Wednesday, May 29, 2024
Homeগোয়েন্দা গল্পঅপ্সরা থিয়েটারের মামলা - সত্যজিৎ রায়

অপ্সরা থিয়েটারের মামলা – সত্যজিৎ রায়

০১. টিভি-তে শার্লক হোমস

টিভি-তে শার্লক হোম্‌স দেখে ফেলুদা মুগ্ধ। বলল, ‘একেবারে বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে হোম্‌স আর ওয়টসন। জানিস তোপ্‌সে—আমাদের যা কিছু শিক্ষা দীক্ষা ওই শার্লক হোম্‌সের কাছে। সব প্রাইভেট ডিটেকটিভের গুরু হচ্ছে হোম্‌স। তাঁর সৃষ্টিকর্তা কন্যান ডয়েলের জবাব নেই।’

জটায়ু সায় দিয়ে বললেন, ‘লোকটা কত গল্প লিখেছে ভাবুন ত! এত প্লট কি করে যে মাথায় আসে সেটা ভেবে পাই না। সাধে কি আমার টাক পড়েছে? প্লট খুঁজতে গিয়ে মাথার চুল ছিঁড়ে!

বাইরে বৃষ্টি পড়েছে, তার মধ্যে চা আর ডালমুটটা জমেছে ভালো। আসলে লালমোহনবাবুও একচল্লিশটা রহস্য উপন্যাস লিখেছেন, কিন্তু তার বেশির ভাগই ফেলুদার ভাষায় থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। তবে প্লটের জন্য মাথা খুঁড়লেও ভদ্রলোকের উৎসাহের অভাব নেই। আর সত্যি বলতে কি, ফেলুদার সঙ্গে বন্ধুত্ব হবার পর থেকে ওঁর গল্পও অনেক ইমপ্রুভ করে গেছে।

‘শ্রীনাথকে একটু বলনা ভাই তপেশ,’ বললেন লালমোহনবাবু, ‘আর এক কাপ চা হলে মন্দ হত না।’

আমি শ্রীনাথকে চায়ের ফরমাশ দিয়ে আসতেই দরজায় টোকা পড়ল। তার আগে অবশ্য ট্যাক্সি থামার শব্দ পেয়েছি।

দরজা খুলে দেখি ছাতা মাথায় এক ভদ্রলোক, মাঝারি হাইট, ফরসা রং, দাড়ি গোঁফ কামানো, বয়স চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ।

বললাম, ‘কাকে চাই?’ অবিশ্যি এ প্রশ্নটা না করলেও চলত, কারণ দেখেই বুঝেছি মক্কেল।

‘এটা কি প্রদোষ মিত্রের বাড়ি?’ প্রশ্ন করলেন ভদ্রলোক।

এবারে ফেলুদাই বলে উঠল, ‘আপনি আসুন ভিতরে।’

ভদ্রলোক ছাতাটা বন্ধ করে ঢুকলেন।

‘ওটাকে দরজার পাশে রেখে দিন,’ বলল ফেলুদা।

ভদ্রলোক তাই করলেন, তারপর সোফার এক পাশে এসে বসলেন। ফেলুদা বলল, ‘আমার নাম প্রদোষ মিত্র; আর ইনি আমার বন্ধু লালমোহন গাঙ্গুলী।’

‘যাক, তবু আপনাকে বাড়ি পাওয়া গেল,’ বললেন ভদ্রলোক, ‘টেলিফোন করে কানেকশন পাইনি। আজকাল যা হয় আর কি।’

‘কী ব্যাপার বলুন।’

‘বলছি। আগে আমার পরিচয়টা দিই। আমার নাম মহীতোষ রায়। নাম শুনে চিনবেন ততটা আশা করি না, যদিও থিয়েটার লাইনে আমার কিছুটা খ্যাতি আছে।’

‘আপনি ত অপ্সরা থিয়েটারে আছেন, তাই না?’

‘ঠিকই ধরেছেন। এখন প্রফুল্লতে অভিনয় করছি।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি।’

‘আপনার কাছে এসেছি একটা সংকটে পড়ে।’

‘কী সংকট?’

‘কদিন থেকে আমি হুম্‌কি চিঠি পাচ্ছি। কার কাছ থেকে তা বলতে পারব না।’

হুম্‌কি চিঠি?’

‘তাঁর কিছু নমুনা আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। এই দেখুন।’

ভদ্রলোক পকেট থেকে চারটে কাগজ বার করলেন, তারপর সেগুলো টেবিলের উপর রাখলেন। আমি দেখলাম একটায় লেখা ‘সাবধান!’ আরেকটায় ‘তোমার দিন ফুরিয়ে এল’, আরেকটায় ‘তোমার দুষ্কৃতির ফল ভোগ কর’, আর চার নম্বরটায় ‘আর সময় নেই। এবার ইষ্টনাম জপ কর!’ গোটা গোটা বড় বড় অক্ষরে লেখা, আর সবই যে এক লোকের লেখা তা বোঝবার উপায় নেই।

‘এসব কি ডাকে এসেছে?’ ফেলুদা জিগ্যেস করল।

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘এগুলো কদিনের মধ্যে পেয়েছেন?’

‘সাতদিন।’

‘কে লিখেছে কিছু অনুমান করতে পেরেছেন?’

‘একেবারেই না।’

‘আপনার প্রতি বিরূপ এমন কোনো লোকের কথা মনে করতে পারছেন না?’

‘দেখুন, আমি থিয়েটারে কাজ করি। আমাদের মধ্যে ছোটখাটো ঝগড়া, মনোমালিন্য—এ লেগেই আছে। আমি দুবছর হল অপ্সরায় আছি, তার আগে রূপমঞ্চে ছিলাম। আমাকে নেওয়া হয় একটি অভিনেতার জায়গায়। স্বভাবতই সে অভিনেতা এতে সন্তুষ্ট হয়নি। সে নিশ্চয় ঈর্ষায় ভুগছে।’

‘এই অভিনেতার নাম কী?’

‘জগন্ময় ভট্টাচার্য। ভয়ানক ড্রিঙ্ক করতে শুরু করেছিল। তাই তাকে আর রাখা যায়নি। তিনি এখন কী করছেন কোথায় আছেন তা জানি না।’

‘এই জগন্ময় ভট্টাচার্য ছাড়া আর কারুর কথা মনে পড়ছে?’

‘আমার একটি ছোট ভাই আছে, তার সঙ্গে আমার বনে না। সে অবিশ্যি আলাদা থাকে। আমার বাবার মৃত্যুতে সম্পত্তি সব আমি পাই। আমার ছোট ভাই অসৎ সঙ্গে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। বাবা তাই তাকে উইল থেকে বাদ দেন। ছোট ভাই স্বভাবতই খুব অসন্তুষ্ট হয়। এছাড়া শত্রু বলতে আর কাউকে মনে পড়ে না।’

‘আপনি সাবধানে আছেন ত?’

‘তা ত আছি, কিন্তু আপনি যদি একটু পথ বাতলে দেন।’

‘এ ব্যাপারে সাবধানে থাকতে বলা ছাড়া ত আর কিছু বাতলাবার নেই। আপনি থাকেন কোথায়?’

‘বালিগঞ্জে। পাঁচ নম্বর পণ্ডিতিয়া প্লেস।’

‘একাই থাকেন?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। একটি চাকর আর একটি রান্নার লোক আছে। আমি এখনো বিয়ে করিনি।’

‘সত্যি বলতে কি, এ অবস্থায় আমার আর কিছুই করার নেই। এরকম হুম্‌কি কেস আমার কাছে আগেও এসেছে। চিঠিগুলো থেকে কিছু ধরা যায় না। এখানে চারটে চিঠিতে দেখছি চার রকম পোস্টমার্ক, কাজেই কোত্থেকে এসেছে তাও বলা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখেছি শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না। তবে আপনাকে কেউ উৎকণ্ঠায় ফেলতে চাচ্ছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমি বলি কি আপনি পুলিশে যান। তারা এসব ব্যাপারে আরো ভালো ব্যবস্থা করতে পারে।’

ভদ্রলোক যেন একটু মুসড়ে পড়লেন, বললেন, ‘পুলিশ?’

‘কেন, পুলিশের বিরুদ্ধে আপনার কোনো অভিযোগ আছে নাকি?’

‘না, তা নেই।’

‘তবে আর কি। আপনি সোজা থানায় গিয়ে রিপোর্ট করুন। আমায় যা বললেন তাই বলুন।’

ভদ্রলোক অগত্যা উঠে পড়লেন। ফেলুদা তাঁকে দরজা অবধি পৌঁছে দিল। তারপর ফিরে এসে বসে পড়ে বলল, ‘ভদ্রলোকের ডান হাতের আঙুলে একটা আংটির দাগ দেখলাম। সেই আংটিটা কোথায় গেছে কে জানে।’

‘বেচে দিয়েছেন বলছেন?’ জটায়ু প্রশ্ন করলেন।

‘দিলে আশ্চর্য হব না। পায়ের জুতো জোড়ার অবস্থাও বেশ খারাপ। প্রফুল্লতে উনি প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করছেন না সেটা জানি। সেটা করছেন অপ্সরার স্টার অভিনেতা নেপাল লাহিড়ী।’

‘কিন্তু কে ওঁর পিছনে লেগেছে বল ত’, আমি প্রশ্ন করলাম।

‘কী করে বলব বল। উনি যে দুজনের কথা বললেন তাদের একজন হতে পারে। মোটকথা এ কেস আমার নেওয়া চলে না। আর অনেক সময় এগুলো স্রেফ ভাঁওতার উপর চলে। আমার কত টেলিফোন এসেছে বলত হুম্‌কি দিয়ে! সে সব মানতে হলে ত বাড়িতে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে হয়।’

কিন্তু এই চিঠির ব্যাপারটা যে ভাঁওতা নয় সেটা তিনদিন পরেই জানলাম।

০২. অন্সরা থিয়েটারের অভিনেতা নিখোঁজ

খবরটা জানা গেল খবরের কাগজ মারফৎ। ছোট করে লেখা খবর—অপ্সরা থিয়েটারের অভিনেতা নিখোঁজ। মহীতোষ রায় নাকি সন্ধ্যাবেলা থিয়েটার না থাকলে লেকের ধারে বেড়াতে যেতেন। গত পরশু, অর্থাৎ সোমবার, তিনি যথারীতি বেড়াতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেন নি। বাড়ির চাকর থানায় গিয়ে খবর দেয়। পুলিশ এই নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে।

ফেলুদা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘লোকটাকে পই পই করে বলেছিলাম সাবধানে থাকতে, তার লেকে বেড়াতে যাবার কি দরকার ছিল? যাই হোক, আমার কাছে যখন এসেছিলেন ভদ্রলোক, তখন একবার ওঁর বাড়িতে যাওয়া দরকার। ঠিকানাটা মনে আছে?’

‘পাঁচ নম্বর পণ্ডিতিয়া প্লেস।’

‘গুড। তোর স্মরণশক্তি পরীক্ষা করছিলাম।’

নটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়লাম।

পাঁচ নম্বর পণ্ডিতিয়া প্লেস একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ি, তার একতলায় থাকতেন মহীতোষবাবু। চাকর দরজা খুলে দিলে আমরা নিজেদের পরিচয় দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ফেলুদা চাকরকে বলল, ‘তোমার মনিব আমার কাছে এসেছিলেন সাহায্য চাইতে। উনি মাঝে মাঝে হুম্‌কি চিঠি পাচ্ছিলেন সে খবর তুমি জান?’

‘জানি বৈ কি বাবু। আমি বাইশ বছর ওনার কাজ করছি। আমাকে সব কথাই বলতেন। আমি ওঁকে অনেক করে বলেছিলাম—আপনি বেড়াতে যাবেন না, বাড়িতে থাকুন, সাবধানে থাকুন। তা উনি আমার নিষেধ শুনলেন না। যখন দেখলাম রাত সাড়ে নটা হয়ে গেল তাও আসছেন না, তখন আমি নিজেই গেলাম লেকে। কোনখানটায় উনি বসতেন, কোনখানটায় বেড়াতেন, সেটা আমি জানতাম। কিন্তু কই, তাঁকে ত কোথাও দেখতে পেলাম না। তারপর পুরো একটা দিন কেটে গেল, এখনো কোনো খবর নেই। আমি থানায় গেসলাম। তেনারা সব লিখে-টিখে নিলেন, কিন্তু এখনো পর্যন্ত ত কিছুই হল না’।

ফেলুদা বলল, ‘তুমি এখন আমাদের সঙ্গে একবার আসতে পারবে? লেকে যে জায়গাটায় বসতেন সেটা যদি একবার দেখিয়ে দাও।’

‘চলুন বাবু, যাচ্ছি।’

‘তোমার নাম কী?’

‘দীনবন্ধু, বাবু।’

আমরা তিনজন ট্যাক্সি করে লেকে গিয়ে হাজির হলাম।

জলের ধারে একটা আমলকি গাছের পাশে একটা বেঞ্চি, তাতেই নাকি হাঁটা সেরে বসতেন ভদ্রলোক। হাঁটার অভ্যাসটা ডাক্তারই বলে বলে করিয়েছিলেন। এখন চতুর্দিকে কোনো লোক নেই, ফেলুদা খুব মন দিয়ে বেঞ্চি আর তার চারপাশটা পরীক্ষা করে দেখল। প্রায় মিনিট পাঁচেক তন্ন তন্ন করে খুঁজে ঘাসের মধ্যে একটা পিতলের কৌটো পেল। দীনবন্ধু সেটা দেখামাত্র বলে উঠল, ‘এ কৌটো ত বাবুর ছিল।’ কৌটোটা খুলে ভিতরে এলাচ আর সুপুরি পাওয়া গেল। ফেলুদা সেটা পকেটে পুরে নিল। তারপর দীনবন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি ভবানীপুর থানায় খবর দিয়েছিলে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ বাবু।’

‘ঠিক আছে। চল তোমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আমরা একটু থানায় খবর করে আসি।’

মোটামুটি কলকাতার বেশির ভাগ থানার ও.সি-র সঙ্গেই ফেলুদার আলাপ আছে। ভবানীপুর থানার ও.সি হচ্ছেন সুবোধ অধিকারী। আমরা দীনবন্ধুকে পণ্ডিতিয়া প্লেসে নামিয়ে দিয়ে গেলাম অধিকারীর সঙ্গে দেখা করতে। রাশভারী হলেও বেশ মাইডিয়ার লোক, আর ফেলুদাকে খুব পছন্দ করেন। আমাদের দেখে একটু অবাক হয়েই বললেন, ‘কী ব্যাপার, এত সকাল সকাল?’

আমরা দুটো চেয়ারে বসলাম।

ফেলুদা বলল, ‘একটা ডিসাপিয়ারেন্সের কেস আপনাদের কাছে রিপোর্টেড হয়েছে। মহীতোষ রায়।’

‘হ্যাঁ। এটা বোধহয় সত্যবান দেখছিল। দাঁড়ান, ওকে ডাকি। একটু চা চলবে?’

‘তা আপত্তি নেই।’

মিনিট খানেকের মধ্যেই ইন্‌সপেক্টর সত্যবান ঘোষ এসে গেলেন। ইনিও ফেলুদার যথেষ্ট চেনা; দুজনে হ্যাণ্ডশেক করার পর সত্যবান বললেন, ‘কী ব্যাপার বলুন।’

‘মহীতোষ রায় বলে একটি অভিনেতা বোধহয় নিরুদ্দেশ হয়েছেন?’

‘নিরুদ্দেশ কেন, আমার ত মনে হয় তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাঁর বাড়ি থেকে বেশ কয়েকটা হুম্‌কি চিঠি পাওয়া গেছে। আর লেকের ধারে মেরে ফেলে গায়ে কিছু ভারী জিনিস বেঁধে লাশ জলে ফেলে দিলে সে ত আর পাওয়াও যাবে না। আপনি এ ব্যাপারে কী করে ইন্টারেস্টেড হলেন?’

ফেলুদা মহীতোষবাবুর আসার কথাটা বলল। তারপর প্রশ্ন করল, ‘আপনারা কোনোরকম এগোবার রাস্তা খুঁজে পাননি বোধহয়?’

ঘোষ বললেন, ‘ভদ্রলোক অপ্সরা থিয়েটারে অভিনয় করতেন। আমরা সেখানে খোঁজ করেছি, কিন্তু কিছু এগোতে পারিনি। থিয়েটারের কারুর সঙ্গে এমন শত্রুতা ছিল না যে খুন হতে পারে। পেটি জেলাসি সব সময়ই থাকতে পারে, কিন্তু সেটা খুনের কারণ হয় না।’

‘ভদ্রলোকের আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল?’

‘মোটামুটি। বারোশ টাকা মাইনে পেতেন। একা মানুষ, তাই চলে যেত। অবিশ্যি খুনই যে হয়েছে একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। ভদ্রলোককে কেউ হয়ত ফুসলে নিয়ে গেস্‌ল, কিংবা ভদ্রলোক হয়ত নিজেই কোনো কারণে গা ঢাকা দিয়েছেন।’

‘আমি আজ লেকের ওখানে গিয়েছিলাম। ভদ্রলোক যে বেঞ্চিতে বসতেন তার পাশেই ঘাসে ওঁর একটা মশলার কৌটো পাই।’

‘তাই বুঝি?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে ত খুন বলেই মনে হচ্ছে। আততায়ীর সঙ্গে স্ট্রাগলের সময় পকেট থেকে কৌটোটা পড়ে গেছল।’

‘তাই ত মনে হচ্ছে।’

‘ঠিক আছে! আমাদের এদিক থেকে কোনো খবর পেলে আপনাকে জানাব।’

‘ভেরি গুড। আমিও আপনাদের টাচে থাকব।’

মিঃ ঘোষ চলে গেলেন। চা এসে গিয়েছিল, আমরা চা খেয়ে উঠে পড়লাম।

বাইরে বেরিয়ে এসে ফেলুদা বলল, ‘একবার অপ্সরা থিয়েটারে যাওয়া দরকার। ওই কেমিস্টের দোকান থেকে লালমোহনবাবুকে একটা ফোন করে বলে দে উনিও যেন চলে আসেন।’

ফোন করে আমরা আবার ট্যাক্সি ধরলাম। যেতে হবে সেই শ্যামবাজার।

০৩. অপ্সরা থিয়েটারে পৌঁছে দেখি

অপ্সরা থিয়েটারে পৌঁছে দেখি লালমোহনবাবু অপেক্ষা করছেন।

‘কী ব্যাপার মশাই?’ ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন।

‘আজ কাগজ দেখেননি?’

‘দেখেছি বৈ কি। মহীতোষ রায় ত হাওয়া।’

‘হাওয়া কেন, বোধহয় খতম।’

সংক্ষেপে লালমোহনবাবুকে সকালের ঘটনাটা বলে দিল ফেলুদা।

‘তাহলে এখন কি আমরা থিয়েটারে তদন্ত চালাবো?’

‘একবার অন্তত ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলি।’

আমরা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, এবার গিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। গেটে দারোয়ান বলল ম্যানেজারের নাম কৈলাস বাঁড়ুজ্যে। তিনি তাঁর অফিসেই আছেন।

ম্যানেজারের আপিসে পৌঁছতে গেলে একটা ঘর পেরোতে হয়। সেখানে একজন ভদ্রলোক একটা টেবিলের সামনে বসে কাগজপত্র ঘাঁটছিলেন, জিগ্যেস করলেন আমাদের কী দরকার।

ফেলুদা এবার তার একটা কার্ড বের করে ভদ্রলোকের হাতে দিয়ে বলল, ‘একবার যদি কৈলাসবাবুর সঙ্গে দেখা করতে পারি।’

ভদ্রলোক আমাদের অপেক্ষা করতে বলে গেলেন ভিতরের দিকে। মিনিটখানেক পরে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘আপনারা আসতে পারেন।’

আমরা তিনজনে গিয়ে ম্যানেজারের ঘরে ঢুকলাম। বেঁটে, মোটা, কালো ভদ্রলোক। নাকের নীচে একটা সরু গোঁফ, বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ। বললেন, ‘আপনার নাম ত শুনেছি, কিন্তু হঠাৎ আমার এখানে আসার প্রয়োজন হল কেন সেইটেই ভাবছি।’

ফেলুদা বলল, ‘আপনার একজন অভিনেতা সম্বন্ধে কিছু জানার ছিল—যিনি দুদিন হল নিখোঁজ।’

‘মহীতোষের কথা বলছেন? সে ব্যাপারে ত পুলিশ এসে এক দফা এনকোয়ারি করে গেছে।’

‘ভদ্রলোক আমার কাছে এসেছিলেন। কতকগুলো হুম্‌কি চিঠি পেয়েছিলেন সেই নিয়ে আমার পরামর্শ নিতে।’

‘হুম্‌কি চিঠি? তাহলে কি ও খুন হয়েছে নাকি? আমি ত ভাবলাম পাওনাদারের কাছ থেকে গা ঢাকা দিয়েছে।’

‘না। ঠিক সেরকম মনে হচ্ছে না।’

‘অবিশ্যি ও গিয়ে যে আমাদের একটা খুব বড় রকম ক্ষতি হয়েছে তা বলতে পারছি না। প্রশান্ত মোটামুটি চালিয়ে নিচ্ছে। পুলিশ কালকেই এসেছিল। আমরা বিশেষ কোনো ইনফরমেশন দিতে পারিনি। মহীতোষ একটু চাপা টাইপের চরিত্র ছিল। ওর কারুর সঙ্গে খুব একটা মাখামাখি ছিল না। অভিনয়টা মোটামুটি ভালোই করত। তবে ওর ইচ্ছে ছিল প্রফুল্লতে মেন রোল করবার; সে ক্ষমতা ওর ছিল না।’

‘ওঁর কোনো শত্রু ছিল না বলছেন?’

‘বলছি ত—শত্রুও না, বন্ধুও না।’

‘জগন্ময় ভট্টাচার্য বলে এককালে আপনাদের একজন অভিনেতা ছিলেন?’

‘ছিল, কিন্তু তাকে ত অনেকদিন আগেই ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’

‘তাঁর জায়গাতেই মহীতোষকে নেওয়া হয়, তাই না?’

‘তা বটে। এটা আপনি ঠিক বলেছেন, আমার খেয়াল হয়নি।’

‘এই জগন্ময় ভট্টাচার্যের বাড়ির ঠিকানা আপনার কাছে আছে?’

‘পুরোন ঠিকানা আছে, সে ত এখন সেখানে নাও থাকতে পারে।’

‘তবু একটা চান্স নেওয়া যেতে পারে।’

কৈলাসবাবু একটা ঘণ্টা টিপলেন। পাশের ঘর থেকে একটি বছর পঁচিশ বয়সের ছেলে এসে দাঁড়াল।

‘এদের জগন্ময়ের ঠিকানাটা দিয়ে দাও ত।’

এক মিনিটের মধ্যেই ঠিকানা এসে গেল। সাতাশ নম্বর নির্মল বোস স্ট্রীট। লালমোহনবাবু বললেন রাস্তাটা ওঁর জানা। আমরা উঠে পড়লাম।

নির্মল বোস স্ট্রীট শ্যামবাজারেরই একটা গলি। জগন্ময়বাবুর বাড়ির ঠিকানায় গিয়ে খোঁজ করে জানলাম ভদ্রলোক এখনো সেখানেই আছেন। ফেলুদা চাকরের হাতে তার কার্ডটা পাঠিয়ে দিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের ডাক পড়ল। আমরা একটা তক্তপোষ পাতা ঘরে গিয়ে হাজির হলাম। তাতে একটি রোগা-রোগা কেন, রুগ্ন বললেই বোধহয় ঠিক বলা হবে—ভদ্রলোক বসে আছেন। আমরা ঘরে ঢোকাতেও তিনি বসেই রইলেন।

‘হঠাৎ আমার সঙ্গে ডিটেকটিভের কী প্রয়োজন পড়ল?’—ভদ্রলোকের প্রথম প্রশ্ন।

ফেলুদা বলল, ‘আপনি কি মহীতোষ রায় বলে একজন অভিনেতাকে চিনতেন?’

‘চিনতুম বললে ভুল হবে। সে এল, আর আমি বরবাদ হয়ে গেলুম—এই চেনা। কিন্তু সে ত দেখছি উধাও হয়ে গেছে।’

‘উধাও নয়, খুব সম্ভবত খুন হয়েছেন।’

‘খুন? অবিশ্যি আমার তাতে যে বুক ফেটে কান্না আসবে তা নয়। সে আমার ভাত মেরেছিল, সেটাই হচ্ছে আমার কাছে সব চেয়ে বড় ট্রুথ।’

‘তার মৃত্যুর আগে মহীতোষবাবু কতকগুলো হুম্‌কি চিঠি পেয়েছিলেন। সেই ব্যাপারে আপনি কোনো আলোকপাত করতে পারেন?

‘আমি চিঠিগুলো লিখেছিলাম কিনা সেইটাই জানতে চাইছেন ত?’

‘আপনার তার উপরে এখনো যথেষ্ট আক্রোশ আছে দেখছি।’

‘সেটা আপনি কথাটা তুললেন বলে। মহীতোষ রায়ের ব্যাপার অতীতের ব্যাপার। এই নিয়ে আর আমি মাথা ঘামাই না। আমি তারপরে দীপ্তি থিয়েটারে কাজ পেয়ে যাই, এখনো সেখানেই আছি, যা পাচ্ছি তাতে আমার চলে যায়। মদ ছেড়ে দিয়েছি। আমি সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। কেবলমাত্র একটা সমস্যা আছে সে হল হাঁপের কষ্ট। এছাড়া আমি দিব্যি আছি। মহীতোষের কথা আপনি মনে করিয়ে দিলেন বলে। নইলে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।’

‘আপনি অপ্সরা ছাড়ার পর মহীতোষবাবুর সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি?’

‘নো স্যার। একবারও না। এমনকি মঞ্চে পর্যন্ত ওকে দেখিনি। অপ্সরা থিয়েটারে আমি যাই না।’

০৪. এরপর তিন মাস কেটে গেছে

এরপর তিন মাস কেটে গেছে; এর মধ্যে মহীতোষবাবুর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তিনি যে আততায়ীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন তাতে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। অপ্সরা থিয়েটারে আরেকবার যাওয়া হয়েছিল ওখানে যদি কোনো খবর থাকে জানবার জন্য, কিন্তু তাতেও কোনো সুবিধা হয়নি। শুধু এই খবরটা পাওয়া গেছে যে মহীতোষ রায়ের জায়গায় আরেকজন অভিনেতা বহাল হয়েছে। এঁর নাম সুধেন্দু চক্রবর্তী। ইনি প্রফুল্লতে অভিনয় করছেন মহীতোষের জায়গায় এবং বেশ ভালো করছেন।

ফেলুদা এর মধ্যে মহীতোষ রায় সম্পর্কে আরো খবর নিয়েছে। ওঁর ছোট ভাই শিবতোষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছে যে সে দাদার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেনি।

ফেলুদা জিগ্যেস করল, ‘আপনার দাদার সঙ্গে আপনার বিরোধের কারণ কি শুধু সম্পত্তি?’

শিবতোষবাবু বললেন, ‘তার বেশি আর কারণের দরকার আছে কি? দাদা বাবাকে খোশামোদ করতেন। আমি সে দিকে যাইনি। খোশামোদ আমার ধাতে নেই। ছোট ছেলে বলে আমাকে সব সময় ছোট করে দেখা হয়েছে। বাবাও তাই করেছেন—দাদা ত বটেই। তাই আমি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হলাম। এতে বিরোধের সৃষ্টি হবে তাতে আর আশ্চর্য কী?’

কথাগুলো শুনে আমার মনে হচ্ছিল শিবতোষবাবুর এখনো পুরোমাত্রায় আক্রোশ রয়েছে দাদার উপর।

ফেলুদা বলল, ‘আপনি মহীতোষবাবুর মৃত্যু সম্বন্ধে কোনো মন্তব্য করতে চান কি? এটা হয়ত আপনি বোঝেন যে তিনি যদি আততায়ীর হাতেই প্রাণ হারান, তাহলে সেই আততায়ী আপনি হওয়া কিছু আশ্চর্য নয়।’

‘আমি গত পাঁচ বছর দাদার মুখ পর্যন্ত দেখিনি। তাঁর সঙ্গে আমার সমস্ত সম্পর্ক চুকে গিয়েছিল। আর তাঁর থিয়েটারের জীবনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না।’

‘যেদিন মহীতোষবাবু নিখোঁজ হন সেদিন সন্ধ্যাবেলা ছটা থেকে আটটার মধ্যে আপনি কী করছিলেন মনে পড়ে?’

‘রোজ যা করি তাই করছিলাম; আমার বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলছিলাম।’

‘কোথায়?’

‘সর্দার শঙ্কর রোড। এগারো নম্বর। অনুপ সেনগুপ্তর বাড়ি। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।’

ফেলুদা এটা চেক করার জন্যে সর্দার শঙ্কর রোডে শিবতোষবাবুর বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিল। তিনি বলে দেন যে তাদের বাড়িতে রোজ তাসের আড্ডা হয় এবং শিবতোষবাবু নিয়মিত আসেন।

একটা বড় সাসপেক্টকে তাই ফেলুদাকে নাকচ করে দিতে হল।

পরদিন সকালে লালমোহনবাবু এসে বললেন, ‘মশাই, এ কেসটা কোনো কেসই না। আপনি মিথ্যে এটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। তার চেয়ে চলুন আমরা দিন চারেকের জন্য কোথাও ঘুরে আসি। আমারও মাথায় একটা প্লট আসছে বলে মনে হচ্ছে, আর আপনিও মাথাটা একটু সাফ করে নিতে পারবেন।’

‘কোথায় যাবেন?’ ফেলুদা প্রশ্ন করল।

‘দীঘা গেলে কেমন হয়? ওটা ত এখনো দেখা হয়নি।’

‘বেশ তাই হোক। আমারও মনে হয় এ কেসটার কোনো নিষ্পত্তি হবে না। মহীতোষের হত্যাকারী আইনের হাত থেকে পার পেয়ে যাবে।’

আমরা পরদিনই দীঘা গিয়ে হাজির হলাম। টুরিস্ট লজে বুকিং ছিল, দিব্যি আরামে থাকা যাবে বলে মনে হল। আর তার উপর সমুদ্রে স্নান। লালমোহনবাবু একটা নতুন লাল সুইমিং কসট্যুম কিনে এনেছিলেন।

দীঘাতে কলকাতার খবরের কাগজ আসতে আসতে সন্ধ্যে হয়ে যায়। তিনদিনের দিন আনন্দবাজারটা হাতে নিয়ে প্রথম পাতা দেখেই ফেলুদা প্রায় লাফিয়ে উঠল।

‘সর্বনেশে খবর।’

‘কী ব্যাপার?’ লালমোহনবাবু আর আমি একসঙ্গে বলে উঠলাম।

‘অপ্সরা থিয়েটারের প্রধান অভিনেতা খুন!’ বলল ফেলুদা, ‘এ কি আরম্ভ হয়েছে বল্‌ ত দেখি!’

খবরটা পড়ে দেখলাম। বলেছে অপ্সরা থিয়েটারের প্রধান অভিনেতা নেপাল লাহিড়ী দুদিন আগে থিয়েটারের পর ট্যাক্সিতে বাড়ি ফিরছিলেন, পথে এক বন্ধুর বাড়িতে যাবেন বলে ট্যাক্সি থেকে নামেন। বন্ধুর বাড়ি একটা গলির মধ্যে। সেই গলিতেই তাকে ছোরা মেরে খুন করা হয়। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে, তারা তদন্ত চালাচ্ছে। নেপালবাবুর স্ত্রী ও একটি বারো বছরের ছেলে আছে; তাঁরা এ বিষয় কোনো আলোকপাত করতে পারেননি।

‘তাহলে কী হবে?’ লালমোহনবাবু প্রশ্ন করলেন।

‘তাহলে একবার আপনাকে যেতে হবে অপ্সরা থিয়েটারে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে।’

‘কেন, আমাকে কেন?’

কারণ আমার পা-টা আজ মচকেছে সমুদ্রে স্নান করার সময়। কাল ভালো রকম ব্যথা হবে বলে মনে হচ্ছে।’

‘তাহলে চলুন আজই ফেরা যাক। কলকাতায় গিয়ে চুন-হলুদ দিয়ে পা-টা বেঁধে ফেলবেন।’

‘আপনি পারবেন ত আমার ভূমিকা নিতে?’

‘তা অ্যাদ্দিন যখন আপনার সঙ্গে রয়েছি তখন কিছুটা জ্ঞানগম্মি ত হয়েইছে।’

আমরা সেদিনই কলকাতায় ফিরে এলাম। কথা হল পরদিন সকাল ন’টায় লালমোহনবাবু আমাদের বাড়ি আসবেন, ফেলুদা তাঁকে কিছুটা তালিম দিয়ে দেবে, তারপর দশটা নাগাদ আমরা দুজনে যাব অপ্সরা থিয়েটার।

পরদিন সকালে ফেলুদার কাছে তালিম নিয়ে আমরা ঠিক দশটায় পৌঁছে গেলাম অপ্সরা থিয়েটারে। লালমোহনবাবুর গদগদ ভাব, বললেন, ‘আমার অনেকদিনের আপশোষ ছিল যে তোমার দাদাকে আরেকটু সক্রিয় ভাবে সাহায্য করতে পারি না। এইবারে তার সুযোগ এসেছে।’ ভদ্রলোক আজ ধুতি পাঞ্জাবীর বদলে প্যান্ট শার্ট পরে এসেছেন; বললেন এতে কাজটা অনেক চটপটে হয়। ‘ওভারনাইট কার্ড ছাপিয়ে নিলুম আমার নামে, দেখতে কেমন হয়েছে।’

কার্ড নিয়ে দেখি তাতে ইংরিজিতে লেখা রয়েছে ‘লালমোহন গাঙ্গুলী, রাইটার।’

‘দিব্যি হয়েছে’, আমি বললাম।

দারোয়ানের হাতে একটা কার্ড ম্যানেজারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হল, তিন মিনিটের মধ্যে আমাদের ডাক পড়ল।

কৈলাসবাবুকে দেখে মনেই হল না আমাদের উনি চিনতে পেরেছেন। বেশ রুক্ষভাবেই বললেন, ‘শুনুন, আমার এখানে এখন বিশেষ গোলমাল। আপনি যদি নতুন নাটক নিয়ে এসে থাকেন ত সে অন্য সময় হবে। এই কটা দিন বাদ দিন।’

লালমোহনবাবু জিভ কেটে বললেন, ‘নতুন নাটক নয় স্যার; আমি এসেছি প্রদোষ মিত্র প্রাইভেট ইনভেসটিগেটরের প্রতিভূ হয়ে। উনি অসুস্থ, তাই নিজে আসতে পারলেন না। উনি এর আগে মহীতোষ রায়ের ব্যাপারে একবার আপনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তখন আমিও এসেছিলাম ওঁর সঙ্গে।’

‘হ্যাঁ—মনে পড়েছে। তা আপনি কী জানতে চাইছেন? খবরের কাগজে যা বেরিয়েছে তার বেশি কিছু বলার নেই।’

‘একটা প্রশ্ন ছিল—নেপালবাবুও কি মহীতোষবাবুর মতো হুম্‌কি চিঠি পেয়েছিলেন?’

‘পেয়েছিল, তবে সে বিষয় প্রথম কদিন চেপে রেখেছিল। কোনো পাত্তা দেয়নি। তারপর তিনদিন আগে প্রথম আমাকে বলে। চিঠি পাচ্ছিল প্রায় দশদিন থেকে।’

‘সে চিঠি আপনি দেখেছেন?’

‘দু-তিনটে দেখেছি। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা। হুম্‌কি চিঠি যেরকম হয় সেরকমই আরকি। আমি ওকে সাবধানে থাকতে বলি, কিন্তু নেপাল মঞ্চে হিরো সাজত বলে নিজেকেও একটা হিরো বলে মনে করত। সে বলে, “এসব হুম্‌কিতে আমি ঘাবড়াই না”।

‘তিনি থাকতেন কোথায়?’

‘নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য লেনে; সাতাশ নম্বর।’

‘উনি কি বিবাহিত ছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘কাগজে লিখেছে উনি ওঁর এক বন্ধুর বাড়ি যাবেন বলে ট্যাক্সি থেকে নেমেছিলেন। এই বন্ধুটি কে আপনি জানেন?’

‘গলিতে বাড়ি বলে যখন বলছে তখন শশধর চাটুজ্যে বলে মনে হয়। সেও অভিনেতা, রূপম্‌ থিয়েটারে অভিনয় করে।’

‘অপ্সরা থিয়েটারে ওঁর কোনো শত্রু ছিল না?’

‘সে আর আমি কি করে বলব বলুন। প্রধান অভিনেতাকে সকলেই ঈর্ষা করে। সে অর্থে শুধু আমাদের থিয়েটারে কেন, অন্য থিয়েটারেও নেপালের শত্রু ছিল। তাকে সরাতে পারলে আমার থিয়েটার কানা হয়ে যাবে এটা অনেকেই জানত।’

‘আপনাদের থিয়েটার কি তাহলে এখন বন্ধ?’

‘আজ প্রফুল্লর লাস্ট শো ছিল—সেটা আর হবে না। আমরা ত নতুন নাটক আলমগীর নামাবো বলে তোড়জোড় করছিলাম। নাম ভূমিকায় ত নেপালেরই করার কথা ছিল। এখন অন্য অ্যাকটরকে ট্রাই করা হচ্ছে। একজন নতুন লোক এসেছে।’

‘কেমন?’

‘মন্দ নয় বোধহয়। দাড়ি গোঁফ নিয়ে আলমগীর সাজবার চেহারা নিয়ে চলে এসেছে। তার আর মেক-আপ লাগবে না।’

এবার আমার একটা কথা মনে পড়ল। বললাম, ‘এখানকার মেন অ্যাকটরদের বাড়ির ঠিকানাগুলো নিয়ে নিন। ফেলুদা হয়ত ওদের কারুর কারুর সঙ্গে কথা বলতে চাইবে।’

‘হ্যাঁ, এটা ঠিক বলেছ’, বললেন লালমোহনবাবু।

কৈলাসবাবুকে বলতে আবার ঘণ্টা টিপে ওর সেক্রেটারিকে আনিয়ে আমাদের সব নাম ঠিকানাগুলো আনিয়ে দিলেন।

‘যেই বন্ধুর বাড়িতে সেদিন নেপালবাবু যাচ্ছিলেন, তিনি কোথায় থাকেন বলতে পারেন?’

‘কাগজে দেখেননি? খুনটা হয়েছে মতি মিস্ত্রি লেনে। কাজেই তিনিও সেখানেই থাকতেন।’

আমরা ভদ্রলোককে আর বিরক্ত না করে উঠে পড়লাম। একবার মতি মিস্ত্রি লেনে শশধর চাটুজ্যের বাড়ি যাওয়া দরকার।

০৫. মতি মিস্ত্রি লেনে

মতি মিস্ত্রি লেনে তিনজনের বেশি লোক পাশাপাশি হাঁটতে পারে না। আমরা গাড়ি বড় রাস্তায় দাঁড় করিয়ে গলির দিকে এগোলাম। মোড়ে একটা পান বিড়ির দোকান। মালিককে জিগ্যেস করতে বলে দিল শশধর চাটুজ্যে তিন নম্বর বাড়িতে থাকেন।

তিন নম্বরের দরজায় টোকা মারতে একজন ভদ্রলোক দরজাটা খুললেন।

‘কাকে চাই?’

‘আমরা শশধর চাটুজ্যের খোঁজ করছিলাম।’

‘আমিই সেই লোক। আপনাদের প্রয়োজন?’

লালমোহনবাবু একটা কার্ড বার করে দিতে ভদ্রলোকের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। ‘আপনিই কি সেই বিখ্যাত রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনীর লেখক?’

লালমোহনবাবু একটু বিনয় করলেন।

‘বিখ্যাত কিনা জানি না, তবে আমিই সেই লোক।’

‘আরে বাবা! আপনার সব বই যে আমার পড়া। তা হঠাৎ এ গরিবের বাড়িতে কী মনে করে?’

‘আমি এসেছি আমার বন্ধু গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্রের তরফ থেকে।’

‘তাঁর নামও ত শুনিচি! আপনারা ভেতরে আসুন, ভেতরে আসুন।’

এতক্ষণে ঘরের ভিতর ঢুকলাম আমরা। একটা তক্তপোষেই প্রায় ঘরটা ভরে আছে, তবে তার সঙ্গে দুটো কাঠের চেয়ার রয়েছে।

লালমোহনবাবু চেয়ারে বসে বললেন, ‘আপনার বন্ধুর খুনের ব্যাপারে আমরা তদন্ত করছি। সে সম্বন্ধে আপনি যদি কিছু বলেন।’

‘আমি আর কী বলব। সে আমার বাড়িতে ঢোকার আগেই খুন হয়। পাড়ার একটি ছেলে আমাকে খবর দেয়। বাইশ বছর হল আমাদের বন্ধুত্ব, যদিও রাইভ্যাল থিয়েটারে আমরা অভিনয় করতাম।’

‘ওঁর কোনো শত্রু ছিল বলে জানেন?’

‘নেপালের শত্রু থাকবে না? সে এত বড় একটা হিরো—অন্য সব অভিনেতার সে ঈর্ষার পাত্র। তার ত শত্রু থাকবেই।’

‘বিশেষ কারুর নাম মনে পড়ছে না?’

‘না। তা পড়ছে না। সেরকম কোনো নাম নেপাল করেনি আমার কাছে। সে কাউকে বিশেষ তোয়াক্কা করত না। একটু বেপরোয়া গোছের লোক ছিল। তার পেশায় তার সমকক্ষ খুব কমই ছিল। অন্য বহু থিয়েটার তাকে অনেক টাকার লোভ দেখিয়েছে। কিন্তু অপ্সরায় তার অভিনয় জীবনের শুরু বলে সে আর কোথাও যায়নি।’

‘তিনি যে হুম্‌কি চিঠি পাচ্ছিলেন সে কথা আপনাকে বলেছিলেন?’

‘বলেছিল বৈ কি, কিন্তু সে পাত্তাই দেয়নি। এক নাম করা জ্যোতিষী তাকে বলেছিল সে বিরাশি বছর বাঁচবে। সেটা সে বিশ্বাস করত। বলত ওই বয়স অবধি সে অভিনয় চালিয়ে যাবে, আর মঞ্চের উপর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবে।’

শশধরবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘এর বেশি আমার আর কিছু বলার নেই, জানেন। আর আমার মন মেজাজও ভালো নেই। আপনারা বরং আসুন।’

আমরা উঠে পড়লাম।

এক সকালের পক্ষে অনেক কাজ হয়েছে মনে করে আমরা বাড়ির দিকেই রওনা দিলাম। ফেলুদাকে সব রিপোর্ট করতে হবে।

ফেলুদা সব শুনেটুনে লালমোহনবাবুর খুব তারিফ করল। বলল, ‘আপনি ত একেবারে পেশাদারী গোয়েন্দার মতো কাজ করেছেন। যেটা বাকি রইল সেটা হচ্ছে অপ্সরা থিয়েটারের অন্য প্রধান অভিনেতাদের জেরা করা। বিশেষ করে টপ অভিনেতা—যাদের সঙ্গে নেপাল লাহিড়ীর হৃদ্যতাও ছিল, রেষারেষিও ছিল।’

‘তোমার পা কী বলে?’ আমি জিগ্যেস করলাম।

‘এখনো নট নড়ন-চড়ন। আরো দুদিন অন্তত লাগবে সারতে। ভালো কথা অভিনেতাদের সঙ্গে যখন কথা বলবেন তখন নতুনটিকেও বাদ দেবেন না।’

‘না না, তা ত নয়ই।’

লালমোহনবাবু ফেলুদার কাজটা করে খুব খোশমেজাজে ছিলেন। বললেন, ‘এ এক নতুন অভিজ্ঞতা হল। আসলে আপনার কাজটা যত কঠিন বলে মনে হয় তত কঠিন নয়।’

‘কঠিন কেবল রহস্যোদ্ঘাটন।’

‘তা বটে, তা বটে। সেটা এখনও পারব না নিশ্চয়ই। আর সেরকম দাবীও করছি না। তবে একটা কথা বলতে পারি—আজ ওখানে আমাকে দেখলে আপনি চিনতেই পারতেন না।’

‘বটে?’

‘সেন্ট পারসেন্ট।’

‘ওখানে কি মহড়া চলছে?’

আমি বললাম, ‘চলছে বোধ হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই ত আলমগীর শুরু হবে।’

‘তাহলে ম্যানেজারকে টেলিফোন করে কোন সময় গেলে সকলের সঙ্গে দেখা হবে আর কথা বলা যাবে সেটা জেনে নিবি।’

‘ভেরি গুড।’

‘পুলিশ দেখলি?’

‘কই, না ত।’

‘আছে নিশ্চয়ই! কাগজে ত লিখেছে তারা তদন্ত চালাচ্ছে। একবার ইন্‌সপেক্টর ভৌমিককে ফোন করব। তার আণ্ডারেই কেসটা পড়বে বলে মনে হচ্ছে।’

০৬. ইনস্পেক্টর ভৌমিকের সঙ্গে কথা

ইন্‌সপেক্টর ভৌমিকের সঙ্গে কথা বলে ফেলুদা জানল যে পুলিশ একটা গুণ্ডার দলকে সন্দেহ করছে। নেপালবাবুর নাকি একটা সোনার ঘড়ি ছিল সেটা খুনের পর পাওয়া যায়নি। খুবই দামী ঘড়ি, এবং সেটাই হয়ত খুনের কারণ হতে পারে। ফেলুদা বলল, ‘তাহলে থিয়েটারের সঙ্গে এ খুনের কোনো সম্পর্ক নেই বলছেন।’ তাতে ভৌমিক বললেন ওঁর তাই ধারণা। একটা গুণ্ডার দল কিছুদিন থেকেই নাকি ওই অঞ্চলে উৎপাত করছে। তারা প্রায় সকলেই দাগী আসামী। ছুরিটা নেপালবাবুর গায়েই বিঁধে ছিল, কিন্তু তাতে কোনো আঙ্গুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। সব শেষে ভৌমিক বললেন, তিনি আশা করছেন দিন তিনেকের মধ্যেই কেসটার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। ‘এবার আর আপনাকে কোনো ভূমিকা নিতে হবে না,’ বললেন ভদ্রলোক।

ফেলুদা টেলিফোনটা রেখে বলল, ‘ম্যানেজারকে ওই ফোনটা করে নে। অভিনেতাদের একবার জেরা করা দরকার।’

আমি তখনই অপ্সরা থিয়েটারে ফোন করলাম। বার তিনেক ডায়াল করবার পর লাইন পেলাম। ম্যানেজার বললেন, ‘পুলিশ এক দফা জেরা করে গেছে সকলকে। তবে আপনারা যদি আবার করতে চান তা হলে বিষ্যুদবার সকাল সাড়ে দশটায় আসুন। সেদিন এগারোটায় রিহার্সাল আছে; আপনাদের আধ ঘণ্টায় কাজ শেষ করতে হবে।’

আমি ফোনটা নামিয়ে রাখার পর ফেলুদা বলল, ‘টপ তিনজন আর ওই নতুন অ্যাকটরটিকে জেরা করলেই হবে।’

বিষ্যুদবার সাড়ে দশটার পাঁচ মিনিট আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম অপ্সরা থিয়েটারে। ফেলুদাকে দেখে এসেছি তার আজও পায়ে ব্যথা রয়েছে। লালমোহনবাবু আজ আরো স্মার্ট; তার হাঁটা চলা এবং কথা বলার ঢংই বদলে গেছে।

আমরা প্রথমে ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে বললাম যে আমরা তিনজন টপ অভিনেতা আর নতুন অভিনেতাটিকে প্রশ্ন করতে চাই।

‘তাহলে ধরণীকে দিয়ে শুরু করুন। ধরণী সান্যাল। সে এখানের সিনিয়ারমোস্ট আর্টিস্ট; ছাব্বিশ বছর হল কাজ করছে।’

আমাদের জেরার জন্য ম্যানেজারের পাশের ঘরটা খালি করে দেওয়া হল। ঘরে একটা সোফা আর তিনটে চেয়ার রয়েছে।

একজন বছর পঞ্চাশের ভদ্রলোক এসে ঢুকলেন। সিংহের কেশরের মতো চুল—তার বেশির ভাগই সাদা—ঢুলুঢুলু চোখ, গায়ের রং মাঝারি।

‘আমার নাম ধরণী সান্যাল,’ বললেন ভদ্রলোক, ‘আপনারা গোয়েন্দা?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, সোজাসুজি বললেন লালমোহনবাবু। ‘আমরা নেপাল লহিড়ীর ব্যাপারে তদন্ত করছি।’

‘নেপাল হুম্‌কি চিঠি পাচ্ছিল,’ বললেন ধরণীবাবু। ‘তাকে বললুম সাবধান হতে, সে কথা কানেই তুললে না। এর মধ্যে গেছে মতি মিস্ত্রি লেনে। আরে বাবা, বন্ধুর সঙ্গে কদিন না হয় নাই দেখা করলে। আমি ত ওকে পুলিশে খবর দিতে বলেছিলাম, কিন্তু ও গা-ই করেনি। ঠিক এরকম হয়েছিল আমাদের আরেক অভিনেতার—মহীতোষ রায়। অবিশ্যি মহীতোষের মৃত্যুটা থিয়েটারের পক্ষে তত বড় লস্‌ নয়।’

‘নেপালবাবুর কোনো শত্রু ছিল বলে জানেন?’

‘থিয়েটারের টপ পোজিশনে বসে থাকলে তার শত্রু থাকবেই। মানুষের ছয় রিপুর মধ্যে একটি হল মাৎসর্য। নেপালের শত্রু থাকবে না? তবে যদি জিগ্যেস করেন কোন্‌ শত্রু এই কুকীর্তি করেছে, বা শত্রু ছাড়া অন্য কেউ করেছে কিনা, তা বলতে পারব না।’

‘আপনার বাড়িতে তাঁর যাতায়াত ছিল?’

‘আজ্ঞে না। এমনিই থিয়েটারে হপ্তায় তিন দিন দেখা হচ্ছে, তার উপর সে আমার এমন বন্ধু ছিল না যে অন্যদিনও দেখা করব।’

‘যেদিন খুন হয় সেদিন সন্ধ্যাবেলা আপনি কী করছিলেন?’

‘কালিকিঙ্কর ঘোষের বাড়ি কেত্তন শুনছিলুম। ইচ্ছে করলে যাচাই করে নিতে পারেন।’

‘ঠিক আছে; আপনাকে আর কোনো প্রশ্ন করার নেই।’

এবার এলেন দীপেন বোস। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স, মাথা ভর্তি কোঁকড়া চুল, ঠোঁটের কোণে একটা সিগারেট, দাড়ি-গোঁফ নেই।

ভদ্রলোক প্রথমেই বললেন, ‘আমি আর নেপাল প্রায় এক সঙ্গেই অপ্সরা থিয়েটারে জয়েন করি। সে ছিল জাত অভিনেতা। আমারও অ্যাম্বিশন ছিল, কিন্তু দেখলাম নেপালের সঙ্গে পেরে উঠব না।’

‘তাতে আপনার মনে ঈর্ষা জাগেনি?’

‘তা জেগেছে বৈ কি। বিলক্ষণ জেগেছে। অনেকদিন মনে মনে ভেবেছি—এই লোকটা আমার পথে কাঁটা হয়ে রয়েছে—এটাকে সরানো যায় না?’

‘এই চিন্তাকে কার্যে পরিণত করার ইচ্ছা হয়নি কোনোদিন?’

‘পাগল! আমরা ছাপোষা লোক। আমাদের দিয়ে কি খুনখারাপি হয়? নাটক করি, তাই নানারকম নাটকীয় চিন্তা মাথায় আসে—ব্যস্, ওই পর্যন্ত।’

‘যেদিন খুনটা হয় সেদিন সন্ধ্যাবেলা আপনি কী করছিলেন?’

‘বায়স্কোপ দেখছিলাম। তবে প্রমাণ দিতে পারব না। টিকিটের অর্ধাংশ আমি কখনো রাখি না।’

‘কী ছবি দেখলেন?’

‘মনের মানুষ।’

‘কেমন লাগল?’

‘থার্ড ক্লাস।’

‘ঠিক আছে, আপনি আসতে পারেন।’

তৃতীয় অভিনেতার নাম ভুজঙ্গ রায়। এঁর বয়স পঞ্চাশের উপর, চোখা নাক, চোখ কোটরে বসা, গাল তোবড়ানো, মাথার চুল পাতলা হয়ে এসেছে।

‘আপনার সঙ্গে নেপালবাবুর সদ্ভাব ছিল?’

‘এই থিয়েটারে নেপালই ছিল আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু।’

‘তাঁর মৃত্যু সম্বন্ধে আপনার কিছু বলার আছে?’

‘এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি থিয়েটার-মহলে অনেকদিন হয়নি। নেপাল ছিল আশ্চর্য অভিনেতা। আমার সঙ্গে কোনোদিন ক্ল্যাশ হয়নি, কারণ ও করত নায়কের রোল আর আমি করতুম ক্যারেকটার পার্ট।’

‘উনি হুম্‌কি চিঠি পাচ্ছিলেন সেটা আপনাকে বলেছিলেন?’

‘প্রথম দিনই। আমি ওকে ওয়ার্নিং দিই—এসব চিঠি উড়িয়ে দিও না, আর বিশেষ করে মতি মিস্ত্রি লেনে কিছুদিন যাওয়া বন্ধ কর। ও পাড়াটা নটোরিয়াস। কে কার কথা শোনে? নেপালের বিশ্বাস ছিল তার আয়ু বিরাশি বছর—সেটা কেউ খণ্ডাতে পারবে না।’

‘তাহলে আপনার ধারণা গুণ্ডার হাতেই তাঁর মৃত্যু হয়?’

‘তাই ত মনে হয়, কারণ তার দামী ঘড়িটাও ত পাওয়া যায়নি। সোনার ওমেগা ঘড়ি, দাম ছিল সাত হাজার টাকা।’

ভুজঙ্গবাবুকে ছেড়ে দিলাম। উনি আমাদের ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলেন।

এবার এলেন নতুন অভিনেতা, নাম সুধেন্দু চক্রবর্তী। প্রথম দেখে একটু হকচকিয়ে যেতে হয়, কারণ মোগলাই দাড়ি আর গোঁফ দেখে মনে হয় উনি মেক-আপ নিয়ে রয়েছেন। বললেন, অপ্সরা থিয়েটারে আলমগীর হচ্ছে শুনেই তিনি দাড়ি রাখতে আরম্ভ করেন। আগে শুধু গোঁফ ছিল।

‘আপনি এর আগে কোথায় অভিনয় করতেন?’ লালমোহনবাবু প্রশ্ন করলেন।

‘কোথাও না। দু-একটা আপিস ক্লাবে করেছি। আমার প্লাইউডের ব্যবসা ছিল। তবে অভিনয় আমার নেশা। আর কিছু না করার থাকলে আমি নাটকের বই খুলে পার্ট মুখস্থ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতাম। এখন অবশ্য তার আর দরকার হবে না।’

‘আপনি কি আলমগীরে পার্ট পেয়ে গেছেন?’

‘সে বিষয় সন্দেহ নেই, তবে কোন্‌ পার্ট সেটা এখনো স্থির হয়নি। মেন পার্টও হতে পারে।’

‘আপনি থাকেন কোথায়?’

‘অ্যামহার্স্ট রো।’

‘ব্যবসা কি এখন ছেড়ে দেবেন?’

‘হ্যাঁ। অ্যাকটিংই আমার ধ্যান ছিল; সুযোগ পাইনি বলে ব্যবসা চালাচ্ছিলাম।’

ফেলুদাকে যাতে ঠিকভাবে রিপোর্ট দিতে পারি তাই আমি কথোপকথনটা টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করে নিচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম লালমোহনবাবু প্রশ্নগুলো করছিলেন নিজেকে ফেলুদা হিসেবে কল্পনা করেই। এটা আমাদের কাছে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।

সুধেন্দুবাবুকে আর একটাই প্রশ্ন করার ছিল।

‘আপনার সঙ্গে নেপালবাবুর আলাপ হয়েছিল?’

‘সামান্যই। তবে ওঁর অভিনয় আমি আগে অনেক দেখেছি। খুব ভালো লাগত।’

০৭. আমাদের রিপোর্ট

ফেলুদা খুব মন দিয়ে আমাদের রিপোর্ট শুনল। তারপর বলল, ‘আমার অ্যাবসেন্সে ত তোরা বেশ চালিয়ে নিতে পারছিস।’

লালমোহনবাবু বললেন, ‘প্রশ্ন করাটাতে খুব একটা বুদ্ধি লাগে না, আসল কথা হচ্ছে উত্তরগুলো থেকে কী বোঝা গেল। আমি ত মশাই এখনো যেই তিমিরে সেই তিমিরে। আর গুণ্ডা যদি মেরে থাকে লাহিড়ীকে তাহলে ত পুলিশ তার কিনারা করবেই।’

‘গুণ্ডারা হুম্‌কি চিঠি দিয়ে খুন করে না।’

‘তা বটে। তা আপনার কি মনে হয় নেপাল লাহিড়ী আর মহীতোষ রায়কে একজন লোকই খুন করেছে?’

‘একজন বা একই দল। সেটাই ত স্বাভাবিক।’

‘কিন্তু মোটিভটা—?’

‘ধরুন যদি অন্য থিয়েটারের লোক খুনটা করে থাকে, সেখানে ত স্পষ্ট মোটিভ রয়েছে। অপ্সরা থিয়েটারে এখন টপ দুজন অভিনেতাই চলে গেল। ওদের আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে কি কম সময় লাগবে?’

ফেলুদার পায়ে এখনো বেশ ব্যথা। বোধহয় এক্স-রে করাতে হবে। ব্যাণ্ডেজ-বাঁধা পা কফি টেবিলের উপর তুলে ও সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিল। বলল, ‘তোরা ত অনেক কাজ করলি, এবার আমায় একটু নিরিবিলি কাজ করতে দে!’

‘কী কাজ করবে তুমি?’

‘চিন্তা করব। একটা আলোর আভাস দেখতে পাচ্ছি অন্ধকারের মধ্যে। সেইটে আরো উজ্জ্বল হওয়া দরকার।’

লালমোহনবাবু বললেন, ‘আপনি ভাবুন; আমি আপনাকে কোনোরকম ডিসটার্ব না করে এক কাপ চা খাব। তপেশ ভাই, ভেতরে একটু বলে দিয়ে এস না!’

ফেলুদা দেখলাম ভ্রূকুটি করে চোখ বুজে ফেলেছে। শেষটায় কি ও ঘরে বসেই রহস্যের সমাধান করে ফেলবে নাকি?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ও একটা প্রশ্ন করল।

‘এইসব অভিনেতাদের সঙ্গে যে কথা বললি, এদের কারুর মধ্যে কোনো বাতিক লক্ষ করলি?’

আমি বললাম, ‘ভুজঙ্গ রায় নস্যি নেন; ধরণী সান্যাল বিড়ি খান আর সুধেন্দু চক্রবর্তী মশলা খান।’

‘গুড।’

আবার কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। ইতিমধ্যে শ্রীনাথ লালমোহনবাবুকে চা এনে দিয়েছে, ভদ্রলোক বেশ তৃপ্তিসহকারে পান করছেন। আমি একটা পত্রিকার পাতা উল্টে যেতে লাগলাম। ফেলুদার কাছে নানারকম পত্রিকা আসে, তার বেশির ভাগই অবিশ্যি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে চলে যায়।

মিনিট পাঁচেক নিস্তব্ধতার পর ফেলুদার দিকে চেয়ে দেখি ও চোখ খুলেছে, আর সেই চোখ জ্বলজ্বল করছে।

‘লালমোহনবাবু’, চাপা স্বরে বলল ফেলুদা।

‘আজ্ঞে?’

‘এই যে সুধেন্দু চক্রবর্তী—ইনি কি মাঝারি হাইটের ভদ্রলোক?’

‘হ্যাঁ।’

‘ফরসা রং?’

‘বছর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বয়স?’

‘হ্যাঁ—কিন্তু আপনি এঁকে চেনেন নাকি?’

‘শুধু আমি নয়, আপনারাও চেনেন’।

‘বলেন কি?’

‘এবার বোধহয় ঘরে বসেই রহস্যোদ্ঘাটন হয়ে গেল।’

‘অ্যাঁ!’

‘দাঁড়ান, আগে ইন্‌সপেক্টর ভৌমিককে একটা ফোন করি।’

আমি ফেলুদার হয়ে নম্বরটা ডায়াল করে ফোনটা ওর দিকে এগিয়ে দিলাম। ফেলুদা বলল, ‘কে, হরিদাসবাবু? আমি প্রদোষ মিত্র কথা বলছি!—শুনুন, ওই অপ্সরা থিয়েটারের মামলাটা—আমার মনে হয় গুণ্ডাদের পিছনে সময় নষ্ট না করাই ভালো, কারণ আমি জেনে গেছি কে খুনটা করেছে। আমি ত চলৎশক্তিরহিত কাজেই আপনাকেই আসতে হবে আমার কাছে। আমি নাইনটি নাইন পার্সেন্ট সিওর…ঘণ্টা খানেকের মধ্যে এলেই হবে।’

ফেলুদা ফোন রেখে দিল। আমরা ওর মুখের দিকে চেয়ে রয়েছি। ‘খুব জানতে ইচ্ছে করছে, তাই না ঠিক আছে তোদের আর সাসপেন্সে রাখব না। ব্যাপারটা জলের মতো সোজা, অথচ জিলিপির মতো প্যাঁচালো! একটা কথা বলতেই হবে—হ্যাট্‌স অফ্‌ টু দ্য মার্ডারার। আশ্চর্য ফন্দি এঁটেছিল। ফেলু মিত্তিরের পর্যন্ত ধোঁকা লেগে গিয়েছিল। আসলে এটা স্রেফ ঈর্ষার ব্যাপার। নেপাল লাহিড়ীকে সরিয়ে প্রধান অভিনেতার স্থান দখল করার চেষ্টা; তার জন্যেই খুন।’

‘কিন্তু মহীতোষ রায়?’

‘তিনি খুন হননি।’

‘অ্যাঁ!’

‘না। তিনি এমনভাবে ঘটনাটাকে সাজিয়েছিলেন—হুম্‌কি চিঠি থেকে আরম্ভ করে—যাতে মনে হয় তিনি খুন হয়েছেন। আসলে তিনি এখনো জীবিত এবং বহাল তবিয়তে রয়েছেন ছদ্মবেশে এবং নতুন ঠিকানায়। লেকে গিয়েছিলেন তিনি শুধু মশলার কৌটোটা ফেলে আসতে। তারপর গা ঢাকা দিলেই লোকের সন্দেহ হবে যে তিনি খুন হয়েছেন এবং তাঁর মৃতদেহ লেকের জলে ডুবে রয়েছে।’

‘আশ্চর্য মাথা বটে লোকটার।’

‘তারপর তিন মাসে দাড়ি গোঁফ গজিয়ে অপ্সরা থিয়েটারে আগমন। দাড়ি গোঁফে মানুষের চেহারা একদম বদলে যায়। তাই আপনারা চিনতে পারেননি। অপ্সরাতে অভিনেতা দরকার—সুতরাং ওঁকে না নেওয়ার কোনো কারণ নেই, বিশেষত যখন সুপুরুষ চেহারা আর কণ্ঠস্বর ভালো।’

‘সুধেন্দু চক্রবর্তী!’

‘ইয়েস স্যার। মশলার অভ্যাস এখনো যায়নি—যদিও আপনাদের সামনে খেয়ে লোকটা কাঁচা কাজ করেছে। যাই হোক, তাঁর প্ল্যান একেবারে ষোল আনা সফল হত, যদি না আপনারা আমাকে সাহায্য করতেন। লোকটা একটা পাকা খুনী বনে গিয়েছিল স্রেফ উচ্চাভিলাষের বশে। আংটি চুরিটা অবশ্য স্রেফ ভাঁওতা। কিন্তু ফেলু মিত্তিরকে ত সে চেনে না। আমার কাছে এসে যে কত বড় ভুল করেছে এবার সে বুঝতে পারবে।’

ফেলুদা যে ব্যাপারটা ঠিকই ধরেছিল সেটা অবিশ্যি পরদিনই ইন্‌সপেক্টর ভৌমিকের টেলিফোনে জানা গেল।

লালমোহনবাবু আমাকে আলাদা পেয়ে বললেন, ‘তোমার দাদার সঙ্গে আমাদের তফাতটা কোথায় সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।’

‘কোথায় তফাত?’

লালমোহনবাবু তাঁর টাকের উপর ডান হাতের তর্জনীর ডগা দিয়ে টোকা মেরে বললেন—‘মাথায়!’

(সমাপ্ত)

Inspire Literature
Inspire Literaturehttps://www.inspireliterature.com
Read your favourite inspire literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments