Friday, April 12, 2024
Homeউপন্যাসকালবেলা - সমরেশ মজুমদার

কালবেলা – সমরেশ মজুমদার

Table of contents

০১. শেষ বিকেলটা অন্ধকারে ভরে আসছিল

শেষ বিকেলটা অন্ধকারে ভরে আসছিল। দুপুরের পর থেকেই আকাশ মেঘলা, মাঝে মাঝে তরল মেঘেরা উড়ে উড়ে যাচ্ছিল আকাশছোঁয়া বাড়িগুলোর মাথা মুড়িয়ে। বাতাস আর্দ্র কিন্তু বৃষ্টিটাই যা হচ্ছিল না।

জানালা খুললে অনেকটা দূর দেখা যায়। অনিমেষ চুপচাপ বসেছিল। এরকম মেঘের দুপুর কিংবা বিকেলে মন কেমন বিষণ্ণ হয়ে যায়। খুব আলস্য লাগে তখন। চোখ বন্ধ করলেই সেই মেঘগুলোর কথা মনে পড়ে যায় যারা ভূটারন পাহাড় থেকে দল বেঁধে উড়ে এসে স্বৰ্গছেঁড়া চা বাগানের ওপর বৃষ্টি ঝরাতো। তখন সেইসব বুনো লম্বাটে গাছগুলো কি উল্লাসে আকাশটা ছুঁয়ে রাখত। কান পাতলেই সেই শব্দ।

এ বছর ঘন মেঘের বিকেলে এই প্রথম। মেঘেদের চেহারা কি পৃথিবীর সব জায়গায় একই রকম থাকে তা হলে স্বৰ্গছেঁড়া এমনকি জলপাইগুড়ির মেঘগুলোর চেহারা চালচলন এখানকার থেকে একদম আলাদা কেন? ভীষণ ময়লা আর ঠুনকো মনে হচ্ছে এদের। যেন খুব কষ্ট করে আসছে ওরা, জমতে হয় তাই জমছে।

মেঘ দেখতে গিয়ে অনিমেষ কাছের দূরের ছাদগুলো দেখে ফেলল। তিনতলার ওপর ঘর বলে বেশ কিছু দূর দেখতে পাওয়া যায়। কোলকাতার মেয়েরা বিকেলের এই সময়টা ছাদে ছাদে কাটিয়ে দেয়। হয়তো ওদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই কিংবা এই বিরাট শহরে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি মেলে না। অন্তত এপাড়ার মেয়েদের দেখলে ওর তাই মনে হয়। কিন্তু এই মেঘ-থমথমে সন্ধ্যেবেলায় যখন সব ছাদ খালি হয়ে গেছে তখন ওই মেয়েটি ঘাড় বেঁকিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে অমন করে কি দেখছে? খুব বিষণ্ণ সময় এলেই মানুষ অমন ভঙ্গীতে দাঁড়াতে পারে। মেয়েটিকে এর আগে সে কখনো দ্যাখেনি। ওই হলুদ বাড়িটার ছাদে প্রায় সময় এক বিশাল চেহারার ফর্সা মহিলা ঘোরাফেরা করেন। মেয়েটি মাথা নামিয়ে কিছু ভাবল, তারপর এদিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই কি হল কে জানে, এক ছুট লাগালো মেয়েটি, আর দেখা গেল না। অনিমেষ হেসে ফেললে। তখন থাকলে বলত, বালিকা জানে না। যে ও মরে গেছে। এই সময় ছটফটিয়ে বৃষ্টিটা নামল। জানলা বন্ধ করে আলো জ্বালালো অনিমেষ।

এই ঘরের অন্য খাটটায় থাকে ত্রিদিব–ত্রিদিব সেনগুপ্ত, জামসেদপুরের ছেলে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া অথচ বাংলা কবিতা লেখে। ত্রিদিবের বিছানায় দিকে তাকালেই বোঝা যায় ওর বেডকভারটা খুব দামী, একরাশ নীল রঙের পাখি সেখানে ভীড় করে আছে; দেওয়ালে আট হুকে ত্রিদিবের যে সব জামা-কাপড় ঝুলছে সেগুলো ওর পারিবারিক স্বাচ্ছল্যের সুন্দর বিজ্ঞাপন। ওর টেবিলের কোণে যে সব প্রসাধন দ্রব্য তা কোলকাতায় আসে। অনিমেষ দেখেনি। অনিমেষ দেওয়ালে টাঙানো ত্রিদিবের আয়নার দিকে এগিয়ে গেল। কোলকাতার জল পেটে পড়লে মফস্বলের মানুষ নাকি ফরসা হয়ে যায়। অনিমেষ নিজেকে সুন্দর দেখল। সামান্য বড় চুল, খুব অল্প এবং কালচে গোঁফদাড়ি মুখের আদল পাল্টে দিয়েছে। চোখ আর নাকে আলো পড়তেই চট করে কদিন আগে দেখা ছবিটার কথা মনে পড়ে গেল। যুবক রবীন্দ্রনাথের মুখ কি এরকম দেখতে ছিল? ভাবতে গিয়েই লজ্জা পেল সে দ্যুৎ, রবীন্দ্রনাথের গায়ের রঙ ভগবানের মত ছিল।

কোলকাতায় দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর হয়ে গেল। কলেজের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে এখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে। সময়টা কম নয় কিন্তু অদ্ভূত নির্জনতা নিয়ে এখনও কোলকাতা থেকে বিচ্ছন্ন রয়ে গেল। কলেজে থাকার সময় সে বাবার আদেশ পুরোপুরি মেনে চলেছে। জলপাইগুড়ি থেকে নিয়মিত দুটো চিঠি সপ্তাহে বিভিন্ন নির্দেশ নিয়ে তার কাছে আসে, একটা ঠাকুরদা সরিৎশেখর, অন্যটা বাবা মহীতোষের। প্রথমবার এই কোলকাতায় আসামাত্রই যে ঘটনাটা ওর শরীর-মনে ছাপ রেখেছিল পাকাপাকিভাবে তার কাঁপুনি থেকে নিজেকে সরাতে সময় লেগেছিল অনেকদিন। ফলে ওই সব চিঠিগুলোর নির্দেশ মান্য করা ছাড়া ওর কোন উপায় ছিল না। আর তাই এই কলেজের সময়টা অদ্ভূত নিঃসঙ্গ হয়ে কোলকাতায় কাটিয়ে দিল।

এই হোস্টেল মূলত কলেজ ছাত্রদের, কিন্তু প্রাক্তন যারা, এখন বিশ্বদ্যিালয়ে পড়ছে তারা ইচ্ছে করলে থাকতে পারে। সেই সুবাদে অনিমেষের এখানে থাকা। ত্রিদিব এখানে নতুন এসেছে। ও কোলকাতার বাইরে যে কলেজ থেকে পাশ করেছে সেই কলেজ আর অনিমেষদের কলেজ একই মিশনারীদের সংস্থার অন্তর্গত। তাই প্রাক্তন ছাত্র না হয়েও ওর এখানে থাকতে কোন অসুবিধে হয়নি। মিশনারী হোস্টেল বলেই প্রতি বছর বেশ কিছু বিদেশী ছাত্র কোলকাতায় পড়তে এসে এখানে থাকে; হোস্টেলের অর্ধেক তারাই। বেশির ভাগই আফ্রিকার, কিছু বর্মামুলুকেরও আছে। আফ্রিকার ছেলেদের ভাবভঙ্গীতে কোন সঙ্কোচ নেই, বিদেশে আছে বলে মনে হয় না। বিশাল চেহারাগুলো নিয়ে সব সমসময় হইচই করছে। প্রথম প্রথম ওদের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত অনিমেষ। যে-কোন আফ্রিকানকে দেখলেই আঙ্কল টমকে মনে পড়ে যায়। ক্রীতদাস করে রেখেছিল সাদা মানুষেরা এই সেদিন পর্যন্ত অথচ ওদের হাবভাবে সেসব কষ্টের কোন চিহ্ন নেই। আর একটা স্মৃতি চট করে অনিমেষের সামনে উঠে আছে। আসাম রোডে ছুটে যাওয়া মিলিটারী কনভয়ের নিগ্রো অফিসারটার মুখ যেন স্পষ্ট দেখতে পায়। লোকটা এখন কোথায় আছে কে জানে। আমরা কাউকে অকারণে মনে রেখে দিই চিরকাল, যার হয়তো আমাদের মনে রাখার কোন কথাই নেই।

শব্দ করে বৃষ্টি পড়ছে এক নাগাড়ে। অনিমেষ দরজা খুলে ভেতরের বারান্দায় এল। হোস্টেলের অনেক ঘর বন্ধ, খোলা দরজাগুলো থেকে আলো এসে বাইরের বৃষ্টিতে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। ইউ প্যাটার্নের এই বাড়িটার মাঝখানের বাস্কেটবল কোর্টটা অন্ধকারে ডুবে আছে। ওপাশের একটা ঘর থেকে মাউথ অর্গানের সুর ভেসে আসছে। টানা এবং কান্নার সুর। আন্তরিক না হলে এ রকম বাজানো যায় না। কোন চেনা গান বা পরিচিত ভঙ্গী সুরটায় নেই। নিশ্চয়ই ওটা ওইসব আফ্রিকানদের কেউ বাজাচ্ছে, হাজার হাজার মাইল দুরে এসে যার খুব কষ্ট হচ্ছে দেশের জন্য কিংবা ফেলে আসা কোন মানুষের কথা সে ভাবছে। অনিমেষের খুব ইচ্ছে হল ছেলেটিকে একবার দেখে আসে। মুশকিল হল ওদের দেখলে সে চট করে আলাদাভাবে চিনতে পারে না, কেউ খুব লম্বা, মোটা অথবা রোগা এইভাবে বুঝতে হয়। তিনতলার বারান্দা ধরে বেশ কিছুটা এগিয়ে সেই ঘরটার সামনে এল অনিমেষ। একটু সঙ্কোচ হচ্ছিল, গায়ে পড়ে কথা বলতে কেমন যেন লাগে।

ঘরের ভেতর ছেলেটি একা চিৎপাত হয়ে খাটে শুয়ে চোখ বন্ধ করে মাউথ অর্গান বাজাচ্ছে। বেশ ঢ্যা চেহারা, জুতো সুদ্ধ পা দুটো খাটের বাইরে ঝুলছে। ঘরটা দারুণ অগোছালো, সাজগোছ করায় কোন চেষ্টাই নেই। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে সে ফিরে আসছিল এমন সময় ছেলেটি বাজনা থামিয়ে, উঠে বসে বলল হে-ই! কথাটা জড়ানো, মানে না বুঝলেও অনিমেষ অনুমান করল যে তাকেই কিছু বলছে ছেলেটি। পরমুহূর্তেই এক লাফে দাঁড়িয়ে দু-হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকল ছেলেটি, গেট ইন, প্লিজ!

এবার বুঝতে পারলেও অনিমেষ লক্ষ্য করল ওর উচ্চারণে একটা মোটা আওয়াজ এমন জড়িয়ে থাকে যেটা অন্য শব্দগুলোকে স্পষ্ট হতে দেয় না। অনিমেষ ভেতরে ঢুকতেই চকচকে সাদা দাঁতে হাসল ছেলেটি, ইয়া–!

ওর আসার কারণটা বোঝাতে গিয়ে বিপদে পড়ল অনিমেষ। মনে মনে দ্রুত ইংরেজি করে নিয়েও ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছে না সে। সঙ্কোচ হচ্ছিল ইংরেজিটা ভুল হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সহজ রাস্তাটা বেছে নিল অনিমেষ, আঙ্গুল তুলে মাউথ অর্গানটাকে দেখাল। ছেলেটি যেন খুব খুশি হয়েছে এমন ভঙ্গীতে বাদ্যযন্ত্রটা শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে ফের লুফে নিয়ে বলল, য়ু লাইক ইট?

ইয়েস! অনিমেষ ধাতস্থ হল, তারপর জুড়ে দিল, ভেরি সুইট।

থ্যাঙ্কু! ইটস মাই ফ্রেও। মাদার গেভ ইট। সিট ডাউন, সিট হেয়ার প্লিজ।

ওর টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারটাকে টেনে নিয়ে খাটের পাশে রেখে সে অনিমেষকে ইঙ্গিত করল বসার জন্য।

এর এগে ইংরেজিতে কখনো কথা বলেনি অনিমেষ। জলপাইগুড়িতে যখন ছিল তখন এ প্রশ্ন উঠতই না। ত্রিদিব যখন বাংলা হিন্দী বলতে বলতে নিজের অজান্তে অনর্গল ইংরেজি বলে যায় তখন সেটা লক্ষ্য করেছে অনিমেষ। অনেক শব্দ যার অর্থ অন্য রকম ছিল, ব্যবহারে তার চেহারা পাল্টে যায়। এই যেমন ছেলেটি তাকে ভেতরে আসার জন্য বলল, গেট ইন। অনিমেষ নিজে গেট কথাটা ভাবতেই পারত না, বলত কাম ইন। অথচ বেরিয়ে যাওয়ার জন্য গেট আউট তো স্বচ্ছন্দে মনে আসে। জলপাইগুড়ির বাঙালি স্কুলে ইংরেজি ভাষাটা যেভাবে শিখিয়েছে তাতে নিজের মত করে কথা বলা যায় না। এই মুহূর্তে সে বিব্রত হয়ে পড়েছিল।

চতুর্দিকে ছেলেটির রঙবেরঙের জামা-কাপড় ঝুলছে। ওর রুমমেটটি এখনও বোধ হয় ফেরেনি। কেউ যে রঙিন জাঙ্গিয়া পরে জানা ছিল না অনিমেষের। চেয়ারে বসে ছেলেটিকে ভাল করে দেখল সে। চামড়ার রঙ কালো হতে হতে তা থেকে কেমন নীলচে জেল্লা বেরুচ্ছে। চোখ দুটো ছোট, মাথার চুলে চিরুনি বোলানো অসম্ভব, এত কোঁকড়া এবং পাক খাওয়া বোধ হয় চুল আঁচড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। শরীর ওর বেতের মত হিলহিলে, সামান্য মেদ নেই।

মাই রুম, চকচকে সাদা দাঁত একবার ঝিলিক খেল। এই প্রথমবার, সে যে ইন্ডিয়ান তা কেউ অনিমেষকে বলল। তার হঠাৎ খেয়াল হল থম্বোটোর মাতৃভাষা ইংরেজি নয় অতএব সামান্য ভুলভাল হলে নিশ্চয়ই সে গ্রাহ্য করবে না। অনিমেষ নিজের নাম বলল, এখন কিছুটা স্বচ্ছন্দ হয়েছে সে।

অনিমেষ জিজ্ঞাসা করল, তুমি তো স্কটিশেই পড়?

হ্যাঁ, বি. এস-সি ফার্স্ট ইয়ার, তুমি?

আমি এম এ-তে অ্যাডমিশান নিয়েছি, এখনও ক্লাস শুরু হয়নি। আর্টস।

ও গড, তুমি তা হলে আমার সিনিয়ার, বাট য়ুলুক সো ইয়াং। অবাক চোখে তাকে দেখছিল থম্বোটো। সত্যি কি তাকে এম এ ক্লাসের ছাত্র বলে মনে হয় না? কি জানি।

সে জিজ্ঞাসা করল, এখানে কেমন লাগছে তোমার?

ভালই। তবে ওই মশলা দেওয়া খাবারগুলো যদি না থাকতো! দ্যাটস হরিবল। আমার স্টমাক প্রায়ই গোলমাল করছে, এ মান ক্যান নট লিভ অন মেডিসিন। তুমি হোস্টেলে থাকছ কেন, তোমার বাড়ি এখানে নয়?

না। আমি এখানে থেকে কয়েক শ মাইল দূরে ডুয়ার্স বলে একটা জায়গা থেকে এসেছি।

সেটা কি ভারতবর্ষ নয়?

কেন নয়? এই পশ্চিম বাংলারই একটা অংশ।

থম্বোটো চট করে টেবিল থেকে একটা বড় ভারতবর্ষের ম্যাপ সামনে বিছিয়ে বলল, শো মি হোয়ার ইট ইজ!

অনিমেষ ঝুঁকে পড়ে পশ্চিম বাংলার মাথায় জলপাইগুড়ি লেখা অঞ্চলটায় আঙুল রাখল। ও দেখল আলিপুরদুয়ার এবং ফালাকাটা ম্যাপে লেখা আছে কিন্তু স্বৰ্গছেঁড়ার উল্লেখ নেই। থম্বোটো জায়গাটা ভাল করে দেখে নিয়ে বলল, এ জায়গা তো হিমালয় পর্বতমালার নিচে, তুমি কি পাহাড়ী মানুষ?

না, না, আমি বাঙালী! হেসে ফেলল অনিমেষ।

স্টেঞ্জ! তোমাদের এই ভারতবর্ষে স্নো-রেঞ্জ আছে, সমুদ্র আছে, মরুভূমি আছে, আবার ডিফারেন্ট টাইপ অফ পিপল উইদ ডিফারেন্ট ল্যাঙ্গুয়েজেস এক সঙ্গে বাস করছ, কেউ বাঙালী কেউ পাঞ্জাবী আবার সকলেই ইন্ডিয়ান, তোমাদের কোন অসুবিধে হয় না? কি করে তোমরা ইউনাইটেড হলে? জানবার আগ্রহ থাম্বোটোর মুখে।

অনিমেষ এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, আমাদের চেহারা এবং ভাষা আলাদা হলেও কালচারের কোথাও কোথাও এবং ধর্মের মিল রয়েছে। তা ছাড়া ইতিহাস বলে, বার বার বিদেশী–আক্রমণ হয়েছে আমাদের ওপর। বোধ হয় আক্রান্ত হলেই ইউনিটি গড়ে ওঠে।

মন দিয়ে কথাটা শুনে থম্বোটা বলল, বাট দেয়ার আর হিন্দুস অ্যান্ড মুসলিমস, ক্রিশ্চিয়ানও কম নেই। এরা তো কমপ্লিট আলাদা ধর্মের মানুষ এবং প্রত্যেকের মানসিকতা আলাদা, তাই না?

অনিমেষ একটু থতমত হয়ে বলল, হ্যাঁ, কিন্তু ধর্ম তো ঘরের ব্যাপার, বাইরে আগুন লাগলে সেটা ঘরে রেখেই মানুষ আগুন নেবাতে বেরিয়ে আসে।

হাসল থম্বোটা, তাই যদি হয় তোমরা এত বছর ব্রিটিশকে থাকতে দিলে কেন? খুব দেরীতে হলেও অবশ্য তোমরা ব্রিটিশকে তাড়াতে পেরেছিলে আর এইটে অন্যদের মত অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশগুলোকে সাহায্য করেছিল।

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে অনিমেষ বলল, হ্যাঁ, ওরা আমাদের হাতে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা দিয়ে গিয়েছে।

বিস্মিত হলো থম্বোটা, ফ্রিডাম কেউ কাউকে দেয় না, ফ্রিডাম আর্ন করতে হয়। তুমি কি বলতে চাইছ তোমরা ফ্রিডাম আর্ন করনি?

কথাটা অনিমেষকে হঠাৎ উত্তেজিত করে ফেলল। স্কুল জীবনের শেষ দিকে সনীলদা যে সব নতুন ব্যাখ্যা ওকে শুনিয়েছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সম্পর্কে, কোলকাতায় আসার পর হাতখরচের পয়সা বাঁচিয়ে কেনা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সেই শোনা ব্যাখ্যাকে আরো দৃঢ় করেছে। সে বলল, আমরা চেষ্টা করেছিলাম বিভিন্ন পথে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওরা আমাদের দিয়ে গেছে। রক্ত না দিলে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না আর যদি তা পাওয়াও যায় তা হলে সে স্বাধীনতা সম্পর্কে দেশের মানুষের মমতা থাকে না। এই প্রথম অনিমেষ প্রকাশ্যে এসব কথা বলল। এতদিন এই সব বিষয় ওর ভাবনায় ঘোরাফেরা করত। কিন্তু এখন বলার সময় ওর মনে হল নিজের দেশের এই রকম দুর্বল জায়গা নিয়ে একজন বিদেশীর সঙ্গে আলোচনা করা ঠিক হচ্ছে না। থম্বোটা তার নিজের দেশের সমস্যা নিয়ে কোন কথা বলেনি। এ সব কথা বললে ও নিশ্চয়ই ভুল বুঝবে এবং সেটা ওর দেশের মানুষ জানুক তা কাম্য নয়। অনিমেষ গলার স্বর পাল্টে বলল, এর মধ্যে অনেকগুলো বছর গেছে, এবার আমরা পুরনো ভুলগুলো শুধরে নেব। এবার তোমার কথা বল, আমরা একই পৃথিবীতে থাকি অথচ তোমাদের দেশের খবর ভারতবর্ষের মানুষ কিছুই জানে না। থম্বোটা বলল ওয়েল, আমাদের দেশ খুবই গরীব এবং বড়লোকেরা যাকে বলে আনডেভেলপড বোধ হয় তাই। প্র্যাকটিক্যালি আমরা আফ্রিকানরা এত ছোট ছোট স্টেটে ডিভাইডেড যে–।

ঠিক এ সময় একজন খর্বকায় মানুষ দরজায় এসে দাঁড়াল। সর্বাঙ্গ ভেজা, পোশাক থেকে টুপটাপ জল ঝরছে মুখ চোখে খুব বিরক্তি। একে অবশ্য অনিমেষ কয়েক বার দেখেছে, এর মত বেঁটে এবং রোগা এ হোস্টেলের কোন আফ্রিকান নয়। তবে এর গায়ের রঙ নিকষ কালো নয় বরং তামাটে ভাবটাই বেশি। মোটা নাক এবং পুরু ঠোঁট থাকা সত্ত্বেও একটা আলগা শ্ৰী আছে। মাথার চুলে একটু বেশি স্প্রিং থাকায় বৃষ্টির জলেও এলোমেলো হয়নি। ছেলেটি ঘরে ঢুকে খুব উত্তেজিত হয়ে হাত পা নেড়ে থম্বোটাকে কি সব বলতে লাগল নিজের ভাষায়। থম্বোটা হাসছে কিন্তু কোন উত্তর দিচ্ছে না। ছেলেটা পাগলের মত দু-তিনবার পাক খেয়েও কথা থামাচ্ছে না। ভাষা ঠাওর না হলেও অনিমেষের মনে হল ছেলেটি বোধ হয় এই ঘরে ওকে দেখে রেগে গেছে। আফ্রিকান ছেলেদের ঘরে কোন ভারতীয়কে সে আড্ডা দিতে দ্যাখেনি, ওরাও কারো ঘরে যায় না। হঠাৎ ছেলেটি অনিমেষের দিকে তেড়ে এসে উল্টোদিকের খাটে বসে তড়বড় করে যে কথাগুলো বলল সেটা যে ইংরেজি ভাষায় তা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত লাগল। অনিমেষ দ্বিতীয়বার ওকে উচ্চারণ করতে শুনল, ইউ মাস্ত প্রতেস্ত। কি প্রতিবাদ করার কথা বলছে ও বুঝতে না পেরে অনিমেষ থম্বোটার দিকে তাকাতেই ছেলেটি একটা আঙুল ওর দিকে উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ইউ লিভ দিস হোস্তেল?

মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল অনিমেষ। একটু আশ্বস্ত হল এই ভেবে যে ওর রাগের কারণ সে নয়, তা হলে প্রতিবাদ করার কথা বলত না। থম্বোটা এবার কথা বলল এই ছেলেটি ওর রুমমেট। আজ বিকেলে এক সদ্যপরিচিতা মহিলার সঙ্গে ওর বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু বৃষ্টি এসে যাওয়ায় ওর হোস্টেলে ফিরে এসে আড্ডা মারবে ঠিক করেছিল। কিন্তু গেটে যে দারোয়ান আছে সে নাকি বাগড়া দিয়েছে এই বলে যে এখানে নাকি মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ। যেহেতু এখন আটটা বেজে গেছে তাই ভিজিটার্স রুমটাও বন্ধ ছিল। থম্বোটোর বন্ধু এতে ভীষণ অপমানিত বোধ করছে। তারা কেউ বাচ্চা ছেলে নয়, নিজের ভালমন্দ বুঝতে জানে, এই ধরনের আইন মেয়েদের হোস্টেলে থাকতে পারে কিন্তু ওদের ওপর প্রয়োগ করা মানে রীতিমত অপমান করা। একটু হেসে থম্বোটা যোগ করল, মহিলাটি আমার বন্ধুর মুখ আর দর্শন করবে না জানিয়ে গেছে।

থম্বোটোর বন্ধু এতক্ষণ চুপ করে কথাগুলো শুনছিল, এবার চিৎকার করে বলে উঠল, শি টোল্ড মি কি-ড।

অনিমেষ হেসে ফেলল বলার ধরন দেখে। থম্বোটোর বন্ধু চট করে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত হাতে নিজের জামাকাপড় খুলতে লাগল। গেঞ্জিটেঞ্জি পরেনি, নির্লোম তামাটে বুক দেখলে কেউ নিগ্রো বলে ভাবতে পারবে না। এরপর সে নির্দ্বিধায় প্যান্টের বোতাম খুলে সেটাকে ছুঁড়ে দিল ঘরের এক কোণায়। অনিমেষ এতটা আশা করেনি, চট করে একটা অস্বস্তি ওকে বিব্রত করে তুলল। পরিচিত কিংবা অপরিচিত যে-কোন মানুষের সামনেই এইরকম জামাকাপড় ছেড়ে শুধু জাঙ্গিয়া পরে দাঁড়ানোর কথা সে চিন্তাও করতে পারে না। এদের কি কোন সঙ্কোচের বালাই নেই? ওর আশঙ্কা হচ্ছিল এবার হয়তো জাঙ্গিয়াটাও শরীরে থাকবে না। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই ছেলেটির খুব ঘেন্নার সঙ্গে বলে উঠল, ইউ ইন্ডিয়ান আর উইদাউট ব্যাকবোন, কাওয়ার্ড। এবার শব্দগুলো বুঝতে এতটুকু অসুবিধে না হওয়ায় অনিমেষের মাথায় রক্ত উঠে গেল। চট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে ছেলেটির দিকে এগিয়ে গেল। ওর শরীর উত্তেজনায় কাঁপছে, দুটো হাতের আঙুল মুঠোয় ধরে রাখতে পারছে না। অনিমেষের মুখচোখের ভাব দেখে ছেলেটি বোধ হয় ভয় পেয়ে দুপা পিছিয়ে গেল। থম্বোটা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই ছুটে এসে অনিমেষকে জড়িয়ে ধরল। ওর বিরাট শরীরের কাছে অনিমেষ এই মুহূর্তে অসহায় হলেও প্রাণপণে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করছিল। জোর না খাঁটিয়ে থম্বোটা বলল, আমার বন্ধুর কথায় কান দিনও না, ও ঠিক জানে না কাকে কি বলতে হয়। তারপর হেসে বলল, তুমি রাগ করেছ দেখে আমি খুশি হয়েছি।

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিল অনিমেষ। এখন শরীর কেমন ঝিমঝিম করছে। থম্বোটো এসে বাধা না দিলে ও নির্ঘাত ছেলেটিকে মারত। উনি মেয়েদের সঙ্গে আড্ডা দেবেন আর সেটা সমর্থন না করলে জাত তুলে গালাগাল দেবেন। কোন রকমে থম্বোটার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এল অনিমেষ। আজ অবধি কখনো কারো গায়ে হাত তোলেনি সে, ছেলেটাকে মারলে ও নিশ্চয়ই কোন প্রতিরোধ করতে পারত না। ওরকম দুর্বল শরীর নিয়ে এ ধরনের কথা বলার সাহস পায় কি করে! মারতে পারেনি বলে জীবনে এই প্রথম বার আফসোস হল অনিমেষের। বাইরে এখনো সমানে বৃষ্টি পড়ছে। মেজাজটা খিঁচড়ে গেছে, আফ্রিকান ছেলেদের মানসিকতা এ রকম হয় কিনা কে জানে, তবে থম্বোটার সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছিল। কয়েক পা এগোতে না এগোতেই পেছনে ডাক শুনতে পেল সে, হেই, হনিমেস।

ঘাড় ফিরিয়ে সে দেখল থম্বোটা আসছে। নিজের নামটার এ রকম উচ্চারণ শুনে বিরক্তিটা যেন সামান্য মরে গেল। কাছে এসে থম্বোটা বলল, আমার খারাপ লাগছে। আমার বন্ধুটি কিন্তু খুব নিরীহ, শুধু মেয়েদের ব্যাপারে দারুণ সেনসিটিভ। যা হোক, তোমার সঙ্গে কথা বলে আমার খুব ভাল লেগেছে, তুমি কি আবার আসবে?

কথা বলার ভঙ্গীতে এমন একটা আন্তরিকতা ছিল যে অনিমেষ রাগ করতে পারল না। সে বলল, আজ থাক, আর একদিন হবে। ঠিক এই সময় থম্বোটার ঘর থেকে একটা উদাম সুর ভেসে এল। মাউথ অর্গানটা যেন ঝড় তুলছে। হেরে যাবে নিশ্চিত জেনে মানুষ যখন মরিয়া হয়ে ওঠে, সুরটা সেই রকম তেজী এবং উদ্দাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ ওরা বাজনাটা শুনল। এই শব্দ করে বৃষ্টিপড়া রাত্রে যখন সমস্ত হোস্টেলটা নিঝুম তখন এই রকম ঝিমঝিমে সুর যেন অবশ করে ফেলছিল ওকে। নীচু স্বরে থম্বোটো বলল, আমার চাইতে অনেক ভাল বাজায় ও, না?

অনিমেষ কি বলবে ঠাওর না করতে পেরে নিজের মনে ঘাড় নেড়ে বারান্দা দিয়ে হাঁটতে লাগল। যে সুরটা ওর পেছন পেছন আসছিল আচমকা সেটা থেমে যেতেই অনিমেষের মনে হল একটা ভারী নিস্তব্ধতা ওর চারপাশ চেপে ধরেছে। ঘরের শেকল খুলে অন্ধকারের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল সে। নিজেকে ভীষণ একা মনে হচ্ছে, এই বিরাট কোলকাতা শহরে তার কোন বন্ধু নেই, আত্মীয় নেই। আলো না জ্বেলে ঘরে ঢুকে চুপচাপ খাটে শুয়ে পড়ল সে।

অস্বস্তিটা তবু যাচ্ছিল না। কি সহজে ছেলেটি ওকে গালাগালিটা দিল! থম্বোটো না থাকলে আজ কি হতো বলা যায় না। হঠাৎ মাথায় রক্ত উঠে যাওয়ায় যে উত্তেজনা সমস্ত শরীরকে কাঁপাচ্ছিল তাতে সে কতখানি আঘাত করতে পারত কে জানে কিন্তু সেটা করতে পারলে বোধ হয় এখন ভাল লাগত। একটা ছেলে অতদূর থেকে কোলকাতায় পড়তে এসে অমন সামান্য কারণে একটা দেশের মানুষের চরিত্র সম্পর্কে এ রকম ইঙ্গিত দিতে যাবে কোন যুক্তিতে?

নিস্তেজ হয়ে অনিমেষ শুয়ে শুয়ে দরজা দিয়ে বাইরের বৃষ্টি দেখছিল। বারান্দায় জ্বেলে রাখা আলোয় বৃষ্টি মাখামাখি হয়ে নীচে নেমে যাচ্ছে। উত্তেজনা কমে আসায় ক্রমশ এক ধরনের অবসাদ এল । অনিমেষ কথাটা নিয়ে নাড়াচড়া করছিল, ইউ ইন্ডিয়ানস্ আর উইদাউট ব্যাকবোন, কাওয়ার্ড। শব্দগুলো হঠাৎ কেমন নিরীহ হয়ে গেল, সে যেন সামান্য ওপরে উঠে এসে ঝুঁকে পড়ে শব্দগুলোকে দেখতে লাগল। এই তিন বছর কোলকাতা শহরে সে যে জীবন কাটিয়েছে, প্রতিদিনের খবরের কাগজে অথবা চারপাশের যে মানুষগুলোকে শহরে সে যে জীবন কাটিয়েছে, প্রতিদিনের খবরের কাগজে অথবা চারপাশের যে মানুষগুলোকে নিত্য সে দেখছে তারা কি ধরনের? জলপাইগুড়ি শহর থেকে সেই প্রথমবার ট্রেনে চেপে আসবার সময় ভারতবর্ষের মাটিতে নতুন কিছু গড়ার জন্য যে ভাঙচুর শুরু হয়েছে বলে উত্তেজনায় টগবগে হয়েছিল সে, এই কয় বছরে তা কোথায় মিলিয়ে গেছে। এখন এই শহরের মানুষগুলোর দিকে তাকালে মনেই হয় না তারা বা তাদের কেউ কেউ ওসব কথা কখনো ভেবেছিল। গড্ডালিকা প্রবাহ সে বইতে পড়েছে কিন্তু সেটা কি জিনিস তা এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা না দেখলে বুঝত না। মেরুদণ্ডহীন কথাটা কি একদম প্রযোজ্য নয়? এখনও ভারতবর্ষের নব্বইভাগ মানুষ জানে না যে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। যারা জানে তাদের অনেকের মানসিকতায় ব্রিটিশ শাসন আর স্বাধীন ভারতবর্ষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

তার কলেজে পড়ার ব্যাপারে মহীতোষের সঙ্গে কিছুটা তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল। মহীতোষ চাননি যে অনিমেষ স্কটিশচার্চ কলেজে ভর্তি হোক। ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে পড়াশুনাটা তিনি পছন্দ করেন না। তাছাড়া হোস্টেলটা যখন কলেজ কম্পাউন্ডে নয় তখন কোলকাতার রাস্তায় ছেলেকে হাঁটাচলা করতে দিতে তিনি রাজী ছিলেন না। প্রায় আট মাস বিছানায় শুয়ে থেকে অনিমেষ খুব কাহিল এবং রোগা হয়েছিল, দ্রুত হাঁটাচলা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। একটু নজর করলেই বোঝা যায় যে সে একটা পা খুঁড়িয়ে হাঁটছে। বস্তুত কোলকাতার কলেজে পড়তে পাঠানোর ইচ্ছাই চরে গিয়েছিল মহীতোষের। মাসকাবারী রিকশার ব্যবস্থা করে জলপাইগুড়ির বাড়ি থেকে আনন্দচন্দ্র কলেজে পড়ার ব্যাপারেই জোর দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মানুষের সহজে শিক্ষা হয় না, বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনিমেষ, যে আরো একগুয়ে হয়ে গেছে সেটা প্রমাণ হল তার কোলকাতায় পড়তে যাওয়ার জেদে। আর একবার ঠাকুর্দা সরিৎশেখর তাকে সমর্থন করলেন। দুর্ঘটনা বারবার ঘটে না। প্রায় বাধ্য হয়ে মহীতোষ ছেলেকে নিয়ে কোলকাতায় এলেন, এবার একা ছাড়েননি। প্রেসিডেন্সীর পাশেই হিন্দু হোস্টেল, কিন্তু সেখানে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা বিফল হল। প্রথম ডিভিসনে পাশ করেও যে কোন কোন কলেজে জায়গা পাওয়া যায় না সেটা জেনে হতবাক হয়ে গেলেন মহীতোষ। ফলে কোলকাতার তিনটি মিশনারী কলেজের দিকে ঝুঁকলেন মহীতোষ, সেন্ট জেভিয়ার্সে মন মানল না। সব দিক দিয়ে দেখেশুনে সেন্ট পলস আসল জায়গা বলে মনে হল। কলেজের মধ্যেই হোস্টেল, রাস্তায় পা দিতে হবে না একবারও। কিন্তু অনিমেষ আকৃষ্ট হল তৃতীয়টিতে। স্কটিশচার্চে বিবেকানন্দ সুভাষচন্দ্র বসু পড়েছেন। কে কবে ঘি খেয়েছেন এখন গন্ধ শোকার কোন মানে হয় না–মহীতোষ এই কথাটা বোঝাতে পারেননি। মা-মরা ছেলেরা বোধ হয় চিরকাল এ রকম জেদী হয়। ছেলের সঙ্গে দুদিন কলেজে গিয়ে ভেতরে ভেতরে কেমন যেন অসহায় বোধ করেছিলেন তিনি। গাদা গাদা মেয়ে রঙবেরঙের পোশাকে জটলা করছে জলেজ চত্বরে, তাদের কারো কারো ভঙ্গী বেশ বেপরোয়া। এখানে ছেলের পড়াশুনা কতদূর হবে সন্দেহ থেকে গেল তার । যে চিন্তাটা তাকে আরো বিহ্বল করে দিচ্ছিল তা হল সায়েন্সের বদলে অনিমেষ আর্টসে অ্যাডমিশন নিয়েছে। বাবা হয়ে ছেলেকে ডাক্তার করার বাসনা জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি দেখলেন এখানেও অনিমেষের ঠাকুর্দার রায়ই শেষ কথা হল। যাওয়ার আগে বার বার তিনি ছেলেকে উপদেশ দিয়ে গেলেন। পড়াশুনা করে ভাল রেজাল্ট করতে হবে। এই কোলকাতা শহর নতুন ছেলেদের নষ্ট করে দেবার জন্য ওত পেতে থাকে, অনিমেষ যেন কখনও অসতর্ক না হয়। কোন বন্ধুবান্ধবকে বিশ্বাস করা উচিত হবে না কারণ বিপদের দিনে তারা কেউ পাশে থাকবে না। কলেজের য়ুনিয়ন থেকে যেন সে সাত হাত দুরে থাকে কারণ মধ্যবিত্ত সংসারের ছেলের এই বিলাসিতা সাজে না। রাজনীতি যাকে নেশা ধরায় তার ইহকাল পরকাল একদম ঝরঝরে হয়ে যায়। যাদের বাপের প্রচুর টাকা আছে তারাই ওসব করুক, যেমন জহরলাল, চিত্তরঞ্জন, সুভাষ বোস।

বাবার এ সব উপদেশ অনিমেষ মন দিয়ে শুনতে বাধ্য হয়েছিল। সে লক্ষ্য করেছিল বাবা যখন কথা বলেন তখন তিনি ভুলে যান ভারতবর্ষ এখন স্বাধীন। কিন্তু বাবার একটা কথার সঙ্গে সে একমত, ইতিমধ্যে তার একটা বছর নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মন্টু তপন অর্ক এখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। মানুষের জীবন বড় অল্প সময়ের, তা থেকেও যদি একটি বছর অকেজো হয়ে যায় তাহলে সেটা কম ক্ষতি নয়। অনিমেষ মহীতোষকে কথা দিয়েছিল সে সময় নষ্ট করবে না। তাই বি এ পাস করা পর্যন্ত সে শুধু দেখে গেছে চারধার। স্কটিশচার্চের ছাত্র যুনিয়ন অবশ্যই ছাত্র ফেডারেশনের দখলে কিন্তু মাঝে মাঝে মিছিল করা ছাড়া তাদের কোন সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। পৃথিবীর কোন প্রান্তে কি হল তার জন্য ওরা মিছিল বের করে অথচ কলেজের জলের কলটা তিনদিন খারাপ হয়েছিল সেদিকে খেয়াল করেনি। অনিমেষ শুধু ওদের দেখে গিয়েছিল এই কটি বছর। দ্রুত হাঁটা অথবা শারীরিক উদ্যম ফিরে আসতে যে এতটা সময় লাগবে তা সে ভাবেনি, মনে মনে ভেবে যাওয়া ছাড়া তার কোন উপায় ছিল না। আশ্চর্য, কেউ তাকে কোনদিন জিজ্ঞাসা করেনি তার পায়ে কি হয়েছে!

ত্রিদিব কখন এসেছে টের পায়নি অনিমেষ। ঘরে আলো জ্বলতেই চোখে লাগল, হাতের আড়ালে চোখ রাখল। ত্রিদিব একা নয়, সঙ্গে আরো দুজন এসেছে। খাওয়ার ঘরে ওদের দেখেছে কিন্তু আলাপ হয়নি। এই হোস্টেলে দুটো খাওয়ার ঘর, একটা বিদেশীদের অন্যটা ওদের। কে এই নিয়ম চালু করেছিল জানা নেই তবে এখনও তা চলে আসছে। অনিমেষ উঠে বসতে একটা তীব্র গন্ধ পেল। ত্রিদিবরা দাঁড়িয়ে আছে আর ওদের শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়া জলে মেঝে ভেসে যাচ্ছে। তিনজনেই ভিজে কাক। অনিমেষ ত্রিদিবকে বলল, কি ব্যাপার, বৃষ্টিতে ভিজে এলে, অসুখ করে যেতে পারে।

ত্রিদিব হাসল। বৃষ্টিতে ভিজলে চুলগুলো এমন নেতিয়ে থাকে যে অনেক সময় মানুষের চেহারা পাল্টে যায়। ত্রিদিবকে এখন অন্যরকম দেখচ্ছে, আরে এরকম ফাইন বৃষ্টির মধ্যে রোড দিয়ে হাঁটতে কি আরাম তা তুমি বুঝবে না। নিজেকে দেওয়ানা মনে হয়।

কিন্তু নিমোনিয়া হলে কি হবে? কথার ভঙ্গীটায় অনিমেষ মজা পেল।

কবিদের নিমোনিয়া হয় না। ঈশ্বর কবিদের সিনায় এত রকমের ভালবাসা দিয়েছেন যে সেখানে নিমোনিয়া জায়গা পায় না। কথা বলতে বলতে ত্রিদিব নিজের অস্থিরতা লুকোতে পারল না। এবার অনিমেষ লক্ষ্য করল ওরা তিনজনে ঠিক স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। ত্রিদিবের গলার স্বরটা একটু অন্যরকম, অনিমেষ, মাই রুমমেট, এদের সঙ্গে তোমার আলাপ আছে? নেই। আমরা এই হোস্টেলে থাকি তবু কেউ কাউকে চিনি না, আমরা একই পৃথিবীতে থাকি তবু মানুষের আজও জানাশোনা হল না। এ হচ্ছে দুর্গা–দুর্গাপদ, গোবিন্দ। আঙুল দিয়ে দ্বিতীয়জনকে দেখাল ত্রিদিব। গোবিন্দ যার নাম সে যখন কথা বলল তখনই গন্ধটার রহস্য বুঝতে পারল অনিমেষ।

তুমি তো গুড বয়, এখনও মফস্বলের আলোয়ান গায়ে জড়ানো!

কথাগুলো জড়ানো, মদ্যপানের প্রতিক্রিয়া প্রতিটি শব্দে। তার মানে ত্রিদিব এবং দুর্গাপদ মদ খেয়েই এসেছে। গোবিন্দর কথায় বিদ্রূপ থাকলেও অনিমেষ জবাব দিল না। এটা জানা কথা, মত্ত হলে মানুষের চিন্তা-ভাবনা অসংলগ্ন হয়ে যায়, তখন যুক্তি অচল। সে শুধু ত্রিদিবকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি মদ খেয়েছ?

কোলকাতার এই প্রবাস-জীবনে ত্রিদিবকে গৃহসঙ্গী পেয়ে খুশি হয়েছিল অনিমেষ। ছেলেটা কবিতা লেখে, অন্য রকম কবিতা, মনটা ভাল । অবশ্যই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে কিন্তু আচরণে কোন চালিয়াতি নেই। শুধু, অনিমেষের ইচ্ছে হোক না হোক ত্রিদিব ওকে কবিতা শোনাবেই। কিন্তু আজ অবধি ত্রিদিবকে সে মদ্যপান করা অবস্থায় দ্যাখেনি। কেউ মদ খেলেই সেই অনেক বছর আগের দেখা মহীতোষের চেহারাটা ওর সামনে উঠে আসে। মত্ত মহীতোষ আর শীর্ণচেহারার ছোটমাকে ভুলে গেছে অনিমেষ, তবু–। মানুষ দুঃখ পেলে নাকি মদ খায়, বড়লোকেরা মেজাজ আনতে ড্রিঙ্ক করে কিন্তু ত্রিদিবের ক্ষেত্রে তো এ দুটোর কোন প্রয়োজন আছে তার জানা নেই। তাছাড়া এই হোস্টেলের যে নিয়মাবলী দরজায় টাঙানো তাতে এ ধরনের আচরণের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা আছে।

ত্রিদিব কথাটার জবাব না দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল জানলার দিকে। পাল্লা দুটো খুলে দিতে দিতে বলে, কেন, মদ খেতে তোমার খারাপ লাগে? পেটে মদ মাথায় বৃষ্টি–লন্ডভন্ড হয়ে যাক সৃষ্টি। তুমি খাবে?

না। নিজের অজান্তেই শব্দটা জোরে বলে অনিমেষ।

কেন গুডি বয়। মদ খেলে মানুষ খারাপ হয়ে যায়? গোবিন্দ টিপ্পনী কাটল জড়ানো গলায়। অনিমেষ দেখল দুর্গাপদ জামার তলা থেকে একটা চ্যাপ্টা বোতল বের করছে। নাক সিটকে অনিমেষ বলল, মদ খেলে মানুষ কি হয় আমি জানি, আমার দেখা আছে।

দুর্গাপদ খিক খিক করে হাসল, অনেকের জামাইষষ্ঠী থাকে না, ভাইফোঁটা নিতে নেই, তোমার বুঝি এরকম ব্যাপার–মদ খেতে নেই!

ত্রিদিব জানলা খুলে দিতেই হু হু করে বৃষ্টির জল ঘরে ঢুকতে লাগল। অমিমেষ দেখল ওর পড়ার টেবিল জলে ভিজে যাচ্ছে। সে তড়াক করে নেমে জানলা বন্ধ করতে গিয়ে ত্রিদিবের কাছে বাধা পেল। দুহাত দুপাশে বাড়িয়ে ত্রিদিব বলল, নিয়ম না ভাঙলে নিয়মটাকে বোঝা যায় না, মাই রুমমেট।

আমার বইপত্র ভিজে যাচ্ছে।

কাল আমি শুকিয়ে দেব।

অনিমেষ লক্ষ্য করল ত্রিদিব ভাবপ্লুত অবস্থায় কথা বললে হিন্দী শব্দ একদম বলে না। যেমন কবিতা লেখার সময় ওর হয়। হাল ছেড়ে দিয়ে সে ফিরে আসছিল এমন সময় গোবিন্দ ওর সামনে এসে দাঁড়াল, ইনডাইরেক্ট না ডাইরেক্ট? বোতলটা সামনে ধরে সে ইঙ্গিত করতেই অনিমেষ মাথা নাড়ল,

আমি খাব না।

তা কি হয়! এক যাত্রায় পৃথক ফল।

আশ্চর্য! আমি না খেলে তোমরা জোর করে খাওয়াবে নাকি?

ত্রিদিব এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখল, সংস্কার ভাঙার কথা হচ্ছিল না সেদিন, তুমি নিজেই তো সংস্কারগ্রস্ত। নাও, খেয়ে নাও–লাথি মারো বিবেকের মাথায়।

ওটা সস্তা নয়, আমি মরে গেলেও খাব না। অনিমেষ ফুঁসে উঠল। হঠাৎ কি হল ত্রিদিবের, ওর চোখ মুখ হিংস্র হয়ে গেল। ধস্তাধস্তি শুরু হল বৃষ্টিভেজা ঘরটায়। অনিমেষ ভাবল চিৎকার করে ওঠে। সুপার ছুটে এলে এদের হাত থেকে বাঁচা যাবেই। কিন্তু তারপর যেটা হবে সেটা ভেবে সে চিৎকার করল না। নিঃশব্দ ছিল বাকী তিনজনই। সে কিছুতেই ওই তিন প্রায়-মাতালের সঙ্গে পেরে উঠছিল না। প্রচণ্ড শক্তিতে ওরা অনিমেষকে মাটিতে চিত করে ফেলে মুখের মধ্যে মদের বোতল গুঁজে দিল। গলগল করে নেমে আসা বিশ্রী স্বাদের তরল পদার্থটিকে জিভ দিয়ে প্রতিরোধ করতে পারল না অনিমেষ। উগরে ফেলতে গিয়ে কিছুটা পেটের ভেতর চলে গেল। জ্বলছে গলা–কি দুর্গন্ধ। অনিমেষ শেষবার দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিরোধ আনছিল। গোবিন্দ খিঁচিয়ে উঠল, শালা খাচ্ছে না। ঠিক আছে, ওর শাস্তি হল আগাগোড়া ন্যাংটা করা।

নগ্নতা কবিতা নয় অথবা আরো কিছু বেশি। ত্রিদিব বিড় বিড় করে উঠল। ওদের হাত চলছে। দুজন চেপে ধরেছে অন্যজন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দুপায়ের প্রতিবাদ সত্ত্বেও অনিমেষের নিম্নদেশ নগ্ন হয়ে গেল। পরবর্তী আক্রমণ কি হবে সেটা ভাববার আগেই একটা অস্ফুট আর্তনাদ শুনতে পেল অনিমেষ।

গোবিন্দ বলছে, আরে ব্বাস, এ শালার থাইতে এত বড় দাগ কিসের? চোখ বন্ধ অনিমেষের শরীরে আচমকা সেই যন্ত্রণাটা ছড়িয়ে পড়ল। সে শূন্যে সামান্য লাফিয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। ত্রিদিব ওকে ছেড়ে দিয়ে অপারেশনের জায়গাটায় হাত দিয়ে অন্য রকম গলায় কথা বলল, কি হয়েছিল এখানে? কিসের দাগ?

মুখের ভেতর বিশ্রী স্বাদ, গলা জ্বলছে, শরীরে অবসাদ, অনিমেষ থুতু ফেলার চেষ্টা করে জবাব দিল, বুলেটের।

০২. হাঁটুর খানিকটা ওপরে

হাঁটুর খানিকটা ওপরে গভীর তামাটে দাগ অস্ট্রেলিয়ার ম্যাপের আদল নিয়েছে। হঠাৎ দেখলে একটু অস্বস্তি হয়। সুন্দর নির্লোম থাই-এর মধ্যিখানে একটা কুৎসিত চিহ্ন সারা জীবন আঁকা থাকবে। সাধারণত ফুলপ্যান্ট পরলে চিহ্নটি কারো চোখে পড়ে না, অনিমেষও সেটা মনের আড়ালে রেখে দেয়। সামান্য পা টেনে হাঁটা ছাড়া এই চিহ্নটি ওকে কোন পীড়া দেয় না। চোখের বাইরে থাকলেই সব জিনিসে ধার কমে যায়। কিন্তু যখনই ওই প্রসঙ্গ ওঠে অথবা খবরের কাগজে পুলিশের গুলী চালানোর কথা লেখা হয় তখনই অনিমেষের থাই টনটন করতে থাকে। ব্যথাটা আচম্বিতে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে যায়।

কখন জ্ঞান ফিরেছিল অনিমেষ জানে না। মানুষ জলে ডুবে গিয়ে কি দ্যাখে সেটাও অভিজ্ঞতায় নেই। কিন্তু চোখের সামনে অজস্র ঘোলাটে ঢেউ ভেঙে ভেঙে পড়ছে–এ ছাড়া সে কিছু জানে না। প্রথম যখন নিজের অস্তিত্ব টের পেল তখন সে বিছানায়, মাথার ওপরে ছাদ এবং নাকজোড়া কড়া ওষুধের গন্ধ। সামান্য মাথা ঘোরাতে ও বুঝতে পারল এটা হাসপাতাল এবং সবে ভোর হয়েছে।

কলকাতায় পড়তে এসে যখন শিয়ালদায় নেমেছিল তখন সন্ধ্যে পেরিয়ে গেছে। অথচ এই ভোরবেলায় সে হাসপাতালে শুয়ে আছে কেন? অনিমেষের চিন্তা করতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। চোখ বন্ধ করে পরিচিত মুখগুলোকে দেখতে চাইছিল। সরিৎশেখর দাদুকে, ও এক পলকেই লাঠি হাতে এগিয়ে আসতে দেখল চোখের পর্দায়। মহীতোষ, ওর বাবা, গম্ভীর মুখে ফ্যাক্টরী থেকে ফিরে সাইকেল থেকে নামছেন। ছোটমা মাঠের মধ্যে দিয়ে দ্রুত হেঁটে চলেছেন, ঘোমটা একটু নেমে এসেছে। না, সবাইকে সে মনে করতে পারছে, আলাদা আলাদা করে প্রতিটি মুখের আদল দেখতে পাচ্ছে। আর তারপরেই সিনেমার মত চোখের পর্দায় জ্বলন্ত ট্রামটা ভেসে উঠল, কিছু ছেলে যেটায় আগুন লাগিয়ে একটু আগে ছুটে গেছে। শব্দ হচ্ছে ট্রামটা থেকে, লকলকে আগুন ট্রামের তার ছুঁয়েছে। বারুদের গন্ধ বাতাসে, অনিমেষ সেই ট্রেনে–পরিচিত বৃদ্ধের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিল। কার্ফু শব্দটার কার্যকর ক্ষমতা সে ওই প্রথম দেখল। এমন নিস্তব্ধ মৃত শহরের নাম কলকাতা এটা আবিষ্কার করে অবাক হয়ে গিয়েছিল সে। সেই বৃদ্ধের মুখটা এখন মনে পড়ছে না, তিনিও কি–। সঙ্গে সঙ্গে যেন শব্দটা শুনতে পেল অনিমেষ। ট্রামের পাশে দাঁড়ানো পুলিশগুলোকে তেড়ে আসতে দেখে সে একটা গলির মধ্যে ঢুকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। এত অন্ধকার জলপাইগুড়ি শহরে কখনো দেখেনি সে। আর তখনই ওর থাই-এর মধ্যে গরম ছুরি বসিয়ে কেউ যেন শূন্যে ঠেলে দিল। প্রচণ্ড একটা যন্ত্রণা নিয়ে মাটিতে পড়ে গেল অনিমেষ, আর কিছু মনে নেই। না, ঠিক তা নয়, কতগুলো অস্পষ্ট মুখ–কিছু না-বোঝা-কথাবার্তা এর পরে সে শুনেছে। নিজের মায়ের মুখ, ছবিতে থাকা মৃত মায়ের মুখ কি ওর দিকে তাকিয়ে হেসেছিল? একটা গান গাইছিল কেউ, তার সুর বা কথা কিছু মনে নেই। আর তারপরেই কে যেন এসে ভুল নামে তাকে ডেকেছিল, তারা কে?

জ্ঞান ফিরেছে। গলাটা খসখসে কিন্তু ভাল লাগল অনিমেষের। সে চোখ খুলে যাকে দেখল তিনি একজন নার্স । সব নার্সকেই একই রকম দেখায়। এর চেহারা মোটেই সুন্দরী নয় এটুকু বোঝা যায়। অনিমেষ কথা বলতে চেষ্টা করল, ভীষণ দুর্বল লাগছে, আমি কোথায়?

এটা মেডিক্যাল কলেজ হসপিটাল। দুদিন আগে আপনি এখানে এসেছিলেন। এখন আরাম করে ঘুমোন। নার্স হাসলেন। ওঁর কালো মাড়ি দেখতে অনিমেষের একটুও খারাপ লাগল না। কিন্তু হঠাৎই মনে হল কোমরের নীচে থেকে নিজের পায়ের অস্তিত্ব সে টের পাচ্ছে না। তলাটা যেন অসাড় হয়ে আছে। ব্যাপারটা কি বুঝে ওঠার আগেই শরীর ঝিমঝিম করতে লাগল এবং পায়ের ওপর রাখা চাদর মাথা অবধি টেনে নেওয়ার মত হঠাৎই একটা আচ্ছন্নতা ওকে ঢেকে ফেলল।

আবার যখন ঘুম ভাঙল তখন বিকেল। কয়েক মুহূর্তের অস্বচ্ছলতা, তারপরেই সব কিছু পরিষ্কার দেখতে লাগল অনিমেষ। তার কাছে কেউ নেই, সেই নার্সটিকেও দেখতে পেল না। কিন্তু ওপাশে বেশ কথাবার্তা চলছে। ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখল ওপাশের বেডগুলোতে আরো মানুষ শুয়ে বসে আছেন এবং তাদের কাছে মানুষজন এসেছেন। হঠাৎ অনিমেষের খেয়াল হল সে যে এই হাসপাতালের বিছনায় শুয়ে আছে তা কি বাড়ির লোকেরা জানে? অনিমেষ উঠে বসতে গিয়ে যন্ত্রণাটাকে আবিষ্কার করল। সে পারছে না, হাত আঙুল কিংবা মাথা তার ইচ্ছে মতন কাজ করলেও কোমরের নীচে ইচ্ছেটা পৌঁছাচ্ছে না।

আঘাত এবং যন্ত্রণাটা যে গুলী থেকে সেটা এখন স্পষ্ট। কিন্তু কে গুলী করল ওকে? সেই গলির মধ্যে পালিয়ে যাওয়া ছেলেগুলো না পেছনে ধেয়ে আসা পুলিশ? সে মনে করতে পারল আঘাতটা পেছন থেকেই এসেছিল এবং সে ধাক্কা খেয়েও পেছনে মুখ ঘোরাতে পারেনি। ট্রামের আগুনে দেখা পুলিশগুলো রাগী গোখরোর মত তেড়ে আসছিল। কিন্তু হাতে স্যুটকেস আর বিডিং দেখেও কি ওরা বুঝতে পারল না? খামোকা ওকে পুলিশ গুলী করল কেন? গুলীটা যদি আর একটু ওপরে লাগত, একটুও অস্বাভাবিক ছিল না তাহলে?

ঘুম ভেঙেছে তাহলে?

অনিমেষ দেখল একজন কালো চেহারার স্থূলকায় নার্স ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। সকালের নার্সটি নন। যদিও সব নার্সের পোশাক এক তবু এর কথা বলার ভঙ্গি এবং চাহনিতে এমন একটা ব্যাপার আছে যা অস্বস্তি এনে দেয়।

হা করে কি গিলছ ভাই, তোমার সামনে এখন অনেক পরীক্ষা।

পরীক্ষা, কিসের পরীক্ষা! নিজের গলার স্বর অনিমেষের অচেনা, সে তো এরকম গলায় কথা বলে না। নার্স বললেন, তুমি তো আকাশ থেকে পড়েছ, নামটাও লেখা হয়নি; আর পায়ে যে মালটি ঢুকিয়েছিলে সেটা শান্ত ভদ্র ছেলের ঢোকে না। একজন বাবাজী রোজ দুবেলা এসে তোমার খোঁজখবর নিয়ে যাচ্ছে। তা আজ যদি কথা বলতে ইচ্ছে না করে চোখ মটকে পড়ে থাক, আমি গিয়ে বলে দিই জ্ঞান ফেরেনি। খবরদার, চোখ খোলা চলবে না। এক নাগাড়ে কথা বললেও মুখের চেহারা একটুও পালটালেন না মহিলা।

বাবাজী? এ সবকিছু হেঁয়ালির মত লাগছিল অনিমেষের।

পুলিশ। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গেলে আর বাবাজীদের চিনলে না? দিয়েছ তো পা ফাঁসিয়ে, এখন থাক বিছানায় শুয়ে। এবার পুলিশ অন্য ঠ্যাঙটা ধরে টানাটানি করবে। কি, ঘুমুবে না খবর দেব? মহিলার কথা বলার মধ্যে এমন একটা ঠাট্টার ভঙ্গি ছিল যে, অনিমেষ অসহায় হয়ে পড়ল। সে কাতর গলায় বলল, বিশ্বাস করুন, আমি পুলিশকে কিছু করিনি, আমি কলকাতার কিছু চিনি না।

ও সব গল্প আমার কাছে বলে কোন লাভ নেই।

কথাবার্তা একদম অস্বাভাবিক। জলপাইগুড়িতে সে কোন মহিলাকে এরকম কথা বলতে শোনেনি। কলকাতার সব মেয়ে কি এই ভঙ্গিতে কথা বলে? ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছে কলকাতার মানুষদের মনে দয়ামায়া কম, কেউ কারো কথা ভাবে না, স্বার্থপর হয়ে যায় সবাই। কিন্তু নার্সরা এরকম হবে কেন?

জলপাইগুড়িতে তার খবর এখনও পৌঁছায়নি। তার পকেটে অবশ্য এমন কিছু ছিল না যা থেকে কেউ তার ঠিকানা খুঁজে পাবে। অবশ্য স্যুটকেস খুললে সব কিছু পাওয়া যাবে। বাবার বন্ধুকে লেখা চিঠিও ওতে আছে। তা হলে কি স্যুটকেস বিডিং–এর হদিস কেউ পায়নি? ও দুটো হারালে সে কি করবে? তার সব শার্ট প্যান্ট তো ওই স্যুটকেসেই আছে। খুব দুর্বল লাগছে এখন।

জ্ঞান ফিরেছে?

অনিমেষ দেখল একজন ডাক্তার–ডাক্তারই, কেননা গলায় স্টেথো ঝোলানো; ওকে প্রশ্ন করছেন। শরীরের পাশে নেতিয়ে থাকা ডান হাতের কবজিটা তুলে পালস্ দেখলেন তিনি, তারপর বললেন,

পাঁচ মিনিটের বেশি কথা বলবেন না।

বাঁধা গৎ। মোটা গলার চাপা হাসি কানে এল।

যা বলেন, তবে এ কেসে আর একটু ব্লিডিং হলে বাঁচানো যেত না। অনিমেষ ডাক্তারকে চলে যেতে দেখল। শরীর থেকে অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে? অনিমেষের ইচ্ছে করছিল ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করে তার পা আস্ত আছে কিনা? সে নিজে উঠে বসে যে দেখবে তেমন শক্তি নেই। যদি পা বাদ দিয়ে থাকে ওরা তা হলে সে কি করবে? চিরকাল খোঁড়া হয়ে হাঁটা–, মেঝেতে কিছু ঘষটে আনার শব্দ হতে অনিমেষ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। একজন রোগা মানুষ কিন্তু কাতলা মাছের মত মুখ, সবুজ হাওয়াই শার্ট আর প্যান্ট পরা, ওপাশ থেকে একটা টুল ঘষটে খাটের কাছে নিয়ে এল। লোকটার চোখ সে ভাল করে দেখতে পাচ্ছে না; কারণ, নাকের পাশে আর ভ্রূর তলার ঢিপি মাংস সে দুটোকে প্রায় ঢেকে রেখেছে।

বিপ্লব হল? মুখের ভেতর চিবিয়ে ছিবড়ে ছুঁড়ে ফেলছে এমন ভঙ্গি কথা বলার । প্রশ্নটা বুঝতে পারল না, কিসের বিপ্লব, তার সঙ্গে ওর কি সম্পর্ক।

ফেরেব্বাজী আমি একদম পছন্দ করি না। যা জিজ্ঞাসা করব চটপট জবাব দেবে, তোমার চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য যে হাসপাতালে শুয়ে আছ। কথা বলে নিঃশব্দে হাঁ করে হাসল লোকটা। অনিমেষ দেখল ওর দাঁতগুলো খুব ছোট, চোখের মত, আছে কি নেই বোঝা যায় না। সে খুব সাহস করে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে?

তোমাদের পরিত্রাতা, ঈশ্বর। ঈশ্বরকে চেনো? যার ডাক নাম ভগবান? বলেই ভেঙচিয়ে উঠল লোকটা, আপনি কে? নবাব সাহেব আমাকেই প্রশ্ন করছেন উল্টে। একদম না। যা জিজ্ঞাসা করার তা আমিই করব। হাতের ডায়েরি খুলে প্রথম প্রশ্ন হল, বাপ-মার দেওয়া নামটা কি?

অনিমেষ। ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে, জিভ টানছে অনিমেষের।

পুরো নাম বলার অভ্যেস নেই নাকি? আচ্ছা ত্যাঁদোড় তো! যেন রবীন্দ্রনাথ, হিটলার, বললেই চিনে ফেলতে হবে। পুরো নাম ঠিকানা বলো!

অনিমেষ বাধ্য হয়ে লোকটার হুকুম তামিল করতেই খিঁচুনি শুনতে পেল, আবার নক্করবাজী! বোমা ছুঁড়লে শ্যালদায় আর ঠিকানা দিচ্ছ সেই জলপাইগুড়ির, ওখান থেকে বিপ্লব করতে এসেছিলে?

অনিমেষ এতক্ষণে বিপ্লব শব্দটার অর্থ ধরতে পারল। সেদিন যে ট্রাম জ্বলছিল, বোমা পড়ছিল, লোকটা তাকেই ব্যঙ্গ করছে। নার্স যার কথা বলছিলেন বাবাজী তিনি যে সুবিধের নন সেটা এতক্ষণে বোঝা হয়ে গেছে। কিন্তু এখন আর কোন ভয় লাগছে না অনিমেষের। সে সহজ গলায় জিজ্ঞাসা করল,

আপনাকে কেউ সত্যি কথা বলে না, না?

না, নেভার । পুলিশদের কারবার সেরা মিথ্যুকদের সঙ্গে। এবার আসল ঠিকানাটা বলে ফেল। আরে বাবা, বাপ-মা থাকলে তারা এতক্ষণে হেদিয়ে মরছে, ঠিকানা জানলে আমি খবরটা দিয়ে দেব। স্নেহ-স্নেহ মুখ করার চেষ্টা করতেই লোকটার চোখের তলার মাংসের ঢিবি নেচে উঠল।

আমি ঠিকই বলছি। জলপাইগুড়ি শহরের হাকিমপাড়ায় আমি থাকতাম। বাবা স্বৰ্গছেঁড়া চা বাগানে কাজ করেন। কথা বলতে এখন ক্লান্ত লাগছে। লোকটা যদি সত্যিই দাদুকে খবরটা দিয়ে দেয়। ঠিকানা লিখে নিয়ে লোকটা জিজ্ঞাসা করল, তোমার সঙ্গে আর যারা ছিল তাদের নাম বল?

একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক। উনি ফুটপাতে পড়ে গিয়েছিলেন, নাম জানি না।

বৃদ্ধ–ইয়ার্কি?

আমরা নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেসে এসেছিলাম। স্টেশনে নেমে দেখলাম খুব গোলমাল হচ্ছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর উনি আমায় নিয়ে বেরিয়েছিলেন।

বেশ, বেশ, বলে যাও। পকেট থেকে একটা চারমিনারের প্যাকেট বের করেও কি ভেবে আবার বুক পকেটে রেখে দিল লোকটা।

আমি এর আগে কখনও কলকাতায় আসিনি!

বাঃ, গুড, চলুক।

আমরা যখন রাস্তায় এলাম তখন চারপাশে নিস্তব্ধ আর একটা ট্রাম দাউ দাউ করে জ্বলছিল।

দাউ দাউ করে জ্বলছিল, অ্যাঁ? কেমন লাগল দেখতে? লোকটা ভ্রূকুঁচকে কিছুক্ষন ওর দিকে চেয়ে থেকে বলল, গল্প বানানো সবার ক্ষমতায় আসে না, বুঝলে ছোকরা! আমরা ট্রাম পোড়ানোর জন্য একমাত্র যাকে ধরতে পেরেছি সে হল তুমি! আর তোমার গল্প হল সে সন্ধ্যেতে প্রথম তুমি কলকাতার মুখ দেখেছ?

কথা বলার ক্ষমতা চলে যাচ্ছে, নীরবে, নীরবে ঘাড় নাড়ল অনিমেষ।

কিন্তু চাঁদু, ওই পোড়ো বাড়ির আখড়ায়–যেখান থেকে বিপ্লব পরিচালনা করা হচ্ছিল সেখানে তোমাকে পাওয়া গেল কি করে? সব তখন ভোঁ ভোঁত, ওনলি তোমার হাফ-ডেড বডি পড়েছিল তো? যেন আসল জায়গায় এতক্ষণে হাত দিয়েছে এমন ভঙ্গি করল লোকটা।

অনিমেষ চোখ বন্ধ করল। চেতনায় অস্পষ্ট হলেও তার মনে আসছে কারা যেন তাকে চাংদোলা করে ছুটে যাচ্ছিল। তারপর কেউ ভুল নামে ওকে ডেকেছিল– সে চোখ না খুলেই বলল, আমি জানি না, আমার কিছু মনে নেই। এতক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলে যেটা সে ঠাওর করেনি সেটাই ঘটে গেল । হঠাৎই যেন তার পায়ের তলায় মাটি সরে যেতে সে তলিয়ে যাচ্ছিল। সে কিছু একটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলেও সব কিছু নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে। কে যেন তাকে টেনে নিয়ে নিয়ে হুহু করে নীচে নেমে গেল এবং তারপর সব অন্ধকার।

ঠিক কত ঘন্টা জানা নেই, ঘুম থেকে ওঠার মত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চোখ খুলল অনিমেষ। এখন বেশ ভাল লাগছে, গতকাল জ্ঞান ফেরার পর যে অবসাদ সমস্ত শরীরে জড়িয়ে ছিল সেটা এখন নেই। দুটো হাত মাথার ওপর এনে সে দেখল বেশ জোর পাচ্ছে, কিন্তু উঠে বসতে গিয়ে খচ করে কোমরে লাগতেই প্রচণ্ড একটা যন্ত্রণা পাক খেয়ে গেল থাইতে। কিছুক্ষণ মুখ বুজে শুয়ে থেকে যন্ত্রণাটাকে কমিয়ে আনল অনিমেষ। হাত দিয়ে যেটুকু পারে বুলিয়ে সে বুঝতে পারল তার পা দুটো আস্তই আছে, মনে হয় কেউ বাদ দেয়নি। হ্যাঁ, পায়ের আঙুলগুলো সে নাড়াচাড়া করতে পারছে। অদ্ভূত স্বস্তি এল মনে, কি আরাম! ওর নাকি খুব ব্লিডিং হয়েছিল? যারা তাকে গলি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তারা কি অযত্ন করেছে? নাকি পুলিশই দেরি করেছে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে?

অনিমেষ দেখল, ওপাশের বেডে একজন বৃদ্ধ উবু হয়ে বসে আছেন। খুব রোগা হাড়জিরজিরে চেহারা। চোখাচোখি হতেই ফোকলা মুখে সরল হাসি হাসলেন, তা হলে ঘুম ভাঙল, কেমন বোধ করছ বাবা? ঘাড় নাড়ল অনিমেষ, ভাল ।

কাল বিকেলবেলায় সেই লোকটা খুব খিঁচোচ্ছিল বুঝি? আমি নার্সকে বললাম কেন এ সব লোককে ঢুকতে দেন? তা সে মাগী জবাব দিল লোকটা নাকি পুলিশ। তা বাবা, কি করেছিলে, ডাকাতি না ছেনতাই?

অনিমেষ হেসে ফেলল, ওসব কিছু নয়।

অনিমেষ দেখল, এটা একটা বিরাট হল ঘর। তার বিছানা, একদম দেওয়াল ঘেঁষে। একপাশে সাদা দেওয়াল অন্য পাশে সারি সারি বিছানা। অনিমেষের মনে হল, বৃদ্ধের বসে থাকার ভঙ্গিটা খুব স্বাভাবিক নয়। সে জিজ্ঞাসা করল, আপনি ওভাবে বসে আছেন কেন?

শুতে পারি না ভাই, শুলেই শরীরের সব হাড় পটাপট গায়ের মধ্যে ফোটে। না খেতে পেয়ে মাংস বলে তো কিছু নেই। আবার লোকে যেভাবে বসে থাকে সেভাবে বসলে খচখচ করে। এই যে উচ্চংড়ের মত বসে আছি–এটাই আমার আরাম। তারপর মাথা দুলিয়ে ফাঁকা মাড়িতে একগাল হেসে বললেন, সকলে মিলে যে নিয়মটাকে তৈরি করে আমরা সেটাকেই স্বাভাবিক বলি। কেউ কেউ যদি নিজের মত কিছু করে নেয় সেটা চোখে ঠেকালেও জেনো তাতেই তার আরাম।

পায়ের শব্দে অনিমেষ দেখল গতকালের সেই অসুন্দর অথচ ভাললাগা নার্সটি এসে দাঁড়িয়েছেন। নিজেই কথা বলল এখন ভাল আছি।

খুব ঘুমিয়েছেন। তারপর খাটের পেছনে টাঙানো একটা কাগজ দেখতে দেখতে জিজ্ঞাসা কররেন, রাত্রে জ্বর এসেছিল? মহিলা ঝুঁকে পড়ে ওর কপাল ছুঁয়ে বললেন, না, এখন টেম্পারেচার নেই। অনিমেষ অবাক হল। ঘুমের মধ্যে তার কখন জ্বর এল আবার চলেও গেল সে টের পায়নি। মহিলা সতর্ক করলেন, এখন নড়াচড়া একদম বন্ধ যদি আবার হাঁটতে চান। হাড়টা এমন জায়গায় ফেটেছে যে অবাধ্য হলে আর জোড়া লাগবে না। খুব ভাগ্য যে বেঁচে গেছেন।

অনিমেষ মহিলার দিকে তাকাল। ছোট্ট শান্ত মুখ, গলার স্বরে দূরত্ব নেই। টুকটাক কাজ সেরে মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সঙ্গে তো কিছুই নেই যা দিয়ে একটু পরিষ্কার হবেন। হাসপাতালে ও সব কিছু পাওয়া যায় না। বাড়িতে খবর গেছে?

জানি না, কাল একজন পুলিশ এসেছিল–ওরা যদি খবর দেয়। বলতে বলতে সে দেখল, ওপাশের অনেক বিছানার চারপাশে কাপড়ের ঘেরাটোপ, সম্ভবত প্রাকৃতিক কাজকর্মগুলো প্রকাশ্যে করা থেকে আড়ালের ব্যবস্থা। আশ্চর্য, অনিমেষ নিজে ওরকম তাগিদ অনুভব করছে না এখন আর করলেও এই মহিলার সামনে মরে গেলেও

ঠিকানাটা বলুন, দেখি হাসপাতাল থেকে চেষ্টা করে যদি খবর দেওয়াতে পারি। মহিলা টুলটাকে টেনে নিয়ে পাশে বসলেন অনিমেষ এবার অনুভব করল ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তার চোখ দুটো ভারী, সম্ভবত সেখানে পিচুটি জমেছে। কোন মহিলার দিকে এই চোখে তাকানো অস্বস্তিকর। সে মুখ ঘুরিয়ে বলল, জলপাইগুড়ির হাকিমপাড়ায় আমার বাড়ি।

জলপাইগুড়ি! ওমা, সে তো অনেক দূরে। কলকাতায় আপনি কোথায় থাকতেন?

যেদিন গুলীটা লাগল সেদিনই আমি প্রথম কলকাতায় এসেছি। এ কথা কাউকে বোঝাতে পারছি না। কলকাতার কিছুই চিনি না আমি। বাবার এক বন্ধু এখানেই থাকেন, তার বাড়িতেই যাচ্ছিলাম। এই যাঃ, পুলিশকে ওঁর ঠিকানাটা বলতেই ভুলে গিয়েছি। অনিমেষের সত্যি আফসোস হল।

কি ঠিকানা?

সাত নম্বর হরেন মল্লিক লেন, কলকাতা–কলকাতা বারো বোধ হয়। বাবার বন্ধুর নাম দেবব্রতবাবু, ওঁকেও আমি কখনো দেখিনি। অসহায়ের মত তাকাল সে।

কলকাতার বারো? তা হলে তো এই এলাকা। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন খবর দিয়ে দেব।

আপনি নিজেই দেবেন?

দিলামই বা। আপনি আগে কলকাতায় আসেন নি। হেসে উঠলেন, আপনাকে আপনি বলতে আমার খারাপ লাগছে, একদম বাচ্চা ছেলে, আমার চেয়ে অনেক ছোট।

ঠিক আছে, আপনি আমাকে তুমি বলবেন। আমার নাম অনিমেষ।

এখানে কি জন্যে আসা হয়েছিল?

পড়তে। আমি এবার স্কুল ফাইন্যাল পাস করেছি।

দেখো কি কপাল এ বছরটা নষ্ট হয়ে গেল তো!

নষ্ট হল মানে? আমি কি হাঁটতে পারব না?

পারবে না কেন? তবে অনেকদিন বিছানায় আটকে থাকতে হবে। হাঁটুর ওপরের হাড়টা ফ্র্যাকচার হয়েছিল, বয়স অল্প বলে জুড়ে যাবে। তুমিতো মরেও যেতে পারতে।

কথা শেষ করতেই ওপাশের একজন রুগী কিছু চেঁচিয়ে বলতে মহিলা উঠে তার কাছে চলে গেলেন। অনিমেষ শিথিলভাবে শুয়ে রইল। ভীষণ মন খারাপ লাগছে।

দুপুরে একটু ঘুম ঘুম ভাব এসেছিল, কিন্তু গরমে জামা ভিজে গেছে, ঘেমো গন্ধ বেরুচ্ছে বিছানা থেকে–গা ঘিনঘিনে ভাবটা আর ঘুমুতে দিচ্ছিল না ওকে। পাশের বেডের বৃদ্ধ সেই রকম ভঙ্গিতে বসে বসেই দুপুরটা ঘুমুলেন। এখন ওয়ার্ডে কেউ হাঁটাচলা করছে না। মাঝে মাঝে ঘড়ঘড় শব্দ ভেসে আসছে বাইরে থেকে। খাওয়ার সময় বৃদ্ধের মুখে শুনে সে জেনেছে ওটা ট্রামের শব্দ। খাওয়া অনিমেষ কোনদিন চিন্তাও করেনি এভাবে শুয়ে শুয়ে মানুষ খেতে পারে। এমনকি প্রাকৃতিক কাজগুলো পর্যন্ত এই বিছানায় সারতে হল । ভাগ্যিস তখন কোন নার্স ছিল না, জমাদার টাইপের একটা লোক অনিমেষকে খুব সাহায্য করেছে। ট্রামের শব্দটা শুনে ওর মনে হল, কলকাতা শহরের বুকে সে শুয়ে আছে কিন্তু একটা চলন্ত ট্রাম সে দেখতে পেল না। এখন নাকি কলকাতা শহর যেমন হঠাৎই ফুঁসে ওঠে তেমনি চটজলদি ঠান্ডা হয়ে যায়। বৃদ্ধের মুখে এ খবর শুনে অনিমেষ অবাক হয়ে গিয়েছিল। যে জন্যে আন্দোলন হয়েছিল তা যেমনকে তেমনই রয়েছে। এ রকম ভালুক-জ্বরের মত আন্দোলন করে কার কি লাভ হয়? আবার এমনও তো হতে পারে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে এর প্রকৃত কারণটা ধরতে পারছে না। কলকাতাকে জানতে হলে এই শহরে মিশে যেতে হবে। অসহায়ের মত অনিমেষ নিজের পায়ের দিকে তাকাল।

কোথাও যেন ঘণ্টা বাজল ট্রেন ছাড়ার আর সঙ্গে সঙ্গে পাশের বিছানার মানুষের নড়েচড়ে বসতে লাগল। এটা তা হলে ভিজিটার্স আওয়ার। রোগীদের আত্মীয় বন্ধুরা আসছে। সে দেখল বৃদ্ধের কাছ কেউ আসেনি এবং তাতে যেন তার ভ্রুক্ষেপ নেই। উনি তেমনি উবু হয়ে বসে সব দেখছেন। অনিমেষ চোখ বন্ধ করল।

কিন্তু কয়েক মিনিট বাদেই একটা অপরিচিত গলায় নিজের নাম শুনে তাকে চোখ খুলতেই হল। একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক ওর মুখের সামনে দাঁড়িয়ে। ফর্সা মাথায় পাতলা চুল, লম্বা, ধুতি পাঞ্জাবি পরা। ওকে চোখ খুলতে দেখে তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, তোমার নাম অনিমেষ?

নিঃশব্দে ঘাড় নাড়ল সে।

কোথায় বাড়ি?

জলপাইগুড়ি। ইনি কে? দেখে তো পুলিশ বলে মনে হচ্ছে না।

বাবার নাম কি? ভদ্রলোক খুঁটিয়ে দেখছিলেন।

মহীতোষ–কথাটা শেষ করতে দিলেন না ভদ্রলোক। যেন উত্তর পেয়ে গেছেন, আর প্রয়োজন নেই এমন ভঙ্গিতে হাত তুলে হাসলেন, আসার কথা ছিল আমার বাড়িতে, তার বদলে চলে এলে এই হাসপাতালে! কি আশ্চর্য!

এবার অনিমেষ অনুমান করল ভদ্রলোকের পরিচয়, আপনি–।

তোমার বাবার বন্ধু দেবব্রত মুখারজি। সাত নম্বর হরেন মল্লিক লেন এখান থেকে দুপা রাস্তা কিন্তু ওই নার্স মহিলা যদি না যেতেন তা হলে জানতেই পারতাম না। ওঁর কাছেই সব শুনলাম, কি গেরো বলো দেখি। বিধিলিপি কে খন্ডাবে! আমি তোমার বাবার টেলিগ্রাম পেয়েছিলাম যেদিন তোমার আসার কথা তার পরের দিন। কি ডাক ব্যবস্থা বোঝ! তা পেয়ে অবধি দুশ্চিন্তায় অস্থির, এই বিরাট শহরে কোথায় আছ কে জানে! তা আজ খবর পেয়েই মহীকে টেলিগ্রাম করলাম চলে আসার জন্য। এখন কেমন আছ? ভদ্রলোকের কথা বলার মধ্যে এমন একটা আন্তরিকতা ছিল যে, অনিমেষের ভাল লাগল । সে বলল, শুধু এই পা–টা।

ঠিক আছে, আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছি, তুমি কিছু চিন্তা করো না। বলে দেবব্রতবাবু মুখ ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন, তোমার সঙ্গে আমার মেয়ের আলাপ করিয়ে দিই–নীলা, এদিকে আয়।

এতক্ষণে অনিমেষ লক্ষ করল, দেবব্রতবাবু একা নন, একটি লম্বা স্বাস্থ্যবতী মেয়েকে এগিয়ে আসতে দেখল সে। যদিও গায়ের রঙ চাপা তবু ওকে দেখলে চট করে উর্বশীর কথা মনে পড়ে যায় । জলপাইগুড়ির বিরাম করের মেজ মেয়ে উর্বশী এখন কলকাতায় আছে।

আপনার অ্যাকসিডেন্টের খবর পেয়ে অবধি বাবা ছটফট করছেন, পারলে সেই দুপুরেই ছুটে আসতেন। রেডিওর ঘোষিকারা যেভাবে কথা বলে থাকেন সেই ভাবে বলল মেয়েটি।

অনিমেষ খুব ভাল ছেলে, ফার্স্ট ডিভিসনে পাস করেছে। নীলাও এবার পাস করেছে, বুঝলে। বিদ্যাসাগর মর্নিং-এ ভর্তি হয়েছে। আচ্ছা নীলা, তুই একটু ওর কাছে বস, আমি ডাক্তারদের কাছ থেকে ঘুরে আসি। দেবব্রতবাবুকে সত্যি চিন্তিত দেখাচ্ছিল, তিনি চলে গেলেন।

কি কথা বলবে অনিমেষ বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। নীলাও সেইভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

এক সময় অনিমেষ বলল, আমার বোধ হয় কলেজে ভর্তি হওয়া হবে না।

আগে সেরে উঠুন তো। যেমন চটপট পুলিশের গুলীর সামনে দাঁড়াতে গিয়েছিলেন! মফস্বলের লোক তো–। হাসল নীলা।

কলকাতার লোকেরা বুঝি খুব বুদ্ধিমান হয়?

হয়ই তো। যাক, বাবা চাইছিলেন আজই আপনাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে । কিন্তু নার্স যা বললেন তাতে কি হবে কি জানি!

আপনাদের বাড়িতে এ অবস্থায় গেলে অসুবিধে করব।

বাব্বা, খুব জ্ঞান দেখছি।

এখন এ কথা বলছেন পরে অসহ্য হবে।

তাই নাকি! এত জেনে বসে আছেন। বরং হয়তো উল্টো ব্যাপার হবে।

তার মানে?

আমার নাম শুনলেন তো?

নীলা!

জানেন তো, ওটা কারো কারো সহ্য হয় না!

০৩. দেবব্রতবাবু খুব কাজের মানুষ

দেবব্রতবাবু খুব কাজের মানুষ। নইলে পুলিশ এত সহজে হাত গুটিয়ে নিতো না। অনিমেষ শুনল, লালবাজারে দেবব্রতবাবুর খুব জানাশোনা আছে। কি করে কি হল অনিমেষ জানে না কিন্তু সেদিনের পর আর কোন পুলিশ ওর সঙ্গে কথা বলতে আসেনি। ব্যাপারটা জেনে দেবব্রতবাবুর ওপর শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।

হাসপাতালে এখন সে অনেকটা স্বচ্ছন্দ । দেবব্রতবাবু সেদিনই দুটো শার্ট আর পাজামা কিনে দিয়ে গিয়েছিলেন। পরদিন নীলা একটা ছোট বাস্কেট তোয়ালে সাবান আর পাউডার এনে দিয়েছে। একই ভাবে দীর্ঘদিন শুয়ে থাকলে নাকি পিঠে ঘা হয়ে যায় তাই পাউডারের ব্যবস্থা। শরীরটা পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় অনিমেষের মেজাজ ভাল হল। শুধু এই একভাবে শুয়ে থাকাটাই অস্বস্তিকর। ঘুম আসে না, বদলে আজেবাজে চিন্তার ভীড় জমে। নীলার মা কখনো আসেননি। কিন্তু নীলার সঙ্গে কথা বলতে অনিমেষের রীতিমত ভয় করে। যদিও দেবব্রতবাবু সামনে থাকলে নীলার কথাবার্তা খুব সাধারণ হয়ে যায়, বোঝা যায় রেখে-ঢেকে কথা বলছে। কিন্তু একা থাকলেই এমন ভঙ্গী করে তাতে সে যে কোলকাতার মেয়ে, অনেক বেশি জানে অনিমেষের চেয়ে, এটা বোঝাতে কসুর করে না। অনিমেষ আন্দাজ করে ওদের সংসার বেশ সচ্ছল, নীলা নিত্য পোশাক পাল্টে আসে, দেবব্রতবাবুকে রোজ ইস্ত্রিভাঙ্গা পাঞ্জাবী পরতে দেখছে সে। বাবা তো চিরকাল স্বৰ্গছেঁড়ায় রয়ে গেলেন, এদের সঙ্গে কি করে আলাপ হল কে জানে। ওদের পরিবারের কোন মেয়ে রোজ রোজ অপরিচিত কোন ছেলেকে দেখতে হাসপাতালে আসত না।

মহীতোষ যে বিকেলে এলেন সেই দিনই মৃত্যু দেখল অনিমেষ। নিজের মাকে যে চোখের সামনে একটু একটু করে মরে যেতে দেখেছে তার কাছে মৃত্যু কোন নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এই ঘটনাটা একদম অবাক করে দেবার মত। সকালে নার্স সবাইকে দেখাশোনা করছেন তখনই ওঁর নজরে পড়ল অনিমেষের পাশের বেডের বৃদ্ধ টানটান হয়ে শুয়ে আছেন। নার্সদের ডিউটি রোজ এক সময়ে থাকে না, আজকে যিনি আছেন তিনি গম্ভীর মুখের এবং অনিমেষ তাকে হাসতে দ্যাখেনি। মহিলা বৃদ্ধের পাশে গিয়ে ঝুঁকে শরীরে হাত ছোঁয়ালেন, একবার নাড়ি দেখলেন, তারপর পায়ের কাছে পড়ে থাকা চাদরটা টেনে মুখ অবধি ঢেকে জুতোয় শব্দ তুলে বেরিয়ে গেলেন।

আচমকা একটা মানুষকে চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় অনিমেষের শরীর কেঁপে উঠল। চোখের সামনে জুড়ে থাকা ওই সাদা কাপড়টা যেন নিষ্ঠুর হাতে জীবনকে সরিয়ে দেয়। ওর মনে পড়ল বৃদ্ধ বলেছিলেন যে স্বাভাবিক ভাবে শুয়ে থাকলে ওঁর সর্বাঙ্গে হাড় ফোটে। তাই এক উদ্ভট ভঙ্গীতে বসে থাকতেন, সেইভাবেই ঘুমুতেন, আরাম তৈরী করে নিয়েছিলেন মনের মত। অথচ এখন কি নিশ্চিন্তে সর্বাঙ্গ বিছিয়ে শুয়ে আছেন। মানুষটা যে কখন নিঃশব্দে চলে গেল সে টের পায়নি দুহাত দূরে শুয়ে থেকেও। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল নার্স চলে যাওয়ার পর এই ঘরে আর কোন শব্দ হচ্ছে না। সবকটা বেডের মানুষ এই দিকে চুপচাপ তাকিয়ে। এঁরা প্রত্যেকেই জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহে হোঁচট খেয়ে হাসপাতালে এসেছেন মেরামতের জন্যে। কিন্তু মুশকিল হল মৃত্যুর দরজাটা এখান থেকে এত কাছে, বড় কাছে! হঠাৎ কেউ শ্লেষ্ম জড়ানো গলায় হরি হে নারায়ণ বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনিমেষের মনে হল বৃদ্ধের শরীর থেকে নির্গত আত্মা এখনও এই ঘরে পাক খাচ্ছে আর তাকে সন্তুষ্ট করার জন্যেই ওই তিনটি শব্দ অঞ্জলির মত ছুঁড়ে দেওয়া হল। এই বৃদ্ধের কোন আত্মীয়কে সে দুদিনে দ্যাখেনি। পৃথিবীতে জন্মে এত বয়স ভোগ করে চুপচাপ চলে যাওয়ায় পৃথিবীর কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হল না। এত কষ্ট পাওয়া অথবা কাউকে কষ্ট দেওয়ার কি দরকার ছিল ওই বৃদ্ধের যদি চুপচাপ মৃত্যুর কাছে এভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়। সেদিন সেই অন্ধকার গলিতে পুলিশের বুলেট যদি আরো কয়েক ইঞ্চি ওপরে ছুটে আসতো তা হলে অনিমেষেরও ওই একই হাল হতো। খুব বিরক্তিতে মাথা নাড়ল অনিমেষ, না, এই রকম চুপচাপ সে মৃত হয়ে যাবে না।

এদিন আর একটা ঘটনা ঘটল। এগারটা নাগাদ অনিমেষ দেখল ওর বেডের দিকে একটি ছেলে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ চোখ পড়ায় চমকে উঠেছিল সে, সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, মনে হয়েছিল সুনীলদা এগিয়ে আসছে। যে মানুষটাকে ওরা মাথায় করে নিয়ে গিয়ে জলপাইগুড়ির শ্মশানে দাহ করে এল সে কি করে এখানে আসবে? সে দেখল পঁচিশের নীচে বয়স, পাজামা আর হ্যাণ্ডলুমের গেরুয়া পাঞ্জাবি পরনে ছেলেটি ঘরে ঢুকে অন্য বেডগুলো একবার দেখে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। কোলকাতা শহরের কোন ছেলেকে অনিমেষ চেনে না। ছেলেটি ওর বেডের পাশে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল খানিক, তারপর বলল, এখন তো আপনি সুস্থ মানে কথা বললে অসুবেধে হচ্ছে না, তাই তো?

অনিমেষ নিঃশব্দে মাথা নাড়ল, সে কিছুই বুঝতে পারছিল না।

আপনি একটু সুস্থ না হলে আসতে পারছিলাম না। ওদের বুলেটটা নীচু হয়ে এসেছিল এটুকুই যা সান্ত্বনা। আপনার সব খবর আমি জানি, দুদিন জ্ঞান ফেরেনি, প্রচুর ব্লিডিং হয়েছিল। সামান্য জড়তা নেই কথায়, অপরিচিত শব্দটা কথা বলার ভঙ্গীতে নেই।

আপনাকে আমি চিনতে পারছি না। সরাসরি বলে ফেলল অনিমেষ।

কি করে চিনবেন? তখন তো আপনার হুঁশই ছিল না। শুধু মা মা বলে গোঙাচ্ছিলেন। হাসল ছেলেটি, যাক, আপনার জ্ঞান ফিরলে আসতে পারছিলাম না। তারপর শুনলাম পুলিশ নাকি এমন মগজ ধোলাই করেছে যে আবার অজ্ঞান হয়ে গেছেন।

বিস্ময় বেড়ে যাচ্ছিল অনিমেষের। ও কি সেই ছেলেগুলোর একজন যারা ট্রাম পুড়িয়েছিল? এই মুহূর্তে যদি সম্ভব হতো অনিমেষ উঠে বসত। ওর চোখমুখে এক ধরনের উত্তেজনা ফুটে উঠল, আপনারা আন্দোলন করছিলেন?

ওর এই উত্তেজিত ভাবটা লক্ষ্য করেও ছেলেটি খুব সহজ গলায় বলল, হ্যাঁ।

পুলিশ আপনাদের ধরতে পারেনি?

না! বলেই হেসে উঠল ছেলেটি, তা হলে এখানে এলাম কি করে? আপনার সঙ্গে পরিচিত হই, আমার নাম সুবাস সেন। চাকরিবাকরি পাইনি এখনও, টিউশানি করি কয়েকটা। আপনার নাম তো অনিমেষ, এবারে স্কুল ফাইন্যাল পাশ করে কলেজে ভর্তি হতে এসে?

আর একবার অবাক হল অনিমেষ। এসব কথা সুবাস জানল কি করে? সে লক্ষ্য করল সুবাস বাক্যটা আরম্ভ করেছিল আপনি বলে, শেষ করল তুমিতে।

টুলটা নিয়ে এসে সুবাস বলল, তোমার স্যুটকেশ খুলে এসব জানতে পারলাম। আমরা প্রথমে বিহ্বল।

অনিমেষ সময় নিল কথা বলতে, হ্যাঁ, বাবার এক বন্ধু দিয়েছেন, পুলিশও দিতে পারে। তারপরই সে প্রশ্নটা ছুঁড়ল, আপনাদের আন্দোলন এখনও চলছে?

সুবাস প্রশ্নটা শুনে অনিমেষকে ভ্রু কুঁচকে দেখল। কি বুঝল–অনিমেষ জানে না। তবে সন্দেহ ছিল ওর চোখে, যতক্ষণ আন্দোলনটা আমাদের সবাইকার না হলে ততক্ষণ তার জীবন কয়েক ঘণ্টা কিংবা দিনের। আমরা শুধু সরকারকে খুঁচিয়ে একটু একটু বিরক্ত করতে পারি কিন্তু সেটাকে বৃহৎ ব্যাপারে নিয়ে যেতে পারি না। তাই সেদিন গুলী চলল, ট্রাম পুড়ল, কাগজে হেডিং হলো কিন্তু মানুষের অবস্থা একই রয়ে গেল । তুমি রাস্তায় বেরুলে দেখবে জীবন একদম স্বাভাবিক, সেদিনের কথা কারো খেয়ালে নেই।

অনিমেষ মন দিয়ে কথাগুলো শুনল। ওর খুব ইচ্ছে হচ্ছিল সেদিন কি ধরনের আন্দোলন তার বিস্তৃত বিবরণ সুবাসের মুখে শোনে। কিন্তু সঙ্কোচ হল এবার, কি মনে করবে বলা যায় না। তাই যে প্রশ্নটা নিজের কাছে অস্পষ্ট সেটাই ও জিজ্ঞাসা করল, আপনারা কিসের জন্য আন্দোলন করছেন?

সুবাস ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবল, তারপর বলল, জলপাইগুড়িতে তুমি কি বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলে? অনিমেষ ঘাড় নাড়ল, না।

আজ থাক। পরে একদিন আলোচনা হবে। তোমার জন্য দুঃখিত, কোলকাতায় পড়তে এসে কি হয়ে গেল! কতদিনে সারবে বলছে?

এখনও বলেনি তবে বাবার বন্ধু বলছেন বেশি দিন লাগবে না। ওকে উঠতে দেখে অনিমেষের খারাপ লাগছিল। সুবাসের সঙ্গে কথা বলতে ওর ভাল লাগছে।

সুবাস বলল, তোমার সুটকেশ আর বিডিং নীচের এনকুয়েরীতে জমা দিয়েছি আজ। মনে হয় ওরা কিছু সরাবে না, দেখে নিও সব ঠিক আছে কি না!

যেন ঝিনুক খুলেই মুক্তো পেল অনিমেষ। হারানো জিনিস দুটো সুবাস জমা দিয়ে গেছে জেনে ও বিহ্বল হয়ে পড়ল। কোলকাতা শহরের কোন মানুষ একটা দায়িত্ব নিজে থেকে নেবে সে কল্পনা করতে পারেনি। এখানকার মানুষের হৃদয় নেই, বিশ্বাস শব্দটা এই শহরে খুঁজে পাওয়া যাবে না এসবই শুনে এসেছে এতকাল। অথচ ওর আহত শরীরটাকেই ওরা শুধু তুলে অনেনি, গলির ভেতর ছিটকে পড়ে থাকা জিনিসপত্র কুড়িয়ে এনে হাসপাতালে জমা করে দিয়ে গেছে–অনিমেষের বুক ভরে গেল । সে জিজ্ঞাসা করল, আপনি আবার আসবেন তো?

তোমাকে এরা কবে ছাড়বে কিছু বলেছে?

না।

যদি উপায় থাকে তবে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়াই ভাল। ভারতবর্ষের হাসপাতালগুলোর সঙ্গে মর্গের কোন পার্থক্য নেই। বিকেলে আমার সময় হবে না, এলে এই সময় আসব।

এই সময় ওরা আসতে দেয়?

এসেছি তো। আমি সব জায়গায় যেতে পারি, ব্রিটিশ আমল হলে লাটসাহেবের শোওয়ার ঘরেও ঢুকে যেতে পারতাম। চলি। কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে এল সুবাস, একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। কাগজে বেরিয়েছে প্রথম সারির একজন নেতাকে পুলিশ নাকি আহত অবস্থায় ধরেছে বলে দাবি করেছে। কিছু না পেয়ে ওরা পুতুলকে মানুষ বলে চালাচ্ছে। ওরা যদি আবার প্রশ্ন করে জবাব দিও না।

অনিমেষ সরল মনে জানাল, পুলিশ তো অভিযোগ তুলে নিয়েছে, ওরা আমার কাছে সেদিনের পর আর আসেনি। বাবার বন্ধু দেবব্রতবাবু এটা ম্যানেজ করেছেন।

একটু অবাক চোখে অনিমেষকে দেখল সুবাস, তারপর জিজ্ঞাসা করল, দেবব্রতবাবু কি করেন?

কথাটার মধ্যে একটুও স্বাভাবিকতা নেই, অনিমেষের অস্বস্তি হল, জানি না, তবে এখানকার পুলিশের সঙ্গে ওঁরা খুব জানাশোনা আছে।

ও। তবে আর চিন্তা কি! কথাটা বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেল সুবাস।

মন খারাপ হয়ে গেল অনিমেষের । যে উপমাটা এইমাত্র সুবাস দিয়ে গেল সেটা মনের সব আনন্দ নষ্ট করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। যেহেতু সে কোন সক্রিয় আন্দোলনে যোগ দেয়নি তাই পুতুল হয়ে গেল? আর দেবব্রতবাবুর কল্যাণে পুলিশ যে হাত গুটিয়ে নিয়েছে এতে তার অপরাধ কোথায়? কিন্তু সুবাসের মুখের ভাব স্পষ্ট বলে দিল কথাটা শুনে সে একটুও খুশি হয়নি। ওপাশের জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল সে। এখন কড়া রোদ। সুবাস নিজে থেকে না এলে তার দেখা পাওয়া আর সম্ভব নয়। পাশের বেডে এখনও সেই বৃদ্ধা চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে আছেন। সুবাস কি একটা মৃতদেহের অস্তিত্ব বুঝতে পেরেছিল?

দুপুরবেলায় ঘুম এল না। আজকাল অবশ্য একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশের বিছানা এখন ফাঁকা। এমনকি বেডকভার না থাকায় ময়লা তোশকটা বিশ্রী দাঁত বের করে হাসছে। ওদিকে চোখ রাখা যায় না। সুবাসের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর অনিমেষের মন কেমন ভার হয়ে আছে। সুবাস ওর চেয়ে বয়সে খুব একট বড় নয় অথচ ওর সঙ্গে কথা বললে নিজেকে ছেলেমানুষ বলে মনে হয় । অনিমেষ জোর করে ভাবনটাকে অন্য দিকে ঘোরাতে চাইল । দেবব্রতবাবু বলেছিলেন যে স্কটিশচার্চে ওঁর এক বন্ধু নাকি অধ্যাপনা করেন। অনিমেষ সেখানে ভর্তি হয়ে বাড়িতেই পড়াশুনা করতে পারে। ফার্স্ট ইয়ারে কাউকেই বেশি পড়তে হয় না। অ্যাটেন্ডেন্সের গড় ঠিক থাকলেই প্রমোশন পাওয়া যায়–তা সেটাও নাকি ম্যানেজ হয়ে যাবে। এটা শুনে অনিমেষ কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছে কিন্তু যতক্ষণ ব্যবস্থাটা পাকা না হচ্ছে ততক্ষণ স্বস্তি নেই। ফার্স্ট ইয়ারটা শুয়ে শুয়েই কাটাতে হবে?

বিকেলবেলায় মহীতোষ এলেন। সঙ্গে দেবব্রতবাবু, আজ নীলা আসেনি। দূর থেকে বাবাকে দেখতে পেয়ে খানিকটা সঙ্কোচ আর কেন জানা নেই অপরাধবোধ এল অনিমেষের। মহীতোষ সোজা মানুষ, চা-বাগানের নির্জনতায় থেকে সরল কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। অনিমেষ জানে বাবা তাকে ঘিরে অনেক আশা করেন। ওকে ডাক্তার হতে হবে, অনেক পশার হবে প্রচুর টাকা আসবে, এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে যে ফর্মূলা তার বাইরে তিনি ছেলেকে কিছুতেই দেখতে চান না। অথচ কোলকাতায় সে পড়তে আসুক এ ব্যাপারে তার কোথায় যেন দ্বিধা ছিল। হয়তো ভেবেছিলেন জলপাইগুড়ি থেকে আই এস-সি পাশ করে কোলকাতায় পড়তে গেলে ওর আরো দায়িত্ববোধ এবং বয়স বাড়বে সুতরাং চিন্তার কিছু থাকবে না। সেই ছেলে কোলকাতায় পৌঁছে পুলিশের গুলীতে আহত হয়ে হাসপাতালে শুয়ে আছে খবর পেয়ে পাগলের মত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। খবরটা এল লোকাল থানা থেকে। সাব-ইন্সপেক্টর ছেলে সম্পর্কে জেরা করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। যেন অনিমেষ কোলকাতায় খুব বড় ডাকাতি করতে গিয়ে আহত হয়েছে। একটা কথা তার মাথায় ঢুকছিল না, একদম আনাড়ি ছেলে কোলকাতায় গিয়ে কি করতে পারে যার জন্যে পুলিশ গুলী করবে? কাগজে তিনি পোড়া ট্রাম-বাস আন্দোলনের ছবি দেখেছেন। মহীতোষের সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর মনে হচ্চিল নিজের ছেলেকে তিনি কখনই চিনতে পারেননি। ট্রেনে গেলে অনেক সময়। পড়ি কি মরি করে তেলিপাড়া থেকে যে বেসরকারি মালের প্লেন ছাড়ে তাতেই জায়গা করে নিলেন। অনিমেষের এই খবরটা জলপাইগুড়িতে সরিৎশেখরকে জানাবার সময় পেলেন না আর। শেষ দুপুরে দমদমে নেমে সোজা দেবব্রতবাবুর কাছে চলে এসেছেন তিনি। জীবনে প্রথম প্লেন চড়ার উত্তেজনা একটুও টের পেলেন না মহীতোষ । দমদম থেকে হরেন মল্লিক লেনে আসতে যে কোলকাতা পড়ল তা শান্ত, কোথাও কোন বিক্ষোভ নেই। কল্পনাই করা যাচ্ছে না এখানে এসে অনিমেষ কি কারণে গুলী খেতে পারে। দেবব্রতবাবু বাড়িতে ছিলেন, দীর্ঘকাল বাদে দেখা হওয়া মাত্র মহীতোষ হাসপাতালে যেতে চাইলেন। কিন্তু তখন দুপুর, যেতে চাইলেই সম্ভব নয়। দেবব্রতবাবু মহীতোষকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সমস্ত ঘটনাটা শোনালেন। এর কিছুটা অনিমেষের কাছে দেবব্রতবাবু জেনেছে কিছুটা পুলিশের সূত্রে, বাকীটা অনুমান।

অনিমেষ এখন মোটামুটি ভাল, জীবনের কোন আশঙ্কা নেই জানতে পেরে মহীতোষ কিছুটা শান্ত হলেন। সকালে পাওয়া উত্তেজনাটা হঠাৎ নিভে এলে নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হল । দেবব্রতবাবু ওঁকে বোঝালেন এখন কিছুই করার নেই, শুধু সময়ের অপেক্ষা। থাই-এর হাড়ে গুলী লেগে সেখানে ফ্র্যাকচার হয়েছিল, অপারেশন হয়েছে, ডাক্তার বলছে মাস ছয়েক বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকলে অনিমেষ হাঁটতে পারবে। দুর্ঘটনা তো ঘটেই কিন্তু মুশকিল হল সেটা ঘটবার আগে কিছুতেই জানা যায় না। মহীতোষ বললেন, আসলে আমার ভাগ্যটাই এই রকম। ওর মা চলে গেল একটা সামান্য দুর্ঘনায়, কোন কারণ ছিল না। ছেলেটা এতকাল দাদুর কাছে মানুষ হয়েছে, আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম। স্কুল ফাইন্যালে ও যখন ফার্স্ট ডিভিসন পেল আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পড়াশুনায় ভাল কিন্তু বড় জেদী আর অবাধ্য মনে হোত। তা রেজাল্ট ভাল হতে ওকে ঘিরে একগাদা কল্পনা করে ফেললাম । অথচ দেখুন, সঙ্গে সঙ্গে আবার দুর্ঘটনা।

দেবব্রতবাবু বললেন, আপনার ছেলেকে অবাধ্য বলে মনে হয় না কিন্তু।

মহীতোষ হাসলেন, ওটা ঠিক বাইরে থেকে বোঝা যাবে না । ও যেটা ভাল মনে করে সেটা করবেই। এককালে কংগ্রেসের কাজকর্ম করত আমার অপছন্দ সত্ত্বেও।

দেবব্রতবাবু অবাক হলেন, অনিমেষ কংগ্রেস করত?

আমি ঠিক জানি না, তবে সেরকমই শুনেছিলাম, নেহাতই কাঁচা ব্যাপার, চাপল্য তো ওই বয়সেই আসে। মহীতোষ নিজেই উড়িয়ে দিলেন কথাটা।

ঠিক আছে, আপনি কোন চিন্তা করবেন না, ওর কলেজে ভর্তির সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। স্কটিশে অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়ে রাখছি, সুস্থ হলে ক্লাশ করবে।

স্কটিশ কেন, প্রেসিডেন্সিতে জায়গা পাবে না?

না–মানে, ধরাধরির ব্যাপার তো। ক্লাশ না করলে প্রেসিডেন্সি খাতায় নাম রাখবে না। খুব কম্পিটিশন ওখানে।

দূর মশাই, ওসব নিয়ে ভাববেন না। প্রেসিডেন্সিতেও মেয়েরা পড়ছে। পড়াশুনাই হল আসল কথা । স্কটিশের আর্টস ডিপার্টমেন্টা ভাল।

আর্টস? মহীতোষ যেন আকাশ থেকে পড়লেন, অনিমেষ কি আর্টসে ঢুকতে চায়?

হ্যাঁ, তাই তো বলল। তা ছাড়া সায়েন্স নিয়ে পড়লে ক্লাশ না করলে চলবে না। প্রাকটিক্যালগুলো তো বাড়িতে বসে করা যাবে না।

মুখচোখ শক্ত হয়ে গেল মহীতোষের, নীরবে মাথা নাড়লেন। সেটা লক্ষ্য করে দেবব্রতবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি অন্য কিছু ভাবছেন?

চটপট সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন মহীতোষ, ডাক্তাররা যদি বলে থাকেন ছয় মাসের মধ্যে ও উঠতে পারবে না তা হলে আর এখানে রেখে লাভ কি! আর তার পরেও তো হাঁটাচলা সড়গড় হতে সময় লাগবে। আমি ওকে নিয়ে যেতে চাই, সামনের বছর দেখা যাবে।

নিয়ে যাবেন মানে? হেসে ফেললেন দেবব্রতবাবু, আপনি সেই তো এখনও ওকে চোখে দেখেননি, সামান্য নড়াচড়া ওর পক্ষে ক্ষতিকর আর আপনি সেই জলপাইগুড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন? তারপর ব্যাপারটা ধরতে পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি চাইছেন না অনিমেষ আটসে ভর্তি হোক?

মহীতোষ ঘাড় নাড়লেন, না, ওর জীবন লক্ষ্যহীন হোক সেটা চাই না । ওর মায়ের ইচ্ছে ছিল ছেলে ডাক্তার হবে, আমারও তাই ইচ্ছে।

কথাটা শুনে দেবব্রতবাবু হাসলেন, তাই বলুন। তা হলে অবশ্য এ বছরটা নষ্ট করতেই হবে। যাক, হাত মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম করুন। চারটের একটু আগেই বেরবো আমরা।

মহীতোষ উঠে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখলেন, আমি বরং হোটেল থেকে ঘুরে আসি।

হোটেল? আপনি হোটেলে থাকবেন নাকি?

কতদিন থাকতে হবে জানি না তো, আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তা ছাড়া প্যারাডাইস হোটেলটা কাছেই, আমাদের জলপাইগুড়ির হোটেল বলতে পারেন–এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না।

দেবব্রতবাবু ঘোর আপত্তি মহীতোষ শুনলেন না। প্রয়োজনে পত্রকে তিনি বন্ধুর কাছে সাময়িকভাবে থাকতে পাঠাতে পারেন কিন্তু নিজের থাকার কোন কারণ পান না।

কদিনের যাওয়া-আসায় দেবব্রতবাবু এর মধ্যেই হাসপাতালে বেশ পরিচিত হয়ে উঠছেন। এনকুয়ারী কাউন্টার থেকে এক ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে ওঁকে ডাকলেন, আপনি তো জেনারেল বেডের একশো আটত্রিশ নম্বরের কাছে আসেন?

দেবব্রত ঘাড় নাড়লেন, কেমন আছে ও?

খারাপ কিছু রিপোর্ট নেই। আপনার পেশেন্টের নাম অনিমেষ, তাই তো?

হ্যাঁ। কি হয়েছে?

ভদ্রলোক বললেন, আজ সকালে একজন আপনার পেশেন্টের নাম করে দুটো লাগেজ দিয়ে গেছে। ওকে দেখিয়ে তো কোন লাভ নেই, আপনারা যদি চান তো নিয়ে যেতে পারেন।

দেবব্রতবু অবাক হয়ে মহীতোষের দিকে তাকালেন। মহীতোষ এগিয়ে এসে বললেন, আমি একটু দেখতে পারি?

দেবব্রতবাবু পরিচয় করিয়ে দেবার ভঙ্গীতে বললেন, ইনি পেশেন্টের বাবা। চিনতে পারলেন মহীতোষ। বেডিংটা তো বটেই, স্যুটকেসটাও সঙ্গে এনেছিল অনিমেষ। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে কেউ হয়তো দিয়ে গেছে কিন্তু এতদিন বাদে চিনে চিনে এগুলো এখানে কি করে পৌঁছাল সেটাই বোধগম্য হচ্ছিল না ওঁদের। জিনিসপত্র মিলিয়ে দেখার কোন মানে হয় না। প্রথমত ওতে কি কি ছিল তাই মহীতোষ জানেন না আর যদি কিছু হারিয়ে থাকে তা কখনই পাওয়া যাবে না। এগুলো কেউ দিয়ে গেছে তাই যথেষ্ট।

কোলকাতার হাসপাতাল সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না মহীতোষের। খাটের অভাবে যাতায়াতের পথের পাশেই রুগীদের শুয়ে থাকতে দেখে যে চিন্তা মাথায় এসেছিল সেটা দূর হল ঘরে এসে। একদম দেওয়াল-ঘেঁষা বিছানায় ছেলে শুয়ে আছে। কোমর অবধি একটা চাদরে ঢাকা, মুখ শুকনো, ভীষণ রোগা দেখাচ্ছে। এক পলকে চেহারাটা দেখেই মহীতোষ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। যে ছেলের জন্য এতটা পথ ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে এলেন তারই জন্য মন তিক্ত হল। তার মনে পড়ল এই ছেলে চিরকাল অবাধ্য এবং এক সময় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই জেদ প্রকাশ করেছে। নিজের গোয়ার্তুমির জন্যে ওর এই অবস্থা, যেমন বীরত্ব দেখাতে গিয়েছিল তার উচিত শিক্ষা হয়েছে। নইলে এতবড় কোলকাতা শহরের কোন মানুষের গায়ে গুলী লাগল না আর উনি ট্রেন থেকে নামতেই গুলী খেয়ে গেলেন! আসলে এটা মহীতোষকে জ্বালানোর একটা রাস্তা যেটায় ওর মা মরে গিয়েও হেঁটে যাচ্ছে।

অনিমেষ মুখ নামিয়ে নিল। চট করে বাবার দিকে চাইতে সাহস হল না । দেবব্রতবাবুর গলা শুনতে পেল সে, যাক, আর কোন চিন্তা নেই, তোমার বাবা এসে গেছেন।

অনিমেষ চেষ্টা করছিল মুখটা স্বাভাবিক রাখতে। তার যে খুব কষ্ট হচ্ছে এটা সে কিছুতেই মহীতোষকে বুঝতে দেবে না। দেবব্রতবাবু টুলটাকে খাটের তলা থেকে টেনে এনে মহীতোষকে বললেন, বসুন।

মহীতোষ বসলেন না। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের শরীরের দিকে তাকালেন। ওর একটা পা সামান্য উঁচুতে, খাটের পায়ার দিকটার তুলনায় মাথার দিকটা একটু বেশি ঢালু। চাদরে ঢাকা থাকলেও বোঝা যাচ্ছে উঁচু পায়ের গুলী লেগেছে। কিছু কথা বলা উচিত কিন্তু কি বলবেন বুঝতে পারছিলেন না মহীতোষ।

দেবব্রতবাবু বললেন, তোমার বাবাকে কত করে অনুরোধ করলাম আমার বাড়িতে থাকার জন্য তা উনি শুনলেন না। বোধ হয় প্যারাডাইস হোটেলের রান্না খুব ভাল। তা আমরা যদি কখনো জলপাইগুড়িতে যাই তা হলে দেখো ঠিক হোটেলে গিয়ে উঠব। কথা শেষ করে সামান্য হেসে মহীতোষের দিকে তাকালেন দেব্রতাবাবু।

জলপাইগুড়িতে হোটেল কোথায়! কিছু একটা বলতে পেরে মহীতোষ সহজ হলেন। তারপর হলঘরটার ওপর নজর বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, একটা ঘরে এতগুলো লোক রয়েছে, এখানে আলাদা ঘর পাওয়া যাবে না?

আলাদা মানে কেবিনের কথা বলছেন? চেষ্টা করলে হয়তো পাওয়া যাবে কিন্তু তার কি দরকার? কেবিনে থাকলে মানুষের মুখ দেখতে পাবে না, দুদিনেই হাঁপিয়ে উঠবে। আর চিকিৎসার কথা যদি বলেন সেটা সবত্রই সমান। দেবব্রতবাবু মুখ ঘুরিয়ে অনিমেষকে প্রশ্ন করলেন, আজ পায়খানা হয়েছে তো?

নিঃশব্দে ঘাড় নাড়ল অনিমেষ। গতকালও এই প্রশ্ন করেছিলেন তিনি এবং সেটা মেয়ের সামনেই। কোন পুরুষমানুষের এই সব প্রাকৃতিক ব্যাপার নিয়ে মেয়েদের সামনে কথা বলা যে লজ্জাজনক সেটা ভদ্রলোকের মাথায় আসে না। দেবব্রতবাবু বললেন, গুড। আসলে ওটা ক্লিয়ার হয়ে গেলে আমাদের অর্ধেক রোগই সেরে যায়। যদিও তোমার ওই পজিশনে ওটা খুব ডিফিকাল্ট।

ভাঙা পা জোড়া লাগার সঙ্গে পায়খানা পরিষ্কারের কি সম্পর্ক অনিমেষ বুঝতে পারল না।

মহীতোষ জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে খাবারটাবার কেমন দেয়?

প্রশ্নটা ঠিক কাউকে নির্দিষ্ট করে নয়, দেবব্রতবাবু অনিমেষের দিকে তাকালেন। এখন অবধি কোন শক্ত খাবার অনিমেষ খায়নি। কাল থেকে তাকে ভাত দেওয়া হতে পারে বলে দুপুরের নার্স বলে গেছে। উত্তরটা দেবব্রতবাবুই দিলেন, হাসপাতালে কি আর রাজভোগ খাওয়াবে? ডাক্তার যদি রাজী হয় তা হলে ওকে বাড়িতে নিয়ে যাই, কি বলেন? অনেক আরামে থাকবে। এখানে কথা বলার লোকই পাওয়া যায় না।

এমন সময় পাশের বেডে দুজন লোক একটি ছেলেকে ধরাধরি করে শুইয়ে দিয়ে গেল তোশকের ওপরেই। এখনও চাদর পাতার সুযোগ হয়নি। ছেলেটা বিছানায় শুয়ে উঃ আঃ করতে লাগল সমানে। ওর সঙ্গীরা যে সেবাযত্ন করছে তাতে সুরাহা হচ্ছে না কিছুই।

দেবব্রতবাবু সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে একজন বুড়ো ছিল না?

অনিমেষ আস্তে উত্তর দিল, উনি মারা গেছেন।

সেকি! কালই তো দেখে গেলাম। হতভম্ব দেবব্রতবাবুর মুখটার দিকে তাকিয়ে অনিমেষ বলল, আজ সকালে টের পাওয়া গেল।

এবার মহীতোষ কথা বললেন, টের পাওয়া গেল মানে? একটা লোক কখন মরে গেছে তা কেউ খবর রাখল না? অদ্ভূত ব্যাপার তো! তুই দেখলি? এই প্রথম ছেলেকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন মহীতোষ।

অনিমেষ বাবার দিকে তাকাল। খুব বিচলিত দেখাচ্ছে ওঁকে। বাবাকে দেখার পরই যে সঙ্কোচটা এসেছিল এখন সেটা অনেক কম। বরং বাবার অদ্ভূত ব্যবহারে সে খুব অবাক হয়ে যাচ্ছিল। ওর আহত হবার পর যিনি জলপাইগুড়ি থেকে ছুটে এলেন তিনি। এসে অবধি একটাও কথা বলেননি, কি করে ঘটনাটা ঘটল জিজ্ঞাসাও করেননি। গম্ভীর মুখে অনিমেষ মহীতোষের প্রশ্নটার উত্তর দিল, হ্যাঁ।

অনিমেষ বললেন, চলুন দেখি। তবে আপনি যা চাইছেন তা হবে না।

অন্যমনস্ক মহীতোষ বললেন, মানে?

ওই যে তখন বলছিলেন না, ছেলেকে নিয়ে ফিরে যাবেন, সেটা অসম্ভব। দেখেই বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। তার ওপর আপনাদের বিখ্যাত মণিহারীঘাট পার হয়ে যাওয়া–কিছু হয়ে গেলে সারাজীবন আফসোস করতে হবে।

কিন্তু এখানে রাখা মানে আপনার ওপর অত্যাচার করা। তা ছাড়া, এ বছর যখন নষ্ট হচ্ছেই, চলুন, আগে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে দেখি–। অনিমেষকে কিছু না বলে ওঁরা বেরিয়ে গেলেন।

কথাগুলো শোনামাত্র অনিমেষের কপালে ভাঁজ পড়েছিল। মহীতোষ এসেছেন তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে? এটা ঠিক, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে ভাল লাগছে না। কিন্তু জলপাইগুড়িতে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই এখানকার কলেজে আর ভর্তি হওয়া যাবে না। একটা বছর চুপচাপ বৃথায় চলে যাবে এবং উনি সেটা মেনে নিয়েছেন। অনিমেষের মনে হচ্ছিল সে যদি একবার এখান থেকে জলপাইগুড়ি ফিরে যায় তাহলে আর কখনো কলকাতার কলেজে পড়া হবে না। কিন্তু সে এখন তো কিছুই করতে পারে না। যার বিছানা থেকে এক ইঞ্চি উঠে বসার সামর্থ্য নেই তার কথা কেউ শুনবে কেন? যদি দাদু থাকতেন কাছে, অনিমেষ সরিৎশেখরের অভাব ভীষণভাবে অনুভব করল। দাদুর কথায় বাবা না বলতে পারতেন না আর দাদুকে রাজী করানো নিজেকে রাজী করানোর মতই সহজ। এখনও সে ভালভাবে কলকাতার রাস্তায় হাঁটেনি, কলকাতার কিছুটা দ্যাখেনি, বিছানায় শুয়ে শুয়ে ট্রামের চাকার ঘরঘর শব্দ ছাড়া কলকাতা ওর কাছে অচেনা, তবু অনিমেষের মনে হচ্ছিল, কলকাতা ছেড়ে চড়ে গেলে তার সব কিছু শেষ হয়ে যাবে।

অনিমেষ চোখ বন্ধ করে ছিল। হঠাৎ সে অনুভব করল কেউ যেন খাটের পাশের টুলটায় এসে বসেছে। সে চোখ খুলল না। খানিক বাদে সে মহীতোষের গলা শুনতে পেল। গলা অদ্ভূত বিষণ্ণ এবং কেমন ভাঙ্গা ভাঙ্গা। এরকম গলায় বাবাকে কখনো কথা বলতে শোনেনি সে। মহীতোষ বললেন, খুব কষ্ট হচ্ছে, খোকা?

চোখ খুলল না অনিমেষ। এতক্ষণ কোথায় ছিল জানা নেই, অভিমানের সুতোটা টানটান হয়ে যেতে আলতোভাবে পায়ের ওপর স্পর্শ পেল অনিমেষ। ওর অপারেশনের জায়গায় হাত রেখে মহীতোষ জিজ্ঞাসা করলেন, খোকা, খুব ব্যথা করছে রে?

সামান্য স্পর্শ কিন্তু অনিমেষের মনে হল, কেউ করাত দিয়ে ওর পা কাটছে। অন্য সময় হলে আর্তনাদ করত কিন্তু এখন শারীরিক যন্ত্রণাটাকে দাঁতে চাপল সে। প্রাণপণে, স্বাভাবিক গলায় সে বলার চেষ্টা করল, না বাবা।

০৪. ব্যাপারটা যে এত দ্রুত চাউর হয়ে যাবে

ব্যাপারটা যে এত দ্রুত চাউর হয়ে যাবে কল্পনা করতে পারেনি অনিমেষ। পরদিন সকালে যখন আকাশ সাজানো রোদ উঠল, ত্রিদিবের সঙ্গে ডাইনিং রুমে ঢুকতেই ও বুঝতে পারল হোস্টেলের বাঙালী বাসিন্দাদের চোখের দৃষ্টি পাল্টে গেছে। প্রথমটায় একটু অস্পষ্টতা ছিল, ছেলেরা খেতে খেতে ওর দিকে তাকাচ্ছে বারে বারে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে এবং সেটা ওকে কেন্দ্র করেই। অনিমেষ ত্রিদিবকে কারণটা জিজ্ঞাসা করল। এরা বেশির ভাগই কলেজের ছাত্র, ওদের চেয়ে জুনিয়ার, এক সঙ্গে মেশার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, কি ব্যাপার, সামথিং গোলমাল মনে হচ্ছে?

ওদের মধ্যে যে ছেলেটি সবচেয়ে সপ্রতিভ সে খাওয়া থামিয়ে হেসে জবাব দিলে, না, না, গোলমাল হবে কেন? আমরা অনিমেষদার সম্পর্কে একটা খবর শুনেছি তাই আলোচনা করছিলাম।

কি খবর? ত্রিদিব মজা করে জিজ্ঞাসা করল।

উনি খুব অ্যাকটিভ কমুনিস্ট অথচ এখানে এমনভাবে থাকেন কেউ তা টের পায় না। অনিমে হেসে ফেলল, তারপর প্রতিবাদ করতে গিয়ে কি ভেবে চুপ করে গেল । ওর মনে হল ফালতু কথা বলে কোন লাভ নেই। যে কেউ ইচ্ছে মতন ধারণা তৈরি করে নিতে পারে, জনে জনে গিয়ে সেই ধারণা আগ্রহ হচ্ছিল। সেটা ত্রিদিবই প্রশ্ন করল, তোমরা এই খবরটা কি করে পেলে?

বাঃ, খাদ্য আন্দোলনের সময় অনিমেষদা পুলিশের গুলীতে হেভি ইনজুরড হয়েছিলেন শুনলাম, সেটা অ্যাকটিভ না হলে হয়? ছেলেটি কথা থামিয়ে একটু ভেবে প্রশ্ন করল, কিন্তু অনিমেষদা, আপনি কলেজ ইউনিয়নে জয়েন করেননি কেন? আমরা শুনলাম আপনি এস এফ–এর মেম্বার পর্যন্ত ছিলেন!

খেতে ভাল লাগছিল না অনিমেষের। ত্রিদিব খুব দ্রুত খায়, ওর খাওয়া শেষ হয়ে এসেছিল। অনিমেষ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তোমরা খুব ভুল খবর শুনেছ। আমার সঙ্গে কম্যুনিস্ট পার্টির মেম্বারশিপ পাওয়া সহজ ব্যাপার ন আর যারা রিয়েল মেম্বার তারা কক্ষণো সেটা প্রকাশ করে না।

ব্যাপারটা যদি এ পর্যন্ত থেমে থাকত তবে সেটা একরকম হতো, ইউনিভার্সিটিতে খবর গড়িয়ে গড়িয়ে এল। সেই মে মাসে রেজাল্ট বেরিয়েছে আর এখন জুলাই–এর মাঝামাঝি, সব ক্লাস শুরু হয়েছে, কেউ কাউকে চেনে না। এমনকি নবীন ছাত্রদের বরণ-করা ব্যাপারটা এখনও হয়ে ওঠেনি। স্কটিশের যে ব্যাচটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে অনিমেষ ওদের সঙ্গেই সময় কাটাতো। ওদের এই ব্যাচের সবাই খুব শান্তশিষ্ট, পড়াশুনোর মধ্যেই থাকতে ভালবাসে। বি-এ অনার্সে যে ছেলেটি ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল সে ওদের ব্যাচেরই। দুজন খুব সিরিয়াসলি সাহিত্য করার কথা ভাবে। এর মধ্যেই বিদেশী সাহিত্যের অনেক খবর ওরা জেনে গেছে। ইউনিভার্সিটিতে আসার পর বিদেশী রেফারেন্স দিয়ে কথা বলার ঝোঁক ওদের আরো বেড়েছে।

স্কটিশের হোস্টেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে কেউ হেঁটে আসে না। পথটা এমন দূরত্বের নয় যে হাঁটা অসম্ভব কিন্তু কোলকাতায় চোখের সামনে এত যানবাহন যে হাঁটার প্রয়োজন পড়ে না। অনিমেষ একটা মান্থলি করিয়ে নিয়েছে সেকেন্ড ক্লাশ ট্রামের । সেটায় সেই ধর্মতলা থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত সারাদিন ধরে ঘোরা যায় অথচ পয়সা সামান্যই লাগে। সেদিন ত্রিদিব একটা কথা বলল। জিনিসপত্রের দাম এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। একটা কাগজ লিখেছিল যে মাথা পিছু মানুষের প্রতিদিনের রোজগার নাকি কুড়ি পয়সা। কুড়ি পয়সায় একটা মানুষ কি করে বেঁচে থাকতে পারে? ত্রিদিব বলেছিল তবু মানুষ বেঁচে থাকে এবং সেটা মানুষ বলেই সম্ভব। ভারতবর্ষের কোথাও যখন মানুষ এ বিষয় নিয়ে হইচই করেনি, জিনিসপত্রের দাম কমানো নিয়ে আন্দোলন হয়নি তখন কলকাতায় একদিন দুদিনের জন্য হলেও বিক্ষোভ ফেটে পড়েছিল। ত্রিদিবের কাছে সেটাই অস্বাভাবিক লাগে। ও বলেছিল, এখানে দশ পয়সা দিলে এক ভাড় চা পাওয়া যায়, ট্রাম মাইলখানেক স্বচ্ছন্দে চলে যাওয়া যায়, বারো আনা পয়সায় একটা মানুষ ডাল ভাত তরকারি খেতে পারে। এই ব্যাপারটা পশ্চিম বাংলার বাইরে কোথায়ও সম্ভব নয়। দিল্লীতে নাকি এটা স্বপ্নকুসুম। তাই এখানে এত মানুষের ভীড়, সবাই কম পয়সায় থাকবার জন্য কলকাতায় ছুটে আসছে। অথচ এখানেই খাদ্য আন্দোলন হয়, এক পয়সা ভাড়া বাড়লে ট্রাম পোড়ে। কেন? তার মানে কি এই যে পশ্চিম বাংলার মানুষ খুব সচতেন, তাদের কেউ ভুলিয়ে রাখতে পারে না? অনিমেষ এই জায়গায় ত্রিদিবের সঙ্গে একমত নয়। এখানে যত তাড়াতাড়ি আগুন জ্বলে ওঠে তত তাড়াতাড়ি তা নিভে যায়। নিভে যাওয়ার পর মনেই হয় না কখনো আগুন জ্বলেছিল। আর এই আগুন জ্বলবারও একটা মজার দিক আছে। বেশির ভাগ মানুষই শীতে হাত পা সেঁকার মত দূরে থেকে নিজেদের গরম রাখতে চায়, মুষ্টিমেয় যে কজন ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের আচরণ নাটক দেখার চোখ নিয়ে দেখে। বেশির ভাগ বাঙালীর চরিত্রই এই, অবাঙালীরা যারা এই শহর কোলকাতায় প্রায় আধাআধি, তাদের সঙ্গে যেন এইসব আন্দোলনের কোন সম্পর্ক নেই, দেখলে মনে হয় তারা অন্য পৃথিবীতে বাস করে। কলেজে পড়ার সময় যে দুচারটে ছোটখাটো আন্দোলন অনিমেষ দেখেছে সেগুলোর চেহারা মোটামুটি একই। একটা ইস্যু নিয়ে বিক্ষোভ, মিছিল করে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল, সেখানে কিছুক্ষণ জ্বালাময়ী বক্তৃতা চলল, ব্যাস, সব কর্তব্য শেষ। কিংবা খুব জোরদার কিছু ঘটলে একদিনের জন্য ধর্মঘট। এই ব্যাপারটা অনিমেষের মাথায় ঢোকে না, ধর্মঘট করলে কি লাভ হবে! নিজেকে নাক কেটে কি অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করা যায়? আমি কোন কাজ করছি না তোমার আচরণের প্রতিবাদে– যারা অন্যায় করে, এত সহজে তারা আজকাল ভয় পায় না এটাই বোধহয় ধর্মঘটী নেতারা ভুলে গেছেন। নাকি আসলে কিছু করার ক্ষমতা নেই বলেই ধর্মঘটের মুখোশ পরে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত রাখতে চান। ক্রমশ এই ধারণা বন্ধমূল হচ্ছে সাধারণ মানুষ কখনই কোন আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের জড়াতে চায় না। অথচ আন্দোলন বলে যেটা হয় সেটা সাধারণ মানুষের জন্যেই।

দ্বিতীয় শ্রেণীতে মান্থলি টিকিট নিয়ে যাওয়া-আসার পথে আর একটা ব্যাপার লক্ষ করেছে অনিমেষ। প্রথম শ্রেণীতে এক তিল জায়গা না থাকলেও ভদ্র বাঙালীরা কখনই দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠতে চান না। সেখানে কিছু অবাঙালী এবং ওই কুড়ি পয়সা-আয় মার্কা মানুষের ভীড়। অথচ দুটো কামরা একই সঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। মেয়েদের মধ্যে তো বিচার আরো প্রবল। অনিমেষ কোন সুন্দরী মহিলাকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে যাতায়াত করতে দেখেনি। চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে এদুটো শ্রেণীর মানুষেরাই সাধারণ-জনসাধারণ।

জলপাইগুড়িতে যে সব চিন্তাভাবনা ওর মাথায় ছটফট করত সেগুলো এই চার বছরে অন্য চেহারা নিয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় সেদিন পুলিশের ছোঁড়া বুলেটটা তার একদিক দিয়ে উপকারই করেছে। এই যে অতদিন বিছানায় শুয়ে থাকা, শরীর কাহিল হওয়ায় সতর্ক হয়ে চলাফেরা–এগুলো অনেক উদ্দামতাকে সংযত করতে সাহায্য করছে। না হলে যে উদ্দীপনা প্রথমবার কোলকাতায় আসবার সময় বুকের মধ্যে আঁচড় কাটতো সেটা তাকে এতদিনে কোথায় নিয়ে যেত কে জানে। খোলা চোখেও যে অনেক সময় দৃষ্টি থাকে না–সেটা সেরকম সময় ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোন বাড়িটায় ওদের ক্লাস শুরু হয়েছে। বইপত্র এখনও কেনা হয়নি। মহীতোষ এখনও টাকা পাঠায়নি। রেজাল্ট বের হবার পর যখন সে জলপাইগুড়ি থেকে এবার এল তখন ভর্তির অতিরিক্ত টাকা মহীতোষ দিতে পারেননি। এম এ ক্লাসে কি রকম বই কিনতে হয় ওঁরা কেউ জানেন না, অনিমেষও বলতে পারেনি। এম এ রেজাল্ট বের হবার পর মহীতোষ একটু পাল্টে গেছেন। তার এখন মনে হচ্ছে অনিমেষ যদি ফাস্ট ক্লাস নিয়ে এম এ পাশ করতে পারে তা হলে কোন কলেজে অধ্যাপনার চাকরী পেয়ে যাবে। যদিও মাইনে কম তবু চাকরীটায় সম্মান আছে। এসব ব্যাপারে দেবব্রতবাবু তাকে হালফিল খবর চিঠিতে জানিয়ে থাকেন।

দেবব্রতবাবুর বাড়িতে অনেকদিন যাওয়া হয়নি। মনে পড়ে, হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে প্রায় মাস তিনেক ওঁর বাড়িতে থাকতে হয়েছিল অনিমেষকে। একটুও কষ্ট হয়নি। দেবব্রতবাবু ব্যবসা করেন কিন্তু কি ধরনের ব্যবসা তা ও জানে না। দিনরাতের খুব কম সময়ই ওঁকে বাইরে যেতে দেখেছে সে সময়। কিন্তু বাড়িতে স্বচ্ছলতা সবখানে, ব্যাপারটা জিজ্ঞাসা করতে সঙ্কোচ হত। নীলা কলেজে পড়ছে। মানে সকালে সেজেগুঁজে যেত আর বারোটা নাগাদ খুব পরিশ্রান্ত হয়ে ফিরে আসত। সারাটা দুপুর নীলার সঙ্গে গল্প করে কেটে যেত। গল্প মানে পৃথিবীর কোন বিষয় যা থেকে বাদ নয়। কদিনের মধ্যে তুই-তোকারিতে সম্পর্কটা নামিয়ে এনেছিল নীলা। অতবড় একটা লজ্জাজনক ব্যাপার। কিন্তু একটা ব্যাপার, ও বুঝতে পারছিল নীলার মতন মেয়ে জলপাইগুড়িতে সে কখনো দেখেনি। সীতা, উর্বশী কিংবা রম্ভার থেকে নীলা যেন হাজার মাইল আলাদা জাতের মেয়ে। মন্টু বলত যৌবন এসে গেলে মেয়ে-পুরুষ বন্ধুত্ব হয় না। অনিমেষের মনে হয়েছিল মন্টু নীলার মত মেয়েকে দেখেনি। কোন রকম নকল লজ্জা বা ঢং ছাড়া একটা মেয়ে যখন কথা বলতে পারে তখন তাকে বন্ধু না ভেবে পারা যায়! ওর কলেজে যাওয়া-আসার পথে ছেলেরা দাঁড়িয়ে থেকে যে সব মন্তব্য ছুঁড়ে মারে সেগুলো অকপটে বলতে পারে নীলা। গুডি ছেলেদের দেখলে কি ভীষণ ক্যাবলা মনে হয়, আবার অতিরিক্ত স্মার্টদের দেখলে গা জ্বলে যায় অনিমেষের জানা হয়ে গেছে। ওদের বাড়িতে থাকার শেষের দিকে ওর সহপাঠিনীর এক দাদাকে ভাল লাগতে শুরু হয়েছিল অনিমেষকে সেটা জানাতে দ্বিধা করেনি নীলা। একসঙ্গে একই বাড়িতে থেকে এক মুহূর্তের জন্য অন্য কোনরকম আচরণ করতে দেখেনি ওকে অথচ হাসপাতালে প্রথম আলাপের দিন অনিমেষ নীলার সম্পর্কে একটা মোটা দাগের ধারণা করে ফেলেছিল।

পরের বছর হোস্টেলে আসার পর দেবব্রতবাবুর ওখনে সে গিয়েছে মাঝে-মাঝে। দেবব্রতবাবুও খোঁজখবর নিতে এসে থাকেন কিন্তু নীলার সঙ্গে সে আড্ডাটা আর জমেনি। একটা বছর নষ্ট হওয়ায় নীলা ওর থেকে এক ধাপ এগিয়ে গেছে। বি-এ পড়ার সময় একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটেছিল যার পর অনিমেষ আর দেবব্রতবাবুর বাড়িতে যায়নি। যায়নি মানে সম্পর্ক চলে যাওয়া নয়, যেতে ঠিক ইচ্ছে করে না। ব্যাপারটা ওকে এমন চমকে দিয়েছিল যে এখনও ভাবলে কুলকিনারা পায় না। দেবব্রতবাবুকে জানাতে পারেনি অনিমেষ। যাকে বলা যেত সে কোনদিন জিজ্ঞাসা করেনি। নীলা কখনই ওর হোস্টেলে আসেনি। যখন বাড়িতে যেত তখন হেসে গল্প করত, খবরাখবর নিত, ব্যাস, এক এক সময় অনিমেষের মনে হয়েছে সরাসরি গিয়ে নীলাকে ব্যাপারটা বলে, ওর কি বক্তব্য সেটা জেনে নেয়। নীলা যেমন সহজ মেয়ে নিশ্চয়ই সত্যি কথা বলবে। কিন্তু সেই জিজ্ঞাসা করাটাই যে অস্বস্তির। সেই বিকেলটা ছিল শীতের। সন্ধ্যেটা আসবার আগেই কোলকাতা ধোঁয়াটে হয়ে যায়। নীলাদের বাড়িতে এসেছিল অনিমেষ। এসে শুনল নীলা দেবব্রতবাবুর সঙ্গে সিনেমা দেখতে বেরিয়েছে। ওর আসার কোন কথা নয়, ওরা জানেও না। মাসীমা খুব আদর করে ওকে খাওয়ালেন, ভদ্রমহিলাকে কখনো গম্ভীর মুখে দেখেনি অনিমেষ। ওদের এই বাড়িটা সুখী সংসারের একটা দারুণ উদাহরণ। মহীতোষ তাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গেছেন একটা স্বপ্নেও ভাবা যায় না। ওদের ফিরতে দেরী হবে বলে অনিমেষ চলে আসছিল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গলি দিয়ে হাঁটছে এমন সময় কেউ একজন ওর সামনে এসে দাঁড়াল। অনিমেষ দেখল ছেলেটি ওর চেয়ে সামান্য বড় হবে কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, এই শীতেও কোন গরম জামা গায়ে নেই। অনিমেষ থমকে দাঁড়াতেই ছেলেটি গম্ভীর গলায় বলল, তোমার সঙ্গে আমার খুব জরুরী কথা আছে।

অনিমেষ হকচকিয়ে গিয়েছিল, কোনরকমে বলল, আপনি কে?

আমি যে-ই হই তোমার তাতে কি দরকার! কথা আছে শুনতে হবে।

বাঃ, আপনাকে আমি চিনি না।

অনিমেষকে থামিয়ে দিয়ে ছেলেটি বলল, ঠিক আছে, তুমি আমার সঙ্গে এস। ওপাশে একটা পার্ক আছে, সেখানে বসব। কথা বলার সময় ছেলেটি বারংবার চারপাশে তাকাচ্ছিল। মনে হল ছেলেটি তো অন্য কারো সঙ্গে তাকে গুলিয়েও ফেলতে পারে। এই আবছা অন্ধকারে সেটা অসম্ভব নয়। সে জিজ্ঞাসা করল, আপনি আমাকে চেনেন?

তুমি তো অনিমেষ, এসো, আমি এগোচ্ছি। ছেলেটি সামনে হাঁটছে, ইতস্তত করেও অনিমেষ ওকে অনুসরণ করল। ঠিক ভয় নয়, অনিমেষের মনে হচ্ছিল কোন কিছু মারাত্মক ব্যাপার ঘটেছে যার ফলে ছেলেটির তাকে খুব প্রয়োজন। কিন্তু সেটা এত অস্পষ্ট যে ওটা জানবার আগ্রহ ওকে পার্কে টেনে আনল। সে পার্কের ভেতর ঢুকে দেখল একটা খালি বেঞ্চিতে ছেলেটি। বলল পার্ক কিন্তু মানুষের ভীড় কম। অনিমেষকে একটু পা টেনে হাঁটতে দেখে ছেলেটি বলল, তোমার পায়ে কি এখনও ব্যথা আছে? অবাক হয়ে তাকাল অনিমেষ। ঘাড় নেড়ে না বলতে বলতে ভাবল এই ছেলেটি ওর সম্পর্কে অনেক কিছু জানে। কি ব্যাপার!

বেঞ্চিতে বসলে ছেলেটি এবার কেমন হয়ে গেল। যে উত্তেজনায় অনিমেষকে এখানে ডেকে এনেছে সেটা কমে আসতেই ও কথা খুঁজে পাচ্ছে না এটা টের পাওয়া যাচ্ছিল। অনিমেষ বলল, কি কথা, বলুন।

ছেলেটি হঠাৎ কাতর গলায় বলে উঠল, তুমি আমাকে চেন না, আমার নাম শ্যামল। আমি নীলাকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসি।

এরকম কথা শুনবে অনুমান করতে পারেনি অনিমেষ। ও অবাক হয়ে ছেলেটিকে দেখতে লাগল । এবং এতক্ষণে ওর খেয়াল হল প্রথম থেকে শ্যামল ওকে সমানে তুমি তুমি বলে যাচ্ছে অথচ ওকে খুব বেশি বয়স্ক মনে হচ্ছে না তার। নীলাকে ভালবাসে বলেই কি অনিমেষকে তুমি বলার অধিকার পেয়ে যাবে! বিরক্ত হয়ে সে অন্যদিকে তাকাল। ছেলেটি সেইরকম গলায় বলল, আমি তোমার কাছে, কি বলব, আমার মনে হচ্ছে পাগল হয়ে যাব।

কোন রকমে অনিমেষ বলতে পারল, এসব কথা আমাকে বলছেন কেন?

শ্যামল বলল, কারণ তুমি আমাকে সাহায্য করতে পার!

আমি? হতভম্ব হয়ে গেল অনিমেষ।

তুমি এমন ভাব করছ যেন কিছুই বুঝতে পারছ না! আড়চোখে তাকাল শ্যামল।

বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

হয় তুমি মিথ্যুক নয়– না, নীলা কখনোই মিথ্যে কথা বলতে পারে না। শোন, তোমাকে একটা কথা স্পষ্ট বলতে চাই নীলাকে আমি ভালবাসি। আমি জানতাম ও আমাকে ছাড়া আর কিছু চায় না। কিন্তু ইদানিং ওর ব্যবহার একটু একটু করে প্যাল্টে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত স্বীকার করল যে আমাকে নাকি ও ভালবাসতে পারছে না। আমি জানি এর কারণ তুমি! তুমি ওদের বাড়িতে অতদিন ছিলে, একসঙ্গে থাকলে অনেকসময় মমতা এসে যায়। নীলা তোমার জন্যে আমাকে রিফুজ করছে। বড় বড় চোখে তাকাল শ্যামল।

হেসে ফেলল অনিমেষ। সে শ্যামলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, একথা আপনি কোত্থেকে জানালেন? নীলা আপনাকে বলেছে?

ঘাড় নাড়ল শ্যামল, নীলা বলবে কেন? আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি ছাড়া আর কোন ছেলে ও বাড়িতে যায় না।

হাসছিল অনিমেষ, ব্যাস, তা থেকেই আপনি ধারণা করে ফেললেন?

শ্যামল রেগে গেল, ইয়ার্কি মারার সময় এটা নয়। নীলা আমাকে যেরকম ভালবাসত তা থেকে সরে যাওয়ার একমাত্র কারণ অন্য কেউ তার মন ভুলিয়েছে। মেয়েরা রুগ্ন মানুষের ওপর চট করে মায়া দেখিয়ে বসে।

অনিমেষ বলল, আপনি ভুল করছেন। নীলার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই। কেন নীলা এরকম করেছে সেটা তাকেই জিজ্ঞাসা করুন।

আমাকে ও এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না। নীলা তোমার গল্প আমার কাছে যখনই করত তখন এমন ভাব দেখাতো যে তুমি একজন হিরো। পুলিশের গুলী খেয়েও বেঁচে গেছ । নীলা জানে না আমি এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারি।

অনিমেষ ভেবে পাচ্ছিল না নীলা এরকম ব্যবহার শ্যামলের সঙ্গে করছে। বোধহয় শ্যামল হল সেই ছেলে যার কথা নীলা ওকে বলেছিল। সহপাঠিনীর দাদা। এত চট করে ভালবাসা চলে যায় কি করে! ও বন্ধুর মত শ্যামলকে বলল, নীলা যখন চাইছে না তখন ব্যাপারটা ভুলে যান। জোর করে কারো ভালবাসা আদায় করা যায় না আর আদায় করাটা পাওয়া নয়।

ফুঁসে উঠল শ্যামল, ভুলে যাব? অসম্ভব। আমি তার আগে নীলাকে মেরে ফেলব।

এবার সত্যি ঘাবড়ে গেল অনিমেষ। শ্যামলের ভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছে সেরকম কিছু করা ওর পক্ষে অসম্ভব নয়। সে তাড়াতাড়ি বলল, ঠিক আছে, আপনি আমাকে কি করতে বলেন?

শ্যামল খুব গম্ভীর গলায় এবার বলল, তুমি যদি আর নীলার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখো তাহলে নিশ্চয়ই নীলার মন আবার আমার দিকে ফিরে আসবে। আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড। তুমি তো বলছ তোমার সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই, তাহলে যোগাযোগ না থাকলে কোন ক্ষতি হবে না।

এই প্রথম ছেলেটির জন্য কেমন মমতা অনুভব করল অনিমেষ। ভালবাসলে মানুষ কি অন্ধ হয়ে যায়! কোন যুক্তি কি আর মাথায় কাজ করে না? নীলা যদি ওকে এড়িয়ে যেতে চায় তাহলে শ্যামল কত মানুষের কাছে গিয়ে এই ধরনের অনুরোধ করবে? কিন্তু নীলার মত সহজ মেয়ে এইরকম ব্যবহার করবেই বা কেন? যদিও নীলা শ্যামলকে বলেনি যে সে অনিমেষকেই ভালবাসে ব্যাপারটা চিন্তা করতেই সমস্ত শরীর সিরসির করে উঠল। সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ঠিক আছে, আপনি নিশ্চিত থাকুন, আমি নিজে নীলার কাছে আসব না।

শ্যামল খুব খুশি হলো, ওর মুখে হাসি ফুটল।

অনিমেষ উঠে দাঁড়ায়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও মন পাল্টালো। শ্যামলকে পার্কের বেঞ্চিতে রেখে সে হন হন করে রাস্তায় দিকে এগিয়ে গেল । দ্রুত হাঁটতে তখনও অসুবিধে হতো কিন্তু সে গ্রাহ্য করল না।

কথা রেখেছিল অনিমেষ। যদিও মাঝে মাঝে মনে হতো শ্যামলের ওই ছেলেমানুষি হৃদয়াবেগকে ও অহেতুক প্রশ্রয় দিচ্ছে তবু নীলাদের বাড়িতে যেতে কেমন আড়ষ্টতা অনুভব করত এর পর থেকে। এসব কথা দেবব্রতবাবুকে বলা যায় না। নীলা-শ্যামলের সম্পর্কটা এখন কি রকম সে খবর আর পায়নি সে। এবং একটা অদ্ভূত ব্যাপার, নীলা তার সঙ্গে দেখা করতে আসেনি। বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্কটিশ তো মোটে দশ মিনিটের রাস্তা।

কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে কি একটা গোলমাল হয়েছে, ট্রামগুলো লাইনবন্দী হয়ে পড়ায় অনিমেষ নেমে পড়ল। আজ প্রথম পিরিয়ড বারোটায়। সময় আছে হাতে। বই-এর দোকানগুলোর সামনে দিয়ে যেতে ওর খুব মজা লাগে। সার দেওয়া দোকানগুলোতে কত রকমের বই অথচ দুদন্ড সেদিকে তাকাবে তার জো নেই। দরজায় দাঁড়ানো কর্মচারীরা চিৎকার করে ডেকে দোকানে ঢোকাবেই। যারা ওই ফুটপাতে হাঁটবে তারা সম্ভাব্য খরিদ্দার বলে বোধ হয় ওরা ধারণা করে। এক একদিন তো প্রায় হাত ধরে টানাটানি চলে ভেতরে নিয়ে যেতে, তা বই কেনার প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক। ওদের কবল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে বই দেখার মধ্যে লুকোচুরি খেলার মত একটা মজা আছে। হ্যারিসন রোড পার হয়ে এপারে আসতেই অনিমেষ চমকে উঠল। প্রায় পাঁচ বছর পর দেখল, চেহারার সামান্য পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু চিনতে একটুও অসুবিধে হয় না। সেই গেরুয়া পাঞ্জাবিটি আর পাজামা, কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ, মাথার চুল উস্কোখুস্কো, হাতে সিগারেট নিয়ে কিছু ভাবছে। অনিমেষ সোজা সামনে গিয়ে দাঁড়াল, চিনতে পারছেন? আচমকা প্রশ্নটায় মুখে ভাঁজ পড়ল ! কিন্তু সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য, তারপরই, অনিমেষের হাত ধরে প্রবল ঝাঁকুনি, আরে তুমি!

অনিমেষ বলল, যাক, শেষ পর্যন্ত চিনতে পারলেন!

সুবাস সেন বলল, কি আশ্চর্য, চিনব বা কেন? তবে তুমি খুব বড় হয়ে গেছ। মুখটা দাড়িগোঁফে ঢেকে ফেললেও চিনতে অসুবিধে হবে কেন? কেমন আছ?

ভাল। অনিমেষ উত্তরটা দিতে গিয়ে টের পেল এতদিন বাদে সুবাস সেনকে দেখতে পেয়ে ওর খুব ভাল লাগছে।

তোমার পা? এখন ঠিক হয়ে গেছে তো? সুবাস পায়ের দিকে তাকাতেই অনিমেষ বলল, প্রায় ঠিক, কোন অসুবিধে হয় না। তবে দৌড়ালে লাগে।

সুবাস হাসল, দৌড়াবার কি দরকার। হেঁটে যদি পৌঁছে যাওয়া যায় সেটাই তো ভাল। তারপর বলল, আছ কোথায়, কি করছ?

একটা সময় ওর সুবাসের ওপর অভিমান হত, এই কয় বছরে কলকাতা শহরে যখনি সে হেঁটেছে তখনই মনে হয়েছে, হয়তো, হয়তো একদিন সুবাসের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে । কিন্তু কোনদিন সেরকম কিছু হয়নি। হাসপাতালে একদিন এসে সেই যে সুবাস চলে গেল আর দেখা পায়নি তার। সুবাস বলেছিল, আবার তাকে দেখতে আসবে কিন্তু কথা রাখেনি। ইচ্ছে করলে কি সুবাস তার ঠিকানা হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করে দেবব্রতবাবুর বাড়িতে যেতে পারত না! এ সব চিন্তা যত পুরনো হয়েছে তত মনে হয়েছে, তার কাছে সুবাসের আসবার কি কারণ থাকতে পারে? সে সুবাসদের আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, একদিন যে হাসপাতালে এসে দেখা করে জিনিসপত্র দিয়ে গেছে তাই ঢের। কিন্তু সুবাস যে কথা দিয়েছিল আসবে–কথা দিয়ে না এলে বড় কষ্ট হয়। এখন এই মুহূর্তে সেই সব অভিমানগুলো যখন ওর মনে দুলতে শুরু করেছে, সুবাস বলল, নাও, এতদিন পর দেখা হল, একটা সিগারট খাও। চারমিনারের প্যাকেটটা সামনে এগিয়ে ধরতে অনিমেষ ঘাড় নাড়ল, না সিগারেট সে খায় না তা নয়, কিন্তু ওই যে অতদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হয় তারপর থেকে খাওয়ার ঝোঁকটাই একদম চলে গেছে। আর এখন মহীতোষ যে টাকা পাঠান তাতে সিগারেট খেতে গেলে খুব অসুবিধে হবে।

অনিমেষ এখন কি করছে তা জেনেটেনে নিয়ে সুবাস বলল, বা, তুমি দেখছি বেশ গুড বয়। যাক, তোমাদের ক্লাস শুরু হয়েছে, ওখানে আমাদের ছেলেদের সঙ্গে আলাপ-টালাপ হলো?

আপনাদের ছেলে মানে? অনিমেষ অবাক হল।

সুবাস ওর দিকে স্পষ্ট চোখে তাকাল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি স্কটিশে ছাত্র ফেডারেশন করতে না? অবশ্য করলে তো আমি জানতামই ।

অনিমেষ ঘাড় নাড়ল, না। য়ুনিয়নের সঙ্গে আমার সরাসরি সম্পর্ক ছিল না।

সুবাস এবার অবাক হল, সে কি! আমার যদ্দূর মনে হচ্ছে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তুমি বামপন্থী কথাবার্তা বলেছিলে।

অনিমেষ বুঝতে পারছিল না কি করে ব্যাপারটা বোঝাবে । সে যদি চটপট বলে বসে যে, আন্দোলনের ব্যাপারটা ওর কাছে স্পষ্ট নয় বলে সে সক্রিয় হতে পারেনি অথবা স্কটিশেন ছাত্র ফেডারেশন কতগুলো বিলাসী ছেলের সময় কাটানোর একটা মাধ্যম বলে তার মনে হয়েছিল, তা বললে সুবাসদা সে কথা নিশ্চয়ই খুব সহজে মেনে নেবে না। ওর ভয় হচ্ছিল; এ কথা শুনলে বরং সুবাসদা ওকে ভুল বুঝতে পারে।

অনিমেষ বলল, আসলে আমার এই পা নিয়ে এত বিব্ৰত ছিলাম, যে, কিছু করতে সাহস পেতাম না। কথাটা শেষ করেই মনে হল উত্তরটায় ফাঁকি থেকে গেল। সে আবার বলল, তা ছাড়া, কোন ব্যাপার অস্পষ্ট থাকলে আমার মন তার মধ্যে যেতে সায় দেয় না।

কিন্তু অস্পষ্টতা কিসের জন্য এ নিয়ে কারো সঙ্গে আলোচনা করেছ কখনো?

সুবাস ওর কাঁধে হাত রাখল। অনিমেষ উত্তর দিল, না, আসলে কিছু কিছু ব্যাপার আছে যা নিজেই ভেবে ঠিক করে নেওয়া যায়।

সুবাসের হাতের আঙুল ওর কাঁধে শক্ত হল, না। অলোচনাই পথ পরিষ্কার করে । ঠিক আছে, একদিন তুমি আর আমি বসব। একা একা লড়াই করা যায় না।

অনিমেষ বলল, মাঝে মাঝে আপনার কথা ভাবতাম কিন্তু ঠিকানা জানি না যে দেখা পাব। কটা বাজে?

সুবাস ঘড়ি দেখল, বারোটা বাজতে তিন মিনিট বাকি। সে বলল, তুমি তো ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছ, চলো, তোমার সঙ্গে একজনের আলাপ করিয়ে দিই।

অনিমেষ অস্বস্তির গলায় বলল, কিন্তু আমার যে বারোটায় ক্লাস!

সুবাস বলল, কি সাবজেক্ট?

অনিমেষ বলল, বৈষ্ণব সাহিত্য।

সুবাস হাসল, এটা জেনে তোমার কি কাজে লাগবে? পরীক্ষার আগে তিন দিন চোখ বোলালেই নম্বর পেয়ে যাবে। বিমানের সঙ্গে আলাপ করো, দেখবে ভবিষ্যতে কাজ করতে সুবিধে হবে। ক্লাস না করে কোথাও যেতে খারাপ লাগছিল অনিমেষের। তবু সে জিজ্ঞাসা করল, বিমান কে?

সুবাস বলল, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি।

০৫. একতলার ক্যান্টিন রুমে

একতলার ক্যান্টিন রুমে সুবাস সেনের সঙ্গে ঢুকল অনিমেষ । এখানে ও প্রথম এল। বারোটার সময় ক্যান্টিনে ভীড় কম, কয়েকজন ভাত খাচ্ছে। ওপাশে তিন চারজন ছেলে বেঞ্চিতে পা তুলে বসে গুলতানি মারছে। সুবাস একবার চোখ বুলিয়ে ক্যান্টিনের ম্যনেজারকে বিমানের কথা জিজ্ঞাসা করল। ভদ্রলোক পেছনের দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে একবার ঘাড় বেঁকিয়ে তাকিয়ে বললেন, মিনিট দশেক অপেক্ষা করতে হবে।

ওরা একটা বেঞ্চিতে বসলে সুবাস দুটো চায়ের জন্য হুকুম দিল। ঘণ্টাখানেক আগে ভাত খেয়ে এসেছে, এখনই চা খাওয়া ওর অভ্যাসে নেই কিন্তু অনিমেষ আপত্তি করল না। কোলকাতার মানুষের কাছে এভরি টাইম ইজ টি-টাইম । দেবব্রতবাবুর বাড়িতে রাত দশটাতেও চা হতো। অথচ স্বৰ্গছেঁড়া চা বাগানে চা খাওয়ার এত চল নেই। বেশি খেলে শরীর কষে যায়–এরকম একটা ধারণা চা বাগানের মানুষের। কোলকাতার মানুষ হার্ট ভাল করতে ঘনঘন চা খায়–এ রকম একটা খবর কদিন আগে কাগজে দেখেছে।

সুবাস চা খেতে খেতে বলল, বিমান খুব সিরিয়াস ছেলে। পলিটিক্যাল চিন্তাভাবনা ওর পরিষ্কার। কিন্তু মুশলিক হল সময় মত কঠোর হতে পারে না, ফলে মাঝে মাঝে গোলমাল করে ফেলে। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি তুমি চার বছর কলেজে থেকে কি করে এস এফ-এর সঙ্গে সম্পর্ক না লেখে চললে! অনিমেষ উত্তর দিল না। কথাটা এর আগেও সুবাস জিজ্ঞাসা করেছে। বোধহয় কোন সন্দেহ ওর মনে ঢুকছে। সুবাস জিজ্ঞাসা করল, চুপচাপ কেন?

অনিমেষ বলল, কোন কারণ নেই। আসলে আমার তো একটা বছর নষ্ট হয়ে গিয়েছে পায়ের জন্য, আর কোন রিস্ক নিতে চাইছিলাম না।

সুবাস বলল, রিস্ক মানে?

অনিমেষ উত্তর দিল, আমি যদি ফেল করতাম তা হলে আর পড়া হতো না। বি-এ একবারে পাশ করাটা জরুরী ছিল।

সুবাস ওর মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞাসা করল, এখন তুমি গ্রাজুয়েট। কতটা লাভবান হয়েছ তুমি?

মানে? অবাক হল অনিমেষ।

বি-এ পাস করে তোমার কটা হাত গজিয়েছে। তুমি কোথাও দরখাস্ত করলে কেউ তোমাকে চাকরি দেবে? সুস্থভাবে বাঁচার জন্য বি-এ ডিগ্রীটা তোমাকে কি সাহায্য করবে? এই যে তুমি বাংলা নিয়ে এম-এ ক্লসে ভর্তি হয়েছ, ধরে নিলাম তুমি খুব ভালভাবে পাস করবে, কিন্তু তারপর? তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল সুবাস।

এম এ পাস করলে। নিশ্চয়ই একটা চাকরি পাওয়া যাবে। অনিমেষ বলল।

ছাই পাওয়া যাবে! বোঝা যাচ্ছে তুমি কোন খবরই রাখ না। স্ট্যাটিস্টিকস বলছে আঠারো লক্ষ বেকার গ্রাজুয়েট আর তিন লক্ষ বেকার এম-এ আঙ্গুল চুষছে। সংখ্যাটা প্রতি বছর বাড়বে। তোমার যদি কোন মামা থাকে তাহলে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। তবে তার জন্য এম এ পড়ার কোন দরকার হয় না। সুবাস সিগারেট ধরাল। কথাগুলো শুনতে শুনতে অনিমেষ কি রকম অসহায় বোধ করছিল।

সুবাস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, একটা জিনিস ভাবলেই ব্যাপারটা তোমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাংলায় এম এ হওয়ার পর চাকরি করার সুযোগ কোথায় কোথায় আছে? প্রথমে কলেজে তারপর স্কুলে। এই দুই জায়গার বাইরে দুএকটা খবরের কাগজ, ব্যাস। প্রতি বছর কটা চাকরি স্কুল কলেজেগুলোতে বাংলার জন্য খালি হচ্ছে? খুব জোর পঞ্চাশটা, আঁ? অথচ দুটো ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে বেরুচ্ছে প্রায় শদুয়েক ছেলেমেয়ে। এই যে প্রত্যেক বছর দেড়শো করে ছেলেমেয়ে বেকার হয়ে থাকছে তারা কোথায় যাবে? চাকরি দরকার বলে ওরা এমন প্রফেসনে ঢুকবে যার সঙ্গে বাংলায় এম এ পড়ার কোন সংশ্রব নেই । এটা কি কর্তৃপক্ষ জানে না ভাবছ? নিশ্চয়ই জানে আসলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে দেশের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায়। কথাগুলো বলতে বলতে সুবাস দরজার দিকে চোখ ফিরিয়েছিল। কথা শেষ করেই বলে উঠল, এই যে, বিমান এসে গেছে।

অনিমেষ দেখল, ফর্সা সুন্দর চেহারার একটি ছেলে ক্যান্টিনে ঢুকছে। শার্ট-প্যান্ট পরনে, চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল। ওর পেছনে আরো দুজন। ঘরের ঢুকেই বিমান সুবাস সেনকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল, আরে সুবাসদা, তুমি কতক্ষণ?

মিনিট দশেক। সুবাস ওর বাড়ানো হাতটা স্পর্শ করে বলল, কেমন আছ?

চলছে। তোমাকে কিন্তু এখানে আশা করিনি। বিমান ওর সঙ্গীদের কিছু বলতে তারা আবার বেরিয়ে গেলে সে ওদের পাশে এসে বসল।

কেন?

শুনেছিলাম তুমি বীরভূমে চলে যাচ্ছ । ওখানকার কাজ কর্ম দেখবে।

ঠিকই শুনেছ। আমি গতকাল কোলকাতায় এসছি। তোমার কাছে আসবার কোন পরিকল্পনা ছিল । হঠাৎ এর সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায় মনে হল তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া দরকার। সুবাস অনিমেষকে দেখাল।

পরিচয়-পর্ব শেষ হবার পর অনিমেষকে বিমান জিজ্ঞাসা করল, আপনি কোন কলেজ থেকে আসছেন? সুবাস বলল, ও স্কটিশে পড়ত। আসলে জলপাইগুড়ির ছেলে, এখানে হোস্টেলে থাকত। ওর একটা ব্যাপার ঘটেছিল সেটার সঙ্গে আমিও কিছুটা জড়িত। বলে সে হাসল ।

বিমান জিজ্ঞসা করল, কি ব্যাপার?

অনিমেষ দ্রুত বলে উঠল, না না; এমন কিছু ব্যপার নয়।

সুবাস হাসছিল, বিমান ওদের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, কটিমের যারা এবার বেরিয়েছে তাদের সাহায্য পাওয়া যাবে না বলে মনে হচ্ছে।

সুবাস জিজ্ঞাসা করল, কেন? ওরা কি সব ডান দিকে?

বিমান বলল, স্কটিশের দেখাশুনা করত অতীনবাবু। ওরা তো এখন আমদের চীনের দালাল বলে বেড়াচ্ছে। ন্যাচারালি স্কটিশের ইউনিটটা ওদের মতকেই সমর্থন করছে। পুরোপুরি ক্লাস শুরু না হলে ঠিক বোঝা যাবে না আমাদের দিকে কারা আছে। আপনার কি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে?

অনিমেষ দেখল বিমান ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল। খবরের কাগজ থেকে আজ কারো জানতে বাকী নেই বিমান কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছে। সেই চীন-ভারত যুদ্ধের সময় থেকেই এই সব ব্যাপার চলছে। অনিমেষ অবাক হতো একটা ব্যাপার দেখে, বিদেশী একটা রাষ্ট্রের আক্রমণের ফসল হিসেবে এদেশের একটা বড় পার্টি ভাগ হয়ে গেল। পার্টির ভাগাভাগিটা সবে অফিসিয়ালি ঘোষণা করা হয়েছে কিন্তু তার প্রস্তুতি চলছিল অনেকদিন থেকে। স্কটিশ যারা ছাত্র ফেডারেশন করছে তারা পার্টিকেই সমর্থন করছে আর বিমান এবং নিশ্চয়ই সুবাসদারা পার্টি থেকে বেরিয়ে আসা বিরাট অংশটার সঙ্গে রয়েছে। একই পার্টিতে দীর্ঘকাল একসঙ্গে থেকে পার্টির নেতারা চীনে–যুদ্ধের পর দ্বিমত হলেন। একদল বললেন চীন আক্রমণকারী, অন্যদল মনে করলেন ওটা সীমান্ত সংঘর্ষ। ব্যাস, ভাগাভাগি হয়ে গেল দলটা। কিন্তু সেই সঙ্গে খবরের কাগজে যে কথাটা লেকা হল সেটাই অনিমেষকে গুলিয়ে দেয়, ডানপন্থী কম্যুনিস্টারা নাকি রাশিয়ার সমর্থক, বামপন্থীরা চীনের। কোন আমরা বিদেশী রাষ্ট্রের কথায় পবিচালিত হব, এটাই বুঝতে পারে না সে। বিমানের মুখের দিকে তাকিয়ে অনিমেষ উত্তর দিল, এসব ব্যাপার আমি সিরিয়াসলি কখনো ভবিনি।

ভাবেননি? নগরে যখন আগুন লাগে তখন কি দেবালয় অক্ষত থাকে? দেশের জন্য যদি চিন্তা ভাবনা করেন তা হলে একটা সঠিক পথে আপনাকে যেতে হবে। পথটা কি নেবেন সেটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে। ঠিক হয়ে গেলেই সেটা আপনার কাছে সঠিক পথ । আজকের এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রতেকটি ছাত্রের দায়িত্ব আছে।

সুবাস এতক্ষণ শুনছিল, এবার বলল, আমি এটুকু বলতে পারি অনিমেষ একসময় কম্যুনিষ্ট আন্দোলনকে সমর্থন করে আমার সঙ্গে কথা বলছিল। আসলে পলিটিক্যাল কনসাসনেস ওর মধ্যে আসেনি বলে ও এখনও মনস্থির করতে পারছে না।

বিমান সোজা হয়ে বসল, আপনি ভাবুন, অনিমেষ। যদি কোন ব্যাপারে অস্পষ্টতা থাকে তা হলে সরাসরি আমার সঙ্গে আলাপ করতে পারেন।

এই সময় আরো কয়েকজন ছেলে ক্যান্টিনে ঢুকল। ওদের দেখে বিমান একটু গম্ভীর হয়ে গেল। সুবাসদাও একটু উসখুস করছিলেন। দলটা থেকে একজন এগিয়ে এল, বিমান, তোমার সঙ্গে কথা আছে।

কি ব্যাপার! বিমান ওদের দিকে তাকাল।

আমাদের ছেলেদের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। অনিমেষ দেখল যে ছেলেটি কথা বলছে তার মধ্যে কোন জড়তা নেই খদ্দরের পাঞ্জাবি আর ধুতি পরনে।

কে বাধা দিচ্ছে, আমরা?

অমাদের কাছে তাই খবর।

কি রকম?

নবাগত ছাত্রদের অভ্যর্থনা জানিয়ে যে সব পোস্টার দেওয়া হয়েছিল সেগুলো ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। ছাত্র পরিষদের একটাও পোস্টার চোখে পড়ছে না।

তুমি কি বলতে চাইছ ওগুরো আমরা ছিঁড়েছি। কেন ছিঁড়ব? ওই সব পোষ্টার পড়লে কি নতুন ছেলেমেয়েরা সব আমাদের বিরোধী হয়ে যাবে? দ্যাখ্যো মুকুলেশ, আমি চাই না কারো সঙ্গে গায়ে পড়ে বিরোধ করতে। তোমাদের যদি সত্যি কোন নালিশ থাকে তা হলে ডি-সির কাছে যাও, আমার কাছে এসেছ কেন?

আমার কি করব সেটা আমাদের বিবেচ্য। যেহেতু তুমি জি এস, আর বাম ছাত্র ফেডারেশন এই কাজ করছে তাই তোমাকে জানিয়ে রাখা হল। যদি একই রকম আচরণ চলতে থাকে তা হলে পরবর্তীকালে আমরা অন্য রকম ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।

কথা শেষ করে ছেলেটি চলে যাচ্ছিল, বিমান তাকে ডাকল। মুকুলেশ পেছন ফিরে তাকাতে বিমান বলল, তুমি আমাকে জান, এই রকম ভয় দেখিয়ে কোন কাজ হবে না। তোমাদের পোষ্টার কারা ছিঁড়ছে আমি জানি না, তবে ওইসব পোষ্টার লেখার আগে তোমাদের চিন্তা করা উচিত ছিল। নতুন ছেলেমেয়েদের ওয়েলকাম করতে আমাদের গালা-গালি করতেই হবে–এটা কি ধরনের ভদ্রতা? কই আমাদের পোস্টরে তো তোমাদের সম্পর্কে কোন কথা বলিনি। রাজনীতির প্রথম কথাই কি অভদ্রতা?

মুকলেশ হেসে উঠল, রাজনীতির পাট তোমার কাছ থেকে নেবার আগে আমার আত্মহত্যা করা উচিত। নতুন যে সব মুরগী ঢুকছে তাদের ব্রেন-ওয়াশ করতে পারো, আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না। তোমরা কতটা ভদ্র তার বিরাট লিস্ট আমার কাছে আছে। যথাসময়ে ছেলেমেয়েদের কাছে সেটা রাখব।

বিমান একটু গলা চড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি আমাকে চোখ রাঙাতে এসেছ?

মুকুলেশ দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, তুমি জেনারেল সেক্রেটারী, তোমাকে চোখ রাঙানোর সাধ্য কি! কিন্তু মনে রেখ, এই দেশটা ভারতবর্ষ, চীনের দালানদের আমরা ক্ষমা করব না। যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেল ওরা।

অনিমেষ দেখল সমস্ত ক্যান্টিনঘর এখন চুপচাপ। যারা ওপাশে ভাত খাচ্ছিল তারা তো বটেই, এমন কি ক্যান্টিনের বয়গুলো পর্যন্ত কাজ ভুলে বিমানের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা নৈঃশব্দ কিছুক্ষণ সুতোর মুখে ঝুলতে থাকল। এতক্ষণ সুবাস সেন চুপচাপ শুনছিল, এবার নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, ব্যাপারটা কি?

সে নিজে হলে কি হতো কে জানে, কিন্তু অনিমেষ অবাক হয়ে দেখল বিমান খুব সহজেই স্বাভাবিক হয়ে গেল। মাথা নেড়ে হেসে বলল, সেই পুরনো চাল, পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করা। দিনরাত গালাগাল দেবে কিন্তু প্রতিবাদ করলেই ছাত্র ফেডারেশনের আক্রমণ বলে পোষ্টার পড়বে।

সুবাস জিজ্ঞাসা করল, পোস্টার ছেঁড়ার ব্যাপারটা কি?

বিমান কাঁধ ঝাঁকালো, আরো যাচ্ছে তাই কথা লিখছে! নবীন ছাত্ররা চীনের দালালদের চিনে রাখুন। একজন দেশদ্রোহী আপনার পাশেই আছেন, যার গেঞ্জি চীন থেকে আসছে। এইসব পোষ্টার দেখেতে দেখতে কোন ছেলে যদি মাথা গরম করে ফেলে এক-আধটা ছিঁড়ে ফেলে তা হলে আমি কি করতে পারি! ওদের চরিত্র সেই টিপিক্যাল গ্রাম্য ঝগড়াটে বুড়ীর মত হয়ে গেছে।

বিমল বলল, দক্ষিণীরা?

বিমান হেসে ফেলল, ভাল বলেছ। তাদের মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের সংখ্যা সামান্য, শুনছি ছাত্র পরিষদের সঙ্গে একটা আঁতাত হচ্ছে ওদের। এক সময় সবার চরিত্র প্রকাশ পাবেই।

চার-পাঁচজন ছেলেকে খুব উত্তেজিত গলায় কথা বলতে বলতে এদিকে আসতে দেখল ওরা। সবাই অনিমেষের সমবয়সী, দু-একজনের চেহারা বেশ রাগী রাগী। ক্যান্টিনে ঢুকে ওরা সরাসরি কাছে চলে এল, কি ব্যাপার, শুনলাম মুকুলেশ নাকি তোমাকে মারতে এসেছিল? একজন খুব উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করল।

কে বলল? অনিমেষ তাজ্জব হয়ে শুনল কি নিরাসক্ত গলায় কথা বলছে বিমান!

সত্যি কিনা একবার বল । শালার লাশ নামিয়ে দেব আজই। এতবড় হেক্কড় যে তোমার গায়ে হাত তুলতে আসে! ফ্যক্ট?

বিমান ওদের উত্তেজিত মুখগুলার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তে ভেবে নিয়ে বলল, মারামারি করে কোন লাভ হবে না। এস এফ গুন্ডাদের পাটি নয়। ওটা যাদের ধর্ম তারা করুক। তোমার এত উত্তেজিত হয়ে পড়লে ওরা সেই সুযোগ নেবে।

আর একজন বলে উঠল, কিন্তু গুরু তোমাকে ইনসাল্ট করলে তো আমরা মুখ বুজে বলে থাকব না। মুকুলেশকে এর কিম্মত দিতে হবে। শালা কি গায়ে হাত তুলেছে?

বিমান হেসে ফেলল, তোমরা এত ক্ষেপে গেছ কেন? বলছি তো ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। আমি জানি কি করে এটা ট্যাকল করতে হবে।

চুপচাপ শুনছিল অনিমেষ একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে অবাক হচ্ছিল ও, ছেলেগুলোর প্রশ্নের উত্তরে বিমান একবারও বলছে না ছাত্র পরিষদের ছেলেরা তাকে মারেনি।

দলের আর একজন বলল, কিন্তু ওদের প্রশ্রয় দিলে শেষ পর্যন্ত রোকা যাবে না। খামোকা জি এস এর গায়ে হাত তুলবে আর আমরা সেটা সহ্য করব–শালারা টিটকিরিতে হাড় জ্বালিয়ে দেয়।

বিমান দুমূহুর্ত চিন্তা করে বলল, সুদীপ এসেছে?

না, দেখিনি। একজন জবাব দিল।

একটু দ্যাখো। তোমার ক্লাসে বলে এসো যে আজ তিনটের সময় লনে আসতে। যা বলার আমরা সাধারণ ছাত্রদের কাছে সরাসরি বলব।

গেট মিটিং?

না, গেট মিটিং নয়। জাস্ট একটা গেট টুগেদার।

মাইক বলব?

দরকার নেই। আমার গলা ওদের কাছে পৌঁছে যাবে। এ নিয়ে তোমরা কোন গোলমাল করো না। তিনটে অবধি অপেক্ষা করতে বল সবাইকে।

ওরা চলে গেলে সুবাস বলল, খুব টেনসন দেখছি।

হবেই। সরকার ওদের হাতে, যা ইচ্ছে করলেও ভাইস-চ্যান্সেলার চুপ করে থাকেন, সেটাই ওদের সুযোগ। এটা আমাদের ছেলেরা সহ্য করতে পারে না। যাক, বীরভূমে তোমার কেমন কাজ হচ্ছে বলো।

সুবাস সিগারেট ধরাল, ওখানে না গেলে সত্যি কিছুই জানতাম না। এখানে এই কোলকাতা শহরের মানুষের যে প্রবলেম আছে, পলিটিক্যাল যে সব ঝামেলা আছে, গ্রামে গেলে তুমি তার সঙ্গে কিছুই মেলাতে পারবে না। কমল্পিট ডিফারেন্ট ব্যাপার । এমন এক একটা গ্রাম আছে যেখানে স্বাধীনতা শব্দটার অর্থ জানে না এমন মানুষের অভাব নেই। জহরলাল, গান্ধী তাদের কাছে শিব নারায়নের মত ভগবানেরই একটা রূপ। ওরা কমুনিস্ট বলে যাদের জানে তারা থাকে অন্য দেশে। যেন বগী কিংবা রাক্ষসের মত ভয়ানক শুক্র তারাই কয়েকদিন আগে এই দেশটাকে জয় করতে এসেছিল, ভাগ্যিস গান্ধী দেবতার শিষ্যরা ছিলেন তাই দেশ রক্ষা পেয়েছে। এইরকম অবস্থায় কাজ করা যে কি দুরূহ তা তোমরা বুঝবে না। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে ওদের যত সহজে কোন সমস্যা বোঝনো যায়, শিক্ষিত মানুষকে তা সম্ভব নয়।

তুমি কোলকাতায় ফিরছ কবে পাকাপাকি ভাবে? বিমান উসখুস করল।

যবে পার্টি বলবে। তবে আমার ওখানে থাকতে ভালই লাগছে। চল, আজ উঠি, কথা বলতে বলতে দেরী হয়ে গেল অনেক। সুবাস উঠে দাঁড়াতেই বিমান যেন দাঁড়াতে পারল। অনিমেষের মনে হল বিমানের উসখুস ভাবটা নিশ্চয়ই সুবাসদা লক্ষ্য করেছিলেন। বিমানের পলিটিক্যাল ধ্যানধারণা সুবাসদার কথা মত হয়তো খুবই ভাল কিন্তু সুবাসদার দৃষ্টিভঙ্গী বিমানের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এ ব্যাপারে অনিমেষের কোন সন্দেহ নেই।

ক্যান্টিনের দরজার গিয়ে সুবাস থমকে দাঁড়ার, ওই যা, চায়ের দামটা দেওয়া হয়নি। দাঁড়াও দিয়ে আসি।

বিমান বাধা দিল, দিতে হবে না। ওটা আমার নামে লিখে লাখবে। সুবাস শুনল না । দাম মিটিয়ে ফিরে এসে বলল, এই লিখে রাখা সিস্টেমটা খুব খারাপ ব্যাপার। খরচের হাত বেড়ে যায়, খেয়াল থাকে না।

বিমান বলল, তুমি তো খুব হিসেবী, সুবাসদা।

সুবাস বলল, আমাক খুব কম অর্থে মাস চালাতে হয় বিমান। অনিমেষ, তুমি কি এখন ক্লাসে যাবে? অনিমেষের খেয়াল হল ততক্ষণে দুটো পিরিয়ড অবশ্যই হয়ে গেছে। সবে শুরু হওয়া সেসনে পড়ানো এখনও সিরিয়াসলি শুরু হয়নি। ভবু খামোকা ক্লাসে না যাওয়ার কোন মানে হয় না। ও ঘাড় নাড়ল, হ্যাঁ।

সুবাস বলল, তা হলে আমি চলি । আবার কবে কোলকাতায় ফিরব জানি না, এলে দেখা করব। বিমানের সঙ্গে তোমার আলাপ হয়ে গেল এখন কাজকর্ম শুরু করতে কোন অসুবিধা নেই।

অনিমেষ জিজ্ঞাসা করল, আপনি আজই যাচ্ছেন?

না, কাল সকালে। কেন?

কারন নেই, এমনি জিজ্ঞাসা করলাম।

সুবাস অনিমেষকে একবার ভাল করে দেখল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, তুমি স্কটিশের কোন হোস্টেলটায় থাক? অনিমেষ ঠিকানাটা বলতে সুবাস মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে, যদি সময় পাই সন্ধ্যেবেলায় তোমার কাছে যেতে পারি। অনিমেষ এটাই চাইছিল। সুবাসদার সঙ্গে একটু আলাদা করে কথা বলা দরকার। কি কথা তা এই মুহূর্তে ওর মাথায় নেই, সমস্ত ব্যাপারটা কি রকম ছায়া হয়ে আছে।

ওরা ক্যান্টিনের সামনের প্যাসেজ দিয়ে বেরিয়ে আসছে হঠাৎ বিমান চেঁচিয়ে একজনকে ডাকল, সু–দী–প। বাঁ হাতে একটা মোটা চুরুট জ্বলছে, সুদীপকে এগিয়ে আসতে দেখল অনিমেষ। সমবয়সী একটি ছেলেকে চুরুট খেতে দেখতে খুব বেমানান দেখাচ্ছে। সিগারেট সবার হাতে মানিয়ে যায় কিন্তু ছেলেটি যে ভাবে চুরুট থেকে ধোঁয়া ছাড়াছে তাতে ওকে একটুও মানায় না। সুদীপের কথা বলার ঢংটাও অদ্ভূত। কেমন চিবিয়ে চিবিয়ে শব্দগুলো ওপর একটু জোর দিয়ে আলতো করে ছেড়ে দেওয়া। সুদীপ কাছে এসে বলল, মুকুলেশের ব্যাপারটা শুনলাম। চল ইউনিয়ন রুমে বসা যাক।

বিমান হাঁটতে হাঁটতে বলল, সুবাসদা, তুমি সুদীপকে চেনো তো!

সুবাস বলল, বাঃ আমি কি এখানে নতুন এলাম? সুদীপ হাসল না শব্দ করল অনিমেষ বুঝতে পারল না।

বিমান বলল, সুদীপ, এর নাম অনিমেষ, ফ্রেশার, স্কটিশ থেকে আসছে। সুদীপ ভ্রূ কুঁচকে বলল, স্কটিশ চার্চ? ওহো, ওখানকার একটা ছেলের কথা শুনলাম একটু আগে, খুব ইন্টারেস্টিং কেস।

ওরা লনে এসে দাঁড়িয়েছিল। বিমান জিজ্ঞাসা করল, কি রকম?

একটি ছেলে, নামটা কি যেন–কি যেন–, হ্যাঁ, ছেলেটি নাকি অ্যাকটিভলি পার্টির কাজকর্ম করে অথচ স্কটিশেন স্টুডেন্টস ফেডারেশনের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখেনি। সবচেয়ে বড় খবর লাস্ট মুভমেন্টে ওকে নাকি পুলিশ গুলী করে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, লাকিলি বেঁচে গেছে। অনেকে বুলেটের দাগ দেখেছে।

বিমান বলল, অদ্ভূত ঘটনা। এরকম একটা কেস কোন কলেজে আছে আর আমরা জানব না? ইম্পসিবল! সুবাসদা, তুমি জান?

সুবাসদা হেসে ফেলল। অনিমেষ খুব অবাক হয়ে গেল। এত দ্রুত গল্পটা বাড়তে বাড়তে এইখানে চলে এসেছে। এভাবে যদি এগোয় তবে শেষ পর্যন্ত সে বিরাট বিপ্লবী হয়ে যেতে পারে।

হঠাৎ বিমান অনিমেষের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, আপনি তো স্কটিশ থেকে এসেছেন। ছেলেটিকে চেনেন? কি পড়ে?

কাঁচমাচু মুখে অনিমেষ বলল, ব্যাপারটা ঠিক সত্যি নয়।

সুবাস হাসছিল, এবার বলল, তোমরা যার কথা বলছ সে তোমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। তবে ঘটনাটা হল পুলিশের বুলেট ওর পায়ে লেগেছিল এটা ঠিক, এক বছর নষ্ট হয়েছে, মারাও যেতে পারত কিন্তু কম্যুনিস্ট পার্টির সঙ্গে ওর কখনো কোন সম্পর্ক তৈরি হয়নি। বাকীটা সবার মনগড়া গল্প।

বিমান অনিমেষকে একদৃষ্টে দেখছিল, এবার প্রশ্ন করল, পুলিশ আপনাকে কেন গুলী করল?

অনিমেষ হেসে বলল, ভুল করে। দৌড়াচ্ছিলাম বলে ভেবেছিল আমিই বোমা মেরেছি। সুদীপ নিবে যাওয়া চুরুট ঠিক করতে করতে বলল, কিন্তু তবু আপনি অভিনন্দন যোগ্য। আমার আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করুন, কমরেড।

এই প্রথম কেউ তাকে কমরেড সম্বোধন করল। একই সঙ্গে অস্বস্তি এবং এক ধরনের খুশি অনিমেষকে টালমাটাল করল । কোনটার পাল্লা ভারী ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সে মুখ নীচু করে বলল, আপনারা বোধহয় তিলকে তাল করছেন, আমি তার যোগ্য নই।

বিমান এক হাত দিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল, আঘাতটা কেমন ছিল? অনিমেষ বিমানের এরকম সুহৃদয় ব্যবহারে আড়ষ্ট হয়ে উত্তর দিল, আমি প্রায় আট মাস বিছানায় শুয়ে ছিলাম। একটা বছর নষ্ট হয়ে গেছে।

তাই নাকি! তা হলে তো আমরা একসঙ্গে পাস করেছি। অনিমেষ, আপনার পায়ে কি এখনও বুলেটের দাগ আছে? বিমান গাঢ় গলায় জিজ্ঞাসা করল।

হ্যাঁ, ওটা মৃত্যু অবধি থাকবে। আমার থাইটা বীভৎস হয়ে আছে।

ভালই হল, আপনি আমাদের হাত শক্ত করে করুন। বিমান ওর সঙ্গে করমর্দন করল।

সুবাসকে সামান্য এগিয়ে দিয়ে অনিমেষ দোতলায় উঠে এল। অনেকক্ষণ ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে । বি সেকশনে ঢোকার তিনটে দরজা, অধ্যাপক যদি পড়ানোর ব্যাপারে বেশি মনোযোগ দেন তা হলে তাঁর পক্ষে লক্ষ্য করা সম্ভব নয় কেউ এল কি না। ওদিকে দেওয়াল ঘেঁষে মেয়েরা, এপাশে দরজার দিকে ছেলেরা বসে আছে। অনিমেষ ইতস্তত করছিল ঢুকবে কি না। এই ভাবে ফাঁকা করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকাও ভাল দেখাও না। এখন যিনি বাংলা ছোটগল্প পড়াচ্ছেন তার সম্পর্কে বাংলা নিয়ে যারাই পড়ে তাদের অসীম দুর্বলতা। গত চার বছরে অনিমেষ ওঁর লেখা সব ছোটগল্প-উপন্যাস গোগ্রাসে গিলেছে। একটা অদ্ভূত জীবন যেন ছিটকে বেরিয়ে এসে হঠাৎ অন্যকরম আদল নিয়ে পাঠককে স্তস্তিত করে দেয় । ছোট গল্প যখন পড়ান তখন চট করে মনে হয় আমি প্যারিসের রাস্তায় হাঁটছি মোপার্সার হাত ধরে অথবা এডলেন আলান পোর সঙ্গে একটু আগে চা খেয়ে এলাম। পড়ানোটা এত আন্তরিক যে কান বন্ধ করতে ইচ্ছে করে না।

দরজার ধারে বসা দুতিনটি ছেলে অনিষেকে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে দেখে ইশারায় ভেতরে আসতে বলল। এরা স্কটিশ থেকে আসেনি। আলাপও হয়নি, কদিনের ক্লাসে শুধু চোখাচোখি হয়েছে মাত্র। মাথা নামিয়ে অনিমেষ চট করে দরজা ডিঙ্গিয়ে সামনের বেঞ্চিতে বসে পড়ল। দু-একজন তাকালো মাত্র কিন্তু কেউ কোন মন্তব্য করল না। অনিমষেকে যারা ডেকেছিল তাদের মধ্যে একজন, যে এখন ওর বামে বসে আছে, চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, কোন কলেজ?

স্কটিশ চার্চ, অনিমেষে উত্তর দিল।

চার্চ? ছেলেটা চোখ বড় করল, চার্চ না সার্চ? মেয়ে খোঁজার জায়গা? মাইরি তোমাদের কপাল সোনা দিয়ে বাঁধানো। আমাদের কলেজের ধারে কাছে মেয়ে ছিল না। দাঁত বের করে হাসল সে। ছেলেটিকে ভাল করে দেখল অনিমেষ। নীল ফুলহাতা শার্ট আর ধুতি পরনে, সাধারণ মানুষের তুলনায় যথেষ্ট বেঁটে। ওপরের দাঁতগুলো একটু উঁচু বলে মুখ খুললেই মনে হয় হাসছে। ছেলেটির কথা বলার ভঙ্গীতে এমণ একটা সহজ ব্যাপার ছিল যে অনিমেষ রাগ করতে পারল না। সে জিজ্ঞাসা করল, কোন কলেজ আপনার?

সিটি। কিন্তু নো আপনি-টাপনি। আমি শালা মেয়েদেরই ডাইরেক্ট তুমি বলছি।

এর মধ্যে কখন পড়ানো থেমে গিয়েছিল বুঝতে পারেনি অনিমেষ। হঠাৎ ছেলেটি পা দিয়ে ওর পায়ে টোকা মারতে দেখতে পেল ক্লাসসুদ্ধু সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখ তুলে তাকাতেই অধ্যাপকের সঙ্গে চোখাচোখি হল। লম্বা মানুষটা নীচের ঠোঁট দাঁতে চেপে টেবিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। একটা চাপা হাসি উঠল ঘরটায়, অনিমেষ বুঝতে পারছিল ওর মুখে রক্ত জমছে। অধ্যাপক এবার হাতের বইটা টেবিলের উপর মুড়ে রেখে খুব ধীর গলায় অনিমেষের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, খুব জরুরী কথা হচ্ছিল কি? উত্তর দিতে হলে উঠে দাঁড়াতে হয়, অনিমেষের মনে হল এর চেয়ে লজ্জা সে জীবনে কখনো পায়নি। ওই ছেলেটা যদি মিছিমিছি তার সঙ্গে কথা না জুড়াতো তা হলে এই পরিস্থিতিতে ওকে পড়তে হতো না। অনিমেষ উঠে দাঁড়িয়ে কোনরকমে ঘাড় নেড়ে না বলল।

আমরা কিন্তু একটু জরুরী কথা বলছিলাম, ছোটগল্প সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন সেটা এখন মানা যায় না। এ ব্যাপারে তুমি বোধহয় আমাদের সাহায্য করতে পারবে। অধ্যাপকের ঈষৎ সরু গলা অনিমেষকে কাঁপিয়ে দিল। ও অনুভব করছিল একটা বিরাট ফাঁদ ওর জন্য পাতা হচ্ছে এবং সেটা জানা সত্ত্বেও ওই ফাঁদে পা বাড়ানো ছাড়া তার কোন উপায় নেই।

অধ্যাপক বললেন, আচ্ছা, আজকালকার একটা গল্পের কথাই ধরা যাক। তুমি ইদানিং যেসব গল্প পত্রপত্রিকায় পড়েছ তার মধ্যে কোন গল্পটা তোমার সব চেয়ে ভাল লেগেছে, আমার ওই গল্পটা নিয়ে আলোচনা করতে পারি। অধ্যাপক ওর দিকে সহানুভূতির চোখে তাকালেন। সমস্ত ছেলেমেয়ের মুখ ওর দিকে ফেরানো। অনিমেষ বুঝতে পারছিল ওর সর্বাঙ্গে ঘাম জমছে। অনিমেষ চোখ বন্ধ করে গত পূজা সংখ্যা দেশ পত্রিকার সেই গল্পটা মনে করল। পড়তে পড়তে সমস্ত শরীর স্থির হয়ে গিয়েছিল। পড়া শেষ হল অনেকক্ষণ কথা বলতে পারেনি। প্রথমদিন ওই অধ্যাপকের ক্লাসে এসে সেই গল্পটার সঙ্গে ওঁকে মেলাতে চেষ্টা করেছিল সে। লেখকদের সঙ্গে লেখা মেলে না বোধহয়। মন ঠিক করে ফেলল অনিমেষ, তারপর পরিষ্কার গলায় জিজ্ঞাসা করল, আমি কি সত্যি কথা বলতে পারি?

আশ্চর্য! খামোকা মিথ্যে বলতে যাবে কেন? অধ্যাপক বিস্মিত হলেন।

এবার অনিমেষের মনে দ্বিধা নেই, সে গল্পটির নাম উচ্চারণ করল। সঙ্গে সঙ্গে অধ্যাপকের কপালে তিনটি ভাঁজ পড়ল, কোঁকড়া চুলে আঙুল বুলিয়ে ঠোঁট টিপে হেসে নিশব্দে পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমার কাঁচ মুছতে লাগলেন। কয়েকটা মুহূর্তের অপেক্ষা, বোধহয় অধ্যাপকের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যই, হঠাৎ ক্লাস ফেটে গেল হাততালিতে। সবাই প্রায় একসঙ্গে অনুরোধ করতে লাগল গল্পটি নিয়ে আলোচনা করতে। অধ্যাপক অনিমেষকে আর একবার দেখে টেবিল থেকে বই টেনে সবাইকে এক হাত তুলে থামালেন। তারপর বললেন, তুমি বুদ্ধিমান সন্দেহ নেই কিন্তু বুদ্ধিমানদেরও মনোযোগী হতে হয়। আচ্ছা, আমরা যেখানে থেমেছিলাম–

আবার পড়ানো শুরু হলো নতুন করে। অনিমেষ ধীরে ধীরে বেঞ্চিতে বসতেই পাশের ছেলেটি চাপা গলায় বলে উঠল, গুরু, একটা লেগ দেখি!

আর কথা বলতে এবার ভয় হল। সে জড়সড় হয়ে সামনে তাকিয়ে থাকল। অধ্যাপক তাকে যে ভাষায় তিরস্কার করলেন সে ভাবে কোন মানুষ তাকে কোনদিন করেনি। একটুও না রেগে যে ঠিক জায়গায় শাসনটাকে পৌঁছে দেওয়া যায় সেটা এই প্রথম অনুভব করল অনিমেষ। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ও মুখ নামাল। অধ্যাপকের সরু গলার মধ্যে এমন মাদকতা আছে, শব্দগুলো এমন গল্প হয়ে যায় যে সত্যি অন্য দিকে মন দিতে ইচ্ছে করে না। সামনে সারসার মাথা, অনিমেষ ছোটগল্পের ব্যাখ্যা শুনতে শুনতে হঠাৎ কেঁপে উঠল। সামনের মাথাগুলো সামান্য ফাঁক একটা সরল রেখায় অনেকটা দূরে চলে গিয়েছে। সেই রেখার শেষে যে বসে আছে তার দুটো চোখ এখন ওর মুখের ওপর নিবদ্ধ। অমন আয়ত গভীর দৃষ্টি যেন মনে হয় সমস্ত হৃদয় ওই চোখে মাখানো অনিমেষ বুকের মধ্যে অজস্র মাথাগুলো সামান্য নড়াচড়া করতেই চোখদুটো হারিয়ে গেল। বুকের মধ্যে থম ধরে গেছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। অনিমেষ কোন কারণ বুঝতে পারছিল না। এরকম হল কেন তার? অধ্যাপকের পড়ানোটা কান দুটোয় পৌঁছাচ্ছে না। যেন ওর সব ইন্দ্রিয় হঠাৎ অকেজো হয়ে গিয়েছে। শুধু দুটো চোখ একটা পদ্মফুলের মত মুখের ওপর থেকে সরাসরি উঠে এসে তার রক্ত নিয়ে খেলা করে যাচ্ছে। এর মধ্যে ঘন্টা পড়েছে, অধ্যাপক ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে করিডোরে দাঁড়িয়ে পড়েছেন কখন টের পায়নি অনিমেষ। কে একজন এসে ওকে বলল, স্যার তোমাকে পরে প্রফেসারস রুমে দেখা করতে বলেছেন।

অনিমেষ বেরিয়ে আসছিল হঠাৎ পেছন থেকে শুনল, লেগটা দিলে না গুরু? সে অবাক হয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই সিটি কলেজের ছেলেটিকে দেখতে পেল।

তোমাকে একটু প্রণাম করতাম। টি. জি.কে যেভাবে বোল্ড করলে গুগলি দিয়ে তুমি মাইরি সাধারণ মাল নও। সত্যি হাসল ছেলেটি।

অনিমেষ বলল, আমার নাম অনিমেষ, তোমার নাম কি? পরমহংস রায়। পরম বলে ডাকাই ভাল, শেষেরটা শুনলে খারাপ লাগে।

পরমহংস, অনিমেষের মুখ হাঁ হয়ে গেল। এরকম নাম কোন মানুষের হয়? ঘাড় নাড়ল ছেলেটি, হ্যাঁ, শুদ্ধচিত্ত সংযতাত্মা নির্বিকার ব্রহ্মানন্দে মগ্ন যোগীপুরুষ। আমার ঠাকুরদার আমাকে ওই ভূমিকায় দেখার বাসনা ছিল।

আরো তিন চারজন ছেলে ওদের ঘিরে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল, তারা এবার খুব জোরে হেসে উঠল। ওরা যখন কথা বলছে তখন অন্যান্য ছেলেমেয়েরা ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে যাওয়া-আসা করছে। বাংলা ক্লাসে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। অনিমেষ আড়চোখে তাদের দেখছিল। এখন সেই ঝিমঝিমে ভাবটা অনেক কম কিন্তু উত্তেজনা কমে গেলে ওর যেমন হয়, পেটের ভেতর চিনচিন করছিল। না, সেই চোখদুটোর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত সে ক্লাস থেকে বের হয়নি। এখন মুষ্টিমেয় ছাত্রী ওই ঘরে আছে, গেলেই দেখা হয়ে যাবে, কিন্তু অনিমেষের যেতে সাহস হচ্ছিল না। পরমহংস চা খাওয়ার প্রস্তাব করল কিন্তু অনিমেষের এখন কোথাও যেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু সে ভেবে পাচ্ছিল না তার এরকমটা কেন হচ্ছে? স্কটিশে ওদের সঙ্গে প্রচুর মেয়ে পড়ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাত্যিকারের সুন্দরী ছিল। কিন্তু কখনো তাদের দেখে ওর মনে এরকম চাঞ্চল্য আসেনি। নীপা বলে একটা মেয়ে ওদের সঙ্গে বাংলা অনার্সে ছিল। প্রথম দিনের পরই সে ওদের সঙ্গে তুই তোকারি করেছে, একটা ছেলের সঙ্গে নিজের কোন তফাত রাখোনি। অদ্ভূত ব্যাপার, ওদের সহপাঠীদের মধ্যে কেউই নীপাকে প্রেম নিবেদন করেনি। অথচ এখন ওই চোখদুটো দেখার পর থেকে ওর এরকমটা হচ্ছে কেন?

পরের ক্লাস আরম্ভ হবার সময় অনিমেষ দেখল সুদীপ করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছে। হাতে তেমনি আধপোড়া চুরুট। ওকে দেখে সুদীপ একটা হাত নেড়ে দাঁড়াতে বলল। অনিমেষের সাথে তখনও পরমহংস ছিল। সে চাপা গলায় বলল, লিডার আসছে, তুমি চেন নাকি?

অনিমেষ ঘাড় নেড়ে এক পা এগোতেই সুদীপ কাছে এসে গেল, তোমাকে খুঁজছিলাম, এইটে তোমার ক্লাস?

হ্যাঁ।

তোমাকে আমারেদ ভীষণ প্রয়োজন কমরেড।

একটা অবাক গলায় অনিমেষ বলল, কেন?

শোন, তুমি অবশ্যই তিনটের সময় লনের মিটিং-এ যাবে আর বাঁ দিকের থামের নীচে দাঁড়াবে। যাতে প্লাটফর্ম থেকে তোমাকে স্পষ্ট দেখা যায়। নেবা চুরুটটা টানল সুদীপ।

০৬. তিনটের ক্লাসটা শেষ হলে

তিনটের ক্লাসটা শেষ হলে অনিমেষ পরমহংসকে বলল, চল একবার নীচের লনে যাই।

পরমহংস বলল, ধ্যুৎ, ওখানে গিয়ে কি হবে! রোজ এক কথা, এস এফ বলবে তাদের মত ভাল দল আর কেউ নেই ছাত্র পরিষদ বলবে ওরাই ধোয়া তুলসীপাতা। এসব শুনে আমার কি লাভ হবে? ওসব ছেঁড়াছেঁড়ি খাওয়াখায়ির মধ্যে আমি নেই।

অনিমেষ হেসে ফেলল বলার ধরনে, তুমি দেশের কথা ভাবো না?

দেশের কথা? হাঁ করে তাকাল পরমহংস, তুমি তো হেভি খ্যাপা! দেশের কথা কেউ ভাবে নাকি! সবাই নিজের ধান্দা হাসিল করার জন্য দেশের নামটা ব্যবহার করে। যে যত দেশের কথা বলবে সে তত মাল গোটাবে।

অনিমেষ বলল, ঠিক আছে, তবু মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে যাই চল, তা ছাড়া স্টুডেন্টস লিডাররা নিশ্চয়ই আমাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলবে, দেশের ব্যাপারটা তো এখানে জড়িত নয়। অনিমেষের একা যেতে ভাল লাগছিল না। স্কটিশে সে অনেককে বক্তৃতা করতে দেখেছে কিন্তু সেগুলো কেমন ছেলেমানুষী ব্যাপার। শোনার ইচ্ছে হতো না তেমন। আজ বিমানের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর একটা কৌতূহল ওর মনে জেগেছে, ওরকম ধীর স্থির এবং সুবাসদার কথামত পলিটিক্যালি কনসাস একটি ছেলে কেন একবারও দলের ছেলেদের বলল না কেউ ওর গায়ে হাত তোলেনি। নিশ্চয়ই হঠাৎ-ডাকা আজকের মিটিং-এ এ ব্যাপারে কিছু জানা যাবে।

পরমহংস বলল, আচ্ছা, প্রথম দিন, তোমার কথা ফেলব না। কিন্তু ম্যাক্সিমাম পাঁচ মিনিট, তারপর কেটে পড়ব।

অনিমেষ জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি এখন বাড়ি ফিরে পড়াশুনা কর?

পরমহংস ঘাড় বেঁকিয়ে ওর মুখের দিকে পিটপিট করে তাকাল, তুমি মাইরি হয় ডুপ্লিকেন, নয় মেড ইন মফস্বল। কোনটা?

অনিমেষ হেসে বলল, প্রথমটা কি আমি বুঝতে পারছি না, তবে আমার বাড়ি ডুয়ার্সে।

তাই বল! নইলে এসব ফর্মা বেরয় মুখ থেকে! বাংলা নিয়ে এম এ বেশির ভাগ ছেলে পড়ে কেন জানো না? পড়ে যাতে ক্লাসের বাকী সময়টা আড্ডা মারা যায়। যারা ফার্স্ট ক্লাসের ধান্দায় থাকে তাদের কথা আলাদা, সেকেন্ড ক্লাস এম-এ’র জন্য পরীক্ষার আগে ছাড়া বাংলা পড়তে হয় না। আমি এখান থেকে বেরিয়ে কফি হাউসে যাব, তারপর হেঁটে চিৎপুরে গিয়ে টিউশানি সেরে বাড়ি ফিরব। পরমহংস জিভে একটা তিক্কুটে শব্দ করল।

এতক্ষণে সব ছেলেমেয়েরা ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেছে। আজ ওটাই শেষ পিরিয়ড ছিল। অনিমেষ দেখল তিনটি মেয়ে নীচু গলায় কথা বলতে বলতে ক্লাস থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গের। তাদের একজনের মুখ নীচে নামানো, কিন্তু অনিমেষের বুঝতে একটুও অসুবিধে হল না এই সেই মেয়ে। ওরা তিনজনই কিন্তু একবারও এদিকে ফিরে তাকাল না। মুখ না দেখতে পেলেও অনিমেষ শরীরটাকে পেছন থেকে দেখে সম্পূর্ণ চেহারাটা অনুমান করে ফেলল। অত সুন্দর চেহারার মেয়ে অমন করে ওর দিকে চেয়েছিল কেন? শুধুই কৌতূহল? তার উত্তর শুনে অন্য ছেলেমেয়েরা খুশি হয়েছিল যেমন, তেমনি ওরা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল এইমাত্র। কিন্তু ওই চোখ দুটোর মধ্যে কেন অত কথা জমা থাকে?

পরমহংস ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল, চাপা গলায় বলল, পিচ খুব খারাপ গুরু। ডিফেনসিভ না খেললেই আউট হয়ে যাবে।

থতমত হয়ে অনিমেষ বলল, মানে?

পরমহংস পরিচয় করিয়ে দেবার ভঙ্গীতে বলল, ওনারা বেথুনের জিনিস। তিন দিনেই বুঝে গেছি নাকের ডগা আকাশে বেঁধে রেখে এসেছেন।

ওরা লনে এসে দেখল তেমন কিছু হয়নি। বড় জোর শখানেক ছেলে এবং কিছু মেয়ে একটা উঁচু চাতালের সামনে জমা হয়েছে। মাইকের কথা তখন নিষেধ করেছিল বিমান কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে একটা পোর্টেবল মাইক এসে গেছে। তাতে একজন ছাত্রবন্ধুদের কাছে সমানে আবেদন জানিয়ে যাচ্ছে সভায় দলে দলে যোগদানের জন্য। চাতারের পেছনে লাল কাপড়ে ছাত্র ফেডারেশনের ফেস্টুন টাঙানো। অনিমেষ আর পরমহংস সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ওদের দেখছিল। হঠাৎ পরমহংস ওকে মনে করিয়ে দিল, এই, তোমাকে লিডার আদেশ করে গেল বাঁ দিকের থামের নীচে দাঁড়াতে, এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? চল ওপাশে গিয়ে দাঁড়াই।

কথাটা তখন খেয়াল করেনি, এখন মনে পড়তে অনিমেষ দ্বিধায় পড়ল। সুদীপ তাকে ওই জায়গাটা দাঁড়াতে বলেছিল যাতে মঞ্চ থেকে ওকে ওরা দেখতে পায়। মঞ্চ যদি ওই চাতালটা হয় তা হলে সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে দেখার কি দরকার? নাকি ওরা দেখতে চায় সে সভায় হাজিরা দিয়েছে, মন দিয়ে বক্তৃতা শুনছে? রাগ হয়ে গেল অনিমেষের সে এমন কিছু কথা দিয়ে আসেনি যে বিমানরা ওর ওপর এখন থেকেই কর্তৃত্ব করবে! মিটিং-এর বক্তব্য সে শুনতে চায়, কেউ দেখুক বা না দেখুক তার বয়ে গেল। সে পরমহংসকে বলল, এখান থেকেই বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ওদিকে যাওয়ার দরকার নেই।

একটু বাদেই চাতালের পাশে দাঁড়ানো ছেলেমেয়ের সমবেত শ্লোগানের পর বিমান এসে মাঝখানে দাঁড়াল। ওর হাতে কিন্তু মাইক নেই। সবাই চুপ করতে ওর গলা শোনা গেল, বন্ধুগণ, আপনারা আমার সংগ্রামী অভিনন্দন গ্রহণ করুন। আজকের এই সভার পেছনে কোন প্রস্তুতি নেই, বিশেষ কারণে আমাদের মিলিত হবার প্রয়োজন হয়েছে। একটু থামল বিমান, অনিমেষ লক্ষ্য করল বিমানের বলার ভঙ্গী খুব স্বচ্ছন্দ, যেন এক টেবিলে বসে কথা বলছে। তা ছাড়া ওর গলার স্বর যে ওইরকম পর্দায় পৌঁছাতে পারে, না শুনলে অনুমান করা যায় না। ওরা যে এত দূরে আছে কিন্তু শুনতে একটুও অসুবিধে হচ্ছে না। বিমান তখন কেন মাইক প্রয়োজন হবে না বলেছিল এখন বোঝা গেল।

বন্ধুগণ! আপনারা জানেন ছাত্র ফেডারেশন কখনই হিংসায় বিশ্বাসী নয়। আমরা গণতান্ত্রিক উপায়ে দেশ এবং ছাত্রবন্ধুদের কাজ করতে চাই। মিথ্যে কুৎসা এবং ভন্ডামিকে আমরা ঘৃণা করি। কিন্তু আমাদের ওপর সেইসব জঞ্জাল চাপিয়ে দেবোর একটা ষড়যন্ত্র চলছে। আমাদের কমরেডদের দিনরাত প্ররোচনা করা হচ্ছে উত্তেজিত হতে। একবার যদি উত্তেজিত করতে পারে আমাদের কর্মীদের তা হলে যে ভুল তারা করবে তার ফসল তুলতে ওরা মুখিয়ে আছে। আমি আমার বন্ধুদের কাছে আবেদন করছি কোন অবস্থাতেই আপনারা উত্তেজিত হবেন না। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে আমরা নাকি ওদের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছি এবং নবাগত বন্ধুরা সেইসব মহামূল্যপোস্টার দর্শনে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভাল কথা কিন্তু কে কখন কি পোস্টার ছিঁড়ছে তার কোন প্রমাণ ওঁরা আমাকে দেননি। আমরা হাওয়ার ওপর বাস করতে পারি না। আর তাদের পোস্টারে কি লেখা থাকে? না, তাদের উদ্দেশ্য বা কর্মপন্থার খবর সেখানে পাবেন না। নবাগত ছাত্রদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন আমাদের গালাগালি দিয়ে। একটা পোস্টারে যদি আশি ভাগ আমাদের কথা লেখা থাকে তা হলে সেটা ওদের পোস্টার কি করে হল! আমি ওদের কাছে সামান্য ভদ্রতা আশা করেছিলাম, কিন্তু উলটে ওরা আমাকে চোখ রঙিয়ে গেল।

নতুন বন্ধুরা নিশ্চয়ই ভাবছেন আমি কাদের কথা বলছি। না, দক্ষিণপন্থী ছাত্র ফেডারেশন সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই। মানুষ যখন ধর্মচ্যুত হয় তখন তার মস্তিষ্ক স্থির থাকে না, না হলে আজ ওরা প্রতিক্রিয়াশীলদের সঙ্গে হাত মেলাবে কেন? আমি ছাত্র পরিষদের কথা বলছি। ওরা বলে এই দেশে স্বাধীনতা ওরাই এনেছে, এই দেশকে সোনায় মুড়ে দেবার জন্য ওরা সংগ্রাম করছে। আমরা নাকি চীনের দালাল, দেশের শত্রু। এই কথা নিয়ে আমি অনেকবার সভায় বলেছি, আমাদের বক্তব্য আপনারা জানেন। চীন না আমেরিকা, সে প্রশ্নে আমি যেতে চাই না। কিন্তু সোনায় মুড়ে দেবার ব্যাপারটা কার ক্ষেত্রে খাটে! দশটা পরিবারকে সোনায় মুড়ে দেবার জন্যে ওরা এই দেশের মানুষকে ছিবড়ে করে দিয়েছে সে কথা কেউ অস্বীকার করতে পারে? আমাদের গালাগাল না দিয়ে ওরা ভেবে দেখুক তারা কার দালাল। ওদের হাতে সরকার আছে, পুলিশ আছে, শুধু গায়ের জোর আর ভাতা দিয়ে সাধারণ মানুষকে কদিন দমন করে রাখা যায়? বিমান সামান্য থামল, শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতিটা বোধ হয় বুঝতে চাইল। পরমহংস চাপা গলায় বলল, এবার নির্ঘাত হাততালি পড়বে। কিন্তু কথাটা ঠিক হল না, বিমানের বক্তৃতায় শ্রোতাদের মনে কি প্রতিক্রিয়া হল বোঝা গেল না। কারণ, সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, বিমান আবার গলা তুলল, যারা আমাদের চীনের দালাল বলে জনসাধারণকে ধোকা দিচ্ছে তাদের জেনে রাখা উচিত আমরা জনসাধারণের সুখ-দুঃখে তাদের সঙ্গেই আছি, কারণ আমরাই তাদের লোক, কয়েকজন শিল্পপতির দালাল নই। বন্ধুগণ, বর্তমান কংগ্রেস সরকার দেশের অর্থনীতি থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা সব জায়গায় অরাজকতা সৃষ্টি করতে চান যাতে মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায় ছাত্র পরিষদের বন্ধুরা সেই কাজই করছে। আমি আপনাদের সামনে এরকম একটি জঘন্য কাজের নমুনা উপস্থিত করতে পারি। এই সরকারের পুলিশ, ছাত্র পরিষদের পুলিশ যে কত নির্মম তার শিকার আমাদের এক ছাত্রবন্ধু, যিনি তার জীবনের অমূল্য একটি বছর হারিয়েছেন। কমরেড অনিমেষ, আপনাকে অনুরোধ করছি আপনি দয়া করে এগিয়ে আসুন।

সমস্ত শরীর কাঁপয়ে একটা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর অনিমেষ আবিষ্কার করল ওর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। পরমহংস ওর বাহু ধরে বলে উঠল, এই তোমার নাম করছে! ওর কথা যাদের কানে গিয়েছিল তারা অবাক চোখে অনিমেষকে দেখতে লাগল । বিমানের ইচ্ছেটা বুঝতে পারছিল না অনিমেষ। সমস্ত ব্যাপারটাই একটা ধাঁধার মতন। ছাত্র পরিষদের ছেলেরা তাকে মেরেছে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে সভা ডেকেছে বিমান। এখন ও সে প্রসঙ্গে না গিয়ে হঠাৎ তার নাম ধরে ডাকাডাকি কেন? তার একটা বছর নষ্ট হয়েছে এটা একান্তই নিজস্ব ব্যাপার, বিমানের এ ব্যাপারে কি বলার আছে। পুলিশ তো তাকে ছাত্র ধারণা করে গুলী করেনি।

বিমান আবার ডাকল, অনিমেষ, কমরেড, আপনি এগিয়ে আসুন। এটা দ্বিধা করার সময় নয়, সমবেত ছাত্রবন্ধুদের ব্যাপারটা জানানো দরকার। বিমানের চোখ বাঁ দিকের থামের কাছে, সেখানে সুদীপকে ব্যস্ত হয়ে কাউকে খুঁজতে দেখা গেল। এবার অনিমেষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল কেন সুদীপ তাকে ক্লাসে এসে ওখানে থাকতে বলে গেছে। কিন্তু বিমান তো মিটিং ডাকার কথা বলেছে তার ব্যাপারটা জানবার আগেই, তা হলে আসল প্রসঙ্গে না গিয়ে ওকে নিয়ে পড়ল কেন?

উপস্থিত ছাত্রছাত্রীরা এখন উসখুস করছে। ব্যাপারটা যেন খুব মজার, জেনারেল সেক্রেটারী যার নাম ধরে ডাকছে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিমানের মুখ লাল হয়ে উঠেছে এর মধ্যে, পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছতে মুছতে সে চারপাশে তাকাচ্ছিল। হঠাৎ একটা ছাত্র অনিমেষকে বলল, আপনার নাম কি অনিমেষ? ওর বদলে পরমহংস ঘাড় নাড়তে ছেলেটি বলল, আপনাকে বিমান ডাকছে শুনতে পাচ্ছেন না?

এবার অনিমেষের মেজাজ গরম হয়ে গেল। তাকে ডাকলেই যেতে হবে? আর এই পরমহংসটা যদি তার নাম উচ্চারণ না করত তা হলে এতক্ষণে ওপাশ দিয়ে স্বাচ্ছন্দে বেরিয়ে যেতে পারত। কিন্তু এখন আরো অনেকের চোখ এদিকে পড়েছে। কি করা যায়? পরমহংস চাপা গলায় বলল, ওপেনিং ব্যাটসম্যানদের ভয় পেলে চলে না। সোজা ক্রিজে দাঁড়িয়ে ব্লক করতে শুরু করে দাও।

এর মধ্যে সুদীপ ওখানে পৌঁছে গেছে। অনিমেষের এক হাত ধরে সে প্রায় টেনে নিয়ে যেতে লাগল সামনে। প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল অনিমেষ, আমি কি করব, আমাকে ডাকছেন কেন? সুদীপ কোন জবাব দিচ্ছিল না। বিমান ওদের দেখতে পেয়ে আবার গলায় জোর পেল, এই যে, আমাদের বন্ধু কমরেড অনিমেষ এসে গেছেন। কোন কোন মানুষ প্রচার চান না, নীরবে কাজ করে যেতে ভালবাসে, অনিমেষ সেইরকম একজন। অত্যন্ত লাজুক এই ছেলেটি তাই আমার ডাকে একটু বিব্ৰত হয়ে পড়েছেন। যা হোক, আমি যে মিথ্যে বলিনি সেটা একটু বাদেই আপনারা বুঝতে পারবেন।

ততক্ষণে আনিমেষ চাতালের কাছে পৌঁছে গেছে। বিমান এগিয়ে এসে ওর হাত ধরে চাতালে তুলে দিল। অনিমেষ এমন নাভার্স হয়ে গিয়েছিল যে ওর গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছিল না। বিমান চাপা গলায় বলল, ডোন্ট গেট নার্ভাস। এটা খুব ইম্পর্টেন্ট সময়। কোন রকমে অনিমেষ বলতে পারল, আমি কি করব বিমানদা? বিমান কোন উত্তর না দিয়ে শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে হাত মাথার ওপর তুলে সবাইকে চুপ করতে বলল। গোলমাল একটু শান্ত হয়ে এলে বিমান আবার কথা শুরু করর, বন্ধুগণ, কমরেড অনিমেষ এখন আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছেন। উনি এ বছর বাংলা নিয়ে এম এ পড়া শুরু করেছেন। কিন্তু এই বছর ওঁর সিক্স ইয়ার হওয়ার কথা ছিল। কে তার এই সর্বনাশ করল, না আমাদের উপকারী বন্ধু পুলিশ। বিনা প্ররোচনায় সম্পূর্ণ অকারণে অনিমেষকে গুলী করে মেরে ফেলতে চেয়েছিল তারা। যখন অনিমেষ মাটিতে পড়ে একটু নিঃশ্বাসের জন্য ছটফট করছেন তখনও তারা অত্যাচার থামায়নি। আমাদের সৌভাগ্য যে তবু তিনি বেঁচে গেছেন আপনারা দেখুন, নিজের চোখে সেই বিভৎস অত্যাচারের নমুনা দেখুন। গঙ্গায় অনেক জল বয়ে গেছে, সময় থেমে থাকেনি, কিন্তু সেই রক্তাক্ত অত্যাচার ওর শরীরে চিরকালের জন্য ছাপ রেখে গেছে। কোন ভাওতা সেটা মুছে ফেলতে পারবে না। অনিমেষ, আপনি সঙ্কোচ করবেন না, আমাদের ছাত্রবন্ধুদের ওই দাগটি দেখান। কুলকুল করে ঘামতে লাগল অনিমেষ। ওর মাথায় আর কিছু ঢুকছিল না। কেন তাকে ওই দাগ দেখাতে হবে এবং সেটা করতে তার ইচ্ছে আছে কিনা এসব কথা তাকে আলোড়িত করছে। এখন যে-কোনভাবে সে নেমে যেতে পারলেই বাঁচে। সামনে সারি সারি মুখ উগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে তারই দিকে। পাশে বিমান ছাড়া সুদীপ এবং আরো কয়েকজন এসে দাঁড়িয়েছে। বিমান আবার চাপা গলায় কিছু বলল কিন্তু সেটা আর কানে ঢুকছে না অনিমেষের। কিন্তু তার পরনে প্যান্ট আর দাগটা হাঁটুর ওপরে, কি করে সহজ ভঙ্গীতে সেটা এত মানুষকে দেখানো যায়!

সুদীপ বলল, বৃস্টিতে আমরা যে ভাবে প্যান্ট রাস্তায় জল ভাঙ্গি সেভাবেই না হয় প্যান্টটাকে গুটিয়ে নিন কমরেড।

বক্তৃতা নয়, যেন নাটক দেখছে একটা, ছাত্রদের মধ্যে উৎসাহ হাজারগুন বেড়ে গেল। ঠেলেঠুলে চাতালের কাছে আসবার চেষ্টা করতে লাগল সবাই, যেন কাছাকাছি হলে ভাল করে দেখা যাবে এবং সে সুযোগ কেউ হারাতে চাইছে না। প্রথমে যত শ্রোতা ছিল এখন তার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। সম্মোহিতের মত নীচু হয়ে ও প্যান্টের তরায় হাত দিল। একটা একটা ভাঁজ ফেলতে ফেলতে প্যান্টটা হাঁটুর ওপরে উঠে এল । ততক্ষণে ভাঁজগুলো মোটা হয়ে গেছে বেশ, পরের ভাঁজটা করতেই একটা অস্ফুট আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল সামনের মানুষগুলোর মুখ থেকে। তেলতেলে বীভৎস চামড়াটাকে পরমুহূর্তেই আড়াল করে প্যান্টটাকে নামিয়ে আনল অনিমেষ। বিমান ততক্ষণে কথার সূতো ধরেছে, বন্ধুগণ আপনারা নিজের চোখে আজ দেখলেন। কিন্তু যারা গুলী করেছিল তারা জানে না ওই বীভৎস চিহ্নটা আগামীকালের একজন সৈনিক তৈরি করে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত লন কাঁপিয়ে হাততালি উঠল। বিমান চিৎকার করল, ছাত্র ঐক্য জিন্দাবাদ, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিধ্বনি উঠল জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক–নিপাত যাক নিপাত যাক। দালালদের চিনে নিন–এই মাটিতে কবর দিন।

এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে রক্ত অনিমেষের শরীরে যেন ফিরে আসছিল। ক্রমশ অন্ধ রাগ এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া কান্না ওর দুটো চোখ ঝাপসা করে দিলে । আজ প্রকাশ্যে যে কাজটা সে করল সেটা করার জন্য কোন রকম মানসিক প্রস্তুতি তার ছিল না। মাঝে মাঝে স্নান করার সময় গোপনে ওই দাগটাকে সে দেখেছে, আঙ্গুল বুলিয়ে সেই যন্ত্রণাকে সে স্পর্শ করেছে, কিন্তু সেটা ছিল তার একদম নিজস্ব ব্যাপার। সেটাকে এমন প্রকাশ্যে হাজির করে সবার করুণা কুড়োতে যাওয়ার মধ্যে এমন একটা অপমান আছে যেটা এতক্ষণে তার ভিতর বাইরে জ্বলুনি ছড়াচ্ছে। নিজেকে সঙের মত মনে হচ্ছে এখন। ছাত্র ফেডারেশনের জয়ধ্বনি দিয়ে জমায়েতটা তখনই শেষ হল ।

ওরা চাতাল থেকে নেমে এলেও কিছু উৎসুক ছাত্র অনিমেষের চারপাশ ঘিরে ধরল। সবাই জানতে চাইছে কি অবস্থায় পুলিশ গুলী করেছিল, তখন অনিমেষ কি করছিল এবং ব্যাপারটা কত দিন আগে ঘটেছিল–এইসব। বিব্ৰত অনিমেষকে সরিয়ে আনল সুদীপ। সে ছেলেদের বলল, আপনারদের আগ্রহ স্বাভাবিক, কিন্তু অনিমেষ একটু আপসেট হয়ে আছে, প্লিজ এ নিয়ে এখন আলোচনা করবেন না। সুদীপ যখন ওকে নিয়ে এগোচ্ছে তখনও ছেলেরা পেছন পেছন আসছিল। তা দেখে সে অনিমেষকে বলল, ভিনি ভিডি ভিসি। এক দিনেই তুমি হিরো হয়ে গেলে। বাংলাদেশে ফিল্ম স্টারদেরই এইভাবে ক্রাইড ফলো করে। কনগ্রাচুলেশনস। সত্যি বলতে কি, অনিমেষের এখন একা হাঁটতে ভয় করছিল । এত লোক যদি তাকে নানান রকম প্রশ্ন শুরু করে তা হলে ও পাগল হয়ে যাবে। তা ছাড়া বিমানের সঙ্গে কথা বলা দরকার। এই রকম একটা ব্যাপার করার আগে বিমান কেন তার সঙ্গে পরামর্শ করেনি? সুবাসদা তার সঙ্গে বিমানের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল মাত্র, তার মানে এই নয় যে বিমান ইচ্ছেমত সিদ্ধান্ত নেবে। সুদীপ তাকে যেখানে নিয়ে এল সেটাই যুনিয়ন রুম সেটা বুঝতে সময় লাগল। চতুর্দিকে নানা রকম ফেস্টুন, পোস্টার স্তূপ রাখা আছে। বেঞ্চিতে বেশ কিছু ছেলে সরবে আলোচনা করছে। গলায় স্বরে বোঝা যায় তারা এখন খুব খুশি। ওপাশের একটা টেবিলে বিমান কয়েকজনের সঙ্গে বলছিল, ওদের দেখে হাসল, এসো অনিমেষ, প্রথমবার য়ুনিয়ন অফিসে আসাটা একটু সেলিব্রেট করি। এই ক্যান্টিনে চা বলে এসো তো। পাশের একটি ছেলেকে কথাটা বলতেই সে ব্যস্ত ভঙ্গীতে চলে গেল।

ওদের দেখে দুটো চেয়ার খালি হয়ে গিয়েছিল আর একটাতে সুদীপ বসে দেশলাই-এর কাঠি দিয়ে চুরুটটা ঠিক করতে লাগল। অনিমেষ বসতেই বিমান বলল, তোমাকে অ্যাডভ্যান্স করগ্রাচুলেশন জানিয়ে রাখি, নেক্সট য়ুনিয়ন ইলেকশনে তোমাকে হারাতে পারে এমন কোন ক্যান্ডিডেট নেই।

অনিমেষ হাঁ হয়ে গেল। ইলেকশন? মানে যুনিয়নের নির্বাচনের কথা বলছে বিমান? সে ইলেকশনে দাঁড়াবে? সে দাঁড়ালে ছাত্ররা তাকে ভোট দেবে? চট করে বাবার মুখটা মনে পড়ে গেল ওর। কোন রকম রাজনীতি কিংবা যুনিয়নের মধ্যে যেতে তিনি পাই পাই করে নিষেধ করে গেছেন। এতদিন, স্কটিশের পড়ার সময়ে সে কখনই সেই আদেশ অমান্য করেনি। করেনি তার কারণ শুধু বাবা নন, সে নিজে ব্যাপারটা ঠিক ঠাক বুঝতে পারছিল না, পরবর্তী সময়ে দেশের কাজ করার যে ইচ্ছে শৈশবে ওর মনে জন্ম নিয়েছিল পনেরই আগষ্টের সকালে, নিশীথবাবু কংগ্রেসর পতাকার তলায় সেই ইচ্ছেটাকে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সুনীলদা বামপন্থী রাজনীতিতে তাকে আকৃষ্ট করেন। এখন এই কোলকাতায় বিগত কয়েক বছরের অরাজনৈতিক জীবনে সে নিজে মনে মনে অনেক কিছু ভাবত এবং সেই ভাবনাগুলো কংগ্রেস সমর্থনপুষ্ট ছিল না। তাই বলে কম্যুনিস্ট পার্টিতে সরাসরি কাজ করবে কিনা এ ব্যাপারটা কখনো স্পষ্ট ছিল না। ছাত্র ফেডারেশন করা মানে কম্যুনিস্ট পার্টি করা নয়। কিন্তু এতদিন সে জেনে গেছে যে কোন ছাত্রসংগঠনের কর্মপদ্ধতি এক একটা রাজনৈতিক দলের আদর্শে নিয়ন্ত্রিত হয়। অনিমেষ বিমানকে সরাসরি বলে ফেলল, আপনি আজ যে কাজ করলেন সেটা আগে জানলে আমি উপস্থিত থাকতাম না।

চা এসে গিয়েছিল, কাপটা এগিয়ে দিয়ে ভ্রূ কোঁচকাল বিমান, মানে?

এইভাবে নিজেকে এক্সপোজ করে সিমপ্যাথি পাওয়া খুব লজ্জার। তা ছাড়া ওই বুলেটের দাগটা পুলিশ আমাকে ছাত্র হিসেবে দেয়নি। ট্রাম পুড়ছিল, ওরা ফায়ার করেছে, আমি আহত হয়েছি মাঝখানে পড়ে গিয়ে। এর সঙ্গে আন্দোলনের কোন সম্পর্কে নেই। অনিমেষ সোজা চোখে বিমানের দিকে তাকাল।

হেসে ফেলল বিমান, তুমি নেহাতই ভাল মানুষ। ঠিক আছে, তুমি তো শিশু নও, যখন আমি তোমাকে ডেকে দাগটা দেখাতে বললাম তখন প্রতিবাদ করলে না কেন?

মুখ নামাল অনিমেষ, তখন কেমন হয়ে গেলাম, আর তা করলে আপনাকে অপমান করা হতো।

কথাটা শুনে শব্দ করে হেসে উঠল বিমান। ঘরের সবাই এবার ওদের দিকে তাকিয়ে দেখছে। বিমান হাসি শেষ করে বলল, তা হলে বোঝা যাচ্ছে তোমার কোন মানসিক সুস্থিতি নেই। দ্যাখো, মহাভারতেই তো আছে ভালবাসা এবং যুদ্ধে কোন রকম অন্যায় নেই। শঠতা সেখানে একটা জয়ের কৌশল মাত্র। আমরা চাই সমস্ত ছাত্রছাত্রী এই সংগঠনের সঙ্গে আসুক যাতে আমরা আরো সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারি। সব মানুষ যদি আজ কমনিস্ট পার্টির পাশে দাঁড়ায়, তা হলে রাতারাতি দেশের চেহারা বদলে যাবে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এবং বুর্জোয়া দল তা হতে দেবে না। তারা বাধা দেবে কায়েমী স্বার্থের দুর্গ আগলে রাখতে। তাই এখন লড়াই শুরু হয়ে গেছে। যুদ্ধে আনফেয়ার শব্দ অচল। তা ছাড়া পুলিশ যে তোমাকে গুলী করেছে এতে কোন মিথ্যে নেই, তাই না?

ঠান্ডা চা মুখে দিতে ইচ্ছে করছিল না। বিমানের কথাগুলোর ঠিক কিভাবে প্রতিবাদ করা যায়, বুঝতে না পেরে সে চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থাকল। হঠাৎ বিমান কেমন অন্যরকম গলায় ওকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কি ইলেকশনে দাঁড়াতে ইচ্ছে নেই?

অনিমেষ সরর হয়ে বলল, আমি বুঝতে পারছি না।

কেন? সুবাসদা বলে গেলেন তুমি আমাদের মত এবং আদর্শকে সমর্থন করো। তা হলে এটাই তো একমাত্র রাস্তা। বিমান অবাক হল।

দেশের কাজে সঙ্গে য়ুনিয়নের কি সম্পর্ক?

বাঃ, কোন শিশু কি এক দিনেই হাঁটতে শেখে? তাকে একটা নিয়মের মধ্যে হতে হয়। ছাত্র ফেডারেশনে সক্রিয় কাজ করতে তুমি ছাত্রদের প্রব্লেম নিয়ে কিছু করতে চেষ্টা করবে। এটাকেই একটা মিনি দেশ ভাব না কেন! সেই সঙ্গে সাধারণ ছাত্রদের দেশের রাজনৈতিক ফোকরগুলো যদি চিনিযে দাও, তারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের প্রতি যদি সহানুভূতি আনতে সাহায্য করে তা হলে এরাই যখন পরবর্তী কালে দেশের নাগরিক হবে তখন আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানো অনেকটা সহজ হয়ে যাবে, তাই না?

এই সময় আরো কিছু ছেলে এসে বিমানের কাছে দাঁড়াল। ওদের দেখে বিমান অনিমেষকে বলল, কমরেড, আজ এই পর্যন্ত, আর এক দিন না হয় আমরা বসব। তুমি মন ঠিক করে নাও। দুর্বলতা থেকে কখনই কোন ভাল সৃষ্টি হয় না।

অনিমেষ বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল বিকেল শেষ হতে চলেছে। সামনে একদম ফাঁকা। কোন রকম ছাত্রছাত্রী ধারে-কাছে নেই। সাধারনত সে কলেজ স্ট্রীটের দরজা দিয়ে আসা-যাওয়া করে, আজ হেয়ার স্কুলের পাশে রাস্তাটা দিয়ে বেরুল। দরজার সামনেই বিরাট পোস্টার, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা, বিয়েৎনাম থেকে হাত ওঠাও। পাশের ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটা আমেরিকান বেয়নেটের ডগায় ভিয়েতনামী শিশুকে গেঁথে রাক্ষুসে হাসি হাসছে। ছবিটা অনেকক্ষণ দেখল অনিমেষ। ভিয়েনামের ঘটনা এতদিনে তার জানা হয়ে গেছে। হো চি মিন নামের একজন মানুষের নেতৃত্বে নিরক্ষর অসহায় ভিয়েনামীরা আজ এক হয়ে আমেরিকান মিলিটারীর বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কোথায় আমেরিকা আর কোথায় ভিয়েতনাম, তবু সেখানে সাম্রাজ্য অটুট রাখার বাসনায় আমেরিকা পাশবিক শক্তি প্রয়োগ করে একটা দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষকে দাবিয়ে রাখতে চাইছে। কেন? শুধু ক্ষমতার অহঙ্কার মানুষকে কতটা উন্মত্ত করতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ । ছবিটা মাথায় নিয়ে অনিমেষ হেঁটে প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনে চলে এল। ততক্ষণে ওর পরমহংসের কথা মনে পড়ল। সেই সুদীপ যখন ওকে চাতালের দিকে ধরে নিয়ে গের তারপর আর ওর দেখা মেলেনি। তখন ওর ওপর খুব ক্ষেপে গিয়েছিল অনিমেষ কিন্তু এখন আর রাগটা নেই। পরমহংস তো ইচ্ছে করে তাকে বিপাকে ফেলবে বলে নাম ধরে ডাকেনি। ছেলেটার সঙ্গে আজই আলাপ কিন্তু বেশ ভাল লেগেছে অনিমেষের। খুব সহজ হয়ে ফটাফট কথা বলতে পারে। মনে পড়ল পরমহংস বলেছিল মিটিং থেকে বেরিয়ে কফি হাউসে যাবে, সেখান থেকে টিউশানি । ওর পোশাক দেখে অবস্থা খারাপ বলে মনে হয় না, তবু টিউশানি করে কেন? অনিমেষের মনে হল বাবার পাঠানো গোণাগুণতি টাকায় তাকে যখন খুব কষ্ট করে চালাতে হয় তখন সেও তা পরমহং&