Wednesday, June 19, 2024
Homeউপন্যাসসাতকাহন (২য় খন্ড) - সমরেশ মজুমদার

সাতকাহন (২য় খন্ড) – সমরেশ মজুমদার

Table of contents

০১. কাকভোর বলে কিছু নেই এখানে

কাকভোর বলে কিছু নেই এখানে। রাতটাকে একটানে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দিন এসেই জাঁকিয়ে বসে। সেই যে সূর্যের উনুন জ্বলল সারা দিন ধরে চরাচর পুড়িয়ে খাক করে দিলেও শান্ত হয় না, দিন নিবে গেলেও তেতে থাকে চারপাশ অনেকক্ষণ। ঘড়িতে যখন প্রায় পাঁচটা, ছায়া সরতে শুরু করেছে পৃথিবীতে, দীপাবলী স্নান সেরে অফিসঘরে চলে এসেছিল। এই একটু সময় প্ৰাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারা যায়। তার আবাস এবং অফিস একই বাড়িতে। পেছনের তিনটে ঘরে সংসার, সামনের তিনটে ঘরে অফিস। ভেতরের উঠোনে একটি গভীর কুয়া আছে। যার জল নামতে নামতে এখন আর চোখে দেখা যায় না। দড়ি নামিয়ে বালতিতে ভরে তুললেও ছেঁকে নিতে হচ্ছে। জষ্ঠি মাসেই যদি এই অবস্থা, আষাঢ়ে কি হবে।

এখন অফিসে কারো আসার কথা নয়। তবে এসে পড়বে। এই সময় অফিস বসে ছটায়, দশটায় যে যার বাড়িতে। আবার সাড়ে তিনটেয় এসে সাড়ে ছটায় ফিরে যাওয়া। ওই সাড়ে তিনটের সময় আসাটায় কষ্টের, শরীর পুড়ে যায়। জানলা খুলে দিয়ে চেয়ারে বসল দীপাবলী। বড়জোর নটা পর্যন্ত এটাকে খুলে রাখা যাবে। ততক্ষণ হাওয়া না আসুক, আকাশ তো দেখা যাবে। চাবি ঘুরিয়ে ড্রয়ার খুলতেই চিঠিটা নজরে এল। গতকালের ডাকে এসেছে। একটা জবাব লেখা দরকার। কাগজ টেনে নিল সে।

অমল। আপনার চিঠি পেয়ে আরাম লাগল। মাসীমার শরীর ঠিক নেই জেনে অবশ্য ভাল লাগেনি। কি করছেন মশাই? ভাল ডাক্তার দেখাচ্ছেন তো? এইটে লিখেই অবশ্য মনে হল আমি অবান্তর ভাবছি। মাসীমার ব্যাপারে আপনি অবহেলা করার মানুষ নন।

আমার কথা আপনি জানতে চেয়েছেন। আমি এখন যেখানে আছি সেখানে প্রকৃতির সঙ্গে সবুজের কোন সম্পর্ক নেই। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানগুলো এখানে বসে স্বপ্ন বলেই মনে হয়। শ্রাবণে পথ ভুলে দুই-তিন টুকরো মেঘ যদি আকাশে আসে তাহলে স্থানীয় মানুষ মুগ্ধ চেখে তাকায় বলে শুনেছি। সারা বছরে সবসমেত চব্বিশ ঘণ্টা বৃষ্টি হয়েছে এমন কথা কেউ বলতে পারেননি। মাটি ফেটে চৌচির। হাতে নিলে ঝুরু ঝুরু ধুলো হয়ে ঝরে পড়ে। মাটিকে বেঁধে রাখে যে রস তার অস্তিত্ব নেই এখানে। নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলালাইনটা এইখানে এসে বড় সত্যি বলে বুঝেছি। সবুজ নেই কারণ গাছে পাতা নেই অথচ নিম্পত্র গাছেরা দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রকৃতিতে যেসব মানুষেরা বেঁচে আছে তারা জানে না কেন বেঁচে আছে! মেদ দূরের কথা, মাংস খুঁজে পাওয়া যাবে না কারো শরীরে। আমার কাজ এদের নিয়ে। ঢাল নেই তলোয়ার নেই তবু যুদ্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে আমার কাজের লোক একটা চমৎকার শিক্ষা দিল। সকালে বেরিয়েছিলাম। ফিরতে দুপুর। রোদে পুড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে অফিসে ফিরে মনে পড়ল আজ সকালে ওকে বাজারের টাকা দিতে ভুলে গিয়েছি। ঘরে এক ফোঁটা তরিতরকারি নেই। খিদে পেয়েছিল খুব এবং সেই সঙ্গে আলস্য। তা থেকেই স্থির করলাম আজ উপোস দেব। বিকেল না হলে দোকানপাট খুলবে না। তখন রাত্রের ব্যবস্থা করা যাবে। ভেতরের ঘরে ঢুকে শুনলাম কাজের মেয়েটি আমাকে খেতে ডাকছে। জানেন, যা আমরা ফেলে দিই, গত দু-তিন দিন তরকারি কুটে ফেলে দেওয়া খোসা বা গোড়া সে সরিয়ে রেখেছিল। তাই দিয়েই বেঁধেছিল। খেতে গিয়ে অমৃত মনে হল। পরে বুঝেছি সে ওই দিয়েই রাতে অভ্যস্ত। আলু যার জোটে না অথচ খোসা পেয়ে যায় চেয়েচিন্তে সে তো খোসার রান্নাতেই সিদ্ধহস্ত হবে। এইটে আমাকে উৎসাহিত করল। আমি ঢাল তলোয়ার ছাড়াই যুদ্ধ করতে নেমেছি। এদের, এই এলাকার মানুষের জন্যে জল চাই, অমৃত নয়। অমৃতে তৃষ্ণা মেটে না।

চিঠি বড় হয়ে যাচ্ছে। আমি ভাল আছি। রজনী নিদ্রাহীন (গরমে), দীর্ঘ দগ্ধ দিন, আরাম নাহি যে জানে রে। আপনি যে কি করছেন। এবার ঘরে তাঁকে নিয়ে আসুন। মাসীমার পাশে যিনি সবসময় থাকবেন। একটু আগেভাগে জানালে ছুটি নিয়ে হাজির হবই। শুভেচ্ছা সহ, দীপাবলী।

চিঠিটা ভাঁজ করতে করতে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল সে। এখনই রোদে ঝলমল করছে চরাচর। এখানে বসলেই একটা ন্যাড়া গাছ নজরে পড়ে। গাছটার প্রতিটি ডাল বেঁকেচুরে আকাশের দিকে প্রতিবাদের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। সতীশবাবুর মুখে শুনেছে ওই গাছে নাকি প্রথমবার জল পড়লেই পাতা গজায়। অবশ্য বেশী দিন সেই পাতা হাওয়া খাওয়ার সুযোগ পায় না। দীপাবলী অনেক দূরে দৃষ্টি বোলালে। ফাটা মাটি আর শূন্য আকাশে রোদের রঙ পাল্টানো শুরু হয়ে গিয়েছে। বেশীক্ষণ তাকালে বুকের ভেতরটায় থম ধরে। নিজেকে নীরক্ত মনে হয়। শূন্যতা গলা টিপে ধরে।

ম্যাডাম!

দীপাবলী মুখ ফেরাল। চিঠি খামে ঢুকিয়ে বলল, বলুন সতীশবাবু।

ম্যাডাম, আপনি কি নিশ্চিত যে আজ এস. ডি. ও. সাহেব আসবেন!

নিশ্চয়ই, আমার সঙ্গে কথা হয়েছে ওঁর।

ও। ঘুরে দাঁড়ালেন প্রৌঢ়।

কেন জিজ্ঞাসা করলেন বলুন তো? দীপাবলী জানতে চাইল।

আমি এখানে আট বছর চাকরি করছি। আজ অবধি এস. ডি. ও. সাহেব মাত্র দুবার। এসেছেন। তাও বৃষ্টি পড়লে। চারজন এস. ডি. ও. সাহেব এই সময় বদলি হয়ে গিয়েছেন। তাই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আর হ্যাঁ, স্টাফদের তাহলে দুপুরে থাকতে বলি। উনি এসে না দেখতে পেলে–!

না, না। এখানকার নিয়মমত যেমন সবাই কাজ করেন তেমন করবেন। উনি যদি দুপুরে এসে যান আমিই কথা বলব! দীপাবলী এক মুহূর্ত ভাবল, আপনি শুধু নেখালির ফাইলটা আমাকে দিয়ে যান।

সতীশবাবু মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলে খামে আঠা সেঁটে ঠিকানা লিখল সে। সতীশবাবু ফাইলটা নিয়ে ফিরে এলেন, একটু বসতে পারি?

নিশ্চয়ই। বসুন।

সতীশবাবু বসলেন। রোগা বেঁটে খাটো মানুষ, মাথায় চুল আশিভাগ পেকে গিয়েছে। দুটো হাত কচলালেন, ম্যাডাম, আপনার আগে যাঁদের দেখেছি তারা মানুষ খারাপ ছিলেন না। তবে সবাই পুরুষমানুষ বলে এসেই বদলির চেষ্টা করতেন। এই হতচ্ছাড়া জায়গায় কে থাকতে চায় বলুন। আর যাঁরা বদলির চেষ্টা করেন তাঁদের কাজে মন বসতেই পারে না।

কিন্তু আপনি কাজ করতে চাইছেন। এখানকার মানুষের জন্যে কেউ কাজ করে না।

আমাকে চাকরি দেওয়া হয়েছে কাজ করার জন্যে, নয় কি?

কিন্তু আপনি কোন কাজ করতে পারবেন না, এইটে আমার অভিজ্ঞতা।

সতীশবাবু, চেষ্টা করতে দোষ কি?

এখানকার সাধারণ মানুষগুলোকে দেখেছেন? বুক পিঠ আলাদা চেনা যায় না। কারো পেটে ভাত দুরের কথা সেদ্ধ পর্যন্ত রোজ পড়ে না। অথচ কোন প্রতিবাদ করার ক্ষমতা নেই, কেড়ে খাওয়ার সাহস নেই। এদের কোন উপকার করবেন আপনি?

দীপাবলী অবাক হয়ে ঢাকাল, সতীশবাবু, আপনি কি কমিউনিস্ট?

চমকে উঠলেন প্রৌঢ়, না, না। আমি কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই।

সমর্থক নন কথাটা সত্যি নয়।

কেন?

আপনি তো ভোট দেন। ব্যালট পেপারে ছাপ দেওয়ার সময় সমর্থন জানানো হয়ে যায়।

মাথা নাড়লেন সতীশবাবু, আমি ভোট দিই না ম্যাডাম।

সে কি? কেন? আপনি সরকারি কর্মচারী, স্বাধীন ভারতের নাগরিক।

জানি, ভোট দেওয়া আমার উচিত, কিন্তু কাকে ভোট দেব বুঝতে পারি না। যে জিনিসটা নিজে বুঝতে পারি না সেইটে কখনও করি না। ব্রিটিশ আমলের অভ্যেস।

কোন আমল ভাল সতীশবাবু?

শুনতে খারাপ লাগবে, কাজের কথা যদি বলেন ব্রিটিশ আমলে ভাল কাজ হত।

ফাইলটা তুলে নিল দীপাবলী, আচ্ছা, এই নেখালির মানে কি? শব্দটা শুনলে মনে হয় খালি নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। অথচ ওই জায়গা থেকে নেওয়ার কিছু নেই।

না ম্যাডাম। লোকে বলে বটে নেখালি, আসলে জায়গাটার নাম নেইখালি। নেই, খালি হয়ে গেছে। বলার সময় উচ্চারণের দোষে অমন শোনায়।

তাই বলুন।

সতীশবাবু উঠে গেলেন। ফাইলে চোখ রাখল দীপাবলী। মোট বাহান্ন ঘর পরিবার আছে নেখালিতে। এরা বেশীর ভাগ জনমজুরি করে। পাঁচ মাইল দূরে অর্জুন নায়েকের জমি চাষ করতে যায় কেউ কেউ। সরকারি প্রকল্পে শ্রম দিয়ে টাকা পায় অনেকেই। কিন্তু সেই টাকার পরিমাণ এত কম এবং ধার শোধ করতে যা বেরিয়ে যায় তারপর দিনের অন্ন জোটানোই দায় হয়ে ওঠে।

নেখালি গ্রামে সতীশবাবুকে নিয়ে সে যখন প্রথম যায় তখন বিকেল। রোদ মরেছে, ছায়া ঘন হয়নি। সে এসেছে জানতে পেরেই পিলপিল করে কঙ্কালসার মানুষগুলো বেরিয়ে এসেছিল কুঁড়েঘরগুলো থেকে। হাঁউমাউ করে চিৎকার কান্নায় মিশিয়ে যা বলতে চেয়েছিল তা প্রথম বোধগম্য হয়নি দীপাবলীর। সে আতঙ্কিত হয়েছিল। এমন মানুষ একসঙ্গে দেখা আতঙ্ক। সতীশবাবু ধমকে রাগারাগি করে ওদের দূরে সরিয়ে রাখছিলেন। একটু একটু করে অভিযোগ বুঝতে পেরেছিল সে। এদের পেটে খাবার নেই, জল নেই, তিন ক্রোশ দূরে যে কুয়ো আছে জল তার তলায় চলে যাওয়ায় কাল এই গ্রামে কারো তৃষ্ণা মেটেনি। দুজন বুড়ো আর বাচ্চা গত সাত দিনে মরে গিয়েছে। ভগবান দেবীকে পাঠিয়েছে তাদের কাছে। এখন দেবী যদি তাদের না বাঁচায় তাহলে আর কোন পথ নেই।

মন্বন্তর দ্যাখেনি দীপাবলী, উপন্যাসে পড়েছে। আজ শিউরে ওঠার পর সে থমকে গেল। অভাবী মানুষেরা শ্রোতা পেলে শুধু নালিশের পর নালিশ জানিয়ে যায়। অর্জুন নায়েক তাদের যে পয়সায় কাজ করতে ডাকে দেবার সময় তার অর্ধেক দেয়। জিজ্ঞাসা করলে বলে ওই পয়সা জমিয়ে গ্রামে কুয়ো করে দেব। গ্রামের দুটি ছেলে এখন চুরি করতে শুরু করেছে। বয়স্করা তাদের নিষেধ করেছিল কিন্তু তারা বিদ্রোহী হয়েছে। চুপচাপ সমস্ত কথা শুনে গেল দীপাবলী। সে আবিষ্কার করল একটি শব্দ উচ্চারণ করলে তা কাঁপা শোনাবে নিজের কাছেই। সমস্ত গ্রাম ঘুরে সে হতশ্ৰী আর হতাশা প্রত্যক্ষ করল। এই মানুষগুলো কেন এখানে পড়ে আছে তাই তার মাথায় ঢুকছিল না। স্বাধীন ভারতবর্ষের একটি গ্রামের এমন বীভৎস চেহারা কজন শহুরে মানুষ জানে সন্দেহ আছে। মন্ত্রীরা যে জানেন না এটা সত্যি।

সতীশবাবু ওদের বোঝাচ্ছিলেন। আজ পর্যন্ত কোন অফিসার এই গ্রামে পা দেয়নি। এবার যখন একজন দিয়েছেন তখন নিশ্চয়ই একটা কিছু ব্যবস্থা হবেই। দীপা সতীশবাবুকে বলল, জনা চারেক মানুষকে বলুন আমার বাড়ির কুয়ো থেকে জল নিয়ে আসতে। তিরি বলে ঘণ্টা দুয়েক বাদে বাদে কুয়োতে জল জমে।

সতীশবাবু গলা নামালেন, এমন কাণ্ড করবেন না ম্যাডাম।

কেন? ছাগলকে বেড়ার ফাঁক দেখালে কি আর বাগান বাঁচাতে পারবেন?

তা হোক, আজ তো প্রত্যেকে একটু জল খেয়ে বাঁচুক।

অগত্যা সতীশবাবু ওদের প্রস্তাবটা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে হইচই পড়ে গেল। সবাই একসঙ্গে ছুটে যেতে চায় জল আনতে। সতীশবাবু বাধা দিয়ে জানিয়ে দিলেন চারজনের বেশী ওখানে গেলে ম্যাডাম রাগ করবেন। আর তিনি রেগে গেলে যে সমস্ত উপকার করবেন বলে ভাবছেন তা আর করবেন না। দীপাবলী দেখল, এতে কাজ হল।

নির্বাচিত চারজন রওনা হল পাত্র নিয়ে জল আনতে।

ফেরার পথে অন্ধকার নামল। দীপাবলী সতীশবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, লোকগুলো এমন অবস্থায় বেঁচে আছে, রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে সদরে?

না ম্যাডাম।

কেন?

এ প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না।

দীপাবলী মানুষটির আবছা মুখ দেখল। সতীশবাবু এখন টর্চ জ্বেলেছেন।

সে বলল, ফাইলে দেখছিলাম খরার সময় শীতের সময় এই ব্লকে কিছু টাকা এসেছিল, কোন্ খাতে খরচ হয়েছে তা নিশ্চয়ই বলতে পারবেন।

হাঁ পারব। খরার টাকা যখন হাতে এল তখন দু-এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। তাই খরচ করা যায়নি। শীতের কম্বল যখন এল তখন শীত চলে গিয়েছে।

ওগুলো গেল কোথায়?

টাকাগুলোর একটা হিসেব পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, কম্বল কিনে নিয়েছে গঞ্জের হরিরামবাবু। ওর একটা কাপড়ের দোকান আছে।

বাঃ, চমৎকার। আপনার বিবেকে লাগেনি একটু। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম ম্যাডাম। আপনি যদি কোন আদেশ করেন তাহলে আমি অমান্য করতে পারি?

একা রাজা ভোগ করেন না, মন্ত্রীরাও অংশ পান নিশ্চয়ই।

অস্বীকার করব না। তবে না নিলে চাকরি থাকত না।

দীপাবলী অবাক হয়ে গেল। এমন অকপট স্বীকারোক্তি সে কখনও শোনেনি। লোকটার ওপর রাগ হল না, বরং সে খুশী হল। হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করল, এখন বলুন তো কি কি কাজ করলে এদের ভালো হয়।

প্রথমে এই গ্রামে দুটো কুয়ো দরকার।

ডিপটিউবওয়েল হলে খুব ভাল।

কে যেন ওদের কুয়ো করে দেবে শুনলাম।

অৰ্জুন নায়েক।

তিনি কে?

ওঁর বাবা ছিলেন জমিদার। উনি ম্যাট্রিক পাস করে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বাপের সম্পত্তি বাড়িয়ে চলেছেন। এস. ডি. ও. সাহেব পুলিশ সুপার সাহেব ওঁর খুব কাছের মানুষ। তাই আমাদের পাত্তা দেন না, দারোগাবাবুকেও ডেকে পাঠান।

সেটা আমাদের দেখার কথা নয়। কিন্তু মজুরির টাকা অর্ধেক কেটে নিয়ে কুয়ো বানিয়ে দেবেন, এটাও ঠিক নয়। দীপাবলী বলল, ওঁর সঙ্গে কথা বলা দরকার।

ম্যাডাম। অর্জুন নায়েকের সঙ্গে আপনি যত কম কথা বলবেন তো ভাল।

কেন?

লোকটা চরিত্রহীন।

দীপাবলী জবাব দিল না। চুপচাপ বাকি পথ হেঁটে এল সতীশবাবুর টর্চের আলোয়। অফিসের সামনে সেই চারটে লোক বিব্রত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। দীপা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কি ব্যাপার? তোমরা জল নাওনি?

ওরা একই সঙ্গে বলে উঠল, ওদের জল নিতে দেওয়া হচ্ছে না। সতীশবাবু বললেন, আপনি যান ম্যাডাম, আমি দেখছি।

বাড়িতে ঢোকার দুটি পথ। পেছনের দরজা দিয়ে উঠোনে, আর অফিসের পাশ দিয়ে মূল দরজা খুলে তিরি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরে হ্যারিকেন জ্বলছে। এই ঘর দিয়েই

অফিসে ঢোকা যায়।

সতীশবাবু তিরিকে জিজ্ঞাসা করলেন, হ্যাঁরে, ওদের জল নিতে দিসনি কেন? মেমসাহেব তো ওদের পাঠিয়েছেন।

না। আমি দেব না জল নিতে। অদ্ভুত গলায় বলল তিরি। ওকে এই গলায় কথা বলতে কোন দিন শোনেনি দীপাবলী। সে বিরক্ত হল, দিবি না কেন?

ওরা যখন আমাকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তখন মনে ছিল না?

তুই নেখালির মেয়ে?

হুঁ। আর আমি এখন এখানে চাকরি করি, দুবেলা খেতে পাই বলে ওরা আমাকে রাস্তায় দেখলেই টিটকিরি দেয়। ওরা তবে কেন এসেছে জল নিতে এখানে? শেষের দিকে গলায় কান্না মিশল যেন।

সতীশবাবু বললেন, আহা। ওরা নিশ্চয়ই অন্যায় করেছে কিন্তু ম্যাডাম ওদের কথা দিয়েছেন যখন তখন একটা দিন জল নিয়ে যেতে দে।

গ্রামসুষ্ঠু লোক জল নিতে এলে আমরা কি বালি খেয়ে থাকব?

আর কেউ আসবে না। ওরাই শুধু নিয়ে যাবে। যা পেছনের দরজা খুলে দে। সতীশবাবুর কথা শেষ হওয়ামাত্র নিতান্ত অনিচ্ছায় তিরি চলে গেল দরজা খুলতে। ব্যাপারটা খুব অপছন্দ করল দীপাবলী। সতীশবাবু বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। যে গ্রাম সে দেখে এল তার ভাবনার সঙ্গে তিরির এমন আচরণ থেকে তৈরি বিরক্তি মিশে এক বিশ্রী মেজাজ তৈরী হয়ে গেল।

মিনিট পনের বাদে চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকে সামনের টেবিলে রেখে তিরি ফিরে যাচ্ছিল, দীপাবলী ডাকল, অ্যাই শোন!

মেয়েটা দাঁড়াল। এখন ওর পরনে দীপাবলীর অল্প রঙ ওঠা নীল শাড়ি। সেদিকে তাকিয়ে দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, এই বাড়িটায় আমি থাকি, তুই এখানে চাকরি করিস। কথাটা কখনও ভুলে যায় না।

মেয়েটা জবাব দিল না। দরজার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কথাগুলো বলেই দীপাবলীর মনে হল একটু রূঢ় হয়ে গেল যেন। মায়ের কাপ হাত বাড়িয়ে নিয়ে আবার প্রশ্ন করল, তকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল কেন?

উত্তর এল না। দীপাবলী দেখল তিরি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি তোকে একটা প্রশ্ন করেছি।

আমি এখানে চাকরি করছি বলে ওরা তাড়িয়ে দিল।

এখানে? তুই তো এখানে চার বছর চাকরি করছি। আমার আগে যাঁরা ছিলেন তাঁদের কাছেও তুই চাকরি করেছিল। তাতে অন্যায় কি হয়েছিল?

আপনার আগে যাঁরা ছিলেন তারা সব ছেলে।

দীপাবলীর কপালে ভাঁজ পড়ল, তুই কি রাত্রে এখানে থাকতিস?

প্রথম সাহেবের সময় থাকতাম না। পরের সাহেব থাকতে বলেছিলেন।

তুই থাকতিস কেন?

নাহলে আমার চাকরি চলে যেত।

চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল দীপাবলী, আগের সাহেবের সঙ্গে তো কোন মহিলা ছিলেন না। তবু তুই কোন সাহসে থেকে যেতিস রাত্রে?

আমি আর গ্রামে ফিরে যেতে চাইনি, তাই।

তুই, তুই কি বলছিস তা জানিস?

মাথা নেড়ে নীরবে হ্যাঁ বলল তিরি।

সমস্ত শরীরে জ্বলুনি শুরু হল প্রবল ঘেন্না এল মনে। মেয়েটাকে নির্লজ্জ, চরিত্রহীনা বলে মনে হল। এই মেয়ের সঙ্গে সে কদিন আছে অথচ সতীশবাবু কিছু বলেননি বলে ওঁর ওপরও খেপে গেল। এখানে চাকরিতে জয়েন করার সঙ্গে সঙ্গে সতীশবাবু বলেছিলেন, ম্যাডাম, আপনার কপাল ভাল, আগের অফিসারের কাছে যে মেয়েটি কাজ করত সে এখানেই আছে। সব কাজকর্ম জানে, আপনার অসুবিধে হবে না। অসুবিধে হয়নি। বরং মেয়েটির কাজকর্ম এবং ব্যবহার দেখে সে নিশ্চিত হয়েছিল। আজ সন্ধের আগে পর্যন্ত কোন খুঁত খুঁজে পায়নি।

তোকে ওরা গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ঠিকই করেছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল সে, আমার আর তাকে দরকার নেই।

তুমিও আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ? আর্তনাদ করে উঠল তিরি।

হ্যাঁ। আমি আর তোকে রাখব না।

কেন? আমি কি করেছি?

কি করেছিস জিজ্ঞাসা করতে লজ্জা করছে না?

না। আমি তোমার কোন কাজে ফাঁকি দিই না, দিই?

আমি সে কথা বলিনি।

তাহলে?

একটা পরপুরুষের সঙ্গে রাত কাটিয়েছিস এখানে, ছিঃ!

ও। যে লোকটা আমাকে এখানে থাকতে বাধ্য করেছিল তার কোন দোষ নেই?

হ্যাঁ। যে তোকে এখানে থাকতে বাধ্য করেছিল সে লম্পট। কিন্তু তাকে ছেড়ে যেতে দিলি কেন তুই? আর কেউ বাধ্য করেছিল বললে দৈাষ মাপ হয়ে যায় না। দীপাবলী মাথা নাড়ল, না। তুই চলে যা।

আমি কোথায় যাব দিদি?

আমি জানি না!

হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল তিরি। কাঁদতে কাঁদতে বলল, তুমি আমাকে মেরে ফেল না দিদি। এখান থেকে চলে গেলে হয় আমাকে বাজারে নাম লেখাতে হবে নয় বিষ—! কান্না থামছিল না।

চোখ বন্ধ করল দীপাবলী। নেখালি গ্রামের মানুষের চেহারার স্বাস্থ্যের সঙ্গে তিরির কোন মিল নেই। তার পূর্বসূরীরা মেয়েটিকে ব্যবহার করেছেন, প্রতিবাদ করলে ওর কি হতে পারত? নেখালি গ্রামে প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে জীবস্মৃত হয়ে বেঁচে থাকতে চায়নি তিরি। একটি কঙ্কালসার মানুষ হিসেবে তিরিকে ভাবতে সেও পারছে না কেন? আজ কথা না উঠলে সে কখনই জানতে পারত না। নিজের অতীতের কথা যে স্বীকার করে, তাকে আরও বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া কি উচিত কাজ। অতীতে কি করেছিল সেইটে বড়, না তিরি তার সঙ্গে কিরকম ব্যবহার করছে তাই বিচার্য? ওর তো ওইটেই নেশা নয়। তাহলে তার সঙ্গে এমন আন্তরিকভাবে থাকতে পারত না। দীপা বলেছিল, আমাকে আর এক কাপ চা করে দে, এটা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে।

নেইখালি গ্রামে দুটো গভীর কুয়ো আর টিউবওয়েল অবিলম্বে তৈরি করে দেওয়া দরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে চাষের খেতগুলোয় যেখানে বছরে একবারই লাঙল পড়ে। যেখানে শস্য আসে কি আসে না সেখানে সেচের ব্যবস্থা করা দরকার। এই জল গভীর কুয়ো থেকে তোলা যেতে পারে। মাটির যে গভীরত্বে জল বৈশাখ মাস পর্যন্ত টিকে। থাকে তার অনেক নিচে পৌঁছতে হবে। চাষ যদি সম্ভব না হয় এই অঞ্চলে এখনই কুটির শিল্প স্থাপন করা উচিত। অন্তত মুরগি চাষের জন্যে বেশী জল দরকার হয় না। অনেকগুলো পরিকল্পনা নিয়ে দিপাবলী এস ডি ওর সঙ্গে দেখা করেছিল। ভদ্রলোক আই এ এস করে সবে কাজে যোগ দিয়েছেন। এখনও এলাকাটা চিনে ওঠেননি। নেখালি গ্রামের বর্ণনা শুনে আঁতকে উঠে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনাদের মত মহিলা ওখানে আছেন কি করে?

আমার মত মহিলা মানে?

সরি, কথাটা অন্যভাবে বলা উচিত ছিল। আমি বলতে চেয়েছি সাধারণ মহিলাদের থেকে আপনাকে আলাদা মনে হয়।

ঠিকই। কিন্তু আমি চাকরি করতে এসেছি। আমার কাজ উন্নয়ন দেখা।

এস ডি ও বলেছিলেন, বাজেট পারমিট করবে কিনা জানি না, তবু আমি একবার নিজের চোখে দেখতে চাই। নইলে ডি এম বলুন আর মন্ত্রী কাউকে কনভিন্স করাতে পারব না।

ভদ্রলোকের কথাবার্তা খুব আশাজনক না হলেও খারাপ লাগেনি দীপাবলীর। অথচ সতীশবাবু বলে গেলেন তিনি আশাবাদী নন। এরকম ঘটনা নাকি সচরাচর এখানে ঘটে না। দীপাবলী ঠিক করল সে অপেক্ষা করবে। যদি ভদ্রলোক আজ না আসেন তাহলে আগামীকাল সে সদরে গিয়ে দেখা করবো ব্যাপারটার হেস্তনেস্ত না করে সে ছাড়বে না। যদি তাতেও ভদ্রলোকের সময় না হয় তাহলে ওপরতলায় সমস্ত ব্যাপারটা জানিয়ে চিঠি লিখবে।

বেলা দশটায় যখন চারজন কর্মচারী বাড়ি চলে গেলেন তখন সতীশবাবু এলেন ওর ঘরে, আমি কি থাকব?

না, আপনি বাড়িতে যান, বিশ্রাম নিন। উনি কখন আসবেন বুঝতে পারছি না।

যদি এসে পড়েন তাহলে তিরিকে পাঠাবেন, সঙ্গে সঙ্গে চলে আসব। আপনি একা ওঁকে নিয়ে নেখালিতে যাবেন না।

কেন?

গতকাল একটা কিছু ঘটেছে ওখানে যার জন্যে সবাই খেপে আছে।

কি ঘটেছে?

আমি ডিটেলস পাইনি। একটু আগে বংশীচরণ বলল কাল নাকি ওখানে খুব চেঁচামেচি হয়েছে। আচ্ছা চলি এখন। সতীশবাবু চলে গেলেন।

আরও দুটো ফাইল শেষ করে যখন দীপাবলী উঠতে যাবে ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির আওয়াজ হল। জানলাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তাপের কারণে, গাড়ি অফিসের সামনে এসে থামতেই দীপাবলী ব্যস্ত হয়ে উঠে বাইরের ঘরের দিকে এগোতে যাবে এই সময় দৌড়ে ভেতরে ঘরের দরজায় এল তিরি। সে হাঁপাচ্ছে, উত্তেজনা চোখে মুখে, দিদি, তুমি বাইরে যেও না।

অবাক হল দীপাবলী, মানে? কেন যাব না?

ওই বদমসটা এসেছে। ওকে দেখলে আমরা লুকিয়ে পড়ি।

কে এসেছে?

এই সময় বাইরের ঘরে কেউ বেশ মেজাজ নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, কি ব্যাপার? অফিস বন্ধ হয়ে গেল নাকি? লোকজন গেল কোথায়?

দীপাবলী এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দিতেই দেখতে পেল ধবধবে চোস্ত পাজামা আর আদ্দির কাজ করা পাঞ্জাবি পরা একটি লোক তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। বছর তিরিশ বয়স, একটুও মেদ নেই শরীরে, চোখ দুটো খুব ধারালো, চুলের কায়দা চোখে পড়ার। মত। দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে?

আমি? লোকটির যেন চমক ভাঙল। সঙ্গে সঙ্গে দুহাত জড়ো করে ঈষৎ ঝুঁকে নমস্কার করতে করতে বলল, আমি অর্জুন নায়েক। এই তল্লাটেই বাস করি। আপনি এখানে। পোস্টেড হয়ে এসেছেন শুনেছিলাম কিন্তু বড় দেরি করে ফেললাম দর্শন করতে, তবে ইংরেজরা একটা ভাল কথা বলে, বেটার লেট দেন নেভার। লোকটার কথা বলার সময়। একটা প্যাচপ্যাচে হাসি ঠোঁটে জড়ানো ছিল।

দীপাবলীর কয়েক মুহূর্ত লাগল। এই সেই অৰ্জুন নায়েক? সে বলল, এখন তো অফিস ছুটি। আপনার কোন দরকার থাকলে বিকেলে আসবেন। সন্ধের পরেও ওঁরা থাকেন।

অর্জুন মাথা নাড়ল ঠোঁট টিপে। তারপর বলল, মেমসাহেব কি আমাকে বসতে বললে খুব অসুবিধে বোধ করবেন?

মুখে হ্যাঁ চলে এসেছিল কিন্তু দ্রুত মন পরিবর্তন করল দীপাবলী, সতীশবাবুর টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে উল্টো দিকটা দেখিয়ে বলল, বসুন, কি বলার আছে বলুন। সে নিজে। সতীশবাবুর চেয়ারে গিয়ে বসল। অর্জুন নড়ল না, সেখানে দাঁড়িয়েই বলল, এটা কি ঠিক হল মেমসাহেব? কেরানিদের চেয়ারে আপনাকে মানাচ্ছে না।

আপনি বসতে চেয়েছিলেন আমি আপত্তি করিনি।

ও। ঠিক আছে। বেশ সমীহ করার ভঙ্গী নিয়ে অৰ্জুন এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে বেশ শব্দ করেই বসে পড়ল। পকেট থেকে একটা রুপোর কৌটো বের করে দুই আঙুলে জদা তুলে নিয়ে মুখে পুরল, আমি ভেবেছিলাম কোন বয়স্কা মহিলা বোধহয় বুড়ো বয়সে প্রমোশন পেয়ে এই পোস্টে এসেছেন। খুব ভাল খুব ভাল। হ্যাঁ, নাম তো বলেছি, একেবারে মহাভারতের নাম, ব্যবসা করি, জমিজমা আছে কিন্তু তার হাল তো দেখছেন, শালা নেচার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে জমির। তবু আপনাদের শুভেচ্ছায় ভাত কাপড়ের অভাব নেই।

আপনার নাম আমি শুনেছি।

আই বাপ! আপনার কানে এর মধ্যেই কেউ মন্ত্ৰ পড়ে দিয়েছে?

মন্ত্র পড়া মানে?

আর বলবেন না মেমসাহেব। এখানে মানুষ থাকে? সব এক একটা শয়তান চুকলিখোর, আপনি যত ওদের জন্যে করুন কিছুতেই মন ভরবে না। কাজ করলেও দোষ, না করলে তো কথাই নেই। আমার দোষ কেন পয়সা রোজগার করছি। মানুষের নিন্দে করে ওরা সকালে দাঁত মাজে কিন্তু সামনে এলে বোবা। বুঝবেন বুঝবেন, কদিন থাকুন বুঝতে পারবেন। মাথা নাড়ল অর্জুন নায়েক।

আমি শুনেছি আপনি নেখালি গ্রামের কিছু মানুষকে খাটিয়ে অর্ধেক টাকা কেটে রেখেছেন ওখানে কুয়ো করে দেবেন বলে। কথাটা ঠিক।

একশ বার ঠিক। আপনি ওখানে গিয়েছেন? গেলে বুকের হাড় পর্যন্ত কেঁপে উঠবে। এক ফোঁটা জল নেই। খাবার নেই। কি দুর্দশা! গবমেন্ট যখন কিছু করছে না তখন তো। ওদের নিজেদেরই সব করতে হবে। হাতে টাকা দিলে তার অর্ধেক খাবার খাবে বাকি অর্ধেক। মদ। আমি সেই মদের টাকায় ওদের জন্যে কুয়ো করে দেব ভেবেছি। খারাপ ভেবেছি বলুন?

কাজটা আপনি ঠিক করেননি। এদের প্রাপ্যটা ওদেরই দেওয়া উচিত।

তাহলে কুয়ো? জলের ব্যবস্থা?

আপনি যখন এতটা ভেবেছেন তখন ওটা নিজেই করে দিতে পারতেন।

অর্জুন একটু ভাবল চোখ বন্ধ করে, তারপর মাথা নাড়ল, ঠিক হ্যায়, করে দেব। কালই লোক লাগিয়ে দেব। জবান দিচ্ছি, আজ বিকেলে কেটে রাখা টাকা ওরা ফেরত পেয়ে যাবে। আপনার উপদেশ আমি মেনে নিলাম।

আপনি যদি এটা করেন তাহলে সত্যি আমি খুশী হব অৰ্জুনবাবু।

জবান তো দিয়েছি। এখন আপনি বলুন আপনি কবে আমার বাড়িতে পা দিয়ে আমাকে খুশী করবেন? ঝুঁকে এল অর্জুন।

আপনার ওখানে যাওয়ার তো একটা কারণ চাই মিস্টার নায়েক। আপনি কিন্তু এখনও আপনার বক্তব্য বলেননি।

বক্তব্য। আরে মেমসাহেব, আমি তো আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এলাম।

তাহলে তো আলাপ নিশ্চয়ই এতক্ষণ হয়ে গিয়েছে।

আপনি আমাকে চলে যেতে বলছেন? বেশ, যাচ্ছি। তবে আমার কিন্তু আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুব ভাল লেগেছে। মুখের ওপরে সত্যি কথা বলার সাহস আপনার আছে। গুড। যখন যা লাগবে আপনি আমাকে বলবেন। সতীশবাবু চেনেন আমাকে, ওঁকে দিয়ে খবর পাঠাবেন।

আমার কিছু প্রয়োজন হলে আপনাকে খবর দেব ভাবছেন কেন?

মেমসাহেব। আপনি কি এদের জন্যে কাজ করতে চান না আপনার আগের লোকদের মত চোখ বন্ধ করে থাকবেন? যদি কাজের ইচ্ছে থাকে তাহলে এই শর্মা আপনার উপকার করতে পারবে। বি ডি ও সাহেব তো বটেই, ডি এমের কাছে কোন ফাইল আটকে থাকলে আমাকে বলবেন এক দিনেই কাজ হয়ে যাবে। আচ্ছা, অনেক বিরক্ত করলাম, এবার আপনি আরাম করুন, আমি চলি। দরজার দিকে কথা শেষ করেই এগিয়ে গেল আচমকা অৰ্জন। হঠাৎ কি মনে হল দীপাবলী ডাকল, শুনুন, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি। কাল। নাকি নেখালি গ্রামে খুব গণ্ডগোেল হয়েছে, কি ব্যাপার আপনি কি কিছু জানেন?

চোখ বড় করল অর্জুন ঘুরে দাঁড়িয়ে, কিছু না, আমি বলেছি ছেলেদের আর কাজে লাগাবো না। ফাঁকি মারে কাজ কম হয়। এবার থেকে মেয়েরেই কাজ দেব, তাই! ও হ্যাঁ, আপনাকে একটা কথা বলতে একদম ভুলে গিয়েছি। একটা নয়, দুটো। প্রথমটা, আপনার এস ডি ও সাহেবের সঙ্গে আজ সকালে দেখা হয়েছিল। তাঁর পেট খারাপ, আসতে পারবেন না আজ। আর দ্বিতীয়টা হল,পোস্ট অফিসের পিওন আসছিল আপনার টেলিগ্রাম নিয়ে। আমি আসছি বলে বেচারাকে কষ্ট দিলাম না, নিন।

টেলিগ্রামটা দীপাবলীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে অর্জুন মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার করে বেরিয়ে গেল। একটু বাদেই তার গাড়ির শব্দ হল। দীপাবলীর ঘোর কাটতে সে টেলিগ্রামটার দিকে তাকাল।

০২. টেলিগ্রামটা ছিঁড়ল দীপাবলী

টেলিগ্রামটা ছিঁড়ল দীপাবলী। এর আগে কখনও তার নামে কেউ টেলিগ্ৰাম পাঠায়নি। কৌতূহল ছিল তাই। শমিতের নামটা দেখে সে ভূ কোঁচকালো। শমিত লিখেছে সে আসছে। কেন আসছে, কি জন্যে এবং কতদিন থাকবে তার বিশদ লেখার প্রয়োজন বোেধ করেন অথবা পয়সা বাঁচিয়েছে। সে যে এখানে আছে তা একমাত্ৰ অমলকুমার ছাড়া কাউকে ও জানায়নি। তাহলে শমিত কি করে ঠিকানাটা পেল! টেলিগ্রামে ওর আসার দিনও উল্লেখ করা নেই।

দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে এল দীপাবলী। তিরি কাছেপিঠে নেই। বাড়ির প্রতিটি জানলা বন্ধ। বাইরে এখন সূর্যের কড়াই থেকে যেন লাভা ঝরছে। শরীরে জামাকাপড় রাখতে ইচ্ছে করে না। শাড়ি পর্যন্ত তেতে উঠেছে। বাঁচোয়া এই যে তেমন ঘাম হয় না। গলা তুলে দীপাবলী ডাকল, তিরি, এক গ্লাস জল দে।

তিরি এল মিনিট দেড়েকের মধ্যেই। জল দিয়ে হাসল। সেটা গলায় ঢেলে দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, আজ জল তুলে রেখেছিস?

আজ কেন তুলব? কাল তুলেছি। ঘোলা জল ছিল ছেঁকে ফুটিয়ে কর্পূর দিয়ে রেখেছি। কেন, কর্পূরের গন্ধ পেলে না?

পেয়েছি। তুই এমন চমৎকার বাংলা শিখলি কোত্থেকে?

শিখে গিয়েছি।

আচ্ছা, যদি একদিন দেখিস কুয়োতে এক ফোঁটা জল উঠছে না তো কি কবি?

তুমি ছুটি নেবে আর আমি তোমার সঙ্গে এখান থেকে চলে যাব। হাসল তিরি, না দিদি, এই কুয়োর জল কখনও শুকোয় না।

তাহলে ওরা নিতে এলে আপত্তি করেছিলি কেন?

দুজনের জল দুশো জন নিলে থাকবে! দিদি, ও তোমাকে কি বলল?

দীপাবলীর মনে পড়ল, হ্যাঁ, তুই অৰ্জুন নায়েককে দেখে আমাকে বাইরে বেরুতে মানা করছিলি কেন? ব্যাপারটা কি?

মাথা নাড়ল তিরি, আমি ভুলে গিয়েছিলাম তুমি মেমসাহেব।

তার মানে?

মেমসাহেব বলে ও তোমাকে কিছু বলল না।

খুলে বল তো, হেঁয়ালি করিস না। আগে পাশের যুত গ্রাম আছে ভাল মেয়ে দেখলেই ও কাজ দেবার নাম করে বদমায়েসি করে। সবাই জানে কিন্তু কেই কিছু বলতে পারে না।

দীপাবলীর চোয়াল শক্ত হল। অর্জুন নায়েকের কিলবিলে হাসিটা মনে পড়ে গেল। সে জিজ্ঞাসা করল, তোকে কিছু বলেছিল?

সেইটাই তো আসল ব্যাপার। মাথা নাড়ল তিরি, দাঁড়াও, আসছি রান্নাঘর থেকে।

দীপাবলী হতাশ হল। সে খাটে শরীর এলিয়ে দিল। মেয়েটাকে কোন প্রশ্ন করলে সরাসরি জবাব পাওয়া যায় না। ওয়ার্কিং গার্লস হোস্টেলে বনানীদির স্বভাবের কিছুটা পেয়েছে ও। বিকেলে বনানীদি হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে বললেন, উঃ, আজ যা কাণ্ড হয়েছে। তোকে কি বলব। প্রথমদিকে দীপাবলী ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞাসা করত, কি হয়েছে?

আর বলিস না। সকালে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর দেখি মাথা ধরেছে। চা খেলাম তবু কমল না। খবরের কাগজ পড়লাম। সুজাতা বলল মাথা ধরার ট্যাবলেট খেতে। আমি। আবার ওসব খেতে পারি না। সাতোড়াতাড়ি স্নান করে খেয়েদেয়ে স্কুলে গেলাম। গিয়ে। শুনি আমাদের এক কলিগ স্বপ্নর কাল রাত্রে বাচ্চা হয়েছে। খুব শখ ছিল ছেলের, হল মেয়ে। ওর কথা ভেবে মন খারাপ হয়ে গেল। তবে স্বপ্ন এত রোগা যে ভালয় ভালয় হয়েছে এই ঢের।

কি কাণ্ড হয়েছে বলছিলেন না?

হ্যাঁ বলছি। দুপুরে হেড মিসট্রেসের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল। আমাদের স্কুলে আবার মেটার্নিটি লিভ নেই। পুজোর ছুটি গরমের ছুটি তার ওপর নাকি মেটার্নিটি লিভ দেবেন। না। বললেন এমনভাবে প্ল্যান করুন যেন ছুটির সময় বাচ্চা হয়। বোঝ!

দীপাবলী হেসে ফেলল, তারপর?

তুই হাসছিস? কিরকম কাণ্ডজ্ঞান দ্যাখ! ছুটির পর ভাবলাম আমার এক মাসতুতো বোনের বিয়ে হয়েছে গড়পাড়ে, ঘুরে আসব। গেলাম। ওতো খুব খুশি। ওর বরের নাকি নিউ মার্কেটে দোকান আছে। যাবি একদিন ওখানে?

যেতে আপত্তি কি! কিন্তু কাটা!

হাঁ, তা ওখানেই বোনের ভাশুরের সঙ্গে আলাপ হল। তার বউ মারা গিয়েছে বিয়ের পরের বছর। মাথায় বিশাল টাক। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স। পেটের গোলমালে ভোগে। অনেক খরচ করেছে কমেনি। তা আমি বললাম গ্রে স্ত্রীটে একজন হোমিওপ্যাথ আছেন আমাদের মণিকার পেটের অসুখ সারিয়েছিলেন। তাই শুনে এমন ধরল যে ওঁকে নিয়ে যেতে হল সেই ডাক্তারের কাছে। আমি তো মণিকার সঙ্গে কয়েকবার গিয়েছিলাম। ওষুধ-টষুধ নিয়ে পৌঁছে দিয়ে গেল আমাকে হোস্টেলে।

এইটে তোমার কাণ্ড?

দূর তা কেন হবে?

তাহলে?

ভদ্রলোকের স্ত্রী, যিনি মারা গিয়েছেন, তিনি নাকি আমাদের হেড মিসট্রেসের বোন, ব্যাপারটা ভাব। সেই বোন যদি বেঁচে থাকত তাহলে মানুষটার অবস্থা কি হত?

দীপাবলী কি উত্তর দেবে বুঝতে পারেনি। বনানীদি যদি শ্যামবাজারের কথা বলতে আসতেন তাহলে বালিগঞ্জ থেকে শুরু করতেন। এবং যে-কোন বিষয়েই কথা বলতে গেলে একবার না একবার হেডমিসট্রেস চলে আসতেনই।

খাটে শুয়ে চোখ বন্ধ করে দীপাবলী ডাকল, তিরি।

তিরি দূর থেকে সাড়া দিল। তারপর তার পায়ের আওয়াজ ঘরে এল। দীপাবলী বলল, শোন, তোকে আমি যখন যা প্রশ্ন করব তখনই তার উত্তর দিবি। ফেনাবি না।

আমি তো উত্তর দিই! সরল গলায় বলল তিরি।

তোকে অৰ্জুন নায়েক কি বলেছিল?

ও, এই কথা! না, শুনলে তুমি রাগ করবে।

আবার?

মানে, আমার যখন চৌদ্দ বছর বয়স তখন চার চারটে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল। নেখালি থেকে না। যেসব গ্রামে বৃষ্টি হয়, চাষবাস করা যায় সেইসব গ্রাম থেকে। বাবার তো পয়সা ছিল না যে বিয়ে দেবে। তা সবাই বলল অৰ্জুনবাবুকে গিয়ে ধর। একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বাবা গেল। অৰ্জুনবাবু বলল, আগে তোমার মেয়েকে চোখে দেখি তারপর বিয়ের খরচ দেব। তাই শুনে মা কিছুতেই রাজি নয়। এগ্রামের মেয়েদের চেহারা ভাল না বলে ডাক পড়ে না। কিন্তু অন্য গ্রামের মেয়েরা নাকি হপ্তায় একদিন অর্জুনের কাছে কাজের নামে গিয়ে থাকে। একজনের পেটে বাচ্চা এসে গিয়েছিল, অৰ্জুনবাবু নেখালির একটা ছেলেকে টাকা দিয়ে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। মেয়েটা নেখালিতে আসার পরের রাতেই গলায় দড়ি দেয়। তাই মা আমাকে পাঠাল না।

তুই ধান ভানতে শিবের গীত গাইছিস কেন?

মানে?

তারপর কি হয়েছিল?

মা পাঠাল না। আমার বিয়েও হল না। এক বছর পরে যখন বাবা-মা সবাই কাজে গিয়েছে, ওই যে তেঁতুলতলার রাস্তাটা তৈরি হচ্ছিল, তখন অর্জুনবাবু লোক পাঠান আমাদের ঘরে। সেই লোক জিজ্ঞাসা করল আমি ওর ওখানে কাজ করতে যেতে চাই কি না। আমি না বললাম। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে নেখালির মানুষদের কাজে নেওয়া বন্ধ করে দিল অর্জুনবাবু। সবাই আমার ওপর খেপে গেল। গ্রামসুদ্ধ, লোক বাবাকে গিয়ে বলল, তোমার মেয়েকে কাজে পাঠাও নাহলে আমরা না খেয়ে মরব। এইসময় বংশীদাদা এসে বাবাকে বলল এই কাজটার কথা। মা বলল, চলে যা নইলে তোক বাঁচাতে পারব না। আমি চলে এলাম। তাই গ্রামের লোক খেপে গেল। বেশ কিছুদিন আমি এখানে চাকরি করতাম আর বংশীদার বাড়িতে থাকতাম। তারপর আগের সাহেব আসার পর। মুখ নামাল তিরি।

অৰ্জুন জানে যে তুই এখানে কাজ করি।

সব জানে। কোন খবর ওর কাছে যায় না বল!

ঠিক আছে, তুই যা। আমাকে খাবার দে।

চোখের ওপর হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইল দীপাবলী। এরকম চরিত্রের কথা কিছু গল্প-উপন্যাসে পড়েছে সে। লোকটার স্বভাবে একটা ডোন্ট-কেয়ার ভাব আছে, কিন্তু প্রথম দিনের আলাপে কখনও অসম্মান করেনি তাকে। এই এলাকার মানুষের জীবন্যাত্রার উন্নয়ন, শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশকে কাজে লাগানো ইত্যাদি কিছু দায়িত্ব চাকরির সূত্রে তার ওপর অর্পিত। এ গ্রামে থানা নেই। থানার দাবোগার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের মানুষ। বছর দুয়েকের মধ্যে অবসর নেবেন। কিন্তু লোকটিকে মনে হয়েছে। মেরুদণ্ডহীন এবং পাশ কাটানো। এস ডি ও কিংবা ডি এমের সঙ্গে যার সখ্যতা তাঁকে তো দায়োগা দেবতাজ্ঞানে পুজো করবেন। অর্জুন নায়েক যদি মেয়েদের নিয়ে সুখী হতে চান তাহলে সে কিছুই করতে পারে না যতক্ষণ না ওইসব মেয়ে বা তাদের পরিবার তার কাছে। নালিশ করছে। কিন্তু এস ডি ও শেষপর্যন্ত এলেন না। সতীশবাবুর ধারণাই সত্যি হল। ভদ্রলোক খবর পাঠালেন অর্জুন নায়েকের মাধ্যমে যেটা দীপাবলী মোটেই পছন্দ করছে না। এখন মনে হচ্ছে উনি বাহানা দিয়েছেন, আসার অভিপ্রায় তার মোটেই ছিল না। এক্ষেত্রে নেখালির মানুষজনের জন্যে আপাতত কিছুই করা যাচ্ছে না।

এমন সময় বাইরে সাইকেলের ঘণ্টা বাজল। বন্ধ অফিসঘরে দরজায় শব্দ হল। দীপাবলী গলা তুলল, তিরি, দ্যাখ তো কে এসেছে?

যাচ্ছি। তিরি রান্নাঘর থেকে সাড়া দিল।

গরম বাড়ছে। যেই আসুক দায়ে না পড়লে এই রোদে বের হবে না। ঈশ্বর নামক শক্তিমানের খামখেয়লিপনার শেষ নেই। আষাঢ় থেকে আশ্বিন পর্যন্ত ক্ৰমাগত বৃষ্টি আর তিস্তা করলার বুক ছাপানো জলের ঢালে জলপাইগুড়ির মানুষ বিব্রত হয় যেখানে—সেখানে এই মাইলের পর মাইল জমি জলের অভাবে বন্ধ্যা হয়ে থাকে। যে। কলকাতা শহরে বৃষ্টির দরকার নেই সেখানে একদিন জল পড়লেই লোকে হাঁটুর ওপর। কাপড় তুলে হাঁটতে বাধ্য হয়। সমস্ত শরীর চিড়বিড় করছে গরমে। শাড়ি খুলে শুতে পারলে ভাল হত। খাওয়াদাওয়ার পর ঘণ্টা তিনেক সেই সুযোগ মেলে। তখন শোওয়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় সে। সংস্কার এমন জিনিস যা কাজের লোকের সামনেও নিজেকে সহজ হতে দিতে পারে না।

তিরি ঘরে এল একটা পিওনবুক হাতে, তার মধ্যে সরকারি বিধি। উঠে বসে চিঠিটা। নিল সে। তিরি কলম এনে দিতে সই করতেই ওটা ফেরত নিয়ে গেল। খামের মুখ ছিড়ল দীপাবলী। ডি এমের সরকারি নির্দেশ। আগামীকাল সকাল দশটায় সমস্ত সাব ডিভিশন। এবং ব্লকের অফিসারদের সার্কিট হাউসে উপস্থিত থাকতে হবে। মাননীয় কৃষিমন্ত্রী আলোচনা করতে চান।

দীপাবলীর মনে হল এটা একটা বড় সুযোগ। তার পক্ষে মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা বা কাজের ব্যাপারে অভিযোগ জানানো ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার শামিল। উপরওয়ালা, তস্য উপরওয়ালার অনুমতি চাই। এরকম একটা আলোচনাসভায় মন্ত্রী যদি কিছু জানতে চান তাহলে সরাসরি বলে ফেললে কেউ কিছু মনে করতে পারবেন না। সতীশবাবুকে বলতে হবে সমস্ত পয়েন্ট সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট তৈরি করতে।

সতীশবাবুর ওপর দায়িত্ব দিয়ে সকাল সাতটার বাস ধরল দীপাবলী। একটাই বাস দিনে দুবার যায় এবং ফেরে। সকালের বাসে ভিড় ছাদেও থিক থিক করে। তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কণ্ডাক্টর ব্যস্ত হয়ে ভিড় হঠিয়ে জায়গা করে দিল বসার। দীপবলী জানত না এখানে আসার এত অল্প দিনের মধ্যেই তাকে এত লোক চিনে গিয়েছে। বাসে বসে আর একটা অভিজ্ঞতা হল। চেঁচামেচি বকরকর যা হবার তা হচ্ছে পেছন দিকে। তার সামনে যেসব দেহাতি এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালি বসে তারা রয়েছে বেশ গম্ভীর মুখে। যেন কথা না বলে তারা তাকে সম্মান দেখাচ্ছে। এর মধ্যেই বাসের জানলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে গরম হাওয়ার জন্যে। চুপচাপ বসে এল দীপাবলী। নামার আগে কণ্ডাক্টরকে ডাকল সে, এই যে ভাই, টিকিটের দাম নাও।

লোকটার বয়স বেশী নয়, এক হাত জিভ বের করে মাথা নাড়ল।

কেন? দীপাবলী বেশ বিরক্ত হল।

না মেমসাহেব, পারব না, আমার চাকরি চলে যাবে।

তাহলে তো তোমাদের বাসে আমি উঠতেই পারব না।

একি কথা বলছেন! আপনি হলেন গিয়ে আমাদের5, না, না। প্রায় পালিয়েই গেল সে। দীপাবলী বুঝল কোন লাভ হবে না। সে মুখে যতই বলুক ভাড়া না নিলে বাসে উঠবে না কিন্তু ভাল করেই জানে বাসে না উঠে কোন উপায় নেই। স্ট্যান্ড থেকে রিকশা নিল। সে। দশটা বাজতে পনের মিনিট বাকি। এবার লোক ওঠা নামা করছে যে দেড় ঘণ্টার পথ প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা লাগিয়ে দিল বাস। সে অবশ্য এস ডি ওর অফিসে যেতে পারত। মিনিট চল্লিশেকের মধ্যেই পৌঁছানো যেত সেখানে। এস ডি ওর জিপে চড়ে। সোজা শহরে। কিন্তু গতকালের ঘটনার পর ব্যাপারটা ভাবতেই ভাল লাগেনি।

সার্কিট হাউসের সামনে পৌঁছে মোটামুটি ভিড় দেখতে পেল। আদেশ মান্য করে সবাই। জমায়েত হয়ে মন্ত্রীর অপেক্ষা করছেন। ডি এম নেই। জানা গেল তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে আসবেন। অরবিন্দ সেন এগিয়ে এলেন, নমস্কার মিসেস ব্যানার্জী, কেমন আছেন? দীপাবলী একটু আড়ষ্ট হল। সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে হলে নিজের ঠিকুজি জানিয়ে দিতে হয়। ইচ্ছা না থাকলেও দীপাকে নিয়ম মানতে হয়েছে। পরলোকগত অতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রীর পরিচয় তাকে বহন করতেই হয় এই কারণে বাধ্য হয়ে। সে মাথা নাড়ল, ভাল। আপনি?

আর বলবেন না। খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমাতে পারছি না। যা গরম?

আপনাদের ওদিকে প্রব্লেম কেমন?

নাথিং। কিছু নেই। আপনার হাতে ওটা কি?

এই কিছু কাগজপত্র। মন্ত্রীমশাই যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে বলতে হবে তো? তাহলে আপনি খুব সিরিয়াসলি কাজকর্ম করছেন বলুন!

দীপাবলী হাসল। যেন কাজকর্ম করা একটা অন্যায় ব্যাপার এমনই মনে হল ওর এর কথা শুনে। সে দেখল তার এস ডি ও আর এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছেন দূরে দাঁড়িয়ে। যাঁর সঙ্গে উনি কথা বলছেন তাঁর নজর এদিকেই। দীপাবলীকে দুচোখে গিলছেন। তিনি। হঠাৎ এস ডি ও এদিকে তাকালেন। তারপর ওরা এগিয়ে এলেন।

সরি মিসেস ব্যানার্জি, কাল শরীর এমন খারাপ হয়ে পড়ল যে যেতে পারিনি কিন্তু আমি আপনাকে খবর পাঠিয়েছিলাম। এস ডি ও বললেন।

হ্যাঁ। আপনি এখন কেমন আছেন? ভাল না। মন্ত্রী না এলে আজ বের হতাম না। বলেই যেন মনে পড়ল, তা আপনি আমার ওখানেই তো আসতে পারতেন, আমি আসছিলামই! ২০

বুঝতে পারিনি আসবেন কি না, অসুস্থ শুনলাম? আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। ইনি সুধীর গুপ্তভায়া, সাউথ ডিস্ট্রিক্টের এস ডি ও। আমারই ব্যাচমেট।

সঙ্গে সঙ্গে ভদ্ৰলোক দুহাত জোড় করে নমস্কার করলেন, আপনার কথা আগেই শুনেছিলাম। আপনার মত সুন্দরী মহিলা এই চাকরিতে আছেন ভাবাই যায় না?

কেন? চাকরি বুঝি অসুন্দরী মহিলাদের জন্যে?

না, না, সুন্দরীরা সাধারণত পটের বিবি হন। এত খাটাখাটুনির চাকরি তাদের সহ্য হয় না। আমি এটাই মিন করতে চেয়েছি।

দীপাবলী হাসল, তাহলে বলব আপনার দেখার পরিধি বেশী বড় নয়।

এইসময় তিনটে গাড়ি ছুটে এল। সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। এস ডি ওরা এগিয়ে গেলেন ব্যস্ত হয়ে। গাড়ি থেকে মন্ত্রী, ডি এম নামলেন। দীপাবলী দেখল মন্ত্রীর বয়স হয়েছে কিন্তু খাদির পাঞ্জাবি ও ধুতিতে বেশ সৌম্য দেখাচ্ছে তাঁকে। পুলিশের সুপারও ছিলেন পেছনের জিপে। অফিসাররা সবাই হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন তাঁদের সারির মধ্যে দিয়ে নমস্কার করতে করতে মন্ত্রীমশাই ডি এম-কে নিয়ে সার্কিট হাউসে ঢুকে গেলেন বিনা বাক্যব্যয়ে।

মিনিট চারেকের মধ্যে মিটিং আরম্ভ হল। মন্ত্রী এবং ডি এম বসেছেন ঘরে একদিকে, • এপার্শে অফিসাররা। দীপাবলী দ্বিতীয় সারির এক কোণে বসে শুনছিল। ডি এম ভূমিকা করতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তাঁকে থামিয়ে দিয়ে মন্ত্রীমশাই বললেন, না, না, কথা বাড়ানোর দরকার নেই। আপনাদের সোজাসুজি কিছু কথা বলি। এই জেলায় খরা যেন চিরস্থায়ী। বন্দোবস্ত করেছে। বৃষ্টি হয় না তাই চাষবাসও হয় না। কৃষকরা খুব কষ্টে বেঁচে আছেন। আমরা অবশ্য তাঁদের নানারকম সাহায্য করি তা আপনারা জানেন। কিছু পরিকল্পনা নেওয়া। হয়েছে যাতে এই এলাকায় চাষবাস হয়। এ ব্যাপারে আপনাদের আরও বেশী পরিশ্রম করতে হবে। আর চাষ ছাড়া ওদের হাতে শ্রমের বিনিময়ে যাতে কিছু পয়সা আসে, নিয়মিত। রোজগার করে যেতে পারে তার জন্যে আমাদের উদ্যোগী হতে হবে। মনে রাখবেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বারংবার বলেছেন কৃষকরাই হল ভারতবর্ষের মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ডকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের সবরকম চেষ্টা করা উচিত। মন্ত্রী হাত বাড়িয়ে গ্লাস। তুলে নিয়ে দুটো চুমুক দিলেন, জল। এই জেলার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল জলের অভাব। ঈশ্বর এই জেলাকে মেরে রেখেছেন কোন বড় নদী না দিয়ে। জল ছাড়া চাষবাস করা সম্ভব। নয়। আমাদের ভাবতে হবে কিভাবে শুধু বছরের দুতিন মাস নয় বরো মাস ফসল ফলানোর ব্যবস্থা এখানে করা যায়। বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে অনেকরকম গবেষণা শুরু করে দিয়েছেন। দুশো বছর ধরে ইংরেজরা শুধু ভারতবর্ষের গরিব কৃষকদের শোষণ করেছে কিন্তু তাদের উন্নতির কোন চেষ্টাই করেনি। আমরা জনগণের নির্বাচিত সরকার, তাই হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। আমাদের হাত হল আপনারা। আপনারাই পারেন গান্ধীজী, জওহরলালের স্বপ্নের ভারতবর্ষকে বাস্তবে নিয়ে আসতে। বন্দেমাতরম্। মন্ত্রী বসে পড়লেন। পকেট থেকে সাদা রুমাল বের করে কপাল গলা মুছে ডি এমের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকালেন।

ডি এম নিচু গলায় তাঁকে কিছু বলতে তিনি বাঁ হাত উল্টে সম্মতি দিলেন। ডি এম উঠে দাঁড়ালেন, ইংরেজিতে বললেন, মাননীয় মন্ত্রী মহাশয় অত্যন্ত ব্যস্ততা সত্ত্বেও এখানে এসে আমাদের যা বললেন তা নিশ্চয়ই স্মরণে রাখব। তবে আপনারা যাঁরা এই জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে আছেন তাঁরা যদি কোন সমস্যার কথা বলতে চান তা লিখিতভাবে আমার কাছে। পাঠালে আমি নিশ্চয়ই কলকাতায় মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়ের দপ্তরে পাঠিয়ে দেব।

হঠাৎ মন্ত্রী বলে উঠলেন, স্পেশ্যাল কিছু সমস্যা আছে না কি?

অফিসাররা সবাই এ ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। মন্ত্রী বললেন, চিঠি। চাপাটিতে সময় নষ্ট না করে বলে ফেলুন এখানে। আপনি বলুন ভাই?

দীপাবলী দেখল সামনের সারিতে বসা তার এস ডি ওর দিকে ইঙ্গিত করছেন মন্ত্রী। তিনি খুব নাভার্স ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন, স্যার, অ্যাজ সাচ তেমন কিছু প্রব্লেম নেই, শুধু গরম ছাড়া।

সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। মন্ত্রীমশাইও সেই হাসিতে যোগ দিয়ে বললেন, এ ব্যাপারে সরকারের তরফে কিছু করার নেই। ঈশ্বরের ওপর আমাদের কোন কন্ট্রোল নেই যে তাঁকে কথা শুনতে বাধ্য করব। সিট ডাউন প্লিজ। এস ডি ও বসে পড়লেন।

ডি এম তখনও দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাহলে আমরা এখানেই আজকের আলোচনা শেষ করছি। মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়কে জেলার পক্ষ থেকে এখানে আসার জন্যে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছিল দীপাবলী। তার এস ডি ওর এইরকম হাস্যকর মন্তব্য: শোনার পর সে ঠিক করল উঠে দাঁড়াবে। ডি এম কথা বলতে শুরু করা মাত্র সে তার হাত উঁচুতে তুলেছিল। কথা শেষ করে ডি এম সেটা দেখতে পেলেন। আলোচনা সভা শেষ হয়েছে ভেবে সবাই উঠে দাঁড়াচ্ছিল ডি এম দুহাত শূন্যে তুলে সবাইকে বসতে ইঙ্গিত করলেন। দীপাবলী দেখল সবাই এখন তার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে। ডি এম বললেন, মনে হচ্ছে আপনি কিছু বলতে চাইছেন?

দীপাবলী উঠে দাঁড়াল, হ্যাঁ।

আপনি কোন ব্লকে আছেন?

দীপাবলী উত্তর দিল। মন্ত্ৰী কিছু বলল ডি এমকে। তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে সেটা শুনে হাসলেন। তারপর ইঙ্গিত করলেন দীপাবলীকে বলতে।

দীপাবলী হাতের ফাইলটা খুলল। তারপর বিনীত গলায় বলল, মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়, মাননীয় ডি এম। আমি খুব অল্প দিন হল এই জেলায় বদলি হয়ে এসেছি। যে এলাকায় আমাকে কাজ করতে পাঠানো হয়েছে তার অবস্থা দেখে আমি শিউরে উঠেছি। স্বাধীনতার পর পনের বছর হতে চলল আমরা শাসনে এসেছি কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি। এখানকার মানুষদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগসুবিধে আমরা দিতে পারিনি।

হঠাৎ একটা চাপা গুঞ্জন উঠল। দীপাবলী অস্বস্তিতে পড়ল। মন্ত্রী মহাশয় হাত তুলে ইঙ্গিত করলেন সবাইকে চুপ করতে। দীপাবলী একটু নাভার্স হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ জেদের বশে সে যা করতে যাচ্ছে তার পরিণতি আন্দাজ করতে পারছিল না। তবু এখন পিছিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। সে বলল, আমার এলাকায় বৃষ্টি হয় না বললেই ঠিক বলা হয়। বছরের একটা সময় জল এতে নিচে চলে যায় যে কুয়ো নতুন করে খোঁড়াতে হয়। আমি নেখালি নামের একটি গ্রামের ছবি মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়ের সামনে তুলে ধরতে চাই। নেখালি গ্রামে বাহান্নটি পরিবার কোনোমতে টিকে আছে। মাটি পাথর হয়ে গিয়েছে তাই চাষ হয় না। কোনরকম গাছপালা নেই। গ্রামে কোন কুয়ো বা নলকূপ নেই। কয়েক ক্রোশ দূর থেকে জল নিয়ে আসে তৃষ্ণা মেটানোর জন্যে। গানের কথা বছরে এক দুদিনের বেশী ভাবতে পারে না। মাঝে মাঝে দিনমজুরি করে এরা যে পয়সা পায় তাই দিয়েই কোন মতে বেঁচে থাকে। কেন বেঁচে আছে তা এরা নিজেরাই জানে না নেখালির প্রায় প্রতিটি মানুষ কমবেশী অসুস্থতায় ভুগছে। তবে চর্মরোগ ওদের মধ্যে ব্যাপক। আমি এদের দিকে তাকালে কোন ভারতবর্ষকে দেখতে পাব? আমরা এদের জন্যে আজ পর্যন্ত কি করেছি?

দীপাবলী থামতেই মন্ত্রী মশাই বললেন, আপনি কি সরকারকে অভিযুক্ত করছেন?

সমস্ত ঘর মুহূর্তেই নিঃশব্দ হয়ে গেল। দীপাবলী মাথা নাড়ল, না, আমি একজন কর্মচারী হিসেবে সরকারের অঙ্গ। সত্যিকারের ছবি তুলে ধরছি।

কিন্তু আমি আপনার গলায় কম্যুনিস্টদের সুর পাচ্ছি।

দীপাবলী থমকে গেল। তারপর বলল, মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়, আমি রাজনীতির ধারে কাছে থাকি না। যা সত্যি তাই বলছি।

এবার ডি এম, এস ডি ওর দিকে তাকালেন, আপনার বক্তব্য কি?

এস ডি ও বললেন, মিসেস ব্যানার্জী আমাকে অবশ্য নেখালির কথা বলেছিলেন। সমস্যা নিশ্চয়ই আছে কিন্তু আমার মনে হয়েছিল মহিলারা একটু বেশী ভাবপ্রবণ হন।

দ্যাটস রাইট। ডি এম বললেন, মিসেস ব্যানার্জী আপনি যাদের কথা বললেন তাদের মত অনেক মানুষ ভারতবর্ষে ছড়িয়ে আছে। মাননীয় মন্ত্রী মহাশয় নিশ্চয়ই তা জানেন। তবে সরকার কিছুই করছে না একথা আমরা বলতে চাই না।

এবার মন্ত্রী মহাশয় উঠে দাঁড়ালেন, একটু আগে যখন জানতে চেয়েছিলাম আপনাদের কোনো সমস্যা আছে নাকি তখন সবাই চুপ করে ছিলেন একজন শুধু বলেছিলেন তাঁর খুব গরম লাগে। কিন্তু এখন উনি যে গ্রামের ছবি তুলে ধরলেন তা যদি সত্যি হয় তাহলে বলতে হবে এ জেলায় সরকারি কাজকর্ম ঠিকঠাক হচ্ছে না। রাজা কান দিয়ে দ্যাখে। আমাদের কান হলেন আপনারা। যা হোক, ঠিক ছিল আমি এখান থেকে কলকাতায় ফিরে যাব। কিন্তু আমি এই ইয়ং লেডির বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে চাই। ওই গ্রামটি এখান। থেকে কতদূর?

ডি এম, এস ডি ওর দিকে তাকালেন। এস ডি ও দীপাবলীর দিকে। দীপাবলী বলল, গাড়িতে যাতায়াতে ঘণ্টা তিনেকের বেশী লাগা উচিত নয়। অবশ্য রাস্তা সব জায়গায় খুব ভাল নয়।

ঘড়ি দেখলেন মন্ত্রী, চলুন, আর দেরি করে লাভ নেই। সভা ভাঙল। সবাই গুনগুন করতে লাগলেন, আগে জানলে তারাও নিজেদের এলাকার সমস্যার কথা বলতে পারতেন। আফসোস এখন সবার মুখে।

দুটো জিপ রওনা হল। মন্ত্রী, ডি এম ও এবং এস ডি ও প্রথম জিপটাতে, দ্বিতীয়টাতে দীপাবলী এবং পুলিশের লোকজন। মন্ত্রীর পি এ প্রথম জিপে উঠলেন। শহর ছাড়িয়ে জিপ। ছুটল। দীপাবলীর ভাল লাগছিল। বৃদ্ধ মন্ত্রী যে এভাবে নিজের চোখে নেখালি দেখতে যেতে চাইবেন তা সে অনুমান করেনি। যেভাবে সাজানো কথার মিটিং চলছিল সেই। পরিপ্রেক্ষিতে ভাবা যায় না। কিন্তু একটা কথা তার মনে খচখচ করছিল। মন্ত্রী মশাই তার গলায় কম্যুনিস্টদের সুর পেয়েছেন। ভবিষ্যতে এর ফল মারাত্মক হতে পারে। নিপীড়িত মানুষের কথা অন্যের মুখে শুনলে এরা কেন কম্নিজম আবিষ্কার করেন তা এরাই জানেন। ধুলো উড়িয়ে জিপ ছুটছিল চাঁদিফাটা রোদ্রে। মুখের চামড়া গরম হাওয়ার হলকায়। জ্বলছে। আঁচলে মুখ ঢেকেও কষ্ট কমানো যাচ্ছে না।

সোওয়া ঘন্টা নাগাদ জিপ থেমে গেল। রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গিয়েছে। মন্ত্রীর পি এ দৌড়ে সামনের জিপ থেকে চলে এলেন, মিনিস্টার আপনাকে সামনের জিপে যেতে বলছেন। দীপাবলী চটপট নেমে পড়ল। রাস্তাটুকু পার হতে মনে হল পায়ে ফোস্কা পড়ে। যাবে। জিপে উঠতেই মন্ত্ৰী জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় হে নেখালি?

সোজা যেতে হবে।

এবার এস ডি ও বললেন, আমার অফিস হয়ে যদি যাই–!

আপনার অফিস কোনদিকে?

ডানদিকে।

নেখালি তে উল্টো পথ হয়ে যাবে। আপনার অফিসে গিয়ে টেবিল চেয়ার দেখতে আমি এসেছি নাকি?

জিপ সোজা পথ ধরল। ডি এম বললেন, সময়টা ভুল বাছা হয়েছে স্যার। এখন যাকে বলে স্কৰ্চিং সান। ভোর ভোর বা বিকেলে এলে দেখার সুবিধে হত।

ঠিক কথা। ব্লক অফিস ওখান থেকে কতদূর?

কাছেই স্যার। দীপাবলী জবাব দিল।

তাহলে ব্লকেই যাই আগে। চারটে নাগাদ নেখালি দেখে ফিরে যাব।

মন্ত্রী কথাগুলো বলামাত্র এস ডি ও জিপের আওয়াজের আড়াল খুঁজে দীপাবলীকে বলল, আপনার ওখানে অ্যারেঞ্জমেন্ট কেমন? ফ্রিজ আছে?

ফ্রিজ? ওখানে তো ইলেকট্রিসিটি যায়নি।

মাই গড! তাহলে মন্ত্রীকে খাওয়াবেন কি?

সেটা ওঁকে বলুন।

এবার মন্ত্রীর পাশে বসা ডি এমের দিকে তাকিয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লাগলেন এস ডি ও। সেটা ডি এম বোঝার আগে মন্ত্রী দেখে ফেললেন, কি হয়েছে? কিছু বলছেন?

তো তো করলেন এস ডি ও স্যার, ব্লক অফিসে আপনাদের জন্যে ভাল অ্যারেঞ্জমেন্ট। করা সম্ভব নয়। মানে উইদাউট নোটিস আর কি!

ডি এম বললেন, দ্যাটস রাইট।

এস ডি ও সাহস পেলেন, বলছিলাম কি, আপনি যদি আমার ওখানে যান, ওখান থেকে বেশী সময় লাগবে না!

আপনি নেখালি গিয়েছেন? মন্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন।

না, মানে, স্যার, আমি তো নতুন এসেছি।

উনি আপনাকে রিপোর্ট করার পরেও যাওয়ার সময় পাননি?

স্যার, আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।

ততক্ষণে ব্লক অফিস দেখা যাচ্ছে। দীপাবলী বলল, ওই যে আমার অফিস। মন্ত্রী বললেন, অনেকগুলো ঘর আছে দেখছি, চল, ওখানেই চল।

অতএব জিপদুটো থামল। অফিসঘর বন্ধু। সতীশবাবুরা ঠিক দশটাতেই আজ চলে গিয়েছেন। তিনি দরজা খুলে দিতেই সবাই যেন প্ৰাণ বাঁচাতে, ভেতরে ঢুকে পড়ল। মন্ত্রীকে নিয়ে দীপাবলী নিজের ঘরে চলে এল, সঙ্গে ডি এম।

অফিসে লোকজন কই হে?

স্যার এখানে গরমের জন্য মর্নিং আর আফটার নুন অফিস হয়।

চেয়ারে বসে মন্ত্রী মশাই বললেন, জল খাওয়াও।

দীপাবলী ছুটে ভেতরে চলে গেল। তিরিকে নির্দেশ দিল, প্রথমে জল, পরে চা দেবার জন্যে। নিৰ্দেশ দিয়েই সে আবার দৌড়ে বাইরে চলে এসেছিল। মন্ত্রী মশাই তখন ডি এমের সঙ্গে গল্প করছেন। তাঁর ধারণা ছিল সরকারি কাজে মহিলারা শুধু শোভাই বাড়ান কিন্তু এই মেয়েটিকে দেখে তার ধারণা পাল্টাচ্ছে।

প্রায় এক কুঁজো জল শেষ হয়ে গেল। এস ডি ও বললেন, শরবৎ করে দিন, এই গরমে। কেউ চা খাবেন না।

তিরি দাঁড়িয়েছিল দরজায়, বলে উঠল, যা জল ছিল তা উনুনে বসিয়ে দিয়েছি চায়ের জন্যে, গরম জলে শরবৎ হবে কি করে?

দীপাবলী বিরক্ত এবং রাগত ভঙ্গিতে বলল, তোকে এখানে কথা বলতে কে বলেছে। ভেতরে গিয়ে কুয়ো থেকে জল তোল।

এখন কুয়োতে জল নেই।

মানে? দীপাবলী একদম অপ্রস্তুত।

তুমি চলে যাওয়ার পরে চারজন লোক এসে জোর করে জল তুলে নিয়ে গিয়েছে। আমাকে বলল মেমসহেব বলেছেন নিয়ে যেতে। এখন কাদা পড়ে গিয়েছে, বিকেলের আগে, জল জমবে না।

কি আশ্চর্য! কারা এসেছিল?

নেখালির ওরা।

ঘরে সবাই একদম চুপ। এই সময় বাইরে একটা জিপ এসে থামল। এস ডি ও কৌতূহলী হয়ে বেরিয়ে গেলেন, পেছনে দীপাবলী। জিপ থেকে নামছে অৰ্জুন নায়েক। সে তার দুই সঙ্গীকে নির্দেশ দিচ্ছে কিছু নামাতে। তারা ভারী দুটো বাক্স নামাচ্ছে। এস ডি ও চেঁচিয়ে উঠলেন, আরে আপনি?

অৰ্জুন ঘরের ছায়ায় চলে এল, এই আর কি! শুনলাম মিনিস্টার নেখালি দেখতে এসেছেন তাই এই গরমে ওঁর সেবার জন্যে চলে এলাম। কোল্ড ড্রিঙ্কস আর তেমন কোন্ড নেই যদিও। নমস্কার মেমসাহেব, নেখালিতে আজ সকাল থেকে কুয়ো খুঁড়তে লাগিয়ে দিয়েছি। আপনার আদেশ অমান্য করিনি।

দীপাবলী দেখল দুহাতে অর্জুনের আনা দুটো ঠাণ্ডা পানীয়ের বোতল নিয়ে এস ডি ও মন্ত্রীকে দেবার জন্যে ছুটে যাচ্ছেন। অর্জুন ফিস ফিস করল, মিনিস্টার কোথায়?

০৩. এরকম একটা দিনের কথা

এরকম একটা দিনের কথা অনেককাল ভুলতে পারবে না দীপাবলী। সন্ধের মুখে জিপগুলো যখন চলে গেল শহরের দিকে তখন মাটির রাস্তায় একা সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এখন জিপের আরোহীদের অবস্থান বদল হয়েছে। সে নেমে যাওয়ার পরে মন্ত্রীমশাইয়ের জিপে শুধু অর্জুন নায়েক ছাড়া আর কেউ নেই। ডি এম, এস ডি ও এবং মন্ত্রীর পি এ অর্জুন নায়েকের জিপে উঠেছিল মন্ত্রীর ইঙ্গিতে। সমস্তটা পথ মন্ত্ৰী অৰ্জুনের সঙ্গে কি কথা আলোচনা করবে তা তিনিই জানেন। আর মন্ত্রীর কাছে এমন গুরুত্ব পাওয়া মানে এস ডি ও-ডি এমের সন্ত্রম আদায় করা একথা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয় কারো।

দীপাবলীর অফিসে সাতোড়াতাড়ি ছুটে এসেও সতীশবাবু যা করতে পারতেন না অর্জুন তা করে দিল অনায়াসে। প্রত্যেকের জন্যে ভাল খাবার, ঠাণ্ডা পানীয়, মন্ত্রীকে সারা সময় হাওয়া করার জন্যে একজন সেবক থেকে শুরু করে যা কিছু তা দীপাবলীর পক্ষে এখানে ব্যবস্থা করা অসম্ভব ছিল। অফিসের অন্য কর্মচারীরা মন্ত্রী এসেছেন শুনে মাথায় সূর্য নিয়ে ছুটে এসেছিল কিন্তু ঘরে ঢুকতে পারেনি। বাইরের ঘরে ডি এম এবং এস ডি ও বসেছিলেন। মন্ত্রীমশাই দীপাবলীর অফিসঘরে। অর্জুন নায়েক একবার হাতজোড় করে প্রস্তাব দিয়েছিল যে ওখান থেকে তার বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি নয়, মন্ত্ৰীমহাশয় যদি অনুগ্রহ করে রাজি হন তাহলে সেখানে বেশ আরামে বিশ্রাম করতে পারবেন। মন্ত্রীমশাই রাজি হননি। বলেছেন, কাজে এসেছি, বিশ্রাম করব কি? এই যে মেয়ে, শোন এদিকে। দীপাবলীকে ডেকেছিলেন তিনি, ওসব দোকানের খাবার ওদের দিতে বল। তোমার জন্য বাসায় ভাত হয়নি?

হয়েছে। দীপাবলী জবাব দিয়েছিল।

তাহলে সেটাই দুজনে ভাগাভাগি করে খাই চল।

দীপাবলী মুখ নিচু করেছিল। আপনি খেতে পারবেন না।

কেন? পারব না কেন? মন্ত্রী অবাক হয়েছিলেন।

খুব সামান্য খাবার। এখানে রোজ সবকিছু পাওয়া যায় না।

হো হো করে হেসেছিলেন ভদ্রলোক, পাঁচ বছর ইংরেজের জেলে কাটিয়েছি হে, সেখানে কি রাজভোগ খেতে দিত? তাছাড়া বাইরে যখন থাকতাম তখন কি রোজ খাওয়া জুটত। পোস্ত আছে বাড়িতে?

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়েছিল তিরি। কথা বলতে নিষেধ করা সত্ত্বেও সে বলে উঠেছিল, আজ তো পোস্ত আর ডিমের ঝোল হয়েছে।

বাঃ। চমৎকার! তাই দাও। ভাগে তোমার কম পড়লে আর কি করা যাবে।

মন্ত্রীমশাই ভেতরের ঘরে গিয়ে তার সঙ্গে খেলেন। তরকারি বেশি ছিল কিছু কিন্তু তিরির ভাগ্যে আজ ডিম জোটেনি। মেয়েটাও যেন চুপসে গিয়েছিল। দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এসেছেন এবং তিনি যখন অর্জুন নায়েকের নিয়ে আসা খাবার খাননি তখন তাঁকে ভাল ভাবে যত্ন করা অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু সেইসময় দীপাবলী মন্ত্রীমশাইয়ের ব্যবহারে আপ্লুত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের পূর্ণমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যাঁর বেশ নামডাক, তিনি তার সামনে বসে প্রফুল্ল মুখে অতি সাধারণ খাবার খেয়ে বললেন, রামাটি তো জব্বর হে। এতে শ্ৰদ্ধা না বেড়ে যাওয়ার কোন কারণ নেই।

খাওয়দাওয়ার পর দীপাবলীর অফিসঘরে তিনি তিনজনকে নিয়ে বসলেন। তখনও অৰ্জুন নায়েক ওঁর কাছে ঘেঁষতে পারেনি। বাইরের ঘরে পুলিশ এবং পি. এর সঙ্গে বসেছিল। মন্ত্রীমশাই একটি কাগজ কলম টেনে নিয়ে দীপাবলীকে জিজ্ঞাসা করলেন, কী নাম যেন বললে তখন? ও হো, নেখালি। নেখালির মত আর কটা গ্রাম আছে এদিকে?

দীপাবলী কিছু বলার আগে এস ডি ও বললেন, আমার সাব-ডিভিসনে প্রায় সমস্ত গ্রামের দশা একইরকম স্যার।

একথা আজকের মিটিং-এ বলেননি কেন? মন্ত্রীমশাই কড়া গলায় জানতে চাইলেন।

এস ডি ও মাথা নিচু করলেন। মন্ত্রীমশাই দীপাবলীর দিকে তাকালেন, ঠিক কটা গভীর নলকূপ অথবা কুয়ো খোঁড়া দরকার বলে।

আমি শুধু নেখালি নিয়ে ভেবেছি স্যার। দীপাবলী জবাব দিল।

ভেরি ব্যাড। একই এলাকার অন্য গ্রামগুলোর অবস্থা আলাদা হতে পারে না।

দীপাবলীর মনে পড়ল সতীশবাবু বলেছিলেন অন্তত আটটি গ্রাম একইরকম খরায় পুড়ছে। সে বলল, অন্তত চব্বিশটা দরকার।

মন্ত্রী সেটি লিখলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, কাছাকাছি নদীগুলোয় তো এসময় একফোঁটা জল থাকে না। আপনারা একটা কিছু ভাবুন যাতে এই অঞ্চলে জল স্টোর করা যায়। আপাতত এই চব্বিশটার ব্যবস্থা আমি করছি। সেইসঙ্গে মাসখানেকের জন্যে ওদের চাল যাতে দেওয়া যায়। তার বেশী দেবার সামর্থ্য আমার হাতে নেই। আমি মনে করি না শুধু সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভর করে এতগুলো গ্রামের মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। ওদের রোজগারের ব্যবস্থা হয় এমন কোন প্রকল্প তৈরি করে আমার কাছে পাঠান, আমি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব!

রোদের তেজ কমে গেলে তিনটে জিপ রওনা হয়েছিল নেখালরি দিকে। এবার সঙ্গে ছিলেন সতীশবাবু। তিনি অবশ্য দুপুরেই খবর পাঠিয়েছিলেন গ্রামে। রাস্তা থেকেই দেখা। গেল গ্রামসুদ্ধ লোক ভিড় জমিয়েছে সামনে। ওদের দেখতে পেয়ে ডি এম বলেছিলেন, বিক্ষোভ হতে পারে। পুলিশদের তৈরি থাকতে বলুন।

কিন্তু কেউ একটা শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করল না। জিপগুলো ঢুকে গেল গ্রামের মাঝখানে। জিপ থেকে নামামাত্র দীপাবলী হতভম্ব। মন্ত্রীমশাই জিজ্ঞাসা করলেন, ওখানে কি হচ্ছে?

সতীশবাবু ততক্ষণে ছুটে গিয়েছেন গ্রামের মানুষদের কাছে যারা খানিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসে তিনি দীপাবলীকে নিচু গলায় কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু মন্ত্রীমশাই ধমক দিলেন, আঃ, যা বলার জোরে বলুন।

সতীশবাবু দুই হাত জোড় করে বললেন, আজ্ঞে, কুয়ো হচ্ছে। দুটো।

কুয়ো? মন্ত্রীমশাই দীপাবলীর দিকে তাকালেন, কি ব্যাপার?

সতীশবাবু বললেন, আজ্ঞে, ওরা বলল অৰ্জুনবাবু আজ সকালে লোক পাঠিয়েছেন কুয়ো খোঁড়ার জন্যে। এ বাবদ যে টাকা কেটেছিলেন তাও ফেরত দিয়েছেন।

অৰ্জুনবাবুটি কে? মন্ত্রীমশাই জানতে চাইলেন।

দুটো হাত বুকের ওপর জড়ো করে এগিয়ে এল অর্জুন, স্যার, আমার নাম অৰ্জুন।

ও আপনি। দুপুর থেকে দেখা লোকটিকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করলেন মন্ত্রীমশাই, আপনি নিজের পয়সায় এখানে কুয়ো খুঁড়ে দিচ্ছেন?

হাত কচলালে অর্জুন, আজ্ঞে, এরা খুব কষ্টে আছে, জল পায় না, তা উনি আমাকে সেকথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। হাত বাড়িয়ে দীপাবলীকে দেখাল, আমার মনে হল জীবনে তো অনেক রোজগার করব কিন্তু কাউকে যদি জীবন ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করি সেটাই পুণ্য। জলের আর এক নাম তো জীবন।

বাঃ, খুব ভাল! আপনাদের মত ব্যবসায়ীরা যদি নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে এভাবে গরিব মানুষের সেবার জন্যে এগিয়ে আসেন তাহলে সরকারের কাজ সহজ হয়ে যায়।

স্যার, একেবারে নিঃস্বার্থ বলবেন না।

মানে? এদের জল পাইয়ে দিয়ে আপনার কি লাভ হবে?

হবে স্যার, আমার ব্যবসায় বিভিন্ন কাজে আমি ওদের নিয়োগ করি, মাইনে দিই। জলের অভাবে ওদের যদি শরীর দুর্বল হয়ে যায় তাহলে কাজ করতে পারবে না, আমারও ক্ষতি হবে। হাত কচলে যাচ্ছিল অর্জুন।

আপনি ওদের কাজ দেন?

হ্যাঁ স্যার। আমার লোকের প্রয়োজন আর এদের রোজগারের।

গুড। কিন্তু কটা মালিকের এমন মানসিকতা থাকে। তারা গরিবকে শোষণ করে বড়লোক হয়। যে কাজ করতে পারবে না তাকে বরখাস্ত করে অন্য লোক নেয়। খুব ভাল লাগল আপনার মত একজন উদার যুবককে দেখে। তারপর দীপাবলীর দিকে ঘুরে বললেন, তুমি ঠিক লোককে বলেছ হে। চল, এবার একটু ঘুরে দেখি।

মন্ত্রী এবং দলবল গ্রামের কিছুটা ঘুরে দেখলেন। মানুষের বেঁচে থাকা যেখানে উপহাস ছাড়া কিছু নয় সেখানে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা খুব মুশকিল। মন্ত্রীমশায়েরও ভাল লাগল না। তবু তিনি একটি প্রৌঢ়কে ডাকলেন। লোকটি কাছে আসতেই চাইছিল না। সতীশবাবু ধমকে কাছে নিয়ে এলেন।

মন্ত্রী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনটে কুয়ো হয়ে গেলে তোমাদের সুবিধে হবে?

লোকটি মাথা নাড়ল, কুয়ো হবে কিন্তু জল থাকবে না। আর জল থাকলেও পেট ভরবে না। যদি জলে পেট ভরে যায় তো জল খেয়ে মানুষ কদিন বাঁচবে?

লোকটা চেঁচিয়ে কথাগুলো বললো। সুতরাং, দূরে দাঁড়ানো গ্রামের মানুষজন তা শুনতে পেল। তৎক্ষণাৎ বক্তব্যের সমর্থনে গুঞ্জন উঠল।

মন্ত্রীমশাই সবিস্ময়ে লোকটিকে দেখে বললেন, পাগল নাকি হে।

সঙ্গে সঙ্গে লোকটি বলে উঠল, পাগল হলে তো ভাল হত। আপনি দেশের মন্ত্রী, আপনি আমাদের পাগল তো বলবেনই। কুয়ো খোঁড়া হচ্ছে কিন্তু পেটে ভাত নেই।

মন্ত্রীমশাই অৰ্জুন নায়েকের দিকে তাকালেন, এ আপনার ওখানে কাজ করে না?

করত স্যার। কিন্তু এত ফাঁকি মারত আর অন্যদের ক্ষ্যাপাত যে বাধ্য হয়েছি ছাড়িয়ে দিতে। অর্জুনের কথা শেষ হওয়ামাত্ৰ লোকটি ক্ষিপ্ত হয়ে তেড়ে যেতে চাইল দুর্বল শরীরে। সঙ্গে সঙ্গে দুজন পুলিশ তাকে ধরে ফেলে প্রায় চ্যাংদোলা করে সরিয়ে নিয়ে গেল সামনে থেকে। লোকটা সমানে চেঁচিয়ে গালমন্দ করে যাচ্ছিল কিন্তু গ্রামের মানুষরা নির্বাক। রইল। মন্ত্রীমশাই বিড় বিড় করলেন, এসব গ্রামে কম্যুনিস্টরা আসাযাওয়া শুরু করেছে নাকি!

অৰ্জুন বলল, হাঁ স্যার। দু-একজন সন্দেহজনক, শহুরে বাবু আসে।

মন্ত্রীমশাই বললেন, ডি এমের দিকে তাকিয়ে, ব্যাপারটা লক্ষ্য রাখুন। এমন হলে কোন। ভাল কাজ এরা করতে দেবে না। দারোগা কোথায়? তাকে বলুন নজর রাখতে।

ডি এম অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, স্যার, ডেমোক্রেটিক কান্ট্রিতে কোন দলকে তোত কাজ থেকে কারণ না দেখিয়ে নিরস্ত করা যায় না। এই তো মুশকিল।

হুম। তাহলে এদের বলুন যারা মন্ত্রণা দিতে আসে তাদের দিয়ে কুয়ো খুঁড়িয়ে নিক। তারাই খাবারের ব্যবস্থা করবে। চলুন, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। মন্ত্রীমশাই হন হন করে। জিপের দিকে এগিয়ে গেলেন। ডি এম এবং এস ডি ও তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। জিপের সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীমশাই একটু ভাবলেন। তিনি না উঠলে বাকিরা উঠতে পারছিলেন না। হঠাৎ মন্ত্রীমশাই অৰ্জুন নায়েককে আঙুল তুলে কাছে ডাকলেন, আপনি আমার গাড়িতে। চলুন। এলাকার কিছু ব্যাপার নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা আছে। তারপর ডি এমকে বললেন, বাকি দুটো জিপে আপনাদের যেতে নিশ্চয়ই খুব অসুবিধে হবে না?

ডি এম বললেন, ন্যা স্যার, অসুবিধে কিসের!

মন্ত্রীমশাই সামনে বসলেন, অর্জুন পেছনে। এবার দীপাবলীর দিকে নজর পড়ল মন্ত্রীমশাইয়ের। তিনি বললেন, তুমি এখানে এসো। তিন মিনিটেই তো তোমাকে পৌঁছে দিতে পারব, তারপর কথা বলা যাবে ওর সঙ্গে।

দীপাবলী আপত্তি করতে যাচ্ছিল, আমি এটুকু পথ হেঁটেই–।

আঃ, ঝামেলা কোনো না তো! মন্ত্রীমশাই ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, যা বলছি তাই করো।

অগত্যা দীপাবলীকে উঠতে হল। চুপচাপ পথটুকু পার হয়ে মোড়ের মাথায় তাকে প্রায় নিঃশব্দে নামিয়ে দিয়ে তিনটে জিপ চলে গেল।

আপনি এখানে দাঁড়িয়ে?

সতীশবাবুর গলা কানে আসতে চমক ভাঙল দীপাবলীর। পাতলা অন্ধকার চুঁইয়ে নামছে । পৃথিবীতে। পথটুকু ঘেঁটে এসেছেন সতীশবাবু। সে সহজ হবার চেষ্টা করল, এমনি।

এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না ম্যাডাম। আর কিছু না হোক, অন্ধকারে সাপ বেরিয়ে আসে মাটি থেকে। দিনেরবেলায় তাপ থেকে বাঁচতে ওরা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে। অন্ধকারে ওদের গায়ে পা পড়ে গেলে।

সাপে চিরকালই দীপাবলীর ভয়। ছবি দেখলেই গা ঘিনঘিন করে। সে প্রায় বাচ্চা মেয়ের মত সতীশবাবুকে বলল, আপনি একটু আমার সঙ্গে যাবেন?

হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। সতীশবাবু আগে আগে হাঁটতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতেই দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, সতীশবাবু, আজ সব দেখে কি মনে হল?

ছোট মুখে বড় কথা বলা ঠিক হবে না ম্যাডাম।

নেখালির লোকগুলো উপকৃত হবে?

হবে। কুয়ো তো খোঁড়া হচ্ছে ম্যাডাম।

এটা ভাবতে পারিনি আমি। অর্জুন নায়েককে গতকাল আমি খুব রেগে গিয়ে যেসব কথা বলেছিলাম ও যে আজ সকালে তাই করবে কে জানত। তিরির কাছে ওর সম্পর্কে যা শুনেছি তাতে এমন ব্যাপার ভাবা যায় না।

ম্যাডাম, আমিও অবাক হয়েছি। কিন্তু দেখুন কাজটা করেছিল বলে মন্ত্রী ওকে নিজের জিপে ডেকে নিলেন। দেখবেন পাঁচ শো টাকা খরচ করে ও পাঁচ হাজার টাকা রোজগারের ব্যবস্থা করে নিল। ভগবান সবসময় ধান্দাবাজদের সাহায্য করেন।

হুম। অর্জুন নায়েককে এস ডি ও পর্যন্ত খাতির করেন কেন?

এসব প্রশ্ন আমাকে করবেন না ম্যাডাম। তবে আমি একটা কথা বলি, ওকে এড়িয়ে চলাই ভাল। লোকটা সাপের মতন।

শরীর ঘিন ঘিন করে উঠল সাপ শব্দটি শুনে। দীপাবলী দাঁতে দাঁত চাপল। না, এড়িয়ে চলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এস ডি ও কিংবা ডি এম অর্জুনকে যে কারণে হাতে রাখতে চান তার সেটার কোন প্রয়োজন নেই। লোকটা যদি কোন অন্যায় করে সে প্রতিবাদ করবে। দরকার হলে আইনসঙ্গত ব্যবস্থাও। চাকরিসূত্রে সে কিছু অধিকার পেয়েছে। সাপকে তোয়াজ করলে ছোবল খেতে হবেই। কিন্তু তার মাজা ভেঙে দিলে নিজের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

অফিসের সামনে এসে সতীশবাবু বললেন, ম্যাডাম, একটা কথা বলব?

বলুন।

আগামীকাল সন্ধের পর কি আপনার একটু সময় হবে?

কেন বলুন তো? আমার বড় মেয়ে এসেছে। নাতনির মুখেভাত কাল। সেই উপলক্ষে কয়েকজনকে খেতে বলেছি। যদি আপনি অনুগ্রহ করে–।

নিশ্চয়ই। এত কুণ্ঠা করছেন কেন আপনি? নিশ্চয়ই যাব। তাহলে তো কাল অফিসে আসছেন না, বাড়িতে যখন কাজ রয়েছে।

না, না, অফিসে আসব। দশটায় ফিরে গিয়ে ওসব হবে।

না, সতীশবাবু। আমার বাবা যদি নাতনির জন্মদিনে অফিসে যেতেন তাহলে আমার ভাল লাগত না। আপনি কাল ছুটি নিন।

অনেক ধন্যবাদ ম্যাডাম। আমি কামাই করলে আপনি কিছু যদি মনে করেন তাই আসতে চেয়েছিলাম। জানেন, আমার মেয়ের বিয়ের দিনেও আমাকে অফিস করতে হয়েছিল। আচ্ছা, আসি আজকে। সতীশবাবু নমস্কার করে বিদায় নিলেন।

দীপাবলী চারপাশ তাকাল। অন্ধকার যেন কিছুটা পাতলা। চাঁদ উঠবে নাকি। ফালি চাঁদের আসার সময় হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও গরম নিঃশ্বাস মিলিয়ে যায়নি। সে দরজায় আওয়াজ করতে তিরির গলা ভেসে এল, কে?

আমি, খোল।

দরজা খুলল তিরি হাতে হ্যারিকেন নিয়ে, সবাই চলে গিয়েছে?

হ্যাঁ। তোদের গ্রামে কুয়ো খোঁড়া হচ্ছে। এখানে আর কেউ তোকে বিরক্ত করতে আসবে না। দীপাবলী নিজেই দরজা বন্ধ করল।

তিরি বলল, নিচুগলায়, একটা লোক এসেছিল।

কে? অবাক হল দীপাবলী।

কি জানি ঠোঁট উল্টালে তিরি, হাতে ব্যাগ ছিল। তুমি নেই শুনেও দাঁড়িয়েছিল। আমি দরজা খুলিনি। তখন বলল ঘুরে আসছে।

তিরি সঠিক কাজই করেছে। অজানা উটকো লোককে ঘরে ঢুকতে না দেওয়ার নির্দেশ ছিল। হাতমুখ ধুয়ে দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, কুয়োয় জল জমেছিল?

পাঁচ বালতি তুলে রেখেছি। তিরি জিজ্ঞাসা করল, চা খাবে তো এখন? আমি জল গরম করেই রেখেছি!

খাব। আচ্ছা, লোকটাকে দেখতে কেমন রে?

লম্বা, পাজামা পাঞ্জাবি পরা চেহারা। তিরি চলে গেল। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ভেবে কোন কূল পেল না দীপাবলী।

শমিত কেন এখানে এল? ওর তো এখানে, তার কাছে আসার কথা নয়। বুকের ভেতর একটা উত্তেজনা শিবিদ্ধ শুয়োরের মত ছটফট করতে লাগল। সে নিজেকে বোঝাতে চাইল। অসম্ভব, শমিত তার কাছে আসতে পারে না। ওর আত্মমর্যাদা আছে। না, অসম্ভব।

তিরি চা নিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে তোমার?

মাথা নাড়ল দীপাবলী, চা রেখে যা।

কিন্তু তুমি ঘামছ?

বললাম তো চা রেখে যা। গলা ওপরে উঠল দীপাবলীর।

খাটের পাশে টেবিলের ওপর কাপ রেখে তিরি চলে গেল। সময় লাগল নিজেকে শান্ত করতে। প্রায় অসাড়েই চায়ের কাপ টেনে নিয়ে চুমুক দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল ঠোঁট। জিভ যেন পুড়ে গেল। চটপট কাপ নামিয়ে রেখে মুখে শব্দ করল দীপাবলী। চা যে গরম থাকবে সেটুকুও মনে ছিল না।

দুটো বছর একা মানুষের জীবনে কতখানি তা ফেলে আসার অনেক পরে যেভাবে টের পাওয়া যায় তা যদি আগে বোঝা যেত? কোন এক পণ্ডিত বলেছিলেন, পৃথিবীতে একটি মানুষের জীবনে ধনরত্ন সম্পত্তির থেকেও মূল্যবান হল সময়। অথচ ঈশ্বর মানুষকে এমন মূর্খ করে রেখে দেন যে সে সেটা চলে যাওয়ার আগে বুঝতেই পারে না কি হারাচ্ছে। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় একটা জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেও মানুষ বুঝতে পারে না ঠিক কতটা সময় অপচয় করল সে।

কিন্তু বেঁচে থাকা মানেই যদি অভিজ্ঞ হওয়া তাহলে অপচয়ের নিশ্চয়ই একটা আলাদা মূল্য রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণে জীবনটাকে দেখার চেষ্টা করলে আর কোন আফসোস থাকে। না। ওয়ার্কিং গার্লস হোস্টলের জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে সেই দুটো বছর তার খুব খারাপ কাটেনি। অন্তত অভিজ্ঞ হয়েছে।

পরীক্ষা পর্যন্ত কোন ঘটনা ঘটেনি যা দীপাবলীকে বিচলিত করতে পারত। জলপাইগুড়ির সম্পত্তির ব্যাপারে অমলকুমার সেখানকার বিখ্যাত উকিল, জীবনগতি রায়মহাশয়ের সঙ্গে থেকে সুরাহা করে দিয়েছিল যা দুটি বিখ্যাত সেবাপ্রতিষ্ঠানের নামে লিখে দিয়ে সমস্ত দায় থেকে মুক্ত হয়েছিল দীপাবলী। এবং এই ঘটনাটির জন্যে যাবতীয় আত্মীয়স্বজনের বিরাগভাজন হওয়াটাকে সে একটুও আমল দেয়নি। পরীক্ষার পর দীপাবলী একই সঙ্গে আই এ এস এবং ডর বি সি এস পরীক্ষায় বসেছিল। আই এ এস পরীক্ষা দিয়েই সে বুঝতে পেরেছিল তার পক্ষে কৃতকার্য হওয়া সম্ভব নয়। পরীক্ষা খুবই খারাপ হয়েছিল। কিন্তু ডব্লু বি সি এস পরীক্ষার দিন আচমকা সর্দিজ্বরে পড়ে গিয়েছিল। জ্বর গায়েই পরীক্ষা দেয় কিন্তু মনে হয়েছিল ফল খুব খারাপ হবে না।

পরীক্ষার পর অখণ্ড অবসর। মায়ার সঙ্গে যোগাযোগ ছিলই। সে মায়াকে বলেছিল শমিতকে খবর দিতে দেখা করার জন্যে। তখন শমিত আসত কালেভদ্রে। তার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসা শমিতের একদম পছন্দ ছিল না। শমিত দেখা হলেই জোর করত নাটকের দলে যোগ দিতে। তার ধারণা নাটকে অভিনয় করলে দীপাবলী অনেক ওপরে পৌঁছাতে পারবে। যে মেয়ে অল্প রিহার্সাল দিয়ে জীবনে নাটক সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকা সত্ত্বেও অত ভাল অভিনয় করতে পারে তার একমাত্র কাজের জায়গা এখানেই হওয়া উচিত। দীপাবলী একমত হয়নি কখনও। সে ইচ্ছে করেই ওর নাটকের দলে যেত না। একধরনের অস্বস্তি হত।

মায়াকে খবর দেওয়া সত্ত্বেও শমিত দেখা করতে এল না। এমনটা সাধারণত হয় না। বেশ কিছুদিন আগে শমিত দীপাবলীকে বলেছিল সে যদি ইচ্ছে করে তবে তার স্কুলে ডেপুটেশন ভ্যাকেন্সিতে কাজ করতে পারে। পরে তার মনে হয়েছিল শমিত আলাপের সময় বলেছিল সে নিজেই ডেপুটেশন ভ্যাকান্সিতে আছে। হয়তো স্কুলের নিয়মিত শিক্ষক না হওয়ায় কর্তৃত্ব তৈরি হয়নি বলে পরে এ নিয়ে আর কথা বলেনি। চাকরি বাকরি পাওয়ার আগে যদি স্কুলে সাময়িক পড়ানোর কাজ পাওয়া যায় মন্দ কি। টিউশনি এবং ব্যাঙ্কের সামান্য সুদে তার মোটামুটি চলে যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে চারটের বেশি ভাল শাড়ি নেই তার। আটপৌরে ধরলে বড়জোর দশটা হবে। দুটোর রঙ উঠে গেছে অনেকটা। শাড়ির ওপর তার কখনই আকর্ষণ ছিল না, নেই, কিন্তু একজন মহিলাকে বাইরে বের হতে গেলে রুচিসম্পন্ন পোশাক দরকার হয়।

এক রবিবার দুপরে খাওয়াদাওয়ার পর হোস্টেল থেকে বের হল সে। মায়ার কাছ থেকে শমিতের ঠিকানা পেয়েছিল কদিন আগে। শ্যামবাজারের মোড়ে গিয়ে বাস ধরে যখন সে শমিতের পাড়ায় গিয়ে পৌঁছল তখন রাস্তাঘাট ফাঁকা, রোদুর কড়কড়ে। জায়গাটা দেখলে কলকাতা বলে মনেই হয় না। একটা মুদির দোকান খোলা ছিল। সেখানে জিজ্ঞাসা করে শমিতের বাড়িতে পৌঁছাল সে। একতলা সাদামাটা বাড়ি। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। হঠাৎ মনে হল এমন না ভেবে চলে আসা ঠিক হয়নি। শমিতের বাড়ির লোকজন কিছু মনে করতেও পারে। কিন্তু চলে আসার পর ফিরে যাওয়ার কোন মানে হয় না। সে দরজায় শব্দ করল।

ভেতর থেকে শমিতের গলা ভেসে এল, কে?

দীপাবলী চুপ করে রইল। কয়েক সেকেন্ড বাদে দরজা খুলল শমিত। তার চোখ বিস্ফারিত। আরে, তুমি? কি আশ্চর্য ঘটনা। কি ব্যাপার?

দীপাবলী হাসল। বাইরে দাঁড়িয়ে উত্তর দেব?

না, না। সরি। এসো, ভেতরে এসো!

দীপাবলী ঘরে ঢুকল। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘর। দেওয়ালে দুটো ছবি টাঙানো। একটি উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের। অন্য ছবিটি সে কখনও দ্যাখেনি। সেটা লক্ষ্য করেশমিত বলল, উনি শিশিরকুমার ভাদুড়ি। আধুনিক বাংলা নাটকের জনক।

দীপাবলী ছবি থেকে চোখ সরিয়ে বলল, এইসব নাম আমি বইয়ে পড়েছি।

শমিত মাথা নাড়ল, আমিও। তবে অনেকেই ওঁর অভিনয় দেখেছেন অনেকবার। ওঁর। সঙ্গে অভিনয় করা মানুষের অভাব নেই শহরে। বসো।

তিনটে বেতের চেয়ারের মাঝখানে ছোট টেবিল। দীপাবলী বসল। উল্টোদিকে শমিত। দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, বাড়িতে কেউ নেই?

নাঃ। মা গিয়েছে তার বোনের বাড়িতে। চা-ফা খাওয়াতে পারব না।

শমিতের এইরকম কথা বলা ভাল লাগে দীপাবলীর। সে হাসল, আমার চায়ের নেশা এখনও তীব্র নয়। আমি কিন্তু অন্য প্রয়োজনে এসেছি।

শোনা যাক। প্রয়োজন ছাড়া আজকাল কেউ কারো কাছে আসে না।

সে কি! আপনি যে আমার জন্যে এত করলেন, এতবার গেলেন তার পেছনে কোন প্রয়োজন ছিল বলে তো মনে হয়নি।

ছিল। প্রথমতঃ, তোমাকে আমাদের নাটকের দলে টানতে চেয়েছিলাম।

ও, শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে যাওয়া বন্ধ করলেন?

তা ঠিক নয়। প্রথমত বললেন যখন তখন দ্বিতীয় কোনো ব্যাপার নিশ্চয়ই আছে!

শমিত হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল, তোমার উচিত আইন পড়া। চমক্কার প্র্যাকটিস করতে পারবে তাহলে! বল, প্রয়োজনটা কি?

মুখ গম্ভীর হল দীপাবলীর। তারপর বলে ফেলল, আমার একটা চাকরি চাই। আপনি বলেছিলেন স্কুলে ডেপুটেশন ভ্যাকেন্সিতে কাজ করা যাবে।

সে কি। তোমার তো বড় বড় আইডিয়া। আই এ এস, ডব্লু বি সি এস!

আইডিয়াগুলো মরে যায়নি বলেই পার্মানেন্ট পোস্ট চাইছি না!

ঠিক আছে, চেষ্টা করব। স্কুলে গিয়ে কথা বলতে হবে। শমিত চোখ বন্ধ করল, তিন চার মাস কিন্তু।

তাতেই হবে। তবু তো একটা কাজ করা যাবে!

হোস্টেল কেমন চলছে?

ঠিক আছে। বৃষ্টির জল পুকুরে পড়লে পুকুরের জল হয়ে যায়।

বাঃ। দারুণ। শমিত উঠল, বসো।

কোথায় যাচ্ছেন?

বাড়িতে অতিথি এল, কিছু যোগাড় করি!

দীপাবলী ঝটপট উঠে দাঁড়াল, না, না, আমি কিছু খাবো না, আপনি একদম ব্যস্ত হবেন না। আমার খারাপ লাগছে।

হঠাৎ চোখ স্থির হল শমিতের, দীপা!

দীপাবলী অবাক হয়ে তাকাল। চোখ না সরিয়ে শমিত বলল, তুমি কি সত্যি কখনো আমাকে তুমি বলতে পারবে না? আমি কি এতই অযোগ্য?

হঠাৎ একথা?

জিজ্ঞাসা করছি।

যোগ্যতা বা অযোগ্যতার কথা নয়। আপনি বা তুমি বলার মধ্যে পার্থক্য করছেন কেন?

হঠাৎ সামনে এগিয়ে এসেই নিজেকে সংযত করল, শমিত, না, ঠিক আছে, শোন, আমি তোমাকে আমার জীবনে চাই। পেতে পারি কি?

ঠিক এইরকম কিছু আন্দাজ আসছিল কিছুক্ষণ। মুখ ফেরাল দীপাবলী।

আমি তোমাকে স্পর্শ করব না, কোন জোরজবরদস্তি করব না, তুমি নির্দ্বিধায় না বলতে পার। আমি কিছু মনে করব না।

দীপাবলী কোন কথা বলতে পারছিল না। তার গলা আচমকা শুকিয়ে যাচ্ছিল, গালে রক্ত জমছিল। শমিত সেটা লক্ষ করল। সে বলল, তুমি কি কখনও আমার মনের কথা বোঝনি? আমি যে বারেবারে তোমার কাছে ছুটে গিয়েছি তা কি শুধু নাটকের প্রয়োজনে!

তাই তো বললেন একটু আগে। দীপাবলী মৃদুস্বরে বলল মুখ ফিরিয়ে।

সেটা অবশ্যই সত্যি। কিন্তু শেষ সত্যি নয়। দ্বিতীয় প্রয়োজনটা যখন তোমাকে বলতে পারিনি। হ্যাঁ, আমি আমার জন্যে গিয়েছিলাম।

আপনি তো আমার সব কথা জানেন। জানি। তুমি বিধবা না কুমারী তাতে আমার কিছু এসে যায় না। শমিত আরও এগিয়ে এল, আমি তোমার ভালবাসা চাই।

সমস্ত শরীরে কাঁটা ফুটল দীপাবলীর, আমি একটু ভাবব।

ভালবাসা ভেবে আসে না।

না ভেবেও তো আসেনি।

আমার জন্যে তোমার ভালবাসা আসেনি?

দীপাবলী জবাব দিল না। শমিত তার দিকে উদ্বেগে তাকিয়ে আছে। সে বলল, আমি এখন যেতে পারি?

হঠাৎ শমিত অদ্ভুতভাবে ডুকরে উঠল। তারপর ছুটে গেল ভেতরের ঘরে। বাইরের ঘরে দাঁড়িয়েই দীপাবলী ওর কান্নার শব্দ শুনতে পেল। নাটকের দলে বা বাইরে যে বেপরোয়া অথচ ব্যক্তিত্বপূর্ণ শমিতকে সে দেখেছে তার গলায় ওই শব্দ এই কান্না কিছুতেই মানায় না। ইচ্ছে সত্ত্বেও শুধু এই কারণে বাইরের দরজা খুলে রাস্তায় নামতে পারল না। দীপাবলী। পায়ে পায়ে ভেতরের ঘরে ঢুকে একটি আটপৌরে শাওয়ার ঘর দেখতে পেল। খাটের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে শমিত। কান্নার শব্দ ছিটকে উঠছে চাপা মুখ থেকে, পিঠ ওঠানামা করছে। একমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দীপাবলী খাটের একপাশে বসে ওর পিঠে হাত দিতেই শরীর স্থির হল। দীপাবলী বলল, এমন করবেন না।

হঠাৎ ঘুরে উঠে বসল শমিত। তারপর দীপাবলী কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু-হাত বাড়িয়ে তাকে বুকে টেনে নিয়ে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল। আচমকা প্রবল বর্ষণে বট গাছের পাতারাও যেমন কেঁপে কেঁপে ওঠে তেমনি টালমাটাল হল দীপাবলী। প্রতিরোধ করার চেষ্টা তীক্ষ্ণ হবার আগেই যেন তার শরীর শক্তিশূন্য হয়ে গেল। ততক্ষণে তার ঠোঁট খুঁজে পেয়েছে শমিত। সেই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সে ফিসফিস করল, বল, তুমি আমাকে ভালবাস না?

না। দীপাবলী কোন রকমে ঠোঁট সরাল।

কেন? আচমকা সমস্ত আক্রমণ গুটিয়ে গেল, শমিত যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। অন্তত ওই মুহূর্তে এমন উত্তর সে আশাই করেনি।

মুক্ত দীপাবলী সরে বলল, আপনি ভুলে যাচ্ছেন মায়া আপনাকে ভালবাসে।

মায়া? আমাকে! স্তম্ভিত হয়ে গেল শমিত।

আপনি জানেন না?

না! তোমাকে বলেছে একথা?

মেয়েরা বুঝতে পারে, বলতে হয় না।

যা তা বকো না। মায়া আমার বন্ধু, জাস্ট বন্ধু, তার বেশি আর কিছু নয়।

আমি বিশ্বাস করি না।

তুমি কি মনে করছ মায়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আমি তোমাকে এসব কথা বলছি? তুমি আমাকে কি মনে করছ?

কিছু না। কিন্তু মায়াকে আমি কষ্ট দিতে পারব না। আপনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব নষ্ট হবে না। শুধু আজকের এই ঘটনাটা আমি যেমন ভুলে যেতে চাইব আপনিও যদি ভুলে যান তাহলে দুজনেরই ভাল হবে। চুপচাপ বেরিয়ে এসেছিল দীপাবলী। শমিত ওঠেনি খাট থেকে।

তুমি চা খেলে না? তিরির মুখে প্রশ্নটা উচ্চারিত হতেই দীপাবলী চায়ের কাপের দিকে তাকাল। ইতিমধ্যে সর পড়ে গিয়েছে ওপরে। হাত বাড়িয়ে কাপটাকে ধরতেই বুঝল ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। এখনও চায়ের নেশা তাকে তেমনভাবে পাকড়াও করেনি। সে বলল, নিয়ে যা। খাবো না।

আর তখনই বাইরের দরজায় শব্দ হল। তিরি বল ওই লোকটা বোধহয় এসেছে। সে বাইরের ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু দীপাবলী পিছু ডাকল, দাঁড়া, তোকে যেতে হবে না। আমি যাচ্ছি।

ভারী পা নিয়ে বাইরের ঘরে এসে কোন প্রশ্ন না করে সে দরজা খুলল। খুলতেই চমকে উঠল সে, আপনি?

পেছনের দরজায় অন্ধকার আলোয় দাঁড়ানো তিরি দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।

০৪. অর্জুন নায়েক

অর্জুন নায়েক হেসে বলল, খুব অসময়ে এসেছি, না? আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। আপনি যদি এখন কথা বলতে না চান তাহলে আমি চলে যাচ্ছি।

কথা বলার কোন আগ্রহ দীপাবলীর ছিল না। যদিও লোকটা খুবই বিনয় নিয়ে কথা বলছে তবু ওর ঠোঁটের কোণের সেই চটচটে হাসিটা দেখতে পাচ্ছিল সে হ্যারিকেনের আলোয়। লোকটা ধাবাবাজ এবং নিঃসন্দেহে বদ লোক। কিন্তু হঠাৎ দীপাবলীর জেদ চেপে গেল। সে বলল, আপনি বসতে পারেন।

একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ধপাস করে বসে দুটো পা ছড়িয়ে যেন আরাম পেতে চাইল অর্জুন। এবং তারপরেই যেন খেয়াল হল, পা গুটিয়ে বলল, সরি।

দীপাবলী কথা না বলে উল্টোদিকের চেয়ারে বসে বলল, অফিসের পরে যখন এসেছেন। তখন নিশ্চয়ই জরুরি কিছু বলার আছে আপনার?

থানার দারোগার সঙ্গে আলাপ হয়েছে আপনার?

হ্যাঁ। এস ডি ও-র অফিসে। কেন বলুন তো?

লোকটার চাকরির বারোটা বেজে গেল। মিনিস্টার বললেন, অর্জুন তুমি খবর পেয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলে আর আমারই দারোগা একবার আসার সময় করতে পারলো না। ডি এম, এস ডি ও খবর পায় আর সে কোথাকার বাদশা?

আপনি কি বললেন? আমি পাবলিক। মন্ত্ৰী সেনাপতিদের যুদ্ধে কথা বলব কেন?

এই খবর শুনে আমি কি করব?

পকেট থেকে একটা ছোট্ট পেতলের কৌটো বের করে দুই আঙুলের মাঝখানে কিছু গুড়ো তুলে মুখে ফেলল অর্জুন, ম্যাডাম, বৃষ্টি হবার আগে পিপড়েরা ঠিক টের পেয়ে যায়। আপনার এখান থেকে সার্কিট হাউসে ফিরে যাওয়ার পরেই যারা জানার তারা জেনে গেল মিনিস্টার আপনাকে খুব পছন্দ করেছেন। নইলে তিনি এই রোদে গরমে নেখালির মানুষদের দেখতে আসতেন না। ম্যাডাম, এই দেশে নেখালির মত হাজার হাজার গ্রাম, লক্ষ লক্ষ মানুষ খুঁকছে। কজন মন্ত্রী ভুল করেও সেখানে পা দিয়েছেন বলুন তো?

আপনি কি বলতে চাইছেন বুঝতে পারছি না। খোলা দরজার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল দীপাবলী। তার অস্বস্তি হচ্ছিল।

খুব সহজ। এটা আপনার বোঝা উচিত ছিল!

মানে?

ম্যাডাম, মিনিস্টার যতদিন থাকবেন ততদিন আপনার ডিম্যান্ড থাকবে। মানে, যার যা প্রয়োজন মেটাতে আপনাকে এসে ধরবে। সবার ধারণা মিনিস্টার আপনার কথা ফেলতে পারবেন না।

আপনার আসার উদ্দেশ্যটা কি বলুন তো?

দারোগা এসে আপনাকে ধরবে মিনিষ্টারকে বলে দেবার জন্যে। হয়তো চাইবে আপনি ওর হয়ে রাইটার্সে গিয়ে দরবার করুন। আপনাকে শুধু বলে রাখি লোকটা অত্যন্ত ফেরেব্বাজ। মন্ত্রী আসবে এদিকে তা জানতো না। কেই বা জানতো। তাই দারোগা গিয়েছিল নিজের ধান্দায়।

আপনার সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক কেমন? চট করে জিজ্ঞাসা করল দীপাবলী।

হাসল অর্জুন, জলে যারা বাস করে তারা পরস্পরকে সামলে চলে ম্যাডাম।

ঠিক আছে, কিন্তু অর্জুনবাবু, আপনি এটা কি করলেন?

কোনটা? চোখ ছোট করল অর্জুন।

এই যে নেখালিতে আজ সকাল থেকে কুয়ো খুঁড়তে লোক পাঠালেন?

এটা তো আপনারই হুকুম ম্যাডাম! তাই না?

কিন্তু এর ফলে মন্ত্ৰী তো হাত গুটিয়ে নিতে পারেন।

পারেন। তবে আদৌ যে হাত খুলতেন এই গ্যারান্টি কি ছিল?

ছিল না। কিন্তু উনি যখন এসেছিলেন তখন একটা কিছু হতই।

সেটা এখনও হতে পারে। ম্যাডাম, লোকে আমাকে ভাগ্যবান বলে। ভাগ্যবানের বোঝা সবসময় ভগবান বয়ে থাকেন। নইলে আপনি বললেন আর লোক পাঠালাম কুয়ো খুঁড়তে, এমনটা হয় না। মানে কারো কথা আমি চট করে শুনি না। তা শুনে দেখুন বিরাট লাভ হল। মিনিস্টারের গুড বুকে চলে গেলাম। জিপে করে যাওয়ার সময় কত গল্প। সব ঠিকঠাক হলে আগামী বছরই জিভে শব্দ করল অর্জুন! আর এসব হয়েছে আপনার জন্যে।

আমার জন্যে? দীপাবলী অবাক।

সত্যি কথা বলতে আমি দ্বিধা করি না। আপনার কথা শুনেছি বলেই আজ ডি এম পর্যন্ত আমাকে খাতির করবেন। লোকটা আগে আমাকে ঠিক পাত্তা দিত না। এবার বলুন, আপনার কি সেবা করতে পারি? অর্জুনের ঠোঁটে সেই চটচটে হাসি চলকে উঠল। তার চোখ দুটো দীপাবলীর মুখের ওপর স্থির।

আপনি কি মিন করছেন? আচমকা মাথায় রক্ত উঠে এল।

ম্যাডাম, একটা কথা শুনেছি, রোমে গেলে নাকি রোমানদের মত ব্যবহার করতে হয়। রাগ করবেন না, আপনি তো নিয়মের বাইরে যেতে পারেন না।

অৰ্জুনবাবু, আপনি কিন্তু সীমা ছাড়াচ্ছেন। দীপাবলী উঠে দাঁড়াল।

এবার অর্জুন উঠল, অনেক ধন্যবাদ মনে করিয়ে দেবার জন্যে। অপরাধ হয়ে থাকলে নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন। আপনি এরকম কথা বলবেন তা আমি আন্দাজ করেছিলাম। ঠিক হ্যায়, নেখালিতে না হয় আরও দুটো কুয়ো আর একটা নলকূপ করে দেব দিন চারেকের মধ্যে। তাতে নিশ্চয়ই আপনি আপত্তি করবেন না! চলি। নমস্কার করে খোলা দরজার দিকে এগিয়ে গেল অর্জুন। একধাপ নেমে সে ঘুরে দাঁড়াল, আপনার এখানে যে মেয়েটা কাজ করে তাকে বলে দেবেন আমি মানুষ, ভয় পেয়ে ওইভাবে ছুটে যাওয়ার কোন কারণ নেই।

দীপাবলী কেটে কেটে বলল, কি করবেন বলুন, আপনার মত মানুষদেরই ওর ভয়।

অর্জুন হাসল, ও যখন নেখালিতে থাকত তখন নিশ্চয়ই ওর ভয় ছিল। কিন্তু এই কোয়াটার্সে আসার পর থেকে আর কোন ঝামেলায় পড়তে হয়নি নিশ্চয়ই। কারো বাগানে ঢুকে ফুল ছেড়ার ইচ্ছে আমার এখনও হয়নি ম্যাডাম। কথা শেষ করে অর্জুন চলে গেল। জিপের আওয়াজটা চারপাশ মাতিয়ে দূরে সরে গেল হেডলাইটের আলোয় অন্ধকার কাটতে কাটতে। দরজাটা বন্ধ করল দীপাবলী। লোকটা যতক্ষণ এই ঘরে বসেছিল ততক্ষণ এক ধরনের আড়ষ্টতা তাকে ঘিরে রেখেছিল। কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছিল না সে! লোকটা কেন এল? একটা অসৎ বদ লম্পট মানুষ কোন প্রয়োজনে তার কাছে আসতে পারে? এই জেলার বড় কর্তারা যার কথায় ওঠে বসে তার কোন দরকার নেই তাকে খাতির করার? মন্ত্রীর নেকনজরে পড়ে লোকটা আরও রোজগার করবে। কিন্তু সেই কারণে তাকে ঘুষ দিতে আসবে কেন? সে রেগে উঠতেই নেখালির মানুষদের উপহার হবে এমন কাজ করার কথা বলল। দীপাবলীর পক্ষে সম্ভব ছিল না লোকটাকে ওই কাজ করা থেকে বিরত করা। কিন্তু অর্জুন নায়েক যতক্ষণ ছিল তাকে অসম্মান করার চেষ্টা করেনি। বরং যথেষ্ট বিনয় দেখিয়েছে। সে যে খারাপ মানুষ তা স্বীকার করতে দ্বিধা করেনি। অবাক লাগছে এখানেই।

দিদি, চা।

দীপাবলী দরজা বন্ধ করে চেয়ারে বসে পড়েছিল। তিরির গলা শুনে মুখ তুলল। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল, শোন, আমার এখানে তোর কোন ভয় নেই। কেউ এলে ওইভাবে দৌড়ে পালাবি না।

তুমি জানোনা দিদি, লোকটা একেবারে শয়তানের বাচ্চা।নতুন নতুন মেয়ে না পেলে ওর চলে না। ওর সঙ্গে বেশি কথা বলো না। তিরি উত্তেজিত।

তিরি? দীপাবলী ধমকে উঠল, এভাবে আমার সঙ্গে কথা বলবি না।

তিরি মাথা নিচু করল। আর তখনই দরজায় খুটখুট শব্দ হল। দীপাবলী বন্ধ দরজার দিকে প্রথমে তারপরে তিরির দিকে তাকাল। তিরি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, আমি কি দরজা খুলব?

দীপাবলী এক মুহূর্ত ভাবল। এই পাণ্ডব বর্জিত জায়গায় রাত্রের অন্ধকারে কিছু মানুষ। যদি মতলব নিয়ে আসে তা হলে দুটি মেয়ের পক্ষে কোন প্রতিরোধ তৈরি করা সম্ভব হবে না। সতীশবাবু অবশ্য বলেছেন তেমন বিপদ এই তল্লাটে এখনও কারো হয়নি। তবু। সে নিচু গলায় বলল, জিজ্ঞাসা কর, কে? তারপর খুলবি। একটু আগে অর্জুনকে দরজা খোলার আগে তার এই কাজটাই করা উচিত ছিল বলে মনে হল।

তিরি গলা তুলে জানতে চাইলে, কে?

বাইরে থেকে আওয়াজ এল, আমি। দীপাবলী ফিরেছে?

সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো দীপাবলী। তারপর তিরিকে বলল, ঠিক আছে, তুই ভেতরে যা।

তিরি পায়ে পায়ে পিছিয়ে গেল ভেতরের ঘরের দরজা পর্যন্ত। দীপাবলী এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই আধা অন্ধারে দাঁড়ানো শমিতকে দেখতে পেল। শমিত হাসল, চমকে গেলে?

একটু, এসো, ভেতরে এসো। কথাগুলো বলামাত্র দীপাবলীর খেয়াল হল কলকাতায় শেষবার দেখা হওয়ার সময়েও সে শমিতকে আপনি বলেছে। মনে মনে তৎক্ষণাৎ কুণ্ঠা ঝেড়ে ফেলল। শমিত ততক্ষণে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তার কাঁধে ঝোলা, হাতে ব্যাগ। পরনে সেই একই পোশাক। দাড়ি রেখেছে।

বসো। দরজা বন্ধ করল দীপাবলী।

চেয়ারে বসে শমিত বলল, আমি বিকেলের দিকে এসেছিলাম। শুনলাম তুমি নাকি মাননীয় মন্ত্ৰীমহাশয়ের সঙ্গে কাজে বেরিয়েছ। কখন ফিরবে তা তোমার মেইড সার্ভেন্ট জানে না। ফলে আমাকে একটা আস্তানার সন্ধানে যেতে হয়েছিল। কিন্তু এই জায়গা এমন পাণ্ডববর্জিত যে রাত কাটানোর কোন ব্যবস্থাই নেই। ভয়ে ভয়ে ফিরলাম যদি তোমার দেখা পাই! আমি ভাবছি বেশ ভাগ্যবান, কি বল?

চুপচাপ কথাগুলো শুনল দীপাবলী। তারপর চুপচাপ উল্টোদিকের চেয়ারে বসল।

শমিত জিজ্ঞাসা করল, আমি কি তোমাকে অসুবিধেতে ফেললাম?

কেন?

তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে!

না। আমি ভাবছি হঠাৎ কি কারণে তুমি তোমার নাটক ছেড়ে এতদূরে, আমার ঠিকানাই বা পেলে কোথায়?

এসবই চেষ্টা করলে পাওয়া যায় দীপা। কিন্তু আমি খুব ক্ষুধার্ত, সারা শরীর গরমে ঘামে পচছে। একটু আরাম করে স্নান করা দরকার তার আগে।

নিশ্চয়ই। কিন্তু এই অঞ্চলে জল খুব মূল্যবান বস্তু। অতএব একটু কৃপণের মত খরচ করলে সবার উপকার হয়। দীপাবলী উঠে ভেতরের ঘরের দিকে যেতেই তিরিকে দেখতে পেল, বাথরুমে একটা আলো দে।

বাইরের ঘর থেকে শমিতের গলা ভেসে এল, আমার কাছে স্নানের সব সরঞ্জাম আছে।

যেমন? গলা তুলল দীপাবলী।

গামছা, সাবান।

দীপাবলীর ঠোঁটে আসি মিলিয়ে গেল। তিনি ফিরে আসা পর্যন্ত সে ভেতরের ঘরেই দাঁড়িয়ে রইল। তিরি বলল, হয়ে গিয়েছে।

দীপাবলী বাইরের ঘরে বেরিয়ে এল, একটু সাবধানে যাও। এখানে ইলেকট্রিক নেই। ব্যাগটা ওখানেই থাক। শমিত ঝোলাটা নিয়েই তিরিকে অনুসরণ করে ভেতরে চলে গেল। খাটে এসে বসল দীপাবলী। অভদ্রতা করা যেখানে অসম্ভব, খুশি যেখানে চেষ্টা করেও হওয়া যায় না সেখানে একধরনের চাপা অস্বস্তি থিক থিক করে দীপাবলী কিছু ভাবতেই পারছিল না। তার এখন কি করা উচিত?

এই সময় তিরি ফিরে এল, দিদি, উনি কি রাত্রে খাবেন?

তাই তো মনে হচ্ছে।

কি হবে তাহলে? আমি তো মাত্র আমাদের জন্যে বেঁধেছি।

আবার ভাত বসিয়ে দে। ডিম নেই?

মাথা নাড়ল তিরি, কিন্তু শোবে কোথায়?

দেখি ভেবে।

তিরি এক মুহূর্ত চুপ করে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কে হয়?

দীপাবলী চমকে উঠল। কেউ না বলতে গিয়েও থমকে গেল। যেটা স্বাভাবিক, সেই বন্ধু শব্দটি উচ্চারণ করলে তিরি হজম করতে পারবে না। অথচ এমন প্রশ্নের জবাব দেবার একটা দায় থেকেই যায়। কর্তৃত্ব দেখিয়ে ধমকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। দীপাবলী উত্তর দিল, আমাদের আত্মীয়। তুই রান্নাঘরে যা।

তিরি চলে গেলে এই একটি বাংলা শব্দের কাছে কৃতজ্ঞ হল সে। আত্মীয় শব্দটি ঠিক আকাশের মত। কোন গণ্ডীতে আটকানো নয়। রক্ত অথবা আত্মার সম্পর্ক থাকলে তো বটেই আবার পাঁচজনের চোখে যা কাছের তাকে দূরে ঠেলতেও ওই একই শব্দ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু শমিত কেন এখানে?

বছরগুলো বেশি পুরনো নয়। সেই দুপুরে শমিতের বাড়ি থেকে চলে আসার পরে দীপাবলী ভেবেছিল হয়তো কিছুদিন সে তার সামনে আসবে না। সেদিন হোস্টেলে ফিরে এসেছিল একটা ঘোরের মধ্যে। যত সময় যাচ্ছিল তো ভাল লাগা কুয়াশার মত তার দশদিক আড়াল করে দিচ্ছিল। একটি ছেলে নাটক করে, কোন বদ-অভ্যাস নেই, পড়াশুনা করতে ভালবাসে এবং সেইসঙ্গে ব্যক্তিত্ব, তার ভালবাসা উপেক্ষা করার একটাই যুক্তি ভবিষ্যতে স্বাচ্ছন্দ্য আসবে কিনা তার স্থিরতা নেই। কিন্তু ক্রমশ মনে হচ্ছিল সেই ঝুঁকি নেওয়া যায়। সৎ শিল্পের সঙ্গে যে মানুষ জড়িত তার পাশে থাকায় নিশ্চয়ই এক ধরনের তৃপ্তি আছে। সেই তৃপ্তি ধনসম্পদের বিনিময়ে পাওয়া যাবে না।

শমিত প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে তাকে স্পর্শ করেছিল। সেই স্পর্শে কাম ছিল কি না এখন বোধে নেই। সে এমন অপ্রাপ্তমনস্ক নয় যে শমিতের মন তার জন্যে তৈরি এই কথাটা এতদিনে বোঝেনি। অতএব নিরালায় একা পেয়ে শমিতের বাঁধ যদি ভেঙে যায় তাহলে প্রাথমিক যে কুণ্ঠা মনে আসে তা দূর করার মত যুক্তি খুঁজে নিচ্ছিল দীপাবলী। সেই কত বছর আগে জীবনীশক্তি ফুরিয়ে যাওয়া একটি অর্ধমৃত মানুষ শুধু আদেশ পালন করার তাগিদে তার শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তখন এই শরীর তৈরি হয়নি কোন পুরুষের জন্যে। যে মানুষটি স্বামী হিসেবে ফুলশয্যায় রাত্রে তাকে মা করতে চেয়েছিল তার ক্ষমতা কত সীমিত ছিল যে সামান্য প্রতিরোধ সহ্য করতে পারেনি। একধরনের জ্বালা ঘেন্না আতঙ্ক তার মনে তৈরি করে মানুষটি নেতিয়ে পড়েছিল। এত বছর পরে সেই ভাবনা মুখ নামিয়ে ছিল মনের কোণে। কোন পুরুষ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি, পুরুষের স্পর্শের জন্যে একটুও আকাঙ্ক্ষা হয়নি তার। ওই দুপুরে শমিতের স্পর্শে সেই ভাবনা মুখ তুলেছিল। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় সেই ঘেন্না আকাশ ছুঁয়েছিল। কিন্তু রাত্রে সব কিছু থিতিয়ে যাওয়ার পর অনেক বছর আগের মৃত মানুষটিকে ছাপিয়ে একটি স্বাস্থ্যবান পুরুষের আবেগজড়ানো স্পৰ্শ তাকে যেন বিপরীত দিকে টানতে লাগল। সেই মুহূর্তে তার সারা আকাশ জুড়ে শমিত। যদি রাত না অন্ধকার ছড়াতে, যদি বাস-ট্রাম বন্ধ না হয়ে যেত তাহলে হয়তো সে। ছুটে যেতে পারত শমিতের কাছে। কি বলত তা জানা নেই, জানতে ইচ্ছেও ছিল না। শুধু ছুটে যাওয়ার এক উগ্র আকাঙ্ক্ষা বুকের পাঁজরে বারংবার ঘা মারছিল।

রাত কেটেছিল আধো ঘুম আধো জাগরণে। সেই একটি রাত যা তার সমস্ত ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে মৃত করে দিয়েছিল। জলপাইগুড়ি থেকে যে প্রতিজ্ঞা নিয়ে কলকাতায় এসেছিল তা যেন অর্থহীন মনে হয়েছিল। এক ফোঁটা ভালবাসার জন্যে যদি কোন মানুষ লক্ষ মাইল হেঁটে যেতে পারে তাহলে একটা পুরো সমুদ্র পেলে সে কি করবে?

সকাল হল। রোদ উঠল রোদের মতন। অদ্ভূত আলস্য নেমে এসেছিল শরীরে, মনে। কিন্তু ভাল লাগছিল না, কিছু না। এমনকি স্নান বা খেতেও মন আসছিল না। দুপুর যখন ঠিক দুকুরবেলা, তখন সে বেরিয়েছিল হোস্টেল থেকে। প্রায় উদভ্রান্তের মত হাজির হয়েছিল মায়াদের বাড়িতে। মায়া বাড়িতে ছিল না। মাসীমা তাকে দেখে চমকে উঠে জানতে চেয়েছিল, কি হয়েছে?

কই! কিছু না তো! হঠাৎ যেন নিজের ব্যবহারে আটপৌরে ভঙ্গী আনতে চাইল সে।

কিছু একটা হয়েছে। শরীর কেমন আছে?

ভাল। মায়া কোথায়?

বেরিয়েছে।

কোথায়? বলে তো গেল ও আর সুদীপ শমিতের বাড়িতে যাচ্ছে।

নামটা শোনামাত্র বুকের বাতাস স্থির হল, কেন?

কাল নাকি শমিত রিহার্সালে আসেনি।

ও তো এমন কখনও করে না।

মায়া সুদীপের সঙ্গে গিয়েছে?

বলে তো গেল। একাও যেতে পারে। আমি মেয়েকে বুঝি না বাবা।

কেন?

মুখে আলগা আলগা ভাব দেখায় কিন্তু মনে যে শমিতের জন্যে টান আছে তা লুকিয়ে রাখতে চায়। দ্যাখো, শমিত ভাল ছেলে। কিন্তু হঠাৎ চুপ করে গেলেন মাসীমা, তারপর মাথা নাড়লেন, নাঃ যখন ঠিক করেছি বাধা দেব না, তখন কিছুতেই বাধা দেব না। নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই বুঝে নিক। আমাকে তো দায়ী করতে পারবে না।

মাসীমা নিঃশ্বাস ফেললেন। আর এই কথাগুলো শোনামাত্র মাথা থেকে একটা স্রোত ধীরে ধীরে পায়ের বুড়ো আঙুলে, শেষে শরীরের বাইরে নেমে উধাও হয়ে গেল দীপাবলীর। আচমকা যেন সবকিছু সহজ হয়ে গেল। হোস্টেলে ফিরে এসে চুপচাপ নিজের খাটে শুয়ে শুধু একধরনের শূন্যতাবোধ ছাড়া আর কিছু মনে জড়িয়ে ছিল না।

অথচ সেই শূন্যতাবোধের যে কতখানি ভারী তার টের সে পেতে লাগল সময় যত পেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ যেন সিংহাসন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এমন অনুভূতি প্রবল হচ্ছিল। এবং সেই সঙ্গে এল ঈর্ষা, রাগ, অভিমান। নিজেকে খুব খেলো মনে হতে লাগল। মায়া কোন এক সময় তাকে ঠাট্টার গলায় বলেছিল, দেখিস বেশী জড়িয়ে যায় না। সেটা কি সতর্কীকরণ ছিল? আমার সম্পত্তিতে হাত দিও না! কিন্তু শমিত কারো সম্পত্তি হতে পারে না। মায়া শমিতকে ভালবাসে এটা নিছক অনুমানেই ছিল তার। সেইমত শমিতকে বলেছিল ওইসময়। শমিত অস্বীকার করেছিল, অর্থাৎ ভালবাসা টাষা নয়, স্রেফ শরীরের প্রয়োজনে তাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। যা একসময় আবেগের চূড়ান্ত প্ৰকাশ বলে মনে হয়েছিল তাকেই এখন পরিকল্পিত লাম্পট্য বলে মনে হল। আর তখনই অপমানবোধ প্রবল হল। ওই দুপুরের পর নিজের যে পরিবর্তন হয়েছিল তার জন্যে লজ্জায় ঘেন্নায় নুইয়ে যাচ্ছিল সে। ইচ্ছে করছিল সোজা মায়ার কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বলে দেয়। যে পুরুষ প্রেমিকাকে প্রতারণা করে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা বোকামি। মায়াকে সতর্ক করে দেওয়া দরকার। মায়ার সঙ্গে কোন আত্মিক সম্পর্ক নেই বলে শমিত যে তাকে ভুল বুঝিয়েছে তাও মায়ার জানা দরকার। মন স্থির করে ফেলেছিল দীপাবলী। আর তখনই ঘটনাটা ঘটল।

সন্ধ্যে সবে ঘন হয়েছে। মায়া এল তার কাছে।

তখনও বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়েছিল দীপাবলী। মায়া একটা চেয়ার টেনে পাশে বসতে সে ধীরে ধীরে উঠে বসে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করেছিল, কি ব্যাপার? আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলি? মায়ার গলায় কোন তাপ নেই।

হঠাৎ কথা বলার ইচ্ছে, এতক্ষণ ধরে জমে থাকা কথাগুলো যেন হারিয়ে ফেলল দীপাবলী। সে নীরবে মাথা নেড়ে হাঁ বলল।

মায়া বলল, শোন, তোর সঙ্গে কয়েকটা কথা আছে। আমি শমিতের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তুই যদি ইচ্ছে করি তাহলে শমিতকে বিয়ে করতে পারিস।

চমকে উঠল দীপাবলী। বুকের ভিতটাই যেন টলে উঠল। সে কপালে ভাঁজ ফেলে মায়ার দিকে তাকাল। মায়ার মুখ পাথরের মত।

মায়া মুখ ফেরাল, শমিত আমাকে বলেছে কি ঘটনা ঘটেছিল।

তোকে শমিত বলেছে? বিশ্বাস করতেই পারছিল না দীপাবলী।

হুম। ও স্বীকার করেছে যে তোকে ভালবাসে!

কেউ যদি আমাকে ভালবাসে তাহলে আমার কি করার আছে? হঠাৎই এক উদাসীনতা দীপাবলীর গলায় জড়িয়ে গেল।

কি বলছিস দীপা?

নতুন কিছু না। পৃথিবীর কোটি কোটি পুরুষ প্রতি মুহূর্তে কোন না কোন মেয়েকে ভালবেসে ফেলছে। এ নিয়ে মাথা ঘামালে মেয়েদের তো কোন কাজই করা হবে না।

তোকে শমিত কি বলেছে?

যা শুনেছি। তোর প্রতিক্রিয়া হয়নি?

হয়নি বললে মিথ্যে বলা হবে। নিজেকে খুব–।

চুপ করলি কেন?

বলতে ইচ্ছে করল না, তাই।

শোন, তোকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করছি, তুই শমিতকে ভালবাসিস?

কিসে একথা মনে হল?

মনে হয়েছে। শমিত তোকে যাদবপুরে পৌঁছে দিতে গিয়েছিল শিফ্‌ট করার সময়। মুখে না বলেও আমার অসুস্থতার সময় তুই নাটক কলি আর যেই আমি সুস্থ হলাম। নিজেকে গুটিয়ে নিলি। শমিত তোকে এই হোস্টেল ঠিক করে দিয়েছে। শমিতের কাছে চাকরির জন্যে গিয়েছিলি? মিথ্যে কথা?

দীপাবলী হাসল, মায়া, তোর সম্পর্কে আমার অন্যরকম ধারণা ছিল। যারা রাজনীতি করে, পাঁচটা ছেলের সঙ্গে দলের প্রয়োজনে দিনরাত মেশে, যাদের পড়াশুনো আছে তাদের দেখার চোখ অনেক ব্যাপক বলে ভাবতাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল। যে কোন ঘরকুনো মেয়ের সংকীর্ণতার সঙ্গে তোদর কোন পার্থক্য নেই, অন্তত ঘা খেলে যে মুখোটা খুলে যায় সেটা বুঝতে পারছি।

তুই আমাকে অপমান করছিস দীপা। আমি সংকীর্ণ? সংকীর্ণ হলে নিজে এসে তোকে বলতাম না শমিতকে গ্রহণ কর।

আমি কাকে গ্রহণ করব তা তুই ঠিক করে দিবি?

আমার তো তাই মনে হয়েছিল। তুই শমিতকে আমার কথা বলেছিলি?

বলেছিলাম। কারণ আমি বিশ্বাস করি তুই শমিতকে ভালবাসিস। না, মায়া, আমি শমিতের জন্যে মোটেই ব্যগ্ৰ নই। একথা ভাল লাগছে শমিত যা করেছে, তা তোকে বলেছে। লোকটা খুব ছোট হয়েছিল এতক্ষণ আমার কাছে, এখন সত্যি শ্ৰদ্ধা হচ্ছে। কিন্তু আমি জানি তুই ওকে ভালবাসিস। তুই নিশ্চিন্ত থাক, শমিতের জন্যে আমার কোন আগ্রহ নেই।

তুই একথা শমিতকে বলতে পারবি?

নিশ্চয়ই। আমি তো বলেই এসেছি ওকে, বন্ধু হিসেবে সম্পর্ক রাখতে।

হঠাৎ মায়া দুহাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেলল, আমি এখন কি করব?

দীপাবলী উঠল এক হাতে মায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল, এবার তোকে আমার হিংসে হচ্ছে।

ঠাট্টা করছিস? মুখ না তুলে বলল মায়া।

নারে। তোর মত এমন ভালবাসা যদি কাউকে বাসতে পারতাম।

কি হবে বেসে! শমিত আমাকে বুঝতে চায় না, বোঝে না।

অপেক্ষা কর। দীপাবলী মায়ার মাথায় হাত বুলিয়েছিল, শমিত নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে। আমাকে নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করিস না।

এরও দিন সাতেক বাদে শমিতের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। হোস্টেলের সামনের রাস্তায়। একেবারে মুখোমুখি, তোমার কাছে যাচ্ছিলাম।

বলুন।

তোমার চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের স্কুলের সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলেছি। তুমি কাল সকাল ঠিক সাড়ে নটায় আমাদের বাড়িতে চলে এস। আমি স্কুলে নিয়ে যাব।

মন স্থির করাই ছিল। দীপাবলী হাসল, আপনি অনেক করলেন আমার জন্যে। কিন্তু আমার পক্ষে আর আপনার স্কুলে চাকরি করা সম্ভব নয়।

সে কি? কেন? অবাক হয়ে গেল শমিত।

আর সম্ভব নয়। মাথা নেড়েছিল দীপাবলী।

আমি কারণটা জানতে চাইছি।

আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। সব কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

কিন্তু আমাকে আগামীকাল কৈফিয়ত দিতে হবে সেক্রেটারিকে। তুমি কি এই ব্যাপারটাকে ছেলেখেলা বলে মনে কর? আমি অসম্মানিত হব তুমি চাইছ?

বেশ, তাহলে বলি। সেদিন আপনার ব্যবহার আমি মেনে নিতে পারিনি।

ও! থমকে গেল শমিত।

আপনার খারাপ লাগতে পারে কিন্তু আমার পক্ষে এক স্কুলে কাজ করা সম্ভব নয়, কারণ আপনাকে দেখলেই ওইসব মনে পড়বে। মায়া আপনাকে কিছু বলেনি?

মায়া? না তো!

ও। আপনি যে ব্যবহার করেছিলেন তা হৃদয়ের সম্পর্ক নিবিড় হলেই মানুষ করে থাকে। বলে শুনেছি। আপনাকে আমি ওই স্তরে ভাবতে পারছি না। অথচ আপনি যেহেতু প্রস্তাব। করেছেন তাই একসঙ্গে কাজ করলে মনে হবে আমি সমস্যা তৈরী করছি। এই অস্বস্তিতে

আমি থাকতে চাই না।

এটাই তাহলে তোমার শেষ কথা?

হ্যাঁ।

কিন্তু তুমি বলেছিলে বন্ধুত্ব থাকবে।

বলেছিলাম। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বন্ধুত্বের মধ্যেও একটা ছোট্ট দেওয়াল থাকে। আপনি সেই দেওয়ালটাকে নড়বড়ে করে দিয়েছেন। তবে দেখা হলে নিশ্চয়ই কথা বলব। আশা করব আপনিও সহজ হয়ে কথা বলবেন।

সেই শেষ দেখা। চাকরি নেবার সময় মায়াদের বাড়িতে গিয়েছিল দীপাবলী। মায়া ছিল না। ওর মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল। ভদ্রমহিলা এসব ব্যাপারের কিছুই জানেন না। নিজের চাকরির বিস্তারিত ব্যাপার মহিলাকে জানিয়েছিল সেদিন। আর তারপর কলকাতা চোখের আড়ালে। খুব খারাপ লেগেছিল লাবণ্যর কাছ থেকে বিদায় নিতে। মেয়েটা এতদিনে যেন অনেক বুঝতে শিখেছে। সে বারংবার ওর দিদিমাকে বলেছিল লাবণ্যকে অন্তত গ্রাজুয়েট যেন করা হয়। শিক্ষিত একটি মেয়ে তার অতীত যা পূর্বনারীরা তাকে দিয়েছিল জেনে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরী করে নিক। ততদিন তার জন্যে সুস্থ পরিবেশ রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ব্যাপস! এত রাত্রেও জল ঠাণ্ডা হয় না এখানে?

চমকে মুখ তুলল দীপাবলী। পাজামা পাঞ্জাবি পরে মাথায় ভেজা গামছা ঘষতে ঘষতে ঘরে ঢুকল শমিত, পরনের গুলো বাথরুমের বালতিতে ভিজিয়ে দিয়েছি। ওগুলো আর গায়ে রাখা যাচ্ছিল না।

ঠিক আছে তিরি কেচে দেবে।

তোমার কাজের মেয়েটির নাম বুঝি তিরি? ফ্যানটাসটিক নাম তো? তিরি মানে কি? তিরতিরে থেকে এসেছে নাকি? শমিত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে প্রশ্নটা করা মাত্র ভেতরের বারান্দা থেকে কৌতুক মেশানো হাসি ছিটকে উঠেই আচমকা থেমে গেল। সেদিকে তাকিয়ে শমিত বলল, বাঃ, চমৎকার বাংলা বোঝে তো!

দীপাবলী ঠোঁট কামড়াল। বারান্দায় অন্ধকার। তিরি ওখানে যে ছিল বা আছে তা বোঝার উপায় নেই। কিন্তু নির্ঘাৎ সে কথা শোনার লোভই কাছাকাছি রয়েছে। শমিত আর কোন বিষয় পেল না বলবার। সমস্ত ব্যাপারটাই খুব বিশ্ৰী লাগছিল দীপাবলীর। খাট থেকে নেমে বলল, তুমি বাইরের ঘরে গিয়ে বসো, রাতের খাবার পেতে সময় লাগবে।

আপাতত এক কাপ চা হলেই চলবে, সঙ্গে বিস্কুট। শমিত পা বাড়াল।

বারান্দার দিকে মুখ করে দীপাবলী গলা তুলল, তিরি, তোর কানে গিয়েছে নিশ্চয়ই। চা নিয়ে আয়।

বাইরের ঘরে ঢুকে দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, তাহলে তুমি একখনও নাটক করছ?

মানে?

তোমার দাড়ি আর কাঁধের ব্যাগ বলে দিচ্ছে শিল্পের জন্যে সংগ্রাম করছ। শুনেছি সংগ্রাম করতে গেলে নাকি এইরকম বেশ দরকার।

ঠাট্টা করছ?

নাঃ। বল, কি উদ্দেশ্যে আগমন?

তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। এসে লাভ হল।

যেমন?

তুমি তো আমাকে আপনি বলতে সবসময়, এসে পড়েছি বলে তুমি শুনলাম।

বয়স মানুষকে অনেক জায়গায় উদার করে।

তোমার বয়স–!

আমার কথা থাক। শুধু দেখার ইচ্ছের জন্যে যদি আসা হয় তাহলে অন্যায় করেছ। আমি এটা পছন্দ করছি না। মায়া কেমন আছে?

মায়া! তুমি জানোনা?

কি জানব?

মায়া বিয়ে করেছে। বছরখানেক হয়ে গেল।

আচ্ছা? বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল দীপাবলীর।

হ্যাঁ। সুদীপকে। সুদীপ তো আমাদের দল ছেড়ে দিয়েছে।

সুদীপকে? দীপাবলী যেন তল পাচ্ছিল না।

ইয়েস ম্যাডাম। জীবন এই রকম। আমি অবশ্য খুব খুশী হয়েছি। তবে মায়া আর সুদীপের টেম্পারামেন্ট আলাদা, এইটেই গোলমাল।

অর্থাৎ মায়া আর শমিতের জীবনে নেই। এতক্ষণ যে স্বাভাবিক ব্যবহার সে করছিল তা যেন অকস্মাৎ হারিয়ে গেল। শমিতের একা হওয়া মানে তার সমস্যা বাড়া—এমন অনুভূতি প্রবল হল। সে কোনমতে জানতে চাইল আমার ঠিকানা পেলে কোথায়?

তোমার হেড অফিস থেকে।

কি জন্যে এসেছ এখনও জানলাম না।

এত ব্যস্ত হচ্ছে কেন? যদি আপত্তি থাকে বল বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাঠেঘাটে রাত কাটিয়ে ফিরে যাই।

সেটা আর বলতে পারছি কোথায়?

বলতে যখন পারছ না তখন এসো অন্য গল্প করি। তোমার চাকরি কেমন লাগছে? জায়গাটা কেমন?

রাত্রে খাওয়া দাওয়া চুকে গেলে তিরিকে দিয়ে বাইরের ঘরে বিছানা পাতালো দীপাবলী শমিতের জন্য। ভেতরের বারান্দায় একটা খাটিয়া পড়েছিল, সেটাকেই নিয়ে আসা হল। তিরি যেমন শোয় তেমনি শোবে দীপাবলীর ঘরে। শুতে যাওয়ার আগে দীপাবলী বলল, কাল ভোর থেকেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। তুমি কখন যাবে?

আমি এখানে কদিন থাকব দীপা। একটা নাটক লিখছি এদিকের মানুষ নিয়ে। তাই এদের ভাষা, জীবন জানা দরকার। একটা দেশলাই দাও তো?

বিরক্ত দীপাবলী ঘরে ফিরে আসামাত্র দেখল তরতরিয়ে একটা দেশলাই নিয়ে তিরি বাইরের ঘরের দিকে যাচ্ছে।

০৫. ঘুম এসেছিল অনেক রাত্রে

ঘুম এসেছিল অনেক রাত্রে। এমনিতেই এ বাড়িতে অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ বাজে রাত গড়ালে। গরমের হাত থেকে নিস্তার পেতেও সময় লাগে। ঘরে কেউ থাকলে ওইসব শব্দ উপেক্ষা করতে অসুবিধে হত না দীপাবলীর। কিন্তু এই রাত্রে হয়েছিল।

মাঝখানের দরজাটা বন্ধ করতে গিয়েও পারেনি। অনেক চেষ্টায় নিজেকে সরিয়ে এনেছিল। দরজা বন্ধ করা মানে নিজেকে দুৰ্বল প্রমাণ করা। অন্তত খোলা দরজায় একটা উপেক্ষার আবহাওয়া তৈরী করা যায়। কিন্তু পাশের ঘরে কেউ শুয়ে আছে, যার সঙ্গে কাঁচের সম্পর্ক ছাড়া এখন আর কিছু আপাতত অবশিষ্ট নেই, এটা ভাবলেই ঘুম চোখ থকে উধাও হয়ে যায়। চিন্তা হচ্ছিল তিরিকে নিয়েও। দেশলাই দিতে গিয়ে তিরি যে হেসেছিল তা সে এ ঘর থেকেও শুনতে পেয়েছে। মেয়েটাকে কখনও এমন কারণ অকারণে হাসতে শোনেনি। খাবার পরিবেশন করার সময় শমিত অকারণে বলেছিল, বা, তুমি তো চমৎকার রাঁধে। শোনামাত্র লজ্জায় এমন মুখের ভঙ্গি করেছিল যে দীপাবলী তাজ্জব হয়ে গিয়েছিল। তিরির রান্না আহামরি কিছু নয়। ভাল রান্না শেখার সুযোগও সে পায়নি। বরং এক ধরনের গ্রাম্য গন্ধ থাকে যা মাঝে মাঝে দীপাবলীর কাছেই বিরক্তিকর বলে মনে হয়। কিন্তু এখানে এটুকু কাজ পরিষ্কার করে করার জন্যে মেয়ে পাওয়া মুশকিল। সতীশবাবুকে বললে অনেকেই আসবে কিন্তু তাদের হাতে খেতে ইচ্ছেই হবে না। দীপাবলীর মনে। হয়েছিল শমিত গায়ে পড়ে নেহাত মন রাখতেই প্রশংসা করল। কোন সাধারণ নাটক দেখে শমিত কখনওই এমন কথা বলত না। মানসিকতার বদল কেন স্থান বিশেষে হবে? দীপাবলীর ধারণা হচ্ছিল, শমিত অনেক পালটে গিয়েছে।

কিন্তু রাতটা একসময় ঘুম জড়িয়েই কেটে গেল। স্নান করে তৈরী হয়ে সে যখন বাইরের ঘরে এল তখনও শমিত ঘুমাচ্ছে। বাইরে তখন সবে ভোর হচ্ছে। তাপ বাড়ার আগে পৃথিবীটা এই মুহূর্তে নিরোদ এবং সুন্দর। শমিত ঘুমাচ্ছে একেবারে ছেলেমানুষের মত, দুটো হাটু প্ৰায় বুকের কাছে নিয়ে এসে। দীপাবলী তিরিকে ডেকে বলল, দাদাবাবু উঠলে চা দিবি। আমি অফিসে যাচ্ছি।

শেষ কথাটা সম্ভবত কানে গিয়েছিল, ধড়মড়িয়ে উঠে বসল শমিত। জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কটা বাজে?

এমন কিছু নয়। তুমি ঘুমাতে পারো। কিন্তু আমাকে এখনই অফিসে যেতে হবে।

এই সাতসকালে অফিস?

গরমের জন্যে নিয়মটা করা হয়েছে। দীপাবলী এক মুহূর্ত ভাবল, তোমার কোন দরকার আছে আমার কাছে?

দরকার? এক কথায় এর উত্তর দেওয়া যায়? হাসল শমিত।

ঠোঁট কামড়াতে গিয়ে সামলে নিল দীপাবলী, তোমার জেনে রাখা ভাল, আমার কোন দরকার নেই তোমার কাছে। আমি কাজে যাচ্ছি। দীপাবলী পাশের দরজা দিয়ে অফিস ঘরে চলে এল। ঘর অন্ধকার। সে জানলা খুলে বাইরের ঘরে চলে এল। সতীশবাবুদের এখনও আসার সময় হয়নি। মূল দরজাটা খুলে সিঁড়িতে এসে দাঁড়াল সে। আকাশে লালচে আভা পুরো মাত্রায় কিন্তু পৃথিবী ছায়ায় মাখামাখি। আহা, কি আরামের সময় এখন। এইরকম যদি সারাটা দিন থাকত কি ভালই না হত। সতীশবাবু বলেছেন শীতের সময় নাকি ঠাণ্ডাপ্ৰচণ্ড পড়ে এখানে। সে বরং ভাল।

আর এই শান্ত প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে দীপাবলীর মনে হল কাল সে শমিতকে নিয়ে একটা বাড়াবাড়ি ভাবনা করেছে। অন্তত তিরিকে জড়িয়ে ভাবনাটা বড় ছোট মনের পরিচয়। এমনটা সে ভাবল কি করে? মানুষের রাগ কখন যে কোথায় টেনে নামায়, নামবার আগে তা বোঝা যায় না। শমিত আর যাই হোক পড়াশুনা করা সুস্থ নাটকের জন্যে আন্দোলন করিয়ে ছেলে। তার রুচি কখনই অমন স্তরে নামবে না। ভাবনাটা ভেবেছিল বলেই এখন লজ্জিত হল সে।

এইসময় বাবুদের আসতে দেখা গেল। দীপাবলীর মনে পড়ল সতীশবাবুর বাড়িতে অনুষ্ঠানের কথা। কাজের চাপে একদম মনেই ছিল না তার। সে ঠিক করল, এখন কিছু বলবে না, আজ রাত্রে একাই ওঁর বাড়িতে গিয়ে অবাক করে দেবে।

ম্যাডাম, আপনি এখানে? অক্ষয়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন।

ইচ্ছে হল এখানে দাঁড়াতে।

শীতকালে রোদ উঠলে এখানে দাঁড়াতে দেখবেন খুব ভাল লাগবে।

সতীশবাবু আসেননি?

না তো! ওঁর বাড়িতে লোকজন আছে, হয়তো দেরিতে আসবেন।

দীপাবলী কিছুতেই মনে করতে পারছিল না অনুষ্ঠান কবে ছিল, গতকাল না আজ? যদি গতকাল হয়ে যায় তা হলে এদের প্রশ্ন করলে অপ্রস্তুত হতে হবে। সে অফিসে ফিরে এসে

অক্ষয়বাবুকে ডেকে পাঠাবে। সতীশবাবুর পরেই অক্ষয়বাবুর অবস্থান।

অক্ষয়বাবু, শুনেছেন নিশ্চয়ই, গতকাল মন্ত্রী এসে নেখালির অবস্থা দেখে গিয়েছেন। আমাদের আজই একটা কাজ করতে হবে। আমাদের ব্লকে যে কয়েকটা গ্রাম আছে তার একটা লিস্ট করে গ্রামপিছু তিনটে কুয়ো আর দুটো নলকূপ বসানোর খরচের একটা এস্টিমেট তৈরী করুন। আমি আজই পাঠাতে চাই, মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়েছে।

অক্ষয়বাবু ঘাড় নাড়লেন, ঠিক আছে, ম্যাডাম, একটা কথা।

বলুন।

দুটো আর্জি ছিল। আমাদের এখানেও, মানে অফিসে আর আমাদের পাড়ায় দুটো নলকূপ ওর সঙ্গে জুড়ে দিই। আমাদেরও তো জলের সমস্যা হচ্ছে। আমাদের এখানেও তো সবসময় জল পাওয়া যায় না।

দীপাবলী একটু চিন্তা করল। অনুরোধটা অত্যন্ত সঙ্গত। কিন্তু ওপরওয়ালা যদি মনে করে সে সুবিধে পেয়ে নিজেদের আরাম দেখছে তা হলে কথা উঠবে। উঠুক। এঁরা কাজ করবেন আর একটু আরামে থাকবেন না, তা কি করে হয়?

মাথা নাড়ল, ঠিক আছে, সব শেষে দেবেন। দ্বিতীয়টা কি বলছিলেন? অক্ষয়বাবু বললেন, এদিকে তো ইলেকট্রিক কবে আসবে কে জানে। অথচ মাত্র পাঁচ ক্রোশ দূরে ইলেকট্রিক রয়েছে। যদি লাইন টেনে আনা যায়?

পাঁচ ক্ৰোশ? হতভম্ব দীপাবলী, পাঁচ ক্ৰোশ লাইন করতে কত লাগবে জানেন? এত খরচ সরকার করবে? পাগল!

ওই পাঁচ ক্রোশ দূর পর্যন্ত আনতে অনেক ক্রোশ ডিঙোতে হয়েছিল তো!

কথাটা বোধগম্য হওয়ামাত্র থমকে গেল দীপাবলী। কিছুদিন আগে একটি সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের যতটা অঞ্চলে সম্ভব হবে বিদ্যুৎ নিয়ে যাওয়া যাবে। সিদ্ধান্ত আর কাজ অবশ্য একসঙ্গে হচ্ছে না। এই অঞ্চলে ইলেকট্রিক এলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অন্তত পাম্প চালিয়ে জল তোলা যাবে। পাঁচ ক্রোশ দূরত্ব সে ভেবেছিল নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার মাপকাঠিতে, চমকে উঠেছিল সেই কারণে। সরকারের কাছে ব্যাপারটা কিছু নয় বরং কর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে। বাজেট অনুমোদন করলে সবই করা সম্ভব। সে বলল, ঠিক আছে, দুটো আলাদা প্রোপোজাল করুন। একটার জন্যে দ্বিতীয়টা আবার বানচাল না হয়ে যায়।

ঠিক আছে ম্যাডাম। অক্ষয়ববু চলে গেলেন।

এই ঘরে বসেই দীপাবলী শুনতে পাচ্ছিল অফিসঘরে উত্তেজনা চলছে। খোদ বিভাগীয় মন্ত্রী এই অফিসে এসে একটা দুপুর কাটিয়েছেন এটা যেন স্বপ্নের মত ব্যাপার। অনেকেই এর পর কি কি ভাল কাজ এই অঞ্চলে হবে তার আনুমানিক ফিরিস্তি দিচ্ছিল। ফাইলপত্ৰ ঘাঁটতে ঘাঁটতে দীপাবলীর হঠাৎ অস্বস্তি হল। সতীশবাবু এখনও আসছেন না কেন? ভদ্রলোক জ্বর গায়েও নাকি অফিস করেন। তিনি নিজেই বলেছেন বাড়িতে কাজ থাকলেও তিনি অফিসে আসবেন। অথচ ভদ্রলোক এলেন না।

শেষপর্যন্ত অক্ষয়বাবুকে ডেকে সে জিজ্ঞাসা করল। অক্ষয়বাবু বললেন, আপনাকে বলে যেতে সময় পাননি বোধ হয়, উনি শহরে গিয়েছে স্ত্রীকে নিয়ে।

স্ত্রীকে নিয়ে? কেন?

কাল সন্ধের পর ওঁর স্ত্রীর বুকে ব্যথা শুরু হয়। রাত্রে খুব বেড়ে যায়। আমাদের এখানে তো ডাক্তার নেই। তাই মাঝরাত্রে গরুর গাড়ি যোগাড় করে স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছেন শহরের হাসপাতালে।

গরুর গাড়ি?

তা ছাড়া আর যাওয়ার কোন ব্যবস্থা ছিল না। আমরা বলেছিলাম সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। অৰ্জুনবাবুর কাছে গেলে জিপের ব্যবস্থা হত কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। অতক্ষণে বিনা চিকিৎসায় যদি কিছু হয়ে যায়।

তা তখনই অৰ্জুনবাবুর কাছে গেলেন না কেন?

অক্ষয়বাবু মুখ নিচু করেছিলেন, যাওয়া হয়েছিল। উনি রওনা হবার পরই কয়েকজন ছুটে গিয়েছিল সাইকেল নিয়ে জিপ পেলে মাইলখানেকের মধ্যেই ওঁদের ধরা ফেলা যেত।

উনি জিপ দিলেন না?

না। তা নয়। উনি বলে দিলেন দুজন মহিলাকে পৌঁছে দিতে হবে খুব ভোরে আগে এই কড়ারে তারা এসেছে অতএব তিনি জিপ শহরে পাঠাতে পারবেন না।

মহিলাকে?

হাঁ ম্যাডাম। ওর এসব অভ্যেসের কথা তো সবাই জানে। উনি নিজেও আজকাল রাখঢাক করেন না। এমন বেপরোয়া লোক বড় একটা দেখা যায় না।

ঠিক আছে, আপনি কাজটা শেষ করুন। দীপাবলী মুখ ফেরাল। অক্ষয়বাবু চলে যেতে ঝিম মেরে বসে রইল সে কিছুক্ষণ। অর্জুন গত রাত্রে এখানে এসেছিল। তার নিশ্চয়ই একাধিক জিপ নেই। তা হলে ওই জিপে দুটি মহিলাকে একত্রের জন্যে আনিয়ে সে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। কিন্তু তাই বা কি করে হবে? অর্জুন মন্ত্রীকে পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসতেই তো ওর চেয়ে বেশি সময় লাগার কথা। তা হলে ওই সব মেয়েরা নিজেদের ব্যবস্থায় এসেছে অর্জুনের কাছে। লোকটা এতখানি হৃদয়শূন্য যে একজন মারাত্মক অসুস্থ মানুষের কথা শুনেও নিজের জিপ দিয়ে সাহায্য করতে রাজি হয়নি। তার চেয়ে সেই সব মেয়েদের পৌঁছে দেওয়া বড় হয়েছিল? দীপাবলী স্থির করল কোন অবস্থাতেই ওই লম্পট মানুষটাকে সে সাহায্য করবে না। যতই সে মন্ত্রীর অনুগ্রহ পাক।

অফিসে বসার পর শমিতের কথা একদম ভুলে ছিল দীপাবলী। এর মধ্যে এক ফাঁকে তিরি এসে চা দিয়ে গিয়েছে। তখনও না। নটা নাগাদ জলখাবার দিতে এলে খেয়াল হল। সে জিজ্ঞাসা করল, দাদাবাবু কোথায় রে?

উনি তো সেই চা খেয়ে বেরিয়ে গেছেন ঝোলা নিয়ে।

ঝোলা নিয়ে? চমকে উঠল দীপাবলী, সুটকেস?

না। তিরি ঘন ঘন মাথা নাড়ল, সুটকেস আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম জলখাবার খাবে কি না তো বলল,না। দুপুরে এলে ভাত খাবে। না এলে সেই ভাত রাত্রে। কি গম্ভীর হয়ে কথা বলছিল দিদি।

ঠিক আছে, তুই ভেতরে যা। শমিত সুটকেস নিয়ে যায়নি শুনে কেন জানে না তার বেশ স্বস্তি হল। এসব জায়গায় বাইরের লোক বড় একটা আসে না। আর গ্রামের দিকে তো নয়ই। তিনটে নির্বাচন হয়ে গিয়েছে তবু ভোটের জন্যেও কেউ প্রচার করতে যায়নি গ্রামে। অতএব ওরা শমিতকে কিভাবে নেবে তা ঈশ্বরই জানেন।

দশটায় ছুটি হবার মুখে একটা জিপের আওয়াজ শুনতে পেল সে। তার মুখ গম্ভীর হল। অকারণে অর্জুন নায়েককে সে এখানে বসতে দেবে না। কিন্তু খানিক বাদেই অক্ষয়বাবু এসে জানালেন, থানার দারোগাবাবু এসেছেন।

নিয়ে আসুন। তৎক্ষণাৎ গত রাত্রে শোনা অর্জুনের কথাগুলো মনে পড়ল। সে শক্ত হল। এইটে এখনও তার অভ্যেসে রয়ে গেল। যা অপছন্দের তার মুখোমুখি হবার মুহূর্তে শরীরে কেমন কাঠ কাঠ ভাব এসে যায়।

বিশাল ভূঁড়ি বেল্টের বাঁধনে থাকতে চাইছে না, চোখের তলায় কমলালেবুর কোয়ার মত মাংসের ঢিবি, মাথায় টাক, বগলে টুপি এবং হাতে লাঠি নিয়ে দারোগাবাবু প্রবেশ করে অনেকটা ঝুঁকে নমস্কার করলেন, গুড মর্নিং ম্যাডাম। আমাকে চিনতে পারছেন?

অবশ্যই। বসুন। গম্ভীর হতে চেষ্টা করল দীপাবলী।

চেয়ার টানলেন দারোগা শব্দ করেই। করে বসলেন, আমার উচিত ছিল অনেক আগেই এখানে এসে আপনার সঙ্গে দেখা করা। কিন্তু থানাটা এমন যে সমস্যা ছাড়া একটাও দিন কাটে না। আর আপনি যখন আমাকে ডেকে পাঠান না তখন বোঝা গেছে এখানে ঝামেলা নেই।

তা নেই কিন্তু আপনার আর আমার নিয়মিত যোগাযোগ রাখা কর্তব্য এবং সেটার দায়িত্ব আপনারই। যাক গে, কেন এসেছেন জানতে পারি?

না, তেমন কিছু না, কাটসি কল আর কি। কোন প্রব্লেম নেই তো?

থাকলে তো আপনি জানতে পারতেন।

হেঁ হেঁ, তা ঠিক। এস ডি ও সাহেব কিন্তু আমাকে খুব ভালবাসেন।

উনি তো আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট।

তা হোক, পজিশনে তো বড়।

দারোগাবাবু, কাল সারাদিন আপনি কোথায় ছিলেন?

ওই কথাটা বলতেই তো আপনার কাছে রোদ ভেঙে এলাম।

রোদ ভেঙে মানে?

আঃ, এখানে দিন হল ঘুমানোর জন্যে আর রাত কাজের। যা শালা, সরি, গরম, দিনে কাজ করবে কে? আমি সারারাত কাজ করি আর দিনটাকে রাতের মত ভেবে নিই। এতে ম্যাডাম বেশি কাজ করা যায়।

কিন্তু কাল দুপুরে আপনি থানায় ছিলেন?

কি করে থাকব বলুন? সবে বডিটা বিছানায় ফেলেছি অমনি মনে পড়ল ঝামেলা অছে। কর্তব্যে গাফিলতি পাবেন না, ছুটে গেলাম।

মন্ত্রীমশাই আমার এখানে এসে নেখালিতে গিয়েছিলেন। ওঁর সঙ্গে শহর থেকে আনা মাত্র তিনচারটে সেপাই ছিল।

ম্যাডাম, একথা শুনে আমি লজ্জায় মরে গিয়েছি। কাল থানায় ফিরেই খবরটা শুনে ছুটে এলাম, ততক্ষণে মন্ত্রীমশাই চলে গিয়েছেন। রাত্রে এস ডি ওর কাছে গেলাম। তিনি বললেন আপনার সঙ্গে কথা বলতে।

এস ডি ও বললেন আমার সঙ্গে কথা বলতে?

আজ্ঞে হ্যাঁ ম্যাডাম। হঠাৎ দারোগাবাবুর গলা ভেঙে মিহি সুর বেরিয়ে আসতে লাগল, আমার সার্ভিস বুক দেখুন, কোথায় একটা কালো দাগ দেখতে পাবেন না। স্বাধীন ভারতবের্ষর সব এস পি অমাকে ভাল সি সি রোল দিয়েছেন। কিন্তু মন্ত্রী যদি খচে যান তা হলে সব দফা রফা হয়ে যাবে।

আপনি কি বলতে এসেছেন?

ম্যাডাম, আপনি আমায় বাঁচান। পাঁচটা মেয়ে আমার, বউটার বয়স কুড়ি, লেট ম্যারেজ, এক বছর বাকি আছে রিটায়ারমেন্টের। এখন চাকরি গেলে ধনেপ্রাণে মরব। মেয়ে পাঁচটার বিয়ে এ জীবনে হবে না। মেয়ে হয়ে মেয়েদের বাঁচান।

আপনি আপনার কথা বলছিলেন।

আমি মানেই আমার মেয়েরা, আমার স্ত্রী।

আমি কিভাবে আপনাকে বাঁচাতে পারি?

শুনলাম নাকি মন্ত্রীমশাই আপনার বাড়িতে ভাত খেয়েছেন, আপনার কথায় তিনি নেখালিতে গিয়েছিলেন। ওঃ, যদি কিছু গোলমাল হত? আমি ভাবতেই পারি না। তাই আপনি যদি কে বুঝিয়ে বলেন তা হলে আর আমার কোন ক্ষতি হবে না।

শুনুন আপনি ঠিক শোনেননি। মন্ত্রীমশাই ডি এম, এস ডি ও-কে জিপ থেকে নামিয়ে দিয়ে অৰ্জুন নায়েকের সঙ্গে শহরে গিয়েছিলেন। আপনি বরং অর্জুনের সঙ্গে যান তাতে কাজ হবে। দীপাবলীর এখন কথা বলতে অসুবিধে হচ্ছে না।

অৰ্জুন। শালা হারামির হাতবাক্স! সরি ম্যাডাম, মুখ ফসকে বেরিয়ে এল। দিনরাত চোরডাকাত ঠ্যাঙাই তো, মুখের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছি। ডোন্ট মাইন্ড। যাহোক অৰ্জ্জুনের কাছে গেলে বলবে, তোমাকে আমি বাঁচাতে পারি একটা কণ্ডিশনে। যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন যা মাইনে পাবে তার ওয়ান ফিফথ আমাকে পাঠিয়ে দেবে।

ওয়ান ফিফথ কেন?

তার নিচে রাজি হবে না।

কিছু মনে করবেন না আপনার বাড়তি রোজগার নিশ্চয়ই আছে?

জলে আছি অথচ সাঁতার জানি না বলা মিথ্যে কথা হয়ে যাবে। তা আছে। কিন্তু এলাকাটা তো দেখছেন! একেবারে মরুভূমি যাকে বলে! বাড়তি রোজগার হবে কোত্থেকে?

আপনি সত্যি কথা বলছেন না।

সেন্ট পার্সেন্ট সত্যি।

ঠিক আছে, মন্ত্রী তো সবে গিয়েছেন, যেতে যেতে এসব ভুলেও যেতে পারেন। আপনি আগে থাকতেই এত চিন্তা কেন করছেন?

ঘর পোড়া গরু ম্যাডাম, মেঘ দেখলেই ভয় পাই।

তা হলে শুনুন, আমি কিছুই করতে পারব না।

পারবেন না? ফ্যাসফেসে শোনাল দারোগার গলা।

না। আর কিছু বলার আছে আপনার? দীপাবলী উঠে দাঁড়াল।

ম্যাডাম আমি একদম মরে যাব। ককিয়ে উঠলেন দারোগা।

আপনি এস ডি ও কিংবা ডি এমের সঙ্গে দেখা করুন। আমার মত সামান্য একজন কর্মচারী কিছুই করতে পারে না। এবার আপনি যেতে পারেন।

ম্যাডাম, আমি জানি কিসে আমার উপকার হবে। ঠিক আছে, আপনাকে একটা প্রস্তাব দিচ্ছি। আপনি পুরুষ হলে অবশ্যই আগেই দিতাম। আপনি আমাকে এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিন আপনার ব্যাপারটা আমি দেখব। দারোগা উঠে দাঁড়াল।

আমার ব্যাপারটা মানে? চকিতে ঘাড় ঘোরাল দীপাবলী।

মানে, ইয়ে, বুঝতেই পারছেন, ওই যে তখন জিজ্ঞাসা করলেন বাড়তি রোজগারের কথা, হয় না, খুব বেশী হয় না, তবু যা হয়—হেঁ হেঁ, বুঝতেই পারছেন?

আপনি আমার অফিস থেকে বেরিয়ে যান, এখনই।

ম্যাডাম।

আপনি এই মুহূর্তে চলে না গেলে আপনার নামে রিপোর্ট করতে বাধ্য হব।

ও, আচ্ছা। আমি মনে রাখব ব্যাপারটা। কটমট চোখে তাকিয়ে দারোগা বেরিয়ে গেলেন। সমস্ত শরীরটা কাঁপছিল দীপাবলীর। এমনভাবে অপমানিত হতে হবে সে ভাবতেই পারেনি। লোকটার স্পৰ্ধার কথা ভেবে শরীর জ্বলে যাচ্ছিল।

দারোগার জিপ চলে যাওয়ামাত্র অক্ষয়বাবুরা ছুটে এলেন। অক্ষয়বাবু দীপাবলীর সামনে বাকিরা দরজায়। অক্ষয়বাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, ম্যাডাম, আপনি এখনই মন্ত্রীকে মানে ডি এমকে জানান। লোকটাকে বিশ্বাস করবেন না।

কেন? এঁদের উত্তেজনা দেখে অবাক হল দীপাবলী।

লোকটা কেউটে সাপের চেয়েও ভয়ঙ্কর। একমাত্র অর্জুন নায়েকের কাছেই ঠাণ্ডা থাকে। ও বুঝে গিয়েছে আপনাকে ভেজানো যাবে না, এবার ঠিক আপনার ক্ষতি করবে।

আমার ক্ষতি? ওঁর তো আমার নির্দেশ মেনে কাজ করার কথা।

ম্যাডাম কথা কি সবসময় পালিত হয়। তা ছাড়া এমন জায়গায় কিছু হয়ে গেলে আমাদের পক্ষে সামলানো সম্ভব হবে না। ও কিছু করে ওঠার আগেই ব্যবস্থা নিন।

আপনারা মিছিমিছি ব্যস্ত হচ্ছেন। এটা আমার ওপর ছেড়ে দিন। যান, সময় হয়ে গেছে, রোদও চড়া হচ্ছে, এর পরে বাড়িতে যেতে অসুবিধে হবে। ও হ্যাঁ, অক্ষয়বাবু, এস্টিমেটের ফাইলটা হয়ে গিয়েছে?

হ্যাঁ ম্যাডাম, দিয়ে যাচ্ছি। মুখ গম্ভীর করে ওরা সামনে থেকে সরে গেলেও পাশের ঘরে এই নিয়ে যে গুঞ্জন হচ্ছে তা কানে এল। দীপাবলী ভেবে পাচ্ছিল না তার কোন ক্ষতি দারোগা করতে পারে। একজন সরকারি অফিসার আর একজন সরকারি অফিসারকে বিপদে ফেলার সাহস পাবে কি করে! অক্ষয়বাবু ফাইলটা দিয়ে গেলে সে তাতে চোখ রাখল। মোটামুটি ঠিকই আছে। একটা শব্দ জুড়ল সে। সতীশবাবু থাকলে এটাও করতে হত না। রিপোর্ট এবং আর্জির নিচে সই করে সে ফাইলটা নিয়েই ভেতরে চলে এল। পিওন দাঁড়িয়েছিল তার যাওয়ার অপেক্ষায়। এবার সে বাইরের দরজা এবং জানলা বন্ধ করবে। দীপাবলী তাকে বলল, আমি দুপুরের পর এস ডি ও অফিসে যাব। অক্ষয়বাবুকে বলো সন্ধে পর্যন্ত আমার জন্যে অপেক্ষা করতে।

বেলা সাড়ে বারোটাতেও শমিত ফিরল না। সে ফিরলে একসঙ্গে খাবে ভেবেছিল দীপাবলী। অবশ্য এখন যা রোদ বাইরে, তাতে কোন পাগলও ছাতি ছাড়া হাঁটতে চাইবে। না। দীপাবলীর মনে হল শমিত যদি কোন ছায়ার নিচে থাকে তা হলে তার একবেলা অভুক্ত হয়ে থাকাও ঢের ভাল কিন্তু এই রোদে আসার অ্যাডভেঞ্চার করা ঠিক নয়।

সে তিরিকে খেতে দিতে বলল। তিরি বেশ অবাক হয়ে বলল, দাদাবস্তু আসেনি, তুমি এখনই খেয়ে নেবে?

দাদাবাবু এই রোদে আসবে না। তা ছাড়া আমাকে একটু বাদে বেরুতে হবে।

তুমি এই রোদে বেরুবে?

থমকে গেল দীপাবলী। দাদাবাবু না আসতে পারলে সে নিজে কি করে যাবে। ঠিক কথা। অথচ এটাই তার মাথায় আসেনি। অতএব সে তিরিকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলল। জানলা দরজা বন্ধ। তিরি কিছুক্ষণ ঘর বারান্দা করল। তারপর বলল, দাদাবাবু জিজ্ঞাসা করল আমি কোন গ্রামের কথা জানি কি না। দাদাবাবু সেখানে গিয়ে আলাপ করবে। আমি আমার গ্রামের কথা বললাম। দাদাবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল আমাদের গ্রামে সবাই এমন বাংলা বলে কি না। আমি তো হেসে বাঁচি না। বললাম গ্রামের লোক গ্রামের ভাষায় কথা বলে। আমি তো ছোট্টবেলা থেকে এদিকে আসি আর তার ওপর বাবুদের কাছে কাজ করছি তাই আমি এমন বাংলা বলতে পারি। তাই শুনে দাদাবাবু বলল। আমি যদি ওকে নিয়ে গিয়ে গ্রামের লোকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই তা হলে খুব ভাল হয়। আমি যে গ্রামে যাব না তা তো বলতে পারি না তাই মিছে করে বললাম তুমি রাগ করবে গ্রামে গেলে।

দীপাবলী কিছু বলল না। শুধু তার মনে হল এইসব কথা শমিত তার সঙ্গে আলোচনা করতে পারত। সে ইচ্ছে করলে পিওনকে সঙ্গে দিতে পারত। একটু বাদে বারান্দা থেকে ঘুরে এসে তিরি জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা দিদি, দাদাবাবু কি যাত্রা করে?

যাত্ৰা? চমকে গেল দীপাবলী।

ওই যে মুখে রঙ মেখে রাম রাবণ সাজে।

তোকে কি বলেছে ও?

না, বলল, তিরি তোমার মত একটা মেয়েকে যদি কলকাতায় পেতাম তা হলে এমন মানাতো না আমার চরিত্রটার সঙ্গে, আহা! একটু অভিনয় করতে পারলেই হত?

তুই কি বললি?

আমি আবার কি বলব! শুনেই গলা শুকিয়ে কাঠ।

তা গিয়েই দ্যাখ না। এই দাদাবাবু খুব বড় পরিচালক। গাধা পিটিয়ে ঘোড়া বানিয়ে নেয়। তোকেও ঠিক অভিনেত্রী বানিয়ে দেবে। দীপাবলী হাসল।

অভিনেত্রী? তিরি অবাক হয়ে তাকাল।

তুই সিনেমা দেখিসনি?

একবার এখনে পর্দা খাটিয়ে সিনেমা দেখিয়েছিল।

সেই সিনেমায় যেসব মেয়েরা কথা বলে তারা অভিনেত্রী। সবাই খুব খাতির করে, অনেক টাকা পায়।

না বাবা।

কেন? দীপাবলীর খুব মজা লাগছিল।

খারাপ খারাপ মেয়েরা ওসব কাজ করে।

হে হে করে হেসে উঠল দীপাবলী এবং তার পরেই গম্ভীর হয়ে গেল, শোন, খুব দরকার না হলে দাদাবাবুর সঙ্গে কথাবার্তা বলার দরকার নেই।

কেন? খুব অবাক হয়ে গেল তিরি।

থমকে গেল দীপাবলী। এই কথাগুলো সে প্রায় অসাড়ে বলেছে। বলার আগে ভাবেনি। এখন মনে হল না বললেই ভাল ছিল। তিরি তার দিকে এখনও তাকিয়ে আছে। অতএব তাকে বলতেই হল, দাদাবাবুর মাথার ঠিক নেই। এই আমকেই ধরে অভিনয় করাতে চেয়েছিল। তুই এখানকার মেয়ে। তোর ওসবে দরকার নেই।

তিরির মুখ সহজ হল, দীপাবলী হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

তিনটে বাজল। রোদ তখনও সমানে তেজী। কিন্তু আর দেরি করা সম্ভব নয়। আধঘণ্টা আগে খাওয়া শেষ করেছে দীপাবলী। এস ডি ও-র অফিস থেকে ঘুরে আসতে গেলে এখনই রওনা হওয়া দরকার। আজই যদি নেখালির এবং আশেপাশের গ্রামের কুয়ো এবং নলকূপের এস্টিমেট গ্রু প্রপার চ্যানেল পাঠানো যায় তা হলে কাজ হতে বেশি দেরি হবে না। তবু আরও একটু নিশ্চিত হবার জন্যেই দীপাবলী ঠিক করলে এস ডি ওকে বলেই একটা অ্যাডভান্স কপি সে পাঠাবে মন্ত্রীর কাছে। লাল ফিতের বাঁধন টপকে থু প্রপার চ্যানেলের চিঠিটা পৌছবার আগেই তাতে বেশি কাজ হবে।

ছাতা নিয়ে বেরুবার আগে সে তিরিকে পই পই করে বলে গেল শমিত এলে খাবার দিতে। সে রাত আটটার মধ্যেই ফিরবে। লাস্ট বাট ওয়ান বাসটা ওই সময়ের মধ্যেই এখান দিয়ে ফিরে যায়। মাথার ওপরে ছাতি থাকা সত্ত্বেও হাঁটাটা সহজ হচ্ছে না। পা এর মধ্যেই জ্বলতে শুরু করেছে। গরম হলকা লাগছে শরীরে। বাড়ি বা অফিস থেকে মিনিট আটেক হাঁটার পর বাস রাস্তা। এদিকের বাসের একটাই গুণ বা দোষ হল হাত দেখালেই দাঁড়িয়ে যায়। তার ওপর মহিলা হলে কথাই নেই। স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়াবার প্রয়োজন হয় না। দীপাবলীর প্রায়ই মনে হয় তার অফিসে যদি একটা গাড়ি থাকত তা হলে কাজের খুব সুবিধে হত। ছেলে হলে সাইকেল চেপে অনেক জায়গায় যাওয়া যায়। মাঝে মাঝেই মনে হয় সরকারি গাড়ি পাওয়ার যখন কোন সম্ভাবনাই নেই তখন সাইকেলটা যদি শিখে নিতে পারে মন্দ হয় না। চা বাগানে থাকতে বেশ কয়েকবার অমরনাথের সাইকেল নিয়ে চেষ্টা করেছিল বিয়ের আগেই। সাইকেলটা সেই বয়সের তুলনায় বড্ড ভারী ছিল। আর বিয়ে এবং বিধবা হবার পর তো জীবনযাত্রাই পালটে গেল।

জীবনযাত্রা শব্দটা মনে হতেই হাসি এল। মানুষ যেভাবে জীবনযাপন করে তাই তার জীবনযাত্রা। একের সঙ্গে অন্যের যেমন মিল নেই তেমনি একের এখনকার সঙ্গে আগামীকালের কোন সাদৃশ্য থাকবে এমন কোনও কথাও নেই। আজকাল মনের ভেতরে এক ধরনের সুখ বুদ্বুদ তোলে, সে নিজের জীবনের অবশ্যম্ভাবী চেহারাটা বদলে ফেলতে পেরেছে।

দুপুরের বাসে ভিড় সামান্য কম থাকে। তাকে দেখে কন্ডাক্টর যে সুবিধে করে দিল তা আজ চুপচাপ গ্রহণ করল দীপাবলী। প্রতিবাদ করে লাভ নেই। তা ছাড়া এই গরমে ভিড়ে প্রতিবাদ করে জেদ ধরে থাকলে অসুস্থ হবার সম্ভাবনাই বেশি। বাসের জানলা তাপের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে এমনিতেই বন্ধ রাখা হয়েছে। বসা অবস্থাতেও কুলকুল করে ঘামতে লাগল সে। বিবেকের ব্যাপারটাই যেন গলে গলে পড়ছিল।

রিকশা নিয়ে এস ডি ওর অফিসে পৌঁছে সে শুনতে পেল ভদ্রলোক ডি এমের কাছে গিয়েছেন। অফিসে কাগজপত্র জমা দিয়ে সে প্রধান কেরানিকে বারংবার অনুরোধ করল যাতে কালকেই কাগজপত্র এস ডি ও নোট দিয়ে পাঠিয়ে দেন ওপরতলায়। কাগজে একবার চোখ বুলিয়ে প্রধান কেরানি অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এসবের কথা সাধে জানেন?

হ্যাঁ। মন্ত্রীমশাই যখন নেখালিতে গিয়েছিলেন তখন উনি তো সঙ্গে ছিলেন।

আহা, তারপর কি ওঁর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছেন?

না। আলাদা কথা বলতে হবে কেন?

বৃদ্ধ ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন, তা হলে এটা পাস হবে না।

মানে? মন্ত্রী আমাকে নিজে বলে গিয়েছেন। উত্তেজিত হল দীপাবলী।

অনেক বছর কাজ করছি দিদি, আমার কথা আপনি শুনে রাখুন, ওঁর সঙ্গে কথা না বলে আপনি পাঠালে তা ওপরতলা থেকে পাস হবে না। মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক।

আপনি একথা বলছেন কেন?

আপনি যে এস্টিমেট দিয়েছেন, এই যে এতগুলো কয়ো খুঁড়তে এত লাগবে, এতগুলো নলকূপের জন্যে এত, এগুলো তো উনি সার্টিফাই করবেন, তাই না?

হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। এসবে একটুও বাড়ানো রেট নেই।

সেটা তো উনি যাচাই না করে বুঝবেন না। যাচাই করতে হলেই আমায় ডেকে বলবেন, হরিহরবাবু একটু বাজারে ঘুরে দেখুন তো।

তাতে অসুবিধে কি হল?

ওঃ, আপনি দেখছি কিছুই বোঝেন না। ওসব করতে গেলে টাইম লাগবে। কাল পাঠানো যাবে না। আবার সাতদিন ধরে দেখার পর আপনার দেওয়া রেটের সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন সাহেব। তাই বলছি কি, অনেক টাকার ব্যাপার তো, একবার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে নিন, কাল সকালেই সদরে পাঠিয়ে দেব।

অতএব এস ডি ওর সঙ্গে দেখা না করে ফেরার কোন উপায় নেই। অবশ্য এখনও হাতে অনেক সময় আছে। প্রধান কেরানি আশ্বাস দিলেন ভদ্রলোক বিকেলের মধ্যেই ফিরবেন। সে একটু ঘুরে আসছে বলে অফিস থেকে বের হল। বাসের জন্যে অন্তত দু ঘন্টা অপেক্ষা করা যায়। দীপাবলী একটা রিকশা নিয়ে সোজা হাসপাতালে চলে এল। মফস্বলের হাসপাতাল, তার ওপর সাব ডিভিশন শহরের। চেহারা দেখেই ভক্তি আসে না। জলপাইগুড়ির সদর হাসপাতালে এর চেয়ে বেশী শ্রী ছিল?

সতীশবাবুর স্ত্রীর বেড খুঁজে পেতে খুব অসুবিধে হল না। লম্বা হল ঘরে পর পর রুগীরা শুয়ে আছেন। তার একেবারে শেষ বিছানার পাশে সতীশবাবু দু হাতে মাথা ধরে বসে আছেন কুঁজো হয়ে। বিছানায় যে মহিলা পড়ে আছেন তিনি জীবিত না মৃত বোঝা যাচ্ছে না দূর থেকে। কাছে গিয়ে দীপাবলী চাপা গলায় ডাকল, সতীশবাবু!

মুখ থেকে হাত সরিয়ে দীপাবলীকে দেখেও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না ভদ্রলোক। দীপাবলী ওর স্ফীত চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে?

হঠাৎ সতীশবাবু হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। সেই কান্নার শব্দে পাশের বিছানায় রুগীরা এবং তাদের কাছে আসা মানুষেরা অবাক চোখে তাকাল। দীপাবলী তড়িঘড়ি শক্ত গলায় বলল, আঃ, সতীশবাবু। আপনি বাইরে আসুন।

ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চলে এল সে অস্বস্তি এড়াতে। পিছু পিছু চোখ মুছতে মুছতে সতীশবাবু বেরিয়ে এলেন, ম্যাডাম, আমার সব শেষ হয়ে গেল।

শেষ হয়ে গেল মানে?

ও নেই। আবার হাউ হাউ কান্না।

কি বলছেন আপনি?

একটু আগে, ঠিক পাঁচটা বাজতে পনের মিনিটে প্ৰাণবায়ু বেরিয়ে গেল। কান্না আরও সোচ্চার হল। এবং তার পরেই সেটাকে গিলতে চেষ্টা করলেন ভদ্রলোক।

সেকি! আপনি ডাক্তারকে বলেছেন?

মাথা নেড়ে না বললেন সতীশবাবু, বললেই তো মর্গে নিয়ে যাবে। কত বছর ওর পাশে দু মিনিটও একা চুপচাপ বসিনি। তাই ভাবছিলাম বসে থাকি। যেন ও ঘুমাচ্ছে আর আমি পাশে বসে আছি। এখন আমি কি করব ম্যাডাম? কান্নায় শব্দগুলো জড়িয়ে গিয়ে যেন দলা পাকিয়ে গেল।

দীপাবলী দূরে দাঁড়ানো একটি নার্সকে ডাকল, শুনুন, ওঁর স্ত্রীকে একটু দেখুন।

কোণের বেডটা তো? নার্স দেখতে চলে গেল। তারপরেই ফিরে এল দ্রুত, ছুটে গেল খবর দিতে।

দীপাবলী বলল, আমি তাড়াতাড়ি ফিরে যাচ্ছি। আপনি চিন্তা করবেন না। সবাই খবর পেয়ে যাতে আজকের লাস্ট বাস ধরে আসে তার ব্যবস্থা করছি।

রিকশায় বসে সে দৃশ্যটা ভাবতেই শিউরে উঠল। সারাজীবন যাতে সময় দিতে পারেননি কিংবা দেবার কথা মনে হয়নি তার পাশে কি ভাবে বসেছিলেন সতীশবাবু? অপরাধবোধ না প্ৰেম, কি বলা যায় একে?

০৬. এস ডি ওর অফিসে

এস ডি ওর অফিসে ফিরে যাওয়ার কথা আর মনে আসেনি। সোজা বাস স্ট্যান্ডে চলে এসেছিল রিক্সা নিয়ে। জানলার ধারে জায়গাও পেয়েছিল। বাস ছাড়তে ছাড়তেই অন্ধকার উঠে এল পৃথিবীর তলা থেকে উঠে আকাশ ছুঁতে চাইল।

এখন ওই তপ্ত অন্ধকার, বাসের খুঁড়িয়ে চলা, যাত্রীদের কথাবার্তা কিছুই যেন স্পর্শ করছিল না দীপাবলীকে। সেই দৃশ্যটি দেখার পর থেকেই বুকের ভেতর যেন হাজারমনি পাথর, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সমস্ত শিরায় শিরায় ঝিমুনি। এও কি সম্ভব? সতীশবাবুর মুখ বারংবার মনে পড়ছিল। মৃতা স্ত্রীর পাশে পাথরের মত বসে থাকা সতীশবাবু। কোন আন্দোলন নেই। একটি মানুষ কখন পৃথিবী থেকে চলে গিয়েছেন, হয়তো তিনি যাওয়ার মুহূর্তেও সাক্ষী ছিলেন কিন্তু তারপরও দীর্ঘ সময় সেই মানুষটির পাশে স্থির হয়ে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। শুধুই কি দিচ্ছিলেন? সতীশবাবু স্ত্রীর জীবদ্দশায় যা পাননি তাই কি পেতে চাইছিলেন। আর একেও কি ভালবাসা বলে?

দীপাবলী চোখ খুলে অন্ধকার দেখল। চলন্ত বাসে অন্ধকারও কি দুলে দুলে ছোট? আর তখনই রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ল। বাঙালির সব শেষ আশ্রয় রবীন্দ্রনাথ। একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের বেঁচে থাকা এবং না থাকার সময়ে সমস্ত অনুভূতি এবং স্মৃতির কথা তিনি ঈশ্বরের চেয়েও আন্তরিক হয়ে বলে গেছেন। সত্যি, কি আশায় বসেছিলেন সতীশবাবু? সে কি শুধুই দুঃখের খাস? না, দুখের আশ? আর ওই চোখের জল কি সুখের সন্ধান? সবই ঠিক কিন্তু তারপরও, তবুও কী নাই? বাঙালির গীতা উপনিষদ তার নিজস্ব ভাষায় লেখা নয়। কিন্তু বাঙালির গীতবিতান আছে। একটি মানুষের যা সমস্ত জীবনের আশ্ৰয়। যেখানে দেবতা মানুষ আর প্রকৃতি একাকার হয়ে পরস্পরের বন্ধু হয়ে যায়। বুকের মধ্যে এত চাপ, দীপাবলী ছটফট করছিল বাড়িতে ফিরতে। কলকাতা থেকে কর্মস্থলে ঘোরার সময় সে কিছু বই সঙ্গে রাখতে পেরেছে, গীতবিতান তো অবশ্যই।

বাস থেকে নেমে সে বুঝতে পারল মনের চাপ শরীরকে আক্রমণ করেছে। হাঁটতেই। যেন কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু খবরটা দেওয়া দরকার। প্রৌঢ় মানুষটি মৃতা স্ত্রীকে আঁকড়ে বেশীক্ষণ বসে থাকতে পারেন না।

ব্লক অফিস তৈরী হবার সময় সরকারি জমিতে কিছু বাড়ি ঘর তৈরী হয়েছিল। পরবর্তীকালে কর্মচারীরা সেগুলোই বাড়িয়ে নিয়েছেন। যদিও বদলির চাকরি তাহলেও একবার এখানে এলে সচরাচর এই স্তরের কর্মচারীদের আর সরানো হয় না। এদিকটায় কখনও আসেনি সে, আসা হয়নি এই পর্যন্ত।

খবর দেওয়ামাত্র শোকের ঢল নামল। সবাই ওই মুহূর্তে শহরে যেতে চান। শেষ বাসের দেরি আছে শহরে ফিরে যাওয়ার। দীপাবলী আর দাঁড়াল না। ফিরে আসার পথে অন্ধকার মাঠে দাঁড়িয়ে পড়ল সে হঠাৎ। চারপাশে কোথাও এক ফোঁটা আলো দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার যেন সমস্ত বিশ্বচরাচর গ্রাস করে নিয়েছে শুধু আকাশ ছাড়া। মুখ তুলল সে। যখন সতীশবাবু স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন তখন তো কেউ সঙ্গে যায়নি। যেন সেটা স্বামীর কর্তব্য ছিল। এখন কেন সবাই ব্যস্ত সহযোগী হতে? শুধু শরীরে প্রাণ নেই বলে? প্ৰাণহীন শরীর কি কারো নিজস্ব আত্মীয় নয়? চোখ মেললো সে আকাশে। আর হঠাৎই তাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে একটি লাইন যেন নিঃশ্বাসের মত ধাক্কা দিতে লাগল বুকের ঘরের দেওয়ালে, দেখো আমার হৃদয়তলে সারারাতের আসন মেলা।

মুখ নামাল দীপাবলী। এমন একটা লাইন কেন মনে এল?

সে দ্রুত হাঁটতে লাগল। ধীরে ধীরে তিরির জ্বালানো হ্যারিকেন চোখে এল। সে সিঁড়িতে পা রাখতেই দরজা খুলে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে এল তিরি, তুমি চলে যাওয়ার পরে দাদাবাবু আর আসেনি।

দীপাবলী এক মুহূর্ত শক্ত হল, নিচু গলায় বলল, আসেনি!

না। সারা দিন নিশ্চয়ই না খেয়ে আছে। তিরি যেন খুবই চিন্তিত।

দীপাবলী আর পারছিল না। বাইরের ঘরের চেয়ারে বসে বলল, আমায় এক কাপ চা করে দে তিরি।

তিরি তবু দাঁড়িয়ে রইল। বলল, একটু খোঁজ করবে না?

আঃ। তোকে যা বলছি তাই কর। স্পষ্টতই বিরক্তি বোঝাল সে। তিরি চলে গেল ভেতরে। গুম হয়ে বসে রইল দীপাবলী। এই ঘরের এক কোণে শমিতের আনা জিনিসপত্র পড়ে রয়েছে। কিন্তু এরকম পাণ্ডববর্জিত জায়গায় সে যাবেই বা কোথায়? নাকি সত্যিই ফিরে গেল কলকাতায়? হয়তো সারাদিন রোদে ঘুরে সহ্য করতে পারেনি, পড়ে আছে কোথাও অসুস্থ হয়ে। এলোমেলো নানান চিন্তা মাথায় জট পাকালো। দীপাবলী বুঝতে পারছিল না তার কি করা উচিত। সতীশবাবুর ভাবনার পাশে শমিতের তৈরী করা সমস্যা যেন একই মাত্রায় উঠে এল। শমিত যদি চলে যায়? একটা খেলা খেলে যাওয়ার জন্যেই। কি এই আসা? ও কিছু চায়নি, দ্বিধাও দেখায়নি কিন্তু একটু আগে মাঠের মাঝখানে মনে আসা লাইনটাকে যেন সত্যি করে দিল, নীরব চোখে সন্ধ্যালোকে খেয়াল নিয়ে করলে খেলা। এবং এই কথাগুলো তো পৃথিবীর জন্মের মত সত্যি, দেখা হল, হয়নি চেনা—প্রশ্ন ছিল, শুধালে না। এই অবধি মনে হতেই অদ্ভুত শান্তি পেল দীপাবলী। সে শমিতের কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে উঠল। মনের আকাঙ্ক্ষাকে হেলায় সরিয়ে দিয়ে শমিত যেন তাকে বাঁচিয়ে গেছে।

তিরি চা করে আনল। চুমুক দিতেই গাড়ির আওয়াজ কানে এল। অন্ধকার কাটতে কাটতে হেডলাইট দুটো ছুটে আসছে এদিকে। ক্রমশ সেটা শব্দ করে থেমে গেল। চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল সে কিন্তু উঠে দাঁড়াল না।

দরজা খোলা। বাইরে গাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভার গাড়ি থামাবার পরেও হেডলাইট অফ করেনি। সেই আলোয় একটি মানুষকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। দরজার সামনে এসে কপালে হাত ছুঁইয়ে নমস্কার করল লোকটা, মেমসাহেব!

লোকটাকে চিনতে পারল না দীপাবলী। সে চুপচাপ বসে রইল।

লোকটা বলল, বাবু জিপ পাঠিয়ে দিয়েছেন।

কোন বাবু? ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল সে।

অৰ্জুনবাবু। লাস্ট বাস খারাপ হয়ে গিয়েছে। আপনাদের শহরে যাওয়ার কথা ছিল, তাই জিপ পাঠিয়ে দিয়েছেন। লোকটি খুব বিনীত ভঙ্গীতে বলল।

এবার দীপাবলী উঠে দাঁড়াল, তোমার সাহেবকে কে খবরটা দিল?

বাড়িতে ফেরার সময় রাস্তায় বাবুদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।

তা আমার এখানে কেন গাড়ি নিয়ে এসেছেন।

বাবু যে আপনার কাছেই নিয়ে আসতে বললেন।

তোমার বাবুকে বলবে আমার গাড়ির দরকার নেই। যাও।

লোকটা এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ফিরে যাচ্ছিল গাড়ির দিকে। এটা অর্জুন নায়েকের আর একটা চালাকি। ঘুষ দিয়ে হাতে রাখতে চাইছে। কিন্তু সেই সঙ্গে ওর মনে হল, শহরে সতীশবাবু একা রয়েছেন। বাস যদি আজ রাত্রে না যায় তাহলে এখান থেকে কেউ সাহায্য করতে যেতে পারবে না। সে তড়িঘড়ি দরজার বাইরে নেমে এল, এই যে, শুনুন।

লোকটা ঘুরে দাঁড়াল। দীপাবলী বলল, আমাদের অফিসের লোকজন কি এখনও বড় রাস্তায় অপেক্ষা করছে? আপনি জানেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ। লোকটি মাথা নাড়ল।

তাহলে ওঁদের কাছে গাড়ি নিয়ে যান। ওরা যদি শহরে যেতে চান, মানে যে কজন আপনাদের জিপে যেতে পারেন, নিয়ে গেলে ভাল হয়।

ঠিক আছে মেমসাহেব। লোকটি আবার মাথা নেড়ে জিপে উঠে বসে ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল অন্ধকার কাটতে কাটতে।

দরজা বন্ধ করল দীপাবলী। সোজা শোওয়ার ঘরে এসে খাটে শরীর এলিয়ে দিল। এবং তখনই তার মনোরর কথা মনে এল। এইভাবে বাইরের জামাকাপড়ে বিছানায় শুলে তিনি নিশ্চয়ই কুরুক্ষেত্র করতেন। একসময় ব্যাপারটা মানত সে, বাধ্য হয়েই মানত। এখন তো সব ছন্নছাড়া। কোন কিছুই আর বেশীদিন আঁকড়ে ধরা যাচ্ছে না।

এই যেমন তাকে শেষপর্যন্ত অৰ্জুন নায়েকের সাহায্য নিতেই হল। প্রথমে সাহায্যটাকে ঘুষ বলে মনে হলেও সেটাকে এড়ানো গেল না বলেই সাহায্য হিসেবে ভাবতে ভাল লাগছে। সতীশবাবুকে আজ রাত্রে হাসপাতালে একা ফেলে রাখা খুব অন্যায় হত। আবার এমনও হতে পারে, অর্জুন সম্পর্কে নানান কুকথা শুনে তার প্রতি বিরূপ হয়েছে সে, হয়ত লোকটা তার সঙ্গে সত্যি সত্যি ভাল ব্যবহার করতে চায়!

মনোরমা বলতেন, ঘরে থাকবি ঘরের মত, বাইরে বাইরের মত। এ দুটোকে কখনই এক করবি না। শোওয়ার আগে নিজে বিছানায় বসবি না, কাউকে বসতে দিবি না। রাত্রে ঠিকঠাক করে রাখা নরম বিছানায় শুয়ে যে আরাম পাবি সেই একই বিছানা ব্যবহার করার পরে ভোরবেলায় তোক শুতে দিলে কি সেই আরাম লাগবে? তার মানে সব কিছু তোর কাছে আলাদা যত্ন চায়। যত্ন করলে সে-ও তোক খুশী করবে, বুঝলি।

মনোরমা এককালে রাত্রে শুয়ে শুয়ে এমন অনেক কথা বলতেন। তখন শুনতে ভাল লাগত না। অন্যমনস্ক হয়ে প্রায়ই সে ঘুমিয়ে পড়ত। এখন তার কিছু কিছু বড় সত্যি বলে মনে হয়। মনোরমা হয়তো একটা মানে ভেবে ওসব বলতেন এখন সেটা আর একটা অর্থ তৈরী করে। আজ এই মুহূর্তে মনোরমাকে খুব মনে পড়ছিল দীপাবলীর। এখন অবশ্য। মনোরমা তাকে মাসে একখানা হলেও চিঠি দেন। চাকরি পাওয়ার খবরে উল্লসিত। হয়েছিলেন। দীপাবলী লিখেছিল, কে বলতে পারে তাকে হয়তো জলপাইগুড়ি জেলায়। কখনও বদলি করতে পারেন সরকার। সেরকম হলে মনোরমা বেশী খুশী হবেন বলে। জানিয়েছিলেন। চাকরি পাওয়ার পর দীপাবলী মনোরমাকে লিখেছিল, তিনি যদি ইচ্ছে করেন তাহলে তার কাছে এসে থাকতে পারেন। মনোরমা জবাবে লিখেছিলেন, বউমা তাঁকে কিছুতেই ছাড়তে রাজি নন। অমরনাথের বড় ছেলে স্কুল ফাইন্যাল পাশ করামাত্র কোম্পানি চাবাগানে ডেকে নিয়ে চাকরি দিয়েছে। এখন বউমাও তাঁর সেবাযত্ন করে। এই অবস্থায়, তাদের ছেড়ে তাঁর পক্ষে অন্য কোথাও গিয়ে থাকা সম্ভব নয়। মনোরমাকে আমন্ত্রণ জানানোর সময় সে নিশ্চয়ই আন্তরিক ছিল কিন্তু পরে মনে হয়েছে তার কাছে এলে মনোরমা নিশ্চয়ই খুব স্বস্তি পেতেন না। তাঁর যাবতীয় শুচিবায়ুতা এখানে এসে প্রতি পদে আঘাত পেত।

রাত দশটায় দুজন গ্রাম্য মানুষ এসে ডাকাডাকি করতে লাগল।

বিছানায় শুয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল দীপাবলী নিজেই জানে না। তিরিও তাকে খেতে ডাকেনি। ঘুম ভাঙার পর মনে হল, মধ্যরাত। ঘরে হ্যারিকেন জ্বলছে। ডাক শুনেছিল তিরিও। সে শুয়েছিল মেঝেতে, ধড়মড় করে উঠে বসল। দীপাবলী তাকে জিজ্ঞাসা করল, কে ডাকছে রে?

দরজা খুলে দেখব? তিরি উঠে দাড়াল।

না, ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা কর।

তিরি বাইরের ঘরে গিয়ে পেঁচিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে দেশীয় গলায় জবাব মিলল। নেখালির দুজন মানুষ এসেছে। নাম শোনামাত্র ছুটে এল তিরি দীপাবলীর কাছে, ওরা এসেছে, নিশ্চয়ই ঝামেলা করবে!

ঝামেলা করবে কেন?

আমার জন্যে।

দীপাবলীর খুব রাগ হয়ে গেল। এই মেয়েটা এখানে থেকেও মাঝেমাঝেই আতঙ্কিত হয়। গ্রামের মানুষ এসে তাকে সুখের জগৎ থেকে টেনে নিয়ে যাবে এইরকম ধারণা ওর মন থেকে সরছে না। আর লোকদুটো যদি সত্যি ঝামেলা করতে আসে তাহলে ওদের শায়েস্তা করার ক্ষমতা দীপাবলীর আছে। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে সে-ও অসহায়। পুলিশের সাহায্য তো আগামীকালের আগে পাওয়া যাবে না।

সে সোজা বাইরের ঘরে গিয়ে দরজা খুলে হ্যারিকে উঁচিয়ে ধরতেই দুটো লোক কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করল। দীপাবলী উঁচু গলায় প্রশ্ন করল, কি চাই?

একজন বলল, একজন বাবু আমাদের গ্রামে মাঠের ওপর শুয়ে আছে। বাবু বলছে আপনার সঙ্গে জানাশোনা আছে।

মাঠের ওপর শুয়ে আছে? চমকে উঠল দীপাবলী।

হ্যাঁ। দিনভর হাঁড়িয়া খেয়েছে, খাইয়েছে সবাইকে। এখন আর উঠতে পারছে না। আপনার নাম শুনে খবর দিতে এলাম।

এখনও মাঠেই শুয়ে আছে?

হ্যাঁ। নেশা মাথায় উঠে গিয়েছে, হাঁটতে পারছে না।

ঠোঁট কামড়াল দীপাবলী। তারপর শেষ সংশয় থেকেই প্রশ্ন করল, কিরকম দেখতে?

লম্বা, পাজামা পাঞ্জাবি পরেছে।

নিঃশ্বাস ফেলল দীপাবলী। তারপর বলল, এতদূরে তো এই রাত্রে ওকে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। তোমরা যদি ওকে কোন ঘরে রাতটা থাকতে দাও তাহলে ভাল হয়?

এবার দ্বিতীয় লোকটি বলল, এখন গ্রামের কেউ ঘরে থাকতে দেবে না।

কেন? মাতাল হয়ে বাবু একজনের সঙ্গে মারপিট করেছে।

মারপিট? সে কি?

হুঁ। যাদের সঙ্গে হাঁড়িয়া খাচ্ছিল তাদের একজন খারাপ কথা বলে, বাবুও তাই খারাপ কথা বলে, তারপর মারপিট আরম্ভ হয়ে যায়।

ও। আমার কাছে লোকজন এখন নেই। আমি কি করতে পারি বল? তোমরা কি ওকে এখানে নিয়ে আসতে পারবে?

লোকদুটো নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলল। তারপর জানালে যে চেষ্টা করবে। নেখালির মানুষদের দীপাবলী যে সাহায্য করছে তার জন্যেই চেষ্টা করবো বলে ওরা চলে গেল।

দরজা বন্ধ করে সোজা বাথরুমে চলে গেল দীপাবলী। সারাদিনের ঘাম, ক্লান্তি আধাঘুম ভেঙে যাওয়ার জড়তার সঙ্গে আর একটা গা ঘিনঘিন করা অনুভূতি জুড়ে গেল। শমিত এত নিচে নেমে গেছে সে ভাবতেই পারছিল না। যে শমিত এককালে সুস্থ শিল্পের কথা বলত, মানুষের প্রতিভার নামে যা-ইচ্ছে তাই করবে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করত না, সে সারাদিন ওই গরিব মানুষদের গ্রামে মদ খেয়ে এবং খাইয়ে পড়ে রইল একটা সাধারণ মাতালের মত মারপিট করল? মগের জল শরীরে ঢালতে ঢালতেও কাঁটা হয়ে রইল দীপাবলী।

স্নান সেরে সে তিরিকে বলল খাবার দিতে। বেশীক্ষণ না খেয়ে থাকলে এবং সেইসঙ্গে উত্তেজনা মিশলে পেটে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। সে খেতে চাইছে দেখে তিরি যেন অবাক। কিন্তু মুখে কিছু না বলে খাবার দিল। কোন কোন সময় খাওয়াটা যে কতখানি বিরক্তিকর হয় তা এখন টের পেল দীপাবলী। খেয়ে দেয়ে বলল, ওরা যদি শমিতকে নিয়ে আসে তাহলে বাইরের ঘরটা খুলে দিবি। ওখানেই শুইয়ে ওরা চলে গেলে দরজা বন্ধ করে তুই শুয়ে পড়বি। শোওয়ার সময় এই দরজাটাও বন্ধ করে রাখবি। যা, খেয়ে নে। আর শোন, ওরা এলে আমাকে ডাকাডাকি করার কোন দরকার নেই। আমার শরীর ভাল না।

মশারি খাটিয়ে দিল তিরি। শুয়ে পড়ল দীপাবলী। বিছানায় গা এলিয়েই বুঝতে পারল আজ সহজে ঘুম আসবে না। একবার ভেঙে যাওয়া ঘুম এখন উধাও হয়ে গিয়েছে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল ঘুম আনতে দুই চোখে। কিন্তু বন্ধ চোখের পাতায় শমিতের মুখ। বারংবার। সে নিঃসাড়ে পড়ে রইল।

নিঝুম হয়ে যাওয়া চরাচরে একসময় কিছু লোকের কথাবার্তা শোনা গেল। শেষপর্যন্ত। দরজায় ধাক্কা, মানুষজনের গলার আওয়াজ। দীপাবলী বিছানায় স্থির হয়ে রইল। তিরির গলা শোনা গেল, কে?

বাইরে থেকে জবাব ভেসে এল, বাবুকে নিয়ে এসেছি।

দীপাবলী শুনল, তিরি দরজা খুলছে। লোকগুলো শমিতকে নিয়ে সম্ভবত ভেতরে ঢুকল। শুইয়ে দেওয়ার শব্দ হল। হঠাৎ একটা লোক বলে উঠল, মেমসাহেব কোথায়?

শরীর খারাপ, শুয়ে পড়েছে। তিরি অন্যরকম গলায় কথা বলল।

তোর জন্যে, তার জন্যে বাবু মারপিট করল। হুঁ।

তারপরেই লোগুলোর চলে যাওয়ার শব্দ পাওয়া গেল। গলার স্বর অন্ধকারে একসময় মিলিয়ে গেল। তিরি দরজা বন্ধ করল আরও কিছুক্ষণ বাদে। দীপাবলী বুঝতে পারছিল না এতক্ষণ দরজা খুলে তিরি কি করছিল! আরও খানিকটা সময় পার করে তিরি এঘরে এল। এবার ও বিছানা করে শুতে যাচ্ছে। দীপাবলী গম্ভীর গলায় বলল, মাঝখানের দরজাটা বন্ধ করে দিতে বলেছিলাম তোকে।

বাবুর শরীরে জ্বর এসেছে। কাতর গলায় বলল তিরি।

তোকে যা বলছি তাই কর।

তিরি উঠল। দরজাটা ভাল করে বন্ধ করতে একটু শব্দ হল। দীপাবলীর মনে হল শব্দটা যেন তিরি ইচ্ছে করেই করল। শমিত আসার পর থেকে যেন তিরি তার সঙ্গে অন্যরকম ব্যবহার করছে। একটা প্রতিবাদী ভঙ্গী সবসময় ওর আচরণে চোখে পড়ছে। দীপাবলীর কিছুতেই ঘুম আসছিল না। সারাদিন মাঠেঘাটে পড়ে মদ গিললে জ্বর আসতেই পারে, কিন্তু তাকে জ্বালাতন করা কেন?

তবু শেষাতে তা এসেছিল কিন্তু রাত ফুরোবার আগেই সেটা গেল সরে। উঠে বসল দীপাবলী। ঘড়িটা চোখের সামনে টেনে এনে সময় দেখল। অন্যদিন আরও আধঘণ্টা সে স্বচ্ছন্দে ঘুমায়। আজ ঘুম এল কখন? চট করে পাশের বন্ধ দরজার দিকে তাকাল সে। ঘরের এক কোনায় নিবন্ত হ্যারিকেন থেকে ফ্যাকাশে হলুদ আলো বের হচ্ছে। মাটিতে অঘোরে ঘুমাচ্ছে তিরি। দীপাবলী বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গেল।

দাঁত মাজতে মাজতে, প্ৰায়ান্ধকার বাথরুমে দাঁড়িয়ে অন্য চিন্তা মাথায় এল তার। শমিতের ঘটনাটা নেখালির মানুষেরা নিশ্চয়ই গল্প করবে। এধরনের ব্যাপার রোজ ঘটে না। আর যেখানে সে জড়িত তখন গল্পের গতি বাড়বে। সে এর আগে দেখেছে, এক অল্পবয়সী মেয়ে চাকরি করতে এসেছে, তা যে পোস্টেই হোক, আশেপাশের মানুষ তার মধ্যে গল্প খোঁজে। শমিত অন্তত এই ক্ষতিটুকু করতে পারল। অবশ্য নিজে যতক্ষণ অন্যায় না করছে ততক্ষণ সে কাউকে পরোয়া করে না, তবু এসব কার ভাল লাগে?

অভ্যেসমত স্নান সেরে সে যখন ঘরে ফিরে এল তখনও তিরির ঘুম থেকে ওঠার সময় হয়নি। বাইরের ঘর দিয়ে বেরুবার প্রবৃত্তি হল না। সে ভেতরের উঠোন পেরিয়ে খিড়কির দরজা খুলে মাঠে এসে দাঁড়াল। অন্ধকার আকাশ থেকে নেমে আসছে পৃথিবীর ওপর। আর একটু বাদেই তারা ঢুকে যাবে মাটির ভেতরে। এ বড় সুসময়। অন্যদিন এই মুহূর্তে মন মাজা কাঁসার থালার মত ঝকঝকে হয়ে যায়।

দীপাবলী অন্যমনস্ক হাঁটতে লাগল। সতীশবাবুর বাড়ির দিকে যাওয়ার কথা ভাবল একবার। নিশ্চয়ই যারা গিয়েছিল কাল শহরে তারা এতক্ষণে শ্মশানেই আটকে আছে। সে পূবমুখে দাঁড়াল। সূর্য দেখা যাচ্ছে না, তিনি এখনও দিগন্তের নীচে। কিন্তু তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে তার উঠে আসার। হঠাৎ দূরে, ঝাপসা হয়ে থাকা একটি মানুষের মূর্তি চোখে পড়ল। লোকটি গুনগুন করে গান গাইছে। বিস্মিত দীপাবলী কয়েক পা এগোল। তখনই কানে এল, আকাশ পানে হাত বাড়ালেম কাহার তরে?

গলার স্বর কাঁপছে, সুর সব জায়গায় চেনা নয়। শরীর দুলছে। শমিত। ও কি করে তার আগে এখানে এল? দীপাবলী অনুমান করল শমিত তার অনেক আগেই বেরিয়েছে। গতরাত্রে সম্পূর্ণ মাতাল একটা লোককে শুইয়ে দেওয়ার পর এই ভোর না হওয়া সময়ে সে কোন পুলকে বাইরে বেরিয়ে গান ধরে?

দীপাবলী লক্ষ করল, গান থামল, ধীরে ধীরে উবু হয়ে বসল মাঠের ওপর। এই বসার ভঙ্গী চোখে খারাপ ঠেকল। স্বাভাবিক মানুষ এইভঙ্গীতে সচরাচর বসে না। মাথা ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে। নিতান্ত অনিচ্ছায় দীপাবলী এগিয়ে গেল। একজন কেউ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এই বোধও যেন শমিতের নেই। একটু বাদেই বাবুরা কাজে আসবেন। তারা যদি শমিতকে এই ভাবে বসে থাকতে দ্যাখেন তাহলে গতরাত্রের গল্প আরও জোরদার হবে। কালকের মদের প্রতিক্রিয়া কি এখনও চলছে ওর শরীরে?

দীপাবলী ডাকল, শমিত।

শমিত অনেক কষ্টে মুখ তুলল যেন। তার মুখচোখ দেখে আঁতকে উঠল সে। হাত। বাড়িয়ে কপাল স্পর্শ করতেই আগুনের ছোঁয়া পেল। আতঙ্কিত দীপাবলী বলল, ওঠো, বাড়িতে গিয়ে শোবে চল। এরকম অসুস্থ হয়ে কেন বাইরে এসেছ?

শমিত হাসতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না।

ওকে একা তোলা দীপাবলীর পক্ষে অসম্ভব। সে দ্রুত ফিরে গেল। তিরিকে ডেকে এনে দুজনে মিলে কোনরকমে শমিতকে নিয়ে এল বাইরের ঘরে। সেখানে ঢুকেই শরীর গুলিয়ে উঠল। সমস্ত ঘরে বমি করে রেখেছে শমিত। দুৰ্গন্ধ সেখানে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। এরকম একটা নরকে কোন মানুষকে শোওয়ানো যায় না। দীপাবলী তিরিকে ভেতরের দরজাটা খুলতে লল। সেটা যেহেতু বন্ধ ছিল ওপাশ থেকে তাই তিরিকে খিড়কির দরজা ঘুরে যেতে হল। শমিতকে দুহাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে দীপাবলী। টলছে শমিত। আর টলতে টলতে বলছে, আই অ্যাম সরি দীপা, লেট মি গো। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।

ভেতরের ঘরে দ্বিতীয় বিছানা নেই। মাটিতেও শোওয়ানো যায় না। অতএব নিজের বিছানাতেই শুইয়ে দিতে বাধ্য হল দীপাবলী। দেখা গেল ওর পাঞ্জাবির হাতাতেও কিঞ্চিৎ বমি শুকনো হয়ে লেগে আছে। নতুন পাঞ্জাবি শমিতের ঝোলা থেকে এনে সেটা পরিয়ে দিতে প্রচণ্ড কসরৎ করতে হল।

তিরি বলল, কি হবে দিদি। শরীর যে পুড়ছে।

মাথা ধুইয়ে দেওয়া দরকার। তুই এক বালতি জল নিয়ে আয়।

শমিতের মাথা বিছানার একপাশে নিয়ে এসে ধীরে ধীরে মাথা ধুইয়ে দিল দীপাবলী। শরীরের ছোঁয়া পাওয়া মাত্র জল গরম হয়ে যাচ্ছে। জলের স্পর্শ পেয়ে চোখ খুলল শমিত। লাল টকটকে চোখ মেলে কি দেখল সে-ই জানে।

তিরি ততক্ষণে চলে গিয়েছে বাইরের ঘরটাকে পরিষ্কার করছে। জল এবং ঝাঁটার শব্দ হচ্ছে সেখানে। একবার দরজায় এসে বলল, কাল সারাদিন কিছু খায়নি দিদি, যেখানে বমি পড়েছে সেখানেই কালো দাগ হয়ে গিয়েছে।

দীপাবলী চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকা শমিতের দিকে তাকাল। সেই শমিত এমন কাণ্ড কেন করল? আর এই শমিত সারাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত সমস্ত জ্ঞান, অহঙ্কার, আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে কি অসহায় হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু এভাবে কাউকে ফেলে রাখা যায় না। একজন ডাক্তারকে ডেকে আনা দরকার। তিরি ফিরে এলে তাকে শমিতের ওপর নজর রাখতে বলে সে তৈরী হয়ে অফিস ঘরে চলে গেল।

হরিপদবাবু নেই। বাবুদের মধ্যে মাত্র একজনই এসেছেন। তিনি এত সামন্য কাজ করেন যে দীপাবলীর প্রয়োজন পড়ে না কথা বলার। তাঁকেই ডাকতে হল। লোকটির যথেষ্ট বয়স হয়েছে। প্রথমদিন দেখেই মনে হয়েছিল বয়স ভাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, সতীশবাবুর কোন খবর পেয়েছেন?

না। দ্রুত মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক, দুপুরে আগে কি করে ফিরে আসবে। সকালের আগে তো বডি শ্মশানে নিয়ে যেতে পারবে না।

এত স্বাভাবিক গলায় কথাগুলো বললেন ভদ্রলোক যে দীপা অবাক হয়ে তাকাল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, সবাই গেল আপনি গেলেন না কেন?

আমি আর কি করতাম ওখানে। জিপে জায়গা বেশী হত না। তাছাড়া আমি সি এল নষ্ট করতে চাই না এখন।

সি এল?

হাঁ ম্যাডাম। ক্যাজুয়াল লিভ। আপনি তো ওদের ছুটি কাটবেন। আমি বছরের শেষে ওই সি এলগুলো নিয়ে দেশের বাড়িতে যাই। আমি তো আপনার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাই না তাই আপনি জানেন না।

হুঁ! আচ্ছা বলুন তো, এখানে ভাল ডাক্তার কী কেউ আছেন?

ডাক্তার? না। কেউ নেই। থাকলে সতীশবাবুর বউ মারা যায়?

কেউ নেই?

আছে। তিন ক্রোশ দূরে মতি হালদার। ব্যাটা চামার।

আপনি একটা কাজ করুন। এখন অফিসে কাজ করতে হবে না। ওরা যখন নেই তখন কি কাজই বা আপনি করবেন। আপনি দয়া করে ওই মতি হালদারকে আমার নাম করে ডেকে আনুন।

ডেকে আনব? কিন্তু সতীশবাবুর স্ত্রী তো মারা গিয়েছেন?

আপনাকে যা বললাম তাই করুন।

ঠিক আছে, যাচ্ছি। কিন্তু কে অসুস্থ জিজ্ঞাসা করলে কি বলব?

আমার বাড়িতে একজন আত্মীয় এসেছেন তিনি অসুস্থ। এই নিন দুটো টাকা, আপনাদের বাস ভাড়া।

টাকাটা নিয়ে ভদ্রলোক আর দাঁড়ালেন না। দীপাবলী একটু স্বস্তি পেল। এই লোকটির সঙ্গে সে আগে কথা না বলে ভালই করেছে। মতি হালদার যত চামারই হোন ডাক্তার তো বটে। এইসময় তিরি চা নিয়ে এল।

দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, হ্যাঁরে, তোদর এখানে কারো অসুখ হলে কি করিস?

শুয়ে থাকি।

শুয়ে থাকলে অসুখ সেরে যায়?

সেরে যায়, কেউ কেউ মরে যায়।

চিকিৎসা হয় না?

মাথা নেড়ে না বলল তিরি।

দীপাবলী বলল, মতি হালদার নামে একজন ডাক্তার আছেন, তাঁকে ডাকতে পাঠালাম।

তুমি পাগলাবাবাকে খবর দেবে?

পাগলা বাবা?

ওই শিবমন্দিরে থাকে। শেকড় পাতা দিয়ে অসুখ সারায়।

চায়ে চুমুক দিল দীপাবলী। কথা ঘোরাবার জন্য বলল, বাবু কি একই রকম ভাবে শুয়ে আছে?

শরীরের রক্ত যতক্ষণ ফুটবে ততক্ষণ হুঁস থাকবে না।

দশটা নাগাদ মতি হালদারকে নিয়ে ভদ্রলোক ফিরে এলেন। মতি হালদার মধ্যবয়সী। পোশাক এবং চেহারায় দুর্দশার ছাপ স্পষ্ট। হাতের ব্যাগটি জরাজীর্ণ। তিনি এসেই ঝুঁকে নমস্কার করলেন দীপাবলীকে, অনেক আগেই এসে আলাপ করা উচিত ছিল কিন্তু গুরুর নিষেধ থাকায় পারিনি। মার্জনা করবেন।

গুরুর নিষেধ?

আজ্ঞে হ্যাঁ। গুরু বলেছিলেন বিনা কলে কারও বাড়িতে যাবে না। সেই থেকে আমি যাই না। আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতেও না। কার অসুধ? কি অসুখ?

আপনি ভেতরে আসুন। দীপাবলীর বলার ধরন দেখে বৃদ্ধ কর্মচারি আফিস ঘরে ফিরে গেলেন। মতি হালদারকে নিয়ে সে শোওয়ার ঘরে চলে এল। খাটের ওপর পা তুলে বসে মতি হালদার মিনিট তিনেক শমিতকে পরীক্ষা করলেন। তারপর বাক্স খুলে দুটো বড়ি বের করে বললেন, একটা এখন খাইয়ে দিন। ঘন্টায় ঘণ্টায় মাথা ধোয়াবেন। জ্বর না কমলে চার ঘণ্টা বাদে দ্বিতীয় বড়ি। তাতেও না কমলে হাসপাতালে চিকিৎসার কিছু থাকবে না।

কি হয়েছে?

সমস্ত শরীর, ভেতরে বাইরে উত্তপ্ত। কেস খুব সিরিয়াস।

আপনি কী এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলছেন?

দুটো বড়ি ফেল করলে।

আপনার ফি কত?

পাঁচ টাকা, বড়ির দাম আট আনা।

টাকা এবং খুচরো পকেটে পুরে দরজা পর্যন্ত গিয়ে মতি হালদার ঘুরে দাঁড়ালেন, ইনি কে?

আমার আত্মীয়।

মুখে এখনও মদের গন্ধ। লিভার থেকেও হতে পারে। চলি।

মতি হালদার চলে যাওয়ার পর দীপাবলী ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। তার এতক্ষণ মনে হচ্ছিল শমিত তাকে ইচ্ছে করে বিপদে ফেলার জন্যে এখানে এসেছে। এখন মনে হল, শমিত কি আত্মহত্যা করতে এসেছিল, একটা জলজ্যান্ত মানুষ তার কাছে এসে যদি দুম করে মারা যায়। সে কেঁপে উঠল। মুখ ফিরিয়ে দেখল তিরি পরম যত্নে শমিতের মুখ তুলে বড়ি খাওয়াচ্ছে। সে চুপচাপ শমিতের মুখে গ্লাসের জলের ধারা পড়তে দেখল।

০৭. অবস্থা খুব গোলমেলে

দুপুর নাগাদ দীপাবলী বুঝতে পারল অবস্থা খুব গোলমেলে।

সকালের ডাক্তারের ওষুধে কোন কাজ দিচ্ছে না, দ্বিতীয় ট্যাবলেট খাইয়ে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোন মানে হয় না। এখন চেষ্টা চরিত্র করলে শমিতকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা হতে পারে। শেকড় বাকড়, তিরি যেসব কথা বলছে, মাথায় ঢাকাতেই চাইল না সে। এর মধ্যে অন্তত চারবার শমিতের মাথা ধোওয়নো হয়েছে। দশটার পর অফিস বন্ধ করে ভেতরে এসে দীপাবলী দেখেছিল শমিতের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে তিরি ভেজা গামছা ওর বুকে গলায় বুলিয়ে তাপ কমাবার চেষ্টা করছে।

দৃশ্যটি একদম পছন্দ হয়নি দীপাবলীর। একথা ঠিক, শমিতের চোখ বন্ধ, চেতনা স্পষ্ট। নয়, তার শরীরের পাশে কে বসে কি করছে তা উপলব্ধি করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু কাউকে সেবা করতে হলে শরীরের অত কাছে যেতে হবে কেন? এমন কি তাকে দৈখেও সরে বসার চেষ্টা করল না তিরি। কাতর গলায় বলল, কি হবে দিদি! শরীর তো একটুও ঠাণ্ডা হচ্ছে না। কাল সারাদিন বোধহয় সূর্য শরীরে ঢুকেছে।

আমি দেখছি, তুই রান্নাঘরে যা। একটু কড়া গলায় বলল দীপাবলী।

তুমি বুক আর পেট ভাল করে মুছিয়ে দিতে পারবে? তিরি যেন উঠতে চাইছে না।

আঃ, কি করতে হবে আমি বুঝব। দুপুরে খেতে হবে না? দীপাবলীর গলা অতটা না উঠলে বোধ হয় তিরি ধড়মড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে আসত না। এমনিতে তিরি তার বিছানায় কখনই উঠে বসেনি এর আগে। যতই থোক কিছু দূরত্ব রাখতেই হয়, রাখা উচিত মনে করে দীপাবলী। শমিতকে এই বিছানায় নিয়ে আসার পর তিরিকে বেশ কয়েকবার বিছানায় উঠতে হয়েছিল, তখন চোখ সেটা ঠাওর করে দ্যাখেনি, এখন দেখল।

শমিতের পাশে বসে ভেজা গামছা তুলে নিতেই সে বুঝতে পারল সেটাও গরম হয়ে গিয়েছে। খাটের নিচে বালতিতে রাখা জলে সেটা ডুবিয়ে নেওয়া হয়েছে এতক্ষণ। তাই অনুসরণ করল সে। গামছাটা শমিতের বুকে গলায় বুলিয়ে দিতে দিতে উত্তাপ টের পেল। একটা কিছু ব্যবস্থù