Wednesday, July 29, 2026
Homeভৌতিক গল্পভূতেশ্বরের দরবারে কোয়েল - জগদীশ দাস

ভূতেশ্বরের দরবারে কোয়েল – জগদীশ দাস

ভূতেশ্বরের দরবারে কোয়েল – জগদীশ দাস

মিশনারী স্কুলের ছাত্রী কোয়েল। একদিন ছুটির পর একলা বাড়ি ফিরছিল। পরনে সাদা ফুলপ্যান্ট। গায়ে টি সার্ট। পায়ে সাদা কেডস। ছিপছিপে সুশ্রী চেহারা।

কোয়েল তাড়াতাড়ি হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাতে পড়ে থাকা একটা কলার খোসায় পা পড়ে। মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। মাথা গিয়ে লাগে একটা থান ইটে। কোয়েল মরে যায়। ওর আত্মা দেহ ছেড়ে বেরিয়ে এল। আত্মা হাল্কা। গ্যাস বেলুনের মত। আপনি উপরে ওঠে। তবুও কিসের যেন একটা টান অনুভব করে সে। সেই টানে ফুরফুরে বাতাসে গা ভাসিয়ে পৃথিবী ছেড়ে মহাশূন্যে চলে যায়।

মহাশূন্যে শুধু বিরাট বিরাট গাছ-গাছালি। টান শেষ হতেই একটা গাছের নীচে গিয়ে ধপ্ করে বসে পড়ে কোয়েল। এতটা উপরে উঠে এসেও ক্লান্তি নেই। শুধু কেমন যেন একটা ঘোর ঘোর ভাব।

এই ঘোর ভাবটা কাটতে একটু সময় লাগে কোয়েলের। তারপর মনে পড়ে যায় আঘাতে মরার পর ও পৃথিবী ছেড়ে এখানে চলে এসেছে। আচ্ছা, এখান থেকে কি পৃথিবী দেখা যায়? মুখ নিচু করতেই চোখে পড়ে শুধু ঘন কুয়াশা আর কুয়াশা।

কতক্ষণ সে বসে আছে খেয়াল নেই। এক সময় চিমড়ে চেহারার এক ছোকরা সামনে এসে দাঁড়ায়। রং কালো, মাথার চুল খাড়া খাড়া, চোখ গোল ভাঁটার মতো। পরনে একফালি কালো ন্যাকড়া। খোনা গলায় জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁরে মিছিলে যাসনি বুঝি?

কোয়েল ভ্যাবাচ্যাকা। জিজ্ঞেস করে, কিসের মিছিল?

চিমড়ে চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, তুই কি এখানে নতুন আমদানি হয়েছিস? জানিস না ভূতেশ্বরের কাছে রোজ মিছিল যায়?

–একটু আগে এখানে এসেছি। এসব কিছু জানি না।

চিমড়ে বেশ মুরব্বির মতো বলে, অঃ, তাই এখানকার হালচাল জানিস না। ঠিক আছে। বুঝিয়ে দিচ্ছি। আমাদের একটাই দাবী, ভূতেদের এই অবস্থার আশু অবসান চাই।

–তার মানে?

— বারে, অপঘাতে মৃত্যু হলেই তো আত্মা ভূত হয়ে যায়। সে আত্মার গতি হতে অনেক ফ্যাচাং।

–কেন?

–আরে, মৃত্যু স্বাভাবিক হলে তো আত্মা সরাসরি চিত্রগুপ্তের দপ্তরে চলে যায়। তিনি খাতা পত্তর দেখে চটপট আম্মাকে হয় স্বর্গে পাঠান, নয়তো নরকে চালান করে দেন। দেরি হয় না বলে সেখানে আত্মাদের ভিড় কিংবা লাইন হয় না।

–ভূতেশ্বর কি পারেন না?

–না। অপঘাতে মৃত্যু হলেই তো ভূতেশ্বরের কাছে চলে আসে। তার আগে তো নয়। তাই তিনি আগে ভাগে কি করে জানবেন কোন কোন আত্মা আসবে। তাছাড়া এলেই তো আত্মার মুখচোখ দেখে হুটহাট করে ইচ্ছেমত স্বৰ্গে কিংবা নরকে পাঠাতে পারেন না।

–কেন অসুবিধা কোথায়?

–বারে, চিত্রগুপ্তের দপ্তরে আরজি পাঠিয়ে জানতে হবে না আত্মা আস্তিক কি নাস্তিক?

–এত কড়াকড়ি কেন?

–কড়াকড়ির কারণ একটাই। নাস্তিকরা বড় ঘোঁট পাকায়। দারুণ কুচুটে। ওরা যদি কোন রকম ফাঁক-ফোকর দিয়ে স্বর্গে ঢুকে পড়ে, তাহলে আর দেখতে হবে না। তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে ছাড়বে স্বর্গে। আর আস্তিকদের যদি ভুল করে নরকে পাঠানো হয়, তাহলে যমরাজের শাপমুন্যি খেতে হবে না? সেই ভয়েই তো ভূতেশ্বর সদাই তটস্থ।

–তুমি এখানে কতদিন আছ?

চিমড়ে বেশ হতাশ সুরে বলে, তা তো হয়ে গেল অনেক কাল! এতদিন তৃত হয়ে থেকে ঘেন্না ধরে গেছে নিজের ওপর। আর ভাল্লাগে না। কি যে হবে ভেবে আর থই পাই না।

— এই দেরী হওয়ার কারণটা কি বল তো?

–আর বলো না। চিত্রগুপ্তের দপ্তর হচ্ছে হরি ঘোষের গোয়াল। ওদের গয়ং গচ্ছ ভাবে জন্যেই তো দেরি হচ্ছে।

–তাহলে ভূতেশ্বরের দোষ কি বল?

চিমড়ে খুব তাচ্ছিল্যের চোখে তাকিয়ে বলে, উনি নিজে গিয়ে আমাদের জন্যে একটু তদ্বির তদারকও করতে পারেন। কিন্তু তাও তো করেন না।

কোয়েল বুঝে গেছে যে এখানে ওকে অনেক হ্যাপা সামলাতে হবে। কতদিনে যে গতি হবে তারও তো ঠিক-ঠিকানা নেই। যাকগে, ভেবে আর কি হবে? আগে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই দরকার। জিজ্ঞেস করে, চারদিকেই তো ঝোপঝাড় জঙ্গল। এখানে তোমাদের ডেরা কোথায়?

চিমড়ে ঠোট উলটে বলে, ভূতেরা তো সব গাছ-গাছালিতেই থাকে। তুমিও একটা আস্তানা ঠিক করে নাও না।

মনে মনে আঁতকে ওঠে কোয়েল। বলে কী? তাহলে তো ঝড় জল ঠান্ডায় কষ্টের সীমা পরিসীমা থাকবে না। জিজ্ঞেস করে, তোমাদের অসুবিধে হয় না?

হি হি করে হেসে গড়িয়ে পড়ে চিমড়ে। আৱে, থাকতে থাকতে গা সওয়া হয়ে যায়।

জিজ্ঞেস করে কোয়েল, ভূতেশ্বর কোথায় থাকেন?

চোখ বড় করে চায় চিমড়ে। একটু ঘুরে ডান হাত তুলে দেখায়। পারিষদদের নিয়ে ঐ দূরে সাদা পাহাড়ের গুহায় থাকেন। গুহাটা খুব সাজানো। ভোগবিলাসের কত রকম সামগ্রী রয়েছে। আবে, ভূতেশ্বর বলে কথা। তিনি তো এসব সুখ-সুবিধা ভোগ করবেনই।

চট করে কোয়েলের মাথায় একটা মতলব খেলে যায়। দেখাই যাক না ওকে একটু বাজিয়ে? কি বলেন? আচ্ছা ভূতেশ্বরের সঙ্গে কি দেখা করা যায়?

–হ্যাঁ, হ্যাঁ। সবার সঙ্গে উনি দেখা করেন, বড় অমায়িক।

চিমড়ে পথ দেখিয়ে দিল। কোয়েল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে গুহার সামনে গিয়ে হাজির হল। গুহার মুখটায় চারজন পা ছড়িয়ে বসে গুলতানি করছে। সবাই বেঁটে খাটো জোয়ান। চেহারা দেখে বয়স বোঝার উপায় নেই। রং কালো। একজন বেশ মেজাজী গলায় জিজ্ঞেস করে, কি চাই?

–আজ্ঞে, ভূতেশ্বরের সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।

–ওদিকে যাও।

কোয়েল গুটিগুটি পায়ে ভেতরে একটা চৌকো চত্বরের কাছে চলে যায়, চত্বরে ফরাস পাতা। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে আছেন একজন থুড়থুড়ে বুড়ো। সারা মাথায় টাক। টাক ঘিরে শনের নুড়ির মত কয়েক গাছি চুল। গোলগাল চেহারা। থেবড়া নাক। গায়ের রং মিশকালো। তারকেশ্বরের কুমরোর মতো বিরাট ভুড়িটা থলথল করছে, খালি গা।

কোয়েলকে দেখে বুড়ো বাজখাঁই গলায় জিজ্ঞেস করেন, কি চাই?

প্রশ্নকর্তা বোধহয় ভূতেশ্বর। তবুও নিশ্চিত হবার জন্য দুহাত জোড় করে নম্রভাবে কোয়েল বলে, আমি কি পূজ্যপাদ ভূতেশ্বরের সঙ্গে কথা বলছি?

বাঃ, কথা বলার ধরণটা বড় সুন্দর, ভূতেশ্বর একটু সিধে হয়ে বসে শুধু মাথা নাড়েন।

কোয়েল হাত কচলে আবার বলে, কিছুক্ষণ আগে আমি পৃথিবী থেকে এসেছি।

কোয়েলের বিনয় ভাব দেখে খুশী হন ভূতেশ্বর। আপাদমস্তক একবার চোখ বুলিয়ে অমায়িক ভাবে আদেশ দেন, তাহলে এখানে থাকার ব্যবস্থা ঠিক করে নাও। সময়মত তোমার ডাক আসবে।

ডাক যে কবে আসবে এবং আদৌ আসবে কিনা কে জানে? তাই এখনই একটু ফয়সালা করা দরকার, একটু মাথা চুলকে শান্ত গলায় বলে কোয়েল, আজ্ঞে আমার একটা আরজি ছিল।

–বলে ফেল কি তোমার আরজি?

এবার কোন ভণিতা না করে একদম সোজাসুজি কোয়েল বলে, দেখুন, আমি না আস্তিক, না নাস্তিক। তাই স্বর্গে না নরকে কোথায় আমায় পাঠানো হবে আগে জানতে চাইছি।

আশ্চর্য। শান্ত মেয়েটার বাক্যির কি ধার। এটুকু বাচ্চা মেয়ে এত সেয়ানাও হয়? হায় হায়, দিনকাল কত বদলে যাচ্ছে। আরও কত কিনা দেখতে হবে। হাসি মুখে বলেন, মানে, মানে, তুমি ভগবানে বিশ্বাসও কর না, আবার অবিশ্বাসও কর না?

— আজ্ঞে হ্যাঁ।

ভূতেশ্বরকে ঘিরে বসে আছে কয়েকজন অদ্ভূত চেহারার লোক। পারিষদদের দিকে বেশ অসহায় ভাবে তাকান ভূতেশ্বর, যদি কোন বিজ্ঞ পারিষদ একটা উপায় বাতলে দেন। নাঃ, কারুর মুখে কোনো রা নেই। সবাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। এখন কি করবেন ভেবে কুল কিনারা পান না। মুখে বলেন, তা হলে তো তোমায় নিয়ে একটা সমস্যায় পড়া গেল।

ফিক করে হেসে ফেলে কোয়েল। বলে, আজ্ঞে, সমস্যার তো কিছু নেই। স্বর্গে কিংবা নরকে ঢুকতে গেলে ফেঁকড়া। গায়ে মার্কা না থাকলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন। তাই চিত্রগুপ্তের দপ্তরে আমার নামটা পাঠাবেন মা।

—বল কি, তা কি কখনও হয়?

কোয়েল এবার বেশ ধমকে বলে, দেখুন, আপনার নিজের কোন দপ্তর নেই, নেই কোনো খাতাপত্তর। চিত্রগুপ্তের ওপর আপনাকে নির্ভর করতে হয়। তাই কবে যে আমার ব্যাপারটা ফয়সালা হবে তারও তো কিছু ঠিক নেই। তাই না?

যথার্থ কথা। বলে মাথা নাড়েন ভূতেশ্বর।

হঠাৎ একটু রাগ দেখিয়ে বলে কোয়েল, কাল আমি মিছিলের সঙ্গে এসে সকলের সামনে আপনাকে নানা প্রশ্নে জেরবার করে ছাড়বো। আর এও বলবো যে ভূতেদের জন্যে কোনো কাজ আপনি করেন না। শুধু তারে-নারে করে সময় কাটিয়ে দিচ্ছেন। সবশেষে দাবী তুলবো যে আপনার এই ভূতেশ্বরের পদে থাকার কোন যোগ্যতা নেই।

ভূতেশ্বরের কোঁচকানো মুখ আরও কুঁচকে যায়। এতদিন তো বেশ ভুজং ভাজাং দিয়ে চলছিল। এই বিচ্ছু মেয়েটার জ্বালায় শেষমেষ না সবার সামনে নাকাল হতে হয়। বড় শ্বাস ছেড়ে বলেন, তা কি করতে বল?

কোয়েল বলে, দেখুন, পৃথিবীতে আস্তিক নাস্তিক নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে থাকে। হেসেখেলে সময় কাটিয়ে দেয়। কোন ঝামেলা নেই। তাই দয়া করে আমায় আবার পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিন।

এই বয়সে উটকো ঝক্কি-ঝামেলা আর ভালও লাগে না ভূতেশ্বরের। পারেনও না আজেবাজে হেপা সামলাতে। এরকম ঘরজ্বালানি আপদ যত তাড়াতাড়ি বিদেয় হয় ততই মঙ্গল। তবুও পারিষদদের একটা মৌখিক মত নেয়া দরকার। তাই জিজ্ঞেস করেন, আপনাদের অভিমত কী?

এমন জাঁহাবাজ মেয়ে পারিষদদের চোখে কখনও পড়েনি। বাঃ বাঃ, মেয়ে নয় তো সিংহী। সবাই ঢোক গেলে আর মাথা নাড়ে। শুধু একজন মিনমিন করে বলেন, আপনি যা বলবেন তাই হবে।

যাক বাঁচা গেল। পারিষদদের সম্মতি পাওয়া গেছে। মনের ভাব স্বাভাবিক রেখে বলেন, তা এত করে যখন অনুনয়-বিনয় করছো, তোমার আবদার তো আর ফেলা যায় না। তাহলে ফিরেই যাও আবার পৃথিবীতে।

হুররে। কি মজা। খুশী চেপে জোড় হাতে কোয়েল প্রথমে ভূতেশ্বরকে, পরে পারিষদদের নমস্কার করে ধীরে ধীরে গুহা থেকে বেরিয়ে পড়ে। তারপর হুস করে চলে আসে আগের গাছটার কাছে। চারদিক সুনসান। এখন চলে গেলে কেউ টেরও পাবে না। তাই চট্‌ করে দুটো হাত মাথার ওপর তুলে দেয়। তারপর সামনের দিকে শরীরটা হেলিয়ে মাথা নীচু করে দেয় ডাইভ। সুন্দর ফ্রন্ট ডাইভ। মাধ্যাকর্ষণের টানে হুহু করে নীচে নামতে থাকে। নিমেষে আবার নিজের দেহের মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়ে কোয়েল।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments