Wednesday, July 29, 2026
Homeভৌতিক গল্পভূতে পাওয়া হরিণ - সংকর্ষণ রায়

ভূতে পাওয়া হরিণ – সংকর্ষণ রায়

ভূতে পাওয়া হরিণ – সংকর্ষণ রায়

ভূতে পাওয়া হরিণ। হরিণকে কি কোথাও ভূতে পায়?

আর কোথাও না পাক, মণিপুরের বিশেষ একটি জায়গায় পায়। সেখানে বিশেষ এক ধরণের হরিণ দেখা যায়, তাকে বলে ‘ভুরু-শিং হরিণ’। মণিপুরীরা মনে করে এই ভুরু শিং হরিণের ওপরে ভূত ভর করে। জ্যোৎস্না রাতে জ্যোৎস্নার আলো বেয়ে নেমে এসে এই হরিণের কাঁধে চেপে বসে সে।

এই জায়গাটি হচ্ছে মণিপুরের লোগটাক্ হ্রদের মধ্যে একটি দ্বীপ। দ্বীপটি জলের ওপরে ভাসমান। ভাসমান দ্বীপের ব্যাপারটা পরে তোমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছি। এখন এই ‘ভুরু শিং হরিণকে’ চিনে নাও

ভুরু শিং হরিণকে ইংরেজিতে বলে ‘ব্রো এনট্লারেড ডীয়ার’। আকারে খুবই ছোট। তার ভুরুর ওপরে শিং আছে বলে মনে হয় যেন সর্বদাই সে শিং উঁচিয়ে তেড়ে আসতে উদ্যত। মণিপুর ছাড়া বর্মা ও থাইল্যান্ডেও তার দেখা মেলে। ও দুটি দেশে তাদের ওপরে ভূত ভর করে কিনা তা অবশ্য জানা নেই।

বিখ্যাত বন্যপ্রাণী বিশারদ ই.পি.গী. একদা এই ভূতে পাওয়া হরিণ দেখার জন্য মণিপুরে গিয়েছিলেন। ইম্ফলে পৌঁছে লোগটাক হ্রদে ভাসমান দ্বীপে কি করে যাওয়া যায় তার খবর নিতে গিয়েছিলেন বনবিভাগের দপ্তরে।

এখন তোমাদের বুঝিয়ে দিই ভাসমান দ্বীপটি কি ধরণের দ্বীপ। জলে জমা শ্যাওলা, আগাছা ও ঘাস, পলিমাটির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে একটি ঘনীভূত স্তর রচনা করে। তা কয়েক ইঞ্চি থেকে শুরু করে কয়েক ফুট পর্যন্ত পুরু। তার ওপর দিয়ে হাঁটলে স্তরটি কাঁপতে থাকে। স্তরটি যেখানে পাতলা সেখানে পা ডুবে যাবার আশঙ্কা আছে, কাজেই খুব সাবধানে হাঁটতে হয়।

স্থানীয় মণিপুরীরা অবশ্য পারতপক্ষে এখানে পা দিতে চায় না, কারণ জলে ভাসমান এই স্তরটিকে ভৌতিক ব্যাপার বলে মনে করে তারা। ভাসমান উদ্ভিজের স্তর দিয়ে গড়া দ্বীপটিকে তারা ভৌতিক দ্বীপ নাম দিয়েছে। এই ভূতুড়ে দ্বীপে থাকে বলেই নাকি ভুরু শিং হরিণের ওপরে ভূত ভর করে।

এ হেন ভুতুড়ে দ্বীপে স্থানীয় মণিপুরীদের নিয়ে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার, কাজেই বনবিভাগের অধিকর্তা একজন ফরেষ্ট রেঞ্জারকে নির্দেশ দিলেন গী সাহেবকে ঐ ভাসমান দ্বীপে নিয়ে যেতে।

বনবিভাগের একটি নৌকাতে করে ফরেষ্ট রেঞ্জার ও গী সাহেব ঐ দ্বীপে গিয়ে পৌঁছলেন। বনবিভাগ একটি খাল কেটে দ্বীপটাকে দুভাগে ভাগ করেছে। এই খাল দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে গী সাহেব ও ফরেষ্ট রেঞ্জার একটি ছোট পাহাড়ের নীচে গিয়ে নৌকো বাঁধলেন। পাহাড়ের মাথায় বনবিভাগের বাংলো। এই বাংলোর বারান্দায় বসে দূরবীন দিয়ে সমস্ত দ্বীপ জুড়ে তন্নতন্ন করে খুঁজলেন গী সাহেব। কিন্তু ভাসমান উদ্ভিজ্জের স্তরের মধ্যে ভুরু শিং হরিণের পাল এমনি গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে থাকে যে কোথাও তাদের খুঁজে পান না তিনি।

ফরেষ্ট রেঞ্জার বললেন– ওদের খুঁজে পাবেন না মিস্টার গী, সব সময়ই ওরা গা ঢাকা দিয়ে থাকে।

গী সাহেব বললেন,–সব সময় গা ঢাকা দিয়ে থাকবে তা তো আর হয় না রেঞ্জার সাহেব, কখনো না কখনো চরতে বেরুবে নিশ্চয়ই। দিনের বেলায় যারা গা ঢাকা দিয়ে থাকে, তারা নিশ্চয়ই রাত্রে চরতে বেরোয়।

— আপনি কী রাত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান না কি মিস্টার গী। ফরেষ্ট রেঞ্জার শিউরে উঠলেন।

— নিশ্চয়ই। জ্যোৎস্না রাত, ওরা বেরিয়ে পড়লে দেখতে পাব নিশ্চয়ই।

–কিন্তু ওদের সঙ্গে তারাও যে আসবে জ্যোৎস্নার আলো বেয়ে বলতে বলতে ফরেষ্ট রেঞ্জারের গলার স্বর কেঁপে ওঠে।

— কারা রেঞ্জার সাহেব?

–তাদের নাম আমি মুখে আনতে পারবো না মিস্টার গী।

মৃদু হেসে গী সাহেব বললেন — মুখ ফুটে যাদের নাম আপনি করতে পারছেন না, তাদের আমি কিন্তু ভয় পাই না রেঞ্জার সাহেব।

এরপর ফরেষ্ট রেঞ্জার আর কোন কথা না বললেও দেখা যায় যে এখানে রাত কাটানোর সম্ভাবনা তাঁকে রীতিমত শঙ্কিত করে তুলেছে। সন্ধ্যা হতেই তিনি ঢুকে পড়লেন বাংলোর মধ্যে। গী সাহেব বিস্তর ডাকাডাকি করেও বের রতে পারলেন না তাঁকে ঘর থেকে।

ফরেষ্ট রেঞ্জার বেরিয়ে না এলেও গী সাহেব এলেন, বারান্দায় বসে বসে অপেক্ষা করেন। জ্যোৎস্নায় অপরূপ হয়ে ওঠে দ্বীপটি। চারদিকে জলের রূপালী জৌলুসের মাঝখানে যেন একটি ছায়াঘন রহস্যময় পরিবেশ। তার মধ্যে কারা যেন নড়ে চড়ে বেড়ায়। চোখে দেখা যায় না তাদের মনে হয় যেন আলো ছায়ার কারসাজি।

হঠাৎ পাহাড়ের ঠিক নীচে ছায়ার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসে দশ বারোটি হরিণ। তাদের ভুরুর ওপরে শিং বাদামী চামড়ার ওপরে সাদা ছোপ জ্যোৎস্নায় ঝলমল করে। জ্বলজ্বল করে তাদের কালো, চোখ। হঠাৎ তারা মুখ ভুলে তাকায়। গী সাহেবের মনে হল যেন তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে।

কয়েক মুহূর্ত মুখ তুলে তাকিয়ে থাকার পর তারা নাচতে শুরু করে। একই সঙ্গে যৌথ নৃত্যের ছন্দে তারা পা ফেলে ফেলে নাচতে থাকে। মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে থাকেন গী সাহেব। দৃশ্যটা এমনি অপ্রাকৃত যে গী সাহেব নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না

হরিণরা চলে গেলে পর ফরেষ্ট রেঞ্জার গী সাহেবকে বললেন ঐ হরিণগুলোর ওপরে ভূতেরা ভর করে বলেই ওরা নাচে। এ কথা আপনি বিশ্বাস করুন বা না করুন মণিপুরের প্রায় সকলেই বিশ্বাস করে, এমন কি জানোয়াররাও-

–বনের জানোয়াররাও বিশ্বাস করে। গী সাহেব অবাক হয়ে বললেন।

–হ্যাঁ মিস্টার গী। বিশ্বাস যে করে তার প্রমাণ হচ্ছে এই যে ওদের নাচতে দেখলেই তারা ভয়ে পালায়। জানেন, বাঘ বা চিতাবাঘও ওদের নাচকে যমের মত ভয় করে। গী সাহেব বুঝতে পারেন এই ভুরু শিং হরিণগুলো খুবই চতুর। তাদের নাচতে দেখলে বন্য জন্তু জানোয়ার, মানুষ নির্বিশেষে সকলেই ভয় পায় বলে তারা নেচেই যায় – নাচই তাদের কাছে আত্মরক্ষার অস্ত্র।

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com/
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments