Wednesday, June 19, 2024
Homeউপন্যাসসাতকাহন (১ম খন্ড) - সমরেশ মজুমদার

সাতকাহন (১ম খন্ড) – সমরেশ মজুমদার

Table of contents

০১. আজ সারাটা দিন সূর্যদেব উঠলেন না

আজ সারাটা দিন সূর্যদেব উঠলেন না। কাঠ-কয়লার মত মেঘ ভুটান পাহাড় থেকে নেমে সারা আকাশ জুড়ে অনড় হয়ে রয়েছে সেই শেষরাত থেকে। সারাটা দিন কেটে গেল গভীর আলস্য নিয়ে। শেষ বিকেলে বাতাস রইল; কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হয়ে গেছে এমন আমেজ ছিল সেই বাতাসে। একটু শীতেল হয়ে উঠল। চারপাশ।

চকোলেট মিলিয়ে যাওয়ার পরও জিভে যেমন তুলতুলে অনুভূতি ছড়ানো থাকে তেমনি এক আলো এখন মাঠের ওপরে, দেওদার গাছের মাথায়, কোয়াটার্সগুলোর টিনের চালের চুড়োয় চুড়োয় নেতিয়ে রযেছে। মুখ তুলে আকাশ দেখলে মনে হয় মেঘেরা বুঝি হওয়ার ধকল সইতে না পেরে এক ছুটে নেমে এল; কিন্তু আজ বৃষ্টি হবে না। মেঘগুলো এই হঠাৎ নামা শীতের দাঁত সইতে না পেরে কুঁকড়ে যাবে। এইভাবেই দু-তিনদিন সইবার পর জল ঝরবে। চা-বাগানের ওপর, কোয়াটার্স, মাঠ, আসাম রোড ভিজবে তেমাথা বুড়ির মত অসাড়ে। এবং সেই পর্ব শেষ হলেই শীত নামবে জাঁকিয়ে। আজকের মেঘ যেন বুধুয়ার তরকারি কোটা, রান্নাঘরে মায়ের উনুনে কড়াই চাপানোর অনেক দেরি। মাঠের মাঝখানে চাঁপা ফুলের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সিরসিরে হাওয়ায় একটু কেঁপে উঠে দীপা চিৎকার করল, তাড়াতাড়ি কর, আমার শীত করছে।

ওপর থেকে কোন উত্তর এল না। যে উঠেছিল ডালে ডালে পা দিয়ে হাওয়া তার পাঁজরে কাঁপন তুলেছিল। কিন্তু মরিয়া হয়ে সে হাত বাড়াচ্ছিল। সদ্যাফোটা সোনালী চাঁপার দিকে। এবছর ওই গাছে প্রথম কুঁড়ি ফুটেছে। লক্ষ্য করেছিল সে, আর তারপরই এই জেদ। অথচ ফুলটা কেবলই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। পায়ের চাপে ডালটা দুলছে। আর সেই সঙ্গে ফুলটাও। দীপা যখন দ্বিতীয়বার চিৎকার করল তখন তার মনোযোগ নষ্ট হল। চোখ তুলে আকাশ দেখে ভয় ঢুকল মনে। শাঁখ বাজছে কোয়াটার্সে কোয়াটার্সে। সে আবার মরীয়া হল। এবং এইবার পাতাশুন্ধু ফুল চলে এল হাতে। তর তর করে দুটো ডাল নেমে এসে নিচে তাকিয়ে দেখল দীপা নেই।

মাঠটা একনিঃশ্বাসে দৌড়ে আসতেই শীত উধাও, ঘন ঘন নিঃশ্বাসে শরীর গরম। দীপা দাঁড়িয়ে গেল। এখন সামনের গেট দিয়ে ঢোকা মানে একশটা বকুনির সামনে দাঁড়ানো। ঠাকুমা যতটা না মা তার তিনগুণ। সে পায়ে পায়ে পিছিয়ে এল। দুটো কোয়াটার্সের মাঝখানের সরু গলি দিয়ে চলে যাওয়া যায় পেছনে। যদিও ও-পাশটায় অযত্নে বেড়ে ওঠা জঙ্গল সাধারণ বিকেলেই গা ছমছমে হয়ে থাকে এবং আজ মেঘ আছে বলে আরও মারাত্মক তবু পেছনের বাগানের গেট খুলে ভেতরে ঢুকে একেবারে উঠোনে চলে গেলে অনেকের দৃষ্টি এড়ানো যাবে। দীপা দ্রুত পা চালাল। গলিটা পেরিয়ে কলাগাছের বনের মধ্যে ঢুকে যাওয়ামাত্র দ্বিতীয় চিন্তায় সে থেমে গেল। এখনও শীত পড়েনি। অতএর সাপেরা, রাত্রির বেলায় সাপ বলতে নেই, ঠাকুমা বলেন অন্ধকারে পথ চলতে গেলে তালি দিতে হয় এবং সেইসঙ্গে আস্তিক আস্তিক বললে তেনার সরে যান, দীপা সেইভাবে এগোতে লাগল। মাঠের ভেতর তবু কিছু দেখা যাচ্ছিল কিন্তু এখানে ঘাসগুলোও নজরে আসছে না। বাড়ির পেছনের পায়ে হাঁটা পথটায় এসে দীপা বাতাবি লেবুর ফুলের গন্ধ পেল। এদিকটায় খোকনদের বাড়ির কোণে তিন তিনটে বাতাবির গাছ আছে। পূর্ণিমার রাত্রে, সেই ডিসেম্বর জানুয়ারি মাসে, খোকনের ঠাকুমা আকাশ থেকে নেমে আসেন বাতবি লেবুর রস খেতে। যখন বেঁচে ছিলেন তখন তিনি কিছুতেই ডিসেম্বরের পূর্ণিমার আগে বাতাবি খেতেন না। তাঁর ধারণা ছিল কালীপুজো পেরিয়ে যাওয়াব অনেক পরে বাতাবির বুকের রস, ঘন হয়। মারা যাওয়ার পর এক ডিসেম্বরের পূৰ্ণিমায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে কোয়াটার্সের জানলা দিয়ে চাঁদ দেখতে গিয়ে খোকনের মা নাকি দেখেছিলেন তাঁর শাশুড়ি বাতাবিগাছের ডালে বসে রস চুষে খাচ্ছেন। তারপর থেকে ওই দুই পূর্ণিমার পরের সকালে গাছের নিচে পড়ে থাকা বাতাবিগুলো তুলে নদীতে ফেলে দিয়ে আসা হয়। গন্ধ নাকের মধ্যে দিয়ে শরীরের ভেতরে যেতেই পড়ি কি মারি করে ছুট দিল দীপা। খোকনের ঠাকুমাকে সে দেখেছে এই এ্যাট্টুকিনি বয়সে। ফোকলা দাঁতে হেসে বলতেন, হ্যারে বেটি, তোর বরের সঙ্গে আমার বে। দিবি? শুধু এইটুকুনি মনে আছে কিন্তু তাতেই গায়ে কাঁটা উঠে এখন একাকার। টিনের দরজাটা একটা তারের হুকে আটকানো থাকে। হাতড়ে হাওড়ে সেটাকে খুলে তবে স্বস্তি। লক্ষ্মী ডাকছে গোয়ালঘরে। ঠাকুমা বলেন গরুটা কুকুরের কাজ করে। বাগানে কারো পায়ের আওয়াজ পেলেই হাম্বা হাম্বা ডাক শুরু করে দেয়। ওই ডাক কানে যাওয়ামাত্র দীপার মনে হল সে নিজের জায়গায় এসে গিয়েছে, আর কোন ভয় নেই। টিনের দরজাটা তারের জালের দেওয়াল কেটে বানানো। সেটাকে বন্ধ করতে গিয়ে দীপা পেছনের অন্ধকারের দিকে তাকাল। ঝোপঝাড়ের পরই ছোট্ট নদীটা। এখনও জল আছে হাঁটু পর্যন্ত। চৈত্রমাসে পায়ের পাতায় নেমে যায়। বর্ষায় এক বুক। চওড়ায় আসাম রোডটার মতন। কিন্তু এখন তার বুকে কুন্দ ফুলের মত জোনাকি ফুটে রয়েছে। রাত যত বাড়বে সমস্ত চরাচরে তখন জোনাকিরা কুরুক্ষেত্র শুরু করে দেবে। কী মজা লাগে তখন চেয়ে দেখতে। দীপার হঠাৎ মনে হল একমাত্র মানুষ ছাড়া পৃথিবীতে আর কারও বোধ হয় শীত করে না।

রান্নাঘরের পাশ দিয়ে উঠোনে ঢুকতেই সে হ্যারিকেনের আলো দেখতে পেল। সর্বনাশ! হ্যারিকেন জ্বালা হয়ে যাওয়া মানে মায়ের হাত এখন খালি। নিশ্চযই ইতিমধ্যে দীপার খোঁজ পড়েছে কয়েকবার। বিশুর ওপর প্রচণ্ড রাগ হয়ে গেল তার। লক্ষবার বলেছে আজ চাঁপা ফুল তোলার দরকার নেই। তবু কথা শুনল না। কেউ ফুলের জন্যে গাছে উঠলে শেষপর্যন্ত না দেখে তাকে গাছের ডালে ফেলে রেখে চলে আসা যায়? গাছের ডালের কথা মাথায় আসতে দীপা ফিক করে হেসে ফেলল। খোকনের কাকা এক বিকেলে কুল পাড়তে গাছে উঠেছিলেন নদীর ধারে। কেউ নাকি বলেছিল ওই গাছের নিচের ডালের কুলগুলো যত টক ওপরের ডালে তত মিষ্টি। ওঠার সময় বুঝতে পারেননি। প্রায় মগ ডালে ওঠার পর মিষ্টি কুল খেয়ে সময়টা ভুলে গিয়েছিলেন। খেয়াল হল যখন তখন এই আজকের মত আঁধার নেমেছে। তড়মড়িয়ে নামতে গিয়ে ঠিক নিচের ডালটা গেল ভেঙ্গে। ওপরের ডালটা ধরা ছিল বলে রক্ষা। তখন আর নামার উপায় নেই। সেই ডালেই কোনমতে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করলেন। রাতটা ছিল অমাবস্যার। নদীর ধারে বড় বড় গাছের জঙ্গল ভেদ করে কেউ অকাজেও যায় না সন্ধে নামলে। খোকনের কাকার চিৎকার শুনতে পাবে কেন কেউ? ডেকে ডেকে গলা ধরে গেল। খিদে পেল এবং তারপরেই তাঁর মনে পড়ল গাছটা কুলে। আশশ্যাওড়া আর কুলগাছে পৃথিবীর যত শাঁকচুন্নীরা গল্পে করতে খুব ভালবাসে। বট অশ্বখ হলে তবু ব্ৰহ্মদৈত্যির দর্শন পাওয়া যেত। তেনারা ভালমানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন না। কিন্তু শাঁকচুন্নিরা হল খুব খারাপ শ্রেণীর পেত্নী। তারা নাকি আইবুড়ো ছেলে দেখলেই আনন্দে ডিগবাজি খায়। আইবুড়ো ছেলের ঘিলু খেলে শাঁকচুন্নীদের আয়ু বেড়ে যায়। খোকনের কাকা যেই সেটা মনে করলেন তখনই রাম নাম করতে লাগলেন। ওই নদীটি যে পাশে সেই খেয়াল নেই তখন। নদী তো মেছোপেত্নীদের প্রিয় জায়গা। সেটা মনে পড়তেই তার চিৎকার বেড়ে গেল। ভাগ্য ভাল ওপরের লাইনের একটা মাতাল কুলি সেই চিৎকার শুনতে পেয়ে নদীর ওপারে এসেছিল পেত্নী পড়েছে মনে করে। তার চেচামেচিতে সবাই খোকনের ছোটকাকাকে নামিয়ে আনে। পরে নাকি তিনি খুব আফসোস করেছিলেন, যদি মাতালটা না আসতো তবে সেইরাত্রে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা হত। এই বছর খানেক হল খোকনের ছোটকাকা জলপাইগুড়িতে চাকরি করতে গিয়ে বিয়ে করেছেন। ফর্সা লম্বা সুন্দর চেহারা। বিয়ের পর এখানে যখন বউ নিয়ে এলেন তখন ঠাকুমাকে বলতে শুনেছিল, কপালে যা লেখা আছে তা খণ্ডাবে কে বউমা! কুলগাছের শাঁকচুন্নীর হাত থেকে না হয় মাতাল বাঁচিয়েছিল। কিন্তু শহরের শাঁকচুন্নী তো ঠিক ঘিলু চুষে নেবে। ছেলেটার হাড়ে দুৰ্ব্বেবাঘাস গজিয়ে ছাড়বে, দেখো। পরদিন দীপা সটান খোকনদের বাড়িতে গিয়ে ওর নতুন কাকিমাকে ভাল করে দেখেছিল। গায়ের বঙ কালো, মাথায় ঘোমটা নেই, বড় রোগা আর জোরে জোরে কথা বলেন। কিন্তু শাঁকচুন্নী বলে মনে হয়নি। ওর কেবলই মনে হয়েছিল সবাই যখন জানেই তখন মাথার ঘিলু ঠিক বাখার জন্যে খোকনের কাকুকে সাবধান করে দিচ্ছে না কেন?

চট করে বাথরুমে ঢুকে গেল দীপা। অন্ধকারেই চৌবাচ্চার জলে হাত দিতেই মনে হল সেখানেও ঠাণ্ডা সেদিয়েছে। শিউলি ফুল ঘাসের ওপর পড়া মানেই শিশির জমা। কিন্তু ওই বৃষ্টিটা না নামা পর্যন্ত সোয়েটার পরতে হয় না। তাহলে জল এত ঠাণ্ডা হল কেন? কিছুদিন হল একটা কথা ওর কেবলই মনে হচ্ছে, আকাশ, মাটি, গাছপালা, চা-বাগান, নদী এমন কি? পাখিদের মধ্যে কিরকম গোপন যোগাযোগ রযেছে যা কেবল তারাই বুঝতে পারে। বাড়ির। পোষা কুকুব বেড়াল গরুদেব সঙ্গে ততটা যোগাযোগ নেই, বেডালের সঙ্গে তো একদম না। এইসময় একই সঙ্গে ধারাপাত আর বর্ণপরিচয় পড়া আরম্ভ হল। দুজন দুগলায় সুর করে করে। আজ আর নিস্তার নেই। ওই মেঘটাও গোলমাল করে দিল। এমন ভাবে আকাশটাকে ঢেকে ঢুকে রেখেছিল যে আলো নেবার সময়টাকে ধরতে পারেনি। অথচ মায়ের কড়া হুকুম শাঁখ বাজার আগেই ঢুকতে হবে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে বারান্দার তারে ঝোলানো গামছা টেনে পা মুছতে গিযে জবাকুসুমের গন্ধ পেয়ে আবার শক্ত হল দীপা। মাযেব গামছা টেনে নিয়েছে সে। মা কাউকে নিজের গামছা ব্যবহার করতে দেয় না। চটজলদি পা না মুছেই সেটাকে তবে টানটান করে মেলে দিল সে। তারপর লম্বা ঘরটায় উঁকি মারল। ঠাকুমা নেই, মাকেও দেখা যাচ্ছে না। কোণার দিকে মাদুর পেতে দুই ভাই পড়তে বসেছে। ওকে দেখামাত্র একজন একগাল হাসল, আই দিদি, বিশুদা তোকে ডাকছিল! দীপা ঠোঁট কামড়াল। বিশু কেন এল? ও বাড়ির পেছন দিক দিয়ে ঘুরে এসেছে বটে। কিন্তু এমন কিছু দেরি করেনি। আর একমধ্যেই বিশু এসে গেল? দ্বিতীয়জন আরও কচি গলায় বলল, তোর চাঁপা ফুল দিয়ে গিযেছে।

প্রচণ্ড রাগ হয়ে গেল দীপার। সে চাপা গলায় বলল, চুপ কর! মনে মনে ঠিক করল

কাল বিশুর সঙ্গে মোটেই কথা বলবে না। কিন্তু ফুলটা কার হাতে দিয়েছিল?

পাশের ঘরে ঢুকতেই সে থতিমত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মা ঠাকুরঘরের দরজা ভেজিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই ওকে দেখতে পেয়েছে, কোথায় ছিলি?

মাঠে। দীপার গলার স্বর কেঁপে উঠল।

তা মাঠেই থাকলে পারতে। এত্ত করে বলেছি শাঁখ বাজার আগেই বাড়ি ফিরবি, কথা কানে যায় না, না? বলতে বলতে কয়েক পা এগিয়ে এসে বা হাতে খপ করে চুলের মুঠি ধরে টান দিল অঞ্জলি। আর মাথাটা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতেই তার ডান হাত এসে পড়ল মেয়ের গালে, ধিঙ্গি মেয়ে কোন কথা কানে যায় না? ফুল তোলানো হচ্ছে? মেরে তোমার বিষদাঁত ভেঙ্গে দেব আজ। বল, কেন শুনিসনি কথা?

দাঁতে দাঁত চেপে কান্নাটাকে সামলালো দীপা। অভিজ্ঞতায় জানে এইসময় কোন প্রতিবাদ করা মানে প্রহার আরও বেড়ে যাবে। বেশ কয়েকবার মারার পর অঞ্জলি ওকে ঠেলে সরিয়ে দিল, আজ রাত্রে তোমার খাবার জুটবে না। এই তোমার শাস্তি।

এইসময় ঠাকুমার গলা বাজল দরজায়, কানে মেরো না। মারতে হলে পিঠে মারবে।

আমি অত হিসেব করে মারতে পারব না। কানে লেগে কালা হয়ে যায় যদি যাক। এত বড় বেয়াড়া মেয়ে আমার কোন কথা শুনবে না! শরীর বড় হচ্ছে অথচ দেখুন বুদ্ধি যেন দিন দিন কমে যাচ্ছে। অঞ্জলি আবার মেয়ের হাত ধরে টান দিল, আয় তুই আলোর কাছে। প্ৰায় হিড়ি হিড়ি করে হ্যারিকেনের কাছে নিয়ে যেতে যেতে বলল, পৃথিবী তো উদ্ধার করে এলে, পা ধুয়েছ?

ততক্ষণে এক পড়ুয়া বলে উঠল, মা, দিদির পায়ে জল।

অঞ্জলির চোখ বাঁদিকে পড়ামাত্র চিৎকারটা জোরালো হল, দেখুন মা, আপনার নাতনির কাণ্ড, হয়েছেন এমন করে যে হাঁটু পর্যন্ত ধূলায় সাদা হয়ে আছে, মোছার সময় পর্যন্ত পায়নি।

মনোরমা গম্ভীর গলায় বললেন, দীপু, যাও, ভাল করে হাত পা ধুয়ে এস। মায়ের হাতের বাঁধন আলগা হওয়ামাত্র দীপা আবার বাথরুমে চলে এল। জোরে জোরে মগের শব্দ তুলে জল তুলে পায়ে ঢালতে ঢালতে সে অমরনাথের গলা শুনতে পেল, আজি রাত্রে খুব ঢালবে মনে হচ্ছে! আরে, কি হয়েছে তোমাদের?

অঞ্জলির গলা কানে এল, অনেকের তো দশ এগার বছরে মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়, তুমি তোমার পেয়ারের মেয়ের ওরকম একটা ব্যবস্থা কর। এরপর বারান্দা দিয়ে একজোড়া পা দুপদাপ শব্দ করতে করতে উঠোনে নেমে গেল। আর কথাগুলো কানে যাওয়ামাত্র দীপার বুক মুচড়ে একটা কান্না ছিটকে এল গলায়, সেইসঙ্গে চোখ ছাপিয়ে জল। সে কোনমতে কান্নাটাকে গিলতে চাইল। অমরনাথের গলা কানে এল, কি ব্যাপার?

তোর মেয়েকে এবার শাসন কর অমর। বয়স হচ্ছে, এখন ছেলেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো ঠিক নয়। সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফেরেনি বলে বউমা রাগ করে ঠিকই করেছে।

ছেলেদের সঙ্গে মানে? ওর বন্ধু তো খোকন, বিশু, ওরাই।

হা, ওরা তো ছেলেই।

কি যে বল মা, তোমাদের মাথার ঠিক নেই। মারধর হয়েছে?

মনোরমা জবাব দিলেন না। দীপার হাত আর চলছিল না। অন্ধকার বাথরুমে যদি অনন্তকাল থাকা যেত তাহলে যেন সে বেঁচে যেত। কিন্তু এসবের মধ্যেই হ্যারিকেনের আলোটা এগিয়ে এল। অমরনাথ সেটিকে নিচে নামিয়ে রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, কি করছিস ওখানে? আয়, বেরিয়ে আয়। দীপার চিবুক এবার বুকে মিশল। এবং কান্নাটা ছিটকে বের হবার পথ পেয়ে গেল। সেই শব্দ উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরে পৌঁছাতেই অঞ্জলি উঁচু গলায় বলে উঠল, নাও, আরম্ভ হল, বাপকে দেখে মেয়ে এবার গলে গেলেন।

অমরনাথ সেদিকে কান না দিয়ে ডাকলেন, তোকে বেরিয়ে আসতে বলছি।

প্রচুর জড়তা পায়ে নিয়ে দীপা বাইরে বেরিয়ে এসে বারান্দায় উঠে এল। অমরনাথ মেয়ের দিকে তাকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, মুখ তোল।

পেছন থেকে মনোরমা নিচু গলায় বললেন, থাক, অনেক হয়েছে। আর কিছু বলিস না।

আমি মুখ তুলতে বলেছি। অমরনাথের গলার স্বর বেশ কড়া।

দীপা মুখ তুলল চোখ বুজে। দুই গাল ইতিমধ্যেই চোখের জলে ভেজা, আর একপ্রস্থ জল উপচে নামল। অমরনাথ দুহাতে মেয়েকে বুকে টেনে নিতেই কান্নাটা বাঁধন-ছেঁড়া হল। বাবার বুকে মুখ চেপে পিঠটা বারংবার ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। কিছুক্ষণ ওরা এইভাবে দাঁড়িয়ে রইল। কান্না যখন প্রায় থামো থামো তখন রান্নাঘর থেকে অঞ্জলির গলা ভেসে এল, মা, ওকে হাতমুখ ধুয়ে নিতে বলুন, চা হয়ে গিয়েছে।

অমরনাথ বললেন, কিছু খেয়ে নিয়ে পড়তে বস মা। দীপার ফোঁপানি তখন স্থির। পেছন থেকে ঠাকুমা বললেন, ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরলেই তো হয়। বড় হচ্ছে, তবু মাথায় বুদ্ধি হচ্ছে না কেন? তুই বিশুর কাছে চাঁপা ফুল চেয়েছিলি?

দীপা কথা বলতে গিযে দেখল গলা শুকনো। সে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল।

অমরনাথ হাসলেন, চাঁপা ফুল তোর ভাল লাগে?

মেয়ে দুবার মাথা ওপর নিচ করল। ঠাকুমা বললেন, ছেলেদের কাছে কক্ষনো ফুলটুল চাইবি না।

অমরনাথ মেয়েকে ছেড়ে নিজের গামছা বারান্দার তার থেকে টেনে নিলেন, তাহলে তো ও চাঁপা ফুল পাবেই না। তোমার নাতনি গাছে উঠতে চাইলে দুটো পা-ই ভাঙ্গবে।

রান্নাঘর থেকে গলা ভেসে এল, নবাবনন্দিনীকে একটু এখানে আসতে বলুন মা।

ঠাকুমা কিছু না বলে। ঘরেব ভেতর চলে গেলেন। অমরনাথ ততক্ষণে বাথরুমে। দীপা দুহাতে চোখ মুছল। জোনাকিগুলো উঠোনেও ঢুকতে আরম্ভ করেছে। পা যেন চলতেই চাইছে না। এমনভাবে সে রান্নাঘরেব দরজায গিয়ে দাঁড়াল! একটা ট্রেতে চায়ের কাপ ডিশ আব্ব বিস্কুট রেখে গালে হাত দিয়ে বসেছিল অঞ্জলি। হ্যারিকেন জ্বলছে। কিন্তু পাশের; কাঠেব উনুনের লকলকে শিখায় তাকে অন্যরকম লাগল এখন। দীপার মনে হল মায়ের মুখটা মুখেব ভেতব জিভ ঢুকিয়ে রাখলে মা কালীকে যেমন দেখাবে ঠিক সেইরকম দেখাচ্ছে। অঞ্জলি ট্রেটা তুলে ধরে বলল, দয়া করে বাইরের ঘরে নিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখ। এক ফোঁটা চা যেন চলকে ডিশে না পড়ে। মানুষকে চা দেবার সময় ডিশ শুকনো রাখতে হয়।

দীপা হাত বাড়িয়ে দেখল সে-দুটো কাঁপছে। অঞ্জলি ট্রে নামিয়ে চোখে চোখ রাখতে চাইলেই মেয়ে চোখ নামাল। অঞ্জলি বলল, থাক। এখানে বস। আমি না আসা পর্যন্ত উঠবে না।

পড়ব। গলা থেকে অনেক কষ্টে স্বরটা বের হল।

পড়ে তো আমাকে উদ্ধার করে দিয়েছ। আমি না ফেরা পর্যন্ত বসে থাকবি এখানে।

ট্রে নিয়ে অঞ্জলি বেরিয়ে গেল রান্নাঘর থেকে। উনুনে কাঠ। ফাটার শব্দ হচ্ছে। ওপরে একটা সসপ্যান চাপানো। দীপা বাইরে তাকাল। শোয়ার ঘরগুলো আর রান্নাঘরের মাঝখানে অন্ধকার উঠোন, ওপাশে ঠাকুমার ঘর। ঠাকুমার ঘরেই তাঁর ঠাকুরের আসন পাতা। মায়ের ঠাকুরঘরটা বড়। উঠোনে জোনাকিগুলো ছবি আঁকছে। বিশু তাকে একটা মজার মতলব বলেছে। জোনাকির পায়ে আঠা লাগিয়ে কপালে সেঁটে নিয়ে রাত্রে বের হলে লোকে অবাক হয়ে দেখবে আলোর টিপ। মায়ের ভয়ে সেটা করা হচ্ছে না। কালীপুজোর রাত্রে একবার চেষ্টা করবে সে। মাথার ওপরে টিনের চালে টপ টপ শব্দ হল। বৃষ্টি এল নাকি? একটু হাওয়া উঠতেই রান্নাঘরের দরজাটা দুলে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে কুঁকড়ে উঠল দীপা। চোরের মত আধ-খোলা দরজার দিকে তাকাল সে। ভূতেদের বিশ্বাস নেই। ঠাকুমা নিজের চোখে কত রাতে দেখেছে সাদা থানের মুণ্ডহীন পা-হীন মূর্তি উঠোন দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সারা গায়ে কাঁটা ফুটল দীপার। আগুনের কাছে সরে বসল সে। এইজন্যে এক রাত হলে রান্নাঘরে থাকতে চায় না সে। আর তখনই উঠোনে সাদা মূর্তিটাকে দেখতে পেল দীপা। সাদাটা তার দিকেই এগিয়ে আসছে। ভয়ে পরিত্ৰাহি চিৎকার করে উঠল সে। প্রায় দৌড়ে চলে এল অঞ্জলি উঠোন পেরিয়ে। এসে দেখল মেয়ে দুই হাঁটুতে মুখ ঢেকে থর থর করে কাঁপছে। অঞ্জলি ওকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে, এই দীপু, চিৎকার করলি কেন? সঙ্গে সঙ্গে মাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল মেয়ে। কাঁপুনি তার থামতেই চায় না। মাথায় পিঠে হাত বোলাল অঞ্জলি আর সমানে কারণটা জানতে চাইল। ওপাশের বারান্দায় মনোরমা এসে গেছেন, ততক্ষণে, কি হল বউমা? ও চেচাল কেন? ও বউমা?

অঞ্জলি নিচু গলায় বলল, তাড়াতাড়ি বল কি হয়েছে। নইলে ঠাকুমা ঠিক আমায় বকবে। মুখ না তুলে হাত বাড়িয়ে অন্ধকার উঠোনটাকে দেখাল দীপা, ভূত।

ভুত? অঞ্জলি চমকে পেছনে তাকাল।

সাদা থান পরে এগিয়ে আসছিল।

কি যাতা বলছিস। লণ্ঠনটা এক হাতে তুলে উঁচু করে ধরল অঞ্জলি মেয়েকে অন্য হাতে সামলে, কিসু নেই। দ্যাখ না চেয়ে। তারপরেই তার গলা পাল্টে গেল, এই, কে রে?

হামি মাইজি! উঠোন থেকে বুধুয়ার গলা ভেসে এল।

কি করছিস ওখানে?

কুছু না। দীপু দিদি হামাকে দেখে ডর পেয়ে গেল। বুধুয়া হেসে উঠল।

ওপাশে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনোরমা ধমকে উঠলেন, ডর পেয়ে গেল! কি বেআক্কেলে কথা! তুই কেন রাতের বেলায় সাদা গেঞ্জি সাদা ধুতি পরেছিস। কালো শরীরে ওরকম পরলে অন্ধকারে চেনা যায়? আবার দাঁত বের করে হাসা হচ্ছে?

অঞ্জলি বলল, দেখলি? তুই বুধুয়াকে ভূত বলে ভেবেছিস! কি বোকারে তুই!

দীপা ধীরে ধীরে মুখ তুলল। বুধুয়া এবার রান্নাঘরের বারান্দায়। খুব রাগ হয়ে গেল দীপার। তবু নিজের বোকামিটা স্বীকার না করতে বলল, ঠাকুমাও তো রাত্তির বেলায় থান পরা ভুতকে উঠোনে হেঁটে যেতে দ্যাখে।

অঞ্জলি মাথা নাড়ল বিরক্তিতে, ঠাকুমা বুধুয়াকে দেখে বুঝতে পারেনি।

তাহলে কাল তুমি ওকে অন্য রঙের গেঞ্জি ধুতি কিনে দিও।

ঠিক আছে। এখন ওঠ, মোয়া দিচ্ছি খেয়ে নিয়ে পড়তে বাস। আর কক্ষনো সন্ধের পর বাড়ি ফিরবি না। অল্পবয়সী মেয়েদের সন্ধে হয়ে গেলেই কত কি হয়ে যায়!

কি হয়ে যায় মা?

উঃ, আবার কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করা হচ্ছে। যে কোন ছুতোয় গল্প ফাঁদতে পারলেই হল, না? অঞ্জলি উঠে পাশের খাওয়ার ঘরে চলে গেল। সেখানে বিভিন্ন রকমের টিনের বাক্সে বাড়িতে তৈরি করা খাবার রাখা আছে। দীপা বুধুয়ার দিকে তাকাল। তারপর নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, বুধুয়াদা, তুমি কখনো ভূত দেখেছ?

বুধুয়া মাথা নাড়ল, বহুৎ। কিন্তু চিল্লালে ভূতরা খুব ভয় পেয়ে যায়।

সন্ধে গড়িয়ে গেলেই ঠাকুমা নিজের ঘরে চলে যান। পুরনো দিনের একটা চীনে সেজবাতি আছে তাঁর ঘরে। আহ্নিক সেরে তিনি রাতের খাওয়া সরে নেন। তারপর ঠাকুব নাম লিখতে বসেন। অঞ্জলির রান্নার পাট চুকলেই বাচ্চাদের খাওয়ার ডাক পড়ে। আটটা বাজার আগেই ছোট দুজনের বই গুটিয়ে ঢুলুনি শুরু হয়ে যায়। ডাকটা কানে আসামাত্র তারা রান্নাঘরের দিকে দৌড়ায়। এই সময় দীপার সঙ্গে অঞ্জলির একপ্রস্থ মন কষাকষি চলে আজকাল। দীপা কিছুতেই খাবে না। এ সময়ে, অঞ্জলি জেদ ধরবে তাকে খাওয়ানোর জন্যে। শেষ পর্যন্ত মনোরমার গলা ভেসে আসবে, ওরা যখন খিদে নেই তখন কেন জোর করছ বউমা।

আজ ছোট দুজনের পেছনে রান্নাঘরের দরজায় চলে এল দীপা, মা, আমি তো একটু আগে দুটো মোয়া খেয়েছি, এখনই কি ভাত খাব?

অঞ্জলি হাসি চাপল, ঘুমিয়ে পড়লে আর ডেকে খাওয়াবো না।

দীপা ছুটে ফিরে এল একেবারে বসবাব ঘরে। বিশাল হ্যারিকেনটা স্ট্যান্ডের ওপর জ্বলছে। দীপা অমরনাথের আরামকেদারায় পা তুলে বসল। আঃ কি আরাম। তারপর হাত দিয়ে রেডিওটা খুলে দিল। কি সব বকর বকর করে বলছে। সে নব ঘোরাতে লাগল। হঠাৎ একটা বাজনা কানে আসতেই সে হাত সরিয়ে নিল। তারপর অমরনাথের রেখে যাওয়া কাগজখানা টেনে নিল। সামনেই জহরলাল নেহরুর ছবি। দীপা ছবিটাকে দেখল। বেশ দেখতে লোকটা। খোকনের চিবুকটা অনেকটা এই রকম। কাল বিশু মাছ ধরতে যাবে বলছে। দুপুরের পর। সেই সময়টায়, খাওয়া-দাওয়ার পর, যাওয়াই ভাল। কেউ খোঁজ নেবার সময় পাবে না। তবে যাই হোক না কেন সন্ধের আগেই ফিরতে হবে। সকালে ফড়িং ভরে রাখতে হবে দেশলাই-এর বাক্সে। বিশু নেবে কেঁচো। কলাগাছের পচা বাকলে থাকা এইসব লিকলিকে কেঁচোগুলোকে দেখলেই গা ঘিনঘিন করে। বড়শি ঢুকিয়ে ওগুলোকে ছিঁড়তে মরে গেলেও পারবে না। আগামীকালের ব্যাপারটা ভেবে উত্তেজিত হল সে। দেশলাই-এর বাক্সেব অভাব নেই। এখন বাড়িটা চুপচাপ শুধু টিনের ছাদে মাঝে মাঝে টপ টপ শব্দ হচ্ছে। বৃষ্টিটা পড়েও পড়ছে না। অমরনাথ গিয়েছেন তাস খেলতে। চা বিস্কুট খেয়েই বেরিয়ে গিয়েছেন। ফিরবেন দশটা নাগাদ। দীপা কাগজটা রেখে দিল। তারপর উঠে বাবার বই-এর তাক থেকে রূপাঞ্জলি পত্রিকা টেনে নামাল। মায়ের সামনে এই পত্রিকায় হাত দেবার উপায় নেই। অঞ্জলির কড়া নিষেধ আছে। এখন কেউ এ-ঘরে আসবে না। কাননীবালা। চন্দ্রাবতী। মেনকা। সন্ধ্যারাণী। এরা সব সিনেমা করে। সিনেমা কী জিনিস জানে না দীপা। এই বাগানে সিনেমা দেখায় না। দেখতে হলে আট মাইল দূরে যেতে হবে। খুব ভাল সিনেমা এলে কয়েকদিন জল্পনা করে অমরনাথ অঞ্জলি এবং আরও তিন চারটে পরিবার বাগান থেকে গাড়ি নিয়ে বাড়িতে ছেলেমেয়েদের রেখে সেখানে সিনেমা দেখতে যায়। প্ৰতিবার সঙ্গে যাওয়ার জন্যে বায়না করে বিফল হয়েছে দীপা। অঞ্জলির এক কথা, ছোটদের সিনেমা দেখতে নেই। বাবার চেয়ারে বসে দীপা ভাবতে বসল সে কবে বড় হবে! আর এটা ভাবতে গেলেই কেমন ঘুম পেয়ে যায়। তার। পত্রিকাটাকে তার জায়গায় রেখে সে চেয়ারে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করতেই বাজনা বন্ধ হয়ে কি কি কথা চুং বুং করে বলা আরম্ভ হল। চটজলদি উঠে পড়ে রেডিওটা বন্ধ করে দিল দীপা। রাত্রের খাওয়া চুকিয়ে ঠাকুমার ঘরে এল সে। আর তখনই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। টিনের চালে বৃষ্টির বড় ফোঁটা প্রচণ্ড আওয়াজ তুলছে। আর এইরকম আওয়াজ শুনলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। দীপার। এক ছুটে মনোরমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল সে।

মনোরমার তন্দ্ৰা এসেছিল। হাতের চাপে জেগে উঠে বললেন, দরজাটা বন্ধ করেছিস?

না। মনোরমার হাতে মুখ চেপে জবাব দিল দীপা।

যা, বন্ধ করে আয়।

ভয় করছে।

মনোরমা উঠলেন। তার ঘরে ডিমবাতি জ্বলছে। দরজা বন্ধ করতে করতে জিজ্ঞাসা করলেন, বাথরুম করেছিস তো?

দীপা মুখ তুলল না, হুঁ!

বাবা ফিরেছে?

না।

রাত কত হল?

জানি না।

মনোরমা একটা চওড়া কম্বল বের কবে নাতনির কাঁধ পর্যন্ত ঢেকে দিলে পাশে শুয়ে বললেন, মনে মনে তিনবার শিব শিব শিব বলবি রোজ ঘুমাবার সময়।

কেন?

তাতে খারাপ স্বপ্ন দেখবি না।

কি খারাপ স্বপ্ন?

জানি না নাতনির এইরকম প্রশ্নকে খুব উল্টোপাল্টা বলে মনে হয় তাঁব। তিনি ওর মাথায় হাত দিলেন, শোন, তুই তো মেয়ে। মেয়েদেব সবসময় শান্ত থাকা উচিত।

দীপা কোন জবাব দিল না। মনোরমা বললেন, বিশু, খোকন, এরা সবাই বড় হচ্ছে, ওদের সঙ্গে আগের মত হৈ চৈ করবি না।

কেন?

আবার প্রশ্ন?

ওরা আমার বন্ধু। তোমার কোন বন্ধু নেই। তাই বলছ।

মনোরমা ঢোঁক গিললেন, মেয়েদের সঙ্গে মেয়েদেরই বন্ধুত্ব হওয়া উচিত।

এখানে তো কোন মেয়ে নেই আমার বয়সী। ছেলেবেলায় তোমার বন্ধু ছিল না?

ওমা, আমার যখন বিয়ে হয়েছিল তখন নয়ই পার হয়নি।

ধ্যাত!

হ্যাঁ রে। তোর মা এ-বাড়িতে এসেছিল পনের বছর বয়সে। তখনই সবাই বলত এ মেয়ে ঘরে এল পোষ মানলে হয়। সেইসময় তো গৌরীদানের রেওয়াজ ছিল।

গৌরীদান কি?

খুব ছোটবেলায় বিয়ে দেওয়া। শিবঠাকুর যখন গৌরীকে বিয়ে করেছিলেন তখন তিনি ছিলেন এই এট্টুসখানি। হাসলেন মনোরমা।

আর শিবঠাকুর?

তিনি যেমন থাকেন, তেমন।

ওমা, ওই বিরাট ভুঁড়িওয়ালা বাবার বয়সী লোকটার সঙ্গে এট্টুসখানি মেয়ের বিয়ে হল! তোমার বর কিরকম ছিল?

তোর ঠাকুর্দা ছিল সুপুরুষ। তোর বাবার থেকেও লম্বা। কি গায়ের রঙ! আমার বাবাকে সবাই বলত জামাইভাগ্য বটে! হঠাৎ মনোরমার গলাটা কেমন হয়ে গেল।

ঠাকুর্দা তোমাকে বকত?

খুব। রেগে গেলে তো কাণ্ডজ্ঞান থাকত না। মনোরমা হাসলেন, আবার সেই রাগ ঠাণ্ডা হতে সময় লাগত না বেশী। যখন রেগে যেত তখন আমি আড়ালে পালিয়ে যেতাম। রাগ ঠাণ্ডা হলে ডেকে ডেকে সারা হত।

বাবা তখন কি করত?

তোর বাবা তখন হয়নি। যে মাসে তোর বাবা এল সেই মাসেই তো গঙ্গায় নৌকোড়ুবি হল। তিরিশজন মানুষ জলে ভেসে গেল। তাঁর শরীর তো জলে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাবা বলেছিলেন শরীর না পাওয়া গেলে আমায় শাখা ভাঙ্গতে দেবেন না। শেষ পর্যন্ত সাতদিন যখন পেরিয়ে গেল তখন আমি বিধবা হলাম।

তোমার বর যদি এখন হঠাৎ ফিরে আসে?

মনোরমা জবাব দিলেন না। নাতনিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন। এই একটা চিন্তা তিনি দিনের পর দিন লালন করে গিয়েছেন। নৌকোড়ুবির পরও তো মৃত মানুষ জ্যান্ত হয়ে ফিরে এসেছিল। শরীর যখন পাওয়া যায়নি তখন তাঁর ভাগ্যেও এমন ঘটবে না কেন? একটার পর একটা বছর গেছে, চিন্তাটা ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অমরনাথ ম্যাট্রিক পাস করে গেল।

হঠাৎ দীপা জিজ্ঞাসা করল, ঠাম্মা, তোমার কি মাছ মাংস খেতে ইচ্ছেও করে না?

চুপ। ওসব কথা মুখে উচ্চারণ করাও পাপ। আমি হিন্দুঘরের বিধবা। শুধু আলো চাল আর শাকসবজি খেয়ে থাকতে হয় বিধবাদের। পেঁয়াজ রসুন পর্যন্ত নয়।

কেন নয়?

যা খেলে শরীর উত্তপ্ত হয় তা বিধবাদেব খাওয়া উচিত নয়।

উত্তপ্ত হওয়া মানে কি?

সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে নেই। নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে হয়। এখন ঘুমিয়ে পড়। মনোরমার হাত একসময় নেতিয়ে পড়ল। ড়ুয়ার্সের বৃষ্টি তীক্ষ্ণধারায় পড়ে যাচ্ছিল টিনের ছাদের ওপর। দীপার চোখের সামনে একটি সুপুরুষ যুবক যে রাগ পড়ে যাওয়ার পর রমা রমা বলে ডেকে যাচ্ছে। ঠাকুমাই একদিন বলেছিল তাঁর ডাক নাম রমা। সেই মানুষটা, যাকে তার দেখার কোন সুযোগ ছিল না তার জন্যে আজ এই বৃষ্টির রাত্রে খুব কষ্ট হচ্ছিল।

বর্ষার বৃষ্টির চরিত্রের সঙ্গে শীত বয়ে আনা বৃষ্টির তফাত হল, এখন রাতভোর জোর জল পড়লেও দিন ফোটার মুখেই তা থেমে যায়। আকাশের মুখ যতই ভার হোক সকাল আসে সকালের মতন। মনোরমা ঘুমাচ্ছেন। ঘড়ি দেখে দীপা উঠল। মাথার টিনে কোন শব্দ নেই, তার মানে বাইরে বৃষ্টি নেই। যদিও ঘরে এখনও অন্ধকার এবং ডিমবাতিটা সমানে জ্বলে যাচ্ছে।

নিঃশব্দে দরজা খুলে সে সতর্ক হাতে ভেজিয়ে দিল। রাত নেই। কিন্তু দিনও আসেনি। উঠোনে এক মায়াবী ঘনছায়া। অন্ধকারে আলো গুলে দেওয়ায় এমন ছায়া তৈরি হয় যাতে পৃথিবীর চেহারা অন্যরকম হয়ে যায়, কেমন আদুরে আদুরে। বড়বাড়ির ভেতর দরজা তো বন্ধ থাকবেই, এমন কি বুধুয়া যে রান্নাঘরে শোয় এখান থেকেই তার নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। দীপা হেসে ফেলল। মা বলে, এই নাক ডাকার জনোই চোর আসবে না বাড়িতে।

কাঁঠাল, লিচু গাছগুলোর মাথায় পাতলা অন্ধকার। পায়ের তলায় ঘাস জলে ভিজে একশা। দীপা দৌড়ে চলে এল উঠোন পেরিয়ে তারের বেড়ার ধারে। তারপর খুঁটিতে পা দিয়ে ওপরে উঠে এক লাফে চলে এল বাড়ির সামনে। এই দৃশ্যটা মা দেখলে পিটুনি খেতে হত। পড়ার সময় তার ফ্রকের প্রান্ত যে জায়গায় উঠে গিয়েছিল তাতে মায়ের প্রচণ্ড আপত্তি। যখন কোথাও বসতে হবে তখনও যেন হাঁটু ঢাকা থাকে! কেন? খোকন বিশু তো হাঁটুর অনেক ওপরে প্যান্ট পরে। জিজ্ঞাসা করলেই একটা উত্তর, তুমি মেয়ে। আরে বাবা, মেয়ে তো হয়েছে কি! এক দৌড়ে দীপা চলে এল শিউলি গাছটার নিচে। আরি বাকবা! গাছের নিচটায় যেন সাদা চাদর বিছিয়ে রেখেছে। কেউ। পা মুড়ে বসে ফ্রকের প্রান্ত তুলে তাতে শিউলি টপাটপ তুলতে লাগল। দীপা ঘোরের মধ্যে তার হাত সমানে ওঠানামা করতে লাগল। এখনও ছায়া ছায়া অন্ধকার চার পাশে। অথচ মোটেই ভয় করছে না। বাতাসে যে শীত শীত ভাব আলতো দাঁত বসাচ্ছে তাও যেন ধর্তব্যের মধ্যে নয়। হঠাৎ মাছ ধরার কথা মনে পড়তেই সে মাথা তুলে আকাশ দেখল। লক্ষ লক্ষ মোষ যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। মুখ নামাতেই সে দেখতে পেল সেই লম্বা ছেলেটা আসছে। মালবাবুর বাড়িতে গতকাল দুপুরে এসেছে। হয়তো ভোরে বেড়াতে বেরিয়েছে।

বছর আঠারো বয়স, ফুল প্যান্ট আর সোয়েটার পরনে, ছেলেটা দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ তাকে দেখে। দীপা আবার ফুল তোলায় মন দিল। হঠাৎ কানে এল, বিউটিফুল।

সে না উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, কিছু বলছেন?

হুম। কেমন কায়দা করল মুখ চোখে ছেলেটা। তোমাকে ঠিক সুচিত্রা সেনের মত দেখাচ্ছে। কি নাম তোমার?

০২. মেয়েরা কি ভূত হয়

সকাল নটায় জলখাবার খেয়ে ধুতি আর পুরো-হাতা শার্ট পরে নিলেন অমরনাথ। এইসময় তাঁর খুব আরাম লাগে। একজোড়া বিদ্যেসাগরী চটি আছে। তিন বছর অন্তর কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে কলেজ স্ট্রীট থেকে কিনে আনেন। সপ্তাহে ছদিন তো কেডস আর হাফপ্যান্ট পরে কাটাতে হয় চায়ের বাগানে। সন্ধের পরে তাসের আড্ডায় যাওয়ার সময় ফুলপ্যান্ট পরেন। রবিবার একটু বাঙালি সেজে বের হলে মনটাও অন্যরকম লাগে।

চিরকালই ব্যাকব্রাস করেন অমরনাথ। আয়নাটা বেলজিয়ামে তৈরী। কুড়ি বছর আগে রবার্ট সাহেবের বউ তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন দেশে ফিরে যাওয়ার সময়। নিজেকে দেখলেন অমরনাথ। চুয়াল্লিশ বছর বয়সেই শরীর ভারী হয়েছে, জুলপি পেকেছে, দ্বিতীয় চিবুক স্পষ্ট। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে মামার এক বন্ধুর কাঠের ব্যবসায় চাকরি নিয়ে গেদে থেকে তিনি এসেছিলেন উত্তর বাংলায়। মাতুলালয়ে যারা মানুষ হয় তাদের স্বাবলম্বী হতে হয় তাড়াতাড়ি। সেই কাঠের ব্যবসায় এসে রবার্টসাহেবের সঙ্গে আলাপ। তিনিই নিয়ে এলেন চা-বাগানের চাকরিতে। চব্বিশ বছর হয়ে গেল সময়টা।

তিনখানা পেল্লাই সাইজের ঘর, উঠোনের গায়ে আর একটি ঘর, ওপাশে রান্নাঘর, দু পাশে আমকাঁঠালের গাছ, শাকসবজি নিয়ে অমরনাথের এই কোয়াটার্স। উঠোনে নেমে অমরনাথ মনোরমার দর্শন পেলেন। উঠোনে মোড়া পেতে বসে আছেন চুপচাপ। রান্নাঘরে বাচ্চাদের কলরব। সম্ভবত জলখাবার খাওয়া হচ্ছে। অমরনাথ মায়ের সামনে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, বল কি আনতে হবে?

মনোরমা বললেন, কি আর আনবি? সেই তো থোড়বাড়ি। তা ছাড়া আজ যে রকম হয়ে আছে আকাশ তাতে ভাল করে বাজার বসবে বলে তো মনে হয় না।

একদম সাদা থান পরেন মনোরমা। একবার অঞ্জলির বাপের বাড়ি থেকে নরুন পাড় ধুতি দিয়েছিল, উনি পারেননি। অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, কাঁকরোল আনবো? গত হাটে খুব ছোট দেখেছিলাম, আজ মনে হয় বড় পাওয়া যাবে।

কাঁকরোল তো বাড়িতেই হয়েছে। তবে ওই বিচিওয়ালা বেগুন আনিস না। নতুন আলু উঠেছে কি না দেখিস। একবেলা তো রান্না করি, বেশী বাজারের কি দরকার! আর হ্যাঁ, সেরখানেক কালানোনিয়া চাল আনিস তো আজ। মনোরমা বললেন।

মাথা নেড়ে রান্নাঘরেব সামনে গেলেন অমরনাথ, হাটে যাচ্ছি, কি কি আনতে হবে?

রান্নাঘর থেকে অঞ্জলির গলা ভেসে এল, বুধুয়াকে বলে দিয়েছি।

সে কোথায়? অমরনাথ গলা তুললেন, বুধুয়া! এই বুধুয়া?

গোয়ালঘরের দিক থেকে কালো মদেশিয়া ছেলেটা দৌড়ে এল। অমরনাথ বললেন, নে। ব্যাগট্যাগ নিয়ে চল। পকেট থেকে নস্যি বেবি করতে গিয়ে সামলে নিলেন তিনি। কোনদিন মায়ের সামনে নস্যি নেননি। পা বাড়াতে গিয়ে ডাক শুনলেন, অমর, অমরনাথ পেছন ফিরলেন। মনোরমা বললেন, একটু কিসমিস আনিস আজ।

কিসমিস?

পায়েস হবে। মেয়ের জন্মদিনের কথা বাপের মনে থাকে না। ছেলে হলে মনে রাখতিস। মনোরমা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। হেসে ফেললেন অমরনাথ। কাল রাতে অঞ্জলি বলেছিল কিসমিসের কথা। মনোরমা মনে না করিয়ে দিলে নিঘাৎ একটা অনর্থ ঘটত আজ।

বাড়ির সামনের মাঠে পা রাখলেন অমরনাথ। আজ রোদ উঠবে না। গাছপালাগুলো পর্যন্ত ভিজে-ভিজে দেখাচ্ছে। ছাতি নেওয়ার দরকার হবে না। বর্ষাকাল নয় তো, মেঘ যতই ঘোরাফেরা করুক চট করে বৃষ্টি নামবে না। আর নামলেও সেটা সন্ধের পর। গত রাতে বাড়িতে ফেরার সময় ছাতা থাকতেও ভিজে গিয়েছিলেন খুব। গরমজলে পা ড়ুবিয়ে তবে সর্দিটা বাঁচানো গেল। মাঠের ওপারে আসাম রোড ধরে এই মেঘলা দিনেও লোক যাচ্ছে হাটে। মাঝে একটা হাটবাস বেরিয়ে গেল বোঝাই লোক নিয়ে। আকাশ ভেঙে না পড়লে সপ্তাহের একটিমাত্র হাটবারে বেচাকেনা জমে উঠবেই। শীত পড়ার মুখে, লক্ষ্মীপুজো চলে গিয়েছে। বড়বাবুর বাড়ির সামনে গেটের ভেতরে চালা বেঁধে অনন্ত কালীঠাকুরে কাঠামোয় খড় বেঁধেছে। আগে লোকটা ওই একটি ঠাকুর গড়তো। এখন পাঁচ পাঁচটা বাগানের কালীর অর্ডার নিয়ে কর্মচারি দিয়ে করায়। তবে অন্য যেখানে যাই করুক, এই বাগানের ঠাকুরের রঙ আর চোখ অনন্ত করবেই নিজের হাতে। অমরনাথ দেখলেন বড়বাবুর কোয়াটার্সের তারের বেড়া ধরে শনিচর ধোপা খড়ের কাঠামোর দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। চা বাগানের একমাত্ৰ ধোপা। এই বাগানে চাকরি নেবার সময় থেকেই ওকে দেখছেন। বাগান থেকেই ওকে থাকার জায়গা দেওয়া হয়েছে। ও অশক্ত হলে ওর ছেলে কাজ করবে। এটাই নিয়ম। কিন্তু সেই ছেলে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে হঠাৎ সংসার ত্যাগ করেছে। ছেলেটাকে দেখেছেন তিনি। রবিবারের বিকেলে ইস্ত্রি করা কাপড় নিয়ে বাড়িতে আসত। সাদামাটা গোবেচারি বিহারী যুবকটির মাথায় এমন মতলব ছিল তা তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি। শনিচর এখন ভয় পাচ্ছে অশক্ত হয়ে পড়লে তাকে এই বাগান থেকে বিতাড়িত হতে হবে। চিন্তাটা মাঝে মাঝে তাঁর নিজেরও হয়। দেশের বাড়িতে এখন কেউ নেই। কাকাদের সঙ্গে তো কোনদিন সম্পর্ক নেই। মামারবাড়িতে যে মানুষ তার সঙ্গে থাকবেই বা কেন? বিষয়সম্পত্তি যা ছিল বাবার নামে তা একসময় কাকারা নিজেদের নামে আইনসম্মত করে নিয়েছে। দাদু মারা যাওয়ার পর মামারা খারাপ ব্যবহার করেনি। তবে তারা যে বাইরের লোক এটা ক্রমশ ব্যবহারে ফুটে উঠছিল। এখন এই চা-বাগানের চাকরিটা ছাড়া তার কোন সম্বল নেই। তবে সময় আছে হাতে। গঞ্জের ওপাশে শস্তায় একটা জমি কিনে রেখেছেন। ষোল বছর চাকরি আছে। একটু একটু করে গুছিয়ে নিতে হবে এখন থেকেই।

চাঁপা ফুলের গাছটার কাছে পৌঁছে উলটোদিক থেকে শ্যামলকে আসতে দেখলেন তিনি। পাতিবাবু, হরিদাস চ্যাটার্জির বড় ছেলে। ম্যাট্রিক পাস করে বসে রয়েছে। ভাল ফুটবল খেলে। পাতিবাবু বড়বাবুকে ধরেছেন যাতে তিনি সাহেবকে বলে শ্যামলের চাকরির ব্যবস্থা করেন। ভদ্রলোক বোকামি করছেন। অমরনাথ জানেন বড়বাবু তাঁর শালার জন্যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

সাইকেল থামিয়ে শ্যামল দাঁড়িয়ে গেল। অমরকাকা, বাবা বলছিলেন আপনি যদি একবার আমাদের বাড়িতে আসেন তা হলে খুব ভাল হয়। বাবা নিজেই যেতেন, কিন্তু তালুইমশাই আছেন বলে যেতে পারছেন না।

কি ব্যাপার তুমি জানো?

ও আপনি বাবার কাছেই শুনবেন। আমি আপনার বাড়িতেই যাচ্ছিলাম।

চল। অমরনাথ আর কথা বাড়ালেন না। সাইকেল নিয়ে শ্যামল পাশাপাশি হাঁটছিল। কোয়াটার্সগুলো বাঁদিকে, ডানদিকে আসাম রোড। ধুতিতে চোরকটা লেগে যাচ্ছে। শ্যামল বলল, কাল লঙ্কাপাড়া বাগানের সঙ্গে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়েছিলেন বড়সাহেব।

হ্যাঁ, তোমার দেওয়া গোলে আমাদের বাগান সেমিফাইনালে উঠেছে বলে শুনলাম।

সাহেব কিছু বলেছেন?

কি ব্যাপারে?

এই আমার গোল দেওয়ার ব্যাপারে?

জানি না। আমার সঙ্গে তো কথা খুব কম হয়। অমরনাথ মনে মনে হাসলেন। একটা গোল দিয়েই ছোকরা ভাবছে চাকরি পেয়ে যাবে। বড়সাহেব গভীর জলের মাছ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বাজার যাবে না?

আমাদের বাজার খাওয়াদাওয়ার পর হয়।

কেন? অমরনাথ অবাক হন।

তখন দাম কমে যায়।

অমরনাথ চুপ করে গেলেন। মালবাবুর পাশেই পাতিবাবুর কোয়াটার্স। বাগানের সরু গলিতে গলিতে টহল মেরে পাতি তোলান হরিদাসদা। এই চা-বাগানের সবচেয়ে প্রবীণ কর্মী। সামনের মাসে অবসর নেবার কথা ছিল, সাহেবকে অনেক ধরেটরে এক বছরের এক্সটেনশন পেয়েছেন। অমরনাথ দেখলেন বাইরের বারান্দায় চেয়ার পেতে হরিদাসদা বসে গল্প করছেন তাঁর বেয়াই-এর সঙ্গে। জলপাইগুঁড়িতে গিয়ে বাড়ি ভাড়া করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখানকার নিমন্ত্ৰিতরা লরিতে চেপে জলপাইগুঁড়িতে গিয়ে সেই বিয়ের নেমস্তন্ন খেয়ে এসেছে। অমরনাথের শরীর ভাল না থাকায় যাননি। খরচ কমানোর জন্যে এখানকার অনেকেই একটা বাহানা দেখিয়ে জলপাইগুঁড়িতে গিয়ে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেয়। হরিদাসদার যা অবস্থা তাতে ওটা না করে উপায় ছিল না। এখানে বিয়ে দিতে আটগুণ মানুষকে খাওয়াতে হত। তবে হ্যাঁ, এই চা-বাগানের প্রথম দিকের সন্ধেগুলো তাঁর কাটতো এই হরিদাসদার কোয়াটার্সেই। পুরনো দিনের কলের গান আছে হরিদাসদার। কানা কেষ্ট, সায়গল, কাননীবালার রেকর্ড বাজাতো সন্ধের পরে। হরিদাসদা একসময় কলকাতায় ছিলেন। আলাউদ্দিন খায়ের বাজনা শুনেছেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্পর্কে ভাল ধারণা ছিল। ওঁর সঞ্চয়ের রেকর্ড আজকাল কেউ শোনে না।

হরিদাস চ্যাটার্জীকে বয়সের চেয়ে বেশী বয়স্ক দেখায়। রোগা ক্ষয়া লম্বা চেহারা। গরমকালেও গেঞ্জির ওপর সুতির চাদর জড়িয়ে রাখেন। কালীঠাকুরের মূর্তিতে অনন্ত হাত দিতেই গায়ে আলোয়ান আসে। অমরনাথকে দেখে হরিদাসবাবু উঠে দাঁড়ান চেয়ার ছেড়ে, এসো অমরনাথ। চা খাবে তো? শ্যামল, যাও তো মাকে বল চা দিতে।

না দাদা। এইমাত্র জলখাবার খেয়ে বেরিয়েছি। কি ব্যাপার বলুন!

আরে বসো বসে। বাজারে যাচ্ছ কিন্তু বাজার তো বসেইনি। এই বারান্দায় বসে কটা হাটবাস এল দেখে বুঝতে পারি বাজারের কি অবস্থা। এই বাদলায় বাজার বসতে সময় লাগবে। বসো।

শ্যামল জিজ্ঞাসা করল, তা হলে সত্যি আপনি চা খাবেন না অমরকাকা?

অমরনাথ মাথা নেড়ে না বলে তৃতীয় চেয়ারটিতে বসলেন।

হরিদাসবাবু বললেন, সবার আমার বেয়াই-এর সঙ্গে তো তোমার আলাপ হয়েছিল।

অমরনাথ নমস্কার করলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ। ভাল আছেন তো?

আছি। বয়স হলে যেমন সবাই থাকে। ভদ্রলোক জবাব দিলেন।

হরিদাসবাবু বললেন, বেয়াইমশাই ব্যস্ত মানুষ, দু দুটো দোকানের ঝামেলা, মিউনিসিপালিটির কাজ, কংগ্রেসী করেন তা তো জানোই, তবু গত রাতে এদিকে এসেছিলেন বলে আমার কাছে একটু থেকে গেলেন। এমনিতে জলপাইগুঁড়ির বাড়িতেই ওঁকে ধরা যায় না।

ওসব ছেড়ে দিন। ভদ্রলোক হাসলেন, জলপাইগুঁড়ি শহরে পুরনো কংগ্রেসী বলতে তো আমরা কজন। লোকে জিজ্ঞাসা করে আমি কেন এম. এল. এ হলাম না। বিধানবাবু অতুল্যবাবুরা তো আমাকে পছন্দ করেন। আমি বলি ওসব করার জন্যে তো খগেন দাশগুপ্ত মশাই আছেন। ওঁকে জেতাতে পারলেই আমাদের জিত। হরিদাসবাবুর বেয়াই চুরুট ধরালেন।

হরিদাসবাবু বললেন, বেয়াইমশাই বোধ হয় একটু বেশী চুরুট খান।

তা খাই। আমি তো বলে রেখেছি চিতায় যখন তুলবে। তখনও মুখে একটা চুরুট গুঁজে দিও।

যেন বিরাট রসিকতা করেছেন এমনভাবে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক।

অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার হরিদাসদা, কিছু বললেন না তো!

হরিদাসবাবু বললেন, বেয়াইমশাই-এর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ওঁর ভাই-এর একটি সুপুত্ৰ আছে। এবার ম্যাট্রিক দেবে। ভ্ৰাতৃবধুর ইচ্ছে ছেলেটির বিয়ে দিয়ে ঘরে বালিকাবধু আনবেন। ওকে আমি একবার দেখেছি। প্রকৃত সুদর্শন। বয়স কত হবে বেয়াইমশাই?

ভদ্রলোক বললেন, কত হবে। সেদিন তো জন্মালো। ধরুন, সতের।

হরিদাসবাবু আবার শুরু করলেন, যা বলছিলাম, ওঁদের কোন দাবিদাওয়া নেই। শুধু মেয়েটিকে সুন্দরী হতে হবে, দশ বারো বছর হলেই চলবে। শুনেই আমার মনে পড়ল তোমার দীপার কথা। এই বাগানে ওর চেয়ে সুন্দরী মেয়ে তো আর কেউ নেই।

অমরনাথ চমকে উঠলেন, সে কি! দীপা তো আজ দশে পড়ল। এই বয়েসে বিয়ে দেবার কথা ভাবছিই না।

হরিদাসবাবুর বেয়াই বললেন, গরমদেশের মেয়েরা বারোতেই যুবতী হয়ে যায়। আমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল সাতে, আমি হয়েছিলাম তেরোতে। ওহো, আমার ভাইটিকে আবার কংগ্রেসী বলে ভাববেন না। সে কনট্রাক্টরি করে প্রচুর পয়সা জমিয়েছে। পুত্র বলতে ওই একটি, ছটি কন্যার একটি বিবাহিতা। আপনাকে শাঁখা সিঁদুর ছাড়া কিছুই দিতে হবে না।

অমরনাথের বুকের পাঁজর যেন টনটন করে উঠল। ওইটুকুনি মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। তা ছাড়া কথাটা মুখ ফুটে বাড়িতে বলবেনই বা কি কবে? অঞ্জলি শুনলে প্ৰচণ্ড রেগে যাবে। অমরনাথ দেখলেন দু দুটো মুখ তাঁর দিকে জবাবের আশায় তাকিয়ে আছে। অমরনাথ বললেন, শুনলাম। কিন্তু হরিদাসদা, ইনি তো আমার মেয়েকে দ্যাখেননি। দেখলে যে পছন্দ হবেই তারও তো কোন মানে নেই।

বেয়াইমশাই বললেন, দেখেছি। একটু আগে ওই মাঠ দিয়ে একটি ছেলের সঙ্গে বাজারের দিকে গেল। দূর থেকে যা দেখলাম তাতেই চোখ জুড়িয়ে গিয়েছে।

অমরনাথ হতভম্ব। দীপা আবার কোন ছেলের সঙ্গে বাজারেব দিকে গেল। তিনি ভেবেছিলেন রান্নাঘরে বসে জলখাবার খাচ্ছে। একটি ছেলে মানে কোন ছেলে? অঞ্জলি যে রাগারাগি করে তা খুব ভুল করে না।

হরিদাসবাবু বললেন, বেয়াইমশাই সামনে রয়েছেন, তবু বলি। সুযোগ যখন পাচ্ছি তখন আর হাতছাড়া করো না। মেয়ে বড় হলে সুপাত্র পাওয়া মুশকিল।। তা ছাড়া আমরা যা চাকরি করি তাতে ভাল পাত্র পেতে গেলে যে বরপণ দিতে হয় তা যোগাড় করতে পারব না। অতি বড় সুন্দরীও সেই কারণে বর পায় না হে।

অমরনাথ বললেন, আপনি নিশ্চয়ই সুপরামর্শই দিচ্ছেন। দেখি, ভেবে দেখি; বাড়িতে একটু আলোচনা করি। তারপর হরিদাসবাবুর বেযাই-এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এখানে কিছুদিন আছেন নাকি?

ভদ্রলোক দ্রুত মাথা নাড়লেন, না না। আজই চলে যাব। তা আপনি ভেবে দেখুন। আজই যে জবাব দিতে হবে তা তো নয়।

একটা কথা। উনি এত অবস্থাপন্ন আমি আমি চা-বাগানের সামান্য কেরানি। বিয়ে-থা সমান ঘরে হওয়া উচিত। আমার মত লোকের মেয়েকে কেন বউ করে নেবেন ওরা?

না মশাই, আপনাকে নিয়ে পারা গেল না। আমাদের সমান ঘর হলে এবিকম প্ৰস্তাব নিয়ে যেতে পারতাম। বড়লোক বাপ কি দশ বছরের মেয়ের বিয়ে দেবে? আমার ভাই চাইছে আপনাদের মত পরিবার থেকে মেয়ে আনতে। কচি আছে, শিক্ষা আছে শুধু পয়সাটাই যা নেই। ভদ্রলোক চুরুটে টান দিতে থাকলেন।

অমরনাথ উঠে দাঁড়ালেন, অর্থবান মানুষের পরিবারে দরিদ্র সংসারের মেয়েরা মানিয়ে নিতে পারে না তো সবসময়। তাই বলছিলাম আর কি?

ভদ্রলোক বললেন, অর্থের সঙ্গে শিক্ষার যোগাযোগ যাদের নেই। সেই পরিবারগুলোতে হয়তো তেমন হয়। এই যে এখানে হরিদাসবাবু রয়েছেন, ওঁর অবস্থা ভাল নয, মেয়েটিও আহামরি সুন্দরী নয় জেনেও আমি আমার ঘরে নিয়েছি। কেন নিয়েছি জানেন? বড়লোকের মেয়ের কাছে আমরা শান্তি পাবো না তাই। তাই বলে কি সে খুব কষ্টে আছে? কি হরিদাসবাবু, বলুন না?

না না। এরা সেই প্রকৃতির মানুষই নয় অমরনাথ। হরিদাসবাবু জানিয়ে দিলেন।

ঠিক আছে, ভেবে দেখি বলে অমরনাথ মাঠে নামলেন। বুধুয়া দূরে দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ। তাঁকে চলতে দেখে সে এগিয়ে গেল। দীপার বিয়ে এই বয়সে তিনি কি সত্যি দিতে পারবেন? বুকের মধ্যে চাপটা রয়েই গেল। মেয়েটির মুখ মনে হতেই তিনি মাথা নাড়লেন, না। পাত্র যতই লোভনীয় হোক সম্ভব নয়।

গাছের গুঁড়ি কেটে সিঁড়ি বানানো হয়েছে মাঠ থেকে তারের গেট পেরিয়ে আসাম রোডে নামতে। অমরনাথ ধুতি সামলে সেখানে পৌঁছে দেখলেন বুধুয়া একটা ডিমওয়ালাকে ধরেছে। কুলি লাইন থেকে সারা সপ্তাহের জমানো ডিম নিয়ে যাচ্ছে হাটে বেচতে। এখানে কিনলে কয়েক আনা শস্তা হয়। দাম দিয়ে তিনি ডিমওযালকেই বললেন কোয়াটার্সে পৌঁছে দিতে।

পিচের রাস্তার দু পাশে পাইকাররা বসে গেছে পাট বিক্রি করতে আসা রাজবংশী কৃষকদের ধরতে। দরাদরি করে কেনা পাট চলে যাচ্ছে সদরে। ড়ুড়ুয়া নদী থেকে মাছ ধরে মদেশিয়ারা আসছে হাটে ঝুড়ি ঝুলিয়ে। বেশীর ভাগই ছোট মাছ। তাদের একজনকে দাঁড় করালেন অমরনাথ, কি আছে, দেখাও। লোকটা দেখাল, বান আর পাথরঠোকরা। কবে বান মাছ খেয়েছেন মনে করতে পারলেন না অমরনাথ। ভাল করে রাঁধলে শুনেছেন মাংসের চেয়েও উপাদেয় হয়। চার টাকা সের শুনে জ্যান্ত কি না দেখতে চাইলেন। পেছন থেকে বুধুয়া জানাল ওই মাছ নিয়ে গেলে মাইজি খুব রেগে যাবে। অন্যদিন সাড়ে তিন টাকায় বিক্রি হয় তবু মাইজি নেয় না। বলে, দেখলে সাপের কথা মনে হয়। অন্যদিন মাছ কেনে অঞ্জলি। দুপুরের খাওয়ার পাট চুকলে ওরা বারান্দায় এসে বসে। দূরে আসাম রোড দিয়ে মাছমারারা গেলে ডাকিয়ে এনে মাছ কেনে।

অমরনাথ মত পরিবর্তন করলেন। হাটে এসে চালানি মাছ কেনাই ভাল। অমরনাথ এগোলেন। আগে হাট বসত এই হাটতলাতেই। এখন চৌমাথা ছাডিয়ে গিয়েছে। আসাম রোড দিয়ে গাড়ি যায় শামুকেব মত। পাঁচ ছটা বাগান থেকে মানুষ ঝেঁটিয়ে আসছে বাজার করতে। ভিড়ে ভিড়ে একাকার। সপ্তাহেব বাকি ছদিন তো মাছিও বসে না। দোকান বলতে হাজারির মুদি খানা, মুখার্জীদের মনিহারী দোকান, একটা হাজামখানা, কয়েকটা সিগারেট বিড়ির দোকান, সাইকেল সারাই-এর দোকান আর যাদবদের ভাটিখানা। এদের ওপর ভরসা করে থাকতে হয় তাঁদের। হঠাৎ কানে তীব্র আর্তনাদ ভেসে এল। একটানা ককিয়ে যাচ্ছে শুয়োরটা। ডানদিকের মাঠের বুকে শুয়োর কাটা হচ্ছে। মদেশিয়াদের প্ৰিয মাংস, শস্তাও। কিন্তু চিৎকারটা সহ্য করা যায় না। এই নিয়ে এককালে অনেক ঝামেলা হয়েছে কিন্তু বিক্রি বন্ধ করা যায়নি।

প্ৰথমে মাছ কিনলেন অমরনাথ। বরফচাপা বড় রুইমাছ। যেটাকে একটু সতেজ মনে হল তার ওজন তিন সের। কয়েকদিন চলবে। একবেলা মাছ খাওয়া হয়। বুধুয়াকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন বাড়িতে। অঞ্জলির সুবিধে হয়, তাড়াতাড়ি রান্না বসাতে পারবে। বুধুয়া জানে ফিরে এসে কোথায় তাঁকে খুঁজতে হবে। হয় হাজারির মুদিখানা নয় পেট্রল পাম্পে তাঁকে পাওয়া যাবে। হাজারির দোকানের সামনে ভিড় বাঁচিয়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালেন তিনি। নস্যি নেন। কিন্তু মাঝে মধ্যে সিগারেটও চলে। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ভিড় দেখতে দেখতে তাঁর মনে হল, তা হলে দীপারও সম্বন্ধ এল। এইসময় একটা স্টেশনওয়াগন এসে থামল সামনে। তেলিপাড়া চা-বাগানের মালবাবু সুনীল সেন ওয়াগন থেকে নেমে তাঁকে দেখেই চিৎকার করে উঠলেন, যাক, একেই বলে বরাত, আপনাকে পেয়ে গেলাম, নইলে বাড়ি পর্যন্ত ছুটতে হত।

কি ব্যাপার? অমরনাথের ভাল লাগল দীপার বিয়ে-ভাবনা থেকে মুক্তি পেতে।

পরশুদিন আপনাদের যে খেলাটা ছিল বানারহাট বাগানের সঙ্গে সেটা ওরা আজ খেলতে চাইছে। একজন পার্টনারকে মঙ্গলবার পাওয়া যাবে না। নিজেদের মধ্যে ব্যাপার, প্লিজ না বলবেন না। সুনীল সেন হাত ধরলেন।

কিন্তু আমার পার্টনারকে তো বলতে হবে। ছুটির দিন বেরুতে ইচ্ছে করছিল না অমরনাথের। তেলিপাড়া ক্লাব অকসন ব্রিজ কম্পিটিশন করছে। এই বাগান থেকে দুটো টিম গিয়েছে। তাঁর পার্টনার মেজগুদামবাবু। ছোকরার একটা দোষ ভুল হলেই বলে আমি ভেবেছিলাম আপনার হাতে অমুক তাসটা আছে। যতবার বলেন তোমার এই ভাবাভাবি ব্যাপারটা ছাড়ো তবু শুধরোয় না। সুনীল সেন বললেন, ম্যানেজ করে নিন। নইলে কম্পিটিশন শেষ করতে পারব না।

আসাম রোডটা নদীর ওপর ছোট্ট সাঁকো ডিঙিয়ে চৌমাথার দিকে চলে গিয়েছে। এখানে বাঁদিকে কাটা কাপড়ের দোকান বসে। উলটোদিকে বেতের ঝুড়ি থেকে আরম্ভ করে তামাকপাতা, সাবান, রঙিন ফিতে থেকে মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে পসারীরা বসে। ডাক্তারবাবুর ছেলে বিশু। উবু হয়ে বসে কাপড়ের ওপর ছড়ানো নানা রকমের বঁড়শি দেখছিল। ঠিক তার পাশে দাঁড়িয়ে অসহিষ্ণু গলায় দীপা বলল, এত দেখার কি আছে? পুঁটি পাথরঠোকরার জন্যেও ছটা নিয়ে নে? বিশু বলল, তুই কেন মেয়ে হলি রে? মেয়েদের এত অধৈর্য হতে নেই!

দীপা ঝাঁঝিয়ে উঠল, মা যদি ডেকে না পায় তা হলে দুপুরে মাছ ধরতে যাওয়া বন্ধ হযে যাবে।

বিশু দোকানদারকে বলল, বান মাছ ধরার সুতো আর বঁড়শি দাও।

দীপা বিরক্ত হল, বান মাছ মা রাঁধবে না।

আমার মা রাঁধবে। তোরা ঘটি তাই ভাল জিনিস খাস না। বিশু বলল।

বিশুর ওপর খুব রাগ হয়ে গেল দীপার। তখন থেকে বঁড়শি দেখছে তো দেখছেই। আবার ঘটি বলে ঠোকা হল। ঠাকুমা বলে বাঙালদের কোন বাছবিচার নেই। ঠিক বলে কি না বোঝা যাচ্ছে না বিশুর বঁড়িশি কেনার ধরন দেখে। সে আগ বাড়িয়ে বলল, ওই আটটা বঁড়শির কত দাম হবে? দোকানদার দেখে বলল, এক টাকা দিদি!

এমা! এ কি বলে রে? এখান থেকে নিস না বিশু। দীপা এমন গলায় চিৎকার করে উঠল যে আশেপাশের অনেকেই এদিকে তাকাল। বিশু শেষপর্যন্ত অনেক ঘ্যানর ঘ্যানর করে দামটা বারো আনায় নামিয়ে আনল। দুজনের সঞ্চয়ে ছিল একটাকা, তার বারো আনাই বেরিয়ে গেল। গত চার রবিবারে বাবার কাছ থেকে দুজনে দুআনা করে সংগ্রহ করেছে।

কাগজে মুড়ে বঁড়শিগুলো পকেটে পুরে বিশু উঠে দাঁড়াল, এই, শোনপাঁপড়ি খাবি?

দীপা মাথা নাড়ল, শোনপাঁপড়িওয়ালা এবারের হাটে আসেনি। বৃষ্টি নামবে, তাড়াতাড়ি বাড়ি চল। আর খাওয়াদাওয়ার পর বৃষ্টি নামলে আমি কিন্তু মাছ ধরতে যাব না।

বেশ। তা হলে কদমা খাওয়া। ওই ওখানে বসে আছে। বিশু আঙুল তুলে দেখাল।

তুই কি পেটুক রে! কদমা খেলে পেটে কেঁচো হয় জানিস না?

বিশু বলল, বাবা ঠিক বলে, মেয়েরা এক নম্বরের কিপটে হয়।

অতএর কদমাওয়ালার কাছে যেতেই হল। দুজনের চার আনা পয়সা বেঁচে আছে। বিশুর জন্যে তার পুরোটাই খরচা হয়ে গেল। কদমাটাকে কামড় দিতেই গিয়েই সে থমকে গেল। সেই ছেলেটা। মালবাবুর বাড়িতে এসেছে। সে চাপা গলায় বিশুকে বলল, অ্যাই বিশু, সেই ছেলেটা!

বিশু বিরক্ত গলায় জানতে চাইল, কোন ছেলেটা?

যে আমাকে আজ সকালে সুচিত্রা সেন বলেছিল।

বিশু সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ ঘুরে দেখতে চাইল ছেলেটাকে। যার কথা হচ্ছিল সে হাটে এসেছে ফুলবাবু সেজে। মাথায় টেরি বানিয়েছে। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে এ দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। দীপার খুব রাগ হয়ে গেল। আজ সকালে ছেলেটার মুখে কথাটা শোনামাত্র সে উঠে দাঁড়িয়েছিল। ফ্রকের প্রান্ত উঁচু করে তুলে ফুল রেখেছিল। হাঁটু দেখা যাচ্ছে বুঝতে পেরে ফুলগুলো ফেলে দিয়ে ফ্রক নামিয়ে গম্ভীরভাবে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছিল। সদর দরজা বন্ধ। তারের বেড়া পেরিয়ে বাইরে থেকে আসা ওই ছেলেটির সামনে অশোভন বলে পাশের গলির পথ ধরেছিল। ফুলগুলো আনা হল না বলে খুব কষ্ট হয়েছিল তার। এখন রাগ হল। সে হাত বাড়িয়ে ডাকল ছেলেটাকে। ছেলেটা বেশ খুশিমুখে এগিয়ে এল, কি ব্যাপার?

কি দেখছেন এদিকে? চেচিয়ে বলল দীপা।

সঙ্গে সঙ্গে বিশু জুড়ে দিল, আপনি ওকে সুচিত্রা সেন বলেছেন কেন?

ছেলেটি ভ্যাবাচ্যাক খেয়ে গেল। দীপা বলল, আবার যদি দেখি আপনি কাছে এসেছেন তা হলে রতনকাকুকে বলে দেব। কথাগুলো শেষ করে সে হাঁটা শুরু করল। বিশু তার সঙ্গ ধরে কয়েক পা হেঁটে বলল, উরি ব্বাস, তুই কি রাগীলোকের মত কথা বললি রে!

দীপা অহঙ্কারী মুখে আকাশ দেখল। এই ভঙ্গীতে কথা বলতে পারবে কোনদিন কেন আজ সকালেই ভাবতে পারেনি। এখন খুব ভাল লাগছে। খোকন বিশুও তো ছেলে কিন্তু ওই ছেলেটার মত বদ চাহনি নেই। আচ্ছা বদ মনে হল কেন? একটা খটকা লাগল তার। কথাটা কাকে জিজ্ঞাসা করা যায়? সে বিশুকেই প্রশ্ন করল, ছেলেটার তাকানো দেখেছিস?

বিশু মাথা নাড়ল, হুঁ। উত্তমকুমারের মত।

উত্তমকুমার? তুই উত্তমকুমারকে দেখেছিস?

পত্রিকায়। মা পড়ে। তাতে উত্তমকুমারের ছবি আছে।

যাই বলিস, ছেলেটা বদ। আমার একটুও ভাল লাগেনি। দীপা এমন গলায় কথা বলল যে বিশু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল হাঁটার সময়। দীপা সেটা লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করল, অ্যাই, তুই আমার দিকে অমন করে কি দেখছিস?

তুই কেমন বড়দের মত কথা বললি।

মানে?

আমার সোনামাসীকে দেখেছিস তো, জলপাইগুঁড়িতে কলেজে পড়ে, একদিন আমার সামনে এক বন্ধুকে বলছিল ঠিক ওইভাবে।

দীপার শরীরটা কেমন করে উঠল কথাগুলো শুনে। সে কি বড় হয়ে যাচ্ছে! সে গম্ভীর গলায় বলল, আমি তো বড় হচ্ছি।

বিশু বলল, ছাই। শাড়ি না পরলে মেয়েরা বড় হয় না।

এই সময় সত্যসাধনবাবুর সঙ্গে দেখা হল তাদের। সত্যসাধনবাবু তাদের ক্লাসটিচার। ময়লা একটা চটের থলি নিয়ে বাজারে এসেছেন। দেখতে পেয়েই ডাকলেন, ও দীপা, তোমাগো বাড়িতে জাম্বুড়ার গাছ আছে না?

দীপা মাথা নাডল, আছে।

সত্যসাধনবাবু খুশি হলেন, চল, একবার তোমাদের অখানে যাব।

মাস্টারমশাই-এর সঙ্গে হাঁটতে একদম ইচ্ছে করছিল না দীপার। বিশুটা তাল বুঝে পিছিয়ে পড়েছে। হাঁটতে হাঁটতে মাস্টারমশাই বললেন, অঙ্ক করতেছ তো রোজ? অন্য সব সাবজেক্টে চিন্তা নাই, অঙ্কটাই তোমার গুলমাল। হাফ ইয়ালিতে কত পাইছিলা?

চল্লিশ।

ভেরি ব্যাড। মিনিমাম নাইনটি পাওয়া উচিত। তোমার বাবাব লাগে কথা বলা দরকার। আপনমনে কথা বলতে বলতে হাঁটছিলেন সত্যসাধনবাবু। দীপা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল বিশু আরও পিছিয়ে পড়েছে। অঙ্কে বিশু পঁয়ত্ৰিশ পেয়েছে।

হাজারির দোকানের সামনে এসে দীপা মুশকিলে পড়ে গেল। বাড়িতে যেতে হলে অমরনাথকে দেখা দিতেই হবে। হাটে আসার জন্যে কৈফিয়ত চাইতে পাবেন এখানেই। কিন্তু কিছু করার আগেই সত্যসাধনবাবু বলে উঠলেন, নমস্কার অমরনাথবাবু, আছেন কেমন?

অমরনাথ বুধুয়ার জনো অপেক্ষা করছিলেন, বললেন, এই একরকম। সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের দিকে নজর গেল তাঁর। সত্যসাধন বললেন, দীপাকে কইলাম আপনার বাড়ি যাব। এ মেয়ে সব বিষয়ে ব্রিলিয়ান্ট, অনলি অঙ্কে একটু কম পায়। যদি ওই সাবজেক্টটা ইমপ্রুভ করণ যায় তা হলে আ্র দেখতে হইব না। ম্যাট্রিকে ফাস্ট ভিভিশন পাইতে হলে এখন থিকাই তৈরী করন দরকার। কিছু একটা করেন।

অমরনাথ বললেন, ভাল প্ৰাইভেট টিউটর পাচ্ছি না। মায়ের কাছেই পড়ে তো।

অন্যান্য বিষযে, দীপা ভাল একথা সত্যসাধনবাবু বলায় খুব খুশি হলেন তিনি। সত্যসাধনবাবুকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। সেটা লক্ষ্য করেই অমরনাথ বললেন, আপনি তো অনেক টিউশনি করেন, সময় পাবেন কি?

দ্যাখেন, ভাল স্টুডেন্ট পাইলে টাইম করা অসুবিধা না।

তা হলে কবে কথা বলব?

বিকালে বাড়ি থাকরেন?

না। তেলিপাড়ায় যেতে হবে। আগামীকাল যদি আসেন তা হলে ভাল হয়।

ঠিক আছে। সেই কথাই থাকল। চল দীপা।

শান্ত মেয়ের মত দাঁড়িয়ে ছিল দীপা। এবাব জিজ্ঞাসা করল, বাবা, তোমার মাছ কেনা হয়ে গিয়েছে? তপসে মাছ উঠেছে আজ?

অমরনাথ বললেন, দেখিনি। যাও, বাড়িতে যাও।

রান্নাঘরের বারান্দায় বাজারের স্তুপ। অঞ্জলি তাই নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। বুধুয়া মনোরমার বাজার আলাদা ব্যাগে এনে দিয়ে গেছে। অঞ্জলি শাশুড়িকে বলল, দেখুন মা, আপনার ছেলের কাণ্ড, কাল রাত্রে আমি বললাম, বেরুবার সময় আপনি মনে করিয়ে দিলেন তবু এখনও কিসমিস কিনে পাঠায়নি। আর এই হাঁদাগঙ্গারামকে প্ৰতিবার বলে দিই বিচিওয়ালা বেগুন আনবি না। তবু কাঁড়ি কাঁড়ি আনবেই।

বুধুয়া একটা বেগুন তুলে বলল, বাহারসে দেখনে তো অচ্ছাই লাগতা হ্যায়। আউর, বাবু তো মেরা বায় শুনতাই নেহি। আজ বান মাছ কিনতে মাংতা থা।

ওটা আনলে তুমি তোমার বাবুকে রেঁধে খাওয়াতে। অঞ্জলি বলল, এখানে বসে না থেকে বাজারে যাও। বাবুকে বলো কিসমিস আনতে।

বুধুয়া ছুটল। মনোরমা বললেন, দুপুরের খাওয়ার পরে মরা আঁচে পায়েস বসিয়ে দিও বউমা।

অঞ্জলি বলল, আপনি পায়েস বাঁধলে আপনার ছেলের বেশী পছন্দ হয়।

না। ছেলেমেয়ের জন্মদিনে মাকেই পায়েস রাঁধতে হয়। সে কোথায়?

কোনরকমে কয়েকটা লুচি মুখে গুঁজে গোথায় গেল কে জানে। রবিবারে তো বই নিয়েও বসে না।

এবার থেকে মেয়ের রাশ ধরো। রান্নাবান্না শেখাও।

অঞ্জলি কিছু বলল না। বড় কাঁঠালগাছে একটা ঘুঘু গলা ফাটিয়ে ডেকে যাচ্ছে। মনোরমা আঁচারের বয়ামগুলো রোদে দিয়েছিলেন। কাকের ভয়ে মুখ খোলেননি একটারও। অঞ্জলি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ও কি করেছেন মা। আচার রোদ পাবে কি করে? আকাশ জুড়ে তো মেঘ।

বলা যায় না, উঠতেও তো পারে। মনোরমা ভুলটা স্বীকার করলেন না। তারপর বললেন, এবার দীপাকে একটু ঘরে আটকে রাখ। ছেলেদের সঙ্গে মেশে এটা ঠিক নয়।

অঞ্জলি তরকারির ঝুড়িটা রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়ার মুখে বলল, কটা দিন তো মা। সারাজীবন তো ঘরে বন্দী হয়েই কাটাবে।

মনোরমা অবাক হয়ে বললেন, সে কি! তুমি তো কাল সন্ধেবেলায় এই নিয়ে রাগারাগি করছিলে। তোমাদের আমি বুঝতে পারি না বাবা। কথা শেষ করামাত্রই তিনি দীপাকে দেখতে পেলেন। পাশের দরজা দিয়ে ঢুকছে। মনোরমা বললেন, এই যে এলেন তিনি রাজ্য জয় করে। চেহারা দ্যাখো, একদম শাকচুন্নী হয়ে এসেছে।

দীপা দ্রুত ঠোঁটে আঙুল চাপা দিল। শাশুড়ির গলা শুনতে পেয়েছিল অঞ্জলি। তাই রান্নাঘর থেকেই চেঁচিয়ে বলল, অ্যাই, কোথায় গিয়েছিলি? দাঁড়া আজ তোর মজা দেখাচ্ছি।

দীপা অঞ্জলির কথা কানে তুলল। না। এক দৌড়ে মনোরমার কাছে পৌঁছে নিচু গলায় কিছু বলতে তিনি ঘোমটা টানলেন, ওমাম তাই নাকি? অ বউমা, তাড়াতাড়ি এসো। মাস্টারমশাই এসে বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

অঞ্জলি হলুদ হাতে বেরিয়ে এল, মাস্টারমশাই? কোন মাস্টারমশাই?

সত্যসাধনবাবু। আমি তো এতক্ষণ তাঁব কাছে ছিলাম। গম্ভীর গলায় বলল দীপা।

ও। তা বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস কেন? বাইরেব ঘরে বাসা। অঞ্জলি ব্যস্ত হল।

উনি বসবেন না। ভেতরে আসবেন। বলে মেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। এবং কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে সত্যসাধনবাবুকে নিয়ে ফিরে এল। সত্যসাধন মহিলাদের নমস্কার করলেন, পরিবারের হুকুম তাই আইলাম আপনাগো বাড়িতে। জাম্বুড়া দরকার একখান।

অঞ্জলি বলল, জাম্বুড়া? ওহে! কিন্তু আমাদের বাড়িতে তো বাতাবি লেবু নেই।

সে কি? দীপা, তুমি কইলা না তোমাগো বাড়িতে জাম্বডা গাছ আছে?

হ্যাঁ। ওই তো। দীপা হাত তুলে একটি যৌবনে পড়া বাতবি লেবুব গাছ দেখিয়ে দিল। নিজের ভুলটা বুঝতে পারলেন সত্যসাধন, তাই কও। আমারই ভুল হইছে। আপনাগো মাইয়ার রসিকতাবোধ প্ৰবল। আমি ফল কই নাই গাছ কইছিলাম। সে ঠিকই কইছে। রিয়েল ইনটেলিজেন্ট গার্ল। আদর করে দীপার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি।

অঞ্জলি লজ্জিত হলেন, না না। আপনার মত মানুষের সঙ্গে রসিকতা করা অন্যায়।

হাত তুলে নিষেধ করলেন সত্যসাধন, আরে না না। আমি কিছু মনে করি নাই।

হঠাৎ দীপা বলল, আপনি বসুন আমি এখনই বাতাবি লেবু এনে দিচ্ছি। খোকনদের বাড়িতে এত্তো বাতাবিলেবু আছে। বলে ছুটে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল। অঞ্জলি জিজ্ঞাসা করল, কি হল?

দীপা বলল, দিনের বেলায় খোকনের ঠাকুমা আসেন না, না?

অঞ্জলি স্থানকালপাত্র ভুলে হেসে ফেললেন। মনোরমা পর্যন্ত লজ্জিত। সত্যসাধন কৌতূহলী হয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন।

খোকনদের গাছে উঠতে হল না। ওর মা রান্নাঘরে রাখা দুটো বাতাবি লেবু দীপাকে দিয়ে দিলেন। সে দুটো নিয়ে বাড়ি ফিরে সে সত্যসাধনবাবুকে দিল। সত্যসাধনবাবু বললেন, শোন খুকি। ভূত পেত্নী দৈত্যদানব বইল্যা কিছু নাই। এ সবই মানুষের কল্পনা। আসল কথা হইল আমাদের সামনে যেসব মানুষ ঘুইরা বেড়ায় তারাই কেউ কেউ ভূত পেত্নী হইয়া যায় সময়সময়। এখন বোঝবা না। এসব কিন্তু কক্ষনো কল্পনার ভয় পাইবা না। মহিলাদের নমস্কার করে সত্যসাধনবাবু বিদায় নিলেন।

অঞ্জলি বলল, যাও ভূতের মত দাঁড়িয়ে থেকে না। স্নান করে আমাকে উদ্ধার করো। দীপা ফিক করে হেসে ফেলল, মা, আমি ভূত হব কি করে? মেয়েরা কি ভূত হয়? অঞ্জলি নিজের হেসে ফেলার কারণে লজ্জিত ছিল, মেয়ের এই কথা শুনে মুহূর্তেই রান্নাঘরে ঢুকে গেল।

০৩. ভালো-মন্দ বোঝার বয়স

এক দেশলাই বাক্স ফড়িং আর এক কোটো কেঁচো নিয়ে ওরা তিনজন যখন কোয়াটার্সের পেছন দিয়ে নিজেদের লুকিয়ে চা-বাগানের ভেতর ঢুকে পড়ল তখন আকাশেব মেঘের গায়ে ফাটল দেখা দিয়েছে। সূর্যদেবের হদিশ নেই। কিন্তু তিনি এখন মধ্যগগন অতিক্রম করেছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে। যদিও চা-বাগানের ভেতর এখন একটা সাঁতসেতে গন্ধ, শেডট্রিগুলোতে ভিজে ছায়া জড়ানো। তবু এখন দিনটার চেহারা একটু পাল্টাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল। সরু পায়ে চলা পথ দিয়ে ওরা হাঁটছিল। প্ৰথমে বিশু ছিপ হাতে, মাঝখানে খোকন, সবশেষে দীপা। খোকনকে বিশু বলেছে। ছিপ দুটো লোক তিনজন। দীপা ঠিক করল সে কিছুতেই ছিপ হাতছাড়া করবে না। খোকনের মাছ ধরার ইচ্ছে হলে বিশুরটা নিক।

মাথার ওপর এক ঝাঁক টিয়া শব্দ করে উড়ে গেল। দূরে বড় সাহেবের বাংলো দেখা যাচ্ছে। চা-গাছের সবুজ কাপোটের ওপর নৌকোর মত। বাড়িটার আদল ওরকমই। ওরা তিনজন চটপট পায়ে চলছিল। দূরের আসাম রোড দিয়ে মদেশিয়া মেয়েরা সেজেগুজে হাটে চলেছে। তিনজন কোন কথা বলছিল না। ক্রমশ গভীর থেকে গভীর চা গাছের জঙ্গলে ঢুকে গেল ওরা। আর তখনই একটা বীভৎস শব্দ শুনতে পেয়ে বিশু দাঁড়িয়ে পড়ল। দীপা জিজ্ঞাসা করল, কিরে? বিশু ঠোঁটে আঙুল চেপে চুপ করতে বলল।

শব্দটা হচ্ছে থেমে থেমে, গোঙানোর মত। দীপা খোকনের হাত জড়িয়ে ধরল। খোকন বলল, চল ফিরে যাই। মাথার ওপর নানান রঙের পাখি সমানে চিৎকার করে যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে। মাঝে মাঝে শেডট্রি থেকে নেমে আবার ওপরে উঠে যাচ্ছে।

বিশু পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল। একটু বাঁক নিয়ে সে হী করে থেমে গেল। তারপর হাত নেড়ে ইশারায় ওদের ডাকল। শব্দটা একটু থামতেই ওরা ছুটে এল। বিশু দেখাল হাত তুলে। কয়েকটা চা গাছ তুলে নেওয়া হয়েছিল কোন কারণে। সেখানে একটা বিশাল পাইথন সাপ স্থির হয়ে তাদের দেখছে। সাপটা নড়ছে না। কারণ ওর মুখের ভেতরে একটা বড়সড় হরিণ ঢুকে আছে। হরিণের সামনের পা দুটো আর শিংওয়ালা মাথাকে গিলতে পারছে না সাপটা। দীপা চিৎকার করে উঠতেই সাপটা নড়বার চেষ্টা করল। খোকন জিজ্ঞাসা করল, কি সাপ রে?

বিশু বলল, অজগর। হবিণটাকে গিলতে পারছে না। কি বিরাট মুখ, না রে!

খোকন বলল, আমাকেও গিলে ফেলবে।

বিশু মাথা নাডল, এখন পাববে না। শিংদুটো আটকে গেছে না! চল, আমরা এদিক দিয়ে চলে যাই। সে আবার হাঁটতে শুরু করলে বাকি দুজন অনুসরণ করল। দীপা বলল, ফেবার সময় এই রাস্তা দিয়ে আমি মোটেই আসছি না বাবা।

খোকন জায়গা অতিক্রম করে হালকা গলায় বলল, এই জন্যেই তুই মেয়ে।

সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ রাগ হয়ে গেল দীপার। সটান একটা চড় মারল খোকনের মাথায়। মেরে রুখে দাঁডাল! আচমকা চড় খেয়ে চিৎকার করে উঠল, তুই আমাকে মারলি কেন?

দীপা রাগত গলায় বলল, বেশ করেছি। আমি তোকে সাবধান করে দিচ্ছি। কক্ষনো আমাকে মেয়ে বলবি না। মেয়ে তো কি হয়েছে? তুই যা পারিস আমি তা পারি না? ঢিসকল!

তুই আমাকে ঢিসকল বললি? খোকন প্ৰায় ঝাঁপিয়ে পডল। দীপা ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল। এবং পড়েই আবার উঠে এগোতে যাওয়ামাত্র পেছনে সাপটা সেই একই গলায় অনেকক্ষণ বাদে গোঙানি শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল দীপা। খোকনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বিশু দূরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ওদের কাণ্ড দেখছিল। এবার বলল, চলে আয়। ডাকটায় কাজ হল। ওর পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে এরা দুজন কথা বলছিল না।

একসময় নদীটা দেখা গেল। চা-বাগান আর ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে। চওড়ায় বড় জোর ফুট তিরিশেক। স্রোত খুব। ওপাশের ফরেস্টের ছায়া পড়ায় জলের রঙ কালো; মাঝে মাঝে ফুট পাঁচেক জল কিন্তু বেশীর ভাগটাতেই নুড়ি দেখা যাচ্ছে। বিশু নিজে বড় ছিপটা নিয়ে কেঁচো পারাতে বসল। দুটো ছিপই সে একসঙ্গে বয়ে এনেছে। খোকন খপ করে দ্বিতীয় ছিপ নিয়ে নিতেই দীপা চেঁচাল, অ্যাই বিশু, আমার ছিপ যেন আর কেউ না নেয়।

খোকন ছিপ থেকে সুতো খুলতে খুলতে বলল, ছিপের গায়ে কারো নাম লেখা নেই।

দীপা চেঁচাল, বিশু বলেছে বঁড়শি কিনতে আমি পয়সা দিয়েছি।

কথাটা শোনামাত্র খোকন ছিপ ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর পকেট থেকে একটা মোটা কাঠি বের করল। দীপা দেখল কাঠির গায়ে বেশ খানিকটা সবুজ সুতো জড়ানো। খোকন বলল, বিশু আমাকে কেঁচো দে তো। বান ধরব। দেখি আর কেউ কেমন রুই কাতলা মারে।

দীপা ছিপ তুলে নিয়ে সরে গেল একপাশে। নদীটার মূল স্রোত উল্টোদিকে তাই এপারের এখানটায় জল খানিকটা স্থির। সে দেশলাই বাক্স বের করে একটা ছোট ফড়িং বের করল। করে অসহায় চোখে দুজনের দিকে তাকাল। দুজনেই বঁড়শিতে কেঁচো গাথছে। ফড়িঙের শরীরের ভেতরে বঁড়শি ঢোকানোর সময় একটু লালচে রস বের হয়। কিরকম ঘিন ঘিন করে ওঠে শরীরটা তখন। এখন ওদের কাছে সাহায্য চাইলে খোকন নির্ঘাৎ হাসবে। মরীয়া হয়ে ফড়িঙটাকে বঁড়শিতে গাঁথল দীপা। বাঁকানো বঁড়শিটাকে ফড়িঙের শরীর ঢেকে দিতেই মন ভাল হল। এসব জায়গায় বেশী লোকজন আসে না। মাছ মারারা অবশ্য মাঝে মাঝে জাল ফেলে। তবে সব জায়গায় নয়। ওরা যায় ড়ুড়ুয়া নদীতে। এখানে জাল ফেললে তা নদীর বুকে পাথরে আটকে থাকাই স্বাভাবিক। নদীর গা ঘেঁষে খানিকটা হেঁটে একটু গভীর জল দেখে ছিপ ফেলল দীপা। ফাৎনাটা সবে ড়ুবেছে কি ডোবেনি আমনি সেটা জলের তলায় তলিয়ে গেল। ব্যাপারটা বুঝতেই জোরে টান মারল দীপা। আর সঙ্গে সঙ্গে জলের ওপর রুপোলি ঝিলিক। দীপা আনন্দে চেচিয়ে উঠল, দাখি, আমিই প্ৰথম ধরলাম। সরপুঁটি। বঁড়শি থেকে ছাড়াতে গিয়ে ইঞ্চি দুয়েক লম্বা মাছটার মুখ থেকে রক্ত বের হল। একটা চোরকটা গাছ তুলে নিয়ে তার ডগা মাছের কানকো দিয়ে ঢুকিয়ে মুখের ভেতর থেকে বের করে আনল সে। তারপর মাছটাকে ফেলে রাখল ঘাসের ওপর।

আধঘণ্টার মধ্যে বিশু আর দীপা টপটপ মাছ তুলতে লাগল জল থেকে। দীপা আড়চোখে দেখেছে খোকন বারংবার জায়গা পরিবর্তন করেও কিছু পায়নি। সে পাড় থেকে ঝুঁকে বঁড়শিটাকে জলের মধ্যে ড়ুবিয়ে দিচ্ছে যতক্ষণ না ফাৎনা ওপরে ভাসে। বঁড়শি থাকছে মাটির ওপর। এবার খোকন ওপর থেকে-সুতো নাচাচ্ছে। খাদ্যবস্তুকে জীবন্ত ভেবে কোন জলচর প্রাণী এসে গিললেই ফাৎনা ড়ুববে এবং খোকন সেটাকে টেনে তুলবে। কিন্তু ব্যাপারটাই ঘটছে না। দীপা চিৎকার করে বিশুকে বলল, আমার নটা হল, তোব কটা।

বিশু জবাব দিল, বারোটা।

রুই কাতলা না ধরতে পারি পুঁটিতো ধবছি। দীপা হাসল।

খোকন চলে এল ওর নিজের জায়গা ছেড়ে, এঃ, এই জায়গাটা পুঁটিতে পটিতে ছেয়ে, গেছে। সব তেতো পুঁটি। অন্ধও ধরতে পাবে।

দীপা নিজের মনে বলল, নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা। খোকন সেই কথায় কান না দিয়ে বলল, বিশু, আমি ওপাশ দিয়ে নদী পার হয়ে ফরেস্টের দিকে যাচ্ছি। ওই জায়গায় ভাল মাছ আছে মনে হচ্ছে। অন্ধকার অন্ধকার।

বিশু আর একটা মাছ তুলতে তুলতে বলল, অন্ধকারেই তো বান মাছ থাকে। তোর বানের বঁড়শি, পুঁটি উঠবে কেন? তাড়াতাডি করিস। সন্ধ্যের আগেই ফিরতে হবে।

খোকন নদীর উজান ধরে এগিয়ে গেল কিছুটা। তারপর নুড়ি দেখতে পেয়ে জলে নামল। দীপার খুব মজা লাগছিল। যেমন পেছনে লাগতে চাওয়া তেমন শাস্তি, জলে নামতে হল তো। সে দেখল কখনও কখনও জল খোকনের হাঁটুর অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছে। হাফ প্যান্ট উঁচু করে ধরে পা মেপে মেপে শেষ পর্যন্ত পা্র হয়ে গেল সে। তারপর খানিকটা নিচে এসে ঠিক ওদের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে বঁড়শি ফেলল জলে। ওর পেছন দিকে গভীর জঙ্গলের অন্ধকার। দীপা আবার নিজের মাছ ধরায় মন দিল। এখানে বোধ হয় আর পুঁটি নেই। বিশুও সরে গেছে অনেকটা ফাৎনাটা নড়ছে অনেকসময় ধরে ভেসে থাকার পরে। হঠাৎ ওপার থেকে খোকন চিৎকার করে উঠল। কিছু একটা টান দিয়ে ওপরে তুলেছে সে। তারপরেই বলল, একটা ইয়া বড় কাঁকডা, কি করব? বিশু দূ্র থেকে উত্তর দিল, পা দাঁড় ভেঙ্গে রাখ।

অতবড় দাঁড় আমি ভাঙতে পারব না। খেপে গেছে।

বিশু জবাব দিল না। খোকন আবার জিজ্ঞাসা করল, কি করব বল না। জলে নেমে যাবে।

অতএর দীপা কথা না বলে পারল না, পাথব দিয়ে মার ওটাকে। শোনামাত্র খোকন একটা পাথর তুলে কাঁকড়াটাকে আঘাত করল। দীপা খুশী হল। মেয়ে বলা হয়েছিল, নিজের ঘটে তো এক ফোঁটা বুদ্ধি নেই। কিন্তু সে আর মাছ ধরতে পারছে না। হঠাৎ মনে হল ওপারে গেলে হত। কিন্তু জল ডিঙিয়ে যেতে সাহস হল না। সে দেখল বিশু জলে নেমে গেল। স্রোতটা হাঁটুর নিচে। সে জিজ্ঞাসা করল গলা তুলে, জলে নামলি কেন?

পাথর ঠোকরা ধরব। স্রোতে পাথরের গায়ে লুকিয়ে থাকে। বিশু জবাব দিল।

এইসময় খোকন আবার চেঁচাল, বান বান বান। দীপা দেখতে পেল জলের ওপরে একটা মোটকা সাপের মত কিছু কিলবিল করছে। লম্বায় দু ফুট হবে। বান মাছ বাড়িতে আসে না। অতএর সে যদি মাছটাকে ধরত তাহলে কোন লাভ হতো না। দীপা নিঃশ্বাস ফেলল। আর তখনই তার চোখ বিস্মফাবিত হল। খোকন যেখানে দাঁড়িয়ে বানমাছটাকে বঁড়শি থেকে খোলার চেষ্টা করছে তার হাত পনের দূরে একটা ছোট্ট হাতি শুড় দোলাচ্ছে। দেখতে মজার কিন্তু দীপা শুনেছে বাচ্চা হাতির কাছাকাছি মা হাতি থাকরেই। সে চিৎকার করে বলল, খোকন তাড়াতাডি চলে আয়।

খোকন বঁড়শিতে গেঁথে থাকা মাছটাকে দেখিয়ে হাসল, এতবড় মাছ জীবনে ধরেছিস?

আর্তনাদ করল দীপা তোর পায়ে পড়ি চলে আয়। হাতি। সে হাত তুলে দেখাল জঙ্গল টা।

সঙ্গে সঙ্গে খোকন ঘাড় ঘোরাল। আর তারপরেই ওর শরীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। খোকনকে লাফাতে দেখে বাচ্চা হাতিটা যেন মজা পেল। ছুটে এল তরতর করে জলের ধারে। আর তখনই পেছন থেকে হুঙ্কার ভেসে এল; বিশু ততক্ষণে জল ছেড়ে উঠে এসেছে। ডাঙায়, পালা দীপা, হাতির সঙ্গে দৌড়ে পারব না আমরা।

দীপা ওর হাত ধরে কেঁদে ফেলল, খোকনের কি হবে। ও তো এখনও মাঝখানে। বাচ্চাটা জলে নেমে পড়েছে। বিশু কি করবে বুঝতে পারছিল না খোকন তখন দ্রুত চলার কাবণেই বারংবার জলে আছাড় খাচ্ছে স্রোতের ধাক্কায। আবার পড়ি কি মরি করে ছুটছে। বাচ্চাটার সেই অসুবিধে নেই। সে ব্যবধান কমিয়েছে। খুব মজা পাচ্ছে যেন। পেছনে তখন অন্ধকার পাহাড়ের মত মা হাতি এসে দাঁড়িয়েছে। শুড় তুলে সম্ভবত সন্তানকে এগোতে নিষেধ করছে। সন্তান সেই নিষেধ শোনার পাত্র নয়। দেখে সে এবার জলে নামল। তখনই বিপর্যস্ত খোকন এপারে উঠে এল। দীপা ওর হাত ধরে টেনে বলল, দৌড়া।

ছিপ ফেলে রেখে মাছের কথা ভুলে ওরা দৌড়াতে লাগল। একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দীপা দেখল বাচ্চাটা উঠে এসেছে এপারে। কিন্তু কি করবে বুঝতে পারছে না। ওর মাটাকে সে তখন দেখতে পেল না। তিনটে শরীর প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছিল। শুধু খোকন পিছিয়ে পড়ছিল আর চিৎকার করছিল, আমাকে ফেলে যাস না। আমাকে ফেলে যাস না।

প্ৰায় মিনিট দশেক দৌড়বার পর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বিশু বলল, ওরা আসছে না। ফিরে তাকিয়ে নির্জন চা-বাগান দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না দীপার। নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল, বলা যায় না। হাতির অনেক বুদ্ধি। হয়তো অন্য রাস্তা দিয়ে আসছে।

বিশু চারপাশে তাকিয়ে বলল, হাতি তো শুয়ে শুয়ে দৌড়াতে পারে না। এলে চ-গাছের ওপরে দেখা যেত। আর তখন খোকন হাঁপাতে হাঁপাতে ওদের কাছে এসে পৌঁছাল, আমি আর পারছি না। বিশু বলল, একটু দাঁড়িয়ে নে।

আর সেইসময় দীপার নজর পড়ল খোকনের পেছনে। সে চিৎকার করল, ওটা কি? খোকনের হাতে কাঠির সুতোটা জড়িয়ে আছে। আর তার আর এক প্রান্তে বানমাছটা এখনও বঁড়শিতে বিদ্ধ অবস্থায় রয়ে গেছে। অবশ্য তাকে আর বানমাছ বলে চেনা যাচ্ছে না। এতটা পথ খোকন যখন ছুটেছে তখন মাছটা মাটিতে ঘষতে ঘষতে এসেছে। মাটি লাগা একটা মোটকা দড়ি বলে মনে হচ্ছে।

বিশু বলল, সে কিরে! তুই বানমাছটাকে নিয়ে দৌড়ে এলি, বুঝতে পারিসনি?

না। খোকন হাত থেকে সুতোর বাঁধন খুলল অনেক চেষ্টার পর। তারপর বানমাছটাকে সুতোয় ধরে তুলে বলল, ধুয়ে নিলে ঠিক হয়ে যাবে।

দীপা খিলখিল করে হেসে উঠল, তুই কিরে! আমরা মরছি প্ৰাণের ভয়ে আর তুই মাছটাকে নিয়ে দৌড়ালি!

এতে প্ৰমাণ হল আমি মাছ ধরতে পারি তোরা পারিস না। খোকন বলল, বিশু খেপে গেল, চমৎকার। তোর জন্যে আমরা ছিপ মাছ ফেলে দৌড়ে এলাম। আর তুই এই কথা বলছিস! তোকে আমার সঙ্গে আনাই ভুল হয়েছিল।

খোকন বলল, ঠিক আছে, ছিপ সুতো বঁড়শির দাম চল আমি দিয়ে দেব।

বিশু চটপট বলল, তিন টাকা।

দীপা সঙ্গে সঙ্গে ধরিয়ে দিল, কিন্তু মাছগুলো? খোকন মুখ বেঁকিয়ে বলল, ধরেছিস তো কয়েকটা পুঁটি, চার আনাও হবে না। দীপা হাসল, পুঁটি মাছের দাম চার আনা কিন্তু ধরার আনন্দটার দাম? রাতে যখন ভাজা খেতাম তখন ভাবতাম নিজের হাতে ধরা মাছ খাচ্ছি। সেইটের দাম?

খোকন হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল, ঠিক আছে, আমি ওখান থেকে নিয়ে আসছি।

দীপা বলল, থাক, অনেক হয়েছে। তোর ঠাকুমা পুৰ্ণিমার রাতে বাতাবি লেবুর গাছে বসে বাতাবি খায়, ওখানে গেলে তুই অমরস্যার রাতে গাছে বসবি। নাড়ুগোপাল ছেলেকে হারিয়ে মাসীমা কেঁদে অন্ধ হয়ে যাবে। লাগবে না ছিপ।

ওরা ঘুর পথে আসাম রোডের দিকে হাঁটছিল। এই পথে ট্রাক্টর আসে পাতি নিয়ে যেতে তাই ঘাসের পথ বেশ চওড়া। সাপটাকে এড়ানো গেল হাতির তাড়া খেয়ে। কিন্তু বিশুর খুব মন খারাপ ধরা মাছ আর ছিপ ফেলে আসার জন্যে। দীপার চোখের সামনে কেবলই মা হাতিটা ভেসে উঠছিল। বুকের মধ্যে হিম ভাবটা ফিরে আসছিল। সে যদি না চেঁচাতো তাহলে খোকন বুঝতেই পারত না। তাহলে এতক্ষণে ওর শরীরটা নিয়ে হাতিরা ফুটবল খেলত। অথচ এমন অকৃতজ্ঞ একবারও সেটা স্বীকার করল না। ছেলেরা কি এমন অকৃতজ্ঞ হয়? এইসময় চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খোকন বলল, এই, আমার খুব শীত করছে।

দীপার খেয়াল হল। জলে নাকানি চুবুনি খেয়ে খোকনের জামা প্যান্ট ভিজে চপচপে হয়ে গিয়েছিল। এখনও জল ঝরিছে টপটপ করে। শীত করাটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। সে বলল, তাড়াতাড়ি পা চালা।

খোকন বলল, আমি এই অবস্থায় বাড়িতে যেতে পারব না।

দীপা জিজ্ঞাসা করল, কেন?

বাবা মেরে ছাল ছাড়িয়ে নেবে।

কালো বাঁদব থেকে সাদা বাদব হবি, ক্ষতি কি? দীপা হাসল।

তোবা। আমার বন্ধু নস। সবসময় আমার পেছনে লাগিস! গাঢ় গলায় বলল খোকন।

আর কখনও আমাকে মেয়ে বলে ঠাট্টা করবি?

না।

তিনবাব বল।

না, না, না।

দীপা খুব ভেবে নিয়ে বলল, ঠিক আছে, তুই বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবি, বিশু গিয়ে ওর প্যান্ট আর গেঞ্জি এনে তোকে দেবে। তুই তাই পরে বাড়িতে ঢুকে নিজেরটা পরে নিয়ে বিশুকে ফেরত দিবি। ঠিক আছে?

কিন্তু মা দেখেছিল। আমি সার্ট পরে বেরিয়েছি।

মাসীমার মনে নেই। আচ্ছা, সেইসময়। আমি মাসীমার সঙ্গে গল্প কবর।

তোর খুব বুদ্ধি। খোকন আপ্লুত হল।

এইসময় বিশু ঠোঁটে আঙুল চেপে শব্দ করল, চুপ কবার জন্যে। ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল। না, কোন গোঙনি শব্দ কানে আসছে না। ওরা বিশুকে ইশারায় কারণ জানতে চাইল। বিশু বলল, চাপা গলায়। আমি যেন শুনতে পেলাম। কেউ সামনে কথা বলছে!

ভূত, নয়, তো! ফিসফিস করে খোকন বলল।

ভূত বলে কিছু নেই, মানুষেই ভূত। সত্যসাধনবাবুর কাছে শোনা কথা উগরে দিল দীপা নিচু গলায়।

ওরা আর একটু এগোলি। এবং তখনই আবার একটা চকচকে শব্দ শুনতে পেল। তারপরই একটি নারী কণ্ঠ বলে উঠিল, তুমি আমাকে করে বিয়ে করবে বল?

পুরুষ কণ্ঠটি বললে, কি আশ্চর্য। চাকরি না পেলে বিয়ে করা যায়?

করে চাকরি পাবে?

চেষ্টা তো করছি। বড় সাহেব যে কি ভাবছে কে জানে। পরশুদিন লক্ষ্মীপাড়া বাগানের সঙ্গে ম্যাচ আছে; যদি জিততে পা্রি, মানে গোল দিতে পারি তাহলে চাকরিটা হতে পাবে।

আমি শ্মশানের কালীবাড়িতে গিয়ে মানত করব।

যা খুশী কর, এখন একটা চুমু দাও তো অনেকক্ষণ ধরে।

দেব। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যাবে না তো!

মরে যাওয়ার আগে না।

যদি তোমার বাবা অমত করে?

চাকরি পেয়ে গেলে কে বাবাকে তোয়াক্কা করে। আর একটা দীর্ঘস্থায়ী শব্দ হল। এবং তখনই মেয়েলি গলায় প্রতিবাদ বাজল, না।

কেন?

এসব করলে যদি বাচ্চা হয়ে যায়!

হবে না।

কি করে বুঝলে?

বইতে পড়েছি।

তারপর নিঃশব্দ। কথাগুলো ভেসে আসছিল ডানদিকের চা-গাছের ভেতর থেকে।

হঠাৎ দীপা দৌড়াতে লাগল। প্ৰাণপণে। অন্য দুজন ভ্যাবাচাকা খেয়ে তাকে অনুসরণ করল। একদমে ওরা চা-বাগান ছাড়িয়ে চলে এল আসাম রোডে। এসে দীপা বড় মুখ করে হাঁপাতে লাগল। খোকন জিজ্ঞাসা করল, ওরা চা-গাছের ভেতরে ঢুকে কি করছে রে?

দীপা মাথা নাড়ল, জানিনা।

খোকন আবার জিজ্ঞাসা করল, যদি সাপে কামড়ায়?

দীপা বলল, কামড়াক।

ইস। শ্যামলদাকে সাপে কামড়ালে গোল দেবে কে?

আমি জানিনা।

বিশু জানতে চাইল, মেয়েটা কে রে?

খোকন বলল, মনে হল ললিতা মাসীর গলা।

কি করে বুঝলি?

বাঃ, ললিতা মাসী ওইরকম গলায় কথা বলে।

কিন্তু ললিতা মাসী আর শ্যামলদা কত জায়গা থাকতে চাগাছের ভেতরে লুকিয়ে আছে কেন? ওরা তো একসঙ্গে মাঠেও হাঁটে না।

কি জানি! বড়দের ব্যাপার। আমি বুঝতেই পারিনা।

দীপা কোন কথা বলছিল না। পিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে সে হাঁটছিল। ললিতা মাসী দেখতে মোটেই সুশ্ৰী নয়। অন্তত ছযজন পাত্র এসে দেখে গিয়েছে ওকে। মালবাবুর মেয়ে। যে ছেলেটা এসেছে ওদের বাড়িতে সে ললিতা মাসীর আত্মীয়। মুখ চোখ নেপালির মত। মোটাসোটা। খুব রঙচঙে শাড়ি পরে। বিকেলবেলায় চুলে টেরি কেটে বাবান্দায মোড়া পেতে বসে। বাগানের কারো সঙ্গে যেচে কথা বলে না। সেই ললিতা মাসী চা গাছের ভেতরে শ্যামলদার সঙ্গে কি করছে? কিছুই বুঝতে পারছিল না। দীপা কিন্তু সেই শব্দটা কানে যাওয়ামাত্র মুখে রক্ত জমছিল। মন বলছিল, ব্যাপারটা ভাল নয়। সে হঠাৎ বন্ধুদের বলল, এই, দৌড়াচ্ছি? কে আগে যায় দেখি।

ওর বন্ধুরা কিছু বলার আগেই সে আর দৌড় শুরু করল। খোকন একটু চেষ্টা করেই থেমে গেল। দীপা মুখ ফিরিয়ে দেখল না। তার এখন বন্ধুদের সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। আকাশে আবার মেঘ আসছে।

বারান্দায় মোড়া পেতে মনোরমা বসেছিলেন। এখন বিকেল। অমরনাথ একটু আগে বেরিয়ে গেছে তাস খেলতে। হাট থেকে মানুষজন ফিরতে আরম্ভ করেছে। মনোরমা চুপচাপ দেখছিলেন। হঠাৎ তাঁর ইচ্ছে হল অনন্তর সঙ্গে কথা বলতে। অনেককাল ধরে লোকটাকে তিনি দেখছেন; কি দক্ষতায় কালীঠাকুর তৈরী করে। ওর হাতে দেবী যেন জীবন্ত হয়ে ওঠেন।

মনোরমা উঠলেন। সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামতেই অঞ্জলির গলা পেলেন, কোথায় যাচ্ছেন, মা?

মনোরমা ইচ্ছেটা জানালেন। অঞ্জলি বলল, চলুন, আমিও দেখে আসি।

ওদিকে সব বন্ধ আছে?

হ্যাঁ। খাওয়া-দাওয়ার বা পান মুখে অঞ্জলিকে বেশ সুখী সুখী দেখায়। মোটাসোটা বেঁটে অথচ মুখখানি লাবণ্যে টলটল। মালবাজারের পোস্টমাস্টার ছিলেন ওর বাবা। চারজন ভাই বোন। এখানকার পোস্টমাস্টারের বউ একদিন সম্বন্ধ আনলেন। ছবি দেখে পছন্দ হল। চোখ দেখে মনে হল এ মেয়ে আর যাই হোক নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে না। ছেলের বিয়ে দিয়ে এক পয়সা নেননি শুনে অনেকেই চোখ কপালে তুলেছিল। বউমার পরের বোনের বিয়ের সময় ওর বাবা প্ৰায় সর্বস্বাস্ত হয়েছেন। অনেককাল হয়ে গেল, এখনও এক দিনের জন্যেও বউমার সঙ্গে তাঁর বাক্যালাপ বন্ধ হয়নি। এটাও তো অনেকের কাছে বিস্ময়। নিজেকে পরিস্থিতি হিসেবে বদলে নিতে জানেন তিনি। খুব কষ্ট হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত তো পেরে যান। অন্যের মতের ওপর নিজেও মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অবিরত করে যাওয়ার ফলেই তো অশান্তি হয়। মনে না নিয়েও তো মেনে নেওয়া যায়। আর সেরকম করলে প্ৰথমে অস্বস্তি হলেও শেষপর্যন্ত পরিবেশ যদি শান্ত থাকে তাহলেই শান্তি। অন্যের ব্যাপারে নাক বেশী গলান না বলেই তাঁর ব্যাপারে কেউ নাক গলায় না। এটাও তো স্বস্তির। ধীরে ধীরে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তিনি জিজ্ঞাসা করলন, পায়েস হয়ে গিয়েছে?

হ্যাঁ, বাটিতে ঢেলে এলাম। সব না পড়লে তো আবার মনে ধরবে না।

সে গেল কোথায়?

আছে আশেপাশে কোথাও।

তুমি এবার একটু রাশ ধরো।

আপনি ওকে শাসন করুন মা। আমার মাথা গরম হয়ে যায়। এরকম ব্যাটাছেলের মত মেয়ে আমি কখনও দেখিনি। কিছু বললেই জিজ্ঞেস করবে, কেন কি জ্বালা। ছোট দুজন ওকে দেখে দেখে সেটা শিখছে।

তাদের ঘুম ভাঙ্গেনি?

আমি ইচ্ছে করেই ডাইনি। যতক্ষণ ঘুমায় ততক্ষণ শান্তি। ফিরে এসে ডাকব।

বড়বাবুর বাড়ির বারান্দায় তাঁর বাবা বসেছিলান। লুঙ্গি এবং গেঞ্জি পরে। প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়স, চোখে ভারি চশমা। ওঁদের দেখামাত্র উঠে চলে গেলেন ভদ্রলোক ভিতরে। একসময় উনি এই বাগানের বড়বাবু ছিলেন। এখন ছেলের আশ্রয়ে আছেন। বেশী কথা বলেন। অঞ্জলি চাপাগলায় বলল, বাঁচা গেল।

অনন্ত চোখ বন্ধ করে কাঠামোর সামনে বসেছিল। মনোরমা বললেন, কেমন আছ অনন্ত?

অনন্ত চোখ খুলল, ভাল মান। আমি ভাল আছি, ঠাকুর গড়তে যখন আসি তখন আমি খুব ভাল থাকি। আপনারা সবাই কুশলে তো?

এই আর কি। তোমাব চুল সাদা হয়ে যাচ্ছে যে।

তা বয়স তো এগোচ্ছে।

ওকথা বলোনা। তোমাকে তো সেই প্রথমদিন থেকে দেখছি। মনোরমার নিজের কথা মনে হল। এখনও একটাও দাঁত পড়েনি, চুলে পাক ধরেনি। বরং অমরনাথের চুলের রঙ পাল্টাতে শুরু করেছে।

অঞ্জলি জিজ্ঞাসা করল, এবার কি ঠাকুরের মুখ পাল্টাবে?

সেই কথাই ভাবছিলাম। চোখ বন্ধ করে মুখ কল্পনা করছিলাম। জানেন মা, মনে হল এবার সেই ঠাকুর গড়ি যিনি শিবের গায়ে সবে পা দিয়েছেন কিন্তু তখনও স্বামী বলে বুঝতে পারেননি। মনে মনে সেই মুখটা কল্পনা করছিলাম। অনন্ত হাসল।

কি রকম? অঞ্জলির কৌতূহল হল।

ক্ৰোধ আছে অথচ তার প্রকাশ নেই, দুঃখ আছে অথচ সেটা রয়েছে চাপা স্নেহ আছে কিন্তু তা বুকের ভেতরে। তাঁর মুখ অনিন্দ্যশ্ৰী, দেবী দুর্গাযাঁর কাছে ম্লান হয়ে যান। তিনি কোন অপরাধ করেছেন বলে বুঝতে পারেননি। তাই লজ্জিত নন। আর সেই কারণেই তাঁর জিহ্বা বাইরে বেরিয়ে আসেনি। তিনি অগ্নিশিখার মত গতিময়ী। সেই দেবীকে কল্পনা করতে গিয়ে মা একটু থমকে গিয়েছি।

মনোরমার খুব ভাল লাগছিল। তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, কেন অনন্ত?

মা, যাঁকে আমি প্রতিমন গড়ি তিনি রণরঙ্গিণী, উর্ধ্বাঙ্গে বসন নেই, কোমর থেকে হাতের মালা তাঁর লজ্জা নিবারণ করছে। অথচ তাঁকে দেখে মোটেই আমাদের খারাপ লাগছে না কারণ তিনি জিহ্বা বের করে আছেন। তাকালেই সেই জিহ্বার দিকে প্রথমে চোখ যায়। ফলে কুভাবনা মনে আসেনা। দেবী যদি ঠোঁট টিপে থাকেন তাহলে মানুষের মন যে ছোট হয়ে যাবে। সমস্যাটা তো এখানেই। অথচ ওঁকে তো কোন পোশাকে বাঁধা যাবে না মা। অনন্ত চিন্তিত গলায় বলল।

এইসময় বড়বাবুর বাবা বেরিয়ে এলেন, আসুন, আসুন। বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? মনোরমা দেখলেন উনি এর মধ্যে পাঞ্জাবি চাপিয়ে এসেছেন। অঞ্জলি বলল, লক্ষ্মীদি কি ঘুমাচ্ছেন মেসোমশাই?

না, না। বউমাকে দেখলাম উঠোনে। যাওনা মা ভেতরে, যাও।

অঞ্জলি চটপট মনোরমাকে বলল, মা, আমি একটু লক্ষ্মীদির সঙ্গে কথা বলে আসি। মনোরমা বুঝতে পারলেন অঞ্জলি বৃদ্ধকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যেই ভেতরে চলে গেল। বড়বাবুর বাবার নাম তেজেন্দ্র। বিপত্নীক মানুষ। তেজেন্দ্র বললেন, আহা, আপনি এ বাড়িতে এসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাবেন তা কি হয়। এখানে বসুন। নিজেই একটা চেয়ার ভেতর থেকে টেনে বারান্দায় রাখলেন তিনি। অগত্যা মনোরমাকে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠতে হল। সাদা থানের ঘোমটা আর একটু টেনে দিলেন। সন্তর্পণে চেয়ারে বসে মায়ের কাঠামোর দিকে তাকালেন। তেজেন্দ্ৰ তাঁর ইজি চেযারে।

তেজেন্দ্র জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার শবীব কি রকম?

এই আর কি? মনোরমার কথা বলতে অস্বস্তি হচ্ছিল।

সাবধানে থাকবেন। বয়স তো হচ্ছে। খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম করবেন না। আমাদের বয়সী মানুষের কাছে গেলেই তো শুধু অসুখের গল্প শুনতে হয়। আমার দেখুন, একদম ফিট। লাস্ট জ্বর হয়েছিল তিরিশ বছর আগে! তাও সেবার জন সাহেবেবী সঙ্গে শিকারে গিয়ে সারারাত বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম বলেই জ্বরটা এসেছিল। জনের বউ আমাকে বলত, বাবু, তোমার মত স্বাস্থ্য আমি ব্রিটিশদের মধ্যেও দেখিনি। তাতে জন খুব রেগে গিয়েছিল। বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন তেজেন্দ্ৰ।

মনোরমা চুপ করে রইলেন। তেজেন্দ্র একটু অপেক্ষা করেই আবার কথা শুরু করলেন, তা চাকরি যখন করেছি তখন একরকম ছিলাম। বউ চলে গেল। কিন্তু অভাব বুঝিনি। সবাই বলেছিল ছেলের বয়স সতের হলেও তোমার বিয়ে করা উচিত। সময় পাইনি। এখন মনে হচ্ছে ভুল করেছি। ছেলের বিয়ে দিয়ে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে আর সময় কাটতে চায় না। কেমন শূন্য লাগে চারধার। আপনার সেরকম মনে হয় না?

মানিয়ে নিতে হয়। এছাড়া অন্য জবাব মাথায় এল না মনোরমার।

ঠিক। মানিয়ে নেওয়া। কিন্তু কতটা? একটা মানুষ নেই যাকে মনের কথা বলি। আর সবাইকে কেমন যেন পর পর বলে মনে হয়। ধরুণ আমার কুঁচকিতে যদি একটা ফোড়া হয় তাহলে তো আর বউমাকে ডেকে বলতে পারি না সেঁক দিতে। এই বয়সে যদি মনের সঙ্গী না থাকে তাহলে বড় কষ্ট। তেজেন্দ্র দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

কোথাও ঘুরে আসুন। ভেতরের দরজার দিকে তাকালেন মনোরমা।

এইই। হরিদ্বারে যাব ভেবেছি। কিন্তু কি হবে গিয়ে। মনে শান্তি পাব? মোটেই না। একা একা কোথাও শান্তি পাব না। আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তেজেন্দ্ৰ, আপনি কি হরিদ্বারে গিয়েছেন কখনও?

মনোরমা মাথা নাড়লেন। তেজেন্দ্ৰ ভালভাবেই জানেন মনোরমা যাননি। এই বাগানের কে করে কোথায় যাচ্ছে তা সবাই জানে। তেজেন্দ্র বললেন, অমরনাথকে সেদিন বললাম, তোমার সংসারের জন্যে মা এত খাটছেন, ওঁকে তীর্থদর্শন করিয়ে আন। তা সে বলল বাড়ি ছেড়ে সবাই যাব কি করে। তা আপনি যদি যেতে চান আমার সঙ্গে যেতে পারেন। গুরুদেবের আশ্রম আছে সেখানে চমৎকার পরিবেশ। কোন অসুবিধে হবে না।

না মনোরমা হাসবার চেষ্টা করলেন, আমি ভালই আছি।

না না কোন সঙ্কোচ করবেন না। আমাদের যা বয়স তাতে একসঙ্গে গেলে কেউ কিছু মনে করবেন না। নিজেরটা তো ভাবতে হবে। আর কতকাল সংসারে জড়িয়ে থাকরেন।

তেজেন্দ্রর কথা শেষ হওয়ামাত্ৰ মনোরমা নাতনিকে দেখতে পেলেন। আসাম রোড থেকে দৌড়ে মাঠে নামছে। যেন পেত্নী তাড়া করেছে ওকে। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, আমি আসছি। বউমাকে বলবেন। মানে দীপা এসে গেছে তো—। মনোরমা আর সেখানে দাঁড়ালেন না। দ্রুত গেটের বাইরে চলে এলেন। তাঁর কান গরম হয়ে যাচ্ছিল। মুখেও তাপ। অনেক অনেকদিন পরে। একি অস্বস্তি!

মনোরমাকে দেখে দীপা দাঁড়িয়ে পডল। ভয়ার্ত মুখ চোখ সেই সঙ্গে হাঁপিয়ে যাচ্ছে। মনোরমা কাছে এগিয়ে গেলেন ঘোমটা মাথায়, কি হয়েছে? কোথায় গিয়েছিলি?

মনোরমার সামনে আর একটু কুঁকড়ে গেল দীপা, মাছ ধরতে।

ওমা! তুই কি করে গেলি? মা জানলে কি হবে জানিস না? মনোরমা এই মূহুর্তে কঠোর হতে পারলেন না। তিনি জানেন তেজেন্দ্র তাঁর বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে তোর?

কিছু না। খুব দ্রুত মাথা নাড়ল দীপা!

মিথ্যে কথা বলিসনা। মনোরমা একবার গেটের দিকে তাকাতে গিয়ে সামনে নিলেন, তুই একা মাছ ধরতে গিয়েছিলি? বিশু খোকন কোথায়?

পেছনে আসছে।

ওরা তোকে কিছু বলেছে?

না।

তাহলে?

শ্যামলদা–। ঢোঁক গিলল দীপা, শ্যামলদা আর ললিতা মাসী বাগানের ভেতর লুকিয়ে বসে আছে। কিসব কথা বলছিল ওরা।

মনোরমা সোজা হয়ে, দাঁড়ালেন। দীপার কাঁধ ধরে তিনি বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন। কিছুটা যাওযার পর চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, মালবাবুর মেয়ে, ললিতা?

হুঁ!

কি বলছিল ওরা?

খারাপ খারাপ কথা।

মনোরমা নিজেকে সামলে নিলেন, হাত মুখ ধুয়ে নাও। কোন কথা খারাপ কোন কথা ভাল তা বোঝার বয়স তোমার হয়নি।

তুমি বলেছিলে আমার বয়সে তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল!

০৪. রমলা সেন

মেজাজ খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল অমরনাথের।

শেষ হাতে নবনীর দোষে হেরে গেলেন তিনি। নবনী তাঁদের বাগানের মেজগুদামবাবু। খুব উৎসাহ তাস খেলার অথচ শেষ সময়ে মাথা ঠিক রাখতে পারে না। মাত্র চারটে বঙ পেয়ে বারো পয়েন্টেই ডবল দিয়ে বসল থ্রি স্পেড্‌সে। প্রতিপক্ষ ওটি করে জিতে গেল। তা না হলে ওরা গেম করলেও অমরনাথই জিততেন। খেলা শেষ হলে নবনী মুখ কালো করে বলল, আমি ভেবেছিলাম দাদা আপনার হাতে দুটো বঙ আর ডায়মন্ড-এর অনার্স কার্ড থাকরে।

কঠোর মুখে অমরনাথ বলেছিলেন, যদি এইরকম ভাবা বন্ধ করতে না পাব তাহলে আমার পার্টনার হয়ে খেলতে এস না। তোমার সঙ্গে খেলতে আমার আর ইচ্ছেও নেই।

এইসময় ঘ্যানর ঘ্যানর করলে আরও রাগ হয়ে যায়। সুনীলবাবু রাত্রের খাওয়া খেয়ে যেতে অনুরোধ করছিলেন প্রতিযোগীদের। অমরনাথ অজুহাত দেখিয়ে একাই বেরিয়ে পড়লেন সাইকেল নিয়ে। দূবত্ব বেশি নয়। বড় জোর পাঁচ মাইল।

পূৰ্ণিমা চলে গেলেও এখন একটু বেশী রাতে চাঁদ ওঠে, অল্প জোৎস্না নামে। কিন্তু আকাশ এখনও মেঘলা। দেবীপক্ষ হয়ে গিয়েছে। দুপাশে চা বাগান। অন্ধকার যেন আটোসাটো হয়ে আছে। মন খারাপের ঘোরে মাইলখানেক আসার পারে হঠাৎ খেয়াল হল একা একা এই পথে এত রাত্রে আসা ঠিক হয়নি। মানুষেবা ভয়া নেই, কিন্তু চিতা আছে দুপাশের চায়ের বাগানে। মাইল তিনেকের মধ্যে কুলি লাইনও নেই। রাস্তার দুপাশে ঝাপড়া হয়ে আছে আম কাঁঠালের গাছ সার সার। বাঁ হাতে টর্চ জ্বেলে সাইকেল চালাচ্ছিলেন। তাগিদ থাকায় জোরে প্যাডল ঘোরাচ্ছিলেন।

বিনাগুড়ির মোড় ছাড়িয়ে রাস্তাটা বা দিকে ঘোরামাত্র অমরনাথ টর্চের আলোয় একটা পুরোন হুডওয়ালা অস্টিন গাড়ি দেখতে পেলেন। রাস্তার একপাশে দাড়িয়ে আছে। অমরনাথ সেটাকে লক্ষা করবেন না ঠিক করে একই স্পিডে সাইকেল চালাতে গিয়ে দেখলেন গাড়ি থেকে কেউ একজন নেমে এসে চিৎকার করল, স্টপ, স্টপ, হেল্প, হেল্প। গলাটা মেয়েদের বলেই অমরনাথ বাধ্য হলেন সাইকেল থামাতে। মধ্যবয়সিনী এক মহিলা তড়বড়ে ইংরেজিতে কিছু বলে গেলেন। সাহেবদের সঙ্গে কাজ করে অমরনাথ এখন ইংরেজিতে মোটামুটি অভ্যস্ত। কিন্তু তিনি কিছুই ধরতে পারলেন না; অমরনাথ লক্ষ্য করলেন মহিলার পরনে শাঙি। অতএর তিনি হিন্দীতে জিজ্ঞাসা করলেন সমস্যাটা কি?

মহিলা চোস্ত হিন্দীতে বললেন, আমার গাড়ি বিগড়ে গেছে। তখন থেকে বসে আছি অথচ এই রাস্তায় কেউ আসছে না। ভয়ে আমার প্ৰাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল।

আপনি এখানে এত রাত্রে কি করছিলেন?

আশ্চর্য! আমি কি করছিলাম সেটা বুঝতে পারছেন না? আমাকে আজ রাত্রেই শিলিগুঁড়িতে যেতে হবে। এখানে মেকানিক কোথায় পাওয়া যাবে? মহিলা এক নিঃশ্বাসে প্রশ্ন করলেন।

এখানে তো পারেন না। গাড়িতে কি আপনি একা আছেন?

হ্যাঁ। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

এখান থেকে কয়েকমাইল দূরে এক চা-বাগানে আমি কাজ করি।

আচ্ছা! ওই বাগানে গেস্টহাউস আছে?

তা আছে। কিন্তু সেখানে থাকতে গেলে বড় সাহেবের অনুমতি লাগবে?

সেটা পেতে আমার কোন অসুবিধে হবে না। আপনি বাগানে গিয়ে একটা এসকর্ট গাড়ি পাঠিয়ে দিন চটপট। মহিলা হুকুম করলেন।

গাড়ি পাঠাবার ক্ষমতা আমার নেই।

আপনার বড় সাহেবকে বলুন। একজন মহিলা গাড়ি নিয়ে অসুবিধায় পড়েছেন।

তাঁকে বলা যাবে না। কারণ ছুটির দিনে তিনি মদ খেয়ে ঘুমিয়ে থাকেন।

এইসব পুরুষগুলোর জন্যে দেশটা উচ্ছন্নে গেল। তাহলে কি করা যায়? ভদ্রমহিলাকে চিন্তিত দেখাল, এই গাড়ি চুরি করার জন্যে এত রাত্রে এখানে কেউ আসবে মনে হয়?

না আসাই স্বাভাবিক। অমরনাথ বুঝতে পারছিলেন না তাঁর কি করা উচিত।

ভদ্রমহিলা অমরনাথকে পেরিয়ে সবাসরি তাঁর সাইকেলের ক্যারিয়ারে উঠে বসলেন, চলুন। এই জঙ্গলে পড়ে থাকলে কাল সকালে কেউ আমাকে খুঁজে পারে না।

প্যাডেল ঘোরাতে গিয়ে সাইকেলটা একটু নড়বড়ে হতেই ভদ্রমহিলা ধমকে উঠলেন, ঠিক ভাবে চালান, পড়ে যাওয়াটা আমার ভাল লাগবে না। ডাবল ক্যারি করার অভ্যাস নেই, চেষ্টা করে নিজেকে সামলে নিলেন অমরনাথ। এ জীবনে কোন মহিলাকে সাইকেলের পেছনে নিয়ে চালাননি। তিনি অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। কিন্তু দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, একে নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন। বড় সাহেবকে ডাকতে গেলে চাকরি যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। পি ডব্লু ডির বাংলোতে গিয়ে অবশ্য চৌকিদারকে অনুরোধ করা যায় একে একরাত থাকতে দেবাব জন্যে। কথাবার্তা এবং চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সম্পন্ন ঘরের শিক্ষিতা মহিলা। কিন্তু চৌমাথার পৌঁছাতে চেনা লোক জন যদি এই দৃশ্য দ্যাখে তাহলে আর চা-বাগানে টিকতে হবে না। অমরনাথ ঘামতে লাগলেন। পেছনে যিনি বসে আছেন তিনি আপাতত শব্দহীনা। মহিলার সাহস খুব। এই রাত্রে এক গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মেমসাহেবদের গাড়ি চালাতে দেখেছেন অমরনাথ কিন্তু কোন ভারতীয় মহিলাকে এই প্রথম দেখলেন। তার ওপর একদম অপরিচিত একটি মানুষের সাইকেলের পেছনে কি অবলীয়ায় চড়ে বসলেন। অমরনাথ না হয়ে কোনো কুমতলববাজও তো হতে পারত। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা ভাবনা মাথায় এল। চা-বাগানের রাস্তায় অনেকেই তেনাদের দর্শন পায়। অমরনাথের প্রতি তেনারা এখন পর্যন্ত দয়া করেননি। আজ সেটাই হল না তো। অমরনাথের সর্বাঙ্গে কাঁটা ফুটল। তিনি আরও জোরে প্যাডেল ঘোরাতে লাগলেন। শেষপর্যন্ত চৌমাথা এসে গেল। দোকানপাট বন্ধ, সারাদিন হাটের পর কেউ আর জেগে নেই। একেবারে নদী পেরিয়ে নিজের কোয়ার্টার্সের সামনে এসে অমরনাথের মনে হল ইনি তিনি নন। হলে এতটা দূর এভাবে আসতে পারতেন না। নিজের বোকামির জন্যে লজ্জা পেলেন তিনি। কিন্তু এখন কি উপায় হবে? কোথায় রাখতে যাবেন একে? চৌমাথার নামিয়ে দিলে মুক্তি পাওয়া যেত! এখন তো ফিরে যাওয়া যায় না; বাবুদের কোয়ার্টার্সের আলো নিবে এসেছে। কেউ তাদের দেখতে পায়নি।

সাইকেল থেকে নেমে অমরনাথ বললেন, আমি আমার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গিয়েছি, এবার আপনি ঠিক করুন কোথায় যাবেন। ভদ্রমহিলা সহজ ভঙ্গিমায় নেমে পড়লেন ক্যারিয়ার থেকে। এখন মাঠ আকাশ ঘুটফুটে অন্ধকারে মোড়া। শুধু অমরনাথের বাইরের ঘরের জানলা দিয়ে হ্যারিকেনের আলোর ফালি বাইরে পড়ছে। ভদ্রমহিলা সেই দিকে তাকিয়ে বললেন, ওখানে আপনি থাকেন?

হ্যাঁ। ওটা আমার কোয়ার্টার্স। অমরনাথ ঈষৎ শঙ্কিত হলেন।

আপনার আত্মীয়স্বজন?

সবাই আছেন। আপনি তো বাঙালি? কথারাত এতক্ষণ হিন্দিতে হচ্ছিল, কুলিকামিনদের সঙ্গে কাজ করতে করতে যে হিন্দী অমরনাথ শিখেছেন তাকে শিক্ষিত হিন্দী বলা যায় না। ভদ্রমহিলা সে-তুলনায় বেশ তুখোড়। হঠাৎ বাংলা ব্যবহার করলেন তিনি।

অমরনাথ বললেন, হ্যাঁ। আমার নাম অমরনাথ মুখোপাধ্যায়।

মহিলা চারপাশে নজর বুলিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, তা এতক্ষণ এ কথা বলতে কি অসুবিধে হয়েছিল বুঝি না। চলুন আজ রাত্রে আপনার বাড়িতেই থাকব। মদোমাতাল সাহেবকে ডেকে তোলার ধকল আর নেব না।

আপনি আমার বাড়িতে থাকবেন? অমরনাথ ফ্যাসফেসে গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।

রাস্তায় পড়ে থাকতে পারি না তো। আমার নাম রমলা সেন। কেশবচন্দ্র সেনের নাম শুনেছেন?

কেশবচন্দ্ৰ? চিনতে পারলেন না অমরনাথ।

নববিধান, ব্ৰাহ্মসমাজ? বুনো জায়গায থেকে কি অশিক্ষিত হয়ে আছেন বলুন তো।

এবার অমরনাথ চিনতে পারলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিন্তু তিনি তো অনেককাল হল গত হয়েছেন। আপনি অমন হুট করে বললে আমি ঠাওর করব কি করে?

করা উচিত। যদি বলি রবীন্দ্রনাথের নাম শুনেছেন তাহলে তো পাড়ার কোন রবির কথা নিশ্চয়ই ভাববেন না। আমি কেশব সেনের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। চলুন ভেতরে।

প্রতিক্রিয়া কি হবে জানেন না। নিজেকে তিনি কিছুটা রক্ষণশীল বলে মনে করেন কিন্তু গোড়ামি নেই। সেটা আছে অঞ্জলির। চাল চলুন বলনে। মনোরমা ব্যাপারটাকে কি চোখে দেখবেন সেটাও একটা প্রশ্ন। কিন্তু এখন কিছু করার উপায় নেই। নবনীর আবার রাগ এল তাঁর। শেষ হাতটা যদি বোকার মত ডাবল না দিয়ে বসত তাহলে দুজনে একসঙ্গে ফিরে আসতেন। পথে রমলা সেনকে পেলে তিনি থেকে যেতেন নবনীর বাড়িতে। সে থাকে একা। বিয়ে থা করেনি। বিমলা সেনের আপত্তি হলে নবনী তার বাড়িতে চলে আসতে পারত। কিন্তু এসব ভেবে আর লাভ কি। অমরনাথ দরজার কড়ার মৃদু আওয়াজ করলেন।

সঙ্গে সঙ্গে অঞ্জলির গলা ভেসে এল, কে?

আমি। জানান দিয়েই সংশোধন করে নিলেন অমরনাথ, আমরা।

ভেতরে অঞ্জলির গলা আর একটু উঁচুতে উঠল, কি তাস খেলার নেশা বাবা, রাত কত হল তাও খেয়াল করো না। কতক্ষণ এভাবে জেগে থাকা যায়।

দরজাটা যখন খুলছে তখন রমলা সেন খেঁকিয়ে উঠলেন, আপনি তাস খেলেন?

অমরনাথ দেখলেন অঞ্জলি যেন একটু অপ্ৰস্তুত। সে ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। রমলা অঞ্জলির দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি জেগে থাকেন কেন? এই ভদ্রলোক নিজের শখ মেটাতে যদি শেষ রাত করেন তাহলেও আপনি জেগে থাকরেন? না না। অমরনাথবাবু, আপনি তাস খেলতেই পারেন, সারারাতও পারেন। কিন্তু উনিও তখন ঘুমাতে পারেন।

অমরনাথ তাড়াতাডি বললেন, এ সব কথা এখন থাক। আপনি ভেতলে এসে বসুন।

অঞ্জলি দরজা থেকে সবে দাঁড়াল। ঘরে ঢুকে বিমলা বললেন, আপনাদের ইলেকট্রিসিটি নেই।

না। এখনও আসেনি।

চায়ের বাগান কিসে চলে, ইলেকট্রিক লাগেনা ফ্যাক্টরিতে?

ওখানে আছে। সাহেবদের কোয়ার্টার্সে আছে।

দিস ইজ ব্যাড। রমলা বসে পড়লেন চেয়ারে, বসলাম। আপনার সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে শরীরে ব্যথা হয়ে গিয়েছে।

অমরনাথ স্ত্রীর দিকে তাকালেন। সেই মুহূর্তে অঞ্জলি চোখ তুলল। অমরনাথ বুঝলেন এখনই সব কথা খুলে না বললে সমস্যা বাড়বে। তিনি সাইকেলটাকে বারান্দা থেকে তুলে ঘরের এক পাশে রেখে বললেন, তেলিপাড়া থেকে আসছিলাম। মাঝরাস্তায় দেখি এর গাড়ি খারাপ হয়ে আছে। জায়গাটা খারাপ, উনি সাহায্য চাইলেন। এত বাত্রে কোথায় নিয়ে যাব—

আপনার স্ত্রী তো? চেয়ারে বসেই হাত তুললেন বিমলা সেন।

হ্যাঁ। ওর নাম অঞ্জলি।

নমস্কার। আমাক নাম রমলা সেন। কলেজে পড়াই। এসেছিলাম এক ভদ্রলোকের অনুরোধে তার চা-বাগানে। আজ সকালেই এসেছিলাম। সন্ধের পারে বুঝলাম লোকটা মোটেই ভদ্রলোক নয়। তাই ফিরে যাচ্ছিলাম। পথে গাড়ি খারাপ হয়ে গেল। আজকের ্রাতটা ভাই এখানেই থাকব। আপনার আপত্তি নেই তো?

এত ক্ষণে অঞ্জলি কথা বলল, না না। বেশ তো।

আমাকে নিয়ে কোন চিস্তা করবেন না। মশা আছে?

অমরনাথ বললেন, হ্যাঁ। মশাবি টাঙালে অসুবিধে হবে না।

অঞ্জলি আবার স্বামীকে দেখে নিয়ে বলল, আপনি একটু বিশ্রাম করুন। আমি আসছি।

এখন চা-বাগানে গভীর রাত। দুটো প্ৰায় ঘুমন্ত ঘর পেরিয়ে অঞ্জলি ভেতরের বারান্দায় চলে এসে মনোরমার দরজায় মৃদু অথচ দ্রুত আঘাত করল, মা, মা! উঠুন, একবার। মনোরমা খানিকটা অবাক হয়ে আঁচল সামলাতে সামলাতে দরজা খুলে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হল। অমর ফেরেনি এখনও?

অঞ্জলি মাথা নাড়ল, না-না। ফিরেছে। কিন্তু সঙ্গে একজন ভদ্রমহিলাকে নিয়ে এসেছে। কলেজে পড়ায়। চোখে মুখে কথা বলেন। আজ রাত্রে এখানে থাকরেন। কিন্তু কি খেতে দেব বুঝতে পারছি না বলে আপনাকে ডাকলাম। আপনি একবার চলুন।

আমি গিয়ে কি করব? মনোরমা জানতে চাইলেন, কোত্থেকে নিয়ে এল আমার ওকে?

রাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে পড়েছিল। আপনার ছেলের কাছে সাহায্য চেয়েছিল।

ওমা। রাতবিরেতে অজানা অচেনা মেয়েমানুষ সাহায্য চাইলেই তাকে বাড়িতে বয়ে আনতে হবে। করে ওর আক্কেল হবে বল দিকিনি! জীবনে একবার ভুল করলে তো মানুষের শিক্ষা হয়! মনোরমার গলা ওপরে উঠছিল। অঞ্জলি সাত তাড়াতাড়ি ইশারা করতে সেটা নেমে এল। পাশেই কৌতূহলী চোখে বিছানা ছেড়ে এসে দাঁড়িয়েছে দীপা। অঞ্জলি তাকে কড়া গলায় বলল, অ্যাই শুতে যা। সারা পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে আর মেয়ের চোখ ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে।

মনোরমা তখন সমস্যার ভেতরে ঢুকে গিয়েছেন, কি খায়—যদি একবার জিজ্ঞাসা করে নিতে।

অঞ্জলি বলল, আমার লজ্জা করছে।

হঠাৎ দীপা প্রশ্ন করল, আমার লজ্জা করবে না। আমি জিজ্ঞাসা করে আসব?

মনোরমা অবাক হয়ে বললেন, এমা! কি ব্যাপারে কথা বলছি তুই জানিস?

দীপা মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। তুমিই তো বল সবসময় চোখ খোলা আর কান খাড়া করে থাকবি।

অঞ্জলি হাসি চাপল। তারপর বলল, তুই ঘুমের মধ্যেও তাই করিস বুঝি!

আমার তো ঘুম আসেইনি। যাব? দীপা ছটফটিয়ে উঠল।

মনোরমা বললেন, দাঁড়াও। তারপর অঞ্জলিকে জিজ্ঞাসা করলেন, অমর ওখানে আছে?

অঞ্জলি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। মনোরমা নাতনিকে বললেন, তুই গিয়ে তোর বাবাকে জিজ্ঞাসা করবি উনি ভাত না রুটি খাবেন?

দীপা ছুটল। চারপা গিয়েই সে কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ফিরে এল, আমার পিঠের বোতামটা লাগিয়ে দাও না।

অঞ্জলি সেখানে হাত দিয়ে হতাশ হলো তুই আবার এই জামাটা পারে শুয়েছিস? তোকে বলেছিলাম না বোতাম না লাগানো পর্যন্ত এটা পরবি না।

একটা তো ছিল। আমার খুব আরাম লাগে শুতে–

আরাম লাগে! এর মধ্যেই আরাম বুঝে গিয়েছ! যাও খুলে অন্য জামা পরে নাও। যে বোতামটা ছিল সেটিও হারিয়েছ।

জামা শরীরে গলালেই চুলে চিরুনি বোলাতে হয়। কিন্তু আয়নাব কাছাকাছি কোন হ্যারিকেন জ্বলছে না। নিজের আরছা মুখের দিকে তাকিয়ে আন্দাজে চিরুনি চালিয়ে দীপা বাইরের ঘরের দাবজায় চলে এল। অমরনাথ কিছু বলছিলেন। মেয়েকে দেখে চুপ করে গেলেন। দীপা আর একটু এগোতেই ভদ্রমহিলাকে দেখতে পেল। কিরকম করে শাড়ি পরা। মায়েদের বয়সী হবে। মুখটা সুন্দব কিন্তু খুব শক্ত শক্ত। সে জিজ্ঞাসা করল, আপনি রুটি না ভাত খাবেন?

আমি যে কিছু খাব তা ভাবলে কি করে? রমলা সেন হাসলেন।

সারারাত তো না থেযে কেউ থাকে না।

ইন্টারেস্টিং! তুমি কি শুনেছ পৃথিবীর অনেক লোক একবেলা খেয়ে থাকে?

শুনলাম।

বাঃ! কি নাম তোমার?

দীপাবলী মুখোপাধ্যায়। আপনার নাম?

রমলা সেন। রমলা যেন একটু থমকে গেলেন।

কি খাবেন বলুন?

যা তোমাদের সুবিধে। তোমার খাওয়া হয়ে গেছে?

কখন! বাবার জন্যে মা বসে থাকে, আজ আপনি এলেন।

রমলা সেন উঠলেন, আপনার স্ত্রী কোথায় অমরনাথবাবু? কি যেন নাম! অঞ্জলি।

রমলা দীপার পাশ কাটিয়ে ভেতরের ঘরে ঢুকে গলা তুললেন, ভাই অঞ্জলি! অঞ্জলি! মেয়ের পেছন পেছন উত্তরটা শোনার জন্যে চলে এসেছিল অঞ্জলি অতএব একদম মুখোমুখি পড়ল। রমলা তাকে দেখামাত্র বললেন, শোন, তুমি যদি ব্যস্ত হও তাহলে ভাই আমি খুব লজ্জায় পড়ব। তোমাদের দুজনের জন্যে যা আছে তাই ভাগ করে তিনজনে খাব। তোমাদের যদি কষ্ট হয় তাহলে একটু মেনে নাও, বুঝলে।

অঞ্জলি বলল, এই বাড়িতে যখন এসেছেন তখন ব্যাপারটা আমাদের ওপর না হয় ছেড়ে দিন। আপনি ববং হাতমুখ ধুয়ে নিন।

সঙ্গে সঙ্গে রমলা সেন গলা তুললেন, আচ্ছা জ্বালাতন তো। এই করেই বাঙালি মেয়েরা নষ্ট হয়ে, গেল। এই রাতদুপুরে তুমি বাঁধতে বসবে? পাগল! আচ্ছা বাবা, যদি তোমাদের বেশ খাবাব না থাকে তাহলে আমায এক বাটি মুড়ি দাও। তাতেই চলবে।

অঞ্জলি তো হতবাক। একদম অচেনা মানুষ এমন ধমক দিয়ে কথা বলতে পারে! এইসময় এইসময় মনোরমার গলা ভেসে এল ভেতরের বারান্দায় যাওয়ার দরজা থেকে, উনি যা বলছেন তা তো বাড়িতে যা আছে তাই ধরে দাও। অতিথি নারায়ণ, যত্নের সঙ্গে যা দেবে তাতেই তিনি খুশী হন।

রামলা সেন এগিয়ে গেলেন, আপনি কে হন এদের?

অমর আমার ছেলে । মনোরমা জানালেন।

নমস্কার। রমলা সেন হাত জোড় করলেন, আপনার কথা আমার খুব ভাল লাগল। তবে আমি নারায়ণ টারায়ণ বুঝি না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আপনাদের ঘুম থেকে তুলে খুব অন্যায় করেছি।

তা কেন? এইসময় কোন আত্মীয়স্বজন তো দূরদেশ থেকে উপস্থিত হতে পারত। যাও বউমা, দাড়িয়ে থেকে রাত বাড়িও না। মনোরমা ফিরে গেলেন নিজের ঘরে।

দীপার ঘুম আসছিল না। এইরকম কথাবার্তা কোন মহিলা বলতে পারে জেনে সে বারে বারে চমকিত হচ্ছিল। রমলা সেন হাত মুখ ধুলেন। অমরনাথের সঙ্গে রান্না ঘরে পিঁড়ি পেতে বসে খেলেন। অঞ্জলিকে বারংবার বলতে লাগলেন একসঙ্গে খাওয়ার জন্যে । অঞ্জলি রাজি হচ্ছিল না । ব্যাপারটা তার অভ্যেসেই নেই। কিন্তু রমলা জেদ ধরলেন অঞ্জলি যদি না খান তাহলে তিনিও খাবেন না। বললেন, আমি কি মনে করব যে তুমি এক সঙ্গে খাচ্ছ না। কারণ আমার ধর্মটা ব্ৰাহ্ম। অঞ্জলি প্রতিবাদ করল। এবং শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে খাওয়া শুরু করল। যদিও দূরত্বটা ছিল অনেকটাই। রান্নাঘর থেকে খাওয়ার ঘর অন্তত হাত দশেক । দীপা পুরো ব্যাপারটা দেখল। তারপর মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাস করল, মা ব্ৰাহ্ম মানে কি? খ্রীস্টান? ধন্দ ছিল অঞ্জলির। শব্দটা সে শুনেছে কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন চেনাজানা মানুষকে ওই ধর্মাচরণ করতে দ্যাখেনি। অঞ্জলি চাপা গলায় বলল, চুপ করো।

অমরনাথ কিন্তু আশ্চর্যরকমের চুপ করে গিয়েছিলন। অঞ্জলি নিজে আলাদা না খেয়ে তাকে আলাদা দিলেই বেশী খুশী হতেন। এ বাড়িতে একটা বেশী ঘর আছে। সকালে ছেলে মেয়েরা সেখানে পড়ে! খাটও আছে। ভদ্রমহিলার শোওয়ার কোন অসুবিধে হবে না। কিন্তু এমন সৃষ্টিছাড়া মহিলার কথা তিনি গল্প উপন্যাসেও পড়েননি; আড় চোখে দেখলেন একবার। অন্ধকার রাস্তায় তাকে থামাবার পর যে রেটে প্রথমে ইংরেজি এবং পরে হিন্দী বলছিলেন তা এখন দেখলে অনুমান করা শক্ত।

খাওয়া শেষ হল। আগে অঞ্জলিরই। রবিবার বলেই বাড়িতে মাছ ছিল। ভাগ করে নিতে অসুবিধে হয়নি। অঞ্জলি বাইরের ঘরে বিছানা করে দিয়ে নিজের দুটো ভাল শাড়ি বের করল। যা পরে আছেন রমলা সেন তা পরে নিশ্চয়ই রাত্ৰে শোবেন না।

ঘরে ফিরে এসে রমলা সেন বললেন, চমৎকার খেলাম। জঙ্গলে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল বাঘের পেটে যেতে হবে নিজের পেট ভরাবার কথা চিন্তাতেও আসেনি। তোমার স্বামীটি ভাই খুব ভাল মানুষ। অন্ধকারে একা পেয়েও কোন বিরক্ত করেনি।

অঞ্জলি অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করল, ওমা, আপনাকে বিরক্ত করতে যাবে কেন?

আচ্ছা মেয়ে তো তুমি? পুরুষমানুষ মেয়েদের কেন বিরক্ত করে তা জানো না? এই এতটা পথ এক সাইকেলে এলাম, একবার পেছনে ফিরেও তাকায়নি যেন আমি একটা ভয়ঙ্কর জীব। স্ত্রী হিসেবে তুমি এই জন্যে গর্বিত হতে পার।

অঞ্জলির কথাগুলো ভাল লাগল না। যত বিপদই হোক হুট করে একটা অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে সাইকেলে কেউ আসে! অঞ্জলি বলল, আপনার সাহস তো খুব।

ওইটেই তো সম্বল। রামলা সেন শাড়িদুটো দেখলেন, আরে একি করেছ! না না তোমার শাড়ির দরকার নেই। এগুলো তুমি নিয়ে যাও।

আপনি রাত্রে ওইটে পরেই শোবেন? নষ্ট হয়ে যাবে কাল সকালে!

সেটা আমি বুঝব। আমি অন্যের ব্যবহার করা শাড়ি পরে শুতে পারি না। শরীর কেমন করে। তাছাড়া এঘরের দরজা বন্ধ করে দিলে তো সব ল্যাঠা চুকে গেল!

অঞ্জলি হেসে ফেলল। দীপা দাড়িয়ে ছিল দরজায়। সেদিকে নজর পড়তে অঞ্জলি বলল, তুমি এখনও ঘুমোওনি? যাও, শুয়ে পড়গে।

দীপা বলল, আমার চোখে ঘুমই আসছে না।

রামলা সেন বললেন, বাঃ । খুব ভাল। এস, ততক্ষণ তোমার সঙ্গে গল্প করি। ঘুম এলেই যে যার বিছানায় চলে যাব।

অঞ্জলি কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। রমলা সেন চেয়ারে বসলেন। বসে দীপাকে ডাকলেন, ওখানে কেন, তুমি বরং ওই খাটে উঠে বস।

কৌতূহলে দীপার পেট ফেটে যাচ্ছিল। বিছানায় উঠে পা ঝুলিয়ে বসে বলল, তোমার বাড়িতে আর কে কে আছে?

রমলা সেন হাসলেন, ‘কেউ নেই শুধু একটা কাজের মেয়ে ছাড়া।

তুমি বিয়ে করোনি?

হুঁ। করেছিলাম।

তোমার বর কোথায় থাকে?

এখন তিনি আর আমার বর নন। তাই আমি আমার মত থাকি।

ওমা । একবার বর হলে আবার বর নয় হবে কেন?

হয়। ধরো, তোমার কোন বন্ধু তোমার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করল। তুমি তার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিলে। সে কি আর তোমার বন্ধু থাকবে? থাকবে না।

বর কি বন্ধু?

হ্যাঁ। কিছু সম্পর্ক আছে যা মানুষ জন্মমাত্র পেয়ে যায়। যেমন মা বাবা দাদা বোন, মাসি পিসি এইসব। এগুলো পেতে মানুষকে কিছু অর্জন করতে হয় না। রক্তসূত্রেই এসে যায়। কিছু সম্পর্ক মানুষ বড় হতে হতে তৈরী করে নেয়, যেমন বন্ধু বান্ধবী, স্বামী। এগুলো নির্ভর করে মনের ওপর। তাই মন না মানলে পরিবর্তন আনা যায়।

দীপা অবাক হয়ে শুনছিল। সত্যি তাই। বিশুর সঙ্গে তোতনের একসময় খুব বন্ধুত্ব ছিল। এখন ওরা কথাই বলে না। কিন্তু মা যদি কথা বন্ধ করে দেয়। তবু মা-ই থাকে। কিন্তু বাবা কষ্ট পেলে মাকে ছেড়ে যেতে পারে, মা-ও তাই? সে জিজ্ঞাসা করল, তুমি ব্ৰাহ্ম? ব্ৰাহ্ম মানে কি খ্রীস্টান?

রমলা সেন মাথা নাড়লেন, না মা। ওটা একটা আলাদা ধর্ম। হিন্দু মুসলমান খ্রীস্টানের মত। এখন বললে তুমি বুঝবে না।

দীপা মাথা নাড়ল, বিয়ে হয়ে গেলে বুঝতে পারব।

ওইটুকুনি মেয়ের মুখে এই কথাটি শুনে হকচকিয়ে গেলেন রমলা সেন, মানে?

ঠাকুমা বলেছে আমি যেসব কথা এখন বুঝতে পারব না তা বিয়ে হয়ে গেলে পারব। দীপা হাসল, ঠাকুমা তো দশ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল তাই তখন থেকেই বুঝেছিল।

রমলা সেনের খুব কষ্ট হল। হঠাৎই। সেই সঙ্গে একটু রেগেও গেলেন, শোন, তোমার ঠাকুমা তো অনেক আগে জন্মেছিলেন। তাই তাঁর সময়ের নিয়ম ছিল আলাদা। বিয়ের সঙ্গে বোঝাবুঝির কোন সম্পর্ক নেই। পড়াশুনা যত করবে, যত নিজের জ্ঞান বাড়াবে, চারপাশের মানুষকে যত জানতে চাইবে তত সবকিছু বুঝতে পারবে। তুমি এখানকার স্কুলে পড়?

হ্যাঁ। পড়াশুনার প্রসঙ্গ তুলতে দীপার মোটেই ভাল লাগছিল না।

এখানে কোন ক্লাস পর্যন্ত আছে?

এইট।

তারপর সবাই কোথায় পড়তে যায়?

বানারহাট, নয় বীরপাড়ায়। যাদের সুবিধে আছে তারা জলপাইগুড়িতে যায়।

তুমি কোথায় যাবে?

জানি না।

শোন, তোমাকে অন্তত গ্রাজুয়েট হতে হবে। বি এ পাশ করলে গ্রাজুয়েট বলা হয়।

আচ্ছা।

আচ্ছা মানে? তুমি কি বুঝতে পারছ আমার কথা? গ্রাজুযেট না হলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না! এই দাখো, তোমার মা ঠাকুমা এখানে আছেন, যদি তোমার বাবা রেগে গিয়ে ওদের বাজার করে না দেন, টাকা পযসা না দেন, খারাপ ব্যবহার করেন তাহলে ওরা কি খেয়ে পারে বাঁচবেন, বল?

খাওয়াই হবে না।

ওরা যদি শিক্ষিত হতেন তাহলে চাকরি করে টাকা রোজগার করতে পারতেন। কারো দয়ার ওপর বাঁচতে হত না। এই দাখো আমি, কলেজে পড়াই, মাইনে পাই, নিজের একটা গাড়ি আছে তাতে চড়ে যেখানে ইচ্ছে বেড়াতে যাই, আমাকে কারো দয়ায় বাঁচতে হয় না।

আর তোমার বর?

তার মত সে আছে। আবার বিয়ে করে বউ নিয়ে ঘর করছে।

তুমি আবার বিয়ে করোনি কেন?

ইচ্ছে হয়নি বলে।

দীপা পূৰ্ণ-দৃষ্টিতে রমলা সেনকে দেখল। রমলা হাসলেন। তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একটা কাগজ কলম বের করে কিছু লিখে সেটা দীপার হাতে দিলেন, এখানে আমার ঠিকানা লিখে দিলাম। তুমি প্রত্যেক মাসে একটা করে চিঠি দেবে আমাকে মনে করে, বুঝলে? আমরা চিঠিতে মনেব কথা বলাবলি করব। তোমাকে আমার খুব মিষ্টি লাগছে দীপাবলী।

কাগজটা ভাঁজ করে উঠে পড়ল দীপা, তুমি এখন ঘুমাবে?

চেষ্টা করব। তোমার ঘুম পেয়েছে বুঝি? যাও, শুয়ে পড়। গুড নাইট।

দীপা কাগজটা নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে দেখল বাবা শুয়ে পড়েছে। মা গালে হাত দিয়ে বসে রয়েছে বিছানার পাশে। সে ভেজানো দরজা খুলে অন্ধকার বারান্দায় চলে এল। সঙ্গে সঙ্গে উঠোনের গাছপালাগুলো বিচিত্র ছবি এঁকে ফেলতেই এক দৌড়ে ঠাকুমার দরজায় পৌঁছে জোরে ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। মনোরম ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাঁর নাক মৃদু ডাকছিল। দীপা দরজা বন্ধ করে ঠাকুমার পাশে নিঃশব্দে শুয়ে পডল। তারপর হাতের কাগজটা বালিশের তলায় ঢুকিয়ে দিয়ে মনে মনে বলল, গুড নাইট। বলেই ফিক করে হেসে ফেলল।

দরজা বন্ধ করে পাশে শুতে শুতে অঞ্জলি বলল, মনে হচ্ছে তুমি খালি কেটে কুমির আনলে।

কেন? অমরনাথের আজ কিছুতেই ঘুম পাচ্ছিল না। এমন বিচিএ মহিলা তিনি কখনও দ্যাখেন নি। কুমিব শব্দটা শুনে অস্বস্তি হল। অঞ্জলি তাকে সন্দেহ করছে নাকি।

এতক্ষণ কানে তুলো দিয়ে বসেছিলে নাকি? পাশের ঘরে যেসব কথা হচ্ছিল শোননি।

শুনেছি। স্বস্তিটা ফিরে এল অমরনাথের।

মেয়েটার মনে একগাদা উল্টোপাল্টা ভাবনা ঢুকিয়ে দিলেন উনি।

কাল সকালেই সব ভুলে যাবে।

ভাল মন্দ বিবেচনা করছি না, হুট করে একজন অচেনা মহিলাকে নিয়ে এলে কি করে তাই ভাবছি। এই বাগানের আর কেউ নিয়ে আসত কক্ষনো না। অঞ্জলির গলায় এবার জ্বালা। ব্যাপারটা যে ঠিক হয়নি তা মনে মনে জানেন অমরনাথ। তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় বলে মনে করলেন।

অঞ্জলি জবাব না পেয়ে বলল, আজ সাবাটা বা ত জেগে বসে থাকতে হবে?

কেন? অমরনাথ প্রশ্ন না করে পারলেন না।

চমৎকার বুদ্ধি। তুমি না জেনে শুনে বাড়িতে এনেছ বলেই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে তার কি মানে আছে। অমন গায়ে পড়ে পড়ে কথা বলা, স্বামীর সঙ্গে না থাকা মেয়ে আসলে যে কি তাই তো জানি না। সকালে উঠে যদি দেখি বাড়ি সাফ হয়ে গিয়েছে তখন কাউকে ঘটনাটা বলতে পারব? কেউ বিশ্বাস করবে?

রমলা সেনকে আর যাই হোক চোর ভাবতে পারছেন না আমরনাথ। চোর কখনও গাড়ি চালায় না। চোর কখনও তিনটে ভাষায় অনর্গল কথা বলে না। ববং তাঁর মনে হচ্ছিল ভদ্রমহিলা এ বাড়িতে জোর করে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে আছেন। এই মুহূর্তে তাঁর মনে হল অঞ্জলি মালবাজারে বড় হয়েও একেবারে গেয়ো হয়ে আছে। সেই তুলনায় মনোরমা অনেক আধুনিক। তিনি রমলাকে গ্রহণ করতে কোন আড়ষ্টতা দেখাননি।

পাশ ফিরে শুতে গিয়েই সকালবেলাব ঘটনাটা মনে পড়ল অমরনাথের। সারাদিন এমন ঝামেলায় কেটে গেল যে অঞ্জলিকে বলারই সময় পাননি। পাতিবাবুর বেয়াই দীপার জন্যে একটি সম্বন্ধ এনেছেন। অমরনাথের মনে হল প্ৰসঙ্গটি তুললে অঞ্জলির মন বিমলা সেন থেকে সরে আসবে। কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটার পাব অমরনাথ চাপা গলায় বললেন, আজ সকালে একটা কাণ্ড হয়েছে। কি করব বুঝতে পারছি না।

অঞ্জলি কোন উত্তর দিল না। অমরনাথ আর একটু সময় কাটিয়ে বললেন, বাজারে যাওয়ার সময় পাতিবাবু ডেকে পাঠালেন। ওর বেয়াই এসেছেন জলপাইগুঁড়ি থেকে। গেলাম। ভদ্রলোক দীপাকে দেখেছেন। ওর ভাইপোর জন্যে গৌরী খুঁজছেন। বললেন, খুব পছন্দ হয়েছে দেখে। যদি আমাদের অমত না থাকে তাহলে শুভকাজটা করে ফেলতে পারেন।

অঞ্জলি বিছানা থেকে উঠে পড়ল। অমরনাথ ঈষৎ হতচকিত। এই বুঝি কোন কাণ্ড করে বসে। কিন্তু অঞ্জলি শুধু কুঁজো থেকে এক গ্লাস জল গড়িয়ে নিয়ে ঢকঢ়ক করে খেয়ে ফের বিছানায় ফিরে উল্টো মুখ করে শুয়ে পড়ল। অমরনাথ কি করবেন ভেবে পেলেন না। মনে হয়েছিল পাতিবাবুর বেয়াই-এর প্রস্তাব শুনে অঞ্জলি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে, এবং তাই নিয়ে কিছুক্ষণ কথা চালাবে। অথচ এসবের কিছুই হল না।

কাজের দিন প্ৰায় অন্ধকার থাকতেই ঘুম থেকে উঠতে হয় অমরনাথকে। সাড়ে ছটায় তাকে পৌঁছে যেতে হয় অফিসে। শীত এখনও নামেনি। কিন্তু দিন ছোট হয়েছে, সকাল হচ্ছে একটু দেরি করেই। কেডসের ওপর হাফপ্যান্ট আর মোটা হাওয়াই সার্ট পারে অঞ্জলির দেওয়া চা খেয়ে নিলেন তিনি। ছেলেমেয়েরা ঘুমাচ্ছে। এইসময় দীপা শিউলি তুলে ফিরল। আজ তার হাতে ছোট্ট বেতের সাজি। অমরনাথ মেয়েকে দেখলেন। ঘরের হ্যারিকেন এখনও নেবানো হয়নি। নরম গলায় বললেন, কখন গিয়েছিলি ফুল তুলতে?

অনেকক্ষণ! দীপা হাসল। এখনও মুখ ধোয়নি সে।

ভয় করে না। বাইরে তো কেউ নেই!

ওমা ভয় পারে কেন?

অঞ্জলি খাটে বসে লক্ষ্য করছিল দুজনকে, বলল, ফুলগুলো ঠাকুরঘরে রেখে এসে পাশের ঘরে ওঁর ঘুম ভাঙ্গাও। দীপা মাথা নেড়ে অদৃশ্য হতেই অমরনাথের মন ভাল লাগল। কথাটা নিজের মুখে বলতে কেমন যেন বাধো বাধো লাগছিল। ও ঘরেব দরজা না খোলালে তিনি সাইকেল পাবেন না। এতটা রাস্তা সাইকেল ছাড়া, যাওয়াও অসম্ভব। আর তখনই অঞ্জলি চাপা গলায় বলল, বাইরের ঘরে যিনি আছেন তাঁর জন্যে কি কি করতে হবে?

কি আর করবে? ঘুম থেকে উঠলে এক কাপ চা করে দিও; কাজের মানুষ চলে যাবেন।

ওরা গাড়ি নাকি কোথায় পড়ে আছে? অঞ্জলির কথার মধ্যে একটু বাঁকা সুর।

হ্যাঁ। সেটা উনি বুঝবেন। জিজ্ঞাসা করলে বলে দিও পেট্রল পাম্পে গিয়ে খবর নিতে।

দীপার দরজা ধাক্কানোর শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল বিমলা সেনের। ইংবেজিতে তিনি অপেক্ষা করতে বলে বা হাতে হাই তোলা মুখ ঢাকতে ঢাকতে দরজা খুলতেই দীপা অবাক হয়ে গেল। রমলা সেন শুধু শায়া আর ব্লাউজ পরে বয়েছেন। ওই অবস্থায় বললেন, গুড মর্নিং।

দীপার মনে পডল কাল রাত্রে উনি তাকে গুড নাইট বলেছিলেন। গুড শব্দটা পাল্টায় নি শুধু নাইটটা মনিং হয়ে গেল। দীপা বলল, বাবা অফিসে যাবে তো, তাই—।

সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় করে আঁতকে উঠলেন রমলা সেন। তারপর দ্রুত ফিরে গিয়ে শাড়িটাকে শরীরে জড়িয়ে নিলেন। এত দ্রুত শাড়ি পরতে কাউকে দাখেনি দীপা। সে আরও মুগ্ধ হল। তিনি ভদ্রস্থ হওয়ামাত্র সে গলা তুলল, বাবা ওঁর হয়ে গিয়েছে। তুমি এখন আসতে পার।

কয়েক সেকেন্ড বাদে অমরনাথ ঘরে ঢুকলেন, নমস্কার। রাত্রে ঘুম হয়েছিল তো? আসলে আমার সাইকেলটা এখানে ছিল বলে আপনাকে বিরক্ত করা হল। ঠিক আছে আপনি চা-টা খেয়ে নিন, আমি চলি ডিউটি আর কি?

আপনি তো নিজেই সব বলে যাচ্ছেন, আমি তো সুযোগই পেলাম না। রমলা হেসে ফেললেন, ঠিক আছে। আসুন। আশ্রয় দেবার জন্যে অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

দীপা দেখল বাবা কেমন একটা অদ্ভুত রকমের মুখের ভঙ্গী করে বাইরের দরজা খুলে সাইকেল নিয়ে মাঠে নেমে গেল। বারান্দায় রমলা এগিয়ে গেলেন। দীপা ওর পাশে দাঁড়াতেই মনে হল বাবা আজ একটু বেশী জোরে সাইকেল চালাচ্ছে। কেন?

শিশির ভেজা ঘাস, কুড়িয়ে নেওয়ার পরেও নতুন করে ঝরে পড়া শিউলি, চাঁপার গন্ধ মাখা বাতাস আর সূর্য-উঠব-উঠব সময়ের আকাশ দেখতে দেখতে রমলা সেন বললেন, ফ্যান্টাস্টিক? দীপা অবাক হয়ে তাকাল। ফ্যান্টাস্টিক কথাটার মানে কি? রমলা সেন তার পরেই বললেন, দীপা, একদিক দিয়ে তুমি খুব লাকি! এমন একটা জায়গায় বড় হচ্ছে যেখানে প্রকৃতি দুহাত ভরে মানুষের মন ভরানোর উপকরণ সাজিয়ে রেখেছে।

এই সময় অঞ্জলি দরজায় এসে বলল, আপনি চায়ের সঙ্গে কি খান?

কিছু না। শুধু চা। আমি একটু বাথরুম থেকে ঘুরে আসি। দাখো ভাই, কাল রাতে অন্ধকারে কোন অসুবিধে হয়নি, আজ আলো ফুটতেই—। হেসে ফেলেন রমলা সেন, আমাকে একটা তোয়ালে দেবে? মানে, একটা গামছা হলেও চলবে।

তাস খেলে প্ৰাইজ পাওয়া একটা বিরাট তোযালে আলমাবি থেকে বের করে দিল অঞ্জলি।

আধঘণ্টা বাদে রমলা সেন বিদায় নিলেন। মনোরমাকে বললেন, মাসীমা, নিশ্চয়ই আপনাদের খুব অদ্ভুত লেগেছে কিন্তু কাল এখানে আশ্ৰয পেয়ে আমি উপকৃত হয়েছি।

মনোরমা বললেন, মানুষেব বিপদে আপদে এটুকু না করলে কি চলে। কিন্তু তুমি একা একা ঘুরে বেড়াও কেন মা? এটা ঠিক নয়।

রমলা কিছু বলতে গিয়ে, সামনে নিলেন, না, আপনার সঙ্গে তর্ক করর না। তারপর অঞ্জলিকে বললেন, রাগ করা উচিত ছিল তোমারই। স্বামী যদি রাত বিরেতে একজন অচেনা মেয়েকে ধরে নিয়ে আসে তাহলে কোন বউই খুশী হতে পারে না। তবে বলি ভাই স্বামীটি সত্যি ভাল পেয়েছ! আর হ্যাঁ, এই মেয়েটাকে পড়াশুনা করতে দিও! ওর ভেতর কৌতূহল আছে। ওকে চট করে বিয়ে থা দিয়ে দিও না।

অঞ্জলি ঠোঁট টিপলেন। দীপা তাকে মাঠ পেরিয়ে আসাম রোড পর্যন্ত এগিয়ে দিল। অঞ্জলি অমরনাথের কথামত রমলাকে পেট্রল পাম্পের সন্ধান দিয়ে দিয়েছে। ওখানে গেলে তিনি এখন মেকানিক পেয়ে যাবেন। বিমলা দীপার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, এবার আসি। মন দিয়ে পড়াশুনা করবে। বড় হবে। আমার ঠিকানাটা লিখে দিয়েছি ওটা খাতায় লিখে রাখবে আর প্রত্যেক মাসে একটা করে চিঠি দেবে আমাকে। বুঝলে? তোমাকে আমার কিছু দেওয়া উচিত ছিল। সঙ্গে তো নেই। আমি শিলিগুড়িতে গিয়েই পাঠিয়ে দেব তোমায়।

আসাম রোড ধরে চৌমাথার দিকে যে শরীরটা চলে গেল তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দীপা। এতকালের চেনাশোনা কোন মানুষের সঙ্গে এঁর কোন মিল নেই। মা বা ঠাকুমার থেকে অনেক অনেক তফাত।

দিন সাতেক বাদে দীপার নামে একটা পার্সেল এল। সবাই খুব অবাক। দীপা নিজে দারুণ উত্তেজিত। এই প্রথম তার নামে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে কিছু এল। মোড়ক খুলতে, বইটা বেরিয়ে, এল। দীপা নামটা পড়ল, লেটার্স ফ্রম এ ফাদার টু এ ডটার।

০৫. সত্যসাধন মাস্টার

সত্যসাধন মাস্টার প্রতি সন্ধ্যায় দীপাকে পড়াতে আসবেন। মাসান্তে তাঁকে দশ টাকা দিতে হবে। ব্যাপারটা মনোরমার পছন্দ হয়নি। তাঁর স্মরণে পড়ে না কখনও পরিবারের কাউকে পড়ানোর জন্যে মাস্টার এসেছে কিনা। এমন কি অমরনাথের ছাত্রাবস্থায্য মাস্টারের প্ৰযোজন হয়নি। ব্যাপারটা তিনি সরাসরি অঞ্জলিকে জানিয়েছিলেন। যে মেয়ে পনের পড়তেই গোত্রান্তরিত হবে তাকে মাস্টার রেখে বিদ্যাধরী করে লাভ কি। ওই টাকা মাসে জমিয়ে রাখলে বিয়ের সময় কাজে দেবে। মনোরমা না বলে পারলেন না, তাছাড়া তোমরা একটু বাড়াবাড়ি করছ বউমা।

অঞ্জলি ঠোঁট টিপে বসেছিল। দশ টাকা খরচ করতে তার সত্যি গাযো লেগেছিল। কিন্তু তার কমে যে মাস্টার পাওয়া যায় তারা সবাই ছেলেছোকরা। সত্যসাধনের নামে আছে পড়ানোতে। কয়েকটা খরচ কমাতে হবে। আসাম রোড থেকে মাছমাবাদে্র হুটহাট ডাকা যাবে না। কিন্তু পড়াশুনায় মাথা আছে মেয়েটার, সত্যসাধন ওবি সম্পর্কে বি আশাবাদী, যেটুকু করা যায়, সেটুকু না করলে মনে খচখচ কাটা ফুটেই থাকরে। যদি ও রমলা সেন মেয়েটাকে যেমন কথা বলে গিয়েছে তা শোনার পর—। অঞ্জলি মুখ নিচু করল। ওরা বসেছিল বারান্দায়। একটু আগে দুপুরে্র খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিয়ে অমরনাথ ফিরে গিয়েছেন কাজে! দীপার ফেরার সময় হয়নি। স্কুল থেকে। ছোট দুটোকে নিয়ে ও ফিরতে এখনও ঘণ্টাখানেক দেরি। অবশ্য বুধুয়া যায়। ওদের আনতে। আর এই দীপার সঙ্গে বুধুয়ার নিত্য লেগে আছে। এই সময়টা অঞ্জলি মনোরমার সঙ্গে বারান্দায় বসে আসাম রোডে গাড়ি যাওয়া আসা দ্যাখে। মনোরমা বললেন, অনেকদিন বাদে লক্ষ্মী আসছে। ভেতর থেকে দুটো মোড়া নিয়ে এস।

অঞ্জলি দেখল কদম গাছের পাশ কাটিয়ে পরিষ্কার সাদা শাড়ির ঘোমটা মাথায় তুলে আসছেন লক্ষ্মীবউদি। খুব ঠাণ্ডা মানুষ। পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। কিন্তু অসুখ বিসুখে বয়স আরও বেশী দেখায়। লক্ষ্মীবউদি এক নন। বাগানের কোয়ার্টার্সগুলোতেই তিনি এক যাওয়া আসা করেন না। সম্ভবত আসবাব সময় ছোট পাতিবাবুর স্ত্রী বীণাবউদিকে ডেকে নিয়েছেন! বীণা বউদিরও বয়স হয়েছে, শরীর ভারী, একটু বেশী কথা বলেন। অঞ্জলি ভেতর থেকে দুটো মোড়া তুলে নিয়ে আসতে আসতে শুনল মনোরমা বলছেন, কেমন আছ লক্ষ্মী, এতদিনে একটু সময় পেলে?

লক্ষ্মীবউদি হাসলেন, জবাব দিলেন না। বীণাবউদি বললেন, তা মাসীমা, আমরা তে সংসারে বিনিপয়সার ঝি, খাটতে খাটতে চোখে ধুতরো ফুল দেখছি, পান থেকে চুন খসলে তো চোখ রাঙানি, আপনার তো ঝাডা হাত পা, আপনি তো যেতে পারেন।

অঞ্জলি হেসে ফেলল। মোড়া এগিয়ে দিয়ে বলল, বসুন। মা অবশ্য গতকাল গিয়েছিলেন বড়বাবুর বাড়িতে ঠাকুর গড়া দেখতে ।

বীণাবউদি বললেন, ওমা। ঠাকুরের গায়ে তো এখন ভাল করে দড়ি বাঁধাই হয়নি। তা অতটা দূর যখন যেতে পারলেন তখন আর একটু এগিয়ে আমাদের বাড়িতে যেতে কি অসুবিধে ছিল? বিজয়ার পরেও তো যাননি।

বিজয়ার পরে কি তোমরাও এসেছ? লক্ষ্মীপুজো পেরিয়ে যেতেও না। মনোরমা বললেন।

লক্ষ্মীবউদি আঁচল টেনে বসলেন, আপনি এখন কেমন আছেন মাসীমা?

আছি। মনোরমা হাসলেন।

অঞ্জলি বলল, গতকাল যদি আপনারা মায়ের মুখ দেখতেন!

বীণাবউদি অবাক হল, কেন কি হয়েছিল আপনার?

অঞ্জলি বলল, আহা, আমার কাছে শুনুন না। আমরা তো গিয়েছি। ঠাকুর গড়া দেখতে। তা বড়বাবুর বাবা খালি গায়ে লুঙ্গি পরে বসেছিলেন। দেখামাত্র ধড়মড় করে উঠে পাঞ্জাবি চাপিয়ে ফিরে বকর বকর আরম্ভ করলেন। আমি ওঁকে এড়াতে ভেতরে গেলাম ছোট লক্ষ্মীদির সঙ্গে কথা বলতে। গিয়ে দেখি তিনি কলঘরে। কি আর করি! ফিরে আসছি, ভেতর থেকেই শুনলাম বড়বাবুর বাবা মাকে বলছেন—। মুখে আঁচল দিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ল অঞ্জলি।

মনোরমা ধমকে উঠলেন, আঃ বউমা, বুড়োমানুষকে নিয়ে মশকরা করা ঠিক নয়।

অঞ্জলি হাসতে হাসতেই বলল, না মা, উনি বুড়োমানুষের মত কথা বলেননি।

বীণাবউদির আর তাঁর সইছিল না, বল না অঞ্জলি কি বলছিল বুড়ো?

অঞ্জলি বলল, হরিদ্ধারে যাওয়ার বাসনা হয়েছে, কিন্তু একা যান কি করে, তাই মাকে সাধছেন সঙ্গে যেতে। মায়েরও তো কোথাও যাওয়া হয়না।

বীণাবউদি উঁচু গলায় এমন হেসে উঠলেন যে সামনের মাঠে ঘাস খেতে খেতে একটা গরু মুখ তুলে তাকাল। লক্ষ্মী বউদি নরমগলায় বললেন, হয়তো সরল মনেই বলেছেন।

সরল মন? বীণাবউদি হাসি থামালেন, নাম যাঁর তেজেন্দ্র তাঁর স্বভাবে নরম ভাব থাকরে কি করে! কাকীমা মারা যাওয়ার পর সেই তেজ সংবরণ করেছিলেন না তা অনেকেই জানে। আসলে পুরুষমানুষ চিতায় উঠলেও যদি চোখ মেলাব সুযোগ পায় তবে সেটা মেলবে মেয়েমানুষের দিকে। একদম বিশ্বাস করবেন না মাসীমা!

মনোরমা বললেন, আমি তোমাদের চেয়ে অনেক আগে পৃথিবীতে এসেছি বীণা।

হাসি মস্করা একটু যেন থিতিয়ে গেল। লক্ষ্মীবউদি আবার আঁচল টানলেন, মাসীমা, আপনারা কি ভাবলেন? উনি দুপুরে যাওয়ার আগে বললেন আপনার সঙ্গে কথা বলতে।

কি ব্যাপার বল তো?

বেয়াইমশাই আপনার ছেলের সঙ্গে যে কথা বলেছিলেন—

তোমার বেয়াই? কি প্ৰস্তাব? কই, আমি জানি না তো? মনোরমা অবাক হলেন।

লক্ষ্মীবউদি অঞ্জলির দিকে তাকালেন। অঞ্জলি বলল, কাল রাত থেকে এত ঝামেলা গেল যে ও সময় পায়নি। বাত্রে ঘুমানোর সময় কিসবা বলছিল যেন!

মনোরমা বললেন, কি বলছিল অমর?

অঞ্জলি মাথা নাড়ল, আমি ভাল করে শুনিনি।

বীণাবউদি বললেন, পুরুষমানুষের যা বলার তা ওরা রাতে শোওয়ার সময় বলে। তখন তো মন দিয়ে শুনতে হয়। তুমি কী গো!

অঞ্জলি বলল, ব্যাপারটা এমন যে আমি কান দিইনি।

মনোরমা বিরক্ত হলেন। লক্ষ্মীবউদির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার বল?

লক্ষ্মীবউদি বললেন, বেয়াই মশাই এসেছিলেন হঠাৎই। একটা রাত ছিলেন। অমন নামী মানুষ, আমি কি করব কি করব না এই ভয়েই মারি। তা উনি সকালে ওঁর সঙ্গে বসেছিলেন বাইরের বারান্দায়। সেইসময় দীপাকে দেখতে পান বিশুর সঙ্গে বাজারে যেতে।

অঞ্জলি হী হয়ে গেল, দীপা আর বিশু বাজারে গিয়েছিল?

মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন লক্ষ্মীবউদি। মনোরমা জিজ্ঞেস করলেন, তারপর?

দীপাকে দেখে খুব পছন্দ হয়েছে বেয়াই মশাই-এর। উনি তখন শ্যামলকে দিয়ে আপনার ছেলেকে ডেকে পাঠালেন বেয়াই মশাই তখন প্রস্তাবটা করেছিলেন। গতকাল সকালেই তো ব্যাপারটা হল।

লক্ষ্মীবউদি আঁচল তুললেন আবার। বীণাবউদি বললেন, ওমা! দীপার বিয়ের সম্বন্ধ এল? পাত্র কি করে কোথায় থাকে?

লক্ষ্মীবউদি হাসলেন, আমার বেয়াই-এর ভাই খুব অবস্থাপন্ন মানুষ। ব্যবসা করেন। ওঁর স্ত্রীর ইচ্ছে অল্প বয়সে ছেলের বিয়ে দেন। বাড়িতে গৌরি আনেন। কিন্তু মেয়েকে হতে হবে খুব মিষ্টি দেখতে। তা বেয়াইমশাই-এর নজর দীপার ওপর পড়তেই তিনি আপনার ছেলের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন। ওঁদের মধ্যে তো অনেকক্ষণ কথাবার্তা হয়েছিল।

মনোরমা চিন্তিত মুখে বললেন, সেকি কথা। আমার তো আমায কিছু বলেনি।

বীণা বউদি বললেন, এ ভারি অন্যায় কথা। মেয়ের বিয়ে দিতে নাভি শ্বাস ওঠে। বাড়ি বয়ে সম্বন্ধ এল আর তাকে গুরুত্ব না দেওয়াটা ভাল কথা নয়। তা ছেলে করে কি?

লক্ষ্মীবউদি বললেন, শুনেছি। এবার ফাইন্যাল দেবে। অত বড় ঘরের ছেলে, অগাধ বিষয়-সম্পত্তি, সবই তো ছেলে পারে, উনি বলছিলেন একেবারে হিরের টুকরো।

মনোরমা গম্ভীর গলায় বললেন, ঠিক আছে। আজ অমর আসুক, আমি ওর সঙ্গে কথা বলি। আজকাল অবশ্য ওই বযসে কেউ মেয়েব বিয়ে দেয় না। কিন্তু তেমন সম্বন্ধ এলে–

লক্ষ্মীবউদি বললে, আপনারা খোঁজ খবব নিয়ে দেখুন। জলপাইগুড়িতে তো এবেলায় গিয়ে, ওবেলায্য আসা যায়। তবে যা করবেন তাড়াতাড়ি করুন।

বীণাবউদি বললেন, পরের ঘরে তো একদিন যাবেই, আগে যদি ভালোয় ভালোয় যায় তো মন্দ কি। মেয়ের ওপর বেশী মাযা রাখতে নেই। নইলে মালবাবুর মেয়েরা দশা হবে। অঞ্জলির এসব কথা শুনতে মোটেই ভাল লাগছিল না। হঠাৎ মালবাবুর মেয়ের প্রসঙ্গ এসে পড়তেই সচকিত হল, মালবাবুর মেয়ে? ললিতা?

হ্যাঁ। বীণাবউদি মাথা নাড়ালেন, দেখলে মনে হয় দেবদারু গাছ নাক তুলে বসে আছেন। রোজ বিকেলে ফুলবিবিটি সেজে বারান্দায় বসে না থাকলে চলে না। এদিকে বেলা যে রয়ে যাচ্ছে। মেয়েছেলে সকালবেলায় বেশ ভাল কিন্তু বিয়ের আগেই যদি দুপুর আসে তাহলেই বিপদ।

মনোরমা এক মুহূর্ত চিন্তা করলেন। শেষপর্যন্ত কথাটা বললেন, লক্ষ্মী, তোমার শ্যামলের সঙ্গে ললিতা মেলামেশি করে?

লক্ষ্মীবউদি আবার আঁচল টানলেন, ওমা, এ কথা বলছেন কেন?

মনোরমা কথা ঘোরান, আমি ভুল দেখতে পারি, একদিন যেন ওদের ওপাশের রাস্তা দিয়ে আসতে দেখেছিলাম। যদি তেমন কিছু হয় তাহলে হয় তোমরা দুঃখ পাবে নয় মেয়েটা কেঁদে মরবে। দাখো বাবা, আমি ভুলও দেখতে পারি, এই কথাটা উঠল তাই বলে ফেললাম।

লক্ষ্মীবউদি ঠোঁট কামড়ালেন, বীণাবউদি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, না না। শ্যামল সেরকম ছেলেই না। দিনরাত যারা খেলাধুলা নিয়ে থাকে তাদের মাথায় ওই বদমতলব আসার সময়ই হবে না। তুমি এ নিয়ে মন খারাপ করো না।

লক্ষ্মীবউদি বললেন, তেমন কিছু যদি করে বসে তাহলে উনি ছেলের মুখ আর দেখবেন না। বাগানের চাকরিটাও যদি হয়ে যেত—।

অঞ্জলি খুব অবাক। শ্যামলের সঙ্গে ললিতাকে যদি মনোরমা দেখে থাকেন তাহলে কথাটা তিনি তাকে বলেননি কেন? এই বারান্দার বাইরে কদাচিতই নামেন মনোরমা। ওরা নিশ্চয়ই এই অবধি সবাইকে দেখিয়ে আসবে না। মনোরমা কি প্রসঙ্গ থামানোর জন্যে বানিয়ে গল্পটা বলেন। তা যদি হয় তাহলে খুব খারাপ করেছেন। বীণাবউদি এখন যতই শান্ত মুখ করে থাকুন না, ওঁর কাছ থেকেই গল্পটা ছড়াবে। শাশুড়ির এই স্বভাবটা অঞ্জলি কখনই মানতে পারে না। অনেকসময় স্রেফ অনুমানের ওপর নির্ভর করে এমনভাবে কথা বলেন যেন তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। হয়তো ঘটনাটা বাস্তবে ঘটেইনি। সে বলল, শ্যামল ওরকম ছেলেই নয়। মা নিশ্চয়ই ঠিক দ্যাখেননি।

এরপর কথা আর বেশী গড়ালো না। সেইসময় বুধুয়াকে দেখা গেল দুজনকে সামলাতে সামলাতে আসাম রোড থেকে বাড়ির দিকে আসছে। দুজনই সমানে দৌড়াচ্ছে, বুধুয়ার নিষেধ কানেই নিচ্ছে না। বীণাবউদি বললেন, নাও তোমার গৌর-নিতাই বাড়ি ফিরল। সে কোথায়?

যার কথা বলা হল সে উদয় হচ্ছে না। তখনও। বীণাবউদি বললেন, আর একটা কথা। দীপা এখনও বাচ্চা কিন্তু আর কদিন বাদেই তো ঠিক বাচ্চা থাকরে না। বিশু খোকনদের সঙ্গে যেভাবে মেশামোশি করে তা ঠিক নয়। এইবার একটু রাশ টানো। সংসারেব কাজকর্ম শেখাও। একেই চা-বাগানে থাকি বলে শহরের লোকজন আমাদের গোযো বলে ভাবে।

বুধুয়া এসে পড়েছিল। বাচ্চা দুটো হই হই করে ভেতরে ঢুকে গেল। অঞ্জলি বুধুয়াকে জিজ্ঞাসা করল, দিদি কোথায়?

বুধুয়া মাথা নাড়ল, ছুটি নেহি হুয়া। মাস্টারজী সাজা দিয়েছে।

সাজা দিয়েছে? কেন? প্রশ্নটা মনোরমার।

হামি জানি না। বুধুয়া লাল দাঁত বের করে হাসল।

যা গরুগুলোকে ঘাস দে। অঞ্জলি ওকে ভেতরে পাঠিয়ে দিল। এর পারে কিছুক্ষণ কি কারণে দীপা সাজা পেতে পারে সেই বিষযে আলোচনা চলল। দুই ছেলেকে খাবার দিতে হবে এই অজুহাতে অঞ্জলি ভেতরে চলে এল। দুজনের হাত পায়ের ধুলো পরিষ্কার করিয়ে দুধ-মুড়ির বাটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে অনর্গল প্রশ্ন করেও নতুন কোন তথ্য দীপা সম্পর্কে আবিষ্কার করতে পারল না অঞ্জলি। মেজাজটা খুব চড়ে গিয়েছিল। সামান্য বাঁদরামি করতে গিয়ে বড়টা বেদম মার খেল। দুজনকেই ভেতরের উঠোনের বাইরে খেলতে যেতে নিষেধ করে সে আবার বাইরের বারান্দায় এসে দেখল এক মনোরমা চুপচাপ বসে আছেন। অঞ্জলি দুটো মোড়া ভেতরে ঢুকিয়ে শাশুড়ির পাশে এসে বসল, ওরকম বানিয়ে বানিয়ে শ্যামলদের কথা বলা উচিত হয়নি মা।

বানিয়ে বানিয়ে? মনোরমা মুখ না ফিরিয়ে বললেন, আমি সত্যি বলেছি। এটা ভাবছ না। কেন? হ্যাঁ, এটা বলতে পার আমি নিজের চোখে দেখিনি। তাই বলে ঘটনাটা মিথ্যে হয়ে যেতে পারে না। লক্ষ্মীকে সতর্ক করে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেছি।

কিন্তু আপনাকে কে বলল কথাটা?

দীপা।

দীপা? অঞ্জলি হতভম্ব, করে বলেছে আপনাকে?

গতকাল। ওরা নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিল। সেই বাগানের ভেতর দিয়ে ফরেস্টের পাশে। হাতি দেখে ভয় পেয়ে ফিরে আসছিল এমন সময় শ্যামল আর ললিতার গলা চা-বাগানের ভেতরে শুনতে পায়। মনোরমা মুখ ফেরালেন।

চা-বাগানের ভেতরে? সেখানে ওরা কি করছিল? অঞ্জলি যেন নিজেকেই প্রশ্ন করল।

মনোরমা উত্তর দিলেন না। আবা তার ফলে উত্তরটা পেয়ে গেল অঞ্জলি। তার দুই কান আচমকা গরম হয়ে উঠল। সে বলল, দীপা কি ওদের কথারাত শুনছে?

হ্যাঁ। মনোরমা গম্ভীর গলায় বললেন।

কি বলেছিল ওরা দীপা আপনাকে বলেছে?

হ্যাঁ। কথাগুলোর অর্থ দীপা পরিষ্কার বুঝতে পারেনি। তবে অনুমান করেছে ওগুলো বলা ঠিক নয়। বউমা, শ্যামল আর ললিতা শারীরিক সম্পর্কের কথা বলছিল। ললিতা আপত্তি করেছিল। তোমার মেয়ে এসব এখনও বোঝে না। তবে আর বেশীদিন ওকে তো না বুঝিযে রাখতে পাববে না। লক্ষ্মীকে এত কথা বলা উচিত নয়। সে আর ও ভেঙে পড়বে। তবে বিশুবা। যদি বাড়িতে এসব আলোচনা করে তাহলে খবরটা আর চাপা থাকরে না। মালবাবুরও জানা উচিত। নইলে বিপদ আসতে বাধ্য।

অন্যের ব্যাপারে আমাদের নাক গলিয়ে কি লাভ?

অন্যের ব্যাপার? এই চা-বাগানের কয়েকটা পরিবার সুখে দুঃখে একসঙ্গে আছি, অন্যের বিপদে যদি পাশে গিয়ে না। দাঁড়াই তাহলে কি চলে!

দেখুন, এই নিয়ে আবার বদনাম না রটে।

তুমি বাপু বড্ড ভাবছ। কিন্তু মেয়েটাকে সাজা দিচ্ছে কেন? তুমি একবার যাবে?

আমি যাব কেন? অঞ্জলির গলায় রাগ স্পষ্ট, নিশ্চয়ই অন্যায় করেছে তাই শাস্তি পাচ্ছে। আসুক বাড়িতে আজ।

মনোরমা বললেন, ভাল করে জিজ্ঞাসা না করে মাবধার করো না।

অঞ্জলি নিঃশ্বাস ফেলল। তার কেবলই মনে হতে লাগল দীপা তাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। নইলে চা-বাগানের ভেতরে যে কাণ্ডটা ঘটল তা মনোরমাকে বলতে পাবলি, তাকে নব্য। ওইটুকুনি মেয়ে একেবাবে ঠোঁট টিপে রইল তার কাছে! অদ্ভুত নির্জন চা-গাছে বা ভেতব বসে শ্যামল কি কথা বলতে পারে ললিতাকে? অঞ্জলির খুব রাগ হচ্ছিল। যে যাই বলুক তোব সেকথা শোনাবা কি দরকার % আবার ঘটা করে ঠাকুমাকে বলা হয়েছে। নিশ্চয়ই বাত্রে শোওযাব সময় পুটুব পটুব করে এইসব গল্প করা হয়। আর এনাকেও বলিহাবি, নাতনিবা সঙ্গে এসব কথা আলোচনা করতে একটু বাধে না। নাতনি বলল আর উনি হজম করে গেলেন। বাইরের লোকের সামনে তাকে কিরকম বেইজিত হতে হল! হঠাৎ অঞ্জলির জেদ চেপে গেল। প্ৰাইভেট টিউটর বা খাব দাবকার নেই। পাত্র যদি ভাল হয়। এই বন্যাসেই ওই মেয়েকে বিদায় করে দেওয ভাল। একবার যখন কানে গিয়েছে কথাগুলো তখন উনিই কখন চা-বাগানের ভেতব কোন ছেলের সঙ্গে ঢুকে ওসব যে আওডাবেন না। তার ঠিক কি!

অঞ্জলি বলল, লক্ষ্মীবউদির কথাটা নিয়ে কিছু ভাবলেন?

মনোরমা বললেন, ওরা প্ৰস্তাব দিয়েছে, অমর কি চিন্তা করছে সেটা আগে জানি। অঞ্জলি মুখ ফেবাল, আপনার ছেলের এসব নিয়ে চিন্তা কবাব সময় আছে?

মনোরমা বললেন, তুমি তো নিশ্চয়ই আপত্তি করবে। মেয়েকে পড়াশুনা কবানোর দাবি তোমার। লোকে শুনলেও বলবে সাততাড়াতাড়ি দায নামাল কাঁধ থেকে। কিন্তু আমি বলি বউমা, যদি পরিবার ভাল হয় তাহলে বিয়েটা দিয়ে দেওয়াই ভাল। আজকাল চারপাশে যা অবস্থা দেখছি–! মেয়ের শরীরে যৌবন এলে পাঁচজনের চোখের আড়ালে রাখতে হিমসিম খেতে হয়। আর পড়াশুনার কথা যদি বল, তাহলে কথা বাতা বলে নিলেই তো হয়, বিয়ের পর মেয়েকে পড়াতে হবে। জলপাইগুঁড়িতে থাকলে আরও ভাল পড়াশুনা হবে। এটা আমার কথা, তোমরা যা ভাব তা হবে।

আমি ভাবাভাবির মধ্যে নেই, আপনার ছেলেকে বোঝান। অঞ্জলির মুখ দেখে মনোরমা বুঝতেই পারলেন না যে তাঁর মতামতে সে খুব খুশী হয়েছে। অঞ্জলি উঠে দাঁড়াতেই দেখতে পেল দীপা আসছে। একা একা, খুব ঝড়ো চেহারা। অঞ্জলির মনে হল মেয়েটা বেশ বড় হয়ে গিয়েছে।

এত দেরি হল কেন? অঞ্জলির গলা এতটা জোরে যে হাত আটেক দূরেই দীপা দাঁড়িয়ে পড়ল। সে মাটির দিকে তাকাল। মনোরমা বললেন, মা যা জিজ্ঞাসা করছে তার জবাব দে।

দীপা মুখ না তুলে বলল, পানিশমেন্ট হয়েছিল।

কি করেছিলি তুই?

আমি কিছু করিনি।

কিছু না করলে তোকে শাস্তি দেবে কেন?

আমার খাতা দেখে বিশু লিখছিল বলে আমাকে আধঘণ্টা নিলডাউন করে রেখেছিল আর বিশুকে দেড়ঘণ্টা। আমি অনেক নিষেধ করেছিলাম কিন্তু বিশু শোনেনি।

তুই বিশুকে তোর খাতা দিয়েছিলি?

না। ও জোর করে নিয়েছিল।

কাল থেকে তোমার স্কুল যাওয়া বন্ধ।

বা রে? আমি তো কোন অন্যায় কবিনি। প্রতিবাদ করে উঠল। দীপা, তুমি স্কুলে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে দাখো, আমি তো নকল করিনি।

কোন কথা শুনতে চাই না। তোমার খুব বাড বেড়েছে। আমাকে না জানিয়ে মাছ ধরতে ফরেস্টের নদীতে গিয়েছিলে? সাহস দেখে আমি হ্যাঁ। সাপেব পাঁচ পা দেখেছ, তুমি? বদমাস মেয়ে। সবাই জানল আমাদের বাড়ির মেয়ে শাস্তি পেয়েছে। এতে তোমাব বাবাব মুখ খুব উজ্জ্বল হবে, না? যাও ভেতরে। আজ তোমার খাওয়া বন্ধ। একনাগাডে কথাগুলো বলে গেল অঞ্জলি। মনোরমা একটা কথাও বললেন না। দীপা গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অঞ্জলি আবার বলল, কথাগুলো কানে ঢুকাল না? যা ভেতরে।

আমি আর মাছ ধরতে যাব না।

যাও না। আরও বেশী করে যাও। হাতির পায়ে চাপা পড়। আমার কি!

আমি আর যাব না।

আর কি কি করবে না লিস্টটা শুনি।

আমি আর কাউকে নকল করতে দের না। দীপার চোখ উপছে জল এল, কিন্তু আমাকে স্কুলে যেতে দাও। মাস্টারমশাই একটু পারে পড়াতে আসবেন।

আমি এখন তোমার সঙ্গে কোন কথা বলব না। দয়া করে সামনে থেকে বিদায হও। অঞ্জলির কথা শেষ হতে দীপা ভেতরে পা বাড়াল। চোখের আড়াল হতেই তার মনে হল সাপের কোন পা নেই। তাহলে মা কেন পাঁচটা পায়ের কথা বলল? সাপেব কি লুকোনো পা আছে? সবাই দেখতে পায় না? সেই পাঁচটা পা দেখতে পেলে কি হয়? সে মাকে একটা কথা বলেনি। বিশু খুব পিটুনি খেয়েছে আজ। তাকে শুধু নিল ডাউন হয়ে থাকতে হয়েছে। বইপত্র রাখতে ব্যাখতে তার খেয়াল হল আজ মা খেতে দেবে না। কথাটা ভাবতেই খুব খিদে পেয়ে গেল। মনে মনে মতলব আঁটতে লাগল সে।

বিকেল আর সন্ধেয় বড় গলাগলি ভাব এখানে। কখন যে মিলে মিশে যায় তা পাখিরাত (টর পায় না। চা-বাগানের বুক চোবা নুড়ি পাথরের রাস্তা বেধে সেইসময় সাইকেলগুলো ফিরে আসে কোয়ার্টার্সে। তাদের টৰ্চেব আলোয় গাছের পাতাগুলো বহস্যময় হয়ে ওঠে। মদেশিয়া কুলি কামিনরা কাজ সেরে বাড়ি ফেরে রাঁচি-হাজারিবাগের গান গাইতে গাইতে। কয়েক পুরুষ ধরে এইসব গান মুখে মুখে চলে আসছে। একটু বাদেই কুলি লাইনে লাইনে মাদল বাজবে। হাঁডিযার সঙ্গে সেই গান গুলো গাইবে যা একদা বাঁচি-হাজারিবাগের গ্রামে গাওয়া হত। তখন চা-বাগান ঘুমোবে নতুন পড়া হিম মাখতে মাখতে। পৃথিবীটা হয়ে যাবে শুধু তারা আর জোনাকিদের রাজত্ব।

অমরনাথ সাইকেল ঘুরিয়ে মাঠে চলে এলো। বড়বাবুর বারান্দায় হ্যাজাক জ্বলছে। শাম্যাপোকা ভিড করেছে সেখানে। অনন্ত ঠাকুর এখনও কালীমূর্তি তৈরী করে চলেছে। নিজের কোয়ার্টার্সের সামনে পৌঁছাতেই অমরনাথ সত্যসাধনবাবুকে দেখতে পেলেন। পাতলা অন্ধকারে ছোট টর্চ জেলে আসছেন। সাইকেল থেকে নামতেই ভদ্রলোক টর্চের আলোয় তাঁকে দেখে নিয়ে নমস্কার করলেন, নমস্কার। আজ প্রথমদিন। ছাত্রী কোথায়।

একটু ব্যস্ত হলেন অমরনাথ। সত্যসাধনকে দাঁড়াতে বলে তিনি বারান্দায় উঠে পাশের ঘরটির দরজা ধরে টান দিতেই সেটা খুলে গেল। ঘর অন্ধকার। সাইকেল এক পাশে রেখে তিনি ভেতরের ঘরের দরজা ঠেললেন। সেটাতেও খিল নেই। অনেকবার বলেছেন এই দুটো দরজা যেন ভাল করে বন্ধ রাখা হয়। অথচ কারো খেয়াল থাকে না। উষ্ণ হতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। সত্যসাধনবাবু আজ প্ৰথম পাড়াতে এলেন, এসেই যদি ধারণা করেন তাঁর মেজাজ খুব উগ্ৰ তাহলে খারাপ লাগবে। বাইরের ঘরে হারিকেন জ্বলছে। অমরনাথ সত্যসাধনকে আপ্যায়ন করে সেখানে বসলেন। তারপর দ্বিতীয় ঘরে পা দিয়ে গলা তুলে ডাকলেন, দীপা, দীপা, কোথায় গেলি।

কেউ সাড়া দিল না! ভেতরের বারান্দায্য পৌঁছে তৃতীয়বার ডাকতেই রান্নাঘর থেকে অঞ্জলির গলা ভেসে এল, কেন, তাকে কি দরকার?

দরকার আছে। এত বার বলেছি, একবার ডাকলেই সাড়া দিবি। তবু অবাধ হবে। কোথায় সে? প্রশ্ন করামাত্র পেছনের দরজায় শব্দ হল। অমরনাথ ঘুরে হ্যারিকেনের আলোয় দেখলেন মেয়ে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর দাঁড়াবাব ভঙ্গী দেখেই মনে হল একটা কিছু ঘটেছে। এখন সেটা শুনতে ইচ্ছে করছিল না! গম্ভীব গলায় তিনি বললেন, তোমাকে পড়াতে মাস্টারমশাই এসেছেন। যাও, বইপত্র নিয়ে! কোথায় ছিলে তুমি?

অত্যন্ত মিনমিনে গলায় জবাব এল, ঠাকুর ঘরের সামনে।

দাঁড়িয়ে আছ কেন, যাও।

মা আমাকে আর পড়তে নিষেধ করে দিয়েছে। স্কুলে যখন যাব না তখন মাস্টারমশাই-এর কাছে পড়ার কি দরকার! মাথা নিচু করে সেই একই স্বরে কথা বলল দীপা।

তার মানে? অবাক হলেন অমরনাথ, স্কুলে যাবে না মানে? যত্ত সব বাজে কথা।

এইসময় মনোরমা তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, বাড়িতে মাস্টার পড়াতে এসেছে যখন তখন পড়তে যাও। তাঁকে আর বাইরের ঘরে বসিয়ে রেখো না।

আমার যে খিদে লেগেছে। খিদে নিয়ে পড়া যায়?

অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, স্কুল থেকে এসে খাসনি?

না।

কেন?

আমি জানি না।

ঠিক আছে। তুই পড়তে বস, মাস্টারমশাই-এর সঙ্গে তোরও খাবার যাবে। কথা শেষ হওয়ামাত্র দীপা ছুটল। অমরনাথ এবার বেশ বিরক্ত হলেন, বাড়ির অবস্থা দিনদিন হচ্ছে কি! ওইটুকুনি মেয়েকে সকালে খাইয়ে স্কুলে পাঠিয়েছ আর তারপর কিছু দাওনি? যা করবে তা একটু ভেবেচিন্তে করলে খুশী হব।

অঞ্জলি রান্নাঘরে বসেই গলা তুলে বলল, গুণধর মেয়ে পুটুস পুটুস করে কি লাগাল আর তাতেই গলে গেলেন উনি। আমি যা করি তা ভেবেচিন্তেই করি।

তার নমুনা তো দেখলাম। বাইরের দরজা হাট করে খোলা। যেদিন সর্বস্ব চুরি যাবে সেদিন বুঝবে। হাজারবাব বললেও তো হুঁস হয় না। ভেবেচিন্তে করি! অমরনাথ ফিরলেন।

সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল অঞ্জলি, দেখলেন মা, গায়ে পড়ে ঝগড়া করেছে। যা ইচ্ছে মুখে বলছে। কখনই আসল ঘটনাটা শুনতে চায় না।

অমরনাথ বারান্দা থেকেই বললেন, আস্তে কথা বল, বাড়িতে মাস্টারমশাই আছেন।

মনোরমা বললেন, বউমার সঙ্গে পরে আলোচনা করিস অমর।

অমরনাথ বললেন, এ নিয়ে আলোচনা করার কি আছে। মেয়েটা হয়তো কোন অনায় করেছিল আর তাই উনি রেগে মেগে খাওয়া বন্ধ করেছেন, স্কুলে যেতে নিষেধ করেছেন।

মনোরমা বললেন, দীপাকে আজ স্কুলেই শাস্তি দিয়েছে।

সেকি? কেন? অমরনাথ এবার অবাক।

মনোরমা বললেন, বিশু ওর খাতা দেখে লিখেছিল বলে শাস্তি পেয়েছে দুজনেই।

নকল করছিল দীপা। হতভম্ব হয়ে গেলেন অমরনাথ।

অঞ্জলি বলল, হয়ে গেল! তিলকে তাল ভাবতে শুরু করে দিলেন উনি।

অমরনাথ আর দাঁড়ালেন না। সোজা বাইবোব ঘরে চলে এলেন। সেখানে হ্যারিকেনের সামনে সত্যসাধন বইখুলে বসেছেন। উল্টোদিকে দীপা সাগ্রহে বসে। অমরনাথকে দেখে সে যেন একটু গুটিয়ে গেল। অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, আজ স্কুলে কি হয়েছিল?

সত্যসাধন জবাব দিলেন, কিছু হয় নাই তো।

শুনলাম দীপা নাকি শাস্তি পেয়েছে।

ওহো! ওর খাতা জোর জবরদস্তি দেইখা বিশ্বনাথ নকল করতেছিল। অ্যাসিস্টেন্ট হেড মাস্টারমশাই ব্যাপারটা না বুইঝাই শাস্তি দিছিলেন। পরে সব শুইন্যা দীপারে আদরও করছেন। কি দীপা, ঠিক না? দীপা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

অমরনাথ আর রাগতে পারলেন না। শুধু বললেন, নিজের খাতা অন্যকে দেখাও কেন? এইসব বন্ধুদের সঙ্গ এবার ছাড়ো। দেখুন মাস্টারমশাই, গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করতে পারেন কি না।

সত্যসাধনবাবু হা হা করে হাসলেন, কি যে কন। দীপা খুব ভাল ছাত্রী। দ্যাখেন, অরে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করাইয়া ছাড়ুম। তারপর দীপার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে তুমি কি কি বই পড়?

দীপা তার বই-এর স্তুপ থেকে রমলা সেনের পাঠানো বইটি বের করল। সেটা হাতে নিয়ে সত্যসাধন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, চমৎকার। অমরনাথ আর দাঁড়ালেন না।

আজ ভেতরের বারান্দায় মনোরমা ছেলেকে চা খেতে বললেন। মাস্টারমশাই আর ছাত্রীকে চা-জলখাবার পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। মোড়া টেনে ছেলের খানিকটা দূরে বসলেন মনোরমা, তোর সঙ্গে কয়েকটা কথা ছিল। ছেলেদুটোকে ভেতরের ঘরে পড়তে বসিয়ে অঞ্জলি এসে দাঁডাল দরজায়। চায়ে চুমুক দিয়ে অমরনাথ বললেন, এখানে চা দিয়েছ যখন তখন বুঝতেই পেরেছি। কি ব্যাপার?

তোর সঙ্গে হরিদাসবাবুর বেয়াই কথা বলেছেন?

হ্যাঁ। অঞ্জলিকে তো বলেছি।

বাঃ! ঘুমের ঘোরে কি বলেছি আমার কি খেয়াল আছে? অঞ্জলি বলে উঠল। আমাকে তো কিছু বলিসনি। মনোরমার গলায় অভিমান বাজল।

ওটা কি কিছু গুরুত্বপূৰ্ণ ব্যাপার? অমরনাথ হাসলেন, দীপাকে দেখে ওঁর খুব পছন্দ হয়েছে। ভাই-এর ছেলের জন্যে অল্পবয়সী পাত্রী খুঁজছেন। ওসব তোমাদের আমলে হত। এখন ওর বয়সে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি শুনলে লোকে পাগল ভাববে।

তোমার মেয়ের যখন বিয়ের বয়স হবে তখন লোকে এসে বিয়ে দিয়ে যাবে?

তার মানে? তোমরা কি বলতে চাইছ?

মনোরমা ছেলের মন বুঝতে পারলেন, জন্ম-মৃত্যু বিয়ে কার কপালে কখন লেখা আছে তা কেউ কি বলতে পারে। মেয়ের তো এক দিন বিয়ে হবেই। চিরকাল তো আর এখানে রাখতে পারবি না। আমি বলি কি, খোঁজ খবব নে, পবিবার কেমন দ্যাখ।

ধর, পরিবার ভাল, ছেলে যেহেতু ছাত্র তাই ভাল, তখন কি করবে?

সবই যদি ভাল হয় তাহলে আর আপত্তি করিস না।

তোমরা ভুলে যাচ্ছ দীপা এখনও বাচ্চা!

হ্যাঁ, তুমি ওই ভাবনা নিয়েই থাক।

অমরনাথ হকচকিয়ে গেলেন। মেয়েরা কোন বয়সে নারী হয়ে যায় সে সম্পর্কে তাঁর একটা আন্দাজ আছে। দীপা তার অনেক নিচে। তাছাড়া মেয়েটার আচরণে কোন পার্থক্য দেখতে পাননি তিনি। একটু আমতা আমতা করে তাই বললেন, আমি অবশ্য কিছু জানি না।

মনোরমা বললেন, না না সেসব কিছু না। তবে চেহারা তো ওর বড়সড়।

অমরনাথ বললেন, আমার এতে সায় নেই। মেয়েটা পড়াশুনায় ভাল। মাস্টারমশাই বললেন, ফার্স্টডিভিশন পেতে পারে। এখন বিয়ে দিলে ভবিষ্যৎ বারোটা বেজে যাবে।

অঞ্জলি বলল, তুমি কথা বল ওদের সঙ্গে। বিয়ের পর পড়াতে হবে।

তোমরা এসব জানলে কি করে?

হরিদাসবাবুর বউ লক্ষ্মী এসেছিল। মনোরমা জানালেন, তুই বিয়ে দিস না দিস একবার ওঁর সঙ্গে কথা বল। আগ বাড়িয়ে খবরটা দিয়েছেন আর তুই যদি চুপচাপ থাকিস তাহলে খারাপ দেখায়।

চা শেষ করে অমরনাথ উঠে গেলেন। আজ ক্লাবে গিয়ে তাস খেলতেও তাঁর ইচ্ছে করছিল না। দীপার মুখটা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা টনটন করছিল। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তিনি চিরকাল। বিধবা বিবাহ এখনও সমাজ মেনে নেয়নি। কিন্তু ক্রমশ বাল্যবিবাহের সংখ্যা কমে আসছে। মনোরমা এটাকে সমর্থন করতে পারেন। কিন্তু অঞ্জলির মুখে তিনি ওসব কথা আশা করেননি। অঞ্জলির কি খুব মেজাজ খারাপ? সেই রমলা সেন আসার পর থেকেই ওর ধবনিটা বদলে গিয়েছে। অমরনাথ নিঃশ্বাস ফেললেন। তারপর ঠিক করলেন একদিন না হয় জলপাইগুঁড়ি যাবেন। ব্যবসায়ী লোকের খুঁত বের করতে বেশী কষ্ট করতে হবে না। সেই খুঁতটাকে বড় করিয়ে দেখে সম্বন্ধ ভেঙ্গে দিলেই চলবে।

রাত নিশুতি হলে অঞ্জলি বিছানায় এল। এসে জিজ্ঞাসা করল, এখনও ঘুমাওনি?

অমরনাথ বললেন, মধুম আসছে না।

কেন?

আমার ভাল লাগছে না।

কি ব্যাপার?

মেয়েটাকে এত অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়াটা পাপ হবে।

আজ যেটাকে পাপ বলছি কাল সেটাকে পুণ্য বলবে। তোমার মেয়ের অবস্থা যদি মালবাবুর মেয়ের মত হয় তাহলে শান্তি পাবে? তাছাড়া এখানে থাকলে ওর ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে মেশা বন্ধ করতে পারবে? হঠাৎ যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে? অঞ্জলি স্বামীর বুকে হাত রাখল।

তবু উশখুস করতে লাগলেন অমরনাথ। শেষপর্যন্ত চাপা গলায় বললেন, বিয়ে যদি দিতে হয় অঞ্জলি তাহলে ওর শ্বশুরকে সত্যি কথাটা বলতে হবে, এটা ভেবেছ তোমরা?

০৬. বৃষ্টিটা চলে যাওয়ার পরে

বৃষ্টিটা চলে যাওয়ার পরেই ফিনফিনে শীতের দিন শুরু হয়ে গেল। চা-বাগানের গাছের পাতা রঙ পাল্টাচ্ছে আকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। একটা রুক্ষু ভাব মাখামাখি চারপাশে। এখন সূর্য ড়ুবলেই চোরা পায়ে ঠাণ্ডা নেমে আসে আকাশ থেকে। রাত নটাতেই সেটা টের পাইয়ে ছাড়ে। রোদে গরম করে রাখা লেপ কম্বল পৌঁছে যায় খাটে খাটে। এখন আর চাদরে কাজ হয় না। এই সময় বাগানে পাতি তোলার কাজটা বাড়ে। ফ্যাক্টবিব ওপর চাপ পড়ে। মাঝে মাঝেই রাতে কাজ হয় সেখানে। ভুটিয়া পুরো হাতা পুলওভার নিয়ে রাতে বের হন। অমরনাথ। কারো কারো মাথায় ইতিমধ্যেই মাঙ্কিক্যাপ উঠে গেছে।

অনন্তর এখন নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। মায়ের শরীর এখন নিটোল। এক পোঁচ রঙ পড়ে গেছে। ইতিমধ্যে। মাঠের কোণে প্যাণ্ডেল বাঁধাব কাজ চলছে। বাগানের। বাবুরা ছুটির পর তার সামনে চেয়ার পেতে বসে নানান আলোচনা করছেন রোজ। পুজোর দাযিত্ব এবারও শ্যামলের ওপর। প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি হবার সুযোগ তার নেই। কিন্তু খেটে কাজ তুলতে তার জুড়ি নেই একথা সবাই স্বীকার করে। আজ রাত্রে ঠাকুরকে প্যাণ্ডেলে আনা হবে। পরশু পুজো। আগামীকাল সারারাত জেগে মায়ের সাজ শেষ করবে, চোখ আঁকবে অনন্ত।

আজ অমরনাথকে রাত নটায় ফ্যাক্টরিতে যেতে হবে। বিকেলে অফিস থেকে ফিরে চা খেয়ে তিনি এলেন পুজো প্যাণ্ডেলে। সেখানে তেজেন্দ্র একাই আসব জমিয়েছেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর সাধারণত সবাই তাঁকে এড়িয়ে চলে সারা বছর। কিন্তু এইসব বারোয়ারি ব্যাপার এলে তিনি মাতকবরী করতে ছাড়েন না। তেজেন্দ্রর ছেলে, এখন যিনি বড়বাবু তিনি রয়েছেন দূরে। পিতার সামনে থাকলে তাঁর ব্যক্তিত্ব কম হওয়ার সম্ভাবনা। অমরনাথকে দেখে তেজেন্দ্র বললেন, এসো অমর। তুমি হয়তো কিছুটা মনে করতে পাবরে। এদের বলছিলাম পুরনো দিনের কথা। পঁয়তাল্লিশ বছর আগে যখন এই বাগানে এলাম তখন কালীপুজোর কথা ভাবতেই পারতাম না। কে পুজো করবে? বাঙালি বলতে তো আমরা চারজন। না না হরিপদ তখনও জয়েন করেনি। চৌমাথায় কোন দোকান ছিল না হে। বিকেল হলেই ঘরের দরজা বন্ধ করতে হত। ওই যে তারের বেড দেখছ। ওইখানে বসে বাঘ ডাকত। কুকুরের মত শেয়াল ঘুরে বেড়াত এই মাঠে।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে শ্যামল প্যাণ্ডেল বাঁধা দেখছিল। ত্রিপল বাঁশ সব বাগানেরই। যারা কাজ করছে তাদের পাঠানো হয়েছে ফ্যাক্টবি থেকেই। শ্যামলের কান ছিল এদিকে। তাই প্রশ্ন করে বসল, তাহলে পুজোটা শুরু হল কিভাবে জ্যাঠামশাই।

কেউ প্রশ্ন করলে তেজেন্দ্র খুশী হন। তাছাডা এই সময়টাতেই চাকরির পদ অথবা বয়সের বাদবিচাবি করা হয় না। তিনি পাকচুলে হাত বুলিয়ে বললেন, একবার বড় সাহেব আমাকে ডেকে পাঠালেন। মিল্টন সাহেব। চাষ করতে এদেশে আসেনি হে। পেটে বিদ্যে ছিল। মিল্টন সাহেব বললেন, বাবু, তুমি কি হিন্দু?

আমি বললাম, ইয়েস স্যার। সেন্ট পার্সেন্ট হিন্দু। মুরগীও খাই না।

মিল্টন সাহেব খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন, তবে আদমসুমারিতে বলছে যে এ তল্লাটে কোন হিন্দু থাকে না। সবাই মুসলমান।

আমি তো অবাক। মাঝে মাঝে মুসলিম লীগের লোকজন এসে চৌমাথায় ভিড় জমাতো বটে হাটেব দিনে কিন্তু আর কিছু খবর রাখতাম না। সাহেব বললেন, তোমাদের তো অনেক ভগবান শুনেছি। তাদের মধ্যে পছন্দ করে তুমি একটা ভগবানের নাম বল যার পূজো তোমরা করতে পার। আমি কোম্পানি থেকে সেই পুজোর খরচ দেব।

আমি তো উৎফুল্ল হয়ে বললাম, দুর্গাঠাকুর আমাদের জননী।

সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, তার পুজো করতে কত খরচ হবে? বাজেট দাও।

আমি দিলাম কাগজে লিখে। দেখে সাহেবের চক্ষু চড়কগাছ। সে কি, তুমি বললে একজন আর এ যে দেখছি পুরো ফ্যামিলি। তার ওপর চার পাঁচ দিন ধরে পুজো। তার মানে এই কদিন নো ওয়ার্ক? অসম্ভব। এই পূজো করতে আমি অনুমতি দিতে পারি না। তোমাদের মুশকিল কি জান কিছু চাইতে বললে তোমরা মাত্রা ছাড়িয়ে চাও। এমন একটা পূজো কর যার সঙ্গে কোন ফ্যামিলি থাকবে না এবং একদিনেই শেষ হয়ে যাবে; তখন সব দেবদেবীকে ছেড়ে শ্যামামায়ের কথা মনে পড়ল! বাজেট দিতেই অনুমতি পাওয়া গেল।

তেজেন্দ্র গল্পটা তখনও শেষ করেননি তা ওর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল।

ডাক্তাববাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কত বাজেট দিয়েছিলেন?

পনের। বড় সাহেব সেটা কমিয়ে বারো করেছিলেন। তা সেই পূজো করে প্রমাণ হল এই চা-বাগানে হিন্দুরা থাকে। বলতে পার আমিই প্রথম মায়ের পূজো করলাম।

চারজনে মিলে এত বড় পুজো? শ্যামল যেন সন্দেহ দেখাল।

চারজন? চা-বাগানেন সমস্ত মদেশিয়া কুলিকামিনরা হাত মেলালো। সেই কদিন আর তারা গীর্জায় যায়নি। তা যা বলছিলাম, সাহেব এলেন ঠাকুর দেখতে মেমসাহেবকে নিয়ে। এক মিনিট দাঁড়িয়েই তাঁবা চলে গেলেন। আমাদের মাথায় হাত। সাহেব কি কোন কারণে রেগে গেলেন আমাদের ওপরে? শলাপরামর্শ করে সঙ্গে সঙ্গে ছুটলোম চা-বাগানের কোণে মিল্টন সাহেবের বাংলোয়। সাহেব আমাকে দেখে বললেন, ছি ছি! কি লজ্জার ব্যাপার। তুমি তো আমাকে বলবে তোমার ভগবান জামাকাপড় পরে না। মেমসাহেবকে নিয়ে তাহলে যেতাম না। তাছাড়া হাজার হোক তিনি একজন নারী, তাঁকে অত বড়সড় করে তৈরী না করে স্বাভাবিক লম্বা করলেই তো পারতে। সাহেবকে বোঝাতে আমার প্রাণান্ত। এসব তো আর তোমাদের ফেস করতে হচ্ছে না হে। এখন মোটা মোটা চাঁদা তুলছ সাপ্লায়ারের কাছ থেকে, কোম্পানিও কিছু দিচ্ছে, কাউকে জবাবদিহি দেবার নেই। আমাদের সেই সময়টাই ছিল আলাদা। সেইসময় যদি চেষ্টা না করতাম এখন তোমরা কি ফলভোগ করতে পারতে?

আজকাল তেজেন্দ্ৰ যে কোন প্রসঙ্গ এইভাবে খোঁচা দিয়ে শেষ করেন। বুড়ো মানুষ, ভাসান পর্যন্ত তাঁর বকবকানি শুনতে হবে। অমরনাথ সরে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তেজেন্দ্ৰ ছাড়বার পাত্র নন। চেয়ার ছেড়ে তিনি উঠে এলেন। অমরনাথ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন দীপা মায়ের মূর্তির সামনে ছেলেগুলোর সঙ্গে দাঁড়িয়ে। তেজেন্দ্র বললেন, অমরনাথ, তোমার সঙ্গে দুটো কথা আছে।

বলুন। অমরনাথ দেখলেন অন্য বাবুরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছেন। তেজেন্দ্ৰ যতদিন ক্ষমতায় ছিলেন তখন কেউ সাহস পেত না এমন করতে। প্ৰাক্তন বড়বাবু এবং বর্তমান বড়বাবুর বাবা হিসেরে এখন সামনাসামনি কেউ কিছু বলে না। কিন্তু বেশী কথা বলার স্বভাব অবসর নেওয়ার পর তৈরী হওয়ায় লোকে ওঁকে নিয়ে আড়ালে মশকরা করে। মানুষ নিজেই নিজের সম্মান হারাতে সাহায্য করে।

তেজেন্দ্ৰ বললেন, তোমার মায়ের বয়স হয়েছে। বউমা সংসারধর্ম নিয়ে ব্যস্ত। তিনি তো অনেক দিন ধরে সেবাযত্ন করে এসেছেন, এখন বউমার পালা। তুমি তাঁর দিকে নজর দাও।

অমরনাথ কিঞ্চিত অপ্ৰস্তৃত, আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।

তেজেন্দ্ৰ অমরনাথের কাঁধে হাত রাখলেন, সেদিন তোমার মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। মনে হল তীর্থে যাওয়ার শখ খুব। একবার ওকে নিয়ে তীর্থে ঘুরে এস। এই কাশী, বৃন্দাবন, হরিদ্বার। হরিদ্বারে অবশ্য আমি যাচ্ছি। আমার সঙ্গেই যেতে পার তোমরা।

অমরনাথ এবার অবাক। জ্ঞান হবার পর তিনি কোনদিন মনোরমার মুখে এমন অভিলাষের কথা শোনেননি। মনোরমা তাঁকে বা অঞ্জলিকে না জানিয়ে তেজেন্দ্ৰকে বলতে গেলেন কেন? মন খারাপ হয়ে গেল তাঁর। তেজেন্দ্র বললেন, আর দ্বিতীয্য কথাটি হল দীপাকে নিয়ে। যাদের সঙ্গে এতকাল খেলাধুলো করত, ছেলেমানুষ বলেই তা মানিয়ে যেত। কিন্তু এখন সতর্ক হবার সময় হয়েছে। সবই তো দেখি আমি ওই বারান্দায় বসে।

আপনি কি বিশেষ কিছু দেখেছেন? অমরনাথ বিরক্ত গলায় প্রশ্ন করলেন।

না ঠিক তেমন নয়। তবে যেভাবে হুড়োহুড়ি করে তা উচিত নয়। তেজেন্দ্রর কথা শেষ হওয়ামাত্র দীপা দৌড়ে এল। কাছে, বাবা, কাল রাত্রে যখন ঠাকুরের চোখ আঁকা হবে তখন আমি মণ্ডপে আসব?

কেন? অমরনাথ বিরক্তি এড়াতে পারলেন না।

সবাই বলছে সেইসময় নাকি কালীঠাকুরের শরীরে ভগবান এসে যায়।

কখন চোখ আঁকা হবে তার ঠিক নেই। যাও বাড়ি যাও।

বল না, আসব কি না! বিশু বলেছে চোখ আকার আগে আমাকে বাড়িতে গিয়ে ডেকে আনবে। তুমি হ্যা বললে মা আর কিছু বলবে না। দীপা খুব সাহস করে কথাগুলো বলে যাচ্ছিল। অমরনাথ আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চাপা গলায় ধমকে উঠলেন, বড্ড বাড়াবাড়ি করছ। যাও, এখনই বাড়ি চলে যাও।

দীপা অবাক চোখে অমরনাথকে একবার দেখে আচমকা ঘুরে নিজেদের কোয়ার্টার্সের দিকে দৌড়ে চলে গেল। অমরনাথ তেজেন্দ্রর কাছ থেকে সরে এলেন। এবং তখনই তিনি হবিদাসবাবুর সামনে পড়ে গেলেন। অমরনাথ বললেন, হরিদাসদা, আমি ভাইফোঁটার পরই জলপাইগুড়িতে যাব ওঁদের সঙ্গে কথা বলতে। আপনি যদি একটু জানিয়ে দেন তাহলে ভাল হয়।

হরিদাসবাবু খুশী হলেন, হ্যা হ্যাঁ, শুভকাজে অকারণে দেরি করো না। এমন পাত্রের খোঁজ পেলে যে কেউ তো ছুটে যাবে হে দেরি করলে আবার আপুল কামড়াতে না হয়।

আলো নিবে এলে মণ্ডপে হ্যাজাক জ্বলল। তিনটে হ্যাজাক মাঠের চেহারাটা পাল্টে দিল লহমায। বাবুবা চাদর মুড়ি দিয়ে এখনও আড্ডা মারছেন। তেজেন্দ্র ফিরে গেছেন কোয়ার্টার্সে হিম পড়ছে বলে! অনন্ত হ্যাজাকের আলোয় এখনও কাজ করে যাচ্ছে। একসময় সে হাঁকল, ঠাকুর তোল গো।

অমবনাথের হঠাৎ একটা কাঁপুনি এল। চুপচাপ একপাশে বসে ছিলেন তিনি। অনন্তর হাঁকটা কানে যাওয়ামাত্র শরীরে শিরশিরানি ছড়িয়ে পড়ল। সব কিছুবই একটা সময় আসে আর তখন ঈশ্বর নীরবে হাঁক দেন। যে মানুষ সেটা শুনতে পায় তার চেয়ে সুখী কেউ নেই। সময়ের ডাক সময় পেরিয়ে গেলেই বা না এলেই আমাদের কানে আসে যে! পাশে বসা নবনী জিজ্ঞাসা করল, কি হল অমরদা দা শরীর খারাপ করছে? অমরনাথ চমকে উঠলেন, না তো!

নবনী বলল, আপনি এমনভাবে কেঁপে উঠলেন যে আমার মনে হল কিছু একটা হয়েছে।

অমরনাথ হাসার চেষ্টা করলেন, না হে। ওই অনন্ত আচমকা এমন হেঁকে উঠল। যে–। কথা শেষ করলেন না অমরনাথ। নবনী মুখ ঘুরিয়ে নিল। অমরনাথের মনে পড়ল লালাবাবুর কথা। বেলা যায় শুনে ভদ্রলোক একবস্ত্রে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কাঁপুনিটা তাঁর শরীরে যত তাড়াতাড়ি এল মিলিয়ে যেতে তার চেয়ে বেশ সময় নিল না!

মণ্ডপে নিয়ে আসা হল রঙবিহীন কালীঠাকুরকে। উদ্যোগটা শ্যামলেরই তারই হাকাহাকি সবাইকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যে ঘাস থেকে, দেওদারু চাঁপার গাছ থেকে অজস্র শ্যামাপোকা ছুটে এসেছে হ্যাজাকগুলোর গায়ে। অমরনাথ প্ৰায় নিঃশব্দে চলে এলেন কোয়ার্টার্সে। বাইরের দরজা শক্ত করে ভেজানো ছিল। সামান্য চাপ দিতে খুলে গেল। বাইরের ঘরে জাম্বো হারিকেন জ্বলছে। ভেতরের বড় ঘর থেকে অঞ্জলির গলা ভেসে এল, মা, কাল চৌদ্দশাকটা আপনি করুন। গতবার আপনার ছেলের আমার রান্না ভাল লাগেনি।

মনোরমা বললেন, চোদ্দরকম শাক একসঙ্গে ভেজে নেবে। এর আবার রান্না কি আছে। চোদ্দটা প্ৰদীপ তোলা আছে। কাল সলতে পাকিয়ে নিলেই হবে। আর হাঁ, শাকগুলো যখন বুধুয়া তুলবে তখন তুমি একটু দাঁড়িয়ে থেকে নইলে জংলা পাতা মিশিয়ে দেবে।

অঞ্জলি বলল, না না। আমি ওকে বলেছি চোদ্দরকম শাক আলাদা করে ভাগ করে রাখবি আমি দেখাব পর মেশাবি।

ঘরে পা দিতেই অমরনাথের বিদ্যাসাগরী চটিতে মচ মচ শব্দ উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের ঘরের আলাপ থেমে গেল। অমরনাথ মুখ তুলে বড় ঘড়িতে সময় দেখে চেয়ারে গিয়ে বসলেন। খবরের কাগজটা টেনে হেডিং দেখলেন, বিধানচন্দ্র রায় জহরলাল নেহরুর সঙ্গে উদ্ধান্তু সমস্যা নিয়ে আলোচনায় বসবেন। কাগজ রেখে দিয়ে অমরনাথ ডাকলেন, মা।

মনোরমার সাড়া এল, বল।

একবার এই ঘরে আসবে? যতটা সম্ভব নরম গলায় প্রশ্নটা করলেন অমরনাথ।

মনোরমা উঠে এলেন দরজায়, কি হয়েছে?

তোমার সঙ্গে কথা ছিল। কি কথা!

বল। না। মানে, আমি তো জানতাম না তোমার তীর্থ-দর্শনের বাসনা হয়েছে। তুমি কি ঠিক করেছ কোন কোন তীর্থে যেতে চাও? মুখ না তুলেই প্রশ্ন করলেন অমরনাথ।

আমি? তীর্থদর্শন করতে চাই? কি আজেবাজে কথা বলছিস? ঝাঁঝিয়ে উঠলেন মনোরমা।

আমি তো তাই শুনলাম। ফেব্রুয়ারি মাসেব আগে আমি তো ছুটি পাব না। তার ওপর যদি বিয়ের দিন স্থির হয়ে যায়-, মানে খরচ টরচ তো হবে, তবু তোমাকে নিয়ে যেতে পারব ছুটি পেলে। আগে থেকে ব্যবস্থা করলে নিশ্চয়ই থাকব জায়গা পাওয়া যাবে।

আমি তীর্থে যেতে চেয়েছি এ কথা তোকে কে বলল?

পুরোন বড়বাবু।

কি বললেন তিনি?

এইসব কথাই। তোমার যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে অথচ আমি খবর রাখছি না। উনি নিজেও নাকি হরিদ্বারে যাচ্ছেন। তোমাকে তো কখনই এসব কথা বলতে শুনিনি। অমরনাথের কথা শেষ হওয়ামাত্র পেছনের দরজায় দাঁড়িয়ে অঞ্জলি প্ৰচণ্ড জোরে হেসে উ&