড়িতে কী? দাওয়াত?
পুলিশের আবার দাওয়াত কী? তাদের কাজতো ওই একটাই…।
শরিফুল আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু রেজা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তেমন কিছু না, শরিফুলের সামনে বিয়ে। কিন্তু বিয়ের পর বউ নিয়ে আসলে তখন সে থাকবে কই? এইজন্যই তার জন্য বাসা ভাড়া দেখতে যাচ্ছি।
.
শরিফুল এবং সোহরাবকে আর কোনো কথা বলতে দিলেন না রেজা। তিনি এগিয়ে গেলেন সামনে। লতিফুর রহমানের বাড়ির গেটে এনায়েত বসা। সে লতিফুর রহমানকে খবর দিয়ে নিয়ে এলো। রেজা সালাম দিয়ে বললেন, আপনার জন্য একজন নিশ্চিন্ত ভাড়াটে আছে স্যার।
লতিফুর রহমান নিস্পৃহ গলায় বললেন, কে?
এই যে শরিফুল। খুব ভালো ছেলে। সে বিয়ে করবে সামনে, কিন্তু বউ নিয়ে এসে এখানে থাকবে কই? এইজন্যই বাসা খোঁজা। আর তখুনি আপনার বাসার কথা মনে পড়ল।
লতিফুর রহমান বিগলিত হাসলেন, সেটাতো শুভ সংবাদ। আর আমার বাড়িতে আপনাদের কেউ থাকা মানেতো আমিও নিশ্চিন্ত। একা এত বড় বাড়ি নিয়ে সবসময়ই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়তো সেই একটাই, ঘরগুলো এখনো থাকার মতো অবস্থায় নেই।
সেটা কোনো সমস্যা না। আমরা পুলিশের চাকরি করি। আরাম-আয়েশের জীবনতো আর নয়, সবকিছুতেই আমাদের অভ্যাস আছে।
শরিফুলকে একে একে নিচের ঘরগুলো দেখালেন লতিফুর রহমান। রেজা অবশ্য ওপরের ঘরগুলো দেখতে চাইলেন। ওপরের একটি ফ্ল্যাটের কাজই শেষ হয়েছে। বাকি অংশের ছাদ করা যায়নি বলে অসমাপ্ত। ঘরের দরজা খুলে প্রথমে ঢুকলেন লতিফুর রহমান। এ ঘরে জানালার আলো সেভাবে আসে না বলে ভেতরটা অন্ধকার। রেজা দেয়ালের সুইচ টিপে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাভ হলো না। লতিফুর রহমান বললেন, এখানে এখনো কারেন্টের লাইন লাগানো হয় নি।
রেজা পকেট থেকে টর্চ বের করে জ্বালালেন। সময় নিয়ে এটা-সেটা দেখলেন তিনি। তারপর ঢুকে গেলেন মূল বেড রুমে। বাথরুমের দরজাটাও খুলে দেখলেন, কোথাও সন্দেহ করার মতো কিছু খুঁজে পেলেন না। লতিফুর রহমান বললেন, বাথরুমের পানির লাইনও এখনো পুরোপুরি ঠিক হয় নি। কবে যে করতে পারব, তাও বুঝতে পারছি না।
রেজা বললেন, যেভাবে এত বড় বাড়ি করেছেন, সেভাবেই ধীরে ধীরে হয়ে যাবে। এত চিন্তা করবেন না। তারপর শরিফুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, থাকবে তুমি, তোমারই ভালো করে দেখে নেয়া উচিত। ওই দিকের জানালার পর্দাটা সরিয়ে জানালা খুলে দাও, আলো আসবে।
শরিফুল জানালার পর্দা সরিয়ে জানালা খুলে দিল। বিকেলের বিষণ্ণ আলোয় অন্ধকার ঘরটা মুহূর্তেই কেমন অন্যরকম হয়ে গেল। রেজা সেই অন্যরকম আলোয় জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে বিস্তীর্ণ জলরাশি। দূরে নির্জিব ইটের ভাটা। ফুরফুরে হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে ধানের ডগা। তিনি দীর্ঘসময় বাইরে তাকিয়ে রইলেন। লতিফুর রহমান বললেন, এই ঘটরটাই যা একটু ভালো, কিন্তু ওই যে, ইলেক্ট্রিসিটি, পানি, বাথরুমের সমস্যা। ওই সমস্যাগুলো না থাকলে থাকার জন্য এটা বেশ ভালোই হতো।
রেজা বললেন, হ্যাঁ, জানালাগুলোও বেশ বড়োসড়ো, আলো-হাওয়াটাও বেশ খেলবে।
আমার একটু বড় জানালাই পছন্দ। সেদিন দেখেননি, নিজের ঘরে দেয়ালজোড়া জানালা করেছি!
হ্যাঁ, তা দেখেছি। বলতে বলতে একহাতে গ্রিলের নিচের দিকটা ধরলেন রেজা। তারপর বললেন, কিন্তু স্যার, এই জানালার গ্রিলটা কী আলাদা লাগানো নাকি? দেখে মনে হচ্ছে নতুন লাগানো?
লতিফুর রহমান তখন বাথরুমের দরজাটা আটকাচ্ছিলেন। তিনি ঘুরে তাকালেন, যেন ঠিকমতো বুঝতে পারেননি রেজার কথা। জিজ্ঞেস করলেন, কোন জানালা?
এই যে এটা। নিচের ওয়াল দেখে মনে হচ্ছে দুয়েকদিন আগে কেবল জানালাটা লাগানো হয়েছে, রংও করা হয়নি। অথচ অন্য সব জানালার গ্রিলেই রঙ করা।
লতিফুর রহমান হাসলেন, ওই যে বললাম, রোজ একটু একটু করে বাড়িটা গড়েছি। এখনো গড়ছি। একসঙ্গেতো সব করার ক্ষমতা নেই। আজ এই গ্রিল করছি, কাল ওই দরজা করছি, এভাবেই চলছে।
রেজা অবশ্য জবাব দিলেন না। তিনি আরো খানিক ঘোরাঘুরি করে নিচে নেমে এলেন।
.
রাতে শরিফুলকে নিয়ে হাঁটতে বের হলেন রেজা। শরিফুল বলল, এবার বুঝলেনতো স্যার, আপনি শুধু শুধু সন্দেহ করতেছিলেন?
শুধু শুধু কীভাবে?
স্যারতো বললেনই কেন তিনি আলাদা গ্রিল লাগিয়েছেন। গ্রিলে কি সমস্যা, সেটাইতো বুঝতে পারতেছি না।
আমিও বুঝতে পারছি না।
তাহলে?
তাহলেও প্রশ্ন আছে। আচ্ছা ধরো, যেই ঘরে ইলেক্ট্রিসিটি নেই, বাথরুমে পানি নেই, এমনকি এর আগে কেউ কখনো সেই ঘরে থাকেনি, তেমন একটা ঘরে জানালায় পর্দা থাকা অস্বাভাবিক কী না? ধরে নিলাম জানালায় পর্দা থাকাটা অস্বভাবিক না, স্বাভাবিকই, কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে সব জানালাতেই পর্দা থাকার কথা। বাট দ্যা ফ্যাক্ট ইজ, সব জানালাতে কিন্তু পর্দা ছিল না। পর্দা ছিল ওই একটিমাত্র জানালাতেই। ঘটনা কী?
শরিফুল ঝট করে তাকাল, এটা সে খেয়াল করেনি। রেজা বললেন, এবং সেই জানালাটাতেও গ্রিল লাগানো হয়েছে নতুন। সেই গ্রিল নিয়ে আসা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে, যেন কেউ না দেখতে পারে এমনভাবে। বিষয়টি কী এমন যে কোনো কারণে এই জানালার গ্রিল কেটে ফেলা হয়েছিল? এবং সেটি যাতে বাইরে থেকে না বোঝা যায়, এইজন্যই আলাদা পর্দা লাগানো হয়েছিল? ওটা হয়তো কেউ খেয়ালই করত না, কিন্তু কথায় আছে না, চোরের মনে পুলিশ পুলিশ!
গ্রিল কেন কেটে ফেলা হবে স্যার?
তিনতলা থেকে ভারি কিছু নামানোর জন্য? যেটা দিনের আলোয়, বা অন্যদের নিয়ে নামানো যাবে না। নামাতে হবে লুকিয়ে, একা একা?
শরিফুল চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর হঠাৎ বলল, আপনি বলতে চাইছেন যে লিখনের লাশটা এখান থেকে নামানো হয়েছে? সে এইখানে খুন হয়েছে!
আমি তা বলতে চাইছি না। এমন চট করে বলে ফেলার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। ওরকম বলার জন্য আমাদের আরো তথ্য-প্রমাণ দরকার। সেগুলো আমাদের হাতে নেই। তবে বিষয়টা সন্দেহজনক।
কিন্তু স্যার… কিছু একটা বলতে গিয়েও শরিফুল থেমে গেল। রেজা বললেন, হ্যাঁ, বলো?
না মানে প্রফেসর সাহেবের মতোন কেউ খুনের সঙ্গে জড়িত থাকবে, এইটা আপনের বিশ্বাস হয়? আমার হয় না।
এটা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন না শরিফুল। এটা তথ্য-প্রমাণের বিষয়।
কিন্তু তারপরও স্যার। ধরেন উনি যদি এই কারণেই গ্রিল কাটতেন, এবং এটা যেন কেউ না বুঝতে পারে সেই ভয় থেকেই নতুন গ্রিল লাগিয়েছেন, তাহলে নতুন গ্রিল লাগাতে এত দিন সময় কিন্তু উনি নিতেন না, নিতেন? উনি যত দ্রুত সম্ভব নতুন গ্রিল লাগাতেন।
উনি দ্রুতই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। দেরি করতে বাধ্য হয়েছেন। দোকানে রেডিমেড অবস্থায় কিন্তু গ্রিল বিক্রি হয় না। কারণ গ্রিল বানাতে হয় জানালার মাপ মতো। শুধু তাই না, অন্য গ্রিলগুলো যেই ডিজাইনের, সেই ডিজাইনের সঙ্গে মিলিয়ে বানাতে হয়। সো অর্ডার দেয়ার পর দোকানদারতো বানাতে দুয়েকদিন সময় নেবে, নেবে না?
তা অবশ্য ঠিক। শরিফুল মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল।
রেজা হঠাৎ শরিফুলের কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর বললেন, শোন শরিফুল, স্যারকে সন্দেহ করতে আমারও ভালো লাগছে না। কিন্তু এতদিন পুলিশের চাকরি করি। এত মানুষ, এত ঘটনা-অপরাধ দেখেছি, আমাদেরওতো কিছু ক্রাইম সেন্স তৈরি হয়েছে, তাই না? কোনো একটা ঘটনা এখানে আছেই। আর সেটা না জানতে পারলে এই কেস সলভ করা সহজ হবে না।
.
০৮.
লতিফুর রহমান একটা তীক্ষ্ণ চাপা আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তার সবসময় মনে হচ্ছে কোনো এক ভয়ংকর অশুভ শক্তি সারাক্ষণ তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। তিনি কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কী ভাবছেন এ সবই সেই শক্তি দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু তিনি তাকে দেখতে পাচ্ছেন না, জানতে পারছেন না, বুঝতে পারছেন না। এ এক ভয়াবহ অস্বস্তিকর, আতঙ্কময় অনুভূতি। এর থেকে বের হবার কোনো উপায় তার জানা নেই। লাশটা বাড়ির বাইরে বের করতে পেরে তিনি একটা বড় বিপদ থেকে হয়তো বেঁচে গেছেন। কিন্তু এতদিনেও তিনি কোনোভাবেই ভেবে বের করতে পারলেন না, ওই লাশটা ওখানে আসার পেছনের ঘটনাটা কী!
এক অব্যাখ্যেয়, অবিশ্বাস্য ঘটনা। এই রহস্যের কোনো কূল-কিনারা তিনি খুঁজে পাননি। ফলে এখন আর কোনো কিছু নিয়েই তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। সারাক্ষণ মাথার ভেতর এই অনুভূতি নিয়ে তার সময় কাটছে, যেন মাথার ঠিক পেছনেই, ঘাড়ের কাছটাতে কোনো এক অদৃশ্য আততায়ী ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে!
.
নাসিমা বেগম আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর পরে সৈকত তাকে চিঠি দিয়েছিল। সেই চিঠি পেয়ে তিনি যেন পুরোপুরি সুস্থই হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সৈকতের পরের চিঠিটিই তাকে আবার অসুস্থ করে দিয়েছে। সৈকতের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয় না। গত পাঁচ বছরে এই নিয়ে তিনটি চিঠি সে পাঠিয়েছে। কিন্তু সেই চিঠিতে সে তার কোনো পূর্ণাঙ্গ ঠিকানাও দেয়নি। তারপরও খামের ওপরে প্রাপকের যে সংক্ষিপ্ত ঠিকানা রয়েছে, সেই ঠিকানায় নাসিমা বেগম কিছু চিঠি পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সৈকত তা পেয়েছে কি না, তিনি জানেন না। এর আগে বহুবছর কোনোধরনের খবরই ছিল না সৈকতের। তারপর হঠাৎ একদিন তার শৈশব, কৈশোর এবং তারুণ্যেরও একটা দীর্ঘ সময় কাটিয়ে যাওয়া বাড়ির ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠিয়েছিল সে। তারপর এই পাঁচটা বছর আবার অপেক্ষায় ছিলেন নাসিমা বেগম।
সন্ধ্যায় নাসিমা বেগমের মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছিল ডালিয়া। এই সময়ে ঘরে ঢুকলেন লতিফুর রহমান। নাসিমা বেগম বললেন, তুমি আবার এই সময়ে এখানে আসছো কেন?
লতিফুর রহমান গম্ভীর গলায় বললেন, তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।
কথা থাকলে পরে বলা যাবে না? নাকি আমি আজ রাতেই মরে যাব?
কী সব কথা বলছ!
কি সব কথা বলি তুমি বুঝতে পারছো না?
লতিফুর রহমান কথা বললেন না। নাসিমা বেগম বললেন, মনে মনে আমার মৃত্যুর অপেক্ষা করার কী দরকার? আমিতো একভাবে মরেই আছি। এই যন্ত্রণা মৃত্যু যন্ত্রণার চেয়েতো কম কিছু না। কম কিছু? এক কাজ করো, আমাকে ঘুমের মধ্যে গলা টিপে মেরে ফেলো।
তুমি কি একটু চুপ করবে?
চুপ করতেইতো চাই। চুপ। আর কোনোদিন জানি কাঁদতে না হয়।
নাসিমা বেগম কাঁদতে থাকলেন। এই সময়টায় তিনি পাগলের মতো হয়ে যান। শোয়া থেকে উঠে বসে আচমকা শরীরের কাপড় খুলে ফেলতে লাগলেন তিনি। দু হাতে মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলেন। ডালিয়া তাকে ধরার চেষ্টা করতেই তিনি ঝাড়া দিয়ে তার গা থেকে ডালিয়ার হাত ফেলে দিলেন।
ডালিয়া ভয়ে জড়সড় হয়ে একপাশে সরে গেল। লতিফুর রহমান কী করবেন বুঝতে পারছেন না। এই মুহূর্তগুলো খুব ভয়ংকর। সৈকত আসার খবর শুনে অনেকটাই সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করতে শুরু করেছিলেন নাসিমা বেগম। কিন্তু এখন আবার ধীরে ধীরে তার অসুস্থতাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে।
লতিফুর রহমান চোখের ইশারায় ডালিয়াকে সরে যেতে বললেন। ডালিয়া চলে যেতেই তিনি নাসিমা বেগমের কপালে আলতো হাত রাখলেন। নাসিমা বেগম প্রথম কিছুটা সময় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন লতিফুর রহমানের দিকে। তারপর আচমকা তার হাত কামড়ে ধরলেন। লতিফুর রহমান এতটা খারাপ পরিস্থিতি আশা করেননি। তিনি তীব্র চিৎকারে হাত ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। নাসিমা বেগমের দাঁত বসে গেছে তার হাতে, দরদর করে রক্ত বেরুচ্ছে। কিন্তু তিনি তার হাত ছাড়াতে পারছেন না। এই যন্ত্রণাময় পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করল ডালিয়া। চিৎকার শুনে ডালিয়া ছুটে এলো। তাকে দেখে যেন আরো খেপে গেলেন নাসিমা বেগম। তিনি কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলেছিলেন, এই ফাঁকে হাতছাড়িয়ে নিলেন লতিফুর রহমান। নাসিমা বেগম পাগলের মতো হাত পা ছুঁড়তে লাগলেন। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগলেন। তারপর সৈকতের জন্য বুক চাপড়ে কান্না শুরু করলেন।
লতিফুর রহমানের হাতের অবস্থা খারাপ। তীব্র ব্যথায় যেন অবশ হয়ে আসছে। হাতটা। তিনি ডান হাতে বাঁ হাত ধরে ঘর থেকে বের হলেন। ডালিয়াকে ইশারায় বললেন নাসিমা বেগমের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে। নাসিমা বেগম অবশ্য তখন আর চিৎকার চেঁচামেচি করছিলেন না। তিনি করুণ স্বরে কাঁদছিলেন। সেই কান্নায় মিশে আছে সন্তানহীন মায়ের সুতীব্র যন্ত্রণা।
.
নিজের ঘরে বসে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন লতিফুর রহমানও। ব্যথায় ভারী হয়ে গেছে হাতটা। দুটো দাঁত পুরোপুরি বসে গেছে হাতে। সেখানে এখনও রক্ত জমে আছে। তিনি ডালিয়াকে গরম পানি আর স্যাভলন আনতে বললেন। ডালিয়া গরম পানি এনে তার হাত ধুয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। ধীরে ধীরে ব্যথা কমে আসলেও সেই সারাটা রাত লতিফুর রহমান ঘুমাতে পারলেন না। তিনি ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। কিন্তু তারপরও চারপাশের পৃথিবীটা যেন ক্রমশই দুঃসহ হয়ে উঠছে।
.
পরদিন ভোরে তিনি আবারো নাসিমা বেগমের ঘরে গেলেন। নাসিমা বেগমকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল ডালিয়া। কিন্তু নাসিমা বেগম ঘুম থেকে উঠে গেছেন তাড়াতাড়িই। লতিফুর রহমান ঘরে ঢুকতেই তিনি মুখ তুলে তাকালেন। তবে কোনো কথা বললেন না। লতিফুর রহমান তার পাশে বসে নরম গলায় বললেন, একটা কথা বলব নাসিমা?
নাসিমা বেগম তাকিয়েই রইলেন, প্রশ্নের জবাব দিলেন না। লতিফুর রহমান তার হাতটা নাসিমা বেগমের সামনে তুলে ধরে বললেন, কাল সারাটা রাত এই হাতের যন্ত্রণায় আমি ঘুমাতে পারিনি নাসিমা। না ঘুমাতে ঘুমাতে আমার একটা উপলদ্ধি হয়েছে।
নাসিমা বেগম ঠাণ্ডা গলায় বললেন, আবার কী নাটক?
লতিফুর রহমান স্নান হাসলেন, আমার কোনো কিছুই তোমার সত্যি মনে হয় না?
হবে না কেন? তোমার সবকিছুইতো সত্যি।
লতিফুর রহমান খানিক চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, কাল রাতে আমি বুঝতে পেরেছি, ঠিক কতটা বছর এর চেয়েও বেশি যন্ত্রণায় তুমি ঘুমাতে পারো না! তোমার ওই কষ্ট বোঝার সাধ্য আমার নাই। কিন্তু কোনো মানুষের পক্ষে এতগুলো বছর এই কষ্ট সহ্য করা অসম্ভব!
তাহলে এখন কি করবে? আমার কষ্টতো কমাতে পারবে না, এক কাজ করো, আমাকে মেরে ফেলো।
লতিফুর রহমান আচমকা কেঁদে ফেললেন, তোমার কি ধারণা সৈকতের জন্য আমার একটুও কষ্ট হয় না? আমি হয়তো ভালো বাবা না, কিন্তু বাবাতো!
লতিফুর রহমান সামান্য থামলেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, তুমি কষ্ট পাও, সেটা তুমি প্রকাশ করতে পারো, বলতে পারো, কাঁদতে পারো। কিন্তু আমি? আমি তার কিছুই করতে পারি না। এর চেয়ে বড় কষ্টের আর কিছু নেই নাসিমা।
লতিফুর রহমান মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগলেন। টুপটুপ করে জলের ফোঁটা ঝরে পড়তে লাগল তার কোলে। নাসিমা বেগম অবশ্য কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। তিনি নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বাইরে। জানালার বাইরে মেঘ করেছে। আবারো বৃষ্টি নামবে হয়তো। নদীর পানি বাড়ছে হু হু করে। এবার বর্ষাকালটা খারাপ যাবে। খুব খারাপ।
.
০৯.
খুব ভোরে ঘুম ভাঙল রেজার। তার ঘুম ভাঙাল শরিফুল। সে জানালো থানার সামনে তুমুল হইহট্টগোল শুরু করেছেন চুন্নু মিয়া আর তার লোকজন। রেজাকে এখনই যেতে হবে। রেজা ঘটনা কিছুই বুঝলেন না। তিনি চোখ কচলাতে কচলাতে থানায় এলেন। থানার সামনে রীতিমতো উত্তপ্ত অবস্থা। তিনি থানার সামনে আসতেই চুন্নু মিয়া তার সামনে একজোড়া স্যান্ডেল ছুঁড়ে দিলেন। রেজা ঘুম ঘুম চোখে বুঝতে পারলেন না, স্যান্ডেল জোড়া আসলেই তার দিকে ছুঁড়ে মারা হয়েছে কি না? তিনি দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
চুন্নু মিয়া চিৎকার করে কিছু বলতে চাইছিলেন। কিন্তু রেজা তাকে শান্ত ভঙ্গিতে একা ভেতরে এসে কথা বলতে বললেন। চুন্নু মিয়া অবশ্য একা ঢুকলেন না, তার সঙ্গে ঢুকল সোহরাব মোল্লাও। রেজা হাই তুলতে তুলতে বললেন, বলুন, ঘটনা কী?
সোহরাব মোল্লা স্যান্ডেল জোড়া সঙ্গে নিয়ে এসেছে। স্বচ্ছ পলিথিনের প্যাকেটে মোড়া স্যান্ডেল জোড়া সে টেবিলের ওপর রাখতেই চুন্নু মিয়া ঠাণ্ডা গলায় বললেন, এই স্যান্ডেল জোড়া কার, জানেন?
রেজা মুখে কথা বললেন না, তবে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। চুন্নু মিয়া বললেন, লিখনের। এই স্যান্ডেল জোড়া লিখনের। গত ঈদে হারাধন মুচির কাছ থেকে আমি তার জন্য স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানিয়েছিলাম।
এখন এটা কোথায় পেয়েছেন?
গোলাম মাওলার বালির স্তূপে।
গোলাম মাওলার বালির স্তূপে? রেজা খানিক অবাকই হলেন। সোহরাব মোল্লা অবশ্য শুধরে দিল, মানে রাস্তার জন্য আর্জেন্ট ইট-বালি দরকার। আপনেতো জানেনই স্যার। এখন সমস্যা হইছে, বর্ষার মৌসুমে গোলাম মাওলা ছাড়া কাছাকাছি আর কারো কাছে ইট-বালি নাই। এদিকে বন্যার অবস্থাও গতরাত থেকে খুব খারাপ। এই জন্য আইজ সূর্য ওঠার আগেই আমরা গেছিলাম লতিফুর রহমান ছারের কাছে। তার বাড়ির কাজে অনেক ইট-বালি এখনো বেঁচে গেছে। তো আমরা…।
চুন্নু মিয়া সোহরাবকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে নিজেই বলা শুরু করলেন, তো আমি গেলাম স্যারের কাছ থেকে কিছু ইট-বালি ধার হিসেবে নেয়ার জন্য। বললাম, তার আবার যখন লাগবে, তখন দিয়ে দিব। তিনি খুশি মনেই রাজি হইলেন। গোলাম মাওলার থেকেই প্রফেসর সাব ইট-বালি কিনছিলেন। কিন্তু জায়গার অভাবে সব ইট-বালি তখন বাড়ির ভেতরে নিতে পারেন নাই। বাড়ির বাইরে রাস্তার পাশে যে উঁচু জায়গাটা আছে সেইখানে রাখছিল সেগুলা। আজ আমরা সেই বালি আনতে গিয়া দেখি সেই বালির মধ্যে এই স্যান্ডেল জোড়া।
রেজা সঙ্গে সঙ্গে কথা বললেন না। এই ঘটনা তিনি আশা করেননি। হতে পারে চুন্নু মিয়া ইচ্ছে করে মিথ্যে বলছে। কারণ লিখনের বস্তাবন্দি লাশের পায়ে জুতা ছিল, সুতরাং এখানে তার স্যান্ডেল পাওয়া আলাদা কোনো অর্থ বহন করে না। কিন্তু গোলাম মাওলাকে যে তিনি যেকোনো উপায়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করবেন, সেটিতো অনুমেয়ই। কিন্তু ঘটনা যদি সত্যিই হয়, তাহলে বিষয়টা অন্যদিক থেকে সমস্যাজনক। এই ঘটনা লতিফুর রহমানের প্রতি তার সন্দেহকে আরো জোরালো করে। লতিফুর রহমানের বালির স্তূপে লিখনের স্যান্ডেল পাওয়াটা রেজার এতদিনকার আর সকল সন্দেহকে কোথায় যেন শক্ত একটা ভিত্তি দেয়। যদিও বিষয়টি অন্য কারো ভাবনায় নেই।
রেজা বললেন, কিন্তু ওগুলোতে এখন আর গোলাম মাওলা সাহেবের না, তার থেকে সেই কবেই কিনে নিয়েছেন প্রফেসর সাহেব। আপনারা তাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছেন? আগেতো তাকে জিজ্ঞেস করা উচিত, তাই না?
চুন্নু মিয়া এবার চটে গেলেন, তাকে কী জিজ্ঞাস করব? ওই ষাইট-সত্তর বছরের বুড়া প্রফেসর আমার ভাগ্নেকে খুন করেছে? আপনার সমস্যা কি বলেনতো রেজা সাহেব? আমি আগেও শুনছি, আপনি নাকি স্যাররে সন্দেহ করতেছেন? একাধিকবার তার বাড়িতেও গেছেন? এখন কি, আসল ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য নিরীহ একজন মানুষের ওপর দোষ চাপানোর ধান্দায় আছেন?
আপনি শুধু শুধু রেগে যাচ্ছেন চেয়ারম্যান সাহেব। আমি সেটা বলছি না, আমি বলছি সবকিছুরইতো একটা লজিক থাকে তাই না? এই ইট-বালি তিনি কবে গোলাম মাওলার কাছ থেকে কিনেছেন, এখন এসে সেখানে কিছু পাওয়া গেলে তার জন্য তো আমরা গোলাম মাওলাকে দায়ী করতে পারি না, তাই না? বা সেটা ঠিকও হবে না। এটলিস্ট, একবারতো প্রফেসর সাহেবকে ঘটনা জিজ্ঞেস করা উচিত, নাকি? আর লিখনের লাশের পায়ে কিন্তু জুতা ছিল। সুতরাং এই স্যান্ডেল সেখানে পাওয়া না পাওয়া নিয়ে আমরা কিন্তু দুম করে খুব বড় কোনো ডিসিশনেও যেতে পারি না! এমনওতো হতে পারে যে স্যার কিংবা গোলাম মাওলা, কেউই হয়তো এর কিছু জনেনই না। অন্য কেউ হয়তো এই স্যান্ডেল এখানে রেখে গেছে, হতে পারে না এমন?
.
চুন্নু মিয়া এবারেও হম্বিতম্বি করলেন। পুলিশ কিছু না করলে তিনি নিজে গোলাম মাওলাকে দেখে নেয়ার হুমকিও দিয়ে গেলেন। কিন্তু রেজা তখন ভাবছেন অন্য কথা। এই মামলার এরই মধ্যে অনেক দেরী হয়ে গেছে, কিন্তু সেই অর্থে কোনো অগ্রগতিই নেই। এখনই যদি কিছু না করা যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে নিশ্চিত। চুন্নু মিয়া হয়তো রাগের মাথায় কোনো অঘটনও ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। খুন খারাবি করে ফেলাও বিচিত্র কিছু নয়। পরিস্থিতি তখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। রেজা বিষয়টি নিয়ে সরাসরি লতিফুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলেন।
.
লতিফুর রহমানকে কিভাবে থানায় নিয়ে আসা হবে, এই নিয়েও ভাবলেন রেজা। তিনি এই এলাকার সম্মানিত মানুষ। একটি খুনের মামলায় তাকে হুট করে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, বিষয়টি কেউই স্বাভাবিকভাবে নেবে না, এবং সামাজিকভাবেও তার সম্মানহানি হবে। রেজা চাইলে তার বাসায় গিয়ে নিজেই খোলামেলা কথা বলতে পারেন। কিন্তু তিনি সেটি করতে চাননি। তার এইটুকু জীবনের অভিজ্ঞতা বলে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানার চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। অপরাধী থানা এবং পুলিশ, এই দুটো জিনিসকে চেতনে-অবচেতনে যেকোনো উপায়ে এড়িয়ে যেতে চায়। ফলে থানায় আসা মাত্রই তার সাহস এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে।
লতিফুর রহমানকে থানায় আনা হলো গোপনে। তিনি একটা আবছা অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসে আছেন। গত আধাঘণ্টায় এই ঘরে আর কেউ আসেনি। তিনি প্রতি মুহূর্তে কারো না কারো আসার অপেক্ষা করছেন। ঠিক এই মুহূর্তে পাশের রুম থেকে একজনের তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এলো। লতিফুর রহমান চমকে গিয়ে তাকালেন। কিন্তু পাশের রুমে কী হচ্ছে তা এখান থেকে দেখার উপায় নেই। তিনি কান পেতে শোনার চেষ্টা করলেন। তীব্র যন্ত্রণাকাতর চিৎকার ভেসে আসছে এখন। সঙ্গে আঘাত এবং অশ্রাব্য গালির শব্দ। তার বুকের ভেতরটা ধরফর করে কাঁপছে। আরো মিনিট কুড়ি পরে রেজা ঘরে ঢুকলেন। তার সারা শরীর ঘর্মাক্ত, তিনি একটা তোয়ালে দিয়ে ঘাড় মুছলেন।
লতিফুর রহমানের সামনের খালি চেয়ারটাতে বসে তিনি নরম গলায় সালাম দিয়ে বললেন, স্যার আমি খুবই দুঃখিত যে আপনাকে এখানে এভাবে আনতে হয়েছে, কিন্তু সত্যি কথা হলো এ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।
লতিফুর রহমান শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, কোন সমস্যা নেই, যদিও আমি একটু নার্ভাস ফিল করছি।
রেজা বললেন, নার্ভাস ফিল করার কিছু নেই স্যার।
লতিফুর রহমান একইরকম শান্ত এবং ঋজু ভঙ্গিতেই বললেন, অবশ্যই আছে। আপনাকে আমি যদি এখন কলেজের বাংলা ক্লাসে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিই, তাহলে সেখানেও আপনার নার্ভাস লাগবে।
তা অবশ্য ঠিক।
আর এর আগে আমি কখনো থানায় আসিনি। তা ছাড়া আমি এখনো জানি না, আমাকে কেন এখানে ডাকা হয়েছে।
রেজা স্পষ্ট গলায় বললেন, আপনাকে এখানে ডাকা হয়েছে চুন্নু চেয়ারম্যানের ভাগ্নে লিখনের খুনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য।
লতিফুর রহমান অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন, কী!
জি স্যার। আমরা এই বিষয়ে আপনার কাছ থেকে স্পষ্ট এবং সত্য কিছু তথ্য : আশা করছি।
এই বিষয়ে আমি আপনাদের কী তথ্য দেব? বরং আপনারা আমাকে তথ্য দিতে পারেন। এই ঘটনার আমি কিছুই জানি না। কেবল লোকমুখে বিচ্ছিন্ন কিছু কথা শুনেছি, বিস্তারিত কিছুই জানি না। আপনার জানার কথা, আমি খুব একটা বাইরের মানুষের সঙ্গে মিশিও না। সুতরাং কি ঘটেছে সেটা আপনি বরং আমাকে বিস্তারিত জানাতে পারেন।
রেজা সামান্য অবাক হলেন। তিনি লতিফুর রহমানের কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করেননি। বরং ভেবেছিলেন লতিফুর রহমান ভেঙে পড়বেন। অথচ তিনি তার পুরো উল্টো আচরণ করছেন। রেজা খানিক নিচের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন। তারপর মাথা তুলে স্থির দৃষ্টিতে লতিফুর রহমানের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বললেন, এই খুনের মামলায় আমি যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারি, সেই অথরিটি আমাকে দেয়া হয়েছে স্যার। প্রমাণ তৈরি করা পুলিশের জন্য কোনো বিষয় না। সুতরাং আপনি যে-ই হোন না কেন, তাতে আমার কিছু যাবে আসবে না। কোনো প্রমাণ ছাড়াই আপনাকে এই মুহূর্তে আমি গ্রেপ্তার করে চালান করে দিতে পারি।
আপনি আমাকে অযথা অন্যায়ভাবে ভয় দেখাচ্ছেন।
অন্যায়ভাবে হতে পারে কিন্তু অযথা নয়।
আপনার কি মনে হয় না আপনি ইলজিক্যালি একজন ইরেলিভেন্ট মানুষকে এই মামলায় ইনভলভ করছেন?
রেজার বিস্ময় আরো বাড়ছে। তিনি শান্ত গলায় বললেন, আমি পৃথিবীতে এই একটা কাজ শুধু করি না। ইলজিক্যাল কোনো কাজ।
তাহলে আমাকে এখানে আনার পেছনে আপনার লজিকটা কি?
রেজা এবার সামান্য কঠিন গলায় বললেন, আপনাকে এখানে প্রশ্ন করার জন্য আনা হয়নি, উত্তর দেয়ার জন্য আনা হয়েছে।
লতিফুর রহমান সামান্য নরম হলেন, বলুন, কি জানতে চান?
লিখনের বিষয়ে আপনি কি জানেন?
বললে আপনি বিশ্বাস করবেন?
সত্য হলেতো অবশ্যই বিশ্বাস করব।
আমি কিছুই জানি না।
এই স্যান্ডেল জোড়া চেনেন? চুন্নু মিয়ার রেখে যাওয়া স্যান্ডেলজোড়া রেজা টেবিলের ওপর রাখলেন।
স্যান্ডেল দেখে লতিফুর রহমানের কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন, কেউ কি কখনো কারো স্যান্ডেলের কথা আলাদা করে মনে রাখে? আমি ঠিক জানি না। তবে আমার কখনো এমন স্যান্ডেল ছিল না।
মানে আপনি এটা চেনেন না?
ঠিক মনে করতে পারছি না। কেন বলুনতো?
আপনার বাড়ির বাইরে আপনার যে ইট-বালির স্তূপটা আছে সেখান থেকে স্যান্ডেলজোড়া উদ্ধার করা হয়েছে। এবং…। রেজা লতিফুর রহমানের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন।
লতিফুর রহমান বললেন, এবং কী?
এবং স্যান্ডেল জোড়া লিখনের।
এই প্রথম লতিফুর রহমান সামান্য চমকালেন। এবং ঠিক তখনই তার মনে পড়ল, সেদিন রাতের অন্ধকারে হারাধন মুচির দোকান থেকে এই স্যান্ডেল জোড়াই তিনি পরে এসেছিলেন। দিন দুই বাদে তিনি এনায়েতকে বলেছিলেন যে সে যেন স্যান্ডেল জোড়া হারাধন মুচিকে দিয়ে আসে। এর পরে আর এই স্যান্ডেলের কথা তার মনেই ছিল না। এমনকি এখন স্যান্ডেল জোড়া দেখে প্রথমে তিনি আসলেই চিনতে পারেননি। লতিফুর রহমান খানিক বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। তিনি এখন বুঝতে পারছেন না কী বলবেন!
মুহূর্তের জন্য হলেও তার চমকে যাওয়াটা চোখ এড়াল না রেজার। তবে লতিফুর রহমান সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সামলে নিলেন, দেখুন, বাড়ির বাইরে ওই বালির স্তূপ থেকে কিছু উদ্ধার করলেই সেটির সঙ্গে আমার যোগসূত্র থাকবে, এটি ভাবলেতো মুশকিল।
লতিফুর রহমান সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, স্যান্ডেলের বিষয়ে তিনি সত্যিটাই বলে দেবেন কি না! তবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি পরিস্থিতি আরো ভালোভাবে বুঝে নিতে চান।
রেজা হতাশ ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর লতিফুর রহমানের চোখে চোখ রেখে স্থির গলায় বললেন, আপনি যে রাতের অন্ধকারে আপনার তিনতলার বাসার জানালার গ্রিল কেটে দড়ি বেঁধে একটা লাশ নামিয়েছেন নিচে, এবং তার পরপরই যে আপনার বাড়ির পাশে জলাশয়েই লিখনের লাশ পাওয়া গেল, এ দুটো ঘটনার মধ্যে কি আপনি কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন, স্যার?
লতিফুর রহমান এটা আশা করেননি। তিনি বুঝতে পারছিলেন, কোনো কারণে তার প্রতি পুলিশের নজর পড়েছে। কিন্তু তিনি ঠাণ্ডা মাথার সতর্ক, বুদ্ধিমান মানুষ, সুতরাং তার জায়গা থেকে যতটা সম্ভব সন্দেহমুক্ত থাকার চেষ্টা তিনি করেছেন। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পেরেছেনও। তা ছাড়া, লাশ যেহেতু তার বাড়িতে পাওয়া যায়নি, এবং সত্যিকার অর্থেই এই খুনের বিষয়ে যেহেতু তিনি কিছু জানেনও না, সেহেতু পুলিশের পক্ষে তার বিরুদ্ধে কোনো অকাট্য প্রমাণ হাজির করা প্রায় অসম্ভব। তিনি জানেন, পুলিশ সর্বোচ্চ যেটি করতে পারে, তাহলো চাপ প্রয়োগ করে, বা ভয়-ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে কোনো স্বীকারোক্তি আদায় করা। কিংবা তিনি নিজে যদি ভয় পেয়ে বা ভুল করে বেস কিছু বলে ফেলেন, তবেই কেবল পুলিশ সেটিকে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু রেজা এখন যেটি বললেন, সেটি লতিফুর রহমানের আত্মবিশ্বাস নাড়িয়ে দিয়েছে। না দেখে, বা কোনো স্পষ্ট প্রমাণ হাতে না রেখে এমন করে কারো পক্ষে বলে দেয়া সম্ভব নয়। তিনি তারপরও যতটা সম্ভব শক্ত গলায় বললেন, আপনি কী বলছেন আমি বুঝতে পারছি না!
রেজা এক মুহূর্তের জন্যও লতিফুর রহমানের চোখ থেকে চোখ সরাননি। তিনি সেই একইভাবে বললেন, আপনি শিক্ষক মানুষ, সারা জীবনে এত এত ছাত্র ছাত্রীদের এত এত কঠিন জিনিস বুঝিয়েছেন। আর এখন শেষ বয়সে এসে এমন সহজ একটা জিনিস নিজে না বুঝলে হবে?
আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না। আমার অসহায় এবং অপমানিত লাগছে।
আপনি কি বিশ্বাস করেন যে আপনাকে অপমানিত হতে দেখতে আমার ভালো লাগবে না?
লতিফুর রহমান এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। রেজাই আবার বললেন, একটা কথা বলি স্যার। মন দিয়ে শুনুন। আমি এমনি এমনি আপনাকে এখানে ডেকে আনিনি, এটা আপনি যেমন জানেন, আমিও জানি। এখন আপনি যদি আমাকে কো-অপারেট না করেন, তাহলেও কিন্তু সিচ্যুয়েশন কিছু পাল্টাবে না। কারণ এই ঘটনায় যত দ্রুত সম্ভব কোনো একজনকে আমার গ্রেপ্তার দেখাতেই হবে। না হলে পুরো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ঝামেলায় পড়ে যাবে। আমি চাইছি, সত্যিকারের অপরাধীকেই গ্রেপ্তার করতে। সমস্যা হচ্ছে, আপনি ছাড়া আর কারো বিষয়ে আমার কাছে বিন্দুমাত্র কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। আর আপনাকে গ্রেপ্তার করলে আমাকে কোনো পলিটিক্যাল প্রেসারেও পড়তে হবে না। সুতরাং আমার কাছে আপনার বিরুদ্ধে যেসব এভিডেন্স এবং সাসপেকশন আছে, সেসবের ভিত্তিতেই আমি আপনাকে গ্রেপ্তার করতে পারি। এবং হয়তো সেটাই করব। আর সেই আপনার তখনকার অপমান এবং অসহায়ত্ব এখনকার চেয়ে অসংখ্যগুণ বেশি হবে। সেটা দেখতে আপনার যেমন ভালো লাগবে না, আমারও না।
লতিফুর রহমান তারপরও কোনো কথা বললেন না। তিনি বুঝতে পারছেন না কী করবেন! তার কি পুরো ঘটনাই খুলে বলা উচিত, নাকি শুধু স্যান্ডেলের ঘটনাটা? তিনি মুহূর্তখানেক সময় নিয়ে মাথা তুলে তাকালেন, তারপর হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে বললেন, একটা বিষয় আমি সম্ভবত মিস করে গেছি। ইচ্ছাকৃত নয়, ভুলে।
বলুন?
সেদিন সন্ধ্যায় পলাশবাড়ি মসজিদে মাগরিবের নামাজ শেষে কিভাবে নিজের জুতো হারিয়ে হারাধনের দোকান থেকে আরেক জনের স্যান্ডেল পায়ে বাড়ি ফিরেছিলেন, সেই ঘটনা বিস্তারিত বললেন লতিফুর রহমান। তারপর বললেন, দিন দুই পরে আমার বাড়ির দারোয়ান এনায়েতকে দিয়ে আমি স্যান্ডেল জোড়া হারাধন মুচিকে ফেরত দিতে পাঠিয়েছিলাম। সে সেটি ফেরত দিয়েছিল কি না। আমি আর জিজ্ঞেস করিনি। আসলে ওটার কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আর সন্ধ্যার অন্ধকারে পায়ে পরে বাড়ি ফিরেছিলাম, ঠিকমতো খেয়ালও করিনি স্যান্ডেল জোড়া। ফলে এখন এটা দেখেও ঠিক মনে করতে পারছি না, এটাই সেই স্যান্ডেল জোড়াই কী না!
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে থানায় নিয়ে আসা হলো এনায়েত ও হারাধন মুচিকে। এনায়েত বলল, ঘটনা সত্য, বাজারের মুচির দোকান থেইকাই ছারে এই স্যান্ডেল পায় দিয়া আইছিল।
এরপর ফেরত দেয়ার জন্য তোকে দিয়ে পাঠানো হয়েছিল?
জ্বে, ছার।
তুই ফেরত দিয়েছিলি?
না।
কেন?
ছারে আমারে ফেরত দিয়াসতে বলল। আমি বাড়ির থেকে বাইর হইয়া কিছুদূর গেলাম। এর মধ্যেই দেখি ছারে আবার আমারে ফোন দিয়া বাড়ি যাইতে বলল। কী একটা জানলার গ্রিল নাকি বানাইতে দিব। সেই গ্রিলের মাপ আর ডিজাইনের কাগজ নিয়া যাইতে হইব। তো আমি ভাবলাম, স্যান্ডেল হাতে নিয়া আবার এতটা পথ যাব, আবার আসব, তার চাইতে পলিথিনে প্যাচানো স্যান্ডেল জোড়া রাস্তার পাশে বালির মধ্যে ঢুকাইয়া রাইখ্যা যাই। যাওনের সময় ওইখান থেকে নিয়া গেলেই হইব।
তারপর?
তারপর বাড়িতে যাওনের পর ছারে আরো কয়েকটা কাজ দিল। সেগুলা করতে দেরি হইয়া গেল। তখন ছারে বলল, এখন আর যাওন লাগতো না, বিকালে বাজারে যাইস। আর গ্রিলের অর্ডার দিয়াসিস।
গ্রিলের অর্ডার দিয়েছিলি কার নামে?
এনায়েত চুপ করে রইল।
.
হারাধন বলল, ঘটনা সত্য, ছারে আমার কাছ থেইকাই স্যান্ডেল নিছে।
পরে আর ফেরত দেয়নি?
না।
তো, তুইও আর স্যান্ডেলের কোনো খবর নেস নাই? স্যান্ডেল যার, সেও আর তার স্যান্ডেল নিতে আসেনি?
আসব কেমনে? সেতো নাই।
নাই মানে? কই গেছে?
মারা গেছে। এইটাতো লিখন ভাইর স্যান্ডেল।
লিখন তোর কাছে সেলাই করতে দিয়েছিল?
হুম।
তা তুই তখনই জানতি যে লিখন মারা গেছে?
মারা গেছে জানব কী করে? তখনতো তারে খুঁইজা পাওয়া যাইতেছে না, চাইরদিকে হৈ চৈ। তো ছারে আইসা স্যান্ডেল চাইল, এহন তারেতো আর না করন যায় না। সে সম্মানী মানুষ। কিন্তু কার স্যান্ডেল দেব? যার স্যান্ডেলই দিই, দেখা গেল একটু পরেই আইসা চাইল। তখন আমি বিপদে পড়বো না? এই জন্য ভাবলাম লিখন ভাইরটা দিই। ছারেতো বলছেই যে পরদিনই ফেরত পাঠাই দিব। আর লিখন ভাইর তখনো কোনো খোঁজ নাই। এই জন্য আমি ভাবলাম, এইটা দেওয়াই নিশ্চিন্ত।
.
রেজা খুব আশাবাদী ছিলেন যে বড় কোনো একটা ব্লু বা প্রমাণ হয়তো তিনি এবার পেয়েই যাবেন, কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। বরং হতাশাই বাড়ল। সঙ্গে কিছুটা অপরাধবোধও। লতিফুর রহমানকে শুধু শুধুই অমন অপদস্ত করলেন! কিন্তু রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আচমকা মনে হলো, একটা বড় প্রমাণ তিনি পেয়ে গেছেন। অন্তত সেটি দিয়ে হলেও আরো কিছুটা দূর এগুতে পারেন তিনি।
পরদিন লতিফুর রহমান আর এনায়েতকে তিনি আবারো ডাকলেন। আলাদা আলাদা বসিয়ে দুজনকে নানা জিজ্ঞাসাবাদ করলেন তিনি। লতিফুর রহমানকে বললেন, স্যার, আপনার তিনতলার ফ্ল্যাটের একটি জানালা ছাড়া বাকি আর সব জানালা একই সময়ে লাগানো হয়েছে, একই সময়ে একই রকম রং করা হয়েছে, কিন্তু একটি জানালা আলাদা। সেটাতে কোনো রং নেই এবং মাত্র দু-তিন দিন আগে সেটি লাগানো হয়েছে। এটাতো সত্যি?
হ্যাঁ, সত্যি। আপনি সেটি নিজ চোখেই দেখেছেন এবং কারণটিও আমি আপনাকে বলেছি।
কিন্তু আপনি যেটি বলেননি সেটি হচ্ছে এই বাড়ির জন্য যখন যা লেগেছে, একটি পেরেক অবধি, আপনি নিজের নামে অর্ডার করেছেন, ক্যাশম্যামোতে বিল করিয়ে নিয়েছেন। কারণ আপনি হিসেবি মানুষ।
রেজা নানা ধরনের বিলের একগাদা কার্বন কপি বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর বললেন, আপনি যেসব দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনেছেন, তার কয়েকটা দোকান থেকে আমরা এগুলো কালেক্ট করেছি। সবগুলোতে আপনার নাম আছে। কিন্তু আপনার বাড়ির প্রয়োজনে আপনি কিনেছেন, এমন একটা মাত্র অর্ডার এবং বিলে আপনার কোনো নাম নেই। সেই বিলটি হচ্ছে ওই গ্রিলটার।
লতিফুর রহমান মৃদু হাসলেন, বাকিগুলো সব আমি নিজে কিনেছি, কিন্তু ওটা কিনেছে এনায়েত। সো, সে তার নামেই করেছে।
না স্যার। সে তার নামেও করেনি। যেহেতু তাকে এখানকার কেউ সেভাবে চেনে না, সো সে অন্য একটি ভূয়া নাম দিয়ে গ্রিলের অর্ডার করেছে, বিল করেছে। এবং সেটি আপনি তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন।
আমি!
জি, আপনি। শুধু তা-ই না, আপনিই এনায়েতকে নিষেধ করেছেন আপনার নামে যেন সে গ্রিলটা না কেনে।
এগুলো আপনাকে কে বলেছে?
এনায়েতই বলেছে?
অসম্ভব।
অসম্ভব কেন?
কারণ সে আমাকে…। লতিফুর রহমান কিছু একটা বলতে গিয়েও মাঝ পথে হঠাৎ থেমে গেলেন।
রেজা বললেন, কারণ এখান থেকে গতকাল বাড়িতে গিয়ে সে আপনাকে এসব বিষয়ে কিছু বলেনি, তাই না? তার বলার কথাও না। কারণ, তাকে আমি স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছিলাম উল্টাপাল্টা কিছু হলেই তাকে আমি ক্রস ফায়ারে দিয়ে দিব।
লতিফুর রহমান কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তিনি মাথা নিচু করে বসে রইলেন। এই মুহূর্তে একজন কনস্টেবলের সঙ্গে ঘরে ঢুকল এনায়েত। তার পায়ের শব্দে মাথা তুলে তাকালেন লতিফুর রহমান। রেজা বললেন, এনায়েত, প্রফেসর সাহেব কি তোকে তার নামে গ্রিলের অর্ডার এবং বিল করতে নিষেধ করেছিলেন?
এনায়েত ভয়ার্ত গলায় বলল, হুম।
তাহলে কার নামে করতে বলেছিলো?
এনায়েত জবাব দিলো না। চুপ করে রইলো। রেজা বললেন, অন্য কোন ভুয়া নামে করতে বলেছিলেন?
এনায়েত একবার আড় চোখে লতিফুর রহমানের দিকে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো, হুম।
রেজা লতিফুর রহমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, এটি কেন করেছিলেন স্যার? নিশ্চয়ই এটিরও একটা চমৎকার, গ্রহণযোগ্য উত্তর আপনার কাছে রয়েছে।
লতিফুর রহমান আতিপাতি করেও এর কোনো জুতসই শব্দ খুঁজে পেলেন না।
রেজা বললেন, আপনি অতি সতর্কতায় অতি অস্বাভাবিক কিছু ভুল করেছেন। যেগুলোই আপনার প্রতি আমাকে আগ্রহী করে তুলেছিল। যেমন আপনার তিন তলার ঘরের ওই একটি মাত্র জানালাতেই আপনি পর্দা ব্যবহার করেছেন। আর কোনো জানালায় পর্দা নেই। এর কারণ কী?
লতিফুর রহমান বুঝতে পারছিলেন যে তিনি ধরা পড়ে গেছেন। শেষ একটা চেষ্টা করার জন্য ভেতরে ভেতরে তিনি বেপরোয়াও হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু জুতসই কোনো ব্যাখ্যাই তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
রেজা বললেন, লিখনের লাশটাতো ওই জানালাটা দিয়েই নামিয়েছিলেন তাই না? তো কাজটা কি আপনি একাই করেছিলেন? নাকি সঙ্গে আরো কেউ ছিল?
লতিফুর রহমান এবারও কোনো কথা খুঁজে পেলেন না। তিনি যেমন মাথা নিচু করে তাকিয়ে ছিলেন, তেমনই তাকিয়ে রইলেন। রেজা শেষ প্রশ্নটা করলেন, ছেলেটাকে আপনি কেন খুন করেছিলেন, স্যার?
.
১০.
পলাশবাড়ি শহরটা অনেক বছর ধরেই একটু একটু করে বিস্তৃত হচ্ছিল। তবে সেই বিস্তৃতি গত বছরখানেক ধরেই খুব বেশি দ্রুত এবং অপরিকল্পিতভাবেই শুরু হয়েছে। ফলে শহরের অগোছালোভাবও বেড়েছে। বেড়েছে যত্রতত্র খনন, খানাখন্দ, বহুতল ভবন, দোকান-পাটের নির্মাণ কাজও। অনেকদিন ধরেই যে নতুন ব্যাংকটির এখানে আসার কথা ছিল, মাস দুয়েক হয় সেটিও চালু হয়েছে। সঙ্গে চালু হচ্ছে দামি-দামি খাবারের রেস্টুরেন্টও। তবে মোবাশ্বেরের দোকানে এখনো সকাল থেকে গভীর রাত অবধি খদ্দেরের ভিড়। যদিও তার বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। বিশেষ করে নির্মাণ ও খনন শ্রমিকের দল। আজ দুপুরে সেখানে দুই দল শ্রমিকের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ছোটখাটো সংঘর্ষ হয়ে গেল। তাতে মাথা ফেটে একজনের রক্তারক্তি অবস্থা। খবর শুনে থানা থেকে শরিফুল ছুটে এলো। দেলোয়ার নামে একজনের বেলচার আঘাতে এক নির্মাণ শ্রমিকের মাথা ফেটেছে। দেলোয়ার দেখতে ছোটখাটো মানুষ। শরিফুল তার সামনে দাঁড়াতেই সে পায়ে পড়ে চিৎকার করতে করতে কাঁদতে লাগল। সব শুনে রেজা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না। দেলোয়ারকে দুদিন থানায় আটকে রেখে ছেড়ে দিতে বললেন। সে গরিব দিনমজুর মানুষ, একটা দিন কর্মহীন থাকা মানেই তার পরিবারের ওপর বিশাল চাপ পড়ে যাওয়া। তা ছাড়া শ্রমিকদের মধ্যে এমন অহরহই হয়ে থাকে। কিন্তু বিষয়টি রেজাকে ভাবিয়েও তুলল। এই শহরে এখন বড়োসড়ো অপরাধ হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। লিখনের ঘটনা ছিল কেবল শুরু। সামনে হয়তো আরো বড় বড় ঘটনা অপেক্ষা করছে। এখনই সতর্ক না হলে বিপদ। এমনকি এই যে এত এত শ্রমিকরা এক সঙ্গে থাকছে, পক্ষ-বিপক্ষ হচ্ছে, এদের নিয়েও সতর্ক হতে হবে। এর মধ্যেই ইয়াবা ছড়াতে শুরু করেছে। সঙ্গে আরো নানা কিছু।
রেজার অভিজ্ঞতা বলে, সতর্ক হবার সময় এখনি। তিনি ছেড়ে দেয়ার আগে দেলোয়ারের সঙ্গে কথা বললেন, বাড়ি কই?
ভোলা।
এইখানে কত দিন?
তিন-চাইর মাস।
কী কাজ করিস? আগে স্যুয়ারেজের লাইনে দিন ঠিকা কাজ করতাম। এখন এইখানে পাঠাইছে সর্দার।
সর্দার কী?
আমগো এইসব কাজে একজন সর্দার থাকে। তার আন্ডারেই সবাই কাজ করি। সে-ই কন্ডাক্টরগোর তন কাজের অডার পায়। কতজন লেবার লাগব সেইটা কন্ডাক্টর সর্দারের লগে বোঝাঁপড়া কইরা ঠিক করে। তারপর আমাগো সে কাজে পাঠায়। আমরা তার কথা মতোই চলি।
কন্ট্রাক্টের টাকা সব সর্দারই পায় আর সে তখন সেখান থেকে তোদেরকে দেয়?
জে।
ঠকায়?
সর্দারে ঠকায় না। তয় সর্দারতো সব জায়গায় কাজে থাকতে পারে না, তার হইয়া আরেকজন থাকে, সেকেন ম্যান, সর্দারের বদলে সাইটে থাইকা সে-ই সব দেখাশোনা করে। সেই হারামজাদা ঠকায়।
কিছু বলিস না তোরা?
অভ্যাস হইয়া গেছে, এহন আর গায়ে লাগে না।
তা গায়ে না লাগলে আজকে ওই লোকটার মাথায় মারলি কেন?
মাথা গরম হইয়া গেছিল ছার।
গরম হয়েছিল কেন?
ও আমার বউরে লইয়া গাইল দিছিল।
বউর জন্য খুব মায়া?
বউ পোয়াতি ছার। পোয়াতি বউরে লইয়া গাইল দিলে গায় সয় না।
রেজা কথাটা ভাবলেন। তিনি এখনো বিয়েই করেননি, সুতরাং পোয়াতি বউয়ের প্রতি স্বামীর অনুভূতি তার বোঝার কথা না। তিনি বললেন, সন্তানরে খুব ভালোবাসিস?
দেলোয়ার জবাব দিল না, মাথা নিচু করে ফেলল। রেজা বললেন, যেই সন্তানের জন্য এত কষ্ট করিস, তাকে নিয়ে একটা বাজে কথা সহ্য করতে পারিস না। এখন ওই লোকটা যদি মারা যেত, বা সিরিয়াস কিছু হতো, তাহলে তোর কি অবস্থা হতো একবার ভেবে দেখেছিস? আর তোর কিছু হলে তোর বউ-বাচ্চা কে দেখত?
ভুল হইয়া গেছে ছার। আমার মাথাটা একটু গরম।
মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।
জে, ছার।
তোদের সর্দার কে?
আলাউদ্দিন হাজি।
হাজি কেন? সে কি হজ করেছে নাকি?
জে, ছার। তিনবার।
সে এখানে আছে?
না ছার, তার সেকেন ম্যান আছে, আজগর। আমরা তারে অজগর সাপ বইলা ডাকি। হা হা হা।
সর্দার আসে না কেন?
তার এরকম আরো কত সাইটে লেবার আছে। সেই সব সাইট বড় বড়, ঢাকায়। সেইগুলাতে সে থাকে। দূরে আসে না। আজগররে পাঠায়।
আচ্ছা, আজগরের সঙ্গে আমি কথা বলব। এইখানে কোনো গণ্ডগোল করা চলবে না। সব লেবারদের সেটা বলে দিতে হবে। প্রথম বলে তোকে ছেড়ে দিলাম, কিন্তু পরের বার সামান্য কোনো ঝামেলা দেখলেই খুব খারাপ হবে। আমি চাই না
আমার এখানে কোনো ঝামেলা হোক।
আর হইব না ছার।
.
গভীর রাতে গোলাম মাওলা নুরু মিয়া এবং সবুরের সঙ্গে মিটিং এ বসেছেন। নুরু মিয়া বলল, পরিস্থিতিতো খুব একটা ভালো মনে হইতেছে না।
গোলাম মাওলা উৎসুক চোখে তাকালেন। নুরু মিয়া বলল, থানায় মনে হয় অতিরিক্ত পুলিশ আসছে। ভেতরে ভেতরে কিছু একটা হইতেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ?
হুম। সঙ্গে এসপি সাব, এএসপি সাবও আসছিলেন আজকে।
ঘটনা কী?
সেইটাই বুঝতে পারতেছি না। তবে একটা কথা শুনলাম।
কী কথা?
লতিফ পোরবেচাররে নাকি থানায় নিয়া যাওয়া হইছিল?
কী বলো! এই ঘটনা কখন ঘটল?
সেইটা বলতে পারব না। এক পুলিশ কনস্টেবলের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক, সে হঠাৎ সেই দিন বলল।
কেন নিছে, কিছু বলে নাই?
নাহ। সেও নাকি জানে না। খুব গোপনে কাজ করতেছে রেজা সাব।
গোলাম মাওলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এই লোক বহুত ঝামেলার। কী চিন্তা করে, কী ভাবে, বোঝার কোনো উপায় নেই। এই মনে হয় সে আমার সবচেয়ে কাছের লোক, আবার পরক্ষণেই মনে হয় আমার সবচেয়ে বড় শত্রু। এরে এইখান থেকে সরাই দিতে পারলে সবচেয়ে ভালো হইতো!
একটু ধৈর্য ধরো। এতদিন যখন এত কষ্ট করে ধৈর্য ধরছো, আরেকটু ধরো। খালি নমিশেনটা পাই আমরা, ইলেকশনে জেতা নিয়া চিন্তা করি না। আর তারপর এর ব্যবস্থা করা যাবে।
সবুর এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি। মনোযোগী শ্রোতার মতো সব চুপচাপ শুনছিল সে। এবার যেন কথা বলার সুযোগ পেল, আচমকা বলল, রাইত বিরাইতেতো দেখি একলা-একলাই এইখানে-সেইখানে হাঁটাহাঁটি করে, আপনে বললে সরানোর ব্যবস্থা করতে পারি।
গোলাম মাওলা ঝট করে সবুরের দিকে তাকালেন। তার চোখ রক্তবর্ণ। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে সবুর আর কথা বলার সাহস পেল না। গোলাম মাওলা চোখের ইশারায় সবুরকে তার সামনে থেকে সরে যেতে বললেন। তারপর বললেন, তারপর? কাজের কতদূর?
নুরু মিয়া যেন একটু নড়েচড়ে বসল, ঝামেলাতো পিছু ছাড়তেছে না। তারপর আজকাল রাইতেও পুলিশ টহল শুরু হইছে। রেজা সাব লেবারগো থানায় নিয়া নানা ভয় ডর দেখাইতেছে। এইখানে কেউ যেন কোনো ঝামেলা টামেলা না করে।
এইগুলা বললেতো হবে না। কাজটাতো শেষ করতে হবে। সময় কিন্তু বেশি নাই। যেকোনো সময় আসল ঘটনা কিন্তু পুলিশ জেনে যাবে। ধরা পড়ে গেলে তখন কিন্তু আমও যাবে, ছালাও যাবে।
সেইটা বুঝতেছি। এইজন্যই এত সাবধান থাকতেছি।
সাবধান থাকতে থাকতে যেন আবার সময় চলে না যায়। ইলেকশনের কিন্তু বেশি বাকি নাই আর! যা করনের এখনই করতে হবে।
আর তোমার ব্যাপারে নেতারা কি বলল?
আমার পক্ষেতো দুয়েকজন আছেই। ওইটা নিয়া চিন্তা করি না। রাজনীতি করতেছি, দুয়েকটা মার্ডার কেস, খুন-টুনই যদি না সামলাইতে পারলাম, তাইলে আর কি! চুন্নু বেশি বাড়াবাড়ি করলে এখনই কিছু বইলো না। এখন চুপ মাইরা পইড়া থাকতে হইবে। পরিস্থিতি একটু ঠাণ্ডা হোক।
নুরু মিয়া খানিক উসখুশ করতে করতে বলল, একজন লোক আছে, দেখা করব।
গোলাম মাওলা খুব অবাক হলেন, এত রাতে আবার কে?
কাজের লোকই, অকাজের না।
নুরু মিয়া চোখের ইশারা দিতেই সবুর একজন লোক নিয়ে ঘরে ঢুকল। সে এতক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করছিল। ঘরে ঢুকেই গোলাম মাওলাকে সালাম দিল সে। গোলাম মাওলা অবাক চোখে তাকালেন, কে?
নুরু মিয়া বলল, ওর নাম আজগর। সবাই ওরে অজগর সাপ বাইলাই ডাকে। হা হা হা সামান্য হাসল নুরু মিয়া। গোলাম মাওলা অবশ্য কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। নুরু মিয়া আবার বলল, পলাশবাড়িতে যে নতুন পানির লাইন, স্যুয়ারেজ লাইন হইতেছে, সেই সাইটে যে লেবাররা কাজ করতেছে, তাদের দেখাশোনার দায়িত্বে আছে। ও খুব কাজের মানুষ। হাত পাকা।
তো ও এইখানে কেন?
ওরে দিয়া কিছু কাজ আমি করাইতে চাইতেছি। সে বিশ্বাসী লোক। টাকায় বনিবনা হইলে অসুবিধা হইব না। আর সাহসী লোক, হাতও পাকা। দিন রাইতে সমানে কাজ করতে পারে।
গোলাম মাওলা কিছুক্ষণ চুপচাপ লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কিছু না বলেই ভেতরের ঘরে চলে গেলেন।
.
রেজার অনুরোধের ভিত্তিতে পলাশবাড়িতে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। শুরু হয়েছে রাতের টহলও। এসপি ও এএসপি সাহেবও এসেছিলেন। চারদিকের পরিস্থিতি হঠাৎ করেই যেন চুপচাপ শান্ত হয়ে গেছে। রেজার ধারণা, ঝড়ের ঠিক আগে আগে পরিবেশ যেমন শান্ত হয়ে যায়, এ হচ্ছে সেই অবস্থা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কী ঘটছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। মাঝখানে নতুন ব্যাংকের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম একদিন থানায় এসে তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেলেন। এতদিন পর দেখা করতে আসার কারণে তিনি দুঃখ প্রকাশও করলেন। ব্যাংকের পলাশবাড়ির নতুন শাখা কেবল শুরু হয়েছে, এই সময়ে সবকিছুই গুছিয়ে আনার জন্য দিন-রাত অমানুষিক পরিশ্রম যাচ্ছে তার। সে কারণেই দেখা করতে দেরি হয়েছে। এই নিয়ে ম্যানেজার রফিকুল আলম বারবার দুঃখ প্রকাশও করলেন। সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ব্যাংকের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিতেও একটু খেয়াল রাখতে বললেন।
ভদ্রলোককে খুবই পছন্দ হলো রেজার। কিছু মানুষই এমন, দেখলে, খানিক কথাবার্তা বললেই মন ভালো হয়ে যায়। রফিকুল আলম তেমনই একজন মানুষ। কথা প্রসঙ্গে রেজা বললেন, তা ভাই এখানে উঠেছেন কোথায়?
এখনোতো সেভাবে উঠিনি। আমার এক আত্মীয়ের বাসা আছে, এখান থেকে দশ-পনেরো কিলোমিটার হবে। আপাতত সেখান থেকে এসেই অফিস করছি।
কিন্তু ফ্যামিলি আনবেন না?
সেটাই ভাবছি। বাচ্চাদের ভালো কোনো স্কুলওতো নেই এখানে। তারওপর ভালো কোনো বাসাও পাওয়া যাচ্ছে না।
কিছু ভালো বাসা কিন্তু আছে। দেখতে পারেন।
হ্যাঁ, একদম যে দেখিনি, তা নয়। সেভাবে পছন্দ হয়নি। তবে প্রফেসর সাহেবের বাড়িটা কিন্তু বেশ।
রেজা চকিতে তাকালেন, গিয়েছিলেন সেখানে?
হ্যাঁ, একবার গিয়েছিলাম। কথাও হয়েছিল, কিন্তু সেভাবে এখনো রেডি না বাসা, তিনি বললেন পরে জানাবেন। কিন্তু পরেতো আর কিছু জানালেন না।
আপনি খোঁজ নিয়েছিলেন আর?
হ্যাঁ নিয়েছিলাম। কিন্তু শুনলাম উনি নাকি বাসা ভাড়া দেবেন না এখন। টু লেটও নাকি সরিয়ে ফেলেছেন, এই জন্য আর গেলাম না।
১১-১৫. লতিফুর রহমান মানসিকভাবে
লতিফুর রহমান মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। সেদিন থানায় রেজার সামনে তিনি শেষ পর্যন্ত হাউমাউ করে কেঁদেছেন। কাঁদতে কাঁদতেই তিনি বলেছিলেন, বিশ্বাস করুন, আমি খুনটা করিনি। এমনকি ছেলেটাকে আমি চিনিও না। আমি একা বৃদ্ধ একজন মানুষ, রিটায়ার্ড একজন শিক্ষক, আমি…।
তিনি কান্নার দমকে কথা বলতে পারছিলেন না। তারপরও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বললেন, আপনার বিশ্বাস হয়, আমার পক্ষে ওই ছেলেটিকে খুন করা সম্ভব? ওকে আমি কেন খুন করব বলুন? আপনিই বলুন, কি কারণে আমি…।
লতিফুর রহমান আবারো কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি ভেবেছিলেন, রেজা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবেন। কিন্তু তাকে চমকে দিয়ে রেজা উঠে তার কাছে এসে দাঁড়ালেন, তারপর তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, স্যার, আপনি ভয় পাবেন না, আপনি আমাকে সত্যি করে খুলে বলুন, ঘটনা কি হয়েছিল!
লতিফুর রহমান ফুল হাতা পাঞ্জাবি পরা বলে তার হাতের ক্ষতটা দেখা যাচ্ছে না। তবে মানসিক এবং শারীরিক ধকলে তিনি তখন অসুস্থ প্রায়। তার শরীরে জ্বরও আছে। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, আমি আপনাকে কসম করে বলছি, খুনটা আমি করিনি। কে করেছে তাও আমি জানি না। তবে কি ঘটেছে, সেটি আমি আপনাকে বলব।
রেজা বললেন, জি বলুন?
লতিফুর রহমান অবশ্য কথা বলতে পারলেন না। তিনি বমি করে মেঝে ভাসিয়ে দিলেন। রেজা তাকে ধরতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, তার শরীরে জ্বর। সেদিন আর কোনো কথা বলতে পারেননি লতিফুর রহমান। তাকে ভালোভাবে বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন রেজা। তবে তিনি স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন থানার নির্দেশ ছাড়া বাড়ির বাইরে এক পাও যেতে পারবেন না লতিফুর রহমান। একটু সুস্থ হলেই তাকে থানায় আসতে হবে।
লতিফুর রহমান বুঝতে পারছেন না এখন তার করণীয় কী? বা তার সামনে এখন কী অপেক্ষা করছে। তার বিরুদ্ধে কি খুনের মামলা হবে? আত্মপক্ষ সমর্থন করার মতো কোনো সুযোগ কি তার রয়েছে? থাকলেও তিনি কিভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন? এমন নানা প্রশ্ন সারাটাক্ষণ তার মাথায় কিলবিল করতে থাকল। লতিফুর রহমানের হঠাৎ মনে হলো, এর চেয়ে বরং সেদিন লাশটা দেখার পর সঙ্গে সঙ্গেই যদি তিনি পুলিশে খবর দিতেন, তাহলেই বোধহয় সবচেয়ে ভালো হতো। হয়তো এখনকার চেয়ে পরিস্থিতিটা তখন খানিকটা হলেও তার অনুকূলে থাকতে পারত। কিন্তু তিনি নিজে নিজেই সেই সব পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। যদিও ওই পরিস্থিতিতে তিনি যেটি করেছিলেন, সেটিই ছিল সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত নিরাপদ উপায়।
দুদিন পরে তাকে আবার থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি গ্রামে যাওয়া থেকে শুরু করে একে একে পুরো ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। রেজা এর মাঝখানে একটা কথাও বললেন না। লতিফুর রহমানের কথা শেষ হলেও রেজা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, আপনার কথা আমি কেন বিশ্বাস করব? আপনি এর আগে পুরোটা সময় খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একের পর এক মিথ্যা বলেছেন। এখনো যে মিথ্যে বলছেন না, তার নিশ্চয়তা কী?
লতিফুর রহমান নরম গলায় বললেন, যুক্তি।
যুক্তি?
জি। আপনি যুক্তিবাদী মানুষ। একটু যুক্তি দিয়ে চিন্তা করলেই বুঝবেন, আমার মতো একজন মানুষের পক্ষে এই ঘটনা ঘটানো সম্ভব না। তা ছাড়া ছেলেটাকে আমি চিনি না, জানি না। এমনকি এখানে আমার কোনো স্বার্থও নেই।
সবকিছু কি যুক্তি দিয়ে হয় স্যার?
হয় না?
তাহলে আপনি আমাকে একটা যুক্তি দিন যে ওই ছেলেটার লাশ ওখানে কীভাবে গেল?
লতিফুর রহমান এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। রেজা বললেন, ছেলেটার সম্পর্কে আমি যতদূর তথ্য পেয়েছি, সে বখে যাওয়া বিপথগামী তরুণ। এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিঁচকে চুরি, ছিনতাই, ইয়াবা ব্যবসা এসবের সঙ্গে সে যুক্ত ছিল। এমনকি হতে পারে যে সে আপনার কাছেও চাদা চেয়েছিল? আর তার জের ধরেই…।
এই প্রশ্নে লতিফুর রহমান চুপ হয়ে গেলেন। এভাবে তিনি ভেবে দেখেননি। রেজা বললেন, তবে হ্যাঁ, আপনার একার পক্ষে খুনটা করা সম্ভব না, এবং খুনের ধরণ দেখে যতদূর মনে হয়েছে, এর সঙ্গে একাধিক মানুষ জড়িত ছিল। সেক্ষেত্রে আপনার সঙ্গে আরো কেউ থাকতে পারে। সেই আরো কেউ কারা, সেটাই আমি জানতে চাইছি।
লতিফুর রহমান অসহায় গলায় বললেন, আমি সত্যিই আর কিছু জানি না রেজা সাহেব। আমি জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু এর বেশি আমি কিছু জানি না। আমি গ্রাম থেকে ফিরলাম, তার দিন দুই বাদে ব্যাংকের ম্যানেজার সাহেব এলেন বাসা দেখতে, আমি খুব খুশি হয়েছিলাম তাকে দেখে। আমি নিজ থেকেই চাইছিলাম উনি ওপর তলার ঘরটা ভাড়া নিন। আমি উনাকে নিয়ে ঘর দেখাতে গেলাম, কিন্তু দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র গন্ধে আমাদের দম আটকে যাবার দশা হলো। আমি ভেবেছিলাম ইঁদুর বেড়াল কিছু মরে পড়ে আছে কোথাও। খুঁজতে গিয়ে দেখলাম বাথরুমের ভেতর…।
একটু থামলেন লতিফুর রহমান। তারপর দম নিয়ে আবার বললেন, তখনো ব্যাংকার সাহেব ভেতরের বেডরুমে আসেননি। তিনি রুমালে নাক চেপে ড্রইংরুমে দাঁড়ানো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমার ইনসটিংকট বলছিল, এই ঘটনা কাউকে জানানো যাবে না। আমি তখন বাথরুমের দরজা বন্ধ করে উনাকে নিয়ে বের হয়ে গেলাম। আপনিই বলুন, আমি যদি জানতাম যে ওই ঘরে একটা লাশ আছে, তাহলে আমি উনাকে সেখানে নিয়ে যেতাম? আর লাশটাকে এতদিন ওখানে রেখে পচে গন্ধ ছড়ানোর সুযোগ দিতাম?
রেজা চুপ করে রইলেন। লতিফুর রহমানের কথায় যুক্তি আছে। তার চেয়েও বড় কথা তিনিতো চাইলেই ব্যাংকের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তা ছাড়া তার যতদূর মনে পড়ছে, ব্যাংকের ম্যানেজারও বলেছিলেন যে তিনি লতিফুর রহমানের বাড়িতে বাসা দেখার জন্য গিয়েছিলেন।
.
সেদিন বিকেলেই রেজা সরাসরি ব্যাংকে গেলেন। ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম প্রচণ্ড ব্যস্ত। অল্পদিনেই প্রচুর মানুষ ব্যাংকে একাউন্ট খুলেছে। লেনদেন শুরু করেছে। জমজমাট হয়ে উঠেছে ব্যাংক। সঙ্গে ব্যাংকের বাইরে মোবাশ্বেরের চায়ের দোকান আর হারাধনের মুচির দোকানও জমে উঠেছে। মোবাশ্বেরের দোকানের গরুর দুধের চা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সকাল-সন্ধ্যা চায়ের অর্ডার নিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারে না সে। এখনো বিকেলের চা নিয়ে সে নিজেই এসেছে ম্যানেজারের কাছে। হারাধনের ব্যবসাও ভালো। স্বয়ং রফিকুল আলম হারাধনের কাছ থেকে অর্ডার দিয়ে জুতো বানাচ্ছেন। সেই জুতার স্যাম্পল দেখাতে নিয়ে এসেছে সে।
রেজাকে দেখে রফিকুল আলম উঠে দাঁড়ালেন, আরে আপনি! বলা নেই কওয়া নেই, একদম সশরীরে হাজির। আগে বললেতো একটু ভালো চা-নাশতার আয়োজন করা যেত!
রেজা হাসলেন, মোবাশ্বেরের দোকানের চা পুরি খাওয়ালেই হবে। ওতেই। আমি খুশি।
মোবাশ্বের হাসতে হাসতে বলল, আমি তাইলে চা আর পুরি নিয়াসি ছার?
রফিকুল আলম হেসে অনুমতি দিলেন। তার পায়ে হারাধনের বানানো জুতা, তিনি জুতা দেখিয়ে বললেন, কেমন হবে বলুনতো?
রেজা বললেন, অল্পদিনেই সে বেশ নাম করেছে। ভালো না হলে এত নাম করার কথা না!
রফিকুল আলম সবাইকে বিদায় দিয়ে বললেন, বলুন, তারপর কী খবর?
এটা-সেটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর রেজা বললেন, আচ্ছা, প্রফেসর সাহেবের ঘরটা কেমন বলুনতো? আপনার পছন্দ হয়ে থাকলে আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। আমার ধারণা, আমি বললে তিনি না করবেন না।
ঘর ভালো। তবে ভালো করেতো দেখতেই পারলাম না!
কেন? দেখতে পারলেন না কেন?
আর বলবেন না। উনারা অনেকদিন পর গ্রাম থেকে এসেছিলেন, সম্ভবত আমি যেদিন গেলাম, তার আগের দিনই। ঘরটর তালা মেরে রেখে গিয়েছিলেন, সেদিনই প্রথম খুললেন। আমরা ঘরে ঢুকতেই মরে পচে যাওয়া কোনো প্রাণীর তীব্র বোটকা গন্ধে আমাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। সম্ভবত ইঁদুর-বেড়াল কিছু মরে পচেছিল। পরে তড়িঘড়ি করে দুজনই বের হয়ে এসেছিলাম। ফলে আর দেখাই হলো না ঘরটা। তবে ভালোই ছিল মনে হয়।
রেজা অবশ্য আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। তবে তার দুশ্চিন্তা আরো বাড়ল। কেউ কাউকে খুন করে কোথাও লুকিয়ে রাখলে সেখানে নিশ্চিত করেই অন্য কাউকে নেবে না। নেয়ার কথাও না। এটা খুব সাধারণ, স্বাভাবিক ব্যাপার। তার চেয়েও বড় কথা, ওই দিনের পরই লতিফুর রহমান টু লেট সরিয়ে ফেলেছেন। তার মানে ওই দিন লাশ আবিষ্কার করার পর তিনি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন এবং সেজন্যই চাননি বাসা দেখতে আর কেউ আসুক। অর্থাৎ এই অংশে তিনি যা বলেছেন, তা সম্ভবত সত্যি। কিন্তু তাহলে খুনটা করল কে? আর লাশটাই বা ওখানে গেল কী করে!
.
রেজা আর অফিসে গেলেন না। বাসায় এসে দীর্ঘসময় চুপচাপ বসে রইলেন। তিনি উঠলেন রাত ৯টায়। উঠে নিজে নিজেই রান্না করে রাতের খাবার খেলেন। ডিম ভাজি, ডাল আর ভাত। সঙ্গে শুকনো মরিচ। খাবার খেতে ভালো হয়েছে। কিন্তু খেতে বসেও তিনি সম্ভবত আনমনা হয়েছিলেন। ভাত খাওয়া শেষ হতে না হতেই প্রচণ্ড ঝালে তার নাকে মুখে পানি চলে এলো। তিনি পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে লাগলেন। এই অবস্থাও চললো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর একদম ঝিম মেরে আবার বসে রইলেন। বসে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, এতদিন তার মধ্যে যে স্পৃহাটা ছিল, সেই স্পৃহাটা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। তার বিশ্বাস ছিল কেসটা তিনি সমাধান করার খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন, বা একটা শক্তিশালী ব্লু বের করে ফেলেছেন। কিন্তু এখন এসে মনে হচ্ছে দীর্ঘ কষ্টকর পথ হাঁটার পর এসে দেখা যাচ্ছে এই পথের কোনো গন্তব্য নেই। এটি একটি কানাগলি। তিনি আসলে কেসটার যেখানে ছিলেন, এখনো সেখানেই আছেন। কিংবা আরো পিছিয়েই গেছেন।
রাতে রেজার ভালো ঘুম হলো না। ঘুমের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সব স্বপ্ন দেখলেন তিনি। ফজরের আজানের খানিক পরে ঘুম ভেঙে গেল তার। মা ফোন করেছেন। গত কয়েকদিন মার সঙ্গে কথা হয়নি। মার ফোন ধরতে যে তার খুব ভালো লাগে, তেমনও না। তিনি জানেন, সেইতো একই কথা। রোজ রোজ। এমনিতে মার খবর তিনি অন্য উপায়ে রাখেন। আর রাখেন বলেই হয়তো ওই এক কথা শুনতে ইচ্ছে করেনা বলেই ফোনটা আর ধরেন না তিনি।
আজ ফোন ধরতেই তার মা রেহানা আখতার বললেন, আনু, কেমন আছিস?
খারাপ।
খারাপ কেন?
কারণ তুমি আমাকে আবারো আনু বলে ডাকছে।
তোর নাম যা, তা বলে তোকে ডাকব না?
এটাতো আমার নাম না, ছোটবেলায় নানাভাই আদর করে ডাকত।
আমিও আদর করেই ডাকলাম। সমস্যা কই?।
তুমি অন্য কারণে ডাকছো মা।
অন্য কী কারণ?
রেজা হাল ছেড়ে দেয়া গলায় বললেন, আচ্ছা, তুমি ডাকো। তোমার যেই নামে ডাকতে ভালো লাগে, তুমি সেই নামেই ডাকো।
রেহানা আখতার হাসলেন, আমি একটা বুদ্ধি পেয়ে গেছি, বুঝেছিস?
কী বুদ্ধি?
তুই যখন আমার ফোন ধরবি না, তখন অন্য কারো ফোন নম্বর থেকে ফোন করব। অচেনা নম্বর।
তুমি অচেনা নম্বর পাবে কই?
অচেনা নম্বরের কি অভাব নাকি? কারো কাছে একটা ফোন করার জন্য চাইলেই দেবে।
আমিতো অচেনা নম্বর ধরি না মা।
কেন? কেউ বিপদে পড়ে তোকে ফোন করলে তুই ধরবি না?
রেজা এবার আর কোনো কথা বললেন না। রেহানা আখতার বললেন, শোন, অনন্যা মেয়েটার কিন্তু দুম করে বিয়ে হয়ে যাবে।
অনন্যাটা আবার কে?
আরে স্কুলে পড়ায় যে মেয়েটা। অনু।
ওর নাম অনন্যা নাকি?
হুম, অনুতো ওর ডাক নাম।
আচ্ছা।
আমি কথা বলি?
কী কথা?
বিয়ের কথা?
কার?
কার আবার? তোর আর অনুর।
আমার কথা তুমি বলবে কেন?
তাহলে কে বলবে?
আমি।
রেহানা আখতার খানিক চুপ করে থেকে বললেন, বল তাহলে। তুই বললেতো আমার আর বলতে হয় না।
সময় হলেই বলব।
তোর সময় হবে কবে?
সেটাতো আগেভাগে বলা যায় না মা।
কেন? আগেভাগে বলা যাবে না কেন?
কেন, শোননি আবার? জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, এই তিনে মানুষের হাত নেই। আগেভাগে কিছু বলা যায় না।
সময় চলে গেলে তখন বুঝবি। মেয়েটার একদিন টুক করে বিয়ে হয়ে যাবে। তখন কান্নাকাটি করেও লাভ হবে না।
তোমার ধারণা ওই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে আমি কান্নাকাটি করব?
শুধু যে কান্নাকাটি করবি, তা-ই না। কাঁদতে কাঁদতে গড়াগড়ি খাবি।
তোমার ধারণা ভুল মা।
স্বামী বা প্রেমিক সম্পর্কে মেয়েদের ধারণা ভুল হয়, কিন্তু সন্তান সম্পর্কে মায়েদের ধারণা ভুল হয় না। তারা সন্তানের চোখ দেখে মনের খবর বলে দিতে পারে।
তোমার ধারণা তুমি আমার চোখ দেখে মনের ভেতর ওই মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছো?
হ্যাঁ, পাচ্ছি। সারাক্ষণ দেখতে পাই।
সাবধান কিন্তু মা।
সাবধান কেন?
ওই মেয়েটাকে সারাক্ষণ দেখতে দেখতে আবার স্কুলের বাচ্চাকাচ্চাগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে ভুলে যেও না। আগে ওদের দিকে খেয়াল রাখো প্লিজ।
রেহানা আখতার হাসলেন। তারপর খানিক চুপ করে থেকে বললেন, দেখেছিস আনু, তোদের দুজনের নামে কী মিল!
রেজা এই কথার কোনো জবাব দিলেন না। তিনি জানতেন, তার মা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তাকে আনু বলে ডাকে।
রেহানা আখতার এবার নিজ থেকেই বললেন, আনু আর অনু, কী সুন্দর নাম, দেখেছিস? এমন আর হয়? হয় না। একটা মাত্র আকার, বাকি সব এক। সুন্দর না? এটা আল্লাহই ঠিক করে রেখেছে, বুঝেছিস? তুই যতই না করিস, লাভ হবে না। হবেই না।
রেহানা আখতার আরো কিছু বলতে চাইছিলেন, তার আগেই রেজা ফোন রেখে দিলেন।
.
১২.
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সন্ধ্যার পরপরই অন্ধকারটাও নেমে এসেছে। সেই অন্ধকারে লতিফুর রহমানের বাড়ির পেছনে নদীতে ছাতা মাথায় বসে আছে নুরু মিয়া আর সবুর। খানিক বাদে এলো আরো একটা নৌকা। নুরু মিয়া নিচু গলায় বলল, কে ওইখানে?
অন্য নৌকা থেকে অনুচ্চ শব্দে সাড়া এলো, আমি আজগর নুরু ভাই।
কয়জন আইছো?
তিনজন?
তিনজনে কাম হইব?
হইব ভাই। আপনে ভরসা রাখেন।
এত সহজ না কিন্তু আজগর মিয়া।
সহজ না দেইখ্যাইতো লোকজন কম আনছি। গোপন কামে লোক আনতে হইব কম। বেশি লোক আনলেই নজরে পইড়া যাওনের চান্স আছে।
এইটা অবশ্য ঠিক কথা বলছ।
সবুর অন্ধকারেই নুরু মিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, হারামজাদার বুদ্ধি আছে।
নুরু মিয়া চাপা স্বরে হাসলেন, বুদ্ধি না থাকলে কী নুরু মিয়া কাউরে কাজে নেয়? নেয় না।
দু খানা নৌকা জলের ভেতর ছপছপ শব্দ তুলতে তুলতে উত্তর দিকের অন্ধকারে মিশে যেতে থাকল।
.
চেয়ারম্যান চুন্নু মিয়া রাতে বন্যা উপদ্রুত এলাকাগুলোতে লোকজন নিয়ে টহল দিচ্ছেন। নির্বাচনের আগে আগে এমন দুর্যোগে লোকজনের পাশে থাকাটা জরুরি। প্রশাসনের কাছে আবেদন করে থানা থেকে কিছু পুলিশও পেয়েছেন তিনি। পুলিশের মধ্যে শরিফুলও আছে। চুন্নু মিয়া শরিফুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, রেজা সাহেবের সমস্যাটা কী বলেনতো?
কোন সমস্যার কথা বলতেছেন চেয়ারম্যান সাব?
তার কী বুদ্ধিশুদ্ধি কম নাকি?
আমারও তাই ধারণা।
বুদ্ধি কম না হলে সে যা করতেছে, তা করত না।
জি, চেয়ারম্যান সাব। কথা সত্য।
সে আমার সঙ্গে যে আচরণ করে, আমার থানায় বইসা আমার সঙ্গে এই জিনিস করা তার নিজের জন্যই ক্ষতি। সে যত যা-ই ভাবুক, সামনের ইলেকশনেও নমিনেশন আমিই পাব। সে যে গোলাম মাওলার পক্ষ নিয়ে নাচতেছে, মাওলারে দিয়ে কী রাজনীতি হবে? হবে না। সে একটা আস্ত রামছাগল। ছাগল দিয়ে হালচাষ হয় না।
গোলাম মাওলা সাবের ধারণা আবার উল্টা।
তার কী ধারণা?
তার ধারণা রেজা স্যার আপনার পক্ষ নিতেছে।
শোনেন, আমি দুই দিনের বৈরাগী না যে ভাত দেইখাই অন্ন বলব। ছোটবেলা থেইক্যা রাজনীতি করি। কোনো বিলাই ইঁদুর ধরে, মোচ দেখলেই বুঝতে পারি। আপনার স্যারের সামনে বিপদ। এটা আমি বলে রাখছি। সে মাওলার কাছ থেকে রেগুলার টাকা পায়। এই ঘটনা আমি জানি।
টাকা যে-ই দিব, স্যারে নিব। না করব না। আপনে দিলেও নিব চেয়ারম্যান সাব।
চুন্নু মিয়া হাসলেন, এই কাজ আমি করব না। আমি দেখতে চাই তার ক্ষমতা কতদূর। সময় খারাপ গেলে দড়িও সাপ হয়ে ছোবল মারে। কিন্তু দড়িতো দড়িই। খারাপ সময় বেশিদিন থাকেনা। তবে আমি কিন্তু এখনো রাতে ঘুমাতে পারি না।
এত চিন্তায় ঘুম হয় কেমনে? আপনে চেয়ারম্যান মানুষ, আপনের মাথায় কি একটা-দুইটা চিন্তা? হাজার হাজার মানুষের জীবন, মরণ নিয়া আপনের চিন্তা।
হাজার হাজার মানুষের চিন্তায় আমার ঘুম বন্ধ হয় না। তাদের জন্য দুশ্চিন্তা হয়, কিন্তু ঘুম হারাম হয় না।
তাহলে?
চোখ বুজলেই লিখনের মুখটা আমার চোখের সামনে ভাইসা ওঠে। রাতের পর রাত। মনে হয় যেই নদীতে লিখনের লাশ ভেসে উঠছে সেই নদীটা রক্তে লাল করে দিই।
শরিফুল কিছু বলার আগেই সোহরাব মোল্লা বলল, কী যে বলেন না চেয়ারম্যান সাব। আপনের মতো ভালো মানুষরে দিয়া এইসব হইব না। আপনের বাইরেরটা শক্ত হইলেও ভেতরটা নরম। আপনেতো আর গোলাম মাওলার মতো বাইরে নরম, ভেতরে কসাই না। আপনে হইলেন…।
সোহরাব কথা শেষ করার আগেই চুন্নু মিয়া ধমকে উঠলেন, তুই চুপ থাক! তুই আমারে চেনোস না। দলের কথা চিন্তা কইরা আমি ধৈর্য ধরে আছি। দল যদি কিছু না করে, এই বন্যার পানিতে রক্ত মিশে বন্যা আরো বাড়ব।
পুলিশের সামনে যে এসব কথা বলা যায় না, তা যেন মাথায়ই নেই চুন্নু মিয়ার। সোহরাব মোল্লা তাকে সেটিই বোঝাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চুন্নু মিয়া তাকে পাত্তা দিলেন না। তিনি গলার রগ ফুলিয়ে ভয়াবহ সব কথা বলতে লাগলেন।
পরদিন দুপুরে রেজা এলেন লতিফুর রহমানের বাড়িতে। তার সঙ্গে শরিফুল। তারা ঘুরে ঘুরে পুরো বাড়িটা আবার দেখলেন। দেখলেন সবগুলো ঘরই। তিনতলার যে ঘরটিতে লাশ পাওয়া গিয়েছিল, সে ঘরটিও তারা যতটা সম্ভব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সম্ভাবনা নিয়েই খতিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এই ঘরে লাশ আসার আর কোনো উপায় খুঁজে বের করতে পারলেন না। লতিফুর রহমান অসহায় গলায় বললেন, আমি ঘুমাতে পারছি না এসআই সাহেব। সারাক্ষণ মাথার ভেতর যন্ত্রণা। এই বয়সে এসে এত টেনশন আর নিতে পারছি না।
টেনশন নিতে না পারলে অত চাপ সামলে অমন বুদ্ধি করে লাশটাকে সরালেন কীভাবে?
কীভাবে সরালাম এখন নিজেরো বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে একটা ঘোরের মধ্যে কাজটা করেছি।
খুনটাতো আবার ঘোরের মধ্যে করেননি? দেখা গেল নিজেই খুন করে ভুলে গেছেন। এমন কিন্তু হয়, বুঝলেন? অনেকের ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে।
লতিফুর রহমান এবার আর কথা বললেন না। রেজা বললেন, আপনি বলেছেন এই বাসার চাবি আপনি ছাড়া আর কারো কাছেই থাকে না?
জি না। ওই যে সিন্দুকটা দেখছেন, ওর মধ্যে সবগুলো চাবি থাকে। আর সিন্দুকের চাবি থাকে আমার কাছে। আমি ছাড়া কারো পক্ষেই কোনো ঘর খোলা সম্ভব না।
আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা যাবে?
বলা হয়তো যাবে, কিন্তু তাতে লাভ হবে বলে মনে হয় না। উনি অসুস্থ।
কী হয়েছে ওনার?
শারীরিক মানসিক স্ট্রেস। মাঝে মাঝে খুব হাইপার হয়ে যান।
এত স্ট্রেস কিসের?
লতিফুর রহমান খানিক চুপ করে থেকে বললেন, আমার ছেলেটাকে নিয়ে।
যেন আচমকা মনে পড়েছে, এমন ভঙ্গিতে রেজা বললেন, ওহ, আপনার ছেলের কথাতো ভুলেই গিয়েছিলাম। সেদিন কিছুটা বলেছিলেন, উনিতো আমেরিকায় থাকেন, তাই না?
জি।
উনাকে নিয়ে কী সমস্যা?
বহুবছর সে বিদেশে, দেশে আসছে না। এই নিয়ে খুব মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে আমার স্ত্রী। সেটা এখন এক্সট্রিম হয়ে গেছে। বুঝতেই পারছেন, একমাত্র সন্তানতো?
উনি আসছেন না কেন দেশে? খুব স্ট্রাগল করে ওখানে গেছে সে। তারপর গিয়েও স্ট্রাগল করতে হয়েছে অনেক। গ্রিন কার্ড পেতেও খুব ঝামেলা হয়েছে। তারপর বোঝেনইতো, পরপর দুটো বাচ্চা হলো, তাদের বড় করা, স্কুলিং, তারপর আর্নিং-এর ব্যাপার। অত দূরের দেশ থেকে দেশে আসা একটা প্ল্যান-পরিকল্পনার ব্যাপার যেমন, তেমনি টাকা পয়সারও ব্যাপার।
সেদিন যে বললেন, এবার আসার কথা ছিল?
জি ছিল। কিন্তু মেয়েটার একসিডেন্টের কারণেইতো আসা হলো না।
.
রেজা নাসিমা বেগম ও ডালিয়ার সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু লাভ হলো না। নাসিমা বেগম কোনো কথাই বলতে চাইলেন না। কথা বলতে চাইল না ডালিয়াও। সে পুলিশকে প্রচণ্ড ভয় পায়। তারপরও তার সঙ্গে কিছু কথা হলো। রেজা বললেন, তোমার বাড়ি কোথায়?
ফরিদপুর।
অতদূর থেকে এখানে এলে কি করে?
আমার ভাই নিয়াসছে।
তোমার ভাই কি করে?
রাজমেস্তরির কাম করে। কনস্টাকশনে।
সে নিয়ে আসল কেন? সে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় কামে যায়। এইখানেও কামে আসছে। তখন পোরবেচার খালুজানে তারে বলছিল কামের মানুষের কথা।
তখন সে তোমাকে নিয়ে এসেছে?
ডালিয়া ওপর নিচ মাথা নাড়াল। সে তাকিয়ে আছে নিচে, পুলিশের দিকে তাকাতে ভয় পাচ্ছে সে।
এখানে আসার আগে কী করতে তুমি?
ঢাকায় আছিলাম।
ঢাকায় কী কাজ করতে?
কিছু করতাম না। আমার স্বামী কাওরান বাজারে কাঁচা মালের ব্যবসা করত।
এখন স্বামী কই?
তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই।
যোগাযোগ নাই কেন?
সে আরেকটা বিয়া করছে।
তুমিতো দেখতে ভালো। চেহারা, গায়ের রংও ভালো। তাহলে স্বামী আবার বিয়ে করছে কেন?
আমার সন্তান হয় না, এইজন্য।
ওহ। তা স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?
নাহ, হয় নাই।
কেন? সে একসঙ্গে দুই বউই রাখতে চায়?
নাহ, সে আমারে তালাক দিব না। আমারে বলছে তারে ডিভোস দিতে।
তুমি দাও নাই?
ডালিয়া মাথা নিচু রেখেই ডানে-বায়ে মাথা নাড়াল। রেজা বলল, ডিভোর্স দাও নাই কেন?
ডালিয়া এই প্রশ্নের জবাব দিল না। সে মাথা নিচু করে বসে রইল। তবে তার চোখের কোল গড়িয়ে দু ফোঁটা জল টুপটাপ ঝরে পড়ল।
.
এনায়েতের বিষয়েও কথা হলো খানিক। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে ঘটনার অনেক পরেই এ বাড়িতে এসেছে এনায়েত। সুতরাং এ ঘটনায় এনায়েতের সম্পৃক্ত বা জানাশোনা থাকার সুযোগ নেই বললেই চলে। লতিফুর রহমানের বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকেলে হারাধন মুচির দোকানে গেলেন রেজা। লিখনের বিষয়ে হারাধন মুচিকেও নানা প্রশ্ন করলেন তিনি। লিখন কাদের সঙ্গে মিশতো, কি করত, কার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল, এই সব। হারাধন মুচি যতটুকু জানত, তা বললও। কিন্তু রেজার তাতে খুব একটা লাভ হলো বলে মনে হলো না। রেজা ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড অস্থির হয়ে উঠছেন। এ অবস্থায় নিজের গা বাঁচানোর জন্য হলেও তার উচিত লতিফুর রহমানকেই গ্রেপ্তার করে ফেলা। কিন্তু ঘটনাটি তাকে প্রচণ্ডরকম ভাবিয়ে তুলছে। পুরোপুরি ধোঁয়াশার মধ্যে পড়ে গেছেন তিনি। সারাক্ষণ একটা প্রবল অস্বস্তি, একটা অস্থিরতা কাজ করছে। তিনি জানেন, এর থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ঘটনার সত্যিকারের অপরাধীকে খুঁজে বের করা। এ ছাড়া আর কোনো কিছুতেই তিনি স্বস্তি পাবেন না। কিন্তু অপরাধীকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাব্য কোনো উপায় রেজার জানা নেই। তার রীতিমতো দিশেহারা লাগছে।
.
সন্ধ্যায় মোবাশ্বেরের চায়ের দোকানের সামনে ভিড়-ভাট্টা লেগেই থাকে। আজও আছে। ব্যাংক ছুটি হয়েছে, ছুটি হয়েছে আরো অনেক অফিসই। তাদের সবার ভিড়ই লেগে আছে এখানে। বিভিন্ন শ্রমিকরাও এই সময়টাতেই যা একটু ফুরসৎ পায়। তারাও এখানে সেখানে বিচ্ছিন্ন দাঁড়িয়ে চা-বিড়ি ফুকছে। সেই ভিড়ে সেদিনের সেই শ্রমিক দেলোয়ারকে দেখে ডাকলেন রেজা। দেলোয়ার সালাম দিয়ে দাঁড়াতেই রেজা বললেন, আর কী খবর তোর? বউ-বাচ্চা ভালো?
বাচ্চাতো এহনো হয় নাই ছার। তয় বউটা ভালো না।
ভালো না কেন?
এই সময়ে কত কিছিমের রোগ-বালাই যে মাইয়া মাইনসের হয়, তার আর শেষ নাই!
তা বাড়ি যাস না কেন? এখন তো বাড়ি থাকা উচিত।
দেলোয়ার অসহায় ভঙ্গিতে হাসল, বাড়ি যাইতে টাকা পয়সা লাগেনা ছার? এই সময় টাকা পয়সাটা খুব দরকার।
তা তোদের সরদার এখনো তোদের টাকা-পয়সা কিছু দেয়নি?
কন্টাকতো এহনো শেষ হয় নাই। শেষ হইলে দিব। এহনো কিছু কিছু দেয়, কিন্তু সেইটা ওই খাওন, হাত খরচের লাইগ্যা। পুরাটা দিব কন্টাক শেষ হইলে।
কিন্তু কন্ট্রাক্ট শেষ হবার আগেই যদি লাগে? যদি তোর বউর ইমার্জেন্সি দরকার হয়ে পড়ে?
তাইলে সর্দাররে জানাইলেই হইব। দিয়া দিব। হারামজাদা হইছে ওই আজগর। অয় দিব না। ঝামেলা করব।
দেলোয়ার হাতের আঙুল দিয়ে আজগরকে দেখাল। তাদের থেকে সামান্য দূরে আজগর দাঁড়িয়ে আছে। আজগরের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে দুজন অচেনা শ্রমিক আর নুরু মিয়া। সঙ্গে শক্তপোক্ত সবুরও আছে। তাদের একসঙ্গে দেখে রেজার খানিক ক্রু কুঁচকে গেল। ছোট্ট জটলাটার সকলের মুখেই দুশ্চিন্তা এবং গুরুগম্ভীর আলোচনার ছাপ। বিষয়টা কেমন একটা খচখচানি তৈরি করল রেজার বুকের ভেতর। তিনি শরিফুলকে পাশে ডেকে নিয়ে বললেন, ও লোকটার দিকে নজর রেখো।
শরিফুল বলল, ওর নামতো আজগর। নিরীহ লোক, কনস্ট্রাকশন শ্রমিকদের দেখভাল করে।
যেটা বলেছি, সেটা করো। সঙ্গে নুরু মিয়া আর সবুরের দিকেও খেয়াল রেখো।
শরিফুল দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলল, আচ্ছা।
.
পরদিন রাতে রেজাকে খবরটা দিল শরিফুল, স্যার, কিছু একটা ঝামেলা।
রেজা তাকালেন, কী ঝামেলা?
প্রায় ভোর রাতের দিকে উত্তর দিকের বিলে আজগরকে নৌকায় দেখা গেছে।
সঙ্গে কে ছিল?
আরো দুইটা লোক ছিল, চিনি না। তবে শ্রমিক ট্রমিক হতে পারে।
সবুর বা নুরু মিয়া ছিল না?
না স্যার।
ঘটনা কি?
ঘটনা বুঝলাম না। তারা শহর থেকে বের হইল রাইত বারোটা নাগাদ। তারপর বিলের মাঝখানে নৌকা নিয়ে সারা রাইত বইসা রইল।
শুধু বসে রইল? আর কিছু করল না?
না, স্যার, আর কিছুই করল না। ধইরা আইনা দুইটা ডলা দিই স্যার? সব বের হয়ে যাবে।
রেজা চিন্তিত গলায় বললেন, উঁহু। কিছু করো না। জাস্ট নজর রাখো।
.
শহরে ভেতরে ভেতরে যে কিছু একটা ঘটছে সে বিষয়ে নিশ্চিত রেজা। কিন্তু কী ঘটছে সেটি তিনি বুঝতে পারছেন না। পরদিন সন্ধ্যায় গোলাম মাওলার বাড়িতে গেলেন তিনি। গোলাম মাওলা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। রেজাকে দেখে অবাক হলেও হাসিমুখেই বললেন, কী খবর রেজা সাহেব, গরিবের বাড়িতে হাতির পাড়া!
রেজা হাসলেন, উল্টোটা বললেন ভাই, হাতির বাড়িতে পিপীলিকার পাড়া হবে।
পিপীলিকা কিন্তু ভয়ংকর প্রাণী ভাই। একবার হাতির কানে ঢুকলে খবর আছে। কিন্তু হাতির পাড়ায় পিপড়ার কিন্তু কিছু হয় না!
সব পিঁপড়াতো আর হাতির কান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
গোলাম মাওলা হাসলেন, আপনি পারবেন।
তার মানে স্বীকার করে নিলেন যে আমি পিপড়া আর আপনি হাতি?
গোলাম মাওলা হো হো হো করে হাসলেন, আপনার সঙ্গে কথায় পারব না ভাই। তা বলেন ভাই, কী খবর?
আপনার জন্য একটা দুঃসংবাদ আছে।
দুঃসংবাদ?
হুম, ওপর মহল থেকে আভাস দেয়া হয়েছে, চাইলে যেকোনো সময় যে কাউকে যেন গ্রেপ্তার করা হয়।
তো করেন গ্রেপ্তার। এরকম একটা খুন হলো, আর আপনি গ্রেপ্তার করবেন? খুন কি খেলা নাকি? আমার শহরে এইগুলা আমি চাইও না। খালি একবার ক্ষমতায় আসতে দেন, দেখেন এই শহরের জন্য কী করি?
রেজা খানিক থেমে বললেন, আমাকে বলা হয়েছে, চাইলে আপনাকেও যেন গ্রেপ্তার করতে পারি!
গোলাম মাওলা সামান্য থতমত খাওয়া গলায় বললেন, আমাকে? আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা আছে? প্রমাণ আছে?
পুলিশের গ্রেপ্তার করতে প্রমাণ লাগে না। মামলা হলেই হয়। আপনার বিরুদ্ধে মামলা আছে।
মামলা? আমার বিরুদ্ধে? কে করেছে, চুন্নু মিয়া?
না, আপনার বিরুদ্ধে মামলা করেছে আপনার বাড়ির কাজের মেয়ে আছিয়া। সে আপনার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করেছে।
গোলাম মাওলা বসা থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন, আছিয়া! সে গত ছয়-সাতদিন আগে বাড়ি যাবে বলে ছুটি নিয়ে গেছে, আর ফেরে নাই। সে কই?
সে কই সেটাতো বলতে পারব না। তবে গতকাল চুন্ন চেয়ারম্যানের ম্যানেজার সোহরাব মোল্লা তাকে নিয়ে থানায় এসেছিল। আমি তখন থানায় ছিলাম না। ডিউটি অফিসার ছিলেন। আছিয়া একা এলে হয়তো সে আপনার বিরুদ্ধে এই মামলা নিত না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, চুন্নু মিয়া বর্তমান চেয়ারম্যান, সে লোক পাঠালে মামলা না নিয়ে উপায় ছিল না। তা ছাড়া, আপনিতো জানেনই, আমরা এখানকার পুলিশরা এমনিতেই নানা প্রেসারে আছি। ওপর মহলের ভালো নজরে নেই। আর চুন্নু মিয়াও আমার ওপর নানা কারণেই ক্ষেপে আছেন, সো, এই মামলা না নিলে এটা নিয়ে তিনি আরো ঝামেলাই করতেন!
গোলাম মাওলা শান্ত গলায় বললেন, কাজটা চুন্নু মিয়া ভালো করল না। আমি শান্ত ভদ্র মানুষ। আমার সঙ্গে এই খেলাটা খেলে সে ভালো করে নাই।
খেলা আপনিও কম খেলছেন না মাওলা সাহেব। আপনি বুদ্ধিমান মানুষ বলে আপনার খেলা চোখে দেখা যায় না। আমি আপনাকে গ্রেপ্তার করতে আসিনি। একটা কথা জানতে এসেছি, আপনি আমাকে বলেনতো, ভেতরে ভেতরে কী চলছে?
কী চলছে মানে? আপনারা পুলিশ হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছেন?
হ্যাঁ, জিজ্ঞেস করছি। শুধু জিজ্ঞেসই করছি না, সতর্কও করছি, কারণ ঘটনা ঘটাচ্ছেন আপনি।
আমি!
হুম, আপনি। আমরা কিছুতো অন্তত টের পাই।
আর চুন্নু মিয়া, উনি কী দুধে ধোয়া তুলসি পাতা?
উনি কী সেটা নিয়ে আপনার না ভাবলেও চলবে। সেটা আমাকেই ভাবতে দিন। আপনি আপনাকে নিয়ে ভাবলেই ভালো হয়।
গোলাম মাওলা শরীর কাঁপিয়ে হাসলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল রেজাকে দ্বিধাগ্রস্ত করে দেয়া। কিন্তু রেজা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। তিনি এক দৃষ্টিতে শান্ত ভঙ্গিতে গোলাম মাওলার দিকে তাকিয়ে রইলেন। গোলাম মাওলা বললেন, এইজন্যইতো এতদিনেও লিখনের আসল খুনিটা যে কে সেটাই বের করতে পারলেন না। অথচ ঘটনা পানির মতো স্পষ্ট।
তাই?
হুম।
তো সেই পানির মতো স্পষ্ট ঘটনায় আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে চুন্নু মিয়া তাঁর আপন ভাগ্নেকে খুন করেছেন?
গোলাম মাওলা মৃদু হাসলেন, শুধু আমি না, চোখ থাকলে আপনিও দেখতে পেতেন এসআই সাহেব। শুধু শুধু অন্য নিরীহ মানুষদের হয়রানি করতেন না। চোখের সামনে স্পষ্ট সাক্ষী প্রমাণ থাক-সত্ত্বেও খুনি গলা উঁচা কইরা লাফ-ঝাঁপ দিয়া বেড়াইতে পারত না।
গোলাম মাওলা সামান্য থেমে বললেন, আমি নিজেই আজ আপনার সঙ্গে দেখা করতে যাইতাম। আপনি আসছেন, ভালো হইছে। একটু দাঁড়ান, আমি ঘর থেকে আসতেছি। আপনের চোখ খোলনের ব্যবস্থা করতেছি।
রেজা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। গোলাম মাওলা অবশ্য বেশি সময় নিলেন না। তিনি মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ঘর থেকে চলে এলেন। তার হাতে অনেক দলিল-পর্চার ফটোকপি। তিনি সেগুলো রেজার সামনে রাখলেন। তারপর বললেন, এইগুলা চুন্নু মিয়ার বাপের সম্পত্তির দলিল, জমি-জমার হিসাব। এই যে দেহেন তাদের মোট সম্পত্তির হিসাব। এক শ বিঘার ওপরে হইব জমি। যদিও এর মধ্যে নদীর মইধ্যেই আছে অর্ধেকে মতোন। বাকি যে জমি, দোকান পাট, তার তিন ভাগের দুই ভাগ পাইব চুন্নু মিয়া আর এক ভাগ পাইব তার বোইন। কারণ তারা এক ভাই এক বোইন। কিন্তু এইখানে আরো ঘটনা আছে। যহন চুন্নু মিয়ার ভগ্নিপতি মানে লিখনের বাপ মারা গেল, তখন চুন্নু মিয়ার বাবা জীবিত। লিখনের বয়সও তখন খুব অল্প। অত অল্প বয়সে মেয়ে বিধবা হইল, নাতি বাপ হারা হইল, এই জন্য তিনি তখনই আরো আলাদা কুড়ি বিঘা জমি নাতিরে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। এই দেখেন, এই হইল ওছিয়তনামা। দেখলেন?
রেজা গম্ভীর মুখে বললেন, হুম।
এখন এইটা কী চুন্নু মিয়া সহজে মাইনা নেওনের লোক? তাইলে তার ভাগে জমি থাকে কতটুক? থাকেই না বলতে গেলে। কারণ তার বাপ লিখনরে যেই জমি লিখ্যা দিয়া গেছে, তার বেশির ভাগই হইছে ভালো জমি। সেইখানে নদীর পানি ওঠে না। আর চুন্নু মিয়ার ভাগের জমি বছরে আট মাস থাকে ডুইবা। এখন হিসাব মিলান। লিখনের মা, মানে চুন্নু মিয়ার বোইনে বাপের সম্পত্তিতে যে ভাগ পাইব, তা কিন্তু লিখনেরই। আবার তার মামা চুন্নু মিয়ার জমির ভাগ থেইকাও সে পাইব কুড়ি বিঘা ভালো জমি। এখন হিসাব মিলান, খুনটা কে করছে? লিখন বাঁইচা থাকলে কার সুবিধা? আর মইরা গেলে কার সুবিধা? মেলান হিসাব।
.
রেজা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছেন অছিয়তনামাটির দিকে। দেখে সঠিকই মনে হচ্ছে। দলিল-পৰ্চাগুলোও। সবচেয়ে বড় কথা হলো গোলাম মাওলা যে যুক্তি এবং প্রমাণ হাজির করেছেন, সেগুলো এমন একটি খুনকে পুরোপুরি নিশ্চিত করতে না পারলেও যুক্তিগুলো খুবই শক্তিশালী। একে অগ্রাহ্য করারও কোনো উপায় নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কেসের এই মুহূর্তে যা অবস্থা, তাতে এটিই সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ, সবচেয়ে অকাট্য যুক্তি।
গোলাম মাওলা রেজাউল হকের মুখের দিকে তাকিয়ে তার শেষ তীরটা ছুড়লেন, আর এই খুনটা যদি সে করে, তাহলে অটোমেটিক্যালি দোষটা চাপব আমার ঘাড়ে। এক খুনে দুই পথের কাঁটা শেষ। বুঝলেনতো, এক ঢিলে দুই পাখি মারা কারে বলে?
রেজা চিন্তিত ভঙ্গিতে মৃদু ঠোঁট নাড়লেন, হুম।
তার ভাবনা-চিন্তার জগৎ ক্রমশই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে।
.
১৩.
পরদিন পুলিশ সুপারের অফিসে গেলেন রেজা। গত এক মাসের কেসের অগ্রগতির রিপোর্ট নিয়ে তিনি এসপি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। গতকাল গোলাম মাওলার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের কথাও তিনি এসপি সাহেবকে জানালেন। তবে ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেলেন লতিফুর রহমানের ঘটনার কথা। বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওই ঘটনার কথা তিনি কাউকেই জানাতে চান না। রেজা জানেন, ওই ঘটনা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে সকলেই একপ্রকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন। বিনা বাক্যব্যয়ে লতিফুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে এতদিনকার চেপে বসা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে চাইবেন সবাই। রেজা তা হতে দিতে চান না। তিনি এই রহস্যের সত্যিকারের সমাধান চান। তিনি বিশ্বাস করেন না এই খুনের সঙ্গে লতিফুর রহমান জড়িত।
এসপি সাহেব সময় নিয়ে চুন্নু মিয়া সম্পর্কে গোলাম মাওলার দেয়া তথ্যের কথা শুনলেন। তারপর বললেন, কিন্তু রেজা, এটা একটা সম্ভাবনার কথা হলো । সম্ভাবনা দিয়েতো খুনের মতো একটা বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যায় না। তা ছাড়া হি ইজ আ ভেরি ইনফ্লুয়েন্সিয়াল পারসন ইন লোকাল পলিটিকস।
জি স্যার।
তা ছাড়া ধরো, সাসপেক্ট যদি এতটাই ডেসপারেট হতো, তাহলে এ ধরনের পারিবারিক ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ফ্যামিলি মেম্বারদের মধ্যে আগেভাগেই একটা দূরত্ব, অবিশ্বাস তৈরি হয়। এখন এই ঘটনা নিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের অসন্তুষ্ট হবার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণই রয়েছে। এবং তিনি যেমন মানুষ, তাতে তার সেই অসন্তোষ লুকিয়ে রাখার মতো মানুষও তিনি নন। সেক্ষেত্রে তার বোনেরও সেটা জানার কথা। আর এমনটা হলে নিজের পিতাহারা একমাত্র সন্তানকে তিনি ভাইয়ের কাছে এভাবে পাঠিয়ে দিতেন বলে আমার মনে হয় না।
কথাটা আমিও ভেবেছি স্যার। এমনকি গোলাম মাওলার কাছ থেকে কথাটা শোনার পর আমি লিখনদের বাড়িতেও গিয়েছিলাম। তার মায়ের সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনি তার ভাই সম্পর্কে এমন কোনো আভাস দেননি, যাতে তাকে সন্দেহ করা যায়! বরং স্বামীর মৃত্যুর পরপরই যখন তার বাবাও মারা যান, তখন থেকে তার ভাই চুন্নু মিয়াই তাকে আর লিখনকে আগলে রেখেছেন বলেই তিনি জানিয়েছেন।
এএসপি সাহেব এতক্ষণ কোনো কথা বলেননি। এবার তিনি কথা বললেন, হুম। কিন্তু ধরো আবার এমনওতো হতে পারে যে, এই পরিকল্পনা চুন্নু মিয়ার বহু আগে থেকেই ছিল। আর ছিল বলেই বোন আর ভাগ্নের বিশ্বাস অর্জন করতেই তিনি তাদের সঙ্গে এত ভালো আচরণ করেছেন। তাদের আস্থা, বিশ্বাস অর্জন করেছেন। কারণ, তিনি নিজেও হয়তো জানতেন, সম্পর্ক নষ্ট করে সম্পত্তি হস্তগত করার চেয়ে সম্পর্ক ভালো রেখে সম্পত্তি হস্তগত করা বেশি সহজ।
কথাটি কারোই গ্রহণ করতে ইচ্ছে করছিল না, কিন্তু যুক্তিটি কেউ অগ্রাহ্যও করতে পারল না। এএসপি সাহেব যেটি বলেছেন, সেটি ফেলে দেয়ার মতো কোনো কথা নয়। বরং এতদিন ধরে রাজনীতি করে আসা একজন মানুষ এমন করে ভাবলে সেটি অবাক করার মতো কিছু হবে না। বাকিটা সময় প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক নানা আলোচনা হলেও তাতে কোনো সমস্যারই কোনো সমাধান হলো না।
.
সন্ধ্যার পর পর পলাশবাড়ি শহরে ঢুকলেন রেজা। শহরের মুখেই তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল দারোয়ান এনায়েত আর কাজের মেয়ে ডালিয়ার সঙ্গে। তারা দাঁড়িয়ে আছে হারাধনের মুচি দোকানের সামনে। এনায়েত জানাল, নাসিমা বেগম আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তারা ডাক্তারের কাছে এসেছে। সঙ্গে ডালিয়াকে নিয়ে এসেছে নাসিমা বেগমের জন্য তার একান্ত দরকারি কিছু জিনিস পত্র কিনে নিয়ে যেতে। ডালিয়ার হাতে কয়েক জোড়া পুরনো রংচটা ছেঁড়া জুতোও। সেগুলো সেলাই করার জন্য হারাধন মুচির দোকানে দেয়া হয়েছে। সম্ভবত নাসিমা বেগমের পুরনো জুতোগুলো সেলাই করেই পরে ডালিয়া।
.
এনায়েত ডালিয়াকে মুচির দোকানে দাঁড় করিয়ে রেখে আরো কী সব কিনতে গেল। রেজাও ধীর পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়ালেন মোবাশ্বেরের চায়ের দোকানের সামনে। একটা চা আর সিগারেটের কথা বলে তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। হারাধনের দোকানের সামনে মুখে ঘোমটা টেনে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডালিয়া। তার দাঁড়ানোর মধ্যে কেমন একটা জড়সড় লাজুক ভাব। এই লাজুকতার একটা অদ্ভুত সৌন্দর্যও আছে। হারাধন মুচিও যেন সেটি খেয়াল করল। এমন রূপবতী তরুণী কাজের মেয়ের সান্নিধ্য সে হেলায় হারাতে চাইছে না। আগ বাড়িয়ে ডালিয়ার সঙ্গে নানা গল্পগুজব করতে চাইছে সে। যদিও ডালিয়া তাতে সাড়া দিচ্ছে কী না তা এতদূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তবে মাঝে মাঝে সেও যে কিছু কথাবার্তা বলছে তা বোঝা যাচ্ছে। একটা লাজুক মেয়ে কেমন ঘোমটা পরে জড়সড় ভঙ্গিতে অচেনা এক আগ্রহী পুরুষের সঙ্গে কথা বলছে, দৃশ্যটা দেখে রেজার অদ্ভুত রকমের ভালো লাগা কাজ করল। মুহূর্তের জন্য হলেও ডালিয়ার জন্য যে হারাধনের একটা আগ্রহ, একটু ভালো লাগা তৈরি হয়েছে, সেটাকে সত্যিই মনে হলো রেজার। এই আগ্রহ বা ভালোলাগাটুকু বিশেষ কিছুই।
কিছুক্ষণ আগেও সলজ্জ ভঙ্গিতে হারাধনকে এড়িয়ে যাওয়া বা একটা-দুটা কথার উত্তর দেয়া ডালিয়াও যে এইটুকু সময়েই খানিক সপ্রতিভও হয়ে উঠেছে, তাও দৃষ্টি এড়াল না রেজার। এরা কী পরস্পরের জন্য কোনো বিশেষ অনুভূতি ধারণ করে? কে জানে? হয়তো করে। আর সেই অনুভূতির হয়তো কোনো নাম নেই, কোনো সম্ভাবনা নেই। তারপরও এই মুহূর্তটুকু কী যে সুন্দর!
রেজার বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে লাগল। মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত, এমন কিছু অনুভূতি থাকা খুব দরকার। এটুকুই হয়তো জীবনের সৌন্দর্য। কিন্তু তার জীবনে কী এমন কিছু আছে?
রেজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। দূরে ব্যাংক ম্যানেজার রফিকুল ইসলামকে দেখা গেল। তিনি রেজার দিকেই এগিয়ে আসছেন। কাছে আসতেই রেজা বললেন, কী খবর? বাসা-টাসা কিছু পেলেন?
আর বাসা? ওই এক লতিফুর রহমান স্যার ছাড়া আর কারো বাসাতো ফ্যামিলি নিয়ে থাকার মতো অবস্থায় নেই ভাই।
তাহলে সেখানেই উঠে যান। উনিতো বলেইছিলেন যে কিছু টাকা পয়সা অ্যাডভান্স পেলেই উনি ঘরের বাকি কাজ ঠিক করে দেবেন।
কিন্তু উনিতো মনে হয় না আর বাড়ি ভাড়া দেয়ায় আগ্রহী। টু লেটতো আর দিলেন না।
রেজা খানিক কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, এক কাজ করি চলেন, একদিন আপনাকে নিয়ে আমি যাই। আমার ধারণা, আমি গেলে প্রফেসর সাহেব না করবেন না।
রেজার প্রস্তাব শুনে রফিকুল ইসলাম খুবই আনন্দিত হলেন, তাহলেতো দারুণ ব্যাপার হয় ভাই। চলেন, আপনার সময়-সুযোগ মতো একদিন যাই।
রেজা হাসলেন, আমি দুয়েকদিনের মধ্যেই আপনাকে জানাব।
ফেরার সময় এনায়েতের সঙ্গে আবারও দেখা হয়ে গেল রেজার। পরদিন যে তারা বাড়ি দেখতে আসবেন, সেটাও এনায়েতকে জানিয়ে রাখলেন রেজা।
.
গভীর রাতে অণুকে ফোন করলেন রেজা। অণু ফোন ধরেই বলল, জি হক সাহেব, বলুন।
আপনি আমাকে হক সাহেব বলেন কেন বলুন তো?
অণু খানিক চুপ করে থেকে বলল, জানি নাতো!
আমারতো একটা নাম আছে?
কোনটা? আমার নামের সঙ্গে মিলিয়ে যেটা? আনু?
রেজার খুবই রাগ লাগছে। কিন্তু সে কিছু বলল না। অণু বলল, কী, হক। সাহেব কি রেগে গেলেন?
রেজা এবারও কথা বললেন না। অণু এবার নরম গলায় বলল, আচ্ছা, বলুন।
রেজা বলল, কিছু বলার নেই অণু। এমনি ফোন করেছি।
এমনি এমনি কেউ কাউকে ফোন করে?
আমি করি।
আপনিও করেননি। যে কারণে ফোন করেছেন, সেই কারণটি বলতে লজ্জা পাচ্ছেন, তাই না?
রেজা এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। চুপ করে রইলেন। অণুই বলল, আপনার ভয় নেই, আমি আপনার মার কাছে বলব না যে মাঝে মাঝে আপনি আমাকে রাত দুপুরে ফোন করেন।
রেজা গম্ভীর গলায় বললেন, স্কুলের ছেলে-মেয়েগুলো কেমন আছে?
হ্যাঁ, ভালো। তবে আপনাকে খুব দেখতে চায়।
আমি চেষ্টা করছি, একটু সময় বের করার। সময়টা বের করতে পারলেই চলে আসব।
আপনার সময় সহজে বের হবে বলে মনে হচ্ছে না।
এটা অবশ্য ঠিক বলেছেন। যে ঝামেলায় পড়েছি, এই ঝামেলা থেকে নিস্তার আছে বলে মনে হয় না।
কী ঝামেলা?
বলতে ইচ্ছে করছে না।
আচ্ছা, বলতে হবে না।
মা ভালো আছেন?
হ্যাঁ ভালো।
আর কী খবর?
আর কী খবর জানতে চান হক সাহেব?
আবার?
তাহলে কী বলব? রেজা ভাই বলব? ভাই শুনতে ভালো লাগবে?
রেজা কথা বললেন না। অণু বলল, তার চাইতে হক সাহেব ভালো না? এই কারণেই হক সাহেব বলি আমি। আপনাকে আমার ভাই ডাকতে ভালো লাগবে না।
রেজা মৃদু হাসল। অণু বলল, বলুন, কী খবর জানতে চান?
না বিশেষ কিছু না। এমনি জিজ্ঞেস করা।
অণু হাসল, আমার বিয়ের খবর জানতে চান?
রেজা জবাব দিল না। অণু বলল, পাত্রের আমাকে দেখে পছন্দ হয়েছে। কিন্তু পাত্রের মায়ের পছন্দ হয়নি। তার ধারণা আমার গায়ের রং খুবই ময়লা।
রেজা চুপ করে রইল। অণু হাসল, কালো মেয়েদের প্রেম খুব সহজে হয়, কিন্তু বিয়ে সহজে হয় না, বুঝলেন?
রেজা বললেন, না, বুঝিনি।
আচ্ছা, আপনাকে বুঝতে হবে না।
রেজা ফোন রেখে দিলেন। তিনি ভেবে পাচ্ছেন না অণুর মতো একটা মেয়েকে কেউ কী করে পছন্দ না করে পারে! তিনি এও ভেবে পাচ্ছেন না, অণু কী সত্যিই কালো? অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পেলেন না। তিনি কী কখনো অণুকে এতটা খেয়াল করে দেখেছেন? রেজা এই প্রশ্নেরও কোনো উত্তর পেলেন না। তবে একটা বিষয় তিনি স্পষ্টই বুঝতে পারলেন, সন্ধ্যায় ফাঁকা ফাঁকা লাগা বুকটা এখন আবার পরিপূর্ণ লাগছে।
.
রফিকুল ইসলামকে নিয়ে আবারও লতিফুর রহমানের বাড়ি দেখতে এসেছেন রেজা। তাদের সঙ্গে এসেছে শরিফুলও। শরিফুল ফিসফিস করে বলল, প্রফেসর স্যারেতো এইবার ভয়েই বাড়ি ভাড়া দিয়া দিব।
রেজা চকিতে শরিফুলের দিকে ফিরে নিজের ঠোঁটে তর্জনি চেপে চুপ থাকতে ইঙ্গিত করলেন। লতিফুর রহমান সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছেন। তার হাতে লাঠি। ডান পায়ের ব্যথাটা আবার বেড়ে যাওয়ায় হাঁটতেও সমস্যা হচ্ছে। ঘরের দরজা খোলার সময় পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকেই যেন অবচেতন এক আশঙ্কা আঁকড়ে ধরল তাকে। বিষয়টি রেজার নজর এড়াল না। তিনি হেসে বললেন, আমার কাছে দিন, আমি খুলছি।
রেজা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। শরিফুল জানালাগুলো খুলে দিতেই হুড়মুড় করে একরাশ হাওয়া ঢুকল ঘরে। খানিকটা আলোকিতও হয়ে উঠল ঘর। রফিকুল ইসলাম আগের দিনের অভিজ্ঞতার কারণেই কী না কে জানে, বার কয়েক নাক টেনে গন্ধ নিলেন। তার কুঞ্চিত কপাল খানিক প্রসারিতও হলো। রেজা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন এপাশ-ওপাশ। এই ঘরে লাশটা কীভাবে এলো, অনেক ভেবেও সেই রহস্যের বিন্দুমাত্র সমাধানও তিনি বের করতে পারেননি। এ এক অবিশ্বাস্য, অদ্ভুত ব্যাপার। তিনি বাথরুমটা খুলে আবার দেখলেন। দেখলেন বারান্দাগুলোও। চওড়া বারান্দাগুলো শক্ত গ্রিলে আবৃত।
বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে আবার ঘরে ঢুকতে যাবেন, এই মুহূর্তে চিৎকারটা শুনলেন রেজা। নিচ থেকে নাসিমা বেগমের তীব্র চিৎকার ভেসে আসছে। সঙ্গে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল। সম্ভবত কাঁচের কিছু মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলেছেন তিনি। লতিফুর রহমান ভারি বিব্রত হলেন। তিনি কাঁচুমাচু মুখে বললেন, আমি একটু নিচ থেকে আসছি, আপনারা দেখুন। মাঝে মাঝে ও খুব বেশি অবুঝ হয়ে যায়। বুঝলেন?
রেজা মৃদু হাসলেন, সমস্যা নেই। আপনি আসুন, আমরা আছি।
লতিফুর রহমান এস্ত পায়ে বেরিয়ে গেলেন। রফিকুল ইসলাম বললেন, রেজা সাহেব, বাসাটা নেয়া যায়, কী বলেন?
তা যায়। শহরতো কাছেই। তা ছাড়া নিরিবিলি, খোলামেলা পরিবেশ। আলো হাওয়াও আছে বেশ।
কী মনে হয়, স্যার কি ভাড়া দেবেন?
না দিলে দেখালেন কেন?
তাও অবশ্য কথা। তা ছাড়া পুলিশ নিয়ে এলে না দিয়ে যাবেন কই? হা হা হা।
রেজাও হাসিতে যোগ দিলেন। রফিকুল ইসলাম খুব মনোযোগ দিয়েই দেখলেন ঘরগুলো। কোথায় কোনো আসবাব বসাবেন, জানালার পর্দার সাইজ কী হবে, সোফা, টিভি কোথায় বসবে, বাচ্চাদের ঘরের সাজ-সজ্জা কেমন হবে এইসব। মিনিট কুড়ি পরে তারা বের হলেন। রুমের বাইরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছিলেন। এই সময়ে লতিফুর রহমান ফিরে এলেন। তিনি আর ঘরের ভেতরে ঢুকলেন না। দরজা টেনে দিতে দিতে বললেন, কি, পছন্দ হলো?
রফিকুল ইসলাম বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, জি স্যার। তবে ফাইনালি জানাচ্ছি দুয়েকদিনের মধ্যেই।
লতিফুর রহমান সম্মতির ভঙ্গিতে হাসলেন। তবে তাকে দেখে রেজার মনে হলো তিনি নাসিমা বেগমের অবস্থা নিয়ে চিন্তিত। নাসিমা বেগম আবারও উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন। রেজা নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করলেন, কী অবস্থা ওনার?
আবার পাগলামি শুরু হয়েছে। বিড়বিড় করে বললেন লতিফুর রহমান।
ছেলেটাকে দেশে আসতে বলুন। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
হ্যাঁ, এবার যে করেই হোক ব্যবস্থা করতেই হবে। কথা বলতে বলতেই চিন্তিত ভঙ্গিতে বন্ধ দরজায় তালা লাগালেন লতিফুর রহমান। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রেজার আচমকা খেয়াল হলো, শরিফুল নেই! তিনি গলা চড়িয়ে বার কয়েক শরিফুলকে ডাকলেন, কিন্তু শরিফুল সাড়া দিল না। আশ্চর্য ব্যাপার, এই কিছুক্ষণ আগেও সে এখানেই ছিল, হঠাৎ গেল কই? এদিকে ওদিকে তাকিয়েও কোথাও দেখা গেল না শরিফুলকে! যেন ভোজবাজির মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে সে!
.
তখন সন্ধ্যা নেমে আসছে। সন্ধ্যার সেই আলো-আঁধারিতে গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল রেজার! চোখের সামনে থেকে শরিফুল গেল কই?
.
১৪.
শরিফুলকে খুঁজে পাওয়া গেল বাথরুমে। তাকে না পেয়ে তালা খুলে আবার ভেতরে ঢুকলেন রেজা। অন্ধকার ঘরে শরিফুলকে বার দুই ডাকতেই সে ভেতরের ঘরের বাথরুম থেকে সাড়া দিল। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলো, হঠাৎ বড়টার চাপ লাগছিল স্যার। তাই বইসা পড়ছিলাম, আর সামলাইতে পারি নাই।
কিন্তু পানিতে নাই!
ভেতরে বালতি আছে, বালতিতে দেখলাম পানি আছে সামান্য।
লতিফুর রহমান বললেন, আপনারা আসবেন শুনে এনায়েতকে বলেছিলাম বাথরুমগুলা ভালো করে ধুয়ে রাখতে। ভাগ্য ভালো যে ওই জন্যই বালতিতে কিছু পানি পেলেন।
শরিফুল হাসল, দেখছেন স্যার, আমার ভাগ্য কত ভালো! একদম সময় মতো সুযোগ।
রেজাও হাসলেন, একদম।
সবাই নিচে নেমে এলেন। নাসিমা বেগমকে ততক্ষণে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে ডালিয়া। বাড়ি ভাড়া নিয়ে লতিফুর রহমানের সঙ্গে কথাও হলো। তিনি কোনো ধরনের শর্ত দিলেন না। সরাসরি বললেন, এখানে রেজা সাহেব আছেন, তিনি যা বলেন সেটাই হবে।
রেজা বললেন, ঠিক আছে রফিক সাহেব, স্যারের যেহেতু সমস্যা নেই, আমরা দুজনে একটু আলাপ-আলোচনা করে নিয়ে স্যারকে জানাই, কী বলেন?
রফিকুল ইসলাম হেসে সম্মতি জানালেন। লতিফুর রহমানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রেজা আর শরিফুল চলে গেলেন থানায়। মাঝরাত অবধি থানায়ই বসে রইলেন তারা। শরিফুল বার কয়েক তাড়া দিল রেজাকে। কিন্তু রেজা তাতে সাড়া দিলেন না। বরং স্থির বসে রইলেন। একটা কথাও বললেন না তিনি। যেন স্তব্ধ পাথরের মূর্তি। মগ্ন হয়ে আছেন কোথাও। রেজার ধ্যান ভাঙল গভীর রাতে। তিনি আচমকা শরিফুলের হাত ধরে বললেন, আচ্ছা শরিফুল, আজ যদি তুমি খুন হয়ে যেতে?
শরিফুল হতভম্ব গলায় বলল, কী বলেন স্যার? খুন হব ক্যান?
ধরো হয়ে গেলে?
কখন? কীভাবে?
লতিফুর রহমানের বাসার বাথরুমে।
মানে!
ধরো আমি আর রফিকুল ইসলাম মিলে তোমাকে বাথরুমে খুন করে রেখে এলাম, তারপর বের হয়ে গেলাম। প্রফেসর সাহেব এসে দরজায় তালা মেরে দিলেন। আমরাও চলে গেলাম।
শরিফুল বড় বড় চোখ করে বলল, স্যার, কী বলছেন এইসব?
রেজা আবারো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ধরো তিন বা চারজন মানুষ বাসা ভাড়া দেখতে এসেছে। বেশিও হতে পারে। তাদের মধ্যে একজনকে বাকি সবাই প্ল্যান করে খুন করতে নিয়ে এসেছে। তারা খুব নরমালি বাসা দেখছে। এর মধ্যে একজন ঘরের বাইরে লতিফুর রহমানের সঙ্গে কথা বলছেন, বা তাকে নিয়ে নিচে চলে এলো। এই ফাঁকে বাকিরা সেই একজনের গলায় আচমকা ধারালো তার পেঁচিয়ে খুন করে ফেলল। সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিটের ব্যাপার। তারা সবাই যেহেতু আগে থেকেই পরিচিত, ঘনিষ্ঠ, সেহেতু খুন হয়ে যাওয়া মানুষটা কিছু বোঝার আগেই ঘটনা ঘটে গেল। তারপর তারা তাকে বাথরুমে আটকে রেখে বের হয়ে লো। লতিফুর রহমান এসে দরজায় তালা দিয়ে দিলেন। তিনি প্রতিদিন অনেক মানুষকেই ঘর দেখান, সুতরাং তার অত ভালো করে খেয়াল করারও কথা না যে কে কে এসেছে, কে কে বের হচ্ছে। ঠিক না?
শরিফুল হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে। রেজা বললেন, আজ যেমন তুমি বাথরুমে আটকা পড়েছিলে, প্রফেসর সাহেব কিন্তু খেয়ালই করেননি যে তুমি নেই। তিনি দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তোমার কথা আমাদের জিজ্ঞেসও করেননি। তা ছাড়া বুড়ো মানুষ, অত কিছু খেয়াল করার কথাও না। তুমি আমি হলেও কিন্তু এতকিছু খেয়াল করতাম না। রোজ কত কত মানুষ আসে, অতো কী খেয়াল করা যায়?
শরিফুল ডানে-বায়ে মাথা নাড়ল, তা যায় না।
এমন জটিল একটা খুনের ঘটনার এত সহজ ব্যাখ্যা তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু রেজার যুক্তির বিপরীতে কোনো যুক্তিও সে খুঁজে পাচ্ছে না। তারপরও সে বলল, কিন্তু কেউ খুন করলে এখানে এনে খুন করবে কেন?
কারণ, এর চেয়ে নিরাপদ আর কিছু হয় না।
শরিফুল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বিষয়টা যেন ধীরে ধীরে বুঝতে চেষ্টা করছে সে। রেজা বললেন, এখানে খুন করে রেখে গেলে পুলিশ সহজেই লতিফুর রহমানকে ধরে নিয়ে যাবে। এই নিয়ে পরে আর তেমন কোনো ইনভেস্টিগেশনও হবে না। আর লতিফুর রহমান যা-ই বলুন না কেন, সেটা কেউ বিশ্বাসই করবে না। আসল খুনিরা চিরদিনের জন্য রয়ে যাবে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
শরিফুল এবার আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। রেজাই বললেন, শোন, আরো একটা ব্যাপার আছে, দিনে হোক, রাতে হোক, বাইরে খুন করা সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ, যে কেউ দেখে ফেলতে পারে। তারপর লাশ লুকানোরও ব্যাপার থাকে। এখানে খুন করলে সেসবের কোন ঝামেলাই আর রইলো না। জাস্ট কোনমতে খুনটা করে নির্বিঘ্নে সটকে পড়তে পারলেই হলো, আর কোন চিন্তা নেই।
জি স্যার। শরিফুলের চোখ বড় বড় হয়ে আছে।
রেজা বললেন, তাছাড়া ধরো, যারা খুন করেছে, তারা যেহেতু লিখনের ঘনিষ্ঠ কেউই ছিলো, সেহেতু চাইলে তারা লিখনকে নিজেদের ঘরেও খুন করতে পারতো। সেটিও সহজ ছিল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, খুন করে লাশতো আর ঘরে রেখে দিতে পারতো না। লাশ লুকানোর ব্যবস্থা তাদের করতেই হতো। এবং আসল ঝুঁকিটা সেখানেই। কিন্তু এখানে এভাবে খুন করার ফলে সেই ঝুঁকি নেয়ারও আর দরকার পড়লো না। স্রেফ পাঁচ মিনিটের কাজ। তারপর নিশ্চিন্ত।
.
শরিফুল চুপ করে রইল। তখন প্রায় শেষ রাত। রেজা ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন। শরিফুল বলল, কোথাও যাচ্ছেন স্যার?
হুম।
কোথায়?
প্রফেসর সাহেবের বাড়ি।
এই শেষ রাতে!
রেজা জবাব দিলেন না। তিনি ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন। শরিফুল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তার পিছু নিল।
.
শরিফুলের বাইকের হেডলাইটের আলোয় মেঘলা রাতের অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। তবে আলোকিত অংশটুকুর বাইরে ঘোর অন্ধকার। যেন ওই অন্ধকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা আরো গাঢ় এক ছায়াকেই শিকার করতে চান রেজা। শহর পেরিয়ে তারা বাইরে এলেন। মোবাশ্বেরের দোকান বন্ধ। নির্জন শহরে কেবল ওই হারাধন মুচির দোকানের একটানা ঠুকঠাক শব্দ। কেরোসিনের মৃদু একচিলতে আলো দেখা যাচ্ছে বেড়ার ফাঁক দিয়ে। চারদিকে আর কোথাও কেউ নেই, কিছু নেই। পুরো শহর ঘুমিয়ে জল।
.
লতিফুর রহমানের গেটের কাছে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে এনায়েত শব্দ করে উঠল, কেডা ওইহানে? কেডা?
এনায়েতের গলা কাঁপছে। রেজা ভারি অবাক হলেন, এতরাতেও এনায়েত জেগে! তিনি গেটের গায়ে হাতের উল্টোপিঠে শব্দ করে বললেন, আমি রেজা, গেট খোল এনায়েত।
এনায়েত গেট খুলে দিল। তার চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টি। রেজা বললেন, এতরাতেও তুই জেগে?
এনায়েত কাঁপা কণ্ঠে বলল, এই বাড়িতে আমি আর থাকব না।
রেজা কৌতূহলী গলায় বললেন, কেন? কী হয়েছে?
এনায়েত উত্তর দিকের দেয়ালের দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলল, এই বাড়িতে জিন-ভূত আছে।
জিন-ভূত আছে মানে?
প্রায় রাইতেই বাইরে শব্দ শোনা যায়। বাড়ির ভেতরেও।
কীসের শব্দ?
তাতো জানি না। তয় মানুষের মতনই। একদিন আমি দেখছিও কিছু, আগুনের গোলার মতো, বাইরে থেকে গেটের মইধ্যে লাফ দিয়া পড়ল। তারপর উধাও।
তুই কাউকে ডাকিস নাই?
কারে ডাকব? তারা থাকে ওপর তলায়, কলাপসিবল গেটে থাকে তালা মারা। চাবিওতো থাকে ছারের কাছে। আমি ডাকলে শুনব?
দিনের বেলা বলিস নাই?
একদিন বলছিলাম, কিন্তু সবাই তখন আমারে লইয়া হাসাহাসি করে, আমি নাকি জিন-ভূত দেখছি।
পেছন থেকে শরিফুল হেসে ফেলল, রাইতের বেলা আগুনের গোলা ওড়াউড়ি করতে দেখলেতো জিন-ভূত হবার কথা! জিন-ভূতের গল্প দিনের বেলা করলে হবে? রাইতের গল্প বলতে হয় রাইতের অন্ধকারেই, বুঝলি?
রেজা বললেন, আজও কিছু দেখেছিস?
না, তয় কী সব শব্দ-টব্দ শুনছি।
রেজা শরিফুলের দিকে ফিরে বললেন, আজগর লোকটাকে না এই বাড়ির পেছনে নদীতে দেখেছিলে?
জি ছার, একদিন রাইতে।
ওর দিকে আরো ভালো করে খেয়াল রাখো। ওরা কোনো একটা বড় মতলবে আছে। খুব সাবধান।
রেজা বাড়ি ঢুকতে গিয়েও কী মনে করে ঢুকলেন না। বাড়ির চারপাশটা একবার চক্কর মারলেন। বৃষ্টি-কাদার দিন বলে মাটিতে নানারকম পায়ের ছাপ। ছাপগুলোও তীক্ষ্ণ চোখে দেখলেন তিনি। এক জায়গায় সাদা সীমানাপ্রাচীরের গায়ে কিছু একটা দেখে খানিক থমকে দাঁড়ালেন রেজা। তবে তেমন গুরুত্ব দিলেন বলে মনে হলো না। পুরো বাড়ি ঘুরে আসতে আসতে ফজরের আজান হয়ে গেল। রেজা এনায়েতকে বললেন লতিফুর রহমানকে খবর দিতে। এই কাকভোরে রেজাকে দেখে লতিফুর রহমান ভারি অবাক হলেন। বললেন, আবার কোনো দুর্ঘটনা রেজা সাহেব?
রেজা হাসলেন, না না স্যার। তবে কিছু জরুরি প্রশ্ন ছিল, ভাবলাম জিজ্ঞেস করেই যাই, না হলে মনের ভেতর আবার খচখচ করবে।
বুঝতে পেরেছি, জরুরি কিছুই হবে। না হলে এত ভোরে এভাবে চলে আসতেন না।
বাড়ির সামনে সিমেন্টের বাঁধাই করা বেঞ্চিতেই বসলেন তারা। রেজা বললেন, গ্রামে যাওয়ার আগের শেষ তিন-চার দিনে আনুমানিক কত জন লোক বাসা ভাড়ার জন্য এসেছিল স্যার?
তাতো মনে নেই রেজা সাহেব।
একজ্যাক্ট বলতে হবে না, আনুমানিক বললেই হবে।
লতিফুর রহমান খানিক্ষণ চুপ থেকে বললেন, পনেরো কুড়িজনতো হবেই।
পনেরো কুড়িজন? নাকি পনেরো কুড়ি বার?
বুঝিনি?
মানে ধরেন আমি বাড়ি ভাড়া নিতে এলাম, আমার সঙ্গে শরিফুলও এলো। আবার কেউ কেউ একাও আসতে পারে, কেউ কেউ তিন চারজন মিলেও আসতে পারে।
সেভাবেতো খেয়াল করিনি, তবে একা সাধারণত কেউ আসে না। আসলে দু তিনজন মিলেই আসে।
সবাই ই?
বেশির ভাগই। একা কেউ এসেছে বলে সেভাবে মনে পড়ে না। শুধু ব্যাংকার সাহেবই সম্ভবত একা এসেছিলেন। আর, হ্যাঁ, দুয়েকজনও আরো হতে পারে, তার বেশি না। কেন বলুনতো?
রেজা জবাব দিলেন না। খানিকটা যেন দমেই গেলেন তিনি। একাধিকজন একসঙ্গে এসেছে এমন ঘটনা অল্প হলে চিহ্নিত করা সহজ হতো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, লতিফুর রহমান বলছেন বেশির ভাগই একাধিকজন মিলে এসেছেন। রেজা খানিক চুপ থেকে আবার বললেন, আচ্ছা, সবচেয়ে বেশি কয়জন এসেছে একসঙ্গে, সেটা মনে আছে?
লতিফুর রহমানকে এবার বেশ অপ্রস্তুত দেখাচ্ছে, যেন রেজা সাহেবের প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দিতে না পেরে তিনি উদ্বিগ্ন। সামান্য চুপ করে থেকে তিনি ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন, আসলে ওভাবেতো খেয়াল করা হয় নি রেজা সাহেব, ভাড়াটে বাড়ি দেখতে এলে কজন এলো সেটাতো মাথায় থাকে না।
হুম। আচ্ছা, এমন কী হয়েছিল যে কোনো ভাড়াটেকে ঘর দেখতে দিয়ে আপনি দীর্ঘ সময়ের জন্য নিচে চলে গিয়েছিলেন? ফিরে আর ঘরে ঢোকেননি, বাইরে থেকে তালা মেরে চলে গিয়েছিলেন?
এবার রীতিমতো ভেঙেই পড়লেন লতিফুর রহমান। তিনি ভাঙা গলায়ই বললেন, এমন হয়েছিল হয়তো, সেদিন আপনাদের সঙ্গেওতো হলো। আগেও মাঝেমধ্যে হয়ে থাকতে পারে। একা মানুষ, যখন তখন যেকোনো প্রয়োজনতো হতোই। আর তখনতো এনায়েতও ছিল না। তা ছাড়া আপনার ভাবি যখন তখন ক্ষেপে যায়, বুঝলেন?
রেজা যতটা আশা নিয়ে গিয়েছিলেন তার চেয়ে বেশি হতাশা ও বিরক্তি নিয়ে ফিরে এলেন। লতিফুর রহমানের প্রতি তার রীতিমতো রাগই লাগছে। তিনি মোটামুটি দু-চার জনের একটা বর্ণনা দিতে পারলেই অন্তত তাদের খুঁজে বের করে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেত। রেজা নিশ্চিত, খুনটা বাসা ভাড়ার নাম করে এসেই হয়েছে। এর বাইরে আর কোনো সম্ভবনা নেই। কিন্তু যারা এসেছিল, তাদের প্রায় কাউকেই সেভাবে চেনেনই না বা মনেই করতে পারলেন না লতিফুর রহমান। কিছু বলতেও পারলেন না সুনির্দিষ্ট করে।
.
১৫.
আজগর, নুরু মিয়া এবং সবুর দাঁড়িয়ে আছে গোলাম মাওলার সামনে। গোলাম মাওলা গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তার হাতে একটা চিঠি। তিনি সেই চিঠিখানা নুরু মিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, দেখো, নির্বাচনের আগে দলের মূল্যায়ন দেখো। আমারতো দুয়ার ধারে আইসা আছাড় খাওয়ার দশা। সবকিছু নিজের পক্ষে আনলাম এত বছর, এত কষ্ট কইরা, আর এখন, এই এক খুন সবকিছু বানের পানির মতো ভাসাই দিতেছে। বাতাসতো এহন চুন্নু মিয়ার দিকে, অ্যাঁ?
তিনি সামান্য দম নিয়ে আবার সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, এই যদি হয় অবস্থা, পাবলিক তার দিকে ঝুলে গেছে, দলও এখন ধীরে ধীরে খুনের বিষয়ে আকারে ইঙ্গিতে আমার দিকেই আঙুল তুলতেছে। আর তোমরা? তোমরা বইসা বইসা আঙুল চুষতেছো?
নুরু মিয়া বলল, আমরাতো চেষ্টার ত্রুটি করতেছিনা মাওলা। কিন্তু পুলিশ টহল বাড়ছে, এহনতো চাইলেই আগের মতো দুম কইরা কিছু একটা কইরা ফালান যায় না। যায়? তহন হাতেনাতে ধরা পড়লে কিন্তু সবই যাবে। লিখনের খুন থেইকা শুরু কইরা কোনো অপরাধই আর তহন এড়াইতে পারবা না? সব অপরাধের দায় আমাদেরই নিতে হইব। যা করছি, তাও। যা করি নাই, তাও।
কিন্তু তাই বইলা এইভাবে হাত গুটাইয়া আর কতদিন বইসা থাকবা? চোর পালাই গেলে বুদ্ধি বাড়লে কিন্তু লাভ নাই।
এই প্রথম কথা বলল আজগর। সে বলল, ছার, আপনে আর কয়টা দিন মাত্র সময় দেন আমারে। আমি আজগর যদি কাজটা করতে না পারি, তাইলে আমি এক বাপের পোলা না।
তুমি চুপ থাকো! বেয়াদবের মতো কথা বলবে না। গোলাম মাওলা রীতিমতো খেঁকিয়ে উঠলেন, টাকা-পয়সা দিয়া আমি কতগুলা গরু-ছাগল পুষতেছি। আমি এত কিছু বুঝি না, পুলিশ থাকুক আর আর্মি থাকুক, ঘটনা আমি ঘটতে দেখতে চাই। তোমরা না পারলে বলো, আমি নিজে যাব।
নুরু মিয়া বলল, আর কয়টা মাত্র দিন সময় দাও মাওলা। কথা যহন দিছি, কাজও করব। কোনো অন্যথা হইব না।
সেইটা এতদিনেই বুঝছি আমি। আর চুন্নু মিয়ার খবর কিছু জানো?
সে তো শুনছি ঢাকা যাইতেছে।
ঢাকা যাইতেছে? এই মুহূর্তে? ক্যান?
নুরু মিয়া খানিক চুপ করে থেকে বলল, আছিয়ারে দিয়া নাকি ঢাকা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করাইবো, এইখানে তোমার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলার কিছু হইতেছে না বইলা।
গোলাম মাওলার রাগ যেন মুহূর্তেই দুশ্চিন্তায় পরিণত হলো। তিনি চিন্তিত মুখে বললেন, এই খবর কে দিল?
কথাতো আর চাপা থাহে না, বাতাসে ভাসে।
কবে যাবে কিছু জানো?
না, তয় বন্যার পানি কমার আগে মনে হয় না যাইত পারব। এই অবস্থায় এলাকা ছাইড়া গেলে লোকজন তার ওপর নাখোশ হইব, বুঝতেছ না? সেতো এইবার এই বন্যার কারণেও লোকজনের কাছে খুব জনদরদি হিসেবে নিজেরে প্রমাণ করতেছে।
গোলাম মাওলা হিসহিস করে বললেন, বাইরে থেকে দেখে এরে মনে হয়, কিচ্ছু বোঝে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে তো একটা কালসাপ। ছোবল সে দেবেই। যা করার তার আগেই করতে হইব।
.
রেজা এসেছেন ব্যাংকার রফিকুল ইসলামের কাছে। রুমে ঢুকতেই তিনি সহাস্যে স্বাগত জানালেন, আসুন আসুন রেজা সাহেব। কেমন আছেন?
হ্যাঁ ভালো। আপনারতো দেখি মন খুব ভালো।
তা একটু ভালো বৈকি! মানুষ নতুন জামাকাপড় পরলে মন ভালো থাকে, আর আমার মন ভালো থাকে নতুন জুতা পরলে।
রেজা তাকিয়ে দেখলেন রফিকুল ইসলামের পায়ে নতুন জুতা, হারাধন দিয়ে গেল?
হ্যাঁ, এইতো তিন-চার দিন হলো। খুবই সুন্দর জুতো, এত আরামদায়ক হবে আগে বুঝিনি। হি ইজ আ ম্যাজিশিয়ান। রফিকুল ইসলাম জুতোটা উল্টেপাল্টে দেখালেন।
রেজা বললেন, সবাই তাই বলে। তা আর কী খবর? বাসা ভাড়ার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত হলো?
বন্যার পানিটা একটু কমলেই ফ্যামিলি নিয়ে আসব ভাবছি।
.
রফিকুল ইসলামের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরেই নানা কথাবার্তা বললেন রেজা। ব্যাংক থেকে বের হতে হতে রাত হয়ে গেল অনেক। বৃহস্পতিবার বলেই সবারই একটু দ্রুত বাড়ি ফেরার তাড়া, ফলে রফিকুল ইসলাম ছাড়া বেশির ভাগ কর্মকর্তাই ততক্ষণে চলে গেছেন। দারোয়ান, পিয়নসহ দুয়েকজন কর্মচারী মাত্র আছে। এর ফাঁকে মোবাশ্বের বার কয়েক চা, শিঙাড়া দিয়ে গেল। সে এখন ব্যাংকের নিজস্ব লোক হয়ে গেছে। যেখানে-সেখানে যখন তখন অবলীলায় ঢুকে যেতে পারে। কোনো অনুমতিও লাগে না তার। রফিকুল ইসলামের সঙ্গে বাইরে কিছুক্ষণ হাঁটলেনও রেজা। তারপর আবার ব্যাংকের কাছে ফিরে এলেন তারা। আজকের রাতটা যেন খানিক বেশিই নির্জন। তবে শ্রমিকরা হয়তো আশেপাশেই কোথাও কাজ করছে। তাদের মাটি খোঁড়ার শব্দ, কম্পন অনুভূত হচ্ছে। দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনিতে শহরটা গড়ে তুলছে তারা। এই মুহূর্তে আজগরকে দেখলেন রেজা। দু তিন জন লোক সঙ্গে নিয়ে মোবাশ্বেরের চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সে। তার হাতে সিগারেট। আচার আচরণে নেতাসুলভ ব্যাপার না থাকলেও একটা স্পষ্ট ঔদ্ধত্য রয়েছে। রেজা আচমকা আজগরকে ডাকলেন, নাম কী?
আজগর, ছার।
এইখানে কাজ কী?
এই লেবারগুলান সব আমার, ছার।
তুমিই সর্দার?
না ছার, সর্দার আমার বড় ভাই।
সে আসবে না?
ছোট কামে সে আসে না। সে আসে বড় কামে।
কী নাম তার?
আলাউদ্দিন হাজি। তিনবার হজ করেছেন।
তুমি করো নাই?
করব ছার, ইচ্ছা আছে।
সব ঠিকঠাকতো? লেবারদের টাকা-পয়সা ঠিক মতো দাওতো?
ঈমানে ছার। ঈমান ঠিক না থাকলে সব ভুল। সবার আগে লেবার। এদের গায়ের ঘাম শুকানোর আগে মজুরি দিতে ভাইজানের কঠিন নির্দেশ।
আচ্ছা, যাও।
.
সেই রাতে আবারো অণুকে ফোন দিলেন রেজা। অণু ফোন ধরেই বলল, আপনি কি কোনো কারণে অস্থির হয়ে আছেন হক সাহেব?
নাহ, অস্থির হবো কেন?
এত অল্প বিরতিতেতো কখনো ফোন দেন না, এইজন্য বললাম।
অল্প বিরতিতে ফোন দেয়া যাবে না? ফোন রেখে দেবো?
আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? অবশ্যই ফোন দেয়া যাবে। আপনি চাইলে প্রতিদিন ফোন দিতে পারেন, আমি কিছু মনে করব না।
তোমার ধারণা, আমার তোমাকে প্রতিদিন ফোন দিতে ইচ্ছে করে?
অণু ফিক করে হেসে দিল, জি হক সাহেব, আমার ধারণা আপনার আমাকে প্রতিদিন ফোন দিতে ইচ্ছে করে।
প্রতিদিন ফোন দিতে ইচ্ছে করলে দেই না কেন?
দেন না কারণ তাহলে আপনার গাম্ভীর্য টিকে থাকবে না। আপনি আমার সঙ্গে আপনার ভাব গম্ভীর আচরণ ধরে রাখতে চান।
মানুষ গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে ভাব গম্ভীর আচরণ করে। তোমার সঙ্গে আমি কেন ভাব গম্ভীর আচরণ করব? তোমার কী নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ মনে হয়?
অন্যদের কাছে মনে হয় না। দেখেন না, গায়ের রঙের জন্য আমার বিয়ে পর্যন্ত হচ্ছে না। আমি অন্যদের কাছে এতটাই অগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমার ধারণা আপনার কাছে আমি মহাগুরুত্বপূর্ণ।
তোমার ধারণা ভুল। আমি তোমাকে ফোন দিয়েছি মায়ের খবর নেয়ার জন্য, তোমার জন্য না।
খালাম্মা ভালো আছেন। এখন কি ফোন রেখে দেব হক সাহেব?
অবশ্যই ফোন রেখে দেবে।
আচ্ছা।
অণু আচ্ছা বললেও ফোন রাখল না। রেজাও না, তারা দুজনই ফোন কানে চেপে ধরে বসে রইল।
.
রেজা ফোন রাখলেন দীর্ঘসময় পর। এই সময়টাতে তারা দুজনের কেউই কোনো কথা বললেন না। ফোন রেখে রেজার মনে হলো তিনি নিজেকে যতটা বুদ্ধিমান মানুষ ভাবেন, তিনি আসলে মোটেই ততটা বুদ্ধিমান না। বরং বোকা। তিনি যে বোকা এই বিষয়টা তার আশপাশের মানুষ না জানলেও দুজনমাত্র মানুষ সেটি খুব ভালোভাবে জানে। একজন তার মা রেহানা আখতার, আরেকজন অণু। অণু কি আসলেই তার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ? কিন্তু তিনি সচেতনভাবে অণুকে কখনো গুরুত্ব দিতে চাননি। অণু অবশ্য আজ ফোন রাখার আগে একটা কথা বলেছে, জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোকেই আমরা বেশির ভাগ সময় চিনতে পারি না। তাদের গুরুত্ব বুঝতে পারি না, ফলে সেই মানুষগুলোই রয়ে যায় আড়ালে, আবডালে। ঠিক সময়ে সেই ঠিক মানুষগুলোকে চিনতে পারলে, তাদের গুরুত্ব বুঝতে পারলে জীবন খুব সহজ হয়ে যেতে পারত। জীবনের অনেক বড় বড় সমস্যার খুব দ্রুত সহজ সমাধান হয়ে যেত।
কথাটা মাথা থেকে তাড়াতে পারলেন না রেজা। দুপুরে ভাত খেতেই শরীরজুড়ে একটু আলস্য ভর করল যেন। তিনি বিছানায় খানিক শরীর এলিয়ে দিলেন। একটু ঝিমুনির মতোও এলো তার। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রেজার মনে হলো এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটাকেই কোনো গুরুত্ব দেননি তিনি। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বহীন ভেবেছেন। অথচ এই গুরুত্বহীন, আপাতদৃষ্টিতে অগুরুত্বপূর্ণ মানুষটিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১৬-২০. চুন্নু মিয়ার সামনে বসে
চুন্নু মিয়ার সামনে বসে আছে আছিয়া। তার পাশে দাঁড়ানো সোহরাব মোল্লা। সোহরাব মোল্লা বলল, যা যা শিখাই দিছে ঠিকঠাক মতো বলতে পারবিতো?
জে, পারব।
কী বলবি?
বলব সে আমারে দুই বছর ধইরা জোর কইরা খারাপ কাজ করত।
সে কে?
গোলাম মাওলা সাবে।
আর কী বলবি? আমার পেটে সন্তানও আসছিল। সে জোর কইরা নষ্ট করছে।
চুন্নু মিয়া টেবিল থেকে কিছু কাগজ বের করে আছিয়ার সামনে ধরলেন, তোর প্রমাণ নিয়া চিন্তা করতে হইব না। এই যে এইখানে সব আছে। সব ব্যবস্থা করা হইছে। ব্যাক ডেটে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, রিপোর্ট, সব।
আছিয়া কথা বলল না, তাকিয়ে শুধু দেখলো।
সোহরাব মোল্লা বলল, এত ভয় কিসের তোর? সে যে একদম কিছুই করে নাই, তাতো না? এক দুইবারতো ঘটনা সত্য সত্যই ঘটাইছে, ঘটাই নাই?
আছিয়া ওপর নিচ মাথা ঝাঁকালো, জে।
তাইলে এত শরম কিসের? এত ভয় রাখলে চলত না। টাকা-পয়সাতো কম দিব না তোরে।
জে।
ঢাকায় গিয়া প্রত্যেক কথায় এমনে জে জে করলে কিন্তু হইতো না। কাট কাট উত্তর দেওন লাগব, বুঝলি?
জে।
তোরে রেগুলার মাইর ধইর করত, এইটাও বলবি, ঠিক আছে?
জে।
আর কথায় কথায় জে জে করবি না, মনে থাকব?
জে।
চুন্নু মিয়া কিছু বলতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। আকাশে আবার মেঘ করেছে। বৃষ্টি নামবে। বন্যার পানি আবার বাড়বে। এত দুশ্চিন্তা আর তার ভালো লাগে না। কোনোভাবে বাঁধ ভেঙে গেলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ গৃহহীন হবে। তাদের ফসল নষ্ট হবে। এলাকায় রীতিমতো দুর্ভিক্ষ লেগে যাবে। এটা হলে তার নির্বাচনের আশাও শেষ। এই বন্যার দুশ্চিন্তায় তিনি ঘুমাতে পারছেন না।
.
বিকেলে আরেক দফা লতিফুর রহমানের বাড়ি যেতে হলো তাকে। আরো ইট বালি লাগবে তার। লতিফুর রহমান অবশ্য বাধা দিলেন না। তিনি যেন বরং খুশিই হলেন। অন্তত কিছু একটাতো কারো জন্য করতে পারছেন তিনি। কেউতো একটু হলেও তার প্রতি খুশি হচ্ছে। তিনি আজকাল সবাইকেই খুশি রাখতে চান। নাসিমা বেগম বিকেলে আচমকা বললেন, তুমি যে একটা আস্ত মিথ্যুক সে কথা তুমি জানো না?
লতিফুর রহমান অবাক চোখে তাকালেন, আবার কী হলো তোমার? দেখেতো সুস্থই মনে হচ্ছে।
আমাকেত অসুস্থ বানিয়ে রাখছো তুমি। যাতে তোমার মিথ্যা চেহারাটা আমি মানুষের সামনে খুলে দিতে না পারি।
লতিফুর রহমান কথা বললেন না। তিনি করুণ চোখে নাসিমা বেগমের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
নাসিমা বেগম বললেন, সৈকত এত বছরেও কেন এ বাড়িতে আসে না, দেশে আসে না, সেটা তুমি কাউকে বলো না কেন? তোমার লজ্জা করে? লজ্জা শরম কিছু আছে তোমার?
লতিফুর রহমান চিৎকার করে ডালিয়াকে ডাকলেন। নাসিমা বেগম সাপের মতো হিসহিস করে বললেন, তোমার ডান পায়ে যে তুমি ঠিকঠাক মতো হাঁটতে পারো না, কেন হাঁটতে পারো না, ঘটনা কী ঘটেছিল সে কথা তুমি কাউকে বলেছো? কাউকে কেন বলেন না প্রফেসর সাহেব? বলেন, বলেন, লোকজনরে জানতে দেন আপনের আসল চেহারাখান?
ডালিয়া এসে দরজার কাছে দাঁড়াল। সে ঘরে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। লতিফুর রহমান তাকে আসতে ইশারা করছেন। কিন্তু ডালিয়া জানে নাসিমা বেগম এক্ষুনি ভয়ংকর আচরণ শুরু করবেন। সেই আচরণ সামলানো বিশাল শারীরিক মানসিক প্রস্তুতির ব্যাপার। এই মুহূর্তে সেই প্রস্তুতি তার নেই।
.
দিন কয়েকের একটানা চেষ্টায় রেজাউল হক আরো কিছু তথ্য বের করতে পারলেন লিখনের ব্যাপারে। লিখনের যেহেতু থাকার কোনো স্থায়ী ঘর ছিল না। যেহেতু বেশির ভাগ সময়ই সে ঘরের বাইরে এখানে সেখানেই থাকত, ফলে তার থাকার জায়গাগুলো একাধিকবার তল্লাশি করেও গুরুত্বপূর্ণ তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি। যা-ও পাওয়া গিয়েছিল, তা এখনো থানা হেফাজতেই রয়েছে। সেগুলো আবারও তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলেন রেজা। যদি কোনো কু পাওয়া যায়! কিন্তু তেমন কিছুই পাওয়া গেলো না। রীতিমতো দিশেহারা লাগছে রেজার। মনে হচ্ছে, কেসটা এই বুঝি সমাধান করে ফেলছেন তিনি, কিন্তু তারপরই সবকিছুই কেমন মরুভূমির মরিচীকার মতো আবার দূরে সরে যাচ্ছে। আলো থেকে আলেয়া হয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে রইলেন রেজাউল হক। তারপর আবারও উঠে বসলেন সকল আলামত, নথিপত্র নিয়ে। কিছু একটা যেন কোথাও চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি আবারও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে খুঁজে দেখতে লাগলেন। আর তা করতে গিয়েই আচমকা থমকে গেলেন তিনি।
মোবাশ্বেরের চায়ের দোকানের ভেতরের দিকে থাকার ছোট একখানা ঘর আছে। রাতবিরেতে এসে সেই ঘরের মেঝেতে মাঝে মাঝে ঘুমাত লিখন। সেখানে বিছানার নিচে জমিয়ে রাখা পুরনো কিছু পত্রিকা পাওয়া গিয়েছিল। সেই পত্রিকাগুলোও সংগ্রহ করেছিল পুলিশ। যদিও সেগুলোকে তেমন কোনো গুরুত্ব দেয়নি কেউই। কিন্তু আজ সেই পত্রিকাগুলোই হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল রেজার কাছে। তিনি ফাইলগুলো খুললেন। প্রায় বছর খানেক আগের পুরনো, মলিন, কোঁচকানো কিছু পত্রিকা রয়েছে ভেতরে। তিনি একে একে সেই পত্রিকাগুলো পড়া শুরু করলেন। পত্রিকাজুড়ে শত শত সংবাদ। রেজাউল হক জানেন না কেন, সেই প্রতিটি সংবাদ তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগলেন। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলেন না। এরপর আবার পড়লেন, আবার। সন্ধ্যা থেকে সারারাত, কতবার যে তিনি সেই খবরগুলো পড়লেন, তা তিনি নিজেও জানেন না।
.
শেষ রাতের দিকে আচমকা এসআই রেজাউল হকের শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। তিনি হঠাৎই আবিষ্কার করলেন, সবগুলো পত্রিকাতেই একটা নির্দিষ্ট সংবাদ রয়েছে। লিখন কি তাহলে এই সংবাদ পড়ার জন্যই পত্রিকাগুলো কিনেছিল? এমনিতে লিখন পত্রিকা পড়ার মানুষ না। তাহলে শুধু এই নির্দিষ্ট একটি খবর পড়ার জন্যই ভিন্ন ভিন্ন তারিখের অথচ একইরকম সংবাদ আছে- এমন পত্রিকাগুলোই সে সংগ্রহ করেছিল? রেজা বারবার সংবাদগুলো পড়লেন। এবং অবশেষে তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে এই পত্রিকাগুলো কেনার কারণ ওই সংবাদই!
পরদিন ভোরে শরিফুলকে ডেকে তিনি রাগী গলায় বললেন, এই পত্রিকাগুলো যে লিখনের ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, তা আমাকে আগে জানাওনি কেন?
ওগুলো দিয়ে কী করবেন স্যার?
কী করবো মানে?
এগুলো লিখনের বিছানার নিচে পাওয়া গেছিলো। সে প্রায়ই রাতবিরাতে মদ টদ খেয়ে এসে মোবাশ্বেরের চায়ের দোকানে ঘুমাতো। ওই দোকানের ভেতরের দিকে একটা ছোট্ট ঘর আছে, সেইখানে। মাটিতেই বিছানা পাতা থাকতো। একটা তোশক আর বালিশ। সেই তোশকের নিচে ফ্লোরে বিছানোর জন্য এই পেপারগুলো ছিল!
রেজা খানিক চুপ করে থেকে বললেন, হয়তো…।
কেন স্যার? কোন সমস্যা?
হয়তো তখন সে বিছানার নিচেই বিছিয়েছিল। কিন্তু পত্রিকাগুলো সে কিনেছিল অন্য কারণে।
অন্য কারণে! শরিফুল ভারি অবাক হলো।
হুম, অন্য কারণে। রেজা গম্ভীর আনমনা ভঙ্গিতে জবাব দিলেন।
অন্য কী কারণে স্যার?
রেজা এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। তিনি থানা থেকে বের হয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন ব্যাংকে। রফিকুল ইসলাম পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন। তার সামনে হারাধন। তিনি হারাধনকে দিয়ে আরো একজোড়া জুতা বানাবেন। কম্পিউটার থেকে জুতার ডিজাইন দেখাচ্ছেন। হারাধন চলে যেতেই রেজা বললেন, আপনি ভালো আছেন ম্যানেজার সাহেব?
রফিকুল ইসলাম বললেন, জি ভালো।
কেমন ভালো?
বেশ ভালো।
কতটুকু বেশ ভালো?
রফিকুল ইসলাম অবাক চোখে তাকালেন। তারপর আচমকা হেসে বললেন, এখানে ব্যাংক এত ভালো বিজনেস করতে পারবে সেটা কেউই ভাবেনি। অল্প কয়েকদিনেই আমাদের লেনদেন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। সবাই খুব খুশি।
আপনি খুশিতো?
আমিতো অফকোর্স খুশি।
রেজা ঠাণ্ডা গলায় বললেন, বেশি খুশি ভালো না রফিক সাহেব। শোনেননি, যত হাসি, তত কান্না, বলে গেছেন রাম শন্না?
রফিকুল ইসলাম আচমকা থমকে গেলেন, কী হয়েছে বলুনতো রেজা সাহেব?
রেজা শান্ত, স্থির কণ্ঠে বললেন, আপনার একটু আমার সঙ্গে থানায় যেতে হবে।
.
১৭.
এনায়েত খুন হয়ে গেল পরদিন ভোর রাতে। তার লাশ পাওয়া গেল লতিফুর রহমানের বাড়ির গেটের বাইরে। লিখনের মতো তাকেও খুন করা হয়েছে গলায় তার পেঁচিয়ে। এই ঘটনায় মুহূর্তেই থমথমে হয়ে গেল পুরো শহর। লিখনের ঘটনায় যেভাবে সবাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, এনায়েতের ঘটনায় ঘটল তার উল্টোটা। হঠাৎ করেই যেন তীব্র আতঙ্কে চুপসে গেল পলাশবাড়ির মানুষ। এই প্রথম তারা উপলদ্ধি করল এক ভয়ঙ্কর খুনি, এক অদৃশ্য আততায়ী দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তাদের ঘাড়ের কাছেই। তারা কেউ সেই অদৃশ্য খুনিকে দেখতে পাচ্ছে না, চিনতে পারছে না। কিন্তু খুনির স্বার্থে এতটুকু ব্যাঘাত ঘটলেই খুন হয়ে যেতে পারে যে কেউ!
লাশের পাশে দীর্ঘ সময় বসে রইলেন পুলিশের এসআই রেজাউল হক। চুপচাপ, একা, নিস্তব্ধ। তিনি উঠলেন দুপুরের পর। শরিফুল তার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে রইল। কিন্তু একটা কথাও বললেন না রেজা। থানায় নিজের ঘরে গিয়ে দুপুরের খাবার খেলেন তিনি। তারপর উঠে এই খুনের সকল ফাইল একের পর এক আবারো দেখতে লাগলেন। তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা একে একে মনে করার চেষ্টা করলেন। এবং প্রতিবারই তিনি একটা জিনিস আবিষ্কার করলেন, সেটি হচ্ছে, যতবারই তিনি ভেবেছেন যে কেসটি সমাধান করার একদম কাছে চলে এসেছেন, ঠিক ততবারই কোনো একটি ঘটনা ঘটেছে, আর তিনি ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। আজকের ঘটনাটিও তেমনই।
তার ধারণা ছিল, তিনি কেসের একদম চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছে গেছেন। এখন শুধু অপেক্ষা, অপরাধী ধরা পড়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু এনায়েতের খুন তার সব ভাবনাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। আর সব বারের মতোই তিনি এবারো পুরোপুরি বোকা বনে গেছেন। যতবার ভেবেছেন কেসটা প্রায় সমাধান করে ফেলেছেন, ঠিক ততবারই তিনি আবৃত হয়েছেন আরো বেশি গাঢ় ধোঁয়াশায়।
.
বন্যার পানি আচমকা যেন থমকে গিয়েছিল দিন তিনেকের জন্য। ভাটার সঙ্গে কমেও গিয়েছিল বেশ খানিকটা। কিন্তু গতকাল বিকেল থেকে টানা দখিনা হাওয়া, তারপর রাত থেকেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। সারাটাদিনই আকাশ মুখভার করে রাখল। মেঘ ডাকল থেকে থেকে। সেই থেকে নেমে যাওয়া জল যেন আবার মন ঘুরিয়ে ফিরে আসত লাগল। সন্ধ্যার আগে আগেই অন্ধকারটাও নেমে এলো। অমাবস্যার ঘুটঘুঁটে সেই অন্ধকারে তিনখানা নৌকা চুপিসারে এগিয়ে চললো উত্তর দিকে। প্রথম নৌকায় গোলাম মাওলা স্বয়ং। তার সঙ্গে সবুর। দ্বিতীয় নৌকায় নুরু মিয়ার সঙ্গে দুই-তিন জন শ্রমিক। তৃতীয় নৌকায় আজগরের সঙ্গে আরো কয়েকজন শ্রমিক। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে পুলিশের টহল অনেকটাই শিথীল। তবে আবহাওয়ার চেয়েও বড় ঘটনা এনায়েতের মৃত্যু। বেশির ভাগ পুলিশকেই জরুরি থানায় তলব করা হয়েছে।
নুরু মিয়া এতদিন যে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, আজ যেন তা সোনায় সোহাগা হয়ে ধরা দিল। পুলিশের টহল দলের চোখে পড়ার সম্ভাবনা আজ আর নেই। সম্ভাবনা নেই চুন্নু মিয়ার লোকজনের চোখে পড়ারও। আজ সবাই এনায়েতের লাশ নিয়ে ব্যস্ত। গোলাম মাওলা এই সুযোগটা হারাতে চাননি, তাই তিনি নিজেই চলে এসেছেন আজকের ঘটনা স্বচক্ষে দেখার জন্য।
অন্ধকারে চল্লিশ মিনিট নৌকা চালানোর পর উত্তর দিকের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের দেখা পাওয়া গেল। বাঁধের গায়ে নৌকা ভেড়াতেই টপাটপ লাফিয়ে নেমে গেল আজগর আর শ্রমিকেরা। সঙ্গে নামল সবুরও। তারপর আজগরের দেখিয়ে দেয়া জায়গাটাতে পৌঁছে গেল তারা। গত প্রায় মাসখানেক ধরে অত্যন্ত সাবধানে, লোকচক্ষু এড়িয়ে একটু একটু করে বাঁধের তলার মাটি সরানো হয়েছে। আজ আর ঘণ্টা দুয়েক সময় পেলেই বাঁধ ধসিয়ে দেয়া যাবে। তারপর শুরু হবে আসল খেলা। নতুন সম্ভাবনায় গোলাম মাওলার চোখ চকচক করে উঠল। গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যাবে। ভেসে যাবে ফসলের মাঠ।
এতদিন এই বাঁধ নিয়ে চুন্নু মিয়ার বিরুদ্ধে যে প্রচারণা চালানো হয়েছিল, তা এবার নিশ্চিত করেই হালে জোর পানি পাবে। বাঁধের জন্য সরকারি বরাদ্দের টাকার সামান্য অংশই যে চুন্নু মিয়া বাঁধ নির্মাণে খরচ করেছিলেন, আর বাদ বাকি টাকা যে তিনি তার পকেটস্থ করেছিলেন, এখনই তা হাতে-কলমে প্রমাণের সময়।
অল্প টাকায় ফাঁকিবাজি করে তৈরি করা অপুষ্ট বাঁধ তাই আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বানের জলে ধসে যাবে। এই বাঁধ বিস্তির্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন-মরণের সীমারেখা। সেই বাঁধ নিয়ে চুন্নু মিয়া নয়-ছয় করেছেন, জনগণের কাছে এর কোনো ক্ষমা নেই। গোলাম মাওলার আর তর সইছে না। এই একটি মাত্র ঘটনার জন্য কত বিনিদ্র দিন-রাত্রির অপেক্ষা তার! এই একটি মাত্র ঘটনায় নির্বাচনের পাল্লা প্রায় শতভাগ ভারী হয়ে যাবে তার দিকে, এটি সুনিশ্চিত। তিনি জ্বলজ্বলে চোখে অপেক্ষা করছেন। তার ইচ্ছে হচ্ছে নিজেই যেন কোদাল হাতে নেমে যান। রাত দশটা নাগাদ বাঁধের একটা অংশ ধসে গেল। হু হু করে নেমে যেতে থাকল পানি। পানির গর্জনের শব্দে গোলাম মাওলার চোখেও আনন্দের পানি চলে এলো।
.
কিন্তু মাছ ধরার এক ট্রলার আচমকা লাইট জ্বালিয়ে ছুটে যেতে থাকল শহরের দিকে। ততক্ষণে আরো বেশ খানিকটা ধসে গিয়েছে বাঁধ। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার এই খবর যতক্ষণে থানায় পৌঁছালো, ততক্ষণে শহরের সকল মানুষ ছুটতে শুরু করেছে বাঁধের দিকে। পলাশবাড়ির মানুষের কাছে এনায়েতের লাশের চেয়ে বহুগুণ গুরুত্বপূর্ণ এই বাঁধ। এই বাঁধ ভেঙে গেলে তাদের জীবন মুহূর্তেই মূল্যহীন হয়ে যাবে। যে করেই হোক এই বাঁধ জোড়া লাগাতে হবে। নাহলে জলে ভেসে, অনাহারে তাদের নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই খবর পেয়েও পলাশবাড়ি থানার এসআই রেজাউল হক তেমন তাড়াহুড়া করলেন না। তিনি অসংখ্য গ্রামবাসীর সঙ্গে একদল পুলিশ পাঠিয়ে দিলেন বাঁধ ঠেকাতে। আর নিজে বসে রইলেন থানায়।
আরো খানিকটা সময় যেতেই রেজাউল হক উঠে দাঁড়ালেন। তারপর হেঁটে চললেন সুনসান শহরের দিকে। তার সঙ্গে শরিফুলসহ আরো দুজন পুলিশ কনস্টেবলও রয়েছে। রয়েছেন ব্যাংক ম্যানেজার রফিকুল ইসলামও। শহরে ঢুকে দুজন পুলিশকে ব্যাংকের বাইরে সতর্ক পাহারায় রেখে তারা তিনজন ঢুকে গেলেন ভেতরে। সঙ্গে ব্যাংকের দুজন গার্ডও। রফিকুল ইসলাম তাদের নিয়ে গেলেন যেখানে টাকার ভল্টগুলো রয়েছে সেই জায়গাটাতে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় একটা। নিঃশব্দ, নির্জন রাত। কেবল টিকটিক করে বয়ে যাওয়া ঘড়ির কাটাটাই যা মৃদু শব্দে সঙ্গ দিচ্ছে। গাঢ় অন্ধকারে কোনো এক অনিশ্চিত অপেক্ষায় বসে আছেন মানুষগুলো। এই বুঝি অন্ধকার ফিকে হয়ে আলো জ্বলে উঠল। এই বুঝি নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল বিকট কোনো শব্দে। কিন্তু কিছুই ঘটল না। কেবল ঘড়ির কাটায় বয়ে যেতে লাগল সময়।
রফিকুল ইসলামের খানিক ঝিমুনির মতো লেগে এসেছিল। চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে বসে থাকলেও মাথাটা হঠাৎ বাঁদিকে কাত হয়ে পড়ল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে খপ করে তার হাতটা চেপে ধরলেন রেজা। চোখ মেলে তাকালেন রফিকুল ইসলাম। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলেন না। তবে শব্দটা শুনতে পেলেন। খুব কাছে কোথাও থেকে কংক্রিটের গায়ে ধাতব, ধারালো কিছুর ঘর্ষণের মৃদু শব্দ আসছে। শব্দটা জোরালো হচ্ছে ক্রমশই। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষায় বসে আছেন রেজা। আর ঠিক সেই মুহূর্তে রাতের নির্জন নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘরের মেঝেটা আচমকা বিকট শব্দে ফাঁক হয়ে গেল। একটা গোলাকার গর্তের মুখ দৃশ্যমান করে কংক্রিটের মেঝেটা সরে গেল একপাশে। সেই গর্ত থেকে প্রথমে সাবধানে মাথা বের করে উঁকি দিল একটি মুখ, তারপর আরো একটি মুখ। তারপর বেড়ালের মতো নিঃশব্দে মাটির নিচ থেকে পরপর বের হয়ে এলো দুজন মানুষ!
রেজা আরো খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলেন। তারপর অন্ধকারে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মানুষ দুজনের ওপরে। শরিফুল ঘরের আলো জ্বালানোর আগ অবধি মানুষ দুজনের চেহারা দেখা গেল না। দীর্ঘ সময় ব্যাংকের নিচের গুহার অন্ধকারে থেকে হঠাৎ ঝলমলে আলোয় চোখ খুলতে পারছে না গুহা থেকে বের হওয়া মানুষ দু’জন। তীক্ষ্ণ আলোর টর্চ লাইটখানা তাদের চোখের ওপর স্থির ধরে আছে শরিফুল। সেই আলোতে হতবুদ্ধের মতো দাঁড়িয়ে আছে চায়ের দোকানি মোবাশ্বের আর মুচি হারাধন!
দুহাতে চোখ মুখ ঢেকে ওই ঝাঝালো আলো থেকে বাঁচবার চেষ্টা করছে তারা!
.
১৮.
পরের সারাটাদিন শরিফুল অনেক চেষ্টা করল রেজার সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু পারল না। খুব জরুরি কিছু কাজে সারাদিন ডুবে রইলেন তিনি। শরিফুলের কোনো কথাই গ্রাহ্য করলেন না তিনি। একের পর এক ফোন করতে হচ্ছে তাকে। হারাধন আর মোবাশ্বেরকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তারা স্পষ্ট করে কিছু না বললেও যতটুকু বলেছে তার সঙ্গে নিজের অনুমান, পর্যবেক্ষণ আর যুক্তি মিলিয়ে মোটামুটি স্পষ্ট একটা ধারণা পেয়েছেন রেজাউল হক। তাদের কথার সূত্র ধরেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে আজগর আর তার সঙ্গের লোকজনকেও। উত্তরদিকের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটা শেষ অবধি পুরোপুরি ধসিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি। এলাকার লোকজন মিলে আপাতত একটা ব্যবস্থা করেছে। বাঁধের ঘটনার কারণে গোলাম মাওলাকে গ্রেপ্তার করা হবে কী না সে বিষয়ে ওপর মহল থেকে এখনো স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা আসেনি। তবে তাকে বাড়িতেই থাকতে বলা হয়েছে। তার বাড়ির বাইরে পুলিশ প্রহরাও বসানো হয়েছে।
শরিফুল আরো একবার বলল, স্যার?
রেজা এবার জবাব দিলেন, বলো?
ঘটনাতো কিছুই বুঝলাম না স্যার?
কোন ঘটনা?
গতকাল রাতে যা ঘটল।
ঘটনাতো এখনো শেষ হয়নি।
আরো বাকি আছে?
হ্যাঁ।
কিন্তু স্যার যা হইল, তাওতো বুঝতে পারলাম না।
না বুঝতে পারার কি আছে?
আপনে কী করে বুঝলেন যে হারাধন আর মোবাশ্বের মিলে মাটি খুঁইড়া ব্যাংক ডাকাতির প্ল্যান করতেছে?
রেজা গম্ভীর মুখে হাতের আরো কিছু কাজ শেষ করলেন। তারপর ধীরে-সুস্থে ফাইল থেকে সেই পুরনো পত্রিকাগুলো বের করলেন। প্রতিটা পত্রিকা থেকেই নির্দিষ্ট একটি সংবাদ কেটে আলাদা করা হয়েছে। সেই পেপার কাটিংগুলো শরিফুলের সামনে মেলে ধরলেন রেজা। তারপর বললেন, এই সংবাদগুলো পড়ো।
বলেই আবারো কাজে ডুবে গেলেন রেজা। শরিফুল সময় নিয়ে পড়ল। তারপর হতভম্ব ভঙ্গিতে বলল, এ তো দেখি সবই ব্যাংক ডাকাতির খবর!
রেজা মুখ তুলে তাকালেন, হুম।
শরিফুল কৌতূহলী গলায় বলল, এই খবরের সঙ্গে লিখনের সম্পর্ক কী? আর লিখনের সঙ্গে গতকালের ঘটনার সম্পর্ক কী?
রেজা হাসলেন, বছরখানেক আগে রাজশাহীতে একটা ব্যাংক ডাকাতি হয়েছিল। মাটি খুঁড়ে ব্যাংকের যে ঘরে টাকার ভল্ট থাকে, ঠিক সেই ঘরে উঠেছিল ডাকাতরা। এই দেখো, সংবাদটা পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিল। দেখেছো?
জি স্যার।
ডাকাতিটা হয়েছিল বৃহস্পতিবার রাতে। কারণ, পরদিন শুক্রবার, ব্যাংক বন্ধ।
জি।
এর কিছুদিন পরে দিনাজপুরেও একদম একইভাবে ডাকাতি হয়েছিল। দেখেছো? এই যে, এই কাটিংটা দেখো।
জি স্যার।
দুটি ডাকাতির ঘটনায়ই অপরাধীরা ধরা পড়ে গিয়েছিল। তবে রাজশাহীর ঘটনায় একরাতের মধ্যে ষোল কোটিরও বেশি টাকা ব্যাংক থেকে সরিয়ে ফেলতে পেরেছিল ডাকাতরা। পরে ট্রাকভর্তি চাল কিনে নিয়ে সেই চালের বস্তায় টাকা ঢুকিয়ে ট্রাকে করে চাল নিয়ে যায় ঢাকায়।
শরিফুল বিস্মিত ভঙ্গিতে আবারো সংবাদটা পড়তে লাগল।
রেজা বললেন, ডাকাতরা ডাকাতির উদ্দেশ্যে ব্যাংকের পাশেই বছরখানেক আগে থেকে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। তারপর দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নিজেদের বাড়ির মেঝে থেকে গর্ত খুঁড়ে ব্যাংকের টাকা রাখার ভল্টের মেঝে পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল তারা।
শরিফুলের বিস্ময় কাটছে না। সে বলল, কিন্তু স্যার, এইটাতো অনেক হিসাব-নিকাশের ব্যাপার।
একদম। অনেক হিসেব-নিকেশ এবং ঝুঁকির ব্যাপারও।
মোবাশ্বের আর হারাধনরা কী এই পত্রিকার খবর থেকেই বুদ্ধিটা করেছিল?
হুম। পত্রিকার খবর এবং অন্যান্য সোর্স থেকে পাওয়া এই ধরনের নানা সংবাদ আর আগের ঘটনাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করে দেখেছিল এরা। তারপর পরিকল্পনা করেছিল। ব্যাংক ম্যানেজার রফিকুল ইসলামের সঙ্গেও এই জন্যই ভালো সম্পর্ক তৈরি করেছিল ওরা দুজন। এতে করে যখন তখন ব্যাংকের ভেতর-বাহির সব জায়গায় যখন তখন যেতে আসতে পারত তারা। খোঁজখবরও জানতে পারত। আর সেই অনুযায়ী প্ল্যান-পরিকল্পনাও করেছিল।
রেজা খানিক থামলেও শরিফুল কথা বলল না। রেজা আবার বললেন, এই পরিকল্পনা তারা করেছে বছরখানেক আগে। তারা কোনোভাবে জেনেছিল যে এখানে নতুন ব্যাংক হবে। তখনই তারা এই পরিকল্পনা করেছিল।
এতদূরের পলাশবাড়িতে নতুন ব্যাংক আসবে, আর সেই ব্যাংক কোথায় না কোথায় বসবে, তা তারা কীভাবে জানবে?
রেজা হাসলেন, তখন যে জিজ্ঞেস করলে, এই ঘটনার সাথে লিখনের সম্পর্ক কী?
জি স্যার।
লিখনের সম্পর্ক এখানেই।
মানে?
এই পলাশ বাড়িতে ব্যাংক আসবে, সেই ব্যাংক কোথায় বসবে, এসব তাদের জানিয়েছিল লিখন।
লিখন!
হুম। এমনকি এটাও হতে পারে যে এর মূল পরিকল্পনাটা ছিল লিখনের। অবশ্য হারাধনেরও হতে পারে। আইডিয়াটা তারা পেয়েছিল পত্রিকার ওই নিউজ থেকেই। সেই সময়ের পত্রিকার এই ব্যাংক ডাকাতি সম্পর্কিত খবরগুলো রেগুলার পড়ত তারা। এমনকি বিভিন্ন সময়ের এমন ব্যাংক ডাকাতির খবরগুলোও সংগ্রহ করতো। তারপর শুরু হয় তাদের প্ল্যানিং। হারাধন এখানে এসে মুচির দোকান দিয়ে বসে যায়। আরেক পাশে মোবাশ্বেরের চায়ের দোকান।
অত আগে থেকেই লিখন জানত কোথায় ব্যাংক বসবে?
হুম জানত। কারণ চুন্নু চেয়ারম্যান তার মামা। আর বাজারে চুন্নু চেয়ারম্যানের অনেকগুলো ভালো দোকান আছে। ফলে এখানে ব্যাংক আসলে তারা তার কোন দোকানে বা ভবনেই করতে চাইবে। তাই না?
জি স্যার।
এই জন্যই অনেক আগেই ব্যাংকের পক্ষ থেকে চুন্নু মিয়ার সঙ্গেই যোগাযোগ করা হয়েছিল। চুন্নু মিয়া সেসবের দায়িত্ব দিয়েছিলেন লিখনকে। আর লিখন তখন এটা নিশ্চিত করছিলো যে ব্যাংক যেন তাদের ভবনেই বসে। এবং কোন ভবনে কোথায় বসবে, সেটাও সে তাই আগেভাগেই জানতো’।
শরিফুল যেন এবার বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সে বলল, তাহলে লিখনরে খুন করল কে?
হয়তো হারাধন আর মোবাশ্বেরই!
কী বলছেন স্যার! তারা কেন খুন করবে? আপনার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে লিখনতো তাদেরই লোক!।
হুম। তবে এসব কাজে যা হয়, একজন ঝামেলা তৈরি করলেই বাকি সবাই ভয়ে থাকে, যদি সে মুখ খুলে দেয়! তাহলেতো সবার বিপদ! লিখন শেষ দিকে এসে সম্ভবত কোনো ঝামেলা করেছিল।
এই জন্য প্ল্যান করে তারা লিখনকে খুন করেছে?
হুম। আর চেষ্টা করেছে যাতে খুন নিয়ে বেশি ইনভেস্টিগেশন না হয়। হলেও একদম ভিন্ন দিকে সন্দেহ চলে যায়। এই সুযোগে যত দ্রুত সম্ভব তারা তাদের কাজ সারবে।
কিন্তু স্যার, হারাধন আর মোবাশ্বেরের মতো দুইজন…।
রেজা হাসলেন, আমার ধারণা হারাধন আসলে হারাধন না। আর সে মুচিও না। এমন কাজই তার প্রফেশন।
তাহলে কে সে?
তার আসল নাম আলাউদ্দিন হাজি। সে আসলে এই কনস্ট্রাকশন লেবারদের সর্দার। কনস্ট্রাকশন লেবারদের সর্দার হওয়ায় তার জন্য খুব সুবিধা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে গেলে, মানুষের বাড়ি, ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর পাওয়া তার জন্য সহজ হয়। প্ল্যানও করতে পারে খুব সহজে। তবে তার লেবারদের সবাই যে এইসব ঘটনা জানে তা না। জানে অল্প কয়েকজন। বাকিরা হয়তো তাকে ভালোভাবে চেনেও না। তারা চেনে আজগরকে। এমন লেবারদের বেশির ভাগকেই ছুটা লেবার হিসেবে ভাড়া পাওয়া যায়।
রেজা সামান্য থেমে আবার বললেন, এই ঘটনাতেও খুব অল্প কয়েকজন লেবার হারাধনকে চিনত, কেবল তারাই জানত ব্যাংক ডাকাতির কথা। বাকিরা কেউ কিছু জানত না। হারাধনের মুচির দোকানে সারাক্ষণ যে দুই-তিনজন কাজ করত, ওরা আসলে হারাধনের ঘরের মেঝে থেকে গর্ত খোঁড়ার কাজ করত, রাত দিন। হারাধন জুতা বানানোর ভান ধরে নানা ধরনের শব্দ তৈরি করত, যাতে রাতের নিস্তব্ধতায়ও কেউ গর্ত খোঁড়ার শব্দ শুনে সন্দেহ করতে না পারে!
কিন্তু সে যে এত সুন্দর জুতা বানাতো?
হতে পারে মুচির কাজটা সে ভালোই জানে! বা এমনও হতে পারে সে জুতা বাইরে থেকে বানিয়ে নিয়ে আসত। তবে নিজেরওতো কিছু কাজ জানতে হয়েছে। তার। আমার ধারণা, মানুষের চোখে ধুলো দেয়ার জন্য সে যেটা করত তাহলে অর্ডার মতো জুতার বিভিন্ন পার্ট সে বাইরে থেকে কিনে নিয়ে আসত। তারপর এখানে এনে জোড়া লাগাত। এই কাজটা সে করতে পারত। আর সঙ্গে কিছু এক্সপার্ট লোকও ছিল। তবে ভুলটাও এখানেই ছিল।
কী ভুল?
সে যে জুতার সোলগুলো লাগাত, তার সবগুলো একইরকম। বাইরে থেকে একসঙ্গে কিনে আনার কারণে এমন হতে পারে!
কীভাবে বুঝলেন?
ব্যাংক ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম, চেয়ারম্যান চুন্নু মিয়া এবং গোলাম মাওলার জুতার সোল একইরকম। এবং সেদিন ভোর রাতে যখন আমরা লতিফুর রহমান স্যারের বাড়ির সীমানাপ্রাচীরের বাইরে চক্কর দিচ্ছিলাম, তখন সেখানে ঠিক একই রকম জুতার সোলের ছাপ আমি দেখেছি। শুধু তাই-ই না, একটা দেয়ালেও কাদা-মাটির এই সেইম জুতার ছাপ ছিল!
তার মানে ওনারা কেউ ওই বাড়িতে যেতেন? বা দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকেছিলেন?
নাহ, রাতের বেলা কাদা-জলের মধ্যে হাঁটতে হবে বলে হারাধন নিজেই সেদিন জুতা পরেই ওই বাড়িতে গিয়েছিল। ঘটনাচক্রে তার সেদিনের পরা জুতাও ছিল ওই একই সোলের জুতা!
কিন্তু হারাধন কেন ওই দিন ওই বাড়িতে গিয়েছিল?
রেজা দীর্ঘসময় চুপ করে থেকে বললেন, ডালিয়ার সঙ্গে দেখা করতে!
ডালিয়া!
হুম।
কোন ডালিয়া স্যার?
লতিফুর রহমান স্যারের বাসার কাজের মেয়ে ডালিয়া।
মানে? শরিফুল যেন রীতিমতো বজ্রাহত হয়ে গেলো। সে আর্তনাদের মতো স্বরে বললো, ডালিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলো হারাধন! কেন? ডালিয়ার সাথে তার কী কাজ? এই ঘটনার সাথে ডালিয়ার কী সম্পর্ক?
রেজা মৃদু হাসলেন, গভীর সম্পর্ক।
শরিফুল কিছুই বুঝতে পারছে না। রেজা যেন তার সাথে ইচ্ছে করেই খানিক হেয়ালিও করছেন। সে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। রেজা সামান্য চুপ করে থেকে অবশেষে বললেন, আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, তবে ঘটনা তা-ই। সম্ভবত এই ঘটনার প্রধান চরিত্রই ডালিয়া! যদিও এখনো পর্যন্ত এটা আমার অনুমান।
শরিফুলের মুখ হা হয়ে আছে। বিষ্ময়ে তার চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে! কোনোমতে ঢোক গিলে সে আবারও বলল, ডালিয়া!
রেজা গম্ভীর গলায় বললেন, খুব খেয়াল করে শোননি বলে ভুলে গেছো, ডালিয়া বছরখানেক আগে লতিফুর রহমানের বাড়িতে থাকা শুরু করে। ঠিক ওই সময়টাতেই হারাধন এবং মোবাশ্বেরও কিন্তু পলাশবাড়িতে আসে। ডালিয়া কীভাবে এসেছিল মনে আছে? এক রাজমিস্ত্রি তাকে বোন বলে রেখে গিয়েছিল?
জি স্যার।
আমার ধারণা, এই পুরো বিষয়ের প্ল্যান পরিকল্পনা ডালিয়ার। সে এই দলের প্রধান। সমস্যা হচ্ছে, ডালিয়ার বুদ্ধি পরামর্শ বা একটার পর একটা সিদ্ধান্ত জানার তাৎক্ষণিক কোনো উপায় ছিল না হারাধনের। কারণ ডালিয়া সতর্কতাবশত কোনো ফোনও ব্যবহার করত না। এই জন্য হারাধনকে প্রায়ই রাতের অন্ধকারে দেয়াল টপকে ওই বাড়িতে ঢুকতে হতো!
তাহলে কী লিখনকে ওই বাড়িতে নিয়ে খুনের পরিকল্পনাও তারই?
একজ্যাক্টলি। ওই বাড়ির কারো যোগসাজশ ছাড়া ওভাবে ওখানে কাউকে খুন করা সম্ভব ছিল না। বা সম্ভব হলেও এত সহজে সম্ভব হতো না। পুরো বিষয়টা একবার ভাবোতো?
জি, স্যার?
লিখনকে খুন করার সময়টায় লতিফুর রহমান যে ঘরের বাইরে বা নিচতলায় চলে যাবেন, তা কিন্তু ভাড়াটের ছদ্মবেশে আসা খুনিদের পক্ষে আগেভাগেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব ছিল না। ছিলো?
না। তা ছিল না!
নম্বর দুই, ধরে নিলাম কোনো না কোনভাবে কথাবার্তা বলে বা কোনো একটা ঘটনা ঘটিয়ে ওইটুকু সময়ের জন্য তারা স্যারকে ঘরের বাইরে নিয়ে এসেছিল, কিন্তু দ্যা ফ্যাক্ট ইজ, এরপর যদি ওইদিনই আরো কোনো ভাড়াটে ঘর ভাড়া নিতে আসত? তাহলে?
তাহলেতো তারা ওই ঘরটা দেখতে গেলেই লাশটাও দেখে ফেলত!
একদম।
জি স্যার।
আর সেটা যদি হতো, তাহলে খুনি সঙ্গে সঙ্গেই ধরা পড়ে যেত। কারণ, অন্য ভাড়াটেরা ঘর দেখতে এসে যখন দেখত যে বাথরুমের ভেতর কিছুক্ষণ আগে খুন করা একটা লাশ পড়ে আছে, খুব স্বাভাবিক তখন একটা হৈচৈ পড়ে যেত। আর কিছুক্ষণ আগের ঘটনা লতিফুর রহমানেরও মনে থাকত। বিষয়টা তখন একেবারেই ওপেন হয়ে যেত।
জি স্যার।
সুতরাং ডালিয়া এটা কনফার্ম করেছিল যে খুনের পর সেদিন আর কোনো ভাড়াটে যাতে বাড়ি দেখতে আসতে না পারে। এবং শুধু তা-ই না, সে এটিও জানত যে প্রফেসর সাহেবরা সবাই মিলে পরদিন বেশ কিছুদিনের জন্য গ্রামে চলে যাবেন। সো, এর চেয়ে ভালো কোনো সুযোগ আর ছিল না।
খুনটা তাহলে কে করেছিল? হারাধন বা মোবাশ্বের হলেতো প্রফেসর সাহেবের চিনে ফেলার কথা?
আমার ধারণা, খুন করার সময় ওরা ছিল না। কিংবা থাকলেও হারাধন হয়তো আলাউদ্দিন হাজি সেজেই গিয়েছিল। এই কাজ সে আগেও করেছে। লম্বা দাড়ি, চোখে সুরমা, জোব্বা পরা হাজি সাহেব দুম করে যেমন হারাধন মুচি হয়ে যেতে পারেন, তেমনি আবার আলাউদ্দিন হাজিও সাজতে পারেন বলেই আমার বিশ্বাস। আর লতিফুর রহমানের এত কিছু খেয়াল করার কথা না। সঙ্গে হয়তো অন্য দুজন শ্রমিকও ছিল। যারাও এই প্ল্যানের অংশ। তবে তাদের আলাদা করে কেউ চেনে না।
কিন্তু স্যার এনায়েততো নিরীহ মানুষ, সে খুন হয়েছিল কেন?
এখনো জানি না আমি। ডালিয়াকে গ্রেপ্তার করলে সব জানা যাবে, তবে আমার ধারণা, এনায়েত খুন হয়েছিল কারণ সে দেখে ফেলেছিল রাতের অন্ধকারে কলাপসিবল গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে হারাধনের সঙ্গে ডালিয়া প্রায়ই কথা বলে। শেষ দিন হয়তো সে হাতেনাতে ধরে ফেলেছিল। আর এ কারণেই খুনটা হয়েছিল। তা ছাড়া ওই খুনটা করে ফেললে সবার মনোযোগও সরে যাবে অন্যদিকে।
একদম!
শুধু তা-ই না, সেদিনই গোলাম মাওলার হয়ে আজগরকে দিয়ে বাঁধ কাটানোরও ব্যবস্থা করা হলো। বাধ নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল, শহর হয়ে গেল ফাঁকা। ব্যাংক ডাকাতির জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগতো আর হয় না!
শরিফুল আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই রেজা বলল,আজ রাতে আরো একটা বাজি হয়ে যাক শরিফুল।
কী বাজি স্যার?।
আজ রাতের অন্ধকারেই ডালিয়া পালানোর চেষ্টা করবে। আমি তাকে হাতে নাতে ধরতে চাই।
.
সেই রাতেই রেজা আর শরিফুল লতিফুর রহমানের বাড়ির বাইরে অন্ধকারে ওঁত পেতে রইলেন। কিন্তু রেজার অনুমান সত্য হলো না। তিনি আবারো বাজিতে হেরে গেলেন। সারারাত মশার কামড় খাওয়াই সাড় হলো তাদের। ডালিয়া বাড়ি থেকে বের হলো না। রেজা যেন আবারও খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ডালিয়া সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন, তার পুরোটাই তার মনের যৌক্তিক কল্পনা। তার হাতে ডালিয়ার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি হারাধন বা মোবাশ্বেরও ডালিয়ার বিষয়ে কিছু বলেনি। অন্যসব বিষয়ে অল্পবিস্তর কথা বললেও অনেক চেষ্টা করেও এই বিষয়ে তাদের মুখ খোলানো যায়নি। রেজা তাই আজ রাতে হাতেনাতে ডালিয়াকে ধরতে চেয়েছিলেন। পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আবারো বাজিতে হেরে গেলেন। ভোরবেলা রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে তিনি থানায় ফিরতে না ফিরতেই শরিফুল কাঁচুমাচু মুখে বলল, স্যার, আমার টেকা?
.
১৯.
ডালিয়াকে থানায় ডেকে আনা হয়েছে। তার সঙ্গে এসেছেন লতিফুর রহমানও। রেজা সরাসরি কথায় চলে গেলেন, তুমি কি বুঝতে পেরেছো, তোমাকে কেন থানায় আনা হয়েছে?
ডালিয়া ডানে-বায়ে মাথা নাড়াল। তার মুখ নিচু। রেজা বললেন, লিখনকে খুনের দায়ে তোমাকে অ্যারেস্ট করা হচ্ছে!
ডালিয়া ঝট করে মাথা তুলে তাকাল, মানে?
মানে লিখনকে খুনের দায়ে তোমাকে আমরা গ্রেপ্তার করছি।
মুহূর্তেই যেন ডালিয়ার সলজ্জ, অপ্রতিভ, গুটিয়ে থাকা ভঙ্গিটা খসে পড়ল। সে স্পষ্ট গলায় বলল, এই আজগুবি কথা আপনি কোথায় পেয়েছেন?
রেজা হাসল, তুমি নিশ্চয়ই জানো যে হারাধন মুচি ওরফে আলাউদ্দিন হাজি মোবাশ্বেরসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছে?
ডালিয়ার চোখে সামান্য কম্পন দেখা গেল। এমনিতেই তার চোখে-মুখে নিদ্রাহীনতার ছাপ। সম্ভবত শেষ কিছুদিন সে ঘুমায়নি। তারপরও যতটা সম্ভব নিষ্কম্প কণ্ঠেই সে বলল, তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী?
সেটা তুমি ভালো করেই জানো। হারাধন আমাদের সব বলেছে।
হারাধন কে?
রেজা হাসল। এই মুহূর্তে শরিফুল একটা ছোটখাটো ব্যাগ নিয়ে ঘরে ঢুকল। ব্যাগের ভেতর কিছু কাগজপত্র। অল্পকিছু জামাকাপড়। ব্যাগটা ডালিয়ার। সেদিকে তাকিয়ে রেজা বলল, তুমি রেডি হয়েই ছিলে, কিন্তু সুযোগ পাওনি, তাইতো?
ডালিয়া ঠাণ্ডা গলায় বলল, কীসের সুযোগ?
পালিয়ে যাওয়ার?
পালিয়ে যাব কেন আমি? কোথায় যাব?
রেজা আবারো হাসলেন, তুমি কিন্তু খুব সুন্দর করে কথা বলো ডালিয়া। সুন্দর, শুদ্ধ উচ্চারণ। ওই দিনের মতো অশুদ্ধ, আঞ্চলিক না।
ডালিয়া সামান্য থতমত খেয়ে গিয়ে বলল, আমি অনেকদিন ঢাকায় ছিলাম।
আর কোথায় কোথায় ছিলে?
আর কোথায় কোথায় ছিলাম মানে?
মানে আলাউদ্দিন হাজির সঙ্গে আর কোথায় কোথায় গিয়েছিলে তুমি?
আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
রেজা টেবিলের ওপর একটা ছবি রাখল। ছবিটার সঙ্গে ডালিয়ার চেহারার মিল খুব স্পষ্ট না হলেও দুজন যে একই মানুষ তা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। রেজা বলল, এই মেয়েটাকে তুমি চেনো?
ডালিয়া ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আচমকা চুপ করে গেল। রেজা বলল, সেদিন পলাশবাড়ি বাজারে হারাধন মুচির দোকানে তোমাকে আমি দেখেছিলাম। তুমি পুরনো স্যান্ডেল সেলাই করতে বাজারে এসেছিলে। কী মনে করে আমি দূর থেকে মোবাইল ফোনেই তোমার কিছু ছবিও তুলেছিলাম। কাল ছবিগুলো ঢাকায় পাঠিয়েছিলাম ডিবি পুলিশের কাছে। তারা কিছুক্ষণ আগে আমাকে কনফার্ম করেছে, এর আগেও তোমার বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধে যুক্ত থাকার প্রমাণ আছে। এই ছবিটিও তারা পাঠিয়েছে। শুধু তাই না, আমার তোলা তোমার ছবির এক কোণে ছোট্ট করে হারাধন মুচিকেও দেখা যাচ্ছিল। ঠিক এই হারাধন মুচিকেও ট্রেস করতে পেরেছে পুলিশ।
রেজা থেমে তার সামনের চায়ের কাপ থেকে পিরিচে চা ঢাললেন, তারপর এক চুমুকে পুরোটা চা খেয়ে নিয়ে আবার বললেন, একাধিক ইউনিভার্সিটি কলেজের সামনে মুচির দোকানের আড়ালে ইয়াবার বিজনেসও করেছে হারাধন। হয়তো এ কারণেই সে জুতো তৈরির কাজটা ভালোভাবেই শিখে গিয়েছিলো। অবশ্য কয়েকবার পুলিশের হাতে ধরাও পড়েছিল সে। কিন্তু টাকা পয়সা দিয়ে প্রতিবারই ছাড়া পেয়েছিল। আর এই ইয়াবা বিজনেস করতে গিয়েই তার সঙ্গে লিখনের পরিচয়। লিখনের সঙ্গে সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই পলাশবাড়িতেও ইয়াবা বিজনেস শুরুর কথা ভাবছিল সে। কিন্তু সেই ইয়াবার বিজনেসের বদলে হঠাৎ ব্যাংক ডাকাতির চিন্তাটা প্রথম কার মাথায়, কিভাবে এলো? তোমার?
ডালিয়া এই প্রশ্নেরও উত্তর দিল না। সে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইল। রেজা বললেন, আমার ধারণা, হারাধন খুব দ্রুত বুঝে গিয়েছিল যে লিখন এখানে খুব প্রভাবশালী, কিন্তু একই সঙ্গে খানিক বোকাসোকাও সে। এখানে যে নতুন শহর গড়ে উঠছে, ইয়াবাসহ এমন আরো বিজনেস যে এখানে খুব সহজেই করা সম্ভব সেটাও সে কথায় কথায় জানিয়েছিল হারাধনকে। ব্যাংক, বীমা এইসব বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কথাও। তাই না?
ডালিয়া অনেকক্ষণ পর কথা বলল, আমি আলাউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলতে চাই। সে এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে, আর কিছু লুকিয়ে রেখে লাভ নেই।
ডালিয়ার চোখের দিকে চোখ রেখে রেজা ঠাণ্ডা গলায় বললেন, সে এখন আর কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।
এই প্রথম পুরোপুরি কেঁপে উঠল ডালিয়া, আপনারা তাকে কত মেরেছেন?
এখনো ততটা মারতে পারিনি, যতটা মারলে এই সব ঘটনায় সে তোমার নাম বলতে পারত, তোমার ইনভলভমেন্টের কথা বলতে বাধ্য হতো।
ডালিয়া ভেঙে পড়া গলায় বলল, ওকে আর মারবেন না প্লিজ, আমি সবকিছুই বলব।
রেজা এক চুমুকে চা-টা শেষ করে উৎসুক চোখে তাকালেন। ডালিয়া ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, আমাকে লিখনের কথা আলাউদ্দিনই বলেছিল। আমি তখন একদিন লিখনের সঙ্গে দেখা করতে চাইলাম। সে তখন পলাশবাড়ির অনেক কথাই বলল আমাকে। আমি চাইছিলাম না আর এই ইয়াবা-টিয়াবা বা ছোট-খাটো ঝুঁকিপূর্ণ ঝামেলার মধ্যে থাকতে। আমি চাইছিলাম বড়োসড়ো কিছু একটা করে তারপর পুরোপুরি গা ঢাকা দিতে। সবকিছু শান্ত হয়ে গেলে দূরে কোথাও গিয়ে থিতু হতে চাইছিলাম। এই জীবন আর ভালো লাগছিল না আমার।
আলাউদ্দিন তোমার হাজবেন্ড?
ডালিয়া এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। সে বলল, তো ইয়াবার বিজনেসের জন্যই আলাউদ্দিন এখানে আসে। এর মধ্যেই আমি একদিন পত্রিকায় ব্যাংক ডাকাতির খবর পড়ি। বিষয়টা আমার খুব পছন্দ হয়ে গেল। আমি তখন আরো খোঁজখবর নেই। কীভাবে রাজশাহীতে, দিনাজপুরে মাটি খুঁড়ে ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে লোকগুলো প্রায় সফল হয়েও ধরা পড়ে গেল। আমি তখন থেকেই প্ল্যান করতে শুরু করলাম। তারপর ঘটনা জানালাম লিখনকে। এরপর এখানে যা যা করার দরকার তার সব ব্যবস্থা আসলে সে-ই করেছে। কনস্ট্রাকশনের জন্য আমাদের লোকজনকে লেবার হিসেবে এখানে আনা। কাজ পাইয়ে দেওয়া। আলাউদ্দিন আর মোবাশ্বেরকে দোকান দিয়ে দেয়া, সবই।
তাহলে? তাকে খুন করলে কেন তোমরা?
ডালিয়া আবারও চুপ করে রইল। রেজা বললেন, তুমি ভালো করেই জানো, এগুলো বের করা আমাদের জন্য এখন আর তেমন কোনো ব্যাপার না। হয়তো তুমি বা আলাউদ্দিন বলবে না। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে আরো যারা আছে, তাদের সবার মুখ আটকে রাখা কিন্তু সম্ভব না! ইনফ্যাক্ট দেলোয়ার কিন্তু অনেক কিছু বলেছেও।
ডালিয়া ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করল, লিখনের তখন নজর পড়ল আমার দিকে। আমার জীবনটা সে জাহান্নাম করে দিতে লাগল। একজন কনস্ট্রাকশন লেবারের মাধ্যমে প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে আমার থাকার ব্যবস্থাও করে দিল সে। তখনো প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে কনস্ট্রাকশন কাজ চলত। সে লেবারদের সঙ্গে নানা ছুঁতায় আসত। আর তখন আমাকেও যখন তখন তার সঙ্গে লেবারদের ঘরে যেতে হতো! সমস্যা শুরু হলো বাড়ির কাজ মোটামুটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর। তখন আর অযথা ও বাড়িতে কারো ঢোকার সুযোগ ছিল না, আমারও বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। এই সময়ে সে নানা হুমকিধামকি দিতো। আলাউদ্দিনের সঙ্গেও খুব বাজে ব্যবহার শুরু করল। কয়েকবার আলাউদ্দিনের গায়েও হাত তুললো সে। খুব বেপরোয়া আর খামখেয়ালি হয়ে উঠেছিল। আমাকে বলল এই বাড়ি থেকে বের হয়ে তার সঙ্গে গিয়ে থাকতে। তারপরও ব্যাংক লুটের পর টাকার ভাগ-বাটোয়ারা কেমন হবে, সেটা নিয়েও সে নানা ঝামেলা শুরু করেছিল। শেষের দিকে আর সহ্য করার মতো অবস্থা ছিল না। অথচ ততদিনে কাজও প্রায় শেষের দিকে।
ফলে খুন করা হলো তাকে? তা খুনটা কে করল আলাউদ্দিন?
ডালিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, নাহ।
তাহলে?
ডালিয়া জবাব দিল না। রেজা বললেন, তুমি?
ডালিয়া মাথা নিচু করে বসে রইল। রেজা বললেন, লিখনকে দেলোয়ারের সঙ্গে আলাউদ্দিন ওই বাড়িতে পাঠাল। কথা ছিল, তুমি লিখনের সঙ্গে জরুরি কথা বলবে, তাই না? বাড়ি ভাড়া নেয়ার কথা বলে তারা আসল। আর এই ফাঁকে লতিফুর রহমানকে নিচে ডেকে পাঠালে তুমি?
হুম। তার স্ত্রী চিৎকার চেঁচামেচি করছিল, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি ওপরে চলে গেলাম।
লিখন তোমাকে দেখে খুশি হয়ে গেল। আর তখুনি দেলোয়ার তাকে জাপটে ধরল, পেছন থেকে তুমি লিখনের গলায় তার পেঁচিয়ে ধরলে?
ডালিয়া মাথা নিচু করে রইল। রেজা আচমকা বললেন, লতিফুর রহমানের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী ডালিয়া?
ডালিয়া এবারও কোনো কথা বলল না। সে চুপচাপ তার পায়ের নখের দিকে তাকিয়ে রইল।
.
সপ্তাহখানেক বাদে লতিফুর রহমানকে ডাকলেন রেজা। দীর্ঘসময় লতিফুর রহমানের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর হঠাৎ ঠাণ্ডা গলায় বললেন, বহু বছর আগে আপনার ছেলে সৈকত আপনাকে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল। সেই থেকে আপনি ডান পায়ে ঠিক মতো হাঁটতে পারেন না। এই কথা সত্য?
লতিফুর রহমান মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
রেজা বললেন, আপনার ছেলে সৈকতের বিরুদ্ধে খুনের মামলাও হয়েছিল, রাইট?
শরিফুল বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল। লতিফুর রহমান কোনো কথা বললেন না। রেজা বললেন, সৈকত কি আসলেই খুন করেছিল?
লতিফুর রহমান কম্পিত কণ্ঠে বললেন, নাহ!
রেজা ধুলোয় মলিন পুরনো একটি ফাইল বের করলেন, এই ফাইলটি চাইলে আপনি পড়ে দেখতে পারেন। আজ থেকে প্রায় ষোলো বছর আগে তার নামে একটা খুনের মামলা হয়েছিল। কিন্তু আগেভাগেই দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিল সে। ফলে পরে আর কখনো দেশে ফিরতে পারেনি।
রেজা লতিফুর রহমানের মুখের কাছে মুখ নিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বললেন, আপনাকে ছাদ থেকে কেন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল সে?
লতিফুর রহমান চুপ করেই রইলেন। রেজা উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে ঝকঝকে নীল আকাশ। মৃদু হাওয়া বইছে। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে মৃদু ঢেউ। তিনি সেই জলরাশির দিকে তাকিয়ে বললেন, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে আমি সৈকতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি। এ কদিনে বেশ কয়েকবার তার সঙ্গে আমার ফোনে কথাও হয়েছে। রেজা জানালার কাছ থেকে সরে এসে লতিফুর রহমানের দিকে ফিরে তাকালেন, বুঝতেই পারছেন, কিছু না জেনে শুনে আপনাকে ডাকিনি আমি। আন্দাজে এতবড় ঢিল ছোঁড়ার মানুষও আমি নই।
লতিফুর রহমান মুখ তুলে তাকালেন। তার শরীর ঘামছে। সামান্য কাঁপছেও। তবে কিছু বললেন না তিনি। রেজা বললেন, আপনার বাসায় কাজের মেয়েরা থাকে না, এ কথা কি সত্যি?
লতিফুর রহমান যেন কথা বলার সুযোগ পেলেন হ্যাঁ, সত্যি।
কেন?
জানেনইতো, আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ। এক ধরনের সিজোফ্রেনিয়াতে ভুগছে। সে। যখন-তখন যার তার সঙ্গে যাচ্ছেতাই আচরণ করে। এ কারণে কেউই তাকে সহ্য করতে পারে না। কাজের মেয়েগুলোও না। ফলে আসার কিছুদিন পর আর কেউই থাকতে চায় না।
আচ্ছা। কিন্তু একটা ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট কিন্তু আছে।
লতিফুর রহমান উৎসুক চোখে তাকালেন। রেজা বললেন, কেউ থাকে না, অথচ ডালিয়া এতদিন আপনার বাসায় রইল! বিষয়টা কেমন না? আপনার স্ত্রীর এমন ভয়াবহ আচরণ, অত্যাচার, দুর্ব্যবহার সহ্য করেও?
প্রশ্নটা শুনে লতিফুর রহমান যেন খানিক সপ্রতিভ হলেন। তিনি বললেন, সেটাতো এখন পরিষ্কার হয়েই গেছে। তার একটা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল। ব্যাংক ডাকাতি। সেটা শেষ না করে সে যাবে কী করে!
রেজা মৃদু হাসলেন, উদ্দেশ্য থাকলেও আপনার বাড়িতেই থাকতে হবে, এমনতো কোনো কথা ছিল না। ছিল?
লতিফুর রহমান জবাব দিলেন না। রেজা বললেন, দিনের পর দিন আপনার স্ত্রীর অমন ভয়ানক দুর্ব্যবহার সহ্য করেও সে কেন আপনার বাড়িতেই থাকতে যাবে? চাইলেইতো সে এখানে অন্য কোনো বাড়িতেও থাকতে পারত। পারত না?
লতিফুর রহমান দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে বললেন, হুম, তা পারত।
তাহলে?
এই প্রশ্নের উত্তর লতিফুর রহমানের কাছে নেই। রেজা আচমকা কথাটা বললেন, ডালিয়ার প্রতি আপনার আচরণ কেমন ছিল?
আমার!
হুম, আপনার। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আপনি মেয়েটাকে উত্ত্যক্ত করেছেন। তারপরও মেয়েটা দাঁতে দাঁত চেপে এতটা দিন আপনার বাড়িতেই কেন পড়ে থাকল স্যার? অন্য কোথাও কেন চলে গেল না? এতকিছু ভেবেছেন আর এইটুকু ভাবেননি?
লতিফুর রহমান এবার সত্যি সত্যিই বিভ্রান্ত বোধ করছেন। রেজা বললেন, কারণ সব কাজ শেষে সে আপনাকে খুন করতে চেয়েছিল।
আমাকে! খুন! লতিফুর রহমান রীতিমতো আঁতকে উঠলেন। তার চোখজোড়া যেন কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে।
হুম। খুন। ঠিক চলে যাওয়ার আগে।
কেন?
কারণ আপনার ছেলে সৈকত আপনাকে খুন করার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছিল আলাউদ্দিন হাজি ওরফে হারাধন মুচিকে।
লতিফুর রহমানের মুখ হা হয়ে গেছে। রেজা বললেন, বহুদিন থেকেই এই সুযোগটা খুঁজছিল সৈকত। নানাভাবে নানা লোকের সঙ্গে খোঁজখবরও রাখছিল। কিন্তু জুতসই কাউকে পাচ্ছিল না। অবশেষে, একজনের মাধ্যমে আলাউদ্দিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হয় সৈকতের। কাজটা করতে রাজি হয় সে।
শরিফুল নিজেকে আর নিবৃত রাখতে পারল না। সে হঠাৎ বলে উঠল, নিজের বাপকে খুন করতে লোক ভাড়া করেছে সে? কী বলছেন স্যার! সৈকত নিজে আপনাকে এ কথা বলেছে?
সে একাই যে পুরোটা বলেছে তা না। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হয় শোনোনি? তাই হয়েছে। আলাউদ্দিন, ডালিয়া, সৈকত, এই তিনজনের সঙ্গে আলাদা আলাদা কথা বলতে গিয়েই এই ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। সৈকতের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া খুনের মামলাটা তখন আমি আবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। মামলাটা করেছিল লতিফুর রহমানের কলেজের দপ্তরি।
দপ্তরি! কেন?
কারণ তার মেয়েকেই খুন করেছিল সৈকত।
সৈকত সত্যিই খুন করেছিল?
হুম।
কেন?
কারণ মেয়েটিকে ভালোবাসত সে।
ভালোবাসতো বলে খুন করেছিল?
হুম।
কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার।
রেজা তার পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর একটি ফোন কল রেকর্ড লাউড স্পিকারে ছেড়ে দিলেন। সৈকতের সঙ্গে তার কথোপকথন শোনা যাচ্ছে। কথোপকথনের এক জায়গায় এসে রেজা সৈকতকে জিজ্ঞেস করেছেন, তার মানে আপনার নামে হওয়া মার্ডার কেসটা মিথ্যে না?
পুরোপুরি সত্যিও নয়।
মানে?
ওপারে কোনো শব্দ নেই। একটা বিদঘুঁটে একঘেয়ে নিস্তব্ধতা। সৈকত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, সে ঘটনাটি খুলে বলবে কী না! অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নিল বলার। বলল, ভেবেছিলাম আলাউদ্দিন হাজি কাজটা ঠিকঠাক শেষ করতে পারবে। এ জন্যই একবারের জন্য হলেও বাড়ি আসতে চেয়েছিলাম আমি। যদি কোনোভাবে মাকে একবার দেখতে পেতাম! যদি তাকে একবার এখানে নিয়ে আসা যেত! কিন্তু যেহেতু আলাউদ্দিন কাজটা করতে পারল না। সেহেতু আর কখনোই হয়তো দেশে ফেরা হবে না আমার। আর দেশে যেহেতু ফেরা হবে না, সেক্ষেত্রে বলতেও আর দ্বিধা নেই।
রেকর্ডে আবার নীরবতা। যেন নিজেকে সামলে নিচ্ছে সৈকত। খানিক সময় নিয়ে তারপর আবার বলল সে, আমার জন্মের সময়ই মায়ের কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। তার জরায়ুও ফেলে দিতে হয়। সঙ্গে আরো নানা সমস্যায় মায়ের এক ধরনের প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক স্ট্রেস শুরু হয়। প্রচণ্ডরকম নিস্পৃহ হয়ে যান তিনি। ধীরে ধীরে বাবার সঙ্গে তার স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্কটা আর রইল না। তখন থেকেই বিষয়টার শুরু। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, বাসায় কাজের মেয়ে এলে বেশিদিন থাকে না। এই নিয়ে বাবা আর মায়ের মধ্যে নানা সময় কথা কাটাকাটি, ঝগড়াঝাটিও দেখেছি। শেষের দিকে এসে মা কিছু বললেই বাবা। মারতেন।
সৈকত আবার থামল। তার গলা ভেজা। কেশে গলার শ্লেষ্ম পরিস্কার করল সে। তারপর বলল, কলেজ থেকেও বাবার নামে কিছু অভিযোগ আসে। যদিও তার কোনো প্রমাণ ছিল না। কিন্তু যত বড় হতে থাকি, চারপাশ থেকে একটা ফিসফিসানি টের পেতাম। বাবাকে নিয়ে আজেবাজে কথা। এমনকি আমার বন্ধুরাও বলত। অনেকে এড়িয়েও চলত। সেই থেকে বাবার ওপর নজর রাখতে শুরু করি। শিউলির ঘটনাটা ঘটে তখনই। দপ্তরী চাচার মেয়ে শিউলি। আমাদের বাড়িতে আসত। ওকে দেখলেই একটা কেমন অনুভূতি হতো আমার। কথা বলার সুযোগ খুঁজতাম। কিন্তু পেতাম না। সবসময় বাবার সঙ্গে লেগে থাকত সে। রোজ বিকেলের দিকে ছাদে শিউলিকে পড়াতেন বাবা। বাংলা ব্যাকরণ। একদিন সন্ধ্যাবেলা ছাদে গিয়েছি। আর তখনই দেখলাম দৃশ্যটা…।
সৈকতের গলা জড়িয়ে আসছে যেন। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ছাদে কার্নিশ ছিল না। একদম শেষ প্রান্তে বাবা একটা চেয়ারে বসে আছেন। আর শিউলি তার কোলে বসা। তারপরেরটুকু আর বলতে পারব না আমি। দৌড়ে গিয়ে এক ধাক্কায় চেয়ারটা ফেলে দিলাম। তিনতলার ছাদ। শিউলির মাথাটা থেঁতলে গিয়েছিল নিচে পড়ে। কিন্তু বাবার তেমন কিছু হয়নি। ওই পাটাই যা একটু জখম হয়েছিলো!।
রেজা রেকর্ডটা বন্ধ করে দিল। পুরো ঘরে পিনপতন নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলছে না। শরিফুল চোখ তুলে তাকাল। রেজা বললেন, মামলাটা হয় আরো বেশ কিছুদিন পরে। কিন্তু সেই সন্ধ্যায়ই বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় সৈকত। তার খোঁজ মেলে বহু বহু বছর পর। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আলাউদ্দিন হাজি ওরফে হারাধন মুচি যে পলাশবাড়িতে আসে এবং লিখনের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাও ঘটনাচক্রে নয়। সৈকতের কাছ থেকে টাকা পেয়েই সে পলাশবাড়িতে যাতায়াত শুরু করে। লতিফুর রহমান সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার জন্য। আর তখনই লিখনের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। কথাবার্তার একপর্যায়ে ঘটনা ডালিয়াকে খুলে বলে আলাউদ্দিন। আর তখনই ব্যাংক ডাকাতির আইডিয়াটা দেয় ডালিয়া। সেক্ষেত্রে : লতিফুর রহমানের বাড়িটাকেই তার আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয় সে। যাতে ব্যাংক ডাকাতির কাজটা শেষ হওয়ার পর পালিয়ে যাওয়ার আগে আগে সৈকতের কাজটাও শেষ করে যেতে পারে। লতিফুর রহমানের বাড়িতে থাকার কারণে বিষয়টা তখন খুব সহজ হয়ে যাবে তার জন্য।
রেজা থামলেন। তবে পুরো ঘরে কেউ আর কোনো কথা বলল না। রেজা তার পকেট থেকে কতগুলো ব্যবহৃত ওষুধের খালি প্যাকেট বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর লতিফুর রহমানকে বললেন, এই প্যাকেটগুলো চেনেন, স্যার?
লতিফুর চোখ তুলে তাকালেন। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। রেজা বললেন, বছরের পর বছর নিজের স্ত্রীকে এই উচ্চমাত্রার সিডেটিভগুলো দিয়ে অসুস্থ করে রেখেছেন আপনি। যাতে ওই অসুস্থ মানুষটির কোনো অভিযোগই কেউ বিশ্বাস না করে। তাই না স্যার?
লতিফুর রহমান কথা বললেন না। তার মাথাটা ঝুলে পড়েছে কোলের ওপর।
.
২০.
বাঁধ কাটার জন্য গোলাম মাওলার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলো না। ওপর মহল থেকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে মামলার বিষয়ে। তবে পুরো ঘটনায় তার ওপর প্রচণ্ডরকম ক্ষুব্ধ হয়েছে দলের নীতি নির্ধারকরা। তার রাজনৈতির উচ্চাভিলাষও বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। আপাতত আর কোনো সম্ভাবনা নেই তার। লিখন খুনের ঘটনায় ডালিয়া, আলাউদ্দিন হাজি ও মোবাশ্বেরসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। লতিফুর রহমানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অভিযোগ দায়ের করা না হলেও সবচেয়ে বড় শাস্তিটা তিনি পেয়েই গেলেন। এই পলাশবাড়িতে তার এতদিনকার স্বচ্ছ ভাবমূর্তিটা যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। তার নানা কুৎসিত ঘটনা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সেসবের কিছু যেমন সত্য, তেমনি মিথ্যেও কম নয়। পুরো ঘটনায় রীতিমতো ভেঙে পড়লেন লতিফুর রহমান। বাড়ি থেকেই আর বের হতে পারলেন না। উপরন্তু পুলিশের মামলার ভয়ও রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এই বয়সে এসে এত মানসিক চাপ আর নিতে পারলেন না তিনি। এক সকালে তাকে মৃত পাওয়া গেল বিছানায়। ঘটনা আত্মহত্যা নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু, তখনো নিশ্চিত হতে পারল না পুলিশ।
রেজা অবশ্য বিষয়টি নিয়ে আর চাপ নিতে চান না। এর মধ্যেই থানার ওসি সাহেব কাজে যোগ দিয়েছেন। ফলে কিছুটা হলেও যেন চাপমুক্ত বোধ করছেন তিনি। পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন প্রায় সকলেই দারুণ খুশি তার ওপর। এই মুহূর্তে মানসিক প্রশান্তির জন্য কিছুদিনের জন্য হলেও ছুটি দরকার তার। ছুটিটা পেয়েও গেলেন রেজা। এমন করে এর আগে আর কখনো বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির লাগেনি তার। ছুটি পাওয়ার পরদিনই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন তিনি। তবে তার আগে দেখা করতে গেলেন গোলাম মাওলার সঙ্গে। রেজাকে দেখে গোলাম মাওলা খানিকটা অবাকই হলেন। সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে তার আদর আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। রেজা অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই বললেন, এত ব্যস্ত হবেন না ভাই। আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না।
তা বললে কী আর হবে রেজা সাহেব? আজ না বেড়িয়ে যেতেই পারবেন না।
রেজা মৃদু হাসল, আজ একটু তাড়া আছে। একটা সামান্য দরকারে এসেছিলাম ভাই।
গোলাম মাওলা হাসি হাসি মুখে বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি। ওই মাসিক খামটার ব্যাপারত?
রেজা মাথা নাড়ালেন, জি।
চিন্তা করবেন না। ওটা রেডিই আছে। আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি।
রেজা তাকে নিরস্ত করলেন, উঁহু। আপনাকে আনতে হবে না। আপনি বসুন।.
না না, ভাই সাহেব। তা হবে না। আপনাকে নিতেই হবে। আচ্ছা, একটা কথা বলেনতো রেজা সাহেব। অতো অল্প কটা টাকা দিয়ে আপনার কী হয়? আপনি চাইলে কিন্তু আমি আরো…।
রেজা মাঝপথে থামিয়ে দিলেন গোলাম মাওলাকে। তারপর বললেন, আমি আজ নিতে আসিনি, দিতে এসেছি।
মানে! অবাক ভঙ্গিতে বললেন গোলাম মাওলা।
মানে আমি আর আপনার কাছ থেকে এই টাকাটা নিতে পারব না।
কী বলছেন? কেন?
কারণ ওই প্রতিবন্ধী শিশুগুলোর জন্য যে স্কুলটা আমার মা চালান, ওখানে মা তাদের কাছ থেকেই সাহায্য নিতে চান, যেই মানুষগুলো মানুষ হিসেবে অন্তত কিছুটা হলেও ভালো।
আমি কিন্তু খারাপ মানুষ না ভাই…
গোলাম মাওলাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে রেজা বললেন, স্রেফ নির্বাচনে নমিনেশন পাওয়ার জন্য আপনি যে কাজটা করেছিলেন, সেটা কত ভয়াবহ অপরাধ আপনি তা জানেন না? ওই বাঁধটার সঙ্গে কত হাজার হাজার মানুষের জীবন জীবিকা, বাঁচা-মরা জড়িয়ে আছে আপনি জানেন না?
গোলাম মাওলা এবার আর জবাব দিলেন না। রেজা তার পকেট থেকে তিনখানা খাম বের করে গোলাম মাওলার সামনে রাখলেন। গত তিন মাসে এই খাম তিনখানাই মাসিক ডোনেশন হিসেবে গোলাম মাওলা দিয়েছিলেন। গোলাম মাওলা আরো কিছু বলতে চাইছিলেন, কিন্তু সেই সুযোগটা আর দিলেন না রেজা। তিনি উঠে ধীর পদক্ষেপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
.
ছোট্ট এক মফস্বল শহর। শহরের এক প্রান্তে টিনের দোচালা ছোট্ট এক স্কুল ঘর। স্কুলের সামনে এক চিলতে মাঠ। মাঠে রংবেরঙের জামা পরে এলোমেলো ভঙ্গিতে ছুটে চলছে অনেকগুলো শিশু। দূরে একটা চেয়ারে বসে আছেন রেহানা আখতার। তার মুখ ঝলমল করছে আনন্দে। বাচ্চাগুলোর মাঝখানে পরির মতো সুন্দর একটা মেয়ে। মেয়েটার নাম অণু। বাচ্চাগুলোর সঙ্গে এই রোদে ছোটাছুটি করতে গিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ঘাম জমেছে। শাড়ির আঁচল আলুথালু হয়ে হাওয়ায় উড়ছে। রেজা দাঁড়িয়ে আছে গেটের বাইরে। এখনো তাকে কেউ দেখেনি। তার খুব ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে ওই মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু তিনি পারছেন না। এ জীবনে কখনো পারবেন বলেও তার মনে হয় না। কী এক অদ্ভুত লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আছে তার সারা শরীর। তিনি সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছেন। শিশুগুলোকে হঠাৎ তার রঙিন পাখাওয়ালা প্রজাপতি মনে হতে লাগল। আর অণু হলো সবচেয়ে বড় প্রজাপতিটা। রেজা গেটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। মুহূর্তেই সচকিত হয়ে গেল প্রতিটি চোখ। এতক্ষণের অকপট উজ্জ্বলতা আচমকা থমকে গেল। তারপর ঝলমল করে উঠল শিশুগুলো। জলোচ্ছ্বাসের জলের মতো তারা ছুটে আসতে থাকল রেজার দিকে। পেছন থেকে তাকিয়ে আছে অনু। অনুর চোখজুড়ে আনন্দ। তার পেছনে মা। মা হাসছেন। রেজার আচমকা মনে হলো, রোজকার ভানের পৃথিবীতে, ছদ্মবেশী অসংখ্য মানুষের ভিড়ে এমন একটা পৃথিবী খুব দরকার। এমন ভানহীন, অকপট, আনন্দময়।
(সমাপ্ত)
