Wednesday, June 19, 2024
Homeউপন্যাসকালপুরুষ - সমরেশ মজুমদার

কালপুরুষ – সমরেশ মজুমদার

Table of contents

০১. কাল রাতের বেলায় কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হয়েছিল

কাল রাতের বেলায় কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হয়েছিল। ভোরের ঝিরঝিরে বাতাস তিন নম্বর ঈশ্বরপুকুর লেনে ঢুকে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই একজন সেটা টের পেল। চাপা গলায় সেই অন্ধ-মুখটা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, বিষ্টি এল নাকি! ন্যাড়া হওয়ার পর সাদা কদমের চেহারা নিয়েছে মাথাটা, দড়ি পাকানো শরীরে একটা চিলতে থান, যাতে বুকের খাঁচা ঢাকতে পায়ের গোড়ালি বেরিয়ে যায়, কাঠির মত হাত বাড়িয়ে দেখতে চাইল জলের ফোঁটা পড়ে কিনা। সামনেই একটা বাঁধানো টিউবওয়েল। তার তলায় পা ছড়িয়ে বসে দাঁত মাজছিল একটি যুবতী। যতক্ষণ না সরু গলির শেষে ঈশ্বরপুকুর লেনের মুখে একটা সাইকেল এসে দাঁড়াবে ততক্ষণ ওর দাঁত পরিষ্কার হবে না। যুবতী বলল, ওমা, কি করছ হাত বাড়িয়ে?

বিষ্টি এল নাকি লা?

ধুস, আকাশে মেঘ নেই তো বৃষ্টি আসবে কোত্থেকে!

তবে যে ঠাণ্ডা বাতাস পেলাম, ভিজেভিজে।

যুবতী ঠোঁট ওল্টালো। তারপর দাঁত মাজতে মাজতে গলির শেষপ্রান্ত দেখে চাপা গলায় বলল, আঃ, বুক খুলে বসে আছ কেন? ব্যাটাছেলে আসছে।

পড়ে যাওয়া থানের আঁচল বুকে জড়িয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কে যায়?

যে গেল সে জবাব দিল না।

ঠাসঠাস বাঁকা টিন আর ভাঙ্গা টালির তলায় যে ঘরগুলো সেখানে এখনও সকাল নামেনি। ঠাণ্ডা বাতাসেরা ভুল করেই বোধ হয় এই সরু পথে ঢুকেছিল। সাধারণত তারা এর অনেক উঁচু দিয়ে সূর্যের কাছাকাছি ঘরগুলোয় খেলা করে। বেলগাছিয়া ব্রিজ ছাড়িয়ে এই এলাকাটার নাম বস্তি। দরিদ্রের ঘনবিন্যস্ত কুটীরশ্রেণী। বসতি শব্দটি সংকুচিত হয়ে অনেক কিছু গুটিয়ে দিয়েছে। আড়াই শো ঘরের দেড় হাজার বাসিন্দার একটাই ঠিকানা, তিন নম্বর ঈশ্বরপুকুর লেন।

এখন, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই গত চার ঘণ্টাই তিন নম্বরে কোন শব্দ নেই। সেই নির্জনে বসে দাঁত মাজতে মাজতে যুবতী আড়চোখে বুড়ির দিকে তাকাল। চার বছর পার হলে একশ হবে। এখন আর মেয়েছেলে বলে মনে হয় না। গলার স্বরেও না। চোখেও দ্যাখে না অনেকদিন। সে বলল, রাতে ঘুমাওনি?

বুড়ি ঘাড় কাৎ করল, ঘুমুবনি কেন লা? তোর মত শরীরের জ্বালায় জ্বলি নাকি আমি!

যুবতীর চোখ ছোট হল, আমি জ্বলি তোমাকে কে বলল?

জ্বলিস! নইলে রোজ এত ভোরে দাঁত মাজার ধুম কেন? ব্যাটাছেলে দেখলে আমায় বুক ঢাকতে বলিস কেন?

ওমা, মেয়েছেলে বুকে আঁচল দেবে না?

যদ্দিন ছিল তদ্দিন দিয়েছি। দু কুড়ি বছর ধরে দিয়েছি।

তাহলে আর বেঁচে আছ কেন?

মর মাগী, আমি মরতে যাব কোন দুঃখে?

ওমা, এখনও বাঁচার ইচ্ছে? এতদিন বেঁচেও শখ গেল না?

না গেল না। কালকের দিনটা দেখব না? রোজ রাত্তিরে শোওয়ার সময় বলি, হে ভগবান, কালকের দিনটা দেখিয়ে দিও। কে যায়? বুড়ি কান খাড়া করল।

যুবতী আগন্তুককে দেখে চাপা গলায় বলল, নারাণকাকা।

যে আসছিল তার কাছে গলিটা যেন ফুরোচ্ছিল না। এই না-রাত না-দিনের সময়টায় এখন একটা বিছানা খুঁজছিল সে। বুড়ি আবার চেঁচাল, কোন নারাণ?

লোকটা কোনরকমে সামনে এসে দাঁড়াল, আমি নারায়ণ। বিষ্ণুর আর এক নাম নারায়ণ। লোকটার গলার স্বর জড়ানো, বিরক্ত।

ওমা তুমি! একটু দাঁড়াও বাবা। বুড়ি রক থেকে হড়বড়িয়ে নামল। তারপর শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে লোকটাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল। লোকটা দুটো হাত শূন্যে ঘোরালো আশীর্বাদের ভঙ্গীতে। তারপর ময়লা জামা আর খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে ভেতরে চলে গেল।

মাটি ছেড়ে উঠে বুড়ি বলল, রোদ ওঠেনি তো রে?

যুবতীর কপালে ভাঁজ পড়েছিল। এবার খিঁচিয়ে উঠল, ওই মাতালটাকে প্রণাম করে তোমার কি পুণ্যিলাভ হল? সারা রাত বাইরে ফুর্তি করে আসে, মেয়ে বউকে খেতে দেয় না আর তাকে তুমি প্রণাম করছ! দেখলে গা জ্বলে যায়।

মদ খাক আর রাঁড়ের বাড়ি যাক আমার কি লা? ওর শরীরে বামুনের রক্ত আছে তাই প্রণাম করলাম। সাইকেলের ঘন্টি বাজছে না? বুড়ি কান খাড়া করল।

যুবতীর আঙুল ততক্ষণে থেমে গেছে। ঈশ্বরপুকুর লেনের যে অংশটা এখান থেকে দেখা যায় সেখানে একটা সাইকেল এসে দাঁড়িয়েছে। সাইকেলের সামনে-পেছনে খবরের কাগজ স্তুপ করা। লম্বা এক যুবক সাইকেল থেকে নেমে কয়েক পা হাঁটতেই যুবতীর চোখের আড়ালে চলে গেল। তাড়াতাড়ি কলের জলে মুখ ধুয়ে যুবতী হেলতে দুলতে গলির মুখে গিয়ে দাঁড়াল। এখনও ঈশ্বরপুকুর লেনের দোকানপাট খোলেনি। নরম ছায়া ছড়িয়ে আছে রাস্তায়। দুটো বাস পাশাপাশি যেতে পারে ঈশ্বরপুকুর লেনে। যুবতী জানে বাঁ দিকের মুদির দোকানের পরেই নিমুর চায়ের দোকান। যুবক সেখানেই গেছে। নিমুর চায়ের দোকান খুলেছে ঘণ্টাখানেক আগে। এই সময় কিছু ঘুম-না-হওয়া বুড়ো দোকানের ভেতরে বসে রাজনীতির কথা বলে। উনুনে ফুটন্ত জলের ড্রাম বসিয়ে নিমু অবিরত চা করে যাচ্ছে। এই একঘণ্টায় নিমুর খদ্দের ঠিকে-ঝিয়েরা। বুড়োগুলো কথা বলে আর তাদের দ্যাখে। যুবক নিমুকে কাগজ দেওয়া মাত্র বুড়োদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। এককাপ চা নিয়ে যুবক গম্ভীর মুখে মুদির দোকানের সামনে চলে আসে, তারপর আরাম করে চুমুক দেয়।

যুবতী যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে চায়ের দোকানের খদ্দেরদের নজর যায় না। এই ভোরে রাস্তায় তেমন লোক নেই। যুবতী মিষ্টি গলায় বলল, আজ দেরি হল যে?

যুবক বলল, দেরি করে ভ্যান এল, লোডশেডিং ছিল কাগজের অফিসে!

যুবতী জিজ্ঞাসা করল, কাশিটা কেমন আছে?

যুবক চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, না মরলে যাবে না।

আঃ, বাজে কথা বলো না। আজ বিকেলে আসবে?

কোথায়?

দর্পণায়।

কি বই?

কি যেন নামটা, মিঠুন আছে!

দূর! ওসব ভাল্লাগে না। মিত্রায় চল।

ওখানে তো কি একটা খটমট বই হচ্ছে!

তামিল ছবি। হেভি সেক্সি। টিকিট কেটে রাখব। ছ’টায়।

যুবতী কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় বাজুতে তেঁতুলের খোলার স্পর্শ পেয়ে চমকে ফিরে দেখল বুড়ি পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। কোঁচকানো শুকনো গালে কেমন যেন ভিজে ভিজে হাসি জড়ানো, ফোকলা মুখে জিভটা নড়ল, একটু চা খেতে ইচ্ছে করছে লা, ওকে বল না!

যুবতী খুব বিরক্ত হল। কিন্তু বুড়ি তার হাত ছাড়ছে না। বাধ্য হয়ে সে বলল, নিমুর দোকান থেকে একটা চা এনে দাও তো?

কে খাবে? যুবক বিস্মিত, সে বুড়িকে দেখতে পায়নি।

যুবতী বলল, ঘাটের মড়া, মোক্ষ বুড়ি!

যুবক ঠোঁট উল্টে কাপের চা শেষ করে নিমুর দোকানের রকে রেখে আর এককাপ চা নিয়ে আসতেই মোক্ষবুড়ি আঁচলের তলা থেকে একটা টিনের গ্লাস বের করল। যুবক তাতে চা ঢেলে দিতেই বুড়ি বলল, বেঁচে থাকো বাবা, তাড়াতাড়ি বিয়েটা হোক।

যুবতী ঝাঁঝিয়ে উঠল, ঠিক আছে, এবার বিদায় হও।

মোক্ষদা বুড়ি আর দাঁড়াল না। চায়ের গ্লাসটা দুহাতে ধরে ভাঙ্গা মাজা নিয়ে টুক টুক করে সরু গলি দিয়ে চলে গেল ভেতরে। যুবক একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, বিকেলে আসার সময় লক্ষ্য রাখিস কেউ ফলো করছে কিনা!

যুবতী ভ্রূ-কুঞ্চন করল, কে ফলো করবে?

তুই জানিস।

ইস! আমি অত সস্তা না?

তিন নম্বরের মেয়েদের আমার জানা আছে।

ছাই জানো!

ও হ্যাঁ, শোন। তোদের এখানে একটা মাস্টারনি থাকে না?

হ্যাঁ। কেন?

ওদের স্কুলে লোক নেবে। কেরানির চাকরি। জিজ্ঞাসা করবি? আমি পি ইউ পাশ। যুবক কথাটা বলে আর দাঁড়াল না। চায়ের দাম চুকিয়ে সাইকেলে উঠে প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, তোর বাপ আসছে!

চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে যুবতী দেখল গলির ভেতরে যে মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে তার চোখ আকাশের দিকে। পঞ্চাশ বছর বয়স, স্টেট বাসের ড্রাইভার। এই গলি দিয়ে বের হতে হতে অন্তত দশবার আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে নমস্কার করবে। যুবতী আবার ঘাড় ঘুরিয়ে দূরে মিলিয়ে যাওয়া সাইকেলটাকে দেখে নিষ্পাপ মুখ করে ভেতরে ঢুকল।

মুখোমুখি হতেই বাপ বলল, এখানে কি করছিস?

এমনি!

এমনি মানে? এই ভোরে রাস্তায় কি দরকার? আমি মরে গেছি, না? সেই হকারটা এসেছিল?

কে আবার আসবে?

আবার মুখে মুখে কথা! যা, ভেতরে যা। নিজে সাততাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠিস আমাকে ডেকে দিতে পারিস না। বাপ আর দাঁড়ালো না।

যুবতী ঠোঁট বেঁকিয়ে চলে যাওয়া শরীরটার দিকে তাকিয়ে বলল, শালা!

সেই সময় গলির ভেতরে মোক্ষদা বুড়ির পরিত্রাহি চিৎকার ছড়িয়ে পড়ল। যুবতী দেখল দুহাতে কপাল চাপড়াচ্ছে বুড়ি আর তার সামনে দাঁড়িয়ে ওর ছোটভাই ন্যাড়া। দিদিকে দেখতে পেয়েই ন্যাড়া দৌড়ে এল, বাবা চলে গেছে? যুবতী ঘাড় নাড়তেই ন্যাড়া ছুটে গেল বাইরের দিকে। বুড়ি তখনও সমানে চিৎকার করে কাঁদছে। একটু একটু করে বিভিন্ন ঘর থেকে মেয়েরা বেরিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুড়ি দুপা সামনে ছড়িয়ে মাথা নাড়ছে আর বলছে, ওলাওঠা হোক, মার দয়া হোক ছোঁড়ার। সক্কাল বেলায় একটু চা খাব ভেবেছিলাম, ছোঁড়াটা ফেলে দিয়ে গেল! তোমরা বিচার করো, আমার কি হবে গো?

দশ বছরের ন্যাড়ার অবাধ্যতা নিয়ে দু-একজন যখন মন্তব্য করছে তখন যুবতীর মা বেরিয়ে এল, ঘর ছেড়ে। বোঝা যায় বিছানা থেকেই ন্যাড়ার নাম শুনে ছুটে এসেছে, কি হল?

আমার চা ফেলে দিল তোমার ছেলে! বুড়ি ককিয়ে উঠল।

চা! তুমি চা পেলে কোথায়? কে কিনে দিল?

তোমার মেয়ের ভাতার। ওই যে সাইকেলে আসে!

যুবতীর মনে হল তার দম বন্ধ হয়ে যাবে। গুঞ্জনরত ভিড়টা আচমকা যেন জমে গেল। যুবতীর মা আগুনচোখে মেয়েকে দেখল। তারপর চিৎকার করে বলল, মুখ সামলে কথা বল, আমার মেয়ে তেমন নয়।

ওমা, আমি বানিয়ে বলছি নাকি। সে ছুঁড়ি কোথায়, তাকেই জিজ্ঞাসা কর না!

অন্ধচোখে বুড়ি যেন চারদিকে যুবতীকে খুঁজতে লাগল।

যুবতীর মা সোজা হয়ে দাঁড়াল, এ্যাই, এদিকে আয়!

যুবতীর কপালে ভাঁজ পড়ল। গোল হয়ে দাঁড়ানো মানুষেরা এবার গুনগুন করতে লাগল। প্রত্যেকের দৃষ্টি যুবতীর দিকে। যুবতী কি করবে বুঝতে পারছিল না। মায়ের ভীষণা মূর্তি তাকে সংকুচিত করে রেখেছিল। কিন্তু সে এগিয়ে যাওয়ার আগেই ছুটে এল মা। রোগা শরীরটা ক্ষিপ্তভঙ্গীতে আছড়ে পড়ল মেয়ের ওপর। একহাতে চুলের ঝুঁটি ধরে টানতে টানতে সবার সামনে দিয়ে ঘরের মধ্যে নিয়ে গেল মা তাকে। মাটিতে শুয়ে থাকা এক ভাই এক বোন চটপট উঠে বসে দেখল দিদি সমানে মার খেয়ে যাচ্ছে। মায়ের গলা যেন চিরে যাচ্ছে উত্তেজনায়, বল, সত্যি কথা বল, রোজ দাঁত মাজতে যাস তোর ভাতারের সঙ্গে দেখা করতে? পিরীত? তোর দড়ি জোটে না! মানুষটা গলায় রক্ত তুলে খাটছে আর তুমি ফুর্তি করছ। কত বড় বংশের মেয়ে তুমি তা জানো? ওই কাগজওয়ালা ছোঁড়াটার কথা ন্যাড়া বলেছিল কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি। তোকে আমি পেটে ধরেছিলাম কি জন্যে? বল, সত্যি কথা বল!

যুবতী চুপচাপ মার খাচ্ছিল। যুবতীর মা উত্তেজনায় শেষ পর্যন্ত দম হারিয়ে মাটিতে বসে পড়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করলে দরজায় একটা মূর্তি এসে দাঁড়াল, অ বউমা, ওকে মের না।– যুবতী কাঁদছিল না। পাথরের মত দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মোক্ষদা বুড়ি আবার বলল, মাথা গরম করো না বউমা।

যুবতীর মা এবার মুখ তুলল, না, মাথায় বরফ দেব!

মোক্ষদা বুড়ি বলল, ছেলেটা তো খারাপ না। আমায় চা খাওয়ালো!

সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠল যুবতীর মা, বেরিয়ে যান, চলে যান সামনে থেকে। এত খেয়েও নোলা যায় না! ঘটকি হতে এয়েছে। বেরিয়ে যান সামনে থেকে।

মোক্ষদা বুড়ি বলল, ওমা, ভাল কথা বলতে এলাম উল্টে চোখ রাঙাচ্ছে! এটা তোর বাপের জায়গা যে বেরিয়ে যেতে বলছিস? ঘটকিগিরি, বেশ করেছি ঘটকিগিরি করে। মেয়ের শরীর ভারী হচ্ছে, সে তো পিরীত করবেই। ট্যাঁক তো ফাঁকা, কে তোর মেয়েকে বিয়ে করতে আসবে। কথাগুলো বলতে বলতে বুড়ি সরে গেল দরজা থেকে। থর থর করে কাঁপছিল যুবতীর মা। তার বন্ধ চোখ থেকে জল গড়িয়ে আসছিল। মাটিতে বসা একটা সরু গলা চিৎকার করে উঠল, দিদি মা পড়ে যাচ্ছে।

যুবতী সঙ্গে সঙ্গে সম্বিত ফিরে পেয়ে দৌড়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের মধ্যে মায়ের ছোট্ট শরীরটা থরথরিয়ে কাঁপছিল। যুবতী ব্যাকুল গলায় ডাকল, মা, মাগো!

যুবতীর মা একটু একটু করে চোখ মেলে মেয়েকে দেখল। যুবতী দুহাতে তাকে জড়িয়ে রেখেছে। হঠাৎ মেয়ের বুকে মুখ রেখে হু হু করে কেঁদে উঠল মা। কিন্তু তারপরেই যুবতী অনুভব করল মায়ের শরীর শিথিল হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে চিৎকার করে উঠল সে। তারপর মাটিতে শুইয়ে দিয়ে এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল। যে ভিড়টা একটু আগে জমেছিল তা এখন গলে গেছে। কি করবে ভেবে না পেয়ে সে সামনের বন্ধ দরজায় আঘাত করল।

কাপড় পাল্টানো হয়ে গিয়েছিল। বদ্ধ ঘরটায় একটা বাসী গন্ধ চাপ হয়ে রয়েছে। দেওয়ালে টাঙানো চৌকো আয়নায় এখন তার সিঁথি। একটু একটু করে চুল পাতলা হয়ে চওড়া হচ্ছে সিঁথিটা। ছোট্ট কপালটাও বেশ বড় হতে চলল। একফোঁটা সিঁদুর সিথিতে বোলানো মাত্রই দরজায় শব্দ হল। মাধবীলতা ভ্রূ কুঁচকে দরজাটাকে দেখল। তারপর ঘরে চোখ রাখল। কিন্তু এবার শব্দের সঙ্গে ব্যাকুল গলা, ও বউদি, বউদি।

দরজা খুলতেই মাধবীলতা দেখতে পেল ওপাশের ঘরের একটি মেয়ে কান্না কান্না মুখে দাঁড়িয়ে। দেখা মাত্রই বলল, বউদি, একটু আসুন, মা কেমন করছে!

কেন কি হয়েছে? মাধবীলতা অবাক হল।

জানি না, চিৎকার করতে করতে কেমন নেতিয়ে পড়ল।

মাধবীলতা আড়চোখে প্রায়ান্ধকার ঘরের দিকে তাকিয়ে চটপট বেরিয়ে এল। যুবতীর নাম অনু। অনুপমা। কিন্তু ওর চেহারায় এমন একটা ভোঁতা উগ্রতা আছে যা সে পছন্দ করে না।

ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মাধবীলতা দেখল অনুপমার মা মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। ঠোঁট বন্ধ, হাত ছড়ানো, মুঠো খোলা। দ্রুতপায়ে কাছে এসে বুকে হাত রাখল, নাকের তলায় আঙুল দিয়ে দেখল নিঃশ্বাস পড়ছে। প্রথমেই তার মনে হল স্মেলিং সল্ট দরকার। তারপরেই চিন্তাটাকে বাতিল করে বলল, জল নিয়ে এস, আর একটা পাখা।

অনুপমা দ্রুত জিনিসগুলো কাছে আনতে মাধবীলতা মুখে জল দিয়ে বাতাস করল কিছুক্ষণ। তারপরে ঠিক সাহস না পেয়ে বলল, আমার ভাল লাগছে না, তুমি মোড়ের ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনতে পারবে?

হুকুম পাওয়া মাত্র অনুপমা ছুটল। এর মধ্যেই চিৎকার চেঁচামেচিতে দরজায় বেশ ভিড় জমে গেছে। বাচ্চা দুটো তখনও বিছানার ওপর পাথরের মত বসে তাদের মাকে দেখছিল। এই ঘরে জানলা বলতে যেটুকু ফাঁক তাতে হাওয়া ঢোকে না। একখানা তক্তাপোশও নেই, চারদিকে হাঁ করা অভাব। মাধবীলতা বলল, আপনারা একটু সরে দাঁড়ান ভাই, হাওয়া আসতে দিন।

মেয়েরা একটু নড়ল কিন্তু সরল না। ওরা সবাই অনুপমার মাকে ছেড়ে এখন মাধবীলতাকে দেখছে। এই বস্তিতে অনেক বছর হয়ে গেল কিন্তু ওকে সবাই মাস্টারনি ছাড়া অন্য পরিচয়ে জানে না। বড়ঘরের মেয়ে, একটু বেশী দেমাক, কারো ঘরে যায় না, প্রয়োজন ছাড়া এ বস্তির কারো সঙ্গে কথা বলে না। কৌতূহল যেমন আছে তেমনি একটু ঈর্ষাও আছে ওর সম্পর্কে। সেই মাস্টারনি আজ অনুর মাকে হাওয়া করছে–এ দৃশ্য দেখার লোভ সামলাতে পারছে না ওরা। এই সময় মোক্ষবুড়ির গলা শোনা গেল, কি হয়েছে, একটু সর না লা, দেখি কি হল?

ছিয়ানব্বই বছরের বুড়িকে জায়গা দিতে হয় না, সে নিজেই করে নেয়। একে সরিয়ে ওর ফাঁক গলে দরজায় এল বুড়ি, অ বউমা! মধ্যবয়স্কা একজন বলল, অনুর মা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে!

সেকি! কি করে হল? মোক্ষদা বুড়ি চমকে উঠল।

আর একজন ফোড়ন দিল, আজ ঝগড়া করেছিলে খেয়াল নেই?

আমি করেছিলুম না ও করেছিল? হাতড়ে হাতড়ে বুড়ি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তারপর অনুর মায়ের শরীর ঠাওর পেয়ে মুখে গলায় হাত বুলিয়ে বলল, দাঁতকপাটি লেগে গেছে। মৃগী। কে বসে এখানে?

মাধবীলতা বৃদ্ধার দিকে অপলক তাকিয়েছিল। দিন রাতে একে ঝগড়াটি ছাড়া অন্য ভূমিকায় সে দ্যাখেনি। কিন্তু অনুর মায়ের গালে কপালে হাত বুলিয়ে দেওয়ার সময় একদম অন্য মানুষ বলে মনে হচ্ছিল তার।

সে নিচু গলায় জবাব দিল, আমি সামনের ঘরে থাকি।

আঃ, নাম নেই নাকি লা? দাঁড়াও, দাঁড়াও, গলার স্বরটা কেমন ঠেকল! অ! তুমি সেই মাস্টারনি না? তা তুমি এখানে কি করে এলে? শুনেছি তোমার নাকি ভারি দেমাক, মাটিতে পা পড়ে না! তোমার ছেলে বাপু ঠিক উল্টো!

মাধবীলতা বলল, আমার কথা থাক।

কি এই সময় বাইরে বেশ গুঞ্জন উঠল। অনুপমা ভিড় সরিয়ে ডাক্তারকে ঘরে নিয়ে এল। সাত সকালে লুঙ্গির ওপর পাঞ্জাবি পরে চলে এসেছেন ভদ্রলোক। নাড়ি দেখে, বুকের শব্দ মেপে, চোখের পাতা টেনে মাথা নাড়লেন ডাক্তার, প্রায়ই ফিট হয়?

প্রশ্নটা মাধবীলতার দিকে তাকিয়ে। মাধবীলতা অনুপমাকে দেখল। অনুপমা ঘাড় নেড়ে না বলল। মাধবীলতা জবাব দিল, না। আজকে এক্সসাইটমেন্ট থেকে এরকম হয়েছে।

ডাক্তার বললেন, ভাল বুঝছি না। একে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যান।

সঙ্গে সঙ্গে একটা চাপা আর্তনাদ বের হল অনুপমার মুখ থেকে। আর তখনই ভিড় ঠেলে ন্যাড়া এসে দাঁড়াল দরজায়, কি হয়েছে?

অনুপমা চিৎকার করে উঠল, মা অজ্ঞান হয়ে গেছে। ডাক্তার বলছে হাসপাতালে নিয়ে যেতে।

ন্যাড়া বলল, বাপ শালা টাকা দিল না। বলল হাত খালি। তারপরে দৌড়ে চলে গেল চোখের সামনে থেকে।

ডাক্তারবাবু বললেন, আমার টাকাটা!

মাধবীলতা অনুর দিকে তাকাল। অনু বলল, টাকা নেই। বাবা বাজারের টাকা পর্যন্ত দিয়ে যায়নি।

ডাক্তারবাবু বোধ হয় এর মধ্যেই মাধবীলতাকে চিনতে পেরেছিলেন। তার দিকে তাকিয়ে বেজার মুখে বললেন, প্রথম কল তো শুধু-হাতে হয় না।

মাধবীলতা ঠোঁট কামড়াল। তারপর বলল, এদের অবস্থা তো দেখতে পাচ্ছেন। আপনি এখন যান, পরে আপনার সঙ্গে দেখা করব।

আজকের মধ্যেই টাকাটা পাঠিয়ে দেবেন। এই জন্যেই ভোরবেলায় বস্তিতে আসি না।’ গজর গজর করতে করতে ডাক্তার চলে গেলেন। একটু পরেই বস্তির চার-পাঁচটি ছেলে এসে অনুর মাকে তুলে নিয়ে গেল বাইরে। মাধবীলতা দেখল একটা প্রাইভেট কার এ করে অনুর মাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল ওরা। অনুপমাও সঙ্গে গিয়েছে। বিস্মিত গলায় পাশে দাঁড়ানো একটা মেয়েকে মাধবীলতা জিজ্ঞেস করল, গাড়িটা কার?

মেয়েটি ঠোঁট ওল্টালো, জানি না। বিনু গাড়িটাকে ধুতে এনেছিল। বিনুর বাবুর গাড়ি বোধ হয়।

মাধবীলতার খেয়াল হল ঈশ্বরপুকুর লেনের তিন নম্বরের সামনে রোজ অনেক প্রাইভেট কার এবং ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকে। তিন নম্বরের অনেকেই ড্রাইভিং জানে।

ঘরে ফিরতে ফিরতে সে দেখল অনুদের দরজা হাট করে খোলা। বাচ্চা দুটো এখন গলির মুখে। কি মনে করে দরজাটা বন্ধ করে দিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। মোক্ষবুড়ি পাশ ফিরে শুয়ে রয়েছে। হাতের ওপর মাথা রেখে। বুড়ির শুকনো গালের চামড়া ভিজিয়ে জল পড়েছে মাটিতে। ওর পায়ের শব্দ পেয়ে সেই অবস্থায় জিজ্ঞেস করল বুড়ি, কে এল?

আমি, মাধবীলতা।

অ, মাস্টারনি! শোন, অনুর মা আর ফিরবে না।

চমকে উঠল মাধবীলতা। অদ্ভুত সিরসিরে, মধ্যাহ্নের তপ্ত হাওয়ার মত শোনাচ্ছে বুড়ির গলা। সে রেগে গিয়ে বলল, ছিঃ, একি বলছেন।

ঠিক বলছি লা। এটাকেও আমি খেলাম। এত নোলা আমায় কেন দিলে ভগবান! এত খেয়েও কেন পেট ভরে না! পাথরের শায়িত মূর্তির মুখ থেকে যেন ছিটকে আসছিল শব্দগুলো। দ্রুত নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল মাধবীলতা। শব্দ করে দরজা বন্ধ করে হাঁপাতে লাগল দাঁড়িয়ে। বালিসে হেলান দিয়ে আধা-বসা অনিমেষ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে তোমার?

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো মাধবীলতা। কানের ভেতর শব্দের গরম হলকা রয়ে গেছে এখনও। ঠিক যেন মৃত্যু টেনে টেনে তোলা, গভীর কুয়োয় ডোবা বালতির মতন। একটা বড় নিঃশ্বাস বুক উজাড় করে দিল সে। তারপর মাথা নাড়ল, সামনের ঘরের বউটাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।

কেন?

ঝগড়া করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। তারপর দ্রুত আয়নার সামনে এসে চুলে চিরুনি বুলিয়ে নিল।

অনিমেষ বলল, বেঁচে যাবে তো?

মাধবীলতা আলনা থেকে ব্যাগ ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, জানি না। এসব আমি আর সহ্য করতে পারি না। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। রোজ রোজ লেট হলে আর চাকরি থাকবে না। তোমার চা করে দিতে পারছি না। খোকাকে বল, নিমুর দোকান থেকে যেন এনে দেয়।

তুমিও তো খেলে না!

স্কুলে গিয়ে খাব। নবাবটাকে ডেকে তোল। এত বড় ছেলের ঘুমুবার সময় কোন হুঁস থাকে। আমি চললাম। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে মাধবীলতা বেরিয়ে গেল।

অনিমেষ বন্ধ দরজাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর ধীরে নিজের পা দুটো প্রসারিত করার চেষ্টা করল। ডান পা কোনদিনই সোজা হবে না। শুকিয়ে লিকলিকে হয়ে গেছে সেটা। অনেক চেষ্টার পর বাঁ পায়ে সামান্য জোর এসেছে। বাঁ পা-টাকে আস্তে আস্তে ভাঁজ করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু অর্ধেক আসার পরই চিনচিনে ব্যথাটা শুরু হল। নিঃশ্বাস ফেলল অনিমেষ। এখন এটাকে বেশী নাড়াচাড়া করতে ভয় লাগে।

বিছানার পাশে রাখা ক্রাচটাকে টেনে নিল সে। ডান বগলের নিচে সেটাকে রেখে শরীর বেঁকিয়ে খাট থেকে ধীরে ধীরে নামল। কাল রাত্রে বেশ গরম গিয়েছে। ঘামে গেঞ্জি চিটচিট করছে। পরনের খুলে আসা লুঙ্গির গিটটাকে শক্ত করল সে। তারপর একটু একটু করে উঠে দাঁড়াল। সারাদিনের প্রথমবার এই ওঠা বড় কষ্টকর। কিছুক্ষণ সময় লাগে সামলে নিতে। তবু ভাগ্য বলতে হবে, একেবারে নুলো হয়ে পড়ে থাকতে হচ্ছে না। মাধবীলতা যখন তাকে জেল থেকে এনেছিল তখন তো এটুকু শক্তিও ছিল না। মানুষের কোলে চেপে আসতে হয়েছে তাকে।

ঠুক টুক করে বাইরে এল অনিমেষ। এখনও রোদ ওঠেনি। আকাশে বেশ মেঘ আছে। অনিমেষ মনে করতে পারল না মাধবীলতা ছাতা নিয়ে গিয়েছে কিনা। সামনের ঘরের দরজা বন্ধ। এই বস্তির অধিকাংশ মানুষের সঙ্গে মাধবীলতার আলাপ নেই কিন্তু খোকার আছে। সে রয়েছে মাঝখানে, যেচে কেউ কথা বললে সে উত্তর দেয়। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা এখানে শান্তি থাকে, শব্দ বাজে না। এখানে পড়ে থাকা ছাড়া অনিমেষের কোন উপায় নেই। স্কুলের চাকরিতে মাইনে ঠিকমতন পাওয়া যায় না। তার ওপর ডাক্তার দেখাতে দেখাতে প্রচুর ধারের বোঝা চেপেছে মাথায়। অনিমেষের মনে হয় সে বোঝা এ-জীবনে নামবে না।

টিউবওয়েলের সামনে এখন বিরাট লাইন। অনর্গল চেঁচামেচি হচ্ছে। মুখ ধোয়া দরকার কিন্তু সুযোগ পাবে বলে মনে হচ্ছে না। ওপাশে একটা গঙ্গাজলের কল আছে। সি এম ডি এ থেকে পাকা পায়খানা করে দিয়ে গেছে তার পাশে। কয়েক পা এগিয়ে অনিমেষ দেখল সেখানেও বেশ ভিড়। হয় খুব ভোরে নয় বেশ বেলায় এসব চেষ্টা না করলে বিপদে পড়তে হয়।

জল দরকার?

অনিমেষ দেখল অবিনাশ হাতে বালতি নিয়ে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সামনের উনুনের কারখানাটা অবিনাশের। ঘর থেকে বেরিয়ে ওইখানে রোজ সে কিছুক্ষণ বসে। ঘাড় নাড়ল অনিমেষ, হ্যাঁ, মুখ, ধোব।

তা নিয়ে নিন। বাঁ হাতের মগটা বালতিতে ডুবিয়ে অবিনাশ বাড়িয়ে ধরল। তাড়াতাড়ি তাই দিয়ে মুখ ধুয়ে অনিমেষ বলল, বাঁচালেন।

কে কাকে বাঁচায়। অবিনাশ কারখানার দিকে চলে গেল।

অনিমেষ ঘরে ফিরে এসে খাটের ওপর বসল কিছুক্ষণ। এইবার ছেলেটার ঘুম ভাঙানো দরকার। ঘরের একপাশে মাদুরের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে ছেলেটা। মাধবীলতা ঠিকই বলেছে, শোওয়া বড্ড খারাপ। অনিমেষ ডাকল, খোকা, খোকা ওঠ।

ওপাশ থেকে কোন সাড়া এল না। অনিমেষ মাটিতে বসে দুহাতে ভর দিয়ে ছেলের কাছে এগিয়ে গিয়ে গায়ে হাত রেখে বলল, এই খোকা, এবার ওঠ। বেলা হয়ে গেছে!

পনের বছরের মুখটা বিরক্তিতে ভাঙচুর হল। উপুড় হয়ে শুতে শুতে বলল, ফোট তো, ন্যাকড়াবাজি করো না।

০২. ঠাস ঠাস করে ঘুমন্ত ছেলের গালে

ঠাস ঠাস করে ঘুমন্ত ছেলের গালে চড় মারল অনিমেষ। কথাটা কানে ঢোকা মাত্রই মাথা ঝিমঝিমিয়ে উঠেছিল, বুকের ভেতর দম আটকানো ভাব এবং সমস্ত শক্তি জড়ো হয়েছিল হাতের কবজিতে। অনিমেষের খেয়াল ছিল না তার হাঁটুর নিচে দুটো অকেজো পা, সে টলছিল রাগে এবং ঘেন্নায়।

আচমকা আঘাত খেয়ে ধড়মড়িয়ে উঠল অর্ক। বিস্ময় এবং ক্রোধ একই সঙ্গে তার চোখে মুখে ফুটে উঠেছিল। তারপরই একটু ভয়ের ছায়া পড়ল সেখানে, গালে হাত রেখে পাথরের মত বসে রইল সে। প্রচণ্ড জ্বলুনি শুরু হয়েছে গালে। অনিমেষ চাপা গলায় বলল, বল, আবার বল কথাটা।

অর্ক আধাভাঙ্গা স্বরে বলল, কি কথা?

যে কথাটা একটু আগে বলেছিস!

এইবার হকচকিয়ে গেল অর্ক। ঠিক কি কথাটা মুখ থেকে বেরিয়েছে সে মনে করতে পারছিল না। আঙ সাঙ কিছু বলে ফেলেছে নাকি! নিশ্চয়ই, তা নইলে বাবা তাকে মারতে যাবে কেন? একটু ধাক্কা দিলেই তো চিৎপটাং হবে কিন্তু তবু বাবাকে এখন আমজাদের মতন দেখাচ্ছে। সে খুব নিরীহ গলায় বলল, মাইরি বলছি, কি বলেছি মনে পড়ছে না।

অনিমেষের চোখে যে ক্রোধের ফণাটা উঁচিয়ে উঠেছিল তা বিস্ময়ে মাথা নোয়ালো। ছেলে কথাটা বলেছে ঘুমের ঘোরে, জেগে উঠে মনে না পড়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু ওই ভঙ্গীতে বিশেষ শব্দগুলো ব্যবহার করার অভ্যেস না থাকলে অত স্বচ্ছন্দে ঘুমের মধ্যেও বলতে পারত না। অথচ সে ছেলের মুখে কোনদিন এইরকম কথাবার্তা শোনেনি। তার মানে ও যখন বাইরে থাকে তখন অনর্গল এইসব কথাবার্তা বলে, ঘরে ফিরলেই সচেতন হয়। ওদের সঙ্গে যখন কথা বলে তখন নিশ্চয়ই বানিয়ে বানিয়ে বলে!

ছেলের মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। ওর খুব কষ্ট হচ্ছিল। ধীরে ধীরে সরে এল খাটের কাছে। পায়া ধরে উঠে বসল ওপরে। তারপর চোখ বন্ধ করল। অর্ক মাদুরের ওপর বসে বাবাকে দেখল। তারপর সেখান থেকেই জিজ্ঞাসা করল, আমি কি খিস্তি করেছি?

অনিমেষ দাঁতে দাঁত চাপল। সে নিজে কি কখনও বাবার সামনে দাঁড়িয়ে খিস্তি শব্দটা উচ্চারণ করতে পারত? অথচ এই ঘরে বসে অনর্গল যখন সারাদিন ধরে অশ্লীল গালাগালি শুনে যেতে হচ্ছে ছেলে বউ-এর সামনেই তখন খিস্তি কথাটার ধারটাই ভোঁতা এবং নিরীহ হয়ে গেছে। অনিমেষের মনে পড়ল ছেলেবেলায় জলপাইগুড়িতে ওরা বড়দের সামনে শালা শব্দটা বলা মহাপাপ বলে মনে করত। পরে সেটাই কথার মাত্রা হয়ে দাঁড়াল। বাক্যকে জোরদার করতে শালা স্বাভাবিক হিসেবে ব্যবহৃত হতে লাগল। এখন এই বস্তিতে বসে শালার বিকল্প হিসেবে আর একটি দু-অক্ষরের শব্দ শুনছে। অবলীলাক্রমে ছেলেরা এখন পুরুষাঙ্গের চলতি নামটিকে একটু ভেঙে শালার প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করছে চেঁচিয়ে। কোন অপরাধবোধ নেই। অর্কও তাই করে কিনা কে জানে!

অর্ক তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে ঘাড় নাড়ল, না।

তাহলে হাত চালালে কেন?

যা বলেছিস তা আমি মরে গেলেও বলতে পারতাম না। কারণ

কিন্তু কথাটা কি? ঘাড় শক্ত হচ্ছিল অর্কর।

ন্যাকড়াবাজি মানে কি?

অর্ক যেন বিস্মিত হল। তারপর ওর হালকা গোঁফের তলায় হাসি খেলে গেল, যা বাব্বা, ন্যাকড়াবাজি খারাপ কথা নাকি! ন্যাকড়াবাজি মানে বিলা করা।

‘বিলা?

ওফ বিলা–বিলা হল। অর্ক মানেটা হাতড়াচ্ছিল।

ঠিক আছে। অনিমেষ তাকে থামিয়ে দিল, আমি আর শুনতে চাই না।

মা চলে গেছে? অর্ক হঠাৎ সজাগ হল।

হ্যাঁ।

মা শুনেছে?

না।

তুমি মাকে এসব কথা বলো না।

কেন? তুই তো খারাপ কথা বলিসনি বলছিস।

তা হোক, মা বুঝতেই চাইবে না। বলবে না তো?

অনিমেষ উত্তর দিল না। বিছানার ওপর উঠে এসে বালিশটা ঠিক করতে লাগল। তারপর তোশকের তলা থেকে একটা টাকা বের করে সামনে রাখল, নিমুর দোকান থেকে চা নিয়ে আয়।

কেন? মা চা করে যায়নি?

না।

কেন?

সে তোর জেনে কি হবে? যা বলছি তাই কর!

অর্ক উঠে দাঁড়াল। মাথায় এখন ও অনিমেষের সমান। শুধু ডাল ভাত খেয়ে ছেলেটার স্বাস্থ্য বেশ চমৎকার হয়েছে। অনিমেষের নিজের কখনও অমন মাসল ছিল না। দেখে বোঝা যায় না ওর বয়স এখনও পনের হয়নি।

গামছা টেনে নিয়ে ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় অর্ক জিজ্ঞাসা করল, দ্যাখো তো, গালে দাগ হয়ে গেছে কিনা?

অনিমেষ তাকাল, তারপর মাথা নাড়ল।

হেভি জ্বলছে।

একটু বাদেই অর্ক মুখ ধুয়ে এসে কেটলি আর টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেল। এত দ্রুত এই ভিড়ের মধ্যে জল পায় কি করে কে জানে! অনিমেষ বাবু হয়ে বসল। আজ সকালটাই বিশ্রী হয়ে গেল। না, তবু কিছু হল, অন্যদিন তো কিছুই হয় না। সে ঘরের মেঝের দিকে তাকাল। অর্ক মাদুরটা তোলেনি, চিটচিটে বালিশটা চেপ্টে রয়েছে। খাটের এপাশের মেঝেতে মাধবীলতা শোয়। সেই জায়গাটা পরিষ্কার। অনিমেষ ঠিক করল মাধবীলতাকে বলবে ঘটনাটা। ছেলেটা পাল্টে যাচ্ছে, খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। এখনই যদি কিছু না করা যায় তাহলে আর সামলানো যাবে না। এই বস্তির বেশীর ভাগ ছেলেই ক্লাস ফোরের পরই পড়াশুনা ছেড়ে দেয়। অর্ক যাদের সঙ্গে মেশে তারা কেউ স্কুলে যায় না। ফুটপাথে বসে তাস খেলে, কেউ কেউ মদ খাওয়া ধরেছে। এদের সঙ্গে অর্ককে মিশতে বারণ করেও সক্ষম হয়নি অনিমেষ। মাধবীলতাও হার মেনেছে।

একবার প্রমোশন হয়নি অর্কর। এবং এ খবরটা বেশ চেপে গিয়েছিল সে। মাধবীলতা জানতে পেরে ক্ষেপে আগুন হয়ে গিয়েছিল। অতবড় ছেলেকে বেধড়ক মেরেছিল সেদিন। কিন্তু সবই প্রায় নিঃশব্দে। ঘরের কথা বাইরের লোককে জানতে দিতে চায় না মাধবীলতা। তারপর ছেলেটা একটু পাল্টেছিল। নিয়ম করে বই নিয়ে বসত, প্রয়োজন হলে অনিমেষকে জিজ্ঞাসা করত। কিন্তু আবার যে কে সেই। অনিমেষ লক্ষ্য করেছে সেই ঘটনার পর থেকেই মাধবীলতা ছেলের ব্যাপারে কেমন গুটিয়ে যাচ্ছে। বাধ্য না হলে সে অর্কর সঙ্গে কথা বলে না। টিউশুনি সেরে মাধবীলতা বাড়ি ফেরে রাত সাড়ে নটায়। এইসময় ঘরে থাকার কথা অর্কর। কিন্তু একটা না একটা ছুতোয় ঠিক বেরিয়ে যায় ও। কাঁহাতক রোজ রোজ মাধবীলতার কাছে নালিশ করা যায়। কিন্তু আজ বলা উচিত। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না অনিমেষ।

চা নিয়ে ঘরে ঢুকল অর্ক, অনুর মা-টা মনে হয় টেঁসে যাবে!

অনুর মা? টেঁসে যাওয়া শব্দটা কানে কটু করে বাজল। আর বোধহয় সাজানো কথা বলছে না অর্ক।

তুমি মাইরি কাউকেই চেন না। আমাদের উল্টোদিকের ঘর। তুমি সারাদিন কান বন্ধ করে থাক নাকি? কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিল অর্ক, তারপর কৌটো থেকে দুটো থিন এরারুট বিস্কুট।

অনিমেষের মনে পড়ল যাওয়ার আগে মাধবীলতাও এরকম খবর দিয়েছিল। কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ করে হাঁফাচ্ছিল মাধবীলতা, কেন? মৃত্যু অবধারিত জেনে?

চায়ে চুমুক দিতে দিতে অর্ক বলল, আজ স্কুলে যাওয়া হল না!

কেন? ভ্রূ কুঁচকালো অনিমেষ।

সবাই হাসপাতালে যাচ্ছে, রক্তফক্ত দিতে হতে পারে!

তুই যাচ্ছিস?

বাঃ যাবো না! প্রেস্টিজ থাকবে পাড়ায়? অর্ক যেন খুব অবাক হয়েছে অনিমেষের কথায়। কাপটা মাটিতে রেখে আলনা থেকে রঙিন শার্টটা টেনে নিয়ে গায়ে চড়াল। তারপর হাফপ্যান্টের বোতামে হাত দিতেই অনিমেষ মুখ ফেরালো। এতবড় ছেলের কোন লজ্জাবোধ নেই। পেছন ফিরে স্বচ্ছন্দে প্যান্ট পাল্টায়। কেমন পশুর মত ব্যাপার।

আমি যাচ্ছি। চল্লিশটা পয়সা আমার কাছে থাকল। অর্ক বেরিয়ে গেল। চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে থমকে গেল অনিমেষ। ওকে পুরো টাকাটা দেওয়া উচিত হয়নি। কক্ষনো বাকি পয়সা ফেরত দেয় না।

একটু একটু করে নয়, হঠাৎই ছেলেটা পাল্টে গেল। অথচ আটবছর আগে প্রথম দিন যখন ওকে দেখেছিল তখন এক তাল নরম মাটি ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। এক তাল মাটি যা দিয়ে ইচ্ছে মতন মূর্তি গড়া যায়। তিল তিল করে মাধবীলতা ওকে নিজের মনের মত গড়ে তুলে তার হাতে ছেড়ে দিয়েছিল। প্রথম দিনেই চমৎকার ভাব হয়ে গিয়েছিল ওদের। যেন জন্মাবার পর সাতটি বছর ছেলে অপেক্ষা করেছিল তাকে দেখবার জন্যে। বলেছিল, পুলিসদের আমি বড় হলে মারব, তুমি ভেবো না।

অনিমেষের মজা লেগেছিল, কেন?

ওরা তোমার পা ভেঙে দিয়েছে, তোমাকে এতদিন আটকে রেখেছিল। আমি ওদের কিছুতেই ছাড়ব না। সেই কচি গলাটা এখনও কানে বাজে। এই অন্ধঘরে বাঁচার একমাত্র আনন্দ ছিল অর্ক। মাধবীলতা যেন একটা সূর্যকেই তার কোলে তুলে দিয়েছিল। কখন যে সেই সূর্যে গ্রহণের নোংরা ছায়া লাগল কে জানে! তার দুটো পা সারিয়ে তুলতে মাধবীলতা নিঃশেষ হয়ে গেল। পাগলের মত এ ডাক্তার সে ডাক্তার করেছে, অকাতরে পয়সা ঢেলেছে ধার করে। এখন কেমন শক্ত হয়ে গেছে ও, চট করে মনের কথা বলার মনটাই মরে গেছে। আর সেই ফাঁকে বদলে গেল অর্ক। অনিমেষ মাথা নাড়ল, সে-ই দায়ী। কাদার তালটা যে বাইরের আঁচে শক্ত হয়ে ঢেলা পাকিয়ে যাচ্ছে টের পায়নি সে। এখন মূর্তিগড়া হল না বলে আফসোস করে কি হবে। ফোটো তো, ন্যাকড়াবাজি করো না! স্বরটা মনে পড়তেই হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল অনিমেষ। একা, ঘরে বসে।

টিফিনের ঘন্টা যেন কানে মধু ঢেলে দিল। খাতাপত্র গুটিয়ে মাধবীলতা উঠে দাঁড়াল। আজ থার্ড পিরিয়ডের পর থেকেই মাথাটা ঘুরছে। পড়াতে মোটেই ইচ্ছে করছিল না। মেয়েদের পুরোনো পড়া লিখতে দিয়ে চুপচাপ বসেছিল। আজও যথারীতি দেরি হয়েছে স্কুলে আসতে। সকাল থেকে এক কাপ চা পর্যন্ত পেটে পড়েনি। ক্লাসকাপ্টেনকে বলে এল খাতাগুলো সংগ্রহ করে টিচার্সরুমে পৌঁছে দিতে। ঝিমুনি লাগছিল ওর, বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখল হেডমিসট্রেসের বেয়ারা সুদীপ তার দিকে এগিয়ে আসছে, দিদি, আপনাকে ডাকছেন বড়দি।

মাথা ঝাঁকালো মাধবীলতা। তারপর একটু এগিয়ে হেডমিসট্রেসের ঘরে ঢুকল। সৌদামিনী সেনগুপ্তার কে নামকরণ করেছিলেন তা নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে। ওরকম বিশাল শরীর আর স্ফীত মুখের দিকে তাকালে নামটা কিছুতেই মনে পড়ে না। এই স্কুলটাকে গড়ে তোলার পেছনে ভদ্রমহিলার অবদান প্রশ্নাতীত। কিন্তু সেটাই হয়েছে কাল, স্কুলটাকে তিনি নিজস্ব সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন। বিয়ে করার সময় পর্যন্ত নাকি পাননি।

বসবার অনুরোধের জন্যে অপেক্ষা করল না মাধবীলতা, ডেকেছেন?

মুখ তুলে ঠোঁটটাকে ছুঁচোর মত করে চশমার ফাঁক দিয়ে কিছুক্ষণ দেখে সৌদামিনী বললেন, অসুবিধেটা কি হচ্ছে?

মানে?

এখন তো আর মাইনেপত্র তিনচারমাস বাকি থাকে না। মাসের মাইনে মাসেই পেয়ে যাচ্ছ।

তাহলে? মাধবীলতার মনে পড়ল ওদের সবচেয়ে জুনিয়ার টিচার নীপা ঠাট্টা করে বলে, বড়দি দাঁড়কাকের গলা ছিনতাই করেছেন।

কি বলছেন বুঝতে পারছি না।

বোঝা উচিত ছিল। তুমি আজও পনের মিনিট লেট!

পাশের বাড়িতে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল।

অজুহাত খুঁজে পেতে তোমাদের কষ্ট হয় না। তোমাকে আমি অনেকবার বলেছি এ জিনিস বেশীদিন চলতে পারে না। সিনিয়র টিচাররা এরকম করলে জুনিয়াররা তো সাপের পাঁচ পা দেখবে। তাছাড়া পড়ানোর ব্যাপারেও তুমি খুব কেয়ারলেস হচ্ছ!

আমি?

ইয়েস। ড্রয়ার থেকে একটা খাতা বের করে সামনে ধরলেন সৌদামিনী, এই মেয়েটিকে তুমি একশ তে পঞ্চাশ দিয়েছ। অথচ ওর পাওয়া উচিত চল্লিশ। গার্জেন এসে কমপ্লেন করে গেছে তুমি মেয়েটির ভুল ডিটেক্ট করোনি। স্কুলের বদনাম হয়ে যাচ্ছে! মাধবীলতা খাতাটা টেনে নিয়ে দেখল, বেশ কয়েকটা বানান ভুল নজরে এল। অত খাতা একসঙ্গে দেখতে গেলে কিছু কিছু গোলমাল হয়েই যায়। কিন্তু এ বিষয়ে সে নিজে খুব সজাগ। তাহলে এটা হল কি করে?

সৌদামিনী বললেন, আমি এখনই কমিটির কানে কথাটা তুলতে চাই না। আমাকে যেন দ্বিতীয়বার না বলতে হয়। যাও।

মাধবীলতা উঠে দরজার দিকে যেতেই সৌদামিনী বললেন, তোমার শরীর কি অসুস্থ? মুখ চোখ ওরকম কেন?

না, কই কিছু হয়নি তো!

খাওয়া দাওয়া করছ!

হ্যাঁ।

স্বামী কি করছে?

ওই আর কি, আছেন।

সৌদামিনী মাথা নাড়লেন, কতকাল আর স্যাক্রিফাইস করবে? ওই ব্যাটাছেলে জাতটার জন্যে নিজেকে শেষ করাটা গাধামি। নচ্ছার জাত একটা। শরীরের যত্ন নিও। ওইটেই আসল। টিচার্স রুমে এসে ধপ করে চেয়ারে বসল মাধবীলতা। খাতাপত্র টেবিলে রেখে শরীর এলিয়ে চোখ বন্ধ করল। উল্টো দিকে বসেছিল নীপা, জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে লতাদি?

চোখ বন্ধ করেই মাথা নাড়ল সে, কিছু না।

তোমাকে খুব সাদা দেখাচ্ছে!

বুড়ো বয়সে ফরসা হচ্ছি বোধহয়।

কি যে ঠাট্টা কর! একবার ডাক্তার দেখাও।

ওমা কেন? মাধবীলতা চোখ খুলে হেসে ফেলল।

তোমার ওপর দুজন নির্ভর করে আছে। একটা কিছু হয়ে গেলে!

দূর! আমাকে যমেও ছোঁবে না। চা দিয়েছে?

দিচ্ছে! কি ব্যাপার? এরকম কথা কখনো বল না তুমি! আজ কিছু হয়েছে মনে হচ্ছে ঝগড়া করেছ?

ঝগড়া আবার কার সঙ্গে করব। এই জানিস, আমাদের পাশের ঘরের একটা বউ সেরেফ ঝগড়া করে অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে চলে গেল। বউটার শরীরে এক ফোঁটা মাংস নেই। আর একটা থুথুরে বুড়ি বলল, ওকে আমি খেলাম। শিউরে উঠল মাধবীলতা কথাগুলো বলতে বলতে। নিচের ঠোঁট দাঁতে চাপল সে।

নীপা ঝাঁঝিয়ে উঠল, ওই জায়গাটা তুমি ছাড়ো তো! আমাদের পাড়ায় একটা ফ্ল্যাট এখনও খালি আছে। তুমি নেবে?

কে টাকা দেবে?

বেশী ভাড়া না। তিনশ। দেড়খানা ঘর, সব সেপারেট। আমার বাবার বন্ধু। সেলামি নেবে না, তিনমাসের ভাড়া অ্যাডভান্স।

মাধবীলতা ক্লান্ত চোখে তাকাল। ও কত মাইনে হাতে পায় তা নীপা জানে কিন্তু কত টাকা বাড়িতে নিয়ে যায় সে খবর জানলে এই প্রস্তাব দিত না। নীপা তাকিয়ে আছে দেখে বলল, দুবছর পরে যদি বাড়িটা খালি থাকে তাহলে বলিস।

নীপা একটু আহত হল। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বলল, যাই বলো, তুমি বস্তিতে থাকবে এটা একদম মানায় না।

মাধবীলতা হাসল, আমাকে কিসে মানায় রে?

নীপা বোধহয় রেগে গেল, জানি না। তারপর চেঁচিয়ে বলল, সুধাদি, চা দিয়ে যাও, জলদি।

লম্বা টিচার্স রুম এখন ভরা। দু’তিনটে দলে সবাই গল্প করছে। একটা অলিখিত শ্রেণীভেদ আছে এখানে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে মাধবীলতা ভাবল বিস্কুট চাইবে কিনা! এখন দুটো বিস্কুট চল্লিশ পয়সা। না, থাক। শুকনো জিভে চা বেশ আরাম দিল। ঠিক তখুনি দরজায় সুপ্রিয়া কর দেখা দিল। এই স্কুলে মেয়েদের যেমন য়ুনিফর্ম আছে টিচারদেরও সাদা শাড়ি পরে আসতে হয়। সুপ্রিয়া করকেও মানতে হচ্ছে নিয়মটা, কিন্তু তার সাদা শাড়িতে যা জেল্লা বের হয় তাতে চোখ ধাঁধিয়ে যায় সবার। সুপ্রিয়ার চাকরি করতে আসা শখের, সময় কাটানোর জন্যে। স্বামী বিরাট চাকরি করেন, কোলকাতায় দুটো প্রকাণ্ড বাড়ি। এক ছেলে দার্জিলিং-এ পড়ে। গাড়ি ছাড়া এক পা হাঁটে না সুপ্রিয়া। ওকে দেখেই মুখ নামালো মাধবীলতা। সে নিজেও জানে এটা এক ধরনের কমপ্লেক্স কিন্তু কিছুতেই কাটাতে পারে না। বিনা সুদে তাকে আট হাজার টাকা ধার দিয়েছিল সুপ্রিয়া। কোনদিন তাগাদা করেনি, কাউকে জানায়নি, এমনকি ব্যবহারেও প্রকাশ করেনি। তবু ওকে দেখলেই অস্বস্তি হয় মাধবীলতার। অনিমেষের পায়ের জন্যে নেওয়া টাকাটা জলের মত খরচ হয়ে গেল। একদম উপকার হয়নি বলা যায় না। এক পায়ে কোনরকমে উঠে দাঁড়িয়েছে শেষপর্যন্ত। অনেকদিন শোধ করতে পারেনি কিছু। এখন প্রতি মাসে চারশো করে দিচ্ছে। তিনশো টাকায় সংসার চালাতে হয়। প্রভিডেণ্ড ফাণ্ড কো-অপারেটিভ থেকে কাটাকুটির পর ওই অঙ্কটাই হাতে থাকে। অবশ্য সুপ্রিয়া কর হাতে হাতে টাকা নেয়নি। বলেছিল, আমি বরং ব্যাঙ্কে একটা অ্যাকাউন্ট খুলছি নতুন করে। তুমি চারশো করে প্রতিমাসে জমা দিও, রেকারিং। মাধবীলতা তাই দেয়।

সুপ্রিয়া কর এসে নীপার পাশে বসতেই সে বলল, নতুন শাড়ি মনে হচ্ছে?

হ্যা গো! জাপানী।

তুমি বেশ আছ সুপ্রিয়াদি। সারা পৃথিবীকে গায়ে চাপাও।

ওইটেই তো শখ। কেন নজর দিচ্ছ! তারপর ব্যাগ খুলে বড় প্যাকেট বের করল সুপ্রিয়া। কাল তোমাদের দাদার জন্যে বানিয়েছিলাম। ও খুব খেতে ভালবাসে তো। খেয়ে দ্যাখো তো কেমন হয়েছে!

এক খণ্ড বড় কেক তুলে দিল সুপ্রিয়া নীপার হাতে। তারপর একটা খণ্ড এগিয়ে ধরল মাধবীলতার দিকে।

মাধবীলতার অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল। নিত্যনতুন বাড়ি থেকে খাবার এনে সুপ্রিয়া টিচার্সদের খাওয়ায়। অথচ সে কোনদিন কিছু আনতে পারে না। কেকটা না নেওয়া অত্যন্ত অভদ্রতা হবে। মনে মনে ঠিক করল, টাকাটা শোধ হয়ে গেলে সে একদিন সবাইকে খাওয়াবে। কেকটা হাতে নিতেই খুব সুন্দর গন্ধ নাকে এল। কিসমিস কাজু চোখে পড়ল। মাধবীলতার মনে হল, অনিমেষ কিংবা অর্ক অনেকদিন এসব জিনিস খায়নি। বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠল ওর। টেবিলের তলায় হাতটা আপনা আপনি নেমে গেল। তারপর একটা ছোট্ট টুকরো গালে ফেলে বলল, সুন্দর হয়েছে।

সুপ্রিয়া খুশি হল। নীপা কিছু বলতেই সুপ্রিয়া ওর দিকে ঘুরে বসে কথা বলতে লাগল। মাধবীলতা সর্তকভঙ্গীতে সবার চোখ এড়িয়ে কেকটাকে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে মুখ নাড়তে লাগল এমন ভঙ্গীতে যেন সে খেয়ে যাচ্ছে। দাঁতের কোণে যে টুকরোটা পড়েছিল তার মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি। কাপের তলানিটা গালে ঢেলে ব্যাগ নিয়ে মাধবীলতা টয়লেটে চলে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর ব্যাগ থেকে কাগজ বের করে কেকটাকে মুড়ে সযত্নে আবার রেখে দিল। মনটা এখন শান্ত হয়ে গেল ওর। বেশ ভাল লাগছে।

.

ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে ঈশ্বরপুকুর লেনে ঢুকল মাধবীলতা। ডাক্তারখানার সামনে আসতেই শক্ত হল শরীর। তারপর ধীরে ধীরে উঠে এল বারান্দায়। ভদ্রলোকের পসার বেশ ভাল। ওকে দেখে আর একজনের পেট টিপতে টিপতে জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার?

আজ সকালে আপনাকে বলেছিলাম! মানে ওদের অবস্থা বুঝতেই পারছেন। আপনি যদি সামনের মাস অবধি অপেক্ষা করেন তাহলে মাইনে পেয়ে আমি না হয় দিয়ে দেব। এক নিঃশ্বাসে বলে গেল মাধবীলতা।

দিতে হবে না। পিলে বড় হয়েছে তোমার। ডাক্তার রোগীকে বললেন।

দিতে হবে না?

না। পেশেন্ট মারা গেলে আমি টাকা নিই না।

চমকে উঠল মাধবীলতা। বউটা মরে গেছে? কোনদিন কথা বলেনি কিন্তু আজ সকালেই তো ওর হৃৎস্পন্দন শুনেছিল সে। মোক্ষবুড়ির কথাই সত্যি হল? টলতে টলতে রাস্তায় নেমে এল সে।

গলির মুখে বেশ ভিড়। সবাই উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যে বউটি মোক্ষবুড়িকে ফোড়ন কেটেছিল তাকে দেখতে পেল মাধবীলতা। চোখাচোখি হতেই বউটি ঘোমটা টেনে বলল, অনুর মা মরে গেছে। এখনই নিয়ে আসবে।

মাধবীলতা মাথা নামাল। তারপর ভারী পায়ে গলির মধ্যে ঢুকল। অনুদের দরজা খোলা। আড়চোখে তাকিয়ে মোক্ষবুড়িকে দেখতে পেল সে। জবুথবু হয়ে বুড়ি বসে আছে দরজায়। তার ঠিক পাশে পাথরের মূর্তির মত বাচ্চাদুটো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে। ছেঁড়া হাফপ্যান্ট আর খালি গায়ে চোখ তুলে ওরা মাধবীলতাকে দেখল। সরল অবোধ দৃষ্টি। মোক্ষবুড়ি বলল, কে যায়?

মাধবীলতা বলল, আমি।

কে? অ, মাস্টারনি?

হ্যাঁ।

সে এল না আর, শুনেছ?

হ্যাঁ।

বড়ঘরের মেয়ে ছিল লা, মরে বেঁচে গেল।

আমি যাচ্ছি।

দাঁড়াও দাঁড়াও, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। আচ্ছা, হাসপাতালের খাটে আজকাল গদি থাকে তো, নরম গদি, তুমি জানো?

মাধবীলতা আর দাঁড়াল না। প্রায় দৌড়েই সে নিজের ঘরের সামনে পৌঁছে গেল। ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখল অনিমেষ শুয়ে আছে, অর্ক নেই। বোধহয় স্কুলে গেছে। ঘাড় বেঁকিয়ে সে দেখল রান্না হয়নি। মাধবীলতা চাল আলু আর ডিম বের করে রেখেছিল স্টোভের পাশে তেমনি রয়েছে। অনিমেষ আজকাল সকালে ওগুলো ফুটিয়ে রাখে।

খাটের পাশে দাঁড়িয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, রাঁধো নি??

মাথা নাড়ল অনিমেষ, না।

খোকা খেয়ে যায়নি স্কুলে?

স্কুলে যায়নি। হাসপাতালে গেছে।

চট করে মেজাজটা গরম হয়ে যাচ্ছিল মাধবীলতার, অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো, তুমি কেন যেতে দিলে?

অনিমেষ স্ত্রীর দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল।

কিছু খেয়েছ?

চা।

আর কিছু?

না।

তোমার জন্যে একটা জিনিস এনেছি।

কি?

কেক। খুব ভাল। অর্ধেকটা তুমি খাও, আর ওর জন্যে রেখে দাও।

অনিমেষ উঠে বসল, আমার শরীর খারাপ, খাব না।

কি হয়েছে?

পেট গোলমাল করছে।

মাধবীলতা স্বামীর মুখের দিকে তাকাল, পেট গোলমাল করলে কি চোখ দিয়ে জল পড়ে?

মানে?

চোখের কোণে জলের দাগ শুকিয়ে আছে।

আমি বলছি খাব না, ব্যাস। অনিমেষ সকালের ক্রোধটাকে টেনে তুলল, তুমি খাও আর তোমার ছেলেকে দাও।

মাধবীলতা মাথা নাড়ল, তুমি এমন করো না, আমি তো আর কিছু চাই না, শুধু তুমি একটু বোঝ আমাকে।

তারপর ধীরে ধীরে কেকটাকে নিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। অনুদের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মোক্ষবুড়ি বলল, কে যায়?

মাধবীলতা দেখল বাচ্চাদুটো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, কিছু খেয়েছিস?

দুটো বাচ্চা পুতুলের মত মাথা নাড়ল, না।

মোক্ষবুড়ি বলল, অ তুমি! তা কে খেতে দেবে বল ওদের?

এই নে খা। কেকটাকে দুটো ভাগ করে বাচ্চাদুটোর হাতে তুলে দিতেই তারা চকচকে চোখে সেটাকে দেখেই মুখে পুরল।

মোক্ষবুড়ি জিজ্ঞাসা করল, কি দিচ্ছ লা?

কেক।

কেক! ওমা, ওতে তো ডিম আছে। অশুচের সময় ডিম খেতে নেই। ফেলে দে, ফেলে দে মুখ থেকে। হাত বাড়িয়ে বাচ্চাদুটোর মুখ ধরতে চাইল বুড়ি। মাধবীলতা স্তব্ধ হয়ে দেখল, বাচ্চাদুটো দ্রুত গিলে ফেলছে কেক দুটো, যত দ্রুত সম্ভব। ব্যর্থ মোক্ষবুড়ি মাথা চাপড়াতে লাগল, এখনও মা পোড়েনি তোদের, ডিম খেয়ে নিলি? রাক্ষস, সব রাক্ষস!

০৩. বেলা দুটো নাগাদ ঈশ্বরপুকুর লেন

বেলা দুটো নাগাদ ঈশ্বরপুকুর লেন চনমনিয়ে উঠল। বস্তির সরু সরু গলিতে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। পিলপিল করে স্ত্রীলোক এবং শিশুরা বেরিয়ে আসছে বাইরে। অনুর মাকে যেন শব্দের রথে চাপিয়ে নিয়ে আসছে ছেলেরা। দশ বারোটা কণ্ঠ থেকে ছিটকে উঠছে হরি বোল। ট্রাম রাস্তা থেকে জানান দিতে দিতে আসছে ওরা। সেই ডাকে ঘরে থাকা তিন নম্বরের বাসিন্দাদের পক্ষে অসম্ভব।

খাঁটিয়াটা নামানো হল গলির মুখে। দলটার অনেক পেছনে আসছিল অনুপমা, বোধহয় তাল রাখতে পারছিল না ওদের চলার সঙ্গে। মিনিট খানেক বাদেই ভিড় সরিয়ে মায়ের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল, ওমা, মা গো, কেন চলে গেলে গো!

তিন নম্বরের এক বউ বলল, সতী সাবিত্রী ছিল, মরার সময় একটুও কষ্ট পায়নি। আর একজন বলল, অনুর ছোট ভাই দুটোকে নিয়ে এস, শেষবার মাকে দেখে নিক।

অনুপমা কান্না থামাচ্ছিল না। মায়ের শরীরের ওপর বারংবার আছড়ে পড়ছিল সে। হঠাৎ ন্যাড়া চেঁচালো, এই দিদি, তোর বুক দেখা যাচ্ছে!

ন্যাড়া দাঁড়িয়েছিল মায়ের পায়ের পাশে। আলুথালু অনুপমার বুকের আঁচল সরে গিয়েছিল অনেকক্ষণ। ভোর বেলায় অন্তর্বাস পরা ছিল না, সেই অবস্থায় হাসপাতালে ছুটেছিল! এখন চাপাচাপিতে বোতাম ছিঁড়েছে ওপরের, অনেকটা দেখা যাচ্ছে যা কিনা শোকের সময় লোকে খেয়াল করে না। কিন্তু ন্যাড়া দেখতে পেল, লোকগুলো মাকে দেখার নাম করে দিদির বুকের দিকে তাকিয়ে আছে। সে সহ্য করতে পারছিল না। তাই আর একবার চিৎকার করল, এই দিদি!

এবার অনুপমা সম্বিত ফিরে পেয়ে আঁচলটা টানল কিন্তু কান্না থামাল না। এই সময় পেছনে মোক্ষবুড়ির কনকনে গলা বাজল, এই হাভাতের দল, মচ্ছব দেখতে এয়েছে না মড়া দেখছে না। আমাদের ঠাকুর দেখছে, সর সর, আমায় যেতে দে। জমাট ভিড়টাকে যেন ছুরির মত কাটল শব্দগুলো। তার ফাঁক দিয়ে ঘুর ঘুর করে বুড়ি এসে দাঁড়াল খাটের পাশে। বুড়ির লিকলিকে হাত বাচ্চা দুটোকে ধরে রয়েছে। তাদের মাকে শুয়ে থাকতে দেখল তারা। একটা চাদরের ওপর মাথা কাত করে শুয়ে আছে অনুর মা। আর একটা সাদা চাদর তার গলা অবধি টানা। মোক্ষবুড়ি খাটিয়ার পাশে হাঁটু ভেঙ্গে বসল। তারপর হাতড়ে হাতড়ে বউটির চিবুক স্পর্শ করল, যাও বউ মা, যাও। কিন্তু আমার যে যেতে ইচ্ছে করে না! কর্তা গেল, ছেলে গেল, নাতিরা দুবেলা লাথি মারে তবু থাকতে ইচ্ছে করে! কর্তাকে গিয়ে আমার কথা–। বুড়ি বিড়বিড় করছিল। হঠাৎ অনুপমা মাকে ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বুড়ির ওপর, তোমার জন্যে, তোমার জন্যে মা মরেছে। হাতে পায়ে ধরে চা খেয়ে আবার চুকলি কাটতে গিয়েছিলে। মানুষটাকে রাগিয়ে দিয়ে মেরে ফেলল রে!

অনুপমার ভরা স্বাস্থ্যের তলায় পড়ে মোক্ষদা বুড়ি চিঁ চিঁ করছিল। সঙ্গে সঙ্গে হই হই শব্দ উঠল। কয়েকটা হাত দ্রুত টেনে সরিয়ে আনল অনুপমাকে। সে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে। প্রথমে মনে হয়েছিল মোক্ষবুড়ি উঠবে না। একজন টেনে তুলে বসিয়ে দিতে মোক্ষবুড়ি চেঁচিয়ে উঠল, ওরে তোরা আমায় এই খাটিয়ায় শুইয়ে দে, বউমার সঙ্গে আমিও চলে যাই।

তিন নম্বরের তাবৎ মানুষ কথাটা শুনে হ্যাঁ হ্যাঁ করে হেসে উঠল। শুধু নিমু চা-ওয়ালা চেঁচিয়ে উঠল, তোরা কি রে, একটা জ্বলজ্যান্ত মড়ার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছিস।

মোক্ষবুড়ি বলল, ওর মাথায় সিঁদুর দাও সকলে, পুণ্যবতী ছিল লা।

এই সময় একটি কালো প্যান্ট আর লাল গেঞ্জি পরা ছেলে এসে ন্যাড়াকে ডাকল, এই ন্যাড়া শোন!

ন্যাড়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখল, কি?

তোর বাপ খবর পেয়েছে?

জানি না। ন্যাড়া মাথা ঝাঁকাল।

নিমু বলল, যাচ্চলে। মা মরল আর বাপকে খবর দিসনি?

ন্যাড়া খিঁচিয়ে উঠল, আমি টাইম পেলাম? সকাল থেকে শালা কিছু খাইনি মাইরি। দিদিটা তো শুধু কেঁদেই যাচ্ছে।

নিমু বলল, ডিউটি থেকে তো আসার সময় হল। ভোর বেলায় যেতে দেখেছিলাম। তোমরা আর একটু অপেক্ষা কর ওর জন্যে।

লাল গেঞ্জি ন্যাড়ার হাত ধরল, এদিকে আয়।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ন্যাড়া ওর সঙ্গে জটলা থেকে বেরিয়ে এল। রাস্তার উল্টো দিকে শিব মন্দিরের পাশের রকে বসে শুয়ে শরীর এলিয়ে রয়েছে তিন নম্বরের কয়েকজন। ওরা ন্যাড়ার চেয়ে বয়সে ঢের বড়। হাসপাতাল থেকে ডেডবডি এনে জিরোচ্ছে সবাই। ন্যাড়াকে ওদের সামনে নিয়ে গিয়ে লাল গেঞ্জি বলল, নে কি বলবি বল।

খুরকি পা নাচাতে নাচাতে বলল, তোর মায়ের জন্যে শ্মশানে যাচ্ছি, বাড়ির ভাত তো চোট হয়ে গেল। আমাদের খাওয়ানোর জন্যে মাল নিচ্ছিস তো?

মাল? টাকা?

হ্যাঁ রে।

আমার কাছে টাকা নেই।

আর জি কর থেকে বডি কাঁধে বয়ে নিয়ে এসে অর্কর ঘাড় টনটন করছিল। কথাটা শুনে বলল, সে কি রে? টাকা না হলে সৎকার হবে কি করে?

ন্যাড়া বলল, বাপ তো বাজারের টাকাই দিয়ে যায় নি আজ।

খুরকি বলল, তোর দিদির কাছে আছে কি না দ্যাখ!

ন্যাড়া আবার ফিরে গেল ভিড়ের মধ্যে। অনুপমা মায়ের পায়ের ওপর মাথা রেখে পড়েছিল। ন্যাড়া গিয়ে তার পাশে বসল, এই দিদি, তোর কাছে টাকা আছে? মাকে পোড়াতে লাগবে!

নিস্তেজ অনুপমার কানে টাকা শব্দটা প্রবেশ করল। সে ওই অবস্থায় মাথা নাড়ল, না! সেইসময় গুঞ্জন উঠল। ঈশ্বরপুত্র লেনের মুখে অনুর বাবা হরিপদকে দেখা যাচ্ছে। অলস পায়ে যেন ঝিমোতে ঝিমোতে আসছে লোকটা। মাটিতে চোখ রেখে যেন কিছু ভাবতে ভাবতে হাঁটছে। সঙ্গে সঙ্গে তিন নম্বরের বাসিন্দারা চুপ করে গেল। এখনই একটা নাটক অভিনীত হতে যাচ্ছে, পর্দা উঠছে যেন। আর একটু কাছে এসে ভিড়টাকে দেখে হরিপদ থমকে দাঁড়াল। এরকম ভিড় এই রাস্তায়। ব্যাণ্ড পার্টি গেলে হয়, ঠাকুর গেলে হয় আবার বর এলেও। সে বেশী গা না করে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল কিন্তু নিমু তাকে থামাল, ও হরিপদ। একটু দাঁড়াতে হবে যে!

ভিড়ের জন্যে বোধহয় খাটিয়াটা নজরে পড়েনি হরিপদর, চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করল, কি ব্যাপার? আমি কেন?

নিমু যেন একটু ইতস্তত করল, তোমাকে তো পাওয়া যায় না, বাস নিয়ে ঘুরছ তাই খবরটা দেওয়া হয়নি। তোমার বউ আজ সকালে, মানে ইয়ে, মরে গেছে।

হরিপদ যেন বুঝতেই পারল না কথাটা, মরে গেছে মানে?

নিমু ততক্ষণে ওর কাঁধে হাত রেখেছে, শরীর খারাপ করছিল, ছেলেরা হাসপাতালে নিয়ে গেল। ওই তো, এইমাত্র নিয়ে এসেছে ওরা।

মুহূর্তে জড়ভরত হয়ে গেল মানুষটা। থপথপ পায়ে এগিয়ে গেল দ্বিভক্ত ভিড়ের মধ্যে দিয়ে। অনুপমা মুখ তুলে তার পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবা গো বলে। হরিপদ শীতল চোখে স্ত্রীকে দেখছিল। এত বছর ধরে যে শরীরটা তাকে সুখ দিয়ে গেছে সেটা নিঃসাড়ে পড়ে আছে খাটিয়ায়। হরিপদর ঠোঁট নড়ল, মরে গেল!

নিমু সঙ্গে ছিল। বলল, হার্টের অসুখ ছিল নাকি?

হরিপদ ঘাড় নাড়ল, জানি না। বাজারের টাকা দিইনি আজ। নিজের সঙ্গেই কথা বলছিল সে। এমনকি পায়ের ওপর আঁকড়ে থাকা মেয়ের অস্তিত্ব যেন টের পাচ্ছিল না।

নিমু বলল, আর ভেবে কি হবে। তবে কিনা তোমার বউ একটুও কষ্ট পায়নি। এরকম যাওয়া খুব ভাগ্য হলে হয়।

পায়ের ওপর পড়ে থাকা মেয়েকে সরিয়ে আরও কয়েকটা পা এগিয়ে গেল হরিপদ। তারপর ধীরে ধীরে স্ত্রীর মুখের সামনে উবু হয়ে বসে পড়ল। তার একটা হাতের ওপর খোঁচা খোঁচা দাড়িময় গাল, একদৃষ্টে সে স্ত্রীর মুখ দেখতে লাগল। বন্ধ চোখের পাতা, ঠোঁট ঈষৎ খোলা-হরিপদর মাথার ভেতরটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল।

হই হই করে ছুটে এল সবাই। ধরাধরি করে নিমুর চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে নিয়ে গেল ওরা হরিপদকে। মাথাটা ঝট করে পড়েছিল খাটিয়ার ওপর, ঠিক বউএর মুখের সামনে। সেখানটা কেটে গেছে। অজ্ঞান হরিপদকে নিয়েই এখন সবাই ব্যস্ত। ন্যাড়া সমস্ত ব্যাপারটা দেখল। তারপর ধীরে ধীরে উল্টো ফুটের রকে চলে এল; দিদির কাছেও টাকা নেই।

খুরকি বলল, চল রে, এ শালার মড়া পোড়াতে কে যাবে!

যাকে বলল সে শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে বলল, তোর বাপের কাছে পয়সাকড়ি নেই? জিজ্ঞাসা করেছিস?

ন্যাড়া বলল, বাপ বাজারের টাকাই দেয়নি আজ। তার ওপর অজ্ঞান হয়ে আছে এখন।

খুরকি বলল, নক্সা! খেতে দেয় না আর মরে গেলে নক্সা মারায়। আবে কিলা, বডিটাকে হাপিস করতে কত মাল লাগবে রে?

কিলা বলে যাকে সম্বোধন করেছিল সে একমনে মশলা মিশিয়ে কাগজটা পাকাচ্ছিল। বলল, দেড়শ।

খুরকি বলল, ফোট। এত লাগবে কেন?

কিলা বলল, শ্মশান তো চিনিস না? সোনাগাছির চেয়েও হারামি। একটা না একটা ফ্যাকড়া বের করবেই। আমি মাইরি আটানব্বইটা বডি পার করলাম, আমাকে শেখাস না।

বলতে বলতে কিলার সিগারেট পাকানো হয়ে গিয়েছিল। পাশের ছেলেটি অনেকক্ষণ থেকেই দেশলাই বের করে তাক করেছিল, এবার ফস করে আগুন জ্বেলে হাতের আড়ালে ধরল। কিলার সিগারেট ধরতেই একটা কটু গন্ধ বের হল। খুরকি বলল, আমাকে দে।

কিলার কানে কথাটা যাবে না তা সবাই জানে। চোখ বন্ধ করে একটানে অর্ধেকটা কমিয়ে তবে সে সেটাকে হাত বদল করবে! সবাই এখন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে, শুধু অর্ক ন্যাড়াকে দেখছিল। একটা খাটো ময়লা সাদা কাপড়ের হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরে কিলাকে দেখছে। মা মরে যাওয়ার পর এক ফোঁটা কাঁদেনি। ওপাশের জটলাটা একটু একটু করে হালকা হচ্ছে। মড়ার আকর্ষণ বোধহয় বেশীক্ষণ থাকে না। কিন্তু বডিটাকে পোড়ানো দরকার। আজ অবধি কখনও শ্মশানে মড়া নিয়ে যায়নি সে। এরকম চান্স ছাড়া যায় না। অর্ক রক ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, একবার পার্টি অফিসে গেলে হয় না?

খুরকির কপালে ভাঁজ পড়ল, কেন?

অর্ক বলল, সৎকারের টাকার জন্যে?

খুরকি মুখ বেঁকালো, আমি যাব না। সতীশটা এক নম্বরের হারামি। যদি পার্টি না করত অ্যাদ্দিনে ওর পেট টানতাম।

কিলা চোখ খুলল। হাতের সিগারেটটা পাচার করে দিয়ে বলল, চল রে অক্ক! আমি যাব। সতীশের বাপ দেবে টাকা। পার্টির জন্যে জান লড়িয়ে দিয়েছি আর এখন দেবে না বললেই হল!

খুরকি ছাড়া সবাই উঠল। সিগারেটটা এখন খুরকির হাতে। এপাড়ায় সবাই জানে কিছুদিন আগে খুরকির সঙ্গে সতীশের খিচু হয়ে গেছে। ফালতু কেসে তুলে নিয়ে গিয়েছিল বড়বাবু। বেধড়ক পেঁদিয়েছিল লক আপে পুরে। খুরকির মা তখন ছুটেছিল সতীশের কাছে। সতীশ থাকে তিন নম্বরেই, একটু ভেতরের দিকে। সি পি এমের লোকাল সেক্রেটারি। নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক। বিয়ে থা করেনি, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ আর পাজামা পরে খুব সিরিয়াসলি পার্টি করে। খুরকির মাকে সতীশ নাকি বলেছিল, সমাজবিরোধীদের সঙ্গে পার্টির কোন সম্পর্ক নেই। আপনার ছেলে খুর চালায় তা সবাই জানে। আমি গেলে পার্টির ইমেজ খারাপ হবে। খুরকির মা নাকি খুব কেঁদেছিল কিন্তু সতীশ কথা শোনেনি। বলেছিল, কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশ, সমাজবিরোধীদের প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। তখন খুরকির মা গিয়েছিল নুকু ঘোষের কাছে। একসময়, কংগ্রেসের আমলে নুকু ঘোষ ছিল এপাড়ার সর্বেসর্বা। সি পি এম ক্ষমতায় আসার পর থেকে নুকু ঘোষের দিন গিয়েছে। কিন্তু পাড়ায় ওর জনপ্রিয়তা ছিল সেটা যায়নি। নুকু ঘোষ বলেছিল, কেন? আমার কাছে কেন? কমরেড সতীশ কি বলল?

খুরকির মা ঘটনাটা বলেছিল। শুনে নুকু ঘোষ নাকি খুব হেসেছিল। বলেছিল, কেন, কিলাটা সমাজবিরোধী নয়? গাঁজা খায়, সিনেমায় টিকিট ব্ল্যাক করে। তা ওকে যখন ধরে তখন সতীশ ছাড়াতে যায় কেন? খুরকির ওপর সতীশের নিশ্চয়ই কোন কারণে খার আছে। কিন্তু তোমার ছেলে কি আমার কথা শুনবে?

খুরকির মা মাথা নেড়েছিল, হ্যাঁ শুনবে।

ছাই শুনবে। এসব হারামির বাচ্চাদের আমার জানা আছে। আমরা পাওয়ারে না আসা অবধি শুনবে না। অলরাইট, আমি দেখছি, ছাড়া পেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলল। তা নুকু ঘোষ কিন্তু কথা রেখেছিল। সেই লালবাজার থেকে বড়বাবুকে বলিয়ে ছাড়িয়ে এনেছিল খুরকিকে। খুরকি বলেছিল, সতীশের পেট টানবে। তাই এখন সে পার্টি অফিসে যাবে না তা বলাই বাহুল্য।

ঈশ্বরপুকুর লেনের শেষপ্রান্তে পার্টির অফিস। সামনে একটা লাল ফ্ল্যাগ ঝুলছে। এই ভর দুপুরেও দরজা খোলা। ভেতরে মেঝেয় সতরঞ্চির ওপর দুটো ছেলে ঘুমুচ্ছে। কিলা চেঁচালো, সতীশদা!

ওর উচ্চারণ জড়ানো, গাঁজা টানবার পরই গলার স্বর ভারী হয়ে যায়। ছেলেদুটোর ঘুম ভাঙ্গছে না। অর্ক বলল, নেই বোধহয়। হয়তো অফিসে গিয়েছে।

কিলা মাথা নাড়ল, সতীশদা সাতদিনে একদিন অফিসে যায়। সোমবার। তুই গিয়ে ওদের তোল তো!

অর্ক এক লাফে রকে উঠে ঘরে ঢুকল। তারপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞাসা করল, এই, সতীশদা কোথায় রে?

দুজনেরই একসঙ্গে ঘুম ভাঙ্গল। অর্ক একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল। পাশ ফিরে থাকায় সে বুঝতে পারেনি। কর্পোরেশন স্কুলের রঘুমাস্টার আর হরি মিষ্টান্নের কারিগরটা শুয়েছিল। দুজনেই তার চেয়ে বয়সে দ্বিগুণ। অথচ এদের সে তুই বলে ফেলেছে। রঘু মাস্টার বলল, সতীশ নেই।

নেই মানে? কোথায় গিয়েছে?

হরি মিষ্টান্নের কারিগর বলল, খেতে। ভজনদের বাড়িতে।

কিলা চেঁচিয়ে উঠল, চলে আয় অক্ক। ওটা শালা সতীশদার ফুলটুসের বাড়ি। ওখানেই যাই।

রঘু মাস্টার ঘাড় বেঁকিয়ে কিলাকে দেখল। কিলা বলল, আরে রঘু, তুই শালা চুকলি খোর?

না। রঘু মাস্টার দ্রুত মাথা নাড়ল।

কথাটা মনে রাখিস।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অর্ক বলল, সতীশদার বোনের সঙ্গে রঘু মাস্টারের বিয়ে হবে।

বিলু বলল, কথা ছিল সেরকম কিন্তু এখন পাখি উড়ে গেছে।

অর্ক রেগে গেল, যা! যা জানিস না তা বলিস না। আমি শালা নিজের চোখে দেখেছি রঘু মাস্টার তানুদিকে চুমু খাচ্ছে!

কিলা থমকে দাঁড়াল, তুই নিজের চোখে দেখেছিস?

হা। একদিন অনেক রাত্তিরে। সতীশদার ঘরে। কেউ ছিল না তখন। আমি পেছন দিয়ে যেতে যেতে শব্দ শুনে জানলার ফাঁক দিয়ে দেখলাম। অর্ক বলল।

কিলা ঘুরে দাঁড়াল, আমি শালা রঘুটাকে খুন করব। আমি কথা বললে উত্তর দেয় না আর ও শালা চুমু খায়!

বিলু খপ করে কিলার হাত ধরল, এখন মাপ করে দাও ওস্তাদ। পরে এ নিয়ে ভাবা যাবে। ন্যাড়ার মা ওদিকে শুয়ে আছে।

কিলা সামান্য টলল। ওর চোখ এমনিতেই বেশ লাল, এখন যেন রক্ত ঝরছে। বিলু ওর হাত ধরে টানতে সে আবার ফিরল। ওরা দল বেঁধে পাশের সরু গলিটায় ঢুকে পড়তেই দেখল সতীশ আসছে। হ্যাণ্ডলুমের পাঞ্জাবি, পাজামা এবং কাঁধে ব্যাগ। ওদের দেখে সতীশ থমকে দাঁড়াল, কি ব্যাপার?

কিলা সবাইকে সরিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, মাইরি সতীশদা, তুমি বল আমি ছিপিএম করি কি করি না?

সতীশ বিরক্ত হল, কি বলছিস বল!

কিলা হাত নাড়ল, না আগে তোমাকে বলতে হবে। খুরকি নুকু ঘোষের গেঞ্জি হয়েছে আর আমি? আমি ছিপিএমের জন্যে জান লড়িয়ে দিয়েছি, কিনা বল? ওই শালা রঘু মাস্টার কি করেছে?

সতীশ একটু অবাক গলায় বলল, রঘু মাস্টারের কথা আসছে কেন?

কিলা বোধহয় এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে উত্তেজনাটা বেশী হয়ে গিয়েছে। সে বিলুকে বলল, বল না বে।

বিলু বলল, তোমাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম পার্টি অফিসে। রঘু মাস্টার হেভি রঙ নিল। যাক ছেড়ে দাও এসব কথা। ন্যাড়ার মা মরে গেছে, বডি নিয়ে এসেছি পাড়ায়। কিন্তু পোড়াবার মাল নেই।

সতীশ বলল, আমি কি করব?

কিলা হাত নেড়ে অর্ককে দেখাল, অক্ক বলল তোমার কাছে আসতে।

সতীশ মুখ ফিরিয়ে অর্ককে দেখল। তারপর হেসে বলল, তোমার কি করে মনে হল আমার কাছে এলেই টাকা পাওয়া যাবে?

অর্কর এসব কথা ভাল লাগছিল না। লোকটা মাইরি সোজাসুজি কিছু বলছে না। সতীশ তাকিয়ে আছে দেখে সে বলল, আপনি ছাড়া অন্য কারো কথা মনে পড়ল না তাই।

সতীশ খুশি হল, ঠিক আছে। আমাদের এলাকায় কেউ মারা গেলে, অবশ্যই কিছু দায়িত্ব আমরা নেব। শোষিত মানুষের পাশে না দাঁড়ালে আমাদের সমস্ত কাজই বৃথা যাবে। কিন্তু মুশকিল হল আমার কাছে তো টাকা বেশী নেই। সমীরকে তো সন্ধ্যের আগে পাওয়া যাবে না। এক কাজ কর। তুমি এই টাকাটা রাখ।

পাঞ্জাবির ভেতরের পকেট থেকে দুটো দশ টাকার নোট বের করে সতীশ অর্কর হাতে দিল। অর্ক টাকাটা ধরে বলল, কিন্তু সন্ধ্যে অবধি তো ন্যাড়ার মাকে রাখা যাবে না! সতীশ মাথা নাড়ল, হ্যাঁ ঠিকই। আমাদের যা ফাণ্ড তা সমীরের কাছেই থাকে। তোমরা জানো আমি টাকা পয়সা হাতে রাখি না। এক কাজ কর। পাড়ার সম্পন্ন মানুষদের কাছে সামান্য চাঁদা তুলে নাও। এরকম ইস্যুতে কেউ না বলবে না। যদি তাতেও টাকা না ওঠে কারো কাছ থেকে ধার নিয়ে নিও সমীর এলে আমি ব্যবস্থা করব।

সতীশের সঙ্গেই ওরা গলি থেকে বেরিয়ে এল। এই ব্যবস্থাটা সবারই যেন মনের মতন হয়েছে। সতীশ বলল, অর্ক, তোমার নামটি কিন্তু ভারী সুন্দর।

কিলা বলল, তুমি মাইরি মাল না খেয়ে আনসান কথা বল। অক্ক মানে তো অক্কা পাওয়া। সুন্দর হল? ফোট।

অর্ক হেসে ফেলল, যা বে! অর্ক মানে হল সূর্য! সান।

.

সতীশ পার্টি অফিসে ঢুকে গেলে ওরা তিন নম্বরের সামনে চলে এল। ন্যাড়ার মাকে ঘিরে তখনও কিছু বউ এবং বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। খুরকি ওদের দেখে উঠে দাঁড়াল রক থেকে, কি বে, সতীশ মাল দিল?

কিলা মাথা নাড়ল, কুড়কুড়ি ছেড়েছে। বলল, পার্টির নাম করে চাঁদা তুলতে।

খুরকির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যদিও একটু আগে কিলার সিগারেট তাকে আচ্ছন্ন করেছে তবু অতিরিক্ত কলজের জোরেই বলল, সাবাস। চল মাইরি খেপ ধরি।

ঠিক হল তিন নম্বরের কোন ঘরে খাওয়া হবে না। কিলা বলল, চাঁদা তুলতে গেলে রসিদ চাইবে না? বিলু ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দিল, দুব্বে, চাঁদা বলবি কেন? ডোনেশন নেব।

দলটা ক্রমশ বড় হচ্ছিল। একগাদাকুচো জুটে গেছে সঙ্গে। কিলা সেদিকে তাকিয়ে খেপে গেল, আরে, তোরা বাড়ি যা! পেছন পেছন এলে চামচিকে সেদ্ধ করে দেব।

বাচ্চাগুলো সরলো সামান্য, কিন্তু ভয় পেল না। বিলু বলল, থাকনা ওরা, দেখতে ভাল লাগবে। বেশ বড় দল হলে ওজন বাড়ে।

প্রথম আক্রমণটা হল নিউ তরুণ ডেকরেটর্সের ওপর। নিউ তরুণের মালিকের ব্যবসা এখন ভাল। দুপুরের খাওয়া সেরে ভদ্রলোক সবে তাঁর ঈশ্বরপুকুর লেনের দোকানে এসে বসেছেন এমন সময় ওরা হাজির হল। ছেলেগুলোকে তিনি চেনেন। প্রত্যেকটা পুজোয় চাঁদা দিতে হয়। ক্যানসারের মত এখন পুজোর সংখ্যা বাড়ছে।

নিরীহ মুখ করে বললেন, কি চাই ভাই?

কিলা বলল, ন্যাড়ার মা টেসে গেছে, তাই ডোনেশন চাই।

হকচকিয়ে গেলেন ভদ্রলোক, ন্যাড়ার মা?

কিলা ডাকল, আব্বে ন্যাড়া, এদিকে আয়।

ভিড় ঠেলে ন্যাড়া সামনে এসে দাঁড়াল। ভদ্রলোক ছেলেটিকে দেখলেন। সামান্য বয়স কিন্তু এর মধ্যেই মুখের চোয়াল চোয়াড়ে হয়ে গেছে। মাতৃবিয়োগের কোন চিহ্ন অভিব্যক্তিতে নেই।

ডোনেশন কেন?

পোড়াতে হবে না? বডি পচবে? একি ধুর মাইরি। কিলা অবাক গলায় বলল। ভদ্রলোকের মুখে রক্ত জমল। অর্ক তখন এগিয়ে এল, বুঝতেই পারছেন ওদের টাকা পয়সা নেই। সকারের জন্যে যে খরচ হবে তাই পাড়ার লোকদের কাছে চাইছি। সতীশদা বলে দিয়েছেন।

কথাটা শুনে মুখ বিকৃত করে ভদ্রলোক পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা পাঁচটাকার নোট বের করে বলল, এ ভাই ঠিক হচ্ছে না। তোমরা পাড়ার ছেলে তাই না বলতে পারি না। কিন্তু রোজ রোজ যদি আস।

খুরকি বলল, নক্সা মারাবেন না। রোজ রোজ কে আসে বে?

অর্ক টাকাটা তুলে নিয়ে বলল, চল।

কার বাইরে বেরিয়ে এসে কিলা বলল, এশালা অক্কটা মাইরি পাঁচ টাকায় ছেড়ে দিল! এর পর থেকে তুই একদম কথা বলবি না।

অর্ক টাকা রাখছিল। ঘুরে ঘুরে ঘন্টাখানেকের মধ্যে শ দেড়েক উঠে গেল। এর মধ্যে শুধু হরিনাথ দের বাড়িতে বেশ ঝামেলা হয়েছিল। অর্ক বলল, মাল তো উঠে গেছে এবার চল।

খুরকি বলল, কত উঠেছে?।

দেড়শো।

ওটা তো পোড়াতেই যাবে। এতগুলো শ্মশানযাত্রী খাবে তার টাকা? চল সেক্রেটারির বাড়িতে যাই। শালা কংগ্রেসী।

পাড়ার একমাত্র স্কুলের সেক্রেটারি ব্রজমাধব পাল এ পাড়া থেকেই এককালে কংগ্রেসের কাউন্সিলার ছিলেন। অতুল্য ঘোষ পার্টি ছাড়ার পর থেকে তিনিও রাজনীতি করেন না। স্কুলটাকে খুব ভাল চালাচ্ছেন ভদ্রলোক। বাপের প্রচুর বাড়ি আর পয়সা থাকায় এখন কোন কাজকর্ম করতে হয় না। বিরাট কোলাপসিবল গেটের সামনে দাঁড়াল ওরা। দারোয়ানকে বলল, পালবাবুর সঙ্গে দেখা করব।

দারোয়ান বলল কি চাই?

কিলা খিঁচিয়ে উঠল, তোর বাপের বিয়ে দেব! যা বলছি তাই কর।

খুরকি চাপা গলায় বলল, কিলা, মুখ সামলে, আমার পার্টির লোক।

বিলু বলল, ছোড় গুরু। ও এখন পার্টি করে না।

দারোয়ান ফিরে এল। পেছন পেছন নেমে এলেন ব্রজমাধব পাল। বিশাল শরীর। গিলেকরা পাঞ্জাবি আর চওড়া পাড় ধুতি পরে থাকেন সব সময়। ফসা মুখটা যেন ঈষৎ বিরক্ত, কি চাই?

ডোনেশন! বিলু বলল।

ডোনেশন? কি জন্যে?

খুরকি এগিয়ে গেল গেটের কাছে, স্যার আমি খুরকি।

কি নাম বললে?

খুরকি।

এরকম নাম কোন মানুষের হয়? বাপ মা রেখেছিল? কিলা চেঁচিয়ে উঠল, বাপ মা তুলে কথা বলবেন না! খুরকি ধমকালো, অ্যাই চুপ কর। ও আমাদের পার্টির লোক না স্যার! আমাকে চিনতে পারছেন না? সেই যে একবার নুকুদা আমাকে নিয়ে আপনার কাছে গিয়েছিল!

কবে বল তো?

সেই যে যেবার ছিপিএমরা আপনাদের স্কুলে বোমা মেরেছিল!

হ্যাঁ হ্যাঁ। ও, আচ্ছা তুমিই সেই? তা কি ব্যাপার?

এই যে ন্যাড়া, ওর মা ঝপ করে মরে গেছে। তাই আপনার কাছে এসেছি। কিছু টাকা কড়ি যদি দেন! খুরকির গলা খুব নরম শোনাচ্ছিল।

মড়া পোড়ানোর টাকা? ওতে তো তোমরা চোলাই গিলবে! ভদ্রলোক মুখ বিকৃত করে পিছু ফিরলেন।

সঙ্গে সঙ্গে কিলা চেঁচিয়ে উঠল, আবে খানকির ছেলে, তাতে তোর বাপের কি?

ব্ৰজমাধব পাল চটপট ঘুরে দাঁড়ালেন, কে বলল কথাটা? কে? জুতিয়ে মুখ ভেঙ্গে দেব হারামজাদা। আমার সঙ্গে ইতরামি? তোদের মত ইতর নিয়ে কত কারবার করেছি এককালে! কে বলল?

বাঘের মত ব্ৰজমাধবের গর্জনে সবাই চুপসে গেল। অর্ক চট করে সরে গেল আড়ালে। ব্রজমাধব ওর স্কুলের সেক্রেটারি, মায়ের সঙ্গে বেশ আলাপ আছে। খুরকি দুহাত তুলে বলল, ও স্যার আমাদের অ্যান্টি পার্টি! ওর কথা ছেড়ে দিন।

ছেড়ে দেব? তুমি বলছ কি! আমি খানকির ছেলে? অত বড় স্কুলটাকে চালাই আমি। প্রতিবছর চারপাঁচজন স্টার পায় আর আমাকে গালাগালি দিচ্ছে!

বিলা বলল, তা স্যার আপনি তো গবমেন্টের অর্ডার মানছেন না।

কি মানছি না?

আপনি স্কুলে ইংরেজি পড়াচ্ছেন। শালা দেশটাকে সাহেবদের চাকর করে দিতে চাইছেন। এটা কি ঠিক হচ্ছে? যেন বেশ ফাঁদে ফেলে দিয়েছে এমন ভঙ্গীতে কথা বলল বিলা।

বেশ করেছি। আমি ইংরেজি বলে কোন সাবজেক্ট রাখিনি। জেনারেল নলেজ হিসেবে আমি যা খুশি পড়াতে পারি! এ বিষয়ে তোদর সঙ্গে কথা বলব না। প্রচণ্ড উত্তেজিত দেখাচ্ছিল ব্ৰজমাধবকে।

খুরকি নরম গলায় বলল, স্যার রাগ করবেন না।

এসব শুনে কেউ চুপ করে থাকতে পারে না।

ছেড়ে দিন। ওরা সব অ্যান্টি পার্টি!

ওদের নিয়ে এসেছ কেন তুমি?

কি করব! এক বস্তিতেই থাকি! কিন্তু আপনি কিছু না দিলে আমার মুখ থাকে না। বেইজ্জত হয়ে যাব।

ব্ৰজমাধব ভাল করে খুরকিকে দেখলেন। তারপর বললেন, তুমি কাল সকালে নুকুকে নিয়ে আমার কাছে এসো।

আচ্ছা স্যার। কিন্তু—

কোন শ্মশানে নিয়ে যাবে?

নিমতলা!

ওখানে তো ইলেকট্রিক আছে! ঠিক আছে, ছেলেটার মায়ের নামটা আমাকে বলে যাও। তোমরা বডি নিয়ে গেলে ওরা পোড়াবার চার্জ নেবে না। আমি লোক পাঠিয়ে ব্যবস্থা করব।

প্রচণ্ড হতাশ হল মুখগুলো। শেষপর্যন্ত বিলু বলল, পুরো টাকাটাই ফিরি হয়ে যাবে?

ব্ৰজমাধব বললেন, বললাম তো! তোমাদের হাতে টাকা দেব না। নাম কি ওর মায়ের?

খুরকি ন্যাড়াকে বলল, আবে, তোর মায়ের নাম কি?

ন্যাড়া মাথা নাড়ল। একটু ভাবল, তারপর বলল, পুরো নাম জানি না, বাপ তো পুনি বলে ডাকত।

ব্রজমাধব বললেন, বাঃ, ছেলে হয়ে মায়ের নাম জানে না! হাসপাতালে কি নাম লিখিয়েছ?

বিলুর মনে পড়ল সেটা লিখিয়েছে অনু, অনুপমা। কাগজটা তার কাছেই আছে। পকেট থেকে সার্টিফিকেট বের করে সে অর্কর দিকে বাড়িয়ে দিল, পড় তো নামটা।

অর্ক পড়ল, অন্নপূর্ণা!

০৪. অনুর মা এখন ফুলের বিছানায়

অনুর মা এখন ফুলের বিছানায় শুয়ে আছে। শ্যামবাজারের মোড় থেকে অর্ক ফুল কিনে এনেছিল কিন্তু একটু আগে নুকু ঘোষ বিরাট একটা মালা পাঠিয়ে দিয়েছে। খাঁটিয়ার চারপায়ে ধূপ জ্বলছে। সারাদিন রোদে পুড়ে যদিও অনুর মায়ের মুখ কালো তবু এত সাদা ফুলে তাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে। অর্ক আর বিলু গিয়েছিল ফুল আনতে, আসার আগে পাঞ্জাবীর দোকান থেকে রুটি আর কষা মাংস খেয়ে এসেছে। দারুণ খেতে। অর্ক এই প্রথমবার খেল। ব্যাপারটা ওরা চেপে গেছে অন্যদের কাছে। অর্ক দেখল, ক্যাশিয়ার হবার বেশ মজা আছে, চট করে কেউ হিসেব জিজ্ঞাসা করে না। ওরা যখন অনুর মাকে সাজাচ্ছিল তখন মাধবীলতা গলি থেকে বেরিয়ে এল। চারটের সময় টিউশনিতে যায় সে পাইকপাড়ার ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে।

সারাদিন ছেলে ঘরে ফেরেনি। দুপুরের রান্না করা ভাত হাঁড়িতেই পড়ে আছে। অপেক্ষা করে করে অনেক বেলায় খেয়েছে মাধবীলতা। অনিমেষ বলেছিল, মৃতদেহ ম্যানেজ করা খুব ঝামেলার ব্যাপার, আজকের দিনটা আর কিছু বলো না ওকে।

মাধবীলতা অনিমেষের দিকে তাকিয়েছিল, তোমার ছেলে তুমি বুঝবে, আমার কি!

অনিমেষ এই রকম কথাবার্তা সহ্য করতে পারে না। এক ধরনের নিরাসক্তির আড়ালে তীব্র খোঁচা থাকে যা হজম করা মুশকিল। সে বলল, ছেলে কিন্তু তোমার, তুমি অনিচ্ছা করলে ও আসতো না।

মাধবীলতা চমকে মুখ ফেরাল। তারপর কিছুক্ষণ অনিমেষের দিকে তাকিয়ে রইল। অনিমেষের অস্বস্তি হল এবার। আঘাতটা দিতে যত আনন্দ হচ্ছিল দিয়ে দেবার পর ততই বিস্বাদ লাগল। হঠাৎ ওর মনে হল তার দিকে তাকিয়ে আছে বটে কিন্তু মাধবীলতা তাকে দেখছে না। ওর দৃষ্টি হঠাৎ শূন্য হয়ে গিয়েছে। অবশ্য খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিল মাধবীলতা। কিন্তু এ প্রসঙ্গে আর একটিও কথা বলল না।

অর্ক দুপুরে বাড়িতে খেতে যায়নি এ রকমটা এর আগে হয়নি। দুপুর থেকেই অর্ক এ নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল। কিন্তু সঙ্গীরা কেউ যখন খেতে যাচ্ছে না তখন সে যায় কি করে! স্বাস্থ্যের কারণেই হোক কিংবা ক্লাস নাইনে পড়ছে বলেই ওরা ওকে দলে নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ওদের প্রত্যেকের বয়স ওর চেয়ে পাঁচ থেকে দশ বছর বেশী। খিদে পেয়েছে বলে বাড়িতে যাওয়া তাই প্রেস্টিজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শ্যামবাজার থেকে বিলুর সঙ্গে খেয়ে এসে শরীরটা ঠাণ্ডা হলেও মন হয়নি। এই নিয়ে মায়ের মুখোমুখি হতেই হবে অর্ক জানে। এইসময় সে শিবমন্দিরের পাশের রকে বসে মাধবীলতাকে বেরিয়ে আসতে দেখল। ফুল দিয়ে সাজাবার পর আবার ভিড়টা জমেছে। মাধবীলতা সেদিকে না তাকিয়ে ট্রাম রাস্তার দিকে চলে গেল।

মড়ার পাশে হরিপদ বসেছিল। অনুপমাও আর কাঁদছিল না। জ্ঞান ফেরার পর হরিপদ কারো সঙ্গে কথা বলছিল না। কিলা চেঁচিয়ে বলল, চল বে, আর দেরি করে লাভ নেই।

সঙ্গে সঙ্গে সাজসাজ পড়ে গেল। অর্ক ঠিক করেছিল এবার সে কাঁধ দেবে না। সকালবেলায় যথেষ্ট শিক্ষা হয়ে গিয়েছে। চারজনের কাঁধে অনুর মা ওপরে উঠতেই খুরকি শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করল, বল হরি আবে হরি বল্। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল অন্যান্যরা, বল বল্ হরি বল্।

কিল্লা এবার লাফিয়ে পড়ল সামনে। শরীরটাকে বেঁকিয়ে চুরিয়ে হাঁটু ভেঙ্গে চিৎকার করল, হ্যারি হ্যারি বোল্ বল, চল বে চল্ চল্। এই চিৎকার বল্লমের মত উড়ে যাচ্ছিল চারপাশে। ঈশ্বর পুকুর লেন দিয়ে ওরা যখন এই রকম ভঙ্গী নিয়ে শব্দ করতে করতে বের হচ্ছে তখন আশে পাশের বাড়ির সামনে ভিড় জমে গেছে। অর্ক পাশে পাশে হাঁটছিল। কিলা তাকে বলল, লে বে, তুই স্লোগান দে। অর্ক একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, কি স্লোগান দেব?

আরে ওই একটা ছাড়া তো অন্যকথা বলা যাবে না।

দ্রুত হাঁটতে হচ্ছে বলে অর্ক প্রথমটায় কাঁপা গলায় বলল, হরি বোল। কিন্তু বলেই বুঝল ঠিক হল না। ওই মড়া নিয়ে যাওয়ার স্পীডের সঙ্গে এইরকম করে বললে চলবে না। ওরা এখন ঠিক ট্রাম রাস্তার মাঝখান দিয়ে যাচ্ছে। ফলে পেছনের গাড়িগুলো হাঁটিহাঁটি করে আসছে। আর জি কর ব্রিজ থেকে নামবার সময় অর্ক খুঁজে পেল। দলের সামনে ছুটতে ছুটতে সে চেঁচাল, ব হরি হরি বল্। একটা সুর এবং তালে শব্দচারটি উচ্চারিত হওয়ায় কিলা সেই ছন্দে কোমর এবং বুক দোলাতে লাগল। ক্রমশ সেটা সংক্রামিত হয়ে গেল পুরো দলটায়। এমন কি যে চারটে ছেলে কাঁধ দিয়েছিল তাদের একজন চেঁচিয়ে উঠল, আবে গাণ্ডুরা, আমি নাচব না? খুরকি ন্যাড়াকে বলল, যা বে, তুই নিজের মাকে কাঁদ দে, কোয়াকে ছেড়ে দে।

ন্যাড়া খিঁচিয়ে উঠল, আমি ছোট না? চারটে কাঁধ সমান হবে? ন্যাড়া কথা বলতে বলতে শরীর দোলাচ্ছিল অর্কের স্লোগানের ছন্দে। ততক্ষণে দলটা এসে গেছে শ্যামবাজারের মোড়ের কাছে। সুভাষ বোসের মূর্তির সামনে হঠাৎ কোয়ারা খাঁটিয়া নিচে নামিয়ে রেখে টুইস্ট শুরু করে দিল। সেই ভর বিকেলে পাঁচ রাস্তা ধেয়ে ছুটে আসা অজস্র গাড়ি বাধ্য হল দাঁড়িয়ে পড়তে। ফুটপাথে ভিড় জমে গেল। ট্রাফিক পুলিসগুলো দাঁত বের করে হাসতে লাগল ব্যাপারটা দেখে। পনের জন ছেলে উত্তাল নেচে যাচ্ছে মড়ার খাঁটিয়া নামিয়ে। তাদের ঠিক পেছনে একটি প্রৌঢ় খোঁচা দাড়ি নিয়ে সাদা চোখে তাকিয়ে। যেন সামনে কি হচ্ছে সে দেখতেই পাচ্ছে না। তার গা ঘেঁষে একটি যুবতী মেয়ে গায়ে শাড়ির আঁচল জড়িয়ে ডানদিকের হোর্ডিং-এর পোস্টার দেখছে। সেখানে মিঠুন এইরকম নাচের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে স্লোগানটা একটু পাল্টেছে। অর্কর মুখ থেকে বিলুর মুখে পৌঁছে গিয়ে সেটা তীব্র স্বরে উচ্চারিত হচ্ছে, হ্যারি বোল্ ডিস্কো বোল হ্যারি কিসকো। পনেরটা শরীর এখন নেতাজীর সামনে উত্তাল, সেগুলো অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ভাঙ্গছে, বুক এবং শুকনো নিতম্ব চরকির মত ঘুরছে।

এই সময় একটা মোটর বাইক শব্দ করে এসে থামল সামনে। বৃহৎ চেহারার এক সার্জেন্ট চেঁচিয়ে উঠল, এই শালা শুয়ারের বাচ্চারা, মড়া তোল। চকিতেই অনুর মা আবার কাঁধে উঠে গেল। যদিও নৃত্য এবং স্লোগান থামল না তবু সেই গতিতেই দলটা মোড় পেরিয়ে ভূপেন বোস অ্যাভিতে ঢুকে গেল। অবিরত গাড়ির হর্ন বাজছে পেছনে, সার্জেন্ট ট্রাফিকের জট ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পাতাল রেলের খোঁড়াখুঁড়িতে ভূপেন বোস অ্যাভিন্যকানা হয়েছিল, এদের মিছিল সেখানে ঢুকে পড়ায় ট্রাফিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। একটা অ্যাম্বুলেন্স নড়তে পারছিল না এক চুল। মুখ বের করে ড্রাইভার চেঁচিয়ে উঠল, ও দাদারা একটু ছেড়ে দিন, স্ট্রোক কেস নিয়ে যাচ্ছি।

কিলা বলল, নিয়ে যেতে হবে না, খাঁটিয়ায় শুইয়ে দে।

.

নিমতলায় যখন ওরা পৌঁছাল তখন সন্ধ্যে পেরিয়ে গেছে। দুটো পা ভারী হয়ে উঠেছিল অর্কর, গলা প্রায় ভেঙ্গে গেছে। মড়া নামিয়ে রাখতেই কটু গন্ধ নাকে এল। নিমতলায় এই প্রথম আসা। ওর। বিলু বলল, আবে অক্ক, চল দেখে আসি আমরা ক’লম্বর!

নম্বর?

তুই শালা বিয়ে করতে এসেছিস নাকি যে এলি আর ঢুকিয়ে দেবে? চল বে?

শ্মশানের ভেতরে ঢুকল ওরা। দাউ দাউ করে চিতা জ্বলছে দুটো। তাদের ঘিরে শ্মশানযাত্রীরা বিহ্বল চোখে তাকিয়ে। অর্ক দুটো পা দেখতে পেল, চিতা থেকে বেরিয়ে আছে, তখনও পোড়েনি। ওর শরীরটা গুলিয়ে উঠল। কটু গন্ধটা যে মড়া পোড়ার তা বুঝতে অসুবিধে হল না আর। ইলেকট্রিক চুল্লির ওখানে বেশ ভিড়। মড়া যেমনভাবে এসেছে তেমনভাবে সুযোগ পাবে পুড়তে। বিলু বলল, তাড়াতাড়ি আমাদের নাম লেখা নইলে মড়া পচবে।

ভিড়ের মধ্যে অর্ক এগোচ্ছিল। এই সময় কানে এল, তাড়াতাড়ি পোড়াবেন? সে মুখ ফিরিয়ে দেখল একটা শুড্যা চোরের মত তাকে দেখছে। এ শালা নির্ঘাৎ দালাল। সে হাত নাড়ল, ফোর্ট।

ঠিক তক্ষুনি একজন ভদ্রলোক লোকটাকে ডাকল, এই যে ভাই, হবে?

আপনাকে বলেচি তো একস্ট্রা তিরিশ ছাড়তে হবে। এসব লাইনে অনেক খরচ, ভাগ বাঁটোয়ারা আছে। লোকটা রোয়াবের সঙ্গে বলল।

ওটা কুড়ি কর।

দূর মাইরি, আপনি ভদ্রলোকের ছেলে?

মানে?

নিজের বাপকে পোড়াবেন তবু দর কষাকষি করছেন। কুড়ি আর তিরিশে পার্থক্যটা কি? আপনার চান্স আসতে আরো চার ঘণ্টা লেগে যাবে। আর এর মধ্যে যদি কোন এম এল এর রেফারেন্স এসে যায় তো হয়ে গেল! রাজি হলে আধঘণ্টার মধ্যে তুলে দেব। দালালটা বলল।

গোলমাল হবে না তো?

সে রিস্ক আমার। তারপর গলা নামিয়ে বলল, দুটো জেনুইনের পর একটা ফলস ঢোকানো আছে আপনাদের জন্যে।

ঠিক আছে।

মালটা ছাড়ুন তাহলে।

আগে দিতে হবে?

হ্যাঁ, তাই নিয়ম।

অর্ক আর দাঁড়াল না। ভিড় ঠেলে টেবিলের সামনে পৌঁছাতে অসুবিধে হচ্ছিল। সে কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে চিৎকার করল, সোরে যান মোশাই। এর মধ্যেই সে জেনেছে যে এইভাবে কথা বললে, দারুণ কাজ হয়। কিলা কিংবা খুরকির মত তার উচ্চারণ সঠিক হয় না বটে তবু কাজ দেয়। এখানেও তাই হল। খুব হেক্কড় নিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, অনেকক্ষণ বসে আছি, কত দেরি হবে?

এখানকার লোকগুলো বোধহয় ঘাটা-পড়া, এইসব কথায় অভ্যস্ত। মুখ তুলে দেখল না পর্যন্ত, বলল, নাম লিখিয়েছেন?

কিসের নাম?

আট ঘণ্টার আগে হবে না। ফাস্ট কাম ফাস্ট সার্ভ।

হঠাৎ অর্কর মনে পড়ল ব্রজমাধব পালের কথা। সে বলল, খাতা খুলে দেখুন ব্রজবাবু নাম লিখিয়ে গিয়েছে।

কে ব্রজবাবু? ওসব নাম বললে কোন কাজ হবে না। পাবলিক এতক্ষণ কষ্ট করে দাঁড়িয়ে আছে আর এখানে ব্রজবাবু। বলতে বলতেই যেন কিছু মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গীতে চোখ তুলল লোকটা, কি বললেন নামটা!

ব্রজমাধব পাল

দ্রুত খাতাটা টেনে নিয়ে লোকটা নামগুলোয় চোখ বুলিয়ে বলল, ডেডবডির নাম কি?

অন্নপূর্ণা

এবার লোকটা খিঁচিয়ে উঠল, এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? ডেকে ডেকে গলা ভেঙ্গে গেল কেউ সাড়া দিল না। আপনার পরে এসে বডি উঠে গেছে আর–। যাক, এর পরে আপনারা, বডি নিয়ে আসুন আর সার্টিফিকেটটা দিন।

হাসপাতালের কাগজটা হাতে তুলে দিয়ে অর্ক বলল, টাকা পয়সা তো সব দিয়ে দেওয়া হয়েছে,?

হ্যাঁ। সে জ্ঞান দেখছি টনটনে।

অর্ক বেরিয়ে আসছিল এমন সময় আর একটা লোক চেঁচিয়ে উঠল, কি ব্যাপার মশাই, আমরা কি আঙ্গুল চুষতে এসেছি?

খাতা-সামনে লোকটা বলল, মানে?

এইমাত্র শালা ওদের বডি নামাতে দেখলাম আর আপনি আগে তুলে দিচ্ছেন?

আপনি কখন বডি নামাতে দেখেছেন জানি না কিন্তু আমার খাতায় তিন ঘণ্টা আগে নাম উঠে গেছে। আমি সেটাই দেখব।

তাহলে তো পেসেন্ট হাসপাতালে গেলেই এখানে নাম লেখাতে হবে।

তাই করবেন।

ঠিক আছে, দেখি ওই মড়া কি করে পোড়ে! এ্যাই পঞ্চু! লোকটা চেঁচিয়ে ডাকতেই একটা মাস্তান-দেখতে ছেলে এগিয়ে এল, কি দাদা! লোকটা তাকে ফিসফিসিয়ে কিছু বলতেই মাস্তানটা এগিয়ে এল অর্কর সামনে, আবে, আগে এদের বডি পুড়বে তারপর অন্য কথা। আমার নাম পঞ্চু।

কে পঞ্চু! অর্কর মাথায় আগুন জ্বলে উঠল।

তোর বাপ।

সঙ্গে সঙ্গে হাত চালালো অর্ক। ডান হাতের পাঞ্জার পাশ দিয়ে তীব্র আঘাত করল পঞ্চুর চোয়ালে। কিছুটা হড়কে গিয়ে ঝট করে ছুরি বের করল পঞ্চু। অর্ক সেটা দেখতে পেয়েই দৌড়াতে শুরু করল সামনে। বিকট আওয়াজ করে পঞ্চু পেছনে আসছে। মুহূর্তেই ওর দলের ছেলেরা হ্যা হ্যা করে যোগ দিল ওর সঙ্গে।

অনুর মায়ের শরীরটার কাছে পৌঁছেই অর্ক চেঁচিয়ে উঠল, কিলা, শালারা আসছে!

ওরা বসেছিল। ডাকটা শুনেই তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। দলটাকে দেখে থমকে দাঁড়াল পঞ্চুরা। শুধু পঞ্চু চেঁচাল, আবে, এগিয়ে আয়, কোন বাপ তোকে বাঁচায় দেখি!

খুরকির হাতে খুর এসে গিয়েছে এর মধ্যে। সে এক পা এগিয়ে জিজ্ঞাসা করল, পঞ্চু না?

আবে খুরকি! পঞ্চুর গলা পাল্টে গেল।

র‍্যালা নিচ্ছিস কেন বে? খুরকি খুরটা নাচাচ্ছিল।

আরে ওস্তাদ, তোমার পার্টি নাকি ও?

হ্যাঁ।

শালা আমার গায়ে হাত চালিয়েছে।

খুরকি টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে। কিলা বলল, বেশ করেছে। পঞ্চু বলল, না ওস্তাদ, এর বদলা আমি নেব। নিমতলায় এসে আমার গায়ে হাত তুলে ফিরে যাবে এমন মাল আজও পয়দা হয়নি।

দুটো হাত দুপাশে ছড়িয়ে বুক চিতিয়ে খুরকি বলল, লে শালা বদলা নে। দেখি কোন খানকির ছেলে এদিকে আসে।

পঞ্চু একমুহূর্ত ভাবল। তারপর বলল, কিন্তু বিচারটা ঠিক হল? তুমি মাইরি লাইনের ওস্তাদ তুমি ঠিক বিচার করলে?

ওদের মধ্যে হাত দশেকের ব্যবধান। অন্যান্য শ্মশানযাত্রীরা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছে। খুরকি পঞ্চুকেই জিজ্ঞাসা করল, কেন হাত তুলেছিল?

পঞ্চু জবাব দিল, ওই বডি তোমাদের তা জানতাম না। আমাদের বডি আগে এসেছে আর ও শালা ম্যানেজ করে প্রথমে পোড়াতে যাচ্ছে দেখে বলতেই হাত তুলল।

অর্ক উত্তেজিত ছিল। পঞ্চু তাড়া করার সময় সে সত্যি ভয় পেয়েছিল। এখন খুরকির প্রতাপ দেখে সে অনেকটা সাহস ফেরত পেয়েছিল। চিৎকার করে বলল, মিথ্যে কথা। আমি ওর নাম জিজ্ঞাসা করতে বলেছিল ও নাকি আমার বাপ।

বলেছিলি? খুরকি জিজ্ঞাসা করল।

এতো আমরা বলেই থাকি! তাই বলে হাত তুলবে?

ঠিক করেছে, শোধবোধ হয়ে গিয়েছে। তুই মিটমাট করবি কিনা সেটাই বল? খুরকির মুখ বিকৃত হল।

পঞ্চু সেদিকে তাকিয়ে যেন হাল ছাড়ল, ঠিক আছে ওস্তাদ। তোমার কথায় আমি ছেড়ে দিলাম। কিন্তু আর কোনদিন যদি পাই তো দেখিয়ে দেব এ তোমায় বলে রাখছি।

ওরা চলে গেলে খুরকি বলল, হারামি!

কিলা বলল, ঝাড়লি না কেন?

খুরকি মাথা নাড়ল, শালার সঙ্গে জেলে ছিলাম না?

এইবার অর্ক বলল, চল, বডি নিয়ে চল।

সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেল সবাই। হই হই করে অনুর মাকে ইলেকট্রিক চুল্লির কাছে নিয়ে যাওয়া হল। কিলা জিজ্ঞাসা করল, ব্রজটা টাকা দিয়েছে এখানে?

অর্ক মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।

তোর কাছে মাল আছে?

গুণে দেখিনি।

দ্যাখ বে।

অর্ক পকেট থেকে টাকা বের করে বলল একশ বিশ। কিলা হাত নাড়ল, যা বাব্বা, তিরিশ টাকা হাপিস!

বিলু বলল, এ শালা কি বে! ফুল কিনতে হল, ফুলের দাম জানিস? কোনদিন কিনেছিস?

কিলা বিহ্বল চোখে অনুর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ফুল শালা এত দামী!

চুল্লিতে ঢোকাবার সময় অনুপমা ছাড়া আর কেউ কাঁদল না। হরিপদ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। অর্ক দেখল কোয়া অনুর কাঁধে হাত রেখে খুব সান্ত্বনা দিচ্ছে। কোয়ার দাঁড়ানোর ভঙ্গীটা খুব খারাপ। সে চেঁচিয়ে ডাকল, অ্যাই কোয়া?

সেইভাবেই দাঁড়িয়ে কোয়া বলল, কি বে?

ওর লাভার আছে।

কথাটা কানে যাওয়া মাত্র অনুপমা কোয়ার শরীরের কাছ থেকে ছিটকে সরে গিয়ে মায়ের জন্যে কাঁদতে লাগল। কোয়া এগিয়ে এল অর্কর কাছে, তুই মাইরি কথাটা বলার আর সময় পেলি না। বেশ লাইন হচ্ছিল।

এই সময় বিলু বলল, আর তো কিছু করার নেই। অ্যাই ন্যাড়া, তুই তোর বাপদের নিয়ে ফিরে যাস। অক্ক, তুই ওকে দশটা টাকা দে।

কেন?

ডোমরা চাইতে পারে।

অর্ক পকেট থেকে দশটা টাকা বের করে এক মুহূর্ত কি ভেবে ন্যাড়াকে এড়িয়ে হরিপদর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হরিপদ পাথরের মূর্তির মত বসে আছে। তার উপস্থিতিতেও কোন সাড়া নেই। অর্ক বুঝল হরিপদকে টাকা দিলে কাজ হবে না। ন্যাড়া পেছন থেকে বলল, আমাকে টাকা দিতে বলল, আমাকেই দাও।

অর্ক হাত নাড়ল, ফোট! তারপর একা দাঁড়ানো অনুর সামনে গেল, এই টাকাটা নাও।

অনুর মুখ ফোলা, চোখ লাল। অর্ককে দেখতে পেয়ে যেন স্বস্তি পেল। বলল, কেন?

আমরা যাচ্ছি। যদি কোন দরকার লাগে তুমি খরচ করবে, ন্যাড়াকে দিও না। টাকাটা অনুর হাতে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই অর্কর চোখে পড়ল দূরে একটা লোক কাউকে খুঁজতে খুঁজতে এদিকে আসতেই ওদের দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়াল। এখন এমন ভান করে দাঁড়িয়ে আছে যেন এদিকে কোন মনোযোগ নেই ওর। লোকটাকে চিনতে পারল সে। অনুর লাভার! ঈশ্বরপুকুরে থাকে না তবে কাগজ দেয়। সে বলল, আর তোমার চিন্তা নেই, পেছন দিকে তাকিয়ে দ্যাখো!

অনু একটু অবাক হয়ে পেছন ফিরে দেখল। তারপর লোকটাকে চিনতে পেতেই আবার সজোরে কেঁদে উঠল। অর্ক জিজ্ঞাসা করল, আরে, আবার কি হল?

ওকে চলে যেতে বল, ও যেন না আসে। অনু কাঁদছিল।

কেন? কিছুই বুঝতে পারছিল না অর্ক।

মা মরার আগে ওকে চায়নি, ওর জন্যেই মা মরেছে! অনুর কান্না থামছিল না।

অর্কর মেজাজ গরম হয়ে গেল। সে বলল, ফোট তো! মরা মানুষের কথার কোন দাম আছে নাকি! আজব চিজ মাইরি। বলে হন হন করে এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। অনুকে কাঁদতে শুনে মুখ ফিরিয়েছিল লোকটা এবার অর্ককে দেখে চোখ নামাল। অর্ক বলল, আমরা কাটছি, আপনি কেসটা টেক আপ করুন।

বিলু বোধহয় পুরো ব্যাপারটা দেখেছিল। অর্ক কাছে আসতে আফসোসের গলায় বলল, যাঃ শালা! আগে জানলে দশ টাকা ছাড়তাম না!

কেন? অর্ক হতভম্ব।

ন্যাড়ার জামাইবাবু খরচা করবে, আমরা কে বে? নারে কোয়া?

কোয়া জিজ্ঞাসা করল, শালাকে ঝাড়ব?

অর্ক চেঁচিয়ে উঠল, না!

কোয়া চমকে গেল, কি বে, চেঁচাচ্ছিস কেন?

অর্ক কিছু বলল না। সে নিজেই বুঝতে পারছিল না কেন এমন করে চেঁচিয়ে উঠল। এই সময় কিলা ডাকতেই ওরা ওইদিকে এগিয়ে গেল। এর মধ্যে দলটা ছোট হয়েছে। বোধহয় খুরকি আর কিলা কিছু ফালতু মালকে ফুটিয়ে দিয়েছে। তারা ফিরে গিয়েছে ঈশ্বরপুকুরে। অর্ক দেখল শ্মশান ছেড়ে ওরা নদীর ধার দিয়ে বাগবাজারের দিকে এগোচ্ছে। ওর দুটো পায়ে বেশ ব্যথা করছিল এবং খিদেও পেয়ে গেছে এতটা পরিশ্রমের ফলে। সে বলল, বাসে ওঠ, আর হাঁটতে পারছি না।

বাস কি বে, ট্যাক্সি বল! কোয়া উত্তর দিল। সঙ্গে সঙ্গে অর্কর মনে পড়ল ওর পকেটে এখনও প্রচুর টাকা অতএব ট্যাক্সিতে চড়া যেতে পারে।

কথাটা শুনে খুরকি কিলাকে বলল, এ শালারা কি ধুর মাইরি! নিমতলায় এসেও পেসাদ না নিয়ে ফিরে যাবে! সে কিলার কাঁধে হাত রেখে হাঁটছিল। কিলা বলল, আমাদের অক্কবাবু বড় ভাল ছেলে। ওর মা তো মাস্টারনি, তাই!

অর্ক পেছন থেকে কথাটা শুনে চোখ কুঁচকে তাকাল। মাকে নিয়ে কোন রসিকতা করছে নাকি? কিন্তু খুরকি কথাটার জবাব না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল, আবে অক্ক, তুই ভদ্রলোক?

অর্ক বলল, তুই কি?

আমি ফালতু আদমি, খুর চালাই। তবে এক নম্বর, ভদ্রলোকেরা দু নম্বর হয়। তুই?

জানি না।

জানতে হবে। নইলে না ঘাটকা না ঘরকা থেকে যাবি। যেই পঞ্চু তাড়া করবে অমনি লেজ গুটিয়ে পালাবি!

পঞ্চুর নামটা শুনতে পাওয়া মাত্র ভেতরে ভেতরে গুটিয়ে গেল অর্ক। পঞ্চুর গালে সে হাত চালিয়েছিল ঠিক কিন্তু ও মাল বের করতেই তার মনে হয়েছিল পালানো ছাড়া বাঁচবার পথ নেই। কেন? কেন সে রুখে দাঁড়াল না। পঞ্চু তো খুরকির মত রোগা, গায়ের জোরে তার সঙ্গে পারতো না। তবে? তবু অপমানটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছিল ওর, তোরা পালাস না? সেবার হেমির পার্টি পাড়ায় চার্জ করেছিল যখন তখন তোরা হাওয়া হয়েছিলি না?

খুরকি বলল, সে ওদের কাছে যন্তর ছিল, দলে ভারী ছিল তাই।

অর্ক হাসল, সে কথাই বলছি। সব সময় রুখে দাঁড়ালে বিপদে পড়তে হয়, মোকা দেখে লড়, তাই না বিলু?

বিলু বলল, এসে গেছি।

এদিকের রাস্তায় আলো জ্বলে না বোধহয়। কিছু হোগলার ছাউনি আছে নদীর গা ঘেঁষে। খুরকি একটা লোককে ডাকতেই সে অন্ধকার ছুঁড়ে উঠে এল। তার সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলে ওরা রাস্তা পেরিয়ে একটা গলির মুখে চলে এল। এখন রেডিওতে নাটক হচ্ছে। আশে-পাশের বাড়িগুলোয় আলো জ্বলছে না। বোধহয় লোডশেডিং। অর্ক দেখল চাঁদ উঠেছে। এ এমন চাঁদ যার কোন জ্যোৎস্না নেই। মোক্ষবুড়ির বুকের মত। কেউ দুবার তাকায় না।

ভাঁড়ে ভাঁড়ে মাংস আর শাল পাতায় রুটি এসে গেল। সেই লোকটাই নিয়ে আসছিল। খুরকি বলল, অক্ক, ওকে চব্বিশ টাকা দিয়ে দে।

কিলা বলল, চব্বিশ কেন রে?

আটজনের রুটি-মাংস, ওই টাকায় তোর নাং দেবে? লোকটা দাঁড়িয়েছিল। আবছা আলোয় অর্ক দেখল লিকলিকে লোকটা মড়ার মত চোখে তাকিয়ে আছে। সে তাড়াতাড়ি টাকাটা দিয়ে দিতেই লোকটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। অর্ক বলল, তোদের মাইরি যা টেস্ট, যা টাকা ছিল তাতে ভাল রেস্টুরেন্টে খেতে পারতাম।

ওরা রকে বসে খাচ্ছিল। কথাটা শুনে কিলা খিকখিক করে একটু হাসল। মাংসটা রেঁধেছে ভাল তবে বড্ড ছিবড়ে। খাওয়া শেষ হতেই খুরকি সিটি মারল। তারপর বলল, অক্ক, দশটা টাকা দে।

আবার কি?

মধু খাব বে, নইলে এখানে আসে কেউ। মাল!

টাকাটা হাত বদল হল। তারপরেই একটা স্ত্রীলোক চারটে গ্লাস আর বোতল নিয়ে এল। অর্ক দেখছিল। খাওয়ার পর হাত ধোওয়া হয়নি। এই জিনিস ওদের খেতে দেখেছে সে অনেকবার। তিন নম্বরের সামনে শিবমন্দিরের পেছনে বসে এটা নিত্য খাওয়া হয়। সে সঙ্গে থেকেছে কিন্তু কোনদিন খায়নি। কেন খায়নি সেটা ভাবা বৃথা! টপাটপ মেরে দিচ্ছিল ওরা। চারজন খেয়ে গ্লাসগুলো অন্য চারজনের হাতে তুলে দিচ্ছিল।

বিলু বলল, তুই তো কখনও খাসনি, আজ টেস্ট কর।

অর্ক হাসল, মাতাল হয়ে যাব না তো?

না বে। আমরা আছি কি করতে?

অন্ধকারে ঢোক গিলল অর্ক। তারপর উৎকট গন্ধযুক্ত তরল পদার্থ গলায় ঢেলে দিল। বুক জ্বলছে, গা গোলাচ্ছে। পিচ করে এক দলা থুতু ফেলল সে। বিলু হাসল, দ্যাখ মাইরি খুরকি, অক্কর মুখটা দ্যাখ!

দাঁতে দাঁত চেপে অর্ক বলল, আর এক গ্লাস দে।

০৫. উঠে দাঁড়াতে গিয়ে অর্ক দেখল

উঠে দাঁড়াতে গিয়ে অর্ক দেখল শরীর নড়বড়ে, দুটো হাঁটু যেন অকেজো হয়ে গিয়েছে। চোখের দৃষ্টি বারংবার ঝাঁপসা হয়ে যাচ্ছে। আর পেটের ভেতরে জমে থাকা যাবতীয় তরল এবং গলিত পদার্থ পাক খেয়ে ঢেউ-এর মত গলা অবধি উঠে আবার নেমে যাচ্ছে। যতক্ষণ বসেছিল ততক্ষণ এসব এমন করে টের পায়নি। দু’তিন গ্লাস খাওয়ার পর বেশ মজা লাগছিল। একমাত্র খুরকি আর কিলা ছাড়া বাকিরা বেশ আলতু ফালতু বকছিল। সেই স্ত্রীলোকটি অন্ধকার থেকে বোতল আনছিল আর শুড্যাটা টাকা নিয়ে যাচ্ছিল। প্রথম প্রথম হিসেব ছিল ঠিকঠাক, কত টাকা খরচ হচ্ছে মনে রাখতে পারছিল কিন্তু তারপরেই সব গুলিয়ে গেল। এখন পকেটে টাকা আছে কিন্তু কত আছে তা সে জানে না। শরীরের সমস্ত শক্তি যখন আচমকা মরে গেল তখনও তার ভাবতে কোন কষ্ট হচ্ছিল না। অন্যদের থেকে যে তার বুদ্ধি সাফ এটুকু জেনে সে খুশি হচ্ছিল। কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই লোডশেডিং-এর মত সেটুকু হারিয়ে গেল। এখন মাথার ভেতরে কিছু নেই, একটা ঢেউ-এ ভাসছে যেন সে। কেউ যেন তাকে টানছে, অর্ক মুখ ফিরিয়ে দেখবার চেষ্টা করল, কে বে?

গলার স্বর নিজের কাছেই অচেনা মনে হল। কেমন মোটা এবং জড়ানো।

খুরকি বলল, এদিকে আয়।

কেন বে?

খুরকিও টলছিল। মুখের সামনে হাত নেড়ে বলল, ভেগে পড়ি চল। এ শালারা আউট হয়ে গিয়েছে। কথাটা শেষ করেই খুরকি ওর বাজু ধরে টানতেই অর্ক হাঁটতে লাগল। গঙ্গার দিকে নয়, বিপরীত দিকের গলিতে ওরা ঢুকে পড়েছে। চারধার ঘুটঘুটে অন্ধকার। কয়েক পা যাওয়া মাত্র পেছন থেকে ডাক ভেসে এল, আবে অক্ক, ফুটছিস কেন?

খুরকি দাঁড়িয়ে পড়ল, অ্যাই কিলা, তোকে ডাকব ভেবেছিলাম কিন্তু একদম ভুলে গিয়েছি। এসো দোস্ত, আমরা তিনজনে যাই।

কিলা ততক্ষণে ওদের পাশে এসে পৌঁছেছে, একদম বাতেলা করবি না, আমি ওয়াচ করছিলাম। তুই মুরগিকে নিয়ে হাওয়া হবি আমি জানতাম; ছোড় ইয়ার, আমার নাম কিলা।

খুরকি অর্ককে ছেড়ে কিলাকে জড়িয়ে ধরল, না দোস্ত, তোকে ব্যাণ্ডেজ করতে পারি আমি? হাত মেলাও গুরু, দোস্তি হয়ে যাক।

অর্ক দেখল ওরা অনেকক্ষণ ধরে করমর্দন করল। কিলা কাকে মুরগি বলল? তাকে? অর্ক ঠিক ভেবে পাচ্ছিল না। তাকেই কি? কিন্তু সে কোন ঝামেলায় গেল না। পকেটে এখনও কিছু টাকা আছে। এগুলোকে সামলাতে হবে। দুটো হাত পকেটে ঢুকিয়ে দিল অর্ক।

গলিটা এঁকেবেঁকে একসময় ট্রাম রাস্তায় উঠে এল। এখন চারপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। তার মানে, অর্ক বুঝল, বেশ রাত হয়ে গেছে। তার নিজের হাতে ঘড়ি নেই। সে কিলাকে জিজ্ঞাসা করল, টাইম কত বে?

কি হবে টাইম জেনে?

বাড়ি যাব।

তোর নেশা হয়েছে অক্ক! তুই শালা মাতাল

কোন খানকির ছেলে আমাকে মাতাল বলে? চিৎকার করে উঠল অর্ক, জানিস আমি ভদ্রলোকের ছেলে। আমি বাড়ি যাব।

কিলা বলল, বাড়িতে ঢুকলে তোর মা কি বলবে তোকে? আদর করে চুমু খাবে? বাবা মাল খেয়েছ, এসো হামি খাও। চুক চুক! জিভ দিয়ে শব্দ করল সে।

আর তখনই ভয়টা মনে ঢুকে পড়ল অর্কর। সেকি সত্যি মাতাল হয়ে গেছে? সত্যি মা কি ওকে দেখেই বুঝতে পারবে? হঠাৎ কেমন ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করল ওর। মা শালা তাকে ঠিক প্যাঁদাবে, হয়তো বাড়ি থেকে বের করে দেবে। বাপ শালা নুলো কিন্তু রাগলে চোখ জ্বলে। পুলিসকে প্যাঁদাতো তো এককালে! না, এখনই বাড়ি যাওয়া উচিত হবে না। কিন্তু সত্যি সে মাতাল? ফিস ফিস করে জিজ্ঞাসা করল সে খুরকিকে।

খুরকি বলল, ঠিক হ্যায়, পরীক্ষা হয়ে যাক তুই মাতাল কিনা? মাতাল হলে আমরা বাড়ি যাব না এখন, না হলে ফিরে যাব। ঠিক আছে?

অর্ক ঘাড় নাড়ল।

খুরকি এগিয়ে গেল ট্রাম রাস্তার উপর। এখন দুপাশে ফাঁকা। গাড়ি কিংবা বাস চলছে না। তবে রিকশাঅলারা খুব ছোটাছুটি করছে। খুরকি চেঁচাল, এই কিলা, তুই ওদিকে দাঁড়া। লাইনটার ওপরে।

একটা ট্রাম লাইনের এপাশে খুরকি ওপাশে কিলা দাঁড়াল। ঠিক হল ট্রাম লাইনের ওপর পা ফেলে অর্ক হেঁটে আসবে। যদি ওর পা লাইনের বাইরে পড়ে তাহলে প্রমাণ হবে সে মাতাল। কিলা আর খুরকি দুপাশে বসে এর বিচার করবে।

আমি মাতাল হইনি। এই লাইনের ওপর হেঁটে যাওয়া জলের মত সোজা। অর্ক কিলার সামনে লাইনে পা দিল। তাকে হাঁটতে হবে দশ হাত, যেখানে খুরকি দাঁড়িয়ে টলছে। কিলা চেঁচাল,রেডি। স্টার্ট।

অর্ক পা ফেলল। এই পা কি তার নিজের? অনেক চেষ্টার পর লাইনেই পা পড়ল তার। পেছনের পা টেনে আনতে সাহস পাচ্ছিল না সে কিন্তু এগোতে হলে ওটাকে আনতেই হবে। স্থির হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চোখের দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করার চেষ্টা করল অর্ক। আর সেই সময় কানের কাছে। আচমকা ঢং ঢং শব্দ বেজে উঠল তারস্বরে। অর্ক কোনক্রমে পেছন ফিরে তাকাল। দৈত্যের মত দুই জ্বলন্ত চোখে একটা ট্রাম ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে কখন। ড্রাইভার ঘণ্টা বাজাচ্ছিল, এবার। চিৎকার করে সরে যেতে বলল। এটা বোধহয় শেষ ট্রাম।

খুরকি চেঁচাল, আয় বে, হেঁটে আয়। হাঁটি হাঁটি পা পা! ট্রামের ড্রাইভার যেমন চেঁচাচ্ছে, যাত্রীরাও মুখ বের করে গালাগাল দিচ্ছে। অর্ক পা ফেলল, ঠিক আছে কিন্তু তারপরই সে লাইনের বাইরে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ওরা দুজন চিৎকার করে হাততালি দিয়ে উঠল। অর্ক কিছু বোঝার আগেই গায়ে হাওয়ার ঝটকা লাগল। বিদ্যুৎচমকের মত ট্রামটা তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

তুই শালা মাতাল, ঠিক আছে। খুরকি কাছে এল।

মাতালের কাছে টাকা রাখতে নেই, ছিনতাই হয়ে যায়। কিলা হাত পাতল, টাকাগুলো দে।

পা ফেলতে না পারার জন্যে নয়, ট্রামটার ছুটে যাওয়া শরীর অর্ককে খুব নার্ভাস করে দিয়েছিল। হাত পা অবশ হয়ে গিয়েছিল তার। সে কথাটা শোনামাত্রই সতর্ক হবার চেষ্টা করল, কিসের টাকা?

আরে চাঁদু, এখন বলে কিসের টাকা! বিলা হচ্ছে? ছাড়!

দু’ পকেটে হাত ঢুকিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াল অর্ক, কি বলছিস?

কিলা ওর কাঁধে একটা থাবড়া মারল আস্তে করে, বিকেলবেলা অতগুলো মুরগি কাটলাম ন্যাড়ার মাকে দেখিয়ে, সেই মালগুলো দে বে?

কি করবি? ওটা তো ন্যাড়ার মায়ের টাকা!

একি মাইরি, মাতাল না হরিদাস পাল? হেসে গড়িয়ে পড়ল কিলা, যার নামের টাকা সে তো কখন ফোট হয়ে গেছে, এতক্ষণে ছাই পর্যন্ত নেই। দেবে, আর কথা বলতে ভাল লাগছে না।

অর্ক বুঝতে পারছিল কিলার দাবি না মিটিয়ে সে পারবে না। তবু সে খুরকির দিকে তাকাল। খুরকি এক দৃষ্টিতে ওদের দেখছিল। এবার নীরবে মাথা নাড়ল, কার বাপের টাকা বে?

সঙ্গে সঙ্গে কিলা ঘুরে দাঁড়াল, মানে?

কার বাপের টাকা যে তুই নিবি?

খবরদার খুরকি, বাপ তুলে কথা বলবি না। এ টাকা আমার, সতীশদা আমাকে তুলতে বলেছে। কিলা এগিয়ে যাচ্ছিল খুরকির দিকে। কিন্তু কাছে যাওয়ার আগেই থমকে দাঁড়াল সে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলতে লাগল। খুরকির হাতে তখন একটা চ্যাপ্টা খুর, খুরটাকে তুলে সে পরম স্নেহে চুমু খাচ্ছে। কিন্তু দৃষ্টি কিলার ওপর নিবদ্ধ।

কিলা চেঁচিয়ে উঠল, খুরকি! মাল সরা!

খুরকি উত্তর দিল না কথাটার। একটু হেসে বলল, অক্ক, টাকাটা আমাকে দে!

কিলা দুটো হাত দুপাশে বাড়িয়ে বুক চিতিয়ে বলল, না বে, ও টাকা আমার। সতীশদা না বললে ওই টাকা আমরা তুলতাম না। সতীশদা আমার পার্টির লোক তাই টাকা আমার।

খুরকি হাসল, তোর সতীশের মুখে আমি–ফোট। অক্ক, টাকাটা দে।

অর্ক বুঝতে পারছিল একটা কিছু গোলমাল হতে যাচ্ছে। রাস্তাটা এখন একদম ফাঁকা। সে এদের থামাতে চাইল, মাইরি খুরকি, তুই এত চালাক আর এটুকু বুঝিস না কেন বে?

কি বুঝি না?

নিজেদের মধ্যে গোলমাল করলে মুশকিল হয়।

নিজেদের মধ্যে মানে? ও শালা সতীশের জাঙ্গিয়া

কিলা সঙ্গে সঙ্গে বলল, তুই বে নুকু ঘোষের গেঞ্জি।

ঠিক সেইসময় দূরে একটা গাড়ির শব্দ ভেসে এল। শব্দটা শুনে খুরকি, চকিতে মুখ ফিরিয়ে চিৎকার করল, ভাগ, গিরধর আসছে।

কথাগুলো মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সে ঢুকে গেল পাশের গলিতে। কিলা এগিয়ে আসা গাড়িটাকে ভাল করে দেখে সুড়ুৎ করে সরে গেল।

অর্ক প্রথমে বোঝেনি এরা কেন পালাচ্ছে। কত গাড়ি তো রাস্তা দিয়ে গিয়েছে, এটার কি বিশেষত্ব! তবু ওর মনে হল এই গাড়ি থেকে কোন বিপদ আসতে পারে। কিন্তু সে দৌড়াতে গিয়ে বিফল হল। শরীরের ওপর কোন অধিকার নেই যেন তার। এক পলকে চোখে পড়ল সামনেই একটা রক, রকের একটা দিকে উঁচু দেওয়াল। হুড়মুড় করে সে ওই দেওয়ালের গায়ে শুয়ে পড়তেই একটা লোক চি চি করে উঠল, কে রে, মরে গেলাম, চেপে দিল রে, উঁহু হু। জড়ানো গলায় অর্ক ধমক দিল, চুপ, পেট ফাঁসিয়ে দেব। শোনামাত্রই লোকটা চুপ করে গেল।

অর্ক দেখল সারা শরীরে ছেঁড়া বস্তা চাপিয়ে একটা ভিখিরী টাইপের বুড়ো ওর পাশে শুয়ে জুলজুল করে দেখছে। হঠাৎ ওর বমি পেল। কয়েক গ্লাস বাংলা মদ খেয়ে যা হয়নি এই লোকটির পাশে শুয়ে তাই হল। দাঁতে দাঁত চেপে বমিটাকে সামলাচ্ছিল অর্ক। আর তখনই গাড়িটা এসে দাঁড়াল পাশের রাস্তায়।

ভ্যান থেকে দুতিনজন পুলিস নামল লাফিয়ে। একজন বলল, মনে হচ্ছে শালারা গলিতে ঢুকেছে। ঢুকে দেখব?

মাতাল ফাতাল হবে, ছেড়ে দে।

মাতাল হলে পালাবে কেন?

টর্চের ভারী আলো পড়তে লাগল গলিতে। দেওয়ালের গায়ে। আর তারপরেই দ্রুত ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। পুলিসগুলো গলির মধ্যে ঢুকে গেছে। অর্ক দেওয়ালের আড়ালে উপুড় হয়ে শুয়ে অনেক কষ্টে বমি সামলাচ্ছিল। এইসময় আলো এসে পড়ল রকের ওপর আর সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার, কে ওখানে?

অর্ক ভিখিরীটার পেটে খোঁচা মারল। ভিখিরীটা বলল, আমি। সরু নাকি গলা। চি চি করছে। সার্জেন্ট চিৎকার করল, নেমে আয়।

ভিখিরীটা উঠবে কিনা ঠাওর করতে পারছিল না কিন্তু অর্ক আবার খোঁচা মারতেই উঠে বসল। তারপর ঘষটে ঘষটে পাঁচিলের আড়াল ছেড়ে নেমে এল ফুটে। সার্জেন্ট তার মুখে টর্চ ফেলে হতাশ হল, যা শালা! আর শোওয়ার জায়গা পাস না?

চি চি করে ভিখিরীটা বলল, এখানেই তো শুই।

তখনই গলি থেকে পুলিসগুলো বেরিয়ে এল, সার, মাল পেয়েছি। এ শালার কাছে খুর ছিল।

সার্জেন্ট এগিয়ে গেল ভিখিরীকে ছেড়ে, এসো চাঁদু, নাম কি?

খুরকির গলা শোনা গেল, মাইরি, আমরা কিছু জানি না, কিছু করিনি আমরা।

করিস নি তো ভাগছিলি কেন? হেভি টেনেছে মনে হচ্ছে। এখানে কি করছিলি? সার্জেন্ট জিজ্ঞাসা করল।

আমরা শ্মশান থেকে আসছি। ভ্যান দেখে ভয় লাগল।

তোর কাছে খুর কেন?

কুড়িয়ে পেয়েছি স্যার।

সার্জেন্ট জিজ্ঞাসা করল, তোর নাম কি?

কিলা। শ্মশান থেকে বাড়ি যাচ্ছিলাম।

তোল শালাদের ভ্যানে। সার্জেন্ট ফিরে যাচ্ছিল। কিলা চিৎকার করল, খুরকিকে তুলুন আমাকে না।

খুরকি? ওর নাম খুরকি?

হ্যাঁ।

আরে এ তো সেই বেলগাছিয়ার মাল। চমৎকার। তুমি কে হে নবাব? তোমাকে তুলব না কেন?

আমি পার্টি করি।

আচ্ছা! বেকায়দায় পড়লে সবাই ওই কথা বলে। ও কি করে? কংগ্রেস?

হ্যাঁ।

তোল ওদের।

একটু বাদেই ভ্যানটা চলে যেতেই ওয়াক ওয়াক করে বমি তুলল অর্ক। এবং যতক্ষণ না শেষ জলটুকু পেট থেকে বের হল ততক্ষণ স্বস্তি পেল না। সে শব্দ শুনে ছুটে এসেছিল ভিখিরীটা, চি চি করে চেঁচিয়ে উঠল, হায় বাপ! আমার বিছানার বারোটা বাজাল। তোমাকে আমি বাঁচালাম আর তুমি আমার সব্বনাশ করলে!

অর্ক উঠে বসেছিল। খুব অবসন্ন লাগলেও শরীর শান্ত হয়েছে এতক্ষণে। সে দেখল রকটা ভেসে গেছে। কোনরকমে নিচে নেমে পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে ভিখিরীটার সামনে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ চোখ পাল্টে গেল লোকটার, বলল, একটা টাকা দাও, তোমাকে বাঁচালাম।

আবার পকেটে হাত ঢুকিয়ে নোট বের করল অর্ক। না, একটাকা তার কাছে নেই। শেষপর্যন্ত দুটো টাকার নোটই এগিয়ে দিয়ে সে ট্রাম রাস্তার ওপর এসে দাঁড়াল। কেউ কোথাও নেই। পুলিস ভ্যানটা কিলাদের নিয়ে হাওয়া হয়ে গিয়েছে। সে পিছু ফিরে গলির দিকে তাকাল। ওটা নিশ্চয়ই ব্লাইণ্ড লেন, না হলে ওদের ধরল কি করে!

হঠাৎ সমস্ত শরীরে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল অর্কর। ভাগ্যিস সে গলির মধ্যে যেতে পারেনি তাহলে এতক্ষণ তাকেও ভ্যানে বসতে হত। মা কি থানায় আসতো? না। বাবা? না। শালা মুখ দেখানো যেত না মায়ের কাছে। কিন্তু এত রাত্রে একা একা বেলগাছিয়ায় ফিরবে কি করে সে? বমি হয়ে যাওয়ার পর শরীরটাও আর ঠিক নেই। তাছাড়া এত রাত্রে এই অবস্থায় বাড়ি যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার।

অর্কর খেয়াল ছিল না সে উল্টো দিকে হাঁটছে। হঠাৎ তার মনে পড়েছে যে পকেটে এখন অনেক টাকা আছে, অনেক। ওই ভ্যানটা না এলে টাকাগুলো আর তার পকেটে থাকতো না। কিন্তু এখন সে-ই এর মালিক। ওরা যদি পরে জিজ্ঞাসা করে তাহলে বলে দেবে ছিনতাই হয়ে গিয়েছে। কিংবা নেশার ঝোঁকে পড়ে গেছে। ওদের কতদিন আটকে রাখবে? যত বেশী দিন রাখে ততই মঙ্গল।

বিডন স্ট্রীটের মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল অর্ক। মোড়ের মাথায় একটা সাদা অ্যাম্বাসাডার দাঁড়িয়ে আছে। আর ড্রাইভিং সিটে বসে একটা লোক হাত বের করে তাকে ডাকছে। তাকেই কি? অর্ক আশে পাশে তাকাল। কেউ নেই। সে আবার সামনে তাকাল। লোকটার মতলব কি? পুলিস নয়তো? পুলিসরা কি সাদা অ্যাম্বাসাডারে থাকে? সে ফুটপাথের ওপর উঠে দাঁড়াল। তখন লোকটা দরজা খুলে রাস্তায় পা দিল। অর্ক দেখল লোকটার পা টলছে, ওপরের শরীরটা নড়বড়ে, কোনরকমে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ওকে দেখছে। যাঃ শালা! লোকটা মাতাল! তাহলে ওর কাছে যাওয়া যায়। অন্তত এই রাত্রে একা একা কোলকাতায় ঘোরার চেয়ে ভদ্রমাতালের সঙ্গ ঢের ভাল। অর্ক পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। এতক্ষণে তার নেশাটা আর নেই বললেই চলে, চোখের দৃষ্টি বেশ সহজ। লোকটার কাছে গিয়ে অর্ক দেখল এ যে সে মাতাল নয়। ঝকঝকে সাদা শার্ট আর টাই, প্যান্টটাও বেশ দামী। কাছাকাছি হতেই ওকে খুঁটিয়ে দেখল লোকটা। দুটো ঠোঁট শক্ত করে চেপা, মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তিনবার দেখে লোকটা বলল, হু আর যু? কে তুমি?

আমি অর্ক।

অর্ক। অর্ক মানে কি? রাতদুপুরে অর্ক? ইয়ার্কি পেয়েছ? তুমি শুকতারা, না হল না, সপ্তর্ষি, নো নট কারেক্ট, তুমি কালপুরুষ। কথাটা খুঁজে পেয়ে যেন খুশি হল লোকটা।

ডাকছিলেন কেন?

ডেকেছি, আমি? ও হ্যাঁ। তুমি কি গুণ্ডা না ছিনতাইবাজ?

কেন?

লজ্জা পেও না, বলে ফেল। আমার কাছে কিছু নেই, সব মিস তৃষ্ণা নিয়ে নিয়েছে। তৃষ্ণাকে চেন? চেন না? ওই যে পার্কটা ওর ওপাশে থাকে। তা ডেকেছিলাম কেন? হ্যাঁ, তুমি আমার গাড়িটাকে একটু ঠেলে দেবে? এই গাড়িটা বাস্টার্ড।

অর্ক বুঝতে পারল। কিন্তু লোকটা কোন দিকে যাচ্ছে? সে বলল, উঠে পড়ুন, আমি ঠেলে দিচ্ছি।

গুড ভেরি গুড। দরজা খোলা রেখেই লোকটা আবার স্টিয়ারিং-এ গিয়ে বসল। গাড়ির পেছনে চলে এল অর্ক। তারপর প্রাণপণে ঠেলতে লাগল গাড়িটাকে। একটু একটু করে নড়তে নড়তে গড়ালো চাকাগুলো। তিন চারবার চেষ্টা করে ইঞ্জিনটা চালু হল। অর্ক ভেবেছিল লোকটা স্পীড তুলে বেরিয়ে যাবে কিন্তু একটু এগিয়ে ব্রেক কষল, এই যে মাই বয়, কাম হিয়ার।

অর্ক এগিয়ে গেল। লোকটা বলল, তোমার নাম কি যেন?

অর্ক।

আবার অর্ক! কালপুরুষ। ইয়েস কালপুরুষ, আমি ভাল করে চোখে দেখতে পাচ্ছি না। তুমি জানো আমি কে?

না।

বিলিতি ডিগ্রি আছে আমার, য়ুনিভার্সিটির ফার্স্ট বয়, ইয়ার্কি মের না। আই অ্যাম নট এ পাতি মাতাল। বিলাস সোম।

আপনি কোনদিকে যাবেন?

লেকটাউন। হোয়াই? লেকটাউন! তাহলে তো বেলগাছিয়া দিয়ে যেতে পারে। সে ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করল, আমি বেলগাছিয়ায় যাব, নিয়ে যাবেন?

নো, এতরাত্রে অচেনা অজানা একটা কালপুরুষকে লিফট দিয়ে যদি খুন হয়ে যাই, নো নেভার। লোকটা গাড়িটা ছেড়ে দেবার উপক্রম করল। অর্ক মরিয়া হয়ে চেঁচাল, শুনুন, যাবেন না। আমি আপনাকে খুন করতে যাব কেন? তাছাড়া আমার কাছে কোন অস্ত্র নেই।

পেটে গোঁজা আছে।

নেই, দেখুন। জামা তুলে দেখাল অর্ক।

তুমি ড্রিঙ্ক করেছ?

করেছিলাম।

হুইস্কি?

না, বাংলু।

যা বাব্বা! তুমি তো ছুপা রুস্তম। ছোলা উইদ বাংলু। তাহলে উঠে এসো বাবা, তুমি আমাকে গাইড করবে। মাথা নাড়ল লোকটা।

সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটাকে আধ পাক ঘুরে অর্ক সামনের সিটে উঠে বসল। লোকটা বেশ জোরে গাড়ি চালাতে লাগল। ট্রাম রাস্তার ওপর ভীষণ বেঁকেচুরে যাচ্ছিল, ওপাশ থেকে কিছু এলেই ধাক্কা লাগবে। অর্ক চেঁচিয়ে উঠল, এত জোরে চালাবেন না, আস্তে আস্তে।

লোকটা কোন উত্তর দিল না। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করছিল আবার যেন কোনক্রমে শক্তি জড়ো করে উঠে বসছিল। দুটো পুলিস কনস্টেবল ব্যাপারটা দেখে চিৎকার করে উঠল। লোকটা তাদের সামনে দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গেল গাড়ি। অর্ক ওর হাত ধরতে গিয়ে সামলে নিল। যে কোন মুহূর্তে অ্যাক্সিডেন্ট ঘটবে কিন্তু হাত ধরলে এখনই। সে অনুনয় করতে লাগল গাড়িটাকে থামাবার জন্যে। লোকটা হঠাৎ হা হা করে হেসে উঠল, স্পীড মোর স্পীড। আরো জোরে ছুটে যাও। ফাঁক দি টাইম, সময় ডিঙ্গিয়ে যাও।

লোকটা হাসছিল আর পাগলের মত মাঝে মাঝে স্টিয়ারিং থেকে হাত তুলে লাফিয়ে উঠছিল। অর্ক একবার বাইরের দিকে তাকাল। বাড়িগুলো কাছে আসছে আর সরে যাচ্ছে। এই অবস্থায় দরজা খুলে লাফিয়ে পড়লে বাঁচতে হবে না। অথচ আজ বেঁচে থাকার কোন উপায় নেই। এত দ্রুতগতি যে ওর সমস্ত শরীর সিরসির করছিল। বাগবাজার দিয়ে গাড়িটা সোজা আর জি করের মুখে আসতেই আচমকা লাফিয়ে উঠল গাড়িটা। অর্কর মনে হল যে শূন্যে উড়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ধপাস করে সিটে আছড়ে পড়তেই সে ব্রেকে হাত দিল। তিন নম্বরের সামনে দাঁড়ানো গাড়িগুলোর চেহারা দেখে ওর এটুকু জানা ছিল। কিন্তু গাড়ির গতি এত বেশী যে সঙ্গে সঙ্গে দুপাক ঘুরে গেল গাড়িটা। ঘুরে দড়াম করে ধাক্কা মারল পাশের দেওয়ালে। অনেকটা ঘষটে গিয়ে গাড়িটা যখন স্থির হল তখন চারপাশে হই চই পড়ে গিয়েছে। ফুটপাথের ঘুমন্ত মানুষগুলো জেগে উঠে চিৎকার শুরু করে দয়েছে। অর্ক আচমকা আঘাতে মুখ থুবড়ে পড়েছিল লোকটার ওপরে। লোকটার একটা হাত সামনের কাঁচ ভেঙ্গে বেরিয়ে গেছে। মুখটা ড্যাসবোর্ডের ওপরে, শরীর ঝুলছে। কোনক্রমে নিজেকে তুলতে গিয়ে অর্ক দেখল লোকটার বুক পকেট থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে একটা কিছু তার মুখের ওপর ঝুলছে। হাত দিয়ে টেনে নিতে সে দেখল একটা চকচকে হার

ততক্ষণে মানুষজন ছুটে এসেছে। দরজা খুলে ওরা প্রথমে লোকটাকে নামাল। তারপর অর্ককে। অর্কর কনুই এবং কপালে খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল কিন্তু রক্ত পড়ছিল না। লোকটা এখন একদম অজ্ঞান। সাদা শার্ট দ্রুত রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে। লোকগুলো বলল, মরেনি মরেনি। ওরা ওকে কাঁধে তুলে নিল, অর্ককেও ছাড়ল না। অর্ক যত বলে তার কিছু হয়নি তবু শুনল না। এই সময় অর্কর খেয়াল হল ওর হাতের মুঠোয় হারটা ঝুলছে। কোনরকমে সে ওটাকে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।

পাশেই আর জি কর হসপিটাল, পৌঁছাতে দেরি হল না। এমার্জেন্সিতে পৌঁছাতেই লোকটাকে দ্রুত ভেতরে নিয়ে গেল ওরা। অর্ককে ফার্স্ট এইড দিয়ে নাম ধাম জিজ্ঞাসা শুরু করল। লোকটার নাম সে জানে না বলতে গিয়েই আচমকা খেয়াল হল। সে বলল, বিলাস সোম, ইঞ্জিনিয়র, লেকটাউনে থাকেন। তারপর ভেবে নিয়ে জানাল, ব্রেক ফেল করায় অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। নিজের নামধাম ঠিকঠাক বলার পর ওর খেয়াল হল এখনই না হসপিটাল থেকে বাড়িতে খবর দেয়। কিন্তু সেরকম কোন চেষ্টাই দেখা গেল না। যারা পৌঁছাতে এসেছিল তারা ফিরে গেলে সে একা বসে রইল কিছুক্ষণ হাতে মাথায় প্লাস্টার লাগিয়ে। হসপিটালের একজন এসে বলল, পুলিসকে খবর দিয়েছি, তুমি ওর বাড়িতে খবর দিয়ে দাও। কণ্ডিশন সিরিয়াস। ভদ্রলোক ড্রাঙ্ক ছিলেন।

অর্ক মাথা নাড়ল। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল বাইরে। কনুইটা কনকন করছে। খোলা আকাশের তলায় আসতেই ঠাণ্ডা বাতাস লাগল। এখন শেষ রাত। কেউ তাকে বাধা দিচ্ছে না। কেউ জিজ্ঞাসা করেনি তার সঙ্গে লোকটার কি সম্পর্ক! হঠাৎ ওর মনে হল, এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া উচিত। যত তাড়াতাড়ি। লোকটা যদি মরে যায় তাহলে পুলিস নিশ্চয়ই তাকে ধরবে। অথচ সে কিছুই জানে না। নিজের নাম ধাম ঠিকঠাক বলার জন্যে খুব আফসোস হচ্ছিল তার।

এইসময় দুটো লোক তার দিকে এগিয়ে এল। একজন একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ আর চাবির রিং এগিয়ে দিয়ে বলল, গাড়িটা গ্যাছে তবু লক করে দিলাম। এই নিন।

অর্ক নিঃসাড়ে হাত বাড়াল। তারপর মাথা নাড়ল। লোকগুলো যেন পবিত্র কর্ম করেছে এমন ভঙ্গীতে চলে গেল। অর্ক দেখল রিং-এ দুটো চাবি। ব্যাগটার মধ্যে কয়েকটা কাগজপত্র এবং বিলাস সোমের ড্রাইভিং লাইসেন্স। লেকটাউনের ঠিকানাটা রয়েছে সেখানে। পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে গিয়ে ও হারটার স্পর্শ পেল। নিশ্চয়ই দামী হার অথচ লোকটা বলেছিল তার কাছে কিছু নেই। লোকটা কি তাকে ভয় পেয়েই জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল!

ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছিল অর্ক। ভোর হচ্ছে। নিচে মালগাড়ির ইঞ্জিন চলতে শুরু করেছে। হারটাকে ঝেড়ে দেওয়া যায়। কেউ টের পাবে না। হঠাৎ খুব আনন্দ হতেই সে চুপসে গেল। ভদ্রলোক তাকে বলেছিল, ছুপা রুস্তম। কেন? এইজন্যেই কি?

পাড়ার মোড়ে সকাল হওয়া আবধি বসে রইল সে। ক্রমশ পৃথিবীটা আলোকিত হলে মাধবীলতা বেরিয়ে এল গলি থেকে। এই ভোরের আলোয় মাকে দেখল অর্ক। মাথা ঝুঁকে পড়েছে, খুব ক্লান্ত পায়ে হাঁটছে। পরনের শাড়িটা আধময়লা, ব্যাগটা বুকের কাছে ধরা। কোনদিকে না তাকিয়ে মাধবীলতা ট্রাম স্টপে গিয়ে দাঁড়াতেই অর্ক গলিতে ঢুকে পড়ল।

নিমুর দোকানের সামনে বেশ ভিড়, সে চুপচাপ তিন নম্বরে পা বাড়াল, অনুদের ঘর বন্ধ। মোক্ষ বুড়ি জিজ্ঞাসা করল, কে যায়? সাড়া দিল না অর্ক। নিজেদের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিঃশ্বাস ফেলল। খুব ভয় করছিল তার। কাল সকাল থেকেই সে ঘরের বাইরে। এরকম কখনো হয় নি। বাবা নিশ্চয়ই খুব রেগে আছে।

সে দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখল অনিমেষ বিছানায় বসে, কোথায় ছিলি?

মড়া পোড়াতে গিয়েছিলাম।

সেখানেই থেকে গেলি না কেন?

অর্ক কোন জবাব দিল না। হাত বাড়িয়ে গামছা নিয়ে ফের যখন বের হতে যাচ্ছে তখন অনিমেষ চিৎকার করল, কথার উত্তর দিচ্ছিস না কেন?

চাপা দাঁতে অর্ক বলল, যাকে দেবার তাকে দেব। তুমি আমাকে খাওয়াও না পরাও যে জিজ্ঞাসা করছ?

০৬. কল-পায়খানা নিয়ে অর্ক

কল-পায়খানা নিয়ে অর্ককে ঝামেলায় পড়তে হয় না। লাইন দিয়ে অপেক্ষা করার ধাত তার নেই। ইদানীং লাইনভাঙ্গা নিয়ে কেউ মুখে কিছু বলে না, তিন নম্বরের কয়েকজনের ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক বলে সবাই মেনে নেয়। এর ওপর আজ ওর মাথা এবং কনুইতে প্লাস্টার বাঁধা থাকায় স্বাভাবিকভাবে সে অগ্রাধিকার পেল। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার পর ঘরে ফেরার সময় অর্ক অনুকে দেখতে পেল। অনুদের ঘরের দরজা এখন খোলা। অনুর বাবা ঘরের মেঝেতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, দুটো ভাইকে নিয়ে অনু দরজায় ঠেস দিয়ে বসে। ন্যাড়া নেই। অনুর মুখ পাথরের মত, কি ভাবছে বোঝা মুশকিল।

যেতে গিয়েও অর্ক দাঁড়াল, কাল কখন ফিরেছ?

অনু মুখ তুলল, এগারটা। তারপরই সে দেখতে পেল, কি হয়েছে কপালে?

অ্যাকসিডেন্ট।

অনু বলল, তোর মা কাল অনেকবার খুঁজতে এসেছিল।

ও। তুমি কি বললে?

তোরা তো অনেক আগেই শ্মশান থেকে চলে এসেছিলি।

হুম। অর্ক বুঝল মায়ের কাছে আর মিথ্যে বলা যাবে না। অনুপমার ওপর তার খুব রাগ হয়ে গেল। সে বেশ শক্ত কথা বলতে যাচ্ছিল এমন সময় অনুর ভাই বলে উঠল, দিদি, খিদে পেয়েছে।

অনু ঝাঁঝিয়ে উঠল, কতবার বলব আমার কাছে পয়সা নেই।

বাচ্চাটার মুখ দেখে জিভ সামলে নিল অর্ক, কিছু খাওনি?

মাথা নাড়ল অনু, বাবার কাছেও পয়সা নেই।

পকেটে হাত ঢুকিয়ে টাকাগুলো বের করল অর্ক। কাল মাল খাওয়ার পরও প্রচুর টাকা ওর কাছে রয়েছে। একবার মনে হল পুরোটাই অনুর হাতে তুলে দেওয়া উচিত। এ টাকা ন্যায্যত ওদেরই। কিন্তু পরক্ষণেই আর একটা মন রাশ টেনে ধরল। সে দুটো দশ টাকার নোট অনুর দিকে বাড়িয়ে ধরল, এটা রাখ।

বিস্মিত অনুপমা ওর মুখের দিকে তাকাতে অর্কর অস্বস্তি হল, ধরো ধরো, ড্যাবডেবিয়ে তাকিয়ে কি হবে। নোট দুটো অনুপমার কোলে একরকম ফেলে দিয়েই সে ঘরে ঢুকল।

অনিমেষ তেমনি বসে আছে খাটের মাঝখানে। গামছা দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়ালে লটকানো আয়নায় চুল আঁচড়াতে গিয়ে আড় চোখে বাবাকে দেখল অর্ক। এই মুখ সে কখনও দ্যাখেনি। ঠোঁট টেপা, চোখ বন্ধ। ওই মুখের দিকে তাকিয়ে অর্কর মনে হল তখন ওইভাবে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। আসলে বাবা তখন এমন টিকটিক করছিল যে–! অর্ক একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করল, চা খেয়েছ?

অনিমেষ জবাব দিল না। অর্ক ঘরের কোনায় তাকিয়ে বুঝল স্টোভ জ্বালানো হয়নি, মা আলু ডিম বের করে দিয়ে যায়নি আজ। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তোমার জন্যে চা আনবো?

না।

কেন? চা খাওনি তো।

অনিমেষ ছেলের দিকে মুখ ফেরালো, তোর সঙ্গে কথা বলতে আমার প্রবৃত্তি হচ্ছে না। আমাকে একটু একা থাকতে দে।

সারাদিনই তো একা আছ।

এবার অনিমেষ উত্তেজিত হয়ে উঠল, তার গলার শিরা ফুলে উঠছিল, কি করতে চাস তুই? আমাকে মেরে ফেলবি? ফ্যাল, আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

বাবার এইরকম মূর্তি দেখে অর্ক একটু ঘাবড়ে গেল, যাব্বাবা, এরকম করছ কেন? আমি তোমাকে কি বলেছি?

কি বলেছিস? আশ্চর্য, তুই কি বলেছিস তা জিজ্ঞাসা করছিস?

হ্যাঁ, আমি তো অন্যায় কিছু বলিনি?

অনিমেষ এবার হতভম্ব চোখে ছেলের দিকে তাকাল। অর্ক চোখে চোখ রাখল না, আমাদের সংসারে রোজগার করে মা, সে কথাই বলেছিলাম। এটা কি মিথ্যে কথা?

আফসোসে বিছানায় চাপড় মারল অনিমেষ, তারপর যেন নিজেকেই বলল, না, সত্যি কথা।

তাহলে এত রেগে যাচ্ছ কেন?

কি বলবে অনিমেষ? কানাকে কানা কিংবা অন্ধকে যে অন্ধ বলতে নেই সেই কৃপা চাইবে? নিজের ছেলেকে বোঝাবে এগুলো সৌজন্যে বাধা উচিত! না, করুণা নয়। তাহলে সে এত দুঃখিত হল কেন কথাটা শুনে, কেন রাগে অন্ধ হল? বাবা হিসেবে ছেলের কাছে সে কি চেয়েছিল?পুরোনো মূল্যবোধ? অর্ক তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে কথা খোঁজার চেষ্টা করল, আমি রোজগার করতে পারি না কেন?

তোমার পায়ের জন্যে।

তবে?

কি তবে?

তাহলে আমি তোদের খাওয়াবো কি করে?

ওটা কোন কথা হল না। তুমি তো তবু দাঁড়াতে পারো, হাঁটতে পারো ক্রাচ নিয়ে, দু পা নেই এমন লোকও রোজগার করে আজকাল।

অর্ক নির্বিকার মুখে বলল। ঈশ্বরপুকুর লেনের মুখে ট্রাম রাস্তার গায়ে একটা লোকের সিগারেটের দোকান আছে যার দুটো পা নেই, লোকটার কথা বলার সময় ভেবে নিল সে।

অনিমেষ বলল, ঠিক আছে। তুই যখন বলছিস তখন নিশ্চয়ই চেষ্টা করব কিছু রোজগার করতে। আসলে তোর মা কখনো চায়নি যে আমি এই শরীর নিয়ে কিছু করি। ভালই হল, তুই মুখের ওপর সত্যি কথাটা বললি।

অর্ক বলল, এত যদি বুঝতে পারছ তাহলে রাগ করলে কেন?

সে তুই বুঝবি না।

কেন?

বুঝলে একথা বলতিস না।

অর্ক কাঁধ নাচাল। তারপর কেটলিটা তুলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। অনিমেষ লক্ষ্য করল আজ চা নিয়ে আসতে যাওয়ার সময় অর্ক তার কাছে পয়সা চাইল না। ও পয়সা পেল কোত্থেকে তা সে ভেবে পাচ্ছিল না।

অর্কর কপাল এবং কনুই-এর প্লাস্টার অনিমেষ দেখেছে। ও দুটো কেন কিংবা কি করে হল তা জিজ্ঞাসা করেনি। প্রচণ্ড অপমানে সাময়িক অন্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। এখন মনে হল কথাটা। মড়া পোড়াতে গিয়ে কারো কপালে আঘাত লাগে না। কাল মাঝরাতে মাধবীলতা খবর পেয়েছিল ওরা দল বেঁধে শ্মশান ছেড়ে চলে গিয়েছে। একথাও শুনেছে ওখানকার এক মাস্তানের সঙ্গে অর্কর ঝামেলা বেধেছিল। খবরটা নিয়ে এসে মাধবীলতা মাটিতে ধপ করে বসে বলেছিল, একি আমাদের ছেলে?

এমন একটা বিষাদ জ্বালা এবং অপমান ছিল স্বরে যা একমাত্র মায়েদের গলাতেই আসে বলে মনে হয়েছিল অনিমেষের। সে নিজে খবরটা শুনে উত্তেজিত হয়েছিল, সেকি! ওর কিছু হয়নি তো?

মাধবীলতা মুখ ফিরিয়েছিল, মানে?

অনিমেষ বলেছিল, খোকা তো কখনও মারামারি করেনি, ওই ছেলেদের বিশ্বাস নেই।

মাধবীলতা বলেছিল, আজকাল আর কেউ একা একা মারামারি করে না, দল বেঁধে করে। তোমার ছেলে যাদের সঙ্গে রয়েছে তারা অনেকেই জেলের ভাত খেয়েছে। ওর কিছু হবে না।

অনিমেষ জিজ্ঞাসা করল, কারা আছে সঙ্গে? বিলু?

একা বিলু কেন হবে? খুরকি, কোয়া, কিলা। নামগুলো দেখে বুঝতে পারছ না চরিত্র কি? কোন ভদ্রছেলের এরকম নাম হয়? তোমার ছেলের প্রাণের বন্ধু এরাই। মাধবীলতা নিঃশ্বাস ফেলল।

অনিমেষ মাথা নাড়ল, আমি বুঝতে পারি না ও কি করে ওদের সঙ্গে মেশে। রুচি পর্যন্ত হারিয়ে গেল এখানে থেকে? অথচ ওকে আমরা ছেলেবেলায় যা শিখেছি তাই শিখিয়েছিলাম।

মাধবীলতা উঠল, যা হবার তাই হয়েছে। আজ রাত্রে ও ফিরলে আমি ঢুকতে দেব না।

সেই সময় অনিমেষের মনে পড়েছিল আজ সকালে অর্ক ঘুমের ঘোরে তাকে কি বলেছিল। কথাটা মাধবীলতাকে বলতে গিয়েও পারল না সে। নিজের কষ্টের বোঝ ওর কাঁধে চাপিয়ে কুঁজো করে কি লাভ। কিন্তু কাল সারারাত ওরা ঘুমুতে পারেনি। অনিমেষ প্রতি মুহূর্তে আশা করেছিল দরজায় শব্দ হবে। তার পর একসময় ভোর হল, মাধবীলতা উঠল। নির্লিপ্তের মত কাপড় পাল্টে স্কুলে চলে গেল। বেচারা আজ এত অন্যমনস্ক ছিল যে চায়ের কথাও খেয়াল ছিল না। অথচ আজ সকালে ছেলে যখন ফিরল তখন তার কোন অন্যায় বোধ নেই। ওই বয়সে জলপাইগুড়ির বাড়িতে সারারাত না ফেরার কথা সে চিন্তাও করতে পারত না। অনিমেষ অনেক চেষ্টায় নিজেকে সংযত স্থির করছিল। না, মাথা গরম করে কোন ফল হবে না।

চা নিয়ে অর্ক ঘরে ঢুকল। নিমুর দোকানে আজ তাকে সবাই খাতির করেছে। কপাল এবং হাতের প্লাস্টার দেখে অনেকেই অনেক রকম কল্পনা করছিল কিন্তু সে সত্যি কথাটা বলেনি। মারপিট যে হয়েছিল এ বিষয়ে সবাই নিঃসন্দেহ কারণ কিলা আর খুরকি এখনও পাড়ায় ফেরেনি। দু-একজন তাকে জিজ্ঞাসা করলেও সে এড়িয়ে গেছে।

কাপে চা ঢেলে বাবার দিকে এগিয়ে দিতেই সে প্রশ্নটা আবার শুনল, কি হয়েছে তোর কপালে?

কিছু না।

কিছু না মানে? সত্যিকথা বলতে তোর অসুবিধে হয় কেন?

অসুবিধে হচ্ছে কে বলল?

মুখে মুখে তর্ক করছিস। কেউ শখ করে ওসব শরীরে লাগায় না।

চায়ে চুমুক দিয়ে অর্ক বলল, অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল।

অ্যাকসিডেন্ট? কি করে? চমকে উঠল অনিমেষ।

শ্মশান থেকে ফেরার সময়। অর্ক মুখ তুলে বাবাকে দেখল। তার পকেটে এখনও লাইসেন্স এবং হার রয়েছে। বাবাকে বলবে নাকি সব কথা? ধুস, বললেই নানান ফ্যাচাং তুলবে। কিন্তু একজন চাই যার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা দরকার। এসবের প্রয়োজন হতো না যদি হসপিটালে নিজের ঠিকানাটা সে না দিত। সে আবার বাবার দিকে তাকাল।

তুই মিথ্যে কথা বলছিস।

মিথ্যে কথা?

হ্যাঁ, নিশ্চয়ই কারো সঙ্গে মারামারি করেছিস। তোর মা ঠিকই বলেছে, গুণ্ডাদের সঙ্গে মিশে মিশে।

কি আঙ সাঙ বলছ। আমি বলছি অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে আর তুমি সেটা বিশ্বাস করছ না। খেপে গেল অর্ক।

না। কোন প্রমাণ আছে?

আর জি কর হসপিটালে যাও তাহলে জানতে পারবে। তারপর দ্রুত পকেট থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স আর হারটা বের করে বলল, আমি মিথ্যে বলছি, না?

এগুলো কি? অনিমেষ বিস্ময়ে জিনিসগুলো দেখল।

ওই ভদ্রলোকের জিনিস।

কোন ভদ্রলোক?

অর্ক বাবার দিকে তাকাল। যাচ্চলে। রেগে গিয়ে যা বলেছে এখন আর তা থেকে ফেরার পথ নেই। ঠিক আছে, বলেছে যখন তখন পুরোটাই বলবে। হঠাৎ তার মাথায় আর একটা চিন্তা খেলে গেল। গতরাত্রে অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল বলে সে বাড়িতে ফিরতে পারেনি এটা যদি বাবাকে ভাল করে বোঝানো যায় তাহলে মায়ের মেজাজ ঠাণ্ডা করা যাবে। সে এই সুযোগ ছাড়ল না।

যার গাড়িতে আমি আসছিলাম। গাড়িটা আর জি কর-এর কাছে এসে প্রচণ্ড অ্যাকসিডেন্ট করেছে। আমার তেমন কিছু হয়নি কিন্তু ওঁর অবস্থা খুব খারাপ। অর্ক খুব বাঁচিয়ে বলার চেষ্টা করছিল।

অনিমেষকে খুব নার্ভাস দেখাচ্ছিল এখন। ছেলের হাত এবং মুখের দিকে ভাল করে লক্ষ্য করে সে নিঃসন্দেহ হল আঘাত তেমন নয়। মারামারি করলে কনুইতে লাগাবে কেন। কিন্তু অর্ক কি করে সেই ভদ্রলোকের গাড়িতে উঠল।

ভদ্রলোকের নাম কি?

বিলাস, লেক টাউনে থাকে।

তুই চিনলি কি করে?

চিনি না তো।

চিনিস না তাহলে গাড়িতে উঠলি কি করে?

অর্ক চটপট নিজের মাতাল হওয়ার প্রসঙ্গটা বাদ দিল। বলল, নিমতলা থেকে ফেরার সময় আমি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সামনে একটা গোলমাল বাধায় ওরা যে যার সরে পড়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে বিডন স্ট্রীটে এসে দেখি এক ভদ্রলোক-এর গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে। আমাকে ঠেলতে বললেন। গাড়ি স্টার্ট হলে জিজ্ঞাসা করলেন আমি কোথায় যাব? বেলগাছিয়া শুনে গাড়িতে উঠতে বললেন। তারপর গল্প করতে করতে আসছিলাম আমরা। হঠাৎ একটা গাড়ি সামনে এসে পড়ায় অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেল। রাস্তার লোকজন আমাদের আর জি করে নিয়ে গিয়েছিল। ওখানেই সারা রাত ছিলাম।

কথাগুলো বলতে বলতে অর্ক লক্ষ্য করছিল বাবার মুখের চেহারা বেশ নরম হয়ে আসছে। তারপর একটু ভেবে বলল, কাউকে দিয়ে যে তোমাদের খবর পাঠাব তারও কোন উপায় ছিল না।

অনিমেষ বলল, অজানা অচেনা লোকের গাড়িতে ওঠা ঠিক নয়। কিছু হলে তো আমরা খবরও পেতাম না। এখন কেমন লাগছে?

মাথাটা একটু ভার ভার লাগছে। অর্ক সত্যি কথাটাই বলল।

অনিমেষ বলল, খোকা, এদিকে আয়।

গলার স্বর হঠাৎ পাল্টে গেল বলে অর্ক অবাক হল। ওরা যে মাল খেয়েছিল সে খবর বাবা জানে নাকি। তাহলে তো পুরোটাই ভেস্তে যাবে। সে চোখ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল, কেন?

কাছে আয় বলছি।

ভয় এবং সন্দেহ নিয়ে অর্ক বিছানার কাছে এল। অনিমেষ খাটের একটা কোণ দেখিয়ে বলল, ওখানে বস।

কি বলবে বল না। অর্ক বসল কিন্তু গলার স্বর পাল্টাল না।

তোকে আমি আমার দাদুর কথা বলেছি, আমার বাবার কথা, তোর মায়ের কথা এমন কি যে জন্যে আমি নিজের কেরিয়ারের কথা না ভেবে আন্দোলনে নেমেছিলাম, সেই সব। তোর মনে কি একটুও রেখাপাত করেনি?।

কেন?

তুই আমাদের ছেলে, তোর পেছনে এই সব ঘটনা আছে, এগুলো ভাবলেই মানুষ নিজেকে স্থির করে, কিন্তু…’

কি বলবে বলতো?

অনিমেষ ছেলের দিকে তাকাল, ওই কিলা খুরকিদের সঙ্গ তোকে ছাড়তে হবে খোকা।

কেন?

তুই আবার প্রশ্ন করছিস? সত্যি কি তুই কিছু বুঝতে পারিস না। তোর সঙ্গে ওদের যে কোন মিল নেই তাও অনুভব করিস না?

অর্ক মাথা নাড়ল, তোমরা ওদের পছন্দ কর না বলে এসব বলছ।

কেন পছন্দ করি না?

ওরা বেশী পড়াশুনা করেনি, আড্ডা মারে তাই।

মোটেই না। ওদের মধ্যে কোন সুস্থ বোধ নেই তাই।

সেটা কি ওদের দোষ?

কার দোষ তা বিচার করে তোর কি হবে? তুই পড়াশুনার সুযোগ পাচ্ছিস, মন দিয়ে তাই কর।

অর্কর ঠোঁটের কোণ ভাঙ্গল, তারপর?

অনিমেষ এই প্রশ্নটা আশা করেনি। সে ছেলের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলল, তারপর শিক্ষিত হয়ে যেটা ভাল লাগবে তাই করবি। তখন আমরা তোকে কিছু বলতে যাব না। এই বয়সে কতগুলো হুলিগানের সঙ্গে আড্ডা মেরে মারামারি করে নিজেকে নষ্ট করবি কেন? ওদের দেখতে পাসনা? মদ খায় আর সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক করে। আর একটু বয়স হলে কি হবে।

মদ তো শিক্ষিত লোকরাও খায়।

খায় কিন্তু সবাই খায় না। যারা খায় তারা সেটাকে মানাতে পারে। তোর মতন বয়সে আমি এসব ভাবতে পারতাম না।

তুমি বস্তিতে থাকতে না। তাছাড়া, তুমি শিক্ষিত হয়ে শেষ পর্যন্ত কি করছ? কত বি এ এম এ বেকার বসে আছে। ওই তো প্রণবদা, এম এ পাশ, চাকরি পায়নি বলে রকে আড্ডা দেয়।

ঠিকই। আমরা চেষ্টা করেছিলাম এই ব্যবস্থাটাকে ভাঙ্গতে। হাজার হাজার ছেলে আন্দোলনে নেমেছিল। পুলিসের গুলিকে তোয়াক্কা করেনি। আমাদের আফসোস যে আমরা পারলাম না। কিন্তু একটা সান্ত্বনা যে আমরা তো চেষ্টা করেছিলাম। তুই আমাদের সঙ্গে তাদের তুলনা করছিস? হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল অনিমেষ।

অর্ক মাথা নাড়ল, দূর। শেষ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে একটা বেকার লোকের কোন পার্থক্য নেই। যে থার্ডের মধ্যে আসতে পারেনি তার সঙ্গে লাস্টের কি তফাত? তোমরা, মা, দিনরাত বল বলে আমি পড়ি নাহলে আমার পড়তে একটুও ভাল লাগে না।

ভাল লাগে না?

না। অশোক কি করেছিল, রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা কবিতাটা মুখস্থ করে আমার কি হবে?

তোর কি ভাল লাগে?

জানি না।

না। জানি না বললে চলবে না। খোকা, তুই অন্তত বারো ক্লাসটা পাশ কর তারপর যা ইচ্ছে করবি। অনিমেষ অনুনয় করল।

অর্ক প্রতিবাদ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মাথা নাড়ল। সেটা হ্যাঁ কি না তা বোঝা গেল না। তারপর বলল, আসলে তোমরা এই বস্তির ছেলেদের ঘেন্না কর।

ঘেন্না করি?

হ্যাঁ। নইলে মা ওদের সঙ্গে মেশে না, কথাও বলে না। তুমি শুধু উনুন সারাই-এর দোকান ছাড়া কোথাও যাও না, কেন?

এদের সঙ্গে আমাদের মনের সঙ্গে মেলে না তাই, ঘেন্না নয়।

কেন মেলে না? আমার বন্ধুদের বাবা মা তো খিস্তি করে না।

তুই এখন বুঝবি না। ক

তোমার ওই এক কথা, তুই বুঝবি না। বোঝার জিনিস কেন আমি বুঝব না? সেদিন কোয়া বলছিল ওরা নাকি উদ্বাস্তু। ওদের পাকিস্তানে অনেক কিছু ছিল। বাবা মা এখানে পালিয়ে আসার পর কোয়া হয়, তাই ও কিছু দ্যাখেনি। ওর বাবা মা নাকি এখনও আফসোস করে কিন্তু কোয়া করে না। কেন করে না সেটা আমি বুঝতে পারি না? অর্ক উঠল। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়াতে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, ফাক্ দি টাইম কথাটার মানে কি?

অনিমেষের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এই বস্তির ছেলেদের মুখ থেকে ছিটকে আসা অশ্রাব্য গালাগালি বাধ্য হয়ে দিনরাত তাকে শুনতে হয় কিন্তু এই ইংরেজি খিস্তিটি তো অর্কর জানার কথা নয়। সে নিজেকে সংযত করল অনেক কষ্টে। তারপর সূত্র খোঁজার জন্যে জিজ্ঞাসা করল, কেন?

কাল রাত্রে সেই ভদ্রলোক গাড়ি চালাতে চালাতে কথাটা বলেছিল। আমি মানে বুঝতে পারিনি।

ও। কথাটা গালাগালি। কিন্তু সেই লোকটা বলল কেন

জানি না। নিজের মনেই বলছিল। কি গালাগালি?

খুব নোংরা।

খিস্তি?

হ্যাঁ।

যাঃ

এসব নিয়ে তোকে মাথা ঘামাতে হবে না। তুই আজ স্কুলে যেতে পারবি? শরীর কেমন লাগছে?

ঘুম পাচ্ছে খুব।

বেশ, তাহলে আজ স্কুলে যেতে হবে না। মানটান করে ঘুমিয়ে নে।

অনিমেষের কথাটা বেশ মনঃপূত হল অর্কর। সত্যি ওর শরীরে এখন অবসাদ, মাথা ঝিমঝিম করছে। কিন্তু একটা কথা সে বাবাকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও করল না, ফাঁক দি টাইম কি ধরনের খিস্তি। কিলারা যা বলে সেই রকম কি? তাই যদি হয় তাহলে শিক্ষিত মানুষের সঙ্গে কিলার প্রভেদ নেই। কিন্তু ততক্ষণে অনিমেষ খাট থেকে ক্র্যাচ নিয়ে নেমে পড়েছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘরের কোণে গিয়ে তরকারির ঝুড়িটা তাক থেকে নামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুই বরং স্নান করে খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়। আমি স্টোভ ধরিয়ে দিচ্ছি।

অর্ক বলল, এখন কেউ ভাত খায় নাকি? মা আসার আগে রান্না করো। কথাটা বলেই ওর খেয়াল হল মাধবীলতার কথা। মাকে বাবা যদি ম্যানেজ করে তাহলে ভাল হয়। কিন্তু সরাসরি কথাটা বলতে আটকালো ওর। তবে এতক্ষণে এটুকু বোঝা যাচ্ছে বাবা নিশ্চয়ই মাকে তার হয়ে বলবে। অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল শুনলে মা কিছু না-ও বলতে পারে।

শোওয়ার তোড়জোড় করছিল অর্ক। ক্র্যাচ বগলে নিয়ে দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে গেল অনিমেষ। মাদুর পেতে চিৎ হয়ে শুতেই খুব আরাম বোধ হল। আঃ, কতদিন যেন শোয়নি সে। প্যান্টটা ছাড়তেও ইচ্ছে করছে না। গত সকাল থেকে এটা পরে আছে সে। শালা, কাল অল্পের জন্যে জান যায়নি। আর একটু বেকায়দায় পড়লে চোট হয়ে যেত। মাতাল হয়ে লোকটা ইংরেজিতে খিস্তি করছিল কেন? বিলাস সোম। নামটা দারুণ। কিন্তু এতক্ষণে হাওয়া হয়ে যায়নি তো? মরে গেলে খবর পাবে কি বাড়ির লোকজন? লেক টাউন বিরাট জায়গা, পুলিস বের করতে পারবে খুঁজে? হসপিটাল থেকে বলেছিল খবর দিতে। দামী হার আর লাইসেন্সটার কথা মনে পড়ল ওর। তড়াক করে উঠে বসে সে খাটের ওপর থেকে সেগুলোকে নিজের কাছে নিয়ে আনল। হারটা বেশ ভারী। লকেটটা কিসের বুঝতে পারল না তবে বেশ দামী বলে বোধ হল। চেপে গেলে কেমন হয়! সে তো আর এই মালটা চুরি করেনি। লোকটার পকেট থেকে আপনিই তার হাতে চলে এসেছিল। তাছাড়া লোকটা যদি টেসে যায় তাহলে কেউ জানতেও পারবে না। শুধু তখন উত্তেজনার মাথায় বাবাকে এটা দেখিয়ে ফেলেছে সে। অবশ্য বাবাকে বলে দেওয়া যাবে যে হার সে ফেরত দিয়ে এসেছে। অর্ক ঠিক করল, দুপুরবেলায় একবার হসপিটালে গিয়ে খোঁজ নেবে লোকটা বেঁচে আছে কিনা, সেই বুঝে কাজ করা যাবে।

দরজায় কড়া নড়ে উঠতেই চমকে গেল অর্ক। দ্রুত হারখানা পকেটে ঢুকিয়ে রাখল সে। কে এল? হসপিটাল থেকে তাকে খুঁজতে আসেনি তো! সে দ্রুত চোখ বোলালো চারধারে, হারখানা কোথায় লুকিয়ে রাখা যায়? আর তখনই ডাক শুনতে পেল, অক্ক।

গলাটা চেনা কিন্তু ধরতে পারল না অর্ক। দ্বিতীয়বার ডাকটা কানে আসতেই সে সাড়া দিল, কে?

বাইরে থেকে ঠেলতেই দরজা খুলে গেল। অর্ক দেখল বিলু এসে দাঁড়াল দরজায়। উঠে বসল অর্ক, কি বে?

বিলুর দুই হাত কোমরে। ওর দিকে তাকিয়ে বলল, এর মধ্যেই ডানা গজিয়ে গেল তোর অক্ক। আমাকে ল্যাং মারতে চাস?

মানে?

মানে টানে বুঝি না, টাকা দে। হাত পাতল বিলু ঘরে ঢুকে।

কিসের টাকা?

শালা আমি তোমার কাছে মারাতে এসেছি? ন্যাড়ার মায়ের টাকা তোর কাছে কত আছে তার হিসেব আমি জানি। টাকাটা দে টিকিট তুলতে হবে নটার সময়। অধৈর্য হচ্ছিল বিলু।

অর্ক উঠে দাঁড়াতেই বিলু প্লাস্টার দেখতে পেল, কি হয়েছে বে তোর। ঝাড়পিট করেছিস?

না। অ্যাকসিডেন্ট। খুব জোর বেঁচে গেছি।

খুরকি কিলা কোথায়?

পুলিস তুলে নিয়ে গিয়েছে। টাকাটার জন্যে ওরা মারপিট শুরু করেছিল। বিশ্বাস কর বিলু, আমি তখন এমন আউট হয়ে গিয়েছিলাম যে ওরা যখন আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল আমি টের পাইনি।

কি করে অ্যাকসিডেন্ট হল?

গাড়িতে। এক ভদ্রলোককে ধরে বাড়িতে ফিরছিলাম। সেই লোকটা হাসপাতালে শুয়ে আছে। এই দ্যাখ লোকটার ড্রাইভিং লাইসেন্স।

মরে গেছে?

জানি না।

বাড়িতে খবর দিয়েছিস?

না। খবর দিতে বলেছিল, দিইনি। লেক টাউনে বাড়ি

দুর বে। তুই শালা বুদ্ধ। কত টাকা আছে তোর কাছে?

যা ছিল তার থেকে কুড়িটা টাকা ন্যাড়ার দিদিকে দিয়েছি। পকেট থেকে টাকাটা বের করে গুনল অর্ক। তারপর অঙ্কটা বলে জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু তোকে আমি এই টাকা দেব কেন?

টাকাটা দেখার পর বিলুর চেহারাটা বদলে গেল। সে বলল, বাইরে চল, তোর সঙ্গে কথা আছে।

না আমি বাইরে যাব না আমি ঘুমাব।

ফোট ঘুমাবার সময় অনেক পারি।

ঘরে কেই নেই।

তোর বাপ শালা উনুনের কারখানায় বসে আছে।

কি করবি বল না?

শোন, খুরকি কিলা ওই টাকা চাইবেই। আমরাও কিছু কমতি না। ওরা আসার আগেই টাকাটা খাঁটিয়ে দুজনে রোজগার করে নিই চল। ফিফটি ফিফটি।

কিভাবে?

বললাম না, টিকিট তুলব। আজ অ্যাডভান্স দেবে সিনেমার। সুপার হিট ছবি। খুরকির সঙ্গে লাইন আছে হলের। খুরকি যদি না আসতে পারে আমরা ওর মালটা নিয়ে নেব।

খুরকি কিছু বলবে না?

ওতো আজ না এলে কিছুই পেত না তবু আমরা দশ বিশ দিয়ে দেব। দু টাকা পঁয়তাল্লিশ আট টাকায় যাচ্ছে। চল, আর দেরি করিস না।

দূর। আমি ব্ল্যাক টল্যাক করতে পারব না।

তাহলে মালটা ছাড়।

তোকে দেব কেন?

ওসব নকশা ছাড় গুরু। হয় দাও নয় চল।

ঠিক আছে, কিন্তু আমি সামনে যাব না

আচ্ছা।

জামা গলিয়ে ও যখন বের হচ্ছে তখন বিলু বলল, আ বে, ওই লাইসেন্সটা সঙ্গে নে।

কেন?

লেক টাউনে যাব। লোকটার বাড়িতে খবর দিয়ে আসি চল

অর্ক বিলুর দিকে তাকাল তারপর ওটা নিয়ে নিল পকেটে। দরজা ভেজিয়ে উনুনের কারখানার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় অর্ক অনিমেষকে দেখতে পেল। ঘুমন্ত ছেলেকে উঠে আসতে দেখে অনিমেষের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছিল। যেতে যেতেই অর্ক বলল, লোকটা মরে যেতে পারে তাই ওর বাড়িতে খবর দিতে যাচ্ছি।

বাবার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যে ও মুখ ফেরাল না। ঈশ্বরপুকুর লেনে পা দিয়ে সে গম্ভীর গলায় বলল, ফাক্ দি টাইম।

বিলু অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করল, কি বলছিস বে?

অর্ক হাসল, তুই বুঝবি না। এটা ইংরেজি খিস্তি।

০৭. বেলগাছিয়া থেকে সেকেণ্ড ক্লাস ট্রামে

বেলগাছিয়া থেকে সেকেণ্ড ক্লাস ট্রামে চেপে ওরা হাতিবাগানে চলে এল। এতক্ষণে অর্কর শরীর ম্যাজম্যাজ করছে, দুচোখ ভারী। মনে মনে বিলুর ওপর ভীষণ চটে যাচ্ছিল ও। হাতিবাগানে নেমে বিলু বলল, ওস্তাদ, পেটে একটু চা ঢেলে নিই চল।

প্রথম প্রথম এই ওস্তাদ কিংবা গুরু সম্বোধনে অস্বস্তি হত অর্কর। পরে বুঝেছে ওগুলো কথার মাত্রা, কোন মানে না করেই বলা হয়। দুই অক্ষরের যে শব্দটি পুরুষাঙ্গের পরিচয় তাও ওরা ব্যবহার করে অসাড়ে। কোন মানে হয় না কিন্তু কথা বলার সময় ওই ব্যবহার বেশ জোর আনে। কথাটা কখনও ব্যবহার করতে পারেনি অর্ক। জিভে যেন আটকে যায়। ও বিলুর দিকে তাকাল। ওদের দলটায় বিলুকেই সবচেয়ে বুদ্ধিমান বলে মনে হয়। চট করে রাগে না কিন্তু কাজ গোছাতে পারে। বাবা চায় না এদের সঙ্গে সে মেশে। শুধু খিস্তি করা ছাড়া বিলুর আর কোন দোষ নেই। অন্তত খুরকি কিংবা কিলার থেকে বিলু অনেক ভাল। এদের সঙ্গে সে মিশছে বছর তিনেক। গত বছর থেকে ঘনিষ্ঠ। হাঁটতে হাঁটতে অর্ক জিজ্ঞাসা করল, তুই কখনও জেল খেটেছিস?

বিলু আচমকা প্রশ্ন শুনে বেশ অবাক গলায় বলল, কেন বে?

এমনি জিজ্ঞাসা করছি।

থানায় গিয়েছিলাম তিনবার, কোর্টে যেতে হয়নি।

ম্যানেজ করেছিলি?

ম্যানেজ না করলে চলে গুরু?

বাঁদিকের একটা গলির মুখে ভাঁড়ের চায়ের দোকান। তার বেঞ্চিতে বসল ওরা। চায়ে চুমুক দিয়ে ভাল লাগল অর্কর। ও হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, তোর দেশ কোথায় ছিল বে?

পাকিস্তান।

দূর বে, বাংলাদেশ বল।

বাবা বলে পাকিস্তান; ওসব দিয়ে কি দরকার?

না, জিজ্ঞাসা করছি। তুই দেখেছিস?

ফোট! আমি শালা এখানে পয়দা হয়েছি। তবে বাবা হেভি গুল মারে, এই ছিল তাই ছিল। মাইরি জন্মাবার পর কোন দিন খাঁটি ঘি-এর লুচি খাইনি।

কথাটা অর্কর মনে লাগল। সে কি নিজে কখনও খেয়েছে? নিচু গলায় বলল, আমাদের দেশ মাইরি পাকিস্তানে ছিল না কিন্তু আমিও খাইনি। একদিন খেলে হয়।

চায়ের দাম মিটিয়ে দিল অর্ক। এখন শরীর একটু ভাল লাগছে। সিনেমা হলটার সামনে এসে ওর চক্ষুস্থির হয়ে গেল। বিরাট ভিড়। এখন সবে নটা বাজে বোধহয় কিন্তু কমসে কম হাজারখানেক লোক জটলা পাকাচ্ছে। মেয়েদের লাইনটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে অনেকদূর। ছবিটার কথা অর্ক শুনেছে অনেকদিন কিন্তু অভ্যেস নেই বলে দেখতে আসার ইচ্ছে হয়নি। হলের কোলাপসিবল দরজা বন্ধ। ছেলেদের লাইনে জোর মারপিট শুরু হয়েছে। পাঁচ ছয়টা ছেলে লাইন ম্যানেজ করছে। ওদের সামনে একটা ছেলেকে বেধড়ক পেটালো ওরা। জামা ছিঁড়ে ছেলেটা লাইন ছেড়ে চলে গেল। হঠাৎ মেয়েদের লাইনে চিৎকার শুরু হল। অর্ক দেখল একটা রোগা মতন মেয়ে একজন মহিলার চুলের মুঠি চেপে ধরে টানছে। মহিলাটি মোটাসোটা তবু সেই চেহারায় দুহাতে মেয়েটি আঁচড়াতে চেষ্টা করছে। লাইনের অন্যান্য মেয়েরা তারস্বরে চিৎকার করছে। এদের ব্যাপার দেখে ছেলেদের মারামারি থেমে গেল। সেই মাস্তান ছেলেরা এদের সামনে এসে জোর হাততালি দিতে লাগল। একজন আবার হেঁড়ে গলায় শোলের ডায়লগ বলতে লাগল। অবিকল আমজাদ খান। মেয়ে দুটোর কোন হুঁস নেই। তারা মাটিতে পড়ে গিয়েও পরস্পরকে ছাড়ছে না। এইসময় একটা পুলিস ভ্যান সামনে এসে দাঁড়াতেই বিলু বলল, খেল শুরু হল।

একজন অফিসার ভ্যান থেকে নেমে চিৎকার করলেন, অ্যাই চোপ! কেউ মারামারি করবে না। মারামারি করা খুব খারাপ।

আমজাদ খান সেই গলায় বলল, খুব খারাপ স্যার, কিন্তু ওরা খুব লড়ে যাচ্ছে।

ঠিক তখনি কোলাপসিবল গেট ফাঁক হতেই প্রথমে ঢোকার জন্যে তাড়াহুড়ো লেগে গেল। অর্ক দেখল রোগা মেয়েটা চটপট মাটি ছেড়ে দৌড়ে গেল লাইনের মধ্যে। মোটাসোটা মহিলা তড়িঘড়ি লাইনে ঢুকে গেলেন। এতক্ষণের অত উত্তেজক মারামারির কোন মূল্য থাকল না। অর্ক বিলুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, টিকিট পাবি কি করে?

পেয়ে যাব।

যা বে! আমি মরে গেলেও ওখানে ঢুকব না। দ্যাখ দ্যাখ পুলিশ লাঠি চার্জ করছে। শালা, বড় হলে পুলিশ হতে হবে।

তুই হতে পারবি, তোর ফিগার আছে। দু’হাত ভরে দুই নম্বর লুটবি। লে বে, টাকাটা বের কর।

টিকিট কোথায়?

তুই আমাকে অবিশ্বাস করছিস অক্ক। এ লাইনে অবিশ্বাস করলে কোন কাজ চলে না। ব্যবসা হয় বিশ্বাসের ওপরে।

অত্যন্ত অনিচ্ছায় পকেট থেকে টাকাগুলো বের করল অর্ক। বের করবার সময় হারখানার কথা মনে পড়ায় সে চট করে দেখে নিল সেটা পকেটেই আছে। বিলুকে হারখানার কথা কিছুতেই বলা যাবে না। টাকাটা হাতে নিয়ে গুণে ফেলল বিলু। তারপর দশটা টাকা অর্কর হাতে দিয়ে বলল, এটা রাখ, ভাগাভাগি করে নেব।

কেন?

তুই শালা ধুর নাকি বে! টিকিটগুলো ক্যাশ না করা পর্যন্ত হাওয়া খাব নাকি? অক্ক, আজ থেকে আমরা হলাম পাটনার, মনে রাখিস।

অর্ককে সেখানেই দাঁড় করিয়ে বিলু হলের দিকে চলে গেল। অর্ক দেখল লাঠি চার্জের পর লাইন বেশ শান্ত হয়েছে। ছয়জন ছেলে আর চারজন মেয়েকে এক একবারে কোলাপসি গেটের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে টিকিটের জন্যে। বিলু সামনের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলে অর্কর মন খুঁতখুঁত করতে লাগল। টাকাটা নিয়ে বিলু হাপিস হয়ে যাবে না তো! যদি হয় তাহলেও অর্কর কিছু বলার নেই। কারণ টাকাটা ন্যাড়ার মায়ের আর সে-ই নিজে কাল রাত্রে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু টাকাটা অনেকক্ষণ পকেটে ছিল, বিলু কি ঢপ দেবে!

মিনিট পনের বাদে ফিরে এল বিল। অর্ক খুশি হল, পেলি?

না পাটনার। ওই চায়ের দোকানে বসতে বলল।

চায়ের দোকানে কেন?

ওখানেই লেনদেন হবে।

সিনেমা হাউস ছাড়িয়ে একটু এগোতেই একটা জীর্ণ চায়ের দোকান চোখে পড়ল অর্কর। গোটা আটেক তাদের বয়সী ছেলে সেখানে বসে আছে। বিলুর সঙ্গে ঢুকে অর্ক একটা বেঞ্চিতে বসতেই মন্তব্য কানে এল, এরা খোঁচড় নাকি বে?

হলে হবে। কোন খানকির বাচ্চা নাক গলালে লাস পড়ে যাবে!

উত্তরটা শুনে কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল অর্কর। সে বিলুর দিকে তাকাতেই বিলু চোখ মারল। তারপর বলল, দেশলাই আছে?

অর্ক মাথা নাড়ল না।

একটা চারমিনার দুই আঙ্গুলে গুঁজে বিলু চারপাশে তাকাল। তারপর যে ছেলেটি লাশ ফেলবে বলেছিল তার দিকে তাকিয়ে বলল, ওস্তাদ, আগুন আছে?

প্রচণ্ড কালো, মুখ চোখ ভাঙ্গা, লাল জামা পরা ছেলেটা বিলুর দিকে তাকাল। অর্ক দেখল ছেলেটা বেশ বিরক্তি সত্ত্বেও পকেট থেকে দেশলাই বের করে খুব জোরে ছুঁড়ে দিল বিলুর দিকে। ছোঁ মেরে সেটাকে লুফে নিয়ে বিলু সিগারেটটা ধরাল মন দিয়ে। তারপর বেঞ্চি ছেড়ে উঠে গেল লাল জামার কাছে, ওস্তাদ, পহেলে পুছোঁ কৌন হ্যায় উসকি বাদ বাত বোলো। সেমসাইড গোল হয়ে যাচ্ছে।

ছেলেটার মুখ আরও কঠিন হল, কি চাই এখানে?

চা খেতে এসেছি।

লাল জামা হাঁক দিল, গণা, ওদের চা দে খেয়ে ফুটে যাক।

বিলু মাথা নাড়ল, আবার সেমসাইড হচ্ছে ওস্তাদ।

লাল জামা ঘুরে বসল, মানে?

অমাদা বলেছে এখানে বসতে।

অমাদা বলেছে! লাল জামার মুখ থেকে কথাটা বের হতেই অন্যান্যরা নড়ে চড়ে বসল। অর্ক বুঝল কেউ তাদের ভাল চোখে দেখছে না।

লাল জামা বলল, আরে, আমি সাফ বলে দিচ্ছি। নতুন পার্টি ঢোকাতে চাইলে হেভি কিচাইন হয়ে যাবে।

বিলু বলল, আমরা নতুন নই।

নতুন নই! হা হা করে হেসে উঠল লাল জামা, এ খোমা অ্যাদ্দিন কোন গাদিতে ঝুলিয়েছিলে চাঁদ!

আমি আসতাম না, আমার দোস্ত আসতো, খুরকি।

খুরকি? অর্ক লক্ষ্য করল ছেলেটার মুখের চেহারা পাল্টে গেল আচমকা। সে বিলুর মুখের দিকে চোখ ছোট করে দেখতে লাগল।

বিলু হাসল, খোমা দেখে নাও ওস্তাদ। অনেক খেলেছ এতক্ষণ। খুরকি আমাদের পাঠিয়েছে ওর মাল নিয়ে যেতে। আপত্তি আছে?

লাল জামা বলল, খুরকি কোথায়?

শরীর খারাপ।

ওকে বলো মানাদা ডেকেছে। ও শালা মানাদাকেও টপকেছে। মানাদাই এই হলের সঙ্গে প্রথম বন্দোবস্ত করেছিল, আমরা এখনও মানাদাকে হিস্যা দিই।

বিলু বলল, বলব। কিন্তু আর কি সেমসাইড হবে?

ঠিক আছে। কিন্তু দশটার বেশী টিকিট।

এক কুড়ি। আমাদের সঙ্গে বাতচিত হয়ে গেছে। যে যার করে খাও গুরু। বিলু ফিরে এল অর্কর পাশে। অর্ক বিলুকে এতক্ষণ অবাক হয়ে দেখছিল। রোগা ক্ষয়াটে চেহারা নিয়ে বিলু কি রোয়াবে কথা বলে গেল এতক্ষণ। সে কি নিজে এরকম পারত! ও দেখল সবাই এবার তার দিকে তাকাচ্ছে। ঠোঁট বেঁকিয়ে কিলার ভঙ্গীতে অর্ক চেঁচাল, কি বে, চা কি বাগানে পয়দা হচ্ছে এখনও?

গলার স্বর এবং ভঙ্গী অনেকটাই কিলার মত মনে হল অর্কর। ওপাশ থেকে সাড়া এল, দিচ্ছি।

হঠাৎ বাইরে দুদ্দাড় করে মানুষজন ছুটতে লাগল। ওরা দোকানে বসেই দেখল পুলিস লাঠি। উঁচিয়ে তাড়া করেছে। লাল জামার কাছে একজন এসে বলল, টিকিট নেই বলে কাউন্টার বন্ধ করে দিয়েছে বলে পাবলিক রঙ নিচ্ছে।

অর্ক চা খেতে খেতে অনুভব করল ওর শরীরের সেই ম্যাজম্যাজানি ভাবটা আর নেই, এমনকি ঘুমও পাচ্ছে না। ঠিক তখনই আবে অমাদা এসে গেছে এসো ওস্তাদ ইত্যাদি হাঁকডাকে ভরে গেল দোকান। অর্ক দেখল একটি আধবুড়ো লোক চায়ের দোকানে ঢুকে সন্ত্রস্ত ভঙ্গীতে চারধারে তাকিয়ে নিয়ে বলল, বাইরে পুলিস প্যাঁদাচ্ছে।

লাল জামা বলল, যুগ যুগ জীও গুরু। যত প্যাঁদাবে তত লাভ।

অমাদা মাথা নাড়ল, ঠিক। আজ আরও চারআনা বেশী লাগবে।

সঙ্গে সঙ্গে লাল জামা ছুটে এল, কি কিচাইন করছ অমাদা, তোমার সঙ্গে মানাদা রেট ঠিক করে গিয়েছে, এখন বেশী চাইলে দেব কি করে?

অমাদা হাত নাড়ল, দর আবার কি! রোজ রোজ যেমন কমছে বাড়ছে তেমন চলবে। আজকের যা ডিম্যাণ্ড তাতে চারআনা বেশী পড়বে।

কথাটা শেষ করে অমাদা দোকানের খদ্দেরদের মুখ ভাল করে দেখল, মারপিট হচ্ছে যখন রাস্তায় তখন ঝাঁপটা বন্ধ করে দে। বাইরের কেউ এখানে নেই তো?

লাল জামা মাথা নাড়ল, না। কিন্তু তুমি খুরকিকে মাল দিচ্ছ কেন?

অমাদা বলল, কে খুরকি?

বেলগাছিয়ার খুরকি।

ওরে বাবা, ওকে না দিলে উপায় আছে! খুরকি যেন কাঁদের পাঠিয়েছে এখানে? অমাদা একটা বেঞ্চিতে বসতেই কয়েকজন সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দিল। বিলু হাত তুলল।

তাকে দেখে নিয়ে অমাদা টিকিট বিতরণ শুরু করল। অর্ক দেখল গোছ গোছ টিকিট হাত বদল হয়ে যাচ্ছে। সাধারণত নিচু আর মাঝারি শ্রেণীর টিকিট অমাদা এনেছে। তবে চার আনা বেশী দিতে হচ্ছে বলে অনেকে যত টিকিট নেবে ভেবেছিল তত নিতে পারছে না। বিলু বেশ কিছু টিকিট ম্যানেজ করে আদ্ধেক অর্ককে দিল, এগুলো শুক্রবার পর্যন্ত তোর কাছে রেখে দে। কেউ যেন টের না পায়।

তোর কাছে রেখে দে না।

না বে, বাইরে বের হলেই খোঁচড় ধরতে পারে। একজনকে ধরলে আর একজনের মাল বেঁচে যাবে।

চোখের সামনে দোকানটা সাফ হয়ে গেল। যে যার টিকিট নিয়ে এক এক করে বেরিয়ে পড়েছে। অমাদা টাকাগুলো থলিতে পুরে বিড়ি ধরাল,একটা ডবল হাফ দাও।

বিলু অর্ককে ইশারা করে বেরিয়ে পড়ল। কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট এতক্ষণে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে বিলু বলল, এ হপ্তার খরচটা ম্যানেজ হয়ে গেল অক।

কি করে বিক্রি করবি?

শো শুরু হবার পনের মিনিট আগে আসব। ততক্ষণে অন্য শালাদের টিকিট শেষ হয়ে যাবে। চারটাকা নাফা রাখব দেখিস।

পুলিস যদি ধরে!

আমার ওপর ভরসা কর ওস্তাদ। তোকে তো বলেছি আমি এখনও শ্বশুরবাড়ি যাইনি। চ, সটকাট করি।

নলিনী সরকার স্ট্রীট দিয়ে কেন যাচ্ছে প্রথমে ধরতে পারেনি অর্ক, পরে খেয়াল হল লেক টাউনের কথা। এইসব উত্তেজনার মধ্যে অর্ক বিলাস সোমের কথাটা ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু লেক টাউনে গিয়ে কি হবে? লোকটা যদি মরে যায় তাহলে পুলিস কি তাকে ঝামেলায় ফেলতে পারে? ওর আর একবার আফসোস হল নিজের ঠিকানাটা হসপিটালে দেওয়ার জন্যে।

হঠাৎ বিলু বলল, তোদের অ্যাকসিডেন্টটা ঠিক কোথায় হয়েছিল?

আর জি করের মুখে।

পুরো ঘটনাটা বল তো!– বিলুর দিকে তাকাল অর্ক। না, হারের কথা বলবে না সে। ওটা আছে জানলেই শালা ভাগ বসাবে। নিজে যদিও জানে না কোথায় কার কাছে হারখানা বিক্রি করা যায়, তবু ভাগীদার চায় না। সে। প্রায় সবটাই খুলে বলার পর বিলু বলল, পার্টি মালদার বলে মনে হচ্ছিল?

বাঃ, নিজের গাড়ি আছে, টাই পরে যখন।, তার মানেই যে মাল আছে তা নাও হতে পারে। চল বাড়িতে গিয়ে দেখব।

সাতচল্লিশ নম্বর বাসে চেপে ওরা লেকটাউনে চলে এল। বাসে উঠেই বিলু বলেছিল, কেমন আছ ওস্তাদ!

কণ্ডাক্টর ওদের বয়সী একটা ছেলে, কাঁধ অবধি চুল, ভাঙ্গা চোয়াল, ঘাড় নেড়েছিল, কিলার খবর কি?

কাল থেকে হাপিস।

কি ব্যাপার?

ঠিক জানি না।

ওরা টিকিট দিল না, কণ্ডাক্টরও চাইল না। দরজায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো বিলু। এখন গাড়ি প্রায় ফাঁকা। কয়েকটা টান দিয়ে সে সিগারেটটা কণ্ডাক্টরকে দিয়ে দিল। অর্ক দেখল বাসের কিছু লোক তাদের দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু কিছু বলছে না।

লেকটাউনে নেমে বিলু বলল, ঠিকানাটা কি পড়!

পকেট থেকে লাইসেন্সটা বের করে অর্ক ঠিকানা পড়ল। জয়া সিনেমার পেছনের রাস্তায় ওদের যেতে হবে। অর্ক বলল, গিয়ে কোন লাভ হবে না। পুলিস নিশ্চয়ই ওদের খবর দিয়েছে। বিলু বলল, তা তো দিতেই পারে। কিন্তু তোর কাজ তুই করবি চল, বলা যায় না কি থেকে কি হয়।

নম্বর মিলিয়ে বাড়িটাকে খুঁজে পেতে দেরি হল না। দোতলা ঘিয়ে রঙের বাগানওয়ালা বাড়ি। সুন্দর দেখতে। গেটে লেখা, কুকুর হইতে সাবধান। অর্ক বলল, কুকুর আছে।

যা বে!

হ্যাঁ, লেখা আছে, দ্যাখ না।

বিলু চোখ বোলালো, আমি তাহলে ঢুকছি না। ওরে শালা, বড়লোকের কুত্তা খুব হারামি হয়।

অর্ক হেসে ফেলল ওর ভয় দেখে, তাহলে চল ফিরে যাই।

তোর তো ভয় নেই, তুই ঢোক না।

কি বলব?

যা ঘটনা তাই বলবি। প্রথমে মাল খেয়েছিল বলবি না, ওটা আমাদের ইস্ক্রু হবে। যা বে। কুকুরটাকে বাঁধতে বলে আমায় ডাকবি।

বিলু গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। নুড়ি দিয়ে সাজানো প্যাসেজে পা দিতেই মেঘ গর্জন করে উঠল যেন। অর্ক থমকে গিয়েছিল। সতর্ক চোখে সে দেখল বারান্দার গায়ে জানলার গ্রিলের ফাঁকে বিরাট একটা কুকুর ছটফট করছে তাকে দেখে, ক্রমাগত ডেকে যাচ্ছে। এগোবে কিনা বুঝতে পারছিল না অর্ক, পেছন থেকে বিলু সাহস দিল, কিছু হবে না, এগিয়ে যা। হারামিটা বেরুতে পারবে না।

অর্ক আরো খানিকটা এগোতেই ভেতর থেকে একটি মেয়ের গলা ভেসে এল, সাট আপ ম্যাক, হোয়াটস দ্য প্রব্লেম!

গলা শুনে ম্যাক আরও উত্তেজিত হল। দুটো পা গ্রিলের ওপর তুলে দিয়ে দাঁতগুলো বের করে চেঁচিয়ে যাচ্ছে সমানে।

তারপরেই নীল ম্যাক্সি পরা একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল গ্রিলের পাশে। কুকুরের বিশাল মাথায় হাত রেখে অত্যন্ত বিরক্ত চোখে অর্ককে দেখে জিজ্ঞাসা করল, কি চাই?

মেয়েটি মোটেই লম্বা নয়। কিন্তু শরীরে বাড়াবাড়ি রকমের যৌবন। চোখ মুখের অভিব্যক্তিতে যে সফিস্টিকেশন তার সাক্ষাৎ কোনদিন পায়নি অর্ক। হঠাৎ সে আবিষ্কার করল তার জিভ শুকিয়ে গেছে, কথা বলতে পারছে না। মেয়েটি আবার জিজ্ঞাসা করল, কি চাই, চাঁদা?

মাথা নাড়ল অর্ক। তারপর কোনরকমে বলল, বিলাস সোম।

ড্যাডি বাড়িতে নেই। ওঃ, ম্যাক, চলে এস। মেয়েটি চলে যাচ্ছিল, অর্ক তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আপনারা কোন খবর পাননি?

কি খবর?

ওঁর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে!

অ্যাকসিডেন্ট? ও মাই গড! মা, মা, তাড়াতাড়ি এস! চিৎকার করতে করতে মেয়েটি ছুটে গেল ভেতরে। এবং কি আশ্চর্য, কুকুরটাও হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। অর্ক বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিলুর দিকে তাকাল। বিলু রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। হঠাৎ অর্কর মনে হল, বিলুটা অত্যন্ত কুৎসিত দেখতে। এই বাড়িতে একদম মানাবে না। ভেতরে একটি ঈষৎ খসখসে কণ্ঠ বাজল, কত আজে বাজে লোক আসে সব কথা বিশ্বাস করতে হবে!

এইসময় গ্রিলের আড়ালে একজন মধ্যবয়সিনী এসে দাঁড়ালেন। হাতহীন জামা এবং কাঁধ ছোঁওয়া চুল। মুখে এই সকালেও বেশ প্রসাধন। ভ্রূ কুঁচকে অর্ককে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে?

অ্যাকসিডেন্ট। কাল রাত্রে

তুমি কে?

আমি ওঁর সঙ্গে ছিলাম।

তুমি বিলাসের সঙ্গে ছিলে?

হ্যাঁ। মানে আমাকে উনি লিফট দিচ্ছিলেন।

ইমপসিল। বিলাস কাউকে লিফট দেয় না। তাছাড়া অ্যাকসিডেন্ট হলে পুলিস খবর দিত। তোমার সাহস তো খুব, আমি যদি এখন তোমাকে পুলিসে ধরিয়ে দিই। ধমকে উঠলেন মহিলা।

বিশ্বাস করুন, আমি মিথ্যে কথা বলছি না। এই দেখুন, ওঁর ড্রাইভিং লাইসেন্স। এখান থেকেই ওঁর ঠিকানা পেয়েছি। পকেট থেকে সেটা বের করে গ্রিলের ফাঁক গলিয়ে মহিলাকে দিল।

লাইসেন্স হাতে নিয়ে মহিলা একটু নার্ভাস হলেন। তিনি অর্কর কপাল এবং হাতের দিকে তাকালেন, এটা তুমি কোত্থেকে পেলে?

গাড়িতে ছিল। পরে পেয়েছি।

কোথায় থাক তুমি?

বেলগাছিয়াতে।

মহিলা চিৎকার করে কাউকে ডাকলেন, দরজা খুলে দে।

খানিক বাদেই একটা বুড়ো চাকর দরজা খুলে দিতে মহিলা বললেন, ভেতরে এসো।

অর্ক ঘরে ঢুকতেই কুকুরটা সাঁৎ করে তার সামনে চলে এল। মহিলা বললেন, সোফায় বসো। ওঠার চেষ্টা করলে ম্যাক তোমাকে ছিঁড়ে খাবে। আমি থানায় ফোন করে তোমার কথা বলছি।

অসহায় অর্ক সোফায় বসতেই কুকুরটা তার সামনে পেছনের পা ভেঙ্গে বসল। মহিলা ততক্ষণে রিসিভার তুলেছেন। সেই মেয়েটি ডিভানে বসে আছে, চাকরটা দরজায়।

লাইন পাওয়া মাত্র মহিলা কথা বললেন, হ্যালো, আমি লেকটাউন থেকে বলছি। আমার নাম সুরুচি সোম। বিলাস সোম আমার স্বামী। কি বললেন? আমাকে খুঁজছেন। অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে! কখন? আর জি করে! কি আশ্চর্য, এতক্ষণ খবর দেননি কেন? ঠিকানা ছিল না এটা মানতে হবে? ভাগ্যিস একটি ছেলে খবর দিল এসে। কণ্ডিশন ভাল নয়, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।

টেলিফোন রেখেই মহিলা মেয়েটির দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন, সু তোমার ড্যাডির অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। এক্ষুনি যেতে হবে।

মেয়েটি চিৎকার করে উঠল মুখে হাত চাপা দিয়ে। মহিলা বললেন, ডোন্ট বি সিলি। তুমি ভেতর থেকে আমার ব্যাগটা এনে দাও। আর নবীন, তুমি জলদি ট্যাক্সি ডেকে আন।

অর্ক হতচকিত হয়ে ব্যাপারটা দেখছিল। মহিলা এবার ওকে জিজ্ঞাসা করলেন, বিলাস কি ড্রাঙ্ক ছিল?

হ্যাঁ।

কোত্থেকে তোমাকে লিফট দিয়েছে?

বিডন স্ট্রীট।

কথাটা শুনেই মুখ বিকৃত করলেন মহিলা, ওঃ, দ্যাট বিচ। শিক্ষা হয় না পুরুষগুলোর। সেই স্ট্রীট গার্লটার কাছেই গিয়েছিল। তোমাকে ও লিফট দিল কেন? ঠিক আছে, যেতে যেতে শুনবো।

ঘরখানার দিকে তাকিয়ে অর্কর মনে হল, এরা কি সুন্দর ঘরে থাকে, কি সাজিয়ে গুছিয়ে। কিন্তু বিচ শব্দটার মানে কি?

০৮. সত্যি কথা বল

সত্যি কথা বল, কি করে অ্যাকসিডেন্ট হল? সুরুচি সোম কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন। অর্ক তখনও পেছন দিকে তাকিয়ে। বিলুর মুখ হাঁ হয়ে রয়েছে। ওরা গেট পেরিয়ে ট্যাক্সিতে যখন উঠেছিল তখন যেন কিছুটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল বিলু। রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে জুলজুল করে দেখছিল। অর্কর মনে হয়েছিল বিলুকে ডাকা দরকার। এক সঙ্গে যখন এসেছে তখন ওকে ফেলে রেখে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু সুরুচি সোমের পেছনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মন মোচড় খেল। বিলুর মুখ চোখ এবং পোশাক সুরুচি পছন্দ করবেন না। সত্যি বলতে কি বিলুকে এই প্রথম অর্কর খুব খারাপ লাগছিল। এই বাড়ি এবং এই পরিবারের সঙ্গে বিলু কিছুতেই মানায় না। ওকে ডাকলে সুরুচি যে অবাক এবং বিরক্ত হবেন এটুকু বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না অর্কর।

ট্যাক্সিটা চলতে শুরু করা মাত্র খারাপ লাগল অর্কর। সে নিজেকে বোঝাবার চেষ্টা করছিল এটা তার দোষ নয়। সুরুচি এত দ্রুত ট্যাক্সিতে উঠলেন এবং এমন গম্ভীর হয়েছিলেন যে তার কিছু করার সুযোগ ছিল না। সে শেষবার দেখল বিলু দৌড়ে রাস্তার মাঝখানে চলে এসে দুটো হাত শূন্যে নাড়ছে। এই সময় সুরুচি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, কি হল, শুনতে পাচ্ছ না?

অর্ক ফিরে তাকাল। সুরুচি দুটো বড় চোখে ওকে দেখছেন। দৃষ্টিতে এখনও সন্দেহ। অর্ক কোনরকমে বলল, হয়ে গেল।

হয়ে গেল মানে? তুমি কোথায় থাকো?

আমি? বেলগাছিয়ায়।

কি কর?

পড়ি।

বাবা কি করেন?

কিছু না।

তোমার মতন ছেলেকে ও লিফট দেবে বিশ্বাস হচ্ছে না। অন্য কোন গোলমাল আছে। তাছাড়া অ্যাকসিডেন্টে তোমার কিছু হল না আর বিলাস হাসপাতালে?

অর্কর মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, যাঃ শালা! অ্যাকসিডেন্ট কি আমার ইচ্ছেয় হয়েছে? বাক্যটি বলা মাত্র বুঝতে পারল সুরুচির সামনে এ ধরনের কথা বলা ঠিক হয়নি। কারণ শোনামাত্র ভদ্রমহিলার মুখ আচমকা থেবড়ে গিয়েছে। বিস্ফারিত চোখে তিনি এখন অর্ককে দেখছেন। যেন এক দলা নোংরা ওঁর গায়ে কেউ ছুঁড়ে দিয়েছে এমন বসার ভঙ্গী। গলার স্বর জড়িয়ে গেল তাঁর, তুমি, তুমি আমাকে শালা বললে? স্কাউন্ট্রেল।

অর্ক একটু সংকুচিত হয়েছিল কিন্তু শেষ শব্দটি কানে যাওয়া মাত্র সে মাথা তুলল। ওটা যে ইংরেজি গালাগাল তা অনুমানে বুঝতে পারছে, বলার ধরনে সেটা স্পষ্ট। কেউ যদি তাকে গালাগাল দেয় তবে তার কি দরকার ভদ্রতা করার। সে চোয়াল শক্ত করে বলল, তখন থেকে আপনি ন্যাকড়াবাজি করছেন। গাড়ি চালাচ্ছিলেন উনি মাল খেয়ে তাই অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। শালা আমারই জান কয়লা হয়ে যেত আর একটু হলে। তবু আমি যেচে আপনাদের খবর দিতে এলাম আর আপনি।

ন্যাকড়াবাজি! ন্যাকড়াবাজি মানে কি?

সুরুচির মুখের চেহারা আচমকা যেন সহজ হয়ে আসছিল। মুখের যে পেশীগুলো এতক্ষণ টান টান ছিল তা শিথিল হয়ে এল।

অর্কর মনে পড়ল ন্যাকড়াবাজি কথাটা শুনে বাবাও মানে বুঝতে পারেনি। এরা মাইরি কোন জগতের মানুষ? কথা বললেও বুঝতে পারে না? সে তো আর ইংরেজি বলছে না। সুরুচির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে বাইরে তাকিয়েই দত্তবাগানের মোড়টাকে দেখতে পেল। পাইকপাড়া দিয়ে না ঘুরে ট্যাক্সি সোজা পাতাল রেলের রাস্তা দিয়ে আর জি কর যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উত্তর না পেয়ে সুরুচি বললেন, তোমার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে তুমি ভদ্রঘরের ছেলে নও!

অর্ক কাঁধ নাচাল, যান যান, কোঠাবাড়ির লোক কত ভদ্র তা জানা আছে। কোঠাবাড়ি কথাটা বিলু প্রায়ই ব্যবহার করে।

কোঠাবাড়ি! সুরুচি ঢোক গিললেন, তুমি কোথায় থাক?

তিন নম্বর ঈশ্বরপুকুর লেন। ওই যে বস্তিটা দেখলেন, ওখানে। গাড়িটা তখন ব্রিজে উঠছে।

ও। তাই তোমার মুখের ভাষা এরকম।

আবার কিচাইন করছেন আমি কোন খারাপ কথা বলিনি।

বলনি? তোমার সে বোধই নেই।

আমার মাথা গরম করে দিচ্ছেন আপনি। একটু আগে কে ইংরেজিতে গালাগাল দিল, আমি?

আমি দিয়েছি? ও, স্কাউণ্ডেল, স্কাউণ্ডেল মানে জান?

ওইটাই তো আপনাদের সুবিধে। আমরা মানে বুঝি না আর আপনারা টপ করে ঝেড়ে দেন। এই যেমন, ফাক্ দি টাইম।

সঙ্গে সঙ্গে সুরুচির কান থেকে যেন গরম হাওয়া বেরুতে লাগল, মুখ চোখ ছাড়ানো তরমুজ। ঠোঁট দাঁতে চেপে উচ্চারণ করলেন, কি বললে?

আমি বলিনি। কাল রাত্রে উনি গাড়ি চালাতে চালাতে বলছিলেন! কথাটার মানে কি?

সুরুচি রাগতে গিয়ে না হেসে পারলেন না। ট্যাক্সি তখন আর জি করের দরজায়। সেদিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, না বলে চলে যেও না, তোমার সঙ্গে আমার দরকার আছে।

অর্ক অবাক হয়ে গেল। সুরুচি সোম যে এত তৎপর হতে পারেন তা ওঁর চেহারা দেখে মনে হয়নি। একে জিজ্ঞাসা করে ওকে ধমকে তার কাছে গলে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বিলাস সোমের শরীরের অবস্থা জেনে নিলেন। এখন রোগীদের সঙ্গে দেখা করার সময় নয়। কিন্তু সুরুচি সেটাও ম্যানেজ করলেন। করে এসে বালিকার ভঙ্গীতে অর্ককে বললেন, জানো ওর জ্ঞান ফিরে এসেছে। কয়েকটা কথাও বলেছে। ওরা বলছে আর কোন ভয় নেই। অর্কর প্রতিক্রিয়া জানার জন্যে এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ছুটলেন সুরুচি আবার ভেতরে।

লোকটা বেঁচে গেল? অর্ক চারপাশে তাকাল। কেউ তার দিকে লক্ষ্য করছে না। এই ভরদুপুরে হাসপাতালটায় একটা সিরসিরে হাওয়া বইছে। সে কি ফেঁসে গেল! ফেঁসে যাবার আর কি আছে! হার পায়নি বললে কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। ওটা পকেটে না থাকলে ভাল লাগত। মুখের ওপর মিথ্যে কথা বলতে পারবে তো সে? হঠাৎ বিলুর ওপর তার রাগ হল। মাল কামানোর জন্যে বিলু তাকে যদি লেকটাউনে নিয়ে না যেত তাহলে এই নকশায় পড়তে হত না। আর কোথায় মাল? ওই জিনিসের কাছ থেকে মাল খসাবে সে সম্ভাবনা নেই। যত সব বাতেলা।

কিন্তু এখন কেটে যাওয়া ঠিক কাজ হবে না। যদি হারখানার কথা ওঠে তাহলে ওরা নিশ্চয়ই তাকেই সন্দেহ করবে। কিন্তু সে যদি সঙ্গে সঙ্গে থাকে তাহলে অবিশ্বাস করার কোন কারণ থাকবে না। অর্ক একটু এগিয়ে একটা বেঞ্চিতে বসল। এবং বসা মাত্রই তার খিদে পেয়ে গেল। এখন পকেটে যা আছে তাতে বেশ ভাল খাওয়া যায়। আজ সকালে কিছুই খাওয়া হয়নি, কাল রাত্রেও, দূর, ওটাকে খাওয়া বলে নাকি!

এই সময় সুরুচি হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। দু পাশে মুখ ফিরিয়ে প্রথমে তাঁর কপালে ভাঁজ এবং ঠোঁটের কোণে বিরক্তি ফুটছিল কিন্তু বেঞ্চির ওপর চোখ পড়ামাত্র তিনি উজ্জ্বল হলেন। দ্রু