Wednesday, September 30, 2026
Homeভৌতিক গল্পভুতটুত - তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

ভুতটুত – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

ভুতটুত – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

শঙ্খদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে বিশাল বাঁশবাগান। ঘোর দুপুরেও বাঁশপাতার আড়াল পেরিয়ে রোদ গলতে পারে না মাটিতে। গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরমে যখন ডা-ডা করতে থাকে ধরণী তখন বাঁশবনের ছায়ায় ঘুরে বেড়ালে কেমন নিথর ঠান্ডা। কেবল বর্ষার সময় যা প্যাঁচপেচে। বাঁশপাতা পচে কাদা কাদা হয়ে যায় নীচেটা। বছরের বাদ বাকি সময় বাঁশমনে ঘুরে বেড়োনোর যা মজা-

তাদের পাশের বাড়ির দুই মেয়ে উমনো ঝুমনো বলেছে, অ্যাই শঙ্খ, দুপুরে রোদ্দুরে অমন টো-টো করে বাঁশবনে ঘুরিস কেন রে! যখন ভূতে ধরবে, বুঝতে পারবি।

দুপুরে ভূতের ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারা যায় না। কিন্তু সন্ধে নেমে এসে চারপাশে ঘনিয়ে আসে মিশ-আঁধার। যখন চাঁদের আলো থাকে না, সে সময় পশ্চিম সীমানার ধারে শঙ্খ নজর করে দেখেছে, ঝুপসি ছায়া কেমন গাঢ় হয়ে বাঁশবনের ভিতর দুলছে, অন্ধকারে চিরিবিরি খেলছে লক্ষ বাঁশপাতা, আর হাওয়া উঠলে একটা মিঠেন সুর ভেসে আসতে থাকে। বাঁশপাতায় বাতাস ছুঁয়ে গেল অমনি শব্দ বাঁশির সুর হয়ে ঘুরে বেড়োয়। হঠাৎ পাখির ডানার শব্দ শোনা যায় কোনও গহন আড়ালে। কখনও মনে হয় একটা অশরীরী ছায়া নড়ে গেল এদিক থেকে ওদিকে। ঘাড়ের কাছে কেউ যেন নিশ্বাস ফেলেই সরে যায়।

কিন্তু চাঁদের আলোর ছায়ায় ভূতের ব্যাপারটা জমে ওঠে আরও। বাঁশপাতার আড়ালে জ্যোৎস্নার কাটাকুটি খেলা চলে সারা রাত। ভূতের নাকি দশ-বিশটা হাত, প্রতি হাতে হাজারটা আঙুল। কয়েক হাজার আঙুল জ্যোৎস্নার আলো চিরে নেমে আসে মগডাল থেকে মাটি অবধি। বাতাসে বাঁশপাতা যত নড়াচড়া করে, ততই আঙুলের চিরিবিরি খেলা চলে বাঁশঝাড়ের ভিতর।

জেলে পাড়ার টুনি বলে, বাঁশগাছের ডগায় বসে ভূতেরা তাদের পা ঝুলিয়ে রাখে নীচে। সে নাকি একদিন সন্ধের পর বাঁশবনে পাতালকোঁড় খুঁজতে গিয়ে এমন ঠোক্কর খেয়েছিল যে, ঝাড়া তিনদিন জ্ঞানহীন। মুখে খ্যাজা তুলে শুয়েছিল সারারাত। ভোর হতে তার বাড়ির লোক খুঁজতে খুঁজতে আবিষ্কার করে বাঁশবাগানে ঘুমিয়ে আছে বেঘোরে।

এহেন বাঁশঝাড়ের পাশে শঙ্খদের বাড়ি। সন্ধে হলে গা-শিরশির তো করবেই। সেও অনেকদিন বাঁশঝাড়ের কাছে গিয়ে এক বুক শিরশিরানি নিয়ে উঁকি দিয়ে দেখেছে, কোথাও ভূতদের লম্বমান পাগুলো ঝুলে থাকতে দেখা যায় কি না। অন্ধকারপক্ষ হলে তো গোটা বাঁশবনকেই মনে হয় একটা ঝুপসি ভূত। তার মধ্যে আলাদা করে ভূতের চোখ-মুখ-পা বেছে নেওয়া মুশকিল। কিন্তু শুক্লপক্ষে চাঁদের মায়াবী আলোয় অসংখ্য ভূতের আনাগোনা ভেবে নেয়া যায়। তেমন হাওয়া উঠলে তো মনে হয় লক্ষ ভূত তা-তা থই-থই তা-তা থই-থই করে দু-হাত তুলে নৃত্য করতে লেগেছে।

তখনো উমনো ঝুমনোর শাসনবাণী স্মরণ করে গায়ের ভিতর একটা ছমছমে ভাব। দুপুরে টইটই করে ঘুরতে গিয়ে মনে পড়ে, ঠিক দুপুরবেলা/ভূতে মারে ঢেলা।

গা-ছমছম করার কারণ একটাই। আজকাল তাদের ঈশ্বরীপুর গ্রামে মেয়ে-পুরুষদের যখন-তখন ভূতে পাচ্ছে। ভূত তাদের তল্লাটে বরাবরই ছিল, কিন্তু ইদানীং তেনাদের উপদ্রব আরও বেড়েছে। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ এসে কারও ঘাড়ে চেপে বসছে পট করে। আর তক্ষুণি শুরু ইয়ে যায় তুলকালাম। চিৎকার আর দাপাদাপি শোনা যায় ভূতের

গাঁয়ের জোয়ান ছেলে ছিরের ঘাড়ে পর-পর দু’দফায় ভূত চেপেছিল। একবার চাপলে দশ-পনেরোদিনের আগে নড়ে না। তাও কি আর এমনি নড়ে। ওঝা-ফোজা ডাকতে হয়, ঝাড়ফুঁক করতে হয়। সে অনেক ঝামিলির ব্যাপার। ভূত ছেড়ে গেলেও ছিরের হাবভাব এমন বদলে গেছে যে গাঁয়ের লোক এখন তাকে ছিরে পাগলা বলে ডাকে।

কিন্তু পুরুষমানুষকে তেমন নয়, ভূতেরা বেছে বেছে ধরছে গাঁয়ের মেয়ে-বউদেরই। কোথায় তাঁতিপাড়ায় কাদের বাড়ির বউ এলোচুলে হেঁটে গিয়েছিল নিমতলা দিয়ে, অমনি বাড়ি ফিরে সে তুলকালাম করে তুলল পাড়ায়। কোথায় কলুপাড়ায় ভরা বয়সের মেয়ে সন্ধের পর আঁচল দুলিয়ে হেঁটে গেছে বেলগাছের পাশ দিয়ে, অমনি বাড়ি ফিরে নাকিসুরে শুরু করে দিয়েছে সাতকাহন।

এসব শুনে শঙ্খ উমনোকে বলে, কক্ষণও চুল এলো করে ঘুরবিনে। শুনেছিস কাণ্ড!

উমনো শঙ্খর চেয়ে এক বছরের বড়ো, ঝুমনো শঙ্খর চেয়ে এক বছরের ছোটো। তবু দু’জনেই শঙ্খর উপর খবরদারি করতে ছাড়ে না। মেয়ে বলে যেন ওদের কর্তৃত্ব করার একটা জন্মগত দাবি। তাই শঙ্খও মাঝেমধ্যে তার নাক দেখায়, অ্যাই, তোরা মেয়েছেনে, অমন করে ছুটবিনে। ফ্রক উড়ছে। ফ্রক বেয়ে কখন ভূতে ধরে নেয় তার ঠিক কী।

সেবার ধরল চাটুজ্জেপাড়ার ভরা বয়সের মেয়ে রেখাকে। ধরল তো ধরল, কিছুতে ছাড়ে না। আর পেয়েছে তার ঠাকুর্দায়। ছিল নাকি নদীর ধারে শান-বাঁধানো ঘাটের ঠিক পাশটায়, চাঁপাগাছের ডালে। রেখা গেছে স্নান করতে, একদম একা। স্নানের পর চাঁপাগাছের নীচে দাঁড়িয়ে ভিজে কাপড় বদলে শুকনো কাপড় গায়ে দিয়েছে, অমনি। শুকনো কাপড়টা নাকি টাঙিয়ে রেখেছিল চাঁপাগাছের ডালেই, তার সঙ্গে বেয়ে উঠেছে রেখার গায়ে।

বাড়ি ফেরা ইস্তক ভীষণ মুখ-চোখ করে সে তার শাসনের তর্জনি ঘোরাচ্ছে গোটা চাটুজ্জেপাড়ার ওপর। কাউকে বলছে, এই ধনু, তুই আজকাল বড়ো রাত করে বাড়ি ফিরছিস। হাতির পাঁচ পা দেখেছিস মনে হয়। আমি বেঁচে নেই বলে যা খুশি তাই করে বেড়োাচ্ছিস। হুঁ!

ধনু হল রেখার সেজককা। রোজ নাকি রাত করে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে। ফিরে এসে বউকে ধরে মারে। চাটুজ্জেপাড়ার অনেকেই তার বউ-এর কান্না শুনতে পায়। এখন রেখার তড়পানি শুনে পাড়ায় বেশ হইচই পড়ে গেছে। রেখা অবশ্য তখন পড়েছে তার ছোটোকাকা কেষ্টকে নিয়ে। কেষ্ট, কাজকৰ্ম্ম না করে ধাড়ি ছেলে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছিস ঢন ঢন করে। বসে-বসে খেতে লজ্জা করে না। আমি বেঁচে থাকলে দিতাম চাবকে সোজা করে।

এমনকী একদিন রেখা বলে বসল, কুটু! অ্যাই কুটু, তুই নাকি বেপাড়ায় যাওয়া-আসা করছিস। বাড়িতে সতীলক্ষ্মী বউ, আর-

ছি, ছি, রেখার মা রেখার মুখ চাপা দিতে চাইছে জোর করে, কিন্তু রেখার গায়ে তখন দশ মানুষের জোর, তাকে রোখে কার সাধ্যি! ওদিকে পাড়ার সবাই মুখ টেপাটেপি করে হাসছে। কুটু তো রেখারই বাবা। কুটুবাবুর চলন-বলন পাড়ার সবাই একটু-আধটু জানত। কিন্তু সে হল গিয়ে আড়ালে-আবডালে। রেখা এখন ঘরের হাঁড়ি ভেঙে দিতে চারদিকে চাপা আলোচনা, গুজ-ফুসফুস। পাড়ার সবাই বেশ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে। রেখা এখন কার হাঁড়ি কীভাবে ভাঙে তাই নিয়ে সবাই ভয়ে কাঠ। রেখার তো মুখের রাখঢাক নেই। সে সমানে তড়পে চলেছে এর ওপর ওর ওপর। বলছে, ভেবেছিস আমি কিছুই জানিনে শুনিনে। সব খবরই আমি রাখি ওই চাঁপাগাছের ডালে বসে।

রেখার বাবা কুটুবাবু তখন গম্ভীর হয়ে সেঁধিয়ে গেছেন ঘরের ভিতর। রেখার মা অন্য ঘরে দরজা বন্ধ করে কাঁদছেন। ওঝা এসেছে সেই দূর লক্ষ্মীনারায়ণপুর থেকে। কী ভীষণ দেখতে ওঝাকে। একমাথা ঝাঁকড়া চুল, কপালে লাল সিঁদুরের ফোঁটা, হাতে একটা লোমের ঝাড়ন। গলায় রুদ্রাক্ষের একগোছা মালা। চোখের তারা গিয়ে ঠেকেছে কপালে। বিড়বিড় করে কী যেন বকছে, আর ঝাড়ন বোলাচ্ছে রেখার গায়ে-পিঠে। কখনও হাতের তেলোয় সরষে নিয়ে তাতে চাপড় মারছে শব্দ করে, আর হাঁকছে, আয় শালা-

রেখার দাপটও কম নয়। অমন নিরীহ শান্তশিষ্ট মেয়েটা চুল এলো করে চোখ রক্তবর্ণ করে শাসাচ্ছে, দ্যাখ, একদম কাছে আসবিনে। অমন ওঝা ঢের ঢের দেখেছি। ভালো হবে না বলছি। বলছে বটে, কিন্তু হাতের তেলোয় যখন সরষে নিয়ে মন্ত্র পড়ছে ওঝা, অমনি ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছে রেখা।

উমনো বলে, রেখা কোথায় রে, ও তো ঠাকুর্দার ভূত। বুড়োটা কী অলপ্পেয়ে দ্যাখ্। ঘাপটি মেরে বসেছিল চাঁপা গাছের ডালে।

পাড়ার সবাই ভেঙে পড়েছে ধনু চাটুজ্জের বাড়ির সামনে। হাঁ করে দেখছে রেখার কাশুভাণ্ড। মাঝে মধ্যে লাফানি-ঝাঁপানিতে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে রেখার শাড়ি, তার মা আবার ঠিকঠাক করে দিচ্ছেন, আর চোখের জল মুছছেন আঁচলে। ক’দিনেই রেখার চেহারাও হয়ে গেছে অদ্ভুত ধরনের, ভয়-পাওয়ার মতোই।

ওঝা যখন কোনওকিছুতে তাকে বাগ মানাতে পারছে না, তখন শুরু করল মার। ছিপছিপে একটা বেতের লাঠি নিয়ে রেখার পিঠে মারতে শুরু করল দুমদাম। সে বড়ো করুণ দৃশ্য। কিন্তু ভূতটারও ভারি জেদ, সে রেখাকে ছেড়ে নড়বে না। বেতের মার খাচ্ছে, আর চেঁচাচ্ছে, না কিছুতেই যাব না আমি। বাড়ির লোকগুলো সাপের পাঁচ পা দেখেছে, এর একটা বিহিত না করে যাচ্ছি নে।

পাড়ার লোক যখন ভূত-খেদানো দেখার জন্য ভিড় করে রয়েছে সেখানে, তখন শঙ্খই কেবল যায়নি। সে রোজ ভূতের রকমারকম গল্প শুনছে উমনো ঝুমনোর মুখে। তাদের রোজ একবার না একবার যাওয়া চাইই রেখাদির বাড়ি। রেখাদি ওদের দু’জনকে কত ভালোবাসত। গরমকালের দুপুরে আম-জারানো, তেঁতুল-আচার, কবেল খাওয়ার সঙ্গী ছিল তারা ক’জন। আর কী সুন্দর দেখতে ছিল রেখাদিকে। তার কোঁকড়া একমাথা চুল, সে চুল এখন জট পড়ে একেবারে জটাঝুড়ি হয়ে গেছে। পরশু নাকি রেখাদির চোখ হঠাৎ ঝুমনোর উপর পড়তে এমন কটমট করে তাকিয়েছে যে, উমনো ঝুমনো ভয়ে পালিয়ে এসেছে সেখান থেকে

সেই ভয়ে শঙ্খ কিছুতেই যেতে চাইছে না রেখাদির বাড়ি। সে কতবার চাটুজ্জেপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মিশে নদীর ওই শান-বাঁধানো ঘাটে গিয়ে বসে থেকেছে, চাঁপগাছের ডালে উঠে টুকি-টুকি খেলেছে, দোল খেয়েছে চাঁপাগাছের নিচু ডালটায় ঝুলে। ঠিক যে-ডালটায় বসে থাকত ওই ঠাকুর্দা-ভূতটা। ভাবলেও বুকের ভিতরটা হিম হয়ে আসে শঙ্খর। ভয়ে কাউকে বলতেও পারছে না কথাটা, এমনকি উমনো ঝুমনোকেও।

তার বদলে শঙ্খ গিয়ে বসে থাকে চাটুজ্জেপাড়ার রাঙা বউদির বাড়িতে। চাটুজ্জেপাড়ায় সব ঘরের মধ্যে শঙ্খর যত ভাব সব ওই রাঙা-বউদির সঙ্গেই। ওদের মেজোতরফের ছোটো ছেলে যতীনদা হল রাঙা-বউদির বর। যতীনদা বেশ ভালো মানুষ, কিন্তু যতীনদার মা খুব দুর্দান্ত আর ঝগডুটে। যা অত্যাচার করে রাঙা-বউদির ওপর! সে-কথা এক শঙ্খকেই বলে রাঙা-বউদি। আর বলবে না-ই বা কেন। রাঙা বউদির তো আর নিজের বলতে কেউ নেই। তার বাপ-মা তো ছোটোবেলা থেকেই নেই। মানুষ হয়েছে মামার বাড়িতে। তারপর একটু বড়ো হতে মামারা কোনরকমে তার বিয়ে দিয়ে পার পেয়ে গেছে। কেউ আর এ-মুখো হয় না। তখন কত আর বয়স ছিল রাঙা-বউদির, চোদ্দো-পনেরো হবে। তারপর ন’দশ বছর হয়ে গেছে, কোনও ছেলেপুলেও হয়নি তার। মাঝে মধ্যে শঙ্খকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রাঙা বউদি বলে, ইস্ যদি আমার একটা ছেলে হত, তাহলে তোরই মতো বড়ো হত এতদিনে বুঝলি।

শঙ্খর তখন ভারী লজ্জা করে, ছটফট করে রাঙা-বউদির বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। কী একটা চমৎকার গন্ধ রাঙা বউদির শরীরে। নিশ্চয় কোন পারফিউম মাখে। আর কী নরম তার শরীরটা। কিন্তু শঙ্খ এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে, হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে তাও কয়েক মাস হয়ে গেল। এখন হঠাৎ যদি রাঙা বউদি এমনভাবে কাছে টেনে নেয়—

তবু কী ভেবে শঙ্খ বেরিয়ে আসতে পারে না রাঙা-বউদির কাছ থেকে। বড়ো দুঃখী সে। একেই তো বাপ-মা মরা, তার উপর শাশুড়ি-ঠাকরুণ রাতদিন গঞ্জনা দেয়। হাভাগির বেটি, অলক্ষুণে বউ, বাজা বউ, এসব বলে উঠতে বসতে গাল দেয়। রাঙা বউদি এ-সব শোনে, আর হাপুস নয়নে কাঁদে। মাঝে মাঝে বলে, অন্য বউরা তবু দু’দণ্ড বাপের বাড়ি গিয়ে কষ্ট ভুলে আসতে পারে। আমার তো তাও নেই রে-

শঙ্খ বুঝতে পারে না এইসব সময়ে কীভাবে সান্ত্বনা দেবে রাঙা-বউদিকে। হয়তো একা ঘরে বসে কাঁদছে, কেঁদে কেঁদে ফুলিয়ে ফেলেছে চোখ, ভিজে চুবচুব করছে আঁচলের কোণ, ঠিক এমন মুহূর্তে তাদের বাড়ি গিয়ে পড়েছে শঙ্খ। তাকে দেখে কখনও লজ্জা পায় না রাঙা-বউদি। বরং লাল জবাফুলের মতো চোখে হঠাৎ হাসি ঝিলিক দিয়ে ওঠে তার। আর-

শঙ্খ জানে এ সব সময় কথার স্রোত ঘুরিয়ে দিতে হয় অন্যদিকে, যাতে রাঙা বউদির কষ্ট একটু লাঘব হয়। বলে, বুঝলে বউদি, কাল না ইস্কুলে একটা কাণ্ড হয়েছে—

—কী কাণ্ড রে শঙ্খ? রাঙা, বউদির ফুলো চোখে অমনি জেগে ওঠে কৌতূহল।

— আমাদের অঙ্ক কষতে দিয়ে ক্লাসের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছেন অমূল্য স্যার।

— সে কি রে, ক্লাসের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল মাস্টারমশাই?

—হ্যাঁ, শোনোই না। অমূল্য স্যার ঘুমোলে নাকের মধ্যে একটা ফর ফর শব্দ হয়। মনে হয় ডাকঘুড়ি উড়ছে আকাশে। আর তারপর—

—তারপর কী?

—তারপর জানলা দিয়ে হঠাৎ উড়ে এল একটা প্রজাপতি, আর বসল কি না গিয়ে অমূল্য স্যারের পাঞ্জাবির ওপর। ঠিক যে জায়গায় ওঁর মস্ত ভুঁড়িটা জেগে থাকে পাঞ্জাবি ফুঁড়ে। আর লক্ষ্মণটা অমনি হেসে ফেলল খিকখিক করে। তার হাসি শুনে অমূল্য স্যার ধড়মড় করে জেগে বললেন, কে হাসল? স্ট্যান্ড আপ অন দ্য বেঞ্চ। স্ট্যান্ড আপ অন দ্য বেঞ্চ। লক্ষ্মণ তো মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে বই-এর দিকে। অমূল্য স্যার আবার বললেন, মনিটর, মনিটর, তুমি বলবে, কে হেসেছে। মনিটর বিদ্যুৎ বলল, কেউ হাসেনি স্যার। লক্ষ্মণ জিজ্ঞাসা করেছে, এই বিদ্যুৎ, ‘গায়ে প্রজাপতি বসলে বিয়ে হয় না কি?’ শুনে অমূল্য স্যার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, রাস্কেল, দাঁড়া, বেঞ্চের উপর দাঁড়া। আর অমনি প্রজাপতিটা পাঞ্জাবির ওপর থেকে উড়ে বসল অমূল্য স্যারের ঠিক মাথায়, টাকের মধ্যিখানে। আর ক্লাসসুদ্ধ ছেলের কী হাসি-

শুনতে শুনতে হেসে গড়িয়ে পড়ে রাঙা বউদিও। একটুক্ষণের মধ্যে কোথায় গেল রাঙাবউদির লাল হয়ে যাওয়া চোখ, কোথায় গেল তার কান্না কান্না চাউনি। শঙ্খ তো এইটেই চাইছিল। রাঙাবউদিকে কাঁদতে দেখলে তার যে ভীষণ কষ্ট হয়। রেখাদিকে ভূতে পাওয়ার পর থেকে তাদের আলোচনার খেই বদলে এখন এসে ঠেকেছে ভূত পৈনিত খপ্পরে। শঙ্খ বলে, ইস, ভূতটা আর লোক পেল না বউদি, শেষে রেখাদির ঘাড়ে! তার চেয়ে তোমার শাশুড়ির ঘাড়েই চাপতে পারত।

রাঙাবউদি হেসে বলে, সে-ভাগ্য কি আর আমার হবে। অমন দজ্জাল মেয়েছেলে দেখলে ভূত অমনি পালিয়ে বাঁচবে।

শঙ্খ হাসতে থাকে, তাহলে এক কাজ করো বউদি, ওঝা যখন ভূত তাড়াতে পারছে না, তখন তোমার শাশুড়িকে পাঠিয়ে দাও না কেন?

এক-একদিন শঙ্খ বলে, রেখাদিকে তুমি রোজ দেখতে যাও, বউদি?

—হুঁ, যাই-ই তো—

—তোমার ভয় করে না?

রাঙাবউদি মুখ ম্লান করে হাসে, আমার আবার ভয়। শাশুড়ি বলেছে এবার উনুন থেকে জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ তুলে এনে মারবে।

শঙ্খর চোখে তরাস ঘনিয়ে আসে। যতীনদার মাকে সেও রীতিমত ভয় খায়। হঠাৎ শঙ্খকে তাদের বাড়িতে আসতে দেখলে বলেন, ওই যে আসছেন সোহাগী। এখন বউদির গলায় গলা জড়িয়ে গল্প হবে।

তার খুব খারাপ লাগে কথাগুলো শুনতে। প্রায়ই ভাবে আর আসবে না এদের বাড়িতে। দু-চারদিন আসেও না। তারপর ক’দিন পরে সে নিজেই হাঁপিয়ে ওঠে। রাঙাবউদিকে না দেখতে পেলে তার নিজেরই মন খারাপ লাগে। সে আবার চুপিচুপি ওদের খিড়কি দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ে রাঙাবউদির ঘরে। রাঙাবউদিও ক’দিন তাকে না দেখে অস্থির হয়ে পড়েছিল, বলে, কী রে ছেলে, তুই কি আমাকে ভুলে গিয়েছিলি?

শঙ্খ মুখ নিচু করে থাকে। রাঙাবউদিকে কি সে ভুলতে পারে! রাঙাবউদির মুখখানা যে কী সুন্দর, একটু তাকিয়ে থাকলেই মন ভালো হয়ে যায়।

কখনও স্পষ্ট জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, যতীনদা কিছু বলে না তার মাকে?

রাঙাবউদি অমনি গম্ভীর হয়ে যায়, কী করে বলবে? যা মাইনে পায় তাতে সংসার চলে? যদি ওদের জমি-জিরেতের ধান না আসে? জমিজমা তো সব ওর মায়ের নামে। বাবা মারা যাবার সময় সব তো মাকেই দিয়ে গেছে।

শঙ্খ আবার চুপ করে যায়। সংসারের এতসব জটিল অঙ্কের উত্তর মেলানো তার সাধ্য নয়। রাঙাবউদি তার নিজের কেউ হয় না, কী করে যেন এ-বাড়ির সঙ্গে তার একটা যোগসূত্র তৈরি হয়ে গেছে। রাঙাবউদি কষ্ট পেলে তার নিজের কেন যেন কষ্ট হয়। উমনো ঝুমনো তাকে প্রায় খেপায়, কী রে শঙ্খ, তুই এত রাঙাবউদির কাছে গিয়ে পড়ে থাকিস কেন? তোকে কি রাঙাবউদি পোষ্যপুত্তর করে নেবে নাকি?

শঙ্খ ঠোট ওলটায়, কেন পোষ্যপুত্তুর না-হলে কারুর বাড়ি যেতে নেই নাকি?

একদিন রাঙাবউদি বলল, রেখার ঘাড় থেকে ভূত নেমেছে, শঙ্খ, কিন্তু এবার বোধহয় আমাকে ধরবে।

শঙ্খ আঁতকে উঠে বলল, ওমা, কেন?

তিনদিন অবিশ্রাম মার খাওয়ার পর রেখার কাছ থেকে তার ঠাকুর্দার ভূত বিদায় নিয়েছে উমনো এসে কালই সে খবর দিয়েছে তাকে। বলেছে, জানিস, শেষ পর্যন্ত ভূতটা ওঝার জুতো মুখে করে নিয়ে তবে এলাকা ছেড়েছে। জুতো দাঁতে তুলে এক দুই তিন — ঠিক সাত পা হেঁটে দড়াম করে পড়ে গেল মাটিতে। ব্যস, পড়েই রেখাদি অজ্ঞান। তারপর কত জলধারানি করে তবে তার জ্ঞান ফেরে। জেগে উঠে কী আশ্চর্যি, রেখাদি একদম অন্য মানুষ। যেন কী হয়েছে জানেই না। চারদিকে চেয়ে বলে, এ কী, এত লোক কেন? কী হয়েছে আমার। আমার কি অসুখ করেছিল?

শুনতে শুনতে শঙ্খর চোখ বড়ো হয়ে যায়। কী করে যে চাঁপাগাছের ডালে সবার চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে লুকিয়ে থাকে ভূতটা তা জানতে ভারি ইচ্ছা যায় তার। আর যেখানেই যাক শঙ্খ, শান-বাঁধানো ঘাটে সে আর ভুলেও যাবে না।

দিনদুয়েক আর চাটুজ্জেপাড়ায় যায়নি সে। হঠাৎ তার মধ্যেই ঘটে গেল সেই সাংঘাতিক কাণ্ডটা। ইস্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল সে। চাটুজ্জেপাড়ার পাশ দিয়ে যাবার সময় শুনতে পেল শোরগোল, কে যেন বলল, আবার ভূতে পেয়েছে।

শঙ্খ বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, কাকে আবার ভূতে ধরল। রেখাদিকে নাকি?

কিন্তু গোলমালের শব্দটা আসছে সেদিক থেকে নয়। বুকে একরাশ শঙ্কা আর কাপ নিয়ে শঙ্খ ছুটল চাটুজ্জেপাড়ার ভিতরে। আর যা আশঙ্কা করেছিল, তাইই ঘটেছ। ভুতে ধরেছে। রাঙাবউদিকে। সেদিন যা হাসতে হাসতে বলেছিল, তাই ফলে গেছে শেষপর্যন্ত। সাধে কি আর বলে, ভূত নিয়ে হাসাহাসি করতে নেই। ওরা তত্ত্বে-তক্কে থাকে। সুযোগ পেলেই ছোঁ মেরে ঘাড়ে চাপবে। আশঙ্কা সত্যি হতেই ছটফট করতে থাকে শঙ্খ, কী করে ভূতে পেল রাঙাবউদিকে? কে পেল? হঠাৎ এত লোক থাকতে রাঙাবউদিকেই বা কেন? রাঙাবউদির অমন সুন্দর চেহারা তো তাহলে ভূতে আঁচড়ে-কামড়ে একাকার করে দেবে? ইস, কী হবে?

মেজোতরফের বাড়ির সামনে তখন অনেক মেয়ে-বউ জুটেছে। তাদের আড়াল পেরিয়ে এখন বাড়ির ভিতরে যাবার কোনও প্রশ্নই নেই। রাঙাবউদিকে না কি দরজা বন্ধ করে রাখতে হয়ছে। ভীষণ চেঁচাচ্ছে, আর ছটফট করছে। যতীনদা গিয়েছিল সামলাতে, তাকেই নাকি সপাটে একটা চড় মেরে দিয়েছে। এখনও লাল হয়ে আছে যতীনদার গাল। ভূত বলেছে, তুই একটা বংশের কুলাঙ্গার—

ভূত না কি আর কেউ নয়, যতীনদার বাবাই। এই তো দু’বছর হল মারা গিয়েছে যতীনদার বাবা। এ দু’বছর নাকি তাদের বাড়ির সামনের আমগাছে লুকিয়ে ছিল ভূতটা। দু’বছর ধরেই তক্কে তক্কে ছিল, কারও ঘাড়ে চেপে বসবে সে। এতদিন পরে—। কাল নাকি সন্ধের পর চুল এলো করে রাঙাবউদি গিয়েছিল আমগাছের তলায়, সেই অবসরে-

রাঙাবউদি নাকি চেঁচাতে চেঁচাতে বলেছে, ইচ্ছে ছিল বুড়ির ঘাড়ে চাপব, বুড়ি খুব জ্বালিয়েছে আমি বেঁচে থাকতে।

শঙ্খ মনে মনে আশপাশে করল, ইস, কেন তাই চাপল না ভূতটা! তা হলে তো খুব জব্দ হত বুড়ি। তার ঘাড়ে না চেপে শেষমেশ কি না চাপল অমন সুন্দর বউটার ঘাড়ে।

যতীনদা একপশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, আর ক্রমশ ভিড় বাড়ছে দেখে যতীনদার সেই দজ্জাল মা হঠাৎ এসে হামলে পড়ল তাদের উপর, এই যে ভালোমানুষের ছেলেমেয়েরা, তোমরা এখেনে কী দেখতে এসেছ। এখেনে কি ঠাকুর উঠেছে না কি? যাও, সব—

ভয়ে সবাই কেটে পড়ল সেখান থেকে।

শঙ্খর একেবারেই ইচ্ছে ছিল না চলে আসার, কিন্তু বুড়ির যা সর্বনেশে মূর্তি, তাতে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনও মানেই হয় না। ভূতে পেলেও মানুষের মুখ বোধহয় খারাপ দেখায় না অত। কিন্তু রাঙাবউদির সুন্দর মুখখানা কি এখন অমনই খারাপ আর বিশ্রী দেখাচ্ছে!

মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে এল শঙ্খ। রাঙাবউদিকে একবার দেখার ইচ্ছে থাকলেও তা আর হয়ে উঠল না।

মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে এল শঙ্খ। রাঙাবউদিকে একবার দেখার ইচ্ছে থাকলেও তা আর হয়ে উঠল না। রাঙাবউদি তো আর এখন রাঙাবউদি নেই। ভূত হয়ে গেছে। ওর শ্বশুরের ভূত। মাগো। কি বিশ্রী!

বাড়ি এসে ভাবতে বসল শঙ্খ, ভূতগুলোর যে সত্যিই কোনও বুদ্ধিসুদ্ধি নেই তা উপলব্ধি হল তার। নইলে অমন জাঁহাবাজ শাশুড়িকে ছেড়ে কেউ সুন্দর বউকে চেপে ধরে! তবে একটা কথা ভেবে আশ্বস্ত হতে চেষ্টা করে, ওই ঝগড়ুটে বুড়ি যখন সামনে আছে, তখন ভূত খুব বেশিক্ষণ তিষ্টোতে পারবে না ও-বাড়িতে।

দিনদুয়েক আর ওমুখো পা বাড়াল না শঙ্খ। উমনো ঝুমনোর কাছে শুনল, সেই ওঝাটা আবার এসেছে। সরষে-বাড় ছাড়ছে ভূতের চোখমুখ লক্ষ করে। তাতে রাঙাবউদি আরও হিংস্র হয়ে উঠেছে, বলছে, ওঝা, তোর একদিন কি আমার একদিন। আজ তুই বাড়ি ফেরার আগেই তোর ঘাড় মটকে দেব আমি।

শঙ্খ স্থির হয়ে কথাগুলো শোনে, তার বুকে হাতুড়ির শব্দ হয়, মোচড় দিয়ে ওঠে শরীরের ভিতরটা। কত কষ্টই না পাচ্ছে রাঙাবউদি। শঙ্কর যেতে ইচ্ছে করলেও যেতে পারছে না সে। কিন্তু দুদিন পরে আর চুপ করে বসে থাকতে পারল না। শুনল ওঝার সমস্ত কারিকুরি ব্যর্থ হয়ে যাওয়াতে সে এখন বেদম মারছে ভূতটাকে। তাতে রাঙাবউদির পিঠ ফেটে নাকি রক্ত পড়ছে।

ছুটে গিয়ে দেখল যথারীতি লোকে লোকারণ্য। এ সব সময় যা হয়, অধিকাংশ লোকই বেশ মজা উপভোগ করছে। ওঝাটা সেই আগের মতোই ভীষণ একটা মুখ করে শাসাচ্ছে রাঙাবউদিকে। দাওয়ার এক কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাঙাবউদি, গায়ের কাপড় এলোমেলো, চুল এলো করে রাখা, ছড়িয়ে রয়েছে বুকে, পিঠে, মুখের ওপর। কপালের সিঁদুর থেবড়ে গিয়ে কি বিশ্রী দেখাচ্ছে। আর রাগ ফেটে বেরুচ্ছে দুচোখ দিয়ে। বলছে, ভালো হবে না বলছি, খবরদার, ওই বুড়িটাকে না নিয়ে এবার আর এ বাড়ি থেকে নড়ছি না।

যতীনদা সেই একইভাবে দাওয়ার এক কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভয়-ভয় চোখে। সবচেয়ে দেখবার মতো হল যতীনদার মা’র মুখখানা। সেই জাঁহাবাজ বুড়ি এই দু-তিনদিনে কেমন সিঁটিয়ে গিয়েছে। ভূতটার সবচেয়ে রাগ তারই ওপর কি না। ওঝা বেতটা উঁচিয়ে ধরতেই ভূত আবার তার তর্জনি তুলে বলল, বুড়ি আমাকে অনেক জ্বালিয়েছে, বেঁচে থাকতে এক মুহূর্ত স্বস্তি দেয়নি, এবার তার শোধ না তুলে ছাড়ছি নে। আজ রাতের মধ্যেই ঘাড় মটকে দেব ওর। একটা রাত সবুর কর।

শুনতে শুনতে বেশ উল্লাস হল শঙ্খর মনে। বাহ্ ভূতটা তো জবর চেপে ধরেছে রাঙাবউদির শাশুড়িকে। হে ভগবান, ভূতটা যেন আজ রাতের মধ্যেই ঘাড় মটকে দিয়ে চলে যায়।

ভূত তখনও তড়পাচ্ছে, বুড়ির সব কীর্তি আমি এবার ফাঁস করে দেব। এতদিন কাউকে কিছু বলিনি, বেঁচে থাকতে সব চেপে-চেপে ছিলাম। সারা জীবন কম কিছু করেছে ও, এই বুড়ি বয়সেও পর্যন্ত ঘরের বউটাকে একটু শাস্তি দেয় না।

বলতে বলতে রাঙাবউদির মুখখানা ভীষণ হয়ে উঠল আরও, যেন এখনই বুড়ির ঘাড় মটকে দেবে লাফিয়ে পড়ে। এ রাঙাবউদিকে যেন চিনতেই পারছে না শঙ্খ। চিনবে কী করে। ভূত যে—

দাওয়ার ওপরেও দু-তিনজন উঠে পড়েছে। শঙ্খর খুব ইচ্ছে হল দাওয়ার ওপর উঠে রাঙাবউদিকে খুব কাছ থেকে দেখে। সে পা টিপে টিপে চলে গেল এমন জায়গায় যেখান থেকে রাঙাবউদির মুখোমুখি হওয়া যায়।

ভিড়ের মধ্যে তখন গুঞ্জন চলছে। সবাই বলাবলি করছে, কী ভয়ানক বুড়ি রে বাবা! এবার নিজের স্বামীই এসেছে বুড়ির কেলেঙ্কারি ফাঁস করতে।

ঠিক এ সময় হঠাৎ রাঙাবউদির নজর পড়ল শঙ্খর দিকেই। শঙ্খও হাঁ করে দেখছে বীভৎস চেহারার ভূতে-পাওয়া রাঙাবউদিকে। আর এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, রাঙাবউদির চোখের ভয়ঙ্কর ভাবটা কমে এল লহমার জন্য, প্রায় সেই আগের মতো সুন্দর আর নরম, বিস্মিত হয়ে সে যেন দেখল একটুকরো চিলতে হাসি ঝিলিক দিয়ে গেল তাঁর ঠোঁটের গোড়ায়। যেন ভূত নয়, সেই রাঙাবউদিই। পরমুহূর্তে আবার মুখখানা ভয়ঙ্কর করে চেঁচিয়ে উঠল, ছাড়ব না ওকে। কিছুতেই ছাড়ব না। একটা দিন সময় দে ওঝা, ওর ঘাড়টা আগে মটকে দি। প্রচণ্ড জ্বালাতে পারে সবাইকে-

শঙ্খর বুকটা এতক্ষণ ভারী হয়ে ছিল, হঠাৎ মনে হল হালকা ফুরফুরে হয়ে গিয়েছে। যেমন ভেবেছিল, ভূতগুলো তাহলে তেমন খারাপ নয়। রেখাদির ঘাড়ে চেপেছিল যে-ভূত, সে ভালো করে কড়কে দিয়ে গেছে তার পাজি, বখাটে ছেলেগুলোকে। যে ভূতটা রাঙাবউদির শরীরে ভর করেছে, সে দিব্যি ঢিট করে দিচ্ছে তার দজ্জাল বুড়িটাকে। এরকম ভূতটুত কিছু থাকা দরকার। গৃহপালিত প্রাণীর মতো ভূত পোষাও খুব প্রয়োজনীয়।

একটা তীব্র উল্লাস সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল শঙ্খর। এতক্ষণে একটা স্বস্তির শ্বাস বুক ভরে নিতে পারল ও।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments