Friday, April 12, 2024
Homeগোয়েন্দা গল্পপ্রাচীন মূর্তি - রকিব হাসান

প্রাচীন মূর্তি – রকিব হাসান

ভিকটর সাইমনের পিছু পিছু রকি বীচের উকিল মিস্টার নিকোলাস ফাউলারের অফিসে এসে ঢুকলো কিশোর আর রবিন।

হাল্লো, ভিকটর! উঠে দাঁড়ালেন ফাউলার। হাত বাড়িয়ে দিলেন বিখ্যাত গোয়েন্দা মিস্টার সাইমনের দিকে। তারপর কেমন আছো? কিশোর, রবিন, তোমরা কেমন?

ভাল, স্যার, ঘাড় কাত করে জবাব দিলো কিশোর।

তার মানে হাতে সময় আছে তোমাদের, রবিনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন উকিল সাহেব। কেস নিতে পারবে।

পারবো, রবিন বললো। মিস্টার সাইমনের কাছে সে-খবর শুনেই তো এলাম।

গুড। বসো।

ডেস্কের সামনে তিনটে চেয়ারে বসলো তিনজনে। ফাউলার বসলেন ডেক্সের ওপাশে তার আগের জায়গায়। জিজ্ঞেস করলেন, চা? কফি?

মাথা নাড়লো রবিন আর কিশোর। খাবে না। মাথা ঝাঁকালেন সাইমন। কফি।

বেল বাজিয়ে খানসামাকে ডেকে নির্দেশ দিলেন উকিল, দুকাপ কফি।

ভূমিকা বিশেষ করলেন না তিনি। সরাসরি কাজের কথায় চলে এলেন। কিশোর আর রবিনকে জিজ্ঞেস করলেন, মুসাকে দেখছি না?

ও গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত, জবাব দিলো কিশোর। কোথায় নাকি পুরনো গাড়ির পার্টস পেয়েছে, আনতে চলে গেছে।

হুঁ। যাই হোক, তোমাদের কেন ডেকেছি, জানো নিশ্চয়?

শুধু জানি, একটা কেস ঠিক করেছেন আমাদের জন্যে। আর কিছু না। মিস্টার সাইমনকে নাকি ফোন করেছিলেন। তিনি আমাদের খবর দিয়েছেন।

হ্যাঁ। দারুণ রহস্যময় একটা কেস। সেটার সমাধান করতে হবে। আশা করি পারবে তোমরা, মাথার টাকে হাত বোলালেন উকিল সাহেব। ছোটখাটো মানুষ। উঁচু ডেস্কের ওপাশে তার শরীরের বেশির ভাগটাই অদৃশ্য। মিস্টার চেস্টার রেডফোর্ডের মৃত্যুর খবর নিশ্চয় কাগজে পড়েছে।

মাথা ঝাঁকালো কিশোর আর রবিন।

সাইমন বললেন, চিরকুমার ছিলেন যদ্দূর শুনেছি। লোকে বলে মাথায় ছিট ছিলো। রকি বীচে এসেছেন বেশিদিন হয়নি।

হ্যাঁ, কিশোর বললো। একটা কেসে তাঁর সঙ্গে আমাদের পরিচয়। হাতির দাঁতের একটা মূল্যবান মূর্তি হারিয়ে গিয়েছিলো তাঁর। খুঁজে দিয়েছিলাম। মেরিচাচীর বাবার বন্ধু ছিলেন। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কেউ ছিলো না তার। দূর সম্পর্কের দুচারজন ভাইটাই বাদে। খামখেয়ালি লোক ছিলেন। দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন।

অনেক কিছুই জানো দেখছি, উকিল বললেন। উইলে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে গেছেন। তবে একটা বিশেষ রহস্যের সমাধান করতে না পারলে কেউই কিছু পাবে না।

ফাউলার জানালেন, নিজের হাতে উইল লিখেছেন রেডফোর্ড। তবে তাতে আইনগত কোনো বাধা নেই। সাক্ষী ছিলো দুজন।

দুজনেই তাঁর আত্মীয়, সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, কাজেই রহস্য সমাধানের ব্যাপারে কোনোরকম সাহায্য ওরা করবে না। তাতে নিজেদের ক্ষতি, হাসলেন উকিল। তবে আশা করি তোমাদের কোনো অসুবিধে হবে না। পুরানো রহস্য খুঁচিয়ে বের করে সমাধান করে ফেলতে পারো। আর এটা তো নতুনই। রহস্যটা কি জানার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছ, না? দাঁড়াও, আগে উইল থেকে কয়েকটা প্যারাগ্রাফ পড়ি…

ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো খানসামা। দুটো কাপ টেবিলে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল।

নাও, চা নাও, সাইমনকে বললেন উকিল। নিজে একটা কাপ তুলে নিলেন। গোটা দুই চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখলেন কাপটা। তারপর ড্রয়ার খুলে একটা দলিল বের করলেন। পড়তে শুরু করলেন, আমি নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছি, মূল্যবান অ্যাজটেক যোদ্ধাকে তারই হাতে দেয়া হবে, যে এসে প্রমাণ করতে পারবে যে সে ওই যোদ্ধার সত্যিকারের বংশধর।

ফাউলার থামলে রবিন বলে উঠলো, এইই? কারো নামটাম নেই?

আরেক জায়গায় তোমাদের চারজনের নাম লেখা রয়েছে, বলে শেষ পাতাটা ওল্টালেন ফাউলার। সাইমন আর তিন গোয়েন্দার নাম। পড়লেন, আমার অনুরোধ থাকলো রকি বীচের গোয়েন্দা ভিকটর সাইমন আর তিন গোয়েন্দা; কিশোর পাশা, মুসা আমান এবং রবিন মিলফোর্ড যেন অ্যাজটেক যোদ্ধাকে খুঁজে বের করে তার সম্পত্তি তাকে প্রদান করে। তদন্তের জন্যে যতো খরচ হবে, সব দেয়া হবে আমার এস্টেট থেকে। কাজ শেষে তাদের পারিশ্রমিকও দেবে এস্টেট। আর যতোক্ষণ অ্যাজটেক যোদ্ধাকে তার সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়া না হয়, ততোক্ষণ আমার কোনো উত্তরাধিকারী আমার সম্পত্তির একটা কানাকড়িও পাবে না।

উইলের দুটো অংশ আরেকবার পড়তে বললেন সাইমন। মন দিয়ে শুনলেন। ভ্রূকুটি করলেন। অবাক হয়েছেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার হাতে কোনো সূত্র আছে, নিক? যা দিয়ে শুরু করা যায়?

না। যে কজন উত্তরাধিকারী আছে, সবাইকে জিজ্ঞেস করেছি আমি নানাভাবে। মিস্টার রেডফোর্ডের পরিচিত যাদেরকে চিনি, তাদেরকেও খুঁটিয়ে প্রশ্ন করেছি। কেউ কিছু বলতে পারেনি। তবে উইলে একটা বাক্য রয়েছে, এটা সূত্র হলেও হতে পারে। এই যে, লেখা আছেঃ গোয়েন্দাদেরকে অবশ্যই পিন্টো আলভারোকে খুঁজে বের করতে হবে।

দলিলের একটা কপি দেয়া যাবে কিনা জানতে চাইলেন সাইমন। মাথা ঝাঁকিয়ে উকিল বললেন, অবশ্যই। চাইতে পারো ভেবে ফটোকপি করিয়েই রেখেছি, বের করে দিলেন তিনি। এই নাও। যেসব জায়গায় তোমাদের কথা লেখা আছে, তোমাদের প্রয়োজন হবে বুঝেছি, দাগ দিয়ে রেখেছি।

দলিলটা মন দিয়ে পড়তে শুরু করলেন সাইমন।

কিশোর জিজ্ঞেস করলো, নাম শুনে তো মনে হচ্ছে স্প্যানিশ, লোকটা কে বলতে পারবেন?

না, জবাব দিলেন উকিল।

অ্যাজটেক যোদ্ধা কে, কি তার সম্পত্তি, এ-ব্যাপারে কিছু জানেন কিনা জিজ্ঞেস করলো রবিন। কিছুই বলতে পারলেন না উকিল।

পুরানো কোনো মূর্তি-টুর্তি হতে পারে, আন্দাজ করলো কিশোর।

কি জানি। মিস্টার রেডফোর্ডের বাড়িতে তেমন কোনো মূর্তি নেই, ফাউলার বললেন।

স্টাফ করা কোনো পাখি বা জন্তু আছে? ডানাওয়ালা সাপ পবিত্র ছিলো অ্যাজটেকদের কাছে।

ওরকম কিছুই পাইনি মিস্টার রেডফোর্ডের বাড়িতে, ফাউলার বললেন। কোনো ছবিও না। এমন কিছু চোখে পড়েনি, অ্যাজটেক যোদ্ধার সঙ্গে যার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক আছে।

জটিল এবং মজার একটা রহস্য। আগ্রহী হলেন সাইমন। বললেন, নিক, কেসটা নিলাম। আমি আর তিন গোয়েন্দা মিলে কাজ করলে সমাধান করে ফেলতে পারবো। সময় লাগবে না।

ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে কিশোর। বেশ কিছুদিন ধরে রহস্য না পেয়ে নিরাশ হয়ে পড়েছিলো। হঠাৎ করে এরকম একটা পেয়ে যাবে, ভাবতেও পারেনি। পুলকিত হয়ে উঠেছে। সাইমনকে জিজ্ঞেস করলো, কখন থেকে কাজ শুরু করবো, স্যার?

পারলে এখন থেকেই করো।

তাহলে রবিনকে নিয়ে একবার রেডফোর্ড এস্টেটে যেতে চাই, এখুনি। দেখা দরকার। কোনো সূত্র মিলতে পারে।

উকিল বললেন, তিনি ওদেরকে নিয়ে যেতে রাজি আছেন। সাইমন জানালেন, যেতে পারবেন না। আরেক জায়গায় জরুরী অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। দরকার হলে পরে যাবেন রেডফোর্ড এস্টেটে। তাছাড়া কিশোর যখন যাচ্ছে, তার নিজের আর যাওয়ার তেমন প্রয়োজন আছে বলেও মনে করছেন না।

সাইমন চলে গেলেন তার কাজে। দুই গোয়েন্দাকে নিয়ে এস্টেটে রওনা হলেন ফাউলার। শহর ছাড়িয়ে চলে এলেন পার্বত্য এলাকায়। একটা পথের পাশে বিরাট এক প্রাইভেট এস্টেট ছিলো, সেটা ভেঙে এখন হাউজিং ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে। এরকম করার নির্দেশ দিয়ে গেছেন রেডফোর্ড। তার রহস্যের সমাধান হলেই এই হাউজিং সোসাইটির মালিক হয়ে বসবে উত্তরাধিকারীরা। অনেক টাকার মালিক। কিশোর আর রবিনকে এসব কথা জানালেন উকিল।

আরো কিছুদূর এগিয়ে মোড় নিলেন ফাউলার। পুরানো পাইনের সারির ভেতর দিয়ে চলে গেছে একটা পথ। সেই পথ ধরে চলে এলেন বিশাল এক বাড়ির সামনে। ভিকটোরিয়ান আমলের বাড়ি। চারপাশ ঘিরে পাতাবাহারে বেড়া গাড়িবারান্দায় গাড়ি রেখে নামলেন উকিল। দুই গোয়েন্দাও নামলো।

চওড়া আর অনেক উঁচু সিড়ি বেয়ে সামনের বারান্দায় উঠে এলো তিন জনে। সদর দরজার হুড়কো খুললেন ফাউলার। ছেলেদেরকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।

ভেতরটা আকর্ষণীয়। চকচকে পালিশ করা মেহগনি কাঠের আসবাবপত্র। বড় বড় জানালায় টকটকে লাল মখমলের পর্দা। ছাতের সামান্য নিচ থেকে শুরু হয়েছে, নেমে এসেছে মেঝের কাছাকাছি-এতো বড় জানালা। অনেক বড় একটা ফায়ারপ্লেসের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে মস্ত এক টেবিল, ঘরের এক কোণে।

ব্যাচেলরদের বাড়ি যা হয় তাই, ফাউলার বললেন। খোঁজ। সূত্র খুঁজতে খুঁজতেই বুঝে যাবে, কিভাবে বাস করতে পছন্দ করতেন মিস্টার রেডফোর্ড। বাড়িঘরের কাজ করার জন্যে অনেক লোক রেখেছিলেন তিনি। তাদের মাঝে মহিলাও ছিলো। তবে কোনো কিছুতেই যাতে কোনো মেয়েলী ছাপ না পড়ে সেদিকে কড়া নজর রাখতেন তিনি। তেমন কিছু করতে গেলেই কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিতেন মহিলা সার্ভেন্টদেরকে।

প্রথমে একতলার ঘরগুলোতে দ্রুত চক্কর দিয়ে এলো কিশোর আর রবিন। আন্দাজ করার চেষ্টা করলো কোনখান থেকে খোঁজা শুরু করলে সুবিধে হয়। টেবিল আর ছোট বড় বেদির ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে অনেক ধরনের মূর্তি– মধ্যযুগীয় রোমান যোদ্ধা, আঠারোশো শতকের ওয়েস্টার্ন বন্দুকবাজ কাউবয়, কুস্তিগীর, ঘোড়সওয়ার সৈনিক, এসব।

কি বুঝলে? জিজ্ঞেস করলেন ফাউলার। হলে অপেক্ষা করছিলেন ছেলেদের জন্যে। নিশ্চয় দেয়ালে ঠুকে ঠুকে দেখেছো, চোরকুঠুরি আছে কিনা…

দড়াম করে কি আছড়ে পড়লো ওপর তলায়। বিকট শব্দ। পুরো বাড়িটা যেন কেঁপে উঠলো।

কি হলো? ভুরু কুঁচকে ফেলেছে কিশোর।

কি জানি! আনমনে মাথা নাড়লেন ফাউলার। চলো তো দেখি!

একেক বারে দুটো করে সিড়ি টপকে দৌড়ে উঠে এলো ওরা দোতলায়। আলাদা হয়ে গিয়ে ঘরগুলোতে খুঁজতে শুরু করলো। কোনো ঘরেই কিছু পড়ার চিহ্ন দেখতে পেলো না।

চিলেকোঠায় ওঠার সিঁড়িঘরের দরজা খুলে ফেললেন ফাউলার। উঠতে শুরু করলেন। পিছে চললো দুই গোয়েন্দা। চিলেকোঠায় ঢুকে থমকে দাড়ালো। অসংখ্য বাক্স আর পুরানো আসবাব স্তূপ হয়ে আছে। তার মধ্যে বড় একটা মেহগনি কাঠের দেরাজ উল্টে পড়েছে। নিচে চাপা পড়েছে একজন মানুষ। বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, পারছে না।

মরে গেল তো! চেঁচিয়ে উঠলো রবিন।

লোকটাকে বের করে আনার জন্যে লাফিয়ে এগোলো কিশোর। তাকে সাহায্য করতে এগোলো রবিন আর ফাউলার। তুলে সোজা করে রাখলো দেরাজটা তারপর তাকালো লোকটার দিকে মাঝবয়েসী একজন লোক রোগা শরীর নরছে না আর এখন। বেহুশ হয়ে গেছে। কপাল কেটে রক্ত ঝরছে। চেহারা ফ্যাকাসে তাড়াতাড়ি হাঁটু গেড়ে বসে নাড়ি দেখলো কিশোর। নাড়ির গতি ক্ষীণ।

অ্যামবুলেন্স ডেকে হাসপাতালে পাঠানো দরকার, ফাউলার বললেন। এখানে কি করতে এসেছিলো?

চেনেন? জিজ্ঞেস করলো রবিন।

আন্দাজ করতে পারছি। শিওর হতে হলে আরও কিছু দেখা দরকার, অচেতন লোকটার জ্যাকেটের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলেন উকিল। নাম-ঠিকানা লেখা কাগজটা পড়ে বললেন, যা ভেবেছিলাম। এর নাম উইলিয়াম বারোজ। মিস্টার রেডফোর্ডের খালাতো ভাই। উইলে এর নামও রয়েছে।

উত্তরাধিকারী! বিড়বিড় করলো কিশোর। উঁকিলের দিকে তাকিয়ে বললো, নিশ্চয় কিছু খুঁজতে এসেছিলো। জরুরী কিছু।

নিচে টেলিফোন আছে। সেকথা রবিনকে জানালেন ফাউলার। অ্যামবুলেন্সের জন্যে টেলিফোন করতে বললেন। অ্যামবুলেন্স আসুক। আমাদের অপেক্ষা করাই ভালো।

লোকটার ওপর নজর রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। কিশোর খুঁজতে শুরু করলো। ড্রয়ার, বাক্স, আলমারি, সব জায়গায়। বের করার চেষ্টা করছে লোকটা কি নিতে এসেছিলো।

দেরাজের মধ্যেও খুঁজতে গিয়েছিলো, বললো সে। হয়তো ঠিকমতো বসেনি। টান লেগে উল্টে পড়েছে গায়ের ওপর।

তাই হবে। চুরি করে ঢুকেছে। আমাকে না নিয়ে এবাড়িতে ঢোকার অনুমতি নেই কারো। ভাবছি, ঢুকলো কিভাবে?

দেরাজের ড্রয়ার পুরানো কাপড় আর বইতে বোঝাই। নাহ্, তেমন কিছু তো দেখছি না, নিরাশ হয়ে মাথা নাড়লো কিশোর। অ্যাজটেক যোদ্ধার সূত্র পাবো। আশা করেছিলাম।

রবিন ফিরে এসে জানালো অ্যামবুলেন্স আসছে। আবার ফিরে গেল নিচে, অ্যামবুলেন্স এলে তাদেরকে পথ দেখিয়ে আনার জুন্যে।

বেশিক্ষণ লাগলো না। একটু পরেই একজন ডাক্তার আর দুজন স্ট্রেচার বাহককে নিয়ে এলো রবিন। বারোজকে পরীক্ষা করলেন ডাক্তার। বললেন, অবশ্যই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

লোকটাকে স্ট্রেচারে ভোলা হলো। বাহকদের সঙ্গে চললেন ডাক্তার, উকিল, আর দুই গোয়েন্দা।

অ্যামবুলেন্স চলে যেতেই কিশোর বললো, আবার সে চিলেকোঠায় ফিরে যেতে চায়। খোঁজার কাজটা শেষ করে ফেলবে।

কেন, কিছু চোখে পড়েছে নাকি? জিজ্ঞেস করলো রবিন।

মনে হয়। কয়েক বাক্স পিকচার স্লাইড পড়ে থাকতে দেখেছি। বোধহয় ওগুলোর জন্যেই গিয়েছিলো বারোজ। আর তাহলে ধরেই নেয়া যায়, সূত্র রয়েছে ওই ছবির মাঝেই।

দাঁড়িয়ে আছো কেন? জলদি চলো!


তুমি ভাবছো, ফাউলার বললেন। এর মধ্যে অ্যাজটেক যোদ্ধার ছবিটবি আছে?

চিলেকোঠার দরজায় পৌঁছে গেল ওরা। কিশোর বললো, হ্যাঁ। হয় লোকটার। নয়তো জিনিসটার।

স্লাইডগুলো কোথায় বসে দেখবে? কিশোর বললো, নিচে গিয়ে দেখাই ভালো। চিলেকোঠায় বসে দেখতে অসুবিধে। কথাটা পছন্দ হলো ফাউলারের। বললেন, সেই ভালো। চলো। স্লাইড দেখতে তো প্রোজেক্টর আর পর্দা লাগে। আছে যে তুমি জানলে কি করে?

সহজ। স্লাইড যখন আছে, প্রোজেক্টর আর পর্দাও আছে। এ-তো জানা কথা। তবে আমি দেখেছি নিচতলার ঘরগুলো খোঁজার সময়। চলুন।

চলো। তিনজনে মিলে বাক্সগুলো নিচে নামিয়ে আনলো। তারপর প্রোজেক্টর আর পর্দা বয়ে নিয়ে এলো লিভিং রুমে। বাক্সের ওপর বিভিন্ন দেশের নাম লেখা রয়েছে। গ্রীস, ইটালি, মিশর, আর ভারত লেখা বাক্সগুলো সরিয়ে রাখলো কিশোর। অ্যাজটেক যোদ্ধাকে এগুলোতে পাবো না, বললো সে। আমি শিওর। আমরা যাকে খুঁজছি তাকে পাবো মেকসিকোয়।

পর্দাটা টেনে নামিয়ে দিয়ে এলো রবিন। প্রোজেক্টর রেডি করে তাতে স্লাইড ঢোকালো কিশোর। একটা বাক্সের ওপরে কিছু লেখা নেই, সেটা থেকেই নিয়েছে প্রথম ছবিটা। দেখলো। তারপর একের পর এক ছবি ঢোকাতে থাকলো।

কিছু ছবি দেখে মনে হলো, সেগুলো রকি পর্বত থেকে তোলা হয়েছে। তারপর এলো হাওয়াই, ক্যানাডা আর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গার দৃশ্য।

মেকসিকোতে ভোলা একটা ছবিও চোখে পড়েনি এখনও, তবু বিমোহিত হয়ে দেখছে কিশোর রবিন। খুবই ভালো লাগছে ওদের। অজানা অচেনা দুর্গম সব জায়গার ছবি। কিছু কিছু তো বিস্ময়কর। কোন দিক দিয়ে যে একটা ঘণ্টা পেরিয়ে গেল টেরই পেলো না ওরা। ফাউলারও মুগ্ধ হয়ে দেখছেন। হঠাৎ কি মনে হতে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, আরিব্বাবা, অনেক দেরি হয়ে গেছে! আর বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না আমি। অফিসে যেতে হবে।

প্রোজেক্টরের দায়িত্ব নিয়েছে এখন রবিন। একের পর এক স্লাইড তুলে দিচ্ছে কিশোর, সেগুলো মেশিনে ঢোকাচ্ছে সে। ছবি দেখতে বেশিক্ষণ আর সময় নিচ্ছে না ওরা। দ্রুত দেখছে। তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে।

দাঁড়াও, দাঁড়াও! প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন ফাউলার। মেক্সিকো! ওই বিল্ডিংটা মেকসিকো সিটিতে, ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়!

গিয়েছিলেন নাকি ওখানে?

হ্যাঁ।

ছবিটা ভালো করে দেখে সরিয়ে দিলো রবিন। আরেকটা ছবি দেখে ফাউলার জানালেন, ওটা পিরামিড অভ দি সান। মেকসিকো সিটির বাইরে বিশাল এক প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ।

রবিন, ধরে রাখ ছবিটা, কিশোর বললো। এটাই অ্যাজটেক। কোনো সূত্র আছে কিনা দেখ।

অনেকক্ষণ দেখেও কিছুই বের করা গেল না ছবিটা থেকে। ছবিতে কয়েকজন লোক রয়েছে। কারোর চেহারাই স্পষ্ট নয়, চেনা যায় না।

বোতাম টিপে দিলো আবার রবিন। চলতে শুরু করলো আবার প্রোজেক্টর। কয়েকটা ছবিতে নানা রকম ক্যাকটাস দেখা গেল, ক্যান্ডেল ক্যাকটাসও রয়েছে তার মধ্যে। একটা হ্রদ দেখা গেল। মাছ ধরছে জেলেরা। জালগুলো অদ্ভুত।

ওটা লেক প্যাজকুয়ারো, ফাউলার জানালেন। আর ওই জালগুলোকে বলে প্রজাপতি জাল। দুনিয়ায় একমাত্র ওই হ্রদেই ওরকম জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়, আবার ঘড়ি দেখলেন তিনি। আর তো বসতে পারছি না আমি। এবার যেতে হয়। বাকি ছবিগুলো দেখার জন্যে আবার নাহয় একসময় ফিরে আসা যাবে।

আমরা থাকি? কিশোর অনুমতি চাইলো। ছবিগুলো দেখেই যাই আমি আর রবিন। অসুবিধে আছে?

হাসলেন উকিল সাহেব। ব্যক্তিগত ভাবে আমার কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু আমি একটা দায়িত্ব পালন করছি। একজনের সম্পত্তি আমার কাছে গচ্ছিত রয়েছে। লোকে জানলে খুব সমালোচনা করবে।

কিশোর কথা বলছে, সময় নষ্ট না করে এই সুযোগ আরেকটা স্লাইড ঢুকিয়ে দিয়েছে রবিন। দুটো লোককে দেখা গেল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে।

অস্ফুট শব্দ করে উঠলো কিশোর। একজনকে চিনতে পেরেছে। বায়ের মানুষটি মিস্টার চেস্টার রেডফোর্ড।

অন্য লোকটা কে? রবিনের প্রশ্ন। দেখতে তো অনেকটা ইনডিয়ানদের মতো লাগছে।

স্প্যানিশ-ইনডিয়ান! বিড়বিড় করলো কিশোর। ফাউলারের দিকে তাকালো। কে ও? পিন্টো আলভারো?

বলতে পারবো না, মাথা নাড়লেন উকিল সাহেব। স্থির দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। অ্যাজটেক যোদ্ধার সত্যিকারের বংশধর হতে পারে! চেহারা অন্তত তা-ই বলছে।

কিশোর আর রবিনের মতোই উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন ফাউলার। যাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন ছবিটার দিকে। দ্রুত পরের ছবিগুলো চালিয়ে দিলো রবিন। প্রতিটিতেই দুজনের ছবি, নানা ভঙ্গিতে, চমৎকার একটা বাগানের মধ্যে তোলা।

মিস্টার ফাউলার, আবার অনুরোধ করলো কিশোর। ছবিগুলো তো সবই প্রায় এক। একটা নিয়ে গেলে কোনো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। নিতে পারি? প্রিন্ট করে নেবো।

ভেবে দেখলেন উকিল। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে অনুমতি দিলেন।

সব চেয়ে পরিষ্কার ছবিটা বেছে বের করলো কিশোর। সাবধানে রুমালে জড়িয়ে পকেটে রাখলো।

প্রেজেক্টর, পর্দা আর বাক্সগুলো যেখানে ছিলো, সেখানে রেখে এলো আবার তিনজনে মিলে। বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। সদর দরজার তালা লাগালেন ফাউলার। তারপর ছেলেদের নিয়ে এসে গাড়িতে উঠলেন। পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে ওদেরকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।

ভেতরে ঢুকেই সোজা হেডকোয়ার্টারের দিকে এগোলো দুই গোয়েন্দা। পথে দেখা হয়ে গেল রাশেদ পাশার সঙ্গে। পুরানো একটা গার্ডেন চেয়ারে বসে পাইপ টানছেন তিনি। গভীর মনোযোগে কি যেন দেখছেন ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে। ওদের সাড়া পেয়ে মুখ তুললেন। হাত নেড়ে ডাকলেন, দেখে যা।

গেল দুজনে। ময়লা পুরানো একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, দুটো আঙুলের ছাপ আছে। দেখ তো একরকম না আলাদা?

অবাক হয়ে চাচার মুখের দিকে তাকালো কিশোর। নীরবে হাত বাড়িয়ে কাগজ আর গ্লাসটা নিলো। ভালোমতো দেখে ফিরিয়ে দিতে দিতে বললো, আলাদা। একজনের না।

মুচকি হাসলেন রাশেদ পাশা। আমি যদি বলি একজনের?

চাচার মুখের দিকে তাকিয়েই রয়েছে কিশোর। কি হয়েছে তোমার, চাচা? পুরানো মাল বাদ দিয়ে হঠাৎ এই গোয়েন্দাগিরি!

তুই যদি পুরানো মাল আর গোয়েন্দাগিরি একসাথে চালাতে পারিস, আমি পারবো না কেন?

তা বটে। কিন্তু হঠাৎ তোমার এই শখ কেন?

হঠাৎ দেখলি কোথায়? তোরা যখন কোনো কেসে কাজ করিস, আমি কি ইনটারেস্টেড হই না? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করি না?

তা করো…

নতুন একটা খবর শুনবি? হাসিটা ছড়িয়ে পড়েছে রাশেদ পাশার চোখে। গোঁফের কোণ ধরে টানলেন। আমিও একসময় গোয়েন্দা ছিলাম।

বোমা ফাটলো যেন, এমন ভাবে চমকে গেল কিশোর রবিন। গোয়েন্দা! একই সঙ্গে বলে উঠলো দুজনে।

হ্যাঁ, গোয়েন্দা। জীবনে অনেক কাজই করেছি, জানিস। বাড়ি থেকে পালিয়ে সার্কাসের দলে যোগ দিয়েছি। ছন্নছাড়ার মতো ঘুরে বেড়িয়েছি দেশে দেশে। জাহাজের নাবিক হয়েছি। মরুভূমিতে গিয়ে বেদুইনদের সঙ্গে বাস করেছি…

সেসব জানি, বাধা দিয়ে বললো কিশোর। জনতাম না শুধু গোয়েন্দা হওয়ার খবর।

ভালো ডুবুরি ছিলাম আমি, সেখবর জানিস? প্রশান্ত মহাসাগরের এক দ্বীপে বহুদিন থেকেছি আমি, মুক্তো-শিকারীদের দলে।

আশ্চর্য! এতো কিছু ছিলে তুমি…

তোর বাপও অনেকটা এরকমই ছিলো। তোর দাদাও। নইলে রহস্য আর, রোমাঞ্চের এই তীব্র নেশা এলো কোত্থেকে তোর রক্তে?

হুঁ! বিমূঢ় হয়ে গেছে যেন কিশোর। রবিন থ। তা গোয়েন্দাটা কবে ছিলে? কোথায়?

জাহাজে থাকতে। একদিন এক কোটিপতি মহিলার নেকলেস হারিয়ে গেল। জাহাজের ডিটেকটিভ কিছুই করতে পারলো না। আমার খুব আগ্রহ হলো, দেখি তো চেষ্টা করে? দুই ঘণ্টার মধ্যেই বের করে দিলাম নেকলেসটা…

এত্তো তাড়াতাড়ি! চোখ বড় বড় করে ফেললো রবিন।

হ্যাঁ। সেদিনই আমাকে সহকারী গোয়েন্দার চাকরি দিয়ে ফেললেন ক্যাপ্টেন। ছমাসের মধ্যেই আসল ডিটেকটিভকে ছাড়িয়ে আমাকে তার জায়গায় বহাল করলেন। কিন্তু টিকলাম না। বছরখানেক পরেই পালালাম। আফ্রিকার উপকূল ধরে চলছিলো তখন জাহাজ। সিংহ আর হাতি শিকারের লোভ সামলাতে পারলাম …

আচমকা কি হলো কিশোরের কে জানে! চট করে বসে পড়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে ফেললো চাচাকে। এতো কথা কোনোদিন কিন্তু জানাওনি তুমি আমাকে!

জানাবো কি? আমার এই ছন্নছাড়া জীবনের কথা শুনলেই তোর চাচী খেপে যায়। বলে ফালতু সময় নষ্ট করেছি আমি। কে যায় অহেতুক সংসারের শান্তি নষ্ট করতে…

হুঁ! মাথা দোলালো কিশোর। তা এই আঙুলের ছাপের ব্যাপারটা কি, বল তো? আবার গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছে নাকি?

না। পুরানো ডায়েরী ঘাঁটতে গিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়লো কাগজটা। অবসর সময়ে ধাঁধার খেলা আমার খুব ভালো লাগতো। বসে বসে খেলতাম। এই আঙুলের ছাপ আমারই। এই যে এটা আসল। আর এটা নকল।

নকল! বুঝতে পারলো না রবিন। কিশোর বুঝে ফেলেছে। বললো, বুঝেছি। রবারের নকল চামড়া লাগিয়ে নিয়েছিলে। এভাবে নকল ছাপ দিয়ে বাঘা বাঘা গোয়েন্দাকে ধোকা দিয়ে দেয় অপরাধীরা।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকালেন রাশেদ পাশা। ভাইপোর মুখের দিকে তাকালেন সরাসরি। খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে। কোনো কেস পেয়েছিস নাকি?

পেয়েছি, খুলে বললো কিশোর। ছবিটা প্রিন্ট করার কথা বললো।

চল, আমিও দেখি। হাতে কাজটাজ বিশেষ নেই। ভাবছি, পুরানো পেশাটা আবার নতুন করে ঝালিয়ে নেবো। মন্দ হয় না, কি বলিস?

একটুও না, খুশি হয়ে বললো কিশোর। স্যালভিজ ইয়ার্ডের পাশাপাশি নতুন কতো ব্যবসাই তো করো। এই যেমন জন্তুজানোয়ার ধরে বিক্রি করার ব্যবসাটা। একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলে ফেললেই বা ক্ষতি কি?

তোদেরকে দেখে সেকথা ভাবছি অনেকদিন থেকেই। সাহস পাই না, বুঝলি, অফিসের দিকে তাকালেন তিনি। ভেতরে কাজ করছেন মেরিচাচী। তোর চাচীর এসব কাজ একদম পছন্দ না।

কই, আমাকে তো কিছু বলে না?

তোকে বলে না। আমাকে বলবে। ওই বেরোচ্ছে। নিশ্চয় খেতে ডাকবে।

বারান্দায় বেরিয়ে এলেন মেরিচাচী। হাত নেড়ে সবাইকে যেতে ডাকলেন। ঠিকই আন্দাজ করেছেন রাশেদ পাশা। খেতেই ডাকলেন তিনি।

টেবিলে বসে সবে প্লেট টেনে নিয়েছে কিশোর, মেরিচাচী জিজ্ঞেস করলেন, এই কিশোর, মিস্টার সাইমন ফোন করেছিলেন কেন রে? নিশ্চয় নতুন কোনো কেস?

হ্যাঁ। তেমন কিছু না… এড়িয়ে যেতে চাইলো কিশোর।

কেসটা কি? মিথ্যে বলে পার পাবে না, বুঝে গেল, কিশোর। বলতেই হলো। বারোজের কথায় আসতেই রেগে গেলেন। কড়া গলায় বললেন, শয়তান! ওটাকে আবার সম্পত্তি দিতে গেলেন কেন মিস্টার রেডফোর্ড! ও তো একটা চোর!

কিন্তু সত্যিই কিছু চুরি করতে গিয়েছিলো কিনা আমরা জানি না।

নিশ্চয় গিয়েছিলো! নইলে লুকিয়ে চিলেকোঠায় উঠতে যাবে কেন? উকিল সাহেবের জায়গায় আমি হলে সোজা সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে বারোজের বাড়িতে তল্লাশি চালাতাম। আজই পয়লা নয়, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আরও চুরি করেছে সে। তার বাড়িতে চোরাই মাল পাওয়া যাবেই।

তুমি রেগে যাচ্ছাে কেন? মোলায়েম গলায় বললেন রাশেদ পাশা। তবে একেবারে ভুল কথা বলোনি। চোর হতেও পারে। যাই হোক, পালিয়ে তো আর যেতে পারছে না। হাসপাতালে রয়েছে। পুলিশ ছাড়বে না। সুস্থ হলেই গিয়ে প্রশ্ন শুরু করবে।

দেখবে তখন, আমার কথাই ঠিক, বলে রান্নাঘরে চলে গেলেন তিনি।

খাওয়ার পরে লিভিং রুমে এসে বসলো সবাই। হাসপাতালে ফোন করলো কিশোর। জানা গেল, তখনও হুঁশ ফেরেনি বারোজের।

অ্যাজটেক যোদ্ধার কেস নিয়েই চললো আলোচনা।

মেকসিকোর পুরানো ইতিহাস ঘাটতে হবে, কিশোর বললো একসময়। বিশেষ করে সেই সময়কার, যখন অ্যাজটেকরা ক্ষমতায় ছিলো।

বাড়িতে বড় একটা লাইব্রেরি গড়ে তুলেছে কিশোর। অবশ্যই সেটা গড়তে সাহায্য করেছেন রাশেদ পাশা আর মেরিচাচী। বইয়ের ব্যাপারে তিনজনেরই প্রচন্ড আগ্রহ। মোটা মোটা দুটো বই নিয়ে এলো কিশোর।

একটা রবিনকে দিয়ে আরেকটা নিজের কোলের ওপর রেখে পাতা ওল্টাতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে নিমগ্ন হয়ে গেল বইয়ের পাতায়।

নীরবে পাইপ টানছেন রাশেদ পাশা। মেরিচাচী একটা পেপারব্যাক উপন্যাস নিয়ে বসেছেন।

বাপরে! কি জল্লাদ ছিলো! হঠাৎ বলে উঠলো রবিন। কিভাবে মারতে মানুষগুলোকে! দেবতার ভোগ! স্বাস্থ্যবান দেখে একজন তরুণকে বেছে নিতো। একটা বছর তাকে ভালো ভালো খাবার খাওয়াতো, কাপড় দিতো, আনন্দের যতো রকম উপকরণ আছে, সব দেয়া হতো। তারপর নিয়ে গিয়ে তাকে বলি দিতো যুদ্ধ দেবতার উদ্দেশ্যে।

হ্যাঁ, তিক্ত কণ্ঠে বললো কিশোর। ধর্মের নামে ধরে ধরে খুন করতে অসহায় মানুষগুলোকে। সব শয়তানী ওই ধর্মগুরুগুলোর। ধর্মযাজক না ছাই! আস্ত পিশাচ একেকটা!

পুরানো আমলের নরবলি নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা চললো। তাতে রাশেদ পাশা আর মেরিচাচীও যোগ দিলেন। অ্যাজটেক যোদ্ধাদের কয়েকটা ছবি রয়েছে বইতে। বিচিত্র পোশাক পরা। একটা দেখিয়ে রবিন বললো, দেখ দেখ, কি অদ্ভুত!

রঙিন ছবি। কাকাতুয়ার পালকের মুকুট মাথায়। গায়ের খাটো জামাটাও তৈরী হয়েছে কাকাতুয়া আর কিছু দুর্লভ পাখির পালক দিয়ে। সোনার সুতো দিয়ে গাঁথা হয়েছে পালকগুলো। এছাড়াও জায়গায় জায়গায় সোনার কারুকাজ।

আরেকটা ছবিতে দেখা গেল পুরো এক স্কোয়াড্রন যোদ্ধা। পরনে জাগুয়ারের চামড়ার তৈরি ইউনিফর্ম। হাতে বর্ম, তাতেও সোনার কারুকাজ। প্রজাপতি আর সাপের প্রতিকৃতি। পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। তাতে সোনা। সোনার ছড়াছড়ি। প্রচুর স্বর্ণখনির মালিক ছিলো ওরা, বোঝা যায়।

মন দিয়ে দেখছে কিশোর আর রবিন, এই সময় এঞ্জিনের শব্দ হলো। বিকট শব্দ করতে করতে অফিসের কাছে এসে থামলো গাড়িটা।

হাসলো কিশোর নিশ্চয় মুসা।

উঠে জানালার কাছে চলে গেল রবিন। ঠিকই বলেছো।

দরজায় দেখা দিলো মুসা। এই যে আছো। ব্যাপার কি? কেস তাহলে সত্যিই মিললো? মিস্টার সাইমন সেজন্যেই ডেকেছিলেন?

হ্যাঁ, রবিন বললো। তা কি কি করে এলে?

তেমন কিছু না, জবাব দিলো কিশোর। দেরাজের নিচে চাপা পড়া একজন মানুষকে বের করে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। আর একজন অ্যাজটেক যোদ্ধার খোঁজ করছি।

বড় হয়ে গেল মুসার চোখ। কিসের খোঁজ করছো!

অ্যাজটেক যোদ্ধার, মুসাকে কেসটার কথা খুলে বললো কিশোর আর রবিন।

এই যোদ্ধার ব্যাপারটা ভাল্লাগছে না আমার। পুরানো ব্যাপার-স্যাপার তো, ভূত বেরিয়ে পড়তে পারে। পুরানো, বাড়িতেই ভূত বেশি থাকে জানোই তো, মুসা বললো। তবে মেকসিকোর ব্যাপারটা বেশ ইনটারেসটিং।

এই উইলের ব্যাপারটা পাগলামি মনে হচ্ছে আমার, মুসা বললো। তবে মেকসিকো বেশ মজার। কিছু ইতিহাস আমিও পড়েছি। পুরানো ওই অ্যাজটেকরা কি খেতে জানো?

না, মাথা নাড়লো রবিন।

ফুল মিশিয়ে খাবার রান্না করতো, নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো মুসা। রবিন আর কিশোরের কাছে বিদ্যে জাহির করার সুযোগ কমই পায় সে। পেয়ে আর ছাড়তে চাইলো না। তাতে নাকি অনেক অসুখ দূরে থাকে। এই যেমন, অ্যাকাশে ফুল নাকি মেলানকালিয়া মানে বিষন্নতা দূর করে, প্রাচীন অ্যাজটেক ওঝারা বিশ্বাস করতো। ডিমের সঙ্গে মিশিয়ে, তাতে চিনি আর দারুচিনি দিয়ে ভাজা করে খেতো, ঠোঁট চাটলো সে। টেস্ট খারাপ হবে না। ভাবছি একদিন বানিয়ে খেয়ে দেখবো।

কেন, তোমাকে মেলানকালিয়া ধরলো কবে থেকে? হেসে জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

আর কোনো ফুল খেতো? রবিনের প্রশ্ন।

নিশ্চয় খেতো। পাই ফিলিং তৈরি করতো গোলাপ ফুল দিয়ে। তাতে মেশাতো চিনি আর লেবু। একধরনের শরবত বানাতে জ্যামাইকা গাছের লাল কুঁড়ি দিয়ে। আর স্কোয়াশ কুঁড়ি খাওয়ার কথা তো নিশ্চয় শুনেছো। শোনোনি? সূর্যদেবতার পুজোর সময় ওই কুঁড়ি মুখে পুরে পানের মতো চিবাতো।

ছাগল ছিলো নাকি ব্যাটারা! মেরিচাচী বললেন।

এক কাজ করো, মেরি, হেসে বললেন রাশেদ পাশা। একদিন জেরানিয়াম, ফুল দিয়ে স্যুপ বানিয়ে দেখ না। অ্যাজটেকরা খেতে পারলে আমরা কেন পারবো না?

হাসতে শুরু করলো সবাই।

হাসতে হাসতে মুসা বললো, কেন এসেছি, সেটা শুনলে না?

নিশ্চয় পার্টসটা পেয়ে গেছ, সেটা বলতে, কিশোর বললো। চমৎকার হয়ে যাবে এবার ভাঙা গাড়িটা। একেবারে নতুনের মতো।

মতো না। নতুনই! তর্জনী নাচিয়ে জোর দিয়ে বললো মুসা। আবার যেতে হবে আমাকে। আরেকটা পার্টসের খোঁজে। এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, বলেও যাই, জিজ্ঞেসও করে যাই, মিস্টার সাইমন ডেকেছিলেন কেন? যাক, তোমরা অ্যাজটেক যোদ্ধাকে খোঁজাখুঁজি করো। প্রয়োজন পড়লে আমাকে নিও। আগে গাড়ির কাজটা শেষ করে নিই…

ঠিক আছে, যাও।

বেরিয়ে গেল মুসা। একটু পরেই শোনা গেল তার জেলোপি গাড়ির ভটভট শব্দ। ইয়ার্ড থেকে বেরোনোর পরেও কিছুক্ষণ শোনা গেল শব্দটা।

বিশ্রাম নেয়া হয়েছে। অফিসে চলে গেলেন মেরিচাচী। ইয়ার্ডের কাজ করতে বেরিয়ে গেলেন রাশেদ পাশা। একা হয়ে গেল কিশোর আর রবিন।

তারপর? রবিন জিজ্ঞেস করলো। এই কেসের ব্যাপারে আর কি করা যায় বলো তো?

তোমার গাড়িটা নিয়ে এসোগে। মিস্টার সাইমনের ওখানে যাবো। তাঁকে সব জানাবো। আর ভাবছি, আজ রাতে আরেকবার যাবো রেডফোর্ড হাউসে। ভেতরে ঢোকা নিষেধ, বাইরে থেকে দেখতে তো বাধা নেই।

তা নেই। কি দেখবে?

দেখি!

মিস্টার সাইমনের সঙ্গে দেখা করে ফিরে এলো দুজনে। রাতের খাবারের পর আবার বেরিয়ে পড়লো। চললো রেডফোর্ড এস্টেটে। গেটের পাশে এনে গাড়ি রাখলো রবিন। এখানেই রেখে যাই, কি বলো?

আরেকটু সরিয়ে রাখো, কিশোর বললো।

গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভওয়ে ধরে হেঁটে চললো দুজনে। আলো রয়েছে তখনও, টর্চ জ্বালার দরকার পড়লো না। বাড়ির বাঁ পাশে পৌঁছে থমকে গেল ওরা। একজন মহিলা, ওপর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মোটাসোটা। মাথায়, শাদা চুল।

শব্দ শুনে ফিরে তাকালো মহিলা। একটা মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে। তারপর হাসলো। গুড ইভনিং। চমকে দিয়েছিলে। চোর মনে করেছিলাম। তা নও, দেখেই বুঝতে পারছি। আমার নাম ক্লারা অ্যাডামস। এখানেই কাজ করতাম, বাড়ির মালিক থাকতে।

মিস্টার রেডফোর্ড? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

মাথা ঝাঁকালো মহিলা। খুব ভালো লোক ছিলেন। তাঁর কাছে কাজ করে শান্তি ছিলো। কি আরামে ছিলাম ভাবলে কষ্টই লাগে এখন।

কতোদিন আগে কাজ করেছে, জানতে চাইলো কিশোর।

ক্লারা জানালো, বছর দুই আগে চলে গিয়েছিলাম। ইদানীং বেশি বেশি বাইরে যেতেন মিস্টার রেডফোর্ড, নিয়মিত কাজের লোক তেমন লাগতো না।

মিস অ্যাডামস, অ্যাজটেক যোদ্ধার নাম কখনো বলতে শুনেছেন মিস্টার রেডফোর্ভকে? প্রশ্ন করে বসলো কিশোর।

শূন্য দৃষ্টি ফুটলো মহিলার চোখে। নাহ্।

মেকসিকোতে যেতেন, তাই না? জিজ্ঞেস করলো রবিন।

প্রায়ই। অনেক সুভনির এনেছেন ওখান থেকে।

ওগুলো কি করেছেন? কিশোর জানতে চাইলো।

কিছু নিজের কাছে রেখেছেন। কিছু দিয়ে দিয়েছেন একে-তাকে।

মেকসিকোর কোনো বন্ধু বা পরিচিতজনের নাম উল্লেখ করেছেন কিনা তিনি। কখনও, জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

মাথা নাড়লো ক্লারা। সত্যি বলতে কি, মিস্টার রেডফোর্ড কথা তেমন বলতেনই না। বাড়ির চাকর-বাকরের সঙ্গে তো নয়ই। তবে কার সাথে যেন কথা বলার সময় একবার বলতে শুনেছিলাম, মেকসিকোতে গিয়ে ইনডিয়ান অস্ত্রশস্ত্র জোগাড়ের চেষ্টা করেন তিনি, সংগ্রহে রাখার জন্যে। ওই সময় একটা লোক ছিলো তার সঙ্গে। নামটা বলেননি।

অনেক অস্ত্র সংগ্রহে আছে বুঝি তার? রবিন জিজ্ঞেস করলো।

আছে। মিউজিয়ামে দান করে দেবেন বলতেন। দেখলে বুঝতে কি সব জিনিস! রোজ ওগুলোর ধুলো মুছে পরিষ্কার করে রাখতাম আমি। কয়েকটা অস্ত্র ছিলো ভয়ংকর, দেখলেই হাত-পা সিঁটিয়ে যেতো আমার।

কোনো অন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে অ্যাজটেক শব্দটা কি বলেছেন?

নাহ্, শুনিনি। কিছু কিছু অস্ত্র আনা হয়েছে আফ্রিকা আর ইউরোপ থেকে। মেকসিকো থেকে যেগুলো এনেছেন, সেগুলোর নাম বলার সময়ও কখনও অ্যাজটেক কথাটা বলেননি।…দেরি হয়ে গেল। যাই। তোমাদের সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগলো।

আপনি কি এখানে প্রায়ই আসেন? প্রশ্ন করলো কিশোর।

কিশোরের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ ক্লারা। সন্দেহ করছো, না?

না, না, এমনি…

হাসলো মহিলা। করলে অবশ্য তোমাকে দোষ দেয়া যায় না। এরকম সময়ে বন্ধ একটা বাড়িতে একজন মহিলাকে দেখলে সন্দেহ হওয়ারই কথা। হ্যাঁ, আসি। মানে, আসতাম। মালিক বেঁচে থাকতে তার সঙ্গে দেখা করতে আসতাম। তাছাড়া বাড়িটার মায়া আমি কিছুতেই কাটাতে পারি না।…ঠিক আছে, চলি। গুড বাই।

দ্রুত হেঁটে চলে গেল মহিলা।

তাকে নিয়ে খুব একটা ভাবছে না দুই গোয়েন্দা। তাদের মনে তখন অন্য চিন্তা। অ্যাজটেক যোদ্ধা কোনো অস্ত্রের নাম নয় তো?

লনের ধার দিয়ে হেঁটে বাড়ির সামনের দিকে চলে এলো দুজনে। অনেক বড় বাড়ি। ডান পাশে চোখ পড়তেই থমকে গেল ওরা।

একটা বাক্সের ওপর উঠে জানালা দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে একজন মানুষ।


লোকটাকে ধরার জন্যে ছুটলো দুজনে। কিন্তু দেখে ফেললো লোকটা। লাফ দিয়ে বাক্স থেকে নেমে একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ে মারলো ওদের দিকে। তারপর ঘুরে দৌড় দিলো উল্টো দিকে।

পাথরটাকে এড়ানোর জন্যে ঝট করে মাথা সরিয়ে ফেললো, কিশোর আর রবিন। চিৎকার করে ডাকলো কিশোর, শুনুন! দাঁড়ান!

কিন্তু লোকটা কি আর শোনে। থামলো না। টর্চ জ্বেলে তার পিছু পিছু দৌড় দিলো দুই গোয়েন্দা। লোকটা বেঁটে, কালো চুল। দৌড়ানোর ভঙ্গিতেই বোঝা যায় এলাকাটা খুব ভালোমতো চেনে, কোনো রকম দ্বিধা নেই। পেছনের একটা পথ দিয়ে ছুটে হারিয়ে গেল অন্ধকারে। তন্ন তন্ন করে খুঁজলো কিশোর আর রবিন। একজায়গায় মাটিতে জুতোর ছাপ ছাড়া লোকটার আর কোনো চিহ্নই দেখতে পেলো না।

পুলিশকে জানানো দরকার, কিশোর বললো। আমি থাকি। পাহারা দিই। তুমি গিয়ে পুলিশকে ফোন করো।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই এসে হাজির হলো একটা পেট্রোল কার। লোকটা যেখানে ছিলো, সেই জায়গাটা পরীক্ষা করতে লাগলো। জানালার চৌকাঠে আঙুলের ছাপ ফেলে গেছে লোকটা। সেগুলো তোলার ব্যবস্থা করলো পুলিশের বিশেষজ্ঞ। মাটি থেকে জুতোর ছাপের মডেল তৈরি করলো। আর যে বাক্সের ওপর দাঁড়িয়েছিলো লোকটা, সেটাও তুলে নিলো গাড়িতে।

ছেলেদেরকে ধন্যবাদ দিলেন পেট্রোল কারের অফিসার-ইন-চার্জ। আবার কোনো চোরছ্যাঁচোড়কে চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে জানানোর অনুরোধ করে চলে গেলেন।

পুলিশ চলে গেলে আবার অ্যাজটেক যোদ্ধার সূত্র খুঁজতে শুরু করলো দুই গোয়েন্দা। টর্চের আলো ফেলে ঘুরে ঘুরে দেখলো। কিছুই চোখে পড়ছে না। তারপর হঠাৎ বলে উঠলো কিশোর, মনে হয় পেলাম!

দৌড়ে এলো রবিন। কিশোরের আলোটার পাশে আলো ফেললো। একটা বড় পাতের কান্ডে খোদাই করে আঁকা হয়েছে একজন ইনডিয়ান মানুষের প্রতিকৃতি, মাথা থেকে কাধের নিচ পর্যন্ত।

কি বোঝাতে চেয়েছে, কিশোর বললো। বুঝলাম না। তবে অ্যাজটেক যোদ্ধার ছবি হতে পারে।

গাছের পুরো কাণ্ডটাতেই চোখ বোলালো ওরা, আরও সূত্রের আশায়। আরেকটা ছবি কিংবা ফাপা জায়গা। নেই কিছু।

গাছের কাছে মাটিতে কিছু পুঁতে রাখেনি তো? রবিনের প্রশ্ন।

আবার খোঁজা শুরু হলো। গাছটাকে ঘিরে চক্কর দিতে শুরু করলো দুজনে। মাটির দিকে চোখ। অনেকখানি জায়গা দেখলো। মাটি খোঁড়ার চিহ্ন চোখে পড়লো না। সমান মাটি। সব জায়গায় সবুজ ঘাস, একরকম হয়ে জন্মেছে। মাটির রঙেরও কোনো পরিবর্তন নেই।

খোঁড়া হলেও, কিশোর বললো। কিছু দিনের মধ্যে অন্তত হয়নি। অনেক আগে। মাটি না খুঁড়লে কিছু বোঝাও যাবে না আছে কিনা। আজ রাতে হবে না সেটা। তাছাড়া মিস্টার ফাউলারের অনুমতি নিতে হবে।

চলো, গিয়ে অনুমতি নিয়ে নিই।

আজকে তো আর হবে না। কাল সকালে দেখা যাক।

রাত তো বেশি হয়নি। এখন কোথায় যেতে চাও? বাড়িতে?

না, চলো, একবার মিস্টার সাইমনের ওখান থেকে ঘুরে যাই। তিনি কিছু করতে পারলেন কিনা জানা দরকার।

আরেকটা জরুরী কেসে ব্যস্ত মিস্টার সাইমন। অ্যাজটেক যোদ্ধা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময়ই পাচ্ছেন না। দুই গোয়েন্দাকে দেখে খুশি হলেন। রেডফোর্ড এস্টেটে যা যা ঘটেছে তাকে জানালো কিশোর আর রবিন।

অন্ত্রের কথা শুনে সাইমন বললেন, ইনটারেসটিং! লুকানো থাকতেও পারে। নিককে ভিজ্ঞেস করবো। গাছের গোড়ায় লুকানো থাকলে অবাক হবো না।

ফাউলারকে ফোন করলেন তিনি। মাটি খুঁড়তে দিতে আপত্তি নেই উকিল সাহেবের। তাকেও বেশ আগ্রহী মনে হলো। জানিয়ে দিলেন, আগামী দিন সকাল নটায় রেডফোর্ড এস্টেটে যাবেন তিনি। ইচ্ছে করলে তখন গোয়েন্দারাও যেতে পারে।

অস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করলেন সাইমন। জবাবে ফাউলার বললেন, বছরখানেক আগেই ওই শখ চলে গিয়েছিলো মিস্টার রেডফোর্ডের। তালিকাটা আমি দেখেছি। তাতে অ্যাজটেক যোদ্ধার নাম নেই।

পরদিন সকালে সময়মতো এসে রেডফোর্ড এস্টেটে হাজির হলো কিশোর, রবিন আর মিস্টার সাইমন। মুসা আসতে পারেনি। গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত। দুটো গাড়ি সাপ্লাই দেবে বলে দুজন খদ্দেরের কাছ থেকে অগ্রীম টাকা নিয়েছে, ঠিকমতো ডেলিভারি দিতে না পারলে ইজ্জত যাবে। সে-কারণে প্রচন্ড আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও আসতে পারেনি।

গ্যারেজ থেকে কোদাল আর বেলচা বের করে আনলেন ফাউলার। চারজনে মিলে মাটি খুঁড়তে শুরু করলেন। গাছের চারপাশে বড় বড় গর্ত খোড়া হয়ে গেল। কিছুই পাওয়া গেল না। হতাশ হয়ে সেগুলো আবার মাটি দিয়ে ভরে দিতে লাগলো দুই গোয়েন্দা। হোস পাইপ দিয়ে পানি ছিটিয়ে, মাটি ডলে সমান করে আগের মতো করে ঘাসের চাপড়াগুলো আবার বসিয়ে দিতে লাগলো। ভীষণ পরিশ্রমের কাজ।

সাইমন বললেন, নিক, যদি সময় দিতে পারো, আমি একবার বাড়িটাতে ঢুকতে চাই। মিস্টার রেডফোর্ডের কাছে নিশ্চয় অনেক চিঠিপত্র আসতো। সেগুলো একবার দেখতে চাই, অ্যাজটেক যোদ্ধার ব্যাপারে কিছু পাওয়া যায় কিনা।

রাজি হলেন উকিল। তবে তেমন কিছু পাওয়া যাবে আশা করতে পারলেন না। রেডফোর্ডের কাগজপত্র নাকি সবই পড়া হয়ে গেছে তার। তবু সাইমন যখন দেখতে চাইছেন.‥তালা খুলে দিলেন তিনি।

কিশোর বললো, আপনারা কাগজ দেখুন। আমি আর রবিন বাকি স্লাইডগুলো দেখে ফেলি।

ভালো কথা বলেছো, উকিল বললেন। দেখ। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, পুলিশকে ফোন করেছিলাম সকালে। আঙুলের ছাপের কথা জিজ্ঞেস করলাম। ওদের রেকর্ডে নেই ওই ছাপ। তারমানে অতীতের কোনো অপরাধের ইতিহাস নেই লোকটার। পুলিশের যে রকম ধারণা ছিলো।

বারোজের কি খবর? জানতে চাইলো কিশোর। হুঁশ ফিরেছে?

না। তবে অবস্থা উন্নতির দিকে। ডাক্তারদের ধারণা তাড়াতাড়িই ফিরবে।

কাগজপত্র ঘাটায় মন দিলেন সাইমন। তার সঙ্গে রয়েছেন ফাউলার। কিশোর ও রবিন প্রোজেক্টর আর পর্দা সাজিয়ে বসলো। মেকসিকোতে তোলা ছবির আরেকটা বাক্স পাওয়া গেল। মেশিনে স্লাইড ঢুকিয়ে বোতাম টিপে চালু করে দিলো রবিন। কয়েকটা ছবি পেরোতেই চেঁচিয়ে উঠলো, আরেকটা সূত্র!

একটা মেকসিকান পিরামিডের সামনে তোলা হয়েছে ছবিটা। সেই রহস্যময় লোকটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরনে অ্যাজটেক যোদ্ধার পোশাক।

স্টিল করে রাখো, কিশোর বললো। আমি মিস্টার সাইমন আর ফাউলারকে ডেকে আনি।

দৌড়ে এসে লাইব্রেরিতে ঢুকলো সে। গভীর মনোেযোগে চিঠি পড়ছেন সাইমন। পাশে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছেন উকিল সাহেব। দুজনকে খবরটা জানালো কিশোর।

হুমম! ছবিটা দেখে মাথা দোলালেন খোঁড়া গোয়েন্দা (এখন আর খোঁড়া নন তিনি, পা ভালো হয়ে গেছে), ভালো সূত্র বের করেছে। হয়তো ওই লোকটাই মিস্টার রেডফোর্ডের অ্যাজটেক যোদ্ধা।

এবং সেই সম্পত্তির সত্যিকার মালিক, যোগ করলেন ফাউলার। যেটার কথা লিখে গেছেন তিনি।

লোকটা কে? নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলো কিশোর। পিন্টো আলভারো, না অন্য কেউ?

এসব ছবি একটা কথাই প্রমাণ করে, রবিন বললো। আমরা যাকে খুঁজছি, তার আসল ঠিকানা রয়েছে মেকসিকোতে।

হাসলেন সাইমন। এতো শিওর হয়ো না। লোকটা মেকসিকোতেই আছে, তা না-ও হতে পারে। অন্য কোনো দেশেও থাকতে পারে। মেকসিকান হলেই যে মেকাকোতে থাকতে হবে তার কোনো মানে নেই।

আরেকটা কথা বললেন তিনি, লোকটা যদি অ্যাজটেক যোদ্ধা হয়ও, কি জিনিস খুঁজে বের করে তাকে ফিরিয়ে দিতে বলা হয়েছে, ছবি দেখে তা জানার কোনোই উপায় নেই।

একটা কথা কিছুতেই বুঝতে পারছি না, উকিল বললেন মাথা চুলকাতে চুলকাতে। লোকটার নাম কেন উইলে উল্লেখ করলেন না, মিস্টার রেডফোর্ড? দুটো রহস্য রেখে গেছেন তিনি। এক, অ্যাজটেক যোদ্ধাকে খুঁজে বের করা। দুই, যোদ্ধার সম্পত্তি খুঁজে বের করা।

রহস্য আরও একটা আছে, সাইমন বললেন। কেসের সমাধান না হওয়াতক কেন সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদেরকে তাদের পাওনা থেকে বঞ্চিত রাখতে চেয়েছেন?

এর একটাই জবাব হতে পারে, কিশোর বললো। কোনো বিশেষ কারণে ওদেরকে ঠেকিয়ে রাখতে চেয়েছেন তিনি। আর সেই কারণটা হলো, অ্যাজটেক যোদ্ধা আর তার সম্পত্তি রক্ষা করা। উত্তরাধিকারীরা পাওনা দখল করে ফেললে কোনো ভাবে যোদ্ধা আর তার সম্পত্তির ক্ষতির সম্ভাবনা আছে।

যুক্তি আছে তোমার কথায়, একমত হলেন উকিল সাহেব। কিন্তু সেই সম্পত্তিটা কি হতে পারে?

নিশ্চয় দামী কোনো জিনিস, রবিন অনুমান করলো। জিনিসটার নাম বললে হয়তো চোর-ডাকাতেরা ছুটে আসবে ছিনিয়ে নেয়ার জন্যে। সেই ভয়েই গোপন রেখেছেন।

হুঁ, মিস্টার সাইমনেরও তা-ই মনে হলো। আরও সাবধানে কাজ করতে হবে আমাদের। আরও গোপনে।

সূত্র খোঁজা চললো। স্লাইড দেখতে লাগলো দুই গোয়েন্দা। সাইমন আর ফাউলার আবার ফিরে গেছেন লাইব্রেরিতে। একের পর এক স্লাইড ঢোকাচ্ছে আর বের করছে রবিন। গভীর মনোযোগে পর্দার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। আচমকা হাত চেপে ধরলো রবিনের। স্টিল করতে বললো। আরেকটা ছবি আগ্রহ জাগিয়েছে তার। বিশাল এক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে রহস্যময় সেই লোক।

বাপরে বাপ! বলে উঠলো রবিন। কত্তোবড় গাছ! কয়েক মিনিট পরে আরেকটা ছবি পাওয়া গেল।

আবার সেই লোক! প্রায় ফিসফিস করে বললো কিশোর, যেন জোরে বললে ছুটে পালিয়ে যাবে মানুষটা।

লাইব্রেরি থেকে ফিরে এলেন সাইমন আর ফাউলার। ওদেরকে ছবিদুটো দেখানো হলো। চিন্তিত ভঙ্গিতে চোয়াল ডললেন গোয়েন্দা। এখন আমার মনে হচ্ছে, লোকটাকে মেকসিকোতেই পাওয়া যাবে।

তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর আর রবিন। কিন্তু তিনি ওদের দিকে তাকিয়ে নেই। পর্দার দিকে চেয়ে কিছু ভাবছেন। চোখ ফেরালেন হঠাৎ। শোনো, ছেলেদের বললেন তিনি। আমার এখন যাওয়ার উপায় নেই। একটা সিরিয়াস কেসের তদন্ত করছি। উইলে তোমাদেরকেও দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। যাবে নাকি মেকসিকোতে? আলভারোকে খুঁজতে?

হাসিতে দাঁত বেরিয়ে পড়লো রবিনের। আমি এক্ষুণি যেতে রাজি।

তোমার গানের অফিসের চাকরি?

ছুটি নিয়েছি কয়েকদিনের। বাইরে কোথাও যাওয়ার জন্যেই। তবে কোথায় যাবো, ঠিক করতে পারছিলাম না। পেয়ে গেলাম।

গুড। কিশোর, তুমি?

প্লেনের টিকেট কেটে শুধু হাতে দিন। তারপর আর আমার ছায়াও দেখতে পাবেন না এ-শহরে, হেসে বললো কিশোর।

সাইমনও হাসলেন। তা দিতে আপত্তি নেই। খরচ তো দেবে রেডফোর্ড এস্টেট। তবে তোমাদের বয়েসী, অর্থাৎ, টীনএজারদের মেকসিকোতে যাওয়ায় কিছু সরকারী অসুবিধে আছে। বয়স্ক কারো সঙ্গে ছাড়া এই বয়েসীদের ঢুকতে দেয়া হয় সাধারণত, খুব কড়াকড়ি। দুটো বিশেষ পাসের ব্যবস্থা করে দিতে পারি আমি।

সাইমনের কাঁধে হাত রাখলেন উকিল। ভালোই হবে তাহলে। ওরা গিয়ে ওখানে খুঁজুক, আমরা এখানে খুঁজবো। দেখি, কোন্ দল সেই রহস্যময় সম্পত্তি খুঁজে বের করতে পারে?

দেখা যাবে! কিশোরের কণ্ঠে চ্যালেঞ্জের সুর। সাইমনের দিকে তাকিয়ে বললো, পাস দুটো হলে চলবে না, স্যার, তিনটে।

ওহ্ হো, ভুলেই গিয়েছিলাম। মুসা বাদ পড়ে গেছে। ঠিক আছে, তিনটেরই ব্যবস্থা হবে।

থ্যাংক ইউ, স্যার।

যে স্লাইডগুলোতে রহস্যময় লোকটার ছবি রয়েছে, সেগুলো নিয়ে গিয়ে প্রিন্ট করার অনুমতি চাইলো কিশোর। রাজি হলেন ফাউলার।

ইয়ার্ডে ফিরে এলো কিশোর আর রবিন। লাঞ্চের পর হেডকোয়ার্টারে ঢুকলো। স্লাইডগুলো নিয়ে ডার্করুমে ঢুকলো রবিন। কিশোর ফোন করতে বসলো মুসাকে।

কে, কিশোর? চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। খুশি খুশি লাগছে তাকে। পেয়ে গেছি! সব পার্টস পেয়ে গেছি!

মেকসিকোতে বেড়াতে যাবে?

কি বললে!

শুনতে চাইলে পার্টসের ভাবনা বাদ দিয়ে এক্ষুণি চলে এসো। আমি আর রবিন আছি।

জাহান্নামে যাক গাড়ি! আমি আসছি!

মিনিট পনেরো পরেই শোনা গেল মুসার গাড়ির বিকট ভটভট। ইয়ার্ডে ঢুকলো। মিস ফায়ার করলো কয়েকবার, যেন পিস্তলের গুলিবর্ষণ করলো। থেমে গেল এঞ্জিন।


খুব সাবধান হতে হবে তোমাকে, মুসা, কিশোর বললো। মেকসিকোর সব খাবার কিন্তু ভালো না। পাকস্থলী জ্বালিয়ে দেয়ার ওস্তাদ।

সব খেতে যাচ্ছে কে? ভুরু নাচালো মুসা। যেগুলোতে ঝাল কম সেগুলো খাবো। টরটিলা খাবো, এনচিলা খাবো। ওসব নাকি দারুণ খাবার। তবে লাল মরিচের চকলেট সস, ওরিব্বাপরে, হাত তুলে ফেললো সে। একশো হাত দূরে থাকবো আমি।

সুর করে গেয়ে উঠলো রবিন,

ফর মেকিং টরটিলাস ইউ উইল ইউজ আ মিটেট,

অ্যান্ড ফর আ বেড উই উইল ইউজ আ পিটেট।

ভ্রূকুটি করলো মুসা। নাম কি! পিটেট! তা যে-টেটই হোক, আমি বাপু ওই। ঘাসের মাদুরে ঘুমোতে পারবো না। আমি অ্যাজটেক নই।

হেসে উঠলো রবিন আর কিশোর। মূসাও হাসলো।

রবিন, কিশোর বললো। দেখ, ছবিগুলো শুকালো কিনা।

ডার্করুমে গিয়ে কয়েকটা ছবি নিয়ে এলো রবিন। ভেজা রয়েছে। বিছিয়ে দিলো টেবিলে। আগ্রহে সামনে ঝুঁকলো মুসা।

যেসব জায়গায় ছবি তুলেছেন মিস্টার রেডফোর্ড, কিশোর বললো। সবখানে যাবো আমরা।

তারমানে প্রাচীন কীর্তিগুলো দেখার সুযোগ পাচ্ছি? মুখ তুললো মুসা।

হ্যাঁ। সবগুলো না হলেও কিছু কিছু।

হাসি দূর হয়ে গেল মুসার মুখ থেকে। সেই জায়গায় ফুটলো সন্দেহ। ছবির পিরামিডের সিঁড়িতে আঙুল রেখে বললো, এখানে আবার ওঠার কথা বলবে না তো? যা সরুরে ভাই, আর যা খাড়া! কোমর ভাঙার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই!

আমারও না, সুর মেলালো কিশোর। ইনডিয়ানরা একটা বিশেষ কায়দায় ওপরে ওঠে, হাঁটাচলা করে। সেভাবে চললে আর পড়বে না।

কিছুক্ষণ পরে ফোন করলেন মিস্টার সাইমন। জানালেন, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তিনটে পাস যোগাড় করেছি। মেকসিকো সিটিতে হোটেলও বুক করা হয়েছে। ওখানে উঠবে। তার পর ইচ্ছে মতো যেখানে খুশি যাবে। কোথায় যাবে, কিভাবে যাবে, সেটা তোমাদেরকেই ঠিক করতে হবে।

প্লেনের টিকেট?

লাগবে না। আমার প্লেনটাতে করেই যেতে পারবে। ল্যারি কংকলিন গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবে তোমাদের। আসার আগে ফোন করে দিও আমাকে। আবার প্লেন পাঠিয়ে দেবো।

টাকার অভাব নেই মিস্টার সাইমনের। বই লিখে, গোয়েন্দাগিরি করে অনেক টাকা আয় করেছেন। ব্যক্তিগত বিমান কিনে, পাইলট সহ সেটার খরচ বহন করারও ক্ষমতা আছে তার। ল্যারি কংকলিন হলো তাঁর পাইলট। বিমানটা খুবই ভালো। তাতে উড়েছে তিন গোয়েন্দা। কংকলিনের পাশে বসে কয়েকবার ওটাকে উড়িয়েছেও মুসা।

কখন রওনা হচ্ছি? জানতে চাইলো কিশোর।

কাল সকালে।

আচ্ছা, ফোন রেখে দিলেন সাইমন।

গাড়ির কাজ শেষ করে মুসাকে তৈরি হয়ে নিতে বললো কিশোর। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল সহকারী গোয়েন্দা। আরও কিছু ছবি প্রিন্ট করার জন্যে ডার্করুমে গিয়ে ঢুকলো রবিন। টেবিলের ছবিগুলো কাছে টেনে নিলো কিশোর। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ভালোমতো পরীক্ষা করে দেখবে, নতুন কিছু পাওয়া যায় কিনা।

কয়েক মিনিট পর আবার ফোন করলেন মিস্টার সাইমন। জানালেন, বারোজের জ্ঞান ফিরেছে। তিনি হাসপাতালে যাচ্ছেন। কিশোররা চাইলে আসতে পারে।

এখুনি আসছি, বলে উঠে দাঁড়ালো কিশোর। ডাক দিলো রবিনকে।

হাসপাতালের গেটে দেখা হলো সাইমনের সঙ্গে। ওদের অপেক্ষায়ই দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ইনফরমেশন ডেস্কে জিজ্ঞেস করতেই জানিয়ে দেয়া হলো বারোজের ঘর কোথায়। এলিভেটরে করে তিনতলায় চলে এলো ওরা। ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন ফাউলার। গোয়েন্দাদেরকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।

ফ্যাকাসে হয়ে আছে বারোজের চেহারা। মলিন হাসি হাসলো। আপনাদেরকে অনেক কষ্ট দিচ্ছি। মাপ করে দেবেন। ওই বাড়িতে ঢুকে একটা গাধামি করেছি। বছরখানেক আগে একটা ডুপ্লিকেট চাবি দিয়েছিলেন আমাকে রেডফোর্ড।

টাকার খুব প্রয়োজন তার, জানালো বারোজ। সেজন্যেই উইলের পাওনাটা তাড়াতাড়ি আদায়ের জন্যে অ্যাজটেক যোদ্ধার খোঁজ করতে গিয়েছিলো। কারণ যোদ্ধাকে বের করে তার সম্পত্তি ফিরিয়ে দিলেই টাকা জোগাড়ের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। টাকা তো পেলামই না, আক্ষেপ করে বললো সে। ঘটালাম দুর্ঘটনা। এখন আরো বেকায়দা অবস্থা আমার।

অ্যাজটেক যোদ্ধা কে, বা কি, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণা আছে কিনা বারোজের জিজ্ঞেস করলেন সাইমন। মাথা নাড়লো অসুস্থ মানুষটা। অনেক দিন আগে একবার রেডফোর্ড বলেছিলেন আমাকে, অ্যাজটেকদের একজন উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে একটা দামী জিনিস পেয়েছেন। তবে সেটা কি, বলেননি। আমার ওই ভাইটা ছিলেন সাংঘাতিক চাপা স্বভাবের। জিনিসটা কি আন্দাজ করতে পারেন? না। বারোজ জানালো, রেডফোর্ড নাকি বলেছেন, জিনিসটা তাঁকে রাখতে দেয়া হয়েছিলো পাঁচ বছরের জন্যে। তারপর আবার ফিরিয়ে দেয়ার কথা। আমার বিশ্বাস, বারোজ বললো। এই জিনিসটার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে উইলে।

তাহলে এমনও তো হতে পারে, ফাউলার বললেন। পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। যার জিনিস তাকেই আবার ফেরত পাঠিয়েছেন মিস্টার রেডফোর্ড। উইলে সেকথা লেখার আর সুযোগ পাননি।

মাথা নাড়লো বারোজ। আমার তা মনে হয় না। যদ্দূর মনে পড়ে, বছর তিনেক আগে আমাকে কথাটা বলেছিলেন রেডফোর্ড। আমাকে বিশ্বাস করতেন। অনেক গোপন কথাই বলতেন। বলেছেন, জিনিসটা তিনি যত্ন করে লুকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু কি জিনিস, তা বলেননি। আমিও চাপাচাপি করিনি। বাড়িতেও থাকতে পারে ওটা, কিংবা অন্য কোথাও। জানি না।

আর কিছু বলার নেই বারোজের। রাস্তায় নেমে কিশোর প্রস্তাব দিলো আরেকবার রেডফোর্ড এস্টেটে যাওয়ার। মেকসিকোতে যাওয়ার আগে আরও একবার খুঁজে দেখতে চায়। ওদেরকে নিয়ে চললেন ফাউলার।

সব সময় কিছু বিশেষ যন্ত্রপাতি থাকে সাইমনের গাড়ির বুটে। তদন্তের সময় কাজে লাগে। নেমে গিয়ে বুট খুললেন তিনি।

তিনটে গাড়ি নিয়ে এসেছে চারজনে। নিজের গাড়ি থেকে নেমে এলেন ফাউলার। কিশোর আর রবিন নামলো রবিনের ফোক্সওয়াগন থেকে। সাইমনকে যন্ত্রপাতি নামাতে সাহায্য করতে এগোলো।

পোর্টেবল ফ্লোরোস্কোপ আর একটা মেটাল ডিটেকটর বের করা হলো। বাড়ির দেয়াল, মেঝে, হাত, সব জায়গায় খোঁজা হলো যন্ত্রের সাহায্যে। কয়েকবার মিটমিট করে জানান দিলো যন্ত্রের বাতি, জিনিস রয়েছে। তবে সেগুলোর কোনোটারই কোনো গুরুত্ব আছে বলে মনে হলো না।

সারাক্ষণ গোয়েন্দাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকলেন ফাউলার। কিছুই পাওয়া গেল না দেখে জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এভাবে হবে না। সমস্ত রহস্যের চাবিকাঠি রয়েছে, আমার ধারণা, পিন্টো আলভারোর কাছে।

সাইমনও একমত হলেন। মনে পড়লো সেই লোকটার কথা,সন্ধ্যাবেলা যাকে তাড়া করেছিলো কিশোর আর রবিন। তার কোনো খবর আছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন উকিলকে।

না, জবাব দিলেন ফাউলার। বেনিফিশারিদের কেউ হতে পারে ভেবে, উইলে যতজনের নাম লেখা রয়েছে, সবার খোঁজখবর নিয়েছি আমি। কেউ আসেনি ওরা। সবারই অ্যালিবাই রয়েছে, হাসলেন তিনি। গোয়েন্দা হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছি অযথা। কিছুই করতে পারলাম না।

ভূল বললে, হেসে বললেন সাইমন। অনেক কিছুই করেছে। এই যে খোঁজাখুঁজিটা করলে, এতে অনেক লাভ হয়েছে। আর এতো দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই তোমার। আমরা তো অভিজ্ঞ গোয়েন্দা। কি করতে পারলাম? এখনও অন্ধকারেই রয়েছি।

সেদিন আর কিছু করার নেই। অফিসে চলে গেলেন ফাউলার। সাইমন চলে গেলেন কাজে। দুই গোয়েন্দা ফিরে এলো ইয়ার্ডে।

পরদিন সকালে মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো তিন গোয়েন্দা। ট্যাক্সি নিয়ে চলে এলো বিমান বন্দরে। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিল্ডিঙের ভেতর দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে এলো একটা খোলা অঞ্চলে। ওখানে রাখা হয় ব্যক্তিগত বিমান। অবশ্যই ভাড়া দিতে হয়। মিস্টার সাইমনের বিমানটা দেখতে পেলো ওরা। রানওয়ের শেষ মাথায়।

হঠাৎ চলতে শুরু করলো ওটা। কিন্তু ছেলেদের দিকে এগিয়ে এলো না। বরং রানওয়ে ধরে উল্টোদিকে রওনা হয়েছে। গতি বাড়ছে দ্রুত। দেখতে দেখতে মাটি ছেড়ে শূন্যে উড়াল দিলো।

খাইছে! বলে উঠলো মুসা।

আমাদের রেখেই চলে যাচ্ছে! রবিনও কিছু বুঝতে পারছে না।

আমার তা মনে হয় না! উত্তেজিত শোনালো কিশোরের কণ্ঠ। নিশ্চয় কিছু ঘটেছে! হাইজ্যাক করা হয়েছে প্লেনটা?


হাইজ্যাক! প্লেনটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে মুসা। কি বলছো তুমি!

রবিনও তাকিয়ে রয়েছে। ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে বিমানটা।

ঠিকই বলেছি, বিমানের দিকে আর নজর নেই কিশোরের। ছুটতে শুরু করলো অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিল্ডিঙের দিকে। কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এখুনি।

টাওয়ারের রিপোর্ট শুনে থ হয়ে গেল। ল্যারিই নাকি কন্ট্রোলের কাছে ক্লিয়ারেন্স চেয়েছে। তাড়াতাড়ি দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। কেন, কিছু হয়েছে নাকি? জানতে চাইলো ডিসপ্যাচার। সন্দেহের কথা জানালো কিশোর। প্লেনটাকে ফেরানোর চেষ্টা করবে, বললো ডিসপ্যাচার।

অস্থির হয়ে পায়চারি করতে লাগলো কিশোর রবিন আর মুসা চুপ করে রয়েছে। তবে ওরাও ভীষণ উত্তেজিত। অবশেষে জানানো হলো ওদেরকে, কোনো সাড়াই দিচ্ছে না বিমানটা থেকে।

হাইজ্যাকই মনে হচ্ছে, এতোক্ষণে বিশ্বাস করলে ডিসপাচার। ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অথরিটিকে রিপোর্ট করছি।

তাকে বললো কিশোর, পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়। তিন গোয়েন্দার একটা কার্ড আর চীফ ইয়ান ফ্লেচারের দেয়া সার্টিফিকেটটা দেখিয়ে গোয়েন্দা পরিচয় দিলো নিজেদের। ফীন্ডে গিয়ে তদন্ত করার অনুমতি চাইলো।

দিয়ে দিলো ডিসপ্যাচার।

তদন্তে নতুন কিছুই বেরোলো না। কয়েকজন মেকানিক ল্যারিকে বিমানে উঠতে দেখেছে। তার সাথে আর কাউকে চড়তে দেখেনি। তবে ফীল্ডে আরেকজন লোকের সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেখেছে।

লোকটা দেখতে কেমন? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

চেহারা ভালোমতো দেখিনি, জবাব দিলো একজন মেকানিক। আসলে দেখার প্রয়োজনই মনে করিনি। তাছাড়া অনেক দূরে ছিলো। যেটুকু দেখেছি তা হলো, বেঁটে, কালো চুল। প্লেন নিয়ে পালাবে জানলে কি আর অবহেলা করতাম! একটা জেট এয়ারলাইনারের দিকে রওনা হয়ে গেল সে। ওটার এঞ্জিনের কাজ করছিলো।

আর কিছু করার নেই এখানে। রবিন বললো, এই লোকটা আমাদের রহস্যের সঙ্গে জড়িত। সেদিন রেডফোর্ড এস্টেটে তাড়া করেছিলাম যাকে, মনে হচ্ছে সে-ই। জোর করে ল্যারিকে দিয়ে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে প্লেন নিয়ে ভেগেছে।

হতে পারে, কিশোর বললো। টাওয়ারে চলে যাই। দেখি কি হলো?

উদ্বিগ্ন হয়ে আছে ডিসপ্যাচার। ছেলেদের দেখে বললো, কোনো খবরই নেই প্লেনটার। বড় বড় সমস্ত এয়ারপোর্টকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। ওরাও যোগাযোগ করতে পারছে না।

অনেক কাজ ডিসপ্যাচারের। সাংঘাতিক ব্যস্ত। তার সঙ্গে আলোচনা করার, কোনো অবকাশ নেই। ওয়েটিং রুমে এসে বসলো তিন গোয়েন্দা।

কারণটা কি, কিছু বুঝতে পারছো? রবিনের প্রশ্ন। হাইজ্যাকিং, এবং কিডন্যাপিং!

ল্যারির কোনো ক্ষতি না করলেই হয়, পাইলটকে পছন্দ করে মুসা। তাকে হাতে ধরে অনেক কিছু শিখিয়েছে, বিমান চালনার। খাঁটি ভদ্রলোক। কিন্তু ধরে নিয়ে গেল কেন? আর প্লেনটাই বা হাইজ্যাক করলো কেন?

এর জবাব জানলে, কিশোর বললো। হয়তো ল্যারি আর প্লেনটার খোঁজ বের করে ফেলতে পারতাম!

তো, এখন কি করবো? মেকসিকো যাওয়া বন্ধ?

জোরে মাথা নাড়লো কিশোর। মোটেই না!

মিস্টার সাইমনকে ফোন করার জন্যে উঠে গেল সে। কিন্তু বাড়িতে নেই। ডিটেকটিভ। ধরলো তার ভিয়েতনামী কাজের লোক নিসান জাং কিম। খবর শুনে সে-ও চিন্তিত, হলো। বললো, কয়েক জায়গায় ফোন করে মিস্টার সাইমনকে ধরার চেষ্টা করবে। খবরটা জানাবে। তাকে বলবে, তিনি যেন এয়ারপোর্টে কিশোরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

আবার এসে আগের জায়গায় বসে পড়লো। দীর্ঘ হয়ে উঠলো অপেক্ষার মুহূর্তগুলো। কথাবার্তা তেমন জমছে না এই উত্তেজনার সময়। খবরের কাগজ পড়ার চেষ্টা করলো। কিছুই মাথায় ঢুকলো না। শব্দগুলোকে মনে হলো অর্থহীন।

শেষে বিরক্ত হয়ে কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে, উঠে দাঁড়ালো কিশোর। বললো, ফাউলারকে ফোন করবে। দেখতে চায় তিনি কিছু বলতে পারেন কিনা। কি আর বলবেন তিনি? খবর শুনে চুপ করে রইলেন দীর্ঘ একটা মুহূর্ত।

কিশোর বললো, কি মনে হয় আপনার? রেডফোর্ড এস্টেটে যে লোকটা এসেছিলো, সে-ই একাজ করেছে?

করতেও পারে। কি বলবো, বলো? ওর সম্পর্কেও তো কিছুই জানি না আমরা।

তা ঠিক। আপনারা তো দেখেননি। পুলিশ আঙুলের ছাপ পেলো, জুতোর ছাপ নিলো, তা-ও তো কিছু করতে পারছে না। ঠিক আছে, রাখলাম।

ওয়েইটিং রুমে ফিরে এলো কিশোর। উজ্জ্বল হয়ে উঠলো মুখ। মিস্টার সাইমন চলে এসেছেন। চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, ল্যারির জন্যে। প্লেনটাকে খুঁজে বের করা সহজ হবে না, ধারণা করলেন তিনি। বড় কোনো এয়ারপোর্টে নামতে সাহস করবে না হাইজ্যাকার, বললেন তিনি। পুলিশের ভয়ে। কোনো খামারের মাঠে কিংবা অব্যবহৃত এয়ারফীল্ডে নামার চেষ্টা করবে।

আমার কি মনে হয়, জানো? আরও কেউ অ্যাজটেক যোদ্ধাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে। প্লেনটা হাইজ্যাক করেছে তোমাদেরকে ভয় দেখানোর জন্যে। যাতে তোমরা আর মেকসিকোতে না যাও।

একই কথা রবিনও ভাবছে। রেগে গেল সে। তাই যদি হয়, তাহলে তো আরও বেশি করে যাবো আমরা। একটা হাইজ্যাকারের ভয়ে পিছিয়ে থাকবো?

ঠিক! মুঠো তুলে ঝাঁকালো মুসা। একটা প্লেন নিয়েছে। সব তো আর নিতে পারেনি। টিকেট কেটে চলে যাবো।

হাসলেন সাইমন। আমিও সেকথাই বলতে যাচ্ছিলাম। প্লেন নিয়ে গিয়ে বেশিদিন আটকে রাখতে পারবে না। খুঁজে বের করে ফেলবোই। তার জন্যে তোমাদের পিছিয়ে আসার কারণ নেই। তোমরা চলে যাও।

টিকেটের খোঁজ নিতে রিজারভেশন কাউন্টারে চলে এলো কিশোর। রবিন আর মুসা এলো খানিক পরে। ততোক্ষণে জানা হয়ে গেছে কিশোরের। মাঝরাতে একটা প্লেন ছাড়বে। মেকসিকো সিটিতে যাবে। সেটার টিকেট পাওয়া যাবে।

তাতেই রাজি তিন গোয়েন্দা। মোট কথা, যখনই হোক, যেতে পারলেই খুশি। মিস্টার সাইমনকে জানানো হলো। টাকা বের করে দিলেন তিনি, তিনটে টিকেট কেটে নাও।

প্লেন ছাড়তে অনেক দেরি। ততোক্ষণ বসে থাকতে হবে। এছাড়া আর কিছু করারও নেই। বই পড়ে সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলো ওরা। এয়ারপোর্টের বুক কাউন্টার থেকে তিনটে পেপারব্যাক বই কিনলো তিনজনে। রবিন কিনলো একটা মিউজিকের ওপর লেখা বই। মুসা কিনলো দেশীবিদেশী খাবারের বই। আর কিশোর কিনলো মেকসিকান ইতিহাসের ওপর লেখা বই। অ্যাজটেক যোদ্ধাদের ব্যাপারে অনেক কিছু লেখা আছে ওতে।

একসময় মুখ তুলে মুসা বললো, প্লেন হাইজ্যাকের খবরটা বাড়িতে জানাবো ফোন করে?

না না, দরকার নেই, তাড়াতাড়ি হাত নাড়লো কিশোর। শুনলেই যাবে ঘাবড়ে। আমাদের যাওয়াও বন্ধ করে দিতে পারে। আমরা চলে যাওয়ার পর শুনলে শুনুকগে, তখন আর ফেরাতে পারবে না। চাচী এখন শুনলে একদম যাওয়া বন্ধ।

অনেকক্ষণ হলো মিস্টার সাইমন চলে গেছেন। ফোন করলেন তিনি। কিশোর গিয়ে ধরলো। একটা জরুরী খবর জানালেন। একজন সত্যিকারের অ্যাজটেক যোদ্ধার বংশধরকে খুঁজে বের করেছি। না না, চমকে উঠো না। আমরা যাকে খুঁজছি এ-লোক সেই লোক নয়। অ্যাজটেক তো আর একজন নয় মেকসিকোতে। কিছু তথ্য জানতে পারলাম ওর কাছে। তোমাদের কাজে লাগবে। ও হ্যাঁ, আগে আরেকটা কথা বলে নিই। লোকটা বিমানের মেকানিক। বাহুতে উল্কি দিয়ে অ্যাজটেক যোদ্ধার ছবি আঁকা।

অনেক প্রশ্ন করেছি লোকটাকে। বাড়ি মেকসিকোতে। পিন্টো আলভারো নামে কাউকে চেনে না। তবে টিকা আলভারো নামটা পরিচিত। ট্যাক্সকোর কাছে চমৎকার একটা হ্যাঁসিয়েন্ডার নাম টিকা আলভারো। ওখানে নাকি কয়েক বছর কাজ করেছে সে। ইচ্ছে হলে ওখানে গিয়ে খোঁজখবর করতে পারো।

সত্যিকারের অ্যাজটেক যোদ্ধার ব্যাপারে প্রশ্ন করতে করতে আরেকটা নাম। জানলাম। সিনর ডা স্টেফানো। লোকটাকে দেখেনি সে, নাম শুনেছে।

কোথায় থাকে? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

বলতে পারলো না। পুরানো প্রত্নতাত্ত্বিক স্পটগুলোতে নাকি ঘুরে বেড়ান। প্রচুর খোঁড়াখুঁড়ি করেন।

প্রত্নতাত্ত্বিক? হ্যাঁ।

আরও কয়েকটা কথার পর লাইন কেটে দিলেন ডিটেকটিভ। ফিরে এসে তথ্যগুলো বন্ধুদের জানালো কিশোর।

সিনর ডা স্টেফানো, না? আরকিওলজিস্ট! দীর্ঘশ্বাস ফেললো মুসা। তারমানে তাকে খুঁজে তুমি বের করবেই। আর তার অর্থ হলো, আমার নিস্তার নেই। পুরানো ওই পিরামিডগুলোর মাথায় আমাকে চড়িয়েই ছাড়বে।

প্লেন ছাড়ার সময় হলো অবশেষে। ছাড়ার পর পরই চমৎকার খাবার দেয়া হলো। অনেক রাত। খাওয়া শেষ করেই ঘুমিয়ে পড়লো ওরা। ঘুম ভাঙলো পরদিন সকালে। রোববার। স্টুয়ার্ডেস ঘোষণা করলো, বিশ মিনিটের মধ্যেই মেকসিকো সিটিতে ল্যান্ড করবে বিমান। দ্রুত বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এলো তিন গোয়েন্দা। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো, বিমান বন্দরের ওপরে চক্কর মারছে বিশাল বিমানটা। ল্যান্ড করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নামলো বিমান।

মুসা প্রস্তাব রাখলো, চলো, ট্যাক্সি নিয়ে শহরটা আগে ঘুরে দেখি। এখুনি হোটেলে যাওয়ার কোনো দরকার নেই।

কাজ চালানোর মতো কিছু শব্দ শিখে এসেছে তিনজনেই। ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশে কথা বললো একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে। হাসলো লোকটা ওদের উচ্চারণ শুনে। দেখেই বুঝে গেছে টুরিস্ট। মেকসিকোতে স্বাগত জানালো। বললো, কোনো অসুবিধে হবে না। দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখিয়ে তারপর নিয়ে যাবে হোটেলে।

গাড়িতে চড়লো তিন গোয়েন্দা। এয়ারপোর্ট এলাকা থেকে বেরিয়ে একটা চওড়া রাস্তায় উঠলো ড্রাইভার। দুপাশে পুরানো স্প্যানিশ ধাচের বাড়িঘর, খোলা বাজার। মাঝে মাঝে মাথা তুলে রেখেছে বিরাট উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট হাউস।

খুব বেশি পুরানো লাগছে না, মুসার কণ্ঠে হতাশার সুর। যেন আশা করেছিলো, এক লাফে হাজার কিংবা পনেরোশো বছর আগের পৃথিবীতে চলে যেতে পারবে।

তাই নাকি? হাসলো ড্রাইভার। পুরানো এলাকায় যেতে চাও? নিয়ে যাবো।

কিছুক্ষণ এপথ ওপথ ঘুরে, অসংখ্য মোড় নিয়ে মস্ত একটা চত্বরে এসে পৌঁছলো ওরা। ড্রাইভার বেশ গর্বের সঙ্গে জানালো, উত্তর দিকে ওই যে গির্জাটা দেখছো, অনেক পুরানো। ১৬৬৭ সালে মহান অ্যাজটেক মন্দিরের ধ্বংসস্তুপের ওপর তৈরি হয়েছিলো।

বিশাল বাড়িটাকে আগ্রহ নিয়ে দেখতে লাগলো তিন গোয়েন্দা। চতুরের আরেক ধারে লম্বা আরেকটা বাড়ি দেখালো ড্রাইভার। ওটা ন্যাশনাল প্যালেস। তার উল্টো দিকে চত্বরের অন্য একধারে রয়েছে প্যালাসিও মিউনিসিপাল, এবং একটা তোরণ। তোরণের নিচে একসারি ছোট ছোট দোকান।

হ্যাঁ, খুশি হয়ে বললো মুসা। এ-জায়গাটা বেশ পুরানো!

হঠাৎ আরেকটা ট্যাক্সি ওদের গাড়ির পাশ কাটালো। জানালা দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা হাত। শাদা একটা রুমাল নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলো যেন তিন গোয়েন্দার।

সংকেত! প্রায় চিৎকার করে উঠলো কিশোর।


জলদি ওই গাড়িটার পাশে নিয়ে যান! ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলো কিশোর।

প্যাডালে চেপে বসলো ড্রাইভারের পা। লাফ দিয়ে আগে বাড়লো গাড়ি। শাঁ করে চলে এলো অন্য গাড়িটার পাশে। ভেতরে কে আছে দেখার চেষ্টা করলো তিন গোয়েন্দা।

পলকের জন্যে লোকটাকে চোখে পড়লো কিশোরের। অবাক হয়ে গেছে। ল্যারি কংকলিন! বন্ধুদেরকে বললো সে। অন্য লোকটা মনে হয় মেকসিকান।

এই দুজন বসেছে পেছনের সীটে। সামনের সীটে রয়েছে আরও দুজন। একজন ড্রাইভ করছে। হঠাৎ সামনের গাড়িটা সরে এসে কিশোরদের গাড়ির পথ রুদ্ধ করে দিলো। ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষতে বাধ্য হলো ড্রাইভার।

সামনের গাড়িটাও থেমে গেল। এক ঝটকায় খুলে গেল সামনের প্যাসেঞ্জার সীটের দরজা। নেমে এলো ড্রাইভারের পাশে বসা লোকটা। কিশোরদের গাড়ির কাছে এসে ওদের ড্রাইভারের নাকের সামনে একটা ব্যাজ আর একটা আইডেনটিটি তুলে ধরে বললো, পুলিশ! দরজা খোলো!

আস্তে করে হাত বাড়িয়ে প্যাসেঞ্জার সীটের দরজা খুলে দিলো বিস্মিত ড্রাইভার। উঠে বসলো লোকটা। তোমাদেরকে অ্যারেস্ট করা হলো!

কে-কেন! তোতলাতে শুরু করলো ড্রাইভার। আমি বেআইনী কিছু করিনি…

থানায় গেলেই বুঝবে কি করেছো! ধমক দিয়ে বললো লোকটা। চালাও!

ঝট করে পরস্পরের দিকে তাকালো কিশোর আর রবিন। ঢোক গিললো মুসা। ব্যাপারটা কোনো চালবাজি? কংকলিনকে গ্রেপ্তার করবে কেন পুলিশ? বেআইনি ভাবে বিমান নামানোর দায়ে? বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো না কিশোরের। ফিসফিসিয়ে বন্ধুদেরকে বললো, মনে হয় শয়তানী! পালাতে হবে! নামো!

মাথা ঝাঁকালো মুসা। সামনের লোকটা কিছু বোঝার আগেই নিজের ব্যাগের হাতল চেপে ধরে এক ঠেলায় খুলে ফেললো দরজা। ঝাপ দিয়ে পড়লো রাস্তায়। তার পর পরই রবিন, সবার শেষে কিশোর। তিনজনের হাতেই ব্যাগ। নেমে আর একটা মুহূর্ত দেরি করলো না। পেছন ফিরে দিলো দৌড়। চেঁচিয়ে উঠলো ড্রাইভারের পাশে বসা লোকটা।

ফিরেও তাকালে না তিন গোয়েন্দা। ঢুকে পড়লো গাড়ির ভিড়ে। সবই চলমান। প্রায় একসঙ্গে একাধিক হর্ন বেজে উঠলো। ব্রেক কষার পর টায়ারের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ উঠলো। ধাক্কা দেয়া থেকে ছেলেদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে গাড়িগুলো। এঁকেবেঁকে দৌড় দিয়েছে ছেলেরা। যে করেই হোক ওপাশের চত্বরে পিয়ে পৌঁছতে চায়। কিন্তু যানবাহনের জন্যে অসম্ভব মনে হচ্ছে কাজটা।

বুঝলো এভাবে হবে না। শেষে এক বুদ্ধি বের করলো কিশোর। রবিন আর মুসাকে নিয়ে হাত তুলে একসারিতে দাঁড়িয়ে গেল গাড়ির নাকের সামনে। থেমে গেল সামনের কয়েকটা গাড়ি। পেছনেরগুলোও আর এগোতে পারলো না। অবাক হয়েছে চালকেরা। কেউ কেউ গাল দিয়ে উঠলো। যারা কিশোরদেরকে দেখছে, তারা বুঝতে পারলো, রাস্তা পেরোনোর চেষ্টা করছে ওরা। যদিও এভাবে রাস্তা পেরোনো নিয়ম নয়। টীনএজারগুলো সব সময়ই খেপাটে, উল্টোপাল্টা কাজ করে বসে। তাছাড়া এই তিনটেকে মনে হচ্ছে বিদেশী। বোধহয় আমেরিকান। অকাজ তো করবেই।

যাই হোক, সুযোগ পেয়ে একটা মুহূর্ত আর দেরি করলো না কিশোর। ছুটতে শুরু করলো। রবিন আর মুসা তার পেছনে। রাস্তা পেরিয়ে এলো একদৌড়ে।

আবার চলতে শুরু করলো গাড়ির সারি। ল্যারি যে গাড়িটাতে রয়েছে, সেটাকে কোথাও আর দেখা গেল না।

একটা স্যুটকেসের ওপর বসে কপালের ঘাম মুছে বললো মুসা, খাইছে! আরেকটু হলেই চাকার নিচে চলে যেতাম! এমন কাজ আর করতে বলবে না। কখনও!

ঠিক! আরেকটু হলেই মারা পড়েছিলাম! রবিন বললো হাঁপাতে হাঁপাতে।

কিশোরও হাঁপাচ্ছে, এছাড়া আর কিছু করারও ছিলো না। বাদ দাও এখন। বেঁচে তো আছি, হাত নাড়লো সে। আসল কথা বলো। গাড়িটার নাম্বার নিয়েছো?

মাথা নাড়লো মুসা। পারেনি।

আমি নিয়েছি, রবিন জানালো।

আমি শুধু দেখেছি, মুসা বললো। হলুদ রঙের একটা সেডান। বাঁ পাশে পেছনের দরজায় মোটা একটা আঁচড়ের দাগ। কোনো কিছুর সঙ্গে ঘষা লাগিয়েছিলো।

আমিও দেখেছি, কিশোর বললো। যাক, চমৎকার কিছু সূত্র মিললো। গাড়িটা বের করা যাবে। পুলিশকে জানানো দরকার। চলো।

খালি একটা ট্যাক্সি দেখে হাত তুলে ডাকতে যাবে কিশোর, এই সময় একটা গাড়ি এসে থামলো ওদের পাশে। জানালা দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা পরিচিত মুখ। সেই ড্রাইভার, যার গাড়িতে বিমান বন্দর থেকে উঠেছিলো ওরা। হাত নেড়ে ডাকলো, এসো।

গাড়ি চালাতে চালাতে লোকটা বললো, কিছুদূর পিস্তল দেখিয়ে নিয়ে গেল আমাকে। তারপর নেমে ওদের গাড়িতে উঠে চলে গেল। হারামজাদা!

তারপর আমাদের খুঁজতে এলেন আপনি? মুসার প্রশ্ন।

হ্যা।

যদি এখানে না পেতেন?

হোটেলে চলে যেতাম। নাম তো জানিই হোটেলের।

লোকটা তাহলে পুলিশ নয়? কিশোর জিজ্ঞেস করলো।

আরে না। আস্ত শয়তান! কিন্তু ব্যাপারটা কি বলো তো? আমাকে নয়, আসলে তোমাদেরকে আটকাতে চেয়েছিলো লোকটা।

সব গোপন না করে কিছু কিছু কথা ড্রাইভারকে জানালো কিশোর। প্লেন, হাইজ্যাক আর কংকলিনকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, বললো। হলুদ গাড়িটাতে যে আমেরিকান লোকটাকে আটকে রাখা হয়েছে সে-ই ল্যারি কংকলিন, একথাও জানালো।

হু! মাথা দোলালো ড্রাইভার। তাহলে তো পুলিশকে জানানো দরকার।

তাই জানাবো। থানায় চলুন।

আমার মনে হয়, মুসা বললো। রুমাল নেড়ে আমাদেরকেই ইঙ্গিত দিচ্ছিলো ল্যারি। আমাদের নজরে পড়তে চাইছিলো।

কিশোর, রবিন বললো। ব্যাপারটা বেশি কাকতালীয় হয়ে গেল না? একেবারে আমাদের সামনে এসে পড়লো ল্যারি, আর জায়গা পেলো না!

মোটও কাকতালীয় নয়, কিশোর বললো। হয়তো ওকে রেখে আসার সময় পায়নি ব্যাটারা। তাই গাড়িতে নিয়েই ঘুরছে। আমাদের পিছে লেগেছিলো। এয়ারপোর্ট থেকেই অনুসরণ করেছে। এখানে এসে গাড়ি থামিয়ে নকল পুলিশ অফিসারের ছদ্মবেশে আমাদেরকেও কিডন্যাপ করতে চেয়েছে।

হ্যাঁ, এইটা হতে পারে, তুড়ি বাজালো রবিন। তা-ই করেছে। আরেকটা ব্যাপারে শিওর হয়ে গেলাম। এতো কিছু যখন করছে, তার মানে অ্যাজটেক যোদ্ধা সত্যিই খুব দামী।

গেটের কপালে বড় করে লেখা রয়েছে পুলিশিয়া। ভেতরে গাড়ি ঢোকালো ড্রাইভার। পুলিশ চীফ ডা মারকাসের সঙ্গে দেখা করলো তিন গোয়েন্দা। মন দিয়ে ওদের কথা শুনলেন তিনি। রিপোর্ট লিখে নিলেন। তারপর জানালেন, স্টেটসের রিপোর্ট আমরাও পেয়েছি। প্লেনসহ পাইলট ল্যারি কংকলিনকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। প্লেনটা আমাদের এয়ারপোর্টে নামেনি। তোমরা বলছে, ল্যারিকে দেখেছে। তার মানে অন্য কোথাও নেমেছে। ছোট প্লেন তো, নামার জায়গার অভাব হয় না। ঠিক আছে, আর বেশিক্ষণ লাগবে না। গাড়ির নম্বর রেখে কাজই করেছো। ল্যারি কংকলিনের ছবিও আমরা পেয়েছি। এখুনি অ্যালার্ট করে দিচ্ছি মস্ত পয়েন্টগুলোতে। নিশ্চিন্তে হোটেলে চলে যাও।

আরেকটা অনুরোধ করবো, স্যার, কিশোর বললো। দুজন লোককে খুঁজে দিতে বলবো, যদি এ-শহরে থাকে। একজনের নাম পিন্টো আলভারো, স্যুটকেস থেকে ছবি বের করে দেখালো। আরেকজনকে চিনি না, শুধু নাম শুনেছি। আরকিওলজিস্ট। সিনর ডা স্টেফানো। ছবিটা কার, বলতে পারবো না। তবে ওই দুজনেরই কোন একজন হতে পারে।

চেষ্টা করবেন, কথা দিলেন চীফ। তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলো ওরা। ট্যাক্সিতে উঠে হোটেলে যাওয়ার নির্দেশ দিলো ড্রাইভারকে।


ঘুমিয়ে পড়েছিলো, টেলিফোনের শব্দে জেগে গেল কিশোর। ফোন এসেছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে। চীফ মারকাস। কে, কিশোর পাশা? এখুনি চলে এসো। তোমাদের পাইলট ল্যারি কংকলিনকে পাওয়া গেছে।

তাই! কোথায়?

এখানেই বসে আছে।

আসছি।

মুসা আর রবিনকেও খবরটা জানালো কিশোর। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে বললো। মুসা মন্তব্য করলো, বাহ্, দারুণ পুলিশ ফোর্স তো! সাংঘাতিক দক্ষ!

নিচে নেমে একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে পড়লো তিনজনে। থানায় চললো।

ল্যারি! পাইলটকে দেখে আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠলো মুসা।

আন্তরিক হ্যান্ডশেক চললো। তিন গোয়েন্দার সঙ্গে হাত মেলালো ল্যারি। সমস্ত ঘটনাটা শুনতে চাইলো কিশোর।

বিধ্বস্ত লাগছে লম্বা, একহারা লোকটাকে। মুখে চওড়া হাসি। বললো, লোকটা যে কোনদিক দিয়ে উঠলো, দেখিইনি। ঘাড়ের ওপর পিস্তল ঠেসে ধরে বললো, টু শব্দ না করে প্লেন চালাতে। কি আর করবো। অনুমতি নিলাম। তারপর উড়লাম। তবে আমি শিওর ছিলাম, আমাকে খুঁজে বের করবেই তোমরা। কিছুতেই পিছু ছাড়বে না।

আজ সকালে রুমালটা দেখিয়ে একটা কাজের কাজ করেছিলেন, কিশোর বললো। নইলে কিছু বুঝতে পারতাম না।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকালো ল্যারি। ওরা আমাকে হুমকি দিলো, পালানোর চেষ্টা করলে মরবো। মরতাম কিনা জানি না, তবে বেরোনোর কোনো সুযোগই পাইনি। তাই তোমাদেরকে হুঁশিয়ার করার পয়লা সুযোগ যেটা পেলাম, কাজে লাগালাম।

টেলিফোন বাজলো। তুলে নিয়ে কানে ঠেকালেন চীফ। কথা বলতে লাগলেন। কিশোরের কানের কাছে মুখ সরিয়ে এনে ফিসফিস করে ল্যারি বললো, লোকগুলো অ্যাজটেক যোদ্ধার জিনিসের পেছনে লেগেছে। আমার কাছ থেকে কথা আদায়ের চেষ্টা করেছে। আমি জানি কিনা জিজ্ঞেস করেছে। ওদের কথা থেকে বুঝলাম, জিনিসটা খুবই দামী।

কথা শেষ করে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন চীফ। ল্যারি বলতে থাকলো, যে লোকটা আমাকে কিডন্যাপ করেছে, তার নাম বলতে পারবো না। শহরের বাইরে একটা বাতিল খামারের কাছে মাঠে নামার নির্দেশ দিলো। মুখোশ পরা আরও কয়েকজন লোক অপেক্ষা করছিলো ওখানে। প্লেন থেকে আমাকে নামিয়ে নিয়ে গিয়ে একটা গাড়িতে তুললো। শহরে নিয়ে এলো। একটা বাড়িতে ঢুকিয়ে প্রশ্ন শুরু করলো। ওদের অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে আমাকে। তোমাদের কথাও জিজ্ঞেস করেছে। তোমরা মেকসিকোতে আসবে, একথা বলতে আমাকে বাধ্য করেছে ওরা।

তারপর বের করে নিয়ে গিয়ে আবার গাড়িতে তোলা হলো আমাকে। বোধহয় বাড়িতে একা ফেলে যেতে সাহস হচ্ছিলো না। যদি পালাই। এয়ারপোর্টে নিয়ে গেল। বসে রইলো তোমাদের আসার অপেক্ষায়। তোমরা এলে। তখন থেকেই তোমাদের পিছু নিয়েছে। তোমাদেরকেও ধরে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো। ভাবলাম, সেটা ঠেকাতে হবে। বেপরোয়া হয়ে গিয়েই রুমাল দেখিয়ে ইঙ্গিত করেছিলাম, যাতে হুশিয়ার হয়ে যাও।

খুব ভালো কাজ করেছিলেন, রবিন বললো। তা না করলে লোকটাকে সত্যি সত্যিই পুলিশ অফিসার ভাবতাম আমরা। আটকা পড়তাম।

ওই লোকটাও ওদের দলের একজন, ল্যারি বললো।

আমরা তো বেরিয়ে পালালাম। তারপর কি করলো? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

হলুদ গাড়িটা চলতে শুরু করলো। তোমাদের গাড়িটাকে কিছুদূর আসতে বাধ্য করলো নকল পুলিশ অফিসার। তারপর নেমে আবার আগের গাড়িতে উঠলো। আমাকে নিয়ে গেল ল্যানিলা মার্কেটে। ওখান থেকেই পুলিশ আমাকে উদ্ধার করেছে। ভাগ্যিস, গাড়ির নম্বরটা রাখতে পেরেছিলে।

লোকটাকে আবার দেখলে চিনতে পারবেন?

মনে হয় না। আমাকে বাড়িটাতে ঢোকানোর পর, অন্য ঘরে গিয়ে মুখোশ খুলে ছদ্মবেশ নিয়ে ছিলো সব কজন। এটা আমার ধারণা। তবে ওগুলো ওদের আসল চেহারা হলে চিনতে পারবো। একটু আগে চীফকে বললাম সেকথা।

ও। আচ্ছা, যে লোকটা আপনাকে কিডন্যাপ করলো, তাকে চিনেছেন?

না। ও একবারের জন্যেও মুখোশ খোলেনি। তবে তার কথায় বুঝলাম, মিস্টার রেডফোর্ডের বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করেছিলো।

লোকটা বেঁটে, কালো চুল। চেহারা আমরাও দেখতে পারিনি। আপনি আর কিছু লক্ষ্য করেছেন?

করেছি। দাঁত। স্বাভাবিক নয়। তেড়াবেঁকা। একটার ওপর আরেকটা উঠে এসেছে।

এই কথাটা ধরলেন চীফ। দাঁতের রঙ কেমন, বলুন তো? লাল? আর সামনের দুটো দাত পোকায় খাওয়া? ফ্যাসফাস করে কথা বলে?

হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন! আপনি জানলেন কি করে?

মাথা দোলালেন মারকাস। বোধহয় চিনতে পেরেছি। ওর নাম গুডু টেরিয়াননা। একটা অপরাধী দলের নেতা। হেন কুকর্ম নেই যা ওরা করে না। জেল খেটেছে কয়েকবার। পুলিশের খাতায় নাম আছে। যে বাড়িটা থেকে আপনাকে উদ্ধার করা হয়েছে মিস্টার কংকলিন, ওটা ওদের বাড়ি নয়। এক বুড়ির। পুলিশ দেখেই বুড়ি ওদেরকে সাবধান করে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস, পালানোরও সুযোগ করে দিয়েছে সে-ই। নইলে দুএকটাকে অন্তত ধরতে পারতামই। যাই হোক, বললেন যখন চোখকান সজাগ রাখবো। ধরা না পড়ে যাবে কোথায়।

ল্যারির কথামতো সেই মাঠে গিয়ে খোঁজ নিয়েছে পুলিশ। যেখানে নামিয়েছিলো, সেখানেই রয়েছে বিমানটা। সেটা নিয়ে আবার রকি বীচে ফিরে যাবে সে। ওড়ার জন্যে অনুমতি দরকার। ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্যে, চীফকে অনুরোধ করা হলো।

ঠিক আছে, বললেন চীফ। টেলিফোনের রিসিভার তুলে নিলেন।

আরেকবার ফিসফিস করে কিশোরকে বললো ল্যারি, তোমাদেরকে কোনো সাহায্য করতে পারলাম না, সরি।

যা করেছেন, অনেক করেছেন, কিশোর বললো। আপনার কিডন্যাপের ঘটনাটা না ঘটলে পুলিশ এতো আগ্রহ দেখাতো না। বিপদে পড়ে যেতাম আমরা।

পুলিশের গাড়িতে করে চলে গেল ল্যারি। তাকে বিমানটার কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। তিন গোয়েন্দা থানা থেকে বেরিয়ে এলো। আলোচনা করে ঠিক করলো, ইউনিভারসিটি অভ মেকসিকোতে যাবে। খোঁজখবর করবে ডা স্টেফানো নামে আরকিওলজির কোনো প্রফেসর আছেন কিনা। শহরের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়টা। ট্যাক্সি নিলো ওরা।

পথে অনেকগুলো বাড়ি চোখে পড়লো। সুন্দর রঙ। কংক্রীটের ওপরেও লাল রঙ করা হয়েছে। চমৎকার লন আর বাগান। উজ্জ্বল রঙের ফুল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি গাড়ি পৌঁছলো। অবাক বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলো মুসা, খাইছে! দেখ, দেখ, কি সুন্দর! হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে সে বাড়িটার একধারের মোজাইকের কাজ করা দেয়ালের দিকে। লাইব্রেরিটা রয়েছে ওখানটাতেই।

মোজাইকে আঁকা রয়েছে মস্ত এক দানবীয় মূর্তি। একজন ইনডিয়ানের। মেকসিকোর ইনডিয়ান আর স্প্যানিশ ইতিহাসের কিছুটা আন্দাজ করা যায় বাকি ছবিগুলো দেখলে।

অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিল্ডিঙের কাছে এসে ড্রাইভারকে থামতে বললো, কিশোর। নেমে ভেতরে ঢুকে একজনকে জিজ্ঞেস করলো আরকিওলজি ডিপার্টমেন্টটা কোথায়। ওই ডিপার্টমেন্টের আরেকজন প্রফেসর ডক্টর হ্যাসিয়ানোর কথা বলে তাকে বলা হলো তিনি হয়তো জানতে পারেন।

ভালো মানুষ প্রফেসর হ্যাসিয়ানো। বেশ আন্তরিক। তিনি বললেন, সিনর ডি স্টেফানোকে চেনেন। ছবি দেখে সনাক্ত করলেন। বললেন, অনেক দিন দেখা হয় না। বেশি ঘোরাঘুরি করার স্বভাব। এক জায়গায় বেশি দিন থাকে না। স্থায়ী কোনো ঠিকানাও নেই, অন্তত আমার জানা নেই।

তাকে খুঁজে বের করার উপায় আছে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর বললেন, পাওয়া খুব মুশকিল। বেশিরভাগ সময়ই কাটায় প্রাচীন ধ্বংসস্তূপগুলোতে। ইনটারেসটিং অনেক প্রাচীন নিদর্শন মাটি খুঁড়ে বের করেছে। তবে নিজে গিয়ে কখনও সরকারী লোকের কাছে কিংবা মিউজিয়ামকে দিয়ে আসেনি ওসব জিনিস, অন্য সব আরকিওলজিস্টরা যা করে। সব সময় অন্য লোকের হাতে পাঠায়।

কিশোর বললো, ডক্টর স্টেফানোকে তার খুব দরকার। জরুরী কাজে। হেসে বললো, কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে পাওয়াটা খুব কঠিন হবে।

তা হবে। কারণ মেকসিকোতে ধ্বংসস্তুপের অভাব নেই। তার অনেকগুলোই এখনও খোঁড়া হয়নি। কোনটাতে গিয়ে বসে আছে এখন ডক্টর কে জানে।

প্রফেসরকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে কিশোর বললো, ঠিক আছে, যাই। খুঁজে দেখিগে। ভাগ্য ভালো হলে পেয়ে যাবো।

ওদেরকে গুড লাক জানালেন হ্যাঁসিয়ানো। বললেন, স্টেফানোকে পেলে আমার কথা বলো। যেন দেখা করে। কয়েকটা ক্লাস নিতে বলবো। কিছু কিছু বিষয়ে আমার চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞান তার।

বেরিয়ে এলো তিন গোয়েন্দা। ঘড়ি দেখলো কিশোর। আজ আর কোথাও যাওয়ার সময় নেই। কাল বেরোবো। সবচেয়ে কাছের ধ্বংসস্তূপটা হলো টিওটিহুয়াকান।

ওখানেই বন্ধুর ছবিটা তুলেছেন মিস্টার রেডফোর্ড, তাই না? মুসার প্রশ্ন। অ্যাজটেক যোদ্ধার পোশাক পরিয়ে?

হ্যাঁ।

ফেরার পথে বইয়ের দোকান থেকে একটা ম্যাপ আর একটা চার্ট কিনলো কিশোর। হোটেলে বসে বসে তিনজনে মিলে চার্ট দেখে বের করতে লাগলো, কোন কোন্ ধ্বংসস্তুপে গাড়িতে করে যাওয়া যায়। রেডফোর্ডের তোলা যে ছবিগুলোর প্রিন্ট করে নিয়েছে রবিন, সেগুলোও মন দিয়ে দেখতে লাগলো। যদি কিছু বের করতে পারে!

যেসব জায়গায় গাড়ি যায়, আগে সেখানে যাই, রবিন বললো। না পেলে তারপর অন্য জায়গায় যাওয়ার কথা ভাববো। কি বলো?

মাথা ঝাঁকালো কিশোর।

টিওটিহুয়াকানের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখালো মুসা। এসব পুরানো ধ্বংসস্তূপ দেখতে খুব ভালো লাগে তার। মানুষের প্রাচীন ইতিহাস জানার প্রচন্ড কৌতূহল। মাঝে মাঝে তো দুঃখই প্রকাশ করে ফেলে, প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীতে জন্মালো না বলে। তাঁর জানা আছে, টিওটিহুয়াকান হলো টোলটেকদের ধর্মমন্দির, যেটা পরে জোর করে দখল করে নেয় অ্যাজটেকরা।

একটা ছবির ওপর আঙুল রেখে বললো সে, এই পিরামিডগুলো খুব উঁচু।

হ্যাঁ, রবিন মাথা ঝাকালো। পিরামিড অভ দি সান।

সূর্যের পিরামিড, কিশোর বললো। অদ্ভুত নাম, না?

নাম যা-ই হোক, হাত নাড়লো মুসা। দয়া করে আমাকে অন্তত ওখানে চড়তে বলো না। পা পিছলালে গেছি। চূড়ায় গিয়ে বসে নেই তো সিনর স্টেফাননা?

কি জানি, হাসলো রবিন। থাকেই যদি, যাবে। আচ্ছা, পাহাড়-টাহাড় তো খুবই বাইতে পারো। ভয় লাগে না। তার মানে উচ্চতা নিয়ে কোনো ফোবিয়া নেই তোমার। পিরামিডে চড়ার ব্যাপারে এতো ভয় কেন?

সত্যি কথা বলবো? বলো।

পিরামিড হলোগে প্রাচীন রাজারাজড়াদের কবর। ওখানে ভূত থাকবেই…

একেবারে রাজকীয় ভূত, কিশোর বললো। হাহ্ হাহ্ হা!

না, ঠাট্টা করো না, সত্যি আছে…

ভালোই তো হবে তাহলে। কখনও তো সত্যিকারের ভূত দেখনি। এবারে দেখা হয়ে যাবে।

তারমানে আমাকে পিরামিডে চড়িয়েই ছাড়বে!

তুমি তো আর একা উঠবে না। প্রয়োজন হলে আমরাও তোমার সঙ্গে থাকবো।

গুম হয়ে গেল মুসা। বুঝতে পারলো, ওরা তার কথা শুনবে না।

পরদিন সোমবার। সকালে নাস্তা সেরেই বেরিয়ে পড়লো তিন গোয়েন্দা। হোটেলের কাছেই একটা রেন্ট-আ-কার সার্ভিস রয়েছে। সেখান থেকে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করলো। একটা কনভারটিবল গাড়ি। টিওটিহুয়াকানে চললো।

দুপুরের দিকে একটা রেস্টুরেন্ট দেখে নাম পড়লো মুসা, গ্রোটো রেস্টুরেন্ট। হুঁ, খাবার-দাবার ভালোই হবে মনে হচ্ছে। চলো, ঢুকে পড়া যাক।

রেস্টুরেন্টটা কোনো বাড়ির মধ্যে নয়। পাহাড়ের একটা গুহার ভেতরে। একসময় প্রাচীন ইনডিয়ানদের একটা গোত্র বাস করতো এখানে।

গাড়ি সরিয়ে এনে রাস্তার পাশে পার্ক করলো কিশোর। তিনজনে মিলে ঢুকে পড়লো গুহার ভেতর। মুসার অনুমান ভূল হয়নি। খাবার সত্যিই চমৎকার। একবার খেয়ে আরেক প্রস্থ খাবারের অর্ডার দিলো মুসা। তাকে সাবধান করলো কিশোর, বুঝেশুনে খেও। অনেক ওপরে উঠতে হবে আমাদের। পেট বোঝাই থাকলে অসুবিধে হতে পারে।

সে দেখা যাবে, তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নাড়লো মুসা।

অবশেষে পিরামিডের কাছে পৌঁছলো তিন গোয়েন্দা। মিশরীয় পিরামিডের মতো তিনটে দেয়াল নয় মেকসিকান পিরামিডের, দেয়ালগুলো সমানও নয়। চারটে দেয়াল, এবং ধাপে ধাপে সিঁড়ি উঠে গেছে ক্রমশ সরু হয়ে। যতোই ওপরে উঠেছে, চেপে এসেছে দুই পাশ, ফলে চূড়াটা হয়ে গেছে একেবারে চোখা। শত শত ধাপ সিঁড়ি। হাঁ করে তাকিয়ে রইলো ওরা। দর্শকের যেমন অভাব নেই, প্রত্নতাত্ত্বিকদেরও কমতি নেই। অসংখ্য জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। মুসার আশঙ্কা হতে লাগলো, এভাবে চলতে থাকলে কোনোদিন ধসিয়েই দেবে পিরামিডটা। তবে তার আশঙ্কা অমূলক। কোনো কিছু নষ্ট না করে কিভাবে খুঁড়তে হয় জানা আছে আরকিওলজিস্টদের।

কি সর্বনাশ! মুসার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললো রবিন। এসেছিলাম একটা ভূতুড়ে শহর দেখতে। কিন্তু এ-যে বাজার বানিয়ে ফেলেছে।

রবিনের কথায় কান নেই মুসার। তাকিয়ে রয়েছে চুড়ার দিকে। আরিব্বাপরে, কি উঁচু। সূর্যের পিরামিড নামটা ভুল রাখেনি। মনে হয় একেবারে সূর্য ছুঁতে চাইছে। ওখানে উঠতে হবে আমাকে?

ভয় পাচ্ছাে? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

ভূতের ভয় আর পাচ্ছি না এখন। এতো লোকের সামনে ভূত আসবে না। উচ্চতার ভয়ই পাচ্ছি। এতো উঁচুতে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরেই না পড়ে যাই!

পড়বে না, কিশোর বললো। যদি ইনডিয়ান কায়দায় ওঠো। ওরা কক্ষণাে সিড়ির দিকে মুখ করে উঠতো না। পাশ থেকে উঠতো। নামার সময়ও একই ভাবে নামতো।

ছাগল ছিলো আর কি, মুসা বললো। পাশ থেকে ওঠা তো আরও কঠিন।

হয়তো। কিন্তু তাতে পড়ার সম্ভাবনা নেই। সিড়িগুলো কি সরু দেখছো না?

তাহলে উঠবেই?

হ্যাঁ। সবাই ওঠো। ডা স্টেফানোকে পাই আর না পাই, এতোদূরে এসে পিরামিডে চড়ার সুযোগ ছাড়বো না।

এগিয়ে গিয়ে উঠতে শুরু করলো কিশোর। দেখাদেখি রবিনও গেল। সবার শেষে মুসা। কিছুদূর উঠে আর পাশ থেকে ওঠার কথা মনে রইলো না তার। কিংবা পরোয়া করলো না। সামনের দিকে মুখ করে উঠতে আরম্ভ করলো। বড় জোর পাঁচ কি সাতটা ধাপ পেরিয়েছে, তার পরই পা পিছলালো। সোজা থাকার অনেক চেষ্টা করলো। পারলো না কিছুতেই। পড়ে গেল। গড়াতে শুরু করলো শরীরটা।

সরাসরি উঠতে গিয়ে সবার আগে চলে গিয়েছিলো সে। পেছনে পড়েছিলো কিশোর আর রবিন। কারণ ওরা তাড়াহুড়ো করেনি। মুসার পতন ঠেকাতে চেষ্টা করলো ওরা। পারলো তো না-ই, ওরাও পড়ে গেল।

গড়াতে গড়াতে নিচে পড়তে লাগলো তিনটে শরীর।

চেঁচামেচি শুনে একবার ফিরে তাকিয়েই আবার যার যার কাজে মন দিলো যারা মাটি খুঁড়ছিলো। গুরুত্বই দিলো না। বোঝা যায়, এভাবে গড়িয়ে পড়াটা এখানে নতুন নয়। দেখে দেখে গা সওয়া হয়ে গেছে ওদের।


বিশাল পিরামিডের একেবারে গোড়ায় এসে বন্ধ হলো গড়ানো। হাঁসফাস করতে করতে উঠে বসলো তিনজনেই। হাঁটু আর কনুই ছড়ে গেছে। আরও কয়েক জায়গায় ব্যথা পেয়েছে, তবে হাড়টাড় ভাঙেনি।

বলেছিলাম না ভূত আছে! কোলাব্যাঙের স্বর বেরোলো মুসার কণ্ঠ দিয়ে। ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে!

তোমার মাথা! রেগে গেল কিশোর। কতোবার সাবধান করলাম ওভাবে উঠতে পারবে না! ইনডিয়ানদের শত শত বছরের অভিজ্ঞতাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে গিয়েই এই বিপদটা বাধালে। ভাগ্যিস বেশি ওপরে উঠে অকাজটা শুরু করোনি!

রবিন কাঁপছে। মুখ থেকে ধুলো আর মাটি মুছে বললো, মুখ-টুখ মোছো না। ভাঁড়ের মতো লাগছে তো।

কিশোর আর রবিনের মুখের অবস্থা দেখেই নিজেরটা কেমন হয়েছে আন্দাজ করে ফেললো মুসা। মুছতে মুছতে বললো, বাপরি বাপ! মনে হলো গত একহাজার বছর ধরে একটানা গড়াগড়ি খেয়েছি। জাহান্নামে যাক সূর্যের পিরামিড। আমি আর এর মধ্যে নেই, দুহাত নাড়লো সে।

জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেললো কিশোর। কিন্তু আরেকবার চেষ্টা করে দেখতে চাই।

উঠতে শুরু করলো আবার সে। পিছু নিলো রবিন। পুরো আধ মিনিট সেদিকে তাকিয়ে বসে রইলো মুসা। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। ওরা দুজনে পারলে সে পারবে না কেন? উঠতে শুরু করলো সে-ও। তবে এবার আর তাড়াহুড়ো করলো না। নিয়মও লঙঘন করলো না। ধীরে ধীরে উঠে এলো ওরা চূড়ার কাছে চওড়া বেদিমতো জায়গাটায়।

এক সময় একটা শহর ছিলো বটে! অবাক হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছে রবিন। আর এসব মন্দির এতো কষ্ট করে তৈরি হয়েছে শুধু মানুষ খুনের জন্যে! ভাবতে কেমন লাগে না? এখানে এনে বলি দেয়া হতো মানুষকে।

বইয়ে পড়েছি, হাত তুলে দূরের একটা জায়গা দেখিয়ে মুসা বললো। একসময় ওখানে নাকি লক্ষ লোকের বাস ছিলো। ওটাই পিরামিড অভ দি মুন। চাঁদের পিরামিড, তাই না?

মাথা ঝাঁকালো কিশোর আর রবিন।

যেটাতে দাঁড়িয়ে আছে, দেখতে অবিকল একই রকম ওই পিরামিডটাও, কেবল আকারে ছোট।

একটা মন্দির দেখিয়ে কিশোর বললো, ওটা তৈরি হয়েছিলো একজন বিদেশীর সম্মানে।

কী! মুসা বললো। আমি তো জানতাম, হাজার বছর আগেই তৈরি হয়েছে ওটা। স্প্যানিয়ার্ডরা এখানে আসার আগে।

তা-ই হয়েছিলো। কেন, কিংবদন্তীটা শোনননি? শাদা চামড়া, নীল চোখ, লম্বা দাড়িওয়ালা একজন মানুষ এসে হাজির হয়েছিলো সাত সাগরের ওপার থেকে, পালকে ঢাকা সাপের পিঠে চড়ে? সেজন্যেই সাপ ছিলো প্রাচীন মেকসিকানদের কাছে পবিত্র। ওই মানুষটার নাম দিয়েছিলো ওরা কোয়েজাল-কোয়াটল। তখনকার ইনডিয়ানদের চেয়ে অনেক অনেক জ্ঞানী ছিলো সেই লোক। তাদেরকে শিখিয়েছিলো কি করে বিল্ডিং তৈরি করতে হয়, ফসল ফলাতে হয়, পাথর কুঁদে শিল্প সৃষ্টি করতে হয়।

এই গল্প খুব ভালো লাগছে মুসার। অ্যাজটেকদের সঙ্গে বাস করতো সেই লোক?

না। ওরা আসার অনেক আগে থেকেই সেই লোক ছিলো সেখানে। তার মৃত্যুর পর তাকে দেবতা বানিয়ে ফেললো ইনডিয়ানরা। কোয়েঞ্জালকোয়াটল ইনডিয়ানদের অনেক দেবতার একজন।

দেখা হয়েছে। আবার নামতে লাগলো তিন গোয়েন্দা। অর্ধেক নামার পর হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো রবিন, এই দেখ দেখ! ওই যে! ছবির লোকটার মতো লাগছে?

সিনর স্টেফানো! মুসা বললো।

হতে পারে, বললো রবিন। তবে নামার গতি বাড়ানোর কোনো চেষ্টা করলো না। এতো ওপর থেকে পড়ে ঘাড় ভেঙে মরতে চায় না।

গোড়ায় নেমে আর লোকটাকে দেখতে পেলো না ওরা। ভাবলো, আরেক পাশে চলে গেছে। দ্রুত হেঁটে আরেক পাশে চলে এলো তিনজনে। নেই লোকটা। প্রায় দৌড়াতে শুরু করলো তিনজনে। পুরো পিরামিডের চারপাশে এক চক্কর দিয়ে এলো। আশ্চর্য! কোথাও দেখা গেল না লোকটাকে। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

ধপ্ করে মাটিতে বসে পড়লো মুসা। পাগল হয়ে গেছি আমরা! কি সব কাণ্ড করে বেড়াচ্ছি! এসবের কোনো মানে হয়? পুরো মেকসিকো শহর ঘুরে এলেও এতো কষ্ট লাগতো না।

তিনজনের মধ্যে মুসাই সব চেয়ে বেশি কষ্ট সহ্য করতে পারে। তারই যখন এই অবস্থা, কিশোর আর রবিনের অবস্থা অনুমানই করা যায়। এক জায়গায় সামান্য ঘাস দেখে তার ওপর শুয়েই পড়লো রবিন। ওই অ্যাজটেক ব্যাটাদের ফুসফুসের ক্ষমতা ছিলো অসাধারণ!

কিশোরও বসে হাঁপাচ্ছে। সে ভাবছে লোকটার কথা। বললো, হয়তো অন্য পিরামিডটার কাছে চলে গেছে সে। দেরি করলে আর পাওয়া না-ও যেতে পারে। তাড়াতাড়ি এসে গাড়িতে উঠলো তিন গোয়েন্দা। ছুটলো চাঁদের পিরামিডের দিকে। সেখানেও পাওয়া গেল না লোকটাকে। এর পর গেল ওরা কোয়েঞ্জালকোয়াটলের মন্দিরের কাছে। এটাকেও ছোটখাটো আরেকটা পিরামিডই বলা চলে। চারপাশে চক্কর দিল এলো একবার।

ভ্রূকুটি করলো কিশোর। লোকটা কে, কে জানে! সিনর স্টেফানো না-ও হতে পারে। আমাদের দেখলে পালাবেন কেন ডক্টর?

তা-ও তো কথা, বললো মুসা। কিন্তু তিনি যদি স্টেফানোই হন, আর আমাদের দেখে এভাবে পালাতে থাকেন, তাহলে তার সঙ্গে কথা বলবো কিভাবে? রবিন, ঠিক দেখেছো তো?

দেখলাম তো আমাদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে, রবিনের কণ্ঠে সন্দেহ। তবে সিনর স্টেফানোই কিনা, শিওর নই। মনে হলো তারই মতো।

হু। সব মেকসিকানের তো একই চেহারা! অন্তত আমার আলাদা মনে হয় না।

আবার মন্দির দেখায় মন দিলো ছেলেরা। পাথর কুঁদে দারুণ সব দৃশ্য আর কল্পিত জীবজন্তুর মূর্তি আঁকা হয়েছে। ফণা তুলে রেখেছে মস্ত এক সাপ। হাঁ করা। ভয়ংকর দাঁতগুলো বেরিয়ে রয়েছে। কয়েকটা সাপ রয়েছে ওরকম। ওগুলোর মাঝে দেখা গেল একজন মানুষকে। বোধহয় ওই লোকই কোয়েঞ্জাল-কোয়াটল। সেই প্রাচীনকালে এরকম শিল্প সৃষ্টি কি করে সম্ভব হয়েছিলো, যখন পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ছিলো না, ভাবলে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না।

আনমনে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো একবার কিশোর। বিড়বিড় করে বললো, এর সামনেই ছবি তুলেছিলেন মিস্টার রেডফোর্ড। এখানে অ্যাজটেক যোদ্ধার কোনো সূত্র লুকিয়ে নেই তো?

বিশাল, মন্দিরটার দিকে তাকিয়ে রবিন বললো, এখানে চিঠি কিংবা দলিল লুকানো আছে ভাবছো? এক মাস লেগে যাবে খুঁজে বের করতে।

তবে আপাতত সেটা নিয়ে মাথা ঘামালো না ওরা। যে কোনো সময় ফিরে আসতে পারবে কোয়েঞ্জালকোয়াটলের মন্দিরে। এখন জরুরী কাজ হলো সিনর স্টেফানোকে খুঁজে বের করা। এখানে যখন নেই, অন্য কোনো ধ্বংসস্তুপে রয়েছেন হয়তো।

আবার গাড়িতে এসে উঠলো ওরা। হোটেলে ফিরে চললো।


হোটেলে ফিরে কাপড় ছেড়েও সারতে পারলো না কিশোর। টেলিফোন বাজলো। পুলিশ চীফ মারকাস ফোন করেছেন। বললেন, এক ঘণ্টা যাবৎ তোমাদেরকে ধরার চেষ্টা করছি। কোথায় গিয়েছিলে?

টিওটিহুয়াকানে। কেন?

একটু আগে খবর পেলাম, একটা গুজব নাকি ছড়িয়ে পড়েছে; মনটি অ্যালবানে একজন আরকিওলজিস্ট একটা বিরাট আবিষ্কার করেছেন। তিনিই তোমাদের লোক নন তো?

সিনর স্টেফানো?

বুঝতে পারছি না। রিপোর্ট পেয়েছি, একজন লোক নাকি শহরে এসে ঢুকেছে। বলে বেড়াচ্ছে খবরটা। তাকে ধরে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। বললো, আরকিওলজিস্ট নাকি তার পরিচয় ছড়াতে নারাজ। সেজন্যেই মনে হচ্ছে আমার, তিনি সিনর স্টেফানো।

তাহলে আর দেরি করবো না, কিশোর বললো। এখুনি বেরিয়ে পড়বো। দেখি তাঁকে ধরতে পারি কিনা। তা আবিষ্কারটা কি করেছেন?

লোকটা বলতে চাইলো না। অনেক চেষ্টা করলাম, একটু থামলেন মারকাস। তারপর বললেন, এখুনি যাবে? মনটি অ্যালবানের রাস্তা কিন্তু ভালো না। আমি অবশ্য কখনও যাইনি। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে যেতে হয়। অনেক দূর। আজকে না গিয়ে কাল সকালেই যাও।

আচ্ছা। লাইন কেটে গেল।

রবিন আর মুসাকে খবরটা জানালো কিশোর। তারপর ম্যাপ খুলে বসলো। মেকসিকোর উত্তরপুবে প্রায় সাড়ে তিনশো মাইল দূরে ছোট একটা শহর আছে। নাম অকজাকা। যেতে হবে ওই শহরের ভেতর দিয়ে।

রবিন বললো, একদিনে মনটি অ্যালবানে যাওয়া সম্ভব না। এক কাজ করবো। অকজাকায় গিয়ে হোটেলে উঠবো। ওখান থেকে আবার রওনা হওয়া যাবে।

পরদিন খুব সকালে রওনা হয়ে গেল তিন গোয়েন্দা। প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে ধরে যেতে হয়। প্রচন্ড ভিড়। দুই ঘণ্টা লেগে গেল পর্বতের কাছাকাছি আসতেই। ভিড় না থাকলে আরও অনেক আগেই চলে আসতে পারতো। সরু একটা শাখা পথ ঢুকে গেছে পর্বতের ভেতরে। সেই পথ ধরে চললো ওরা। একটু পর পরই তীক্ষ্ণ মোড়। ওপাশ থেকে সাড়া না দিয়ে গাড়ি এলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। মোড় ঘোরার সময় তাই বার বার হর্ন দিতে লাগলো কিশোর। তার পরেও আরেকটু হলেই অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাচ্ছিলো একবার। ওপাশ থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে এলো একটা গাড়ি। এরকম মোড়েও গতি কমায়নি। শাই শাই করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পর্বতের দেয়ালের সঙ্গে প্রায় সেঁটে গেল কিশোর। অন্য গাড়িটা পড়ে যাচ্ছিলো পাশের গভীর খাদে, নিতান্ত কপাল জোর আর ড্রাইভারের দক্ষতার কারণে বেঁচে গেল।

অপূর্ব দৃশ্য পর্বতের। দেয়াল কোথাও খাড়া, কোথাও ঢালু। বেরিয়ে রয়েছে গ্রানাইটের বিচিত্র স্তর। ছোটবড় চূড়ার কোনো কোনোটাতে রোদ পড়ে জ্বলছে। যেন কড়া লাল রঙে রাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। ছবির মতন।

ঢালে জন্মে রয়েছে নানা জাতের ক্যাকটাস। চিউলিপ ফুলের মতো দেখতে খাটো ম্যাগুই ক্যাকটাস থেকে শুরু করে দৈত্যাকার ক্যানডেল ক্যাকটাস, সবই আছে। যেমন বিচিত্র চেহারা, তেমনি রঙ।

ছড়ানো, সমতল একটা জায়গায় পৌঁছলো ওরা। জায়গাটা পর্বতের ওপরেই। ক্যাকটাসের এক ঘন ঝাড় হয়ে আছে ওখানে।

এই, দাঁড়াও তো! কিশোরের কাঁধে হাত রাখলো মুসা।

গাড়ি থামালো কিশোর। গরুর গাড়ির চাকার মতো সমব্রেরো হ্যাঁট পরা একজন মানুষ মাটিতে ঝুঁকে বসে কি যেন করছে একটা ম্যাগুই কাকটাসের গোঁড়ায়। তার কাছে এগিয়ে গেল মুসা। বুঝতে পারলো কি করছে লোকটা। ক্যাকটাসের ভেতরে এক ধরনের রস হয়। পানির বিকল্প হিসেবে সেটাকে খাওয়া যায়। তা-ই বের করছে লোকটা।

এদিকে অনেক টুরিস্ট আসে। এখানকার লোকেরা তাই ইংরেজি বোঝে, বলতেও পারে কিছু কিছু। এই লোকটাও পারে। সহজেই তার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ফেললো মুসা।

রবিন আর কিশোরও নেমে এলো। খিদে পেয়েছে তিনজনেরই। গাড়িতে লাঞ্চ প্যাকেট আর পানির বোতল রয়েছে। নামিয়ে আনা হলো। ক্যাকটাসের ছায়ায় খেতে বসলো তিনজনে। লোকটাকে আমন্ত্রণ জানাতেই রাজি হয়ে গেল সে।

লেখাপড়া মোটামুটি জানে লোকটা। তার নাম ডিউগো। মেকসিকো সম্পর্কে অনেক কিছু বলতে পারলো সে। অনেক মজার মজার গল্প, ইতিহাস।

ইনডিয়ানদের সামাজিকতা, দেবতার উদ্দেশ্যে নরবলির কাহিনী, এসব অনেক কিছুই জানে সে। বলে গেল গড়গড় করে। আর বলতেও পারে বেশ গুছিয়ে, সুন্দর করে। শুনতে ভালোই লাগে।

একসময় পিন্টো আলভারোর কথা জিজ্ঞেস করে বসলো কিশোর।

না, চিনি না, মাথা নাড়লো ডিউগো।

অজাকায় থাকে?

জানি না, পকেট থেকে ছবি বের করে দেখালো কিশোর। এই আরেকজন লোক, সিনর স্টেফানো। আরকিওলজিস্ট। নাম শুনেছেন?

সি, সি. দ্রুত জবাব দিলো লোকটা। দেখিনি কখনও। তবে শুনেছি, সিনর স্টেফানো নামে একজন লোক এখানকার ধ্বংসস্তূপগুলোতে খুঁড়তে আসে। বহুবার এসেছে।

মনটি অ্যালবানে যায়?

তা বলতে পারবো না।

লোকটাকে আরও কিছু প্রশ্ন করে, ধন্যবাদ এবং গুডবাই জানিয়ে উঠে এলো তিন গোয়েন্দা। গাড়িতে উঠলো। এবার ড্রাইভিং সীটে বসলো মুসা।

নাহ, একবিন্দু এগোতে পারছি না, নিরাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো কিশোর। লাভের মধ্যে শুধু বেড়িয়ে বেড়াচ্ছি, রহস্যের কিছুই করা যাচ্ছে না!

অকজাকাতে একটা হোটেলে উঠলো ওরা। ম্যানেজারের সঙ্গেও আলাপ করে দেখলো কিশোর। কিছুই জানতে পারলো না। মনটি অ্যালবানে যে একটা বড় আবিষ্কার হয়েছে, এই খবরটা জানে না পর্যন্ত ওই লোক।

রবিন জিজ্ঞেস করলো, আজই যাবে?

ঘড়ি দেখলো কিশোর। ছটা বাজে। এখুনি খেয়ে নিলে যাওয়া যায়।

তাহলে দেরি করছি কেন? ভুরু নাচালো মুসা। বসে গেলেই হয়।

খেয়েদেয়ে আবার বেরিয়ে পড়লো তিন গোয়েন্দা। এবারের গন্তব্য মনটি অ্যালবানের ধ্বংসস্তূপ, যেখানে সিনর স্টেফানো যুগান্তকর এক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার করেছেন বলে গুজব ছড়িয়েছে।

যেতে নিশ্চয় রাত হবে না, কি বলো? দুই সহকারীর উদ্দেশ্যে বললো কিশোর।

হলেই বা কি? রবিন বললো। শুনেছি, রাতে ওসব প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ দেখার আলাদা মজা। আর চাঁদ থাকলে তো কথাই নেই।

ওরা যখন বেরোলো তখন সাতটা বাজে। অচেনা পথঘাট। শুরুতেই পথ হারালো। ব্যাপারটা ধরতে পারলো প্রথমে রবিন। ম্যাপ দেখে। ঠিক পথে এসে ওঠার জন্যে এবড়োখেবড়ো একটা কাঁচা রাস্তা ধরতে হলো।

প্যান প্যান শুরু করলো মুসা, এভাবে চললে ঘণ্টাখানেক পরেই আবার খিদে পাবে। নাহ, ঘোড়ার ডিমের অ্যাজটেক যোদ্ধাকে খুঁজে আর বের করা হলো না এযাত্রা!

গতি খুব ধীর। কিশোরও অধৈর্য হয়ে উঠেছে। নিজেকেই যেন সান্ত্বনা দিলো, আসল রাস্তায় উঠতে বেশিক্ষণ লাগবে না।

এঞ্জিনটা এখন বন্ধ না হলেই হয়, মুসা বললো।

কিংবা টায়ার পাংচার, পেছনের সীট থেকে বললো রবিন।

তবে এঞ্জিন বন্ধ কিংবা টায়ার পাংচার কোনোটাই হলো না। খোয়া বিছানো একটা পথে এসে উঠলো গাড়ি। গতি বাড়ালো মুসা। পাহাড়ী পথ ধরে দ্রুত ধ্বংসস্তুপের দিকে উঠে চললো। পথ ভুল করায় বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হয়েছে। সেটা পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করছে মুসা। কিন্তু তার পরেও দিনের আলো থাকতে থাকতে পর্বতের ওপরের চ্যাপ্টা সমতল জায়গাটায় পৌঁছতে পারলো না, যেখানে রয়েছে মনটি অ্যালবানের ধ্বংসস্তূপ। সূর্য ডুবে গেছে। চাঁদ উঠেছে।

টর্চ না নিয়ে নেমো না, সতর্ক করলো কিশোর, যতোই চাঁদ উঠুক। মুসা, ভূতের ভয় লাগছে না তো?

লাগলেই আর কি করবো?

হাসলো কিশোর। রবিন কিছু বললো না।

চাঁদের আলোয় কেমন যেন ভূতুড়ে লাগছে মনুটি অ্যালবানের পিরামিড আকৃতির মন্দির, সমাধিস্তম্ভ, আর বাড়িঘরগুলোকে। গা ছমছমে পরিবেশ। বিশাল এক চত্বর দেখতে পেলো ওরা। চারপাশ ঘিরে তৈরি হয়েছে পাথরের বাড়ি। দুটো বাড়ির মাঝের ফাঁকে গাড়ি রাখলো মুসা। টর্চ হাতে নেমে পড়লো তিনজনে। জায়গাটার বিশালত্বের কাছে অনেক ক্ষুদ্র মনে হলো নিজেদেরকে। স্তব্ধ, নীরব। অথচ এককালে নিশ্চয় গমগম করতো লোকজনে।

ডানে বাঁয়ে তাকালো মুসা। রবিনকে জিজ্ঞেস করলো, মিস্টার বুক অভ নলেজ, এর ইতিহাস কিছু জানো নাকি?

কিছু কিছু। পনেরোশো শতকের গোড়ার দিকে গড়ে উঠেছিলো এই শহর। তারপর হাত বদল হলো। স্প্যানিশরা এসে দখল করে ফেললো। নতুন মনিবেরা অনেক কিছু রদবদল করে তৈরি করলো নতুন শহর। মূল জায়গা থেকে কিছুটা সরে গিয়ে। আর পুরানো শহরটাকে ব্যবহার করতে লাগলো, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কাজে। তাদের বড় বড় নেতাকেও কবর দিলো এখানে।

তার মানে পুরোপুরিই ভূতুড়ে শহর!

একটা পাথরের দেয়ালের পাশে চলে এলো ওরা। নাচের দৃশ্য আঁকা হয়েছে খোদাই করে। খাইছে! প্রায় চিৎকার করে উঠলো মুসা। দেখ দেখ!

ঝট করে ঘুরে গেল অন্য দুটো টর্চের আলো। কিশোর জিজ্ঞেস করলো, কি?

জ্যান্ত! ওগুলো জ্যান্ত!

হাসতে শুরু করলো কিশোর আর রবিন। এই ভূতই তোমার সর্বনাশ করবে। মাথাটা একেবারেই খারাপ করে দিয়েছে! একটা মূর্তির গায়ে হাত বোলালো কিশোর। এই দেখ, একেবারে মরা! পাথর!

যতো যা-ই বলো, হাসিতে যোগ দিতে পারলো না মুসা। আমি কিছু নড়তে দেখেছি। মনে হচ্ছে চারপাশের কবর থেকে বেরিয়ে এসেছে সমস্ত প্রেতাত্মা! আমাদের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে!

বাদ দাও তো ওসব ফালতু কথা! অধৈর্য হয়ে হাত নাড়লো কিশোর। কি কাজে এসেছি ভুলে গেছ? সিনর স্টেফানোকে খুঁজতে।

কিন্তু তাকে পাওয়া যাবে না। অন্তত এই বেলা। ধ্বংসস্তুপে যদি কাজ করেনও রাতের বেলা এখন কি করতে আসবেন?

কোথায় ঘুমান, সেটা খুঁজে বের করবো, বললো বটে, কিন্তু জোর নেই কিশোরের গলায়। জায়গাটায় এসেই তার মনে হয়েছে, কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে। স্টেফানো এখানে সত্যি আছেন কিনা, এ-ব্যাপারেও সন্দেহ জাগতে আরম্ভ করেছে। হয়তো ইচ্ছে করেই গুজব ছড়িয়ে ওদেরকে টেনে আনা হয়েছে এখানে, কে জানে!

অ্যাই, দেখ! বলে উঠলো রবিন। হাত তুলে দেখালো।

সামনে পিরামিডের মাথায় একটা আলো মিটমিট করছে। লণ্ঠনের আলোর মতো।

পেয়েছি! উত্তেজিত কণ্ঠে আবার বললো ররিন। নিশ্চয় সিনর স্টেফানো! কাজ করছেন ওখানে!

সন্দেহ গেল না কিশোরের। কেন যেন মনে হতে লাগলো, পুরো ব্যাপারটাই একটা ফাঁকিবাজি। ধোকা! মনটি অ্যালবানেতে এসে ডা স্টেফানোর প্রত্নতাত্ত্বিক খোড়াখুঁড়ির গল্পটা ভুয়া। ওরকম কিছু হলে, আর এতো বড় একটা আবিষ্কার ঘটলে, হোটেলের ম্যানেজারের অন্তত না জানার কথা নয়। তার সন্দেহের কথাটা বললো দুই সহকারীকে।

কিন্তু কেন এই গল্প বানিয়ে বলতে যাবে? রবিনের প্রশ্ন।

শুধু আন্দাজ করতে পারি, জবাব দিলো কিশোর। নিশ্চিত হয়ে এখনও কিছু বলতে পারবো না। আমার বিশ্বাস, টোপ দেখিয়ে আমাদেরকে এখানে পাঠানোর উদ্দেশ্যেই একাজ করা হয়েছে। আমাদের শত্রুরা জানে, শুনলে তদন্ত করতে আসবোই আমরা। হয়তো কোনো কারণে সরিয়ে দিতে চেয়েছে। কিংবা ভুল পথে ঠেলে দিয়ে সময় নষ্ট করাতে চেয়েছে। যা-ই হোক, আলোটার দিকে দেখালো সে। ওটা দেখতে যাবো। কিসের আলো জানা দরকার। খুব সাবধানে থাকবে।

ওই আলো দেখতে যাওয়ার ব্যাপারটা ভালো লাগছে না মুসার। দশজন ষন্ডামার্কা লোকের সঙ্গে লাগতেও ভয় পায় না সে। কিন্তু রোগাটে একটামাত্র ভূত হলেও তার ধারেকাছে যেতে রাজি নয় সে। তবে কিছু করার নেই। কিশোর যখন যেতে বলেছে, যেতেই হবে।

সিড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলো কিশোর। তার পেছনে রইলো রবিন। আরেকবার দ্বিধা করে যা থাকে কপালে ভেবে মুসাও পা রাখলো সিঁড়িতে। চিৎকার করে উঠলো হঠাৎ। কিশোর, সাবধান, ব্যাটারা…

কথা শেষ করতে পারলো না সে। প্রচন্ড বাড়ি লাগলো মাথায়। বেহুশ হয়ে গেল।

১০
ঝট করে ঘুরে তাকালো কিশোর আর রবিন। চোখে পড়লো দুটো ছায়ামূর্তি। ওদেরই দিকে আসছে। দুজনের হাতেই হকিস্টিক।

পালানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। রুখে দাঁড়ালো দুই গোয়েন্দা। লোকদুটোকে আরও কাছে আসার সময় দিলো। তারপর ওরা আঘাত হানার আগেই নড়ে উঠলো কিশোর আর রবিন। একজন ব্যবহার করলো জুডোর কৌশল, আরেকজন চালালো কারাত। ফেলে দিলো লোক দুটোকে। তারপর উঠতে শুরু করলো সিড়ি বেয়ে। চূড়ায় কি আছে দেখতেই হবে।

কথাটা রবিনের মনে পড়লো প্রথমে। ফাঁদ নয়তো? হয়তো আলোর টোপ জ্বেলে আমাদের টেনে নিয়ে চলেছে ব্যাটারা!

তা-ও দেখবো, কি আছে! বলে পেছন ফিরে তাকালো কিশোর, লোকদুটো আসছে কিনা দেখার জন্যে। তাকিয়েই থমকে দাড়ালো। লোকগুলো নেই। মুসাও নেই। তার মাথায় যে বাড়ি মারা হয়েছে, একথা জানে না কিশোর কিংবা রবিন। ভেবেছে, সে-ও আসছে পেছনে। উত্তেজনায় খেয়ালই করেনি, লোকগুলোর সঙ্গে মারপিট করার সময় মুসা সেখানে ছিলো না। মুসা কই?

রবিনও ফিরে তাকালো। বেশ উজ্জ্বল হয়েছে জ্যোৎস্না। ভালোমতোই চোখে পড়ছে নিচের সিড়িগুলো। কোথাও দেখা গেল না মুসার্কে। হয়তো কোথাও লুকিয়েছে। লোকগুলোকে দেখেই আমাদেরকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে লুকিয়ে পড়েছে।

তা হতেই পারে না! জোর দিয়ে বললো কিশোর। তুমিও মুসাকে চেন। মানুষের ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালানোর বান্দা ও নয়।

তাহলে গেল কোথায়?

চাঁদের আলোয় যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে দেখলো দুজনে। কোথাও মুসাকে দেখা গেল না। কোনো নড়াচড়া নেই। কোনো মানুষ নেই। যে দুজন লোক বাড়ি মারতে এসেছিলো, তাদেরও চোখে পড়লো না। আশ্চর্য!

উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো দুই গোয়েন্দা। মেরে বেহুঁশ করে ধরে নিয়ে যায়নি তো! রবিন বললো।

দুজন বাদেও আরও লোক থাকতে পারে, কিশোর বললো। নিয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

চূড়ায় উঠে কিসের আলো জ্বলছে দেখার আগ্রহটা আপাতত চেপে রাখতে বাধ্য হলো কিশোর। মুসার কি হয়েছে দেখা দরকার আগে। তাড়াতাড়ি নেমে চললো সিড়ি বেয়ে। শুধু চাঁদের আলোর ওপর ভরসা না করে টর্চও জ্বাললো। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলো ফেলে খুঁজতে লাগলো মুসাকে। চিহ্নই নেই। তবে কি সত্যিই কিডন্যাপ করে নিয়ে গেল?

ব্যাপারটা কি… বলতে গিয়ে থেমে গেল রবিন।

পাথরের একটা বাড়ির দরজায় দুজন লোককে দেখা গেল। সোজা সেদিকে দৌড় দিলো দুই গোয়েন্দা। কিন্তু হারিয়ে গেল লোকগুলো। এই এলাকা ওদের পরিচিত। যখন খুশি বেরোচ্ছে, যখন খুশি লুকিয়ে পড়ছে। বাড়িটার কাছে এসে অনেক খোঁজাখুজি করলো দুজনে, লোকগুলোকে পেলো না। কয়েক মিনিট পরে একটা গাড়ির এঞ্জিনের শব্দ হলো।

চলে যাচ্ছে, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো কিশোর। তবে একটা ব্যাপার শিওর। মুসা ওদের সঙ্গে নেই।

মাথা ঝাঁকালো রবিন। যে বাড়িটা থেকে বেরোলো, তাতে ঢুকিয়ে রেখে যায়নি তো?

চলো, দেখি।

দরজায় দাঁড়িয়ে টর্চের আলো ফেললো দুজনে। শূন্য ঘর। মুসার নাম ধরে চেঁচিয়ে ডাকলো রবিন। পাথরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুললো সে চিৎকার। কিন্তু মুসার সাড়া নেই।

দুজনকে যেতে দেখেছি, কিশোর অনুমান করলো। আরও লোক থাকতে পারে। ওরা হয়তো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলেছে মুসাকে। তাহলে, এখানে চেঁচামেচি করে লাভ হবে না।

তবু চুপ করলো না রবিন। চেঁচিয়েই চললো মুসার নাম ধরে। কিশোর খুঁজে চলেছে। ভালো মতো না খুঁজে বেরোবে না এখান থেকে।

পায়ের ওপর শরীরের ভার বদল করলো সে। কি যেন শুনলাম! কান পাতলো দুজনেই। চাপা একটা গোঙানির মতো শব্দ শোনা গেল। বাড়ির আরও ভেতরে! ফিসফিসিয়ে বললো কিশোর।

পাথরের দেয়াল। দরজা খুঁজতে লাগলো ওরা। ঢোকার পথ। একজায়গায় বুক সমান উঁচু চারকোণা একটা ফোকর দেখতে পেলো। কয়েকটা পাথর পড়ে রয়েছে আশেপাশে। এককালে দরজাই ছিলো, এখন আর সেটা বোঝার উপায় নেই। পাল্লা-টাল্লা কিছু নেই। আর কোনো পথ না দেখে সেটা দিয়েই ঢুকে পড়লো দুজনে। আরও স্পষ্ট হলো গোঙানিটা।

আরেকটা ফোকর চোখে পড়লো। সেটা দিয়ে ছোট আরেকটা ঘরে চলে এলো ওরা। মুসাকে দেখতে পেলো। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। জ্ঞান পুরোপুরি ফেরেনি।

হাঁটু গেড়ে তার দুপাশে বসে পড়লো দুজনে। মাথায় বাড়ি মেরে বেহুঁশ করা হয়েছে। একপাশ ফুলে উঠেছে গোল আলুর মতো। এছাড়া শরীরের আর কোনো জায়গায় জখম নেই।

পানি দরকার ছিলো, কিশোর বললো। তাহলে তাড়াতাড়ি হুঁশ ফেরানো যেতো।

যেন তার কথা কানে যেতেই চোখ মিটমিট করলো মুসা। শূন্য দৃষ্টি।

মুসাআ! একই সঙ্গে প্রায় চিৎকার করে উঠলো রবিন আর কিশোর কিশোর যোগ করলো, ভালো আছো তো, মুসা?

কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না যেন মুসা। তবু কনুইয়ে ভর দিয়ে কোনোমতে উঠে বসলো।

চলো, বাইরে চলো, কিশোর বললো। তাজা বাতাস পেলে ভালো লাগবে। চলো, ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছি আমরা।

দুদিক থেকে ধরে মুসাকে দাঁড়াতে সাহায্য করলো কিশোর আর রবিন। ওদের কাঁধে ভর দিয়ে টলতে টলতে বাইরে বেরোলো মুসা। কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস টানলো। অনেকটা সুস্থ বোধ করলে ভার সরিয়ে আনলো বন্ধুদের কাঁধ থেকে।

বাড়ি মেরেছিলো, না? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

ম-মনে হয়, দুর্বল কণ্ঠে জবাব দিলো মুসা। ঝাড়া দিয়ে যেন ঘোলাটে মগজ পরিষ্কার করতে চাইলো। তোমরা ভালোই আছো মনে হয়। ভালো। লোকদুটোকে দেখলাম, হকিস্টিক হাতে তোমাদেরকে হুঁশিয়ার করেও সারতে পারলাম না। ধা করে মেরে বসলো আমাকে। তারপর সব কালো। আমার চিৎকার শুনতে পেয়েছিলে, না?

হ্যাঁ, রবিন বললো। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। নিজে মার খেয়ে আমাদের বাঁচিয়েছো।

আরে না, হাত নাড়লো মুসা। অতোটা হীরো নই আমি। চিৎকার না করলেও আমাকে মারতো ওরা। কারণ আমিই ছিলাম সবার পেছনে, আবার টলে উঠলো সে।

তাড়াতাড়ি তাকে ধরে ফেললো কিশোর আর রবিন। একটা পাথরের ওপর বসিয়ে দিলো জিরিয়ে নেয়ার জন্যে। আপাতত হোটেলে ফেরারই সিদ্ধান্ত নিলো। মুসাকে ধরে ধরে নিয়ে এগোলো গাড়ির দিকে। কিশোর আশঙ্কা করছে, লোকগুলো কোথাও লুকিয়ে থেকে ওদের ওপর চোখ রাখছে। সুযোগ পেলেই হয়তো বেরিয়ে এসে আবার হামলা চালাবে।

কিন্তু না, কেউ বেরোলো না। নিরাপদেই গাড়িতে উঠতে পারলো ওরা। ড্রাইভিং সীটে বসলো কিশোর। গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবতে লাগলো, কে লোকগুলো? কোথা থেকে এলো? কেন পিছু লেগেছে ওদের? অ্যাজটেক যোদ্ধাকে যারা খুঁজছে, তাদেরই কেউ? তদন্ত করা থেকে বিরত করতে চাইছে ওদেরকে?

একই ভাবনা চলেছে মুসা আর রবিনের মনেও। মুসা বললো, আমি সব ভজঘট করে দিলাম। কিশোর, পিরামিডের ওপরে কে আলো জ্বেলেছিলো, জেনেছো? শয়তান লোকগুলোই গিয়ে উঠেছিলো ওখানে?

মনে হয় না, কিশোরের দৃষ্টি রাস্তার ওপরে নিবদ্ধ। ওরা নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখতে চায়। অতো খোলা জায়গায় যাবে না। কাল দিনের বেলা আবার যাবো মনটি অ্যালবানে। দেখি, কোনো জবাব মেলে কিনা।

আর কিছু বললো না মুসা। আহত জায়গাটা ব্যথা করছে। মাথা ঘুরছে অল্প অল্প। আগামী দিন রবিন আর কিশোরের সঙ্গে বেরোতে পারার শক্তি পাবে বলে মনে হলো না তার। তবে রাতের বেলা ভালো একটা ঘুম দিতে পারলে বলা যায়, সুস্থও হয়ে যেতে পারে সকালে।

হোটেলে ঘরে পৌঁছেই বিছানায় গড়িয়ে পড়লো মুসা। কাপড় খোলারও শক্তি নেই!

দাঁড়াও, খুলে দিচ্ছি, কিশোর বললো।

সে আর রবিন মিলে প্রথমে মুসার জ্যাকেট খুলে ঝুলিয়ে রাখলো। তারপর খুললো জুতো আর মোজা। সবশেষে প্যান্ট। চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো মুসা। মাঝে মাঝে নিদ্রাজড়িত কণ্ঠে শুধু বললো, কি করো, কি করো!

শাট খুলতে গিয়ে বুক পকেটে একটা কাগজ পেলো রবিন। জিজ্ঞেস করলো, আই মুসা, এটা কি? এই কাগজটা?

আমি কোনো কাগজ রাখিনি…

ভাঁজ খুলে ফেললো রবিন। পড়ে বিস্ময় ফুটলো চোখে। তাকিয়েই রয়েছে কিশোর। ব্যাপারটা নজর এড়ালো না তার। জিজ্ঞেস করলো, কি?

নীরবে কাগজটা বাড়িয়ে ধরলো রবিন। কিশোরও পড়লোঃ বাড়ি যাও। আমাদের গুপ্তধন ছিনিয়ে নেয়ার কোনো অধিকার তোমাদের নেই। কথা না শুনলে মরবে।

১১
পুলিশকে জানানো দরকার, কিশোর বললো চিন্তিত ভঙ্গিতে। আলোচনা করে দুজনেই একমত হলো। মুসা ঘুমিয়ে পড়েছে, সে এসবের কিছু জানলো না।

হোটেলের ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলো কিশোর, রাতে এখন রাস্তায় বেরোনো উচিত হবে কিনা। প্রশ্নটা অবাক করলো লোকটাকে। যেন বুঝতে পারছে না, রাতের বেলা আর দিনের বেলা রাস্তায় বেরোনোর কি তফাৎ থাকতে পারে। চোর-ডাকাতের ভয় আছে কিনা, একথা কিশোর বুঝিয়ে বললে ম্যানেজার। জবাব দিলো, অকজাকার পুলিশ খুবই সতর্ক। এখানে কোনো রকম অঘটন ঘটে না।

তাই নাকি? না বলে পারলো না রবিন। এই তো খানিক আগেই আমার বন্ধুকে পিটিয়ে বেহুশ করে দিলো কয়েকটা ডাকাত। ঘটে না মানে?

আরেক দিকে মুখ ফিরিয়ে ম্যানেজার বললো, তাহলে ওরা বাইরের লোক। এখানকার লোক খারাপ না।

এই লোকের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা, বুঝতে পেরে, থানাটা কোথায় জেনে নিয়ে রবিনকে সহ বেরিয়ে এলো কিশোর। তখন ডিউটিতে রয়েছেন ক্যাপ্টেন ডগলাস। মনটি অ্যালবানে যা যা ঘটেছে খুলে বললো তাকে দুজনে।

ভ্রূকুটি করলেন অফিসার। তাই! এখানে অপরাধ খুব কমই ঘটে! আশ্চর্য! কাগজটা এনেছো?

বের করে দিলো রবিন। পড়তে পড়তে ভাঁজ পড়লো ডগলাসের কপালে। মুখ তুলে বললেন, হুঁ, বুঝতে পারছি। একদল তরুণ আছে এই এলাকায়, বেশি দেশপ্রেমিক। তাদের উদ্দেশ্যটা ভালোই, তবে মাঝেসাঝে বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলে দেশপ্রেম দেখাতে গিয়ে। আইন বিরোধী কাজ করে বসে।

ওরা কি করে, জানতে চাইলো কিশোর।

ক্যাপ্টেন জানালেন, বাইরে থেকে কেউ এলেই তাদের পেছনে লাগে। তাদের ধারণা, যে-ই আসুক, মেকসিকো থেকে প্রাচীন নিদর্শন সব বের করে নিয়ে যাবে। ঠেকানোর জন্যে উঠে পড়ে লাগে ওরা। বাইরের কেউ কিছু আবিষ্কার করলে কেড়ে নিয়ে গিয়ে মিউজিয়ামে জমা দেয়, হাসলেন তিনি। অকজাকার স্টেট মিউজিয়াম সাংঘাতিক। দেখলে বুঝবে। অনেক অমূল্য সংগ্রহ রয়েছে ওখানে।

বাইরে থেকে কেউ এলেই যে তারা চোর হবে, প্রতিবাদের সুরে বললো রবিন। তা ঠিক নয়।

আমরা সেটা বুঝি, ক্যাপ্টেন বললেন। কিন্তু ওই মাথা গরম ছেলেগুলোকে বোঝানো শক্ত। ফ্যানাটিক।

প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলো কিশোর, তথ্য বের করে নিতে চাইলে ডগলাসের কাছ থেকে, দুজন লোককে খুঁজতে এসেছি আমরা। ঠিক বেড়াতে আসিনি। সেজন্যেই গিয়েছিলাম মনটি অ্যালবানে। একজনের নাম পিন্টো আলভারো, আরেকজন ডা স্টেফানো তিনি আরকিওলজিস্ট।

আরকিওলজিস্ট? নাম শুনেছি, মাথা নাড়লেন ক্যাপ্টেন। আর পিন্টো আলভারো অনেক আছে এদেশে। কজনের কথা বলবো? কাছেই থাকে একজন। পিন্টো আলভারো রবার্টো হারমোসা আলবার্টো সানচেজ।

চোখ কপালে তুললো রবিন। একজনের নাম, না তিনজনের?

হাসলেন ক্যাপ্টেন। একজনেরই। ম্যাটাডর।

মানে বুল ফাইটার? ভুরু কোঁচকালো কিশোর।

মাথা ঝাকালেন ডগলাস।

না, তাকে আমাদের দরকার নেই। আমরা যাকে খুঁজছি, ও আর যাই হোক, বুল ফাইটার নয়।

তবে কি আরেকজন আরকিওলজিস্ট?

তা হতে পারে।

আরকিওলজিস্টেরও অভাব নেই এদেশে। মেকসিকান তো আছেই, বাইরে থেকেও প্রচুর আসে। শুনেছি, খুব বড় একজন আরকিওলজিস্ট কাজ করছেন এখন মনটি অ্যালবানে। তিনিই ডা স্টেফানো হতে পারেন, জানি না।

কয়েকটা সেকেন্ড নীরবে ভাবলেন পুলিশ অফিসার। তোমাদেরকে খুব একটা সাহায্য করতে পারছি না। দেখ, তোমরা যদি কিছু বের করতে পারো। তবে নোটটা রেখে দিলাম। অতি দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে একটা প্রমাণ রইলো। আবার যদি কিছু করে ধরতে পারবো। খুব সাবধান। ওরা ডেনজারাস। বুঝেই তো গেছ সেটা।

হোটেলে ফেরার সময় ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলো কিশোর। আসলেই কি দেশপ্রেমিক তরুণেরা হামলা করেছে ওদের ওপর? নাকি অ্যাজটেক যোদ্ধাকে যারা খুঁজছে, তারা?

কাল সকালেই বেরোতে হবে, রবিন বললো। বোঝা গেল একই ভাবনা চলেছে তার মাথায়ও। আর দেরি করা যায় না। মনটি অ্যালবানে গিয়ে তদন্ত করতে হবে। যতো তাড়াতাড়ি পারা যায় এই রহস্যের সমাধান করে ফেলা উচিত।

হ্যাঁ, চিন্তিত ভঙ্গিতে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো কিশোর।

পরদিন সকালে রাক্ষুসে খিদে পেয়ে গেল যেন মুসার। ফল, সিরিয়াল, ডিম, গরুর মাংস ভাজা, আর বড় বড় দুটো পাউরুটি দিয়ে নাস্তা সেরে তৃপ্তির ঢেকুর তুললো। অনেকটা সুস্থ বোধ করছে। তাকে নোটটার কথা জানালো রবিন আর কিশোর। রাতে যে থানায় গিয়েছিলো সেকথাও বললো।

চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, মনটি অ্যালবানে যাচ্ছাে নাকি?

নিশ্চয়, কিশোর বললো।

চলো, আমিও যাবো। ব্যাটারা এলে বাড়ি মারার শোধ না নিয়েছি তো আমার নাম মুসা আমান নয়।

না, তোমার আজ ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। শরীর এখনও ঠিক হয়নি। ওখানে ঘোরার অনেক ধকল, সহ্য করতে পারবে না। ঘরে বসে থাকতে ভালো না লাগলে বরং আরেক কাজ করো, শহরে স্টেট মিউজিয়ামে চলে যাও। কিউরেটরের সঙ্গে আলাপ করতে পারো ইচ্ছে হলে। জানার চেষ্টা করবে অ্যাজটেক যোদ্ধা সম্পর্কে। সূত্র পেয়েও যেতে পারো।

তা মন্দ বলোনি। মিউজিয়াম দেখতে ভালোই লাগে আমার।

কাপড় পরে দুই সহকারীকে নিয়ে নিচে নামলো কিশোর। রকি বীচের খবর জানা দরকার। মিস্টার সাইমনকে ফোন করলো। এখানকার সমস্ত খবর জানিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তিনি কতখানি এগিয়েছেন। ডিটেকটিভ বললেন, প্রায় কিছুই না। জ্যাক আর আমি কয়েকবার করে গিয়েছি রেডফোর্ড এস্টেটে, লাভ হয়নি। জ্যাক ফাইবার তার সহকারী, আরেকজন তুখোড় গোয়েন্দা।

সাইমনের কথা থেকে নতুন একটা খবরই জানতে পারলো কিশোর, তা হলো, যে গাছটায় অ্যাজটেক যোদ্ধার মাথা আঁকা আছে, তাতে আরও একটা ছবি আঁকা রয়েছে। ছোট একটা তীর, জানালেন তিনি। খুব ভালো করে না তাকালে চোখেই পড়ে না। দেখে মনে হলো কোনো কিছু নির্দেশ করতে চেয়েছে। আমি আর জ্যাক অনেক জায়গায় খুঁড়েছি, পাইনি কিছু।

আর কাউকে এস্টেটে রহস্যজনক ভাবে ঢুকতে দেখা গেছে কিনা, কিশোরের এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, না। পুলিশ কড়া নজর রাখছে। তারপর কিশোরদেরকে সাবধান থাকতে বলে, গুড লাক জানিয়ে লাইন কেটে দিলেন তিনি।

বেরিয়ে পড়লো তিন গোয়েন্দা। শহরের দিকে চলে গেল মুসা। কিশোর আর রবিন মনটি অ্যালবানের দিকে। হোটেলের নিউজ স্ট্যান্ড থেকে মনটি অ্যালবানের ওপর লেখা একটা পুস্তিকা কিনে নিয়েছে কিশোর।

দিনের আলোয় পুরানো শহরটাকে অনেক বেশি জমকালো মনে হলো রাতের চেয়ে। সত্যি, দেখার মতো। এতো প্রাচীন কালে যখন যান্ত্রিক সুবিধা বলতে গেলে ছিলোই না, তখন কিভাবে এরকম একটা শহর গড়া হয়েছিলো, দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না।

ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো দুজনে। বিরাট বিরাট মন্দির, স্তম্ভ, প্রাকার, পিরামিড তৈরি করা হয়েছে পাথর দিয়ে। প্রাকারের গায়ে নানারকম চির আঁকা হয়েছে পাথর কুঁদে। পাথরের তৈরি মূর্তিও রয়েছে অনেক। রাতের বেলা যে পিরামিডের ওপরে আলো দেখা গিয়েছিলো, তার নিচে এসে দাঁড়ালো দুজনে। চ্যাপ্টা চূড়ায় উঠে এলো। ওপর থেকে নিচে তাকিয়ে পুরো শহরটা দেখা যায়।

একবার তাকিয়েই সূত্র খুঁজতে শুরু করলো কিশোর। একটা ভাঙা পাথরের টুকরো দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তার। আস্ত বড় কোনো পাথর থেকে ভেঙে আনা হয়েছে টুকরোটা, দুই বাই তিন ফুট, চার ইঞ্চিমতো পুরু। একটা কোণ ভাঙা। একটা ছবি খোদাই করা রয়েছে ওটাতে।

অ্যাজটেক যোদ্ধা! উত্তেজনায় স্বাভাবিক স্বর বেরোলো না রবিনের, ফিসফিসিয়ে বললো। আশ্চর্য! এটা এখানে কেন?

হয়তো এটাই নিতে উঠেছিলো লোকটা। তাড়াহুড়োয় বা অন্য কোনো কারণে ফেলে গেছে। হয়তো মূল্যবান কোনো আবিষ্কার।

কি জানি! পাথরটা তোলার চেষ্টা করলো কিশোর। বেজায় ভারি। দুজনের পক্ষে বয়ে নেয়াই মুশকিল। হাত থেকে ফেলে দিলে ভেঙে নষ্ট হতে পারে। খুব সাবধানে জিরিয়ে জিরিয়ে সিড়ি বেয়ে নামতে লাগলো ওরা। নিরাপদেই নামিয়ে আনলো অবশেষে। আর কেউ নেই তখন। একেবারে নির্জন। বোধহয় দর্শকদের আসার সময় হয়নি এখনও।

পাথরটাকে গাড়ির বুটে রেখে দিয়ে এলো ওরা। মুসাকে যেখানে বাড়ি মারা হয়েছিলো, সেজায়গাটায় এসে দেখতে লাগলো কিছু পাওয়া যায় কিনা। গাইড বুক বলছে, কিশোর বললো। এটা সাত নম্বর কবর। অনেক মূল্যবান নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে এখানে। স্টেট মিউজিয়ামে রাখা আছে ওগুলো।

আরও অনেক খোঁজাখুঁজি করলো ওরা। যে ঘরটায় মুসাকে ফেলে রাখা হয়েছিলো, সেটাতেও খুঁজলো। কিছু পাওয়া গেল না।

আর থাকার প্রয়োজন মনে করলো না কিশোর। তাছাড়া পাথরটাকে ভালোমতো পরীক্ষা করে দেখার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে সে। হতো না, যদি ওটাতে অ্যাজটেক যোদ্ধার ছবি আঁকা না থাকতো।

হোটেলে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না, ওদেরকে চোর ভেবে বসতে পারে। সোজা অজাকার মিউজিয়ামে চলে এলো ওরা। কিউরেটরের সঙ্গে দেখা করলো।

পাথরটা অফিসে এনে ম্যাগনিফাইং গ্লাস আর আরও নানা যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন কিউরেটর। অবশেষে মুখ তুললেন, ভালো। খুব ভালো। তবে সাংঘাতিক কিছু না। এরকম জিনিস পাওয়া যায়।

কোনোই বিশেষত্ব নেই? নিরাশই হয়েছে কিশোর।

আছে, ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কিউরেটর বললেন। কোণের কাছে খরগোশের ছবি আর কয়েকটা বৃত্ত আঁকা আছে দেখ। এটা একটা অ্যাজটেক ক্যালেন্ডার। খরগোশ দিয়ে বছর গুনতো ওরা। একে বলে খরগোশ বছর। আমাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটা পনেরোশো দশ সাল।

কিন্তু এটা বের করলো কে? রবিনের প্রশ্ন। পিরামিডের মাথায় নিশ্চয় আপনাআপনি ওঠেনি?

না, তা তো নয়ই, মাথা নাড়লেন কিউরেটর। হয়তো কোনো কবরের ভেতরে পেয়েছে কেউ।

কিন্তু ওখানে গেল কি করে? কিশোর বললো। পিরামিডের ওপরে?

একথার জবাব দিতে পারলেন না কিউরেটর। তাঁর কাছেও রহস্যময় লাগলো ব্যাপারটা।

মিউজিয়াম থেকে ফেরার পথে বিড় বিড় করে যেন নিজেকেই বোঝালো কিশোর, জবাব একটাই হতে পারে। আমাদেরকে ফাঁকি দিতে চেয়েছে। পেয়েছে কোনো কবরের ভেতর। ভেঙে এনেছে। ফেলে রেখেছে আমাদেরকে বোঝানোর জন্যে, যে এটাই অ্যাজটেক যোদ্ধা। যাতে আমরা এটা নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে বাড়ি ফিরে যাই।

কারা?

আর কারা? যারা আমাদের পিছে লেগেছে। যারা মুসাকে বাড়ি মেরেছে। যারা হুমকি দিয়ে নোট লিখেছে। এভাবে ফাঁকি দেয়ার জন্যেই মনটি অ্যালবানে টেনে এনেছে আমাদের।

তোমার কি মনে হচ্ছে, যারা নোট লিখেছে তারা দেশপ্রেমিক তরুণের দল নয়?

না। ওটাও আরেকটা চালাকি। তরুণদের ওপর নজর ফেলতে চেয়েছে। আমাদের এবং পুলিশের। নিজেরা আড়ালে থাকতে চেয়েছে।

১২
খুশিতে প্রায় নাচতে নাচতে হোটেলে ফিরলো মুসা। হাতে একটা মূর্তি। ছোট। জানালো, এক সুভনিরের দোকান থেকে অ্যাজটেক যোদ্ধার মূর্তিটা কিনে এনেছে সে। কিশোরকে দেখিয়ে বললো, এটাই, কি বলো?

না, মাথা নাড়লো কিশোর। এ-হতেই পারে না। সাধারণ মূর্তি। এখনকার কুমোরদের তৈরি…

কিন্তু সেলসম্যান যে বললো, কবর খুঁড়ে পাওয়া!

ফাঁকি দিয়েছে। মিথ্যে কথা বলেছে বিক্রি করার জন্যে। আসল জিনিস হলে ওটা দোকানে যেতো না, মিউজিয়ামে থাকতো।

চোরাই মালও তো হতে পারে?

উঁহু। তাহলে অতো খোলাখুলি বেচতে পারতো না। পুলিশের ভয় তো আছেই। সব চেয়ে বেশি ভয় তরুণ দেশপ্রেমিকদের।

তা বটে! হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো। নইলে একরকমের এতো মূর্তি আসতে দোকানে…

মানে?

লোকটা বললো, আরও অনেকগুলো মূর্তি নাকি ছিলো। এটার মতোই। অ্যাজটেক যোদ্ধা। কাল একটা লোক সব কিনে নিয়ে গেছে। এটা পড়ে ছিলো বাক্সের তলায়, কাল পাওয়া যায়নি। আজ বাক্সের খড়টড় ফেলতে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

কাল পেলে এটাও কিনে নিয়ে যেতো? রবিনের প্রশ্ন।

তাই তো মনে হয়, জবাব দিলো মুসা।

কে কিনেছে জিজ্ঞেস করেছো? কিশোর জিজ্ঞেস করলো। এতো আগ্রহ কেন অ্যাজটেক যোদ্ধার মূর্তির ওপরে?

না তো!

ভুল করেছো। চলো।

কোথায়?

দোকানে। লোকটা কেমন দেখতে, জিজ্ঞেস করবো। আমার বিশ্বাস, এই লোকই আমাদের পেছনে লেগেছে। আমাদের মতোই অ্যাজটেক যোদ্ধাকে খুঁজছে সে-ও।

মনটি অ্যালবানে গিয়ে কি পেয়েছে, খুলে বললো মুসাকে রবিন আর কিশোর। মুসা জানালো, সে-ও মিউজিয়ামে গিয়েছিলো। খোঁজখবর করেছে অ্যাজটেক যোদ্ধার ব্যাপারে। তদন্তের কাজে লাগতে পারে তেমন কিছু জানতে পারেনি।

দোকানে গেলে জানতে পারবো, কিশোর বললো। যোদ্ধার ব্যাপারে না হোক, লোকটার ব্যাপারে পাবোই। চলো।

নানারকম জিনিসে ঠাসা দোকানটা। ছোটখাটো আরেকটা মিউজিয়ামের মতোই লাগে। কাঁচের শো-কেসে সাজানো রয়েছে নানারকম প্রাচীন অস্ত্র, আধুনিক নির্মাতাদের তৈরি। পিস্তল আর ছুরি রয়েছে নানারকম। দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে শিরস্ত্রাণ, ধাতব পোশাক আর বিভিন্ন আকারের, বিভিন্ন আকৃতির তলোয়ার, ভোজালি।

ডাক শুনে পেছনের ছোট একটা ঘর থেকে বেরোলেন মাঝবয়েসী একজন হাসিখুশি মানুষ। কি চায়, জিজ্ঞেস করলেন।

কাউন্টারের দিকে নির্দেশ করে মুসা জানতে চাইলো, ওই লোকটা কোথায়?

কে? ও, হুগো? খেতে গেছে। আমি এই দোকানের মালিক। বলো, কি চাই?

না, কিছু চাই না। খানিক আগে একটা পুতুল কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। অ্যাজটেক যোদ্ধা। ওটা কি আসল?

হাসলেন দোকানের মালিক। একই সাথে বিরক্তও হলেন। তাই বলেছে বুঝি? এই হুগোটাকে নিয়ে আর পারি না। কতোবার মানা করেছি, মিথ্যা কথা বলে মাল বিক্রির দরকার নেই। শোনে না। তো, আসল নয় জেনে নিরাশ হয়েছো? ফেরত দিতে চাও?

না, সেজন্যে আসিনি, এগিয়ে এলো কিশোর। আসলে, অ্যাজটেক যোদ্ধার ব্যাপারে কয়েকটা প্রশ্ন করতে এসেছি।

তা বাবা, আমি তো সেটা ভালো বলতে পারবো না। আমি সামান্য দোকানদার। আরকিওলজিস্ট নই। বলতে পারবে আরকিওলজিস্টরা। সব চেয়ে ভালো হয়, মিউজিয়ামে চলে যাও, কিউরেটরের সঙ্গে দেখা করো…

করবো। আচ্ছা, খুব মাল বিক্রি হয় আপনার দোকানে, তাই না?

মোটামুটি।

কি ধরনের জিনিস বেশি চলে?

এই ছুরি, পিস্তল, এসব। অস্ত্র।

মূর্তি?

খুব বেশি না। তবে কাল একটা আজব ব্যাপার ঘটেছে। প্রায় দেড় ডজন অ্যাজটেক যোদ্ধার মূর্তি কিনে নিয়ে গেছে একজন। মনে হলো, আরও থাকলে আরও কিনতো। পাগল! অথচ ওই মূর্তি খুব একটা বিক্রি হয় না এখানে।

সুযোগ পেয়ে গেল কিশোর। জিজ্ঞেস করলো, লোকটা কেমন? ওরকম একজনকে চিনি আমরা, মূর্তি কেনার পাগল, শেষ কথাটা মিথ্যে বললো সে। কথা আদায়ের জন্যে। তবে জবাব শুনে বুঝলো, একেবারে মিথ্যে বলেনি। লোকটা ওদের পরিচিতই। অন্তত দেখেছে, ওকে। ল্যারি কংকলিনকে যে লোক কিডন্যাপ করেছিলো, ভুয়া পুলিশ অফিসার সেজে যে ওদের ট্যাক্সিতে চড়েছিলো, তার সঙ্গে মূর্তি কিনেছে যে লোক, তার চেহারার বর্ণনা হুবহু মিলে গেল।

অ্যানটিক আর সুভনির নিয়ে আরও কয়েকটা কথা বলার পর আচমকা প্রশ্ন করে বসলো কিশোর, আচ্ছা, পিন্টো আলভারো নামে কাউকে চেনেন আপনি? আপনার বাড়ি তো এখানে। নামটা শুনেছেন?

ওরকম নামে তো কতো লোকই আছে এখানে।

তা আছে। তবে একজন বিশেষ লোককে খুঁজছি আমরা, পকেট থেকে ছবি বের করে দেখালো কিশোর।

চশমা লাগিয়ে ভালো করে ছবিটা দেখলেন মালিক। ধীরে ধীরে মাথা দোলালেন। বোধহয় চিনি। কয়েকবার দেখেছি একে। আমার দোকানেও ঢুকেছে। টুলে ট্রীর কাছে থাকে। ওখান থেকে মিটলা খুব কাছে তো, গিয়ে খুঁড়তে সুবিধে হয় বোধহয় মেকসিকান ধ্বংসস্তুপের একজন বিশেষজ্ঞ এই লোক।

টুলে ট্রী কী এবং কোথায় জিজ্ঞেস করলো কিশোর। শুনে ধক করে উঠলো বুক। বুঝলো, পেয়ে গেছে। এই লোককেই খুঁজছে। মনে পড়লো, স্লাইডের বিশাল গাছটার কথা।

মিটলা হলো একটা ধ্বংসস্তূপ, মালিকের কাছে জানতে পারলো কিশোর। ওই দোকানে ম্যাপও আছে। ওখানকার একটা ভালো ম্যাপ কিনে নিয়ে, ভদ্রলোককে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে এলো হোটেলে।

ডা স্টেফানোর কথা জিজ্ঞেস করেছে দোকানদারকে, কিছু বলতে পারেননি তিনি। তবে তাতে কিছু এসে যায় না, বুঝতে পারছে কিশোর। কান টানলে যেমন মাথা আসে, তেমনি করে আলভারোকে বের করতে পারলেই বেরিয়ে আসবেন ডা স্টেফানো। কোনো সন্দেহ নেই আর এখন তার।

১৩
হোটেলে ফিরে ম্যাপ নিয়ে বসলো কিশোর। আর গাইডবুক পড়তে লাগলো রবিন। মুসা বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো।

মিটলা ধ্বংসস্তুপে যাওয়ার পথেই পড়ে টুলে ট্রী। ম্যাপ থেকে মুখ তুলে কিশোর বললো, দরকার হলে একেবারে মিটলাতেই চলে যাবো। মনে আছে, একটা ছবিতে ছিলো, বিশাল এক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক লোক?

সিনর স্টেফানোকেও ওখানেই পাবে ভাবছো? মুসার প্রশ্ন। টুলেট্রীতে?

পেতেও পারি। কিংবা মিটলাতে। টুলে ট্রী থেকে মিটলা বেশি দূরে নয়।

গাইডবুক থেকে মুখ তুলে রবিন বললো, জানো, গাছটা তিন হাজার বছরের পুরানো! আমেরিকান কন্টিনেন্টের সম্ভবত সব চেয়ে পুরানো গাছ ওটা।

কি গাছ? মুসা জিজ্ঞেস করলো। সাইপ্রেস। সবুজ সাইপ্রেস।

এতো বছর বেঁচে আছে! খাইছে! ইস, আমি যদি এতোদিন বাঁচতাম! কতো কিছু দেখতে পারতাম, খেতে পারতাম!

তার কথায় হেসে ফেললো কিশোর। তোমার খালি খাওয়ার কথা। এক কাজ করলেই পারতে। গাছ হয়ে গেলেই হতো। মাটির ওপর শেকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে, আর খালি রস টানতে মাটি থেকে…

নাহ, গাছ হয়ে লাভ নেই। বেঁচে থাকে বটে। নড়তে চড়তে পারে না, পাখিরা বাসা বাঁধে, পায়খানা করে। লোকে মড়াৎ করে ডাল ভেঙে ফেলে, পাতা ছেড়ে। না, বাপু, মানুষ হয়ে বাঁচতে পারলেই খুশি হতাম আমি…

ভূত হলে? হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলো রবিন।

ভেবে দেখলো মুসা। তা হতাম। মানুষ হওয়ার চেয়ে অনেক ভালো। কেউ দেখতে পেতো না আমাকে। যা ইচ্ছে করতে পারতাম। যেখানে খুশি যেতে পারতাম। আর খাওয়া! সে তো যখন যা খুশি! যে রেস্টুরেন্টে যা পাওয়া যায়, যা খেতে ইচ্ছে করতো…নারে ভাই, ভূতই হওয়া উচিত ছিলো।

বেরোনোর সময় ম্যানেজার জানতে চাইলো, আবার কোথায় যাচ্ছে ওরা। এতে তাড়াতাড়ি বেরোচ্ছে দেখে কৌতূহল হয়েছে লোকটার। জানালো কিশোর।

টুলেট্রীর দিকে গাড়ি চালালো মুসা। ম্যাপ দেখে রাস্তা বাতলে দিতে থাকলো কিশোর। শহর ছাড়িয়ে আরও কয়েক মাইল আসার পর মস্ত গাছটার দেখা মিললো। মুসা বললো, এই যে, সাইপ্রেস গাছের দাদার দাদা।

পেছন থেকে রবিন মন্তব্য করলো, শুধু দাদার দাদা না, তারও অনেক বেশি।

গাছটাকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে একটা পার্ক। দর্শনীয় জিনিস। টুরিস্টরা আসে। গাড়ি থেকে নেমে হাঁ করে গাছটার দিকে তাকিয়ে রইলো তিন গোয়েন্দা। বিশ্বাসই করতে ইচ্ছে করছে না, তিন হাজার বছর ধরে বেঁচে রয়েছে ওই গাছ। পৃথিবীর কতো পরিবর্তনের নীরব সাক্ষি। ওই গাছের বিশালত্ব আর বয়েসের কাছে নিজেদেরকে বড় ক্ষুদ্র মনে হতে লাগলো ওদের।

আশ্চর্য! বিড়বিড় করলো রবিন।

গাছের কান্ডে একটা সাইনবোর্ড লেখা রয়েছে, তাতে গাছটা সম্পর্কে তথ্য। কান্ডের বেড় একশো ষাট ফুট। বয়েস, তিন হাজার বছর। জাত, সবুজ সাইপ্রেস।

চারদিকে অনেকখানি ছড়িয়ে রয়েছে ডালপালা। গোড়ার চারপাশ ঘিরে চক্কর দিতে শুরু করলো তিন গোয়েন্দ।

নীরবে গাছের কাছে এগিয়ে এলো বারো বছরের এক কিশোর। তিন গোয়েন্দাকে গাছের গোড়ায় চক্কর দিতে দেখে অবাক হয়নি। এই দৃশ্য বহুবার দেখেছে সে। বুঝতে পেরেছে, ওরা বিদেশী, টুরিস্ট। তার জানা আছে, টুরিস্টদেরকে তথ্য জানাতে পারলে খুশি হয়ে পয়সা দেয়। সেই লোভেই এসেছে সে।

ঠিক যা ভেবেছিলো ছেলেটা, তা-ই ঘটলো। তাকে দেখেই কাছে ডাকলো কিশোর। জিজ্ঞেস করলো, কি নাম তোমার?

পিকো।

এই গাছটর কথা কি জানো তুমি?

সঅব। কয়েক পেসো পেলে বলতে পারি।

পাবে, বলে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলো কিশোর। কয়েকটা মুদ্রা বের করে ফেলে দিলো ছেলেটার বাড়ানো হাতে। দাঁত বের করে হাসলো পিকো। পয়সাগুলো ময়লা প্যান্টের পকেটে রেখে দিয়ে বললো, কি জানতে চান?

এই গাছের পুরো ইতিহাস।

সত্যিই জানে ছেলেটা। গড়গড় করে বলে যেতে লাগলো। গাইডবুকের সঙ্গে তার কথার সামান্যতম অমিল হলো না। আরও নতুন তথ্য দিলো সে, হন্ডুরাসে যাওয়ার পথে এই গাছের নিচেই জিরোতে বসেছিলেন বিখ্যাত স্প্যানিশ যোদ্ধা করটেজ।

কথায় কথায় অ্যাজটেক যোদ্ধার কথায় চলে এলো কিশোর।

অনেক যোদ্ধাই আছে। কার কথা জিজ্ঞেস করছেন?

তা তো জানি না। বিশেষ কার নাম জাননা তুমি?

অনেক অনেক আগে একজন নামকরা যোদ্ধা ছিলেন, অ্যাজটেকদের মহান নেতা। ম্যাক্সিল ডা স্টেফানো।

চট করে দৃষ্টি বিনিময় করলো তিন গোয়েন্দা। একটা জরুরী তথ্য জানতে পেরেছে। কিশোর জিজ্ঞেস করলো, একজন ডা স্টেফানোকে খুঁজছি আমরা। আধুনিক স্টেফানো। আরকিওলজিস্ট। এদিকে বেশ খোড়াখুড়ি করেন। চেনোটেনো নাকি?

না, মুখ কালো হয়ে গেল ছেলেটার। প্রশ্নের জবাব জানা না থাকা যেন বিরাট অপরাধ তার কাছে।

পিন্টো আলভারোকে চেনো? চেহারার বর্ণনা দিলো কিশোর।

হাসি ফিরে এলো ছেলেটার মুখে। সবাই চেনে তাকে। এই তো, কাছেই থাকেন সিনর আলভারো, পুবে হাত তুললো সে। ওদিকে যাবেন। বায়ের প্রথম গলিটাতে ঢুকবেন। সোজা এগিয়ে গিয়ে থামবেন শাদা রঙ করা উঁচু দেয়ালওয়ালা বাড়িটার সামনে। ওরকম বাড়ি একটাই আছে। চিনতে অসুবিধে হবে না।

ছেলেটার হাতে আরেকটা পেসো গুজে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো কিশোর, আলভারোর কথা আর কিছু বলতে পারবে?

খুব ভালো খুঁড়তে পারেন তিনি। বড় বড় আরকিওলজিস্টরা এসেই তাঁর খোঁজ করেন। তাদের সঙ্গে অনেক জায়গায় চলে যান সিনর আলভারো।

আর কোনোই সন্দেহ থাকলো না তিন গোয়েন্দার, এই পিন্টো আলভারোকেই খুঁজছে ওরা। তার কাছে হয়তো জানা যাবে অ্যাজটেক যোদ্ধার বংশধরের খবর। রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে তাহলে।

উত্তেজিত হয়ে এসে গাড়িতে উঠলো তিনজনে। গাড়ি ছাড়লো মুসা। পিকো ঠিকই বলেছে, বাড়িটা খুঁজে পেতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হলো না। দরজার কড়া নাড়ল কিশোর। খুলে দিলো মোটাসোটা এক মহিলা পরনে কালো পোশাক। কালো একটা ফিতে দিয়ে চুল বাঁধা। নিশ্চয় আলভারের হাউসকিপার।

কি চাই?

সিনর আলভারো আছেন?

মিটলা ধ্বংসস্তুপে গেছেন।

ও। সেখানে গেলে তার দেখা পাবো?

পেতে পারো। যদি অন্য কোথাও চলে না গিয়ে থাকেন। মিটলা থেকেও খুঁজে বের করা কঠিন। অনেক বড় জায়গা। কোথায় যে কখন থাকবেন, বলা যায় না, হাসলো মহিলা। তবে কাছাকাছি যদি চলে যেতে পারো, তোমাদের আর খুঁজে বের করা লাগবে না। তোমাদেরকেই খুঁজে বের করবে।

মানে? বুঝতে পারলো না রবিন।

সিনরের কুত্তাগুলো বড় সাংঘাতিক। ধারেকাছে কাউকে ঘেঁষতে দেয় না। কাজ করতে গেলে লোকে বিরক্ত করে। ইদানীং তাদের হাত থেকে বাচার জন্যেই বোধহয় এই পাহারার ব্যবস্থা করেছেন তিনি।

গাড়িতে এসে উঠলো আবার ওরা। মিটলায় চললো। টুলেট্রী ছাড়িয়ে কিছুদূর আসার পর চোখে পড়লো ধ্বংসস্তূপ। দেখ, কতো পিরামিড! বলে উঠলো মুসা।

আরও খানিকদূর এগিয়ে গাড়ি থামালো সে। তিনজনেই নামলো। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল ওরা। এর কাছে মনটি অ্যালবান কিছু না। মহিলা একটু ভুল বলেছে, খুঁজে বের করা কঠিন! আসলে বলা উচিত ছিলো, অসম্ভব! কিশোরের তা-ই মনে হলো। যেদিকেই তাকায়, সবই একরম লাগে দেখতে। আলাদা করা মুশকিল।

তবে, আলভারোকে সহজেই খুঁজে বের করে ফেললো ওরা। কিংবা ওদেরকেই খুঁজে বের করলো কুকুরগুলো।

কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে এগোলো তিন গোয়েন্দা। ধ্বংসস্তুপে ঢুকে ঘোরাঘুরি করছিলো, এই সময় কানে এলো ডাক। একটা সমাধি মন্দিরের কাছে পৌঁছতেই জোরালো হলো চিৎকার। মনে হলো ভেতর থেকে আসছে।

দরজার কাছে গিয়ে উঁকি দিয়েই ছিটকে সরে এলো মুসা। ঘেউ ঘেউ করে বেরিয়ে এলো বিশাল এক অ্যালসেশিয়ান। ওটার পেছনে বেরোলো আরও দুটো। ঘিরে ফেললো তিন গোয়েন্দাকে। কামড়ালো না, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগলো। সেরকমই ট্রেনিং দেয়া হয়েছে, ওগুলোকে। জোরে জোরে ডাকলো কিশোর, সিনর আলভারো আছেন? সিনর আলভারো! আপনাকে খুঁজছি আমরা। আমেরিকা থেকে এসেছি!

১৪
দরজায় বেরিয়ে এলো একজন মানুষ। স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে উঠলো। ডেকে সরিয়ে নিলো কুকুরগুলোকে। তিন গোয়েন্দার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো, কি চাও?

মেকসিকান লোকটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিশোর, আপনি সিনর পিন্টো আলভারো?

হ্যাঁ। কেন?

আমেরিকা থেকে এসেছি আমরা; আপনার খোঁজে। কয়েকটা প্রশ্ন আছে।

একটা পাথরের ওপর বসে পড়লো আলভারো। তিন গোয়েন্দাকেও পাথর দেখিয়ে বসতে বললো। জানতে চাইলো, কি প্রশ্ন?

চেস্টার রেডফোর্ড নামে একজন কোটিপতি আমেরিকানকে চেনেন? লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছে রকি বীচে বাড়ি।

চিনি। আমার এক বন্ধুর বন্ধু।

আপনার বন্ধুর নাম ডা স্টেফানো?

বিস্ময় ফুটলো মেকসিকান মানুষটির চোখে। হ্যাঁ। তুমি কি করে জানলে?

প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো কিশোর, আলভারো আর স্টেফানো কি শুধুই বন্ধু, না বিজনেস পার্টনার।

হেসে জবাব দিলো আলভারো, দুটোই বলতে পারো। আজকাল আর খুব একটা দেখা হয় না তার সঙ্গে। তবে কয়েক বছর আগে একসঙ্গে খুঁড়েছি আমরা। তারপর কি জানি কি হলো। আমাকে বাদ দিয়ে একাই খুঁড়তে লাগলো।

এখন কোথায় আছে জানেন? রবিন জানতে চাইলো।

মাথা নাড়লো আলভারো। জানি না। তবে বেশি জরুরী হলে খুঁজে বের করতে তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারি। মিস্টার রেডফোর্ডের কথা কি যেন বললে?

পকেট থেকে ছবির খামটা বের করলো কিশোর। দেখালো। সঙ্গে সঙ্গে স্টেফানোকে চিনতে পারলো আলভারো। সাথের অন্য লোকটাকেও।

কিশোর বললো, উইলে পিন্টো আলভারো নামটা লিখে গেছেন মিস্টার রেডফোর্ড। আমার মনে হয় আপনিই সেই লোক।

উইলে আমার কথা লিখেছেন! বিশ্বাস করতে পারছে না আলভারো।

ব্যাপারটা আমাদেরকেও অবাক করেছে। আমরা গোয়েন্দা। আমাদের কথাও লিখেছেন তিনি। অনুরোধ করেছেন, যেন অ্যাজটেক যোদ্ধার সত্যিকার উত্তরাধিকারীকে খুঁজে বের করে তার সম্পত্তি তাকে ফিরিয়ে দিই। কোনো একটা জিনিসের কথা বোঝাতে চেয়েছেন তিনি।

এতোই অবাক হয়েছে আলভারো, কথা বলতে পারলো না পুরো তিরিশ সেকেন্ড। তারপর বললো, তাহলে তোমরা ডিটেকটিভ?

নিজেদের পরিচয় দিলো কিশোর। কার কি নাম, বললো।

হুঁ, আলভারো বললো। কয়েকটা ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে আসছে এখন। খোঁড়াখুড়ির সময় আগে কুকুর সঙ্গে নিতাম না। কয়েক দিন ধরে নিচ্ছি। কারণ গত দুই হপ্তায় কয়েকবার রহস্যজনক ভাবে হামলা হয়েছে আমার ওপর। কয়েকজন লোক, যাদেরকে আগে কোনোদিন দেখিনি, আমাকে ধরে হুমকি দিয়েছে। অ্যাজটেক যোদ্ধার জিনিস কোথায় আছে না বললে মেরে ফেলারও হুমকি দিয়েছে।

চট করে আবার একে অন্যের দিকে তাকালো তিন গোয়েন্দা।

ওরা কি বলছে বুঝতে পারিনি তখন, বলছে আলভারো। বার বার বলেছি, আমি কিছু জানি না। ভুল লোককে ধরেছে। মনে হয় ওরা আমার কথা বিশ্বাস করেছে। আর আসছে না। তা এই জিনিসটা কি, তোমরা কিছু বলতে পারবে?

পুরানো অস্ত্রশস্ত্র হতে পারে, মুসা বললো।

কিংবা প্রাচীন কোনো অ্যাজটেক মূর্তি, বললো রবিন।

আসলে, কিশোর বললো। কিছুই জানি না আমরা। জানার চেষ্টা করছি।

পিন্টো আলভারোকে বিশ্বাস করা যায়, মনে হলো তার। একবার দ্বিধা করে রেডফোর্ডের উইলের কথাটা বলতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ শোনার পর হঠাৎ হাত তুললো আলভারো। বললো, ডা স্টেফানো একটা জিনিস পেয়েছিলো। মিউজিয়ামকে দেয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার আগে মিস্টার রেডফোর্ডকে ধার দিতে বাধ্য হলো, এমন করেই চেপে ধরেছিলো তাকে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জিনিসটা আবার স্টেফানোকে ফেবত দেবে কথা দিয়েছিলো আমেরিকান লোকটা। দুজনে আলোচনা করে ঠিক করেছে, জিনিসটা পাওয়ার কথা চেপে রাখবে, যতোদিন না মিউজিয়ামকে দেয়া হয়।

তবে জিনিসটা কি, কথা শেষ করলো আলভারো। আমি বলতে পারবো না।

সেই নির্দিষ্ট সময়টা নিশ্চয় অনেক দীর্ঘ ছিলো, কিশোর বললো। ওই সময়ের মধ্যে মারাও যেতে পারে দুজনের যে কোনো একজন। এবং তা-ই হয়েছে। মিস্টার রেডফোর্ড মারা গেছেন।

আর মজার ব্যাপার হলো, মধ্যস্থতা করার জন্যে রাখা হয়েছিলো আমাকে। জিনিস দেয়ার জন্যে কেউ খোঁজ করতে এলে যাতে চিনিয়ে দিতে পারি ডা স্টেফানোকে, অ্যাজটেক যোদ্ধার সত্যিকার উত্তরাধিকারী বলে। তবে জিনিসটা যে কি, কিছু জানানো হয়নি আমাকেও। তুমি কিছু আন্দাজ করতে পারছো?

যেহেতু, জবাব দিলো কিশোর। অ্যাজটেক যোদ্ধা বলা হয়েছে, প্রাচীন মূর্তিটুর্তি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু মূর্তি কালেকশন করতেন না মিস্টার রেডফোর্ড, সেরকম কোনো আভাস পাইনি। পেয়েছি অস্ত্রের ব্যাপারে। পুরানো অস্ত্র জোগাড় করাটা নাকি তার নেশা ছিলো। স্টেফাননা ওরকম কোনো অস্ত্রের আভাস আপনাকে দিয়েছেন কখনও?

না, চুপ করে কি ভাবলো আলভারো। তারপর বললো, মিস্টার রেডফোর্ডের উইলের কথা জেনে গেছে লোকগুলো, যারা আমার ওপর চড়াও হয়েছিলো। তার মানে জিনিসটার কথাও জানে ওরা। কি করে জানলো?

সেটা আমিও বুঝতে পারছি না, জোরে নিঃশ্বাস ফেললো কিশোর। উইলের কথাটা গোপন রাখা হয়েছে। শুধু আমরা কয়েকজন জানি।

ভ্রূকুটি করলো আলভারো। এসব ব্যাপারে জড়াতে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু কি আর করবো, কথা যখন দিয়েছি… দেখি খোঁজখবর করে। ডা স্টেফানো এখন কোথায় খুঁড়ছে বের করতে পারি কিনা।

থ্যাংকস।…আচ্ছা, অনেক আগে নাকি একজন মহান অ্যাজটেক নেতা ছিলেন, নাম মাক্সিল ডা স্টেফানো?

হ্যাঁ। কেন জিজ্ঞেস করেছো বুঝতে পেরেছি। ঠিকই অনুমান করেছো তুমি। আজকের আরকিওলজিস্ট এমিল ডা স্টেফানো সেই স্টেফানোরই বংশধর।

উত্তেজনা চাপতে কষ্ট হলো তিন গোয়েন্দার। কিশোর বললো, সে আলভারোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। হোটেলের নাম বললো, রুম নম্বর দিলো, টেলিফোন নম্বর দিলো। কিছু জানতে পারলে যেন দেরি না করে তাদেরকে জানানো হয়। জানাবে কথা দিলো আলভারো। আন্তরিক হ্যান্ডশেক করলো তার সঙ্গে তিন গোয়েন্দা।

হোটেলে ফিরেই আগে মিস্টার সাইমনকে ফোন করলো কিশোর। তদন্তের অগ্রগতির কথা জানালো ডিটেকটিভকে।

ওদের কাজের অনেক প্রশংসা করলেন তিনি। কিভাবে ডা স্টেফানোকে খুঁজে বের করা যেতে পারে, কয়েকটা পরামর্শ দিলেন। একটা খুব মনে ধরলো কিশোরের। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া। বলতে হবে, খুব জরুরী একটা ব্যাপারে কথা বলার জন্যে আরকিওলজিস্ট এমিল ডা স্টেফানোকে খোঁজা হচ্ছে। বিজ্ঞাপন পড়ে থাকলে তিনি যেন অবিলম্বে সাড়া দেন এই অনুরোধ করা হবে।

গোসল আর খাওয়া শেষ করেই আবার বেরিয়ে পড়লো তিন গোয়েন্দা। অকজাকা থেকে যে কটা দৈনিক বেরোয়, সব কটার অফিসে গিয়ে বিজ্ঞাপনের জন্যে ফিস জমা দিয়ে এলো। সবাই বলে দিলো, সকালের খবরেই বেরোবে বিজ্ঞাপনটা।

পরদিন সকালে হোটেলের ঘরে বসে নাস্তা সেরে নিচে নামলো তিন গোয়েন্দা। নিউজ স্ট্যাওে এসে প্রথম কাগজটা হাতে নিয়েই চমকে উঠলো কিশোর। হেডলাইন করা হয়েছেঃ পাহাড় থেকে পড়ে বিখ্যাত আরকিওলজিস্ট এমিল ডা স্টেফানোর মৃত্যু!

১৫
ধাক্কাটা সামলে নিয়ে খবরটা পড়তে শুরু করলো তিন গোয়েন্দা।

পুরোটা পড়ার পর বোঝা গেল, মারা গেছেন তিনি, এটা অনুমান করা হচ্ছে। একেবারে নিশ্চিত নয় কেউ। পার্বত্য এলাকায় বেড়াতে গিয়েছিলো তিনজন আমেরিকান টুরিস্ট-নীল হ্যাঁমার, রবার্ট জনসন, আর ডেভিড মিলার। এমিল স্টেফানোকে ওখানে দেখেছে তারা।

পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন আরকিওলজিস্ট। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যান। দৌড়ে যায় তিন টুরিস্ট। কিন্তু যেখানে স্টেফানোর দেহ পড়ে থাকার কথা সেখানে পৌঁছে কিছুই দেখতে পায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি করে ফিরে এসেছে তিনজনে।

এসেই হ্যামার ফোন করেছে পুলিশকে। জনসন করেছে পত্রিকা অফিসকে। একটা উদ্ধারকারী দল ছুটে গেছে সঙ্গে সঙ্গে। অরকিওলজিস্টের লাশ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, গিরিখাতে আছড়ে পড়েছেন স্টেফানো, সেখান থেকে নদীতে গড়িয়ে পড়েছে তার লাশ। ভেসে চলে গেছে।

দুবার করে খবরটা পড়লো ওরা। অবশেষে মুসা বললো, সর্বনাশ হয়েছে। আমাদের রহস্যের কিনারা বুঝি আর হলো না!

আমি বিশ্বাস করাতে পারছি না, কিশোর বললো।

পত্রিকা কি আর মিথ্যে খবর ছাপবে? রবিনের প্রশ্ন।

ওদের রিপোর্টার নিজে গিয়ে তো আর খবর আনেনি। অন্যের কথা শুনে লিখেছে।

তোমার কি মনে হয়? মুসা জিজ্ঞেস করলো, স্টেফানো মারা যাননি?

হয়তো গেছেন। তবে পা পিছলে পড়েছেন, একথা বিশ্বাস হচ্ছে না। হয়তো ঠেলে ফেলে দেয়া হয়েছে। অ্যাজটেক যোদ্ধার সম্পত্তি পুরোপুরি গোপন করে ফেলার জন্যে। আর আরেকটা প্রশ্ন। ডা স্টেফানো ঘোরাঘুরি করেন ধ্বংসস্তূপগুলোতে। পর্বতের ওপরে তিনি যাবেন কি করতে?

প্রশ্নটা রবিন আর মুসা দুজনকেই ভাবিয়ে তুললো।

তাহলে কি যাননি? রবিনের প্রশ্ন।

জবাব দিলো না কিশোর। গভীর ভাবনায় ডুবে গেছে। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো কয়েকবার। বিড়বিড় করে বললো, ব্যাটারা ভুয়াও হতে পারে। চলো, ফোন করি।

কোথায়? মুসা অবাক।

মেকসিকান টুরিস্ট ডিপার্টমেন্টে। জানবো, ওই নামের তিনজন আমেরিকান টুরিস্ট সত্যিই এসেছে কিনা।

ঠিক বলেছো! রবিন বললো। চলো।

ফোন করলো কিশোর। ফোন ধরেছে যে লোকটা, সে কথা দিলো, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব জানাবে। ফোনের কাছে অপেক্ষা করতে বললো কিশোরকে।

অস্থির হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো তিনজনে। এতোই উত্তেজিত হয়ে আছে, আলোচনা পর্যন্ত করতে পারছে না। শেষে আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললো মুসা, দূর, এতো দেরি কেন…

ঠিক এই সময় বাজলো ফোন।

ওপাশের কথা শুনলো কিশোর। ধীরে ধীরে বিমল হাসি ছড়িয়ে পড়লো মুখে। রিসিভার রেখে দিয়ে বন্ধুদেরকে বললো, যা ভেবেছিলাম। ওই নামে কোনো আমেরিকানই মেকসিকোতে ঢোকেনি গত কয়েক দিনে। মনে হচ্ছে মারা যাননি ডা স্টেফানো। কিডন্যাপ করা হয়েছে। মৃত্যুর খবর ছড়ানো হয়েছে আমাদেরকে ফেরানোর জন্যে। আর কোনো কারণ নেই। লোকগুলো ভেবেছে, এখবর পেলে আমেরিকায় ফিরে যাবো আমরা। এটা সেই দলের কাজ, যারা আমাদের এবং অ্যাজটেক যোদ্ধার সম্পত্তির পিছে লেগেছে।

এখন তাহলে কি করবে? মুসা জিজ্ঞেস করলো।

ডা স্টেফানোকে খুঁজতে বেরোবো।

কোথায়?

অবশ্যই সেই পার্বত্য এলাকায়। আমি শিওর, ওখানেই কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাঁকে।

কোন এলাকায় মারা গেছেন স্টেফানো, ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। ম্যাপ নিয়ে বসলো কিশোর। জায়গাটা চিহ্নিত করলো। তারপর বেরিয়ে পড়ল দুই সহকারীকে নিয়ে।

জায়গাটা অকজাকার উত্তর-পুবে। সরু একটা আঁকাবাঁকা পথে এসে পড়লো ওদের গাড়ি। ধীরে ধীরে উঠে চললো পর্বতের ওপরে। অনেক উচু একটা চুড়া চোখে পড়ছে। মেঘের মধ্যে ঢুকে গেছে। ঢালের গায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে স্থানীয় অধিবাসীদের কুঁড়ে।

গাছপালার ফাঁক দিয়ে নিচে দেখা যায় নদী। সিনয় স্টেফানো ওটাতে পড়েই ভেসে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পর্বতের গোড়ায় বড় বড় গাছের জঙ্গল, কিন্তু যতোই ওপরে উঠছে ঢাল, কমে গেছে বড় গাছ। তার জায়গায় ঠাই করে নিয়েছে ঝোঁপঝাড় আর লতা। তবে পাথর আছে সর্বত্রই। বড়, ছোট, মাঝারি সব রকমের, সব আকারের।

হুঁ, মাথা দোলালো মুসা, কেন এসেছিলেন এখানে বোঝা যায়। ধ্বংসস্তূপ এখানেও আছে।

বেশ কিছু কুঁড়ে পেরিয়ে এলো গাড়ি। তারপর শেষ হয়ে গেল পথ।

গাড়ি থামিয়ে কিশোরের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচালো মুসা। এবার?

ম্যাপ দেখতে লাগলো কিশোর। আন্দাজ করলো, যে জায়গা থেকে পড়ে গেছেন স্টেফানো, বলা হয়েছে, সেটা আরও ওপরে। গাড়ি রেখে যেতে হবে।

সবার যাওয়া কি ঠিক হবে? মুসা বললো। লোকগুলো বেপরোয়া। লুকিয়ে রেখে এখন আমাদের ওপর নজর রেখেছে কিনা তাই বা কে জানে। এক কাজ করো, তোমরা দুজন যাও। আমি গাড়ির কাছে থেকে পাহারা দিই। বলা যায় না, তোমাদের পেছনে যাওয়ার আগে গাড়িটাও এসে নষ্ট করে দিয়ে যেতে পারে।

ঠিকই বলেছে মুসা। একমত হলো কিশোর। বললো, থাকো। যদি কোনো বিপদে পড়ি, জোরে জোরে শিস দেবো দুবার। যদি মনে করো, একা আমাদেরকে উদ্ধার করতে পারবে না, সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে থানায় চলে যাবে।

আচ্ছা। ঢাল ওখান থেকে বেশ খাঁড়া। এবড়োখেবড়ো। পাথরে বোঝাই। সে-জন্যে আরও ওপরে রাস্তা নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। উঠে চললো কিশোর আর রবিন। সন্দেহ হতে শুরু করেছে, সত্যিই এরকম একটা জায়গায় এসেছিলেন কিনা সিনর স্টেফাননা। কোনো ফাঁদে গিয়ে পা দিচ্ছে না তো! আরও কিছুটা উঠে থেমে আলোচনা করতে লাগলো দুজনে। ঠিক করলো, এতোটাই যখন এসেছে, একেবারে চূড়ায় না উঠে ফেরত যাবে না।

আরিব্বাবা! কি ঠান্ডা! চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে রবিন বললো।

চূড়ায় পৌঁছলো দুজনে। সাধারণত পাহাড়ের চূড়া যেমন হয় তেমন নয় এটা। কয়েকশো গজ জুড়ে একেবারে সমতল। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে এলো। নিচে চোখে পড়লো গিরিখাত। হালকা মেঘ ভেসে যাচ্ছে ওদের নিচ, দিয়ে। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ে পাহাড়ী নদীর চকচকে জলস্রোত।

পড়লে একেবারে ভর্তা! নিচের পাথরস্তুপের দিকে তাকিয়ে গায়ে কাঁটা দিলে কিশোরের। নিশ্চয় ওখানেই খুঁজেছে ওরা স্টেফানোকে। এখানে আসেনি।

দরকার মনে করেনি।

সমতল চূড়াটায় চষে বেড়ালো দুজনে। কোনো সূত্র চোখে পড়লো না। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো আরেক প্রান্তে, যেখান থেকে নেমে গেছে আরেকটা ঢাল। যেটা দিয়ে উঠেছে ওরা, তার চেয়ে কম খাড়া।

কিশোরের হাত খামচে ধরলো রবিন। আরেক হাত তুলে দেখালো। জুতোর ছাপ! অনেকগুলো!

ধস্তাধস্তি হয়েছে! কিশোর দেখে বললো।

ছাপগুলোর কাছে এসে দাঁড়ালো ওরা। চারপাশে ভালোমতো নজর করে তাকাতেই চোখে পড়লো ভারি জিনিস হিচড়ে নিয়ে যাওয়ার দাগ। পাশে জুতোর ছাপও রয়েছে, অন্তত দুই জোড়া। তিন জোড়াও হতে পারে, বোঝা গেল না ঠিক। তবে অনুসরণ করা সহজ।

একজায়গায় এসে হারিয়ে গেল দাগ। এর কারণ মাটি ওখানে নরম নয়। বেশি রকম পাথুরে। ছড়িয়ে পড়ে খুঁজতে লাগলো দুজুনে। আবার পেলো দাগ। একটা কাঁচা পায়েচলা পথে উঠে গেছে। কিছুদূর এগিয়ে আবার হারিয়ে গেল দাগটা। তবে জুতোর ছাপ ঠিকই রয়েছে।

সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো কিশোর। এখান থেকে নিশ্চয় বয়ে নেয়া হয়েছে স্টেফানোকে। তার মানে কাছেই কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাকে।

আরও শখানেক গজ এগিয়ে থমকে দাঁড়ালো দুজনেই। সামনেই পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা কুঁড়ে। পাতার ছাউনি।

ওখানে! ফিসফিসিয়ে বললো রবিন। মাথা নাড়লো শুধু কিশোর, মুখে কিছু বললো না।

খুব সাবধানে, চারপাশে নজর রেখে, পা টিপে টিপে এগোলো দুজনে। চলে এলো কুঁড়েটার কাছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, আরেকবার চারদিকে দেখলো কাউকে দেখা যায় কিনা। নেই।

আস্তে দরজায় ঠেলা দিলো কিশোর। সরে গেল বাঁশের ঝাঁপ। ভেতরে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে একজন মানুষ। হাত-পা বাঁধা।

মুখ দেখা না গেলেও মানুষটা কে, বুঝতে অসুবিধে হলো না ওদের। দ্রুত এসে ভেতরে ঢুকলো দুজনে। বাঁধন খুলতে লাগলো রবিন। টেনে মুখে গোঁজা কাপড়টা বের করে আনলো কিশোর। জিজ্ঞেস করলো, আপনি সিনর এমিল ডা স্টেফানো, তাই না?

দুর্বল ভঙ্গিতে উঠে বসলেন ছিপছিপে মানুষটা। মাথায় ধূসর চুল। মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালেন। এতোই দুর্বল, কথা বলতেও বোধহয় কষ্ট হচ্ছে। দেয়ালে ঝোলানো একটা লাউয়ের খোল দেখে উঠে গিয়ে নামালো রবিন। এগুলোতে পানি রাখে পাহাড়ী অঞ্চলের মেকসিকানরা। এটাতেও পানি রয়েছে। বাড়িয়ে দিয়ে বললো, নিন। পানি খান। ভালো লাগবে।

খুব আগ্রহের সঙ্গে খোলটা নিয়ে পানি খেলেন স্টেফানো। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে আস্তে করে বললেন, অনেক ধন্যবাদ, তোমরা এসেছে।

ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাইলো না কিশোর। কাজের কথায় চলে এলো। জিজ্ঞেস করলো, আপনার আরেক নাম কি অ্যাজটেক যোদ্ধা, সি স্টেফানো? মানে, অ্যাজটেক যোদ্ধা নামে ডাকা হয় আপনাকে?

অবাক হলেন আরকিওলজিস্ট। হ্যাঁ। তোমরা জানলে কিভাবে? কে তোমরা?

আমার নাম কিশোর পাশা। ও রবিন মিলফোর্ড। আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি।

তাহলে কথা না বলে জলদি আমাকে নিয়ে চলো। ডাকাতগুলো ফিরে আসার আগেই।

প্রশ্ন করার জন্যে অস্থির হয়ে আছে দুই গোয়েন্দা। তবে সেটা পরেও করা যাবে। আগে স্টেফানোকে এখান থেকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া দরকার। দুদিক থেকে তাকে ধরে তুললো ওরা। রবিন আর কিশোরের কাধে ভর রেখে বাইরে বেরোলেন আরকিওলজিস্ট। ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছেন।

ঢাল বেয়ে যেখান দিয়ে নেমেছে ওরা, স্টেফানোকে নিয়ে সেখান দিয়ে ওঠা যাবে না। তার পক্ষে সম্ভব নয়। ঘুরে আরেক পাশে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। তাতে সময় লাগবে বেশি। লোকগুলোর সামনে পড়ারও ভয় আছে। কারণ ওরা এলে ওদিক দিয়েই আসবে। চূড়ায় উঠে আবার নামার কষ্ট করতে যাবে না। তবু ঝুঁকিটা নিতে বাধ্য হলো গোয়েন্দারা।

এমনই একটা জায়গা, স্টেফানোকে বয়ে নেয়াও কষ্টকর। অগত্যা হাঁটিয়েই নিয়ে যেতে হলো। তবে শরীরের ভর বেশির ভাগটাই কিশোর আর রবিনের কাঁধে দিয়ে রেখেছেন তিনি।

কিন্তু এতো চেষ্টা করেও পার পেলো না। ধরা পড়তেই হলো। বড় জোর একশো ফুটও যেতে পারলো না, বিশাল এক পাথরের চাঙরের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এলো একজন মানুষ। ওদের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল, এক মুহূর্তের জন্যে, তার পরেই পেছন ফিরে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো। বেরিয়ে এলো আরও দুজন।

কিছুই করার সময় পেলো না কিশোর আর রবিন। তিনটে ল্যাসো উড়ে এলো ওদের দিকে। এভাবে ল্যাসোর ফাঁস ছুড়ে ছুটন্ত বুনো জানোনায়ারকে বন্দী করে ফেলে মেকসিকানরা, আর ওরা তো দাঁড়ানো মানুষ। মাথা গলে কাঁধের ওপর দিয়ে নেমে এলো দড়ির ফাঁস। হ্যাঁচকা টান পড়লো দড়িতে। বুকের কাছাকাছি চেপে বসলো ফাঁস, এমন ভাবে, হাত নাড়ানোরও ক্ষমতা রইলো না কারো। আটকা পড়লো দুই গোয়েন্দা। আবার বন্দি হলেন সিনর স্টেফানো।

শিস দিতে গিয়েও দিলো না কিশোর। মুসা একা এসে কিছু করতে পারবে না তিনজনের বিরুদ্ধে। তাকেও আটকে ফেলবে। তার চেয়ে মুক্ত থাকুক। ওদেরকে পরে উদ্ধার করার একটা ব্যবস্থা করতে পারবে।

দড়ির ফাঁস থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে জোরাজুরি করলো অবশ্য কিশোর আর রবিন। বৃথা। সামান্যতম ঢিলও করতে পারলো না।

খকখক করে হাসলো একজন লোক। স্প্যানিশ আর ভাঙা ভাঙা ইংরেজি মিলিয়ে বললো, খামোকা নড়ো, খোকা। ষাঁড় ছুটতে পারে না এই ফাঁস থেকে, আর তোমরা তো ছেলে মানুষ। ভ্যাকুয়ারোর হাতে পড়েছে তোমরা, ছোটার আশা বাদ দাও।

আমাদের কেন ধরেছেন? রাগ দেখিয়ে বললো কিশোর।

হেসে উঠলো লোকটা। তোমাদের দেশে তোমরা হলে কি করতে, যদি তোমাদের বন্দিকে কেউ ছিনিয়ে নিতে চাইতো?

কিন্তু এই মানুষটাকে আটকে রাখার কোনো অধিকার আপনাদের নেই, স্টেফানোকে দেখিয়ে রাগ করে বললো রবিন।

সেটা তোমরা ভাবছো, আমরা না, হেসে জবাব দিলো লোকটা। শুরুতে ভেবেছিলাম, ছোট মাছ ধরেছি। এখন বুঝতে পারছি, দুজনেই তোমরা বড় মাছ। তবে প্রজাপতি জাল দিয়ে না ধরে ধরেছি ল্যাসসা দিয়ে। পালাতে আর পারবে না! নিজের রসিকতায় নিজেই হা হা করে হেসে উঠলো সে। বেরিয়ে পড়লো নোংরা হলদেটে দাঁত।

অন্য দুজনও যোগ দিলো তার সঙ্গে।

ল্যাসোর দড়ি টানটান করে ধরে রেখে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করলো তিনজনে। নিচু স্বরে। কিছুই বুঝতে পারলো না ছেলেরা। মনে হলো, তর্ক করছে তিনজনে। কোনো একটা ব্যাপারে একমত হতে পারছে না। হাবভাবেই বোঝা যায়, কিশোরদের সঙ্গে যে কথা বলেছে, সে-ই দলপতি। অবশেষে একমত হলো তিনজনে। দলপতি বললো কিশোরদেরকে, আমরা ঠিক করলাম, তোমাদেরকে কুঁড়েতেই রেখে যাবো। আর বড় মাছটাকে নিয়ে যাবো সাথে করে।

বড় মাছ কে, বুঝতে অসুবিধে হলো না গোয়েন্দাদের। ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করলো আরেকবার। বুঝতে পারলো এই ফাঁস গলায় আটকালে কতোটা কষ্ট পায় গরু।

শক্ত করে হাত-পা বাঁধা হলো কিশোর আর রবিনের। টেনেহিঁচড়ে এনে ওদেরকে কুঁড়ের মেঝেতে ফেললো লোকগুলো। কিছুক্ষণ আগে সিনর স্টেফানো যেখানে পড়েছিলেন। দুজনের মুখেই রুমাল গুঁজে দিয়ে আরকিওলজিস্টকে নিয়ে চলে গেল।

সাংঘাতিক অস্বস্তিকর অবস্থা। না পারছে নড়তে, না পারছে কথা বলতে। এমন বাঁধা-ই বেঁধেছে, সামান্যতম ঢিল করা যাচ্ছে না।

অনেক চেষ্টা করার পর হাল ছেড়ে দিলো ওরা। নাহ, হবে না। নিজে নিজে খুলতে পারবে না। একমাত্র ভরসা এখন মূসা। কোনো বোকামি করে সে-ও যদি ধরা পড়ে যায়, তাহলে সব আশা শেষ।

অপেক্ষা করতে লাগলো দুজনে। গড়িয়ে চললো সময়। এক মিনিট দুই মিনিট করতে করতে ঘণ্টা পেরোলো। কিন্তু মুসার আসার আর নাম নেই। তবে কি সে-ও ধরা পড়লো! বাইরে বেলা শেষ হয়ে এলো। ছায়া ফেলতে আরম্ভ করেছে গোধূলি।

ভয় পেয়ে গেল রবিন আর কিশোর। হলো কি মুসার?

আরেকবার মুক্তির চেষ্টা শুরু করলো দুজনে। দরদর করে ঘামছে, কিন্তু দড়ির বাঁধনকে পরাজিত করতে পারলো না। যেমন ছিলো তেমনি রয়ে গেল ওগুলো। উপুড় হয়ে মাটিতে মুখ গুঁজে হাঁপাতে লাগলো ওরা।

হঠাৎ, একটা ছায়া দেখা গেল দরজায়। ফিরে তাকালো কিশোর।

মুসা।

রবিনও দেখেছে। ঢিপঢিপ করছে বুকের ভেতর। আনন্দে।

পাশে এসে বসে পড়লো মুসা। একটানে কিশোরের মুখের রুমাল খুলে দিলো। তারপর রবিনের।

এতো দেরি করলে! রবিন বললো। আমরা তো ভাবলাম তোমাকেও ধরেছে! বললো কিশোর।

দেখিইনি কাউকে, ছুরি বের করে বাঁধনে পোঁচ দিলো মুসা। ধরবে কি?

দেরি করলে কেন? জিজ্ঞেস করলো রবিন।

আমি কি জানি নাকি তোমরা ধরা পড়েছো? বসে থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তোমরা বলে গেছ, বিপদ দেখলে শিস দেবে। আসসা না দেখে উল্টো তোমাদেরকেই বকাবকি শুরু করেছিলাম। রবিনের বাঁধন কাটা শেষ হয়ে গেল। উঠে বসলো সে। ডলে ডলে বাধনের জায়গাগুলোয় রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে লাগলো। কিশোরের দড়িতে পোচ দিতে দিতে মুসা বললো, শেষে আর থাকতে না পেরে বেরিয়ে পড়লাম, তোমরা কি করছে দেখতে। জুতোর ছাপ আর হিচড়ানোর দাগ চোখে পড়লো অনুসরণ করে চলে এলাম কুঁড়েটার কাছে।…তা কি হয়েছিলো, বলো তো?

সমস্ত কথা তাকে জানালো কিশোর আর রবিন।

তার মানে তীরে এসে তরী ডুবলো! মুসা বললো। ধরেও রাখতে পারলে না। আর কি পাওয়া যাবে সিনর স্টেফানোকে? নিশ্চয় এমন জায়গায় লুকিয়ে ফেলবে, যেখান থেকে খুঁজে বের করা খুব কঠিন হবে। কারণ, তোমরা দেখে ফেলেছ। মুক্তি পাবেই। সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে বলবে পুলিশকে, এরকমই ভাববে ওরা। অনেক দূরে কোথাও নিয়ে যাবে সিনর স্টেফানোকে, বুঝলে। যেখানে আমরা কিংবা পুলিশ, কেউই খুঁজে পাবে না।

আমারও সেরকমই মনে হচ্ছে! চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো কিশোর। মারাত্মক বিপদে পড়েছেন সিনর স্টেফাননা। টর্চার করে হোক, যেভাবেই হোক, তার মুখ থেকে কথা আদায়ের চেষ্টা করবে লোকগুলো। তারপর আর না-ও ছাড়তে পারে। হয়তো খুন করে গুমই করে ফেলবে।

১৬
হোটেলে ফিরে এলো তিন গোয়েন্দা। আসার পথেই থানায় নেমে পুলিশকে। জানিয়ে এসেছে সব কথা।

অপেক্ষা করছে ওরা। পুলিশ বলেছে, কোনো খোঁজ পেলেই জানাবে। অনেক রাত হলো। কিন্তু ফোন আর আসে না। বসে বসে আলোচনা করছে তিনজনে, অনুমান করার চেষ্টা করছে, কোথায় নিয়ে যাওয়া হতে পারে সিনর স্টেফানোকে। কিছুই বুঝতে পারছে না। কোনো সূত্র ছাড়া বুঝবেই বা কিভাবে?

ঘুমোতে যেতে তৈরি হলো তিনজনে। এই সময় এলো ফোন। রিসিভারটা কিশোরের দিকে বাড়িয়ে ধরে ম্যানেজার বললো, তোমাকে চাইছে।

প্রায় থাবা দিয়ে রিসিভারটা নিয়ে কানে ঠেকালো কিশোর। হালো!

কিশোর? আমি, পুলিশ নয়। আমি, পিন্টো আলভারো।

ও, আপনি! কি খবর?

তোমাদেরকে বলেছিলাম না, খোঁজখবর করবো। করেছি। আমার পরিচিত সমস্ত জায়গায় ফোন করেছি। যেখানে যেখানে স্টেফানো যেতেন, আমাকে নিয়ে, সব জায়গায়। এইমাত্র ট্যাক্সকো থেকে হ্যানিবাল কারনেস জানালো, তাকে নাকি দেখেছে। তিনজন লোকের সঙ্গে গাড়িতে। খাবার কিনতে থেমেছিলো গাড়িটা। কারনেসের মনে হয়েছে, পুরানো কোনো ধ্বংসস্তূপ খুঁড়তে চলেছেন আরকিওলজিস্ট। সেজন্যেই তোক নিয়েছেন সাথে।

কোনদিকে গেছে! দুরুদুরু করছে কিশোরের বুক।

উত্তর-পশ্চিমে। ঠিক কোথায়, বলতে পারলো না। জিজ্ঞেস করতে পারেনি কারনেস।

এই হ্যানিবাল কারনেসটি কে?

ট্যাক্সকোর একটা সুভনিরের দোকানের মালিক। আর্টিস্ট-কাম-আরকিওলজিস্ট। ডা স্টেফানোর ছাত্র।

ও। আর কিছু বলতে পারলো? গাড়িটা কি গাড়ি? লোকগুলো কেমন?

গাড়িটা কালো রঙের সেডান। লোকগুলো মেকসিকান, জেলে বলেই মনে হয়েছে কারনেসের। নানারকমের কাজ করে ওই অঞ্চলের জেলেরা মাছ ধরে, গরু পোষে, ভালো টাকা পেলে শ্রমিকের কাজ করে। বিশেষ করে মাটি খোঁড়ার কাজ। অনেক টাকা দেয় তো আরকিওলজিস্টরা।

ডা স্টেফানোর সঙ্গে যে দেখা হয়েছে, সংক্ষেপে সেকথা জানালো কিশোর। শুনে খুব চিন্তিত হলো আলভারো। বললো, পুলিশ খুঁজছে খুঁজুক, সে আরও খোঁজ নেবে।

তাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে দিলো কিশোর। দুই সহকারীকে নিয়ে ঘরে ফিরে এলো। ম্যাপ খুলে বসলো।

ট্যাক্সকো বের করলো। উত্তর-পশ্চিম দিকে আঙুল এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ বলে উঠলো, বুঝেছি! লেক প্যাজকুয়ারোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে!

কি করে বুঝলে? একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করলো রবিন আর কিশোর।

ওটাই ওদের জন্যে একমাত্র নিরাপদ জায়গা। এখানকার পুলিশ অতদূরে খুঁজতে যাবে না। তাছাড়া, কয়েকটা সূত্র আছে আমাদের হাতে। রবিন, মনে আছে, কথা বলার সময় খালি মাছ মাছ করছিলো লোকগুলো? আলভারোও বললো, কারনেসের নাকি জেলের মতো মনে হয়েছিলো লোকগুলোকে। আর সব চেয়ে বড় সূত্রটা হলো প্রজাপতি জাল। বলেছে, প্রজাপতি জাল দিয়ে না ধরে ধরেছি ল্যাসো দিয়ে। লেক প্যাজকুয়ারোই একমাত্র জায়গা পৃথিবীতে, যেখানে ওই জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়। তারমানে লোকগুলো ওখানকারই অধিবাসী। কাউকে লুকানোর জন্যে নিজের অঞ্চলকেই সবচেয়ে নিরাপদ মনে করবে ওরা। গেছেও সেদিকেই। আর কোনো সন্দেহ নেই, টেবিলে চাপড় মারলো কিশোর। ওই হ্রদেই সিনর স্টেফানোকে নিয়ে গেছে ওরা।

পুলিশকে জানানো দরকার, মুসা বললো।

না! এটাই আমাদের শেষ সুযোগ, বিফল হতে চাই না। পুলিশ দেখলে হুঁশিয়ার হয়ে যেতে পারে ব্যাটারা। জায়গায় জায়গায় ওদের চর থাকতে পারে। খবর পেলেই আবার সিনর স্টেফানোকে সরিয়ে ফেলবে। ওরা এখনও জানে না আমরা আন্